Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Nolini-basonta

2009/10/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নলিনী-বসন্ত নাটক। মহাকবি সেক্সপিয়র কৃত টেম্পেষ্ট নামক নাটক অবলম্বনে বিরচিত। “Sweetest Shakespeare Fancy's chil Warbling his native wood-notes wild “ভারতের কালিদাস, জগতের তমি।” কলিকাতা ২৯৩ নং নন্দকুমার চৌধুরীর লেন হইতে আৰ্য-সাহিত্য-সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত। (সংশােধিত, সংস্করণ।

No text on this page.

চিত্ৰধ্বজ কৃপ বৈজয় স্ত স্ত্রীপুৰুষদিগের নাম। গুজরাটের রাজা। তস্য ভ্রাতা। কঙ্কনের রাজা। তস্য ভ্রাতা এবং কঙ্কনরাজ্যপহারক। গুজরাটের যুবরাজ। গুজরাটরাজের বৃদ্ধমন্ত্রী। অনন্ত বসন্ত প্রচেতা গুজরাটভূপতির দুইজন সভাসদ। বিজয় ৱৰ্বটউদয়••• গুজরাটের রাজভাণ্ডারী। তিলক গুজরাট ভূপতির জনেক ভৃত্য। নলিনী বৈজয়ন্তের কন্যা। সুমালী প্রধান পরি। শচী, লক্ষী-চপলা ইত্যাদি, ছদ্মবেশধারী অন্যান্য পরিগণ। • • • ০০০ প্রস্তাবনা। নট। বৈজয়ন্ত নামে রাজা কঙ্কনভূপতি নিরবধি যাদুবিদ্যা করি আলােচনা, হারাইল রাজ্যদেশ, ভ্রাতার কপটে ; ভাসিয়া সাগর নীরে, অরণ্য পুলিনে, বালিকা কন্যার সহ দ্বাদশ বৎসর, করিল অজ্ঞাতু বাস, পড়িয়া বিপাকে, পরে কুহকের শক্তি প্রকাশি অসীম বিপক্ষ দমন করি ফিরিল স্বদেশে। এ আখ্যান চমৎকার শুন মন দিয়া শুনিলে কৌতুক হবে চিত্ত বিনােদিয়া । [ প্রস্থান ।

নলিনী বসন্ত। প্রথম অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। সমুদ্রে ঝড় বৃষ্টি, সেই ঝড়ে একখানি জাহাজ ভগ্ন ও মগ্ন হইতেছে ( দ্বীপের উপরিভাগে সমুদ্রের কিনারায় বৈজয়ন্ত এবং নলিনীর প্রবেশ) F নলি। দেখ পি, চেয়ে দেথ-অশান্ত সাগরে, তরঙ্গ ছুটেছে কত ভয়ঙ্কর বেগে ভৈরব নিনাদ করি ; -শূন্য অন্ধকার, দেখ গাে মেঘের ঘটা অবনী নাশিতে, জলদ উগারে যেন জ্বলন্ত অঙ্গার। ক্রোধেতে অধীর যেন গভীর জলধি উথলি উঠিছে তাই পাতাল ত্যজিয়া, নিবাইতে মেঘানল তরঙ্গ আঘাতে। পিতা গাে, নিবার মায়া-মায়া মন্ত্রে যদি তুলে থাক এ ঝটিকা, কর শান্ত তবে কর শান্ত, কর দেব-অশান্ত সাগরে। আহা! সে তরণীখানি কিবা মনােহৱ ?

নলিনী-বসন্ত। তার গর্ভে মনােহর কতই পরাণী অবশ্য ছিল গাে পিতা ;—সুকলি সংহার হলাে কি সাগর গর্ভে পলক ভিতরে । মরি মরি অভাগারা কতই চীৎকার করিল গাে মৃত্যুকালে-বিদারিস হিয়া ! হায় ! তারা মরিল কি সাগরের জলে ? হায় রে ! আমার যুদি দেবতার বল থাকিত, তা হলে আমি গঙুষে শুষিয়া, জলধিজঠরে তারা পশিবার আগে, শুখাতাম জলধিরে—অধবা পাতালে পাঠাইয়া বাঁধিতাম দুরন্ত সাগরে। বৈজ। স্থির হ মা–স্থির হ ;-অনিষ্ট ঘটে নি। নলি। কি দুর্দিন!-হায় ! কেন বাছা, হতেছিল এতই উতলা ? ঘটে নাই অমঙ্গল অনিষ্ট কাহার ;- প্রণাধিকা দুহিতা রে তােরই জন্যে সব।-- হা সরলে ! জান না মা-কে আমি, কে তুমি, এখছি কোথায় হােত ;-ভাবি গাে সুধু, আমি ক্ষুদ্ৰ বৈজয়ন্ত তােমার জনক, এই ক্ষুদ্র গিরি গুহা, কুটীর নিবাসী। নলি অন্য কিছু জানিতেও, পিতা গো, কখন হয় নাই অভিলাষ । বৈজ এবে তােরে আরো কিছু হবে গো জানাতে ; খুলে রাখি আগে এই মায়া-পরিচ্ছদ ;- ( নে ত মা, খুলে দেতৎ ) (পরিচ্ছদ রাখিয়া ) “থাক অই খানে থারে কুহকী তুই। -মুছাও নয়ন মা তােমার, হও শান্ত, কর চিন্তা দূর **;- নলিনী-বসন্ত। বৈজ । v: ব্যাকুল হয়েছে চিত্ত যে দুর্যোগ দেখে, সংযােগ করেছি তার হেন সুকৌশলে, হয় নাই কারু দেহে লােমান্ত নিপাত । জলমগ্ন তরিমাঝে যাদের চীৎকার শুনিয়া, অন্তরে তাের লাগিল আঘাত, প্রাণে বেঁচে, প্রাণাধিকে আছে গাে সকলে। বসাে মা কিঞ্চিৎ এবে শুনাব তােমায়। নলি। কতবার, পিতা তুমি, বলিবে বলিলে ; বলিতে আরম্ভ করি বলিলে না আর , বারম্বার অনুনয় করিলাম কত, সময় হয় নি বলে নিরস্ত হইলে । সে সময়, ওরে বাছা, হয়েছে এখন ; এখনি শুনাব তােরে শ্রবণ ভরিয়া হা নলিন্, হা গা তাের পড়ে কি গা মনে এ গুহাতে আসিবার বিবরণ কিছু ? কোন কথা আগেকার আছে কি স্মরণ ? বুঝি তা মনে নাই—তখন শৈশব ছিলি তুই তিনবর্ষ পূর্ণ হয় নাই। নলি। হঁ্যা পিতা, পড়ে মনে। বৈজ। বল মা, প্রকাশি বল, কি আছে স্মরণ কিবা অবয়ব তার—গৃহ কি মানব ? নলি। অনেক দিনের, পিতা, কথা সে সকল, দেখি যেন স্বপ্নবৎ আঁধার আঁধার, দীপ্তাকার নহে তত ;-বােধ হয় যেন দাসী ছিল চারি পাঁচ সেবিত আমায় ;- ছিল না কি ? হ্যা গা ?... বৈজ। ছিল গো মা, ছিল তাের অনেক কিঙ্করী ; চারি পাঁচ নয় সুধু; কিন্তু বল দেখি নলিনী-বসন্ত। এসব রয়েছে চিতে অঙ্কিত কিরূপে? নিবিড় তিমিরময় কালের জঠরে আরাে দেখিছ বলে।-হেথা আসিবার আগেকার কথা যদি হতেছে স্মরণ, স্মরণ থাকিবে তবে কিরূপে এখানে আসিলে বা কত দিন? নলি । সে কথাটি মনে নাই। বৈজ। নলিনী রে হলাে আজ দ্বাদশ বৎসর, নরপতিকুলে তাের জনক সুমতি ছিল সুবিখ্যাত রাজা কঙ্কন প্রদেশে। নলি। হঁ্যা গা—তুমি না আমার পিতা। বৈজ। তােমার জননী, বাছা, পতিব্রতা সতী ; তিনি কহিতেন তুমি তুহিতা আমার ; তব পিতা কঙ্কনের সিংহাসন পতি, বংশের প্রদীপ তুমি একমাত্র তার ;- তুমি বাছা রাজার নন্দিনী। নলি। হা বিধাতঃহা বিধাতঃ! কুচক্রে কি তবে স্বদেশ হারায়ে মোরা এসেছি এখানে ; অথবা সে আমাদেরই সৌভাগ্যের গুণে। বৈজ। দুই বটে—অরে বাছা, বমিলি যা তাই ;- কুচক্রে স্বদেশ হারা—ভাসিয়া সাগরে, অনুকুল ভাগ্যবলে এসেছি এখানে। নলি। হায় ! পিতা–মনে নাই-না জেনে সন্তাপ দিয়ছি তােমায় কত ; -ভাবিতে সে কথা, ও গো, হৃদয় বিদরে।-পিতা, তার পর ? বৈজ।. তাের খুল্লতাত, সুতে, মাের সহােদর অনন্ত তাহার নাম-হা রে নরাধম ! ভাই হয়ে, শােন্ গাে শশা, ভাই হয়ে কত C নলিনী-বসন্ত। ৯ বিশ্বাসঘাতক হলে ;-এ জগতে যারে প্রিয়তম ভাবিলাম তুমি ছাড়া, সুতে! তারি হাতে সঁপিলাম রাজত্বের ভার ; সুবিখ্যাত যে রাজত্ব জনপদ মাঝে, বৈজয়ন্ত নৱপাল শাস্ত্রে অদ্বিতীয়, গৌরবে সমে যথা ভূপতি সমাজে। নিরবধি বিরলেতে বিদ্যার চালনে, থাকিতাম ভ্রাতৃ করে রাজ্যভারু দিয়া; অবশেষে বিষধর বিশ্বাসঘাতক- তাের সেই খুল্লতাত—শুচ কি ? নলি। শুচি গো। বৈজ। সুনিপুণ ক্রমে হলে শাসন'কৌশলে ;-- কারে অনুগ্রহ করে নিগ্রহ করিতে, কার পদোন্নতি আর কার অধােগতি, কি ভাবে করিতে হয় সকলি শিথিল ; তখন কুটিল ভাব ধরিল দুৰ্ম্মতি; ছিল যারা অনুগত ভুলায়ে তাদের হস্তগত করিল সে গড়ে পিটে নিয়ে, অমাত্য আত্মীয়গণে কুমন্ত্রণা দিয়ে । আপনার হাতে পেয়ে রাজার ভাণ্ডার, দান বিতরণ করে রাজা প্রসাদ, স্বইচ্ছায় সকলের চিত্ত নােয়াইল ভক্ত হলো রাজ্যসুদ্ধ উপাসক তার। আশ্রিত থাকিয়া লতা তদেহে যথা আচ্ছন্ন করিয়া শেষে খায় সে তরু, সেইরূপে রাজদেহ কিয়া আমার, হবিল দেহের তেজ-কৰ্বিল নীরস, ;

নলিনী-বসন্ত। ; নলি। শুচি পিতা। বৈজ। শােন্ গাে, অন্য মনে শােন্ গাে এ কথা; জ্ঞানতরু চিত্তক্ষেত্রে রােপণ করিতে, বিদ্যারূপ কিরণেতে হৃদয় মণ্ডিতে, থাকিতাম এইরূপে নির্জনে একাকী ; যশঃপ্রভা সে বিদ্যার কত দেশান্তরে উজ্জ্বল হতো গাে আজ নির্জনে না হলাে। সেই অবসর পেয়ে দুৰ্ম্মতি চণ্ডাল অনন্তের হৃদয়েতে খলতা জন্মিল ; তার প্রতি বিশ্বাসের ইয়ত্তা ছিল না, কারো এবে না রহিল খলতার সীমা ভাণ্ডারেতে ছিল যত সঞ্চিত বিভব, লুটিয়া দৌরাত্ম করি উপার্জিল যত, মুক্ত হস্তে, অকাতরে ছড়াতে লাগিল। হয়ে রাজপ্রতিনিধি, পেয়ে রাজপূজা, ভ্রমে আপনারে ভুলে ভাবিতে লাগিল কঙ্কন-ভূপতি যেন সত্যই হয়েছে। ও যুথা আপনার ছলে ভুলিয়া আপনি / অসত্যকে সত্যভাবে মিথুক যে জন ;- বাহাকারে ছিল রাজা-রাজপ্রতিনিধি, রাজবেশে আড়ম্বরে করিত ভ্রমণ, আশা বৃদ্ধি হলাে তাই আকাশ ধরিতে। — শুচ না। নলি । যে জন বধির সেও শােনে গগ এ কথা । বৈজ। অবশেষে আমারে সে ভাবিল অসার, (হায় রে অভাগা আমি) মম গ্রন্থাগার ভাবি আমার পক্ষে রাজত্ব বিপুল। রাজত্ব শাসনে আমি নিতান্ত অপটু, নলিনী-বসন্ত । ;- দৃথা তবে ছদ্মবেশে কি কারণে থাকা, ভাবি, কপটতা দূর করিল দুৰ্ম্মতি, হরিল সে সিংহাসন দুরাত্মা অধম । করিল গুজরাট সনে সন্ধির বন্ধন হােতে তার পদানত—দিতে উপহার অঙ্গীকার করিল সে অনভিজ্ঞ চোর তার কিরীটের তলে কিরীট নােয়াতে, লুটাতে কঙ্কন রাজ্য—-(হা পােড়া কঙ্কন, ভাগ্যে যাহা ঘটে নাই কখন রে তাের ) লুটায়ে ফেলিতে তােরে শত্রু-পদতলে। নলি। হা অদৃষ্ট! বৈজ। এই সন্ধি ;-পরে এই সন্ধি অনুসারে, ঘটাইল যে ঘটনা, শুনে বল বাছা, নরাধম সে চণ্ডাল ভাই কি আমার ? নলি। পিতামহী গুরুজন, কু ভাবিতে নাই , কিন্তু পিতা, কুলাঙ্গার কুপুত্র কথন জনমে সােণার গর্ভে ? শুন সুতে তার পর। হেন সন্ধি পেচ্ছ, চিরশত্রু আমার সে গুজরাট-ভূপতি তখনি সম্মতি দিল ;--সন্ধির নিয়ম- রাজপূজা, রাজকর (মনে নাই কত গুটপতিকে দিবে মম সােদর, তার বিনিময়ে সেই গুজরাটভূপতি, নিৰ্বাসিত করে দিয়ে তোমায় আমায়, আমার ভ্রাতার হস্তে করিবে অর্পণ, সম্পদ, ঐশ্বৰ্য্য সহ কঙ্কন প্রদেশ । অতঃপর এক দিন গুজরাটের সেনা, নিবিড় তিমিরাচ্ছন্ন গভীর নিশীথে, বৈজ।

১২ নলিনী-বসন্ত। । বৈজ। বেড়িল নগর সীমা;—খুলিল আপনি স্বহস্তে নগর ঘর অনন্ত পামর । সেই অন্ধকার রাত্রি তােমায় আমায়, নিয়ােজিত ছিল যারা সে কাৰ্য্য সাধিতে, ধরিয়া নিমেষ মধ্যে নিঃউদ্দেশ হলাে। কত কান্না, তুমি বাছা, কঁদিলে তখন। লি। হা অদৃষ্ট মনে নাই—পিতা গাে আমার কাদিতে বাসনা হয় বারেক আবার ; হায় হায় কে না কাদে—হায় এ কথায় ! আরাে কিছু শুন তবে বুঝিতে পারিবে উপস্থিত এ ঘটনা, নতুবা নিস্ফল কহিলাম যত কিছু। নলি। সেই দণ্ডে, হঁ্যা গা, পিতা, প্রাণে না বধিয়ে কেন তারা ক্ষান্ত হলাে ? অরে বাছা, তত দূর সাহস ধরিতে পারে নাই পাষণ্ডেরা ,কঙ্কনে আমায় এত ভাল বাসিত গাে প্রজারা সকলে। অথবা সে অভিসন্ধি ছিল না তাদের কিম্বা লােক-অপবাদ এড়াবার তরে গােপনে সাধিতে কার্য্য মনস্থ করিল, {সংক্ষেপেতে বলি শুন) -সে দুরাত্মাগণ আসিয়ে সাগরতটে, ভাসাইয়ে ডিঙি, ক্রোশেক দুক্রোশ পথ বাহিয়ে চলিল ; পরে এক তরিকাষ্ট অতি জীর্ণকায়া জীবন শঙ্কায় যাহা মূষিকও ত্যজেছে, হে ফেলি চণ্ডালেরা স্বদেশে ফিরিল। চতুর্দিকে হুহুঙ্কারে তরঙ্গ ছুটিল গ্রাসিতে সে ভগ্নতরি ;-ভয়েতে অ্যান্ধুি, ;

নলিনী-বসন্ত । ; বারিধির পানে চেয়ে দিলাম কত। পবনদেবের কাছে কতই মিনতি করিলাম গলবস্ত্রে ;-আমার দুঃখেতে কঁদিতে লাগিলবায়ু নিশ্বাস ছাড়ি। হায়রে অদৃষ্টগুণে সে মেহ আমার অনিষ্টের হেতু হলাে। মলি। তখন কি গলগ্রহ হয়েছি, পিতা। বৈজ। মা তুমি তখন- দেবকন্যা তুল্য হয়ে বাঁচালে আমাষ্য । আমার চক্ষের জল সাগরের জলে পড়িতে লাগিল যত—ঘন ঘন ফোটা, তুমি, বাছা, দেবদত্ত সাহসে নির্ভয়, হাসিয়ে মধুর হাসি, শিখালে আমায় সাহসী হইয়া চিত্তে ধৈরজ ধরিতে। ললি। হঁ্যা গা পিতা, "কি উপায়ে এখানে উঠি ? বৈজ। অরে বাছা, জগত ঈশ্বর যিনি তাহারই কৃপায় ;- সঙ্গে ছিল খাদ্য দ্রব্য মিষ্ট জল কিছু দয়াভেবে ভরি’ মধ্যে সঙ্গে দিয়াছিল গুজরাটের রাজমন্ত্রী, প্রচেতা দয়ালু, আমাদিগে দেশান্তর করিকার ভার আছিল যাহার প্রতি ;-পরিণাম ভেবে পপ্রিধেয় বস্ত্র কিছু সঙ্গে দিয়াছিলা, এতদিন তাহাতেই হয়েছে সুর; রাঁজ হইতে আমি গ্রন্থ ভালবাসি গ্রন্থাগার হতে চাই আছি কতিপয় । পুধি সঙ্গে দিয়াছিল। নলি। কখনাে গুহার সঙ্গে দেখা যদি হয় । .

নলিনী-বসন্ত। ܕܝ বৈজ। (সুমাঙ্গীর প্রতি) হয়েছে বিলম্ব নাই, নুষ্পিনীর প্রতি) রসাে গাে মা তুমি ; শোন এর পরিণাম ; আম্বি এই স্থান্তে গ্রহণ, করিমু তাের: শিক্ষকের ভার; রাজার নন্দিনীগণ পায় না অনেকে। পেয়েছ যে উপ্লকার শিক্ষায় আমার হেন গুৰু ঘটে নাক ভাগ্যেতে তাদের, বৃথামােদে করে তারা বৃথা কালক্ষ। নলি। মঙ্গল করুন, পিতা, ঈশ্বর তােমার ; এবে দেৰ কহু শুনি কি হেতু এ ঝড় উঠাইয়ে ঘটাইলে এ হেন দুৰ্যোগ ; সে কথা জাগিছে চিত্তে এখনও আমার । বুৈজ। থাক আজ এই অবধি ;-এবে শুভগ্রহ হয়েছে আমার, বাছু,-পুড়েছে খর্পরে দুরন্ত বিপক্ষগণ, এসেছে এ দেশে; এ শুভূগ্রহের ফল এখন যদ্যপি নাভি, তা হলে আর এ জন্মে পাব না ; আর সুধাইও না, বাছা, হস্বেছু নিদ্রালু, নিদ্রা যাও ক্ষণকাল,নিদ্রার বিশ্রাম মহৌষধ জীবনের। নলিনী নিদ্রিত। সাধ্য কি এড়াতে, স্যাগেই তা জানি আমি। সুমালি--সুমালি ! আয় বাপ, কাছে আয়-নিশ্চিন্ত হয়েছি। সুমাঞ্জীর প্ররেশ।) সুমা। জয়, প্রভুজেমনাথ-জয় দেব, জয় ; আকাশে উড়িতে কিবা পাতলে ডুবিতে, ভূলে পশিতে কিবা মেঘেতে চুড়িতে নলিনী-বসন্ত। , f কুণ্ডলী বাধিয়া যবে ওঠে সে আকাশে, কি আজ্ঞা করুন, প্রভু। বৈজ। সুমালি--প্রণালীমত বলেহি যথা অনুষ্ঠান করেছ ? সুমা। প্রভু, তার বর্ণ বিন্দু অন্যথা করিনে - উঠিলাম রাঙ্গর্পোত্তে এলিতে অলিতে । কখন গলুইমুখে কখন শিহাতে, কখম চাতালে আর কখন বা খােলে, কখন বা মানুলের উগাষ ভগায়, এই অলি এক ঠাইএই অন্ত ঠাই, এই আছি এই নাই, আবার যিশাই হঠাৎ একত্র হয়ে অবাক সবাই, চাহিয়া রহিল যেন ভেল্কী ভেকা হয়ে। ভীমনা ভয়ঙ্কর বজ্রের আগেতে ছোটে যে বিদ্যুৎ-লতা সেও দ্রুতগতি নহে তত ক্ষণস্থায়ী, চকিত চপলা ;- গন্ধপােড়াম গন্ধ, খুমাে পােড়া পাফায় ধুময়াশি, দুর্গন্ধ বাতাস কড়ি ফাটা, কঁাড়ি ফাটা, শব্দ ভয়ঙ্কর, হলকে হলকে বহি জলধি বেষ্টিল অভয় সমুদ্র ঢেউ অস্থির ভয়েতে, পাতালে বরুণ হস্তে ত্রিশূল কপিল। বৈজ। সাবাস, মালি-সাবাস এ বিপদে স্থিতবুদ্ধি স্থিরচিত্ত হয়ে, ধৈৰ্য্য ধরে অর মধ্যে ছিল কি রে কেহ ? সুমা। কেউই না ; ভয়াকুল হতবুদ্ধি উন্মাদের প্রায়, হতাশ হইয়া ত্যজি অগ্রিময় পােত, ।

নলিনী বসন্ত। দাড়ি মাঝি ভিন্ন সবে সমুদ্রে পড়িল, সাগরের ফেনামাখা তরঙ্গের মাঝে। ভয় কদম্বের ফুল মস্তকের চুল বসন্ত, রাজার পুত্র রােমাঞ্চ শরীর,- “প্রতরাজ্য শূন্য আজ, প্রেতবৃন্দ যত সমাগত এই স্থানে বলি উচ্চস্বরে পড়িল সাগরগর্ভে সকলের আগে। ৰৈজ। বা আমার-বে! কিন্তু বাপ্ এ দুর্যোগ কিনারার কাছে করেই ত সঘটনা ? সুম। প্রভূ, অতি কাছে। বৈজ। ওরে, পরি, তারা সকে নির্বিঘ্নে ত আছে ? সুমা। প্রভু গো, কাহারই মস্তকের চুটি খসে নি, বস্ত্র পরিচ্ছদে কারো দাগটি লাগে নি, বরং অধিক আরাে উজ্জ্বল হয়েছে; দলে দলে সকলেরে ফেলেছি ছয়ে এ দ্বীপের চতুর্দিকে--যথা আজ্ঞা তব ; • আপনি তুলিয়া আনি গুজরাট তনয়ে শীতল ছায়াতে একা বসায়ে এসেছি ; বসিয়া জলের ধারে শীতল বাতাসে, বাঁধি বুকে এইরুপে দুই বাহুলতা, ফেলিতেছে ঘন ঘন সুদীর্ঘ নিশ্বাস। বৈজ। রাজপপান্তু, দাড়ি মাঝি, অন্য অন্য আর * বহরের যত পােত কোথায় রেখেছ ? সুমা। এ দ্বীপের প্রান্তভাগে রাজার জাহাজ লুকায়ে ঋয়েছি সেই গভীর মুতিতে, এক দিন; প্রভু যথা, জকিরে আমায়, .

নলিনী-বসন্ত। কহিলা আনিতে বারি বক্ষঃহ্রদ হতে যে হ্রদের তীব্ৰবারি তপ্ত অতিশয় চক্রাকারে ঘুরিতেছে যুগযুগান্তর ; অন্য অন্য যত পােত অতি ক্ষুন্নভাবে চলেছে গুজরাট মুখে একত্রে জুটিয়া,- ভারত সমুদ্রে ভাসি ধীরে। বৈজ। সকলি প্ৰণালীমত করেছ, সুমালি। কিন্তু বা কিছু বাকি আছে--বেলা কত ? সুমা। দুই প্রহর অতীত হয়েছে। বৈজ। চারদণ্ড বেশী হউক,এর বেশী নয় ; সন্ধ্যার প্রাক্কালে কিন্তু সাঙ্গ করা চাই, অবশিষ্ট এখনাে যা আছে। সুমা। আঃ-আবার খাটুনি ? কষ্ট দিচ্চ এত; কিন্তু মনে যেন থাকে করেছ কি অঙ্গীকার।--- বৈজ। কি ?-ফের অবাধ্য ?-কি চাস ? সুমা। দাসত্ব মােচন। বৈজ। এখনি কি ? নিয়মিত কালপূর্ণ হয় নি এখন, এরি মধ্যে ?-চুপ। সুমা। প্রভু! আমি কত কাজ করেছি তােমার । প্রতারণা করি নাই মিথ্যা কথা বলে ; যথাসাধ্য প্রাণপণে দিবা রাত্রি খাটি, কথার অবাধ্য নহি তিলার্ধ কথন। তােমারি গাে শ্রীমুখের এই আজ্ঞা ছিল, নিয়মিত সময়ের একবর্ষ আছে আমারে নিতি দিবে। বৈজ। উদ্ধার করেছি তােরে কি যন্ত্রণা হক্সে নলিনী-বসন্ত। সে সব ভুলিলি বুঝি ? সুমা। ভুলি নাই, প্রভু। বৈজ। নিঃসন্দেহ ভুলেছি;-এখন তােমার সাগরের ফেণামাখা তরঙ্গে ছুটিতে, বায়ুর পশ্চাতে শূন্যে গগনে উড়িতে, হিমাচ্ছন্ন পৃথিবীতে ভ্রমণ করিতে, আমি আজ্ঞা করি তাই বড় কষ্ট হয়। সুমা। না, প্রভু। বৈজ। পাপাত্মা--অসত্যবাদি!-মিথ্যা কথা তাের। এখন সে ৰিজটাকে ভুলে গেলি বুঝি ? পাপিষ্ঠা ডাকিনী সেটা, দেখুলে ঘৃণা হতাে, অতি বৃদ্ধা-পরহিংসা, পরদ্বেষ করে, হয়েছিল শীর্ণদেহ অস্থিচৰ্ম্মসার ; চতে গেলে মাজাভাঙ্গা ধনুকের মত মাটিতে আসিয়ে তার কপাল ঠেকিত ; দন্তহীন যষ্টি হাতে দৃষ্টি মিটি মিটি, বিষম ডাকিনী সেটা-তারে ভুলে গেলি? সুমা। না, প্রভু, ভুলি নাই। বৈজ। ভুলিস্ নে ?-বল শুনি, বল কোথা তবে জন্মেছিল সে ডাকিনী। সুমা। উদয়পুরেতে। বৈজ। বটে ?--হা পাষণ্ড!-মাসে মাসে তােকে চেতাইতে হবে দেখি-সব ভুলে গেলি ;- থাকিত উদয়পুরে বিকটা ব্রিজটা, জানিত সে ছিটেফোঁটা, মন্ত্রতন্ত্র কত, সমুদ্রে জোয়ার ভাটা চন্দ্র সূৰ্যোদয় করাইতে পারিত সে-সাধ্য ছিল এত ; অত্যাচার অপকার লােকের সহিত ৫ নলিনী-বসন্ত। } করেছিল কতই যে-সে সবশুনিতে শ্রবণ রােধিতে হয়। তাই সে দুষ্টারে দূর করে দিয়াছিল দেশছাড়া করে, উদয়পুরের লােক -প্রাণ না বধিল গর্ভবতী বােলে সেটা ;-ক্যামন রে, ঠিক্ কি না? সুমা। বৈজ। এই খানে দাড়ি মাঝি ব্রিজটারে আনি, রাখিয়া চলিয়া গেল -তুই রে সুমালি,- আমার কিঙ্কর এবে,-তােরি মুখে শােনা- ছিলি তার কেনা দাস ;-অতি সুকুমার কোমল শরীর তাের কদৰ্য্য, কঠিন পালিতে তাহার আজ্ঞা করিতিস হেলা ; তাই তােরে সে ডাকিনী-ক্রোধে অন্ধ হয়ে - বান্ধিয়া রাখিল এক তালবৃক্ষ চিরে, অন্য যত বলবান ভৃত্য সহকারে। ছিলি সেই বৃক্ষে গাঁথা দ্বাদশ বৎসর, ইতােমধ্যে ব্রিজটার প্রাণত্যাগ হলো, তুই বদ্ধ রহিলি সে বৃক্ষের ভিতরে ; আঁতার শব্দের ন্যায় ঘর্ঘর নির্ঘোষ করিতিস কণ্ঠশ্বাসে বৃক্ষ মধ্য হতে ; জনপ্রণী কেহ ছিল না তখন হে, এটা সুধু পশুবৎ কিস্তৃত আকার মনুষ্য আকৃতি মাত্ৰ - অরণ্যে ভ্ৰমিত। ত্রিজটার বেটা সেটা সুমা।.বটে বটে,-সেই বট বৈজ। হ্যা রে মুখ --আমিও তাই বলছি-সেই সে সেই কট--আমার যে কিঙ্কর এখন ;- হেথা এসে কি দুর্দশা দেখিলাম তাের, নলিনী-বসন্ত। কি নরকভােগ, ওরে মনে কি তা পড়ে ? তাের সে চীৎকারে ডাকিত বনের বাঘ, চির-রােষপরবশ ভল্লুকও কাদিত। সে দুর্গতি হােতে কভু পাবি যে নিস্তার ভরসা ছিল না তার (গতায়ুত্রিজটা ); আমি মন্ত্রবলে তােরে করিনু উদ্ধার ; তালবৃক্ষ পুনর্বার দুই খণ্ড করি মােচন করিনু তাের বন্ধনের দশা সুমা। প্রভু, দণ্ডবৎ-বচায়েছ প্রাণদান দিয়ে। বৈজ। বিরক্ত করিবি যদি পুনৰ্ব্বার তুই অবজ্ঞা করিয়ে আজ্ঞা - পুনঃ বৃক্ষ চিরে বান্ধিয়া রাখিব তােরে ;-দ্বাদশ বৎসর মরিবি চীৎকার করে ;-দেখ সাবধান। সুমা। প্রভু! ক্ষমা কর আর আমি অবাধ্য হব না ; পালিব তােমার আজ্ঞা - যে আজ্ঞা করিবে। বৈজ। তা হলে দুদিন পরে দাসত্ব ঘুচাৰ। সুম। তাই ত বটে-এনা হলে মনিব কি হয় ; বল, প্রভু, শীঘ্র বল, কি আজ্ঞা তােমার । বৈজ। যা এখন নাগকন্যা রূপ ধরে আয় ; অন্য কারু নাহি হবি দৃষ্টির গােচর তুই আর আমি ছাড়া।- যা শীঘ্র যা ? [সুমালীর প্রস্থান। উঠ গাে মা প্রাণাধিকে নলিনি আমার ঘুমায়েছ অনেক ক্ষণ। নলি। পিতা গাে, তােমার শুনিয়া অদ্ভুত কথা নিদ্রা আকর্ষিল। অবসন্ন নিদ্রাভারে এখন ও অলসে এলায়ে পড়িছে অঙ্গ ভুমিতে লুটায়ে ।

নলিনীবসত্ত। ২৮ বৈজ। এসো মা আমার সঙ্গে আলস্য ত্যজিয়ে বটের কাছে যাই ব্যাটা কি বৎ, করিছে দাসত্ব তবু ভুলেও কখন মিষ্ট কথা মুখে নাই। নলি। পিতা! সেটা অতি পাপী। মুথ দরশনে তার মহাপাপ হয়। বৈজ। কি করিবে বল মা, সে না হলে ত নয়; বারি আনে, কাষ্ঠ ভাঙে, অগ্নি জেলে দেয়, কতদিকে আমাদের করে সে সুর।-- ওকে ওঃ-ও বর্বট – পাদুকাবাহক বেটা মৃত্তিকার ঢিপি-কথা নেই যে ? বৰ্বট। ভিতর হইতে) ঢের কাঠ ভােলা আছে। বৈজ । বেরাে বচি-পাজি ব্যাটা-ঢের কাজ আছে বেরুলি ? ( পরির পুনঃ প্রবেশ।) বাঃ,-সুমালি কাঃ-উত্তম সেজেছ । শােন বলি---(কাণে, কাণে কথা।) সুমা। যে, আজ্ঞাঃ [ প্রস্থান। { ওরে ও পাপিষ্ঠ-ওরে ভূতের জন্মিত- বেরে বচি। ( বর্বটের প্রবেশ।) বৰ্ব। কচু পাতা ঢল ঢল, শিশিরের জল তাতে মাকড়ের নাল, স্লপের গরল, • উঠিয়ে কাকের ডাকে মা বেটি আমার করিত যে ময়ুপড়ে ঔষুধ যােগাড়, উহাদের দুজনার মাথায় পড়ক চোক্‌ কাণ নাক মুক পুড়ুকপুড়ক। বৈজ ।

নলিনীবসন্ত। বৈজ। দেধিস্ এর শাস্তি আজ রাত্রে পাবি তুই, হাতে, পায়ে, বুকে, পিঠে বাতের কামড়ে, কাণামাছী বােতা ভঁস সারা রাত্রি ধরে দংশিবে রৈ, আজ তোরে-বিন্ধিতে থাকিবে। ভিলের চাক যথা—তেমনি হবে ফুলে সৰ্বাঙ্গ শরীর তাের । বর্ব। ঈস্-তাই বলে আমি বুঝি ভাত খাব না।-- ব্রিজটার বেটা আমি আমারই এ দ্বীপ-- আমারই ত রাজ্যদেশ অধিকার এই এসেছিলি এই দেশে প্রথমে যখন যত্ন করে সমাদর করিভিস কত ; গায়ে বুলাতিস হাত ;-খাওয়াতি কত ভিজে টসটসে ফল ;-আকাশের আলাে দিনে রেতে যে দুটোয় ঘুরে ঘুরে ওঠে, ছােট বর্ভ সে দুটোর নাম শিখাতিস; তথন তুচ্ছারে আমি বাসিতাম ভাল ; কি আছে কোথায় হেথা দেখায়েছি তাই মিঠে মিঠে বারি ঝরা পাহাড়ে পাহাড়ে, কোথায় উর্বর মাটি কোথা মরুভূমি গু খেয়েছি দেখায়েছি।-- ত্রিজটা শব্দের ছিল ছিটে ফোঁটা যত মাকড় শেকড় ব্যাঙ বিষের আধার পড় ক তােদের ঘাঞ্জে, ধরুক মড়ক। আগে রাজা ছিনু হেথা, এখন তােদর একমাত্র প্রজা জামি হয়েছি এ দেশে ; তােরাই কলি ভোগ বিপুল এ বীপ, আমারে রাখিস কোলে শূকরের ক্ষত কঠিন গহ্বর এই পর্বত ভিতরে।

নলিনী-বসন্ত। - = - বৈজ। অল্পে ব্যাটা, মিথ্যাবাদী, ভালাের খুবিস প্রহারের বশ তুই পড়ে না কি মনে কত স্নেহ করিতাম রাখিতাম কাছে গ্রাকিতিস এক সঙ্গে কুটীরেতে শুয়ে ; কিন্তু তুই, নরাধম, ইচ্ছিলি হরিতে কন্যার কৌমার ধর্ম অধৰ্ম্ম আচারে ;- তাই তােরে দূর করে দিয়াছি এখানে। বৰ্ব্ব। উ',-হু-হু-কি বলব!—কি সুযােগই গেছে ; তুই যদি সে সময়ে বাদী না হতিস্, এত দিনে এ রাজ্যেতে আমার মতন ছােট ঘােট বুৰ্ব্বটের হাট বসে যেতাে। বৈজ। পাপিষ্ঠ, পাতকী,-তুই অতি নরাধম। কত যত্নে দিয়াছি যে কত উপদেশ, দণ্ডে দণ্ডে অহরহ, সব মিথ্যা হলাে! অরে পশু, আগে তুই পশুতুল্য ছিলি, কুকুর, শৃগাল, ছাগ, মেষের সদৃশ, ছিল তাের কণ্ঠস্বর তাৎপৰ্য বিহীন, আমি তােরে মনুষ্যের ভাষা শিখায়েছি, কিন্তু তাের জাতিধৰ্ম্ম এমনি কুৎসিত, ভদ্রের সুসাধ্য নহে তাের সঙ্গে থাকা; বধে পরাণে তােরে রেখেছি যে হেথা এই তাের ঢের ভাগ্য। বর্ব। ভাষা শিখিয়েছ! বৃড়ই কাজ করেছ ! গালমন্দ দিতে মজবুত হয়েছি-তুই ওলাউটোয় মর-ততাকে মড়কে ধরুক। বৈ। “দুর হ ব্যাটা পাজি নচ্ছার—দুর হ; কাঠ আগে যা ;-ভাল চা ও শীগগির যা।-শিউরে উঠলি যে ?-দেখ, যদি আলিস্তি করিস তু এখনি এমনি বাত ধরিয়ে দেব যে পাঁজরের এক এক থানা হাড় ৫ ২৪ নলিনী-রসক্ত: ! থােরা যাবে—আর এমনি চিৎকার কবি মে রনের পশুগুলাে সুদ্ধ কঁপতে থাকবে। বৰ্ব্ব । না দোহাই তােমার, আমায় মাপ কর। (স্বগত) কি করি, যা বলে করতে হয় ;-ব্যাটার এমনি দাপট যে আমার মায়ের গুরুর ইষ্টিদের ভােলাচণ্ডেশ্বরকে সুদ্ধ পায়ের তলায় ফেলে ঘেঁথলে মারতে পারে। বৈজ ! যা ব্যাটা-তবে যা ; [ বৰ্ব্বটের প্রস্থান। ( গান বাদ্য করিতে করিতে অদৃশ্যভাবে সুমালীর প্রবেশ ; ঐ শব্দের পশ্চাৎ পশ্চাৎ বসন্তের প্রবেশ।-সুমালীর গান।) রাগিণী ললিত-তাল আড়াঠে কা। দিবা হলে অবসান ডুবিছে মিহির ; যামিনী আনিতে ধীরে চলেছে সমীর। মেঘের বরণ জন, সাগরেতে শতদল, একি কামিনীর চুল গ্রাসে করিব । পুত্ৰ পরে চারি ধারে, সখীগণে নৃত্য করে, করতালি দিয়ে করে, উড়ায় ভ্রমর। ছড়ায়ে কুন্তল পাশ, অধরে মধুর হাস, পবনে উড়ায় বাস, ভুলাতে অমর। এসাে কে দেখিতে যাবে, এ মায়া ফুরায়ে যাবে, এখনি ভানু ডুবিবে, আসিরে তিমির। যামিনী আনিতে ধীরে চলেছে সমীর। বস। হেন গীত বাদ্যধ্বনি কোথা হৈতে হয় -- আকাশে না মহীতলে ?-বাজিছে না আর। হবে বুঝি এ দ্বীপেরই কোন দেবালয়ে। বসিয়া ছিলাম খেদে সাগরে তটে, ভাবি জনকের কথা অশ্রুময় আঁখি, ।

নলিনী-বসন্ত। হেনকালে যেন গীত সাগর হইতে স্রোতে ভাসি, কুলে উঠি, শ্রবণ পশিল ; অমনি হইল শান্ত সুমধুরস্বরে আমার চিত্তের আর তরঙ্গের বেগ ; আইলাম সঙ্গে সঙ্গে শুনিতে শুনিতে কিম্বা যেন আকর্ষণ করিয়া আনিল । যাই হােক নাই আর, নীরব হয়েছে, না না,আবার অই-অই যে বাজিছে । সুমালীর গান । রাগিণী আলেয়া-তাল আড়াঠেকা। কি হবে কঁদিলে ভবে কেহ চিরজীবী নয় ; ভূপতি শকতিহীন করিতে শমন জয়। গভীর গভীর জলে, তব পিতা দৈববলে, সৌরভ গৌরব ভুলে, হয়ে আছে শবকায়। অই শুন শঙ্খধ্বনি, পাতালে নাগকামিনী, সে দেহ তুলিয়ে মানি, অন্ত্যেষ্টি করিতে যায়। যােজন যােজন পথ, যাও হে ধরণীনাথ, পূরাইতে মনােরথ, দেখিতে পাইকে র্তায় বস। আমারই যে জলমগ্ন পিতার বারতা শুনাইছে এই গীত !-দেবকীৰ্ত্তি ইহা ;- হেন সুমধুর ধ্বনি তুমণ্ডলে কোথা ?- আবার বাজিছে মই। বৈজ। দেখ, নলিন্-দেখ, এ দিকে—গাড়ায়ে ওখানে- হা গা বল দেখি স কি ? নলি। তাই ত গা !-কি গা ওপরি বুঝি হবে ? আহা মরি । অপরূপ কিবা মনােহর ! দেখিছে কি চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখ, ২ নলিনী-বসন্ত। ; পরিই ও বটে, পিতা। বৈজ। অরে বাছা পরি নয় ;-আমাদেরই মত নিদ্রাহার অভিলাষী—আমাদেরই মত আছে সৰ্ব্ব জ্ঞানেন্দ্রিয় ;-ওই সুপুরুষ ছিল সেই জলমগ্ন তরণী ভিতরে ; হয়েছে মলিন কিছু শােকের উত্তাপে।' ( চিন্তাই সৌন্দৰ্যরূপ কুসুমের কীট ), তা না হলে বাখানিতে পারিতে উহারে সুন্দর পুরুষ বলি-সঙ্গী হারা হয়ে, তাহাদের অন্বেষণে ফিরিছে একাকী। নলি। দেবতা বলিলে বুঝি বলিতে বা পারি পৃথিবীর কোন বস্তু এমন সুন্দর চক্ষে কভু দেখি নাই ; বৈজ। (স্বগত) এই যে, যা ভেবেছিনু ;-সুমালি রে, আর দুটি দিন পরে তাের দাসত্ব ঘুচাব । রস। বুঝিলাম এতক্ষণে, এরি সন্নিধানে, গীত বাদ্য হয় নিত্য-দেবকন্যা ইনি ; করযেছে, হে সুন্দরি ! করি হে মিনতি, নিবাস কি এই দেশে কুহু কৃপা করি ? কৃপা করি মােরে কিছু শিখাইয়ে দেও এ দেশের রীতি নীতি প্রথা ব্যবহার ; শেষে করি নিবেদন-একান্ত জানিতে মনের বাসনা যিটি—কহ বিনােদিনি, হয়েছে কি পরিণয়—আছ বা কুমারী ? বৈজ। কুমারীই বটে,-তাতে আশ্চৰ্য্যটা কি ? বস। একি! আঁ!--আমারই যে স্বদেশীয় ভাষা ! হায় যদি থাকিতাম স্বদেশে এখন, হােম সৰ্বাংশে শ্রেষ্ঠ, আমিই সে দেশে।

নলিন-বসন্ত। বস। ; বৈজ। কি বল্লি ?-সৰ্ব্বাংশে শ্রেষ্ঠ হােতিস সে দেশে, এ আস্পর্ধা শশানে যদি গুজরাট ভূপতি কি হবে বল দেখি তবে? বস। শুনায়ে গুজরাট নাম, তুমি হৈ যাহারে করিলে বিস্ময়পন্ন, হয়েছে এখন সে অভাগা পিতৃহীন ;--পিতাও আমার স্বর্গে বসি শুনিছেন আমার এ কথা- স্বর্গে গিয়াছেন তিনি তাই কাঁদিতেছি। আমিই, গুজরাটপতি হয়েছি এখন; জলধি জীবনে পিতা মগ্ন যে অবধি করিতেছি অশ্রুপাত—বিগলিত ধারা দেখ চিহ্ন এখনাে রয়েছে। নলি। হায়! হায় ! কি বেদনা ! সত্য কঁহি ডুবিছেন জলধি জীবনে সঙ্গে যত পারিষদ তারাও ডুবেছে ; অপুৰ্ব্ব তনয় সঙ্গে কঙ্কনভূপতি পিতা পুত্র এক সঙ্গে মরেছে ডুবিয়া। বৈজ। স্বগত) অরে মূঢ়, কঙ্কনের প্রকৃত ভূপতি- অপূৰ্ব সহস্র গুণ তনয়া তাহার এই দণ্ডে পারে তােরে যথা শাস্তি দিতে। দর্শনেই শুভদৃষ্টি হয়েছে দোহার ; সুমালি রে, তােরে এর পুরস্কার দিব, দাসত্ব ঘুচায়ে তাের। { বসন্তের প্রতি) অরে ধূর্ত শঠ, শশান্ বলি—হেথা আয়। নলি। কেন পিত, এর প্রতি কঠিন এমন ? মানব জাতিতে আমি হেরিনু নয়নে ইনিই তৃতীয় ব্যক্তি ;-ইনিই প্রথম, নলিনী বসন্ত। কঁদিল যাহার জন্যে হৃদয় আমার করুণা উদয় হােক পিতার হৃদয়ে, আমার মনের মত হােক তার মন। বস। হও যদি, হে সুন্দরি, তুমি হে কুমারী, অন্যে যদি মনােবাধা নাহি দিয়া থাক, বসাব তােমায় তকে করিয়া বরণ গুজরাটের সিংহাসনে। বৈজ। থাম্‌-থা- ( স্বগত) দুজনার প্রেমে বাঁধা পড়েছে দুজনে ; অযতন করে পাছে ভাবিয়ে সুলত, সুলভ না ভাবে যায় তাহাই ঘটাব । (প্রকাশে) শােবলি; সাবধানে, যা বলি তা শােন্ : স্বনাম গােপন করে মিথ্যা পরিচয় দিয়াছিস হেথা এষে, গুপ্তচর হয়ে, ছদ্মবেশে এসেছিল ছলিতে আমারে, রাজ্য হরে ক্ষতে মাের- বস। ধর্মসাক্ষী কহিতেছি--কখনই নয়। নলি। “এ হেন মন্দিরে, আহা, মন্দ কি কখন, লুকায়ে থাকিতে পারে ; কিম্বা এ ভবনে মন্দ এসে থাকে যদি—উৎকৃষ্ট সমূহ করিবে সদাই ছন্দ সে মনে তাড়াতে, এ মন্দির হােতে দূরে। বৈজ। (বসন্তের প্রতি) আয় তুই সঙ্গে আয়।-তুমিও নলিনী এর জন্যে অনুরােধ করাে না আমায়, রাজদ্রোহী এই ব্যক্তি।-আয় সঙ্গে আয় হস্ত পদে দিৰ তাের লৌহের শৃঙ্খল, লক সলিল পানে পিপাসা জুড়াৰি; শুষ্ক তৃণ ফল মূল বল নীৱষ; ;

নলিনী-বসন্ত। । অসার ধান্যের খােসা, চণক, মটর, জলশুক্তি আদি তাের সুখাদ্য হইবে । আয় চলে আয়। বস। নড়িব না এক পদ--শত্রুর প্রতাপ বুছিব যতক্ষণ–পাব পরিচয় আমা হােতে বলবান বিপক্ষ আমার। [ অসি নিষ্কোষ করিল এবং তৎক্ষণাৎ যাদুমন্ত্রে স্তম্ভিত হইল ] নলি। পিতা, ইনি বীৰ্যশালী মহাবংশােদ্ভব নিদারুণ এ পরীক্ষা এর যােগ্য নয়। বৈজ। কি ? -কি ?—কি আস্পর্ধা! পাদুকা হইতে তুই অধম হইয়ে আমারে শিখাতে চাস ?- (বসন্তের প্রতি) ওরে রাজদ্রোহি। তুলে রাখতুলে রাখ বােঝা গেছে তেজ, বৃথা আড়ম্বরই সার তলবার খােলা, চালিতে সামর্থ্য নাই—ধিক্ থাক্ তােরে ; কৃপাণ লুকাইয়ে রাখ পিধান ভিতরে ; সামান্য যে এই ষষ্টি ইহারি আঘাতে এই দণ্ডে পারি তােরে নিরস্ত্র করিতে। নলি কৃতাঞ্জলি, করি পিতা, ক্ষম গাে উহারে। যা - যা-বস্ত্র ছাড়। নলি। হও গাে সদয়, পিতা,-প্রতিভূ ইহার আমিই থাকি, আৰ্য ! বৈজ। চুপ করফের যদি কথাটি কহিবি, . ভৎসনা করিব তােরে ;-ঘৃণা জন্মে, ছিছি তাের ব্যবহার দেখে ;-এত অনুরােধ! এই শঠের জন্যেতে!ভেবেছিস্ বুঝি—- এটা আর বব্বটেরে হেরিয়ে নয়নে- ৩০, নলিনী-বসন্ত। বৰ্ব্বটের তুল্য - হেন সুপুরুষ আর ত্রিভুবনে নাই। হারে নির্বোধ মেয়ে-অনেকের কাছে, এটা অতি কদাকার, এর তুলনায় তারা দেবতা বিশেষ। নলি। পিতা, আমার এই ভাল এর চেয়ে আর; শ্রেষ্ঠতর দেখিবার নাহিক বাসনা; হেন নীচগতি-প্রণয়:আমার যেন চিরদিনই থাকে। বৈজ। বসন্তের প্রতি আয় চলে অায়- পুনঃ তাের বাল্যাবস্থা দেখি যে আগত, বল বীৰ্য্য শরীরেতে বিন্দুমাত্র নাই, হস্ত পদ দেখি যেন হয়েছে অবশ। বস। সত্যই হয়েছে তাই ;-শরীর দুৰ্বল হয়েছে অবশ যেন নিশার স্বপনে। কিন্তু প্রতিদিন যদি পাই একবার দেখিতে ও বিধুমুখ কারাগার হােতে ভুলিব সকল দুঃখ, সৰ্ব্ব মনস্তাপ জনকের মৃত্যুশোকে, বন্ধুর বিচ্ছেদ, এ দেহের-দুৰ্ব্বলতা, দুৰ্ব্বাক্য উহার। সসাগরা পৃথিবীর অন্য যত ভাগ ;. থাকু লয়ে অন্য সবে স্বাতন্ত্র সুখেতে,, বিশ্বভূমণ্ডল সেই কারাই আমার। ব্লৈজ। (স্বগত) ধরেছে বিষের তেজ-ধরেছে ধরেছে; বড় কাজ সুমালীরে করেছিস বাপ্। ( প্রকাশে) আয় চলে আয় দেহে পশ্চাতে পশ্চাতে; (জনান্তিকে) সুমালি শােন বলি।

নলিনী-বসন্ত- . নলি। ('বসন্তের প্রতি। মহাশয়!—স্থির হউন-জনক আমার, এখন যেরূপ তুমি দেখিছ উহাৱে, স্বভাবে সেরূপ উনি নন্। বৈজ। ( জনান্তিকে সুমালীর প্রতি) স্বাধীন হবি রে তুই-দাসত্ব ঘুচিবে পৰ্বত-শিখরে যথা বায়ুর.হিল্লোল অবাধে ভ্রমণ করে—তুইও ভ্ৰমিবি, আমার কথার বাধ্য থাকিস যদ্যপি। মােL অরাধ্য তিলেক মাত্র হর না তােমার। বৈজ। (সুমালীর প্রতি) এসাে তবে ; (বসন্ত এবং নলিনীর প্রতি) তােরা দোহে পেছু পেছু আয় । [ সকলের প্রস্থান এ । দ্বিতীয় অঙ্ক। দ্বীপের অন্য এক ভাগ। প্রথম গর্ভাঙ্ক। (চিত্ৰধ্বজ মন্ত্রী প্রচেতা, অনন্ত, কপ, ভৱত এবং বিজয় প্রভৃতির প্রবেশ।) মন্ত্রী। মহারাজ প্রফুল্ল হউন-মহারাজের আহলাদের বিষ, আর তামাদেও বটে; যে রক্ষা পাওয়া গিয়েছে ;-তার, চেয়ে ক্ষতিটা যৎসামান্য বলতে হবে।—এমন সােক অপ ত (৩২ নলিনী-বসন্ত। অন। সকলেরই হয় ;-মাঝীমাল্লা বণিকব্যাপারীদের ঘরে প্রত্যহই ত এরূপ একটা না একটা অসুখের কারণ ঘটে; কিন্তু আশ্চৰ্য্য এই যে, আমরা রক্ষা পেয়েছি ;-সহস্রে কজনের ভাগ্যে এমটি ঘটনা হয় ? মহারাজ, তাই বলি বিবেচনা করে দেখুন, অসুখের চেয়ে আমাদের আহলাদেরই বিষয় বলতে হবে । চিত্র। অহে, ক্ষান্ত হও। কৃপ। গা জুড়য়ে দিচ্ছেন আর কি! ও ছাড়বে না। মন্ত্রী। মহারাজ! অন। অই শােননা। মন্ত্রী। মহারাজ, শােকাৰ্ত্ত হইলে কি একবারে অভিভূত হয়ে পড়তে হয় ! চিত্র। অহে ক্ষমা দেও। মন্ত্রী। ভাল আর বলব না ;—কিন্তু মহারাজ, তবু অন। ও থাম্‌বে না। কৃপ। আর—ওর জিবটাও সড় সড় কছে, সুর ধলে বলে। ভর। যদিও দৃশ্যত এ দেশটি মরুভূমির তুল্য কৃপ। কিন্তু তবুও-তারপর? ভর। তবুও জলবায়ু অতি উত্তম ;-অতি স্নিগ্ধ, শীতল। অন। বটে বটে—ঠিক এঁচেছ, দিল্লীর লাড্ডর মতন। তার পর ? ভর। ক্যামন পরিষ্কার সুগন্ধি বায়ুর হিল্লোল বচ্চে। কৃপ। আহা! যেন বারাণসীর সুগন্ধি পয়ঃপ্রণালীর সৌরভ নির্গত হচ্ছে। অন। কিম্বা যেন সুন্দরবনের সুবাসিত কর্দমের পরিমল মন্ত্রী। জীবনের সমস্ত উপাদেয় সামগ্রীই এখানে সুলভ।} অন। কেবল অন্নজলেরই কিঞ্চিৎ অভাব । -তারপর?

নলিনীবসন্ত মন্ত্রী। আহা! তৃণগুলি কেমন রসাল এবং সুন্দর শ্যামবর্ণ । কৃপ । আহা! যেন উলুখাকড়ার সমুদ্র হয়ে রয়েছে। অন। আর মাটির রংটাও দিব্বি—পাথুরে কয়লার মত কালাে, কাঁকর কুলুই আর কোথাও নেই বলেই হয়। কৃপ। না—তা ওর তুলে ঠিক আছে—এক চুল তফাৎ হবার যাে কি। মন্ত্রী। কিন্তু আশ্চৰ্য্য এই কথাটা বিশ্বাসের বহিভূত বল্লেই হয় ) কৃপ। ওঁর সকল কথাই প্রায় সত্যের বহিভূত। মন্ত্রী। আশ্চৰ্য্য এই যে, আমাদের পরিধেক্ষগুলি সমুদ্রের জলে আর্দ্র হয়েও ঠিক তেম্‌নি আছে, লবণ সলিলে নিমজ্জিত হয়ে কলঙ্কিত হওয়া দূরে থাকুক, বােধ হয়, যেন আকোরা নূতন রং করা, এখনি পাট ভাঙা হয়েছে। বিবাহের দিবস সিংহলে যখন পরিধান করা গিছল—ঠিক যেন তেমনিই আছে। কৃপ। মরি আর কি, বিবাহটা কি শুভক্ষণেই হয়েছিল, আর পুনর্যাত্রাটা ক্যামন নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হলাে। মন্ত্রী। এনি ধারা যদি গুটিকত দ্বীপ পেতুম। অন। কি হে মন্ত্রী-কি বলচ ? মন্ত্রী। আজ্ঞা -বচি কি-রাজকন্যাশ্রীবিষ্ণুসিংহলের বর্তমান রাজমহিষীর বিবাহের দিবস পরিধেয়গুলি যেমন পরি- পাটি ছিল এখনও ঠিক তেমনি আছে।মহাশয় ! আমার উত্তরীখানি ঠিক তেমনিই আছে না?-মহারাজ আপনার কন্যার বিবাহের দিবস এইখানি পরিধান করেছিলাম। চিত্র। একে অঙ্গ জ্বলে মন্ত্রি, কেন দগ্ধ কর ?- 'তােমার এ বাক্য-যেন কন্টক বিধিছে আমার শ্রবণ পথে;-হায় রে কপাল ! হেন দেশে অভাগিনী কন্যার বিবাহ হওয়াই ছিল ভাল ;-পড়ে এ জঞ্জালে, } ৩৪ নলিনী-বসন্ত। মন্ত্রী। ফিরিতে সিংহল হােতে প্রাণের তনয়ে হারালাম, হা অদৃষ্ট! জলধি সলিলে ; কন্যাকেও চক্ষে আর পাবনা দেখিতে গুজরাট হইতে এত দূরেতে সিংহল ; হা পুত্র!--গুজরাট কঙ্কন অধিকারী। কোন্ জলজন্তু তােরে করেছে রে গ্রাস ! মহারাজ ! কুমারের বঁাচাও সম্ভব। -- চলেছেন দেখিলাম তরঙ্গ বাহনে, তুরঙ্গমে সাদী যেন অবলীলা ক্রমে ; বৈরিতা করিতে যত আসিছে ছুটিয়া তরঙ্গ হুঙ্কার করি-দূরেতে নিক্ষেপ করিছেন দুই ধারে, বাহু প্রসারিয়া। অটল উন্নত শির তরঙ্গ উপরে, চলেছেন মহাবেগে বাহু দণ্ডে বাহি যথায় সমুদ্র তট তরঙ্গ-খনিত, হেঁট হয়ে আছে তারে ক্রোড়েতে তুলিতে। চিত্র। না, মন্ত্রী—নাই আর বসন্ত আমার । কৃপ। তুমিই ত এ সকল বিপদের মূল,-- আহা! সে ত কন্যা নয়!—ভারত উজ্জ্বল। তারে কি না মিলে এক অসভ্যের হাতে, বৰ্ব্বর সিংহলবাসী ;-ভােগগা তারি ফল ; ইহ জন্মে কন্যাকেও পাকে না দেখিতে । চিত্র। ক্ষমা দে ভাই কৃপ। আমরা ত সকলেই, গললগ্ন বাসে, কৃতাঞ্জলি পুটে, কতকরিনু নিষেধ, মেয়েটারও, তাতে আহা, অনিচ্ছাই কত', এবে তার প্রতিফল যথেষ্ট হয়েছে- জন্মের মতন-হারাইলে পুত্রধনে, নলিনী-বসন্ত। ৩৫ করিলে বিধবা কত পতিপ্রাণ সতী গুজরাট কঙ্কনে। চিত্র। ততধিক মনস্তাপ আমারও হে তাই। মন্ত্রী! মহাভাগ, কৃপ সত্যই বলছেন, কিন্তু বাক্যগুলি কিছু কঠোর প্রয়ােগ করা হচ্ছে, এ সমস্ত অবিনীত বাক্য এ সময়ের যােগ্য নয়। দগ্ধ স্থানে নবনী না দিয়ে এ যেন লবণ নিক্ষেপ করা হচ্ছে। কৃপ। ভালো হচ্ছে ত হােতোেমার কি ? অন। কেন, আজকালের চিকিৎসাই ত ঐরূপ। মন্ত্রী। আপনাদের যখন এরূপ বৈষম্যভাব তখন সময়টা নিতান্ত দুঃসময়ই দেখছি ; কৃপ। দুঃসময় ! অন। তার ত কথাই নাই। মন্ত্রি। মহাশয় ! এ দ্বীপটি দেখে আমার মনে বড় আলাদ হচ্চে। কৃপ। কেন হে মন্ত্রি, বল দেখি । মন্ত্রী! মহাশয়। বাল্যকালাবধি আমার বাসনা আছে যে একবার রাজত্ব করি; কিন্তু প্রাচীন দেশ মাত্রেই, রাজড়াদের এত ভিড়, যে তার ভেতর মাথাগুজে প্রবেশ করাই ভার ,তাই চির- কালটা মনে মনে ভাবতুম যে ওরি মধ্যে একটা ছােটখাটো নিরেলা দেশ পাই ত সেই খানে একবার রাজত্ব করে নি, আর কেমন করে রাজত্ব কত্তে হয়, একবার দেখাই। এই দ্বীপটি দেখচি তার সম্যক উপযুক্ত স্থান। এই খানে কতকগুলি প্রজার বসতি করয়ে তাদের উত্তমরূপ তরিবত দিতে পাল্লে একটি আশ্চৰ্য্য জনপদের সৃষ্টি হয়। প্রাচীন দেশ নিবাসীদিগের যে সমস্ত কুসংস্কার আছে, তার কিছুমাত্র এখানে প্রবেশ কত্তে দি না। আমার সে রাজ্যে বিবাহরূপ স্কুপ্রথা থাকে না, ধন সম্পত্তিতে স্বত্বাস্বত্বের প্রভেদ থাকে না, স্বেচ্ছাধীন সকল স্ত্রীই সকল পুরুষের ভোগ্যা -সকল পুরুষই সকল স্ত্রীর কাম্য, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই চৌষট কলায় ব্যুৎপন্ন-হিংসা দ্বেষ বিবাদ, ৬ নিদ্রিত এবং সুমালীর প্রস্থান।] নলিনী-বসন্ত । বিসম্বাদ, যুদ্ধ বিগ্রহ রাজ্যমধ্যে একবারে বিলুপ্ত হয় প্রতারণা- শূন্য সত্যবাদী জনগণ পরহিতৈষী পরােপকারী হয় ; ;-স্বতঃসিদ্ধ ধৰ্ম্মজ্যোতিতে সকলেই নিরুদ্বেগ শান্তচিত্ত থাকে। রােগ, শােক, তাপ, চিন্তা, দারিদ্র সমূলে নিৰ্ম্মল হয় এবং সুখ সচ্ছল সৰ্ব্বত্রে বিরাজিত হয়ে প্রীতি সম্পাদন করে। কৃপ। মন্ত্রী, যা বলেছ মিছে নয়—এই স্থানটিই তার উপ- যুক্ত আর তুমিই এখানকার ভূপালের উপযুক্ত পাত্র। এই দেশেই গাধা পিটলে ঘােড়া হয়। অন। আর ওঁর রাজ্যে বাস কল্লেই জ্যান্ত মানুষ গাধা হয়। চিত্র। আঃ - কি আপদ। এ যে বিষম যন্ত্রণা দেখছি ; এক দণ্ডকাল কি চুপ করে থাকতে পার না। ( অদৃশ্যভাবে সুমালীর প্রবেশ এবং গভীর বাদ্যধ্বনি। চিত্ৰধ্বজ কৃপ এবং অনন্ত ব্যতিরেকে সকলেই নিদ্রিত হইল।) চিত্র। আঁ;-এরি মধ্যে নিদ্রাগত হলাে এরা সবে । আমার চক্ষেতে কেন নিদ্রা না আইল ; বিষম চিন্তার দাহ হইতে তা হলে বচিতাম ক্ষণকাল-হতেম সুস্থির আঃ! চক্ষু দুটো মুদে আচে। কৃপ। মহারাজ ! নিদ্রা যান ;-এসেছেন যদি বিরামদায়িনী নিদ্রা করুণা করিয়ে, অবহেলা করে, দেব, ঠেলনা উহারে। অন। নিদ্রা যান মহারাজ । আমরা দুজনে জাগিব প্রহরী হয়ে । চিত্র। বাধিত করিলে বড়,-নিদ্রার আবেশে হয়েছে অবশ অঙ্গ- কৃপ। দেখি নাই কভুত অদ্ভুত, এমন!! বলা কওয়া ছিল যেন সেই ভাবে এরা t নলিনীবসন্ত। ৩৭ একত্রে নিদ্রিত হলাে । অন। এ দেশের বারি আর বাতাসের গুণে হয় বুঝি এইরূপ। কৃপ। আমাদের চক্ষে তবে নিদ্ৰা নাই কেন ? অন। আমারাে ত নিদ্রা ইচ্ছা হতেছে না কিছু । সৰ্ব্বাঙ্গ শরীরে স্ফৰ্ত্তি আছে ত তেমতি ; ঘুমায়ে পড়িল এরা ঐক্য হয়ে যেন ; কি হেন বজ্রাঘাতে একত্রে মরিল ; অহে কৃপ মহােদয়, তুমি হে এখন, থাক্ থাক্‌, সে কথায় কাজ নাই আর তবু যেন লক্ষ্য হয় তব মুখশ্রীতে অতুল মহত্বটা-দেখিতেছি যেন পড়িতেছে তব শিরে আকাশ হইতে সুবৰ্ণ মুকুট খসে । রূপ। কি হে, তুমি জাগ্রত কি ? শুৰ্চ না, কৃপ। শুচি বটে; কিন্তু এ যে স্বপ্নের প্রলাপ-- নিদ্রিতের অসঙ্গত বাক্য এ তােমার। কি বলছিলে তুমি ?-কি আশ্চৰ্য্য নিদ্রা ইহা, দুই চক্ষু উন্মীলিত জাতের প্রায়, কথা কয়, চলে যায়, দাড়ায়ে রয়েছে । গভীর নিদ্রার ঘােরে তবু অভিভূত। অন। আমি হে নিদ্রিত নই, অহে মহাভাগ, তােমারি সৌভাগ্য আছে অগাধ নিদ্রায়। এর চেয়ে মৃত্যু ভাল-জেগে নিদ্রা যাও? কৃপ। এ ত নয় নিদ্রিতের নাসিকার ধ্বনি, . সে শব্দ এরূপ নয়—অর্থ আছে এতে। অহে কপ, কৌতুকের সময় এ নয় ; কি কথা?

নলিনী-বসন্ত। ত্যজেছি এখন আমি স্বভাব চঞ্চল, অবধান কর যদি আমার কথায়, আমারি মতন হবে উৎসাহে উৎসাহী ; দ্বিগুণ রুধির স্রোত বহিবে অঙ্গেতে দ্বিগুণ বাড়িবে পদ নিমেষ মধ্যেতে। কৃপ। শ্রোতহীন বারিতে কি স্রোত বহে কভু ! অন। বহে যদি পারে কেহ আমি বহাইব স্রোত তােমার শরীরে। কৃপ। দেথ তবে পার যদি ভাটা ফিরাইতে; একটানা চিরকাল আমার এ দেহে আলস্যই কুলগত স্বধৰ্ম্ম আমার। অন। অহে কৃপ, তােমার বঙ্গ উপহাসে, ক্রমে আরাে সে বাসনা হতেছে প্রবল ;- ‘জড়ালে ফাঁসের গিরাে, যত খােল তায়, তত আরাে ফাঁসে ফঁসে গিরাে বসে যায়, জাননা ত এ প্রবাদ-জানিতে যদ্যপি ত্যজিতে এ ব্যঙ্গভাব, হইতে উদ্যোগী । অসাহসী পুরুষেরা এইরূপে বটে ভয় কিম্বা আলস্যেতে অধঃপাতে যায় । কৃথ। বলে যাও-বলে যাও ;-দেখিয়া তােমার মুখের ভঙ্গিমা আর চখের ইঙ্গিত, বােধ হয় যেন কোন দুর্জয় বাসনা প্রজ্জ্বলিত হয়ে তর অন্তর দহিছে। অন। শােন তবে, শােন বলি, ভ্রাতুস্পুত্র তর মরেছে অগাধ জ্বলে—মরেছে নিশ্চয় ; অই চতুর প্রচেতা, ভুলাইতে ভূপতিরে উপন্যাস কথা। আরে ধূর্ত ব্যবসায়ী, মিথ্যা কথা ক যতই বলুক নলিনী বসন্ত। • কাটাইলি চিরকাল জঠরের দায়ে, আজ মলে কাল তােরে কেহ না খুঁজিবে ; ঘুমায়ে সাঁতার দেওয়া তােমায়াে যেমন, রাজপুত্র বেঁচে থাকা নিশ্চয়ই তেমন। কৃপ। অনন্ত হে আশ্বাস নাহিক আমার । স্পন। সে অশ্বাস না থাকাই তােমার আশ্বাস সে আশা নিৰ্ম্মল কিন্তু এত উচ্চ আশা উদয় হয়েছে সেই নিরাশা অম্বরে অতি উচ্চ বাসনাও সে আশা শিখরে আরােহিতে নাহি পারে অনেক আয়াসে- রাজপুত্র বেঁচে মাই--তােমারাে ত মত ? কৃপ। না—সে জীবিত নাই। অন । ভাল তবে বল দেখি, রাজসিংহাসনে, সে অভাৰে অধীশ্বর কে হবে গুজরাটে ? কৃপ। রাজকন্যা কলাবতী। অন। কি বল্লো ? কলাবতী ?-সিংহলেতে যিনি ? কুমেরুকেেেত এবে অবস্থিতি যার ? পাবে না যে এ সংবাদ, সংবাদ না দিলে সূৰ্য্যদেব বার্তাবহ হইয়ে আপনি, কিম্বা সদ্যোজাত শিশু শ্মশ্রুধারী হয়ে ? যার জন্যে সাগরের জঠরে ডুবিয়া বাঁচিয়াছি কেহ কেহ দৈব নিবন্ধনে ;- অহে কৃপ, বিধাতার কৌশল এ সব, তােমা আমা দুজনার গৌরব বাড়াতে। কৃপ। এ আবার কি ?-কি বঞ্চ হে ? সত্যইত কলাবতী সিংহল মহিষী গুজরাটের অধীশ্বরী বসন্ত অভাবে ; সিংহলাে গুজরাট হতে দূর কিছু বটে। ?

৪০ নলিনী-বসন্ত। অন। এত দূর-ভাবিলে ত, মানেনা বিশ্বাস পুনৰ্ব্বার আসিবে সে, গুজরাট নগরে ; থাক সে সিংহলে পড়ে ;-কৃপ হে জাগ্রত হও তুমি ;-বল এরা কাল নিদ্রাগত ;- অই যে নিদ্রিত দেখ, উহারও সদৃশ রাজকার্যে সুনিপুণ সম্ভ্রান্ত কুলীন আছে ত অপর আরাে গুজরাটধামেতে সদা নিরর্থক ভাষী অই যে প্রচেতা, আছে ত অনেক লােক উহারো মতন; কাজ কি অন্যের কথা—আমিই ত আছি অহে কৃপ মহাভাগ, যদি হে তােমার হইত আমার মত দুর্জয় বাসনা, ইহাদের এ নিদ্রায় কতই উচ্চেতে উঠিতে পারিতে তবে-বুঝেছ কি ? কৃপ বুঝি—বুঝি। অন। বােক তবে সে ঐশ্বৰ্য্য, অতুল সম্পদ তােমারই এ বাসনার অনুগামী কি না? কৃপ। তুমিই হরেছিলে তােমার ভ্রাতার কঙ্কনের সিংহাসন ? অন। হরেছিনু বটে;-তাই দেখ না এখন কেমন সেজেছে অঙ্গে রাজ পরিচ্ছদ পূৰ্ব্বে ভৃত্যগণ যত ভ্রাতার আমার আমারই সদৃশ ছিল—এক্ষণে আমার ভাহারাই হয়েছে হে আমার কিঙ্কর। কৃপ। কিন্তু ওহে ধৰ্ম্মজ্ঞান করে যে নিষেধ। অন। ধৰ্ম্মজ্ঞান?-অহে কৃপ, এ দেহের মাঝে কোন্ খানে সে বিচিত্র জ্ঞানের নিবাস ? এখানে ?-না এখানে ?-না অন্য কোন স্থানে ? = ।

নলিনী-বসন্ত। ৪১ আমি কিন্তু ভাল জানি আমার হৃদয়ে নাহি সে দেবের বাস ;-সহস্র তেমন ধৰ্ম্মজ্ঞান এসে যদি করিত নিষেধ লভিতে কঙ্কনরাজ্য-চূর্ণ করে তার ফেলিতাম পদতলে।—পড়িয়া ভূতলে অই যে তােমার ভাই—কি ভেদ উহাতে- বলল হে কি ভেদ ওতে মৃত্তিকাতে আর ? নিদ্রা আর মরণেতে প্রভেদই বা কি ? তখনও ত শান্ত হয়ে থাকিবে ঘুমায়ে। এই ক্ষুদ্র ছুরিকার আঘাতে উহারে এ জন্মের মত পারি নিদ্রিত করিতে । তুমিও নিমেষ মধ্যে অই প্রাচীনেরে, চির-নিদ্রা-অভিভূত করিতে হে পার। তা হল্যে ও মৃৎপিণ্ড, লােকালয় মাঝে পারেনাকো আমাদের নিন্দা রটাইতে অন্য ওরা যতবােঝে ওরা কালাকাল, তুচ্ছ ইঙ্গিতের বশ কুকুরের মত, অন্নমুষ্টি পেলে সবে হবে পদানত। কৃপ। অহে বন্ধু প্রিয়তম! দৃষ্টান্তের স্থল করিব তােমায় আমি-তুমি হে যেরূপে লভিলে কঙ্কন রাজ্য, আমিও তেমতি লভিব গুজরাট দেশ ;-খােল তরবার- এক চোটে এড়াইবে করদের দায় ; জীয়ে রবে যত দিন অমাত্য, প্রধানু আমি রাজা, তুমি মন্ত্রী, হবে হে আমার । অন । এক সঙ্গে খােল তবে ;- আমিও যখন উঠাইব তীক্ষ্ণ অসি-তুমিও উঠাইও প্রচেতার বক্ষঃস্থল দৃঢ় লক্ষ্য করি।

নলিনী-বসন্ত। কৃপ। অহে, শােন- (গােপনে কথােপকথন। ( অদৃশ্যভাবে সুমালীর প্রবেশ।) সুমা। তুমি আমার প্রভুর পরম হিতৈষী বন্ধু ; তােমার আসন্ন বিপদ, আমার প্রভু যাদুবিদ্যার প্রভাবে সমস্ত অবগত হয়ে তােমাদের সকলের জীবন রক্ষার জন্য আমাকে পাঠায়ে- ছেন;-নতুবা তাঁর সঙ্কল্প নিস্ফল হয়। (প্রচেতার কর্ণমূলে।) তুমি নিদ্রাগত, দুরাত্মারা যত ষড়যন্ত্র কত করে কুমন্ত্রণা ; বাঁচিতে বাসনা থাকে ঘুমাইও না ; ত্যজ নিদ্রা ঘাের শিয়রেতে চোর, উঠ উঠ আর নিদ্রা যেওনা। অন। এসাে তবে ;-আর কেন, বিলম্বে কি কাজ ? মন্ত্রী। ( জাগ্রত হইয়া) হে বিজয়ী সুরবৃন্দ রক্ষা কর ভূপে। চিত্র। অ——;--ও কি ?-অহে ওওঠো, সকলে ওঠো ;-তােমাদের তলবার খােলা কেন? আর মুখই বা অমন পাঙাশবর্ণ কেন? কেন ? কি ?-কি ?--ব্যাপারটা কি ? কৃপ। মহারাজ! আপনার বিঘ্নবিনাশন করিতে দুজনে মােরা ছিলাম প্রহরী হেনকালে বৃষধ্বনি অতি ভয়ঙ্কর, কিম্বা যেন ঘােরর কেশরীগর্জন পলি শ্রবণ পথে ; সে ভৈরব নাদ এই মাত্র শুনিলাম—তথনে ভয়েতে হতেছে হৃদয় কম্প- মহারাজ! শশানে নি কি ? চিত্র। কই-আমি ত শুনিনি। মন্ত্রী। ন নলিনী-বসন্ত। ৪৩ অন! অহহ!কি ভৈরব না ! রাক্ষসেরও হৃৎকম্প হয় সে হুঙ্কারে ; বাসুকি অস্থির হন ;-বােধ হলাে যেন সহস্র মাতঙ্গ-অরি একত্রিত হয়ে করিতেছে হুহুঙ্কার। রাজা। মন্ত্রি !তুমি শুনেছিলে ? মন্ত্রী। সত্য কহি, মহারাজ, গুনু গুনু ধ্বনি শুনিলাম কর্ণমূলে,-অপূৰ্ব তেমন পূৰ্ব্বে কভু শুনি নাই।সেই শব্দ শুনে ভাঙিল নিদ্রার ঘাের, উঠি জাগিয়া ; পরশিনু তব অঙ্গ বিকট চীৎকারি, দেখিলাম অসিহস্তে দাঁড়ায়ে উহারা শব্দ হয়েছিল সত্য-কিন্তু মহারাজ সতর্ক হইয়া এবে থাকাই উচিত, অথবা কুস্থান এই পরিত্যাগ করা। রাজা। এসাে তবে এ কুস্থান করি পরিহার, অভাগার অন্বেষণে স্থানান্তরে যাই। মন্ত্রী। মহারাজ! যুবরাজ আছেন নিশ্চয় এদ্বীপেরই কোন স্থান ;-এ সঙ্কট হােতে ত্রিকোটি দেবতা রে করুন উদ্ধার। রাজা। হও তবে অগ্রসর। সুমা। (স্বগত) প্রভুর নিকটে গিয়ে বন্দুতে হবে সব। [ সকলের প্রস্থান।

দ্বিতীয় অঙ্ক। দ্বীপের অন্য এক ভাগ। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। ( কাঠের বােঝা মাথায় বৰ্বটের প্রবেশ ।) মেঘের গর্জন।) বর্ব। মরুক - ব্যাটা বৈজনাে মরুক ;-সৰ্ব্বাঙ্গে কুড়িকুষ্ঠ হয়ে মরুক-ব্যাটা আমায় একদণ্ড আলিস্যি রাখতে দেয় না— খাটতে খাটতে মনু। গাল দিচ্চি তার পরিগুলাে সব শুচে- শুনুক্ ;-গাল না দিয়ে যে থাকতে পারিনে।-সে গুলাে এখনি এসে জ্বালাতন করূবে এখন। কান টাবে, চুল টাবে’ চিটি কাটবে, কাদায় ফেলে দেবে—ভয় দেখাবে—না হয় ত আলেয়া সেজে অন্ধকারে পথ ভুয়ে দেবে। কথায় কথায় ব্যাটা সেই গুলােকে আমার উপর নেয়ে দেয় ;-কখন বাঁদর হয়ে এসে মুখ ভেঙচায়, আঁচড়ায়, কামড়ায়,-ঝালাপালা করে মালে ;- হয় যে পথ দিয়ে যাচ্ছি সেই পথের মাঝখানে সজারুর মত হয়ে পড়ে থাকে—আর মাড়য়ে ধল্লেই উঃ, প্যাট প্যাট করে কঁটা ফুটয়ে দেয় ;-আবার না হয় ত সাপের মত জিব লক্ লক্ করে ফোস্ ফোস করে চোটাতে থাকে। ব্যাটারা আমায় ক্ষেয়ে তুল্লে ।অই রে -ঐ-আচে। তিলকের প্রবেশ—মাথার বােঝ ফেলে বৰ্ব্বটের ভূতলে শয়ন।). তিল। আবার মেঘ ডাচে-ঝড় ওঠবার উজ্জগ হচ্চে- যাই কোথা!—এখানে ঝােপঝাপ কিছুই দেখচি নে; কোথায় লুকুই।--বাপ্ রে—মেঘের যে ফাগুনি, বােধ হচ্চে মুষলের ধারে বৃষ্টি হবে।-আবার যদি তেনি ধারা বজ্রাঘাত হয়—মাথা গোঁজবার একটুকু স্থান নেই—অা-গ্যাল—এটা কি ?-কি ') ।

নলিনী-বসন্ত। ৪৫ 4 এটা পড়ে রয়েছে ? মানুষ না কচ্ছপ ? জ্যান্ত না মরা ?- উঃ-কি দুর্গন্ধমরা কচ্ছপই বটে—কিন্তু বড় নূতনতর দেখছি!-- আমি যদি এই সময় একবার কলকাতায় যেতে পাত্তম, আর এই কচ্ছপটাকে রংচঙে করে মানুষের ন্যাজ বের- য়েছে বলে মাঠের ধারে একটা তাবু ফেলে বসতে পাত্তম ত কত পয়সাই লাভ হত ;—সেখানকার বাবুরা আজ কাল ভারী হুজুকে হয়ে উঠেছে ঘােড়ায় নাচ, বিবির নাচ, ভুত নাবান, সং নাচান নিয়ে বড়ই সাখরচে হয়ে পড়েছে-কিন্তু এ দিকে একজন ভিকিরি এলে এক মুটো চাল যােটে না।-টোলচৌপাড়িগুলো একবারে লােপ পাবার যাে হয়েছে, তবুও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের এক পয়সা দিয়ে সাহায্য করেন না। সত্যই ত এটা জ্যান্ত যে !-- এ কচ্ছপ নয় এই দেশেরই মানুষ, বজ্রাঘাতে এমনি হয়ে পড়েছে। (মেঘের গর্জন।) হায় হায়, আবার ঝড় উঠল - যাই এইটের পিঠের তলায় লুকুই গে—এখানে ত অন্য কোন আশ্রয় দেখচি নে।-বিপদে কত রকম লােকের সঙ্গেই মিত্রতা হয়— ঝড়টা যতক্ষণ থাকে এরই পিঠের নীচে পড়ে থাকি। ( মদের বােতল হাতে গান করূতে করতে উদয়ের প্রবেশ ।} উদয় (গান।) ও আমার আদরিণী প্রাণ চলো যাবে গঙ্গাস্নান হাঠখােলাতে তােমায় আমায় খাব পাকা পান চলল আদরিণী প্রাণ। উই-এ সুরটই হচ্ছে না। ( পুনর্বার গান।) বকুল গাছে শিমুল ফুল চাদের কাণে হীরের দুল। বছর ষােলাে রয়স হলাে চামর চোচা চুল।

৪৬ মলিনী-বসন্ত। পায়ে তার ঘােড়া মল হাতে বাজু পলার ফল তাইরে নারে তাইরে নায়ে না । দূর হাে—এই আমার ধন্বন্তরি- ( মদ্যপান।) বর্ব। ধৰ্ব্ব। উ:উ ;-আঁরে আর টিপিস নে তাের পায়ে পড়ি। উদ। আঁ -এ আবার কি ? এ কি ভূতের দেশ না কি? তুই কি আমায় কচিছেলে পেয়েচিস্, যে চারটে পা দেখয়ে ভয় দেখাবি—সমুরে সাঁতার দিয়ে, ভূতের ভয়ে কি আঁতকে পড়তে হবে না কি ?—বাবা আমি উদয়াদ--- উ-উ-আমার সাল্লে - চিটে মাল্লে । উদ। এটা এই দেশেরই চারপেয়ে, মানুষ, বাতিকের জ্বর হয়েছে।কিন্তু আমাদের দেশের বুলি শিখলে কোথেকে ? যাই হউক ব্যাটাকে এর একটুকু খাইয়ে দিয়ে বাঁচাতে হলো; গুজরাটে নিয়ে যেতে পাল্লে বিলক্ষণ দশ টাকা লাভ হবে। বৰ্ব্ব। তাের পায়ে পড়ি আমাকে আর পেড়াপীড়ি করি নে-আমি এখনি কাট নিয়ে যাচ্ছি। উদ। এইবার জ্বরের ধমটা এসেছে তাই এলাে মেলাে বচে; বােতল থেকে ফোঁটা কত দিতে হলাে ; পেটে যদি কখন পড়ে থাকে ত গলা থেকে নামতে না নামতেই সেরে যাবে । -এটাকে বাঁচাতে পালে হয়। বৰ্ব্ব । বুঝেছি, তোর কাপুনিতেই বুঝেছি, আর বেসিক্ষণ খাবি নি- বৈজনাে তােক ডাকছে। ওরে ওধ, হাঁ কর; যা খেতে দিচ্চি এমন আর পাবি নেতাের জ্বরের কাপুনিকে এখুনিই কঁপয়ে তুলবে—হাঁ কর ব্যাটা,হাঁ কর—আপনার পর জানিস নে;-ফের-হা কর। তিল। ক্যাম হলাে। চেনা লােকের মত গলটা যে ! উদ।

নলিনী-বসন্ত। ৪৭ তিল। বােধ হচ্চে যেন—কিন্তু সে যে ডুবে মরেচে। রাম রাম। এগুলো সকলি ভূত। গুরুদেব রক্ষা কর। উদ। অ সৰ্ব্বনাশ; চা টা পা, দুরকম কথা—এ যে বড় আশ্চর্য জানােয়ার দেখচি,-সানের মুখে ভাল বলে, আবার পেছনের মুখে গাল দেয়। যদি বােতলের সবটুকু দিলে ভাল হয় তবে তাও কবুব। আয়-তাের ও মুখে একটু ঢেলে দি আয় । কেও-উদয় ! উদ। আমার নাম ধরে ডাকে যে ; দুর্গা দুর্গা -এটা জানােয়ার নয় —ভূত – পড়ে থাক্‌-ওটাকে ঘাঁটয়ে কাজ নি। তিল। উদয় কি ?—বলি অহে যদি উদয় হও তবে একবার আমায় ছোও দেখি আমার সঙ্গে কথা কও দেখি। আমি তিলক- তােমার পরম বন্ধু তিলক উদ। যদি সত্যি হও ত বেরয়ে এসে ; ঘােট দুটো পা ধরে টানি-দেখি যদি তিলক হয়, তবে এই দুটই তার পা। আরে তাই ত, সেই ত বটে। আরে তুই-এখানে কোখেকে—এ কচ্ছপটার পিটের নীচে সেঁধুলি কি সে? তিল। আমি ভেবেছিনু ওটা মা–বাজপােড়া; কিন্তু ভাই-উদয় তুমি মরেছিল নয় ?—এখন মনে হচ্ছে যেন ময়রানি ঝড়টা গেছ কি ? আমি ঝড়ের ভয়েই এটার নীচে সেঁধিয়ে ছিনু। সত্যি বল ভাই, জ্যান্ত আছিস না মরেছি।-উদয় ! দেশের লােক দুজন বেঁচেছে—উদয় ! দুজন বেঁচেছে--মাগছেলেকে খপর দেবার লােক ছেল না—আবাঁচলুম। উদ। অহে অমন্ করে নাড়া চাড়া দিও না--পেটটা বড় সহজ অবস্থা নেই। বৰ্ব্ব। ভেকধারি পরি যদি না হয় ত এরা বড় সরে লােক;-ইনি ত দেবতা বিশেষ—আর সঙ্গে যে জলটুকু ছিল, সেইটুকুও মধু-আমি ওঁর কাছে একবার ভূমিষ্ট হই- উদ। তিলক তুই ক্যাম করে পার হয়েছিধ-সত্যি বলল- ১৯ নলিনী-বসন্ত। এই বােতল ছুয়ে বল্। আমি একটা মদের কুঁপােয় রসে ভাসতে ভাতে এসেছি। বৰ্ব্ব। আমাকে দেও-আমি ছুয়ে দিব্বি কচ্চি—য়ে আজ থেকে তােমার চরণের গােলাম আমি তিল। আমি সাঁতরে এসেছি—জানত আমি জলের পােকা। উদ। তবে ধর—এইতে মুখ দিয়ে দিব্যি কর। তিল। অহে উদয়, আরাে আছে—না এই ? উদ ! এই কি ? গােটা পিপেটাই রয়েছে, কিনারার ওপর একটা পাহাড়ের ভেতর লুকয়ে রেখে এসেছি। যত চা খা জলছত্তর কলে ও ফুরাবে না-ক্যামন্ রে জানােয়ার—তাের বাতিক শ্লেষ্মটা ক্যামন্? বৰ্ব। হা গা-তুমি আকাশ থেকে নেমে এসেছ বুঝি। উদ। না রে না-চাদের ভেতর থেকে এসেছি—দেখি নে চাদের ভেতর একটা মানুষ বসে থাকে --আমিই সে । বৰ্ব্ব। হাঁ, তবে তােমাকে দেখেছি বৈকি। আমার মনিবের একটি মেয়ে আছে--সেই তাে আমাকে চঁাদের ভেতর তােমাকে দেখয়ে ছেলে ;-সেই একটা হরিং কোলে করে তুমিই বুঝি বসে থাক? উদ। বেস্ বলে বাবা, বেস্ বলেছ,--আর একটুকু খাও। তিল। কি জালা এটা ত ভারী গর্দভ দেছি। বৰ্ব। এখনকার যত ভাল ভাল যায়গা দেখাব, তুমি আমার চাকর রাখবে বলে ? তিল। হা-হা-হা;-দমফেটে গেল—আর কত হাসূবাে- ব্যাটাকে ঠেঙাতে ইচ্ছা করূচে-কিন্তু জানােয়ারটা মাতাল হয়ে পড়েছে—পাপিষ্ঠ—কদাকার। বৰ্ব্ব। কোন্ শালা আর তার চাকরি করবে—ব্যাটা বেধড়ক বজ্জাৎ-বয়ে গেছে কাট বয়ে মতে—আমি এই ঠাকুরেরতল্পিদার হবাে ;-ও গাে তােমাকে এখনকার সব সন্ধান বলে দেব কাঠ, নলিনী-বসন্ত। ৪৯ বয়ে দেব-মাছ ধরে দেব—ফল পেড়ে দেব—ভাল মিঠেন জল এনে দেব—আমি তােমারই পায়ের জুতো। হাড় জুড়ােল-থানি গেল, কলা দেখয়ে বুনাে পালাল- আহ্ ত যাব না। থাগে পড়ে মনিব, ব্যাটা, খুজে নিগুগে পারে যটা, তার কপালে মুড়া ঝাটা হা-হা-হাঃ। তিল। বাপ রে-কি চীৎকা;-এটা কি জানোয়ার হ্যা ? বৰ্ব। পেয়েছি নূতন মনিব, সুখে থাকুকু আরত যাব না, আমি আর—আত যাব না ; মাছ ধরূতে, ঘুনি পাতুতে ধেউড় কঁাদে করে, আমি ত আ ত যাব না। খুজে নিগৃগে-অন্যকে সে কঃ-কঃ-ক-কলাটি আমার, আমি আর তু যাব না। উদ। বেস্ বাবা- চলো আগে আগে চলাে। (সকলের প্রস্থান।

তৃতীয় অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক কাষ্ঠ বৈজয়ন্তের কুটিরের সম্মুখ ভাগ। ( বৃহৎ একখণ্ড স্কন্ধে করিয়া বসন্তের প্রবেশ ।} বস। অনেক আমােদালাদ আছে এ সংসারে বহু কষ্ট ব্যতিরেকে সম্ভোগ না হয় ;- কিন্তু সে কষ্টের কষ্ট আনন্দে ঘুচায় । কাৰ্য্য অনুরােধে কভু উঞ্ছবৃত্তি করে অসম্ভব ফললাভ অকস্মাৎ হয়। যে কাজে প্রবৃত্ত এবে, আম হেন জনে। ইহা কি সম্ভবে কভু ?-কিন্তু ভৃত্য যার, এ দাসত্ব যার জন্যে সেই শশিমুখী • মৃত দেহে প্রাণদান, নিরানন্দে সুখ, করিছেন বিতরণ-আনন্দরূপিণী । আহা! কি দয়ার দেহ, কোমল হৃদয় ! যেমন কঠিন হিয়া পিতার তঁাহার তার শতগুণ দয়া প্রিয়ার আমার। এইরূপে কাষ্ঠখণ্ড সহস্র গণিয়া বহিয়া রাখিতে হবে স্ত পেতে সাজায়ে- হায় কি নিষ্ঠুর আজ্ঞা !—যখনি প্রেয়সী এসে দেখে এ দুর্দশা, নয়নের জলে বক্ষঃস্থল ভাসে—আর কেঁদে কেঁদে বলে “হেন ভাগ্যে হেন দশা ঘটাইল বিধি।” কচি কি ভ্রমেতে ভুলে প্রেমের প্রলাপে! । --- নলিনী-বসন্ত। ৫) কিন্তু এই সুবােধ চিন্তাই আমার জীবনের সুখামৃত,-মগ্ন যতক্ষণ থাকি আমি এ চিন্তায়, শান্তি ভুলি সব। (নলিনীর প্রবেশ ;-এবং চিকিৎদূরে অস্পষ্টভাবে বৈজয়ন্তের প্রবেশ ।) নলি। কি অভাগ্যি! হা অদৃষ্ট !–ওগাে ক্ষণকাল তিষ্ঠ তুমি এই স্থানে-কর ক্লান্তি দূর । ঘন ঘন ঘর্মবিন্দু ছুটিছে ললাটে হায় রে কি পরিতাপ।--বামলে কেন দগ্ধ হয়ে ছারখার না হয় এ সব ? দিতেছে যেমন কষ্ট,: আগুনে জ্বলিয়া পুড়ে ছারখার হাে-পাঠে মগ্ন পিতা, ওগাে এই অবসর—দণ্ড দুই কাল তুমি নিরুদ্বেগে থাক। বসু। হায় ! প্রিয়ে এখনি যে সূর্য অস্ত হবে, আসিবে তিমির নিশি, সন্ধ্যা না হইতে শ্রম সাঙ্গ করা ভাল। নলি। ক্ষণেক তিষ্ঠগাে তুমি—আমি লয়ে যাই, থুয়ে আসি কাষ্ঠভার তােমার হইয়ে দেও, ও বােঝাটি দেও, আমার মাথায়। বস। না না, হৃদয়েরি। তাও কি সম্ভব ? নবীন অধিক অই কোমল অঙ্গেতে তুমি ব্যথা পাবে, আর আমি রব বসে? তার চেয়ে পৃষ্ঠদণ্ড খণ্ড হােক মাের। 'শিরা, অস্থি মাংসপেশী চূর্ণ হয়ে যাক্। নলি । এ কাজ করিতে যদি তােমাকেই সাজে, কি লাজ আমার তবে—আমায় সাজিবে ; তােমা হােতে শীঘ্র আরাে পারিব করিতে ;

নলিনী-বসন্ত। ন আমার সাধের কষ্ট সহজে সহিব, তােমার অনিচ্ছা এতে-কষ্ট হবে কত ! বৈজ। (স্বগত বােঝা গেছে, বােঝা গেছে--বিহঙ্গ আমার পড়েছে ব্যাধের জালে। নলি। আহা! তুমি নিতান্তই কাতর হয়েছ। বস। না, ধনি! না সীমন্তিনি! ভুমি হেন শশি উদয় হয়েছ যবে দুখের নিশিতে, এ নিশি প্রফুল্লতম উষাই আমার। প্রিয়ে। নামটি কি?—অন্য ইচ্ছা নাই ওহে তব নাম লয়ে ধেয়াব পরমেশ্বরে, তাই এ জিজ্ঞাসা ;--প্রিয়ে। নামটি কি ? নলি। নলিনী-- ওমা, আমি কি কল্লেম-পিতার নিষেধ বিস্মৃত হলেম, হায়! ধন্য ধনি হে নলিনি! এ জগতে তুমি অমূল্য বস্তুর সার—আশ্চর্যের চূড়া, হে সুন্দরি ! এ বয়সে শুনেছি অনেক কামিনীর কণ্ঠস্বর পিযুষ লহরী, শ্রবণকুহর ভরে পিয়াসা জুড়ায়ে ; দেখেছি নিমেষশূন্য নয়নে অনেক রমণীর অপরূপ রূপের মাধুরী । কিন্তু আহা নিকলঙ্ক নির্মল এমন একাধারে সর্বগুণ চক্ষে দেখি নাই ; রূপে গুণে সকলেরি কলঙ্কের লেশ আছে কিছু-তুমি প্রিয়ে স্বর্গের প্রতিমা। প্রাণেশ্ববি! প্রজাপতি গঠিল তােমায় ব্ৰহ্মাণ্ডের রূপ গুণ একত্র করিয়া । নলি। রমণীর রূপ নয়নে হেরি নে ;

নলিনী-বসন্ত। ৫৩ == আপনারি প্রতিবিম্ব হেরেছি দর্পণে ; পুরুষও দেখেছি যাহা অধিক তা নয়— পিতা আর তুমি ভিন্ন-তুমি হে সুহৃৎ- অনন্য কভু দেখি নাই ;-অন্যত্রে কি রূপ মানবের অবয়ব তাহাও জানিনে ; কিন্তু কহিতেছি সত্য কৌমারের নামে যে কৌমার সবে মাত্র সম্পদ আমার তােমার সঙ্গিনী ভিন্ন পৃথিবী ভিতরে অন্য কারাে অনুগামী হােতে ইচ্ছা নাই ; ভেবেও পাই না ধ্যানে তুলনা তােমার। কিন্তু বৃথা কেন হেন প্রগল্ভা হতেছি, বারম্বার ভুলিতেছি পিতার নিষেধ। বস। প্রাণের নলিনি।আমি রাজার তনয় ; অথবা নৃপতি বুঝি হয়েছি এখন আমি কি হে করিতাম দাসত্ব স্বীকার, জঘন্য এমন বৃত্তি ?—নিকটে আসিতে পারিত কি এইরূপে মক্ষিকা সকল ? শুন বলি মন খুলে, কি হেতু হে তবে, এ দাসত্ব করি আমি কি হেতু মন্তকে বহি, এ কষ্টের ভার-ও চন্দ্রবদন- কি সুধা যে আছে হােতা বুঝিতে না পারি— দেখিলাম যে মুহূর্তে, অমনি পরাণ ছুটিল ভােমার অই চরণ সেবিতে ; তােমারি জন্যেতে প্রিয়ে, দাসত্ব আমার। নলি। আমারে কি ভাল বাস ? বস। চন্দ্র, সূৰ্য, বসুন্ধরা -সাক্ষী হও সবে, সত্য যদি বলি তবে বাঙ্গাসিদ্ধি করাে, প্রতারণা মিথ্যা,যদি থাকে এ কথায়, নলিনী-বসন্ত। ক তবে যেন আশাতৃষ্ণা সব মিথ্যা হয়, এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড মাঝে সবার উপরি, ভালবাসি, ভক্তি করি, তােমায় সুন্দরি ! নলিহায় রে অবােধ মন!-আনন্দ সংবাদে কঁদিতেছি কেন আমি ! বৈজ। আজি এ দোহার প্রেম জগতে দুর্লভ একত্রে মিলন হলো!—হে ত্রিদিববাসী, প্রসন্ন হইও দেৰ, এদের সন্তানে! বস। কাচ কেন ? নলি। কঁদি, নাথ, আপনারি হীনতা ভাবিয়ে ; মনে করি দিয়ে যাহা: পূরাই বাসনা, মনে করি নিয়ে যাহা জুড়াই জীবন, দিতে নারি, নিতে নারি, সাহস করি। দূর হােতূ এ কথায়- বৃথা. এ সকল ! গােপন করিতে চাই যতই ইহাতে ততই প্রকাশে, আরােমনের বেদনা , যারে লজ্জা, কপটতা, দূর হয়ে যা, এসে সরলতা দেবি, বসাে রসনায়, মনের বাসনা যাহা প্রকাশিয়া, দেও। হৃদয়-বল্লভ, তুমি আমি ভাৰ্য্যা তব, যাদি হে সম্মত হও-নতুবা তােমার দাসী হব যতকাল পরাণে আঁচিব সম্মত না হােতে, পার সঙ্গিনী করিতে | কিরী করিতে. কিন্তু নারিবে এড়াতে। স। প্রিয়তমে প্রাণপ্রিয়ে!—তােমারি হে আমি থাকিলাম পদাশ্রিত জন্ম জন্মকাল । নলি। তবে তুমি পতি হলে? বশ। কারাবন্দী ব্যগ্র যথা, বন্ধন জিতে, ; [ নলিনী-বসন্ত। ৫৫ তেমতি আগ্রহ সহ, হলাম তােমারি ; এই ধর করশাখা দিলাম, প্রেয়সি ! নলি। আমারাে পরাণ, আমি, অহে প্রাণনাথ। দিলাম ইহারি সঙ্গে ;-বিদায় এখন, অর্ধ দণ্ড পরে এসে করিব সাক্ষাৎ। বস। বিদায়-জীবেতেশ্বরি! (আলিঙ্গন)। [ উভয়ের প্রস্থান। বৈজ। (স্বগত) আহলাদ বিস্ময়ে এরা মােহিত হয়েছে । না. সম্ভবে এ আনন্দ আমারে কখনাে ; কিন্তু মম অদৃষ্টেতে হবে নাক আর এমন সুখের দিন।—এথন: পাঠেতে বসিয়া করিগে পুনঃ অন্য আয়ােজন ; হবে শীঘ্র সমাপিতে, সন্ধ্যা না হইতে। ( প্রস্থান। তৃতীয় অঙ্ক। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। (বৰ্কট, উদয় এবং তিলকের প্রবেশ।) বৰ্ব। কুর্তা, আজ্ঞা হয় তু আমার সেই কথাটা বলি। উদ শুবাে বই কি, বল্ ; হাঁটু পেতে বােস, বসে, যােড়- হাত করে বল্ওমরাও. সাহেবদের কাছে, খােসামুদে ওমেদ- ওয়ার বাবুরা যেমন্ করে বলে, তেমনি করে বল;-ধর, আগে একটুকু খেয়ে নে।

( ৫৬ নলিনী-বসন্ত। তিল। অহে! ওটাকে আর দিও না; ব্যাটা মবে যে- চো দুটো বসে গেছে। উদ। অহে! ও কি তেনি জানােয়া-আজকাল ভাল মানুষের ছেলেদের দুচার বােতল ওডটমেই কিছু হয় না, তা এই আদ মানুষ আদ জানােয়ারটার এতে কি হবে!-আঁ, তার পর ? তিল। ও কি !-ও হলাে না;-ওমরাও সাহেব সুবােরা ওমেদওয়ার বাবুদের যেমন্ করে দু এক ঘা জুতাের তত দিয়ে আলাপকুশল করে, তেনি ধারা দু এক ঘা দেও, তবে ত হবে। বর্ব। তােকে দু এক ঘা দিগ ;-এই দেখ, আমিই না হয় দু এক ঘা দি। তিল। পাজি বজ্জাৎ-ষত বড় মুখ, তত বড় কথা । বৰ্ব। দেখলে—দেখলে—আমায় গালাগালি দিচ্ছে- কৰ্ত্তামশায় ওকে তুমি কিছু বলবে না? উদ। ওহে তিলক থেমে যাও, সাবধানে কথাবার্তা কও। ও আমার ভৃত্য, অপমানের কথা সইতে পারে না। বল তুই কি বলছিলি বল। '( অদৃশ্যভাবে সুমালীর প্রবেশ ।) বৰ্ব। বলেছিই ত, আমি একজন নিষ্ঠুর পাষণ্ডের হাতে পড়েছি ;-সে বেটা ভেল্কী জানে আমাকে যাদু করে ফাঁকি দিয়ে আমার হাত থেকে এই রাজ্যটা কেড়ে নিয়েছে। সুমা। দূর-মিথু। বৰ্ব। তুই মিথুক্-তাের বাপ মিথুকদাতকেলানে বাদর । উদ। তিলক! ফের যদি ওর কথায় বাগড়া দেও ত এক কিলে দুপাটী দাঁত উপড়ে ফেলব। তিব। আমি ত কিছুই বলি নি উদ। তবে চুপ কর ;-বল তুই বল বৰ্ব। সেই হাড় পেকে বাজীকর ভেল্কী করে আমার হাত নলিনী বসন্ত। থেকে রাজ্যটা ফাঁকি দিয়ে নিয়েছে তাকে যদি জব্দ করতে পার ;-আমি জানি তুমি পারবেই-ও পােড়ার মুকো হনুমানের মত ত নয়—ভয়েই অস্থির। উদ। ঠিক, ঠিক্তা বই কি। বৰ্ব্ব। তা হলে তুমিই এখান্ কার রাজা, আর আমি তােমার মােড় হবাে। উদ। তাই ত রে–ক্যামন্ করে সেটা হয় বল দেখি একবার তাকে দেখাতে পারি? বর্ব। মশাই গাে এক্ষণি, এক্ষণি;—সে ঘুময়ে থাকবে, আর আমি তােমাকে তার কাছে ছেড়ে দেব-কাছে না গিয়ে মাথায় এক ঘা গুলবসান লাঠি আচ্ছা করে বসয়ে দিলেই- সুমা। তাে বাপের সাধ্যি ব্যাটা মিথু! বৰ্ব। আ মলাে—এটা কি নচ্ছা। দূর কচুখেকো-কলা পােড়াটী খাও,—মশায় একে ঘা কত দেও ত, আর ঐ বােতলটা কেড়ে নেও ত। ব্যাটা বােদা জল খেয়ে মরূবে এখন-কোন্ শালা ওকে পাহাড়ের ঝরণা দেখুঁয়ে দেবে। উদ। তিলক আর বাড়াবাড়ি না ;-ফের যদি আধ, খানি কথা মুখে আন ত মাইরি বলচি, মাথাটা কিলিয়ে আট থানা করে ফেলব। তিল। কই আমি কি বলুচি- কিছুই ত বলি নি ;-কাজ নেই বাবু সরে দাড়াই। উদ। ক্যান বল্লিনে যে ও মিছে কথা বলছে। সুমা। তুই মিছে কথা বলছি। উদ। আমি ? হঁারা শালা, আমি ? - তবে এই দ্যাখ, ( মুষ্টি প্রহার)-ক্যামন, আর একবার বলে দেখ না, আমি মিছে কথা বচি ? তিল। কই এমন কথা ত আমি বলিনি। কাণের মাথা খেয়েছ-বােটার মুখে আগুন; মদ খেলে এমনিই হয় বটে- *.

নলিনীধসম্ভ। বৰ্ব্ব । বাপ ভাই জ্ঞান থাকে না ; তােমার হাতে কুড়িকুষ্ঠি হয় না ; আর এই পাজি নচ্ছার কাণকাটাটাকে যমে ধরে না? বৰ্ব। হা হা হা ! । বল্ তুই বল্ , যা তুই সরে দাড়া। বৰ্ব। বেস্ : বেস্ ভাল করে ঘা কত দেও—তার পর আমিও একবার উত্তম মধ্যম করব। উদ। যাও সবে দাঁড়াও।—বল, তুই বল,তার পর। সে প্রত্যহ দুপর বেলা ঘুমােয় ; সেই সময় না গিয়ে, পুথি গুলাে সরয়ে ফেলে, মাথায় ঘা কত লাঠি, না হয় পেটে একটা বাঁশের ডগালি, না হয় ত তােমার ঐ ছােরাখানা দিয়ে গলাটা দুচির কল্লেই অক্কা পাবে। কিন্তু সাবধান্ আগে তার সেই পুথি গুলাে সাত, করতে হবে, সে গুল না থাকলে আমিও যেমন মদ, সেও তেমনি। সে ব্যাটা সবায়েরুই দুচোখের বিষ,--কিন্তু সাবধান পুথিগুলাে আগে পুড়িয়ে ফেলল,সেই গুলােতেই ব্যাটার বেতালসিদ্ধি ; তাই থেকে কি বিড় বিড় করে পড়ে, আর এক বারে দু শ, চার শ ভূত, প্রেত, দানা, দক্ষি এসে উপস্থিত হয়— আর যা বলে তাই করে। আবার তাও বলি, তার যে একটি মেয়ে আছে যে টুকটুকে মাকাল ফল।আমি মেয়ে মানুষ কখন দেখিনি --কেবল ত্রিজটা মাকেই দেখেছি—তা মনে হয় যেন আকাশ পাতাল তফাৎ। উদ। অ বলিস কি ? অ্যামন সুন্দরী। বৰ্ব। মাইরি বলচি -সে তােমারই উপযুক্ত—বিছানা ভালো করে থাকবে—আর সােণার চঁাদ সব ছেলে বিয়ােবে। উদ। অরে কচ্ছপদাস, আমি সে ব্যাটাকে মারবই মার, ব ; আর সেই সুন্দরীকে (হরি হরি) রাণী করে, এখানকার রাজা হব। তুই আর তিলক দুজন আমার সুবেদার হবি ; ক্যাম তিল এতে মত আছে ত? তিল। তুমি যা বলছ, তার কি আর অন্যথা ? } নলিনী-বসন্ত। উদ। তাইত বটে এসাে একবার কোলাকুলি করি ; তােমার গায়ে হাত তুলে কাজটা ভাল করিনি; অমন্ ধারা এলাে মেলাে আর কখন বকো না । বৰ্ব্ব। তবে আর দেরি ক্যান --সে এখুনি ঘুমবে- চল যাই। ( অন্তরীক্ষে গান বাদ্য) উদ। ও কি ? তিল। তাই ত—কেও-কেউ কোথাও নেই—এ যে- উদ। কে রে তুই?. হাত পা থাকে ত এখনি দেখা দে, আর না হয় ত এই যমের বাড়ি যা - (শূন্যে অস্ত্রাঘাত) তিল। গুরুদেব, রক্ষা কর । উদ। মলে ত আর কোন শালার কর্জ শুধূতে হবে না; তা ভয় কি–দুর্গা দুর্গা। বৰ্ব। তােমরা ভয় পেয়েছ না কি ? উদ। না রে বক্মট, আমি না- ভয় কি গাে ; এ দেশেতে শব্দ মনােহর হস নিত্য দিবানিশি গীত বাদ্যধ্বনি, কখন কঠোর, কভু মধুর ঝঙ্কার ; অনিষ্ট ঘটে না তাতে, সুধাবৃষ্টি হয় কভু বাজে শত শত বেহালা সেতার মৃদু মৃদু মধুস্বরে কভু ধীরে ধীরে ললিত কণ্ঠের স্বর শ্রবণ জুড়ায়। জাগি যদি নিদ্রাভঙ্গে, নিদ্রালু করিয়া করে দেহ অবসন্ন নিদ্রায় আবার , স্বপনে কতই দেখি আশ্চৰ্য্য অদ্ভুত গগন ফাটিয়া যেন হীরক কাঞ্চন ঢালে শিরে:রাশি রাশি—যেন বা কথন অমরাবতীর দ্বার দেথায় খুলিয়া।' === বৰ্ব্ব।

নলিনী-বসন্ত। উদ। নিদ্রাভঙ্গ হলে আর কিছুই থাকে না ; কঁদি কুত সেই স্বপ্ন দেখিতে আবার । উদ। রাহবা, বড় মজার রাজত্ন পাব-নিথরচায় গান বাজনা শুনব-বহুত আচ্ছা। বৰ্ব্ব । বৈজনােকে মাল্লে তার পর ত। । সে ত হবেই ; রয়ে, রয়ে—সে কথা ভুলিনি, মনে আছে। তিল। অহে ঐ শব্দটা চলে যাচ্ছে, চলাে আমরাও ওর সঙ্গে সঙ্গে যাই—তার পর দেখা যাবে। উদ। চরে বৰ্বট, চ—এগাে। আমি এই বাজয়েকে একবার দেখতে পাই, বাহবা ক্যামন বাজাচ্ছে ! তিল। উদয় যাবে ত এগও, আমি তােমার পেচু পেছু যাই। সকলের প্রস্থান। তৃতীয় অঙ্ক। তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। দ্বীপের অন্য এক ভাগ । (চিত্ৰধ্বজ, মন্ত্রী প্রচেতা, কৃপ এবং অনন্ত প্রভৃতির প্রবেশ । ) মন্ত্রী। ( উপবেশন করিয়া) মহারাজ! অপরাধ অর্জমা করূবেল—আমি আর পারিনে ; আমার জীর্ণ অস্থিগুলো জর জর হয়েছে; হাত, পা, কোমর, যেন ভেঙে পড়চে ; আমি একটুকু না বলে আর চলতে পারি নে।

নলিনী-বন্ত। • চিত্র। বৃদ্ধমন্ত্রি, তােমাকে দোষ দেব কি, উৎসাহভঙ্গ হয়ে আমিই শ্রান্ত হয়ে পড়েছি বসাে একটু বিশ্রাম কর। এই খানেই আমি আশা ভরসা পরিত্যাগ কল্লেম ;-মিছে আর কেন ঘুরে বেড়ান ; যার জন্যে এত কষ্ট, সে সমুদ্রে ডুবেছে, পৃথিবীতে অন্বেষণ কল্লে আর কি হবে ;-হা পুত্র ! অন। (জনান্তিকে) যত হতশ্বাস হয় ততই ভাল ;-অহে কৃপ, একবার ব্যর্থ হয়েছে বলে সঙ্কল্পটা ছেড়ােনা। কৃপ। ফের একবার সুযােগ পেলে হয়, এবার আর এড়াবে না। অন। তবে আজ রাত্রেই ;-কেন না, ওরা পথশ্রান্তিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে—আজ তত সজাগ থাকবে না। কৃপ। ভাল, তবে আজই।—থা আর ও কথায় কাজ নাই। ( গম্ভীর অদ্ভুত বাদ্যধ্বনি; এবং অদৃশ্যভাবে শূন্ঠে বৈজয়ন্তের প্রবেশ ।-অন্ন ব্যঞ্জনের পাত্র হস্তে নানাবিধ অদ্ভুতাকার ললাকের প্রবেশ। অন্নব্যঞ্জনের পাত্ৰাদি রাখিয়া তাহার চতুর্দিকে প্রদ- ক্ষিণ করিতে করিতে নৃত্য এবং নম্রভাবে আকারেঙ্গিতে রাজাকে ভােজনে আহ্বান করিয়া সকলের প্রস্থান।) চিত্র। অহে অমাত্য, শােনাে,-এ আবার কিরূপ বাদ্য। মন্ত্রী। আহা—অতি আশ্চৰ্য্য—চমৎকার ! কৃপ। এমন তামাসা ত কখন দেখি নাই—এ কি অসম্ভব ! - কারাে মুখে শুনলে, এ সব কি বিশ্বাস হতাে? কিন্তু এখন্ আর কিছুতেই অপ্রত্যয় কব না,—বুকে মাখা, কন্ধকাট, প্রভৃতির যে সব গল্প শােনা গিয়েছে, তা এখন ভ সকলিই সত্য মনে হয়। বােঝা গেছে, দেশবিদেশ না বেড়য়ে, 'সােণারবেণেদের মত মাগ- মুখখা হয়ে বসে থাকলেই, কুঁজড়াে হয়ে যেতে হয়। মন্ত্রী। কি আশ্চর্য! গুজরাটে গিয়ে এ কথা বলে কি কেউ প্রত্যয় যাবে, যে, অমুক দেশে এরূপ কিম্ভুতকিমাকার মানুষ দেখে এসেছি ?-কথা ত মিথ্যা নয়—এরা ত এই দেশেরই ০ নলিনী-বসন্ত। . ;" লােক বটে। যাই হউক, আকার অবয়বে যতই কেন বিকৃতাঙ্গ হউক না, সভ্য জাতি বলে যত জাতি গৰ্ব করেন, তাদের অনেকের চেয়ে এরা সহস্র গুণে ভদ্র। বৈজ। (জনান্তিকে) সাধূপুরুষ—যা বচ সত্যই বটে কেন না উপস্থিত যে কজুনের মধ্যে তুমি বসে রয়েছ, এরা সকলেই নরাধম দুৰ্ম্মতি। চিত্র। তাই ত আমি কিছুই ভেবে উঠতে পাচি নে ;- এমন আকৃতি—এম অঙ্গভঙ্গি—এমন শব্দ-কথা না করে এরূপ সদালাপ ত কোথাও দেখি নি। বৈজ। ( জনান্তিকে) এখন না হে—এখন না—যাবার সময় যত পার সুখ্যাতি করে। অন। ক্যামন আশ্চৰ্যরূপে মিয়ে গেল ! কৃপ। যাক না কেন—আহার সামগ্রী গু. 1 ত রেখে গেছে, আর আমাদের ক্ষুধা নেই, তাও ত নয় । মহারাজ যৎকিঞ্চিৎ আস্বাদ গ্রহণ করূতে আজ্ঞা হয় । চিত্র। না – আমি ত না। কৃপ। ভয়ের কারণ নাই ;-যখন আমাদের গোপদাড়ি ওঠেনি, তখন কত কথাই অলীক, অসম্ভব, গালগল্প মনে ক- তুম ;-এখন ত স্বচক্ষেই সব দেলেন।-রাক্ষস পিশাচ দানা দত্যিদের যে সব কথা শােনা যেত সে সব পাহাড়ী বুনো ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়। চিত্র। কপালে যাই থাক্‌-আহার করি ;-না হয় এই আমার শেষ আহার হবে। -সুখের দিন যা, তা ফুরয়ে গেছে। -ভাই কৃপকঙ্কন ভূপতি অনন্ত-এসে তােমরাও এসে। (বজ্রনাদ এবং বিদ্যুৎ। রাক্ষসবেসে সুমালী পরির প্রবেশ, এবং অকস্মাৎ অন্নব্যঞ্জন অদৃশ্য হইল।) সুমা। স্বজাতি হিংস্রক, অরে পাপী তিন জন। ইহকালে সুখভােগ নাহিরে তােদের ;- নলিনী-বসন্ত। । অদৃষ্টই মূলাধার, এ মহীমণ্ডলে যেমন দুঞ্জিয়া তার উপযুক্ত ফল পেয়েছিস এত দিনে |--সর্বগ্রাসী দেব সাগরও তােদের নিজ উদরে না ধরে, উগারি ফেলেছে এই জনশূন্য দ্বীপে, লােকালয়ে থাকিবার অযােগ্য ভাবিয়ে। রাজা, কৃপ প্রভৃতি কর্তৃক অসি নিষ্কোষিত করা এবং তদৃষ্টে সুমালীর উক্তি।) সুমা। হতভাগ্য জন যত এইরূপে বটে আপনার মৃত্যুবা আপনিই করে ; আত্মঘাতী হয় কেহ রজ্জতে ঝুলিয়া, কেহ বা, সলিলে ভােবে ;-অরে, ও নির্বোধ। নিয়তির সূত্র লয়ে, ব্রহ্মাণ্ড ভিতরে ভ্রমণ করি অমরা ;—এ দেহে কি হয় অস্ত্রাঘাতে রক্তপাত ;-যে ধাতুনির্মিত তােদের এ করবাল, উহাতে যেমন বায়ুতে আঘাত করা, কিম্বা জলদেহে, আমারাে দেহেতে ওর প্রহার তেমতি ; পক্ষটিও খসিবে না উহার আঘাতে - অনুচরগণও মম অভেদ্য সকলি আঘাতের সম্ভবনা যদিও থাকিত, দেখ, তা ফুরায়ে গেছে—নিস্তেজ শরীর অস্ত্র উঠাইতে এবে সামর্থ্যবিহীন। শােন্ বলি –(এই কথা কলিতেই আসা) বৈজয়ন্ত সাধু ছিল কঙ্কন ভূপতি, তােরা তিন জনে মিলি তাড়াইলি তায়, অকুল সাগরজলে করিলি নিক্ষেপ, বালিকা কন্যার সহ তারে ভাসাইলি ;

৬৪, নলিনী-বসন্ত। তারি পুরস্কার ইহ, স্বর্গবাসী যত (ভুলিবার নয় তঁারা) এত দিন পরে, বৈমুখ তােমাদের প্রতি ; দেরি আজ্ঞায় ক্ষিতি, তেজ, বায়ু আদি জীবজন্তু যত সকলে করিছে এবে তােদ্রের বৈরিতা । সেই পাপে, চিত্রধ্বজ, নিৰ্ব্বংশ হইলি, হারালি প্রাণের পুত্র ; আরাে মনস্তাপ পাবি তুই যতদিন থাকিবি সংসারে ; দিন দিন যাতনায় হবে আয়ুক্ষয় অকস্মাৎ মরণের সুখও না ভুঞ্জিবি। তঁাদের আজ্ঞায়' আমি দিলাম এ শাপ। সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়া তাদের ক্রোধানল নিরারণ করিবার, হেতু অকৃত্রিম অনুতাপে হৃদয় শুধিয়া পাপ পথ পরিত্যাগ কর ভবিষ্যতে, ইহা ভিন্ন নাহি. আর-না করিবি যদি অনন্ত যাতনা তবে পাবি পদে পদে। (বজ্রনিনাদ এবং পরির অদৃশ্য হওন—পরে মৃদু বাদধ্বনি সহকারে নৃত্য করিতে করিতে পূর্বোক্ত বিকৃত শরীরীদের প্রবেশ এবং ভােজন পাত্ৰাদি লইয়া প্রস্থান।) বৈজ। বেস্ বাবা সুমালি বেস্-এই রাক্ষসের আচরণটা অতি পরিপাটি হয়েছে, তােমার অনুচারেরাও যার যে কৰ্ম্ম অতি সুন্দররূপে নিৰ্বাহ করেছে। এত দিনে আমার কুহকশিক্ষা সার্থক হলো, শত্রুপক্ষ সকলেই হস্তগত এবং উন্মক্তপ্রায় হয়েছে। দুৰ্ম্মতির কিছুকাল এই যন্ত্রণা ভােগ করুক:-আমি এক্ষণে রাজকুমার বসন্ত এবং প্রাণাধিকা নলিনীর নিকট গমন করি। [ বৈজয়ন্তের শূন্য হইতে প্রস্থান। tr.

নলিনী-বসন্ত। মন্ত্রী। কি সর্বনাশ! মহারাজ কি হলাে ! অমন্ করে উদ্ধ নেত্র হয়ে এক দৃষ্টিতে দাঁড়ায়ে ক্যান ? হা জগদীশ্বর। চিত্র। ভয়ঙ্কর! ভয়ঙ্কর!-শুনিলাম কাণে, সাগর-তরঙ্গ যেন হুঙ্কারি কহিল,- সমীরণ সেই কথা নিনাদিল যেন, বজ্রনাদ গভীর ভৈরব ভীমনাদ শুনাইল বৈজয়ন্ত ভূপতির নাম ; তাই বলি প্রাণাধিক বসন্ত আমার ডুবেছে সমুদ্রজলে, এ জন্মের মত যাই তবে আমিও সে অতল সলিলে, কর্দম শয্যায় পুত্র পড়িয়া যেখানে। [ দ্রুতবেগে প্রস্থান। কৃপ। আসে যদি একে একে, সহস্র রাক্ষসে একা পারি বিনাশিতে। অন। আমি হই সহকারী তবে সে যুদ্ধেতে। উভয়ের প্রস্থান। মন্ত্রী। হতশ্বাস, উন্মত্ত হয়েছে, মনােগত পাপ এবে জ্বলিছে অন্তরে কালব্যাপী বিষ যথা কাল বিলম্বেতে। দ্রুতগামী যত জন আছ, হেতােমর যাও দ্রুত পাছে পাছে—নিবার গে ত্বরা ;. না জানি কি কোরে বসে উন্নত-প্রমাদে। প্রটে। এসো হে সকলে এসাে। সকলেরপ্রস্থনি। ; # চতুর্থ অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। বৈজয়ন্তের কুটীরের সম্মুখ ভাগ। বৈজয়ন্ত এবং বসন্তের প্রবেশ। বৈজ। কঠিন যাতনা বাপু দিয়াছি তােমায় ; কিন্তু তার বিনিময়ে তেমতি দুলভ দিয়াছি অমূল্য ধন প্রাণের দুহিতা ; সংসারের সার বস্তু জীবন আমার ; এই ধর পুনৰ্বার করি সম্প্রদান। বুঝিতে তােমার প্রেম, এত যে যাতনা দিলাম অশেষ ক্লেশ, সহিলে যে সব, দেখাইলে প্রণয়ের অদ্ভুত ক্ষমতা। সাক্ষী হও সুরবৃন্দ করি সম্প্রদান অমূল্য দুহিতা-রত্ব দুর্লভ জগতে। হেসে না হে যুবরাজ পশ্চাতে জানিবে শত মুখে বাখানিয়া ফুরাতে নারিবে। বস । অপ্রত্যয় এ কথায় হবে না আমার, আকাশবাণীতে যদি বিপরীত কয় । বৈজ। দিলাম হে ধর তবে মম উপহার, আমার দুহিতা-রত্ন-মহা যত্নে তুমি করেছ যা উপার্জন ধর সেই ধন ; কিন্তু যদি হােম যাগ বিধানের আগে ফৌমার-কলিকা চূর্ণ করহ উহার, করিলাম অভিশাপ, তবে এ বিবাহে ফুটিব না প্রণরের সুরভি কুসুম, ফলিবে না প্রেমতরু, ক্রমে শুথাইবে;

নলিনী-বসন্ত। ৬৭ বন্ধ্যা রবে চিরকাল কলহ বিবাদে, বিষদৃষ্টি দোহাকার দোহারে পুড়াবে । জন্মিবে কণ্টকরূপ ঘৃণা, মনান্তর, এ বিবাহে পরিণামে গরল উঠিবে। বস। ঘাের অন্ধকার পুরী নিবিড় কানন, দিবস, রজনী, কিবা সময় সুযােগে, কোন স্থানে, কোন কালে, কভু যদি হয় এ ভাবের ভাবান্তর—ভ্রমে যদি কভু ভুলি এ পবিত্র প্রেম মদনের মদে, তবে যেন যত আশা কামনা করেছি ভুঞ্জিতে প্রণয়-সুধা দীর্ঘজীবী হয়ে, হৃদয়ের জ্যোৎস্নারূপ সন্তানে হেরিতে- সব যেন ভস্ম হয় দাবদগ্ধ প্রায়। ছবজ। সাধু, পুত্র, সাধু, সাধু-একত্রে দুজনে বসাে বাপু এই স্থানে কর সদালাপ ; তােমারি এখন এই দুহিতা আমার। সুমালি !—কোথারে, তুই, আয় বাপ আয়, সুমালি ! ( পরির প্রবেশ।) সুমা। এই যে এসেছি প্রভু। বৈজ। বেস, বাপ, বেস ; রাক্ষসের কৌতুকটী অতি পরিপাটি দেখায়েছ অনুচর পরিগণ সহ, তাহারাও দেখায়েছে অদ্ভুত কৌশল। সেইরূপ আর এক আশ্চর্য কৌতুক দেখাইতে হবে পুনঃ, আছি প্রতিশ্রুত কন্যা জামাতার কাছে,যাও শীঘ্র যাও, দলবল সঙ্গে লয়ে শীঘ্র এসাে ফিরে ;

নলিনী-বসন্ত। পাও শীঘ্র যাও। সুমা। যাব তড়িতের ন্যায় ফিরিব চকিতে। বৈজ। বাপ আমার যাও শীঘ্র—এসসা শীঘ্র ফিরে দেখাে আমি না ডাকিলে এসাে না নিকটে। সুমা। বুঝেছি বুঝেছি, আর বলিতে হবে না। [ প্রস্থান। বৈজ। সাবধান দেখাে যেন সত্য রক্ষা হয়। প্রমত্ত বিলাসে অত অধৈৰ্য্য হইও না ; হৃদয়ে জ্বলিলে শিখা, সহস্র শপথ তৃণতুল্য দগ্ধ হয় তিলার্ধ ভিতরে ধৈৰ্য্য ধর, নতুবা যে সঙ্কল্প করেছ ব্রাহ্মণায় নম বলি কর উদ্যাপন । কস। ভয় নাই মহাশয়, শােণিত উত্তাপ শীতল করিতে স্নিগ্ধ প্রণয়ের বারি হৃদয়ে রেখেছি তুলে—সতীত্ব যেমন পতিহীনা রমণীর হৃদয় মাঝারে । বৈজ। সাধু-সাধু! সুমালিরে আয় তবে বেশ ভূষা করে। কথাটি, কইও না কেহ, দেখ স্থির হয়ে। (লক্ষ্মী এবং চপলার বেশে দুই জন পরির প্রবেশ।) লক্ষ্মী। ওগাে চপলা; ভাল আছিস ত ? স্বর্গের সকলে ভাল আছেন ত ? -তােদের রাণী শচী কোথায়? রতি এবং কামদেব এখন কি তার কাছেই থাকে; না সেই বিবাদ উপলক্ষ করে অমরাবতী পরিত্যাগ করেছে ? চপ। আপনি ভাল আছেন?—বৈকুণ্ঠনাথের প্রসন্নভাব ? আমাদের সকল মঙ্গল বটে, অমরনাথের সঙ্গে মন্মথের 'যে মনা- ন্তর হয়েছিল, ভালয় ভালয় মিটে গিয়েছে - এখন রতির সঙ্গে তিনি অমরাবতীতেই আছেন।

নলিনী-বসন্ত। ৬৯। লক্ষ্মী। ওরে চপলে!—শচীর সঙ্গে একবার দেখা করতে ইচ্ছা হয়েছে, অনেক দিন দেখা হয় নি, তুই একবার তারে সমাচার দিয়ে আয় না -তুই ত পলকে জগৎ ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমণ করতে পারিস। ইন্দ্রধনুরূপ ছটা মাথায় দিয়ে মেঘের কোলে কত খেলাই খেলাস - যা না একবার। কিন্তু দেখিস বিলম্ব করিস্ নে–মেঘের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাের ত আর কিছুই মনে থাকে না—শচীদূতি, যা একবার যা। চপ। আর যেতে হবে না, অই তিনি আছেন। লক্ষ্মী। তাই ত, শচীই ষে। চলনেই টের পেয়েছি । স্বর্গের রাণী না হলে, অমন সদর্প পদবিন্যাস আর কার ? ( শচীর প্রবেশ।) শচী। কে ও নারায়ণী।শ্রীকান্তের কুশল ? আজ আমার সুপ্রভাত, কতদিনের পর সাক্ষাৎ হলো।-অমরনাথ সে দিনও তােমাদের কথা বলছিলেন—আমাদের এবারে ভুলে গেছেন। অমরাবতীতে ত আর পদার্পণ হয় না। তবে এখানে কি মনে করে ? লক্ষ্মী। এই নববিবাহিত দম্পতীকে আশীর্বাদ করতে এসেছি। চলাে, দুজনে গিয়ে আশীর্বাদ করে আসি। - এ দুটি অতি পুণ্যাত্মা। শচী। চল, চল। লক্ষ্মী। ( ধান দুৰ্ব্বা: লইয়া) করি, আমি আশীৰ্বাদ, থাক দোহে নিরাপদ, অচলা ভাণ্ডারে থাক ধন। সুবুষ্টি পালিত ধরা, তরুলতা ফলে, ভরা, শস্য ভার করুত্ব বহন। বসন্ত নিয়ত বাস, পরিয়া কুসুমবাস, আসিয়া থাকুক ধরাতলে, ৭০, নলিনী-বসন্ত। ঘুচুক সকল দুখ, দেখ সন্তানের মুখ, পাল অম্নে দরিদ্র কাঙালে। এই আশীৰ্বাদ লও জন্ম জন্ম সুখী হও, নারায়ণে ভেবাে ইহকালে। শচী। অনন্ত যৌবন, লভ দুইজন, রাজ্য সুশাসন, প্রজার পালন সদানন্দ মন, কর সর্বক্ষণ নিরাপদে কাল হর ; বিপক্ষের কাল, স্বপক্ষের বল্ । প্রতাপে প্রবল, দেশমুখােজ্জ সম্প্রীতি কুশল, প্রণয়ে সরল ঐশ্বর্য কিরীট পর ; এই আশীর্বাদ করি নিরাপদ অতুল সম্পদ, আহলাদ আমােদ লয়ে থাক নারী মর! বস। অদ্ভুত কৌতুক ইহা দৃশ্য মনােহর, সুশ্রাব্য মধুর ভাষ শুনিতে কোমল ; ঘুঝিবা ইহারা সবে হবে দেবযােনী ! , বৈজ। দেবযােনী বটে এরা অন্ধকূপ হতে মন্ত্রবলে আনিয়াছি রহস্য দেখাতে। বস। ইচ্ছা হয় এই স্থানে থাকি চিরকাল। এ হেন অদ্ভুত জায়া, প্রবল শ্বশুর হবে এ কৈলাসধাম কিম্বা স্বর্গপুর! বৈজ। . থামাে বাপ, কাণে কাণে লক্ষ্মী আর শচী পরামর্শ করিতেছে অতি মৃদুস্বরে ; আরো বুঝি হবে কিছু ;- (স্বগত) প্রায় বিস্মরণ হয়েছিনু দুষ্টমতি বৰ্কটের কথা ; '।

নলিনী-বসন্ত। ৭১, বৈজ। ষড়যন্ত্র করেছে সে বধিতে আমারে, সহকারী দস্যসহ, দুরাত্মা পামর ; এতক্ষণ বুঝি তারা এসেছে কুটীরে । ( পরিদিগের প্রতি) পরিপাটী রহস্যটি হয়েছে হে বাপু, এখন গমন কর সকলে স্বস্থানে। বস। হঠাৎ এরূপ কেন হলেন উতলা ? দেখ প্রিয়ে, পিতা তর ক্রোধেতে অধীর হয়েছেন অকস্মাৎ! নলি। তাই ত গা, কেন হেন ? কখন ত আগে দেখি নাই ক্রোধানল জ্বলিতে এমন ! অহে বাপু, ভয় নাই, স্থিরচিত্ত হও; লীলা হলাে সমাপন।-এ রঙ্গভূমিতে সেজেছিল যত পরি করি নটবেশ, বায়ুর পুত্তলি তারা মিশিল বায়ুতে,-- মিশিয়া হইল লীন তরল আকাশে । হবে লীন এইরূপে, ইহাদেরি মত, মাটীর পুত্তলি য়ত মানব এ ভবে ; পাষাণের অট্টালিকা অভ্রভেদী চূড়া, দেউল, মন্দির, মঠ, উন্নত শরীর, রাজ নিকেতন কিম্বা দেব-অট্টালিকা আভাময়ী, রত্নময়ী—চূর্ণ হয়ে যাবে । এই যে মহীমগুল ফণীন্দ্র আসনে, পয়ােধি, পৰ্বত, বৃক্ষ, প্রাণিবৃন্দ সহ,, এও ধ্বংস হবে শৈষে-চিহ্নটি না রবে ! অসার স্বপ্নের ন্যায় নিদ্রায় বেষ্টিত অনিত্য আমরা সবে অনিত্য জগতে ! বিরক্ত হইও না বাপু, অথৰ্ব্ব হয়েছি, १२ নলিনী-বসন্ত। " - সদা ভিক্ত হয় চিত্ত জরাজীর্ণ দেহে। ইচ্ছা যদি হয় তবে প্রবেশি গুহায় বিশ্রাম করগে দোহে আমি ক্ষণকাল, এই স্থানে বেড়াইয়া শীতল বাতাসে, জুড়াই উত্তপ্ত তনু। নলি এবং বস । শান্তিলাভ "অচিরাৎ হউক তােমার । [উভয়ের প্রস্থান। বৈজ। সুমালি নিকটে আয়, বিদ্যুতের গতি। যাও, গৃহে যাও দেহে। (সুমালীর প্রবেশ।) সুমা। প্রভুর কি ইচ্ছা ? স্মরণ মাত্রে ভৃত্য উপস্থিত। বৈজ। হে সুমালি ! দুষ্ট বৰ্বটের যড়যন্ত্র-ব্যর্থ করবার কি ? সুমা। আপনি যখন কন্যা জামতাকে রহস্য দেখাচ্ছিলেন সে কথ আমারও মনে হয়েছিল ; কিন্তু পাছে বিরক্ত হন্ ভেবে আপনাকে বলতে সাহস করি নাই। বৈজ। সেই পাজি নচ্ছারদের কোথায় ফেলে এসেছ বছিলে? সুমা। আপনাকে স্ত বলেছি সুরাপানে সকলেই যেন মত্ত হয়ে উটেছে ; ভারী ঝাঁঝ, কাছে এগােয় কার সাধ্যি ; বাতাস মুখে লাগচে, মাটি পায়ে ঠেচে, তাতেই আস্ফালনের ধূম দেখে কে ? হয় তত বাতাসেই ঠেঙাচ্চে নয় ত মাটিতেই লাথি মাচ্চে। যেন কতই বাহাদুর হয়েছে। কিন্তু তবুও বজ্জাতের আসল মতলবটা ভােলে নি। তাই দেখে আমি বেহালা বাদ্য আরম্ভ কল্লেম। বাজনা শুনেই একবারে যেন মােহিত হয়ে গেল। ঘােটক শাবকেরা যেমন নাসিকা, কর্ণ, চক্ষু বিস্তার করে স্তব্ধ হয়ে শােনে, তারাও তেমনি করে শুতে লাগলাে। বাজনা শুনে এমনি মােহিত হলাে যে, গাভী বৎসসকল যেমন হাম্বা রব শুনে গাভীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছােটে, তাহারাও তেমনি কণ্টকাকীর্ণ কুশাচ্ছন্ন বনের ভেতর দিয়া আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটতে ;

; ; বর্ব। মশাই গো, রাগ করবেন না; এ কষ্ট এখনি ঘুচবে- নলিনী-বসন্ত। লাগলাে। পরিশেষে আপনকার কুটীরের বাহিরে পচা পানা পুষ্করিণীর ভিতর প্রবেশ করিয়ে ছেড়ে দিলুম; সেই পুষ্করিণীর গাঢ় পঙ্কে বন্ধ হয়ে, এ গলা জলে দাঁড়ায়ে সকলে ছট ফট করছে। বস। উত্তম করেছ ; ঐরূপ অদৃশ্যভাবেই আমার কুটীর হতে মন্ত্রপূত পরিচ্ছদটা নিয়ে এসাে-দস্যুদের ধরূতে হবে। সুমা। যে আজ্ঞা।- [ প্রস্থান। বৈজ। নারকিপিশাচ -দুরাত্মার এনি অসৎ প্রকৃতি, যে কতই যত্ন পরিশ্রম কল্পম—কত উপদেশই দিলুম, সকলই ব্যর্থ— সকলই নিস্ফল হলাে। বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে ক্রমে যত কুশ্রী আর কদাকার হচ্ছে, অন্তঃকরণটাও তেম্‌নি ক্র হচ্ছে। সব ব্যাটাকে উত্তমরূপ শাস্তি দিতে হবে-যেন চীৎকার কতে করতে নিশ্বাস রােধ হয়ে প্রাণত্যাগ করে। (সুমালীর পরিচ্ছদ লইয়া পুন: প্রবেশ ।) (দেও—পরয়ে দেও। উভয়ের অদৃশ্যভাবে অবস্থিতি।) ( আদেহ বৰ্কট, উদয় এবং তিলকের প্রবেশ ।) বৰ্ব। দোহাই তােমাদের, একটুকু আস্তে আস্তে পা ফেল। ইদুর বেরালটি পর্যন্ত যেন টের না পায়। এখন আমরা তার কুটীরের মধ্যে প্রবেশ করেছি। উদ। অরে ব্যাটা কচ্ছপ —তুই না বলে ছিলি, তােদের পরি কাৰু কোন অনিষ্ট কতে জানে না, তবে আমাদের এ দুর্দশা হলাে ক্যান? ব্যাটা আলেয়ার মত ঘুরিয়ে মেরেছে-বাপ্। তিল। অরে ও! আমার সর্বাঙ্গে যেন ঘােড়ার প্রস্রাবের দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে— উকি দুর্গন্ধ ; থুঃখঃ- উদ। তাই ত, আমরাও ত দেখছি -অরে ও, আমার সঙ্গে ভণ্ডামি ? দেখ, == কত আশ্চৰ্য্য অমূল্প সামগ্রী পাবে তার আর কি বলব। একটু ৭৪ নলিনী-বসন্ত। ধীরে ধীরে কথা কওদুপুর রাত্রের মত দেখ সব নিষাড় হয়েছে। তিল। যাই হউক বােতা সেই পুকুরে রইল— উদ। কি লজ্জার কথা ;—এমন সৰ্ব্বনাশ কি মানুষের হয়। তিল। ভিজে ঢােল হয়েছি—তাতেও কিছু এসে যায় না, কিন্তু বােতলটা-অরে ব্যাটা কুকুষ্ম—এই কি তাের পরি কারু মন্দ করূতে জানে না। উদ। যাই-বােতলটা আনিগে—না হয় মাথা ভেজে ভিজবে। বৰ্ব। মশাই—স্থির হউন ;-এই যে দেখছেন, এটি তার গুহা প্রবেশর দ্বার—নিঃশব্দে ইহাতে প্রবেশ করুন। একবার যদি তাকে মাতে পারেন—তবে আর এ রাজত্ব কোথা যায়- প্রভু গাে, আমি তােমার গােলাম। উদ। আয় তবে আয় ;আমার গায়ের রক্তটা তেতে উঠছে-হাতটা নিস্ পিস্ কচ্চে-ব্যাটার মাথাটা গুড়াে করে ফে। তিল। অহে উদয়—রাজচক্রবর্ত্তী উদয়-সম্ভ্রান্ত কুল প্রদীপ উদয়- দ্যাখ দ্যাখ-হেথা কি বহুমূল্য রাজপরিচ্ছদ দ্যাখ /বৰ্ব্ব। ছুইও না--আরে ও পড়েথাক্-চুইও না—দূর হাে। তিল। অরে ধূৰ্ত্ত কচ্ছপবাচ্ছা-জানি রে, আমরা জানি, 'রাজপরিধেয় বস্ত্র আমরা চিনি—উদয় হে দ্যাখ দ্যাখ উদ। তিলক-খােল বলচি—আমাকে দে নৈলে এখনই তাের মুণ্ডপাত করব । তিল। না না—এ তােমারই ত—এই নেও। বৰ্ব্ব । চুলােয় যাও !–ও গুলাে এখন পড়ে থাক্ না—তুচ্ছ কাপড় চোপড় নিয়ে এত ব্যস্তক্যান ?—তাকে আগে খুন করে, তার পর যা ইচ্ছে হয় কুররা। একবার যদি জেগে ওঠে ত তুলরাম খেলয়ে দেলে এখন—ঘাড়মােড় মুচড়ে বাতের ব্যাথায় ছটফটয়ে দেবে-গ্যালাে আর কি—সর্বনাশ হলাে । == ।

নলিনী-বসন্ত। । উদ। অরে কচ্ছপ-থাম্ -থাম্ ;-তুই এই গুলাে নিয়ে যা আমাদের মদের পিপেটা যেখানে আছে সেই খানে রেখে আয় । তিল। নেহাতে একটুকু খড়িমাটি মাখু-ব্যাটার হাত ত নয় যেন ধানসিজনাে হাঁড়ির তলা। বৰ্ব্ব। আমি ওতে নেই ;-মরণ আর কি-মিছেমিছি সময়টা যাচ্চে ;-দুব্যাটা হাতের হাতে পড়ে প্রাণটা গেলাে। ধ-ধ-আলগা করে ধরিস্;- নৈলে এখনি তােকে এ দ্বীপ হােতে বহিস্কৃত করে দেব ;-ধর—এটাও নিয়ে উদ। - তিল। তবে এটাও নে। এটাও নে যা ( রাক্ষসমূৰ্তি কতিপয় পরি সঙ্গে লইয়া সুমালীর প্রবেশ এবং উহাদিগকে বেষ্টন।) বৈজ। বাধ হাতে পায়ে গলায় লােহার শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধ অন্ধকূপের ভিতর নিয়ে যা ;—পিছবােড় করে বাঁধ, বুকে পিঠে কেঁাকে বাত ধরয়ে দে—আর সাপের ফণা ধরে চাদ্দিক থেকে চোটাতে আরম্ভ কর। -পাজি--নেমােখারাম-চোর- ডাকাত ব্যাট্রারানে বেটাদের অন্ধকূপে নেযা! [ উহাদিগকে লইয়া পরিদিগের প্রস্থান। সুমা। ঐ-শােননা-চীৎকার শােনাে- বৈজ ; আচ্ছা করে শাস্তি দেবে, যেন চিরকালের জন্য স্মরণ থাকে।-তুমি আর খানিকক্ষণ আমার কাছে থাকো; এখন শত্রু সকল হস্তগত হয়েছে -আমারও পরিশ্রমের শেষ হয়ে এসেছে ;-আর দণ্ডেক দু দণ্ড পরেই তােমার দাসত্ব মােন করব। [ সকলের প্রস্থান।

পঞ্চমাঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক বৈজয়ন্তের কুটীরের সম্মুখভাগ। (বৈজয়ন্ত এবং সুমালীর প্রবেশ।) বৈজ। অব্যর্থ কুহকমন্ত্র ফলিছে অবাধে ; আজ্ঞাবহ পরিগণ খাটিতেছে সবে ; সময় সরলভাবে করিছে গমন ;- হলাে বুঝি এত দিনে ব্রত উদযাপন ;- বেলা কত ? সুমা। দিবাকর অস্তপ্রায়, অপরাহ শেষ, যে সময়ে আমাদের শ্রম অবসান হবে কহেছিল, প্রভু ! বৈজ বলেছিনু বটে, যবে উঠাই ঝড় ; সে কথা নিল, পরি, হবে না আমার । কিন্তু বাপু, বল দেখি কোথায় এখন, কি ভাবে গুজরাটপতি সঙ্গীগণসহ করিছে সময়ক্ষেপ? সুমা। কুটীরের চতুর্দিক করিয়া বেষ্টন, বজ্রাঘাত ঝাৎ বেগ নিবারিতে, আছে যে শালের বন, তাহারি ভিতরে গতিশক্তিহীন সবে আছে বন্দী হয়ে। হস্তপদে রজ্জ বাধা, বাধিয়া যে রূপে দিয়াছিলা মাের ঠাই, আছে সেই ভাবে। ।

নলিনী-বসন্ত। ৭৭। তথায় ভ্রাতার সহ গুজরাট ভূপতি সঙ্গে তব সহােদর-উন্মাদ হয়েছে। অনুচরগণ যত, কুষ্ঠিত সকলে, সশঙ্কিত হয়ে সবে করিছে আক্ষেপ। নিতান্ত অধীর শােকে সেই বৃদ্ধ নর যারে, প্রভু সাধুধন্য প্রচেতা নামেতে করেছিল সম্বােধন ;-হেমন্ত ঋতুতে শিশিরের নীরধারা, শরবনে যথা, শীষ বয়ে পড়ে ধীরে, শ্মশু বয়ে তার পড়িতেছে ধীরে ধীরে অশ্রুবিন্দু কণা। বৈজ। সত্য, কি র্যা, পরিরাজ ? সুমা। মানব শরীর হলে, আমারাে হৃদয় বিদীর্ণ হইত, সেই যাতনা দেখিয়া । বৈজ। বায়ুর শরীর তাের, সুমালি রে, তুই তাদের দুঃখেতে এত আদ্রচিত্ত হলি ; আমার স্বজাতি তারা—তাদেরি মতন শশাকে তাপে জ্বলে অঙ্গ--আমি কঁদিব না ? আমার মাংসের দেহ বিদীর্ণ হবে না। বিস্তর অহিত আর বিস্তর যাতনা দিয়াছে করেছে তারা অসংখ্য প্রকারে, ভুলিব সে সমুদায়, করিব মার্জনা। এ দুরন্ত ভূমণ্ডলে, মানব জাতিতে ক্ষমাই পরম ধৰ্ম্ম পরম দুর্লভ ! অনুতাপে তাপিত যে, তাকে দণ্ড দেওয়া ভ্রান্তমতি মানবের কভু বিধি নয়। দেওগে বন্ধন খুলে, ষাও হে সুমালি, কুদুক বন্ধন আমি করিনু মােন, হবে পুনঃ সচেতন এখনি তাহার। --- ৭ নলিনী-বসন্ত। সুমা। যাই তবে, এই খানে আনিগে তাদের। বৈজ। অহে ও পৰ্বতবাসী পরি যত জন, ভ্রম যারা পৰ্বতের নিরের ধারে, কাননে, কন্দরে কিম্বা নদ নদী তীরে- অহৈ পরি যত জন, সমুদ্র-বিলাসী, সদা রঙ্গ কর যারা সমুদ্র-পুলিনে, তরঙ্গের পাছে পাছে ছুটে ছুটে যাও, ভাটিয়া তরঙ্গ যবে সাগরে লুকায়, আবার যখন ছুটে ওঠে সে পুলিনে তরঙ্গের আগে আগে ছুটিয়ে পালাও ! গগনবিহারী পরি, নৃত্য কর যারা মাঠে মাঠে জ্যোৎস্না রেতে, তৃণে ধেখা দিয়ে, * প্রভাতে হরিণী যত আসে সে মাঠেতে ভ্ৰাণ পেয়ে সে তৃেেত মুখ না পরশে। তােমরা, অহে যত, দশ দণ্ড পরে রজনীতে ভেকছত্র কর প্রস্ফুটিত। তােমাদেরি সকলের সাহায্যেতে আমি,- আমি যে দুৰ্বল জীব, সামান্য মানব, তুলেছি প্রলয় ঝড় দিবা দ্বিপ্রহরে প্রচণ্ড মার্তণ্ড রশ্মি ধূমাচ্ছন্ন করে ;- নীলাম্বর, নীল-অম্বুসাগরের সনে বাধায়েছি ঘাের রণ ;-ইন্দ্রের বর্জ্যেতে জ্বালায়েছি হুতাশন ;-দ্বিখণ্ড করেছি প্রকাণ্ড শালের কাণ্ড সে বজ্র আঘাতে ;- পূৰ্ব্বকালে ইংলণ্ডের সাধারণ লােকের বিশ্বাস ছিল যে, ঐরূপ রেখা সকল পরিদিগের দ্বারা অঙ্কিত হইত; এবং রজনী: যােগে উহারা দলবদ্ধ হইয়া সেই সেই রেখাসকলের মধ্যে নৃত্য করিত। এই রেখা মধ্যস্থিত তৃণস্পর্শ করিতে কেহ সাহসী হইত না।

নলিনী-বসন্ত। ৭৯। • অস্থির করেছি ধরা বাসুকির শিরে । উঠায়েছি প্রেতবৃন্দ প্রেতরাজ্য হােতে মহাশক্তি যাদুমন্ত্রে করে আজ্ঞাবহ। কিন্তু সে দুরন্ত বিদ্যা ত্যজিলাম আজ, ত্যজিলাম এই দণ্ডে—মুহূৰ্ত্ত মাত্রে ক আনিতে অমর-বাদ্য জপিব ইহারে চেতাইতে পুনৰ্ব্বার মন্ত্রে নিয়ন্ত্রিত করিয়াছি যত জনে ;-এখনি তা হবে- পরে খণ্ড করি এই যষ্টি শত ভাগে গভীর মেদিনীগর্ভে রাখিব পুতিয়া ; কুহকের গ্রন্থমালা করিব নিক্ষেপ অগাধ সাগর জলে। (গভীর বাদ্যধ্বনি ;-উন্মত্ত প্রায় চিত্রধ্বজের সঙ্গে প্রচেতা, এবং তদস্থ কৃপ অ অনন্তের সঙ্গে ভরত এবং বিজয়কে লইয়া সুমালীর পুনঃ প্রবেশ। বৈজয়ন্ত কর্তৃক অঙ্কিত যাদু রেখার মধ্যে প্রবেশ করিয়া সকলের স্তম্ভিতভাবে অবস্থিতি ;-তদৃষ্টে বৈজয়ন্তের উক্তি।) বৈজ। গম্ভীর বাদ্যের স্বরে চিত্তের উদ্বেগ · হয় শান্ত অচিরাৎ-অসুস্থ তােমরা কর শান্ত চিত্তবেগ সে গম্ভীর স্বরে। কুহক নিগড়ে বদ্ধ করেছি অচল, থাক সবে, এই স্থানে—থাক দাড়াইয়া। সাধুত্তম প্রচেতা হে, নিরখি তােমায় আমারে নয়নে ধারা বহে অনর্গল প্রভাত কিরণে যথা ভাঙে নিশা ঘাের ভাঙিছে যাদুর ঘাের তেমতি এদের, চেতনার জ্যোতিঃ ক্রমে পশিছে অন্তরে, ভ্রমে যাহা অন্ধকার ছিল এতক্ষণ !

নলিনী-বসন্ত। অহে বন্ধু, রাজভক্ত প্রচেতা প্রবীণ, দিব শােধ যত ধার ধারি হে তােমার, কথায়, কাৰ্যেতে পারি-অহে চিত্রধ্বজ । তুমি হে নির্দয় হয়ে বিবিধ যাতনা দিয়াছ আমায়, আর কন্যারে আমার ; ছিলে তাতে সহযােগী, তুমি ও হে কৃপ; তাই হেন মনস্তাপ পাত হে এখন । অনন্তরে তুই, সহােদর ভাই হয়ে, মায়া দয়া একেবারে সকলি ভুলিলি, দুষ্ট দুরাশার বশ হয়ে দুরাত্মন্ । এখানে আসিয়া, পুনঃ কৃপের সংহতি (এ অসহ্য চিন্তানলে চিত্ত, দহে তাই) মন্ত্রণা করিলি তাের সম্রাটে বধিতে-- তােরেও করিনু ক্ষমা !–এখনাে আমায় চিনিতে নারিছে এরা, একদৃষ্টে আছে ! সুমালি হে, নিয়ে এসে শাণিত কৃপাণ, নিয়ে এসাে গুহা হােতে মাথার মুকুট, দেখা দিব কঙ্কনের ভূপতির বেশে ; শীঘ্র আনন, শীঘ্র তব দাসত্ব ঘুচাব । ( গান করিতে করিতে সুমালীর পুনঃপ্রবেশ। ), সুমা। যে কুসুমে মধুপান করে মধুমাছী, আমিও সে কুসুমের মধুপানে আছি; ধুতুরা ফুলেতে শুয়ে সুখেতে ঘুমাই ; ডাকে যবে দিবা অন্ধ সুধাংশুরে পাই ; বাতুলির পৃষ্ঠে চড়ি বেড়াই আকাশে, গ্রীষ্মকালে বিশ্বমাঝে মনের উল্লাসে এবে পুনঃ উড়ে উড়ে কত গীত গাব, ফুলে ভরা তরুশাখা আনন্দে নাচাক। বৈজ। বেস, বাপ, বেস।কিন্তু শুন রে সুমালি। ।

নলিনী-বসন্ত। ৮১। == মন্ত্রী। অন্তরে বেদনা পাব বিহনে তােমার, তবু সত্য করিলাম- দাসত্ব ঘুচাব । ক্ষণকাল থাক বাপ, অদৃশ্য অমনি, অই বেশে যাও এবে রাজপােত যথা, দেখিবে কাণ্ডারী যত, গুল্ম আচ্ছাদিত, আনাে গে তাদের হেথা জাগ্রত করিয়া ; দেখে, শীঘ্র ফিরে এসাে সুমা। না পড়িতে দুইবার নিশ্বাস তোমার, আনিব তাদের হেথা - [ প্রস্থান। ভয়ঙ্কর দেশ ইহ-অনন্ত যাতনা, অদ্ভুত, আশ্চৰ্য্য যত-সকলি এখানে ! হে বিধাতঃ, কর ত্রাণ এ কুস্থান হােতে। বৈজ। অহে, চিত্ৰধ্বজ রাজ! দেখ চক্ষু মেলি, বৈজয়ন্ত নরপতি সম্মুখে দাড়ায়ে {; কঙ্কনের অধিকারী সেই দুঃখী আমি যারে দুঃখ দিলে এত—এখনো জীবিত পরিচয় দিতে তার, করি আলিঙ্গন। করি আবাহন, আসি কুটীরে আমার আতিথ্য সৎকার সহ সঙ্গীগণ সহ। চিত্র। বৈজয়ন্ত হও, কিম্বা, হও অন্য কিছু মায়ার পুত্তলী মাত্র প্রপঞ্চ অলীক, দেখিলাম হেথা যত-না পারি বুঝিতে। কিন্তু শােণিতের স্রোত শরীরীর ন্যায় বহিছে শরীরে ত;-দেখিয়া তােমায়, তাও বলি-চিত্তদাহ কমেছে অনেক, ক্ষিপ্তপ্রায়, এতক্ষণ ছিলাম যাহাতে ; এ যদি যথার্থ হয় অদ্ভুত এ কথা । ;

৮২ নলিনী-বসন্ত। দিলাম তােমার রাজ্য ফিরিয়া তােমারে, ক্ষম. দোষ এ মিনতি এখন আমার। কিন্তু যদি যথার্থই বৈজয়ন্ত তুমি, কিরূপে এখানে এলে ?- বাঁচিলে কিরূপে? বৈজ। অহে বন্ধু নরোত্তম, এসেং হে অগ্ৰেতে করি অই বৃদ্ধদেহে স্নেহ আলিঙ্গন এ জগতে সাধু নাই তুলনা তােমার। মন্ত্রী। কি আশ্চর্য্য! সত্য কি প্রপঞ্চ ইহা বুঝিতে না পারি। বৈজ। এখনাে এ মায়াময় দ্বীপের প্রভাবে ভ্রমে অন্ধ আছ সবে, অপ্রত্যয় তাই করিতেছ অসংশয়ে সংশয় ভাবিয়া। এসো হে বান্ধবগণ: প্রবেশ কুটীরে। ( জনান্তিকে কৃপ ও অনন্তের প্রতি) তােমরাও এসাে—অহে তােমা দোহাকারে, ইচ্ছা হলে এই দণ্ডে পারি দণ্ড দিতে রাজদ্রোহী অপরাধে অথ্য প্রমাণে, ভূপতির কোপানলে পরি নিক্ষেপিতে!- মিথ্যা কথা চাতুরীর সময় এ নয়, ক্যামন হে সত্য: কি না ? কৃপ। (স্বগত) এ ব্যাটা মানব নয়-মায়াবী রাক্ষস ! নতুবা মনের কথা জানিল কিরূপে ? বৈজ। মিথ্যা নয়, বুঝেছি তা ;- অরে ও চণ্ডাল, সােদর বলিতে তােরে জিহ্বা দগ্ধ হয়, তােরও গুরু অপরাধ করিনু মার্জনা;- এখন আমার রাজ্য ফিরে দে আমায়, ভেবে দেখ দিতে হবে, এবে, নিরুপায় । চিত্র। বৈজয়ন্ত যদি ভূমি কহ বিবরণ, নলিনী-বসন্ত। . কিরূপে বাঁচিলে প্রাণে ?-ভেটিলে কিরূপে আমাদের সঙ্গে হেথা কহ বিস্তারিয়া ; হবেনাকো দণ্ড ছয় তরিভগ্ন হয়ে পড়িছি এ দেশে মােরা—হারায়েছি হায় ! ( স্মরিতে বিদরে বুক সে দারুণ কথা ) প্রিয়তম প্রাণাধিক বসন্ত কুমারে ! বৈজ। হায় ! কি দুঃখের কথা ! চিত্র। বৈজয়ন্ত! জন্মশােধ গিয়াছে ফুরায়ে জীবনের যত সাধ——ফিরিবার নয় ! সে জ্বালা জুড়াতে স্থান নাহি ভূমণ্ডলে ! বৈজ, চিত্রধ্বনি! আমিও হে তােমার মতন হয়েছি জীবনশূন্য তনয়া হারায়ে ! কিন্তু করে আরাধনা, শান্তির প্রসাদে শীতল করেছি দগ্ধ তাপিত হৃদয়ে; বুঝি তুমি করাে নাই আরাধনা তার। চিত্র। কি বলিলে, বৈজয়ন্ত?-কন্যা হারায়েছ ? হায় রে বিধাতঃ, হায় !-কি নিষ্ঠুর তুই ? আমি কেন না ডুবিনু ? বাঁচিল না তারা? রাজা রাণী হতে আজ গুজরাট নগরে থাকিত যদ্যপি দেহে! কবে হারায়েছ অহে দুহিতা তােমার ? বৈজ। এই ঝড়ে। দেখিতেছি এরা সবে হতচিত্ত দুয়ে, করিছে বিস্ময়জ্ঞান সহসা মিলনে, ভাবিছে নয়নে ধাহা করিছে দর্শন নয়নের ভ্রম তাহা ! বদনের সুর আপনার বাক্য কি না, ভাবিয়ে অস্থির। অহে মতিভ্রান্তগণ, বৈজয়ন্ত আমি, ৮৪ নলিনী-বসন্ত। . সেই কঙ্কনের পতি, তােমরা যাহারে করেছিলে দেশত্যাগী কঙ্কন হইতে ; আশ্চৰ্য্য দৈবের শক্তি, পেয়ে পরিত্রাণ দুরন্তু সাগর হতে, এসেছি এদেশে রাজত্ব করিতে এই জনশূন্য দ্বীপে। পশ্চাতে বলিব সব, সময় এ নয়, এক দিনে সে আখ্যানাে হবে নাকো শেষ ; এখন প্রবেশ সবে কুটীর ভিতরে রাজ-অট্টালিকা এই এখন আমার, দাস দাসী নাহি হেথা, প্রজাও বিরল। যথাসাধ্য সমাপিব অতিথি সৎকার ;- গুজরাজ ভূপতি তুমি রাজ্য ফিরে দিলে, আমিও কিঞ্চিৎ দিব বিনিময়ে তার ; অথবা যেরূপ তৃপ্ত করিলে আমায়, রাজ্য দিয়ে পুনৰ্ব্বার - আমিও তেমতি, করিব তােমায় তৃপ্ত আশ্চর্য্য দেখায়ে । ( গুহার দ্বারােদঘাটন এবং দাবক্রীড়ারত নলিনী ও বসন্তকে সন্দর্শন।) নলি। প্রাণনাথ! ফাঁকি দিলে ? বস। না, প্রেয়সি, না-ব্রহ্মাণ্ড পেলেও নয়। নলি। ব্রহ্মাণ্ড ত দূরে থাক, দশটি রাজ্য পেলে, যুদ্ধ-বিগ্রহেছে, নাথ, নিরস্ত হবে না চিত্র। এ যদি অসত্য হয়, পুনরায় তবে পাব আমি পুত্রশােক-মরিবে তা হলে এক পুত্র দুই বার । কৃপ। (স্বগত) কি আশ্চর্য!—অসম্ভব! কখনাে সে নয় বস। মিথ্যা তবে জলধীরে লাপান্ত করিনু, বিভীষিকা দেখাইলা সমুদ্র আমায় । • t নলিনী-বসন্ত। ৮৫ স্বাহা শান্ত বারিনিধি প্রশান্ত হৃদয়। (পিতার চরণে প্রণত।) চিত্র। ওঠো পুল, ওঠো বাপু, করি আশীৰ্বাদ চিরসুখে সুখী হও ! নলি। ওমা, ওমা—একি দেখি !–অপরূপরূপ এত প্রাণী কোথা থেকে আইল এখানে ! আহা, কি লাবণ্য ছটা !—মানব এমন সুন্দর আকৃতি, তা তো স্বপ্নেও জানিনে। ধন্য ভাগ্যবতী ধরা, নিবাসে যেখানে এ হেন সুন্দর জীব?---অতি রম্যস্থান সেই নবীন পৃথিবী! বৈজ। হা রে পাগলিনী মেয়ে ! নবীন পৃথিবী তােমারি নিকটে সুধু । চিত্র। হ্যা বসন্ত! যার সঙ্গে ক্রীড়য়ত ছিলে, ও রমণী কোন্ জন-মানবী দেবী ? ওঁরি আশীর্বাদে পুনঃ হলে কি সাক্ষাৎ ? হবেনাকো প্রহরেক পড়েছ এ দেশে, এরি মধ্যে এত গাঢ় জন্মেছে প্রণয় ? বস। দেবী নয়, মানবী গাে,—ইহারি নন্দিনী ইনিই কঙ্কনপতি, সুখ্যাতি যাহার শুনিতাম জনরবে, চক্ষে দেখি নাই। দৈবগুণে এরমণী আমারি এখন ;- করিয়াছি মনােনীত না করে জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা করিতে আশা ছিল না যখন, জভবেছিনু যে সময়ে হারায়েছি পিতা- প্রাণদান দিয়াছেন ইনিই আমার, কন্যাদানে হয়েছেন পিতার সমান। মন্ত্রী। এতক্ষণে মনে মনে আহলাদে রােদন নলিনী-বসন্ত। . করিতে ছিলাম তাই বাক্য নাই মুখে, নতুবা কল্যাণ আমি করিতাম আগে। হে ত্রিদিববাসীগণ, কটাক্ষ করিয়া রাখ সুখে এ দোহারে-কর চিরজীবী। তােমাদেরি নিয়ােজিত ভবিতব্য বলে একত্রেতে সমাগত হয়েছি সকলে। চিত্র। তথাস্তু—তথাস্তু, মন্ত্রি । মন্ত্রী। কঙ্কন ভুপতি ত্যক্ত কঙ্কন হইতে হলো কি ইহারি জন্যে?—গুজরাট নগরে, হয়ে বল্যে অধিকারী বংশাবলী তার ? কি আনন্দ !-কি আনন্দ হীরার অক্ষরে লেখা থাক এ আখ্যান পাষাণে গ্রথিতু- “যে যাত্রায় কলাবতী সিংহলে মহিষী, বসন্ত তাহার ভ্রাতা হয়ে নিরুদ্দেশ করিল রমণীলাভ কষ্টের প্রবাসে ; জনশূন্য দ্বীপমাঝে, দৈবশক্তি বলে বৈজয়ন্ত হারারাজা পাইল আবার !” আমারাও যতজন প্রাণে প্রাণে বেঁচে হইলাম যে যেমন ছিলাম পূৰ্ব্বেতে। চিত্র। এসসা মা, এ দিকে এসাে-এস পুত্র এসস ; আশীৰ্বাদ করি দেহে, চিরজীবী হও;- এআনন্দে আনন্দিত যে না হবে আজ, জন্ম জন্ম নিরানন্দ থাকে যেন তার। মন্ত্রী তথাস্তু -তথাস্তু! ( ঈড়ি মাঝীদের লইয়া সুমালীর পুনঃপ্রবেশ ।) দেখুন মহারাজ, ওদিকে দেখুন--এরা কোথেকে ! অরে ব্যাটা পাজি,জাহাজের উপর যে বন্ধু গলাবাজী কচ্ছিলিমাটীতে পা দিয়ে যে এখন আর মুখে কথাটি নেই।—খপ কি বল ? } নলিনী-বসন্ত। চিত্র। মাকী। প্রথম সুখপর এই যে মহারাজ এবং তাহার সঙ্গীগণকে নিরাপদে দেখছি ;-তার পর এই, যে জাহজধ্বনি- যাহা ঘণ্টা দুই পূর্বে মনে করেছিলুম যে ভেঙে চুরমা হয়েছে, এখনও নিটুট আহে—একগাছি দড়াও আগা হয়নি—দেশ থেকে হাড়বার সময় যেমনটি ছিল, ঠিক তেমনিটিই আছে। সুমা। (জনান্তিকে) প্রভু দেখুন—আমি গিয়ে কত কাজ করেছি। বৈজ। কে বাকা-বে। এ সকল ভৌতিক ব্যাপার, স্বাভাবিক নয়, ক্রমশঃ দেথ চি আশ্চর্যের উপর আশ্চৰ্য্য বাড়ছে। তার পর এখানে কিরূপে এলি ? সঃ দা। আমি স্পষ্ট সজাগ ছিলুম, এমন যদি বুঝতে পাত্তম, তা হলে মহারাজকে সব ভেঙে বতুম ; কিন্তু আমরা যেন ঘুমের ঘােরে মড়ার মতন হয়ে কতকগুলো খড় চাপা পড়েচিলুম (ক্যামন করে যে তার ভেতর সে ধুলুম বলতে পারিনে ;) কিন্তু তেমনি হয়ে পড়েছিলুম ; তার পর এই খানিকক্ষণ হলো চার্দিক থেকে একবারে চীৎকার, কান্না, শিখলির ঝঝনি, আর নূতনতর কত যে ভয়ানক শব্দ হতে লাগল, তাতেই ঘুম ভেঙে দেখি, সেহাতের পায়ের বদন খুলে গেছে, এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের চাচা- ছােলা চর্চকে জাহাজখানি দেখতে পেলুম ; মাজির পাে, তাই না দেখে হাত পা তুলে নাতে আরম্ভ কল্লে। তার পর চকের পাতা ফেতে না ফেতে, যেন ঘুমের ঘােরে স্বপন্ দেখতে দেখতে এইখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। সুমা। ( জনান্তিকে) প্রভু গাে, ভাল হয় নি। বৈজ। বেস হয়েছে, অতি পরিপাটী হয়েছে; অতি সত্বরেই তােমার দাসত্ব মােচন কব। চিত্র। এমন আশ্চর্য্য ত কখন দেখিও না, শুনিও না; এ ত • স্বাভাবিক ব্যাপার বল্যে বােধ হয় না। আকাশবাণী না হলে ত এর নিগূঢ় তত্ত্ব কিছুই বােঝা যাবে না।

নলিনী বসন্ত। বৈজ। মহারাজ, এই সব আশ্চর্য ব্যাপার ভেবে ভেবে বিব্রত হবেন না ; সাবকাশ মতে অতি শীঘ্রই আদ্যোপান্ত সমস্ত বিবরণ কব, তখন বুঝতে পারবেন যে এ সকলি সম্ভব—কিছুই অসম্ভব নয়। এক্ষণে নিরুদ্বেগ, প্রফুল্লচিত্ত হউন, এবং যে কিছু ঘটনা হয়েছে ইষ্টসাধনের জন্যই হয়েছে জ্ঞান করুন। (জনান্তিকে) সুমালি ! এদিকে এসাে;--বট এবং তার সঙ্গীদের বন্ধন মােচন করে দে ও গো-মহারাজের কোন অসুখ হচ্ছে না ত ?' আপনকার অনুচরদের মধ্যে এখন ও দু এক জন বাকি আছে, স্মরণ হচ্চে কি ? (বৰ্বট, উদয়, এবং তিলককে লইয়া সুমালীর পুনঃপ্রবেশ।) উদ। লােকে আমার আমার করে কেনই মরে ; সবাই যেন পরের জন্যেই ভাবে আপনার জন্যে ভাববার কোন প্রয়ােজন নেই কপালই মূল। বাবা জানােয়ার-তুই কি বলিস। তিল। এই যদি আমার ঘাড়, আর এই আমার গর্দান হয়, তবে যা দেছি তা ত বড় মন্দ নয়। ও আমার মায়ের বাপ। বারে বাস্—উঃ ! কি বড় বড় কি--ক্যামন, সুশ্রী, আমার মনিবও ত ক না। কিন্তু ভয় হচ্চে, পাছে আবার বাত, ধরিয়ে দেয়। উদ। কি গো অনন্তদেব -বলেন কি—এদিকে দেখেছেন - এম জিনিস্ কি কড়িতে কিন্ত মেলে। অন। তাই ত—এটা. কচ্ছপও নয়, মানুষও নয় ;-বাজারে নিয়ে গেলে বেচতে পারা যায়--তার ভূল নাই। বৈজ। এদের চাপটাপ, গুলাে ভালাে করে দেখুন, তা হলেই বুঝতে পাবেন। কিন্তু এই ব্যাটা- এই কিত- কিমাকার ভূতটা—আমারি লােক-ওর মা বেট ঘাের.ডাইনী ছিল, জোয়ারভাটা এবং চন্দ্রের উদয় অনুদয়, আপনার আজ্ঞাধীন করে তুলেছিল। এই ক ব্যাটায় মিলে আমার বিস্তর দ্রব্যাদি অপহরণ করেছে, এবং এই নচ্ছার পাজিটা আমায় বৰ্ব্ব ।

নলিনী-বসন্ত। ৮৯ মাবার জন্যে ওদের সঙ্গে এক জুটী হয়ে কুটীরের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। বৰ্ব্ব । (স্বগত) যা, এইবার প্রাণটা গেলাে!-যত ব্যাটা পরিকে দিয়ে আমার হাড়গুলাে ঘুরবে দেখছি। চিত্র। এ কে-আমার ভাণ্ডারী উদয় মাতাল না ? অন। এখনও মদে চুর চুরে রয়েছে-মদ পেলে কোথায় ? অরে তােদর এ দশা কোথেকে ঘটল। তিল। আর কোখেকে! মাথাটা যে মাথায় আছে এই ঢের। কৃপ। অরে উদয়—তাের কি ? উদ। আর কি! গায়ের মাস গায়েই যে আছে এই আমার বাপের ভাগ্যি। বৈজ। তুই এই দেশের রাজা হবিনে? উদ। আর কাজ, নেই মশাই, যা হয়েছি তারই ঘা সুধুরতে এখন কদ্দিন যাবে। তােমার দুটো পায়ে চারটে গড়-বাপ্ । বৈজ। ব্যাটার বাইরেও যেমন, ভেতরেও তেমনি ;-যা ব্যাটা যা, এই দুজনকে নিয়ে কুটীরটী ভালাে করে ঝেড়েঝুড়ে সাজয়ে রাখগে-ভাল চা ত যা। বৰ্ব। এক্ষণি যাচ্চি—এমন কৰ্ম্ম আর করব না; ঘাট হয়েছে, দোহাই তােমার-আমায় মাপ্ করাে।-আমার মতন গাধা কি আর দুটী আছে, এই মাতাটাকে দেবতা ভেবে ছিলাম—আর এই ভাঁড়টাকে পূজো করবার উজ্জ্বগ করেছিলুম। ছি ছি-ধিক্ থাক্‌ -- আমাকে ধিক্ থাক্। বৈজ। যা শীগগির যা। চিত্র। যা, তােরা ও যা, দ্রব্যসামগ্রী যেথানকার যা এনে- ছিস রেখে দিগে যা। উদয়। আনিনি বড়—সাই করেছি। [ বৰ্বট, তিলক এবং উদয়ের প্রস্থান। ] বৈজ। মহারাজ, অনুগ্রহ করে সহচরবর্গের সঙ্গে একবার g নলিনী-বসন্ত। আমার কুটীরে পদার্পণ করুন ;-অদ্য রাত্রি কথায় বিশ্রম করে শ্রান্তিদুর করুন। আমি-দেশত্যাগী হবার পর এই দ্বীপে আশা অবধি যে সকল ঘটনা হয়েছে, সমুদায় বিবৃতি করে কৌতুকে কালাতিপাত করাব। কল্য প্রাতে আপনকার জাহাজের নিকট লয়ে যাবাে; পরে আপনাকে গুজরাটে অবতরণ করে দিয়ে কঙ্কনে প্রত্যাগমন কব।-এখন আমার অাঁর. অন্য বাসনা নাই, কেবল গুজরাটে এদের দুজনের বিবাহােৎসব সমাধানান্তে কঙ্কনে গিয়ে পরকালের চিন্তায় কালাতিপাত করি, এই আমার বাসনা। চিত্র। তােমার জীবনবৃত্তান্ত অতি কৌতুকাবহ হবে, তার সন্দেহ নাই। বৈজ। আমি আদ্যোপান্ত সমুদয় শ্রবণ করার এবং নিৰ্বিঘ্নে সকলকে স্বদেশে প্রত্যায়ন করব—দেখবেন সমুদ্র সুস্থির খাবে—সুবায়ু সঞ্চালিত হবে- জাহাজখানি বায়ুমুখে নির্বিঘ্নে অতি দ্রুত গমন করতে থাকবে। ( জনান্তিকে) সুমালি ! বাপ্ আমার ! দেখাে বা তােমার এই ভার ;-এই কাজটি শেষ করে, তার পর আকাশ পাতাল খান খুসি উড়ে যেইও—তােমার দাসত্ব মােচন কাম— আশীৰ্বাদ করি সুখে থাক। আসুন, আপনারা আসুন। [ সকলের প্রস্থান । যবনিকা পতন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nolini-basonta

Author
Not Available
Title
Natak
File name
Nolini-basonta
Text
OCR done
Citation
1893
Published
2009/10/6
Publisher
Arjya Sahitya Samiti,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
99
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Bharat
DLI number
513004
Barcode
4990010020023.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
6NKxOwVXGa8
Download PDF

Nolini-basonta