Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Devala Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দেব না।
DEVALA
ঐতিহাসিক কাব্য।
HISTORICAL POEM.
হাফেজ সাহেব প্রণে
মৌলবী ওসমান আলী বি, এল,
কর্তৃক বিরচিত।
মেদিনীপুর “মােসলেম লিটারারী সােসাইটী” হইতে
প্রকাশিত।
==
শদ কফ
প্রথম সংস্করণ
কলিকাতা।
৪নং কড়েয়া গােরস্থান রােড়।
রেয়াজ-উ-ইসলাম প্রেসে,
মােহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ কর্তৃক মুদ্রিত।
মেদিনীপুর।
0901
No text on this page.
ভ্র-সংশােধন। মুদ্রাকর প্রমাদে পুস্তকের কয়েক স্থলে অশুদ্ধ রহি- আছে, সে গুলি সংশােধনপূর্বক পাঠ করিবেন। পৃষ্ঠা লাইন করি, . ১০ ১৯ অশুদ্ধ করি, মুহূর্তে মূহুর্তে ‘সেকেন্দার’ নামা সেকেন্দার নামা’ তথা। তথা যথা’ যথা, চূমিলা চুমিলা ১৪ ৮ २० ৭ ৪১ ৪৩ ১ ০ ভূজ ভূজবলে, গগণে ৫৮ কল্যানে অনুমাত্র ভুবলে গগনে কল্যাণে অণুমাত্র ভূপতি ১০ ভুপতি।
No text on this page.
মুখবন্ধ। বঙ্গের কৃতি সন্তান মিঃ রমেশচন্দ্র দত্ত সি, আই- ই মহােদয় প্রণীত ভারতবর্ষের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে, আল- উদ্দীন বাদশাহের রাজত্ব কালের বর্ণনা পাঠ করিতে করিতে, গুজরাটের রাণী কমলা দেবী ও তদীয়া দুহিতা দেবলা দেবীর মনোেহর আখ্যান অবগত হই। যদবধি কমলা দেবীও দেবলা দেবী সম্বন্ধীয় ঐতিহাসিক ঘটনাবলী পাঠ করি, তদবধি তদসম্বন্ধে একটী কাব্য রচনা করিবার বাসনা আমার অন্তরে জাগরুক থাকে। উক্ত বাসনার বশবর্তী হইয়া কাব্যের উপকরণ সংগ্রহে প্রবৃত্ত হইলাম। অনন্তর শায়র-উল-মুতাক্ষেরীন, মৌলবী আবদুল করিম বি এ সাহেবের প্রণীত সংক্ষিপ্ত ভারত ইতিহাস, ভারত ভ্রমণ প্রভৃতি হইতে আবশ্যকীয় উপকরণ সংগ্রহ করিয়া এই ক্ষুদ্র কাব্যখানি রচনা করিলাম। ইহাতে ইতিহাস উল্লিখিত প্রকৃত ঘটনাবলী যথাসাধ্য সন্নিবেশিত করিয়াছি, অনৈতিহাসিক অমূলক ঘটনা বিবৃত করিবার চেষ্টা করি নাই ; ফল কথা ঐতিহাসিক
go
সত্য ঘটনা যাহাতে উল্লষ্মিত না হয়, তৎপক্ষে যথেষ্ট
প্রয়াস পাইয়াছি; অবশ্য, কতদূর কৃতকার্য হইয়াছি,
বলিতে পারিনা। অল্প পাঁচ বৎসর হইল কাব্যখানি
প্রণয়ন করি, কিন্তু সাধারণে প্রকাশ করিব কিনা বিবে-
চনাধীন থাকে। আমার স্বদেশীয় বন্ধু সৈয়দ আবদুল
গফফার সাহেব প্রথমাবধিই উহা প্রকাশ করিতে অনু-
রােধ করিয়া আসিতেছিলেন, পরে সুধাকরের মাননীয়
সম্পাদক মুনশী আবদুর রহিম সাহেব ও লহরীর সম্পা-
দক মাননীয় মুন্শী মােজাম্মেল হক সাহেব উহা পাঠ
করিয়া, স্থানে স্থানে সংশােধন করিয়া দেন এবং উহা
প্রকাশ করিতে উৎসাহিত করেন।
এইরূপে উৎসাহিত হইয়া ‘দেবলা’কে অবশেষে
সাধারণে প্রকাশ করিতে মনস্থ করিলাম। ঘটনাক্রমে
ইসলাম প্রচারকের মাননীয় সম্পাদক মৌলবী রেয়াজু-
দ্দীন আহমদ সাহেবের হস্তে কাব্যখানি পতিত হওয়ায়,
তিনি পাঠ করিয়া প্রকাশ করিতে অনুরােধ করেন ;
সুতরাং আমি তাহার হস্তেই উহার মুদ্রাঙ্কণের ভার
প্রদান করিলাম। তিনি যত্ন পূর্বক উহার মুদ্রাঙ্কণ কাৰ্য্য
ও প্রুফ দেখিয়া দেন, এজন্য আমি তাহার নিকট
বাধিত থাকিলাম।
vo
সুধাকরের মাননীয় সম্পাদক হিতাকাঙক্ষী মুর্শী
আবদুর রহিম সাহেব ও লহরীর সম্পাদক মাননীয়
মুন্শী মােজাম্মেল হক সাহের যত্ন পূৰ্ব্বক স্থানে স্থানে
সংশােধন করিয়া দেবলাকে প্রকাশ করিবার জন্য উৎসা-
হিত করিয়াছিলেন বলিয়া, আমি তাহাদের নিকট অকৃ-
ত্রিম ঋণ-পাশে আবদ্ধ রহিলাম।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে, দেবলা একজন পাঠকের
ও মনস্তুষ্টি সম্পাদন করিতে পারিলে এবং পাঠক মহাশয়
উহা পাঠ করিয়া ‘সময় টুকু অপব্যয় হইলনা” বিবেচনা
করিলে, আমি আমার শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব।
চুয়াডাঙ্গা (নদীয়া )
গ্রন্থকারস্য।
২৩ শে জুন, ১৯০১ সাল
No text on this page.
দেবলা।
প্রথম সর্গ।
;
অস্ত গেল দিনমণি বিষাদে ধরণী
ধূসর বরণ বাসে আচ্ছাদিল কায়।
পতি দরশন আশে কুমুদিনী ধনী,
আশায় বাঁধিয়া বুক ছিল সারাদিন,
সন্ধ্যা সমাগমে এবে, শশাঙ্ক উদয়
নিশ্চয় জানিয়া মনে হইল প্রফুজ ;
পূজা সমাগমে যথা বঙ্গবন্ধুগণ।
সান্ধ্য সমীরণ বহি’ মৃদুল হিল্লোলে
জুড়াল জীবন, শ্ৰম-ক্লম করি দূর।
নীরবে বিহগকুল পশিছে কুলায় ;
সারা দিন পরিশ্রমে অবশ শরীর,
হল কঁাধে ধরি ধরি কৃষকের দল,
চলেছে বাড়ীর পানে এরে ;
মাঠ হতে
২
দেবলা।
"
;
রাখালেরা ধেনু সহ ফিরিতেছে গেহে।
প্রতি উপাসনালয়ে উঠিল মধুর
“আল লাহহা আকবর” আহবান ধ্বনি
ভেদিয়া গগণ ; ধর্মভীরু, ধর্মপ্রাণ
মােসলেম গণ ছুটিলা মসজিদ পানে,
সাংসারিক সব কর্ম করি পরিহার,
বিভু উপাসনা তরে, রণমদে মাতি
ছুটে যথা ধীর গণ, রণাঙ্গণে হায় !
ভেরীর ভীষণ রব পশিলে শ্রবণে।
উঠিল ঘণ্টার ধ্বনি দেবালয় হতে,
আরতি করিতে রত হইল পূজারি।
ক্রমে অন্ধকার জাল বেড়িল জগত,
একে একে তারা দল সুনীল আকাশে
মিটি মিটি মেলিল নয়ন, মানবের
মনে যথা ফুটে আশা ফুল। প্রতি গৃহে
জ্বলিল প্রদীপ ; দীপমালা উজলিল
সম্রাট ভবন—ফানুস, দেয়ালগির,
ঝড় নানাবিধ, থরে থরে চারিভিতে
শােভে অপরূপ; সাধ্য কি লেখনী করে
বর্ণনা তাহার। •
প্রথম সর্গ।
.
;
প্রাসাদের এক পার্শ্বে
দিল্লীশ্বর, নৃপবর শােভিছে আলার
রম্য কৌতুক ভবন ; নীল লােহিতাদি
সুস্নিগ্ধ উজ্জ্বল শত আলােক মালায়।
চামেলী, গােলাপ আদি সুগন্ধি আতর,
আমােদিছে চারিদিক; সুরভি কুসুম
রাজি, সুচিকণ হারে শােভে স্তম্ভে স্তন্তে ;
হেম ফুল
দানে পুনঃ শােভে কি সুন্দর।
দিনমানে গুরুতর সাম্রাজ্য শাসনে,
প্রজার মঙ্গল কর বিধি সংগঠনে
নিয়ত রহেন আলা ব্যস্ত অতিশয়,
সন্ধ্যা সমাগমে তাই রাজ কাৰ্য হতে,
লভি
অবসর,
শান্তি-সরে সন্তরণ
হেতু,
নিত্য দিল্লীপতি আসেন এখানে।
পাত্র মিত্র বয়স্যাদি সহ নানারূপ
গল্প, শ্রুতি--সুখকর করেন শ্রবণ।
কভু সেনাপতি মুখে, যুদ্ধের কাহিনী
শুনে সুখী হ’ন দিল্লীশ্বর, কেমনেতে
সম্মুখ সমরে, অস্ত্রে অস্ত্রে, মল্ল যুদ্ধে
বীর সেনাগণ করে রণ; পরাজিত
৪
দেবলা।
করি বিপক্ষীয় সেনা “সম্রাটের জয়”
রবে, মহা জয়ােল্লাসে কাঁপায় মেদিনী;
উৎকর্ণ হইয়া আলা করেন শ্রবণ ;
আনন্দে হৃদয় তার নাচে তালে তালে।
বীরত্ব কাহিনী সদা প্রিয় বীরজনে।
বেতালের মুখে শুনি'রঙ্গ রসিকতা,
আমােদে সম্রাট কভু হয়েন অধীর,
আনন্দে বিহবল হ’ত পাত্র মিত্র গণ ;
হাসিয়া হাসিয়া সবে হইত অস্থির,
উঠিত হাসির ঢেউ ছাইয়া গগণ।
কখন নর্তকী বৃন্দ অতুল রূপসী,
যােগীদের ধ্যান ভাঙ্গে রূপ হেরি যার,
কি ছার সামান্য নর! মানস মােহিনী
চারু কাঁচলি শােভি, বাসন্তী ওড়না
‘তাহে চুমকীর কাজ, নীল নভস্তলে
যথা শােভে তারাকুল ; ফুলহার গলে
দোলে মরি কি সুন্দর, চরণে নুপুর
পরি’ ঠমকে ঠমকে খঞ্জন জিনিয়া
করে নৃত্য ; কোকিল গঞ্জিনী বামাকুল
কম কণ্ঠে সম সুরে ধরে যবে গান,
t
প্রথম সর্গ।
?
মন প্রাণ কাড়ি লয় ; তার সহ-হানে
যবে কটাক্ষের বাণ, (হেন সম্মােহন
বাণ আছে কি ভূতলে ?) সুপ্ত কামানল
জ্বলে উঠে মানবের চিতে, ভস্মাবৃত
হুতাশন যথা চণ্ড পবনের বলে।
তানপুরা, পাখােয়াজ, মৃদঙ্গ, সেতার,
এস্রাজ, তাউস, বীণ, একতারা আদি
বাদ্য যন্ত্রে উঠে বােল সরস মধুর,
কর্ণে ঢালে মধু মন আবেশে বিভাের।
একদা সবারে আলা করিয়া বিদায়,
বয়স্তেরে সম্বােধিয়া সরল অন্তরে
কহিতে লাগিলা “শুন, প্রিয় বন্ধুবর,
হৃদয়ের এককোণে নিভৃত নিলয়ে
কৃপণ যেমন ধন রাখে লুক্কায়িত,
ততােধিক লুকায়িত ভাবে, পুষিতেছি
আশা এক, সংগােপনে অতি, বহুদিন
হ’ল আজি তাহা, কিন্তু সময় অভাবে
সময় অভাবে কেন ? আলস্য করিয়া
তােমার নিকটে আজো করিনি প্রকাশ।
প্রাণের সুহৃৎ তুমি, তােমারে কখন
৬
দেবলা ।
;
।
ভিন নাহি ভাবি আমি ; দুই আলা, এক
মন প্রাণ ; তব যুক্তি বিনা কহ দেখি
ভ্রাতঃ ! কোন্ কাৰ্য্য কবে করেছি সাধন ?
রাজনীতি ক্ষেত্রে, কিবা সমর ব্যাপারে,
নিয়ম গঠনে, কিম্বা প্রকৃতি পালনে,
তব পরামর্শ বিনা কইকোন্ কালে
কোন্ কাযে হস্তক্ষেপ করিয়াছে আলা?
সুধাই তােমারে তাই দেহ সুযুকতি,
কেমনে পূরিবে মম হৃদয়ের আশা।”
শুনিলা সম্রাট বাক্য বয়স্য নীরবে,
হাসিলা অমনি হাে হো করি ; অনন্তর
রঙ্গ করি কহিলা বয়স্য ;—“দিল্লীশ্বর।
বুঝিয়াছি আমি তব মনােগত ভাব
কোন উপবনে, কিম্বা রাজোদ্যানে পুনঃ
কুসুম কলিকা বুঝি হয়েছে বিকাশ,
সমীরণ পাশে তাই পাইয়াছ তার
সৌরভ আম্রাণ ; সুখের বারতা ইথে
নাহিক সংশয়, সেই হেতু রসরাজ ! ·
চিত তব ব্যাকুলিত এত, লভিবারে
সে প্রসূন দুরলভ সুতি, তার(ই) আশা
প্রথম সর্গ।
৭
পুষেছ কি নৃপবর হৃদয় কন্দরে
সযতনে সংগােপনে ? জল, ভাল, ভাল,
•কহ তবে কত দূরে কোন্ উপবনে
ফুটেছে সে কমনীয় ফুল। বনে ফুটে
ফুল বনেতেই ঝরে, কিবা ফল তায় ?
বৃথা সে কুসুম তার ব্লথায় সৌরভ,
বৃথা তার সুষমা সম্ভার, যদি নাহি
দেবতা সেবায় লাগে, কিম্বা যদি তাহা
রাজ উপলােগ তরে না আসে কখন ?”
বলিয়া বয়স্ক নীরবিলা।
দিল্লীপতি
বিরক্তি ব্যঞ্জক স্বরে কহিলা তখন,
‘প্রিয়বর। এ মিনতি করি’ পরিহর
রসিকতা; রঙ্গরস বিনা তিল মাত্র
কিহে তিষ্ঠিতে না পার ? রসিকতা বুঝি
তব অঙ্গের ভূষণ ?” আবার বয়স্ক
হাসিলা বিকট হাসি ; “রস নটবর”
সম্বােধিয়া দিল্লীশ্বরে কহিলা মধুরে,
“বারি বিনা মীন কভু পারে কি তিষ্ঠিতে ?
জীবগণ কয় দিন বাঁচে বায়ু বিনা?
;
;
দেবলা।
তেমতি রহস্য বিনা না বাঁচে বয়স্য।
নৃপতির হের যথা মুকুট ভূষণ,
রজনী ভূষণ যথা পূর্ণ শশধর,
বসন্ত ভূষণ যথা কোকিল কূজন,
রঙ্গ রসিকতা জেন তথা বয়স্যের।
নৃপবর রহস্যে-কি কাজ? এক কালে
ত্রিদিব সুন্দরী রূপবতী পদ্মিনীর
ভুবন মােহনরূপ নেহারি দর্পণে
লতিতে তাহারে ইচ্ছা করিলে রাজ,
কিন্তু বামা চিতানলে ত্যজিলা জীবন,
ভস্মে পরিণত হল সােণার প্রতিমা
পূরিল না আশা তব।
পুনঃ হে নরেশ
গুর্জর রাজার রাণী, কমলা সুন্দরী
গুণে রমা, তিলােত্তমা রূপে, চিত্ত তব
করিল হরণ ;কিন্তু সুকৃতির ফলে
পূরিয়াছে আশা, এবে সেই সুভাগিনী
অঙ্ক বিরাজিতা তব ; মনােসুখে আছ
মজি সুধাময় প্রেমে। পুনঃ নর নাথ।
কহ কোন্ সিমন্তিনী হৃদয় তােমার
প্রথম সর্গ।
করিয়াছে অধিকার ? কোন্ রূপবতী
ধাঁধিয়াছে তব আঁখি রূপের ছটায়?”
উত্তরিলা দিল্লী পতি, “আর কেন ভাই!
পদ্মিনীর নাম করি জ্বালাও আমারে?
নিৰ্বাপিত হুতাশনে কি হেতু জাগাও
আর ঘৃতাহুতি দানে ? পদ্মিনী পাপিনী
আত্মঘাতী হয়ে পাপ পরাণ ত্যজিলা,
তার সম পাপিয়সী নাহি ধরাতলে ;
আত্মহত্যা মহাপাপ শাস্ত্রের বচন,
জেনেও পাপিনী পশি’ ঘাের চিতানলে
সঁপিলা আপন প্রাণ, অনন্ত নরকে
হবে বাসস্থান তার, পুড়িবে সদাই
জলন্ত অঙ্গারে, কভু সুগতি না হবে।
আর যারা তার সহ জহরের ব্রতে
অগ্নি কুণ্ডে, দিল প্রাণ, তারাও পুড়িবে
অনন্ত নকৗনলে, তারাও পুড়িবে
তার মত। ভ্রাতৃবর! কমলা অবশ্য
কামিনী কুলের কোহিনুর, বীরােচিত
ভাব তার হৃদয়ের পরতে পরতে
রয়েছে নিহিত, দেখসে প্রমাণ চারু,
১০
দেবলা।
যবে মম সেনাপতি বীর আলেফ খান
মন্ত্রী নসরৎ সহ, ৬ীম পরাক্রমে
গুর্জরের রাজধানী কৈল আক্রমণ,
নৃপতি করুণা রায় পলাইল ত্রাসে ;
মেষ শিশু হেরি যথা ভীষণ শার্পলে।
সমর প্রাঙ্গণহ’তে, প্রাণ ভয়ে পতি
পলাইল নিরখিয়া কমলা সুন্দরী,
ধিক্কারিয়া শত সেই কাপুরুষ মরে
বরিলা অপর বীরে রণে। সাধে বলি
কমলা কামিনী কুল কোহিনুর, মণি।”
বাধা দিয়া এই স্থলে সম্রাট আলারে
কহিলা বয়স্য ধীরে “শােন নৃপবর
সামান্য যে নর তারাে ক্ষুদ্র মনােভাব
অনুমানে কহিবারে পারে কোন্ জন ?
সম্রাট আপনি ; শত উচ্চ অভিলাষ
নিমেষে উদয় তব মহান্ হৃদয়ে
আঁখির পলকে পুনঃ হয় তিরােহিত,
বিশাল বারিধি মাঝে তরঙ্গ নিচয়
মুহূর্তে উদয় লয় যথা। তাই বলি,
কহ যদি বিবরিয়া, জানিবারে পারে
;
প্রথম সর্গ।
তবে এ কিঙ্কর তব।” বলি নিরবিলা।
“সত্য যা কহিলে তুমি” আরম্ভিলা আলা
“সত্য তব বাণী ; কিন্তু আমার সে আশা
দুরাশা বলিয়া যেন লয় মম মনে।
একদা যামিনী যােগে পৰ্যটন কালে,
উপনীত হইলাম নগরের মাঝে
বিপণি সম্মুখে এক ; দেখিলাম তথা
শুনিছে একাগ্ৰমনে মিলি কয় জন,
বীরত্ব কাহিনী পূর্ণ ‘সেকেন্দার’ নামা •
দিগ্বিজয়ে বাহিরিয়া সেকেন্দার বীর,
উলঙ্গ কৃপাণ করে জিনিছে সমরে
সামন্ত ভূপাল গণে; শুনিছে সকলে
আর সাবাসিছে বাহুবল উঁর ; শুনি’
তার শৌর্য বীর্য গাথা আমিও দিলাম
মাথ
তারে শত ধূন্যবাদ। শুন ভ্রাতৃবর !
তদবধি এই আশা জাগিছে অন্তরে
সেকেন্দার মত আমি হব দিগ্বিজয়ী।
এতবলি নীরবিলা দিল্লী অধিপতি।
“উত্তম, উত্তম অতি উত্তম” সহাস্যে
কহিলা বয়স্য ত্বরা ‘হৈ মহারাজ।
১২
দেবলা।
উত্তম এ আশা তব, জগতে নিয়ম
এই ; ক্ষুদ্র কবি শুনি সুকবির যশ
অভিলাষ হয় তার সুকবি হইতে,
রচিতে কবিতা গাথা সুকবি মতন।
সুদৃষ্টান্তে সদা ফলে সুফল রাজ।
বিধাজ করুন তুমি হও বিশ্বজয়ী,
সুযশ কিরণ তব ভাতুক মেদিনী,
সামন্ত নৃপতি গণ হ’ক পদানত,
কিন্তু প্রভু কর অগ্রে করতল গত
সমগ্র ভারত, পরে করাে দিগ্বিজয়।”
“কহ তবে ভ্রাতৃবর!” জিজ্ঞাসিলা আলা
“কোন্ দিকে অভিযান করিব প্রথম ?”
ধীরি ধীরি উত্তরিল বয়স্য তখন
“হইয়াছে ভারতের উত্তর পশ্চিম
শাসন অধীন তব; পূরব, দক্ষিণ
এবে বাকী মাত্র হেরি, তাই বলিতেছি
‘দক্ষিণে প্রথমে কর যুদ্ধ অভিযান ;
বিধির কৃপায়, গললগ্নীকৃত বাসে
যত রাজা গণ আজ্ঞা পালিবে তােমার
গুরু আজ্ঞা সম। বিধাতার ইচ্ছাক্রমে
দ্বিতীয় সর্গ ।
;
হবে রাজ চক্রবর্তী ; জয়-গীত তব
উঠিবে ব্যাপিয়া বিশ্ব। কিন্তু রেখ মনে
তব চির অনুগত এই দীন জনে,
ভুলনা তখন।” এত বলি মীরবিলা
বয়স্য প্রবর। “তথাস্তু, তথাস্তু, অতি
উত্তম যুকতি তব” বলি হাসি হাসি
বাড়াইল দুই কর দিল্লীশ্বর আলা,
বয়স্যের পান, ধরি গলায় গলায়
আলিঙ্গিলা সমাদরে। সানন্দ অন্তরে
তেয়াগিলা অতঃপর উভয়ে আসন।
দ্বিতীয় সর্গ।
অয়ি গাে কল্পনে মানস বাসিনি,
কবিগণ চিত্ত্বে সুখ প্রদায়িনি,
কবিকুল-পূজ্যা, দয়াবতী তুমি,
তােমার দয়ার নাহি গাে সীমা ;
তুমি,কৃপা যারে কর গাে কল্পনে,
কিসের অভাব তার এ ভুবনে,
?
১৪
দেবলা।
শােক, তাপ, দুঃখ, দারিদ্র ভীষণ
নিমেষে পলার হেন মহিমা।
তােমার প্রভাবে যত কবি গণে,
দিব্যজ্ঞান লভি অসাধ্য সাধনে,
সুদূর প্রসারি বিজ কানন
চন্দ্রাতপ যাহে পাতার রাশি,
দিবাকর কর তীব্র অতিশয়,
পারে পশিতে মানে পরাজয়,
তােমার সাহায্যে কবিগণ তথা।
অনাসে প্রবেশ করে গাে হাসি
গভীর সাগরে তরঙ্গ সহিত
ক্রীড়া করে রঙ্গে কভু নহে ভীত,
কভু তলদেশে করিয়া গন
রত্ন রাজি হেরে হরষ ভরে ;
ভীষণ দর্শন জল জহুগণ,
প্রবাহের সনে দেয় সন্তরণ,
কবিগণ তাহা মানুস নয়নে
হেরে কল্পনে । তােমার বরে।
দ্বিতীয় সর্গ।
অভ্রভেদী ওই পর্বত শিখর, ,
কটিতটে যার ঘন জলধর,
মাথার উষ্ণীষ পড়ে গাে খসিয়া
বারেক চাহিলে যাহার পানে,
কিছার মান। দেব সমীরণ,
আরােহিতে যাহে নারে কদাচন,
তদুপরি কবি করে আরােহণ,
হাসিয়া হাসিয়া পুলক প্রাণে।
স্বর্গ-ধামে পশে ত্যজি ধরাধাম,
সুধানদী যথা বহে অবিরাম,
শােক, তাপ যথা না পারে পশিতে,
চিরশান্তি যথা বিরাজ করে,
মন্দার কুসুম অপূর্ব সুষমা,
এ জগতে তা কি দিব উপমা ?
নন্দন কাননে নিত্য বিকশিত,
সৌরভে মজায় সুর নিকরে।
দিবাঙ্গনাগণ মুক্ত কেশ দাম,
কিরূপ মাধুরী গঠন সুঠাম,
১৬
দেবলা ।
সুমধুর স্বরে নানা রাগ রঙ্গে
সুধামাখা গান
গাইছে সুখে ;
পুণ্যাত্মা মানব, স্বর্গবাসিগণ,
সে গান শুনিয়া পুলকিত মন,
তােমার প্রসাদে সে সুখ-সঙ্গীত
গায় কবিগণ শতেক মুখে।
কভু লেখে কবি নরকের কথা
কালানল জুলে ধক ধকে যথা’
দীপ্ত শিখা উঠে ভেদি ব্যোম দেশ,
ঝলসে নয়ন এমনি তাত্ ;
পাপীরা পুড়িছে সংখ্যা নাহি যার,
পুড়ে কাল কাল বিকট আকার,
দুর্গন্ধ উৎকট! বমি আসে গায়,
মুখ দিয়া উঠে পেটের ভাত।
পুরীষের বাশ গন্ধে প্রাণ যায়,
গিজি গিজি করে পােকা গুলাে তায়,
নাকে, মুখে, চোখে, টুকে পাপীদের
রক্ত মাংস মজ্জা টানিয়া খায়
দ্বিতীয় সর্গ।
১৭
সাপ, বিছে আদি বিষধর গণ,
পাপীদের করে ভীষণ দংশন,
দৰ্বাঙ্গ ফুটিয়ে লালা পূজ পড়ে,
আৰ্তনাদ ঘাের উঠিছে হায় ।
সূৰ্য্যমুখী স্থলে, জলোকমলিন,
রবি হেরি কেন হয় গাে সুখিনী ;
কুমুদিনী ফুল্ল কেন হেরি চাঁদে
বসন্তে কোকিল কেন বা গায়,
সৌদামিনী কেন হাসে জলধরে,
ঘন হেরি কেন শিখী নৃত্য করে,
কি বলি ভ্রমর ভুলায় কুসুমে,
তবভক্ত কবি জানে গাে তায়।
তব ভক্তগণ প্রসাদে তােমার,
লভেছে জগতে সুযশ অপার,
তুলি মনােলােভা সুকীৰ্ত্তি কেতন,
মরেও অমর হয়েছে সবে;
তাইগাে কল্পনে নিবেদি’ তােমায়,
কৃপাকণা দান করগাে আমায়,
১৮
দেবলা।
তব অনুগত রব চিরদিন
জীবন আমার সফল হবে।
নিরজন এই নিশীথ সময়,
স্বকাৰ্য্য সাধনে সবে রত রয়,
কি নরঘাতক, তস্কর বঞ্চক,
কিবা যােগী ঋষি ধাৰ্ম্মিক যত ;
চলগাে কল্পনে যাই একবার,
সম্রাট ভবনে সঙ্গেতে তােমার,
হেরিব ভথায় দিল্লী অধিপতি
কোন্ কাৰ্য্যে এবে রয়েছে ব্রত।
সুন্দর সজ্জিত প্রকোষ্ঠের মাকে,
সুকোমল শয্যা পালঙ্কে বিরাজে,
তদুপরি আল তাকিয়া হেলনে
রয়েছে আয়াসে আধ শায়িত
আবােলা নল ভুজঙ্গের প্রায়,
পড়িয়াছে হায়!
সুগন্ধি তামাক পুড়িছে তাবায়,
সুগন্ধে চৌদিক পরিপূরিত।
রত্ব বিখচিত
দ্বিতীয় সর্গ।
আলার অঙ্কেতে কমলা সুন্দরী,
সুখাবেশে শির রাখি বক্ষাপরি
ঈষৎ হেলিয়া সপ্রেম নয়নে
রয়েছে চাহিয়া আলাম পানে;
সহকার শাখে সুবর্ণ লতিকা
তথা মনােল্লাসে প্রেমিক প্রেমিকা,
সােহগের ভয়ে রহি’ জড়াইয়া,
কটাক্ষ শায়ক সঘনে হানে।
সুরসিক আলা বাম কর দিয়া
কমলার কটি আছে জড়াইয়া,
দক্ষিণে ধরিয়া আবােলা নল,
ধীরে ধীরে ধীরে দিতেছে টান ;
কভু কমলার গােলাপী বরণ,
চুম্বি’ গণ্ড দ্বয় করিয়া যতন,
তাম্বুল রঞ্জিত অধর পল্লবে ,
প্রেমভরে সুধা করিছে পান।
ক্ষণপরে আলা চিবুক ধরিয়া
কমলারে হেন কহিলা হাসিয়া,
দেবলা।
“কহ বিধুমুখি ! কহ বিবরিয়া
সুখে কিম্বা দুঃখ রয়েছ হেথা,
দাস দাসী সেবা করে কি প্রকার ?
পরিজন সবে কেমন ব্যভার,
করে তােমা
প্রতি, কহ বরাননি ?
জানিতে বাসনা সকল কথা।”
বলি আলা বিধু বদন চুমিল,
অমনি কমলা মুচকি হাসিলা,
সরসীর মাঝে যথা কমলিনী
হাসে গাে রবির কর পরশে;
“জাঁহাপনা” বলি কহিলা তখন,
পরাভবি’ শত কোকিলা কূজন,
কিম্বা সমস্বরে যেন শত বীণা
বাজিয়া উঠিল মরি হরষে
“জাহাপানা! আমি সামান্য রমণী
রাজ সুখে যাপি দিবস রজনী,
দিয়াছ থাকিতে সুরম্য প্রাসাদ,
বিলাস সামগ্রী সজ্জিত যায়
দ্বিতীয় সর্গ।
২১
শ্বেত, পীত, নীল, লােহিত
বরণ,
সাচ্চা কাজ করা সুচারু বসন,
মাণিক্য খচিত অমূল্য ভূষণ,
হের নাথ ! শােভে দাসীর কায়।
“নানাবিধ চব, চোষ্য, লেহ, পেয়,
ভােজন কারণ খাদ্য উপাদেয়
সদাই প্রস্তুত ; দাস দাসী সেবা
করে রীতিমত সদাই মম ;
শােন প্রাণেশ্বর! তব পরিজন
ভিন্ন বলি মােরে ভাবেনা কখন,
স্নেহ করি কত ভালবাসে মােরে,
অভিন্ন হৃদয়া সঙ্গিনী সম।
“কুমার খেজের সরলতাময়,
মাতৃ সম করে ভক্তি অতিশয়
ৰূপে অনুপম, পঙ্কজ আনন, .
গুণে অলঙ্কত হৃদয় তার
কি কহিব নাথ ! নিখি’ কুমারে
ব্যথা পাই বড় মনের মাঝারে,
•
দেবলা।
।
শশাকে হিয়া জ্বলে না পারি নিভাতে,
দর দর বহে নয়নাসার।”
ছাড়ি’ দীর্ঘ শ্বাস কমল তখন,
আনত করিলা কমল বদন,
ঘন জলধরে ঢাকিলে তপন
বিষাদে মলিন নলিনী প্রায় ;
‘একি বিপরীত ! আলা ভাবে মনে,
সহসা এরূপ হইল কেমনে,
শারদীয় পূর্ণ সুবিমল শশী
অকস্মাৎ রাহু গ্রাসিল হায়!
“কহ প্রিয়দে” প্রকাশি’ কহিল,
“শােক সিন্ধু তৰ কেন উথলিল ?
রূপে গুণে বুঝি কুমার সদৃ
ছিল তব এক নয়ন মণি?
হারায়ে সে ধন দুর্ভাগ্যের ফলে,
ভাসিছ দুর্বার নয়নের জলে,
শােকসিন্ধু তেঁই পড়িছে উছলি’
স্মরণ করিয়া তারে লাে ধনি ?”
দ্বিতীয় সর্গ।
“না, না, হৃদয়েশ ঠিক তাহা নহে,
বহু পুণ্য ফলে বিধি অনুগ্রহে,
লভেছিনু এক কন্যা সুলক্ষণা
রূপ গুণবতী দেবলা নামে;
দুরদৃষ্ট হয় ! বঞ্চিতা সে ধনে,
পুনঃ যদি পাই জুজই জীবনে,
হাতে যেন পাই গগণের চঁাদ,
মন্দার কুসুম এ ধরাধামে।
r
“কিন্তু হায়! নাথ এ আশা আমার,
মিটিবে না কভু পূরিবে না আর ।
হায়রে ! অসার স্বপন নিশার,
বাস্তব হয়েছে কোথায় কবে ?
আহা যদি কোন হতভাগ্য জন,
গভীর সাগরে হাতের রতন,
ফেলাইয়া দেয় বল দেখি প্রিয়।
পায় সে কি তাহা ফিরিয়া তবে
ছাড়িয়া হুতাশ নীরবিলা রাণী,
উত্তরিল আলা “কেন চন্দ্রাননি,
২৪
দেবলা।
থাকে যদি কেহ সুদক্ষ ডুবুরী
আনিবে সে রঙে তুলি অনা’সে !
সুলােচনে যদি অনুমতি পাই,
শত শত বীরে এখনি পাঠাই,
যেখানে পাইবে দেবলা রতন,
আনিবে সর তােমার পাশে।”
=
=
বলি আলা তার বদন চুমিলা,
হাসি হাসি রাণী সম্রাটে কহিলা,
“এ দুঃখিশী চির রহিল বাধিত,
শােন প্রাণেশ্বর ! চরণে তব
রূপ-গুণ-যুত খেজের তােমার,
রূপ-গুণ-যুতা দেবলা আমার,
এক বৃন্তে দু’টি কুসুম কলিকা
ধরিয়াছে যেন শােভা কি কব ?
৫৫
‘শােন দিল্লীপতি তাই সাধ মনে,
পরিণয় সূত্রে গাঁথিয়া দু’জনে,
অতুল সুষমা, অপূর্ব মাধুরী
নেহারিব সদা নয়ন ভরি;
দ্বিতীয় সর্গ।
হংস হংসী প্রায় প্রণয় সরসে,
সরিবে দেহে মনের হরষে,
চিত্রা চন্দ্র কিম্বা গগনের ভালে,
শােভিবে
অতুল, অতুল মরি।”
“আঃ মরি প্রেয়সী? কহিলা ভূস্বামী,
সুখময় সাধ অবিলম্বে আমি
পূরাইব তব ; পাইবে নিশ্চয়
সত্বর দেবলা রতনে রাণি
পশ্চিমে ভানুর সম্ভবে উদয়,
শুষ্ক শাখে যদি নব পত্র চয়,
অমারাতে উঠে পূর্ণ শশধর,
বৃথা না হইবে আমার বাণী।
এত বলি আলা কমলা প্রিয়ারে,
জড়ায়ে সাদরে হিয়ার মাঝারে,
দিয়া আলিঙ্গন সপ্রেম চুম্বন,
কক্ষান্তরে গেল হৃদয়ে রাখি,
আলা পানে রাণী চাহি’ কতক্ষণ,
( অলি পানে মরি কুসুম যেমন )
দেবলা।
কোমল শয্যায় করিলা শয়ন
নিদ্রাবেশে ধীরে মুদিলা আঁখি।
তৃতীয় সর্গ ।
কৃষ্ণপক্ষ নিশি ঘাের অন্ধকার ময়,
ঘাের ঘটাকার ঘন ব্যাপ্ত বিশ্বময়,
ভীষণ দর্শন সৃষ্টি,
হার মানিয়াছে দৃষ্টি,
দূরে কি অদূরে কিছু না হয় দর্শন,
একাকার তমােময় মেদিনী গগন।
থেকে থেকে সৌদামিনী চমকে চঞ্চল,
ধাঁধায় নয়ন, দীপ্ত করে মহীতল ;
মূহুৰ্ত্ত উজলি ধরা,
প্রেমিকার হাসি পারা,
লুকায় জলদ মাঝে চকিতে আবার,
বাড়ায় জগতে পুনঃ দ্বিগুণ আঁধার।
তৃতীয় সর্গ।
२१
তার সহ ভীমনাদে গরজে অশনি,
কড় মড় শব্দে ঘাের কঁপায় অবনী,
সহস্র কামান প্রায়,
একেবারে গর্জে হয় ।
শ্রবণ বধির হয় কেঁপে উঠে প্রাণ,
ভেবে সবে পরমাদ। অবাক অজ্ঞান !
হেরি’ প্রকৃতির হেন মূরতি ভীষণ,
নীরব অবনী, ভয়ে স্তব্ধ সমীরণ,
জননীর কোলে শিশু,
কাননে গহবরে পশু,
কুলায়ে বিহগগণ জড় সড় ভয়ে,
স্থির অচঞ্চল তরু, লতিকা নিয়ে।
এ হেন সময়ে এক কুটীরের মাঝ,
বসে বীর কতিপয় পরি রণসজ ;
তাহাদের পাশে হায় !
বসেছে করুণা রায়
হৃত রাজ্য বিহীন শ্রী
নিশা অবসানে
নিষ্প্রভ শশাঙ্ক যথা পশ্চিম গগনে।
;
দেবলা ।
-
প্রকৃতি যে ভাব আজি করেছে ধারণ,
করুণার হৃদে হেরি তার নিদর্শন ;
জলদে দামিনী হাসি
ক্ষণেক তিমির নাশি,
দীপ্ত করে ধরাতল উজ্জ্বল প্রভায়,
পুনঃ মেঘে পশি’ ধরা আঁধারে ভুৰায়
রাজ্যোদ্ধার আশা তথা উদি’ কতবার,
করুণার হৃদে, দীপ্ত
দীপ্ত করে মুখ তার ;
পুনঃ সেই আশা হায় ।
অনন্তে মিশিয়া যায় ;
নিরাশ ভিমিরে ঢাকে করুণার মন,
বিষাদ কালিমা মাখে প্রফুল্ল আনন।
বিরলে বসিয়া ওই বীর কয় জনা,
কেমনে লভিবে রাজ্য করিছে জল্পনা,
খেদাইয়ে করুণায়,
গুজরাটের রাজ্য হায় !
দখল করেছে আলা খিলজি প্রধান,
কেমনে উদ্ধার হবে ভাবিছে সন্ধান।
s
তৃতীয় সর্গ।
হেনকালে ভৃত্য এক প্রবেশি’ তথায়,
প্রদানি পত্রিকায় কহিল সবায়
“অশ্বারােহী দুই জন ;
করি বহু অন্বেষণ,
দিয়া গেল মহারাজে এই পত্রদ্বয়,
আনিনু গােচরে এরে কিবা আজ্ঞা হয়।”
“ভাল, ভাল, যাও ত্বরা বাহির দুয়ারে”
বলিয়া করুণারায় বিদাইল তারে ;
অতঃপর শশব্যস্তে,
পত্র এক তুলি হস্তে,
দেখিলেক শিরােনামা পারসী অক্ষরে,
যুরিল মস্তক, হিয়া দুরু দুরু করে।
“বুঝেছি এবার মম নাহি পরিত্রাণ
কহিলা করুণারায় কম্পিত পরাণ,
“এতদিন শত্রুগণ,
করি নানা অন্বেষণ,
সন্ধান পাইল মম বধিতে জীবন,
করিয়াছে তেঁই বুঝি পত্রে নিমন্ত্রণ।
দেবলা।
“ভাঙ্গিল সুখের স্বপ্ন, বৃথা রাজ্য-আশ,
বৃথা এ জল্পনা আর বৃথা এ প্রয়াস,
শিয়রে শমন যার,
বৃথা আশা করা তার,
ভুঞ্জিতে সংসার সুখ পূরাইয়া সাধ,
অবিলম্বে ঘটে তার হরিষে বিষাদ।”
“কি হেতু রাজন, এত হতাশ অন্তর ?
সদর্পে জনেক যােদ্ধা করিলা উত্তর
‘যতক্ষণ বহে শ্বাস,
ততক্ষণ রহে আশ,
আশাকে কে কবে বল করে পরিহার ;
আশায় রয়েছে হের নিখিল সংসার।
“দেহত রাজন্ আমি পড়ি পত্র খান
যাহয় উচিত মােরা করিব বিধান।”
বলি সেই বীরজন,
লিপি করি উন্মােচন,
পড়িলেক উচ্চকণ্ঠে পত্রের লিখন,
নীরবে বসিয়া সবে করিল শ্রবণ।
তৃতীয় সর্গ।
৩১
“শুনহে করুণরায় করি বিজ্ঞাপন,
সম্রাটের অনুমতি তোমারে এখন,
তব পত্নী কমলার
গর্ভে অতি চমৎকার,
রূপ গুণবতী এক জনমে দুহিতা,
দেবলা সুন্দরী নাম জগত বিদিতা।
“বহু দিন তঁারে রাণী না হের নয়নে,
সতত কাটেন কাল বিষাদিত মনে।
আদেশ আমারে আছে,
পাঠাতে জননী কাছে,
দেবলারে রাজধানী দিল্লীতে সত্বর,
দিবে কিনা? কল্য তার দিও সদুত্তর।”
“হায় কিবা পরিতাপ !” বলিয়া করুণ,
বাজিল অন্তরে যেন শেল নিদারুণ,
“হৃত রাজ্য, গত মান,
কি দুঃসহ অপমান,
এখনাে নিশ্বাস কেন বহিতেছে হায় ।
প্রাণ বায়ু কেন নাহি অনন্তে মিশায় ?
দেবলা।
“এখনাে মাথায় কেন পড়েনি অশনি ।
দ্বিধা নাহি হয় কেন এখনো ধরণী
কেন কাল বিষধরে
দংশন নাহি করে,
হিমাচল চূড়া কেন পড়েনা মাথায় ?
হেন অপমান আর সহা'নাহি যায় ।
“রে বিধা।
আমা প্রতি কেন হেন নিঠুর ব্যভার
কিবা অপরাধ আমি করেছি তােমার ?
যেই দিন শত্রুগণে,
পরাস্ত করিল রণে
যেদিন সৌভাগ্য-রবি অস্তমিত হল,
আমার জীবন দীপ কেননা নিভিল ?
“আবার যে দিন অহো ! বিদরে হৃদয়
কেমনে কহি 'সে কথা ! বিধর্মী নির্দয়
লক্ষীৰূপী কমলায়,
ধরিয়া ভেটিলা হায় !
দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দিন সদন ,
সে দিন হলনা কেন আমার মরণ ?
তৃতীয় সর্গ।
‘আজি পুনঃ পাপ কথা এ পাপ শ্রবণে
শুনিতে হইল অহাে ধক এ জীবনে !
বল বল কোন প্রাণে,
বিধর্মী মুসলমানে ;
সমৰ্পণ করি হায় ! স্নেহের কুমারী,
সােণার প্রতিমা সুমা দেবলা সুন্দরী ?
“হা দেবলে! প্রাণাধিকে ! তুমিগাে আমার,
কন্যা না হইয়ে যদি হইতে কুমার,
তা হলে কি হিয়া মাের,
শােকানলে দহে ঘাের
করিতে কি পারে পাপী হেন অত্যাচার,
লইতে কৃপাণ ধরি প্রতিশােধ তার ।
“অথবা জন্মিয়া যদি হইত মরণ,
তাহলে লভিত শান্তি এ পাপ জীবন:
অহহ কিবা পরিতাপ ।
কিসে ঘুচে মনস্তাপ,
বল বল এর কিবা আছে সদুপায়,
মস্তক ঘুরিছে অহহ বুক ফেটে যায় !”
৩৪
দেবলা।
বলিয়া করুণারায় হইল মূচ্ছিত,
বজ্রাহত তরু যথা ভূতলে পতিত ;
ত্বরা করি এক বীর,
তুলিয়া তাহার শির,
সেচন করিতে বারি মুখে বার বার,
মেলিল নয়ন হ’ল জ্ঞানের সঞ্চার !
।
অহহ ! শব্দে ছাড়ি এক সুদীর্ঘ মিশ্বাস,
তুলিল করুণারায়—অন্তরে তরাস
অপর পত্রিকা খান,
দেখি তার শিরােনাম,
মহারাষ্ট্র ভাষে, ত্বরা করুণা তখন
পড়িতে লাগিল তার খুলি আবরণ।
“শােনহে করুণারায় গুর্জর নৃপতি,
মম নিবেদন কহি করিয়া প্রণতি,
রামদেব নাম মম,
বিক্রমে কেশরী সম—
আছয়ে শঙ্কর, দেব আমার নয়,
দেবগিরি রাজ্য মম শুন পরিচয়।
তৃতীয় সর্গ।
“শুনিলাম আছে তব অনূঢ়া দুহিতা
রূপের মাধুরী গুণে ভুবনে বিদিতা,
তাহার সম্বন্ধ আশে,
আসিলাম তব পাশে
কৃতার্থ হইব মম পূরিলে কামনা,
কিবা তব অভিপ্রায়জানিতে বাসনা।”
“উভয় সঙ্কট মোর” কহিলা করুণা।
“কোন পথে যাই এবে দেহ সুমন্ত্রণা ;
এদিকে বিধর্মিগণ,
সন্ত্রাসিছে অনুক্ষণ,
ওদিকে শঙ্কর দেব মহারাষ্ট্র কুলে,
কেমনে বা দেবলায় সঁপি হস্ত তুলে।”
‘শুনহে রাজন’ বলি একজন বীর,
উত্তরিল করুণায় বচন গম্ভীর;
“কালপাত্র ভেদ জ্ঞানে,
কাৰ্য করে সুধী জনে,
অবস্থা বুঝিয়া করে ব্যবস্থা যে জন,
জগতে পণ্ডিত নাহি তাহার মতন।
দেবলা।
দেখেছ বিধৰ্ম্মিগণ চতুর কেমন,
কেমন সুন্দর হের লিপির গঠন,
দুষ্ট, আলা দুরাচার,
ভাণ করিকমলার
লভিতে দেবলা ধনে পাতিয়াছে জাল,
পাবেনা সে ধনে যদি নিজে আসে কাল
-
“চাহিতেছে রামদেব মহারাষ্ট্রপতি
দেবলায় পুত্রবধূ করিতে নৃপতি !
জন্ম মহারাষ্ট্র বংশে,
হীন নহে কোন অংশে,
রাজপুত কুলে কিন্তু জনম তােমাব ;
তেই তব অসম্মতি বুঝিলাম সার।
“কিন্তু দেখ মহারাজ করিয়া বিচার,
. উভয়ে ক্ষত্রিয় জাতি মিছা নহে তার,
কুলে ভিন্ন হলে হায় !
বল কিবা হানি তায় ?
সম জাতি ভিন্ন কুলে হলে পরিণয়
কোন ক্ষতি নাহি তাহে সর্ব শাস্ত্রে কয়।
তৃতীয় সর্গ। ; “বিশেষ শঙ্করে কন্যা কৈলে সম্প্রদান, হইবে অশেষ লাভ, বাঁচিবেক মান ; নতুবা বিধৰ্ম্মিগণ, করি বল প্রদর্শন, হরিবে দেবলা ধনে পাইবে যথায়, কলঙ্ক রটিবে তব বিশাল ধরায়।” নীরবিলা বীরবর; সকলে তখন উত্তম যুকতি বলি করিলা গ্রহণ; নীরবে করুণারায় ভাবি এবে নিরুপায় শির নাড়ি জানাইল স্বীয় অভিমত, অপাঙ্গ বহিয়া অশ্রু ঝরে অবিরত। অতঃপর মহােৎসাহে যত বীরগণ দু’টি কাৰ্য সাধিবারে করিল মনন । প্রথম, শত্রুর সনে মাতিবে তুমুল রণে; দ্বিতীয়, শঙ্কর সহ বিবাহ কারণ- অবিলম্বে দেবলারে করিবে প্রেরণ
দেবলা।
চতুর্থ সর্গ।
1
নিস্তব্ধ মন্ত্রণা-গৃহ; সুউচ্চ আসনে
বসিয়াছে দিল্লীপতি গম্ভীর মুরতি,
‘আঁখিদ্বয় তার, অস্ত প্রায় রবি সম
রক্তিম বরণ ; ঘন ঘন চারিদিকে
ঘুরিছে নিয়ত ; মুখে প্রতিভা আহা
প্রতিজ্ঞা ভীষণ ; আহত ভুজঙ্গ সম
ছাড়ে ঘন্ তপ্ত শ্বাস ; বদ্ধ মুষ্টি তার
হেরিলে অন্তরে হয় আতঙ্ক সঞ্চার।
;
;
;
সম্মুখে আসীন মন্ত্রী, আনত বয়ান,
চিন্তারত স্থির নেত্রে করে বিলােকন
লিপি এক ; জন কয় আশে পাশে তাঁর,
• রয়েছে বসিয়া সবে নিস্পন্দ নীরব ;
করযােড়ে রহিয়াছে
অদূরে
দাড়ায়ে
দূত এক চিত্রার্পিত ছবির আকার ।
হেরিলে এ সব হয় এ ভাব উদয়,
বুঝি কোন অভাগার নিকট সংশয়।
t
চতুর্থ সর্গ।
কহিল সম্রাট
“কহ মন্ত্রি কহ ফিরে, মালিক কাফুর
কি লেখেছে পত্র মাঝে ?”
জলদ গম্ভীর স্বরে। “মৰ্ম্ম এই তার”
উত্তরিল মন্ত্রী, “আহা দুবুদ্ধি করুণা
অবহেলি আজ্ঞা তব, দেবগিরি পতি
শঙ্কর দেবের সহ দেবী দেকলার
দিবে পুরিণয়; পুনঃ বহু আয়ােজন
করিতেছে স্বীয় রাজ্য উদ্ধার কারণ।”
ঘৃতাহুতি দিলে যথা জ্বলে হুতাশন,
জ্বলিল আলার অঙ্গ রােষে ততােধিক,
আরাে ঘাের হ’ল তার ঘােরাল নয়ন,
কঁপে অঙ্গ থর থর, কঁাপে যে প্রকার
ধরাতল ভূকম্পনে হায়! দণ্ডে দণ্ডে
দংশনে অধর হ’ল রুধির বরণ,
বজ নাদ জিনি’ ঘাের করিয়া গর্জম
কর্কশ বচনে আলা কহিলা তখন।
“দুবুদ্ধি করুণারায়, ভীরু, কাপুরুষ,
রাজপুত কুল গ্লানি সমর বিমুখ,
দেবল।
জগত হাসায়ে আর বীর ধৰ্ম্ম ভুলে,
সমর প্রাঙ্গণ ই’তে মেষ শিশু প্রায়
করি পলায়ন, ঘাের কলঙ্ক-কালিমা
লেপন করিল ছি ছি!” রাজপুত কুলে ।
সেই ভীরু মম আজ্ঞা করেছে লঙ্ঘন ?
নিশ্চয় এবারে তার নিকট মরণ।
“রাজদ্রোহী হয়ে পুনঃ লিপ্ত ষড়যন্ত্রে।
মূষিক হইয়া চাহে করিবারে রণ
মত্ত করি সহ ; ধূৰ্ত্ত
শৃগালের প্রায়
কেশরীর সহ চাহে করিতে সংগ্রাম ।
খগরাজ সহ আহা সামান্য পতঙ্গ
আসে যদি মত্ত হয়ে সমর আশায়,
অচিরেই মিটে তার রণ কয়ণ
বুদ্ধি দোষে যায় ত্বরা শমন ভবন।
।
“দুৰ্ম্মতি শঙ্কর দেব, রাম দেবত,
জেনেও আমার আজ্ঞা করুণার প্রতি
এরূপ ধৃষ্টতা কেন এত দর্প তার !
দেবলারে চাহিয়াছে করিতে বিবাহ ?
চতুর্থ সর্গ।
৪১
ভুলেছে সে দিন যবে পিতা পুত্র ভয়ে
পরাস্ত মানিল দোহে বিক্ৰমে আলার :
ধন রত্ন, জনপদ, করিয়া প্রদান
শান্তিলা আমার রােষ পেল প্রাজ্য প্রাণ!
“কুহ মন্ত্রি ! কি হেতু নীরব আজি তুমি
বীর শূন্য হয়েছে কি সম্রাট সেনানী ?
নাহি কেহ বুঝি আর হেন বীর জন,
বিদ্রোহী করুণারায়ে, দুষ্ট রামদেবে,
ত্বরায় বাঁধিয়া আনে সম্মুখে আমার;
অথবা বিক্রমে ধরি অসি খরশান
ভূমে কাটি পাড়ে শির ছাগমুণ্ড প্রায় ;
সমুচিত শাস্তি তবে পাপীগণ পায় ।
“বাস্তবিক যদি মন্ত্রি নাহি হেন বীর,
আপনি যাইব রণে পরি বীর সাজ ;
এখনাে রয়েছে শক্তি মম ভূজ দ্বয়ে,
এখনাে এ মুষ্টি পারে ধরিতে কৃপাণ,
এখনাে সাহস নাহি হারায়েছে কাল,
কল্যই আনিব বাঁধি রাজদ্রোহী দ্বয়ে
দেবলা।
কহ মন্ত্রি সত্য করি নাহি কোন ভয়,
গােপন করিলে ফল হবে বিষময়।”
নীরবিলা নৱনাথ। মন্ত্রী ধরি ধরি
কহিতে লাগিলা হেন সম্রাটে তখন,
“কি হেতু এ ক্রোধ তব কহত রাজন
আপনার রণসাজে কিবা প্রয়ােজন ?
সামান্য পতঙ্গ যদি করে আস্ফালন
নিভাইতে জ্বলন্ত প্রদীপ, কতক্ষণ
রহে তার প্রাণ? যুক্তি করি শিবাগণ
পারে কি সিংহের খাদ্য করিতে হরণ ?
“নৃপবর! কভু যদি অতল অর্ণবে
ঘটে জলাভাব, কিম্বা মরুভূমি হয়
বালুকায় দীন, নীল গগন মণ্ডলে,
যদ্যপি সম্ভবে কভু তারকা অভাব,
তথাপি হে নরপাল, বীরের অভাব
কভু না সম্ভবে তব সেনানী মণ্ডলে।
আছে হেন শত শত বলী যােদ্ধাগণ
ইঙ্গিতে ঘটাতে পারে প্রলয় ভীষণ।
-
চতুর্থ সর্গ।
“মালিক কাফুর তব দক্ষ সেনাপতি,
অতুল সাহস তার বীরত্ব অসীম,
সমর কৌশল তার বিদিত জগতে,
তার সহ আছে সেনা শমনসােদর,
ক্ষিপ্রগতি সংগ্রামে অটল। দাক্ষিণাত্য
জয় হেতু পাঠায়েছি বহু পূর্ব হতে ;
সামান্য ইঙ্গিত যদি করি তারে এবে,
সত্বর আনিবে বাঁধি দুষ্ট রাম দেবে।
“সেনাধ্যক্ষ আলেফ খা, গুর্জর বিজয়ী
শৌর্য বীৰ্য ভূজবলে অজেয় জগতে।
দুৰ্ম্মদ মােগলগণ ভীম পরাক্রমে
প্রলয় ঝটিকা সম ভারত মাঝারে
হায়রে পশিল যবে, যত নরনারী
কপিল আতঙ্কে ; কিন্তু অমিত বিক্রমে
আলেক জাফর সহ কৈল আক্রমণ
পলাইল মােগলেরা ভঙ্গ দিয়া রণ।
;
“রিস্তিদার দুর্গ আহা অবরোধ কালে
বিস্তর সাহায্য তব করেছিল প্রভু
৪৪
দেবলা।
গুর্জরে পশিল যবে সেই, ভয়ে তার
পলাইল দেশ ছাড়ি গুর্জর নৃপতি
নির্বীৰ্য করুণারায়, তপন দিলে
নক্ষত্র দুর্গতি যথা ; এবে পুনর্বার
পাঠাব করুণা-ভীতি বীর আলেক্ খানে
ধরিয়া আনিবে তানে পাইবে যেখানে ।
;
;
নীরবিলা মন্ত্রীবর, রহিল সবাই
বাকশূন্য মৌনীভাবে স্থির কতক্ষণ ;
বাম গণ্ডে বাম কর করিয়া স্থাপন,
ভূতলে রাখিয়া দৃষ্টি থীর, অপলক
বসিয়াছে আলা দিল্লীপতি, অচঞ্চল
ধীর সুগম্ভীর ভাবে, হিমাদ্রি যেমন
প্রবল ঝড়ের পূর্বে প্রকৃতি যেমতি,
আসীন গম্ভীরে তথা ক্ষণেক ভূপতি।
.
“বল তবে মন্ত্রীবর” উত্তরিলা আলা,
প্রতিধ্বনি হ’ল-বল তবে মন্ত্রীবর’
“বল এই দণ্ডে মম সেনাপতি দ্বয়ে
সাহসী কাফুরে আর বীর আলে খাশে
চতুর্থ সর্গ।
৪৫
রামদেব, করুণায় পরাজয়ি রণে
সত্বর বাধিয়া যেন পাঠায় উভয়ে।
সমুচিত দণ্ড হেথা পাবে দুইজন,
শূলে কি করলে ববি জীবন।
“আর শুন মন্ত্রীবর! বলিহে তােমায়,
কত দেশ আসিয়াছে শাসনে আমার
মেনেছে আমার আজ্ঞা ক’জন ভূপাল ?
সত্য বটে পাঠায়েছ মালিক কাফুরে
দাক্ষিণাত্য দিগ্বিজয় হেতু ; কিন্তু কহ
দেখি মােরে, লাগিবেক আর কত কাল
দক্ষিণ ভারতে ? কত দূর অগ্রসর
হয়েছে কাফুর, কহ বিবরি সত্বর ;
শুন দিল্লীশ্বর” মন্ত্রী করিলা উত্তর
“আদেশ করেছি আমি মালিক কাফুরে
সমুদায় দাক্ষিণাত্য কৱিবারে জয়
ভারতের দক্ষিণান্তে করিতে নির্মাণ
জয় স্তম্ভরূপী এক উন্নত মসজিদ,
শােভিবে তাহাতে রক্ত পতাকা বিজয়
৪
দেবলা।
ঘােষিৰে জগতে পুনঃ সম্রাট গৌরব
আমােদিবে' চারিদিক সুযশ-সৌরভ।
“শুভ কাৰ্যে মেন আর বিলম্ব না হয়
উত্তরিলা আলা ; “জানাও কাফুরে মম
শুভ আশীৰ্বাদ, আর বলে দেহ তারে
দাক্ষিণাত্য পরাজয়ি ফেরে শীঘ্রগতি।”
“যথা আজ্ঞ মহীপাল” মন্ত্রী দিয়া সায়
সব কথা বলি দূতে বিদাইলা তারে;
সভা ভঙ্গে গৃহে গেলা আলা দিল্লীশ্বর,
তারকা বেষ্টিত অস্ত গেল নিশাকর।
।
পঞ্চম সর্গ।
রূপসী ললনা গলে,
মণিময় হার দোলে
তার মাঝে মধ্য মণি শােভা করে যেমতি ;
নিখিল পৃথিবী মাঝে,
ভারত বিবিধ সাজে
সর্ব দেশ শিরােমণি শােভা পায় তেমতি।
পঞ্চম সর্গ।
৪৭
মনে হেন লয় মরি, বিধাতা কৌশল করি
জগতের হাট রূপে গড়েছে এ ভারতে;
এ হাটে যা নাহি মিলে, লক্ষ মুদ্ৰা প্ৰদানিলে,
পাবেসন্ধান তার অন্য কোন দেশেতে।
বিন্ধ্য গিরি হিমালয়, সিন্ধু, গঙ্গা নদী চয়
তাজ, মতি, জুমা খ্যাত কুতবের মিনারা; ও
হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, পার্শী, শিখ, খৃষ্টিয়ান
নানা জাতি নানা ভাষা নানারূপ চেহারা।
সিংহ, ব্যাঘ, হয়, হাতি, বিহঙ্গম নানা জাতি
বিশাল প্রান্তর আর সুবিস্তত কানন,
কাশ্মীরে সুষমা হায় ! নন্দন কানন প্রায়,
সুগন্ধি প্রসূন শত মরি মনােমােহন।
p
মুক্তা, হীরা রত্ন সার, চারু কারু কাৰ্য্যে আর,
ভারতের যশােরশ্মি ভাতিয়াছে জগত,
ভাস্কর বিদ্যার তরে
নিখিল অবনী’ পরে
অদ্বিতীয় খ্যাতি লাভ করিয়াছে ভারত।
.
দেবলা।
যােম্বাই প্রদেশ মাঝে,
তার নিদর্শন রাজে
সমগ্র ধরণী পরে খুজিয়া যা পাবেনা,
নিরমিত পরিপাটি,
গুহার মন্দির শত নাহি যার তুলনা।
সুদৃঢ় পর্বত কাটি
‘ঘর পুরী’ দ্বীপ মাঝে খ্যাত ‘হস্তিগুহা’ রাজে
বিরাজে “কেনেরী গুহা' সালশেতি দ্বীপেতে,
কারুকার্যে সুখচিত নানা চিত্রে সুচিত্রিত,
‘অজন্ত গুহার যশ ব্যাপ্ত দিক দশেতে।
ইলােরা গুহার যশ
ভুবন করেছে বশ,
পর্বত-মন্দির শত তার মাঝে রয়েছে,
‘ইন্দ্র সভা’ চমৎকার,
‘দশ অবতার’ আর,
‘কৈলাস’ সবার শ্রেষ্ঠ মহা খ্যাতি লভেছে।
কৈলাস মন্দির পাশে,
সুন্দর উদ্যানে হাসে
প্রফুল্ল কুসুম রাজি অনুপম সুষমা ;
এহেন উদ্যানে মরি, ভুবন উজ্জ্বল করি,
কে দুটি দাঁড়ায়ে আছে সুবর্ণের প্রতিমা।
পঞ্চম সর্গ।
৪৯
হেরিলে বালিকা দ্বয়, দেব বালা ভ্রম হয়,
মানবীর বেশে বুঝি নামিয়াছে মহীতে,
কিম্বা বনদেবী বালা,
রূপে বন করি আল
কুতূহলে বনশােভা নিমগনহেরিতে।
।
লাবণ্য সারল্যময়ী, মাধুর্যে জগত জয়ী
বিরাজে ভূতলে আহা হরষিত অন্তরে,
সুঠাম গঠিত কায়,
চারুবাস শােভা পায়
হেরিয়া রতির হিয়া অবসাদে বিদরে।
চম্পক কলিকা সম হস্তের অঙ্গুলি কম,
তাহে দোঁহে মনােল্লাসে পুষ্প কলি তুলিছে,
কুসুম কলিকা গুলি পরশি’ কোমলাঙ্গুলি
সােহাগে ভরিয়া যেন আপনিই ফুটিছে।
একজন ক্ষণ পরে
অন্যে কহেমৃদুস্বরে
“দেখ দেখ নন্দবালা নেহারিয়া নয়নে।”
একেবারে যেন মরি,
মধু বীণা সপ্তস্বরি
ঝঙ্কারি উঠিল, মধু বরষিয়া শ্রবণে।
দেবলা।
আবার কহিলা, বালা সম্বােধিয়া নন্দবালা
“দেখ দেখ প্রিয় সখি নেহারিয়া নয়নে,
প্রফুল্ল গােলাপ সঙ্গে
খেলিছে ভ্রমর সুখে আলাপিয়া বিজনে।
“মকরন্দ লুব্ধ মতি, হের ওই প্রজাপতি
রজনী গন্ধার পরে হর্ষভরে বসিল,
হেরি জ্বালা মনে স্মরি,
প্রাণভয়ে পুনরায় ত্রাসে বেগে উড়িল।
অদূরে ভ্রমর অরি
“ভৃঙ্গরাজ সগৌরবে
গুণ গুণ গুণ রবে,
রজনীগন্ধার মধু সুখে আসি হরিছে ;
স্যায় পূর্ণ বিশ্ব যাঁর, এই কি বিচার তাঁর ?
সবল দুর্বলে সদা পদতলে দলিছে।”
;
বলি, বালা নীরবিল ; শশি-মুখ শুকাইল,
গভীর বিষাদে তার হিয়া পূর্ণ হইল;
নিরখি অন্যায় হেন,
কোমল অন্তরে যেন
বাজিল বিষম, আঁখি অশ্রুনীরে পূরিল।
পঞ্চম সর্গ।
নযালা কহে ধীরে- “কেন মগ্ন দুঃখ নীরে?
কেন সখি বৃথা নিন্দা কর বিশু পালকে ?
তিনি সকলের সার, হের ইচ্ছা ক্রমে তার,
ঘটিছে ঘটনা কত শত আঁখি পলকে।
শুন গাে দেবল তবে, একাকিনী আমি যবে
বাহিরিনু বন প্রান্তে পৰ্যটন লাগিয়া
সম্মুখে হেরিনু এক, লাফায়ে নিরীহ ভেক
নিজ গৰ্ত্ত পানে ধায় থপ থপ করিয়া।
“হেনকালে সেই ভেকে সপ এক মহা বেগে
নিমিষে ধরিয়া মহা সাপটিয়া গ্রাসিল,
ক্ষণপরে দেখি আমি,
নকুল ত্বরিত গামী
চকিতে সে সর্প দেহ খণ্ড খণ্ড করিল।
মুহা জড় সড় ইয়ে
“বিষাদে, বিস্ময়ে, ভয়ে
মর্মাহত হৃদে আমি গৃহ পানে ফিরিনু,
বিধাতারে দূষি’ শত
নিন্দিলাম কতমত,
পরিশেষে জনকেরে সব কথা কহিনু।
দেবলা।
••
“নিন্দা শুনি বিধাতার, করি মােরে তিরস্কার,
নিষেধ করিল পিতা বিভু নিন্দা করিতে;
তিনি প্রভু লীলাময়, লীলা ক্রমে সব হয়,
অবােধ মানবে তার কি পারিবে বুঝিতে ?
২
“শুনিয়া পিতার কথা, দূরে গেল মনােব্যথা
তদবধি সংসারের নিত্য নব ঘটনা ;
ব্যাকুল করে না চিত, কিন্তু হয়ে তিরপিত
তার ইচ্ছা পূর্ণ হােক’ করি এই কামনা।
নন্দবালা মুখে শুনি, উপদেশ পূর্ণ বাণী,
দেবলার মুখ পদ্ম প্রফুল্লিত হইল,
যেন পুষ্প ধূলি ভরা, পেয়ে বরিষার ধারা
বিধৌত হইয়া মরি নব রাগে শােভিল।
দেবল
লাে তখন কয়
“বিষাদ বিস্ময় চয়
বিদূরিত হল সখি আজি তব কল্যাণে,
এস তবে দুই জনে
কহি মােরা ফুল্লাননে
‘বিভু ইচ্ছা হােক পূর্ণ ভক্তি ভরা পরাণে।
পঞ্চম সর্গ।
“হের ভাই নন্দবালা গগণে উঠেছে বেলা
পূরিয়াছে ফুলডালা নানাজাতি প্রসূনে,
পূজার হয়েছে বেলা, কেন করি অবহেলা,
তােমার জনক পাশে চল ত্বৱা গমনে।
“কিন্তু একি হ’ল দায়, • অকস্মাৎ কেন হায় !
বাম চক্ষু আজি মম স্পন্দনিয়া উঠিল ?
বুঝি কোন অমঙ্গল,
গ্রহ দোষে আজি পুনঃ মম ভাগ্যে ঘটিল।
কিম্বা কোন মন্দ ফল,
“তােমারে সঙ্গিনী করে, তব জনকের করে
সঁপিয়া আমারে পিতা গিয়াছেন চলিয়া
চতুর প্রহরী গণ,
করি সবে প্রাণপণ
মম রক্ষা হেতু সবে আছে বন ঘেরিয়া।
‘শত্রুদল' সংহারিতে নিজ রাজ্য উদ্ধারিতে
নানা আয়ােজন পিতা করিছেন যতনে,
বহুদিন হল তার
পাইয়া সমাচার,
আকুল হ’তেছে মন বােধ মানে কেমনে?
৫৪
দেবলা
“শুনেছি বিধীদল
জানে নানা ছল কল
কখন কি বৈশ ধরি প্রবেশিয়া কাননে,
বন্দিনী করিবে মােরে,
অথবা ধরিয়া জোরে
অপমান করি গত বধিবেক জীষনে।
“অতএব চল ভাই, বিলম্বেতে কাজ নাই
দেবতা মন্দিরে চল তব পিতা সদনে।”
শুনি দেবলায় বাণী নন্দবালা চাননী,
সভয়ে ফুলের ডালি তুলি অতি যতনে,
দ্রুত পদে অগ্রে যায়, দেবলা পশ্চাতে ধায়
উষার পশ্চাতে যথা অরুণের কিরণ ;
দোহে পরিশ্রান্ত দেহে উত্তরে মন্দির গেহে
দূরে গেল চিন্তা ভয় প্রফুল্লিত আনন।
ষষ্ঠ
সর্গ।
এ কি গাে কল্পনে আনিলে কোথায় ?
একি দেখি হেথা দৃশ্য বিভীষণ!
শরীর রােমাঞ্চ হয় নয়ন টাটায় ;
সমর প্রাঙ্গণ এ যে ভয়ঙ্কর।
পরীক্ষার মূল নর বাহুবল,
বিষম পরীক্ষা আর আছে কি ধরায়।
রুধির সাগরে রুধির তরঙ্গ,
হয়েছে মেদিনী রুধিরে রঞ্জিত,
বিকট আকার শত মৃত নর দেহ,
রক্ত, কাদা মাখা ওতপ্রােত ভাবে
রয়েছে পড়িয়া বিভীষিকা ময়,
ক্ষীণ শাস বহে কার, অর্ধমৃত কেহ।
কারাে হস্ত কাটা, কারাে কাটা পদ,
কারাে মাথা কেটে হয়েছে দুখান,
ঘােটকের খুরে কারাে ছিন্ন নাড়ি ঊড়ী,
দেবলা।
.
অসিধারে কারাে সর্ব অঙ্গ ক্ষত,
প্রহারের চোটে ভাঙ্গিয়াছে সঁত
বাণ বিদ্ধ হয়ে কেহ যায় গড়াগড়ি।
‘জল, জল’ কেহ করে আর্তনাদ,
‘প্রাণ যায়’ ধলি ছাড়িছে হুতাশ,
যন্ত্রণায় ছাড়ে কেহ বিকট চীৎকার;
শিবাগণ আসি মারিছে কামড়,
ঘা’র মুখে কারাে রক্ত চেটে খায়,
তাড়াতে উহায় কারাে শক্তি নাহি আর।
পূর্বে যার দাপে কাঁপিত মেদিনী,
ভয়ে জীবগণ পলাইত দূরে,
তার কি এ দশা হায়! দেখি কান্না পায় ;
সামান্য শৃগালে করিছে দংশন,
বাতনায়, ঘাের করিছে ক্রন্দন,
তাড়াইতে এক রতি শক্তি নাহি হায় !
আর না, আর না, আর না কল্পনে
যথেষ্ট হয়েছে এ দৃশ্য দর্শন,
ষষ্ঠ সর্গ। এখান হইতে চল অন্য কোন ঠাই এ বীভৎস দৃশ্য নেহারিব যত, নৃশংসের কাজ যুদ্ধ বিসম্বাদ- পূরিবে অন্তর মম বিষাদে সদাই। - ৩৮ •এ কি চিত্র পুনঃ বলগা কল্পনে, আনন্দ লহরী ছুটিছে প্রবল, আনন্দ সাগরে হেথা সবে ভাসমান এ বুঝি শিবির বিজয়ী যােদ্ধার, ওই রণাঙ্গণে ভুজবলে যারা সম্নর জিনিয়া এবে উল্লাসিত প্রাণ। কেহ বা বসিয়া আনন্দিত মনে ‘আরে মেরি জান’ গাইছে সঙ্গীত, বাদ্য যন্ত্রে কোন জন ধরিয়াছে তান ; কেহ যুদ্ধ সাজ উন্মােচনে তার কেহ তরবারে দেয় খুর ধার, বিশ্রাম লাগিয়া কেহ রয়েছে শয়ান।
৫
দেবলা
এক পটে দুটি চিত্র মনােহর,
একটি হরিণ
অন্যটি বিষাদ,
হেরিনু কল্পনে যাহা কল্যানে তােমার
নিত্য হেন চিত্র জগত মাঝার
প্রতি গৃহে হইতেছে সংঘটন ;
বিধির অপার লীলা বুঝে সাধ্য কার ?
বিদ্রোহী করুণ জিনিয়া সমরে,
আপন শিবিরে খট্টাঙ্গ উপরে,
সেনাপতি আলেফ খা রয়েছে শায়িত
সংগ্রামে বিজয়ী তবু কি আশ্চর্য, !
মনে অনুমাত্র নাহিক উল্লাস,
চিন্তা ভারে যেন তার হৃদয় পীড়িত।
.
ভাবিছে আলেফ নিজ মনে মনে,
“সত্য বটে আমি করুণারে রণে
পরাজয় করি সৈন্য কৈমু হতবল,
প্রাণ ভয়ে কিন্তু সমধিক তার
নির্লজ্জের কিবা লােক লাজ আর ।
পলাইল তেঁই ভীরু ত্যজি রণস্থল।
ষষ্ঠ সর্গ
“সঙ্কটের কিন্তু আছয়ে আদেশ
ধৃত করি তারে প্রেরিতে দিল্লীতে,
সে আদেশ বুঝি আর হলনা পালন ;
বৃথা হল মম এত পরিশ্রম, .
রণ জয় মম শুধু পণ্ডশ্রম,
বিজয়ী বলিয়া মম যশ অকারণ।
“আর উপায় কিছু নাহি হেরি,
কোথা আছে দুষ্ট তাহাও নাজানি,
কিম্বা এবে কতদূরে করেছে প্রস্থান;
জয়ােল্লাসে আজি মত্ত সেনাগণ,
রণ সাজ খুলি আনন্দে মগন,
•এ নিশীথে কেবা তার করিবে সন্ধান ?
“হয়েছে, হয়েছে” ( চিন্তি কতক্ষণ)
কহিলা আলেফ “কিন্তু আশা কম,
পূর্ণ যদি করে বিভু করুণা নিদান;
করুণার কন্যা দেবলা নামেতে
যদি পারি তার করিতে সন্ধান,
সম্রাটের কাছে মম বাড়িবে সম্মান”।
দেবলা।
এরূপ ক্ষণেক চিন্তিয়া অন্তরে,
চিন্তার তরঙ্গে ভাসিয়া ভাসিয়া,
দেহ মন অবসন্ন হইল যখন,
তন্দ্রা আসি ধীরে মুদিল নয়ন';
গভীর নিদ্রায় ক্ষণপরে আহা!
দেখিলা আলেফ এক অপূর্ব স্বপন।
শূন্য হ’তে এক জ্যোতি অপরূপ,
দীপ্ত করি তেজে ব্যোম মহীতল,
ইরম্মদ বেগে তার আসিল নিকটে
তার মাঝে এক অলৌকিক নারী,
ঝলসে নয়ন হেরিলে মাধুরী,
দেখিলা আলেফ, ধরা কপিল দাপটে
=
,
দীর্ঘ তনু ঢাকা চারু রক্ত বাসে,
মুক্ত কেশ দাম অসিত বরণ,
জ্যোতির্ময়ী মূৰ্ত্তি তার প্রফুল্ল বয়ান,
আয়ত লােচন ধক ধক জ্বলে,
শিরােপরি শােভে অমূল্য কিরীট,
রাম করে ঢাল। ডানে অসি রসন
**
ষষ্ঠ ১র্গ
৬১
*হিলা সুন্দরী, অমৃত, ভাষিণী,
সুধা মাখা স্বরে বীর আলেখানে,
অমৃত লহরী মরি ছুটিল প্রবল,
শত বীণা নিন্দি সুমধুর স্বর,
শুনিয়া আলেফ প্রফুল্ল অন্তরে,
মানিলা মানব জন্ম হলরে সফল ।
“কেন বাছা তুমি রণজয়ী হয়ে,
আমােদ উৎসব তেয়াগিয়ে সব,
চিন্তিত অন্তরে আহা যাপিছ রজনী ?
অন্য বস গণ যুদ্ধ অবসনে,
জয়ােল্লাসে হের মাতিয়াছে সবে,
বিষন্ন অন্তর শুধু তুমি বীরমণি!
“তােমার চিন্তায় অন্তর আমার,
আকুলিত হ’ল হইনু অস্থির,
বাজিয়া উঠিল হৃদি-তন্ত্র সমুদায় ;
তব দুঃখ ভার করিতে লাঘব,
সুপুত্র আমার তুমি বীরবর ।
আসিনু হেথায় তেঁই জানাতে উপায়
দেল।
“চতুর করুণা গুজ্জর নৃপতি,
স্নেহের দুহিতা দেব দেবীর
শঙ্কর দেবের সহ বিবাহ কারণ,
ভাল ভাল বীর ‘করি মনােমত,
রক্ষা হেতু তার সহগামী করি,
দেবগিরি অভিমুখে করেছে প্রেরণ
“এখান হইতে কিছু দূর আগে,
কানন বেষ্টিত
পর্বত গুহায়,
ইলাের মন্দির আছে বিদিত ভুবনে,
সে মন্দির মাঝে দেলা সুন্দরী,
কিছু দিন তরে আছে লুক্কায়িত,
যােদ্ধাগণ যত তারে নিযুক্ত রক্ষণে।
“প্রিয় বৎস ধর আমার বচন,
প্রাতঃকালে তথা করিও গমন,
দেবলার দেখা পাবে বলিনু সংবাদ ;
পরম যতন করিয়া তাহারে,
ভেটিও দিল্লীতে মহিষী সমীপে,
পাইবে যথেষ্ট মান ঘুচিবে বিষাদ।”
ষষ্ঠ সখ।
।
“দৃশ্য হইল বামা; আচম্বিতে
ভেঙ্গে গেল ঘুম ; সভয়ে আলেফ
মেলে অখি, বদ্ধ করে ত্রাসে পুনরায় ;
জ্বলন্ত প্রদীপ গিয়াছে নিভিয়া,
অন্ধকারে কক্ষ হয়েছে পূরিত,
মেলিলে নয়ন কিছু দেখা নাহি যায়।
“একি হল’ বলি ভাবিল আলেফ
“কোন্ নারী ছিল ? নাপারি বুঝিতে
রক্ত বাস, ঢাল, অসি, কিরীট শােভিত,
রণ সাজে বামা, সম্ভাষিল মােরে
অতি স্নেহভরে ; ভাল, প্রাতঃকালে
ইলাের মন্দিরে যাব হইয়া সজ্জিত।
পােহাইল নিশা, বিহঙ্গম গণ
গাইল প্রভাতী গান সুধাস্বরে,
বহিল প্রভাত বায়ু মৃদুল হিল্লোলে ;
কাননে কুসুম হ’ল বিকশিত,
সৌরভেতে দশ দিক আমােদিত,
তটিনীর স্রোত বহে মধুর কল্লোলে।
৬৪
দোলা
জাগরিল সেনা, ঠুেষিল তুরঙ্গ,
উঠিল আলেফ শয্যা পরিহরি,
স্মরিতে লাগিল মনে স্বপনের কথা
সত্য ভাবে কভু স্বপনের বাণী,
কভু ভাবে মনে স্বপন অলীক---
তালাক, মরুভূ মাঝে মরিচীকা যথা।
কিংকর্ত্তব্য জ্ঞান হারায়ে ক্ষণেক,
বহুচিন্তা মনে করিল আলেফ,
চিন্তার সাগরে যেন নাহি পায় কুল ;
ইলাের মন্দির-গুহা অবিলম্বে
আক্রমিৰে তেজে স্থির করি শেষে,
আজ্ঞা দিলা ভেরী ধ্বনি করিতে তুমুল।
ভো ভাে ভীষণ শুনিয়া সহসা,
চিমকিত হ’ল বীর সেনাগণ,
অতর্কিতে গৃহদাহে গৃহস্থ যেমন ;
শিবির' মাঝারে শুনি তূর্য্যধ্বনি,
রণ সাজে সবে সাজিল অমনি,
ছাড়িল হুঙ্কার ঘাের কপাল ভুবন।
ষষ্ঠ ।
সনাগণে পরে ডাকিয়া নিকটে,
কহিলা আলেফ সুগম্ভীর স্বরে,
“সাজ, সাজ সেনাগণ সাজহ ত্বরায়,
অদূরে ইলাের মন্দির গুহায়,
বিদ্রোহী করুণা আছে লুকাইয়া,
চুলই সত্বর সবে ধরিব তাহায়ণ”
*
চতুর আলেফ সেনাগণ সবে
বন অন্তরালে রাখিয়া গােপনে,
ভ্রমণের ছলে গেল ইলাের মন্দির
দেখিল কাননে ইতস্ততঃ ভাবে,
বিচরিছে শান্ত্রী গণ রণ সাজে,
শমন কিঙ্কর যেন এক এক বীর ।
বিজন অরণ্যে হেরিয়া প্রহরী,
স্বপ্ন বাণী সত্য ভাবিল আলেক,
পুলকে শরীর তার কণ্টকিত হল।
ধরি ধরি এক প্রহরীর তরে,
জিজ্ঞাসিল কোথা ইলাের মন্দির ?
কোন্ পথে যেতে হবে সত্য করি বল।
দোলা।
সুচতুর রক্ষী হেরিয়া আলেফে,
শত্ৰুচর বলি করিয়া সিদ্ধান্ত
উত্তর দানিল হেন গম্ভীর বচন ;-
“প্রভুর আদেশ’আছে আমা প্রতি,
কোন বিধর্মিরে ইলাের মন্দিরে,
যাইতে নাদিব কভু থাকিতে জীবন।”
আলেফ তাহারে জিজ্ঞাসিল ধীরে
“কেবা তব প্রভু কহত প্রহরী ?
কাহার আদেশে কর নিষেধ আমায় ?”
হইল উত্তর—“ গুর্জর ভুপতি,
দুর্জয় করুণারায় মম প্রভু,
তঁাহারি আদেশে আমি নিবারি তােমায়।”
আলেফ হারে কহিলেন পুনঃ,
“তব প্রভু কিন্তু কল্যকার রণে
সম্রাটের সেনা পাশে হয়ে পরাজিত
হইয়াছে দেশত্যাগী ; কহ রক্ষি ;
এখন তােমার প্রভু কোন্ জন,
কার আজ্ঞা এবে তব পালন উচিত ?”
;
ষষ্ঠ ধর্গ।
৬৭
"আহত ভুজঙ্গ সম সে প্রহরী
কহিলা সক্রোধে'তুলিয়া কৃপাণ,
“বিধৰ্ম্মী বঞ্চক তুই মিথ্যাবাদী ঘাের !
রটাস কলঙ্ক প্রভুর সুনামে,
আমার সাক্ষাতে হেন দুঃসাহস !
পরে এখান হ’তে নহে মৃত্যু তাের।”
“কার মৃত্যু দেখ’ হুঙ্কারি আলেফ,
ভোঁড়ােম শবদে বাজাইল ভেরী,
পলকে গর্জিয়া ভীম শত সেনাদল
বিদ্যুতের বেগে ধাইল সতেজে,
বাঁধ ভগ্ন হলে স্রোতস্বতী যথা,
শত মুখে ধায় বেগে তরঙ্গে প্রবল।
সেনানী-তরঙ্গ হেরিয়া অদূরে,
স্তম্ভিত হইয়া প্রহরী সকল,
ভাবে একি ইন্দ্রজাল অথবা স্বপন;
অবশেষে ভাবি বিপদ ভয়াল
ভীরুমতি যত অধম শৃগাল,
পলাইল প্রাণ ভয়ে ত্যজিয়া কানন।
Cन्तता
অবারিত গতি সেনাপতি তবে,
ধাইল ইলাের মন্দিরের পানে,
জলমগ্ন জন যথা নেহারিলে কূল,
পর্বত গুহায় ইলাের মন্দিরে,
কানন সাঝারে বনদেবী সমা,
দেখিল দেব দেবী বিরাজে অতুল
=
দীন দুঃখী জন অকস্মাৎ যথা,
হেরি বহু ধন প্রফুল্লিত হয়,
মরুভূমি মাঝে কিম্বা তৃষাতুর জন—
পাইলে সলিল প্রফুল্ল যেমতি,
দেবলারে হেরি আলেফ তেমতি
আনন্দে বিহ্বল অতি উল্লাসিত মন।
\মণীর মণি দেবলা দেবীরে,
আনিল শিবিরে পরম যতনে,
ফলিল স্বপন কথা, পূরিল কামনা ;
সঙ্গে লয়ে তারে দিল্লী অভিমুখে,
চলিল আলেফ হরষ অন্তরে ;
বিধি সুপ্রসন্ন যারে কি তার ভাবনা।
সপ্তম সর্গ
শারদীয় অপরাহু; সুনীল আকাশে
শাদা মেঘ খণ্ডচয়,
ভাসিতেছে আনমনে ;
সূর্যের যৌবন আর নাহিক এখন,
মন্দীভূত এবে তেঁই উজ্জ্বল কিরণ।
ঘন পল্লবিত তরু শােভার আধার,
বক্রভাবে ছায়া গুলি
পড়িয়াছে ধরাতলে,
পত্র অন্তরালে বসি বিহঙ্গম গণ,
হৃষ্টমনে সুমধুর করিছে কূজন।
তৃণাবৃত সুশ্যামল প্রশস্ত প্রান্তর,
গবাদি বিবিধ প্রাণী
সুখে তাহে বিচরয়,
মন্দ মন্দু সুখস্পর্শ বহে সমীরণ,
কুসুম সৌরভ দানি তােষে জীবগণ ।
৭ ০
দেবলা
মনােহর রাজোদ্যান ; সুষমা অপার।
নানাজাতি তরুলতা,
কতবা করিব নাম
থরে থরে চারি ধারে কিবা শােভে হায় ।
নন্দন কানন যেন এ মর ধরায়।
কুসুমিত লতাগুলি মহীরুহ সহ,
সােহাগে বেষ্টিত হয়ে,
সেজেছে সুন্দর কিবা
প্রেমিক প্রেমিক সহ প্রেম আলিঙ্গনে
জড়িত রয়েছে যেন প্রেম মুগ্ধ মনে।
মাঝে এক সরােবর স্বচ্ছ নীল বারি,
শ্বেত নীল লােহিতাদি,
শােভে পদ্ম নানাজাতি
রাজহংস সুখে তাহে করে বিচরণ ;
মৃণাল ভাঙ্গিয়া কভু করয়ে ভক্ষণ।
চারি ধারে তরুগুলি রয়েছে ঝুকিয়া,
সরােবর হৃদে তার
পড়িয়াছে প্রতিবিম্ব,
সপ্তম সং।
বৃহৎ দর্পণে যেন নেহারিছে মুখ,
কভু মৃদু মৃদু দুলি’ হৈরিছে কৌতুক।
চারি পাশে চারি ঘাট শােভে অনুপম ;
সুচিকণ রাঙ্গা রাঙ্গা
প্রস্তরে নির্মিত ঘাট,
সুশীতল অতি আহা তুহীন সমান,
বারেক পরশে স্নিগ্ধ হয় মনঃ প্রাণ।
s
পশ্চিমের ঘাটে বসি যুগল মূরতি;
বল গাে কল্পনে মােরে,
কেবা এরা দুই জন,
দেবলােক বাসী দেহে, কিম্বা হুর পরী,
আসিয়াছে রাজোদ্যানে নররূপ ধরি।
বহুমূল্য পরিচ্ছদ রতনে জড়িত
মণিময় অলঙ্কার
অঙ্গে শােভে দুজনার,
অপূর্ব লাবণ্যময়ী কান্তি কমনীয়,
হেন অপরূপ রূপ নহে তুলনীয়।
৭২
দিবল
এক গাে কল্পনে ! এযে যুবরাজ হেরি,
সম্রাটের জ্যেষ্ঠ পুত্র
কুমার খেজের নাম,
পাশে বসিয়াছে তার কমলা দুহিতা,
দেবলা সুন্দরী, রূপে ভুবন বিদিতা।
বসিয়াছে যুবরাজ আনত আননে,
বিষাদে মলিন মুখ
রাহুগ্রস্ত শশী যথা,
মাঝে মাঝে ছাড়িতেছে তপ্ত দীর্ঘশ্বাস,
নয়নে নাহি সে জ্যোতিঃ, বদনে সে ভাস
দেবল চয়ণ করি বিবিধ প্রসূন
যতনে গাথিছে মালা
সুচিকন মনােরম,
পরশন করি তার পদ্মনিভ কর,
বিকশিছে হাসিছলে কোরক নিকর।
সরলা যুবতী এক মনােহর হার,
হাসি হাসি পরাইলা
যুবরাজ গলদেশে,
সপ্তম সং।
যুবরাজ কিন্তু এক ছাড়ি দীর্ঘশ্বাস,
বাসনা মনের ব্যথা করিতে প্রকাশ।
কুমারে হেরিয়া আজি বিষাদে মলিন,
কাতরে কহিল বালা,
“কি হেতু কুমারু আজি
বিষন্ন বদন তব সজল নয়ন ?
কেনবা ছাড়িছ উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ঘন?
।
“পিতার সদনে করি অপরাধ কোম,
তাড়না খেয়েছ বুঝি,
অথবা জননী ঠাই
পাইয়াছ তিরস্কার কঠিন বচন,
মনােদুঃখে তেই তব বিষাদিত মন।”
উত্তরিল যুবরাজ ছাড়িয়া হুতাশ,
“পিতৃপাশে বরাননি,
অপরাধী ;
মাতৃ সন্নিধানে হেন করিনি কুকাজ,
গালি খাব যার লাগি কিম্বা পাব লাজ।
নহি কভু
৭৪
বলা।
“ক বলিব সুলাচনে। জননীর মুখে
শুনিনু যে কথা আজি
মরমে মরিনু তাহে,
সুখের সংবাদ সত্য নাহি তাহে ভুল,
আমার হৃদয় কিন্তু দুঃখেতে আকুল।
“একি একি হে কুমার’ বিস্ময়ে দেবলা,
জিজ্ঞাসিল যুবরাজে,
‘বিষম সমস্যা এযে,
বুঝিতে না পারি যেন হরিষে বিষাদ,
কহ কিবা শুভ কাৰ্যে অশুভ প্রমাদ।”
“ক্ষান্ত হও চন্দ্রাননি! হওনা বিস্মিত
সব কথা একে একে,
কহিব তােমায় আমি,
তাহলে বুঝিবে কিবা সমস্যা ভীষণ,
হরিষে বিষাদ সত্য হয়েছে ঘটন।
“যদবধি বিধুমুখি, বিধির কৃপায়,
তোমারে হেরেছি আমি,
হৃদয় উদ্যানে মম
সপ্তম সগ
রােপিয়াছি তদবধি এক আশালতা,
পােষিয়াছি যত্নে
শুন গাে বারতা।
তাহ
“ভেবেছিনু এক দিন সে আশা ব্রততী
মুঞ্জরিত হয়ে মরি
দানিবে অতুল সুর্থ ;
পূরাইবে মন সাধ মিটাইয়া আশ,
শুকাল সে আশালতা হইনু হতাশ।
০
“আমাদের হিতৈষিণী তােমার জমনী,
স্থির করেছিলা মনে
( পিতারও ছিল মত,)
গাঁথিতে বিবাহ সূত্রে তােমায় আমায়,
হেরিতে স্বর্গীয় সুখ অতুল ধরায়।
“আমার জননী কিন্তু অসম্মত তাহে,
তার ভ্রাতৃ কন্যা সহ
দিতে মম পরিণয়,
সংকল্প করেছে মনে না হবে তান্যথা ;
তেঁই ধনি মম হৃদে লাগিয়াছে ব্যথা।
দেবলা।
.
“পতা মাতা পাত্র পাত্রী করিবে নির্ণয়
এহেন কঠোর বিধি,
কি হেতু সমাজে রহে ?
মনােমত হলে দোহে করিবে বিবাহ
সুধার্ণবে উঠে
নতু
গরল প্রবাহ।”
নীরবিলা যুবরাজ শােকতপ্ত মনে,
মূর্তিময়ী শান্তিসমা,
হিলা দেৰলা দেবী
পিকক স্বর জিনি অমিয় বচনে,
শান্তিবারি-প্রদানিল কুমারের মনে।
“কি হেতু কুমার এত দুঃখ ভাব মনে,
বিমল হৃদয়ে তব
ও কেন মাখ শােক কালি ?
কেন বৃথা কর রােষ সমাজের প্রতি ?
লঙ্ঘিলে সমাজ বিধি হয় অথবাগতি।
ক
সপ্তম সর্গ।
৭৭
D
“পিতা মাতা দোষ গুণ হেরিয়া কন্যার
হেরি তারে সুলক্ষণা,
পুত্র হিত ভাবি পুনঃ,
শুভক্ষণ দেখি তার দেন পরিণয়,
হয় তাহে শুভ ফল সতত উদয়।
“যুবকেরা অন্ধ হয়ে রূপের ছটায়,
ভবিষ্য পত্নীর আর
নাহি বাছে দোষ গুণ,
সুখের বিবাহে দুঃখ ঘটে শেষফুল,
ধার সাগরে উঠে তীব্র হলাহল ।
“বিধির নিবন্ধ যাহা, কহ হে কুমার !
খণ্ডন করিতে তারে
কে পেরেছে কোন্ কালে?
তবে মিছে দুঃখ করি কিবা ফলােদয়
আরাে দুঃখ বাড়ে তাহে হ্রাস নাহি হয়
৭৮
দেবলা
}
“জননী তােমার তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রী সহ,
তােমার বিবাহ দিতে
করেছেন অভিমত,
অন্যমত নাহি তাহে করিও কুমার
দুঃখিতা হবেন অতি জননী তােমার।
“মম লাগি চিন্তা নাহি করাে যুবরাজ,
চিরতরে এ অভাগী
দাসী রবে তব পদে,
চাহিনা মহিষী হু’তে, কিম্বা রাজ্য ধন,
দাসী ভাবে সদা তব সেবিব চরণ।
“যেই দিন শুভক্ষণে শুনহে কুমার,
এখানে আসিয়া আমি,
হেরিলাম তব মুখ
সেই দিন তব পদে সঁপিয়াছি প্রাণ ;
সৰ তেয়াগিয়ে সদা করি তব ধ্যান।
ষষ্ঠ সর্গ।
৭৯
“তব ক্রীড়া সঙ্গী হয়ে প্রভাতে সন্ধ্যায়
কত আশা, কত সুখ
কল্পনা করেছি মনে,
ভ্রমিয়াছি পুষ্পেদ্যানে নানবিধ ফুলে,
গাঁথি নব মালা দোহে পরিয়াছি গলে।
“বিধির ইচ্ছায় কিন্তু সে আশা কুমার !
মিটিলনা বুঝি আর,
সে সুখের সাধ মম
অলীক হইল যথা নিশার স্বপন ;
অভাগীর ভাগ্যে সুখ ঘটে কি কখন ?
“হউক বিবাহ তব অন্য নারী সহ,
তাহে মম নাহি দুঃখ,
আমি কিন্তু দাসীরূপে
তােমাগত প্রাণ হয়ে কাটাৰ সময়,
রহিব কুমারী চির বলিনু নিশ্চয়।”
দেবলা।
মদুেঃখে নীরবিলা দেবলা সুন্দরী,
চাহি তার
মুখ
পানে,
কুমার কহিলা দুঃখে
কি করিব সুলােচনে। নিরুপায় এবে’
বিধির লিখন যাহা অবশ্য তা হবে।”
অস্ত গেল দিনমণি; তার সহ হায় ?
অস্ত গেল স্লান মনে
সুখ রবি দুজনার,
তেঁই দেহে ক্ষুগ্নমনে ত্যজি রাজোদ্যান,
ধীরি ধীরি ভবনেতে করিলা প্রয়াণ।
অষ্টম সর্গ ।
কুমারের পরিণয় মহাসমারােহে,
মাতুল কন্যার সহ হ’ল সম্পাদন
তাহে কিন্তু যুবরাজ ক্ষণেকের তরে ।
সন্তুষ্ট না হন কভু সদা ক্ষুন্ন মন।
অষ্টম সর্গ।
৮১
সদা চিন্তা মগ্ন যুবরাজ, যেন হয় !
চিন্তার সাগরে আর নাহি পান কূল ;
আহারে, বিহারে, কিম্বা জাগরণে আর,
সদাই বিষন্ন চিত সদা চিন্তাকুল।
“দেবলা” বলিয়া কভু ছাড়ে উষ্ণ শ্বাস,
কভু রহে এক দৃষ্টে চাহিয়া কেবল ;
দেবলার অদর্শনে বিরহ অনল,
দহিল বিষম তার হৃদয় কোমল।
কুমারের অদর্শনে দেবলা সুন্দরী,
মরমে মরিল আহ কি কহিব আর ;
দিনপতি অদর্শনে যথা কমলিনী,
বিষন্ন বদনে রহে দুঃখিত। অপার।
|
-
যুবরাজ মনে তার পড়ে নিশি দিন,
কম তনু শুকাইল বিরহ দহনে ;
নব বিকশিতা যথা কুসুম কলিকা
শুকাইল মরি তীব্র নিদাঘ তপনে।
দেবলা।
খেজেরের হাসি ভরা ফুল্ল মুখ ছবি,
দেবলার হৃদিপটে জাগে অনুক্ষণ ;
শয়নে, স্বপনে, আহা জাগরণে আর,
রহে বালা নিরন্তর বিষাদিত মন।
কুমারের প্রীতিভরা সােহাগ যতন,
আর তার মধুমাখা অমিয় বচন,
ধ্বনিছে সতত যেন কর্ণে দেবাের,
সহিছে অন্তরে বালা যাতনা ভীষণ
উদ্যানের অনুপম শােভা নিরখিয়ে,
দেবলার চিত আর প্রফুল্ল নাহয়,
পাদপলতিকা এবে পত্র পুষ্প ফল
অবিরাম করে তার ব্যথিত হৃদয়।
সুশীতল সমীরণ, পরশিলে কায়,
মরুভূর তপ্ত বায়ু সম বােধ হয়,
বিহগ কূজন এবে পশিলে শ্রবণে,
নীরস কর্কশ লাগে তীব্র অতিশয়।
অষ্টম সর্গ
1
অদূরে কাহার যদি গদ শব্দ হয়
অথবা কাহার স্বর করিলে শ্রবণ,
কুমার আসিছে, কিম্বা কহিছেন কথা,
দেবলার মনে ভ্রান্তি হইত এমন।
তেঁই নিরজনে বালা বসি একাকিনী,
দুঃখিত অন্তরে চিন্তা করে অবিরল,
চিন্তার সাগরে যেন চলেছে ভাসিয়া,
আঘাতিছে হিয়া তার তরঙ্গ প্রবল।
একদা দেবল। অতি চিন্তিত অন্তরে,
ভাবিতে ভাবিতে কত নিদ্রিত হইল,
কিছুক্ষণ তরে নিদ্রা দেবীর কৃপায়
হৃদয়ের ভার তার লাঘব হইল ।
শান্তি প্ৰদায়িনি। নিদ্রে মায়াবিনি তুমি !
তােমার মহিমা হেরি অতুল ধরায়,
কি সাধ্য আমার করি বর্ণনা তাহার,
মহা মহারথী হার, মানিয়াছে যায়।
৮৪
দেবলা।
.
"
প্রবল পীড়নে, কিম্বা ব্যাধি-আক্রমণে,
সংসারের মাঝে যেই হতভাগ্য জন--
নিয়ত সহিছে শত যাতনা ভীষণ,
তােমার কল্যাণে শান্তি পায় কিছুক্ষণ।
শােক, দুঃখ, মনস্তাপে যাহার হৃদয়
ব্যথিত পীড়িত সদা গুরু ভারে হায় !
তােমার অঙ্কেতে শির করিয়া স্থাপন,
ভুলে যায় শােক তাপ, মনে শান্তি পায়।
নিদ্রার কোলেতে তেঁই দেবলা সুন্দরী,
শির পাতি সুখাবেশে করেছে শয়ন,
বিস্মৃত হয়েছে এবে দুঃখ, মনস্তাপ
ঘুম ঘােরে নেহারিছে অদ্ভুত স্বপন
এ
অশ্রুত, অপূর্ব এক কল্লোলিনী কূলে,
"কুমারের বাম কর করিয়া ধারণ,
মনােসুখে দুই জনে করিছে বিহার,
প্রকৃতির শােভা হেরি প্রফুল্লিত মন।
অষ্টম সর্ব ।
tel
রজত সলিলা নদীতরঙ্গে তরঙ্গে,
আনন্দে বহিয়া যায় করি কুল কুল,
বিমল জােছনা রাশি পড়ি হৃদে তার,
প্রকাশিছে মনােহর সুষমা অতুল।
তটিনীর দুই ধারে বিবিধ কুসুম,
বিকশিত হয়ে শােভা ধরেছে অপার,
নৈশ সমীরণ মরি মৃদুল হিল্লোলে,
বহিতেছে চারি দিকে সৌরভের ভার
• সুনীল আকাশে ভাসে পূর্ণ শশধর,
ধবল কিরণ তার ঢালিছে ধরায়,
তরু, লতা আদি যেন করিতেছে স্নান,
নেত্র তৃপ্তি কর শােভা ধরিয়াছে হায় ।
থেকে থেকে পিকবর কুহু কুহু সুরে,
শ্রবণে অমৃত যেন করিছে বর্ষণ,
দূরে প্রতিধ্বনি তার হতেছে মধুর,
প্রকৃতির নিস্তুত করিছে হরণ।
১৬
বেল্য।
হরিত তৃণেরদল মনাের অতি,
বিস্তত
ত রয়েছে যেন শয্যা সুকোমল ;
তাহে দোঁহে মনােসুখে করিছে ভ্রমণ,
আমােদ প্রমােদে সুখ ভুঞ্জিছে বিমল।
হেন কালে শব্দ এক বিকট ভীষণ,
সহসা ধ্বনিত হ’ল কাপিল পরাণ
প্রলয়ের কালে যথা বজের নিনাদ,
অথবা গর্জিল ভীম সহস্র কামান।
‘একি হ’ল অকস্মাৎ’ বলি যুবরাজ,
বিস্মিত হইয়া অতি চাহে চারিভিতে,
ভয়ে দেবলার অঙ্গ কঁপে থর থর,
জড়ায়ে ধরিল তারে আতঙ্কিত চিতে।
অতঃপর শদিক আঁখির পলকে,
সুরঞ্জিত হ’ল যাের লােহিত বরণে,
জলস্থল, বৃক্ষলতা, চন্দ্রিমা আকাশ,
রক্তময় হ’ল যেন শােণিত বর্ষণে।
অষ্টম স্যা।
৮৭।
দেখিতে দেখিতে নদী বক্ষ ভেদ করি,
উঠিল মূরতি এক বিকট আকার,
ঘাের কৃষ্ণ, বর্ণ দেহ পর্বত প্রমাণ,
হেরিলে অন্তরে হয় আতঙ্ক সঞ্চার।
বড় বড় চক্ষু দ্বয় ধক ধক জ্বলে,
বিকট দশন তার মূলার মতন,
নিশ্বাস বহিছে যেন প্রলয়ের ঝড়,
মুখের বিবর তার গহ্বর যেমন।
ধীর পদক্ষেপে দৈত্য মথিয়া সলিল,
আসিল কুমার পানে প্রসারিয়া কর ;
দেবলা কুমারে আরাে ধরিল জড়ায়ে,
মনে ভাবে পরমাদ ত্রাসিত অন্তর।
খেজেরের দুই হস্ত ধরিয়া দানব,
হুঙ্কার করিয়া ঘাের, গরজি ভীষণ,
সাপটে মারিছে টান ছাড়াতে কুমারে,
ছাড়াইতে কিন্তু নাহি পারে কদাচন।
ساس :
দিবনা।
হায়রে! যেমতিচণ্ড টিকা প্রবল,
উপাড়িতে মহীরুহ করে মহাবল,
কোমল লতিকা কিন্তু রহে জড়াইয়া,
তাহারে ছাড়তে ঝড় নিতান্ত দুর্বল।
৫.
•
দেবলার বাহু লতা বন্ধন হইতে,
কুমারে ছাড়াতে দৈত্য মানে পরাজয়
প্রেমের বন্ধন হের সুদৃঢ় কেমন,
শত শত্রু আক্রমণে ছিন্ন নাহি হয়।
{
সহসা সে ভীম মূৰ্ত্তি হ’ল অন্তর্ধান,
তার সহ রক্ত আলাে হ’ল তিরােহিত,
অপরূপ জ্যোতিঃ তদা ভাতিল মেদিনী,
সহস্র তপন যেন হইল উদিত।
পুনরায় নদীবক্ষ করিয়া বিদার,
সমুথিত হ’ল এক রূপসী ললনা,
স্থির সৌদামিনী সমা উজলিল ধরা
এ ছার জগতে তার কি দিব তুলনা ?
অম সর্গ
বণ্য
সুঠাম গঠন খানি লাবণ্যময়,
সুচিকণ শ্বেতবরে রয়েছে মাগুত,
কুসুম মুকুট শিরে, কুসুম ভূষণ,
কুসুমের হার গলে অতি সুশশাভিত
অপূর্ব রমণী, তার কান্তি রমণীয়,
মনােরম ফুল সজ্জা প্রফুল্ল আনন,
হেরি দেহে পুলকিত হইল অন্তরে,
দূরে গেল ভয় আর ভাবনা ভীষণ।
চারু পুষ্প হার বামা লয়ে উভকরে,
মরাল গমনে মৃদু হাসিয়া হাসিয়া,
( কিবা সে মাধুরী আহা ভুবন মােহন)
আইল দোহার পাশে নাচিয়া নাচিয়া
পুষ্পহারে দোহাকারে সাজাল সুন্দর,
একত্রে দোহার কর বাঁধি পুষ্পহারে,
নাছিতে লাগিল রমা দিয়ে করতালি,
শূন্য হতে পুষ্প বৃষ্টি হ’ল শত ধারে।
দেবা?
মন্দ মন্দ প্রবাহ্যি। সুদ পবন,
স্বর্গীয় সৌরভে দিক হ’ল আমােদিত,
নেপথ্যে উঠিল বাদ্য ধ্বনি সুমধুর,
তার সহ সুধামাখা গান সুলালত।
সহসা ভাঙ্গিল ঘুম, মেলিয়া নয়ন
দেখিল দেবলা শুয়ে আছে একাকিনী।
কোথা গেল নদী আর কোথা যুবরাজ,
কোথা গেল ফুল রাণী অপূর্ব কামিনী।
.
একে একে স্বপনের অদ্ভুত ঘটনা,
দেবলার স্মৃতিপথে হইল উদয় ;
শরীর রােমাঞ্চ তার হইল বিস্ময়ে,
নীরবে নিস্পন্দ ভাবে শয্যাপরি রয়।
মনে ভাবে কেবা সেই মূর্তি ভয়ঙ্কর,
কি-হেতু কুমারে বেগে দিল আকর্ষণ,
কেবা ছিল সেই নারী
কুসুম শােভিতা,
কেন ফুল হারে দোহে করিল বন্ধন ?
অষ্টম
ম সর্গ
তবে
দিক রাতি স্বপ্ন ক ভাবে নিজমনে
•সদুত্তর কিন্তু তার কোথাও না পায় ;
যুবরাজে মনে যবে পড়িত তাহার,
ভাসিত দেবলা দুঃখে নিরবধি হায় !
অবশেষে দুঃখ নিশা হইল প্রভাত, •
উদিল সুখের রবি ভুবন মােহন ;
পরীক্ষার পরে প্রভা পাইল প্রকাশ,
অগ্নি পরীক্ষায় ভাতে সুবর্ণ যেমন
পরীক্ষার অবসানে দেবলা খেজের,
উভয়ে হইল বদ্ধ বিবাহ বন্ধনে,
ভুলিল বিগত দুঃখ অপগত শােক,
ভুঞ্জিল অপার সুখ পবিত্র মিলনে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.