Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Ramsundar Jibani

Mallik, Jibananda · 2010/02/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী
শ্রীজীবানন্দ মল্লিক প্রণীত
টাকা।

গ্রন্থকার কর্তৃক
রাণাঘাট হইতে প্রকাশিত
গীবিলাস প্রেস
১২নং নারিকেল বাগান লেন হইতে
বলাইচন্দ্র দাস দ্বারা খুজি।

DEDICATED to N. Blount Esqr., in all respect and with a deep appreciation of his wholehearted sympathy and interest in the descendants of Ram Sundar Sikdar,-in India, her aspirations, art and people, coupled with the devout wish he may live to grace Calcutta for many years to come. Ranaghat, June 26th, 1918.) Jibananda Mullick.

No text on this page.

নিবেদন।
প্রিয় সুহৃদ সুলেখক শ্রীযুক্ত অমরেশ শিকদারের
সহিত একদিন কথায় কথায় তাঁহাদের বংশ এবং
তাঁহার পিতামহ রামসুন্দর শিকদারের প্রসঙ্গ
উত্থাপিত হয়। রামসুন্দরের চরিত্রের সামান্য
পরিচয়েই আমি মুগ্ধ হই এবং বন্ধুবরের নিকট
রামসুন্দরের একখানি জীবনী লিখিবার ইচ্ছা জ্ঞাপন
করি। তিনি আমাকে বিশেষ উৎসাহিত করেন,
এবং তদভ্রাত আমার অগ্ৰজতুল্য উদারহৃদয় শ্রীযুক্ত
কুমারেশ শিকদার মহাশয়ের নিকট লইয়া যান।
আমরা তখন অষ্টবজ্রে এক হইয়া বর্তমান পাটের
ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় কর্মবীর শ্রীযুক্ত ক্ষেত্রমােহন
এবং তদনুজ সুবিজ্ঞ ধর্মপ্রাণ ধ্রুবচন্দ্র শিকদার
মহাশয়দের নিকট আসিয়া উপস্থিত হই। দুই ভাই
আমাকে পুত্রসম স্নেহে ভঁহাদের পিতার জীবনী
সম্বন্ধে অনেক অমূল্য উপদেশ দেন এবং প্রয়ােজনীয়

উপাদান গুলির সংগ্রহে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য
করেন। তাঁহাদের মধুর সরল ব্যবহার জীবনে
ভুলিবার নয়। আমি তাহাদিগকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা
জানাইতেছি।
faptott Messrs. Sinclair Murray
নামক বিখ্যাত সওদাগরী অফিসের অন্যতম সত্বা-
ধিকারী ইংরাজকুলগৌরব Mr. Blount আমাকে
তাহার নামে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি উৎসর্গ করিবার
অনুমতি দিয়া বাধিত করিয়াছেন। এজন্য আমি
তাঁহার নিকট চিরকৃতজ্ঞ। ইতি--
বিনীত
রাণাঘাট,
১২ই আষাঢ়,
গ্রন্থকার
সন ১৩২৫ সাল।

No text on this page.

No text on this page.

অবতরণিকা

No text on this page.

মামসুন্দর জীবনী জননী বঙ্গভূমি চিরদিনই রত্নগর্ভা। পবিত্র ধর্ম- ক্ষেত্রে প্রবেশ কর দেখিবে মায়ের সন্তানদের অপূৰ্ব্ব কীর্তি, প্রবল ধৰ্ম্মানুরাগ, অলৌকিক আত্মদর্শন। বিশ্ব- গৌরব শচীদুলাল মহাপ্রভু হইতে আরম্ভ করিয়া মহাত্মা রাজা রামমােহন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, ভক্ত- বতার রামকৃষ্ণদেব প্রভৃতি এই মায়ের স্তন্যদুগ্ধ পানে পুষ্ট হইয়াই ধর্মের ভেরীনিনাদ করিতে করিতে ধরাধামে অক্ষয়কীৰ্ত্তি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। সাহিত্য ও মনীষা মন্দির প্রাঙ্গনে দৃষ্টিপাত কর, দেখিবে এখানেও মাতৃভক্ত সন্তানদের অখণ্ড কৰ্তব্যারাগ, অতুলনীয় মাতৃভক্তি, অবিনশ্বর কাৰ্যানুষ্ঠান। কবি- কুলশেখর কৃত্তিবাস, কাশীদাস, মাইকেল মধুসূদন, ৩ রামসুন্দর জীবনী হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, নাট্য- মহারথী দীনবন্ধু, গিরিশচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল প্রভৃতিও এই বঙ্গভূমির ক্রোড়ে লালিত হইয়াই পৃথিবীর মুখ উজ্জ্বল করিয়া গিয়াছেন। মায়ের উর্বর বাণিজ্য- ক্ষেত্রও তাঁহার প্রিয় সন্তান—লক্ষ্মীর বরপুত্রদিগের কীর্তিচ্ছটায় চির উদ্ভাসিত। প্রসিদ্ধ ধনকুবের মতি- লাল শীল, রামগােপাল ঘােষ, কৃষ্ণ পান্তি, রামদুলাল সরকার প্রভৃতিও এই মায়ের শীতল অঞ্চলচ্ছায়ায় বসিয়াই স্বােপার্জিত বিপুল সম্পত্তি সাহায্যে দেশের, দশের ও সমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধন করিয়া গিয়াছেন। আর এক মহাপুরুষ যিনি ইহাদেরই মত বাণিজ্যের বিশাল-ক্ষেত্রে কর্তব্যের আসনে বসিয়া অনন্যসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় ও দেবহুলভ চরিত্র- বলে তদানীন্তন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ স্থান অধিকার করিয়াছিলেন, সেই প্রাতঃস্মরণীয় মহাত্মা রামসুন্দর শিকদারও এই বঙ্গমাতৃভূমির মুখােজ্জ্বলকারী প্রিয় সন্তানদের অন্যতম। সেই কর্মময় পূত জীবনকাহিনী বর্ণন উদ্দেশ্যেই এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের অবতারণা।

রামসুন্দর জীবনী
এক্ষণে দেখিতে হইবে জীবনী প্রয়ােজন কাহার।
পৃথিবীতে তাে প্রতিদিনই লক্ষ লক্ষ জীবনের উন্মেষ,
অবসান ঘটিতেছে। ধনী, নির্ধন, বিদ্বান, মূখ, সাধু,
অসাধু প্রভৃতি অসংখ্য ব্যক্তিরই জীবন স্পন্দন ঘড়ির
কাটাটির মত অনন্তকালের বুকে টিকটিক্ করিয়া
চলিতেছে। কে তাহার সন্ধান রাখে ? রাখিলেও
অতি অল্পকালমধ্যেই বিস্মৃতি-যবনিকার অন্তরালে
তাহার চির সমাধি হয়। ইহাই কালের নিয়ম।
প্রতিরােধ করিবার সাধ্য মানুষের নাই। কিন্তু
পক্ষান্তরে বহু শতাব্দীর শেষেও পূর্বোক্তদিগের মতই
হস্তপদাবলম্বী ঐ যে প্রাতঃস্মরণীয় মহাত্মাদিগের
জীবন-স্মৃতি সমাজের হৃদয়দর্পণে চির উজ্জ্বল হইয়া
রহিয়াছে তাহারই বা প্রতিবােধ কে করিবে ?
যে জীবন-সৌধের মনুষ্যত্ব মূল ভিত্তি, ন্যায়পরতা,
সত্যনিষ্ঠা, সশস্ত্র সজাগ প্রহরী,-কীর্তি বিজয় নিশান,
শত ঝঞ্চাবাত রাষ্ট্রবিপ্লব ও যুগপরিবর্তনের মধ্যেও
তাহার কণামাত্র ক্ষতিও সংসাধিত হয় না। কালের
বুকে সে জীবন-সৌধ উন্নতমস্তকে সগর্বে দণ্ডায়মান
৫

ব্যামসুন্দর জীবনী থাকিয়া পৃথিবীকে যেন নিৰ্বাক্ ভাষায় বলিতে থাকে “কীৰ্তির্যস্য স জীবতি।” এই কীর্তিমান্ পুরুষ- দেরই জীবনী লােকশিক্ষার জন্য মনুষ্যসমাজে বিশেষ প্রয়ােজনীয় এবং এই কারণেই আমাদের আলােচ্য রামসুন্দরের জীবনীর অবতারণা।

চরিত্র আলােচনা।

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী রামসুন্দরের সমগ্র জীবন স্বাবলম্বন এবং পুরুষ- কারের একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সহায়সম্বলহীন রাম- সুন্দর দারিদ্রের ভীষণ কশাঘাত সহ করিয়াও বীরের ন্যায়, মনুষ্যের ন্যায় প্রতিকূল অবস্থার সহিত অহরহঃ সংগ্রাম করিতে করিতে জীবনযুদ্ধে জয়লাভ করিয়া ছিলেন। কোন দিন আহার জুটিত—কোন দিন জুটিত না। কিন্তু তাহাতে রামসুন্দরের কি? নির্ভীক অচল অটল রামসুন্দর আপনার কাৰ্য্য করিয়া যাইতেন। কোন প্রকার অবস্থা-বৈগুণ্যই তাহাকে বিচলিত করিতে পারি না। তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সহিত কর্তব্যজ্ঞান মিলিত হইলেই মানুষ এই ভাবেই গড়িয়া উঠে। তখন সত্যবাদিতা, সৎসাহস, তেজস্বিতা প্রভৃতি আপনা আপনিই অঙ্গের ভূষণ হইয়া পড়ে। কোনরূপ নীচতা, সংকীর্ণত এরূপ ভাগ্যবান্ ব্যক্তির ত্রিসীমানায় পর্যন্ত পৌঁছিতে পারে না। রাম- রামসুন্দর জীবনী সুন্দরের জীবনে একাধারে এ সমস্ত গুণগুলিই পরিলক্ষিত হইত। সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ বাণিজ্য- প্রতিভা, কষ্টসহিষ্ণুতা ও শ্রমশীলতার অদ্ভুত সংমিশ্রণে তঁাহার চরিত্রে পুরুষােচিত কাঠিন্যের অভাব ছিল না। সে এক অপূর্ব চরিত্র-কোমলতার সহিত কাঠিন্য, গর্বের সহিত দীনতা। এই উভয় প্রকার বিপরীত মনােবৃত্তির সংস্পর্শে একটা বিচিত্র স্বাতন্ত্র রামসুন্দরের কর্ম জীবনে স্বতঃ পরিস্ফুট ছিল। এই স্বাতন্ত্রই তঁাহার উন্নতির মূল কারণ। ঈশ্বর-অনু- গৃহীত ব্যক্তিরাই এই স্বাতন্ত্রের একমাত্র অধিকারী। আমাদের আলােচ্য রামসুন্দরও পূর্বজন্মের সুকৃতি- বলে ঈশ্বর অনুগ্রহেই তাহারই দৌত্য লইয়া পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন। ১০ বংশপরিচয়।

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী
যশোহর জেলার অন্তর্গত আবাইপুর গ্রামের
শিকদার গােষ্ঠী ঐ অঞ্চলের মধ্যে একটী অতি পুরা-
তন এবং সম্ভ্রান্ত বংশ। ইহারা জাতিতে তিলি এবং
ইহাদের আদি উপাধি কুণ্ডু-পরে নবাব-প্রদত্ত
শিকদার উপাধিতে খ্যাত। এই বংশের কীৰ্ত্তিমা
বংশধর কার্তিকচন্দ্র শিকদার লবণ ও চাউল
প্রভৃতির ব্যবসায়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন এবং
দেশের মধ্যে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বলিয়া খ্যাত
হয়েন। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তাহার অনেকগুলি
আড়ত এবং গদী ছিল। তন্মধ্যে কলিকাতার
জোড়াসাঁকোর গদীই সমধিক প্রসিদ্ধ। অনেকের
ধারণা এই অঞ্চলের শিকদারপাড়া স্ট্রীট নামকরণ
হার নামানুসারেই হয়। এই কার্তিকচক্রের
ব্যবসা বাণিজ্য কাৰ্য্যের আর একজন অংশীদার ছিল।
সরল কার্তিকচন্দ্র তাহাকে নিজ মহােদরের মত
r

রামসুন্দর জীবনী ভাল বাসিতেন এবং গভীর বিশ্বাসে সমস্ত বিষয়েরই ভার তাহার উপর দিয়াছিলেন। কিন্তু দারুণ লােভই তাহার কাল হইল। উক্ত অংশীদার বিশ্বাস- ঘাতকায় সরল বিশ্বাসের প্রতিদান দিল। ফলে কার্তিকচন্দ্র হীন অবস্থায় পড়িলেন—একমাত্র পুত্র বাণেশ্বর উপায়ান্তর না দেখিয়া সামান্য চাকুরী-বৃত্তি গ্রহণ করিতে বাধ্য হইলেন। কিন্তু ইহাতে অবস্থার কিছুমাত্র পরিবর্তন হইল না—আর কোথায়ই বা কাহার হইয়া থাকে ? যাহা হউক, বাণেশ্বর লক্ষ্মীর কৃপা দৃষ্টি হইতে বঞ্চিত হইলেও মা ষষ্ঠীর যথেষ্ট অনুগ্রহ লাভ করিয়াছিলেন। যথাকালে তাঁহার চারিটী পুত্র জন্ম গ্রহণ করে। তন্মধ্যে রামাদ জ্যেষ্ঠ, আলােচ্য রামসুন্দর মধ্যম, রাধামােহন। তৃতীয়, কৃষ্ণমােহন কনিষ্ঠ। ১৪ দেশের ও তৎকালীন তিলি জাতির অবস্থা।

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী রামসুন্দরের জন্মের সময় বঙ্গদেশের পল্লীগ্রাম- গুলি শান্তি ও স্বাস্থ্যের আনন্দনিকেতন স্বরূপ ছিল। ম্যালেরিয়া রাক্ষসীর সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় তখনও পল্লী- গ্রামগুলি জনশূন্য হইতে বসে নাই—লােকের দেহে শক্তি ছিল, মনে বল ছিল, হৃদয়ে সাহস ছিল। এখনকার অস্থিচর্মসার পল্লীবাসীর মত তখন তাহারা ফুলের গায়ে মূৰ্ছা যাইত না। তাহার উপর প্রতি গ্রামেই লােকের মরাই-ভরা ধান- বাগান-ভরা ফল-পুকুর-পােরা মাছ। দেশে তখনও বিলাসিতা প্রবেশ করে নাই—অল্পতেই লােকে সন্তুষ্ট হইত। পরনে ন-হাতি মােটা কাপড়- কোন রকমে হাঁটু পর্যন্ত পড়িয়াছে ; গায়ে মেরজাই বা পিরিহাণ, তাহাও আবার ৬ মাসে ৯ মাসে কোন কাজকর্ম পূজাপার্বণে গায়ে উঠিত। গ্রামের নিঃ- সম্পৰ্কীয় লােকেরাও কেহ দাদা কেহ খুড়া প্রভৃতি নামে অভিহিত হইত। শূদ্রের ব্রাহ্মণ দেখিলে ১৭

রামসুন্দর জীবনী
ভক্তিভরে মাথা নােয়াইয়া প্রণাম করিত। আবার
ব্রাহ্মণেরাও শূদ্রদিগকে স্নেহ ও প্রীতির চক্ষে দেখিত।
‘পেন্নাম গো দাদাঠাকুর’--‘কল্যাণ যােক নাতি
ইত্যাদি আন্তরিক শুভেচ্ছাজ্ঞাপক অভিবাদন তখন
লােকের মুখে মুখে নিত্য শােনা যাইত। সকালে
যে যাহার কাজ কর্মে বাহির হইত-দ্বিপ্রহর
বেলায় নদী বা পুষ্করিণীতে অবগাহন-স্নানের পর
স্বচ্ছন্দচিত্তে আহার সারিয়া লােকে সুস্থ হইয়া
বিশ্রাম করিত, সাহেবের তাড়না বা বড়বাবুর বকুনি
শুনিবার ভয়ে কথাগত প্রাণ হইবার সুদিন তখনও
বাংলায় আসে নাই। সন্ধ্যায় ঘােষেদের বা পালে-
দের দাওয়ায় দাবা ও পাশা খেলিবার ধুম পড়িয়া
যাইত। “কচে বারাে, এই মাৎ”, ইত্যাদি চীৎকারে
ক্ষুদ্র পল্লীগ্রামগুলি মুখরিত হইয়া উঠিত। দোকানী
পশারীরা দোকানের ‘টাটে’ বসিয়াই সুর করিয়া
“ইতেক শুনিয়া রাম” ইত্যাদি পড়িত-নিরক্ষর
পল্লীবাসীরা হুঁ করিয়া সেই সুধা পান করিতে
করিতে নিজেদের জীবন ধন্য জ্ঞান করিত।
১৮

রামসুন্দর জীবনী
এই সময়ে তিলিজাতির অবস্থা বিশেষ উন্নত।
রাজশাহীর দয়ারাম রায়, মুর্শিদাবাদের কান্ত বাবু,
রাণাঘাটের কৃষ্ণ পান্তি প্রভৃতির সুযােগ্য বংশধরেরা
ধনে মানে খ্যাতিতে বাংলায় তখন সৰ্বাগ্রগণ্য।
তিলি জাতির মধ্যে প্রায় অধিকাংশ ব্যক্তিই
স্বাধীন ভাবে ব্যৱসাবাণিজ্য করিয়া জীবনযাত্রা
নিৰ্বাহ করিত। এই সময়ে এক একটী গ্রাম বা
কতকগুলি গ্রামের গণ্ডির মধ্যেই তাহাদের বিবাহাদি
সামাজিক আদানপ্রদান চলিত--বিভিন্ন সমাজের
সহিত পরস্পরের কাজকর্ম একপ্রকার নিষিদ্ধই ছিল।
সে যাহাহউক, ব্যবসাবুদ্ধির সহিত আর একটা
মনুষোচিত কৰ্তব্যবুদ্ধিও তৎকালীন তিলিজাতির অস্থি-
মজ্জাগত ছিল—সেটী নিজ উপার্জনে বৃহৎ গােষ্ঠী
প্রতিপালন এবং যৌথপরিবারের ভার গ্রহণ। জাতির
এই সমস্ত বিশেষত্ব লইয়া রামসুন্দরের জন্ম।

No text on this page.

জন্ম ও বাল্যজীবন।

রামসুন্দর জীবনী সন ১২০৮ সালের আষাঢ় মাসে সে বার ভয়ানক বর্ষা। পল্লীগ্রামের পথ ঘাট মাঠ ডুবিয়া গিয়াছে— বাড়ীর উঠানে এক হাঁটু জল। পল্লীবাসীর কষ্টের একশেষ—দুস্থ গৃহস্থদের তাে কথাই নাই। মাটীর ঘর-খড়য়া চালের ফাঁক দিয়া জল পড়িতেছে। গৃহের আসবাব যেখানে যাহা থাকিবার তাহা সমস্তই ভিজা-সাতসেতে। এমনই একটা বর্ষার রাত্রে অবিশ্রান্ত বারিপাত ও বিদ্যুৎগর্জনের মধ্যে রাম- সুন্দর জন্মগ্রহণ করিলেন। গরীবের ঘর—একে গরম কাপড় চোপড়ের অভাব, তাহার উপর সাক- তাপের কাষ্ঠের অল্পতা। গৃহস্থ ভাবিয়াই আকুল, কি করিয়া সদ্যোজাত শিশুটীর জীবন রক্ষা হয় । মনে মনে দীনের সহায় ঈশ্বরকে ডাকিতে লাগিলেন। ঈশ্বর মুখ তুলিয়া চাহিলেন। এক প্রতিবেশী উপ- যাচক হইয়া কতকগুলি শুষ্ক কাষ্ট দিয়া গেল—শিশুর ২২

রামসুন্দর জীবনী
জীবন রক্ষা হইল। বাহা হউক বাণেশ্বরের ভাবনার
অন্ত নাই। একে সংসারের সমস্ত ভার তাহার
উপর-ভরসা সামান্য চাকুরীটা, এদিকে আবার
সংসারে পােষ্য বাড়িয়া গেল। কি করিয়া কি
হইবে এই ভাবনায় তিনি অস্থির হইলেন। অবস্থা-
বৈগুণ্যে পূৰ্ব গােশালায় গরু নাই, কিন্তু পুত্রের
জীবন রক্ষার জন্য দুধের প্রয়ােজন। দুধ কিনিয়া
খাওয়াইবারও সংস্থান নাই। বাণেশ্বর চারিদিক
অন্ধকার দেখিলেন। কিন্তু ভগবান যাহার সহায়-
কালে যাহাকে তিনি ধনে মানে যশে অদ্বিতীয়
করিবার ব্যবস্থা করিয়াই পৃথিবীতে পাঠাইয়াছেন,
সামান্য দুধের অভাব তাহার কি করিবে? প্রতি-
বেশীদের নিকট চাহিয়া চিন্তিয়া যে দিন দুধের
যােগাড় হইত সে দিন উহাতেই কোনরূপে চলিয়া
যাইত। আর যেদিন নিতান্ত তাহাও জুটিত না
সে দিন ভাতের মাড়ই দুধের অভাব পূর্ণ করিত।
পিতামাতা চক্ষের জলে ভাসিতে থাকিতেন—নয়না-
নন্দ ফুল্লকুসমসদৃশ বংশধর—দুধের পরিবর্তে ভাত
২৩

রামসুন্দর জীবনী হইতে মাড় বাহির করিয়া তাহাকে খাওয়াইতে হইতেছে, ইহা ভাবিতেও তাঁহাদের হৃদয় বিদীর্ণ হইত। কিন্তু একজন যে অলক্ষ্যে থাকিয়া তাহাদের দুঃখ দেখিয়া মনে মনে মৃদু হাস্য করিতেছেন, ইহা তাহারা স্বপ্নেও ভাবিতেন না। মানুষ কাঁদে-বিধাতা পুরুষ হাসে। মানুষ না বুঝিয়া তাহার দোষারােপ করে, কিন্তু ভাবিয়া দেখে না এই দুঃখের মধ্য দিয়াই কোন দিন না কোন দিন মঙ্গলময়ের মঙ্গল উদ্দেশ্য ফুটিয়া উঠিবে ! ঈশ্বরের নিয়মে অন্ধকারেই হীরকের সমধিক দীপ্তি—দারিদ্র ও দুঃখের মধ্যেই মনুষ্যত্বের চরম- বিকাশ। তাই বুঝি একজন খ্যাতনামা লেখক লিখিয়া গিয়াছেন- It is in misfortune that the character of an upright man shines forth with the greatest lustre, দুঃখের মধ্যেই শিশু রামসুন্দর শশিকলার ন্যায় দিন দিন বাড়িতে লাগিলেন। সুন্দর শিশুটী রামসুন্দর জীবনী কোকড় কেঁকড়া চুল—ছবির মত মুখখানি—রং যেন কাঁচা সােণা। লােকে দেখিয়া বলিত, “আহা, সােনার চাদ ছেলে।” যথাসময়ে হাতে খড়ি হইয়া গেল। বাণেশ্বর এইবার জ্যেষ্ঠপুত্র রামাদ ও তাহাকে একসঙ্গে পাঠশালায় পড়িতে দিলেন। দু’জনের বয়স বেশী তফাৎ নহে—দুই বৎসরের ছােটবড়। দুই ভাই একসঙ্গে গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় পড়িতে গেলেন। গ্রাম্য পাঠশালা—ছেলের সংখ্যা খুব বেশী নহে। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, তিলি এবং নিম জাতীয়ের ছােট ছােট ছেলেদের লইয়াই এই পাঠশালা। বালক রামসুন্দরের প্রতিভা দেখিয়া গুরুমহাশয় চমৎকৃত হইলেন—পড় মারাও রামসুন্দরের ন্যায় সহপাঠী পাইয়া বিশেষ আনন্দিত হইল। সকাল ও বৈকালে দু’বেলা পাঠশালা বসিত। পাঠশালায় গিয়া রাম- সুন্দর দেখিলেন, পিতা মাহিনা দেন মাসিক দুই আনা। উহাতে একজনের মাহিনাই হয়। কিন্তু তাহাদের দু’টী ভাইকেই তাে পড়িতে হইবে। পিতার ২ ২৫ রামসুন্দর জীবনী এমন অবস্থা নহে যে সংসারের খরচ চালাইয়া তাহাদের পড়ার জন্য। আর অধিক খরচ করেন। এরূপ অবস্থায় হয় তাহাকে না হয় ভ্রাত রামাদকে পাঠশালা ছাড়িতে হইবে। দুই একদিন ভাবিবার পর তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন এই বালকের মাথায় মৎলব আসিল। বালক ঠিক করিল এই দুই আনা হইতেই আমরা দুজনেই পাঠশালায় পড়া চালাইব আমি পড়িব সকালে, রামাদ পড়িবে বৈকালে। ইহাতে গুরুমহাশয়ের কিছু বলিবার থাকিবে না— অথচ দুইভায়েরই পড়া হইবে। গৃহে আসিয়া রাম- সুন্দর পিতার নিকট মনােভাব ব্যক্ত করিলেন- পিতা পুত্রের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও মিতব্যয়িতার পূর্ণ পরিচয় পাইয়া আনন্দাশ্রু ফেলিতে ফেলিতে পুত্রের মুখ চুম্বন করিলেন। পরে গৃহিণীকে ডাকিয়া বলি- লেন, “গিন্নি, আর আমাদের ভাবনা নাই—দুঃখের দিন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তােমার ছেলে রামসুন্দর থেকেই আমাদের বংশের পূর্ব গৌরব আবার ফিরে আসবে। কালে এই রামসুন্দর রামসুন্দর জীবনী বিখ্যাত লোেক হবে। পরবর্তী কালে পির এই ভবিষ্যৎ বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলিয়া গেল। রামসুন্দরের এই অদ্ভুত ধীশক্তি ও বাণিজ্য-বুদ্ধি (Speculation) দেখিয়া কি বলিতে ইচ্ছা হয় না The child is the father of the man ? পাঠশালায় পড়া চলিতে লাগিল ; কিন্তু এই পাঠ্যা- বস্থাতেই সংসারের কতক ভার রামসুন্দরের উপরেই পড়িল। কিন্তু বালক এ বয়সে কি করিয়া অর্থ উপার্জন করিবে তাহাই ভাবিবার বিষয় হইল। ভাবিয়া চিন্তিয়া রামসুন্দর শেষে কড়ির পােদ্দারী করিতেই মনস্থ করিলেন। শ্ৰীখােলের হাট তখন বিশেষ সমৃদ্ধ। পাঠশালায় পড়ার অবকাশে রাম- সুন্দর এই এখােলেই কড়ির পােদারী করিতে লাগিলেন। উপার্জন অতি সামান্য মাত্র এক আধ পয়সা। সমস্ত দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর এই এক আধ পয়সা লইয়া রামসুন্দর বাড়ী ফিরিতেন। মুখখানি শুষ্ক—দেহ ঘর্মাক্ত–পা দুখানি ধূলাধূসরিত। দারুণ ক্ষুধায় শরীর অবসন্ন-পিপাসায় কণ্ঠ শুষ্ক ২৭

রামসুন্দর জীবনী
আতপতাপে জ্যোতির্ময় চক্ষু’টা কোটর-গত।
রামসুন্দর বাড়ী আসিয়াই মাতাকে তাঁহার পথ
চাহিয়া বসিয়া থাকিতে দেখিয়া বলিতেন, “মা, বড়
ক্ষিধে।” মাতার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইত
ঘরে এমন কিছু খাবার নাই যে তাহা হাতে তুলিয়া
পুত্রকে খাইতে দেন। মাতা অঞ্চলপ্রান্তে চক্ষের
জল মুছিতেন। পুত্রকে লুকাইবার চেষ্টাই পুত্রের
জানিবার কারণ হইত। বালক রামসুন্দর মায়ের
কোলটীর কাছে গিয়া বসিয়া হাসিমুখে বলিত,
“মা, তুমি কেঁদ নাঘরে খাবার না থাকে আমার
কাছে আছে। এই দ্যাখ তাে মা—আজ আ’সবার
সময় মাঠ থেকে কেমন ডাগর ডাগর মেটে আলু
তুলে এনেছি। দাও তো মা, দুএকটা পুড়িয়ে--
আমি আর দাদা দু’জনেই খাব এখন।”
এই পােড় মেটে আলু খাইয়াই রামসুন্দরের যে
কত দিন চলিয়া গিয়াছে তাহার সংখ্যা নাই। কিন্তু
একদিনের জন্যও কেহ তাহার মুখে হাসি ছাড়া
দুঃখের রেখাটুকুও দেখিতে পায় নাই। কাপড়ের
৮

রামসুন্দর জীবনী
অভাব—একখানি কাপড়,তাহাও ছিড়িয়া গিয়াছে।
এক্ষণে উপায় ? কি করিয়া পাঠশালায় যাওয়া হয়
আর কি করিয়াই হাটের কাজ চলে? রামসুন্দর
দেখিলেন, পিতাকে বলিয়া কেবল তাহার দুঃখের
উপর অতিরিক্ত দুঃখের বোঝা চাপান মাত্র। তিনি
নিজেই অনভ্যস্ত হস্তে দুই সুতা লইয়া সেই শতগ্রন্থি-
যুক্ত কাপড়খানি সেলাই করিতে বসিলেন।
জ্বালানি কাষ্ঠের অভাব-বাড়ীতে একখানিও
কাঠ নাই। রামসুন্দর ভাের হইতে না হইতে বাড়ী
হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন। মাঠে মাঠে ঘুরিয়া
একরাশ গােবর বা ঘুটে কুড়াইয়া সকলের উঠি-
বার পূর্বেই বাড়ী ফিরিলেন। কোন দিন কোন
দিন বা নীলের ক্ষেতে যাইতেন। নীলকরেরা
তাহাদের প্রয়ােজনমত যাহা লইবার তাহা কাটিয়া
লইয়াছে—অবশিষ্ট গােড়াগুলিই রহিয়া গিয়াছে।
রামসুন্দর বহুশ্রমে সেই গােড়াগুলি খুড়িয়া তুলিতেন
এবং অনেক গুলি জড় হইলে একসঙ্গে আঁটি বাঁধিয়া
বাড়ী লইয়া আসিতেন।

রামসুন্দর জীবনী দুঃখে কষ্টে রামসুন্দরের দিনগুলি এইভাবে কাটিতে লাগিল। কিন্তু শেষে এমন হইল যে আর চলে না। অর্ধাশনে অনশনে দেহ ভাঙ্গিয়া পড়িবার উপক্ৰম-হাটের এতখানি রাস্তা হাঁটিয়া যাইবার সামর্থ্যও বুঝি যায়! পাঠশালায় আর মাহিনা দেওয়া হয় না। দুই আনা দুই আনা করিয়া জমিয়া থােক টাকায় গিয়া দাড়াইয়াছে। সুতরাং তাঁহাকে বাধ্য হইয়া পাঠশালা ছাড়িতে হইল। রামসুন্দরের জীব- নের এই অধ্যায়টাই বিশেষ স্মরণীয়। এই উন্নতি অবনতি, জীবন মরণের সন্ধিস্থলে দাঁড়াইয়া দশ- বৎসরের বালক রামসুন্দর যে প্রখর বুদ্ধিমত্তার, যে অনন্যসাধারণ স্বাবলম্বনের পরিচয় দিয়াছিলেন তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়জনক। সংসারের ঘূর্ণাবর্ভে পড়িয়া রামসুন্দর যখন কর্তব্য নির্ধারণে অসমর্থ তখন ভগবানের কৃপায় একদিনের একটী সামান্য ঘটনা হইতেই তাহার জীবনস্রোত পরিবর্তিত হইবার সূচনা হইল। রামসুন্দরের কষ্ট দেখিয়া তাহার মাসীমাতাঠাকুরাণী কতকগুলি কথা

রামসুন্দর জীবনী
বিক্রয়ে যে আধুলীটা পাইলেন তাহাই সঁহার হাতে
দিয়া তাঁহাকে কাজে লাগিতে বলিলেন। এই আধুলী
মূলধন লইয়াই রামসুন্দরের ব্যবসা আরম্ভ। প্রথম
দিনে ঐ আধুলী হইতে কয়েক আনার পান কিনিয়া
ঝিনাদহের হাটে বেচিতে গেলেন। সন্ধ্যার পর
হিসাব করিয়া দেখেন দিনটা নিতান্তই বৃথা যায়
নাই—আড়াই পয়সা আলাজ লাভ হইয়াছে।
রামসুন্দর বুঝিলেন এই পান হইতে কিছু হইবার
সম্ভাবনা। পরদিনও দেখা গেল, পূৰ্বদিন অপেক্ষা
আরও আধ পয়সা বেশী লাভ। এইরূপ প্রতিদিনই
লাভের মাত্রা একটু একটু করিয়া বাড়িতে লাগিল।
কিছুদিন এই ভাবে যায়। ইহার মধ্যে রামসুন্দরের
উপার্জন যে দুই এক টাকা না হইয়াছে এমন নহে।
তবে সংসারের অসচ্ছলতা যায় নাই—কিছু কমিয়াছে
মাত্র। কিছু দিন পরে সুবিধা বুঝিয়া তিনি পান
বিক্রয়ের সঙ্গেই লবণ ও গুড়ের বেচাকেনা আরম্ভ
করিলেন। এই সময়ে একদিন হাট হইতে বাড়ী
ফিরিতেছেন—খালি পা, পরণে একখানি ঘােট
৩

রামসুন্দর জীবনী কাপড়, বগলে একটা ভাঙ্গা ছাতা, মাথায় গুড়ের নাগরী। ঝিনাদহ হইতে আবাইপুরের পথ অনেকটা অনেকগুলি মাঠ ভাঙ্গিয়া এবং দুই একটী বাঁশ বন ছাড়াইয়া তবে রামসুন্দর বাড়ী পৌছিবেন। বৈশাখ মাস-কথায় বলে “কাল বৈশিখি।” কোন খানে কিছু নাই—হঠাৎ আকাশ মেঘে ছাইয়া গেল। রামসুন্দর দ্রুত চলিতে লাগিলেন—কিন্তু কিছুদুর গিয়াই ঝড়ে ঠেকিলেন। ভীম বেগে পবনদেব গর্জিয়া উঠিলেন। মড় মড় শব্দে গাছের ডাল ভাঙ্গিয়া পড়ি- তেছে—কড় কড় শব্দে মাথার উপর মেঘ ডাকি- তেছে—এদিকে মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়াছে। রাম- সুন্দর তখন একটী বাঁশঝাড়ের তলা দিয়া দ্রুতগতিতে চলিয়াছেন—মাথার উপর যে কতকগুলি বাঁশ মাটীর দিকে ঝুকিয়া পড়িয়াছে ইহা তাহার লক্ষ্যই হয় নাই। চলিতে চলিতে সেই বাঁশগুলিতে লাগিবা- মাত্র তাহার মাথার নাগরীটী মাটীতে ঠিকরাইয়া পড়িল এবং নাগরীর গুড়টুকুও নষ্ট হইবার উপ- ক্রম হইল। রামসুন্দর এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় ৩২ রামসুন্দর জীবনী কি করিবেন ঠিক করিতে না পারিয়া এবং বহু কষ্ট- সঞ্চিত অর্থের গুড়খানি নষ্ট হয় দেখিয়া তাড়াতাড়ি বাঁশ ঝাড়ের তলা হইতেই একটি হাঁড়ি কুড়াইয়া লইলেন এবং উহা যেমন তুলিয়া ধরিতে যাইবেন অমনি মহা বিস্ময়ে দেখিতে পাইলেন হাঁড়ির মধ্যে একটা বড় কড়ি রহিয়াছে। রামসুন্দর কিংকর্তব্য- বিমূঢ় হইয়া কড়িটী দেখিতে লাগিলেন। এমন সময় তাহার মনে হইল, কে যেন তাহার কাণে কাণে বলিতেছে “রাম, ভাবছিস কি ?-ওই কড়িশুদ্ধ হাঁড়ি নিয়ে বাড়ী যা। তাের ভাল হবে—তুই লক্ষপতি হবি।” রামসুন্দর পুলকে শিহরিয়া উঠিলেন এবং ভক্তি- ভরে হাড়িটী মাথায় লইয়া গৃহে ফিরিলেন। অদ্যা- বধি শিকদারবংশীয়দের গৃহে ঐ কড়িটী পূত দেব- সামগ্রীর মত সমান ভক্তি ও যত্নে রক্ষিত।

No text on this page.

কর্মজীবন।

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী
পূর্বোক্ত ঘটনার পর হইতেই রামসুন্দরের
উন্নতির আরম্ভ। এই সময়ে তাঁহার পূর্ণ যৌবন।
লবণ ও গুড় হইতে তিনি ক্রমে তুলার ব্যবসায়
ধরিলেন।
ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত গােহাইল
পাড়া নিবাসী আরাধন কুণ্ডু তখন ভূলার বিখ্যাত
মহাজন। রামসুন্দর ব্যবসাসূত্রে এই আরাধন কুণ্ডুর
সহিত পরিচিত হইলেন। আরাধন একজন অতি
সজ্জন মহাশয় ব্যক্তি। তিনি যুবক রামসুন্দরকে
প্রথম হইতেই স্নেহের চক্ষে দেখিলেন। রামসুন্দর ও
তাহাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করিতে লাগিলেন। এইরূপে
যুবক
রামসুন্দর ও বৃদ্ধ আরাধনের মধ্যে বিশেষ সৌহার্দ ও
আত্মীয় জন্মিল। রামসুন্দর বৃদ্ধকে কাকা, কাকা
বলিয়া ডাকিতেন-বৃদ্ধ ও তাহাকে পুত্রের মত স্নেহ
করিতেন। এইরূপে ভাগ্যলক্ষ্মী তাহার প্রতি
সুপ্রসন্না হইলেন।
তখনকার দিনে আরাধনের মত
৩৭

রামন্দর জীবনী
একজন ধনী মহাজনের সহায়তা প্রাপ্ত হওয়া বিশেষ
সুবিধারই কথা। রামসুন্দর এখান হইতে মােটা
মােটা টাকার তুলা ধারে পাইতেন এবং উহা
আবাইপুর ও সােদপুর প্রভৃতি স্থানে লইয়া গিয়া
বিক্রয় করিতেন। পরে আরাধনের টাকা শােধ
হইত। এইরূপে তুলার কাজ হইতে রামসুন্দরের
বেশ উপার্জন হইতে লাগিল। কাৰ্য্যের আর একটু
সুবিধা হইলে তিনি সােদপুরে একটী মােকাম
খুলিলেন এবং এই সঙ্গে চাউলের ব্যবসাও আরম্ভ
করিলেন।
এই সময় পশ্চিমে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। অন্নাভাবে সহস্র
সহস্র লােক মরিতেছে। একে গরীবের দেশ, তাহাতে
অজমা। ইহার উপর কর্তব্যজ্ঞানহীন বিবেকশূন্য
মহাজনদের অযথা মূল্যবৃদ্ধিতে
চাউলের বাজার
আগুন। যথাসময়ে সমস্ত সংবাদই রামসুন্দরের কর্ণে
পৌছিল। রামসুন্দর সমস্ত শুনিয়া বাড়ীতে আসিয়া
বলিলেন, “দ্যাখ, আমি একবার পশ্চিমে যা’ব মনে
করছি। শুনলাম সেখানে নাকি ভারি কষ্ট।

রামসুন্দর জীবনী
অনাহারে হাজার হাজার লােক মারা যাচ্ছে।
যারা বেঁচে আছে এমন ধরা অনেক লােক নাকি
শেয়াল কুকুরের মত কোথায় চারিটি অন্ন পাবে এই
ভেবে দোরে দোরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাপ মায় নাকি
ছেলেমেয়েদের খেতে দিতে না পেরে তাদের নিজের
হাতে গলা টিপে মেরে ফেলছে-” বলিতে বলিতে
তঁাহার করােধ হইয়া আসিল। তিনি অতিকষ্টে
আত্মদমন করিয়া বলিলেন, আমি যাব—আর
গিয়ে একবার দেখবাে সেই পাষণ্ড মহাজনদের, যারা
চামারের মত এই সব বেচারী গরীবকে মেরে
নিজেদের বাড়ী বালাখানা ক’ছে। তাদের ব্যবসা
মাটী না করি তাে আমার নামই মিথ্যা। আর
সঙ্গে সঙ্গে দেখিয়ে দেব গরীবদের না মেরেও কি
করে পয়সা রােজগার করতে হয়।”
পরদুঃখ-কাতর রামসুন্দর উত্তেজনার মুখে এ
সমস্ত কথা বলিলেও উহা কি করিয়া কাৰ্য্যে পরিণত
করিবেন তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। তাঁহার যাহা
মৎলব তাহাতে বিস্তর টাকার প্রয়ােজন। অবশ্য

রামসুন্দর জীবনী তাহার এমন অর্থ নাই যাহাতে তার উদ্দেশ্যটা সিদ্ধ হইতে পারে। তাহা হইলে এ ক্ষেত্রে কর্তব্য কি? রামসুন্দর যুক্ত করে ঈশ্বরের স্মরণ লইলেন। খানিকটা এই ভাবে চিন্তা করিবার পর একটা কি মৎলব ঠিক করিলেন এবং ময়লা চাদর খানি কাঁধে ফেলিয়া লক্ষ্মীপুরে প্রসিদ্ধ রায় বাবুদের বাড়ী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। এই রায় বাবুরা ঐ অঞ্চলের একটী বনিয়াদী ঘর। ধনে মানে তখন তাহারা সৰ্বাগ্রগণ্য। তাহাদিগের তদানীন্তন বংশধরটি একজন অতি উপযুক্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি প্রিয়দর্শন রামসুন্দরের সৎস্বভাব, বুদ্ধিমত্তা ও কাৰ্য- তৎপরতা দেখিয়া তাহার উপর বড়ই প্রীত ছিলেন এবং প্রয়ােজন হইলে তাহাকে টাকা কড়ি কৰ্জ দিয়াও সাহায্য করিতেন। রামসুন্দর ইহার বিশেষ অনুগত এবং অনুগৃহীত। রায় বাবু সটকায় তামাক টানিতেছেন—রাম- সুন্দর সটাং তাহার খাসকামরায় গিয়া উপস্থিত। রামসুন্দরকে আসিতে দেখিয়াই বাবু মুখের নলটা ৪০

রামসুন্দর জীবনী
পাশে রাখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,“কি হে রামসুন্দর,
খবর সব ভাল ?~-ব্যবসাবাণিজ্য চলছে বেশ ?*
রাম। আজ্ঞে হ—আপনার দয়ায় খবর সবই
ভাল।
রামসুন্দর আর অধিক কিছু ভাঙ্গিবেন না মনে
করিলেন। তিনি বাবুকে বেশ ভালরূপই চিনিতেন।
তিনি নিজে কিছু না বলিলেও বাবু তাঁহার মুখ
দেখিয়াই তিনি যে কিছু কাজে আসিয়াছেন বুঝিয়া
লইবেন, ইহা রামসুন্দর জানিতেন। সুতরাং বাবু
যাহাতে নিজেই কথা পাড়েন এজন্য আর বেশী কথা
বলিলেন না।
বাবু আবার তামাক টানিতে লাগিলেন,পরে
রামসুন্দরের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “তা, রামসুন্দর,
তােমার মুখখানা যে বড় শুনে শুনে দেখছি
ব্যাপার কি ? নূতন ব্যবসা ট্যবসা কিছু আরম্ভ
করলে না কি ? বড় কি খাটতে হচ্ছে ?”
রাম। আজ্ঞে ব্যবসা কিছু আরম্ভ করিনি—তবে
করবে মনে করছি।
৪১

রামসুন্দর জীবনী বাবু। কি রকম? কি রকম? আবার কি আরম্ভ করবে হে? বলি বাদ কিছুই দেবে না ? তা এ ব্যবসাটা কি রকম হবে শুনি। রামসুন্দর সােজা কথায় আনুপূর্বিক সমস্ত ব্যক্ত করিলেন এবং শেষে বলিলেন, “পয়সার জন্য যত না হােক এই লােক গুলােকে বাঁচাতে আর কতক- গুলো অর্থপিশাচ ব্যবসাদারদের শিক্ষা দিতে এ কাজটা আমাকে করতেই হয়েছে। এখন আপ- নার উপর সমস্ত নির্ভর—বরাবরই আমার উপর আপনার দয়া। খুব বেশী টাকার দরকার না হলে আর আপনার কাছে ছুটে আসতাম না--আমি সামান্য যে দু’চার পয়সা নিয়ে নাড়াচাড়া করছি তাতেই চালিয়ে দিতাম। বাবু ঈষৎ জকুঞ্চিত করিয়া কি ভাবিলেন—পরে বলিলেন “তা এতে টাকা কি রকম প্রয়ােজন ?* রাম। আজ্ঞে, টাকাটা কিছু বেশী। আমার মনে হয় এই লাখ খানেক টাকা হলেই চলবে—অন্ততঃ নব্বই হাজার টাকার জন্যে আপনি ভাববেন

রামসুন্দর জীবনী
। আমি মাসখানেকের মধ্যেই ও টাকাটা শােধ
করে দেব। আর যদি দরকার হয়
কথায় বাধা দিয়া বাবু যেন মহা চটিয়াছেন এই
ভাব দেখাইয়া বলিয়া উঠিলেন “মসুন্দর, তােমায়
আমি লাখটাকা কেন এক পয়সাও দেবনা। তুমি তাে
সব কর্তে পার দেখতে পাই। আমি তােমায় লাখ টাকা
দিয়ে তুমি শােধ দেবে কি না দেবে তাই ভাবতে যাব,
এ যখন তােমার মনে হয়েছে তখন তুমি আমায়
আরও কত নীচু মনে কর্তে না পার তাতো জানিনে।
তার উপর আবার বলছিলে, আর যদি দরকার
হয় তা হলে কি হবে? হাঁ, আমায় সুদ দেবে?
কেমন, এই না? জান, অন্য কেউ এসে এ ভাবের
কথা বললে দরওয়ান ডেকে তার গলায় হাত দিয়ে
এখান থেকে বার করে দিতাম। তুমি বলে পার
পেয়ে গেলে। যাও—হাঁ করে দাড়িয়ে থেকো না।
নব্বই হাজার নয়—ঐ এক লাখ টাকাই নিয়ে যাও।
যখন সুবিধা হয় দিও-কড়ারে আমি কখনও
কাকেও টাকা ধার দিইনে।”

রামসুন্দর জীবনী রামসুন্দর রায় বাবুর সম্মুখে হাতজোড় করিয়া বলিলেন, “বাবু, আপনি দেবতা—আপনাকে চিনতে পেরে আপনার অসম্মান করেছি। আমায় ক্ষমা করুন।” রায় বাবু আসিয়া রামসুন্দরের হাত ধরিলেন এবং হাসিয়া বলিলেন, “যাও! বাজে কথা ছেড়ে দাও। এখন এস, টাকাটা নিয়ে যাবে। চল, ব্যবস্থা করে দিইগে।” রায়বাবুর নিকট লক্ষ টাকা পাইবার পর রাম- সুন্দর আহারনিদ্রা ত্যাগ করিয়া বাখরগঞ্জ, নাদন ঘাট, বরিশাল প্রভৃতি স্থান হইতে চাউল সংগ্রহ করিতে লাগিলেন। এক মাসের মধ্যে প্রায় লক্ষ মণ চাউল সংগৃহীত হইল। পূৰ্ব্ব হইতে মৃজাপুরে একটী মােকাম খুলিবার ব্যবস্থা হইয়াছিল। এক্ষণে সমস্ত চাউলই রামসুন্দর মৃজাপুরের মােকামে পাঠাইতে লাগিলেন। পশ্চিম প্রদেশে একটা সাড়া পড়িয়া গেল। রামসুন্দর অন্যান্য মহাজন অপেক্ষা অনেক কম মূল্যে চাউল বিক্রয় করিতে লাগিলেন। ৪৪ রামসুন্দর জীবনী তাহার টাকা বেশী-পড়ন কম—মালও অনেক ; সুতরাং অন্যান্য ব্যবসায়ীরা হটিয়া গেল। চাউলের কাৰ্য্য তাঁহার মৃজাপুরে একচেটিয়া হইল। রাম- সুন্দরের ইহাতে বিস্তর লাভ হয় এবং ইহা হইতেই তিনি তদানীন্তন ব্যবসায়ীদের মধ্যে অগ্রগণ্য হইলেন। মৃজাপুরের মােকাম হইতে তিনি আর একটা নূতন ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। সস্তায় পশ্চিম দেশীয় তুলা কিনিয়া তিনি কলিকাত, সােদপুর ও জিয়াগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে উহা পাঠাইতে লাগি- লেন। ইহাতেও যথেষ্ট লাভ হইতে লাগিল। কার্যের সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া এবং উপযুক্ত কৰ্ম্ম- চারীর হস্তে মােকামের ভর দিয়া রামসুন্দর দেশে ফিরিলেন। দেশে রামসুন্দর তখন একটী দেখিবার জিনিষ। আত্মীয় অনাত্মীয়ে তাহার গৃহ ভরিয়া গেল। সকলের মুখেই রামসুন্দরের সুখ্যাতি। কেহ বলিতেছেন, “আরে, এতাে জানা কথা—পড়েই রয়েছে। রামসুন্দর খুড়ে যে একটা মানুষ হবে ৪৫

রামসুন্দর জীবনী
এতে আমরা গােড়া থেকেই বলে আসছি।” আর
একজন বলিতেছেন, “রামসুন্দর ভায়ার উন্নতিতে
সারা গ্রামটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এই ভাবে
পরিচিত অপরিচিত, শত্রু মিত্র, সকলেই রামসুন্দরের
যশােগান করিতে লাগিল। পৃথিবীর নিয়মই এই
যাহারা দুঃখের দিনে একবার উকি মারিয়াও
দেখিবার অবকাশ পায় না, সুখের দিনে তাহারাই
আবার পরম মিত্র হয়।
রামসুন্দর দেশে ফিরিবার কিছু দিন পরে চিনির
ব্যবসা আরম্ভ করিলেন এবং এই কাৰ্য্য হইতেই
বিখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী রামগােপাল ঘােষের সংস্রবে
আসিলেন। যশােহর, শান্তিপুর এবং গােবরডাঙ্গা
প্রভৃতি স্থান হইতে প্রচুর পরিমাণে চিনি সংগ্রহ
করিয়া কলিকাতায় পাঠাইতে লাগিলেন। প্রথম
বৎসরেই এই চিনির কাৰ্যে তিনি বিস্তার লাভ করেন।
এই সময়ে পূর্বোক্ত রামগােপাল ঘােষের তিনিই
প্রধান মহাজন (Banker)। এই কাৰ্যে প্রয়ােজন
হইলে সময় সময় দুই তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত
৪৬

রামসুন্দর জীবনী রামসুন্দরকে বাহির করিতে হইত। রামসুন্দরের বিপুল অর্থের কথা তখন দেশ বিদেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে এবং তাহার মহাজনী কাৰ্য্যের (Banking business) এরূপ সুনাম হইয়াছে যে সকল ব্যবসা- দারই রামসুন্দরের টাকা লইয়া কাৰ্য্য করিবার জন্য ব্যগ্র! এ বিষয়ে অনেক ইংরাজ কুঠিয়াল সাহেবরাও রামসুন্দরের যথেষ্ট সাহায্য পাইতেন। তন্মধ্যে বিখ্যাত কুঠিয়াল মিঃ কেনী (যাহার নামে কুষ্টিয়ার বর্তমান কেনিক বাজারের নামকরণ হইয়াছে) জেম্‌স টুইডি এবং মিঃ ওমেন সমধিক প্রসিদ্ধ। সময়ে রাম- সুন্দরই তাহাদের প্রধান মহাজন হয়েন। তাহাদের যত টাকার প্রয়ােজন রামসুন্দর সমস্তই সরবরাহ করিতেন এবং ঐ টাকা কলিকাতায় Messrs. R, Thomas & Co. (ইহার বর্তমান নাম Messrs, J. Thomas & Co.) Moran & Co. Gisborne & Co., Jardine Skinner & Co. এবং Oriental Bank প্রভৃতির নিকট হইতে হণ্ডিতে (Draft) টাকা লইতেন। এই মহাজনী ৫৭ রামসুন্দর জীবনী কাৰ্যে রামসুন্দর এত টাকা উপার্জন করিয়াছিলেন যে তাহা শুনিলে আশ্চর্য্য হইতে হয়। রামসুন্দরের বরাৎ তখন খুলিয়া গিয়াছে। তিনি যে কাৰ্য্য ধরিতেছেন তাহাতেই প্রচুর লাভ প্রচুর অর্থসমাগম। এই সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া রাম- সুন্দর আর দুইটী নুতন কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন- উহার মধ্যে একটী কাপড়ের আর একটী নীলের। সৈয়দপুরের নিকটবর্তী বােয়ালমারী গ্রামে কাপড়ের এক বৃহৎ দোকান খুলিলেন; এবং শান্তিপুর, ফরাস ডাঙ্গা, ঢাকা প্রভৃতি স্থান হইতে বিস্তর টাকার কাপড় আনাইয়া বিক্রয় করিতে লাগিলেন। নীলের কাৰ্যও বেশ চলিতে লাগিল এবং তিনি সুবিধা বুঝিয়া কলিকাতায় হাঠখােলা অঞ্চলে দেশীয় লােকের উৎপন্ন নীলের এক প্রকাণ্ড আড়ৎ খুলিলেন। চারিদিক হইতে অর্থসমাগম হইতে লাগিল এবং অল্পদিনের মধ্যেই রামসুন্দর ধনী বলিয়া খ্যাত হইলেন।

শেষ জীবন ।

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী আমেরিকার চিন্তাশীল লেখক (Emerson) এমাস তাহার একটি সারগর্ভ প্রবন্ধে afatiga--"There is always room for a inan of force and he makes room for others ”চরিত্রবলে বলীয়া, অধ্যবসায়ী, দৃঢ় সংকল্প ব্যক্তি নিজের উন্নতির পথ নিজেই করিয়া লয়েন এবং অপরের জন্য পথ করিয়া দেন। রামসুন্দর একটী আধুলি মাত্র মূলধন লইয়া ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছিলেন—প্রথম দিনে ব্যবসায়ে লাভ করিয়া- ছিলেন মাত্র আড়াই পয়সা-ব্যবসায় হইতে প্রকৃত প্রস্তাবে অবসর লইবার সময় প্রভূত সম্পত্তির অধিপতি হইয়াছিলেন। যাহারা মূলধনের অভাব স্বাধীন-বৃত্তি অবলম্বনের অন্তরায় মনে করেন, রাম- সুন্দরের জীবনী পাঠ করিয়া তাহাদের এই অমূলক ধারণা দূরীভূত হইবে এরূপ আশা করা যায়। অপরন্তু, কর্মক্ষেত্র হইতে অবসর লইয়া তিনি যাহা রামসুন্দর জীবনী করিয়াছিলেন তাহাতে উল্লিখিত লেখকের উক্তির দ্বিতীয় অংশও যে সত্য তাহা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। এই সময়ে ব্যবসায় বাণিজ্য-প্রচার তাঁহার মুখ্য কাৰ্য্য হইয়াছিল। উপার্জনপ্রয়াসী ব্যক্তিমাত্রকেই রামসুন্দর স্বাধীন ব্যবসায় করিতে উপদেশ দিতেন- মূলধনের অভাব শুনিলেই তাঁহাকে নিজের জীবনের ইতিহাস বলিতেন—একান্ত প্রয়ােজন হইলে আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্যও করিতেন। তাহার উপদেশ অনুযায়ী কাৰ্য্য করিয়া, অনেকে সামান্য মূলধন লইয়া ব্যবসায়ে বিশেষ উন্নতি লাভ করিয়াছেন। রামসুন্দর তাহার গ্রামের ও চতুঃপার্শ্ববর্তী গ্রাম- সমূহের অনেক গৃহস্থকে সুতা কাটিবার জন্য চরকা ও কাপড় বুনিবার জন্য গত ইত্যাদি যােগাইতেন, এবং তাহাদের শ্রমজাত সুতা ও কাপড় নিজে খরিদ করিয়া লইতেন। এই উপায়ে অনেক গৃহস্থের জীবিকা নির্বাহ হইত। ইহাই প্রকৃত দেশ-হিতৈ- ষণা—ইংরাজীতে যাহাকে practical patriotism বলে। আজকাল কাপড় যেরূপ দুৰ্ম্ম ল্য হইয়াছে রামসুন্দর জীবনী w, । ও তজ্জন্য জনসাধারণের যেরূপ কষ্ট ও অসুবিধা হইতেছে, তাহাতে রামসুন্দরের প্রবর্তিত উপায় অব- লম্বন করিলে তাহার প্রতীকার হইতে পারে। চরকা ও তাঁতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা যে এই বস্ত্র-বিভ্রাটের —এমন কি একমাত্র মহৌষধ—ইহা সকলের বুঝিয়া দেখা উচিত। কিন্তু রামসুন্দরের চেষ্টা ও অধ্যবসায় একমাত্র বাণিজ্য-প্রচারে আবদ্ধ ছিল না। তিনি আনুষ্ঠানিক নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন—ধর্মশাস্ত্রে যে সকল পূজা- পদ্ধতি ক্রিয়াকর্মের অনুশাসন অাছে, তাহা যথাসাধ্য পালন করিতেন। এই সকল পদ্ধতি ও ক্রিয়াকলাপ যে প্রকৃত আধ্যাত্মিক উন্নতির সােপান-মূর্তিপূজা যে ভ্রান্ত নিরর্থক কুসংস্কার নহে-তাহা রামসুন্দর বিশ্বাস করিতেন এবং হিন্দুনামধারী প্রতিবেশী ও অন্যান্য জনসাধারণের এ সম্বন্ধে অনাস্থা ক্রমশঃ বৰ্ধিত হইতেছে দেখিয়া তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ অনু- ভব করিতেন। আধ্যাত্মিক জীবনের সহিত নৈতিক জীবন যে অবিচ্ছেদ্যরূপে সম্বদ্ধ—একের উন্নতি রামসুন্দর জীবনী অবনতিতে যে, অপরেরও আনুপাতিক উন্নতি অব- নতি অবশ্যম্ভাবী—ইহা একটী অভ্রান্ত সত্য-সকল দেশে সকল যুগেই হইয়া আসিতেছে। নানা কারণে শাস্ত্রনির্দিষ্ট ক্রিয়াকলাপের লােপ হইতে ছিল। অভাব দারিদ্র্য যে ইহার অন্যতম কারণ তাহা রামসুন্দর স্পষ্ট বুঝিতে পারিয়াছিলেন। লুপ্ত- প্রায় ক্রিয়াকলাপের পুনরুদ্ধার যে কি কষ্ট ও পরিশ্রম সাধ্য এবং তাহার নিজের শক্তি যে কত ক্ষুদ্র তাহা রামসুন্দর জানিতেন; তথাপি তিনি এই সাধু কাৰ্য্যে পশ্চাৎপদ না হইয়া যথাশক্তি চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং কৃতকাৰ্যও হইয়াছিলেন। আমরা এস্থলে তঁাহার নানা উদ্যোগের মধ্যে দুই একটা মাত্র উদাহরণ দিব। দুর্গোৎসব বঙ্গীয় হিন্দুর সর্বপ্রধান উৎসব। কিন্তু দুর্গাপ্রতিমার সংখ্যা ক্রমশঃ হ্রাস হইয়া আসিয়াছিল। রামসুন্দরের নিজগ্রামে ও চতুঃপার্শ্ব- বর্তী গ্রামসমুহে পূর্বে যাহারা প্রতি বৎসর দুর্গা- পূজা করিয়া আসিতেছিলেন তাঁহাদের অনেকেই এই ক্রিয়া নানা কারণে বন্ধ রাখিয়াছিলেন। রাম- ৫

রামসুন্দর জীবনী
সুন্দর এখন অনেককে অর্থসাহায্য করিয়া আবার
পূজা আরম্ভ করিতে প্রােৎসাহিত করিয়াছিলেন।
জাবীর পবিত্র জল এই পূজায় ও অন্যান্য ক্রিয়া-
কলাপে প্রধান উপকরণ—না হইলে চলে না।
এই জলের বিশেষ অভাব দেখিয়া রামসুন্দর নিজ
ব্যয়ে বহুদূর হইতে গঙ্গাজল আনাইয়া অনেক
পূজাবাড়ীতে রাখাইয়া ছিলেন। ইহাতে এই অসুবিধা
সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হইয়াছিল।
সাধারণের ব্যাবহারিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতিকল্পে
রামসুন্দরের একাগ্রতা ও অধ্যবসায় এখনও
অনেকে গৌরবের সহিত উল্লেখ করেন।
এসকল ছাড়া শেষজীবনে রামসুন্দর নানাবিধ
পুণ্য কাৰ্য্য করিয়াছিলেন। দুঃস্থ বিপন্ন লােকের
উপকারের জন্য তাহার অনেক দানের কথা শুনা
যায়। অনেক সাধারণ হিতকর কাৰ্য তাহার পবিত্র
স্মৃতির সহিত অদ্যাপি জড়িত রহিয়াছে।

No text on this page.

পারিবারিক বিবরণ ও মৃত্যু।

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী এইখানে রামসুন্দরের পারিবারিক জীবনে একটু পরিচয় দিব। রামসুন্দরের দুই বিবাহ। প্রথমা পত্নীর নাম লক্ষ্মীমণি-দ্বিতীয়া দুর্গামণি। লক্ষ্মীমণির গর্ভে তাহার একটী পুত্র সন্তান জন্মে নাম নীলমাধব। তাঁহার উন্নতির প্রথম অবস্থাতেই লক্ষ্মীমণির মৃত্যু হয়। প্রিয়তমা সহধর্মিণীর মৃত্যুতে রামসুন্দর শােকে দুঃখে মুহ্যমান হইয়া পড়েন। কালের শীতল প্রলেপে শােকাবেগ একটু প্রশমিত হইলে আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবের অনুরােধে তিনি দুর্গামণিকে বিবাহ করেন এবং তাহারই গর্ভে তাহার ছয় পুত্র এবং তিনটী কন্যা জন্মগ্রহণ করে। পুত্র- দিগের নাম—বেণীমাধব, যাদব, বিশ্বম্ভর, অকুর, ক্ষেত্র, ধ্রুব। যখন কনিষ্ঠ ধ্রুব দুই বৎসরের শিশু এবং ক্ষেত্রর বয়স ছয় বৎসর মাত্র তখন রাম সুন্দরের অবসরের সময় আসিল—পৃথিবীর পরপর হইতে কালের ডাক পড়িল। রামসুন্দর পীড়িত

রামসুন্দর জীবনী
হইলেন। প্রথমে সামান্য জ্বর—পরে উহা সাংঘাতিক
হইয়া দাঁড়াইল। কবিরাজ আসিয়া নাড়ী দেখিয়া
মুখ বাঁকাইলেন। পরে গম্ভীর মুখে বলিলেন,
“জীবনের আশা নাই, শীঘ্রই দীপ নিৰ্বাণ হবে।”
তৎক্ষণাৎ সজ্ঞানে ৮ গঙ্গাযাত্রার ব্যবস্থা হইয়া গেল।
সঙ্গে সঙ্গে এই নিদারুণ বার্তা গ্রামময় রাষ্ট্র হইল।
গ্রামে হাহাকার পড়িয়া গেল। সে এক মর্মভেদী
করুণ দৃশ্য ! গ্রামের ধনী নিধন, ইতর ভদ্র এমন
কি কুলী মজুরেরা পর্যন্ত আপন আপন কাজ
ছাড়িয়া রামসুন্দরকে শেষ দেখা দেখিতে আসিল।
সকলের মুখেই এক কথা, “আজ সত্য সত্যই আমরা
অনাথ হ’লাম—আবাইপুরের আজ মহা দুর্দিন।
দেশের মাথা—গরীবের মা-বাপ-ধনীর সহায়
রামসুন্দর আমাদের ফাঁকি দিয়ে চল।”
অর্ধশতাব্দীর পূর্বে এই করুণ দৃশ্যটী স্মরণ
করিলে এখনও চক্ষে জল আসে-কষ্ঠ রুদ্ধ হয়।
ভাষায় এমন শব্দ নাই-শব্দে এমন ঝঙ্কার নাই যে
যাহাতে সাধারণের এই আন্তরিক শােকানুভূতির

রামসুন্দর জীবনী
সম্যক পরিচয় হইতে পারে। ইহা বুঝি শুধু বুঝিবার,
অনুভব করিবার—দেখাইবার নহে।
নিভৃততম প্রদেশ হইতে যে হাহাকারধ্বনি একদিন
আবাইপুরের জলে স্থলে সৰ্বত্ৰ কঁদিয়া ফিরিয়াছিল,
বুঝি আন্তরিকতার হিসাবে, প্রাণস্পর্শী ব্যথার
দরদে, তাহা অতুলনীয়।
গঙ্গাযাত্রার পর পথেই গোঁসাই দুর্গাপুরে সন
১২৭০ সালের ২৫ শে বৈশাখ তারিখে (কবিরাজের
কথাই ফলিয়া গেল ) রামসুন্দর পবিত্র হরিধ্বনি
শুনিতে শুনিতে চিরতরে চক্ষু মুদিলেন-বঙ্গের
বাণিজ্য-আকাশ হইতে একটী উজ্জ্বল নক্ষত্র খসিয়া
পড়িল!
যথাসময়ে উপযুক্ত পুত্রের পিতার সমােচিত
শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন করেন। এরূপ সমারােহের শ্রাদ্ধ
যশােহর জেলায় খুব কমই হইয়াছে বলিয়া শুনা যায়।
পরে পিতার স্মৃতি-রক্ষার জন্য বিশ্বম্ভর-প্রমুখ তাহার
পুত্রগণ বহু ব্যয়ে আবাইপুর গ্রামে একটী উচ্চ
ইংরাজি বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া পিতার নামানুসারে

রামদের জীবনী উহার Ramsunder Institution নামকরণ করেন। রামসুন্দরের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র সুচরিত্র ধ্রুবচন্দ্র এই স্কুলের বর্তমান সেক্রেটারী। তাহার কাৰ্যকুশলতায় এবং তত্ত্বা কৰ্ম্মবীর বিচক্ষণ ক্ষেত্রমােহনের তত্ত্বাবধানে উহা দিন দিন উন্নতির পথে অগ্রসর হইতেছে এবং রামসুন্দরের অক্ষয় কীৰ্ত্তি ঘােষণ করিতেছে। সন ১৩০৪ সালে বাণিজ্য-ক্ষেত্রেও এই মহাত্মার স্মৃতি-রক্ষাৰ্থ তাহার কৃতী পুত্রগণ Ramsundar Sikdar & Co. নামক কলিকাতায় এক বিখ্যাত পাটের ব্যবসায় আরম্ভ করেন। সন ১৩১৯ সালে উক্ত কোম্পানীর পাটের ট্রেডমার্ক গুলি পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া ধাৰ্য্য হয় এবং আজ পর্যন্তও উহা সর্বশ্রেষ্ঠই আছে। এইরূপে দেশবিদেশে রাম- সুন্দরের নাম বিস্তৃত হইয়া পড়ে। রামসুন্দর এই নামে কি মাহাত্ম্য আছে জানি না; কিন্তু এই নামের গুণেই নিউ ইয়র্ক এবং জাপান প্রভৃতি স্থান হইতে রামসুন্দর জীবনী অনেক প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ীরা কলিকাতায় আসিয়া উক্ত ট্রেডমার্ক গুলির ছবি তুলিয়া লইয়া গিয়াছেন। সুতরাং শুধু বঙ্গদেশে কেন পৃথিবীর বাণিজ্যক্ষেত্রে রামসুন্দরের প্রতিষ্ঠা। ভগবানের আশীর্বাদে রাম- সুন্দরের নাম কালের বুকে অমর অক্ষয় হইয়া থাকুক ইহাই আমাদের আন্তরিক কামনা।

No text on this page.

মরণীয় ঘটনা। দয়া। "Getting money is not all a man's business : to cultivate kindness is a valuable part of the business life"-Dr. Johnson,

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী
দয়ার প্রতিমূর্তি রামসুন্দর প্রকৃত দুঃখীর দুঃখ
দূর করিতে সর্বদাই মুক্তহস্ত ছিলেন এবং অর্থ
উপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে ইহাও একটী অবশ্য করণীয়
কাৰ্য্য জ্ঞান করিতেন।
কলিকাতা হইতে নৌকাযােগে রামসুন্দর বাড়ী
ফিরিতেছেন। সন্ধ্যার আর বেশী বিলম্ব নাই।
সঙ্গে লােকজন অল্প-নৌকা নদীর কিনারার নিকট
দিয়াই চলিয়াছে। রামসুন্দর ছইএর বাহিরে বসিয়া
সূৰ্যাস্ত দেখিতেছেন। খালি গা—সুন্দর মুখখানির
উপর সূর্যের শেষ রশ্মিটুকু আসিয়া পড়িয়াছে।
রামসুন্দর নিবিষ্টমনে পশ্চিম আকাশের দিকে চাহিয়া
আছেন। এমন সময় হঠাৎ কাণে গেল কে যেন
কাঁদিতে কাদিতে বলিতেছে-“ওগাে আমাদের
কি হবে গাে-সে তো শুধু নিজে মলে না
আমাদেরও মেরে গেল। রামসুন্দর আর
স্থির থাকিতে পারিলেন না। তখনই নৌকা
৬৭

রামসুন্দর জীবনী দেখেন, একটী ; বাঁধিতে বলিয়া খালি পায়ে শব্দ লক্ষ্য করিয়া অগ্রসর হইলেন। কিছু দূর আসিয়া স্ত্রীলােক বসিয়া বসিয়া কঁদিতেছে ; পাশে দু’টী শিশু -একটী চার বৎসরের, আর একটী দুই বৎসরের-তাহার মুখপানে চাহিয়া বসিয়া আছে। রামসুন্দর নিকটে আসিয়া স্নেহপূর্ণ কণ্ঠে ডাকিলেন, “মা ঈদ কেন? আমি তােমার সন্তান-আমায় তুমি পুত্ৰজ্ঞানে সমস্ত খুলে বল।” রমণী কাঁদিতে কাদিতে বলিল, “কি আর বলব বাছা। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আজ দুপুরেই ভগবান আমার সিথের সিঁদুরটুকু মুছে দিয়েছেন। বাবা, গরীব আমরা। ঘরে যা কিছু ছিল—রােগের চিকিৎসায় তার শেষ পয়সাটী পর্যন্ত খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু এত করেও বাঁচাতে পার- লাম না। ভাঙ্গা বাড়ী থানা পর্যন্ত শেষে বাঁধা পড়লো। পাওনাদার এত দিন রয়ে রয়ে আজ সকালে এসে বলে গিয়েছে আজ সন্ধ্যার মধ্যে তার পাওনা টাকা মিটিয়ে না দিলে সে আমাদের

রামসুন্দর জীবনী
ভিটে-ছাড়া করবে। এখন এ অবস্থায় এ গুড়াে
দু’টুকরােকে কি বা খাওয়াই আর কি দিয়ে দেনা
শুধেই বা মাথা গোঁজবার ভিটেটুকু বজায়
রাখি? তাই, বাবা, কাঁদতে কাঁদতে ভগবানকে
জানাচ্ছি।”
রামসুন্দর গিয়া দুই কোলে দুইটী শিশুকে তুলিয়া
ইলেন—পরে বলিলেন, “চল তে, মা, আমার সঙ্গে।
তােমার কোন ভাবনা নেই—আমি তােমার সমস্ত
বন্দোবস্ত ঠিক করে দিচ্ছি।”
রামসুন্দরের কথাগুলির মধ্যে এমন একটা
আন্তরিকতার ভাব ফুটিয়া উঠিল যে রমণী নিশ্চিন্ত
মনে এই অপরিচিতের সঙ্গে সঙ্গে চলিল। খানিকটা
আসিয়া তাহারা একটী ভাঙ্গা মেটে ঘবের সম্মুখে
আসিয়া পৌছিলেন।
রমণী কঁাদিতে দিতে বলিল, “বাবা, এই
আমার স্বামীর ভিটে।”
রামসুন্দর বাড়ীর উঠানে গিয়া দাড়াইলেন।
ইতিমধ্যে রামসুন্দরকে দেখিয়া অনেকগুলি গ্রামবাসী

রামসুন্দর জীবনী
আসিয়া জুটিয়াছিল। রামসুন্দর তাহাদিগকে ডাকিয়া
বলিলেন-“শুনলাম এই বাড়ীখানা বাঁধা আছে।”
একজন অগ্রসর হইয়া বলিল, “আজ্ঞে হুঁ, বন্ধক
আছে—আমার কাছেই আছে।”
রাম। কত টাকায় ?
লােক। আজ্ঞে একশাে টাকায় ছিল। এখন
সুদে আসলে প্রায় দেড়শ টাকা হয়েছে।
রাম। বাড়ীর কৰ্ত্তাতে মারা গিয়েছেন। এখন
শােধ দেবেন কে? দুটী অপােগণ্ড শিশু আর
লােকটী তাহার কথায় বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল,
“থামুন, থামুন, মশাই—আপনার এত মাথা ব্যথায়
কাজ নেই। আমার কাজ আমি বেশ বুঝি। আমি
যেমন করে পারি ঐ টাকা আদায় করব।”
রাম। যেমন করে পারি! তার মানে এদের ভিটে
ছাড়া করবেন—বাড়ীটা নিলেম করে নেবেন ?
লােক। হাঁ, আলবত নেব। আটকায় কে?
জানেন আমি এ গাঁয়ের মােড়ল?
রাম। মােড়ল মশাই,
আপনি মানুষ না

রামসুন্দর জীবনী কসাই ? বাড়ীতে একটা মড়া মরেছে—বিধবা মেয়ে- টীর এখনও চোখের জল শুকোয় নি, আর আপনি এসে তার বাড়ী চড়াও হয়েছেন। আপনার চোখে কি মানুষের চামড়া পৰ্য্যন্ত নেই ? থা—আপনাকে গাল দিতেও ঘৃণা হয়। আসুন আমার সঙ্গে- চলুন আমার নৌকায়—আপনার সমস্ত টাকা শােধ করে দিচ্ছি। রামসুন্দর শিকদার আমার নাম- ঐ স্ত্রীলােকটাকে আমি মা বলেছি। আমিই দেনার টাকা শােধ দিয়ে আমার মার নামে এই বাড়ী লেখা পড়া করে দেব। আর দ্বিতীয় কথা না বলিয়া রামসুন্দর নৌকায় গিয়া মােড়লের হাতে প্রতিশ্রুত দেড়শত টাকা দিলেন এবং বাড়ীর কর্জকবলাটী ফিরাইয়া লইলেন। সেদিন আর সেখান হইতে আসা হইল না। পরদিন স্ত্রীলােকটীর নামে দলীল পাকা করিয়া দিয়া এবং তাহার গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থার পর রামসুন্দর ঘাটে আসিয়া নৌকা খুলিয়া দিলেন। ৭১

No text on this page.

বন্ধুবাৎসল্য।
Old friends are best. King James
used to call for his old shoes ; they
were easiest for his feet. -Selden,

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী বন্ধুবৎসল রামসুন্দর পুরাতন বাল্য- বন্ধুদের প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন। এ বিষয়ে তাহার নিকট ছােট বড় ছিল না। এই স্বার্থহীন বন্ধুবাৎসল্য আজকাল একান্তই দুর্লভ। শীতের রাত্রি। রামসুন্দর কাজকর্ম সারিয়া কলিকাতার গদীতে বসিয়া আছেন। হাতে হুকা— মধ্যে মধ্যে তামাক টানিতেছেন। এমন সময় চাকর আসিয়া খবর দিল একটা লােক তাহার সহিত দেখা করিতে চায়। রামসুন্দর লােকটীকে আনিতে বলিয়া দিয়া আবার তামাক টানিতে লাগিলেন। ক্ষণকাল পরে চাকর ফিরিয়া আসিল—সঙ্গে সেই লােকটী। মুহুর্তের জন্য চাহিয়া দেখিয়াই রামসুন্দর শশব্যন্তে উঠিয়া গিয়া আগন্তুকের হাত ধরিলেন এবং বলিলেন, “আরে কেও, হলধর যে ?—বলি, ভাল আছ?-বাড়ীর সব খবর ভাল ?–মা ভাল আছেন?” আগন্তুক বলিয়া উঠিল—“আরে দাড়াও ভায়া, ৭৫ রামন্দর জীবনী । এক একটা করে জিজ্ঞাসা কর, উত্তর দিচ্ছি- একসঙ্গে এতগুলাে কথার উত্তর এখন দেই কি করে বল দেখি? তার পর লােকটী ওরফে হলধর একে একে সমস্ত প্রশ্নেরই উত্তর দিল। রামসুন্দর তখন যেন মহা খুসী। হলধরফে পাশে বসাইয়া তাহার হাতে হুকাটী দিয়া বলিলেন- “তােমাকে পেয়ে আজ কত কথাই মনে পড়ছে ও-সে যেন আজ একটা যুগ বলে মনে হচ্ছে। তুমি আর আমি সেই গুরুমশাইয়ের পাঠশালে এক সঙ্গে পড়তে যেতাম। পাঠশালা থেকে এসে দু’জনে কত খেলাই খেলেছি। পুকুরের পাড়ে-বাগানের মধ্যে-নদীর ধারে কত ছুটাছুটোই করেছি। এমন দিন গিয়েছে যে সকাল থেকে আরম্ভ করে সন্ধ্যা পর্যন্ত তােমাদের বাড়ীতেই কাটিয়ে দিয়েছি। আবার তুমিও কতদিন আমাদের বাড়ী এসে নিজের বাড়ীর কথা ভুলে গিয়েছ। তখন আমার মা বেঁচে বলিতে বলিতে মাতৃভক্ত রামসুন্দরের চক্ষে জল ৭৬

রামসুন্দর জীবনী
দেখা দিল। রামসুন্দর ক্ষিপ্র হস্তে চক্ষু মুছিয়া
বলিলেন, “তােমায় আর আমায় তিনি কখনও
ভিন্ন দেখতেন না। আমাদের গরীবের সংসার।
তিনি বসে থেকে হাতে করে আমাদের দুজনের
মুখে কত দিন শুধু পান্তভাতের আমানি তুলে
দিয়েছেন, আর কাপড়ে চোখ মুছেছেন।
কিন্তু
তুমি আর আমি হাসি মুখে কত সুখেই সেই মুন
দেওয়া পান্তভাত খেয়েছি। আজ এই এত ঐশ্বর্যের
মধ্যেও সমস্ত কথাগুলাে যেন চোখের উপর ভাসছে।
যা সে সব কথা—এখন বল তাে, হলধর, হঠাৎ
এত রাত্রে কি মনে করে ?”
হলধর। মনে আর কি করে ? এই শুনলাম
তুমি নাকি কাল মৃজাপুরের মােকামে রওনা হবে।
তা যদি সেখানে গিয়ে আমায় একখানি ভাল পশ্চিমে
আলােয়ান পাঠিয়ে দাও তাহলে কলকাতার বাজে
জিনিষগুলাে আর কিনতে হয় না। আর যদি পার,
কেঁচো পােদ্দারের জন্যেও একখানা দিও-সেও
সেদিন বলছিল।
৭৭

রামসুন্দর জীবনী রাম। বেশ, একখানা তােমার—আর এক খানা পেঁচো পােদ্দারের। এই দুখানা তাে-কেমন ? কিন্তু নফর কলু, কেষ্টা কৈবর্ত, রেমো জেলে এদের কি হবে ? এরা কি বানের জলে ভেসে এসেছে না কি? একটা কথা বলি, হলধর—রাগ ক’র না ভাই। তুমি আর কেঁচো পােদ্দার যেমন- এরাওতো তেমনই। ছেলেবেলায় এদের না হলে যে ভাত হজম হত না। ঝগড়া করে পরস্পরে মারামারি করেছি—তখনই আবার চোখের জলে সে ঝগড়া মিটমাট হয়েছে। তারা যে আমার জীবনের কি, তুমি তাে সবই জান, ভাই। এখনও এক এক বার মনে হয় এই সব ধন দৌলতের মায়া কাটিয়ে তাদের সঙ্গে সমান হয়ে আবার আগেকার মত গলা ধরাধরি করে বেড়াই। রামসুন্দরের কণ্ঠ আর্জ হইয়া আসিল। দুই একটী কথার পর হলধর বিদায় লইল। পরদিন রামসুন্দর মৃজাপুরে যাত্রা করিলেন। যথাসময়ে মৃজাপুর হইতে রামসুন্দর-প্রেরিত শাল, আলােয়ান, ৭৮

রামসুন্দর জীবনী
লেপ, তােষক—প্রভৃতিতে তাহার পূর্বোক্ত বাল্য
বন্ধুদের গৃহ ভরিয়া গেল।
৭৯

No text on this page.

ক্ষমাশীল।
Yes to have power to forgive
Is empire and prerogative ;
And 'tis in crown a nobler gem
To grant a pardon than condemn.
S. Butler.

No text on this page.

মাসুন্দর জীবনী চির বিনয়ন রামসুন্দর ক্ষমতার দর্পে অন্ধ হইয়া ক্ষমাপ্রার্থীকে কখনও বিমুখ করিতেন না এবং অনেক স্থলে প্রার্থনার পূর্বেই ক্ষমা করিয়া বসিয়া থাকিতেন। যশােহর মাগুরা সবডিভিশনের অন্তর্গত আঠার- খাণ্ডানিবাসী জনৈক ব্রাহ্মণ-সন্তান এক সময়ে রাম- সুন্দরের নিকট বিনা হানােটে প্রায় সহস্রাধিক টাকা কর্জ লয়েন। টাকাটা হাওলাত হিসাবে লওয়া হইয়াছিল বলিয়াই সরল রামসুন্দর ইহার জন্য হা- নােট লইবার আবশ্যকতা বােধ করেন নাই; আর ব্রাহ্মণকে টাকা দিয়া এ সমস্ত তিনি কখনও লইতেন না। ব্রাহ্মণ দেবতার অংশ—তাহাতে নীচতা স্পর্শ করিবে ইহা হইতেই পারে না। টাকা দিবার নির্দিষ্ট সময় চলিয়া গেল। ব্রাহ্মণের দেখা নাই—টাকা শােৰ দিবারও নাম নাই। কৰ্ম্ম- চারীরা রামসুন্দরের নিকট প্রয়ােজনে অপ্রয়ােজনে

রামসুন্দর জীবনী
আসিয়া ব্রাহ্মণের ব্যবহারের কথা বলিতে লাগিল
এবং এ ক্ষেত্রে নালিশই যুক্তি আকার ঈঙ্গিতে ইহাও
বুঝাইয়া দিল। রামসুন্দর ভাল মন্দ কিছুই বলিলেন
না।
এইরূপে ছয় মাস কাটিয়া গেল। ইহার মধ্যে
উক্ত ব্রাহ্মণের দুর্দশার একশেষ। অগ্নিদাহে বাস্তু-
ভিটাটি নষ্ট হইয়া গিয়াছে—নগদ টাকাকড়ি যেখানে
যাহা ছিল বাড়ীর সঙ্গে সমস্তই অগ্নিদেবের উদরসাৎ
হইয়াছে। বিপদের উপর বিপদ-আজ দুইদিন
হইল ব্রাহ্মণের ঘােট ছেলেটীর কলেরা—এখন যায়
তখন যায়। ঘরে এমন পয়সা নাই যে যাহাতে ঔষধ
বা পথ্যের ব্যবস্থা হইতে পারে। ব্রাহ্মণ কপালে হাত
দিয়া ঘরের দাওয়ায় বসিয়া চোখের জল ফেলিতেছেন
আর আপন মনে কি ভাবিতেছেন এমন সময় বাহির
হইতে কে ডাকিল, “দাদাঠাকুর, বাড়ী আছ গাে ?”
ব্রাহ্মণ শশব্যন্তে বাহিরে আসিয়া দেখে উঠানে
দাঁড়াইয়া রামসুন্দর! ব্রাহ্মণ আর স্থির থাকিতে
পারিল না—ভেউ ভেউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল এবং

রামসুন্দর জীবনী
রামসুন্দরের নিকটে আসিয়া তাহার হাত ধরিয়া
বলিল, “রাম, আমায় ক্ষমা কর ভাই।”
রামসুন্দর বলিলেন, “দাদাঠাকুর, তােমার দোষ
কি যে তার ক্ষমা ? দোষ বরং আমার যে একটা
তুচ্ছ টাকার মামলা নিয়ে তােমার এই এত বড় একটা
বিপদ-সেই যে সেদিন বাড়ী খানা পুড়ে গেল
সে সময় একবার উকি পর্যন্ত মেরে দেখলাম না।
যাক সে সব কথা—এখন ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে।
আমি আসবার পথে কবিরাজ বৈদ্যদা’কে ডেকে
এসেছি-তিনি এলেন বলে।
যথাসময়ে কবিরাজ আসিয়া রােগী দেখিলেন ;
পরে টিকি নাড়িতে নাড়িতে বাহিরে আসিয়া গম্ভীর
মুখে বলিলেন, “জীবনের আশা খুবই অল্প—একবারে
নিদানে পৌচেছে।
রামসুন্দর কবিরাজের হাতদু’টা ধরিয়া ব্যগ্র
আগ্রহে বলিয়া উঠিলেন, “বৈদ্যদা-তােমার হাতে
ধরছি—ভূতােকে আমার বাঁচাতেই হবে। তুমি
মনে করতেই পারবে। টাকার জন্য ভেবাে না—
৫

রামসুন্দর জীবনী
অত টাকা হয় আমি দেব। দেখাে, শেৰে যেন
ধৰ্ম্মের কাছে আমায় দোষী হতে না হয়। তা হলে
মলেও সে আক্ষেপ যাবে না। আমার মনস্তাপই
যে ব্রাহ্মণের সমস্ত বিপদের কারণ হয়েছে, একথা
ভাবতেও আমার বুক ফেটে যাবে।”
বিরাজের চিকিৎসার গুণে এবং ভগবানের
কৃপায় ব্রাহ্মণের পুত্র এ যাত্রা রক্ষা পাইল।
রামসুন্দর কবিরাজকে যথাযােগ পুরস্কৃত করি-
লেন এবং নিজ ব্যয়ে ব্রাহ্মণের নুতন বাড়ী নির্মাণ
করিয়া দিলেন।

নির্ভীকতা।
There was a quenchless energy
A spirit that could desire
The deadliest form that death could take
And dare it for the daring's sake.
Landon.

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী
কর্মবীর রামসুন্দরের নির্ভীক যুদ্ধজয়ী
মহাবীরেরও অনুকরণীয়।
চৈত্রমাসকাটফাটা, রৌদ্র। বেলা দ্বিপ্রহর।
রামসুন্দর হাট হইতে ফিরিতেছেন। মাঠের ভিতরের
রাস্তাটা একটু সােজা হয় বলিয়াই রামসুন্দর মেঠো
পথেই চলিয়াছেন। বাড়ী পৌঁছিবার এখনও প্রায়
অর্ধেকপথ বাকি, এমন সময় রামসুন্দর দেখিলেন
একজন লােক মাঠের মধ্যে একটী আমগাছের তলায়
মৃতবৎ পড়িয়া রহিয়াছে। তিনি কালবিলম্ব না
করিয়া তাহার নিকটে গেলেন এবং অবস্থা দেখিয়া
বুঝিলেন লােকটী পীড়িত। রামসুন্দর কোমলকণ্ঠে
জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাপু, তুমি এখানে পড়ে কেন?
তােমার বাড়ী কোথায়, কি হয়েছে ?
লােকটী যেন উত্তেজিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল,
“সকলের মুখেই এক কথা—কি হয়েছে? সেই
সকাল থেকে উত্তর দিতে দিতে আমার গলা পড়ে
গেল। কিন্তু উত্তর শুনে আর কেউ দাড়ায় না।
আমার নিশ্বাসের ভয়ে যেন তারা ছুটে পালায়।

রামসুন্দর জীবনী আর না পালিয়েই বা করবে কি? সাক্ষাৎ যম বসন্তরােগের বাতাসকেও ভয়! বাপু, আমায় যমে ধরেছে। যাক, শােন-গ্রাম আমাদের এখান থেকে দুক্রোশ পথ-নাম মােনসাপোঁতা। সকালে জ্বর- গায়েই না বুঝে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়েছি-পথে এই বিপদ। এখন আর নড়বার ক্ষমতা পৰ্যন্ত নেই। বুঝি এই মাঠেই প্রাণ যায়।” রামসুন্দর দৃঢ় কণ্ঠে বলিলেন, “বাপু, তােমার কোন ভয় নাই। আমি তােমায় বাড়ী পৌছে দিচ্ছি।” লােকটী রামসুন্দরের কথা শুনিয়া যেন কেমন হইয়া গেল-বলিল, “কেন, বাছা, পরের জঙ্গ নিজের বিপদ ডেকে আন। এ রােগ বড় ছোঁয়াছে—এক- বার ধরলে আর রক্ষা নেই।” রাম। রক্ষা নেই—প্রাণ যাবে। কেমন এই তে? আজ যদি তােমায় বাঁচাতে গিয়ে আমার এই প্রাণটাই যায়, তাহলে দুনিয়ার কোন ক্ষতিই হবে না। আর যদি তােমাকে কোন রকমে বাঁচাতে

রামসুন্দর জীবনী
পারি তা হলে তােমার স্ত্রী পুত্র কন্যাদের হাসিমুখ
কল্পনা করতে কতে সুখে মরতে পারবে।
উন্নতবপু, বলিষ্ঠ রামসুন্দর লােকটীকে আর
দ্বিতীয় কথা কহিবার অবকাশ না দিয়া নির্ভয়ে
তাহাকে কাঁধের উপর
উঠাইয়া লইলেন এবং
মােনসাপোতার পথ ধরিলেন।
দুই দিন পরে রামসুন্দর বাড়ী ফিরিলেন।
ইতিমধ্যে বাড়ীর সকলে ভাবিয়াই আকুল। পরে
রামসুন্দরের মুখে যখন তাহারা আসল ঘটনাটা
শুনিলেন তখন আর তাহাদের আনন্দের সীমা রহিল
৯১

No text on this page.

সত্যনিষ্ঠা।
I love to tell the truth and shame
the devil Dean Swift,

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী সত্যনিষ্ঠ রামসুন্দর প্রাণ দিয়া সত্যকে ভাল বাসিতেন এবং সর্বান্তঃকরণের সহিত মিথ্যাকে ঘৃণা করিতেন। মিথ্যবাদী, এমন কি তাহার সম্পর্কীয়দের সহিতও সংশ্রব রাখিতে তাহার ঘৃণা বােধ হইত। ব্যবসা বাণিজ্যসূত্রে বাধ্য হইয়া রামসুন্দরকে মধ্যে মধ্যে মামলা মােকর্দমা করিতে হইত। এক সময় এইরূপ একটী মামলায় তাহার স্ত্রীর খুড়া- সম্বন্ধীয় এক ব্যক্তি বিপক্ষ পক্ষের সাক্ষী ছিলেন। সাক্ষীর ডাক হইলে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া হলফ করিয়া মিথ্যা বলিলেন। রামসুন্দর সত্যের এই ভীষণ অপলাপ দেখিয়া মর্মাহত হইলেন। যাহা হউক, হাকিমের ন্যায় বিচারে মােকর্দমায় রাম- সুন্দরেরই জয় হইল : কিন্তু জয়ের কোন চিহ্নই তাহার মুখে নাই। তিনি গম্ভীর মুখে বাড়ী ফিরি- লেন। পথে কাহারও সহিত কথাও কহিলেন না। স্ত্রী তাঁহার পথ চাহিয়া বসিয়াছিলেন। এক্ষণে

রামসুন্দর জীবনী
তাঁহাকে দেখিবামাত্র পা ধুইবার জল এবং গামছা
প্রভৃতি লইয়া আসিলেন। রামসুন্দর সেদিকে দৃষ্টিপাত,
পৰ্য্যন্ত না করিয়া বলিয়া উঠিলেন—“তােমার ছোঁয়া
জিনিষ নেওয়ায় আমার পাপ আছে।
কর্তা হলফ করে আদালতে মিথ্যা বলতে পারে
সে বংশের আর সকলে তার চেয়ে ভয়ানক আর
কত মিথ্যার সৃষ্টি ক’তে পারে তা জানিনে-আমি
সে বংশের সঙ্গে সংশ্রব রাখাও পাপ মনে করি।
আজ থেকে তােমার সঙ্গে আমার কোন সম্বন্ধ
নেই।”
সত্যের এই অন্ধ ভক্ত রামসুন্দর সত্য সত্যই
ছয়মাস কাল স্ত্রীর মুখদর্শন পর্যন্তও করেন নাই

উদ্যোগ।
Idleness is the key of beggary and
the root of all evils Spurgeon,

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী
পরিশ্রমী রামসুন্দরের সমগ্র জীবন পুরুষাে-
চিত উদ্যোগের একটা জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি
আলস্যকে অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতেন এবং সাধ্য
হইলে অলস ব্যক্তিকে কঠিন শাস্তিতে তাহার চৈতন্য
উৎপাদনের চেষ্টা করিতেন। এ বিষয়ে তাঁহার
নিকট নিজ পুত্রেরও মার্জনা ছিল না।
বর্ষাকাল—রামসুন্দর নদীতে স্নানে যাইতে
ছিলেন, এমন সময় দেখেন কতকগুলি জ্বালানি কাঠ
উঠানে পড়িয়া রহিয়াছে। জ্যেষ্ঠপু
জ্যেষ্ঠপুত্রকে ডাকিয়া
বলিয়া দিলেন যে কাঠগুলি যেন রান্নাঘরের মধ্যে
তুলিয়া রাখা হয়, নচেৎ বৃষ্টিতে ভিজিয়া যাইবার
সম্ভাবনা। যথাকালে স্নানের পর বাড়ী ফিরিয়া
দেখিলেন যেখানকার কাঠ সেইখানেই পড়িয়া
রহিয়াছে এবং পুত্র নিশ্চিন্তমনে তাস খেলায় মত্ত।
দেথিয়াই রামসুন্দর জ্বলিয়া উঠিলেন; বেলা দ্বিপ্রহরে
আপনার নির্দিষ্ট কাজ ফেলিয়া এই আলস্যের
অভিনয়ে তিনি ক্রোধে অধীর হইলেন এবং

রামসুন্দর জীবনী
তৎক্ষণাৎ পুত্রকে আদেশ করিলেন—“যাও, ঐ
কাঠের বােঝা মাথায় করে গ্রামের চারিপার প্রদক্ষিণ
করে এস। আর স্মরণ রেখে জীবনে বারদিগর
যেন এরূপ ঘটনা আর না ঘটে। যাও।”
পুত্র অবনত মস্তকে দাড়াইয়া রহিল। তাহার
চোখে জল—মুখে কথা নাই। ইচ্ছ। এই কঠোর
আদেশ প্রত্যাখ্যানের জন্য পিতার পায়ে ধরিয়া ক্ষমা
ভিক্ষা করে কিন্তু সাহসে কুলায় না।
ঘটনা শুনিয়া রামসুন্দরের গৃহিণী আসিয়া পুত্রকে
ক্ষমা করিবার জন্য স্বামীকে ধরিয়া পড়িলেন।
রামসুন্দর অচল অটল। তিনি বলিলেন—“একবার
যে কথা মুখ দিয়ে বার করেছি—তা করতেই হবে—
অন্যথা নেই। আমার বাড়ীতে আলস্যের প্রশ্রয়
চলবে না।”
বাধ্য হইয়া সেই দ্বাবিংশ-বয়স্ক পুত্রকে পিতার
আদেশ প্রতিপালন করিতে হইল।

আড়ম্বর-শূন্যতা।
Beauty armed with virtue bows the soul
With a commanding but sweet control.
-Percival
.

No text on this page.

রামসুন্দর জীবনী প্রিয়দর্শন রামসুন্দরের সাজ পােষাকের কোন রকম জাক জমক ছিল না; কিন্তু তাহার দৈহিক সৌন্দর্য্যে পরিচিত অপরিচিত সকলেই মুগ্ধ হইত। তাঁহার ব্যক্তিগত বিশেষত্ব তাহার আকৃতিতে স্বতঃ পরিস্ফুট ছিল এবং অন্তরের সৌন্দৰ্যও তাহার ভাব ভঙ্গিতে ফুটিয়া উঠিত। রামসুন্দর একবার সস্ত্রীক পুরীধামে যাইতে- ছেন। আজকালকার মত তখনকার দিনে রেলের সুবিধা হয় নাই—সুতরাং পথের কষ্ট সহজেই অনুমেয়। সারাদিন হাঁটিবার পর তাহারা একটী নদীর তীরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং নদীটী পার হইবার জন্য ঘাটের পাটনীকে ডাকিলেন। পাটনী আসিয়া তাহাদিগকে সসম্রমে নৌকায় লইয়া গেল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নৌকা পারে আনিয়া রাম- সুন্দরের সম্মুখে হাতজোড় করিয়া দাড়াইল এবং বলিল “বাবু, গরীবের বশীশ।”

রামসুন্দর জীবনী
রামসুন্দর বলিলেন, “বাবা–আমি সামান্য
লােক, তােমাকে বশীশ দিয়ে খুসী করি এমন ক্ষমতা
আমার কই ?”
পাটনী জিব কাটিয়া বলিল, “বাবু, ও কথা বলবেন
না—আপনি রাজা লােক। নইলে সামান্য গরীব
লােকের কি আপনার মত চেহারা হয়? হুজুর,
আগুন কি কখন ন্যাকড়-চাপা থাকে ? আপনি
পরিচয় না দিলেও আপনার ওই টানা চোখ, ছবির
মত মুখ-ফ্যালােয় কপাল--আপনার আসল পরিচয়
দিয়ে দিচ্ছে। বাবু, আপনার চেহারাতেই মালুম
আপনি লক্ষপতি।”
অন্যান্য দুই চারিটী কথার পর রামসুন্দর উপযুক্ত
বখশীশে পাটনীকে
খুসী করিয়া নিজ গন্তব্য পথে
চলিয়া গেলেন।
১০

ন্যায়পরতা
Impartiality holds the scales of
justice with a firm and even hand.
-E, Davies

No text on this page.

রময় জীবনী স্যারের প্রতিমূর্তি রামসুন্দর জীবনে কখনও অন্যায়ের ছায়া স্পর্শ করিতেন না। বিবেক এবং কৰ্তব্য-বুদ্ধির সাহায্যে অতি কুট বিষয়গুলিরও যথাযথ ন্যায়-সংঙ্গত মীমাংসা করিতেন। নরাইলের প্রসিদ্ধ জমিদার রতন রায়ের নাম বাংলায় সুপরিচিত। এক সময়ে তাঁহার দুই বর্ধিষ্ণু প্রজার মধ্যে একটা জমি লইয়া গােলযােগ বাধে। দুইজনেই রতন বাবুর নিকট আসিয়া পড়িলেন এবং তিনি ইহার একরূপ মীমাংসাও করিয়া দিলেন ; কিন্তু উহা তাহাদের কাহারও মনঃপূত হইল না। রতন বাবু হাল ছাড়িয়া দিলেন। তিনি বুঝিলেন ব্যাপার আদালত পর্যন্ত গড়াইবে। অবস্থা যখন এইরূপ তখন দৈববলে একদিন ব্যবসাসুত্রে দু’জনেই রামসুন্দরের গদীতে উপস্থিত। কথায় কথায় রাম- সুন্দর পূর্বোক্ত গােযােগর কথা পাড়িলেন এবং পরামর্শচ্ছলে ইহা লইয়া তাহাদিগকে আদালতে যাইতে রামসুন্দর জীবনী নিষেধ করিলেন। ফলে দুপক্ষের সম্মতি ক্রমে তিনিই উহার সালিশী হইলেন। রামসুন্দর দুই চার কথায় ইহার অতি সুন্দর মীমাংসা করিয়া দিলেন। দুপক্ষই তাহাকে ধন্য ধন্য করিয়া প্রস্থান করিল। রতন বাবু ঘাটী শুনিলেন। পর দিবস কোন সংবাদাদি না দিয়াই একবারে সশরীরে রামসুন্দরের গদীতে আসিয়া উপস্থিত। রামসুন্দর সসম্ভ্রমে তাহার অভ্যর্থনা করিলেন। রতন বাবু স্মিত মুখে হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “কিহে, রামসুন্দর, তুমি কি কোন যাদু টা জান না কি? আমি-রতন রায়-যাতে অপারক তুমি একদিনে তার মীমাংসা করে দিলে। আমি শুনে আর স্থির থাকতে পারলাম না। ভাব- লাম দেখে আসি, এই রামসুন্দর লােকটী কেমন— সত্য সত্যই কোন যাদু জানে কি না?” পরে রামসুন্দরকে সম্মুখে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন, “কিহে, দাঁড়িয়ে থাকলে কেন ?-বস। ১০৮

রামসুন্দর জীবনী
রামসুন্দর একটু জড়সড় হইয়া বলিলেন, “আজ্ঞে,
আপনি জমিদার -আমি সামান্য প্রজা। আপনার
সম্মুখে বলে যে বেয়াদবী হবে।”
উত্তরে কথা না বলিয়া রতন বাবু রামসুন্দরের
হাত ধরিয়া তাহাকে পার্শ্বে বসাইলেন এবং বলিলেন
“হাঁ, প্রজা—প্ৰজাই বটে। কিন্তু আমার এই বিস্তৃত
জমিদারীর মধ্যে তােমার মত আর দু’টী নাই।
ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি তােমার মত প্রজা
নিয়ে যেন জন্ম জন্ম জমিদারী করি।”
।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ramsundar Jibani

Author
Mallik, Jibananda
Title
Ramsundar Jibani
File name
Ramsundar Jibani
Text
OCR done
Citation
1918
Published
2010/02/16
Publisher
Lakshmibilas Press
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
sundar
DLI number
511315
Barcode
4990010018474.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
6X7OryZqovb
Download PDF

Ramsundar Jibani