Makardah Saraswat Library, Howrah
Maner Gahane
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মনের গহনে
সরােজকুমার রায় চৌধুরী
১৭ ২২
VIA
KI
প্রকাশক-ঐভবভূতি রায়
রসচক্র সাহিত্য-সংসঃ
এ, সাহানগর রােড
টালীগঞ্জ, কলিকাতা
আশ্বিন, ১৩৪৩
-দাম দেডটাকা—
মুদ্রাকর—শ্রনীলকণ্ঠ ভট্টাচার্য্য
দি নিউ প্রেস
১, রমেশ মিত্র রােড, ভবানীপুর,
কলিকাতা।
অধ্যাপক শ্রীযুক্ত বিশ্বপতি চৌধুরী করকমলেষু
No text on this page.
মনের গহমে
822
মুর্শিদাবাদ জেলার দক্ষিণাংশে একটি সমৃদ্ধ গ্রাম।
এদিকে
কেবল মাঠের পর মাঠ, ধান-জমি। মাঝে মাঝে তাল ও আয়ের
বাগান। তাও মাঠের মধ্যে নয়, গ্রামের কোলে ।
জঙ্গলের চিহ্নমাত্র নাই। শীতকাল ! ধান কাটা হইয়া গিয়াছে
শুধু মাঝে মাঝে আগের ক্ষেত মাঠের শূন্যতা দূর করিতেছে।
এদিকে বাঘ আসার কথা নয়।
কেবল গো?
আখ গুলিকে ছেলেদের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য মাঝে মাঝে
লােকে গুজব তোলে, অমুক মাঠে বাঘ আসিয়াছে। এমন একট।
গুজবের মুখে সেবারে একটা ঘটনা ঘটিয়। গে।
তাতীপাড়ার কয়েকটি ছোকর: পাড়ার কয়েকটি খেজুর গাছে
র। লাগায়। গুড় তৈরী করিবার মতে প্রচুর রস এ দিকে হয় না ।
শুধু নিজেদের উষাপান, পাঁচজনের মধ্যে বিতরণ এবং খানিকটা
আমােদ—এই লাভ। কিন্তু তাহার জন্য কম কষ্টও করিতে হয় ন! ৷
রাত্রে লােকে আসিয়া রস খাইয়া চলিয়া যায়। সকালে ইহার।
গি দেখে ভাণ্ডে রস নাই। সেজন্য প্রায়ই রাত্রি জাগি
পাহারা দিতে হয়। এই কয়দিন
কেবল পাহারা দি:
হইতেছে না। বাঘের ভয়ে কেহ আর রাত্রে বাহির হইতে সাহ
করে না।
খুব ভােরে। আর রাত নাই, কিন্তু ভাের হইতেও বিল
আছে। তাতীপাড়ার ছােকরা কয়টি বেশ করিয়া কাপড় মুড়ি দি
মনের গহনে
থুর থর করিয়া কাশিতে কাপিতে হন হন্ করি। পথ চলিতেছিল।
হঠাৎ এক জন থমকিয়া দাড়াইয়া পড়িল।
–কি ।
ছােকরা কথা কহিল না, শুধু আঙ্গুল দি দেখাইয়া নিল,-
পথের ধুন স্পষ্ট বাঘের থাবার দাগ ! এ টি, টি, তিনটি, অনেক
ও বg-পদচিহ্ন বঁ দিকের ডোবার পথ বরিয়া গিয়াছে।
এইখানেই একট; খেজুর গাছে রস লাগান হই," যে !
সক্ট'' ।
-তার রসে কা নই, ' । চন হলে ঘরে ফিরি।
— র : গি পরিবারের ১: 'ব ব'সে থক গে ।
*
--কি কত বড় থাবদেখ: ?
'! .: 1 :: :: এর চেয়ে বড়।
বলি , কিন্তু সকলেরই কণ্ঠস্বর নামিয়া গিয়াছে।
বাঘ হইতে পারে, • • পরে । ব; কী এটার পায়ের
দগি {
স;' ৫ কাণ্ড ৮ করি। chat
3 : বড় কর | : : ন; ।
অং বে • • উঃ, এরে বারে বাঘ,
বাঘ !
এক কাণ্ড সকল তর্কের অবন ।
হারে ভাড়
মনের গহনে
-
দুম্ করিয়া মাটিতে ফেলিয়া দিয়া, সকলে একলাফে পাশের প্র*
টার উপর উঠিল । নীচে মাটির ভাণ্ড ভাঙিয়! রস গড়াইয়া পথ
কদ্দমাক্ত হইয়া গেল। আর উপরে তাতীপাড়ার ছেকর: ক. টি
পরস্পর জড়াজড়ি করিয়া কঁাপিতে সাগিতা।
প্রচারটি মােড়লদের খামারবাড়ার। এক {ন্তে !!
গােয়া ঘর, আর প্রান্তে রান্নার ।
র বিক। '
দেখিতে পায় নাই, চরের ঠিক নীচেই মোড়লদের বাড়'র ২
বৌ টি গােবর মাখিতেছিল । তগুলি লোক মাম্ কবি
প্রাচীরের উপর উঠিতেই সে ভয় পাইয়া বাড়ীর ভিতরে গি।
শশুকে খবর দিল।
শাশুড়া বাড়ার ভিতরে উঠান ঝট দিতেছিল । ব ‘টা হতেই
বাহিরে নিয়া কা সকণ্ঠে হাকিল,-কে রে পাড় !
আর জায়গা পাস নি ? আমার বউ এসেছিস উপদ 4
করতে ?
মুখপােড়র একদল তখন সরিতে সরিতে গোয়ালঘরের ক'?
পৌছিয়াছে, আর একদল রান্নাঘরের কাছে।
বুড়া চীৎকার করিতেই তাহার। ধমকাই; কহিল,
বাঘ!
-বাঘ ! দিনের বেলায় বাঘ !
ছোট ছে
পেয়েছিস, না রে ? নাম বলছি।
মনের গহনে
}
প্রাচীরের উপর দাড়াইয়া থাকা নিরাপদ নয়। বাঘ তো এক
লাফেই সব কয়টাকে সাবাড় করিয়া দিবে। তাহারা সকলেই
চালের উপর উঠিবার চেষ্টা করিতেছিল । কি শিশিরে খড়ের
চাল এমন পিছল হইয়া উঠিয়াছে যে, উঠিতে বড়ই কষ্ট হইতেছে।
আর সেই সময়েই বুড়ী টিসটিস্ আরম্ভ করিয়াছে ।
-আরে, এ মাগী করে কি ? বলছি, বাঘ .. !
—বাঘ বার করছি দাড়া রে মা ! ডাকি সনাকে, সে এসে
দেবে তােদের মুখে উড়ে জেলে। ওঠ তে রে লসন, মড়ার।
এসেছে সকাল বেলায় আমার বাড়ীতে বাঘ দে।
মাতার বারম্বার আহ্বানে লসন চোখ মুছি.• •ছিতে বিছানা
ছাড়িয়া উঠিয়া আসিল। দাওয়ায় দাঁড়াইয়া তা'র নজর পড়িল
সুমুখে রান্নাঘরের চালের উপর কয়েকটি লােক মাঘেষি বসিয়া
আছে, আর ভয়ে বারবার চারিদিক নিরীক্ষণ করিতেছে ।
কী হে পেল্লাদ ।
প্রহলাদ একবার পিছন ফিরিয়া চাহিয়া গেল না। (जगन
অবস্থায় বসিয়া ছিল, তেমনি অবস্থায় শুধু অস্ফুট স্বরে কহিল,-বাঘ ।
বাঘের গুজব কয়দিন হইতেই উঠিতেছিল।
লসন যে
কহিল—কোথায় হে?
প্রদ সাড়া দিল না, তীক্ষ দৃষ্টিতে চারিদিকে কি যেন
খুজিতে লাগিল।
মনের গহনে
লসন আবার উচ্চতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল,—কোথায়
পোদ ?
ভয়ের সময় বেশী কথা কহিতে বিরক্ত লাগে।
ঝাঁঝিয়া কহিল,কোথায় তা কি দেখতে পাচ্ছি না কি ?
খানেই আছে কোথাও।
পরক্ষণেই কে যেন চীংকার করিয়া উঠিল। কি বলিল বােক
গেল না। কিন্তু আওয়াজটা অত্যন্ত কাছেই মনে হইল। সঙ্গে
সঙ্গে আরও একজন কর্কশ কণ্ঠে পাড়া মাতাইয়া চীৎকার করিল --~-
পালারে বাঘ, বাঘ :
এবং তাহার চীংকার বাতাসে মিলাইতে না মিলাইতে কি
যেন একটা ভারী জন্তু যে ঘরের দাওয়ায় দাড়াইয়া লসন ব্যাঘ্রের
সংগ্রহ করিতেছিল, সেই ঘরের চালের উপর দুম
করিয়া লাফাইয়া পড়িল, বােধ করি পাশের তেঁতুল গাছট!
হইতে।
বাঘ।
চক্ষের নিমেষে লসন ছুটিয়া ঘরের মধ্যে গিয় খিল লাগাই।
তাহার স্বী দাওয়ার এক কোণে অন্তরালে উদগ্রীব হইয়া
দাড়াইয়াছিল। সেও কালবিলম্ব না করিয়া পাশের ঘরে খিল
লাগাইয়া দিল। কেবল লসনের বৃদ্ধা জননী ছুটিয়া পাওয়ায় উঠিতে
গিয়া সিড়িতে হোঁচট খাইয়া আবার উঠানেই গড়াইয়া পড়িল এবং
দিল ।
৭
মনের গহনে হাত-পা ছুড়িয়া জড়িত কণ্ঠে এমন ভাবে কাৎরাইতে লাগিল যে, শুনিলে মনে হয়, বাঘটা তাহার টুটি চাপিয়া ধরিয়াছে। আর গােয়াল ও রান্নাঘরের উপরের লােকেরা প্রাণপণে চালের খড় আঁকড়াইয়া ধরিয়া উপুড় হইয়া প্রায় শুইয়া পড়িয়াছে। ওদিকে বড় ঘরের চালের উপর যে জন্তুটা লাফাইয়া পড়িয়াছিল, ব্যাপার দেখিয়া সে তখন থম্কিয়া দাড়াইয়াছে। রান্নাঘরের উপর হইতে প্রহলাদের দল স্পষ্ট দেখিতেছে, সেটা সত্যই বাঘ নয়, একটা হনুমান মাত্র। কিন্তু তথাপি যেন কিছুতে বিশ্বাস করিতে পারিতেছে না। থাকিয়া থাকিয়া স্থলিত কণ্ঠে কেবলই চীৎকার করিতেছে,-বাঘরে, বাঘ, বাঘ ! কথাটা সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎগতিতে রাষ্ট্র হইয় গেল । মেয়েরা স্নান, ঘরের কাজ, রান্নাবান্না বন্ধ করিয়া রুদ্ধ রে ছেলেপুলে লইয়া বসিয়া রহিল। ঘাটে যাওয়ারও উপায় নাই, ঘরের বাহিরে আসিবারও উপায় নাই। বাঘটা যে কোনো মুহুর্তে যে কোন স্থান হইতে আসিয়া আক্রমণ করিতে পারে। অথচ মুস্কিলের কথা এই যে, বাঘটা যে ঠিক কোথায় আছে তাহাও ঠাহর করিবার উপায় নাই। এই দক্ষিণপাড় হইতে চীংকার আসিল, বাঘ, বাঘ। পরক্ষণেই পূর্বপাড়া হইতে তেমনি চীংকার আসিল। কোথাও খুট করিয়া একটা শব্দ হইতেছে কি লােকে ভয়ে বাঘ, বাঘ, বলিয়া চীৎকার করিতেছে।
মনের গহনে
গ্রামের চৌকিদার পরাণ হাজরার বয়স হইয়াছে। তবু এখনও
বেশ শক্ত-সমর্থ আছে। এতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের কুঁড়ে ঘরের
দাওয়ায় বসিয়া নিঃশব্দে তামাক টানিতেছিল। ঘরে তাহার দরজা
নাই, রাত্রে একটা ঝাপ বন্ধ করিয়া থাকে । তাহার স্ত্রী ঘরের
মধ্যে বসিয়া এতক্ষণ ধরিয়া পরাণকে ঘরে আসিবার জন্য সাধ্যসাধনা
করিতেছিল। সে ঘরে না আসিলে বেচারা ঝাপ বন্ধ করিতে
পারিতেছিল না। আবার ঝাঁপি বন্ধ না করাও নিরাপদ নয়।
—মিসে নিজেও মরবে, সাতগুষ্ঠিকেও মারবে ।
ঘরে আসবি
তাে আয়, নইলে দিলাম ঝাপ বন্ধ করে।
এবারে পরাণ ঝঝের সঙ্গে বলিল,-দে ক্যানে ঝাঁপ বন্ধ
ক'রে ! মানা করছে কে ?
তাহার স্ত্রী মুখ ভেঙুচাইয়া বলিল,—মানা করছে কে?
একটা মানুষ ঘরের বাইরে বসে থাকলে ঝাপ দেওয়া যায় ?
-তবে মর।
বলিয়া পরাণ বিরক্ত ভাবে কাটা দেওয়ালে ঠেস দিয়া রাখিয়া
উঠিয়া পড়িল এবং ঘরের এক কোণ হইতে একটা বড় টাঙি এবং
তাহার চৌকিদারী পেটিটা বাহির করিয়া উঠানে নামিল।
—আবার টাঙি নিয়ে চললি কোন্ চুলােয় ?
সে কথার কোন উত্তর না দিয়া পরাণ বাহির হইতে হইতে
শুধু বলিয়া গেল,—দে এইবার ঝাপ বন্ধ করে।
৯
মনের গহনে
তাহার পরিবার হাউ মাউ করিতে লাগিল। কিন্তু সে কোনাে
প্রকার ভ্রক্ষেপ না করিয়া বড় রাস্তায় আসিয়া দাড়াইল । তখন
অনেকটা বেলা হইয়াছে। সুমুখেই বৈঠকখানায় একটা মােড়ার
উপর বসিয়া রায়েদের বড় বাবু পাটের দড়ি কাটিতেছিলেন। পরাণ
উঠান হইতেই গড় হইয়া তাহাকে প্রাতঃপ্রণাম করিল।
বড় বাবু বিপুল শক্তি ও অসীম সাহসের জন্য বিখ্যাত। বয়স
ষাটের কাছে পৌছিয়াছে, কিন্তু এখনও তিনি হুঙ্কার দিলে বড়
বড় জোয়ানেরও বুক কাপিয়া ওঠে। এই বৃদ্ধ বয়সেও তাহার
সম্মুখে লাঠি ধরে, এমন লােক এ অঞ্চলে বেশী নাই।
তিনি পরাণের দিকে বঞ্চিম নেত্রে একবার চাহিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন,—এদিকে চলি কোথারে হারামজাদা? বাঘ এসেছে
পরাণ করযােড়ে নিবেদন করিল,--আজ্ঞে তাই শুনেই একবার
বেরুলাম বাবু। মাগীকে বললাম, তুই ঝাঁপ দিয়ে ছেলেগুলােকে
নিয়ে বােস, আমি বাঘের খপর টা একবার নিয়ে আসি।
বড় বাবু হাসিয়া বলিলেন-তাই যা। মাগীর হাতে শ্মশান
খরচটা রেখে এসেছিস তো?
পরাণ একগাল হাসিয়া কোমরের পেটিটার উপর অঙ্গুলি নির্দেশ
করিল । কহিল, “আজ্ঞে আমরা মহারাণীর চাকব, আমাদের
ওপর তো তেনার হস্ত উঠবে না ।
১০
মনের গহনে
যেন
এমন সময়ে কাছেই বহু কণ্ঠের সম্মিলিত কলরব উঠিল,-এই
যে, এই যে ! মার, মার।
মনে হইল মুখুয্যেদের খামারবাড়ীতে।
বড় বাবু ডান হাত দিয়া মেঝে হইতে কাস্তেটা উঠাইয়া লইয়া
মােড়াটিকে একেবারে দরজার গােড়ায় টানিয়া আনিলেন।
প্রয়ােজন বােধ করিলে, এক লম্ফে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতে
পারেন।
কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন অথচ বিরক্ত কণ্ঠে কহিলেন,—তা, সংবাদ নিতে
হয় তাে যা। নইলে ঘরের মধ্যে ঢোক্ ! বাঘট। মনে হচ্ছে
মুখুয্যেদের খামারবাড়ীতে ঢুকেছে।
পরাণ বাঁ হাতট। একবার পেটিতে একবার কপালে ঠেকাইয়া
টাঙ্গিটা কাধে ফেলিয়া কহিল,আজ্ঞে না, ঘরে আর প্রেবেশ করব
না, খপরটাই নিয়ে আসি।
বলিয়া মুখুয্যেদের খামারের উদ্দেশে প্রস্থান করিল।
বড় বাবু উদ্বিগ্ন মুখে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। এখান
হইতে মুখুয্যেদের খামারবাড়ী মিনিট তিনেকের পথ। একাকী,
এত কাছে একখানি মাত্র কাস্তে সম্বল করিয়া বসিয়া থাকা নিরাপ
হইবে কি না তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। এক কালে তাহার
নিজের বন্দুক ছিল, শিকারের সখও ছিল। পরিণত বয়সেও তিনি
নিজের হাতে ব্যাঘ্ৰ শিকার করিয়াছেন। তাই বাঘ যে কত হিংস্র
মনের গহনে
তাহাও তাহার অজানা ছিল না। কিন্তু কিছুদিন হইল কোন
অজ্ঞাত কারণে সরকার তাহার বন্দুক, এমন কি, বহুকষ্টে সংগৃহীত
কয়েকখানি গুপ্তি এবং তরবারিও বাজেয়াপ্ত করিয়াছেন। উপযুক্ত
অস্ত্র না লইয়া বাঘের সম্মুখীন হওয়া তিনি সঙ্গত মনে করেন নাই
বলিয়া নিশ্চেষ্টভাবে বসিয়। ছিলেন।
অথচ, ছাড়া বাঘ দেখিবার
সখটুকুও যােলাে আনা আছে ! এত কাছে বাঘ আসিয়া পড়ায়
তিনি ভাবিতেছিলেন, এখানে বসিয়া থাকা সঙ্গত হইবে কি না।
এমন সময় পাঁচু সেখ আসিয়া অভিবাদন করিল,-সেলাম
বাবু।
লােকটা উৎসাহের আধিক্যে একবারে শুধু হাতেই আসিয়া
উপস্থিত হইয়াছে !
--কি হে সেখজি ?
—জি, আপনাদের পাড়ায় নাকি বাঘ আছে ?
-আছে। তাই শুধু হাতে নেমন্তন্ন রক্ষা করতে
এসেছিস্?
পাচু এক গাল হাসিয়া কহিল,—জি, আমরা জাত পাঠান।
একটা নেংটে বাঘ মারতে আমাদের হাতিয়ার লাগে না। ধরব,
কি কল্লা মুচুড়ে লুব।
দাঁত খি চাইয়া বড় বাবু বলিলেন,-ভারি মরদ !
পাচু সেইখানেই সিড়ির উপর বসিয়া মেঝেয় একটা চাপড় দিয়া
।
মনের গহনে
কহিল,জি, পাঁচু সেখের মর্দানি সেবার বিলের লড়ায়ে তো
দেখলেন। পঁচিশটা জোয়ান আমি একা ভাগিয়েছি।
পাঁচু ক্ষুন্ন হইয়াছে দেখিয়া বড় বাবু হাসিয়া বলিলেন,—ওরে
হতভাগা, এ তাের লেঠেলি নয়। বাঘ লাঠি মানে না।
পাঁচু লাঠিয়ালি ঢঙে মাথায় একটা ঝাকি দিয়া তড়াক্ করিয়া
লাফাইয়া উঠিয়া বলিল,-কোন খানে বাঘটা আছে বলুন। পাঁচু
সেখের কেরামতি আর একবার হুজুরকে দেখিয়ে দিই।
পাঁচু বড় বাবুর পেয়ারের লাঠিয়াল। নিজের হাতে তাহাকে
লাঠি খেলা শিখাইয়াছেন। তাহার বহু দুঃসাহসের বিশ্বস্ত সঙ্গী সে।
তাহাকে বাঘের মুখে পাঠাইতে মন সরিতেছিল না। কিন্তু সে যে এ
ব্যাপারে নিষেধ মানিবে না, তাহাও বুঝিলেন।
একটু দ্বিধার সঙ্গে বলিলেন, যাবি ? তা যা।
বােধ করি
মুখুয্যেদের খামারেই আছে ।
তবে শুধু হাতে যাস নে। এই
কাস্তেখানা নিয়ে যা।
পাচু ওস্তাদের দেওয়া কাস্তেখানি পরম সমাদরে মাথায়
ঠেকাইল।
বড় বাবু আবার বলিলেন, দেখিস, যার তার ঘাড়ে
বসাস না যেন।
ওতে বিষ পান দেওয়া আছে। রক্ত বার হলে
আর নিস্তার নাই।
পাঁচুর উল্লাস দেখে কে! কাস্তেখানা ভালাে করিয়া পরীক্ষ।
মনের গহনে করিয়া পাঁচু বলিল, জি, তা হলে ও শালার মিত্যু নিঘ্যাৎ আমার হাতে। বলিয়া পাঁচু ওস্তাদকে আর একবার সেলাম করিয়া কাস্তেখানা উর্ধে তুলিয়া লাঠিয়ালি ঢঙে লাফাইতে লাফাইতে চলিয়া গেল। তঁতীপাড়ার ছেলে গুলি ঠিক দেখিয়াছিল । বাঘের পায়ের থাবাই বটে। অনুমান হইতেছে বাঘঢ়ি সেই দিক দিয়া সােজা চাটুয্যেদের কলাবাগানে ঢােকে। চাটুয্যেদের কলাবাগান তাহাদের অন্দরেরই এক প্রান্তে। চাযোগিন্নী সেদিকে গােবরছড়া দিতে গিয়া দেখিতে পান, বাঘটি সুমুখের দুই থাবায় মুখ ঢাকিয়া ঝােপের মধ্যে সম্ভবত নিদ্রা যাইতেহে। তিনি ছুটিয়া ঘরের মধ্যে আসিয়া প্রাণপণে বাঘ, বাঘ, বলিয়া চীংকার জুড়িয়া সে চীৎকারে পাড়ার লোেক উঠিয়া পড়ে। যাহারা সাহসী তাহারা ছুটিয়া বাহিরে আসে। কিন্তু এরূপ সাহসী ললাকের সংখ্যা নিতান্তই কম। অধিকাংশ লােকই নিরাপদ গৃহকোণে বসিয়া বলিতে থাকে—বাঘ না আরও কিছু! দেখেছে হয়ত উদবেড়াল, অমনি ভয়ে ভিরমি খেয়েছে। তবে আর মেয়েমানুষ বলেছে কেন? তথাপি পাড়ায় একটা সােরগােল ওঠে। এবং সে চীৎকারে নিদ্রাভঙ্গজনিত বিরক্তিতে গাত্রোখান করিয়া, ব্যাঘ্র মহাশয় দেন। ১৪
মনের গহনে
ছিল।
পদ্মগড়ের দক্ষিণ এবং বন্দীগড়ের উত্তর দিয়া সােজা পশ্চিম মুখে
হাঁটিতে থাকে। বন্দীগড়ের ঘাটে দত্তদের সেজ বৌ বাসন মাজিতে-
সে বাসন লইয়া একরূপ বাঘের মুখ দিয়াই বাড়ী ঢেকে ।
বাঘ হয়তাে তাহাকে লক্ষ্য করে নাই, নয় তাে অন্য কোন খেয়ালে
ছিল, অবলা মানবীকে আক্রমণ করার প্রয়ােজন বােধ করে নাই।
দত্তদের সেজ বৌও অতটা খেয়াল করে নাই। করিলে সেইখানেই
মূচ্ছ। যাইত।
বলে,দেখলাম যেন মা, কি একটা পদ্মগড়ের পাশ দিয়ে এই
দিকেই হেলে-দুলে আসছে। কে জানে মা, বাঘ! আমি তো
সুমুখ দিয়েই চলে এলাম।
বলে আর তাহার বুকের ভিতরটা পর্যন্ত কাঁপিয়া ওঠে।
দত্তরে সেজ ছেলে তখনও লেপ মুড়ি দিয়া শুইয়া ছিল। এই
শীতের রাত্রে এত ভােরে উঠিয়া স্ত্রী যে বাসন মাজিতে যায়, তাহা
তাহার ভালে লাগে না।
মুখের উপর হইতে লেপটা সরাইয়া তিক্ত কণ্ঠে সে বলিল,-
! রাত পােয়াতে না পােয়াতে নিত্যি নিত্যি বাসুন মাজার ধুম
পড়ে যায় ! নিত মাগীকে গপাং করে তাে বেশ হত ?
মাগী সভয়ে শিহরিয়া বলিল,-বাবা! এত বড় মাথাটা।
আমি তখনি জানি, উনি সহজ পেরানী লয় ।
উঃ! তুইত সবই জানিস। নিত্যি বলি অত ভােরে যাস
মনের গহনে: , গায়ে বাঘ এসেছে। আমার কথা গেরাহিই হয় না। এইবার যা । -আবার ! বলিয়া সেজ বৌ স্বামীর কাছে ঘেসিয়া আসিল। এখান হইতে বাঘ বরাবর গিয়া মুখুয্যেদের খামারে ঢােকে। শীতকাল। খামারে সারি সারি অনেকগুলি ধানের পালা। পাশা- পাশি দুইটি পালার মধ্যে যে সরু ফাক আছে, সেই স্থান দিনযাপনের পক্ষে নিরাপদ হইবে মনে করিয়া বাঘটা তাহারই মধ্যে আশ্রয় লয়। লােকে আর বাঘ খুঁজিয়া পায় না। শেষে মুখুয্যেদের রাখাল আসিয়া সংবাদ দেয়, বাঘ তাহার মনিবের খড়ের পালার ফাঁকে আশ্রয় লইয়াছে। খামার পরিষ্কার করিতে আসিয়া সে ছােকরা দেখিতে পায়, বাঘের লেজের কিয়দংশ বাহিরে থাকিয়া থাকিয়া লট্পট্ করিতেছে। দেখিতে দেখিতে বহুলােক খামারবাড়ীর চারিদিকের বাড়ী- গুলির চালের উপর উঠিয়া পড়িল। কিন্তু বেলা বাড়ে, তবু বাঘের বহিরাগমনের কোনাে লক্ষণই প্রকাশ পায় না। লােকে চালের উপর বসিয়া বসিয়া অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। এমন কি, কেহ কেহ এমনও বলিতে লাগিল যে, এত সােরগােগালের পরও যখন জন্তুটা বাহিরে আসে না, তখন ওটা নিশ্চয় বাঘ নয়, উবেড়াল কিম্বা অমনি একটা কিছু হইবে।
মনের গহনে
অবশেষে সরকারদের ওরধাপদ সকলের নিষেধ অগ্রাহ্য করিয়া
লাফ দিয়া খামারবাড়ীর মধ্যে পড়িল। ওর দেখিতে বেটে-খাটো,
কিন্তু গায়ে অসীম জোর--প্রশস্ত বুক, সুদৃঢ় পেশীবহুল বাহু এবং
সাহসও যথেষ্ট।
ছোকরা গায়ে ডজন্ খানেক জামা
জামা চড়াইয়া,
বুকে-মাথায় বেশ করিয়া কার্টার জড়াইয়া আসিয়াছে। বিশ্বাস,
বাঘে তাহার কিছু করিতে পারিবে না।
ওর অপেক্ষাকৃত কাছে আসিয়া ভীষণ দৃষ্টিতে দেখিতে
লাগিল, লেজটি বাঘেরই কিনা। বাঘ সে কখনও দেখে নাই।
বড়বাবুর বাড়ীতে কতকগুলো বাঘের চামড়া আছে বটে, কিন্তু তাহা-
দের লেজ কি রকম ছিল ঠিক মনে পড়িল না। তবু তাহার মন
বলিল, এ লেজ বাঘের না হইয়া যায় না।
উপর হইতে তখন ক্রমাগত প্রশ্ন আসিতেছে,—বাঘ বটে ত
হে ? না উদবেড়াল ?
সাড়া দিবার উপায় নাই।
ওর ঘাড় নাড়িয়া জানাইতে
লাগিল, বাঘই বটে।
শুনিয়া লােকগুলা চালের উপর বেশ সাবধান হইয়া বসিল।
ওরষার মাথায় একটা বুদ্ধি জাগিল । যদি আস্তে আস্তে খড়
চাপা দিয়া ফাঁকটুকু বন্ধ করিয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে বাঘটার
নিশ্চয়ই পলাইবার পথ বন্ধ হইবে। তখন তাহাকে কায়দা
করা সহজ হইবে । আগুন লাগাইয়াই হউক, আর সকলে
মনের গহনে মিলিয়া চাপ দিয়াই হউক, বাঘটাকে মারিয়া ফেলিতে কষ্ট হইবে না। এইরূপ সংকল্প করিয়া ওর বাঘের লেজের দিকে অটি আঁটি খড় চাপা দিতে লাগিল। পিছনের ফাঁকটা কেবল বন্ধ হইয়াছে, অকস্মাৎ একটা ভীষণ গর্জন উঠিল। তেমন গর্জন এ অঞ্চলের লােকে জীবনে শশানে নাই। চালের উপরের লােকগুলি পড়িতে পড়িতে কোনরূপে চালের খড় ধরিয়া বাঁচিয়া গেল বটে, কিন্তু তাহাদের কাঁপুনি আর থামে না। ভীষণ গর্জন এবং সঙ্গে জে ওর লক্ষ্য করিল বাঘটা দুই পা তুলিয়া সােজা হইয়া তাহার সম্মুখে দাড়াইয়াছে। প্রকাণ্ড মাথা, তাহাতে চোখ দুইটা জ জ করিতেছে, আর হা-মুখটা এতই বড় যে ওরম্বার কস্ফার্টার সমেত মাথাট। অবলীলাক্রমে তাহার ভিতর চলিয়া যাইতে পারে। পলকের মধ্যে ওরম্বার চক্ষুর সম্মুখ হইতে খড়ের পালা, ঘরের দেওয়াল, আকাশ, মাটি, গাছপালা লেপিয়া একাকার হইয়া গেল। তাহার সমস্ত বাহচৈতন্য লােপ পাইল। কিন্তু ভগবান মানুষের মনে আত্মরক্ষার যে স্বাভাবিক প্রেরণা দিয়াছেন, বােধকরি সেই প্রেরণার বশেই সে বাঘের উর্দ্ধোখিত সমুখের দুইটা পা প্রাণপণ শক্তিতে চাপিয়া ধরিল। তারপর আরম্ভ হইল, মানুষে বাঘে লড়াই। ১৮ মনের গহনে ওরম্বার দেহে অমিত শক্তি। বাঘটা তাহার দৃঢ়মুষ্টি হইতে সুমুখের পা দুইটা ছাড়াইয়া লইতে পারিতেছে না। কিন্তু এমন ধ্বস্তাধ্বস্তি করিতেছে যে, আর বােধ হয় বেশীক্ষণ সে-আক্রমণ প্রতিরােধ করিবার শক্তি ওরম্বার থাকিবে না। তাহার পিঠ একটা খড়ের পালায় না ঠেকিলে এতক্ষণ বােধ হয় সে পড়িয়া যাইত। পিছনের পা দিয়া বাঘট। তাহার পায়ের হাঁটু হইতে নীচে পৰ্যন্ত কয়েকটা স্থান চিরিয়া দিয়াছে। ক্ষতমুখ নিয়া ঝর ঝর ধারে রক্ত পড়িতেছে। ওরা বাঘের মুখের পা দুইটা ধরিয়া বাহু প্রসারিত করিয়া ঠায় দাঁড়াইয়া আছে। বিস্ফারিত চোখে সে যে কি দেখিতেছে, তাহা নিজেই বুঝিতে পারিতেছে না •••দুই মিনিট... এমন সময় চৌকিদার পরাণ হালদার আসিয়া টাঙি দিয়া বাঘের পিঠে মৃদু মৃদু আঘাত করিয়া বলিল,-হেট, হে। যেন তাহার দুষ্ট, হাঁস বলদটা গলাঞ্চি খুলিয়া খামারে ঢুকিয়াছে, ধান খাইতে। বাঘটা এক মুহূর্ত থমকিয়া দাঁড়াইল। তারপর এক ঝটকায় ওরম্বার মুষ্টি হইতে আপনাকে মুক্ত করিয়া লইয়া পরাণের উপর লাফাইয়া পড়িল—এবং সরকারী পেটির মর্যাদা কিছুমাত্র রক্ষা করিয়া মহারাণীর ভৃত্যের ঠোঁটের দক্ষিণ পাশ হইতে গালের খানিকটা মাংস উঠাইয়া লইয়া, এক লাফে খামার এক মিনিট..
মনের গহনে
বাড়ীর অনুচ্চ প্রাচীর ডিঙাইয়া একেবারে রাস্তায় আসিয়া
দাড়াইল ।
সেটা বড় রাস্তা নয়। ডান দিকে মুখুয্যেদের বাড়ী, তারপরে
মহান্তদের গােলাবাড়ী, তারপরেই একটা ছােট ডােবা। সেখান
হইতে একটা ছােট রাস্তা বাহির হইয়া গ্রামসীমান্তে হাড়ীপাড়ায়
পৌছিয়াছে, আর একটা বয়ে বেকিয়া রায়েদের বৈঠকখানার পাশ
দিয়া তাতীপাড়ার দিকে গিয়াছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পাঁচু
সেখ ডােবাটা পার হইয়া মহান্তদের
গােয়ালবাড়ীর কাছ পর্যন্ত লাফাইতে লাফাইতে গিয়াছে। কান্তে-
খানা তখনও তাহার ডান হাতে তেমনি শূন্যে নাচিতেছে ।
এমন সময় চারি চক্ষে সম্মেলন !
সঙ্গে সঙ্গে জাত-পাঠানের মুখ শুকাইয়া গেল।
কে জানিত
বাঘের চোখ এমনি করিয়া জ জ করে ! বাঘটা তাড়াইয়া
আসিতেই, সে কাস্তেখান। তাহার দিকে লক্ষ্য করিয়া ছুড়িয়া দিয়াই
ডােবায় লাফ দিল, সেখানে বাঘের গায়ে লাগিল কিনা, অথবা
লাগিলে ও ফল হইল কিনা, পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিলও না।
কেবল অনুমানে বুঝিল ঠিক তাহার পিছনে পিছনে আরও একটা
কি যেন জলে লাফ দিয়া পড়িল ।
পাচু সেখ ডুব-সাঁতার কাটিয়া ও-পারে গিয়া উঠিল, এবং
দুরন্ত শীতে ভিজা কাপড়ে ঠক্ ঠক্ করিয়া কাপিতে কাঁপিতেই
২০
মনের গহনে ওপাশের পদ্মগ’ড়েতে আবার লাফ দিয়া পড়িল। বাঘটা খানিক জলে সাঁতরা-সাঁতরি করিয়া আবার এ-পারেই উঠিয়া আসিল, এবং মহান্তদের গােয়ালঘর ও মুখুয্যেদের বাড়ীর মধ্যে যে সরু গলি আছে সেইখানে দাড়াইয়া হাঁপাইতে লাগিল। হঠাৎ তাহার নজরে পড়িল বড় বড় বাবরী চুলওয়ালা কে একজন একটা রামদা হাতে করিয়া চুপি চুপি সরিয়া পড়িবার চেষ্টা করিতেছে। বাঘটা ইচ্ছা করিলে এক নিমেষে তাহার উপর লাফা- ইয়া পড়িয়া তাহাকে শেষ করিয়া ফেলিতে পারিত। কিন্তু সে কিছুই করিল না। শুধু সুমুখের বড় বড় ঝকঝকে দাঁত দুইটা বাহির করিয়া শব্দ করিল,-গাও-ও। ব্যস। আর দেখিতে হইল না। বাবরীওয়ালা লােকটি ছিটুকাইয়া প্রথমে মহান্তদের গােয়ালঘরের দেওয়ালে পড়িল, সেখান হইতে আছড়াইয়া পড়িল মুখুষ্যেদের ঘরের দেওয়ালে। দুইটা গাল এবং হাঁটুর চামড়া খানিকটা উঠিয়া রক্তাক্ত হইয়া গেল । তখনও তাহার থামিবার উপায় নাই। লােকটা গড়াইতে গড়াইতে ডােবার জলে গিয়া পড়িল। বাঘ কিন্তু আর সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করিল না। হেলিয়া দুলিয়া মৃদুমন গতিতে মহান্তদের গােয়ালঘরে গিয়া প্রবেশ করিল। গােযাগের এক কোণে গুটি তিনেক গরু বাঁধা ছিল। দেখিয়। সেগুলা তখন কোণে ঘেষাঘেষি করিয়া দড়ি ছিড়িবার ব্যর্থ কিন্তু মনের গহনে চেষ্টা করিতে লাগিল। গােকুল মহান্ত খবরটা শুনিয়া রুদ্ধ শয়ন- কক্ষের মধ্যে বসিয়া কপালে করাঘাত করিয়া আর্তনাদ করিতে লাগিল,—গেল রে, গেল গেল, হিন্দুধৰ্ম্ম রসাতলে গেল। বাঘটা এতক্ষণে গরুগুলিকে বুঝি সাবাড় করিয়া ফেলিল। কিন্তু ডােবার জল হইতে উঠিবার পর হইতে বাঘটা যেন মহাত্মা গান্ধীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছে। গরুগুলির হাম্বার এবং হুটোপাটিতেও তাহার জলযােগের স্পৃহা দেখা গেল না। সে আর এক কোণে স্থির হইয়া বসিয়া প্রসারিত জিহ্বা দিয়া পদতল হেলন করিতে লাগিল। অনেকগুলি লােক সঙ্গে সঙ্গে গােয়ালঘরের চালের উপর উঠিয়া পড়িল। একজন বুদ্ধি করিয়া চালের খড় খানিকটা ফাঁক করিয়া, সেই পথে একখানা কাস্তে-বাঁধা বাঁশের লগি দিয়া গরুগুলির গলার দড়ি কাটিয়া দিল। ছাড়া পাইয়া গরুগুলি যে লাফ দিয়া কোন্ দিকে পলাইল, তাহা আর দেখা গেল না। বাঘ শুইয়া শুইয়া অপাঙ্গে চাহিয়া সব দেখিল । কিন্তু একটা গরুও ধরিবার চেষ্টা করিল না। সেই অবস্থায় শুইয়া শুইয়া ফাইতে লাগিল। এইবারে বাঘটাকে বন্দী করা যায় কি করিয়া? গােয়ালঘরের শিকল সাধারণতঃ আগাই হয়। কিন্তু নামিয়া গিয়া শিকল লাগাইবে কে ? আবার কয়েকজন লােক সেইখানকার চালের ২২ মনের গহনে খানিকটা অংশের খড় সরাইয়া ফেলিল এবং বারকয়েক চেষ্টা করার পর সেই কাস্তে-বাঁধা লগিটা দিয়া অবশেষে শিকল তুলিয়া দিতে সক্ষম হইল। প্রথমে উপর হইতেই বেশ ভালাে করিয়া দেখা হইল শিকল ঠিক লাগিয়াছে কি না। কিন্তু তাহাতেও যথেষ্ট আস্থা স্থাপন করিতে না পারিয়া, শেষে একজন সাহসী ব্যক্তি নামিয়া আসিয়া, তাহার উপর একটা ভারী তালা বেশ শক্ত করিয়া লাগাইয়া দিল। এত বড় সাফল্যে চালের উপর মহােৎসব লাগিয়া গেল। কতকগুলা ছােকরা চালের মটকার প্রায় সমস্তটারই খড় উপড়াইয়া ফেলিয়া দিয়া হৈ হৈ করিতে লাগিল । সে খবর শুনিয়া গােকুল মহান্ত আবার চীৎকার করিতে লাগিল, ওরে বাবারে, ছোড়ারা মিলিয়া তাহাকে সর্বস্বান্ত করিল রে। একে তাহার খড় নাই। খড়ের অভাবে বহু কাল গােয়াল- ঘর সংস্কার করিতে পারে নাই। তাহার উপর যে সামান্য আচ্ছাদন ছিল, তাহাও পাঁচ শয়তানের পাল্লায় পড়িয়া শেষ হইয়া গেল। গােকুল শাসাইতে লাগিল, নষ্টামি দেখিয়া দেখিয়া তাহার চুল পাকিয়া গেল। সে আর নষ্টামি বােঝে না ? ও সব বাঘ-মারা তাে নয়, তাহার সর্বনাশ করা। একবার কাছারী খুলুক, তারপর সে সকলের নামে এক এক নম্বর ঠুকিয়া খেসারত আদায় করিয়া ছাড়িবে, তবে তাহার নাম গােকুলচন্দ্র দাস মহান্ত।
মনের গহনে কিন্তু গােকুলের কণ্ঠ রুদ্ধগৃহের বাহিরে এতদূর পর্যন্ত পৌছিতে- ছিল না। পৌছিলে তাহাতে কর্ণপাত করিবার মতাে মনের অবস্থাও কাহারও ছিল না। তাহারা উপর হইতে বাঘের উপর বড় বড় ইট, পাথর ছুড়িতে লাগিল। তাহাতে অবশেষে বাঘ যেন অত্যন্ত বিরক্তভাবে উঠিয়া দাড়াইয়া চালের উপরকার লােকদের প্রতি একবার ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া, ঘরের মধ্যে পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। লােকে মাঝে মাঝে বর্শা ছুড়িয়া মারে। কোনােটা গায়ে আসিয়া টপ করিয়া পড়ে, কোনােটা মেঝেয় বিধিয়া যায়। বাঘটা মাঝে মাঝে লাফ দিবার ভয় দেখায়। কিন্তু লাফ দিয়া তাহাদের কিছুই করিতে পারিবে না জানিয়াও লােকেরা ছুটিয়া পলাইবার চেষ্টা করে। তাড়াতাড়িতে পরস্পরের মাথায় মাথা ঠুকিয়া যায়, মাথা ফুলিয়া ওঠে। অবশেষে স্থির হইল, এমন করিয়া কিছুই হইবে না। গ্রামের মধ্যে একটি মাত্র লােকের কাছে বন্দুক আছে। তাহাকেই ডাকিয়া আনা হউক। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন লােক লাফাইয়া পড়িয়া ছুটিল কাশী হালদারের বাড়ী। হালদার বাড়ীতেই ছিল। ডাকাডাকির পর তাহার বড় ছেলে আসিয়া বলিল,-বাবা মাথার অসুখে শয্যাগত। -তা হােক। তাকে উঠতেই হবে। বাঘটাকে মহান্তদের গােয়ালে বন্দী করেছি। গুলি করে মারতে হবে। অনেক ২৪
মনের গহনে
ছেলেটি বাড়ীর ভিতরে গেল। ফিরিয়া আসিয়া জানাইল,
তাহার ভয়ানক মাথা ধরিয়াছে, কিছুতেই উঠিতে পারিবেন না।
লােকগুলিও নাছােড়বান্দা, তাহারা বলিল,-উঠতে পারবে
কি রকম! এখান থেকে আমরা তার গলা শুনতে পাচ্ছি।
তে উঠেই আছে।
ছেলেটি আবার বাড়ীর ভিতর হইতে ফিরিয়া আসিয়া
জানাইল, না, তিনি কিছুতেই উঠিতে পারিবেন না। তাহার মাথা
ঘুরিতেছে, গুলির নিশানা হইবে না।
-তবু বন্দুকটা দিতে বল। আমরা অন্য লােক দিয়ে
গুলি করাবাে। বড় বাবুই করতে পারবেন, কি বল হে
চন্দরা ?
এমন সময়ে কাশী হালদার মাথায় পাগড়ী জড়াইয়া আসিয়া
উপস্থিত হইল। মিষ্টি হাসিয়া বলিল,-বন্দুক দোব কি করে
হে?
আমি ছাড়া আর কারও ও বন্দুক ছোবার লাইসেন্
আছে ?
লােক গুলি সকাল হইতেই উত্তেজিত হইয়াছিল। এখন চটিয়া
বলিল,-তাহলে বাঘ মারার কি হবে?
হালদার অবলীলাক্রমে হাতের তালু উল্টাইয়া বলিল,-তা
আমি কি জানি !
এ কথায় লােক গুলি চটিয়া আগুন হইল। বলিল,-তুমি
মনের গহনে -ওঃ । জান না, বটে? তোমাকে গাঁয়ে বাস করতে হবে না? ছেলে মেয়ের বিয়ে পৈতে দিতে হবে না? পাঁচজনকে কাজকর্মে ডাকতে হবে না? তখন দেখে নােব জানাে কিনা। এবারে হালদার যেন অনেকটা নরম হইল। কহিল,তুমি তাে বলছ বটে হে, চন্দরা। কিন্তু তিনটি বুলেটের দাম একটি টাকা। টাকাটি দেবে কে শুনি? তুমি দেবে ? —আমি কেন দেবে ? দরকার যদি হয়, গাঁয়ের যােনল। আনা চাদা তুলে দেবে। যােলাে আনা চাঁদা তুলে দেবে ! তবেই হয়েছে ! হালদার ঠোট উল্টাইয়া হাসিল । চন্দর অসহিষ্ণু ভাবে তাহার হাতে একটা ঝাকি দিয়া কহিল, –আচ্ছা, একটা টাকা তুমি আমার কাছেই নিও হে। তারপর সে চাদা তুলতে হয়, যা করতে হয় আমি বুঝবে। মানুষের বিপদের সময় মােচড় দিয়া অমনি ভাবে টাকা আদা- য়ের অভ্যাস হালদারের চিরকালের। সে সন্ধিগ্ধ ভাবে চন্দরার পানে চাহিয়া বাড়ী যাইতে যাইতে বলিল,-দেখাে ভাই চন্দরা, বত্রিশ বন্ধনের মধ্যে কথাটা বললে। তােমার ধর্ম তােমার কাছে। আমি আর কি বলবাে? হালদারবাড়ীর ভিতরে চলিয়া যাইতেই চন্দরা পাশের লােক- টির গা টিপিয়া বলিল,-তিনটি বুলেটের দাম এক টাকা। শুনেছ মনের গহনে গু, হে! কাৰ্য্য তো উদ্ধার হােক, তারপরে দেখা যাবে কত জলে কত মুসুরী ভেজে। হালদারকে পরম সমাদরে গােয়ালঘরের চালের উপর তুলিয়া দেওয়া হইল। সঙ্গে তিনটি বুলেট। কিন্তু নিরাপদ স্থানে দাঁড়াই- যাও ব্যাঘ্রের চাল-চলন, সক্রোধ দৃষ্টি দেখিয়া তাহার হৃদকম্প উপস্থিত হইল। অমন করে নয়,—অমন করে নয়। একটা দাবা বাশ চালের ভেতর দিয়ে নামিয়ে দাও। দিয়ে জন পাচেক বলাধান লােক সেইটে বেশ বাগিয়ে ধরাে,-যেন নড়ে না। আর আমার মাজায় দড়ি দিয়ে বেশ ক'রে বাধে। দেখছো না, বাতের যন্ত্রণায় মাজা হিছে । তাহাই করা হইল। বাঁশের সঙ্গে বেশ করিয়া হালদারকে বাধা হইল, যাহাতে তাহার কোমর না নড়ে। তারপরে হালদার বেশ করিয়া বন্দুক উচাইতেই বাঘটা থাবা গাড়িয়া বসিয়া নির্নিমেষে চাহিয়া রহিল। সে চাহনিতে তাহার বুকের ভিতর পর্যন্ত কাপিয়া উঠিল। কোন রকমে ঘােড়াট। টিপিতেই গুড় ম করিয়া একটা আওয়াজ হইল। এই পর্যন্ত হালদারের মনে আছে। তারপরে কখন যে গুলি খাইয়া বাঘটা ভীষণ গর্জন করিয়া চালের মটকা পর্যন্ত লাফাইয়া উঠিল, আর কখনই বা তাহার বন্দুকট। হস্তচ্যুত হইয়া পড়িয়া গেল, সে সকল কিছুই মনে পড়ে না। ২৭ মনের গহনে যখন জ্ঞান হইল, তখন দেখিল বাঘটা কাৎ হইয়া পড়িয়া আছে। তাহার মুখ দিয়া অঝােরে রক্ত গড়াইতেছে,সে রক্তে গােয়ালঘরের মেঝে কর্দমাক্ত হইয়া গিয়াছে। আর লােকগুলা সেই ভারী বশটা দিয়া বাঘের মুখে-পেটে ক্রমাগত গুতাইতেছে। কিন্তু সে সমস্ত দেখিয়া ও সে কিছু মাত্র উৎসাহিত হইল না। যেন শুধু বলিল, “একটু জল । বাঘ মরিয়াছে ! বাঘ মরিয়াছে । কথাটা শুনিয়া মানুষের দেহে প্রাণ আসিল। যে যাহাকে দেখে, সেই তাহাকে উৎসাহের সঙ্গে সংবাদটা দেয়, যেন সে-ই বাঘটা মরিয়াছে। মেয়েরা ত সমস্ত দিনের পর বাহিরে আসিয়া আলাের মুখ দেখিয়া বঁচিল। সমস্ত দিন কচি-কাচা ছেলে-মেয়ে লইয়া দুরু দুরু বক্ষে ঠায় বসিয়া কাটাইয়াছে। ছেলেদের মনে এমন একটা আতঙ্কের সঞ্চার হইয়াছিল, যে কেহ একটা টু শব্দ পর্যন্ত করিতে সাহস করে নাই। অপরাহ্ন বেলায় একখানি হিষের গাড়ীতে বাঘের মৃতদেহ লইয়া লােকে গ্রাম-প্রদক্ষিণে বাহির হইল। ছেলেরা মরা বাঘের উপর অকারণেই মাঝে মাঝে খোচা দিয়া বীরত্ব প্রকাশ করিতে লাগিল। যে জন্তুটা এত লােককে জখম করিয়াছে, এবং গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতাকে সমস্ত দিন এক প্রকার অনাহারে রাখিয়াছে, তাহার প্রতি ক্রোধ হওয়াই স্বাভাবিক। মরার পর জানা গেল, ২৮
মনের গহনে
বাঘটার বসন্ত হইয়াছিল। সেইজন্য সে বেশ কাবু হইয়াছিল।
নহিলে তাে গ্রামে আর লােক রাখিত না। তাহাকে যে এখন
সকলে খোঁচা দিবে তাহা আর বিচিত্র কি ?
মহান্তদের গােয়াল হইতে মিছিল বেণেপাড়ার ভিতর দিয়া
ঠাকুরপাড়ায় পৌছিল। প্রথমে হরিহর ঠাকুরের বাড়ী, তার পরেই
চাটুয্যে বাড়ী। বাঘের গাড়ী আসিয়া দাঁড়াইতেই চাটুযযাগিন্নী
একটা ঘটি হাতে করিয়া আসিয়া একবার সানেত্রে বাঘটার
সৰ্বাঙ্গ নিরীক্ষণ করিয়া, অবরুদ্ধ স্বরে কহিলেন,-কা’র শাপে এসে-
ছিলি বাবা! বাঘ তাে নাে, বাঘ হয়ে ছ’লতে এসেছিলি! আমি
যে তােকে দেখেই চিনেছি ।
চাটুষ্যেগিন্নী ঘটির জল দিয়া বাঘের চারিটি পা ধুইয়া দিয়া,
পথের উপরেই গড় হইয়া প্রণাম করিলেন।
হরিহর ঠাকুরের স্ত্রী এমনি মজা দেখিতে আসিয়াছিলেন ।
কিন্তু চাটুযযাগিন্নীর কাণ্ড দেখিয়া তাঁহার ঠোঁটের হাসি মিলাইয়া
গেল। তিনিও ছুটিয়া বাড়ীর ভিতর হইতে একঘটি জল আনিয়া
বাঘের চরণ প্রক্ষালন করিয়া ভক্তিভরে প্রণাম করিয়া, পুত্রকন্যার
জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করিলেন।
এক মুহুর্তে বাঘ দেবতা হইয়া গেল। কাহার শাপে তিনি
ব্যাঘ্ৰদেহ ধারণ করিয়াছেন, কেনইবা এই গ্রামের নিরীহ
বাঙালী সন্তানকে এতক্ষণ ধরিয়া ছলনা করিলেন এবং চাটুয্যে-
মনের গহনে গিন্নীইবা শকটারূহ মৃত ব্যাঘ্ৰদেহ দেখিয়া কি করিয়া চিনিলেন, এ সকল বিষয়ে চাটুয্যেগিন্নীকে কেহ কোনাে প্রকার প্রশ্ন করারও প্রয়ােজন বােধ করিল না। যে পথে বাঘ যায় তাহার দু-পাশে কাতার দিয়া মেয়েরা আসিয়া দাড়াইতে লাগিল এবং বিসর্জনের প্রতিমাকে যেমন মহা ভক্তিভরে গলদলােচনে বিদায় দেয়, তেমনি করিয়া বিদায় দিতে লাগিল। বাঘের বড় বড় থাবা সধবা মেয়ের দেওয়া সিন্দুরে রাঙা হইয়া উঠিল। যে কয়টা ছোড়া এতক্ষণ খোচা দিতেছিল, বড়দের তাড়া খাইয়া তাহারা পিছনে হটিয়া গেল এবং বড়দের মুখ দেখিয়া মনে হইল, বাঘটাকে চালচিত্র দিয়া ঘিরিয়া প্রতিমার মতাে সাজাইয়া লইয়া যাইবার উপায় থাকিলে, তাহারা কঁাধে করিয়াই গ্রাম-প্রদক্ষিণ করিত। ৩০ মনের গহনে
No text on this page.
মনের গহনে
উঠে না।
সেই।
এ-পাশে শিবের মণ্ডপ। মাঝখানে একটা ডােবা। ও-পাশে
নদাই ঘােষের ছােট্ট কুড়ে ঘর।
শিবের মণ্ডপ জরাজীর্ণ হইয়া গিয়াছে। ছাদের খানিকটা
অংশ ভাঙিয়া পড়িয়াছে। থামগুলা সরু হইয়া আসিয়াছে, গাজনের
ঢাক বাজিলে বুড়া মানুষের দাতের মত হ হ করিয়া নড়ে।
তথাপি যে, ভাঙিয়া পড়ে না, সে নিশ্চয় বাবা ধৰ্ম্মরাজের মহিমা।
প্রতি বৎসর গাজনের সময় মণ্ডপের মাতব্বরের মণ্ডপ সংস্কারের
জন্য চঁদা সংগ্রহের চেষ্টা করে। গাজন কাটিয়া যায়, কিন্তু চাদা
আবার যে কে
এমনি করিয়া বছরের
পর বছর কাটে। মণ্ডপের অবস্থা জীর্ণ হইতে জীর্ণতর হয়।
মণ্ডপের ‘দেয়াসীন’ ঢাকের বাজনার সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে মাথা
বাবা ধৰ্ম্মরাজ অবশেষে তাহার স্কন্ধে ভর করেন।
‘দেয়াসীন মণ্ডপের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে গড়াগড়ি দেয়।
ঘন ঘন ‘বলল শিববা ধৰ্ম্মরাজ' বলিয়া চীৎকার করে, কেহবা
দেয়াসীনকে বাতাস করে, কেহবা বেতের ছড়িটা দিয়া ভিড়
সরায়।
-বাবা, কি অপরাধ হয়েছে বলুন?
দেয়াসীন পাশের গ্রামের চাড়ালদের একটি আধা-বয়সী মেয়ে।
পরণে রক্তাম্বর। গলায় এবং হাতে অনেক গুলি রুদ্রাক্ষের মালা,
মাথায় জটা। কথা কহিলেই ভন্ ভন্ করিয়া মদের গন্ধ বাহির
কোটে।
মনের গহনে হয়। বাবা সম্বােধন করা হইল তাহাকে নয়, তাহার মাথায় যে দেবতা ভর করিয়াছেন তাহাকে। বাবা দেয়াসীনের মুখ দিয়া বলিলেন—আমার ঘরের কি ক’লি ? কতদিন থেকেই তাে ব’ছি। কি ক’বলি ? কি করলি? জল হবে ভেবেছিস? হবে না ত। তােদের ধান হবে বলে কি আমি ভিজবো নাকি? হবে না তো! আমার ঘরের কি ক’লি বল ? বাব। বহুদিন হইতে এমনি ধারা শাসাইয়া আসিতেছেন। গ্রামের যােল আনার বাবার উপর শ্রদ্ধাও অটুট। কিন্তু তথাপি মণ্ডপের সংস্কার আর কয়েক বৎসরে কিছুতে হইয়া উঠিতেছে না। তবু এ-পর্যন্ত এই অপরাধে বাবার রুদ্ররােষ কাহারও উপর নামে গ্রামের লােকে বাবার মন্দিরের ধূলা জিহ্বার অগ্রভাগ হইতে ললাট পর্যন্ত ভক্তিভরে স্পর্শ করে। বলে,-বাবা আমাদের সদাশিব। নইলে এত অপরাধের বােঝা নিয়ে কোন দিন ভরাডুবি হয়ে যেত। ছেলেপুলে নিয়ে। , বাবার সদাশিবত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার বিন্দুমাত্র কারণ নাই। এতগুলি সন্তানের সম্বংসরের সমস্ত অপরাধের বিষ তিনি নিজের কণ্ঠে তুলিয়া লইয়া, গাজনের কয়ট। দিন বিনা আপত্তিতে রৌদ্রে পােড়ন এবং বৃষ্টিতে ভেজেন। তাহার পক্ষে সুখের কথা এই যে, বেশী দিন এই ভাঙা মণ্ডপে তাহাকে বাস করিতে হয় না। বারো মাসই পুরােহিত-গৃহে থাকেন। নাই। ও মনের গহনে মণ্ডপের অবস্থা এইরূপ । ডােবার অবস্থাও তাহার চেয়ে ভাল নয়। এ-পাড়ার এইটিই খিড়কী বলিলে খিড়কী, সদর বলিলে সদর। বাসন মাজা, হাত-পা ধােওয়া এই জলেই হয়। মুখে দিবার উপায় থাকিলে মুখ ধােওয়া ও চলিত। কিন্তু সে উপায় নাই। শুধু এই ঘাটের দিকটা ছাড়া বাকী সাড়ে তিন দিকে দুর্ভেদ্য বাঁশের ঝাড় এমন অন্ধকার করিয়া আছে যে, জলে সূর্যালােক পড়িবার কোন প্রকার আশঙ্কা নাই এ-কথা শুনিয়া শহরের লােকে নাসিকা কুঞ্চিত করিবেন সন্দেহ নাই; কিন্তু সমস্ত ব্যাপার ত তাহারা জানেন না। পাড়াগাঁয়ে বাঁশ নিত্যপ্রয়ােজনীয় বস্তু। ঘর-ছাওয়া, খুটি তৈরি করা আছেই। বাঁশের পাতা জলে পড়িয়া জল নষ্ট করে, এ তথ্য তাহাদের নিজেদেরও অবিদিত নয়। কিন্তু উপায় কি ? প্রতিবেশীরা কেহই ভাল লােক নয়। চোখের সুমুখ হইতেই বাঁশ চুরি করিয়া পলায়ন করিতেছে ; দূরে চোখের আড়াল হইলে কি আর ঝাড়ের চিহ্ন রাখিত ? শুধু তাহাই নয়। এই অতি তুচ্ছ ডােবাটিই এ-পাড়ার একটি মূল্যবান সম্পত্তি। সম্বৎসরের শাক ইহাতেই উৎপন্ন হয়। তাহ তুচ্ছ করিবার বিষয় নয়। ঘাটের উপর সম্মুখ দিকে হাত দুই মাত্র স্থান ছাড়া বাকী সমস্তই শাক, শাক, শাক--জল নজরে পড়ে না। এক-এক পরিবার এক-একটি মাত্র কঞ্চির সাহায্যে অদ্ভুত কৌশলে ৩৫ মনের গহনে নিজের নিজের শাক আটকাইয়া রাখিয়াছে। এদিকের শাক ওদিকে যাইবার উপায় নাই। তাও কি আর যায় না। কিন্তু সে কচিৎ। তখন এই শাক লইয়াই একটা ফৌজদারী বাধিয়া যায়। কিন্তু শুধুই কি শাক! আপনি নয়টা-দশটার সময় যদি এদিকে আসেন, দেখিবেন,—অবশ্য একটু লক্ষ্য করিয়া দেখিতে হইবে,-- দেখিবেন, একটি বৃদ্ধ সেই বাঁশবনের নীচে অন্ধকারে অন্ধকারে বকের মত সন্তর্পণে পা ফেলিয়া মাছ ধরিয়া বেড়াইতেছে। তাহার বাঁ-হাতে একটা ভাঙা এনামেলের বাটিতে কতকগুলা কেঁচো এবং একটা সরু তালপাতায় গাঁথা কতকগুলি ন্যাটা, মাগুর ইত্যাদি মাছ। তিন- চারিটি মাত্র। এই কয়টি সংগ্রহ করিতেই তাহাকে বার-দুই ডােবার ধারে ধারে পরিক্রমণ করিতে হইয়াছে। এই লােকটিই নদাই ঘােষ ! বয়স পঞ্চাশের বেশী হইবে না। কিন্তু দেখিলে মনে হয় ষাটের কাছাকাছি। মাথার চুলগুলি সব পাকিয়া গিয়াছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। শীর্ণ, দীর্ঘ দেহ,—কোমর ব্যাকিয়া গিয়াছে। চোখ কোটর- প্রবিষ্ট, চৰ্ম্ম লাল এবং কর্কশ। বাঁ পা-খানা অস্বাভাবিক রকম সরু। সেজন্য খোড়াইয়া খোঁড়াইয়া হাঁটে। মুখে দাত বলিতে একটিও নাই। শীর্ণ, ভাঙা গাল একেবারে মুখের ভিতরে প্রবেশ করিয়াছে। ডােবার ওধারে তাহার বাড়ী এবং এই ভােবাটি শুধু শাক নয়, তাহার সম্বৎসরের মাছ ও সরবরাহ করে। অভাব কেবল অম্নের মনের গহনে এবং বস্ত্রের। কিন্তু সে আর কতই বা ! এক জোড়া বস্ত্র তাহার দিব্য একটা বৎসর চলিয়া যায়। আর অল্প ? একটা পেটে কতই বা লাগে ? সপ্তাহে দুইটা দিন মুনিশ খাটিলেই সে-অন্ত্রের সংস্থান হইত। যত দিন শরীর সামর্থ্য ছিল তার বেশী সে কখনও খাটেও নাই। নিতান্ত নিরুপায় হইয়া যদি কখনও কেহ মাঠে খাটিবার জন্য তাহাকে ডাকিতে আসিত, পেটের ব্যথার অজুহাতে প্রায়ই তাহাকে সে ঘুরাইয়া দিত। লােকটা উহারই মধ্যে একটু শয্যা-বিলাসী। বেলা নয়টার আগে আর তাহার অতি-পুরাতন ছিন্ন মলিন শয্যার বাহিরে পারতপক্ষে আসে না। যখন শরীর সামর্থ্য ছিল তখনও আসিত না, এখনও না। অবশ্য শরীরে সামর্থ ছিল বলিতে এ-কথা বুঝিলে ভুল হইবে যে এককালে তাহার শরীরে যথেষ্ট সামর্থ্য ছিল। যথেষ্ট সামর্থ্য তাহার কোন কালেই ছিল না। চিরদিনই অমনি ঢ্যাঙা এবং লিকলিকে দেহ, কোলের কাছে কুঁজো। গত পঁচিশ বৎসর কাল বছরে ছয় মাস ম্যালেরিয়ায় ভুগিলে সামর্থ্য আর থাকে কি করিয়া ? তা নয়, তবে পেটের ভাতের সংস্থানের জন্য সপ্তাহে দুই তিন দিন মাঠে খাটিতে যেটুকু সামর্থ্যের প্রয়ােজন হয়, সেটুকু সামর্থ্য এতকাল ছিল ! কিন্তু গত দশ বৎসর হইতে আর তাহাও নাই। এখন আর মাঠে খাটিতে পারে না। সে একপক্ষে ভালই হইয়াছে। হইয়াছে। সকালবেলায় মাঠে খাটিতে মনের গহনে যাইবার জন্য এখন আর কেহ অকালে নিদ্রাভঙ্গ করিয়া বিরক্ত করিতে আসে না। বেলা নয়টা পর্যন্ত নির্বিঘ্নে ঘুমটা হয়। ডােবার মাছ এবং শাক ত আছেই। আর আছে ডােবার ধারে কয়েক ঝাড় বাঁশ। তাহা বিক্রয় করিয়া তাহার বৎসরের কাপড় দু’খানির দাম ওঠে। আর । এইখানেই তাহার ভাগ্যকে অসাধারণ বলা চলে। যৌবনে নাই ঘােষের বিবাহ হয় নাই। কতকট। কন্যাপক্ষীয়- দের দোষে। পণ না লইয়া কেহই এই সুপাত্রের হাতে কন্যা সম্প্রদান করিতে সম্মত হয় নাই। কতকটা তাহার নিজের অলসতায়। তাহার নিজের তরফ হইতেও কোন আগ্রহ দেখা যায় নাই। আর কতকটা আত্মীয়জনের অভাবে। মা-বাপ ছেলেবেলাতেই হারাইয়াছে। বড় কিংবা ছােট একটা ভাই পৰ্য্যন্ত নাই, যে খুজিয়া-পাতিয়া ভায়ের জন্য একটি বন্ধু সংগ্রহ করিয়া আনিবে। যৌবনটা এমনি করিয়াই কখন যে কাটিয়া গেল বােঝাই গেল না। অবশেষে, চল্লিশ বৎসর বয়সের সময়, ম্যালেরিয়ার হাতে পড়িয়া শরীর যখন জীর্ণ, একমাত্র প্লীহাবিপুল উদরপ্রদেশ ছাড়া, দেখাইবার মত কিছুই যখন অবশিষ্ট নাই, তখন অকস্মাৎ এক শুভলগ্নে তাহার বিবাহ হইয়া গেল। ছােটবাবুর বহু কীর্তির মধ্যে এই এক কীর্তি। পাত্র এবং পাত্রী দেখা, লগ্নপত্র, সম্পাদন, আশী- ৰ্বাদ, গাত্রহরিদ্রা, শােভাযাত্রা, বিবাহ, বাসরশয়ন, পাকস্পর্শ, ফুলশয্যা,
মনের গহনে
এমন কি
-এক কথায় সংবাদপত্রে সংবাদটি প্রকাশিত হওয়া ছাড়া সমারােহ
বলিতে আর যাহা-কিছু বােঝায়, তাহার কোথাও ক্রটি ছিল না।
নহবৎ বসিল। ঢাক, ঢােল, সানাই, কাশি বাজিল।
ছেলেরা তাহাতেও তৃপ্ত না হইয়া শেষে কতকগুলা টিন আনিয়া
বাজাইতে লাগিল। এজন্য একটি পয়সাও নদাইকে ব্যয় করিতে
হয় নাই। সমস্ত ছােটবাবু নিজের পকেট হইতে দিয়াছেন। পাঁচ
জনের কাছে কিছু চাদাও উঠিয়াছিল। নদাই মনে মনে খুশী
হইলেও খুব লজ্জিতই বােধ করিতেছিল। এ-বয়সে আর কেন
এ-সব ?
নদাই মিথ্যা বলে নাই। সত্যই এ-বয়সে আর এসবের
প্রয়ােজন ছিল না, এবং শেষ পর্যন্ত সেই কথার সত্যতাই প্রমাণিত
হইল। ফুলশয্যার সকালে বহুকষ্টে আনক খোজাখুজির পর কেবল
নদাইকে পাওয়া গেল,-হস্তপদবদ্ধ অবস্থায় খাটের নীচে অজ্ঞান
হইয়া পড়িয়া আছে। বধূ নাই। ঘরে,
ঘরে, বাহিরে, কোথাও নাই।
এমন কি ছােটবাবু নিজে লােক নামাইয়া ডােবার জলে পৰ্যন্ত খোজ
করিলেন। সেখানেও নাই। সম্ভব-অসম্ভব সকল স্থানেই খােজ
করা হইল। কোথাও পাওয়া গেল না।
নদাইয়ের জ্ঞান যখন হইল তখন বেলা দশটা। এই রকম
সময়েই সাধারণতঃ তাহার ঘুম ভাঙে। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা
হইল।
মনের গহনে
=
তখনও তাহার কথা কহিবার শক্তি নাই। বেচারার ভয়ানক
ভয় হইয়াছে। দুই চোখের কোণ বাহিয়া কেবল অশ্রু গড়াইতেছে।
উত্তরে সে শুধু হাতের তালু উল্টাইয়া জানাইল, বধূ নাই ।
কোথায় গেল?
জানে না।
তাহাকে এমন হাত-পা বাঁধিয়া ফেলিয়া গেল কে ?
নদাই আঙ ল দিয়া খাটের নীচেটা দেখাইয়া দিল ।
আরও বেলা হইলে কথাটা স্পষ্ট করিয়া জানা গেল :-
বৌভাতের হাঙ্গামা মিটাইয়া এমনিতেই ফুলশয্যার দেরি হইয়া
গিয়াছিল। বর বধূর শুইতে রাত্রি এগারােটা কি বারােটাই হইবে।
নদাই বধূর একটা হাত ধরিয়া প্রীতি-সম্ভাষণ করিতে যাইবে, বউ এক
ঝটকা দিয়া হাত টানিয়া লইল। ঠোটে হাত দিয়া ইঙ্গিতে বলিল,
চুপ।
নদাই ভাবিল, বােধ করি কেহ জানালার গােড়ায় আড়ি
পাতিতেছে। সেই ভয়েই বধুর এই সতর্কতা। আড়ি পাতিবার
অবশ্য তাহার কেহ নাই। তবু পাড়ার মেয়েরা কি আর
ছাড়িবে?
বধূ পা ঝুলাইয়া খাটের উপর নিঃশব্দে বসিয়া রহিল। নাইও
আর কথা না কহিয়া, যেমন ছিল তেমনি বসিয়া রহিল।
এমনি বােধ করি ঘণ্টাখানেক কাটিল ।
:0
মনের গহনে
নদাই আর থাকিতে না পারিয়া ধীরে ধীরে ডান হাতখানি
বধূর কাধের উপর রাখিল।
—এই—বলিয়া বধূ কঁাধের এক ঝাঁকুনীতে নদাইয়ের হাতটা
ফেলিয়া দিল।
আরও অনেকক্ষণ কাটিল। ছােট বাবুদের বালাখানার ঘড়িতে
ঢং ঢং করিয়া দুইটা বাজিল। সমস্ত দিনের পরিশ্রমে নদাইয়ের
চোখ ঘুমে ঢুলিয়া পড়িতেছিল। কিন্তু বধু ঠায় তেমনি বসিয়া
আছে।
নদাই ফিস্ ফিস্ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল,-তােমার ঘুম
পায় নি ?
বধূ ঘাড় নাড়িয়া জানাইলনা, পায় নাই।
—দুটো বাজে যে ।
বাজুক।
হ্যা, বাজবে বইকি? এস—বলিয়া নদাই যেমন বধূকে
হুপাশে বাঁধিতে যাইবে, অমনি বধূ তড়াক করিয়া নীচে লাফাইয়া
পড়িয়াই ফস করিয়া আলাে নিবাইয়া দিল। তারপর কোথা দিয়া
ক হইল, ভাবিলে এখনও হৃৎকম্প হয়, যমদূতের মত কতকগুলাে
লােক পট পট করিয়া তাহাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিয়া, বােধহয় বউ
ইয়া চলিয়া গেল। নইলে বউ গেল কোথায়? মােট কথা,
ইহার পরে ঠিক কি যে হইল তাহা আর স্মরণ নাই।
৪১
মনের গহনে ছােটবাবু অনেক ভাবিয়া বলিলেন—সেই যমদূতগুলাে নিশ্চয় এর নীচে ছিল। বলিয়া আঙুল দিয়া খাটের নীচেটা নির্দেশ করিলেন । নিতান্ত ভালমানুষের মত নদাই বলিল—বােধ হয়। সে যাহাই হউক, সময় এবং স্রোতের মত বধূও একবার গেলে আর ফিরিয়া আসে না। বধূ আর কোন দিন স্বামীর ঘর করিতে আসিল না। নদাই ও ঘৃণায় লজ্জায় তাহার কথা আর জিজ্ঞাসা করিল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বধূ না আসিলেও বধূর পিতৃগৃহ হইতে মাসের মধ্যে দুইবার কোন-না-কোন পৰ্ব্ব উপলক্ষ্যে চাল, ডাল, নুন, তেল হইতে আরম্ভ করিয়া মানুষের নিত্যব্যবহার্য প্রত্যেক দ্রব্য এত পরিমাণে আসিতে লাগিল যে, নদাইয়ের অন্নসমস্যার চিহ্নমাত্র রহিল না। এই জন্যও বধূর বিয়ােগব্যথা নাই- য়ের বুক হইতে অনেকটা দূর হইল। আর বাকীটা দূর হইল ছােটবাবুর আশ্বাসে। ছােটবাবু, এ-গ্রামের হর্তা-কৰ্ত্তা-বিধাতা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না । এ-গ্রামের ষােল আনারই তিনি জমিদার। বছর চল্লিশ বয়স। দিব্য সুপুরুষ চেহারা। লেখাপড়া বিশেষ করেন নাই। কিন্তু গানে, বাজনায়, বক্তৃতায় অদ্বিতীয়। বস্তুতপক্ষে এখানকার থিয়েটার পাটির ইনিই প্রাণ-স্বরূপ। অত্যন্ত আমুদে লােক, ধাহাকে বলে মজলিসী। নদাই তাহার অত্যন্ত স্নেহভাজন। ৪২
মনের গহনে
কিছু দিন নদাই মুখ বুজিয়াই কাটাইল। পাড়ার লােকের
তাহার স্ত্রী-ভাগ্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং শ্বশুর ভাগ্যের জন্য আনন্দ
জ্ঞাপন করে।
—মেয়েমানুষের কথা ছেড়ে দাও ঘােষ, ওদের চরিত্র তােরা
পৰ্যন্ত বুঝতে পারেন না। কিন্তু এমন শ্বশুর ক’জনের হয় বল ত ?
মাসে দু-বার তত্ত্ব করা কি এই বাজারে
কি এই বাজারে সােজা ব্যাপার
কি?
নদাই হা না কোন কথাই বলে না। কিন্তু আলােচনাটা
শুনিবার জন্য বসে। লােকে এই দুস্কার্যের পাণ্ডা কে কে তাহা
অনুমান করিবার জন্য বহুলােকের নাম করে। তাহারা পাড়ারই
ছেলে-ছােকরা। কথাটা নদাই ঘােষের মনে লাগিলেও, সে মুখ
ফুটিয়া সমর্থন কয়িতে ভয় পায় । ছেলেগুলা সত্যই দুষ, মন-প্রকৃতির।
নদাই চুপ করিয়া থাকে। মনে মনে ভাবে, অমন সুন্দরী মেয়ে
তাহার কপালে সহিবে কেন ? মেয়ের মুখ সে দেখিয়াছে।
অবশেষে নদাই এক দিন ছােটবাবুকে ধরিয়া বসিল। বিবাহ
না করিলে তাহার একটি দিনও চলিতেছে না। এই বয়সে নিজে
হাত পােড়াইয়া রান্না করার ঝকমারি কি সহজ !
এই কথা !
ছােটবাবু তৎক্ষণাৎ তাহাকে আশ্বাস দিলেন, এক পক্ষের মধ্যে
বিবাহ দিয়া তবে তাহার অন্য কাজ।
৩
মনের গহনে
কেবল
ছােটবাবু ইচ্ছা করিলে, কি না হয়। এক পক্ষও অপেক্ষা
করিতে হইল না। দুই-তিন দিনের মধ্যেই কোথাকার কে এক
জন আসিয়া পাত্র দেখিয়া গেল। দেখামাত্র পাত্র পছন্দ হইল।
সঙ্গে সঙ্গে আশীৰ্বাদ এবং দিন স্থির।
পাড়ার আবালবৃদ্ধবনিতার মনে খুশী আর ধরে না।
নদাই নিজে একটু খুখু করিতে লাগিল। মেয়েটি নাকি কালে।।
নদাইয়ের স্মৃতিপটে তখনও তাহার প্রথমা পত্নীর অপরূপ রূপলাবণ্য
ভাসিতেছিল। কিন্তু এ-আত্তির কথা মুখ ফুটিয়া কাহাকেও বলিতে
সাহস করিল না।
শুভদৃষ্টির সময় মনে হইল, মুখ ফুটিয়া বলিলেই ভাল ছিল।
প্রথমা পত্নীর শুধু রংটাই ফর্সা ছিল না, মুখখানিও ছিল বেশ কচি।
এ-মেয়ে যেমন কালাে, তেমনি কুৎসিত। মুখের গড়ন একেবারে
পুরুষালি। গাল ভাঙিয়া গিয়াছে। চোখের কোণে কালি পড়িয়াছে,
এবং শুভদৃষ্টির সময় এমন কটমট করিয়া চাহিল যে নদাই শিহরিয়া
উঠিয়া ভয়ে চক্ষু বন্ধ করিল
বউ দেখিয়া পাড়ার মেয়েরা নাদাইকে শুনাইয়া বলিয়া গেল,
বেশ বউ হয়েছে। কালাে হ’ল তাে কি হ'ল? রূপ নিয়ে কি
মানুষ ধুয়ে খাবে? বেশ বউ হয়েছে। এ-মেয়ে নিয়ে
এ-মেয়ে নিয়ে দু-দিন তবু
ঘর করতে পাবে।
কিন্তু তাহাদের কথায় নাই কিছুমাত্র আশ্বাস পাইল বলিয়া
মনের গহনে
মনে হইল না। তাহার মনে পড়িতে লাগিল, সেই কোটর-প্রবিষ্ট
চোখে জ্বলন্ত দৃষ্টি। মনে পড়ে, আর ভয়ে চোখ বেজে ।
সেদিন ‘কালরাত্রি। বধূ-সম্ভাষণের বালাই নাই। মন্দ
কাটিল না। কিন্তু পরের দিন সকাল হইতেই জরজর করিতে
লাগিল। রাত্রে তাহাকে এক প্রকার জোর করিয়া ঠেলিয়া ঘরে
পাঠানাে হইল। বধূ তখন দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুজিয়া দেওয়ালে
ঠেসান দিয়া বিশ্রাম করিতেছিল। মেয়েদের সম্বন্ধে নদাইয়ের অবশ্য
কোন প্রকার অভিজ্ঞতা নাই। তথাপি এই ভাবে যে কোন রমণী
কখনও বসিতে পারে, তাহা সে জীবনে দেখে নাই।
বধূটির বােধ করি একটু নিদ্রার ভাব আসিয়াছিল। নদাইয়ের
পদশব্দ টের পায় নাই। নদাই দরজাটা বন্ধ করিতেই বধু জাগিয়া
উঠিয়া ভাল করিয়া বসিল। নদাই খাটের দিকে আগাইয়া আসিতে-
ছিল। বধূর চোখে চোখ পড়িতেই থমকিয়া দাড়াইল ।
নববধুই আগে কথা কহিল ! মেঝেয় যে মাদুরখানি পাতা
ছিল সেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, ওইখানে শুয়ে চুপটি
ক'রে ঘুমিয়ে পড়। এদিকে এসেছ কি খেংরে বিষ ঝেড়ে
দোব।
কণ্ঠ ত নয়, যেন একসঙ্গে অনেকগুলি ভাঙা থালাবাসন ঝন ঝন্
করিয়া বাজিয়া উঠিল। আচ্ছা মেয়েদের পাল্লায় পড়িয়াছে যা
হােক।
৫
মনের গহনে —আমার কাছে এসেছ কি, তােমারই এক দিন আর আমারই এক দিন। বুঝলে? নদাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেঝের মাদুরে শুইয়া পড়িল এবং অনেক ক্ষণ পর্যন্ত জাগিয়া জাগিয়া শুনিতে লাগিল, নব-বধূর নাসিকা বিচিত্র সুরে গর্জন করিতেছে। তার পরে সমস্ত দিনের পরিশ্রমের পর কখন এক সময় সে নিজেও ঘুমাইয়া পড়িল । আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সকালে দেখা গেল এই মেয়েটিও কোথায় অন্তর্হিত হইয়াছে। বহু লােক জড় হইল। ছােটবাবু নিজে আসিয়া সকলকে শুনাইয়া বােধ করি বাতাসকে শাসাইয়া বেড়াইতে লাগিলেন। কিন্তু তথাপি তাহাকে পাওয়া গেল না। সকলের চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, নদাই বধূর শােকে প্রকাশ্য- ভাবে এমন কান্না কাদিতে লাগিল, যে সমস্ত লােককে শুধু হাসি চাপিবার জন্য ছুটিয়া পলাইতে হইল। এই ঘটনার পর কয় দিন পর্যন্ত নদাই বিছানা ছাড়িয়া ওঠে নাই,জারের জন্য নয়, শশাকে। ছােটবাবুর চাকর প্রত্যহ ভাত লইয়া আসিয়া বহু সাধ্য-সাধনা করিয়া তবে তাহাকে দুটি অন্ন গ্রহণ করাইতে সমর্থ হয়। দেখিতে দেখিতে নদাই একেবারে উন্মাদ হইয়া গেল ৬
মনের গহনে
রাস্তায় বাহির হইলেই ছেলেরা পিছনে লাগে। প্রথম প্রথম
নদাই ইট, কাঠ, হাতের কাছে যাহা পাইত, তাহা লইয়া তাড়া
করিত। কিন্তু সব সময় ইট, কাঠ হাতের কাছে পাওয়া যায় না
দেখিয়া অবশেষে লাঠি লইয়া বাহির হইত। শেষে দেখিল কিছুতেই
তাহাদের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। নাগালের বাহিরে
থাকিয়া তাহারা কেবলই বিরক্ত করে। নদাই বাহিরে বাহির
হওয়া ছাড়িয়াই দিল। দিন-রাত্রি বাড়ীর মধ্যেই থাকে এবং আপন
মনে বিড় বিড় করিয়া কি বকে।
তাহার অবস্থা দেখিয়া ঘােটবাবু বলিলেন-আমি বলি কি,
নদাই, তুমি আর একটা বিয়ে কর। এই বয়সে যত্ন-আত্তি করার
লােক নইলে চলে?
নদাই একেবারে আহলাদে আটখানা হইয়া উঠিল।
-কি যে বলেন ছােটবাবু? আবার
ছােটবাবু দু-হাত নাড়িয়া তাহার কথা উড়াইয়া দিয়া বলিলেন,
--না, না, আমি তােমার কথা শুনব না। দেখ তাে, আমি এমন
মেয়ে আনছি...
নদাই আর আপত্তি না করিয়া হাত কচলাইতে লাগিল।
অবশ্য এবার আর বিবাহ হইল না। নদাইয়ের বিষন্ন মনটা
বিবাহের নামে খুশী হইবে বলিয়াই কেবল কথাটা ছােটবাবু
পাড়িয়াছিলেন।
৭
মনের গহনে
?
আগের রাত্রে নদাইয়ের জ্বর হইয়াছিল। তখনও একটুখানি
জর ছিল। নদাই আর বসিয়া থাকিতে পারিতেছিল না।
ছােটবাবু, তাহাকে দেখিতে আসিয়াছেন। ভিতরে গিয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন,-জ্বর কি খুব বেশী নাই?
নদাই বােগযন্ত্রণায় মুখখানা বিকৃত করিয়া উত্তর দিল,-না।
ছেড়ে যাবে এক্ষুণি।
ম্যালেরিয়া জ্বর। মানুষ আর কত উপবাস পালন করিবে
এদিকের সকলেই জ্বর ছাড়িয়া গেলেই দু’টিখানি ভাত খায়।
ছােটবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন,-তাহলে তােমার খাওয়া-
দাওয়ার: • • !
–থাক, হবে এখন।
ছােটবাবু একটু ক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিলেন—তাহলে আমি
বরং তােমার ভাত পাঠিয়ে দোব। কি বল ?
কপালের রগ দুইটা টিপিয়া ধরিয়া নাই বলিল—তাই
করবেন।
ছােটবাবুর আর অপেক্ষা করিবার সময় ছিল না।
মধ্যে দুইটা
দিন, তার পরেই পূজা। নহবং বসিয়া গিয়াছে। প্রতিমা তৈরিও
শেষ হইয়া আসিল। এখন হইতেই বাড়ীতে সমারােহ আরম্ভ
হইয়া গিয়াছে বলা চলে,—বিশেষ করিয়া ছেলেমহলে এবং
মেযেমহলে। তিনি চলিয়া গেলেন।
৪৮
মনের গহনে সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী তিন রাত্রি গান হয়,ছােটবাবুর নিজেরই থিয়েটার পার্টির। কিন্তু পাশের গ্রামে যে সখের যাত্রার দল আছে, এ আসরে কখনও তাহার। গান করে নাই। এবারে তাহারা ধরিয়া পড়িয়াছে, দুর্গাপূজাতে তাহার এক দিন গান করিবে। ছােটবাবু তাহাদের ‘না’ বলিতে পারেন নাই। স্থির হইয়াছে, অষ্টমীর রাত্রে তাহাদের গান হইবে । ষষ্ঠী এবং সপ্তমী এই দুইটা দিন নদাই ভাল ছিল। অষ্টমীর দিন আর থাকিতে না পারিয়া, ঠুক ঠুক্ করিতে করিতে নাটমন্দিরে গিয়া উপস্থিত হইল। তখন সন্ধ্যা অনেক ক্ষণ উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। গান আরম্ভ হয় নাই, কিন্তু বিস্তীর্ণ শামিয়ানার নীচে ভিড় বেশ জমিয়াছে, এবং সেখানকার জনকল্লোল অনেক দূর হইতেই শ্রুতিগােচর হয়। প্রবেশপথের মুখেই দুই পাশে দুটি ‘হুমহুমি' স্বল্প আলােক এবং প্রচুর ধূম উদগীরণ করিতেছে। লােকে আসিবার সময় সেখানে একবার বাড়াইয়া বিড়ি ধরাইয়া লইতেছে। ইহারা অপেক্ষাকৃত সৌখীন লােক এবং ছােকরা বয়সের। মাথায় ঢেউ-খেলানো এলবার্ট টেরী আছে। কাহারও গায়ে পাঞ্জাবী, কাহারও কোট। তাহার উপর কাপড়খানি কোমরে গােয়ালছাদে বাধা! যাহাদের গায়ে কিছুই নাই, তাহারা আসরের পশ্চিম দিকটা জুড়িয়া বসিয়া আছে। খড়ের ধোঁয়ায় সেদিকটা অন্ধকার,দৃষ্টি চলে । দলের পর দল ১ মনের গহনে আসিতেছে। আসিয়া পরস্পরের সঙ্গে কলহ অথবা কুশল প্রশ্নের পরেই তামাক খাওয়ার পালা। হুকা, কলিকা, তামাক এবং যথেষ্টসংখ্যক পাকানো খড়ের ‘মুটি’ সঙ্গেই আছে। চকমকি ঠুকিয়া : অগ্নিগর্ভ শশালার উপর সে ‘মুটি’ বসাইয়া দুইটা ফু দিলেই গলগল করিয়া ধোয়া ওঠে। ভাগ্য ভাল যে, শুধু মাথার উপরের দিকটাই শামিয়ানা দিয়া বন্ধ। চারিপাশ বন্ধ থাকিলে, যে-পরিমাণ ধোয়া উদগত হইতেছে তাহাতে নাটমন্দির-সমেত সমস্ত স্থানটা বেলুনের মত উর্ধে উঠিতে থাকিলেও বিস্মিত হইবার কোন কারণ ঘটিত না। ওদিকের বড় বারান্দায় চিক টাঙাইয়া মেয়েদের জায়গা করা হইয়াছে। আর সমাগত ভদ্রলােকেদের বসিবার জায়গা হইয়াছে দক্ষিণ দিকের বারান্দায়। নদাই সেই দিকে আসিয়া উপস্থিত হইল। ছােটবাবুর কাছে বসিয়া গান না শুনিলে নদাইয়ের সুখ হয় না। বারান্দার এক পাশে গােটাকয়েক তাকিয়া লইয়া ছােটবাবু বসিয়া থাকেন। তাহার পাশেই বারান্দায় পা ঝুলাইয়া একটা থামে ঠেস দিয়া নদাই মাঝে মাঝে ঘুমায় এবং মাঝে মাঝে গান শােনে। নদাইকে দেখিয়া ছােটবাবু উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন এত দিনের অভ্যাসে তিনি যেন কোথায় একটু ফাক অনুভব করিতেছিলেন। নদাই তাহার চিরদিনের বিনীত হাসি হাসিয়া নিজের জায়গাটিতে গিয়া বসিল।
মনের গহনে গােটা-দুই কনসার্টের পরেই অভিনয় আরম্ভ হইয়া গেল,-ধ্রুব চরিত্র। জীমূতবর্ণ, বিপুলকায় মহারাজা ধীরগম্ভীর পদক্ষেপে প্রবেশ করিয়া, আসরেই গড় হইয়া মা-দুর্গাকে প্রণাম করিয়া চেয়ারে আসিয়া উপবেশন করিলেন। তাহার দক্ষিণ পার্শ্বে দীর্ঘ গ্রীব, অত্যন্ত শীর্ণকায় মন্ত্রী এবং বাম পার্শ্বে বেঁটে, কাঠ-কাঠ গড়নের সেনাপতি আসিয়া দাড়াইলেন। রাজার দৃষ্টি সম্মুখে স্থির ভাবে নিবদ্ধ। মন্ত্রীবর নিতান্ত নিরীহ স্বভাব ভালমানুষ ভদ্রলােক। আসরে আসিয়া সেই যে চোখ নামাইলেন আর তুলিলেন না। সেনাপতির বয়স অল্প। আসিয়াই একবার চারি দিকে চাহিয়া লইলেন। উপরের আলাে এবং তরবারির দৈর্ঘ্য মনে মনে হিসাব করিয়া দেখিলেন, রণােন্মত্ত- তায় তরবারির খোচা লাগিয়া আলােটা ভাঙিয়া যাইতে পারে কিনা। অন্য আসরে একবার সে-দুদটনাও ঘটিয়াছে। রাজা জলদগম্ভীরক রাজ্যের বিবরণ জানিতে চাহিলেন । মন্ত্রীবর আধ-আধ শৰ্ণ কণ্ঠে তাহার যথাযথ উত্তর দিয়া থামিতেই, সেনপতি অমিত্রাক্ষর ছন্দে বিশুদ্ধ বাংলায় প্রায় পাচ মিনিটকাল অনর্গল এত কথা বলিয়া গেলেন এবং তরবারিট। এতবার আস্ফালন করিলেন যে, সমস্ত লোেক মুগ্ধ হইয়া গেল। আসর নিস্তব্ধ। মাছিটি নড়িলে জানিতে পারা যায়। ছােটবাবু তাকিয়া ঠেস দিয়া শুইয়াছিলেন, উঠিয়া বসিয়া বলিলেন—নাঃ! গান এরা জমাবে দেখছি।
মনের গহনে মৃদুকণ্ঠে সকলেই সে-কথায় সায় দিলেন। বস্তুতপক্ষে সেনা- পতির বীররসােগারের পরে সে-বিষয়ে আর কাহারও মনে সংশয় ছিল না। রাজা সেনাপতির মতেই মত দিলেন। তাহাই হয়। পৃথি- বীতে কোন কালেই ভালমানুষের জয় হয় না। দর্শকদেরও মন্ত্রীর উপর সহানুভূতি ছিল না। লােকটার একটা ভাল পােষাক পর্যন্ত নাই। সে যাহাই হউক, কিয়ৎক্ষণ বাদানুবাদের পর মন্ত্রী এবং সেনাপতি উভয়েই প্রস্থান করিলেন এবং ম্যানেজার বংশীধ্বনি করিবামাত্র সুয়ােরাণী আসিয়া প্রবেশ করিলেন। নদাই চমকিয়া ছােটবাবুর পায়ে হাত দিল। --কি হল? -কিছু নয়। বলিয়াই নদাই হাতখানি সরাইয়া লইল। আশ্চর্য মিল ! অবিকল তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মত ! তেমনই ভাঙা গাল, কোটর প্রবিষ্ট জলন্ত চোখ যেন দপ দপ করিয়া অলিতেছে! মুখের গড়নও তেমনি পুরুষালি। সুয়ােরাণী আসিয়াই চেঁচাইতে লাগিলেন। ধ্রুব এবং তাহায় জননীর সম্বন্ধে তাহার যাহা কিছু অভিযােগ ছিল, তাহা এমন হাত নাড়িয়া বিবৃত করিতে লাগিলেন যে, দর্শকেরা পর্যন্ত তাহার উপর ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল। নদাই কিন্তু সে সকল কথার এক বর্ণ ও শুনিতেছিল না। তাহার মনের গহনে দ্বিতীয় স্ত্রীর কণ্ঠস্বর সে একরূপ ভুলিয়াই গিয়াছিল। ইহার চীৎকার শুনিয়া তাহার মনে পড়িয়া গেল, দ্বিতীয় স্ত্রীর কণ্ঠস্বরও ছিল অবিকল এইরূপ। এমনি করিয়া কটমট করিয়া চাহিয়া সে এক দিন তহাকেও ধমকাইয়াছিল। আশ্চর্য মিল বটে । অনেক ক্ষণ ধরিয়া চীৎকার করিয়া অবশেষে সুয়ােরাণী চলিয়া গেল । গান জমিয়া গিয়াছে। আসর নিস্তব্ধ। নদাই উঠিয়া বসিয়াছিল, সুয়ােরাণী চলিয়া যাইতে আবার থামে ঠেস দিল। অতঃপর আসিলেন দুয়ােরাণী, ধ্রুবের হাত ধরিয়া। এ ছছাকরার বীররসের বক্তৃতা নয়, করুণ রসের। ‘মহারাজ’ বলিয়াই ঝর ঝর করিয়া কাঁদিয়া ভাসাইয়া দিল। কিন্তু করুণ রসের বক্তৃতা ইহাকে মানায় ভাল। রংটি ফরসা, মুখখানি বেশ ঢঢলে, গলার স্বরও মিষ্টি। এক নম্বর বক্তৃতা করিয়াই মাতা-পুত্রে গান আরম্ভ করিল। সে গানের সুরে পাষাণও দ্রব হইল। কিন্তু নদাই একবার আলস্যভাবে আড়চোখে তাহার দিকে চাহিয়াই সােজা হইয়া উঠিয়া বসিল। স্থান-কাল-পাত্র সমস্তই সে বিস্মৃত হইয়া গেল। এই বিচিত্র আলােকমালা, অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের বিবিধ বর্ণের রঙীন পরিচ্ছদ, বাদ্যযন্ত্রের মধুর ধ্বনি, সমস্ত মিলিয়া তাহাকে যেন কোন কল্পলােকে উড়াইয়া লইয়া গিয়াছিল। নদাই সােজা হইয়া উঠিয়া বসিল। লােকটা কি একেবারেই মনের গহনে ? ক্ষেপিয়া গেল না কি ? তাহার স্পষ্ট মনে হইল, সম্মুখের ওই অভিনেত্রীটী তাহার প্রথমা পত্নী ছাড়া আর কেহ নয়, কেহ হইতে পারে না। সেই বড় বড় চোখ, সুচিকণ যুগল, ঢঢলে মুখ । এমন কি চোখের নীচের সেই কাটা দাগটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাইতেছে। উত্তেজিতভাবে নাই ছােটবাবুর হাত ধরিয়া টা দিল। ছােটবাবু বিরক্তভাবে বলিলেন-ও কি করছ ? একবার হাত ধরে টানছ, একবার পা ধরে টানছ । তােমার হ’ল কি কথা বলিতে নদাইয়ের যেন দম বন্ধ হইয়া আসিতেছিল। খাস রুদ্ধ করিয়া বলিল—অনেকটা সেই রকম দেখতে নয় ? অনেকটা? নদাইয়ের মনের কথা বুঝিয়া ঘােটবাবুর হাস্য সংবরণ করা কঠিন হইয়া উঠিল। প্রাণপণ চেষ্টায় গম্ভীর হইয়া বলিলেন- পাগল নাকি। ধমক খাইয়া নাই আমতা-আমতা করিয়া বলিল—না, তাই বলছিলাম। নদাই উসখুস করিতে লাগিল, এবং কখন একটু একটু করিয়া সরিয়া, সরিতে সরিতে আসরের একান্ত সন্নিকটে আসিয়া বসিল। হ্যা, অবিকল সেই রকম। কাছে হইতে দেখিয়া তাহার মনে আর কোন সংশয়ই রহিল না। মেয়ে দু’টি যখনই আসরে আসে, দেখে, ৫
মনের গহনে
বুড়া তাহাদের দিকে হাঁ করিয়া চাহিয়া আছে । চোখে চোখ
পড়িলেই তাহারা ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলে। বুড়ার কর্ণমূল
পর্যন্ত গরম হইয়া ওঠে। শরীরের মধ্যে কি যে এক বিদ্যুৎপ্রবাহ
বহিয়া যায়—সে একেবারে অস্থির হইয়া ওঠে। লােকের পর
লােক আসে। কেহ গান গায়, কেহ যুদ্ধ করে।
কেহ কাদে,
কেহ হাসে। দৃশ্যের পর দৃশ্য অভিনীত হইয়া যায়। বুড়ার সংজ্ঞা
নাই। একদৃষ্টে ঠায় চাহিয়া আছে । পালা শেষ হইয়া গেল।
লােকজন যে যাহার বাড়ী চলিয়া গেল। বুড়া বসিয়াই আছে।
একা! দৃষ্টি তেমনি দূরের দিকে নিবদ্ধ । চাকরেরা যথাসময়ে
আলাে লইয়া চলিয়া গিয়াছে। সূৰ্য্য উঠিয়াছে। নদাই সেইখানেই
সতরঞ্চির উপর শুইয়া পড়িল ।
কতক্ষণ এমনিভাবে শুইয়া ছিল কে জানে।
হঠাৎ বাবুদের
বাড়ীর একজন চাকরের নজরে পড়িয়া গেল। সে শতরঞ্চ তুলিতে
আসিতেছিল। ডাকাডাকি করিতে নদাই জবাফুলের মত লাল
চোখ মেলিয়া চাহিল। ডান হাতখানি বাড়াইয়া যতদূর খোঁজা
ষায়, কি যেন হাতড়াইয়া খুজিল। তারপর বলিল, কোথায় গেল?
কে ?
—আমার বৌ ! এই যে এখুনি এখানে আমার পাশে বসে
মাথা টিপে দিচ্ছিল। এরই মধ্যে আবার পালিয়ে গেল। ওরা
কি কেবল পালিয়েই বেড়াবে ?
মনের গহনে নাই আবার চোখ বন্ধ করিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল। চাকরটা ছােটবাবুকে ডাকিয়া আনিল। তিনি গায়ে হাত দিয়া দেখেন, ভীষণ জর। অবশ্য ভয়ের কিছু নাই। ম্যালেরিয়ায় কথায় কথায় এক-শ পাঁচ ডিগ্রী জ্বর ওঠে। ছােটবাবু তখনই তাহাকে নিজের বাড়ীতে উঠাইয়া আনিয়া ডাক্তার ডাকিতে পাঠাইলেন। ইহার পর আর তাহার বিবাহের চেষ্টা হয় নাই।
ম্যালেরিয়া
No text on this page.
মনের গহনে বহু কালের পুরাতন একখানি গ্রাম। সকল পুরাতন গ্রামের মতো এই গ্রামখানিরও একটি ইতিহাস আছে। কিন্তু সে কথা থাক। শরৎকালের প্রভাত। কিন্তু শারদ-এতে উদ্ভাসিত নয় । প্রভাতের আলাে কেমন যেন পাণ্ডুর, মলিন। একটি অপরিচ্ছন্ন, জঙ্গলাকীর্ণ ডােবার ধারে ধারে গুটিকয়েক শীর্ণদেহ, নগ্নকায় বালক নিঃশব্দ সতর্কতার সহিত ছিপ হাতে মাছ ধরিয়া বেড়াইতেছিল। তাহাদের পায়ের চাপে ঝরা পাতায় যে মৰ্ম্মর-ধ্বনি হইতে- ছিল, তাহা ছাড়া আর কিছুতে তাহাদের দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় না। ডােবার ওদিকের কোণে একটি বক মুনি-ঋষির মতো নিৰ্ব্বিকার ভাবে বসিয়াছিল। আর একটা মাছরাঙ্গা পাখী ডােবার জলের এক ইঞ্চি উপর দিয়া অবিশ্রাম ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। ডােবার পূৰ্বদিক দিয়। যে কাচা রাস্তাটি মাঠের দিকে গিয়াছে, সেই পথে একটি রাখাল বালক গুটিদুই শীর্ণ অস্থিচর্মসার গরুকে ঠেঙ্গাইতে ঠেঙ্গাইতে চরাইতে লইয়া যাইতেছিল। পত্র-মৰ্মরে তাহার দৃষ্টি বা দিকে পড়িতেই সে মেছুরিয়া বালকদের মধ্যে যেটি সৰ্ব্বপেক্ষ। বয়ােজ্যষ্ঠ তাহাকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, কিরে শরতা, মাছ পেলি ? হেই! শালার গরু- শরতার ছিপে মাছ লাগিবার কেবল সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে।
মনের গহনে
সে ইঙ্গিতে রাখাল-বালকটিকে কথা কহিতে নিষেধ করিবার জন্য
বা হাতটি তুলিল।
গরু দুটি শীর্ণ হইলে কি হয়, বদমাইসিতে কোনাে গরুর চেয়ে
কম নয়। একটির তে গলায় উদুখলই দিতে হইয়াছে, তবু কি
মানে? কেবলই বিপথে ছােটে। রাখাল-বালক এইটিকে লইয়া
ব্যস্ত ছিল, শরতার ইঙ্গিত দেখিতে পায় নাই। গরু দুটিকে মাঠের
দিকে নামাইয়া দিয়া সে ছুটিয়া মাছ ধরা দেখিতে আসিল।
পেয়েছিস্? শরতা?
মাছ বােধ হয় একটা লাগিয়াছিল। কিন্তু রাখালের পদশকেই
হােক, অথবা তাহার চীংকারেই হােক, অথবা অন্য যেকোনাে
কারণেই হােক, মাছটি ছাড়িয়া গেল।
শরত শূন্য ছিপে একটা খিচ দিয়া দাত-মুখ খি চাইয়া কহিল,
—পেয়েছিস্? শরত?
মারবে। শালা ছিপের বাড়ি।
শরত বলিষ্ঠ নয়, কিন্তু রাখাল আর ও দুর্বল। বছর পনেরাে
বয়স, কিন্তু আট নয় বৎসরের বেশী বলিয়া মনে হয় না। জাম্মান
যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার সময় হইয়াছিল বলিয়া তাহার নাম জাৰ্মান।
পেট-জোড়া পীলে, বুকের হাড় গােণা যায় ।
শরতার বিঘূর্ণিত লােচন ও উদ্যত ছিপ দেখিয়া জার্মান ভয়
পাইয়া গেল। কিন্তু দমিবার ছেলে সে নয়। জিভ বাহির করিয়া
ভেংচি কাটিয়া সে মাঠের দিকে ছুট দিল।
মনের গহনে শরতা হাতের কাছে একটা মাটির ঢিল তুলিয়া লইয়া তাহার দিকে ছুড়িয়া মাড়িল। ঢিল লাগিল না। সে আবার মৎস্য-শীকারে মনােনিবেশ করিল। ডােবার দক্ষিণ দিক হইতে পায়ে-চলা রাস্তাটি ঢালু হইয়া যেখানে নামিয়াছে, সেইখানটি এ পাড়ার খিড়কীর ঘাট। একটি বর্ষিয়সী বিধবা মহিলা সেখানে আপন মনে বাসন মাজিতেছিলেন। একটি তরুণী বধূ বাঁ হাতে এক কঁাড়ি বাসন লইয়া সেই ঘাটে নামিল। তাহার পিছনে আর একটি বছর তিনেকের খুকী। গায়ে অনেক গুলা সূতী জামার উপর একট জুট-ফ্লানেলের ফ্রক,-ফ্রক ঠিক নয়, একেবারে পায়ের গােছ পৰ্য্যন্ত ঝুলিয়াছে । তাহার উপর আবার একটা ছােট সাড়ী ভাজ করিয়া গায়ের কাপড়ের ভঙ্গিতে বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে। বধূটি ডােবার উচু পাড়ের একটা পরিচ্ছন্ন বৌদ্ৰাস্তীর্ণ স্থান দেখাইয়া খুকুকে বলিল,-এই খানে বােস সন্তু। ঘাটে নামি না। সন্তু দুটি হাত উপরের দিকে ছুড়িয়া নাকি সুরে বলিল,-না। -লক্ষ্মীটি, বােসস। আমি বাসন মেজেই তােমাকে কোলে নােব, কেমন ? সন্তু বড় ভালাে মেয়ে। এবারে সে চুপ করিয়া বসিল। বসিল বটে, কিন্তু সে মায়ের অনুরােধে নয়, ঘাটে ষে বর্ষিয়সী মহিলা বাসন মাজিতেছিলেন, তাহারই ভয়ে। কিন্তু বেশীক্ষণ সে চুপ করিয়া
মনের গহনে
থাকিতে পারিল না। একটু পরেই গুগুন্ স্বরে কাদিতে আরম্ভ
করিল।
বষিয়সী জিজ্ঞাসা করিলেন,-হরিহর এসেছে না কি বৌমা ?
হরিহর কলিকাতায় চাকরী করে। এক শনিবার অন্তর বাড়ী
আসে, আবার রবিবার রাত্রের ট্রেণে চলিয়া যায়।
বৌমা সলজ্জ ভাবে ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, আসিয়াছে।
-আমাদের সেই ওষুধটা এনেছে নাকি দেখেছ ?
বৌমা অত জানে না। বলিল,--তাতো জানি না জ্যেঠিমা।
তবে অনেক জিনিসই তো এনেছে। বােধ হয় আপনারটাও
এনেছে।
জ্যেঠিমা অনেকটা আশ্বস্ত হইলেন। বলিলেন—তােমার
মেয়েটি কিন্তু বেশ ঠাণ্ডi বৌমা। আর আমাদের লক্ষ্মীমন্ত...
বৌমা হাসিয়া বলিলেন,—ঠাণ্ডা না ছাই। বােধ হয় আপনাকে
দেখে অমনি ক'রে রয়েছে। জর হয়ে অবধি কি যে ঝুকি
হয়েছে ।
জ্যেঠিম। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন,এখনাে জ্বর রয়েছে
নাকি ?
-এখন তাে আর আসে না। আসে বিকেল বেলায়।
—জরের কথা আর বােলো না বৌমা, কি যে ম্যালােয়ারী
লেগেছে, মরে গেলাম। আমাদের রাখালদাস ক'দিন বেশ ছিল।
মনের গহনে
কাল সন্ধ্যে বেলায় কোথা থেকে বেড়িয়ে এলো, গা একেবারে
আগুন। আর কী কঁপুনী ! দু’খানা লেপ চাপিয়েও তার কঁাপুনী
যায় না। ম্যালােয়ারী বটে, মা!
-বঠাকুর কেমন আছেন এখন ?
—জরটা একটু নরম পড়েছে বটে, কিন্তু এখনো ছাড়ে নি।
ঝিম্ হয়ে পড়ে রয়েছে । তােমাদের বাড়ী তে হাসপাতাল।
বৌটি একটু মৃদু হাসিল । বলিল,-পনেরো-ষােলো জন
লােক, তার দশ-বারো জন পড়ে। সাবু রান্না হয় ডেকচিতে।
জ্যেঠিমার বাসন মাজা হইয়া গিয়াছিল। উঠিতে উঠিতে
বলিলেন,-আর বলাে কেন, মা। যাবে। একবার তোমাদের
বাড়ীতে। দেখি গে, ওষুধটা এনেছে কিনা।
জ্যেঠিমা যাওয়া মাত্র সন্তুর গুঞ্জন উচ্চতর হইয়া উঠিল। বধূটি
হাতের কাজ তাড়াতাড়ি সারিয়া তাহাকে লইয়া প্রস্থান করিল।
ডােবার ধারেই যে বাড়ী, সেই বাড়ীটি মুখুয্যেদের। হরিহরকে
মুখুয্যে-বাড়ীর কুলপ্রদীপ বলা চলে। গত বৎসর সে এম-এ পাশ
করিয়াছে এবং সৌভাগ্যক্রমে মাস কয়েক পরেই কলিকাতার একটি
মার্চেন্ট অফিসে পঞ্চান্ন টাকার চাকুরী পাইয়াছে। মেসে থাকে,
বাড়ী যখন আসে কপিতে-আলুতে-মটরশুটিতে, কাপড়-চোপড়ে যে
জিনিস লইয়া আসে তাহ। তিনটি কুলীর বােঝা।
পড়িয়া যায়।
দেশে ধ
মনের গহনে
বাড়ীতেও একটা সমারােহ পড়ে। বধূটির কাজও বাড়ে,
হাসিও বাড়ে।
পােষ্যসংখ্যাও তত কম নয়। কিন্তু এবারে সব জ্বরে পড়িয়া।
মেজ ভাইটির সতেরাে আঠারো বৎসর বয়স। কিন্তু এমন কাবু
হইয়াছে যে আর উঠিতে পর্যন্ত পারে না। মেজাজ খিটখিটে
হইয়াছে। সাগুর নাম শুনিলে চটিয়া যায় । অথচ ম্যালেরিয়ায়
সাগু ছাড়া আর কি-ই বা খাইতে দেওয়া যায় ।
হরিহরকে সব ভাই-ই অত্যন্ত ভয় করে।
মা বলিলেন,-ওরে হরি, মুরলীর ঘরে গিয়ে একটু বােস গে
তাে। তােকে দেখে যদি একটু সাবু খায়।
হরিহর ঘরের মধ্যে আসিয়া মুরলীর ললাটের উত্তাপ পরীক্ষা করিল।
-এখন তাে আর নেই, দেখছি।
মুরলী ক্লান্ত কণ্ঠে বলিল,-সকালেই ছেড়ে গেছে।
আসবে সেই বিকেল পঁচটায়।
এমন সময় মা আসিয়া দাড়াইলেন সাগুর বাটি হাতে করিয়া ।
সকালে মুরলী মায়ের দুটি হাত ধরিয়া সাদিয়াছিল,আমাকে
কই মাছ দিয়ে বাঁধাকপির তরকারী একটু দি ও মা, দেবে?
মা বিরক্ত ভাবে বলিয়াছিলেন,-তুই কী রে মুরলী ! আজ
সকালে জ্বর ছেড়েছে আর এরই মধ্যে বাঁধাকপির তরকারী ? তুই
যে মণ্ট ও অধম হলি!
:
মনের গহনে
মুরলী মিনতি করিয়া বলিয়াছিল, তােমার দুটি পায়ে পড়ি
মা, একটুখানি দিও। আমার অসুখ যখন সারবে, তখন বাঁধাকপি ও
উঠে যাবে। দেখবে তখন তােমার মন-অসুখ করিবে।
এই কথায় মায়ের মন অনেকটা নরম হইয়াছিল।
তিনি চুপি চুপি বলিয়াছিলেন,-আচ্ছা, সবারই খাওয়া-দাওয়া
হয়ে গেলে, আমি তরকারী একটু নিয়ে আসব। কিন্তু আর কোনো-
দিন চাইতে পাবে না। বেশ ?
মুরলী পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে ঘাড় নাড়িয়া বলিয়াছিল, আচ্ছা।
কিন্তু ম্যালেরিয়ার রােগীর শত্রু বােধ হয় পদে পদে।
পিসিমা যে বাহিরের বারান্দায় বসিয়া রৌদ্র সেবন করিতে-
ছিলেন, সে কথা ইহাদের কেহ জানিত না। বিধবা পিসিমা,
ছেলেপুলে নাই। এই বাড়ীর তিনিই কী। মায়ের অধিক স্নেহ
দিয়া বাড়ীর প্রত্যেকটি ছেলে মেয়েকে তিনি মানুষ করিয়াছেন।
তিনিও ম্যালেরিয়ার আক্রমণ হইতে দিন চারেক হইল উঠিয়া দুটি
পথ্য করিয়াছেন। মা ও ছেলের কথা তাহার কানে যাইতেই তিনি
তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিলেন,
-তাই দিও। ছেলেটাকে বাঁচতে যে দেবে না সে তাে
জানি। আর যত কুপথ্য করবে কি এই ধেড়ে ছেলেটাই ।
প্রকাশ্যে কিছু বলিবার সাহস মুরলীর ছিল না। সে মনে
মনে বলিল,-ডাইনী ।
মনের গহনে
মুরলীর মা আর কথাটি না কহিয়া তখনই সরিয়া পড়িলেন।
এখন মা ঘরে আসিতেই সে প্রথমটা উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়াছিল।
কিন্তু তার হাতে সাগুর বাটি দেখিয়া মুরলী পাশ ফিরিয়া শুইল।
রকম দেখিয়া মা মুখ টিপিয়া হাসিলেন।
-খা একটু সাবু।
মুরলী জবাৰ দিল না।
এবারে হরিহর ডাকিল,-খেয়ে নে, নিয়ে শাে। সাবু খাবার
সময় হলেই যত গােলমাল।
মুরলী যেন সাগুর উপরই রাগ করিয়া, মায়ের হাত হইতে
বাটি লইয়া ঢক করিয়া এক নিশ্বাসে সবটা পান করিয়া আবার
পাশ ফিরিয়া শুইল।
মা মুখ ফিরাইয়া হাসি ঢাকিলেন। হরিহর ও পিছন ফিরিল।
এতক্ষণে তাহার পাশের বিছানাটির দিকে দৃষ্টি পড়িল ।
হরিহর জিজ্ঞাসা করিল, -এটকোথায় গেল রে ?
সাগু খাইলেই মুরলীর বমি আসে। কিন্তু এই প্রশ্নে সে
কোনাে রকমে বমি চাপিয়া বিরক্ত ভাবে বলিল,—যাবে আবার
কোথায় ? রান্নাঘরেই আছে । সে তাে দিন নেই, রাত নেই,
রান্না-ঘরেই পড়ে আছে। জ্বর কি সরে না সাধে?
হরিহরের খাওয়ার জায়গা করা হইয়াছে। সে এইবার
খাইতে আসিবে বুঝিয়া মণ্ট, আগে-ভাগেই সরিয়া পড়িয়াছে।
মন্ট টা?
মনের গহনে
মুরলীর কথা শুনিয়া সে বাহির হইতেই চি-চি করিয়া বলিল,-
রান্নাঘরে আবার কখন গেলাম। আমি তাে সেই থেকে এইখানে
বসে আছি।
হরিহর হাসিয়া বলিল,-কই, আমি যখন আসি তখন তাে
তুই ওখানে ছিলি না।
মন্ট র বয়স আট নয় বৎসরের বেশী হইবে না।
কৈফিয়ং দিতে কখনাে ভাবিতে হয় না।
সে আপন বিছানাটিতে শুইতে শুইতে বলিল,-বা রে !
তখন তাে আমি পায়খানায় ।
মুরলী গোঁ গোঁ করিয়া বলিল,-ই! পায়খানায় ।
অকস্মাৎ মণ্ট চীৎকার করিয়া উঠিল,-আমার ডিম ! আমার
কমলা লেবু ?
হরিহর বিস্মিত ভাবে বলিল,-ডিম কি রে ?
সে কথা কানে না তুলিয়াই মণ্ট চীৎকার করিতে লাগিল,
আর একটা ডিম, আর কমলা লেবু ? এই বালিশের নীচে রেখে-
ছিলাম যে ! নিশ্চয় তুমি নিয়েছ মেজদা। দিয়ে দাও বলছি।
মুরলী ভেংচাইয়া বলিল, --আহ, স্বপ্ন দেখছেন।
মন্ট কিন্তু এত সহজে ভুলিবার ছেলে নয়। গর্জন করিয়া
বলিল,-ইয়ার্কি কোরাে না মেজদা। নিশ্চয় তােমার কাজ।
লুভিষ্টি কোথাকার!
4
৬৭
মনের গহনে
ন
হরিহর আবার জিজ্ঞাসা করিল,ডিম কি রে ?
মণ্ট বালিশটা তুলিয়া বলিল,-এইখানেই রেখেছিলাম যে।
মােট ছ'টা ছিল তাে? কই ছ'টা? এক, দুই, তিন, চার, পাচটা।
আর একটা গেল কোথায় ?
মা হাসিয়া বলিলেন,-আচ্ছা, আচ্ছা, আর চিলের মতো
চাচাতে হবে না। আমি দেবো তােকে আর একটা, তা হলেই
তো হবে।
মাকে চটাইবার সাহস কোনো রােগীরই ছিল না।
মুরলীর কাছ হইতে হৃত সম্পত্তি উদ্ধার করাও মণ্ট র সাধ্যাতীত।
সে শুইতে-শুইতে বিড়, বিড়, করিয়া বলিতে লাগিল,তুমি
তাে সবই দেবে !
মন্ট র ডিঙ্গ-সংগ্রহের একটা ইতিহাস আছে।
গত তিনমাস
ধরিয়া সে ম্যালেরিয়ায় ভুগিতেছে। একদিন ভালো থাকে তো
দু’দিন জ্বরে ভােগে। তাই ভালো-মন্দ জিনিষ তাহার খাওয়া হয়
। হংস ডিম্বের উপর মন্টর বিশেষ প্রীতি আছে। যেদিনই
বাড়ীতে ডিম-রান্নার আয়োজন হয়, সে দিনই সে খাওয়ার বায়না
ধরে। তাহাকে শান্ত করিবার জন্য তাহার অংশের একটি করিয়া
কাচা ডিম তাহাকে দেওয়া হয়। সে ভালো হইয়া উঠিলে খাইবে ।
এই ডিমের একটি মুরলী চুরি করিয়াছিল,-খাওয়ার জন্য নয়
নিশ্চয়ই, মন্ট কে রাগাইবার জন্যই।
৩
মনের গহনে
সে চলিয়া যাইতেই
হরিহরের খাওয়ার ডাক আসিয়াছিল।
মুরলী করুণ কণ্ঠে ডাকিল,-মা !
কিরে ?
মুরলী কথা বলিল না। শুধু করুণ নেত্রে চাহিয়া রহিল।
মা হাসিয়া বলিলেন,-তরকারী ? এখুনি ঠাকুরঝি জানতে
পারলে আর রক্ষে রাখবে না। ক্ষিধে যদি পায়, বরং আর একটু
সাবু এনে দোব।
মুরলী রাগিয়া বলিল,-আর সাবু আনতে হবে না।
प
সাবু খাওয়াই যেন শেষ সাবু খাওয়া হয়।
মা চটিয়া বলিলেন,—কি বললি?
মুরলী উত্তর দিল না, পাশ ফিরিয়া শুইল । জ্বরে ভুগিয়া-
ভুগিয়া মুরলী দার্শনিক হইয়া উঠিয়াছে। জীবনের অনিত্যতা
সম্বন্ধে তাহার আর কোনাে সংশয় নাই। জ্বরে কুপথ্য যে কত খারাপ
সে কথা বুঝিবার বয়স তাহার হইয়াছে। তবু ভয় করে না।
বাহিরে তখন হরিহরের সঙ্গে পিসিমার কথা হইতেছিল।
হরিহর কি বলিতেছিল শােনা গেল না। কিন্তু পিসিমার ঝাঁঝালাে
কণ্ঠ কাসরের মতো ঝন্ঝন্ করিয়া বাজিয়া উঠিল,
-জ্বর তাে কোন্ দিন সেরে যেত। সারছে না শুধু তাের
মায়ের জন্যে। যখন যে যা বায়না ধরবে, ই ওর দেওয়া চাই।
কুপথ্যি দিতে ওর একটু ভয় করে না তাই ভাবি। আর তাও বলি,
মনের গহনে
মন্টটা না হয় ছেলেমানুষ, ঝোঁক একটু হয়। কিন্তু তুই একটা
ধেড়ে মিসে, তুই যা তা খেতে চাস কি বলে ?
মন্ট, কথা শুনিয়া লেপের মধ্যে মুখ ঢুকাইয়া ফিক্ফিক্ করিয়া
হাসিয়া ফেলিল। সে হাসি শুনিয়া মুরলীর রাগে সৰ্বাঙ্গ জ্বলিয়া
উঠিল।
সে চাপা কণ্ঠে মন্টকে ধমক দিল,-এই দেখ, মন্ট, এক চড়ে
দাত ভেঙে দেব।
হরিহর খাওয়া শেষ করিয়া উপরে চলিয়া গেল। নীচে শুইয়া
শুইয়াই মুরলী তাহার পায়ের শব্দ শুনিল । অনেকক্ষণ পরে তাহার
মনে হইল, হরিহর এতক্ষণ নিশ্চয় দিবানিদ্রায় মগ্ন হইয়াছে।
আস্তে আস্তে ডাকিল,-মণ্ট !
—কি ?
—ডিম নিবি না?
মণ্ট, উঠিয়া বসিল। বলিল,-দাও।
মুরলী বালিশের নীচে হইতে একটা ডিম বাহির করিয়া দিল।
মন্ট, বলিল,-আর কমলা লেবু?
--সেটা খেয়ে ফেলেছি।
মন্ট, রাগিয়া বলিল, -তুমি যে একটা রাক্ষস।
মুরলী রাগ করিল না, বরং একটু প্রসন্ন মনেই হাসিল।
বলিল,—রান্নাঘর থেকে খুব খেয়ে এলি তাে?
৭০
মনের গহনে
মণ্ট জবাব দিল না।
মুরলী আবার বলিল, -বড়দা কি কি এনেছে রে ?
-কমলা লেবু।
-আর?
—কপি, মটরশুটি।
—আর কিছু আনে নি ?
মণ্ট, মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল।
মুরলী বলিল, -বল না।
কাঁকড়া এনেছে এক হাঁড়ি। চমৎকার !
-কাঁকড়ার নামে মুরলীর জিহ্বা লালাসিক্ত হইয়া উঠিল।
সে ঝাড়িয়া উঠিয়া বসিয়া বলিল,-তুই খেয়ে এলি তো?
মণ্ট, আবার মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল।
মুরলী বলিল,--স্বার্থপর কোথাকার! একটা খবরও যদি দেয় ?
মুরলী আর অপেক্ষা করা সমীচীন মনে করিল না। সে
কেবল উঠিতে যাইবে, এমন সময় মা নিজেই আসিয়া তরকারীর
বাটা
সুমুখে
ধরিলেন।
কাকড়া আছে ?
আছে। সে খবরও পেয়েছে ?
একটু একটু করিয়া মুরলী তরকারীটুকু পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে
আহার করিতে বসিল। কিন্তু তাহার কি নিশ্চিন্ত মনে আহার
মনের গহনে মা করিবার যাে আছে ? আহার শেষ হইতে না হইতে হরিহর একেবারে ঘরের মধ্যস্থলে আসিয়া উপস্থিত হইল। -ওকি হচ্ছে রে ? তখন আর বাটি লুকাইয়া ফেলিবারও সময় ছিল না। মুরলী বাটিটা ঠেলিয়া দিয়া শুধু একটু অপ্রতিভের মতো হাসিল । বাটিটা আবার তাহার দিকে আগাইয়া দিয়া বিরক্ত ভাবে বলিল,- খা বাপু খা। তুই আর বাধা দিনে। হরিহর বিস্মিত ভাবে বলিল,-তুমি বলল কি ! কাল ওর একশাে পাচ জর, আর আজ ওকে ওই সব দিচ্ছ ? কাঁকড়া ও হজম করতে পাররে ? -খুব পারবে। ও কি বেশী খাচ্ছে নাকি ? হরিহর বিরক্ত ভাবে বলিল,-যা মন চায় তাই করাে। -তাই করব। তুই সব দেখি ! বেচারাকে মুখের খাবার খেতে দিচ্ছি না। কিন্তু মুরলী আর বাটি স্পর্শও করিল না। বসিয়া রহিল। গােযােগ দেপিয়া পিসিমাও দোরগােড়ায় আসিয়া দাড়াই- লেন। তাহার তখনও আহার হয় নাই। তিনি বলিলেন,-জরের মুখে ওই সব যে ওকে খাওয়াচ্ছ বৌ, ওকে কি বাচতে দেবে না ? মুখ নীচু করিয়া ৭২
মনের গহনে
হ’ল তাে !
মায়ের মেজাজ চটিয়াই ছিল । বলিলেন,—খুব বাঁচবে।
একটুখানি তরকারী খেলে আর মানুষ মরে না।
পিসিমা শান্তভাবে বলিলেন,—সে সহজ মানুষ মরে না। কিন্তু
ওর গায়ে এখনও জ্বর আছে। ওর কাছে ও যে বিষ! রােগীর
কাছে মা হ'লে চলে না, শক্ত হতে হয়।
হাতের বাটিটা ছুড়িয়া বাহিরের নর্দমায় ফেলিয়া দিয়া মা
বলিলেন,-তবে এই নাও।
রাগে তাহার চোখ ফাটিয়া কান্না আসিতেছিল। তিনি হন
হন করিয়া বাহির হইয়া গেলেন।
মন্ট এতক্ষণ বেশ মজা দেখিতেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত
তাহারও মন মেজদাদার প্রতি সহানুভূতিতে ভরিয়া উঠিল ।
তাহার তখন জ্বর আসিতেছে, এক কাপুনিও দেখা দিয়াছে।
কাপিতে কাঁপিতে সে বলিল,“আর তুমি যে দিব্যি কদবেল বসাচ্ছ !
হরিহর বিস্মিত ভাবে বলিল,-কে রে ?
এই পিসিমা।
পিসিমা যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। বলিলেন,-কে রে ?
শােনাে ছেলের কথা !
মণ্ট বলিল,-তােমার ঘরে দেখলাম সে ! মাথা রয়েছে একটা
পাথর-বাটিতে।
পিসিমা বলিলেন,—কখন দেখলি রে হতভাগ?
আমি ?
৭৩
মনের গহনে
হরিহর বলিল,-বুঝতে পেরেছি।
তােমার ঘর
দেখি গে !
হরিহরকে বেশী খুজিতে হইল না।
হইল না। একটা কোণে একটা
শ্বেতপাথরের বাটিতে কদবেল সত্যই মাখা, অতি সহজেই
পাওয়া গেল।
বাটিটা হাতে করিয়া তুলিয়া ধরিয়া হরিহর বলিল,-এটা কি ?
পিসিমা ধরা পড়িয়া চটিয়া গেলেন। বলিলেন,-বেশ করব,
খাবো। বিধবা মানুষ, টক খাবো না, কিছু খাবো না, তাে খাবে।
কি দিয়ে?
–আমার মাথা দিয়ে খাবে। আজ সকালের ওষুধ খেয়েছ?
পিসিমা ন’ বছরের দুরন্ত জেদী মেয়ের মতাে ঘাড় বাঁকাইয়া
বলিলেন,-না বাপু, ওই তেতো ওষুধ আমি খেতে পারবাে না।
হরিহর রাগিয়া বলিল, তবে টক খাও, খেয়ে মর।
এবারে পিসিমা হাসিয়া ফেলিলেন। বলিলেন,-ওরে, আমি
মরবো না রে, মরবে না। বিধব হওয়ার পরে যখন ত্রিশ বছর
বেঁচে আছি, তখন টক খেলে ও মরবে। না, ওষুধ না
খেলেও
মরবে। ন}।
এ বড় মন্দ যুক্তি নয় । যে মানুষ বিধবা হওয়ার পরেও ত্রিশ
বংসর কাল বাচিয়া রহিল, সে নিশ্চয় অমর। নহিলে বৈধব্যশশাকে
বহুকাল পূৰ্বেই তাহার প্রাণ বায়ু বহির্গত হইত। তা যখন হয় নাই।
৭৪
মনের গহনে তখন তাহার পক্ষে যে-কোনরূপ কুপথ্য-ভােজন অনায়াসেই চলিতে পারে। কিন্তু হরিহর শুধু বিস্মত হইয়া ভাবিল, ছেলেদের এতটুকু অনিয়মে যিনি ব্যস্ত হইয়া উঠেন, জীবনের প্রান্তে আসিয়। তিনি নিজে এমন অনিয়ম করেন কি বলিয়া? ত্রিশ বৎসর বৈধব্য-যন্ত্রণ। ভােগ করিয়া সকল প্রকার সুখ-বিলাস যিনি পরিত্যাগ করিতে পারিলেন, তিনি যে আজ সামান্য কদবেলের প্রলােভন সম্বরণ করিতে পারিলেন না, ইহার চেয়ে আশ্চয্যের আর কী হইতে পারে ? ৭৫
No text on this page.
শনি রবি সােম
No text on this page.
মনের গহনে এবারে বর্ষার প্রকোপট। কিছু বেশী। গত শনিবারে বৃষ্টি নামিয়াছে, আর এক শনিবার শেষ হইতে চলিল, কিন্তু বৃষ্টির আর বিরাম নাই। পল্লী গ্রামে কাদা তাে আছেই। কিন্তু এই ঝম্ ঝম্ শব্দ যেন আরও পাগল করিয়া তুলিল। মানুষ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। সােনাটিকুরীর বিল বান গ্রামের কোল পর্যন্ত ঠেলিয়া আসিয়াছে। দিগন্ত প্রসারী মাঠে যত দূর দৃষ্টি যায়—কেবল জল, জল, জল, বানের গেরুয়া জল। মাঝে মাঝে যে সকল বড় বড় গাছের মাথা জাগিয়া আছে,কেবল তাহা দেখিয়াই অনুমান করা চলে, কোষ্ট। নতুন পুকুরের চক আর কোন্টা বামুনহাটির মাঠ। কিন্তু ট্রেণ বর্ষা মানে না। একমাত্র ভূমিকম্প ছাড়া আর কোনাে দুর্যোগেই বােধহয় ভয় পায় না। শনিবারের লােকাল ট্রেননি ঠিক আটটা পঞ্চান্ন মিনিটের সময় গ্রামের ষ্টেশনে আসিয়া খালি । দুযোগের রাত্রি। যেমন দুযোগ, তেমনি অন্ধকার। প্লাটফর্মে গােটা কয়েক আলো জ্বলিতেছে বটে, কিন্তু তা এত দূরে দূরে এবং বৃষ্টির ছাটে এমন ঝাপসা হইয়া গিয়াছে যে, অন্ধকার খুব সামান্যই কনিয়াছে। এ ট্রেণে চড়িবার জন্য একখান টিকিটও বিক্রি হয় নাই। রাত্রের অবস্থা দেখিয়া ষ্টেশন-মাষ্টার আশা করেন, এখানে নামিবার যাত্রীও কেহ নাই। সুতরাং ভারী বর্ষতিটা গায়ে দিয়া এবং হাতে একটা রেলের বাতি লইয়া কোনাে রকমে গাড়ীখানাকে ৭৯ মনের গহনে পত্রপাঠ বিদায় করিবার জন্য ভদ্রলােক হন্ হন্ করিয়া ছুটিতেছেন, এমন সময় সামনের থার্ড ক্লাশ হইতে নামিল দুইটি কাপড়ের পুটলি, একটি প্রজলিত হারিকেন এবং একটি ভদ্রলােক। পুটলি দুইটির অবস্থা মলিন। হারিকেনে এত কালি পড়িয়াছে যে, বড় জোর সেই- টাকে দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী আর কিছু নয়, এবং সেই স্বল্পালােকে স্পষ্ট করিয়া দেখা না গেলেও বােঝা যায়, ভদ্রলােকর অবস্থাও উক্ত অস্থাবর বস্তু কয়টি অপেক্ষা আশাপ্রদ নয়। ষ্টেশন-মাষ্টারকে দেখিয়াই ভদ্রলােক জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়ে, আমাদের রতন আসেনি মাষ্টার মশাই ? বলিয়া ছাতাটা মেলিয়া মাথায় ধরিলেন। ছাতার আদিম কালাে কাপড়ের উপর আর একটা শাদা কাপড় বসানাে হইয়াছে। মাঝে মাঝে ফুটা, বােধ হয় বিড়ি-সিগারেটের কাণ্ড। শ্বেতছত্র বর্ষার ধারা নিবারণ করিতে না পারিয়া যেন ক্রোধবশে পর্জন্মদেবকে ভেঙচাইতে লাগিল। ভদ্রলােকের অনুনাসিক, ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে মাষ্টার মশাই প্রথমটা চমকাইয়া গেলেন। কিন্তু হাত-বাতির আলােটা তার মুখের উপর ফেলিয়া তখনই বলিলেন, আরে ! দত্ত মশাই যে! ধিলক্ষণ এই দুর্যোগেও বেরিয়েছেন ? —দুৰ্যোগ মানে, ইয়ে! আমাদের রতন••• কিন্তু ষ্টেশন-মাষ্টারের তখন দাড়াইয়া কথা বলিবার সময় নাই। ০ মনের গহনে হাত-ইসারায় দত্ত মহাশয়কে ষ্টেশনে উঠিতে বলিয়া তিনি ট্রেণ পাস করিবার জন্য গার্ডের গাড়ীর দিকে ছুটিলেন। দত্ত মহাশয় পুটলি দুইটা হাতে করিয়া অর্ধসিক্ত অবস্থায় ষ্টেশনে আসিয়া উঠিলেন। ষ্টেশন-ঘরের উজ্জ্বল আলােয় এতক্ষণে দত্ত মহাশয়কে ভাল করিয়া দেখা গেল। দেখিলে মনেই হয় না, ইনি জাৰ্ম্মোলিন লিমিটেডের একটা ছােট বিভাগের বড়বাবু। অত্যন্ত শীর্ণ দেহের উপর একটা বৰ্ত্ত লাকার শীর্ণ মাথা এমন আলগােছে বসান যে, কেহ একটা কথা কহিলেই সেটা ঢেউ-লাগা কলসীর মত দুলিতে থাকে। এইটুকু তাে মাথা। তাহারও তিন-চতুর্থাংশ স্থান একটি বিপুল নাসিকা একাই দখল করিতেছে। বাকী এক-চতুর্থ স্থানে অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলি ঘেঁসাঘেঁসি করিয়া কোনাে প্রকারে অস্তিত্ব বজায় রাখিয়া, নিতান্তই ভগবানের রাজ্য বলিয়া টিকিয়া আছে। প্লাটফর্ম হইতে এইটুকু আসিতেই দত্ত মহাশয় ভিজিয়া গেলেন। গায়ে একটি মাত্র লংক্লথের পাঞ্জাবী। বৃষ্টিতে ভিজিয়া সেটা গায়ের সঙ্গে ল্যাপটাইয়া গিয়াছে। জোলাে হাওয়ায় ভদ্রলোেক ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপিতেছেন। করিবার মত কোন কাজ হাতের কাছে না পাইয়া, দত্ত মহাশয় বিরলকেশ মাথাতেই হাত বুলাইতে লাগিলেন। মাষ্টার মহাশয় দুম, দাম, করিয়া ফিরিয়া আসিয়া ভারী বর্ষাতিটা ডান দিকে ছুড়িয়া ফেলিলেন, আর মাথার বর্ষাতি টুপিটা বা দিকে।
মনের গহনে
তারপর একটা চেয়ার টানিয়া বসিয়া হাঁপাইতে হঁপাইতে বলিলেন,
তারপরে? দত্ত মশাই ? এই দুর্যোগেও বেরুলেন ?
মাষ্টার মহাশয়ের যেমন কলেবর তেমনি কণ্ঠস্বর। কিছুক্ষণ
তঁার কণ্ঠস্বর শ্রবণ করিলে আর সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর কানে প্রবেশ
করে না, এত ক্ষীণ মনে হয়। সে ক্ষেত্রে দত্ত মহাশয়ের তাে
কথাই নাই।
তিনি ঠাণ্ডায় কাপিতে কঁপিতে কোন প্রকারে বলিলেন,
ইয়ে•••! আর বলেন কেন মশাই! আমার হয়েছে: হু:! সবাই
বললে, ঘরে চাষ করুন। তদর্ফং কৃষিকৰ্ম্মাণি। সেই ঝঞ্চাট ।
মাষ্টার মহাশয় অট্টহাস্যে ষ্টেশন-ঘর কাপাইয়া বলিলেন,
বিলক্ষণ ! এই বাজারে ঘরে চাষও করবেন না কি ?
সে হাসির দমকে দত্ত মহাশয়ের মাথাটা দুলিয়া উঠিল। টানিয়া
টানিয়া বলিলেন, আর বলেন কেন মশাই ? ঘরে চাষ, তাও একটি-
মাত্র মােষ পাওয়া গেছে। আর একটা•••হু: !
আর একটা কি হ’ল বললেন ?
—হবে আবার কি ? সে এখনও হাটে।
মাষ্টার মহাশয় আবার অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন ।
—হাটে কি মশাই! সেটা কি সেইখান থেকেই চাষ করবে
কি ? বিলক্ষণ ।
মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে দত্ত মহাশয় বলিলেন, গতিক
মনের গহনে
সেই রকমই। বর্ষা পড়ে গেল। লােকের অর্ধেক জমি আবাদ
হয়ে গেল। আর আমি ওই আধখানা মােষ নিয়ে কি করি
বলুন তাে !
—মােষ কি আর পাওয়া যাচ্ছে না ?
—কি করে বলব মশাই! এক একবার আসি, আর এক এক
রকম::হু। কিছুই বুঝি না।
দত্ত মহাশয় হতাশভাবে হাত নাড়িলেন।
টেলিগ্রাফের কলটা বাজিয়া উঠিতেই মাষ্টার মহাশয় তাড়া-
তাড়ি উঠিলেন। বলিলেন, যাকগে। ভিজে কাপড়ে আর বসে
থাকবেন না। ঠক্ ঠক করে কাপছেন যে !
দত্ত মহাশয় সৰ্বাঙ্গ নজর করিয়া দেখিলেন, সত্যই ঠক ঠক
করিয়া কাঁপিতেছেন কিনা। দেখিলেন, কঁপিতেছেন বটে।
করিতে করিতে বাড়ী যাওয়ার কথাটাও ভুলিয়া গিয়াছিলেন।
চমক ভাঙ্গিতে উঠিয়া দাড়াইলেন। রতনের কথাটাও মনে
পড়িল।
জিজ্ঞাসা করিলেন,...ইয়ে আমাদের রতন আসে নি মাষ্টার
মশাই ?
মাষ্টার মহাশয় টাটক টেলিগ্রাফটা সারিয়া বলিলেন, রতন ?
আপনাদের সেই চাকরটা ?
-হ্যা ? ? কালাে মতন
মনের গহনে
—ক্ষেপেছেন মশাই? সে আসবে এই ঝড় বৃষ্টিতে ? আপনার
যা বাবু চাকর! দিন রাত্রি গায়ে ফু দিচ্ছে।
দত্ত মহাশয় দুই হাতে দুটি পোটলা তুলিয়া লইয়া বিব্রত ভাবে
বলিলেন, তাইত ! আলােটা?
অর্থাৎ দুইটা হাতই বন্ধ, আলােটা কি করিয়া লইয়া যাইবেন?
তার উপর একটি ছাতাও আছে।
মাষ্টার মহাশয় হাসিয়া বলিলেন, পোটলা দুটো বরং রেখে
যান।
কাল সকালে আপনার রতনকে পাঠিয়ে দেবেন।
নিয়ে যাবে।
হাঁফ ছাড়িয়া দত্ত মহাশয় বলিলেন, ইয়ে, সেই ভাল।
হয়েছে:::::
শ্বেতছত্র মাথায় দিয়া দত্ত মহাশয় সেই দুর্যোগে ষ্টেশন হইতে
নামিলেন।
ষ্টেশন হইতে দত্ত মহাশয়ের বাড়ী মিনিট পনেরাের পথ।
ষ্টেশন হইতে লাইন ধরিয়া খানিকটা গিয়া, বায়ে আল ভাঙ্গিতে হয়।
ও দিক দিয়া একটা কাচা সড়ক ও আছে বটে, কিন্তু সে অনেকটা
ঘুরিয়া যাইতে হয়। ওটা গরুর গাড়ীর রাস্তা। সহজ হয় বলিয়া
যাহার। হাঁটিয়া যায়, তাহারা সাধারণতঃ এই আল-পথ দিয়াই যায়।
সােনাটিকুরীর বিল গ্রামের ওধারে। এধারে বান আসে নাই
বটে, কিন্তু যে বৃষ্টি হইয়াছে তাহাতেই মাঠ ভাসিতেছে। সৰু
মনের গহনে আল । কোথাও দেখা যায়, কোথাও যায় না। ধুম-মলিন হারি- কেনের আলাে যে সাহায্য করিতেছে তাহা অতি সামান্য । ও দিকে ভাঙা ছাতা দিয়াও অজস্র ধারায় জল পড়িতেছে। দত্ত মহাশয় কাপড় হাঁটুর উপর পর্যন্ত বেশ সামলাইয়া পরিয়া আন্দাজে আন্দাজে পা টিপিয়া পথ চলিতে লাগিলেন। চাষীরা জমির জল-নিকাশের জন্য মাঝে মাঝে আল কাটিয়া দিয়াছে। সে দিক দিয়া প্রবল স্রোতে জল নামিতেছে। দত্ত মহাশয় সেই সব জায়গায় একটু থামিয়া হিসাব করিয়া পার হইতেছেন। মাঝে মাঝে খালে পা পড়ায় দত্ত মহাশয় উল্টাইয়া পড়িতে- ছেন। কোথাও বা পড়িতে পড়িতে সামলাইয়া লইতেছেন। বড় জোর ছাতাটা ছিটকাইয়া পড়িতেছে। এমনি একটা দুর্ঘটনায় মধ্যপথে আলােটা নিভিয়া গেল। দত্ত মহাশয় কিছুক্ষণ কিংকর্তব্য- বিমূঢ় হইয় দাড়াইয়া রহিলেন। পরে নির্বাপিত আলােটা তুলিয়া লইয়া ধীরে ধীরে চলিতে আরম্ভ করিলেন। পকেটে দেশলাই ছিল বটে, কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজিয়া অকেজো হইয়া গিয়াছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। চোখের সম্মুখে নিজের হাতখানাই দেখা যায় না। চারিদিকে গ্যাঙের গ্যাং শবে ব্যাঙ ডাকিতেছে । কিন্তু এই দারুণ দুযোগে, জনশূন্য প্রান্তরে মত্ত দাদুরী সম্বন্ধে দত্ত মহাশয়ের কিছুমাত্র আগ্রহ হইল না। বরং দুরে কোথায় একটা গো-সাপ এমন ভীষণ গর্জন করিতেছে যে, ভয়ে তাহার প্রাণ উড়িয়া মনের গহনে গেল। বিষধর সাপের ভয়ও যথেষ্ট, কিন্তু উপায় কি ? এই মধ্য- পথ হইতে ফিরিয়া যাওয়াও যা, আগাইয়া যাওয়াও তাই। তাছাড়া দত্ত মহাশয় বাহিরে যেরূপ নির্জীব, ভিতরেও সেইরূপ নিস্পৃহ। জীবন এবং মৃত্যু উভয়ের সম্বন্ধেই সমান উদাসীন। তথাপি তাহার রতনের উপর রাগ হইল। লােকটার আসা উচিত ছিল। অবশ্য এই জল এবং কাদা ভাঙিয়া পথ হাঁটিবার যে দুঃখ, সে তাে আছেই। রতন কিছু তাহাকে কাধে করিয়া পার করিত না। তবু এমন একলা তো চলিতে হইত না! কথা বলিবার একজন লােক তাে পাওয়া যাইত। গাে-সাপটা সমানে গর্জন করিতেছে। তাহার পায়ের শব্দ পাইয়া কয়েকটা ব্যাঙ টুপ টুপ, করিয়া নীচের জলে লাফাইয়া পড়িল। বাঁ দিকের লােকাল-বাের্ডের রাস্তার কাভার্ট হইতে হুড়, হুড়, শব্দে জল নামিতেছে। তবে ভরসার কথা এই যে, পনেরো মিনিটের জায়গায় আধঘণ্টা লাগিলেও রাস্তা ক্রমেই শেষ হইয়া আসিতেছে। গ্রামের কোলে এখানে-ওখানে-সেখানে প্রায় একশ’টা আলাে দেখা যাইতেছে। বেশী দূরে নয়। সেই আলােতে অবশ্য মানুষগুলিকে চেনা না গেলেও, তাহাদের চলাফেরা দেখা যাইতেছে, এবং উল্লাসের চীংকারও শােনা যাইতেছে। আর একটু আগাইতেই দত্ত মহাশয় তাহাদের কাছে আসিয়া পড়িলেন। সে এক অপূর্ব দৃশ্য ! দত্ত মহাশয় কবি নন, তবু এক মনের গহনে মিনিট দাড়াইয়া দাড়াইয়া দেখিলেন । মাথায় মাথালি, পরণে একখানা করিয়া গামছা, মালসাট মারিয়া পরা, ছােট বড়-মাঝারি নানা আকারের কৃষ্ণবর্ণ দেহ, এক একখানা পলুই হাতে লইয়া মহানন্দে ব্যাঙের মত লাফাইয়া বেড়াইতেছে। আর মাঠের এ-প্রান্ত হইতে ও-প্রান্ত পর্যন্ত শতখানেক আলাের মালা। লােক গুলা ‘পাউষে’ মাছ ধরিতে বাহির হইয়াছে। দত্ত মহাশয়ের মনে হইল, দেরী যা হইবার হইয়াছে। ভিজার ও চূড়ান্ত হইল। এই পথে একবার সাতবিঘার বাকুড়িটা ঘুরিয়া নিজের ডহরের বড় আড়াটা দেখিয়া গেলে মন্দ হয় না। আড়াটা বড়। সবজিপুকুরের জল বাধ ছাপাইয়া ডহরে পড়ে। বাধের গায়েই আড়া, বেশ ভাল মাছ পড়ে। নিজস্ব আড়া। কড়-ক্রান্তির অংশীদার নাই। সেজন্য একটা কই, কি দু'টা মাগুর মাছ লইয়া ফৌজদারী বাধে না। ঠক ঠক করিয়া দত্ত মহাশয় সেখানে গিয়া দেখিলেন, রতন লাঠি হাতে সেখানে পঁাড়াইয়া আছে বটে, কিন্তু তাহার দুইটা ছেলে দুই খালুই মাছ লইয়া বাড়ী যাওয়ার উপক্রম করিতেছে। অন্ধকারে দত্ত মহাশয়ের আগমন তাহার। টের পায় নাই। অকস্মাৎ সম্মুখে পড়িয়া ভয়ে থমকাইয়া দাড়াইয়া গিয়াছে। এত কাছে যে, খালুই লুকাইবারও উপায় নাই। খানিকটা পিছনেই রতন আলাের সামনে বসিয়া আড়া 69
মনের গহনে
পাহারা দিতেছে। সম্মুখে আলাে থাকায় দত্ত মহাশয়কে চিনিতে
পারিল না।
অন্য কেউ ভাবিয়া, গম্ভীর মেজাজে হাকিল, কে রে
বঙ্কা? দাড়ালি কেন?
বঙ্কার উত্তর দিবার শক্তি নাই। কিন্তু দত্ত মহাশয় তাহাদের
যেন দেখিয়াও দেখিলেন না, এমনি ভাবে পাশ কাটাইয়া আগাইয়া
আসিয়া বলিলেন, রতন নাকি ?
মনে মনে রতনও শিহরিয়া উঠিল। কিন্তু দত্ত মহাশয়কে
তাহার চিনিতে বাকী নাই। লাফাইয়া উঠিয়া সাগ্রহে বলিল,
বড় বাবু? অন্ধকারে যে?
অন্ধকারের কথাটা বড় বাৰু নিজেই ভুলিয়া গিয়াছিলেন।
হাতের নির্বাপিত হারিকেনের দিকে চাহিয়া ক্লান্ত কণ্ঠে বলিলেন,
হাওয়ায় নিভে গেল ।
রতন গড় গড় করিয়া বলিয়া যাইতে লাগিল, তাইতো বলছি,
বড় বাবু ঠিক আসবেন। মা ঠাকরুণকে বললাম, ষ্টেশনে যাই।
ত। মা ঠাকরুণ বললেন, হ্যা, এই দুজ্জোগে আবার মানুষ আসে।
তুই বরং আড়ার কাছে দাড়াগে! লােকের তে ধম্মাধম্ম জ্ঞান নেই।
আছার মাছ শেষ করে ছেকে নিয়ে যাবে। তাই এই দিকে এলাম।
কিন্তুক, আমার মন বলছিল••• আসতে বড় কষ্ট হয়েছে তাে?
একটা আলােও নেই।
লােকের ধর্মাধর্মজ্ঞানহীনতা, কিংবা পথের কষ্ট সহ্মন্ধে দত্ত
মনের গহনে
আচমন সারিয়া তিনি উপরে গেলেন। তিনটি ছেলেতেই
অতবড় বিছানায় এমনভাবে শুইয়া আছে যে, আর একটা মানুষের
শােয়ার স্থান নাই। দত্ত মহাশয় প্রত্যেকের ললাটের উত্তাপ
পরীক্ষা করিলেন। সকলেই ভাল আছে দেখিয়া সম্বােষ সহকারে
একটি “হু” ছাড়িলেন। রান্নাঘরের কাজ শেষ করিয়া ইতিমধ্যে
গৃহিণীও আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
জিজ্ঞাসা করিলেন, টাকাকড়ি এনেছ ?
টাকা.. হু:!
কিন্তু এই দুটি কথা বলিতে দত্ত মহাশয় যতখানি সময় লইলেন,
ততক্ষণে গৃহিণী তাহার পকেট হইতে তিনটি টাকা বাহির
করিয়াছেন।
-মােটে তিনটি ? কি হবে এতে? গয়লাকে একটা টাকা
দিতেই হবে।
ধােপাকে আট আনা না দিলেই হবে না। বাকী
রইল দেড়টি টাকা। তা পরাণ মুদি কি দেড় টাকায় ছাড়বে ?
দত্ত মহাশয় একট থামিয়া টানিয়া টানিয়া জড়াইয়া জড়াইয়া
বলিলেন, তিনটে মানে...ইয়ে। যাবার ট্রেনভাড়া রইল না আর
কি! ও তিনটে... !
অর্থাৎ ওই তিনটি টাকাই তাহার সম্বল। ও টাকা লইলে
তাঁহার ফিরিবার ট্রেনভাড়া পর্যন্ত থাকিবে না।
গৃহিণী টাকা তিনটি বাক্সে তুলিয়া ঝঝের সঙ্গে বলিলেন,
১৭
মনের গহনে
ট্রেন ভাড়া রইল না মানে ? তুমি কি যাওয়ঃ-আসার টিকিট ক'রে
আসনি? আমাকে ন্যাকা বোেঝাচ্ছ ?
গৃহিণীর উষ্ময় দত্ত মহাশয় ভয় পাইয়া গেলেন। তঁাহার
স্বাভাবিক নিম্নম্বর নিম্নতর অনুনাসিকে পরিণত হইল। কোন
প্রকারে জড়াইয়া জড়াইয়া বলিলেন, যাওয়া-আসা মানেই !
মেম সায়েবকে বললাম, তা :
গৃহিণী ধমক দিলেন, থাক্, থাক্।
দত্ত মহাশয় চুপ করিলেন। গৃহিণী ওদিকে গিয়া শুইয়া
পড়িলেন। মিনিট পনেরাে পরে দত্ত মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন,
তােমার শরীর ভাল আছে তাে?
গৃহিণী পিছন ফিরিয়াই বলিলেন, না।
উদ্বেগে দও মহাশয় খাড়া হইয়া উঠিয়া বসিলেন। শুষ্ক মুখে
জিজ্ঞাসা করিলেন, কি আবার হ'ল ?:: ইয়ে, জ্বর ?
—ইয়ে, জ্বর, নিউমােনিয়া, কলেরা, বসন্ত, ইয়ে...
দত্ত মহাশরের ছােট মাথাটি ঢেউ-গা কলসীর মত দুলিতে
লাগিল। আশঙ্কায় নয় ; গৃহিণী দে পরিহাস করিতেছেন তিনি
তাহ। বুঝিতে পারিয়াছেন। আবার শুইয়া পড়িয়া বলিলেন, তাই
হােক। আমি ভেবেছিলাম,'' ।
গৃহিণ বলিলেন, হু! আর ভাবতে হবে না। আলােটা
নিবিয়ে দিয়ে শােও দিকি ?
মনের গহনে
দত্ত মহাশয় উঠিয়া আলােট। নিবাইয়া দিয়া স্বস্থানে শুইয়া
পড়িলেন ; এক মিনিটের মধ্যে তাহার নাসিকাধ্বনি শােনা
যাইতে লাগিল।
চাটুযোদের বড় গিন্নি দিয়াছিলেন এক শিশি ‘পাইরেক্স
আনিতে। তাহাব বড় নাতি ম্যালেরিয়ায় ভূগিয়া কাটাখানি সার
করিয়াছে। বছর দুই ধরিয়া ভুগিতেছে। বয়স ষােল বৎসরের কম
নয়, কিন্তু দেখিলে নয়-দশ বৎসরের বেশী বলিয়া মনে হয় না।
সকালেই তিনি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। ঘােযেদের ছােট
বৌ দিয়াছিল ‘উল আনিতে। তাহার বছর দশেকের ভাসুরঝি
আঁচলে করিয়া মুড়ি চিবাইতে চিবাইতে হাজির। গৃহিণী পুটলি
খুলিয়া তাহার জিনিষগুলি বাহির করিয়া দিলেন।
একটু পরেই দত্ত মহাশয় ঠক ঠক করিয়া নামিয়া আসিলেন।
তাহার মা তখন চাটুয্যে-গিন্নীর কাছে পুত্রের গুণপণা শতমুখে
ব্যাখ্যা করিতেছিলেন। একালে অমন মাতৃভক্ত পুত্র যে নিতান্ত
দুলাভ, এ বিষয়ে চাটুয্যে গিন্নীর অণুমাত্র সংশয় ছিল না। তিনি
ঘাড় নাড়িয়া সায় দিতেছিলেন, এবং পুত্রের যে সব কাহিনী মাও
ভুলিয়া যাইতেছিলেন, সে সব স্মরণ করাইয়া দিতেছিলেন।
দত্ত মহাশয় নামিয়া আসিলেন।
মনের গহনে চাটুয্যে-গৃহিণী মুখখানি বিকশিত করিয়া বলিলেন, এই যে বাবা, ভাল ছিলে তাে? তাই বলছিলাম তােমার মাকে। ধন্যি তােমার কেঁাক বােন, অনেক তপিত্যে করে ছেলে পেয়েছিলে ! বেঁচে থাক বাবা, আমার মাথায় যত পাকা চুল, তত বৎসর পেরমাই হােক। বৌমা আমার জন্ম-এয়ােস্ত্রী হয়ে স্বামী পুত্র নিয়ে ঘর করুন। বৌমার সম্বন্ধে চাটুয্যে-গিন্নীর ভয় ছিল। নাতির ঔষধটা আসিয়াছে বটে, কিন্তু টাকাটা দেওয়া হয় নাই। দত্ত মহাশয় হয়ত তাগাদা করিবেন না, কিন্তু গৃহিণী সাতবার লােক পাঠাইয়া টাকাটা আদায় করিয়া লইবেন। সুতরাং তাহাকেও খুশী করার প্রয়োজন। তিনি একখানা চওড়া লালপাড় মটকার শাড়ী পরিয়া ছেলেদের জন্য মুড়ি বাহির করিয়া দিতেছিলেন। সেদিকে একটা কলরব উঠিয়াছে। আজ মুড়ির পরিমাণ অন্যদিন অপেক্ষা বেশী। মিত্র-বাড়ীর ছোটবৌমার একটি পুত্ৰ-সন্তান হইয়াছে। করিয়া তাহার অন্নপ্রাশন হইবে । অন্যান্য আরও পাঁচটি স্বজাতীয় মহিলার সঙ্গে দত্ত-গৃহিণীকেও এখনই রান্না করিতে যাইতে হইবে। পল্লী গ্রামে উড়িয়া ব্রাহ্মণের এখনও অত্যুদয় হয় নাই। বিশেষ করিয়া নিমন্ত্রণ বাড়ীতে তো নয়ই। দত্ত-গৃহিণী ভােরেই স্নান সারিয়া একবার সেখানে দর্শন দিয়া ছেলেমেয়েদের জলখাবার বড় ঘট। ১০০
মনের গহনে
দিবার জন্য আসিয়াছেন। আবার এখনই বাহির হইয়া যাইবেন।
তঁাহার বড় তাড়াতাড়ি।
দত্ত মহাশয় নম্রকণ্ঠে চাটুয্যে-গৃহিণীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, খবর
সব ভাল তো, খুড়িমা ?
-আর ভাল বাবা । নাতিটার জ্বর তাে এই দু’বছরের
মধ্যে কিছুতে ছাড়ছে না। কত ওষুধ খাওয়ালাম, বাবার থানে
কত মানসিক করলাম, কিছুতে কিছু না।
দত্ত মহাশয় গাডুটা লইয়া বাহির হইয়া যাইতেছিলেন।
খবর ভাল নয় শুনিয়া বিব্রতভাবে থমকিয়া দাড়াইলেন। কি যে
করিবেন ভাবিয়া পাইলেন না। বিব্রতভাবে বলিলেন, তাইত•••
ইয়ে, রজনী ডাক্তারকে
-কত ডাক্তার দেখালাম বাবা। ডাক্তার-বদ্যি আর বাকী
রাখিনি।
তবু জ্বর ছাড়িল না? দত্ত মহাশয় গাডুহাতে অকূল সাগরে
ভাসিতে লাগিলেন। অবশেষে জ্বরের কোনই কিনারা করিতে
পারিয়া টুক টুক করিয়া নাথা নাড়িতে নাড়িতে বাহির হইয়া
গেলেন। কিন্তু তখনই ফিরিয়া আসিয়া রান্নাঘরের ছাচতলায়
দাড়াইয়া বলিলেন, একটু তেল দিও তাে। এই সঙ্গে একটা•••হু !
দত্ত গৃহিণী তেলের বাটিটা স্বামীর কাছে নামাইয়া রাখিয়া
ফিস ফিস করিয়া বলিলেন, এই সাত-সকালে তেল মেখে কি হবে ?
১০১
মনের গহনে -সাত সকালে মানে..ইয়ে। বিলের জমিটা একবার•••ছ, সেই সঙ্গে নদীর ঘাটে একটা•••হুঃ । দত্ত-গৃহিণী ফিস ফিস করিয়া বলিলেন, সেই সঙ্গে আমার মাথাতেও একটা...ই। বেশী দেরী ক’র না যেন, মিত্রিবাড়ীতে নেমন্তন্ন আছে। দত্ত মহাশয় মাথা নাড়িয়া বলিলেন, না, না। যাব আর আসব। শুধু বিলের জমিটায়... দত্ত মহাশয় তেল মাখিয়া বাহির হইয়া গেলেন। চাযের সঙ্গে সঙ্গে বিলে বিঘা কয়েক জমি বন্দোবস্ত করার কথাও উঠিয়াছে। কতদূর পর্যন্ত বান আসে, নিজের চোখে তাহা পরীক্ষা করিয়াই বন্দোবস্ত পাক। করিবেন, সকাল বেলায় এইরূপ ইচ্ছ। মনে উদয় হইয়া স্থির করিয়াছেন, এই সঙ্গে তেলটা মাখিয়া গেলে আসিবার সময় নদীর ঘাটে একটা ডুব দিয়া আসা যায়, তাহাতে অনেকটা সময় অপব্যয়ের হাত হইতে বাচিবে । দত্ত মহাশয়ের বাড়ী হইতে বাহির হইয়া বড় রাস্তা ধরিয়া সোজা পূৰ্বমুখে নদীর দিকে খানিকটা গেলেই বড় অশথতল।। গ্রামের লােক চাদা তুলিয়া তাহার নীচে বেশ উচু করিয়া বাধাইয়া লইয়াছে। গ্রামের যত নিষ্কর্মা মাতব্বর ব্যক্তি সকাল হইতে সন্ধ্যা পৰ্য্যন্ত সেইখানে বসিয়া তাস-পাশা-দাবা খেলেন, এবং অপর্যাপ্ত পরিমাণে খরসান তামাক পুড়ান। দত্ত মহাশয় প্রথমে সেইখানে ছিল।
মনের গহনে
আট কাইয়া গেলেন। সপ্তাহ পরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, একটু ইচ্ছা
করিতেই হইল।
কিন্তু বেশীক্ষণ নয়। বিলের জমি লওয়ার সম্বন্ধে দত্ত মহাশয়
অভিজ্ঞ বন্ধুদের সঙ্গে কেবল আলােচনা আরম্ভ করিয়াছেন, এমন
সময় দূরে দেখা গেল, একটা লােক কতকগুলি মহিষ তাড়াইয়া লইয়া
আসিতেছে। দত্ত মহাশয় পাশের লােকটিকে টিপিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, দেখতে। হে মহিন্দির, পাইকের বলে মনে হচ্ছে না?
মহিন্দির তীক্ষ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, পাইকেরই বটে।
উলােপাড়ার হাটে যাচ্ছে। তােমার একটা মােষ
দরকার,
না ?
উলাপাড়ার হাটে যাইবার এই রাস্তা। পাইকার কাছে
আসিতে তাহাকে থামানো হইল। বিচক্ষণ ব্যক্তির। মহিষের শিং
টানিয়া, দাত দেখিয়া এখান-ওখান টিপিয়া মহিষ পছন্দ করিতে
লাগিল।
দত্ত মহাশয় তাহাদের দিকে আগ্রহের সঙ্গে চাহিতে
লাগিলেন। বিচক্ষণেরা একটা মহিষ পছন্দ করিল। মহিষটা
ভাল ; সবে চার দত। এটা হইলে দত্ত মহাশয়ের মহিষটার সঙ্গে
জোড়া মেলে ভাল ।
কলিকাটা হুকা হইতে নামাইয়া দিয়া মহিন্দির বলিল,
তােমার মােষের দর কি রকম হে, পাইকের ? বল দেখি শুনি।
—ঠিক একদর বলব ?
মনের গহনে দত্ত মহাশয় তাড়াতাড়ি বলিলেন, হ্যা, হ্যা, এক দর। দর- দস্তুর আমি পছন্দ করি না। কলিকাটা হাতে ধরিয়া দু’টা টান দিয়া পাইকার বলিল, ছােটটা নেবেন তো? —ছােটটাই নােব, কি বল মহিরি ?--বলিয়া দত্ত মহাশয় মহেন্দ্রের দিকে তাকাইলেন। মহেন্দ্র পাকা লােক। কোষ্টা লওয়া হইবে স্পষ্ট করিয়া ভাঙিতে চাহিল না। বলিল, সব কটারই দর শুনি। আচ্ছা, ছােটটারই আগে বল। কলিকায় বেশ করিয়া একটা শে-টান দিয়া পাইকার কলিকাটা নামাইয়া রাখিয়া নিশ্চিন্ত ভাবে ধোয়া ছাড়িতে লাগিল। একটু পরে বলিল, একদর বলছি,-এক কুড়ি আট টাকা। এক আধলা কম দোব না। মহেন্দ্র বিজ্ঞের মত উপেক্ষাভরে হাসিয়া নিঃশব্দে হুকায় মন দিল। পাইকারের কথাট। গ্রাহের মধ্যেই আনিল না। मछ মহাশয় একবার মহেন্দ্রের একবার পাইকারের দিকে চাহিতে লাগিলেন। কেহই কোন কথা কহে না দেখিয়া অধীর হইয়া উঠিলেন। অবশেষে নিজেই আগাইয়া আসিয়া বলিলেন,—ইয়ে ! আটাশ-ফাটাশ বুঝি না। ন’টি টাকা..হঁ ! এবারে মহেন্দ্র এবং পাইকার দুজনেই অবাক হইয়া গেল। ১০৪ মনের গহনে মহেন্দ্র অনুমান করিয়াছিল বাইশ টাকায় লওয়া যায়। পাইকার ও আঁচিতেছিল চব্বিশ টাকা বলিলে দিয়া দিবে। এবারে মহিষের বাজার নাই। খড়েব অভাবে লােকে মহিষ বিক্রি করিতে পারিলে বাঁচে। কিন্তু সে জায়গায় একেবারে নয় টাকা ! পাইকার আর দাড়াইল না। বেশ কয়েছেন করত, বলিয়া মহিষ লইয়া চলিতে আরম্ভ করিল। পিছনে পিছনে দত্ত মহাশয়ও গাড়, হাতে চলেন। নয় হইতে দশ, এগারাে, সাড়ে এগারে। পয্যন্ত উঠিলেন, পিছনে পিছনে মাইল দেড়েক আ ও হইল, কিন্তু পাই- কারের মন তথাপি দ্রব হইল না। লােকটা মহেষের পিঠে দুইটা বাড়ি দিয়া বলিল, আর কতদূর আসবেন কত? ফিরে যান। এবারে ছাগল দিয়ে চাষ করুন। মোষ কেন। আপনার কম্ম লয়। নিরাশ হইয়া দত্ত মহাশয় ফিরিয়া আসিলেন। কিন্তু গ্রামে নয়, মাঠে মাঠে একেবারে বিলে । ভাল বান আসিয়াছে। এখনও হু হু করিয়া বাড়িতেছে। যে জায়গাটা দত্ত মহাশয়ের লওয়ার কথা, তার অনেকখানি বন্যার গর্তে। কিন্তু ঠিক সমস্তটা পয্যন্ত বান আসে কিনা, না দেখি। পাকা বন্দোবস্ত করা কাজের কথা নয়। দত্ত মহাশয় গামছাট। মাথায় দিয়া সেইখানে দাড়াইয়া রহিলেন। এক আঙুল বান বাড়ে তিনি এক আঙুল পিছাইয়া আসেন। আবার এক আঙুল বাড়ে, আবার এক অঙল পিছান। এমনি করিয়া যান বেল। চারটা কি ১০৫
মনের গহনে
সাড়ে চারটা, তখনও দেখা গেল বিঘা প্রশেক জমিতে বান
আসিতে বাকী আছে।
এমন। সময় রতন হাফাইতে হাফাইতে আসিয়া বলিল,
বড় বাবু,
আপনি এখানে ?
আমি পিথিমীটা খুজে
এলাম।
বলিয়া হাত ঘুরাইয়া পৃথিবীটা দেখাইয়া দিল।
বলিল, গা’র ষােলো আনা মিত্রিবাড়ীতে এসেছে। আপনার
জন্যে বসতে পারছে না। এখনও চান হয় নি আপনার ?
দত্ত মহাশয় তাহার পিছন পিছন নদীর ঘাটের দিকে চলিতে
চলিতে বলিলেন, বিলের সবটায় তো বান আসে নি ! এখনও
বিঘে দশেক, হু: ?
-আজ্ঞে, এই তাে আসতে আরম্ভ করেছে। কাল সকাল
নাগাদ সবটা ডুববে।
রতন দত্ত মহাশয়কে তিষ্টাইতে দিল না! নিজে দাড়াইয়া
থাকিয়া স্নান করাইয়া নিয়ে সঙ্গে করিয়া লইয়া চলিল। বলিল,
মহিন্দির বললে, পাইকেরের পেছু পেছু গেছেন। ভাবলাম, হাটে
গিয়েই বা উঠলেন হয় তো!
দত্ত মহাশয় চলিতে চলিতে বলিলেন, হাটে মানে.. ইয়ে।
তা প্রায় হাটের কাছাকাছিই.. :! কিছুতে দিলে না রতন !
না দিবার কারণ রতনের অজ্ঞাত নয়। মহেন্দ্রের মুখে মুখে সে
১০৬
মনের গহনে ইতিবৃত্ত সমগ্র গ্রামে রাষ্ট্র হইয়া গিয়াছে। সে মনে মনে হাসিতে হাসিতে নিঃশব্দে পথ চলিতে লাগিল। একটা সুবিধা হইয়া গেল, দত্ত-গৃহিণী যজ্ঞবাড়ীতে। মা একা বাড়ী আগলাইয়া বসিয়া ছিলেন। দত্ত মহাশয় বাক্যবাণের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন। তাড়াতাড়ি কাপড় ছাড়িয়া যখন তিনি মিত্রবাড়ীতে পৌছিলেন, তখন সকলের আহার প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে ; মিষ্ট পড়িতেছে । দত্ত মহাশয়কে দেখিয়া সকলে হা হা করিয়া উঠিলেন। কিন্তু তিনি কোন কথা গায়েই মাখিলেন না। উঠানের একাংশে গােলার এক পাশে বসিয়া পড়িয়া তিনি বলিলেন, তা হােক, তা হোক। আমাকে এই খানেই দুটো..হুঃ । খাওয়া নিয়ে কথা । বৃদ্ধ মিত্র মহাশয় ছুটিয়া আসিয়া বলিলেন, সে কি হয় বাবা! তােমার জন্যে ঘরের ভেতরে জায়গা করে দিক। ওরে ! কিন্তু দত্ত মহাশয়ের মনে অভিমানেরও স্থান নাই, অহঙ্কারেরও না। তিনি হাসিয়া বলিলেন, ঘরে মানে...ইয়ে। এই বেশ হবে। সেইখানেই পরিতােষ সহকারে আহার সারিয়া দত্ত মহাশয় হাত চাটিতে চাটিতে উঠিয়া আসিলেন। কলিকাতা ফিরিবার গাড়ী রাত্রি দুইটায়। কলিকাতায় পৌছায় পৌনে দশটায়। ডাকগাড়ী নয়, প্যাসেঞ্জর। এটায় গেলে দিনের বেলায় দত্ত মহাশয়ের ভাত জোটে না। ষ্টেশন হইতেই আফিস ১০৭ মনের গহনে লইলেন । ছুটিতে হয়। ট্রামে গেলে ছুটাছুটি কমে বটে, কিন্তু দত্ত মহাশয় পারংপক্ষে ট্রামে-বাসে চড়িতে চান না। ঘুমাইতে ঘুমাইতে হটিয়া চলিয়া যান। কিন্তু সে যাক, এখন ট্রেন ভাড়ার কি করা যায় ? মেমসায়েব তাে•••হু', এদিকে গৃহিণী ও•••হু। দত্ত মহাশয় জননীর শরণ মাসের মধ্যে অন্তত দুইবার এই রকম হয়। গৃহিণীর ব্যাঙ্কে যাহ। একবার জমা হইয়া যায়, তাহা আর বাহির হয় না। মাকে দুইটা টাকা প্রণামী লইযা তিনটি টাকা আশীৰ্বাদী দিতে সেকেলে মানুষ, হিসাব-নিকাশের জ্ঞান কম। অত ভাবিয়া দেখেন না। শুধু ছেলের হাতে টাকা নাই শুনিয়াই ব্যাকুল হন। এবারেও দত্ত মহাশয়কে তিনটি টাকা বাহির করিয়া দিলেন। রাত্রি একটার সময় বাহির হওয়ার কথা থাকিলে দশটার সময় হইতে গৃহিণীকে তাগাদা দিতে হয়। এই রূপে দত্ত মহাশয় কোনো প্রকারে যথাসময়ে ষ্টেশনে এবং তারপরে আফিসেও পৌছিলেন। আফিসে পৌছিয়া একশত আটবার যাবতীয় দেবতার নাম একটা ফাস কাগজে লিখিয়া কপালে ঠেকাইলেন। বেয়ারা হইতে বাবু পর্যন্ত যে কেহ আসিল, তাহারই কুশল-প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন, এবং অবশেষে একখানা চিঠির খসড়া করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িলেন। দিবানিদ্রা বলিয়া নয়, হাটিতে হাঁটিতেও ভদ্রলােক ঘুমাইয়া পড়েন। মাঝে মাঝে লোকের ধাক্কা খাইয়া চমক ভাঙে। Sob
মনের গহনে
এক দফা ঝিমাইয়া লইয়া দত্ত মহাশয় পাশের ঘরের সহকৰ্ম্মীব
খােজ লইতে গেলেন। তিনি তো অবাক।
—কি খবর দত্ত ? বুড়ো মা
সহকর্মীর মুখ দেখিয়া দত্ত মহাশয়ের প্রাণ শুকাইয়া গেল।
তার উপর বুড়ো মা ! তাহার মাথা কলীর মত দুলিতে লাগিল।
-বুড়াে মা •••মানে চিঠিপত্র কিছু এসেছে নাকি?
-কেন? তুমি বাড়ী থেকে আসছ না? ভাল আছেন তো
তিনি?
দত্ত মহাশয় জড়াইয়া জড়াইয়া বলিলেন, ভাল মানে, হ। ভালই
তো দেখে এলাম।
তবে তােমার মাথা অমন উস্কখুস্ক কেন ? পায়ের জুতো
কি হল ?
দত মহাশয় আশ্বস্ত হইয়া হাসিলেন। বলিলেন, জুতাে মানে
•••ইয়ে। বাড়ী থেকে যখন বেরুলাম, মনে হ'ল জুতােটা হাতেই
আছে। ষ্টেশনে এসে পা ধুতে
গিয়ে দেখি, হু। তা হলে
বাড়ীতেই বােধহয় তােমার বাড়ীর খবর ভাল ? ছেলেপুলে
সব:••
-হ। ভাল।-বলিয়া ভলােক কলম তুলিয়া লইলেন। দত্ত
মহাশয় খানিকক্ষণ দাড়াইয়া থাকিয়া বলিলেন, তােমার কাছে•••
ইয়ে, দুটো টাকা হবে?
১০৯
মনের গহনে
--টাকা? কি করবে ?
মাথা চুলকাইয়া দত্ত মহাশয় বলিলেন, যাওয়ার পথে•••',
জুতাে এক জোড়া
ভদ্রলােক দুটি টাকা বাহির করিয়া দিলেন । দত্ত মহাশয়
আস্তে আস্তে নিজের ঘরে গিয়া বসিলেন। তারপর আফিসের কাজ
আরম্ভ হইল। একটা খসড়া সাতবার কাটেন। অবশেষে সেটা
ছিড়িয়া ফেলিয়া আবার নতন করিয়া লেখেন। সেটা পছন্দ না
হইলে আবার কাটেন, আবার লেখেন। এমনি করিয়া যখন খান
পাঁচেক খসড়া শেষ হইল, তখন বেয়ার আসিয়া জানাইল রাত নয়টা
বাজে। বাবার জন্য সে বেচারাও বাড়ী ফিরিতে পারিতেছে না।
বাবু উঠিলেই আললা নিবাইরা দিয়া চলিয়া যাইতে পায়।
বাধ্য হইয়া দত্ত মহাশয়কে উঠিতে হইল। কিন্তু তখনও
অনেক কাজ বাকী। অগত্যা সে গুলি বাপিয়! বাসায় লইয়া যাওয়া
স্থির করিলেন। আফিসে আসিয়া টিফিনের সময় খান দুই পুরী আর
একটা সন্দেশ মুখে দিয়া জলযােগ করিয়াছিলেন। সমস্ত দিনের মধ্যে
পেটে আর কিছু পড়ে নাই। কিন্তু সেজন্য বিশেষ অসুবিধা
হইতেছে না। উপবাসে তিনি সিদ্ধ উদর’–এক আধ বেলা না
খাওয়ার কথা মনে পড়ে না
আফিসের ফাইল বগলে দাবি ছা মাথায় দিয়া দত্ত মহাশয়
রাস্তায় নামিলেন। রৌদ্র-বৃষ্টি থাকুক আর না থাকুক, দিনেই
মনের গহনে
হােক অথবা রাত্রেই হােক, ছাতাটি ভদ্রলােকের মাথায় দেওয়াই
চাই, এবং এই ছাতাটি-ই। এ তঁাহার বহু কালের অভ্যাস।
ছাতাটি মাথায় দিয়া রাস্তায় ঘুমাইতে ঘুমাইতে আসা।
বাসায় যখন ফিরিলেন, তখন সাড়ে দশটা বাজিয়া গিয়াছে।
অবশ্য বাস একটু দূরেই। হাতিবাগানে। সাধারণ মানুষের
তিন কোয়ার্টারের বেশী লাগে না। দও মহাশয়ের দেড়
ঘণ্টা।
বাসার সকলে তখন নিদ্রামগ্ন। উড়িয়া ঠাকুর তখনও বাবুর
প্রতীক্ষায় একটা পিড়িতে বসিয়া দুলিয়া দুলিয়া একটা উড়িয়া গান
মক্স করিতেছে। সুমুখে বসিয়া চাকরটা বিড়ি মুখে দিয়া তন্ময়
হইয়া শুনিতেছে। দত্ত মহাশয় দরজায় উকি দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,
খবর সব ভাল তো ঠাকুর?
চাকরটা বিড়ি পিছনে লুকাইল। ঠাকুর সঙ্গীত বন্ধ করিয়া
ব্যস্তভাবে উঠিয়া বলিল, আজ্ঞা হা বাবু। ঈশ্বর প্রসাদাং খবর
ভাল। আপনার খবর ভাল? বাড়ীর সব মংগল ?
দত্ত মহাশয় বাড়ীর চারিদিক ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া উপরে
উঠিতে উঠিতে বলিলেন, বাড়ী মানে...।
উপরে আসিয়া ছাতাটি বেশ করিয়া কাড়িয়; একটি কোণে
ঠেস দিয়া রাখিলেন।
জুতা খুলিতে গিয়া মনে
পড়িল জুত।
বাড়ীতে ফেলিয়া আসিয়াছেন। আসিবার সময় রাস্তায় এক জোড়া
১১১
মনের গহনে ভুল হইয়া কিনিয়া লওয়ার কথা ছিল। তাহাও হয় নাই। গিয়াছে। দত্ত মহাশয় আপন মনেই একটা হু দিতেন। তঁাহার বড় ছেলে এইখানে থাকিয়া কলিকাতার কলেজে পড়ে। গ্রামের আরও দুইটি ছেলে তাহার ঘরেই থাকিয়া কলেজে । পড়ে। জামা খুলিয়া আলনায় রাখিয়া দত্ত মহাশয় তীক্ষ দৃষ্টিতে সকলকে একবার দেখিয়া লইলেন। সব কয়টিই আছে, এবং অঘোরে নিদ্রা যাইতেছে। সকলের ললাটের উত্তাপ পরীক্ষা দেখিলেন, কাহারও জর হয় নাই। ভাল বলিয়াই বােধ হইল। হাত-মুখ ধুইবার জন্য নীচে নামিয়া "সিয়। ঠাকুরকে বলিলেন,•••ইয়ে। আমার জন্যে রুটি হয়েছে তো? -আজ্ঞা হু। —তবে আর কি ?.. ইয়ে। আমার খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে তােমরা খেয়ে নাও। আমার...হু। উপ-প সেরে খেতে দেরী হবে। ঠাকুর খাবার বাড়িতে লাগিল। দত্ত নহাশয় হাত-মুখ ধুইয়া নিশ্চিন্ত মনে জপে বসিলেন। অনেক রাত্রে দত্ত মহাশয়ের ছেলে উপেনের ঘুম ভাঙিয়া গেল। উঠিয়া দেখে আলো জ্বলিতেছে । দত্ত মহাশয় কুশাসনে বসিয়া গভীর ধ্যানমগ্ন । অর্থাং মাথাটা ধীরে ধীরে নামিতে নামিতে এক- বার গঙ্গাজলের পাত্র স্পর্শ করিতেছে, আবাব উঠিয়া আসিতেছে।
মনের গহনে
-বাবা, ঘুমুচ্ছেন নাকি ?
'—দত্ত মহাশয়ের চমক ভাঙিল ।
-ঘুমুচ্ছেন নাকি ?
-ঘুম মানে—একটুখানি হু !...ইয়ে
কোশার গঙ্গাজল লইয়া দত্ত মহাশয় চোখে দিলেন। বলিলেন,
তােমরা সবাই ভাল তো? ক'টা বাজে?
ঘড়ি দেখিয়া উপেন বলিল, তিনটে পাঁচ।
- তা হলে আর...ইয়ে।—দত্ত মহাশয় তাড়াতাড়ি নীচে
ছুটিলেন।
No text on this page.
মহা প্রলয়ের পরে
No text on this page.
মনের গহনে ইহারা অতি নিরীহ লােক। বাকযুদ্ধ ছাড়া আর কোনে। প্রকার যুদ্ধে এ গ্রামের কোনো লােকের অনুরাগ নাই। কথায় কথায় লাঠি ধরিবার দুর্নাম আছে একমাত্র বংশীধর মণ্ডলের । লােকটা বলশালী নয়। বছরের মধ্যে নয়টা মাস ম্যালেরিয়ায় ভুগিয়া দেহে শুধু হাড় সার হইয়াছে। কিন্তু হইলে কি হয় ? যাহারা তেজী লােক তাহাদের তেজ কিছুতে যায় না। বংশীধর তাহার বৃদ্ধা মা এবং চিররুগ্ন। স্ত্রীর উপর চটিয়া কথায় কথায় এমন চীৎকার করে এবং মাথার উপর সরু তেল-চুকচুকে লাঠিটা এমন ভাবে ঘুরায় যে পাড়ার লােক জুটিয়া যায়। বড় মা মার খাইলেও চেচায় , নিঃশব্দে থর থর করিয়া কাপে। কিন্তু রুগ্না কী স্বামী লাঠি ধরিবামাত্র ভাঙা কাসরের মত ঝন্ ঝন্ করিয়া বাজিয়া ওঠে এবং স্বামীর উর্দ্ধতন চতুর্দশ পুরুষের প্রতি এমন সকল বাক্য প্রয়ােগ করে যে তাহা কানে শোনা যায় না। একমাত্র বংশীধর এই প্রকৃতির লােক। বাকী সকলেই নিজের নিজের সংসারের সহস্র প্রকার অভাব-অভিযােগ লইয়াই মাঝে মাঝে পাচজনে জটলা করিয়া প্রতিবেশীর দুরবস্থা সম্বন্ধে শ্রুতিমধুর আলোচনা করে। কখনও চারি আ ল জায়গা কিম্বা জমির আলের স্বত্ত্ব লইয়া নিজেদের মধ্যে বিবাদও বাধে। তখন দুই পক্ষই সদরে গিয়া এক এক নম্বর ঠুকিয়া আসে, এবং বাকী সকলেই কোন না কোন পক্ষে সাক্ষ্য দিয়া সত্যের মর্যাদা ১১৭
মনের গহনে
রক্ষা করে। যাহারা শিক্ষিত, তাহারা গ্রামের অথবা পার্শ্ববর্তী
গ্রামের স্কুলে মাষ্টারী করে এবং সকালে-সন্ধ্যায় তাস-দাবা খেলে।
এখানে খবরের কাগজ আসে না। একখানা ঢাউস্ সাপ্তাহিক
আসিত, তাহাও কিছুদিন হইতে বন্ধ হইয়া গিয়াছে । খবরের
কাগজের অভাব ও কেহ বােব করে না। চীনের সঙ্গে জাপানের
লড়াই বাধিবে কি না, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক হওয়া ভালো কি মন্দ,
হােয়াইট পেপারে কি দেওয়া হইয়াছে, আর কি দেওয়া হয় নাই,
সেইজন্য ইহাদের মাথা-ব্যথা নাই। এক কথায়
এক কথায় ইহারা ধরিয়া
রাখিয়াছে সকলের অদৃষ্টে যাহা হইবে, ইহাদেও তাহাই হইবে।
খবরের কাগজ পড়ে না বলিয়া তো আর বেশী হইবে না। তবে
আর ব্যয়বাহুল্যের প্রয়ােজন কি ?
ব্যবাহুল্য করে না-খবরের কাগজও পড়ে না। তবে
মানুষের মনে সংবাদ-সংগ্রহের যে সনাতন কৌতূহল আছে, তাহা
মিটায় ব্রহরাখাল। ব্ৰজরাখাল কলিকাতায় কি একটা আপিসে
কাজ করে—কাল-সন্ধ্যায় ইশান আছে। এ সমস্ত শরিয়া
এমন সময় থাকে না যে, খবরের কাগজটা একবার উল্টায়।
তবে কলিকাতায় থাকিলে মানুষের কানে দুই-চারিট। খবর আসেই।
ব্রজরাপাল কুতূহলী জনবৃন্দকে সেই খবর শােনায়। সে খবরের
কতক অরিয়নে বিকৃত, কতক একেবারে মিথ্যা। তা হউক,
খবরের কাগজ কেনার অপব্যয়ট। তে। বাচে।
১১
মনের গহনে
এই সকল নানা কারণে গ্রামের মধ্যে ব্রজরাখালের যথেষ্ট খাতির
ছিল।
সেদিন চরণ মাষ্টার খুব ভােরই গাড় হাতে মাঠে যাইতে
ছিলেন। দীঘির ঘাটের কাছে আসিতেই, মনে হইল নৈঋত
কোণের বুড়া বটগাছের নীচে দিয়া কে যেন হন্ হন্ করিয়া
আসিতেছে। একে তাের আছে, তাহার উপর কুয়াশা। চরণ
মাষ্টার থমকিয়া দাড়াইলেন।
, যাহা আশঙ্কা করিতেছিলেন সে রকম কিছু নয়,
ব্রজরাখাল। রাত্রের গাড়ীতে নামিয়া শীতের অন্ধকারে আর বাড়ী
আসিতে সাহস করে নাই। রাতটা ষ্টেশনেই কাটাইয়া, ভাের
থাকিতে রওনা হইয়াছে।
ব্রজরাখাল দুই হাতের বােঝ। দুইটা পথের উপর নামাইয়।
টিপ করিয়া প্রণাম করিল। চরণ মাষ্টারের সে ছাত্র।
•••কি বাবা, ভাল আছ তাে ?
জরাখাল ঘাড় নাড়িয়া জানাইল ভালােই আছে। কিন্তু
মাষ্টারের এমন শুষ্ক কণ্ঠ সে কখনও শােনে নাই। উদ্বিগ্নভাবে
জিজ্ঞাসা করিল,--আপনার শরীরটা কি ভাল নেই স্যার?
বিস্মিতভাবে চরণ মাষ্টার বলিলেন,-ভালােই আছে তো !
কিন্তু তথাপি ব্রজরাখাল সে কথা যেন বিশ্বাস করিতে পারিল না,
তীক্ষ দৃষ্টিতে মাষ্টার মহাশয়ের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিতে লাগিল।
১১৯
মনের গহনে
ও সব
অকস্মাং মাষ্টার মহাশয়ের যেন অসুস্থতার কারণ মনে পড়িয়া
গেল। এক গাল হাসিয়া বলিলেন—ও হাে ! বোধ হয় কাল রাত্রে
ভালাে ঘুম হয় নি, সেইজন্যে।
ব্রজরাখাল ফিক্ করিয়া হাসিয়া ফেলিল। কিন্তু তখনই হাসি
চাপিয়া কহিল,--ঘুম হওয়াই মুস্কিল। যা ভূমিকম্প...
ঘাড় নাড়িয়। মাষ্টার কহিল, ভূমিকম্প নয়, বাবাজি, কাল
সন্ধ্যেয় এককড়ির সঙ্গে এক বাজি দাবায় বসলাম।
আনাড়ির সঙ্গে বড় দাবা তো ধরি না, সে তুমি জাননাই। কিন্তু
একলা বসে থাকতে কি রকম বিরক্ত লাগছিল।
ভাবলাম, হােক
গে আনাড়ি, তবু সময় তো কাটবে। কিন্তু বলল বিশ্বাস করবে না
বাবাজি, এ দিগরে আমার সঙ্গে দাবা ধরতে কেউ সাহস করে না,
আর আমিই উপযুপরি তিনবার গেলাম হেরে । দুঃখে সমস্ত রাত
চোখের পাতা বুজতে পারলাম না।
দাবা খেলা সম্বন্ধে ব্রজরালের উৎসাহ ছিল না। শুধু বলিল,
এক মিনিট চুপ করিয়া থাকিয়া চরণ মাষ্টার মাথায় একটা
ঝাকি দিয়া যেন সমস্ত দুঃখ ও দুশ্চিন্তা দূর করিয়া ঠেলিয়া বলিলেন
--তারপরে, ভূমিকম্পের কথা কি যেন বলছিলে, বাবাজি ?
পশ্চিমে নাকি...
—সে য। যাবার তা তাে গেছেই। এখন আবার যে নতুন বিপদ!
মনের গহনে
:
চরণ মাষ্টার একটুতেই বিচলিত হইয়া ওঠেন। গাড় টা
নামাইয়া পথের উপরেই তিনি বসিয়া পড়িলেন।
—কি রকম? বােসাে, বােসাে।
ব্ৰজরাখাল সেইখানেই উবু হইয়া বসিয়া, গম্ভীর ভাবে
কহিল,—ইটালী থেকে বড় বড় জ্যোতিষী গণনা করে বলেছেন,
বিশে তারিখে নবগ্রহেব সঞ্চার হবে। এ রকম সমাবেশ নাকি সেই
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে একবার হয়েছিল, আর হয় নি।
—হু ? তাহ'লে ?
ব্রজরাখাল মােট দুইটা হাতে তুলিয়া লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া
মাথা নাড়িয়া বলিল,-এবারে আর রক্ষে নেই। যাবে সব আর কি !
চরণ মাষ্টার কথাটি কহিতে পারিলেন না। ব্রজরাখাল যখন
মােড়ের মাথায় অদৃশ্য হইয়া গেল, তখন একট দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া
উঠিলেন। মাঠে গেলেন বটে, কিন্তু সে যা ওয়ামাত্র। ঘাটে
আসিয়া গাড়, মাজিতে মাছিতে আর একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন।
এমন সুন্দর কাকচক্ষুর মতো কালো জল, একুশে তারিখে আর
কোনাে মানুষের চোখ এই কালাে জলের তরঙ্গ ভঙ্গ দেখিতে পাইবে
,হয়তো এইখানে উঠিবে একটা পাহাড়, আর প্রভুর বাড়ীর
মন্দিরটা বিরাট জলাশয়ে পরিণত হইবে। কে জানে, এই পৃথিবীর
কোনাে চিহ্নই থাকিবে কি না! আর কোনােদিন হয়তাে ঘটা
করিয়া সূৰ্য্য উঠিবেও না, অস্তও যাইবে না। নব গ্রহের সঞ্চার তাে
১২১
মনের গহনে আর সােজ জিনিস নয়। এক শনির কোপেই অত বড় শ্রীবংস রাজার কি লাঞ্ছনাই না হইয়াছে । আর এ তো একেবারে নয় নয়টা গ্রহ! এই পৃথিবীর জন্মকালের মধ্যে এমন প্রচণ্ড সমাবেশ একবার মাত্র হইয়াছিল। তার ফলে কুরুক্ষেত্র, পৃথিবীতে ক্ষত্রিয় বলিতে আর ছিল না। গাড়, মাজিতে মাজিতে গােটা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধটাই যেন চরণ মাষ্টারের চোখের সুমুখে ভাসিয়া উঠিল। ঈশান কোণের বটগাছটার গােড়ায় যেন অর্জনের রথ, আর ওই রঞ্জাবতীর মাঠে কুরুসৈন্য । মধ্যে চিকণদহের বিল। ७निक সারি সারি কাতর দিয়। শূল, মুঘল, পরশু, তোমর হাতে কুরুসৈন্য। দেখিলে মনে হয়, কে যেন দেওয়াল দিয়া রঞ্জাবতীকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছে। বাণে বাণে আকাশ অন্ধকার, দিবা দ্বিপ্রহরে ও সূর্য দেখ যার না, কি থাকিয়া রণশঙ্খ বাজিতেছে, অশ্বের হেয়, হস্তীর বৃংহতিতে, পীরগণের সিংহনাদে ও আস্ফালনে এবং কোটি কোটি মানুষের চাকরে পৃথিবীর আর সমস্ত শব্দ কোথায় ডুবিয়া গিয়াছে। রণগে এময় বিপুলাকার রণহস্তিগণ সঞ্চরণ করিয়া বেড়াইতেছে,-মনে হয় যেন ওদিকে আকুল করিয়া মেণ উঠিয়াছে। এই ভীমসেন ‘তিষ্ঠ তিষ্ঠ রবে ক্ষেমধূর্তির গজবাহিনীর উপর শার্প লের মত। লাফাইয়া পড়িলেন,—তাহার গদাঘাতে গঙ্গবাহিনী বায়ুতাড়িত মেঘের মতো চঞ্চল হইয়া উঠিল। ১২২
মনের গহনে
এই অশ্বথ মা গর্জন করিয়া পাণ্ড্যরাজের বাহিনী আক্রমণ করিলেন,
—তাহার নিশিত কঙ্কপত্রাঙ্কিত শর জালে আকাশ প্রান্তর
আলােকিত হইয়া উঠিল। মাত্র আঠারােটি দিন,অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী
মনুষ্য ধরাপৃষ্ঠ হইতে মুছিয়া গেল ।
এমনি ভয়ঙ্কর কুরুক্ষেত্র সমর !
গ্রহ-নক্ষত্রের তেমনি যােগা-
যােগ এতকাল পারে আবার হইয়াছে ।
চরণ মাষ্টারের মনে হইল, এতক্ষণ ধরিয়া ঘষিয়া মাজিয়া
গাড় টিকে দর্পণের মতো পরিষ্কার করার মতো নিরর্থক কাজ আর
কিছুই নাই।
কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্রের দোষও তে দেওয়া যায় না।
কলি যে চার পােয়া হইয়া উঠিয়াছে ।
মদন মিস্ত্রী একটা ভাঙা জানালা মেরামত করার মজুরী বাবদ
কয় আনা পয়সা লইয়া কী কথাটাই না শােনাইয়া গেল।
মিস্ত্রীর বাবা পাচ বৎসরের ব্রাহ্মণ-শিশু দেখিলে ও তাহার পায়ের
ধুলা লইত। আজ মদন কলিকাতার কোন কাঠের দোকানে ষাট
টাক। মাহিনায় চাকুরী করিয়া কিছু টাকা জমাইয়াছে। তাহার স্ত্রীর
গায়ে সােনার গহনা উঠিয়াছে। দু’ পাঁচ টাকা সুদে ও খাটাইতেছে।
দেমাকে আর মাটিতে পা পড়ে না। দেবু পরামাণিক ও জমিদারের
পাইককে লাঠি দেখাইয়া হাঁকাইয়া দেয় ! আবার কলি কাহাকে
বলে ?
মনের গহনে
চরণ মাষ্টার বুঝিলেন, গাড় মাজা মিথ্যা। চৈত্র মাসে জল
পড়িলেই ঘর ছাওয়াইবার সংকল্প করিয়াছিলেন। কয়েকজন
ছাত্রের কাছে কিছু খড়ের প্রতিশ্রুতিও পাইয়াছিন। কিছু খড়
তাহার নিজেরও আছে। চরণ মাষ্টার একটা নিঃশ্বাস ফে.িলেন।
যাক, আর
ছা ওয়াইবার দুর্ভোগ পোহাইতে
হইবে
সকালে ঠাহর কাছে কয়টি ছাত্র পড়িতে আসে। বৈঠকখানার
দাওয়ায় বসিয়া তাহারা এতক্ষণ হুটোপাটি করিতেছিল। মাষ্টারের
মূর্তি দৃষ্টিপথে পড়িই শশব্যস্ত প্রাণপণে ১২কার করিয়া পড়া
মুখস্থ
করিতে বসিল। পূর্বাভাস বশত মাষ্টার একবার তাহাদের
দিকে রোকসাতি লােচনে চাহিলেন, কিন্তু তখনই দৃষ্টি সংযত
করিয়া লইলেন।
—স্যার, মধু কষ্টান্টিনোপলকে বলছে কটিনােপল।
মাষ্টার সে কথ; শুন্নিাও শুনেন না। কাল ২১শে। এই
একটা দিন কষ্টান্টিনােপল্ হয় । উক। একুশের পর কষ্টান্টি-
নােপলে আর কলিকাতাতে কোন প্রভেদই থাকিবে না।
মাষ্টার সবিস্ময়ে ভাবিলেন, এত দিন ধরিয়া নিজে যে এত পাশের
পড়া মুখস্থ করিলেন, এবং এত ছেলেকে পড়া তৈরী না করার জন্য
এত নির্যাতন করিলেন, সে কিসের জন্য ? পরশু হইতে যুগ
যুগান্তরের
গুণার সংগৃহীত, বহুকালের তপস্যালব্ধ
চরণ
বহু জ্ঞান
১২৪
মনের গহনে
জ্ঞানের কি মূল্য থাকিবে ? সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানের কথা ভাবিয়া
ভাবিয়া মানুষ আপনার দেহপাত করিয়াছে। ভাবিয়াছে দেহ যায়
যাক, তাহাদের স্মৃতি মানুষের মনে অমর হইয়া থাকিবে। সেই
স্মৃতিরও এই পরিণতি !
ছেলেরা পড়িতেছিল, ১৭৫৬ সালে ক্লাইভ পলাশীর যুদ্ধে
সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেন। ৫৬ নয় ৫ ৭। অন্য সময়
হইলে মাষ্টার আস্ত একগাছ। বেত ছাত্রের পিঠে ভাঙিনে। কিন্তু
আজ আর কিছুই করিলেন না। ৫৬ই সই। কালকের পরে এই
পৃথিবী,—অর্থাং যাহাকে আমরা পৃথিবী বলি,—কতকগুলি নেবুলার
সমষ্টি অথবা অন্য কোনো কিছুর সমষ্টি হইবে,—এই পৃথিবী নামধারী
গ্রহ এক মুহর্তে মহাকালের শাসন অতিক্রম করিবে । তখন আর
১৭৫৭’র সঙ্গে ১৮৫৭'র কোনােই ব্যবধান থাকিবে না।
-ক্লাইভ, ক্লাইভ, ক্লাইভ...
ছেলের। ক্লাইভ নামটাকে মুখস্থ করিতেছে ! একজন লােক
পলাশীর যুদ্ধে লাভ করে। তাহার নাম ক্লাইভ না হইয়া রবার্টসন্
হইলেই বা কি আসে যায় ! কে বলিল ক্লাইভ যুদ্ধ-জয় করিয়াছে ?
কে বলতে পারে, যে অজ্ঞাতনামা লােকটার তােপে মীরমদন
আহত হয়, যুদ্ধের জয়ফল তাহারই প্রাপ্য নয় ? অথব। অপর
কোনাে নিম্নতম সৈনিকের একটা চালের ফলে যে যুদ্ধ জয় হয় নাই,
তাহাই বা কে বলিতে পারে ?
১২৫
মনের গহনে
মাষ্টার এক ধমক দিয়া বলিলেন,-কে বললে ক্লাইভ যুদ্ধ-জয়
করেছে ?
৫
তবে ?
-অন্য লােক। পরশু সকালে আসিস, তার নাম বলে দোব।
—স্যার, পরশু সকলে ?
—হ্যা, হঁা, যদি বেঁচে বর্তে থাকি।
একুশে তারিখে চরণ মাষ্টার আর স্কুলে গেলেন না। আর
স্কুলে যাওয়া ! একখান ছুটির দরখাস্ত করার ও প্রয়ােজন বোধ
করিলেন না ।
সকাল-সকাল স্নান সারিয়া একটু জপে বসিবার ইচ্ছা করিতে
ছিলেন। এমন সময় ডাক আসিল,-
-চরণ আছ না কি ?
এককড়ি ! দাবার পুটুলিটি হাতে ঝােলানাে।
চরণ মাষ্টার একটু হাসিলেন।
একটু হাসিলেন। একদিন জিতিয়া লােকটার
স্পর্ধা বাড়িয়া গিয়াছে। বলিলেন,
—চলো, আমি বাইরের ঘর খুলে দিচ্ছি।
বাহিরের ঘর খুলিয়া দিয়া চরণ তাহাকে
তাহাকে দায়গা পাতিয়া
বসাইলেন। দাবার বল গুলি সাজাইতে সাজাইতে বলিলেন,
-তােমাদের সঙ্গে দাবা খেলতে বসাই বিপদ, এককড়ি।
জিতলে নাম নেই, হারলে সর্বনাশ।
মনের গহনে
সুমুখের দুইটা বেড়ে টিপিয়া এককডি বলিল,
-আগে ভয়ে তােমার সঙ্গে দাবা ধরতাম না মাষ্টার,-ভাবতাম
তােমার কী-না-কী ।
তারপরে দেখলাম, ও ম! !
প্রত্যুত্তরে চরণ শুধু একটু হাসিলেন, এবং সামান্য দুই একটা
চালের পরই এক কড়ির কয়েকটা বল টুক টুক করিয়া মারিয়া আবার
একবার হাসিলেন। চরণ মাষ্টার ত্যই ভালো দাবা খেলেন।
এককড়ি তঁাহার কাছে নিতান্তই শিশু। তাহার রাজা চরণের
বল গুলির চাপে অসহায় অবস্থায় এঘর হইতে ঘরে লাফাইয়া
বেড়াইতেছে। কিন্তু অকস্মাৎ তাহার বলের চাপ মন্দীভূত হইয়া
পড়িল। মনে হইল, চরণ মাষ্টার কেমন অন্যমনস্ক হইয়া পড়িতে
ছেন। খড়ের চাল হয়তো কোথাও একটু মচ, মচ, করিতেছে,
কোনো কারণে দরজার কপাট হয়তো একটু নড়িতেছে, পাশের ঘরে
টিনে মুড়ি আছে, ইদুরে হয়তো সেখানে টুক করিয়া একটু শব্দ
করিতেছে,অমনি চর মাষ্টার চমকিয়া চারিদিকে চাহিতেছেন।
এমনি অবস্থায় তাহার মন্ত্রী বেঘােরে প্রাণ হারাইল। চরণ মাষ্টার
সচকিত হইয়। আবার ভালো করিয়া বসিলেন। কিন্তু বেশীক্ষণ
মনােযোগ দিবার সাধ্য কি ? আকাশে অল্প অল্প করিয়া বেশ মেঘ
সে মেঘ ক্রমেই ঘনীভূত হইতেছে। এইবার বৃষ্টি হইবে,
সঙ্গে সঙ্গে ঝড়, তার সঙ্গে
এককড়ি নৌকার একট। কিস্তি দিয়া হাকিল,
উঠিল।
১২৭
মনের গহনে
-মাং !
চরণ চমকিয়। চাহিয়া দেখিলেন, এককছির তি চারিটি বল
রাজার সুমুখে থাবা পাতিয়া বসিয়া আছে, নড়িবার উপায় নাই।
কিন্তু চরণ তাহাতে দুঃখিত হইলেন বলিয়া মনে হইল না। উঠিয়া
দাড়াইয়া বলিলেন,
—দুৰ্যোগট। বােধ করি বিকেলের দিকেই শাগবে এককড়ি।
কি বল ?
এককড়ি দবার গুটি গুলি থালির মধ্যে পুরিতে পুরিতে বলিল,
--হা, দুর্যোগ না আরও কিছু ! তোমার ন কাণ্ড।
চরণ চোখ কপালে তুলিয়া সবিস্ময়ে কহিলেন,
-বল কি হে! পণ্ডিতে গণনা করে বলেছে ।
-বলুক গে। পণ্ডিত বললেই তমনি ক্ষুতে বাড়ীর
ছেড়ে মাঠে পালাবে নাকি ?
চরণ কথা বলিলেন না, কিন্তু তাহার মুখ দেখি। বােঝা গেল,
এক কড়ির নাস্তিকতায় তিনি বিরক্ত হইয়াছেন।
দুপুরে মাষ্টার আর দিবানিদ্রার জন্য উপরে গেলেন না।
একখানি কঙ্গল বিছাইয়া বৈঠকখানার দাওয়াতেই শয়ন করিলেন।
বাড়ীতে মেয়েরা এইজন্য তাহাকে কত ঠাট্ট। করিতে লাগিল, কিন্তু
তিনি সে সব গায়ে মাখিলেন না। এটি নডিলেই তিনি লাফাইয়া
রাস্তায় নামিবেন।
১২
মনের গহনে
এদিকে কয়দিন হইতে তাহার কি যে হইয়াছে, চোখ
করিলেই মনে হয় পৃথিবী টলিতেছে, দেওয়াল নড়িতেছে, চারিদিকের
সমস্ত কিছু ঘুরিতেছে। চরণ মাষ্টারের চাখ ঘুমে ঢুলিয়া আসিতেছে,
অথচ নিদ্রার উপায় নাই। হঠাৎ নজরে পড়িল, ওপাড়ার একটি
ছেলে তাহাকে দেখিয়াই পাশ কাটাইবার চেষ্টা করিতেছে। মাষ্টার
তাহাকে ডাকিলেন,
-এই, শােন্ ।
ছেলেটি কাপিতে-কাপিতে সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।
স্কুল কামাই করি। পাখীর ছানা পাড়িবার জন্য এদিকে আসিতেছিল।
চরণ মাষ্টার যে স্কুলে না গিয়! এইখানে বসিয়া আছেন, তাহা সে ভাবে
নাই।
—কোথা যাচ্ছিস?
-আ•ে • •
মাষ্টার বুঝিলেন, ছেলেটি বিনা কাজেই ঘুরিতেছে ।
বলিলেন,
-এইখানে বােস্। আমি একটু ঘুমুবো। ভূমিকম্প আরম্ভ
হলেই ডেকে দিস্। বুঝলি ?
কিন্তু তথাপি ঘুম হয় না। তাহার দেহের যন্ত্রপাতি যেন
বিকল হইয়া গিয়াছে। লােকে কথা কহিলে শুনিতে পান না, কিন্তু
কপাটের শিকল ইক্ করিলে ঘুম হইতে লাফাইয়া ওঠেন। ছেলেটি
১২৯
মনের গহনে যে মাষ্টারের কাছে প্রহার খাইল না, ইহাতেই কাৰ্থ হইয়া গেল। সে পাশেই একটা খুটিতে ঠেস দিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। প্রলয়ের কথাটা গ্রামে রাষ্ট হইয়া গিয়াছিল । ভয় সকলেরই হইয়াছে, কিন্তু চরণ মাষ্টারের মতাে এমন কেহ সৰ্ব্বকৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া হাল ছাড়িয়া দেয় নাই। ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে চরণ মাষ্টারের ভয়ের কথাটাও চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল । মেয়েরা পর্যন্ত তাহার অবস্থা উকি-ঝুকি দিয়া দেখিয়া দেখিয়া যায়। দেখিবে আর কি ? বাতাহত কদলীবৃক্ষের ন্যায় একখানা দেহ আপাদ মস্তক বস্ত্রাবৃত অবস্থায় পডিয়া আছে। চরণ মাষ্টার মনে মনে ভগবানের নাম করিতেছিলেন। প্রলয় সম্বন্ধে তাহার কোনো সন্দেহ নাই। ভাবনা হইয়াছে তাহার পরের অবস্থার কথা স্মরণ করিয়া । ভগবানে তাহার কোনাে কালে বিশ্বাস ছিল না। আত্ম, পরলােক, পুনন্ম এ সবও নিতেন না। এখন মনে হইল, আছে বই কি, সবই আছে। আর কয়েক ঘণ্টা। পরে এই পৃথিবীর কোন চিহ্নই থাকবে না, তাহার দেহেরও না। কিন্তু আত্মাই হউক, আর যাহাই হউক, সত্যকার সে তিনি, তাহার জন্ম তারপরেও তো একটা অশ্র চাই। প্রাণপণে ভগবানকে তখনকার একটা অবস্থা করিবার জন্য ১রণ মাষ্টার সকাতরে ডাকিতে লাগিলেন, এবং কখন একটুখানি তাভিভূত হইয়া পড়িলেন। এককড়ি পান চিবাইতে চিবাইতে দাবায় পুটুলিটি হাতে মনের গহনে করিয়া এইদিকে আসিতেছিল। আশে পাশে কৌতূহলী জন দেখিয়া থমকিয়া দাড়াইল। চরণ মাষ্টারের অবস্থা দেখিয়া পাড়ার মেয়েরা মুখে কাপড় দিয়া হাসিতেছিল, ছেলেরাও সহাস্যে নিজেদের মধ্যে ফিস্ ফিস্ করিতেছিল। এই সব দেখিয়া শুনিয়া এক কড়ির পরিহাস-প্রবৃত্তি উদ্যত হইয়া উঠিল সে একটা মস্তবড় ইট দুম্ করিয়া দরজা লক্ষ্য করিয়া ছুড়িয়া মারিল। দরজার কাঠে লাগিয়া ভীষণ শব্দ হইল, শিকল ঝন্ ঝন্ করিয়া উঠিল, আর চরণ মাষ্টার ‘বাপ’ বলিয়া শব্দ করিয়া জ্যা-মুক্ত ধনুর ন্যায় ছিটকাইয়া রাস্তায় পড়িলেন, আর উঠিলেন না। সে রাত্রে কী দুৰ্যোগই না গেল ! বাহিরে ঝম ঝম্ করিয়া সমস্ত রাত বৃষ্টির আর বিরাম নাই। চরণকে ধরাধরি করিয়া সকলে বাহিরের ঘরে আনিয়া শােয়াইয়াছে। রাত্রি বারােটার সময় তিনি চোখ মেলিয়া চাহিলেন। চাহিলেন বটে, কিন্তু সে দৃষ্টি সদ্য প্রসূত শিশুর মতাে ঘােলাটে। ডাকিলেও সাড়া নাই। তাহার মনে হইতেছিল, যা কিছু তিনি দেখিতেছেন সবই মিথ্যা, শাস্ত্রে যাহাকে বলে মায়।। এ সব পূর্ব জন্মের স্মৃতি ! সদু পিসি চেচাইয়া আর উপস্থিত সকলকে ফরমাদ করিয়া ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিতেছেন, তাহার স্ত্রী কোলের ছেলেটিকে কাপড় ঢাকা দিয়া স্তন্য দিতেছেন আর অঝোরে কাঁদিতেছেন, কয়েকটা ছেলে শিয়রের কাছে বসিয়া মাথায় জল দিতেছে আর হু হু শব্দে পাখা করিতেছে, ঘরে ও বাহিরে
মনের গহনে
বহু লােক কলরব করিতেছে—চরণ মাষ্টারের মনে হইল, এ সবই
মায়া, চোখের ভুল। সত্য শুধু বাহিরের ঝম্ ঝম্ বৃষ্টির শব্দ।
তাে বৃষ্টির শব্দ নয়, মহাপ্রলয়ের কল্লোল গীত। তিনি আবার চোখ
বন্ধ করিলেন।
অবশেষে ভােরের দিকে তঁাহার জ্ঞান সঞ্চার হইল। তিনি
উচু হইয়া বালিশে ঠেস দিয়া বসিলেন। পাড়ার লােকেরা কেহ বা
সহানুভূতি জানাইতে লাগিল, কেহ বা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করিতে লাগিল ;
স্বামীকে উঠিতে দেখিয়। গৃহিণী নিশ্চিন্ত মনে গৃহ কর্মের জন্য রান্না
ঘরে গেলেন।
এ কি !
রান্নাঘরের দরজা খােলা কেন ? গৃহিণী চীৎকার
করিয়া উঠিলেন,—সর্বনাশ হয়েছে গাে !
চরণ মাষ্টার লাফাইয়া উঠিলেন,--আবার কি।
লােকজন ছুটিয়া ভিতরে আসিল।
সর্বনাশই বটে! বাসন বলিতে একখানি নাই।
ভাতগুলি ঢালিয়া রাখিয়া পিতলের ভাতের হাড়িটি পর্যন্ত কে
লইয়া গিয়াছে।
মহাপ্রলয়ের পরে চরণ মাষ্টার রান্নাঘরের দাওয়ার উপর মাথায়
হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন।
এমন কি
০৭২১২
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.