Bally Sadharan Granthagar

Surja-sarathi Ed. 1st

Gangyopadhyay Narayan · 2009/09/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সূর্যসারথি
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
বেঙ্গল পাবলিশার্স
১৪, বঙ্কিম চাটুজ্যে ষ্ট্রীট, কলিকাতা

প্রথম সংস্করণফা, ১৩৫৩
প্রকাশক-শচীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
বেঙ্গল পাবলিশার্স
৫, বঙ্কিম চাটুজ্যে ধ্রুট
মুদ্রাকর-শশধর চক্রবর্তী
কালিকা প্রেস লিঃ
২৫, ডি, এল, বার ষ্ট্রট
কলিকাতা
প্রচ্ছদপট পরিকল্পনা
পাণ্ড বন্দ্যোপাধ্যায়
ব্লক ও প্রচ্ছদপট
মুদ্রণ
ভাত ফোটো-টাইপ ইডিও
বাইবেল বাইস

অগ্রণী কথাকার
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
অগ্রজপ্রতিমেষু

এই লেখকের অন্যান্য বই :
উপনিবেশ (তিন পর্ব )
তিমির তীর্থ
বীতংস
ভাঙা বন্দর
দুঃশাসন
মমুখর
স্বর্ণসীত
সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ
বনজ্যোৎস্না

এক । বাড়ীটা নিকুঞ্জ ঘােয় কিনেছিলেন যুদ্ধের হিড়িকে। সে একটা আশ্চর্য সময়। রেঙ্গুনে জাপানী বােমা পড়েছে। তার সৃপ্লিন্টার অবশ্য কালাপানি পেরিয়ে হুগলী নদীর তীর পর্যন্ত এসে পৌছােয়নি —কিন্তু দানবীয় একটা আতঙ্কের বিভীষিকা এসে নেমেছে নিষ্প্রদীপ কলকাতার ওপরে। প্রতিবেশী শহর রেঙ্গুন। আউটরাম ঘাট থেকে জাহাজে উঠলে চোখ বুজে সেখানে গিয়ে পৌছুনাে চলে। সেখান থেকে খােলা আকাশ বেয়ে বােমাহরের কলকাতায় আসতে আর কতক্ষণ? গড্ডলিকা প্রবাহের পেছনে তাড়া করলে নেকড়ে বাঘ। হাওড়ায় শেয়ালদায় মানুষের উন্মত্ততা। ব্যবসা, চাকরী, দেশসেবা, সাহিত্য আপাতত একটি মাত্র জৈবিক তাগিদে রূপায়িত হয়েছে। যা পলায়তি। নিত্য নতুন গুজবের হিড়িক, পাড়ায় পাড়ায় রয়টারের নিজস্ব সংবাদদাতাদের যুদ্ধ সংবাদ পরিবেশন। ১৯৪৬ সালের অবিশ্বাস্য জনসমুদ্র এই কলকাতা, সেদিন যেন মজা নদীর চড়া। ছত্রিশ ফ্ল্যাটের শূন্য বাড়ীতে দু’ঘর নিরুপায় ভাড়াটে অসহায় ভয়ে থরহরি কম্পমান। মেদিনীপুরের ঝি মেদিনীপুরে পলাতকা ; উৎকলের ঠাকুর পুরী প্যাসেঞ্জারে ওঠবার জন্যে হাইকোর্ট থেকে হাওড়া পর্যন্ত কিউ করেছে। আজমীরের আগরওয়ালা আর বােম্বাইয়ের বাটলিওয়ালা ফাস্ট ক্লাশ কাউন্টারের সামনে মল্লযুদ্ধ করছে। বি এ আরের কেরানীরা পিতামহ থেকে পৌত্র পর্যন্ত পরিবৃত বিরাট সংসারের হাঁড়ি কলসী সিঙ্গার মেসিন নিয়ে স্টেশনের কল্পনাতীত ভিড়ে অনন্ত প্রতীক্ষায় সমাসীন। ছাপরা মজঃফরপুর শাহেরিয়া সায়াইয়ের কুলি কামিন, রিকশওয়ালা আর গােয়ালার দল গঙ্গা পেরিয়ে (সুৰ্য) গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রােড ধরেছে—ককেশাসের পাদমূল থেকে আদিমন্ত্রী আর্য পূর্বসূরিদের মতাে। হােটেল তালাবন্ধচায়ের দোকান সাহারা মরুভূমির মতাে নীরস আর নির্জন। বারাে আনা সেরের মাছ বাজারে চার আনা নেমেছে—কেনবার লােক নেই। টাকায় বত্রিশটা দরের ফুলকপি পচে স্তুপাকার হয়ে আছে। চীপ মীড ডের প্রায় শূন্য ট্রাম গাড়ি বিষ শীতের রৌদ্রে নিষ্প্রাণ পথের ওপর দিয়ে টনটন করে ঘন্টা বাজিয়ে চলে যায়। দূর নিঃশব্দ গলির মধ্যে ওই শব্দটা যেন একটা অশুভ ইঙ্গিত বহন করে আনে। শুধু ছায়াচিত্রের প্রেক্ষাগারগুলাে দিনান্তে এখনাে কিছু পরিমাণে জনসঙ্কুল হয়ে উঠে। প্রতি মুহূর্তের দুঃস্বপ্নকে মানুষ এখানে ভুলে থাকতে চায় অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে, সস্তা হাসিতে, সুলভ কান্নায়। কিন্তু সেখানেই কি নিষ্কৃতি আছে? রূপালী পটের ওপরে প্রথমেই সেই স্বপ্নকে সজাগ করে দিয়ে আলাের লেখন ফুটে ওঠে : যদি সাইরেন বাজে, তাহা হইলে তারপরেই নিউজ রীল। আকাশে বােমার গর্জন, শি-ই-ই স্ক্রীমিং ৰােমার আর্তনাদ, তাসের ঘরের মতাে ধ্বসে পড়েছে অবিলেহী সৌধমালা। ট্যা টমিগান আর রাইফেল নিয়ে হেলমেট-পরা অগণিত অমানুষিক ছায়ামুতি বােমা বিধ্বস্ত প্রতীচ্যের রণাঙ্গন বেয়ে মার্চ করে চলেছে। পথে ঘাটে দেখা হলে একটি মাত্র প্রসঙ্গ। কী মশাই, পালাননি এখনাে ? পালাবে আর কোথায় বলুন? থাকতেই হবে এখানে। নিতান্তই তাহলে মরবার ইচ্ছে হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সম্বােধিত ব্যক্তিটি জোর করে সাহস সঞ্চয় করবার চেষ্টা করে। বলে, আরে মশাই, এত বড় কলকাতা। চারদিকে এত মিলিটারী টার্গেট। সে সব ছেড়ে কি এই পটলডাঙা স্ট্রীটে আমার ঘাড়েই বােমা এসে ছিটকে পড়বে? তা না হয় না পড়ল। কিন্তু কনসজীপশন হবে যে। -কনসীপশন?, সে আবার কী? —কসজীপশন বােঝেন না? বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে যােগদান করাবে। বেকায়দা দেখলে নিজেরা ঘটি বাটি তুলে চম্পট দেবে ইংলিশ চ্যানেল ডিঙিয়ে আর কলকাতাকে ডিক্লেয়ার করে যাবে ‘ওপন সিটি' বলে। তারপর কী হবে বলুন তাে ? অপরপক্ষ নীরব। তারপর এসে ঢুকবে জাপানীরা। আপনারা যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করেছেন, সবাইকে গড়ের মাঠে লাইন করে দাড় করিয়ে দিয়ে নিপ্পনী কায়দায় বেয়নেট প্র্যাকটিশ চালাবে। লােতার মুখের ভাব অবর্ণনীয়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে-হাঁটু কাঁপছে ঠকঠক করে। ক্ষীণ দুর্বল গলায় প্রশ্ন আসে । আর আপনি কী করেছেন? —আমি ? আমি আজ বাড়ির সবাইকে নিয়ে দেওঘরে পাড়ি দিচ্ছি। তিন শাে টাকা ঘুষ দিয়ে বার্থের ব্যবস্থা করা গেছে—আমার এক ভায়রাভাই আবার হাওড়া স্টেশনে কাজ করে কিনা। —কিন্তু চাকরী? চুলােয় যাক। প্রাণে বাঁচলে অমন চাকরী ঢের মিলবে মশায়। দেওঘরে থাকবার বন্দোবস্ত করেছেন বুঝি? না, এখনাে কিছু হয়নি। নইলে যেখানে জায়গা হয়গিরিডি, মধুপুর, কার্মাটার, শিমুলতলা। আর কিছুই যদি না পারি তত যে কোনাে একটা প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকব। বােমার ঘায়ে ইটো জগন্নাথ হয়ে থাকার চাইতে দিন কয়েক কৃচ্ছ সাধন ঢের ভালাে।

। বক্তা একটা সিগারেট বাড়িয়ে দেয় শ্রোতার দিকে। কিন্তু শ্রোতার মানসিক অবস্থা সিগারেট খাওয়ার মতাে নয়। শুকনাে গলায় শুধু জবাব দেয়, মনঃ, থ্যাঙ্কস! ঠিক এই সময়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ওপরে বাড়িখানা কিনেছিলেন নিকুঞ্জ ঘােষ। ঝকঝকে নতুন বাড়ি। চারতলা মিলিয়ে চব্বিশখানা ঘর, দুটো গ্যারেজ, গােটা আষ্টেক কল আর বাথরুম। পূর্ব দক্ষিণের পথে অবাধ আলাে বাতাস। নীচে বিস্তৃত উজ্জ্বল উত্তর কলকাতার সর্বশ্রেষ্ঠ রাজপথ। বাড়ির মালিক ছিল এক বুড়াে ভাটিয়া। সংসারে থাকবার মধ্যে তার একমাত্র ছেলে—মস্তবড় কারবারী করাচীতে। বুড়াে চনদাস কলকাতার ব্যবসা দেখা শােনা করত। হৈ চৈ হাঙ্গামার খবর পেয়ে ছেলে চিঠি লিখল : শুনছি কলকাতা নাকি বােমা পড়ে অধেক উড়ে গেছে। ওখানে আর মরবার জন্যে পড়ে আছ কেন? ঘর-বাড়ি-গদী যে দামে পাও ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে এসে এখানে। তােমার ছেলে কেশবদাস-চন্দনদাস বেঁচে থাকতে কোনাে ভাবনা নেই। চায়ের ব্যবসায় নিকুঞ্জ ঘােষের সঙ্গে চন্দনদাসের বিশ বছরের বন্ধুত্ব। সুতরাং বাঙলা দেশের বাড়ি বাঙালির হাতে তুলে দিয়েই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল চন্দনদাস। নামমাত্র দামে বাড়ি কেনা হল। কিন্তু কেনাই হল, কাজে আর লাগল না। নিকুঞ্জ ঘােষ ওসম্বন্ধে সব আশাই ছেড়ে দিয়ে- ছিলেন। তিনি নিশ্চিত জানতেন, বােমার মুখে ও বাড়ি গুড়িয়ে যাবে, দু’চার টুকরাে ইট পাথর ছাড়া ওর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। চলন- দাস কিন্তু ভরসা দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, ভাই, তুমি যে কতখানি জিতলে তা তুমি নিজেই জানাে না। যে গুজব আর হুজুগের হিড়িক আজ দেখতে ৪ পাচ্ছ, দুদিন বাদে তার কিছুই থাকবে না। আমি যে ভয় পেয়ে পালাচ্ছি তা নয়। তবে বয়স হয়ে গেছে, কলকাতার কারবার নিজে ভালাে করে দেখতে পারছি না—বেধড়ক চুরি বাটপাড়ি হচ্ছে। তা ছাড়া দেশের জঙ্গ বড় মন কাঁদছে—শেষ কটা দিন আরামেই কাটতে চাই। তাই দোন্ত তুমি, -বাড়িটা তােমাকে দিয়েই দিলাম একরকম। নিকুঞ্জ ঘােষ হেসে বলেছিলেন, দিয়েই যখন দিচ্ছ, তখন এ কয়টা টাকা আর হাতে করে নিচ্ছ কেন? চন্দনদাসও হেসেছিল-শানাদা বাঁধানাে দাঁতগুলাে বার করে ভারী স্নিগ্ধ সে হাসি। জবাব দিয়েছিল : জাত বানিয়ার বাচ্ছা আমি। বিদামে কাউকে কিছু দিয়ে আমাদের ধমকে অপমান করা হয়। তাই কিছু নিলাম। কিন্তু তুমি তাে জানাে ভাই, যে টাকা তুমি দিয়েছ, ওতে বাড়ির কড়ি বরগারও দাম হয় না। নিকুঞ্জ ঘােষ আর কিছু বলেননি। কিন্তু তিনি মনে মনে স্থির জানতেন ও বাড়ি বােমায় উড়বেই, আর ভাঙা আবর্জনার স্তুপ বিক্রী করে সে দুর্দিনে হয়তাে পঞ্চাশটা টাকাও ঘরে আসবে না। কিন্তু চন্দনদাসকে সে কথাটা বলতে মনের কোণে কোথায় যেন বাধল। বাড়ি তাে কেনা হল, এখন দেখাশােনা করে কে? একটা দারােয়ান কিংবা চাকর পাওয়া দুঃসাধ্য দাঁড়িয়েছে। নিকুঞ্জ ঘােষ গােটা কয়েক তালা মারলেন এখানে ওখানে। ওদিক মাঝে মাঝে মহলা সাইরেন বাজছে। তার কঁকিয়ে কান্নার মতাে কাঁপা একটানা শব্দটা কানে ভালাে লাগে না, মনে তাে নয়ই। বড়বাজারের ভাঙা বাজার থেকে কিছু কেনা-কাটা সেরে হ্যারিসন রােডের একটা নির্জন-প্রায় হােটেলে তিনি ফিরে এলেন। • দার্জিলিং মেলে ওঠবার জন্যে যখন জিনিসপত্র বাঁধছেন এমন সময় পেছনে শুনতে পেলেন লঘু পায়ের শব্দ।

বিক্ষিত হয়ে নিকুঞ্জ ঘােষ পেছনে ফিরে তাকালেন।
একটি তরুণী মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। শ্যামবর্ণ, ছােটখাটো চেহারা। এক
হাতে প্যারাসােল, আর এক হাতে বইপত্র। বড় একটা চামড়ার ব্যাগ, যে
জাতীয় ব্যাগ মেয়েরা সাধারণত ব্যবহার করে নামােটা চামড়ার স্ট্র্যাপের
সঙ্গে কাঁধের ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে।
নিকুঞ্জ ঘােষ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। এমন জায়গায় মেয়েটিকে তিনি
আশা করেননি—কেউ করেও না।
বড় সুটকেসটার বেল্ট বাঁধা স্থগিত রইল। বললেন, আরে একে ?
সুমিতা নয় ?
-কেন কাকাবাবু, এর মধ্যে এতই কি বদলে গিয়েছি আমি? চিনতে
কষ্ট হচ্ছে?
না, না—তা নয়। তারপর, ভালাে আছে তাে? এখানে এলেই বা
কী করে?
—ভালােই আছি। আপনার এখানকার ঠিকানা বাবার চিঠিতে
জেনেছিলাম। এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম—ভাবলাম যদি পাই তাে দেখাটা
করে যাবাে।
-বেশ করেছ। আজই চলে যাচ্ছি আমি, পরে এলে দেখা হত না-
নিকুঞ্জ ঘােষ চুপ করে রইলেন কয়েক মুহূত: যাচ্ছ কবে ?
নিকুঞ্জ ঘােষ চমকে গেলেন : কেন কী? কলকাতার অবস্থা তাে
দেখতে পাচ্ছ। কোনদিন কী হয় ঠিক নেই। তােমার বাবা লিখেছিলেন
তােমাকে নিয়ে যেতে। আমার সঙ্গেই চলল না হয়।
মা কাকাবাবু, সে হয় না। এখন আমি যেতে পারব না।
যেতে পারবে না? এখানে এখন কী কাজ তােমার ?

সুমিতা হাসল, জবাব দিল না। --তমার ইউনিভার্সিটি তত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এখানে থেকে আর না কাকাবাবু, যাওয়ার উপায় নেই। জলপাইগুড়িতে আপনি তত নাববেনই, বাবাকে বলে যাবেন আমার জন্যে ভয়ের কিছু নেই, আমি ঠিক আছি। —কিন্তু একি ভালাে করছ ? নিকুঞ্জ ঘােষের গলায় অভিভাবকতার সুর : কোন্‌দিন যে কী হয়ে যায় -সেইটে দেখবার জন্যেই তাে আরাে থাকতে ইচ্ছে করছে : সুমিতার গলায় মধুর আবদার : যুদ্ধের খবর কাগজেই পড়লাম, চোখে কখনাে কিছু দেখতে পাইনি তাে। এই সুযােগে যদি পাওয়া যায়— বিস্ময়ে খানিকক্ষণ হাঁ করে রইলেন নিকুঞ্জ। কী আশ্চর্য এই এক কেঁাটা মেয়ের সাহস। বড় বড় পালােয়ান আর জাদরেল লােক যখন ভয়ে ইদুরের মত চি চি করছে, আর পালাবার জন্যে আঁদাড় পাঁদাড় খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন এই মেয়েটার প্রাণে বিন্দুমাত্র ভয় নেই ! —বড় হঠকারিতা করছ মা। কখন কী হয়— সে ভাবনা ভাবছি না কাকাবাবু, মুস্কিল হয়েছে থাকবার জায়গা নিয়ে। হস্টেলে তাে তালাবন্ধ। কোথায় যে থাকি- চট করে নিকুঞ্জ ঘােষের একটা কথা মনে পড়ে গেল। মেয়েটা তাে বেপরােয়া, বােমাই পড়ুক আর যাই পড়ুক, এখান থেকে নড়বে না। তা হলে তার অত বড় বাড়িটাই বা এমন রক্ষকহীনভাবে অনাথ হয়ে পড়ে থাকে কেন ? সুমিতা বরাবরই চালাক আর চটপটে মেয়ে, সে সবদিকই মােটামুটি বজায় রাখতে পারবে, অবশ্য যতদিন না বােমার মুখে হাওয়ায় উড়ে যায়। প্রস্তাবটা শােনবামাত্র সুমিতা যেন আনন্দে নেচে উঠল। বেশ তাে, বেশ তাে কাকাবাবু। আমি তা হলে বাঁচি, মস্ত একটা দুর্ভাবনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ৭ -কিন্তু অত বড় বাড়ি একা একা সে সব ঠিক করে নেব কাকাবাবু, আপনি ভাববেন না। —তবু তুমি আমার সঙ্গে চলে এলেই বােধ হয় ভালাে করতে। কে জানে কী ভালাে হচ্ছে সুমিতা চাবির গােছা তুলে নিয়ে নিকুঞ্জ ঘােষের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিকুঞ্জ তাকে আন্তরিক আশীর্বাদ জানালেন। তার বাড়ি যায় যাক, কিন্তু মেয়েটা যেন না মরে, বেঁচে বতে থাকে— ঘুষ দিয়ে টিকেট আগেই কেনা আছে, এখান থেকে দু পা শেয়ালদা অবধি যেতে রিকশ ভাড়া নিলে দু টাকা। পথ দিয়ে বন্যার মতাে ধারায় চলেছে ভয়ার্ত মানুষের শশাভাযাত্রা। ঠিক শশাভাযাত্রা নয়, শবযাত্রা। ছেদহীন ট্রাফিকে পলাতকদের বহু আশার গৃহস্থালীর সরঞ্জাম—অনেক শুকিয়ে যাওয়া সাজানাে বাগানের কাসার জিনিসপত্র থেকে সুরু করে পায়া উঁচু করা ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত। সেই মহামানবের স্রোতে নিকুঞ্জ ঘােষও মিশে গেলেন, আপাতত এ যাত্রা বােধ হয় রক্ষাই পেয়ে গেলেন জাপানী বােমার হাত থেকে। দার্জিলিং মেল ছাড়তে সাড়ে চারঘণ্টা দেরী আছে এখনাে। সেদিকে খানিক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সুমিতা। তারপর হাতের মুঠোর মধ্যে চাবির গোঁহাটা নিয়ে অন্যমনস্কভাবে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করে দিলে। পৃথিবীটা অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। বদলে গেছে মানুষের মন পলায়নী ছাড়া আর শাশ্বত সমস্ত বৃত্তিগুলােই যেন ভোতা হয়ে গেছে এক সঙ্গে। তাই সুমিতাকে দেখে কেউ হাঁ করে তাকিয়ে রইল না, কেই শিস দিলে না, আলগাভাবে কেউ একটুখানি ধাক্কা দিয়ে গেল না ওকে। যুগান্তর ঘটছে যেন চারদিকে—পৃথিবীতে সত্য যুগ এবারে নেমে আসবে বলেই ভরসা হচ্ছে।

চারদিকে টুকরাে টুকরাে উত্তেজিত আলােচনা। একই আলােচনা। —ওদের আর কিছু নেই, এবারে ডুবল বলে —ফ্ল্যাণ্ডাসে যে মারটা খেল, দেখলেন না?—শুনেছেন, হাওড়া ব্রীজের ওপারে স্টেশনের দিকে আর এগানাে যাচ্ছে না --অদ্ভুত জাত বটে, এই জাপানীরা। কী কাণ্ডটাই না করলে সিঙ্গা- পুরে। এই বেঁটে ব্যাটারই দুনিয়ায় কীতি রাখলে দাদা। তাড়াতাড়ি চল বাবা রিক্স, নইলে ঢাকা মেলে নাক গলাবারও উপায় থাকবে না যে। না হয় আরাে কিছু বকশিস দেব- সেই পুরানাে ভয়, পুরানাে যুদ্ধের খবর। অসুস্থ, অসংলগ্ন কলকাতা। সমস্ত শৃঙ্খলা আর নিয়মানুবর্তিতার ওপরে ছেদের একটা আকস্মিক সীমারেখা নেমেছে এসে। হঠাৎ ভয় পেয়ে জ্বরে পড়লে যেমন হয়, তেমনি ভূতগ্রস্ত বিকারের রােগীর মত দুটো ভয়াতুর রক্তবর্ণ চোখ মেলে কলকাতা প্রলাপ বকছে। —টেলিগ্রাম টেলিগ্রা—আ- —কী বাবা, আবার নতুন কী খবর? —এই কাগজওয়ালা ! এদিকে এসে তত একবার ভগ্নদূত, স্বর্ণলঙ্কার কোন দেউটিটি আবার নিভল দেখা যাক- —টেলিগ্রা—— বাবু, লড়াইয়ের জোর খবর, দু পয়সা Fall of—আঁ! Successful retreat—তাই নাকি! এ যাবৎ ততা ওই ওস্তাদিটুকুই দেখিয়ে আসছ সােনার চাদেরা। আরাে কিছু পারলে তাে বেঁচে যেতাম। না মশাই, অত সহজে হবে না। এ যুদ্ধে ফ্যাসিস্টরা এবারে মরবেই, তাই শেষ দশায় পিঁপড়ের পাখা উঠেছে।

ই, পাখা যে কাদের উঠেছে সে তত দেখতেই পাচ্ছি। মাথার ওপর দিয়ে আর এ এফ এর বিমান উড়ে গেল। জনতার মধ্যে জয়ধ্বনি, নানা রকমের টীকা দীপ্পনী । —যাওনা বাপু, জাপানে গিয়ে গােটা কয়েক ডিম পৈড়ে এসে গে। —অত সস্তা নয়, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট দাঁত খি চিয়ে আছে সেখানে। —আমেন জনি, হ্যারি, টমি! তােমাদের বাবােটা তত বেজেছে। এখন প্রার্থনা করি আত্মাগুলাে শান্তিলাভ করুক। আমেন —আমেন। পরম দুঃখের মধ্যেও রসিকতা করতে পারে বাঙালি। জাতটার আর কিছু না থাক, এই বৈশিষ্ট্যটুকু যে এখনাে বজায় আছে-এটা মনে করেই যেন সুমিতা আশ্বাস পেল থানিকটা। চলতে চলতে একটা ওষুধের দোকানের সামনে এসে সে দাড়িয়ে পড়ল। বড় দোকান, কিন্তু এখন তার শশাভা বিশেষ কিছু চোখে পড়ছে না। শশা কেসগুলােতে যে সব শিশি বােতল প্যাকেট সাজানাে আছে, তারা যেন কেমন একটা অসহায় করুণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রয়েছে। দেখলেই বােঝ যায় ওগুলাে শুধু দোকানের ফাপা অলঙ্কার ভেতরে সারবস্তু বিশেষ কিছু নেই। কাচের গায়ে কাগজের আর কাপড়ের অসংখ্য পটি আঁটা-বােমার ঝাঁকুনির প্রতিষেধক। কয়েক মিনিট কিছু একটা ভেবে নিলে সুমিতা। রাস্তার উদ্দাম জনযাত্রা গায়ের ওপরে প্রায় নদীর স্রোতের মতাে এসে পড়ছে। এতলােকের কি দাড়াবারও জায়গা হবে শেয়ালদা স্টেশনে ? একটু ইতস্তত করে সুমিতা ওষুধের দোকানে ঢুকল। কাউন্টারে লােকজন নেই। শুধু এক পাশে বুড়ােমতন একজন ভদ্রলােক বসে খাতায় কী হিসেব লিখছিলেন। চোখে মুখে দুশ্চিন্তার কালােছায়া। -কী চাই মা? । ১০

একটু ফোনটা ব্যবহার করতে পারি ?
“নিশ্চয়।
ফোন তুলে নিয়ে সুমিতা একটা খবরের কাগজের অফিসকে ডাকলে।
আদিত্য অফিসেইছিল, পাওয়া গেল তাকে।
কী খবর সুমি ?
-খবর আছে—খুব ভালাে খবর।
চটপট বলে ফেল।
—এত তাড়াতাড়ি নয়। তােমাকে আসতে হবে।
—এখুনি ?
-এখুনি।
—অসম্ভব। এখন রয়টারের সঙ্গে ব্রহ্মদেশে যুদ্ধ করছি আমরা। গান
পয়েন্ট আগলে বসে আছি, নড়বার জো নেই।
-চালাকি নয়। আধঘণ্টার মধ্যে আসা চাই-মণিদির ওখানে।
-এক ঘণ্টা সময় দাও তবে।
-আচ্ছা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এক সেকেণ্ড ওদিকে নয়।
-তাই তাে, মুস্কিল! আচ্ছা-চেষ্টা করছি।
-চেষ্টা নয়—অবশ্য অবশ্য। নইলে তুমিই ঠকবে, আমার কী!
—আচ্ছা।
'ফোনটা রেখে সুমিতা এগিয়ে গেল ভদ্রলােকের দিকে। ব্যাগ থেকে
তিন আনা পয়সা টেবিলে রেখে বললে, ধন্যবাদমস্কার।
দুশ্চিন্তা বিবর্ণ ভদ্রলােক খাতা থেকে চোখ না তুলেই বললেন, নমস্কার।
সুমিতা আবার রাস্তায় নেমে পড়ল।
১১

মণিকাদির আস্তানা সীতারাম ঘােষ স্ট্রীটে-নরেন্দ্র সেন স্কোয়ারের পাশেই। বাড়ীটা পুরােনাে। চুণ সুরকির আস্তর ঝরে গিয়ে সারা গায়ে যেন অসংখ্য ক্ষত চিহ্ন ফুটে উঠেছে। যুদ্ধের দোহাই দিয়ে বাড়িওলা চুপ করে কসে আছে, অনেক আবেদনেও ফল হয়নি। তারই মাঝখানে মণিকাদির ঝকঝকে সাইনবোের্ডটা কেমন বিচিত্র আর বেমানান লাগে দেখতে। বাইরের চেহারা যত বিবর্ণই হােক-ভেতরের ব্যাপারটা অত খারাপ নয়। পুরােনাে বাড়ির পুরােনাে ঘরকেই যতদূর সম্ভব সুন্দর করে সাজাবার চেষ্টা করেছে মণিকা। একা মানুষের পক্ষে যতটুকু প্রয়ােজন তার চাইতে অনেক বেশিই সে রােজগার করে। তাই দেওয়ালের শাদা চূণকামের ভেতর দিয়ে কতগুলাে বিশ্রী আর খয়েরী রঙের দাগ এলােমেলােভাবে ফুটে বেরুলেও মণিকার সাজানাের গুণে সেগুলােকে যেন তেমন পীড়াদায়ক বলে মনে হয় না। ইচ্ছে করলে অবশ্য বাড়ি বদলাতে পারত মণিকা—যে কোনাে সুন্দর নতুন বাড়িতে সুন্দর করে গুছিয়ে নিতে পারত। কিন্তু বাড়ি বদলানাে সম্পর্কে তার ভয়ঙ্কর একটা আলসেমি আছে। মন্দ কী—এই তাে বেশ। তা ছাড়া দশ বছর আগে যখন প্র্যাকটিশ জমে ওঠেনি, তালি দেওয়া জুতত আর সেলাই করা কাপড় পরে যখন তাকে কলকাতার রাস্তায় পথ কাটতে হত, তখন থেকেই এই বাড়িটার সঙ্গে অনেক সুখ দুঃখের স্মৃতি তার জড়িত। তাই এর ওপরে কেমন যেন একটা মায়া বসে গেছে মণিকার।

মােটা মানুষ-মনের দিক থেকেও ভারী শান্ত আর স্তিমিত। কোনাে রকম হাঙ্গামা হট্টগােলটা ঠিক বরদাস্ত করতে পারে না। তাই যেমন বিশ্রী তেমনি একটা তীব্র বিরক্তি বােধ হচ্ছিল মণিকার। এতদিন পরে সত্যিই ক বাড়ি বদলাতে হবে নাকি? শুধু বাড়ি নয়—ছেড়ে যেতে হবে কলকাতাকে ? একটা ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চিন্তাকুল চোখে মণিকা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। সামনে নরেন্দ্র সেন স্কোয়ার। স্কোয়ার নয়-স্কোয়ারের একটা নকল এক মুঠো সংস্করণ। ধূলােভরা খানিকটা বিবর্ণ জমির চার পাশে সঙ্গে লােহার রেলিং দেওয়া। মাঝে তিন চারটে লােহার বেঞ্চি পড়ে আছে, তাদের চেহারাও সমান বিবর্ণ এবং বয়ােজীর্ণ। সব চাইতে উপভােগ্য নানাবিধ নিষেধ সম্বলিত কর্পোরেশনের সুদীর্ঘ লিপিখানা। ফুল ছিড়িলে আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় হইতে হইবে। এক গােছ মরা ঘাস থাকলেও কথা ছিল—তাতে অন্তত দু চারটে ঘাসের ফুল ফুটতে পারত। চারপাশের বাড়ি অনেকগুলােই এর মধ্যে তালা বন্ধ। যারা বন্ধ নয়, তাদের সামনে ট্যাক্সি, ঘােড়ার গাড়ি আর রিক্সার ভিড় জমেছে, উঠেছে সুপাকার মালপত্র। ছারপােকা আর ধূলােয় ভরা পুরােনাে জাজিম থেকে কানাভাঙা ফুলকাটা কুজো পর্যন্ত। যাচ্ছে তাে সব, কিন্তু মানুষ যাবে কী করে? সামনে দু তিনটে ডাস্টবিনে শতাব্দী সঞ্চিত আবর্জনা। ক’দিন ধরে বাঙ্গড়ের দেখা নেই, তারা বােধ হয় রাস্তার ধুলাে ঝাঁট দিতে দিতে এতক্ষণে মােকামা ঘাটে গিয়ে পৌছুল স্কোয়ারের এদিকের রাস্তায় লােকজন নেই -শুধু হাওয়ায় হাওয়ায় কতগুলাে শুকনাে কলাপাতা উড়ে বেড়াচ্ছে কোন শেষ মহফিলের আরক চিহ্ন বােধ হয়। থেকে থেকে ভেসে আসছিল ডাস্টবিনের পচা গন্ধের এক একটা উত্তাল তরঙ্গ। ১৩ । বাইরে খুট খুট করে হালকা জুতাের শব্দ। দরজা ঠেলে সুমিতার প্রবেশ। কাধের ব্যাগটা ঝুপ করে টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে বললে, বাবা, হাঁপিয়ে গেছি। অসাড় জড় মনটা যেন খানিক পরিমাণে সক্রিয় হয়ে উঠল মণিকার। যেন আশ্রয় পেল, আশ্বাস পেল। তারপর, কোন্ লঙ্কা জয় করে এলি? —অনেক। মীজাপুর, কলেজ স্ট্রীট, বেনেটোলা, হ্যারিসন বােড় থাম্ থাম। দিনরাত কেন এই টো টো কোম্পানির ম্যানেজারী করে বেড়াচ্ছিল বলতে পারিস। —আমি তাে আর তােমার মতাে মােটা নই যে, জড় ভরত হয়ে ঘরের . মধ্যে বসে থাকব। -চুপ করে সুমি, মােটা বলবি না। —আচ্ছা বলব না—সুমি হাসল । কিন্তু একটু চা খাওয়াতে হবে মণিকাদি। একেবারে বেদম হয়ে গেছি। —চা খাবে? তা হলে তৈরী করে নাওগে। -কেন, তােমার খসরু কোথায় গেল? -খসরু?—মণিকাদি ভঙ্গি করলে সে এখন আর খসৰু নেই, সম্রাট সাজাহান। তাই দিল্লীর তখতে-তাউস অধিকার করবার জন্যে দিল্লী এক্সপ্রেসে উঠতে গেছে। যাক, বাঁচিয়েছে।অত্যন্ত খুশি হয়ে সুমিতা হেসে উঠল। ইজিচেয়ার- টাতে নড়ে চড়ে সােজা হয়ে বসল মণিকা : কী যে হাসছিস সুমি, ভালাে লাগে না। আমি অনাথ হয়ে পড়ে আছি, তাের হাসি পাচ্ছে কী করে। -অনাথ! আহা হা, কী দুঃখের কথা। কেন সময়মতাে একটি গােলগাল পতিকে ইহ-পরকালের সিংহাসনে বসিয়ে সনাথ হওনি মণিকাদি। ১৪ তা হলে তাে এখন এমন বিলাপ করতে হত না। অন্তত এই দুঃসময়ে এক পেয়ালা চা করে সে খাওয়াতে পারত। -আমাকে চটাসনি মুমি, মার খাবি। -না মণিকাদি, তুমি একেবারে হােপলেশ। সুমিতা উঠে দাড়ালাে। -যাচ্ছিস কোথায় ? -বাে আবার কোথায়? একটু চা তৈরীর চেষ্টাই করা যাক। তােমার খসরু সাজাহানই হােক আর আলমগীরই হােক, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। কিন্তু এখন এক পেয়ালা চা না পেলে নির্ঘাৎ মরে যাবাে। অসহায় নৈরাশ্যের একটা করুণ নিশ্বাস ফেললে মণিকা। পেছন থেকে ডাক দিয়ে বললে, দু পেয়ালা করিস। সুমিতা ভেতরে চলে গেল, আর ইজি চেয়ারটায় তেমনি করে ঠেসান দিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বসে রইল মণিকা। কঁকা হয়ে আসা কলকাতার সঙ্গে সঙ্গে মনটাও যেন কেমন কঁকা হয়ে গেছে। উৎসাহ নেই, উদ্যম নেই, নিজেকে আত্মস্থ করে রাখবার কেন্দ্রীয় বিন্দু নেই কোনাে । একটা পীতাভ কুয়াসার মতাে জমাট অবসাদে সমস্ত চৈত যেন মুর্ভূিত হয়ে আছে। পার্কের পাশ দিয়ে এক একটা করে বােঝাই গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। একটা খােলা ফিটনে একটি বউ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে আর পা-দানীতে দাড়িয়ে রুমালে চোখ মুছছেন একজন ভদ্রলােক নিশ্চয় স্বামী। যে বােমার দিন আসছে, তাতে স্বামীর সঙ্গে ফিরে দেখা হবে কিনা কে জানে। মাথার ওপরে বায়ু তরঙ্গে সাইক্লোন। এবােপ্লেন উড়ে গেল, চারদিকের এই অশুভ আয়ােজনটাকে আরাে বেশি পরিপূর্ণ করে দিয়ে গেল যেন। মণিকার কেমন বি অস্বস্তি বােধ হতে লাগল। ইচ্ছে করতে লাগল সেও ১৫

পালিয়ে যায় এখান থেকে পালিয়ে যায় কোন দূরের আশ্রয়ে। এই
ভীতির বাইরে—এই পুঞ্জিত আতঙ্কের নেপথ্যে। কলকাতার আনন্দিত
আতিশয্য পীড়াদায়ক লাগে, কিন্তু তার চাইতে ঢের বেশি পীড়াদায়ক
মহানগরীর এই বৈধব্য-মুর্তি।
চমক ভাঙল সুমিতার ডাকে।
-মণিকাদি, ঘুমুচ্ছাে নাকি? চা নাও।
নিরুত্তরে হাত বাড়িয়ে চায়ের পেয়ালা নিলে মণিকা।
—তােমার খসরুর বাহাদুরী আছে। কেটলী, পেয়ালা, দুধ, চা, চিনির
এমন চমৎকার বন্দোবস্ত করে রেখেছে যে তাদের এক সঙ্গে জড়াে করতে
গেলে উত্তর মেরু আবিষ্কার করতে হয় ।
চায়ে একটা আলগা চুমুক দিয়ে মণিকা বললে, কী করা যায় বলতাে,
সুমি ?
সুমিতা বললে, অনাথিনী হয়ে পড়েছে বুঝি ? তার জন্যে এত দুর্ভাবনার
কী আছে ? অনুমতি দাও, বারাে ঘণ্টার ভেতরে নাথের ব্যবস্থা হয়ে দিচ্ছি।
-ইয়ার্কি দিসনে। সত্যিই কী করি বলতাে ?
এবারে সুমিতার মুখের ওপর থেকে হাল্কা হাসির সূক্ষ্ম রেখাটা মিলিয়ে
এল। নিবিষ্ট মনে চামচে দিয়ে পেয়ালাটা নাড়তে নাড়তে জবাব দিলে, কী
আবার করবে ? চুপ করে বসে থাকো।
বসে থাকব মানে? অবস্থা দেখতে পাচ্ছিস না? কলকাতা তাে
নয়—যেন নরককুণ্ড। এর ভেতরে পড়ে থেকে কী লাভ আছে বলতে
পারিস ?
—পালিয়ে গিয়েই বা কী লাভ?
কেন? যুদ্ধের যে অবস্থা
সুমিতা আবার হাসল।
১৬

—আচ্ছা মণিকাদি, কলকাতা যারা দখল করে নিতে পারে, ভারতবর্ষের কোথায় তারা বােমা ফেলবে না আমাকে বলতে পারাে ? মণিকা চুপ করে রইল। পালিয়ে কোথায় যাবে? আগুন শুধু বােমারই নয় সারা দেশেই জ্বলেছে। চারদিক থেকে ছুটে আসছে বেড়া আগুন। তার হাত থেকে কোথাও তুমি রেহাই পাবে না। কলকাতায় যদি না হয়, তা হলে পৃথিবীর কোন প্রান্তেই নয়। এবারেও চিন্তিত মুখে চুপ করে রইল মণিকা। কোন কথা আসছে না তার মুখে। শুধু টেবিলের ওপরে গােলাপী রঙের সুগন্ধি হাল্কা ধোয়াটা হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে চায়ের পেয়ালাটা ঠাণ্ডা হয়ে চলেছে। মণিকার মনে হতে লাগল যেন তার সমস্ত সত্তা তলিয়ে যাচ্ছে কোন কোন একটা অতলান্ত গভীরতার মধ্যে, বায়ুবাষ্পহীন জলের নীলিম অন্ধকারের ভেতরে। চোখের দৃষ্টি খোলা—অথচ সে চোখে ক্রমাগত অদ্ভুত একটা যন্ত্রণা বােধ হচ্ছে। কিছু ভালাে করে দেখা যাচ্ছে না, বােঝা যাচ্ছে না। বুকের মধ্যে নিশ্বাস আটকে আসছে বারে বারেনাক কানের ভেতর দিয়ে যেন ঝলকে ঝলকে রক্ত বেরিয়ে আসবে। ঠিক এই রকম একটা অনুভূতি হয়েছিল তার ছেলেবেলায় মামার বাড়িতে গিয়ে। বড় দীঘিটার শ্যাওলা পড়া ঘাট থেকে পা পিছলে সে গভীর জলের মধ্যে গিয়ে পড়েছিল—নীলাভ শীতল অন্ধকারের মধ্যে এমনি করেই চূড়ান্ত বিস্মৃতির ভেতরে বিলীন হয়ে আসছিল তার চেতনা। হঠাৎ মিষ্টি করে হাসল সুমিতা। -আচ্ছা মণিকাদি তুমি কাজ করােনা আমাদের সঙ্গে।—চটুল কৌতুকে সুমিতার চোখ জ্বল জ্বল করতে লাগল : তােমাকে আমরা প্রেসিডেন্ট করে দেব। (সূর্য) ১৭

মণিকা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল।
হঠাৎ ?
?
বাঃ-হঠাৎ কেন! তােমার মতাে যােগ্য প্রেসিডেন্ট আর কোথায়
পাওয়া যাবে। বেশ মানানসই চেহারা আছে—লােবকে দেখানাে যাবে।
-কেন, আমার কি আর মরবার জায়গা নেই ?
-তােমার রােগীরা তাে? তারা কি আর কলকাতায় আছে নাকি
যতদিন তাদের মারবার সুযোগ ফিরে না পাচ্ছ, ততদিন আমাদেরই মাথা
খাও না হয়।
-ততাদের মাথায় কি আর কিছু আছে যে খাবাে?
বাইরে ঘটাং ঘটাং করে কড়া নড়ে উঠল।
সাড়া নেই। তেমনি ঘটু ঘটু করে কড়া নড়তে লাগল।
—আঃ জালাতন করলে। সুমি, একটু দেখে আয়তাে লক্ষ্মীটি।
কিন্তু সুমিতাকে আর যেতে হল না। যে কড়া নাড়ছিল, নিজেই এসে
শন দিলে। মণিকা তাকিয়ে দেখলে আদিত্য।
চেয়ারে একবার নড়ে চড়ে ওঠবার চেষ্টা করেই হাল ছেড়ে দিয়ে আবার
শুয়ে পড়ল মণিকা : ও তুমি! এক সুমিতা এসে হাড় জ্বালিয়ে মারছে,
সেই সঙ্গে তুমিও এসে জুটলে !
আদিত্য প্রাণখােলা হাসি হেসে উঠল। প্রচুর শক সাড়া করে এক কোণ
থেকে চেয়ারটাকে টেনে আনল আরেক প্রান্তে। তারপর আরাম করে তার
ওপরে আসন নিলে। হাতে মােটা একটা চুরুট, তাই থেকে এক রাশ ধোয়া
উড়িয়ে বললে, ছিঃ মণিকাদি, আপনি দিনের পর দিন যেন কেশ হয়ে
যাচ্ছেন। এটা কি কোন ভদ্রলােককে অভ্যর্থনা করবার রীতি নাকি।
তােমাদের ভদ্রতার জ্বালায় আমি তাে গেলাম।
১৮

—এখনি কী হয়েছে। আদিত্য কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতাে দৈববাণী করতে লাগল। মাত্র আমাদের দুজনকে দেখেই আপনি বিচলিত হয়ে পড়ছেন, কিছুদিনের মধ্যে দেখবেন গােটা কলকাতাকেই আপনার ঘরের ভেতর এনে জড়াে করে ফেলব। ছােটখাটো মানুষ আদিত্য। অতিরিক্ত বই পড়ে পড়ে কেমন একটু বানি কুঁজো হয়ে গেছে। মাথার চুলগুলাে বদ্য এবং বিশৃঙ্খল—বিয়ােগা- নাটকের শেষ দৃশ্যে বিরহী নায়কের মতাে। কিন্তু এটা ইচ্ছাকৃত নয়—যে কোন বিদ্যা এবং বুদ্ধিজীবীর মুতােই নিয়ন্ত্রিত চুল কাটানাের ব্যাপারে ও যেমন আছে আতঙ্ক, তেমনিই সময়াভাৰ। শেষ পুর্ব কেশভার যখন গল ছাড়িয়ে কঁাধের সীমা ডিঙ্গিয়ে পিঠে নেমে পড়তে চায়, সেই সময় গলির মােড়ে একটা উড়ে নাপিত ডেকে আনে আদিত্য-ওর ভয় হয় সেলুনের ভলােক হেয়ার কাটার ওর বন্য বর্বর চুলে কচি ছোঁয়াতে রাজী হবে না। কিন্তু চুলের বেলা যাই হােক, দাড়ি সম্বন্ধে আদিত্য অত্যন্ত হুসিয়ার। সে দাড়ি গজায় একেবারে মােগল সম্রাটদের মতাে—শুধু চোখ দুটো বাকী রেখে মুখের সর্বত্র তাদের উদার অভ্যুদয় ঘটে। আদিত্য গর্ব করে বলে, বহুররামিতা আর্যত্বের লক্ষণ—এ হচ্ছে আমার এরিয়ান বিয়ার্ড। কিন্তু এরিয়ান বিয়ার্ডের আরেকটা দিকও আছে। একটু বড় হলেই তারা একেবারে পিনের মত ফুটতে থাকে। তাই বাধ্যতামূলক ভাবেই আদিত্যকে নিয়মিত দাড়ি কামাতে হয়। গায়ের জামাতেও বেশ বৈশিষ্ট্য আছে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে বুকপকেটটা কাধের কাছাকাছি অনেকখানি উঠে পড়েছে, অন্যান্য সেলাইগুলােও ঠিক নিয়মমাফিক পড়েনি। ওর বােন্ পিংড়ী—যার কলেজের নাম সুশ্বেতা রাষ—তারই হাতের এক্সপেরিমেন্ট এসৰ। সে বাড়িতে বসে নিজের হাতে টেলারিং শিখছে। বন্ধু-বান্ধবেরা ঠাট্টা করলে ভারী চমৎকার ৮ জবাব দেয় আদিত্য। বলে, বহু মানুষ বানর আর গিনিপিগের প্রাণ নিয়ে বিজ্ঞানের এক্সপেরিমেন্ট চলে, পিংড়ীর এক্সপেরিমেন্টের কল্যাণে আমি না হয় পােষাকী সভ্যতাটাকেই কিছু পরিমাণে নিধন করলাম। এ হেন আদিত্য। যেমন সপ্রতিভ, তেমনি ওরিজিন্যাল। খবরের কাগজে চাকরী করে আর অঙ্গাঙ্গীভাবে করে খানিকটা রাজনীতি। একটা এম. এ. আর একটা এম এস-সি পাশ করে বসে আছে, যদিও দুটোর কোনােটাই বিশেষ কাজে লাগে না। শুধু তর্কের বেলায় রাজনীতির মধ্যে খানিকটা বিজ্ঞানের দুর্বোধ্য মিশাল দিয়ে প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। আর তার চরিত্রের বিশেষত্ব সব চাইতে চমৎকার হয়ে ফুটে আছে তার চোখে। চোখ দুটি বড় নয়—কিন্তু আশ্চর্য নীল তাদের রঙ। বাঙলা দেশের শ্যামবর্ণ বেঁটে মানুষ আদিত্য সমুদ্র পার থেকে অমন নীলিম চোখ কী করে আমদানি করল, ওর এক জেনিটিকস-বিশারদ ডাক্তার বন্ধু মাঝে মাঝে তাই নিয়ে গবেষণা করতে চেষ্টা করে। আদিত্যের চোখের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ফেলে মণিকাদি বললে, থাক অত বিশ্বপ্রেমে দরকার নেই। আমার ঘরটা এখনাে অতটা পরিমাণে সােস্যালাইজড হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ব্যাপার কী, একসঙ্গে মঘা অশ্লেষা এখানে এসে জুটলে কেমন করে। সুমিতা ভালাে মানুষের মতাে চায়ে চুমুক দিয়ে বললে, চা খাবে আদিত্য দা? মণিকাদি’র খসরুর চা নয়—আমার শ্রীহস্তের তৈরী। আদিত্য হাসল : উহু, মণিকাদি’র প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলে চলবে না। সত্যি বলছি মণিকাদি, আমার কোনাে দোষ নেই। সুমিতা আমাকে টেলিফোন করেছে পত্রপাঠ আপনার এখানে চলে আসবার জন্যে। २० সুমিতা বললে, সত্যি দরকারী কথা। তােমাদের দুজনকে স্তম্ভিত করে দিতে পারি এমন খবর নিয়ে এসেছি। আদিত্য চুরুটে টান দিয়ে বললে, বটে! তা হলে বলল, অবহিত হয়ে সেই ভয়ঙ্কর সংবাদটা শােনা যাক। সুমিতা গম্ভীর হয়ে বললে, তাহলে শােননা। আমি এখন বিবেকানন্দ রােডে একখানা চারতলা বাড়ীর একচ্ছত্র মালিক। তার মানে ? মণিকা এবং আদিত্যের যুগপৎ সবিস্ময় স্বর বেরুল। ঈড়াও বলছি। তার আগে আর একবার চা করে আনি-নইলে আলােচনাটা ঠিক মতাে জমে উঠবে না। সমস্ত ঘরে বিস্মিত কৌতুহলের , একটা নাটকীয় আবহাওয়া সৃষ্টি করে সুমিতা চায়ের সন্ধানে গেল। বাইরে বেলা ডুবে আসছিল। কলকাতার ভাঙা হাটের ওপর দিয়ে বিমর্ষ বিষয় হয়ে নামছিল বিকেলের রাঙা আলাে। সামনে পার্কের বেঞ্চি গুলাে এমন সময়েও প্রায় শূন্য পড়ে আছে—একফালি নির্ধারিত আকাশ আর খােলা হাওয়ার লােভে কোনাে স্বাস্থান্বেষী ওখানে এসে আসন নেয়নি। শুধু হেঁড়া হাফ প্যান্ট পরা অত্যন্ত মলিন চেহারাদু তিনটি ছেলে ওখানে ডাংগুলি খেলছে। নিতান্তই পথের ছেলে, তাই জীবনের দাম নেই, জীবনের ভয়ও নেই। একখানা কলাপাতাকে অবলম্বন করে দুটো নেড়ী কুকুর শুরু করেছে আকাশ-ফাটানাে কলহ। মণিকার ঘরের ভেতরে তিনটি প্রাণীর আলােচনা জমে উঠেছিল। মণিকা বললে, অত বড় বাড়ি দিয়ে তুমি কী করতে চাও? -বিশেষ কিছু না। অনাথ-আশ্রম খুলব। —অনাথ-আশ্ৰম ! -ক্ষতি কী! সুমিতা সকৌতুকে হেসে উঠল।

মণিকা বিরক্ত হয়ে বললে, দ্যাখ সুমি, ইয়াকীরও একটা সময় অসময় আছে। এখন ওসব ভালাে লাগছে না। —বাঃ, ইয়াকী। অনাথ আশ্রম খুলব এর মধ্যে ইয়ার্কীর কী আছে! এতাে রীতিমত মহৎ ব্যাপার! পরলােকে কাজ দেবে। মণিকা বললে, খুব তত আনন্দ দেখতে পাচ্ছি। দুদিন পরেই যখন ঘাড়ের ওপর বােমা পড়বে, তখন টের পাবি। তখন কোথায় থাকবে অনাথ, কোথায় থাকবে কী। আদিত্য জানলার বাইরে নীল চোখের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ফেলে অনেকক্ষণ ধরে কী একটা পর্যবেক্ষণ করছিল। এইবারে বেশ আরাম করে খানিকটা চুরুটের ধোঁয়া ছড়িয়ে বললে, আশ্রমে অনাথের অভাব হবে বলছেন মণিকাদি? কিন্তু আপনি তাে জানেন না কত অসহায় নাবালক এই মুহূর্তেই আশ্রমে আশ্রয় পাওয়ার জন্যে আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। -তার মানে ? ঈড়ান, দেখাচ্ছি-চেয়ার ছেড়ে চট করে উঠে পড়ল আদিত্য। দ্রুতগতিতে বেরিয়ে এল বাইরে। পার্কের এদিকের কোণায় একটা লাল বাড়ির বােয়াকে একটি ভদ্র সন্তান গোঁফের পরিচর্যা করতে করতে বিড়ি টানছিল, আর মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে সিনেমার গানের কলি গুঞ্জন করছিল। আদিত্যকে ঘাড় নীচু করে বুলডগের মতাে তার দিকে আসতে দেখে গুফো লােকটির হঠাৎ কী একটা জরুরী কথা মনে পড়ে গেল। বিদ্যুৎগতিতে উঠেই সে জোর পা চালিয়ে দিলে নরসিং লেনের দিকে। পাথরের মতাে কঠিন মুখ নিয়ে আদিত্য ফিরে এল। নীল চোখে আর প্রসন্ন কৌতুক নেই, আগুনের স্ফুলিঙ্গ চমক দিয়ে উঠছে। —কী হল আদিত্যদা? টিকটিকি। ২২ । এর —সেকি! মণিকা সভয়ে বললে, এখানে কেন ? ওয়াচ করছিল আমাদের। -কী সর্বনাশ ! সুমিতা হাসল, কিন্তু আদিত্যের নীল চোখের স্ফুলিঙ্গ উঠল শিখা হয়ে। —এরা ভেবেছে কী! এমনি করে শানানাে চোখ আর শানানাে ঠোট নিয়ে বসে থাকবে আর ছো মারবে! জীবন যে দুর্বহ করে তুলল। কেউ আদিত্যের কথার জবাব দিল না। আদিত্য বাইরের দিকে তাকিয়ে দু চোখের আগুন বৃষ্টি করে চলল। তার সমস্ত চেহারাটাই বদলে গিয়েছে মুহূর্তে : নাঃ, আর সহ্য হয় না। একটা উপায় করতেই হবে। বন্দুক ছোঁড়াটা ভুলেই গিয়েছিলাম তিরিশ সালের পরে—এবার শকুন শিকার আবার প্র্যাকটিশ করতে হবে। মণিকাদি বললে, শকুন শিকার! ! মেঘের মত গলায় আদিত্য জবাব দিলে, হাঁ, শকুন বই কি। শুধু শকুন নয়—কাক-চিল থেকে শুরু করে ডােরা কাটা বাঘ পর্যন্ত। খবরের কাগজ উড়িয়ে অনেককাল কাটল, এবারে দেখা যাক তার চাইতে বেশী কিছু করা যায় কি না। তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল সুমিতার দৃষ্টি—আর মণিকা বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইল। আদিত্যের কথাটা সে ঠিক যে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে তা নয়, কিন্তু তার মধ্যে কেমন একটা অশুভ ইঙ্গিত অনুভব করেছে। জঙ্গলের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে আসা শিকারীর বন্দুকের নল থেকে বুনাে হস যেমন বারুদের গন্ধ পেয়ে সজাগ ও চকিত হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি ভাবে মণিকার মনও যেন একটা, সুনিশ্চিত আসন্নতায় শঙ্কিত হয়ে উঠল। বাইরে সাইকেলের শব্দ। ডাক শােনা গেল, আদিত্যবাবু আছেন এখানে ? ২৩ কে? আত্মসংবরণ করে সাড়া দিলে আদিত্য। -আমি মধুর, অফিস থেকে আসছি। একটা চিঠি আছে আপনার। আদিত্যের আফিসের ছােকরা বেয়ারা মথুর।, খামে আঁটা একখানা চিঠি নিয়ে এসেছে। বললে, এক ভদ্রলােক অফিসে এসে এটা দিয়ে গেলেন। বললেন, খুব জরুরী, এক্ষুণি এটা আপনাকে পৌছে দিতে হবে। চিঠি দিয়ে মধুর চলে গেল। ক্ষিপ্র হাতে খাম খুললে আদিত্য। কালাে মুখের ওপর কালাে কালাে রেখা দেখা দিল এক রাশি। হাত কাঁপতে লাগল। সুমিতা, অনিমেষের খবর। ব্যাকুল উৎসুক ভাবে সুমিতা এগিয়ে এল : কী খবর অনিমেষের ? ভালাে নয়। বাগানের ভেতরে সাহেব তাকে এমন ভাবে মেরেছে। যে, বাঁচবে কিনা বলা শক্ত। সমস্ত অবস্থাই প্রতিকূলে। মণিকা বললে, কী ভয়ানক! আমাদের অনিমেষকে। —হ্যা, অনিমেষকে। শােনাে সুমি, আমার আর দাঁড়াবার সময় নেই। আমি এক্ষুণি অফিসে যাচ্ছি ছুটির জন্য—যত ভিড়ই হােক না কেন, সাড়ে দশটার ট্রেন আমি ধরবই। চারতলা বড় বাড়িটা আপাতত তােমার চার্জেই রইল, যা হয় কোরো তুমি। ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল আদিত্য—এক মুহূর্ত দাঁড়ালাে না। আর এতক্ষণে ভাবান্তর দেখা গেল সুমিতার মুখে। মণিকাদির চোখে পড়ল তার গালের ওপর থেকে রক্ত সরে সরে সমস্ত মুখটাই কাগজের মতাে বর্ণহীন আর শাদা হয়ে যাচ্ছে। ২৪ এদিককার ছােট গাড়ি যে ছােট লাইন দিয়ে আসে, তার দুপাশেই আলাের গতিকে স্তব্ধ সংহত করে ঘন নিবিড় জঙ্গল দাঁড়িয়ে আছে। সে জঙ্গল শালের। মাঝে মাঝে দুচারটে অন্য গাছও আছে। নিঃসঙ্গ নিভৃত দু-একটি দেবদারু শাল বনের ঘন সন্নিবেশের মধ্যে নিজের রাজকীয় মর্যাদাকে তেমন করে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি ; পলাশ শিমূলের যে রাঙা ফুলের মঞ্জরী পাহাড়ী ঝােরার পাশে রূপের আগুন জ্বালিয়ে জেগে আছে, এক বুননা জানােয়ার ছাড়া সে সৌন্দর্যকে উপভােগ করবার দৃষ্টি নেই কারাে। শুধু মাঝে মাঝে ভীরু ভীরু পা ফেলে হরিণের পাল আসে, শিমুলের ফুল খেয়ে খুশি হয়, দেবদারুর ছায়ায় পরস্পরের গা চাটে আর ভয় পেলে শুকননা শালের পাতায় মর্মরিত পদশব্দ তুলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। তা ছাড়া শাল, শাল, আর শাল। রেল লাইনের দুপাশে মন্দিরের মতো উঠে পাতার আবরণে যেন ঢেকে দিয়েছে আকাশকে। তবু লাইন যেদিকে সােজা চলে গেছে—সেদিকে অনাবরণ দিগন্তের একটা মুক্ত রূপ চোখে পড়ে। মুক্ত রূপ কিন্তু সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ওখানে আকাশের সীমা টেনে দিয়েছে হিমালয়ের মহিমামণ্ডিত অপূর্ব সুন্দর গিরি শৃঙ্গ-তুষার মৌলি কাঞ্চন জন্য। এক বর্ষাকালে যখন মেঘের পর মেঘের কালাে দুর্ভেদ্য প্রাচীর ওদিকটাকে দৃষ্টি দুরধিগম্য করে রাখে সেই সময় ছাড়া বছরের আর সব সময়েই এই রেল লাইনে দাঁড়িয়ে কাঞ্চন জমার অপরূপ মূর্তিখানা দেখা যায়। ভােরের আলাে যখন শাল বনের অন্ধকারকে স্বচ্ছ তরল করে দিতে পারে না, শুধু ২৫ কোরার জল একটা আসন্ন আশায় ঝিকিয়ে ওঠে—তারও বহু আগে আকাশের এই প্রান্তে কাঞ্চন জঘার ঘুম ভাঙে। পেন্সিলে আঁকা ঝাপসা ধোয়াটে ছবির মতাে সে দাড়িয়ে থাকে সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায়। তারপরে অরণ্যের কোনাে এক প্রান্ত রেখায় দেখা দেন সুর্য-সারথি, আকাশ রাঙা হয়ে ওঠে। এই শালবন ছাড়িয়ে আরাে বহু বিস্তীর্ণ বাঙলা দেশ, সেই বাঙলা দেশের আরাে সুদূর কোন এক সীমান্তে কলকাতার আকাশ অরুণ রাগে রাঙিয়ে ওঠবার আগেই কাঞ্চনজঙ্ঘা তার দীপ্তিতে রঙীন হয়ে ওঠে। শাদা তুষারের ওপর দিয়ে যেন রক্তের ধারা গলে গলে পড়তে থাকে। শালবনের বনের মধ্যে সূর্যের আলাে টুকরোটুকরাে হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আর কাঞ্চন- জঙ্ঘার রূপ ক্রমশ উজ্জ্বল আর প্রখর হয়ে ওঠে। আবার বেলা ডােবে, দুপুরের রৌদ্র শাণিত তীক্ষ্ণ তুষার সােণার রঙ মাখে,—দেখতে দেখতে সে রঙ ছাপিয়ে রক্তধারা গড়িয়ে যায়। সুমেরু থেকে পরিক্রমা সুরু করে কুমেরুর অন্ত দিগন্তে সূর্য-সারথি তার যাত্রা শেষ করে-কাঞ্চনজঙ্ঘার ধোঁয়াটে ছায়ামূর্তি একটা বিশাল প্রেতছবির মতাে নিঃসীম অন্ধকারের নেপথ্যে তলিয়ে যায়। সারাদিন সারারাত কখনাে প্রত্যক্ষ আবার কখনাে অবগুণ্ঠিত এই পর্বত শিখরের ছায়ার নীচে শালবনের ফাকে ফাকে যন্ত্র গর্জন করে চলে। বাঘের ডাক তলিয়ে যায় তার ভেতরে, তলিয়ে যায় শাল-পলাশের ডালে ডালে । শালবনের ওপরে নির্মল নীল আকাশে চিমনির ধোঁয়া উঠতে থাকে। চা-বাগান। ঢালু মাটি। চারিদিকে অরণ্যের পরিবেশ। বর্ষার জল গড়িয়ে গড়িয়ে নীচের দিকে চলে, চা-বাগানের বড় বড় নালা বেয়ে নেমে যায় পাহাড়ী নদীতে। চায়ের পক্ষে আদর্শ দেশ। ময়ূরের কেকাধ্বনি ২৬ শালবনের মধ্যে পত্তনি করে, আশে পাশের ফাঁকা জায়গায় অনেকগুলি চায়ের বাগান গড়ে উঠেছে। শুধু বাঙলাদেশে নয়, সমস্ত পৃথিবীময় খ্যাতি- লাভ করেছে এই তথাকথিত ভারতীয় চা। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চমৎকার পীচের রাস্তা, বাগানের ইনসপেকশন বাংলােতে একেবারে রাজপ্রাসাদের স্বাচ্ছন্দ্য। সস্তা ডিম, দুধ, মাংস আর সস্তা মানুষের পরিশ্রম। অপ্রতিহত প্রতাপে সাম্রাজ্যভােগ করবার এমন সুযােগ অন্যত্র দুর্লভ। তাই বুনন জানােয়ারের আর কালাজরের ভয়কে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেই অর্থলােভী মানুষ এখানে ডেরা বেঁধেছে। এই স্বনামধন্য ভারতীয় চা আর সেই সঙ্গে কাঠের ব্যবসার জন্যেই এই রেল লাইন। দুপাশে শালবন আর দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘা। পাহাড়ে বুনন জানােয়ারের ডাক। ঘাসবনের মধ্যে অজগরকবলিত বুনােশূয়ােরের আর্তনাদ। আর সব কিছুর ভেতর দিয়ে মসৃণ, মােটরের তেলে চকচকে পীচের রাস্তা। রেলের ওয়াগনে আর লরীতে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পানীয়ের সহজ রপ্তানি। এইখানে এইটি সাহেবী চা-বাগানে মাস তিনেক আগে বাবু হয়ে এসেছিল অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’জন ইংরেজ এই বাগানের মালিক। একজন লিয়ােপােড়, আর একজন রবার্টল। লিয়াপােড় বড় সাহেব, ইয়ােরােপীয়ান প্ল্যান্টাস অ্যাসােসিয়েশনের একজন হর্তাকর্তা-বিধাতা। সে সহরেই থাকে, নিতান্ত দরকার না পড়লে বাগানের দিকে পা বাড়ায় না। আর এখানকার সবকিছু দেখাশােনা করে ছােট সাহেব রবার্টস-দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জেনারেল ম্যানেজার। মস্ত বড় বাংলাে, ফুলের বাগান, বিলিতী কুকুর, ঘােড়া আর দু’দুটো বন্দুক। যেন দক্ষিণ-আফ্রিকার কোনাে জঙ্গলে উপনিবেশ বসিয়ে সেখানে রাজত্ব করে যাচ্ছে। ২৭

আদর্শ ইংরেজ রবার্টস। নিজের শিরায়ুতে যেন প্রতি মুহূর্তে অনুভব
করে নর্ডিক রক্তের নীল-প্রবাহ। মাথার চুলগুলাে উগ্র তামাটে রঙের।
মােটা নাকে পরিস্ফীত রক্তাক্ত শিরার জাল বিস্তার। হাতের রাইডারটা
বড় ঘােড়াটাকে মায়া করে চলে বটে, কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে তার অনুকম্পা
নেই। কুলির পিলে-ফাটানাে বীর জাতির উপযুক্ত বংশধর।
অনিমেষ যখন চাকরীর দরবারে এল, সাহেব তখন হাফ-প্যান্টের পকেটে
দুহাত পুরে নতুন ডায়নামােটাকে নিবিষ্টচিত্তে লক্ষ্য করছিল। কাল এটাতে
একটা অ্যাসিডেন্ট ঘটে গেছে। একটা কুলির একখানা হাত বেটটা
সম্পূর্ণভাবে টেনে নিয়েছিল-বহুভাগ্যে লােকটা প্রাণে মরেনি। কুলিরা
বলছে বিপজ্জনক, ওটাতে কাজ করতে তারা ভরসা পাচ্ছে না। কুঞ্চিত
করে রবার্টস ভাবছিল, কী করা যায়।
এমন সময় অনিমেষ এসে সেলাম দিলে।
ঠোটের পাশে পাইপ কামড়ে ধরে, মােটা নাক আর কপিশ চোখ
দুটোকে এক সঙ্গে জড়াে করে রবার্টস জিজ্ঞাসা করলে, কী চাই বাবু?
-একটা চাকরী !
-ওঃ-রবার্টসের চোখ দুটো মিট মিট করতে লাগল। বাগানে কাজ
করেছ কখনাে ?
—টেটিমােনিয়াল আছে ?
—চায়ের কাজ কিছু বােঝাে?
—কিছু না।
রবার্টসের চোখ তেমনি মিট মিট করতে লাগল । তা হলে আমি
নিরুপায়। বাগানে অভিজ্ঞ লােকই আমাদের দরকার।
২৮

অনিমেষ বললে, মাপ করবেন স্যার। কাজ করবার সুযােগই যদি না পাই, তা হলে অভিজ্ঞতা আসবে কোথেকে। আপনি আমাকে সুযােগ দিয়ে দেখুন। —তা বটে।—কথাটা রবার্টসের মনে লাগল। পাইপের ধোয়া ছড়িয়ে কী ভেবে নিলে মিনিট কয়েক। বললে, আচ্ছা, বিকেলে দেখা কোরাে আমার সঙ্গে। তােমার স্পষ্টবাদিতা আমার ভালাে লেগেছে। বিকেলে অনিমেষের চাকরী হয়ে গেল। সে প্রায় আজ ছমাস আগেকার কথা। এর মধ্যে অনেকখানি বদলে গেল পৃথিবী। ইয়ােরােপে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার আগুন আস্তে আস্তে শিখা বিস্তার করতে লাগল এশিয়ার প্রান্তে প্রান্তে। খবরের কাগজ খুলে রবার্টসের চোখে পড়তে লাগল দুঃসংবাদের পর দুঃসংবাদ। চায়ের ব্যবসায় মন্দাইয়ােররাপে শিপমেন্ট যাচ্ছে না—প্লাইউডের বাক্স ভর্তি চা পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে খিদিরপুরের ডকে। বাকী ছিল আমেরিকা, জাপানী যুদ্ধের ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের প্রশান্ত জলের তলাতেও দেখা দিতে লাগল ইউ-বােট আর টর্পেডাে—ও পথও বন্ধ হয়ে গেল। শুধু এ হলেও দুঃখ ছিল না। খবরের কাগজগুলাে যেসব বার্তা বহন করে আনে, বেতারের ঘােষক প্রতিদিন গম্ভীর কণ্ঠে যে ঘােষণা করে, তার কোনােটাই আনন্দে রােমাঞ্চিত হয়ে ওঠার মতাে নয়। সমস্ত পৃথিবী ব্যাপী যে সাম্রাজ্যের আকাশ থেকে কখনাে সূর্য অস্ত যেতাে না—তার সেই সূর্যের দিকে অনিবার্যভাবে এগিয়ে আসছে করাল রাহ। শুধু গেল-গেল ডুবল-ডুবল, বােমায় চুরমার হয়ে গেল সমস্ত । অপমানে দুশ্চিন্তায় রাত্রে রবার্টস ঘুমােতে পারে না। অসহায় আক্রোশে নিজের হাত দুটোকে তার কামড়ে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। এ কী হচ্ছে, এ কী হল? হিংস্র বিদ্বেষে রবার্টস নিজের ঘরের মধ্যে পায়চারী করে বেড়ায় বুননা জানােয়ারের মতাে। খেতে বসলে খেতে পারে না, মাঝে মাঝে মনে হয় ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠতে পারলে যেন সে বাঁচে। বুকের ভেতরে থেকে থেকে আর্তনাদ ওঠে। গেল, গেল, সব গেল। মেজাজ যেমন তিরিক্ষি, তেমনি বিকট হয়ে উঠেছে। কথায় কথায় কুলিদের ওপর হাত চলে। অকারণে লাথি মারে কুকুর দুটোকে। কোনাে জামানকে বা জাপানীকে হাতের কাছে পায় না বলেই কাক-চিল-শকুন যা পায় তারই ওপরে গুলি চালাতে চেষ্টা করে। রবার্টস নিজেই যেন ভয়ানক একটা বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে। কিছুতেই মন শান্তি পায় না। শেষ পর্যন্ত দু’কাধে দুটো রাইফেল নিয়ে রবার্টস জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। শিকার করবে। দুর্ভাগ্য যেদিন আসে সেদিন সেটা সব দিক থেকেই আসে। সারাদিন শালবনের মধ্যে ঘুরেও কিছু মিলল না। বড় শিকার তত দূরের কথা, দু- একটা হরিণও চোখে পড়তে না পড়তেই মিলিয়ে গেল নক্ষত্ৰবেগে। কাটায় হাঁটু ছিড়ে গেল, কাধ টনটন করতে লাগল রাইফেলের ভারে। নিজের ঠোটটাকে কামড়াতে কামড়াতে রবার্টস উঠে এল রেল লাইনে, হাঁটতে শুরু করে দিলে বাগানের দিকে। সামনে কাঞ্চন-জ। দিনান্তে তার চুড়াে বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ওই দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রবার্টসের চোখে জল এল। এমনি করে কি অস্তে নামছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্যও ? ওই রক্ত কি ইংলিশ চ্যানেলে, ফ্ল্যাণ্ডাসে আর সিঙ্গাপুরে অমনি করে ছড়িয়ে গেছে ? নীচ দিয়ে পীচের একটা রাস্তা চলে গেছে বাগানের দিকে। রবার্টস দেখলে বাগানের একটা কুলি-সর্দার সেই পথ দিয়ে সাইকেলে করে চলেছে। লােকটা নতুন, খুব কাজের লােক। কিন্তু আশ্চর্য, সাহেবকে দেখেও লােকটা সাইকেল থেকে নামল না।

বা সেলাম দিল না। কয়েক মুহূর্ত ঘটনা যেন বিশ্বাস করতে পারল না রবার্টল। এতবড় দুঃসাহস তার বাগানের একটা কুলির কেমন করে হতে পারল যে, এতদিনের বাঁধা নিয়মকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ করেই বীরের মতাে সে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল ! জঙ্গলের ভেতর ঘুরবার সময় প্রাণভরে হুইস্কি গিলেছিল রবার্টস। এতক্ষণে : দেহের মধ্যে অ্যালকোহলের সেই আগুন যেন সক্রিয় হয়ে উঠল। বাজের মতাে গলায় রবার্টস ডাকলে, এই শূয়ারকা বাচ্চা। সাইকেল তখন পীচের রাস্তা ধরে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। কিন্তু কটু গালটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নক্ষত্ৰবেগে নেমে পড়ল। বললে, কেন গাল দিচ্ছ সাহেব ? ধ! কপিশ চোখ দিয়ে মাংসাশী ক্ষুধা যেন ঠিকরে বেরােতে লাগল। কেন সে পাল দিচ্ছে তারও কি কৈফিয়ৎ দিতে হবে এই কুলিসারটাকে। ইংরেজ কি যুদ্ধে সত্যি সত্যিই হেরে গেছে নাকি যে এর মধ্যেই এই ব্লা- সােয়াইনেরা যা খুশি তাই করতে আরম্ভ করেছে। সেলাম দিতে জানােনা শালা শূয়াের ? খবর্দার, গাল দিয়ােনা সাহেব। তুমি যাচ্ছ লাইন দিয়ে, আমি যাচ্ছি রাস্তা দিয়ে। আমাকে তােমাকে সেলাম ঠুকতে যাবাে কেন? গিলেছ, ঘরে গিয়ে পড়ে থাকো গে যাও। রাস্তায় মাতলামি করে মরছ কেন। রবার্টস থরথর করে কাঁপতে লাগল। এর পরে মুখে আর কোনাে কথা আসছে না, আসা সম্ভবও নয়। মিনিটখানেক কুলিটার দিকে তাকিয়ে থেকে রবার্টস বললে, ইউ এন্টার মাই গার্ডেন এগেইন অ্যাণ্ড আই উইল শুটু ইউ। যাও, যাও।একটা ব্যঙ্গাত্মক মুখভঙ্গি করলে কুলিশার : গুলী করা অত সস্তা নয়। পয়সা লাগে। অনেক সেলাম তাে পেয়েছ, এবার চুপ করে বসে থাকো গে। অত নবাবী আর চলবে না। রবার্টস পিঠের রাইফেলে হাত দিলে। সত্যি সত্যিই লােকটাকে গুলী করবে কিনা ভাবতে ভাবতে তাকিয়ে দেখলে সাইকেলটা বাঁক ঘুরে শালবনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। হেঁটে নয়, যেন জলন্তু একটা হাউয়ের মতাে বাগানে উড়ে এল রবার্টস। একটা কুলি-সারের এত সাহস হওয়া সম্ভব নয়—এর পেছনে কোনাে ভদ্রবাবুর ইঙ্গিত নিশ্চয় আছে। এতকাল এই চায়ের বাগানের সপ্তদশ শতাব্দীর ধরণে যে রাজত্ব চলে এসেছে সাহেবের সামনে দিয়ে কেউ ছাতা মাথায় চলতে পারে নি, ঘােড়া বা সাইকেলে করে যেতে পারেনি, সাহেবকে যারা দেবতার চাইতেও বড় করে দেখে এসেছে-তাদের এতখানি আম্পধ দিল কে? কে সেই শয়তান ? কোয়ার্টারে ফিরে রবার্টস গুম হয়ে বসে রইল খানিকক্ষণ। হুইস্কির ক্রিয়াটা ততক্ষণে শান্ত হয়ে এসেছে। না-রাগে আগুন হয়ে ঝটপট একটা কিছু করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। একটা কুলিসর্দারের কথায় রাগ করে কোন লাভ নেই, ঝড়ে-মুলে একে উচ্ছন্ন করতে হবে। রবার্টস বাগানের ডাক্তার ডাক্তার যাদব ঘােষালকে খবর দিলে। গুটি গুটি পায়ে এল যাদব ডাক্তার। প্রথম জীবনে সহরে কোথায় কম্পাউণ্ডারী করে হাত পাকিয়েছিল, সেই যােখ্যতায় চা-বাগানের সুযােগ্য সিভিল সার্জেন হয়ে উঠেছে। কিন্তু যােগ্যতা হিসেবে সেইটাই তার বড় পরিচয় নয়। সাহেবের অত্যন্ত বিশ্বস্ত লােক সে হুইস্কির একটুখানি তলানি বকশিস পেলেই বাগানের অনেক গােপন খবর সে সাহেবের কানে তুলে দেয়। অনেকটা তারই বিশ্বস্ততার গুণে বাগানের জীবনযাত্রা এতকাল নিরাপদ স্বাচ্ছন্দ্যে চলে এসেছে। ৩২ এক পেগ পেটে পড়তেই যাদব ডাক্তারের মুখ খুলে গেল। বলতে, অনেকদিন ধরেই বলব বলব করছিলাম, কিন্তু হুজুরের যে মনের অবস্থা দেখেছি, সেই জন্যেই-- সবটা শুনে রবার্টস চুপ করে রইল। পাইপের গােড়াটা চিবুতে লাগল নিজের মনে। তারপর বললে, আচ্ছা তুমি যাও ডাক্তার, আমি দেখছি। পরদিন সকালে কুলিদের কোলাহলে রবার্টসের ঘুম ভাঙ্গল। সমস্ত বাগানে কেমন একটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ফ্যাক্টরীর বাঁশি বেজেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু বাগানে একটি লােক কাজ করতে যায় নি, একটি লােকও হাত দেয়নি। ম্যানেজারের কোয়ার্টারের সামনে এসে হট্টগােল মুক্ত করে। দিয়েছে তারা। চাবুক হাতে করে রবার্টস নেমে এল। -কী ব্যাপার? —আমাদের মজুরী বাড়াতে হবে। যুদ্ধের বাজারে ঢের খরচ। পােযাচ্ছে না। -বটে ? রবার্টসের জীবনে এ আর একটা নতুন অভিজ্ঞতা। ধর্মঘটের খবর সে কাগজে পড়েছে, পড়েছে শ্রমিক বিক্ষোভের বিবরণ। কিন্তু সেসব শহরের ব্যাপার, তার সম্পর্ক বড় বড় ফ্যাক্টরীর সঙ্গে। সেখানে বাইরে থেকে উত্তেজনা জোগাবার মতাে লােকের অভাব হয় না সেখানে আছে শিক্ষা, আছে খবরের কাগজ। কিন্তু এই চা-বাগানে, হিমালয়ের ছায়ার নীচে দূর দুর্গম এই ডুয়ার্সের জঙ্গলের ভেতরে যে সে-আগুনের ফুলিঙ্গ কখনাে উড়ে আসতে পারে, তা রবার্টসের ধারণাও ছিল না। কালাজ্বরে জীর্ণ নির্বোধ সঁওতাল আর ভয়ত্ৰস্ত ওঁরাওঁয়ের দল-যাদের সঙ্গে না আছে শিক্ষার সংজৰ পৃথিবী, এমন করে দাবী জানাতে তাদের শেখালে কে? এই ভয়ে রবার্টস বাগানের ইস্কুলে কুলির ছেলের ভালাে করে লেখাপড়া শেখবার সুযােগ দেয় না, সন্দেহজনক কোনাে বাইরের লােককে ঢুকতে দেয় না বাগানের ত্রিসীমানার ভেতরে। কিন্তু আজকে জার্মানী আর জাপানের প্রতি সঞ্চিত ক্রোধ একসঙ্গে জ্বলে উঠল রক্তের মধ্যে। বাড়তি মজুরী চাও, বটে?-খাড়া খাড়া চোয়াল দুটো ঝুলে পড়ল রবার্টসের : দিচ্ছি বাড়তি মজুরী। তােমাদের ব্যানার্জিবাবুকে ডাকো ত একবার। তার সঙ্গেই কথা কইব। কুলিরা কিছু বুঝতে পারল না। আনন্দিত কোলাহল করে তারা অনিমেষকে ডেকে নিয়ে এল। তাদের দাবী পূরণ হবে বলেই ভরসা হচ্ছে। সাহেবের আহ্বানে অনিমেষ সামনে এসে দাড়ালাে। বুক সােজা করেই দাড়ালাে। রবার্টসের চোখের দিকে তাকিয়েই সে বুঝতে পেরেছে এ সাক্ষাৎ সুখের বা আনন্দের নয়। কিন্তু এই ভেবে তখনাে তার বিস্ময় লাগছিল যে সে এর ভেতরে যে আছে এ খবর রবার্টসকে কে দিলে? রবার্টস বললে, ভেতরে এসে আমার সঙ্গে। তারপর কুলিদের দিকে ফিরে বললে, তােমরা যাওকাজ করােগে। আমার যা কথাবার্তা আমি ব্যানার্জি বাবুর সঙ্গেই বলব। আধ ঘণ্টা পরে যা ঘটল তার জন্যে বাগানের কেউ প্রস্তুত ছিল না। চাবুক আর বােলারের ঘায়ে ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত অনিমেষের অচেতন দেহটা সাহেবের চাপরাশীরা বাইরে টেনে নিয়ে এল। পেছনে পেছনে এল রবার্টস। তার এক হাতে রাইফেল উদ্যত হয়ে আছে। বাঘের মতাে গর্জন করে রবার্টস বললে, এই রাঝেলকে বাগানের সীমানার বাইরে টেনে ফেলে দাও। আর শুনে রাখাে সকলে, আমার ৩ রাইফেলের মুখেই বাড়তি মজুরীর ব্যবস্থা করেছি, যাদের দরকার থাকে এসে নিয়ে যেতে পারাে। ভয়ে আতঙ্কে সমস্ত বাগানটা থম থম করতে লাগল। আর এই দুদিন পরে নরেন্দ্র সেন স্কোয়ারে মণিকাদি’র বাড়িতে বসে মধুরের মারফৎ খবরটা পেল আদিত্য। প্রশস্ত চারতলা বাড়িটার মালিক সুমিতা। শুধু মালিক নয়-একচ্ছত্র মালিক। নীচ দিয়ে উত্তর কলকাতার দীর্ঘ বিস্তীর্ণ রাজপথ। যুদ্ধের দুর্যোগ নেমেছে। চারদিকে—তবু এ পথটায় ট্রাফিকের মা পড়েনি। ছেদহীন গাড়ির সারি চলেছে, চলেছে মানুষ, অথচ বেশ বােঝা যায় কোথায় যেন সুর কেটে গেছে, কোথায় যেন ঘটে গেছে ছন্দোপতন। শীতের রৌদ্রে যেন একতান মিলিয়েছে। একটা অনাসক্ত ঔদাসীন্য প্রয়ােজনের তাগিদ নেই, কাজের অহেতুক বিড়ম্বনা নেই, একটা বৈরাগ্যের ইন্দ্রজালে কলকাতার সমস্ত স্নায়ুগুলাে শিথিল আর নিঃসাড় হয়ে গেছে। শুধু কান পেতে আছে কখন বেজে উঠবে সাইরেনের প্রেতিনীকণ্ঠ, আকাশে দেখা দেবে নিপ্পনী বিমানের বিভীষিকা, তারপর তেতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুমিতা অন্যমনস্কর মতাে তাকিয়ে ছিল নীচের দিকে। শীতের রােদে চাপা ফুলের রঙ, উত্তরে বাতাসে অল্প অল্প ধূলাে উড়ছে। সামনে কতগুলাে দোকান খােলা-কতগুলােতে কোলাপসিবল গেটে তালা ঝুলছে। তেতলা চারতলার বারান্দায় আর কাপড় শুকোচ্ছে , বােমার ভয়ে সব একতলায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। টাকার পাখায় উড়ে যারা আকাশের গােত্র হয়ে উঠছিল, তারা হঠাৎ কঠিন মাটির অতিশয় কাছাকাছি নেমে এসেছে—পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে বাধ্যতামূলক সাম্যবাদ। ত এতবড় বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। এখানে ওখানে ঢুকছে বাইরের অনধিকারী বাতাস, কোথায় যেন জানলার একটা পাল্লাকে নিয়ে ক্রমাগত আছড়া-আছড়ি করছে। চব্বিশখানা ঘরে ঘুরতে ঘুরতে আর সিড়ি ভাঙতে ভাঙতে হাত-পা ব্যথা হয়ে গেছে সুমিতার। বিচিত্র একটা অনুভূতিতে সমস্ত মনটা কেমন বিহবল হয়ে গেছে যেন কলকাতার নয়, কোথায় কোন্ একটা নির্জন দ্বীপে কে ওকে নির্বাসন দিয়ে গেছে। তিনদিন হল হঠাৎ ঝড়ের মতাে চলে গেছে আদিত্যদা। সেই থেকে আর কোনাে খবর নেই। কোথায় ভুয়ার্সের চা-বাগান,ঘন শালের বন, দিক-চক্ৰবালে কাঞ্চন জঘ, যেখানে অনিমেষ থাকে, সেইখানে চলে গেছে আদিত্য। তারপর আদিত্যের কোনাে খবর নেই, অনিমেষেরও না। একদিন ছিল, যখন অনিমেষের খবরই সবচাইতে বেশি দরকারী ছিল সুমিতার জীবনে। কিন্তু সেদিন আর নেই—সব বদলে গেছে। নিজের হাতেই একদিন সব-কিছুর ওপরে সীমারেখা টেনে দিয়েছে অনিমেষ। যা হতে যাচ্ছিল, তা হল না। কোনােদিন আর হওয়া সম্ভবও নয়। যেদিন মনে হল, বসবার ঘরের এই চায়ের পেয়ালা, হাতের কাছে এই দিশি-বিলিতী কবিতার বইগুলাে,—নিঅনের বর্ণচ্ছটায় সিনেমার ইন্দ্রপুরী, গড়ের মাঠের ঠাতা অন্ধকারে মিষ্টি আইসক্রীম আর মিষ্টি ভালােবাসা, এরা শুধু নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা—সেদিন থেকে সব কিছুর অর্থই বদলে গেল। তখন নামজাদা একটা মিশনারী কলেজে পড়াশুনাে করত ওরা দুজনে। অনিমেষ ছিল কলেজ ইউনিয়নের সেক্রেটারী। যথানিয়নে একদিন গােলমাল বাধল কলেজের প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে। দু’পক্ষেরই জেদ ছিল সমান—ছাত্রেরা এক পা নড়তে চাইলে না—প্রিন্সিপ্যালও নয়। ফলে স্ট্রাইক এবং হাঙ্গার স্ট্রাইক উত্তেজনা কলকাতার সব কলেজগুলােতে ছড়াতে লাগল প্রবল দাবাগ্নির মতো। তারপরে দেখা দিল পুলিশ। ৩০ সুমিতা বি-এ পাশ করল কিন্তু অনিমেষ করল না। কলেজ থেকে আগেই তাকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিতে হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকেই দুজনের পথ এক হয়ে গেল। যে অনিমেষ সুমিতাকে অনার্স পড়াত, সেই অনিমেষই তাকে পড়াতে লাগল রাজনীতির বই। আগে দেখা হত লেকের ধারে, এখন দেখা হতে লাগল বস্তিতে বস্তিতে, সভামমিতিতে আর রাজনৈতিক আলােচনার চক্রে। আশ্চর্য, কী হতে গিয়ে কী হয়ে গেল! নিতান্ত সৌখীন মানুষ ছিল অনিমেষ। কবিতা ভালােবাসত, ভালােবাসত থর্নি স্মিথের ফ্যান্টাসী। আদ্দির পাঞ্জাবী গিলে করত, চশমার ভেতর দিয়ে তাকাত উদাস দৃষ্টিতে যেন জন্ম জন্মান্তর ধরে না পাওয়া প্রিয়ার বিরহে সে ব্যাকুল হয়ে আছে। পেছন থেকে একটি মেয়ের বিনুনী নজরে পড়লে তার মুখখানা দেখবার জন্যে এক মাইল রাস্তা হেঁটে যেতেও তার আপত্তি ছিল না। আউটরাম ঘাটে বাফেটে বসে গঙ্গার বুকে জ্যোৎস্না দেখে তার মরে যেতে ইচ্ছে করত, ইচ্ছে করত মরে গিয়ে সে ম্যাগালিয়া হয়ে ফুটে উঠবে। গরম চায়ে সে চমুক দিতে রাজী হত না—ভয় পেতে পাছে তার ঠোট দুটো মােমের মতাে গলে যাবে। অর্থাৎ দেহে-মনে-প্রাণে পরিপূর্ণ অ্যাডােনিস হবার সে স্বপ্ন দেখত—তার পৃথিবীতে জ্যোৎস্নার আলাে আর রজনীগন্ধার গন্ধ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। যে কোন মেয়ের সঙ্গে যে কোন মুহূর্তে প্রেমে পড়বার জন্য সে তৈরী হয়েই ছিল, সুতরাং সামান্য পরিচয়ের সূত্রেই সুমিতাকে সম্পূর্ণ করে হৃদয় ঢেলে দিতে তার দেরী হয়নি। বাহিক ন্যাকামী অবশ্য যথেষ্ট ছিল অনিমেষেরতবু সুমিতার তাকে নিতান্ত মন্দ লাগেনি। মানুষটা সরল, মন শিশুর মতাে অপরিণত। মেয়েদের সম্বন্ধে দুর্বলতা থাকলেও বর্বরতা ছিল না। প্রেমিক মানুষ, সুমিতাকে যখন ভালােবাসবার সুযােগ পেল তখন নিঃশেষে তার কাছে আত্মসমর্পণ করে নিশ্চিত হয়ে রইল, নিজের মনের মধ্যে পূর্ণ হয়ে উঠল, আর ছন্দ মেলাতে না পেরে দিস্তা দিস্তা কাগজে গাদায় গাদায় গদ্য কবিতা লিখতে বেশ চলছিল—শেষ পর্যন্ত হয়তাে চলতও এমনি করেই। তারপর সুমিতার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যেত, তারও পরে অ্যাডভােকেট হয়ে কালাে গাউন গায়ে চড়িয়ে হাইকোর্টে গিয়ে ‘মি লড’ বলে সওয়াল করত অনিমেষ। সেদিন কাব্য ল রিপাের্টের নীচে চাপা পড়ত, আদ্দির পাঞ্জাবী গিলে করবার সময় পাওয়া যেত না। উচ্চবিত্ত বাঙালি ছেলের জীবনে কলেজী রােমান্স যে পরিণতি লাভ করে, অনিমেষের বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হত না। কবিতা লিখেই কলেজ ইউনিয়নের সেক্রেটারী হল অনিমেষ। কিন্তু পরিণতি যা ঘটল তা কবিতা নয়। আবেগমুখী রােম্যান্টিক মন। কিন্তু একটা নিষ্ঠুর আঘাতেই সে মনের গতি ঘুরে গেল সম্পূর্ণ উল্টো দিকে। কবিতার স্রোত ছুটল সক্রিয় রাজনীতির খাতে। চাদের আলাে হঠাৎ ঝড়ের কালাে মেঘের করাল ছায়ার নীচে চাপা পড়ে গেল, রজনীগন্ধার গন্ধ ছাপিয়ে হঠাৎ রক্তের গন্ধের জোয়ার এল। যে অনিমেষ একদিন রাজনীতিকে মেছােহাটার দরাদরি বলে ঠাট্টা করত, সেই অনিযেষের নাম একদিন ছাত্র-সমাজকে চঞ্চল করে তুলল। তবু মাঝে মাঝে পুরােনাে দিনগুলাে রক্তের মধ্যে কথা কয়ে উঠেছে। যেন ভুলে যাওয়া একটা গানের কলি হঠাৎ গুঞ্জন করে উঠেছে চেতনার ভেতরে। সবই তাে স্বপ্ন—দিবাস্বপ্ন। তবু কোনাে কোনাে স্বপ্নের রেশ মনের ভেতরে অস্ফুট ব্যথার মতাে বাজতে থাকে, কয়লার ধোঁয়ায় কালাে ফ্যাক্টরীর আকাশে যেন অ্যাডোনিসের জ্যোতিময় মুর্তিটা চকিতের জন্যে আভাসিত হয়ে ওঠে। এমনিই একদিন হয়েছিল। মানিকতলার একটা শ্রমিক অঞ্চল থেকে ফিরে আসছিল সুমিতা আর ৩৮ অনিমেষ। রাত প্রায় দশটা বেজে গিয়েছিল—এর মধ্যে কেমন করে যেন কে রাজা দীনে ধ্রুটকে ঘুম পাড়িয়ে ফেলেছিল। শুধু দক্ষিণ থেকে বাতাস বইছিল, লন-ওলা একটা বাড়ি থেকে বিলিতী ঝাউ শব্দ করছিল, আকাশে শুক্লা রাত্রের মস্ত বড় একখানা চাদ জেগে ছিল আর বেতারে যেন কে চমৎকার ক্ল্যারিওনেট বাজাচ্ছিল। নির্জন পথে পাশাপাশি চলছিল সুমিতা আর অনিমেষ। সুমিতার কাঁধে মােটা স্ট্র্যাপের সঙ্গে ঝোলানো বড় একটা চামড়ার ব্যাগ, তাতে রাশীকৃত কাগজপত্র খচখচ করছে। অনিমেষ প্রাণপণে তাকে জটিল একটা রাজনৈতিক সমস্যা বােঝাবার চেষ্টা করছিল—সুমিতা মন দিয়ে শুনছিল, কিন্তু ভালাে করে বুঝতে পারছিল না। এমন সময় হঠাৎ সুমিতার খেয়াল হয়েছিল আকাশে চাঁদ উঠেছে, বিলিতী ঝাউয়ের শব্দ বয়ে দক্ষিণা বাতাস বইছে, ক্ল্যারিয়ােনেটের একটা মধুর মাদক সুর রক্তের মধ্যে ঘুমন্ত স্বপ্নকে জাগিয়ে তুলছে। সুমিতা বলে বসল, বড় ক্লান্তি লাগছে। চলাে, বসা যাক। -এখন, এই রাতে ? কোথায় বসবে? কলকাতার পথ ঘাট সব ভুলে গেলে নাকি ?—সুমিতা হঠাৎ মিষ্টি করে হেসে উঠল : সামনেই তাে দেশবন্ধু পার্ক। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অনিমেষ বললে, রাত কিন্তু দশটার : —তাতে কী হয়েছে ! —পুলিশে ধরবে। ধরবে তো ধরুক। কিন্তু সত্যি আমি আর হাঁটতে পারছি না। —একটা রিক্সা ডাকি তা হলে। —আঃ, সত্যিই তুমি অধঃপাতে গেছ। এমন চমৎকার জ্যোৎস্না-সামনে ৩৯ এমন চমৎকার পার্ক, এখন ৰিা চড়ে ঠনঠন করে যেতে তাে আমার বয়ে গেছে। হঠাৎ অনিমেষের চমক লাগল। চাদ বেশ মাথার ওপর। তার সমস্ত আলাে একরাশ সদ্যফোটা বকুলের মততই যেন সে সুমিতার মুখে উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে। আর তার ছোঁয়ায় সুমিতার চোখ দুটিও ফুলের মতাে ফুটে উঠেছে—ফুটে উঠেছে সন্ধ্যার আকাশে প্রথম জেগে-ওঠা দুটি মিথোজ্জল নক্ষত্রের মত। এই চোখ—এই চাঁদকতকাল আগে ভুলে গিয়েছিল অনিমেষ ? মুহূর্তের জন্যে ঘাের লাগল অনিমেষের। রক্তে কথা কয়ে উঠল কথা- কলির ছন্দ। বললে, আচ্ছা, চলাে। পার্কেও লােকের ভীড় নেই। যারা স্বাস্থ্যন্বেষী, তারা অনেকক্ষণ আগেই স্বাস্থ্যলাভ করে বিদায় নিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে দু একটা বেঞ্চিতে দু একজন ভবঘুরে সাংখ্যোক্ত পুরুষের মতাে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছে, অথবা আলােয় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়ি টানছে। অন্য সময় হলে হয়তাে ওই বিড়ির আগুনের দিকে তাকিয়ে অনিমেষ বলে উঠত, The desire of the moth for the star- নিভৃত ঘুমন্ত পার্ক। কোথাও যেন আমের মুকুল ধরেছে, দক্ষিণা বাতাস তার জানান দিয়ে গেল। সামনে ছােট পুকুরটায় জল যেখানে জ্যোৎস্নায় ঝলমল করছে, দুজনে সেইখানেই এসে বসল। কিছুক্ষণ কারাে কোনাে কথা নেই। শুধু অনিমেষ দেখছিল চাঁদের আলােয় দুটি নক্ষত্র ফুটেছে সুমিতার চোখে। অসম্বত ; একগুচ্ছ চুল উড়ে পড়েছে ওর মুখের ওপর, একটা উজ্জ্বল সরীস্থপের মতাে সরু সােনার হারটা ওর কণ্ঠকে বেষ্টন করে আছে। নীরবে একটা ঘাষের শীষ তুলে নিয়ে সেটাকে চিৰিয়ে চলেছে সুমিতা। ৪৫ . জ্যোৎস্নায় স্নান করেছে পার্ক। জ্যোত্যায় ঝিলমিল করছে রূপকথার মতাে সামনের জলটা। জ্যোত্যায় একাকার হয়ে গেছে আমের বউলের গন্ধ। জোৎক্সায় আলাে হয়ে গেছে সুমিতার মুখ। তিন বছর আগেকার কবি অনিমেষ হঠাৎ যেন ফিরে এল।(আঁড়ােনিসের পায়ের কাছে হঠাৎ তরঙ্গ-মন্ত্রে মুর্ভূিত হয়ে পড়ল পূর্ণিমার মায়ায় বিহ্বল সেই ঈজীয়ানের উদ্বেল উল্লাস। মনে হল পাশে সুমিতা নেই-কিরণবর্ণা অ্যাটলান্টা উঠে এসেছে সমুদ্রের অতল গর্ভ কালাে অন্ধকার থেকে ফুল আর জ্যোৎস্নায় ভরা পৃথিবীর এই স্বপ্নলােকে) যেন মগ্নচৈতন্যের ভেতর থেকে কথা কয়ে উঠল অনিমেষ : আউটরাম ঘাটের সেই সন্ধ্যাগুলােকে তােমার মনে আছে সুমি ? সুমিতা ফিস ফিস করে জবাব দিলে, আছে । --আজ অনেকদিন পরে তেমনি রাত ফিরে এসেছে, না? সুমিতা জবাব দিলনা। আবার চুপচাপ। বহুদিনের পর যখন হারানাে স্বপ্ন ফিরে আসে, তখন হয়তাে সব কথাই এমনি করে অনুভূতির :-Tােয় হারিয়ে যায়। নেপলসের সমুদ্র আর দেশবন্ধু পার্কের এই জটা যেন একাকার হয়ে গেছে। কিন্তু রাস্তায় তীব্র স্বরে কুকুর ডেকে উঠল। কোথায় একটা পেটা-ঘড়ি প্রবল বেগে বাজালাে রাত দশটা। খালের দিক থেকে ছারারারারা করে উঠল মাল্লাদের প্রচণ্ড হােলির গান। অ্যাটলান্টার স্বপ্ন বহুদূরের নিকষ কালাে ঈজীয়ানে অবলীন হয়ে গেল। অনিমেষ আত্মস্থ হয়ে উঠল—হঠাৎ হেসে উঠল হাে হ করে। রাস্তায় যে কুকুরটা গলা খুলে সঙ্গীতালাপ করছিল, এই আকস্মিক হাসিতে সন্ত্রস্ত .. হয়ে সে সবেগে রাস্তা দিয়ে ছুটতে লাগলাে। ওপাশের বেঞ্চির ওপরে যে ৪

লােকটা সুখনিদ্রায় মগ্ন ছিল, কাণখাড়া করে সে তড়াক করে উঠে বসল,
জ্বলন্ত চোখে তাকালে এদের দিকে।
-তাই বলাে বাবা, প্রেম করছে। তা এমন করে হাসবার দরকার ছিল
কী! শালা কঁচা ঘুমটাকে মাটি করে দিলে।
চাপা আক্রোশে দাঁতের নীচে একটা কটু গাল বর্ষণ করে সে
আবার লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল—কাচা ঘুমটাকে আবার জমাতে হবে
ভালাে করে।
অনিমেষের হাসির শব্দে সুমিতা শুদ্ধ চমকে উঠেছিল। কয়েক মুহূর্ত সে
বিস্মিতভাবে অনিমেষের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
—অমন করে হাসলে যে ?
নেশা ধরছিল। ছেলেবেলার বােকামিগুলাে আবার সার বেঁধে
পিপড়ের মতাে মগজের ভেতরে হানা দেবার চেষ্টা করছিল।
-তাই বুঝি ওই রকম একটা বেখাপ্পা হাসি হেসে সেগুলােকে ছভঙ্গ
করে দিলে?
—নিশ্চয়। কবিতা তাে কবিতা, দেখলে না, রাস্তার থেকে কুকুর শুদ্ধ
তাড়িয়ে ছাড়লাম। বেচারা বাড়ি গিয়ে হার্টফেল না করে।
সুমিত হাসল : না, তা করবে না। কিন্তু পাহারাওলা তেড়ে আসতে
পারে। ভাববে আমরা এখানে মদ খেয়ে ইয়াকী দিচ্ছি।
—তা হলে হাসির তােড়ে পাহারাওলাকে শুদ্ধ উড়িয়ে দেব। মনে করবে
ভূত। নমুনা দেখতে চাও তার ?
“থাক, রক্ষা করাে। এমন অসময়ে অত বীরত্বে দরকার নেই। কিন্তু
—সুমিতা ইতস্তত করতে লাগল। একটা কথা জিজ্ঞেস করব কী?
আকাশে চাঁদ তখনাে মােহ ছড়াচ্ছে। তখনাে জ্যোৎস্না জলছে সামনের
৪২

জলটায়। মুকুলের গন্ধ তখনাে রক্তের মধ্যে নেশার মতাে সংক্রামিত হয়ে
যাচ্ছে। সুমিতার চোখে ফুটে-ওঠা নক্ষত্র দুটো তখনাে নিবে যায়নি।
সব জিনিস কি সব সময়ে হেসেই উড়িয়ে দেওয়া যায় ?
অত্যন্ত আস্তে আস্তে কথাটা বললে সুমিতা। উড়ন্ত কতগুলাে লঘু
পালকের মতাে হালকা হাওয়ায় যেন কথাগুলাে উড়ে গেল।
তার মানে ?-অনিমেষ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাে।
—মানে আর কিছুই নেই—তেমনি আস্তে আস্তে সুমিতা বললে,
আউটরাম ঘাটের সন্ধ্যাগুলাে কি একেবারেই মিথ্যে? জীবনে কোনাে দাম,
কোনাে সার্থকতাই নেই তাদের ?
—হয়তাে আছে। কিন্তু আজ নয়।
কবে তা হলে ?
—যেদিন অধিকার আসবে।
—কিন্তু মানুষের এই অধিকারগুলাে কি কোনাে মুহুর্তের মুখ চেয়ে থাকে ?
-মানে?
-বলছি।—আকাশের দিকে আবিষ্ট চোখ রেখে সুমিতা বললে, ধরাে
একজন বন্দী। চারদিকে তার লােহা আর পাথরের বেড়া। পাহারাওলা,
ওয়ার্ডার আর পেটির ঘা তার কাছে প্রতি মুহূতের সত্য। কিন্তু কোনাে
রাত্রে তার লােহার শিকের ফাক দিয়ে যদি জ্যোৎস্না পড়ে, যদি তখন তার
গান গাইতে ইচ্ছে হয়, সেটা কি অপরাধ?
--অন্তত বন্দিত্বটা ভুলে যাওয়া অপরাধ বই কি।
-কিন্তু বন্দিত্বটা ভুলতে তাে তাকে কেউ বলছে না। জীবনে সব কিছুরই
প্রয়ােজন আছে। বন্দিত্ব তার কালও থাকবে, এমন কি কয়েক মুহূত পরেও
থাকবে। কিন্তু সেই বিশেষ সময়টিতে তার মন যদি হঠাৎ মুক্তি পেয়ে বসে,
তা হলে কি তুমি তাকে অস্বীকার করবে ?
৪৩

রােমান্টিক বন্দীর মনােবিলাসকে আমি স্বীকার করি না। চকিতের জন্যে সুমিতার মুখের ওপর দিয়ে কৌতুকের একটুখানি হাসি খেলা করে গেল। আজ অনিমেষও রােমান্টিকদের বিরুদ্ধে জেহাদ যােবনা করেছে। মরে গিয়ে যে ম্যাগ্নোলিয়া হয়ে ফুটবার কামনা করত, গরম চায়ের কাপে যে চুমুক দিতে চাইত না ঠোঁট গলে যাওয়ার ভয়ে-আজ তারই মুখে এই কথা! অতিরিক্ত নেশা করত বলেই যেন নেশার নামে ক্ষেপে ওঠে অনিমেষ, প্রয়ােজনের চাইতে ঢের বেশি গোঁড়ামি করে। যেন এতকাল ধরে অজ্ঞানের মতাে যে পাপ সে করেছে, আজ একটা সজ্ঞান চেতনা লাভ করে সেই পাপের সে প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। শুধু যােলাে আনা নয়—তার চাইতে আরাে কিছু বেশি, একেবারে আঠারাে আনা ! কিন্তু সুমিতা হঠাৎ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। -আমি তােমার সঙ্গে তক করব। অনিমেষ একটা সিগারেট ধরালাে। খুশিমুখে খানিক ধোঁয়া ছড়িয়ে দিয়ে প্রসন্ন ভাবে বললে, বেশ, করাে তর্ক। রােমান্টিক হওয়া কি এমনিই ভয়ঙ্কর অপরাধ? অনিমেষ অনাসক্ত হয়ে বললে, জবাব দেওয়া অনাবশ্যক। কারণ প্রশ্নটাই তামাদি হয়ে গেছে। Barred by limitation ফাকি দিলে তুমি। -ফাকি দেব কেন? ও কথার জবাব এতবার এত লােকে দিয়েছে যে তার পরে ও সম্পর্কে আর কিছু বলবারই দরকার নেই। -মােটেই না। কোনাে লােক এ কথার জবাব দেয়নি। যারা রােমান্টিক নয়, তারা নরােমান্টিক হওয়ার জন্যেই রােমান্টিক। অত্যন্ত বাজে কথা—অনিমেষ সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে লাগল। ৪ —বাজে কথা ? কে রােমান্টিক নয়, বলতে পারে? আচ্ছা, একটা দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। যুদ্ধক্ষেত্রের মতাে বাস্তব আর কিছুই হতে পারে না, সে কথা মানাে কিনা? মাথার ওপরে বােমা, সামনে শক্ত আসছে, মেশিনগানের গুলি কানের কাছে শিস দিয়ে যাচ্ছে, এর চাইতে নিষ্ঠুর রিয়্যালিটি আর কিছু নেই নিশ্চয়? মানলাম। —আচ্ছা বেশ। সেই যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বসে যাওয়া ট্রেঞ্চের ভেতরে এক সৈনিকের মৃতদেহ পাওয়া গেল। বুকের কাছে তার পকেট বইতে দেখা গেল একগুচ্ছ শুকনাে মৌশমী ফুলের পাপড়ি আর একটি মেয়ের ফোটো। তখন তাকে তুমি কী বলবে? -বলব, মেয়েটির সম্বন্ধে ভাবতে ভাবতে বেচারা বেহুশ হয়ে গিয়েছিল, সেই ফঁাকে শত্রুর বুলেট এসে তার পাঁজরা ফুটো করে ফেললে। অর্থাৎ নির্বুদ্ধিতার প্রায়শ্চিত্ত। কিন্তু ওসব অ্যাকাডেমিক তক এখন থাক— সিগারেটটাকে জুতাের তলায় মাড়িয়ে অনিমেষ বললে : ও রবারের মতাে, টানলেই বাড়তে থাকবে। তার চাইতে উঠে পড়া যাক—অস্ত্র রকমের রাত হয়ে গেছে। পৃথিবী আরাে নীরব, জ্যোৎস্না আরাে বিহবল, আমের মুকুলের গন্ধ আরাে গভীর আর জলটা আরাে জ্বলন্ত। অনিমেষের চোখের দিকে সন্ধানী দৃষ্টি ফেলল সুমিতা। অনিমেষ যা বলেছে, এ ওর নিজের কথা নয়। ওর মনের ভেতর যে সুরের সাড়া গুন গুন করে উঠেছে, তাকে গলার জোর দিয়ে চাপা দিতে চায়, বুলী করে আত্মনিগ্রহ করতে চায়। সুমিতা জানে, ওর সঙ্গে অনিমেষের মতের কোনাে তফাৎ নেই, বরঞ্চ যেগুলাে ও ভালাে করে বলতে পারেনি, তাদের আরাে চমৎকার করে আরাে সুন্দর করে বলতে পারত অনিমেষ। কিন্তু সে কথা সে বলবে না, নিজেকে শাস্তি দেবে; অনেক ৪৫ বিভ্রান্তিভরা রাত্রি—অনেক আত্মমগ্নতার দুর্বল মনােবিলাস, অনেক কাজে আর উজ্জয়িনীর স্বপ্নকে নিষ্ঠুর আঘাতে যেমন করে হােক সে ভেঙেচুরে দেবেই। পরম বস্তুবাদী আদিত্যদা আজো কবিতা পড়ে খুশি হতে রাজী আছে, কিন্তু অনিমেষ নয়। সে নােম্যান্টিক কবিদের—এবং সেই সঙ্গে নিজেকেও ফঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিতে প্রস্তুত। দুজনে আবার পথে নেমে পড়ল। আবার নীরবতা। দুজনেই দুজনকে সম্পূর্ণ করে বুঝতে পেরেছে, কিন্তু কোন উপায় নেই। জীবনের গতি যখন ঘুরেছে, তখন একান্ত করেই ঘুরেছে। কোন মধ্যপন্থা নেই, আজ আর কোনাে মধ্যপন্থার প্রশ্নও আজ অবান্তর। নিজের মনকে এখনাে বিশ্বাস করে না অনিমেষ, সুমিতাও না। একটুখানি চাদ আর একটুকু বিহ্বল মুহূত হয়ত আদর্শের দৃঢ় কঠিন প্রাচীরে এমন একটা ফাটল ধরিয়ে দেবে যেখান দিয়ে ঢুকবে অসংযমের বাঁধভাঙা বা প্রতিজ্ঞাকে সহস্র মুখে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে। তার চেয়ে এই ভালাে। কোনােদিন কবিতা ছিল না, কোনােদিন প্রেম ছিল না। একটা দুরপ্রসারী পথ—সংশয়ে শঙ্কিল, সঙ্কটে বন্ধুর। সে পথে পাশাপাশি চলেছে দুজনে। সুমিতার চোখ থেকে দুটি শান্তাজ্জল সন্ধ্যা-নক্ষত্র নিবে গেছে অনেকদিন আগে, শুধু সেখানে জ্বলে যাচ্ছে উদ্ধার প্রখর শাণিত শিখা।••••••••• •••••••••চমক ভাঙল। অনিমেষ পাশে নেই। কয়েক মাস আগে সে বেরিয়ে চলে গেছে একটা গুরু দায়িত্ব নিয়ে, চা-বাগানে অর্গানাইজেশন গড়ে তুলতে হবে। ধনতান্ত্রিক শােষণের অন্যতম চুড়ান্ত রূপ হচ্ছে চা-বাগান। সেখানে এখনাে আফ্রিকার আদর্শে রাজ্যপাট চলছে। সেখানে শ্রমের দাম নাম মাত্র, জীবনের দামও প্রায় তাই। ম্যালেরিয়া আর কালাজ্বর মানুষের জীবনীশক্তিকে নিঃশেষ করে দিয়েছে, যেটুকু বাকী আছে, তাকে শেষ করে দিচ্ছে ম্যানেজার থেকে নিম্নতম বাবুটি পর্যন্ত। বাইরে থেকে কারাে সেখানে ৪৬ ঢুকবার জো নেই—যে ঢুকবে তাকে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে বিতাড়িত করবার ব্যবস্থা হবে। তাই আদিত্য অনিমেষকে পাঠিয়েছে বাগানে। যেমন করে থােক ঢুকতে হবে, যেমন করে হােক বহুদিনের নিশ্চিন্ত রাজ্যপাটে ফাটল ধরাতে, হবে। অনিমেষ চলে গেছে কয়েক মাস আগে, নানা বাগানে ঘুরে একটা সাহেব বাগানে চাকরী জুটিয়েছে। কাজকর্মও করছে ভালাে। তারপর দিন তিনেক আগে এসেছে দুঃসংবাদ। কী একটা অঘটন ঘটেছে, ছুটে গেছে আদিত্য। অনিমেষ আদিত্যের ডান হাত-—তাকে বাদ দিলে এক- মুহূত তার চলে না। অথচ এ পর্যন্ত অনিমেষ বা আদিত্য কারাে খবর এল না। তার কাছে নয়, মাণিকাদির ওখানেও নয়। কী যে হয়েছে কে জানে। রেলিঙে ভর দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে তেমনি করে দাড়িয়ে রইল সুমিতা। সমস্ত চৈতন্যটা যেন বিশৃঙ্খলভাবে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে। ঠিক উৎকণ্ঠা বােধ হচ্ছে তা নয়—কেমন একটা অনাসক্তি তাকে যেন আচ্ছন্ন করে ধরেছে। সুমিতা বুঝতে পারছে লক্ষণটা ভালাে নয়—হারানাে চাদ তার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে, তার রক্তে রক্তে ছায়া সঞ্চার করছে। তাই অলক্ষ্যে থেকে অনিমেষ নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আত্মস্থ হওয়ার চেষ্টা করলে সুমিতা। শীতের রােদে চাপা ফুলের রঙ। সামনে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে গাড়ীর শ্রোত।. একখানা এ-আর-পি’র মােটর তীরবেগে বেরিয়ে গেল—যেন ভবিষ্যৎ কর্মতৎপরতার আভাস দিচ্ছে। দেওয়ালে দেওয়ালে পড়েছে সতর্কতামূলক পােস্টার। ওপাশের লাল বাড়িটার গায়ে দুজন বিকৃত বীভৎস-মুখ জাপানীর চিত্র। একজন হাতে ফুলের মালা নিয়ে পরম স্নেহভরে বেতারে বক্তৃতা দিচ্ছে আর একজন জানােয়ারের মতাে ৪৭ বত্রিশটা তীক্ষ্ণ দাত বের করে তার পেছনে সঙ্গীন উচিয়ে আছে। প্রচার পত্র বড় বড় হরফে বলে দিচ্ছে? ভুলেও ভুলবেন না—এরাই আপনাদের শত্রু হঠাৎ হাসি পেল। ছবিটা একেছে মন্দ নয়। মানুষকে কত বিকৃত করে দেখানাে যায় তার নমুনা। জাপানীরা ইংরেজের কী জাতীয় কার্টুন আঁকে জানতে ইচ্ছা করে—অন্তত তাদের হাতে কী রকম রূপ পায় উইনস্টন চার্চিলের মুখখানা। বাড়ির নীচে দুখানা রিকসা এসে থামল। সুমিতার দৃষ্টি উৎসুক হয়ে উঠল মুহূর্তে। চারটি ছেলে নেমেছে রিকসা থেকে। বার বার করে তারা বাড়ীর নম্বর মিলিয়ে দেখল, তারপর তাকালাে এ ওর মুখের দিকে। যেন ব্যাপারটা তারা বিশ্বাস করতে পারছে না। মাণিকতলার একটা অন্ধকার থােলার ঘর থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের এই রাজ প্রাসাদে তাদের পদোন্নতি--এটা যেন তারা স্বপ্নেরও অতীত বলে মনে করছে। সুমিতা সকৌতুকে তাদের লক্ষ্য করতে লাগল। একজন বললে, সুর, ভুল হয়েছে। আর একজন জবাব দিলে, কেমন করে হবে? এই তাে নম্বর। কিন্তু ইতিমধ্যে বাকী দুজন তেতলার বারান্দায় দেখে ফেলেছে সুমিতাকে। উল্লাসে তারা চীৎকার করে উঠল। আরে, ওই তাে সুমিতাদি। চারজনের দৃষ্টি একসঙ্গে সুমিতার ওপরে গিয়ে পড়ল। সত্যিই সুমিতাদি-অবিশ্বাস্য হলেও এ বাড়ির মালিক এখন তারাই। খােলার ঘরের অন্ধকারে ঠাণ্ডা মেজেতে শুয়ে শুয়ে আর ইদুর তাড়াতে হবে না, মন্ত বাড়িতে নিশ্চিন্ত আরামে রাজার হালে তারা ঘুমুতে পারবে। —ও সুমিতাদি, ভেতরে যাবে কোন রাস্তায়? সৰ তত বন্ধ। -দাড়াও ভাই, আমি আসছি, সদর খুলে দিচ্ছি। দ্রুতগতিতে ভেতরে চলে এল সুমিতা, তর তর করে নামতে লাগল ৪৮ সিড়ি দিয়ে। পাটির ছেলেরা এসে পড়েছে। এখন তার অনেক কাজ। এই 'ভবঘুরে বাউণ্ডুলে ছেলেগুলাের দায়িত্ব তাকে নিতে হবে—এদের সামলাতে হবে, এই হচ্ছে আদিত্যদার আদেশ। অনিমেষের কথা ভাববার সময় নেই এখন আদিত্যেরও নয়। সুমিতার এখন অনেক কাজ। । [ ৪ ] কলকাতায় সম্পূর্ণ ব্ল্যাক-আউট হয়নি, শুধু আললাগুলাের মুখে কালাে ঘােমটা নেমেছে। মাঝে মাঝে পুরাে অন্ধকারের মহড়া চলে ; অস্বাভাবিক একটা বিভীষিকার মতাে অন্ধকারের কালাে গুণ্ঠন কলকাতাকে ঢেকে দেয়—ট্রাফিক থমকে দাড়ায়, চারদিকের বাড়ীঘরগুলাে থেকে দানবীয় চীৎকার ওঠে। সে চীৎকার আনন্দের না ভয়ের ঠিক বােঝা যায় না। মােড়ের বিড়িওয়ালা অশ্লীলভাবে অশ্লীলতম একটা গানের কলি চীৎকার করে ওঠে—মনের নিরুদ্ধ পশুটাকে মুক্তি দেবার পক্ষে এর চাইতে চমৎকার সুযােগ আর কী হতে পারে ? মনে হয় এ অন্ধকার কলকাতার ওপরতলার নয়-নীচের ড্রেন পাইপের কালাে গতের থেকেই এ বস্তু ওপরে ঠেলে উঠেছে। তেমনি বিষাক্ত, তেমনি শ্বাসরোধী, তেমনি কদর্য আর তেমনি পূতিগন্ধী। আর বাকী সন্ধ্যাগুলাে ঘােমটা-পরা আলাের অনুগ্রহে অস্বচ্ছ, অনুজ্জ্বল। একটা প্রেতপিঙ্গল আভায় চারদিকের মানুষ-জন, বাড়িঘর গাড়ি-ঘােড়া- সব যেন অশরীরী ছায়ামূর্তির মতাে নাচতে থাকে। সব বদলে গেছে, সব অন্যরকম হয়ে গেছে। এ কলকাতা আলাদা। এ কলকাতা অচেনা। এখানকার মানুষগুলাে একটা পাথরের মতাে গুরুভার ভয় বুকে চাপিয়ে নিয়ে যেন শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে। আর পালাচ্ছে প্রাণপণেF ৪৯ পালাচ্ছে কুৎসিতভাবে-প্রাণরক্ষার একটা ঐকান্তিকী জৈব তাড়নায়। থাকিতে চরণ মরণে কি ভয় নিমেষে যােজন ফরসা’-—পথ চলতে চলতে চলতে এই গানের কলিটাই বার বার করে আদিত্যের মনে পড়ছিল। একহাতে একটা ছােট সুটকেশ নিয়ে হন হন করে এগিয়ে আসছিল আদিত্য। সাড়ে দশটার ট্রেনটা তাকে ধরতে হবে—যদিও ট্রেন ছাড়তে এখনও দু ঘণ্টার ওপর দেরী আছে। গাড়িটা সাইডিং থেকে এসে প্ল্যাটফরমে ই করার আগেই চলতি অবস্থায় তাতে ঝাঁপিয়ে উঠতে হবে-একেবারে ওস্তাদ সঁতারুর ডাইভ করবার কায়দায়। না হলে পরমুহুতে লাঠিঠ্যাঙ্গা এবং বিপুল জনতার এমন তরঙ্গ আসবে যে, মুহুতে পিষে ফেলে দেবে একেবারে। যতই আত্মবিশ্বাস থাক, গণদেবতার এই ভৈরব-সংঘাতকে ভয় করে না, এত বড় সাহসী পুরুষ আদিত্য নয়। বড় রাস্তা বিপজ্জনক। একচোখে মােটরগুলো এর মধ্যেও পাগলের মতাে ছুটছে। আলােটা মােটরের কোন্ দিকে যে জলছে, ঠিক ঠাহর করা যায় না—বিব্রত পথচারী পাশ কাটাতে গিয়ে অনেক সময় সােজা মােটরের তলায় গিয়ে ঢােকে। সুতরাং সন্ধ্যার পর গলিই নিরাপদযদিও এর মধ্যেই গুণ্ডার আবির্ভাব ঘটেছে শহরের অন্ত-প্রত্যন্তে। অন্ধকার কলকাতার ভূগর্ভবাহী বিষদিগ্ধ নালাগুলাে থেকে দানবের আনাগােনা শুরু হয়েছে। তবু গলিই ভালাে। পায়ের নীচে ও পাকার আবর্জনা নাড়িয়ে আদিত্য এগােতে লাগল। চাপা গলির দুপাশে বীভৎস দুর্গন্ধ পাক খাচ্ছে। তার ওপরে খাদ্য খুঁজছে পথের কুকু-অন্ধকারে তাদের চোখগুলাে বুননা জানােয়ারের মতাে জ্বলছে। ওই কুকুরগুলােকে দেখেও এখন ভয় করে। শ্মশান-কলকাতার বুকে যেন ওরা সুশান-কুকুরভীত আতঙ্কিত মানুষের কাঁধের ওপরে এই সুযােগে ওরা বাঘের মতাে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। .

চুরুটটা ধরিয়ে নেওয়া দরকার। এই আবর্জনার ভেতরেও আদিত্য দাড়িয়ে পড়ল। পকেট থেকে দেশলাই বার করে একটা কাঠি ধরালাে। সঙ্গে সঙ্গে একটা চাপা তিরস্কার। -আসবে তত এসাে না। অত পরখ করবার কী দরকার? আদিত্য চমকে উঠল। ভৌতিক গলা নাকি? না-ভুতের চাইতেও মারাত্মক। অন্যমনস্ক আদিত্যের এতক্ষণ চোখেই পড়েনি এই সরু গলির দুপাশের বােয়াকে আর দরজায় কারা মূর্তির মত স্থির দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বিড়ি টানছে, কেউ সিগারেট। এতটুকু দেশলাইয়ের কাঠি, এইটুকু আলাে। তবু মলিন অন্ধকার গলিটা . যেন অতিরিক্ত আলাে হয়ে উঠেছে—আলাের খোঁচা তীক্ষমুখ আলপিনের মতে গিয়ে বিধছে নিশাচরীদের চোখে। দুপাশে রং-বেরংয়ের কাপড়-পরা বিকৃত নারীপণ্য। কলকাতার পয়ঃপ্রণালীর আরেক রূপ। কুর বিসর্পিল কামনার কদর্য প্রবাহিকা। –দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছ কী? আসবে তাে চলে এসাে না নাগর। দুপাশের মূর্তিগুলাে প্রেতিনীর মত খিল খিল করে হেসে উঠল। নিশ্চয় ভেবেছে নবাগত—এ পথে নতুন সংশয়গ্রস্ত পথিক। চুরুট আর ধরানাে হল না, পালাতে পারলে বেঁচে যায় আদিত্য। --আহা, পালাচ্ছ কেন? টাকে পয়সা নেই বুঝি ? খালি দেখেই মুখ । আদিত্য প্রায় ছুটে চলেছে একরকম। পেছন থেকে হাসির আওয়াজ কানে আসছে, ওর কাপুরুষতায় ভারী কৌতুক অনুভব করছে ওরা। গলি দিয়ে আসতে গিয়ে এই বিড়ম্বনা। শর্টকাট করবার বিয় অনেক। কিন্তু আদিত্য ভাবতে লাগল। এরা এখনাে দাড়িয়ে আছে, এখনাে প্রতীক্ষা করে আছে কিসের আশায় ? ওদের খদ্দেরেরা তাে প্রায় পালিয়ে প্রাণ ৫ বাঁচিয়েছে—ওদের কি কোনখানে যাওয়ার জায়গা জুটল না? পরিত্যক্ত কলকাতার পাপ আর আবর্জনার বােঝর সঙ্গে ওরাও কি এইখানেই পড়ে রইল। সভ্যতার যে নরকে এসে ওরা নেমেছে, সেখানে ওদের নতুন করে কিছু ভাববার নেই, ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকবার জন্যে ওদের যে দুঃসহ যন্ত্রণা, জাপানী বােমা তার চাইতে বেশি দুঃখ ওদের আর কী দিতে পারে? সমাপ্তি ঘটে অকথ্য ব্যাধিতে জর্জরিত হয়ে, গুণ্ডার ছুরি আর মদের গ্লাসের আসেনিকে, একেবারে একটা বিকট বিস্ফোরণের মধ্যে সেই সমাপ্তি যদি ওদের কাছে নেমে আসে, তাহলেও ...অনুযােগ করবার কিছুই নেই ওদের। চলার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাও দ্রুতগতিতে চলছিল। তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌছনাে দরকার। পরে আর গেটের ভেতর ঢােকা যাবে না। অনিমেষের খবরটা দুশ্চিন্তার একটা পাথরের মতাে চেতনার ওপরে চেপে বসেছে। কী যে হয়েছে, কে জানে—ডুয়ার্সের জঙ্গলে যে কোন রকম ঘটনা যে কোন মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে। চাকরদের অপরিসীম মহিমা আর দোর্দণ্ড প্রতাপের ইতিবৃত্ত অজানা নেই আদিত্যের। কিন্তু চিন্তায় ছেদ পড়ে গেল। ছােট গলির পাশে আবার কানাগলি। কোন অ্যাসিডেন্টের ফলেই বােধ হয় সেখানে আধখানা গ্যাস জ্বলছে। তারই আলােয় দেখা গেল, কাণাগলির ভেতর দিয়ে টলতে টলতে একটি কাপ্তান বেরুল। যাক, বােয়াকে যারা দাড়িয়ে আছে, তাদের একেবারে হতাশ্বাস হওয়ার মতাে অবস্থাটা এখনাে ঘটেনি তাহলে। লােকটা একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছিল। পরম বিরক্তিভরে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে আদিত্য, এমন সময় আধখানা • গ্যাসের আলােয় আদিত্য তাকে চিনতে পারল। এবং চেনবার সনে ৫২ সঙ্গেই বিস্ময়ের একটা প্রচণ্ড চমক তার সমস্ত শরীরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেল! লােকটি হেমন্তবাবু। হেমন্তবাবু। তাদের পাড়ারই মানুষ। কী একটা ব্যাঙ্কের সামান্য কেরাণী, আধবুড়োে নিম্নবিত্ত ভদ্রলােক। শান্ত এবং নির্জীব। নটা না বাজতেই অফিসে ছােটে, ফেরে বিকেল পাঁচটায়। নিজের দীনতায় সব সময়ে নীচু হয়ে থাকে—সহজে চোখ তুলে কারও সঙ্গে কথা বলে না। সেই হেমন্তবাবুর পেটে পেটে এই বিদ্যে । হেমন্তবাবু তাকে চিনেছে। অথচ আশ্চর্য, লােকটা লজ্জা পেল না ! বরং পরম কৌতুক ও কৌতুহলভরে হাে হাে করে মাতালের হাসি হেসে উঠল। -কী দাদা, তুমিও এই দলে? বাইরে ভালাে মানুষটি, ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানাে না, আর ভেতরে ভেতরে আঁ— হাসির আবেগে টলে পড়ে যাচ্ছিল হেমন্তবাবু, হঠাৎ গ্যাসপােস্টটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিলে। আদিত্য বললে, পথ ছাড়ুন। বুড়াে বয়েসে এসব করে বেড়াচ্ছেন, লজ্জা করে না আপনার ? লজ্জা? লজ্জা কিসের বাবা? ওসব তােমাদের ভূষণ। আমাদের তাে পেটেও নেই, পরণেও নেই। একটু ফুরতি করব, তাতেও তােমরা বাগড়া দিলে চলবে কেন ? —পথ ছাড়ুন। আদিত্য অধৈর্য আর বিপন্ন বােধ করতে লাগল। পথ ছাড়ব ? আচ্ছ বেশ। কিন্তু সােণার উঁদ, একটা কথার জবাব দাও দিকি। তােমরা সব ভালাে লােক--তােমাদের এত ভালাে ভালাে। জায়গা থাকতে আমাদের এই হাড়কাটায় এসে ঢুকলে কেন? সবই তাে বাবা নিয়েছ, ভালাে চাকরী, ভাললা বাড়ি, ভালাে খাবার আমাদের খেলী পাঁচী বিদ্যেধরীদের দিকে হাত বাড়াতে চাও? এমনিতে পথ ছাড়ব না বাপধন, কৈফিয়ৎ চাই। আশ্চর্য, হেমন্তবাবুও কৈফিয়ৎ চায়। সেই কোলকুঁজো লােকটা, যার মেরুদণ্ড চাকরীর চাপে ধনুকের মতাে বাঁকানাে, পৃথিবীর সকলের কাছে মাথা নুইয়ে দুইয়ে যার ঘাড় ঝুলে পড়েছে, সে কিনা আদিত্যের কাছে কৈফিয়ৎ চাইতে এল। যার জোর গলার আওয়াজ কেউ কখনাে শুনতে পেয়েছে কিনা সন্দেহ-সেই হেমন্তবাবু যেন সম্রাট আলেকজাণ্ডারের মতাে অকস্মাৎ উদাত্তকণ্ঠ হয়ে উঠেছে। তার নির্বোধ ভীত চোখে যেন হঠাৎ জলে উঠেছে পৌরুষের আগুন। একি শুধুই মদের নেশা, না আরাে কিছু আছে এর পেছনে? বাইরের পৃথিবীতে, সভ্য ভদ্রলােকের জগতে ভয় পায় হেমন্ত- বাবুরা, তারা চোখ তুলে চাইতে জানে না, কথা কইতে ভরসা পায় না। সেখানে যেন তারা অনধিকারী। কিন্তু এই অন্ধকার হাড়কাটা গলিতে তারা যেন নিজের রাজ্য ফিরে পায়, মদের তরল তীক্ষ্ণ ধারা তাদের বুকের মধ্যে প্রদীপ্ত পৌরুষকে জ্বালিয়ে তােলে-নিজস্ব গৌরব এবং মর্যাদায় তারা আদিত্যদের পথ আটকায়, জবাবদিহি দাবী করে। আদিত্য বললে, হেমন্তবাবু সরুন, আমাকে স্টেশনে যেতে হবে। স্টেশনে ? তাই বলল। পালাও বাবা পালাও। কলকাতায় মধু নেই তাে, এখন সটকান দিয়ে প্রাণ আর পিত্তি রক্ষে কবরী। তােমরা সব সুখের পায়রা হে-হে-হে- আবার প্রচণ্ডভাবে হাসতে শুরু করে দিলে হেমন্তবাবু। থুথুর কণা ছিটকে এসে আদিত্যের মুখে এসে পড়তে লাগল, নাকে আসতে লাগল দিশি মদের উগ্ৰ অম্ল গন্ধ। আদিত্যের ইচ্ছে করতে লাগল এক ধাক্কা দিয়ে ডাস্টবিনের মধ্যে উল্টে ফেলে দেয় হেমন্তবাবুকে—তার সময় নেই, এর পরে আর প্ল্যাটফর্মে ঢােকা যাবে না। কিন্তু হেমন্তবাবুর বলার মধ্যে এক বিন্দুও সত্যি নেই কি ? -আপনি পথ ছাড়বেন, না ধাক্কা মেরে চলে যাবাে? ছাড়ব বইকি, ছাড়ব বইকি। আপনাদের পথ কি আমরা কখনাে আটকাতে পারি স্যার? আপনাদের দামী জীবন স্যার—পাঁচ শশ সাত শাে হাজার টাকা মাইনে পান, আপনাদের মারতে পারে কে? কিন্তু আমার তাে পালাবার উপায় নেই, ঘুষ দেবারও পয়সা নেই। বােমা খেয়ে ঘরে বউ ছেলেমেয়ে মরুক, এখানে আমি পাঁচীকে আঁকড়ে নিয়েই উড়ি। যাঃ- শালা, চুকে যাক ল্যাঠা। হাতের কাছে পাঁচীকে পাওয়া গেল না, কাজেই ল্যাম্পপােষ্টকে আঁকড়ে হেমন্তবাবু মাটিতেই বসে পড়ল। —এই বসলাম। বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পাদমেকং উহু। এসাে বাপ জাপানী বােমা, তােমার সঙ্গেই মােলাকাৎ হােক। পাশ কাটিয়ে তীরের মতাে এগিয়ে গেল আদিত্য। পেছনে তখন চিরনির্বাক হেমন্তবাবু প্রাণ খুলে একখানা বিচিত্র দুর্বোধ্য গান ধরেছে—হয় তাে পেশােয়ারী ফুংরী কিংবা আফগানী গজল। আর গলি নয়, ঘুরে ফিরে এবার মীর্জাপুর স্ট্রীট। ওদিকের ফুটপাথে পানের দোকানে কতগুলাে লােক জটলা করছে। লুঙ্গি, লাল গেঞ্জী আর গিলে করা পাঞ্জাবীপরা গুণ্ডা-শ্রেণীর লােক। পান খাচ্ছে, সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াচ্ছে। নিশ্চিন্ত আর নির্ভীক। ওরা জানে ওদেরই দিন এসেছে এইবারে। তবু ওর ভেতর থেকে একজন আদিত্যকে দেখেই চট করে উঠে দাড়ালাে। তারপর নিতান্ত উদাসীনের মতাে যেন সান্ধ্য ভ্রমণ করবার জন্যেই ধীর মন্থরগতিতে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করে দিলে। ৫৫ কিন্তু আদিত্যের দৃষ্টি এড়ালাে না। টিকটিকি। এই ডামাডােলের মাঝখানেও ভয় পায়নি, কর্তব্য বুদ্ধি হারায়নি। বরং ভারতরক্ষা বিধান আইনে অনেকগুলাে নতুন হাতিয়ার পেয়েছে হাতে। ওদের প্রভুভক্তি অতুলনীয়-মরে নিশ্চয়ই কুকুরের স্বর্গলােক লাভ করবে। আদিত্য তাড়াতাড়ি চলেছে, লােকটারও যেন কাজের তাগিদ বেড়ে গেছে অত্যধিক পরিমাণে। যেন সাড়ে দশটার ট্রেনটা না ধরলে ওরও চলবে না-অনিমেষের মতাে ওরও কোন বিপন্ন বন্ধু সেখানে হাপিত্যেশ করে বসে আছে। কিন্তু ওদিকে লক্ষ্য রেখে লাভ নেই। যা খুশি করুক—যতটুকু পারে কর্তব্য পালনের আনন্দটা উপভােগ করে নিক। কিন্তু আসছে শিয়ালদা স্টেশনের মহাসাগর, সেখানে ওর যে কিছুই করবার নেই, আদিত্য তা ভালো করেই জানে। অনুমানটা একেবারে মিথ্যাও হল না। মেইন গেটে ঢােকবার মুখেই বাক্স প্যাটরা, মানুষ, রিকসা, ঘােড়ার গাড়ি আর চারদিকের প্রায়ান্ধকারে একেবারে হারিয়ে গেল আদিত্য, হারিয়ে গেল সমুদ্র বেলায় একটি বাণিবিন্দুর মতাে। সরকারের ঘ্রাণকুশল বুলডগ এই জনারণ্যে তাকে খুজে পেল না। সে খুঁজে পাবে কি, নিজেকেই নিজে খুঁজে পায়না আদিত্য-এমনি কী করে যে ট্রেনে উঠল নিজেও তা ভালো করে বুঝতে পারল । কয়েক মুহূর্ত পিণ্ডাকার ধ্বস্তাধস্তি, তারপর একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় বন্দুকের গুলির মতাে জানালা ডিঙ্গিয়ে ভেতরে ছটকে পড়ল একখানা বেঞ্চের ওপর। তারপর টাল সামলে দাঁড়াতে গিয়ে দেখল কাঠের দেওয়াল ঘেষে বেঞ্চের এক পাশে ইঞ্চিকয়েক জায়গায় সে কচ্ছপের মতাে সংকীর্ণ হয়ে আছে। কোন অবস্থাতেই মানুষের যে অতখানি সংকুচিত হওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে—এটাকে একটা নতুন অভিজ্ঞতা বলে মনে হল। মাত্র দু মিনিট কি তার চাইতেও কম। তারপরে আর সর্ষে ফেলবার জায়গা রইল না। গরমে নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম—দর দর করে ঘামের স্রোত নেমে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিতে লাগল। আর এরই মধ্যে চোখে পড়ল ঘড়ির কাচটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, শক্ত খদ্দরের পাঞ্জাবীটাও আধাআধি ছিড়ে নেমেছে একরকম। নিশ্চিন্ত আরামে একটা চুরুট ধরালাে আদিত্য। তবু সে উঠতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত, গিয়ে পৌছুতেও পারবে হয়তাে। কিন্তু বাইরে প্রলয় কাণ্ড শুরু হয়েছে তখন। যারা ভেতরে উঠতে পেরেছে তারা আর অপেক্ষা না করে পত্রপাঠ নামিয়ে দিয়েছে শার্শী আর কাচের জানালাগুলাে। যারা বাইরে আছে তারা দমাদম শব্দে বন্ধ দরজা জানলায় কিল ঘুষি চালাচ্ছে শাঠির ঘা মারছে। . আর সবশুদ্ধ এমন দানবীয় কোলাহল উঠছে যে কানের পর্দা ফাটবার উপক্রম। ঝন ঝন ঝন প্রচণ্ড আঘাতে ওদিককার একটা কাঁচের জানলা ভেঙে পড়েছে। তীরের মতাে কাঁচের টুকরাে উড়ে এল, তারপরেই একটা অস্ফুট আর্তনাদ। আহা-হা- —একদম খুন কর দিয়া মারাে শালাকে। তারপর ভেতরে বাইরে অশ্লীলতম ভাষায় গালাগালি। ভদ্রাভদ্র, বাঙালি হিন্দুস্থানীর বাছবিচার নেই, ভয়ের মর্মান্তিক তাড়নায় মানুষ তার খাঁটি অনার্য আদিমতাকে খুঁজে পেয়েছে। আদিত্য চুরুট টানতে লাগল। কামরায় বাতাস আসবার এতটুকু পথ নেই। যেটুকু ছিল তা এত মানুষের নিশ্বাসে বিষাক্ত হয়ে গেছে। তার সঙ্গে মিশেছে রাশি রাশি বিড়ি সিগারেট, সেই সঙ্গে নিজের চুরুটের ধোঁয়া। পাশেই ল্যাভেটরী, মানুষের চাপে তারও দরজাটা একেবারে খােল— দুর্ভাগ্যের যেটুকু বাকী ছিল, ওখান থেকে যে তীব্রতর গন্ধটা আসছে তাতে তাও পূর্ণ হয়ে গেছে। রুমাল ঘুরিয়ে আদিত্য বৃথাই খানিকটা বায়ুলাভের চেষ্টা করতে লাগল। চারদিকে আলােচনার আর বিরাম নেই। কান্নার শব্দও শােনা যাছে। কারাে কাছে একটি কচি শিশু আছে বলে মনে হয় মাঝে মাঝে প্রবলবেগে সে ডুকরে উঠছে। নিশ্চয় কামরায় ওঠবার সময় সেই মল্লযুদ্ধের পরে কোথাও চোট লেগেছে তার। একটা বিরক্ত পুরুষ-কণ্ঠ বীভৎসভাবে ধমক দিচ্ছে : চুপ চুপ! গলা টিপে মেরে ফেলব কিন্তু। গলার আওয়াজে মনে হল কাজটা তার পক্ষে একেবারে অসাধ্য ব্যাপার নয়। বাঙলা-হিন্দী-উর্দুতে মেশানাে আলাপ-আলােচনা তাে চলছেই; কেউ শােক করছে অমন কারবারটা এবারে গেল ; কারাে চাকরির মায়া ছাড়তে হয়েছে, এবার দেশে ফিরে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা ছাড়া আর উপায়ান্তর নেই। তেতারিয়ার মা ব্যাকুল স্বরে বলছে, তার জোয়ান মেয়েকে সে হারিয়ে ফেলেছে, এই ভিড়ের মধ্যে কোন্ গাড়িতে কাদের পাল্লায় সে পড়েছে কে জানে। কোন এক অতুলদার কোন এক ভাই তার বৌদিকে বােঝাচ্ছে যে, অতুলদা অত্যন্ত হুশিয়ার মানুষ—তার জন্যে ভাবনার কিছুমাত্র কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু অতুল-বৌদি বুঝছেন না—তিনি ফঁাচ ফঁাচ করে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছছেন—গাড়ির অনুজ্জ্বল আলােতেও তার কপালের সিন্দুর বিন্দুটা বড় বেশি জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। অশ্লীল ইয়ার্কিও চলছে, চলছে হিন্দী সিনেমার গান। ওদিকে স্ত পাকার একটা বিছানার ৫৮ ওপরে আসীন দুজন প্রৌঢ়বয়সী হিন্দুস্থানী এর ভেতরেও সুর করে কী একখানা ধর্মগ্রন্থ পাঠ শুরু করেছে—খুব সম্ভব তুলসীদাসের ‘রাম-চরিত মানস’। শ্মশান বৈরাগ্যই বােধ হয়। বাইরে প্রবল কোলাহলে স্টেশন ফেটে যাচ্ছে, ভেতরে যারা আছে, তাদের সে সম্বন্ধে কোন প্রক্ষেপ নেই। যেন জাহাজ ডুবছে—সেই অবসরে তারা লাইফবােট আশ্রয় করে সমুদ্রে ভেসে পড়েছে। আর রাজনীতি, যুদ্ধের আলােচনা তাে আছেই। জাপানী লােগ তাে আ গিয়া। জরুর। মাণিক লালজী বােলা রহা কি দো-চার রােজ মে কলকাতা একদম চুর চুর হাে যায়ে গা । -অ্যায়সা-ই? —আখবার নেই দেখা ? রংগুণমে ভি ভারী জং লাগ গিয়া—অংরেজ লােক একদম- হাঃহাঃহাঃ- -হ-অায়সা? —ও আর কিছু হবে না দাদা। সিঙ্গাপুরে প্রিন্স অব ওয়েলস আর রিপালসের সঙ্গে সঙ্গেই যা হবার হয়ে গেছে। —সেদিন টোকিও রেডিও থেকে কী বলেছে শােনেন নি ? where is the great British Navy ? Under the sea! Where is the great Commander-in-Chief? He is commanding his fleet at the bottom of Pacific ! -বাঃ, বেড়ে বলেছে তাে। ব্যাটাদের বসবােধ আছে। —আজকের কাগজ দেখেছেন তাে? রেঙ্গুনে শত্রু-বিমানের বােম বর্ষণের ফলে কয়েকজন অ-সামরিক হতাহত হইয়াছে। ক্ষতির পরিমাণ নগণ্য। ১ -তাই বটে! দেখুন গে, এতক্ষণে সব লেভেল করে দিয়েছে। মিথ্যে কথা তাে বলবেইলােকের মােরেল’ ঠিক রাখা চাই তাে। -হা-হা-মােরেল। ও নিয়ে আর মােড়লী না করে নিজেদের ‘মােরেল’ ঠিক রাখুক গেযুদ্ধটা জিততে পারবে। হ', জিতবে। গােড়া থেকেই তারই তাে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। -আহা ঘাবড়াচ্ছেন কেন! এ হচ্ছে স্ট্রাটেজির যুদ্ধ-ওয়ার অব নার্ভস। ব্লিৎসক্ৰীগ দেখিয়ে চমক দিলেই হয়না মশাই, ওস্তাদের মার শেষ রাত্রে। -রাত তাে পুইয়েই গেল দেখতে পাচ্ছি। এর পরে আর মারের সময় আসবে কখন বলুন দেখি ? —আসবে আসবে। সেদিন কাগজে একটা স্ট্যাটিস্টিক্স দেখেন নি ? অ্যাংলাে-আমেরিকান এয়ার ফোস ইচ্ছে করলে তিন দিনে ফুজিয়ামা শুদ্ধ জাপানকে জাপান সাগরের নীচে পৌছে দিতে পারে। —তা ইচ্ছেটা তারা করছেন না কেন? আপনি মশাই দুখানা টেলিগ্রাম করে দিন না চার্চিল আর রুজভেল্টকে—কথাবাত শুনে মনে হচ্ছে, তাদের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা আছে আপনার। —ওরকম অ্যাটাক করছেন কেন মশাই? তর্ক করবেন তত ভদ্রভাবে -কী বললেন! আপনার কাছ থেকে ভদ্রতা শিখতে হবে নাকি ? মহা ভদ্রলােক দেখছি যে! বলি মশায়ের পেশাটা কী, নিবাস কোথায় ? তারপর ভদ্র-ভাষায় অভদ্র বাক্য বিনিময়। বাঙালি যুদ্ধ করতে পারে না, তাই যুদ্ধ করবার আগ্রহ ও উত্তেজনা এই পথেই ব্যয় করছে। মনে হল, এরা ইচ্ছে করলে এই মুহূর্তেই যুদ্ধের যা কিছু জটিলতার মীমাংসা হয়ে যেতে পারে। ৬০ থামুন দাদারা, আর বকাবকি করবেন না। এর পরে যে ইণ্ডিয়া ডিফেন্স-অ্যাক্টে পড়বেন, সে খেয়াল নেই বুঝি ? সরকারী প্রচার-পত্র পড়েন নি? শত্রুর কান চারিদিকেই খাড়া হইয়া আছে ? বেশ উপভােগ্য লাগছে আদিত্যের। আলােচনা শুধু শুষ্ক রাজনীতিই নয়—বেশ সরস, উপাদেয়। তবু এই ভালাে ট্রেনের এই আবহাওয়ার মধ্যে পাণ্ডিত্যের কূটতর্ক বরদাস্ত হত না। গরমে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে—অন্ধকূপ হত্যার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। দরজায় জানালায় সশব্দ আঘাতের বিরাম নেই। সমস্ত কোলাহল ছাপিয়েও শােনা যাচ্ছে বাইরে কে কাতরকণ্ঠে ডেকে ফিরছে : সুবােধ, সুবােধ কোথায় গেলিরে ? ও সুবােধ ? দরজার কাছে কার বিপর মিনতি : খােল দিজীয়ে—মেহেরবাণী ককে থােরা খােল দিজীয়ে নেহি নেহি- -মর জায়েগা, বালবাচ্ছা মর জায়েগা যে অবস্থা হয়েছে, দেখছ না ? কে কাকে বাঁচাতে পারে বাবা? ছােট ছেলেটি মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে এখনােধমকাতে ধমকাতে পুরুষটি হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, অথবা হয়তো যােগ দিয়েছে রাজনীতির উত্তপ্ত আলােচনায়। অতুল-বৌদির বিলাপের বিরাম নেই। দেবর অশ্রান্তভাবে সান্ত্বনা দিচ্ছে : কেন ভয় পাচ্ছ? যদি তেমন কিছু হয়, তাহলে পালিয়ে আসতে আর কতক্ষণ লাগবে ? কলকাতা থেকে রংপুর আর ক’ ঘণ্টার পথ! তাছাড়া অতুলদা তাে হুশিয়ার মানুষ—সব ঠিক হয়ে যাবে স্মরনে দেও। বৌদি। ঢং ঢং বাইরে ঘণ্টা বাজল। ট্রেন ছাড়বার সময় হয়ে এসেছে। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নড়ে চড়ে বসল আদিত্য পাড়ি ছাড়লে জানালা খুলবেহাওয়াও আসবে দু-চার ঝলক। যাক, বাঁচালে বাবা। বন্ধ দরজা-জানলার বাইরে শেষ আকুতি। ওদিকে কোথায় আর একখানা কাচ ভাঙল। আর একদফা গালাগালি উঠল উত্তাল হয়ে । সবাই পালাতে চায়, সবাই বাঁচতে চায়। কাউকেই দোষ দেওয়া চলে না। বাঁশি বাজলনড়ে উঠল গাড়ি। আস্তে আস্তে চলতে শুরু করে দিলে। হঠাৎ শােনা গেল : গেল, গেল। কে গেল কোথায় গেল, কে জানে। হয়তাে কোন গাড়ির হাত থেকে সােজা চাকার নীচে, অথবা প্ল্যাটফরমের ওপর। তা যাক-কারাে জঙ্গে কিছু ভাববার সময় নেই—নিজের কথা ভেবেই এখন পাচ্ছে না মানুষ। স্বার্থপরতা ? ভালাে ভালাে কথা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গেলে অর্থটা তাই হয়েই দাঁড়াবে বই কি। কিন্তু জীবন শুধু ভালাে কথাই নয়—বেঁচে থাকার নামই জীবন। সেই বাঁচাটা যে কত শক্ত, আজ তা মানুষ অস্থি-মজ্জায় টের পেয়েছে। আর সেই সঙ্গে ওর টের পেয়েছে, ভালাে কথা বলবার বা শােনবার ক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা। অন্তত দুর্দিনের আকাশে যখন জাপানী বােমার আবির্ভাব ঘটে, তখন সেই লগ্নটা পরার্থপরতার অনুকূল অবকাশ নয়। ট্রেন বেরিয়ে এসেছে প্ল্যাটফরম থেকে। ঝরাং ঝরাং করে দুপাশের কাচ আর কাঠের জানলাগুলাে খুলে যেতে লাগল—বাইরে থেকে ছুটে এল শীতরাত্রির হাওয়া। কিন্তু বাতাসটাকে তেমন তীব্র বলে মনে হল না, এতক্ষণ ধরে গরমে সেদ্ধ হওয়ার পরে যেন এই প্রয়ােজন ছিল। অন্ধকারের ভেতরে একে একে ছিটকে সরে যেতে লাগল নানা রঙের অসংখ্য আলাে, এঞ্জিনের সার্চ লাইট, শেড, থেকে বয়লারের রক্তিমাভা। অনিমেষের জন্ঠে সমস্ত মনটা উদ্বিগ্ন আর বিষন্ন হয়ে আছে। কী যে ७२ ঘটেছে ভালাে করে বােঝা যাচ্ছে না। যুদ্ধের সময়। পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্য বাদ ভয়চকিত হয়ে যেন অপমৃত্যুর প্রহর গুণছে। আমাদের যা করবার তা করতে হবে এখনি। হাতে হাত মেলাও ভাই, কাঁধে কাঁধ মেলাও। আদায় করে নাও যা তােমার পাওনা। কল-কারখানার হাতুড়িতে, ধানের ক্ষেতের কান্তের মুখে প্রতিষ্ঠা করাে তােমার দাবী-দাওয়াকে। অনেকবার অনেক ভুল করেছে—আর নয়। কিন্তু অনিমেষের কী হয়েছে কে জানে। চা-বাগানওয়ালাদের অসাধ্য কাজ সংসারে নেই কিছু। হঠাৎ চমক ভেঙে গেল। সামনের সীটে একটু এগিয়ে কে বলে ? লােকটাকে যেন চেনা চেনা ঠেকছে না?—হাঁ, চেনা লােকই বটে, শশাঙ্ক। শশাঙ্ক! শশাঙ্ক চমকে মুখ ফেলল। আদিত্যের দিকে চোখ পড়তেই সে যেমন ম্লান, তেমনি বিমর্ষ হয়ে গেল। মুখের ওপরে একটুকরো কৌতুকের হাসি খেলা করে গেল আদিত্যের। —কোথায় চলেছে শশাঙ্ক ? —রাজসাহী। রাজসাহী? রাজসাহী কেন ? শশাঙ্ক নিরুত্তর। মনে হল কী একটা কথা বলবার জন্যে নিজের ভেতরে সে অসহায়ভাবে খাবি খাচ্ছে, কিন্তু বলতে পারছে না। —পালাচ্ছ তাহলে? মিথ্যে বলতে পারলে সুখী হত শশাঙ্ক, কিন্তু বলতে পারল না। আদিত্যের নীল চোখ থেকে খানিকটা বিদ্যুতের মতাে তীব্র একটা কিছু এসে তার গায়ে বি ধছে। হঠাৎ শশাঙ্ক টের পেল বেঞ্চের ভেতরে বড্ড বেশী ছারপােকা, তাকে ভয়ঙ্করভাবে আক্রমণ করেছে।

—না, ইয়ে তা নয়, তবে বাবা লিখলেন কিনা— আদিত্যের কণ্ঠস্বরে ব্যঙ্গ ফুটে বেরুল। পিতৃভক্তির জন্যে এত সুনাম তত তােমার ছিল না। তাছাড়া প্রতিজ্ঞা করেছিলে, কলকাতা হাওয়ায় উড়ে গেলেও এখানেই তুমি পড়ে থাকবে। তা প্রতিজ্ঞার চাইতে পিতৃ- আজ্ঞাটাই বােধ হয় বেশি হয়ে উঠল? শশাঙ্ক তাকিয়ে রইল। অসহায়ভাবেমূঢ় একটা নির্বোধ জানােয়ারের মতাে। যেন আত্মসমর্পণ করে বসে আছে—যেন করুণা ভিক্ষা করছে আদিত্যের। সদর রাস্তা হলে ছুটে পালিয়ে যেত, কিন্তু এখানে ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। যে ভয় করছিল, সেই প্রশ্নটাই এল শেষ পর্যন্ত। -শীলার কী করলে? কী আবার করব ?—অনেকটা যেন মরিয়া হয়েই জবাব দিলে শশাঙ্ক। -কী করবে? আচ্ছা, আমি বলে দিচ্ছি। নিজে তাে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাচ্ছ, তাকে কার কাছে রেখে এলে ? —তার—তার-মাসিমার কাছে। —বাঃ, চমৎকার। আদিত্য হেসে উঠল ; চমৎকার। তােমার জন্যে সে বেরিয়ে এল ঘর-বাড়ি ছেড়ে, বাপ-মায়ের সম্পর্ক ত্যাগ করতে পারল, আর তুমি তাকে মাসিমার কাছে ফেলে চলে যাচ্ছ ? —কী করব? —মুখ চুণ করে শশাঙ্ক বললে : বাবার কাছে নিয়ে গেলে বাবা আমাকে সুদ্ধ বাড়ি থেকে বার করে দেবেন। আপনি বাবার মেজাজ জানেন না আদিত্যদা। এবার ঘৃণায় আদিত্যেরও আর কথা বোল না। কী কাপুরুষ—কী ইতর। শীলা ওর জন্যে সব ফেলে বেরিয়ে এসেছে—নিজের সমস্ত ভবিষ্যৎকে দু-হাতে ছিড়ে ফেলে দিয়েছে। আর সেই শীলাকে আজ আসন্ন ৪৪ বােমার অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে শশাঙ্ক—আকস্মিকভাবে পিতৃভক্ত হয়ে-ওঠা কাপুরুষ স্বার্থপর শশাঙ্ক। যুদ্ধের কালাে বিষ আজ ওর রক্তকেও জর্জরিত করে দিয়েছে, আজ ওর চেতনার প্রান্তে প্রান্তে নেচে বেড়াচ্ছে আদি মানবতার দানবীয় প্রেতচ্ছায়া! দাতের ফাকে ফাকে চাপা গর্জন বেরুলাে আদিত্যের। নীল চোখ যেন জ্বলে যেতে লাগল। যাক-বেশ করেছে। —আমি, আমি বাবার সঙ্গে একটু দেখা করতে যাচ্ছি। তিন চার দিনের মধ্যেই আবার কলকাতায় ফিরে আসব। আর কথা বাড়াতে প্রবৃত্তি হচ্ছে না আদিত্যের। শশাঙ্ক মিথ্যা কথা বলছে-অনিবার্যভাবেই মিথ্যা কথা বলছে। তার জন্যে কোনাে প্রমাণ প্রয়ােগেরই দরকার নেই। তার চোখ-মুখ, তার সন্ত্রস্ত ভঙ্গি সব কিছু এক সঙ্গে বলে দিচ্ছে, শীলার প্রতি প্রেমের চাইতে তার আরাে বড় তাগিদ আছে—সে জৈবিক তাগিদ, প্রাণটাকে বাঁচিয়ে রাখবার তাগিদ। একটু আগেই যে কথাটা ভাবছিল আদিত্য। নিজেকে ভালােবাসে বলেই সব কিছুকে ভালােবাসে মানুষ। প্রেম, মেহ, বন্ধুত্ব আর এথিক্‌সের সব তত্ত্বগুলাে এরই কষ্টিপাথরে নির্ভুলভাবে যাচাই হয়ে যায়। শশাঙ্কের দোষ নেই। শশাঙ্ক মুখ ফিরিয়েছে। জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে আদিত্যের নীল তীক্ষ্ণ চোখের সঙ্গে দৃষ্টি মেলাবার সাহস তার নেই। এক আধটা নয়—সবগুলাে কথাই মিথ্যে বলেছে সে। শীলাকে সে মাসিমার বাড়িতে রেখে আসেনি, কলকাতায় শীলার মাসিমা কেন, কোনাে আত্মীয়ই যে নেই একথা আদিত্য না জানলেও শশাঙ্ক জানে। চোরের মধ্যে রাত্রির অন্ধকারে বেরিয়ে পড়েছে শশাঙ্ক-একা ঘরে ঘুমের ঘােরে হয়তাে এখন তাকে বিছানায় হাতড়ে ফিরছে শীলা। কাল নিবন্ধিব নিঃসহায় কলকাতায় তার কী হবে সে কথা ভাববার মতাে মনের অবস্থা নয় শশাঙ্কের। একটা বােকা রােমান্টিক মেয়েকে নিয়ে দিনকয়েক প্রেম করা চলতে পারে, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎকে তার সংগে হত্যা করা চলে না, নষ্ট করা চলে না বাবার অতবড় জমিদারীটাকে। পৃথিবীতে শীলা একমাত্র নয় —অসংখ্য ; আর এই অসংখ্য শীলারা আছে বলেই শশাঙ্কদের জীবনে বৈচিত্র্য আছে-রােমাঞ্চ আছে। অনেক দিন ধরেই যা তার কাছে বােঝা হয়ে উঠেছিল, আজকের এই উপলক্ষ্যটাকে অবলম্বন করে সেটাকে ঝেড়ে ফেলেছে শশাঙ্ক-যুক্তি পেয়েছে। শীতের বাতাস নাসারন্ধ ভরে বুকের মধ্যে টেনে নিতে লাগল সে—আঃ। বাইরের দিক-চিহ্নহীন অন্ধকার আর অবারিত আকাশের রাশি রাশি তারায় তার মুক্তি যেন প্রসারিত হয়ে গেছে। আদিত্যের নীল চোখের আগুন এখন তাকে অস্বস্তির কাটায় পীড়িত করে তুলছে বটে, কিন্তু এ আর কতক্ষণ! ওদিকে নিবে যাওয়া চুরুটটাকে আবার ধরিয়েছে আদিত্য। হঠাৎ মনের সামনে ভেসে উঠেছে স্টেশনে আসবার পথে ভুল করে চুকে পড়া হাড়-কাটা গলির কথা। আধা-অন্ধকার—অথবা সম্পূর্ণ অন্ধকারে দেহপসারিণীরা সার বেঁধে দাড়িয়ে আছে। কেন যেন মনে হল ওদের দলে একদিন শীলাকে দেখতে পেলেও সে আশ্চর্য হবে না। আর শ্যাম্প-পােষ্ট ধরে টলছে মাতাল হেমন্তবাবু। পালান, পালান আপনারা। আপনাদের দামী জীবন, বাঁচাতে হবে। কিন্তু আমরা এখানকার আবর্জনা, এই আস্তাকুঁড়ে মরবার জছেই জন্মেছি। যদি বােমায় উড়ি তাে পাঁচীকে আঁকড়ে নিয়েই উড়ব। সুখের পায়রা আপনারাআনে মানে সরে পড়ুন। মানে মানে সরেই তাে যাচ্ছে সব। সুখের জন্যে যাদের বলি দেওয়া হয়েছে, যাদের নিঃশেষে নিষ্পেষিত করা হয়েছে, তারাই পড়ে থাকবে, তারাই শ্মশানে জাগিয়ে রাখবে কঙ্কালের বাসর। আজ তাদের প্রয়ােজন ফুরিয়েছে —আজ আর তাদের কেউ চায় না। যারা স্বর্গের অধিবাসীস্বর্গে তারাই যাবে, তাদের পবিত্র এটো পাতা ধুলােয় পড়ে থাকবে-হাওয়ায় উড়বে। কিন্তু শীলা ! অমন ফুলের মতাে মেয়েটা। জীবনে এমন ভুল কেন করল কেন শশাঙ্কের মতাে এমন একটা অপদার্থকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে বসল। এযে কতখানি অপাত্রে দান হচ্ছে, শীলার মতাে এমন বুদ্ধিমতী মেয়ে তা কি এক মুহূর্তের জন্যেও বুঝতে পারেনি। আজ শশাঙ্ক পালিয়ে যাচ্ছে প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে। পুরুষ মানুষের জীবনে ভুল দু'চারবার হয়েই থাকে— সেজন্যে কেউ ওকে অপরাধী করবে না—নিজের হারানাে অধিকারে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে শশাঙ্ক। কিন্তু শীলা ? শীলার কী হবে? গাড়ির ভেতরে কোলাহল চলেছে, তর্ক চলেছে, কান্নাকাটি চলেছে, কদর্য গালাগালি চলেছে, গান আর ধর্মগ্রন্থ পাঠ চলেছে। কিন্তু সব কিছুর পেছনে একটি সুর-সীমাহীন ভয়, আকুল অসহায়তা আর অন্ধ জৈবিক তৎপরতা। এ কিসের রূপ ? মনে হল : যেন ভারতবর্ষের পরিপূর্ণ একটা মূর্তি খণ্ডাংশ হয়ে এই কামরাটার ভেতরে এসে দেখা দিয়েছে। শতাব্দী- সঞ্চিত গ্লানি আর অপমানের বিকারে বিভ্রান্ত ভারতবর্ষ অলক্ষ্য নিয়তির শাসনে ছুটে চলেছে—কোথায় কোন দিকে—জানে না। আজ যুদ্ধ। পৃথিবীব্যাপী স্বাধীনতার সংগ্রাম—দেশে দেশে মানুষের হাতে আত্ম-প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। এদের হাতে সেই অস্ত্র থাকলে অন-যাত্রার ধারা কি বদলে যেত না? পলায়ন কি সেদিন হয়ে উঠত না অগ্রগামী সংশপ্তকের মুক্তি অভিযান ? জানলার বাইরে থরে থরে অন্ধকার। কল্যাণতম রূপের পাত্র অপাবৃত করে কবে সেখানে দেখা দেবে সবিতা-জ্যোতির্ময় হিরণ্য-পাণির সুপারথি কোন তমসা-তীর্থে সেই শুভযােগের প্রতীক্ষা করে আছে ?

পাঁচ দেখতে দেখতে সুমিতার চারতলা বাড়িটা প্রায় ভরে উঠল। যেখানে যেসব ছেলেরা ছড়িয়েছিল, তারা তাে এলই, মেয়েরাও বাদ গেল । আর এতগুলি ছেলেমেয়ের কতৃত্ব করবার ভার সম্পূর্ণভাবে এসে পড়ল সুমিতার ওপইে। কিন্তু কর্তৃত্ব করা কি সহজ? দিনের বেলা অবশ্য খুব বেশি অসুবিধা হয় না। আটটা নটা বাজতে না বাজতে ছেলেরা বেরিয়ে পড়ে নিজেদের এলাকায়। কেউ কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে নেয়, কেউ বা রেশনের থলে। বইতে আর কাগজপত্রে সেগুলােকে একেবারে ঠাসাঠাসি করে তারা নেমে পড়ে রাস্তায়। তারপর বাড়িটা নিঝুম হয়ে থাকে সারাদিন। প্রায় নির্জন কলকাতার था নির্জন দ্বিপ্রহর। শীতের চাপাফুলী রৌদ্রেও সামনের পীচ জ্বলতে থাকে-কোলাপসিবল গেটে বড় বড় ভারী তালা আঁটা বাড়িগুলােকে যেন ভূতুড়ে বলে মনে হয়। সুমিতার বাড়িতেও কোন সাড়াশব্দ থাকে না। মেয়েরা নিজেদের ঘরে পড়াশুনাে করে, রিপাের্ট তৈরি করে, পােস্টার লেখে। শুধু বাতাসে কোনাে খােলা জানালা থেকে কট কট করে শব্দ ওঠে, কোথাও বা গঙ্গাজলের কল থেকে ছর ছর করে অবিশ্রান্ত জল পড়ে। ঠিক এই সময়টাতে সুমিতার কিছু ভালাে লাগে না। নিজের মনটাকে ভারী অপ্রস্তুত, ভারী নিরবল, ভারী অসহায় বলে বােধ হয়। এত কাজ আছে, এত দায়িত্ব আছে। সমস্ত জীবনটাকে ছবির মতাে সামনেই তাে দেখতে পাওয়া যায়। দুস্তর কঠিন পথ। বিল্প, বাধা, সন্দেহ, অবিশ্বাস। ৬৮ মাঝে মাঝে নিজের শক্তির ওপরেও সংশয় আসে। কিন্তু দাঁড়াবার সময় নেই, অপেক্ষা করবার উপায় নেই। দিগদিগন্তে প্রচণ্ড ধ্বনি তরঙ্গ জাগিয়ে চলেছে জগন্নাথের রথ। আর সেই রথের দড়ি ধরে টানছে গণ-জনতা। তার সামনে থেমে দাঁড়ানাে তাে চলবে না। হয় রথের দড়ি টানাে নতুবা জন- জগন্নাথের জয়রথের চক্রতলে চূর্ণ নিষ্পিষ্ট হয়ে যাও। এ ছাড়া আর কোনাে উপায় নেই, গত্যন্তর নেই কিছু। আসন্ন যুদ্ধের আতঙ্কে বিহ্বল ব্যাকুল কলিকাতা। সব বশৃঙ্খল, সব অসংলগ্ন। কিন্তু আকাশে বাতাসে যেন কিসের একটা সুতী সংকেতময়তা, একটা অনিবার্যতার ইঙ্গিত। নিজের রক্তের মধ্যে সুমিতা শুনতে পায় অথচক্রের গর্জন। আসছে—আসছে—তার আর দেরী নেই। আকাশে ঝড়ের মেঘ উড়েছে, সেই মেঘের বুকে বিদ্যুতের রক্ত-শিখায় লকলক করে যাচ্ছে তার রক্ত পতাকা। দুপুরের বাতাসে বিচিত্র শব্দ বাজে--মনে হয় কোথাও দৃষ্টির অগােচরে—কোনাে একটা নেপথ্য লােকে কারা যেন লক্ষ লক্ষ তরােয়ালে শান দিয়ে চলেছে, তাদের দিন আসছে, তাদের প্রবল প্রচণ্ড মুহূর্ত আসছে ঘনিয়ে। এই যুদ্ধ শুধু এশিয়া-ইউরােপে খানিকটা বিচ্ছিন্ন রক্তপাতের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে না। বদলে দেবে লক্ষ কোটি মানুষের চিরাচরিত অপমানের ইতিহাস, নতুন করে গড়ে তুলবে আর এক পৃথিবী। সার্থক এবং পরিপূর্ণ, বিপুল এবং বিরাট কিন্তু তবুও নির্জন দুপুর। ঘরে বাইরে একটা আশ্চর্য শূন্যতা। সেই শূন্যতা যেন চেতনার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়ে যায়। অনিমেষ আর আদিত্য, '. আদিত্য আর অনিমেষ মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। বহুদূরে কোথায় সমুদ্রের নীল-তরঙ্গ প্রতিহত হচ্ছে গ্রানাইটের শৈলসিকতায়। বাতাসে নারিকেল বীথির মর্যর। ঈজিয়ানের সমুদ্র। পূর্ণিমার চাঁদ উঠল। ইংরেজ কবির এলােমেলাে কবিতার লাইন। অনিমেষ কোথায়, অনিমেষ কত দূরে? = T এইসব কবিতাগুলাে কখনও কি তার মনে পড়ে না? সমুদ্রের জল হীরার মতাে ঝলমল করছে। কিরণবর্ণা অ্যাটলান্টা কি চিরদিনের জঙ্গেই তার আড়ালে তলিয়ে গেল, আর কোনােদিন উঠে আসবে না? সৈনিকের জীবনে কি একটি মুহূর্তও নেই, নেই এতটুকুও অবকাশ? দুপুর গড়িয়ে যায়, বিকেল আসে। চব্বিশটা ঘরের ওপর দিনান্তের মলিন ছায়া ঘনাতে থাকে। তারপর চব্বিশটা ঘরে একটার পর একটা আলাে জ্বলে ওঠে। ছেলেরা ফিরে আসে। আর নিজের ভেতরে মগ্ন হয়ে থাকবার সুযােগটুকুও ফুরিয়ে যায় সুমিতার। বড় একটা কেটলিতে চায়ের জল ফোটে। ছেলেমেয়েরা গােল হয়ে ঘিরে বসে তার চারপাশে। কাচের গ্লাস, মাটির ভাড়, হাতল ভাঙা পেয়ালা, যে যা পারে যােগাড় করে নিয়ে বসে। তর্ক চলে, আলােচনা চলে। লেবারকে মহিলাইজ করতে গেলে আগে ওদের লিটারেচার ভালাে করে পড়ানাে দরকার। অন্তত একটা ক্ল্যারিটি অক্ ভিসন— -আমার কিন্তু মনে হয় খাটি থিয়ােরী ওদের মনে সাড়া দেবে না। ওরা কাজ বােঝে, কথা বােঝে না। -আহা সে তাে বটেই, সেটা কে অস্বীকার করছে। আমরা তাে ওদের বক্তৃতা দিয়েই উদ্ধার করে দিচ্ছি না। বক্তৃতায় কাজ হলে তাে সুরেন বাঁড়ুয্যের আমলেই দেশ স্বাধীন হয়ে যেত। আসল কথা—ওদের বােঝানাে দরকার কিসের জন্যে ওরা লড়ছে, কেমন করে ওরা লড়বে। বেশ তাে, সেটাই বােঝাও। -বােঝাচ্ছি তাে নিশ্চয়ই। সেই সংগে ভেটেড, ইনটারেস্টের শিকড়টা কোন অবধি গিয়ে যে পৌছেছে, সেটাও ভালাে করে পরিষ্কার করে দেবার দরকার আছে তাে। তাই বলছিলাম লিটারেচারটা কিছু কিছু পড়ানাে ভালাে। ৭০ -কিন্তু সেটা সকলের জন্যে নয়। ওতে অনর্থক সময় নষ্ট, উৎসাহেরও অকারণ অপব্যয়। এটা তাে মানাে কোনে' কাজে সবাই-ই লীজ নিতে পারে না, মাত্র দু’একজনকেই সে দায়িত্ব নিতে হয় ? —মানি। -আর এও নিশ্চয় জানাে, পিপলের সামনে যে বাস্তব সমস্যাগুলাে আসে, তাকেই তারা একমাত্র স্বীকার করে? ফাকা আদর্শের মূল্য কী, বললা? আমাদের দ্যাশন্যাল স্ট্রাগল থেকে এর দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। স্বাধীনতা আন্দোলন আমরা বারে বারেই তাে করেছি। দেশের সবাইকে ভাক দিয়েছি, মধ্যবিত্তকে, শ্রমিককে, কৃষককে। কিন্তু ফল কী হয়েছে শেষ পর্যন্ত। আমরা বন্দেমাতরম্ বলে আহ্বান জানিয়েছি, তারাও ছুটে এসেছে। জেলে গেছে, নির্যাতন সয়েছে, পিটুনী ট্যাক্সের অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছে। তার পরের ইতিহাস দেখাে। আমরা যারা উকিল, তারা আবার আদালতে ফিরে এসে ‘ইয়াের অনার’ বলে সওয়াল করেছি, যারা ছাত্র তারা আবার ইস্কুল, কলেজে ফিরে গিয়ে অধ্যয়নের তপস্যায় মন দিয়েছি, যারা জমিদার তারা ‘এ’ ক্লাস প্রিজনার হয়ে সসম্মানে জেল খেটে আবার এসে যথানিয়মে জমিদারী করেছি। কিন্তু একবার ভাবো কৃষকের কথা। কী লাভ হয়েছে তার, এ থেকে সে কী পেল? অপর পক্ষে এতক্ষণে অধৈর্য হয়েউঠেছে তা হলে তুমি কী করতে বলে ? —যা করতে বলি, তা এই। ওদের রাতারাতি বিদ্বান করতে চেয়ে না। মােটা প্রয়ােজনগুলাে মােটা কথায় ওদের বুঝিয়ে দাও, যদি কাজ হয় তাে তাতেই সব চাইতে বেশি হবে। -তুমি কি মনে করে দশ বছর আগে আমাদের যে পলিটিক্যাল লাইন অৰ, একটিভিটিজ, ছিল, আজো তাই আছে ? আজকের লিটারেচার শুধু কতগুলাে কথার সমষ্টি নয়, তা প্র্যাকটিক্যাল। ৭১ তর্ক চলে, মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, সবাই উত্তপ্ত বােধ করে, উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আর সঙ্গে সঙ্গে চলে চা। দুধ-চিনির মাত্রা ক্রমশ কমতে থাকে আর উদ্দীপনাও বেড়ে উঠতে থাকে সমান তালে। গল্প করে, হাসি-ঠাট্টা করে। এক পাশে দু’তিনজনে মিলে ঘরােয়া আলােচনা চালায় চাপা গলাতে। কেউ নিজের ঘরে বসে চুপ চাপ করে পড়ে, কেউবা লেখে। তারপর আলােচনায় যখন ছেদ পড়ে, সবাই যখন ক্লান্ত হয়ে ওঠে, তখন সুমিতা মধ্যস্থতা করে। বলে, আর তর্ক নয়—ওসব কচকচি এখন থাক। এখন কাব্যপাঠ হােক। কথাটা কাণে যাওয়া মাত্র অল্প বয়সী একটি ফস। ছেলের চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠে। নিঃশব্দে সে সরে পড়বার চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। রমলা বলে, সুমিতাদি, ইন্দু কিন্তু পালালাে। সুমিতা হাসে, না, না, কবি পালালে চলবে না। এবারে তােমার পালা, রাজনীতির এই মরুভূমিতে তুমি কবিতার মরূদ্যান দু’চারটে জাগিয়ে তােলল দেখি। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। ইন্দু যেন লজ্জায় আরাে ছােট হয়ে যায়। একটু আগেই এই ছেলেটি যে রাজনীতি আলােচনা করতে গিয়ে হাতাহাতির উপক্রম করেছিল, একথা এখন কিছুতেই যেন মনে করা চলে না। ইনু বলে, না, সুমিতাদি। না কেন? সভার সকলের সনির্বন্ধ অনুৰােধ। কই, পকেট থেকে বার করে খাতা। একটা গরম গরম কিছু শুনিয়ে দাও দেখি। ইন্দু প্রাণপণে কী বলবার চেষ্টা করে, কিন্তু চারদিকের প্রবল কোলাহলে তার গলার স্বর অসহায়ভাবে হারিয়ে যায়। কবিতা শােনবার জন্যে সকলের মন যে একেবারে হাহাকার করে উঠেছে তা নয়। দুর্দান্ত তার্কিক এবং পরম १२

সপ্রতিভ ইন্দুর এই বিপন্ন অবস্থাটা সকলের কাছে ভারী উপভােগ্য বলে বােধ
হয়। বিশেষ করে তর্কে যারা হেরে গেছে, তাদের পলাই আরাে বেশি
জোরালাে হয়ে ওঠে।
জলে ডােবা মানুষের মতাে ইন্দু অবশেষে পকেট থেকে একটুকরাে কাগজ
টেনে বার করে। একবার শেষ চেষ্টা করে বলে, এ কবিতাটা ভালাে হয়নি।
উল্লসিত চীৎকার ওঠে: না, না, চমৎকার হয়েছে। পড়াে কবি,
শােনাও আমাদের।
আর উপায় নেই। ইন্দু শেষবারের মতাে তাকায় সকলের মুখের দিকে
-কিন্তু কোথাও এতটুকু সহানুভূতি নেই কারো। এমনকি সুমিতারও না।
অতএব নিরুপায় হয়ে কবিতা পড়তে শুরু করে ।
প্রথমে ভীরু, তারপর ক্রমশ গলার স্বর সুস্থ ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠতে থাকে,
উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে। ইন্দু কবিতা পড়তে শুরু করে।
হংস-মিথুন, নীড়ের ঠিকানা কই
অসীম সাগর দুলিছে পাখার নীচে,
ছুটেছ কোথায় কোন মরীচিকা পিছে।
পথের সঙ্গী আমরা তাে কেহ নই--
একজন মন্তব্য করে : এখনাে হংসমিথুনের কবিতা।
সুমিতা বলে, চুপ। বে-রসিকের মতাে আপে থাকতেই টিপ্পনী কাটতে
যেয়াে না।
হংস-মিথুন দেখাে দিগন্ত-তলে
মেঘের মতন কামানের ধোয়া জমে।
আলাের আভাস দেখে কি পড়েছে। ভ্রমে ?
আগুনে বােমায় মারণ-যজ্ঞ চলে।
এইবারে সকলে চুপ করে যায়। হংস-মিথুন নীড় হারিয়েছে। কবিতার
৭৩

ছন্দে ছন্দে উচ্ছসিত ভাষায় ইন্দু বলে চলে, বিলের বুকে বুনন কলমী ফুলের
আড়ালে-আড়ালে তােমাদের যে মিলন-বাসর, আজ সেখানে বিপ্লব দেখা
দিয়েছে, বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আজ বন্দুক হাতে এসেছে শিকারী, তাদের
সাথে সাথে এসেছে লােল-জিহবা ঝুলে পড়া হিংস্র শিকারী কুকুরের দল।
আজ আর নিস্তার নেই, রক্ষা নেই কারাে। তােমাদের স্বপ্নাতুর বাসক
রজনী অপমৃত্যুর প্রচণ্ড আঘাতে চুরমার হয়ে গেল ।
হংস-মিথুন এখন সেদিন নয়,
হাঁকিছে শিকারী, ডাকিছে যুগের শিখা,
কোনাে আলাে নেই, নেই কোনাে সান্ত্বনা,
বধির স্বর্গে ভাষাহীন প্রার্থনা,
দেবতার বেদী বলির রক্তে লিখা
লােভী পুরােহিত জাগিছে বিশ্বময়
উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ইন্দু থেমে যায়। কবিতা থামে, তার রেশ
হারায় না। সকলে চুপ করে বসে থাকে। এত বস্তুবাদী এরা, এত বুদ্ধিবাদী,
তবু কারাে সমালােচনা করতে ইচ্ছে করে না। কবিতা ভালাে কি মন্দ
সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু তার দোলাটা বাজছে রক্তের মধ্যে, তার ছন্দটা যেন
মর্মরিত হয়ে উঠেছে শিরায় শিরায়।
খানিক পরে একটি দুটি করে কথা বেরুতে থাকে।
বাঃ, বেশ হয়েছে।
মন্দ হয়নি তাে কবিতাটা।
নাঃ, কবির হাত আছে সেটা মানতেই হবে। আগামী দিনের স্বাধীন
ভারতবর্ষে ইন্দুই নব-জীবনের গান গাইবে।
বুদ্ধিবাদীদের বুদ্ধিও সজাগ হয়ে ওঠে আস্তে আস্তে।
তবে প্রকাশ-ভঙ্গিটা এখনাে গতানুগতিক।
৭৪

—আরাে স্ট্রেট, মানে আরাে তীক্ষ্ণ হওয়া দরকার। ইন্দুর বুদ্ধি যতটা ধারালাে হয়ে উঠেছে, মন ততটা নয়। ওর ভেতরে একটা ডুয়্যালিটি আছে। বাইরে ও ভয়ঙ্কর যুক্তিপন্থী, কিন্তু মনে রােমান্স একেবারে ফেনিয়ে ফেনিয়ে উঠছে। -তবু চেষ্টাটা ভালাে। “নিশ্চয়। তবে আরাে সজাগ মন চাই। এখনাে হংসমিথুনের জঙ্গ বিলাপ করছে। কিন্তু পুরানাে নীড়ের ঠিকানা যদি নাই থাকে, তা হলেই বা এত কাতর হবার কী আছে! নতুন নীড় খুঁজে নিতে হবে, নতুন করে বাঁচতে হবে। —হংস-মিথুন পরাজয়ের মধ্যেই তলিয়ে যাবে কেন? তারও দিগন্ত আছে আরাে বিস্তীর্ণ পৃথিবী আছে। কবি, সেই বৃহত্তর পৃথিবীরই জয়গান করাে। ঠিক কথা। কবি তবে উঠে এসে যদি থাকে প্রাণ ইন্দু উত্তর দেয় না। চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে নিজের ঘরে উঠে চলে যায়। কোন সমালােচনায় সে কখনাে জবাব দেয় না, যে যা বলে, নীরবেই শুনে যায় চিরকাল। বাইরে রাত বাড়ে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে ট্রাফিকের স্রোতে মন্দা পড়তে থাকে। রান্নাঘরের তত্ত্বাবধানে যারা ছিল, তারা এসে খবর দেয়, খাবার তৈরী হয়ে গেছে, এবার বৈঠক ভাঙতে পারে। খাওয়ার ঘরেও তর্ক আর আলােচনা চলে পুরােদমে। মাঝে মাঝে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথাও ওঠে। উঃ, মাণিকতলার বস্তিতে কী দিনগুলােই গেছে ভাই। -আর ইঁদুরগুলাে ? এক একটা যেন বাচ্ছা শূয়ােরের মতাে দেখতে। সারারাত ঘরে কী গণ্ডগােল যে করত। সুরেশদার পায়ে কামড়ে দিলে সেবার, একটু হলে চাই কি একটা আঙুলই কেটে নিয়ে যেত। ৭৫ সাঃ, এখানে রাজার হালেই আছি বলে মনে হচ্ছে। একেবারে রাইট রয়্যাল। স্বাধীন ভারতে আমরা সুমিদিকে জন-খাদ্য-বিভাগের প্রেসিডেন্ট করে দেব। সুমিতা ভঙ্গি করে বলে, থাক, অত অনুগ্রহে দরকার নেই। —অনুগ্ৰহ মানে? ভােটের জোরে করে দেব—দেখবেন। সত্যি বড় খাওয়া হচ্ছে। এ রকম খাওয়া দাওয়া হলে ক’দিন বাদে আয়েসী হয়ে পড়ব, বাড়ি ছেড়ে আর নড়তে পারব না। সুমিতা বলে, যাও না তােমরা সব বাড়ি ফিরে। ঘরের ছেলে ঘরে যাও, আমার হাড় আর জালিয়ােনা। খেতে খেতেই একজন গান জুড়ে দেয় । “যাবােনা আজ ঘরে রে ভাই, যাবেনা আর ঘরে- সকলে মুহূর্তে তাকে থামিয়ে দেয়।—থাম, থাম্ বাপু, তােকে আর তেওট তালে হালুম্ব-রাগিণী ভাজতে হবে না। বিষম লাগিয়ে এমন খাওয়াটা একেবারে মাটি করে দিবি দেখছি। এমন খাওয়া ! তাই বটে। সুমিতার মনটা হঠাৎ ছল ছল করে ওঠে। কত অল্পে এরা খুশি, কত সামান্য আয়ােজনে এরা পরিতৃপ্ত ! অথচ, এরা লই যে গরীবের ঘরের ছেলে তা নয়। ভালাে খাওয়া-দাওয়া কাকে বলে তা এদের অজানা নেই। কিন্তু যে পথে অজ এরা নেমে এসেছে, তার দাবীতেই, মুছে ফেলেছে, দূরে সরিয়ে দিয়েছে এত দিনের অভ্যাস, এতদিনের সংস্কার। কী খেতে পায় এখানে ? একটুকরাে মাছ, একটুখানি ডাল, আর কোনােদিন বা একটু তরকারী। তাতেই খুশির সীমা নেই, যেন রাজতােগ খাচ্ছে। ওরা মুখে যা কিছু তর্ক করুক, যা কিছু বলুক-জীবনের লক্ষ্য ওদের বাধা। এগিয়ে চলল, এগিয়ে চলল। কঠিন পৃথিবী ডাকছে, ডাকছে কঠিনতম কর্তব্য। নতুন মানুষ, নতুন জগৎ। সেই নতুন মানুষদের না আনা পর্যন্ত সেই নতুন জগৎকে সৃষ্টি করে না তােলা পর্যন্ত বিশ্রাম নেই—ড়াবার উপায় পর্যন্ত নেই। দুশাে বছরের পরাধীনতার অভিশাপ। দুশাে বছরের কালাে অন্ধকার জাতির আর দেশের বুকের ওপরে জগদ্দল পাথরের মতাে চেপে বসে আছে। সেই পাথরকে ঠেলে সরিয়ে দিতে হবে। উদয়-দিগন্তের দিকে তাকিয়ে প্রতীক্ষা করতে হবে সেই লগ্নের জন্যে-যেদিন দিক-চক্রে তিমিরহারী সুর্যের বাণী বয়ে দেখা দেবেন সূর্যসারথি। তারই প্রতীক্ষা, তারই সাধনা বস্তির বিষাক্ত অবরােধে, কারখানার ধোয়া আর আগুনে, খর রৌদ্রে দিগবিস্তীর্ণ মাঠে মাঠে। তিলে তিলে নিজেদের জীবনকে ক্ষয় করে ওরা মহাজীবনের যজ্ঞাগ্নিতে আহুতি দিচ্ছে। কতদিন খাওয়া জোটে না, শশাবার জন্ঠে এতটুকু জায়গা পর্যন্ত জোটে । দু’এ নের সাসপেক্টেড টি বি, কেউবা ম্যাল নিউট্রিশনে ভুগছে। সাধারণের চোখে ওরা শহীদের সম্মান পাবে না, ফুলের মালাও নয়। ওরা বক্তৃতা দেয় না, সভা-সমিতি করেও বেড়ায় না। তাই ওদের নাম নেই কোনােখানে, তাই কেউ ওদের চেনে না। যেদিন মরবে, সেদিনও unwept, unlamented, unsung, মহা জীবনের যজ্ঞাগ্নিতে প্রাণের হবি-বিন্দু মুহূর্তে ছাই হয়ে মিশিয়ে যাবে ! —বাঃ, কী চমৎকার ডালটা। কতদিন পরে এমন ডাল জুটল বল দেখি । —যাই বলল, জগদ্দলের সেই হরবশীর মা খাসা অড়ােরের ডাল রান্না করে। মােটা রুটির সঙ্গে সেই ডাল একদিন খেলে তিনদিন পেট ভরে থাকে ভাই। অকারণেই সুমিতার চোখে জল আসে। রাত বারােটা বেজে গেল। - ৭৭ যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। সারাদিন খেটে এসেছে-এখন ঘুমােচ্ছে একেবারে কুম্ভকর্ণের মতাে। শুধু দু'চারজন এখনাে আলাে জেলে পড়াশুনাে করছে। আর ঘুম নেই সুমিতার চোখে। ইন্দুর কবিতার লাইনগুলাে মনের কাছে ক্রমাগত ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবিতা কার? শুধু কি ইন্দুর, না সুমিতারও? হংস-মিথুন, এখন সেদিন নয় । বিলের বুকেতে বুনন কমির ফুল। বিভাের স্বপ্নে প্রহর হয়েছে ভুল- কালের আঘাতে সে মােহের হলাে লয়। হংস মিথুনের মতাে নীড় ভাঙলাে কাদের? অনিমেষের আর সুমিতার ? দেশের আরও বহু মুগ্ধ বিহ্বল প্রেমিক প্রেমিকার ? স্বপ্ন দেখছিল তারা, একটা মধুর আবেশের মধ্যে পড়েছিল মূৰ্ছিত হয়ে। কিন্তু এল আঘাত এল নিষ্ঠুর কাল। কোথা থেকে নির্মম বাণ এসে বিল অ্যাডােনিসের বুকে-ঈজিয়ানের হীরা মাখানাে জল রক্তে লাল হয়ে গেল। নীচে নিঃশব্দ রাত্রি—ওপরে তারাখচিত আকাশ। অস্বচ্ছ আলােয় পিঙ্গল অন্ধকার রাস্তার বড় বড় বাড়িগুলাের ওপরে যেন প্রেতচ্ছায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। একচক্ষু মােটরগুলাের স্রোতে ভাটা পড়ে গেছে একবারে। এক আধখানা মােটর যা চলছে, তাদের শব্দ যেন বড় বেশি জোর-যেন সে শব্দে দুপাশের বাড়িগুলাে অবধি কেঁপে উঠছে। মাঝে মাঝে দু'একজন পথচারী চলেছে, তাদের জুতাের শব্দ যেন পাঁচগুণ হয়ে বহুদুর থেকে ভেসে এসে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু কোথায় এত রাত্রেও কারা গ্রামােফোন বাজাচ্ছে—হাল্কা একটা হিন্দী গান, সুরটা খ্যামটার মত। প্রতিমুহূতে যারা আসন্ন দুর্বিপাকের প্রহর গুণছে, তারা যেন ওই গানের ভেতর দিয়ে নশ্বর জীবনের শেষ আনন্দটুকু উপভােগ করে নিতে চায়। ৭৮

-সুমিতাদি ।
সুমিতা চমকে উঠলঃ কে ?
মিষ্টি হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল : ভয় পেলে নাকি ? আমি রমলা।
-ও। কিন্তু এত রাত্রে হঠাৎ উঠে এলি যে?
-এমনি, ঘুম আসছিলাে না। আমার ঘরের জানালা দিয়ে দেখছিলাম
তুমি কখন থেকে এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তাই এলাম।
-বেশ, আয়।
রমলা এসে পাশে দাঁড়ালাে। ওপাশের একটা ঘর থেকে যে আলাে
এসে পড়েছিল, তাতে করে রমলাকে সুমিতা দেথে নিলে একবার।
শ্যামবর্ণা একটি ক্ষীণকায়া মেয়ে, দেখলে কেউ সুন্দরী বলতে রাজী
হবে না। কিন্তু রূপ না থাকলেও লাবণ্য আছে। চোখ মুগ্ধ হয়ে
ওঠে। ছােট বােনের মতাে ভালােবাসতে ইচ্ছে করে, আদর করতে
ইচ্ছে করে।
সুমিতা আন্তে রমলার পিঠে হাত রাখল। রমলা আরাে ঘন হয়ে তার
কাছে এগিয়ে এল, যেন আশ্রয় খুঁজছে।
-কী হল রমলা? কিছু বলবি?
রমলা কয়েক মুহূর্তের জন্যে চোখের দৃষ্টি ডুবিয়ে দিলে বাইরের তরঙ্গিত
রাত্রির ভেতরে। তারপর আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলে, আদিত্যদার
কোনাে খবর কি আসেনি সুমিতাদি ?
না তাে।
-আর অনিমেষদার।
বুকের ভেতরে একটা নিঃশাস চেপে নিয়ে সুমিতা বললে, না।
-ওখানে কী সৰ গণ্ডগােল হয়েছে, তুমি জাননা?
সুমিতা মনের ভেতরে ক্লান্তি বােধ করতে লাগল। এ আলােচনা তার
৭৯

ভালাে লাগছে না, এ প্রসঙ্গটাকে সে এড়াতে চায়। এ গলায় জবাব দিলে, নাঃ, কিছুই না। রমলা চুপ করে রইলাে। এ কৌতূহলগুলাে স্বাভাবিক হলেও এগুলাে তার বলবার কথা নয়। রাত বারােটার পরে যে প্রসঙ্গ ও যে চিন্তা তার স্নায়ুকে এমন ভাবে সজাগ করে রেখেছে, তারা সম্পূর্ণ আলাদা। আদিত্য আর অনিমেষের কথাটা তারই ভূমিকা মাত্র। রাস্তার ওপরে জোরালাে টর্চের আলাে পড়ল। মচ, মচ, করে জুতাের শব্দ। দু’জন সার্জেন্ট রাউণ্ডে বেরিয়েছে। শান্তি রক্ষা করছে যুদ্ধ-বিঘ্নিত নিশীথ নগরীর। গ্রামােফোনে হিন্দী খ্যামটার গানটা বারে বারে বাজছে, ঘুরে ঘুরে বাজছে। বােধ হয় মদের বােতল খুলে নিয়ে বসেছে একদল । রমলা আস্তে আস্তে, অত্যন্ত কোমল গলায় বললে, আজকে একটা ব্যাপার হয়ে গেছে সুমিতাদি। -কী ব্যাপার। রমলার স্বর আরাে মৃদু হয়ে এল। আজকে দেখা হয়েছিল। --তাই নাকি? বাসুদেবের সঙ্গে? রমল' চুপ করে রইল। । -কী বললে? -যা বলে আসছে চিরকাল। —অর্থাৎ ফিরে এলাে? তােমার জন্যে পথ চেয়ে আছি ? জীবনে শুধু রাজনীতি নয়, তার অন্য দিকও আছে। এই তাে ? —শুধু এই ? আরাে অনেক কথা। তার মাথা মুণ্ডু কিছুই নেই। এত করেও আমি ওকে বােকাতে পারলাম না সুমিতাদি। ঢের লেখাপড়া শিখেছে, তবু এই সহজ জিনিসটা কেন যে বুঝতে পারে না—আশ্চর্য। 'সুমিতা সস্নেহে হাসল। সবাই কি সব জিনিস বুঝতে পারে বােকা? ৮০

পৃথিবীতে একদল নির্বোধ থাকবেই—হাজার চেষ্টা করলেও তােরা কখনাে
তাদের জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়াতে পারবি না।
রমলা যেন আহত হল একটুখানি : তুমি আমাকে ঠাট্টা করছ
সুমিতা রমলার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল : ঠাট্টা করব কেনরে?
যা সত্যি, তাই বলছি। বাসুদেব চৌধুরী কখনাে আদিত্য রায় হতে পারবে
, ওরা আলাদা ভাতের মানুষ।
রমলা বললে, আমি বড় বিপদে পড়ে গেছি সুমিতাদি। যেখানে যাই
কেমন করে খোঁজ নিয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হয়। আর এমন ভাবে
তাকিয়ে থাকে যে কী বলব।
—এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে যে ভয়ানক রাগ হয়, তাই না?
রমলা মাথা নীচু করে জবাব দিলে, ই। কিন্তু তার আকার ইঙ্গিতে
এটা অন্তত স্পষ্ট হয়ে উঠল যে বাসুদেব নিতান্ত অশােভন ভাবে তার দিকে
তাকিয়ে থাকলেও যে অনুভূতিটা তার মনে জাগে, সেটা আর যাই হােক,
রাগ যে নয়, এটা নিশ্চিত।
—তা হলে এখন কী করবি ?
-কী করল তাই তাে তােমাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম। আজকে একটা
ভারী বিশ্রী কথা বলেছে সেই থেকে মনটা বড় খারাপ হয়ে আছে।
-কী বিশ্রী কথা বলেছে ? সুমিতার দৃষ্টি তীক্ষ আর কৌতুহলী হয়ে
রমলার লজ্জিত মুখের ওপরে পড়ল।
বলেছে রমলার গলাটা একবার কেঁপে উঠল : বলেছে, আমি যদি
কথা না শুনি, তা হলে আত্মহত্যা করবে এবারে।
-আত্মহত্যা!
রমলার সুরে যেন প্রচ্ছন্ন কান্নার আভাস পাওয়া গেল। ই।
৮১

পাগল নাকি রে? একটা বুদ্ধিমান মানুষ আত্মহত্যা করবে কী রকম? ও তােকে ভয় দেখিয়েছে। রমলা প্রতিবাদ করলে : না সুমিতাদি, ভয় দেখানাে নয়। যে রকম মানুষ সৰ করতে পারে। সব সময় খেয়ালের ওপরে থাকে, কখন যে কী করে বসবে- হঠাৎ কেমন একটা বিদ্বেষে সুমিতার মনটা পূর্ণ হয়ে উঠল। রমলা দুঃখ করছে, বাসুদেব যে তাকে জ্বালাতন করে বেড়ায় সেজন্যে ক্ষোভ করছে, আত্মহত্যা করবার ভয় দেখিয়েছে বলে তার অস্বস্তির সীমা নেই। কিন্তু সব কিছুর ভেতর দিয়ে একটা সুর স্পষ্ট হয়ে ফুটে বেরুচ্ছে, সেটা সুখের, সেটা গর্বের। সাধারণ একটি কালাে মেয়ে, তবু একজন তাকে এত বেশি ভালােবাসে যে তার জন্যে প্রাণ পর্যন্ত দিতে চায়, এটা তার কাছে যেমন গৌরব, তেমনি আনন্দের সামগ্রী হয়ে উঠেছে। ক্ষণিকের জন্যে সুমিতার মনটা যেন কালাে হয়ে গেল। বানুদেব রমলাকে চায়, প্রাণ দিয়ে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে। অথচ রূপ নেই রমলার, এমন কিছু বিশেষত্বও নেই। আর সে? তার তাে সব ছিল, তবু অনিমেষ তাকে স্বীকার করে নিলাে না, বৃহত্তরের আহ্বানে অনায়াসে পেছনে ফেলে চলে গেল। বাসুদেবের মতাে গদ্যময় ইতিহাসের অধ্যাপক যেখানে বিহবল ব্যাকুল হয়ে নিজের হাতে নিজের জীবনের ওপর যবনিকা টেনে দিতে চায়, সেখানে কবি রােম্যান্টিক অনিমেষ এমন ভাবে নিজেকে বজ্রকঠিন করে তুলল। কী উপায়ে ? এমন একটা বজ্রমণির ছোঁয়াই কি সে পেয়েছিল? সুমিতা হঠাৎ রূঢ়ভাবে বলে ফেলল, তােরও দোষ আছে। প্রশ্রয় দিস বলেই ওসব নাকে কাঁদবার সুযােগ পায়। পুরুষকে এখনাে চিনিসনি কিনা। মিষ্টি কথা ভালাে করে সাজিয়ে বলতে ওরা ওস্তাদ, কথার প্যাচে লােককে ভুলিয়ে দেওয়াতেই ওদের বাহাদুরী। ৮২ সুমিতার স্বরের রূঢ়তায় রমলা চমকে গেল। ঠিক এমনটা সে আশা করেনি, সুমিতাদির পক্ষে এটা কেমন অশােভন আর অস্বাভাবিক বলে তার ঠেকছে। সে কথা বলতে পারল না, শুধু মূক বিস্ময়ে সুমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অমিতা যেন আত্মমগ্ন হয়ে গেছে। একটানা বলে চলল, কথা বলা একটা আর্ট, সে আর্ট ওরা ভালাে করেই জানে। কিন্তু ওদের পক্ষে শুধুমাত্র আর্ট ফর আর্টস সেক—জীবনে তার প্রয়ােগ নেই। ওরা মুখে যা বলে, তার এতটুকুও যদি অনুভব করত, তাহলে পৃথিবীর চেহারাটা এতদিনে আগা- গােড়াই বদলে যেত, বুঝলি ? রমলা শুনে যেতে লাগল, জবাব দেবার মতাে কোনাে কথাই সে আর এখন খুজে পাচ্ছে না। -কী, কথা বলছিস না যে? কী বলব ? -কী বলবি?—যেন অন্ধ একটা রাগে হঠাৎ ফেটে পড়ল সুমিতা : সােজা বাড়ি ফিরে যাবাসুদেবকে বিয়ে করে বেশ একটা গিন্নী বায়ী হয়ে বােস। দিন কাটবে ভালাে, প্রজাপতির অনুগ্রহে বংশবৃদ্ধি করতে পারবি, তাতে বাধা পড়বে না। সুমিতাদি! এতক্ষণে সুমিতার চমক ভাঙল। এ সে করছে কী! এ কার কথা কাকে সে বলছে ! রাত্রির এই পরম বিস্ময়কর বিচিত্র মুহূর্তটিতে নিজের মনের একান্ত নিভৃত দুর্বলতাটাকে এই ভাবে সে প্রকাশ করে বসল শেষ পর্যন্ত ! যে আঘাত নিজেকে সে দিতে চেয়েছিল, স্বগতােক্তিটা শেষে সজোর হয়ে সেই আঘাতটা গিয়ে পড়ল বেচারী রমলার ওপরে। রমলার কী দোষ! কালো মেয়ে সে-রবীন্দ্রনাথের ভাষায় অতি সাধারণ মেয়ে সে ৩ একজন পুরুষের প্রেম যদি তার সেই অতি সাধারণ জীবনটিকে মধুর উজ্জ্বলতায় পরিপূর্ণ করে দিয়ে থাকে, তাতে সুমিতার এতটা হিংসা করবার কী আছে! নিজেকে সে এমন করে ছােট করে ফেলল অবশেষে। সুমিতার হাতখানা আবার রমলার পিঠের ওপরে ফিরে এল। না সুমিতাদিরুদ্ধ গলায় রমলা বললে, আমি ফিরে যাব না। আত্মহত্যা করে করুক, কিন্তু সে নিয়ে ভাবলে তাে আমার চলবে না। ওর। চাইতে ঢের বড় কাজ আমার আছে। সুমিতা বললে, থাক থাক। কিছু মনে করিসনি ভাই। তােক একটু ঠাট্টা করলাম খালি। বাসুদেবের কথা না হয় ভাবা যাবে কাল সকালে, এখন তা নিয়ে ব্যস্ত হবার দরকার নেই। তুই গিয়ে লক্ষ্মী মেয়েটির মত বিছানায় শুয়ে পড়, ঢের রাত হয়ে গেছে। রমলা আর দাঁড়ালাে না। মনের মধ্যে তীব্র ঘা লেগেছে একটা। সুমিতাকেও সে আর সহ করতে পারছে না। যেখানে আশ্রয় আশা করেছিল, সেখানে দেখেছে দাবাগ্নি। সুমিতাদির বুকের ভেতরে এমন একটা আগ্নেয়গিরি যে লুকিয়ে রয়েছে, একথা কি সে কোনাে দিন স্বপ্নের মধ্যেও ভাবতে পেরেছিল। রমলা চলে গেল। বারান্দায় সুমিতা আবার একা। কলকাতা গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে এখন। সাড়া নেই, শব্দ নেই, গ্রামােফোনটাও থেমে গেছে। শুধু আকাশে নক্ষত্ৰমালার আবর্তন চলেছে নিয়মানুগ গতিতে-- পৃথিবীর ওপর এত অসংলগ্নতা, এত বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও ওদের কোনাে নিয়মভঙ্গ ঘটবে না কোনাে দিন। চব্বিশটা ঘরের আলাে নিবেছে। সবাই ঘুমিয়েছে, হয়তাে রমলাও ঘুমিয়ে পড়বে একটু পরে। কিন্তু সুমিতার আজ আর ঘুম আসবে না। হংস-মিথুন নীড়ের ঠিকানা হারিয়েছে, ঠিকই লিখেছে ইন্দু। এবার অসীম ৮৪ সাগরের ওপর দিয়ে অশ্রান্ত যাত্রা দিগন্তের দিকে—সেই দিগন্ত, যা কামানের ধোয়ায় কালাে হয়ে গেছে, রাঙা হয়ে গেছে বােমার আগুনে। চলতে শালের বন, ছােট লাইন, ছােট ট্রেন। মন্থরগতিতে চলতে খেলনার মতাে রেলগাড়িটা এসে জঙ্গলের মধ্যে থামল। স্টেশন নয়, স্টেশনের পরিহাস। একদিকে ঘন জঙ্গল অচ্ছেদ্য রেখায় তরাইয়ের দিকে অগ্রসর হয়ে গেছে, অন্যদিকে চা-বাগানের নিস্তরঙ্গ সবুজ সমুদ্র। সমান মাপে ছাটাইকরা কোমর সমান উঁচু চা গাছের শ্রেণী ওদিকের দিগন্তরেখায় মিশে গেছে—মাঝে মাঝে ছােট ঘােট শিরিষ গাছ ছায়া দিচ্ছে তাদের। আর সামনে কাঠের খুটি দেওয়া একখানা চালাঘর, তার গায়ে লেখা বাতাসীপুর স্টেশন। আদিত্য নেমে দাঁড়ালাে পাথর ছড়ানাে প্ল্যাটফর্মে। শুধু পাথর নয়, প্রচুর বালিও মিশে আছে। এককালে এখান দিয়ে একটা পাহাড়ী বােরা বয়ে যেত বােধ হয়। কিন্তু সে ঝোরা আজ ফােরা হয়ে মাটির তলায় মিলিয়ে গেছে, শুধু পড়ে আছে অসংলগ্ন বালুবিস্তৃতি। বালি আর পাথরের মধ্য দিয়ে অনিশ্চিতভাবে হাঁটতে লাগল আদিত্য। কোথায় কোনদিকে যাবে ঠিক জানা নেই। এই পর্যন্ত জানে এখানে নেমে মাইল তিনেক হাঁটলে বাগান পাওয়া যাবে যে বাগানে আজ অনিমেষ বিপন্ন আর বিব্রত হয়ে আছে। একটা চুরুট ধরিয়ে আদিত্য চিন্তা করতে লাগল। বাঙালি স্টেশন মাস্টার কিছুক্ষণ থেকে আদিত্যকে লক্ষ্য করছিলেন। আস্তে আস্তে এগিয়ে এলেন ভদ্রলােক। ৮৫ পিনার টিকেটটা দিয়েছেন স্যার? -না-এই নিন। টিকেটখানা হাতে নিয়ে তার ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন স্টেশন মাস্টার।-ওঃ, কলকাতা থেকে আসছেন ? কোথায় যাবেন আপনি? রংঝােরা বাগান। কোন্‌দিক দিয়ে যাব বলতে পারেন ? —রংঝােরা? এদিক দিয়ে নেমে এগিয়ে যান। ভালল পীচের রাস্তা আছে, মাইল তিনেক হাঁটলেই বাগান পাবেন। থ্যাঙ্ক ইউ। আদিত্য চলতে সুরু করলে। মনের ভেতর বিশৃঙ্খল চিন্তা ঘুরছে। বাগান যে কী ব্যাপার সে সম্বন্ধে কোন পরিষ্কার ধারণাই তার নেই। অনিমেষ সেখানে কীভাবে আছে, কেমন আছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। তা ছাড়া বাগান সম্বন্ধে যে-সব কাহিনী সে শুনেছে, তাতে মনটা আরাে বেশি সংশয়ে পীড়িত হয়ে আছে। বিচিত্র দেশ-বিচিত্ৰতর পরিবেশ। জঙ্গলের মধ্যে অষ্টাদশ শতকীয় রাজ্যপাট। চা বাগানের সাহেব বিধাতার মত দণ্ডধর। নিমম আর সংক্ষিপ্ত বিচার কালাজরে স্ফীতােদর কুলির পিলে ফাটানাে সেখানে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ব্যাপার নয়। তার খবর বিশ্বদূত রয়টারের মুখে এসে পৌছােয় না—প্লাইউডের বাক্সে তার রােমাঞ্চকর বাত। নিউজ এডিটরকে অনুপ্রাণিত করে না। শালবনের নিভৃত পাচ্ছাদনের রহস্যময় অন্তলোকে রহস্যজনকভাবেই তা মিলিয়ে যায় যেমন করে জঙ্গলের পথে অত্যন্ত অনায়াসে ভালুক এসে বজ্র-আলিঙ্গনে একটা মানুষের হাড়গােড় গুড়াে করে দিয়ে যায় কিংবা নীল-পাইয়ের শিং বুকের পাজরা ভেঙে ফুসফুসটাকে নিষ্পেষিত করে ফেলে। বাগান তাে ফরবিডেন প্যারাডাইজ ঢোকবার কোন উপায় নেই। ৮৬ আশ্রয় কুলিলাইন, কিন্তু সেও নিরাপদ নয়। সাহেবের শ্যেন দৃষ্টিকে তা এড়াতে পারবে না। কোথায় অনিমেষ-কী ভাবে আছে কে জানে। চলতে চলতে হঠাৎ আদিত্যের চোখ পড়ল সামনের দিকে। কাঞ্চনজঙ্ঘা। তুষারপুঞ্জিত শুভ্রবপুতে হীরার মতাে সূর্যকিরণ। পূর্ব দিগন্তে সূর্য সারথি দেখা দিলে ওখানে তার প্রথম সম্বধনা। আদিত্য মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেইদিকে। পীচের পথ চলেছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মানুষের হাতে গড়ে দেওয়া পথ, মসৃণ, মনােরম। চমৎকার বীথিপথ। আলগা হয়ে যাওয়া বনের আড়ালে আড়ালে সূর্য আর কাঞ্চনজঙ্ঘা। আশ্চর্য জগৎ। শাল গাছের মাথায় হরিয়াল ডাকছে—বনমুরগী চলেছে ছুটে। কেমন একটা ক্লান্তি আর অবসাদ যেন আদিত্যকে আচ্ছন্ন করে দিলে। মনে পড়ল কলকাতা। দিগন্তে যুদ্ধ আর ভীতিজর্জর রাজপথে মানুষের ক্লেদাক্ত শশাভাযাত্রা। কবি ইন্দুর কয়েকটা লাইন মনে পড়ছে । প্রাচীতে প্রারব্ধ হােলাে যুগান্তের মহা নরমেধ নিষ্প্রদীপ নিশীথ নগরী। বিদেহী বেতারে বাজে প্রলয়ের সমুদ্র গর্জন ভয়াত মানুষ পশু চলিয়াছে ক্লেদাক্ত মিছিলে শােভাহীন উগ্রতায় প্রাসাদের পরিসীমা পারে, আঁকড়ি রাখিতে হবে দুমুল্য জীবন। দুমূল্য জীবনকে আঁকড়ে রাখতে হবে। নাগরিক জীবন। সংগ্রামে ক্ষত বিক্ষত, বিস্বাদ, যক্ষ্মার রােগীর মতাে বিড়ম্বিত, মনুষ্যত্বের বিচারে প্রতি- মুহুর্তে লাঞ্ছিত ও অপমানিত। এদিকে শ্যামবাজার, ওদিকে টালীগঞ্জ মাঝখানে ডালহাউসি স্কোয়ার। যমুনা আর সরস্বতী এসে মিশেছে গঙ্গায়। বাঙালি জীবনের ত্রিবেণীসঙ্গম । ৮৭ কিন্তু ত্রিবেণীসঙ্গম? মানবতার মহাতীর্থ? নাকি পশ্চিমগামিনী সুবর্ণরেখায় উপনদীর আত্মদান—তিলে তিলে, রক্ত দিয়ে, স্বাস্থ্য দিয়ে, মানবতা দিয়ে ? আর—এখানে অরণ্য। আদিম অরণ্য, প্রাথমিক অরণ্য। পৃথিবীর প্রথম প্রাণশক্তির শ্যামায়িত বিকাশ। কোথায় ছুটেছ তােমরা, পালাচ্ছ কোথায় ? শহরে, গ্রামে ? তার চাইতে চলে এসাে এখানে, সব ভুলে যাও, ভুলে যাও সেদিনের কথা—যেদিন এই বনানীর আশ্রয় থেকে তােমরা বেরিয়ে চলে এসেছিলে, তােমরা ভেসে পড়েছিলে সভ্যতার স্রোত প্রবাহে, এগিয়ে গিয়েছিলে বিজ্ঞানীদের জ্যামিতিক পরিমিতি কষা রাজপথ দিয়ে। তার ফলে এল দ্বন্দ্ব, এল সমস্যা। অনেক পেলে, হারালেও অনেক। খনির তলা থেকে জাগিয়ে তুললে ঘুমন্ত কালবনকে, তার হাতে তুলে দিলে বিশ্বকর্মার হাতুড়ি। সব কিছুকে ভেঙে চুরে সে গড়ে দিলে যন্ত্র—যান্ত্রিকতা, আকাশ- ছোঁয়া বাড়ি, বৈদ্যুতিক স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু দানবের রক্তে জেগে উঠেছে পাশব বিদ্রোহ। হাতুড়ি ফেলে দিয়ে গদা তুলে নিয়েছে হাতে, ভেঙে চুরমার করছে সমস্ত, কিছু বাকী রাখবে না কোনােখানে। তার চেয়ে পালাও পালাও, পালিয়ে এসে এখানে। এই জঙ্গলে, এই শালবনানীর নিভৃত মর্মলােকে। দৈত্যের গদা এখানে তােমাদের খুঁজে পাবে না। আবার পশুর মাংস, আবার চকমকির আগুন—আবার পাথরের অন্ত্র। শহরে পড়ে থাক শীলারা, পড়ে থাক হেমন্তবাবুরা-বক রাক্ষসের মুখে খাদ্য জুগিয়ে দিক নিরীহ নির্বোধ প্রজাবৃন্দ। তােমরা চলে এসাে, আদিমতায় ফিরে যাও--সার্থক হােক ওয়ার্ডসওয়ার্থের স্বপ্ন থেকে ডি এইচ লরেন্সের কামনা। জ্যামিতির রেখা ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যাক, বিদ্যুতের তার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে মিলিয়ে যাক পৃথিবীর ধুলাের সঙ্গে ৮৮ কিন্তু এ কী ভাবছে আদিত্য! একি ওর মনের কথা, না কাল রাত্রে ট্রেনের সেই দুর্বিষহ প্রহরগুলাের প্রতিক্রিয়া এটা। সেই রাজনীতির তর্ক, সেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদা মেয়েটি শশাঙ্কের সেই স্বার্থপর পলাতক মুখচ্ছবি। কিন্তু একি সত্য? এতদিন ধরে রাজনীতি চর্চা আর ফিজিক্‌সে এম এস-সি পাশ করবার এই কি পরিণতি। —না, কখনাে না। মানুষ কখনাে পিছােয় না, পিছানাে তার ধম” নয়। মানুষ কখনাে আর হামাগুড়ি দিয়ে তার শৈশবে ফিরবে না, মাতৃ- গর্ভে তার প্রত্যাবর্তন হতে পারে না কোনােদিন। যে দানব আজ বিদ্রোহী, তার বিদ্রোহকে দমন করতে, দলন করতে কতক্ষণ লাগবে। অমিত মানুষের শক্তি, অপরিসীম তার আত্মবিশ্বাস। আবার বাঁধা পড়বে কালবন, পশু চূর্ণ হয়ে যাবে—বজ্রধর মানুষের শক্তি নতুন নির্দেশ দেবে তাকে। আজ যে হিংসা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে, সে তত এই আদিম সত্তারই দান,—তাকে নিয়ন্ত্রণ করাই মানুষের সভ্যতা, মানুষের প্রগতির তাৎপর্য। ঘুমিয়ে থাক শালবন—শান্ত পরিতৃপ্তি নিয়ে নির্জনতার অখণ্ড আনলে বিস্তীর্ণ হয়ে থাক তার নীলচ্ছায়া। এখানে আর আমরা ফিরে আসব না। জ্যামিতির রেখা আমরা টেনে আনব এখানে, বয়ে আনব বিদ্যুতের শক্তি। তােমরা আজ যারা ভয় পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছ, তােমরা আবার ফিরে আসবে, ফিরে আসবে কলকাতায়-কলকাতাকে সঞ্চারিত করবে দিকে দিকে, অরণ্যে প্রান্তরে। পলাতকের মিছিল সেদিন রূপায়িত হবে বিজয়ীর অভিযানে তাই। ইন্দু লিখেছে । প্রশান্ত সমুদ্রজলে ফেনায়িত নিষ্ঠুর সংগ্রাম দিগন্তের চক্ৰতীর্থে রক্তশতদল দেবতার সিংহাসন ভাবীযুগে করিবে রচনা। কিন্তু এখনাে সময় হয়নি : মালয়ের তীরে তীরে পীতরক্তে নামিল জোয়ার ৮১ সিদ্ধার্থের স্বপ্ন বয়ে তন্দ্রাতুর পাষাণ দেবতা- আদিত্য চলেছে এগিয়ে। চুরুটের ধোয়া ভেসে যাচ্ছে শালবনের বাতাসে বাতাসে। মনে পড়ছে অনিমেষও কবিতা লিখত এক সময়ে, কবি অনিমেষ। আজ চা-বাগানের অক্লান্তকর্মী যে কীভাবে আছে সেটা অনুমানও করতে পারছে না আদিত্য। দূরে কতগুলাে ঘরবাড়ি—একটা বাগানের শ্যামায়িত ব্যাপ্তি। ওই কি রংঝােরা বাগান? আদিত্য পা চালিয়ে দিল। বন্দুকটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তেমনি বাংলাের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল রবার্টস। শিরায়ুতে নর্ডিক নীলরক্ত তরঙ্গিত হয়ে উঠছে বারে বারে। কপিশ চোখে বহিংসা জ্বলছে-বন আর বাঘ-ভালুকের সংস্পর্শে থেকে রবার্টস তাদের স্বভাবেরও খানিকটা আয়ত্ত করে নিয়েছে। নিজের মধ্যে। হাতের সামনে জাপানীরা নেই। যারা মালয় কেড়ে নিয়েছে, যারা ডুবিয়ে দিয়েছে প্রিন্স অব ওয়েলস, সমুদ্র-শাসক ব্রিটানিয়াকে যারা সমুদ্রের তলায় চালান করে দেবার মতলব করেছে, তাদের কাউকে হাতের সামনে পাচ্ছে না রবার্টস। কিন্তু ক্ষুদ্র শত্রু যে আছে সেও নিতান্ত অবহেলা বা অবজ্ঞার ব্যাপার নয়। এই চরম দুর্বল মুহূর্তে আর চূড়ান্ত দুঃসময়ে সাপের মতাে এরা এসে মাথা তুলেছে মাটির তলা থেকে। কিন্তু এই উদ্যত মাথাকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে—ব্রিটানিয়া শুধু সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণ করে না, সসাগরা পৃথিবীর মাটিতেও তার তুল্য মূল্য অধিকার, তার সমান মর্যাদা। ৯০ মাথার ভেতরে হুইস্কির নেশা। বাঘের মতাে দৃষ্টিতে অনিমেষের দেহটার দিকে তাকিয়ে রইল রবার্টস। যেন গ্রাস করৰে, চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে তাকে। শুনেছিল জাপানীরা নাকি দরকার হলে নরমাংস খায়, সেও দেখবে নাকি একবার। দুরে কুলিরা ভীত, বিবর্ণ হয়ে দাড়িয়ে আছে। কথা বলছে না তারা, কথা বলবার শক্তি বা সাহস পাচ্ছে না কেউ। মাইনে বাড়াবার দাবী তুলেছিল, সে দাবীর জবাব রবার্টস তৈরী করে রেখেছে তার দুনলা বন্দুকের মুখে। তাদের মধ্যে হঠাৎ এসেছিল অনিমেষ, এসেছিল একটা নতুন-পৃথিবীর খবর নিয়ে। কোথায় নাকি এমন একটা দেশ আছে যেখানে মালিক বলে কেউ নেই, যেখানে কথায় কথায় বুকে পিঠে বুটের লাখি এসে পড়ে না। যেখানে খাটুনি কম, মজুরী বেশি। যেখানে ওরা সব, ওদেরই সব। ম্যানেজার নেই, সুপারভাইজার নেই, বাগানের ছােট বড় লাটসায়েৰ বাবুরা নেই, বেগার খাটনি নেই। যেখানে কুলির ছেলে বাবুদের চাইতেও বেশি লেখাপড়া শেখে, বাবুদের চাইতেও বেশি রােজগার করে। ব্যানার্জি বাবু সেই দেশের খবর ওদের দিয়েছিল—আশ্বাস দিয়েছিল সেই দেশের মানুষদের মতাে ওরাও সব পাবে, এত বড় পৃথিবীটার যা কিছু আছে সব চলে আসবে ওদেরই হাতের মুঠির ভেতরে। সব কথা ওরা বােঝেনি, যতটুকু বুঝেছিল তাই ওদের মনের কাছে পৌছে দিয়েছিল একটা বিচিত্র আস্বাদ, একটা বিপুল অনুভূতি। আশায় আনন্দে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল মন। ব্যানার্জি বাবুকে দেবতা বলে মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল : ব্যানার্জি বাবু সব করতে পারে, তাদের গুণিনদের মতো অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারে। একদিন হয়তাে ঘুম ভেঙে ওরা উঠে দেখবে কাঞ্চনজঙ্ঘার চুড়ােয় একটা নতুন সুর্যের আলাে পড়েছে। ম্যানেজার নেই, বাবুরা নেই। কলটা ওদের বাড়িঘরগুলাে ওদেরসব ওদের, শহরও ওদের। সেই দিনের আসন্ন ইঙ্গিত যেন শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু কী হল—এ কী হয়ে গেল। সমস্ত মন নিরাশার মধ্যে তলিয়ে গেছে। সামনে ব্যানাজি বাবু পড়ে আছে রক্তাক্ত হয়ে। ওদের জীবনে সম্ভাবনার কথা যা ওরা শুনেছিল তা একটা নিছক রূপকথা। যা আছে তাই সত্য—যা এতকাল চলে আসছে তাই সত্য। কিছুই বদলাবে না। চিরকাল ওদের বুকের সামনে বন্দুকের নলটা উচু হয়েই থাকবে, চিরদিন ওরা ভয় করেই চলবে। কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথার ওপরে সে সূর্য আর কখনাে উঠবে না। রবার্টস আগুন ঝরা গলায় বললে, কী, সব চুপ করে দাড়িয়ে আছো যে? কুলিরা কাঁপতে লাগল । কথা বলতে পারল না। —এখুনি সরিয়ে নিয়ে যাও—আমার সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাও। ছুঁড়ে ফেলে দাও জঙ্গলের মধ্যে। পাে- এক পা এক পা করে কুলিরা এগােতে লাগল। রক্ত শুধু অনিমেষের গা থেকেই ঝরেনি,তাদের বুকের ভেতরেও যেন ওই আঘাতগুলাে এসে পড়েছে। -আর শােনন। এর একটি বর্ণও যেন বাইরে প্রকাশ না পায়। যদি কেউ বলে, তার অবস্থাও ঠিক এই রকম হবে—রিমেম্বার। কুলিরা অনিমেষের দেহকে বহন করে নিয়ে গেল। সপদদাপে ঘরে ঢুকল রবার্টস। মনের মধ্যে ভয়ঙ্কর কী একটা ঘটে চলেছে। যেন একটা প্রচণ্ড যুদ্ধে গৌরবময় জয়লাভ হয়েছে তার, নিজের ভেতরে আত্মবিশ্বাসের একটা প্রবল উদ্দীপনা। আঃ, কেন সে যােগ দিলে না যুদ্ধে? আজ যদি সে সেনাপতি হত, তাহলে মালয়ের যুদ্ধের ইতিহাসটাই হয়তাে বদলে যেত, সব কিছু হয়ে যেত সম্পূর্ণ অন্যরকম। রুল ব্রিটানিয়া কু গু ওয়েভস ১২ ঘরে ঢুকে আরও দুপেগ হুইস্কি গিললে সে। একটা মালিকপত্র খুললে, প্রথমেই বেরিয়ে পড়ল অ্যাডলফ হিটলারের একটা ছবি। দ্য ডেভিল, স্ক মনসটার। দাঁতের ভেতর থেকে বেরুল একটা চাপা রূঢ় গর্জন। পরক্ষণেই পত্রিকাটাকে টুকরাে টুকরাে করে ছিড়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে ছুঁড়ে ফেললে রবার্টস। তারপর প্রচণ্ড বেগে একটা কিল মারলে কলিং বেলটার ওপরে। বেলটা শুধু যে বেজে উঠল তাই নয়, টেবিলটা শুধু কেঁপে উঠল থর থর শব্দে। ওটা কাঠের টেবিল না হয়ে যদি তােজোর মাথা হত, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই গুড়ো হয়ে যেত বােধ হয়। কম্পিত পায়ে সঁওতাল কুলি ঢুকল একটা। —ডাক্তার কো বােলাও- কুলিটা পালিয়ে বাঁচল। হাতের পাশেই রবার্টসের দোনলা বন্দুকটা দাড়াে করানাে। মগজের ভেতরে হুইস্কির আগুন নেচে বেড়াচ্ছে। বন্দুকের একটা গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার দিকে ছিটকে আসাটা আজকে নিতান্ত অসম্ভব ঘটনা নাও হতে পারে। খবর পেয়েই যাদব ডাক্তার এল। ঘটনাটা নিজের চোখেই দেখেছে সে সমস্ত । শ্রদ্ধ এ পর্যন্ত গড়াবে কল্পনাও সে করতে পারে নি। তাই নিজের মনের ভেতরে এক ধরণের অনুতাপ তাকে পীড়ন করছিল। কিন্তু এ সময়ে তাকে আবার খবর কেন? আশঙ্কা হচ্ছিল। বলির পশুর মতাে যাদৰ ডাক্তার এসে সেলাম দিলে। —সিট ডাউন ডাক্তার। ডাক্তার তবু দাড়িয়ে রইল। অপাঙ্গে লক্ষ্য করতে লাগল রবার্টসের হাতের পাশেই রাখা টোটাভরা দোনলা বন্দুকটার দিকে।

ইয়েস স্যার
রবার্টস বিকটভাবে ধমকে উঠল : নােনাে ইয়েস স্যার।
মতাে হাঁ করে দাড়িয়ে আছে কেন? বােসাে।
-ই-ইয়েস স্যার—জড়িত গলায় অস্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে পুটলির
মতাে যাদব ডাক্তার ঝুপ করে চেয়ারে বসে পড়ল।
রবার্টস তখন গ্লাসে হুইস্কি ঢালছে। মদের পর মদের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ
আজ তার মনের সব কিছু সীমাকে ছাড়িয়ে চলে গেছে। রক্তের মধ্যে তার
যেন যুদ্ধের বিউগল বাজছে। যাদব ডাক্তার আড়ষ্ট দৃষ্টিতে রবার্টসকে লক্ষ্য
করতে লাগল।
-খাবে একটু?
-নাে ারএক্সকিউজ মি---
—হােহােয়াই? রবাটসের দুই চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে পড়তে
লাগল : তুমিও কি ওদের সঙ্গে ভিড়েছ নাকি? আমাকে দিয়েছ বাদ
দিয়ে? হােহােয়া ইয়াের বিগ আইডিয়া ?
নাথিং স্যার
-দে-দেন হাে-হােয়াই? কেন খাবে না?
মানে, আ-আমি ওসব বেশি স্ট্যাণ্ড করতে পারি না স্যার
রা-রা-রাঙ্কেল।
ফটু করে একটা সােডার বােতল খুললে রবার্টস। হইব্ধি ঢাললে
গেলাসে। সমস্ত শরীরটা তার টলছে, তবু আজ মদে বিরাম দেবে না সে।
রক্তে রক্তে বিউগল বাজছে, স্নায়ুর ভেতরে সে শুনতে পাচ্ছে যেন টর্পোেের
বিস্ফোরণে ফেনায়িত প্রশান্ত সাগরের উত্তাল গর্জন ।
ইয়েস স্যার?
B

ভেবেছ? স্বাধীন হয়ে গেছ তােমরা? —না স্যার, কক্ষনাে না। ভেবেছ, যুদ্ধে আমরা হেরে গেছি, তাই না? এইবার তােমরা আমাদের বুকের ওপরে চেপে বসবে? নেভার স্যার।-যাদব ডাক্তার নেশা করেনি, তবুও তার গলা জড়িয়ে আসছে। আমি কখনাে একথা বিশ্বাস করি না। ওয়ারফাণ্ডে আমি পঞ্চাশ টাকা চাঁদা দিয়েছি —রিয়্যালি? বেশ, বেশ? আই ওয়ান্ট এ ডগ লাইক ইউ। আর ইউ নট এ ডগ ডাক্তার ? —ডগ স্যার ?—যাদব ডাক্তার মাথার মণ টাকটাকে চুলকে নিলে এইবারে : ই-ইয়েস স্যার, এ ভেরি লয়্যাল ডগ। রবার্টস টলছে, চোখের রাঙা দৃষ্টি ঘােলা হয়ে আসছে ক্রমশ। অস্বাভাবিক গলায় বলে চলল, স্ত জামনিস আর ডগস, দ্য জাপস আর ভগল, ইণ্ডিয়ানস আর ডগস। ইউ আর এ ডগ ডাক্তার। -সাটেনলি স্যার। —ডাক্তার, কুকুর কি কখনাে স্বাধীনতা দাবী করতে পারে ? কখনন না স্যার। কুকুর সব সময় লাথি খাওয়ার জন্যে তৈরী থাকে নিশ্চয়? নিশ্চয় স্যার। যােলা চোখ দুটো সম্পূর্ণ করে মেলল রবার্টস। মদের নেশায় সমস্ত চিন্তা আর বুদ্ধি বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। একটা অপরিসীম ঘৃণা ফেনিয়ে ফেনিয়ে উঠছে অনুভূতির অন্তু প্রত্যন্তে। জামানদের ওপরে ঘৃণা, জাপানীদের ওপরে ঘৃণা, ইণ্ডিয়ানদের ওপরে ঘৃণা। দুর্দিন আর দুঃসময় এসেছে বলেই আজ মাটির তলা থেকে কেঁচোরা অবধি কেউটে হয়ে উঠেছে। ব্যানার্জিবাবু।

ছদ্মবেশে ঢুকে তারই রাজ্যপাটে ভাঙন ধরাবার উপক্রম করেছিল। গ ডগ ! আর সামনে বসে আছে যাদব ডাক্তার। তাদেরই একজন, তাদেরই মতাে কালাে চামড়া। হােক লয়্যাল, তবু এ ডগ ইজ এ ডগ আফটার অল। —ইউ থিঙ্ক সাে? -ই-ইয়েস স্যার—তেমনি শঙ্কিত গলায় যাদব ডাক্তার জবাব দিলে। ? বিদ্যুৎগতিতে রবার্টস উঠে দাঁড়ালাে। তারপর প্রচণ্ড বেগে একটা লাথি ঝেড়ে দিলে যাদব ডাক্তারের বুকের ওপরে। মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা আর্তনাদ বেরুল কি বেরুল না, পর মুহূর্তেই চেয়ার শুদ্ধ যাদব ডাক্তার হুড়মুড় করে উল্টে পড়ল মেজেতে। প্রভুভক্ত কুকুরের অকৃত্রিম পুরস্কার। মিনিটখানেক যাদব ডাক্তার হতভম্ব হয়ে পড়ে রইল মেজেতে। বিনা মেঘে বাজ নেমেছে আকাশ থেকে। ব্যথার চাইতেও বেশি জেগেছে। বিস্ময়কী অপরাধে এই শাস্তি কিন্তু অর ভাববার সময় নেই। তার চোখের সামনে রবার্টসের চোখ দুটো আগুনের মত জলে যাচ্ছে। আর একটু অপেক্ষা করলে ওই রকম আরাে দু একটা লাথির পুনরাবৃত্তি হওয়া অসম্ভব নয়। তড়িৎগতিতে সে উঠে পড়ল, তারপর মুক্তকচ্ছ হয়ে উধ খালে ছুটে পালিয়ে গেল বাইরে। কানের কাছে ক্রমাগত বাজছে প্রভুভক্ত কুকুরের অকৃত্রিম পুরস্কার। একটুর জন্যে মাতালের লাথিতে তার দুমূল্য মহাপ্রাণীটা বেরিয়ে যায়নি। রবার্টস হাে হাে করে হেসে উঠল। যাদব ডাক্তারের পলায়নটা ভারী উপভােগ্য বলে মনে হয়েছে তার। অ্যানাদার ভিক্টরী। আজকে মালয় ফ্রন্টে থাকলে নির্ঘাৎ যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারত রবার্টল।

কুলিরা অনিমেষকে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে এল নিয়ে এল ফ্যাক্টরীর সীমানার বাইরে। যারা এতক্ষণ রবার্টসের বাংলাের সামনে থ হয়ে দাড়িয়ে ছিল, তারাও সন্ত্রস্তভাবে পেছনে পেছনে অনুসরণ করতে লাগল। রবার্টস বলে দিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে দিতে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, কোন গণ্ডগােলই আর থাকবে না তা হলে। সেইখানেই পড়ে থাকবে, শেয়ালে বা অন্য জানােয়ারে খেয়ে শেষ করে দেবে। কোন দায়িত্ব থাকবে রবার্টসের, কোন অসুবিধাও না। জানােয়ারে যাকে মেরে ফেলেছে, তার সম্বন্ধে রবার্টস আর কীই বা করতে পারে ? কিন্তু কুলিরা অনিমেষকে জঙ্গলে নিয়ে গেল না। বনের আড়ালে তখন দিনান্ত ঘনিয়ে আসছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার চুডাের ওপর দিয়ে রক্তের ধারা যাচ্ছে গড়িয়ে। অনিমেষের সর্বাঙ্গে রক্ত। ক্লান্ত নিশ্বাস পড়ছে। নাক দিয়ে কপাল দিয়ে ফোটায় ফোটায় রক্ত নামছে, দিনান্তের আলােয় সে রক্ত জ্বলছে চুনীর মতাে। নির্মমভাবেই তাকে মেরেছে রবার্টস। কুলিরা অনিমেষকে নিয়ে গেল বাগানের মধ্যে। শুইয়ে দিল চা গাছের ছায়াকুঞ্জের ভেতরে। তারপরে জটলা করতে লাগল কী করা যায়। --কখননই না । প্রাণে ধরে তারা ব্যানার্জিবাবুকে কখনাে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসতে পারবে না। তাকে বাঁচাবে, তাকে লুকিয়ে রাখবে। নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন এখনাে মুছে যায়নি মন থেকে। রবার্টসের বন্দুকের নল দেখে ভয় পেয়েছিল, সাময়িকভাবে একটা নৈরাশ্য আর অবসাদ এসে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল ওদের চেতনাকে। কিন্তু সেটাই সব নয়—সেটাই শেষ কথা নয়। ৭ (সূর্য) ওদের রক্তের মধ্যে ডাক এসেছে। পৃথিবী ওদের, দিন ওদের, আগামী কালের যা কিছু সব ওদের। ভয় পেলে চলবে না। এর শােধ দিতে হবে, এর বদলা নিতে হবে কড়ায় গণ্ডায়। এখানকার চা বাগানের বিষাক্ত বাতাস আর কালাজ্বরের মৃত্যুবীজাণু ওদের নির্জীব করে ফেলেছে বটে, কিন্তু এই ওদের শেষ পরিচয় নয়। এই বাগানে যখন আড়কাঠি ওদের ভুলিয়ে আনে, তার আগে ওদেরও দিন ছিল, ওদের দিগন্তব্যাপ্ত আকাশ ছিল একটা। ওদের পাহাড়ে পাহাড়ে মহুয়ার গন্ধ ভাসত, ওদের দেশে এমনি করে ফুটত শালের ফুল। ওরা সজীব ছিল—ওরা সেদিন কুলি ছিলনা, মানুষ ছিল। দিন-মজুরীর বদলে কথায় কথায় ওদের কেউ লাথি মারতে পারত না। সেদিন ওরা তীর শানিয়ে রাখত, টাঙীতে ধার দিয়ে রাখত। আজ ওদের সেই তীর ভোতা হয়ে গেছে, মরচে পড়ে গেছে ওদের টাঙীতে । কিন্তু পৃথিবীতে আজ যুদ্ধ এসেছে, এসেছে ওদের যুদ্ধের দিন। আবার ওরা নতুন করে সেই অস্ত্রগুলােকে শান দেবে—এর বা নেবে। কিন্তু সে তাে পরের কথা, এখন কী করা যায় ? কুলি লাইনে নিয়ে রাখবার কোন উপায় নেই। সাহেবের চোখ শয়তানের চোখ। আর তার চাইতেও বেশি ভয় ওই ডাক্তারটাকে। ওই লােকটাকে ওরা কখনাে দুচক্ষে দেখতে পারে না। ব্যানার্জীবাবুর মুখে শুনেছে, ওদের অসুখ বিসুখে চিকিৎসা করার জন্যেই নাকি ডাক্তার এখানে থাকে। কিন্তু ওরা তার পরিচয় পায়নি কোনদিন। ওষুধ চাইতে গেলে গালাগালি করেছে, কখনাে দেখতে এলেও গাল দিয়ে গেছে অশ্রাব্য ভাষায়, যেন অসুখ করাটা ওদের পক্ষে একটা প্রচণ্ড অপরাধ। ওই ডাক্তারটাই সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে ঘােরে দিনরাত। ও ঠিক খবরটা জোগাড় করে সাহেবের কানে পৌছে দেবে। তা হলে? উপায় ঠিক হয়েছে। ধরমবীরের কাঠের পােলায় ব্যানার্জীবাবুর জায়গা ১৮ হতে পারে। ধরমবীরের সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে ব্যানার্জীবাবুর। ধরমবীর লােক ভালাে, গান্ধী মহারাজের চেলা। ••••••সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। বন থেকে সবে ফিরে এসেছে ধরমবীর, ফিরে এসেছে তার কাঠগােলায়। অনেকগুলাে গাছে আজ দাগ দিয়ে আসতে হয়েছে, কাল থেকে কাটাবার পালা। শালবনের মাঝখানে ধরমবীরের কাঠগােলা। শুধু শালবন নয়, এখানে ওখানে দু-একটা আম গাছ, লেবু গাছ, পাহাড়ী বাঁশের কয়েকটা ঝাড়ও আছে। আর এই আরণ্যক পরিবেশের ভেতরে অনেকখানি জায়গা নিয়ে ধরমবীর তার কাঠের গােলা ফেঁদে বসেছে। বড় বড় শালের গুড়ি, চেরা- কাঠের স্তুপ । সেই কাঠ থেকে বিচিত্র একটা মিষ্টি গন্ধ উঠে চারদিক ভরিয়ে দিয়েছে। ক্লান্ত ধরমবীর নেমে পড়ল টাট্ট থেকে। নির্জন থম থম করছে চারদিক। যারা কাজ করছিল তারা চলে গেছে, স্তব্ধতায় ভরে আছে সমস্ত। ধরমবীর টাট্ট টাকে একটা কাঠের খুঁটিতে বেঁধে কাঠের সিড়ি বেয়ে উঠল ওপরে। চাবির তাড়াটা বার করে ঘর খুললে, আলাে জ্বাললাে, নিজের হাতে স্টোভ জেলে কাপ চা খেল, তারপর একটা ইজিচেয়ারে বসে সিগারেট ধরালাে। ভারী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের তাগিদে অর্ডারের আর বিরাম নেই, এক মুহূর্তও সে বিশ্রাম পাচ্ছে না। এই লােকজনে তার কুলােবে না, আরাে জোগাড় করতে হবে । ধরমবীর একবার ঘরটার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলে। সব যেন মূর্তিমান বিশৃঙ্খলা। একার সংসার। প্রথম জীবনে একটি মেয়ে তাকে অশেষ দুঃখ দিয়েছিল, তার ফলে আর বিয়ে করাটা ঘটে উঠল না তার কপালে। তারপর উনিশ শশা তিরিশ সাল এল। পান্ধী মহারাজ ডাক দিলেন স্বরাজের লড়াইয়ের জন্থে। ভাণ্ডীতে সত্যাগ্রহ। আইন ভাঙতে হবে লড়তে হবে সরকারের বিরুদ্ধেসত্যাগ্রহীর বুকের শেষ রক্তকণা ।

দিয়ে স্বরাজ আনতে হবে ঝাঁপিয়ে পড়ল ধরমবীর, জেল খেটে। তারপর ঘুরতে লাগল জীবনের চাকা। টাকা দরকার, বাঁচা দরকার। বন ইজারা নিলে, সুরু করলে কাঠের ব্যবসা। আজ তার অবস্থা ভালাে, অনেক টাকার মালিক সে। প্রেম তাকে দুঃখ দিয়েছে, ব্যথা দিয়েছে বলেই সেটাকে সে ভুলতে চেয়েছে। কিন্তু যা ভুলতে পারেনি তা গান্ধী মহারাজের কথা, ডাঙী সত্যাগ্রহের শপথ। তাই ধরমবীর আজো পড়াশােনা করে। ভালাে হিন্দী জানে, ইংরেজিও জানে একরকম। সেইজন্যেই এই জঙ্গলের মধ্যেও জোগাড় করেছে একগাদা রাজনীতির বই। এতদিন একা ছিল, এইবারে এসে জুটেছে আর একটি আশ্চর্য লােক, তার নাম ব্যানার্জীবাবু। আশ্চর্য মনের মিল ঘটেছে দুজনের। এক সঙ্গে পড়ে, এক সঙ্গে আলােচনা করে। ব্যানার্জীবাবু যে কত জানে ভাবতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় ধরমবীর। তার যেন মনের কবাট খুলে যাচ্ছে। নতুন ভাব, নতুন ভাবনার একটা জগৎ। এই সন্ধ্যাবেলাতেই রােজ ব্যানার্জীবাবু তার কাছে আসে, আজও আসবে নিশ্চয়। ধরমবীর সিগারেট ধরিয়ে ব্যানার্জীবাবুর প্রতীক্ষা করতে লাগল। এমন সময় চোখে পড়ল বাগানের একদল কুলি আসছে। কী একটা জিনিষ তার বয়ে আনছে। আশঙ্কায় শিউরে উঠল ধরমবীর। নিশ্চয় জানােয়ারে মেরেছে কাউকে, কিন্তু কাকে? দ্রুতপায়ে সে নেমে এল বারান্দা থেকে। বললে, কে ? --আমরা। বাগানের কুলি। —কী হয়েছে? ব্যানার্জীবাবুকে মেরেছে। -ব্যানার্জীবাবুকে মেরেছে। তিন লাফে ধরমবীর নেমে পড়ল নীচে। বললে, কে মারলে? ১০ ০ তারপরে খানিকটা উত্তেজিত কোলাহল। তার মাঝখানেই সব কথা শুনতে পেল ধরমবীর, বুঝতে পারলে সমস্ত। কিন্তু তখন আর সময় নেই সে সব আলােচনা করবার । ধরাধরি করে অনিমেষকে নিয়ে এল নিজের ঘরে, শুইয়ে দিলে বিছানায়। আঘাতের জায়গাগুলাে ধুয়ে আইডিন লাগালে, তারপরে মুখে ঢেলে দিলে ব্রাপ্তি। আস্তে আস্তে চোখ মেললে অনিমেষ । কেমন আছাে ব্যানার্জীবাবু? -কে, ধরমবীর ? হ্যা ভাই, ভালাে আছি। কিন্তু মাথায় বড় কষ্ট হচ্ছে। সকালেই ডাক্তারকে খবর দেব । বাগানের ডাক্তার তাে আর তােমাকে দেখতে আসবে না, আমি সকালে সাইকেল দিয়ে লােক পাঠাব মাণিক নগরে। -আচ্ছা-অনিমেষ চোখ বুজল, তারপরে আবার আস্তে আস্তে চোখ মেলল। —ভাই, বুকে ভয়ানক লেগেছে। আমার হার্টের অবস্থা আগেই খারাপ ছিল। বােধ হয় বাঁচব না। তুমি শুধু একজনকে একটা খবর পাঠাও । কাকে খবর পাঠাব ? মুহূর্তের জন্যে অনিমেষের মুখের সামনে ভেসে উঠল সুমিতার মুখ। সুমিতা। একদিন আকাশে বাতাসে যে ফুলের গন্ধের মতাে পরিব্যাপ্ত হয়ে গিয়েছিল, একদিন যাকে কেন্দ্র করে মুখরিত হয়ে উঠেছিল ওর সমস্ত প্রাণ, সমস্ত গান, সমস্ত কবিতা। তারপর যখন জীবনের স্রোত বইল অমুখে, সেদিনও যে ওর পাশ ছাড়েনি, সমস্ত প্রতিকুলতার ভেতর দিয়েও ওর সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসেছিল, সেই সুমিতা। কিন্তু না। এখন দুর্বলতার সময় নয়। এখন সে মরবে না, তার বাবার ১০১ প্রয়ােজন আছে। যুদ্ধ এসেছে, এসেছে স্বাধীন ভারতের মানুষদের সৈনিক এতে দীক্ষিত করবার পরমতম অবকাশ। এখন মরলে চলবে না। আর যদি বা মরে তাতেই বা ক্ষতি কী। সুমিতার কাজে তাতে বাধা ঘটবে না, হয়তাে বা মনের দিক থেকে একটা মুক্তিই খুঁজে পাবে সে। কিছুক্ষণ অনিশ্চিত হয়ে রইল অনিমেষ। বললে, আদিত্যদাকে খবর দাও একটা—আদিত্যদাকে— আদিত্যদা ! ঠিকানা কী ? কিন্তু ঠিকানা পাওয়া গেল না। অনিমেষ আবার আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিলে ধরমবীর। আদিত্যের নাম সে শুনেছে অনিমেষের মুখে, যে খবরের কাগজে আদিত্য চাকরি করে সে কাগজটার নামও জানে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ সে একটা চিঠি লিখলে কলকাতায় তার এক দেশােয়ালী ভাইয়ের নামে। সে যেন যেমন করে হােক খবরটা ওই পত্রিকার আফিসে আদিত্যবাবুকে পৌছে দেয় । এদিকে কুলিরাও চুপ করে বসে ছিল না। অনেক রাত পর্যন্ত তারা লাইনে ফিরে গেল না। যতই সময় কাটছে, মনের ভেতরের ভয়টা ততই বেশি করে মুছে যাচ্ছে হালকা কুয়াশার মত। পাহাড়ী জীবন, মহুয়া ফলের গন্ধ, শানানাে তীর, মাদলের শব্দ। চা-বাগানের বাঁশি, কালাজর আর বাবুদের ভয়ে যা এতকাল চাপা পড়ে ছিল, তাই হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে আবার। অগ্নদগারের নতুন সম্ভাবনায় বুকের তলায় ধূমায়িত হয়ে উঠছে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। তাদের দিন আসছে, তাদের পৃথিবী আসছে। ব্যানার্জীবাবুর কথা মিথ্যে নয়, তাদের স্বপ্নও মিথ্যে নয়। কোনাে অন্যায় আর তারা সহ্য করবে না, এর বিচারের ভার নেবে নিজেদেরই হাতে। একবার দেখিয়ে দেবে তারা শুধু মার খেতেই জানে না, দরকার হলে দিতেও জানে। ১০২ ধরমবীরের গােলার বাগানে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত বসে রইল তারা। ব্যানার্জি বাবু বেঁচে আছে তাে? -হ্যা। বাঁচবে তাে ? বলা যায় না। পাথরের মতাে বসে রইল তারা। তারপর সেইখানেই নিয়ে এল তাদের ঘরের ভাত পচানন মদ। রবার্টসের মতাে ওদেরও শিরায় শিরায় নেশার আগুন জ্বলতে লাগল। যুদ্ধে ওরাও জয়লাভ করবে, ওরাও দমন করবে ওদের প্রবল পরাক্রান্ত শত্রুকে। রাত বাড়তে লাগল। ধরমবীরের ঘরে আলাে জ্বলছে। প্রহর জেগে অনিমেষের শুশ্রষা করছে ধরমবীর। শালবনের মধ্যে থম থম করছে রাত। বহুদূরে কোথায় হাতীর ডাক শােনা যাচ্ছে জঙ্গলের ভেতর থেকে তার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসছে বাঘের গর্জন। শালবনের খসখসে পাতাগুলােতে বাতাসের অশ্রান্ত দোলা, নানা জাতের পােকার অশ্রান্ত ঐকতান। কুলিরা কতগুলাে কাপড়ের মশাল জেলে নিয়ে গােল হয়ে বসেছে ধরমবীরের গােলায়। আগুনের আলােয় ওদের কালাে মুখগুলােকে ব্রোঞ্জের মূর্তির মতাে অসাড় নিষ্কম্প বলে বােধ হচ্ছে। ভুল করেছিল রবার্টস। রক্তবীজের রক্ত পড়েছে মাটিতে। তার প্রত্যেকটি বিন্দু থেকে জেগে উঠছে এক একটি সৈনিক, এক একজন শত্রু। অকালে বিনাশ করতে গিয়ে রবার্টস অকালেই জাগিয়ে তুলেছে চামুণ্ডাকে। সঁওতালের বুকের ভেতরে সঁওতাল বিদ্রোহের অতীত ইতিহাস অনুরণিত হয়েছে। রাত আরাে বাড়তে লাগল, একটা একটা করে নিতে লাগল মশালের আলাে। পচাইয়ের হাঁড়ি নিঃশেষিত হয়ে আসতে লাগল। শুধু ব্রোঞ্জের

মতাে কঠিন মুখগুলাে অন্ধকারের ভেতরেও জেগে রইল, জেগে রইল
তাদের চোখে আগ্নেয়গিরির আগুন।
পরের দিন ।
ভােরের বাঁশি বাজবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভাঙল রবার্টসের। নেশাটা কেটে
গেছে, চাঙ্গা আর ঝরঝরে হয়ে গেছে শরীর। আর তখনি মনে পড়ে গেল
অনিমেষের কথা।
কুলি সর্দারকে ডেকে পাঠালাে রবার্টস।
-ব্যানার্জীবাবুকে কী করেছিল?
-জঙ্গলে ফেলে দিয়েছি হুজুর।
জঙ্গলে-কোথায় ?
-কালীঝােরার খাদের ভেতর।
যাক নিশ্চিন্ত। কালীঝােরার গভীর খাদ। মানুষ প্রমাণ জল সেখানে।
দুপাশে দুর্ভেদ্য ঝােপ, চারদিকে শালবনের ছিদ্রহীন পত্রাবরণ। আশে পাশে
হিংস্র জানােয়ারের অভাব নেই। সুতরাং অনিমেষের জষ্ঠ আর ভাবতে
হবে না।
-কী বলেছি, মনে আছে তাে?
—আছে হুজুর।
—একথা যেন বাইরে কেউ টের না পায়। রটিয়ে দিবি ব্যানার্জীবাবুকে
বাঘে খেয়ে ফেলেছে।
--জী হুজুর।
কুলি সর্দার চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল রবার্টসের। শুধু
ঘুষি নয়, ঘুষও দরকার। ভেতরে ভেতরে অনিমেষ কতটা এগিয়ে গেছে কে
জানে। অথচ আজকে বড় দুর্দিন। খবরের কাগজের পাতায় আর
রেডিয়ােতে ক্রমাগত দুঃসংবাদ আসছে। এখান ওখান থেকে আসছে
১০৪

ধর্মঘটের বিবরণ। সুতরাং আমরা একটু সতর্ক হওয়া দরকার। কাজ করা দরকার আরাে একটু বুদ্ধিমানের মতাে। সময়টা সত্যিই বড় খারাপ। কুলি সর্দারকে আবার ডাকলে রবার্টস। -এই শােন। —কী হুকুম হুজুর ? —ততাদের সকলকে আজ মদ খাওয়ার বাড়তি পয়সা দেব আমি। আট আনা করে বেশি মজুরী সকলের মিলবে আজকে—যা বলে দে সবাইকে। জী হুজুর। কুলি সর্দার সেলাম ঠুকলে একটা। অনুগৃহীত হওয়ার একটা ভাব ফুটিয়ে তােলবার চেষ্টা করছে সর্বাঙ্গে। কিন্তু সত্যিই কি অনুগৃহীত হয়েছে অতটা? লােকটার চোখে মুখে একটা অস্বাভাবিক দীপ্তি যেন খেলা করে গেল, ঠোঁটের কোণে যেন ঝিলিক দিয়ে গেল বিচিত্র একটা হাসির আভাস। সঙ্গে সঙ্গে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেল রবার্টসের। —হাসলি যে—এই উলুক ? —না হুজুর, হাসিনি তাে? -না ? অল-রাইট। -রবার্টস গর্জে উঠল অকস্মাৎ গেট আউট, রাস্কেল। অর আই উইল শুট ইউ- কুলি সর্দার সােজা হয়ে দাঁড়ালাে, দাড়ালাে মেরুদণ্ড খাড়া করে। শেষ ঘা পড়েছে। এরপরে আর অপেক্ষা করা চলে না। এর পরে যা করবার তাদেরই করতে হবে । বড় বড় পা ফেলে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। সেইদিন সন্ধ্যা। ১০৫ রােজকার অভ্যাসের মতাে ঘােড়া ছুটিয়ে ফিরছিল রবার্টস। বেলা ডুবে আসছে—কাঞ্চনজঙ্ঘাকে রাঙা করে দিয়ে জঙ্গলের ওপারে আস্তে নামছে সূর্য। চমৎকার বাতাস দিচ্ছে শালফুলের গন্ধটা নেশার মতাে ছড়িয়ে যাচ্ছে চেতনায়। খট খট করে আসছে ঘােড়াটা, কাঁধে ঝুলছে বন্দুক। বনের সান্ধ্যত্র রবার্টসের মনটাকে প্রসন্ন আর প্রফুল্ল করে তুলেছে। গাইতে গাইতে চলেছে সে : ট্রী প্যারেরি—ট্রী প্যারেরি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গৌরবময় অভিযান-গীতি। দুদিকে জঙ্গলমাঝখানে বােরা। তার ওপর দিয়ে একটা কাঠের পুল। খট্ খট্‌ করে বীরদর্পে ঘােড়া পুলের ওপর উঠে পড়ল। রবার্টসের গলার সুর চড়ল আরাে এক পর্দা: ট্রী প্যারে—রি- কিন্তু গানটা শেষ করা রবার্টসের কপালে ছিল না। জঙ্গলের ভেতর থেকে অব্যর্থ লক্ষ্যে দুটো তীর এসে বিধল—একটা রবার্টসের বুকে আর একটা পেটে। প্রবল কণ্ঠে একটা অভিশাপ দিয়ে আছড়ে পড়ল রবার্টল। ছুটন্ত ঘােড়ার পা-দানীতে একখানা পা আটকে গিয়ে ঝুলন্ত মাথাটা কাঠের খুঁটিতে আছড়ে আছড়ে চুরমার হয়ে গেল, তার পরেই শেষ আশ্রয়চ্যুত হয়ে দেহটা ঝপাং করে পড়ল বিশ ফুট নীচে কর্দমাক্ত বােরার মধ্যে। খট্ খট্ করে বাগানের দিকে ছুটে চলে গেল ঘােড়া, আর বােরার কাদাজলটা লাল হয়ে উঠল একটু একটু করে। তার পরেই আগুন জ্বলল। আর ঠিক পরের দিন বেলা বারােটার সময় রংবােরা বাগানে এসে পৌছল আদিত্য। ১০৬ আট ঘুম ভাঙতেই মণিকাদি তন্দ্রাজড়িত চোখে একবার সামনের সেলফের দিকে তাকালেন। টাইমপীসটা নির্ভুল নিয়মেই চলছে, যুদ্ধের এত বিড়ম্বনার মধ্যেও ওর কোন ব্যতিক্রম নেই। ঘরের ভেতর প্রথম সুর্যের আলো পড়েছে—সকালটা বড় তাড়াতাড়ি হয়ে গেছে বলে মনে হল। ঘড়ির কাঁটা বলছে সাড়ে সাতটা। মানে হাতে আর এক ঘণ্টা সময় নটার সময় ডিউটি দিতে হবে হাসপাতালে। মনটা বিরক্তিতে কালাে হয়ে গেল। অভ্যাসবশেই ডাকলেন : খসরু। ডাকটা আর্তনাদের মতাে আছড়ে পড়ল শূন্যে ঘরের মধ্যে। তার শেষ রেশটুকুও মিলিয়ে গেছে মুহূর্তে। সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ঠুর নির্মম সত্যটা সূর্যের আলাের মতােই প্রতিভাসিত হয়ে উঠল। খসরু পালিয়েছে। সম্রাট সাজাহানের শূদ্য তখত-ই তাউস অধিকার করবার জন্যেই বােধ হয় চটপট উঠে পড়েছে দিল্লী এক্সপ্রেসে। অতএব অতএব জীবনটা একেবারে নীরস। শুধু নীরস নয়, মরুভূমি এবং সাহারা মরুভূমি। আপাতত এই মুহূতে গলাটা, শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, সমস্ত অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠেছে একপেয়ালা চায়ের জন্যে। খসরু থাকলে এখন কী আর ভাবনা ছিল ? দরজায় এতক্ষণে কড়া নড়ে উঠত, খসরুর আদেশ আসত : চটপট উঠে পড়ুন দিদিমণি, জল চাপিয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে শােনা যেত পাশের ঘরে স্টোভের গর্জন, নাকে আসত খিদে-চাগানাে মাখন-মাখানাে ভাজা টোস্টের গন্ধ। তড়াক করে মণিকাদি উঠে পড়তেন, নিশ্চিন্ত আরামে মন বলে উঠত। আঃ! কিন্তু কিন্তু এখন সেসব স্বপ্ন। যুদ্ধ মানুষের অনেক স্বপ্নকেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, করুক-মণিকাদির আপত্তি ছিল না। কিন্তু আক্রমণটা তাঁর ঘাড়ের ওপরে কেন ? উঃখসরু। ব্যাটার মনে-মনে এই ছিল। এত করে খাইয়ে-দাইয়ে—এত আদর-যত্ন করে—শেষে এই কাণ্ড। নাঃ —পৃথিবীটা ভালাে লােকের জায়গা নয়। সব কৃত—সব বিশ্বাসঘাতক। এমনকি ঘড়িটাও। যেন ঘােড়ার মতাে চলেছে। একটু দাড়ানা বাপু। মােটা মানুষ, একটু হাঁফ ছাড়তে দে। কিন্তু ছাড়তে দিচ্ছে কই। দেখতে দেখতে পাঁচ-পাঁচটা মিনিট উড়ে গেল হাওয়াতে। আর দেরি করা চলে না। মণিকাদি কম্বলটা আস্তে আস্তে সরালে গায়ের ওপর থেকে। অসম্ভব আশায় একবার অভ্যাস মতাে তাকালাে রান্নাঘরের দিকে। পৃথিবীতে কত মিরাই তাে ঘটে, কিন্তু এমন একটা কিছু কি ঘটতে পারে না এখন ? বিবেকের দংশনে মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছে খসরু। হঠাৎ তার মনে হয়েছে দিদিমণিকে এমন বিপন্ন অবস্থায় ফেলে আসা গুরুতর নৈতিক অপরাধ। আর সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে সে, লাফিয়ে উঠে পড়েছে উজানমুখী গাড়িতে। তারপর ভাের বেলা এসে নেমেছে হাওড়াতে, সােজা চলে এসেছে সীতারাম ঘােষ স্ট্রীটের এই বাড়িতে, ঢুকেছে রান্নাঘরে, কেটলিতে জল চাপিয়ে দিয়ে ডাকছে : দিদিমণি কিন্তু বৃথা। কলিযুগে মানুষের বিবেক নেই—মির্যাল-এর দিনও ফুরিয়ে গেছে অনেককাল আগে। সুতরাং রান্নাঘর শ্মশানের মতাে খাঁ খাঁ করছে। স্টোভের শব্দ আসছে না, আসছে না পেট আর প্রাণজুড়ােনাে মাখন-মাখানাে টোস্টের গন্ধ। শুধু শীতাত ঘরটার ভেতরে রাত্রির ইদুরের গায়ের গন্ধ যেন জমাট ঠাণ্ডার সঙ্গে ঘনীভূত আর বিস্বাদ হয়ে আছে। মােটা মানুষ মণিকাদি উঠে পড়ল। একটা স্কাফ জড়িয়ে নিলে গায়ে। ১০৮ আগে চা-টা করে নিয়ে তারপর যেমন করে হােত সেদ্ধ-ভাত একটা চাপিয়ে দিতে হবে। নটার সময় ডিউটি, ভুললে চলবে না কোন উপায়েই। শুধু একটা সান্ত্বনা : বাঁকুড়ার ঝি-টা পালায়নি এখনাে। তিনকুলে কেউ নেই, পালাবার জায়গাও নেই। তাছাড়া অন্য পেশাও তার আছে বলে মণিকাদির সন্দেহ হয়। একমাত্র সেই আছে, কলতলায় বাসন মাজছে ও পালালেও মন্দ হত না। সুখের পাত্রটা একেবারে কানায় কানায় ভরে উঠত। গজগজ করতে করতে মণিকাদি স্টোভ ধরালাে। বহু পরিশ্রমে কাপ- পেয়ালা জড়াে করলে একসঙ্গে, খুঁজে আনলে চা-দুধ-চিনির কৌটো। তারপর চায়ে একটা চুমুক দিয়ে চোখ বুজে ভাবতে লাগল । আর কতদিন এভাবে বিড়ম্বনা সহ্য করা যায়। নাকি এবারে পালাতেই হবে কলকাতা থেকে? কিন্তু সুখ মণিকাদির কপালে ছিল না। দরজার কড়া নড়ে উঠল। হঠাৎ মণিকাদির হৃৎপিণ্ডটা উছলে উঠল একবার। খসরু ফিরে এল নাকি? আহা তা যদি হয়— কড়া নড়ছে। নাঃ, খসরুর চেনা-হাতে মিষ্টি কড়া নাড়া এ নয়। অত সুখ ভগবান কপালে লেখেন নি। নিশ্চয় পেসেন্ট। কপালের ওপরে বিরক্তির রেখাগুলাে সংকুচিত হয়ে উঠল অধবৃত্তের আকারে। দাড়ান আসছি- এক চুমুকে বাকী চা-টা গিলে নিলে মণিকা। স্কাফটা ভালাে করে জড়িয়ে নিলে গায়ে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা আঁচড়ে নিলে এক মিনিটে। শাড়ি বদলাবার আর সময় নেই, সভ্যতা-ভব্যতাও রসাতলে গেল মনে হচ্ছে। দরজাটা খুলল মণিকা। একটি মেয়ে দাড়িয়ে। মেয়ে নয়-হতভাগা হাড়-জ্বালানাে মেয়ে। সুমিতা মিত্র।

—ও, তুই। কী মনে করে রে ?
দর্শন দিতে এলাম।
দরকার নেই দর্শনে।
সুমিতা ফেরবার জন্যে পা বাড়ালাে : চলে যাব নাকি ?
হতাশভাবে মণিকাদি বললে, লাভ কী। একটু পরেই তাে আবার
আসবি জালাতন করতে। তার চাইতে ঘরে আয় বাপু, বোস। যা বকবক
করার ইচ্ছে থাকে করে যা।
সুমিতা হাসলবাঃ, কী চমৎকার অভ্যর্থনার ভাষা। মণিকাদি, জন্মাবার
সময় তােমার মুখে কী দিয়েছিল বলতে পারে? নিশ্চয় মধু নয় ?
-না, কুইনাইন।
—তাই দেখতে পাচ্ছি। সেই কুইনাইনের জোরেই ডাক্তার হয়েছে
তাে? শিখেছ লােককে গাল দেবার তৈরি আর চোস্ত বুলি ?
—তর্ক করিসনি সুমি ভেতরে আয়। আমার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে,
ওদিকে হসপিট্যাল ডিউটির সময় হয়ে গেল।
দুজনে চলে এল ভেতরে। সুমিতা বললে, দিব্যি চায়ের গন্ধ বেরিয়েছে
ততা। নিশ্চয় একা খাচ্ছ না মণিকাদি?
নিশ্চয় একা খাচ্ছি। সখ থাকে বানিয়ে নাও নিজের জন্যে।
তাতে আপত্তি নেই—সােৎসাহে সুমিতা কেটলিটা স্টোভে চাপালাে।
—আর শােন সুমি-মণিকা আদেশ দিলে আমার জন্ঠে দুটো ভাত
আর ডিমসেদ্ধ বসিয়ে দিস তত লক্ষ্মীটি। এক্ষুণি খেয়ে বেরুতে হবে।
চা নিয়ে এল সুমিতা। আরাম করে বসল মণিকাদির ডেক-চেয়ারে।
বললে, নাঃ, মুখটা তােমার যেমনই হােক না মণিকাদি, আতিথেয়তাটা
ভালাে। লােক তুমি নেহাৎ মন্দ নও দেখতে পাচ্ছি।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়িয়ে তখন প্রসাধন শুরু করেছে মণিকা।
*
১১০

০
অকুটি করে বললে, তােমার সার্টিফিকেটে আমার দরকার নেই। কিন্তু
মতলব কী সেইটে আগে বলল দেখি। বিনা কাজে তাে পা দাও না। আজ
প্রায় সাত দিনের মধ্যে টিকিটিও দেখতে পাইনি।
—বড় ব্যস্ত ছিলাম মণিকাদি। নতুন সংসার পেতেছি—তার দায়িত্ব
কত, সে তাে জানাে।
সংসার?
সবিস্ময়ে হাঁ করলেন মণিকাদি : তাের আবার কিসের সংসার রে ?
বাঃ, সেই চারতলা বাড়িটা ? বিনা পয়সাতে অত বড় একখানা
বাড়ির মালিক হলাম, সেটা কি খালি পড়ে থাকবে নাকি? সংসার গুছিয়ে
নিতে হবে না ?
সংসার গুছিয়ে নিলি ? বর পেলি কোথায় ?
বর জুটল না—হঠাৎ সুমিতার প্রসন্ন হাসিটা যেন ম্লান হয়ে এল। কিন্তু
বর না থাকলেই কি আর সংসার হয় না? একবার গিয়ে দেখে এসাে না
দেখলে আর ফিরতে চাইবে না।
দরকার নেই দেখে—ঐকান্তিক তাচ্ছিল্যের একটা ভঙ্গি করলে
মণিকা :
কতগুলাে বাউণ্ডুলে ছেলেমেয়ে জুটিয়ে নিয়ে ওখানে পলিটিক্স
করছিস তাে। সৰশুদ্ধ, একদিন জেলে যাবি, এই একখানা কথা বলে
রাখলাম।
সুমিতা বললে, তা তাে যাবই। কিন্তু তুমি অ্যাপ্রুভার হয়ে, গায়ে
আঁচড়টাও লাগবে না বরং পরকালের কাজ হয়ে যাবে।
কী ভেবে হঠাৎ মুখ ফেরালে মণিকা।
-একটা কথা শুনবি সুমিতা ?
কী কথা?
বল গুনবি কথাটা
?
১১১

? সুমিতা হেসে ফেলল : মুখ অত গম্ভীর করছ কেন? ভাবটা যেন বলে ফেলবে আমার সাসপেক্টেড ‘টি-বি’র লক্ষণ দেখেছ। -না , ঠাট্টা নয়। -মণিকার মুখে গাম্ভীর্যের মেঘ তেমনি ঘন হয়েই রইল । আমার কথাটা শােন। বিয়ে করে ফেল। —বিয়ে! সুমিতার শরীরের ভেতর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ বয়ে গেল। এমনভাবে চমকে উঠল যে, আর একটু হলে হাত থেকে চায়ের পেয়ালাটাই আছড়ে পড়ত ঝনঝন করে। -হ্যা, বিয়ে। এসব করে কোন লাভ নেই। জোরে—অনেকটা যেন জোর করেই, সুমিতা হেসে উঠল : মণিকাদি আজকাল ডাক্তারী ছেড়ে ঘটকালির পেশা নিয়েছ নাকি কিন্তু আমাকে ঝােলাবার চেষ্টা করছ কেন? নিজের ইচ্ছে হয়ে থাকে বলল, আমি পাত্র জুটিয়ে আনি। বয়েস নেই, থাকলে তাের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে থাকতাম না। কিন্তু তাের তাে সময় যায় নি। শােন সুমি, এর পরে যেদিন ক্লান্ত হয়ে উঠবি, সেদিন বুঝবি কী হারালি জীবন থেকে। সুমিতা বললে, তােমার উপদেশ মনে থাকবে। কালই কাগজে বিজ্ঞাপন দেব পাত্র চাই বলে। দেখি কোন্ ময়ুর-চড়া কার্তিক বরমাল্য নিয়ে আসে। আমার জন্যে। মণিকাদি বললেন, আচ্ছা, বিয়ে করতে আপত্তি কী —কিছু না। কিন্তু আমার এমন কপাল মণিকাদি—বর আর ধরা দিল না, ছিটকে পালিয়ে গেল। তাইতাে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি—অলিতে-গলিতে, আলােয়-অন্ধকারে। যদি কোনদিন ধরা দেয়, তুমি খবর পাবে বৈকি। কিন্তু এ যাত্রা বােধ হয় নিতান্তই শ্মশান-বাসর। সুমিতা হঠাৎ উঠে পড়ল । দেখি তােমার ভাতটা হয়ে গেল কিনা। ? ১১২ ভাত কিন্তু সত্যিই হয়নি। চড়িয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই ভাত যে ফোটে না, এ কথাটা মণিকাও জানে, সুমিতাও জানে। তবু সুমিতা সরে এল পালিয়ে এল। কাল সারারাত মনের মধ্যে ঘুরেছে রমলা আর বাসুদেবের কথা। বাসুদেব আত্মহত্যা করতে চায়। কিন্তু বুক ফেটে মরে গেলেও অনিমেষ ফিরে তাকাবে না। ফুলের মধ্যে তার বস্ত্র লুকিয়ে আছে। অন্যায় হচ্ছে—অত্যন্ত বেশি প্রশ্রয় পাচ্ছে এলােমলাে ভাবনাগুলাে। এ উচিত নয়, একে দমন করা দরকার। চারতলা বাড়ির অত বড় সংসারের মধ্যেও মনটাকে সে তলিয়ে দিতে পারছে না, থেকে থেকে বিদ্রোহ করে উঠছে। সেকি দুর্বল—মলার চাইতেও দুর্বল ? আজ সকালে সে কেন ছুটে এল মণিকাদির এখানে? কী প্রয়ােজন ছিল ? এইখানেই অনিমেষের সঙ্গে তার শেষবারের মতাে দেখা হয়েছিল বলে ? সাতদিন হতে চলল আদিত্যদার কোন খবর নেই, অনিমেষেরও না। সে কি অবচেতন মনের ভেতর থেকে একটা আশা পােষণ করছিল যে, এখানে এলেই ওদের কিছু একটা খবর পাওয়া যাবে ? হঠাৎ নিজেকে অত্যন্ত অভিশপ্ত, অত্যন্ত অসহায় বলে মনে হল সুমিতার। এগােতে পারছে না, পিছিয়ে যাবার উপায় নেই।একি বিড়ম্বনা পেয়ে বসল তাকে ? হঠাৎ মণিকাদির ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল। সুমিতা শুনতে পেল মণিকা কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। তার পরেই তীব্র উত্তেজনা উৎকণ্ঠায় মণিকা ডাকলে, সুমি ! সুমিতা বেরিয়ে এল রান্নাঘর থেকে। সমস্ত চেতনাটা চকিত হয়ে উঠেছে। টেলিফোনে কার খবর এল কে জানে। আদিত্যের, না অনিমেষের ? —কী হল মণিকাদি। —একটা ভয়ানক দুঃসংবাদ আছে সুমি।

। সুমিতার মুখ থেকে রক্ত সরে গেল, বুকের মধ্যে হাতুড়ির ঘা পড়তে লাগল। কথা বলতে পারল না, শুধু মণিকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বিলভাবে। শীলা আফিং খেয়েছে। হাসপাতাল থেকে ফোন করেছে আমাকে। মনের ভেতর থেকে ভয়ের গুরুভার পাথরটা নেমে গেল, কিন্তু জেগে উঠল অপরিসীম বিস্ময়। সুমিতা বললে, শীলা? কোন্ শীলা ? —আমাদের শীলা রে। সেই যে শশাঙ্ক লাহিড়ীর —বুঝতে পেরেছি। সুমিতার গলায় বেদনার সুর ফুটে উঠল । কিন্তু অমন শান্তশিষ্ট মেয়েটা আফিং খেতে গেল কেন? শশাঙ্ক কী করছে? শশাঙ্কের কোন খবর নেই। —খবর নেই ? না, পালিয়েছে। কলকাতায় বােমা পড়বে সেই ভয়ে আগে থাকতেই তার দামী মূল্য জীবনটা নিয়ে চম্পট দিয়েছে। কয়েকটা মুহূত স্তব্ধতা। দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, কেউ কোন কথা বলতে পারছে না। শশাঙ্ক লাহিড়ী পালিয়েছে। বীরের মতাে অসবর্ণ বিয়ে করে বাপের অত বড় সম্পত্তির মায়া কাটিয়ে সমাজে একটা আদর্শ স্থাপন করেছিল শশাঙ্ক। কিন্তু তারও একটা সীমা আছে এবং এই যুদ্ধের সুযােগে শশাঙ্ক সে-সীমাটাকে বুঝে ফেলেছে। বহু কষ্টে ক্ষিতি-অপ-তেজ থেকে সংগ্রহ করা দামী দুর্লভ প্রাণ। তাকে এত সহজে হারালে চলবে না, বরং জইয়ে রাখলে ভবিষ্যতে অনেক শীলা আসবে। কারণ শশাঙ্কের রূপ আছে, শশাঙ্কের টাকা আছে এবং শশাঙ্কের অভিনয় করবার ক্ষমতা আছে। সুমিতা হঠাৎ হেসে উঠল। যাক, বিবাহিত জীবনের চরম পুরস্কার পেল শীলা। এর পরে আমার পত্রপাঠ বিয়ে করে ফেলা উচিত, কী বলল মণিকাদি। ১১৪ মণিকা কথা বললে না, ব্যথায় সমস্ত মুখটা পার হয়ে গেছে। তার পরেই পায়ে গলিয়ে নিলে একটা স্যাণ্ডাল, হাতে তুলে নিলে তার ডাক্তারী ব্যাগটা। -একবার যাবি সুমিতা ? দেখে আসবি? —চলল। বাচবে তাে ? -জানি না। ওরা স্টমাক পাম্প দিয়েছিল, কিন্তু বেশি তুলতে পারে নি। অনেকটাই কনজিউম করে ফেলেছে তার আগে। মরুক, ওর মরাই ভালাে। অনেক কষ্ট পেয়েছে, এবার রক্ষা পাবে। ঘরে তালা দিয়ে দুজনে রাস্তায় নেমে এল। নির্জন নরেন্দ্র সেন স্কোয়ার। বন্ধ আর শূন্য বাড়িগুলাে যেন ভয়াতুর চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে শূন্য দিগন্তের চক্ৰবালে—যেখানে মৃত্যুব বহন করে জাপানী বিমান দেখা দেবে। লােহার বিচ্ছিন্ন বেঞ্চগুলাে সব ফঁকা—মরা ঘাসে রাত্রির শিশির ঝিকমিক করছে। ব্যথাবিদীর্ণ ভয়ার্ত কলকাতার চোখের জল যেন ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে দিকে দিকে। প্রায় নির্জন পথ দিয়ে চলল দুজনে। কলেজ স্ট্রীটের মােড় থেকে ট্রাম ধরতে হবে-ওখান থেকে বেলগাছিয়া। —খেয়ে নিলে না মণিকাদি? -এসে খাব। -মণিকার স্বর ক্লান্ত শােনালাে। সুমিতা ভাবছে শীলার কথা। অবশ্য ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল না, তবু চিনত শীলাকে। ছােট একটুকরাে মেয়ে কথা বলে না, চুপ করে শশানে, মিষ্টি করে হাসে। ভীরু চোখ, শান্ত স্বভাব। বলার চাইতে অনুভব করে বেশি। লেখাপড়া শিখেছে, তবুও গৃহকপােতী। পথে নামলে কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায় বাইরের পৃথিবীটাকে ভর করে, নিজেকে অনুভব করে একান্ত অসহায় ৰলে। তিনপুরুষ কলকাতায় কাটিয়েছে, তবু চালচলন দেখলে মনে হয় যেন গ্রামের একটি ছােট মেয়েকে হঠাৎ মহানগরীর এই জীবন-স্রোতের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে—এখানে সে যেমন বেমানান তেমনি অসঙ্গত। সেই শীলা। হঠাৎ এ কী করে বসল। অমন ভী ছােট মেয়েটা পরিবারের শাসন মানল না, বাঘের মতাে বিশুদ্ধ ব্যুরােক্র্যাট বাপের তর্জনকে ভয় করলে না, সমাজকে অস্বীকার করলে, বেরিয়ে এল শশাঙ্কের হাত ধরে। সেদিন সবাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল—জলভরা মেঘে যে প্রচ্ছন্ন বস্ত্র থাকে, এই সত্যটাকে বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু এই জোরটা কি এসেছিল শীলার নিজের ভেতর থেকেই ? না—এই শক্তি সে পেয়েছিল শশাঙ্কের কাছ থেকে, পেয়েছিল তার প্রেম থেকে? ভালােবাসা শীলার জন্মান্তর ঘটিয়েছিল, ভীরু মেয়েটির ভেতর থেকে আর একজনকে জাগিয়ে তুলেছিল যে কাউকে ভয় পায় না—পৃথিবীকে নয়, সমাজকেও নয়। নিশ্চয় তাই—সুমিতা ভাবতে লাগল । নিশ্চয়ই তাই। নিজের জীবনেও এই সত্যটাকে সে বুঝতে পেরেছে। অ্যাভােনিসের ভেতরেও হার্কিউলিস জাগে। লীলাসঙ্গিনী হয় বিপ্লবী-নায়িকা। হাত থেকে লীলাকমল ঝরে গিয়ে সেখানে আসে তলােয়ার। সে তলােয়ার অগ্নিদীপ্তবস্ত্রের চাইতেও গুরুভার। তবু তাকে বহন করতে হয়, সেই দানকে গ্রহণ করতে হয়। “কী পেলি তুই নারী বলে আক্ষেপ করা বৃথা-চোখের জল মূল্যহীন। কিন্তু নিজের কথা থাক। শীলা। ভুল করেছিল। শশাঙ্ক ওকে লীলা- কমল দেয়নি, তলােয়ারও নয়। যা দিয়েছে, তা বঞ্চনা। তাই আজ নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে শীলাকে। আফি খেয়েছে। হয়তাে বাঁচবে হয়তাে বাঁচবে না। মণিকাদির অসন্তু গুঞ্জনে চমক ভাঙল মুমিতার। -মােটা মানুষ, হাঁটতেও পারি না ছাই। একটা রিক্সা যদি পাওয়া যেত—কিন্তু বৃথা আশা। রিক্সা আছে, চলছেও অনেক, কিন্তু সব উজানের শােতে। বাক্স-প্যাটা আর বাক্স-প্যাটার সামিল মানুষ। হাওড়া-শেয়ালদার মুক্তিপথ দিয়ে খাচায়-বন্দী মহাপ্রাণীগুলাে উড়ে পালাচ্ছে। চার আনার রিক্সা আড়াই টাকা। মণিকা বললে, কী আর করবে, হেঁটেই চলল—একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। ভাবটা এই: যেন সুমিতারই কষ্ট হচ্ছে তাকে একটা রিক্সাতে চাপিয়ে দিতে না পারলে মণিকার মন শান্তি পাচ্ছে না। সুমিতা সান্ত্বনা দিয়ে বললে, চলাে, আর দু-পা রাস্তা—এক্ষুণি তাে ট্রাম পাবে। —অগত্যা। শীলা। সুমিতা ভাবছে : এই যুদ্ধ অনেক সত্যকে অনাবৃত করল, মুখােস খুলে দিলে অনেক মিথ্যার, উজ্জ্বল আর নির্মল করে তুললে অনেক বিভ্রান্তিকে। যেন সুমিতা বেঁচে গেছে—যেন একটা ভার নেমে গেছে কাল সারারাত্রির বিনিদ্র অস্বস্তিটার ওপর থেকে। ভালােই করেছে অনিমেষ রক্ষা করেছে একটা স্বপ্নভঙ্গ থেকে—হয়তাে শীলার মধ্যে আফিংয়ের হাত থেকে।—সেও তত রােমান্টিক ছিল, তারও তাে এই রকম বিল আত্মবিস্মৃতি ছিল। কিন্তু অনিমেষ নিজেকে বাঁচিয়েছে, তাকেও বাঁচিয়েছে। লীলাকমল নাই রইল—নাই-বা রইল পদ্মপর্ণে নিজের স্বপ্ন-কামনার রক্তরাগ। তার চাইতে ঢের বড় সত্য হাতের এই তলােয়ার। আত্মরক্ষা করতে পারে, আঘাত করতে পারে—আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে পারে। নিঃশকে পথ কাটতে লাগল। সুমিতা ভাবছে-মণিকাও ভাবছে। গাড়ির হােত চলেছে স্টেশনের দিকে, ওই পথ দিয়েই পালিয়ে গেছে শশাঙ্ক। পালিয়ে গেছে অনেক অসত্য-অনেক মিথ্যা—অনেক অভিনয়ের নিপুণ আর নিখুঁত চতুরতা। ১১৭ মােড়। ট্রাম এল। যাত্রীর ভিড় নেই—দুজনে তেমনি নীরবে ট্রামে উঠে বসল। হাতের ঘড়িটার দিকে একবার তাকালাে সুমিতা। ন’টা বাজে। তার সংসার এখন মুখরিত। ছেলেমেয়েরা একদল খেয়ে-দেয়ে এখুনি বেরিয়ে বেরিয়ে যাবে। ওদের শীলার কথা ভাববার সময় নেই সুমিতার হৃদয়ের কথাও না। তার চাইতে ঢের বড়াে, অনেক বড়াে কথা ওরা ভাবছে। দেশ। দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশ, মহাদেশ ছাড়িয়ে পৃথিবী। ওরা সেই দিনটাকে স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছে যেদিন পৃথিবীতে সব মিথ্যা—সব অপমান—সব উৎপীড়নের সমাপ্তি হয়ে গেছে—যেদিন শীলারা এত সহজে ভুল করে না, আর যদি ভুলই করে, তাহলে আত্মহত্যা করে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় না। এদের নিয়েই সুমিতার সংসার—এদের স্বপ্নই আগামী কালের, আগামী পৃথিবীর সংসার। আর শীলার সংসার। ঠুনকো কাচের মতাে ভেঙে পড়ল মাত্র একটি আঘাতে। এতটুকু ভর সইলাে না। চোরাবালির বনিয়াদ শিথিল হয়ে এক মুহূর্তে মাটির তলায় দুজনকে টেনে নিয়ে গেল। মনের দিক থেকে হঠাৎ যেন জোর পেল সুমিতা। হঠাৎ যেন পুঞ্জীভূত আলস্য আর জড়তা—দ্বিধা আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে সে পথ খুঁজে পেল। সে শক্তি ফিরে পেয়েছে। শীলার সংসার ভাঙবে না-মরবে না শলা। সে বেঁচে উঠবেসামগ্রিক সংসারের নতুন ইঙ্গিত নতুন সম্ভাবনায় ধন্য হয়ে উঠবে। শীলা মরবে না। কিন্তু শীলা বাঁচলাে না। ওরা যখন পৌছল, তার দশ-পনেরাে মিনিট আগেই শীলা মরে গেছে। হাসপাতালের লােহার খাটে শাদা-চাদরে বুক পর্যন্ত চেকে সে ঘুমিয়ে আছে। স্টমাক টিউব বসানাের চেষ্টায় গালের একদিকে একটুখানি চিরে গিয়েছিল সেখানে একটুখানি কালাে রক্ত জমাট ১১৮ বেঁধে আছে শুধু। আর কোনখানে কোন বৈলক্ষণ্য নেই—ঘুমিয়ে আছে শীলা। শশাঙ্ককে নিষ্কণ্টক করেছে, নিজেকে ভারমুক্ত করেছে। একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলেন মণিকাদি। সুমিতা শুধু চিত্রকরা চোখে তাকিয়ে রইল শীলার মৃত্যু-পাণ্ডুর মুখের দিকে। ডাক্তার বললেন, অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল মিস সেনবাঁচানাে গেল না। অনেকটা আফিং খেয়েছিল, খবরও পাওয়া গিয়েছিল ঢের দেরীতে। ততক্ষণে রক্তের ভেতরে ছড়িয়ে গেছে। একটু চুপ করে থেকে ডাক্তার আবার বললেন, শুধু আত্মহত্যাই করেনি, সি হ্যাজ অলসাে কিন্তু এ চাইল্ড উইথ হার। আবার একটা আর্তনাদ। এবার শুধু মণিকা নয়, অমিতাও। শীলা মরে গেছে। সেই সঙ্গে ধ্বংস করে গেছে শশাঙ্কদের পাপ- শশাঙ্কদের বীজাণু। বড়লােক শশাঙ্ক-অভিজাত শশাঙ্ক, মেয়েদের জীবন নিয়ে যারা অসঙ্কোচে ছিনিমিনি খেলতে পারে সেই শশাঙ্ক। কিন্তু এক শীলাই কি নিজেকে বলি দিয়ে নীল রক্তের এই অভিশাপকে ধ্বংস করতে পারবে? এত সহজেই কি এর সমাপ্তি ? সুমিতা ভাবতে লাগল : এত সহজেই কি এই রক্তবীজেরা পৃথিবী থেকে অপমৃত আর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? খােলা জানলা দিয়ে সূর্যের আলোে শীলার মুখে এসে পড়েছে। এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারে ওই পূর্ব-পৃথিবীর আদিম দিনে তামস বিজয়ী যে সূর্যকে অগ্নিমন্ত্রে বন্দনা করা হয়েছিল; অন্ধকারের পরপার থেকে অমৃতরূপে যে হিরন্ময় দ্যুতির আবির্ভাব-যার ত্রিকালদর্শী নিরঞ্জন দৃষ্টি অতীত-ভবিষ্যৎ- বর্তমানকে স্পষ্ট আর প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছে। * রমলার ঘুম ভাঙল কবি ইন্দুর কণ্ঠস্বরে। রাত্রির সেই ভীরু লাজুক কৰিটি আর নেই। এখন ওর মধ্যে দ্বিতীয় সতা জেগেছে। চীৎকার করে সমস্ত বাড়ীটা মাথায় করে তুলেছে, মনে হচ্ছে যেন মারামারি বাধিয়েছে। কিন্তু মারামারি নয়, কাকে যেন একটা প্রাণপণে দুরূহ রাজনীতির জটিল তত্ত্ব সম্বন্ধে জ্ঞানালােক বিতরণ করছে। রমলা ঘর থেকে বেরিয়ে বললে, কী শুরু করেছ ইন্দু। মানুষকে কী একটু ঘুমােতেও দেবে না ? ইন্দু বললে, বেলা আটটা পর্যন্ত ঘুমােবে মানে? ওসব জমিদার-গিন্নীর চাল ছাড়ে। —না, শেষ রাত্রে উঠে তােমার মত চাচাতে শুরু করব। কবির ইমােশনটা যখন রাজনীতির ওপর গিয়ে পড়ে, তখন তার চাইতে মারাত্মক দুর্ঘটনা পৃথিবীতে আর ঘটতে পারে না। ইন্দু বলে, যাও–যাও। -বটে?-বমলা হাসল : তাহলে শােনন: হংস মিথুন, নীড়ের ঠিকানা কই অসীম সাগর- ইন্দুর কাণ লাল হয়ে উঠল : রমলাদি, থামাে। —মবাে মানে ?—আড়চোখে কবির বিব্রত বিপন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে রমলা বলে চলল : অসীম সাগর দুলিছে পাখার নীচে-- প্রচণ্ড রাজনৈতিক ইন্দু মুহূর্তে ছেলেমানুষ হয়ে গেল। আলােচনার উৎসাহে ভাটা পড়ে গেছে। দেখতে দেখতে সামনে থেকে পালিয়ে মান এবং কাণ বাঁচলল। ওর পলায়ন দেখে খিল খিল করে হেসে উঠল রমলা। কত সহজেই মানুষটাকে যে বিব্রত করে তােলা যায়। সুমিতার দ্বারের সামনে এসে ডাকলে, সুমিতাদি! ঘর থেকে বেরুল শােভা-সুমিতাদি সকালে বেরিয়ে গেছে। -কখন ফিরবে ? ১০ বলে যায়নি। রমলা খানিক্ষণ দাড়িয়ে রইল অনিশ্চিতভাবে। কী করবে বুঝতে পারছে না। একটা অদ্ভুত দোটানায় বুকের ভেতরটা তােলপাড় করছে। সুমিতা নেই, সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল যেন তার নােঙর ছিড়ে গেছে—এই স্রোতের ভেতরে নিজেকে সে সামলাতে পারছে না। সুমিতা যেন ওর শক্তি —ওর আশ্রয়। একদিকে বাসুদেব, অন্যদিকে আদর্শ। কোন পথে যাকে সে-আত্মরক্ষা করবে কী উপায়ে ? বাসুদেবের সঙ্গে এনগেজমেন্ট। রমলা করেনি, বাসুদেবই করেছে। বলেছে কাল আটটার মধ্যে আসবে কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ কোণায়। আমি তােমার জন্যে প্রতীক্ষা করে থাকব। যদি না আসাে, তাহলে জীবনে আর কোনদিন আমাকে দেখতে পাবে না। বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতেই কথাগুলাে বলেছে বাসুদেব। বুকে হাত দিয়ে, চোখের কোণা ছলছলিয়ে, গলার স্বরে একটা ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার অনিবার্য ইঙ্গিত এনে। সুমিতার কথা সত্যি, খানিকটা অভিনয় করেছে বাসুদেব। কিন্তু সবটাই অভিনয় নয়। নিজের কথাটাকে প্রাণ দিয়ে বােঝাতে গেলে খানিকটা অভিনয় আসবেই-এটা স্বাভাবিক এবং অপরিহার্য। বাসুদেবের চোখে কাতরতা-বাসুদেবের সমস্ত মুখ একটা সঙ্কল্পে নিষ্ঠুর। বেশ বােঝা যাচ্ছে, রমলাকে না পেলে নিজেকে ক্ষমা করবে না, নিজের ওপর একটা নিষ্ঠুর প্রতিশােধ নেবার জন্যে সে প্রস্তুত হয়ে আছে। কথাটা কল্পনা করেও রমলার অন্তরাত্মা চমকে উঠল। ঘড়িতে সাড়ে সাতটা। আর আধ ঘণ্টা সময়। যাবে কি যাবে না? আদর্শ আর সঙ্কলকে একেবারে বিসর্জন দেবে, না বাঁধা পড়বে বাসুদেবের জীবনে? এ সময়ে সুমিতা থাকলে কাজ হত। সুমিতার মধ্যে শক্তি আছে জোর আছে। তবু ১২১

তবু মনে হয়েছে সুমিতাও একেবারে খাঁটি নয়। কোথায় যেন তারও
ভাঙন আছে, অন্তত কাল রাত্রে তাই মনে হল। কাকে ভালােবেসেছে
সুমিতা ? আদিত্যদাকে ? কে জানে?
কিন্তু কী করবে রমলা? বাসুদেব প্রতীক্ষা করবে। যদি না যায়, তাহলে
বাসুদেব কী করে বসবে, কে জানে। তার জন্যে একটা মানুষ অসময়ে
জীবনটাকে শেষ করে দেবে-না, অসম্ভব। অত একবার দেখা করে
আসা যাক, একবার বুঝিয়ে বলবার চেষ্টা করা যাক যে এম-এ পাশ করে
কলেজের অধ্যাপক হয়ে এসব ছেলেমানুষি শােভা পায় না। জীবনটাকে
সহজভাবে দেখতে শিখুক বাসুদেব, বুঝতে শিখুক যে-
একটা অজ্ঞাত টানেই রমলা বেরিয়ে পড়ল।
বাসুদেব ঠিকই অপেক্ষা করছিল, ঘন ঘন অধৈর্যভাবে তাকাচ্ছিল হাতের
ঘড়িটার দিকে। রমলাকে আসতে দেখে তার আগ্রহ-ব্যাকুল দুই চোখে
যেন আলাে জ্বলে উঠল।
এসেছ?
রমলা ম্লান বিষয় গলায় বললে, হাঁ আসতেই হল।
বাসুদেব বললে, চলল।
-কোথায় যেতে হবে ?
চলাে কথা আছে।
একটা ট্যাক্সি নিলে বাসুদেব। দুজনে এল চৌরঙ্গীতে—ঢুকল একটা
নিরিবিলি ছােট রেস্তোরায়।
রমলা বললে, আমি কিছু খাব না।
খাবে না? বেশ, আমিও খাব না।
-অমনিই রাগ হল? আচ্ছা, তাহলে চা নাও দু পেয়ালা।
চাষের কথা বলে দিয়ে বাসুদেব একবার নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকালে
১২

রমলার দিকে।
তারপরে সােজা পরিষ্কার গলায় জিজ্ঞাসা করলে, কী
ঠিক করলে?
রমলা টেবিলটার ওপরে নখ দিয়ে আঁচড় কাটতে লাগল, জবাব
দিল না।
বাসুদেব নাছােড়বান্দা। বললে, কী ঠিক করলে?
—তুমি ফিরেই যাও।
-আর তােমার কিছু বলবার নেই ?
রমলা বললে, না। তার গলা কাঁপতে লাগল।
—আমার চাইতেও তােমার কাজ বড়?
রমলা আবার চুপ করে রইল। একথার জবাব দেবে কি, জবাবটা তার
নিজেরই জানা নেই। কে বড়, কে ছােট এটা যদি বুঝতে পারত তাহলে
অনেক আগেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। বুঝতে পারেনি বলেই তাে
এই বিপিত্তটা দেখা দিয়েছে।
স্বীকার করি, যে কাজ তুমি করছ, তার দাম আছে। নিজের দেশকে
ভালােবাসি না, এমন অকৃতজ্ঞ আমি নই—বাসুদেবের গলা আবেগে কাঁপতে
লাগল : কিন্তু এ নিয়মেরও ব্যতিক্রম আছে। সব কাজ সকলের জন্যে নয়।
আমাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেবার কী অধিকার তােমার আছে, সেই
কথাটাই স্পষ্ট করে তােমার মুখ থেকে জানতে চাই রমলা।
রমলা মুখ তুললে। গালের দুপাশে উত্তেজিত রক্তের কণিকা এলে
জমেছে। সে নিজেই দুর্বল—নিজের কাছে নিজেই একান্তভাবে অসহায়।
বাসুদেবকে কেমন করে সংযত করবে, কেমন করে জয় করবে?
—কিন্তু আমি ছাড়া আরাে তত মেয়ে আছে রমলা আস্তে আস্তে
বললে কথাটা। কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বর মিজের কাছেই কেমন অপরিচিত
আর বেখাপ্পা ঠেকল। সত্যিই আজ যদি সে শুনতে পায় যে, বাসুদেব

- আর একটি মেয়েকে বিয়ে করে সুখী হয়েছে, তাহলে মনের দিক থেকে সেকি সুখী হতে পারবে একবিন্দুও ? বাসুদেব উত্তেজিত গলায় বললে, মেয়ে অনেক আছে, কিন্তু তাদের সবাইকে আমি ভালােবাসি নি। অনর্থক ওসব কথা বলো না রমলা, অকারণে আমাকে আঘাত দিয়াে না। রমলা বললে, আঘাত কেন পাও ? কেন সহজভাবে বিদায় করে দিতে পারাে না আমাকে? তােমার জীবন থেকে, তােমার কামনা থেকে? বাসুদেব যেন হিংস্র হয়ে উঠল। সেইখানেই তাে আমার কাল হয়েছে। তা যদি পারতাম, তাহলে কোন সমস্যাই আজকে আর দেখা দিত না। অবজ্ঞা করতে পারি না, ভুলতে পারি না, আঘাত করে সান্ত্বনা পাই না। ওতেই আমার মরণ হয়েছে- বাসুদেব আরাে কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলা হল না। চায়ের ট্রে নিয়ে বেয়ারা ঘরে ঢুকল। রমলা পেয়ালায় চা ঢাললে। একটা চুমুক দিয়ে বাসুদেব বললে, তােমার সঙ্গে আর আমার দেখা হবে না। অনেক বিরক্ত করেছি আর করব না। আজ শুধু শেষ কথাটা শুনে যেতে চাই। রমলা মৃদু গলায় বললে আমার কথা তাে শুনেইছ। অনেক কাজ—অনেক দায়িত্ব। এখন এসব ফেলে দিয়ে নিজের সুখ আমি বেছে নিতে পারব না। বানুদেব খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল—তার হতাশক্ষিপ্ত জ্বলন্ত চোখের আগুন যেন দগ্ধ করতে লাগল রমলাকে। আর রমলা রইল মথা নত করে- বাসুদেবের ওই অগ্নিময় চোখের দিকে তাকাবার সাহস পর্যন্ত তার নেই। শুধু দুজনের চায়ের পেয়ালা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, চায়ের সুরভিত ধোয়া • কতগুলাে এলােমেলাে সর্পিল রেখায় উঠে ঘরময় ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর কাণে আসছে চৌরঙ্গীর ট্রাফিকের অবিরাম গর্জন । ১২৪

বাসুদেব বললে এই শেষ কথা ?
রমলা জবাব দিলে না।
বাসুদেবের মুখে দৃঢ়সঙ্কল্পের একটা কঠিন ব্যঞ্জিত হয়ে উঠল। পরক্ষণেই
পকেটে হাত দিয়ে একটা ছােট শিশি সে বের করে আনল। নীল রঙ,
চ্যাপ্টা ছিপি।
-দেখেছ।
!
রমলা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।
প্রশান্ত নিরুদ্বিগ্ন গলায় বাসুদেব বললে, হাইড্রোসায়নিক।
জিনিস, বেশি সময় লাগবে না।
সভয়ে রমলা বাসুদেবের হাত আঁকড়ে ধরনে, না-না।
বাসুদেব তেমনি নিরাসক্ত গলায় বললে, তােমার ক্ষতি কী! তােমার
আদর্শ আছে, সঙ্কল্প আছে। এ তােমার মনেও থাকবে না। পৃথিবীতে কত
মানুষই তাে প্রত্যেক দিন এমনি করে মরে যাচ্ছে, তাদের জন্ঠে কে আর
চোখের জল ফেলতে যাচ্ছে বলে ?
এতক্ষণে রমলা বাসুদেবের হাত থেকে জিনিসটাকে আয়ত্ত করে
ফেলেছে। বাসুদেব কিন্তু জোর করেনি, খুব সামান্যতেই তার হাতের মুঠি
আলগা হয়ে গেছে।
রমলা বললে, না।
আমাকে মরতেও দেবে না ?
না। রমলার চোখ এবারে বলতে লাগল। ভেবেছ ইচ্ছে করলেই
পারাে?
-আমার ওপরে তােমার দাৰী আছে।
নিশ্চয়।
১২৫

আধ ঘণ্টা পরে সেই ট্যাক্সিটাই আবার বেরিয়ে পড়ল রাজপথে। চলে গড়ের মাঠে, চলাে লেকে। যুদ্ধ এসেছে, দুর্দিন এসেছে—তাতে ক্ষতি কী। জীবন এখনাে রিক্ত হয়ে যায় নি—প্রেমের মৃত্যু ঘটেনি এখনাে। সমস্ত দুঃখ সমস্তু ব্যথার অন্ধকারে মৃত্যুঞ্জয় ভালােবাসা ধ্রুবতারার মত চিরজাগ্ৰৎ হয়ে আছে। . আদিত্য যখন রংবােরা বাগানে এসে দাড়ালাে, তখন সেখানে একেবারে প্রলয় কাণ্ড চলছে। রবার্টসের বিকৃত মৃতদেহটা জলের থেকে তুলে আনা হয়েছে পরদিন সকালে। খবর গেছে থানায়। উধশ্বাসে ছুটে এসেছে পুলিস। ব্যাপারটা তুচ্ছ করবার মত নয়। সাধারণ হত্যাকাণ্ডের পর্যায়ে একে ফেলা চলবে না, এর ভেতরে বিরাট একটা ব্যঞ্জনা লুকিয়ে রয়েছে। শহরের পথঘাটে, মিলে, ফ্যাক্টরীতে দিনের পর দিন যে আগুন অলক্ষ্যে ধূমায়িত হয়ে উঠছে—এ তারই একটি বহ্নিস্ফুলিঙ্গ। সুনিশ্চিত এবং আশঙ্কাজনক। রবার্টসকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু শুধু রবার্টসকে নয়—এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে একটা প্রবল ও প্রকাণ্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহবান। অপমানিত মানুষের রক্তে রক্তে সাড়া উঠেছে শ্রেণীসংঘাতের সাড়া। বিপ্লবের লাল ঘােড়া দিগন্তের আকাশে বােড় মেঘের কেশর ফুলিয়েছে। এখন থেকে এর এতিবিধান না করলে কল্পনাতীত পরিণাম অপ্রত্যাশিত নয়। ।

ওদিকে বম। ফ্রন্টে দুঃসংবাদ। রেঙ্গুনের পতন হয়েছে, মান্দালয়ের ওপরে চলেছে প্রচণ্ড বােমাবর্ষণ। মিত্রবাহিনী এক পা এক পা করে “শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী পশ্চাদপসরণ” করছে আসামের দিকে। ব্রিটিশ সিংহ ঔপনিবেশিক সুপ্তি-গুহা থেকে চমকে জেগে দেখতে পাচ্ছে সামনে বন্দুকের উদ্যত নল! সুতরাং ঘরের বিদ্রোহ আগে দমন করা দরকার। বাইরের আঘাতে যখন চারদিক টলমল করছে, তখন যদি সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভিতটাও নড়ে ওঠে, তখন পরিণামে ইংলিস-চ্যানেলে আত্মহত্যা করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে । উইনস্টন চার্চিলের মেঘমন্দ্র আশ্বাসবাণীতেও নয়। রবার্টসের হত্যার মধ্যে এতগুলি সম্ভাবনা প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। চারদিকে একেবারে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে বসেছে ইয়ােরােপীয়ান প্ল্যান্টাস এসােসিয়েশন। এই যদি সূত্রপাত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বিলক্ষণ উৎকণ্ঠিত হওয়ার কারণ আছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কি সত্যি সত্যিই লালবাতি জ্বলিয়ে লিকুইডেসনে গেল নাকি? ভারতবর্ষে ইয়ােরােপীয়ানদের নিশ্চিন্ত ব্যবসা বাণিজ্যকেও কি এমনি করেই লালবাতি জ্বলতে হবে ? এর মধ্যে নীল বিদ্রোহের পূর্বাভাস লুকিয়ে নেই তাে? অতএব থানা আর সদর উজাড় করে পুলিশ এসে পড়েছে। ইতিমধ্যে আদিত্য এসে পৌঁছেছে রংঝােরা বাগানের দরজায়। একরাত একবেলা অসহ ট্রেনের কষ্ট গেছে। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পেটে কিছু পড়েনি। তার ওপর তিন মাইল রাস্তা হেঁটে এসেছে ক্লান্তিতে যেন সর্বাঙ্গ ভেঙে পড়ছে আদিত্যের। কিন্তু বাগানের গেটের সামনেই জমেছে লাল-পাগড়ী। সেই সঙ্গে একদল কুলি। শহরের ইয়ােরােপীয়ান ডি-এ-পি একখানা টেবিল পেতে নিয়ে জেরা করছেন তাদের। যেটা ৰাঙলাতে ভালাে আসছে না, সেটার ।

ব্যাখ্যা করে দিচ্ছেন দারােগা এবং যাদব-ডাক্তার। বাগানের অন্যান্য বাবুদের চাইতে পুলিসের সহযােগিতায় যাদব ডাক্তার বেশী অগ্রণী। রবার্টস তাকে লাথি মেরেছিল—সে ব্যথাটা এখনাে মিলিয়ে যায়নি। তাই বলে যাদব ডাক্তার অকৃতজ্ঞ নয়। রবার্টসের অনেক প্রসাদ পেয়েছে সে হুইস্কির সে সব ঋণ যদি সে বেমালুম ভুলে বসে থাকে তাহলে অধম হবে যে। পরকালে সে কী বলে জবাবদিহি করবে। ডি-এ-পির চোখে আগুন জ্বলছে। টেবিলের ওপরে তিনি টোটাভরা রিভলভারটা খুলে নামিয়ে রেখেছেন। ওর একটা মনস্তাত্ত্বিক সার্থকতা আছে। ইংরেজ রাজত্ব যে এখনাে বানচাল হয়ে যায়নি, ওটা তারই নিদর্শন। দরকার হলে ডি-এস-পি এই মুহুতে' ওটাকে হাতে তুলে নিতে পারেন-সৰ কটা ব্লাডি-নিগারকে একেবারে শেষ করে দিতে পারেন। কিন্তু ডি-এস-পি বলেছেন, তিনি অত্যন্ত সদাশয় লােক বলেই তা করবেন না। ইংরেজ সরকার বিচার করে--প্রতিহিংসা নেয় না। সুতরাং কুলিরা যদি অপরাধীদের খবরটা দিয়ে দেয়, তাহলেই সমস্ত জঞ্জাল মিটে যাবে। আর তা যদি না হয়, তাহলে তাদের অদৃষ্টে যে বিস্তর দুঃখ আছে, এ নিশ্চিত। এই সময়ে প্রায় ধুকতে ধুকতে এসে দাড়ালাে আদিত্য। জিজ্ঞাসা করলে, এই কি রংঝােরা বাগান ? ডি-এস-পি উঠে দাড়ালেন বিদ্যুৎবেগে। আদিত্যের সমস্ত অবয়বের মধ্যে এমন এমন একটা কিছু আছে, যা দেখে অনায়াসে অনুমান করা চলে যে, লােকটি বিপজ্জনক। বজ্রকণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করলেন, হু ইজ দ্যাট। ? মুহূর্তে আদিত্য বুঝতে পারল, সে ভুল জায়গায় এসে পড়েছে। —এটা কি রংঝােরা বাগান। —হ্যাদুমি কি চাও? -অনিমেষ ব্যানার্জিকে।

-অনিমেষ ব্যানার্জি ডি এস-পি বললেন, অল রাইট। আই হাত । এ রু। ছােনার নাম কী ? -আদিত্য রায়। -অল রাইট মিস্টার আদিত্য রায়, আই অ্যারেস্ট ইউ। অপরিসীম বিস্ময়ে আদিত্য বললে, অ্যারেস্ট। কেন? -এই বাগানের ম্যানেজার লিওপােন্ড রবার্টসের হত্যা সম্পর্কে। ভয় পেল না আদিত্য, হতবুদ্ধি হয়ে গেল না। শুধু অসীম বিস্ময়ভরে সে সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে রইল। আদিত্য বাগানে পৌছেছে এই খবরটা যখন ধরমবীর পেল, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। আদিত্যকে গ্রেপ্তার করে ইন্সপেকসন বাঙলােতে রাখা হয়েছে-তাকে যথাসময়ে সদরে চালান করে দেওয়া হবে। অসহায়ভাবে মাথার চুল ছিড়তে লাগল ধরমবীর। একটু আগে যদি জানতে পারত, তাহলে কখনও এমন একটা ব্যাপার ঘটতে পারত না। হয় নিজে স্টেশনে যেত অথবা লােক রাখত-সােজা আদিত্যকে নিয়ে আসত তার গােলায়। কিন্তু আদিত্য যে এমন হঠাৎ বাগানে এসে পৌছে যাবে, এ কথাই বা কে কল্পনা করতে পেরেছিল। শুনে অনিমেষের মুখ পাংশু হয়ে গেল। তিনদিন পরে আজ সে বিছানার ওপরে উঠে বসতে পেরেছে। খবরটা যখন এসে পৌছল, তখন একটা কাপে করে সে দুধ খাচ্ছিল। খবর পাওয়া মাত্র হাত থেকে কাপটা ঝন ঝন করে পড়ে চুরমার হয়ে গেল, কাঠের মেজে দিয়ে গড়িয়ে চলল দুধের সােত। অনিমেষ বললে, আমি যাব। ধরমবীর কাছে এসে দাড়ালাে। একটা হাত রাখলে অনিমেষের কাঁধে। জিজ্ঞাসা করলে, কোথায় যাবে।

বাগানে। -আদিত্যদা’কে পুলিশে গ্রেপ্তার করেছে- তুমি গিয়ে কী করবে? —ওদের বুঝিয়ে বলব যে- ধরমবীর সস্নেহে হাসল ব্যানার্জি বাবু, দেশের কাজ যা-ই করাে, তুমি এখনাে নেহাৎ ছেলেমানুষ। পুলিসকে তুমি কী বােঝাবে? যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা তােমাকেও গ্রেপ্তার করবে--কী লাভ হবে বলতে পারাে। লাভ! সত্যিই কোনাে লাভ হবে না। কিন্তু শুধু কী লাভালাভের কথাটাই ভাবছে অনিমেষ? আদিত্য। উজ্জ্বল নীল চোখ। একটু কুঁজো ধরণের মানুষ, অতিরিক্ত পড়াশােনা করার জন্যেই বােধ হয় ঘাড়টা একটু সামনের দিকে ঝুকে গিয়েছে তার। মাথার বিশৃঙ্খল ঝাঁকড়া চুলগুলাে কাঁধ বেয়ে প্রায় পিঠের ওপরে নেমে এসেছে। গায়ের খন্দরের জামাটা ঘােট ৰােন পিংড়ীর এক্সপেরিমেন্টের একটা অপূর্ব নিদর্শন। কিন্তু এই সমস্ত আপাত-বৈসাদৃশ্যের আবরণের নীচে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে নানাে তলােয়ার। সেই তলােয়ারের আঘাতেই একদিন কবি অনিমেষের রজনীগন্ধার স্বপ্ন কেটে টুকরাে টুকরাে হয়ে গিয়েছিল সেই তলােয়ারের ঝলকেই একদিন পথ দেখতে পেয়েছিল অনিমেষ। আজ আদিত্যকে সম্পূর্ণ নিরপরাধ এবং সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত আদিত্যকে খুনের অপরাধে পুলিসে গ্রেপ্তার করেছে। অথচ অনিমেষের কিছু করবার উপায় নেই—কিছুই না। অনিমেষ ক্ষীণশ্বরে বললে, তা হলে? ধরমবীর চিন্তাচ্ছন্ন মুখে বললে, একটা কিছু হবেই। এই কুলি ব্যাটারা পচাইয়ের নেশায় সাহেবকে খুন করে যে কাণ্ড বাধিয়ে বসেছে—তাতে— ১৩০ ধরমবীর থেমে গেল। কুলি লাইনের দিক থেকে প্রবল আতনা আসছে। খুব সম্ভৰ আসামীর হদিস পাওয়ার জন্যে ওখানে কিছু কড়া ওষুধ প্রয়ােগ করেছে পুলিস। ধরমবীর বললে, লােকগুলােকে মারপিট করছে বােধ হয়। অনিমেষের বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতাে চমকে উঠল । আদিত্যদা’কে না তাে? —না অতটা নয় বােধ হয়। আচ্ছা-আমি দেখছি। তুমি চুপ করে বসে থাকো ব্যানার্জিবাবু, তােমার কিছু ভাবতে হবে না। যা করবার আমরাই করব। অনিমেষ চুপ করেই বসে রইল। কিছু ভাবতে পারছে না। চিন্তায় দুর্ভাবনায় বোঁ বোঁ করে ঘুরছে দুর্বল মস্তিষ্কটা। আদিত্যদা'কে গ্রেপ্তার করেছে, অথচ তার কিছুই করবার নেই। রবার্টসকে খুন করেছে কুলিরা। কারাে মতামতের অপেক্ষা করেনি, কারাে কাছ থেকে নির্দেশ নেয়নি। বাঘ-শিকারকরা সাওতালী রক্তে যখন আগুন ধরেছে, তখন সে আদিম প্রবৃত্তিকে ওরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি-- প্রতিহিংসা নিয়েছে। কিন্তু এ পথ নয়। রবার্টসের মতাে একজনকে হত্যা করে অত্যাচারের মূল উপড়ে ফেলা যায় না—অত্যাচারকে সুযােগ দেওয়াই হয় মাত্র। সমস্ত বিপ্লব আন্দোলনের পেছনেই এ ইতিহাস আছে। একটি হত্যার ছুতােকে অবলম্বন করে ওরা বহুকে হত্যা করবার বহু-বাঞ্ছিত অবকাশ পায়, সুবিধে পায় বিপ্লবকে সমূলে উৎপাটন করবার। কুলির সেই ভুলই করে বসেছে। এ ভুলের জন্যে কঠিন প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, অনেক মূল্য দিতে হবে। আদিত্যকে দিয়েই তার সূত্রপাত। কারা খুন করেছে। তাদের নাম অনিমেষ জানে। আদিত্যকে বাঁচাবার একমাত্র উপায় তাদের নামগুলাে গিয়ে পুলিসকে বলে দেওয়া। কিন্তু সে রকম একটা কথা বিকৃত-মস্তিষ্কেও কল্পনা করা চলে না। ১১

তা হলে উপায়? আদিত্য। তাদের সংগঠনের প্রাণস্বরূপ। শুধু
প্রণই নয়—তাদের মধ্যে আদিত্য নেই একথা ভাবতে গেলেও একান্তভাবে
দুর্বল আর অসহায় বলে মনে হয় নিজেদের, অথচ কিছু করতে পারছে না
অনিমেষ, গিয়ে একবার দেখা করে আসবে সে উপায়ও তার নেই।
হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে এসে পড়ল ধরমবীর।
ব্যানার্জিবাবু, ভারী গােলমাল শুনে এলাম।
-কী হয়েছে।
পুলিশে খবর পেয়েছে তুমিই এ সব সঁওতালদের দিয়ে করিয়েছে,
আর আমার গােয় লুকিয়ে আছে। ওরা তােমাকে ধরতে আসছে।
বেশ ধক
—না।ধরমবীরের চোখ জ্বলে উঠল । যতক্ষণ জান আছে তা হতে
দেব না।
কী করবে?
যা করব তা শােননা। আমার ভাল গাড়ি জোতা আছে—মি
এখনি স্টেশনে চলে যাও। গাড়ি হাঁকিয়ে গেলে দশটার ট্রেনটা ঠিক
এরতে পারবে।
-কিন্তু ওরাও তাে পেছনে ছুটতে পারবে—শহরে টেলিগ্রাম করতে
পারবে-
—কিছুই করতে পারবে না—ধরমবীরের কণ্ঠস্বরে যেন আগ্নেয়গিরি
আভাবিত হয়ে উঠল। মহাত্মাজীর হুকুমে একদিন পথে নেমেছিলাম।
আজ দেখছি মানুষ এত ছােট যে মহাত্মাজীকে বােঝবার ক্ষমতা তাদের
নেই। তাই তাদের মতাে ছােট হয়ে গিয়েই আমার কথাটা বােঝতে
চেষ্টা করব।
অনিমেষ সবিয়ে বললে, তার মানে ?
১৩২

।
শৰ কথার মানে বুঝতে চেয়ােনা ব্যানার্জিবাবু। কিন্তু তুমি আর
দেরী কোনাে না—পালাও
তারপর ?
-আমরা আছি।
অনিমেষ ধরমবীরের মুখের দিকে তাকালাে। সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল
ঠিক যেন প্রকৃতিস্থ নেই ধরমবীর। খুব খানিকটা কড়া মদের নেশা করলে
চোখমুখের অবস্থা যে রকম হয়—ধরমবীরকে দেখলে অনেকটা তাই মনে
হতে পারে। অনিমেষের ভয় করতে লাগল, শঙ্কার আচ্ছন্ন হয়ে এল
চেতনাটা।
—তুমি কী করতে চাও জানতে না পারলে আমি এখান থেকে
যাবে না।
-কী ছেলেমানুষি করছে ব্যানার্জিবাবু—এবার যেন দস্তুরমতাে একটা
ধমক দিলে ধরমবীর : তােমার শরীর এখনাে সারে নি। তুমি রওনা হয়ে
যাও—তােমার গাড়ি তৈরী।
অনিমেষ আর কথা বলতে পারল না। কথা বলবার কিছু তার
ছিলও না।
আধ ঘণ্টা পরেই ধরমবীরের কাঠগােলায় পুলিশবাহিনী এসে দর্শন
দিলে। ধরমবীর যথাসাধ্য অভ্যর্থনা করলে ডি এস পি সাহেবকে, আদর
করে বসতে দিলে। তারপর সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলে, হুজুরের আদেশ কী?
হুজুর সংক্ষেপে জবাব দিলেন সেই ব্লডি ব্যানার্জিকে বার
করে নাও।
-কে ব্ল্যাডি ব্যানার্জি।
হুজুর গর্জন করে উঠলেন।
—চালাকি কোরাে না। হােয়ার ইজ ব্যানার্জি।

} -আমি জানিনা। সাহেব বললেন, বলবে না? -আমি জানি না। —তা হলে তােমাকে গ্রেপ্তার করলাম। কথাটা শােনবার সঙ্গে সঙ্গে ধরমবীর উঠে দাঁড়ালাে। নাে, ইউ ওন্ট, অ্যারেস্ট, মি—এক হ্যাচকা টানে ঘরের কাঠের দেওয়ালটা থেকে বন্দুকটা নামিয়ে আনল : আই নাে হাউ টু ডিফেণ্ড মাই লিগ্যাল রাইটস প্রায় মিনিটখানেক সাহেব বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। এমন একটা অভিজ্ঞতা তার জীবনে কমই ঘটেছে। তারপরে সগর্জনে বললেন, ভারেস্ট হিম—ম্যাচ দি গান। বন্দুক উদ্যত রেখে ধরমবীর বললে, প্রসিড ওয়ান স্টেপ, অ্যাণ্ড- সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকালাে। কী করা যাবে কিছু বােঝ ৰাচ্ছে না। কয়েক মুহূর্ত একটা পাথরের মতাে স্তব্ধতা চারদিকে বিরাজ করতে লাগল। কিন্তু ধরমবীর কাউকে কিছু ভাববার সময় দিলে না। অপ্রস্তুত আতঙ্কের সুযােগ নিয়ে একটা লাফ দিয়ে সােজা সে কাঠের বারান্দা থেকে মাটিতে নেমে পড়ল, তারপর দ্রুতগতিতে অদৃশ্য হয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। এতক্ষণে সাহেবের চমক ভাঙল। -হা করে সব দেখছ কি? ইউ ফুলস! ফলাে হিন—অ্যারেস্ট। উৎখালে পুলিশবাহিনী ছুটল জঙ্গলের দিকে—তন্ন তন্ন করে ধরমবীরকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথায় ধরমবীর? ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গলের ভেতর কোন্ নিভৃত আশ্রয়ে সে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছে—কে বলবে? ততক্ষণে কোরার পাশে নিবিড় একটা ঝােপের মধ্যে বসে একটা সিগারেট ধরিয়েছে ধরমবীর। ওরা খুঁজুক—খুঁজে বেড়াক ওকে। ধরমবীর ক জানে পুলিস জীবনে তাকে ধরতে পারবে না—আজকেই রাতারাতি চেনা। পথ দিয়ে সে সােজা চলে যেতে পারবে সিকিমে। ঠিক এই রকম একটা ব্যাপারের জন্যে প্রস্তুত ছিল বলেই আগে থেকে নগদ টাকাগুলাে এনে পেট-কাপড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। ডুয়ালে কাঠের কারবার তার গেল; কিন্তু সেজন্য তার দুঃখ নেই। বরাবর নিজের ভাগ্য নিজের হাতে সে গড়ে তুলেছে—এবারেও সে পারবে -এটুকু আত্মবিশ্বাস তার আছে। একটা ভালাে ব্যবসা গেল, অনেকগুলাে টাকাও গেল। ডাণ্ডী সত্যাগ্রহের সময় এর চাইতে বড় ত্যাগ সে করেছিল। সেদিন মহাত্মাজী তাকে ডাক পাঠিয়েছিলেন—আজ ডাক দিয়েছে ব্যানার্জিবাবু। ডাক যেই দিক, তার লক্ষ্য এক, উদ্দেশ্য এক। চিরকাল ধরমবীর আজাদীর সৈনিক। আজও তার ব্যতিক্রম হবে না। নিজের জন্থে তার ভাবনা নেই। একা মানুষ-বাঙলাদেশে না হয়, বাঙলার বাইরে, বাঙলার না হয় ভারতবর্ষে, আর ভারতবর্ষে না হয় ভারতবর্ষের সীমা ছাড়ি যেখানে হােক সে নিজের ভাগ্য গড়ে নিতে পারবেই। ডাণ্ডী সত্যাগ্রহের সময় সে কোনাে কথাই ভাবে নি, আজও ভাববে না। হাতে যতক্ষণ তার বন্দুক আছে, ততক্ষণ সে নিশ্চিন্তু, ততক্ষণ সে নির্ভয়। পুলিশ তাকে ব্যাকুল হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। বুজুক। তাকে তারা খুজে পাবে না কখনাে। আর এই ফঁাকে ব্যানার্জিবাবু নিশ্চয়ই সাড়ে দশটার ট্রেন ধরে কলকাতার দিকে সরে পড়তে পারবে। ধরমবীরের বিশ্বাস আছে যে ধরা পড়বে না। হাতের বন্দুকটা মাথায় দিয়ে ঝােপের মধ্যে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল সে। তার ঘুম পাচ্ছে। ৩৫ শীলার মৃত্যুটা কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিল না সুমিতা। শীলা মরে গেছে। কিন্তু মরে গেছে বললে কথাটা ঠিক হল না, শশাঙ্ক হত্যা করেছে তাকে। শশাঙ্ক, শিক্ষিত ভদ্রলােক শশাঙ্ক। সমাজ সংস্কার করবার জন্যে শীলাকে বিয়ে করেছিল, চেয়েছিল একটা মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। কিন্তু তার ভিত্তি যে এত ভঙ্গুর একথা কল্পনা করেছিল কে। মনে আছে শীলাকে জিজ্ঞাসা করেছিল একদিন : যা করতে যাচ্ছ তার ভবিষ্যৎ ভেবেছ কি? এক মুহূর্ত চুপ করে ছিল শীলা। স্বল্পভাষী মানুষ, কোনদিন বেশি কথা বলেনি, কোনােদিন সহজে নিজেকে উদঘাটিত করতে চায়নি। কিন্তু সেদিন কথা বলেছিল। বলেছিল, আমি ওঁকে বিশ্বাস করি নুমিতাদি—উনি আমাকে কখনাে ঠকাবেন না। বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছে শশাঙ্ক। কিন্তু কাকে দোষ দেবে সুমিতা ? এই বিশ্বাসের ওপরেই তাে অনাদি অনন্তকাল থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে প্রেম। বারে বারে প্রেম আঘাত খেয়েছে, বারে বারে প্রেম মিখ্যার সংঘাতে রঙীন কাচপাত্রের মতাে ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে গেছে, বনহংসীর বাণবিদ্ধ বুকের মতে ঝিলের জল রাঙা হয়ে গেছে। তবু প্রেম মৃত্যুহীন। শশাঙ্কেরা শীলাদের চিরকাল ঠকিয়ে আসছে, চিরদিন ঠকাবে। তবুও শীলারা শশাঙ্কদের ভালােবাসবে—আফিং খেয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত এক অনিমেষ কি এই সত্যটাকে বুঝতে পেরেছিল ? কী জানি। ১৩৬ কিন্তু অনিমেষের কথা মনে পড়তেই সুমিতার মনটা ভয়ানকভাবে নাড়া খেয়ে উঠল। আজ পাঁচ দিন আগে চা বাগান থেকে অস্বস্তিকর সেই খবরটা এসেছে, পাঁচ দিন আগে রওনা হয়ে গেছে আদিত্য। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার—এর ভেতরে কারাে কোনাে খবর নেই। ওখানে কী হচ্ছে কে জানে। এক লাইন পােস্টকার্ড লিখে একটা খবর দেওয়াও কি অসম্ভব ছিল ? মরুক গে। এখানে তার অনেক কাজ। এখানে তার সংসার। এই বিরাট সংসারের ভার আদিত্য তাকে দিয়ে গেছে। তার কর্তব্য সে করে যাবে-তার বেশি ভাববার অধিকারও নেই তার, সময়ও নেই। —সুমিতাদি । -কে, ইন্দু? রমলাদির কী হল বলাে দেখি। রমলা? কেন-কী হয়েছে? -কাল সকালে বেরিয়ে গেছে—এখনাে ফেরেনি। সেকি!—ভয়ে সুমিতা পার হয়ে উঠল : গেল কোথায়? —সে আমরা কেমন করে জানব। এখানে কোনাে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে হয়তাে আত্মীয়-স্বজন!—সুমিতা জ কুঞ্চিত করলে। আত্মীয়-স্বজন কেউ আছে বলে তাে জানি না। হস্টেলে থেকে পড়ত, তারপর এখানে—তবে- একটা কথা মনে পড়তেই চমক ভাঙল। বাসুদেব। এর মধ্যে বাসুদেবের কোনাে হাত নেই তাে? কিন্তু তাও কি সম্ভব? এমনভাবে না বলে কি কখনাে চলে যেতে পারে রমলা ? না—অতটা দায়িত্বজ্ঞানবর্জিত রমলা নয়। সুমিতা সন্ত্রাসে বললে, থানাগুলােতে খবর নাও। হাসপাতালগুলােতে খোঁজ করে। যদি কোননারকম অ্যাকসিডেন্ট ঘটে থাকে— ১৩৭ } ইন্দু বললে, তাই যাচ্ছি। সুমিতা এল রমলার ঘরে। ছােট বিছানাটা যত্ন করে গুটানােজালা খােলা কাটাচিটা তার পাশেই পড়ে আছে। এটা ঠিক যে রমলা ইচ্ছে করে চলে যায়নি। এমনকি যে বইখানা পেনসিলে দাগ দিয়ে দিয়ে সে পড়ছিল, তার পাতাটাও তেমনি করে ভাঁজ করা আছে। একপাশে ময়লা শাড়ী জামাগুলাে স্তুপাকার। শুধু নেই তার ব্যাগ আর শ্লিপারটা। দুশ্চিন্তায় বিবর্ণ মুখে সুমিতা খানিকক্ষণ রমলার বিছানার ওপরে চুপ করে বসে রইল। কী হল মেয়েটার। যুদ্ধ-ব্ল্যাক-আউট। বিশৃঙ্খল কলকাতা। কোনাে গুণ্ডা বদমায়েসের হাতেই গিয়ে পড়ল না তত শেষ পর্যন্ত? ভাবতেও আতঙ্কে যেন দম আটকে এল তার। তবু বৃথা আশায় চারদিক একবার খুজলে সুমিতা। যদি একখানা চিঠি পাওয়া যায়-যদি কোনাে হদিস মেলে— কিন্তু বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না সুমিতাকেও। একটু পরেই এল ডাক- পিয়ন আর তার সঙ্গে এল রমলার চিঠি। রমলা লিখেছে : সুমিতাদি, আমি পারলাম না। আমাকে ক্ষমা কোরাে। আমি যে এত দুর্বল তা জানতাম না। বাসুদেব আত্মহত্যা করতে চেয়েছে। তার মৃত্যু আমি সহ্য করতে পারব না। জানি কতবড় অন্যায় আমি করছি। কিন্তু আজ যদি বাসুদেব আত্মহত্যা করে তা হলে সেটাও কি অন্যায় হবে না? কোনটা বড় অন্যায় আর কোনটা ছােট তা বিচার করবার শক্তি আমার নেই—এ টি আমি স্বীকার করি। তােমার সঙ্গে দেখা করবার সাহস আমার নেই। জীবনে কখনাে আর হয়তাে দেখা হবে না। প্রণাম নিমােমলা। চিঠিটা হাতে করে সুমিতা খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। ইতিহাসের ১৩৮ পুনরাবৃত্তি এমনি করেই ঘটে নাকি? শীলা যেভাবে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছে। রমলাকেও কি তাই করতে হবে? দৃষ্টির সামনে ভেসে উঠল হাসপাতালের ছবি। লােহার খাটে শুয়ে আছে শীলা। বুক পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। গালের একপাশে কয়েক ফোটা কালাে রক্ত জমে রয়েছে। জানলা দিয়ে সূর্যের আলাে রমলার মৃত্যু-বিবর্ণ মুখের ওপরে ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ সুমিতার যেন সব গােলমাল হয়ে গেল। শীলা, না রমলা? কিন্তু নিজেকে সংযত করলে সুমিতা। সবাই তাে শশাঙ্ক নয়। পৃথিবীতে । সব প্রেম এমনি করে ব্যর্থ হয় না। (যুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষায় সব প্রেমের মর্মগত নগ্ন স্বার্থপরতাই যে এমনভাবে উদঘাটিত হয়ে যাবে এমন কথাই বা কে ক্লতে পারে? নিজের বাসর-ঘরে আগুন জ্বলেছে সুমিতার। রুদ্র দেবতার আহ্বানে বেরিয়ে চলে গেছে অনিমেষ। তাই কি পৃথিবীর যত প্রেম তাদের সকলের সম্পর্কে একটা অবচেতন ঈর্ষা জেগেছে সুমিতার মনে? শীলার মৃত্যুতে কি একধরণের আনন্দ পেয়েছে—একধরণের তৃপ্তি পেয়েছে সুমিতা নিজেকে সান্ত্বনা দেবার, আখাস দেবার একটা আশ্বাস আর অবলম্বন খুজে পেয়েছে সে ? কথাটা ভাবতেও সুমিতা শিউরে উঠল। মনের মধ্যে অনুভব করল যেন একটা প্রচ্ছন্ন সরীপের বিষাক্ত নিশ্বাস। হঠাৎ নিজের মধ্যে এ কী বিচিত্র ভয়াবহ একটা সত্যকে আবিষ্কার করে বসল সুমিতা। রমলার চিঠিটার দিকে আর একবার তাকালাে সে। না—না, সুখী হবে রমলা, জয়ী হবে। বাসুদেবের প্রেমে হয়তাে খাদ নেই—হয়তাে মলাকে পেলে সে সত্যিই বাঁচবে না। ঘর যার ভেঙেছে-ভাঙুক। যে ধর বেঁধেছে তার স্বপ্ন যেন মিথ্যে না হয়।

একটা দীর্ঘশ্বাসের মতাে বাইরে থেকে এক ঝলক ঝােড়াে হাওয়া এসে সুমিতার চুলে চোখে আছড়ে পড়ল। খাওয়ার ঘরে তখন তর্কের ঝড় শুরু হয়েছে। রমলার তিরােধানের খবর সকলে রাখে না, যারা জানে তারাও চুপ করে আছে। অতএব তর্ক চলছে তাদের চিরন্তন বিষয়বস্তু নিয়ে। —তা হলে শনিবার থেকে এশিয়া আয়রণে স্ট্রাইক? —উপায় নেই। —কিন্তু ওদের ইউনিয়ানের অবস্থা কি যথেষ্ট ভালাে? শুনেছি রি-অ্যাক- শনারী দলগুলাে এর মধ্যেই বেশ জাকিয়ে বসেছে। হাঁশেষ পর্যন্ত যদি কল অফ করতে হয়- কক্ষণাে না। আজকে লেবারের আর সে অবস্থা নেই। নিজেদের দাবী দাওয়া ওরা বুঝে নিয়েছে। ওরা জানে হাজার অসুবিধে হলেও পিছিয়ে যাওয়া চলবে না। একবার পিছিয়ে গেলে আবার এগােতে পাঁচ বছর সময় লেগে যাবে। -সে বেশ কথা। তার আগে স্ট্রেংথ একবার বােঝা দরকার তাে। শেষ পর্যন্ত যদি দ্যাখাে-একটা জিনিস তােমরা বুঝতে পারছ না। মানলাম, ওরা এখনাে যথেষ্ট সবদ্ধ হয়নি। এটাও সত্যি যে কোনাে কাজেই তােমরা সকলের সমর্থন সঙ্গে সঙ্গে পাবে না। কিন্তু একবার কাজটা শুরু হয়ে গেলে ঝোঁকের ওপরে সবাই এগিয়ে আসে—তখন আর কেউ গড়িয়ে থাকতে পারে না। ——বিশেষ করে ওদের রক্তে বিপ্লবের বীজ। সব সময়ে ফেটে ১৪০ পড়বার জন্যে তৈরী হয়ে আছে। শুধু সুযােগ বুঝে ওদের জাগিয়ে দিতে হয়। -কিন্তু কাজ বন্ধ হলে মজুরীও বন্ধ হবে। তখন খাবে কী? -সে ব্যবস্থা যদি না করতে পারে তা হলে এতদিন ওয়ার্ক করছ কী? সেইখানেই তাে ওদের ইউনিয়নের শক্তি পরীক্ষা করবে। তা ছাড়া কালেকশন করতে হবে—যেমন করে তােক স্ট্রাইককে বাঁচিয়ে রাখা চাই। -মালিক এবার খুব স্টার্ণ অ্যাটিচুড নেবে বােধ হচ্ছে। খুব স্বাভাবিক। দরকার হলে গুলি চালাতে পারে। -সে তত আরাে ভালাে। যত বেশি গুলি চলবে তত বেশি করে শক্তি বাড়বে আমাদের। গুলির ভয়ে কোনাে দেশে বিপ্লব বন্ধ হয়েছে কি কখনন ? চিকাগাের পথ একদিন রক্তে লাল হয়ে গেছে, একদিন প্যারীর পথে হাজার মজুর রক্ত দিয়েছে—সােভিয়েটের তাে কথাই নেই। কিন্তু ফল হয়েছে কী? কে জিতেছে ? -সে কথা সত্যি। তবে আমাদের অর্গানাইজেশন —এখনাে অত শক্ত হয়ে ওঠেনি। হয়তাে পিছিয়ে যেতেও পারে। কিন্তু আজ পিছােলেও কাল আমরা এগােবই। এক আঘাতেই কোনাে বিপ্লব কখনাে সার্থক হয়নি। নাইটি ফাইভের পরে এসেছে নাইনটিন সেভেন্‌টিন। তােমরা কি একবারেই ক্যাপিটালিজমকে শেষ করে দিতে চাও নাকি? দিস ই ওনলি দি বিগিনিং অব দি এণ্ড- ঘরে ঢুকল.সুমিতা। -ব্যাপার কী, তােমরা যে ঘর-বাড়ি একেবারে ফাটিয়ে দিচ্ছ। -সুমিতাদি-শনিবারে এশিয়াটিক আয়রণে স্ট্রাইক। সুমিতা একটা আসন টেনে নিয়ে বসল। মালিকের সঙ্গে রফা হল না। ১৪১

শাঃ। ওরা আপােষের কোনাে কথাই শুনতে রাজী নয়। সুতরাং
ওদের একবার নিজেদের শক্তিটাই ভালাে করে বুঝিয়ে দিতে হবে।
ফ্যাক্টরীতে এখন ওদের কাজের চাপ। ওয়ার এমার্জেলী। ক্ষেপে
গিয়ে রিপ্রেশন চালাতে পারে।
তা পারে কিন্তু সুমিতাদি-কতদিন গুলি চালাবে ওরা? ওদের
গুলি একদিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষ মেরে কোনােদিন ওরা শেষ করতে
পারবে না।
হঠাৎ বুক ভরে একটা নিশ্বাস টেনে নিলে সুমিতা। কেমন যেন জোর
ফিরে পেয়েছে নিজের পায়ে। রমলা চলে গেছে কিন্তু তার ভেতরে কোনাে
সংকেত নেই পরাজয়ের, কোনাে ইঙ্গিত নেই ব্যর্থতার। আরাে অনেকে
আছে-এই ছেলেরা আছে, আছে এই মেয়েরা। শীলার ভাঙা সংসার নয়,
রমলার ক্লেদাক্ত গতানুগতিক সংসার নয়—এদের নিয়েই সে গড়ে তুলবে
সমস্ত মানুষের সংসার ভাৰী ভারতের যৌৎ-পরিবার।
রাত হয়ে গিয়েছিল।
বিছানায় শুয়ে কী একটা বই পড়ছিলেন মণিকাদি। এমন সময় দরজায়
কড়া নড়ল।
—এত রাত্রে আবার কে জ্বালাতন করতে এল।
বিরক্ত মুখে গজ গজ করতে করতে উঠে গিয়ে মণিকা দরজা খুলে দিলে।
তারপরে আতঙ্কে তিন পা পিছিয়ে এল।
আমি অনিমেষ।
একি চেহারা তােমার?
-পরে লব। এখন এক কাপ চা খাওয়ান তাে মণিকাদি।
১৪

—এগারো- টেবিলের এক পাশে একটা সবুজ আলাে জ্বলছিল। আলােটা ক্ষীণ ঘরখানাকে উদ্ভাসিত করে তােলেনি, বরং একটা বিষঃ ছায়ায় স্নান করে রেখেছে। গােটা কয়েক ধূপকাঠি জ্বলছে : টিপয়ের ওপরে-বন্ধ ঘরের ভেতর রুদ্ধ সুগন্ধি আবর্তিত হচ্ছে। শেলফের ওপরে টিক টিক করছে ঘড়িটা । দেওয়ালে মণিকাদির একখানা ছবি—প্রথম কৈশােরে যে সময় মানুষ নিজেকে ভালােবাসতে শেখে বােধ হয় সেই সময় ছবিটা ভােলা হয়েছিল। তারপর কৈশােরের আত্মপ্রেমকে টুকরাে টুকরাে করে ভেঙে দিয়েছে বহু ঝড়, বহু ভূমিকম্প, বহু বিপর্যয়। শুধু সেদিনের ছায়ামূর্তি নিয়ে দেওয়ালের বুকে মণিকাদির ফোটোটা জেগে রয়েছে। বয়েসকালে মণিকাদির চেহারা নেহাৎ মন্দ ছিল না। ওই ফোটোটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে শুয়ে ছিল অনিমেষ আর পায়ের কাছে তেমনি নীরবে বসে ছিল সুমিতা। একটা পুরু কাশ্মীরী রাগ অনিমেষের গলা পর্যন্ত টানা—পাণ্ডুর মুখে মৃত্যুর মতো মানি। সুমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তার মুখের দিকেই। বাইরে বর্ষণ-মত্রিত শীতের রাত্রি যেন স্বপ্নময়ী হয়ে উঠেছে। কাচের জানালায় ঘন ঘন বিদ্যুতের চমক। শীতার্ত অন্ধকার কলকাতা শত্যুভয়ে যেন অবর্ষণ করে চলেছে। অনিমেষ আস্তে আস্তে বললে, পালিয়ে আসাটা ঠিক হয়নি। সুমিতা শুনে যেতে লাগল, জবাব দিলে না। অনিমেষ আবার বললে, ওতে করে নিজেদের অপরাধটাই যেন প্রমাণ হয়ে গেল। কাজটা ভয়ানক ভুল হয়ে গেছে। ১৪৩ সুনিতার মুখে দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনাচ্ছিল। কিন্তু রবার্টল তােমাকে মারবার পরে কুলিরা ধরমবীরের ওখানে তােমাকে নিয়ে গিয়েছিল এ খবর তে কেউ জানত না। বাগানের ডাক্তার খোঁজ পেয়েছিল। লােকটা সাহেবের স্পাইওর নজর কেউ এড়াতে পারে না। এ সব গণ্ডগােল ওরই জন্যে। -তা হলে? -তাই ভাবছি। ওরা যা বােঝাবার সােজা বুঝে নিয়েছে। রবার্টস আমাকে মারবার পরেই আমি কুলিদের ক্ষেপিয়ে তুলেছি—কুলিরা রবার্টকে খুন করেছে। সুতরাং আমরা সবাই খুনী-আদিত্যদাও। -কিন্তু সত্যিই তাে তুমি জানতে না। -না—আমরা কেউ কিছুই জানতাম না। কুলিদের রক্তে আগুন ধরে গিয়েছিল। ওরা কারাে কথা শােনবার অপেক্ষা রাখেনি। নিজেদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির সাহায্যেই ওরা অপরাধীর বিচার করেছে। —কিন্তু এর ফল যে ভয়ানক হল। -হল বইকি। এ পথ আমাছের নয়। একজন রবার্টসকে খুন করা আমাদের কাজ নয়—আমাদের উদ্দেশ্য পৃথিবী জুড়ে রক্তবীজ রবার্টসদের ঝড় শুদ্ধ উপড়ে ফেলে দেওয়া। কিন্তু ওরা ভুল করল—ভয়ঙ্কর ভুল করল। একপা এগােতে গিয়ে আমরা তিন পা পেছিয়ে গেলাম। --তাহলে? অনিমেষ ক্লান্তভাবে হাসল। আবার গােড়া থেকে মুক্ত করতে হবে। অনেক অপচয়ের ভেতর দিয়ে করতে হবে পাপের প্রায়শ্চিত্ত। সুনিতা নীরবে চিন্তা করতে লাগল। অনিমেষ বলে চলল, কিন্তু আমাদের দমে গেলে চলবে না সুমি। বিপ্লবের এই যে এই। শক্তি আমরা যত বেশী সঞ্চয় করৰস্থানে স্থানে সে | ১৪ শক্তি নিজেকে প্রকাশ করবার চেষ্টা করবেই। মাঝে মাঝে বিস্ফোরণ ঘটবে আমরাও রেহাই পাব না। তারপর যেদিন শেষ বিপ্লব আসবে—সেদি আমরা অনেকেই চূর্ণ হয়ে যাব বটে, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে এই রক্তবীজেরা একেবারে নিঃশেষে লােপ পেয়ে যাবে। এ তারই ভূমিকা। —কিন্তু আদিত্যদা? --বিশেষ কিছু হবে বলে মনে হয় না। অনিমেষ ব্যানার্জিকে খুঁজতে যাওয়ার সঙ্গে বাগানের ম্যানেজার খুন হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। তবু দুর্ভোগ বইতেই হবে। -আর তােমার ? —এখনাে ঠিক বুঝতে পারছি না। কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল অনিমেষ, বড় একটা নিশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল। আবার সমস্ত ঘরটায় ঘনিয়ে এল সঙ্কেতময় একটা নিস্তব্ধতা। ধূপদানীতে ধূপকাঠিগুলাে পুড়ে পুড়ে ঘরময় গন্ধের ইন্দ্রজাল বিকীর্ণ করতে লাগল। বাইরে বৃষ্টি চলেছে সমানে-যেন আকাশ জোড়া একটা তার-যন্ত্রে মল্লারের মুছনা অনুরণিত হচ্ছে। উত্তরে বাতাসে যেন পূবালি হাওয়ার ছোঁয়া লেগেছে—যুদ্ধ-শঙ্কিত বেদনাত কলকাতার চোখের জল আকাশ থেকে অবিরাম ঝরে পড়ছে। কাচের জানলায় তেমনি বিদ্যুতের চমক। অনিমেষ ভাবছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লবীর বাণী : দরকার হলে এক পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে যাও। সত্যি কথা—কোনাে ভুল নেই, কোনাে সংশয় নেই। বিপ্লব কখনাে সােজা রাস্তায় তীরের মতাে উড়ে চলে না। তার লক্ষ্য নিশ্চিত, কিন্তু গতি পথ সরীস্থপের মতাে আঁকাবাঁকা কুটিল। ‘পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা। কিন্তু প্রতীক্ষা করা যায় না—অপেক্ষা করা যায় না। কুলিরা হয়তাে ভুল করেছে কিন্তু একেবারেই কি ভুল করেছে। ১৪৫ অপমানে যখন হাড়গুলাে পর্যন্ত ইলেকটিক আগুনে জ্বলে যাওয়ার মতো পুড়ে যায়—যখন প্রতিটি মুখের গ্রাস লজ্জা আর ক্ষোভের অশ্রুতে নােনা বলে মনে হয়—যখন সহিষ্ণুতার পাত্র মানুষের নিজের রক্তেই পূর্ণ হয়ে ওঠে তখন কজনে বিচার করে চলতে পারে? অপেক্ষা করতে পারে কয়জনে? ঠিক যে কারণে বাঙলাদেশের বিপ্লবীদের হাতে একদিন রিভলভার গর্জন করে উঠেছিল, কালাপানির পারে আর কঁসির মঞ্চে তারা জীবনের জয়গান গাইবার শক্তি অর্জন করেছিল, আজ সেই কারণেই কুলিদের কাড় এসে রবার্টসের ফুসফুস ফুটো করে ফেলেছে। কাকে দোষ দেবে অনিমেষ ? পিছিয়ে যেতে হল—কোনাে ভুল নেই। কিন্তু পিছােতে পিছােতে এমন এক জায়গায় মানুষ এসে দাঁড়াৰে-যেখান থেকে আর পিছিয়ে যাওয়া চলে না। তারপরে আগে কদম’! আঘাত করাে--ভাঙো—মিথ্যার আর শশাষণের যে দেবতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাক্ষসের মতাে নরবলি নিচ্ছে, তাকে সেখান থেকে উপড়ে এনে বিসর্জন দাও অতলান্ত সমুদ্রের জলে। সেই সিংহাসনে বসাও নতুন যুগের দেবতাকে, মানুষকে, সমাজকে। শেষ সংগ্রামে সেইদিন জয় হবে। গভীর গলায় অনিমেষ বললে, সুমি, আমরা জিতবই। তুমি ভেবাে না। সুমিতা হঠাৎ মৃদুরেখায় হেসে ফেলল : না, আমি ভাবব না। ঘরে আবার স্তব্ধতা ঘনিয়ে এল। , সুমিতা ভাববে না। সত্যিই তার ভাববার কী আছে। সে তো সেনাপতি নয়, সৈনিক। তাকে যে পথে চলবার নির্দেশ দেওয়া হবে সেই তার একমাত্র উদেশ্য। পথের লক্ষ্য সে জানে, কিন্তু পথ জানে না। সে জানে অনিমেষ, আদিত্য-আর পৃথিবীর বিপ্লবীরা—দেশ-দেশান্তর, যুগ-যুগান্তের সূর্য-মন্ত্রের সাধকেরা। তবু পথ চলতে বাধা আসে। বাধা দেয় রমলা, বাধা দেয় দল। শলা ১৪৬ ক মরে গেছে, রমলা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছে বাসুদেবকে। একজন পথ খুঁজে পেল অপমৃত্যুর মধ্যে, আর একজন পথ খুঁজে নিলে দৈনন্দিন জীবনের মৃত্যুর মতাে সংকীর্ণতার অন্তরালে। সুমিতা জানে ওরা দুজনেই পথভ্রষ্ট রমলার পরিপূরক শীলা। তবুও পতঙ্গের মতাে মন উড়ে যেতে যায়পুড়ে মরতে চায়। আজও সুমিতা নিজেকে জয় করতে পারল না। আজকের এই রাত্রি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। নির্জন ঘরে সে আর অনিমেষ। সুমিতার মনে হল এ তাদের বাসর রাত্রি। তিন বছর আগে তিন বছর আগে এমন একটি নির্জন ঘরে বর্ষাতরঙ্গিত রাত্রিতে যদি তার সঙ্গে অনিমেষের দেখা হত, তাহলে কী হত ? কী হত? ভাবতেও সমস্ত শরীর একটা নিষিদ্ধ আনন্দের নেশায় রােমাঞ্চিত হয়ে উঠল। কিন্তু তিন বছর আগের রাত্রি আর নেই। এ তাদের বাসর বটে, কিন্তু লােহার বাসর। বাইরে বৃষ্টিতে স্বপ্নের মূছনা তার কানে এসে বাজছে না—যেন ক্রুর কুটিল একটা চক্রান্তের আভাস সে পাচ্ছে। উত্তর বাতাসে পূবালির আমেজ নেই, মনে হচ্ছে লােহার বাসরের চারপাশে ঘিরে ঘিরে কালী নাগিনীরা গর্জে বেড়াচ্ছে—একটা ছিদ্রপথ । পেলেই সেখান দিয়ে এসে লখন্দরকে দংশন করবে। এ কী করল সুমিতা। এ কোন রাস্থর প্রেমে জড়িয়ে পড়ল। আজ মনে হচ্ছে এ পথ তার ছিল না। অতি কঠোর, অতি নিষ্ঠুর। সহজ স্বাভাবিক প্রেম-রমলার মতো ভালােবাসাকে জীবনে কেন মেনে নিতে পারল না? পুড়ে মরত? পুড়ে মরাই যদি পতঙ্গের ধম হয় তবে আলােক তীর্থের পথে তার এই অভিযান কেন? তার পাখা ছিড়ে পড়ছে—সে আর সহ্ন করতে পারছে না। অনিমেষ ডাকলে, সুমি? সুমিতা চমকে উঠল। বহুদিন পরে এমন কোমল গলায় এত মিষ্টি করে ১৪৭ অনিমেষ তাকে ডেকেছে। রক্ত যেন ঝন ঝন করে উঠল। একটা রাতে ব্যতিক্রম হলে ক্ষতি কী। বিপ্লবীর জীবন কি এমনই শচারী যে একটা বিশেষ মুহূর্তের জন্যে সে মাটির কাছে নেমে আসতে পারে না। অথবা লৈ জীবন সমগ্ৰব্যাপী মহাজীবনের সাধনা করে বলে প্রতি দিনের ছােট বড় কামনার একটি ঝরা পাপড়িও কুড়িয়ে নিতে রাজী নয় ? অনিমেষ আবার ডাকলে সুমি ? সুমিতা কথা বললে না, শুধু কথার আলােয় উজ্জ্বল দুটি গভীর চোখের দৃষ্টি অনিমেষের চোখের ওপরে ফেলল। ঘরে সবুজ আলােটার দীপ্তি তার দৃষ্টিকে আরাে ঘন, আরাে নিবিড় করে তুলল। অনিমেষ বললে, কাছে এসাে। সুমিতার হৃৎপিণ্ড দুটো প্রাণপণে শব্দ করতে লাগল, মনে হল কী একটা অসহ উদ্দাম আবেগে যেন তারা টুকরাে টুকরাে হয়ে ফেটে পড়বে। আজ তার প্রথম মিলন রাত্রি এল নাকি। বিপ্লবী যাত্রী সূর্যোদয়ের দিগন্তে যাত্রা করবার পথে একটি ফুল ছিড়ে নিয়ে তাকে কি উপহার দিয়ে গেল? . নিরুত্তরে সুমিতা এগিয়ে এল, বসল অনিমেষের পাশে। আজ তিন বছর পরে অনিমেষ সুমিতার একখানা হাত টেনে নিলে বুকের ওপরে। বরফের মতাে ঠাণ্ডা হাতে অনিমেষের উত্তপ্ত স্পর্শ লাগল মনের মধ্যেও কোথায় যেন জমাট তুষারকণা তরল হতে শুরু করেছে সুমিতার। অনিমেষ বললে, তােমার খুব কষ্ট হচ্ছে, না? চাপা গলায় ফিস ফিস করে জবাব দিলে সুমিতা : না, কষ্ট আর কী। --জানি, তােমার ভালাে লাগে না, কষ্ট হয়—ঘরের জন্যে মন টানে। কী হতে পারতে, অথচ কী হয়ে গেলে। ১৪৮ সুমিতা চোখ বুজে অনিমেষের বিচিত্র স্পর্শানুভুতিটা যেন নিজের চেতনার মধ্যে সঞ্চার করে নেবার চেষ্টা করছিল। তেমনি চাপা গলায় জবাৰু. দিলে, না। অনিমেষ হাসল । তার চেয়ে সেই রমেশ চৌধুরীকে অনুগ্রহ করলে আজ কোন ঝঞ্জাট তােমার থাকত না। বড়লােকের ছেলে—বহুদিন মােটর নিয়ে তােমার পেছনে পেছনে ঘুরেছিল, অনেক সাধনা করেছিল। চৌধুরী- গিন্নী হলে আজ বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাতে পারতে। সুমিতার চোখে যেন ঘুম জড়িয়ে আসছিল। কথা বলবার কিছু নেই বলবার প্রেরণাও নেই। যুগ যুগান্তরের ক্লান্তি যেন আজ তাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে। অনিমেষ বললে, সুমি, অনেকের ঘর বাঁধবার জঙ্গে আমাদের ঘরটাকে নিতান্ত বাজে খরচ করতে হল। কিন্তু কে জানে—হয়তাে সুযােগ আমাদেরও আসবে। আমরা সন্ন্যাসী নই—কিন্তু যুদ্ধ যখন শুরু হয়েছে, তধন রাইফেল ছাড়া আর কী ভাবতে পারি, বলাে? সুমিতা কিছুই বললে না। শুধু অনিমেষের বুকের ওপর নিজের মাথাটাকে এলিয়ে দিলে—বহুদিনের বহু অনিদ্রা সুযােগ পেয়ে আজ তার ওপরে প্রতিশােধ নিচ্ছে। অসুস্থতা আর ক্লান্তি অনিমেষকেও কি দুর্বল করে ফেলেছে? মুহূর্তের জন্য সমস্ত মনটা তার বিদ্রোহ করে উঠল। কিন্তু সবুজ ল্যাম্পের স্বপ্নচ্ছায়া ছড়িয়েছে সুমিতার মুদিত চোখে, তার ম্লান মুখের ওপরে। রুক্ষ চুল থেকে কতদিন আগেকার একটা তেলের ক্ষীয়মান গন্ধ এসে মিশছে ঘরের ধূপের গন্ধের সঙ্গে-মণিকাদির কৈশােরে ভােলা ছবিখানা যেন সকৌতুকে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। অনিমেষ সস্নেহে সুমিতার চুলের ভেতরে আঙুল বুলােতে লাগল। ১১ বাইরে কালী-নাগিনীর বিষ নিশ্বাস থেমে গেছে। কুটিল চক্রান্তের গুঞ্জন ছাপিয়ে রণিত হচ্ছে মল্লারের সুর। আজ সুমিতার বাসর। সুমিতা জানে এই প্রথম, এই শেষ। কাল থেকে অনিমেষের সময় থাকবে না, তারও না। একটি রাত্রির বর্ষণেই তার মরুভূমি চিরশ্যামল হয়ে থাকবে একটি ফুলের গন্ধ তার চেতনাকে চিরদিন ঘিরে রাখবে। রাত্রির তমসা- তােরণ ভেদ করে যতক্ষণ সুর্য-সারথির আবির্ভাব না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তিমির-যাত্রায় এই তার পাথেয় থাক। আজ হাসপাতালে মণিকাদির নাইট ডিউটি, সকালের আগে ফিরবে না। ; বিলিতী সিনেমার বক্সে বসেছিল বাসুদেব আর রমলা। সামনে সাদা পর্দায় মিউজিক্যাল কমেডির উত্তাল উল্লাস চলেছে। সমস্যাহীন জীবনে—বন্ধনহীন প্রেমে। ফ্ল্যাটে, মােটরে, হােটেলে, জাহাজে, সমুদ্রের ধারে। পৃথিবীতে এখন আর কিছুই নেই। এয়ারকন্ডিশনড়, ঘরের উত্তপ্ত আবহাওয়া সিগারেট আর চুরুটের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠেছে। পুরু কুশন, দামী শীতের পোষাক আনন্দিত অনুভূতিটার তীব্রতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। জীবন কত সহজ—কত নিঝঞ্জাট। ফুলের মতাে সুন্দর পৃথিবী। ভালাে- বাসাে, ভালােবাসায় পূর্ণ হয়ে ওঠো। অর্কেস্ট্রার তালে তালে সুরের আগুন জ্বালিয়ে দাও—দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণুকে নাচের ছলে অপূর্ব ভঙ্গিতে লীলায়িত করে তােলতা, পুরুষের দেহে রক্তধারা উদ্বেল-উল্লাসে নাচতে শুরু করে দিক। তােমাদের মিলন শয্যা বিছিয়ে আছে সী-বীচে, পাম-গ্রোতে, আলােকোজ্জল হােটেলে, ক্যাবারেতে। পৃথিবীতে চিরতারুণ্যের কন্দর্প- উৎসৰ চলেছে। বানুদেব আস্তে আস্তে রমলাকে স্পর্শ করলে।

—তােমার ভালাে লাগছে । জড়িত মৃগলায় রমলা জবাব দিলে, ই। -কতদিন যে তােমার জঙ্গে অপেক্ষা করে ছিলাম ? আজ যদি তুমি আমার জীবনে দেখা না দিতে, তা হলে হয়তাে ওই হাইড্রোসায়নিক বাসুদেবের মুখে হাত চাপা দিয়ে রমলা বললে, ছিঃ, চুপ করাে। বাসুদেব বললে, চুপ করব না। আজ তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ, নতুন করে গড়ে তুলেছ আমাকে। আজ আমার জন্মান্তর। রমলা বললে, আমারও। রমলার আঙুলগুলাে নিজের আঙুলের ভেতরে জড়াতে জড়াতে বাসুদেব বললে, জানাে, আজকাল আমি রীতিমতো রােমান্টিক হয়ে উঠেছি। কবে তুমি রিয়্যালিস্টিক ছিলে ? -মনে নেই। আজ ভাবছি : “আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি যুগল- প্রেমের স্রোতে রমলা বললে, থামাে, কাব্যি রাখাে। পাশের বক্সের ভদ্রলােক কেমন ভ্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছেন, দেখতে পাচ্ছে না? —হি ইজ জেলাস। আহা বেচারা, আই পিটি হিম। এয়ার-কণ্ডিশনড, ঘরের ভেতরে চুরুট, প্রসাধন আর বিলিতি মদের চাপা গন্ধ ভাসছে একসঙ্গে। সমুদ্রতীরে নারিকেল-বীথি মর্মরিত হয়ে উঠছে, বালুবেলার ওপরে তরঙ্গে তরঙ্গে সফেন রােলার ভেঙে পড়ছে। নারিকেল পুঞ্জের ভেতর থেকে যে বিচিত্র লতার পােষাক পরে নায়িকা বেরিয়ে এল সে পােষাকের অর্থ দেহকে আবৃত করা নয়, তাকে আরাে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তােলা। হঠাৎ কোথা থেকে চিতাবাঘের জাঙিয়া-পরা নায়ক এসে দেখা দিলে। তারপর মিলনের উত্তেজক ঝােমান্স। হুলা হুলা নাচের উন্মাদ উল্লাসে সফেন তরঙ্গের মতাে যৌবনের মত্ততা। দর্শকের রক্তেও যৌবন কথা । ১৫১ কয়ে উঠছে—পুরু গদী-আঁটা চেয়ারে বসে অদ্ভুত ভালাে লাগছে প্রশান্ত- সাগরীয় স্বপ্নলােককে। রমলার হাতের ভেতর বানুদেবের স্পর্শ ক্রমশ যেন দুখর হয়ে উঠছে। বাসুদেব রমলার কাণের কাছে মুখ এনে বললে, যুদ্ধ থামলে আমরা ম্যানিলায় বেড়াতে যাব। নতুন করে আমাদের হনিমুন হবে ওখানে। । কিন্তু যুদ্ধ থামলে! কথাটা রমলার কাণে যেন খট করে বিধল। থামলে! কী বলেছিল সুমিতা, কী বলেছিল যেন আদিত্য-দা? যুদ্ধ থামলে নতুন যুগ আসবে আমাদের, আসবে নতুন জগৎ। সেদিন পরাধীনতা থাকবে না, সেদিন আমরা আগামীকালের মানুষের জন্যে আগামী দিনের সমাজ গড়ে তুলব। আজ তার জন্যে আমাদের প্রস্তুতি চাই—প্রাণ দিয়ে, রক্ত দিয়ে। আর তারই প্রতিধ্বনি করে ইন্দু লিখেছিল : হেঁড়া-তারে ঘেরা ভাঙা-ট্রেঞ্চের মলিন অন্ধকারে, মৃত-সৈনিক ঊষার স্বপ্ন দেখে চিন্তার জাল ছিড়ে গেল। হাতে চাপ দিয়েছে বাসুদেব। কণ্ঠ মৃদু মৃদু কাপছে উত্তেজনায় : দেখেছ কী রকম এক্সাইটিং। মেয়েটা কী দারুণ ককেট। এক মুহূর্তে বাস্তব জগতে ফিরে এল রমলা। ওসব ভেবে আর কোন লাভ নেই বাস্তবিক। যা হারিয়ে গেছে তা হারিয়েই যাক, যা পেছনে পড়ে আছে তা পেছনেই পড়ে থাকুক। সবাই সৈনিক হতে পারে না, রমলাও পারেনি। তার জন্থে অপরাধবোেধ কেন ? সুমিতাদি বৃহত্তরের সন্ধানে ছুটেছে, নিজের হােট গণ্ডিটুকুতেই পরিতৃপ্ত আর পরিপূর্ণ হয়েছে রমলা। সুমিতার নতুন যুগ যত দূরে—তার চাইতে রমলার ম্যানিলা অনেক কাছে। সুতরাং এয়ারকণ্ডিশন্ড, ঘরে গদীআঁটা চেয়ারে স্বপ্নের মধ্যে ডুবে ১৫ গেল রমলা। সামনে ম্যানিলার নারিকেল বীথিতে চলেছে যৌবনের নির্লজ্জ উৎসব-জীবনে এ সত্যকেও তাে অস্বীকার করার উপায় নেই। নামলা অস্বীকার করতে চায় না। সিনেমা শেষ হল। বাসুদেব ট্যাক্সি ডাকলে। রমলা বললে, কোথায় যেতে চাও? -আমার বাড়িতে। —ছিঃ, সেটা কি ভালাে হবে। এখনাে বিয়ে হল না— --ওর জন্যে কী হয়েছে ? অত বড় বাড়ি আমার-লােকজন নেই তাে। তােমার কোনাে অসুবিধে হবে না। তাছাড়া ভেবােনা, কালই রেজিস্ট্রেশনের বন্দোবস্ত করব। —তুমি বড় ভাবছো মনু। কালই তুমি আমার আমার হচ্ছে, আর শুধু আজকের রাতটা আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না? আর যাবেই বা কোথায় ? ফিরতে হলে তােত তােমাদের বিবেকানন্দ রােডের সেই পার্টি-অফিসে সাপের কামড় খাওয়ার মতাে রমলা চমকে উঠল। না, না যাব। তােমার ওখানেই চলল। ট্যাক্সি চলল। শীতার্ত রাত্রি—চারদিকে চলেছে অশ্রান্ত ধারাবর্ষণ। অধবিগুষ্ঠিত আলােগুলাে বৃষ্টিতে অদ্ভুত দেখাচ্ছে যেন কতগুলাে মড়ার চোখ শুধু জেগে আছে কলকাতার ওপরে। বাসুদেব দু’হাত দিয়ে নিবিড়- ভাবে জড়িয়ে রেখেছে রমলাকে। বৃষ্টিভেজা পথ মােটরের চাকার নীচে ছিটকে ছিটকে সরে যাচ্ছে। এমন সময় হাড়কাটা গলি থেকে বেরুল হেমন্তবাবু। নেশায় একেবারে চুরচুরে হয়ে গেছে ভালাে করে করে চলতে পারছে না। যার ঘরে ছিল, পকেটগুলাে বেশ করে হাতড়ে নিয়ে সে হেমন্তবাবুকে বার করে দিয়েছে রাস্তায়। তারও ক্লান্তি আছে, শীতের রাত্রে লেপের মধ্যে প্রেমের মতাে একটা স্নিগ্ধ ঘুমে মগ্ন হয়ে যাওয়ার প্রলােভন আছে। তা ছাড়া হেমন্তবাবুর আর শাস নেই—সারারাত একটা ভবঘুরে বুড়াে মাতালকে বরদাস্ত করাও শক্ত। অতএব হেমন্তবাবু বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। টলতে টলতে একটা লাইট পােস্টকে আঁকড়ে ধরলে, তারপর আবার ছিটকে সরে এল সেখান থেকে। ছেড়া ফ্ল্যানেলের জামার ফাক দিয়ে শীতের হাওয়া ঢুকছে হাড়ের মথ্যে—এমন চমৎকার নেশাটার ভিৎ অবধি মাথার ওপরে টপ টপ করে পড়ছে শীতের বৃষ্টি। অবচেতনভাবে হেমন্তবাবুর মনে হতে লাগল : এই রাত্রে এমন শীতে পথে পথে বেড়ানােটা কোন কাজের কথা নয়। কোথায় যেন তার জন্যে একটা আশ্রয় আছে, একটা উত্তপ্ত বিছানা আছে—যেখানে গিয়ে একটা পলাতক কুকুরের মতাে সে লুকিয়ে থাকতে পারে। যেখানে গেলে একখানা লেপ সে পাবে—হিমে ঠাণ্ডা বরফ হয়ে-আসা হাত-পাগুলাে উষ্ণতার আরাম পাবে, মাথাটা সেখানে এমনভাবে ভিজবে না। কিন্তু সে কোথায়, কতদূরে ? নেশাটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে হেমন্তবাবুর, কিছুই ভালাে করে মনে পড়ছে না। কঁপিয়ে তুলছে। • জুতােশু, পা-টা পড়ল জলের মধ্যে। জুতাে তাে গেলই, জল মুখে চোখে পর্যন্ত ছিটকে এল। খানিকটা দুর্গন্ধ পচা জল—বােধ হয় কোনাে ডাস্টবিন থেকে চুইয়ে বেরিয়ে এসেছে। শালার—একটা অশ্লীল গাল দিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলে হেমন্তবাবু। চারদিকে অন্ধকার--কালাে কালির মতাে অন্ধকার। তমসার নিচ্ছিদ্র বনিকা দিয়ে কেউ যেন সবকিছুকে ঢেকে রেখে দিয়েছে। সরু গলির মধ্যে ১৫৪ চলতে চলতে নােনাধরা ঠাণ্ডা দেওয়ালে বারকয়েক ধাক্কা খেল হেমন্তবাবু। জুতাে দিয়ে বেড়ালের মতাে কী একটা জানােয়ারকে মাড়িয়ে দিলে, তারস্বরে আর্তনাদ করে উঠল সেটা। দুচো। টলতে টলতে হেমন্তবাবু বড় রাস্তায় বেরিয়ে এল। -শালার যুদ্ধ বেধেছে। সব অন্ধকার। পড়ুক—পড়ুক, বােমা পড়ুক। বাবুরা তাে পালিয়ে বাঁচল, আমি এণ্ডি-গেণ্ডি ছাপােনা নিয়ে পালাই কোথায় ?—বিড় বিড় করে হেমন্তবাবু বকতে লাগল । পড়—পড়, জাপানী বােমা-লাগ, বাবা ভানুমতীর খেল। চুরমার হয়ে যা সব—খাস্ত হয়ে যা। খেদী মরুক—আমাকে ঘর থেকে বার করে দিলে। মরুক—মক- —কিন্তু-হেমন্তবাবুর নেশায় আচ্ছন্ন মগজের ভেতরে হঠাৎ চেতনার বিদ্যুৎ খেলা করে গেল। নিজের বাড়ীর কথা এতক্ষণে মনে পড়েছে পঞ্চানন সিকদার লেনের সেই একতলা ঘরখানার কথা। হঠাৎ হেমন্তবাবুর কান্না পেল। মরবে, মরবে ? তার ঘর আছে, ছেলেপুলে আছে। টু, বুচি, বিজলী আছে-স্ত্রী আছে। নানা কখনাে বােমা পড়বে না। হেমন্তবাবু মরবে না, তারা মরবে না—সবাই বাঁচবে—বাঁচবে সবাই বাঁচবে। হেমন্তবাবুর মুখ চেয়ে এতগুলি প্রাণী বেঁচে আছে। মাথার ওপর টপ টপ করে বর্ষার জল পড়ছে—আস্তে আস্তে ফিরে আসছে না—খুব অন্যায় হচ্ছে। আর নেশা করবে না হেমন্তবাবু। কাল থেকে এ পথে আর পা দেবে না সে। যুদ্ধ লেগেছে, যুদ্ধ একদিন থামবে; এই ব্ল্যাক-আউট থাকবে না, সূর্য উঠবে, অন্ধকার মিলিয়ে যাৰে ছায়া হয়ে। সবাইকে বাঁচতে হবে। জোর পা চালিয়ে দিলে হেমন্তবাবু নেশায় ক্লিষ্ট পায়ে যতটুকু জোর সম্বিৎ।

পাওয়া যায়। ঘরের কথা মনে পড়েছে—মনে পড়েছে টু-বুচি- বিজলীর কথা কিন্তু ভালাে করে মনে পড়রে আগেই মাথায় যেন প্রচণ্ড একটা হাতুড়ির বা পড়ল। চোখের সামনে অন্ধকার কলকাতা ভেঙে গেল হাজার টুকরাে হয়ে, শেষবারের মতাে আলাে দেখতে পেলাে হেমন্তবাবু। রাশি রাশি আলাে-অজস্র আলাে—হাজার হাজার ফুলঝুরির ঠিকরে-পড়া গণনাতীত আলাে! ট্যাক্সি ড্রাইভার মুহূর্তের জন্যে ব্রেক কষলে, পরক্ষণেই বিদ্যুতের মতাে ছুটিয়ে দিলে গাড়িটাকে। রমলা অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠেছে। ব্যাকুল গলায় বাসুদেব বললে, এই নােখাে, নােখাে, আদমী চাপা পড়ল যে- ড্রাইভার গাড়ি থামালে না, বরং আরাে স্পীড বাড়িয়ে দিলে। —নােখাে-রাখাে- -চুপচাপ রহ, যাইয়ে বাবুজী-মাতােয়ালা থা—ড্রাইভারের কণ্ঠ নিরাসক্ত। -তাই বলে- ড্রাইভার যেন ধমক দিলে এইবার। পুরাে বহরের ছয়হাত পাঞ্জাবী, গলার স্বরে কর্কশ নিষ্ঠুরতা ফুটে বেরুল : বাস বাস। পুলিশ পাকড়নেসে আপকো ভি মুস্কিল হাে জাগে। উও মাতােয়ালা থামােটরকা আগমে আ পড়া- তা সত্যি। মাতাল নিজের দোষে চাপা পড়েছে—তার জন্যে কে দায়ী? যে মাতাল সে গাড়ি চাপা পড়বেই—হয় বাসুদেবের, নইলে আর কারুর। . বাসুদেবের ট্যাক্সির নীচে সে স্বর্গলাভ করল—এ দুর্ভাগ্য তার নয়, বাসুদেবেরই। ১৫৬ অতএব অতএব আরাে জোরে ছুটিয়ে চলল মােটর। শীতের রাত্রি-গয়ম বিছানা, নিশ্চিন্ত আরাম। এমন সময় পুলিশের হাঙ্গামায় পড়ার অর্থ যে কী শােচনীয় তা বাসুদেব জানে। বাঘে ছুঁলে আঠারাে ঘা, কতদিন যে তার ক্ষের চলবে কে জানে। তা ছাড়া যুদ্ধ থামলে রমলাকে নিয়ে পার্ল হারবারে যাবে বাসুদেব, যাবে ম্যানিলায়। সে বহু দূরের পথ। এখানে এখনি তার ট্যাক্সি থামলে চলবে কেন? ওদিকে বেশ জমিয়ে নিয়েছে আদিত্য। জেলখানার একটি মনােরম ঘরে সে আশ্রয় পেয়েছে। আদিত্য ভাবছে। হমেনস্ত-হমেনস্ত! স্বৰ্গমুখ ভােগ করা আর কাকে বলে! দিল্লীর দেওয়ানী খাস যারা গড়েছিলেন তাদের শােচনীয় দুর্ভাগ্য যে জেলখানার এই ইন্দ্রপুরী তারা দেখতে পেলেন না। কত বড় বাড়ি, আর তার কী রাজকীয় বন্দোবস্ত। আকাশ ছোঁয়া প্রাচীর, লােহার শিকের বেড়া। অতি সাবধান, অতি সতর্ক। পৃথিবীতে কারাে সাধ্য নেই এখন তাকে স্পর্শ করতে পারে। সে আজ রাজবাড়ির অতিথিস্থায়ী একটা বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাই যে একটা দুর্বোধ্য রহস্য বলে মনে হচ্ছে। বাগানের ম্যানেজার খুন হয়েছে, অতএব কলকাতার আমদানী আদিত্যকে ধরে চালান দাও। কে ম্যানেজার, কী হয়েছে, কিছুই সে জানে না। কিন্তু কিছু না জানাতেও যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আশা করা যাচ্ছে ১৫৭ বেশি কিছু বােঝবার আগেই তার শাস্তিও হয়ে যাবে। বেঁচে থাকুন রাজা হবুচন্দ্র আর তার গবুচন্দ্র মন্ত্রী। মানুষকে তারা অনেক মূল্যবান শিক্ষা দিয়ে গেছেন। শুধু একটা জিনিস খচ খচ করছে মনে। অনিমেষের হল কী ? অমনভাবে তাকে চিঠি দিয়ে ডেকে আনবার তাৎপর্যটাই বা কী হতে পারে? কিছুই করতে পারল না আদিত্য। লাভের মধ্যে ডি-এস-পি তাকে অনেক তর্জন গর্জন করলেন, স্বীকারােক্তি আদায় করার জন্যে পাঁয়তারা ভজিলেন অনেকখানি। -Perhaps you know many things about the murder Babu ! Confess it like a nice chap and get rid of all these troubles ! -বিশ্বাস করাে সাহেব, আমি কিছু জানিনে। -ইম্পসিবল! আমি বলিটেছে—টোমাকে কনফেস করিটে হেইবে। তুমি তাে বলিতেছে—কিন্তু আমাকে কী কনফেস করিটে হােইবে ? মেনে নিতে হবে যে, আদিত্য রবার্টসকে খুন করেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে সাহেবের দায়মুক্তি হয়ে যাবে, তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সে নিশ্চিন্তমনে পাইপ ধরাবে ! আদিত্য পরােপকার করতে নেহাৎ অরাজী নয়; কিন্তু দধীচির মত অত বড় আত্মত্যাগে তার আপত্তি আছে। তা ছাড়া উপকার করবার লােকের অভাব নেই সংসারেসাহেবকে ঠিক অতখানি যােগ্য ব্যক্তি বলে কোনমতেই আদিত্য মেনে নিতে পারেনি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। নিশ্চিন্তে হাজতে আশ্রয় পেয়েছে আদিত্য। কলকাতায় খবর পাঠিয়েছে, ওখান থেকে যতক্ষণ ব্যবস্থা না হয়—ততক্ষণ এখানেই বাস করতে হবে। তা ছাড়া যে রকম ব্যাপার জামিন দিলে হয়। ১৫৮ দিকে। সাহেব চটে বলেছে, আমি টোমাকে ডেখিয়া লইবে। আদিত্যের হাসি পেয়েছিল। জবাব দিয়েছে, লইয়াে।তারপর সাহেবের ভাষার প্যারডি করে বলেছে : শাদা চোখে ডেখিতে না পারিলে, মাইক্রোসকোপ লইয়া ডেখিয়াে। দুঃখের কথা, সাহেবের রসজ্ঞান নেই। সুতরাং ঘৃতাহুতি পড়েছে আগুনে। বলেছে : টুমি বড়মাস আছে। -তাতাে বটেই। তুমি মহাৰাজ সাধু হলে আজ’—ইতি দুই বিঘে জমি। সাহেব খানিকক্ষণ সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকেছে আদিত্যের মুখের পাগল নয়তাে লােকটা? তারপর বলেছে, লে যাও। -তােমারও দিন একদা আসবে বৎস—সেডিন আমিও তােমাকে ডেখিয়া লইবে—স্বগতােক্তি করে করে পুলিসের পাহারায় চলে এসেছে। আদিত্য। নীল চোখ দুটোতে প্রচ্ছন্ন কৌতুকের আড়াল থেকেও ঝড় ঝিকিয়ে উঠেছে। যতদূর মনে হচ্ছে কিছুই হবে না, দিন কয়েক বিড়ম্বনা সহ করতে হবে শুধু। কিন্তু কাজ নষ্ট হয়ে গেল। অনিমেষের কী হল— ব্যাপারটাই বা কী ঘটেছে আসলে কিছুই বুঝতে পারছে না। সুতরাং আপাতত কম্বশাসনে যােগনিদ্রায় মগ্ন হয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করবার নেই। যােগনিদ্রাই বটে! কম্বলের এই মনােহর শয্যায় যােগ ছাড়া শয়নানন্দ উপভােগ করা একটু শক্ত। লােহার খোঁচা খোঁচা তারের মতাে কম্বলের রেয়া, তার সঘর্ষে গাছের ছাল-বাকলশুদ্ধ উঠে আসবার উপক্রম করে। পুলিশী শাসনের সুযােগ্য সহকারীরূপে তার ভেতরে কৌরব- অক্ষৌহিণীর মতাে অগণ্য ছারপােকা রৌরব যন্ত্রণা স্মরণ করিয়ে দেয়। হঠাৎ আদিত্যের একটা থিয়ােরী মনে এল। রাজদ্রোহীদের দমন করবার শ্রেষ্ঠ উপায় কঁসিকাঠ নয় ; তুড়ং ঠোকবার মতাে এই একথানা কম্বল বাধ্যতামূলকভাবে গায়ে জড়িয়ে রেখে তাদের তিনদিন ঠায় বসিয়ে রাখা। ব্যাস, আর দেখতে হবে না। ফাসির চাইতে সেটা অনেক বেশি শিক্ষাপ্রদ এবং হিতকর হবে। ঠিক আদিত্যের ভাববার প্রতিধ্বনি করেই যেন পাশের যােগশয্যা থেকে আর একজন যােগী বললে, উঃশালার কী ছারপােকা রে! বাগ নয়তে ‘বাধ । বােঝা গেল লােকটির ইংরেজি বিদ্যা আছে। হঠাৎ আদিত্যের কৌতুকবােধ হল। একটু আলাপ জমাবার ইচ্ছেও হ’ল সঙ্গে সঙ্গে। -ঠিক বলেছেন মশাই। একেবারে সোদরবনের বাঘ। চুষে আঁঠি বের করে ফেললে। ঘরে দুর্গন্ধ অন্ধকার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবু আদিত্য টের পেলাে সমর্থন পেয়ে পাশের বিছানার লােকটি উৎসাহিত হয়ে উঠে বসেছে। -আপনিও ভদ্রলােক নাকি! বাঁচালেন মশাই, একটা কথা কইবার লােক পাওয়া গেল। খােট্টা আর মেডাের পালের ভেতরে পড়ে প্রাণটা ছটফট করছিল। তারপর, এখানে ঢুকলেন কী মনে করে ? -সাধ করে কি আর ঢুকেছি! ধরে ঢাকালে আর কী করতে পারি বলুন? T —তা বটে। উত্তরে পাশের ভদ্রলােকটি খুশি হয়েছে বলে মনে হল। কী করেছিলেন? আদিত্য নিরাসক্ত গলায় জবাব দিলে, বেশি কিছু নয়, এক ভদ্রলােকের পকেট হাতড়েছিলাম। -আরে, একই দলের যে—ভদ্রলােকটি রীতিমত উৎফুল্ল হয়ে উঠল । আমার অবস্থা ওই রকম। বললাম, বিড়ি খুঁজছিলাম—তা বিশ্বাস করলে না। বলে, পরের পকেটে কেন? জবাব দিলাম, ভিড়ের মধ্যে নিজের আর পরের পকেট বুঝতে পারিনি। তা ব্যাটাদের ধর্মভয় নেই—ব্রাহ্মণ সন্তানকে এনে হাজতে ঢােকালে। পাপের ভরা ওদের পূর্ণ হয়ে উঠেছে মশাই, দেখবেন দুদিন পরেই জাপানী বােমা ওদের ঠাণ্ডা করে দেবে। যাক- সঙ্গটা ভালাে। একে ভদ্রলােক, তার ওপরে ব্রাহ্মণ সন্তান। —ঠিক বলেছেন। ব্ৰহ্মশপ ক্ষত্রিয় পরীক্ষিৎ এড়াতে পারলে না তাে ম্লেচ্ছ ইংরেজ কোন ছার। -আপনি রসিক লােক। বিড়ি আছে দাদা ? -না মশাই, কোথায় পাবাে ? -ধ্যাৎ, কোনাে কাজের নােক নন আপনি। পয়সা-টয়সা লুকোনাে আছে কোথাও ? থাকে তাে দিন, ওয়ার্ডার ব্যাটাকে কিঞ্চিৎ দক্ষিণান্ত করলে হয়তাে মিলতে পারে। —না পয়সাও নেই। -ধ্যাৎ-কিছু হবে না আপনাকে দিয়ে—ব্রাহ্মণসন্তান আবার নিরাশচিত্তে কম্বলাসন গ্রহণ করলে। তারপর জিজ্ঞাসা করলে এই বুঝি প্রথম এলেন? --আর আপনি? -এবার নিয়ে বার পাঁচেক হ’ল। কী করব মশাই। লেখাপড়া শিখিনি, চাকরী পাই না। ঘরে বউ আছে, ছেলেপিলে অছে। বাঁচতে তাে হবে একরকম করে ! বাঁচতে হবে। সব চাইতে বড় কথা, সব চাইতে নিষ্ঠুর আর নির্মম সত্য। কিন্তু বঁচবার অধিকার নেই। প্রতি পদে পদে তাদের খর্ব করাে, প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে তাদের ঠেলে দাও সুস্থ জীবন আর সহজ মনুষ্যত্বের সীমারেখার বাইরে-গ্লানি আর অপরাধের ক্লেদ-পঙ্কিল অন্ধকার গহরটার ভেতরে। সেখানে তারা হাহাকার করুক, তারা আর্তনাদ করুক—আকাশ- -১১ ফাটানাে গলায় স্রষ্টা আর সৃষ্টিকে অভিসম্পাত করুক। কিন্তু তােমরা তা শুনতে পাবে না। তােমাদের এখন কাজ রেকর্ডে নাচের সুর বাজছে, তােমাদের রূপালি পর্দায় এখন কোকোনাট গ্রোভের প্রেমস্বপ্ন মদির হয়ে উঠেছে, তােমাদের বেতারযন্ত্রে এখন ককণ্ঠে ঘােষিত হচ্ছে বিজয়ী বাহিনীর জয়যাত্রার ইতিহাস। সম্মুখের রণাঙ্গনে তােমাদের সেনাবাহিনী কামান গর্জনে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে এগিয়ে চলেছে—তাদের বুটের তলায় পড়ছে। রক্তের ছাপ-ঔপনিবেশিক মৃত্তিকার অধিকার নিয়ে ক্ষমতালুব্ধ শক্তির সংগ্রাম। তােমর পেছনের কালাে গহ্বরের দিকে তাকিয়ে না ; উপনিবেশকে আয়ত্ত করে, কিন্তু উপনিবেশের মানুষগুলাের দিকে তাকিয়ে দেখাে না ; দুঃখ পাবে-লজ্জা পাবে, নিজেদের কীর্তির পরাকাষ্ঠায় নিজেরাই স্তম্ভিত হয়ে যাবে। তার চাইতে জাজ, রেকর্ড, সিনেমার গান, বেতারের প্রচণ্ড কলরব এবং রণাঙ্গনের কামান নির্ঘোষের মধ্যেই শ্রবণেন্দ্রিয়কে তলিয়ে দাও—এত বড় জগৎ—এমন বিপর্যস্ত বিপ্লববিক্ষুব্ধ জগৎ তার মাঝখানে বিন্দুবৎ হয়ে মিলিয়ে যাবে। মনে রেখো, অনেক মানুষকে অমানুষ করলে তােমরা অতিব হতে পারবে না। আদিত্য আস্তে আস্তে বললে, হাঁ, বাঁচতে হবে বইকি। —কিন্তু বাঁচতে দিচ্ছে কে দাদা? যা যুদ্ধ বেধেছে। আমি চলে এলাম জেলে ছেলেপুলেগুলাে না খেয়ে মরবে? ব্যাটারা এনে জেলে ঢােকাতে পারে, কিন্তু খেতে দিতে পারে না কেন বলতে পারেন মশাই ? যেদিন খেতে দিতে পারবে, সেদিন আর জেলখানা থাকবে না। খেতে দিতে চায় না বলেই তাে পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজার জেলখানা ওরা গড়ে রেখেছে। লােকটি কী বুঝল, কে জানে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপরে বললে, ই, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। ১২ বাইরে থেকে সেণ্টি ধমক দিলে রূঢ় গলায়। -আই-ৰাতচিত, মত, করাে। চুপসে নিদ যাও- ধর্মরাজ্যের ধর্মশালায় অক্ষুন্ন শান্তি বিরাজ করতে লাগল। শুধু মাঝে মাঝে দূরে কাছে সেল্টির জুতাের শক বিচিত্রভাবে পাষাণ-পুরীর অন্ত্য- প্রত্যন্তে পড়তে লাগল মূৰ্হিত হয়ে, আর অকারণে কাণ পেতে শব্দটা শুনতে লাগল আদিত্য। বারাে- চা বাগানে জ্যোৎস্নার জোয়ার নেমেছে। দু হাজার একার’ প্ল্যান্টেশনের ওপরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছে শুক্লা চতুর্দশীর চাদ। শীতের রাত্রে আকাশে ম্লান কুয়াশার অস্পষ্ট ছায়া আবর্তিত হচ্ছে- কিন্তু মেঘ নেই কোনােখানে। দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার স্বর্ণমুকুটকে ভালাে করে চেনা যাচ্ছে না—শুধু একটা অতিকায় কৃষ্ণতার ওপরে যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে খানিকটা ম্লান তাম্রাভ দীপ্তি। ডুয়ার্সের ঘন অরণ্য জ্যোৎস্নায় আর শিশিরে অপরূপ হয়ে আছে। দু হাজার ‘একার প্ল্যান্টেশনের ওপরে জ্যোৎঙ্গা ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কুয়াশায় একটুখানি ফিকে, একটুখানি বিষয়। তবুও আকাশ-গলা জ্যোঙ্গা, নরম স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না-বাসর রাত্রির বাতায়নে প্রসন্ন আশীর্বাদের মতাে পিছলে- পড়া চিরন্তন জ্যোৎস্না। চা-বাগানের বিস্তীর্ণ শ্যামলতার ওপরে তার অবলেপ পড়েছে, যেন কালে সাওতাল মেয়ের মুখে চন্দনের পত্ৰলেখা পরিয়ে দিয়েছে কেউ। এমন রাত্রে বাগানের শােষিত পীড়িত কুলিরাও যেন হঠাৎ প্রাণ পেয়ে ওঠে। ওই জ্যোৎঙ্গা যেন সঁওতাল পরগণার পাহাড় আর মহুয়া ফুলের ১৬৩ গন্ধ বয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে সঁওতাল পরগণার পাহাড় নেই- মহুয়াও নেই। আছে ফ্যাক্টরী, আছে ম্যানেজার, আছে ক্ষুদে লাটবাবুরা আর আছে অত্যাচার। তবু এমনি রাত্রে মহুয়ার বদলে ওরা সরকারী মদে বন্য যৌবনকে জ্বালিয়ে তােলে, এমনি রাত্রে ওদের মাদলে পাহাড় ভাঙা পাগলা- ঝরণার ছন্দ লাগে। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম। এ যুগ আলাদা, একালের রূপ স্বতন্ত্র। এদেশ সঁওতাল পরগণা নয়। সহজ অরণ্য-জীবনের সরল কাব্য যান্ত্রিক জটিলতায় প্রত্যক্ষ সংঘাতের রূপ নিয়েছে। শুধু বিচ্ছিন্নভাবে এই চা বাগানেই নয়, সমগ্রব্যাপী বিপ্লব সমুদ্রের জোয়ার এসে দোলা দিয়েছে ওদেরও ধমনীতে। চা বাগানের পাশেই ফরেস্ট শুরু। ডুয়ার্সের যােজনব্যাপ্ত শালবনের একটি প্রান্ত জ্যামিতিক ত্রিভুজের সূক্ষ্মগ্রের মতাে রং-ঝােরা চা-বাগানকে ছুঁয়ে গেছে। চা বাগানের পাশে সেই শালবনের ভেতরে কুলিদের বৈঠক বসেছে। গভীর রাত—ঘুমন্ত অরণ্য। বাতাস নেই, শালের পাতার শিরশিরানি পর্যন্ত শােনা যাচ্ছে না। ঘুমিয়েছে হরিয়াল, ঘুঘু, বনমুরগী। জঙ্গলের মধ্যে সতর্ক পায়ে চলা সম্বর আর চিতি হরিণের চোখেও যেন ঘুম জড়িয়ে এসেছে। শুধু ঝােপের আড়ালে হয়তাে পাইথনের হিংস্র চোখ জেগে আছে অসতর্ক দুর্ভাগা শিকারের প্রতীক্ষায়। আর জঙ্গলের মধ্যে জেগে আছে হিংস্র জানােয়ারের চাইতেও হিংস্র একদল মানুষ। শালপাতার ফাক দিয়ে হয়তাে স্বপ্নের মতাে মিষ্টি জ্যোৎস্না ঝিলিক দিয়ে পড়েছিল, কিন্তু তীব্রতর আগুনের আলােয় সে জ্যোৎস্না হারিয়ে গেছে। একরাশ কাঠ-কুটরাে জেলে নিশীথ সভার আয়ােজন করেছে কুলিরা। লাল আগুন ওদের কালাে মুখগুলােকে বিচিত্রভাবে রাঙিয়ে দিয়েছে—যেন ১৬৪ যজ্ঞাগ্নির কুণ্ড থেকে বেরিয়ে এসেছে কতগুলাে অগ্নিময় পুরুষ-দ্রুপদের হবি- হুতাশন থেকে প্রতিহিংসামূর্তি ধৃষ্টদ্যুম্নের দল। ছবির মতাে সবাই নীরব হয়ে আছে। ঝংঝং- স্তব্ধ বনভূমিকে চকিত করে দূরে কোথায় পাহাড়ীদের ঝাকড়ী বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল মানুষগুলাে, নড়েচড়ে বসল একবার। তারপর কথা বললে হীরালাল। হীরালাল। কুলিদের সর্দার। তিরিশ বছর চাকরী করছে এই বাগানে। পনেরাে বছর ভুগেছে ম্যালেরিয়ায়-পাঁচ বছর কালাজ্বরে। আর দীর্ঘ তিরিশ বছর বুকের রক্ত বিন্দু বিন্দু ঢেলে দিয়ে বাড়িয়েছে বিলাতী মালিকের । লােভের পুজি। তারপর আজ বছরখানেক ধরে বুকের ভেতরে বাসা বেঁধেছে মরণ কীট, যক্ষ্মা। তিরিশ বছর একনিষ্ঠ সেবার পুরস্কার। নিঃশব্দে দিনের পর দিন এগিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর পথে। কিন্তু মরবার আগে জ্বলে উঠতে চায় একবার। দেখে যেতে চায় নতুন যুগের গােড়া পত্তনি। এতদিন শুধু দিয়েই এসেছে—ফিরে পাওয়ার যে লগ্নটা এল তার পদধ্বনি একবার অনুভব করে নিতে চায় নিজের মধ্যে। অন্ধকারের শেষ পৈঠায় পা দিয়ে একবার পেছন ফিরে দেখে নিতে চায় আকাশে সূর্য উঠছে। হীরালাল ডাকলে, মং, ডােমন ! ডাকটা একেবারে বেজে উঠল গমগম করে। কঠিন, গম্ভীর গলা। পাহাড়ীদের ঝাঁকড়ীর শব্দ ছাপিয়েও যেন তার ডাক বনের প্রান্তে প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হয়ে পড়ল। মাথার ওপরে শালের ডালে ঝটপট করে পাখা ঝাড়া দিলে একটা ঘুমন্ত । পাখী বলিষ্ঠদেহ দুজন উঠে দাড়ালাে। একজন সাওতাল, আর একজন ওঁরাওঁ। ১৬৫ নতুন আমদানী, চা বাগানের বিষ এখনাে ওদের রক্তে ক্রিয়া করেনি। আগুনের আলােয় ওদের চোখে প্রতিহিংসারূপী ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রেতচ্ছায়া। -ঠিক আছে। এখন বৈঠ যাও। বিচার হবে। নীরবে দাঁড়িয়ে উঠেছিল, নিরুত্তরেই বসে পড়ল। -তােমরা তীর মেরেছিলে? . -কে মারতে বলেছিল ? পঞ্চায়েত। আবার স্তব্ধতা। শুধু সামনের আগুনটা পাতা পােড়ানাের একটা বিচিত্র শব্দ করে জ্বলে যেতে লাগল। আর দূরে বাজতে লাগল পাহাড়ীদের বাঁকড়ী -ওরা ভূত তাড়াচ্ছে। রবার্টসদের প্রেতাত্মাগুলােকেই হয়তাে। -কে কে ছিল পঞ্চায়েতে? সঙ্গে সঙ্গে পাঁচজন উঠে দাঁড়ালাে। দুজন বুড়াে, তিনজন আধবুড়াে। সব চাইতে যে বুড়াে তার নাম দুলীরাম। কয়েক বছর আগে এই দুলী- রামের ছেলেকে ইলেকট্রিক ডায়নামাের বেন্ট ভেতরে টেনে নিয়েছিল, রক্তাক্ত টুকরাে কয়েক মাংস ছাড়া তার আর কিছু পাওয়া যায়নি। অনেক কায়দা- কানুন করে কোম্পানী পুলিশের হাঙ্গামা এড়িয়েছিল আর দুলীরামের ক্ষতি- পূরণ মিলেছিল নগদ একশ টাকা। কিন্তু ক্ষতিপুরণে ক্ষত শুকোয়নি। —এক, দুই, তিন-হীরালাল গুণতে লাগল। মােট সাত। সাতজন বরবাদ। কারাে মুখে কোনাে কথা নেই। সবাই যেন নিশ্বাস বন্ধ করে একটা চরম মুহূর্তের জছে প্রতীক্ষা করে আছে। হীরালাল চারদিকে তাকিয়ে নিলে একবার। শুভ্র রেখাটা আবর্তিত হয়ে গেল বিচিত্র ভঙ্গিতে। বনের মধ্যে এতক্ষণে একটু একটু হাওয়া ১৬৬ দিয়েছে, পােড়া পাতাগুলাে উড়তে লাগল, আগুনের একটা দীর্ঘ শিখা বেঁকে গিয়ে হীরালালের মুখটাকে যেন আরাে বেশি করে রক্তাক্ত করে তুলল। হীরালাল বললে, পঞ্চায়েতের ভুল হয়েছিল। ব্যানার্জিবাবু কি কোনােদিন তােমাদের বলেছিল মানুষ খুন করতে ? সবাই নড়ে চড়ে উঠল, কেউ কথা বললে না। -একটা দুটো মানুষকে খুন করে দাবী মেটে না, ওতে নিজেদেরই খুন ঝরে যায়, নিজেদেরই দুর্বল করে ফেলে। আমি জ্বর হয়ে পড়ে ছিলাম, সেই ফাকে তােমরা এ কাজ করে ফেলেছ। কী লাভ হল এতে ? নির্বাক সভার ওপর একটা তীব্র দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে হীরালালই বললে, কারাে লাভ হল না। মাঝখান থেকে পুলিশ এসে হাত বাড়ালাে-বাবুরা বিনা দোষে জেলে চলে গেল। তােমাদের কাজ পেছিয়ে গেল দশ বছর। এর জন্যে দায়ী কে? দায়ী কে তা সবাই জানে। তাদের উত্তর এত স্পষ্ট যে ভাষা দিয়ে তা বােঝাবার দরকার নেই। নীরবে নিজেদের অপরাধ তারা কবুল করে নিয়েছে। হীরালাল বললে, এক— -দুই-তিন-সাতজন আবার দাঁড়াও। সাতজন ফের উঠে দাড়ালাে। তােমরা ক্ষতি করেছ কাজের। ক্ষতি করেছ সমন্ত মজুরের, ক্ষতি করেছ দুনিয়ার যত গরীব পরিবারের। এর সাজা তােমাদের নিতে হবে। অপরাধী সাতজন ছাড়া বাকী মানুষগুলাে এককণ্ঠে সাড়া দিলে এইবারে। আলং। -তা হলে সকলে একমত ? সমস্ত অরণ্য মুখর করে আবার সাড়া উঠল : আলবৎ। -তােমরা-তােমরা সাতজন শােননা। আজ রাতেই সব হেঁটে সদরে চলে যাও। কবুল করে দোষবলে আমরা সাহেবকে খুন্ন করেছি। কী বলল আর সবাই? -আলবৎ। -কেউ বেইমানি কোরাে না, কেউ পালিয়াে না। হয়তাে মরতে হবে, হয়তাে ফাস হবে তােমাদের। কিন্তু তােমরা মরলে তাতে দুনিয়ার মানুষের আরাে বেশি লাভ হবে। এক আধটা দুশমন নয়—সব দুক্ষনের জান নেবার জন্থে হাতে হাতিয়ার তৈরী হবে তাদের। যাও—আজ রাতেই সব সদরে চলে যাও- সভায় চাঞ্চল্য দেখা দিল, কিন্তু অপরাধীরা দাড়িয়ে রইল পাথরের মতাে নিস্তব্ধ। সামনের আগুনটা এতক্ষণে প্রায় নিবে এসেছে, এতক্ষণে শালের পাতার ফাক দিয়ে জ্যোৎস্না পড়েছে ওদের চোখেমুখে। প্রতিহিংসা কঠোর অগ্নিমূর্তিগুলাে ধোঁয়াটে জ্যোৎস্যায় অকস্মাৎ যেন বিচিত্র কোমল আর করুণ হয়ে গেছে। কঠিন সংযম সত্ত্বেও একটা চাপা কান্নার গােঙানি ডােমনের বুকের ভেতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে এল। আঠারাে উনিশ বছরের ছেলে, সামনে অফুরন্ত জীবনের আশা-রক্তে রক্তে উদ্বেলিত যৌবন। কদিন আগেই সাঙ্গা হয়েছে তার প্রথম প্রেম, প্রথম মিলনের নেশা এখনাে তার চেতনার ভেতরে ছড়িয়ে রয়েছে। তার ফঁস হয়ে যাবে। ফুরিয়ে যাবে সমস্ত--মিটে যাবে জীবন? অসহায় হাহাকারটা চাপা কান্না হয়ে বেরিয়ে এল ; উই -চুপ-বাজের মতাে গর্জে উঠল হীরালাল : কাদে কে-কোন্ শূয়ােরে, বাচ্ছা? মরতে যে ডর করে, মারতে তার হাত ওঠে কেন ? সে পুরুষ না মেয়ে মানুষ ? তিরিশ জোড়া চোখ পলকে ডােমনের ওপরে গিয়ে পড়েছে। তিরিশ ১৬৮ জোড়া চোখে শুধুই স্মৃণা—অমানুষিক ঘৃণা—যে ঘৃণা দিয়ে তারা দেখত রবার্টসকে, যাদব ডাক্তারকে। কোনখানে একৰিন্দু সহানুভুতি নেই, এতটুকু আশ্বাসও নেই। দাতে দাতে চেপে নিজেকে সামলে নিলে ডােমন। মাথা ঘুরছে—চোখের সামনে সব শূন্য হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে ডুকরে উঠছে কান্নার উচ্ছাস। ফাস হয়ে তার—সে মরে যাবে! পৃথিবীতে দুঃখ আছে—অপমান আছে। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আছে চাদ, আছে শাল ফুলের গন্ধ, আছে বাঁশি, আর কিন্তু উপায় নেই। এ বিচার। এর নিধারণ মৃত্যুর মতাে নির্ভুল। শুকনাে পাতা পড়ে সম্মুখের আগুনটা আবার জ্বলে উঠেছে দপদপ করে। কালাে মুর্তিগুলাের গায়ে আবার ছড়িয়ে পড়েছে সেই আশ্চর্য আগ্নেয় রক্তাভা। আর হীরালাল জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ডােমনের দিকে গলা দিয়ে তার একটা শব্দ বেরুলে বাঘের মতাে যেন ঝাঁপ দিয়ে পড়বে !••• ••••••শালবনের মধ্যে রাত ঘনিয়েছে, আরাে নিবিড়, আরাে নিঃশব্দ। পাতায় পাতায় চলেছে বাতাসের কানাকানি—কুহেলিগ্রস্ত জ্যোৎস্না জঙ্গলের মধ্যে আঁকছে অপরূপ পত্রলেখা। আর আলাে আঁধারির বনপথ দিয়ে এগিয়ে চলেছে সাতজন। স্থির, অকম্পিত, সুনিশ্চিত। ওদের মধ্যে ডােমনকে চেনা যাচ্ছে না। তাই বুঝতে পারা যাচ্ছে না তার পা কাপছে কি না, তার চোখে ছড়িয়ে আছে কিনা অপমৃত্যুর আতঙ্ক। অন্ধকার পথ দিয়ে ওরা এগিয়ে চরেছে শহরের দিকে। কিন্তু ওরা জানে : ওই ফাসি কাঠ চিরদিন থাকবে না। অনেক পাপ, অনেক মিথ্যার সঙ্গে সঙ্গে রবার্টসরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ওদের সাতজনের মৃত্যুর পেছনে জেগে উঠবে সাত হাজার সাত লক্ষ—সাত কোটি—সংখ্যা- তীত, গণনাতীত জীবন। ওই ফাঁসিকাঠে সেদিন মানুষের রক্ত ফুল হয়ে ফুটে উঠবে—সে ফুল অহিংসার, সে ফুল মৈত্রীর—সে ফুল কল্যাণের।

কল’ থেকে ফিরে মণিকাদি-দেখল অনিমেষ আর সুমিতা তখনাে বসে বসে নিশ্চিন্তে গল্প করছে। হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে মণিকা কুঞ্চিত করে বললে, সুমি, অনিমেষকে খেতে দিসনি এখনাে ? খায়নি। তুমি এলে এক সঙ্গেই খাবে বলেছে। মণিকা চটে উঠল কেন ? এক সঙ্গে কেন ? বেলা কটা বেজেছে খেয়াল আছে? রােগীকে এতক্ষণ না খাইয়ে রাখলি, তুই ভয়ানক ইরেসপনসিবল মুমি। অনিমেষ হাসল, খামােখা বেচারাকে বকছ মণিকাদি। ওর দোষ নেই। -না, কারাে দোষ নেই। তুই এখন ওঠতে সুমি। চটপট গরম জল নিয়ে আয় অনিমেষের। ঝিটা বাজার করে দিয়ে যায়নি বুঝি এবেলা। —সবাই মিলে হাড় জ্বালিয়ে দিলে আমার। • নতুন গৃহিণীর সংসার পাতবার মতাে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে মণিকা। নতুন সংসার বইকি। চিরকাল কেটেছে নিজের সংক্ষিপ্ত গণ্ডিরেখার মধ্যে, বৈচিত্র্যহীন নিঃসঙ্গ জীবন যাত্রার ভেতরে। খসরুর চিরন্তন রারা, হাসপাতাল, ডিউটি, রােগী দেখে বেড়ানাে। বাড়ি ফিরে এক একদিন নিজেকে কেমন অবলম্বনহীন, আশ্রয়হীন বলে মনে হয়েছে। বঞ্চিত মাতৃত্ব আর রিক্ত নারীত্ব জীবন যুদ্ধের কঠিন বর্ষটার তলায় রক্তটাকে মাঝে মাঝে চঞ্চল করে তুলেছে, ১৭০ ঘুম ভাঙা নিশীথ রাত্রে নির্জন নরেন্দ্র সেন স্কোয়ারটার মতাে নিজেকেও অস্বাভাবিক শূণ্ঠ বলে বােধ হয়েছে। আজ অনিমেষ একান্তভাবে তারই আশ্রয়ে এসেছে। আর তার দেখা- শােনা করতে এসেছে সুমিতা। হঠাৎ যেন সব পূর্ণ হয়ে গেছে। মণিকাদির কল্পকামনা এক ধরণের পরিতৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে যেন, এতদিন পরে সংসার বেঁধেছে সে। খাওয়ার টেবিলে বসে মণিকা বললে, না—এতে চলবে না। আমি বিকেলে নিজেই বেরু, বাজার করে আনব। অনিমেষের এখন ভালাে নিউট্রিশন দরকার। অনিমেষ ছােট্ট করে হাসল । কিন্তু আজ বিকেলে আমি চলে যেতে চাই মণিকাদি। সে কি! মণিকা আর সুমিতা দুজনেই এক সঙ্গে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। –হ্যা, আমাকে যেতেই হবে। না গিয়ে উপায় নেই। জোর করে হাসবার চেষ্টা করলে মণিকা: পাগল, এখন এই শরীর নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে কে তােমাকে? বাড়ির বাইরে তােমাকে এক পা বেরুতে দেওয়া হবে না । অনিমেষ তেমনি ছােট করে হাসল, জবাব দিল না। সে হাসি সংক্ষিপ্ত, তার অর্থও সংক্ষিপ্ত। অর্থাৎ কোনােমতেই তাকে রাখা যাবে না। বাইরের ডাকে আজ সে চঞ্চল হয়ে উঠেছে, তাকে ধরবার ক্ষমতা কারাে নেই। মণিকার স্নেহেরও নয়, সুমিতার প্রেমেরও নয়। সুমিতার মুখের ভাত মুহূতে তেতাে হয়ে গেছে। শুকনাে গলায় জিজ্ঞাসা করলে, কোথায় ? -গার্ডেনে। রংবোেরা চা-বাগানে। ১৭১ চা-বাগানে। —হ। পালিয়ে এসে ভয়ানক ভূল হয়ে গেছে। তখন অনুস্থ হয় পড়েছিলাম। মাথার ঠিক ছিল না। ধরমবীর কী করেছে না করেছে, কিন্তু বুঝে উঠতে পারিনি। ওটাও এক পাগল—যা তা করতে পারে। কিন্তু এখন আর আমার থাকা চলে না—ফিরে যেতেই হবে। —কিন্তু পুলিস অনিমেষ হাসল। পুলিস আর কী করবে? ওদের হাঙ্গামাকে ভয় করি , ভয় করি নিজের মনের অপরাধকে। কোনাে দোষ করিনি, কোনো অন্যায় করিনি কেন পালিয়ে আসব চোরের মতাে, খুনীর মতত? বরং যারা খুন করেছে, তাদের এখনি এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনা দরকার, তাদের বােঝানাে দরকার, শক্তিকে অপচয় করবার কোন সার্থকতা নেই, আসন্ন আগামী বিপ্লবের জঙ্গে তাকে সংহত করতে হবে। —কিন্তু এই শরীরে —ও কিছু না, দুদিনেই চাঙ্গা হয়ে উঠব। অত সহজে মরলে কি আমাদের চলে ?-সন্ন হাসিতে অনিমেষের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ইংরেজের দৈত্যকুলে আমরা প্রহলাদ। হিরণ্যকশিপু গণনৃসিংহের হাতে না মরা পর্যন্ত আমাদের মৃত্যু নেই। মেয়েরা দুজনেই চুপ করে রইল। একজনের দৃষ্টি হতাশায় ম্লান, আর একজনের মুখ বেদনায় পাণ্ডুর। প্লেটের ভাত কারও আর মুখে উঠছে না। তা ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই, অবিলম্বে আদিত্যদার একটা ব্যবস্থা করা দরকার। অকারণে হয়রাণ হতে হচ্ছে বেচারাকে। আমি না গেলে কিছুই করা চলবে না। আর আদিত্যদা ফিরে না এলে এদিকের কাজকর্ম সব পণ্ড এ যুক্তির কোন প্রতিবাদ নেই। একটা আকস্মিক তিক্ততায় ভরে উঠল ১৭২ মণিকার মন। বৃথা-ব্যর্থ। এ নিয়ে দুদিনের জঙ্গেও নিজেকে পূর্ণ রে তােলবার কল্পনা অর্থহীন। এদের রক্তে রক্তে ঝড়ের রাত্রির ফেনায়িত সমুদ্রের আহ্বান। সেই মাতাল সমুদ্রের বুকের ওপর দিয়ে এরা উদয়-তীর্থের। পথে নৌকো ভাসিয়েছে। হয় ভরাডুবি হবে—অথবা কোন একদিন, কে জানে কবে-সার্থকতার বন্দরে গিয়ে পৌছুবে। আর সুমিতা ভাবছিল : এক রাত্রির মােহ-এক রাত্রির স্বপ্ন। প্রথম এবং শেষ বাসর। তার মাথাটাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল অনিমেষ, সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। ব্যক্তিজীবনের চরম সার্থকতা এসেছিল আকস্মিকভাবে, আকস্মিকভাবেই ঘটল তার শেষ পরিণতি। ক্ষণিকের জন্যে লােভ এসেছিল—ক্ষণিকের জন্য এসেছিল দুর্বলতা। কিন্তু নিজের হাতেই অনিমেষ শেষ করে দিলে তাকে, তার বিস্মৃতি-জাল ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে দিলে। তিন বছর আগে যেমন করে বিদায় নিয়ে গিয়েছিল একদিন। সেদিন মন ছিল কাঁচা, সেদিনের স্বপ্নভঙ্গ বেজেছিল অত্যন্ত নির্মমভাবে, বুকের ক্ষতচিহ্ন থেকে অনেক রক্ত ঝরে পড়েছিল। কিন্তু আজ আর সে দুর্বলতা নেই—পথ চলতে নেমে অনেক কঠোর হয়ে গেছে—নিজের সীমার ওপারে মহাজীবনের নির্দেশ—আত্মকেন্দ্রিকতার বাইরে সর্বময় মানবতার নির্দেশ পেয়েছে সে। তবু একটি রাত্রির ফুল-একটি রাত্রির মাদকতা। বন্ধুর পথে চলতে চলতে যখন নিজের ভেতরে ক্লান্তি ঘনিয়ে আসবে, সেদিন এই ফুলের গন্ধ, এই মাদকতার মাধুরী তাকে প্রাণ দেবে । সুমিতা মৃদুকণ্ঠে বললে, আজকেই যাওয়া দরকার ? -হ্যা, আজই। মণিকাদি কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলা হল না। বাইরে দরজার সজোরে কড়া নাড়ছে কে যেন। এমনভাবে কড়া নাড়ছে, যেন ভেঙে ১৭৩

পুলিস নয় তাে! মুহূর্তে রক্তহীন হয়ে গেল সুনিতা আর মণিকার মুখ ।
প্রায় আর্তকণ্ঠে মণিকা চীৎকার করে উঠল। কে ?
-আমি বিকাশ। সুমিতাদি আছে?
বিকাশ। দলের ছেলে। সুমিতা ভাত ফেলে উঠে পড়ল। এগিয়ে গেল
দরজার দিকে। জিজ্ঞাসা করলে, কী হয়েছে?
-সাংঘাতিক ব্যাপার সুমিতাদি।
-কী হল?
-এশিয়াটিক আয়রনে স্ট্রাইকারদের ওপর গুলি চলছে।
গুলি চলছে। মুহুতে ইঙ্গিতময় স্তব্ধতায় ভরে গেল সব। মণিকা তাকিয়ে
রইল বিহ্বল দৃষ্টিতে, সাগ্রহ উত্তেজনায় অনিমেষের চোখ জ্বলতে লাগল।
সংশয়গ্রস্ত ক্ষীণ গলায় সুমিতা জিজ্ঞাসা করলে, আমাদের কোনাে ছেলে-
-হ্যা, ইন্দুর বুকে লেগেছে একটা
ইন্দু। কবি ইন্দু! সুমিতার মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা আর্তনাদ বেরুল শুধু।
মুহুর্তে টেবিল থেকে উঠে এল অনিমেষ। চোখে আগুন । বিকাশকে
বললে, চলাে।
অনিমেষকে দেখে বিকাশ চমকে উঠল।অনিমেষ-দা! আপনি এখানে?
-হ্যা আমি এখানে। সেসব কথা পরে হবে। এখন চলে, ইন্দু
বাঁচবে তাে ?
' বলা যায় না
সাে, চলােE
চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে মণিকাদি দেখলে কেউ নেই। বিকাশ
নেই, অনিমেষ নেই, সুমিতাও নেই। যেন ছায়াবাজির মতাে মিলিয়ে
গিয়েছে।
মণিকা পাথরের মতাে বসে রইল টেবিলে। অনিমেষ আর মিতার
১৭৪

অধভুক্ত প্লেটের দিকে তাকিয়ে তার ঠোখ জ্বালা করতে লাগল। তারপর টপ টপ করে চোখের জল ঝরে যেতে লাগল নিজের প্লেটটার ওপরে। না-সত্যিই যুদ্ধ বেধেছে কলকাতায়। আর থাকা চলে না। মণিকা এবার কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে যাবে যেখানে হয়, যতদুরে হয়। দৃষ্টির সামনে সমস্ত কলকাতা শূন্য, আর ঝাপসা হয়ে গেছে। আসামীরা একবার করেছে এসে। জেল থেকে বেরিয়েই কলকাতায় ফিরেছে আদিত্য। লক্ষ্যহীনের মতাে পথ দিয়ে চলতে লাগল সে। ক’দিনের একটা ঘূর্ণি ঝড়েই সমস্ত আয়ােজনটা বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। এশিয়াটিক আয়রনে গুলি চলবার পরের দিনই সুমিতার চারতলা বাড়ির সংসারে নজর দিয়েছিল পুলিস। অনেককে ধর-পাকড় করেছে, বাকী সব আবার কোন্ অন্ধকারের মধ্যে ছিটকে পড়েছে, তার ঠিকানা নেই। আবার তাদের খুঁজে বার করতে হবে, আবার কাজ শুরু করতে হবে নতুন করে। অনিমেষ, সুমিতা জেলে। ইন্দু হাসপাতালে, বাঁচবে কিনা ঠিক নেই। কবি ইন্দু। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চারতলা শূন্য বাড়িটার দিকে আদিত্য একবার তাকালাে। গােটা দুই শক্ত শক্ত তালা ঝুলছে লােহার গেটে। কে তালা দিয়েছে কে জানে-বােধ হয় পুলিস। একবার থেমে দাড়িয়েই চলতে শুরু করেছিল আদিত্য, হঠাৎ হাওয়ায় একটুকরাে হেঁড়া কাগজ এসে তার জুততার সঙ্গে যেন জড়িয়ে গেল। কী মনে করে কাগজখানাকে তুলে নিলে সে। কবি ইন্দুর কবিতার একটা ছেড়া পাতা। রাত্রিতে বৃষ্টি হয়েছিল। অনেক গুলাে অক্ষর একেবারে ধুয়ে গেছে। তবু দুটো লাইন পরিক্ষার পড়া যায় এখনাে ;

হেঁড়া তারে ঘের ভাঙা ট্রেঞ্চের মূলৰ অন্ধকারে মৃত সৈনিক উনার স্বপ্ন দেখে। মাথার ওপত্রে কর্কশ ধ্বনিতে বিমান উড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ। গণতন্ত্রের জষ্ঠে, স্বাধীনতার জন্যে ভারতের শৃঙ্খলিত বুকের ওপরে ট্যাঙ্কের চাকা কেটে কেটে বলে যাচ্ছে-স্বাধীনতা আর গণতন্ত্র আসছে বইকি। কিন্তু এ যুদ্ধে নয়, এ যুদ্ধে তার প্রস্তুতি মাত্র। উজ্জ্বল নীলকান্ত মণির মতাে তীব্র দৃষ্টিতে সন্ধ্যার কালাে আকাশের দিকে তাকালাে আদিত্য। মৃত সৈনিকের চোখে উষার স্বপ্ন। কাঞ্চনজঙ্ঘার স্বর্ণ- শিখর থেকে সাগর-প্রান্তের কলকাতা পর্যন্ত আসমুদ্রহিমালয় সুর্য-সারথির রথচক্রে মন্ত্রিত হয়ে উঠেছে। ক ১৭৬

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Surja-sarathi Ed. 1st

Author
Gangyopadhyay Narayan
Title
Surja-sarathi Ed. 1st
File name
Surja-sarathi Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/09/11
Publisher
Shachindranath Mukhopadhaya
Language
Sanskrit
Pages
189
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Surja-Sarathi- Story
DLI number
513370
Barcode
4990010020354.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
5nyxN8WtwzX
Download PDF

Surja-sarathi Ed. 1st