Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kusum-kanan Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
KUSUM-KANAN.
BY
ADHARLAL SEN, B. A.
SECOND EDITION,
THE NEW BENGAL PRESS :
JOGENDRA NATH VIDYARATNA :
CALCUTTA.
*
1883.
Q
CRIP
TIOMTE
BEN
NCAL
RINTIND
NETTLY
EXECUS
PRINTED AND PUBLISHED
BY
J. N. VIDYARATNA, AT THE NEW BENGAL PRESS,
15, GOTEEKRISHNA PAL'S LANE;
CALCUTTA.
কুসুম-কানন।
শ্ৰী অধরলাল সেন বিরচিত।
"The poet in a golden clime was turn,
With golden stilrs alove;
Dowered with the late of late, tlie scorn of scorn,
The love of Jove,". TENNYSON.
দ্বিতীয় সংস্করণ।
কলিকাতা :
গােপীকৃষ্ণ পালের লেন নং ১৫ :
নূতন বাঙ্গালা যন্ত্রে যােগেন্দ্রনাথ বিদ্যারত্ন কর্তৃক
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সম্বৎ১৯৩৯.
No text on this page.
INSCRIBED
WITH ALL DE VOTION AND BEVERENCE
TO
TIIE HON.
SIR LOUIS JACKSON, KT.,
C. I. E.
No text on this page.
সূচীপত্র। ফিরিনু দুজনে যবে মহাবীর • • ১২ বিজয়ী * ০। ৫ ০ ০ ••• সে ধীর সমীর + এ এ কামিনী • • ••• • • • কোথা থাকে সুধাকর p ••• কলঙ্ক ০ ০ ০ ••• আলাের-সঙ্গীত ৮ । । আন পানপাত্র ••• ৪২ সেই সুধাময় সরল হৃদয় ৪৪ সুধকির ৫ ০ ০ ৪৬ হ’তে সুন্দরী ALL FOR LOVE । ০ ০ +
II
যমুনার তীরে
আকাশ-কুসুম
৮০ +
৫ , ০
৫৯
কিশলয়-শমনে
০ ০ ০
৬৪
প্রতিভা
.
•
১০০
p০০
বিরহ
০ ০ ০
৭৭
যাইলাম সেইখানে
৩ .
৭৮
এখনও নীরব নহে
৮০
The Empress of India
০
•••
৮৭
বিসর্জন
. . .
•••
•••
কুসুম-কানন।
উপহার।
« The desire of the moth for the star,
Of the night for the morrow."
SHELLEY.
১৮৭৭।
খদ্যোত-আবৃত তরু তারকিত নভে
দেয় প্রভা-উপহার,
দূরবাহী নদ-নদী অনন্ত সাগরে
দেয় সলিল-সম্ভার,
জলধর পূজা করে ধরণী-চরণ
শত সহস্র ধারায়,
নিগন্ধ নীরস মাের কুসুম-কানন,
আমি কি দিব তােমায় ?
কুসুম-কানন।
অনিল-হিল্লোলে দোলে সরস কুসুম
আর নীরস পল্লব,
রজনীতে ফোটে তারা সপ্রভ নিষ্প্রভ
নীল নভের বিভব;
তাই নিবে কি আদর করি’ কুসুম-কাননে ?
মাের নবীন বয়স ;
কোথা গেলে পাব আমি সরস কুসুম,
যথা সকলি নীরস?
চকিতে চকিতে গেল চখের উপর
হায়, এ কয় বরষ,
দেখিতে দেখিতে কিন্তু আমার ভুবন
আজি নিগন্ধ নীরস।
আর ত গাহে না গান আমার হৃদয়,
আর আমার বাঁশরী,
আমার হৃদয় সহ মিলাইয়ে কই
গায় কল্পনা সুন্দরী ?
মৃণালে বাঁশরী করি’ কোমল কৈশােরে
আমি গাহিয়াছি গান,
যৌবন বিভ্রমে লয়ে নবীন বাঁশরী
পুন ধরিয়াছি তান;
কুসুম-কানন।
এখনও কি আছে আর সে নেশার ঘুম,
সেই সাধের স্বপন?
কোথা গেল ললি, ও মেনকা, নলিনী,
মাের সাধনের ধন ?
চকিতে মিলায় যথা নিশির শিশির
আর নারীর প্রণয়,
চকিতে যেমন হয় সুখ-তিরােধান
আর বিজলী-বিলয়,
চকিতে যেমন যায় তরল মদিরা
আর কুসুম শােভন,
কোথা গেল ললিতা, ও মেনকা, নলিনী,
মাের সাধনের ধন ?
নিশীথে কাহার দেখি রূপ বিমােহন,
কারে ভাবি বা দিবসে ?
কার প্রেমে মুগ্ধ আমি, ভাসি মুখে দুখে
কা'র মানস-সরসে ?
আর কোন ললিতা, ও মেনকা, নলিনী,
রাজে হৃদয়ে আমার ?
বিজন, বিজন, হায়, হেরি চারি দিক,
ঘাের বিজন কান্তার ।
৪
কুসুম-কানন।
সময়ের স্রোতে নিবে সকল আগুন,
আর সকলেই জ্বলে,
সময়-বেদনা, হায়, সকলেই সহে,
আর সকলেই ভুলে ;
সহিয়াছি সব এই নবীন বয়সে,
কিন্তু ভুলি নাই সব,
অলােপ, অবশ দুখ, অগম্য, অদম্য,
মাের হৃদয়-বিভব।
সব আলাে নিবে, কিন্তু জ্বলে এক আলাে
রক্ত-প্রভাত-গগনে,
তাও যদি নিবে, তবু জ্বলে এক আলাে
পুন প্রদোষ-গগনে,
জ্বলিবে কি কোন লেখা তাহার মতন
ঘাের কালের নিশায় ?
নিগন্ধ নীরস মাের কুসুম-কানন,
আমি কি দিব তােমায় ?
ফিরিনু দুজনে যবে
“Go, where Glory waits thee.'
Moon, .
ফিরিনু দুজনে যবে,
জানিত তখন কাহার হৃদয়
শেযযতে এমন হবে!
কাহার হৃদয় বলিতে পারিত
মিলন হবে না আর,
বিরহ-বিচ্ছেদে মনের বিষাদে
জীবন হইবে বার ।
দূরদেশ’পরে ফিরি দুইজনে,
মাঝারে দুখের নদী ;
কুসুম-কানন।
কর সমর্পণ জীবন যৌবন,
পার হতে চাও যদি।
কর সমর্পণ সুজনের নাম,
পাবন সাধুর মান ;
লােকলাজভয় পরিহার করি,
জুড়াও আমার প্রাণ।
জুড়াও আমার তাপিত পরাণ,
তাপিত তােমারই তরে ;
আমি দাসী:তব, হে জীবিতনাথ,
এস হে হৃদয়’পরে।
৮;-'
আমি দাসী তব, হে জীবিতনাথ,
এস হে হৃদয়’পরে,
তােমার কারণ অতুল রতন
রেখেছি যতন করে।
রেখেছি যতনে সরলতা-মধু,
কর এসে তাহা পান ;
কর এসে পান প্রেমের পীযুষ,
জুড়াবে তােমার প্রাণ।
জুড়াইবে প্রাণ, পাইবে হরিষ,
আমার রূপের বনে ;
কুসুম-কানন।
দেখাে, হে মধুপ, কত ফুল আছে,
খেলিও তাদের সনে।
আধ-ফোটো-ফোটো কত ফুল আছে,
সুষমা-মুকুল-রাশি,
হাসি-হাসি-মুখ নবীন যৌবনে,
এখনও হয় নি বাসি।
নবীন যৌবনে যত সুখ আছে,
সঁপিব তােমার করে ;
এস, ওহে দেব, হৃদয়-ভুবনে
বিহর আমােদ ভরে !
এস, 'ওহে দেব, হৃদয়-ভুবনে,
জ্বলে জ্বলে যায় প্রাণ ;
তােমার বিহনে কি হয়ে গিয়েছি,
দেখ, কর এসে ত্রাণ!
নাহিক এখন সে লীলা বিলাস,
কেশ বেশ বিভূষণ,
নাহিক সে সব আমোদ প্রমােদ,
চির প্রিয় বিনােদন।
নাকি এখন সে সব, প্রাণেশ,
২য়-উচ্ছসি হাসি ;
কুসুম-কানন। তােমার বিহনে কি হয়ে গিয়েছি। ভাল বাসি কি না বাসি ? ৪ যখন মিলন ছিল, কি এক সুখেতে যেপেছি জীবন- সে সুখ কে হরে’ নিল। লুকায়ে লুকায়ে দেখেছি তােমারে, দেখেছি সে চাদ-মুখ ; নয়ন-মিলনে-হৃদয়-কম্পনে- ভুলে গেছি সব দুখ। প্রেমের ভাবনা মধুর যেমন, তেমনই তােমার হাসি, পরাণ থাকিতে ভুলিব কেমনে তােমায়, হে গুণরাশি? কবিগণ করে তব গুণ গান, কবিতা তােমারই রূপ; পড়িতে পড়িতে জুড়ায় অন্তর, উথলে প্রেমের কৃপ। তােমার মূরতি বিরাজে আলােকে, বিরাজে আশার মাঝে ;
কুসুম-কানন।
চিন্তার কাননে, সুখের ভবনে,
আমার হৃদয়ে রাজে।
কাহার হৃদয় এ হেন মূরতি
ভুলিবে প্রেমের ভবে ?
এ দেহ যাইবে, যাইবে এ প্রাণ,
ভুলিব তােমায় তবে !
}
;
, না, নাথ, তাহা হইবার নয়,
ভুলে যাও অগীরে
ভুলে যাব প্রেম, ভুলে যাব সুখ,
এ কাল-নদীর তীরে।
দুই পারে দোহে দূরদেশ’পরে,
কেমনে মিলন হবে ?
কেমনে রে বল, নিদারুণ বিধি,
সুখে জলাঞ্জলি দেবে ?
কেন রে আমায় রূপ দিয়েছিলি,
গুণ দিয়েছিলি তারে ?
কেন না করিলি পাষাণ দোহারে,
এ কাল-নদীর ধারে ?
অম্লান বদনে লােকে, প্রাণেশ্বর,
তব মধু নাম কয় ;
কুসুম-কানন।
শুনিয়ে নীরবে আমার হৃদয়ে
তাড়িত প্রবাহ বয়!
ডাকি প্রাণেশ্বর, মম প্রাণেশ্বর,
অভাগিনী-প্রাণেশ্বর !
এক মনে ডাকি, এক মনে থাকি,
ভাবি সেই প্রাণেশ্বর।
কেন হয়েছিলে হেন প্রিয়, নাথ,
কেন বা বেসেছ ভাল,
কেন বা আমার হৃদয়-আগার
করেছ রূপেতে আলাে ?
এখন ভুলিতে হবে।
এত ভালবেসে জনমের মত
সে সব ভুলিতে হবে।
যাও, প্রাণেশ্বর, কর মধুপান
কবিতা-কমল-বনে ;
পড়িব তােমার মধুর কবিতা,
লেখ গে প্রেমের মনে!
তােমার সুনাম হউক ধ্বনিত
বিশাল ধরণী-ধামে
।
কুষমকানন।
ভূধরে, সাগরে, কাননে, গহনে,
শুনিব তােমার নামে!
ভাবিব এ সব কাহার গৌরব ?
ধন্ত মাের প্রাণেশ্বর!
ধন্ত সেই নারী, আমি অভাগিনী,
তুমি যা’র প্রাণেশ্বর !
মহাবীর।
“
কে মম ধন্বিনােহন্যে।
কালিদাস।
উন্নত শিখরে,
গভীর সাগরে,
বিজন প্রান্তরে,
অভেদ্য নগরে,
বিশাল ভুবন এই মম অধিকার ;
চাদের কিরণে,
জলদ-গর্জনে,
সৌরভ-কাননে,
চিন্তার ভবনে,
মহাবীর আমি, হয় রাজত্ব আমার।
কুসুম-কানন।
আমার আদেশে
বায়ু দেশে দেশে
সুবাস-পরশে
বহে হেসে হেসে,
আমার আদেশ লক্ষ্যে ক্ষমতা কাহার?
ওই দিননাথ
অরুণের সাথ
প্রদোষ-প্রভাত
করে যাতায়াত,
অহহ, নাহি কেহ বিশ্বে সমান আমার।
বিজন কাননে
তাপসের মনে
পবিত্র আসনে
পবিত্র ভূষণে
আমিই পরমজ্যোতি করুণানিলয়।
সােণার আগারে,
সােণার ভাণ্ডারে,
সােণার মাঝারে,
হীরকের হারে,
অতুল বিভবে তুষি রাজার হৃদয়।
কুসুম-কানন।
পাতার কুটীরে,
কৃষাণ-মন্দিরে
কৃষাণ-নারীরে
ভুলাইয়ে ধীরে,
দেখাই কতই আমি মােহন স্বপন ;
প্রাসাদ উপরে
সুপ্ত বীরবরে
বাসনা-সমরে
পরাজিত করে’,.
নিদ্রায় পূজাই আমি তাহার চরণ।
গৃহস্থের মনে
তুষি’ পরিজনে,
পবিত্র কিরণে
উজলি’ ভবনে,
সন্তোষ-আকারে আমি হই বিরাজিত।
ধনসুখনাশা
বিজ্ঞানের বাসা ; .
বিদ্বানের আশা
সময়ের পাশা,
আমি বিনা আর কে বা রাখে উত্তেজিত
কুসুম-কানন।
সদা ছারখার,
সদা হাহাকার,
হৃদয়-আগার
আঁধার যাহার
আমারই করুণা রাখে জীবন তাহার ;
আকাশ খুঁটিয়ে,
পৰ্বত ভেদিয়ে,
সাগরে ডুবিয়ে,
প্রাণেশে আনিয়ে,
ভােবাে-ডােবাে সুখশশী কে করে উদ্ধার ?
রসের নিলয়
কবির হৃদয়,
তাহে প্রভাময়
আমিই প্রণয়,
আমারই প্রভাবে ভােলে পাতাল গগন ;
ত্রিদিব-নন্দনে
অপ্সরীর সনে
সহাস নয়নে
বসায় কেমনে,
ভুলে যায় তারই মন আমার আসন।
কুম-কানন।
ঋষি রত্নাকর
হ’ল কবিবর,
যবে ব্যাধশর
পাখীর অন্তর
বিদার করিল আসি’ বেগের মাথায় ;
ফুলের কাননে,
ফুল-শরাসনে,
ফুলের আননে,
ফুলের নয়নে,
মহাবীর আমি, ছিছি, বর্ণিল আমায়।
সেই রত্নাকর
নহে একেশ্বর ;
আবার হােমর
অন্ধ কবিবর
হানিল নয়ন, অন্ধ করিল আমায়।
কালিদাস বলে
হরনেত্রানলে
তপােভঙ্গ-ফলে
ফুলতনু জলে,
অনঙ্গ হয়েছি-ছিছি, অঙ্গ নাহি, হায়
কুসুম-কানন।
হইয়ে পাষাণ,
ধরিয়ে পরাণ,
হলে তিরােধান,
বিশ্ব পরিত্রাণ
পাইবে কি করে’, হায়, তাহারা না জানে।
রবি শশী তারা,
যেথা আছে যারা,
গগনে পাহারা
দেয় কাল সারা,
নিবিবে তাহারা সবে অন্তিম নির্বাণে।
আমার স্বরূপ
অতি অপরূপ,
যেথা যত রূপ
সুন্দর স্বরূপ
আছে, সে সকল হয় মম উপাদান
অথচ সে সব
আমারই বিভব,
স্ব-বাসনা-ভব
শােভা অভিনব,
হেলায় খেলায় সব হয়েছে নির্মাণ।
১৮
কুসুম-কানন।
দেখিবে যে দিন
শশী মসিহীন,
মৃণাল-বিলীন
প্রফুল নলিন,
বিরহ-বিচ্ছেদ ছাড়া মনের মিলন ;
সে দিন দেখিবে,
সমুখে পাইবে,
হৃদয় জুড়াবে,
আনন্দ লভিবে ;
মহাবীর আমি, শুধু জানিও এখন।
কুসুম-সৌরভে
মধুকর সবে
গুণ গুণ রবে
আমারই গৌরবে,
আমারই গুণের গানে হয় মত্ত-মন।
বসন্ত-মিলনে
কুসুম-কাননে
সুমধুর-স্বনে
কোকিল-বদনে
গুণের নিনাদ মম বাজে অনুক্ষণ।
কুসুম-কানন।
হাসে সৌদামিনী,
হাসে কাদম্বিনী,
হাসে কমলিনী,
হালে কুমুদিনী,
সে সব হাসির মাঝে আমার শয়ন।
আমার শাসনে
বিশাল ভুবনে
জীবজন্তুগণে
সুখী সৰ্ব্বক্ষণে,-
মহাবীর আমি, মনে জানিলে এখন
বিজয়ী।
"I am monarch of all I survey"
COWPER,
তুষার-মণ্ডিত
বিজন শিখর,
শৈবালভূষিত
স্বচ্ছ সরােবর,
পদার্পণ মানবের হয় নি যেখানে ;
ভগ্ন দেবালয়,
বৃদ্ধ গােরস্থান,
রক্ত-অস্থিময়
ভীষণ অশান,
একাকী বিজয়ী আমি ভুমি সেইখানে।
কুসুম-কানন।
২১
আমার আদেশে
মলয় পবন
ভ্রমে দেশে দেশে
বিষাদিতমন
কানন-কুসুমদলে করে’ হাহাকার।
ওই দিনপতি
পরিহৃত করে
প্রদোষেতে নিতি
অগাধ সাগরে
ডুবে যায় বিরহীর হৃদয় আঁধার।
কোন জ্বালা নাই,
শূন্য তপােবনে,
প্রশান্ত সদাই
তাপসের মনে
আমিই নিৰ্বেদ হই নিরাশানিলয়।
হীরকের হারে
অতুল বিভবে
সােণার ভাণ্ডারে
তুচ্ছ করি’ সবে,
বিষাদে কাঁদাই আমি রাজার হৃদয়।
২২
কুসুম-কানন।
মধুর এখন
পাতার কুটীর,
কি ছার শােভন
রাজার মন্দির,
কৃষাণ-নারীর মন করি উচাটন।
কি ছার গৌরব ?
সকলই অসার !
কি ছার বিভব ?
তুচ্ছ তরবার।
!
বুঝাই বীরের মনে মিছা ধনজন।
সদা খুটিমুটি
গৃহস্থ-ভবনে,
সবে দেখে ক্রটি
সরােষ-নয়নে
কলহ-আকারে আমি হই বিরাজিত
চাদিনী নিশায়
নিরাশ-অন্তর
বৈজ্ঞানিক, হায়,
ভাবে একেশ্বর
কেন সাধে অকৃতজ্ঞ জগতের হিত
কুসুম-কানন।
সদা হাসি হাসি,
কুসুম-কানন,
ভাল বাসি বাসি,
ত্রিদিব-ভুবন,
প্রণয় হরণ করি হেন প্রমদার।
সে প্রেম কোথায় ?
সদা হাহাকার !
সে সুখ কোথায় ?
বিশ্ব অন্ধকার !
কে আনিতে পারে শশী ডুবেছে যাহার ?
কবির হৃদয়
দীনতা-সােহাগ,
তাহে বিভাময়
আমিই বিরাগ,
আমারই প্রভাবে ভােলে পাতালগগন ;
বিষাদবিষিত
কাতর হৃদয়,
তাহাতে নিহিত
আমার নিলয়
ভুলে যায় ত্ৰিজগত আমার আসন।
কুম-কানন।
রাজা ভর্তৃহরি
হ’ল দেশত্যাগী,
হেরি প্রাণেশ্বরী
নহে অনুরাগী,
পরিহরি’ ধন-রাজ্য-সুখ-লালসায় ;
বুঝিতে পারিল
প্রেমের কিঙ্কর,
এ বিশ্বে অখিল
আমি অধীশ্বর,
যারে সদা বাসি, সে ত বাসে না আমায়।
একাকী বসিয়ে
নীলনদতটে,
বিমােহিত-হিয়ে,
আমি সত্য বটে
জেনেছিল শেষে অর্ধ-ধরা-অধীশ্বর ;
অভাগা তাইমন
অথেনির বনে,
শেলি, বায়রণ
মিলিয়ে দুজনে,
গেয়েছে আমার গান ভরিয়ে অন্তর।
কুসুম-কানম।
কবি চেটাৰ্টন
নবীন-বয়স,
পূরিয়ে বদন,
ঢালি বিষরস,
অনাহারে হতপ্রায় জীবন হানিল ;
সে মহা-হৃদয়
বাল্যে পরিণত,
মরণ-সময়
মম প্রেমগত,
গাহি মম যশ শেষনিশ্বাস ত্যজিল
অহহ, সে সময়
আমি না থাকিলে,
তাদের হৃদয়
স্নিগ্ধ না রাখিলে,
কে শুনিত সে মধুর বীণার ঝঙ্কার?
কোথায় বহিত
সে মধু-লহরী ?
কোথায় ফুটিত
সে ফুলবল্লরী ?
দেখ দেখি কতই না করুণা আমার
কুসুম-কানন।
আমার নিয়মে
শারদ গগনে
ধীরে ধীরে প্রমে
বিজলীর সনে,
কঁদিয়ে জলদ করে অশ্রু-বিসর্জন
রাজ-সিংহাসনে
বিজন নিশায়
মলিন আননে
}
তারকা সহায়
নিশানাথ দুখৰশ্মি করে বিতরণ।
।
শরদ, শিশির,
।
নিদাঘ, মাধব,
ধীরে ধীরে চির
ভ্রমিতেছে ভব
মাের মহােদয়ী ইচ্ছা করিয়ে প্রচার
আমি শান্তিমুখ,
বিরাগ বিশ্বের ;
আমাতে প্রমুখ
সুবােধ জনের
চিন্তার শ্মশানে সদা সুখের বিহার।
কুসুম-কানন।
২।
কাঁদে সৌদামিনী,
কঁদে কমলিনী,
কাদে কুমুদিনী
বিরহ-দুখিনী,
তাদের নয়নজলে আমার শয়ন।
আমার শাসনে
লভি’ তত্ত্বজ্ঞান,
জীবজন্তুগণে
হয় মতিমান
জিত কি বিজয়ী আমি, বুঝিলে এখন
;
সে ধীর সমীর।
Mais où sont les neiges d'antan ?
VILLON.
সে ধীর সমীর, সে সরণীতীর,
সে নীহার-প্রায়-নিরমল নীর,
সে কানন, হয়, সেই তরুগণ,
কোথায় প্রেয়সী হৃদয়-ধন।
যবে ভালবাসা, কত সুখ-আশা,
মধুরতাময়, কত মধু-হাসা,
হায় রে এৰে সে সাধের প্রণয়,
কেন, কা’র তরে, পেয়েছে লয় ?
কুসুম-কানন।
২৯
রমণি, তােমার সরল হৃদয়,
রমণি, তােমার কুটিল হৃদয়,
রমণি, তােমার মধুর হৃদয়,
রমণি, তুমিই গরলময়।
সে ধীর-সমীর, সে সরসী-ওর,
সে নীহার-প্রায়-নিরমল নীর,
সে কানন, হায়, সেই তরুগণ,
কোথায় প্রেয়সী হৃদয়-ধন !
কামিনী।
কি মধুর, হায়, প্রভাত-উদয়,
বিকচ কমলে অরুণ-রেখা।
কি মধুর হায়, শৈশব-সময়,
নবীন হৃদয়ে প্রণয়-লেখা ।
চাদিনী-যামিনী-যােগেতে যেমন
যমুনার জলে উজান বায় ;
তেমনই নিশীথে প্রেমের স্বপন
শৈশব-হৃদয়ে বহিয়ে যায়।
যেমন হসিত কুসুম-পরশ
প্রদোষসমীরে সরস করে,
তেমনই মধুর কে জানে কি রস
বিতরে লহরী মানস-সরে।
কুসুম-কানন।
৩১
নাহি জানে সুখ, নাহি ভালবাসা,
হায় রে এই কি সে প্রেম হবে,
যেই প্রেমমাঝে করি সুখ-আশা
বিষাদ-হৃদয়ে হতাশ সবে ?
জানিত না তারা ; দিবস যামিনী
কি সুখে যাপিত প্রণয়িজন,
ত্রিশােক-ললাম ললনা কামিনী,
তাহার শিশির সরল-মন!
সে সরলমনে প্রেমের আদরে
বাসিত কামিনী কোমল-প্রাণ ;
নরনারীময় জগত ভিতরে
সকলের চেয়ে তাহার মান।
আহা। তাহাদের সরল প্রণয়
ছিল রে প্রদোষ-প্রভার মত,
আর যেন, হায়, কাহারও হৃদয়
ভুলেও কখন বাসে না তত!
আচম্বিতে হ’ল প্রলয়-উদয়,
কোথা সে প্রণয়-প্রদোষ-প্রভা,
কোথা তাহাদের উদার হৃদয়,
জগতের সেই নবীন শােভা।
কুসুম-কানন।
যে কাল নিশিতে জনক-জননী
বরিল তাহারে অপর বরে,
সে নিশীথে, হায়, কাতরা রমণী
ত্যজিল পরাণ আপন করে।
;
ত্যজিল পরাণ শিশির সরল
বিষাদ-হুতাশে নিরাশাভরে
আঁধার যাহার ভুবন উজল,
কি কাজ তাহার জীবন ধরে’?
করুণ হইল বিধাতার মন,
শিশিরে রাখিল মেঘের বুকে,
কাননে রাখিল কামিনীরতন,
কেহ যেন বাধা না দেয় মুখে।
এখনও নিশীথে যখন সমীর
বিকসিত করে কুসুমগণে,
ধীরে ধীরে গিয়ে নিশির শিশির,
নিরখে তাহার দয়িতাজনে।
আমােদেতে ফাটে কামিনীহৃদয়,
বিকসিত থাকে কুসুমকুল ;
কেবল মধুর এক ধ্বনি হয়,
কামিনী, কামিনী, কামিনীফুল!
৫
কোথা থাকে সুধাকর।
কোথা থাকে সুধাকর, হাসে কুমুদিনী
পুলকিতমনে,
কোথা থাকে দিনকর, দোলে কমলিনী
সহাসবদনে,
কোথা থাকে জলধর, হাসে চাতকিনী
প্রেমের পরশে,
প্রেমের তরঙ্গে ঢলে পড়ে লাে তরঙ্গিণী
সাগর-উরসে
নাহি দূর, নাহি কাল, সবে ভাল বাসে রে
মরতভুবনে,
তবে কেন আমি ভাল বাসিব না তােমারে,
লাে বিধুবদনে ?
;
কুসুম-কানন।
গগন চুম্বন করে প্রেমে গিরিবর
উন্নতহৃদয়,
কুসুমনিকর প্রেমে চুমে মধুকর
মধুর নিলয়,
লহরী চুম্বন করে দেব শশধর
সুধার আকর,
বিজলী করিয়ে বুকে চুমে লাে কাদম্বিনী
,
উল্লাস-অন্তর,
কি কাজ বল লাে তবে এ সকল চুম্বনে
মরতভুবনে,
যদি তুমি না চুমিলে আমার অধর, লাে
ত্রিলােক-শােভনে ?
ত্রিদিবে বাজনা বাজে, জননীর কোলে
হাসে শিশুগণ,
রসের বাজনা বাজে কবির বদনে
মনােবিনােদন,
সমর-বাজনা বাজে, 'প্রফুল্লিত হয়
বীরের হৃদয়,
বিজনে সঙ্গীত-ধ্বনি করে লাে প্রতিধ্বনি
নিশীথ-সময়,
কুসুম-কানন।
কোমল-কুসুম-সম ও চারু-হৃদয়,
নহে ত পাষাণ,
আমার প্রণয়গীতে কেন না মজিবে লাে
তােমার পরাণ ?
ত্রিদিব-কুসুম তুমি সােণার কমল,
ফুটেছ মরতে,
অলকা-রতন তুমি কুবেরের মণি,
উজল জগতে,
সমােহন বাণ তুমি, ভুলে যায় সবে
যে দেখে তােমারে,
সঞ্জীবনী সুধা, যেই বিষাদ-তাপিত রে
জুড়াও তাহারে,
সকলে বাসিল যদি তােমারে, লো স্বজনি,
বিমােহিত মনে,
তবে কেন আমি ভাল বাসিব না তােমারে,
লাে বিধুবদনে ?
সে পবিত্র নাম তবে নাহি কি তােমার ?
হয়েছ কি পরিশেষে কুলকলঙ্কিনী ?
নয়নে সে সরলতা নাহি কি গাে আর ?
হয়েছ কি জনমের তরে অভাগিনী ?
কেমনে হইবে তাহা ?–মিছা সে সম্বাদ,
সে বিষ-সদ্ধাদেকভু করি না প্রত্যয় ;
যদিও কলঙ্ক ধরে গগনের চাঁদ,
ভূতলে দি তুমি পবিত্ৰতাময়।
যদিও কন্টকময় কোমল কমল,
যদিও অমিয়নিধি গরল উগরে,
নিরমল জগতের শােভা-শতদল,
তােমার স্বভাব প্রাণে ভূমানন্দ ঝরে।
কুসুম-কানন।
;
কেমনে বিশ্বাস করি ?—সেই স্নেহলতা
হবে না, হবে না কভু বিষের বল্লরী ;
পুণ্যান পতিগতা বিভুপদে রতা
হবে না পাপিনী কভু সে সুরসুন্দরী।
তা’ হলে আঁধার হ’ত গগন ভূতল,
রবি, শশী, তারাগণ পাইত বিলয়
উবে’ যেত ফুলকুল, শুকা’ত কমল,
শুকা’ত আমার, সখি, কাতর হৃদয়।
তাহা হ'লে থাকিত না সতীত্বাভিধান,
থাকিত না শােসময় রূপের গৌরব,
থাকিত না সারল্যের রজতাভিমান,
থাকিত না এ জগতে গুণের গৌরব।
থাকিলে এখন সেই কোমল বালিকা,
ছিলে তুমি একদিন, সুন্দরি, যেমন,
দোলাতেম বুকে, যথা কুসুমকলিকা
দোলায় আনন্দভারে সদয় পবন।
আমার শৈশবসখি নববিযাদিনি,
যেমন চরিত তব বিমল উজল,
তেমনই কি দেখ দেখি, অয়ি অভাগিনি,
এ নােচনে বহমান বিষাদের জল।
।
কুসুম-কানন।
কত দিন বিজনেতে প্রেয়সী সহিত,
স্মরিয়া তােমার গুণ, তােমার বদন,
চাহিয়াছি একমনে দেহে তব হিত,
যেন তুমি সুখসরে থাক অনুক্ষণ।
তারই কি এ পরিণাম ?-কলঙ্ক ঘটন!
তারই কি এ ফল ?-তুমি চির-অভাগিনী!
কে জানে, দারুণ বিধি, তুমি রে কেমন,
চির-অভাগিনী হ’ল চিরসােহাগিনী।
সে দিন সরলচিতে গিয়েছ যেমন
হাসিতে হাসিতে, অয়ি, প্রাণেশের সনে,
এখনও তেমনই দেখে আমার নয়ন
অবলা সরলা বালা, জিলােকশােভনে।
সে দিন হরমনে বলেছি যেমন,
এখনও তেমনই আজি আশীৰ্বাদ করি,
ভুবনভূষণ তুমি যেমন পাবন,
তেমনই সুখেতে থাক, হে সুরসুন্দরি।
আবাের-সঙ্গীত
হর হর হর!—ডাহীরের জয়।
বাজাও সমরভেরী।
তরবার ল’য়ে এস, বীরগণ,
বাজাও, বাজাও ভেরী।
বাজাইয়ে ভেরী কঁপাও গগন,
কঁপাও ভীরুর মন,
গান্ধার ছাড়িয়া এসেছে যবন,
এস সবে, বীরগণ।
এস রথে, রথি, মাতঙ্গে, মাতঙ্গি,
অশ্বে, অশ্বারােহী বীর,
এস পদচারে, পদাতিক সবে,
ধামুকী সমূরে ধীর !
কুসুম-কানন।
এস যেন আসে ভীম প্রভঞ্জন
যবে দাবানল জ্বলে ;
এস যেন আসে করাল তরঙ্গ
তরণী গরাসি’ জলে।
তরবারি ল’য়ে এস সেই বীর,
তরবারি আছে যার,
এস ল’য়ে সেই বীরের হৃদয়,
সে হৃদয় আছে যার।
চাষ ত্যজি’ এস, পরিশ্রান্ত চাষি,
দান ত্যজি’ এস, দাতা,
প্রেম পরিহরি’ এস, হে প্রেমিক,
শিশু পরিহরি’, পিতা।
কোন্ সুধা হয় এমন মধুর
শত্রুর শােণিত যথা?
কোন্ কথা হয় মধুর, যেমন
শত্রুর বিনাশ-কথা ?
আলােরের গড় অজেয় জগতে
জানুক সকল জন,
আলােরের বীর অজেয় জগতে,
জানুক সবার মন।
কুম-কানন।
সাহসে আশ্রয়, পুরুষ হৃদয়,
শূরের অটল মন,
গান্ধার ছাড়িয়া এসেছে যবন,
এস সবে, বীরগণ।
তরবার ল’য়ে এস, বীরগণ,
বাজাও সমর-ভেরী।
হর! হর! হরডাহীরের জয় ।
বাজাও, বাজাও ভেরী।
আন পানপাত্র।
জীবয় মৃতমিব দাস।”
জয়দেব।
আন পানপাত্র, করি সুধাপান,
জুড়াক, প্রেয়সি, তাপিত পরাণ,
পাসরিব আজি তােমার হৃদয়ে
পাপ, তাপ, দুখ, জগতজালা।
মেদুর সমীর, যমুনার তীর,
আবেশে অলস অবশ শরীর,
মধুর ললিত কোকিল কাকলী,
গলে ত্রিদিবের মালতী-মালা।
ধর নব তান, গাও প্রেমগান,
মেল, বিধুমুখি, কমল নয়ান,
পর ফুলভার কুন্তলে তােমার,
হাসি মুখে কর হৃদয় আলা।
কুসুম-কানন।
৩
আন পানপাত্র, করি সুধাপান,
চুম্বনে জুড়াই তাপিত পরাণ,
পাসরি, প্রেয়সি, তােমার হৃদয়ে
পাপ, তাপ, দুখ, জগতজ্বালা।
সেই সুধাময় সরল হৃদয়।
“যাং চিত্তয়ামি সতত ময়ি সা বিরক্ত।”
ভর্তৃহরি।
সেই সুধাময় সরল হৃদয়
তবে কি, প্রেয়সি, শুধু বিষময়,
তবে কি তােমার মধুর প্রণয়
বিষম ব্যতীত কিছুই নয়।
তবে কি তােমার সরল আচার
কেবল বাহ্যিক মুখের ব্যাভার,
হায় রে অমিয়-লহরী-মাঝারে
কাল-বিষধর লুকায়ে রয়।
অয়ি,শােভাময় কুবলয়দল,
প্রণয়-পথে তােমরা কেবল
আছিলে আশ্রয়, তােমাদের মত
প্রিয়ার প্রণয় মৃণালময় ?
কুসুম-কানন।
৪৫
তােমাদের মত নয়নমােহন,
তােমাদের মত হৃদয়তােষণ
তােমাদের মত কণ্টকজীবন,
আমার প্রিয়ার প্রণয় হয় ?
সেই সুধাময় সরল হৃদয়
তবে কি, প্রেয়সি,শুধু বিষময়,
তবে কি তােমার মধুর প্রণয়
বিষম ব্যতীত কিছুই নয়।
সুধাকর।
“I ask not proud Philosophy
To teach me what thou art."
CAMPBELL.
আশৈশব নিরীক্ষণে ঠিক হয় নাই মনে,
কে তুমি হে বিরাজ গগনে।
কোথা তব জন্মভূমি, কার প্রেমে প্রেমী তুমি,
কেন ভ্ৰম কিরণকাননে ?
তুমি কি ত্রিদিব-মণি, বিমল তেজের খনি,
প্রভাজালে উজল অবনী
ব্রহ্মের কিরণরাশি, বিভাসি মুখের হাসি,
যােগেশের কর গুণধ্বনি?
অথবা সুষমা-কলা সৌদামিনী অচপলা
তপস্যার অতুল পুতলী,
কবিরা যাহারে বলে, মহেশ-কপালদলে
ব্রিলােচন কমলের কলি ?
কুসুম-কানন।
অথবা অমর-বালা, জুড়া’তে হৃদয়-জ্বালা,
প্রতিনিশি আসিয়ে আকাশে,
কর আসি’ দরশন কোথা তব প্রাণধন,
কোন্ সরে হাসিয়ে বিকাশে ?
•
অথবা প্রমােদরূপে প্রতিনিশি মুনিরূপে
কর বিশ্বে শান্তির প্রচার ;
যেন জীব জন্তুগণ, নর নারী সৰ্বজন,
করে সুখে সকলে বিহার ?
অথবা বিভুর নেত্র, নিরখ ব্ৰহ্মাণ্ডক্ষেত্র,
যােগেশের সৃজিত ভুবনে
কে বা করে পুণ্যপাপ, কে দেয় কাহারে তাপ,
তাই কি হে নিরখ নয়নে ?
যে হও সে হও তুমি, এ অখিল মর্ত্যভূমি
উদ্ভাসিত তােমার কিরণে ;
হাসে উচ্চ গিরিবর, হাসে শুভ্র জলধর
হীরাবৃত নীলাভ গগনে।
কুসুম-কাননপাশে সুখে কুমুদিনী হাসে,
হরষিত চকোরের প্রাণ ;
কুলুস্বরে হেলে দুলে’, নাচিয়ে তরঙ্গকুলে,
যমুনায় প্রেমের উজান।
৮
কুসুম-কানন।
এইরূপে কত দিন হয়ে গেছে প্রভাহীন,
তােমার কিরণে উদ্ভাসিত।
তুমি, হে আনন্দময়, আছ সেই প্রভালয়,
জুড়াও এ ভুবনের চিত।
কনক-সিংহল কোথা, হস্তিনা কথার কথা,
অস্তমিত ভারত-প্রতাপ ;
গিরীস্ জীয়ন্তে মরা, কোথা বা রােমের ধরা,
ফরালির ভয়ঙ্কর দাপ?
*
কোথা সে সকল মুনি, কোথা সে সকল গুণী,
সকলেই পাইবে বিনাশ;
কিছুদিনে এ সংসার হয়ে যাবে ছারখার,
থাকিবে না,এ সব বিলাস।
তুমি, হে তারকাপতি, ব্রহ্মের পবিত্র জ্যোতি,
ঝলসিবে কিরণছটায়,
আরােহি’ সময়রথে, চলিবে অনন্তপথে
আনন্দের অশেষ সুধায়।
আর আমি সে সময়ে, না জানি কি জীব হয়ে,
নিরখিব সে ঘাের প্রলয় ;
দেখিব তােমার সনে, নষ্টপ্রায় ত্রিভুবনে,
ব্যোম রসাতল জলময়।
কুসুম-কানন।
না জানি প্রলয় কত, দেখেছ এমন শত,
কত কোটি বিনষ্ট ভুবন ;
অভাগা আমার মত, কত শত জীব গত,
হেরিয়াছ, রােহিণীরমণ।
হেরিয়াছ কত নিশি, সজল নয়নে, শশি,
সীতা সতী অশােককাননে ;
নয়নেতে নীর বহে, দেহে না পরাণ রহে,
কি আঁধার বিষাদের মনে।
হেরেছ দ্রুপদসুতা বিয়ােগ-বিষাদযুতা
চেয়ে আছে গগনের পানে,
যে গগনে প্রাণপতি ধনঞ্জয় মহামতি
বিরাজিছে প্রণয়ের ধ্যানে।
হেরিয়াছ শকুন্তলা সরলা মেনকাবালা
প্রেমলিপি লিখিছে প্রাণেশে,
যে প্রাণেশ ভুলে গিয়ে, ধরিয়ে পাষাণ-হিয়ে,
অধিষ্ঠান করে দুরদেশে।
হেরিয়াছ কাদম্বরী পতিরে হৃদয়ে ধরি’
সভয়ে করিছে আলিঙ্গন
;
নাহিক সেখানে কেহ, কেঁপে উঠে মৃতদেহ,
চমকিত কামিনীর মন।
কুসুম-কানন।
বিজন কার্থেজকুলে, আশার দোলায় দুলে,
রাজরাণী একাকী বসিয়ে ;-
হায়! সেই ক্ষুদ্র তরী, প্রাণেশে বহন করি,
কবে আর আসিবে ফিরিয়ে।
সখীরা সঙ্গীত গায়, বিজনে পাগল প্রায়
ভাবিছে অপ্সরা প্রাণচোর,
যেই জন ইথাকায় রাখালের খাদ্য খায়,
কিঙ্করের প্রণয়েতে ভাের।
এইরূপে কত নিশি হেরেছ নয়নে,শশি,
আর কত হেরিবে আবার
আবার রােমিও কত, জুলিয়েটে প্রাণগত,
প্রেম-দিব্য করিবে তােমার।
আবার প্রেমিক কত, হ’য়ে জ্ঞান-পরাহত,
বলিবে কি ছার রাজমান ;
নীল-নদ-উপকুলে মিশরীর প্রেমে ভুলে,
যথা বীর দিয়েছিল প্রাণ।
আমিও একা, হায়! ছিলাম তাদের ন্যায়,
রমণীর প্রণয়ে কাতর ;
কত নিশি তব করে তার সনে একান্তরে
যাপিয়াছি উল্লাস-অন্তর।
;
কুসুম-কানন।
এখন সে সুখ কোথা, কেন রে পরাণে ব্যথা,
কোথায় সে প্রেমের রজনী ?
দোহে আছি দোহা কাছে, দোহারই জীবন আছে,
কেন নহি স্বজন-স্বজনী ?
এখনও যৌবন আছে, এখনও সুষমা আছে,
মাঝে কেন বিরাগের নদী ?
প্রাণ দিয়ে, মন দিয়ে, কেন বা দহিবে হিয়ে ?
কি সুখ, না ভালবাসি যদি ?
তা’ও এক দিন নয়, তাও এক মাস নয়,
নয় এক বিরহ-বরষ।
অনন্ত বিরাগ যেথা, অনন্ত বিয়ােগ সেথা,
কোথা তবে সাধের হরষ?
না জান এমন নয়, কহ দেখি, সুধাময়,
প্রেমের কি বিধান এমন,
ভালবাসি এক দিন, তার পর প্রেমহীন,
চক্রবাক দুপারে দুজন।
এই কি রে ভালবাসা, এই কি সুখের হাসা,
এই কি সে কুসুম-কানন ?
এই কি সে প্রেমসুধা, কে খাইবে, কোথা ক্ষুধা?
কে চাহে দেখিতে সে বদন?
,
২২
কুম-কানন।
মরুভূমে চল যাই, হেন প্রেমে কাজ নাই,
এ স্থান আমার তরে নয় ;
সেখানে তােমার সনে দুইজনে একমনে
গাব গান, জুড়াবে হৃদয়!
গাব গান দুইজনে একতানে একমনে
এ জগতে নাহি কোন সুখ,
যে চাহে লভিতে সুখ, সে দেখিবে দুখ-মুখ,
সুখ নরে অনন্তবিমুখ!
আর কি গাহিব ?
গাহিব, যে বিধি তাে’রে কলঙ্কী করিল,
সে বিধি আমার, শশি, হরিষ হরিল।
না হ’তে সুন্দরী
“ Why wert thou so fair. "
BYRON.
হ’তে সুন্দরী যদি, প্রাণেশ্বরি,
তবে কি বহিত প্রণয় লহরী,
তবে কি কাদিত বিরহ-পাগল--
কাদিত আমার তাপিত মন ?
---
থাকিতে সুখেতে, থাকিতাম সুখী,
না হেরে’ তােমারে থাকিতাম সুখী,
প্রেয়সি, আমার দুখের আকর,
প্রেয়সি, আমার যতন-ধন।
কোথায় জ্বলিত বিরহ-অনল,
কাহারে করিত প্রণয়-পাগল,
কোথায় থাকিতে তুমি, রূপেশ্বরি,
উজলিতে, হায়, কাহার মন।
কুসুম-কানন।
হ’তে সুন্দরী যদি, প্রাণেশ্বরি,
তবে কি বহিত প্রণয়-লহরী,
তবে কি কাদিত বিরহ-পাগল—
কঁদিত আমার তাপিত মন ?
ALL FOR LOVE.
আমি যে তােমারে ভাল না বালি তা নয়,
কিন্তু তুমি কই মােরে ভালবাস?
আমি যে তােমার তরে পাগল-হৃদয়,
হায়, তুমি কই মিটাও পিয়াস।
নিরন্তর চেয়ে আছি শুধু প্রাণ ধরে,
হায়, নিতি নিতি কত আশা করি।
কথায় কি বাঁধা থাকে হৃদয়-সাগরে
প্রিয়ে, ডােবে ডােবে প্রণয়ের তরী।
–
বলল না লভিতে যশ গৌরব বিভব,
হায়, যশ খ্যাতি সকলই পার্থিব ;
তুমিই বাসিলে ভাল আমার গৌরব,
প্রিয়ে, তুমি মাের প্রাণের ত্রিদিব ।
যমুনার তীরে।
১
যমুনার তীরে বসে একাকিনী,
মদন ধরিল মােরে,
“প্রাণেশ্বরি, আমি নহি কি তােমার ?”
বলে’ আলিঙ্গন করে।
দিন হ’ল রাতি, রাতি হ’ল দিন,
তপন হইল শশী,
ভালবাসা বলে, “আমি হনু সুখ”
সুখ বলে “ভালবাসি।
যমুনার জল হেসে বহে যায়,
সুধাকরে সুধা ক্ষরে,
যমুনার তীরে বসে একাকিনী,
মদন ধরিল মােরে।
৫৭
কুসুম-কানন।
।
२
যমুনার তীরে বসে উদাসিনী,
মদন ধরিল মােরে,
*প্রাণেশ্বরি, ত’রে বড় ভালবাসি,
বলিয়ে চুম্বন করে।
জানি কতই ছলনা সে জানে,
কতই কেমন হাসে ।
আমি ভালবাসি—সেও যেন মােরে
প্রাণে প্রাণে ভালবাসে।
ভালবাসা আর জাগিতে না পারে,
মুখেতে শয়ন করে,
যমুনার তীরে বসে উদাসিনী,
মদন চুম্বন করে ।
যমুনার জল হেসে বহে যায়,
সুধাকরে সুধা রে,
ঘুমায় মদন পুলকের শেষে
সুখেতে শয়ন করে।
বিষাদ ধরিল বিরাগের রূপ,
বিরাগে বিষাদ হ’ল,
হৃদয়ে বিরাগ বিষাদ রাখিয়ে,
মদন পলা’য়ে গেল।
কুসুম-কানন।
ছিনু দুইজন, হইলাম একা,
সুধাকরে সুধা রে,
যমুনার জল হেসে বহে যায়,
আমারই নয়ন ঝরে।
আকাশ-কুসুম
বল দেখি কোন্ খানে তােমার জনম,
কি রূপ মুরতি,
দেখিতে কি রূপ অঙ্গ, অনঙ্গ, তােমার,
কোথায় বসতি ?
তুমি কি ফুটিয়ে থাক, আকাশ-কুসুম,
কামিনী-কুন্তলে,
অথবা লােহিত ভৃঙ্গ, লুকাইয়ে থাক
কপােল-কমলে ?
বল দেখি কোন্ খানে তােমার জনম,
ফোট কোন্ জলে,
হৃদয়ে হৃদয়ে কিম্বা নয়নে নয়নে
কিম্বা বাসনার কোলে ?
৬ •
কুসুম-কানন।
হৃদয় সঁপিয়ে, দিয়ে জীবন কুসুম,
পূজিব তােমারে
মানস-কাননে, সখে, শােভার আসনে
রূপের শৃঙ্গারে।
কোন্ রাজ্যে রাজা তুমি, মদন রাজ,
কাহার কিঙ্কর,
তুমি কি বাসনা-সুখ, সুখের বাসনা,
মনের চকোর ?
বল দেখি কোন্ খানে তােমার জনম,
ফোট কোন্ জলে,
হৃদয়ে হৃদয়ে কিম্বা নয়নে নয়নে
কিম্বা বাসনার কোলে ?
ত
আমার নয়ন নিয়ে করিলে দর্শন,
পাই না দেখিতে,
আমার শ্রবণ নিয়ে করিলে শ্রবণ,
পাই না শুনিতে।
আমার অধর তুমি কাড়িয়ে লইলে
করিতে চুম্বন,
আমার পরাণ তুমি হরিয়ে লইলে,
হয়েছি এমন।
কুসুম-কানন।
বল দেখি কোন্ খানে তােমার জনম,
ফোট কোন্ জলে,
হৃদয়ে হৃদয়ে কিম্বা নয়নে নয়নে
কিম্বা বাসনার কোলে ?
৪
ফিরে দাও আঁখি মাের, করিব দর্শন,
মদন চপল,
ফিরে দাও কর্ণ মাের, করিব শ্রবণ,
হয়েছি পাগল।
ফিরে দাও, প্রিয়তম, অধর আমার,
করিব চুম্বন,
ফিরে দাও প্রাণ মাের, করিব ধোেন
তােমায়, মদন।
বল শুধু কোন্ খানে তােমার জনম,
আকাশ-কুসুম ?
বল মােরে কোন্ খানে তােমর বাতি,
মনের জুলুম ?
দুলিয়ে দুলিয়ে পড়ে আমার নয়ন
তােমার ধেয়ানে,
তােমার নূপুর-ধ্বনি প্রতিঘাত হয়
আমার পরাণে,
७२
কুসুম-কানন।
তােমার কেশের বাস তিরপিত করে
নাসিকা আমার,
তােমার বদনশশী তিরােহিত করে
মনের আঁধার।
ওহে চারুচন্দ্র, ওহে মত্ত মধুকর,
বিশ্ব-ভালবাসা,
জগত সুন্দর বটে, তথাপি সুন্দর
তােমার পিয়াসা।
সাগরের বেশ নহে তেমন সরেস
যথা তব বেশ,
সাগর-বালুকা নহে তেমন চিকণ
যথা তব কেশ,
সাগর-তরঙ্গ নহে তেমন তরল
যথা তব হাসি,
সাগর অসীম, তুমি তথাপি অসীম,
তাই ভালবাসি।
বলিবে কি কোন খানে তােমার জনম,
কারে ভালবাস,
কা’র প্রেমে, ধনু-হাতে বীরবেশে কর
সমর-প্ৰয়াস ?
কুসুম-কানন।
৭
ওহে বিলাসের পুত্র বাসনার প্রেমে
যমুনার তীরে,
ওহে হাসি-হাসি-মুখ মানস-কুসুম
লাবণ্যের নীরে,
ওহে কুহু-কুহু-রব অস্ফুট অশ্রুত
কোকিল-বদনে,
ওহে প্রণয়ের বার্তা বসন্ত-আগমে
মৃদু সমীরণে,
ওহে সদা ক্রীড়মান তরল লহরী
কারণের জলে,
তােমাতে ভাসিব আমি আমােদে আহলাদে
সুখ-শতদলে।
কিশলয়-শয়নে।
ভালবাসা-ফুল
জগতে অতুল,
বাসনা-মুকুল
অমূল জানি।
ঘন আলিঙ্গনে,
ঘন পরশনে,
ঘন সম্মিলনে,
হরষ মানি।
কুসুম-কানন।
হাসিয়ে হাসিয়ে,
চুমিয়ে চুমিয়ে,
প্রেমে বুকে নিয়ে,
কি সুখ হয় !
সুখের জীবন,
সুখের ভুবন,
সুখের মদন,
কে বলে নয় ?
পাতি আশা-ফাঁদ,
ধরি’ প্রেম-চাদ,
বধি’ প্রেম-বাঁধ
দোহার বুকে ;
কুটিল-কুন্তলে,
কপােল-কমলে,
বক্ষঃ-শতদলে,
লুকাই সুখে।
কুসুম কানন।
৪
নিশি অবসান,
শশী ম্রিয়মাণ,
অলস পরাণ,
অবশ আঁখি ;
আরক্ত-অধরে,
পীন-পয়ােধরে,
ঘুমায় বিঘােরে
বাসনা-পাখী।
দারুণ সে রসে,
দারুণ হরষে,
দারুণ পরশে,
গরল ক্ষরে।
ভালবাসা নয়,
সুধাময় নয়,
হৃদে বিষােদয়,
শােণিত ঝরে।
কুসুম-কানন।
আকুল প্রেমিক
তবু জানে ঠিক
মদন-মাণিক
অতুল ভবে ;
সকলেই, হায়,
দেখিয়াছে তায়,
সকলেই চায়
কেন রে তবে ?
প্রতিভা।
(অসমাপ্ত)
রূপের সামগ্রী দেখি সতত সুন্দর,
রূপের মায়ায় মুগ্ধ নয়নযুগল,
রূপের সঙ্গীতে মিগ্ধ শ্রবণবিবর,
রূপের ধেয়ানে মগ্ন মানস বিহ্বল।
দূরদেশে নীলাকাশে শােভে শশধর,
কে দেয় তাহার মুখে প্রসন্ন কিরণ?
সরসীর বুকে ফোটে স্বর্ণ-শতদল,
কেন করে তার তরে ভ্রমরে গুঞ্জন
কুসুম-কানন।
দীপ্তিমতী সৌদামিনী ঝলসে নয়ন,
কেন তারে বুকে ধরে নব জলধর ?
উষারে কেন বা দিতে নব আলিঙ্গন,
নিতি নিতি ফিরে আসে দেব দিবাকর ?
৪
প্রদীপ্ত প্রদীপ জ্বলে উজলি’ ভবন,
পতঙ্গ তাহায় কেন পড়ে বা পুলকে ?
উছলি’ উছলি’ কঁদে মােহন বাঁশরী,
ভুজঙ্গ কেন বা পড়ে তাহার কুহকে ?
কবিদের সুধাময় মনের পরশ
মানবের মনে কেন সুধাময় করে ?
কামিনীর মনে যদি জানি গাে চঞ্চল,
কেন বা বৃথায় ভ্রমি তার প্রেমতরে ?
ভালবাসা দিয়ে যদি ফিরে নাহি পায়,
তবে, হায়, লােকে কেন ভালবাসে পরে ?
হবে না আপন, তবু কেন রাখে তা
নয়নে নয়নে আর অন্তরে অন্তরে ?
৭
কুসুম-কানন।
৭
হয় না কি অবসান সুখের যামিনী,
হয় না কি অবসান সাধের প্রণয় ?
বুঝিতে কি পারে না গাে মানুষের মন,
কেন করে পর-সনে চিত্ত-বিনিময় ?
৮
কুসুম-কাননে একা বিহরে মদন,
কুসুম-সৌরভে রতি বিহরে বিরলে,
ফুলেতে নির্মিত তনু, ফুলেতে বসতি,
ফুলময় ফুলময়ী ফুলবাণে জ্বলে।
৯
পরের বদনে আছে কি মােহন শশী,
পরের মনেতে আছে কি প্রেম মােহন ?
হে রূপ-সৌন্দৰ্য-শােভা-সুষমা-মাধুরি,
কেন লুব্ধ, মুগ্ধ হয় মানুষের মন ?
আছে ত কতই বিশ্বে সুন্দরী রমণী,
পােড়া আঁখি কেন, হায়, তারই পানে ধায় ?
আছে ত গােকুলে কত গােপের নাগরী,
“রাধা রাধা” বলে’ কেন বাঁশরী বাজায় ?
কুসুম-কানন।
৭১
নাহিক দোহারই আজি শাস্ত্র-আলােচনা,
নাহিক দোহারই আজি সঙ্গীতশীলন,
কি এক উঠেছে মনে নব উদ্দীপনা,
কি এক তপনে তপ্ত হৃদয়-ভুবন।
১২
যমুনার তীরে জ্বলে শতেক প্রদীপ,
যমুনার নভে শেভে শতেক তারকা,
যমুনার তীরে ব্যাপ্ত চাঁদের কিরণে
ধৌত সৌধ অট্টালিকা কুবের অলকা।
মলয় পবন খেলে-রাজার ভবনে
নাহি শােনা যায় আজি বীণার ঝঙ্কার,
কামিনীর কণ্ঠস্বর, মৃদঙ্গের বােল,
নুপুর-নিক্কণ আর সঙ্গীত-সম্ভার।
১৪
সােণার পালঙ্কে বসি’ রাজার কুমারী,
সােণার আসনে বসি’ প্রতীপ কুমার,
সমুখে সােণার কাব্য পড়িয়ে শয্যায়,
সমুখে সােণাৱ দীপ শশাঙ্ক-প্রকার।
৭২
কুসুম-কানন।
কুসুম-মালিক ব্যাপ্ত বিলাস-ভবন,
কুসুম-সুবাসে সুপ্ত মেদুর সমীর,
প্রতীপ প্রতিভা বসি’ নীরব-অধর,
নীরব নিস্তব্ধ আজি রাজার মন্দির।
এই কি গাে কুমারীর শাস্ত্র অধ্যয়ন,
এই কি গাে কুমারের শাস্ত্র-অধ্যাপন ?
এ হেন নিশীথে আর এ হেন সমীরে,
পরস্পর কেন করে মুখ-বিলােকন?
১৭
মায়াময় এই বিশ্ব, পার্থিব মানব,
পার্থিব এ প্রেম যদি জানিত দুজনে,
যমুনার তীরে তবে মেদুর সমীরে
কেন বা রহিবে দেহে বিরস বদনে ?
১৮
পড়িয়াছে কত বার প্রেমে কত দুখ,
পড়িয়াছে কত বার প্রেমে সুখ নাই,
তবে কেন ভালবাসে, ভালবাসে পরে,
প্রেম যদি জগতের এমন বালাই ?
কু-কানন।
আপনার প্রাণ, মন, জীবন, যৌবন,
কত লােকে করিয়াছে আহুতি-প্রদান,
হবে, হায়, বাড়াইতে তাহাদের নাম,
পােড়াইবে কেন দোহে দোহারই পরাণ?
ওহে দার্শনিক, কর হৃদয় দর্শন,
ওহে বৈজ্ঞানিক, দেখ হৃদয়-বিজ্ঞান,
প্রজ্ঞায় প্রশান্ত তৰ হৃদয়-কদরে
রমণীর মূৰ্ত্তি কেন করে অধিষ্ঠান?
কোমল কামিনী করে শাস্ত্র-আলাপন,
তা’র মনে আজি কেন মদনের ব্যথা?
কত গুরু কত শিয্যে হয়েছে মিলন,
তবু তাহা নহে কি গাে সরমের কথা ?
২২
কহিল প্রতীপ--“দেখ, প্রতিভা সুন্দরি,
নিতি নিতি করি বটে শাস্ত্র আনােচন,
আজি কিন্তু মনে মাের বিষম জঞ্জাল,
অনুমতি পাই যদি করি নিবেদন।
সুষম-কানন।
*নহি আমি ব্রহ্মচারী, রাজার নন্দিনি,
জানিও আমারে মরাজের নন্দন,
আজি যে দেখিছ এই বিভূতি লেপন,
ছিল এর পরিবর্তে চল ভূষণ।
२०
“আমার পিতার রাজ্য আজি ছারখার,
আমার পিতার আঁখি শেষ নিমীলিত।
একাকী, একাকী ভ্রমি জগত ভিতর,
নাহি পাত্ত, মিত্র, সেনা,-কে সাধিবে হিত ?
২৫
জগত অসীম দেখি ভ্রমণকারণ,
জীবন অশেষ দেখি বাঁচিবার তরে ।
নিরন্তর ঘূরি যথা আঁখি ল’য়ে যায়,
এই কয়খানি শুধু কাব্য ল’য়ে করে।
“রৌদ্র, বৃষ্টি, শীত, তাপে নাহি মানি দুখ,
ভােজন শয়নে কিছু নাহিক বিকার
আকাশ আমার পিতা, পৃথিবী জননী,
পার্থিব সকলে দেখি সমান আমার।
কুসুমকলিন।
“রৌদ্র বৃষ্টি শীত তাপ সহে গিরিব,
অনন্ত কিরণে কিন্তু শিখর মণ্ডিত,
রৌদ্র বৃষ্টি শীত তাপ সহেছি, প্রতিভে,
প্রজ্ঞার প্রভায় চিত ছিল প্রফুল্লিত।
২৮
“জ্ঞানও পার্থিব,হায়, পৃথিবী ভেদিয়া
অপর আলােক কভু দেখে নাই জ্ঞান ;
প্রাণও পার্থিব,-হায়, পৃথিবী ভেদিয়া
অপর আলােক কই দেখিয়াছে প্রাণ?
“শুকায় তরুর পাতা শীতের প্রভাবে,
বসন্তের উদ্বোধনে হয় বিকসিত,
চন্দ্রমা কখন গিয়ে সাগরে লুকায়,
কখন বা করে বিশ্বে প্রভা উদ্ভাসিত।
4
অন্তিম বিলয় যবে হবে উপস্থিত,
কোথায় রহিবে এই বিচিত্র জগত।
মানুষের জ্ঞান তবে হবে তিরোহিত,
মানুষের প্রাণ-বায়ু বহন-বিরত।
কুসুম-কানন।
“নশ্বর শরীর জানি, নশ্বর হৃদয়,
নশ্বর নরের জ্ঞান, সকলই নশ্বর,
আজনম তবুও করেছি অন্বেষণ
যেখানে যখন থাকে সুরূপ সুন্দর।
“কবিতা-কুসুমবনে যে জন সারদা,
কমলা নিরখি তারে রূপের সাগরে ;
পৃথিবী আরব্ধ যবে সাগর মন্থিয়া,
তারেই রেখেছে নরে হৃদয়ভিতরে।
৩৩
“বহুদিন, বহুদেশ করেছি ভ্রমণ,
বহুভাব রাখিয়াছি আমার অন্তরে,
বিচলিত হয় নাই কভু যেই চিত
আজি তাহা ক্ষুব্ধ দেখি তরঙ্গ-নিকরে।
৩৪
নিতি নিতি করি দেহে শাস্ত্র-আলাপন,
এই খানে, বিধুমুখি, নিতি যাই আসি,
বলি—যদি অভাগারে দাও অনুমতি,
প্রতিভে, তােমারে আমি বড় ভালবাসি।
বিরহ।
তখন বলিত যদি তুলল না এ ফুল,
এ ফুলের নাহিক সৌরভ ;
ভখন বলিত যদি দেখাে না এ শশী,
এ শশীর নাহিক গৌরব ;
তখন বলিত যদি খেয়াে না এ মধু,
এ মধুর নাহিক মাধুরী ;
তখন বলিত যদি কােরা না এ প্রেম,
এ প্রেমের সকলই চাতুরী ;
তবে কি পড়িয়ে তার রূপের কুইকে
সঁপিতেম তাহারে প্রণয় ?
তবে কি কাদিত আজি বিচ্ছেদ্রে বিষাদে
তা’র তরে আমার হৃদয় ?
যাইলাম সেইখানে
যাইলাম সেইখানে তােমায় আমায়
যথা হ’ল প্রথম মিলন,
লাবণ্য-লীলায় আর রূপের তরঙ্গে
যথা তুমি দিলে দরশন।
এখনও সেখানে ফুটে কুসুম কোমল
এখনও গুঞ্জরে মধুকর,
এখনও সেখানে খেলে অনিল মলয়,
এখনও ঝলসে নিশাকর।
কুসুম-কানন।
এখনও সরসী নাচে রজত তরঙ্গে,
এখনও কমল ফোটে জলে,
সকলই তেমনই ; প্রিয়ে, তুমি নাই তথা,
আমার নয়ন শুধু বলে।
গাহিলাম সেইখানে, প্রিয়ে, সেই গান
তােমার শবপরিগ্ধকর ;
আমার গানের সনে আর কে বা গায়,
শুনি কানে কা’র কণ্ঠস্বর ।
ওকি প্রতিধ্বনি করে দূরদেশে গান,
কি তব লােহিত অধর?
ত্রিদিবে কি ভুল নাই আমার প্রণয়,
তাই দাও সঙ্গীত উত্তর ?
এখনও নীরব নহে
এখনও নীরব নহে সে বীণা-ঝঙ্কার,
যে বীণার বাণী, হার, আর না শুনিবে ;
এখনও নীরব নহে সে গীতের রব,
যে গীতের প্রতিধ্বনি আর না বাজিবে ।
যে তরণী’পরে আজি হইতেছি পার,
কোন হতভাগা যেন না চড়ে তাহায় ;
যে ঘুমে আমার আঁখি হতেছে জড়িত,
সেই ঘুমে আর যেন কেহ না ঘুমায় ।
এতদিনে ঝরে’ - জীবন-পল্লব,
ফুরায়েছে এ জনমে জনমের আ
কেন রে আমায় তবে করি, পাগল,
ভাবনা, বাসনা, সুখ, হে, ভালবাসা।
•
কুমকানন।
জানিতাম যদি শেষে হইবে এমন,
যেমন জেনেছে আজ হতাশ হৃদয়,
ফেটে যায় ফেটে যা’ক বিষাদের বুক,
স্মরিতে পারি নে আর সে সব সময়।
হায় রে তখন এই বিশাল ভুবন
কি এক ভূষণে ছিল ভূষিত হইয়ে।
এখন আঁধার করি আমার হৃদয়,
কি যেন এ ধরা থেকে গিয়েছে চলিয়ে।
সেই রামধনু উঠে শারদ গগনে,
সেই শশধর আজও উজলে ভুবন ;
সুবাসে পাগল করি’ চপল অনিলে,
সেই ফুলকুল শােভে কুসুম-কানন।
সেইরূপ কলস্বরে যায় তরঙ্গিণী,
উজল লহরী ল’য়ে সাগর-সদনে ;
ভেদিয়ে গগন রাজে শ্যাম গিরিবর
সেইরূপ উচ্চভাবে উন্নতবদনে।
সেইরূপ গান করে বিহঙ্গমগণ
কে জানে কি অপরূপ হরষে মাতিয়ে ;
যে হাসি উজল করে তাদের সঙ্গীত,
সে হাসি আমার, হায়, গিয়েছে চলিয়ে।
কুসুম-কানন।
তখন আকাশে ওই নব জলধর
বুকে ল’য়ে সৌদামিনী খেলিত কেমন।
তখন কেমন এক নবীন কিরণে
উদিত প্রভাতকালে মধুর তপন !
তেমনই সকল আছে, ছিল যে যেমন,
প্রাচীন শােভায় আজও প্রাচীন বিভব ;
শুধু, হায়, অভাগার লােচন কাতর
দেখিতে পারে না আর দেখেছে যে সব।
জীবন-মরণ যদি নিদ্রা-জাগরণ,
হয় না তা হলে কেন অনন্তু মরণ।
জনম-মতন, হায়, ভুলিব তা হলে
হৃদয়ের অনির্বাণ অনন্ত-জলন।
ভুলিব তা হলে মম মুখসরােবরে
দুলিত কি রূপে ফুল্ল কবিতা-কমল,
বাসনা-সমীরে আর আশার সৌরভে
কোন্ ভাবে ভ্ৰমিতাম পীযুষ-চপল।
ভুলিব তা হলে মম যৌবন কাননে
কিরূপে উঠিল এক কামিনী-কণ্টক,
নালিল কোমল মম সুখের লতায়,
করিল আমার মনে বিকট নরক।
কুসুম-কানন।
ভুলিব তা হলে সেই প্রিয়সখাগণ,
যাদের প্রণয়মণি হৃদয়-আকর
আঁধারি, গিয়েছে চুরি কালের করেতে,
উজল করিতে, হায়, ত্রিদিব-নগর।
এস সবে প্রাণসম প্রিয় সখাগণ,
একবার তােমাদিগে হৃদয়েতে ধরি ।
আয় রে শৈশবকাল সুখের সময়,
আয় রে বারেক তাে’রে আলিঙ্গন করি।
তখন ক’জনে মিলে হৃদয়ে হৃদয়ে
কি সুখেই কেটে যেত সুখময় দিন।
কি সুখের মদিরায় ছিলাম মগন,
হৃদয়ে হৃদয়ে প্রেমে করিয়ে বিলীন।
কবিতায় ভাসমান পরাণ-নিকর,
তােমাদেরই রাগে ছিল এ চিত রঞ্জিত
জীবনের মরু-ভূমে শ্যাম ওয়েসিস,
জুড়ায়েছ শান্তিদানে হৃদয় তাপিত।
আসিব না আর আমি তােমাদের কাছে
শুনাইতে হৃদয়ের বিষাদের গান ;
চাহিব না স্নেহজল প্রণয়ের কর,
দূরদেশে নিবে’ যাবে আমার পরাণ ।
কুসুম-কানন।
যে লহরী আজি বঙ্গ করিত প্লাবন,
সে লহরী দূরদেশে বহিয়ে যাইবে ;
যে বাঁশরী আজি বঙ্গ করিত মােহন,
বাজিবে সেথায় আর না হয় থামিবে।
বিলাত অপূৰ্ব্বদেশ ত্রিদিব-সমান,
বিলাত অলকাপুরী, যথা শেপী’র,
মিলতান, বায়রণ করিয়াছে গান,
বিলাত বিজ্ঞানগৰ্ব্ব, সার ধরণীর।
ভালবাসি বিলাতের কাব্য মনােহর,
ভালবাসি বিলাতের মধুর বিজ্ঞান,
ভালবাসি বিলাতের রমণীর রূপ,
ভালবাসি বিলাতের বিজ্ঞের পরাণ।
সেইখানে সুইবার্ণ, আর টেনিসন
এখনও ঝঙ্কার করি’ জগত জুড়ায় ;
আরও কত পিকবর সুমধুর স্বনে
অনন্ত বসন্ত করি’ নিত্য গান গায়।
সেইখানে সাগরের তরঙ্গের পাশে,
দাসত্ব ভুলিয়া, মুছি’ নয়ন সলিল,
বলিব করুণস্বরে হৃদয়-উচ্ছাসে,
England, with all thy faults I love thee still
কুসুম-কানন।
৮ ৫
আর কেন মিছামিছি সে সব কথায় ?
সকলে হইয়ে যাবে অভিধানাধার ;
জন্মভূমি, প্রিয়সখা, প্রাণেশ-বাসনা,
দেখিতে পাবে না আর লােচন আমার
আসি তবে, প্রিয়তম প্রাণসখাগণ,
যখন এ কাব্য’পরে নয়ন পড়িবে,
ভাবিয়ে এ অভাগার বিঘাের বিষাদ,
কাতর হৃদয়ে তব সলিল বহিবে।
নবীন বয়সে আমি বিষাদ-তাপস,
ধন বিভবের মাঝে অভাগা ভিকারী,
বিমল প্রেমের বুকে বিরাগি-হৃদয়,
বিমুখ কবিতাবনে কমলবিহারী।
আসি তবে জাতিচ্যুত, দেশনির্বাসিত,
জনমের মত আসি,—অন্তিম বিদায়।
কেন বা আসিল এই বিষাদ বরষ,
কেন বা নূতন শাস্ত্র শিখিলাম, হায় ?
যে লহরী আজি বঙ্গ করিত প্লাবন,
সে লহরী দূরদেশে যা’ রে বহিয়ে ;
যে বাঁশরী আজি বঙ্গ করিত মােহন,
বাজুক সেথায় কিম্বা থাকুক থামিয়ে ।
৮
কুসুম-কানন।
এখন নীরব হ’ল সে বীণা-ঝঙ্কার,
যে বীণার বাণী, হায়, আর না শুনিবে ;
এখন নীরব হ’ল সে গীতের রব,
যে গীতের প্রতিধ্বনি আর না বাজিৰে।
THE EMPRESS OF INDIA.
সােণার আসনে রাজরাজেশ্বরী
বসে বিক্টোরিয়া রাণী,
লর্ড বীকন্সফী সচিব প্রধান
কহে যােড় করি’ পাণি :-
“বৃটেন-ঈশ্বরি, ভারতবরষে
ভারতবাসীরা সবে,
কুমারে লইয়ে সমাদর করে’
মাতিয়াছে মহােৎসবে।
আজি ভারতের যথা শুভদিন,
সবে রাজপূজা করে,
আজি ভারতের যথা সুখদিন
রাজপুত্র-সমাদরে,
কুসুম-কানন।
আপনি তেমনই “ভারত-ঈশ্বরী
এই নব নাম ধরি,
করুন তাদের আনন্দ-বৰ্ধন,
হে ভারত-অধীশ্বরি।
ভারতের সুখে সুখ আপনার,
দুখে আপনার দুখ,
ভারতবাসীও রাজপূজাদানে
কভু নহে পরাঘুখ।
অতএব, দেবি, সুসিদ্ধ হউক
মম দীন আবেদন,
ভারত-বরষ আপনার প্রিয়
হক বিশ্বে বিজ্ঞাপন।
সােণার আসনে রাজরাজেশ্বরী
বসে’ বিক্টোরিয়া রাণী,
লর্ড বীকন্সফীল্ড সচিব প্রধানে
কহিলেন এই বাণী:-
“হইলাম প্রীত, সচিব-প্রধান,
তব এই আবেদনে,
ভারতবাসীরে অতি প্রিয়তম
জানি আমি সদা মনে।
কুসুম-কানন।
কুমার যেমন ভারতবরষে
শয়নে স্বপনে দেখে,
ভারতবরষে তেমনই সুপ্রিয়
জানিও আমার চখে।
হইলাম প্রীত, ভারতবাসীরা
যুবরাজে পূজা করে
মনের হরষে মানসে মানসে
ভকতির সমাদরে।
অতএব বলি সুসিদ্ধ হউক
তব প্রিয় আবেদন,
ভারতবরষ মম প্রিয়তম
হ'ক বিশ্বে বিজ্ঞাপন।
তড়িতে ত্বরিত চলিল সম্বাদ,
যথা বহুদিনপরে
বিদেশ-বচন মার কানে আসে
তনয় আসিছে ঘরে,
কলিকাতাপুরে, বােম্বাই নগরে,
হিমালয় গিরি’ পরে,
রাজপুতানার রাজ-বালুকায়,
কাশ্মীরের কাল-সরে।
India has been the dream of my life."
H. R, H. THE PRINCC OF WALES.
কুসুম-কানন।
তড়িতে ত্বরিত চলিল সম্বাদ,
যথা রাজপ্রতিনিধি
ভারতবরষে প্রদান করেন
সভ্যতার রাজবিধি ;
শুনিল ভারত ভূমাপ্রেমানন্দে
তাড়িতের বিবরণ,
ভারতবরষ মহারাণী-প্রিয়
হবে বিশ্বে বিজ্ঞাপন।
S
যথা করেছিল রাজসূয়-যজ্ঞ
ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির,
যথা শুনেছিল ভারত-কাহিনী
জন্মেজয় মহাবীর,
যথা পৃথ্বীরাজ সংযুগা-বদনে
দেখিত নবীন প্রভা,
যখা কবিবর বাবর দেখিত
কবিতা-কানন-শােভা,
যথা আদিধৰ্ম্ম করিত প্রচার
আকবর মহামতি,
যথা ঘুমাইত প্রিয়া মদিরায়
নুরজেহানের পতি,
কুম-কানন।
যথা শাজেহান ময়ূর আসনে
পড়িত দারার লেখা,
যথা মহারাষ্ট্র দেখেছিল দূরে
মােগলবিনাশ-রেখা,
সেইখানে আজি হ'বে প্রচারিত
তাড়িতের বিবরণ,
ভারতবরষ মহারাণী-প্রিয়
হবে বিশ্বে বিজ্ঞাপন।
কি মধুর আজি নিশীথ এখন ।
দিল্লীর গগন’পরে
অযুত উজল তারকা হইতে
অযুত কিরণ ঝরে ।
অযুত প্রদীপ উদ্ভাসিত করে
প্রাসাদের সৌধ প্রভা,
অযুত পতাকা বিকসিত করে
প্রতাপের নব শােভা।
অযুত নয়ন বিস্ফারিত হয়
অযুত নয়ন’পরে,
অযুত হৃদয় বিদাৰিত হয়
অযুত মদনশরে।
কুসুম-কানন।
অযুত সঙ্গীত গগনেতে উঠে,
অযুত বাজনা বাজে,
অযুত লহরী বিকসিত হয়
অযুত হৃদয়মাঝে।
কি মধুর আজি নিশীথ এখন!
সকলেরই মন ভাবে
রজনী প্রভাতে “ভারত-ঈশ্বরী”
বিশ্বে প্রচারিত হবে।
রজনী প্রভাত! মহা সমারােহ।
চারিদিকে কোলাহল,
দীর্ঘ রাজপথ জনে পরিপূর্ণ,
শকটিত ভূমিতল।
মনােহর যানে ধায় রাজগণ
অনুচর দলবলে,
শিরেতে কিরীট, করে রাজদণ্ড,
পৃথিবী প্রভায় জ্বলে।
কপায়ে মেদিনী উল্লাসের ভরে
দ্রুত ধায় অশ্বগণ,
কনকভূষণে হইয়ে সজ্জিত
মদমত্ত গজগণ ;
কুসুম-কানন।
কনক ভূষণে ভূষিত পতাকা
অগ্রে অনুচরে বয়,
সিন্ধিয়া, হােলকার, কাশ্মীর, নিজাম,
পরে পরে নৃপচয় ;
সকলেরই মন উল্লাসেতে পূর্ণ,
সকলেরই মন ভাবে
এখনই শুনিব ভারত ঈশ্বরী”
বিশ্বে প্রচারিত হবে।
৭
সুবৰ্ণ বেদিতে আসীন সকলে
দাড়ালেন যােকরে,
রাজপ্রতিনিধি পশিলেন যবে,
মহাসভাগৃহ’পরে।
অপরূপ সভা।—হেরি যাহে চখে
যুধিষ্ঠির শাজেহান,
সার্থক ভাবিত পৃথিবীর অর্থ,
গৌরবের অভিমান !--
তাহারই মাঝারে হীরক-আসনে
মহামতি গবর্ণর,
রাজপ্রতিনিধি কবীন্দ্র লিটন
কহিলেন ধীরস্বর ;-
কুসুম-কানন।
“ভারত-বালীরা, বিক্টোরিয়া রাণী
হইয়ে পরম প্রীত,
“ভারত-ঈশ্বরী ” ধরিলেন আখ্যা,
করি তাহা প্রচারিত ;
তােমাদের সুখে সুখ মহিষীর,
দুখেও তাহার দুখ,
তােমরাও জানি রাজপূজাদানে
কভু নহ পরাঘুখ।
সেই হেতু আমি তাহার আদেশে
করি এই প্রচারণ,
ভারতবরষ মহারাণী-প্রিয়
হক বিশ্বে বিজ্ঞাপন।”
বুম্ বুম্ ” করি নাদিল কামান,
ভারতের রাজগণ
নত করি শির আনন্দে উৎফুল্ল
করিলেন সম্মােদন।
চারি দিকে শুনি হরষের ধ্বনি,
হিমালয় গিরি’পরে,
কলিকাতাপুরে, বােম্বাই নগরে,
কাশ্মীরের কাল-সরে।
কুসুম-কানন।
আবালপ্রবীণ যুবকযুবতী
সকলেই আজি গায়,
লর্ড লিটনের যশের সুখ্যাতি
ভারত ভুবনমায়।
এইরূপে তথা রাজপ্রতিনিধি
মহামতি কবিবর
* ভারত-ঈশ্বরী ” আখ্যা প্রচারিত
করিলেন বিশ্ব’পর।
বিসর্জন।
একাকী বসিয়ে আমি জাদুবীর তীরে,
গগনে মলিনমুখে নীরদ-উদয়,
নিবিড় আঁধারে আঁখি চাহে ফিরে ফিরে,
পবনহিল্লোলে কাপে আমার হৃদয়।
মাঝে মাঝে পশ্চিমেতে চমকে বিজলী,
বিষাদ-হৃদয়ে যথা সুখের স্মরণ ;
নীরবিত চারি দিক, নভ, বনস্থলী,
বিজনে প্রকৃতি দেবী করিছে রােদন
কুসুম কানন।
কোথা সেই অপরূপ কুসুম সুবাস,
খুজিয়াছি আজনম যাহার আম্রাণ?
কোথা বা সে অপরূপ লহরী-বিলাস,
নাচিতে চেয়েছে যাহে আমার পরাণ?
৪
আছে কি গাে কোন তীর আশার সাগরে,
যাহাতে লাগিতে পারে সাধের তরণী ?
জুড়াইতে প্রেমিকের তাপিত অন্তরে
প্রেমের কাননে কোন আছে সঞ্জীবনী ?
সাধের সামগ্রী যত ছিল এ ভুবনে,
সকলে চলিয়ে গেছে সময়ের ঘরে ;
পরিশেষে-পরিশেষে কুসুম-কাননে
ভাসাইয়ে দিই আজি কালের সাগরে।
মুমূমুর শেষ অঞ ভুবনে যেমন
পৃথিবীর মায়াপদ্ম বিদলিত করে,
তুমিও তেমনই, ওহে কুসুম-কানন,
আমার হৃদয় যাও বিদলিত করে।
১৮
কুসুম কানন।
৭
এইখানে পরিহরি মৃণাল বাঁশরী,
এইখানে শেষ করি শিশুর কবিতা,
হৃদয় হইতে আজি বিসর্জন করি
চিরসহচরী মাের শৈশবের সীতা।
৮
আপনার তনয়ার করিয়া সৎকার
যথা নর ফিরে যায় গম্ভীর হৃদয়ে,
সেইরূপ ফিরে যাই, হৃদয়সম্ভার ,
কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে উঠে উচ্ছলিত হয়ে ।
ভেসে যাও তবে তুমি, কুসুম-কানন,
ভেসে যাও একেশ্বর কালের সাগরে ।
ভাসাইয়ে দিই আমি হবে কি এমন
নিবে তাে’রে কোন জন সমাদর করে ?
কোথা সেই অপরূপ কুসুম সুবাস
খুঁজিয়াছি আজনম যাহার আঘ্রাণ ?
কোথা বা সে অপরূপ লহরী-বিলাস,
নাচিতে চেয়েছে যাহে আমার পরাণ ?
কুসুম-কানন।
আছে কি গো কোন তীর আশার সাগরে,
যাহাতে লাগিতে পারে সাধের তরণী ?
জুড়াইতে প্রেমিকের তাপিত অন্তরে
প্রেমের কাননে কোন আছে সঞ্জীবনী ?
শতক। ====
'
CALCUTTA : PRINTLD AT THE NEW BENGAL PRESS. -138.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.