Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rakta-jaba

Gangopadhyay, Khirodchandra · 2010/02/9

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বক্ত-জবা
ক্ষীরােদচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, বি, এ,
বিরচিত
প্রকাশক
ভাষা-পরিষৎ লিমিটেড
পুস্তক-প্রকাশক ও বিক্রেতা
মুদ্রাযন্ত্র পরিচালক
২৯, কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা

প্রকাশ ক--
ক্ষীরােদচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, বি, এ,
২৯, কর্ণওয়ালিদ ধ্রুট, কলিকাতা।
প্রিন্টার-শ্রীশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায়
বাণী প্রেস,
১২।১, চোরবাগান লেন, কলকাতা।

উৎসর্গ
সর্বশক্তি প্রদায়িনী,
সর্বংসহা পৃথিবির প্রতিমূর্তি
অামার
এই মনুষ্য জন্মের বিধাত্রী,
जव
জন্মজন্মান্তরের অনন্ত-বন্ধন-খণ্ডন-কারিণী,
প্রেম ও ভক্তিরসের অনন্ত উৎস:স্বরূপিণী,
‘রােরের মহাগুরু
জননীর
শ্রীচরণকমলযুগলে
তার্পণ
কারাম :

No text on this page.

ভূমিকা
দ্বাদশ বৎসর পূর্বে “কর্মযােগিন্ পত্রিকায় মুখপত্রে যে
কবিতাগুলি পর পর প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহারই কতকগুলি
রক্তজবার আকারে গ্রথিত হইল।
বিগত, স্বদেশী আন্দোলনের শেষ মুহূর্তে, এই কবিতাগুলি
নিৰ্বাণােখ আগ্নেয়গিরির অনলােচ্ছাসের ন্যায় বিনির্গত
হইয়াছিল। অবার এই মৃতকল্প জাতির প্রাণে যে অভিনব
স্পন্দনের লক্ষণ সূচিত হইয়াছে, উহা সেই বিলুপ্ত শক্তিরই
রূপান্তর মাত্র। এই শক্তি-ভগবতী, অপরাজিত। অগ্নি-
সংযােগে অঙ্গার যেমন মলিনত্ব পরিহার করে, এই ঐশীশক্তির
সংযােগে জড় জীবদেহও চৈতন্য প্রভায় সেইরূপ দীপ্তি পাইতে
থাকে। আবার এই জড়কল্প জাতির সেই অগ্নিসংস্কার
আরম্ভ হইয়াছে। ইন্ধনে প্রবেশপূৰ্ব্বক অগ্নি যেমন উহার যত
অসারত্ব ভস্মীভূত করিয়া, শুধু শক্তিটুকু লইয়া অসীমে বিলীন হয়,
সেইরূপ এই ভগবতী শক্তিও, এই বিশাল জনসংঘের সমস্ত
অসারত্ব ভস্ম করিয়া দিয়া, শুধু সারটুকু লইয়া অমৃতত্ত্বে প্রয়াণ
করিবে। অলমতিবিরেণ—
গ্রন্থকার

No text on this page.

সূচী
পৃষ্ঠা
১
। । ।
বিষয়
আবাহন
যদি তুমি ফিরে আস মা
স্বাধীনতা
অশােকবনে সীতা
জয় মা জনমভূমি
কুৰ্ম্মযােগির গান
। । ।
৮
ও এ
মাতৃভাষ।
০ ০ ০
৪১
ব্রাহ্মণ
কলির ব্রাহ্মণ
প্রত্যুত্তর
শ্রীরামচন্দ্রের বােধন
বৃহন্নলা
বিজয়া
প্রভাত ভৈরবী
কুরুক্ষেত্রে অর্জুনেব বিষাদ
৪৫
১

পৃষ্ট।
বিষয়
দ্রোণাচাৰ্য্য
.
অপেক্ষা
লক্ষণের শক্তিশে,
গায়ত্রীর অন্তর্দান
প্রতিধ্বনি
প্রস্তরময় ভগ্ন বাসুদেব মৃতিদর্শনে
১৪
রামনাম
অপরেঙ্গানুভূতি
দৈত্যকুলে' প্রহলাদ
৯
১২
। ৩
. . .
দ্বৈতবনে পাণ্ডব
১১০
মৃত্যুভয়
আকাশ
মৃক

ৰক্ত-জন্য- অাবাহন স্বর্ণ-সিংহাসন শূন্য করি ভারতী ভারত ছাড়ি গিয়াছে চলিয়া। কোটী কণ্ঠ মিলি ডাকি 'রে, আনি ফিরাইয়া। এস, ; এ তঁাহার প্রিয় জন্মভূমি, এ সাম্রাজ্যে তিনি মহারাণী ; আজি তঁাহারি ভারভ তারে দিব ফিরাইয়া।

এস, মা, ভারতেশ্বরি,
“সগাে, স্বদেশে ফিরি,
এসগাে, এসগাে, ফিরি ;
আজি ব্যাকুল ভারত পুনঃ
তােমারি লাগিয়া ।
এইটা এবং পরবর্তী কবিতাটী—১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দে হাজারিবাগ কলেজে
অধ্যয়ন কালে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে রচিত ও গীত হইয়াছিল ।
২

“যদি তুমি ফিরে আস মা”
আগেরি মতন
সকলি রয়েছে,
শুধু তুমি হেথা
নাই মা !
হিমাদ্রি অচল
রয়েছে পড়িয়া,
ঐ বিন্ধ্যাচল
পড়েছে ঢলিয়া,
শত বিপাশা,
সিন্ধু ভাগিরথী,
সকলি তােমারে
ডাকে মা।

শতকোটী পুনঃ
ভারত সন্তান,
আধেক পরাণ,
আধ আধ জ্ঞান,
লুপ্ত নহে শক্তি
সুপ্ত হয়ে আছে ;
তুমি ফিরে এলে
জাগিবে তারা।
ওঙ্কার ঝঙ্কারি
উঠিবে অম্বরে,
জাগিবে ব্রাহ্মণ
সে গম্ভীর স্বরে ;
৪

রক্ত-জবা ছুটীবে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য দলে দলে, ছাইবে মেদিনী ভূজবীৰ্য্য বলে, রণ-পণ্য-পােত কত শত শত, নাচিবে সাগর বক্ষে লয়ে কত! বানিজ্য-সম্ভার- ভরা ভূমণ্ডলে ভারতের জয় গাহিবে সকলে ;

সুমেরু, কুমেরু,
কান্তারে পাথারে,
বিজয় পতাকা
হিমাদ্রি শিখরে
উড়িবে গৌরবে
প্রতি সৌধ শিরে,-
হইবে সিঞ্চিত
বক্ষের রুধিরে,
করিবে সজীব
বিলুপ্ত গরিমা !
জাগিবে, জাগিবে,
ভারত জাগিবে,
জ্ঞান বিজ্ঞানের
আলােক প্রভাবে

আঁধার ভারত
আবারাে হাসিবে
যদি তুমি ফিরে
আস মা ।
লহ করে তুলি
সেই রুদ্ৰ বীণা,
করি
এ মােহ মুঞ্ছনা,
দেহ দূর
চেতাও পরাণ।
অমৃত সিঞ্চনে,
মুছিয়ে ফেল, মা,
মুখের কালিমা।
২০১৬ সালে এই আষণ কষােগি পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত।
৭

রক্তজবা
স্বাধীনতা
আমি স্বাধীনতা
দেবের দুলভ,
মানবের তাহে
শুধু অধিকার ;
আমি, মহাশক্তি,
আমি ভক্তি, মুক্তি,
ভক্তের হৃদয়ে
বসতি আমার।

রক্তজবা
উদার অসীম
অনন্ত অধরে,
সুনীলে শ্যামলে
কান্তারে পাথারে,
নিত্য বিরাজিত
মুরতি আমার ।
যদি ভালবেসে,
কেহ কাছে আসে,
দেখাই তাহারে
সে রূপ আমার।
দরশে পরশে
কাটে মােহ-পাশ,
কে দেখিবি তাের
আয়, আয়, আয় ।

কভু মৃত্যুমুখে
নৃত্য করি রঙ্গে,
প্রচণ্ড মার্কণ্ডে
কভু শৈল শৃঙ্গে,
বায়ু উপাত,
বঞ্জ শিখা ধরে
অশনির মুখে
ছাড়ি হুহুঙ্কার
অত্যাচার অবিচার,
আমি রে সকল,
অচল অটল
আমি হিমাচল,
১০

ভক্তের হৃদয়ে
মৌনী হয়ে রই,
কভু সিংহ-নাদে
মেদিনী কঁপাই,
রক্ত-গঙ্গা মাঝে
কভু করি গান,
কঙ্কাল মালিনী
কভু মাের নাম ;
আমি মহাশক্তি,
আমি ভুক্তি মুক্তি
জীবন মরণ
সকলই আমার।
১৪ই এাবণ, ১৩১৬

অশোক বনে সীতা
( হনুমানের সীতা-সন্দর্শন )
দেখিলাম, মা আমার
বৃক্ষমূলে
নিরানন্দা
বিরস বদন।
দুরন্ত চেড়ীরা ঘেরি
করে নির্যাতন।
১২

উপবাস-কৃশা মৌনী
একবেণী তপস্বিনী
ধুলায় ধূসর অঙ্গ
ব্রহ্মাণ্ডে বিলীন
কি ব্ৰত ধরেছ, মাগাে,
করিতে লঙ্কার নাশ,
দারুণ প্রয়াস হেরি
সুরাসুর প্রায় ত্রাস।
ভাবি ভাবী লােকক্ষয়,
ধরিত্রী ব্যথিত হয়,
বিষন্ন মলিন।
১৩

রক্তজবা
ক্ষীণ চন্দ্রলেখা পারা,
মলিন বসন পরা,
ছায়ে ঢাকা প্রলয়ের
যেন রে আগুন।
নাশিতে রাক্ষস পুরী,
যৈন শম্ভু ত্রিপুরারী,
মহাক্রোধে কালনেত্রে
করিছে ঈক্ষণ।
মুহুর্মুহু দীর্ঘশ্বাস,
মুহুর্মুহু হা হুতাশ
যেন রে প্রলয়ােচ্ছ্বাস
‘হা, রাম লক্ষণ’ বলি
করিছে গর্জন ;
১০

|
যেন মণি হারা ফনী
যেন কাল ভুজঙ্গিনী
কভু গর্জে কভু তর্জে
কভু ক্রোধে বসুন্ধরা
করে রে দংশন।
দুষ্ট রক্ষকারাগারে
বাঁধিয়া রেখেছে তারে,
দুরন্ত চেড়ীরা মিলি
করে নিপীড়ন।
ভীতা কুরঙ্গিণী প্রায়,
সভয়ে চকিতে চায়,
প্রিয়জন কে কোথায়
কারে না দেখিতে পায়
দেখে শুধু, চারি ভিতে,
বিকট দশন ।

রক্ত-জবা
মুচ্ছিত হইয়া পড়ে,
যেন চন্দ্রলেখা ভূমে,
‘হা, রাম লক্ষ্মণ’ কোথা
রহিলে এখন?
হায় রে, জগত লক্ষ্মী
ভাসে দুঃখে রক্ষপুরে।
গলে রে, ব্রহ্মাণ্ড গলে
শুনি সে ক্রন্দন!
হেরিয়া মায়ের দুঃখ
রামভক্ত গলে যায়,
নীরবে বৃক্ষের পরে
করে রে ক্রন্দন।
২১, শ্রাবণ, ১৩১৩

জয় মা জনমভুমি”
দেবতা তােমার করে জয় গান,
জয়, জয়, জয়, জয় আমার,
জয় মা জনমভূমি।
অমর-কণ্ঠে উঠিছে ঝঙ্কার,
ত্রিভুবন গায় মহিমা তােমার,
জয়, জয়, জয়, জয় আমার,
জয় মা জনম ভূমি।
রবি শশী গলে দোলে রত্ন-হার,
মন্দাকিনী ঢালে করুণা অপার,
ফল-পুষ্প যা’র সুধার আধার,
১৭

গন্ধ-বহ বহে নন্দন-মন্দার,
সে ভারত ভূমে জনম আমার,
জয় মা জনমভূমি।
০
কোট কোটী কণ্ঠে উঠিছে ঝঙ্কার,
রবি শশী করে আরতি তােমার,
জাগাে মা, জাগাে মা, জাগাে মা আমার,
জাগাে মা জনম ভূমি।
রূপচ্ছটা যা’র কোটা সুৰ্য্য জিনি’
চন্দ্রমা জিনিয়া অঙ্গের লাবনি ;-
অট্ট অট্ট হাস, দিগম্বর বাস,
জয় মা জনমভূমি !
১৮

কভু উলঙ্গিনীমুণ্ডমালিনী,
রাজরাজেশ্বরী, কভু কাঙ্গালিনী,
কভু রণবেশে নৃত্য কর রঙ্গে,
কভু বা শ্মশানে ভূতগণ সঙ্গে,
এ কি খেলা তাের, জননি আমার,
জয় মা জনম ভূমি !
কভু যােগনিদ্রা অনন্তশয়নে,
কখন মগন কপট স্বপনে,
কি কপট ঘাের ভাঙ্গে নাকি তাের—
জাগাে মা জনম ভূমি।
২৮, প্রাবণ, ১৩১৬
১৯

কৰােগির গান
ভারত ভূমি
মাের জন্মভূমি
এ যে, ভােগ-ভূমি নয়,
মহা কৰ্ম্মভূমি।
মােক-ফল হেথা
কৰ্ম্ম-বৃক্ষে ফলে,
ধৰ্ম্ম অর্থ কাম
চতুৰ্ব্বর্গ মিলে;
২৫

সামান্য এ দেশ
.
নয় রে কখন,
দেবের দুর্লভ
মাের জন্মভূমি।
ভারতের এই
চন্দ্রাতপ তুলে
কত কৰ্ম্ম-যােগী
এসে কুতুহলে,
করেছে সংগ্রাম !
কত হরি নাম
করেছে প্রচার !
সেই জন্মভূমি
২১

রক্তজবা
ভারত আমার,
এখনাে বক্ষেতে
সাধু-পদ রেণু
করে রে ধারণ।
কত কোটী কণ্ঠে
‘জয় সীতারাম’
কত কোটা কষ্টে
উঠে হরিনাম
;
কত কোটা প্রাণ
চাহি ভগবান,
অন্নভাবে হায়,
ত্যজে রে পরাণ!

ভিখারী আসিয়া
মুষ্টি ভিক্ষা তরে,
‘ভিক্ষাদাও’ বলি’
ডাকিছে দুয়ারে ;
সুমধুর সুরে
গাহি হরি নাম,
দ্বারে দ্বারে ঘুরি
শিখায় নিষ্কাম,
সে যে অন্য দেশে নয়,
এই দেশে হয়,
এ যে রে করমভুমি ।

রক্ত-জবা
কে বলিতে পার,-
বল রে কোথায়,
গৃহস্থ বালিকা
দ্বারে ছটে যায়
‘ভিক্ষা লও বলি’
ডাকিছে সাদরে,
মিষ্ট ভাষে তুষ্ট
করে দেবতায়
শৈশব হইতে
ত্যাগ ভাণ্ড হাতে
জননীর সাথে
শিখে কৰ্ম্মযােগ।

রক্তজবা
সে যে, অন্য দেশে নয়-
শুধু এই দেশে হয় ?
তা’রা হত সবে-
বীর প্রসবিণী।
এ ভারত ভূমি
মাের জন্মভূমি
অমৃতের দ্বার
জননী আমার ।
১৩১৬
২৫

মাতৃভাষা
যারা মা স্বাধীন, তাদের মন্দিরে,
চির দিন ওগাে বসতি তোমার।
ব্ৰহ্মময়ী বাণি, জগত জননি,
তুমি স্বাধীনতা, জননী আমার ।
মানবের কণ্ঠে ভাষা হয়ে ফুট,
কৃপাণের মুখে ঝনঝনি’ উঠ,
কভু রণক্ষেত্রে ছাড় হুহুঙ্কার,
মুক্তির বারতা করহ প্রচার,

মেঘের মাঝারে বিজলী উছলে,-
বজর-গম্ভীর নিনাদ তােমার।
মােরা পরাধীন, হারয়েছি হায়,
হায়, জননি গাে সেই অধিকার।
ভাঙ্গিয়া গিয়াছে মন্দির দুয়ার,
ধূলায় লুটায় মুরুতি তােমার,
অনাৰ্য্য অস্ফুট শব্দ স্পর্শে আজ,
হয়েছে দূষিত কণ্ঠ সবাকার ।
বিলীন হইল কণ্ঠে বেদ গান,
ভুলিল ব্রাহ্মণ সে মধুর তান,
ব্ৰহ্ম বীৰ্য্য তেজ হ’ল অবসান,
পিশাচ পেচক করিছে চীৎকার।
২৭

স্বর্ণ সিংহাসন শূন্য পড়ে আছে, ধূপ দীপ শিখা নিভিয়া গিয়াছে, বিজয় শঙ্খ হয়েছে নীরব- হয়েছে আঁধার মন্দির তােমার। মুক্তিময়ী বাণি বিশ্বের জননি, জাগাে, জাগাে, কণ্ঠে জাগগা মা আমার। ১১, ভাদ্র, ১৩১৬ ২৮

|
ব্রাহ্মণ
;
জীর্ণ শীর্ণ জ্যোতির্ময় দেহে
শুভ্র উপবীত ; অর্ধ শূন্যে
অর্থ অঙ্গ গঙ্গাজলে তার।
মনে মনে জপিছে প্রণব ;-
ব্রহ্মাণ্ডের অন্তরালে যেন
ওঙ্কার ঝকারি উঠে।
দশবার জপিয়া প্রণব
দিলা বিসর্জন গঙ্গাজলে।
২৯

রক্ত-দবা
প্রলয়পয়ােধি মাঝে যেন
বিলীন হইল চতুর্বেদ,
উঠি তবে জাহ্নবির কুলে,
দেখিলা পলকে দ্বিজবর,
মেঘমুক্ত শারদ অম্বরে
দিবাকর উজ্জল ভাস্বর ।
তেজোরাশি নাচিছে হিল্লোলে,
অনন্ত হিল্লোলে যেন তার
জাতি ধর্ম সব ভেসে যায়।
কালের অনন্ত-গর্ভে, হায়,
হায়, ভুবেরে, ডুবেরে, ওই
স্বর্ণময়ী বঙ্গের প্রতিমা।

ডুবে জ্ঞান, ডুবে ভক্তি, বুঝি
বাঙ্গালীর সব ডুবে যায়।
দেখিতে দেখিতে উঠে ভাসি
দূর চক্ৰবালে, নীলিমার
সম্মিলন স্থলে, দীপ্তিময়ী
জননী আমার, প্রণবের
প্রতিমূর্তি, গায়ত্রী ভাস্বরী
স্বর্ণ সিংহাসন শূন্য করি,
মৃন্ময়ী জননী যেন মাের,
বিজয়ার শেষােৎসব দিনে,
বাঙ্গালীর আঁখি ভরা জলে,
হেলিয়া দুলিয়া ভেসে যায়,

রক্ত-জবা
কোটী কণ্ঠে উঠে, হায়, হায় !
বিশ্বের সে হাহকারে পুন,
ধ্যানস্থ হইলা দ্বিজবর ।
ব্ৰহ্মাণ্ড বিদারি’ গরজিয়-
:
উঠিল ওঙ্কার। মন্ত্রমুগ্ধ
হইল ব্রাহ্মণ সেই স্বরে
স্থিরনেভে করিলা ঈক্ষণ,
অপার অসীমশূন্য পথে,
নীলিমার যবনিকা করি,
অন্তরাল, বিরাট পুরুষ
এক, বাহিরিলা হাতে অসি,
খল খল হাসি,-কোটী কোটা

রক্ত-জবা
চন্দ্রসূৰ্য্য করিছে উদগার,
মরি, কিবা সে হাসির ছটা !
কেটে গেল কাল ঘনঘটা,
দশদিক উঠিল হাসিয়া ;
দেবতা গন্ধর্ব সিদ্ধ সবে
করে স্তব, গায় জয় গান ;
করে স্তব দেবী বসুন্ধরা ;
বেদগান উঠে বিশ্বময় ;
নতজানু ব্রাহ্মণ যুবক
ইষ্টদেবে করিলা প্রণাম।
২৫, ভাদ্র, ১৩১৬

কলির ব্রাহ্মণ
রে দাসত্ব-খর্বকায়, রে কৰ্ম্ম-চণ্ডাল!
আমার অদৃষ্টলিপি; ঘাের কর্মফল,
শবৃত্তি বলিয়া তােরে লােকে করে ঘৃণা,
বেদশা পুরাণেতে তাের নিন্দাবাদ ।
কুৎসিত কর্কশ দেহ পরশে আমার,
মলিন হইল অঙ্গ দিন দিন ক্ষীণ,
সর্বনাশ,জাতিধর্ম সব মাের গেল ।
কৃষ্ণকায় কুরমতি রে দুষ্ট চণ্ডাল !
৩৪

লােহার শৃঙ্খল পরি’ ভ্রম ভূমণ্ডল,
পশু পক্ষী কীট কি মানব,-অবিচারে-
সবার গলায় পরাইয়া দেও, ওই,
আয়সের হার, কঠিন বন্ধনে বাঁধে।
অত্যাচার অবিচার দুটী দ্রুতপদে
অবহেলে দলি’ যাওদুর্বলের হিয়া !
অকাল বার্ধক্য আর জরা মৃত্যু ব্যাধি
ঝাবাতে ধূলি সম চৌদিকে ছড়াও।
দুর্ভিক্ষ পিশাচ তাের সাথে সাথে নাচে ;
‘হা অল্প, হা অনু’ রবে করিয়া চীৎকার।
জন্মায় বিলােক-ত্রাস, ঘাের বিভীষিকা।
কোন কর্মদোষে, বল, দুগ্রহ প্রায়,
ভাগ্যাকাশে আসি মাের হলি রে উদয় ।

রক্ত-জবা
কোন পাপে, হায়, মাগাে জন্মভূমি মাের,
জন্মমাত্র দেখিলাম, হস্তপদগলে,
হায়, পড়েছে শৃঙ্খল, কঠিন বন্ধন।
দুৰ্ব্বহ জীবন-ভার করিরে বহন।
কি কৰ্ম্ম-বন্ধন হায় ! ওহে নারায়ণ,
আমি কি মানুষ নই ? ভারতবরষে
জনমিলে কিগো, মানুষের অধিকার
মানুষে কাড়িয়া লয়? ধিক সেই দেশ ?
?
সেথা জনম-মরণ সকলই পাপ।
কোন কর্মফলে আমি বহিরে শৃঙ্খল ?
কোন কৰ্ম্মফলে আমি পশুর সমান।
কোন কৰ্ম্মফলে আমি কলির ব্রাহ্মণ ?
৮ আশ্বিন, ১৩১৬

রক্ত প্রত্যুত্তর হে কৰ্ম্মযােগি, আমি, শুনিয়াছি ওগাে, তােমার আহ্বান। তুমি বল ভাই, সবাই মানুষ, সবাই সমান সবারি হৃদয়ে এক নারায়ণ বল, কেন তবে আজ অৰ্ব্বদ মানব- শত পদাঘাতে হয় না চেতন ? ৩৭

রক্ত-বা
যারা বুঝিতে পারে না,
বাঁচে, কিম্বা মরে,
জাতি-ধর্ম নিয়ে
মরে ধীরে ধীরে ;
যারা জীবনের মায়া
ছাড়িতে পারে না,
বীরের মতন
মরিতে জানে না ;
অন্তিমে তাদের
কিবা হবে গতি
তারা কিগাে কভু
পায় নারায়ণ?
৪c

রওযা
শ্রীরামচন্দ্রের বােধন
জাগিবে না যদি,
জন আমার,
আন ধনুর্বাণ ।
হৃৎপিণ্ড উপাড়ি
খর শরাঘাতে,
রাখিব রে আজ
মায়ের সম্মান।
৪১

হৃদয়-রুধিরে
পুজিব চরণ,
পায়ে ডালি দিব
কমল নয়ন।
অকালে মায়েরে
জাগিতে হইবে,
রামচন্দ্র আজ
করে রে বােধন
কে বলে অকাল
মায়ের পূজার,
চির কাল জেগে
আছে মা আমার।
৪২

রক্ত-জবা
সন্তান হইয়া
মায়ে পাসরিলে,
মেহের যে রীতি
সকলি ভূলিলে
কি হইবে, বল,
মায়েরে দূষিলে,
পাষাণের মেয়ে
নয় রে পাষাণ
অকাল বলিয়া
আর কত কাল,
ভুলাবে বিধাতা
অভাগারে আর ;
৪৩

মায়েরে ডাকিবে
সন্তান তাহার,
তার কিগাে কভু
আছে কালাকাল ?
আর না হনু রে,
দিন চলে যায়,
দেবতার ফঁাকি
বুঝে উঠা দায় ;
সময়ের আশে
বসিয়া থাকিলে,
হবে না অভাগী
সীতার উদ্ধার ।
২৯, আশ্বিন, ১৩১৬
৪৪

রক্ত-জব
সম্মুখে যাহার কুরুক্ষেত্র ঘাের,
তা’র কিগাে সাজে ললনার সাজে,
অন্তঃপুর মাঝে, কুলবালা সাথে,
দিবানিশি হাস্যরস-নৃত্য-গীত?
দুর্জয় গাণ্ডীব টঙ্কারে যাহার,
সুরাসুর ভয়ে ভাবে চমৎকার ;
করিয়াছে যেই জন এক রথে
ত্রিভুবন জয়, তুমি কিগাে সেই,
ধনঞ্জয় ?
৪৫

রক্ত-জবা
কিরীট-গাণ্ডীব ফেলি,
পরেছ কেয়ুর, দীর্ঘ বেণী শিরে-
লম্বমান। শঙ্খে ঢাকিয়াছ হস্ত
শিঞ্জিণী-লাঞ্ছিত বীর-অভিজ্ঞান।
বাহু যুদ্ধে তুমি নাকি এক দিন
পরাভবি দুর্জয় কিরাতে কভু,
লভেছিলে পশুপত মহাঅস্ত্র ?
কোথা সে বিক্রম হল অন্তর্ধান ?
বল, কোন উচ্চ শমীবৃক্ষ চুড়ে,
রেখেছ লুকায়ে
বীৰ্য-বহ্নি তব ?
শমীগর্ভ করিয়া বিদার কবে
ছুটিবে প্রলয়-শিখা-দাবানল
করিতে কৌরবকুল ভস্মসাৎ।

রক্ত-জবা • নিবাত-কবচে বধি অমরায়, লভেছিলে ইন্দ্রের-কিরীট উর্বশীর বৃথা গৰ্ব খর্ব করি, অভিশপ্ত হলে হে ব্রহ্মচারি। সেই শাপে সাজিয়াছ ক্লীব, ভস্মে ঢাকিয়াছ ভীষণ অনল । চক্ষের উপরে, বিরাটের পুরে, সহিতেছ কত শত অপমান! দেখিয়া দেখ না তাহা ; অবনত করি শির, মন্ত্রৌষধি-রুদ্ধবীৰ্য্য- আশীবিষ প্রায়, আছ যেন কার প্রতীক্ষায় ? কখন বাজিবে শঙ্খ, শুভলগ্নে মুক্ত হবে অভিশাপ ? ৭

এক দুই তিন, গণিতেছ দিন,
ধৈৰ্য্য না ফুরায় তবু ! কতকাল
আর হীনজনােচিত আচরণ,
হাস্য-রস-গীতে কতকাল আর,
পররঞ্জন অঞ্জন কালিমায়,
ঢাকিয়া রাখিবে তব চন্দ্রমুখ ।
কি আত্মগােপন ! কিবা সহিষ্ণুতা
কি জীবত্ব আজ, অয়ি বৃহলে ?
যেন ঝটিকার
তুমুল প্রাক্কালে
রুদ্ধশ্বাস মরুতের প্রায়, ওই
রক্তসন্ধ্যা প্রকৃতির নির্নিমেষ
আঁখি, হের ব্রহ্মাণ্ড উজলি জ্বলে

রক্ত-বা
তেমতি কি পঞ্চভ্রাতা, স্থির
করিছ ঈক্ষণ রাজ্য ধন মান,
দুৰ্য্যোধন দুষ্টগ্ৰহ সমাকুল ?
দুস্তর সংগ্রাম সিন্ধু, মরণের
ছবি, মহােল্লাসে হইছে উধাও।
হা অদৃষ্ট ! রাজার নন্দন যারা,
বিক্রমে যাদের সুরাসুর কাপে ;
অবহেলে যারা ইন্দ্রের অমরা
কেড়ে নিতে পারে ; বঁধা তারা আজ,
দাসত্বশৃঙ্খলে, বিরাটের
পুরে !
‘ধর্ম ধৰ্ম্ম করে আপনার ন্যায্য
অধিকার, সর্বস্ব করিয়া ত্যাগ
৪১

রক্ত-জবা
সেজেছে ভিক্ষুক, ওহে নারায়ণ ।
লােকে বলে, তুমি না তাদের সখা ?
“এই কিগাে বটে তার পরিচয় ?
“যতাে-ধৰ্ম্ম-তত জয়” এই কিগাে-
তার পরিণাম ? কোন্ ধৰ্ম্মরাজ্য
তুমি করিবে উদ্ধার, রণরক্ত
মহােদধি মথি ? হে অন্তর্যামিন,
পার নাকি ফিরাইতে দুষ্টমতি
ক্রুর দুর্যোধনে
শুভবুদ্ধি দানে,
প্রত্যপিতে পিতৃরাজ্য পাণ্ডবেরে ?
বিনা রক্তপাতে, প্রভাে, পার নাকি,
কভু ধৰ্ম্মরাজ্য করিতে স্থাপন ?
২৯শে আশ্বিশ, ১৩১৬

রক্তজবা
বিজয়া
কিসের বিজয়া, .
কি করেছ জয় ?
কিসের উল্লাস,
কিসের হুঙ্কার ?
গগন বিদারি
পটহ গরজে,
প্রতি কণ্ঠে উঠে
৩
‘জয়-জয়কার,

কেন রে আনন্দে
ভাসিস বাঙ্গালি ?
করিলে কি কবে,
কিসের উদ্ধার ?
হাসিস্ নে বাঙ্গালি
হাসিসনে রে আর,
ডুবাইয়া জলে
জননী আমার ।
দু’দিনের খেলা,
দু’দিন খেলিয়া,
পুতুলের ডালি
দিয়া বিসর্জন ;

পুতুল নহেরে
বাংলার মাটী-
প্রিয় জন্মভূমি
জননী আমার
এ কেমন রীতি,
কেমন পূজন ?
মহাশক্তি যদি
দিলে বিসর্জন,
কা’র শক্তি বলে,
এই ভূমণ্ডলে,
হইবে মানুষ,
ধরিবে জীবন ?

রক্তজবা
আয় রে বাঙ্গালি,
আয়, আয়, আয়,
কোটী ভূজে পুনঃ
তুলে
আনি মায়;
আমার পূজায়
নাহি বিসর্জন,
প্রাণ-ভরা শুধু
আছে আবাহন ;
জীবন মরণ
সকলি সমান,
মরণের খেলা
বিজয়া আমার
৫৪

রক্ত-জবা
প্রভাত ভৈরবী
দেখা দিয়ে কেন, নাথ,
লুকালে আবার ?
এ নিশীথে কেন এসে,
জাগালে আমায় ?
এখনাে আঁধার
কাটে নাই ঘাের,
এখনাে জনতা
সুষুপ্তি-বিভাের,

রক্ত বা
এ দুর্গম পথে
আঁধার জগতে
কেন লুকাইলে
আলােক তােমার?
প্রভাত গগনে,
ফুটে নাই তারা,
ডাকে নাই পাখী,
দেয় নাই সাড়া,
আঁখি মেলি মেলি
পড়ে ঢলি ঢলি,
কেন এ নিশীথে
হৃদয়ে আমার ?

কেন এসেছিলে,
কেন লুকাইলে,
সরল হৃদয়ে,
কেন বা ছলিলে,
এ অব মিলন,
এ সুখ স্বপন,
পুনঃ কিগাে হবে
জীবনে আমার ?
২৬, কার্তিক, ১৩১৬

কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের বিষাদ
ধৰ্ম্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে
অবতীর্ণ নর-নারায়ণ ।
করে অসি, ভীম শরাসন,
পৃষ্ঠে তুণ অক্ষয় অব্যয়।
খর অসিধারে ধর্মরাজ্য,
হৃদে কৃষ্ণনাম অবিরাম।
শিরে শােভে ভক্তিরকেতন,
রাম-ভক্ত বীর হনুমান।

রক্তজবা
ভক্ত-রথী মায়া তুরঙ্গম,
অচ্যুত সারথি রথে তার
মৃত্যুমুখে, আগে নারায়ণ ।
নিরাশী নির্ভীক বীরবর
দেখিল সম্মুখে আৰ্য-কীর্তি,
আৰ্য গৌরবের সুবিস্তীর্ণ
কুরুক্ষেত্র ভীষণ শ্মশান,
তাহে প্রাণ দিতে বিসর্জন
সমবেত বান্ধব সকল।
জাতি নাশ ধৰ্মনাশ ভয়ে
শিহরি উঠিল ধনঞ্জয়,
কহিল কৃষ্ণেরে ডাকি ;
৯

রজবা
একি খেলা, ওহে নারায়ণ,
জীবনের সারথি আমার,
কেন মােরে আনিলে হেথায় ?
কি ভীষণ সংগ্রাম পাথার।
উপকূলে তার, কেন সখে,
আনিলে আমায় ? অধিকার
কি আমার, কেবা দিল--বরিবারে
লােক হত্যা মহা ভয়ানক ?
জ্ঞাতি বন্ধু করিয়া বিনাশ
বল, কোন ধর্ম-রাজ্য, কৃষ্ণ,
লভিবে পাণ্ডব ?—চাইনা
বিজয়, কৃষ্ণ, রাজ্য সুখ মান
৬

কোটা নরহত্যা করি, হবে
রাজ্য-লাভ! তুচ্ছ এ প্রয়াস !
কোটী প্রাণ দিবে বিসর্জন
ভীষণ আহবে, শূন্য হবে
p
বসুন্ধরা ; ঘাের অরণ্যাণী
গ্রাসিবে ভারত; লুপ্ত হবে
ক্ষত্রিয়ের নাম ; বল, হেন
রাজ্যলাভে কি আত্ম-প্ৰসাদ ?
হে মাধব! হেন কৰ্ম্ম ঘােরে
কেন মােরে করেছ নিয়োেগ ?
সেই সাধে কি গাে জনার্দন,
আপনি আসিলে অবতরি?
১১

রক্তজবা হে মায়া-মানুষ বেশি, পার্থের সারথি হয়ে আজ, ক্ষত্রিয়-রুধির বিনিময়ে, ‘শান্তি, শান্তি’, বলে কুরুক্ষেত্র- মহাযজ্ঞে দিতে পূর্ণাহুতি ! ৩, অগ্রহায়ণ, ১৩১৬

র
দ্রোণাচাৰ্য
কি উদ্দেশ্যে, বলহে ব্রাক্ষণ,
নিভাইলে হােন বহ্নিশিখা,
স্তব্ধ শূন্যে স্বধা বষট্‌কার ?
ববদমন্ত্র দিয়া বিসর্জন
বীরবেশে ব্রাহ্মণ নন্দন
অবতীর্ণ
কুরুক্ষেত্রে আজ ?
শুভ্রবেশ, শুভ্রকেশ, শিরে ।
বৰ্মে চৰ্ম্মে ঢাকি উপবীত,

করে ধরি’ অসি খরধার, উত্তাসম, আমিলে যেন কুরুকুল ! ক্ষত্রিয় নিবহ নাশে, যুগশেযে মুহুর্মুহু পড়ে যেন ভীষণ কুঠার। কোথা কোশাকুশী গঙ্গাজল- অস্ত্রমুখে উগরে অনল? যুগধৰ্ম্ম-মহারণােন্মাদ। ব্রাহ্মণ্যের নাশ, জাতি, ধর্ম, ভক্তি, মুক্তি, সব লুপ্ত প্রায়, এই কি আপদ, ধৰ্ম্ম গুরাে, অরিরক্তে ব্যাহতির হােম। ১৩, অগ্রহায়ণ, ১৩১৬

'সারাটী রজনী
রয়েছি জাগিয়া
চাহিয়া রয়েছি
তােমারি পানে।
কবে বা হাসিবে,
প্রভাত গগনে
ভাসিবে ধরণী
তােমার কিরণে।

তােমার করুণা
আঁধার টুটিয়া
কবে বা হৃদয়ে
উঠিবে ফুটিয়া।
হাসিবে আকাশ
তােমারে পাইয়া,
ভাসিবে বাতাস
নূতন আনে।
গাহিবে বিহগ
প্রভাত সমীরে,
অমনি ধাইব
সেই পথ ধরে,

দেখিব তােমারে
দাড়ায়ে দুয়ারে
হাসি খল খল,
আঁখি ছল ছল,
ভাবে ঢল ঢল
আমারি তরে।
কবে বা এ নিশি
হবে অবসান,
তােমারে নেহারি
জুড়াইব প্রাণ,
আনন্দে উছলি,
পরাণ আমার,

রক্ত-জব
মিশে যাবে কবে
পরাণে তােমার,
আনন্দ সাগরে
দিব গাে সাঁতার
তুমি আমি মিশে
হব একাকার !
১৭, অগ্রহায়ণ, ১৩১৬

রক্ত-বা
লক্ষ্মণের শক্তিশেল
নিম্নে সিন্ধু করিছে গর্জন,
উর্ধে শেল ছুটিল গর্জিয়া,
পৌলত্যের ক্ষিপ্র হস্ত হতে;
যেন সৃষ্টি করিতে বিনাশ
সহস্র সহস্ৰ উকারাশি
উগারছে ঘাের কালানল ।
তেমতি ছুটীল দৈত্যশেল
মহাশূন্য পথে অকস্মাৎ

রক্তজবা
দীপ্ত করি গগন মণ্ডল।
চন্দ্র-সূর্য নক্ষত্র সকল
অদৃশ্য হইল মহাত্রাসে ;
দেবগণ ভয়ে শশঙ্কিত;
শশব্যস্ত বানর কটক,
চতুর্দিকে উঠে হাহাকার
দূরে বিভীষণ দাঁড়াইয়া
গণিল প্রমাদ ; দেখাইলা
••
রামেরে অজুলি সঙ্কেতে,
ঐ দেখ, ওহে নারায়ণ,
ব্যোমগর্ভ করিয়া বিদার
অব্যর্থ দৈত্যের শক্তি পায়
লক্ষ্মণেরে করিতে বিনাশ।
৭০

রক্ষা কর, রক্ষা কর, প্রভাে,
রক্ষা কর, অনুজ লক্ষ্মণে।
দেখিতে দেখিতে আচম্বিতে
*
সম্মুখে গড়িল দৈত্যশেল,-
লক্ষ্মণের বক্ষস্থলে হায়
বাজিল বিষম! দীৰ্ণ হল
কুসুম কোমল হিয়া তাহে,
জ্ঞান-শূন্য লক্ষ্মণ ঠাকুর
ভূতলে পড়িল তৎক্ষণাৎ।
গগন মণ্ডল ছাড়ি যেমতি
চন্দ্রমা ভূমে যায় গড়াগড়ি।
৭১

ধায় রাম, বায় বিভীষণ,
ধাইল বানর সেনা যত
লক্ষ্মণের পানে ত্বরান্বিত।
সাপটি ধরিয়া বাহু পাশে
বসাইল। অঙ্কের,উপরে
জগন্নাথ ; জননীর কোলে
শিশু যথা ভুলে সব জ্বল,
তেমতি ভুলিল, দুর্বিসহ,
অস্ত্রের যন্ত্রণা সুকুমার,
শ্ৰীঅঙ্গ পরশে অচিরাৎ।
পলকে হাসিল চন্দ্রমুখ,
পলকে মলিন হল পুনঃ।
92

পলকের মাঝে যেন, হায়,
মিশাইল মহাশূন্য মাঝে
জীবনের বিদ্যুৎ-বন্ধুরী।
জলস্থল মরুংব্যোম, সব
যেন অকস্মাৎ, গেল ডুবে
শূন্যগর্ভে। ডুবিল অযোধ্যা,
সীতা, স্বর্ণলঙ্কাপুরী,
দেবতার জয় পরাজয়।
চন্দ্র-সূর্য নক্ষত্র মণ্ডল
কালগর্তে হইল বিলীন।
লক্ষ্মণ বিহনে শূন্যময়
দেখিল শ্রীরাম ত্রিভুবন !
৩

দুঃখ-জড়, রুদ্ধশ্বাস
অবিরল বহে অশ্রুধার,
ভাসিল শ্রীমুখ বক্ষস্থল,
ভাসে জলে যেন কোকনদ।
এরামের অশ্রুজলে, হায়,
সে চন্দ্র, ভাসে সূৰ্য, ভাসে
গ্রহতারা, জলস্থলবব্যাম,
যায়রে ব্রহ্মাণ্ড ভেসে যায়।
গিরিদরি ভেদ করি যেন
রুদ্ধ স্রোত বাহিরিল বেগে,
প্রাণের আবেগে কলক
মহাশূন্যে উঠিল ঝঙ্কার,
নঃ

‘আমার, আমার প্রাণাধিক,
প্রাণাধিক লক্ষ্মণ আমার ;
আবার শ্রীমুখ পানে চাহি
শিহরি উঠিল নারায়ণ,
অহ, মলিন হয়েছে চন্দ্র মুখ,
নিদারুণ শক্তির আঘাতে
শুকায়েছে ফুল্ল কোকনদ।
প্রাণের দেউটী হায়, মাের
নিভিয়াছে চিরদিন তরে
কেন বৎস, সৈকত শয়নে
রণবঙ্গ মহােৎসব ভূলি?
“কোথা হুহুঙ্কার বীরদাপ ?
?

রাে
কোথা শিঞ্জিনির আস্ফালন,
তড়িত-চাহনি টকারের ?
যেই ভূজ-বীৰ্যবলে তুমি
বাঁধিয়া সাগর, দিলে হানা
লঙ্কার দুয়ারে, বীরবেশে
সেইপুরে না করি প্রবেশ
রণক্ষেত্রে করিলে শয়ন?
ডুবায়ে সিন্ধুজলে ওই,
রাক্ষসের স্বর্ণ লঙ্কাপুরী
বাহুমূল হইল শিথিল ।
রহিল বিজয় লক্ষ্মী বাধা
তবে রক্ষপুরে চিরকাল।

রও-জ
‘হা, লক্ষ্মণ এ কি ব্যবহার।
রাক্ষসের শক্তিপদতলে
কেন ভাই নােয়াইলে শির ?
আত্মহারা কেন হলে ভাই ?
বিষ্ণুশক্তি হৃদয়ে তােমার,
ব্ৰহ্মাণ্ড করিতে পার গ্রাস,,
রাক্ষসের শক্তি কোনছার !
যক্ষ-রক্ষ-অমরমণ্ডল
নতজানু যার পদতলে!
হেন শক্তি কেন পাসারিলে ?
উঠ বৎস, উঠ প্রাণাধিক,
তােমারে শয়ন হেরি, হের
দশমুখ হাসে খল খল।

রক্তজবা
উঠ বৎস, গরজি আবার,
ব্রহ্মাণ্ডের মূল ধরি কর
আকর্ষণ ; খমুক অমরা
ছিল্প হাে নক্ষত্র মণ্ডল,
মহােল্লাসে উইক উথলি
মহাযাের লবণাম্বুরাশি
গ্রাসিবারে সরাবণ স্বর্ণলঙ্কাপুরী।
হে বীর কেশরি
আপনার কর্তব্য ভুলিয়া
কেন ভাই, রয়েছ শয়ান
বিশ্রামের এ নহে সময়?
৮

অকুল-পাথার বেঁধেছিলে
যার লাগি, বিনাশিলে ভাই,
লক্ষ লক্ষ বক্ষবীরগণ ;
মাতাসম যারে নিশিদিন
করিতে পূজন ; বন্ধ তারে
রাখি আজ রক্ষকারাগারে,
কেন ভাই করিলে শয়ন ?
বিভীষণ সুগ্রীব অঙ্গদ,
বীরভক্ত বীর হনুমান,
বিপুল বানর সেনা, হের,
ব্যাকুল তােমার লাগি আজ ;
ভাসে দুঃখে রক্ষপুরে সীতা।

পাগল হইবে মা আমার,
শুনিবে যখন, ‘তুমি নাই—
বনবাসী হইবে ভরত।
অযযাধ্যা শ্মশান হবে পুনঃ।
শুকাইবে রযুর ধারা,
জনস্থান গ্রাসিবে রাক্ষস !
অভিচারে করিবে যিনাশ,
বর্ণাশ্ৰমধৰ্মকৰ্মহােম ;
অন্তর্ধান করিবে ব্রাহ্মণ ;
লুপ্ত হবে ক্ষত্রিয়ের নাম ;
আৰ্য বলি কিছু না রহিবে,
ভারত দণ্ডক হবে স্থির।

প্রজা নষ্ট হবে অগণন,
দেশান্তরী হইবে শ্রীরাম,
কাযায় কৌপীন ডাের পরি ;
কি পশিবে সাগর গর্ভে।
মরিবে বৈদেহী লঙ্কাপুরে!
তুমি না জাগিলে প্রাণাধিক,
ঘুচিবে না দেবের বন্ধন,
খুলিবে না স্বর্গের দুয়ার,
অমরা হবেনা মুক্তপাশ।
২রা, পৌষ, ১৩১৬।
১

রজবা
গায়দ্রীর অন্তর্ধান
হে ব্ৰহ্মবাদিনি, ব্ৰহ্মাণ্ড-রূপিণি,
লুকাইলে কোথা জননি আমার ?
ছিন্ন করি যবে প্রলয়ের পাশ,
আপন মাধুরী করিলে প্রকাশ,
ফুটিয়া উঠিলে নীল নীলিমায়,
ঢলিয়া পড়িলে কুসুমের গায় ;
ঘাের ঘন-ঘটা করিয়া বিদার
উঠিল উজলি আভাস তােমার ;
অভ্র ভেদ করি হিমাদ্রির শির,
উঠিল গরবে প্রশান্ত গম্ভীর
সামঋককণ্ঠে উঠিল ঝঙ্কার ;
আসিল ব্রাহ্মণ আহ্বানে তােমার ;
বিরাটের বাহু করিয়া বিদার
ছুটীল ক্ষত্রিয় ছাড়িয়া হুঙ্কার ;
এই পুণ্য পীঠে গড়িয়া মন্দির,
করেছিল সেই প্রথম পূজন!
•
;

শূন্য করি সেই পুণ্য পাদপীঠ
শুন্য করি সেই সােণার মন্দির,
শূন্য করি সেই ত্রিদিব নন্দন,
কোথা, জননি গাে, করিলে প্রস্থান ?
ধূলায় ধূসর অমরমুকুট,
বিধ্বস্ত নন্দন, পারিজাত মূল,
শূন্য রাজপথ, শূন্য সুরপুরী,
স্বর্গের সে শােভা হইয়াছে ম্লান।
দূরদুরান্তরে নগরে নগরে,
মরুভুমে কত কান্তারে পাথারে
কতনা খুজেছি তন্ন তন্ন করে,
কুটীরে কুটীরে করেছি সন্ধান !
পাগলের প্রায় কভু উচ্চৈঃস্বরে,
কেঁদেছি ডেকেছি কত না তােমারে,
ছুটেছি উল্লাসে প্রতিধ্বনি ধরে,
তবু জননি গগ পাইনি সন্ধান !
প্রতিধ্বনি সরে, যায় আরাে দূরে,
দুরদুরান্তরে, মৃত্যুর দুয়ারে,
ডেকে বলে, হেথা জননী তােমার।।

সাগরের জলে, জাহ্নবী সলিলে,
কভু বা ডুবেছি, তােমা পাব বলে,
কভু বা সৈকতে দিয়া গড়াগড়ি
‘মা, মা’ বলে কত করেছি ক্রন্দন।
মাখিয়াছি মাটী.সর্বাঙ্গে আমার,
গঙ্গা-গর্ভে তব পাইয়া আম্রাণ ।
বাঙ্গালার মাটী হৃদয়:আমার,
চিরদিন যেন থাকে বাঙ্গালার !
তবু গলেনাকো, রে কঠিন হিয়া,
বাঁধিয়াছ বুক পাষাণে তােমার!
গাে-ব্রাহ্মণ গেল, হয়ে তােমা হারা,
শুকাইল হায় জাহ্নবির ধারা,
সাগর শুকাল, ধর্ম লুপ্ত হল,
কোটী বাহুমুল শিথিল হইল ;
চন্দ্র সূৰ্য্য খসি ভূতলে পড়িল,
এ ছার জীবনে উঠিছে ধিকার।
ব্রাহ্মণ প্রতি কোথা বেদমাতা,
কোথা স্বাধীনতা জননি আমার ?
৯ই, পৌষ, ১৩১৬
৮৪

প্রতিধ্বনি
[ সাহায্য প্রার্থী কোন বালকের পত্র প্রাপ্ত ]
রে অবােধ শিশু,
আমি বিলাইব অন্ন-জল,
তৃপ্ত হবে ক্ষুধার্ত জগৎ।
আমি দিব, তােমাৰে আহার,
তবে রক্ষা হবে তব প্রাণ।
নাহি পারে রাখিতে যে জন,
আপন পরাণ, অন্নদানে
সে কাহারে পারে গাে রক্ষিতে ?
দাস-ভাগ্য উপজীবি, হীন
বৃত্তিভূক, পারে কি কখন
কোটী কোটী ক্ষুধার্তের ক্ষুধা,
নিবারিতে ! ওরে ভ্রান্ত শিশু,
হীন সেবা ন কর্তব্য কতু!

রক্তজবা
কিবা ফল,
কর শীঘ্র মহৎ আশ্রয় ;
ছায়া ফলান্বিত তরুবর।
যদি দৈবে ফল নাহি মিলে,
ছায়া তার লভিবে নিশ্চয়।
আমি ক্ষুদ্রশক্তি বৃত্তিভুক্
দরিদ্র ব্রাহ্মণ ! বল বৎস,
কি শক্তি আমার !
আমারে বলিলে, মর্মন্তুদ
নিদারুণ দুঃখের কাহিনী,
‘ভাই ভগ্নী মরে অনাহারে ;
সােনাভরা মাটী বাঙ্গালার,
গােলাভরা ধান ঘরে ঘরে।
অহহ কে করে বিশ্বাস আজ,
জন্মভূমি, সন্তান তােমার,
কত শত মরে অনাহারে ?
যাও, বৎস, যাও রাজদ্বারে,
বাঙ্গালির হৃদয়ের রাজা ;
হৃৎপিণ্ড উপরে, একদিন,
যারে সঙ্গোপনে গঙ্গাজলে

রজবা
করি অভিষেক, ঘােয়াইছে
ক্ষুধার্তের অশ্রুজলে হায়,
কত শত চরণ যুগল !
যাও তথা, বিরাট ভবনে,
অতুল ঐশ্বৰ্যপতি তারা,
দিগ্বিজয়ী সম্রাটের জাতি ;
হের সসাগরা বসুন্ধরা
ধনরত্ন লয়ে করে পূজা,
তাহাদের ; যাও বৎস তথা !
যাও, একবার ! আর্তনাদে
জাগাও তাদেরে, খেতে দেও,
খেতে দেও, প্রভাে, অনাহারে
মরে, কোটীকোটী: নর-নারী,
মুরে সহােদর অনাহারে !
সসাগরা পৃথিবীর যারা
অধীশ্বর, তুমি তার প্রজা!
কেবা বল, করিবে বিশ্বাস
তুমি নাকি মর অনাহারে ?
বিলাস বিভােরা গাের, ওই
৭

দেখ যায় ! যাও, পিছু পিছু,
সাহসে করিয়া ভর! তব
জীর্ণ শীর্ণ বিশুস্ক কঙ্কাল
দেখাও তাদেরে, শুনে এস,
কি দেয় উত্তর ? কি হইবে
দীনহীন ব্রাহ্মণে বলিলে,-
বিষদভগ্ন আশীবিষে ?
অতুল ঐশ্বৰ্যপতি যারা,
যদি, একমুষ্ঠি অন্ন দিতে
তাহারা কাতর, আর আমি,
দেশধৰ্ম ধনজন মান,
কিছু নাই,কিছু নাই যার !
আহার বিহার যা’র, হায়,
সব পরাধীন,-এত লঘু,
যেন নিশ্বাসে উড়িয়া যাই,
পৃথিবী হইতে ;-বল, বৎস,
আমি কি করিতে পারি আজ?
প্রলাপে আমার, স্তব্ধ শিশু,
ভুলিল সকল জালা,-ক্ষুধা,

তৃষ্ণা ডুবাইয়া দিল সব,
সেই চিন্তাসিন্ধু মাঝে।
চপলার চকিত খেলায়,
যেন শূন্যে উঠিল ফুটিয়া
ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান।
শিশুকঠে
শূন্যে শূন্যে, যেন,
প্রতিধ্বনি ছুটিল গরজি,-
“আমি কি করিতে পারি আজ।”
১৬ পৌষ, ১৩১৬
৯

রক্ত-জবা প্রস্তরময়ী ভগ্নবাসুদেব মুত্তিদর্শনে ( বালুরঘাটের সন্নিকট আগ্রাদুগুণে কালাপাহাড়ের ধ্বংস, প্রবাদ) জনশূন্য স্থানে, এই বিটপীর মূলে, অনাৰ্য-বসতি-উপকণ্ঠে, কে আনিল, দেব, বিগ্রহ তােমর ? কে ভাঙ্গিল কঠিন কুঠারে, হায়, সুঠাম প্রতিমা ? ছিন্ন ভিন্ন হস্তপদ তব ! বৃক্ষমূল করিয়া আশ্রয়, আছ পড়ে কতকাল? অহ, ওই দুবৃত্তের দারুণনখর- বিকৃত করেছে চারু বদন মণ্ডল। রামভক্ত মারুতির রুদ্র প্রতিমূর্তি- অদূরে দাড়ায়ে ; বিচ্ছিন্ন মস্তক, বলি, রক্ষিতে লক্ষণে যেন রাক্ষসের রণে দিলা ভক্ত বিসর্জন আপন পরাণ । ।

কালের কুঠার হস্তে করিয়া ধারণ
লক্ষ লক্ষ পশেছিল, যবে কর্মক্ষেত্রে,
তখনও আঁখিমেলে চাও নাই প্রভাে,
পলকে করিতে দগ্ধ পতঙ্গ সকল।
কালগর্ভে হয়েছে বিলীন দুবৃর্তের
দোর্দণ্ড প্রতাপ। কিন্তু, হায়, জাগিলে না,
তুমি, ওহে নারায়ণ,গেল কতকাল!!
দীন হীন একি বেশ ধূলায় ধূসর,
বৃক্ষমূলে, বল, দেব, কেন এ শয়ন ?
পরিহরি কতকাল ক্রিদিব-নন্দন
আকুল এ গ্ৰামচৈত্যা মাঝে, বনস্পতি-
অন্তরালে কেন বল, এ আত্ম-গােপন ?
উৰ্দ্ধশ্বাসে আসিয়াছি তােমারে দেখিতে,
তােমারে মলিন হেরি হয়েছি কাতর !!
ছিন্নভিন্ন বনমালা তবু গলে দোলে,
শ্ৰীঅঙ্গে নখরাঘাত বিকল চরণ।
এও কি পরাণে সহে ওহে নারায়ণ ?
আয়রে, বাঙ্গালি, আয়, দেখাইব তােরে
যুগ-যুগান্তের ইতিহাস—দুবৃত্তের
৯১

দারুণ নখর শ্রীঅঙ্গে পড়িয়া আছে অনন্ত ধরেছে বক্ষে কলঙ্ক- লান বাঙ্গালির !! আয়, ওরে, প্রত্নতত্ববিৎ, দেখাইব তােরে, চারু কারু শিল্পকলা কত বাঙ্গালার; যবে ভূগর্ভ-বিবরে ছিল তাের পাশ্চাত্যের নৃতন সভ্যতা! এস ভক্ত, এস যােগী, যে যথায় থাক— দেখ দুটা চক্ষু মেলি হেথা,-কোটী কোটা অগ্নিহােত্রী ব্রাহ্মণের দল, পুষ্প-অর্ঘ্য লয়ে করে, পৃজিছে বিরাটে ; কোটী কণ্ঠে সমস্বরে তার প্রতিধ্বনি, আজো উঠে, “রক্ষা কর গাে ব্রাহ্মণ, ওহে নারায়ণ, করি মােরা নমস্কার দেবতা তােমায়।” আরাে দূরে, দেখ, দূর অতীতের গর্ভে, পশেরে পতঙ্গস হাের দাবানলে, যবনের খরধার কৃপাণের মুখে, গাে-ব্রাহ্মণ বেদোদ্ধার করিবারে ধায়, অশ্বপৃষ্ঠে উদ্ধশ্বাসে লক্ষ লক্ষ বীর, মুক্ত অসি উল্কাসম নাচিছে অম্বরে ; ৯২

রক্ত-জমা
কঁপে বসুন্ধরা বীরদাপে ; প্রতি কষ্টে
উঠে জয়ধ্বনি, “জয় জগদীশ হরে,
প্রতিধ্বনি উঠে শূন্যে, “জয় জগদীশ হরে,
দেবতা গন্ধৰ্ব গায়, “জয় জগদীশ হরে।”
নাচে ভক্ত, নাচে যােগী, “জয় জগদীশ হরে,
ব্ৰহ্মাণ্ড বিদারি ছুটে, “জয় জগদীশ হরে।”
২৩, পৌষ, ১৩১৬।

“রাম নাম”
( অশােকান্তরালে হনুমানের শ্রীশ্রীরাম-নাম-কীৰ্ত্তন
ও বৈদেহির মূচ্ছাভঙ্গ)
সহসা বৃক্ষের ডালে
কেবা রাম, রাম’ বলে
রাম-নামে পূরিল গগন।
পশিনাম কর্ণমূলে
হৃদে ‘রাম, রাম’ বলে
রামরূপ দেখায় স্বপন।
স্বপ্নে রামরূপ হেরে
তীব্র মূচ্ছা গেল দূরে
উঠে সতী করিয়া বােদন।
এ কেমন মায়া, প্রভু,
আরত দেখিনি কভু,
রামময় জাগ্রতপন।

রক্তজবা
স্বপ্ন আসে চলে যায়,
ধরা কভু নাহি দেয়,
চির স্থির, কেমন স্বপন।
রক্ষপুরে রাম-নাম,
এও কি সম্ভব হয়,
রাক্ষসের ধরে সাধন!
এ পিশাচপুরে প্রভু,
দুঃখিনির তরে, কভু,
করিবে, কি, হায় পদার্পণ ?
আর কত কাল পরে,
আসিবে এ রক্ষপুরে,
দুঃখিনিরে করিতে মােচন ?
কে শুনাল ‘রাম নাম,
চমৎকার অভিরাম,
রামরূপ করি দরশন।
অনিলে অনলে রাম,
প্রাণারাম রাম নাম,
ঘােষে সিন্ধু করিয়া গর্জন।
ত

রক্তজবা
?
চন্দ্র সূৰ্য গাহে ‘রাম,
পত্রে-পত্রে রাম নাম,
উথলে সাগর জল নামে।
,
এসেছ কি পথ ভুলে ?
রে নিঠুর! এত কালে,
দুঃখিনিরে পড়েছি কি মনে ?
আসি’ সাগরের পারে
ডেকেছ কি নাম ধরে,
তাহে সিন্ধু উঠিছে উথলি।
চন্দ্র-সূৰ্য্য-গ্রহ-তারা,
আকুল সাগর-পারা,
উঠে প্রাণ আকুলি বিকুলি !
অথবা রাক্ষসী মায়া
রচিয়াছে তব ছায়া,
রামময়, তাহে, ত্রিভুবন ?
ছলিবারে অভাগিরে,
তাই আসে বারে বারে,
নানারূপ করিয়া ধারণ।

-সব
যবে পঞ্চবটী-গেহে,
কত সুখে ছিনু সোহে,
এল মৃগ সােণার বরণ।
তুমি গেলে ধরিবারে,
হরিয়া আনিল মােরে,
যতী-বেশ করিয়া ধারণ।
স্বর্ণমৃগ রূপ ধরে,
মানবের মন হরে-
অতিথি সাজিয়া হরে ধন।
কভু যতীবেশ ধরে--
আসে রক্ষ মাের দ্বারে
করে কত ধৰ্ম্ম আলাপন।
কভু অট্টহাসি হাসে
কভু বা পরুষ ভাষে
নিশিদিন করে জালাতন।
স্ত্রী-পুরুষ নানা মত,
আমারে বুঝায় কত,
মর রাম,-অমর রাবণ !
১৭

শত্রু-মিত্র কত ভাবে কত যে রচিছে মায়া রাক্ষসের দুরন্ত ছলন- আবার বৃক্ষের ডালে কেবা রাম রাম’ বলে, সেই নামে কঁপে ত্রিভুবন। ৪ কপিল সাগর জল করে লঙ্কা টল মল, ‘রাম নামে’ এমনি প্রতাপ। বসি’ অশােকের ডালে, ভাসে ভক্ত অশ্রু-জলে মুখে নাম, হৃদে তীব্র তাপ। . ৮, মাঘ, ১৩১৬ অপরােক্ষানুভূতি সত্য এই জগত-সংসার। সত্য এই সৌন্দৰ্য-সম্ভার। অপার অসীম শূন্য ভরা চন্দ্র-সূৰ্য কত গ্রহ তারা, জল-স্থল মরুৎবব্যাম কাল, সপ্ত-স্বর্গ সপত-পাতাল, তুঙ্গ-শৃঙ্গ শুভ-হিমাচল, নীলাকাশ, নীলঘন জল, সব সত্য, সকলি সুন্দর। উদ্ভাসিত এই চরাচর যার তেজে, সেই বৈশ্বানর- সত্য ; সত্য আমি,-আমি সত্য সাক্ষীরূপী নর-নারায়ণ। জগন্নাথ, আনন্দ কানন, গয়াধাম, মধু বৃন্দাবন, -

রক্ত-বা
যেথা আমি লভেছি জনম,
ত্রিদিব-নন্দন-সম, সেই
কেন্দ্র তীর্থ বাংলা আমার,
সদাসত্য, সতত-সুন্দর।
;
কত তারে ভালবাসি আমি,
সুরবন্দ্যা প্রিয় জন্মভূমি ;
প্রতি অনুপরমাণু যা’র
ধরে বক্ষে সাধুপদভার ;
তীর্থ হতে, মহাতীর্থসূল
কুমারিকা হতে হিমাচল।
কুরুক্ষেত্র নর্মদা কাবেরী
প্রভাস, পুষ্কর, গােদাৰী,
ব্ৰহ্মপুত্র, সিন্ধু, ইরাবতী,
আত্রেয়ী, ভারতী, ভাগিরথী,
সব সত্য, সত্যগঙ্গাজল!
শুকণ্ঠা পুণ্যতােয়া ভূমি,
শৃখলিতা আমার জননী-
শীর্ণ শীর্ণা দীন হীন বল!

রক্ত-সব
সত্য বটে, এ শৃঙ্খল তার,
অনশনে অর্ধাশনে স্বা’র
সর্ব অঙ্গ হইছে বিকল।
;
সত্য শােন ওই হাহাকার
কুমারিকা হতে হিমাচল।
সত্য আমি ব্রাহ্মণ সন্তান
সত্য আমি হারায়েছি মান;
সত্য মাের জনম বিফল
খুব সত্য, দাসত্ব-শৃঙ্খল !!
১৫, মাঘ, ১৩১৬।
১০১

রক্ত-জবা
দৈত্যকুলে প্রাদ
-
হে দৈত্যবালক,
ভক্ত শ্রেষ্ঠ, হে বীর প্রহলাদ।
ধন্য তুমি, তুমি ধন্য, আজ!
কত জন্ম জন্মান্তর স্মৃতি,
পুঞ্জীভূত সাধনার ধারা,
উজলি উঠিল বিশ্বময়।
শিশুকণ্ঠে উঠিল ফুটিয়া
হরিনামামৃত গুণগান,
ভাসাইয়া দিল দৈত্যকুল।
শুভক্ষণে শুভ দিনে এক
চরাচর-ব্যাপী-বিষ্ণুরূপ
শিশু চক্ষে হইল প্রকাশ।
ভক্তের হৃদয়াসনে, সুখে,
আপনি হইলা সমাসীন
অদ্বিতীয় বিশ্বের সম্রাট।

শিকণ্ঠে কহিলা গরজি,
“ত্যজ, দৈত্য, বৃথা অহঙ্কার!
যক্ষ-রক্ষ, অসুর, মানব,
দেবতা গন্ধৰ্ব আদি যত,
কেহ নহে আমার সমান।”
পুত্র মুখে আত্ম-নিন্দা-বাদে
ক্রুদ্ধ ক্ষুব্ধ দৈত্যরাজ কহে,-
“দৈত্যকুলে একিরে, প্রহ্লাদ,
পিতৃনিন্দা কে শিখাল তােরে?”
ক্রোধে দৈত্য জলিল দ্বিগুণ,
সম্মুখে ব্রাহ্মণে চাহি, কহে,-
“ব্ৰহ্মবন্ধো ! একি ব্যবহার ?
পিতৃনিন্দা,স্তুতি বিপক্ষের,
শিখাইলে অর্ভকে আমার!”
দৈত্যগুরু, দৈত্য অন্নদাস,
মূঢ়, ভীরু, ব্রাহ্মণ-নন্দন,
কহিতে লাগিলা,-দৈত্যরাজ,
বিষ্ণুভক্ত সন্তান তােমার

হাসে কঁাদে পাগলের প্রায়,
ককারে দেখিয়া কৃষ্ণরূপ ।
কহে কৃষ্ণে বিশ্বের সম্রাট,
শিখায় সবারে কৃষ্ণ কথা।
কত মন্ত্র, কত অভিচারে,
নারিলাম বুঝাতে বালকে,
পিতা তার বিশ্বের সম্রাট।
ব্রাহ্মণ আমরা,-নাহি জানি
তুমি নি, দ্বিতীয় ঈশ্বর ;
স্বর্গ মর্ত্য রসাতলে, তুমি,
একমাত্র অদ্বিতীয় রাজা।
হব্য কব্য যাগ-য-হােমে,
তােমার উদ্দেশে, দৈত্যরাজ,
করি গাে নিক্ষেপ বৈশ্বানরে।
ব্রাহ্মণ আমরা পুরাতন,
অতি পুরাতন ব্রহ্মাণ্ডের
কোন আদি কাল হতে আছি ;
দেখি নাই, কোথা বিষ্ণু সেই ;
তােমারেই, ওহে দৈত্যরাজ,

কায়মনােবাক্যে নিরন্তর
জবা বিহুদল গঙ্গাজলে ,
পুজিতেছি ব্রাহ্মণ-নন্দন।
ব্রাহ্মণ আমরা -হে সম্রাট
সর্বশক্তিমান,-তুমি বিনা
কারাে নাহি জানি; পিতৃদ্রোহী
পুত্র তব, না করে স্বীকার
তােমা বিশ্বের সম্রাট বলি।
কত মন্ত্র-তন্ত্র-তাড়নায়
নারিলাম বুঝাইতে, হায়,
কয়াধুনন্দনে,
দৈত্যরাজ
অদ্বিতীয় বিশ্বের সম্রাট।
৬, ফাভন, ১৩১৬।

হরিভক্ত।
নিভিল, নিভিল, হায়, ব্ৰহ্মবীৰ্য তেজ,
নােয়ায় ব্রাহ্মণ শির দৈত্যপদতলে,
কাপিল ত্রৈলােক্য ব্রাসে দৈত্যের দাপটে।
সুরাসুর, চন্দ্র-সূৰ্য্য, নক্ষত্র-মণ্ডল,
মহাত্রাসে মহাশূন্যে করে টলমল !
টলিল না হরিভক্ত বালকের হিয়া!
ব্রহ্মাণ্ডের মূল হরি করিয়া আশ্রয়,
নির্ভীক বালকবীর কহিতে লাগিল,-
“দৈত্যপতি! হরিভক্তে কি দেখাও ভয় !
ভীষণ হইতে হরি অতীব ভীষণ !
ভয়ঙ্কর হতে হরি আরাে ভয়ঙ্কর।
বিশ্বের সম্রাট হরি পরম ঈশ্বর।
স্রষ্টা পাতা ধাতা হরি তােমার আমার,
পরম পিতায়, পিত, কর নমস্কার।”
জলিল দৈত্যের ক্রোধ মহা-ভয়ঙ্কর,
নাশিতে বালকে চেষ্টা করে নানা মত।

রক্ত-জবা
কভু তীক্ষ প্রহরণ, কভু হলাহল,
কভু অভিচার, কৃত্যা, অনিল, অনল,
কভু বা আসুরী মায়া, করিল বিস্তার
ব্ৰহ্মাণ্ড টলিল ত্রাসে ; চন্দ্র-সূর্য-তারা
অসুরের পদতলে খসিয়া পড়িল।
টলে না প্রহলাদ-তবু, না নােয়ায় শির,
বিশ্বের সম্রাট বলি, দৈত্যপদতলে ;
তবু না ভূলিল, শিশু, মধু হরি নাম।
হরিভক্ত বালকের তেজে, মিশাইল
দৈত্যতেজ-খদ্যোতিকা প্রায় ; অকস্মাৎ
উজ্জ্বল স্ফটিক-স্তম্ভ করিয়া বিদার,
ভক্তির বিজয়কেতু প্রলাদের তরে,
নর-হরিরূপ হরি করিলা প্রকাশ ।
১৩ ফান, ১৩১৬।

র- দ্বৈত্যবনে পাণ্ডব। ছলনায় পরাজিত দুর্জয় পাণ্ডব রাষ্ট্র-কোষ-দণ্ড-দুর্গ-রাজ্য পরিহরি বনবাসে করিল প্রস্থান অচিরাৎ। সাথে কৃষ্ণা রাজলক্ষ্মী চলিল কাদিয়া সুরপুরী পরিহরি যেনরে অমর, বৃত্ৰভয়ে ব্যোম-গর্ভে হইল বিলীন। কাদিলা প্রকৃতিপুঞ্জ ; ব্রাহ্মণমণ্ডলী পরিহরি কৌরবের দুষ্ট অধিকার একে একে দ্বৈতবনে করিল প্রবেশ ; বেদনাদে পরিপূর্ণ হইল কানন ! ঋক্‌-যজু-সাম গানে সদা মুখরিত, পাণ্ডবের পূত-বনাশ্রম, ব্ৰহ্মগীতে- ছন্দে ছন্দে, কত পুণ্যবন্দনায় যেন উঠিল হাসিয়া। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় মিলি’ মহারণ্যে মহারাষ্ট্র করিল স্থাপন। ১০৮

রক্ত-জ
দাবানল সম মুহুর্মুহু জ্বলিতে লাগিল
ক্ষত্ৰতেজ ব্রাহ্মণের বেদবন্দনায়।
ব্ৰহ্মতেজ-পূত-শিখাস্পর্শে, শিঞ্জিনীর
দ্রুত আস্ফালনে, কত হাসিলাতড়িৎ,
গর্জিয়া গর্জিয়া শূন্যে ঘুরিতে লাগিল ।
শূন্যে শূন্যে প্রতিধ্বনি কহিতে লাগিল,
রাজ্য-লাভ, কিম্বা, বনবাস,-পাণ্ডবের
•
উভয় সমান।
২৭, ফান, ১৩১৬

রক্ত-জবা
মৃত্যুভয়
কেন মৃত্যুভয়ে, রে মন আমার,
প্রতিপদক্ষেপে সঙ্কুচিত হও?
মরিবে, এ ভয়ে, মর বারবার,
বেঁচে থাকা, সেও মরণ তােমার,
কেন জনমিলে, কেন বা মরিবে
বুঝে, না ভেবে, কর হাহাকার ?
বিষয়ের লােভে সব ভুলে যাও,
বিষয় না পেলে বালকের প্রায়,
ভবঘুরে হয়ে কাদিয়। বেড়াও।
বিযেতে কেবল দেহ নষ্ট হয় ।
বিষয়ের বিষ অতীব দুর্জয়,
বারম্বার,
জন্মমৃত্যু
সঘটায়।
জনম, মরণ, বিধির নিয়ম,
দিন দিন জীব যায় যমালয়।
।

রক্ত-জবা
কাল-সাগরেতে বুদ্ধদের প্রায়,
যেই ফুটে উঠে, সেই মিশে যায়,
জীবের জীবন মায়ানীলিমায় ।
কত জন্ম-মৃত্যু তেমতি তােমার,
হয়ে গেছে, হবে আরাে কতবার !
কিসে ভবােেগ হবে নিরাময়,
সেই চিন্তা মন কর বার বার !
সুদীর্ঘ সংসার কবে হবে ক্ষয়,
কবে ষড়রিপু হবে পরাজয়,
পলাইবে দূরে দুর্জয় শমন,
মৃত্যু-মুখে পাবে অমৃত আড্রাণ ?
১১, চৈত্র, ১৩১৬

রাজবা আকাশ চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারাভরা দীপ্তিময়, রে মুক আকাশ, পরিপূর্ণ শান্ত নীলিমায় । জগতের পরপারে যেন, জীবনের জ্যোতির্ময় পথ, নক্ষত্রের স্তরে স্তরে বাধা। শুভক্ষণে প্রশান্ত মুহুর্তে যবে মানবের দৃষ্টিপথে হইলে প্রকাশ, বসুধার চারি ধারে পড়িল ঢলিয়া নীলিমার প্রেমমৃত ধারা, ছিন্ন করি চির নীরবতা, কত ছন্দে ছন্দে ব্যোমগর্ভে উঠিল বাজিয়া শঙ্খ দেবতার- স্নিগ্ধ মধ্বনি হানাদ;

রক্ত-জবা
সেই দিন পিতামহ মাের
এই পুণ্য.পাদপীঠোপরি,
হইয়া উদ্গ্রীব, শুনেছিল,
বিরাটের মঙ্গল আবান।
কত দিন পরে তা’র, ওগাে,
আজ আমি রয়েছি দাড়ায়ে,
তব নীল চন্দ্রাতপতলে ;
যুগপং সহস্র নয়ন-মেলি
দেখিতেছ মােরে-কোথা যাই ?
যুগপৎ দেখিতেছি, দেব,
সহস্র নয়ন তব, ধরে ফেলে,
মােরে পলাতক ; চক্ষুম্মান
হে মহান ! হে দেবাদিদেব ।
বিরাটের প্রশান্ত ললাট !
রত্নগর্ভ জ্যোতিষ্ক-মণ্ডল।
কভু রূপ, ভাষা হয়ে কতু,
ফুটে উঠ নীল নীলিমায়।

আমার অজ্ঞাতসারে কত
গাহিয়াছ গান; দেখায়েছ
রাশি রাশি রূপ ; দেখি নাই
আঁখি মেলি, করিনি শ্রবণ ।
বিশ্বের এ কোলাহলে, প্রভাে,
সুগভীর স্বার্থ অন্ধকারে
ছিলাম ডুবিয়া এত কাল।
তড়িতের চকিত খেলায়
দেখায়েছ রূপ যদি তব,
অশনির গম্ভীর নির্ঘোষে
যদি ডাকিয়াছ মােরে, দেব,
এসাে, শষ্যো, এস, অবতরি
এই পুণ্যপাদ পীঠে, প্রভাে,
হৃদয়ে আমার ; তুলিয়াছি
পূজিবারে চরণ কমল,
পূতগন্ধ স্নিগ্ধ সচন্দন
জবা বিহুদল গঙ্গাজল।
১৮, চৈত্র, ১৩১৬
১১৪

রক্তজবা মুক স্তব্ধ মূক বধির পাষাণ, ভাষাহীন পিণ্ডীভূত জড়, কি রহস্য রেখেছ ঢাকিয়ে স্থূল দৃঢ় আবরণ তলে ? কতযুগ, কত যুগান্তর, কত ঋতু, কত মাস দিন, পদচিহ্ন রেখে গেছে হেথা ; কত জয়-পরাজয়-গাথা আছ বক্ষে করিয়া ধারণ ; কতকাল নিস্পন্দ নিৰ্বাক- কি রহস্য, হে মৌনীতাপস, জড়নিম্নে করিছ দর্শন ? নিস্তব্ধ নীরব বসুন্ধরা, চন্দ্র সূৰ্য কোটী গ্রহতার ধ্যানমগ্ন তােমারই সাথে নির্বিকল্প সমাধি সাগরে। ১১৫

জ্যোতিষ্ক-মণ্ডল উন্ধে, ওই,
হেসে যায়, কথা নাহি কয় !
নিম্নে বসুন্ধরা, শত শত
পদাঘাতে, মাথা নাহি তুলে,
হে বৃক্ষরূপি, রূদ্রদেব,
মােক্ষদ্বারে, হে দেব-প্রহরি ।
জড়-বিজড়িত-অঙ্গ, স্কুল,
স্পন্দহীন নিস্তব্ধতাপস,
স্থির নেত্রে করিছ দর্শন
স্থাবর জঙ্গম চরাচর,
সহস্র উদয়, অস্তাচল,
মানবের উত্থান-পতন,
জন্মমৃত্যু সহ বিপ্লব।
.
ধ্রুবসাক্ষী যুগযুগান্তের,
কি উদ্দেশ্যে, করিছ বহন,
বিশ্বের এ জটিল বারতা ?
কোন উচ্চধৰ্ম্মঅধিকারে,
জানাইবে-দেব,মানরের,
অত্যাচার অবিচার কয়
১১৬

লুব্ধ-মুগ্ধ অস্থির জনতা-
অবহেলে দলিযা দুর্বলে
উৰ্দ্ধশ্বাসে ধায় পুরাইতে
আপনার রাক্ষসী-লালসা ।
পশু-পক্ষী-কীট-পতঙ্গাদি
কৃপাণের মুখে দেয় শির।
স্বার্থপর নির্দয় মানব
চাহে না চাহে না ফিরে, হায়,
দুৰ্ব্বলেরে, করিতে উদ্ধার !
হা অদৃষ্ট! রে বধির জীব ।
সাজিয়াছ মূক! ভূলে গেছ
মুক্তিমন্ত্র সারা জীবনের।
অন্ধ দু’নয়ন ; আছে যাহা
শুধু তাহা পােড়ায়ে মারিতে,
দেখাইতে মরণের পথ।
২৫, চৈত্র, ১৩১৬
১১৭

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rakta-jaba

Author
Gangopadhyay, Khirodchandra
Title
Rakta-jaba
File name
Rakta-jaba
Text
OCR done
Citation
1909
Published
2010/02/9
Publisher
Bani Press
Language
Sanskrit
Pages
132
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Jadi Tumi Phire Aso Ma
DLI number
511301
Barcode
4990010018462.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
6kBPucN3pod
Download PDF

Rakta-jaba