Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rakter Lekha Ed.2

Dasgupta, Bankimchandra · 2009/10/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

G,
ৈ
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র দাশগুপ্ত
দ্বিতীয় সংস্করণ
বৈশাখ
১৩৯

প্রকাশকীরকদাস গঙ্গোপাধ্যায়
“যােগেন্দ্র পাবলিশিং হাউস”
১০৮নং গ্রাণ্ডট্রাঙ্ক রােড, শালিথা, হাওড়া
মূল্য-আট আনা
কলিকাতা
১০৮নং নারিকেলডাঙ্গা মেন রােড, স্বর্ণপ্রেসে
শিবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত

৫। পৱিঞ্জ • তেগবাহাদুর ••• নবম শিখগুরু ঔরঙ্গজেব ••• সম্রাট গুরু গােবিন্দ দশম শিখগুরু জোরাবর সিংহ ও ফতেসিংহ রামরায় সপ্তম শিখগুরু হরিরায়ের পুত্র অজুমের চাদ কহলুরের নুতন রাজা বণিক, তেগ বাহাদুরের শিষ্য শিরহিল-পতি ৫ । মাখন শা নবাব বাজিদ খ। ভীমচাদ, হরিচাদ, মেদিনীপ্রকাশ ও ফতোদ ••পার্বত্য রাজসংহতির হিন্দুরাজগণ দয়াসিংহ, ধরমসিংহ, মহাকম সিংহ, হিম্মৎ সিংহ ও জীবন সিংহ •••গুরুগগাবিন্দের প্রধান শিষ্যগণ কাজী মীর মহম্মদ গােবিন্দের কোরাণ শিক্ষক গোবিন্দের পাচক ব্রাহ্মণ নাগা মােহন্ত মােহন্ত কৃপাল দাস • • • যু শা পাঠান অশ্বারােহিগণ, মােহন্তের শিষ্যগণ, চণ্ডাল, শিখসৈন্থ ও ওমরাহগণ প্রভৃতি গ্রন্থকারের নব প্রকাশিত উপহার গ্রন্থ —রাজ্য ছবি, ভাষা, প্রচ্ছদপট মনমাতানো কন্যা ও বধূকে উপহার দিন, তার ললাটের সিদূর- টীপের মত তাকে উজ্জ্বল করবে। ভ্রাতা, পুত্র বা বন্ধুর হাতে তুলে দিন, তাকে তার কপালের চন্দন-লেখার মত পবিত্র করবে। দাম-আট আনা মাত্র মতে = লেখা প্রথম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। স্থান—দিল্লীর প্রাসাদ-কক্ষ। কাল—মধ্যাহ্ন। = [ সিংহাসনে সম্রাট ঔরঙ্গজেব, সম্মুখে শৃঙ্খলাবদ্ধ গুরু তেগ- বাহাদুর দণ্ডায়মান, ওমরাহগণ, সভাসদগণ ও রামরায় সম্রাটের উভয় পার্শ্বে উপবিষ্ট, মুক্ত অসিহতে তাতার প্রহরিগণ প্রহরায় নিযুক্ত, অদূরে ছদ্মবেশী মাখন শা ও দর্শকগণ। ঔরঙ্গ। তেগ বাহাদুর, তেগ। সম্রাট ! ঔরঙ্গ। তােমাদের পাথরের দেবতা বিশ্বনাথ ঠাকুরকে জ্ঞান-বাপীর অতল গর্ভে ডুবিয়ে দিয়েছি। তেগ। সম্রাট সুকৃতী পুরুষ।-সত্যইত জ্ঞান-বাপীর অতল গর্ভে ঠাকুর বিশ্বনাথের পুণ্য পীঠস্থান। মানুষ অন্ধ, তাই মন্দিরের অন্ধকার কোণে তাঁকে খুঁজে মরে

রক্তের লেখা
ঔরঙ্গ। বিশ্বনাথের মন্দির চূর করে তার উপর খােদা-
তাল্লার মসজিদ্ গড়েছি।
তেগ। সম্রাট আলামগীরকে যে আলেম ধাৰ্মিক বলে
মােল্লাগণ কীৰ্ত্তন করেন, সম্রাটের এ কাজে তা প্রমাণ হল ;-
তিনি হিন্দুর বন্দিত ভগবানের মন্দিরের উপর ইস্লামের
বন্দিত ভগবানের মজিদ্ গড়েছেন,—যে স্থানে অতীতের যুগে,
যুগে হিন্দুগণ ভগবানের উপাসনার উদাত্ত মন্ত্রধ্বনি মুখর করে
তুলেছেন, ভবিষ্যতের যুগে সেখানে ইস্লামগণের উপাসনার
আজানধ্বনি উচ্চকণ্ঠে ঘােষিত হয়ে সেই ভাগবানের বন্দনা
করবে। সম্রাটের জয় হোক, হিন্দু মুসলমানের মিলিত
প্রার্থনা ভগবানের চরণ প্রান্তে পৌঁছে এ হিন্দুস্থানকে ধন্য
করুক।
। কাফের! হিন্দুগণের আবার ধৰ্ম্ম কি যে তারা
ভগবানের উপাসনা করূবে ? তারা শয়তানের দূত,-তারা
নিজের হাতের সৃষ্টিকে বিশ্বস্রষ্টা ভগবান বলে পূজা করে
জাহান্নামে যাচ্ছে-
তেগ। সর্বভূতে ভগবানের স্বরূপ দর্শনের মর্মকথা
আমি জ্ঞানমূখ মুসলমান সম্রাটকে বুঝাতে পারব না।
ওমরাহগণ। খবরূদার—খবরূদার।
ঔরঙ্গ। কাফের! তােমার ঐ বর্বরধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করে
২

রক্তের লেখা সত্য ইলাম ধর্ম গ্রহণ কর, নৈলে তােমার শিরের জন্য ঐ জল্লাদের হস্তের শাণিত তরবার উদ্যত হয়ে আছে। যদি সম্রাটের দয়া চাও, সত্য ধৰ্ম্ম গ্রহণ করে প্রাণ বাঁচাও। প্রঃ ওম। আহা! সম্রাটের কি মেহেরবানি— তেগ। পিতৃদ্রোহী, ভ্রাতৃদ্রোহী সম্রাটের হস্তে যেদিন বন্দী হয়েছি সেই দিনেই প্রাণের মায়া পরিত্যাগ করেছি। দ্বিঃ ওম্। চুপচুপ। কাফের, সাবধান! ঔরঙ্গ। তেগবাহাদুর, সম্রাট আলামগীর ক্ষমাশীল তাই তােমার এত ঔদ্ধত্য মার্জনা হচ্ছে; কিন্তু তােমায় মাত্র এক লহমা সময় দিলেম,—বিবেচনা করে দেখ এখনােনৈলে কোড়ার ঘায়ে তােমার গায়ের ছাল তুলব, গােরক্তে রসনা সিক্ত করে দেব, তারপর ঐ ঘাতকের অসিতে ঐ অপবিত্র শির ধূলায় লুষ্ঠিত করা হবে। তৃঃ ওম। কাফের, কেন কতল হবে ? হজরত মহম্মদের প্রচারিত সত্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ইহকালের প্রাণটি বাঁচাও পরকালে খােদার মেহেরবানিতে বেহস্তে তােমার যায়গা হবে। সকলে। ঠিবাৎ, ঠিবাৎ- ঔরঙ্গ। কাফের, ইলাম ধৰ্ম্মই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ধর্ম। হজরত মহম্মদ আল্লার “অহি” দুনিয়াতে প্রচার করেছেন,

রতের লেখা
কেন এই সত্য ধর্মের আশ্রয় তলে না এসে শয়তানী ধৰ্ম্ম
রক্ষা করবার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন কচ্ছ ?
তেগ। হে মাটীর মালিক গর্বিত সম্রাট ! আমি
ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহাত্মা মহম্মদের উদ্দেশে ভক্তি-
প্রণত হৃদয়ে মস্তক অহরহঃ নত করে থাকি। কিন্তু হে
ধৰ্ম্মান্ধ সম্রাট! ইসলাম ধর্মের বহু সহস্র শতাব্দী পূর্বে
যখন আরবের ঊষর মরু প্রান্তরে, মধ্য এসিয়ার পাষাণময়
পর্বতের প্রচ্ছন্ন গহ্বরে, তাতার, তৈমুরের পূর্ব পুরুষগণ
অজ্ঞতার অন্ধতামসে আচ্ছন্ন হয়ে রক্তলি, দানবের মত
মানুষের হৃদপিণ্ডের রুধির ধারা ক্ষরিত করবার জন্য ঘুরে
বেড়াত, তখন এই জ্ঞানদীপ্ত ভারতের ভক্তি-ধৰ্ম্ম কাকে
বন্দনা করে ধন্য হয়েছে তার ইতিহাস জান কি সম্রাট
যদি দিব্য চক্ষু থাকে, যদি বক্ষে ভাবের আবেশ থাকে একবার
অতীত ভারতের পানে ফিরে চাও,মানব জীবনের সেই
প্রথম প্রত্যুষে, শ্যামসলিল সরস্বতী তীরে দাঁড়িয়ে ঐ দেখ,
সুঠাম, শুভ্রকান্তিমান আর্যগণ জোড় করে, ঊর্ধ্বমুখে, নবােদিত
সবিতার পানে চেয়ে ভগবানের বন্দনা গানের ললিত ঝঙ্কার
তুলছেন ! এরা কি বর্বর ধৰ্ম্মের উপাসক, উদ্ধত সম্রাট ?
সভাসদগণ। খবরদার-খবরদার!
তেগ। স্তব্ধ হও হীন চাটুকারদের দল! তারপর এস
?
৪.

রক্তের লেখা সম্রাট।—ধৰ্ম্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের উন্মুক্ত, উদার প্রান্তরে। ঐ দেখ, কে ঐ শান্ত, নবদূর্বাদলশ্যাম সৌন্দর্যের প্রশান্ত স্থির মূর্তি। যেদিন এই প্রান্তরে দাড়িয়ে ঐ মহাপুরুষ গীতার অমৃতময় ভাবধারায় মানবের প্রাণতীর্থকে জ্ঞানের গঙ্গোদকে অভিষিক্ত করলেন সেদিন তােমার সত্য ইসলাম ধৰ্ম্ম কোথায় ছিল? আবার চেয়ে দেখ ;—ঐ নিরঞ্জার পাদপঘন পূত পুলিনে,-কে ঐ সৌম্য, সুন্দর, তরুণ তাপস নয়নে কি করুণা, আরক্ত অধরে কি প্রীতিময় হাসি ? জান সম্রাট ?—এই শাক্য রাজকুমার মানব প্রেমের কল্যাণ কল্পে সন্ন্যাস নিয়েছেন ?—যখন এই মহাত্মার অহিংসা মন্ত্রের “অনন্ত পতাকা” মূলে অর্ধ পৃথিবীর মানব মস্তক নত করেছিল তখন তােমার সত্য ইসলাম ধৰ্ম্ম কোথায় ছিল হে হিংস্র সম্রাট ? ঔরঙ্গ। কাফের ! তেগ। সম্রাট।••• ঔরঙ্গ। এই জরীর জুতাে দেখছ ? এই পাদুকা-প্রহারে তােমাদের সব দেবতাকে চূর্ণ করব- তেগ। [ রক্তাক্ত চোখে ] কি ? ঔরঙ্গ। ইয়ে কাফের বহুৎ বেৎমিজ, বখৎ। কোড়া- লাগাও রক্তের লেখা [ জল্লাদ তেগবাহাদুরকে কশাঘাত করিতে লাগিল, তেগ বাহাদুরের শরীর ক্ষত বিক্ষত হইয়া গেল ] প্রঃ ওম্। কাফের, সম্রাটের সম্মুখে “তওবা” কর, গােস্তাকী মাফ চাও তেগ। কি ? তওবা কর্ব ? এই ধৰ্ম্মদ্বেষী সম্রাটের কাছে ? ক্ষান্ত হলে কেন জল্লাদ ? কোড়া লাগাও, আঘাতে আঘাতে মাংস, পেশী ছিড়ে দাও। দাও। কোন দুঃখ নাই! সম্রাট। যত ইচ্ছা নিৰ্যাতন কর, কোন ক্ষোভ নেই। হে প্রতীচীর পাবক ! হে প্রেম ধর্মের অবতার যীশাষ, খাইষ্ট ! একদিন তােমার সুকুমার শরীর নিষ্ঠুর, ধৰ্ম্মান্ধ ইহুদীগণ কশাঘাতে ক্ষত বিক্ষত করে তুলেছিল, তারপর তাদের বর্বরতার স্মৃতিফলক ক্রুশ শীর্ষে যেদিন তুমি শশাণিত- সিক্ত দেহে, অকম্পিত ধৈর্য্যে, অশেষ যন্ত্রণার মধ্যে মানব মঙ্গল প্রার্থনা করুতে করতে আত্মােৎসর্গ করেছিলে সেদিন তােমার পবিত্র আত্মাকে বিদ্রুপের বিষ বর্ষণে আবিল করতে চেয়েছিল ঐ ইহুদীরা! আজ তারা অনুতপ্ত হৃদয়ে তােমার চরণে মস্তক নত কচ্ছে। হে পরম পুরুষ ! আমায় আশীর্বাদ কর,—যেন আমি এই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে মুক্তিকে বরণ করূতে পারি।

রক্তের লেখা
ঔরঙ্গ। ইয়ে আজব কাণ্ড! কাফের যাদুকর।
যন্ত্রণা কি করে সহ্য কচ্ছে ?
তেগ। যন্ত্রণা ? যন্ত্রণা কোথায় সম্রাট ?—হিন্দুস্থানের
সমগ্র হিন্দুগণের মর্ম মাঝে তুমি যন্ত্রণার যে বিষদিগ্ধ শাণিত
শেল বিধেছ, তার কাছে ত এই যন্ত্রণা অতি তুচ্ছ! আমি
যাদুকর নই, যাদু জানি না। কি শক্তিতে আমি এই
নিৰ্যাতন সয়ে নিচ্ছি তা আমার কণ্ঠলগ্ন কবচে রক্তের অক্ষরে
লিখিত আছে।
ঔরঙ্গ। জল্লাদ, কাফের চোখ রাঙা করে আমার পানে
চাইছে, জলন্ত লৌহ শলকা দিয়ে এর চোখ দুটি জ্বালিয়ে দাও,
তারপর চাদনী চকের জনসঙ্কুল স্থানে নিয়ে একে এখনিই হত্যা
কর। কাফের, এখনাে যদি বাঁচবার সাধ থাকে ইসলাম ধৰ্ম্ম
গ্রহণ কর-পঞ্চনদের সুবাদার পদ তােমায় দেব—দেখ--
তেগ। সম্রাটের এই দান ঘৃণার সহিত প্রত্যাখ্যান
করি।
ঔরঙ্গ। লে যাও জল্লাদ,—কতল
[ প্রহরিবেষ্টিত তেগবাহাদুরকে লইয়া জল্লাদের প্রস্থান ।
রাম। জাহাপনার জয় হোক। এতক্ষণ কম্পিত বক্ষে
জাঁহাপনার বিচার দেখছিলাম। প্রাণ খুলে জয়ধ্বনি
কচ্ছি—জাহাপনার সুবিচারের জন্য। ঐ শয়তান, কাফেরেরও

রক্তের লেখা
অধম, দুনিয়ার দুষমন—ও নাস্তিক ;-ও বৌদ্ধের মহিমা কীর্তন
করে, মুশার কাছে মস্তক নত করে আবার হিন্দুয়ানিও ফলায়।
জাঁহাপনার এই ন্যায় বিচারে আজ হিন্দুগণ দুহাত তুলে
সম্রাটের জয় ঘােষণা কবে।
ঔরঙ্গ। খােদাতাল্লা —খােদাতাল্লা ! তুমিই সত্য, তুমিই
সত্য। তােমার দীন নফর আমি।
সকলে। জয়, শাহানশা বাদশা সম্রাট আলমগীরের জয়।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-কুটীর সংলগ্ন পূজাগৃহ। কাল—প্রভাত।
[ গােবিন্দ গুরুতেগবাহাদুরের তরবারকে ফুল, চন্দনে পূজা
করিতেছিলেন।]
গােবিন্দ। অত্যাচারের সহস্র
অত্যাচারের সহস্র শাণিত তরবার এই
মুষ্টিমেয় শিখগণের শির লক্ষ্যকরে উত্থিত হয়েছে, তুমি পাবে
কি তার বিরুদ্ধে তােমার করাল খরধার দেহ প্রসারিত করে
দাঁড়াতে, হে আমার পরম পূজ্য প্রিয়তম কৃপাণ ? পিতামহ,
গুরু হর গােবিন্দের বজ্রমুষ্টি তােমার অঙ্গে, পিধানে এখনাে
অঙ্কিত রয়েছে, পিতা, গুরু তেগবাহাদুর তােমায় আমার করে

রক্তের লেখা
অর্পণ করে বলে গেছেন—“পুত্র, আমার পিতার এই পবিত্র
কৃপাণ, এর মর্যাদার জন্য জীবন পণ করাে।”—পিতা আজ
মৃত্যুর
অভিশাপ মস্তকে নিয়ে দিল্লীর মােগল কারাগারে।
দেখাে কৃপাণ! তার শেষ বাণী যেন ব্যর্থ না হয়—
[ মােহন্ত কপাল দাসের প্রবেশ
কৃপা। উঃ ! কি ভীষণ অত্যাচার !•••একটা মৌন
আর্তনাদে হৃদপিণ্ড ফেটে যেতে চাইছে,—হিন্দুর পূজাহ
পীঠস্থান—বিশ্বনাথের মন্দির আজ ধ্বংস স্তুপে পরিণত, সহস্র
শতাব্দীর ভক্তিস্নাত কোটী কোটী বিগ্রহ মূৰ্তি মােগলের
পদতলে দলিত, রক্ত-শােষী জিজিয়ার জ্বালায় প্রাণ অতিষ্ঠ ;
তবু একটি হিন্দু এর বিরুদ্ধে মস্তক তুলে দাঁড়াচ্ছে না।
গগাবিন্দ। কে দাড়াবে মােহন্ত বাবা ?-রাজপুতনার
তপ্ত মরুবক্ষো ফুড়ে যে কঠোর মাড়ােয়ার জাতি মাথা তুলে
দাঁড়িয়েছিল আজ তার শির তুর্কীর পদতলে ;-অম্বর,
বিকানীর, বুন্দি করজোড়ে, মস্তক নত করে মােগলের কৃপা
ভিখারী;—স্বদেশপ্রেমিক, সন্ন্যাসী পুণ্যশ্লোক প্রতাপের সঙ্গে
সঙ্গে ভারতের শক্তি সাধনার অবসান হয়েছে, স্বার্থপরতার
কৃমিকীট লেগে হিন্দুর মেরুদণ্ড জীর্ণ করে ফেলেছে তাই শির
উন্নত করে দাঁড়াতে পারূছে না।

রক্তের লেখা [ মাখন শার প্রবেশ মাখন। পাচ্ছে না কি রকম ?—দিল্লীর দরবার কক্ষে যে তেজস্বী পুরুষের গর্বোদ্ধত উন্নত শির চোখের সম্মুখে দেখে এলেম, নগরাজ হিমালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শৃঙ্গ তুষারমৌলী গৌরীশঙ্করের শিরও বােধ হয় তত উন্নত নয়। গােবিন্দ। কি মাখনজী ! আপনি কাপছেন কেন ? মাখন। কঁপছি ? না, কৈ ? কঁপব কেন ?—যে অটল স্থির মূর্তির স্মৃতি বুকে নিয়ে এসেছি তাতে হৃদয় কেন স্পন্দিত হবে ? গগাবিন্দ। আপনি দিল্লী হতে কখন এলেন ? পিতার সংবাদ কি ? মাখন। পিতার সংবাদ ?—অলৌকিক,—অপূর্ব- ভয়ানক!মৃতুকে এমন ভাবে ব্যঙ্গ করতে, কুরুক্ষেত্রের সে ভয়াবহ সমর প্রাঙ্গণে বােধ হয় মহাত্মা ভীষ্মদেবও সক্ষম হন নি।—কি সে মহান দৃশ্য!—মন্ত্ৰস্তব্ধ নিষ্কম্প সমুদ্রের মত স্থির অনম্য, দুর্ধর্ষ হিমাদ্রির মত-উন্নত, অটল।—পৈশাচিক অত্যাচারের প্রলয় ঝঞা মস্তকের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, জ্বলন্ত লৌহদণ্ডের দগ্ধ জ্বালার মর্মন্তুদ বেদনায় সর্বাঙ্গ ব্যথিত করে তুলছে তবু গুরুজীর কণ্ঠস্বরে একটু কাতরতা ক

রক্তের লেখা
;
নেই, নয়নে একবিন্দু অশ্রু নেই, মস্তকের একগাছি কেশও
কণ্টকিত হয়ে ওঠে নি।
গগাবিন্দ। পিতা-পিতা-
মাখন। কাতর হবেন না গােবিন্দরায়! কাতর হয়ে
গুরুজীর অপমান করবেন না। কি অমানুষিক সে প্রশান্ত
হৃদয়ের স্থিরতা ?-সম্রাট ঔরঙ্গজেব রেখেছিলেন গুরুজীর
একদিকে ইস্লাম ধর্ম গ্রহণের জন্য শত সুখদ প্রলােভন ;
অপর দিকে,-গুরুর ভগবৎ পিপাসু হৃদয়ের স্থির বিশ্বাসের
জন্য অশেষ নিৰ্যাতন,—মস্তকের উপর ঘাতক-হস্তের উদ্যত
তরবার। গুরু সে তরবারের নীচে মস্তক রেখে বেছে নিলেন
কি ?—আৰ্য্য ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য অসহ্য নিৰ্যাতন!
তখন তার কণ্ঠস্বর কি বজ্রগম্ভীর!—সে স্বরের আবেগ তরঙ্গে
মােগল সম্রাটের সে মৰ্ম্মর প্রাসাদের ভিত্তিমূল যেন কেঁপে
উঠল। ময়ূর সিংহাসনে বসে গর্বিত ঔরঙ্গজেব যখন তার
জরীর মিনে করা পাদুকা পরা পাটি তুলে কুৎসিত অবজ্ঞার
ভঙ্গীতে গুরুকে বল্লেন—“কাফের, হিন্দুর দেবমন্দিরের
সব দেবতাকে এই পাদুকা প্রহারে চূর্ণ করব, সব হিন্দুকে
কলমা পড়িয়ে ইস্লামের নফর করে দেব, তখন গুরুজীর
শির কি ঋজু হয়ে উঠল ! চোখের পানে চাইলেম,—চোখ
দুটি ফুড়ে ধক ধক্ করে অগ্নি জ্বছে !

রক্তের লেখা কৃপাল। গােবিন্দ রায়, ওঠ জাগগা এই অপমানের প্রতিশােধ নাও; সমস্ত হিন্দুর মস্তক নত হয়েছে সত্য তুমি মস্তক তােল। মাখন। তারপর আবার নিদারুণ নিৰ্যাতন গুরুর সর্বাঙ্গে রুধিরাক্ত দাগ দাগিয়ে দিলে। কিছুতেই যখন গুরুজীকে নত করতে পারলে না, সম্রাট সবিস্ময়ে বল্লেন- “এই কাফের যাদু জানে।” গুরু উত্তর করলেন—“আমি যাদু জানিনে ; আমার কণ্ঠে, রক্তের লেখায় যে কবচ লিখে রেখেছি এ যাদু জানে।” তারপর ঔরঙ্গজেবের আরক্ত কুটীল আঁখির ইঙ্গিতে জল্লাদের কণ্ঠ ছিন্ন হল- গােবিন্দ। যােহাে- খড়গে গুরুজীর - (বেগে নকু চণ্ডালের প্রবেশ ] নকু। এনেছি মহারাজ!.এনেছি। এই যে গুরুজীর মুণ্ড মহারাজ! [ গােবিন্দ হস্তদ্বারা চক্ষু আবৃত করিল ] নকু। মাখান সেজী! আপনার আজ্ঞা ঠিক ঠিক মেনে চলেছি। দিল্লীর কেউ জানেনা, কেউ দেখতে পায়নি। লছমি ঠেকেদার বয়েল গাড়ীতে গুরুজীর ধড় নিয়ে পালিয়েছেন, আমি মুণ্ড নিয়ে এসেছি। ১২

রক্তের লেখা
?
?
;
কৃপাল। গােবিন্দ রায় ? একি একি দৌর্বল্য
স্নেহের আবেগ-প্রবাহে প্রাণের পুরুষত্বকে ভাসিয়ে দিও না।
মাখন। দিল্লীর দরবার-কক্ষে ছদ্মবেশে দাড়িয়ে
সম্রাটের অমানুষিক অত্যাচার নির্বাক হয়ে চেয়ে দেখেছি,
গুরুজীর মৃত্যুর আদেশ অবিচল ধৈর্য্যে মস্তক উন্নত করে
শুনেছি ; কিন্তু ক্ষোভে, ঘৃণায়, লজ্জায় মস্তক নত করে
এসেছি যখন দেশদ্রোহী রামরায় গুরুজীর মৃত্যুর আদেশ
শুনে আনন্দে, হর্ষে সম্রাটের জয়ধ্বনি করে উঠল—
গগাবিন্দ। নাঃ—অশ্রু, শুষ্ক হয়ে যাও, হৃদপিণ্ডের
রক্তধারা উন্মাদ উচ্ছ্বাসে ফেঁপে ওঠ—আমি গুরুর বাণী
সফল করব,
আমি এ অনাচারের মূল
উচ্ছেদ করব।
কৃপাল। এইত চাই গোবিন্দ রায়! ঝেড়ে ফেলে
দাও প্রাণের এই মৰ্ম্মঘাতী শােকজ্বালা, জাগিয়ে তােল
হৃদয়ের ঘুমন্ত প্রতিহিংসাকে দেশের অনাচার, অত্যাচারের
বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে দাড়াও, হৃদয়ের প্রতি রক্তবিন্দুকে
এই নিষ্ঠ র হত্যার প্রতিশােধের জন্য উন্মাদ করে তােল।
মাখন। এ নিন্
এ নি গােবিন্দ রায় গুরুজীর কণ্ঠলগ্ন
রক্তের লেখা কবচ। দিল্লীর ‘চাদনি চকে’ পরিত্যক্ত ধূলা-
রাশির মধ্য হতে অতি সংগােপনে এই মুণ্ড কবচ সহ
উদ্ধার করে এনেছি। [ কবচ অর্পণ ]

রক্তের লেখা
গগাবিন্দ। [ কবচ পাঠ ] “শির দিয়া শিরহ ন দিয়া”
পিতা,—পিতা! শির দিয়েছ কিন্তু ধৰ্ম্ম দাওনি। তােমার
এ জলন্ত রক্তের লেখায় আমার ধমনির রক্ত নেচে উঠছে।
কৃপাল। গােবিন্দ রায়! তােমার সম্মুখে পিতার
এই ছিন্নমুণ্ড, হস্তে পিতার রক্তের লেখা কবচ,তােমার
জীবনের এই ভৈরব যুগ-সন্ধ্যায় তােমার মহিমাময় স্বর্গীয়
পিতার আদেশে এই পঞ্চনদের গুরুপদে তােমায় বরণ
করলেম! যাও বৎস, এ লাঞ্ছিত অবনত ভারতের
মৰ্য্যাদা রক্ষা, পিতার নিঠর হত্যার প্রতিশােধের জন্য
মুক্ত কৃপাণ নিয়ে দেশদ্রোহী ধর্মদ্রোহীগণের উপর আপতিত
হও। জয় গুরু গােবিন্দের জয় ।
মাখন প্রভৃতি। জয় গুরু গােবিন্দের জয়।
গােবিন্দ। আসুন পিতার এই পবিত্র মুণ্ডের সৎকার
আগে শেষ করি।
১৪

রক্তের লেখা তৃতীয় দৃশ্য। স্থান—রাম রায়ের বিলাস-বাটিকা। কাল-সন্ধ্যা { রাম রায় মত্ত অবস্থায় টলিতেছিল, তার পারিষদগণ তবলা, বায়া, সারঙ্গী লইয়া গান, বাজনায় মত্ত ) গীত হিন্দু, হিন্দু মাের খাটি হিন্দু। কপালে তিলক আঁকি, অনুকারি আকাশের ইন্দু। মােরা সে শুদ্ধ সনাতন আর্য গােস, রুটি, কাবাব, যদিও গােপন আহাৰ্য্য, কিন্তু জাতি যাবে এটি অনিবাৰ্য্য । যদি পার হই ভারত সিন্ধু। রাম। বাঃ! বাঃ! সােভানাল্লা! সােভানাল্লা! ইয়ে মিঠা বুলি দিল্লীসে আমদানি কিয়া। চালাও চালাও ভেইয়া ! “খাঁটি হিন্দু-খাটি হিন্দু।” হিন্দু।” কার বাবার সাধ্য বলে ? এই তিলকত্ৰিপুণ্ডের বিলাস! এই টিকির বহর। আর চাই কি ? চালাও না গােপনে সিরাজী, সাকী, পারিষদগণ গাইল- নিয়ে পৈতা টিকির বড়াই (মােরা) জাত বিজাতির মুখে থু থু ছড়াই, কিন্তু মনু যাজ্ঞবল্ক করি গাে জবাই যদি পাই স্নেচ্ছের উচ্ছিষ্ট বিন্দু। = রক্তের লেখা রাম। চালাও চালাও। ঠিক বাৎ হে। টিকির ঠমকে, যজ্ঞসূত্রের জমকে হিন্দুয়ানি জমিয়ে সমাজের বুকে যত ইচ্ছা ব্যভিচার কর কেউ টু শব্দ করবে না। কিন্তু হুসিয়ার। আচারের অভিনয়টা খাসা চালাবে। পারিষদগণ গাইল- মােদের ছুঁত মার্গের নাহিরে তুলা, বার ভাইয়ের তের চুলা, কারো অঙ্গের যদি লাগে ধূলা, মাের ডুব দিই জাহ্নবী, যমুনা, সিন্ধু। রাম। বহুৎ আচ্ছা বহুৎ অাচ্ছাচালাও- পারিষদগণ গাইল- মােরা চাহিনা ভারত, চাহিনা দেশ যদি পাই সুখ সম্পদ লেশ, কিন্তু জাহির করি অশেষ (মােরা) দিতে পারি দেশের তরে বুকের রক্ত বিন্দু রাম। বাঃ! এই ত কলিজার কথা।—কে চায় দেশ ? খাও, দাও ফুর্তি কর, কে জানে কবে জীবন হবে শেষ । চালাও, চালাও- প্রঃ পারি। সাদা প্রাণে আর চলে না দাদা।

রক্তের লেখা রাম। কুছপরওয়া নেই।—লেও, পিয়ালা ভর লেও; মেজাজমে তর বেতর রােশন্ চালাও! ইয়ে বহুৎ আচ্ছা বারুণী,-গুলাবকে। গুপানি, বাদশেকো মেহেরবানি। লেও, পিয়ালা ভর লেও,ভাের রাত পিও। কেয়া তােফা। তেগ বাহাদুরকা শির তােড় দিয়া,হাম ত আভি গুরু বন্ গ্যেয়া। কহে ভেইয়া—“গুরু রামজীকো ফতে”। ( মোহন্ত কৃপাল দাসের প্রবেশ ] কৃপাল। নেহি, নেহি। কহহ,-গুরু গােবিন্দজী কী জয় ! রাম। ক্যেয়া ? হাম ত আভি গুরু হে। কৃপাল। কভি নেহি।—আভি গুরু-গুরু গােবিন্দ হে। রাম। গােবিন্দ ? পুঃ ! এখনাে নাক টিপলে ঝর ঝক্ করে দুধ ঝরে ! পু! গােবিন্দ আবার গুরু? কৃপাল। গুরু গােবিন্দের অভিনন্দন-গীতিকার উন্মাদ কোলাহল, পঞ্চনদের জল কল্লোলকে বিহবল করে কোটি কণ্ঠে মুখর হয়ে উঠেছে, তার ধ্বনি কি রামরায়ের বিলাস কুঞ্জে এখনাে প্রবেশ করে নি ? রাজ। জান ওহে, মােহন্ত বাবাজী ?—পাগলের প্রলাপ- বাণীর প্রবেশ অধিকার রামরায়ের সীমার মধ্যে নিষেধ। ১৭ রক্তের লেখা কৃপাল। গুরু গােবিন্দের মােহন মন্ত্রে পঞ্চনদ যে আজ উন্মাদ হয়ে গেছে। কি করবে রামরায় ? বার বার ত গুরু হওয়ার জন্য চেষ্টা কচ্ছ,–এর জন্য একটা পুণ্য প্রাণ মােগলের চরণতলে বলি দিলে— রাম। কে এ অর্বাচীন বালককে গুরু পদে বরণ করলে ? কৃপাল। গুরু তেগ বাহাদুরের আদেশ, আর পঞ্চনদের সমস্ত জনবৃন্দ রাম। যাক, কুছ পরওয়া নেই। রামরায়ের যে ক্রোধাগ্নিতে তেগ বাহাদুর ভস্ম হয়ে গেছে, গােবিন্দও সে আগুনে পুড়ে মরূবে। নাঃ!—কখনাে না? মােগল সৈন্য এসে যদি পঞ্চনদকে শ্মশান করে দেয়, সে বরং সহ হবে- কৃপাল। কি করবে রামরায় ? দেশের শত্রু, জাতির শত্রু, মােগলের দাসানুদাসকে পঞ্চনদের কেউ যে গুরু বলে স্বীকার করূবে না। গুরু গােবিন্দ বালক বটে, কিন্তু তার তরুণ প্রাণে স্বদেশ প্রেমের যে ভাবমন্দাকিনীর পরিপ্লব উঠেছে তার অমৃত প্রবাহে অবগাহন করবার জন্য পঞ্চনদ- বাসী উদ্দাম উচ্ছ্বাসে ছুটে চলেছে ;-দুর্বল মানব তুমি, তােমার সাধ্য কি এই বিরাট জনসঙ্ঘের গতি রােধ কর ? রাম। দেখা যাবে। ১৮

রক্তের লেখা
রাম।
;
কৃপাল। কি ভয় দেখাচ্ছ রামরায় ? গােবিন্দের উদার
হৃদয় মধ্যে যে অগ্নি প্রজ্বলিত হয়েছে, তুমিত তুচ্ছ-তার
তীব্র জ্বালায় শক্তিমান সম্রাট ঔরঙ্গজেব ভয়ার্ত হয়ে ছুটো-
ছুটি করূবে। রামরায়, আমার সবিনয় নিবেদন,আত্মদ্রোহী,
ধৰ্ম্মদ্রোহী হয়ে যে পাপ সঞ্চয় করেছ তার প্রায়শ্চিত্ত কর।
সাবধান!
( প্রস্থান)
ভয় পেয়েছে, তাই একটু ভিকুটী করে গেল।
পাবে না? রামরায় কি, যে সে ? সম্রাটের দরবারে কদর
কি ? কিন্তু এ ভিরুকুটী, ফিরকুটী আমার কাছে টিকবে
, দেখে নেব,—দেখে নেব। ধ্যানচঁাদ ; তুমি আমার
শৈশবের সখা তুমি আমার পার্শ্বে এসে দাড়াও !
ধ্যান। আমি না হয় পার্শ্বে এসে দাড়ালেম, আমার
পার্শ্বে এসে দাঁড়াবে কে ?
রাম। নেহেল সিং আছে, হিম্মৎ চাদ আছে।
নেহেল। আমরা ত আছি রায়জী, কিন্তু আমাদের
অস্ত্রের মধ্যে ত এই সারিঙ্গীর ছড়ি। যখন গুরু গােবিন্দ
লক্ষ শিখ সঙ্গে তরবার ঘুরিয়ে ছুটে আসবে তখন এই ছড়ি
দিয়ে তার গতিরােধ করতে পারব কি
রাম। ভয় নেই ; মােগল ফৌজ এনে পঞ্চনদ এক নিমেষে
মরুভূমি করে ফেলব।
?
;
১৯

রক্তের লেখা
ধ্যান। সে কি কথা ? মােগলেরা এসে পদাঘাতে জননী
জন্মভূমির বক্ষোদেশ দলিত করে তাকে মরুভূমিতে পরিণত
কবে আর আমরা সে অত্যাচারের সহায়তা করব ? না
সখা, আমি তােমার পার্শ্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি—
অন্যপারিষদগণ। আমরাও পিঠটান দিচ্ছি।
[ সকলের প্রস্থান )
রাম। যা, দূর হয়ে যা—চাহিনা তােদের মত ক্ষুদ্র
অধমের সহায়তা।—দিল্লীর সম্রাট যার সহায় সে দুনিয়ার
কাকেও ভয় করে না। দেখে নেব দেখে নেব।
[ প্রস্থান ]
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থান-নয়নাদেবীর মন্দির। কালরাত্রি।
গুরু গােবিন্দ
গগাবিন্দ। মা !-মা ! কৈ মা? কোথায় মা? ঘাের
তমিস্র রজনী আঁধারের উপর আঁধার ছেয়ে আছে,
নক্ষত্র নিভেছে, চন্দ্রমা চক্রবাল রেখার গাঢ় তিমির তলে
ডুবেছে। কৈ মা ? কোথা মা? ভীষণ নিশা। অশনি
গজ্জাচ্ছে, প্রলয়ের মত্ত বিষাণ বিকট নিনাদে বাজছে ?
?

রক্তের লেখা
কৈ মা? কোথা মা ?—জ্বলন্ত বিদ্যুতের রক্তশিখা
অন্ধকারের বুক চিরে চমকাচ্ছে ? রুধিরান্মত্ত দানবদল
শ্মশানের প্রেতভূমিতে ধেই ধেই করে নাচছে।—ভয়ার্ড
সন্তান মা, মা বলে মার অভয় কোল খুঁজে সারা ;-কৈ মা?
কোথায় মা ? একি ? একি ?—বজশিখার বিদ্যুৎ বহ্নিতে
একি ভৈরবীরূপে দেখা দিলি মা ?-নৃমুণ্ডমালিনী,
কম্পিত খর কৃপাণ ধারিণী, রক্তস্নাতা রণরঙ্গিনী ! এমনি
যদি মা! তাের ধারা, তবে দে মা তারা। তাের এই ঘাের
নিশা-এই বীভৎস শ্মশান, উন্মত্ত প্রলয়ের ঐ সর্বনাশী
তাণ্ডব লীলা!—কেঁদে উঠুক মৰ্ম্মছেড়া আর্তনাদে পুত্রহারা
জননী, মুমু মরুক তার মৃত্যু শয্যার উপর দারুণ যন্ত্রণায়
ছট ফট করতে করতে, চির ক্ষুধাতুর তার শীর্ণ কঙ্কাল নিয়ে
ছুটে বেড়াক তপ্তশ্বাসে আকাশে বাতাসে হাহাকার তুলে।
দে মা, এই নিবিড় তিমিরাচ্ছন্না ঝাক্ষুব্ধ প্রলয়ের নিশা,
শবাকীর্ণ এ মহাশ্মশান, এইত তাের সাধনার শুভ সংযােগ
[ দয়াসিং প্রভৃতি শিখগণের প্রবেশ ]
শিখ। জয় দেবী নয়না মাইকী জয়।
গােবিন্দ।
দেখ তােরা ?- মা নাছছে রণরঙ্গের তালে
তালে,-তমসা ঘাের নিশীথের অঙ্গে অঙ্গে মিশে; ধক ধক
২১

রক্তের লেখা
করে জ্বলছে প্রলয়ের অগ্নি মায়ের আঁখিতে, পদভরে পৃথিবী
টছে।
বল তােরা-
জয় ত্বং দেবী চামুণ্ডে জয় ভূতাপহারিণী।
জয় সৰ্বগতে দেবি কালরাত্রি নমােহস্তুতে।
দয়া। কি চায় মা ?
গােবিন্দ। রক্ত,রক্ত। এই দেখ,-মায়ের এই কৃপাণে
রক্ত-চন্দনের লেখায় মায়ের আশীৰ্বাদবাণী। যমুনার তীরে
তীরে, গহন গিরি গহবরে মা, মা বলে মায়ের কঠোর সাধনায়
জীবনের দীর্ঘ দিন কাটিয়েছি, আজ মার দেখা পেয়েছি,
“আজ প্রাণ খুলে বলিতে পেরেছি
পেয়েছি আমার শেষ
তােমরা সকলে এস মাের পিছে,
গুরু তোমাদের সবারে ডাকিছে,
আমার জীবনে লভিয়া জীবন
জাগরে সকল দেশ।”
শিখগণ।
জয় গুরুজীর জয়।
দয়া। নাও গুরুজী ! তােমার চরণে আমরা সকলকে
নিবেদন করলেম।
গগাবিন্দ। মায়ের চরণে নিবেদন কর।
কর। মা যে
২২

রক্তের লেখা
হায় !
চেয়েছেন পঞ্চশিখের পবিত্র শির ;-কে মায়ের চরণে নিজের
মুণ্ড
উৎসর্গ করে ধন্য হবে এস।একি ? সকলে স্তব্ধ
হয়ে দাড়িয়ে রৈলে যে? এস, এস মায়ের তৃপ্তির জন্য
শির দিয়ে কে কৃতার্থ হবে এস। শুধু কি মাকে মুখের কথা
শােনাচ্ছ ? মা যে অন্তরের কথা জানেন। হায় !
আজ গুরুর বাণী বাতাস কেটে শুধু শূন্যে মিশে গেল। আমরা
এমনি কুলাঙ্গার, তাইত মা আমাদিগকে পরিত্যাগ করেছেন।
দয়া।
জর গুরুজীর জয়।
জয়। আমার অপরাধ ক্ষমা
করুন। তুচ্ছ প্রাণের মায়ায় গুরুর আহ্বানে সাড়া দিই
নি। নিন গুরুজী, অধমের এই শির মায়ের চরণে নিবেদন
করে মা’র তুষ্টি বিধান করুন।
গােবিন্দ। এস মাতৃভক্ত সন্তান, মায়ের চরণে শির
উৎসর্গ করে ধন্য হয়ে যাও।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
ধরমসিং। দয়াসিং নিজের জীবন সার্থক করল ! আর
আমি স্বজনের মায়ায়, সম্পদের আকর্ষণে মায়ের আদেশ
উপেক্ষা করেছি। ধিক্ আমাকে।
। মাও বা হতে সাবমাজত দেখে ম এখে।
গােবিন্দ। কি একান্ত ভক্তি! দয়াসিং ! তুমিই
ধন্য! এই জনসঙ্ঘের মধ্যে আর
মধ্যে আর কার প্রাণ মায়ের

রক্তের লেখা
আদেশ পালনে উদ্যত হয়েছে ; এস, এস, নিজেকে নিবেদন
করে কৃতার্থ হও।
ধরম। গুরু, আমায় নাও, আমায় নাও, আমি নরাধম,
আমার এ নগণ্য জীবন সার্থক করে দাও গুরুজী।
গগাবিন্দ। এস।
( উভয়ের প্রস্থান)
মহাকম। হীন ছিপার ঘরে জন্ম আমার,-এ অপবিত্র
দেহ মায়ের চরণে উৎসর্গ করতে পারব কি ?
[ গােবিনের প্রবেশ
গােবিন্দ। মায়ের কাছে ত জাতি বিচার নেই মহাকম ।
একই মাতৃস্তন্য পান করে যে ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল প্রাণবন্ত।
হৃদয়ের অবিচল ভক্তিতে যদি নিজেকে বলি দিতে চাত্ত,
এস।
মহাকম। ধন্য আমি।
[ উভয়ের প্রস্থান)
সাহেব সিং। একি আনন্দে, হর্ষে প্রাণ আমার নেচে
উঠছে। গুরুজী। গুরুজী ! আমায় নাও, আমি মায়ের
কাছে প্রাণ বলি দেব। তুচ্ছ নাপিত আমি, তাই বলে
আমায় ঘৃণা কর না।
২৪

রক্তের লেখা
[গােবিন্দের প্রবেশ ]
গগাবিন্দ। সকলই মায়ের সন্তান। কে কাকে ঘৃণা
করে সাহেবসিং? ভাইয়ে ভাইয়ে ঘৃণার গণ্ডী তুলে হিন্দুগণ
আজ সকলের ঘৃণার পাত্র হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী
অতীত হয়ে গেল,—স্লেচ্ছ, হুণ, তুর্কী, তাতারের ঘৃণালিপ্ত
কোটি কোটি পাদুকা প্রহারে এদের চৈতন্য হচ্ছে না, এমনি
দুর্ভাগা এরা। এসসা, মায়ের চরণে নিজেকে উৎসর্গ করে
কৃতার্থ হয়ে যাও।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
হিম্মৎ। আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ। মা, মা ! নীচ
‘কাহার’ আমি ! তােমার চরণে আমায় ঠাঁই দেবে কি ?
গুরুজী। গুরুজী ! দয়া করে আমায় নাও
[ গােবিন্দের প্রবেশ ]
গােবিন্দ। এস, এস, মাতৃগতপ্রাণ ভক্ত সন্তান নিজেকে
নিবেদন করে মায়ের পূজা সফল কর।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
অন্যান্য শিখগণ। ওয়া গুরুজীকী ফতে। গুরুজী নাও
আমাদেরে। মার কাছে আমাদেরে বলি দাও-[ শিখগণের
কোলাহল ]
২৫

রক্তের লেখা ; [ গােবিন্দের প্রবেশ ] গােবিন্দ। ধন্য ধন্য! শিখগণ! তােমাদের ভক্তি, তােমাদের পূজা,—মার চরণে প্রাণ অঞ্জলি দেওয়ার তােমাদের এ একাগ্র কামনায় মা আজ প্রসন্না; তাই পঞ্চ সন্তানের ভক্তি নিয়ে মা তাদিগকে দেশের কাজে ফিরে পাঠিয়েছেন। ঐ দেখ দয়াসিং, ধরমসিং, প্রভৃতি শিখগণ মায়ের আশীর্বাদ- চিহ্ন রক্ততিলক লেখা ললাটে ধারণ করে প্রফুল্ল প্রাণে ফিরে আসছে, বল-মায়িকী জয় শিখ। মায়িকী জয়। নয়না মায়িকী জয় [ দয়াসিং প্রভৃতি পঞ্চ শিখের প্রবেশ ] = সকলে। ওয়া গুরুজী কী ফতে, ওয়া গুরুজী কী ফতে। গােবিন্দ। সিন্ধু মাঝারে মিশিছে যেমন পঞ্চ নদীর জল, আহ্বান শুনে কে কারে থামায়, ভক্ত হৃদয় মিলিছে আমায়, পঞ্চাব জুড়ি উঠিছে জাগিয়া উন্মাদ কোলাহল। ভুলে যায় সবে জাতি অভিমান, অবহেলে দেয় আপনার প্রাণ ২৬

রক্তের লেখা
এক হয়ে যায় মান অপমান,
কণ্ঠে কণ্ঠে মুখরে মুক্তির গান।
সকলে। ওয়া জরুজীকী ফতে, ওয়া গুরুজীকী ফতে।
( সকলের প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান-মােহন্ত কপালের আশ্রম। কাল-সন্ধ্যা
( ভারতবর্ষের মানচিত্রের সম্মুখে জোড় করে মােহন্ত কপাল ও
শিষ্যগণ গাইতেছিল]
গীত
নমাে নমাে ভারতভূমি !
ভীষ্মৰ্জ্জুন প্রসবিনী,
ব্যাস বাল্মিকী বন্দিতা জননী
বুদ্ধ শঙ্কর হয়েছে ধন্য
পিইয়ে যাঁহার শুন্য
যার গিরি দরি তলে
নদ নদী জলে পুলকিত কত পুণ্য।
আজি কেন সে ছিন্ন ভিন্ন,
রিপু পদভরে পঞ্জর জীর্ণ,
বিশ কোটি কণ্ঠে ডাকে যারে জননী
?
২৭

রক্তের লেখা
দীপ্ত যাহার ললাট
রবি শশী তারকায়,
কোন মেঘলার লেগেছে আঁধার
সে মুখ চন্দ্রমায় ?
উঠ, জাগ সব সন্তান!
তীব্র জ্বালায় খােল গাে কৃপাণ
দিকে দিকে বাজুক রুদ্র বিষাণ
হাসিবে জননী মহিমা শালিনী।
স্থানকেশগড়ের মুক্ত প্রাঙ্গন। কাল-প্রভাত
| গােবিন্দসিংহ, দয়াসিংহ, ধরমসিংহ, মহামসিংহ, সাহেবসিংহ,
হিম্মৎ সিংহ ও অন্যান্য শিখগণ ]
গােবিন্দ। তােমরা সকলে প্রস্তুত ?
সকলে। প্রস্তুত।
গগাবিন্দ। শুদ্ধ, স্নাত ?
সকলে। শুদ্ধ, স্নাত।
গােবিন্দ। যার, যার কণ্ঠে উপবীত আছে, ত্যাগ কর।
[ দয়া সিংহ ও অন্যান্য কতিপয় শিখ উপবীত ত্যাগ করিল।
২

রক্তের লেখা
গগাবিন্দ। বল,—আমাদের এক জাতি, এক ধৰ্ম্ম, এক
প্রাণ, এক লক্ষ্য।
সকলে। আমরা এক জাতি,—আমাদের এক ধৰ্ম্ম, এক
প্রাণ, এক লক্ষ্য।
গগাবিন্দ। আজ হতে সৰ শিখেরা এক সিংহ উপাধি
নামের সঙ্গে ব্যবহার করবে। তােমাদের অন্য ধর্ম নেই
অন্য ক্রিয়া কৰ্ম্ম নেই, ‘পাহল’ তােমাদিগকে মুক্তি দান
করবে। বল,পরস্ত্রীকে মাতৃবৎ জ্ঞান করব।
সকলে। পরস্ত্রীকে মাতৃবৎ জ্ঞান করূব।
গােবিন্দ। কোনরূপ মাদক দ্রব্য সেবন করব না।
সকলে। কোনরূপ মাদক দ্রব্য সেবন করব না।
গােবিন্দ। সকলে কেশ, কৃপাণ, কাঙ্গা, কচ্ছ, কড়া,
-শিখগণের জাতীয় চিহ্ন—এই পঞ্চ ‘কক্কা’ ধারণ করূব।
সকলে। ধারণ করব।
গগাবিন্দ। বল—কখনাে কৃপাণ পরিত্যাগ করব না।
সকলে। কৃপাণ পরিত্যাগ করব না।
গগাবিন্দ। কখনাে শির উলঙ্গ রাখব না, সত্যবাদী,
জিতেন্দ্রিয় হব।
শিখ। সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় হব।
মহাকম। গুরু মাইজী মিষ্টান্ন নিয়ে দাড়িয়ে আছেন।

রক্তের লেখা গগাবিন্দ। এ! এযে বড় শুভ লক্ষণ। নিয়ে এস মহাকম। (মহাকমের প্রস্থান ও মিষ্টান্ন লইয়া পুনঃ প্রবেশ গগাবিন্দ। শক্তিরূপিণী তােমাদের গুরুপত্নীর এই মিষ্টান্ন তীর্থ সলিলে তরল করে তােমাদের এই অমৃত- উৎসবের পানীয় তৈরি কচ্ছি, পান করে তােমরা খাসা হয়ে যাও। সকলকে অঞ্জলি করিয়া সরবৎ বিতরণ ) সকলে। শ্ৰীবাহি গুরুজীকী ফতে,শ্রীবাহি গুরুজীকী ফতে। গােবিন্দ। তােমাদের দীক্ষা সম্পন্ন হল। অতীতের সকল আচার, সকল ধৰ্ম্ম, সকল সংস্কার ত্যাগ করে আজ তােমরা বিরাট খালা সম্প্রদায়ে পরিণত হলে, বল—অকাল পুরুষ ভগবানের জয় সকলে। জয় অকাল পুরুষ ভগবানজীকো জয়। গােবিন্দ। যাও, তােমাদের হস্তের কৃপাণ উলঙ্গ করে অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছুটে যাও। পাহল’ তােমাদিগকে মুক্তি দেবে।

রক্তের লেখা শিখগণ গাইল- গীত মােরা শক্তির সন্তান, নাহি জাত অভিমান ; দেশের চরণে সপেছি প্রাণ। আনুক শত বাধা দুনিবার আসুক মড়ক ঝঙ্কা হাহাকার, মােরা, হব হব—আগুসার মুক্ত করিয়া ক্ষুধিত কৃপাণ। ( সকলের প্রস্থান)

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য।
স্থানপ্রাসাদ-কক্ষ।
কাল–অপরাহ্ন।
( কহলুর রাজা ভীমদ, হিতুর রাজা হরিচাদ, নাহনপতি
মেদিনীপ্রকাশ ও শ্রীনগরের রাজা ফতোদ প্রভৃতি পার্বত্য
রাজন্যবর্গ মিলিয়া মন্ত্রণা করিতেছিল-]
ভীম। ঐ যাদুকরের কথায় তােমরা কখনাে ভুল না ।
তার শক্তি কি ? শেষে সেও মজবে, তােমাদিগকেও মজাবে ।
দেশে আর তিষ্ঠিতে দিলে না,জাঠ চাষারা লাঙ্গল ফেলে
তরবার নিয়ে তেড়ে আসে। তাদের জয়ধ্বনির কি
চীৎকার!—“ওয়া গুরুজী কী ফতে,” “ওয়া গুরুজী কী
কতে।”--কাণ ঝালা পালা ! যেন বাছারা হলদীঘাটের যুদ্ধ
জয় করে এল! বুঝছে না ত—দুদিন পরে চোখে সরুষের
ফুল দেখতে হবে—
হরি।
সে দিন সমস্ত শিষ্যদল নিয়ে গুরুজী আমাকে
ভজাতে এসেছিল !—সবারই হাতে কৃপাণ, প্রকোষ্ঠে লৌহ

রক্তের লেখা
বলয়, মস্তকে কঁকই, খাটো পায়জামার উপর নীল কোর্তা;
সে এক অদ্ভুত দৃশ্য ! যাক গে। আমার প্রাণের কথা কি
জান ভাই ? মােগলের মহিমা তবু সহ হবে,একটা
তরুণ বালক এসে যে দেশের রাজগিরি ফলাবেন, এ কিছুতেই
সহ কর্তে পাব না।—গােবিন্দজী এসে দেশের দুর্দশার
চিত্র যতই রঙিণ তুলি দিয়ে অঙ্কিত করুন—তাঁর পতাকার
তলে এসে, তার ইঙ্গিতে কখনাে মােগল সম্রাটের বিরুদ্ধে
তরবার তুলতে পারব না।
মেদিনী। তুমি সবার প্রাণের কথা কয়েছ হরিচাদ !
কেন আমরা একটা অর্বাচীন বালকের নেতৃত্ত্ব অবনত মস্তকে
স্বীকার করে নেব ? আমাদের সামর্থ্যে যদি আমরা মােগলের
বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারি, দাড়াব না। ব্যাস্! পাঁচশাে
বছর ধরে মােগল, পাঠানের কত অত্যাচার আমাদের পিতা,
পিতামহগণ নীরবে সহ্য করে গেছেন, আমরা হঠাৎ এতটা
চাঙ্গা হয়ে উঠি কেন?
ভীম। মরুবার জন্য।—মেওয়ারের রাণা প্রতাপ
সিংহের কাণ্ডখানা জানত ?—মােগলের প্রতি চোখ রাঙ্গা
করে চাইলে, অমনি ব্যাস্ ?—আকবর বাদশার একটা অঙ্গুলি
হেলনে সব ভুষ। কোথায় গেল সােণার চিতাের, কোথায়
গেল শ্যামল মেওয়ার ?বনে, বনে, পাহাড়ে পাহাড়ে,

রক্তের লেখা
--
গহরে, গহ্বরে ঘুরে সারা !–ঘাসের চাপাটি ভােজন পর্ণ
শয্যায় শয়ন ;-রাণ গিরির চরম !
ফতে। মহাত্মা প্রতাপের নাম নিও না ভাই ভীমচঁাদ ।
হীন, অভাজন আমরা সে পুণ্য নাম নেওয়ার যে আমাদের
অধিকার নাই।
ভীম। ফতেচাদ ভায়া ! স্বাধীনতা, স্বাধীনতা করে খুক
চেঁচাও বটে, কিন্তু তােমার চীৎকার যদি দিল্লীর তােরণদ্বার
ভেদ করে বাদশার কর্ণে প্রবেশ করে তােমার শ্রীনগরের
চিরদিনের জন্য যে বিশ্রী হয়ে যাবে সে কথা চিন্তা করেছ ?
ফতে। চিন্তা কি ভাই ?-যদি সমস্ত শ্রীনগর শ্মশানের
আগুনে পুড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করূতে পারতেম, আমি
নগরের
বুকের উপর আমার ধন, জন, সম্পদ সমস্তকে
ভস্মশেষ করূবার জন্য চিতা সজ্জিত করূতেম ;
মেদিনী। কি দুঃখে ভাই ?-মােগল আমাদের কি
করেছে ?-ভারত ছারখার হোক, রাজপুতনার গৌরব দুর্বহ
অপমান ভারে নুয়ে তার তপ্ত মরুভূমির বালুকা সমুদ্রে
মিশে যাক, ইন্দ্রপ্রস্থের পুণ্য ক্ষেত্রের উপর মােগলের
রক্তাক্ত চরণ-চিন্তু অঙ্কিত হৌক,—আমাদের কি ? আমাদের
এই পার্বত্য রাজ্যগুলির উপর সম্রাট কখনাে দৃষ্টি দেন
নি-
৩৪

রক্তের লেখা ফতে। দেননি কেন জান?•••আমরা এত যে ক্ষুদ্র, এত যে নগণ্য অধম, আমাদের উপর সহজে কাহারাে দৃষ্টি পড়ে না। ভীম। ক্ষুদ্র হয়ে আমরা কোন শক্তি বলে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিমান মােগল সম্রাটের প্রতিদ্বন্ধী হতে চাইছি ? [ হঠাৎ গােবিন্দ সিংহের প্রবেশ ] গােবিন্দ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধূলিকণার সমষ্টি নিয়ে ঐ দুর্ভেদ্য, বিরাট হিমাদ্রি গঠিত হয়েছে তা কি জান না ভাই ? মােগল, পাঠান কয় মুষ্টি ? কিন্তু তারা আজ বিশকোটি হিন্দুকে দলিত মথিত করে তাদের বিজয় সিংহাসন ভারতের বুকের উপর সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।—কি করে তা সম্ভব হল জান তাই ভীমচঁাদ ?—সম্ভব হল ভাতৃহিংসার বিষে হিন্দুগণ জর্জরিত বলে আজ !—কি কুক্ষণে কুরুক্ষেত্রের সমর প্রাঙ্গণে কৌরব কুমার দুৰ্য্যোধন এই বিষবৃক্ষের বীজ বপণ করেছিলেন, কত যুগ যুগান্তর অতীত হল, এখন তার প্রাণঘাতী জ্বালার তীব্র দাহনে ভারতের প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা,সমস্ত পুড়ে ভস্ম- শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভাইগণ ! বড় মৰ্ম্ম বেদনায় আজ তােমা- দের দ্বারে দ্বারে এসে মাথা খুঁড়ছি; একবার দেশের পানে ৩৫

রক্তের লেখা
ফিরে চাও,অত্যাচারের ভীম আঘাতে আজ কি দারুণ
দুর্দাশা তার! ভাইগণ।
“তােমাদেরে হেরে চিত চঞ্চল
উদ্দাম ধায় মন।
রক্ত অনল শত শিখা মেলি
সর্প সমান করে ওঠে কেলি
গঞ্জনা দেয় তরবারি যেন,
কোষ, মাঝে ঝন্ ঝ।
চল ভাই, ছুটে যাই হাতে লয়ে জয় তুরী
অত্যাচারের বক্ষে পড়িয়া
হানিতে তীক্ষ ছুরি”
?
মেদিনী। তুমি কি উন্মাদ গােবিন্দ জী
গগাবিন্দ। সত্যই আমি উন্মাদ।—ভারতের তীর্থে তীর্থে
তার বিচূড় মন্দিরগুলি, মােগলের সিংহাসন তলে লুণ্ঠিত,
ভারতের শক্তির গৌরব-বুদী, বিকানীর, অম্বর, মাড়া-
বারের ঐ শিরগুলি আমায় উন্মাদ করেছে
ভীম । আমরা কিন্তু উন্মাদ নই গােবিন্দ রায় ।
আমাদের রাজ্য আছে, সুখ ঐশ্বৰ্য্য আছে, আমরা তােমার
মত উন্মাদের পেছনে ছুটে নিজের সর্বনাশ করতে পারি
না।

রক্তের লেখা • গােবিন্দ। তবে থাক -তােমাদের দেশকে নিৰ্যা- তনের রুধিরসিক্ত পদতলে ফেলে রেখে, তােমরা যাও তােমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থের তৃপ্তি সাধন করবার জন্য। আমি সুখ জানি না, স্বার্থ বুঝি না, আমার সব সুখ ঐশ্বৰ্য ঐ স্বর্গাদপি গরিয়সী জননী জন্মভূমি।-এর উদ্ধারের জন্য আমি জীবন পাত করব। ফতে। গুরু গগাবিন্দ! আমি দীন, শক্তি হীন তােমার পার্শ্বে আমায় ঠাই দিয়ে মাতৃ-সেবার সুযােগ দাও- গােবিন্দ। এস ভাই! ক্ষুদ্র একটা রক্ত করবীও মায়ের পূজার অমূল্য অর্ঘ্য ! [ উভয়ের প্রস্থান) ভীম। হরিচাদ ভায়া! ব্যাপার কি ? ফতে সিং তিড়িং তিড়িং করে লাফায় কোন সাহসে ? দেখা যাবে। ভাই ভীমচঁাদ! যুদ্ধ আসন্ন, তৈরি হতে এক মুহুর্ত দেরী কর না। হরি। ৩৭

রক্তের লেখা
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-বুদ্ধশাহ ফকিরের আস্তানা। কাল-প্রভাত
ফকির বুদ্ধশাহ ও আমীরগণ
বুদ্ধ।
প্রঃ আমীর। থােরা চানা, এক পেয়ালা পানি কেউ
দিলে না। ফকিরজী ! খােদা আপনার মেহেরবানি করবেন।
তােমরা বীর, ভয় কি তােমাদের ? সম্রাট
আলামগীর তােমাদিগকে তাড়িয়ে দিয়েছেন ; এই হিন্দুস্থানের
কত নবাব, রাজা তােমাদিগকে সেধে ডেকে নেবেন।
দ্বিঃ আমীর। কেউ নেবে না ফকির জী, কেউ নেবে,
।-বাদশা আলমগীরের ভয়ে সমস্ত হিন্দুস্থান শির নত
করে আছে, কেউ আমাদিগকে আশ্রয় দেবে না।
যুদ্ধ। এই হিন্দুস্থানে এখনাে এমন লােক রয়েছে
যিনি সম্রাট আলমগীরকে একটুকুও ভয় করে না।
তৃঃ আমীর।
কে সে দুঃসাহসী আমী।
বুদ্ধ। আমার দোস্ত,—পঞ্চনদের-গুরু গােবিন্দ।
দ্বিঃ আমীর। কাফের আপনার দোস্ত ?
বুদ্ধ। হাঁ ভাই, কাফের আমার দোস্ত। ঐ কাফেরের
কলিজার মাঝে আমি পয়গম্বরের ছায়া দেখেছি, তাই হিন্দু

রক্তের লেখা মুসলমানের সমস্ত পার্থক্য ভেঙ্গে দিয়ে কাফের গােবিন্দকে বুকের মাঝে টেনে নিয়েছি—এই যে [ গুরু গােবিন্দের প্রবেশ বুদ্ধ। গােবিন্দ। বন্দেগি শা সাহেব। | বন্দেগি গুরুজী ? তবিয়ৎ আচ্ছা হাে গােবিন্দ। আপকো দোয়াসে। বুদ্ধ। বহুৎ খেস্ খবর হায় গুরুজী গােবিন্দ। কি খবর শা সাহেব। বুদ্ধ। হিন্দু হিন্দুর মস্তক লক্ষ্য করে তরবার তুলেছে। গুরুজী মুসলমানের বিরুদ্ধে যা দিগকে জাগাতে চেয়েছিলেন, তারা হিন্দুর বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে। আমি মুসলমান, আমার পক্ষে এটি খােস, খবর নয় কি গােবিন্দ জী ? গােবিন্দ। না, শা সাহেব! আপনি মুসলমান বলে এটি আপনার পক্ষে খােসখবর নয়। গােবিন্দ মুসল- মানের বিরুদ্ধে কখনাে দেশকে জাগাতে চায় নি,—চেয়েছে অত্যাচারের বিরুদ্ধে। —যে এই ভারতবর্ষের সিংহা- সনে বসে তার ধৰ্ম্ম, তার কীর্তি, তার বিদ্যাভবন ধ্বংস করে সারা দেশকে লাঞ্ছিত করছে, আমি খড়গ তুলেছি তার উদ্দেশে। সে সম্রাট হোক, সে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ রক্তের লেখা শক্তিমান পুরুষ হোক, গােবিন্দ ন্যায়ের পথে চলতে কখনাে তাকে ভয় করূবে না। মুসলমান বলে কারাে উপর গােবিন্দ সিংহের এক কণা ঘৃণা নেই।—এই ভারতে শকেরা এসেছে, দ্রাবিড়েরা এসেছে আজ তারা ভারতের বিরাট সন্তান সঙ্ঘের সঙ্গে মিশে এই ভারতভূমিকে মা বলে পূজা করূছে। মুসলমান হৌক, যবন হোক—যে মহানুভব ভারতের কল্যাণকল্পে প্রীতির পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করূবে, সেই আমার দোস্ত,—সেই আমার ভাই- বুদ্ধ। তা জানি বন্ধু, তাই তােমায় এত ভালবাসি। তুমি হিন্দু নও, তুমি মুসলমান নও, তুমি মুক্তপুরুষ। কিন্তু তােমার ঘরে বাইরে আজ শত্রু লেগেছে, যে মহৎ সঙ্কল্প নিয়ে অগ্রসর হয়েছ, পর্বে কি এই শক্তিমান দুর্ধর্ষ শত্রুগণের বিপক্ষে দাড়িয়ে তা সফল করূতে ? গগাবিন্দ। কৰ্ম্ম করে যাই শা সাহেব, ফল তাঁর হাতে যিনি ভারতের ভাগ্য-পুরুষ। তবে আমার মনের স্থির ধারণা—হিন্দুগণকে পদে পদে লাঞ্ছিত করে, তাদের ধর্ম, তাদের কীৰ্ত্তির উপর কুঠারাঘাত করে কোন সম্রাট তার সিংহাসন এই হিন্দুস্থানের বুকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারবেন না। ৪০

রক্তের লেখা
বুদ্ধ।
বুদ্ধ। গােবিন্দজীর বিপক্ষে ত হিন্দু ভ্রাতাগণ দাঁড়িয়ে-
ছেন, গােবিন্দজী মুসলমানের সাহায্য চান কি ?
গােবিন্দ। আমার কাছে হিন্দু, মুসলমান নেই বন্ধু!
তবে এই আমীরগণকে সঙ্গে নিন। ইহারা বীর,
যুদ্ধ এদের ব্যবসা। এরা পাঠান অশ্বারােহী, খাইবার গিরিপথ
অতিক্রম করে এরা ভারতে এসে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের অশ্বারােহী
সৈন্যদলে প্রবেশ করেছিল, কেন জানি না, এরা সম্রাটের
বিষনজরে পড়ে প্রতাড়িত হয়েছে ;-কতদিন এই পাঠান
বীরগণ অনাহারে অনিদ্রায় রাজ্যে, রাজ্যে আশ্রয় খুঁজে সারা
হয়েছে।সম্রাটের ভয়ে কেহই তাদের আশ্রয় দেয় না,
শেষে এই দীন ফকিরের আশ্রয়ে তারা এসেছে। তুমি নাও
তাদেরে সঙ্গে, তােমার সঙ্কল্প সিদ্ধির জন্য তারা তােমার
পার্শ্বে থেকে তােমার সঙ্গে অসি মুক্ত করূবে।
গগাবিন্দ। এস ভাইগণ ! বল–জয় ভারতের জয়, জয়
সত্যের জয়, জয় অলখ নিরঞ্জন ভগবানের জয়,—একি ?
স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রৈলে যে? পারুলে না আমার সঙ্গে জয়-
ধ্বনি করূতে ? তবে বল—“আল্লা হাে আকবর।”
আমীরগণ। আল্লা হাে আকবর,আল্লা হাে আকবর।
গগাবিন্দ। এস।
[ গােবিন্দ ও আমীরগণের প্রস্থান।
}
৪১

রক্তের লেখা বুদ্ধ। উদার! মহৎ! তােমাকে দোয়া করি গােবিন্দ, খােদার মেহেরবানি তােমার উপর নেমে আসুক। ভূতীয় দৃশ্য স্থান-ভিঙ্গালীর যুদ্ধক্ষেত্রের এক পার্শ্ব। কাল—অপরাহ্ন। ( মুক্তকৃপাণ হন্তে মােহন্ত কৃপালদাস ও তার শিষ্য নাগাসৈন্যগণ।] কৃপাল। কি ভীষণ যুদ্ধ বেধেছে,-ভিঙ্গালী প্রান্তরের শ্যামল দুর্বাদলের উপর রক্তের ঢেউ লেগেছে। পার্বত্য রাজ সংহতির সমস্ত হিন্দুরাজ শক্তি গুরুজীকে সমূলে ধ্বংস করুবার জন্য আজ খড়গ নিয়ে ছুটেছে। যাও, অগ্রসর হও ! দেশদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী, দুরাচারগণের জন্য ভিঙ্গালী প্রান্তরে রক্ত-শয্যা রচনা কর! দাড়িয়ে থেক না,দেখছ না সম্মুখে মৃত্যুর ঐ ভৈরবলীলা –ঐ দেখ গুরুজীকে চারদিক হতে ঘিরে ফেলেছে, যাও, যাও, শীঘ্র ছুটে যাও- প্রঃ শিষ্য। আর আমরা অগ্রসর হতে পাব না। কৃপাল। সে কি ? পারবে না কি রকম? প্রঃ শিষ্য। কে এ স্থির মৃত্যুর মাঝে—ঝাপিয়ে পড়বে? ১২

রক্তের লেখা
কৃপাল। তবে কেন এসেছ তােমরা ?—একটা শােভা
যাত্রার সমারােহ দেখতে ?
প্রঃ শিষ্য। যে যুদ্ধ ! বাপরে! মিছি মিছি প্রাণটা যাবে।
কৃপাল। প্রাণের প্রতি যদি এত মমতা, তবে কেন
মূক্ত অসি নিয়ে ছুটে এসেছ ?
প্রঃ শিষ্য। মনে করেছিলাম,—শুধু খানিকক্ষণ ঠুক
ঠা করে—হয় তারা পালাবে, নয় আমরা পালাব, কিন্তু এযে
দেখছি সত্যি সত্যি যুদ্ধ। দুপক্ষেই মরিয়া হয়ে লেগেছে,
এমন যুদ্ধে মেতে কে প্রাণ দিতে যাবে বলুন?
কৃপাল। প্রাণ দেবে না। -কিন্তু প্রাণটাকে কয়দিন
বাঁচিয়ে রাখতে পাবে ?•••যখন ব্যাধি মহামারি এসে
তােমাদের টুটি চেপে ধরে গলায় ঘড়ঘড়ি তুলবে, তখন কি
উপায়ে প্রাণটাকে ধরে রাখবে? ঐ-যে-ঐযে গুরুজী
বিপন্ন হয়ে তােমাদিগকে খুঁজছেন, চল, চল, দেরী
কর না।
প্রঃ শিষ্য। না মােহন্তজী। আমরা যুদ্ধ করব না।
কৃপাল। অকৃতজ্ঞ, হতভাগ্যের দল, তােমরা কেউ
যুদ্ধ
করবে না।
শিষ্য অনেকে। আমরা কেউ কব না, আমরা কেউ
করব না।
৪৩

রক্তের লেখা কৃপাল। তরে দূর হ’ দুরাচারের দল,-জননী জন্ম- ভূমির অভিশাপ মস্তকে নিয়ে, দুর্বহ জীবন ভার, শির অবনত করে বহন করগে যাই আমি মৃত্যুর মাঝে- পাঁচজন শিষ্য। আমাদেরও সঙ্গে নিন্ মহন্তজী। কৃপাল। এস, এস,—ঐ দেখ গুরুজীর সর্বাঙ্গ রক্তে সিক্ত হয়ে গেছে, এস, এস এই আসন্ন মৃত্যুর হস্ত হতে গুরুকে উদ্ধার করি। [ পাঁচজন শিষ্যসহ প্রস্থান) প্রঃ শিষ্য। এমন লড়ায়ে মােহন্ত দেখি নি বাবা। ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম, সব গেছে চুলােয়।-এসেছিলাম মােহান্তজীর কাছে যাগ যােগ কিছু শিখব। হঠযােগ ত গেল হঠে, মল্ল যােগের পাল্লায় এসে পড়লাম শেষে ;—দিন রাত তরবার ঘুরােও, বর্ষা ছােড় দ্বিঃ শিষ্য। ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম না হােক,লুচি, পুরিটা হত তবু ছিল ভাল,—কিন্তু বাবা। রাত দিন ফল, মূল, আর কাঁচা কলা সেদ্ধ ! যাক, দুচার দিন ভগবানকে ডেকেছিলাম কি না তাই প্রাণটা রক্ষা হল।—পালাও—পালাও, যুদ্ধ করূতে করুতে সব এদিকে ছুটে আসছে। [ সকলের প্রস্থান । ৪৪

রক্তের লেখা
পটপরিবর্তন
স্থান-যুদ্ধক্ষেত্রের অপর পার্শ্ব। কালরাত্রি।
[ ধাবমান পাঠান আমীরগণের পশ্চাতে পশ্চাতে রক্তাক্ত দেহে
গুরু গােবিন্দ ও শিখ সৈন্যগণের প্রবেশ ]
গোবিন্দ। শিখ সৈন্যগণের শিবির লুঠ, করে কোথায়
পালাচ্ছ তােমরা ?
প্রঃ আমীর। পালাচ্ছি কোথায় ? আমরা লুঠ করতে
যাচ্ছি।
গগাবিন্দ। এ ঘাের যুদ্ধের সময় তােমরা রণস্থল পরি-
ত্যাগ করে লুঠ করতে যাচ্ছ ?
প্রঃ আমীর। আমরা দেশ ছেড়ে এ বিভূই পরদেশে
এসেছি পয়সা রােজগারের জন্য, যাতে তার সুবিধা হয় তা
করব না ?
গােবিন্দ। আগে প্রাণ নিয়ে দেশে যেতে পার কি না
দেখ, যে যুদ্ধ লেগেছে কেউ যে বেঁচে থাকব সে ভরসা
হয় না।
প্রঃ আমীর। আমাদের ভরসা খুব হয়। আমরা কি
এখানে ভারত উদ্ধার করতে এসেছি। যে দিকে সুবিস্তা
সমজাব সে দিকে যােগ দেব।
৪৫

রক্তের লেখা গােবিন্দ। [ ক্ৰোধ কম্পিত স্বরে ] বিশ্বাসঘাতক- নিমকহারাম !—তােমরা যখন অনাহারে নিরাশ্রয়ে মরুতে বসেছিলে আমি না তােমাদিগকে সে ভীষণ বিপদের সময় রক্ষা করি ? প্রঃ আমীর। তাতে মাথা কিনেছ নাকি ? গােবিন্দ। কিনেছি বই কি! অকৃতজ্ঞ ! এখনি আমার কেনা মাথা ধূলার মাঝে লুটিয়ে দিচ্ছি। [ আমীরকে আক্রমণ ও আমীরের শির অসির আঘাতে ভূমিতে পতিত ) [ অন্যান্য আমীরগণ গােবিন্দকে আক্রমণ করিলে শিখগণ সহ তাদের যুদ্ধ করিতে করিতে প্রস্থান ) গােবিন্দ। ফকিরজী !-ফকিরজী। তােমার শরণাগত পাঠানদের কাণ্ড দেখে যাও—এই আসন্ন বিপদের মধ্যে তাদের কি ব্যবহার । [ অদূরে এই সময় শিখ সৈন্যগণের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে করিতে ফতোদের অধীনে বিপক্ষ সৈন্যদলের প্রবেশ গােবিন্দ। দেশ দ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক ফতোদ। তুমি দেশের দুঃখে গলে আমার পার্শ্বে এসে দাড়িয়েছিলে ? আজ ভীমৰ্চাদের সহিত তুচ্ছ স্বার্থে জড়িত হয়ে দেশের সর্বনাশ ৪৬

রক্তের লেখা
করূতে উদ্যত হয়েছ ? এই বুকের মাঝে না তােমায় বন্ধু
ভাবে একদিন জড়িয়ে ধরেছিলেম ?—সেই বুকে তরবার
হানবে ? এই বুক পেতে দিলেম, তােমার ঐ তরবার আমূল
বসিয়ে দিয়ে এক মুহূর্তে তােমাদের সকল আপদের অবসান
কর। চারদিকে বিশ্বাস ঘাতকের দল। আমি কাকে নিয়ে
যুদ্ধ করূব ? আমার নিজেকে বিশ্বাস হচ্ছে না। ফতোদ,
ওদের সঙ্গে কি যুদ্ধ করছ ? এস, আমায় হত্যা কর
( দ্রুত মুসলমান সৈন্যসহ বুদ্ধশার প্রবেশ ]
বুদ্ধ। ফতোদের সাধ্য কি দোস্তকে হত্যা কর ?-
হিন্দু অকৃতজ্ঞ, পাঠান বিশ্বাসঘাতক, যাক তারা জাহান্নামে।
বুদ্ধশা তার একমাত্র পুত্র সহ, বিশ্বাসী মুসলমান সৈন্যদল
নিয়ে উপস্থিত হয়েছে ;—এরা খাঁটী মুসলমান, কখনাে
পৃষ্ট ভঙ্গ দিয়ে বন্ধুকে পরিত্যাগ করবে না। যাও, তােমরা
অগ্রসর হও, এস দোস্ত
( উভয় দলের ভীষণ যুদ্ধ )
ফতেচাদ। [ যুদ্ধ করিতে পশ্চাৎ হটিয়া ] না। আর
পারলেম না। গুরুজীর আজ অমানুষিক শক্তি ; সকলে
প্রায় গুরুজীকে পরিত্যাগ করেছিল, আবার কোন দৈব বলে
নিমেষে অসংখ্য দুর্ধর্ষ মুসলমান এসে তার সঙ্গে যােগ দিলে।
'৪৭

রক্তের লেখা নাঃ-নাঃ আর রাখতে পারুলেম না। পালাই পালাই [ সৈন্যগণ সহ ফতোদের প্রস্থান, গুরুগগাবিন্দের সৈন্যদলের তাহাদের পশ্চাৎ ধাবন ] গগাবিন্দ। নাঃ। এবার সত্যই পালাচ্ছে, আমাদের সৈন্যগণ তাদের পশ্চাৎ ছুটেছে—যেন প্রলয়ের ধ্বংসরূপে, -ওকি বন্ধু ? কাকে খুজছ ? বুদ্ধ। পুত্রটিকে এইখানে পতিত হতে যেন দেখে- ছিলাম- গােবিন্দ। সে কি ? বুদ্ধ। [ একটা পতিত শব কোলে লইয়া ] এই যে ! আহা! সর্বাঙ্গ ক্ষত বিক্ষত ! যাও পুত্র, পিতার অশ্রুতে ‘অজু করে পবিত্র হয়ে খােদার চরণ তলে আশ্রয় নাও। গােবিন্দ। আজ এ বিজয়ের সব আনন্দ এই সুকুমার শিশুর স্পন্দনের অবসান হলাে ? ও— হােহাে- বুদ্ধ। ওহহহহ [ গােবিন্দকে আলিঙ্গন ] হৃদয়ের = ৪৮

' রক্তের লেখা
চতুর্থ দৃশ্য
স্থান—দিল্লীর দরবার-কক্ষ। কাল—পুৰ্ব্বাহু
{ সিংহাসনে সম্রাট ঔরঙ্গজেব, ওহগণ সম্রাটের উভয় পার্শ্বে
উপবিষ্ট, তাতার প্রহরিগণ দ্বার রক্ষা করিতেছিল।
এই সময় রাম রায় আসিয়া সম্রাটকে কুর্ণিশ
করিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল।
ঔরঙ্গ। কি হে রাম রায় ? যদি কাফেরের কলিজার
-খুনে জুমা মসজিদের রক্ত প্রস্তরগুলি রাঙ্গা করে দিই কেমন
সুরৎ হয় বল দেখি?
রাম। বহুৎ, খুভ!—যদি ভিঙ্গালীর যুদ্ধটা জুমা
মজিদের সুমুখে হত
জাহাপনার এই মজ্জিটা সফল
হয়ে যেত।
ঔরঙ্গ। শুক্লাম ভিঙ্গালীর যুদ্ধে তােমার দুশমন
গগাবিন্দজীর জয় হয়েছে।
রাম। হত না জনাব! যদি ফকির বুদ্ধশা অসংখ্য
মুসলমান সৈন্য নিয়ে এসে গােবিন্দের সঙ্গে যােগ না দিত।
ঔরঙ্গ। ফকির বুদ্ধশা ?
রাম। হাঁ জঁহাপনা। দেখলেম—সে আজ ছদ্মবেশে
দিল্লীর পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
৪৯

মজের লেখা ঔরঙ্গ। প্রহরি! [ কুর্ণিশ করিয়া জনৈক তাতার প্রহরী সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল) ঔরঙ্গ। ফকির বুদ্ধশা ছদ্মবেশে দিল্লীর পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোতয়ালকে বােলাও, যেন এখনই গ্রেপ্তার করে তাকে এখানে নিয়ে আসে। প্রহরী। যে হুকুম জনাব ! { কুর্ণিশ করিয়া প্রস্থান ] রাম। পারেন না কি জনাব ! আপনার দুর্বার সৈন্য- দল লেলিয়ে দিয়ে পঞ্চনদের উপর দিয়ে রক্তের বন্যা বহিয়ে দিতে ? প্রঃ ওম। তখন রামরায় পঞ্চনদ ছেড়ে কোথায় যাবেন ? রাম। সপরিবারে সম্রাটের চরণতলে এসে আশ্রয় নেব। ঔরঙ্গ। রামরায়ের রাজভক্তিতে সত্যই আমি সন্তুষ্ট। হিন্দুস্থানের কাফেরদের মধ্যে একমাত্র সাধুপুরুষ তুমি। রাম। জাহাপনার মেহেরবানি।আমি ত জঁহাপনার তাবেদার গােলাম। ঔরঙ্গ। তােমার এ রাজভক্তির জন্য তােমায় খেতাব

রক্তের লেখা
দেব রামরায়! তুমি গােবিন্দের সমস্ত গােপন কথা আমায়
এসে জানাবে।
রাম। জাঁহাপনা জানের মালিক। আপনার দোয়াতে কি
না হয়। এ দাসকে আপনার বিশ্বাসী নফর বলেই জানবেন।
[ ফকির বুদ্ধশাকে লইয়া প্রহরীর প্রবেশ ]
ঔরঙ্গ। বুদ্ধশা, তুমি মুসলমান না কাফের ?
বুদ্ধ। খােদা জানেন। তাঁরই বান্দা আমি।
ঔরঙ্গ। খােদা তােমায় দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন খােদার
রাজ্য হতে কাফেরগণকে উচ্ছেদ করতে; তুমি তা না করে
তাদের সাহায্য কছ ?
বুদ্ধ। বান্দা খােদার সে আদেশ শােনেনি।
ঔরঙ্গ। তুমি খােদার পেয়ারের পাত্র না হলে খােদার
আদেশ শুবে কেন ?
বুদ্ধ। বান্দা বড় অভাজন তাই বান্দার সঙ্গে খােদা
পেয়ার করছেন না।
ঔরঙ্গ। তুমি রাজদ্রোহী।
বুদ্ধ। সে কি জনাব ?
ঔরঙ্গ। তুমি কাফের গােবিন্দের পক্ষে যেয়ে দিল্লীর
সম্রাটের বিরুদ্ধে
যুদ্ধ করেছ।
A

রক্তের লেখা
বুদ্ধ।
ঔরঙ্গ।
;
। মিথ্যা কথা জাঁহাপনা।
গগাবিন্দজীর যুদ্ধ
হয়েছে পার্বত্য হিন্দু রাজাগণের সঙ্গে
সে যুদ্ধে যে মােগল সম্রাটের স্বার্থ আছে তুমি
জান না ?
বুদ্ধ। না হুজুর।
ঔরঙ্গ। তুমি কাফেরের সঙ্গে দোস্তি করে খােদার
কাছে অপরাধী হচ্ছ কেন ?
বুদ্ধ। বেয়াদপি মাপ করূবেন জনাব।—কাফের সঙ্গে
দোস্তি সম্রাট আলামগীরও করূছেন, তার পূর্ব পুরুষগণও
করেছেন ;-দিল্লীর এই মােগল মন্দ কাফের ও ইল্লামের
দোস্তির উপর শিকড়
গেড়েছে।—মানসিংহ, জয়সিংহ,
যশােবন্ত সিংহের অপরিমেয় মােগল প্রীতির উপর এই
সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত নয় কি জনাব ?
ঔরঙ্গ। সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর, সাজাহান কি
করেছেন তার কৈফিয়ত আমি দিতে পারি না। তবে ইহা
সম্পূর্ণ সত্য কথা যে সম্রাট ঔরঙ্গজেব কখনন কাফেরের সঙ্গে
দোস্তি করে না,—জয় সিংহ, যশােবন্ত সিংহ দিল্লীর সম্রাটের
নফর মাত্র,“দোস্ত হওয়ার সে স্পর্ধা তারা করতে পারে না।
[ প্রহরী সহ অজমের চঁাদের প্রবেশ ]
অজু। দিল্লীর শাহান শা বাদশা আলমগীরের জয় হোক।

রক্তের লেখা
এই নফর আজ একটি জরুরী আজ নিয়ে সম্রাট সমীপে
উপস্থিত হতে সাহসী হয়েছি।
ঔরঙ্গ। কি আরজ ?
অজ। এই নফর কইলরের নবীন রাজা। সমস্ত পার্বত্য
হিন্দু রাজাগণ আমাকে প্রতিনিধি করে সম্রাটের কাছে
নিবেদন করতে পাঠিয়েছেন।—পঞ্চনদের গুরুগােবিন্দের
অত্যাচারে সমস্ত পার্বত্য হিন্দুরাজাগণ উৎপীড়িত আজ।
তারা গােবিন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন কিন্তু সফলকাম
হতে পারেননি। তাই তাঁরা জাঁহাপনার সাহায্য প্রার্থনা
জানিয়েছেন।
ঔরঙ্গ। ভাল কথা। আমি সেদিন শিরহিন্দপতিকে
গােবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান পাঠাবার জন্য ফারুমান্ দিয়েছি,
তােমরা তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে কাজ করগে।
অজ। যাে হুকুম জনাব।
[ কুর্ণিশ, করিতে করিতে প্রস্থান ।
ঔরঙ্গ। এবার চারিদিক হতে সুযােগ হয়ে উঠছে, এবার
পঞ্জাবের গুরুর দফা রফা। বুদ্ধ, শা আবার তােমার
দোস্তের সঙ্গে যােগ দিয়ে রাজদ্রোহিতা করবেনা ?
বুদ্ধ। গােবিন্দজীর খালসা সৈন্যদল নিতান্ত দুর্ধর্ষ হয়ে

রক্তের লেখা
উঠেছে।
ঔরঙ্গ।
এ দীনকে
বর্তমানে কারাে সাহায্যের বােধ হয় তাঁর
দরকার হবে না।
সে দেখা যাবে। রামরায়! তুমি গুপ্তচর হয়ে
যুদ্ধের প্রত্যেক খবর আমাকে পাঠাবে।
রাম।
যে আতেও।
[ নেপথ্যে হতে আজানের ধ্বনি শ্রুত হইল ]
ঔরঙ্গ। জুমা মসজিদে আজান হচ্ছে। খােদা ! খােদা !
খােদা আসমান, দুনিয়ার মালিক তুমি।
দয়া কর ।
( সিংহাসন হইতে নামিয়া নেমাজ করিবার ভঙ্গীতে দাড়াইলেন,
রামরায় ভিন্ন সকলেই তাই করিল ]
ঔরঙ্গ। রামরায়, তুমি বসে রইলে যে ? উঠে এসে
নেমাজে যােগ দাও।
রাম। আজ্ঞে জনাব !-জনাব !
ঔরঙ্গ। না, তা হবে না; নেমাজ করুতেই হবে।
বুদ্ধশা, এ কলমা জানে না, একে ভাল করে শিখিয়ে দাও।
[ সকলে নেমাজ করিতে লাগিল, রামরায় তাহাতে যােগ দিয়া
আনাড়ির মত ভঙ্গী করিতে লাগিল ]
৫

রকের লেখা
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান-নয়না দেবীর মন্দির। কালঅম রজনী।
[ প্রতিমার সম্মুখে কৃপাল দাস গাইতেছিল।)
গীত
শঙ্কিত চিত এ কম্পিত পরাণ।
কেন অনল উগারি জ্বলিছে নয়ান ?
ওমা, কি পূজা রেখেছি বাকী,
কোন উপচার করিনি দান ?
প্রভাতে দিয়েছি চরণে ডারি
শিশিরসিক্ত শত কুসুম হাসি,
সন্ধ্যায় জেলেছি দীপ
পুড়িয়ে বাসনা রাশি।
এ ঘাের নিশায়
প্রাণ তাের কি যে চায় ?
কেন থমকি থমকি
উঠিছে চমকি,
ক্ষুব্ধ আবেগে কুদ্ধ কৃপাণ?

রক্তের লেখা মই দৃশ্য। স্থান-মুখওয়াল দুর্গাভ্যন্তর। কাল-সন্ধ্যা। গুরু গােবিন্দ গগাবিন্দ। আজ গর্বে বক্ষঃ আমার স্ফীত হয়ে উঠছে।—সুদূর পঞ্চনদের এ দীন গুরুকে ধ্বংস করবার জন্য দিকে দিকে কি বিরাট আয়ােজন! অতীতের সে বিশ্ব- বিজয়ী বীর এলেকজাণ্ডার যদি সম্রাট ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে অভিযান পাঠাতেন, সম্রাট এর চেয়ে বােধ হয় বেশী আয়ােজন করতেন না। [ ধরম্ সিংহের প্রবেশ j ধরম। না, গুরুজী। কোন দিকে বেরুবার পথ নেই। দুর্গের সমস্ত দ্বার অবরােধ করে বিপক্ষের সেনাদল ঘাটি করেছে, বাহির হতে রসদ আবার সামান্য সুবিধাটুকুও বন্ধ হয়ে গেল। উপায় কি গুরুজী ? গগাবিন্দ। উপায় নেই, সকলকে মরতে হবে। তার জন্য প্রস্তুত হও। চেয়ে দেখ ঐ অস্তগামী আরক্ত সূর্যের পানে। ওর সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চনদের গৌরব-সবিতাও অস্ত যাচ্ছে। কি করব ধরম সিংহ!-অভিশপ্ত জাতি এ হিন্দুগণ ! এদের অভিশাপ মােচনের জন্য কৈশােরে সন্ন্যাস নিয়ে, সারা জীবন

রক্তের লেখা
ভাের সাধনা কলেম কিন্তু পারুলেম না ত এই দুরপনেয়
অভিসম্পাদ মােচন করতে
[ দয়াসিংহের প্রবেশ ।
দয়া। গুরুজী। -গুরুজী ।-
গােবিন্দ। কি দয়াসিংহ ? তােমার কণ্ঠে এত কাতরতা
কেন? কি হয়েছে ?
দয়া। মা তার কনিষ্ঠ পৌত্র দুজনকে নিয়ে দুর্গ ত্যাগ
করেছেন।
গগাবিন্দ। সে কি ?
দয়া। হ গুরুজী ! ভ্রাতা জোরাবরসিংহ ও ফতে-
সিংকে নিয়ে মা দুর্গ ছেড়ে চলে গেছেন ; সঙ্গে একমাত্র
পাচক-ব্রাহ্মণ গঙ্গু
গােবিন্দ। মা ! মা ! একি করলে মা ? শক্তি স্বরূপা
মা আমার ! তুমি যদি সন্তানকে ত্যাগ করলে, কে তার
মস্তকে আশীর্বাদ বর্ষণ করে তাকে সমর বিজয়ী করে তুলবে ?
মা! তুমি যদি নিজেকে অসহায় মনে করে সন্তানের আশ্রয়
ত্যাগ করে থাক, তবে মা! তুমি সংসারের ধারা তােমার এ
স্থবির বয়সেও জানলে না। সংসারের বিপদসঙ্কুল ধূ ধূ
প্রান্তরে কে তােমায় এ সন্তানের মত তার স্নেহ নিবিড়
বিপুল বক্ষঃ দিয়ে ঘিরে রাখবে ? মা ! না বুঝে তুমি

রক্তের লেখা নিজের সর্বনাশ করেছ, তােমার পৌত্রগণেরও সর্বনাশ দয়া। তাকে খুঁজে নিয়ে আসি গুরুজী ? গােবিন্দ। কোথায় খুজবে ? যে মা সন্তানকে ফেলে চলে যায়, সে মাকে কি কখনাে খুঁজে পাওয়া যায় ? শত্রু বেষ্টিত এ পুরী হতে মা কেমন করে বেরিয়ে গেলেন ? দয়া। গঙ্গু নাকি মােগল সৈন্যাধ্যক্ষের কাছ হতে ছাড়- পত্র সংগ্রহ করেছিল। গগাবিন্দ। গঙ্গু আমাকে একটু ইঙ্গিতেও জানাল না ? কি জানি ? কেন তার এই মমতা ! হয়ত সে পুত্রদের বুকে ছুরি বসাবে। ( ব্যস্ত হইয়া মহাকম সিংহ ও তৎপশ্চাৎ পশ্চাৎ শিখ সৈন্যগণের প্রবেশ মহাকম। সর্বনাশ গুরুজী। সর্বনাশ- গােবিন্দ। কি ? কি ? মাকে তারা বধ করেছে ? মহাকম। মার কোন অমঙ্গলের কথা নয় ; অমঙ্গল এ পঞ্চনদের আমাদের প্রায় সমস্ত সৈন্যগণ দুর্গ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে ; আসুন গুরুজী! তা দিগকে ফিরিয়ে আনি, আসুন।

রক্তের লেখা গগাবিন্দ। যারা গুরুর উপর বিশ্বাস হারিয়েছে তারা কি গুরুর কথায় ফিরে আসবে ? যাক,সব চলে যা। তােমরা কেন হেথায় দাড়িয়ে আছ ? চলে যাও, সব চলে যাও। আজ তােমাদের কাছে তােমাদের গুরু অতি ছােট, ধৰ্ম্ম অতি তুচ্ছ, দেশ অতি ঘৃণার পাত্র,—আজ তােমাদের কাছে প্রিয়তম তােমাদের ঐ প্রাণটুকু! যাও, যেমন করে পার তাকে রক্ষা করগে। দাড়িয়ে রৈলে যে ?—যাও যাও। গুরুর মুখের দিকে অমন করে তাকিয়ে আছ কেন ? তােমাদের গুরু নেই, দেশ নেই ;-প্রাণটুকু আছে, আত- তায়ীর পদতলে পড়ে সেটি রক্ষা করগে । সকলে। আমরা কেউ যাব না। গােবিন্দ। না। তা হবে না। । তা হবে না। তােমাদের যেতে হবে। মা সন্তানকে ছেড়ে গেল,-শিষ্য গুরুকে ছেড়ে গেল, শুধু এ কয়খানা হাড়ের তলে হৃৎপিণ্ডের ভিতর যে প্রাণটুকু ধুক ধুক কচ্ছে, তার জন্য একটা ক্ষুদ্র বিষণায় যাকে এক নিমেষে স্তম্ভিত করা যায়। তােমরাও থেক না, পালাও—পালাও,-প্রাণটুকু নিরাপদ কর। সকলে। আমরা যাব না,-গুরুজীর পার্শ্বে দাঁড়িয়ে প্রাণ দেব,—“জয় গুরুজীর জয়।” গােবিন্দ। গুরু কোথায় ? সে মরেছে। এই যে

রক্তের লেখা
দেখছ-এ তার প্রাণহীন কঙ্কাল।—ভারত মহাশ্মশানের
জ্বলন্ত অঙ্গার মধ্যে দাড়িয়ে তার ধ্বংসলীলা দেখছে।
সকলে। আমরা কিছুতেই যাব না গুরুজী। জয়
গুরুজীর জয়
গগাবিন্দ। যাবে না ? প্রাণ দেবে ? সত্যই তা দিতে
পারবে ?
সকলে। এ
বাহী গুরুজীকীফতে। আমরা প্রাণ
দেব।
গগাবিন্দ। তবে অগ্রসর হও। ভারতবিধ্বংসী হিন্দু
মুসলমানের মিলিত উদ্ধত শক্তিকে দ্বিধা ছিন্ন করে অগ্রসর
হও। “জয় অলখ নিরঞ্জন”, “জয় অলখ নিরঞ্জন।”
[ নেপথ্যে হঠাৎ রণবাদ্য বাজিয়া উঠিল ও কামানের
শব্দ শ্রুত হইতে লাগিল।
গগাবিন্দ। অই বাজে ভেরী আসে মহাআহ্বান, মরণের
ডাকে কে দিবিরে সাড়া রক্ত করিবি দান ?
[ জীবন সিংহের প্রবেশ ]
জীবন সিংহ। গুরুজী ! গুরুজী ! সাবধান ! সাবধান!
শত্রুগণ আপনার শির লক্ষ্য করে ছুটেছে।
গােবিন্দ। কি জীবন?

রক্তের লেখা এক জীবন। আপনার পাগড়ী পরবার সৌভাগ্য দু দণ্ডের জন্য আমায় দিন। গুরুজীর শির সমস্ত শত্রুর লক্ষ্য আজ। -পাগড়ীটি আমায় দিন আমি সে লক্ষ্যের বিষয় হই- সকলে। ধন্য! ধন্য! জীবন সিংহ। গগাবিন্দ। জীবন!—প্রিয়তম আমার ! হীন ঝাড়ুদার ঘরে জন্ম তােমার, কিন্তু কি মহৎ! কি উদার । গুরুকে রক্ষা করবার জন্য এমন মহৎ প্রাণ নষ্ট হবে ? কখনাে না। পাগড়ী দেব না। জীবন। [ গুরুর পদতলে পড়িয়া ] অভাজনের আশা পূর্ণ করুন। এই সৌভাগ্যটুকু আমায় ভিক্ষা দিউন। দিন মরুতে হবে, আজ এই গৌরব বহন করে যেন মরতে পারি। গুরুজী ! আপনার এখনাে অনেক কাজ বাকী, দেশ শত্রুর শকট-চক্ৰতলে ফেলে আপনি মরতে পারেন না। গগাবিন্দ। পাগড়ী পরাইয়া দিয়া ] জয় অলখ নিরঞ্জন! যাও দেশের গৌরব তােমার অসির ঝকে দীপ্ত হয়ে উঠুক। পুত্র অজিত আর জুঝার সিংহ কোথায় ? জীবন। তারা শত্রুর রণবাদ্য শুনে মােহান্ত কৃপালদাস সহ মুক্ত কৃপাণ করে শত্রুর উপর আপতিত হয়েছে। গােবিন্দ। জয় অলখ নিরঞ্জন। জয় অলখ নিরঞ্জন।

রক্তের লেখা
সকলে। জয় গুরুজীর জয়জয় গুরুজীর জয়।
( মুক্ত অসি হন্তে বেগে সকলের প্রস্থান ]
সপ্তম দৃশ্য।
স্থান-কারাগার। কাল—প্রভাত।
( কারাগার মধ্যে শৃঙ্খলাবদ্ধ জোরাবর সিংহ ও ফতেসিংহ।
অদূরে প্রহরী।]
ফতে। কি অন্ধকার রাত্রি কেটেছে। সারা রাত্রির
মধ্যে একটু আলো দেখালে না, এক বিন্দু জল খেতে
দিলে না। দাদা! এই শেখল খুলে দাও না, বড় লাগছে!
জোরাবর। কি করে খুলব ভাই! আমারও যে হাত
দুটি শেখলে বাঁধা।
ফতে। দাদা! ঠাকুরমা নেই, বাবা নেই, আমার মন
কেমন কচ্ছে! গঙ্গু আমাদেরে হেথায়
হেথায় নিয়ে এসে এত
যন্ত্রণা দিচ্ছে কেন?
জোরাবর। কথা কসনে ভাই, তারা শুনতে পেলে
আবার মারূবে। গঙ্গু বিশ্বাস ঘাতক সে মুসলমানদের কাছে
আমাদেরে ধরিয়ে দেছে।

রক্তের লেখা
ফতে। আমি ফিরে যেয়ে গঙ্গুর কথা সব বাবাকে
বলে দেব।
জোরাবর। আর কি বাবার কাছে ফিরে যেতে পারব
ভাই!
দাদা,
ফতে। কেন ? তারা কি আমাদেরে কেটে ফেলবে।
জোরাবর। কাটতে পারে ভাই!
ফতে। আগে তােমায় কাটবে না আমায়
কাটবে ?
জোরাবর। কি জানি ভাই।
ফতে। অগে যদি তােমায় কাটে, আমি কাটতে দেবনা।
জোরাবর। কেন ভাই ?
ফতে। সে আমি সইতে পারব না দাদা।
জোরাবর। আর তােকে কাটলে আমি তা সইতে
পারব ?
ফতে। তুমি যে দাদা, বড় হয়েছ, তুমি যুদ্ধ যেয়ে কত
লােক কাটবে দাদা! ঐ কারা আসছে,
{ নবাব বাজিদ খাঁ, গঙ্গু, জল্লাদ প্রভৃতির প্রবেশ ]
ফতে। তােমরা আমাদের কাটতে এসেছ ?
বাজিদ। হাঁ কাটতে এসেছি।

রক্তের লেখা
ফতে। আগে আমায় কাট, তারপর দাদাকে কেটো।
জোরাবর। না, না আগে আমায় কাট। ওকে ছেড়ে
দিতে পার না তােমরা ? কতটুকুন রক্ত ঐ এক রত্তি
শরীরে ? ঐ রক্ত টুকুন তােমাদের খুব দরকার হবে কি ?
গঙ্গুদা, এ কি করেছ ? তারা তােমায় টাকা দিয়েছে,
বাবা কি তােমায় কখনাে টাকা দেন নি ? ফতুকে তুমি
কোলে করেছ, মুখে চুমাে দিয়েছ,
পিঠে করে নেচেছ ;
আজ তার হত্যা দেখতে এসেছ। -দেখে খুব আনন্দ
হবে কি ?
বাজিদ। তােমাদিগকে কাটব না, যদি আমার একটা
কথা শােন।
জোরাবর। কি কথা?
বাজিদ। তােমরা যদি সত্য ইস্লাম ধৰ্ম্ম গ্রহণ কর
তােমাদের সকল অপরাধ মাপ করব।
গঙ্গু। তাই কর ফতুদা, তাই কর জরুদা! তার জন্য
নবাবের কাছে কত ইনাম পাবে, সুখে থাকবে।
জোরাবর। তুমি আমার মুখ থেকে সরে যাও গঙ্গুদা!
তােমায় দেখলে আমার বুক ফেটে কান্না আসে। তুমি
ঠাকুরমার কাছে মুখ দেখাবে কেমন করে? আহা! তিনি
কেঁদে কেঁদে সারা হচ্ছেন।
৬৪

রক্তের লেখা বাজিদ। গঙ্গুর কথা থাক, কথা থাক, এখন বল, মুসলমান হবে কিনা ? জোরাবর। কেন মুসলমান হব ? বাজিদ। জাইগীর পাবে, ইনাম পাবে, প্রাণটিও বাঁচবে। জোরাবর। তুমি কি জান না যে আমরা গুরু গােবিন্দ সিংহের পুত্র ? বাজিদ। খুব জানি। ফতে। জান কি আমাদের পিতামহ,-গুরু তেগ- বাহাদুর মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে রক্তের লেখায় কি লিখেছিলেন ? বাজিদ। কি লিখেছিলেন ? কতে। লিখেছিলেন,-“শির দিলাম, ধৰ্ম্ম দিলাম না।” বাজিদ। তা জানি। জোরাবর। তবে জেনে শুনে কেন তাঁর নাতিগণকে ধৰ্ম্ম ত্যাগ করতে বল্‌ছ ? বাজিদ। ইস্লাম ধৰ্ম্ম সত্য ধৰ্ম্ম। জোরাবর। যার পূর্ব পুরুষগণ বেদ, উপনিষদ রচনা করেছেন তা’দিগকে ধৰ্ম্ম শেখাতে এসেছ তুমি ? বাজিদ। তবে মরবার জন্য প্রস্তুত হও। জোরাবর। প্রস্তুত আছি, সে ভয় আমাদের নেই।

রক্তের লেখা
;
ফতে। ভয় কিসের দাদা ?—টু করে গলাটা কাটবে
বৈত না ?—ওতে আমাদের কোন কষ্ট হবে না।
জোরাবর। তােমরা কাপুরুষ ; ছলে আমাদিগকে বন্দী
করেছ। মৃত্যুভয় দেখিও না। জান, শিখ সন্তান কৃপাণ
শিয়রে রেখে শুয়ে থাকে ?
ফতে। আগে আমায় কাট আমি চোখ বুজে আছি।
বাজিদ। তােমাদের
তােমাদের কাটব না। আরাে কঠিন শাস্তি
দেব। দেখ, এখনাে সময় আছে, ইল্লাম ধর্ম গ্রহণ কর।
গঙ্গু। তাই কর দাদারা, তাই কর ।
জোরাবর। গন্ধু তুমি আমাদের সুমুখ হতে দূর হ।
তাই করব ? তুচ্ছ প্রাণের জন্য ধৰ্ম্ম দেব ? আমাদের
শিরায় শিরায় গুরু তেগবাহাদুরের রক্ত,—আমরা তেজস্বী
গুরু গােবিন্দের সন্তান ; আমরা প্রাণের ভয়ে ধৰ্ম্ম দেব ?
যে এ কথা বলে,—যদি পারতে, তার জিভটা জলন্ত অগ্নিতে
পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতেন।
বাজিদ। জল্লাদ,
জল্লাদ। জনাব!
এ দুটাকে নিয়ে জ্যেন্ত দেয়ালের মধ্যে
গেঁথে ফেল।
জল্লাদ। যাে হুকুম জনাব!
বাজিদ।

রক্তের লেখা দু ফতে। বেশ ইল দাদা ভাই মুখে মুখে, বুকে বুকে জড়িয়ে থাকব, এ বড় মজা হবে, বড় সুখে ময়ূব। জোরাবর। গঙ্গু, তামাসা দেখবে এস না। [ শৃঙ্খলাবদ্ধ জোরাবর ও ফতে সিংকে লইয়া জল্লাদের প্রস্থান ] গঙ্গু। হুজুর! আমার ইনাম ? বাজিদ। ইনাম খুব দেব। এত বড় নেমকহারামির ইনাম দেব না ! গঙ্গু। হুজুর! আমি ছেলেদিগকে ধরিয়ে না দিলে তাদিগকে কারারুদ্ধ করা আপনার সাধ্য ছিল না। বাজিদ। সে ত সত্য কথা। আমরা দুচার লক্ষ মােগল পাঠান এসে বিশ কোটি হিন্দুকে পদানত করে রেখেছি কি করে জান ?—তােমাদের মত নেমকহারাম, বিশ্বাস ঘাতকের সাহায্য পেয়েছি বলে। তােমাকে ইনাম দেব না ? প্রহরি, প্রহরী। জনাব ! বাজিদ। জলন্ত লৌহদণ্ড দিয়ে এ কাফেরের সর্বাঙ্গে “নেমক হারাম,” “বিশ্বাস ঘাতক” এই কথা কয়টি লিখে সহর ঘুরিয়ে নিয়ে এস ; তারপর যতক্ষণ এর জান্ বেরিয়ে না যায় ততক্ষণ বেত লাগাও- গঙ্গু। হুজুর, হুজুর! মাপ করুন, মাপ করুন, আমি ইনাম চাই না। ৬৭ রক্তের লেখা বাজিদ। ইনাম দেওয়ার আদেশ দিইছি তাকি প্রত্যাহার কতে পারি ? লে যাও প্রহরি, গঙ্গু। আমি মুসলমান হব জনাব ! আমি ইস্লামধৰ্ম্ম গ্রহণ করব। বাজিদ। চাই না তােমায়। পবিত্র ইল্লাম ধৰ্ম্মে দেশদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক, নেমকহারাম কাফেরের প্রবেশ অধিকার নেই। লে যাও। গঙ্গু। উঃ! উঃ! উঃ । ( গন্ধুকে লইয়া প্রহরীর প্রস্থান) ! অষ্টম দৃশ্য। স্থান-লুধিয়ানা নগরের উপকণ্ঠ। কাল—অপরাহু। [ রূক্ষ কেশে, জীর্ণ মলিন বেশে উদ্ভান্তভাবে গােবিন্দের প্রবেশ ] গােবিন্দ। নাঃ।আর পারি না।ভীষণ, রক্ত- লি অনুসরণকারী শত্রুগণকে পশ্চাতে রেখে আর ছুটতে পারি না।-নগর হতে নগরে, বন হতে বনান্তরে প্রতাড়িত হয়ে,—প্রতি মুহূর্তে শঙ্কাকুল হৃদয়ের স্পন্দনকে দ্রুত করে ছুটছি ;-পথেরও শেষ নেই, জীবনেরও শেষ নেই। গুরুর

রক্তের লেখা
নিশ্চিত
মৃত্যুকে
নিজের মস্তকে টেনে নিয়ে, মরণযাত্রী শিষ্য
জীবন সিংহ বলে গেছে,-“গুরু তােমায় বাঁচতে হবে, তােমার
কাজ বাকী।” তাই পুত্রশােক বুকে নিয়ে বাঁচবার জন্য
ছুটেছি। উঃ! আর পারি না। দারুণ পিপাসা ! কত দিন
অনশনে কাটছে ;-মাথার উপর শুধু নিদাঘের তপ্ত অনাবৃত
আকাশ, পদতলে বন্ধুরা পৃথিবী ! ওকে যাচ্ছে ?-না,
এদিকেই আসছে। হিন্দু বলে যেন মনে হয়, দেখি, এর
কাছে একটুখানি আশ্রয় পাই কিনা!
[ জনৈক শিখের প্রবেশ )
গােবিন্দ। ভাই তৃষ্ণায় আমার ছাতি ফেটে যায়। এই
শুষ্ক কণ্ঠে এক বিন্দু জল দাও, আমায় একটু আশ্রয় দাও
শিখ। কে তুমি ?
গােবিন্দ। আমি গােবিন্দ।
কে ?
গুরুগগাবিন্দ
গগাবিন্দ। হাঁ ভাই।
শিখ।
তােমায় আশ্রয় দিয়ে কে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের
ক্রোধ উৎপাদন করবে ?
গােবিন্দ। বিপন্ন শরণাগতকে আশ্রয় দান যে পরম
ধৰ্ম্ম। সম্রাট বড় না ধৰ্ম্ম বড়?
শিখ।
?

রক্তের লেখা
শিখ। আমরা ধৰ্ম্ম বুঝি না, আমরা স্বার্থ বুঝি। যাও,
এখানে কিছু হবে না।
[ প্রস্থান।
গােবিন্দ এই স্বার্থপর জাতি নিয়ে স্বাধীনতার
সঙ্কল্প,—প্রভাতের স্বপ্ন মাত্র। ! একবিন্দু জল পেতাম
তবু যেন ক্লান্তি দূর হত। ঐ না কে জল নিয়ে আসছে ?
হাঁ, হাঁ এযে দেখছি খা,--আমার শিষ্য ;-এর কাছে
কখনাে প্রত্যাখ্যাত হব না।
[ জনৈক খালসা শিখের প্রবেশ ]
গােবিন্দ। আমায় চিনতে পারছ ? আমি তােমাদের
গুরু গােবিন্দ।
শিখ। এখন আর গুরু কি ? কি চাই ?
গােবিন্দ। আমায় একট, জল দাও,-বড় তৃষ্ণা
শিখ। কি করে দেব ? তুমি যে বিদ্রোহী পলাতক।
সম্রাট যদি একথা জানতে পারে।
গগাবিন্দ। একদিন না আমার পদতলে পড়ে জয়।
গুরুজীর জয়’ গেয়েছিলে ?-সে কি শুধু মুখের কথা ?
প্রাণের একটা ক্ষীণ প্রতিধ্বনিও তার মধ্যে ছিল না ?
শিখ। যাও, যাও, পথ ছাড়, ত্যক্ত কর না।
৭০

রক্তের লেখা
গােবিন্দ। আমি গুরু নই।—দীন, পিপাসাতুর,
পথের ভিখারী! তার তৃষিত কণ্ঠে একটুখানি জল দেবে না ?
আমার প্রাণ যে যায়।
শিখ। যাক্ না,—তােমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য আমার
প্রাণ দিতে পারি না।
[ প্রস্থান)
গগাবিন্দ। এইত দুনিয়া ! প্রিয়তম শিষ্য জীবন!
স্বার্থের এ প্রেত ভূমিতে কি কাজ আমার বাকী ? কি
কাজের জন্য বেঁচে থাকব ? দেশ আমায় চায় না। যারা
আমায় চেয়েছিল তারা প্রায় সব চলে গেছে। শিরহিন্দের
পাষাণ ঘেরার মাঝে পুত্র দুজন সমাধি পেয়েছে, তাদের আকুল
ক্রন্দন সে পাষাণ কারা ভেঙ্গে যেন আমার মৰ্ম্মে এসে বিধছে।
পুত্র অজিত ও জুঝার মুখওয়াল দুর্গ প্রাকারে অতুল শৌর্য্যের
অপূর্ব দীপ্তি দেখিয়ে আমার চোখের সম্মুখ দিয়ে মৃত্যুর পারে
চলে গেল। তবু আমি বেঁচে আছি।
[ মীর মহম্মদের প্রবেশ)
মীর।
কে তুমি মােশাফের ?
গােবিন্দ। এসেছ ? এসেছ ? আমায় বধ করবে ?
মীর। পাগলের মত কি বছ? কে তুমি?
৭১

রক্তের লেখা
গােবিন্দ। আমাকে চিনতে পারনি ? তবে কাকে বধ
করূতে এসেছ ? মােগল সেনানী ! যেখানে হিন্দু দেখছ
হত্যা করছ ? পারবে কি বিশ কোটি হিন্দুকে এমন করে
শেষ করতে ?
মীর। এ কি ? এ যে গুরু গােবিন্দ।
গগাবিন্দ। হাঁ, আমি গুরুগগাবিন্দ।—যাকে বন্দী
করবার জন্য তােমাদের মােগল সৈন্যদল দিন রাত্রি ছুটে
'চলেছে।
মীর। আমি মােগল সৈন্য নই গুরুজী। আমায়
চিনতে পারলে না?—আমি মীর মহম্মদ ; তুমি যে আমার
কাছে ইসলাম ধর্মের পবিত্র কেতাব, কোরাণ অধ্যয়ন করেছ।
গগাবিন্দ। মীর মহম্মদ ? আমার সে শিক্ষাদাতা উদার,
স্নেহশীল মীর মহম্মদ ?-হায় মুন্সীজী !
মীর। তােমার দুর্ভাগ্যের কথা আমি শুনেছি গুরুজী।
হতাশ হয়াে না, দুঃসময় কারাে চিরদিন থাকে না ;—দিল্লীর
মােগল সিংহাসনের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা হুমায়ূন ভীম মরুভূমির
তপ্ত বালুকা স্তুপের মধ্যে না প্রাণভয়ে ছুটোছুটি করে-
আজ হুমায়ূন নেই, কিন্তু তাঁর অবিচলিত
অধ্যবসা মােগল সিংহাসনকে ভারত বক্ষে কায়েমি করে
ছিলেন ?
গেছে।
१२

রক্তের লেখা গােবিন্দ। কিন্তু এ কায়েমী স্বত্ব সম্রাট ঔরঙ্গজেব রক্ষা করতে পারবেন কি মুন্সীজী ? মীর। খােদার মর্জি খােদাই জানেন। তার ন্যায় বিচারে হকদারই ইনাম্ পেয়ে থাকে। গগাবিন্দ। হিন্দুগণ এতই কি বেহদার যে খােদার একটুখানি মেহেরবানি তাদের উপর নেমে আসে না ? মীর। গােষা কর না গােবিন্দজী ! তােমাদের হিন্দুগণ খােদার কাছে আরজ করূতে ভুলে গেছে, তারা দেশের প্রবল রাজশক্তির কাছে শির নত করে জোড়করে নিজের সুখ, স্বার্থের প্রার্থনা জানায় ;—রাজা মেহেরবানি করে মুষ্টি ভিক্ষা যা দেন তাতেই নিজেকে ধন্য মনে করে। খােদার মেহেরবানি যদি হিন্দুর উপর নেমে না আস্ত আজ পঞ্চ- নদের গুরুর কণ্ঠের ভূৰ্য্য ধ্বনিতে মােগলের ময়ুর মসনদ কেঁপে উঠত না। গােবিন্দ। মুন্সীজী ! সে সূৰ্য্যধ্বনি আজ নীরব, পুত্রহারা, হৃত সর্বস্ব, পরিত্যক্ত, গৌরবহীন গুরু আজ প্রাণভয়ে বন কান্তারে ছুটে চলেছে। মীর। গুরুগােবিন্দ প্রাণভয়ে ছুটে চলেছেন ?-গুরুর মুখে শুনেও যে এ কথা বিশ্বাস হয় না। গুরুর কি মহান উদ্দেশ্য তা কি মীর মহম্মদ জানে না ? সে উদ্দেশ্য সফল ৭৩ রক্তের লেখা হতে গুরু যে প্রাণ দিতে পারে না। কিন্তু গুরু। তােমার ঘরে বাহিরে শত্রু, এ শক্রপুরীর মধ্যে তােমার প্রাণটিকে নিরাপদে রাখতে হলে তােমার একটুখানি কৌশল করতে হবে। গগাবিন্দ। কি কৌশল মুন্সীজী ? মীর। তােমাকে গুরুর উদ্দী ত্যাগ করে মুসলমানের পােষাক পরুতে হবে। রাজার জাতি মুসলমান,—মুসল- মানের পােষাকে সজ্জিত কোন ব্যক্তির উপর হস্ত তুলতে হিন্দুগণ সাহসী হবে না, আর মুসমানগণও তাদের স্বজাত বলে, কখনাে তােমাকে আক্রমণ করবে না। গােবিন্দ। এই কি তারা সেই হিন্দু, যারা বুক ফুলিয়ে বিশ্ববিজয়ী গ্রীক বীরের বিরুদ্ধে সবলে অসি তুলেছিল, আজ তাদের হস্ত তুচ্ছ পােষাকের ভয়ে স্তম্ভিত ? [ নেপথ্যে সৈন্যগণের জয়ধ্বনি ও কোলাহল ] মীর। গুরুজী, তােমার অনুসরণকারীরা এসে পড়েছে, শীঘ্র এ পােক ত্যাগ কর, তােমাকে হেথা লুকোবার অন্য জায়গা নেই। গগাবিন্দ। মুন্সীজী ! মীর। কথা কইবার ফুৎ নেই, শীঘ্র, শীঘ্র!—দুদিনের ক ৭৪ রক্তের লেখা হলেও আমি তােমার শিক্ষাদা, আমার অনুরােধ ; শীঘ্র এ পােষাক ত্যাগ কর। এই নাও, আমার কাছে পােক আছে। তােমার মস্তকের বেণী এলিয়ে দাও। [ গুরুগােবিন্দ শিখ গুরুর পােষাক ত্যাগ করিয়া মুসল- মানের পােষাকে সজ্জিত হইল ও মস্তকের কেশ গুচ্ছ এলাইয়া দিল ] [ কতিপয় হিন্দু সৈন্যের প্রবেশ ] প্রঃ সৈন্য। কৈ কোথায় গেল? দ্বিঃ সৈন্য। আমি নিশ্চিত তাকে দেখেছি। অপরাহ্নের এই ম্লান অন্ধকারের মধ্যেও তার হাতের কৃপাণ ঝক ঝক্‌ করে উঠেছিল। প্রঃ সৈন্য। আপনি দেখেছেন খাঁ সাহেব। গগাবিন্দকে ? সে এদিকে পালিয়ে এসেছে ? মীর। তা হবে-- দ্বিঃ সৈন্য। তবে এ সন্ধ্যার অন্ধকারে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে। তাকে খুঁজে বের করতে হবে, তার মুণ্ডটি মােগল বাদশার কাছে নিয়ে যেতে পারলে অনেক ইনাম পাব। ৭৫ রক্তের লেখা প্রঃ সৈন্য। ঐ দিকে চল, ঐ দিকেই গেছে- [ সকলের প্রস্থান মীর। এইত তােমাদের হিন্দু ?—এরা খােদার মেহের- বানি পাবে ? সত্যই এরা কাফের। হিন্দুরাজ্য স্থাপন করবার আগে এই কাফেরগণকে বিশ্বাসী কর। নৈলে তােমার এ উদ্যম ব্যর্থ। গগাবিন্দ। হায় ভারতবর্ষ। ৭৬

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দুখ
স্থান—প্রান্তর। কাল-প্রভাত।
( ফতেসিংহ ও রামরায় )
ফতে। অপূর্ব পুরুষ এ গুরুগােবিন্দ !—কত দুঃখ,
যন্ত্রণার ঝঞা মস্তকের উপর দিয়ে বয়ে গেল তবু তার শির
একটুখানি নত করতে পারুলে না।—কি অলৌকিক তার
স্বদেশ প্রেমের মােহনিয়া শক্তি। এই দেখ লেম,-সব কটা
পুত্রকে মৃত্যুর হাতে সপে দিয়ে রিক্ত সম্বল, সহায়, সম্পদহীন
দীন গােবিন্দ উন্মাদের মত পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে ; অকস্মাৎ
লক্ষ কণ্ঠে গুরুজীর জয়ধ্বনি মরুভূমির বালিয়াড়িতে তুফান
তুল্লে। কি পাপ করেছি এই মহাপুরুষের মস্তক লক্ষ্য
করে তরবার তুলে ! আমি এর প্রায়শ্চিত্ত করব।
রাম। কি প্রায়শ্চিত্ত করূবে ?-মােগল সম্রাটের
বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করূবে নাকি ?
ফতে। যদি প্রয়ােজন হয়। রামরায়! তুমিও এস,
৭৭

রক্তের লেখা স্বদেশ দ্রোহী, স্বজাতিদ্রোহী হয়ে যে পাপ সঞ্চয় করেছ তার প্রায়শ্চিত্ত কর। রাম। আমি স্বদেশদ্রোহী, স্বজাতিদ্রোহী যাহাই হই, রাজদ্রোহী নই কিন্তু। ফতে। রামরায়, কিছুতেই কি তােমার ধৈৰ্য্যচ্যুতি হয় না? বারাণসীর বিশ্বনাথের ঐ বিচূড় মন্দিরের পানে চেয়ে দেখ, নবমগুরু তেগবাহাদুরের রক্তের লেখায় সম্রাট ঔরঙ্গ- জেবের অমানুষিক অত্যাচারে যে কীর্তি-কথা কালের পাতায় চির মুদ্রিত হয়ে গেছে তা একবার পাঠ কর, জিজিয়ার অপমান ভারে হিন্দুগণ যে প্রতি মুহুর্তে লাঞ্ছিত হচ্ছে তার বিষয় একবার ভেবে দেখ। দেখ, রামরায়, প্রবল সামরিক সাহায্যের সুবিধায় যে শক্তি তাঁর অত্যাচারের লৌহ শকট অসহায় প্রজার পাঁজর চূর্ণ করে চালিয়ে নেয়, তার বিরুদ্ধে যদি কেউ প্রতিবাদ করে সে কি রাজদ্রোহ ?- সাপ যে মাটীতে বুক দিয়ে চলে,—তাকেও পদদলিত করলে ফোঁস করে উঠে! পৃথিবীর জ্ঞান, সভ্যতার পুরহিত, প্রাচীনতম জাতির আদর্শ এই হিন্দুগণ কি মানুষ নয় ? কিন্তু সম্রাট ঔরঙ্গজেব ঘৃণার কি নিষ্ঠীবন তাদের মুখের উপর অহরহঃ নিক্ষেপ করছেন ! রাম। তা হলে তুমি গােবিন্দের পক্ষ নেবে? ৭৮

রক্তের লেখা
ফতে। হাঁ নেব। আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত
কব। ভীমাদের অনুরােধে বন্ধুত্বের উপর যে আঘাত
করেছি সে পাপ মােচন করব।
রাম। কিন্তু আমি এসেছিলেম সম্রাট ঔরঙ্গজেবের
আদেশ তােমাদেরে জানাতে।
ফতে। আদেশ ? তিনি কি অধিকারের উপর নির্ভর
করে আদেশ পাঠিয়েছেন।
রাম। সম্রাট ঔরঙ্গজেবই ভারতের একচ্ছত্র রাজা-
ধিরাজ। এই হিন্দুস্থানের সকলেই অবনত মস্তকে তাঁর
আদেশ পালন করূছে।
ফতে। রামরায়! আমি না হয় হীন, ক্ষুদ্র। কিন্তু
সহাদ্রির সানুদেশে দাড়িয়ে ছত্রপতি শিবাজী সে আদেশ কি
ভাবে পালন করূছেন তার সংবাদ কি রাখনা? রাণা
রাজসিংহ তাঁর রণভেরীর মধ্যে দিয়ে সে আদেশের যে উত্তর
দিয়েছেন মেওয়ারের প্রতি পর্বত করে তা এখনও
ধ্বনিত হচ্ছে।
রাম। তােমার এ উত্তর বােধ হয় তােমার চিতার মধ্যে
ধ্বনিত হবে। এখনাে সাবধান ফতেসিংহ। পরের জন্য
সম্রাটের রােষ প্রদীপ্ত করনা।
[ নেপথ্যে—তুৰ্য্যধ্বনি ও গুরুজীর জয় ইত্যাদি রব ]
৭১

রক্তের লেখা
ফতে। রামরায়! তুমি যাও, সম্রাটের পদতলে পড়ে
যত পার তার বােষ প্রদীপ্ত করগে। ঐ রণভেরী বাজছে,
আমি চল্লেম প্রায়শ্চিত্ত করূতে।
জয় গুরুজীর জয়,
রাম। পিপীলিকার পক্ষোভেদ হয়েছে। তাই তিড়িং
তিড়িং করে লাফাচ্ছে।
।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-মরুভূমির মধ্যস্থ যুদ্ধক্ষেত্র। কাল—অমা রজনী।
( অন্ধকারের বুক চিরে মাঝে মাঝে বিদ্যুত চমকাইতেছিল।
বিদ্যুলােকে শবাকীর্ণ, রুধিরাক্ত রণভূমি অতি
ভৗষণ দেখাইতেছিল।]
[ জলন্ত মশাল হন্তে গুরুগােবিন্দের প্রবেশ
গগাবিন্দ। এ কি রণভূমি না প্রেত ভূমি ?—মৃত্যুর
যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে! কি ভীষণ ! মৃত্যুর মুখাে-
মুখি দাঁড়িয়ে আমার শরীরও যেন ছন্ ছম করে উঠছে।
‘জয় অলখ নিরঞ্জন’ ‘জয় অলখ নিরঞ্জন। সম্রাট ঔরঙ্গজেব !
তুমি দিল্লীর সুখ-প্রাসাদে ময়ূর সিংহাসনে বসে কাফের ধ্বংসের

; ! স্বপ্ন দেখছ ; তােমার দুর্ধর্ষ মােগল সৈন্যগণ আজ মরুভূমির দগ্ধ বালুকা শয্যার উপর কি ভাবে ঢলে পড়েছে একবার এসে দেখে যাও। আমার পুত্রঘাতী শিরুহিন পতির কি দুর্দশা আজ ! তার দুঃখ, পুত্রশােক বিধুর এ দগ্ধহৃদয়ে করুণা জাগিয়ে দেছে।•••মরুভূমির ভীম বিস্তার মাঝে সে যখন তৃষ্ণায় ছট ফট করতে করতে উন্মাদের মত মুঠো মুঠো বালি বাতাসে উড়িয়ে দিতে লাগল,—পাষাণ কারাবদ্ধ, শ্বাসরুদ্ধ আমার পুত্র দুটির কথা মনে পড়ল ! নিষ্ঠ র কারাগার হতে পিতা, পিতা বলে তারা কত না ডেকেছিল, হায় ! তাদের কণ্ঠস্বর তাদের বুকের মাঝেই মিলিয়ে গেছে [ মৃত-শুপ হইতে—ওয়া গুরুজীকী ফতে” ] গগাবিন্দ। কে ? এই কে ? এই মৃত-স্তপের মধ্যে কে গুরুর জয়ধ্বনি করে ? [ মশাল হস্তে নিকটে যাইয়া অনুসন্ধান ] কে তুমি বীর ?—রক্তশয্যায় মৃত্যুহিম অঙ্গকে লুটিয়ে দিয়ে গুরুর জয়ধ্বনি তুলছ ? আহত শিখ। গুরুদ্ৰোহী অতি অভাজন আমি। মুখ- ওয়াল দুর্গে, গুরুর দুর্দশার দিনে যারা গুরুরে ত্যাগ করে পালিয়েছিল, আমি তাদের একজন। আজ আমাদের সকলে প্রায়শ্চিত্ত করেছে,সকলে গুরুর কাজে প্রাণ দেছে। এই ৮১

রক্তের লেখা
হতভাগ্যকে তারা রেখে গেছে,গত অপরাধের জন্য গুরুর
কাছে ক্ষমা চাইতে। গুরুজী। গুরুজী! বল, আমরা
সকলকে ক্ষমা করেছ, আমি সে ক্ষমাবাণী তাদের কাছে বহন
করে নিয়ে যাই
গগাবিন্দ। [ আহত শিখের মস্তক কোলে তুলিয়া ]
গুরুগত প্রাণ, স্বদেশভক্ত, শূরশ্রেষ্ঠ বীর।—দেশের কাজে
প্রাণ দেছ, যাও অক্ষয় স্বর্গ লাভ কর। গুরু তােমাদের
সকলকে ক্ষমা করেছে।
আহত শিখ। জয় গুরুজীর জয়।
জয়। সময় শেষ হয়ে
এসেছে, আর কথা কইতে পাচ্ছি না। ওয়াগু
কী
[ মৃত্যু
গগাবিন্দ। অন্ধকার রজনী ! তুমি অবসান হও।
পঞ্চনদের আকাশতলে আবার নবীন অনুরাগে অরুণের
আরক্ত-আভা ফুটে উঠছে।
( হঠাৎ অন্ধকার মধ্যে রক্তের লেখায়—“শির দিয়া শিরহ ন
দিয়া” এই লেখা ফুটিয়া উঠিল ]
গােবিন্দ। পিতা-পিতা। আবার সে তােমার
রক্তের লেখা চোখের সুমুখে ফুটিয়ে তুলে তােমার সে
৮২

রক্তের লেখা অমরবাণী স্মরণ করিয়ে দিচ্ছ? সে বাণীর মর্যাদা রক্ষার জন্য আমি জীবন পণ করেছি পিতা। [ মােহন্ত কৃপালদাসের প্রবেশ ) কৃপাল। “জয় সতি এ অকাল”। গুরু। আজ কি মহিমা দেখালে ?—গর্বে, আনন্দে আমার মৰ্ম্মমাঝে রক্তধারা উল্লাসে নৃত্য কচ্ছে। কি বিরাট তােমার মনুষ্যত্ব ! তুমি অসম্ভব সম্ভব করেছ, চিরশত্রুকে চির মিত্র করেছ। ঐ দেখ ঊষার রক্তরাগ পূর্বাশায় কি গরিমায় ফুটে উঠছে। আজ শিখগণেরও জীবন প্রভাত- [পুষ্পমালা হন্তে রামরায়ের প্রবেশ ] রাম। সত্য আজ শিখগণের জীবন প্রভাত। গােবিন্দ। তুমি আজ পাষাণ গলিয়ে দেছ ; তুষারে আগুন জ্বেলেছ। তােমার অপূর্ব শৌর্য, তােমার অমানুষিক ত্যাগ, তােমার অতুলনীয়া দেশ ভক্তি, আমার হিম, প্রস্তরিভূত হৃদপিণ্ডকে গলিয়ে তার মাঝে স্বদেশ প্রেমের অমৃত উৎস উচ্ছ্বসিত করেছে। হঠাৎ নিজেকে চিন্‌তে পেলেম, তােমাকে চিনতে পেলেম। তাই আজ ফিরে দাড়িয়েছি। তােমার প্রতি শ্রদ্ধায় ভক্তিতে আমার সমস্ত দেহ, মনকে অভিভূত করে ফেলেছে। আজ তােমায় অভিনন্দন করবার

রক্তের লেখা
জন্য, আমার হৃদয়ের সমস্ত প্রেম, ভালবাসা নিংড়ে প্রতি
পুষ্পকোষে ঢেলে দিয়ে এই ফুলের মালা গেঁথে নিয়ে এসেছি।
জানি, তুমি অভাজনকে বুকে টেনে নিতে দুটি বাহু প্রসারিত
করে রেখেছ, তাই সমস্ত দ্বিধা, সঙ্কোচ পরিত্যাগ করে তােমার
চির শত্রু তােমায় সম্বর্ধনা করতে এসেছে। এই মালা কণ্ঠে
ধারণ করে আমায় কৃতার্থ কর।
[ পুষ্পমালা গােবিন্দের কণ্ঠে পরাইয়া দিল, গােবিন্দ
অবনত মস্তকে তাহা ধারণ করিল )
কৃপাল। “শ্রীবাহি গুরুজীকীফতে।”
ক্ষে
৮৪

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rakter Lekha Ed.2

Author
Dasgupta, Bankimchandra
Title
Rakter Lekha Ed.2
File name
Rakter Lekha Ed.2
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2009/10/12
Publisher
Jogendra Publishing,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
94
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Ajmer Chand
DLI number
513141
Barcode
4990010020147.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
5s1kuxhVMOd
Download PDF

Rakter Lekha Ed.2