Makardah Saraswat Library, Howrah

Sovieter Meyera Ed.1st

Roy Kalyani · 2009/08/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সাের্ভিসের থবী

No text on this page.

সেয়েটের
মেয়র
কল্যাণী রায়
..
LIGHAH
BLE WAT
td '.
ফুন্টারন্যাশনাল পাবলিশিং হাউস
৮৭.চৌরঙ্গী রােড় কলিকাতা

শত্রী কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রকাশক
ধ্রুব মিত্র
ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশিং হাউস
৮৭, চৌরঙ্গী রোড, কলিকাতা
মুদ্রাকর
সুধাংশুরঞ্জন সেন
টুথ প্রেস, ৩, নন্দন রােড
কলিকাতা
প্রচ্ছদপট ও বর্ণলিপি
দেবব্রত ঘােষ
ব্লক-নির্মাণ
রিপ্রােডাকশন সিণ্ডিকেট
প্রচ্ছদপট মুণ
ভারত ফটোটাইপ স্টুডিও
বাধিয়েছেন
বাসন্তী বাইণ্ডিং ওয়ার্ক
কলিকাতা
দাম এক টাকা আট আনা
প্রথম সংস্করণ ২৬শে জুন ১৯৪৬ ১১ই আষাঢ় ১৩৫৩

চট্টগ্রামের বীরকন্যা শ্রদ্ধেয়া কল্পনা দত্ত-কে

সূত্র
১। মেয়েদের অধিকার
২। কর্মময় জীবনের অগ্রগতি
৩। শ্রমশিল্পে মেয়েদের কৃতিত্ব
০ ০ ০
২০
৪। যৌথ কৃষিশালার মেয়েরা
৫। জাতিগঠন ও শাসনকার্যে মেয়েদের স্থান
৪৬
৬। নতুন জীবনের পথে
৭। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎকর্ষ
৭৮
৮। জাতীয় রিপাবলিকের মেয়ের

প্রকাশকের কথা বাংলা দেশের মেয়েদের কাছে এই বইখানি পোঁছে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি জরুরী কথা জানিয়ে রাখার আবশ্যকতা রেছে ; রয়েছে এই কারণে যে সােভিয়েটের মেয়েদের সম্বন্ধে এ রকম তথ্যবহুল ও চিন্তা- বই আমাদের সাহিত্যে ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয় নি। এই সর্বপ্রথম বিভিন্ন ইংরেজী প্রামাণ্য গ্রন্থ ঘেঁটে সােভিয়েটের নারীসমাজের নানামুখী রূপকে চিত্রিত করতে প্রয়াস পেয়েছেন শ্রীমতি কল্যাণী রায়। প্রথম প্রচেষ্টা বলে কারাে কারাে কাছে বইখানি সাংবাদিক আড়ম্বর দোষে দুষ্ট বলে মনে হতে পারে কিন্তু সােভিয়েটের অগ্রসর নারী আন্দোলনের যে গতি ও প্রাণস্পন্দন লেখার মধ্যে রেখায়িত হয়ে উঠেছে সেই গতি ও প্রাণস্পন্দনই আমাদেরকে ত্রিশ বছরের এক নতুন সভ্যতাকে বুঝতে সাহায্য করবে। আরেকটা কথা, কারাে কারাে মনে হতে পারে যে ভারতবর্ষের মেয়েরা থাকতে, আরও অন্যান্য দেশের মেয়েরা থাকতে, সােভিয়েটের মেয়েদের প্রতি আমরা এতােটা মনােযােগ দিতে যাবে কেন ? সত্যিই, সােভিয়েটের মেয়েরা কেন ? একজন দুজনকে নয়, আমাদের দেশের হাজার হাজার মানুষকে এই প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ পৃথিবীতে এতে দেশ রয়েছে যেখানকার মানুষ জাগছে, সংগ্রাম করছে, আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করছে—অথচ সে সব দেশ ছেড়ে পৃথিবীর এক ষষ্ঠমাংশ দেশ’ নিয়ে এতে আগ্রহের আতিশয্য কেন ? আপাত দৃষ্টিতে এই প্রশ্ন অত্যন্ত জটিল মনে হতে পারে ; মনে হতে পারে ভুইফোড় আন্তর্জাতিকতা থেকে এর সৃষ্টি স্বাদেশিকতা ও জাতীয়তার সঙ্গে যার কোনাে যােগ নেই। কিন্তু আসলে সােভিয়েটের প্রতি জনসাধারণের এই অসাধারণ কৌতুহল কি সত্যই এ থেকে জন্ম নিয়েছে ? এ কথা আজ গভীর চিন্তার অপেক্ষা রাখে। ০ এই জটি 'কেন-র উত্তর অনেকে পেয়েছে। যারা, পেয়েছে তারা বুঝেছে যে, আমাদের দেশের খাতিরেই আমাদেরকে সােভিয়েট সমাজের কথা জানতে হবে•••জানতে হবে ওদেশের মেয়েরা কী করে এত অল্প সময়ের মধ্যে এতােটা সমৃদ্ধিলাভ করতে পেরেছে। কোনাে ভুইফোড় আন্তর্জাতিকতা থেকে এই সােভিয়ে-প্রীতি জন্ম নেয় নি ; আসলে সােভিয়েটের সর্বহারা বিপ্লবই আমাদের কাছে শ্রদ্ধা ও কৌতুহলের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। ভারতবর্ষের মেয়েরা ওদেশের মেয়েদের সম্বন্ধে যেটুকু জেনেছে সেটুকু জেনেছে ১৯৪১ সালের ২২শে জুনের পর। তারা দেখেছে জীবন-মরণ সংগ্রামের সামনে দাড়িয়ে ওরা কি ভাবে মুখখামুখি সংগ্রাম করেছে, ইতিহাসে যার কোনাে জুড়ি মেলে না। নাৎসী আক্রমণ সােভিয়েট সমাজের সামনে যে অগ্নিপরীক্ষা উপস্থিত করেছিল, সােভিয়েটের মেয়েরা অসমসাহসিকতার সঙ্গে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে পুরুষের পাশাপাশি সংগ্রাম করে। হাজার হাজার তানিয়ার রক্তাক্ত স্বাক্ষরেই তার প্রমাণ লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে। সােভিয়েটের মেয়েদের মন থেকে সে রক্তের দাগ আজও মুছে যায় নি•••সেই রক্তের দাগ যা দিয়ে নিজেদের নতুন সভ্যতাকে রক্ষা করেছে তারা বর্বর নাৎসী আক্রমণের হাত থেকে। অন্য কোনাে দেশের মেয়েরা এর শতাংশের একাংশ কৃতিত্বও অর্জন করতে পারে নি। কেন পারে নি ? স্বভাবতই আমাদের কৌতুহলী মনে এ প্রশ্ন ওঠে। আমাদের দেশের মেয়েদেরকে ওদেশের মেয়েদের কথা জানতে হবে কারণ আমাদের চোখের সামনে যে কণ্টকাকীর্ণ পথ, সে পথ অতিক্রমের একমাত্র প্রেরণা হল সােভিয়েট দেশ•••সেই সােভিয়েট দেশ যে দেশে জনসাধারণ তার আপনার রাষ্ট্র কায়েম করেছে।

মেয়েদের অধিকার প্রত্যেক দেশে মেয়েরা হল জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ। এই অংশকে বাদ দিয়ে কোনাে মুক্তি আন্দোলন বা নতুন জাতিগঠনের প্রচেষ্টা সার্থক রূপ গ্রহণ কর্তে পারে না, যে কোনো দেশের আন্দোল ইতিহাসে তার প্রমাণ মিলবে। দুশো বছরব্যাপী বৃটিশ-শাসিত ভারতবর্ষের ইতিহাসের রক্তাক্ত পাতায়ও তার স্বাক্ষর রয়েছে। অমানুষিক অত্যাচার ও অবমাননার মধ্যে দিয়েই এ দেশের মেয়েদের চৈতন্যপ্রাপ্তি ঘটেছে এবং নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তারা এগিয়ে এসেছে জাতীয় আন্দোলনের পুরােভাগে। ঠিক এমনিভাবেই দুঃসাহসের সঙ্গে একদিন এগিয়ে এসেছিল জার-শাসিত রাশিয়ার লাঞ্ছিত মেয়েরা। আমাদের ভারতবর্ষের মতই ছিল সেদিন রাশিয়ার অবস্থা। জারের অপ্রতিহত শাসন, ব্যক্তি-স্বাধীনতার অভাব, মুক্তি আন্দোলনের নিষ্পেষণ ; ঘরে ঘরে দারিদ্র, অশিক্ষা, বেকার সমস্যা, মৃত্যুর পরােয়ানা ; গ্রামে গ্রামে কৃষকরা ছিল জমিদারের কেনা সম্পত্তি, রুটি ছিল না। তাদের পেটে, গায়ে ছিল না তাদের কাপড়। এমনি শােচনীয় ছিল রুশ সাম্রাজ্যে লােকেদের অবস্থা। তবু এরই মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল জাতীয় আন্দোলনের স্রোত। ঘরে ঘরে সংগঠিত হচ্ছিল চাষী মজুর, একেকটি করে জ্বলে উঠছিল বিপ্লবের অনির্বাণ শিখা। একাধারে সােভিয়েট বিপ্লবের সংগঠক ও নেতা নিকোলাই লেনিন মেয়েদের সমস্যা সম্বন্ধে পুরােপুরি সচেতন ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন কোনাে জাতি তার এক বিরাট জনসংখ্যাকে রন্ধনশালায় বন্দী রেখে দেশের স্বাধীনতা অর্জন কতে পারে না। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক নীতির ভিত্তিতে মেয়েদের জীবনের নানান সমস্যা নিয়ে তাকে চিন্তা কর্তে হতাে। বর্তমানে সােভিয়েট দেশে যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ পূর্ণতার , পথে এগিয়ে চলেছে, লেনিন জানতেন যে এই আদর্শকে যদি তার লক্ষ্যে নিয়ে যেতে হয় তাহলে মেয়েদের ওপর পুরুষদের নির্বাধ শােষণের অবসান ঘটাতে হবে। শুধু শশাষণই নয়, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে নারী পুরুষের মধ্যে যত কম সামাজিক অসাম্য ও অন্যায় মাথা উঁচিয়ে রয়েছে তাদেরকেও ঘা দিতে হবে শেষবারের মতন। শতাব্দী-ব্যাপী অচলায়তনের বিরুদ্ধে এমনি দৃঢ়তার সঙ্গেই সেদিন এগিয়ে এসেছিল লেনিনের বিপ্লবী নীতি। ১৯১৭ সালের পরবর্তী যুগে সােভিয়েট দেশে যে সব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতেই তার কার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। জারের রাশিয়ার মেয়েরা সমস্ত রকম সামাজিক, রাষ্ট্রিক, অর্থনৈতিক ও রাজনীতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে স্বামীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত অপমানজনক। স্ত্রীরা ছিল স্বামীর কেনা বাঁদি। বিবাহিত মেয়েদের পথে বেরােনাের কোনাে স্বাধীনতা ছিল না। স্বামী ইচ্ছে করলে স্ত্রীকে যে কোনাে লােকের কাছে বিক্রী কর্তে পারতো। তাতে তার কোনাে আপত্তি তোেল। চলত না। এমনিভাবে একজন বিবাহিত মেয়ে যে ক’বার হাত বদল হতাে তার ঠিক নেই। কারণ সে ছিল পুরুষের কেনা সম্পত্তি। মেয়েরা ইচ্ছে করলেও আদালত থেকে স্বামী-বিচ্ছেদের অনুমতি সহজে পেত না। যারা পেত তাদের অনেক কষ্ট স্বীকার কর্তে হতাে; খােলা আদালতের সামনে খুলে বলতে হতে তাদের পরস্পরের জীবনের কুৎসিত ইতিবৃত্ত। কিন্তু অধিকাংশ মেয়েরাই এই অমর্যাদা মাথা পেতে নিতে পারত না। তাছাড়া গরীব মেয়েদের সামর্থও ছিল না আদালতের খরচ জোগাবার। সে যুগে বর-কনেকে গির্জায় গিয়ে বিয়ে কর্তে হতো এবং তাই ছিল একমাত্র আইনানুগ নিয়ম। ছেলেমেয়েদের ওপর বাপের ছিল সর্বপ্রথম ২ অধিকার, অবিশ্যি অবৈধ সন্তানের বেলায় মাকেই তার দায়িত্ব গ্রহণ কর্তে হতে; আদালতের সাহায্য নেয়ারও কোনাে অধিকার ছিল না সােভিয়েট রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হবার পর এই সদস্ত আইনকানুন উচ্ছেদ করে নতুন নিয়মকানুন গঠন করা হল। এবং•এই নিয়মে বিবাহ বা পরিবারগত সমস্ত ব্যাপারে মেয়েরা পেল পুরুষের সমান অধিকার। সুস্থ ও সবল সমাজ গড়তে হলে সবার আগে দরকার মানুষের পরিবার ও বিবাহিত জীবনকে দৃঢ়ভাবে নতুন আদর্শে সংগঠিত করা—সাভিয়েট কর্তৃপক্ষরা বুঝেছিলেন এর গুরুত্ব এবং সেই ভাবেই অগ্রসর হয়েছিলেন নরনারীর জীবনকে সমানাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে। সােভিয়েট সমাজে বিবাহিত জীবনের ক্ষেত্রে এই নীতিই সর্ব প্রধান। আগে স্বামীই ছিল পরিবারের কর্তা, তার ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করতে। পরিবারের ভালো-মন্দ, কিন্তু নতুন শাসনব্যবস্থায় স্বামীর সেই সংজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে বদলে গেল ; এমন কি স্ত্রী বিয়ের পর স্বামীর পদবী গ্রহণ কর্তেও বাধ্য থাকল না। স্ত্রী ইচ্ছে করলে স্বামীর পদবী গ্রহণ করতে পারে বা তার নিজের পদবীও বজায় রাখতে পারে, তাতে কোনাে আবশ্যিকতার কথা ওঠে না। স্বামী এবং স্ত্রীর তাদের ইচ্ছানুযায়ী সে কোনাে পেশা বা কাজ গ্রহণ করার স্বাধীনতা রয়েছে। বিয়ের সময়ে তার। যদি কোনাে সম্পত্তি লাভ করে তাতে তাদের দুজনেরই অধিকার আছে । বিয়ের আগে যদি দুজনেরই কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে থাকে তার মালিকানা যৌথ নয়, সম্পূর্ণ পৃথক। সুতরাং বােঝা যাচ্ছে যে অন্যান্য দেশের মতন সােভিয়েট দেশে মেয়ে পুরুষ কোনো স্বার্থের খাতিরে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় না। যৌতুকের প্রলােভনে আজ আর কারো প্রা৷ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আজ স্ত্রী পুরুষ আজ স্ত্রী পুরুষ ইচ্ছে করলেই রেজিস্ট্রেশন আপিসে গিয়ে তাদের নাম তালিকাভুক্ত করিয়ে বিয়ে কতে পারে। তার জন্যে কোনাে ধর্মানুষ্ঠান বা আড়ম্বরের প্রয়ােজন নেই। কিন্তু তাই বলে গির্জার দর; বন্ধ হয়ে যায় নি। লােকে ইচ্ছে করলে সেখানে গিয়েও ঘটা করে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারে। জারের যুগে গির্জায় মেয়েদের জন্যে সব চেয়ে নিকৃষ্টতম ও পশ্চাৎবর্তী জায়গা সংরক্ষিত , থাকত, আজ সে বৈষম্য সম্পূর্ণভাবে লুপ্ত হয়েছে। আগে বিয়ের সময়ে পুরুষরা পরতাে সােনার আংটী, মেয়েরা পরতে লােহার। এই ছিল সেদিনকার নিয়ম। আজ কিন্তু সে সব নিয়মকানুনও চিরদিনের জন্যে অবলুপ্ত। বর্তমানে সােভিয়েট ব্যবস্থায় বিবাহ এবং বিচ্ছেদ দু পক্ষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তার ওপর রাষ্ট্রের অনুশাসনের কোনাে চোখ * রাঙানি নেই। কিন্তু তাই বলে এ সম্বন্ধে লঘু চিত্তর প্রশ্রয় দিতে সােভিয়েট কতৃপক্ষ একেবারে নারাজ। সমতা ও স্বাধীন ইচ্ছার বনিয়াদের ওপর সুস্থ ও সবল পরিবার গড়ে উঠুক—মানুষ যেন এই স্থির লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়। সােভিয়েট আইন অনুসারে দাম্পত্য-বিচ্ছেদ ঘটানাের আগে কেউ দ্বিতীয়বার বিয়ে কর্তে পারে না। এবং দাম্পত্য-বিচ্ছেদ কমানাের জন্যে প্রত্যেকবার দাম্পত্য-বিচ্ছেদের ওপর ক্রমবৃদ্ধি হারে সরকারী ফী আদায় করা হয় যেমন প্রথমবার ৫০ রুবল, দ্বিতীয়বার ১৫০ রুবল এবং তৃতীয়বার ৩০০ রুবল। ফলে কেউ অকারণে বা সামান্য কারণে বিবাহ- বিচ্ছেদে সাহসী হয় না। সন্তান-পালনের সমস্ত দায়িত্ব ও খরচ সমানভাবে বাপ এবং মার ওপর পড়ে। যদি কোনাে দায়িত্বহীন লােক তার পরিবারের গুরুভার গ্রহণ কর্তে অনিচ্ছুক হয়—সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র ভাকে সন্তান-পালনের খরচের এক অংশ দিতে বাধ্য করে। যতদিন সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত এই অর্থদান আবশ্যিক। বৈধ, অবৈধ সমস্ত সন্তানের ক্ষেত্রেই একথা পুরােপুরি প্রযােজ্য। খােরপােষ অনাদায়ে অপরাধীকে কঠোর শাস্তি গ্রহণ করতে হয়। শুধু তাইই নয়, জনসাধারণের সামনে খােলাখুলিভাবে তার কীর্তিকলাপ জাহির করে কঠোর সমালােচনা কর। হয় ; দৈনিক ও সাময়িক পত্রিকায়ও এর বিরুদ্ধে নিয়মিত আন্দোলন চলে। যদি কখন দেখা যায় যে বিচ্ছেদের পর স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কেউ অকর্মণ্য হয়ে পড়েছে তখন যে কর্মক্ষম সেই অপর পক্ষের জীবিকার খরচ বহন করে। এই স্ত্রী-স্বাধীনতা শুধু যে পারিবারিক জীবনে বর্তমান তাই নয়, রাজনীতির বিস্তৃত ক্ষেত্রেও গিয়ে পৌচেছে এর ব্যাপ্তি। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে যতদিন না পর্যন্ত মেয়েরা পুরুষের সমকক্ষ হয়ে অগ্রসর হতে পাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত নতুন সমাজ-গঠনের পথে অসম্পূর্ণতা থেকে যাবেই। • তাই সােভিয়েট আইনে আঠারাে বছরের যে কোনো যুবতী জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভােট দেবার অধিকার পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সােভিয়েটের যে কোনাে পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার অধিকারও তার পূর্ণ মাত্রার বর্তমান। জারের শাসনে মেয়েরা ছিল পুরুষের মুখাপেক্ষী। অর্থোপায়ের চাবিকাটি ছিল পুরুষদের হাতে। তারাই রােজগার আনতে এবং সেই অর্থের ওপরই নির্ভর করত মেয়েদের জীবনের সমস্ত করে * বর্তমান আইন অনুসারে কোনাে কোনো লােককে উপার্জনের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ অর্থ দিতেও হতে পারে।

আশা আকাঙ্খ, সুখ দুঃখ। আজ সেই পুরােনাে নিয়ম বাতিল হয়ে গেছে। মেয়েরা পেয়েছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। লক্ষ লক্ষ দরিদ্র, নির্যাতিত মেয়েরা এসে কাজ নিয়েছে কলকারখানায়, লকারখানায়, যৌথ কৃষিশালায়, সরকারী আপিসে ও নানান জন-কল্যাণকর প্রতিষ্ঠানে; তাই তারা অশিক্ষা আর কুসংস্কারের জীর্ণ বন্দীশালা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঔৎকর্ষের পথেও পা বাড়িয়েছে। দলে দলে কলকারখানায় যােগ দিয়ে মেয়েরা সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করেছে। পরমুখাপেক্ষীতার প্রশ্ন আজ তাদের কাছে নেই। রন্ধনশালার, দেয়ালের অন্ধকার আশ্রয় থেকে সােভিয়েট সমাজব্যবস্থা তাদেরকে সত্যিকার মুক্তি দিয়েছে। কারণ লেনিন জানতেন “কোনাে জাতি তার অধেক জনসংখ্যাকে রন্ধনশালায় আটক রেখে প্রকৃত স্বাধীনতা পেতে পারে না। তাই শহরে ও গ্রামে হাজার হাজার সাধারণ ভােজনাগর আজ কোটি কোটি সােভিয়েটবাসীকে খাওয়াবার দায়িত্ব নিয়েছে। তাতে শুধু যে মেয়েরাই লাভবতী হয়েছে তাই নয়, সমগ্র দেশ এই বিরাট জনসংখ্যাকে রন্ধনশালা থেকে মুক্তি। দিয়ে সমৃদ্ধিশালী হতে পেরেছে। যে সব মেয়েরা কলকারখানায় কাজ করে তাদের ওপর রাষ্ট্র ও শ্রমিক । সংঘের পক্ষ থেকে সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়। বিশেষ করে সন্তানসম্ভব? মেয়েদের স্বাস্থের ওপর। কলকারখানার প্রায় পঞ্চাশ রকম কাজ করা মেয়েদের পক্ষে নিষিদ্ধ কারণ সেই সব কাজের ফলে তাদের শারীরিক ক্ষতি হওয়া সম্ভব। কিন্তু এই নিষেধ চিরস্থায়ী নয়। বৈজ্ঞানিক উপায়ে যন্ত্রের ও কলকজার ক্রমােন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই নিষেধ উঠে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। সােভিয়েট দেশে বৈজ্ঞানিকরা দলবদ্ধভাবে গবেষণা করেন এবং তাদের গবেষণার ফলে যে কাজ করা মেয়েদের পক্ষে ক্ষতিকর বিবেচিত হয়, সে কাজ মেয়েদের জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৩১ সালে বৈজ্ঞানিক গবেষণার এর ফলে দেখা যায় যে আধ মণের (বিশ কিলােগ্রাম) বেশী ওজন বহন করা মেয়েদের স্বাস্থের পক্ষে হানিকর। সেই বছরেই মেয়েদের জন্যে ২০ সেরের বেশী বােঝা বহন করা বেআইনী বলে ঘােষণা করা হয়। প্রত্যেক কারখানায় স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা পরিদর্শন করার জন্যে বিশেষ পর্যবেক্ষক আছে যারা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য-বিষয়ক সমস্ত সুবিধে অসুবিধে পরীক্ষা করে দেখে এবং প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করে। তাছাড়া সােভিয়েট শ্রমিকদের, শ্রমিকদের, বিশেষ করে মেয়ে-শ্রমিকদের স্বাস্থ্যরক্ষার প্রধান সহায় হল শ্রমিক আইন ও সামাজিক বীমাব্যবস্থা। সােভিয়েটে কোনাে কলকারখানায় সাত ঘণ্টার বেশী কাজ করা আইন- বিরুদ্ধ, এমন কি পরিশ্রমবহুল কাজে ছয় ঘণ্টার বেশী কাজ করা বে-আইনী । প্রত্যেক মেয়ে-শ্রমিকই পুরুষদের সমান মাইনে পায় এবং বছরে অন্তত দু সপ্তাহ করে ছুটি পায় । এ ছাড়া কাজ বিশেষে আরও ছুটির ব্যবস্থা আছে। অন্য দেশের মত সােভিয়েট মেয়ে-শ্রমিকদেরকে কারখানার হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জীবনপাত কতে হয় না। সুখ, স্বাচ্ছন্দ, প্রাচুর্য ও অবসরের মধ্যে তার নতুন জীবনের ইমার তৈরী করে। সােভিয়েট বীমাব্যবস্থা শ্রমিকদের জন্যে এক নতুন স্বর্গের দ্বার খুলে দিয়েছে। অসুস্থতায়, দুর্ঘটনায় বা চিরস্থায়ী পঙুতায় এই বীমা ব্যবস্থাই শ্রমিকদের জীবনের সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করে। গর্ভাবস্থার আগে এবং পরে মেয়েদের এই বীমা ভাণ্ডার থেকেই অর্থ সাহায্য করা হয়। অন্যান্য দেশের মতন শ্রমিকদের মাইনে থেকে একাংশ কেটে নিয়ে এই বীমা-ভাণ্ডার তৈরী হয় না। সােভিয়েট শ্রমিকরা এক পয়সা দিয়েও এই বীমা-ব্যবস্থাকে পুষ্ট করে না। কারখানা-কমিটিই কারখানার অর্থ ৫ দিয়ে এই ভাণ্ডার গঠন করে। কোনো শ্রমিক মারা গেলে এই বীমা- ভাণ্ডার থেকে তার পরিবারকে অর্থদান করা হয়, মৃতদেহ সৎকারের জন্যে সাহায্য দেয়া হয়, নতুন সন্তান জন্মাবার পর মায়েদের প্রতি মাসে সন্তান-পালনের জন্যে অতিরিক্ত অর্থ দান করা হয়। শুধু তাই নয়, এই ভাণ্ডারের তরফ থেকেই সমস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবাররা বিনামূল্যে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য-নিবাস ও বিরামাবাসে থাকার সুবিধে পেয়ে থাকে। ১৯৩৫ সালে সমস্ত সােভিয়েট দেশে ৬ কোটি ৭০ লক্ষ রুবলের ওপর অর্থ এই বীমাব্যবস্থার জন্যে ব্যয়িত হয়েছে। যার এই ভাণ্ডারের অর্থে নানা স্বাস্থ্য-নিবাস ও বিরামাবাসে অবস্থান, করেছে ১৯৩৮ সালে এখনি লােকের সংখ্যা হল ৫ লক্ষ ৫৫ হাজার। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সােভিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে কিছু কিছু বেকার ছিল, তুখন বীমা-ভাণ্ডার থেকেই তাদের নিয়মিত অর্থসাহায্য করা হতাে। ১৯৩০ সালের পর সে সমস্যা অবিশ্যি নেই। বরং তার পর থেকে কর্মীর অভাব দেখা দিয়েছে । প্রাক-বিপ্লব রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের অবস্থা বিচার করলে দেখা যায় যে সুস্থ সমাজগঠনের পথে প্রবল অন্তরায় হল সে দেশে মাতৃত্ব ও সন্তান লালন-পালনের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলা। পেটের দায়ে মেয়েরা কলকারখানায় কাজ নেয়, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দৈনন্দিন অন্নের সংস্থান করে, বস্তিতে আলাে হাওয়া পার না, হাজার রকম অসুস্থতায় ভােগে, প্রয়ােজনমতাে চিকিৎসা পায় না। ফলে সুস্থ সন্তানের জন্ম দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। গর্ভপাত, অকাল-প্রসব, শিশু-মৃত্যু হল তাদের জীবনে অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। এই মারাত্মক অবস্থা থেকে মেয়েদের রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে সােভিয়েট রাষ্ট্র। সে যে কাজই করুক না কেন প্রত্যেক মেয়েই সন্তান প্রসবের আগে দু মাস এবং পরে দু মাস করে পুরাে বেতনসহ অবসর পেয়ে থাকে। তাছাড়া প্রসবের পর মায়েরা নানা রকম ছােট বড় সাহায্যও সরকারের কাছ থেকে পায় যা যে কোনো দেশের মেয়েদের চোখে স্বপ্নের সমান। আইন জারী করেই বসে নেই সােভিয়েট সরকার। বিস্তৃত পরিকল্পনা করে সারা দেশ জুড়ে সে হাজার হাজার শিশুসদন, কিণ্ডারগার্টেন, খেলার-মাঠ ইত্যাদির ব্যবস্থা করেছে। বিপ্লবের পর কয়েক বছর সােভিয়েট দেশকে এক অসহনীয় দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এবং তার ফলেই ১৯২০ সালে আইন করে গর্ভপাত করার প্রয়ােজনীয়তা স্বীকার করা হয় । কারণ তখন অনেক দারিদ্রক্লিষ্ট মায়েদের এ ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। এরই সাহায্যে দারিদ্রের কবল থেকে তারা রক্ষা পেয়েছিল কিন্তু বর্তমানে আইন জারী করে তা বন্ধ করা হয়েছে। কারণ আজ সােভিয়েটের মেয়েরা ভবিষ্যতের জন্যে কোনাে রকম ভয় না করেই মা হিসেবে তাদের সমস্ত দায়িত্ব পালন কর্তে পারে । এই হল সােভিয়েট সমাজব্যবস্থার বাস্তব রূপ। মেয়েদের জীবনে সমস্ত রকম সামাজিক ও রাজনৈতিক সমতা, দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, সমস্ত রকম কাজ কর্মে ( শারীরিক ক্ষতিকারক কাজ বাদে) ও শিক্ষায় দীক্ষায় সমান প্রবেশাধিকার এবং মাতৃত্বের প্রতি সযত্ন দৃষ্টি—এরই ভিত্তিতে প্রকৃত স্ত্রী-স্বাধীনতা ও নারী পুরুষের একাত্মতা গড়ে উঠেছে।

কর্মময় জীবনের অগ্রগতি জারের আমলে-মেয়ে শ্রমিকদের সংখ্যা নেহাৎ কম ছিল না। পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের অত্যন্ত অল্প মজুরীতে পাওয়া যেত বলে পুঁজিপতি মিল-মালিকরা তখন মেয়েদেরকেই কলকারখানায় কাজ দিত। পুরুষরা যা মজুরী পেত তার অর্ধেকেরও কম (অর্থাৎ শতকরা ৪৭৭ গ) পেত মেয়েরা। সুতরাং প্রত্যেক শিল্পাঞ্চলেই এর সুযােগ গ্রহণ কর্তে মিল মালিকরা ছাড়ে নি । ১৯০০ থেকে ১৯১৩ সাল। এই সময়ের মধ্যে হু হু করে বেড়ে উঠেছিল মেয়ে মজুরের সংখ্যা। ছিল ২,৫৯,০০০, গিয়ে দাড়ালাে ৫, ৫৭, ৪০০ এ। ১৯১৩ সালের শেষের দিকে সংখ্যা আরও বাড়ল। অর্থাৎ সমস্ত রুশ দেশে মেয়ে মজুরদের মােট সংখ্যা হণ ৬, ৩৬, ০০০। আর বেশীর ভাগ মেয়ে মজুরই হল কাপড়ের কলের যেখানে দুর্দশা ও খাটুনির অন্ত ছিল না। ১৯১৪ সাল থেকে আরম্ভ হল প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের আগুন। পুরুষরা চলে গেল মাঠে লড়াই-এর সৈন্য হয়ে। মেয়েরা গিয়ে জমল কলকারখানায়। ছয় লক্ষ চুত্রিশ হাজার থেকে আট লক্ষ আশি হাজারে গিয়ে দাড়ালাে মেয়ে-শ্রমিকদের সংখ্যা। সংখ্যা বাড়ল কিন্তু দুর্দশা ঘুচল না এতটুকু। মজুরী কমল, কাজের ঘণ্টা বাড়ল ; খাদ্যদ্রব্য আক্রা হল, সঙ্গে সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ল অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম। লড়াই- এর ময়দানে দলে দলে প্রাণ দিল সৈন্যেরা। সাহায্যের অভাবে ঘরে ঘরে উপপাসী রইল তাদের মা-বােন। এমনি এক শােচনীয় অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হল রাশিয়ার দরিদ্র মেয়েদের। শুধু অর্থনৈতিক অবস্থাই নয়, জারের শাসনে মেয়ে মজুরদের সাংস্কৃতিক অবস্থাও ছিল অত্যন্ত হতাশাপূর্ণ । ১৯১৮ সালে শতকর পঞ্চাশ জন মেয়ে মজুর অক্ষর চিনতে পারত না। ১৯১৭ সালে বিপ্লবের সাফল্য কিন্তু এক নতুন ঘােষণা পাঠাল। মেয়ে মজুরদের ঘরে ঘ, চাষী-মেয়েদের কুটিরে কুটিরে। বহু যুগের কালো শাসনের পালা শেষ হল—এবার বৈপ্লবিক জাগৃতির অভূদয় । বিপ্লবের প্রথম বছরেই শহরে ও গ্রামে গড়ে উঠল শিশুসদন, কিণ্ডারগার্টেন ও সাধারণ ভােজনাগার। গাহস্থ্য জীবনের সম খাটুনি আর বােঝা থেকে মুক্তি পেয়ে মেয়েরা পুরুষদের সমান ! হয়ে দাড়াল। কিন্তু বহু যুগের শাসন আর অত্যাচার, অবনতি আর অপমানের গ্লানি মেয়েদের মন থেকে সরে যেতে সময় নিল। যে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় তাদের জীবনে একমাত্র সত্য হয়ে দাড়িয়েছিল, সেই ঝুটো সত্যকে দূর করবার জন্যে দরকার হয়ে পড়ল আমুল পুনর্গঠনের। এই পুনর্গঠনের জন্যে ১৯১৭ থেকে আজ পর্যন্ত সােভিয়েট দেশকে নানান পরীক্ষা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিপ্লবের পর থেকে সাল পর্যন্ত সামরিক সমাজতন্ত্রের ( war communism) যুগ। এবং বাইরে দেশী-বিদেশী দুষমনরা নবজাতক সােভিয়েটকে ছিড়ে খাবার জন্যে উদ্যত হল। চোদ্দটী বিদেশী জাতির সৈন্যের পা বাড়ালাে আতুড়-ঘরে নতুন সম্ভাবনাপূর্ণ শিশুকে হত্যা কতে। সে দিন সােভিয়েটবাসীর জীবনে এক মহা দুর্যোগ ! হাজার হাজার মজুর চাষীর ছেলে লালফৌজে যােগ দিয়ে যুদ্ধ কর্তে গিয়েছে ময়দানে ; মেয়েরা ঘর সামলাচ্ছে সজাগ হয়ে। কঁচামাল নেই -কলকারখানা বন্ধ । মিলের বাঁশী স্তব্দ হয়ে গিয়েছে। ঘরে ঘরে ধুকছে বেকার মেয়েরা। ১৯১৮ ১৯২১ ১৯২১ সালের পর ভালো হল অবস্থা। কথা উচুল নতুন কথা উঠল নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পত্তন হবে••••••ঘরে ঘরে কাজ পাব, কুটি পাবে দেশের প্রত্যেকটি মানুষ ; গৃহযুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠিত করা হবে নতুন ভাবে। ১৯২৭ সালে বাস্তবে প্রবর্তিত হল নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তার পরের বছরেই বৃদ্ধি পেল মেয়ে-শ্রমিকদের সংখ্যা। ছয় লক্ষ ছত্রিশ হাজার থেকে এক লাফে সাত লক্ষ, উনেষাট হাজার তিন শশায়। শুধু কলকারখানাতেই নয়, সমাজের বিভিন্ন শাখায় ধীরে ধীরে এগিয়ে এল মেয়েরা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে প্রাক-বিপ্লব যুগের তুলনায় সােভিয়েট । ব্যবস্থার আওতায় হাজার হাজার মেয়েরা এগিয়ে এসেছে কর্মক্ষেত্রে। মেয়েদের এই অগ্রগতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা ১৯১৭ সালের আগে মালিকরা কলকারখানায় মেয়েদের কাজ দিত এই কারণে যে তাদের অত্যন্ত অল্প মজুরীতে পাওয়া যেত। ফলে হাজার হাজার টাকা মুনাফা লুটতে পারত কল-মালিকরা কিন্তু বিপ্লবােত্তর যুগে মেয়ে পুরুষ শ্রমিকদের মজুরীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকল না। সমান মজুরী ধার্য হল সবার জন্যে। অর্থাৎ অল্প মজুরী বা মুনাফা নয়, সমাজ-জীবনের বিস্তৃতির মধ্যে অসংখ্য মেয়েদেরকে টেনে আনাই হল এই অগ্রগতির তাৎপর্য। এবং সেকারণেই ১৯২৮ সালের মধ্যে ২, ৫৭, ০০০ শিশু সদন ও ৪, ৫৩, ০০০ কিণ্ডারগার্টেন গােল হল সমস্ত দেশে ; ৭, ৫০, ০০০ লােকের আহারের ব্যবস্থা হল সাধারণ ভােজনাগারে। এরই সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল তুমুল শিক্ষার আয়ােজন। প্রথম দিকে মেয়ে-শ্রমিকদের হার্ধেকের বেশী ছিল নিরক্ষর। কিন্তু পঞ্চ- বার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম বছরেই তা কমে গেল আশাতীতভাবে। একশো জনের মধ্যে ৮৪২ ভাগ মেয়ে লেখাপড়ায় পারদর্শিনী হয়ে উঠল। দলে দলে বিভিন্ন শিল্প-শিক্ষালয়ে গিয়ে ভর্তি হল তারা। সাধারণ শ্রমিক হয়ে থাকলে চলবে না-দেশের খাতিরে, তাদের নিজেদের ভবিষ্যতের খাতিরে, তাদের আধুনিক বৈজ্ঞানিক শিয়া-শিক্ষায় সুদক্ষ হয়ে উঠতে হবেএকথা মনে প্রাণে বুঝল তারা। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী সােভিয়েট দেশকে সমাজতক নীতি মাফিক গড়ে তােলার চেষ্টা হল। এই অতিকায় প্রচেষ্টাকে সফল করে তােলার জন্যে সে দিন সারা দেশের লোেক কি ভাবে আলােড়িত ও উৎসাহিত হয়েছিল তা তাদের কর্মোদ্যম ও সাফল্য থেকেই প্রমাণিত হয়েছে। এই প্রচেষ্টার ডাকে সর্বহারা মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে এগিয়ে এসেছিল সমানভাবে। এবং বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সমাজতানিক মনােভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের কর্মস্পৃহার প্রমাণ দিয়েছিল। পাঁচ বছর পরে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হল। গতবারের তুলনায় এই পরিকল্পনা আরও বৃহৎ, আরও সম্ভাবনাময়। গত পাঁচ বছরে যে সব জিনিস তৈরী হল সে সব জিনিসকে ঠিক মত কাজে লাগানাে হল এই পরিকল্পনার অন্যতম কর্মসূচী। এর পর সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি, কলকারখানা, যন্ত্র ইত্যাদি নির্মাণ এবং শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি, এ হল দ্বিতীয় পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য। সুতরাং এই বিপুল প্রচেষ্টাকে সফল করার জন্যে মেয়েদের অপরিহার্যতা আরও বৃহৎভাবে স্বীকৃত হল। কলকারখানা বাদে অন্যান্য কাজকর্মে মেয়েদেরকে নেয়ায় প্রধান বাধা ছিল একটা। অনেক কাজেই এতটা শারীরিক শ্রমের প্রয়ােজন হতাে যে মেয়েদের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। সুতরাং প্রথম এবং দ্বিতীয় পঞ্চ- বার্ষিকী পরিকল্পনায় শতকরা আশি ভাগ শারীরিক শ্রম-চালিত কাজগুলি যাতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে যন্ত্রচালিত হতে পারে তার ব্যবস্থা হল।

বর্তমানে অবিশ্যি সােভিয়েট ইউনিয়নে এ ব্যাপারে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। কলকারখানা বা শারীরিক শ্রমসাপেক্ষ অত্যন্ত কাজ ছাড়াও মেয়েদেরকে শিল্প-কর্মে শিক্ষিত করে তােলা হয়েছে। ফতে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে নেই মেয়েরা। ১৯৩৭ সালের হিসাব থেকে দেখা যায় যে ৯৪,০০, ০০০ মেয়ে সােভিয়েট দেশের নানান কাজে কর্মে নিযুক্ত আছে। ১৯৩৫ সালের একটি হিসাবে মেয়েদের কাজের নিম্নলিখিত সংখ্যাগুলি পাওয়া যায় । । বড় বড় কলকারখানায় ২৬,২৭,০০০ নির্মাণকার্যে ৪,৫,০০০ ৪ যানবাহনে ৩,৮৪,০০০ বাণিজ্য ও সাধারণ ভােজনাগারে ৮,২২,০০০ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ১৯,৮,০০০ কৃষিকার্যে ৬,৮,০০০ জারের আমলে চার পঞ্চমাংশ মেয়ে-শ্রমিক কাজ করত কাপড়ের কলে ; প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে সে সংখ্যা গিয়ে দাড়িয়েছিল দুই তৃতীয়াংশে। কিন্তু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কার্যকরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবস্থা বদলে গেল আগাগােড়। মেয়ের অন্যান্য কাজকর্ম পাওয়ার সুযােগ পেল। ফলে ১৯:৩৫ সালের মাঝামাঝি কাপড়ের কনের মেয়ে-শ্রমিকদের সংখ্যা দাঁড়ালো এক তৃতীয়াংশেরও কম ( ৩১'৭ ভাগ }, বাকী যারা তারা সবাই পুরুষ। অন্যদিকে এমবহুল কাজকর্মে মেয়েদের সংখ্যা বাড়ল। কেমিক্যাল, লােহা কারখানা, বিদ্যুৎ কল-এই সব কাজে ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হল মেয়েরা। সােভিয়েট মেয়েদের উন্নতির পেছনে এর গুরুত্ব অনেকখানি কারণ বর্তমানে মেয়েরা শুধুমাত্র শ্রমিকই নয়, তারা একেকটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ 0 ১৪ হয়ে উঠেছে। ফলে দেশের উৎপাদনী ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা, তাদের সংসারের স্বাচ্ছ, তাদের স্বাস্থ্য। দুয়েক বছর আগে তারা কিংবা তাদের বাপ মা যে সংকীর্ণ দৃষ্টি দিয়ে দারিদ্র-জীর্ণ পংকিল সমাজকে উপলব্ধি করতে, তাকে অভিশাপ দিত, যে সমাজ গেছে বদলে, তাদের সেই হলদে ফ্যাকাশে দৃষ্টি হয়েছে অনেক বড়, অনেক উজ্জ্বল। সমবায় শিল্পে মেয়েদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। প্রথম পঞ্চ- পরিকল্পনা কার্যকরী হওয়ার সময়ে (১৯২৮ সালে) সমবায় শিল্পে কাজ করত ২,৬৫,০০০ মেয়ে। পরিকল্পনা সমাপ্তির সময়ে (১৯৩৩ সালে । দেখা গেল মেয়ে-কর্মীর মােটসংখ্যা হল ৭,০২,৬০০। সমস্ত রকম হাতের কাজ এই সমবায় সংঘের মারফৎই পরিচালিত হয়ে থাকে। সােভিয়েট কৃষিকার্যের দিকে তাকালে আরও বেশী অবাক হতে হয় । কারণ সমাজতন্ত্র কৃষিক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে; পবনির্ভর শীল মেয়েদেরকে দিয়েছে আর্থিক ও সামাজিক স্বাতন্ত্র। আগের দিনে একেকটী চাষী পরিবার খণ্ড খণ্ড জমিতে পুরােনো প্রথায় জরাজীর্ণ হাল বলদ নিয়ে চাষ করত। না ছিল চাষীদের জলসেচ বা সারের ব্যবস্থা, না ছিল তাদের ফসল বােনা বা কাটা ঝাড়ার কোনাে যন্ত্র। কান পর্যন্ত তারা ডুবে থাকতে দেনায়-কৃষিঋণ আর খাজনার বােঝায়, অনাহারে আগুন জ্বলত তাদের পেটে, জমিদার ও তার পাইক বরকন্দাজদের জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে ভিটে ছাড়তে হতাে তাদের। এমনি এক মর্মান্তিক অবস্থায় ডুবে ছিল কৃষিসমাজের আপাদমস্তক। সােভিয়েট সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জমিদাররা নিশ্চিহ্ন হল আর জোতদারদের ক্ষমতা হ্রাস পেল। শােষণের বিষদাতগুলো ভেঙে গেল তাদের। তারপর ধীরে ধীরে কার্যকরী হল যৌথ প্রথায় চাষ করার ০ নীতি। বড় বড় যৌথ ও সরকারী কৃষিশালা গড়ে উঠতে লাগল। ক্রমে ক্রমে সংঘবদ্ধ হল চাষীরা। জেলায় জেলায় বসল ট্রাকটর ও অন্যান্য যাদির স্টেশন। দলে দলে ছেলেমেয়েরা ট্রাকটর, কমবাইন ও অঁন্যান্য কৃষি চালাতে শিখতে আরম্ভ করল। সস্ত সােভিগেট কৃষিব্যবস্থা জুড়ে হল এক প্রকাণ্ড বিপ্লব। ১৯২৯ সাল পর্যন্ত শতকরা মাত্র ৪৯ ভাগ কৃষিক্ষেত্র যৌথ কৃষিব্যবস্থার আওতায় আনা গিয়েছিল কিন্তু দশ বছরের মধ্যে (১৯৩৮ সালে) শতকরা ৯৯৩ ভাগ চাষের জমি যৌথকৃষিক্ষেত্রে (সােভিয়েট ইউনিয়নে ‘কলজ বলা হয় ) পরিণত হয়েছে। ১৯২৮ সালে সরকারী খামারের (সােভিয়েট ইউনিয়নে ‘সভকজ’ বলা হয় ) সংখ্যা ছিল ১,৪০৭। নয় বছর পরে তা দাড়িয়েছে ৩,৯৯২ এ। এই অবস্থান্তরের মুখে মেয়েরা বিপুল উৎসাহের সঙ্গে এসে যৌথ কৃষিশালার সভ্য হয়েছে। তবু প্রথম দিকে কৃষক-মেয়েদের মধ্যে যৌথ-কৃষি প্ৰা সম্বন্ধে উপযুক্ত সচেতনতা লক্ষ্য করা যায় নি। শৃংখলার অভাব, কাজে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং কম কাজ—এরই মধ্যে দিয়ে লক্ষ্য করা গিয়েছিল এর গুরুত্বের প্রতি তাদের ঔদাসিন্য। কিন্তু ১৯৩৩-৩৫ সালের মধ্যে আগাগােড়া বদলে গেল তাদের দৃষ্টিভঙ্গী। তাদের সহযােগিতা, কর্মক্ষমতা এবং শৃংখলা আরাে দৃঢ় হয়ে প্রকাশ পেল। আগল ভেঙে বেরিয়ে এল সব বয়সের মেয়েরা। এর ফলে কি শুধুই আর্থিক স্বতন্ত্র পেল তারা ? তা নয়, সমস্ত সামাজিক মর্যাদায় মাথা উচিয়ে তারা পুরুষের পাশে গিয়ে দাড়ালাে। শিক্ষায় দীক্ষায় তারা আজ উপযুক্ত হয়েছে পুরুষের পাশে দাড়াবার। যৌথ কৃষিব্যবস্থাই সােভিয়েট মেয়েদের জীবনে এই অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে পেরেছে। ১৯২৯-৩০ সাল পর্যন্ত সােভিয়েট দেশে মােট ১৭ লক্ষ ৭২ হাজার বেকার ছিল। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক ছিল মেয়ে-বেকার। আবার এই মেয়ে- বেকারদের অধিকাংশই ছিল গ্রামাঞ্চলের। গ্রামে অন্ন সংস্থানের কোনো ব্যবস্থা না হলে তারা ছুটতে শহরের দিকে। কিন্তু যৌথ কৃষি-প্রথায় চাষ হওয়ার পর ১৯৩৩ সাল থেকে এ সমস্যা সম্পূর্ণভাবে ঘুচে গেল। যৌথ খামারের একশাে জনের মধ্যে ৩৭ জন হল মেয়ে কর্মী। ভবিষ্যতের প্রতি তাদের অগাধ আত্ম-বিশ্বাস এবং বৃত্তি নির্বাচন ব্যাপারে নির্বাধ স্বাধীনতা তাদের জীবনে এক নতুন পরিচ্ছেদের সূচনা করেছে। আসল কথা সােভিয়েট রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা তাদেরকে আকর্ষণ করতে পেরেছে বলেই তারা এগিয়ে এসেছে নির্ভয়ে ৫ খাওয়ার সুবন্দোবস্ত, পরবার কাপড়, থাকবার বাড়ী, ছুটিতে বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা, নিখরচায় ছেলেমেয়েদের বাধ্যতামূলক শিক্ষা, শিশু সন্তানদের অর্থসাহায্য, প্রসূতিদের জন্যে দীর্ঘ ছুটি ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে দেখাশােনা, বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা, আমােদ প্রমােদ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- দরিদ্র মেয়েদের জীবনে এক নিশ্চিতি এনেছে। এর সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতি ও অর্থোন্নতি তাে আছেই। সােভিয়েট বিপ্লবের পর থেকে যে সব মেয়েরা কলকারখানায় এসে যােগ দেয় তাদের মধ্যে অধিকাংশই হল খাঁটি মজুর যারা জারের আমলে পুঁজিপতিদের যাতাকলে কাজ করত। তা ছাড়া সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘর থেকেও মেয়েরা এগিয়ে আসে। গ্রামাঞ্চল থেকেও এগিয়ে আসে অনেকে। গার্হস্থ্য জীবনের সংকীর্ণ পরিমিতি পেরিয়ে সমাজের রাজপথে এসে দাঁড়ায় তারা, যেখানে মানুষের সৃজনীশক্তি জীবনের নতুন উপনিবেশ আবিষ্কার করে চলেছে। এ আমাদের দেশ, আমাদের ঘর বাড়ী, আমাদের সমাজ, একে নতুন পথে গঠন করার দায়িত্ব আমাদের এমনি সমাজমুখী দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে ওঠে প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে। ১৭ সমাজতান্ত্রিক প্রতিযােগিতা (socialist competition) হল উৎপাদন বুদ্ধির এক প্রধান হাতিয়ার। এই হাতিয়ারের সাহায্যে সােভিয়েট দেশের উৎপাদন জগতে এক অবিশ্বাস্য যুগান্তর এসেছে। প্রত্যেক কারখানায় কারখানায় এই প্রতিযােগিতা হয় শ্রমিকরা যােগ দেয় দলে দলে। কে সবচেয়ে বেশী উৎপাদন বাড়াতে পারে, কে কলকজার উন্নতি সাধন করে যন্ত্রের গতি বাড়াতে পারে-এই নিয়ে লড়াই। পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরাও এই প্রতিযগিতায় অগ্রণী হয়েছে। বয়নশিল্পী এভড়ােকিয়া ও মেরিয়া ভিনােগ্রাডােভা, অডিন্ট জোভা, ফাদী ও বুননকল-শিল্পী ফেডেরােভার নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযােগ্য। এরা সারা সােভিয়েট দেশে শক্‌-ওয়ার্কার' বলে খ্যাত। এই প্রতিযােগিতার আন্দোলনকে স্টাখানােত আন্দোলন' বলা হয়ে থাকে। ১৯৩৬ সালে ডন বেসিনের কয়লা খনির শ্রমিক আলেক্সাই স্টাখানােত প্রথম এই উৎপাদন বৃদ্ধির আন্দোলনে অগ্রণী হন এবং তারপর তারই নামে এই আন্দোলন সমগ্র সােভিয়েট ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যই হল উৎপাদনের সাধারণ হার ও গতিকে অতিক্রম করা। এই হার ও গতি অতিক্রম ও রেকর্ড স্থাপনের প্রধান মুলধন হল শ্রমিকের সাংস্কৃতিক ও সৃষ্টিশীল ক্ষমতা। কৃষিজগতেও মেয়েদের দান অসামান্য। প্রতি বছর কৃষিক্ষেত্রে যে ফসল বৃদ্ধি পাচ্ছে তার পেছনে মেয়েদের পরিশ্রম ও আন্তরিকতা অপরিসীম। ১৯৩৫ সালে পাঁচশাে লােকের সহযােগিতায় যে কৃষি আন্দোলন আরম্ভ হয় তার নেতৃত্ব করে মেরিয়া ডেমচেংকো নামে একটি মেয়ে। সে সময়ে এক হেটেয়ার (প্রায় আড়াই একর) জমিতে ১৩২•• পাউও বীট উৎপন্ন হতো। আন্দোলনকারীরা সেখানে ৫০••• পাউণ্ড বীট ফলাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন।

০ জ্ঞান সােভিয়েট এশিয়ার (উজবেকিস্তান, ফাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাকস্তান প্রভৃতি জায়গায়ে) যৌথ কৃষিশালা ও তুলাে ক্ষেতেও এমনি আশাপ্রদ ফল পাওয়া গিয়েছে। বিপ্লবের আগে মধ্য-এশিয়ার মেয়েরা ছিল পুরুষদের বাঁদি। ঘর ছেড়ে তাদের বাইরে বার হার কোনো স্বাধীনতা ছিল না। সােভিয়েট আমলে কিন্তু তারা নতুন শিক্ষা ও মর্যাদার অধিকারিণী হয়েছে। তুলো চাষের সমস্ত রীতিনীতি সম্বন্ধে তারা বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে। ১৯৩৫ সালে তারা তুলল উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি করে। গাে-প্রজনন ব্যাপারেও তারা তেমনি বুদ্ধিবৃত্তির পরিচয় দেয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে সমাজ-চেতনা ও রাজনৈতিক লাভের সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েরা কর্মবহুল উৎপাদন জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তবু অত্যন্ত সহজে এই রূপান্তর এলছে মনে করলে • ভুল করা হবে। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষকে রীতিমত সংগ্রাম চালিয়ে, পুরােনাে ধ্যান ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়ে এর পথ তৈরী কর্তে হয়েছে । • প্রাক-বিপ্লব যুগে পুরুষদের মধ্যে, বিশেষ করে কৃষকদের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে মেয়েরা হল সমাজের জঞ্জাল, মেয়েরা হল অস্পৃশ্য, অপবিত্র, কেবল সন্তান সৃষ্টি করাই তাদের কাজ ; দেশের ভালাে মন্দের ওপর তাদের কথা বলার অধিকার নেই কোননা। এই মতের সঙ্গে লড়তে হয়েছে বলশেভিকদের, সােভিয়েট দেশের প্রগতিবাদীদের। প্রচণ্ড সংগ্রামের পর ধীরে ধীরে গোঁড়া কৃষকরা মেনে নিয়েছে যে স্টালিনের কথাই ঠিক-যৌথ কৃষিক্ষেত্রে মেয়েরাই হল প্রবল শক্তি।

শ্রমশিলে-মেয়েদের কৃতিত্ব প্রাক-বিপ্লব যুগে কলকারখানায় কাজ করার সঙ্গে বিপ্লবােত্তর সমাজে শ্রমিক-পরিচালিত এমশিল্পে কাজ করার অনেক তফাৎ আছে। জার-শাসিত ও বিদেশী মূলধন-কবলিত (১৯১৭ সালের আগে বৃটিশ, মার্কিণ, জার্মান ও ফরাসী পুজিপতিরাই ছিল রুশ শ্রমশিল্পের আসল মালিক) আধা সামন্ততান্ত্রিক শ্রমিক সমাজের সঙ্গে ১৯১৭ সালের পরবর্তী বৈপ্লবিক পরিবর্তন-সাধনকে নতুন দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করে দেখতে হবে। আগে জারের পরিবার ছিল রুশ সাম্রাজ্যের গােটা মালিক, দেশী ও বিদেশী মিল-মালিকরা ছিল সমস্ত কলকারখানার একচ্ছত্র অধিপতি; শ্রমিকরা * ছিল সকলের পায়ের নীচে। দেশের ভালো-মন্দ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার দায়িত্ব ছিল না তাদের কাঁধে, বরং নিজেদের দেশে তারা ছিল পরদেশী। সুতরাং মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, শারীরিক শ্ৰম পরের দোরে বিক্রী করে, দৈনিক ১১ ঘন্টা (কোননা কোনাে কারখানায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হতো) পরিশ্রম করে তারা তাদের জীবিকা আহরণ করতাে। এই জীবিকা-আহরণ সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই । তখনকার রাশিয়ার মর্মান্তিক বিপর্যয়ের পরিমাণ জানতে হলে আমাদের নিজেদের দেশের দিকে তাকিয়ে দেখলেই হবে। চাকরির জন্যে কাড়াকাড়ি, রুটির জন্যে কাড়াকাড়ি, সামান্য ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্যে কাড়াকাড়ি-এই অমানুষিক কাড়াকাড়িই হল সাম্রাজ্য-কবলিত ভারতবর্ষের ইতিহাস। নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত রাশিয়া এক নতুন দিকে মােড় নিল। মানুষের মনে জন্মালে এক নতুন মূল্যবােধ, এক নতুন সমাজচেতনা যে এ দেশ আমার—এ দেশের জল, মাটি, হাওয়ার ওপর প্রত্যেকটি মানুষের সমান অধিকার'; এ কলকারখানার মালিকানা আরকোনাে পুজিপতির নয়, দেশের প্রত্যেকটি লােকের; এ জমির • এ কণা মাটিও জমিদার বা জোতদার কেউ স্পর্শ কতে পারবে না, হাল যার সেই সােনা ফলাবে এই মাটিতে। অতএব হুসিয়ার সােভিয়েট দেশের নাগরিক! আজ সত্যি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনাে রকম গাফিলতি না দেখিয়ে জোর কদমে অগ্রসর হও তােমার কাজে। মেয়েরা ছিল সব চেয়ে পিছিয়ে, তাই সব চেয়ে এগিয়ে এল তারাই। কলকারখানার নানান রকম কাজকর্মে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠার জন্যে তাদের মধ্যে অদম্য উৎসাহ দেখা গেল। কারণ শিল্পশিক্ষার পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেকখানি। শিল্পজগতে মেয়েদের পশ্চাত্বর্তিতা সম্পূর্ণভাবে দূর না হওয়া পর্যন্ত সত্যিকার মুক্তি ও সমতা সম্ভব নয়। একজন পারদর্শিনী মেয়ের পক্ষেই শিল্প, সমাজ ও শিক্ষা জগতে পুরুষের সমকক্ষ হওয়া সম্ভব কারণ তার পারদর্শিতাই তার জন্যে সভ্য জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এই কারণে সােভিয়েট কতৃপক্ষ মেয়েদেরকে কলকারখানায় টানার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে শিল্পশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছে। কেন্দ্রীয় কার্যকরী সমিতির তৃতীয় অধিবেশনে বিশেষ করে এ সম্বন্ধে দীর্ঘ আলােচনা হয় এবং স্থির হয় যে যদি সােভিয়েট দেশের ভবিষ্যৎ শিল্পজীবনে মেয়েদের সহযােগিতার প্রয়ােজনীয়তা থাকে তাহলে তাদের শিল্প ও -ব্যাপক শিক্ষার দিকে সষত্ন দৃষ্টি দিতে হবে। বিপ্লবপুর্ব যুগে যে সমস্ত মেয়ে শ্রমিক ছিল, তাদের না ছিল কোনাে শিল্পশিক্ষা, না ছিল কোনাে ক্ষ। তারা সবাই ছিল কাজ-না-জানা বা আধা-কাজ-জানা মজুর। শুধু শিল্পজগতে নয় সমস্ত জাতীয় জীবনে এই ছিল তাদের একমাত্র পরিচয়। সুতরাং নারীসমাজের এই প্রকাণ্ড অংশকে শিল্পশিক্ষ দেয়ার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ল সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের ওপর। দেখা যায় যে ১৯২৭ সাল এমন কি ১৯৩০-৩২ সাল পর্যন্ত মেয়েদের টেকনিক্যাল শিক্ষা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে দলে দলে মেয়েরা কলকারখানায় যােগ দিলেও বেশীর ভাগ মেয়েই আধা-কাজ- জানা এবং কাজ-না-জানা স্তরে থেকে গিয়েছিল, উচ্চ শিল্পের কাজে পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে নি। কিন্তু এমন অনেক কাজে মেয়ের যােগ দিয়েছিল যে কাজ আগে কোনো দিন তারা করে নি। ১৯২৭-এ শতকরা মাত্র ১৬ ভাগ মেয়ে কৃষি-যন্ত্র বিভাগে কাজ করত; ১৯৩৪ সালে তা বেড়ে ২৫৫ ভাগ হল। ধাতুশিল্পে চুল্লীঘরের কাজ বিপদজনক বলে মেয়েদের জন্যে নিষিদ্ধ কিন্তু কপিকল ওঠানাে নামানাের কাজে মেয়ে-শ্রমিকের সংখ্যা কম নয়। ১৯২৭ সালে একটা মেয়েও বিদ্যুৎ- উৎপাদন ধরে কাজ করত না কিন্তু ১৯৩৪-এ সেখানকার ফিটারদের মধ্যে শতকরা তের ভাগ এবং প্রধান সুইচবাের্ড কর্মীদের মধ্যে বত্রিশ ভাগ হল মেয়ে। ১৯২৬ সালের শেষ দিকে মাত্র ৯০০ জন মেয়ে-মজুর নির্মাণকার্যে নিযুক্ত ছিল। চার বছর পরে তার সংখ্যা স্ফীত হয়ে ১৭,০০০ হাজারে দাড়ালো। এমনিভাবে সমস্ত রকম যানবাহনের কাজে, কলে কারখানায়, আপিসের কাজকর্মে এক অভাবনীয় উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেল। শােভিয়েট শ্রমশিল্পে শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের দান নিতান্ত অল্প নয় । কিশাের কিশােরীরা সাত বছর সাধারণ শিক্ষা পাওয়ার পর অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সে যে কোন কারখানা, যানবাহন বা কৃষি-শিক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে ভর্তি হতে পারে। এই বয়সেই অনেকে স্থির করে, তারা ভবিষ্যতে কী হবে, কোন্ বৃত্তি গ্রহণ করবে এবং সেই আকাঙ্খা অনুযায়ী তারা শিক্ষালাভ করে। যে সব ছাত্রছাত্রীরা উচ্চ শিক্ষা পেতে চায় তারা বিদ্যালয়ে গিয়ে কৃতিত্ব অর্জন করে। এই শিক্ষাকেন্দ্র গুলির কাজ কিন্তু অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ কারণ এই কেন্দ্রগুলির ওপরই শিল্প-জগতের উন্নতি • ও অগ্রগতি নির্ভর করে। ১৯৩৩ সালের হিসাব থেকে দেখা যায় যে সে বছরে শিল্প-শিক্ষাকেন্দ্রে মােট ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৯,৫৮,৯০০। তার মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা হল ১, ৬২, ৮০০। অন্যান্য ধনতন্ত্রী দেশগুলির দিকে যদি তাকিয়ে দেখা যায় তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে যে সে দেশগুলিতে কত অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা শিক্ষার অভাবে, দারিদ্রের তাড়নায় কলকারখানায় কুলি মজুরের কাজ নেয় এবং কোনো রকমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের শিক্ষাদীক্ষা, স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ সব কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমাদের নিজেদের দেশেও তার ভুরি ভুরি প্রমাণ মিলবে। কয়লা-খাদের মেয়েমজুরদের দিকে তাকিয়ে দেখলে বােঝা যাবে যে তাদের মধ্যে কত অপ্রাপ্তবয়স্কা কিশােরীরা জীবনপাত করে রুটির সংস্থান করছে। দুর্নীতির আবর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে তাদের তাদের সাধারণ মানবিক ও নৈতিক মূল্যবােধ। কিন্তু সােভিয়েট দেশে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের কোনাে রকম শ্রমসাধ্য কাজ করা আইনবিরুদ্ধ। শিল্প-শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে ছাত্রীদের সংখ্যা ও আগ্রহ লক্ষ্য করে ১৯৩১ সালে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ এক নতুন আইন জারী করেন যে, প্রত্যেক শিক্ষাকেন্দ্রে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সমান সমান হবে অর্থাৎ পঞ্চাশ ভাগ ছাত্র এবং পঞ্চাশ ভাগ ছাত্রী—এই ভাবে গঠিত হবে শিল্প-শিক্ষা কেন্দ্রগুলি। ১৯৩৫ সালে কৃষি-শিক্ষাকেন্দ্রেও এই আইন বলবৎ হয় ।

শিল্প-শিক্ষা জগতে মেয়েদের এই অভাবনীয় উন্নতির পেছনে আছে কলকারখানায় কাজ করার জন্যে এক প্রচণ্ড আগ্রহ ও নতুন কাজ শেখার জন্যে দুর্দমনীয় উৎসাহ। আগেকার সময়ে মেয়ে-শ্রমিকরা নিজেদের যােগ্যতা বা দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যাপারে কিছুমাত্র আগ্রহ নিত না কারণ তারা, ভাবত যে, আজ এ কাজে আছি, কাল চলে যাবাে অন্য কাজে। দক্ষতা বাড়িয়ে আর কী এমন লাভ হবে? মজুরী যা পাবার তাই পাবে, কোনো মালিক এক পয়সা বেশী দেবে না আমাদের দক্ষতা দেখে। আসলে পেটের দায়েই তারা কারখানায় ঢুকতাে। নতুন যুগে বদলে যেতে লাগল সেই দৃষ্টিভঙ্গী। টাইপরাইটিং, কাপড় সেলাই-এমনি সব হালকা কাজগুলাে ছেড়ে মেয়েরা শ্রমসাধ্য কাজে যেতে চাইল। শ্রমিক পরিবারের মেয়েরা হতে চাইল টার্নার, মিলিং কাটার। এই চেতনার মধ্যে সমাজমুখী মনের এক নতুন বিফার চোখে পড়ল। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষ দিকে “ইলেকট্রোকবিনাৎ” নামে মস্কোর এক শিল্প-শিক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণ করে দেখা যায় যে ছাত্রীদের ফলাফল ছাত্রদের সমতুল্য। ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা কোনাে অংশে নিকৃষ্ট নয়। ১৯৩৫ সালে বড় বড় কলকারখানার আট লক্ষ শ্রমিকদের টেকনিক্যাল পরীক্ষা নেয়া হয় কারণ সেই বছর থেকেই প্রত্যেক শ্রমিকের ন্যূনতম দক্ষতার স্তর নির্ধারণ করা হয়। এবং এই নূ্যনতম দক্ষতা প্রত্যেক শ্রমিকের শ্রমিকের জন্যে আবশ্যিক। সেই পরীক্ষার ফলাফলেও মেয়ে-শ্রমিকরা পুরুষদের সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বেরিয়ে আসে। শুধু তাই-ই নয়, কয়েকটা বিষয়ে তারা পুরুষদেরকেও অতিক্রম করে যায়। ১৯৩৬ সালে যন্ত্রনির্মাণ, ধাতুশিল্প, কয়লাখনি ও কাপড় কলেও টেকনিক্যাল ২৫ পরীক্ষার আয়ােজন হয় এবং মেয়েদের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা পূর্ণমাত্রায় প্রমাণিত হয়। এই জ্ঞান আহরণের আন্দোলনে শুধু যে কিশােরী ও যুবতীরা এল তাই নয়, বৃদ্ধাদের মধ্যেও নতুন আশার স্ফুরণ দেখা গেল। ইয়াটসেভ কারখানার চুয়ান্ন বছরের এক বৃদ্ধা বয়নশিল্পী এগিয়ে এসে বললে “আমি চুয়ান্ন বছরের বুড়ী হয়েছি বটে তবু লেখাপড়া শিখতে চাই আমি।” শিল্প-শিক্ষাকেন্দ্রগুলি যে একমাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ তাই নয়, কারখানার কাজের পর অনেক শ্রমিকই এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে এসে শিক্ষা গ্রহণ করে। সােভিয়েট দেশে গুণগত এবং পরিমাণগত দুদিক থেকেই মেয়ে- শ্রমিকদের দক্ষতা প্রমাণিত হয়েছে। এবার তাদের পারিশ্রমিক সম্বন্ধে খবর নেয়া যাক। অনেক জায়গাতেই দেখা গেছে যে স্ত্রী সমান মজুরী পায়। আবার কতক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে মেয়ে-শ্রমিকরা পুরুষদের তুলনায় বেশী অর্থ পেয়ে যেমন যন্ত্র-নির্মাণের কাজে, কাপড়ের কলে। এরকম প্রায়ই দেখা গিয়েছে যে একটি অনভিজ্ঞা মেয়ে কারখানায় কাজ নিয়ে হঠাৎ কয়েক বছরের মধ্যে সবদিক দিয়ে রীতিমত বড় শিল্পী হয়ে উঠেছে আর সারা দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে তার নাম। ১৯৩৪ সালে স্টালিনের কাছে লেনিনগ্রাডের মেয়ে-শ্রমিকদের এক চিঠি থেকে জানা যায় যে টুলা ফ্যাট্রিকে বারাে হাজার কিলােওয়াটের এক জলচক্র (turbine) তৈরী করে দেয়ার দায়িত্ব রেড পুটিল ফ্যাকটির এক বিভাগের ওপর এসে পড়ে। এই জলচক্র তৈরী করার জন্যে বিশেষ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়ােজন। আইভানােভা ও স্বাভস্কায়া নামে দুটি মেয়ে এর নেতৃত্ব গ্রহণ করে এবং অত্যন্ত পুরুষ উভয়ই २९ যােগ্যতার সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্ডারটি সম্পাদন করে। ১৯৩১ সালে এই আইভানোভা ছিল কাজ-না-জানা মেয়েদের দলে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত মস্কো শহরে পরিচারিকার কাজ করত ভেরা ব্রাগিনা। তার গ্রাম ববরিকীতে নতুন কারখানা তৈরী হচ্ছে শুনে সে সেখানে কাজ নেয়। কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে সে সাধারণ শিক্ষা ও যন্ত্রবিদ্যা আয়ত্ত করবার জন্যে আপ্রাণ পরিশ্রম করে। তিন বছর পরে এমােনিয়া কারখানার নির্মাণকার্যে তাকে স্থানান্তরিত করা হয় এবং সেখানে কমপ্রেসারের কাজ দেয়া হয়। এই কাজে সক্রিয় ‘শক ওয়ার্কারের’ যােগ্যতা দেখানাের ফলে অর্ডার অব দি ব্যানার অব, লেনিন' উপাধি উপহার দেয়া হয় তাকে। আইভানােভা কাপড় কলের ক্লডিয়া বুইকোভার নামও কম উল্লেখযােগ্য নয়। ১৯২৬ সালে যখন সে গ্রাম থেকে আইভােনােভােয় আসে তখন একেবারে অশিক্ষিতা ছিল সে। লেবার এক্সচেঞ্জ তাকে পাঠিয়ে ফেলিক্স জারঝিন্‌স্কি কারখানায়। সেখানে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ১৯২৭-এ কাঠিম জড়ানাের কাজে তাকে স্থানান্তরিত করা হয়। কাজের সঙ্গে সঙ্গে সে সাধারণ ও টেকনিক্যাল শিক্ষা গ্রহণ করে। অল্প সময়ের মধ্যে সে তার বিভাগের অধ্যক্ষ হিসাবে নিযুক্ত হয় এবং ছাব্বিশটি বিশেষ পুরস্কার লাভ করে। ইয়ং কমুনিস্ট লীগের পঞ্চদশ বার্ষিকীতে সরকার থেকে তাকে অর্ডার অব দি লেনিন’ উপাধি দান প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এমনি কত মেয়ে যে তাদের কৃতিত্বের জন্যে পুরস্কৃত হয়েছে তার ঠিক নেই। এবং এই কৃতিত্বের পরিমাণ প্রতি দিন বেড়ে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে ‘শক-ওয়ার্কার’এর সংখ্যা সমাজতন্ত্রী সমাজে এই অগ্রণী মেয়েরাই হল পথ প্রদর্শক। উৎপাদন জগতে এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের ফলেই সমাজের প্রত্যেকটি লােকের সমস্ত চাহিদা মেটানাে সম্ভব হয়েছে। এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এইচাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমনি মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি • হচ্ছে তেমনি প্রসারিত হচ্ছে তার প্রয়ােজন ; আরও বেশী হাত পা ছড়িয়ে সে বাঁচতে চাইছে তার ক্রমবর্ধমান পরিমিতির মধ্যে। সােভিয়েট দেশে মানুষের সংখ্যা ও তার চাহিদার হিসাব নিয়ে উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। অন্যান্য দেশের মতন শ্রমিকদের ফাকি দিয়ে, খরিদ্দারের পকেট কেটে এবং প্রতিযােগীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যক্তিগত মুনাফার জন্যে মাল উৎপন্ন হয় না সােভিয়েটে। তাই যখন শ্রমিকরা উৎপাদন বাড়ায় তখন তারা এই ভেবেই উৎপাদন বাড়ায় যে এই উৎপন্ন মাল তাদের এবং সমগ্র দেশবাসীর কল্যাণে লাগবে.••••• কোনাে মূনাফাখখার মিল মালিক বা ব্যবসাদার লুটবে না এর লাভ ; সােভিয়েট দেশের উৎপাদনের পেছনে এই সমাজতান্ত্রিক চেতনাই হল প্রধান মুলধন। এই মূলধনকে আশ্রয় করেই এগিয়ে চলেছে স্টাখানােত আন্দোলন। ১৯১৭ থেকে ১৯৪৬ সাল—এই ২৯ বছরে সমস্ত সােভিয়েট দেশের শ্রমশিল্পের ধারা আগাগােড়া পালটে গেছে। পুরােনো কালের ছােট ছোট হস্তচালিত যন্ত্রগুলো উঠে গিয়ে বসেছে নতুন নতুন বৈদ্যুতিক যন্ত্র । যে সােভিয়েট দেশ বিপ্লবের অব্যবহিত পর পর্যন্ত বড় বড় যন্ত্রের জন্যে বিদেশের দিকে তাকিয়ে ছিল, সেই সােভিয়েট দেশেই তৈরী হচ্ছে সমস্ত রকম ভারী ভারী যন্ত্র। অর্থাৎ তিরিশ বছর আগেকার অশিক্ষিত, অভুক্ত ও আনাড়ী শ্রমিকরাই যন্ত্র জগতে এই বিপ্লব এনেছে যা অন্য কোনো দেশ পারে নি। কিন্তু শ্রমিকদের এবং সমস্ত মানুষের জীবনের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের २१ পেছনে মূল কথা হল অর্থনীতির পুঁজিবাদী রূপ পালটে যাওয়া। অর্থাৎ যে উৎপাদন-যন্ত্র সমস্ত দেশের গতি ও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রিত করছিল তার হস্তান্তর ঘটল। মুষ্টিমেয় কলমালিকদের হাত থেকে সমস্ত উৎপাদন-যন্ত্র চলে এল শ্রমিকদের হাতে যারা হল যন্ত্রের প্রকৃত চালক। সাধারণ মানুষের সঙ্গে উৎপাদন-যন্ত্রের যে অস্বাভাবিক সম্বন্ধ ধনতান্ত্রিক যুগে রচিত হয়েছিল তা আর থাকল না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনসাধনের বড় কথা হল রাজনৈতিক বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক বিপ্লব। এই অর্থনৈতিক বিপ্লব বাদে কোনো দেশই সােভিয়েট রাষ্ট্রের মত সমৃদ্ধির অধিকারিণী হতে পারে না। ২০ যৌথ কৃষিশালার মেয়েরা { কৃষিকাজ হল সােভিয়েট দেশের অন্যতম কৃতিত্ব। আগেকার দিনে আমাদের ভারতবর্ষের কৃষকদের মতই রাশিয়ার ঋণগ্রস্ত ও দারিদ্রক্লিষ্ট কৃষকেরা ঘােট ঘােট জমিতে আলাদা আলাদা ভাবে চাষ করত, তাও অত্যন্ত প্রাচীন প্রথায় । যে সব জোতদারদের হাতে অনেক জমি এবং পয়সা তারা ক্ষেতমজুর রেখে চাষ করাতে। হাল বলদ ধার করে, সারের অপেক্ষা না রেখে চলত সেদিনকার চাষবাস, কিন্তু ব্যক্তিগত ঘােট ঘােট জমিতে বিভক্ত হয়ে চাষ করার অসুবিধে অনেক এবং বর্তমান যুগে তা সম্ভবও নয়। কারণ নতুন যুগের সঙ্গে সঙ্গেবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে পঙ্গে সমাজব্যবস্থাও পরিবর্তিত হচ্ছে। আবার এরই সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে গঠিত হচ্ছে মানুষের চিন্তাধারা, পালটাচ্ছে তার হাতিয়ার। সুতরাং সাধারণ অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে কৃষিব্যবস্থারও যে একটা পরিবর্তন আসবে তা সহজেই বােঝা যায়। যদি অন্যান্য দেশের বর্তমান অবস্থা অনুযায়ী একেকটি কৃষক তার আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ মাফিক আলাদা আলাদা জমিতে চাষ করে তাহলে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্য নেয়া ও ফসলবৃদ্ধির প্রশ্ন কল্পনারও বাইরে। কারণ ঐ কয়েক হাত জমিতে কোথায় চলবে ট্রাকটর, কোথায় বসবে কম্বাইন, কি ভাবে যন্ত্র দিয়ে বীজ বােনা হবে জমিতে আর কী করে ফসল কাটা হবে যন্ত্রের সাহায্যে? আর তাছাড়া কৃষকের পক্ষে কি ঐ যন্ত্রগুলি কেনা সম্ভব? কারণ যে কৃষক জমিদারের খাজনা দিতে ও পরিবারের অন্নবস্ত্র জোটাতে পারে না, যে কৃষক ঋণ করে ও ধান কর্জ করে কৃষিকাজ চালায়, সেই কৃষকের চোখে ঐ দানবীয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলি এক প্রকাণ্ড দুঃস্বপ্ন। অথচ ঐ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলির উপযুক্ত ব্যবহার না করেও উপায় নেই। মানুষকে শৃংখলমুক্ত করে নতুন সুখ, সম্পদ, সমৃদ্ধি ও বিশ্রামের অধিকার দিতে হবে। এই সমস্যার ব্যাপক সমাধান হয়েছে সােভিয়েট দেশে। ১৮৬০ সাল পর্যন্ত রুশ সাম্রাজ্যে ছিল দাসপ্রথার অপ্রতিহত প্রভাব। মানুষের ব্যক্তিত্ব বলে কোনো পদার্থ সেদিন জন্মাতে দেয়া হয় নি দাসদের মধ্যে। নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে কোথাও যাওয়ার অধিকার ছিল না দাসদের। প্রভুরা জমি বিক্রী করলে সেই জমির সঙ্গে সঙ্গে দাসেরাও হস্তান্তরিত হয়ে যেত নতুন প্রভুর হাতের মুঠোর মধ্যে। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের ফলে ১৮৬০ সালে দাসপ্রথার জীর্ণ শিকল ভেঙে গুড়ো ওঁড়াে হয়ে যায়। অপেক্ষাকৃত স্বাধীন পরিবেশের মধ্যে এসে মানুষের মনে নতুন ব্যক্তিত্ববােধ জন্মগ্রহণ করে। তবু ওপরআলার অর্থনৈতিক শশাষণ তাদের বাঁকানাে শিরদাড়াকে সােজা হতে দিল না। হাল যার, প্রকৃত পক্ষে জমির মালিক হল না সে। চাষীরা হয়ে রইল চিনির বলদ। সােভিয়েট বিপ্লব এই চিনির বলদদের জীবনে সত্যিকারের মুক্তির ঘােষণা নিয়ে এল। বিপ্লবের পর হতে জমিদার এবং গির্জা কারো দখলে এক কাঠা জমিও থাকল না। বিনা ক্ষতিপূরণে সে জমিগুলি কেড়ে নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বিলি করে দেয়া হল। রাতারাতি চল্লিশ কোটি একরের বেণী জমির মালিক হয়ে বসল কৃষকরা। এতদিন প্রতি বছর পঞ্চাশ কোটি রুবল খাজনা দিতে হচ্ছিল এখন তারা সেই গুরুভার থেকে মুক্ত হল। কিন্তু নতুন সমাজের অগ্রদূত বলশেভিকরা শুধু জমি বিলি করেই বসে রইল না। কৃষকদের বােঝালে যে পুরােনাে প্রথায় চাষ করলে চলবে না। যুগ পালটেছে, সঙ্গে সঙ্গে তােমাদের চাষের রীতিনীতিও পালটাতে হবে। ফসল ফলাতে হবে দশগুণ। কারণ তােমরা এতদিন মজুরদেরকে, সাধারণ দরিদ্র মানুষদেরকে আধপেটা খাইয়ে এসেছে;

তাদেরও পয়সা ছিল না, তােমাদেরও গোলায় ফসল ছিল না, কিন্তু এখন পেট ভরে খাওয়াতে হবে প্রত্যেকটি মানুষকে ; তােমরাই হলে অন্নদাতা। অতএব ছােট ছোট জমির টুকরােগুলােকে এক করে ফেলে বড় বড় খামার তৈরী করে এবং সেখানে যৌথ প্রথায় কাজ করাে তােমরা সকলে। যৌথ খামারের যারা যারা সভ্য হবে তারা সকলেই হবে তার মালিক। সকলেই সমান ফলের অধিকারী হবে। প্রত্যেকে সকলের জন্যে এবং সকলে প্রত্যেকের জন্যে এই নীতিতে ফসল বাড়বে বহুগুণ ও তােমাদের পরিশ্রমও লাঘব হবে। আমরা রাষ্ট্র থেকে তােমাদের ট্রাকটর দেব, কম্বাইন দেব, বীজ বােনবার জন্যে ও জল দেবার জন্য যে সব যন্ত্র লাগে দেব। তােমরা যাতে ব্যায্য দাম পাও তার সমস্ত ব্যবস্থা করব; তােমাদের ঘরে ঘরে বিজলী বাতি পৌছে দেব, নতুন ঘর বানাবার জন্যে মালমশলা দেব, যানবাহনের ব্যবস্থা করব গামে, গ্রামে, তােমাদের প্রত্যেকটি নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিসের চাহিদা মেটাব। সে দিন অত্যাচারিত, নিগৃহীত কৃষকদের জীবনে এক নতুন ঐশ্বর্যের আলাে বিস্ফারিত হয়ে উঠল! তবু বহু দিনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন কৃষক- সমাজ সহজে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে নি। হাজার দ্বিধা-দ্বন্দের মধ্যে 'দোল খাবার পর তারা ধ্রুব সত্যকে স্বীকার করে নিয়েছিল। কারণ বহু যুগের আত্মকেন্দ্রিক মনােভাব, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রতি পাশবিক মমতা . •••একে ছাড়িয়ে উঠে নতুন সমাজতান্ত্রিক আদর্শে জীবনের গতিপথ নিয়ন্ত্রিত করা নিতান্ত সহজ প্রক্রিয়া নয়। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়ে কৃষিক্ষেত্রে সমগ্ৰীকরণের নীতি প্রথম কার্যকরী করা হল। কৃষকদেরকে নতুন যুগের তাৎপর্য বােঝানো হল, সমাজতান্ত্রিক চেতনার কথা বে নাে হল। উৎপাদন-যন্ত্রের হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের প্রত্যেকটি রীতিনীতিকে যুগোপযােগী করে তুলতে ৩১ হবে একথা কেউ তখনই বুঝল, কেউ দেরীতে বুঝল। যারা তখনই বুঝল তারা অগ্রসর হল যৌথ খামারের কাজে। ১৯২৯ সালে তাই দেখা গেল যে ৪৯ ভাগ (প্রায় কুড়ি ভাগের এক ভাগ) কৃষিক্ষেত্র যৌথ খামারের নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ অন্যান্য কৃষকদের সামনে এই খামারগুলি এক নতুন কৃষিসমাজের ছবি তুলে ধরল। ব্যক্তিগত কৃষিকাজের সঙ্গে সমষ্টিগত কৃষিকাজের তুলনা করবার একটা সুযােগ পেল সাধারণ কৃষকরা। কারা কম পরিশ্রমে বেশী ফসল উৎপন্ন করছে ; কারা বেশী প্রাচুর্য, স্বাচ্ছন্দ ও ঐশ্বর্যের মধ্যে বাস করছে। সাধারণ কৃষকরা উকি মেরে মেরে দেখল, গােপনে এবং প্রকাশ্যে আলােচনা করল, যৌথ খামারের ঐশ্বর্য দেখে দেখে হিংসে করল। বুঝল ওরাই ভুল করেছে তারাই। সমগ্ৰীকরণের তাৎপর্য তারা হৃদয়ংগম কর্তে আরম্ভ করল। অন্যদিকে বাড়তে লাগল যৌথ ঠিক। খামারের সংখ্যা। ১৯৩৪ সালের জানুয়ারী মাসে সােভিয়েট ইউনিয়নের কম্যুনিস্ট পাটির সপ্তদশ অধিবেশনে কমরেড স্টালিন বলেন-“আদর্শস্থানীয় গির্জা, সম্মুখপটে কুলাক, পাদ্রী ও পুলিশদের বড় বড় প্রাসাদ ও পশ্চাৎ পটে কৃষকদের আধ-ভাঙা জরাজীর্ণ কুঁড়ে-ঘর পরিবেষ্টিত পুরােনাে গ্রামগুলি ক্রমে ক্রমে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। তার জায়গায়ে গড়ে উঠছে নতুন গ্রাম, তার বড় বড় বাড়ী, ক্লাব, বেতার, চলচ্চিত্র, স্কুল, গ্রন্থাগার ও শিশু- সদন, তার ট্রাকটর, কম্বাইন, মাড়াইকল ও অন্যান্য যন্ত্র। গ্রামের একসময়কার নামকরা প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি শােষণকারী কুলাক, রক্তশােষক মহাজন, মুনাফাখখার ব্যবসায়ী ও ক্ষুদে বাপ’ পুলিশরা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। যৌথ খামার, সরকারী খামার, স্কুল ও ক্লাবের নেতৃ- ধনী কৃষক ৩২ স্থানীয় কর্মী, ট্রাকটর ও কম্বাইনের প্রধান চালক, গাে-মেষ পালন কেন্দ্রের কর্মী এবং যৌথ খামারের ‘শক-ওয়ার্কার’-এখন এরাই হল গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি। কমরেড স্টালিনের বক্তৃতা থেকে কৃষিসমাজের বিশাল, পরিবর্তনের ছবি চোখে পড়ে। আর চোখে পড়ে এক ক্ষয়িষ্ণু সমাজের ভাঙনের সাথে সাথে এক নতুন সমাজগঠনের গতিছন্দ। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার শেষে ১৯৩৮ সালে শতকরা প্রায় ৯৯৩ ভাগ কৃষিক্ষেত্র যৌথ খামারের অন্তর্ভূক্ত হল। ট্রাকটর, কম্বাইন, মাড়াই কল, ডাইনামাে ও যানবাহনের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল প্রত্যেকটি গ্রাম। কানে এল নতুন মানবতার জন্মের গান। কৃষিক্ষেত্রের সমগ্ৰীকরণ মেয়েদের জীবনেও এক ব্যাপক পরিবর্তন আনলাে। জারের রাজত্বে আইনকানুন ও সামাজিক প্রথার শিকল লাগানো ছিল তাদের সর্বাঙ্গে। কৃষক-মেয়েদেরকে মাঠে ও বাগানে ভয়ানক পরিশ্রম করতে হতাে, গরুবাছুর দেখাশােনা করতে হতাে এবং সংসারের সমস্ত কিছু কাজ করতে হতাে। বাড়ীর কর্তাই ছিল তাদের একচ্ছত্র মালিক ও স্বামীর মারপিট ছিল তাদের দৈনন্দিন পুরস্কার। অশিক্ষা, সাধারণ জ্ঞানের অভার এবং অত্যাচার, পুরােনাে রাশিয়ায় এই ছিল কৃষক-মেয়েদের ছবি। যৌথ কৃষিব্যবস্থা এক ব্যাপক মুক্তির আস্বাদ আনলাে তাদের জীবনে। পুরুষদের সমান নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পাবার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পেল তারা। যৌথ খামারে কাজ অনুযায়ী পুরুষদের সমান বেতন ধার্য হল তাদের জন্যে। ইতিহাসে এই সর্বপ্রথম কৃষক-মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে স্বচ্ছন্দ জীবন যাপনের অধিকারিণী হল । কৃষক-মেয়েরা যৌথ খামারে কী কী কাজ করে থাকে ? (১০) ১৯৩০-৩২ সালে অল্পসংখ্যক মেয়েরাই খামারে কাজ করত, তাও বিশেষ করে ফসল বােনা ও ফসল কাটার সময়ে। ১৯৩২ সালে হিসাব করে দেখা গেছে যে বড় জোর শতকরা ২০-৪০ ভাগ মেয়ে খামারের কাজে নিযুক্ত ছিল, তাও আবার সারা বছর নয়। বাকী মেয়েরা খামারের কাজকর্ম নিয়ে কিছুমাত্র কিছুমাত্র মাথা ঘামাত না। উপরােক্ত যে বিশ-চল্লিশ ভাগ মেয়ে কাজ করত, তারা ছিল 'কাজ-না-জানা কর্মীদের পর্যায়ে। তাদেরকে মাঠের সাধারণ কাজগুলি দেয়া হত। ট্রাকটর কি অন্যান্য যন্ত্র চালানাের ব্যাপারে পুরুষরাই ছিল সর্বজ্ঞ। কারণ তখনও মেয়েরা যন্ত্রবিদ্যা সম্বন্ধে কিছুমাত্র শিক্ষা পায় নি। এমন কি দুধের ব্যবসায় ও গো-মেষ পালনের কাজেও মেয়েরা খুব সামান্য অংশই গ্রহণ করত। পুরুষরাই দেখা শােনা করত গরু বাছুর। আবার তারাই যেত হাটে বাজারে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত মেয়েরা কেবলমাত্র বিশেষ বিশেষ সময়ে খামারে কাজ করত এবং তাও আধা-কাজ-জানা বা ‘কাজ-না-জানা মজুরের কাজ। খামারের আপিস চালনা বা হিসাব লেখার কাজেও অত্যন্ত মুষ্টিমেয় মেয়ে কাজ করত। কিন্তু মেয়েদের এই শৈথিল্য বেশী দিন স্থায়ী হল না। ১৯৩৪-৩৫ সালে সমস্ত কৃষিসমাজ জুড়ে এল এক নতুন স্রোত। প্রত্যেক খামারে দেখা দিল গুণগত ও পরিমাণগত উন্নতি। আরাে বেশী বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষ করার ফলে খামারগুলি দৃঢ় অর্থনৈতিক বনিয়াদের ওপর খাড়া হল; মানুষের সংগঠন-ক্ষমতা বাড়ল। কি ট্রাকটর, কি কম্বাইন কোনাে যন্ত্র চালাবার জন্যে লােকের অভাব রইল না। এই গুণগত ও পরিমাণগত সমৃদ্ধিলাভ মেয়েদেরকে খামারের কাজে আকর্ষণ করবার জন্যে জনসাধারণের দৃষ্টি ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে নতুন ৩১ উৎসাহের আতিশয্যে মেয়েরাও যৌথ খামারের কাজে তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিতে সচেষ্ট হল। আর শতকরা ২০-৪০ ভাগ মেয়ে নয়, ১৯৩৪- ৩৫ সালে ৮০-৮৫ ভাগ মেয়ে নিজেদেরকে খামারের কাজে আত্মনিয়ােগ করল। মেয়েদের এই যােগদানের পেছনে আরেকটা বড় কারণ আছে, সে কারণ হল সাধারণ ভােজনাগার। সে সময়ে রাষ্ট্র থে সে সময়ে রাষ্ট্র থেকে যৌথ খামারের কর্মীদের জন্যে আহারের ব্যবস্থা করার ফলে মেয়েরা রসুইঘরের কাজ থেকে নিষ্কৃতি পেল। তাছাড়া অস্থায়ী শিশুসদন ও কিণ্ডারগার্টেন গঠনের ফলে লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েদের লালনপালন ও শিক্ষার দায়িত্ব সাময়িক- ভাবে সেই সংগঠনগুলির উপর ন্যস্ত হল। এই অস্থায়ী সংগঠনগুলি বিশেষ করে মার্চ থেকে সেপটেম্বর মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যে সময়ে সকলে খামারের কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে। এই কয়েক মাস সাধারণ ভােজনাগার খামারগুলিতে ব্যাপকভাবে আহার পাঠাবার ব্যবস্থা করে । ১৯৩৫ সালে সারা সােভিয়েট দেশে দশ লক্ষ পাচক কৃষি-ভােজনাগারে নিযুক্ত ছিল। পাচকের সংখ্যা থেকেই এর বিরাটত্ব উপলদ্ধি করা যাবে। কয়েক বছরের মধ্যে মেয়েদের কাজের স্তর অপ্রত্যাশিতভাবে উন্নতি লাভ করেছে। কৃষিশালাগুলিও সমস্ত রকম আধুনিক সাজসজ্জা ও যন্ত্রে সজ্জিত হয়ে উঠেছে। নীচের সংখ্যাগুলির আপেক্ষিক বিচার থেকেই যন্ত্রের অবিশ্বাস্য উন্নতির হিসাব পাওয়া যাবে :- ১১ ১৯ ২,৯১৬ ১,২৩,••• ৩,৯৪,••• ট্রাকটর স্টেশন ট্রাকটর-যন্ত্র শতচ্ছেদক যন্ত্র শস্যবাহী-লরি ১৩,৪০০ ১,২৭,৫০০ ৯২,৬০০ নতুন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের আমদানীর সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের কাজের ধারা ও মনােবৃত্তি যে পরিবর্তিত হবে এ অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ নতুন যন্ত্র ও নতুন বৃত্তিই হল কৃষিকাজের গতি নিয়ন্তা। প্রত্যেকটি কর্মীই আজ শিক্ষিত, প্রত্যেকটি যন্ত্রই আজ বৈজ্ঞানিক। আজ থেকে দশ বছর আগে (১৯৩৫ সালে) ৫,৫০,০০০ ট্রাকটর-চালক, ৬৪,০০০ কম্বাইন-চালক, ৮,০০০ মােটরচালক এবং ৭০,০০০ ট্রাকটর-চালক দলের নেতা ও কর্মী:•••••সারা সােভিয়েট দেশে এরাই ছিল কৃষিশালার প্রধান শক্তি। এবং এই সাড়ে সাত লক্ষ কর্মী কিছু দিন আগে পর্যন্ত সাধারণ কৃষক ছিল। ট্রাকটর, কম্বাইন ইত্যাদি যন্ত্র ছিল তাদের কাছে রূপকথার গল্প। আগেই বলা হয়েছে যে নয়-দশ বছর আগে পর্যন্ত মেয়েদেরকে কাজ-ন- জানা শ্রমিকদের দলে কাজ করতে দেয়া হত। আজ কিন্তু তারা কৃষিসমাজের ভেতর একটা বড় আসন দখল করেছে। আগে মেয়েদের সম্বন্ধে অদ্ভুত অবিশ্বাস ছিল পুরুষদের মনে। মেয়েরা ট্রাকটর, কম্বাইন চালাতে পারবে, বড় বড় খামার পরিচালনা করে ‘শক ওয়ার্কার’এর মর্যাদা পাবে••••••এ কথা সহজে বিশ্বাস করত না তারা। অন্দরমহলের নিরীহ মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা করুণার ভাব জেগেছিল সমস্ত স্ত্রী-জাতির ওপর। শুধু পুরুষরাই নয়, অনেক বয়স্থা স্ত্রীলােকও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে যে এ সব কাজ মেয়েদের জন্যে নয়। মেয়েরা অন্য ধাতু দিয়ে গড়া, মেয়েদের জীবনের উদ্দেশ্যও ভিন্ন। সুতরাং ঘরেই তাদের একমাত্র বিস্তৃতি। এই পুরানাে সংস্কার কাটতে সময় নিল। ১৯৩৩-৩৪ সালে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল সবাই যে মেয়েরা মাঠে মাঠে ট্রাকটর, কম্বাইন চালাতে শুরু করেছে। এমন কি ১৯৩৪ সালে একদল মেয়ে ট্রাকটর-চালক পুরুষদেরকে কাজে হারিয়ে দেয় এবং পরে সেই পুরুষরা মেয়েদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করে। পশ্চিম সাইবেরিয়ার টালভস্কি ট্রাকটর স্টেশনের অধিনায়িকা ভি, এম বারদিনার কৃতিত্ব এখানে উল্লেখযােগ্য। ১৯২৬ সালে সে যৌথ খামারে যােগ দেয় এবং ১৯৩১ পর্যন্ত সাধারণ মজুরণীর কাজ করে। ১৯৩১ সালেই সে প্রধান ট্রাকটর-চালকের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। যৌথ কৃষিকর্মীদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সে বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলে—“প্রথমে লােকেরা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল কিন্তু বসন্তকালেই আমি রেকর্ড ভাঙতে সফল হলাম। সাধারণত সবাই ১৮৮ হেটেয়ার জমি ট্রাকটরে চষে থাকে কিন্তু ৩৬• হেটেয়ার জমি চষে আমি জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করলাম।” শুধু এই-ই নয়, বারদিনার সমস্ত জীবনই একটা সাফল্যের ইতিহাস। সে কারণে জনসাধারণ তাকে সােভিয়েট সরকারের সব চেয়ে বড় সংগঠন অল ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কার্যকরী সমিতিতে প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচন ০ এই সময়ে গাে-পালনের কাজেও মেয়েদেরকে আগ্রহ নিতে দেখা যায় । আগে একেকটি মেয়ে পনেরটি গরু দেখাশােনা করত, এখন এক সঙ্গে সাতাশটি গরু দেখাশােনা করতে লাগল। ডেয়ারী ফার্মগুলি উন্নতি লাভ করতে লাগল উত্তরােত্তর। তিন বছরের মধ্যে মেয়ে কর্মীর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের বেশী হল-৩, ৩২, ৩০০। কৃষিসমাজে নতুন স্থান অধিকার করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ববােধ আরও বৃদ্ধি পেল। ১৯৩০ সালের গােড়ার দিকে উত্তর ককেশাসের যৌথ খামারের মেয়ে-কর্মীরা স্টালিনের কাছে এক চিঠিতে লেখে “এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যৌথ কৃষিব্যবস্থা ১৯৩৫ ১৯৩৪ আমাদেরকে কোন্ পথে নিয়ে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে তার তাৎপর্যও আমরা অনুধাবন করেছি। গ্রামের খামারগুলির কর্মীদের মধ্যে এক অদ্ভুত কর্মচাঞ্চল্য ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা লক্ষ্য করতে পারছি•••••• দেখছি মেয়েরা দলে দলে গিয়ে সমাজতান্ত্রিক প্রতিযােগিতায় যােগ দিচ্ছে এবং কাজের মধ্যে এগিয়ে আসছে।” সাল সােভিয়েট কৃষিমেয়েদের জীবনে এক অপূর্ব জয়যাত্রা আরম্ভের বছর। এই বছরে যে পাচশশা মেয়ে বীটের ফসল বৃদ্ধির অভিযানে বার হয়েছিল, তাদের কথা আগেই জানিয়েছি। এই অভিযানের অধিনায়িকা ছিল মেরিয়া ডেমচেংকে। মেরিয়া একজন গরীব চাষীর মেয়ে। প্রথম থেকেই তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। কৃষি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই সে সমাজতান্ত্রিক কৃষি আন্দোলনের পুরােভাগে যােগ দেয়। সালে তার দল আড়াই একর জমিতে ৪৬,৯০০ পাউণ্ড বীট ফলাতে সমর্থ হয়। পরের বছর যৌথ খামারের শকু-ওয়ার্কারদের দ্বিতীয় অধিবেশনে মেরিয়া ডেমচেংকো প্রতিজ্ঞা করে যে আড়াই একর জমিতে তার পঞ্চাশ হাজার পাউণ্ড বীট ফলাবেই। সে এবং তার দল এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেছিল। কিন্তু অনেক কষ্ট স্বীকার কর্তে হয়েছিল তার জন্যে। বসন্তকালে এত তুষার পড়ল যে অর্ধেকের বেশী বিচি নষ্ট হয়ে গেল। গ্রীষ্মকালে দেখা দিল অনাবৃষ্টি.. ••••••১০৬ দিন এক বিন্দু বৃষ্টির দেখা নেই। তারপর ফসল নষ্ট করতে এল পােক। কিন্তু অধ্যবসায়, অমানুষিক পরিশ্রম ও কৃষি-বিজ্ঞানের সাহায্যে তারা সমস্ত বাধা জয় কর্তে সমর্থ হল। ১৯৩৫ সালেই তারা আড়াই একর জমিতে ৫২,৪৫৪ পাউণ্ড বীট উৎপন্ন করে সমস্ত পােভিয়েট দেশকে সচকিত করে দিল। এই সাফল্যই মেরিয়া ডেমচেংকোর প্রধান কৃতিত্ব নয়, তার কৃতিত্ব হল সাধারণ মেয়েদেরকে এই বিশাল আন্দোলনের মাঝখানে টেনে আনায় । কারণ তার সহকর্মীরাই একদিন তাকে অতিক্রম করে চলে গেল। যােলাে বছর বয়স্ক মেয়েদের দলের অধিনায়িকা হানা ভিকা আড়াই একর জমিতে ৫৭,৬০০ পাউণ্ড এবং চৌষটি বছরের বৃদ্ধাদের একটা দল সেই পরিমাণ জমিতে ৬৭, ০০০ পাউণ্ড বীট জন্মাতে সফল হল। বীট-উৎপাদনকারী এলাকার হাজার হাজার চাষীরা এখন মেরিয়া ডেমচেংকোর সঙ্গে এসে দেখা করে কিংবা চিঠি লেখে । কৃষি-বিজ্ঞানই হল শ্রেষ্ঠ ফসল ফলনের প্রধান হাতিয়ার—এই হাতিয়ারের ওপরই জোর দেয় মেরিয়া। কারণ “কৃষি-বিজ্ঞানের সাহায্য ছাড়া বীটের ফসল ও ভালাে হবে না এবং তাতে চিনির পরিমাণও যথেষ্ট থাকবে না। তােমরা খামারের উন্নতির জন্যে মন প্রাণ দিয়ে পরিশ্রম করে, কৃষি-বিজ্ঞান সম্বন্ধে পড়াশােনা করাে, খামারে আপনিই ভালাে ফসল ফলবে।” সােভিয়েটের কৃষক-মেয়েরা শুধু যে ট্রাকটর চালনায় দক্ষতা অর্জন করেছে তাই নয়। কম্বাইনের মতন জটীল যন্ত্র চালাতেও শিখেছে তারা। ১৯৩৫ সালে কম্বাইন পিছু ৪০০-৪৫০ একর জমি তৈরী করা যেত। সে জায়গায়ে আমেরিকায় একজন চাষী ৫৭৭২ একর জমি তৈরী করিতে পারত। কিন্তু ১৯৩৫ সালেই সােভিয়েট দেশের বীর কৃষক-মেয়েরা আমেরিকার রেকর্ড অতিক্রম করে বহুদূর এগিয়ে যায় । সারাটভ, জেলার মেরিয়া পেট্রোভা ১,৩৬০ একর জমি প্রস্তুত করে । নিপ্রােপেট্রভঙ্ক, জেলার এভড়ােকিয়া ভিনিক করে ১,২০২২ একর জমি সেই জেলারই আরেকটি মেয়ে সুখিনা করে সকলের বেশী-১,৮২০ একর জমি। এই অদ্ভুত সফলতা থেকে প্রমাণিত হয় যে মেয়েরা পুরুষের তুলনায় কোনাে অংশে ছােট নয়। সােভিয়েট দেশের মতন যে কোনাে দেশের মেয়েরা তাদের মােগ্যতার প্রমাণ দিতে পারে যদি বর্তমান সমাজব্যবস্থার অন্ধ কুঠরী থেকে মুক্তি পায় তারা। তারা। কারণ এই কাইনের মতন জটীল যন্ত্র মেয়েরা চালাতে পারবে এ কথা ভাবতেই পারত না মুজিকরা। সবেমাত্র ১৯৩০ সালে যৌথ খামারের মাঠে মাঠে তারা দেখতে পেয়েছিল এই অত্যাশ্চর্য যন্ত্র। বীটের ফসল' বৃদ্ধির ব্যাপারেই যে মেয়েরা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে তাই নয়, শণ তৈরীর কাজেও তাদের কর্মনিষ্ঠা সত্যিই কৌতুহলপ্রদ। পৃথিবীর যে সব দেশে বিপুল পরিমাণে শণ উৎপন্ন হয় তাদের মধ্যে সােভিয়েট দেশ হল অন্যতম। সেখানে সাধারণত একটি লােক দিনে ১৭২ পাউণ্ড শণের আঁশ তুলতে। ১৯৩৫ সালের অক্টোবর মাসে আনা ভিরােবয়েভা ৭৫ পাউণ্ড শণের আঁশ তুলতে পেরে সবাইকে আশ্চর্য করে দেয়। তার নেতৃত্বেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। তার পরেই যৌথ খামারের চাষী-রাসােজিনা ও রােগগাসিনা যথাক্রমে ২৪২ ও '২৪৪২ পাউণ্ড আঁশ উৎপাদন করে। স্টাখানােত আন্দোলনের পেছনে রয়েছে এক নতুন পদ্ধতির শিক্ষা ও প্রেরণা। শণের আগামী ফসলের পরিকল্পনা করা কালে যৌথ খামারের এক কৃষক-মেয়ে মলিয়াকোভা বলে-“আমরা প্রত্যেকটি বিষয় ভেবেছি এবং কৃষি-বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলােচনা করেছি। আমরা সমস্ত ভালো ভালাে রাসায়নিক সারদ্রব্য ব্যবহার করেছি ; বৈজ্ঞানিক মতে জমি পছন্দ করেছি। আর অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বিচি বাছাই করেছি যাতে একটা দাগ ওলা বিচিও না থাকে। এই পদ্ধতি ও এই বৈজ্ঞানিক-দৃষ্টি সম্পন্ন মেয়েটির সঙ্গে জারের যুগের একটুখানি তুলনা করে দেখলে দেখা যাবে যে এক তিমিরাবৃত জনপদের ওপর নতুন সূর্যের আলাে এসে ঝলসিয়ে উঠেছে। ৪০ | গাে-পালন সম্বন্ধে দু একটি কথা এখানে বললেই যথেষ্ট হবে। রেড ডন’ যৌথ কৃষিশালার নাদেজা পারসিয়ান্টদেভা ও কাথারিন নাটোভাই গাে-পালনে প্রথম স্টাখানাে আন্দোলন শুরু করে। আগে সাধারণত সােভিয়েট ইউরােপে বছরে একটি গরু প্রতি ২৪৫ গ্যালন (১,১০০ লিটার) দুধ পাওয়া যেত। এদের নেতৃত্বে আন্দোলন হওয়ার ফলে-গরু পিছু ৬৬৭ গ্যালন (৩,০২ লিটার) দুধ পাওয়া গেল। অন্যান্য খামারের মেয়েরা অত্যন্ত খুসী হল এদের ফলাফল দেখে। জার্মান ভঙ্গ রিপাবলিকের খামারের একটি মেয়ে ই, ক্রাউবার্জার তার ছয়টা গরুর প্রত্যেকটি থেকে বাৎসরিক ৯৮৩ গ্যালন দুধ আদায় করতে সমর্থ হয়। সমস্ত দেশে আলােড়ন পড়ে যায় এই নিয়ে। এই জার্মান মেয়েটির সাফল্য খামারের প্রত্যেকটি মেয়েকে সমাজতান্ত্রিক প্রতিযােগিতায় এক নতুন অনুপ্রেরণা জোগায়। এবং একদিন ঐ জার্মান মেয়েটিকে অতিক্রম করে তাসিয়া প্রােকোভয়ে সবার সামনে এক নতুন রেকর্ড উপস্থিত করে। একটি দুটি নয়, তার খাটালের প্রত্যেকটি গরুর থেকে সে বাৎসরিক ১,৩৯৮ গ্যালন দুধ পেতে সফল হয়। প্রতিযােগিতায় তাসিয়াই অপরাজেয় আসনে বসবার সম্মান লাভ করে। এখানে বুঝে দেখতে হবে যে এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের পেছনে কোনাে যাদু নেই, কোনাে ভূত বা ভগবানের তপস্যা করেও এই বরপ্রাপ্তি ঘটে নি। মানুষ তার নিজের জনচেতনা, বাস্তববােধ, আত্মবিশ্বাস ও সমবেত চেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধার ফলেই তার প্রয়ােজন ও ইচ্ছা অনুযায়ী ফলাফল সৃষ্টি করতে পেরেছে। খামারের প্রত্যেকটি কাজকর্মে মেয়েদের কৃতিত্ব প্রমাণিত হওয়ায় তারা খামার পরিচালনার ব্যাপারেও বড় বড় পদের অধিকারিণী হয়েছে। কমিটির সভ্যা, সভানেত্রী, সহ সভানেত্রী, দলের অধিনায়িকা এমনি ১১ কত উচ্চ সম্মানে মেয়েরা আজ সম্মানিত। বর্তমানে সম্মানিতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং দায়িত্বশীল কাজে মেয়েরা কখনও অযােগ্যতার পরিচয় দেয় নি। এবারে গ্রামে শিক্ষাদীক্ষা প্রসারের কথা। জারের আমলে চাষীদের অবস্থা কোন্ শুরে ডুবে ছিল তার কিছু পরিচয় আগে দেয়া হয়েছে। শিক্ষার দিক থেকে তাে সম্পূর্ণ অন্ধকারে তলিয়েছিল গ্রামাঞ্চলের লােকেরা। কিন্তু আজ সােভিয়েট দেশের সদূরতম অঞ্চলে গিয়ে পৌচেছে শিক্ষার আলো। মেয়েরা গিয়ে ভীড় করেছে ইস্কুলে, শিল্প শিক্ষালয়ে, শ্রমিকদের শিক্ষায়তনে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯১৭ সালের আগে শহরে এবং গ্রামে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ইস্কুলে পড়ত এমনি ছেলেমেয়েদের মােট সংখ্যা ছিল আটাত্তর লক্ষ। এই ছিল সারা রাশিয়ায় ইস্কুল-যাত্রী ছেলেমেয়েদের সংখ্যা। সে জায়গায়ে সােভিয়েট সরকারের আওতায় ১৯৪০ সালে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন কোটিতে। ১৯৩৩-৩৪ সালে মােট ৬০,৪০০ ক্লাবের মধ্যে ৫৩,৯০০টি ছিল গ্রামাঞ্চলে । এ থেকে পৃথিবীর লােক কী বুঝবে? বুঝবে একেকটি গ্রাম হল সােভিয়েট ইমারতের একে কটি ইট। কারণ গ্রামের অর্থনৈতিক বনিয়াদের সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক ভিতও গাঁথা হয়েছে মজবুত করে। আজ প্রত্যেকটি গ্রামে সিনেমা, থিয়েটার, ক্লাব, গ্রন্থাগার, বৈদ্যুতিক আলাে, রেল লাইন ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক আকারে। সােভিয়েটের গ্রামগুলি একেকটি ছােট ছােট শহর হিসাবে গড়ে উঠেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে আর কাউকে কষ্টভােগ করতে হয় না। মেয়েরা জীবনে এই সর্বপ্রথম শিক্ষিত জীবন যাপনের সুযোেগ সুবিধা পেয়েছে। আগের দিনে তারা ইস্কুল কলেজ, বই পত্র, আমােক প্রমােদ সব কিছুর আস্বাদ থেকে বঞ্ছিত ছিল। তার ওপর তারা ছিল দরি; 82 নিগৃহীত। গ্রীষ্ম, বর্ষা শীত সমানে তাদেরকে পেটের ধান্ধায় ঘুরতে হতাে। জীবিকাকে বাদ দিয়ে অন্য কিছু চিন্তা করবার অবসর পেত তারা। যৌথ খামারের ফলে অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমতার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জাবনে বিকাশ লাভ করেছে এক নতুন চেতনা। বালির নীচে ঢাকা পড়ে শুকিয়ে গিয়েছিল যে স্রোত তা আবার প্রাণচাঞ্চল্যে শ্রোতস্বিনী হয়ে উঠেছে। সােভিয়েট রাষ্ট্রের তরফ থেকে কখন কখনও অনুসন্ধান করে দেখা হয় যে কৃষকরা কী ভাবে সময় কাটাচ্ছে••••••কতটা সময় তারা কাজে ব্যয় করে এবং কতটা সময় বিশ্রাম করে। এই সংখ্যা থেকে সােভিয়েট কৃষিজীবনের এক দিককার ছবি স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। ১৯২৩ সালে সােভিয়েট দেশে যৌথ কৃষিপ্রথা প্রবর্তিত হয় নি। হয় নি। তখনও কৃষকরা নিজেদের ছােট ছােট জমিতে আলাদা আলাদা ভাবে চাষ করছিল। সে সময়ে বিস্তৃত খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় যে চব্বিশ ঘণ্টা সময় চাষীরা নিম্নলিখিত ভাবে ব্যায় করতঃ- ক্ষেতের কাজকর্ম ১১ ঘন্টা ৫১ মিনিট ব্যক্তিগত বা সংসারিক কাজ বিশ্রাম নিদ্রা ১৯২৩ সালে একজন বিবাহিতা কৃষক-মেয়ে কী ভাবে সময় ব্যয় করত তার খবর আরেকটি হিসাব থেকে পাওয়া যায়। তখন প্রয়ােজন মতাে ঘুমােবার সময় পর্যন্ত পেত না তারা। সে কারণে নীচের সংখ্যাগুলি ভালাে করে বিচার করে দেখবার প্রয়ােজন আছে : ক্ষেতের ও সংসারের কাজ ১৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট বিশ্রাম নিদ্রা ৫৮ ৪৩ ১ ০৩ স ১৯৩৬ সাল। তখন শতকরা নিরানব্বই ভাগ জমি যৌথ-প্রথায়, চাষ হচ্ছে। সারা দেশ সরগরম হয়ে উঠেছে যন্ত্রের কোলাহলে ও মানুষের পদশকে। সে সময়ে অনুসন্ধান করে যে তথ্যগুলি পাওয়া যায় আপেক্ষিক বিচারের জন্যে সেগুলি নীচে দেয়া গেল :- ক্ষেতের কাজকর্ম ৮ ঘণ্টা ২৩ মিনিট ব্যক্তিগত বা সাংসারিক কাজ ২৪ বিশ্রাম ৫ २१ নিদ্রা ৭ 8२ ১৯২৩ আর ১৯৩৬। ওপরের তথ্যগুলােকে তুলনামূলক বিচারের মাপকাটিতে ফেললেই বোঝা যাবে সােভিয়েট দেশ কোন্ দিকে মােড় নিয়েছে। ১৯২৩-এর তুলনায় বর্তমানে কৃষকরা কী পরিমাণ সুখ, স্বাচ্ছন্দ ও প্রাচুর্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বিচারের ব্যারােমিটারেই তা ধরা পড়বে। আজ অনেক বেশী বিশ্রাম পাচ্ছে সােভিয়েট চাষীরা। এই বিশ্রামের সময়ে তারা পড়াশােনা করে, সামাজিক কাজকর্ম করে। থিয়েটার সিনেমা দেখে, আমােদ প্রমােদের মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে দেয়। গ্রীষ্মকালে আরাে কম পরিশ্রম করে বলে সবাই আরাে বেশী বিশ্রাম করে। সােভিয়েট কৃষিসমাজের বিশাল পরিবর্তন থেকে একটা জিনিস অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নজরে পড়ে যে শহর ও গ্রামের মধ্যে যে পার্থক্য সােভিয়েট দেশে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞানের প্রসার, যন্ত্রের অগ্রগতি এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা—এদের সামনে শহর ও গ্রামের মধ্যবর্তী প্রাচীর ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ এই দুইয়ের মধ্যে যে ফাক আর কাকি তা ভরাট করে দিয়েছে কমুনিস্ট সরকার। বহু যুগ যুগান্ত ধরে শহর ও গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ, বিদ্বেষ ও ঘৃণায় যে শক্তির s3 অপচয় হচ্ছিল তার সত্যিকার মীমাংসা সম্ভব হয়েছে। আজ আর গ্রামের ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে শহরের লােকেরা তামাসা করে না, তাচ্ছিল্য করে না। ফাক আর ফাকি, কোনাে অসঙ্গতিই আজ আর গ্রাম্য জীবনে অবশিষ্ট নেই। যৌথ কৃষিসমাজে এক কোটি নব্বই লক্ষ কৃষক-মেয়েৱা হল একটা বিরাট সামাজিক শক্তি। তাই এই মেয়েদের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে স্টালিন এক জায়গায়ে বলেছেন “যৌথ কৃষিকাজ নারীজাতিকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তার অধিকার দিয়েছে। আজ আর সে মেয়ে হিসাবে তার বাপের জন্যে বা স্ত্রী হিসাবে তার স্বামীর জন্যে কাজ করছে, না, সে কাজ করছে সর্বাগ্রে তার নিজের জন্যে। এই হল কৃষক-মেয়েদের মুক্তির গােড়ার কথা। এই হল যৌথ কৃষিব্যবস্থার মুলতত্ব যা একজন মেয়েকে একজন পুরুষের সঙ্গে সমান জায়গায় দাড়াবার অধিকার দিয়েছে।”

জাতিগঠন ও শানকার্যে মেয়েদের স্থান একজন মেয়ের পক্ষে দক্ষতা অর্জন করার জন্য প্রথমেই টেকনিক্যাল শিক্ষা গ্রহণ করা দরকার। এর পর দক্ষতার ক্ষেত্র আরও বিরাট, আরও প্রশস্ত। কারণ প্রাথমিক টেকনিক্যাল শিক্ষা পাওয়ার পর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা চলতে পারে। সর্ববিশেষজ্ঞ, ইঞ্জিনীয়ার, যন্ত্রবিদ, ফোরম্যান, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, আইনজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানের কত রকম শাখা প্রশাখা•••যে কোনাে দিকে মেয়েদের পারদর্শিতা প্রমাণের পথ খােলা আছে। মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের ছাত্র-ছাত্রীরা বিশেষ শিক্ষা পেয়ে থাকে। কিন্তু এমন অনেক কল-কারখানা আছে যেখানে সাধারণ শ্রমিকরা বিশেষ রকম শিক্ষা না পেয়েই নিজেদের পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে এবং উচ্চ পদে উন্নীত হয়েছে। এই সব কর্মীদের জন্যে সােভিয়েট রাষ্ট্র থিয়ােরিটিকাল শিক্ষার সুবিধা করে দিয়েছে যাতে তারা আরও উন্নতি করতে পারে। বুদ্ধিজীবী জগতে সােভিয়েটের মেয়েরা কী রকম অংশ গ্রহণ করে তা জানবার জন্যে আমাদের দেশের মেয়েরা স্বভাবতই অত্যন্ত আগ্রহশীল। সেভিয়েট মেয়েরা কি ইঞ্জিনীয়ারিং বা যন্ত্রবিদ্যায় পারদর্শিণী ? মাধ্যমিক ও উচ্চ স্কুলে মেয়েদের পড়বার জন্যে কি বিশেষ কোনো ব্যবস্থা আছে ? এমনি কত প্রশ্ন তাদের মধ্যে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছে। জারের ঐতিহাসিক রাজত্বে শিক্ষার দরজা ছিল মেয়েদের জন্যে বন্ধ। মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে, বহির্জগতে আত্মপ্রকাশ করবে—এ কথা কেউ স্বপ্নেও আনতে পারতাে না। ১৯০৫ সালের পর অবিশ্যি মেয়েরা ৪) কিছু সুবিধা আদায় করতে পারে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মাত্র তিনটি উচ্চ শিক্ষায় ছিল সারা রুশ সাম্রাজ্যে, মস্কোতে একটি ও পিটার্সবুর্গে দুটি-প্রথমটি সাধারণ স্কুল ও দ্বিতীয়টি মেডিকাল স্কুল। ১৯০৫৬ সালে বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে নারী জাগরণের স্রোত আরও ব্যাপক রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল। শিক্ষা রাজধানীর গণ্ডী ছাড়িয়ে তাই ওডেসা, খারকভ, কিয়েভ, কাজান ও অন্যান্য প্রদেশে বিস্তার লাভ করল। ১৯০৯ সালে সেন্ট পিটার্সবুর্গে উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছে এমন ছাত্রীর সংখ্যা হল ৫,৭৭০। তাও সাধারণ স্কুলশিক্ষা, কোনাে রকম বিশেষ শিক্ষা নয়। বিশেষ শিক্ষার মধ্যে অত্যন্ত অল্প সংখ্যক ছাত্রী চিকিৎসা- শাস্ত্র, আইনবিদ্যা ও কৃষি-বিদ্যা অধ্যয়ন করছিল। প্রাক-বিপ্লব যুগের শিক্ষা সম্বন্ধে আরেকটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য যে সে যুগে কেবলমাত্র অর্থশালী পরিবারের মেয়েরাই স্কুলে যেতে পারতাে। সাধারণ কৃষক বা শ্রমিক ঘরের ছেলে- মেয়েদের এমন কি উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের অভিভাবকদের শিক্ষকের ফি জোগাবার সামর্থ ছিল না। যে সব মেয়েরা শিক্ষায়তন থেকে লেখাপড়া শিখে বের হতো তারা শিক্ষয়িত্রীর কাজ পেত। কারণ সে সময়ে অল্প বেতনে শিক্ষয়িত্রীর কাজ সংগ্রহ করা এমন কিছু দুঃসাধ্য ছিল না। ১৯১২ সালে একমাত্র মস্কো শহরেই একশো জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৪ জন ছিল শিক্ষয়িত্রী অর্থাৎ সংখ্যায় সাড়ে দশ হাজার। এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষয়িত্রী। এ ছাড়া শতকরা ১৫ জন ছিল ডাক্তার আর বাকী যারা তারা ছিল ধাইয়ের কাজে বা আরও ছােটখাটো কাজকর্মে। এ হল রাজধানীর অবস্থা। মফস্বল শহরে মেয়েরা বড় একটা এ ধরনের কাজ করত না বললেই চলে। D ৪৭ প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে যখন পুরুষরা যুদ্ধের ময়দানে সৈন্ঠ হয়ে চলে গেল তখন মেয়েদেরকে নানান কাজকর্মে গ্রহণ করা হল। লােকজনের ভয়ানক অভাব, সুতরাং সেদিন মেয়েদেরকে এ সুযােগ না দিয়ে শাসকদের কোনাে গত্যন্তরও ছিল না। অন্যদিকে মেয়েরাও এই ফাকে বৃহত্তর কর্মজীবনে প্রবেশ করে তাদের ক্ষমতা প্রকাশের সুবিধা পেল। তারপর এল সমস্ত কিছু পরিবর্তনের পালা। বিপ্লবের সম্মার্জনীতে সমাজের যত সব অন্যায় অসাম্য ঝেটিয়ে দূর হয়ে যাবার জোগাড় হল। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ সমস্ত রকম বাধা নিষেধের দেয়াল চূর্ণ করে মেয়েদের জন্যে খুলে দিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার প্রবেশপথ। সমাজের অভুক্ত, অশিক্ষিত কিশােরীদের ডাক এল শিক্ষালয় থেকে। সে দিন 'আর পয়সাওলা লােকেদের ছেলেমেয়ে নয়, সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত সমাজের আঙিনা থেকে হাজার হাজার শিক্ষাগ্রহণেচ্ছু ছেলেমেয়েরা জড়াে হল স্কুলের আশে পাশে। একেকটি প্রেমিথিউসের মন চঞ্চল হয়ে উঠল বৃহত্তর পৃথিবীকে চেনবার ও জানবার জন্যে। সাধারণ শিক্ষালয়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠল বিশেষ রকম স্কুল যেখানে কেবলমাত্র চাষী মজুরের ছেলেমেয়েরাই পড়বে। এই রকম ইস্কুলগুলিকে বলা হতাে র্যাবফাক (Rabfak) অর্থাৎ ওয়ার্কাস ফ্যাকাটি। এখানে তিন-চার বছরের কোর্সের সাহায্যে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়-পূর্ব শিক্ষা দেয়া হতাে। এবং দেখা গেছে এই শিক্ষা সােভিয়েট সমাজে এক নতুন ধরনের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর জন্ম দিয়েছে। ১৯২৬ সালের তথ্য বঁটিলে দেখা যায় যে তথন সােভিয়েট রাষ্ট্ৰচালনার কাজে ও টেকনিক্যাল কাজেকর্মে মেয়েরা একটা বিশেষ স্থান অধিকার করে বসেছে। পরের পাতায় সংখ্যাগুলি দেয়া গেল :- ৪ ৮০০ রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে টেকনিক্যাল কাজকর্মে কৃষিবিদের পদে ৭০০ আইনজ্ঞের কাজে আসলে কিন্তু একটা বিরাট উন্মাদনা চোখে পড়ল প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রবর্তনের ভেতর দিয়ে। এই পরিকল্পনাকে সফল করে ভােলার জন্যে ডাক পড়ল দেশের বৃহত্তর মানব গােষ্ঠীর কারণ প্রত্যেকটি নারী পুরুষের সহযােগিতা ব্যতীত এই অতিকায় পরিকল্পনাকে কাজে পরিণত করা কোন দিনই সম্ভব ছিল না। দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে নিজেদের সমস্ত ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র বােধ বিসর্জন দিয়ে এগিয়ে এসেছিল বলেই সফল হয়েছিল পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনা। অন্য কোনাে পুঁজিবাদী দেশে এই, মানবিক বোধ, সমাজতান্ত্রিক সমাজ চেতনা ও যৌথ সহযােগিতা সম্ভব নয়। কারণ যে দেশের মানুষ জাতিতে জাতিতে বিচ্ছিন্ন, শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভক্ত, ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষে আচ্ছন্ন, অর্থের পরিমাণ বিচারের ওপর যে দেশে মানুষের উচ্চ নীচতা নির্ভরশীল, সে দেশে কী করে জন্ম নেবে সমাজ চেতনা ? যে দেশের অধিকাংশ মানুষ পেট ভরে খেতে পায় না, চিকিৎসার অভাবে হাজারে হাজারে মারা যায়, বস্তি-জীবনই যাদের কাছে ঐশ্বর্যের চরমতম প্রকাশ, বেকারত্বের বিভীষিকায় ভীত মানুষ যে দেশে কারখানার দোর থেকে দোরে তাড়া খেয়ে বেড়ায়, সে দেশের মানুষ কিসের ভরসায় এগিয়ে আসবে যৌথ সহযােগিতার ইচ্ছায়। কিন্তু সােভিয়েটের মেয়েরা এগিয়ে গিয়েছিল নিজেদের ইচ্ছায় কারণ তারা বুঝেছিল যে সমাজের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে তারা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। প্রথম পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার ফলাফলের দিকে তাকালেই তার প্রমাণ ৪ (১০) । মিলবে। পাঁচ বছরের মধ্যে সংখ্যা কী ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার খবর নীচে দেয়া গেল :- ১৯২৮-এর শেষে ১৯৩৩-এর প্রথমে মেয়ে-ইঞ্জিনীয়ার ও অন্যান্য সুদক্ষ কর্মী ১,৪৬,০০০ ৩,৭৫, শিক্ষয়িত্রী ২,১১,৫০০ ৩,৮৭,২০০ মেয়ে-চিকিৎসক ১,৩৫,৫০০ ২,১১,০০০ ০ ৪,৯৩,০০০ ১,৩২০ মােট সংখ্যার দিকে দেখলে দেখা যাবে যে শতকরা প্রায় একশাে ভাগ কর্মী এই পাঁচ বছরের মধ্যে গড়ে উঠেছে যারা সত্যি সত্যিই জাতি গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে সক্ষম। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার হিসাব নিকাশ নিলে আরও অবাক লাগে। ১৯৩৩-এ যে মেয়ে ইঞ্জিনীয়ার ও সুদক্ষ কর্মীর সংখ্যা ছিল পৌনে চার লক্ষ, ১৯৩৫ সালের জুলাই মাসে তা হল পাঁচ লক্ষ। সংখ্যাগুলির দিকে চাইলে মনে হয় যেন মানুষ গড়া চলেছে বিদ্যুতিক গতিতে। যেন জ্ঞান-আহরণ নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছে। কে আগে শিখবে, কে আগে মানুষ হবে, কে আগে তার বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দেবে—এই নিয়ে একটা প্রতিযােগিতা। কিন্তু এই প্রতিযােগিতা সারা পােভিয়েট দেশ জুড়ে ব্যাপকভাবে দেখা দিল। স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিল্প-শিক্ষালয়ে-কোথায় নয়••দলে দলে মেয়েরা ভর্তি হওয়ার জন্যে আবেদন জানালাে। শহরের মেয়েরা নয়, দূর দূর গ্রামের মেয়েরা যারা কিছু বছর আগে পর্যন্ত লেখাপড়ার কথা মনেও আনতে পারত না, তারা তাদের কাছাকাছি শিক্ষায়তনে গিয়ে উপস্থিত হল। যেন যাদুঘর দেখতে এসেছে, এমনি কৌতুহল এমনি বিস্ময় তাদের দু চোখে, এমনি অপরিমেয় উন্মাদনা তাদের মনে। কলকারখানায়, ক্ষেত খামারে, ট্রাম ও রেলগাড়ী চালনায়-শুধু এসব কাজকর্মেই নয়, রাষ্ট্রের পরিচালনা-যন্ত্রের মধ্যেও মেয়েরা উল্লেখযােগ্য পরিমাণে অংশ গ্রহণ করল। আপিসের সমস্ত কাজকর্মে, বড় বড় দোকান—( সবগুলিই রাষ্ট্রের অধীন ) পরিচালিকার পদে এবং রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সমস্ত প্রতিষ্ঠানে মেয়েরা তাদের অনধিকৃত অধিকার * দখল করে বসল। রাসায়নিক পরীক্ষা-ঘরে বিশেষ করে যন্ত্র নির্মাণ শিল্পে, মেয়েরা তাদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। দেখিয়েছে রাসায়নিক পরীক্ষার ব্যাপারে -মেয়েদের দৈন্ত প্রকাশ করার কিছু নেই। তারাও চেষ্টা করলে বড় বড় রাসায়নিক, বড় বড় বৈজ্ঞানিক হতে পারে। তাছাড়া ছােট ছােট কলকারখানায় পরিদর্শনের কাজে মেয়েরাই হল অগ্রণী। ১৯৩৮ সালের একটা হিসাব থেকে পরিস্কারভাবে জানা যায় মেয়েরা সােভিয়েট সমাজে কত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। পাঠকদের অবগতির জন্যে তা উদ্ধৃত করা হল - শতকরা হিসাব পুরুষ বড় বড় শ্রমশিল্পে (১৯৩৭) ৩৯, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ৩৪% বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩১% ৫৬৯% চিকিৎসাশাস্ত্রে ৫০-৬০ ৪৯°৪% শিক্ষাজগতে ৬৪৮% ৩৫২% ভারতবর্ষে কিছু বছর আগে পর্যন্ত মেয়েদের ভােট দেয়ার কোনাে অধিকার ছিল না। শ্রীমতি সরােজিনী নাইড়র প্রাণপণ চেষ্টায় এবং নারী আন্দোলনের চাপে ১৯২৩ সালে মনটেগু চেমসফোর্ড রিফ বিলে এদেশের মেয়েরা সব প্রথম ভােট দেয়ার অধিকার মেয়ে ৬০২% ৬৬% পায় এবং তাও অত্যন্ত সীমাবদ্ধভাবে। ১৯৪৬ সালের ভারতীয় নির্বাচনের হিসাব পর্যালােচনা করলে জানা যাবে যে শতকরা মাত্র চোদ ভাগ মেয়ে ‘ভােটার হিসাবে সরকারী বইয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। সােভিয়েট দেশে কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাই অন্য রকম। সে দেশে যে কোনাে মেয়ে যার আঠারাে বছর বয়স পূর্ণ হয়েছে সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে এবং তােট দিতে পারে। অর্থাৎ দেশ-শাসনে মেয়েদের অধিকার ও দায়িত্ব পূর্ণমাত্রায় স্বীকৃত হয়েছে । সােভিয়েট দেশে যা “সর্বোচ্চ শাসন পরিষদ”—যাকে ও দেশের লােকেরা সুপ্রীম সােভিয়েট বলে, সেই পরিষদের সভ্য সংখ্যা হল ১১৪৩ জন ; এর মধ্যে ১৮৯ জন হল মেয়ে ডেপুটি। এ সম্মান পৃথিবীর অন্য কোনাে দেশের মেয়েরা পায় নি। সবচেয়ে সভ্য, শিক্ষিত এবং নারী প্রগতির দেশ বলে যে দেশ গর্ব করে, সেই ইংলণ্ডেও প্রথম মহাযুদ্ধের আগে পর্যন্ত মেয়েরা নিবাচনের সময়ে কোনো ভােট দিতে পারত না। সে কারণে মেয়েদেরকে প্রচণ্ড আন্দোলন (যা সাফ্রেজিস্ট আন্দোলন বলে খ্যাত) চালাতে হয়। পুলিশের লাঠি, কারাবরণ, অনশন ও হাজার রকম অত্যাচার সহ্য কর্তে হয় তাদেরকে সাধারণ ভােটের দাবী আদায় করবার জন্যে। প্রত্যেকটি বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভােট দেবে’ এ কথা স্বীকার করতে রাজী নয় পুঁজিবাদী দেশের শাসকরা। কারণ তারা জানে যে সাধারণ মানুষকে ভােট দেয়ার অধিকার দিলে তাদের রাজত্ব বেশী দিন টিকবে না। ভােটের অধিকার মানুষকে রাজনীতি-সচেতন করে তুলবে এবং সেই অধিকারের জোরে তারা একদিন কায়েম করবে জনসাধারণের নিজের সরকার। এই ভয়, এই আশংক। সােভিয়েট দেশে নেই। কারণ তারা সে যুগকে উত্তীর্ণ করে নতুন যুগে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে যেখানে জনসাধারণই মহিলা ম্যাদাম মেয়ে ব, সব কিছুরই মালিক। ছােট বড় শ্রেণীর সহস্র রকম দড়িদড়া ছিন্ন ভিন্ন করে উড়িয়ে দিয়েছে তারা। সােভিয়েট শাসনব্যবস্থায় যে সব মেয়েরা উচু আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে এখানে তাদের হিসাব নেয়া প্রয়ােজন। পৃথিবীর মধ্যে সর্বপ্রথম নারী- প্রতিনিধি (ambassador) হলেন একজন রুশ কোলােটায়। ইনি বহুদিন সুইডেনে প্রতিনিধিত্ব করেন। সর্বোচ্চ শাসন পরিষদের সভাপতিদের মধ্যে দুজন হলেন সভানেত্রী। সােভিয়েট অব দি ন্যাশনালিটিজ-এর সহ সভানেত্রী হলেন আজারবাইজানের মেয়ে আনােভা। সুদূর মধ্য এশিয়ার অঞ্চল থেকে সভানেত্রী হিসাবে, এসেছেন চুভাষ-মেয়ে আন্দ্রিয়েভা, ইয়াকুট-মেয়ে সিডােরােভা ও বারিয়াৎ- মঙ্গোল মেয়ে সাইজিনােভা। তারা সবাই ছােট ছােট জাতির জারের আমলে যে সব জাতিদের বলা হতে মধ্যযুগের মানুষ। সােভিয়েট দেশের ষােলােটি রিপাবলিকের মধ্যে পাঁচটি হল সােভিয়েট এশিয়ার—যে এশিয়া বিপ্লবের আগে পর্যন্ত ছিল জারের কলােনি, যে এশিয়া শশাষিত ও নিপীড়িত হত আমাদের ভারতবর্ষের মতন। এই . এশিয়ার মেয়েরা ডুবে থাকত ‘ পাঞ্জা’র আড়ালে, বাইরে আত্মপ্রকাশ করার কোনাে অধিকার ছিল না তাদের। কিন্তু তাদের দেশেরই তুর্কমেন-মেয়ে কেরেজায়ে হল তুর্কমেন সােভিয়েটের বিচার বিভাগের পিপলস্ কমিশার, তাদের দেশেরই খিরগিজ মেয়ে কারা কুলােভা হল খিরগিজ সােভিয়েটের বিচার বিভাগের সহকারী পিপলস্ কমিশার। ১৯০৯ সালের কথা। সে সময়ে একাটেরিনা ক্লিশিটজ নামে একটি মেয়ে আইন পাশ করে সহকারী এটর্ণির পদে সেন্ট পিটার্সবুর্গ বার এসােসিয়েশনে যােগ দেয়। এই নিয়ে তুমুল আলােড়ন সৃষ্টি হয় সমস্ত রাশিয়ায়। একদিন সেই মেয়েটি একটি ফৌজদারী কেসে আসামীর পক্ষ সমর্থন করতে ওঠায় প্রসিকিউটার তাতে আপত্তি জানায়। কারণ মেয়ে- এটর্ণির স্থান নাকি আদালতে হওয়া উচিৎ নয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রসিকিউ টারটি প্রতিবাদে ঘর ছেড়ে চলে যায়। সমস্ত ব্যাপারটি উচ্চতর পরিষদে বিচারের জন্যে পাঠানো হয়। এবং সেখান থেকে ঘােষণা করা হয় যে ভবিষ্যতে কোনাে মেয়ে আইনজ্ঞের পেশা গ্রহণ করতে পারবে না। একাটেরিনাকে বাধ্য হয়ে সে কাজ ত্যাগ কর্তে হয় । কিন্তু বর্তমান সমাজ তাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে। আজ একাটেরিনা একজন অধ্যাপিকা, ব্যবহারবিদ্যার বিশেষজ্ঞ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা গৃহের সভা, মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার, বৈদেশিক বাণিজ্য ইনস্টিটুটের আইন বিভাগের বড় পদাধিকারিণী এবং ব্যবসায়ী পরিষদের একজন সক্রিয় কর্মী। ১৯৪০ সালের ১লা জানুয়ারীর সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা যায় যে সে সময়ে সমস্ত যৌথ খামারের সভানেত্রী ও সহ-সভানেত্রীর সংখ্যা হল চোদ্দ হাজার দুশো এবং খামারের প্রাণী-পালন বিভাগের প্রধান পরিচালিকার সংখ্যা হল চল্লিশ হাজার। এই ভাবে সমাজের প্রত্যেকটি বিভাগে মেয়েরা তাদের যােগ্যতা অনুসারে কাজ পেয়েছে ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে তাদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছে। সােভিয়েটের মেয়েদের এই অগ্রগতির সঙ্গে অন্যান্য দেশের মেয়েদের অবস্থা কী পরিমাণে উন্নত হয়েছে তা বিচার করে দেখা প্রয়ােজন। ইংলণ্ড ও আমেরিকা নারীপ্রগতির নামে যতই বড় বড় কথা বলুক না কেন আজও তারা মেয়েদেরকে পুরুষের সমান সম্মান দেয় নি। আজও তারা মেয়েদেরকে পূর্বপুরুষদের চোখে দেখে থাকে। কারণ সমাজব্যবস্থা ৫৪ পরিবর্তিত না হলে দৃষ্টিভঙ্গী পালটাতে পারে না ; অসাম্য ও দুর্নীতি বা ধনতন্ত্রী সমাজের সব চেয়ে বড় ব্যাধি ঢাদেরও চিকিংসা হতে পারে না। সোভিয়েটের মেয়েদের জয়যাত্রার কথা বলতে গিয়ে তাই স্টালিন বলেছেন “ক্রমবর্ধমান সামাজিক কাজকর্মে শ্রমজীবি মেয়েদের যােগদানকে আমরা অভিনন্দন জানাবাে। উচ্চতর পদে পদোন্নতি থেকেই তাদের সাংস্কৃতিক ঔৎকর্ষের প্রমাণ মিলছে।”

নতুন জীবনের পথে ১৯৪১ সালের শেষ দিকে মাক্সিম লিট্‌ভিনফ, সােভিয়েট দত হিসাবে ওয়াশিংটনে যান। তাঁর পৌছানাের কিছু দিন পরেই মেয়েদের জাতীয় গণতন্ত্রী ক্লাব থেকে তার স্ত্রীকে বক্তৃতা দেয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানানাে হয়। মধ্যাহ্ন ভােজনের সে এক বিরাট রাজকীয় আয়ােজন! ম্যাদাম লিভিনফ, বুঝলেন কোন্ শ্রেণীর অভিজাতদের নিয়ে এই ক্লাবের সংগঠন। বক্তৃতা প্রসঙ্গে ম্যাদাম লিটভিনফ বললেন “এই সভায় এসে দেখছি যে এখানকার সমস্ত মেয়েদেরকে “ইনি অমুক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির স্ত্রী “উনি তমুক ব্যক্তির সম্ভ্রান্ত স্ত্রী হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। হচ্ছে, এমন কি আমাকেও! আমাদের রাশিয়ায় এ প্রথা আঁচল। সেখানে এই তথাকথিত ‘সম্রান্ত ব্যক্তি বলে কোনাে পদার্থ নেই। আমি একজন স্টেট-কর্মচারীর স্ত্রী বলে সেখানে কেউ আমার বক্তৃতা শুনতেও আসবে না। একজন সােভিয়েট মেয়ের তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আছে যা তার কৃতিত্ব দিয়ে অর্জন করা; স্বামীর খ্যাতির ওপর তা নির্ভরশীল নয়।” সােভিয়েটের মেয়েরা আজ কোন্ নতুন স্তরে গিয়ে পৌঁচেছে ম্যাদাম লিট্‌ভিনফের উক্তি থেকেই তার প্রমাণ মেলে। জার্মানীতে যখন ফ্যাশিস্টরা মেয়েদেরকে লক্ষ্য করে ‘রসুইঘরে ফিরে যাও বলে আন্দোলন চালিয়েছে, সােভিয়েট দেশ তখন তাদেরকে রান্না- ঘরের সংকীর্ণ পরিমিতি থেকে মুক্তি দিয়ে বৃহত্তর পৃথিবীতে যাবার ছাড়পত্র দিয়েছে। ফ্যাশিস্টরা যখন বলেছে যে সন্তানসৃষ্টিই হল মেয়েদের একমাত্র কাজ ; সােভিয়েট সমাজ তখন তাদেরকে ডেকেছে সমাজ গঠনের কাজে, ডেকেছে ভবিষ্যৎ ইমারতের ভিত পত্তনের কাজে। বিপ্লবের জয়যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে সােভিয়েটের নতুন বিজ্ঞান বহন করে এনেছে নারীমুর্তির ধ্বজা। বিজ্ঞানীরা বলেছে-মেয়েদের মা হওয়ার যে জন্মগত অধিকার আছে তা তারা উপভােগ করতে পারবে স্বামীর সাহচর্যের ও সন্তানের অধিকারিণী হতে পারবে,তার জন্যে তাদেরকে জীবিকা থেকে বঞ্চিত হতে হবে না; ফলে উন্নত হবে সমস্ত জাতি। প্রত্যেকটি সােভিয়েট মেয়ে জানে ? (ক) যে, সে বিয়ে করুক বা না করুক কাজের জন্যে তাকে চিন্তা করতে হবে না, সােভিয়েট রাষ্ট্র তাকে খাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। (খ) যে, সন্তানের জন্ম হলে রাষ্ট্র বহন করবে হাসপাতালের সমস্ত খরচ ; অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার জন্যে এক পয়সাও লাগবে না, ডাক্তার বাড়ীতে এসে দেখে যাবে তাকে। (গ) যে, সন্তান জন্মের আগে দু মাস এবং পরে দু মাস (অল্প পরিশ্রমী মেয়েদের ক্ষেত্রে ৩৫ দিন আগে ও ২২ দিন পরে) ছুটি তার বরাদ্দ আছে, এই কয় মাস পুরাে মাইনে পাবে সে। (ঘ) যে, সন্তান পালনের জন্যে চিন্তা করতে হবে না তাকে, সন্তানের খরচ হিসাবে রাষ্ট্র তাকে অতিরিক্ত অর্থ দেবে প্রতি মাসে। (ঙ) যে, সংসারের কাজ করার মত দেশের কল্যাণে কাজ করাও জীবনের একটা বৃহত্তম মর্যাদা। সােভিয়েট দেশে মেয়ে-শ্রমিকরা বা কৃষক-মেয়েরা কাছে যাবার সময়ে তাদের ছেলেমেয়েদেরকে আমাদের দেশের মতন অনাদৃত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় না। যে সব ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে তারা নিয়মিতভাবে স্কুলে যায় নইলে ‘রেড কর্ণারে’ (শ্রমিকরা যে সব বড় বড় বাড়ীতে থাকে, সেই সমস্ত বাড়ীতে একটা করে ছােটদের ক্লাবের ব্যবস্থা আছে) খেলা ০ করে, পড়াশােনা করে বা গল্প করে। যে সব ছেলেমেয়েরা কোলের শিশু, তাদেরকে মায়ের কাজে যাবার সময়ে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে কাছাকাছি শিশু-সদনে জমা দিয়ে যায়। সেখানে যত্ন নেয়ার জন্যে ধাত্রীরা সারাক্ষণ থাকে। তারা শিশুদের গায়ে লেবেল এটে ঘােট ঘােট বিছানায় শুইয়ে রাখে, খাওয়ায় দাওয়ায়, খেলা করায় ; যাদের কিছুটা বুদ্ধি হয়েছে তাদেরকে লেখা পড়া শেখায়। টিফিনের সময়ে মায়েরা এসে শিশু সন্তান- দেরকে দুধ খাওয়াতে পারে, তদারক কর্তে পারে, আদর করতে পারে। আবার ফেরার পথে বাড়ী নিয়ে যেতে পারে তাদেরকে। কেউ ইচ্ছে করলে বেশী দিনের জন্যে শিশুদেরকে নিশ্চিন্তে সদনের দায়িত্বেও রেখে যেতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ মায়েরাই কাজ থেকে ফেরার পথে ছেলেমেয়েদেরকে বাড়ী নিয়ে যায়। সারা সােভিয়েট দেশে তিরিশ হাজারের ওপর সাধারণ ভােজনাগার আছে। সেখানে লক্ষ লক্ষ কর্মব্যস্ত মানুষদের জন্যে আহার তৈরী হয়ে থাকে। মেয়েরাও দলে দলে এসে সেখানে আহার গ্রহণ করে। রান্না- ঘরের হাজার রকম ঝামেলা থেকে ছাড়া পেয়ে তারা সেই সময়টা অন্যান্য মুল্যবান কাজকর্মে ব্যয় করার সুযােগ পেয়েছে। কিন্তু তাই বলে এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে সােভিয়েটের মেয়ের বন্ধন-শিল্পকে বিসর্জন দিয়েছে বা সােভিয়েট পরিবারের অভিধান থেকে রান্নাঘর শব্দটা মুছে গিয়েছে চিরদিনের জন্যে। হাজার হাজার সােভিয়েট পরিবার বাড়ীতে রান্না করে এবং যারা নিয়মিতভাবে বাইরে খায় তারাও ছুটির দিনে বা বিশেষ উপলক্ষে বাড়ীতে রান্নার উৎসব পালন করে। রন্ধনশিল্পের প্রয়ােজনীয়তা অস্বীকার করে না সােভিয়েটের মেয়েরা কিন্তু তাই বলে তাদের জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় তারা রসুইঘরের পেছনে নষ্ট কর্তেও রাজী নয়। ৫৮ সাধারণত সােভিয়েট শ্রমশিল্পে কাজের সময় হল সাত ঘণ্টা। যে সব কলকারখানার কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য সেখানে মেয়ে পুরুষ কাউকেই ছয় ঘণ্টার বেশী পরিশ্রম করতে দেয়া হয় না। বাকী সময়টা তারা স্বাধীন। পড়াশােনা, বেড়ানাে, সামাজিক কাজকর্ম, ইচ্ছে করতে পারে তারা। কেউ পথ আটকাবে না তাদের, অন্নচিন্তায় চুল পাকাতে হবে না কাউকে, পয়সার অভাবে দুধ না পেয়ে মারা যাবে না কারাে শিশু সন্তান, পরিশ্রান্ত হয়ে অভিশপ্ত জীবন কাটাতে হবে না কাউকে বস্তির পাঁকের মধ্যে। এ নিশ্চিতি আছে বলেই সােভিয়েটের ছেলেমেয়েরা মাথা উঁচু করে চলতে পারে। এবার দেখা যাক রাষ্ট্রের তরফ থেকে সােভিয়েটের মেয়েরা কি কি সুবিধা পেয়ে থাকে। আগেই জানিয়েছি যে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ দেশের প্রতিটি লােকের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তার জন্যে জনসাধাণরকে কোনাে খরচ বহন করতে হয় না। অসুস্থ বােধ করলেই ডাক্তারখানা বা হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করালেই হল। শয্যাশায়ী হলে ক্লিনিকে যাবার প্রয়ােজন করে না। খবর পাঠাইলেই ডাক্তার এবং নার্স তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার আয়ােজন করে। অসুস্থ হয়ে পড়লে শ্রমিক সংঘ সঙ্গে সঙ্গে ছুটির ব্যবস্থা করে এবং অর্থ সাহায্য দেয়। যারা শ্রমিক সংঘের সভ্য এবং এক জায়গায়ে স্থির হয়ে ছয় বছর কাজ করছে তারা পুরাে বেতন পায়। কিন্তু বারা তা নয় তাদেরকে দেয়া হয় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ সাহায্য। কেউ যদি কোনাে পীড়ায় বা দুর্ঘটনায় অকর্মণ্য হয়ে পড়ে, শ্রমিক সংঘ তাকে নিয়মিতভাবে তার আয়ের ৪৫ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত অর্থ সাহায্য দেয়। অর্থাৎ সােভিয়েট দেশের প্রত্যেকটি মানুষ জানে বিপদে পড়লে তাকে না খেয়ে মরতে হবে না, রাষ্ট্র তার অন্নের সংস্থান করবে।

বৃদ্ধ বয়সে মেয়ে পুরুষ প্রত্যেক শ্রমিকেরই পেসনের ব্যবস্থা আছে। সাধারণত বিশ বছর কাজ করার পর বীমাব্যবস্থা চালু হয় অর্থাৎ সে তার আসল মাইনের শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পেন্সন পেয়ে থাকে। পুরুষেরা ষাট বছর এবং মেয়েরা পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হলেই পেন্ন দাবী করতে পারে । সােভিয়েট দেশে সবাই পাঁচ দিন কাজ করে এবং একদিন ছুটি ভােগ করে (ওদের দেশে ছয় দিনে সপ্তাহ) এবং প্রত্যেক বছরে দু থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত বেতনসহ ছুটি পেয়ে থাকে। এই ছুটির সময়ে সবাই স্বাস্থ্য-নিবাস বা বিশ্রাম-গৃহে দিন কাটায়। যাওয়া আসার ভাড়া ও সেখানে থাকার সমস্ত খরচ শ্রমিক সংঘই দেয়। কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে ও ককেশাস অঞ্চলে হাজার হাজার স্বাস্থ্য-নিবাস ও বিশ্রাম-গৃহ গড়ে উঠেছে সােভিয়েট সরকারের চেষ্টায়। বিপ্লবের আগে রাজা মহারাজাদের যে সব বড় বড় প্রাসাদ ছিল এই সব অঞ্চলে, বিপ্লবের পর সেই সব প্রাসাদগুলিকে চাষী-মজুরদের স্বাস্থ্য-নিবাসে পরিণত করা হয়েছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ সােভিয়েট নাগরিক এই সব জায়গায়ে ভ্রমণে আসে এবং উৎসবের মধ্যে দিয়ে দিন কাটিয়ে যায় । এ হল বাৎসরিক ছুটি কাটানাের কথা। কিন্তু রবিবারের ছুটি কাটানাের জন্যেও সােভিয়েট দেশে বহু One Day Rest Home রয়েছে। প্রতি রবিবার লােকেদের ভীড়ে সরগরম হয়ে ওঠে এই বিশ্রাবাস। সবাই ছুটিতে উৎসব মানাতে আসে। আলাদা আলাদা ভাবে নয়, সবাই একসঙ্গে সেদিনের উল্লাসকে ভাগ করে নেয় খেলা, ভ্রমণ, গল্প ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে। সেদিন বিশ্রামাবাস থেকে চারবার আহার পরিবেশন করা হয় সবাইকে। খাওয়ার পর যারা যেখানে ইচ্ছে দলবেঁধে বেড়াতে যেতে পারে, নৌকাভ্রমণে বেরােতে পারে, টেনিস, ভলিবল, টেবল-ক্রীড়া যা ইচ্ছে খেলতে পারে, গল্প করে সময় কাটাতে পারে.........মুঠো মুঠো সময় কী ভাবে খরচ করবে তা নির্ভর করে সময়ের মালিকের ওপর। ১৯৩৮ সালের একটা হিসাব থেকে জানা যায় যে সােভিয়েট শ্রমিক সংঘ • সে বছরে তার ছয় লক্ষ সভ্যকে এই রকম একদিনের বিশ্রামাবাসে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছে। এখানে জেনে রাখা দরকার যে প্রত্যেক স্বাস্থ্য-নিবাস ও বিশ্রামাবাসে সারাক্ষণের ডাক্তার এবং নার্সের ব্যবস্থা আছে। নিয়মিতভাবে তারা প্রত্যেক ভ্রমণকারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখে এবং সামান্য অসুস্থ হলেই তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এর জন্যে কাউকে এক পয়সা ফি দিতে হয় না। সােভিয়েট দেশের মানুষ এক নিশ্চিতি পেয়েছে। সে নিশ্চিতি হল যে • মানুষকে বড় করার জন্যে, জীবনকে প্রসারিত করার জন্যে এবং মনকে সমৃদ্ধ করার জন্যে যে মালমশলা দরকার তা সমস্ত পাওয়া যাবে যৌথ সােভিয়েট-ব্যবস্থা থেকে। কোনো রকম দৈন্ত কলুষিত করবে না তাদের নিষ্কলুষ জীবনকে। এই নিশ্চিতিই এক-ষষ্ঠমাংশ দেশের মানুষদের চোখে এক বৃহত্তম সম্ভাবনাকে আলােকিত করে তুলেছে। এই অধ্যায়ে সােভিয়েট দেশের পারিবারিক জীবনের বিস্তার ও গুরুত্ব বিশেষভাবে আলােচনা করে দেখার প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। সসাভিয়েট সমাজের জন্মের পর থেকে পরিবারের প্রশ্নকে বৃহত্তর সমস্যা হিসাবে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছে সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ। কারণ পারিবারিক সম্বন্ধের ওপরই সমাজের গঠনবিন্যাস অনেকটা নির্ভরশীল। সে কারণে বিপ্লবের কিছুদিন পরে ১৯১৮ সালের শরৎকালে কর্তৃপক্ষ জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু এবং ‘বিবাহ, পরিবার ও অভিভাবকত্ব’ ৫ সম্বন্ধে বিস্তারিত আইনকানুন জারী করে। তার পরও বহু ছােট খাটো বিধান কার্যকরী হয়েছে বিশেষ করে ১৯৩৬ ও ১৯৪৪ সালে । এবং এই বিধান অনুযায়ীই সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এই বিধানগুলি গৃহীত হবার আগে সােভিয়েট সরকার সেগুলি সারা দেশবাসীর সামনে উপস্থিত করেছিল এবং জনসাধারণের মতামত ও সংশােধনগুলি বিচার করার পর সেগুলি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল । বিবাহ সম্বন্ধে সােভিয়েটের বিধান কী? সােভিয়েট-ব্যবস্থা একমাত্র লৌকিক বিবাহ (civil marriage) স্বীকার করে। কিন্তু তাই বলে গিজার আচার ও অনুষ্ঠান মাফিক বিবাহে কতৃপক্ষ কোনাে বাধা দেয় না। সােভিয়েট গঠনতন্ত্রেই যে কোনো মানুষের ধর্ম-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠানে যােগ দেয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে। ধর্ম এবং রাষ্ট্র দুটো পরস্পর থেকে আলাদা। সুতরাং একমাত্র লৌকিক বিবাহই সােভিয়েট সমাজের মতে আইনসঙ্গত বিবাহ। এ কথা অবিশ্যি বিপ্লব-পূর্ব যুগের বিবাহ সম্বন্ধে প্রযােজ্য নয়। বিপ্লবের পর সেগুলিকে আইনসঙ্গত বলেই মেনে নেয়া হয়েছে। সােভিয়েট দেশে কোনো যুবক যুবতী বিয়ে করতে চাইলে তাদেরকে এই জানিয়ে একটা আবেদন করতে হয় রেজিস্ট্রারের আপিসে যে তাদের বিয়ের পথে কোনো রকম আইনগত বাধা বিপত্তি নেই এবং তাদের দুজনেরই স্বাস্থ্য রাষ্ট্র কতৃক পরীক্ষিত হয়েছে। তাদেরকে আরও জানাতে হয় যে এই বিয়ে তাদের প্রথম, দ্বিতীয় কি তৃতীয় বিয়ে ও তাদের আগেকার বিয়ের কোনো ছেলে মেয়ে আছে কিনা। তারপর রেজিস্ট্রার যুবক-যুবতীটির কাছে বিয়ের আইনকানুনগুলি পড়ে শােনায় এবং ভুল খবর দেয়ার ফলাফল সম্বন্ধে সতর্ক করে দেয় অতঃপর আইনের কোনো রকম বাধা না থাকলে দুজনের স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ করার পর বিয়ের কাজ শেষ হয় । এ ব্যাপারে রেজিস্ট্রারই হল দায়িত্বশীল সাক্ষী। বিয়ের পর তাদের দুজনের 'ছাড়পত্রে এই বিয়ের কথা স্বাভাবিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। যদি দেখা যায় যে কোনে' আইনগত অসুবিধা আছে তাহলে বিয়ে স্থগিত রেখে সে সম্বন্ধে অনুসন্ধান চলে। সােভিয়েট আইন অনুসারে দু পক্ষের অনুমােদন থাকলেই বিয়ে রেজেস্ট্রী- কৃত হতে পারে। তৃতীয় পক্ষ যেমন বাপ-মা বা অভিভাবকদের হস্তক্ষেপ সেখানে অপ্রয়ােজনীয়। সােভিয়েট আইন এমন কি অভিভাবকদের পরােক্ষ সম্মতির অপেক্ষা রাখে না। অভিভাবকদের অনুমােন না থাকলে তাদের ছেলে বা মেয়ে সম্পত্তিচ্যুত হবে, এ প্রশ্ন ও দেশে ওঠে না। তাই প্রত্যেক নাগরিক যারই বিবাহযােগ্য বয়স (আঠারাে বছর) হয়েছে তারই নিজের সঙ্গী বা সঙ্গিনী বাছাই করে নেয়ার স্বাধীনতা আছে। পাঠকদের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে যে আচ্ছা, সােভিয়েটের ছেলেমেয়েরা কি তাহলে বাপ-মা বা অভিভাবকদের না জানিয়েই বিয়ে করে ? তারা কি সত্যিই সত্যিই এততাই উচ্ছংখল এবং বাপ-মাদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ? পাঠকদের মনে এ প্রশ্ন জাগা হয়তাে অস্বাভাবিক নয় কিন্তু সােভিয়েট সমাজকে আমাদের আজ এক নতুন বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার দেখতে হবে। কারণ ওপরে যে বিবাহ-আইনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার ভিত্তি রচিত হয়েছে সমস্ত রকম শােষণমুক্ত বিধানের জমিনের ওপর। আমাদের দেশে বা অন্যান্য দেশে বাপ-মা বা * সােভিয়েট দেশে নারী পুরুষ প্রত্যেক নাগরিকের একটি করে ছাড়পত্র আছে। এই ছাড়পত্রই তার নাগরিকত্ব প্রমাণ করে।

অভিভাবকদের অন্যায় হস্তক্ষেপে কত তরুণ জীবন নষ্ট হয়েছে এবং ধ্বসে গিয়েছে সেই কলঙ্কময় ছবি আমাদের চোখের সামনে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। সােভিয়েটের সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা ভাই অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সাথে সাথে এই সর্বাঙ্গীন মুক্তির ভিত, পত্তন করেছে। আসলে সােভিয়েটের ছেলেমেয়েরা বিয়ে করার আগে নিশ্চয়ই অভিভাবকদের জানিয়ে বিয়ে করে কারণ অভিভাবকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ও অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু আইন লিপিবদ্ধ রইল। যদি অভিভাবকদের পক্ষ থেকে কোনো অন্যায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা চলে সে ক্ষেত্রে এই আইন হবে সেই তরুণদের সমর্থক কোনাে যুবক যুবতী যদি লৌকিক বিবাহ না করে স্বামী-স্ত্রীর মত বসবাস কতে চায়, সােভিয়েট আইন তাতে কোনো বাধা দেয় না। সােভিয়েট নাগরিকের এ স্বাধীনতা আছে। এবং তাদের সন্তান জন্মলাভ করলে অবৈধ বলে অবজ্ঞাত হয় না। তাদের চোখে কোনাে শিশুই অবৈধ নয়। প্রত্যেক শিশুই রাষ্ট্রের কাছে সমান দৃষ্টি পাবার দাবী রাখে। কিন্তু ওদেশে এ রকমের সহবাস ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। আজ সাধারণত সবাই রেজিস্ট্রারের আপিসে গিয়েই তাদের বিয়ে তালিকা- ভুক্ত করায়। বিবাহ-বিচ্ছেদের বেলাও তারা তেমনি রেজিস্ট্রারের কাছে উপস্থিতি হয়ে আবেদন পেশ করে এবং জনসাধারণের আদালতে বিচার হওয়ার পর তারা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নেয়। সম্ভব হলে আদালত দুজনের মধ্যে মীমাংসা করার চেষ্টা করে। সালের নতুন ডিক্রী অনুযায়ী বর্তমানে বিবাহ-বিচ্ছেদের অনুমতি দেয়া দেয়া আদালতের ওপর নির্ভর করে। কেউ হঠাৎ খেয়ালের বশে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাতে চাইলেই তা ঘটাতে পারে না। কিন্তু তাই বলে বিপ্লব-পূর্ব যুগের মতন নয়, প্রয়ােজন থাকলে এবং সমীচীন হলে, ১৯৪৪ ৬০ আপত্তি। বিবাহ-বিচ্ছেদ কোনাে অজুহাতেই বাধা দেয়া হয় না। বিবাহ-বিচ্ছেদ হলে ছেলে-মেয়েরা (যদি ইতিমধ্যে কোনাে সন্তান জন্মলাভ করে থাকে। মা বা বাবা কার কাছে থাকবে এবং কে তার ভরণ-পােষণের খরচ বহন করবে তা আদালতে স্থিরীকৃত হয় । একটা কথা প্রায়ই শােনা যায় যে সােভিয়েট দেশে মেয়েদের জাতীয়করণ (nationalisation) হয়েছে অর্থাৎ সােভিয়েট সমাজের নৈতিক জীবন এত দুষিত যে সেখানে সতীত্ব, মাতৃত্ব ও সভ্যতা বলে কোনাে জিনিস নেই। এই মিথ্যা অপপ্রচারের মূল হল সাম্রাজ্যবাদী দেশে। সেই দেশের গণ্ডী ছাপিয়ে আমাদের দেশে এসে পৌচেছে এই মিগ্ন্যা প্রচারের স্রোত। আসল কথা সােভিয়েট বিপ্লব মানুষে-মানুষে এবং নারী-পুরুষে যে অবাধ স্বাধীনতার পত্তন করেছে, সেই স্বাধীনতার ওপর সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধান এবং সে জন্যেই তাদের মুখে সতীত্ব ও মাতৃত্বের জিগির! আজ আমাদের সমাজের পানে তাকালে কী দেখতে পাই ? দেখতে পাই স্ত্রী পুরুষের মধ্যে নানান অসাম্য ও অসামঞ্জস্য, ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পারস্পরিক স্বাভাবিক মেলামেশার অভাব, তাদের মধ্যে যৌনজ্ঞান সম্বন্ধে অমার্জনীয় অজ্ঞতা, সমস্ত সমাজকে এক কুৎসিত রূপে ভরে তুলেছে। একটি ছেলে কি একটি মেয়ে পরস্পরের মধ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না। যদি কখনও লােকচক্ষুর বাইরে তাদের দুজনকে কথা বলতে দেখি, তাহলে দেখবো অত্যন্ত মেকী আভিনয়িক ভঙ্গীতে তারা কথা বলছে। দুজনেই দুজনের সম্বন্ধে এমন এক কাল্পনিক স্বপ্নজাল সৃষ্টি করেছে যা স্বাভাবিকও নয়, বাস্তবও নয়। কিন্তু একদিন বাস্তব জগতের মুখখামুখি তাদের দুজনকেই দাঁড়াতে হয়। সেদিন তাদের সামনে তিনটি পথ থােলা ; প্রথম, অত্যন্ত ভালাে ছেলের মতন সহস্র অসঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক বিধানকে ০ মেনে নেয়া ; দ্বিতীয়, সামাজিক বিধানকে মন দিয়ে গ্রহণ করতে না পেরে হতাশার আশ্রয় খোঁজা। তৃতীয়, বিদ্রোহ করা। মানুষে মানুষে এবং নারী পুরুষে স্বাভাবিক মেলামেশার অভাবই সমস্ত রকম সামাজিক দুর্নীতি, ব্যাভিচার ও হতাশার জন্যে দায়ী। এই অসঙ্গতিকেই সােভিয়েট-বিপ্লবের সন্মানী পৃথিবীর এক-ষষ্ঠমাংশ অংশ থেকে ঝেটিয়ে সাফ করে দিয়েছে। আজ তাদের মধ্যে তাই দুর্নীতি নেই, অসামঞ্জস্য নেই। আজকে সােভিয়েট সমাজের মেয়েদের ওপর থেকে সমস্ত রকম শােষণ আইন জারী করে তুলে নেয়া হয়েছে। জারের আমলের কথাই ধরা যাক । সেদিন গণিকারা পথে ঘাটে, সমাজের গলিঘুজিতে সমস্ত জনসমাজের স্বাস্থ্যকে দূষিত ও রােগাক্রান্ত করে তুলেছিল। কিন্তু আজ? সােভিয়েট ব্যবস্থার জন্মের পর থেকে গণিকালয়ের দরজাগুলাে চিরদিনের জন্যে বন্ধ। আজ আর মেয়েদেরকে কেউ পণ্য হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। রাষ্ট্র আইন করে গণিকাবৃত্তিকে বেআইনী ঘােষণা করেছে। যারা তিরিশ বছর আগে এই বৃত্তি গ্রহণ করে জীবিকা আহরণ করত, তার আজ সমাজে সংস্কৃত, সুপ্রতিষ্ঠিত। সাম্যবাদী রাষ্ট্র মাতৃত্বকে আজ যে মর্যাদা দিয়েছে সে মর্যাদার শতাংশের একাংশও অন্য কোনাে দেশ দেয়নি। সন্তানের জন্মের পর তার লালন- পালনের জন্যে রাষ্ট্র নিয়মিতভাবে মায়েদের কি ভাবে অর্থ সাহায্য করে, নীচের হিসাব থেকে তা পরিস্ফুট হয়ে উঠবে :- এককালীন দান মাসিক দান (রুবল ) ( রুবল) তৃতীয় সন্তান জন্মের পর চতুর্থ ১,৩০০ পঞ্চম ১,৭০০ ৪০০ ৪০ স A এককালীন দান (রুবল') মাসিক দান ( রুবল ) ২,০০০ ১৪০ সপ্তম ২,৫০০ ২০০ A অষ্টম ২,৫০০ ২০০ ৮ নবম ১১ ২৫০ ৩,৫০০ ৩০০ দশম २१. দশম সন্তানের জন্মের পর প্রত্যেকটি সন্তানের বেলায় যে সব তরুণ তরুণীর বিবাহ রেজিস্ট্রারের আপিসে তালিকাভুক্ত হয়নি তারা রাষ্ট্র থেকে সন্তানের ১২ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত নিম্নলিখিত অর্থ সাহায্য পেয়ে থাকে :- মাসিক দান প্রথম সন্তান ১০০ রুবল দ্বিতীয় তৃতীয় যদি কোনাে অবিবাহিতা মা তার সন্তানকে লালন-পালন কর্তে ইচ্ছুক না হয় বা অন্য কোন দিক থেকে অসুবিধা বােধ করে তাহলে শিল্প-সদন তার সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করে। তার সমস্ত অর্থ ব্যয়ের ভার নেয় সােভিয়েট সরকার। অর্থাৎ বাপ বা মাকে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যে কোনাে অর্থ খরচ কর্তে হয় না। কিন্তু সন্তানের ওপর মার দাবী চিরদিন অক্ষুন্ন থাকে, যে কোনাে দিন মা ইচ্ছে করলে তার সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারে। অর্থ সাহায্য ছাড়াও মায়েরা ‘মাতৃত্ব পদক পেয়ে থাকে যেমন “অর্ডার অব ৩৭ দি গ্লোরিয়াস মাদারহুড”, “হিরােয়িন মাদার”, “অর্ডার অব দি হিরােয়িন মাদার” ইত্যাদি। প্রত্যেকটি পদক অবিশ্যি সন্তানের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। এবারে সােভিয়েট সমাজ মায়েদের আরাে কি কি সুবিধা দিয়েছে দেখা যাক। ১৯১৩ সালে প্রতি সদনে বেড-এর সংখ্যা ছিল মাত্র সাত হাজার। ১৯৪১ সালে তা বেড়েছে উনিশগুণ—অর্থাৎ এক লক্ষ চল্লিশ হাজারেরও বেশী (শহরে ৭৬,০০০; গ্রামে ৬৪,০০০ )। কিন্তু প্রসূতি সদনে যাবার আগে মায়েদের অনেক কিছু জ্ঞাতব্য বিষয় জানবার থাকতে পারে। সে কারণে সারা সােভিয়েট দেশে প্রায় ৫,০০০ পরামর্শ কেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলির কাজ হল মায়েদেরকে উপদেশ ও শিক্ষা দিয়ে সাহায্য করা। কিন্তু সােভিয়েটের প্রতি সদনগুলি কী রকম? আমাদের ভারতবর্ষের মতন, না তার চেয়ে কিছুটা উন্নত। আমাদের দেশের কথা দূরে থাক, কোনাে দেশই এ ব্যাপারে সােভিয়েটের সঙ্গে দাড়াতে পারে না। সদনগুলি বাড়ীর তুলনায় যেন একেকটি স্বর্গ। হাজার রকম সুখ সুবিধা যা আমরা কল্পনা কর্তেও সাহস করি না। পৃথিবীতে এমন কোন জায়গা আছে যেখানকার মাতৃসদনে কোনাে প্রসূতিকে বিনামূল্যে স্থান দেয়া হয়? এমন কোনাে মাতৃসদন আছে যেখানে প্রসূতিরা সারাক্ষণ ‘ইয়ারফোন’ (এই যন্ত্রটি দু কানে লাগাল বেতারের সমস্ত কিছু অনুষ্ঠান শােনা যায় অথচ তার শব্দ বাইরে ধ্বনিত হয়ে কারাে বিরক্তি উৎপাদন করে না) এর সাহায্যে পৃথিবীর সঙ্গীত শুনতে পারে? এমন কোনাে দেশ আছে, যে দেশ সােভিয়েটের মত গর্ব করে বলতে পারে যে তার মাতৃ- সদনে প্রসূতিরা বিছানার ধারের টেলিফোনের সাহায্যে যতক্ষণ ইচ্ছে তার স্বামী, পুত্র বা বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে কথােপকথন চালাতে পারে ? এবং তাও বিনামূল্যে ?

ভারতবর্ষের মেয়েরা একবার কল্পনা করুন যে সাধারণ চাষীর মেয়ে, সাধারণ মজুরের মেয়ে সােভিয়েট দেশে আজ কোন্ স্তরে উন্নীত হয়েছে। কেন আজ সেই দেশ তার জনসাধারণকে, তরি নারীজাতিকে এমনি অবারিত সুখ, সুবিধা, ঐশ্বর্য দিচ্ছে যা অন্যান্য দেশ দিতে কুণ্ঠিত। দিচ্ছে তার কারণ সােভিয়েট দেশ কোনাে কায়েমী স্বার্থ-সম্পন্ন দল বা চক্রের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জনসাধারণই আজ সে দেশের মালিক। প্রসবকালীন অবসর, মাতৃসদন ও অর্থ সাহায্য ছাড়াও প্রতিরা আরাে দুটি সুবিধা পেয়ে থাকে যেমন গর্ভাবস্থার চতুর্থ মাস থেকে তাদেরকে পরিশ্রমবহুল কাজ বা অতিরিক্ত কাজ (overtime) দেয়া . হয় না। এবং সে সময় থেকেই তারা ডবল রেশন পেয়ে থাকে। পারিরিক ভিত্তি আরাে বেশী দৃঢ় করার জন্যে সােভিয়েট দেশে কতকগুলি কর ধার্য করা হয়েছে। যারা অবিবাহিত, সন্তানহীন বা এক বা দুই সন্তানের বাপ-মা তারা পড়ে এই আইনের গণ্ডীতে। পুরুষদের ২০ থেকে ৫০ বছর এবং মেয়েদের ২০ থেকে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত এই কর নিয়মিতভাবে দিতে হয় । (ক) অবিবাহিত বা সন্তানহীন স্ত্রী-পুরুষ যারা আয়কর দেয় তাদেরকে তাদের আয়ের শতকরা ছয় ভাগ অর্থ কর হিসাবে দিতে হয়। যাদের একটি সন্তান তারা দেয় শতকরা এক ভাগ এবং যারা দুই সন্তানের বাপ-মা তারা দেয় শতকরা এক ভাগের আধ ভাগ। (খ) যৌথ চাষী, স্বতন্ত্র চাষী বা খামারের অন্যান্য কর্মী যারা কৃষি-কর দেয় তাদেরকে যথাক্রমে ১৫০ রুবল ৫০ রুবল ও ২৫ রুবল দিতে হয়। (গ) অন্যান্য নাগরিক যারা আয়কর বা কৃষি-কর দেয় না তারা যথাক্রমে ৯০ রুবল, ৩০ রুবল ও পনের বল কর দিয়ে থাকে। এই করের অর্থ কি ? এই কর ধার্যের অর্থ মিলবে সােভিয়েটের নীতির মধ্যে। প্রত্যেকটি নাগরিক অত্যন্ত সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে তার জীবনকে গড়ে তুলুকসােভিয়েটের এই নীতিই তার প্রত্যেকটি কার্যপদ্ধতির মধ্যে ওতপ্রােতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সুতরাং এই কর সমস্ত স্ত্রী-পুরুষকে চাপ দিচ্ছে যাতে তারা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সংসার জীবন যাপন করে, অত্যন্ত সুস্থভাবে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও মধুর ও আরও ঘনিষ্ঠ করে তোেল। বয়ঃপ্রাপ্তির পর একটা মানুষ কেন সাধারণভাবে অন্য সকল মানুষের মত জীবন যাপন করবে না? বিয়ের পর স্ত্রী-পুরুষ কেন তার স্বাভাবিক কর্তব্য পালন করবে না? এ হল ওদেশের প্রশ্ন। প্রত্যেকটি মানুষকে এ বিষয়ে সচেষ্ট হতেই হবে কারণ সামাজিক জীব হিসাবে তা না করলে সমগ্র সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাতে। একটা বিরাট যন্ত্রের ছােট কগ উইল থেমে গেলে সমস্ত যন্ত্রই যেমন অচল হয়ে পড়ে, একটি মানুষের কর্তব্যচ্যুতিও তেমনি সমাজে একটা বিরাট কঁকি সৃষ্টি করে। আমাদের দেশের কথা আলাদা। এখানে আমরা স্বাভাবিকভাবে, সুস্থভাবে জীবনকে গড়ে তােলার কথা চিন্তাই করতে পারি না। দৈনন্দিন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জীবনকে ভেঙে চুরে দুমড়ে, ছােট করে তবে আমাদের বাঁচার পথ করে চলতে হয়। সােভিয়েট দেশ পেরেছে। কারণ একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর তারা দাঁড় করিয়েছে তাদের সমস্ত সমাজব্যবস্থাকে। সােভিয়েট ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে নিজের ওপর নিয়েছে কারণ ছেলেমেয়েদের ওপর বাপ-মার যা দায়িত্ব আছে তার চেয়েও বেশী দায়িত্ব আছে রাষ্ট্রের কারণ আগামী সমাজকে অবহেলার চোখে দেখলে চলবে না। তাই যখন ও দেশের শিক্ষা-জগতের দিকে তাকাই তখন অবাক লাগে.••অবাক লাগে ওদের বিস্কার দেখে। এই বিস্বার, ১ এই ব্যাপ্তি ওরা পেল কোথায় ? কোন্ যাদুর গুণে ওরা এই সম্পদের অধিকারী হল? ১৯১৭ সালের রুশ সমাজের দিকে তাকাই। অশিক্ষার অন্ধকারে তলিয়ে আছে সমস্ত দেশ। শিক্ষা হল ধনিকদের একচেটে। দেশের হাজার হাজার দরিদ্র মজুর চাষী তা থেকে বঞ্চিত। আজ সে অবস্থা পালটেছে, আগাঁগােড়া। ১৯১৩ সালে সমস্ত রুশ সাম্রাজ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলযাত্রী ছেলেমেয়ের সংখ্যা ছিল ৭৮ লক্ষ অর্থাৎ জমিদার, বড়লােক ও উচ্চ মধ্য- বিত্ত শ্রেণীর ছেলেমেয়েরাই যেত স্কুলে পড়তে। ১৯৪০ সালে সেই ছেলেমেয়েদের সংখ্যা হল ৩ কোটি ৫০ লক্ষ। ১৯১৪ সালে শিশু সদনে মােট বেড-এর সংখ্যা ছিল ৫৫০। ভেবে দেখা যাক ১৯৩৮ সালে সে সংখ্যা কত উচুতে উঠতে পারে ! ভাবতে গেলে কল্পনাশক্তিকে অনেক দূর টেনে নিয়ে যেতে হবে। কারণ তার সংখ্যা- বৃদ্ধি এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায় উঠতে পেরেছে। ৫৫০ থেকে একেবারে ৭ লক্ষ, ২৩ হাজার, ৬৫১-য়। ১৯৩৬ সালে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা হল ৫৫,১০২ যা ১৯১৯ সালে ছিল মাত্র ২৭৫টি। ছেলেমেয়েদের কি করে শিক্ষা দেবে কী করে স্কুলের ফী আর বইয়ের খরচ জোগাবে•••এ চিন্তা ও দেশের কোনাে বাপ মাকে কতে হয় না। কারণ শিক্ষার দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রই গ্রহণ করেছে। এবং আইন জারী করে প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ের জন্য শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক বলে ঘােষণা করেছে। একটি ছেলে কি একটি মেয়ের যখন তিন বছর বয়স তখন থেকেই সে কমিসেরিয়ট অব হেলথের তত্বাবধানে থাকে অর্থাৎ শিশুসদন তার কল্যাণের জন্য সমস্ত দিকে দৃষ্টি দেয়। এবং এই শিশুসদনে শিক্ষার ভার গ্রহণ করে কমিসেরিয়ট অব এডুকেশন। সাত বছর পর্যন্ত এরই তত্বাবধানে কিণ্ডারগার্টেন শিক্ষা অগ্রসর হতে থাকে। আগেই জানিয়েছি কাজে যাবার পথে মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদেরকে এই শিশু সদনে জমা রেখে যায়। অর্থাৎ সকলে ৮টা থেকে সন্ধে ৫টা কিবা ৯টা থেকে ৭টা পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা (বারা স্থায়ীভাবে শিশুসদনেই থাকে তাদের কথা স্বতন্ত্র) এইখানে থাকে। এই নয়-দশ ঘণ্টা সময় তারা যে ভাবে কাটায় তা অত্যন্ত কৌতুহলপ্রদ। সাধারণ খেলা, শিক্ষামূলক খেলা, ভ্রমণ, খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুম—এ হল মােটামুটি তাদের প্রােগ্রাম। শিক্ষামূলক খেলার মধ্যে দিয়েই সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। আট বছর বয়স থেকে আরম্ভ হয় বাধ্যতামূলক শিক্ষা। এবং পনের বছর বয়স পর্যন্ত তা চালু থাকে। পনের বছর বয়স থেকে উচ্চ শিক্ষার আয়ােজন। এই উচ্চ শিক্ষা অবিশ্যি বাধ্যতামূলক নয়। যার যে বিষয়ে আগ্রহ ও যার যে পরিমাণ আগ্রহ তারা সে ভাবে শিক্ষা বা বৃত্তি গ্রহণ কতে পারে এ তাে গেল শিক্ষার কথা। এ দিক থেকে সােভিয়েট দেশের প্রত্যেকটি বাপ-মা আজ নিশ্চিন্ত। তারা জানে রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিয়ে তাদের ছেলেমেয়েদেরকে তারা অনেক বড় অনেক যােগ্য হওয়ার সুযােগ দিয়েছে। শিক্ষা-জগতে মেয়েরা কত দায়ীত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে তা আগে আললাচনা করেছি। যারা সােভিয়েট দেশের শিক্ষা পরিচালনা করে মেয়েরা হল তাদের মধ্যে একটা বিরাট অংশ। ক্রীড়া জগতেও মেয়েদের মধ্যে এক অপূর্ব উন্মাদনা চোখে পড়ে। প্যারাসুট থেকে লাফ, নৌকা দৌড়, ফুটবল, ভলিবল, টেনিস, স্কিয়ী, স্কেটিং, বক্সিং, ওয়াটার পােললা, ভার উত্তোলন, সাঁতার কাটা, বন্দুক ছোঁড় १२ ৪। কী নয়? খেলাধূলাের মধ্যে মেয়েরা ডুবে আছে আকণ্ঠ। শুধু তাই নয়, তারা কয়েকটা বিষয়ে সারা পৃথিবীর রেকর্ডকে পর্যন্ত ভাঙতে পেরেছে। যেমন মস্কোর মেয়ে বুইকোভা-৯৩৫ সালে সে ৩০০ মিটার রেসে আগেকার প্রতিদ্বন্দ্বী (যিনি ৪৮৩৬ সেকেণ্ড সময় নিয়েছিলেন) কে হারিয়ে দিয়ে মাত্র ৪১৬ সেকেণ্ডে সমস্ত জায়গাটা দৌড়তে সক্ষম হয়। সেই বছরই লেনিনগ্রাদের মেয়ে মামলােভা ৫৭০৫ মিটারের রেকর্ডকে ভঙ্গ করে ৬২২০ মিটার দূরে বর্শা ফেলতে সফল হয়। ১৯৩৬ সালে গােকীর মেয়ে কুজনেটলােভা ৫,০০০ মিটার দূরত্ব ১০ মিনিট ২১২ সেকেণ্ডে স্কেট কতে পারে। তার আগের প্রতিদ্বন্দ্বী পেরেছিল ১০ মিনিট ৩৩৬ সেকেণ্ডে। সােভিয়েট ক্রীড়া জগতের ত্রিশ বছরের ইতিহাস এমনি কত কীতি ও কৃতিত্বের কাহিনীতে উজ্জ্বল। ত্রিশ বছর আগেকার ইতিহাসের পানে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে সে সময়ে মেয়েদের কথা দুরে থাক, সাধারণ পুরুষমানুষরাই তাতে যােগদান করবার কথা চিন্তা করতে পারত না। খেলাধুলাে ছিল বড়লােকদের একচেটে। ১৯৩৫ সালে মেয়ে-পুরুষ উভয়েই খেলাধুলাের ব্যাপারে কী পরিমাণ আগ্রহ নিচ্ছে নীচের তথ্য থেকে তা পরিষ্কারভাবে বােঝা যাবে। শতকরা হিসাব কুস্তিবিদ্যা মাঠের খেলা সাঁতার পুরুষ নারী ভলিবল দাবাবােড়ে অন্যান্য ক্রীড়া ২৩৯ ৩৭ ২৭৭ ৩৪৩ ১৩৪ २१.० ১৭৩ ৬৪ নারী বিশ লক্ষের ওপর মেয়ে খেলাধুলােয় সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে থাকে এবং ৭৩ তাদের মধ্যে হাজার হাজার মেয়ে রয়েছে যারা সেরা সাতারু, দাড়ী, স্কীয় ও স্কেটার হওয়ার উপযুক্ত। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মেয়ে ইতিমধ্যে খেলা খুলােয় উত্তীর্ণ হয়ে “লেবার এণ্ড ডিফেন্স ব্যাজ পেয়েছে। এই সব মেয়েরা শুধু নিজের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীময় তারা পরিচিত। সােভিয়েট মেয়েদের জীবন পরিবর্তনের যে ধারা আমরা এই কয় অধ্যায়ে লক্ষ্য করেছি তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি সামাজিক ও অর্থ- নৈতিক বিপ্লবের সাথে সাথে যন্ত্র জগৎ জুড়ে যে বিপ্লব এল...সেই বিপ্লবের মধ্যে দিয়েই নতুন গতিপথ খুঁজে পেল সােভিয়েট দেশের সমস্ত স্ত্রীজাতি। অথচ ধনতন্ত্রী পশ্চিম ইউরােপীয় দেশগুলিতে আমরা কী দেখতে পাই? দেখতে পাই হাজার রকম শাসন আর সংস্কারের শেকল দিয়ে বাঁধা সে সব দেশের মেয়েরা। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে কলকারখানায় প্রবেশ করা মেয়েদের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাদের স্বাস্থ্য ও সন্তানধারণের পক্ষে হানিকর। কিন্তু সােভিয়েট শাসনব্যবস্থা প্রমাণ করেছে যে এ বিশ্বাস ভুল। এ হল পুঁজিবাদী শােষকদের আরেকটা বিরাট প্রবঞ্চনা। সােভিয়েট দেশের স্ত্রী-স্বাধীনতাকে স্বতন্ত্র করে দেখলে চলবে না, বিশ কোটি নিপীড়িত জনসাধারণের সামগ্রিক জাতীয় মুক্তির সঙ্গে তাকে পাশাপাশি রেখে সমস্তটা বােঝবার চেষ্টা করতে হবে। কারণ যে নীতি সােভিয়েট দেশে বিপ্লবের সৃষ্টি করেছে সেই নীতির পেছনে ছিল দেশের সর্বাঙ্গীন মুক্তির প্রচেষ্টা। আমাদের ভারতবর্ষের বেলায় একথা খুব স্পষ্টভাবে বুঝে দেখতে হবে। কারণ স্ত্রী-স্বাধীনতার সংগ্রাম শুধুমাত্র সামাজিক সংগ্রামই নয়, রাজনৈতিক সংগ্রামও। নারীমুক্তির সংগ্রাম আলাদা আলাদাভাবে চলে না:••রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে সাথেই তা অগ্রসর হয়। কারণ নারীমুক্তির সংগ্রাম আসলে পুরুষ জাতির সঙ্গে নয়, সে সংগ্রাম হল সেই শশাষণ ও শাসনব্যবস্থার ৭৪ বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা পুরুষজাতিকে এমনি এক আবর্তে এনে উপস্থিত করেছে। নতুন জীবনের পথে ? হ্যা, নতুন জীবনের পথেরই হদিশ পেয়েছে আজ সােভিয়েটের মেয়েরা সন্ধান পেয়েছে এক নতুন জগতের যে জগৎ : একমাত্র সাম্যবাদের সুস্থ ও সবল ভিত্তির ওপরই গড়ে উঠতে পারে। এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন বৃদ্ধাদের মনকে কি ভাবে স্পর্শ করেছে তা একটা ছোট ঘটনা থেকেই বােঝা যায়। ১৯৩৭-৩৮ সালে বিখ্যাত মার্কিন শিক্ষয়িত্রী ডিয়ানা লেভিন একবার বেল যােগে সােচি যাচ্ছিলেন। তাঁর ট্রেনের কামরায় কয়েকজন লালফৌজের সৈন্য, একজন বৃদ্ধা ও আটাশ বছরের একটি মহিলা ভ্রমণ করছিলেন। অনেক আলাপ আলােচনার মাঝখানে বৃদ্ধাটি ফেটে পড়লেন। তাকে বললেন “.. তােমার দেশে বিপ্লব হয় নি। হয়েছে কি ? এদিকে বিপ্লব আমার দেশের কী অবস্থা করেছে দেখাে। আমি যৌথ খামারে থাকি, আমার বড় ছেলে ট্রাক্টর চালায় আর আমার মেয়ে হল যে দল গরু চরায় সে দলের পরিচালিকা। আমার মেজ ছেলে মস্কোয় কৃষি-বিদ্যা পড়ছে। আমাদের খামার তাকে সেখানে পাঠিয়েছে। আমার নাতি-নাতনীরা সবাই চমৎকার শিক্ষা পাচ্ছে। আমি নিজে অবিশ্যি লিখতে পড়তে জানি না। বয়সও হয়েছে, সুতরাং আর সম্ভবও নয়। কিন্তু আমি এইটুকু জানি—করুক দেখি কেউ আমাদের দেশ আক্রমণ—আমরা তাকে উচিত শাস্তি দেব।” বৃদ্ধাটি বজ্র মুষ্ঠি তুললেন। ‘সাবাস, সাবাস, দিদিমা। এই ত উচিত কথা’ লাফিয়ে উঠে অভিনন্দন জানালাে লাল ফৌজের সৈন্যরা। একটি বৃদ্ধার মধ্যে এই যে পরিবর্তন এ পরিবর্তন এল কী করে? এ রাষ্ট্রের *অনিলকুমার সিংহ অনুদিত “সােভিয়েট রাশিয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উদ্ধত।

তরফ থেকে শেখানাে কোনাে প্রচারকর্ম নয়। নতুন জীবনের পাঠ থেকেই এ শিক্ষা নিয়েছেন সােভিয়েট বৃদ্ধাটি । প্যাট শ্লোন একজন ইংরাজ লেখক। তিনি বহুবার সােভিয়েট দেশে গিয়েছেন। এবং সেখানে দীর্ঘ দিন থেকে সে সমাজের সামগ্রিক রূপকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৩২ সালে তিনি যখন মস্কো যান তখন একটি মেয়ের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। মেয়েটি যে বাড়ীতে তিনি উঠেছিলেন সে বাড়ীতেই পরিচারিকার কাজ করছিল। গ্রামের মেয়ে একেবারে অশিক্ষিতা। প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত জোটে নি তার ভাগ্যে। ইংলণ্ডের লােকেরা অত্যন্ত খেলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে এই সব মেয়েদের দিকে। ১৯৩৭ সালে আবার যখন প্যাট শ্লোন মস্কোয় যান তখন সেই মেয়েটির সঙ্গে তার দেখা হয় কিন্তু মেয়েটি আর সে-মেয়েটি নেই। জিজ্ঞাসু স্লোনের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলল পরিচারিকার কাজ আমি ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমি একটা ল্যাবরেটরিতে যুক্ত আছি এবং ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ছি।” কথা শুনে শ্লোন আশ্চর্য বােধ করলেন না। কারণ তিনি তখন ধরতে পেরেছিলেন সােভিয়েট সমাজের পেছনকার জীবন-দর্শন। তিনি শুধু এইটুকু ভাবলেন যে মেয়েটি যদি মস্কোয় না থেকে ইংলণ্ডে থাকত তাহলে কী হত তার ভবিষ্যৎ? গ্রামের সেই অশিক্ষিতা মেয়েটি শুণ, এক মনিবের দরজা থেকে অন্য এক মনিবের দরজায় ঘুরে বেড়াত। শুধু—এই একটি মেয়েই নয়, এমনি হাজার হাজার মেয়ে সমাজের নিম্ন * বিপ্লবের পর থেকে সােভিয়েট দেশে পরিচারিকা মাের অভ্যাস ও প্রয়ােজন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৩৬ সালের হিসাব থেকে জানা যায় যে সে দেশে তখন পরিচারিকার সংখ্যা ছিল শতকরা মাত্র দু ভাগ। * সুধাংশু সরকার অনুদিত “বিপ্লবােত্তর রাশিয়া থেকে উদ্ভূত।

স্তর থেকে উঠে সােভিয়েট দেশে উচ্চ শীর্ষে বসবার সম্মান পেয়েছে। কোনাে দেশের মেয়ে তার সমাজের কাছ থেকে এমনি সম্মান ও মর্যাদা দাবী করতে পারে কিন্তু তার আগে তাকে তার সমাজের রূপ পাল্টাতে হবে, রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করতে হবে। আজ সােভিয়েটের মেয়েদের সামনে সুস্থ ও সুখী জীবনের এক অপরিমেয় বিস্তৃতি। মাতৃত্বের মর্যাদায় তাদের নারীত্ব আজ সমৃদ্ধ এক নতুন সম্পদের অধিকারিণী। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ তাদের জীবনে এক অমূল্য অনুপ্রেরণা। এই নতুন জীবনের স্ফুরণকে সবচেয়ে আগে স্বীকৃতি দেবে আমাদের দেশের মেয়েরা—যারা আজও পিছিয়ে পড়ে আছে। ৭৭ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎকর্ষতা শ্রমজীবী হিসাবে সােভিয়েট মেয়েদের উন্নতি ও কৃতিত্বের পেছনে রয়েছে তাদের সমাজগত ও সংস্কৃতিগত চেতনা যে চেতনা ও উপলব্ধি বিপ্লবােত্তর সমাজ এক সুষ্ঠু ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলেছে। বিপ্লব সফল হবার পর থেকেই বলশেভিকরা মেয়েদের শিক্ষা সম্বন্ধে পরিকল্পনা গ্রহণ করছিল এবং ১৯১৯ সাল থেকে ব্যাপকভাবে আরম্ভ হয়েছিল অশিক্ষা-বিরােধী আন্দোলন। শহরে এবং গ্রামে তুমুল অভিযান মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল এই সামাজিক ব্যাধিকে উচ্ছেদ করার জন্যে। ফলে ১৯১৯ সালেই একটা পরিবর্তন চোখে পড়ে। দেখা যায় মেয়েরা দলে দলে ‘সােভিয়েটের প্রতিনিধি নির্বাচনের কাজের মধ্যে এগিয়ে এসেছে যা পূর্বে কোনাে দিন লক্ষ্য করা যায় নি। কিন্তু সােভিয়েটের মেয়েদের মধ্যে যে ব্যাপক পরিবর্তন এল, সে পরিবর্তন এল ১৯২৭ সালে, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কার্যকারিতার মধ্যে দিয়ে। জারের আমলে শতকরা সত্তর ভাগ লােক এক অক্ষর লিখতে পড়তে জানত না। গ্রামের কৃষক-মেয়ে ও কারখানার মেয়ে-শ্রমিকদের মধ্যে অশিক্ষা ছিল আরও প্রবল, আরও গভীর। ১৯২০ সালে মােট জনসংখ্যার ৬৭ ভাগ ছিল অশিক্ষিত। মেয়েদের ক্ষেত্রে অশিক্ষার প্রসার ছিল আরও বেশী-শতকরা সাড়ে পঁচাত্তর ভাগ। ১৯১৯ সালের ২৬শে ডিসেম্বর পি কমিশারদের এক সভায় স্থির হল যে সমস্ত সােভিয়েট দেশ থেকে অশিক্ষার গ্লানি দূর কর্তে হবে। লেনিনের ডিক্রী জারী হয়ে বেরুল সাধারণের সামনে। তারপর শুরু হল শিক্ষার প্রসার। অশিক্ষার অন্ধকারে ঢাকা জনসমাজকে জাগাও দিক থেকে দিকে ডাকের প্রতিধ্বনি শােনা গেল। বিপ্লবী মজুর চাষীদের হাঁক ৭৮ গিয়ে পৌছল মানুষের কানে যারা অক্ষর চিনতে শেখেনি তাদের কাছে••••••যারা পড়তে শিখেছে অথচ অক্ষর লিখতে জানে না তাদের কাছেও। ডাকের ফল ফলল। ১৯২৯ সালে শতকরা ৫৮ ভাগ মানুষ শিক্ষিত হয়ে উঠল। আর একটা যুগের প্রয়ােজন হল না, মাত্র চার বছরের মধ্যেই ১৯৩২ সালে শতকরা ৯০ ভাগ জনসংখ্যা অক্ষর চিনতে শিখল, নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসতে শিখল। মাত্র বারাে বছরের মধ্যে অশিক্ষিত জনসংখ্যার শতকরা ৬০ জনতাকে কী করে শিক্ষিত করে তােলা হল এ সত্যিই একটা বিস্ময়কর ব্যাপার। আরও বিস্ময়কর এইজন্যে যে এক পক্ষের প্রচেষ্টার দ্বারা এ কাজ সম্ভব নয়। কারণ যতক্ষণ না পর্যন্ত রাষ্ট্রের শিক্ষা দেয়ার অভিযানের সঙ্গে জনসাধারণের শিক্ষা গ্রহণেচ্ছু মনের মিলন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তা সম্পূর্ণ অসম্ভব। এই দুইয়ের মিলন কী করে সম্ভব হল? এর উত্তর মিলবে, মাকস্বাদে। এর উত্তর মিলবে মার্কসবাদী জীবন দর্শনের প্রতিফলনে। শিক্ষা আর কোনাে একটা শ্রেণীর হাতে ক্রীড়ানক বা বিলাসিতা হয়ে রইল না। শিক্ষা হয়ে দাড়াল জীবনের দৈনন্দিন প্রয়ােজনের একটা অঙ্গ। তৃষার্ত লােকের পক্ষে জলের মতন জরুরী হয়ে পড়ল এই শিক্ষা। সােভিয়েট সরকার শুধু মাত্র প্রাপ্তবয়স্ক অশিক্ষিতদের শিক্ষা দেয়ার কাজেই ব্যস্ত রইল না •আগামী সমাজকে চালিয়ে নিয়ে যাবে যে ভবিষ্যৎ বংশ...সেই শিশুদের শিক্ষা দেয়ার দিকেও বেশ কিছু দৃষ্টি দিল। শিশুসদন, কিণ্ডারগার্টেন, প্রাথমিক স্কুল, চিলড্রেনস্ প্যালেস, রঙ্গমঞ্চ, সিনেমা, ক্লাব:••সংস্কৃতি জগতে প্রবেশ করল ছেলেমেয়েরা যেন রূপকথার এক একটি নায়ক নায়িকা হয়ে। মেয়েদের জীবনে সন্তান পালন করা হল একটা ভয়ানক পীড়াদায়ক কাজ। শুধ, পীড়াদায়ক কাজই নয়, একটা বড় সমস্যা। সন্তানপালন একজন ০ ৭৯ মার ব্যক্তিগত জীবনকে কী ভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে তা আমরা আমাদের সমাজের দিকে তাকালেই দেখতে পাবাে। দেখতে পাবে তার ব্যক্তিত্ব সন্তানপালনের কাছে কত ছােট, কত নগণ্য হয়ে গিয়েছে। তার সমগ্র জীবনকে ঘিরে আছে স্বামীর পরিচর্যা আর সন্তানপালন। এর বাইরে সে অনুপস্থিত। এর বাইরে তার অস্তিত্ব একটা প্রকাণ্ড শুন্যতার মধ্যে বিলুপ্ত। সুতরাং সন্তানপালন ও শিক্ষাদীক্ষার মত বিরাট সামাজিক সমস্যাকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে সমাধান করতে পেরেছে বলে সােভিয়েট সমাজ দাবী করতে পারে। আজ প্রতিটি সােভিয়েট ছেলে-মেয়েকে কিণ্ডারগার্টেনে যেতে হবে, স্কুলে পড়তে হবে, সােভিয়েট শিল্প, কৃষি বা রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করতে হবে:••এ হল সমগ্র সােভিয়েট সমাজের দাবী। এ. থেকে ফাকি দেয়ার উপায় নেই। যদি কেউ ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করে তাহলে সে সােভিয়েট নাগরিক হওয়ার অনুপযুক্ত, তাহলে সে হল সােভিয়েট ব্যবস্থার শত্রু•••সােভিয়েট সমাজে অপাঙক্তেয়। শিশু-শিক্ষা ও উচ্চ শিক্ষার মধ্যেই সমস্ত শিক্ষা-আন্দোলন সমাপ্তিলাভ করে নি। সমাজের আরও গভীর তলদেশে, আরও ব্যাপক বিস্তৃতি নিয়ে সােভিয়েট সংস্কৃতির প্রবাহ অগ্রসর হয়ে চলেছে। তার ব্যাপ্তি দেখা যায় শহরের ও গ্রামের হাজার হাজার ক্লাবের মধ্যে। ও দেশের ক্লাবগুলি নিছক আমােদ প্রমােদের জায়গাই নয়, ক্লাব হল সামাজিক উৎকর্ষতার বড় বড় পীঠস্থান। ১৯১৪ সালে সমস্ত দেশে ক্লাবের মােট সংখ্যা ছিল ২২২টি। আর তখন কারা যেত এ সব ক্লাবে? জারের মােসাহেব, বড় বড় রাজকর্মচারী, বড় বড় খেতাবধারী খয়ের খাদের ছেলেমেয়ে, বড় লােক ও জমিদারদের পােষ্যপুত্র-এরাই ছিল সেদিন ক্লাবের পৃষ্ঠপােষক গরীব মজুর চাষীরা সেদিন শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থাকত ক্লাবগুলির দিকে••তার ত্রিসীমানায় প্রবেশ করতে পারত না কেউ। কিন্তু সেই ক্লাবের সংখ্যা ১৯৩৮ সালে দাড়িয়েছে ৯৫, ৬২৬-এ। আজ কারা যায় এই সব ক্লাবে? সেই সব লক্ষ লক্ষ মজুর চাষী যারা জারের সমাজে ছিল অপাঙক্তেয়, অস্পশ্য, ছােটলােক। সােভিয়েট ক্লাবের মধ্যে দিয়ে সংস্কৃতি আন্দোলন কী ভাবে অগ্রসর হচ্ছে তার খবর নেয়া দরকার। শিল্পাঞ্চলে, যৌথ খামারে, শহরে, জনসংখ্যার প্রয়ােজন অনুযায়ী হাজার হাজার ক্লাব সমস্ত দেশ জুড়ে গড়ে উঠেছে। কোথাও সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি কেন্দ্র, কোথাও শ্রমিক সংঘ ক্লাব, আবার কোথাও,যৌথ খামার ক্লাব । এই সব ক্লাবে একটা করে অত্যন্ত সুসজ্জিত পাঠাগার আছে। এখানে এসে লােকেরা মনােযােগের সঙ্গে পড়াশােনা করে•••নিজেদের দেশের নানান খবর, দেশ বিদেশের খবর, জ্ঞানবিজ্ঞানের খবর আহরণ করে, আলােচনা করে•••••পারস্পরিক আলােচনার মধ্যে দিয়ে শিক্ষা দিয়া-নেয়া করে। এই ক্লাবগুলি আবার শিল্প-কলা ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অনেকগুলি চক্র পরিচালনা করে যেমন সংগীত চক্র, কবিতা চক্র, চিত্রকলা চক্র, জীববিদ্যা চক্র, প্রত্নতত্ত্ব চক্র, স্থাপত্যবিদ্যা চক্র, এমনি আরও অনেক। শুধু ক্লাবেই নয়, কলকারখানাতেও এমনি অনেক চক্র গড়ে উঠতে দেখা গেছে। এই চক্রগুলি সােভিয়েটের সংস্কৃতি জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এবং এই চক্রগুলির মধ্যে যারা অত্যন্ত সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে থাকে তাদের মধ্যে মেয়েদের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযােগ্য। ১৯৩৩ সালের এক হিসাব থেকে জানা যায় যে তখনকার মােট চক্র-সভ্য সংখ্যা ২১,৭৯,০০০-এর মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ছিল ৯৭,০০০। তথ্য থেকে প্রমাণিত হয়েছে সৃজনীশক্তি, যে ৬ (১০) ৮১ কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে চক্রের মেয়েরা পুরুষদের প্রায় সমান সমান। সােভিয়েট দেশ থেকে নিয়মিতভাবে প্রায় চার হাজার দৈনিক ও সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে থাকে। এই সব পত্রিকার সংবাদদাতা ও সাংবাদিক হিসাবে মেয়েদের দান কিছু সামান্য নয়। তের বছর আগেকার কথা—সে সময়েই শতকরা প্রায় তের ভাগ সংবাদদাতা ও সাংবাদিক ছিল মেয়েরা। আজ অবিশ্যি তার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে কারণ সেদিনের তুলনায় মেয়েরা আজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির দরবারে এক বিশেষ আসন পাবার দাবী রাখে। ১৯৩৬ সালে মেয়েদের সম্পর্কে এক অত্যন্ত কৌতুহলজনক অনুসন্ধান চালানাে হয়েছিল সােভিয়েট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। ' সেই অনুসন্ধান থেকে জানা যায় যায় যে মেয়েরা গড়ে প্রতি মাসে প্রায় চার বার সিনেমা, থিয়েটার, কনসার্ট, যাদুঘর ইত্যাদিতে গিয়ে থাকে। জারের আমলে অধিকাংশ মেয়েই বাড়ীর বার হতাে না, যারা হতাে তারা কচিৎই এমনি ঘন ঘন আমােদ প্রমােদ অনুষ্ঠানে , যােগদান করত। আজ সেখানে পুরুষদের মতন মেয়েরাও সমানভাবে সিনেমা, থিয়েটার, কনসার্ট সম্বন্ধে আগ্রহ নেয়। সাহিত্য সম্বন্ধে তারা কী পরিমাণ আগ্রহ নেয় শুনলে অবাক হতে হয়। সে বছরেই হিসাব নিয়ে দেখা গেছে যে এক যন্ত্র নির্মাণ কারখানার মেয়ে কর্মীদের মধ্যে শতকরা ৬৬ ভাগ পুশকিনের “ইউজিন অনেজিন” ও গাের্কীর “মাদার” পড়েছে, ৫১ ভাগ পড়েছে গােগলের “ডেড সােস, ৫৫ ভাগ পড়েছে শােলােকভের “ভাজিন সয়েল আপটার্নড়” এবং শতকরা ৬৭ ভাগ গভীর মনযােগ দিয়ে অধ্যয়ন করেছে কমরেড স্টালিনের সপ্তদশ ক্যুনিস্ট পার্টি কংগ্রেসের অভিভাষণ। বিপ্লবের আগে যে নারীজাতির ২ সাহিত্য-জগতে (প্রাচীন সাহিত্যই হােক বা আধুনিক সাহিত্যই হােক) প্রবেশের কোনাে অধিকার ছিল না•••অশিক্ষার অন্ধকারে তলিয়ে ছিল যে বিরাট নারীসমাজ...তারা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উচ্চশীর্ষে উঠল কী করে? এই উন্নতি বাস্তবিকই চমক লাগায়। কৃষি জগতে মেয়েদের অস্বাভাবিক সাংস্কৃতিক উন্নতি সত্যি সত্যিই আরাে বেশী করে নজরে পড়ে। কারণ আগে অন্তঃপুরে বন্দী ছিল মেয়েরা। তাদের জীবনে ‘ঘর’ই ছিল একমাত্র সত্য•••তার বাইরে নিজেদের কথা ভাবতে পারতাে না তারা। দেশ বিদেশে কি ঘটছে, দেশের রাজনীতি কোন্ পথে চলেছে, সমাজ কোন্ দিকে মােড় নিচ্ছে, দেশের কোটি কোটি মানুষ কী ভাবছে, বিজ্ঞান জগতে কি কি নতুন আবিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে•••এ বিষয়ে কিছুমাত্র মাথা ঘামাত না তারা। খবরের কাগজ ছিল তাদের কাছে বিলাসিতা। আবার অধিকাংশ মেয়েরা কাগজের অক্ষরই চিনত না। আজ কিন্তু ঘরের বাইরে এসে তারা সমাজকে চিনেছে, জীবনে সমাজতন্ত্রবাদের বৈপ্লবিক আস্বাদ পেয়েছে। তাই সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে, সংবাদ- পত্রের মধ্যে দিয়ে তারা অগ্রসর সমাজের প্রাণস্পন্দন উপলব্ধি করতে পারে শ্রমিক সংঘ ও যৌথ খামার কর্মীদের সংগঠন পরিচালনার কাজে সােভিয়েটের মেয়েরা অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। প্রত্যেকটি কলকারখানায়, প্রত্যেকটি শ্রমশিল্পে সক্রিয় ও সচেতন মেয়েরা হাজার হাজার মেয়েদেরকে শ্রমিক সংঘে টেনে এনেছে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তাদেরকে দেখিয়েছে পরিবর্তনশীল সমাজ তাদের জীবনে কি সম্ভাবনা, কি সম্পদ নিয়ে আসছে। তেমনি গ্রামে গ্রামে হাজার হাজার পিছিয়ে থাকা মেয়েদের জীবনে তারা এক নতুন বার্তা t উপস্থিত করেছে ••যেথা খামারের কাজে তাদের সক্রিয় সহযােগিতা আদায় করেছে। সব চেয়ে উল্লেখযােগ্য বিষয় হল “যে সােভিয়েট ইউনিয়নের কম্যুনিস্ট পাটিই আজ সারা সােভিয়েট দেশকে জনসাধারণের কল্যাণে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। ১৯৩৩-এ এই পার্টির কেন্দ্রীয় তথ্য বিভাগ একটি হিসাব প্রকাশ করে, সে হিসাব থেকে জানা যায় যে পাটির শতকরা সভ্য-সংখ্যার সাড়ে যােলাে ভাগ হল মেয়ে। তের বছর পরে বর্তমানে মেয়ে-সভ্য সংখ্যা কত দাড়িয়েছে খবর অবিশ্যি আমাদের জানা নেই। কিন্তু এটুকু বল: চলে যে মেয়ে সভ্য সংখ্যা নিশ্চয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে কারণ সােভিয়েট নাৎসী যুদ্ধেই আমরা তাদের এক অসাধারণ গৌরবােজ্জ্বল রূপ দেখতে পেয়েছি। সােভিয়েটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি থেকে এতটা জিনিস খুব ভালােভাবে ধরা পড়ে যে সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর আজ আর কারা একচেটে অধিকার নেই। সংস্কৃতির সম্পদ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী ও পুরুষ নির্বিশেষে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। একজন রাশিয়ান, তাতার, আর্মেনিয়ান, সাদা রুশ, ভার জার্মান, কি উজবেক—কারাে মধ্যে এতটুকু অসামঞ্জস্য নেই। তারা প্রত্যেকেই বলতে পারে যে—এ আমার দেশ, একে ইচ্ছেমতাে গড়ে তােলার স্বাধীনতা আমার আছে এবং তাতে সােভিয়েট দেশের হাজার হাজার মানুষ সায় দিয়ে বলবে “নিশ্চয়ই, সে স্বাধীনতা তােমার আছে তােমার এবং আমাদের। আমাদের প্রত্যেকের স্বার্থ আজ আর পরস্পর বিরােধী নয়। এই সংস্কৃতি আজ আর লক্ষ্মীর বরপুত্রদের হাতে বিলাসের সামগ্রী হয়ে নেই। সভ্যতা ও সংস্কৃতির নতুন আলােয় আমাদের সমস্ত দেশ আজ উদ্ভাসিত।” ৮৪ এ কথা ওরা বলতে পারে। বলতে পারে টাকেন্টের মজুর আর জর্জিয়ার চাষী। কারণ ওরা জানে যে কারাে লুট করা সম্পদ দিয়ে আলাে জ্বলে নি ওদের দেশে। ওদের আলাে ওদের নিজেদের সৃষ্টি।

জাতীয় রিপাবলিকের মেয়েরা নানান জাতির মানুষ নিয়ে সােভিয়েট দেশের জনসংখ্যা। একশাে নব্বই রকম ছােট বড় জাতি সমান অধিকারের ভিত্তিতে ছড়িয়ে রয়েছে সারা দেশময়। এরাই হল সােভিয়েট সমাজের প্রাণ এবং তার মার্কস্বাদী নীতির ধারক ও বাহক। সােভিয়েটের নীতি যখন নারীমুক্তির বার্তা নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল তখন তা কোনাে বিশেষ দেশের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি, সমস্ত দেশের ছােট বড় সকল অঞ্চলে গিয়ে পৌচেছিল তার আলাে। কোনাে জায়গায়ে অতি সহজে সেই স্বাধীনতার বাণী গৃহীত হয়েছিল, আবার কোনাে কোনাে জায়গায়ে তুমুল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাকে এবং এই বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করতে গিয়ে বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণের প্রয়ােজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল। জারের রাজত্বে ছােট ঘােট জাতিদের হাজার রকম শোষণ নির্বিবাদে সহ্য করতে হতাে। তাদের প্রদেশ বা এলাকাগুলি ছিল জারের ঔপনিবেশিক শশাষণের যাঁতাকলের নীচে। যারা দরিদ্র জনসাধারণ তাদের ওপর ছিল দেশী ও বিদেশী দু রকমের শােধণ••••••একদিকে স্বদেশী বণিক, জমিদার ও মােল্লা, অন্য দিকে রুশীয় পুঁজিপতি। সুতরাং ধ্বংস হতে বসেছিল এই জাতিগুলির অস্তিত্ব। অত্যন্ত নিম্নস্তরের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আবর্তে ডুবে ছিল এই বিরাট এনামাজ। তাদের গােষ্ঠিপতি-প্রভাবান্বিত গােত্রীয় ও সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক বিধিব্যবস্থার মধ্যেই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। এই সমাজব্যবস্থায় স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আদিম প্রকৃতির। মেয়েদের ওপর পুরুষদের ছিল অখণ্ড আধিপত্য ; সামাজিক কাজকর্মে যােগ দোের তাদের কোনাে স্বাধীন ছিল না। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন ছিল তাদের কাছে স্বপ্ন। স্বামীর কাছে স্ত্রী ছিল তার দাসীর মতন•••••• তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির সমতুল্য, বাইরের সমাজে তার গতিবিধি ছিল নিষিদ্ধ। সারা দিন সাংসারিক কাজ, স্বামীর পরিচর্যা ও সম্মান সৃষ্টি—এই ছিল জীবনের মহত্তম উদ্দেশ্য। বহু শতাব্দী আগে (দ্বাদশ, এয়ােদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে) কিন্তু ঠিক উল্টো ছিল এই সমাজের অবস্থা ; মেয়েরাই ছিল সমাজের কত্রী। মধ্য এশিয়ার অনেক বড় বড় এলাকা ছিল মেয়ে-খানদের শাসনের অধীনে। চেঙ্গিস খাঁর আক্রমণের সময়ে দেখা গেছে যে মেয়েরা বীরত্বের সঙ্গে সেই দস্যু-সৈন্যদলের সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে। সেদিন উচ্চ শীর্ষে ছিল তাদের স্থান। মধ্য এশিয়া, ক্রাইমিয়া, ককেশাস, ট্রান্স-ককেশিয়া ও অন্যান্য মুসলমান সংস্কৃতিসম্পন্ন জাতিগুলি জারের আমলে বিশেষ করে এক নিদারুণ নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করত। তাদের ধার্মিক ও লৌকিক সংস্কারবদ্ধ সমাজ পরিবারের কর্তার ওপরই মেয়েদের সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করেছিল। যার চূড়ান্ত পরিণতি দেখা গিয়েছিল চরমতম নারী-নির্যাতনের মধ্যে। তাদের সামাজিক বিধি অনুসারে কোনাে স্ত্রী স্বামীর ও বাড়ীর কতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছাড়া কারাে সাথে বাইরে বেরুতে পারতাে না; নিষিদ্ধ ছিল পরপুরুষের সাথে কথা বলা, বােরখা না পরে রাস্তায় চলা ছিল বিধি- বহির্ভূত। নয় বা দশ বছর পার হলেই প্রত্যেক মেয়েকে পারাঞ্জা (মাথা থেকে পা পর্যন্ত দীর্ঘ আবরণ) পরতে হতাে। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত এই আবরণ অঙ্গে ধারণ করা ছিল সামাজিক বিধি। উজবেক এবং তাজিক মেয়েদের আট নয় বছর বয়সে বিয়ে দেয়া হতাে এবং যে কোনাে পাত্র অর্থের বিনিময়ে মেয়ে খরিদ করে তার মালিকানা স্বত্বের অধিকারী হতে পারত।

কিন্তু নতুন যুগ পত্তনের পর জার-শাসিত উক্ত উপনিবেশের সমস্ত ছােট ছােট জাতিগুলিকে সােভিয়েট রাষ্ট্র সমস্ত রকম অন্যায় ও অসঙ্গতি থেকে মুক্তি দিল। শুধু মুক্তি দিয়েই ক্ষান্ত হল না, অর্থনীতি, শিল্প ও কৃষিগত উন্নতির সাহায্যে পিছিয়ে-পড়া দেশগুলিকে স্বাবলম্বী সম্ভাবনাপূর্ণ করে তােলার দিকে নজর দিল। সােভিয়েটের ইউরােপীয় অংশে যে সব বাধাবিঘ্ন আদৌ দেখা দেয়নি বা অল্প পরিমাণে দেখা দিয়েছিল সেগুলি ব্যাপক আকারে দেখা দিল এই জাতীয় রিপাবলিক- গুলিতে। কারণ এই সব জাতির মেয়েরা ছিল অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং রক্ষণশীল। তাই আইনের সাহায্যে তাদের চিরাচরিত রীতিনীতি উচ্ছেদ করে স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করতে হল। জনসাধারণের কতৃত্ব কায়েম হবার সাথে সাথে বাধ্যতামূলক বিবাহ, গৌরীদান প্রথা, বলপূর্বক বিবাহ, মেয়ে-বিক্রী প্রথা আইনত উচ্ছেদ করে যােলাে বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার আইনসঙ্গত বয়স স্থিরীকৃত হল ! খােলা হল মেয়েদের ক্লাব সেখানে পুরুষদের যাতায়াত নিষিদ্ধ) এবং এই ক্লাবগুলিতে বসল সব বয়সের মেয়েদের জটলা; তাদের হাতের কাজ প্রদর্শিত হল সেখানে, নানান বিষয়ের ওপর নিয়মিতভাবে শিক্ষা পেতে থাকলে সবাই। ধীরে ধীরে এই ক্লাবগুলিই হয়ে উঠলো হাতের কাজের সমবায় ভাণ্ডার। এই ক্লাব থেকেই সর্বপ্রথমে মেয়েরা নিজেদের পরিশ্রমে একটা কারখানা গড়ে তুলল—সেই সব মেয়েরা যারা আগের দিনে ছিল হারেমের বন্দিনী। নারী আন্দোলনে এক নতুন স্রোত চোখে পড়ল। সবখানে যেন কর্মচাঞ্চল্যের ভাব। একমাত্র আজারবাইজান রিপাবলিকে ১৯২৩ সালে অনুষ্ঠিত হল যােলাে শো নারী সভা ও বিশটি নারী সম্মেলন। জর্জিয়ায় হল দু হাজার সভা, তেইশটি সম্মেলন। রক্ষণশীল মুসলিম সামাজিক প্রথা যা এতদিন সমস্ত নারীসমাজকে তার ৮৮ কর্মীর। নাগপাশে বেঁধে রেখেছিল, নতুন যুগের প্রবর্তনে তা ভঙ্গুর হয়ে এল। তার পর এল প্রথম ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা যা এই নড়বড়ে সমাজের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে কঠিন জমিনের ওপর স্থাপন করল। শিল্প ও কৃষি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দরকার হয়ে পড়ল নতুন মেয়েদের সামনে কর্মজগতের দ্বার উদ্ঘাটিত হল বিরাট প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বিভিন্ন কলকারখানায় যে সব শ্রমজীবীরা অংশ গ্রহণ করল তার মধ্যে কোথাও শতকরা প্রায় পঁচিশ ভাগ, কোথাও ত্রিশ ভাগ হল মেয়ে-শ্রমিক। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত এদের স্থান ছিল হারেমে... মেষপালন ও জীর্ণ কৃষিকর্ম ছিল এদের সমাজের রূপ। আমীর, খান, বে, মােল্লা, ইমাম, সুফি••••••মধ্য এশিয়ার বুক থেকে এদের কলঙ্কময় শশাষণের দাপট নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ধীরে ধীরে। এক সামাজিক বিপ্লব সমস্ত সমাজকে নতুনভাবে ঢেলে তৈরী করতে অগ্রসর হল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে জারের যুগে রাশিয়ায় অশিক্ষিতের সংখ্যা ছিল শতকরা সত্তর ভাগ কিন্তু এই সব নির্যাতিত জাতিগুলির মধ্যে অশিক্ষার প্রভাব ছিল আরও অনেক বেশী যেমন তাতারদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৮২ জন, শাদা রুশদের মধ্যে প্রায় ৮৯ জন, চুভাসদের মধ্যে ৯৪২ জন, কাবারডিনােদের মধ্যে ৯৬ জন। মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা ছিল আরও কম••••••প্রায় ছিল না বললেই চলে। কোথাও একশাে ভাগের এক ভাগের এক-তৃতীয়াংশ, কোথাও বা এক-পঞ্চমাংশ—এই ছিল স্ত্রী শিক্ষার প্রসার। আজ আর সেদিন নেই। শিক্ষার আনােয় আলােকিত হয়ে উঠেছে সমস্ত জাতীয় রিপাবলিকগুলি। খুব ছােট ছােট জাতি যেমন ইগুটিয়া, চুভাস, আদিজিয়া যাদের মধ্যে শিক্ষা ছিল না এতটুকু তারা আজ পুরােপুরি শিক্ষিত, সভ্য, সংস্কৃত। মেয়েদের মধ্যে সবাই লিখতে পড়তে । ৫ শিখেছে..কয়েক বছর আগে পর্যন্ত যারা শিক্ষার প্রয়ােজন অনুভব করত না। তুর্কমেনিস্তান, কাজাকস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, খিরগিজিয়া মধ্য এশিয়ার এই সব জাতীয় রিপাবলিকগুলি যেমন ভাবে দ্রুতগতিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে তেমনিভাবে উন্নত, স্বাবলম্বী ও সুসভ্য হয়ে উঠেছে সে সব দেশের লােকগুলি। সে সব দেশে কলখারখানা বসেছে, হাজার হাজার যৌথ খামার গড়ে উঠেছে, বৈদ্যুতিক স্টেশন, যানবাহন, রেল-লাইন, এবােপ্লেন, সভ্য সমাজের সব রকম সুখ সুবিধা সমস্ত দেশ- বাসীর জীবনে এক নতুন সভ্যতার ভিত গেঁথেছে। এই নতুন সভ্যতার স্পর্শ থেকে মেয়েরা বাদ যায় নি। যাদুর মতন এই রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে তারাও নিজেদেরকে নতুন সমাজের মুখােমুখি দাঁড় করিয়েছে। সােভিয়েট মধ্য এশিয়া তুলাের জন্যে বিখ্যাত। ওদেশের অপর্যাপ্ত তুলাের ফসলকে লােকেরা বলে শাদা সােনা। আগের দিনে এই তুলাের ফসলের সমস্তটাই জার সরকার নিয়ে যেত নিজের দেশে এবং রাশিয়ার সূতত কলে কাপড় তৈরী হতাে এই তুলে দিয়ে। কিন্তু আজ সােভিয়েট এশিয়াতেই রেশম ফ্যাক্টরী, সূতাে কল, কার্পাস কর্মশালা (cotton ginnery) গড়ে উঠেছে•••গড়ে উঠেছে সাধারণ ভােজনাগার, শিক্ষালয়, ডাক্তারখানা, ফ্যাক্টরী ক্লাব। তাই আর ঘরের কোণে আলাদা হয়ে বসে থাকতে পারে নি মেয়েরা ; সমাজের কর্মমুখর জীবনে এসে নিজেদের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে। কলকারখানায় এক মাস, দেড় মাস কাজ করে তাদের সমাজ-সচেতন মন এক অভিনব আস্বাদ পেয়েছে•••••• সবাই মিলে বৃহত্তর সমাজের জন্যে শিল্প উৎপাদনের এক অভিনব আস্বাদ যে আস্বাদ তাদেরকে উত্তরােত্তর আরও কর্মনিষ্ঠ আরও সমাজমুখী করে তুলেছে। বাড়ীর অভিভাবক বা স্বামী চাইত না যে করে। তার বােন, মেয়ে বা স্ত্রী কলকারখানায় কাজ করুক বা ঘন ঘন বাইরে অবাধ ভ্রমণ করুক কিন্তু সে সব লােক পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে যে তার সন্দেহ ভিত্তিহীন•••কোনাে মেয়েই ভুল পথে যাচ্ছে না, বরং অর্থ রােজগার করে নিয়ে আসছে, পরিবারে অর্থ বৃদ্ধি করছে; দৈনন্দিন জীবনে বিকাশ লাভ করছে সুখ ও সমৃদ্ধি। আধা-বর্বর মানুষ এমনি করে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নতুন সভ্যতার অধিকারী হল। আটত্রিশটি ছোট ছােট জাতি যাদের কোনাে বর্ণমালা ছিল না, সােভিয়েট শাসনে তাদের প্রত্যেকের জন্যে বর্ণমালা তৈরী হল। আজ সেই আটত্রিশটি জাতি তাদের নিজেদের বর্ণমালায় তাদের সমাজকে ব্যক্ত করে, প্রতিফলিত মধ্য যুগের অশিক্ষিত মানুষদের কাছে সংস্কৃতি নিয়ে এল এক বিস্ময়। বইয়ের পাতায় পাতায় অক্ষরের সমুদ্রের মধ্যে তারা এক নতুন কৌতুক, নতুন দীপ্তি খুঁজে পেল, যা এতদিন চাপা পড়েছিল নিতান্ত বাবর জীবনযাত্রার আড়ালে। কারখানার ক্লাবে ক্লাবে, গ্রামের কুঁড়েঘরের চালায় চালায় পাঠাগার বসল•••মানুষ জমলে দলে দলে•••হেঁড়া নাের কাপড় পরা দাড়ীওলা মুসলমান চাষী, কারখানা ও সমবায় ভাণ্ডারের মুসলমান মজুর •••তাদের চোখে মুখে অপরিমেয় কৌতুহল, হাল-বদলে যাওয়া দুনিয়ার দিকে তাকাবার কেমন একটা অপ্রতিরােধ্য উলঙ্গ দৃষ্টি। পারাঙ্গা-ঢাকা এবং পারাঞ্জা-খােলা মেয়েরাও করণ পাঠাগারের চার পাশে । গ্রামের কুঁড়েঘরে এমনি আলাের বিস্ফার! মেয়েদের দু চোখে শাণিত বিস্ময় ! শুধুমাত্র বিপ্লবের পরই নয়, আজও গ্রামে গ্রামে চাষীর কুটীরে পাঠাগার শিক্ষার পীঠস্থান হিসাবে বিরাজ করছে। কি ভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে এই পাঠাগারের সংখ্যা তা ভাবতে গেলে অবাক লাগে। এসে জটলা ১৯২৮-২৯ ১৯৩৩-৩৪ ৫৪ ৭৭ ২৪৮ ট্রান্স-ককেশাস ৮১১ ১,৪০৭ উজবেকিস্তান ৩,৪৭১ তুর্কমেনিস্তান তাকিজিস্তান ৩১৭ এই সংখ্যাগুলি সম্বন্ধে কিছু বলা নিষ্প্রয়ােজন। কারণ ক্ৰম-সমৃদ্ধিশালী সংস্কৃতি কি পরিমাণ এগিয়ে চলেছে তা আপনা থেকেই বােঝা যায়। বােঝ যায় কয়েক বছর আগে যে জাতির বর্ণমালা ছিল না সে জাতির কাছে এই মর্যাদা কত গভীর, কত ব্যাপক। নতুন সভ্যতার সংস্পর্শে এসে মেয়েরা বর্তমান যুগের বিলাসদ্রব্যের ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতন হল। সাবান ব্যবহার করতে শিখল তারা, কাপড়ের নীচে অন্তর্বাস পরার প্রয়ােজন অনুভব করল, বিছানা ও আসবাবপত্র তাদের দৈনন্দিন প্রয়ােজনের মধ্যে গণ্য হল...বিজলী বাতি পেল তারা তাদের হাতের নাগালে। সঙ্গে সঙ্গে পেল বিবাহ-বিচ্ছেদ ও স্বামী নির্বাচনের অধিকার। অর্থাৎ মধ্যযুগীয় সমাজ থেকে এক লাফে তারা চলে এল বিংশ শতাব্দীর সােভিয়েট সমাজের আওতায়। বারাে বছর বয়স হলেই পারাঞ্জার আড়ালে ঢাকা পড়ত যাদের জীবন, পরিবারের প্রত্যেকটি পুরুষ মানুষের পা ধােয়াই ছিল যাদের জীবনের ব্রত, বাড়ীর খুদ-কুঁড়ো দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হতাে যাদের•••তারা আজ স্বামীর পাশাপাশি বসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে•••তারই পাশে হয়ত পড়ে আরেকটি মেয়ে যার মা হয়তাে সারা জীবন কাটিয়েছে মাটির ওপর শুয়ে, কোনাে দিন সমাজের ভয়ে স্বামীর নাম পর্যন্ত মুখে আনতে পারে নি। মধ্য এশিয়ার কলঙ্কময় অতীত বর্তমানের উজ্জ্বলতায় মুছে গেছে ৯২ মুছে গেছে জার, আমীর, খান, বে ও মােল্লাদের কালাে শাসনের কাহিনী। একজন উজবেক মেয়ে আজতার মার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “পারাঞ্জা কাকে বলে বলতে পারাে মা?” মা অতীতের দিকে তাকায়, তারপর থেমে থেমে নতুন আগ্রহ নিয়ে পারাঞ্জার গল্প বলে। মেয়েকে যেন সাত সমুদ্র তের নদী পারের রূপকথার কাহিনী বলছে সে। সােভিয়েটের নারীমুক্তির কাহিনী এমনি কৌতূহলজনক,এমনি রােমাঞ্চকর। পর পর আটটি অধ্যায়ে সােভিয়েটের মেয়েদের কৃতিত্ব সম্বন্ধে যে সংক্ষিপ্ত ও ধারাবাহিক বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা থেকেই তার দূরপ্রসারী । বিস্তৃতি সম্বন্ধে একটা উজ্জল পরিচয় মেলে। অনেক দেশেই স্ত্রী-স্বাধীনতা বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল রেখে অগ্রসর হতে চেষ্টা করেছে•••••বিশেষ করে শহুরে মেয়েদের মধ্যে স্ত্রী-স্বাধীনতার ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছে উগ্র আধুনিকতা কিন্তু তাতে করে নারী সাধারণের সামগ্রিক স্বাধীনতা আসে নি। পাশ্চাত্যে স্ত্রী-স্বাধীনতা বলে যা পরিচিত তা হল অর্থশালী বণিক ও তার অনুবর্তী শ্রেণীর (বুজোয়। ও পেটিবুর্জোয়া) সামাজিক ব্যাধি—উগ্র আধুনিকতার নামে নারী জাতিকে শােধণের বৃত্তের মধ্যে আটক করে রাখার নতুন কায়দা। ভারতবর্ষের মত ঔপনিবেশিক দেশকে না হয় বাদ দেয়া গেল, কিন্তু অন্যান্য বড় বড় দেশ থেকে কোনাে অনুপ্রেরণা মেলে কি ? সেখানেও মেয়েদের ওপর সেই সামাজিক শশাষণ, পুরুষদের অপ্রতিহত অধিকার, অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা (যেটুকু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে জন- সংখ্যার তুলনায় সে আর কতটুকু!), রাষ্ট্ৰিক ক্ষেত্রে নিদারুণ অবজ্ঞা ; ব্যক্তিগত জীবনে সেই হতাশা, লাঞ্ছনা, সংগ্রাম ও দারিদ্র । কারণ পুরুষ কিংবা নারী কারাে চোখেই সমাজ, অর্থনীতি বা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ও রূপ ; এতটুকু পালটায় নি। বিত্তশালী ও বিত্তহীনের সেই সংগ্রাম বর্তমান, দেশের পঁচানব্বই ভাগ জনসাধারণ সর্বহারা শ্রমিক ও নিঃস্ব কৃষকের ওপর সমাজের পাঁচভাগ শােষকের নির্যাতন ; অসমান ধনবণ্টনপ্রণালী, পাশাপাশি প্রাচুর্য ও দুর্ভিক্ষের অবস্থান••••• এ সমাজে নারীমুক্তির কথা কল্পনা করা হাস্যকর। পাশ্চাত্য-মার্কা মুক্তি মিলবে কিন্তু সােভিয়েট সমাজ যে দূরপ্রসারী সামগ্রিক মুক্তির কথা প্রচার করে সেই মুক্তি বর্তমান সমাজকে জিইয়ে রেখে পাওয়া অসম্ভব। সুতরাং সােভিয়েটের মেয়েদের স্বাধীনতার কথা পুরোপুরি বুঝতে হলে, আমাদেরকে সস্ত সােভিয়েট সমাজকে বুঝতে হবে কারণ যে ভিত্তির ওপর সেখানকার মেয়েরা তাদের এমনি সুখী ও সম্পংশালী জীবন গড়ে তুলেছে, সে ভিত্তি অনেক মজবুত, অনেক গভীর আর অনেক ব্যাপক। ৯৪

স্বীকৃতি
“সােভিয়েটের মেয়েরা” বইখানি লেখবার সময়ে যে সব বইয়ের সাহায্য
পেয়েছি সেগুলির নাম নীচে উল্লেখ করলাম ।
The Position of Women in the U.S.S.R.
Soviet Communism
Russia in Peace and War
U.S.S.R. Speaks for Itself
Socialist Sixth of the World
Dawn over Samarkand
A to Z of the Soviet Union
Legal Rights of the Soviet Family
Education in the U.S.S.R.
..Soviet Union News
FLEWA
ot.'.
৯৫

উল্লেখযােগ্য ছাপার ভূল পৃষ্ঠা পঙক্তি অশুদ্ধ আকাঙ্খা আকাক্স। পঞ্চ-বার্ষিকী . শিল্প-শিক্ষা ৭ পঞ্চ- ২২: শিল্পশিক্ষ আকাঙ্খ চাষী আকাঙ্ক। চাষী ৪৮ ১ তাদেরকে তাদেরৰুে জনসাধাণরকে উপস্থিতি উৎকর্ষত। ৬s ১৮ জনসাধারণকে, উপস্থিত উৎকর্ম উৎকর্ষে ৭৭ ৭ ৮০ ২৫ ৯৬

No text on this page.

No text on this page.

Sovieter Meyera Ed.1st

Author
Roy Kalyani
Title
Sovieter Meyera Ed.1st
File name
Sovieter Meyera Ed.1st
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/08/17
Publisher
Dhruba Mitra, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
109
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Essays, Articles
Keywords
Development of the community of women at Soviet
DLI number
513316
Barcode
4990010020305.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
64Imcf2FvJ7
Download PDF

Sovieter Meyera Ed.1st