Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Rabeya
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
রাবেয়া।
( নাটক
শ্ৰীবীরেন্দ্র নাথ রায়
প্রণীত।
প্রকাশক
শ্রীবিনােদবিহারী বিশ্বাস
চিথলিয়া-নদীয়া।
ফান, ১৩১৬।
মূল্য ১ এক টাকা মাত্র।
কলিকাতা,
২৫নং রায়বাগান ষ্ট্রীট, ভারতমিহির যন্ত্রে,
শ্রীমহেশ্বর ভট্টাচাৰ্য্য দ্বারা
মুদ্রিত।
উপহাৰ।
কায়স্থ-কুল-গৌরব
পরম শ্রদ্ধাস্পদ
প্রাচ্যবিচ্ছিরােমণি
পণ্ডিতবর
শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু
প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব
মহাশয়ের
করকমলে
অকৃত্রিম শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ
এই নাটকখানি
সমৰ্পণ করিলাম।
গ
No text on this page.
গ্রন্থকারের নিবেদন। ‘উম্ অ খয়ের রাবেয়া’ মােসলেম সুফী সম্প্রদায়ে বিশেষ পূজনীয় ঐতিহাসিক মহিলা। কিন্তু এই নাটকের সহিত ইতিহাসের সম্বন্ধ অতি অল্প। আমি কল্পনাকে স্বেচ্ছাধীন পরিচালিত করিয়া ছ, ইতিহাসের অনুসরণ করি নাই। রাবেয়ার মহিমান্বিত জীবনীর মূল উপজীব্য তাহার অমৃতময়ী প্রার্থনা গুলির মধ্যে কয়েকটী সুবিখ্যাত ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত সুলেখক শ্ৰীযুক্ত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের “রাবেয়া নামক প্রবন্ধ হইতে প্রায় যথাযথ গ্রহণ করিয়াছি। কেবল নাটকীয় ভাব-সৌকৰ্যার্থ উহার অংশবিশেষ মৎকর্তৃক পরিত্যক্ত বা সামান্য পরিবর্তিত এবং কয়েকটা স্তবগীতাকারে গ্রথিত হইয়াছে। অপর এই পুস্তকে উদ্ধত পারস্যকবি ওমর খৈয়ামের ‘রুবায়াৎ’গুলি স্বনামধন্যা শ্রীযুক্তা সরলা দেবী বি, এ, মহাশয়ার উক্ত ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধাবলী হইতে গৃহীত। ফলতঃ এই নাটকখানি রচনা সম্বন্ধে আমি উপরিনির্দিষ্ট শ্রদ্ধাস্পদ লেখিকা ও লেখক মহাশয় এবং ভারতী’র কর্তৃপক্ষ-মহাশয়গণের নিকট বিশেষ ঋণী। অগণ্য ধন্যবাদের সহিত তাঁহাদিগকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি।
[ ৬ ] পরিশেষে বক্তব্য এই যে বঙ্গবাসী কলেজে ইংরাজী সাহিত্যের অধ্যাপক প্রথিতনামা সাহিত্যিক পূজনীয় শ্ৰীযুক্ত ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এম, এ, ও মদীয় অকৃত্রিম সুহৃদ পরমাত্মীয় শ্ৰীযুক্ত উপেন্দ্রচন্দ্র রায় মহাশয় দ্বয় এই পুস্তকের আবশ্যকীয় সংশােধনাদির দ্বারা আমাকে চিরবাধিত করিয়াছেন। তঁাহ- দিগের প্রতি আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশিত হইবার নহে। শ্ৰীবীরেন্দ্রনাথ রায়।
নাট্টোলিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষ। u r জনৈক দরিদ্র গ্রাম্যশিক্ষক। + ০ ০ গ্রাম্য ধনি-সন্তান, ঐ শিষ্য । ইসমাইল •• মােহসীন্• আবৃদুল•• ইউসুফ•• সলিমা ঐ বন্ধু। * * * আবদুলের শ্বশুর। বােেরানিবাসী জনৈক আমীর । নসেরুলা•• । । ঐ পুত্র। এব্রাহিম:•• জনৈক সম্রান্ত ব্যক্তি, সলিমানের বহু ঐ পুত্র। আহসান বেদুইন্ দস্যপতি .. আরবব্যর স্বনামখ্যাত দয়া- সম্প্রদায়ের জনৈক নেতা। সাখাওৎ•• জনৈক প্রধান দম্য। আসগর••• দ্যপতির পালিত দাস। দালাল, হকিম, মাতাল, দম্য ও দন্ত্যবালকগণ, গ্রামবাসিগণ, ব্যাপারিগণ, বান্দাগণ, নাগরিকগণ, দরবেশগণ ইত্যাদি।
[ ৮ }
স্ত্রী।
।
রাবেয়া:••
সােফিয়া •••
ইসমাইলের কন্যা ।
ইউসুফের কন্যা, পরে
আবদুলের পত্নী।
দ্যপতির কন্যা।
=
আন্দা••
আমীনা•••
সলিমানের কন্যা।
ঐ জনৈকা বাদী।
দিজান••
৫০
বাদীগণ, ভিখারিণীদ্বয় ইত্যাদি।
নংযােগস্থল—আরব্যের মরুসন্নিহিত কোন প লা,
বেদুইন দস্য-শিবির ও বসসার নগরী।
রাবেয়া।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
ইসমাইলের কুটীর ।
কাল-~প্রভাত।
প্রাঙ্গণে বৃক্ষতলে ইসমাইল, কুটীরালিন্দে
রাবেয়া উপবিষ্টা।
ইস্মাইল। “অন্নকে জান্না বখুশী দস্ত, রসীদ
হরজিনা দিলের। সওে সহৱা হোবসীস্ত।
ব ই শাখে ত মূসা দস্তীস্ত,
দ হ নফসে ঈম। নফসীস্ত, ।
আজ প্রতি কুসুমন শাখায় মূসার শ্বেতহস্তের আবির্ভাব
হইয়াছে, প্রতি সমীরণে ঈসার সঞ্জীবন শ্বাস-কম্পন অনুভূত
হইতেছে। আজ বিশ্বের প্রাণ সুখময়—তাই প্রতি জীবন্ত হৃদয়ের
কামনা আজ মরুদেশাভিমুখে ছুটিয়াছে।”
রাবেয়া। [ ১ম অঙ্ক রাবেয়া; বাবা । ইস। কি মা ? রাবেয়া। কবিতায় কি কবিকে বােঝা যায় ? ইস। চেষ্টা করুলেই যায়। রাবেয়া । কি করে বুঝব? যে মহাকবি খৈয়াম এই মহান সৌন্দৰ্য-বিভূষিত বিশ্ব-প্রকৃতির মাধুৰ্য্য উপভােগ, কেবল মদির। ইত্যাদির সাহায্যেই সৰ্ব্বদা কল্পনা করেছেন, তার মুখে মূসার শ্বেত হস্ত ও ঈসার সঞ্জীবন শ্বাসে সেই প্রকৃতির পূর্ণত্বের বিকাশ কল্পনা শুনে, সম্পূর্ণ দু’টী বিরুদ্ধবাদের মধ্যে তাকে কি করে চিনে নেব ? ইস। কবি যত কথাই বলুন, বাহ দৃষ্টিতে বিরুদ্ধ বলে বােধ হ'লেও তার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম একাত্মতা আছে। কিন্তু মা, সেই সূক্ষ্মবােধ-সেই সমন্বয় সমীকরণ, অতি দুরূহ । কাব্যে আত্যন্তিক অনুরাগ আকর্ষণ ব্যতীত তা অধিগম্য হয় । কবিতা কবিহৃদয়েরই স্বাভাবিক উৎস—তারই অন্তরের অভিব্যক্তি বটে! তবে অনেক সময়েই মূল্যবান্ রত্নসমূহ অসার বস্তু দ্বারা বাহিক আবৃত থাকে। অভিজ্ঞ রত্ন-বণিকের দৃষ্টিই সেই আবরণ ভেদ করে রত্নের অস্তিত্ব সন্ধান পায়। অনভিজ্ঞের সাধ্য কি ? যত্ন ও চেষ্টাই অভিজ্ঞতার মূল । কাব্যের মধ্যে কবিকে বুঝতে চাচ্ছ !-অনুসন্ধান কর, যত্ন কর, অবশ্যই সময়ে উপায় দেখতে পাবে। রাবেয়া। কিন্তু কবিকে বুঝেই বা লাভ কি ? ইস। কবিতা বুঝতে পাবে! কবিকে বােঝকাব্য বুঝবে, কাব্য বােঝ কবিকে বুঝবে। আর সেই বােধেই যথার্থ কাব্য- ১ম দৃশ্য ] রাবেয়া জগতের দ্বারাবরণ তােমার চক্ষু হ’তে সম্পূর্ণ রূপে অপসারিত সংসারে সমস্তই স্বপ্ন ; যদি কিছু সেই স্বপ্নের মাধুৰ্য্য থাকে—তা কবিত্ব ও কাব্য! সে মাধুৰ্য যে উপভােগ করতে পারে-নরকুলে সেই ধন্য ! তারই জীবন-স্বপ্ন উপভােগ্য। রাবেয়া। কিন্তু দারিদ্র্য যে এ মাধুৰ্য্য উপভােগের বিষম বাধা! ইস্। কেন মা, আমরা অতি দরিদ্র হলেও ত আমাদের জ্ঞানালােচনায় কখন বাধা উপস্থিত হয় নাই। রাবেয়া। আমাদের কথা স্বতন্ত্র। তুমি শিক্ষোপজীবী, কাজেই সৰ্ব্বদা কাব্যালােচনার অবসর প্রাপ্ত হও। সকলের ত এ সুবিধা নেই। ইস। ভুল ব’ মা! মানুষের দেহের সঙ্গে খাদ্যের সম্বন্ধ -আত্মার সহিত কাব্যের সম্বন্ধ । অবশ্য আত্মাও দেহে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু তাই বলে তার শক্তি শুধু দেহেই সম্পূর্ণ রূপে নিরুদ্ধ নয়। তার স্বাধীন চিন্তার পথ সদাই উন্মুক্ত। আত্মা অসীম ক্ষমতার আধার । সে ক্ষমতার সামান্য অংশই দেহ পােষণের জন্য প্রয়ােজন। অবশিষ্টের দ্বারা বিরাট সাধনা সিদ্ধ হতে পারে । অজ্ঞ মানব এই অসীম ক্ষমতার প্রসার উপলব্ধি করতে না পেরেই তার অপব্যবহার করে। দেখ, জগতে এ পর্যন্ত যত সাধক-যত কবি দেখা গিয়েছে প্রায় সকলেই দরিদ্র, তাতে ত তাদের সাধনার কোন বাধা হয় নাই ! আরও প্রায়শঃ দেখা যায়, দীন সাংসারিক ভােগে দরিদ্র হলেও অন্তরে মহৎ! ধনী ভােগে প্রধান—অন্তরে দরিদ্র। অন্তরের বিশুদ্ধতাই মানব- জীবনে প্রকৃত সুখশান্তির নিদান।
৪
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
রাবেয়া। সে ত তােমার সেই গানটীতেই দীনজীবনের
চরমােৎকর্ষের কারণ কল্পনা করেছ। গানটা আমার বড় মিষ্ট
লাগে ! গাইব ?
গাও!
রাবেয়া।
গীত।
দীন-জীবন ধন্য হে নাথ,
কাতরে সদা সে ডাকে তােমায় ।
কর দীন হতে দীন, অনশনে ক্ষীণ,
নিরুপায়ে যেন খুঁজি তােমায় !
কর শােক-মলিন ব্যথিত প্রাণ,
রােগ-পিত বেদনা দান,
ভগ্ন হৃদয় করহ শূন্য
ধন্য হব হে তব কৃপায় ।
দীন-জীবন ধন্য হে নাথ,
কাতরে সদা সে ড'কে তােমায় ।
আন প্রেম-স্বপনে প্রিয়-ব্যভিচার,
প্রতি বাঁধনে অসূয়া-বিকার,
বন্ধন যত করহ ছিন্ন
ধন্য হব হে তব রূপায় !
দীন-জীবন ধন্য হে নাথ,
কাতরে সদা সে ডাকে তােমায়।
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া ।
কর লুব্ধ-পরাণ বিষাদময়,
দেহ মুগ্ধ জীবনে মরণ ভয়,
কঠোর পীড়নে আনহ দৈন্য
ধন্য হব হে তব কৃপায় !
দীন-জীবন ধন্য হে নাথ,
কাতরে সদা সে ডাকে তােমায় !
হ বাবা! যদি সত্যই তেমন হয়, তবে কি তুমি সুখী হও ?
আমি ত তােমার একমাত্র বন্ধন ছিন্ন হলে ?
ইস্! মা, দুৰ্বল মানব আমি, প্রাণে ক্ষণ-বৈরাগ্যোদয়ে
গান লিখেছি ; সত্য হলে কি করি—তা কেমন করে ব’ব ।
কল্পনায়--বাস্তবে প্রভেদ বিস্তর। ভাবতে গেলেও যে ভয়
করে মা !
রাবেয়া । তবে ও সব কথা লেখ কেন ? নাও বেলা
হ’ল, খাবে এস।
ই। একটুকু কাজ আছে, এসে খাব এখন ।
রাবেয়া। বেশী দেরী হবে কি ?
ইস। খুব নয়, তবে কিছু বটে।
রাবেয়া। তবে আমি আর সব ঘরকন্না সেরে, জল নে
আসি ?
ইস্।
তা এস।
উভয়ের প্রস্থান।
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
দ্বিতীয় দৃশ্য।
প্রস্রবণ-সন্নিহিত পথ।
কাল-পূৰ্বাদু।
কলসী-কক্ষে সােফিয়ার প্রবেশ।
সােফিয়া।
গীত।
লহরে দুলছে কমল প্রেম-মলয়ার পরশ পেয়ে।
ধীরে তার পাঁপড়িগুলি খুলছে নয়ন বাস ছড়িয়ে।
এখন লাজুক কলি চাহে নাই আঁখি তুলি,
এই বেলা আয় রসিক অলি, মধু চারে গুণগুণিয়ে
কলসী-কক্ষে রাবেয়ার প্রবেশ।
রাবেয়া। সােফিয়া লো সই! বহুদিন দেখি নাই
তােরে, কোথা ছিলি এত দিন ?
সােফিয়া।
তােরেও ত
দেখি নাই সই, তুই বা কোথায় ছিলি ?
রাবেয়া। আমি কোথা যাব!
সােফিয়া।
আমিই বা কোথা যাব ?
রাবেয়া। তবে কেন যাস নাই কুটীরে মােদের ?
সােফিয়া। তুমিই বা গেছ কোন্ আমাদের ঘরে ?
রাবেয়া। তাই অভিমান! সই, বল অবসর
কোথা পাব ? যাই যদি ভ্রমিতে কোথাও,
ক্লেশ পাবে অতিশয়, বৃদ্ধ পিতা মাের ।
সােফিয়া। কেন, পিতা কি মােদের নাই ?
রাবেয়া।
আছে, তবে
২য় দৃশ্য ]
রাবেয়া
৭
প্রভেদ রয়েছে। প্রভাতে উঠিয়া যবে,
পিতা তৰ যায় চলি দৈনিক কাৰ্যেতে ।
দিদি মা তােমার, অন্নপানি দেয় তারে
আদর করিয়া। দিদি মা ত নাই মাের,
ঘুমায়ে রহিলে আমি, সই, উপবাসে
কাটিবে আধেক দিন পিতার আমার ।
অপরাহ্ৰে কৰ্ম্মক্লান্ত জনক তােমার,
অবসাদ-ক্লিষ্ট-প্রাণে ফিরে যবে গৃহে,
হাসি হাসি মুখে তব জননী আসিয়া,
মুছাইয়ে শ্রমবারি—প্রীতিপূর্ণ ভাষে
সাদরে কহিয়া কত মধুমাখা বাণী,
ক্লান্তি নাশি কমকরে কোমল ব্যজনে,
তৃপ্ত করে তায়রসনা-রসাল ভােজ্য
পানীয় দানিয়া। খোজেনা তােমারে কেহ !
সই সই, হায়—জননী ত নাই মাের;-(অশুমােচন)
(আমি না সেবিলে তারে কে বল সেবিবে ? )
সায়াহ্নের আধছায়ে পরিজন সহ,
কুটীর-প্রাঙ্গণে বসি’ জনক তােমার,
রহে যবে কলহাস্যে আনন্দ-বিভাের,
থাক বা না থাক তুমি অভাব না হয় ।
কিন্তু শ্রান্ত-দিবসের শয়ন সময়,
আমি মাত্র আছি তার বিষাদ ঘুচাতে।
পিতা শুধু খেটে আনে, আমি বেঁধে দেই ।
শ্রমজল ঝরে তঁার, আমি মুছে দেই ।
৮
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
পিতা বাধে গৃহখানি, আমি তা সাজাই ;
পিতা রােপে তৃণপুঞ্জ, আমি তা বাড়াই।
পিতা ফিরে দ্বারে দ্বারে, আম ঘরে রই,
পিতার শুধুই আমি, আমার(ও) ত সেই।
সােফিয়া।
বটে লো, তাই ।
আমি বলি আর (ও) কিছু করিস তুই কামাই !
তুই নারুল কে করবে, কেউ নেই তোর ঘরে,
আপন কাজ কি ক’ কভু করে দেয় লো পরে?
সাচ্চা কথা বলে রে গায়ে বাবে ঝল,
তাই বলি না, কাজ কি মেনে খেয়ে মিছে গাল।
মা স’রেছে ভানের তাগ, বাপ করেছে বড় ;
আঁধার ঘরের চঁাদ তুই তাই তাত বের ।
ওমরেতে যান কোথ, ব’ সেটা বাধে,
কাজের ছুতাে শুনতে ও বল, কে ৩ারে বা সাধে ?
যা---যা ঘরে ব! লো, কথা নময় গেল,
দেখগে যা তার কাণাকড় বাপের কসুর হ’ল ।
রাবেয়া।
রাগ ক’লি ভাই ?
প্রাণে কারও ব্যথা দিয়ে কথা বলতে নাই।
দোষ যদি হয় ঘাট মাছি, ক্ষমা ঘেন্না চাই,
রাগলে তাের মনের মাঝে সত্যি ব্যথা পাই।
সােফিয়া। নে-নে-নে কথার ঘটা রাখলাে এখন চেপে ;
দিন-ভিখারীর মেয়ে, তারে কথা কইব মেপে ?
ও মা কি ঘেন্না।
প্রস্থান।
২য় দৃশ্য ]
রাবেয়া।
মােহসীনের প্রবেশ।
মােহ। রাবেয়া !
রাবেয়া। কে মােহসী?
মােহ। সােফিয়া তােমায় গা দিল কেন ?
রাবেয়া । কি জানি, হয় ত আমি তারে কিছু অন্যায় বলেছি।
মােহ । হয় ত বলেছ ? না তুমি কখন অন্যায় বলনি ।
অন্যায় কারে বলে তা তুমি জান না। সােফিয়া বড় মুখরা।
তা হবে। সবাই ত ঐ রকম বলে, গরীবের
মেয়ের সঙ্গে আবার কি করে কথা কইতে হয় ? তা সােফিয়ার
দোষ কি ? তুমি যাচ্ছ কোথা ?
মােহ । গুজব শুলুম, বেদুইরা লুটতে আছে ; তাই
লড়াই দিতে যাচ্ছি ।
রাবেয়া। ওম। বেদুইন্! বাবার কাছে শুনি বটে; তারা
কি গা ?
মােহ। দুর্দান্ত আরব, এই আমাদেরই মত মানুষ ।
রাবেয়া। মানুষ। তবে তারা মানুষ ধরে কেন ?
মােহ। বিক্রী করে, ধনীরা কিনে বান্দা বাদী করে।
রাবেয়া। তারা কি সবাকেই ধরে, বুড়ো মানুষকেও ধরে ।
যার আর কেউ নেই তারেও ধরে ?
মােহ। সবাইকে ধরে ।
যুবা বৃদ্ধ বালক বালিকা, শিশু প্রৌঢ়।
যুবতী বাছে না! নিষ্ঠুর বর্বর দস্য,
পূরাইতে পৈশাচিক ধনীর কামনা,
অর্থলােভে কাৰ্যাকাৰ্য্য করে না বিচার।
১০
রাবেয়া ।
[ ১ম অঙ্ক
দয়া মায়া সুকোমল বৃত্তি সমুদয়,
লেশ মাত্র হৃদয়েতে নাহিক তাদের ।
অনা’সে কাড়িয়া লয়, জননীর ক্রোড়
হ'তে স্নেহের দুলাল, কিম্বা নন্দনের
পাশ হতে চিরপূজ্য জনক জননী।
রাবেয়া। যদি কেউ যেতে না চায়, কেউ যদি বাধা দেয় ?
মােহ। সজোরে বাঁধিয়া লয়,
নহে অসিধারে মুক্ত করে পথ।
রাবেয়া। তবে তুমি যাচ্ছ, তােমায় ধ’রূবে না ?
মােহ। ( অসি দেখাইয়া) এ থাকতে পারবে না।
রাবেয়া। তা হক, কাজ কি গিয়ে ?
মােহ। আমি তাদের বাধা দেব । গ্রামের বহু যুবক
চলেছি ; আমরা দাঁড়িয়ে থাকতে, তারা গা লুটতে কি কাউকে
ধ’তে পাবে না।
রাবেয়া। তবে যাও।
মােহ। তাই যাচ্ছি ! তােমায় একটা কথা ব’তে এলুম।
এখন ঘরে যেও না, এইখানে কোথাও লুকিয়ে থাক। সন্ধ্যার
মধ্যেই বেদুইদের যা হয় শেষ হয়ে যাবে, তার পর ঘরে যেও।
রাবেয়া। এখন গেলে ?
মােহ। যদি আমরা তাদের সঙ্গে না পারি, তবে তারা
গ্রাম লুটবে। তােমায় যদি পায়, তবে ?-
রাবেয়া। তবে আমার বাবার কি হবে, তারে যদি পায় ?
মােহ। তিনি পুরুষ, লড়াই করূতে পাবেন, লুকোতে
পাবেন, তার জন্য ভয় কি? তুমি লুকোও।
!
৩য় দৃশ্য ]
রাবেয়া।
১১
রাবেয়া। তা সে পাবে না, আমি ঘরে যাই ।
মােহ। না না যেও না, কথা শােন, তুমি লুকোও।
রাবেয়া। তুমি যাও, লুকোতে হয় তারে নে লুকোব।
প্রস্থান।
মােহ। রাবেয়া ! রাবেয়া !
নেপথ্যে রাবেয়া। না তুমি যাও।
বেগে আবৃদুলের প্রবেশ ।
আ। মােহসী! মােহসী! ঐ তারা আসছে ।
মােহ। কই, কই ?
আব,। ওই উড়ছে ধূলাের রাশি মাঠের মাঝে মেঘের মত,
ঘােড়ার খুরে দেশ কাঁপিয়ে আসছে ডাকাত শত শত ।
মােহ। চল তবে আমরা ও যাই, সবে রণরঙ্গে হব রত;
হয় মায়ূব তাড়িয়ে দেব, নয়ত আজই হব হত।
উভয়ের বেগে প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
ইসমাইলের কুটীর।
কাল--মধ্যাহ।
ইসমাইলের প্রবেশ।
ইস। রাবেয়া, রাবেয়া ! কি বিপদ, কোথা গেল ? রাবেয়া,
রাবেয়া । ঘরে কি নেই ? (পশ্চাতে দেখিয়া ) ঐঐ তারা
১২
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
এল!
হে খােদ, রক্ষা কর ! আমি গেলে রাবেয়ার কেউ
থাকবে না। কে তারে এনে দেবে, কে তারে খেতে দেবে,
কে তারে দেখবে ? সে আমার পাখীর ছানা, হাসে গায়
খেলে বেড়ায়, কোন কষ্ট জানে না। তামি গেলে কে তারে
আপদে বিপদে বুক পেতে ডানায় ঢেকে রাখবে। বেয়া,
রাবেয়া ! কোথা গেলি মা আমার ? তবে কি ধরা পড়েছে ?
রাবেয়া কি সয়তান বেদুইদের হাতে পড়েছে ? হে খােদা !
শেষ কি এই ক'লে, রাবেয়া আমার বাদী হয়ে বাজারে বিকুবে?
সােণার কমল আগুন-তাপে শুকিয়ে যাবে? ঐ এল, রাবেয়া —
রাবেয়া ! এখনও পালা,-থাকিস যদি-পালা-পালা, ছুটে
পালা। মা আমার ।
ক
দস্যগণের প্রবেশ ও ইসমাইলকে ধৃতকরণ।
ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও ! আমি বৃদ্ধ অক্ষম, আমায় নে
কোন লাভ হবে না ।
ইস্।
১ম দস্য। দাও ছেড়ে দাও, দর হবে না শুধু ভার বাড়াব !
২য় দমু। না না ছেড় না। ঘেসেড়া কম হয়েছে, না
বিকোয় সেই কাজে লাগবে।
ওগো, দাও গো আমায় ছেড়ে দাও! কচি মেয়ে
আমার ঘরে আছে তার কেউ নেই ;—আমি গেলে সে না
খেয়ে মরবে।
৩য় দস্যু। কই, কোথা সে দেখিয়ে দে। তারেও নে যাই,
এক সঙ্গে থাকবি, সুখে দিন চলবে ।
ইস। না না, নেই নেই আমার কেউ নেই।
৩য় দৃশ্য )
রাবেয়া।
২য় দ্য। দেখ, ঘরে দেখ। ( দস্যুদ্বয়ের গৃহানুসন্ধান ।)
১ম দস্যু। কই, কেউ নেই ।
৪র্থ দস্য। চল্ শালা বদমাইসি? (মুষ্ট্যাঘাত)
ইস্। ও হাে হাে ! পায়ে ধরি তােমাদের, দাও ছেড়ে
দাও!
২য় দস্য। এই যে দিচ্ছি ! (বন্ধন)
ইস্। দাও ছেড়ে দাও ! খােদ। তােমাদের দয়া করবে।
দাও গো দাও আমায় ছেড়ে দাও ।
ইমাইলকে লইয়া প্রস্থান।
দুইজন গ্রামবাসীর প্রবেশ ।
১ম গ্রাম। ওই, ওই যাচ্ছে । আহা, চার-পাঁচ জনকে
ধরে নে গেল।
২য় গ্রাম। বেটারা দু’দল হয়ে এসেছিল, ও দিকের দল
ছোঁড়াদের হাতিয়ারের চোটে ভেঙ্গে পালিয়েছে ।
কে জান্ত
যে এ ধার থেকেও আবে ?
রক্তাক্ত কলেবরে মােহসীনের প্রবেশ।
মােহ। রাবেয়, রাবেয়া ! মুনসী সাহেব !
১ম গ্রাম। এই যে মােহসী মিঞ' ! ওই যাচ্ছে, ওই
ইসমাইল মুন্সীকে ধরে নে যাচ্ছে ;-ঘঘাড়ার পিঠে বেঁধেছে।
আরও চার পাঁচ জন ওদের হাতে পড়েছে।
মােহ। এস, আমার সঙ্গে এস! হয় মরব, নয় কেড়ে নেব।
বেগে প্রস্থান।
১৪
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
১ম গ্রাম। এত তা কোন্ দিকে যাব ?
২য় গ্রাম। আবার কোন্ দিকে যাব !
বিপরীত দিকে প্রস্থান।
১ম গ্রাম। দাড়া দাড়া, আমিও ত যাব।
পশ্চাদনুসরণ।
কলসী-কক্ষে রাবেয়ার প্রবেশ।
রাবেয়া। বাবা, বাবা! কই বাবা? ( অগ্রসর হইয়া )
বাবা, বাবা! বাবা তুমি কি এসেছ ? (কুটীর সম্মুখে গিয়া) বাবা,
বাবা! কোথা তুমি, ঘরে কি এসেছ ? যদি এসে থাক,
তবে সাড়া দাও! কই না, এখনও তবে আসে নাই। (কলসী
রাখিয়া) ফিরে আসবার সময় কি হয় নাই ? বেলা ত হয়েছে।
তবে কি কোথাও দূরে গেছে? না, তা হলে ত ব’লেই যেত।
আমায় খুঁজতে গেছে ? তাই গেছে, বেদুইনরা আসবে
শুনে, তাড়াতাড়ি ঘরে এসে, আমায় না দেখে অনি খুঁজতে
ছুটেছে। ( গৃহ দেখিয়া ) এঁ, ঘরের দাওয়া ভাঙ্গ লে কে, দোর
খুললে কে ? দেখ দেখি কোন্ দুষ্ট ছেলে এসে, আমার সব
জিনিষপত্র ছড়িয়ে ফেলে পালিয়েছে।
মােহসীনের পুনঃ প্রবেশ।
মােহসী মােহসী ! একি, তােমার গায়ে রক্ত কেন?
আহা, গা হাত পা যে সব ছড়িয়ে গেছে, রক্ত ঝুঝিয়ে পড়ছে।
কে তােমায় মেরেছে, বেদুইনরা বুঝি ? তাদের তাড়িয়ে দিতে
পেরেছ ?
.
৩য় দৃশ্য )
রাবেয়া ।
মােহ। তারা গেছে।
রাবেয়া । যাক্ বাঁচলুম। কাউকে ত ধরে নে যায়নি ?
মােহ। গেছে।
রাবেয়া। ধরে নে গেছে! আহা কাদের নিয়েছে গা?
মােহ। পাঁচজনকে।
রাবেয়া ! সৰ্ব্বনাশ, তবে তাদের কি হবে ? তারা কি আর
ঘরে আতে পাবেনা ?
মােহ। না, তাদের ইহ-জন্মের সাধ মিটেছে। এখন তারা
ঘর-পালা জানােয়ারের মত হাটে বাজারে বিকোবে। যে. কিবে
সেই রাখবে, সেই তারে যা ইচ্ছা ক’বে। রাখুক মারুক দায়-
দাবী নেই। ক্রেতার মনস্তুষ্টির জন্য, তার কর্ম সাধনের জন্য, দিবা-
নিশি পরিশ্রম করতে হবে। পুরস্কার বেত্রাঘাত, কারণে অকারণে
প্রহার। ক্রীতদাস—তারা এখন ক্রীতদাস হবে। আমরা
কুকুর বিড়ালকে যে স্নেহ—যতটুকু দয়া করি, সেটুকু অনুগ্রহও
তা’দের মিলবে না।
রাবেয়া । তবে ত বড় কষ্ট! তা তােমরা কেড়ে নিতে পারুলে
কেন ?
মােহ। আমরা গ্রামপ্রান্তে জমায়েত ছিলুম। সেখানে যারা
এসেছিল তাদের সব তাড়িয়েছি, এমন সময় খবর পেলুম,
অন্য পথে এসে আর একদল লুঠপাট ক’রূছে। পাপিষ্ঠেরা যে এই
রকম কৌশল ক’রূবে, তা পূৰ্বে বুঝতে পারিনি। তবু খবর
পেয়ে সবাই ছুটলুম, এসে দেখি পাঁচজনকে ঘােড়ার পিঠে বেঁধে
পালাচ্ছে। আমরা পাওদলে—পেছনে ছুটেও আর ধ’তে পালুম
। এই দীর্ঘ মরুপথে, তারা দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল।
১৬
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
রাবেয়া। আমার বাবাকে দেখেছ ?
মােহ। (নিরুত্তর)
রাবেয়া। বল না-দেখেছ ?
রাবেয়া। কোথায় সে কোথায় ?
মােহ। ( নিরুত্তর)
রাবেয়া । চুপ করে রইলে কেন?—বলনা !
মােহ। তঁারেও নে গেছে।
রাবেয়া। কে নে গেছে, কোথা নে গেছে ?
মােহ। তারা।
রাবেয়া। কা’রা বল না ?
মােহ। বেদুইনরা।
রাবেয়া । নে গেছে !-বেদুইরা তারে ধরে নে গেছে!
বাবাকে নে গেছে !
মােহ। রাবেয়া !--
রাবেয়া। তারে নে গেছে !—আর সে ফিরবেনা ?
মােহ। রাবেয়া !
রাবেয়! 'অার সে খেতে চা’বে না? তার জন্য যে খাবার
রেখেছি, তা অম্নি পড়ে থাক্বে ?—আর তারে দেখব না ?
আর সে ফিরে এসে আমায় আদর করবে না ?-সন্ধ্যা হলে,
রােজকার মত সে আর আমার পাশে বসে বয়ে শুনাবে না;
গল্প করবে না ?
মােহ। রাবেয়া-রাবেয়া।
রাবেয়া। কি বলছ ? ওগো, সকালে যে সে না খেয়ে
৩ দৃশ্য ]
রাবেয়া।
গেছে, এখনও খাবার পায়নি। সেখানে কি কেউ তারে
একমুটো খাবার দেবে না ?
মােহ। দেবে রাবেয়া, তারে খেতে দেবে, বাঁচিয়ে রাখবে।
মরে গেলে তাদের লােক্সন—মেরে ফেলবে না। ভয় কর না,
আমরাই তােমার জন্য যা হয় একটা ব্যবস্থা ক’ব।
রাবেয়া। তা করবে! আমি থাকবাে, সে থাকবে না।
আমি আছি, সে নেই। আমায় রাখবে, তারে রাখতে পার
নাই। আমি হাসব, সে কাদবে। না না, সেও কাবে—আমিও
কঁ, শুধু কেউ কারে দেখব না, কেউ কারও চোখের জল
মুছাব না।
মােহ। কি করবে রাবেয়া, উপায় নেই। সংসারে সইতে
এসেছ, সইতে হবে।
রাবেয়া। কি আর করব ? তা সইব! না না, আর আমি
জল আনতে যাবনা। বাবা, বাবা! জল আনতে গিয়ে তােমায়
হারিয়েছি, আর আমি জল আনব না। ( ক্রন)
মােহ। (নীরবে অশ্রু মোচন।)
কয়েক জন গ্রামবাসীর প্রবেশ।
১ম গ্রাম। এই যে রাবেয়া ! ছি মা কেঁদনা, কি কবে
বল ;-অদৃষ্টের ফল!
২য় গ্রাম। ভয় নেই মা, তােমার বাপ গেছে আমরা ত
আছি। বাপ কারও চিরদিন থাকে না, মানুষ মরেও ত যায়।
৩য় গ্রাম। চল দিদি, চিন্তা কর না। তুমি আমাদের
যার বাড়ী ইচ্ছা থাকবে।
১৮
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
মােহ। রাবেয়ার কেউ নেই, আপনারা যদি আশ্রয় না
দেন, তবে ওরে অনাহারে ম’তে হবে।
১ম গ্রাম। সে বিবেচনা আমরা করেছি। আর যাদের
নে গেছে তাদের দশ জন আছে ; কোন অভাব হবে না। এক
রাবেয়া? তা গ্রামে এত লােক আছি, এক রকম অবশ্যই চলবে।
মােহ। তবু একটা ব্যবস্থা স্থির হওয়া প্রয়ােজন।
২য় গ্রাম। ব্যবস্থা আর কি ? রাবেয়া আমাদের সবার
বাড়ী এক একদিন থাকবে। বাড়ী পিছু বছরে দু’চারদিন
পড়বে, তাতে কারও ভার হবে না। অতিথ সেবাও ত করে
থাকি ; আজ হ’তে রাবেয়া আমাদের বাধা অতিথ।
৩য় গ্রাম। সেই কথাই ভাল । চল দিদি, আজ তুমি
আমার ঘরে চল।
রাবেয়া। আমি যাব, ঘর গুছাবে কে ?
মােহ। তুমি যাও, আমি সব ঠিক করে রাখছি।
রাবেয়া। বাবা কি আর আসবে না ?– ক্রন্দন )
৩য় গ্রাম। তা আসতে পারে, তাদের কাছ থেকে অনেকে
ত পালিয়ে আসে। ছি—কেঁদনা, এস আমার সঙ্গে এস।
রাবেয়াকে লইয়া প্রস্থান।
২য় গ্রাম। আহা, রাবেয়া বড় ভাল মেয়ে, অতি নিরীহ।
১ম গ্রাম। হবে না কেন? ইসমাইলকে কখন কেউ
অন্যায় ক’তে দেখেছ ? বেচারির মুখে বড় কথাটী ছিল না।
২য় গ্রাম। কোলের মেয়ে রেখে স্ত্রী মরে যায়, সেই
অবধি মেয়েটাকে বুকে করে মানুষ ক’ছে। তার সংসারের
৪র্থ দৃশ্য )
রাবেয়া।
১১
সুখ শান্তি, আশা ভরসা, সব এই মেয়েটীতেই ছিল । চুল
যাওয়া যাক।
১ম গ্রাম। কার অদৃষ্টে কখন কি ঘটে কিছুই বলা যায় না।
উভয়ের প্রস্থান।
মােহ। খােদা! একি করলে?
দ্রব্যাদি গুছাইতে কুটীরে প্রবেশ।
চতুর্থ দৃশ্য।
মরূদ্যান-বেদুইন্ পল্লী।
দ্যপতির শিবির।
কাল—অপরাহ্।
দস্যপতি, সাখাওৎ ও অন্যান্য দস্থ্যগণ।
দস্যপতি। কেমন হে, নূতন লুটের বান্দা সব বিকুল ?
:ম দস্য।
সব বিকিয়েছে, একটা কেবল আছে, সেটার
দর হয় না।
দ, পতি। ভালমত না হয়, যা হয় তাতেই ছেড়ে দাও।
১ম দস্যু। কেউ তারে নিতে চায় না,খদ্দেরে বলে পয়সা দে
বুড়ো হাবড়া কিব কেন ? ক’হাট ফিলুম, কেউ দর বলে না।
দ, পতি। তবে সাবাড় করে দাও, কাজ কি খামাখা
খােরাক জুগিয়ে। কি বল সাখাও?
সাখা। একটা ঘেসেড়া সে দিন মরে গেছে, একটা পালি-
২০
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
য়েছে ; ঘােড়াগুলো ঘাস না পেয়ে কাবু হচ্ছে। এ ললাটাকে
সাবাড় না করে সেই কাজে ভর্তি ক’বুলে চলে।
দ, পতি। তা কি পাবে ?
সাখা। বােধ হয় পাবে। না হয় দু’চারদিন ত চলুক ;
এর মধ্যে অন্য বান্দা! জুটলে, তখন যা হয় করা যাবে।
দ, পতি। আচ্ছা তারে নে এস, দেখি কেমন লােক।
জনৈক দর প্রস্থান।
আবদার প্রবেশ।
আবদা। বাপজা, বাপজান্! আমার সে নয়া বাদী
মরে গেল।
দ, পতি। কি হয়েছিল তার ?
আবদা। আমায় রাগিয়েছিল, গােস্তাকি করত, তাই তারে
মেরেছিলুম, খেতে দেইনি । তার পর যেন কি হয়ে মরে গেল।
দ, পতি। তা যাক্, ফেলে দিতে বলগে।
ইসমাইল সহ দর প্রবেশ।
আরে ছ্যা ছ্যা, এ বড় বিশ্রী বুড়ো, কোন কাজ পাবে না;
সাবাড় করে দাও।
সাখা। এই গিদ্ধড়, তসলিম দেও।
(ইসমাইলকে বেত্রাঘাত।)
ই। উঃ মা, প্রাণ যে যায়।
আবদা। বাহবা উল্লুকের মত লাফায় দেখ। (বেত্র লইয়া
আঘাত) বাহা : বাহ !
৪র্থ দৃশ্য ]
রাবেয়া।
২১
ইস্। রাবেয়া, রাবেয়া ! কোথা রইলি মা আমার !
আবদা। (বেত্রাঘাত সহ) ফিন্ কুদোফি চিল্লাও।
এইসা-এইসা-হাঃহাঃহাঃ।
দ, পতি। নে যাও সাবাড় কর, খােরাক নষ্ট কর না।
আবদা। না বাবা ওবে রাখ, আমি উল্লুকের নাচ দেখব।
(বেত্রাঘাত) না উল্লু না।
ইস। ওঃ মাঃ!
দ, পতি। তবে ঘেসেড়ার কাজেই লাগিয়ে দাও।
ক’দিন বাঁচে, থাক্ ।
ইসমাইলকে লইয়া জনৈক দর প্রস্থান।
আবদা। চল্ উল্ল চ, নাচতে নাচতে চ।
বেত্রাঘাত করিতে করিতে প্রস্থান।
দ, পতি। হাঁ হে, সে দিন যে এক বেটা বান্দা পালিয়েছে,
তার খোঁজ পেলে না? এখান থেকে মরে গেলে টাকা লােকসান,
কিন্তু পালিয়ে বাঁচলে বড় খারাপ হবে। লােকে আমাদের আড্ডা
জেনে নিলে বিষম মস্কিল করবে। যদি দল বেঁধে দু’চার শ
এসে চড়াও করে, তবে একদম আমাদের নিকেশ ক’বে।
সাখা। তা আর বলতে। আমি দলের সবাইকে সাবধান
করে দিয়েছি, যে খবরদার যদি কোন বান্দা পালায়, জান্
কবুল করে তার পেছনে ছুটবে। যদি কোন গ্রামে গিয়ে ঢােকে,
তবুও ছাড়বে না; ধরে না আনতে পার, মেরে ফেলবে। এতে
দলের কারও জান্ দিতে হয় সেও ভাল।
দ, পতি। বেশ বেশ, ভাল করেছ।
চল এখন নূতন
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
লুটের জোগাড় দেখি। খুব খবরূদারীতে কাজ ক’তে হবে,
লুটের আগে কথা প্রকাশ পেলে কঠিন হয়ে পড়ে ; দেখ না
এবার একরকম শুধু হাতে ফিতে হয়েছে। সােণা দানার ত
কথাই নেই, ক’টা লােক পেলে—তাও এক রকম অকেজো।
এখন হ’তে রেতে গিয়ে পড়ব।
সাখা। এবারে একে সকাল বেলা, তায় দলের কতক
যেতে দেরী করে, কাজেই গাঁয়ের কাছে গিয়ে আমাদের দেরী
হওয়াতেই লােকে টের পায়। ঐ জন্যই ত বলি, সব শুদ্ধ এক
সঙ্গে বেরুন উচিত।
দ, পতি। তবু রেতে গেলে অনেকটা সুবিধা হয়।
সাখা। তা’ত হয়ই। তবে রেতে আবার মরুপথ ঠিক
রাখা কঠিন যে।
দ, পতি। তাও ত বটে। যা এস।
সকলের প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য।
মরূদ্যান-বেদুই-পল্লীস্থ পথ।
কাল—অপরাহু।
দস্য-বালকগণ।
গীত।
এইসা কাম্ সব করে ভেইয়া,
দিল যিসে খােদ হেই ।
৫ম দৃশ্য।
রাবেয়া।
ধরম করম ঝুটা বাৎ, আউর
দীদার নেহি কোই ।
মুদেগা আঁখি, মিলেগ মটুটী,
শেষ হােগা তেরা কাম্ ;
সােণে দানে জহরৎ নেহি তুম,
তুনে কিসকা দম্।
য্যায়সা মােরগ, ত্যায়সা মর,
জান্ ত এই সব,
ইসকা মারূণে দর নেহি যব,
উক। নেহি তব,
ঝুটা ঝুটা ঝুটা বয়ে সব,
ঝুটা পয়গম্বর হােয় ;
মর যাে সব, উড়াওয়ে স্মৃত্তি,
নাৎ সব, রােয় ।
সকলের প্রস্থান।
সাখাওতের প্রবেশ।
সাখা। এক পা এক পা করে অনেকটা উঠে পড়েছি,
এখন উপর থেকে এই বেটাকে সরিয়ে দিতে পারুলেই, বস
একদম দলের মাথা ।
সর্দার—সর্দার—সর্দার! যেন মাথা
কিনে ব’সেছে। সর্দারী মান সহজেই ঘুচিয়ে দিতে পারি ।
লােক গুলােকে বুঝিয়ে দিলেই হ’লসেও যা-তােরাও তাই।
কিন্তু তাতে এক গােল আছে, যদি নিজে কখন সর্দার হতে
পারি, তখন বেটারা আমায়ও মানবে না। আবার দলের কর্তা
২ রাবেয়া। [ ১ম অঙ্ক থাকলে কাজ চলাও মস্কিল। কাজেই সর্দারও চাই, সর্দারের সম্মান, ক্ষমতাও থাকা চাই। কিন্তু সর্দারিটী নিতে হবে আমায়, এই হচ্ছে মূলকথা—তা যেমন করেই হক। ও কে আসে, আবদা বিবি ! না বাবা সরে দাঁড়াই, দেখা হলেই এটা না এটা আবদার ধরে বসবে। অন্তরালে অবস্থান। বেহস্তে আবুদার প্রবেশ। আবদা। হাঃ হাঃ হাঃ, বেশ কথা ! স্বর্ণবর্ণ জল, বাক- শক্তি-বিশিষ্ট পক্ষী, সঙ্গীতকারী বৃক্ষ, জিনী, পরী, হীরামুক্ত ;- বাহ! হাজার রাত্রি গল্প করে কাটিয়ে দিল ।—নিত্য নূতন সােণার স্বপন! বুড়া ইসমাইল বড় আচ্ছা লােক! বাহবা সব গল্প বলে। ওর ঘেসেড়াগিরি ছাড়িয়ে নিতে হচ্ছে। আহা!- গীত। সত্যি যদি সোণার স্বপন, অনি অনি ফলে যেত । বাগান বাড়ী, ফুল-কেয়ারী, ফোয়ারাটী গড়িয়ে দিত। হীরার পাহাড়, সােণার খনি, ঝিলে মুক্তা সৃটিক মণি, জদা আমার মূর্তিখানি হুরীর মত দেখতে হত।
৫ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
আস্ত কোন্ সে রাজার ছেলে,
ক’ত প্রণয় রাজ্য ভুলে,
চাইতাম যদি আঁখি তুলে
ভাগ্য মন্ত কতশত ।
আগরের প্রবেশ।
আস। এ-এ-বিবি সাহেব! তা’ত আর হয় না।
তবে যা আছ, ওইতেই যদি একবার নেক্ নজর ক’তে, তবে
(সুরে) ‘ভাগ্য মাতাম কতশত!
আবদা। ফি আয়া গােলাম? (বেত্রাঘাত )
আস। ইয়া আল্লা! ( ভূমিতে গড়াগড়ি দেওন।)
আবদা। কেঁও, তরিৎ হুয়া বেতমেজ।
আস্। বহুৎ বিবি সাব-বহুৎ !
আবদা। ফি দি করাগে, তও বাজীকো বােলকে
কুত্তাসে খিলাওঙ্গে।
প্রস্থান।
আস। ইঃ হিঃ হিঃ, খুব পীরিত ক’তে এসেছিরে বাবা !
আবার খাড়ার ঘা, ভয় দেখিয়ে গেল—বাজীকো বােলকে!
তবেই হয়েছে। ইঃ হিঃ হিঃ, বেজায় জ’ছে। ও বাবা, ও আবার
কে ?—দূরের কাজ নিকটেই হ’লআর ফিনের দরকার হ’ল না।
শাকের আটি বুঝি সঙ্গে সঙ্গেই চাপে। (গম্ভীরভাবে উপবেশন।)
সাখাওতের প্রবেশ।
সাখা। ওরে—এই ।
আ। (স্বগত) ধরা পড়ে গেছি বাবা।
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
সাখা। এ-বেটার মুখের কাট দেখ, যেন পাঁচ উল্টিয়ে
আছে। অরে—ওই !
আস। ( উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন।)
সাখা। আরে গেল; বেটা চেঁচাসনি !
আস। ভুল হয়েছিল সাব-ভুল হয়েছিল, মানুষ ঠাওরাতে
পারিনি।
সাখা। তা কুকুর গুলো ভুল করেই তােকে খাবে এখন।
আস। দোহাই সাহেব দোহাই, জান্ বাঁচিয়ে দাও।
সাখা। তাে বেটার জান্ বাঁচিয়ে লাভটা কি ?
আন। গােলাম হয়ে থাক্ব সাহেব, গােলাম হয়ে থাক।
সাখা। এখনই বা কোন্ নবাবজাদা আছিস ?
আস। কুত্তার মত পায়ে ফিক্ব সাহেব, কুত্তার মত ফিব।
দোহাই তােমার, আজকার মত জাটা বাঁচিয়ে দাও।
সাখা। ঠিক্ ব’ছিস ?
আস। তােব তােবা, বেঠিক জবা পাবে না সাহেব,
বেঠিক জবান্ পাবে না।
সাখা। আচ্ছা, দাড়া ভেবে দেখি।
আস। আর ভেব না সাহেব, আর ভেব না; মেহেরবানী
হয়ে যাক।
সাখা। আচ্ছা, চেপে গেলুম। শশা, যা বলি যদি হুকুম
মত চলিস, তবে শুধু আজ ব’লে নয়, তাের যখন যে বিপদ
আসুক, বাঁচিয়ে দেব। আর যদি কাজ দেখিয়ে খুসী ক’তে
পারিস, তবে পুরচার বখসিস-চাই কি একদিন স্বাধীন হতে
পাবি; এখন যা সন্ধ্যার পর দেখা করিস।
মৈ দৃশ্য ]
রাবেয়া।
আস। যে হুকুম মেহেরবান্! আদাব, জনাব আদা!
( স্বগত) এ বেটা বলে কি গাে ? দেখ বরাতের কথা, কিসে
কি হয় ? পথ ভুলেও ত মসজিদে যায়।
প্রস্থান।
সাধা। লােক্টা চালাক চতুর বটে; তাতে সর্দারের
পেয়ারের নফর। হাতে পেয়ে সুবিধা হল, অনেক কাজ পাওয়া
যাবে।
প্রস্থান।
খুরপী হস্তে ইসমাইলের প্রবেশ।
ইস। একে একে চলে গেল কত দিনমান,
কত সন্ধ্যা খেলে গেল আলাে-ছায়া লয়ে,
কত নিশি বহি’ গেল জ্যোছনা-আঁধারে,
কত উষা হাসি-মুখে মেলিল নয়ন।
প্রকৃতির আবর্তনে জড়-জগতের,
সময়ের গতি-ফলে মানব-কুলের,
সুখে দুঃখে হয়ে গেল কত বিপর্যয়।
যে নদীতে খরস্রোতে ডুবেছে তরণী,
সেই খানে খেলিতেছে কৃষক-বালক
যে গৃহেতে কেঁদেছিল পুত্র শােকাতুর,
পুনঃ তাহা মুখরিত জন্ম-মহােৎসবে।
এইত এ জগতের নীতি। কিন্তু হায়,
জগতে থাকিয়া আমি জগৎ বাহিরে ।
অদৃষ্টের দোষে, বিবর্তন নাহি মাের
২৮
রাবেয়া।
[১ম অৰু
mim
এ দগ্ধ ললাটে; এক ভাবে, এক ধ্যানে,
এক মনস্তাপে কাটিতেছে নিশিদিন।
রাবেয়া ! রাবেয়া ! সরলা বালিকা তুই,
পাপের সংসারে একা চলিবি কেমনে ?
পড়ে মনে ক্ষুদ্র মুখে মাতার মহিমা !
শুনি আশাহীন আনন্দবিহীন প্রাণ,
দেহে নাহি রয়। কই, কোথ। আশা-কোথা
আনন্দ আমার ? শূন্য—শুন্য চারিদিক্ !
আহা, স্নেহের করুণা-ধারা, মায়াময়ী
দুলালী আমার, তাের(ই) সনে হারায়েছি
আনন্দ, আকাঙ্ক', তৃপ্ত-প্রাণের বন্ধন।
তবু কেন বেঁচে আছি ?—তবু কেন রহে
নিরানন্দ আত্মা মাের এ দেহে এখন ?
হাঁ , আছে আশা;—সেই হতাশের আশা,
সন্ধ্যাকাশে সবিতার শেষ রাগমত,
ভাতে মাের আনন্দের ক্ষীণ রশ্মিটুকু ;-
রক্ত-সন্ধ্যা যথা, ক্ষণে চমকিয়া উঠি,
উলিয়া দিশি দশ লােহিত কিরণে,
স্বাগত বন্দনা করে সন্ধ্যা-সুন্দরীর
ঢালিতে ধরার বক্ষে নিবিড় আঁধার,
আমিও তেমতি-শেষ দেখিয়া তায়,
ডুবাব জীবন-জ্যোতিঃ অনন্ত আঁধারে
মরু! তুমি কতই বিস্তৃত? হে দুস্তর,
হে আমার স্নেহ-ধারা বিশুষ্ক-কারক,
৫ম দৃশ্য।
রাবেয়া।
দুস্তর হলেও তুমি নহ ত অপার !
পার হব অবহেলে রহিলে আবেগ।
হে প্রান্তর ! হে উদাসী, বাসনার লতা-
গুল্ম তরু-ছায়া সনে-স্নেহ করুণার
নিঝর-বিহীন! পাষাণ হ’তেও তুমি
নির্মম সংসারে! পাষাণ হইলে মাের
অন্তর্ভেদী দীর্ঘশ্বাসে, ভেদি অন্তস্তল
উঠিত ও বক্ষে তব উৎস করুণার !
কত সন্তাপিত তাহে লভিত সান্ত্বনা।
অহংকারী! ভাব বুঝি নির্বিকার তুমি ?
নির্বিকার! নাহ তব ও শুষ্ক পরাণে
এক বিন্দু প্রেম-বারি প্রেমসাগরের ।
বিশ্ব-জনকের নিষ্করুণ অংশটুকু
পূর্ণ প্রতিভাত শুধু অস্তিত্বে তােমার !
নহ নির্বিকার, মহতে বিকার তুমি।
আর কিছু দিন, করেছে বিশ্বাস মােরে
দ-দলপতি, কন্যা তার হইয়াছে
অনুগতা মম, তীক্ষ দৃষ্টি হইতেছে
শিথিল ক্রমশঃ রহ ধৈৰ্য কিছু দিন,
সুবিধা সুযােগ আসি মিলিবে নিশ্চিত ;
পাব পুনঃ স্নেহশীল কন্যারে আমার ।
প্রস্থান।
রাবেয়া। ১ম অঙ্ক ষষ্ঠ দৃশ্য। ইসমাইলের কুটীর । কাল-সায়াহ্ন। রাবেয়া। গীত। সময়-সাগরে খেলিছে লহরী, জীবন বেলাটী ভাঙ্গিছে। শিশির-শীকর বহিছে সমীরে, শিহরি’ সেফালি ঝরিছে। মধুর কাকলী উঠিছে বীণায়, আকুল বিরহী কঁদিছে ; নবীন কিরণে হাসিছে নলিনী, কুমুদ নয়ন মুদিছে । হাসিতে যাতনা মিশিছে সদাই, দুখে পুনঃ সুখ আসিছে ; এ খেলা কি খেলা, অবােধ পরাণ- বুঝি’ রহসে মিশিছে । মােহসীনের প্রবেশ। মােহ। রাবেয়া ! রাবেয়া। (নীরবে উদাস দৃষ্টি ।) মােহ। কি ভাবছ ? রাবেয়া । কি আর ভাবব; চুপ করে বসে আছি।
৬ষ্ঠ দৃশ্য ) রাবেয়া। মােহ। শুধু বসে আছ, তবে চোখে জল কেন ? ছি, প্রায় বৎসর ঘুরে এল ; তবু এত দিনেও ভুলতে পারনি ? সংসারে প্রীতির মালা ত চিরদিনই ছিন্ন হয়! মাতার কোল থেকে পুত্র, প্রণয়িনীর বাহু হ’তে প্রণয়ী, মানবের শত আকর্ষণের বস্তু চিরদিনই ত একে অন্যকে পরিত্যাগ করূছে। তােমার যেমন হয়েছে, এর চেয়ে অনেক বিষাদপূর্ণ ঘটনা ত অহরহ ঘটছে । তা’ কি চিরদিন স্মরণ করে রাখলে মানুষে সহ্য ক’তে পারে ? কেঁদে কি করবে, ভেবে কি ক’রূবে ? যা হবার হয়ে গেছে, বৃথা। চিন্তায় তার কি সংশােধন হবে ? ভুলে যাও, ভােলাই সংসারে শান্তির উপায় । ভুল-ভুল, সব ভুলের খেলা! ভােলার সংসারে ভুলতে পারাই মনুষ্যত্ব । রাবেয়া। মােহসী! সারাদিন পরের ঘরে থাকি, যার যে দিন খাই, তার সে দিন খেটে দি; না খাটলে পরে দেবে কেন ? তখন ভাবতে পারি না। কেবল বাবার ছবিটী যেন আশে পাশে ঘুরে বেড়ায়। পাখী ডাকলে কোন শব্দ হ'লে চমকে ফিরে চাই, মনে হয় সে যেন দাড়িয়েছিল,—ওই স’রে গেল । মুহূর্তে প্রাণ কেঁদে ওঠে, পরের বাড়ী-তাই সালে থাকি, কেঁদেও কঁাতে পারি না। তারপর দিন শেষ হলে যখন ঘরে ফিরি, তখন-তখন আমার বাঁধ ভেঙ্গে যায় ; বাধাশুন্য প্রাণে কেঁদে কেঁদে শশাকের মলা ধুয়ে ফেলি । কি এক বিমল শান্তি এসে সদা-ক্লিষ্ট নরজগতের মাঝ থেকে আমায় পৃথক করে রাখে। রাত্রে তােমাদের বুড়ী এলে সেই বৈকল্য ভেঙ্গে যায়, তার সনে গল্প করি, সে ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন এসে আমার কল্পনা-রাজ্যে • আবার বাবাকে এনে দেয় ; রাত কখন চলে যায় তা জানতে
রাবেয়া ।
[ ১ম অঙ্ক
পারি না। তুমি আমায় কি ভুলতে বল—তারে ? ঐ দেখ, ঐ
খেজুর গাছগুলি সে লাগিয়েছে, ঐ দেখ ঘরখানা সে বাঁধিয়েছে ।
এই দেখ কাঠখানা সে এনেছে, ঐ বেড়াটা সে ঘিরেছে, কখন
কি করেছে-কেমন করে করেছে, সব যেন আমি দেখছি।
আমি যে তখন তার পাশে ছিলুম। এই দেখ বাঁ হাতখানায়
কাটা দাগ আছে, বাবা এতে এমনি করে পটি বেঁধেছিল। দেখ
এই বিকেল বেলা, আমি হেথায় এমনি করে বসে থাকতুম
বাবা এসে ডাক্ত, রাবী-রাবেয়া ! ওগো! সেই ত বিকেলে
বসে আছি, সে ত এসে ডাকেন। রাবী-রাবেয়া ! সব তেমনি
আছে,ওই ঘর—এই আমি; তেমনি করে শ্রান্ত কৃষক-পাঠক্লান্ত
বালক গৃহে ফিরূছে, সে কেন ফেরে না? ঘরে খাবার রাখি,
আমার রেতের খাবার-সে এলে খাব! সে আসে না, আমিও
খাইনা। যা ছিল সব আছে, নেই কি ? নেই শুধু জল !
জল আনতে গিয়ে আমি তারে হারিয়েছি, আর জল আনা !
ওগাে, আর আমি জল আব না।
মােহ। তুমি সন্ধ্যাবেলা আমাদের বাড়ী যেতে পার ? নেই
বা সেখানে থাকলে, যেতে দোষ কি? যখন বুড়ী আসে তার
সঙ্গে ঘরে এস, হেথা একলা থেকেই তােমার মন খারাপ হয় ।
রাবেয়া। সেথা তােমার পিতার সান্ধা-বিশ্রমে তােমার
ভগিনীরা
মােহ। না না, সেখা গিয়ে কাজ নেই, আমি বরং বুড়ীকে
সকাল সকাল পাঠিয়ে দেব। তুমি অত ভেবনা! ভুলতে
পার নেই পালে, তা বলে চিরদিন শােক ক’তে হবে সেটা ত
ঠিক নয়! তুমি খেয়েছ?
৬ষ্ঠ দৃশ্য রাবেয়া। রাবেয়া। (নীরবে শিরশ্চালনা।) মােহ। তবে খাওগে যাও! আমি চললুম, বুড়ীকে এখনই পাঠিয়ে দেব, কেমন ? রাবেয়া। আচ্ছা। মােহসীনের প্রস্থান। (কিছুকাল নীরব থাকিয়া) কি ও? কি যেন ছুটে আসছে । ( চক্ষু মুছিয়) এ সময় এ মরু-পথ ভেঙ্গে কে আসবে? কে আসে ? যে হয় হক, আমার কি ? আহ', যদি ওই বাবা হত ; যদি সেই অনি এখন ছুটে আস্ত, তা হলে আমি কি ক’তুম ? ছুটে গিয়ে তার গলা জড়িয়ে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিতুম। না না, তা’ ক’তুম না, তারে হেসে আদর ক’তুম, যত্ন করে খাবার রেখেছি, কাছে বসে খাওয়াতুম। কত গল্প শুতুম, কোথা ছিল- কেমন ছিল জিজ্ঞাসা করতুম। আমার কথা সব তারে ব’তুম ; কেবল যে তার জন্য আমার বুক ফেটে যায়, রােজ রােজ যে কেঁদে রাত কাটাই, সেইটুকু ব’তুম না। তা বলে সে হয়ত শুনে কেঁদে ফেত। আমার তাকে খাওয়ান হত না। ও কে ও ? এ দিক্ পানেই আসছে যে; সে তনয় ; বাবা ত নয় ? না সে অত রােগা নয় ; আর সে আসবেই বা কি করে ? না না, সেই ত যেন বােধ হচ্ছে। সেই—না— সেই, বাবা- ইসমাইলের প্রবেশ। বাবা, বাবা! তুমি—তুমি ! তুমি এসেছ! সত্যই তুমি এসেছ? ইস। এসেছি, রাবেয়া, আমি বেদুইদের কাছ থেকে
৩ঃ
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
পালিয়ে এসেছি। এই দীর্ঘ মরু ছুটে পার হয়েছি! উঃ বড়
পিপাসা, মা একটু জল। (ভুমিতে উপবেশন।)
রাবেয়া। জল-জল ত ঘরে নেই।
ইস। ও মা প্রাণ যায়, শীঘ্র একটু জল আন। এক ফোটা
জলও কি ঘরে নেই ?
রাবেয়া। বাবা তুমি একটু বস, আমি ছুটে গিয়ে জল
আছি। একটু বিশ্রাম কর, আমি যাব আর আসব।
জলভাণ্ড লইয়া প্রস্থান।
ইস। উঃ বুক ফেটে যাচ্ছে, কাণ মুখ দে আগুন বেরুচ্ছে।
বড় পিপাসা। ( ভূমিতে শয়ন) উঃ মা রাবেয়া ! একটু জল ।
জল, জল-রাবেয়া—মা-একটু জল, রাবেয়া-মা (আক্ষেপ
ও মৃত্যু।
কিছুক্ষণ পরে জলভাণ্ড লইয়া রাবেয়ার প্রবেশ।
রাবেয়া। বাবা, বাবা! জল এনেছি, এই নাও। ( নিকটে
গিয়া) বাবা, ও বাবা! ওঠ, জল খাও! কথা কচ্ছনা কেন।
এর মধ্যে ঘুমিয়ে গেলে ? ওঠ, জল খাও! ( গাত্ৰস্পৰ্শ করিয়া)
বাবা, ও বাবা! ওঠ না, জল খাও! একি চোখ চেয়ে আছ,
কথা নেই কেন? ব’তে পাছ না? এই খাও! (মুখে জল
প্রদান) যা সব জল গড়িয়ে গেল, খাও না! এ কি হল,
এ যে শ্বাস চলছে না!
দুইজন বেদুইন্ দস্যুর প্রবেশ।
ওগো, দেখ কি হ’ল ! 'বাবা আমার বেদুইদের কাছ থেকে
৬ষ্ঠ দৃশ্য )
রাবেয়া।
পালিয়ে এসে জল চাইলে, আমি জল আনতে গেলুম; এসে দেখি
শুয়ে আছে—শ্বাস বন্ধ ! ডাকলে সাড়া দিচ্ছেনা, জল দিলে
খাচ্ছেনা, একবার দেখ না গা কি হ’ল ।
১ম দস্য। ( দেখিয়া ) ওহে, শালা মরে গেছে।
রাবেয়া। মরে গেছে ? না না, মরে নি! এইত এল—এইত
জল চাইল । যেমন দেখলুম—তেমনি আছে, তবে কেমন করে
মরে গেল ?
২য় দস্য। আবৎ মরেছে! না মলে আমরাই মেরে
ফেতুম। যাও শালা জাহান্নমে যাও, বড় হয়রাণ করেছ।
( পদাঘাত )
রাবেয়া ।
ও কি ও?-
১ম দস্য। আরে ছ্যা, মড়া মেরে কি হবে? এখন চ’
এইটাকে পাকড়াই, খাটনি ববাদ হবে না।
২য় দস্য। তা আর বলতে। (রাবেয়াকে ধৃত করণ।)
রাবেয়া। কেন ধ’ছ ?—ছেড়ে দাও, বাবাকে দেখি!
২য় দস্য। আরে ছুড়ি, মরা বাপ দেখে কি করবি? এখন
খস দেখবি চ!
রাবেয়া। মরে গেছে, সত্যি মরে গেছে ? ওগো কেন
আমি জল আনতে গেলুম! বাবা, বাবা!-- মুচ্ছা)
১ম দস্য। বেড়ে সুবিধা হয়েছে, মুচ্ছ গেছে ; ধর ঘােড়ার
পিঠে বাঁধি।
রাবেয়াকে লইয়া
উভয়ের প্রস্থান।
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
সপ্তম দৃশ্য।
আদুলের গৃহ ।
কাল-প্রভাত।
আবদুলের প্রবেশ ।
আব, না বাবা স’রে পড়াই ভাল, কাজ কি এত ঝঞ্চাটে
থেকে। আর কাজ কর্ম বন্ধ করেই বা কতদিন থাকা যায় ?
যাই, বসােরা মুখেই রওনা দি। এখন শ্ৰীমতীর মত হলেই
আঃ এক রকম ভয়টয় দেখিয়ে রাজি করে নেব এখন।
ব’তে না ফ’তে, মাথার রতন ত দেখা দিয়েছেন। সুর
তােলা যাক।
সােফিয়ার প্রবেশ।
সােফি। একঘরের একার রাজ্যি, আর বল অমন সােয়ামী,
তা মন্দই বা কি? গােলামে বরং কখন অগ্রাহ্য করে, তা মিসে
সাহস পায় না। তবে কি না, একটু কড়া মেজাজে না থাকলে
শেষ হয় ত বিগড়ে যাবে, তাই-ওমা মিসে এখানে দাঁড়িয়ে
হাঁ করে কি ভাবছে! ( প্রকাশ্যে ) বলি ও গো,বলি শুছ ?
ঢং দেখ ! ( নিকটে গিয়া নাড়া দিয়া) বলি ও গো।
আব। এ হে হে, সব গেল গো—সব গেল !
সােফি। ওমা গেল কি গা ?
আব। আর কি গা ? সব গেল-সব গেল ।
সােফি। ওমা সে কি গো?
৭ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
আব,। ওগো, তাই—তাই! আহা, কিছু রইল না গাে
কিছু রইল না!
সােফি। ওমা বল কি গো ?
আব। আহা উট ভেড়া দুধ্যে গাে!
সােফি। পােড়ারমুখো ! যা মুখে আছে, তাই বলে গাল
দিচ্ছ।
আব,। ধন দৌলত মাথার মণি সবই গো!
সােফি। নাও আর জুতো মেরে পা'র ধূলো কাজ নেই !
অত আর মুখের আদর--
আব। ও আমার সাধের ধন-প্রেমের কেতন, সো-
সো-সােফিয়া গো!
সােফি। আঃ মিছে ব’ছ কেন ?
আব। তুমি আমার কোথা যাবে গাে !
সোফি। ওমা আমি কোথা যাব ?
আব,। আর কোথা ? আহা, আমার কি হ’ল গাে,
আমার যে সবই গেল গাে !
সােফি। ( ক্রন্দন সুরে) ওমা আমি কি ক’ৰ গো ?
মিসে কেমন হ’ল গো?
আব। আহা, আমার এমন সাধের সােফিয়া গাে,তুমি
কোথায় গেলে গো !
সােফি! (সমসুরে) ওমা এই যে আমি, তবু মিসে বলে
কি গো-ওমা মিসে বুঝি পাগল হ’ল গাে !
আব,। চুপ, চুপ, ! হু তুই আমায় পাগল
ঠাওরেছিস ?
৩৮
রাবেয়া।
{ ১ম অঙ্ক
সােফি। (পূৰ্ব্ববৎ) ও গো, তেমনি ধারাই
ধারাই লাগছে যে
গো !
আব। বটে?-
সােফি। (পূৰ্ব্ববৎ ) ও গাে, সত্যি সত্যি মিসে আমার
ক্ষেপেছে যে গো !
আব। চোপ্রাও !
সােফি। (পূৰ্ব্ববৎ) ও গো, কে কোথায় আছ এস না গো !
মিসে বুঝি মেরে ফেলে গো !
আব,। এই মজালে, সােফি-সােফি, চুপ ক !
সােফি। (পূৰ্ব্ববৎ ) আর যে আমি চুপ, ক’রুতে পাছি নি
গাে!
আব। না বাবা ঘাট হয়েছে, খুব লােক্ কে ঘাটিয়েছি।
ওরে দোহাই তাের, চুপ ক র !
সােফি। (পূৰ্ব্ববৎ ) ও গাে, আর অমন পাগলামাে কবে
না ত গাে ?
আব,। ওরে না না, এখন কাজের কথা শােন্।
সােফি। আচ্ছা বল !
আব। বেশ ঠাণ্ডা মেজাজে সম্ঝে দে, যা ভাবছি তাতে
কান্না আসে কিনা ?
সােফি। আচ্ছা, আচ্ছা, বল।
আব। বলি কাণ্ডখানা কি হচ্ছে, দেখতে পাচ্ছ ?
সােফি। কি ?
আব৷ কি? এত বড় কাণ্ডটা চোখের উপর হচ্ছে, তবু
ব’ছ কি ?
৭ম দৃশ্য ]
রাবেয়া
৩৯
সােফি। আরে ছাই, না বললে বুঝব কি করে ?
আব। তা বটেই ত, নইলে আর খোদা মেয়ে মানুষ
সােফি। আরে গেল, অধঃপেতে মিসে জ্বালিয়ে খেলে গা,
ভাঙ্গবেও না—আঁশও ছাড়বে না।
আব। বুঝবেও না, ব’তেও দেবে না।
সােফি। তবে রে হতচ্ছাড়া!—নিজে ব’বে না, আবার
পাল্টা
দুষবে।
আব। (স্বগত) এইবার বিপরীত, আর বাড়ালে তিত হবে।
( প্রকাশ্যে ) বলি এই যে সব লুটপাট হচ্ছে, দেখছ না ?
সােফি। ওমা বেদুইন্! আবার তারা এসেছে ! ( কম্পন )
আব। আসে নাই, তবে আসবে ত! দেখছনা, ক্রমে পথ
করে নিচ্ছে! একে ভয়—দুয়ে সয়, তিনের বেলা চেপে রয়।
দু’বার গেছে, এইবার তিন, তারপর চ’বে দিন দিন।
সােফি। তাইত কি হবে ?
আব,। কি আর হবে ? ধন দৌলৎ গরু জরু সবই যাবে।
সোফি। ওগো আমায় বাচাও গে !
আব৷ সেই কথাই ত ভাবছি গো।
সােফি। কি—কি ভাবছ? যা হয় একটা কিছু উপায় কর
গো।
আব। তাইত, বড় বিষম সমস্যা।
সােফি। ওগাে আমি যে গেলুম গো !
আব। চেঁচাস নি, তা হলে কাজ হবে না। যা বলি তা
পাবি?
৪০ রাবেয়া। [ ১ম অঙ্ক সােফি। ওগো, যদি বাঁচি তবে নিশ্চয় পাব ! আব। আহা, তা নইলে কি আর কবরে গিয়ে পাবি? শে, দেশ ছাড়তে পাবি ? সােফি। পাব। আব। এই সব ঘর দোর ? সােফি। পাব। আব,। বােঝ, তা হলে বাপ মা ভাই বন্ধু সবই এক রকম ছাড়তে হবে। সােফি। ওমা তাইত। আ। আবার তাইত কি ? এ তবু আশা থাকবে, বেঁচে থাকলে দেখা হবে। কিন্তু বেদুইদের হাতে পড়লে যে চির- কালের মত সে গুড়ে বালি। সােফি। তবে সবাইকেই সঙ্গে নাও না কেন ? আল্। ক্ষেপী, দেশ ছেড়ে যাওয়া অমনি সহজ কথা কিনা, যে মনে ক’লেই হ’ল ? সােফি। তবে তুমি যে ব’ছ ? আ। আমার সঙ্গে তােমার বাপ ভায়ের ঢের তফাৎ। তাদের মস্ত সংসার। জমি-জমা ঘর-দোর, ছেড়ে গেলেই ত হ’ল না ; বলি পেট ত সঙ্গে থাকবে ? সােফি। আর তােমার বুঝি রেখে যাবে ? রেখে কি আর যাব ? তবে সব খুলে বলি শােন্ ! জানিস ত সংসারে আমার কেউ ছিল না। ভালমন্দ যা নিজের খেয়ালে আস্ত তাই ক’তুম, দুঃখে কষ্টে খেয়ে না খেয়ে দিন চন্ত। ছেলে বুদ্ধি—দু’একটা অকাজও যে না ক’তুম তা নয়, তবে ৭ম দৃশ্য ] রাবেয়া। কাজের চেয়ে নাম বেরুল বেশী ; আমার হয়ে দু’কথা বলবে, দুটো সাম্লে নেবে, সে লােক ত ছিল না ; বাপ মা না থাকলে, বিশেষতঃ হাভাতের আত্মীয় বন্ধুই বা কে থাকে ? কাজেই গাঁয়ের লােকের তাড়ায়, মনের দুঃখে একদিন দুতোর ব’লে ভেসে পড়লুম। কোথায় গেলুম জানিস ? হীরাট, কাবুল, তিহারাণ, ইস্পাহান, একদিক থেকে ঘুরে শেষ বসােনায় গিয়ে জ’লুম। সায়েত ভাল, সেখানে এক মহানুভব সদয়হৃদয় ভদ্রলােকের আশ্রয় পেলুম, তার নাম এব্রাহিম সাহেব। এ নাম তােকে কত বার বলেছি। তিনি কথায় কথায় সমস্ত ঘটনা জেনে, দয়ার সাগর আমায় পুত্রের ন্যায় স্নেহ ক’রূতে লাগলেন। স্নেহ ক’রূতে লাগলেন। হায় সােফিয়া, এ দুনিয়াতে অভাগাকে যে দয়া করে, তার তুলনা কার সঙ্গে দেব ? তার তুলনা সেই ! যাক্, শেষে সেই মহাপুরুষের স্নেহ- ছায়ে লেখা পড়াও কিছু শিখলুম ; ভদ্রলােক হ’লুম। তারই সাহায্যে পাঁচ রকম কাজ কৰ্ম্ম করে-শেষ স্বাধীন ব্যবসা আরম্ভ করলুম। বহু দেশ দেখা ছিল, কাজে সুবিধা হ’ল ; খােদার মজিতে দু’পয়সা সংস্থান ক’লুম। চলছিল বেশ সুখ-স্বচ্ছন্দে। কিন্তু মন মালে না, এই যে সাত পুরুষের এই একরত্তি ভিটে, এই যে জন্মস্থান টুকু, যার প্রতি অণুতে দৃষ্টি পড়লে মনে হয়— আমার পূর্বপুরুষগণ কতবার এই ধূলিতে পদস্থাপন করে ভ্রমণ করেছেন,বুঝি এখনও এতে তাদের সে পদসৌরভ মিশ্রিত আছে; এই ভিটের মােহ আমায় এখানে টেনে আলে। এব্রাহিম সাহেব! যিনি একাধারে আমার পিতা মাতা ভ্রাতা বন্ধু, তার স্নেহ-বন্ধনও আমায় আবদ্ধ রাখতে পারল না। আমি আমার এই পূৰ্বপুরুষের সগৌরব স্মৃতি-জড়িত জীর্ণ কুটীরে ফিরে এলুম।
82
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
সােফি, সােফি, সে কুটীর আজ অট্টালিকা ! যাক, তারপর শােন !
ধন হলেই মানুষ বদলে যায়, শুধু যে সে নিজে বল্লায় তা নয়;
আশ্চর্যের বিষয় সঙ্গে সঙ্গে অন্য পাঁচজনেরও চোখ বদূলায় !
আর ছাই শুধু চোখ বলি কেন? চোখ মুখ হাব ভাব ভাষা
সমস্তই বলায় ; ঠিক যেন পুনর্জন্ম। কাজেই ছিলুম আব্দুল্লা,
হ’লুম মীর মােহাম্মদ আব্দুল জব্বার ; তুই বদলে হ’ল আনি,
চাটি ব’দলে হ’ল দোস্ত, যারা ছিল পর—তা’রা হ’ল আপন।
অবশ্য দুই একজন লােক পূৰ্ব্বাপরই ভাল ব্যবহারে চলেছে,
যেমন মােহসীদের গােষ্ঠী । কিন্তু সে ক’টি ? আঙ্গুলে গােনা
যায়। যাহ’ক ফিরে এসে যখন এমারত গাঁথলুম, তখন অনেক
আপনার লােক—অনেক দরদি জুটে গেল । দু’চার জন মুরুব্বিও
দেখা দিল, তার মধ্যে তাের বাপ কিছু বেশী । চটিস নি,
খাঁটী কথাই ব’ছি ! শেষ কি দিয়ে কি হয়ে, তােকে নিয়ে
মজলুম।
সােফি। যাও !
আব,। যাও নয় ! লােকে বলে বটে, যে বে থা করে
সংসারী হ’লুম, কিন্তু আমি সুরে)
“কি রকম যে হয়ে গেলুম, বলিব তা কাহারে ?”
সােফি। আহা কত রঙ্গই জান ?
আব। রঙ্গই বটে সােফি! সংসারে সবই রঙ্গ। নইলে
আর মহাপুরুষেরা দুনিয়াকে নাট্টশালা বলেছে কেন ? ভাবতে
গেলেও বিশেষ তফাৎ নাই, এ পঞ্চাশ বছর—সে নয় পাঁচ ঘণ্টা।
ব্যাপারটা একই। যা কথাটা শেষ করি, ভাল হক মন্দ হক
সংসার পেতে তােকে নিয়ে দেখতে দেখতে প্রায় দু’মাস কেটে
৭ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
৪৩
-
গেল ! চলছিল মন্দ নয়, কিন্তু কোথা থেকে এই বেদুইদের
উপদ্রব জুটে, মনের স্বাচ্ছন্দ্য ঘুচিয়ে দিলে ; সদাই ভয়—কখন
কি হয় ? তাই ভাবছিলুম কি, এমন ঝঞ্চাটে থাকার চেয়ে একটু
নিরুপদ্রব জায়গায় যাওয়া ভাল।
সােফি। এই না তুমি বল, তােমার কোন ভয় নেই ! তবে
যে পালাতে চাচ্ছ ?
আব। কথাটা কি জানিস সােফি? এই ঘুরে ঘুরে এমন
স্বভাব হয়েছে, যে এক ঠেয়ে বসে থাকলে প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।
তারপরও একটু সূক্ষ্ম আছে ; বলি কি মনে কর, আমি অফুরন্ত
ধন রােজগার করে এনেছি, যে চিরকাল বসে খেলে চলবে?
তা’ত নয়, কাজেই কাজ কর্মের চেষ্টাও দেখতে হয়। আর
বেদুইদের ভয়টাও যে একেবারে কিছু নয়, তা বলে মিছে
কথা বলা হবে। তাই ব’ছিলুম কি, চ’ কিছুদিনের জন্য বসাের।
যাই। কাজ কৰ্ম্মও চলবে, নিশ্চিন্তও থাকা যাবে। তারপর যখন
খুসী এলেই হ’ল, কি বলিস?
সােফি। সবাইকে ছেড়ে আমি কি করে যাব গা ?
আব। তবে থাক গা! বেদুইনে ধ’রূলে তখন নাকি সুরে
কেঁদ গা ! তারা তােমায় খােস মেজাজে ছেড়ে দিয়ে যাবে গা !
সােফি। ওমা তাওত বটে গা ?
আব। এখন ওগাে আগে ছেড়ে, কি করবে তাই বল ।
বেদুইনদের হাতে পড়বেন। আমার সঙ্গে বহাল তবিয়তে
বসােনা যাবে ?
সােফি। ওমা আমি কি করব গা.?
আৰ। আহা, যা হয় একটা কিছু ত ক’রূবে গা ?
৪৪ রাবেয়া। [ ১ম অঙ্ক ইউসুফের প্রবেশ। ইউ। (কাশিয়া) এই যে, বাবা কি ঠিক করলে? আব,। আজ্ঞে কি করি তাই ভাবছি। ইউ। আমি বলি কি তােমরা বরাতেই যাও। কি জান বাবা, বড় ভয়ের কথা হয়ে পড়েছে। তােমরা ভাল আছ জালেও অনেকটা নিশ্চিন্ত হব। আর আমরাও দেখি, যদি উপদ্রব বেড়ে যায়, তবে সব শুদ্ধ না হয় তােমাদের কাছে গিয়ে কিছুদিন কাটান যাবে। আব। সে ত বেশ ভাল কথা ! আমি বলি কি, কেন এক সঙ্গেই চলুন না ? আরও কিছুদিন দেখি। কি জান বাবা, ঘর- সংসার ছেড়ে যাওয়া ! তা তােমরা যাও, দরকার বুঝি তবে নিশ্চয়ই যাব। আব। আজ্ঞে আমি ত সংকল্প এক রকম ঠিকই করেছি। তবে এরা আপনাদের ছেড়ে যেতে চায় না। ইউ। কে সােফি? পাগল আর কি! যাও মা, নেহাত দায়ঠেকেই তােমাদের তফাতে পাঠাচ্ছি, নইলে কি ছেড়ে থাকতে আমাদেরই মন যায় ? উপদ্রব থামলেই আবার চলে এস, নইলে ত আমরাই তােমাদের কাছে যাব নাও, আর অন্যমত করে গুছিয়ে সুছিয়ে বেরিয়ে পড় বার জোগাড় কর । এখন আমি আসি ! ( প্রস্থানােদ্যোগে ফিরিয়া) হাঁ, আর একটা কথা, পথ চলতে টাকা কড়ি ‘বেশী সঙ্গে না রাখাই ভাল, কি জান পথও ত বড় ভাল নয় ! আর তােমার সেখানে গিয়ে যখন কোন
৭ম দৃশ্য ]
রাবেয়া ।
৪৫
অভাব হবে না, তখন এখানে যা আছে ইচ্ছা কলে আমার কাছে
রেখেও যেতে পার। আর বাড়ীর চাবিটা দিয়ে যেও, ঘর দোর
দেখা থাকূলে একেবারে নােঙ্গর হয়ে যাবে।
আব,। যে আজ্ঞা ! টাকা কড়ি বিশেষ কিছু নেই, তবে
চাবী ত রেখেই যাব। আপনারা বই আমার আর কে আছে ?
ইউ। তা’ত বটেই, তুমি আর সােফি ত আমার একই।
তবে আসি ।
আব। ব’সবেন না ?
ইউ। না, একটু দরকার আছে। সন্ধ্যার পর আমার
ওখানে একবার যেও, সব ঠিক করে দেব এখন। সােফি, তুইও
যাস; কত দিনের মত যাবি, যে দু’দিন আছিস কাছে থাকৃবি।
প্রস্থান।
সােফি। হাঁ গা, কি কি গুছােতে হবে ?
আব। একেবারে যে ডানা বের ক’রূলে ?
সােফি। যাও বল না, আমি সব ঠিক করে রাখছি।
আব। গুছােবে আর কি ? তােমার ঝাল ঝাপী,
বাসন কোশন, পেঁটরা পোঁটলা; আর এই,
গীত।
আব,। সাগর ছেচা অমূল্য ধন,
যত্নে বেঁধ অঞ্চলে !
সােফি। ভাগ্যে আমি পেয়েছিলুম,
নইলে যেতে জঞ্জালে !
৪৬
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
আব। মাইরি না কি কদর কত ?
সােফি। নও জহরী বুঝবে না ত,
আব,। জহর তুমি জানি তা ত,
ওগাে প্রিয়া চঞ্চলে !
সােফি। নইলে কি রই সাপের মুখে,
আব,।
বিষের থােলো আর কে রাখে?
সােফি। সমং সমঃ শময়তি
আব।
তাই ত আছি মসগুলে!
নেপথ্যে। ' আবদুল জব্বার মিঞা বাড়ী আছ ?
আব। যা যা সরে যা, কে আসছে।
সােফিয়ার প্রস্থান।
নেপথ্যে। বলি মিঞা ঘরে আছ কি ?
আব,। কে গা কে, ভিতরে এস।
জনৈক গ্রামবাসীর প্রবেশ ।
আরেংক ও, মীর সাহেব! ভাল ভাল, কি মনে করে ?
গ্রামবাসী। একটা কথা আছে, সকলে মিলে এই বেদুই
দের উপদ্রব নিবারণের একটা উপায় ক’তে হবে। সন্ধ্যার
যুক্তির জন্য মজলিস বসবে, সবাইকে ডাকা হচ্ছে ; তােমায়
ব’লে গেলুম, অবশ্য অবশ্য যেও।
আব। তা নিশ্চয়ই যাব। এত সবারই ভাববার কথা,
কোথায় মজলিস হবে ?
৪
৮ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
গ্রামবাসী। খাঁ সাহেবের বাড়ী, আমি চ’লুম আর দেখ,
যা’র সঙ্গেই দেখা হক, বলে দিও।
আব,। আচ্ছা, আমিও বেরুচ্ছি; যতটা পারি খবর দেব।
উভয়ের ভিন্ন দিকে প্রস্থান।
অষ্টম দৃশ্য।
দস্যু-শিবির সম্মুখস্থ ময়দান।
কাল—অপরা।
দুইজন দস্যু ও আসগর।
১ম দ্য। সে ত ঠিক! সর্দার আছ, সর্দারী ভাগ নাও।
বাড়াবাড়ি কলে চলবে কেন?
আস্। এই বােঝ ত মিঞা, এ কথা উচিত কি না?
২য় দস্যু। আজ স্পষ্ট বম্ব। না মানে নুতন সর্দার হবে।
আস। বলাই ত উচিত, আপনারাও যা—সেও ত তাই।
তবে কিনা একটা মান ; তা মান কি আর আপনাদের নেই ?
১ম দস্তু। আঃ চুপ কর, আর আলাস নি। সে কি বড়
সহজ মনে কর ?
২য় দস্য। কঠিন কি ?
১ম দস্য। কে সর্দার হবে ?
২য় দ্য। কেন সাখাওৎ।
আস। আহা, অমন লােক আর হয় না ।
১ম দস্য। তো বেটাকে ঘা কতক, না দিলে আর ঠিক
'হচ্ছিস নি।
৪৮
রাবেয়া ।
[ ১ম অঙ্ক
আস। আজ্ঞে
১ম দস্তু। ফের ?
আস্। আজ্ঞে হয়েছে। (মুখে অঙ্গুলি স্থাপন।)
১ম দস্যু। যাক্, তাতেই বা সুবিধা কি ?
২য় দস্য। অনেক ! লােক ভাল, এয়ার, সমানে চলবে।
সর্দারী মান আমরাই দেব, সে ব্যস্তৃ হবে না।
আস। অবশ্য !
১ম দস্য। ফিন্?
আস্। কসুর হুয়া । ( পুনরায় মুখে অঙ্গুলি স্থাপন।
অন্য একজন দস্থ্যর প্রবেশ।
৩য় দস্যু! কি অন্যায়, সে বাঁদীটার পঞ্চাশ আসরফি দর
হয়েছে, সর্দার তারে বেচতে দেবে না।
আস। এই বুঝুন!
১ম দসু্য। তবে রে বেইমান্! (আসগরকে তাড়া
করণ।)
আস। ইয়া আল্লা। (বেগে পলায়ন।)
২য় দস্য। বেচতে দেবে না কেন ?
৩য় দস্য। ঐ তার সােহগের বেটীর আবদার! বেটী তারে
পাবে। সর্দারের বেটী হলেই যে তার জন্য নিত্যি
নুতন
सामो
দিতে হবে, তার মানে কি ? তাও যদি যখন পুরান গুননা
বিক্রী হয়, তখন তার ভাগ দিত তবে না হয় কতক বুৰুতুম ।
২য় দস্যু। পুরান বাঁচলে ত বিক্রী, অর্ধেক তাম’রেই
যায়।
৮ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
৪৯
অন্য দুইজন দ্য ও আগরের পুনঃ প্রবেশ ।
৪র্থ দস্য। এই যে, খবর শুনেছ ?
২য় দস্য। উলুম ত।
৫ম দস্য। সর্দার যদি বাদী চায়, দাম দিক। আর কথা
রাখে তবে আজ হতে তার সর্দারী খতম্। সাখাওৎকে সর্দার
করে আমরা নূতন দল ক’ব ।
১ম দস্য। দলাদলি কি ভাল হবে ?
আস! কিছু ভয় নেই মিঞা, কিছু ভয় নেই। যা হয় ওই
একটা দিয়েই যাবে। ওর আর আদলি হবে না।
১ম দস্য। আবার যুটিছিস বেটা বাস্তু ঘুঘু ?
২য় দস্যু। তুমি ওর উপরেই রুখছ কেন ? ঠিক কথাই ত
ব’লছে। এর আবার দলাদলি কি ? বাবা, পয়সার কথা, অত
খাতের জোগাতে রাজি নই। যার সখ থাকে--যে পারে সে
জোগাক, আমরা পাব না।
৩য় ব্য। এই ত সােজা কথা।
১র্থ দস্য। দুভোর সর্দারের কিছু বলেছে। বলি তােমরা
রাজি কি না ?
সকলে। আলবৎ রাজি।
১ম দস্য। চুপ চুপ, সর্দার আসছে।
আস। (স্বগত) স’রে পড়ি বাবা, কি জানি কাছে থাকলে,
আগুনের হল্কায় নিজের মুখ পােড়াও বিচিত্র নয়।
প্রস্থান।
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
রাবেয়া, আবুদা, দস্যপতি, সাখাওৎ ও অন্যান্য
দস্যগণের প্রবেশ।
আদা। না বাঙ্গী, এরে দেব না।
এও সেই বুড়াের
মত অনেক গল্প জানে, আমি শুব।
দ, পতি। আচ্ছা, তুই ওকে নে যা! আমি সব বুঝছি ।
আদা। আয় তুই চলে আয়।
রাবেয়াকে লইয়া প্রস্থান।
সাখা। যদি নেহাতই বাদী রাখেন, তবে দাম দিয়ে রাখুন।
সর্দারী মানের জন্য দর কিছু কম হ’ক! পাঁচজনের কাজ, নিজ
মৎলবে চলে মাবে কেন? বিশেষতঃ পয়সার বেলায় ।
দ, পতি। কি বললি?
২য় দস্যু। অন্যায় কিছু বলে নি। কৰ্ত্তা হলে স্বার্থ ছাড়তে
হয়, তা নয় আপন কোলে ঝােল টানা
দ, পতি। তবে রে বেইমা, মুখের উপর জবাব! এত দূর
বেয়াদবি ?
৪র্থ দস্য। কিসের বেয়াদবি, বাঁদী আমরা দেব না !
দ, পতি। তাের ঘাড়ে দেবে! শয়তান!-(প্রহারােপক্রম)
সাখা। খবরুদার ব’ছি, গায়ে হাত দিও না। সর্দার বলে
ঢের স’য়েছি।
দ, পতি। তবে দেখবি ! ( সাখাওৎকে আক্রমণ।)
দস্যগণ। মার সর্দারকে, সর্দারী ঘুচিয়ে দিচ্ছি । ( আক্রমণ )
১ম দস্য। হাঁ হাঁ, সর্বনাশ হ’ল যা।
(পরস্পর যুদ্ধ ও সর্দারের পতন।)
৫
৯ম দৃশ্য ] রাবেয়া। ৩য় দস্যু। ঠিক হয়েছে, যেমন কর্ম তেমনি ফল। সাখাওৎ, ভাই আজ থেকে তুমি আমাদের সর্দার। ২য় দস্য। ওহে, সর্দারের সেই সয়তানী বেটীকে বেচে, নূতন বাদীকে নুতন সর্দারের নজর দেওয়া যাবে, কি বল ? সকলে। ঠিক কথা ! ৩য় দস্য। সে বিক্রীর টাকাও নজর দেওয়া যাবে । ৫ম দস্য। বহুৎ আচ্ছা ! সাখা। ভাই সব! আমার আবার নজর কি ? চল দুটোকেই বেচব। ও ছারূপােকার বিছন যাক। বরং তােমরা আমায় সর্দার ক’রূলে, সেই জন্য আমি এ সওদার ভাগ যা পাব, তােমা- দের খাইয়ে দেব। সকলে। বহুৎ দিলওয়ারি, বহুৎ দিলওয়ারি। ৩য় দ্য। চল চল, এখন সুখবরটি সবাইকে দিতে হবে। ২য় দস্য। চল, লাসটা নাও। ৫ম দ্য। (লাস ধরিয়া ) ধর পীরবক্স। ধর, ধর। লাস লইয়া সকলের প্রস্থান। ৪র্থ দস্য। নবম দৃশ্য। আবৃদুলের গৃহ-সম্মুখস্থ পথ। কালরাত্রি। মােহসীন্। মােহ। শিশির-শীকরবাহী শরৎ-অনিলে, শিহরিত ধীরে যেই কনক-কমল ;
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
যা’র আশা-মুগ্ধ অক্লান্ত নয়নে চাহি,
নিশি শেষে হতাশ পাণে, আঁখি-বারি-
হিমকণরূপে ঘন ঢালিত চন্দ্রম;
উষাতে মলিন হেরি বিধুমুখখানি,
উল্লাসে যে সরােহৃদে ফুটিত হরষে ;
ছুটিয়া আসিত যাহে, মকরন্দ আশে-
গুণ-মুগ্ধ অলিকুল করিয়া গুঞ্জন।
প্রেমিক পাইলে যা’রে রাখিত হৃদয়ে ।
ভক্ত যাহে সাজাইত দেবতা-চরণ ;
শােকাতুর ল’য়ে যেত সমাধি-প্রাঙ্গণে
ভগ্নপ্রাণে দিতে যায় শেষ উপহার।
আজি সেই জগতের আদর্শ প্রমুন,
অবহেলা-বিমর্দিত করি পদতলে,
দীর্ণ, ছিন্ন, ভূলুণ্ঠিত কর্দম-পুলিনে!
মিটে গেছে সাধ আশা হাসি খেলা তার,
কঠোর আঘাতে হায় ভুলে গেছে যত
বুক-ভরা স্নেহপ্রীতি প্রেম করুণায় ;
ছিড়েছে মৃণাল-ডাের প্রাণের বন্ধন,
শুকাবে অচিরে আহা তাপিত পবনে !
নাহি কোন আশা তার ; তবু যেন আছে-
দীর্ণ সেই বক্ষ ল’য়ে বহুক্লেশে চাহি
কা’র ক্ষীণ রেখাঙ্কিত আশাপথ পানে ;-
নিশান্তে 'বিরহী মত, আশা তার—যদি
যদি হায়,—আসে যদি সেই পথ দিয়া,
৯ম দৃশ্য ] রাবেয়া। - পথভ্রান্ত কোন কেহ প্রেমের পথিক ;- পড়িলে নয়নে তার যদি তুলে লয়, একবার শেষ য দ পরশে হৃদয়ে, তবুও সার্থক হবে কমল-জীবন । হ’ক না সে মুহূৰ্ত্তেক, তথাপি সফল- তথাপি স্বরগ-সুখ মুহূর্ত-স্বরগ। নহি ত প্রেমিক আমি—উভ্রান্ত পথিক, নাহি ত হৃদয়ে মাের স্বরগ-সুষমা, পূর্ণ এ পরাণ শুধু স্বার্থ-হলাহলে, এ হৃদয়ে শান্তি নাহি পাইবে কমল। তবু যাব আমি, যেথা আছে পথ চেয়ে সেই দলিত কমল ; (অচেনা পথিক খুঁজে লব পথ তার মুগ্ধ-আকর্ষণে ) হ’ক না এ সচ্ছিদ্র আধার ; হক না এ জড় প্রাণ ! আধেয় স্বগুণে, পুরাইবে ছিদ্রকুম্ভ-এনে দেবে মধুর স্পন্দন। আর যদি-যদি হায়,–এই মরুতুল্য হৃদয় দরশে, আশঙ্কায় সঙ্কুচিত হয় সে কমল ; তবে ?—তবে ?—তবে ধীর- অতি ধীর স্পর্শে, রাখি’ ফিরায়ে বদন, নিশ্বাসে কি জানি যদি শুকায় তখনি ; তাই ফিরায়ে বদন, অতি সন্তর্পণে তুলি আনি দিব, তার যথা অভীপিত যে কেন না হয়, সেই দেবতার শিরে ।
৪
রাবেয়া ।
[ ১ম অঙ্ক
শুধু দুরে থেকে একবার,-একবার
ফিরায়ে নয়ন, দেখি’ চির-সাধনার
প্রাণভরা হাসিটুকু কমলের মুখে,
পরিপূর্ণ করি সাধ উদ্ভ্রান্ত পথিক,
চলে যাবে চিরতরে অনন্তের পথে।
রাবেয়া ! রাবেয়া ! এত কষ্ট ছিল তাের
ভালে ? অভাগিনী, আজনম দুঃখ পেতে
এসেছিলি হেথা ? কত সাধ ছিল মনে,
বলিব কাহারে ?—হায়, মিটিল সকলি ;-
এত যত্ন করি, ঘুচা’তে নারিনু তাের
আবাল্য দুর্দশা ! হায়, ভাগ্য-বিপৰ্যয়-
বিধি-বিড়ম্বনা, অবিশ্বাসী ছিনু আমি ;
বিশ্বাস দানিলি তুই দৃষ্টান্ত প্রদানে।
তবু—তবু শেষ বার দেখিব যতনে,
ফিরাইতে পারি কিনা অদৃষ্টের খেলা।
একান্তে আবদুলের প্রবেশ।
আব,। (উকি দিয়া, স্বগত) কে বাবা! বেলেল্লা জোয়ান,
রাত দু’পুরে দোর গােড়ায় দাড়িয়ে বিজির বিজির করছে ; রকম
খানা কি, অপদেবতা না চোর ছ্যাচর ?
মােহ। আরে দ্য হিংস্র পশু মানব আকারে,
আরে আরে বেদুইগণ! ভগ্ন যদি
নাহি হয় শক্ত মাের প্রিয়ার কারণে,
যদি সে হেলায় মােরে দলিত না করে,
৯ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
যদি তার হৃদয়েতে স্থান থাকে মাের,
নতুবা যে জ্ঞান বীৰ্য্য হারা হব আমি-
( সন্দেহ রয়েছে তাই প্রতিজ্ঞা পালনে)
এক মাত্র সে কারণ বিনা, জেন স্থির,
প্রতিহিংসা মাের উথলি সাগর জলে-
মুহূর্তেকে মুছাইবে ধরাপৃষ্ঠ হতে,
চিরতরে বেদুইন্ দস্যুদল নাম ।
আব! (স্বগত) কি রকম বাবা ! হাত পা খিচুনিও যে
আছে! আচ্ছা, ঠাউরে দেখি। প্রথম ধর—নিশাচর পঞ্চবিধ,
যথা,চোর, অভিসারক, পাগল, কবি, প্রেমিক, এই পাঁচ রকমের
লােকরাত জেগে পথে ঘােরে। আরও এক রকম আছে, যারা
কাজের খাতেরে বেরােয়—যেমন আমি মজলিস থেকে ফিছি ।
কিন্তু তারা অমন ঠায় দাড়িয়ে ভঙ্গির বহর দেখায় না। সুতরাং
এখন দেখতে হচ্ছে, এ অপদেবতাটী কোন লক্ষণাক্রান্ত।
তার পর কর্তব্য অবধারণ। প্রথম ধর চোর ; যথা,
সচকিত ক্ষিপ্রগতি দৃষ্টি চারিভিতে,
সন্তর্পণে গৃহকোণে ফিরে রজনীতে।
এ ত গোড়াতেই মিল না। তারপর ধর—অভিসারক; অবশ্য
এখানে অজ পাড়াগেঁয়ে অভিসারকের লক্ষণই বিবেচ্য ; তার হ’ল
দু’টা অধ্যায়, প্রথম—পথে, দ্বিতীয়-কাণাচে। পথের লক্ষণ,
চলে যায় হাসি মুখে, চাহে না কাহার দিকে,
এক ধ্যানে একমনে প্রিয়া-মুখ ভাবিয়া ;
কল্পনায় ভরা বুক,
ভাবি মিলনের সুখ,
পলে পলে হেসে ওঠে স্বর্গ-দ্বার খুলিয়া।
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
অপিচ কানাচে,
কোণে গিয়ে কাণ পেতে, রয়েছে আধেক রেতে,
ভো ভো করে মশা দেয় কটাস কামড়।
সন্তর্পণে হস্ত তুলে,
ধীরে তারে ড’লে ফেলে,
শব্দ ভয়ে নাহি দেয় চটাস চাপড় ।
সদা সচকিত কাণ,
হাঁচি কাশি চেপে যান,
কুকুর দেখিলে ঘটে বিষম কঁাপড়।
যদি কেহ দ্বার খুলে,
আশে চায় আঁখি তুলে,
প্রিয়া নাহি হলে ত্বরা সামালে কাপড়।
এও মেলেনা। তিনে ধর উন্মাদ ; যথা,
ক্ষণে হাসি ক্ষণে রােল,
তুলে করে গণ্ডগােল,
ক্ষণে স্থির ক্ষণে নৃত্য ক্ষণে উঠে কঁদিয়া ;
ক্ষণে চাহে পথ পানে,
ক্ষণে রহে আনমনে,
ক্ষণে স্তব্ধ ক্ষণে যায় বিড় বিড় বকিয়া।
এর শেষটা মিছে বটে! তবে কবি, প্রেমিকেরও এ লক্ষণের
সঙ্গে কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য আছে। কাজেই নিশ্চিত মীমাংসা হল
। আচ্ছ৷ তার পর ধর কবি ; শক্ত কথা, পুরো ব্যাখ্যায়
অভিধান লিখতে হয়, সংক্ষেপে বুঝি,
অহং ভুলিয়া প্রকৃতি মাঝে,
রহে সে বিভাের আপন কাজে ;
জগতে রহিয়া জগতে নাই,
প্রাকৃত নয়ন উদাস তাই।
৯ম দৃশ্য )
রাবেয়া।
ভেদি আবরণ মরমে থাকি,
খুঁজিছে রতন বিবেক আঁখি।
সহজ সরল জীবন তার,
প্রকৃতি তথাপি বুঝিতে ভার।
কিন্তু এ লক্ষণ ঝুঁ করে যার তার ঘাড়ে চাপান চলে না।
অনুচ্চ,
লম্বা গুছান চুল,
পিরানেতে অতি ঝুল,
ফিট ফাট টেড়ী কাটা ললিত গমন ।
নিশিতে কদাচ তায়,
বাহিরে পাবার নয়,
করে মাত্র মেয়ে-ঘাটে সাঁঝেতে ভ্রমণ।
বলে বটে সারানিশি, প্রকৃতির শােভারাশি,
নেহারি ফিরিয়াছিনু বিপিনে পুলিনে ;
মূলে সেটা বাজে কথা, রেতে ভয় যাবে কোথা,
পুথি পাঠে ঢােকে মাত্র কাব্যের কাননে ।
বড় জোর,-
কচিৎ জানালা খুলি, লিপিক্লান্ত নেত্ৰ তুলি,
চেয়ে দেখে ফুটিয়াছে জ্যোছনা কেমন ;
খেজুর তালের বন,
মেলে না তাহার সনে লিখেছে যেমন।
যাক, এও ত নয়ই। তারপর প্রেমিক! সে লক্ষণ ধরা কিছু
কঠিন ; আর ছাই প্রেমিকের লক্ষণই বা কি ? সে প্রায়
পাগলেরই এ পিঠ আর ও পিঠ। লােকটাও তারই একটা কিছু
হবে। যাই হক, চিন্তার কারণ নেই বলেই বােধ হয়; সাড়া
ঝাউ করে শন্ শ
৫৮
রাবেয়া ।
[ ১ম অঙ্ক
দিয়ে বুঝি। (পদ-শব্দ-করণ) কই, খেয়াল করে না।
( পুনরায় শব্দকরণ)
মােহ। (ফিরিয়া দেখিল )
আব। (স্বগত) না বাবা বলােক নয়। তা হলে এত
ক্ষণ পাইতার ক’ত। ( প্রকাশ্যে ) কে গা, কে ওখানে ?
মােহ। কে আবদুল ? আমি মােহসীন্।
আব,। তুমি এত রাত্রে এখানে,-মজলিসে যাও নি ?
মােহ। গিয়েছিলুম, অল্পেই ফিরিছি। কি হল ?
আব। স্থির হ’ল, গ্রামের সমর্থ ব্যক্তি মাত্রের আত্মরক্ষার
জন্য প্রস্তুত থাকা। প্রয়ােজন হলেই দলবদ্ধ হয়ে দসু্যর
আক্রমণ প্রতিরােধ ক’তে হবে। পাড়ায় পাড়ায় এক একজন
দলপতি নির্বাচিত হ’লপ্রত্যহ পালাক্রমে এক এক দলের
উপর গ্রাম পাহারার ভার রইল । সে যাক্, তুমি এখানে কি
ক’ছিলে ?
মােহ। কিছুই না, আকাশ পাতাল ভাবছি ; মনে একটা
খেয়াল উঠেছে-দেশ-ভ্রমণে যাব। শুনলুম, তুমি বসােনা যাচ্ছ ।
সঙ্গী হওয়া চলে কি না জানতে এসেছিলুম।
আব। না ভাই, শাদা কথা কইছ না।
মােহ। সত্যই তাই।
আব,। মৎলব খান কি ?
মােহ। পালান!
আব। সে কি, কেন ?
মােহ। (ঈষৎ হাশ্যে ) ডাকাতের জন্যে।
আব। বল কি হে ?-
৯ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
বাঘ ভালুক সব উজোড় হ’ল,
শেষ—ছারূপােকাতে দেশ ছাড়ালে ?
মােহ। দোষই বা কি?—সে যে শয্যাকণ্টক !
আব, ‘মাথা নেই তার মাথা ব্যথা! তােমার ত শয্যাই
নেই হে, তার আবার কণ্টক কি ? বাজে কথা ছাড়, আসল
মৎলব কি ?
মােহ। আগে বল তােমার যাওয়া ঠিক কি না ?
আব,। হা।
মােহ। কবে যাবে ?
আ। পরশু ;
এখন বল ?
মােহ। শুনে ছাড়বে না ?
আব! ব’লে সন্তুষ্ট হই ।
মােহ। একটা রত্নের সন্ধানে।
আব,। তা এই গােলমালের সময় ! বাড়ীতে যদি কোন
বিপদ ঘটে ?
মােহ। আরে ভাই, ডাকাতেও জায়গা বুঝে ডাকাতী করে।
আর ও ত নূতন নয়! তবে ব’বে বছর না ঘুরতেই দু’বার হ’ল ;
সে কিছু নয়, শেষেরটা তাদের পলাতক ধ’তে এসে ফাকে
পেয়ে নিয়ে গেছে। ভায়া, ব্যবসায়ী চোর সজাগ ঘরে সিধ কাটে
। যদি ফের আসে, তবে দু’চার বছর পরে যখন সকলে নিশ্চিন্ত
থাকবে, তখন হঠাৎ একদিন এসে পড়বে।
আমার নেই।
আব। আচ্ছা বুঝলুম ! এখন তােমার সে রত্ন কোথা
আছে ?
সে চিন্তা
৬০
রাবেয়া।
[ ১ম অঙ্ক
,
মােহ। তা জানি নি, তবে দরে বিকোবে। ব’তে পার,-
কোথা রত্ন-ক্রেতা অধিক ?
আব,। ও হাে, তােমার মন গিয়েছে হারিয়ে ? এখন
সবই বুঝলুম। ভায়া হে!
যৌবনের বিষম নেশা,
দুনিয়া করে অন্ধকার।
মন হারিয়ে ফেল যদি,
কুড়িয়ে আনা হবে ভার !
এঃ ঘুণ ধরিয়ে বসেছ !
মােহ। সে হক, তােমায় যা জিজ্ঞাসা করলুম, তার
উত্তর দাও।
আব। তা অনেক জায়গার সন্ধান দিতে পাব। তবে
বসেরা একটা বড় জায়গা বটে! কিন্তু কথা এই, হারাধন
যে খুঁজে পাবে, তার প্রমাণ কি ?
মােহ। পাব আশায় চলেছি, না পাই আশায়
ঘুব
আব। এ যে ভাই, বড় বাড়াবাড়ি ?
মােহ। কমাবার উপায় নেই ; তুমি বন্ধু—বিশ্বাস করে
বলেছি।
আব। নিশ্চিন্ত থাক ! কিন্তু
মােহ। না, আর কিন্তু নেই ; আমি স্থির-সংকল্প। তুমি
বন্ধু, তােমার সাহায্য পাব কি না?
আৰ। অবশ্যই পাবে । তােমার মত লােকের সাহায্য
ক’তে পারাও সৌভাগ্য।
মােহ। তবে আমি প্রস্তুত হই ?
৯ম দৃশ্য ]
বাবেয়া
আব। হও! মনের গতি-জলের মত, বর্ষা গেলেই শান্ত
হতে পারে। কিছু দিন আমার সঙ্গে থাক, সে ভালই।
মােহ। জান ত, ধীর ধারা পাথর কাটে।
আব। ধীর ধারা কি হঠাৎ প্লাবন তার ঠিক কি ? সে
দেখা যাবে ।
মােহ। (ঈষৎ হাস্যে) তবে চলুম, কাল দেখা হবে।
প্রস্থান।
আব,। হু, হাসির রকমটা ভাল নয়! (দ্বারে আঘাত করিয়া)
ওরে ও ও রহিম। ওরেও রহমৎ। ওরে,না বেটার।
সব মরেছ। ও-সো-সো-সােফি-ও হো, সে না বাপের
বাড়ী,ইয়া আল্লা! ওরে, ও রহিম-ওই ! ( দ্বারে আঘাত )
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বসােরা-বাঁদীর হাট।
কাল-প্রভাত।
ব্যাপারী ও বাদীগণ।
স্বাদীগণ।
গীত।
লুটে নাও ফুলের মধু, রেখ না শেষটুকু তার,
বাসি হলে শুকিয়ে যাবে, আজ গেলে কাল আর পাবে না।
পিয়ে নাও চাদের সুধা, ঘুমিয়ে রাত যেপ না,
প্রভাতের মলিন শশী হেলে চকোর আর গা’বে না।
মলয়ার মৃদু পরশ, বসন্তের ক’দিন পাবে,
মন-কোকিল কুহুতানে যৌবনেই প্রেম শিখাবে,
বরষা আবে যখন, এ নেশা ছুটবে তখন,
জেনে কেন সে পরিণাম ভােগর সময় ভােগ কর না।
মােহসীনের প্রবেশ।
মােহ। কোথায়—কোন্ দেশে, জগতের কোন প্রান্তে
গেলে তারে দেখতে পাব ? মূর্তিমতী সরলতা, ভগবানের আদর্শ
সৃষ্টি, সে কোথা—কোন্ পাপিষ্ঠের করে নির্যাতিতা হচ্ছে, তা
কি করে জানতে পাব?' এ কেন হয় ?-নিষ্পাপ, নিরীহ, যারে
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
দেখলে করুণার উদ্রেক হয়, সংসারে যে সর্বপ্রকারে শক্তিশুন্য,
তার প্রতি শক্তিমানের অত্যাচার! কে ব’বে কেন হয়? রাবেয়া,
রাবেয়া ! স্বর্গের দেবী তুমি,-শয়তানের বিলাস-সামগ্রী হবে,
এই কি তােমার পরিণাম? হা হতভাগিনি! কেবল অনন্ত যাতনা
ভােগ ক’রুতেই সংসারে এসেছিলি ?
জনৈক দালালের প্রবেশ।
রয়্যা,
দালাল। বলি কোর্তা! আসছ্যান কন্ থিক্যা ?
মােহ। বহুদুর হতে।
দালাল। বাদুরীর দ্যাশ থিকা। তা বাল কছান ; এ
বরার গুলাবী খােবা না ললি আপনাগরে দ্যাখাল আমীর
ওর চবি কিসি? বাল কছান কোর্তা, বােরই বাল
ক’রূছান! এ্যাহন এহানে খােস মেজাজে কিছুদিন
পেরাণ ডারি মাজি গসি লন। এ্যাম্বা মাজবান যে দ্যাশি যাইয়া
আজির ওলি, চমহানি দেহেই লােকির তা লাগ্যা যায়।
হাদে কোর্তা বাসা লইছ্যান্ কোতি ?
মােহ। (নিরুত্তর)
দালাল। এ তাে—বােরাে কথা ! বলরা সহরে আস্যা ঠাই
পান্ নি ? পথে দারায় বাবতিছান। আস্তান আমার সাতি!
এমন ঠাই দেবয়নে, যে কিছুরি নাজাই পাব্যান না।
মােহ। জায়গার জন্য আমি চিন্তিত নই। আমার এই
বাজারে প্রয়োজন আছে।
দালাল। বাদী লবান, বাঁদী লুবান! আরে তাই কন!
আমি বাবছি মিঞা তালাস করে কি ? এই ত হব বাদী আছে,
৬৪
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
পােছন্দ করেন-পােছন্দ করেন। দরের লাগা বাবান না,
তা আমি ক’র্যা দেবয়নে, এহি বারেই ঠগবান না।
মােহ। এ বাঁদীতে আমার প্রয়ােজন নাই, আমি যা খুঁজছি
তা এখানে নেই।
দালাল। বুচছি, বুচছি! অয় অয়, বােয়স কাল, নালি
চ’ব ক্যা? তা আন্ দ্যাহাই গ্যা।
মােহ। তুমি যা বুঝেছ—তাই বটে, কিন্তু আমি একটা
পছন্দ করা লােকের চেষ্টায় এসেছি ; তারে যদি পাই তবেই
নােব, নইলে নয় ।
দালাল। অপিরীতির ময়না খাঁচায় পােবান! তা
ক’লিই অয়। এ হাটত যদি থাহে, তাে নিয্যশ আপনারে লয়্যা
দিমু। এহানকার যােত ব্যাপারি, হন্ হালাই আমার নেঙ্গুর ধরা।
মােহ। তা যদি পার, তবে তুমি যা পেলে সন্তুষ্ট হও, তাই
তােমায় দেব।
দালাল । আস্তান কোর্তা, দেহাই গ্যা! আমাক দেওয়া থােয়ার
কথা বা ব্যান না, উজুরগরে গােলাম আমরা, যা তা পালিই ওল।
উভয়ের প্রস্থান।
১ম ব্যাপারী। খদ্দের চলে যায়। গান ধ, গান ধ!
রসের সাগর উথলে উঠুক।
বাদীগণ ।
গীত।
যদি রস উথলে ওঠে, কেন তবে গুমরে মর।
জোয়ারের জলের ধারা, বালিতে কি বাঁধতে পার।
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
৬৫
ভেসে যাও স্রোতের সাথে, ফির’ না আধেক পথে,
গেছে ত দু’কূল দূরে চুবন খেতে কেন ফের।
১ম ব্যাপারী। খদ্দেরটা রকম সই আছে, চল না দেখি ।
২য় ব্যাপারী। দেখতেই ত হয় । এই, তােরা সব আয় ত!
সকলের প্রস্থান।
মােহসী ও দালালের পুনঃ প্রবেশ।
?
মােহ। যা খুঁজলুম তা কই
দালাল। হঃ!
মােহ। এখানে যদি না এসে থাকে, তবে কোথা গেল ?
দালাল। অয় কোর্তা।
মােহ। কি, পূৰ্ব্বে এসেই বিকিয়ে গেছে ? তা হলে কি
আমার সমস্ত যত্ন বিফল হবে ?
দালাল। অইছে কোর্তা অইছে । সে দিন দুড্যা বােনর
খাসুরত বাঁদী বেচছি।
মােহ। তার মাঝে যে সে ছিল, তার প্রমাণ কি ?
দালাল। র রন্ বুঝি, এই এটটু বাঁঠ্যা?
মােহ। তত নয়, তবে কিছু বটে ।
দালাল। রােংডা গুলাবী ?
মােহ। হাঁ।
দালাল। নাটা এটটু তােলা, বােরির ন্যাখাল ?
মােহ।
হবে!
দালাল। বয়স বুজি বছর ষােল ?
[ ২য় অঙ্ক
মােহ। ঐ রকমই।
দালাল। এহিবারে হবদা মােত ?
মােহ। কি ব’ছ ?
দালাল। এই যারে হাবা যােবা কয় ! কথা বার্তা ক’তি চায়
, সাতেও নাই—পাঁচেও নাই ; হু তাে ই না তাে না।
মােহ। কি ক’ত?
দালাল। গালে আত দিয়্যা ব’স্যা আপনার কথা বাত।
মােহ। দূর পাগল!
দালাল। পাগল নয় কোর্তা, এইড্যাতিই যত গােল ।
‘আমরা বাতাম হাবা, ম্যান বুচছি তা নয়—পিরীতির চাপি
দাবা।
মােহ। বলে না দু’জন ?
দালাল। এটা তার ছন্বােন্যা, ভার চাপি নি; হয় যদি
তো এইড্যাই।
মােহ। নামটা কি বলতে পার ?
দালাল। নাম,-নাম! কি য্যান ? রা——
মােহ। রাবেয়া ?
দালাল। অয়-অয় কোর্তা অয়।
মােহ। তাদের কে কোথা বলতে পার ?
দালাল। কইলাম তো ৰিকাইছে, দুড্যারি কিনছে একই
জোনা।
মােহ। কে কিনেছে,-কত মূল্যে কোন উপায়ে কি
ফিরে পাওয়া যায় না ?
দালাল। কিন্ছৈ সহরের মােস্ত ধােনী, বােয়াে ওরা; নাম
১অ দৃশ্য ]
রাবেয়া।
তার সলিমা সাহাব। তার গরে কি ট্যাহার নাজাই, যে বাদী
বেচপি ? আর বেচলি কি মান থাহে ? লােকে ক’বি সলিমা
সাব বাদী ব্যাচে। সে ওবি ন্যা মিঞা-সে ওবি ন্যা! তার চায়
চলেন, বাল দেহে এটা কিন্যা দেই গ্যা। আঃ-যাবার দ্যান,
ও চোহির গমাই দু’দিনি ছুটা যাবি।
মােহ। একবার চেষ্টা করে দেখ না, যদি কোন উপায়ে
ফিরাতে পার—শত মুদ্রা পুরস্কার দেব।
দালাল। সে ওলি কি আপনার কামে গােস্তাকি
কোনৃত্যাম কোর্তা!
মােহ। তবে আমায় বাড়ীটি দেখিয়ে দাও, আমি নিজে
চেষ্টা করে দেখি ।
দালাল । কোৰ্তা তুমি খ্যাছ দেহি ! তা যাও, খুজ্য।
দাহ গা । বাজার ছারা যাওয়ার আমার সােময় নি।
মােহ। এই নাও! ( অর্থ প্রদান) বাড়ী দেখিয়ে দিলে
আরও পাবে ।
দালাল।
চলেন কোর্তা চলেন । আপনাগরে গোলাম
আমরা, গােস্তাকি কি ক’তি পারি ? চলেন, চলেন।
মোহ।
চল।
উভয়ের প্রস্থান।
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
দ্বিতীয় দৃশ্য।
বােরারাজপথ।
কাল-প্রভাত।
সুসজ্জিত আসগর ।
আস। বেড়ে বাবা, সব ফক্কিকার ;—বিমােল্লাতেই
গল! দিব্বি গুছিয়ে সুছিয়ে জোগাড় করে, সাখাওৎকে
সর্দারী পাইয়ে দিলুম। ভাবলুম বুঝি বরাত ফিল,-আবদা
বিবিকে ত পাবই, আরও কত কি ? শেষ দেখি, সেই বাঘ
আর বকের গল্প ফ’লে গেল । বলে দাসত্বে মুক্তি দিলুম, মাথা
বের ক’তে দিলুম, এই ঢের! আর কিছু নয়, বেটা যে ছেড়ে
দিয়েছে, সে শুধু ভয়ে ; শেষ আবার আর কারও সঙ্গে মিশে,
ঠিক এনি পাল্টা সুর গাই। কি বাবা, পদে ব’সলে—জায়গায়
পড়লে সবারই মেজাজ বদলে যায় ? এই সাখাওৎ মিঞা
চাকর ডাকে, ( মৃদুস্বরে ) ওরে—ওই ; ও বাবা, সর্দার হয়েই
দেখি সুর বলেছে, গুরু গম্ভীরে আওয়াজ দিচ্ছে,-এই।
ভাগ্যে সেই খুন-খারাপীর সময় মৎলব করে সর্দারের তহবিল
হাতুড়েছিলুম; নইলে ত দেখছি শুধু হাতে বেরুলে বিঘঘারে মারা
যেতুম। যাক, এখন এই আবদা ছুড়ী যে হাত ছাড়া হ’ল, তার
কি করি? মৎলব ক’লুম, দালাল লাগিয়ে বেনামী কিন্ব ।
কোথেকে আমীর শালা এসে ছোঁ মেরে নে গেল। না বাবা,
সহজে আশা ছাড়া হবে না ! যখন নজর ধরেছে, আর মনটাও
খুরিয়েছে, তখন যে করেই হক আদা বিবিকে চাই। শুনলুম
আমীরের এক ছেলে আছে, তারই সঙ্গে যােগে যাগে ভিড়ে
২য় দৃশ্য ]
রাবেয়া।
পড়তে হচ্ছে। আর বল, নইলে চম্বারও ত একটা উপায় চাই।
সেই বেটাকে পটাতে পারলে, কোচোয়ানি গাড়ী চড়া দুইই হবে।
ভদ্দরলোক ত সেজেছি, এখন যা হ’ক করে মিশতে হচ্ছে।
দেখা যাক।
প্রস্থান।
বান্দা বেশে মােহসীনের প্রবেশ।
মােহ। পরিচিত কেহ নাই নগরে আমার,
ছদ্মবেশ সহজে চলিবে। একমাত্র
আব্দুলের ভয় ! সহৃদয় বন্ধুর
সরল উদার, কাৰ্য শেষে দেখা হলে
যাচিব মার্জনা ! হায়, যদি সফলতা
আসে মাের সুকঠিন উদ্দেশ্য-সাধনে ।
ভিখারিণীদ্বয়ের প্রবেশ।
গীত।
ভিখা।
খেলা ধূলাে ছেড়ে দে মন, ঘরে যাবার সময় হ’ল ।
ভবে এসে খেল কত, তবু না তাের সাধ মিটিল ।
নিত্য নুতন আশার ছলা, করিস নে আর মিছে খেলা,
চোখ মেলে দেখ গেল বেলা, কাজ যে বাকী পড়ে র’ল ।
ডেকে ঐ দেখ ব’ছে পাখী, খেলেও ত কাজ করে থাকি,
শতেক ভুলেও মনে রাখি, সে আমায় যা বলেছিল।
মানুষ হয়ে ক’লি হেলা, বৃথা যে তাের ডুবলাে বেলা,
যাবে যখন ভেঙ্গে খেলা, ভাবি শুধু হায় কি হ’ল।
৭০
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
মােহ। এ দিকে এস, ভিক্ষা নাও।
১ম ভিখা। আপনি ছেড়া ন্যাড়া পরে,
পরকে দিচ্ছেন কাপড় ধরে !
কি দাতার বেটা দাতা রে ?-ভিক্ষে নিয়ে যাও! আ মরণ !
ইয়াকির আর যায়গা পাও নি? আয় লাে আয় !
প্রস্থান।
মােহ। বেশ বেশ, বেশ সনে গিয়াছে সম্মান,
মিটিয়াছে বহুতর কৰ্ম্ম-অধিকার ;
দান দয়া সদাচার তাও অনুচিত।
ধন্য রে সংসার! মানুষের পরিচয়
শুধু পরিচ্ছদে—শুধু ধনের আভাসে,
অভ্যন্তর দেখিবার নাহি প্রয়ােজন।
দরিদ্র ভিখারী, সেও কিনা ঘৃণা করে
দরিদ্র দেখিয়া ! ধনী কেন দোষী তবে ?
সংসারে ত পদের (ই) সম্মান, যত তেজ
নামের গৌরবে ! শুধু নাম, নামে যেন
করে দেয় তােতার পরাণে-কি যেন কি
সম্মােহন প্রভাব বিস্তৃত, স্বতঃ হে
নত হয় মানবের বিবেক বিচার !
শুধু কথা-শুধু নামের(ই) সংসার। যাক,
প্রম কেন হয় পুনঃ পুনঃ ? এবে দীন,
সম্বল বিহীন, ভৃত্যপদপ্রার্থী আমি;
ফিরিতেছি ধনি-দ্বারে জীবিকা-সন্ধানে।
৩য় দৃশ্য )
রাবেয়া।
৭১
(ঈষৎ হাস্যে) আজন্ম সংস্কার, সহজে কি ভােলা যায় ?
তাহে মাত্র স্বেচ্ছল ছলনার বেশ ;
বিশেষতঃ সদাই বিমনা আমি, তাই
মুহূর্তে ভুলিয়া ছল, রহি আত্মবােধে।
না, কোন ভ্রম যেন নাহি আসে প্রাণে,
উদ্দেশ্য বিফল তাহে হইবে আমার ।
যাই দেখি সলিমাগৃহে, বিনা পণে
রাখে কিনা কর্মহীন দরিদ্র নফর।
প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
সলিমানের প্রাসাদ-সংলগ্ন উদ্যান।
কাল—অপরাহু।
রাবেয়া ও আব্দা।
আবদা। সই! আমার জন্য এত পরিশ্রম কর কেন ?
একবার নিজ দায়িত্বের কার্য সম্পাদন করবে, আবার আমার ;-
শরীরে স’বে কেন ?
রাবেয়া। তুমি আমায় সই বল কেন ?
আবদা। তুমি বল, তাই বলি ! 'সই হলেই যে তার সমস্ত
ভার ঠেলতে হবে, তার মানে কি ? পূর্বে আমার আরও সই
ছিল ; কই, তারা ত আমার কোন কাজ করে দিত না।
রাবেয়া। তুমি কি তাদের কিছু ক’তে ?
१२
রাবেয়া।
| ২য় অঙ্ক
আবদা। তা কেন ক’রূতে যাব ?
আমি সর্দারের মেয়ে
তখন, আমি পরের কাজ ক’ব ।
রাবেয়া। তারাও সেই জন্যই তােমার কিছু ক’ত না।
আবদা।. তুমি কর কেন, তােমার কি কিছু করি ?
রাবেয়া। আমি দরিদ্রের কন্যা, আবাল্য খেটে খেতে
হয়েছে । বাড়ীতেও খাটতুম—এখানেও খাটি ; কিন্তু তুমি ত তা
নও সই! কত বাঁদীতে তোমার হুকুম তামিল করেছে, একদিনে
বিপরীত অবস্থা, সেই বাদীর খানি তুমি পাবে কেন ? তাই
যতটুকু সাধ্য, তােমার সাহায্য করি ।
আবদা। সই ! তােমার কথা বড় মিষ্টি, কেন জানি না
তােমায় বড় ভালবাসতে সাধ হয় ! এমনটা আর কখন কারও
ওপর আমার হয় নি।
রাবেয়া। তােমার মত সরল-প্রাণ সই, আমিও আর কখন
পাই নি।
আদা। তুমি আমায় যা ভাব, আমি ত তা নই সই।
তােমার পিতা বুড়ো ইসমাইকে আমােদর জন্য আমি কত
চাবুক মেরেছি, তা’ত তুমি জান না সই।
রাবেয়া। (স্বগত) খােদা, এ কি শুলুম ! (প্রকাশ্যে )
তুমি—আদা! বুড়ো মানুষের উপর অত্যাচার ক’তে, প্রাণে
একটুও কষ্ট হত না?
আদা। তখন হত না, তা হলে কি আর ক’তুম ।
রাবেয়া । এখন ?
আন্দা। এখন মনে হয় তার বড় কষ্ট হত। কাল গুলাব
আনতে দেরী হওয়ায়, মিঞা সাহেব আমায় এক ঘা চাবুক
৩য় দৃশ্য )
রাবেয়া।
৭৩
মেরেছিল, এখন পর্যন্ত ব্যথা রয়েছে। আহা! এমন চাবুক আমি
কতজনকে মেরেছি, তার যন্ত্রণায় চীৎকার করেছে,আমি
হেসেছি। কখন ত জানি নাই—সে চীৎকার কেন করে ?
তাই মেরেছি, তাই হেসেছি।
রাবেয়া। মিঞা সাহেব মেরেছেন! সেকি, তা ত বল নি ?
আদা। ব’লে কি ক’ব সই ? তুমিই ত বলেছ, কষ্ট সহ্য
ক’তে না পারা-কেবল তার ভােগ বাড়ান।
রাবেয়া । সই। অনেক কষ্ট পেয়েছি। ভেবে দেখেছি,
যেটা হয়ে যায়—সেটা মনে করে রাখা, কেবল যাতনার সময়
বাড়ান মাত্র। সে হক, তুমি মিঞা সাহেবের সামনে একটু স্ত
হ’য়ো। সে মনীব, সে রুখলে কে তারে বাধা দেবে ?
আন্দা। কি ক’ব সই ? মিঞা সাহেব দিন রাত মাতালের
দলে থাকেন, তাদের সামনে গেলে ভয়ে আমি কেমন হয়ে
যাই। কি বলে, কি ক’ব, কিছুই বুঝতে পারি নি।
রাবেয়া। সই ! বুড়াে যতদিন তােমাদের কাছে ছিল, শুধু
কি ঐ রকম যন্ত্রণাই দিয়েছ ?
আব্দা। তােমার পিতাকে ?
না সই । যখন অন্য
লােকে যন্ত্রণা দিতুম, তা’র কত কাকুতি মিনতি ক’ত, কত,
চীৎকার ক’ত, হয় ত সময়ে গালাগালি দিত ; আমি আরও
আমােদ পেতুম। কিন্তু ইসমাইল তা ক’ত না, দু'এক দিনের
পর হতেই সে সমস্ত অত্যাচার নীরবে সহ্য ক’ত। বড় অসহ
হলে, কচিৎ দীর্ঘশ্বাসে বলে উঠত,-রাবেয়া, রাবেয়া ! আমার
প্রাণ কেঁপে যেত! আর তাকে কষ্ট দিতে পাতুম না। সে
ভাব আমার সেই প্রথম। শীঘ্রই তার সঙ্গে আমার ভাব হয়েছিল,
৭৪
রাবেয়া ।
[ ২য় অঙ্ক
আমায় যেন সে কেমন বশ করে ফেলেছিল। আমি তার
কাছে গল্প শুনতুম, শুনতে শুনতে মন কেমন হয়ে যেত, যেন কি
একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা, কি একটা অশাস্তি, আমার মনে আপনা
আপনি এসে পড়ত, আমি আর কাউকেই কষ্ট দিতে পারতুম
। তার গল্পে আমি বিভাের হয়ে যেতুম, সেই গল্পের মেয়েদের
মত হ’তে আমার ইচ্ছা ক’ত। কত কল্পনা ক’তুম! বাপ্পীকে
বললে সে হাত। (অশ্রুমােচন)
রাবেয়া। সই, সই।
আব্দা। আমি তার সমস্ত কষ্ট দূর করেছিলুম। কেন
সে চলে গেল ?-কেন তারে ধ’রুতে গেল,-কেন তােমায়
আলে?—হায়, কেন আমি তােমার জন্য বাজীকে অনুরােধ
ক’লুম ! (রুদ্ধকণ্ঠে অশ্রুমােচন)
রাবেয়া । সই, দুঃখ কর না। ভগবানের রাজ্যে অতি সূক্ষ্ম
আমরা আপাত দৃষ্টিতে যেটাকে ঘটনার কারণ বলে
মনে করি-বাস্তবিক সেটা উপলক্ষ মাত্র । ভেবে দেখতে
গেলে--
মােহসীনের প্রবেশ ।
একি, মােহসী যে! কোখেকে এলে?
মােহ। তুমি কোত্থেকে এলে ?
রাবেয়া । আমায় বেদুইরা ধরে এনে বিক্রী করেছে,
আমি এখন বাদী।
মােহ। আমি আপনি এসেছি, এখন আমি বান্দা।
রাবেয়া। সে কি, কেন এলে ?
৩য় দৃশ্য ]
রাবেয়া।
মােহ। তােমায় কেন আলে?
রাবেয়া। তা জানি নি।
মােহ। আমিও ব’তে পারি নি।
প্রস্থান।
আবদা। কে সই ?
রাবেয়া। জানি না।
আবদা। সে কি কথা! (কিছুপরে) কি ভাছ ?
রাবেয়া। ভাবছি—কি কথা!
আদা। তােমায় বুঝতে পারি না, তুমি কি সই ?
রাবেয়া। কেন সই ?
আন্দা। তােমায় হাতে দেখি না, কঁাতেও দেখি না।
সুখও বুঝি না, দুঃখও বুঝি না। সাধও নাই, বিষাদ ও নাই।
তুমি কি সই ?
রাবেয়া ।
গীত।
যদি হাসিতে চাই দুখ আপনি আসে,
কাদিতে গেলে সুখ ছলিতে বসে।
তাই চাহি না মধু-নিশা, চাহি না সঁঝ,
আমি রাখি না কোন আশা হৃদয়-মাঝ,
যেন নিয়তি ললাটে শুধু লুকিয়ে পশে।
কিছু না, জলের ঢেউ সখি! কত উঠছে, কত মিলিয়ে যাচ্ছে।
একের পর আর তারপর আর, অবিশ্রান্তে এ গতি অনন্ত
কাল চলেছে। আমি উঠিছি,
আমি উঠিছি, তুমিউঠেছ, আরও কত অগণ্য
অসংখ্য উঠেছে। সব মিলিয়ে যাবে, আবার উঠবে।
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
আদা। তুমি কি ভাব সই ?
রাবেয়া। ভাবি, এই ঢেউ কেন ওঠে, কেন মিলিয়ে যায় ?
কে তােলে, কে মিলায় ?
আবদা। ঢেউ আবার কে তােলে ? বাতাসে ওঠে, বাতাসে
মিলায়।
রাবেয়া। (কিছুক্ষণ আৰদার মুখ চাহিয়া) বাতাসে ওঠে,
বাতাসে মিলায় ! কি কথা বললে সই ? এ সহজ কথাটা এত
দিন বুঝি নাই ! বাতাসে ওঠে-বাতাসে মিলায় । জল-জলই
থাকে, কোন পরিবর্তন নাই। যে ঢেউ তীরে আছড়ায়, তাতেই
শুধু কর্দম মেশে।
সই, সই! মাঝখান দে চলে যেতে
পাব কি ?
শুধু মাথা তুলে দুধারে
তটপ্রান্তে মােহমুগ্ধ
আবিল তরঙ্গের আত্মনিৰ্যাতন দেখতে দেখতে তীরবাহী
সম্মােহন প্রতিকূল বায়ুকে উপেক্ষা করে মাঝের ঢেউ আমি
মাঝখানে মিলিয়ে যেতে পাব কি ? সই, সই! যদি বলে
তবে বলে দাও!
আন্দা। কি বল ছাই, বুঝতে পারি নি।
এখন এস,
আবার বকুনি খেতে হবে।
রাবেয়া। কি বলি, নিজেই জানি না। আমি বলি, না
কেউ আমায় বলায় ? কি জানি, আমার সমস্তই যেন দিনে
দিনে কেমন ঘুলিয়ে যাচ্ছে।
আবদা। আবার দাড়িয়ে রইলে, এস না!
উভয়ের প্রস্থান।
৪র্থ দৃশ্য।
রাবেয়া।
চতুর্থ
দৃশ্য।
বসােরা-আঙ্গুলের গৃহ-কক্ষ।
কাল–প্রভাত।
আবদুল।
আন্। এই খানে জীবনের দারিদ্র্যের ভােগ,
আবাল্য ক্লেশের স্মৃতি, দিয়াছিল ফেলি
তার শেষ যবনিকা। এনেছিল হাসি,
নব ভাবে নব রঙ্গে সুখের বাসর
সাজাইয়া নবসাজে রতন-প্রভায়।
প্রতি অঙ্গ এ গৃহের করিছে বহন
মাের ধনের গৌরব-অতি সযতনে
আবরিয়া সেই, শৈশবের পল্লীস্থিত
সেই ক্ষুদ্র মাের মাতৃভূমি-বক্ষে জাত
যাতন যতেক । কিন্তু কই, কোথা তৃপ্তি
এ গৃহে আমার ? সেই যাতনার দেশ,
বিচিত্রতা-শিল্পকারু-সৌষ্ঠব-বিহীন
মরুপল্লী খানি এসেছি ছাড়িয়া, তাহে
এত ব্যথা বাজে কেন হৃদয়ে আমার ?
সে ত শুধু শক্ত আর হিংস্রকের স্থান,
সে ত শুধু বালি আর উত্তাপের দেশ,
তুলনায় বসাের। যে স্বর্গতুল্য তার ;
তবু কেন তা’র(ই) তরে কেঁদে উঠে প্রাণ ?
হউক এ স্বর্গ কিম্বা হ’ক পয়ীস্থান,
৩৮
রাবেয়া।
[২য় অঙ্ক
প্রবাসী পথিক আমি-পরের এ দেশ!
হ’ক গৃহ-থাকুক সম্পদ, তবু হায়
সুত্রহীন মালার মতন, প্রশ্বাসের
অভিঘাতে ছিন্ন হয় যাহা, সেইরূপ
স্নেহ-প্রীতি-বন্ধন-বিহীন। আর সেই
অযত্ন-সঞ্জাত মাের প্রকৃতির দেশ,
সেই স্মৃতিপূর্ণ পৈতৃক-আবাস, যার
প্রতি ধূলি-সনে জড়িত রয়েছে মাের
পিতৃ-পিতামহদের চরণের রেণু;
হায়, সে যে মাতৃভূমি পুণ্যভূমি মাের!
জগতে কোথায় আছে মার তুলনা ?
সেই স্বর্গ, স্বর্গ কভু এ নহে আমার ;-
তাই প্রাণ সম্পদেও বিষাদ-কাতর !
সােফিয়ার প্রবেশ।
সােফি। কি গো কি, খুজে পেলে ?
আব। কই আর পেলুম।
সােফি। আচ্ছা লােক যা হক। সঙ্গে এল, কোথাও যেতে
হলে ব’লে যাওয়া ত উচিত। ওমা, কথা নেই বার্তা নেই,
বেমালুম ভুব। আমরা এখন সৃষ্টি খুজে হল্লাক হচ্ছি; দেখ
দেখি কি আক্কেল!
আব। তাই ত ভাবছি।
সােফি। এখন কি কবে ?
আবৃ। তাও ত ভাবছি।
৪র্থ দৃশ্য।
রাবেয়া।
৭৯
সােফি। আমি বলি, এক খানা চিঠি লিখে লােক পাঠিয়ে
দাও, যে এই রকম মােহসী কোথায় চলে গেছে । আমরা
খুঁজে পেলুম না। যা করতে হয়, তার বাপ ভাই আছে—
ক’রূবে এখন, আমাদের ত ঝুকি গেল। তুমি একা মানুষ,
তােমার প্রাণে আর সয় কত ?
আব। তা আমার কিন্তু আদৌ অসহ্য হয় নি; সত্য কথা
ব’তে কি, অসহ্ন বা ঐ রকম কোন কথা মনে করবারও
আমি কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছি নি ।
সােফি। তবে যা খুসী কর, আমি আর পারি নি।
আব। না একটু পাতেই হবে।
সােফি। ওম, কি পাব গা ?
আব। এই যে কি পারি নি বলে ?
সােফি। যাও, সব কথাতেই ঠাট্টা!
আব। ঠাট্টা কি ? মােহসী তােমার মাথায় কত বড়
ভার চাপিয়েছে, যে তুমি অস্থির হয়ে পড়েছ।
সােফি। আমার মাথায় আবার কি ভার চাপালে ?
আব। সে ত আমিও খুজে পাচ্ছি নি ।
সােফি। তবে যে ব’ছ ?
আব। তুমিই ত বললে, অন্ততঃ কথার ধরণে সেইটা
মনে এসেছিল ।
সােফি। আমার না হ’ক! তােমার ত চিন্তা হয়েছে বটে ;
তা হলেই হল। এখন কি করূবে তাই বল ?
আৰু। ও প্রণয়-বন্ধনের অভিব্যক্তি ? তবে ব’তেই
হ’ল! দেশে খবর সহজে দিচ্ছি নি। আর সেটা কিছু মনে
৮০
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
কলেই ত হবে না; এত দূরদেশে লােক পাঠান সহজ কথা
নয়। দেখা যাক্, সে ত আর নাবালক নয় যে পথ ভুলে
হারিয়েছে ?
আর তার মৎলবও কিছু জানি, তত চিন্তার
কারণ নেই বলেই ত বােধ হয়। যাক, সে যা হয় দেখা যাবে।
এখন শুনি, বলি সহরে এসে লাগছে কেমন ?
সােফি। কেমন আর, ভালই।
আব। ইঃ, কতই যেন সহর দেখে অশ্রদ্ধা ধরেছে ! কথার
মহড়া দেখ।
সােফি। দেখি যেন নাই, এই বা কি দেখালে ? শুনিছি
সহরে এসেছি-ঐ পৰ্য্যন্তই! দোলা থেকে নেবে অবধি ঘুরে ফিরে
ত তােমার এই ঘরদোর গুনােই দেখছি। সহর কি তা তােমরাই
জান! গাঁয়ে বরং ছিলুম ভাল ; হেথা সেথা যেতে পেতুম ।
এ একেবারে চন্দ্র সূর্যের মুখ দেখা বন্ধ হয়েছে।
আব। হবে গো হবে । কেবল এসেছ, দু’চার দিন
ঠাণ্ডা হয়ে ঘর সংসার গুছিয়ে নাও, তারপর খুব ঘুরে।
সােফি। সে হক, তুমি একবার আমায় এব্রাহিম সাহেবের
বাড়ী নে চল । যাকে তুমি বাপের মত ভক্তি শ্রদ্ধা কর,
আমি তার ঘর দেলুম না—বৌ ঝীদের দেখলুম না, সে কি
হয় ? আমায় আজই সেখানে নে যেতে হবে ।
আব। এ কথা ব’তে পার।
নেপথ্যে। আবদুল বাড়ীতে আছ ?
আব। ঐ এব্রাহিম সাহেবের গলার সাড়া পাচ্ছি। তুমি
সরে যাও, আমি তাকে আছি।
প্রস্থান।
*
৪র্থ দৃশ্য )
রাবেয়া।
৮১
সােফি। যাক, লােকটীকে ত আজ দেখব।
প্রস্থান।
এব্রাহিম ও আহসান্ সহ আবদুলের পুনঃ প্রবেশ।
এব্রা। সুখের কথা ! তােমার স্ত্রী আমার পুত্রবধূতুল্যা ।
আমার বাড়ীতে যেতে চান, অত্যন্ত আনন্দের কথা। আগ্রহ
করে নে যাওয়া আমারই উচিত। এতদিন নে যেতুম, তবে কি
জান,—কেবল এসেছ, ঘর সংসার নে ব্যস্ত থাকা সম্ভব মনে
করেই চেষ্টা করি নি। তুমি ও আহসান্ আমার প্রায় তুল্য।
আব। দাস আমি! আমার বৈভব বিত্ত সুখস্বাচ্ছন্দ্য,
অধিক কি আমার মনুষ্যত্বই আপনার কপালব্ধ । আপনার
দয়ায়, আপনার স্নেহে সন্দেহ করব, এত নরাধম আমি নই।
এব্রা। যা’ যা’! তােমায় কি আর ব’ছি ? আচ্ছা,
মাকে বল, আজ বিকেলেই নে যাব । কিন্তু একটা কথা ;
সেখানে গেলে দু’ চার দিন আসতে পাবেন না।
আব,। আপনার গৃহ তার ভূ-স্বর্গ। স্বর্গবাসে আপত্তি
কার ?
এব্রা। বেশ ত, সৰ্ব্বদাই থাকতে পারেন। তবে কি জান
বাবা ! মানুষের সংসার হলেই একটা পৃথক আস্তানা চাই, তাই
সংসার করার পূর্বেই তােমায় এই বাড়ী ক’রুতে উপদেশ
দিয়েছিলুম।
আব,। এও আপনারই গৃহ; পৃথক বলবেন না, তাতে
আমার কষ্ট হয়।
এত্ৰা। ছি, মনে কিন্তই ভাবি? সে
সে যা’, তুমি যে সেই
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
ভদ্রলােকের কথা বলেছিলে- মােহসী মিঞা, তার কোন
সন্ধান পেলে?
আব,। আজ্ঞে না, কোন সন্ধানই পাই নি।
এব্রা। তবে ত বড় চিন্তার বিষয় হয়ে পড়ল। তা হলে
উপযুক্ত অনুসন্ধানের বন্দোবস্তই ক’তে হয় ।
আব,। না, বিশেষ চিন্তার কারণ বােধ হয় নেই।
এব্রা। তা তুমি যদি মনে না কর, তবে আমি ব্যস্ত হব না।
আব। না, যা ক’তে হয় আমিই ক’ব। তবে যদি
দরকার বুঝি, অবশ্যই আপনাকে ব’ ।
এব্রা। তা’ত ব’বেই। তবে এখন আমি আসি, বিকেলে
দোলা পাঠাব, বৌমাকে পাঠিয়ে দিও।
আব। যে আজ্ঞ।
এব্ৰ।। এস আহসান!
প্রস্থান।
আহ,। ভাই সাহেব ! বিকালে বাড়ী থাকবে ত?
আব। কেন ?
আহ,। অনেক দিন পর এসেছ, দেশের গল্প গুজব শােনা
আব। বেশ ত!
উভয়ের প্রস্থান।
৫
সােফিয়ার পুনঃ প্রবেশ।
সােফি। দিব্বি ছােরা ত! নাম বলে কি আহসান ?
৪র্থ দৃশ্য।
রাবেয়া।
৮৩
হ আহ সাইত ওঁর ছেলে, এদের খুব দোস্ত । বেশ ফুট ফুটে
চেহারা, হাসি হাসি মুখ, এই আহসান্!
আবদুলের পুনঃ প্রবেশ।
আব,। ওগো-ওগাে !
সােফি। কি গা?
আব। আমার কি হ’ল গা?
সােফি। কি হল ?
আব! ঐ যে সাহেব বলে দু’ চার দিন আসতে দেবে
। হায় হায়, তুমি যেতে চেয়েছ, দোর গোড়ায় পা দিতে না
দিতেই সে কথা কেন মাথা খেয়ে ব’লুম গা?
সােফি। আ মরি, ঢং দেখ! দু’দিন সেখানে রইলে উনি
ভেসে যাবেন। সব কাজেই অত হাঁক পাঁক্ কর কেন ?
আব৷ করি কি আর সাধে ? প্রাণে যে বিষম বাধে!-
গীত।
আব,। বুঝলে না ত প্রাণের রতন,
ফুলের বাধন কঠিন কত ?
সাফি। (ওগাে) ব’তে কথা শুনায় যেমন,
মূলে কিন্তু নয়কো তত।
আব, ছি ছি, তুমি নও প্রেমিকা,
সােফি। তােমার মত নই ত বােকা,
আব,। প্রেমিক যারা থােক। তারা ?
সােফি।
নয় অনুমান, দেছি তা’ত ।
৮৪
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
সােফি! নাও এখন রস রাখ, কাজ আছে।
প্রস্থান।
আব। এমন প্রাণটা, মাঠে মারা গেল গা।
প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য।
সলিমানের প্রাসাদ-সংলগ্ন বৃক্ষ-বাটিকা।
কাল-অপরাহু।
নসের।
নসের।
নসের ও আসগর।
বড় অসুখ করেছিল, সকালে আর মাথা তুলতে
পারি নি।
আস।
প্রথম কিনা, দু চার দিন পরে আর হবে না।
স্নান আহারের পর ভাল ছিলুম, এখন যেন আবার
কেমন বােধ হচ্ছে।
আস। খোঁয়াড়ি লেগেছে, একটু খেলেই সব সেরে যাবে।
নসের। বড় ভয় করে ; শেষ যদি বাজী জানতে পান?
আস্। এ সব কথা কি বাপ মার কাণে গেলে তারা কিছু
বলে ? আপনিও যেমন, লায়েক ছেলে—আরও চাপ দেবার
চেষ্টা কবে; হাঁ, নাবালক হলে সে চিন্তা ছিল বটে। (ঈষৎ
হাস্যে) আর আমীর সাহেবই বা একজন কম কি! আব?
নসের। এখনই
আদ। এই ত সময়, খোঁয়াড়ির মুখে বড় মধুর লাগবে।
নসের। (ঈষৎ হাস্যে, সুরে)
?
৫ম দৃশ্য ]
রাবেয়া ।
৮৫
“তাড়ি ঢল দেও পাসানিয়া, খোঁয়াড়ি লাগ বা।”
বহুৎ আচ্ছা! কিন্তু খবরূদার, কেউ যেন দেখতে না পায়।
আগরের প্রস্থান।
আবার খাব ? মদ খাওয়াটা ঠিক নয়, নানা দোষ ঘটে ওঠে।
আঃ, একটু আধটু আমােদ না করেই বা করি কি? নিষ্কর্মা বসে
ব’সে বিরক্তি ধরে গেল। সেই একঘেয়ে জীবন,সকাল, সন্ধে,
দিন, রাত্রি, খাও শশাও বসে থাককাহাতক ভাল লাগে ?
আগরের পুনঃ প্রবেশ।
কেউ ত দেখে নি ?
আস। আমি ত পাগল নই ! আপনার অত ভয় কেন?
নি! (মদ্য প্রদান )
নসের। বিমােল্লা ! তোবা, তােবা! এ সময় ও কথা
বলতে নেই, মদ ধৰ্ম্মের শক্ত ; কেমন ?
আস।
তবে ত কোন কথাই নেই। যে ধর্মের শত্রু তার
রক্ত পান ক’ব, শাস্ত্রে তাই বলে।
নসের। সােভানাল্লা! তবে
তবে শত্রুর রক্ত পান করি
(মদ্যপান)
আস। কালুকের চেয়ে আজ বেশ খেয়েছেন।
নসের। ওঃ বাপরে, কাল বিষম লেগে মরি আর কি।
আস। প্রথম অমন হয়। শেষে কুঁজোয় মুখ দিলেও আঁৰ
লাগবে না। (মদ্যপান ও প্রদান।)
নসের। তত পাকা হতে ঢের দেরী, ( মদ্যপান) দুনিয়ার
সার জিনিষ বটে, এরেও লােকে নিন্দে করে।
৮৬
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
আস। যেতে দিন যত হাভাতের কথা। ভিখারী পােলা-
ওয়ের গন্ধে কার করে। তাই বলে পােলাওটা কি অখাদ্য
বলতে হবে।
নসের। কদাচ নয়। চলুক !
আদ। না, প্রথম আর বেশী নয় ।
নসের। তবে থাক, যখন বারণ ক’ছ ; ওস্তাদের কথা
মানাই ভাল।
আস। (স্বগত) বারণ তোমায় ক’ব । একে চন্দ্র
আলাে দেখছ, দুয়ে পক্ষ—উড়তে হবে, তিনে চোখ, চারে
চান, তাতে যদি ফের—তবে বাঁচলে, নইলে বাবা পঞ্চ বাণেই
কুপােকাৎ।
নসের। বড় পিপাসা পাচ্ছে। কোই হায় ?
জনৈক বান্দার প্রবেশ।
এক পেয়ালা সরবৎ পাঠিয়ে দে।
বান্দা। যাে হুকুম খামি !
প্রস্থান।
আ। চলুন বেরুই।
নসের। নেশা ধরেছে ভাই। শেষ কি পথে ঢলাঢলি
আস। জায়গা মত গেলে, সে ভয় নেই।
যা খুসী করুন,
কেউ জানবে না।
নসের। বল কি, কোথায় সে ?
আস। আছে, যদি যান—আমি ঠিক করতে পারি।
৫ম দৃশ্য।
রাবেয়া ।
৮৭
নসের। তা মন্দ কি? বাড়ীতে ফুৰ্ত্তি জমে না।
কোথায় দেখবে, ভয় করে।
আস। সে সব নিশ্চিন্ত জায়গা। হর্দম আমােদ উড়ােন,
কাগে বগে জানবে না।
নসের। তাই নাকি, তবে দেখ না ।
আস। বেশ, আমি ঠিক করে আসি, সন্ধ্যে বেলা নে’
যাব; কিন্তু কিছু খরচ হবে ।
নসের। আচ্ছা, কুছ, পরােয়া নেই !
আস। তবে চললুম। ( স্বগত) তােমার মাথাটা ভাল
করেই খেতে হচ্ছে।
প্রস্থান।
নসের। প্রাণটার ভেতর যেন রুনু ঝুনু খেলচে।
ফুৰ্ত্তি ! আমীরের ছেলে হরূদম আমােদ লুটবে,—ঠিক কথাই ত !
আচ্ছা দোস্ত পেয়েছি বটে । এমন না হলে আমিরী ?
পাত্র হস্তে আবদার প্রবেশ।
কেয়া খবর বিবি সা’ব ?
আবদা। আপনি সরবৎ চেয়েছেন ?
নসের। ওহা; দাও! ( সরবৎ পান) আঃ, ঠাণ্ড
হলুম। বলতে পার বিবি, প্রাণের তৃষা কিসে যায় ?
আবদা । ( নিরুত্তর)
নসের। উ ? (মুখ-পানে স্থির ভাবে চাহিয়া) আবদা
বিবি! তুমি অতি সুন্দর! আমি অনেক সময় তােমায় দেখে
থাকি, কিন্তু যেন সাধ মেটে না। কেন ব’তে পার ? সুন্দরী
৮৮
রাবেয়া।
[ ২য় অঙ্ক
ত হারেমে অনেক আছে, তাদের ত এমন দেখতে সাধ হয়
। তুমি লজ্জা পাচ্ছ ? আমার এ কথা বলা উচিত ছিল না!
কি জান, এখন মনটা কেমন হয়ে আছে, তাই বলেছি ;
নইলে ব’লতুম না। তুমি কি রাগ ক’বৃছ ?
আবদা। ( আনত বদনে) আপনি এ সব কি বলছেন?
নসের। কিছু না, তুমি রাগ কর না !
আবদা। ( সেলাম করিয়া প্রস্থানােদ্যোগ।)
নসের। ব’লে যাও,-রাগ ক'লে ?
আবদা। আজ্ঞে না ।
প্রস্থান।
নসের। ছি, মদের দোষই এই, মনের কথা চাপা থাকে
যা ব’ না মনে ছিল, তাই বলে ফেলুম। আচ্ছা,
দোষই বা কি ? বাদীকে বার ত আমার অধিকারই আছে।
সেটা ভাল লাগে না। বাদী ভাবলে, বিলাসে মেশা’তে
পারি কিন্তু তাতে মন পাব না; ছি, সে ত পৈশাচিক কামনা।
( উচ্চ হাস্যে ) মদ ধরেছি, আর দ্রব্যগুণের কামনাটীকে
ঘৃণা ক’ছি ? বাহবা বুদ্ধি! ( ক্ষণেক পরে) আবদা সত্যই
সুন্দরী। মনটাও যেন ভাল, যদি মন মেলে—ভালবাসা জন্মে
আঃ, মনে ক’তেই আনন্দ বােধ হচ্ছে। আগর কোথা
গেল? না, তাকে বলা হবে না । এসব কথা কাউকে বলতে
নেই। ব’লে মধুর কল্পনাটা ভেসে ওঠে।
প্রস্থান।
।
৬ষ্ঠ দৃশ্য ) রাবেয়া। ৮৯ ষষ্ঠ দৃশ্য। সলিমানের হারেম-সংলগ্ন রাবেয়ার কক্ষ। কাল-নিশীথ। প্রার্থনার্থ উপবিষ্টা রাবেয়া । রাবেয়া। যেন দূর বিস্মৃতির কোলে—ছায়াময়ী কোন স্বপনের মত, আধ আধ কেন মনে হয়, কি যেন—কি যেন ছিল মাের ? যেন কোথা, শত্রু মিত্র আত্মজন সনে- হাসা কঁদা বাদ-বিসম্বাদ-পূর্ণ, ছিল কোন মায়াময় সংসার আমার! যেন- কত আলা অগণন ধরিয়াছি বুকে, আঘাতে আঘাতে যেন,—ছিড়েছিল সেথা- ধীরে ধীরে প্রীতিপূর্ণ মরমের তার- গুলি মাের! যেন শােক-তাপে মুহমান হয়ে, খুঁজেছিনু আমি—কোথা, কেবা আছে সংসারের মাঝে, পরম করুণাময় জুড়াইতে স্নেহছায়ে সে জ্বালা আমার । কত কেঁদেছিনু তার চরণ আশায় ; আকুল পরাণে বলেছিনু যেন,দাও দয়াময় মােরে, এক বিন্দু প্রেম-বারি জুড়াইতে ভীষণ সন্তাপ। তার পর সৰ অন্ধকার! সেই ঘাের তুমােমাঝে হয়ে আছে ক্ষীণ স্মৃতি পথ-হারা মাের,
রাবেয়া।
[২৪ অৰু
ক্লান্ত-যেন ঘুমে অচেতন। তার পর
পুনঃ ফুটিল আলােক, নহে দূর-সে ত
এই সে দিনের কথা, সেই কুটীরেতে,
পিতৃ-স্নেহে সদানন্দে শৈশব যাপন।
এ আবার কি খেলা দেখিনু, না না আর
যেন নাহি ভুলি, কেকে তুমি, কোথা তুমি,
এস দয়াময় অনাথ-শরণ, শূন্য
এ হৃদয়াসনে হও বিরাজিত ; দাও
নাথ, শক্তি মােরে আপন শাসনে,-যেন
তােম ভুলে নাহি থাকি তােমার মাঝেতে।
গীত।
তােমায় জানি না হে! (অনাথ-নাথ )
চিনি না বুঝি না ভাবিতে পারি না,
তবু তােমারি চরণ-প্রয়াসী হে।
ব্যথা পেলে শুধু কেঁদে ফিরে চাই,
বিপদে অভয় পদ-ছায়া পাই,
ভুলে ভুলে ফিরি তবু নাহি ভুলি,
সে যে তােমারি অতুল দয়াতে হে।
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বসােরা—আবদুলের গৃহ।
কাল-পূৰ্বাদু।
সােফিয়া।
সােফিয়া। হা এরেই বলে বড় লােক ! আহ সাদের বাড়ী
কি দেখলুম! কেমন ঘর দোর, কেমন সাজান বাগান, ফুলের
কেয়ারী, পরী-চেহারা—মাঝে ফোয়ারা উঠছে। কত লােকজন
বান্দা বাদী, ঘরে ঘরে জাজিম পাতা ; কত ছবি, মেয়েদের গায়ে
গহনা কত! আমি যে সখের পােষাক পরে গেছ লুম, তারা
তা দিন রাত পরে। আবার গাঁয়ের লােকে কি না আমাদের
মিসেকে ব’ বড়লােক ; আ আমার বড় লােক রে ?
অধঃপেতে পােড়ারমুখাে পাড়াগেঁয়ে ভূতগুনাে বড় লােক ত কখন
দেখে নি, তাই যে একটা কোটা-বাড়ী করে, দু’টাকা নাড়ে চাড়ে
তারেই ভাবে মস্ত লােক। বাবা আমার এরি সঙ্গে বে দিতে,
না বুঝে কতই ব্যস্ত হয়েছিল। তখন যদি একবার এ সব জায়গা
দেখে যেত? মা আবার বলে কি না মিসের মন জুগিয়ে চলতে,
নইলে যদি তালাক দেয় ! দেয় দি’ক না—আমি ত বাঁচি।
আহসানের আমার ওপর চোখ পড়েছে। তাদের বাড়ীতে দেখা
হলে কেমন যেন ভাব ক’ত,-তা কি আর বুঝি নি ? বাবা
আসতে চেয়েছে, টাকার দরকার হলে নিশ্চয়ই আসবে।
তখন স্পষ্ট বলব, দেবার মত লােকের হাতে দিলে দু’হাতে
রাবেয়া ।
[ ৩য় অঙ্ক
দিতুম। এর আছে কি ছাই যে দেব ? ভারি দু’দশ হাজার
টাকা! দেখি, সে কিছু উপায় ক’তে পারে কি না?
আবদুলের প্রবেশ।
আব! ও গাে, একটা সুখবর আছে।
সােফি। কি ?
আব। খুসী হয়ে খবর দিতে এলুম, আর ন্যাড়া বেচা
কথায় জিজ্ঞাসা ক'লে কি ?
সােফি। তবে আবার কতখানি কথা বলতে হবে ?
আব। . অন্ততঃ বলা উচিত ছিল,—কি গাে কি, বল না
কি ? আরও দু’টে। সাধ্য সাধনা।
সােফি। বাজে না বলে কি কথা হয় না ?
আব,। কথায় হিসাবী হওয়া ভাল বটে, কিন্তু ব্যক্তি-
বিশেষে।
সােফি। কেন ?
আবু,। দেখ, বহির্জগৎটা কেবল আদব কায়দায় বাধা,
তার মধ্যে হাঁফ, জিড়ােবার স্থান—স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরে। যদি
তাদের মধ্যেও চোস্ত কথা। অর্থাৎ সেই বন্ধন এসে পড়ে, তবে
সংসারটা যে একেবারেই দুৰ্ব্বহ হয়ে পড়বে।
সােফি। নাও, তােমায় আর মােল্লাগিরি ফলাতে হবে না।
ইচ্ছা হয় ত কথাটা বল।
আব। সােফি! সহরে এসে তােমার যেন কিছু পরিবর্তন
বােব হচ্ছে। অনভ্যাসে একা এমন আবদ্ধ স্থানে থাকতে
কষ্ট হওয়া আশ্চর্য্য নয়। তাই যদি কারণ হয়, তবে না হয়
১ম দৃশ্য ] রাবেয়া। কাটিয়ে এস। আরও একবার এব্রাহিম সাহেবের বাড়ী গিয়ে দু'চার দিন সেখানে ত তুমি ভাল ছিলে বলেছ । সােফি। সে যেতে হলে, আমি কিন্তু ভাল পােষাক না পেলে যাব না। আব,। ও, এতক্ষণে তােমার ভাব বুঝলুম। সেখান থেকে ফিরেই মেজাজ বদলেছে বটে। দেখ, সােফি! আমি পাড়াগাঁয়ের ধনী হলেও এখানকার কেউ নই। এখানে বড়র বড় তস্য বড় আছে। কি জানিস, এই রকম সহরগুনাে দুনিয়ার পরীস্থান—উপভােগের, বিলাসের কেন্দ্রভূমি। যার ক্ষমতা আছে, সে পল্লীর সেই সংযমের মধ্যে বাস ক’তে চায় না। কারণ ধন-মদই সর্বাপেক্ষা বিলাস ও লালসার উত্তেজক। তাই দেশের অধিকাংশ ধনী, তাদের ধন-মদের তৃপ্তিস্থান—বিলাস- বাসনের অবাধ ক্ষেত্র সহরে এসে জোটে। এখানে তুলনা করে মন ভার ক’রূলে, ফকীরের ছেলের ঘােড় রােগের মত অসাধ্য হয়ে উঠবে। আজ এব্রাহিম সাহেবের পরিবারের সাজ-শয্যা দেখে আপশােষ হচ্ছে, কিন্তু কাল যদি আবার তাদের মত পােষাকে সলিমা সাহেবের বাড়ী যাস, তবে ঠিক আবার এই ভাবই বােধ হবে। শশা, মনের তৃপ্তি মনে ! যা আছে তাইতেই খুসী হতে শেখ, দেখবি অভাব চলে যাবে। মানুষের দীনতা বা হীনতা শুধু মনেরই বিকার, নইলে বাস্তব জগতে যার কোন শারীরিক দৈন্য নেই, সে কখন দীন নয়,যার মানসিক হীনতা নেই, সে কখন হীন নয়! বুঝলি ? সােফি। তা বলে, একেবারে তাদের দাসী বাদীর মত সেজে যেতে হবে ?
১৪ রাবেয়া । [ ৩য় অঙ্ক লঘু চিত্তের আব। তাদের অনুগ্রহেই আমার সব। দাসী বাদী হলেও অপমান নেই, বরং সমতা দেখাতে যাওয়াই পরিচায়ক। তা যাক, আমি যতটা সম্ভব ভাল পােক এনে দিচ্ছি। কাল না হয় সেখানে যেও, আর মন গুরাে না। সােফি। হাগা, কি ব’তে এসেছিলে ? আব। তবু যা হক মেঘ কেটেছে। ব’ আর কি, মােহসীনের সন্ধান পেয়েছি, তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সােফি। কোথা আছে ? আব,। আর কিছু জাতে চেও না, এখন ঐ পর্যন্তই । তবে সে ভাল আছে। সােফি। এর জন্য এত কথা ? আব। শুধুই কি তাই? যে কোন রকমে তােমার চাদ- মুখের দুটী বাণী শ্রবণ। বুঝলে কিনা, * গীত। (এই) নীরস-তৃণে নীহার তব পেলবধির-বাক্য-সুধা। তাই ত আকুল চন্দ্রাননে, আঁখি মেলি মিটাও ক্ষুধা। শাদা মেঘে ফল কি বল, বর্ষে না সে ঢাকে আলাে, নীহারটুকু শেষ সম্বল, তাতেও নিঠুর সাধে বাধা। কি রকম, পাল্টা দিলে না ? একেবারে ঘুণ ধরেছে। সােফি। আমার এখন ভাল লাগছে না। আব। খােদার মজ! যাই পােষাকের চেষ্টাই দেখে আসি। তাতেও যদি কিছু বর্ষে। প্রস্থান।
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
সােফি। বােধ হয় সন্দেহ করবে ? তা করুক না, আমিও
ত তাই চাই। শেষে যদি ?-না আগেই চটান ভাল নয়। সব
দিকে বুঝি, বাবাও আসুক। যাক, পােক ত আছে ; পসন্দ
হলে, দু’টো মিষ্টি কথা বলতে হবে।
আহসানের প্রবেশ।
আহ,। আবদুল, আবদুল !
সােফি। (ঈষৎ ব্যস্তে মুখাবরণ দিয়া) সে বেরিয়ে গেল।
আহ,। কোথা ?
সােফি। (কম্পিতস্বরে) পােষাক কিতে।
আহ,। আপনার ? তবে আমিও যাই ।
সােফি। সে এখনই ফিবে।
আহ, না, দেখি কি পােষাক কেনে।
প্রস্থান।
সােফি। কথা ত ব’লে ফেলুম, শুনলে হয় ত রাগ ক’বে।
রাগের কথা কি ? এব্রাহিম সাহেবের ছেলে, তার প্রাণের বন্ধু,
তার সঙ্গেই ত বলেছি। আহসান্ হয় ত বলবেই না। যদি না
বলে, তবে আরও মন বােঝা যাবে। এবার তাদের বাড়ী গেলে
হয় ত কত কথাই হবে। মনের টান খুব আছে, নইলে আমার
পােষাক বুঝতে পেরেই পসন্দ করতে গেল কেন ?
লােক কিন্তু !-
প্রস্থান।
রাবেয়া।
[ ৩য় অঙ্ক
দ্বিতীয় দৃশ্য।
সলিমানের ভৃত্যাবাসের সম্মুখ।
কাল-সায়াহ্ন।
আবা।
গীত।
কি যেন আজ মনের পাশে, লুকিয়ে হেসে চলে যায়।
লহরটা তা’র ঘুরে ঘুরে প্রাণের সুরে মিশে রয় ।
এ যেন কি নূতন খেলা, খেলতে সাধে পরাণ ধায়,
জানি না এ নুতন তানে হৃদয়-বীণা কে বাজায়।
রাবেয়ার প্রবেশ।
রাবেয়া। এত কি কথা সই ?
আবদা। কি কথা?
রাবেয়া। গাচ্ছিলে যে ?
আবদা। ও অনি একটা গান।
রাবেয়া। মনের সঙ্গে গানের সম্বন্ধ। মন যেমন চায়,
তেনি গান মনে পড়ে। দুঃখের সময় সুখের গান, সুখের সময়
শশাকের গান, কেউ কখন গেতে পারে না। যদি বা গায়,
তা’তে প্রাণের তারে ঝঙ্কার দেয় না, তাই বেসুর বেলয় না হলেও
সে যে নীরস সখী ?—এ যে সই রসে ভরা ।
আবদা। কি জানি সই, অত কথা জানি না।
রাবেয়া । জানতে না সই, এখন জেনেছ। প্রাণে প্রেমের
বাতাস ব’য়েছে, মলিন কুয়াশা উড়ে গেছে, শুধু স্নিগ্ধ আলােকে
২য় দৃশ্য )
রাবেয়া।
নুতন নয়ন নবীন জগৎ দেখছে। সে ধু ধু মরুভূমির মত বালির
চড়ায় প্রেমের পলি পড়েছে। তীক্ষ্ণ নীরস জ্বালাময় বালুকাপুঞ্জ
এখন নয়ন-মননামুগ্ধকর শ্যাম-তৃণ-সুশশাভিত। তরঙ্গিণীর ভয়াবহ
গর্জন এখন মধুর কলতানে মুখরিত। লুকিও না সই ।
আদা। না, লুকোব না সই। সত্যই আমি কি হয়েছি।
তােমার অনুসরণ ক’তে চাই, পারি নি কেন সই ?
রাবেয়া। যার প্রাণ যে দিকে টানে সেইটীই তার ভাল ।
আত্ম-বঞ্চনায় যে সাধনার আরম্ভ, তা চিরদিনই বিফল হয়ে
থাকে। তবে সু কু বেছে চল। আর তুফান তুল’ না সই, নূতন
বাঁধ ভর সবে না।
আবদা। বুঝিছি সই, তুমি জেনেছ !
রাবেয়া। জেনেছি। তােমার প্রতি আমীরজাদার ব্যবহার
দেখে, মনে স্বভাবতই খটকা লেগেছিল ; তবু যা কিছু সন্দেহ
ছিল, আজ গান শুনে তা মিটে গেছে।
আবদা। কি ক’ব সই ?
রাবেয়া। প্রাণ কি চায় ?
আবদা। তা কি বােঝ নি ?
রাবেয়া। পাঁচটায় মিশে দূরে সরে গেছিলে সই, প্রেম
তােমায় ফিরিয়েছে। ভালবেসতা’তেই তাকে দেখতে পাবে।
সে আমার এক, কেবল পথই বহু ; তারে ভুল না, সে তােমায়
দেখবে। সাবধান, বিপথে চল না সখি
প্রস্থান।
আবদা। বিপথে যাব না? পথাপথ যে চিনি না। কি
ছিলাম, কি হয়েছি ? আমার যে সবই নূতন।
১৮
রাবেয়া।
[ ৩য় অঙ্ক
একটা—একটা
নূতন নয়! সেটী স্মৃতি।
কেন সে একেবারে
চলে যায় না? ওঃ, কি ভয়ানক! দাও খোদা, আমায় সক
ভুলিয়ে-নুতন জীবন করে দাও! বাল্যের দ্য-দুহিতা আমি
আর এ আমি, যেন এক ব’লে না মনে থাকে।
আগরের প্রবেশ।
আদ। বিবিজান্!
আবদা। কি চাও? তােমায় অমন করে ডাকতে আমি
নিষেধ করেছি, মনে নেই ?
আস্। তােমার কথা মনে নেই। তুমি যে আমায় মেরে
রেখেছ জানি! প্রাণ দিন রাত্তির অই ঢাই করছে, আহার
নিদ্রার ফুসৎ পাই না। বলতে গেলে এক রকম হ’ন্যে
হ'য়ে আছি। হায়, তবু তুমি আমার উপর এত নারাজ কেন ?
আবদা। (স্বগত) ভগবন্! এ সয়তানের হাত থেকে
আমায় মুক্ত করে দাও।
আস। তবে জানি! মেহেরবানী হবে কি? সত্যি সত্যি
আশা ক’তে পারি কি,(সুরে)
আমার যৌবন গােবরের তুমি হবে পদ্মফুল,
গােনূরে পােকা ঝেটিয়ে তেড়ে, আবে অলিকুল।
আদা। আবার! কেন তুমি আমায় দিন রাত বিরক্ত কর ?
আস। বটে, বিরক্ত করা হ’ল ? ভাল, কথাটাই তবে
খােলস হক। বলি, আমায় সাদি করে, স্বাধীনভাবে ঘর সংসার
করাই ভাল, না বাদীগিরিই ভাল ? তুমি বল, আমি এখনই
আমীরজাদাকে বলে তোমায় খালাস করে নিচ্ছি।
২য় দৃশ্য ] রাবেয়া। আবদা। আমি তােমার অত অনুগ্রহ চাই নি। যদি তত দয়া হয়ে থাকে, তবে আমায় আর জ্বালাতন না ক’রুলেই আমি যথেষ্ট মনে করতে পারি। আস। ভালবাসা কি জ্বালাতন ? আবদা। নরাধম কুকুর ! তুমি আমার পিতৃহত্যার অন্য- তম কারণ, আমি তােমায় অন্তরের সহিত ঘৃণা করি। মূখ, ভাল- বাসার মৰ্ম্ম তুমি কি বুঝবে ? আস। সে ঘটনায় আমার অপরাধটা কি ? আবদা। সে আমি তােমায় কারণ দেখাতে বাধ্য নই আস। না, তা বলতে হবে। খামাকা একটা দোষ চাপা- লেই ত হ’ল না ? আৰদা। দুর হক ছাই। প্রস্থান । আদ। দুর নেহাত সহজে হচ্ছি নি বাবা! দেখা যাক, মেয়ে মানুষের জাই কত কড়া। ঘসতে ঘসতে পাথর ক্ষয় যায়, আর এর গুমর যাবে না ? নসেরের প্রবেশ। নসের। ওহে, এব্রাহিম সাহেব যে নিমন্ত্রণ করে গেল । কি করি বল ত ? আস। রাত্রে ? নসের। হা । আস। সৰ্ব্বনাশ, আজ যে গুলবাহার খাবার জোগাড় রাখবে বলেছে?
১০০ রাবেয়া। [ ৩য় অল্প নসের। তাই ত ভাবছি, কি করি? আস। না সে হতেই পারে না। এব্রাহিম মিঞাকে বরং খবর দেওয়া যাক যে হঠাৎ আপনার অসুখ করেছে। নসের। একেবারে ডাহা মিছে কথাটা ? আস। নইলে উপায় কি ? নসের। সে কিন্তু তুমি না হলে হবে না। আস্। বেশ, আমিই যাব। নসের। যাব নয়, তা হলে এখনই যাও। ভদ্রলােক শেষে আয়ােজন না করে বসে। আস্। আচ্ছা চ’লুম। এমন আমােদ কিছুতেই নষ্ট করা যেতে পারে না। প্রস্থান। নসের। বাঃ, দিনের পর দিন চরিত্রের কি আশ্চর্য্য পরিবর্তন হয়ে আছে। মদ ধ’লুম, মদ ধ’লুম,কুৎসিৎ আসক্তি এসে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা দেখা দিয়েছে। আরও কত হবে, কে জানে ? 'আগে ভান্তুম, মানুষ অধঃপাতে যায় কেন? এখন ভাবছি, যাচ্ছি কেন ? কিন্তু ঐ পৰ্যন্তই। সে ‘কেন’র। আর উত্তর ঠিক হ’ল না। আশ্চৰ্য্য এই যে,-ভাবছি—তবু যাচ্ছি। তবে সে নিস্ফল ভাবনায় দরকার কি? তার চেয়ে নির্ভাবনা ভাল । দুনিয়ায় এসেছি কেন ?—জানি না! যাব কেন? জানি না। আদও জানি না, অন্তও জানি না। তবে আর মাঝ- খাটা জানবার চেষ্টায় দরকার কি? সেটাও জানি না(ই) খাক।
২য় দৃশ্য )
রাবেয়া।
১০১
একান্তে আবদার পুনঃ প্রবেশ।
আবদা। (স্বগত) আমার জীবনের অমা-রজনীর অবসানে
এ কি আলাে ছায়া আবার এসে জুটল? নসের আলো, আগর
অন্ধকার, আবার আমায় ঘাের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে চায়।
ধ্রুবতারা রাবেয়া—পথ-প্রদর্শিকা ; ত্রিশক্তির কি আশ্চর্য্য সংঘর্ষণ!
নসেরে আসগরে—এ আলােয় অন্ধকারে কেমন করে মিশে
আছে ? হয় আলো-নয় অন্ধকার। তবে কি নসের আলেয়ার
আললা ? তা যদি হয়—রক্ষা ক’র দয়াময় কুহকে যেন না
ভুলি!
নসের। এই যে আমার দিবাগিচার গুল-আনার!
আবদা। আমি বাঁদী, বাদীর সঙ্গে বাঁদী জেনেই আলাপ
কবেন।
নসের। ছি, ফের সেই কথা। বলেছি ত তুমি আমার
কলিজা।
আবদা। একি ঠিক বলেছেন?
নসের। বিশ্বাস না হলে কি ক’ব জানি ?
আবদা। না না, অবিশ্বাস নয় ! তবু এখনও ত আপনার
ও সম্বােধনের অধিকার জন্মে নি ?
নসের। সে শুধু তােমার অনুগ্রহ হ'লেই হয়।
আবদা। অনুগ্রহ আপনার।
নসের। সে কি কথা? মাথায় তুলে রাখু! (হস্তচুম্বন )
আব্দা। কিন্তু ?
নসের। কিন্তু কি ?
১০২ রাবেয়া। [ ৩য় অঙ্ক নসের। আবদা। বাদীর সঙ্গে বিবাহে আমীর সাহেব মত দেবেন কি ? বে! সে কি, কার সঙ্গে,-তােমায় আমায় ? পাগল আর কি ! সেই দিনই আমীর সাহেব দু’জনকে দূর করে দেবেন। তা কি হয় ? আবদা। তবে আপনি কি আমায় ?—ছি । প্রস্থান। ? নসের। ব! এত কথা—এত প্রণয়, এক কথাতেই ছি । স্ত্রী-চরিত্রের কি অদ্ভুত রহস্য ! না না, এটা যে স্বাভাবিক। আবদার উচ্চ আশা দুরাশা। কিন্তু দোষী কে ? আমি ! আমিই তারে এ দুরাশা হৃদয়ে পােষণ করতে প্রশ্রয় দিয়েছি । আমি গড়েছিলুম-আমি ভেঙ্গে দিলুম, বস ! ( চিন্তা করিয়া) বিবাহ কি অসম্ভব ? না, আমার মন ছােট হয়েছে, তাই যে চ’খে আদাকে প্রথম দেখেছিলুম, ভালবাসা জানিয়েছিলুম, সে চোখ-সে মন আর আমার নাই! বুঝি সে সাহসও নাই। নিরীহ রমণী !—মনঃক্ষুন্ন হলে ? হলে হলেই—আমি কি ক’ব ? ( চিন্তা করিয়) হয় ত কিছু ক’তে পান্তুম—কিন্তু করে কে?—আমার আমিত্ব অনেক দূরে চলে গেছে, আর তা’কে বশে আনতে পারি না। যানে দেও! প্রস্থান। ! আগরের পুনঃ প্রবেশ। আস । কি রকম বাবা ! হাত ধরাধরি-প্রেমের ঝাঁকুনি, ব্যাপারখানা কি ? ডুব দিয়ে জল খাও, হু। আর আমি শালা ৩য় দৃশ্য ] রাবেয়া। ১০৩ হা প্রত্যাশায় এতকাল ঘুরে ম’ছি, দেখেও দেখ না! আমীর- জাদার ধন দৌলতে মন ধরেছে, বটে! আচ্ছা, দেখি কত ধানে কত চাল বেরােয়। কি ভাগ্য বাবা, এব্রাহিম সাহেবকে পথেই পেয়েছিলুম, নইলে ত তােমাদের এ রঙ্গ রস আঁধারেই থাকত। আচ্ছা! প্রস্থান। তৃতীয় দৃশ্য। আদার কক্ষ। কালরাত্রি। চিন্তামগ্ন। আবুদার প্রবেশ। আবদা। না, কিছুতেই হ’ল না। মন আমার বশ হবে । কি করে হবে ? আশৈশব কেউ ত আমাকে মন বশ ক’তে শেখায় নি। প্রবৃত্তির দমন ক’তে হয়, সদসৎ বিবেচনা রাখতে হয়, সংযম সদ্বিবেক যে জীবনপথের সর্বশ্রেষ্ঠ অবলম্বন, তা কেউ আমাকে বলে নি। শুধু অসংযত চিত্তের আত্মঘাতী বীভৎসাচরণ প্রত্যক্ষ করেছি। শুধু ক্ষণতৃপ্তিকামী জনে ভীষণ কলুষিত কামনার স্রোত প্রবাহিত হতে দেখেছি। কখন দেখি নি, কখন বুঝি নি, কখন ভাবি নি যে অদৃষ্টের নিষ্ঠুর উপহাসের ক্ষণিক বিজলীর ভবিষ্যৎ ঘাের-তমােরাশি-সমাচ্ছন্ন। কল্পনা কখন ততদুর যায় নি যে এর পর আর কিছু আছে। তবে ?—তবে আমি কেমন করে আত্মশাসন ক’ব ? (শয্যায় উপবেশন) দাও দয়াময়, আমার এ আগুন নিবিয়ে নাও!
১০৪
রাবেয়া।
[ ৩য় অঙ্ক
এ জ্বালাময়ী অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার তুষানল হ’তে আমায় মুক্ত
করে দাও! দাওবলে দাও, কি জ্ঞানের অধিকারী হলে,
কোন অমৃতরাশি স্পর্শ করলে আমার এ কামনা নিৰ্বাপিত
হতে পারে ? কখন ত তােমাকে জানি নি প্রভা ! কি তুমি-
কেমন তুমি, কখন ত শুনি নি প্রভো!
কি বলে ডাকতে
হয়, কি করে কঁদতে হয়, কি করে তােমায় ভাবতে
হয়, কখন ত কেউ বলে নি প্রভাে! তাই তােমায় চিনি না, তাই
তােমায় জানি না। তা বলে কি দয়া ক’রূবে না; অজ্ঞানের অপরাধ
কি মার্জনীয় নয় ? না না, তুমি যে দয়াময়, অবশ্য দয়া ক’রূবে ।
দয়া ত করেছ প্রভু, নইলে কে সে রাবেয়া—তা’র উপদেশে
আমার নয়নে এ নূতন রশ্মি প্রতিভাত হবে। সৰ্ব্বভূতময় ।
রাবেয়ার সে অমৃতময় উপদেশ তােমারই বিভূতি মাত্র।
আমার ভয় কি ? তুমি রাবেয়ারও যেমন—আমারও তেমন।
ক্ষণেক নিস্তব্ধ থাকিয়া) কি ভ্রম! চিরবিলাসলালিত, আবাল্য
শত শত কলুষ-প্রবৃত্তির অনুকূল স্রোতে ভাসমান যুবকের হৃদয়ে
আমি স্বর্গীয় প্রেমের স্থিতি-সম্ভাবনা করেছিলুম। বিষধরের
দন্তে অমৃতের অনুসন্ধান ?—কি উন্মাদ আকাঙ্ক্ষা! (ক্ষণপরে )
আমি কি ভালবাসতুম? কই না;-ভালবাসলে আবার তারে
পিশাচ মনে ক’ব কেন ? অন্ধকার জীবন আমার এখনও
অন্ধকার, তাই এ পদস্খলন—তাই এ অলেয়া-বিভ্রম। (শয়ন)
আগরের প্রবেশ।
আস। (স্বগত) হয় এসপার নয় ওসপার ! এতদিন
এত সাধ্য-সাধনা ক’ছি, তবু মন নরম হ’ল না! এত তাচ্ছীল
৩য় দৃশ্য।
রাবেয়া।
কেন? আমি কি মানুষ নই ? আমীরজাদা, তার সঙ্গে
কালকের পরিচয়,তা’তেও এত ! আর আজ আমি কতদিন
পায়ে পায়ে ফিরছি। না তার পয়সা দেখেছ, তাই ? মেয়ে
মানুষে এতদুর হতশ্রদ্ধা ক’রূবে, চখের উপর অন্যের সঙ্গে প্রণয়
করবে, তাই সহ করতে হবে ? তার চেয়ে মরণও ভাল ।
এই যে, একি ঘুমিয়েছে ?
আদা। (দেখিয়া) কে, কে তুমি ?
আদ। আমি তােমার প্রেম-সায়রের শেওলা জানি।
আদা। (উঠিয়া) সয়তান্! তুমি কেন এখানে?
আস। তাও ত বটে আমি যে আমীরজাদা নই ।
আব্দা। এখনই বেরােও ব’ছি, নইলে আমি চীৎকার
ক’ব।
আস। সবুর, ঠাণ্ডা মেজাজ রাখ! অত বাড়াবাড়ি কেন?
আদা। তুমি বেরুবে কি না ?
আ। আম্বৎ বেরুব। কিন্তু আমার ক’টা কথা আছে,
আগে তার উত্তর চাই।
আবদা। কোন কথা শুনতে চাই নি, তুমি দুর হও।
আস। আমি দুর হব না! ভাল কথায় যা বলি শােন,
নইলে গােলে পড়বে।
আদা। (চীৎকার স্বরে) কে কোথায় আছ
আস। দেখবে তবে ?— অগ্রসর হওন)
আদা। বেইমা, গােলাম ! (পাদুকা নিক্ষেপ )
আস্। তবে রে সয়তানি! ( সক্রোধে আক্রমণ)
আদা । (চীৎকার স্বরে) কে আছ, আমায় বাঁচাও !
১০৬
রাবেয়া।
[ ৩য় অঙ্ক
ভয় করে।
মােহসীনের প্রবেশ।
মােহ। (আগরের গ্রীবা ধরিয়া) কে তুই পিশাচ, রমণীর
প্রতি অত্যাচারে উদ্যত হয়েছিস ?
আস। (হস্ত মুক্তির চেষ্টা করিয়া) খবরূদার, ছেড়ে দে
ব’লছি বেটা।
মােহ। কে তুই ? আসগর !
আ। জানের মায়া যদি থাকে, তবে ছাড়, ব’ছি! নইলে
কালই আমীরজাদার কাছে টেরটা পাবি।
মােহ। নরাধম ! তুই কি মনে করিস, তাের চেয়ে জীবনের
মায়া আমার বেশী ? মুখ, তা নয়! যারা তাের মত পিশাচ,
তারাই
মৃত্যুকে
আস। এ—ভাই সাহেব, তুমি ! আমি ভেবেছিলুম
আর বা কে! ই হিছেড়ে দে ভাই—লাগে, ওঁক-তাের
পায়ে ধরি, ছেড়ে দে দোস্ত !
মােহ। নিতান্ত কাপুরুষ তুই! মনে করেছিলুম উচিত
শাস্তি দেব, তা কুকুরকে অন্য শাস্তি নিষ্প্রয়ােজন । (আসগরকে
পদাঘাতে দুরে নিক্ষেপ ) যাও দূর হও !
আস। (উঠিয়া সক্রোধে, স্বগত) আচ্ছা!
প্রস্থান।
মােহ। আমি ঘরের পাশ দে যাচ্ছিলুম, হঠাৎ তােমার
চীৎকার শুনে, এসে দেখি এই কাণ্ড। ব্যাপার কি ?
আবদা। কিছুই জানি নি, শুয়ে ছিলুম-হঠাৎ দেখি
সয়তা ঘরের ভেতর, তার পরেই আমায় আক্রমণ ক’মূলে।
,
৪র্থ দৃশ্য )
রাবেয়া !
মােহ। তােমার ন্যায় স্ত্রীলােকের এখানে এমন ভাবে একা
থাকা উচিত নয়। রাবেয়ার কাছে থাকলেই পার ? বিশেষতঃ
তা’র কক্ষ হারেম-সংলগ্ন, অনেকটা নিরাপদ।
আদা। তাই যাব, আমায় সেখানে এগিয়ে রেখে এস,
একা যেতে সাহস হচ্ছে না।
মােহ। চল।
উভয়ের প্রস্থান ।
চতুর্থ দৃশ্য।
উদ্যানপার্শ্ব ।
কাল-পূৰ্বাদু।
আসগর ।
আস। উদগার অনল-স্রোত গিরি-প্রস্রবণ,
ঢাল তপ্ত হাহা-শ্বাস রৌদ্র-দগ্ধ মরু,
বিশ্বনাশী এস ঝা-এস বজ্রনাদ,
উথলিয়া ধাও বেগে সাগরের জল,
নাশ সৃষ্টি মুহূর্তেকে প্রলয়-প্লাবনে ।
লই প্রতিশােধ আমি শত্রু-জিঘাংসায় ।
বিষ—বিষ–বিষময় সকল সংসার,
আলা-জ্বালা-জ্বালাময় হৃদয় আমার
প্রণয়ের প্রতিদ্বন্দী অধম নফর,
পদাঘাত করিয়াছে নায়িকা-সম্মুখে!
অসহ্য এ অপমান সহ্য করা চেয়ে,
মৃত্যু ভাল মাের ছি ছি শত শত গুণে।
১০ রাবেয়া। [ ৩য় অঙ্ক দিজানের প্রবেশ। দি। আ-মরণ, গরব আর সয় না। ওলল, বয়স একদিন আমাদেরও ছিল—আমরাও একদিন গতর দুলিয়ে হেঁটেছি, এ দেমাক থাকবে না লাে—থাকবে না, (অঙ্গুলি নিপীড়ন) যাবে—যাবে—যাবে, গতরখাকীর গতর মাটীতে মিশবে—মিশবে—মিশবে । আস। কি দিদি, হয়েছে কি ? দি। এই গতরখাকী শকুনির ঝী-ওমা আবার কি ব’ছি! না না, আমাদের এই বাদী কত্রী রাবেয়া, আমীর- জাদীর আদর পেয়ে আহলাদে আটখানা হয়েছেন। ওলো! ধন যৌবন ঢলের ভর, শুকিয়ে ফাটে ডালে খরা। রেতের পিরীত দিনে রয়, যদি নুতন অভাব হয়। আস। সত্যি ত, এত দেমাক কেন লা? তুই কাকের বাঁদী, আর দিদি আমাদের বলতে গেলে ঘরের একজন হয়ে পড়েছে। দি। বল ত ভাই, আমি যখন আসি তখন আমীরজাদীর জন্মই হয় নাই। আর সেই আমীরজাদী আজ আমায় ওই মকুটীর কুমন্ত্রণায় এত কথা শুনালে। ওই আবাগীই কুযুক্তি দিয়েছে, ওই আমার কোটনা গেয়েছে। আস। আমারও তাই মনে বলে। তােমায় কি আর জানি নি দিদি ! আর হাজার হলেও পুরান লােক, তােমাদের একটু মান্য রেখেই আমাদের চলতে হয়।
৪র্থ দৃশ্য ] রাবেয়া। ১০৯ দি। এই বােঝ ত দাদা! ( ক্রন্দনের সুরে) আমীরজাদী আমায় দশের মধ্যে এমন অপমান করূলে গা ! ওমা সে কি কথা গা, আমি রাবেয়ার হিংসা ক’ব কেন গা,-তা’রে গাল দেব কেন গা,ফরমাস ক’ব কেন গা,-আমি তারে বাদী বলে ডাকূব কেন গা ?- আস। ছি ছি, এমনও কথা গা!-স্রেফ কোটনা গেয়েছে দিদি-স্রেফ কোটন গেয়েছে। দি। খোদা আছেন, অত বাড় থাকবে না! ও আদর- যাবে—যাবে—যাবে- আস। দিদি ! এত দেমাকের—এত আদরের কারণ জান ? দি। কি—কি ? আস। না, সে সব কথা না বলাই ভাল । আর তােমার কাছে বলেই বা কি, তুমি ত আর পর নও! ( জনান্তিকে কথােপকথন) দি। ওমা, এত বিদ্যে তােমার পেটে ! তাই ত বলি, অত আদর কেন ? ধরিয়ে দিতে পার ?—বাদী বেটীর কবর কাটি। আস। তা পারি। কিন্তু, সাবধান, আমি না দোষী হই। দি। আমায় কি তেমনি মানুষ পেলে ? আমার পেটের কথা কখন রটে না। আস। সে কি আর তােমায় জানি নি দিদি ? তা কাল বিকেলে এস, ধাদী বেটীর যা’তে আকেল হয় তা তােমায় ৰালে দেব। দিল। বেশ, বেশ! লক্ষ্মী,ভাইটা আমার—দেখ যেন ভুল না!
১১০ রাবেয়া। [ ৩য় অঙ্ক আস্। একি ভােলার কথা দিদি, তােমার অপমান আমি সইব ? দি। বেঁচে থাক তুমি—চিরজীবী হও! আমি চ’লুম! হ্যা দেখ দাদা, যদি পার,-তবে তােমার অনেক কাজ করে দেব। আস। আর তােমায় ব’তে হবে না, আমি।সব সন্ধান ঠিক করে রাখ। দিজানের প্রস্থান। বান্দা মােহসী, অবােধ নসের, তারা হ’ল মনােমত জন-প্রণয়-আম্পদ, আর আমি ঘৃণিত কুকুর ? দেখ, তবে, কুকুর-দংশন-জ্বালা ভীষণ কেমন ? তাের(ই) প্রণয়ীর প্রাণে জালিয়া অনল, সন্দেহ-ফুৎকারে তা’য় করিয়া প্রবল, ঘৃণা, লজ্জা, ক্ষোভ, রােষে পীড়িয়া মরমে, পুড়াইব যত তাের মনের বাসনা ! আর মােহসী! শুধু তাের নয়, জানি তাের বড় আদরের প্রাণের রাবেয়া ; তা’র(ই) রক্তে শাণিত করিয়া ছুরী, পরে উপাড়িব তীক্ষ্ণ-ধারে হৃৎপিণ্ড তাের ! কবরে ঢাকিয়া দোহা, শত শত বার- পদাঘাত করিব ঘৃণায়। রে নফর, তবে যাবে বক্ষ হতে এ জ্বালা আমার ! দেখি, অগ্নি প্রজ্জ্বলিত কতক্ষণে হয়। প্রস্থান।
৫ম দৃশ্য ) রাবেয়া। ১১১ পঞ্চম দৃশ্য। আবদুলের গৃহ। কাল-পূৰ্বাদু। সােফিয়া ও আহসান্। আহ,। আবার কবে যাবেন ? সােফিয়া। তা কি করে ব’? বসরা এসে অবধি ত প্রায় আপনাদের বাড়ীতেই কাটাচ্ছি! প্রথমে নানা ছুতে চলেছে, কিন্তু বেশী হলে হয় ত কি ভাবে। এই দু’দিন হ’ল এসেছি, আবার কি করে বলি আপনাদের বাড়ী যাব । আহ,। সেও ত বটে। সােফিয়া। শুধু বটে নয়, অন্য লােক হলে কোন্ দিন সন্দেহ করে ব’সত! তবে সে কিছু বােকা কিনা, তাই অত- শত ভাবে না। আহ, কি সন্দেহ কবে, কোন অন্যায় হচ্ছে কি ? সােফিয়া। হচ্ছে না হচ্ছে তার প্রমাণ কি ? লােকে বাইরে থেকেই দেখে, অত কে তলিয়ে বুঝতে চায় ? আর সন্দেহ এমন জিনিষই নয়, সে এক বার হলে তখন আর সম্ভব অসম্ভব, যুক্তি বুদ্ধি কিছুই ঠিক থাকে না। যত রকমেই ভাবতে যায়, ঘুরে ফিরে সন্দেহটাকেই বড় করে তােলে। আহ,। তবু সন্দেহ কেন আসবে? আমাদের বাড়ী যান সােফি। শুধু তা নয়, তার সঙ্গে এ গুলিও আছে ! আহ,। কি, আপনার সঙ্গে কথা বলি—গল্প করি ? তা কি একেবারে অসম্ভব ?
রাবেয়া।
[ ৩য় অঙ্ক
সােফি। অসম্ভব নয়। তবে দোষ পড়েছে কি জানেন,
গােড়া থেকেই কেমন একটু
লুকোছাপা চ’ছে, নইলে
আর বাধা কি ? সে ত আদৌ জানে না যে আমাদের আলাপ
হয়েছে ? জানলে ভয় ছিল না, তার সামনেও কথা চত।
আহ,। তা আপনিই ত নিষেধ ক’লেন, নইলে আমি
লুকোতুম না।
সেও ত আমাদের বাড়ীর প্রায় মেয়েদের
সঙ্গেই কথা বলে, তাতে দোষ কি ?
সােফি। ( স্বগত) কি বােকা! ( প্রকাশ্যে আমি ও
বারণ ক’তুম না, তবে কথাটা হঠাৎ আমিই আগে বলেছি-
লুম কি না, তাই !
আহ,। তাই কি ?
সােফি। আপনাকে কিছু না বল্লেও আমার উপর বড়
রাত!
আহ,। আচ্ছা, এখন ব’লে কি হয় ?
সােফি। বিশেষ আর কি হবে ? হয় ত আমাদের দেখা
শুনা বন্ধ করবে ! চাই কি এতদুর শুলেমানুষের মন ত,
কি বুঝতে কি বুঝে,-শেষ হয় ত আমায় তালা দিয়ে
তাড়িয়েও দিতে পারে।
আহ,। বলেন কি, আপনাকে তালাক দিতে পারে ।
সােফি। সেটা আর বেশী কথা কি ?
আহ। বড়ই মস্কিল দেখছি, কি করি ভেবেও যে পাই
ভাল কথা, আপনার পিতা কবে আসবেন ?
সােফি। শীঘ্রই ত আসবার কথা ! আমাদের গাঁয়ের এক
জন লােক এসেছিল, তারই কাছে শুনিছি।
৫ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
আহ। আচ্ছা, তাকে বলায় ত কোন দোষ হবে না ?
সােফি। না, তা আর দোষ কি ? সে ত আর মেয়েকে
ভাসিয়ে দিতে পাবে না ?
আহ,। তবে তিনি আসুন, তাঁর সঙ্গে যুক্তি করে যা
হয় করা যাবে। বড় মস্কিলেই পড় লুম যে !
সােফি। অত মস্কিল মস্কিল ক’রূছেন কেন? মস্কিল মনে
হয়, না এলেই পারেন।
আহ,। ( নিরুত্তর)
সােফি। চেয়ে রইলেন যে ?
আহ। তা—তা-
সােফি। ( ঈষৎ হাস্যে) অত ভাববেন না ! না বলে ত
সহজে জানছে না; তার পর বাজী আসুক, যা হয় দেখা যাবে।
আহ,। তা আচ্ছা, তবে আমি এখন আসি। বাপঞ্জী
আবার খুঁজবে এখন।
প্রস্থান।
সােফি।
অত ধন দৌলতের এক ছেলে ; বুদ্ধি সুদ্ধি যেমন,
তাতে আমার হাতে পড়লে যে করে চালাতুম, তাই চ’ন্ত।
ওর বাপ কি নিকে দেবে না ? ললাটা যেন কেমন কেমন ;
বডড কঠিন কথা। তা দেখি, ওর মা বােনের ত খুব মন
জোগাচ্ছি, তারাও আদর ক’রূছে। ছোঁড়ারও মন পড়েছে।
একমাত্র ছেলে, যদি আদার ধরে বসে না রেখে কি আর
পাবে? এক রকম করে কাজ গুছােবই। বাঞ্জী এলে, কৌশল
করে মিনসেকে চটিয়ে, আগে তালা নিতে হচ্ছে। তার পর
কিছু দিন বাদে চেষ্টা করলে, তখন আর ওর বাপ কি বলে
। আপত্তি করবে ? ওমা মিসে আছে যে! প্রস্থান।
১১৪
রাবেয়া।
{ ৩য় অঙ্ক
আবদুল ও এব্রাহিমের প্রবেশ।
এব্রা। সলিমান্ মূলে খুব সহৃদয় ব্যক্তি। সুস্থচিত্তে পেলে,
তার দ্বারা আমি সমস্ত কাৰ্য্যই সম্পন্ন করাতে পারি। আমার
অনুবােধ সে অবহেলা কবে না। তবে কথা এই যে তাকে
প্রকৃতিস্থ পাওয়াই কঠিন। যাই হক তুমি নিশ্চিন্ত থাক,
সুযােগ পেলেই আমি সলিমকে সমস্ত কথা বলে, যাতে
গেমার বন্ধুর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় তার ব্যবস্থা ক’ব ।
আব। আমার বল ভরসা সমস্তই আপনি। সে আমার
যথার্থ বন্ধু, তার জন্য যা কিছু করতে হয়, আমি মনে
করেই ক’রূবেন।
এব্রা। সে আর কেন ব’ছ বাবা! আমার সাধ্যমত
চেষ্টার ত্রুটী হবে না। এখন আসি ! ভাল কথা, আহসান্
যদি এখানে আসে, তবে তার গতি লক্ষ্য রেখ। ছোঁড়াটার জন্য
আমার কিছু চিন্তাই হয়েছে।
অব। এ কথা কেন বলছেন ? সে অতি সচ্চরিত্র
যুবক! বসােরায় তার মত চরিত্রবান্ সরল হৃদয় যুবক বােধ
হয় অল্পই আছে।
এব্রা। সে বটে, কিন্তু কি জান,সময়ের দোষে, ঘটনার
ফেরে, মানুষ কখন কি হয়ে ওঠে বল ত যায় না। বিশেষতঃ
যৌবন বড় ভয়ানক কাল। যাই হ’, তুমি দৃষ্টি রেখ !
আৰ। যে আজ্ঞা !
উভয়ের প্রস্থান।
৬ষ্ঠ দৃশ্য )
রাবেয়া।
আবদুলের পুনঃপ্রবেশ।
আৰ। ওগাে,ওগাে!
সােফিয়ার প্রবেশ।
সােফিয়া। কি গা ?
আব। কঁ করে চারটা খাবার দাও ত, আমায় এখনি
বেরুতে হবে! আহ সা এসেছিল ?
সােফি। হাঁ-না,-আসে নাই।
আব। (সন্দিগ্ধ নয়নে চাহিয়া ) যাও, জোগাড় কর’গে !
সােফিয়ার প্রস্থান।
কি রকম হ’ল, “না, কি ? ( চিন্তা করিয়া) আরে না,
হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছে, শাদা কথা।
প্রস্থান।
शर्छ
দৃশ্য।
সলিমানের কক্ষ।
কাল-পূৰ্বাদু।
সলিমা পত্রপাঠে নিযুক্ত
দিজ্জা উপস্থিত ।
সলি। তুই এ চিঠি কোথা পেলি ?
দি। কুড়িয়ে পেয়েছি।
সলি। কোথায় ?
দি। আমীরজাদীর ঘরের সামনে।
সলি। কেউ এ চিঠি খোঁজ করেছিল ?
১১৬ রাবেয়া। [ ৩য়, অঙ্ক দি। হাঁ। 'রাবেয়া ব’ছিল একখানা চিঠি হারিয়েছে, কেউ খুঁজে দিলে আমীরজাদী তা’রে এক আরফী বক্সিস দেবে। সলি। (পত্র খুলিয়া স্বগত পাঠ) রাবেয়াকে উপযুক্ত পুরস্কার দিও, সে যােগ্যতার সহিত দৌত্য সম্পন্ন ক’ছে। ই। ( প্রকাশ্যে ) তুই এ চিঠি আমায় দিলি কেন? দি। আমি কাগজখানা কি জাবার জন্য আগর মিঞাকে দিয়েছিলুম। সে পড়ে বলে এ চিঠী আমীর সাহেবকে দেওয়া উচিত। তা হলে নিমকের কাজ হবে। সলি। আচ্ছা, তুই এখন যা। দি। (স্বগত) আসগর যা শিখিয়ে দিয়েছিল, তাই বলেছি, ধ’তে পারে নি। এইবার দেখব, রাবেয়া মসকুটির আদর কোথা থাকে ? প্রস্থান। । সলি। বান্দা! নে-বান্দা। হজুরালি ! বান্দার প্রবেশ। সলি। নসের কোথাতল দে ! বান্দার প্রস্থান। ছি ছি ছি, আমার কন্যা আমীন, বসােরার সর্বশ্রেষ্ঠ ধনি- কন্যা, সুন্দরী, শিক্ষিতা, তা’র এনীচপ্রবৃত্তি-এ কুৎসিৎ লালসার সম্ভাবনা যে স্বপ্নের অগােচর। লােকে তার চরিত্রের মাধুৰ্য্য উপ- মায় ব্যবহার করে, আমি কন্যার গৌরবে গরীয়ান্; সেই আমীন শেষে একজন নীচ বান্দার কাছে আত্মদান করলে। তবে ৬ষ্ঠ দৃশ্য । রাবেয়া। । ১১৭ এ জগতে অসম্ভব কি? আর মােহসী, এই তোঁর সদাচার? তুই যে বিষকুম্ভ পয়গামুখ তা’ত স্বপ্নেও অনুমান করতে পারি নি। এতদুর স্পর্ধা! রে নফর ! কুকুর দিয়ে তাের দেহ ভক্ষণ করাব। রাবেয়ারাবেয়া, কি প্রহেলিকাচ্ছন্ন অদ্ভুত চরিত্র ! ধীর, নম্র, শিক্ষিতা বালিকা, ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে কঠোর কাৰ্য্যের পরিবর্তে কন্যার পরিচর্যায় নিযুক্ত ক’লুম, একি তারই প্রতিদান ক’রূলি ? ছি ছি ছি, চারিদিক থেকে লজ্জা, ঘৃণা, ক্ষোভ, যেন মূৰ্ত্তিমা হয়ে এসে আমার মর্মস্থানে আঘাত করছে। অসহ যাতনা, শান্তি-শান্তি চাই। সাকি!-পেয়ালা ! (বান্দার প্রবেশ ও মদ্য প্রদান, মদ্যপানান্তর) বসরার গুলাবের মত সৌরভশালী যে নাম ছিল, তাতে নরকের বায়ু মিশেছে—অতি তীব্র, অতি দুর্গন্ধময় । ভাণ্ডপূর্ণ দুগ্ধমধ্যে বিন্দুমাত্র বিষ নিজের অধিকার স্থাপন কবে, সব বিকৃত হবে। যুবকদলের সান্ধ্যভ্রমণে, রমণীসমাজের প্রীতি- সম্মিলনে, পূর্বের ন্যায় এখনও আমার নাম প্রধান আলােচ্য বিষয় থাকবে। কিন্তু সেই আলােচনায়, আমীনার নামে আমার কন্যার নামে, সকলের আঁখিকোণে যে একটু উপহাসের তীক্ষ্ণ কটাক্ষ তরঙ্গ তুলে মিলিয়ে যাবে, তা’রই বায়ু-হিল্লোল ঢেউয়ের উপর ঢেউ তুলে এসে আমার হৃদয়-বেলা চুর্ণ করে দেবে। কেউ দেখবে না, কেউ জানবে না, কেউ ইচ্ছায় আঘাত ক’বে না—অথচ আমি আপনাতে আপনি ধ্বংস হব। চেয়ে যাতনা—এর চেয়ে সৰ্ব্বনাশ আর কি হতে পারে ? জ্বালা—আলা; সাকি, পেয়ালা চাই! (বান্দার প্রবেশ ও মদ্য প্রদান, পানান্তর) এই আমার শান্তি! ভুল, কে বলে শান্তি ? তীক্ষ্ণ স্মৃতির জ্বালা ত একটুকুও যায় না। (পেয়ালা নিক্ষেপ )
১১৮
রাবেয়া।
[ এ অঙ্ক
নসেরের প্রবেশ।
নসের। আমায় স্মরণ করেছেন কেন ?
সলি। কেও নসের ? স্মরণ করেছি কেন? কাপুরুষ!
মান, গৌরব, তেজ, বীৰ্যাদি অভিমানরূপ যে বিশাল মহীরুহের
ছায়ায় স্ফীতবক্ষে কালযাপন ক’ছ, তা একটা নগণ্য কীটের
দংশনে ধ্বংস হতে চলেছে, আর তুমি তার ভবিষ্যৎ ফলাধিকারী
নিরুদ্বেগে কাপন ক’ছ ? এই দেখ তােমার ভবিষ্যৎ
গৌরবময় জীবনের সূচনার উপকরণ দেখ! (পত্র নিক্ষেপ
নাও, কুড়িয়ে নাও, পাঠ কর! হৃদয় হ’তে শান্তিকে বিসর্জন
দাও, পার যদি আত্ম-সম্মান—বংশ-গৌরব রক্ষা কর।
নসের। (পত্র পাঠ)
সলি। দেখলে ?
নসের। আজ্ঞা হা! এ সম্ভাবনা আসগর আমায় পূর্বেই
ইঙ্গিতে জানিয়েছিল। বহু পূৰ্বে এর প্রতিবিধান হ’ত, কেবল
আপনার অনুমতি
সলি। মুখ! এর আবার অনুমতি কি ? বংশের গৌরব,
পিতামাতার সম্মান, পরিবারের পবিত্রতা রক্ষার্থ কাৰ্য কবে,
তা’র আবার অনুমতি কি ? যাও, শক্তি থাকে—অভিমান
থাকে, তবে এই মুহূর্তে বিষবৃক্ষের অঙ্কুর লােক-লােচনের অগােচর
থাকতে থাকতেই সমুলে তাকে উৎপাটিত কর । নচেৎ এ দিন
আর ফিবে না।
নসেরের প্রস্থান।
শান্তি চাই
পেয়ালা, জ্ঞানশূন্য করে দাও!
প্রস্থান।
! সাকি
৭ম দৃশ্য )
রাবেয়া।
সপ্তম দৃশ্য।
সলিমানের হারেম ।
আমীনার কক্ষ।
কাল=সায়াহ।
আমীনাবানু ও রাবেয়া।
রাবে। ঠাকুরাণি ! কুঞ্জে অই শেফালির শিরে-
শ্যামপত্র সুশশাভিত মুকুলিত শাখে,
আধ ফুটো শ্বেত কলিগুলি, সায়াহিক
জলধর-মাথে ছিন্ন রবিকর-মত,
শােভিতেছে সৌন্দর্যের অতুল উপমা।
চেয়ে দেখ, ওর(ই) পাশে শুন্যবৃন্তগুলি-
হেসেছিল কাল যারা কুসুমিত বুকে,
উদাস-মলিন আজি কালের পরশে ;-
সংসারের নশ্বরতা করিছে জ্ঞাপন।
ওই মত আমাদের(ও) জীবন যৌবন,
মত্ত হয়ে আছি যাহে আনন্দ-বিলাসে,
কালে যাবে ধরা হ’তে অচিহ্নিত হয়ে।
সফলতা কোথা তবে মানবজীবনে ?
কীৰ্ত্তি গৌরবের ভাতি ?—স্মৃতি-মাত্র শুধু!
নশ্বরে নশ্বর স্মৃতিকায়াহীন ছায়া,
অনন্ত আকাশে খণ্ড মেঘদল মত,
অবলম্বহীন ছায়া ক্ষণে চলে যায়।
১২০
রাবেয়া।
[ ৩য় অঙ্ক
ক্ষু কীট ভাবে যথা গুল্মে মহীরুহ,
মানবের বিবেচিত কালের দীর্ঘতা,
বাস্তবের গণনায় নগণ্য তেমতি।
কীৰ্ত্তিমানে—সাধারণে প্রভেদ কেবল,
ওষধি ও মহাবৃক্ষে বিভেদের-মত
সাময়িক জীবনের ইতর-বিশেষ ।
মহাকীৰ্ত্তি-স্মৃতিও সে সময়ে নিশ্চিত
ধ্বংস হয়—হইতেছে, হবে চিরদিন।
আমী। তবে কিবা জীবনের সাফল্য-উপায় ?
রাবে। এখানে আঁধারে ঢাকা মানব-নয়ন।
শাস্ত্র শুধু তর্কময় এ প্রশ্ন-বিচারে !
বহু পন্থা, মতদ্বৈধ-বহু অনুমান,
অন্ধকার আর (ও) দেয় গভীর করিয়া ।
সংস্কার-আবদ্ধ জীব সত্য ভাবে যাহা,
বিশ্বাস, ধারণা বিনা আর কিছু নয় !
আমী। তবে ত আঁধার সব(ই)! অন্ধ জীব তবে,
কেমনে যাইবে বল অমৃতের দ্বারে ?
রাৰে। ভগবৎ-কৃপা বিনা নাহিক উপায় !
আত্মায় জাগিলে তৃষ্ণা পিপাসু পরাণ,
হাহাকারে চা’বে যবে অমৃত-সাগর ;-
অন্ধকারে দিশাহারা, ভয়ার্ত কাতর
পথাপথ জ্ঞানশুন্য,—সর্প বিতাড়িত
জীবনে হতাশ যথা প্রান্তরে পথিক,
সেই মত নিরাশায় ছুটিবে যখন,
৭ম দৃশ্য )
রাবেয়া।
১২১
অচিন্ত্য দয়াল নাথ-এ বিশ্ব-জনক,
স্নেহ-বশে চাবে ফিরে সন্তানের প্রতি ;-
সেই দৃষ্টি সুমঙ্গল স্নিগ্ধ শান্তি-ধারা-
বরষিয়া ধৌত করি অন্তরের ক্লেদ,
আঁখি-সনে করে দেবে পথের নির্দেশ ;-
পাবে যাহে অমৃতের নীর-নিধি মাঝে,
তাপ-হারী জনকের চরণ-আশ্রয়।
আমী। মুগ্ধ মােরা, আকুলতা কেমনে পাইব ?
রাবে। ভাব তারে—ডাক তারেকর গুণগান,
সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রিয় বলি করহ ধারণা ;
দয়াল আপনি হবে হৃদয়ে প্রকাশ !
জীবের কল্যাণ,
জগৎ-কল্যাণ সে যে তাহার(ই) কল্যাণ ;
পিতৃ-আত্মা পুত্রে যথা হয় সংক্রমিত,
জগৎ-পিতার আত্মা জগতে তেমতি।
জ্যোতীরূপে বৰ্তমান তিনি সৰ্ব্বভূতে ।
আমী। এস তবে, তব সনে ক্ষীণ-কণ্ঠে মম,
গাহি সুখে সুধা নাম চাহি গাে মঙ্গল,
আত্ম হতে মহাবিশ্ব-চির-সুমঙ্গল !
উভয়ের জানু পাতিয়া
প্রার্থনা করহ শুধু
প্রার্থনা গীতি ।
‘আমায় ক’র না হে। অনুৰ্বর উচ্চ হেন,
মেঘ চুম খায়, গিরির মতন!
১২২
রাবেয়া।
। ৩ আৰু
করে দাও নীচ সমতল, শস্য-শ্যামল,
নরে—ক্ষুধার অন্ন পায় যেন হে!
ক’র না বিশাল অসীম লবণ-ভরা,
মহা জলের সাগর মত,
করে দাও, তাপিত ধরায় ক্ষীণ তটিনী,
শান্তি পাবে তৃষিত যাহে!
হে দয়াময়। বীরের হাতে, চাই না হতে,
তীক্ষু উজল তরবারি,
করে দাও সরল লাঠি, অন্ধ আতুর
পতিত পাবে সহায় যাহে।
চতুর্থ অঙ্ক।
ক
প্রথম দৃশ্য।
রাবেয়ার কক্ষ-সম্মুখ, উপবন-প্রান্ত।
রাবেয়া ও মােহসী।
রাবে। কত দিন ভাবিয়াছি জিজ্ঞাসিব তােমা,
সাধিতেছ কেন এই আত্ম-নিপীড়ন?
ধনীর কুমার তুমি, দাস দাসী কত
রহিয়াছে কৰ্ম্ম-লিপ্ত তােমারি গৃহেতে।
সচ্ছল স্বাচ্ছন্দ্যময় আবাসে তােমার
শুনি নাই ক্ষীণ স্বার্থে গঞ্জনা কখন,
বিরাগ সম্ভব যাহে। জানি না কখন,-
তমা হেন সদালাপী সজ্জনের সনে
প্রতিবাসী বিসম্বাদ ঘটিয়াছে কভু।
আল-বনিত-বৃদ্ধ গ্রামবাসী যত,
সকলেই মুগ্ধ তব সদাচার-গুণে।
তবে, কোন্ ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সাধনায়
আত্ম-ত্রুতে স্থির চিত্তে হয়ে অগ্রসর,
সাধিয়া ল’য়েছ এই ঘৃণ্য দাস্য-ব্রত।
মােহ। ( স্বগত)
জীর্ণতার বীণা বুকে স-মিড় রঙ্গে,
এ কি নব আবেগের ঘন সঞ্চালন
১২৪
রাবেয়া।
[ ৪র্থ অঙ্ক
না না, বেজ না রে বীণা—নীরবে ঘুমাও,
স’বে নারে বুকে তাের এ গুরু ঝঙ্কার !
( প্রকাশ্যে )
রাবেয়া ! রাবেয়া ! কেন জাল নির্বাপিত
স্মৃতির আলােক ? কি ছিলাম, কি হয়েছি
ভুলে গেছি সব। ভূতপূর্ব সুখ-স্মৃতি
ভাবি না কখন? জানি শুধু বর্তমান।
ভবিষ্যৎ চিন্তা কোন নাহিক আমার ।
রাবে। একি আকুলতাময় তীব্র উন্মাদনা !
এত ব্যথা হৃদয়ে তােমার ? নব প্রাণে
কেন নাহি ভবিষ্যৎ বাসনার খেলা ?
মুক্ত কর হৃদয়ের দ্বার! সমব্যথী,
বাল্য-সাথী আমি গাে তােমার, সাধ্য হলে
মুছাইব তাপ-ক্লিষ্ট যাতনার রাশি।
মােহ। উন্মাদনা ?—উন্মাদনা ছিল না ত কভু !-
জাগাইলে তুমি আজ সে স্মৃতি আমার !
ভুলে আছি, বহু যত্নে অবশ বাসনা,
কেন তারে অকারণে কর উত্তেজিত ?
নিবাত সরসী-হৃদে তুলিয়া লহর,
ছিন্ন করি রবি-তপ্ত কুমুদ-পল্লবে-
কোন্ ইষ্ট সিদ্ধ তাহে হইবে তােমার ?
আহা, সে যে সঙ্কুচিত মরম-ব্যথায়
সহিবে না ক্ষীণ প্রাণে প্রবল ঝটিকা।
তবে—তবে-না না, সে যে আর(ও) অসম্ভব।
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
রাবে। অসম্ভব কিছু নয় জগৎ-মাঝারে !
হতে পারে অই তব কুঞ্চিত কুমুদ,
চন্দ্রমা-কিরণ-সনে শিশির সেবিয়া-
পূৰ্ব্ব রূপাভায় পুনঃ পূর্ণ শােভাময়ী
শতদল শােভে যথা প্রথম ঊষায়।
মােহ। রাবেয়া ! রাবেয়া ! কেন ঢাল বিষ-রাশি
তীব্র উপহাসে ? জানিতাম চিরদিন,
দান করি প্রতিদান মিলে এ জগতে ,
কল্পনায় ছিনু সুখী বিশ্বাসে আপন।
ছি ছি ! এতই নিঠুর। তুমি, চেয়ে দেখ
প্রতি কেন্দ্র—প্রতি স্নায়ুপ্রতি মৰ্ম্মস্থানে
তােমারি মূরতি-খানি রয়েছে অঙ্কিত !
শয়নে ভ্রমণে কিম্বা কৰ্ম্ম-কোলাহলে
ফেরে শুধু জড় দেহ অভ্যাসে আপন,
আত্মা মাের আছে সদা তােমাতে বিলীন।
হায় নারি ! তবু তুমি বুঝেও বােঝ না।
না, ক্ষমা কর।উন্মাদ হয়েছি আমি।
শুনিও না—পুনঃ চেও না খুলিতে আর
কষ্টদ্ধ জীর্ণ মাের হৃদয়-কপাট।
রাবে। তুমি-তুমি-আমা-তরে এ দুর্দশা তব ?
মােহ। জানি না রাবেয়া, দুর্দশা কাহারে বল ?
ভালবাসিভালবেসে সুখী আমি সদ। ;-
রহিয়াছি আপনাতে আপনি বিভাের।
চাহি নাই কারও কাছে কভু প্রতিদান !
রাবেয়া।
[ ৪র্থ অঙ্ক
আশা-নিরাশার ঘাত-প্রতিঘাতে, কভু
সংক্ষোভিত হয় নাই ক্ষণেকের তরে,
সুখদ কল্পনাময় জীবন আমার ।
দুর্দশা কেমনে তবে কর অনুমান ?
রাবে। ভালবাস তুমি!-কেন ভালবাস মােরে ?
মােহ। গিরি হ’তে উঠি প্রস্রবণ, ছুটে চলে
অনির্দিষ্ট অচিন্তিত পথে, মিশে শেষ
সাগর-সলিলে। কেন ধায়—কেন মিশে
কে বলিতে পারে ? বুঝি বা ফেনিল নীল
জলধির বুকে, অস্তাচলগামী রাঙ্গা-
রৰিকরে মৃদুমন্দ লহরীর খেলা,
বড়ই সুন্দর লাগে নয়নে তাহার !
কাননে ভরিয়া থাকে তরু-শাখা-পরি
স্নিগ্ধোজ্জল বসন্তের নব কিসলয়,
শূন্যপথে মেঘগুলি চলিতে চলিতে
সহসা থমকি কেন রহে তা’র শিরে—
বরষিতে সুশীতল নব-নীর-ধারা ?
বুঝি, রৌদ্র-ঝলসিত নয়নে তাদের
শ্যাম-শােভা-দরশনে লভিয়া সান্ত্বনা,
অতুলিত সৌন্দর্য্যের বিকাশ-কারণ
প্রতিদানে খুলে দিতে স্নেহের নিঝর !
ফোটে ফুল গভীর কাননে, কোথা থেকে
কেন আসে আকুল ভ্রমর-মাখিতে সে
কোমল পরাগ ? বুঝি কামদ সুন্দর
১ম দৃশ্য )
রাবেয়া ।
।
মােহনীয় কুসুমের ব্যাপ্ত আকর্ষণে!
সুশীতল গগনের বায়ু-কক্ষ হতে
কেন আসে হিম-কণ তাপিত ধরায় ?
চন্দ্রোজ্জ্বল উপবনে কুসুমের বুকে
উছলিত মধুসনে মিশায়ে আপনা-
স্বতন্ত্র অস্তিত্ব টুকু করিয়া বিলােপ,
বুঝি, ধন্য হ’তে মধুকর মধুর চুম্বনে!
ভালবাসি—কেন বাসি কেমনে বলিব ?
বুঝি, শান্ত-সুরভিত স্নিগ্ধ-সমুজ্জ্বল
তব সিত-ফুল্ল-মালতীর দল মত
তনুখানি পরে, হেরি আমি চন্দ্রমার
নীহার-শয়ন! বুঝি, আঁখি-যুগে তব
ভ্র কুমুদের বুকে ভ্রমরের মত।
অচঞ্চল মণিদ্বয় প্রকাশিছে সদা,
শান্তির অমল চিহ্ন জগৎ-মাঝারে !
স্বর-লহরীতে যেন খেলিছে সতত,
মৃদু মধুস্বনে—বিরহিণী-করােখিত
বীণা-তারে বেহাগের করুণ ঝঙ্কার।
অধরে লুকান হাসি-নব-জলধরে
যেন প্রভাময়ী চপলার খেলা। আর
বুঝি সরল অন্তরে তব, হেরি আমি
সস্নিগ্ন নিরমল নীহারের মত
স্বচ্ছ প্রেমকণাউজলিত নবপ্রেম,
প্রভাত কিরণে- শােভাকর সূর্য যেথা
১২৮
রাবেয়া।
{ ৪র্থ অঙ্ক
কেন্দ্রে সমুজ্জল ) বিশ্বের একত্রীভূত
স্নেহলিপ্ত সৌন্দর্য্যের রাশি,—প্রতিবিম্ব
হেরি যার, মুগ্ধ মাের মানস-নয়ন।
রাবে। জানি আমি চিরদিন বুদ্ধিমান্ তুমি!
একি মােহে আচ্ছাদিত হৃদয় তােমার ?
রস-রক্ত-ক্লেদময় রমণী শরীর
ভাব তুমি নিৰ্বিচাবে সৌন্দর্য্যের খনি।
ক্ষণ-মুগ্ধ অস্থির চঞ্চল আত্ম-সুখী
রমণী-অন্তুরে, কর তুমি সুমহান
প্রণয়ের আশা! লবণাক্ত সাগরের
জলে, চাহ তুমি পিপাসা বারিতে ! ছি ছি,
ভেঙ্গে দাও নিদ্রালস নয়নের ভুল,
মেল আঁখি নবীন কিরণে ! দেখ চেয়ে
গগনমণ্ডলে, কার রবি শশী তারা
শােভে অনুক্ষণ ? কা’র ওই জলদের
মালা, সান্ধ্য-গগণের লােহিত কিরণে
প্রকাশি’ বিমল শােভা বিবিধ স্তবকে
হাসি মুখে চেয়ে থাকে জগতের পানে ?
কার ও মােহন বেণু ললিত ষড়জে
তােলে তান টি ী লহরী-লীলায় ?
স্বচ্ছ স্নিগ্ধ নিরমল বিটপি-কল্যাণ
কোথা হতে আসে এই তুহিনের রাশি ?
কা’র প্রেমে ফুটে উঠে কেতকী কর?
কে সাজায়-বিহঙ্গম—প্রজাপতি দলে,
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
১২৯
কমনীয় কলাপীর কেয়ূর-কলাপে ?”
একবার ভাব দেখি জিজ্ঞাসু পরাণে-
এই যে নশ্বর হেয় রমণীর দেহ,
অতুল সৌন্দৰ্য ভাবিমুগ্ধ তুমি যাহে,
কা’র অবহেল-ব্যক্ত বাসনা-মাত্রেই
ধরা-পরে মুহূর্তেকে হয়েছে উদ্ভূত !
সে যে কি সুন্দর।–পার কি গাে কল্পনায়
আনিতে কখন!-যা’র অণু-পরিমাণ
সৌন্দর্যের কথা ব্যক্ত করি শােতে ধরা
অতুলন প্রকৃতির বিবিধ বরণে!
ভালবাস !—প্রেমপূর্ণ পরাণ তােমার !
মহাপ্রেমে মিশে যাও সখে, মিশে যথা
সাগরের কোলে আসি তটিনীসকল !
মােহ। হতে পারে অনিত্য সংসার। হতে পারে
অগণন দুঃখে ভরা মানব-জীবন,
হতে পারে বিষকুম্ভ
হতে পারে বিশ্বস্রষ্টা মহান্ সুন্দর ।
কিবা তাহে আসে যায় মাের? খুঁজি নাই
কোন দিন,কেন ফুল সুগন্ধ বিলায়,
কা’র প্রেমে হাসে শশধর, গাহে পাখী
ললিত পঞ্চমে ? দিন যায়—দিন আসে,
আসে যায় জানি; কারণ খুঁজিতে কভু
হয় নি কামনা। বেশ আছি নিরুদ্বেগে।
অহেতুক
অতীন্দ্রিয় তর্কে মন দিয়া-
রমণী-হৃদয়,
১৩০
রাবেয়া।
[ ৪র্থ অঙ্ক
সাঁধিয়া আলিব কেন সন্দেহ-অনল ?
লুকাইয়া রেখেছিনু অতি সযতনে
হৃদয়-নিহিত মাের কামনার কথা,
কেন তুমি জানিতে চাহিলে ?-কেন তুমি
জীর্ণতার বীণা-বুকে করিলে আঘাত,
তাই ত মলিন সুর কাদিল আক্ষেপে!
রাবে। তবে অকারণ কেন এ সাধনা তব ?
ফিরে যাও গৃহে আপনার ! সুখ দুঃখ
করিয়া বর্জন, রহ লিপ্ত কৰ্ম্মযােগে
সংসার-মাঝারে! সংসারের রত্ন তুমি,
বহু কাৰ্য্য সাধিতে পারিবে, সমাজের
বহু বিঘ্ন দূরে যাবে দৃষ্টান্তে তােমার !
মােহ। রাবেয়া ! রাবেয়া ! এতই নিঠুরা তুমি ?
পিপাসিত আমি-হও তুমি মরীচিকা,
তবু তােমা পানে চেয়ে আশে আছে প্রাণ।
এক বিন্দু সুধা আশে দুরাশী চকোর,
ধেয়ে চলে মহােৎসাহে ছায়াপথ পানে,
বােঝে না অবােধ,—ক্ষীণ প্রাণে শক্তি তার
কভু না ঘটিবে, পশিবারে চন্দ্রলােকে ;
তবু আশায় মােহিত থাকে! চন্দ্রমার
কিবা ক্ষতি তায়? তবে অকারণে কেন
বাসনা তােমার—শুধু কাদা’তে আমায় ?
রাবে। মােহসী! শুন তবে মরমের কথা !
ভালবাস তুমি মােরে,অন্তরে অন্তরে
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
বুঝিয়াছি বহু দিন তাহা ! কিন্তু হায়,
পারি নাই আত্মদান করিতে তােমায় !
কেন—জান ? তােমা হ’তে অধিক সুন্দর
অতি প্রেমময় মহান্ পুরুষ এক,
ভুলায়েছে নিৰ্বিকল্পে মনপ্রাণ মাের ।
মুগ্ধ আমি কায়মনে প্রভাবে তাহার ;
কিন্তু হায়, তব নীরব সাধনা-বলে-
আত্মা মাের নাহি পারে ত্যজিতে তােমায় ।
সংসার-পিঞ্জর-মুক্ত বিহঙ্গিনী আমি,
পড়িয়াছি বাঁধা তব কামনার জালে !
ভালবাস-ভালবাসি সখা ! ভালবেসে
মুক্ত কর মােরে ! ছেড়ে দাও, ছুটে যাই
কুরঙ্গিণী সম তার বাঁশরী-নিনাদে,
পশি গিয়া সে অনন্ত মহাপ্রেম মাঝে।
ছেও না লতিকা-জালে সে পথ আমার ।
সকাতরে সাধি সখা, ফিরে যাও গৃহে--
প্রলােভনে আর তুমি ফেল না আমায় !
মােহ। রাবেয়া ! রাবেয়া ! একবার-একবার
আর একবার বল শুধু ভালবাস,
একবার প্রেমাবেগে ডাক সখা বলি;
চ'লে যাব নিষ্কণ্টক করিয়া তােমায়।
তার পর ?-এক পাত্র লােহিত মদিরা,
একখানি রুটী শুধু ধরিতে জীবন,
আর উদ্ভাসিত চন্দ্রালােকে--কল্পনায়
১৩২
রাবেয়া ।
[ ৪র্থ অঙ্ক
অশরীরী প্রাণময়ী প্রতিচ্ছবি তব,
এই ল’য়ে ধেয়ানে কাটা’ৰ বাকী দিন।
এই চন্দ্রালােক কতবার এসে যাবে,
কতই নূতন প্রেম-নব অনুরাগ,
কত বিরহীর তপ্ত আকুল নিশ্বাস,
পাবে দরশন! কত এসে চলে যাবে।
কিন্তু হায়, আমার এ প্রেমের সাধনা
এই প্রণয়ের স্মৃতি, বিভাের আত্মায়-
অবিকারে অফুরন্ত রবে চিরদিন।
বল--একবার বল—ভালবাসি সখা।
রাবে। ভালবাসি—ভালবাসি ভালবাসি সখা ।
কিন্তু আমি নহি ত আমার ; হারায়েছি
বহু দিন তার সে বিভূতি মাঝে ! বল,
হারানিধি পুনরায় কেমনে মিলাব ?
মােহ। ডাক পাখীবাজ বীণা-গাও রে ভ্রমরা,
হাস চন্দ্রালােকে মুগ্ধ মালতী শেফালি ।
মলয়া বহিয়া যা রে দোলাইয়া ধীরে,
অবিন্যস্ত প্রেয়সীর নিবিড় কুন্তল ।
দেখে সুখে চলে যাই তৃপ্ত-পরাণে।
দূরে যা রে বিরহীর কাতর উচ্ছাস
ব্যথিত আকুল যত অতৃপ্ত কামনা !
চির মিলনেতে আজি মিলিলাম আমি।
ওই
দূরে,
এই পাশে, সুনীল গগনে,
মরুভূমি, প্রান্তরে কি সাগর-সৈকতে,
১ম দৃশ্য ) রাবেয়া । ১৩৩ পর্বতে, কাননে কিম্বা নিরিণী-বুকে, প্রিয়া মাের ঐকান্তিকী কামনার ছবি- কল্পনায় বর্তমান রয়েছে সদাই। (প্রস্থানােদ্যোগ) রাবে। মােহসী! মােহসী ! মােহ। না না, সখি, না না, দেখায়াে না আর পুনঃ নবীন অরুণ, নিদ্রালস নয়নেতে স’বে না কিরণ মননামাঝে ছবি তব আদরে রেখেছি, শয়নে স্বপনে কিম্বা ক্ষণ-জাগরণে, ধ্যানে জ্ঞানে বিশ্বমাঝে চাহিব যে দিকে অই ছবি মনশ্চক্ষে হবে প্রতিভাত ; একা তুমি কায়াময়ী সমক্ষে এখন, বিহনে তােমার ছায়াময়ী তােমাময় হেরিব ভুবন ! স্বার্থজ্ঞান হৃদয়েতে দিয়াছ ললনে! সেই স্বার্থে হয়ে লুব্ধ তােমা ছেড়ে চলিয়াছি তােমার(ই) জগতে। না সখি, ক্ষমা কর—ফিরায়াে না মােরে ! প্রস্থান। রাবে। আরে আরে হীন প্রাণ! আর কত দিন, রহিবি রে মােহমুগ্ধ নিদ্রা-অচেতন ? দুরে ফে বাসনার রাশি, ভুলে যারে সংসারের যত কিছু আপাত-সুন্দর! তাের চিরসখা সে জনে ভুলিয়া, ব- পান্থ সহ পথে কেন মিলনের সাধ ?
১৩৪ রাবেয়া। [ ৪র্থ অঙ্ক ছুরিকা হস্তে আগরের প্রবেশ। আস। প্রতিশােধ প্রতিশােধ করিব গ্রহণ। দাবানল জালিয়াছি আমি, ফুৎকারের ভার পড়েছে আমার(ই) করে! ভস্ম হবে রাবেয়া সুন্দরী, ভস্ম হবে মােহসী! তার পর বােঝা যাবে, আব্দ। সুন্দরীর কিবা আছে ভবিষ্যৎ ললাট-লিখন! রাবে। কে তুমি ? আসগর ! এ বেশে এখানে কেন ? আস্। মােহসীন কোথা? রাবে। কেন ? আ। কালসর্পশিরে করিয়াছে পদাঘাত, কাল তার ফুরা’য়েছে তাই! মহাকাল- সঙ্গী আমি, আসিয়াছি তারে লয়ে যেতে চির অন্ধকারে! তুমিও সঙ্গিনী হবে! ভেব না সুন্দরি ! প্রিয়-বিরহের ক্লেশ দানিব না তােমা, ততটা নিষ্ঠুর নই! ( রাবেয়ার বক্ষে ছুরিকাঘাত, রাবেয়ার পতন।) শীঘ্রই তােমার পথে যাবে মােহসী, ছায়ামূর্তি ধরি কর অপেক্ষা ক্ষণেক ! বেগে প্রস্থান। রাবেয়া। আঃ আঃ, “যদি স্বর্গের লােভে তােমায় ডেকে থাকি প্রভু, সে স্বর্গ আমার হারাম হ’ক! যদি নরকের ভয়ে ডেকে থাকি প্রভু, তবে সেই নরকেই আমার গৃতি হ’ক।”
২য় দৃশ্য )
রাবেয়া।
১৩৫
=
আবদার প্রবেশ।
আবদা। সই, সই! (দেখিয়া) একি, একি!-কে রে
নরাধম, এমন বিমল জ্যোতিঃ অন্ধকারে ঢেকে দিলি ?
সই-ই।
রাবেয়া। সই! বড় পিপাসা একটু জল !
আবদার প্রস্থান।
“তুমি যদি স্বর্গ হও, আমি প্রভু স্বর্গ-ভিখারিণী ! তুমি যদি
নরক হও, আমি তবে অনন্ত কাল নরকের দ্বারে প্রবেশ ভিক্ষা
ক’ব।”
( আব্দার পুনঃপ্রবেশ, বারি প্রদান ও পার্শ্বে বসিয়া
রক্ত-রােধের চেষ্টা।)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
নদীতীরস্থ পথ।
কাল—ব্রাহ্ম মুহূর্ত।
মােহসীনের প্রবেশ ।
মােহ। (কিছুক্ষণ উদাস-নেত্রে উপরে চাহিয়, স্বগত)
নীলাকাশ! অনন্ত নক্ষত্র-মালায় পরিশােভিত হয়ে হাসছ!
আমায় উপহাস ক’ছ ? গুরু-গম্ভীর প্রশান্ত-নয়নে আমায়
দেখাচ্ছ, তুমি কত সুখী ? না তা নয়, তুমি অব্যাহত সুখী
নও!
তােমার সুখেরও বিবর্তন আছে। ঐ যে ছায়াপথের
রাবেয়া। [ ৪র্থ অঙ্ক রেখা তােমার কষ্ট-কল্পিত গাম্ভীর্যের অসারতা প্রতিপন্ন ক’ছে; ও রেখা আমারই বক্ষের মত তােমার বিরহ-মিলনের প্রতিঘাত চিহ্ন। তােমার হৃদয়-চন্দ্রিকাও ঐ পথে তার স্মৃতি রেখা অঙ্কিত করে চলে গেছে। নক্ষত্র-মালায় কি সে অভাব পূর্ণ ক’বুতে পেরেছে? না পারে নাই, পাবেও না! স্থির আছ—শুধু আশায়, আবার কে তােমার অন্ধকার জীবন-পথের সঙ্গিনী পাবে বলে ! তবুও কাছ ;—শিশির-বিন্দু যে তােমারই বিরহ-বিধুর নয়নের অশ্রুকণা। তবে এ বৃথা অহঙ্কার কেন, এ কপট হাস্যে উপহাসের বিড়ম্বনা কেন ? মারুত ! কুসুমিত ফুল্লকাননে হিল্লোলিত হয়ে স্নিগ্ধ সৌরভ মেখে মৃদু-মধুর স্পর্শে আমায় কি জানাচ্ছ ? তুমি কত সুখী কত শীতল ? দূর কানন হতে পাপীয়ার সপ্তম ঝঙ্কার বহন করে এনে আমায় শুনাচ্ছ—তােমার হৃদয় কত প্রফুল্ল ? আত্ম- বিস্মৃত দান্তিক! আপেক্ষা কর, নিশি অতিবাহিত হতে দাও। মধ্যাহ্নের প্রখর সূৰ্য্যোত্তাপে তোমারই বিষাদ-করুণ হাহা-শ্বাসে জগৎ প্রতিধ্বনিত হবে। তটিনি ! কূলে কূলে। উছলিয়া অদূর-গত বরষার মিলন-গরি- মায় আত্মবােধান্ধ স্ফীত বক্ষে তরঙ্গ-হিল্লোলে উচ্ছসিত হয়ে নেচে নেচে কলতানে আমায় শ্লেষ ব্যঙ্গ ক’ছ ? ভুলি নাই, পূৰ্বে তােমারই বক্ষ শৈবাল-বিজড়িত শােক-মলিন স্থির নিশ্চল দেখেছি! এখনও সে শৈবাল-মূল তােমার অন্তস্তলে প্রচ্ছন্ন আছে। অপেক্ষা কর, দু’দিন পরে প্রকৃতির পরিবর্তনে শীতের উষায় তােমারই হৃদয়-ভেদী বিরহের বিষাদ-কুহেলিকায় বনরাজি-নয়নেও বাষ্প বিগলিত করবে।
১৩৭
মনে
২য় দৃশ্য ]
রাবেয়া।
ধরিত্রি শ্যামল সৌন্দর্য্যে বক্ষ আবরিত করে, অন্তর্জাল
যতই কেন লুকায়িত কর না-ও হৃদয়-নিহিত অগ্নিময় তরল
প্রস্রবণ গােপন রাখতে পার নাই!-যতই স্থিরা বলে গর্ব কর
না কেন, সে উত্তপ্ত-যাতনা-বিগলিত তরঙ্গের প্রবল প্রতিঘাতে
তােমায় শত সহস্রবার বেপথুমতী করে তুলেছে।
আর তুমি জ্যোতির্ময় সবিতা ! ঘনান্ধকারকে অপসারিত
করে ধীরে ধীরে উষার অমল রাগে মৃদুহাস্যে প্রকাশিত হ’চ্ছ ।
নিজের আনন্দে জগৎসংসারকে উদ্ভাসিত ক’ছ! অত আনন্দ,
অত উচ্ছাস কেন? সন্ধ্যা-সুন্দরীর নির্মম নিষ্ঠুর উপহাস, যা
তােমার দৈনিক জীবনের চির-নির্দিষ্ট প্রতিঘাত, তা এত সহজে
বিস্মৃত হ’চ্ছ কেন?
রেখ, যেমন নবরাগরঞ্জিত
দীপ্ত-নয়নে দিগবলয় উল্লাসে উদ্ভাসিত করে উদিত হ’চ্ছ, তেমনি
বিষাদ-নির্যাতিত রক্ত-নয়নে অবসাদ বিলিয়ে অপসৃত হতে
এই অন্ধকার আবার এসে তােমার স্থান অধিকার
করবে।
পঞ্চ মহাভূতাধার! তবে তােমাদের এ ক্ষণিক সুখ দেখিয়ে
তুলনায় আমার হৃদয়কে অধিকতররূপে বিষাদ-মথিত কবার
প্রয়াস, এ প্রগতা কেন? তােমরাই না সৃষ্টির মূল উপাদান ?
যা’র উপাদানের অণু পরমাণু দুঃখ-কালিমালিপ্ত, তার সমষ্টি যে
সদা ব্যথিত হবে সে ত স্বতঃসিদ্ধ কথা ।
( নেপথ্যে মসজিদে প্রাতঃকালীন আজান।)
ডাক্ছ—ডাক! কিন্তু তার কথা ভেবেছ কি? সে চিরদিন
নিঃসঙ্গ। ওঃ, সে অপরিবর্তনীয় অবস্থা—ক্ষুদ্র মানব আমাদের
ভাবতেও ভয় হয় ।
রাবেয়া।
[৪র্থ অঙ্ক
পশ্চাতে আঙ্গুরের প্রবেশ।
আস। (স্বগত) এই যে, সমস্ত রাত্রি খুঁজে খুঁজে হল্লা
হয়েছি। শালা ঠিক কোথাও ঢুকেছিল, ভােরের হাওয়া পেয়ে
বেরিয়ে পড়েছে। এ পাড়ায় ?আচ্ছা তা দেখা যাবে, আগে
ত শালাকে নিকেস করি। ভাের হয়েছে আবার সেরে যেতে
হবে। ( ধীর-পদ-বিক্ষেপে সভয়ে পশ্চাতে আগমন-চেষ্টা ও
নেপথ্যে গীত-শ্রবণে সচকিতে অবস্থান।)
নেপথ্যে মাতাল।
গীত।
খেদি, তুই রাগলে আঁধার দেখি,
ভয় করি না বা দেখে।
হয় যদি হক সহর-ডুবি,
তাের বাড়ী আর সরাব রেখে।
( জনৈক নাগরিকের প্রবেশ ও অন্যমনে প্রস্থানেদ্যোগ,
শশব্যন্তে আসগরের পার্শ্ববর্তী ঝােপে শয়ন, জনৈক স্থূলকায়
মাতালের প্রবেশ ও নাগরিকের সহিত গাত্র-সংঘর্ষ ।)
নাগরিক। কি হে ? চ’খে দেখতে পাও না ?
মাতাল। মাসী, চটিস নি বাবা! শেষ রাত্তিরে তাের বােন
ঝি চ’খে সুমা দিয়ে দিয়েছে, তাই দুনিয়াটাই ঝাপসা দেখছি।
নাগ। বেটা ত বড় রসিক দেখি! পেঁচি মাতাল !
মাতাল। কি বললি? ভর রাত্তিরে এক কুঁজো সরাব
টেনেছি, তা পা টলে নি। আর আমায় বলিস পেচি মাতাল ?
তাের চৌদ্দ পুরুষে কখন মদ খেয়েছে রে বেটী ? কি ব’ মাসী
তুই রাজির বােন, নইলে কোন শালা না তােকে নিকে ক’ত।
২য় দৃশ্য ) রাবেয়া। == নাগ। তবে রে বেটা ! (মাতালের গ্রীবা ধারণ) মাতাল। তবে রে বেটী, আলিঙ্গন না করে ছাড় বি নি ? ( নাগরিককে জাগ্লাইয়া ধারণ) নাগ। ছাড়, ছাড়! মাতাল। ওয়া! নাগ। আরে গেল, ছাড় না বেটা ! মাতাল। ওয়াও- নাগ। ওয়া—শাল কাকার করে দিলি ? ভাের বেলা কার মুখ দেখে বেরিয়েছি রে বাবা! ওয়াক—ছাড়, শালা ছাড়! মাতাল। ওয়া- (উভয়ে জড়াজড়ি করিয়া ঝােপে লুক্কায়িত আসগরের উপর পতন ) আস্। আঁক্ ! (স্বগত) এই বার গিয়েছি রে বাবা! উঃ, শালারা কি ভারি! ( নিম্ন হইতে উত্থান-চষ্টা ) নাগ। কিরে শেয়াল নাকি ? ছাড়, বেটা মাতাল ছাড়! শেয়ালে কামড়ে মেরে দিলে ! ছাড় না শালা ! ( মুষ্ট্যাঘাত) মাতাল। মাসী, যখন ঝাটা ধরেছিস, তখন চুমুও খেতে হ’ল ! ( আসগরের গণ্ডে দংশন।) আ। উঃ-হু-ও- নাগ। বেটা মাতাল, শেয়াল কাড়েছিস! খেয়ে ফেললে রে বাবা! ছাড়, শালা ছাড়! (মুষ্ট্যাঘাত) মােহ। (নাগরিককে মাতালের হস্ত হইতে মুক্তকরণ ।) নাগ। (উঠিয়া) কে মহাশয়! প্রাণ বাঁচালেন! মাতাল বেটা মেরে ফেলেছে। কাপড় চোপড় গুলো ত গিয়েছে, উপরন্তু গাময় ন্যাকার করে দিয়েছে! ওয়া—ওয়া-থু থু!
১৪০ রাবেয়া। [ ৪র্থ অঙ্ক মাতাল। মাসী, সুর ছাড়লি কেন বাবা? (সজোরে দংশন) আস। উঃ——ও- নাগ । শেয়াল কামড়ে ধরেছে মশায় ! (মােহসী কর্তৃক মাতালকে উত্তােলন, গালের টানে সঙ্গে সঙ্গে আসগরের উত্থান।) আস। হু -উ- নাগ। একি রে মানুষ যে! চোর নাকি ? মশায়! ছেরা দেখেছেন ! (ছাের। সহিত আসগরের হস্ত ধারণ ।) (মােহসী মাতালের গাল টিপিয়া ধরিলে মাতাল ছাড়িয়া দিল, সঙ্গে সঙ্গে আসগরের সজোরে হস্ত মুক্ত করিয়া পলায়ন।) নাগ। ধন্ বেটাকে ধ! চোর-চোর-চোর! মাতাল। ভর বৃ ! মাসী, যাস নি! এইবারে পিরীত ঘনিয়ে আসছে ! অন্য দুই জন নাগরিকের প্রবেশ। উভয়ে। কি হে—কি হে ? ১ম নাগ। আঃ ভাই! মাতালের হাতে পড়ে নাকাল হ’লুম! ২য় নাগ। তাের গায়ে কি ও ? ১ম নাগ। এই শালা মাতাল ন্যাকার করে দিয়েছে। এই ভদ্র লােক না এলে, মেরে ফেলেছিল আর কি মাতাল। মাইরি-? ৩য় নাগ। আরে ছা ছা! ধােগে যা ! ১ম নাগ। তা যাব, শালাকে ঢিট করি আগে! ধর ত, ফাড়িতে নে যাই! (তিনজনের মাতালকে ধৃতকরণ চেষ্টা )
৩য় দৃশ্য ]
রাবেয়া।
১৪১
মাতাল। হ্যা—ত! (হস্ত ঘুরাইয়া প্রস্থান,
সকলে। ধরু-ধ! (পশ্চাদ্ধাবন)
মােহ।
এরাও মানুষ! এরাও সুত্থান্বেষী।
প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
আবদুলের গৃহ।
কাল-পূৰ্বাদু।
ইউসুফ।
ইউ। এখানে এসে ত আচ্ছা গােলে পড়লুম। যা বুঝলুম,
তা’তে মেয়ে ত বিগড়েছে। আমিও যে না বিড়াচ্ছি তাও বড়
নয়। কথাও ঠিক, অত ধন দৌলত, যদি মেয়ে আমার সে
ঘরের সৰ্বে সৰ্বা হতে পারে তবে ত পাথরে পাঁচ কিল। কি
আহম্মকিই করেছি, মেয়েটা যেমন দেখতে শুতে ছিল, তাতে
বে’র আগে যদি এখানে নে আসতুম, তা হলে নিশ্চয়ই একটা
খুব বড় হিল্লে লেগে যেত। যাক্, আর ভেবে কি ক’ছি ; না
ভেবেই বা করি কি ? এত বড় একটা আশা, তাই বা ছাড়ি কি
করে। উপায় কি হতেই পারে না? দেখি ত, চেষ্টায় দোষ কি?
আহসানের প্রবেশ।
আসতে আজ্ঞা হয়, এই দেরী দেখে আপনার কথাই
ভাবছিলুম।
আহ,। আমার কি বেশী দেরী হয়েছে ?, তা হতে পারে।
૨૬ર
রাবেয়া।
[ ৪র্থ অঙ্ক
কি জানেন, কেন জানি নি বাপঞ্জী আমাকে এ দিক্ পানে
আসতে দেখলেই রাগ করেন। তাই তাঁর সুমুখ দে বেরুন
চলে না। তাতে অনেক সময় দেরী হয়ে যায় ।
কেন-কেন, তাকে কি কিছু বলেছেন ?
আহ,। না, বলি নি ত ।
ইউ। তবে তিনি সন্দেহ করেন কেন ?
আহ,। তা’ত ব’তে পারি নি। তবে একদিন তিনি আমা-
দের গল্প ক’রূতে দেখেছিলেন। সেই থেকেই যেন এই রকম
ভাব, দেখছি।
?
আহ,। এখন কি করি
বলুন
দেখি
সে সবই ভাবছি। কিন্তু আগে আপনার মতটা
শুনি। যা জিজ্ঞাসা করব, ঠিক নিজের মন বুঝে উত্তর দেবেন।
আহ,। ঠিক উত্তর কেন দেব না ?
ইউ। আচ্ছ। প্রথমে বলুন, আবদুল যদি আমার মেয়েকে
তালাক দেয়, তবে আপনি তাকে নিকে ক’তে রাজি হবেন
কি না ?
আহ,। তা—তা,বাঞ্জী কি দেবেন?
সে উপায় ক’তে হবে। আমার পরামর্শে চলে
সে সব ঠিক হয়ে আসবে। এখন আপনি রাজি কি না?
আহ,। তা-আবদুল ?
এ-সে-অত খাতের ভাবলে, চক্ষু-লজ্জা রাখলে ত
চ’বে না ? নিজের ইচ্ছা থাকলে মন শক্ত ক’তে হবে। দর
কার হলে শক্ত কাজও চাই।
৪র্থ দৃশ্য ]
রাবেয়া।
১৪৩
আহ, তাতা-
ইউ। যা বুঝলুম, আগে যান নিজের মন ঠিক করুন,
তারপর পরামর্শ ক’তে আসবেন।
আহ,। আচ্ছা, আমি ভেবেই দেখি।
ইউ। সেই ভাল, আপনার মন বুঝলে তখন দেখা যাবে।
আহ,। তা আচ্ছা, ভেবেই দেখি ।
ইউ। তাই দেখুন।
আহসানের প্রস্থান।
ইউ। একেবারে কঁচা কাঠ, ও’তে কাজ চলবে না। শেষ
কি দুকূল হারা’ব? কাজ কি অত ঝঞ্চাটে! মেয়েটাকে কৌশলে
জানাতে হচ্ছে, যদি ওর মন ঠিক করে নিতে পারে তবে চেষ্টা
দেখব। নইলে যা আছে, এই ভাল।
প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
সলিমানের প্রাসাদ-সংলগ্ন উদ্যান-পার্শ্ব ।
কাল-পূৰ্বাদু।
নসের।
নসের।
কে জানে প্রকৃত ঘটনা কি? রাবেয়া–নিরীহা,
ধৰ্ম্ম ভীত, তার দ্বারা কি এত দূর সম্ভব? আমীন-ভগিনী,
সে যে স্বর্গের কুসুম, তাতে নরকের কীট-প্রবেশ—কেমন করে
সম্ভব হ’ল ! না, কখনই এ কথা সত্যু নয় । তবে মােহসী
পালালে কেন ? রাবেয়া হয় ত নির্দোষ, তাকেও কি
১৪৪
রাবেয়া।
[ ৪র্থ অঙ্ক
ভীষণ! দৰ্দর করে রক্ত ছুটে বেরুল—ওঃ! আমি ত দোষী
নই, আমি ত আসগরকে নিষেধই করেছিলুম। রাবেয়াকে
আপাততঃ ও কে, আসগর না? কখন ফিরুলে, মােহসীকে
কি পায় নি ? আবদার সঙ্গে অত ঘনিয়ে কি কথা বলছে ?
আড়াল থেকে শুনতে হ’ল। (অন্তরালে অবস্থান)
আবদা ও আগরের প্রবেশ।
আবদা। আসগর ! তুমি অতি হতভাগ্য! তােমার উপর
আর আমার বিদ্বেষ নাই ; বুঝতে পেরেছি, তুমি নরাকারে
পশু মাত্র।
আস্। তা যাই বল, আমি যা কিছু করেছি তােমারই
জন্য ! তােমাকে পাব আশাতেই সর্দারের হত্যায় সাখাওতের
সঙ্গে মিশেছিলুম। তােমার জন্যই এখানে এসে, নানা কৌশলে
আমীরজাদার দোস্ত হয়ে এ বাড়ীতে ঢুকিছি। তােমার ব্যবহার
ফলেই বান্দা মাে: . "মায় পদাঘাত করেছে! আর তার
প্রতিশােধের জন্যই আমি স্থানের সাহায্যে আমীরজাদির নামে
মিথ্যা কলঙ্ক রটিয়ে এ সংসারে আগুন জ্বেলেছি। রাবেয়ার রক্ত
পান করেছি—সে যে মােহসীনের বড় ভালবাসার ধন!
আবদা। আসগর, আগর! সমস্তই আমার জন্য করেছ
তা জানি, কিন্তু তুমি এ ভ্রম করলে কেন? আমার উপেক্ষার
জন্য, আমার ঘৃণার জন্য, আমার পাদুকাঘাতের জন্য আমার
রক্তপান ক’রূলে না কেন? নিষ্ঠুর নরাধম ! তুমি ভুজঙ্গীকে
প্রতিশােধ দিতে নিরীহ ভেকীর মস্তক চূর্ণ ক’রূলে কেন ? মুখ,
কাচমে তুমি হীরক চূর্ণ করেছ! জান না পিশাচ, কি মহারত্ন
৪র্থ দৃশ্য ]
রাবেয়া।
১৪৫
অবহেলায় জলধি-তলে নিক্ষেপ করেছ। কি মহিমান্বিত
জীবনে তুমি সামান্য উত্তেজনার বশে বিঘ্ন এনে ফেলেছ ।
শােন সয়তান! আমি তােমায় চিরদিন ঘৃণা করি—চিরদিন
ঘৃণা ক’ব। যদি এ ঘৃণা হতে মুক্তি চাও, তবে দাও-তােমার
সেই শাণিত ছুরিকা আমার বক্ষে বিদ্ধ করে দাও!
আস্। অমঙ্গলকে সেধে আতে হয় না, সে আপনি
আসে। যদি
নসেরের প্রবেশ।
নসের। সে কথা ঠিক। এ সংসারের অমঙ্গল-স্বরূপ তুমি
সয়তান—তােমায় কেউ সেধে আনে নি, আনি এসে আমার
স্কন্ধে ভর করেছিলে। আর কুকুর, তােমার অসংযত বাসনার
স্রোতে বাধা দিবার জন্য, তােমার কাহিনী কেউ তােমায়
সেধে বলায় নি—আনি বলেছ
আমি বিনা আহ্বানে
বিনা চেষ্টায় আনি শুনেছি। নর। । তাের এ পাপের
প্রায়শ্চিত্ত কি ?
আস। আমীরজাদা, খবরদার! আমি আপনার ভৃত্য নই,
আশ্রিত বন্ধু মাত্র। আপনার বংশ-গৌরবের জন্য, আপনার
ভগিনীর পাপ-স্রোতে বাধা দিবার জন্য, তার কলঙ্ক ঢেকে রাখবার
জন্য বন্ধুত্বের খাতেরে নিজের হাতে রক্ত মেখেছি, নইলে
নসের। আরে শৃগাল । এখনও আত্ম-সমর্থন, এখনও
সরলা আমীনার নামে মিথ্যা কুৎসা-রটনার সাধ ? দেখ,
তবে পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি? (সক্রোধে আসগরকে আক্রমণ ও
উভয়ের জড়াজড়ি করিয়া ভূতলে পতন।)
০৪৬ রাবেয়া। [ ৪র্থ অঙ্ক এব্রাহিমের প্রবেশ। এব্রা। (স্বগত) বাঃ, দিব্বি সঁড়ে যাড়ে লড়াই বেধেছে ! হবে না কেন ?-অব্যবস্থিতচিত্তের প্রসাদও ভয়ঙ্কর আস। এ-হে-হে! গেছি—গেছি, চোখ দুটো গেল- জন্মের মত অন্ধ হ’লুম ! ছাড়ুন ছাড়ুন, ঘাট হয়েছে ! নসের। পিশাচ! যা’তে জীবনময় স্বকৃত পাপের অনুতাপ ক’তে না ভুলিস, তার ব্যবস্থা না করে ছাড়ছি নি! এব্রা। ( স্বগত) ইঃ, এদের দেখছি ক্ষণ-বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়েছে ! না, আর সংসারের ভরসা নেই , ধৰ্ম্মের আগাছা গজাচ্ছে ! আন্দা। ওগো ! দেখ ওগো ! দেখ দেখ, দু’জনে রক্তারক্তি হয়ে ম’ল! আহ, দাও না গাওদের ছাড়িয়ে দাও না! এব্রা। তাই ত! ( উভয়কে ধরিয়া সজোরে পৃথক্করণ ) বাঃ, বেড়ে মানিয়েছে, একদম লালে লাল। এঃ, একেবারে চোখ দুটোতেই আঘাত করেছ। নসের। নরাধম ! এই মুহূর্তে দুর হও ! নচেৎ তােমার জীবন রক্ষা করা কঠিন হবে। এব্রা। বস বস, আর কেন ? চলে, এস !- নসেরকে লইয়া প্রস্থান। ও বাবারে!—একেবারে গেছিরে ! ওঃ বাবা, একটুকু জল দাও! কে আছ, একবার আমায় ধর ! চোখ দুটো গেলে দিয়েছে রে বাবা! আব্দা। হতভাগ্য! পাপের পরিণাম এইরূপই হয়ে থাকে। আস।
৫ম দৃশ্য ] রাবেয়া। ১৪। এস, আমার স্কন্ধে ভর দাও! আমার কক্ষে চল, একটু সুস্থ হয়ে তার পর যে দিকে ইচ্ছা যেও! (আসগরকে উত্তোলন) আস। (স্বগত) বেটি, তােমার জন্যই আমার এ দুর্দশা ! থাক তুমি, যদি মরি—তবু একবার মরণ কামড় কামড়ে নােব। আদার স্কন্ধে ভর দিয়া প্রস্থান। পঞ্চম দৃশ্য। রাবেয়ার কক্ষ-সন্নিহিত উদ্যান-পথ । কাল—জ্যোৎস্না রজনী, প্রথম প্রহর। সলিমা। সলি। কি করলুম ! একটা মিথ্যা সংবাদে উত্তেজিত হয়ে স্ত্রী-হত্যার কারণ হ’লুম। একটু অনুসন্ধান ক’রূলে, একটুকু বিবেচনার সময় রাখলে, হয় ত এ ভুল ঘটত না। মুহূর্তের সামান্য একটা ভুলের জন্য, জীবনময় এমন অনুতাপের কারণ উৎপন্ন ক’লুম, যে যা’র আর সংশােধন হবে না ! কি ক’ব, উত্তেজনা—ভ্রম এত মানুষেরই স্বভাবসিদ্ধ ধৰ্ম্ম । কেমন করে বুঝব, সামান্য দ্বেষের বশবর্তী হয়ে মানুষে এতদূর কূট কৌশলের সৃষ্টি ক’তে পারে, এমন সৰ্বনেশে উত্তেজনার কারণ সৃজন করতে পারে ? আমি কি মুখ, বুড়ো হ’লুম- এখনও বুঝতে পালুম না, যে সংসারে অসম্ভব কিছুই নাই। উপন্যাসের উপাদান যা আমরা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব বলে মনে করি, আমাদেরই গৃহমধ্যে যে তা’র ছায়ামূর্তি সাধারণ লােক-লােচনের অন্তরালে অবস্থান ক’রূছে, তা কেন বুঝি নাই ?
১৪৮
রাবেয়া।
[ ৪র্থ অঙ্ক
যাক, ভেবে আর ফল কি ?—সমস্তই সময়ের ঘটনা। দেখছি
অদৃষ্টে বিশ্বাস না করা, একটা সকলের চেয়ে অজ্ঞানতার ফল।
এব্রাহিমের প্রবেশ।
কে ?-এস ভায়া এস !
এব্রা। কি রকম। এ যে ভরা নদে চড়া দেখতে পাচ্ছি।
এই সন্ধ্যা রাত্রিতে মজলিস ছেড়ে ফুলবাগানে ? পেয়ালা-
সুন্দরীর উপর এ নূতন অভিমান কেন ভায়া ?
সলি। না ভাই আর কিছু ভাল লাগে না। কি জানি
কেন-প্রাণে যেন আর কিছুতেই শান্তি পাই না।
এব্রা। বল কি হে? আমীরলােক তােমরা, দিন রাত
আনন্দ-সাগরে ডুবে আছ। তােমাদের প্রাণে অশান্তি এলে
যে খােদর বিবেচনার ভুল হবে।
নেপথ্যে রাবেয়া। স্তব গীতি।
‘যাতন নিপীড়নে এ আঁখি ঝরে যত
শুধু আপনা তরে সখা কাদি না হে!
এব্রা। কি ও ?-
নে, রাবেয়া।
ভাবি যে কত জনা
এমনি দুখ ভারে
সদা আকুল আঁখি-ধারা বরষে হে!
হায় গো কত দিনে
“তাদের দুখ জ্বালা
দিয়া আমারি হিয়া-মাঝে সঁপিয়া হে,
দীন-দয়াল প্রভাে,
অনাথ-নাথ সখা,
তব সুখদ নাম সবে গাহিবে হে।
৫ম দৃশ্য।
রাবেয়া।
১৪৯
এব্রা। কি অদ্ভুত নিষ্কাম প্রার্থনা ! কি মধুর ভগবৎ-প্রেমের
বিমল প্রবাহ!
নে, রাবেয়া। সখা হে।
পতিত জন যদি উঠিবে না,
ব্যথিত আঁখি যদি মুছিবে না,
ক্লান্ত নব-প্রাণে জাগিবে না,
তবে অভয় নাম তব স্মরিবে কে ?
এব্রা। কোথা হতে এই স্বর্গীয় প্রেমের আহ্বান ছুটে
আছে ? মিঞা সাহেব, মিঞা সাহেব ! এমন অমূল্যরত্ন তােমার
গৃহে গােপন নিহিত আছে, তা ত একদিনও জাতে পারি নাই !
সলি। ভাই মুর্থ আমি, রত্নের গৌরব বুঝতে পারি নাই ।
তাই এ মহারত্ন হেলায় পদদলিত করেছি।
এব্রা। কি করেছ ? খুলে বল, বুঝতে পাছি নি।
সলি। তবে শােন! পাপ প্রকাশও প্রায়শ্চিত্তের অঙ্গী-
ভুত, তােমায় সমস্তই ব’স্ব।
নে, রাবেয়া।
‘না উঠে যত দিন
পতিত জন সব,
তব বিমল স্নেহ-কর পরশে হে!
ধ’র না তত দিন আমার(ও) কর সখা,
সুধু আগ্ধনা সুখটুকু চাহি না হে!
তাপিত জন আঁখি ঝরিবে যত দিন,
যেন আমার(ও) আঁখি-ধারা মুছ’ না হে।
সিক্ত কর যদি
এ মরুপ্রাণ সখা,
তবে সকল হিয়া যেন তুষিও হে!
৮
রাবেয়া।
[ ৪র্থ অঙ্ক
এব্রা। বল বল, কি ব’ছিলে বল ? আমার যেন বােধ
হয়—এমন নিঃস্বার্থ জীবনেও তুমি কোন বিপ্ন এনে ফেলেছ।
সলি। সত্যই তাই। তবে শােন! নসেরের বন্ধুরূপে এক
সয়তান এসে আমার গৃহে আশ্রয় লয়, মনে পড়ে ?
এব্রা। বিলক্ষণ! এই আবার সকালে যখন সে বন্ধুত্বের
বিচ্ছেদরূপ গজ-কচ্ছপী হচ্ছিল, তখন আমি এসে মাঝে পড়াতেই
কতক রক্ষা হয়েছে, নইলে ফয়তা অনেক দূর গড়া’ত।
সলি। তা আমি জানি! সেই নরপিশাচ আসগর, আব্দা
নামে আমার এক বাদীর প্রতি অত্যাচারে উদ্যত হওয়ায়
মােহসী নামে এক বান্দা তাকে বাধা দেয় এবং অপমান করে ।
পিশাচ তারই প্রতিহিংসা সাধনের জন্য মােহসী ও আমার
কন্যা আমীনার মধ্যে কল্পিত কুৎসিত সম্বন্ধের প্রমাণস্বরূপ এক
মিথ্যা পত্র প্রস্তুত করে রাবেয়া নামে এক বাদীকে তা’র দূতী-
স্বরূপ প্রমাণ সহ কৌশলে আমার গােচর করে !
এব্রা । কি ভয়ানক! তার পর ?
সলি। আমি পাপিষ্ঠের এই কৌশল-জাল ভেদ ক’রুতে
না পেরে সত্য বিশ্বাসে ক্রোধান্ধ হয়ে রাবেয়া ও মােহসীকে
উপযুক্ত শাস্তি দেবার জন্য নসেরকে অনুমতি করি । তারই
ফলে সেই পাষণ্ড আসগর ভারপ্রাপ্ত হয়ে ভগবানের আদর্শ
সৃষ্টি নির্মল কুসুম-স্বরূপা রাবেয়ার রক্তপান করেছে।
নিষ্কাম প্রার্থনার স্বরলহরী তােমায় মুগ্ধ ক’ছিল, তা সেই
অভাগিনীরই কণ্ঠস্বর ।
এব্রা। মােহসীনের প্রতিহিংসার জন্য রাবেয়ার রক্তপান
যে
কেন?
৫ম দৃশ্য ]
রাবেয়া ।
১৫১
সলি। ঠিক জানি না, তবে শুনলুম তার বিশ্বাস ছিল
রাবেয়া মােহসীনের প্রণয়িনী, সত্য মিথ্যা ভগবান জানেন।
মােহসী আমার ক্রীতদাস নয়, সাধারণ ভৃত্য মাত্র। তবে তার
চরিত্রে, তা’র অবয়বে, তাকে একজন ভদ্রবংশজাত পবিত্ৰ-চেতা
যুবক বলেই বােধ হত ।
এব্রা । তবে আজ এক আশ্চর্য রহস্য তােমায় বলি শােন।
মােহসী সত্যই উচ্চবংশীয় ধনাঢ্য ভদ্র-সন্তান। সে রাবেয়াকে
অত্যন্ত ভালবাসত। উভয়ের বাস একই স্থানে। দৈব-দুর্ঘটনায়
রাবেয়া বেদুইন্ দস্যু কর্তৃক লুষ্ঠিত হয়। মােহসী তা’র অনু-
সন্ধানে বসােৱা এসে জানতে পারে, তুমি তারে ক্রয় করেছ।
মূল্য দিলেও তুমি বাদী বিক্রয় করূবে না, তা সে বুঝেছিল।
তাই, যদি কোন উপায়ে তােমাকে সন্তুষ্ট করে রাবেয়ার
মুক্তি সাধন ক’ঝতে পারে, সেই ইচ্ছায় ছদ্মবেশে সে তােমার
পরিচর্যায় ব্রতী হয়েছিল।
সলি। তুমি এত কথা কি করে জানলে ?
এব্রা। আবদুল মােহসীনের পরম বন্ধু। তার কাছেই সমস্ত
শুনেছি।
ও হো, আবদুল এ দিকে প্রায়ই এখানে আসত
বটে, তা তুমি বা আদুল এ কথা ত আমায় কিছুমাত্র বল
সলি ।
নাই ?
এব্রা। সময় এবং সুযােগের অপেক্ষায় ছিলুম।
সলি। কি করেছ ভাই! কেন এ কথা পূৰ্ব্বে বল নাই,
তা হলে ত আজ আমি এ মহাপাপে কলঙ্কিত হতুম না।
তােমার কথা ত আমি কখন অবহেলা করি নাই। তুমি বললে
রাবেয়া। ( ৪র্থ অঙ্ক অবশ্যই রাবেয়াকে মুক্তি দিতাম ! হায় হায়, অদৃষ্ট-বৈগুণ্যে তুমিও আমায় পর ভেবেছিলে ? এব্রা। অত অধীর হয়াে না। কৰ্ম্মের গতি কে রােধ ক’তে পারে ? যাক্, এখন মােহসী কোথা, তার পরিণাম কি হয়েছে ? সলি। জানি না কি কারণে, এই ভয়ানক ঘটনার পূর্ব- ক্ষণেই সে গােপনে আমার গৃহ পরিত্যাগ করে চলে গেছে। আপাততঃ সে নিরুদ্দেশ। নে, রাবেয়া। ‘নিঙ্গাড়ি হৃদি মম রুধির-ধারা ঢালি, এই তাপিত মরুভূমে যদি বা হে! শীতল হয়ে থাকে তপ্ত পদ কার(ও) তবে করেছ ধন্য তুমি আমারে হে! সলি। হায় হায়, মুখ আমি, আমার কি প্রায়শ্চিত্ত আছে ? এব্রা । চুপ, শােন ! নে, রাবেয়া । তীব্র ব্যথা মম ঢাকিয়া নিজবুকে, যেন তৃপ্ত করিতে পারি জগত হে! আগ্নেয়গিরির স্নিগ্ধ লতা তৃণে সাজি’ নহে কি শ্যামল সুন্দর হে ? সলি। এব্রাহিম, এব্রাহিম! মদ খেয়ে বিলাসে জীবন কাটিয়েছি, কই তা’তে শান্তি কোথা? এ কি মহাশান্তির স্নিগ্ধ আলােকে আমার মানস-নয়ন পরিতৃপ্ত হচ্ছে ? হায়, হতভাগ্য । আমি! তাই এ অমৃত নিষেকেও আমার অনুতাপ-লাঞ্ছিত যাতনা- ৫ম দৃশ্য ) রাবেয়া। সমাচ্ছন্ন হৃদয় সিক্ত হচ্ছে না। ভাই, ভাই!' এমন কি কোন উপায় নেই, যাতে রাবেয়াকে পৃথিবীতে ধরে রাখতে পারি ? আমার এভীষণ মানসিক যন্ত্রণার কিঞ্চিৎ উপশমের কারণ হয় ? এব্রা । চেষ্টা করেছ ? সলি। কিছুই না। কোন লজ্জায় আমি তার কাছে মুখ দেখা’ব ? কেমন করে স্বকৃত অস্ত্রাঘাতের ক্ষতমুখে প্রলেপ দিতে চাইব ? এব্রা। এতক্ষণে বুঝলুম, তুমি সত্যই মূখ! যতক্ষণ জীবন- ততক্ষণ আশা। যথাসাধ্য চেষ্টা কর, তারপর ভবিতব্য ভগবানের ইচ্ছা। অনুতাপের জন্য সমস্ত জীবন সময় পাবে। সলি। না না, তা আমি পারব না ! ভাই, বন্ধু! তুমি যাও, আমার অতুলিত অর্থের ভাণ্ডার মুক্ত কর, চিকিৎসক আন! যদি মানবের সাধ্য থাকে, তবে তাকে রক্ষা কর! বন্ধুর কাৰ্য কর ! না না, তার কাছে আমি যেতে পারব না, সে নিরপরাধ নয়নের নৰ্বাক্ করুণ ভৎসনা আমার সহ্য হবে না। নে, রাবেয়া। ‘সারাটা রজনী সখার ভবন বাহিরে দাড়ায়ে কে তুমি হে! রুদ্ধ দুয়ারে অবশ পরাণে জাগিলে কেবলি বিফলে হে! নাহি কেন ধারা আঁখিতে তােমার, পাপানলে হিয়া পুড়িল যে । ছাই হ’ল প্রাণ তবু না বহিল, প্রেম-বারি তব নয়নে হে!
১৫৪ রাবেয়া। [ ৪র্থ অঙ্ক উৎস প্রেমের, ওরে ও তৃষিত, ওরে ও ভিখারী, ধূলি-মাঝে কেন পড়িয়া রে ? আয় আয় ভাই হৃদয়ে আমার, তাপ সনে তৃষা মিটাবি রে ! নয়নে বহিবে কাদিয়া দেখিবি কি সুখ রে । শান্তি মিলিবে, এ শীতল বুকে- আয় আয় দুখী কাদিতে রে ! সলি। না না, আমি যাব—তা’র কাছে ক্ষমা চাইব। অমৃত-তরু সকলকেই সমভাবে ফল বিলিয়ে থাকে, কে তাকে বারি সেচন করে—আর কে তার শাখা ছেদন করে, তা বিচার করে না। এব্রাহিম, এস ভাই ! ওই শােন, কি মধুর দুর বাঁশরীর স্বরে কোন মহীয়সী দেবী আমাদের মহলোকের পথ- প্রদর্শন করে আহ্বান ক’ছে। এস, এস, যাবে এস ! হে সংসারী, হে অগণ্য-দুঃখ-বেষ্টিত নরদেহধারী যাতনার প্রতিমূর্তি পৃথিবীর হতভাগ্য অভিশপ্ত জীব ! এস, এস, চলে এস ! পেছনে চেও না, ছায়াবাজীতে ভুল না, বিবেচনার সময় নিও না, এস- এই প্রেম-সাগরে অবগাহন করে পাপের মলিনতা দুর করূবে এস! তার পর সাধ হয় ফিরে যেও, তখন কষিত কাঞ্চন তুমি- সংসারের উত্তাপে তােমায় মলিন ক’রূতে পাবে না । প্রস্থান। এব্রা। যত আকাঙ্ক্ষা-তত অতৃপ্তি, যত মায়া-তত শােক, সংসারের নিয়মই এই। দেখতে হ’ল । প্রস্থান।
৫ম দৃশ্য ] রাবেয়া। ১৫৫ আংশিক দৃশ্য। (পূৰ্বানুবর্তী ) রাবেয়ার কক্ষ। . অৰ্ধশায়িতাবস্থায় যুক্ত করে রাবেয়া, পার্শ্বে আদা ও আমীন। সলিমা ও এব্রাহিমের প্রবেশ, আমীনার প্রস্থান। সলি। রাবেয়া ! বুঝতে পেরেছি তুমি স্বর্গীয় অমৃত-নিঝর ; শান্তি-নিষেক জন্য এ দগ্ধ ধরাধামে এসেছিলে ! মুখ আমি- অকালে তােমায় ফিরিয়ে দিলাম। হায়, আমি মহাপাপী, তােমার উপর অমানুষিক অত্যাচার করেছি। আমারই ইঙ্গিতে আজ তােমার এ দুর্দশা । আমার কি প্রায়শ্চিত্ত আছে ? কি হলে প্রাণে শান্তি আসবে, কেমন করে তােমার ক্ষমালাভ ক’রূব ?–দাও আমায় উপায় বলে দাও । রাবেয়া। “জগদীশ, তােমায় শত ধন্যবাদ ! হে আমার আশ্রয়দাতা পার্থিব প্রভু, আপনাকেও শত ধন্যবাদ ! আপনার নিকট যে আশ্রয় ও সুখ পেয়েছি তার জন্য ধন্যবাদ—আবার আপনা হতে যে দুঃখ পেয়েছি তার জন্য আরও ধন্যবাদ।” আপনার অত্যাচার-অত্যাচার নয়, আমার প্রিয়তমকে প্রকৃষ্ট রূপে জান্বার—তাঁর সান্নিধ্যলাভের উপায় মাত্র। দুঃখ ক’বেন না,পিতা সন্তানের মঙ্গলকামনায় যে তাড়না করেন- আপনার তাড়নাও আমাতে সেই ফল প্রদান করেছে। এব্রা। হা ভগবন্! যে তােমার এত আপন তারেও এমন কষ্ট দিতে হয় ? রাবেয়া। “ছি, আমার দুঃখ কোথায়? আমি মহাসুখী রাবেয়া। [ ৪র্থ অঙ্ক নইলে তার নাম করে নিশ্বাস ফেলে হৃদয়ে শান্তি পাই কেন ? তার কাছে আর কি সুখ চাইব, তারে ডেকেই যে অনন্ত সুখ পাই।” সলি। এব্রাহিম! আমার সমস্ত বাসনা অবসাদগ্রস্ত হয়ে আছে । যেন কি এক বিতৃষ্ণা—হৃদয়ের অন্তস্তল হ’তে রাশি রাশি ধিক্কার সহ উঠে আমায় আচ্ছন্ন করে ফেলছে। একটা শেষ কৰ্ত্তব্য আছে, তুমি অনুগ্রহ ক’রূলে সম্পন্ন হতে পারে । একবার মােহসীকে খুঁজে আন, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। এব্রা। ভাল, আমি যাচ্ছি । কিন্তু তুমি নিশ্চিন্ত থেক না, হকিম ডাকতে পাঠাও ; সাধ্যমত কর্তব্যের ত্রুটী না হয়। সলি। যা করতে হয়, নসেরকে উপদেশ দিয়ে যাও। ভগবন্! কোন অপরাধে আমায় এ যন্ত্রণা-রাশি বহন ক’বৃতে দিলে ? এব্রাহিমের প্রস্থান। রাবেয়া । স্তব-গীতি। ‘বহিছে দুখধারা কেন গো প্রভু তৰ স্নেহ-বিধৌত স্নিগ্ধ জগতে হে! কেন এ গঞ্জনা তােমার ও সৎনামে বৃথা উঠিতে দাও সদা দয়াল হে! সাগর বুকে যথা মিশিছে নদী যত আন তেমতি সব দুথ আমাতে হে! অধম হয়ে আমি তােমারি নাম গুণে হাসি সহিব ধরা-ভার অনা’সে হে। - পঞ্চম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। আবদুলের গৃহ-কক্ষ। কালরাত্রি। সােফিয়া ও আহসান্ উপবিষ্ট। সােফি। আপনি কি আমায় ভালবাসেন? আহ। তা-তাবাসি না ? সােফি। সত্য বলছেন ? আহ। সত্যই সােফি। যদি ভালবাসেন, তবে আমায় আপনার করুন না কেন ? আহ,। তা—সে ত ভাবছি, কিন্তু হয় কি করে ? সােফি। তবে শুনুন ! আমি আবদুলের ঘর আর কিছুতেই ক’ব না। যে করেই হ’ক, তার কাছে তালা নােব। তার পর কি আপনায় আমায় সম্বন্ধ হওয়া অসম্ভব ? যদি বলেন- বাপ আছে ? ভেবে দেখুন, আপনি তার একমাত্র ছেলে, যদি কোন অন্যায় করে বসেন, তবে অবশ্যই তিনি আপনাকে একেবারে পরিত্যাগ করূতে পাবেন না। আহ,। হাঁ, তা বটে। কিন্তু সােফি। না, কিন্তু কিছু নেই। আমার জন্য কি আপনি তার সামান্য অসন্তুষ্টিও সহ ক’তে প্রস্তুত নন ? ক
১৫৮
রাবেয়া।
[ ৫ম অঙ্ক
আহ। তা—তা—সামান্য কেন যথেষ্ট সহ্য ক’রুতে প্রস্তুত
আছি ।
সােফি। (কোরান হস্তে লইয়া) তবে এই কোরান ছুঁয়ে
শপথ করুন !
আহ,। কোরান !
সােফি। হাঁ, এই কোরান ছুয়ে ব’তে হবে যে আবদুল
আমায় পরিত্যাগ করূলে আপনি ধৰ্ম্মতঃ আমায় গ্রহণ করূবেন!
বলুন! নইলে এই মুহূৰ্ত্ত হ’তেই চিরদিনের জন্য আপনায় আমায়
সাক্ষাৎ বন্ধ হবে। আশা যদি অসম্ভব হয়, তবে তাকে আর
অন্যায়রূপে প্রশ্রয় দেওয়া কেন ? বলুন!-নইলে এই শেষ!
আহ,। না না, বলছি ! আপনি রাগ ক’রূবেন না ।
(কোরান স্পর্শ করিয়া) আবদুল আপনাকে পরিত্যাগ করূলে
আমি নিশ্চয়ই গ্রহণ ক’ব !
সােফি। (হস্ত ধারণ করিয়া) ইয়া আল্লা ! আমার বুকের
পাথর নেবে গেল।
গবাক্ষ-পার্শ্বে অলক্ষ্যে আবদুলের প্রবেশ।
আব। (স্বগত) এ কি ! কে ও ?
আহ,। তা হলে বলুন, সত্যই আপনি আমার হবেন ?
সােফি। প্রতিজ্ঞার মুহূর্ত হতে আমি আপনার হয়েছি।
( আহসানের হস্ত চুম্বন )
আব,। (স্বগত) খােদা ! এ আমায় কি দেখালে ? ওহো-
অসহ!
প্রস্থান।
} ১ম দৃশ্য। রাবেয়া। সােফি। এখন যে কিছু বাধা আছে শীঘ্রই দুর করব। বলুন আমায় ভালবাসেন, বলুন আমায় ভুলবেন না? আহ,। তাকি ভুলতে পারি ? গবাক্ষ-পার্শ্বে এব্রাহিমের প্রবেশ। এব্রা। (স্বগত) এই যে আহসান্ ! কি সৰ্ব্বনাশ, যা সন্দেহ করেছিলুম, তাই! ভাগ্যে বান্দাকে পেছনে রেখেছিলুম! প্রস্থান। আহ,। (ইতস্ততঃ করিয়া সােফিয়ার হস্ত চুম্বন ) ছােরা হস্তে বেগে আবদুলের প্রবেশ। আব। (সােফিয়াকে পদাঘাত ও আহসানের গ্রীব। ধারণ।) আহ,। কি কি—ভা- তা- আব,। পিশাচী, এতদূর ! অগ্রে তার জীবন-সৰ্বম্বের জীবন গ্রহণ করি, তারপর তাের প্রায়শ্চিত্ত ! খােদা! নরহত্যার অপরাধ মার্জনা কর। (অস্ত্রোত্তোলন ) আহ। আল্লা, একি হল ? আব। ( সচকিতে আহসানকে পরিত্যাগ করিয়া) কে কে তুই ? আহ-আহ সা!—তুমি ! খােদা, এ কি ক’রূলে ? আমার জীবনের সমস্ত বন্ধন এক আঘাতে ছিন্ন কলে! আহ- সা, তুমি এব্রাহিম সাহেবের সন্তান! তুমি অবধ্য ! তােমার পদে কুশাঙ্কুর বিদ্ধ হবার চেয়ে—এই বক্ষে বজ্রাঘাত আমার চির-বাঞ্ছনীয়। সে বাঞ্ছা আজ পূর্ণ হ’ক। কিন্তু সাবধান, আত্ম- রক্ষা ক’র ! পিশাচীর কুহকে তুমি মুগ্ধ।
১৬০ রাবেয়া । [ ৫ম অঙ্ক এব্রাহিমের প্রবেশ। এব্রা। আবদুল, আবদুল ! ও আমার পুত্র নয়, ও পিশাচ। আমার অনুমতি, তুমি ওকে হত্যা কর ! আব,। হত্যা ক’ব ! তুচ্ছ স্ত্রীলােকের জন্য ক্ষুদ্র আমিত্বের সংস্কার-মােহে—আমার ইহলােকের পরমােপকারী—আমার মনুষ্যত্বদাতা—আমার ধনজনবিদ্যা-গৌরবের মূলীভুত কারণ, পরম পিতা পরমেশ্বরের ন্যায় স্নেহশীল আমার ধৰ্ম্ম-পিতা;--তার অগণ্য মহদুপকারের প্রত্যুপকার স্বরূপ তারই স্নেহ-কোমল-হৃদয়ে পুত্র- শােকের আগুন জ্বেলে দেব !-ভ্রাতৃহত্যা কব! আহ, আবদুল ! আবদুল ! ভাই সাহেব, আমায় হত্যা কর! আব। তােমায় ক্ষমা করলুম! বেগে প্রস্থান। এব্রা। সেই ভাল, আজীবন অনুতাপানলে দগ্ধ হও! আবদুল-আবদুল ! প্রস্থান। আহ,। খােদা!-খােদা!—এ আমি কি করলুম ? প্রস্থান। ইউসুফের প্রবেশ। বাবা, ঝড় বয়ে গেল। কিন্ডাগ্যি ছোড়া সময় মত চেঁচিয়েছিল, নইলে ত এতক্ষণ রক্ত-নদী বইত। (সসাফিয়ার প্রতি) চ’—চ’ পালাই চ’! হা করে বসে ভাবছিস কি ? ওরে ছেড়েছে বলে কি আর তােকেও ছাড়বে? চল দেশে চল,
১ম দৃশ্য ]
রাবেয়া।
সেখানে টের নিকে জোটান যাবে। বাবা, এমন বেতালা
গোঁয়ার !
সােফি। এত রাত্রে কি করে যাব গো ?
ইউ। ওরে,
সকাল হ'লে কি আর তােকে রাখবে ?
ঝোঁকের মাথায় বেরিয়ে গেছে, ফিরে এসেই সর্বনাশ করবে।
বাঁচতে চাস ত এই বেলা পালাবি চল। আমি ত আর দাঁড়াচ্ছি
নি, অন্ততঃ সহরের মধ্যে ত নয়ই।
সােফি। শুধু হাতে যেতে হবে যে ?
ইউ। প্রাণ বাঁচলে সেই ঢের! আর শুধু হাতেই বা যাবি
কেন? বাড়ী থেকে যে চারূটে উট এনেছি, যত পারি তাতেই
চাপিয়ে নােববা চল!
সােফি। চাকর দুটো যদি বাধা দেয় ?
ইউ। আরে সে বেটারা হাঙ্গাম দেখেই পালিয়েছে।
নেহাত এসে পড়ে, হাতে কিছু দিলেই হবে এখন। মােন্দা,
কথা রেখে শিগগীর কাজ দেখ; নইলে সাজতে গুজতেই আসর
ভাঙ্গবে।
সােফি। কি কি নােব ?
ইউ। রাবিশ ছেড়ে সােণা দানা গুছো। তারপর জায়গা
থাকে, বুঝে শুঝে নেওয়া যাবে। চল্ চল্ আর দেরী করিস নি ।
সােফি। তবে ওই ঘরে চল, আগে গহনা গুলো বাঁধি।
ইউ। চল্ চল্ ! (স্বগত) খােদার মজি, বরাত-বরাত!
উভয়ের প্রস্থান।
রাবেয়া।
[ মে অঙ্ক
দৃশ্য।
দ্বিতীয়
প্রান্তর-পথে নদীতীরস্থ বৃক্ষতল।
কাল-পূৰ্বাদু।
মােহসীনের প্রবেশ।
মােহ। “প্রথমে তােমার এত অনুগ্রহ, এত করুণা কেন ?
এত আদর, এত সােহগে আমায় পােষণ কেন ? আবার এখন
এত দুঃখদানের চেষ্টাই বা কেন ? এই বা কেন—সেই বা
কেন? দুর হক, অনুশােচনায় লাভ কি ? শুধু নিজের বুকের
রক্তপাত, তা যদি আজীবনও কর—অদৃষ্টের এক তিলও পরিবর্তন
হবে না। তার চেয়ে, কাল এসে তােমার শােণিত পাত
কবার পূর্বে সুরায়ের শশাণিত তুমি পেয়ালায় ঢাল ; আর
পার যদি, নেশার ঘােরে কল্পনায় প্রিয়ার কুন্তলে আঙ্গুল লতিয়ে
দেওয়ার সুখানুভব কর!—সেই ভাল !” (বৃক্ষমূলে উপবেশন )
দরবেশগণের প্রবেশ।
দরবেশগণ ।
গীত।
নাখ, দীন-পতিত ত্রাতা,
দয়ার সাগর তুমি,
কেমনে করিব প্রেম গান ?
অনন্ত মহিমা-জ্যোতিঃ,
• উজলি’ ভুবনে তব,
প্রচারিছে তুমি কি মহান্ !
অধম মানৰ মােরা,
তােমারি জ্যোতির কণা,
এ দেহেতে তুমি প্রাণায়াম!
. :
২য় দৃশ্য ] রাবেয়া। তােমাতে উখিত অণু তােমাতে বিলয় চাহে, তাই তােমা খুজি গুণধাম! সসীম জ্ঞানের বলে, অসীম তােমারে চাহি, ভরসা তােমারি সুধা-নাম। জনম অবধি যদি, প্রেমছায়া বিছায়েছ, মরণেও নিও প্রেমধাম । মােহন মায়ার রাশি, তুমিই সৃজেছ নাথ, লুবধ হৃদয়(ও) তব দান! যদিও তাহারি সনে, প্রজ্ঞা দিয়েছ প্রভাে, মূঢ়তাও তবনহে আন। শিশুর সমক্ষে যদি, জননী গরল ধরে, হাসে শিশু তাহে করি পান, অবােধ নহেক দোষী, তাই এ হৃদয়ে আশা- অন্তে অধম(ও) পাবে ত্রাণ । প্রস্থান। মােহ। গাচ্ছ-গাও! থােকা দিও না! তুমি গেয়ে সুখী, আমি শুনে সুখী। তার মাঝেও তুমি ভাবে মুগ্ধ—আমি সুরে মুগ্ধ। তােমার সুখ তােমাতে ; আমার সুখ আমাতে। তুমি আমি কি এক? মায়াবাদ ?—তা ছেড়ে দাও, সে খুব বড় কথা ! আমরা যেমন ছােট তেনি ছােট চখে দেখতে দাও! দেখৰে তুমি-তুমি! আমি—আমি! তােমার মত তুমি থাক, আমার মত আমায় থাকতে দাও—উপদ্রব ক’র না! ব’বে ভুল ক’ছি ? আরে পাগল ! যখন কি সত্য তারই মূল নেই—তখন ভুল কি ? স্বর্গ-নরক? ভাবছ বিষম সমস্যা।
১৬৪
রাবেয়া !
[ ৫ম অঙ্ক
সেটা তােমার কাছে, আমার তা নয় ; “স্বর্গ—আমার সুখের
সময়ের একটা মুহূর্ত, নরক-তোমার বৃথা হা হুতাশের একটী
স্ফুলিঙ্গ। আমি নগদাটাকে চেপে ধরেছি, তুমি পা ওনার
আশায় বসে আছ।” সে আঁধারে হাতড়ান !-খানায়ও
পড়তে পার, মাণিকও পেতে পার । তবে তােমার সে অন্ধকার
পথে কেন যাব ? তার চেয়ে প্রিয়তমার ধ্যান করি ;-সুখটা
অনুভব বই ত আর কিছু নয়।
আবদুলের প্রবেশ।
আব,। বাঃ রে জগৎ! বাঃ রে সংসার ! বাঃ রে মেয়ে
মানুষ তাের জীবন। লােকে বলে সয়তানরূপী সর্পের হৃদয় নাই ।
মিছে কথাকে বলে তাদের হৃদয় নাই ? দলিত না করলে ত
তারা দংশন করে না !
ধন, ঐশ্বৰ্য, যৌবন সমস্ত সমর্পণ করে
আমি যে অনন্যচিত্তে তার সেবা ক’ছিলুম,—কি অপরাধে
সে আমায় দংশন ক’বৃলে ? কে বলে সয়তান সর্প ?—সয়তান
মেয়েমানুষ ! কে বলে মিছে কথা ? সংসারে যত রকম মহাপাপ
হয়ে থাকে তার একমাত্র মূলীভূত কারণ স্ত্রীলােক ! লােকে
কামিনীকাঞ্চনে তুলনা করে, ভুল-ভুল ! কামিনীর নিকট
কাঞ্চন ধূলিমুষ্টি! জগতে কতবার এক কামিনীর জন্য অসংখ্য
কাঞ্চন-মন্দির ধূলিরাশিতে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে সকলের
চেয়ে আহাম্মক কে ?—যে এই কথা গুলােকে ঔপন্যাসিকের
কল্পনা বলে মনে করে। অন্ধ কে ?—যে স্ত্রী-জাতিকে বিশ্বাস,
করে। হতভাগ্য কে ?—যে স্ত্রীলােকের উপর নির্ভর করে। যাক,
আপদ গেছে। যা ছিলাম তাই ! সেই—সেই আমি ভবঘুরে' ;
২য় দৃশ্য।
রাবেয়া।
AA
আব্দুল্লা! মাঝের ও মীর মােহাম্মদ আব্দুল জববারও একটা
স্বপ্নের খেয়াল, হঠাৎ বাদসাহা মত! কিছু না কিছু না।
বাহবা বাহবা সংসার! মানুষ স্ত্রীপুরুষে মিলে তবে সংসারী !
মিল-মিলন, প্রেম-প্রণয়, প্রীতি-ভালবাসা, কথার লহর
বাক্যের ছটা,-কল্পনার ঘটা! হাঃহাঃহাঃ!-
মােহ। কে, কেও—আবদুল ?
আব। আমি আবদুল—আবদুল্লা! মীর মােহাম্মদ আবদুল
জব্বার নই—ভবঘুরে আবদুল্লা ! কে তুমি বন্ধু ?
মােহ। তুমি কি উন্মাদ হয়েছ ?
আব। আমি মানব-চরিত্রের নিগুঢ় মূর্তি
মূর্তি দেখেছি,
সংসারের কথার আবরণ ভেদ করেছি। তাই আমি মুগ্ধের
নয়নে আজ উন্মাদ! কে ও মােহসী ? ভাই! তুমি পুরুষ !
তােমার বন্ধুত্বে অবিশ্বাস করবার আর আমার কারণ নেই।
সে কারণ হ’তে আমি মুক্তি পেয়েছি! (দৌড়াইয়া গিয়া
আলিঙ্গন) ভাই!বন্ধু !-আমার প্রাণ শীতল হ’ল ।
মােহ। তােমার এ দশা কেন ?
আব! কেন ?--শুনবে কেন ? শােন-শােন! সে
কথা নূতন নয়! সে ঘটনা সংসারে অহরহ সৰ্ব্বস্থানে ঘটছে!
কিন্তু কেউ বলে না—ব’তে পারে না, ওইটুকুই ওর মজা। হয়
ত কেউ জানে না, খোঁজে না-দেখে না—ববাঝে না। আমি
জেনেছি, আমার চোখ খুলেছে, বাঁধন ছিড়েছে!—কিন্তু লােভ
যায় নি। এখনও সাধ আছে—এখনও সাধ আছে! এ সাধ
কেন থাকে? কেন থাকে—জানি না! হায়, হায় ! আমার
বাঁধন ছিড়েছে, তবু সাধ আছে ! শুনবে ?-শােন, শােন !
৬৬
রাবেয়া।
[ ৫ম অঙ্ক
গীত।
( আমার প্রাণের বাঁধন ছুটে গেছে,
বাধা কি আর পড়বে না ?
সাধের নেশা কেটে গেছে,
( ফিরে) খোয়াড়ি কি আসবে না ?
আছি সদাই বিভাের হয়ে,
কি জানি কি বেদন পেয়ে,
না, জানি জানি জানি সে যে
পাগল হলেও ঘুচবে না।
ছিলাম ঘুমে আপন-হারা,
নিঠুরা তায় আলি সাড়া,
(কেন) সুখের স্বপন ভেঙ্গে দিলি,
(আহা) ফিরে কি ঘুম আসবে না ?
এব্রাহিমের প্রবেশ।
এব্রা। এই যে, এই যে আবদুল ! বাবা ! বাবা! ঘরে
চল ! আমার ঘরে চল ! তােমার সরল প্রাণের অন্ধকার আমি
ঘুচিয়ে দেব!—আবার আলাে আসবে।
আব। ঘরে ?-আপনার ঘরে যাব ? আপনার অনুরােধ ?
কিন্তু আহসান্ তা'তে জীবন্ত হবে, সে আমায় কখনই মুখ
দেখাতে পাবে না।
এব্রা। বাবা! আমার অনুরােধ রক্ষা কর। জীবনের এই
প্রথম হয় ত এই শেষ অনুরােধ রক্ষা কর । কিছু ভেব না, সমস্ত
*।
৩য় দৃশ্য।
রাবেয়া।
বাধা বিঘ্ন আমার মুখ চেয়ে, ভগবানের নাম স্মরণে উপেক্ষা কর ।
অবশ্যই শান্তি আসবে। ইনি কে?—মােহসী মিঞা ! ওহহ,
আপনাকেও আমি ছেড়ে যাব না। আমি সলিমানের নিকট
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বেরিয়েছিলুম, পথে এসে ভুলে গেছি ! দয়া
করে আমায় প্রতিজ্ঞা রক্ষা ক’তে দিন। আপনার জীবন-সর্বস্ব
রাবেয়ার জীবন-প্রদীপ নিৰ্ব্বাণােন্মুখ ! যদি শেষ দেখা দেখতে
চান, অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে আসুন! বৃদ্ধের অনুরােধ রক্ষা
করুন।
উভয়ের হস্ত-ধারণ করিয়া প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
রাবেয়ার কক্ষ।
কালউ।
রাবেয়া শায়িত।
আবদা, আমীন, সলিমা নসের, হকিম ও দাসদাসীবৃন্দ।
হকিম। আর বৃথা আশা, সময় হয়েছে।
সলি । নসের ! আমার পাপ পরিপূর্ণ হয়েছে, যে ক’দিন
বচি ভগবানের কাছে ক্ষমাভিক্ষায় কাটিয়ে দেব। আজ হতে
এ সংসার তােমার ! যদি এ দৃষ্টান্তেও জ্ঞানলাভ না করে থাক,
তবে আর বৃথা উপদেশ দিয়ে কি ক’ব ? ( দাস. দাসীদিগের
প্রতি) রাবেয়া নিজ জীবনের বিনিময়ে তােমাদের মুক্তির উপায়
করেছে, আজ হতে তােমরা স্বাধীন।
১৬৮
রাবেয়া।
৫ম অঙ্ক
দাস দাসীগণ। প্রভু-প্রভু !-
সলি। না না, ধন্যবাদ দিও না! নসের ! এদের উপযুক্ত
ধন দান কর, যাতে আর কখন দাস্তবৃত্তি ক’তে না হয়। মা
আমীন! তােমায় আর কি ব’? ভগবানের কাছে প্রার্থনা
করি, রাবেয়ার মধুময় হৃদয় তােমার জীবনের স্থায়ী আদর্শ হ’ক !
রাবেয়া । কি মধুর, কি সুন্দর ! এস প্রিয়তম, আমায়
কোলে নাও! (মৃত্যু)
হকিম। শেষ !
আবদা। সই! সই !– রাবেয়ার বক্ষে পতনােপক্রম )
সলি। ( বাধা দিয়া) কি কর, কেঁদ না! কার জন্য শােক
ক’ছ ? রাবেয়া এতদিন বিরহ-যন্ত্রণা ভােগ ক’ছিল, আজ
তার প্রিয়মিলন হল। বড় আনন্দের দিন, আনন্দ কর।
আবদা! তুমি স্বাধীন। তুমি রাবেয়ার শিষ্যা, তােমায় সন্তুষ্ট
ক’তে পারুলেও আমি কিছু শান্তি পাব। বল তুমি কি চাও?
আদা। প্রভু, আর কি অনুগ্রহ চাইব? যদি দয়া হয়,
অনুমতি করুন, জীবনের অবশিষ্ট দিন কয়টী সখীর সমাধি-
মন্দির মাৰ্জ্জুনে অতিবাহিত করি। সই আমার একা থাকবে, তা
আমার সবে না।
সলি। বুঝিছি, পরশমণির সংস্পর্শে সমস্তই রত্ন হয়। তাই
হ’ক! বন্ধুগণ! আর কেন, এস শেষ কৰ্ত্তব্য সম্পন্ন করি
একবার জীবনের শেষ—উপকারীর প্রত্যুপকার কর ! চল,
সমাধি-প্রাঙ্গণে এ পবিত্র দেহ পিশাচরূপী মানবের সংস্পর্শ
হ’তে লুকিয়ে রেখে আসি ।
৪র্থ দৃশ্য }
রাবেয়া।
১৬৪
চতুর্থ দৃশ্য।
রাজপথ।
অন্ধ আসগরের প্রবেশ
আস। (সুরে) ও আমার আল্লা বিনে,
ও আমার দয়াল বিনে,
সংসারেতে নাই যে কেহ!
জয় হক বাবা সকল, অন্ধের প্রতি দয়া কর ।
মােহসী ও আবদুল সহ এব্রাহিমের প্রবেশ।
এব্রা। কে হে, আসগর ? তুমি, তােমার এ দুর্দশা ?
আস্। জয় হক বাবা ! কে তুমি?
কে তুমি? পরিচয় না দিলে
চিনতে পাছি নি!
এব্রা । আমি এব্রাহিম! সত্যই কি তুমি অন্ধ ?
আস। (স্বগত) হা-তাের ভাল হক ! কি বরাত
করেছি বাবা! অন্ধ হয়েছি, তাও লােকে বিশ্বাস করে না।
এব্রা । চুপ করে রইলে যে?
আস। কি বলব! অন্ধ কি না, চোখে দেখেও বুঝতে
পাছেন না ?
এব্রা। এ দুর্ঘটনা কেমন করে হ’ল ?
আস। সবই ত জানেন, আবার জ্বালা কেন ? সেই নসে-
রের সঙ্গে বিবাদের ফল। চোখ দুটোয় এনি পুঁতে দিয়েছিল, যে
পেকে ফুলে গলে বেরুল। ভগবান্ আছে, সেই বিচার করূবে ।
এব্রা। এত দিনে বুঝি স্ত্রীলােক ছেড়ে, ভগবাকে মনে
পড়েছে ।
১৭০ রাবেয়া। [ ৫ম অঙ্ক আস। কেন বাবা, অপরাধটা কি ? লম্বা মাঠ পড়ে রয়েছে, দেখলে কোন্ বেটার না বাগান বাড়ী ক’তে ইচ্ছা হয় ? মুখে বললেই হ’ল পাগল ! চুড়ীর ঝুনে, সব ভায়ারই কাণ খাড়া হয়, কেউ আড়ে চায়—কেউ আগলে দাঁড়ায় । মূলে তফাৎ নেই। এব্রা। অতিবড় পাষণ্ড তুমি, নিস্পাপ রমণীরক্তে হস্ত কলুষিত করেছ, তার উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্তই হয়েছে। আদ। চটেন কেন, অদৃষ্টটা ত মানতে হবে ? বুঝুন্ না কেন, তার সময় ফুরিয়েছিল—তাই গেল, আমি উপলক্ষ মাত্র । এবা। সে কি, রাবেয়া নেই ? আস্। আছে, কবরের তলায়। মােহ। ভেঙ্গে গেলে সাধনার মানস-দর্পণ। কোথা ছায়া ?—কোথা রহে প্রতিবিম্ব তার ? প্রস্থান। আদ। মিঞা সাহেব, গেলেন নাকি? আমায় কিছু দিন, সমস্ত দিন খাই নি। এব্রা। 'হতভাগ্য! এতদূর পরিণাম ঘটেছে, তবু আত্ম- প্রবােধে তৃপ্ত আছ ? নাও, (অর্থ প্রদান) গিয়ে ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ কর ; আর যদি পার অনুতাপ কর, এখনও সময় আছে! নইলে ভগবানের কাছে কি কৈফিয়ৎ দেবে? আস্। “ওঃ তিনি আমায় ক্ষমা করবেন, ক্ষমা করাই তাঁর পেশা।” এব্রা। বিশ্বাস থাকলে মন্দ নয়। কিন্তু নরাধম তুমি, তােমার কি সে বিশ্বাস আসবে ? যাও পথ দেখ!
৪র্থ দৃশ্য ) রাবেয়া। ১৭১ আস। (ও আমার আল্লা বিনে ইত্যাদি) যা হয় কিছু দয়া হক বাবা সকল! অন্ধের প্রতি কৃপা কর। প্রস্থান। জনৈক বান্দার প্রবেশ। বান্দা। (কাদিয়া) এই যে, এই যে সাহেব! সাহেব, সাহেব! সর্বনাশ হয়েছে ! হায় হায় হায় হায় ! এব্রা। ( শশব্যস্তে) কি কি, কি হয়েছে ? বান্দা। ( কঁদিয়া) আহসান মিঞা নেই। তিনি আত্ম- হত্যা করেছেন! আব! ও হে!-শুধু আমার আমার জন্য সুখের সংসার পুড়ে গেল ! অভাগার নিশ্বাসে জগৎ দগ্ধ হয় ! খােদা ! খােদ৷!কি ক'লে ? অন্ধকার-অন্ধকার এনে আমায় ঢেকে ফেল! এ মুখ যেন জগতে আর কেউ না দেখতে পায়। বেগে প্রস্থান। এব্রা। (শােক-কম্পিত স্বরে) আহসান্! আহসান! বান্দা, গাের দিয়েছিস ? বান্দা। না ! এব্রা। চল।—সে পিতার যােগ্য সন্তান! আত্মসম্মান রক্ষা করেছে। আর তাকে আমার ধিক্কার দেবার অধিকার নেই। বান্দা!—বান্দা! চল, আমি তাকে দেখব, আমি তাকে আলিঙ্গন কব! উভয়ের প্রস্থান।
১৭২ রাবেয়া। [ ৫ম অঙ্ক পঞ্চম দৃশ্য। সমাধিস্থান। কাল-=সায়াহ। ক্ষুদ্র উদ্যান-মধ্যে প্রস্ফুটিত কামিনীবৃক্ষতলে রাবেয়ার সমাধি- স্তম্ভ। দুরে আব্দা দণ্ডায়মানা, মােহসী স্তম্ভগাত্রে কামিনী- ফুলের মালায় লিখিয়া দাড়াইলেন। আন্দা। কি লিখলেন ? মােহ। “আগ সন্ বাজ, বিনম্ রুহে জারে খো, তা কেয়ামৎ শােক গুজার কির্দিগারে খেশ্র।। অর্থাৎ যদি আমার প্রিয়তমার মুখকমল, আর একবার দেখতে পেতাম, তা হলে দয়াময় জগদীশ্বরকে জগতের শেষ দিন পৰ্যন্ত ধন্যবাদ দিতাম।” (প্রস্থানােদ্যোগ) আবদা। কোথা যান ? মােহ। “বুদ্ধি আমার যে অনুতাপ গড়ে তুলেছিল, প্রাণ- প্রিয়া তা ভেঙ্গে দিয়েছেন।” প্রস্থান। আব দা। (সমাধি-পার্শ্বে বসিয়া স্তম্ভগাত্রে মস্তক রাখিয়া ) গীত। মিছে মরম যাতনা ভুলিয়া, সাগর-সৈকতে এসএস হে ! অই বীচিকার মত ধীর লহরে, সুর-লহরী তুলিয়া হে! চরণ-রেখাগুলি আঁকিয়া বেলা-বুকে, মুক্ত পরাণে হাসিয়া, (রহ) জলধির সনে নীলিমার মত অনন্তে মিশিয়া ঘুমায়ে হে! যবনিকা পতন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.