Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Landaner Naxsa Abang Fransh Bhraman
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
লণ্ডনের
এবং
ফানস ভ্রমণ।
প্রমথনাথ বসু প্রণী।
কলিকাতা ;
১১ কলুটোলা স্ট্রীট, বঙ্গবার্সী মেশিন প্রেসে শ্রী রমেশ
স্বরা মুতি এবং ৫৫ কলেজ স্ত্রী কানিং লাইব্রোস
হইতে প্রকাশিত।
.
১২৯)।
No text on this page.
সুচীপত্র। লণ্ডনের না! दिवस পৃষ্ট। ••• ০ ••• ৩ ।। ••• २० ১। খামার বাশ ও চারুণী ২। গৃহক ( Landlady) প্রোফেসর ডাঃ সস । •ল (Ball ) ফান্সড্রমণ। ১। পারিস ও পাৰিালী ০ ০ ০ ২৫ ০ ০ ০ ••• ৩০ • এ ০ ০ ৩৪ • ৩১ ০০০ ফরাসি ধৰ্ম্ম কাফের যুক্ত ০ ৬ n ৬২ ।। যাদুঘর ও বিজ্ঞানচর্চ। ৭। জাতীয় স্বভাব ৮। পাতাল পারি ৯। দুপুর মতন ১০। ক্লেয়াস ও সি। ৭: ৩ . । e এ •• ••• ০০ ০ ০ ০
No text on this page.
লণ্ডনৈর
কুসা।
আমার বাসা ও চাকরাণী।
আমার বাসবাদী চেতল—এখানকার প্রায়
সকল বাটাই ত্রিতল কি চৌতল। দুইপাশে
লাগাও আর দুটী বাড়—িএইরূপ বাড়ার সারি
চলিয়াছে। বাটীর সম্মুখে, রাস্তার দিকে প্রাঙ্গণ
—খুব ছােট, লােহার রেলে বেষ্টিত। প্রাঙ্গণের
নীচে অন্ধকূপ গােছের ঘর (Cellur), এখানে
কয়লা থাকে। বাড়ীর সর্বনিম্ন তলকে Ground
floor বলে, ইহা খানিকটা জমির নীচে। এখানে
দুইটা ঘর ; রাস্তার দিকের ঘরটীতে আমার গ
কী (Land lady) ও তাহার আত্মীয় স্ব
ও খাওয়া দাওয়া করেন ;. পিছন দিকের ঘরে
মা হয়।
গ্রাউণ্ড ফোবের উপরতলাকে
ঐখানেও দুটী ঘর; সম্মুখেটা
Parluir"
বলে।
২ লণ্ডনের না। . থাকে। বসির জন্য সাজান, পশ্চাতের ঘর শােবার। Drawing-room-floor পালরের উপর। সেখানকার ঘর দুটীরও বন্দোবস্ত পালরের মত। চোতলায়, গৃহকত্রী তাঁহার মেয়েরা ও চাকরাণী শয়ন ককে। আমি পালরের ঘর দুটীর জন্য সপ্তাহে ১৬ শিলিং ভাড়া দিই। ড্রয়িং রুমে আর এক জন বসাড়ে তাহার ভাড়া বেশী, এক গিনি। আমার ঘরের একটু বিশেষ বর্ণনা দিব। মেজে কাটের, কার্পেটে আবৃত তাই রক্ষা, নাহলে জুর ঠিক্ শব্দে কান ঝালাপালা হইত। রাস্তার দিকে একটী সাসি খড়খড়ি লাগ ন জানালা; শীতকালে সকালে যখন চাকরাণী ঘর আসিব করে, তখন ছাড়া, সাসি খােলা হয় না। র পাশে বসিয়া, কোন কাজ না থাকিলে লােকজন দেখিয়া সময় কাটান যায়। টেবিল, সােফা ইত্যাদির বিষয় বিশেষ বলিবার আবশ্যক নাই। ঘরের এক দেয়ালে, আগুন জ্বালাইবার স্থান ( Fire- খােনে আগুন জ্বলিতেছে। উহায়, ওনারে, এক পাশে একখানি আরামচৌকি। ০ কান্সাভ্রমণ। ইহা বাস্তবিক আরামের জিনিস।, বাহিরে বিষম শীত, বরফ পড়িতেছে। রাত্রিকাল, সব নিস্তব্ধ। তখন ঐ চৌকিতে হাত পা ছড়াইয়া আধ-বসা অধ-শােয়। রকম বসিয়—শুইয়া, চক্ষু মুদিয়া একটী পাইপ টানতে টানতে (কি দুঃখ গুড়- গুড়ি নাই) ভাবিতে, কল্পনার সহিত উড়িতে, শূন্যে বড় বড় অট্টালিকা গড়িতে ভাঙ্গিতে কি সুখ ! গুড়গুড়ি থাকিলে চরম সুখ হইত—সেই টাই অভাব । ইংজেরা খুব সভ্য হইয়াছেন বটে, কিন্তু তাহারা সভ্য রকমে তামাক খাইতে শিখেন নাই। হুকা গুড় গুড়ী এবং অম্বুরী যে পাইপ ঢুরােট আর শুখনাে তামাকের চেয়ে কত গুণে শ্রেষ্ঠ, সেটা তাহাদের বুঝিতে বাকি আছে ; শুধু যে অধিক প্রীতিকর তা নয়, শরীরের পক্ষে ও কারণ হুকার জলে তামাকের ‘নিকটিনাদি’ বিষাক্ত পদার্থ মিশ্রিত হইয়া যায়, মুখের ভিতর যাইতে পারে না। আমাদের দেশে আজ কাল চুৱােট খাওয়া ফেসয়ান হই- তেছে দেখিয়া আসিয়াছি। নব্য-বঙ্গ হুকা ছাড়ি- তেছেন। একেবারে ছাড়িয়া দেও ভালই-- অনেক ভাল।
৪
লণ্ডনের নক্সা।
.
t
কিন্তু তার বদলে চুৱেট ধরিও না। গুড়গুড়ী
নাই, দুঃখে এতটা বলিতে হইল, পাঠক মার্জন।
করিরেন। আমি এক রকমের গুড়গুড়ী তৈয়ার
করিয়াছিলাম; কিন্তু তামাক কোথায় ? গুড়-
গুড়ীতে খরসা চলে না, কাজেকাজেই তাহা
ছাড়িতে হইল।
পূৰ্ব্বে বলা হয় নাই যে রাস্তা হইতে প্রাঙ্গণে
প্রবেশ করিতেই এক টী সিড়ি। তাহা দ্বারা
উঠিয়া, বাড়ীর দরজা , ইহা ভিতর দিকে খুব
ভাল করিয়া বন্ধ না থাকিলে, বাহির হইতে
চাবি দিয়া খােলা যায়। আমার ডুয়িং-রুমের
বাসাড়ের ও গৃহকর্মীর কাছে এক একটী এইরূপ
চাবি (Latch-key) আছে। আমরা যখন তখন
এই চাবি দ্বারা দরজা খুলিয়া ভিতরে আসিতে
যে দরজার কথা বলিলাম তাহাতে
ঢুকিতেই সম্মুখে একটী রাস্তা (Passage)। আমার
বসিবার ঘরের একটী দ্বার এই রাস্তার দিকে ;
আর একটা অপেক্ষাকৃত বড় দ্বার এই ঘরের
ও শােবার ঘরের মধ্যে। শােবার ঘরেও এক টী
দ্বার রাস্তা দিকে।
পারি।
ভ্রমণ। এত খুটিনাটি করিয়া বলাতে, ভরসা করি পাঠক চটিবেন না। আমি যখন শুইতে যাই, শােবার ঘরের দুইটা দ্বারই চাবি বদ্ধ করি। সকালে উঠিয়া সেইখানেই টবে জল থাকে (পৃথক স্নানাগার নাই), তাহাতে পাখীর স্নান- গােছ স্নান করা যায়। খুব • শীতের সময়, প্যাসেজের দিকের দ্বারে চাকরাণী গরম জল রাখিয়া যায় ; তাহাতে বরফ বা ঠাণ্ডা জল মিশা- ইয়া লই। আমার স্নান করিবার,—অনেক সময় আমার উঠিবার,আগে,চাকরাণী' প্যাসে- জের দিকের দ্বার দিয়া বসিবার ঘরে প্রবেশ করিয়া, সেখানকার কার্পেট, চৌকি, টেবিল, ইত্যাদি পরিষ্কার করিয়া, টেবিলের উপর খাওয়া দাওয়ার বাসনাদি সাজাইয়া, এবং ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালিয়া চলিয়া যায়। আমি স্নানান্তে বসিবার ঘরে আসিয়া ঘণ্টায় ঘা দিলাম অর্থাৎ ফায়ার প্লেসের কাছে একটা হ্যাণ্ডেল , আছে সেটা নাড়িয়া দিলাম , তাহার সহিত তার দ্বারা নীচের তলায় (যেখানে চাকরাণী ও গৃহকত্রী কাজ করে) ঘণ্টার যোগ আছে। হ্যাণ্ডেল
লণ্ডনের নক্সা।
নাড়িয়া দিলে ঘণ্টা বাজিল। কিছুক্ষণ পরেই
চাকরাণী প্রাতঃ ভােজনের উপকরণ লইয়া
হাজির।
চাকরাণীর নাম মেরি। বলা বাহুল্য অবি-
বাহিতা
এখানে বিবাহিতা স্ত্রীলােকদের
চাকরী করা রীতিবিরুদ্ধ। মেরির বয়স ১৭।১৮
বৎসরের অধিক হইবে না; এখানে বয়স
জিজ্ঞাসা করা রুচিবিরুদ্ধ, আন্দাজে লিখিলাম ।
রং ফরসা লা অত্যুক্তি বােধ হইতে পারে।
আমাদের কাছে সব সাহেব বিবি ফরসা,
আবার আমরা সকলেই সাহেবদের কাছে কাল।
তাহারা যেরূপ আমাদের মধ্যে কে গৌরবর্ণ
এবং কে শ্যামবর্ণ হঠাৎ ঠিক করিতে পারেন
, সেইরূপ আমরাও তাঁহাদের মধ্যে ফরসা
(dark) শীঘ্র চিনিতে পারি না। মেরির রং
আমি যদিও ফরসা বললাম, আমার গিমি
তাহাকে (dark) বলেন। মেরি লেফাফা দোস্ত।
পাঠক। তুমি যদি সভ্যতা কি এক কথায়
জানিতে চাও আমি বলিয়া দি।
দি।-লেফাফা-
দোস্ততা। চাকরাণী হােক আর যাই হােক,
ফ্রান্সভ্রমণ। মেরি সভ্য সমাজের সভ্য, অতএব ইহার গুণ তাহাতে যােল আনা বর্তমান। দিনের মধ্যে কতবার যে সে সাবান দিয়া মুখ পরিষ্কার করে তাহা বলিতে পারি না। বৈকালে বেশ পরিষ্কার করিয়া থােপা বাঁধা হয়। কিন্তু ব্যাপটিম্মের সময় যদি মাথায় জল না পড়িয়া থাকে, তাহা হইলে জীবনে মেরির কখনও স্নান হইয়াছে কি না, সে বিষয়ে আমার বিলক্ষণ সন্দেহ। আমি যখন বাড়ী ভাড়া লইয়া রােজ সকালে স্নান করিবার ব্যবস্থা করিলাম, চারাণী অবাক। রােজ স্নান! মেরির একটা বিশেষ গুণ পরের জিনিস দর- কার হইলে আপনার মনে করা এবং ব্যবহার করা। সােজা কথায় ইহা এক রকম চুরি- তবে এত কথা প্রয়ােগ করিলাম কেন ? মেরিকে প্রকারান্তরে চোর বল, সে কিছুই বলিবে না, কিন্তু যদি তাহাকে সােজাসুজি “চোর” বল, তাহা হইলে সে ‘গ’ মাথায় তুলিবে। আমার বসিবার ঘরে Gupboardএ জাম, জমান দুধ, ইত্যাদি মিষ্ট সামগ্রী থাকে। মধ্যে মধ্যে
লণ্ডনের নক্স।
.
দেখি সে সব বড় কমিয়া যায়। একদিন মেরীকে
ডাকিয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম, সে প্রত্যুত্তরে
বিড়ালের উপর সব দোষ চাপিয়া দিল এবং
কবাের্ডের কোন্ ফাটাফু দিয়া বিড়াল প্রবেশ
করিয়াছিল সম্ভীরভাবে তাহার অনুসন্ধান
করিতে লাগিল। আমি হাসি রাখিতে পারিলাম
। আর এক দিন আমি একখানি পিয়াসের
ভাল সুগন্ধি সাবান, একবার মাত্র ব্যবহার
করিয়া সাবানের ডিসে রাখিয়া দিয়াছি। পরে
আর তার দেখা নাই। চাকরাণীর উপর সন্দেহ
হইল , মুখে সুবাস সাবান মাখিতে সাধ গিয়া-
ছিল তাই লইয়াছে। কিন্তু ডাকিয়া জিজ্ঞাসা
করাতে, সে যেন কিছুই জানে না এইরূপ ভাব
চেহারায় প্রকাশ করিল এবং কিছুক্ষণ পরে
বলিল যে, সাবানখান নিশ্চয়ই মুখ ধােবার পাত্রে
কয়লা জলের ভিতর ছিল, জলের সহিত সে
ফেলিয়া দিয়াছে। সাবান পিচ্ছল পদার্থ, হাত
হইতে পড়িয়া যাওয়া অসম্ভব নয়, কিন্তু সাবানের
পাত্র হইতে কিরূপে উহা জলে প্রবেশ করিল,
বিড়ালের কবাের্ড প্রবেশ করার ন্যায় বিষম
ফ্রান্সভ্ৰমণ। সমস্যা রহিল। আবার গৃহকর্তী আসিয়া চাক- রাণীর পক্ষে সাক্ষ্য দিল। তাহাদের দুজনের আপনাদের মধ্যে মিল থাক না থাক, বাসাড়েদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ঐক্য। চাকরাণী কোন দোষ করিলে গৃহকত্রী তাহার পক্ষ অবলম্বন করে, এবং গৃহকত্রীর কোন ত্রুটি, হইলে, চাকরাণী তাহার ওকালতী করে। দুই জনের কাহাকেও দোষী করা এক রকম অসম্ভব। এখানকার চাকুরাণীরা খুব খাটে। একলা মেরি সমুদায় বাড়ীর কায যেরূপ সুচারুরূপে করে, আমাদের দেশে ৪৫ জন চাকর চাকরাণী সেরূপ করিতে পারে না। সকালে ৬টা হইতে রাত্রি ১০১১টা পর্যন্ত খাওয়াদাওয়ার সময় ছাড়া তার বিশ্রাম নাই বলিলে হয়। ভাের বেলায় আমার বসিবার ঘর কিরূপ সে পরিষ্কার করে, তাহা পূৰ্বে বলা হইয়াছে। সেখানে আসিলে শােবার ঘরও সেইরূপ পরিষ্কার করে। বাড়ীতে যতগুলি ঘর আছে.এই রকম তার ছাপ ছােপ রাখিতে হয়। তা ছাড়া আমাদের খাবার- দাবার যখন যা কিছু দরকার, ঘণ্টায় ঘা দিলেই লণ্ডনের না । ‘আনিয়া দেয় ; যে, সিড়ি ও প্যাসেজের কথা পূৰ্বে বলিয়াছি তাহা নিকোন, বাসন মাজা, গৃহকত্রীকে রন্ধনে সহায়তা করা, দোকান হইতে খুজরা জিনিস লইয়া আসা, ইত্যাদি সবই তার কার হয়। সুধু যে খাটে তা নয়, খাটে বিনা বাক্য ব্যয়ে, প্রফুল্লচিত্তে। এক গৃহকত্রী এবং এক চাকরাণী, এক ঢোল এক কঁসি, ত'হতেই যথেষ্ট। চাকরাণীর বেতন সপ্তাহে ২ টাকা এবং খােরাক। শুইবার জন্য একটী ঘােট ঘর পায়। এখানে ধনী লােক ব্যতীত কেহই চাকর রাখে “না কারণ তাহাতে অনেক খরচ। একজন চাক- বের মাসিক বেতন ৪০ ৫০ টাকার কম নয়, এবং সে চাণীর মত সব কাজ করিবে না। এখানকার রাধুনীরাও প্রায় সব স্ত্রীলােক। মধ্য- ত্তি গৃহস্থেরা এক জন চাকরাণী ও একজন রাধুনী, স্ত্রীলােক রাখিয়া থাকেন। মেরি প্রতি রৱািরে কয়েক ঘণ্টার ছুটী পায় তাহার গিরজায় যাইবার জন্য। কিন্তু সেখানে কখনও তার পা পড়িয়াছে কি না সন্দেহ। মেরি
ফ্রান্সাভ্রমণ।
যীশু খ্রীষ্টের নাম শুনিয়াছে, দেবতা বলিয়া মানে,.
সেই পৰ্য্যন্ত । তার হৃয়ের টান আর একটী।
কৃষ্ণের দিকে। ইনি মেরির Sweetheart । এই
কৃষ্ণ কখনও কখনও পার্কাদি নিকুঞ্জ কাননে,
নিরূপিত স্থানে, তাহার প্রণয়িনীর আগমু
প্রতীক্ষা করে, কখনও বা বাড়ীর সম্মুখে রাস্তায়
পায়চালি করে এবং সিস, দেয়। আমি কয়েক
রবিবার বৈকালে বাড়ীর কাছে একটি বিশেষ
সিস, শুনিতাম, দেখিতাম উহা শুনিলেই মেরি ।
ছটফট করিত, কাজকৰ্ম্ম “জো সে” • করিয়া
সারিয়া বাহিরে যাইবার জন্য ব্যগ্র হইত, ঐ
সিস মেরির কৃষ্ণের বাঁশি। মেরি পােষাকী
কাপড় পরিয়া (সম্ভবতঃ আমার পিয়াসের সােপ
মাখিয়া ) সাজিয়া গুজিয়া তাহার নিকট যাইত।
-:():০
গৃহকত্রী । ! আমার বর্তমান গৃহকত্রীর বয়স অনুমান ৪০'। ৪৫গুরুৎসর। এখানকার হিসাবে তাহাকে মধ্যম বয়স্কা বলা যাইতে পারে। পাঠক! তুমি যদি লণ্ডনে এস, বৃদ্ধা গৃহকত্রীর বাড়ীতে বাসা ভাড়া লইতে চেষ্টা করিও। যাঁহাদের মস্তিষ্কে “রুচির পীড়া জন্মিয়াছে হন্যে কুকুরাহত ব্যক্তি যেরূপ জল দেখিলে ভেউ ভেউ করে, সেইরূপ যাহারা যে কথার কোন দূষিত অর্থ হওয়া সম্ভব, সেইটাই আগে ভাবিয়া লইয়া কুরুচি, ‘কুরুচি’ চীৎকার ছাড়েন, তাঁহারা নিশ্চয়ই বলিবেন আমার এটী কুপরামর্শ, আমি খারাপ কথা লিখি- লাম। আমি এখানে অনেক দিন আছি, অনেক গৃহকী দেখিয়াছি-যে পরামর্শটা দিলাম, সেটা আমার বহুদর্শিতার ফল। অগ্রাহ্য কর—ঠকিবে। লণ্ডলের সকল গৃহ- কীই তােমার খাবারদাবার জিনিসপত্র ও ফায়ারপ্লেসের কয়লা ইত্যাদির জন্য বাজারের
যে
গৃহকত্রী ।
অপেক্ষ', কিছু কিছু বেশী দাম লইবেই লইবে;
এইরূপ উপরি পাওনা ত হারা সকলে ন্যায্য মনে
করে, তাহা বন্ধ করা এক রকম অসম্ভব।
বৃদ্ধা, যাহার তিন কাল গিয়া এক কাল আছে, সে,
নরম এবং আলগা পলি যেরূপ কালে কঠিন
পাথর হয়, অথবা ইট যেরূপ পুড়িয়া ঝামা হয়,
সেইরূপ ঠনঠনে শক্ত। তাহার চুলের সহিত
ঠকান-বিদ্যা পাকিয়াছে। মনে করিয়াছিলাম,
ধৰ্ম্মনিষ্ঠা বৃদ্ধা গৃহকত্রী বেশী ঠকাইবে না। কিন্তু
কে বাস্তবিক ধৰ্ম্মনিষ্ঠা, তাহা কেমন করিয়া
বুঝিব? আমার একটা পলিতকে কী,
ধার্মিক বলিয়া বােধ হইল, প্রতি রবিবারে গির
জায় যাইতে হইবে। কিন্তু তাহাতে আমার
লাভ এই মাত্র দেখিলাম, যে রবিবারে আমার
খাওয়া দাওয়ার সময় তাঁহার গিরজায় যাওয়ার
সুবিধানুযায়ী করিতে হইল। তিনি যেমন ধারা
শশণ করিতেন, তেমন আর কেহই করে নাই।
আমাদের দেশে অনেকের যেরূপ দৃঢ় বিশ্বাস, যে,
ভাগীরথীর জলে স্নান করিলেই সব পাপ ধৌত
হইয়া যায়, সেইরূপ আমার বােধ হয় তাহার
১৪
লণ্ডনের নক্সা ।
বিশ্বাস, যে, সপ্তাহে সপ্তাহে বাসাড়েদের বিল
লিখিয়া যে পাপ সঞ্চিত হয়, তাহা প্রার্থনাপুস্তক
খান সম্মুখে খুলিয়া গিরজায় বসিলে, এবং
প্রার্থনার সময় দাড়াইলে, ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আমার
বৌহয়, গিরজা যাওয়া তিনি সেই জন্য অত্যা-
বশ্যক মনে করিতেন। ঝানু’ কথাটা মার্জিত
রুচিবিরুদ্ধ কিনা জানি না; কিন্তু বৃদ্ধাকে ঐ
বিশেষণটা দিলে সংক্ষেপে তাহার বর্ণনা হয়।
যে গৃহকর্তীর কথা লিখিতেছি, তিনি যে
বিশেষ গুণবতী বা রূপবতী, তা নন। ইংরাজী
রান্নার কথা শুনিয়া আমাদের দেশের গিন্নিরা
হাসিবেন। সে রান্নায় হলুদবাটা, ধনে বাটা,
ঙ্গিরামরিচ, এমন কি . লবণ পৰ্য্যন্তও পড়ে না
ফোড়ংএর কথা দূরে থাক,—ওমা সে কি আবার
রান্না! যে রান্নায় সুতো, শাকের ঘন্ট, মােচার
ঘন্ট, চড়চড়ি, বড়া, তিলেবড়ি ভাজা, ছেচড়া, অম্ল,
গরম গরম ফুল্কো লুচি, ইত্যাদি নানাবিধ জিনিষ
একেবারে নাই, হঁাগা তাও আবার মানুষের
ভাল লাগে। রান্নায় তাহাদের সম্পূর্ণ জিৎ, সৈ
কথা আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতেছি ; এবং ভরসা
গৃহকত্রী ।
১৫
D
করি, আমাদের সুশিক্ষিতা ব্যারা সে রান্না
ছাড়িয়া দিবেন না। সে রান্নার কথা মনে
পড়িলে, চোখে ও জিহ্বায় যেন কিরূপ সহানু-
ভূতি জন্মে—একত্রে বিশিষ্টরূপে সিক্ত হয়।
আমার গৃহকী এখানকার রান্নায় পারছী,
অর্থাৎ মাংসটা Ovenর ভিতর রাখিয়া দিলে,
কখন তাহা খাদ্যোপযােগী হয় সেটা বেশ বুঝিতে
পারেন, এবং আলুটা আটা জলে ফুটাইলে
কখন নরম হয় তাহাও আন্দাজ করিতে অক্ষম
নন। রান্নার কি তারিফ ! কিন্তু ঐ রান্নার
প্রশংসা করিলে তিনি বড় খুনী, তাহার মন গলিয়া
যায়। যদি তিনি বেমকা রকম চাষ করিয়া
থাকেন, তাহলে এরূপ দু চারটা মিষ্ট কথা বলিয়া
ভূমিকা করিয়া, তবে আসল কথা গাড়িতে হয়,
তাহাহইলে অনেকটা কাৰ্যসিদ্ধি হইবার সম্ভব।
কিন্তু যে বুড়ী গৃহকর কথা পূৰ্বে বলিয়াছি,
সে কিছুতেই গলিত না-গলা দূরে থাক্ একটু
নরমও ইত না। প্রশংসা তার কাছে খাটিত
না। গল্পের নসীরামের ন্যায় সে বেগুণ কখনও
ছাড়িত না।
১৬ লণ্ডনের নক্সা। আমার গৃহকত্রী, উপরে বলিয়াছি, তত রূপ- বতী নন, তবে নিজে তাহা ওয়াকিব কিনী সন্দেহ। “অশ্বথামা হত ইতি গজ” গােছ করিয়া যদি কেউ তঁাহার শ্রী বা পােষাক সম্বন্ধে দুচারটা মি কথা বলে, তাহা হইলে তিনি আহলাদে আটখানা। এরূপ প্রশংসা কার্যসিদ্ধির ব্রহ্মাস্ত্র। এস্থলে বলিয়া দেই, যে বৃদ্ধা গৃহকর্তীর ন্যায় যুবতী গৃহকর্ত্তীও বাঞ্ছনীয় নয়। পক্ককেশার ‘টাকার উপর মায়া যেমন অধিক নবীনার তেমনি কম। অনেকে মনে করেন বয়স হইলে সংসারে বৈরাগ্য জন্মে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঠিক তার উল্টা দেখা যায়। বয়সের সঙ্গুে সংসারের বন্ধন দৃঢ়তর হয়, সঞ্চয়ের ইচ্ছা প্রবল- তর হয়, কৃপণতা বাড়ে। যুবতীর সংসারে আঁট বাঁধে নাই, সম্পূর্ণ ঔদাসীন্য। নববিবাহিত। নূতন প্রেমে মগ্ন। তােমাকে ঠকাইবে খুব কম। কিন্তু তােমার খাবার দাবার জন্য যত্ন করিবে না—আপ লইয়াই ব্যস্ত। তুমি চলিয়া যাও ক্ষতি নাই, টাকার প্রতি তত মায়া জন্মে নাই। সব নবীনাই যে এইরূপ হইবে, তার বটে। গৃহকত্রী । কোন কথা নাই। ভাল গােছাল গিন্নি হইলে, সে উৎকৃষ্ট গৃহকত্রী হইবে। ঠকান-বিদ্যায় আজও তার হাত পাকে নাই। আমাদের দেশের গিন্নিদের রান্নায় জিৎ, পূৰ্বে বলিয়াছি। কিন্তু বাড়ী সাজান ও পুনি স্কার রাখা সম্বন্ধে আমার গৃহকত্রীর কাছে তাহা- দের হার মানিতে হইবে। পান্ বড় উত্তম জিনিস, অল্প পরিমাণে খাইলে উপকারও হয় হার রসে ওষ্ঠ চমৎকার রঞ্জিত হয়, সত্য। কিন্তু পানের পিকে যে চুনকাম-করা দেয়ালের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়, সে বিষয় সন্দেহ। “সন্দেহ” বলিলাম ভয়ে ভয়ে—“হয় না” বলিতে ছিলাম। এখানকার ঘর ছবিওয়ালা কাগজে মােড়ান; তাহাতে একটী দাগ পর্যন্তও লক্ষিত হইবে না। গৃহকত্রী হরিণয়না নন, বিড়াল- নয়না। কিন্তু ঐ চোখ বাড়ীর চারিদিকে, ঘরে, বাহিরে ঘুরিতেছে ; কোন চেকীখান্ চাকরাণী ভাল করিয়া মুছিতে ভুলিয়া গিয়াছে, কোথায় কোন্ কোণে একটু ময়লা রহিয়া গিয়াছে, ক্রমা- গত আবিষ্কার করিতেছে। ইহা অনেকটা
লণ্ডনের নক্সা।
লেফাফাদোরস্ততার ফল বটে। কিন্তু এরূপ
লেফাফাদোরস্ততা প্রশংসনীয়। বাড়ী, ঘর, দ্বার,
জিনিস পত্র সব তকৃ ত করিতেছে।
আমার গৃহকত্রী বাসাড়েদের বড় যত্ন করেন।
সা, বাজার করা, বিল করা সব ভার তাহারই
উপর। তাঁহার মেয়েদের কথা গত নক্সায়
উল্লেখ করিয়াছি। তাহাদের দ্বারা কাজ কর্মের
বিশেষ সাহায্য পান না; কিন্তু তাহারা রােজগার
করে-একজন কোথায় পড়ায় ও বাজনা শিখায় ;
আর একজন বােথ হয় কোন দোকান কাজ
করে। গৃহকত্রীর স্বামীর উল্লেখ করা হয় নাই।
প্রথম প্রথম তাহার অস্তিত্ব সম্বন্ধেই সন্দেহ
ছিল ; কারণ কখনই তাহাকে দেখিতে পাইতাম
।
সে নগর গুদমসরকারী গােছের কি কাজ
করে। বাড়ীর সম্মুখে যে প্রাঙ্গণের কথা বলি-
য়াছি, তাহা হইতে সিড়ি দিয়া নীচে নামিয়া
গ্রাউণ্ড ফ্লোরে যাইবার রাস্তা আছে। সে রােজ
সকালে আমার উঠিবার আগে ঐ রাস্তা দিয়া
বাহিরে যাইত, আবার সন্ধ্যার পর গ্রাউণ্ডফোরে
পুনঃ প্রবেশ করিত। বাড়ীর কোন কাজে
গৃহকত্রী। তার হাত নাই, হাত দেয় না। গােপালের মত ভাল ছেলে, যা পায় তাই খায়, ভাল খাব ভাল পরিব বলিয়া বায়না করে না। গৃহকত্রীই সর্বেসর্বা। সংসারের সব কাজেই • তাহার হুকুম অকাট্য। বংশের ও ধনের গৌরব করা ইংরাজদের সঙ্গীয় স্বভাব। আমার : গৃহকত্রীও সুবিধা পাইলে এ স্বভাব প্রকাশ করিতে ছাড়িতেন না। একটু আরম্ভ করিয়া দিলে হয়, আর মুখ দিয়া বাক্যের স্রোত বাহিরিবে–“পৰ্বত হইতে যবে বাহিরায় নদী, কে রোঁধে তাহার গতি ?? অমুক লর্ডের প্রপিতামহের সহিত তাঁহার পিতামহের বড় সৌহৃদ্য ছিল, তাহার নিজের সহিত রাজ- বংশীয় অমুক ডিউকের সঙ্গে বড় আলাপ ছিল, তাহার এক ভ্রাতুষ্পত্র আমেরিকায় গিয়া ক্রোড়- পতি হইয়াছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রােফেসর ভাচুসন।
-(৩)-
প্রাফেসর ভাচুসনের গাড়ি যুড়ী নাই ।
মােড়ের মাথায় টুমি হইতে নামিয়া, মন্দগতি
কলেজের দিকে যাইতেছেন। বাঁ হাতে একটা
মাঝারিগগাছের কালো ব্যাগ, ডানহাতে একটা
হ'তা। কিছু পূর্বেই বৃষ্টি হইয়াছিল ; রাস্তায়
বড় কা; প্রােফেসরের জুতায় এবং পান্ট
লনের নিম্নভাগে কাদা লাগিতেছে-ভ্রক্ষেপ
নাই। তাঁহার মস্তক ঈষৎ অবনত, দেখিলেই
বোধ হয়, কি যেন ভাবিতেছেন। তিনি চলি-
তেছেন,
ঠিক কলেজের দিকে যাইতেছেন বটে;
কিন্তু নিজে তাহা জানেন কি না সন্দেহ।
লােকটী দেখিতে কিছু “আলাভােলা” ; ভিড়ের
ধ্যে যাইতে যাইতে মাঝে মাঝে দুই একজন
'মুটে মজুরের ঘেঁস লাগিতেছে—দৃকপাত নাই।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তিনি গাড়ি চাপা,
পড়েন না।
২।
প্রোফেসর ভাচুসন।
প্রফেসর ভাচুসন ব্যাগ হাতে ক্লাসে
প্রবেশ করিলেন। তিনি ধীর, চিন্তাশীল, স্থির ;
তিনি গম্ভীর; কিন্তু ঐ গাম্ভির্যের সহিত কেমন
যেন একটু চাপা মাধুৰ্য্য আছে, তাহা বর্ণনা কর।
যায় না। তাঁহাকে দেখিলেই ভক্তি, শ্রদ্ধা
আপনা আপনিই জন্মে ; ঐ ভক্তি শ্রদ্ধার সহিত
কেমন যেন একটু ভালবাসা মিশ্রিত থাকে।
তিনি ব্যাগ হইতে কতকগুলি কাগজের টুকরা
বাহির করিয়া লইয়া, যেমন বক্তৃতা দিতে আরম্ভ
করিলেন, অমনি সকলে নিস্তব্ধ,—টু শব্দটী নাই।
তিনি কোন পুস্তক বিশেষের টীকা দীপনি
পড়েন না। গালগল্প করিয়া সময় কাটান না। যে
বিষয়ে বক্তৃতা দিতেছেন, সে বিষয়ে তাহার জ্ঞান
অগাধ। তাহার বক্তৃতা-স্রোত বহিতে লাগিল
অল্প জলের স্রোত তর্জন গর্জন করিয়া,
পাথরের উপর লাফাইয়া লাফাইয়া, যাইতেছে,
। সে স্রোতের জল সুগভীর—অতলস্পর্শ।
তাহা শ্রোতৃবর্গকে ডুবাইয়া লইয়া মন্দ মন্দ গমন
করিতেছে—সময় যেন কোথা দিয়া চলিয়া গেল।
প্রােফেসরের বার্ষিক বেতন ৩০০০ টাকা
-
২২ লণ্ডনের নক্সা। এত অল্প। মাত্র। কিন্তু, এখানে বেতন, বিদ্যা বুদ্ধির পরিমাণ নহে; বেতন দ্বারা মানমর্যাদা নিৰ্দ্ধা- রিত হয় না। তিনি আমাদের দেশের ১০২০ টা যুড়ী হাঁকান, হট,হট করা, প্রােফেসরকে সিলিয়া খাইতে পারেন। বেতনে সন্তুষ্ট, তবুও ও তিনি এমন নম্র-গিলিয়া খাইতে পারেন বলিয়া, এমন সন্তুষ্ট ও নম্র। তিনি, যে ধনে ধনী, রৌপ্য বা স্বর্ণমুদ্রা তাহার পরিমাণ বৃদ্ধি করিতে অক্ষম। তাহার চেহারা দেখিলে বােধ হয়, তাহার যেন কিছুরই অভাব নাই। বেতন ছাড়া, সাময়িক পত্রে লিখিয়া, বা স্থানান্তরে বক্তৃতা দিয়া, তিনি আরও কিছু উপার্জন করেন। কিন্তু টাকা রােজগার করা তাঁহার উদ্দেশ্য নহে; তঁাহার অভাব অধিক নহে, খাইও অধিক নহে। প্রােফেসর ভাচুসন যেমন বিদ্যার জাহাজ, তেমনই আবার সচ্চরিত্তের ও সদ্ব্যবহারের আদর্শস্থল। তিনি গুরু; কিন্তু তাই বলিয়া যে ছাত্রের সহিত দূর-সম্বন্ধ, তাহা নহে। তিনি গুরু এবং বন্ধু—সাধ্যমত উপকার করিতে, সৎ- প্রােফেসর ভাচুসন। পরামর্শ দিতে, এমন লােক আর কুত্রাপি দেখা যায় না। প্রােফেসর ভাচুসন নন একদিন আমাদিগকে স্থানান্তরে কিছু দেখাইতে লইয়া যাইবেন। আমাদের বড় আহাদ। নির্দিষ্ট রেলওয়ে ষ্টেশনে সকলে একত্র হওয়া গেল। আমাদের মধ্যে কেহ কেহ ধনী, কেহ বা গরিব। কিন্তু সকলকেই রেলের গাড়ির তৃতীয় শ্রেণীতে যাইতে হইবে। প্রােফেসরও আমাদের সঙ্গে ঐ শ্রেণীতে—তাহাতে তাহার মানে ,হানি হয় । এখন আর তিনি বা দিতেছেন না- আমাদের সঙ্গে হাস্য পরিহাস, নানা রকমের আমােদ প্রমােদের গল্প করিতেছেন। হইতে নামিয়া, চলিতে চলিতে, কোন স্থানে ক্ষুধা পিপাসা লাগিলে, সকলে মিলিয়া পান্থ- শ্রমে যাওয়া গেল—সেখানেও গল্প, আমােদ প্রসােদ। প্রােফেসর ভাচুসনের যশ খবরের কাগজে 'কীৰ্ত্তিত হয় না; সুশিক্ষিত সম্প্রদায়ের বাহিরে কেহই তাহাকে চিনে না, কেহই তাহার নাম
২৪
লওনের নক্সা।
পৰ্যন্তও হয়ত শুনে নাই। কিন্তু যদি আমাকে
জিজ্ঞাসা কর, ইংলও সভ্যদেশ কেন ? আমি
উত্তর দিব, কারণ এখানে প্রােফেসর ভাচুসনের
মত অনেকগুলি লােকের একটা সম্প্রদায় আছে।
দি আমাকে জিজ্ঞাসা কর, ইংলণ্ডের গৌরব,
ইংলণ্ডের অলঙ্কার কাহারা?-আমি উত্তর দিব,
প্রােফেসর ভাচুসনের মত লােক। ইহার।
ফ্যাসনের পূজা করেন না; ইহঁদের কোটের
কাট, জুতার ঢং হয়ত মার্জিত রুচি-বিরুদ্ধ ;
“বলে” হয়ত ইহাদিগকে দেখিতে পাইবে না।
কিন্তু বস্তুত, ইহারাই ইংলণ্ডের মহত্ত্বের কারণ
বুড় বড় রাজনৈতিক বল, আর কারীগরই বল,
চিত্রকর বা যন্ত্রকার যাহাই বল, সব ইহারাই
প্রস্তুত করেন।
-0:0:0-
* বল”।
-স্ট্রীটে, -নং বাড়ীতে বড় ধূম। রাত্রি দশটা
বাজিল।
অনেক পুরুষ ও মহিলার সমাগম
হইয়াছে, তাহাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়িতেছে।
পুরুষদিগের প্যাণ্টলন কালো রঙের। কোটও
কালাে ; বুকু খােলা, সেখানে দুগ্ধনিন্দিত শুভ্র
কামিজ শােভা পাইতেছে। কোমর হইতে
কোটের সম্মুখভাগ কাটা ; তাহার পিছনদিকের
অংশ লেজের ন্যায় ঝুলিতে থাকে, তজ্জন্য ঐ
রকমের কোটকে লেজওয়ালা কোট বলে।
সন্ধ্যার পর খানায়, নাচে, কি “ অ্যাটহােমে
যাইতে হইলে, ঐ রকমের কোট পরিয়া যাওয়া
দস্তুর। পুরুষদিগের পরিচ্ছদের আমি বিশেষ
তারিফ করিতে পারিলাম না। তাহার রং ও
ঢং কেবল যে আমাদের চক্ষুর অপ্রীতিকর তাহা
নয়; অনেক ইংরেজও তাহা পছন্দ করেন না।
কিন্তু তারা প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে কাজ করিতে
চান না। মহিলাদের পােষাক নানা রঙের ও
গ
লণ্ডনের নক্সা।
ঢঙের, দেখিতে বড় ভাল। তাঁহাদের মধ্যে
অনেকেই আপন আপন সৌন্দর্য বাড়াইতে এবং
অঙ্গসৌষ্ঠব দেখাইতে সাধ্যমত প্রয়াস পাইয়া-
ছেন। কত জনের বেণীর শােভা যে পরচুল
বিক্রেতার দৌলতে, তাহা ঠিক করা দুঃসাধ্য।
পাউডার এবং রুজ প্রভৃতি রঙের ত কথা নাই ;
তদ্বারা মুখ চিত্রিত বিচিত্রিত করা অনেকের
পক্ষে নিত্যকর্মের সামিল হইয়া পড়িয়াছে।
শুনিয়াছি, আমাদের দেশেও সভ্যতার বৃদ্ধির
সহিত এইরূপ ঘটিতেছে। সভ্যতা কি জিনিস।
কাহারও কাহারও মৃণালভুজের এবং কণ্ঠদেশের
অধঃস্থিত প্রদেশের সৌন্দর্য্যের ঈষৎ আভা
পােষাক ফুটিয়া বাহির হইতেছে। আশ্চৰ্য্য
কি! এরূপ সমাবেশে কত ভালবাসার বীজ
রােপিত হয়, কত ভালবাসার চার বর্ধিত হয়।
মহিলাদিগকে কয়েকটী দলে ভাগ করা যাইতে
পারে
। ১ম, পতিতা
মহিলা। ইহারা বড়
রূপলাবণ্যবতী নন। সুন্দরীরা ইহাদিগকে “blue
stocking” বলিয়া ঠাট্টা করেন ; আরও বলিয়া,
থাকেন, যে, ইহঁদের রূপ নাই বলিয়াই বিদ্যার
বল।
দিকে এত দম। যাহারা রূপবতী তাদের কি
লেখা পড়া করিয়া সময় অপব্যয় করিবার অবকাশ
আছে ? দিগগজ রমণীরা প্রায়ই অবিবাহিতা ;
শারীরিক উৎকর্ষ সাধনে তাহারা যত্নবতী নন ;
তাঁহাদের দিকে ২৪ জন পরিচিত পণ্ডিত ব্যতীত
কেউ ঘোঁসিতেছে না। ২য়, সুন্দরী যুবতী।
ইহারাই এখানকার চুম্বক পাথর। ইহাঁদের
কৃপাদৃষ্টির উপর অনেক যুবকের জীবন মৃত্যু নির্ভর
করে। ইহাদের চারিপাশে একটী হুলস্থুল কাণ্ড
পড়িয়া গিয়াছে। সকলে যদি আপন আপন
মন খুলিয়া দিত, তাহা হইলে সমাজনীতিজ্ঞ,
অধ্যয়ন করিবার কত বিষয় পাইত ; কাহারও
sweet heart হৃদয়ের ধন, অন্য একজনের সহিত
হাস্য পরিহাস করিতেছে ;—সে জ্বলিয়া পুড়িয়া
মরিতেছে।
কোন বৃদ্ধের নবীনা স্ত্রী, কোন
যুবকের সহিত অনেকক্ষণ ধরিয়া হাসি গল্প করি-
তেছে,-বৃদ্ধ ব্যাচারি ফ্যাল ফ্যাল,
ফ্যাল ফ্যাল করিয়া
সেদিকে চাহিয়া রহিয়াছে। কোন স্ত্রীর স্বামী
একটা রূপলাবণ্যবতীর সহিত ঠাট্টা তামাসায়
ব্যস্ত। স্ত্রীর ক্ষমতা থাকিলে তৎক্ষণাৎ সুন্দুরী-
”নর নক্স। টীকে দ্বীপান্তর কি আরও কিছু করিতেন ; আপাততঃ, তাহাকে অভিশাপ দিয়া, বাড়ী গিয়া স্বামীকে কিরূপ শাস্তি দিতে হইবে তাহা ঠিক করিতে করিতে কোন পুরুষের সহিত গল্প বাধাইবার চেষ্টায় ঘুরিতেছেন। সৌভাগ্যের মধ্যে, সভ্যতার বলে ইহাদের এ সব সহিয়া গিয়াছে ; নহিলে একটা তুমুল কাণ্ড হইত ঘুসোঘুসী, কান্নাকাটি, ইত্যাদি ইত্যাদি। ৩য় **রে রমণীদের নচ রূপ, নচ বিদ্যা। ইহ- দিগকে কেউ বড় পুছে না ইহাদের ঈর্ষা বড় এবল।' খুঁত ধরা, গালি দেওয়া, ইহাদের প্রধান কাজ। * Miss- কি বেহায়া ! একেবারে লজ্জার মাথা খেয়েছে, ” “ Mrs- বুড়াে বুড়াে ছেলের ম তিনকাল গেছে এক কাল আছে, এখনও লজ্জ। সম হলো না ?” দেখিছিস "লা Miss- কি চলানটা ঢলাচ্ছে, তবু ত রূপের গন্ধও নাই, ইত্যাদি। (লের প্রধান অঙ্গ নাচনা। না এখানে একটী প্রধান গুণের মধ্যে গণ্য। 'ভদ্র পুরুষ ও মহিলা সকলেই রীতিমত নাচিতে শিখেন। স
বুল।
কেবল ধেই ধেই করিয়া ঘুঝলে নাচা হয় না,
তার মধ্যে অনেক কাচুপি আছে। ডুয়িং
রুমে নাচ হয়। তােমার সহিত কোন মহি-
লার আলাপ হইলে, তিনি তােমার সঙ্গে
কোন ন'চে নাচিয়া সুখী করিবেন কি না,জিজ্ঞাসা
করিতে পার। তিনি যদি অন্য কাহারও সঙ্গে
নাচিতে প্রতিশ্রুত হইয়া না থাকেন, এব যদি
তােমাকে তিনি পছন্দ করেন, তাহা হইলে
তােমার প্রার্থনা মঞ্জুর হইবে। নাচ শেষ হইলে
নীচে পালরে রিফেসমেন্টের আয়ােজন আছে ;
সেখানে তাঁহাকে লইয়া গিয়া, তঁাহাকে খাওয়ার
ও তঁাহার সহিত গল্পাদি করিবার সুখ উপভােগ
করিতে পার। যিনি নিমন্ত্রক, যাহার বাড়তে
বল”, তিনি আহুতদিগকে অভ্যর্থনা করিয়া
খালাস; তার পর, তারা চরিয়া খান্। “বল”
প্রায়ই রাত্রিশেষে সমাপ্ত হয়। যাহারা “ল”
ভক্ত, তাঁহাদের পক্ষে রাত্রিই দিন, এবং দিনই
রাত্রি।
)
-(::::)-
ফুল ভ্রমণ। (::::)- পারিস ও পারিস-বাসী। (পারিস ভােগ্নবিলাসের চরমস্থান,-“ফ্যাস- নের” খাস্আড়া। নগরটী যেন একটা ছবি। নগরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার ও প্রশস্ত। অনেক পথের দুই ধারে বড় বড় শ্যামল তরুরাজি, এবং বড় বড় সুসজ্জিত দোকান। (স্বাভাবিক সৌন্দর্য্যের অনুকরণ, কিম্বা স্বাভাবিক শােভার উন্নতি কতদূর সম্ভব, তাহা পারিশের ও তাহার চারি পাশের সুরম্য উদ্যানগুলি না দেখিলে বুঝা যায় না। লণ্ডনের ‘সিটি (City) অর্থাৎ নগর- ভাগটা অনেকটা আমাদের বড় বাজারের মত, সেইরূপ সঙ্কীর্ণগলি, সেইরূপ লােকের ভিড়, বৃষ্টির পর সেইরূপ কাদা। বিশেষ কোন কাজ থাকিলে কেহ কখন সে দিকে ঘেঁসে না। কিন্তু পারিসের ‘সটিতে’ লােকে সখ করিয়া বেড়ায়; এমুন কি, কেহ না বলিয়া দিলে, কোন পারিস ও পারিসবাসী। ৩১ ) অংশটা ‘সিটি’ তাহা ঠিক করা দুঃসাধ্য। লণ্ড নের নাট্যশালা প্রভৃতি আমােদ-প্রমােদের বাড়ী খুব বড় বড়, এবং ভিতরে বেশ সাজান ; কিন্তু সেখানে যাইবার রাস্তা প্রায়ই ছােট ছােট পচা ঘুপসীগলি,-দুধারে মান্ধাতার আমলের সেকেলে কালাে কালাে বাড়ী, দেখিলে ভয় হয়। পারিসের থিয়েটার ও অপেরা প্রভৃতি স্থানে যাইবার পথে সহ্ করিয়া, সুখে বেড়ান যায় (কেন এমন প্রভেদ হইল ? ১৭৯৩ সালের প্রসিদ্ধ বিপ্লব এই একটী প্রভেদের কারণ। বিদ্রোহীরা পারিসের অসংখ্য বাড়ী ভাঙ্গিয়া ছার- খার করে ; সেই সময় অনেক পুরাণ, পচা বাড়ী ভূমিসাৎ হয়। দেশে যখন আবার শান্তি বিরাজ করিল, তখন পারিসের সেই শ্মশানভূমির উপর আবার উত্তম উত্তম অট্টালিকা দেখা দিল ; নূতন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট প্রস্তুত হইল, নূতন প্রশস্ত বাগান তৈয়ার হইল। ফরাসীরা বিপদে দমে না, বিপদে বরং তাহাদের ঘূর্তি আরও বাড়ে। খরস্রোতস্বিনী নদীর পক্ষে বালির বাঁধ, তেজীয়ান ফরাস র পক্ষে তেমনি যেমন
ফ্রান্স ভ্রমণ।
বিপদ-বাধ। (১৮৭১ সালে এখানে কি মহা কুরু-
ক্ষেত্ৰ-সমর ঘটে, তাহা অনেকেরই স্মরণ আছে।
কিন্তু তাহার সাতবৎসর যাইতে না যাইতেই
পারিসে আবার কত আমােদের তুফান উঠিল,
রঙ্গরসের গা চলিল। ১৮৭৮ সালের মেলায়
দেশ বিদেশ হইতে পারিসে লক্ষ লক্ষ লােকের
সমাগম হইল। তখন আর কমিউনিষ্টদের
বৰ্ধতার চিহ্ন কোথায় ?—সকল স্থলেই হাসি
খুসি, নাচ-তামাসা, আমােদ প্রমােদ! ফল কথা,
ফরাসীরা স্বভাবত বড় আমুদে। তাদের “সখের
প্রাণ গড়ের মাঠ”। জীবন ধারণের জন্য যেমন
আহার আবশ্যক, ফরাসী জীবনের পুষ্টি সাধনের
জন্য আমােদও সেইরূপ আবশ্যক। (ইংরাজের
ইষ্ট-দেবতা, টাকা, ইংরেজ, ঘােড়শ-উপচারে
টাকার পূজার জন্য অষ্ট প্রহর হন্ হন্ ঘুরিতেছে।
ফরাসীর ইষ্টদেবতা—বাবুগিরি ; চাল চলন
“গদাই লস্কর”; কাজ কর্ম
চুলােয় থাক্ ; মধ্যাহ্ন
ভােজনের পর, তাহাকে দুই দণ্ড কাফির আডডায়
গল্প করিতে বা কনসার্ট শুনিতে হইবেই হইবে।
• যেখানে বসন্ত রােগের প্রাদুর্ভব, সেখানকার
পারিস ওপারিসবাসী।
হাওয়া লাগিলে বসন্ত হয়। হাওয়ার বড় গুণ!
লণ্ডনে যাও, সকলেই কাজে ব্যস্ত ; সেখানকার
বাতাস লাগিলে হাত পা সুড়, মুড় করে,
খাটিতে প্রবৃত্তি যেন আপনা হইতেই জন্মে।
আমােদ-প্রমােদও সংক্রামক। পাসে আসিলে
আমােদ স্রোতে নিশ্চয়ই ভাসিতে হইবে ।
এখানকার এমন সুচারু বন্দোবস্ত যে, তুমি
অন্তত প্রথম প্রথম-সে স্রোত এড়াইতে পারিবে
। (বাসা ভাড়া লও, বাটীতে সকালে এক
পেয়ালা কফী ও একটুকুর। রুটী ব্যতীত আর
কিছুই খাইতে হইবে না; বাকী বাহিরে খাইতে
হইবে। )
(::::)-
আহারের আড়া। এখানে অলিগলি চারিদিকেই অসংখ্য খাবার আড়া। ইচ্ছা করিলে, দিনরাত বেশ বাহিরে কাটান যায়—অনেকে তাহাই করেন। কেবল পয়সার শ্রাদ্ধ ; এখানে এক ফাঙ্ক, ওখানে আধ ফাঙ্ক, এইরূপ যে কত যায়, তাহা আমার মত লােকের পক্ষে (যে কখনও হিসাব রাখে না ) ঠিক করিয়া উঠা দুঃসাধ্য। এক ফাঙ্কে প্রায় ॥০। আহাৰ্বীয় সামগ্রীর মূল্য যে, লণ্ডন বা অন্য স্থান অপেক্ষা অধিক, তাহা নহে। ফরাসীদের রান্না জগদ্বিখ্যাত, তাহারা ইংরেজ- দের মত সিদ্ধ পােড়া খাইয়া জীবনধারণ করে , নানা রকমের, নানা আস্বাদের ব্যঞ্জনাদি খুব ভালবাসে। এ সম্বন্ধে আমাদের সঙ্গে খানিকটা মিলে।) আমি একদিন বেলা এগারটার সময় ঢিকুতে চিকুতে এদিক ওদিক ঘুরিয়া মধ্যাহ্ন ভােজনের জন্য এক খাবার আড়ায়, (Restaurant) ঢুকি- বরং কম।
আহারের আচ্ছা।
লাম। আচ্ছা দুই রকমের ; এক রকমে তােমার
সম্মুখে একখানা লম্বা কাগজ আনিয়া দেয়,
তাহাতে সকল রকম খাদ্যের নাম ও দাম লেখা
থাকে—ফরাসী ভাষায় ; ইংরাজী এখানে অল্প
লােকেই বুঝে। তােমার যে রকম ইচ্ছা,
খাবার বাছিয়া লও। যাহারা,কেবল ইংরাজী
জানে, ফ্রান্সে তাদের বড় নিগ্রহ; ফরাসীভাষা
একটু আধটু কস্ত না হইলে, এরূপ আড্ডাঘরে
প্রবেশ বড় সুবিধা নয়,-ফর্দে হয়ত ৩০/৪০ টা
খাদ্যের নাম আছে, তুমি কোটা বাছিয়া
লইবে ? আর এক রকম আডডাঘর আছে, তথায়
মধ্যাহ্ন ও সান্ধ্য-ভােজনের দাম নিরূপিত
সাধারণতঃ এক টাকার মধ্যে ঐ দামে তোমার যে
কয়টা খাবার প্রাপ্য, ক্রমান্বয়ে সব তুমি
পাইবে;—উপরন্তু এক বােতল ক্লারেট মিলিবে
এইরূপ স্থানেই অধিক লােক আসে, কারণ
শস্তা,অথচ খাবার জিনিস ভাল । মধ্যাহ্ন
ভােজনের পর, সকলে কাফির দোকানে (কাফে)
চলিল। এত অধিক সংখ্যক এবং এত বড়
বড়, সুসজ্জিত কাফেইংলণ্ডে নাই। ইংরেজের
ফ্রান্স ভ্রমণ। যেমন একটী অগ্নিকুণ্ড না হইলে চলে না, ফরাসীর সেইরূপ কাফী-গৃহ অবর্তমানে সংসার অচল। অধিকাংশ ফরাসীর অধিকাংশ ' সময় এখানে অতিবাহিত হয়। দুই এক পেয়াল। কাফি, বা দুই এক গ্লাস আরও গুরুতর পদার্থ পান করিয়া, বিলিয়ার্ড খেলিয়া, বখাম করিয়া ইয়ার্কি দিয়া প্রায় অনেকেই এখানে অন্তত ২৪ ঘণ্টা কাটায়। দিন একটা হইতে' রাত্রি দুপর পর্যন্ত কাফির দোকান লােকে পরিপূর্ণ। বৈকালে এত লােক হয়, ভিতরে স্থান কুলায় ,রাস্তার ধারে অনেকে বেঞ্চ পাতিয়া বসিয়া যায়। অনেকে বন্ধুবান্ধবের সহিত এখানে সাক্ষাৎ ও আলাপ পরিচয় করেন। অলস ও নিষ্কৰ্ম্মা লােকের ইহা এক রকম বাসা বলিলেও চলে এখানকার লােকদিগকে দেখিলে বােধ হইবে যে, তাহারা সারাদিন আহারে, পানে ও গল্পে ব্যস্ত। তাদের যে অন্য কিছু কাজ আছে, সে পক্ষে সন্দেহ হয়। ৫টা হইতে ৮টা পর্যন্ত সান্ধ্য-ভজনের সময়। এই উপলক্ষে ৪টা হই- তেই সকলে কাফেতে দুই এক গ্লাস ‘অ্যাবসান্ত’
পারিস ও পারিসবাসী।
-
ও ‘ভারমুখ’ সম্মুখে করিয়া উপবিষ্ট ; তাহা ,
শেষ করিয়া আড্ডাঘরে ; অঙ্ঘর হইতে ফের
কাফি গৃহে; তথা হইতে নাচঘর, থিয়েটার
ইত্যাদি।
আর এক রকম কাফে আছে, তার একটু
বিশেষ বিবরণ দিব। ইহার নাম ব্ৰাসারি।
এখানে সুন্দরী যুবতীরা ডেক্সের পাসে বসিয়া
হিসাবপত্র লিখিতেছেন। নবীনারা তােমার
হুকুম মত পানীয় সামগ্রী আনিয়া দিতেছেন,
একে পালিসের যুবতী, তাতে আবার, বাছা
কাছা ;তােমার অনুমতি পাইবামাত্র, একজন
বিদ্যাধরী আসিলেন,-হাতে দুইটী গ্লাস।
তুমি ভাবিতে লাগিলে, এ কি ?—একটা গেলাস
চাহিলাম, দুটা গেলাস আনিল কেন ? বুঝি
আমার ভাল ফরাসী জানা নাই, তাই ভুল
বলিয়া থাকিব। আচ্ছা, দুই গ্লাস আনিয়াছে,
থাক ; ফিরিয়া দেওয়াটা ভাল দেখায় না। আমি
এইরূপ ভাবিতে না ভাবিতে অমনি আমা
পাশ ঘেঁসিয়া যুবতী আসীন হইলেন,-এব টী
গেলাস আমার হাতে দিলেন, অপরটী স্বয়ং চো
ঘ
ফ্রান্স ভ্রমণ।
চো শেষ করিলেন। ভাবনা হইল, কে দ্বিতীয়
গেলাসটীর দাম দিকে? সে যা হােক, স্ত্রীলােকটী
তখন আরও যেন পরিচিতভাবে আমার সহিত
নানা খােস গল্প আরম্ভ করিলেন। ইউরােপীয়
সভ্যতা,-রমণীরত্নের সহিত কথা না কওয়া
বা তাহাকে তাড়াইয়া দেওয়া উচিত নহে,
আর, পাশে দুই এক দণ্ড বসিলেই বা হানি কি?
তােমাকে যদি নিতান্ত গােবেছারি-গােছ দেখে,
বিশেষতঃ যদি জানিতে পারে তুমি ইংলণ্ড
হইতে আসিয়াছ, তাহা হইলে আর তুমি যাবে
কোথা; তােমাকে একেবারে পাইয়া বসিল।
ফান্সে আসিতে হইলে ভাল ফরাসী জানা
দরকার ; 'যদি ফরাসী ভাল না জান, ভুলেও
কখনও ইংরেজী বলল না,কোন রকমে কেউ
সেঁউ করিয়া ফরাসীতেই বুঝাইয়া দিও,ইংরেজী
বলিলে পদে পদে ঠকিতে হইবে।
উভয়ের গেলাস শেষ হইল। অপ্সরী, তখন
বীণানিন্দিত সুরে জিজ্ঞাসিলেন, শ্যাম্পেন
আনিয়া দিব কি? শ্যাম্পেন খাওয়াইবার জন্য
ভয়ানক জি আরম্ভ করিলেন,-যেন কত
ফরাসির ধর্ম।
কালের আলাপ,—যেন তােমাকে অদ্য আহা-
রের জন্য নিমন্ত্রণ করাই হইয়াছে। তুমি হাঁ হু
করিতে করিতে, একটু মুচকি হাসি হাসিয়া
শ্যাম্পেন হাজির র করিলেন,—আবার, দুইটা
গেলাস।
ফরাসির ধর্ম।
আজ ২৫। ৩০ বৎসর হইতে ইউরােপ খণ্ডে
খ্রষ্টান ধর্মের সহিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তুমুল
সংগ্রাম চলিতেছে। বিজ্ঞানের সৈন্য সামন্ত
ক্রমশ বাড়িতেছ, খ্রীষ্টানির দল বল কমিতেছে।
ইউরােপের অলঙ্কার, শ্রদ্ধাস্পদ, পূজনীয়, অনেক
দেবতুল্য মহাপুরুষ খ্রীষ্টান ধৰ্ম্মের, বিশেষতঃ
গোঁড়ামির বিপক্ষে। পৃথিবী এক দিনে সৃষ্ট
হইতে পারে না, হয় নাই; মনুষ্যাবির্ভাবের
পূৰ্বে কত যুগ কাটিয়া গিয়াছে, অসংখ্য জীব
জন্মিয়াছে, মরিয়াছে, অনেকের বংশ একেবারে
বিলুপ্ত হইয়াছে; এ সৃষ্টি মানুষের জন্য নয়,
মানুষ ইহার এক ক্ষুদ্রাংশ মাত্র ; তাহার উৎপ
S০
ফ্রান্স ভ্রমণ।
ত্তির পূর্বে যত যুগ অতীত হইয়াছে সে হিসাবে
মানুষ ক দিনের ? অামরা পৃথিবীর আদিমা-
বস্থা হইতে আধিপত্য করি নাই ; আমাদের
অস্তিত্ব নিকৃষ্ট জন্তুর এমন কি উদ্ভিদ প্রাণীরও
পূৰ্বাস্তিত্বের সহিত নিগুঢ় সম্বন্ধে সম্বদ্ধ ; আমরা
ক্রীবৃক্ষের একটী অভিনব শাখামাত্র—এই
রকমের জ্ঞাৈনিক সত্য সকল দিন দিন যত
দৃঢ়ীভূত হইতেছে, খ্রীষ্টানধৰ্ম্মের বল ততই কমি-
তেছে, অখষ্টাদের সংখ্যা ততই বাড়িতেছে।
ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ আস্তিক, কেহ
কেই নাস্তিক, কেহ কেহ কি যে তাহা ঠিক
করিয়া বলেন না, অথচ খৃীষ্টানির সহিত কাৰ্য্যে
বা বাকে সহানুভূতি দেখান না। ইংলণ্ডের
শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অনেকে এই শে। দলভুক্ত ;
কারণ ইংরাজের স্বভাবতঃ চাপ্ল, মনের ভা।
ঠাৎ প্রকাশ করিতে কিছু নারাজ। ফ্রান্সে
বিধৰ্ম্মীরা বেশ দলে পুরু।
ফরাসিদের মন
খোলা; ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলে মতামত
ব্যক্ত করতে কুণ্ঠত হয় না, জিজ্ঞাসা না করিলেও
কথোপকথনে হয়ত আপনিই, বলিয়া ফেলিবে।
ফরাসির ধৰ্ম্ম।
৪১
(ফরাসিরা মনের ভাব গােপন করিতে চেষ্টা,
করে না, অনেক সময় এত বাড়াবাড়ি করে,
যে তাহাদের বাতিকের ছিট আছে বলিয়া
বােধ হইতে পারে।)তারই জন্য যদিও ফরাসিরা
সমুদয় ইউরােপকে সাম্যভাব শিক্ষা দিয়াছে,
যদিও তাহাদের গবর্নমেন্ট প্রজাতন্ত্র, তবুও এই
সাম্যভাব এবং স্বাধীনতার দেশে,খবরের কাগজের
ইংলণ্ডের মত তত স্বাধীনতা দেওয়া হয় না।
১৮৮১ খৃষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসের আদমসু-
মারিতে, ফ্রান্সে যাহারা খ্ৰীষ্টান, য়িহুদী বা অন্য
ধর্মাবলম্বী নন তাহাদের সংখ্যা ৭৬ লক্ষ ৮৫
হাজার গণিত হয়। ফ্রান্সের সমুদয় লােকসংখ্যা
৩ কোটী ৭৬ লক্ষ ৭২ হাজার ; অতএব ইহার।
সমুদয় লােক সংখ্যার পঞ্চমাংশের একাংশ। যদি
ছেলেপিলে এবং অশিক্ষিত লােককে বাদ দেওয়া
যায়, তাহা হইলে সুশিক্ষিত সমাজের অধিকাংশ
লােকই এই দলভুক্ত হইবেন।(ফল কথা ফরাসি-
দিগের ধৰ্ম্মে আস্থা নাই। ইউরােপে 'কালে
খ্রষ্টান ধর্মের কি পরিণাম হইবে তাহার চিহ্ন
ফ্রান্সে বেশ লক্ষিত হয়। ) খ্রীষ্টানের। প্রথম প্রথম
S২
ফ্রান্স ভ্রমণ।
গালি মন্দ দিয়া, ঠাট্টা বিদ্রুপ করিয়া, ভয় দেখা-
ইয়া, বিপক্ষ দলকে চুণ করাইবার চেষ্টা করিয়া-
ছিলেন ; এক্ষণে তাঁহাদের ইচ্ছা, ও চেষ্টা
বিজ্ঞানের সহিত সন্ধি করা। চেষ্টা প্রশংসনীয়
বটে, কিন্তু কতদূর ফলবতী হইবে, ইংলণ্ডের
বিশেষতঃ ফ্রান্সের কাললক্ষণ দেখিলে সে বিষয়ে
সন্দেহ হয়।
(ইংলণ্ড ও স্কটলণ্ড হইতে এখানে গোঁড়ামি
কম। ইংরাজের। রবিবারে খেলাধূলা করিবে
না, যাদুঘর প্রভৃতি স্থানে—যেখানে দুই চারি
ঘণ্টা লােকে আমােদ আহলাদের সহিত জ্ঞানাে-
পাৰ্জন করিতে পারে, তাও সব বন্ধ রাখিবে-
থিয়েটার, অপেরার ত কথাই নাই। স্কটলণ্ডে
আরও বাড়াবাড়ি । এডিনবরায় দিনকতক
আমাদের তাস খেলিবার বড় বাই হইয়াছিল ;
রােজ গ্রাবু খেলিতেই হইবে। আমার একটা
বন্ধু পকেটে তাসযােড়াটী না লইয়া বাহিরে
যাইতেন না, পাছে যার বাড়ী যাওয়া যায়
সেখানে তাস না থাকে, আনাইতে দেরী হয়।
রবিবারে বড় গোল। সেদিন ঘবের দ্বারে চাবি
ফরাসির ধর্ম ।
দিয়া, অতি গােপনে, চুপ করিয়া, খেলিতে,
হইত—যেন কি কুকাজই করিতেছি ; তাস
টেবিলের উপর আস্তে আস্তে ফেলিতে হইত,
পাছে শব্দ হয়, land lady (বাড়ির গিন্নি ) টের
পান। তিনি জানিতে পারিলে সম্ভবত মুচ্ছ।
যাইতেন, বাসাড়েকে পরদিনই তাড়াইয়া
দিতেন; অন্যান্য গিন্নীরা শুনিলে হয়ত ইহার
ঘরভাড়া পাওয়া দুঃসাধ্য হইত, ইনি যেন মার্কা-
মারা জেলের ফেরত হইয়া যাইতেন।)
ফান্সে রবিবারে আমােদ প্রমমদের জাক
অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশী বই কম নয়।
চারিদিকে গানবাদ্য তামাসা চলে।) যাহারা
অন্যান্য দিন কাজে ব্যস্ত, রবিবার তাহা।
যাদুঘর ইত্যাদি স্থানে গিয়া সুখে সময় কাটায়
এবং শিক্ষা লাভ করে। (ইংলণ্ডে অন্যান্য
স্থান বন্ধ বলিয়া রবিবারে গিজার উপর বড়
দম্। অনেক যুবকের মুখ্য উদ্দেশ্য প্রণয়িনীর
সহিত সাক্ষাৎ করা, কি সুন্দরীদের দেখ ;
অনেক যুবতীর মনােগত ইচ্ছা বাঞ্ছিত যুবকের
চোখে পড়া, কি ভাল যুবক বাছিয়া লওয়া।
৪৪ ফ্রান্স ভ্রমণ। রবিবারে যাদুঘর উপাসনার সময় তাঁহাদের যেরূপ এদিক ওদিক চোখ চলে, তাহাতেইহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। আবার, অনেকে গিরজায় যাইতে হয় বলিয়া যান, না যাইলে সারাদিন ঘরে বসিয়া বিরক্তি লাগে, তাই যান। ইংলণ্ডে খােলা হয় না, পাছে গিজা খালি হয়। ইহা তেই বুঝিবে কত লােকের বাস্তবিক ধর্মের উপর আস্থা আছে, কত লােক ইচ্ছাপূর্বক ধৰ্ম্মের টানে গিরজায় আসে। ফ্রান্সে এরূপ জোর করিয়া গিরজা পূরাইবার চেষ্টা করা হয় না—ইচ্ছা হয় যাও, না ইচ্ছা হয় যাহা খুশী কর, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া আছে। ফরাসীরা সাম্য- ভাব লইয়া পাগল হইয়াছে, স্বাধীনতার জন্য ক্ষেপিয়াছে, গত একশত বৎসরের মধ্যে কত বিপ্লবে মাতিয়াছে, তিনবার প্রজাতন্ত্র গবর্ণমেন্ট স্থাপন করিয়াছে, কিন্তু ধৰ্ম্ম লইয়া কখনও পাগল হয় নাই। ফরাসীদের জাতীয় জীবনে ধর্মের প্রভাব আদৌ লক্ষিত হয় না। -o:()ঃ০-
অনেক
কলেজের
কাফের মুড়ী।
'খাবার আড্ডায়, থিয়েটারে, নাচঘরে, যেখানে
যাও, ফরাসীয়ুবক যুবতীদিগকে প্রায়ই যুড়ী
যুড়ী দেখিতে
পাইবে।
ছেলেকে প্রায় কখনই বেযােড় দেখুম না।
পুরুষেরা তাদের সঙ্গিনীদের সম্মানের সহিত
বসনি। যদি কোন বন্ধু বান্ধবের কাছে সেই
রমণী অপরিচিত থাকেন, আদব কায়দার সহিত
স্ত্রী’ বলিয়া পরিচয় দেন—অর্থাৎ Mansieur A.
তার সঙ্গিনীকে Madame A. বালিয়া অালাপ করা-
ইয়া দেন।
কাফে, কি রেষ্টোরান্তে এলে
চাকর বাকরেরা তাদের হুকুম খাটতে বিশেষ
মনােযোগ দেয়।
এখানেও কি আমাদের দেশের মত বাল্য
বিবাহ প্রচলিত ? হঠাৎ দেখলে এরূপ সন্দেহ
হইতে পারে। কিন্তু আর একটু ঘরের খবর
নেওয়া যাক।
এক দিন আমি রেষ্টোরান্তে খাইতেছি ;
আমার পাশে একটী যুড়ী --পুরুষটি ফরাসী-
৪৬ ফ্রান্স ভ্রমণ। যে ব্যক্তি খাবার দাবার যােগাইতেছে, তার সঙ্গে বিশুদ্ধ ফরাসীতে কথাবার্তা কহিতেছে ; কিন্তু স্ত্রীলােকটার চেহারা ফরাসী ঢংএর নয়। দোম, তিনি রােষ্টবিফ’ (গরুপপাড়া) বড় ভাল বাসেন। আমরা যেখানে যাই, সেখান- কার আচার ব্যবহার অবলম্বন করি। বাঙ্গালী ইংলণ্ডে গেল, হ্যাট কোট পরিল, গরুপােড়ায় বিশেষ রুচি জন্মিল—গরুপােড়ার চেয়ে আর খাদ্য নাই। বাঙ্গালী ফ্রান্সে আসিল, পােষাক বদলাইতে হলাে না বটে, কিন্তু আহারের সময়, খাওয়া দাওয়ার জিনিস একেবারে বদলিয়া রােষ্টবিফের দিকে ঘেঁসিল না। ইংরা- জেরা যেরূপ নয় ;-তারা যেখানেই যা আপনাদের আদব-কায়দা, খাওয়া দাওয়া, বজায় রাখে, রােষ্টবিফের প্রতি দম্ সমান থাকে। তারা বিদেশীয় ভাষা বলে না, কি বলিতে পারে । আমরা ইংলণ্ডে ইংরেজ, ফ্রান্সে ফরাসী- ইংলণ্ডে ‘বিয়ার’ পার করি, ফ্রান্সে ক্ল্যারেট ঠুকি। ইংরেজের সব যায়গাতেই ইংরেজ ; তারই জন্য ইউরোপে তাদের চিনিয়া লওয়া সােজা। গেল ;
৪৭'
কাফের যুড়ী।
সে যাহােক, আমার পার্শ্ববর্তিনীর প্রথম
নম্বরে চেহারা, দ্বিতীয় নম্বরে রােষ্টবিষ্ণুপ্রিয়তা
দেখিয়া-মনে সন্দেহ হইল। কিছুক্ষণ পরেই
তিনি ইংরাজীতে কথা বলিলেন—সব সন্দেহ দূর
হইল। আমি ভাবিলাম পুরুষটী যদি ইংরাজ
হয়, তা হলে এমন ভাল ফরাসী বলতে কেমন
করিয়া শিখিল। জানিতে ইচ্ছা হলাে; আমি
জিজ্ঞাসা করিলাম—তিনি ইংলণ্ড হইতে এসেছেন
কি ? তিনি উত্তর দিলেন, তিনি নিজে ফরাসী,
কিন্তু তাহার স্ত্রী ইংরেজ। তঁাহার নাম ধাম
লিখিত ‘কার্ড’ দিলেন তার নাম Monsieur C;
তিনি এখানকার আদলতের একজন উকীল ।
তাঁহাদের উভয়ের সহিত আলাপ পরিচয় হইল।
দেখিলাম তিনি ইংরেজী বােঝেন—ভাল রকম
নয়,-বতে ত, পারেনই না; তাঁর স্ত্রী ফরাসী
একটু আধটু বােঝেন, কিন্তু ভাল বলিতে পারেন
। তাদের সঙ্গে বেশ আলাপ পরিচয় হলো;
তাঁদের কাফেতে লইয়া গিয়া কফি ইত্যাদি পান
করাইলেন। Madame 0 র ইংরেজীতে কথা
বলিবার সুবিধা প্রায়ই ঘটে না; পারিসে যে
৪৮ ফ্রান্স প্রমণ। সকল ইংরেজ আসেন, তাহাদের গুটীকত নির- পিত হােটেল আছে, সেখানকার চাকর বাক- রেরা ইংরেজী বােঝে—সেটা ইংরেজটোলা। আমি যে পল্লীর কথা বলিতেছি, সে দিকে ইংরেজ বড় একটা দেখা যায় না। মাদাম অনেক ক্ষণ ধরিয়া কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন; তিনি পারিসে ৮। ৯ বৎসর আছেন ; যদিও ফরাসী ভাল জানেন না, ফরাসীদের চাল চলন, ৪রণ ধারণ বেশ জানেন। কাফের অন্যান্য লােকেরা আমাদের কথা কেউ বােঝে না; fonsieur C একটু আধটু বুঝিতে পারিতেন; কিন্তু তিনি বিলিয়ার্ড খেনিতে আরও ভাল । Madame C. কাফের সকলকেই বেশ চেনেন ; সব যুড়ীদের খবর, নাড়ী নক্ষত্র বেশ জানেন। ইহাদের বিবাহে পুরােহিতের প্রয়ােজন নাই। গিরজায় যাইতে বা নাম লেখাইতে হয় না। বন্দোবস্ত পাকাপাকি নয়। দম্পতীর মধ্যে যখন যাহার ইচ্ছা হাত বদলাইতে পারেন। কিন্তু বিশেষ কারণ ব্যতীত যদি কেউ হাত ব- লান, তাঁহাকে অপমান ও সমাজের ধিক্কার সহ কাফের যুড়ী। করিতে হইবে। যতদিন যুড়ীদের বিবাহ বজায় থাকে, ততদিন তাহারা ঠিক পাকাপাকি রকমের বিবাহিত স্ত্রীপুরুষের মত। পাকাবিয়ের বাহ্যিক ‘ভালবাসা’, তাঁহাদের মধ্যে যােল আনাই আছে বলিতে হয়। স্ত্রী, স্বামীর জন্য ঘর সাজান, হিসাব রাখেন, হেঁড়া কাপড় সারেন, স্বামী কলেজ বা কাছারি হইতে আসিবার সময় উৎ- ফুল্ল লোচনে আগমন প্রতীক্ষা করেন, এলে পর স্নেহালিঙ্গনের জন্য অত্যন্ত ব্যগ্রতা দেখান। স্বামী স্ত্রীর হাত ধরিয়া রাস্তা দিয়া চলিয়া যান, সাদরে কাফে ও রেষ্টোরান্তে খাওয়ান, ভাল ভাল শােষাক দেন—গয়নার জন্য ইহারা পাগল মাদাম কঁাচা বিয়ের খুব প্রশংসা করি- লেন। পাকা ( অর্থাৎ পাকাপাকি বিয়ের ) যুড়ীর স্বামী স্ত্রী উভয়েই মনে করেন, যে একে- বারে নিতান্ত ঢলঢলি না করিলে উভয়ের কেউ কাহাকে ছাড়িতে পারিবেন না; আজীবন সহ- বাস করিতেই হইবে ইচ্ছা থাক বা না থাকা কাচা বিয়ের দম্পতীর একজন অপরের খুত পাইলেই ছাড়িতে পারেন; সেই ভয়ে স্ত্রী নন। ও ফ্রান্স ভ্রমণ। স্বামীর গােলাম, স্বামী স্ত্রীর গোলাম। পাকা বিয়েতে আইন যাহা জোর করিয়া করায়, কাঁচা বিয়েতে সামাজিক নিয়ম, মান মর্যাদার ভয়, ঠিক তাই বিনা জোরে করাইতেছে। মাদাম এই প্রকার অনেক কথা বলিলেন। -:03- সাম্যভাব। ও হরে, তামাক দে রে।” বড় বাবু বৈঠক- খানায় তাকিয়া ঠেশ দিয়া এইরূপ মিষ্ট ভাষায় তাহার চাকর হরিচরণকে সম্বােধন করেন। হরিচরণের সাড়া নাই, হয় ত রাঁধুনী বামনের সহিত গল্প করিতেছে, হয় ত দুই চারিটী আম কোন রকমে হস্তগত হইয়াছে, তাহাদিগকে উদর সাৎ করিতে ব্যস্ত, পাছে কেউ দেখতে পায়। বড় বাবু আবার সজোরে হেরে ব্যাটা ইত্যাদি বলিলে হরিচরণ বুঝিল বাবুর বাস্তবিকই তামা- কের দরকার, এবং হুকা হইতে কল্কে লইয়া সাইবার জন্য ব্যস্ত-সমস্ত উপস্থিত হইল; বাবুর
সাম্যভাব।
মুখ হইতে হরিচরণের বংশাবলী সম্বন্ধে আরও
গুটিকত বাছা বাছা মিষ্ট কথা নির্গত হইল।
হরিচরণ কি তাতে দুঃখিত ? মােটে না; বরঞ্চ
উল্টা। আমাদের একজন সহধ্যায়ীকে • আমরা
“প্রেত” বলিয়া ডাকিতাম ; ৬। ৭ বছর পরে
তার সহিত দেখা হইল ; অন্যান্য বন্ধু বান্ধব
( যাহাদিগকে ‘আপনি’ সম্বােধন করা বিধেয়।
তার সঙ্গে থাকায়, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম
“আপনারা কেমন আছেন ?” অমনি “প্রেতের”
মুখ শুকাইল, কথা নাই—ব্যাপারটা কি তখন
বুঝিতে পারিলাম না। কিছুক্ষণ পরে আর
সকলে চলিয়া গেলে জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি
রে প্রেত ! চুপ করে আছিস কেন?” অমনি
“প্রেত” আহলাদে আটখানা, বলিল “তাই ত
বলি, আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে চিনতে
পার নি।” বড় বাবু যদি হরিচরণকে বলিতেন
“হরি। এক ছিলুম তামাক সাজিয়া দিতে পার
কি ?” কিম্বা হরি কল্কে আনিলে বাবু যদি
তাহাকে ধন্যবাদ দিতেন, তা হলে হরিচরণ কি
ভাবিত ? সভার ভিতর যৎপরােনাস্তি অপদস্থ
ফ্রান্স ভ্রমণ।
হইত এবং হয় ত আপনাকে অপমানিত বােধ
করিত। আবার যদি বাবু তার চাকরাণীকে
বলতেন, “ঝি, অনুগ্রহ করে পান আন, তাহলে
কি সভাস্থ সকলে চোখ, ফারিয়া, একটু ঘাড়
বাঁকাইয়া, মুখ টিপিয়া ঈষৎ হাসিয়া, আপনাদের
মধ্যে ইশারা করিতেন না? এবং চাকরাণীও কি
লজ্জিত হইত না?' কিন্তু ইংলণ্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি
দেশে বাস্তবিকই এইরূপ করিয়া চাকর চারা-
নীকে কাজ করিতে বলিতে হয়। লাথির গুতাে,
চড় চাপড়ের কথা দূরে থাক, তাহাদিগকে কটুক্তি
পর্যন্ত করিতে পারিবে না। পছন্দ না হয় এক
সপ্তাহের নােটিস দেও, তার মধ্যে তারা অন্য
চাকুরি খুজিয়া লইবে। তােমার চাকর, তােমার
কাজ করিতে বাধ্য, তবুও তাহাকে ধন্যবাদ দিতে
হইবে, না দিলে তিনি ক্ষুন্ন হইতে পারেন।
দেশ শাসনে তাহারও হাত আছে। Election এর
সময় সেও Vote দিতে পারে; উপযুক্ত হইলে,
ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিলে, এমন কি এক
দিন প্রতিনিধি সভায় বসিতে পারে, কৃষ্ণ বিষ্ণুর
মধ্যে গণ্য হইতে পারে।
৫৩ সাম্যভাব। ‘আমার প্রভু পারিসে প্রায় সকলকেই ‘মসু’ (Monsieur) বলিয়া সমােধন করিতে হইবে। মসুর’ ধাত্বৰ্থ এবং প্রথম প্রথম রাজবংশােদ্ভব মহাপুরুষদের এই পদবী একচেটে ছিল। কিন্তু এক্ষণে সিংহাসনারূঢ় রাজাও ‘ম, আবার রাস্তার প্রহরীও ‘ম’ এদেশে এখন উচ্চ বংশের বিশেষ মান সম্ভ্রম নাই। সাম্যভাবের প্রাদুর্ভাব, ইংলণ্ড অপেক্ষা বেশী। সব সরকারী বাড়ীতে বড় বড় অক্ষরে “Liberte, Egalite, Fraternite” ( স্বাধীনতা, সাম্যভাব, ভ্রাতৃভাব) এই তিনটী কথা জ্বলজ্বল করিতেছে। যেখানে সম্রাটের নাম ছিল, সেখানে এখন ‘aepublique Francaise।' রাজার যেখানে যা কিছু ছিল সব বিলােপ করা হইতেছে। ইংলণ্ডের মত এখান- কারও গবর্ণমেন্ট দুই ভাগে বিভক্ত ; কিন্তু সেখান কার মত এখানে House of Lords' নাই, বংশসত্ত্বে বা উচ্চপদ সত্ত্বে এখানকার পালেমেন্টে কেই দখল পান না—সকলেই নির্বাচিত। ইংলণ্ড, স্কটল ও আয়ারলণ্ডের লােকসংখ্যা প্রায় ৩
ফ্রান্স ভ্রমণ
১
কোটী ৫০ লক্ষ ; তন্মধ্যে অনধিক ৩২ লক্ষ লােক
মাত্ৰ নিৰ্বাচক। ফান্সে ৩ কোটা ৭৬ লক্ষ
লােকের বসতি ; তন্মধ্যে অন্যূন ১ কোটী, ১
লক্ষ অর্থাৎ চতুর্থাংশের একাশেরও অধিক লােক
নিৰ্বাচক। নির্বাচক হইবার জন্য কেবল
ফান্সের citizen (বাসা) এবং ২০ বৎসরের
অধিক বয়স হওয়া দরকার।
(ফরাসী পার্লেমেন্টের দুই ভাগের এক ভাগের
নাম “Chamber of Deputies” অপর ভাগের নাম
‘Senate'; এই দুইটা একত্রে জাতীয় প্রতিনিধি
সভা (National assembly)। Chamber of Deputies
এর সত্য হইবার নিমিত্ত কেবল ফান্সের Citizen
এবং ২৫ বৎসর বয়ঃক্রম হওয়া প্রয়ােজন; এবং
ফরাসী ও অন্যূন ৪০ বৎসর বয়স হইলেই যে
কেহ সেনেটের সত্য হইতে পারে।
প্রভু,
ভূত্য, ধনী, নির্ধন, শিক্ষক, ছাত্ত সক্ষম হইলে
সকলেই স্বদেশের শাসনকার্য করিতে পারেন।
ইংলণ্ডে গরিব লােকের পক্ষে পার্লেমেন্টের সভ্য
হওয়া অসম্ভব—বিনা পয়সায় কাজ করিতে হয় ;
ফরাসী পার্লেমেন্টের সত্যর মাসে চারি শত
সাম্যভাব। টাকা ভাতা পান, তাহাতে পারিসে থাকার • খরচ পত্ৰ নিৰ্বাহ হইতে পারে। ( ‘আইনের চোখে ফান্সে সব ধর্মই সমান। যে কোন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা এক লক্ষের অধিক, তাহারা পুরােহিত ইত্যাদি রাখিবার জন্য, গবর্ণ- মেন্ট হইতে বৃত্তি পাইতে পারে। রােমান ক্যাথলিকের সংখ্যা সর্বাপেক্ষা অধিক, এবং য়িহুদির সংখ্যা সর্বাপেক্ষা কম; কিন্তু সকলেই। সংখ্যানুযায়ী বৃত্তি পান। ইংরেজেরা কবে এরূপ উদারতা শিখিবেন ? -(:)-
যাদুঘর, বিজ্ঞান-চর্ড!।
পারিসে অনেকগুলি যাদুঘর আছে'। এখানে
যাহারা আসেন, সকলেই সে সব দেখিতে যান,
চক্ষু সার্থক করেন। তাহাদের বর্ণনা করিতে
গেলে পুথি বড় অধিক বেড়ে যায় ; পাঠকের
পক্ষে সেরূপ বর্ণনা সম্ভবত নীরস হইবে, ভাল
লাগিবে না, ফলদায়ক হইবে কি না সন্দেহ।
তবে মােটামুটি দুচার কথা না বলিয়াও থাকিতে
পারিলাম না।
সুভর নামক বিখ্যাত যাদুঘরে রাফেল, টিসি-
য়ান প্রভৃতি প্রসিদ্ধ চিত্রকরগণ-কৃত ছবি, মিসর,
আসিরিয়া, চীন, গ্রীস ইত্যাদি দেশ বিদেশের
পুরাতন পদার্থ, নানা স্থানের বাছা বাছ। প্রস্তর
খােদিত মুর্তি, আমাদের দেশের দেবদেবীর প্রতি
মুর্তি, কতরকম জাহাজ নির্মিত হইয়াছে, তাহার
আদর্শ ইত্যাদি নানাবিধ দ্রষ্টব্য জিনিস সংগৃহীত
হইয়াছে। ইহাদের সংখ্যা এত অধিক যে ২৩
দিন ধরিয়া না দেখিলে কেবল ছবিগুলিও ভাল
করিয়া দেখা হয় না। লুক্সামবুর্গের রাজকীয়
যাদুঘর, বিজ্ঞানচর্চা প্রাসাদে আধুনিক চিত্রকর এবং খােদকদিগের ভাল ভাল কাজ সাজান রহিয়াছে ; তাহারও সংখ্যা বড় কম নহে। আবার এখানকার নন্দন- #tata,-(Champs Elyseel) “Palais de Industrie' নামক অত্যুৎকৃষ্ট অট্টালিকায় প্রতি বৎসর উত্তম উত্তম নূতন ছবি ও মূর্তি প্রদর্শিত হয়। আবার গবল। (Gobelins) বলিয়া একটা জায়গা আছে, সেখানে কার্পেটে উত্তম উত্তম চিত্ৰ বােনা হয়, এবং এই রকমের অনেক প্রীতিকর পুরাণ ছবি সাজান রহিয়াছে। ভাল ভাল কার্পেট বােনা ছবির দাম ২০ হাজার এবং ততােধিক টাকা । ইহাতে বুঝিবে এখানে ছবি ও মূর্তির কত আদর; কত কারিকর এরূপ শিল্পকার্যে ব্যাপৃত ; কত লােক ইহাতে বড়মানুষ হইতেছে—একখান ভাল ছবির দাম ২৪ হাজার টাকা হওয়া কিছু বড় কথা নয়। যাঁহারা কেবল ছবি-বিদ্যা অধ্য য়ন করিতে চান, কেবল ছবি লইয়া পাগল (ইউ- রােপে ইহাদের সংখ্যা বড় কম নয়) পারিদে তাঁহার শিখিবার, অনুকরণ করিবার, প্রশংসা করিবার বা কিনিবার কত জিনিস পান! লুভর
ফ্রান্স ভ্রমণ।
এ স্থানটী
ETTY, Musie de Cluny, Musie Carnavalet atefu
আরও কয়েকটা যাদুঘরে, পুরাতত্ত্ব চিত্র ইত্যাদি
দ্রষ্টব্য অনেক আছে।
পারিসের জাতীয় পুস্তকাগারে ত্রিশ লক্ষ
ছাপান বই, এবং এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার হাতের
লেখা পুথি আছে। বই রাখিবার আলমারির
সংখ্যা এত অধিক যে, সে গুলিকে এক সারি
করিয়া রাখিলে ১৫ ক্রোশ লম্বা হয়।
লণ্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়মের মত। যাহার ইচ্ছা
আসিয়াপড়িতে পারে। প্রায়, যে কোন বই
চাও পাওয়া যায় , যত বই চাও অবিলম্বে
তোমার নিকট হাজির। একটী পয়সাও দিতে
হয় না; 'সাধারণের, বিশেষত গরিব লােকের
পক্ষে বড় সুবিধা। আমাদের দেশে কখনও কি
এরূপ পুস্তকাগার হইবে ?
শিল্প-বিদ্যাবিষয়ক কতকগুলি যাদুঘরের
নাম পূর্বে উল্লেখ করা গিয়াছে। বৈজ্ঞানিক
যাদুঘরও এখানে অনেক। তন্মধ্যে উদ্ভিদ বিদ্যা
সম্বন্ধীয় বাগানে স্থিত Musie d' Histoire Natus.
elle (Museum of Natural History) সৰ্ব্বাপেক্ষা
যাদুঘর, বিজ্ঞান-চর্চা।
৫৯
প্রধান। ইহার এক ভাগে অন্যূন ২ লক্ষ এরা
পাখী, সরীসৃপ, মাছ, স্তন্যপায়ী প্রভৃতি জন্তু
রক্ষিত হইয়াছে। আর এক ভাগে আধুনিক
এবং ফসিল (fossil) নানাবিধ জীবের কঙ্কাল (হাড়
গােড় ইত্যাদি) ; তৃতীয় বিভাগে পৃথিবীতে যত
জাতীয় মানুষ আছে তাহাদের ছাঁচ, ছবি, ফটো-
গ্রাফ, মুর্তি ও কঙ্কাল, ভলটেয়ার রুসসা প্রভৃতি
বড় বড় লেকের মাথার উঁচ (ভঁহাদের মাথা
কত বড় এবং কিরূপ আকারের ছিল তাহা
দেখাইবার জন্য) ইত্যাদি মনুষ্য-বিদ্যা বিষয়ক
সংগ্রহ। অপর এক ভগে বহুবিধ খনিজ পদার্থ,
প্রস্তর ইত্যাদি। পঞ্চম ভাগ উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ক ;
এখানে অনেক রকমের ফল, মূল, পাতা, ফুল,
গুড়ি, গাছের ছাল দেখা গেল।
বাগানটী অতি সুন্দররূপে সাজান। রাস্তা-
গুলি অতি পরিপাটী, বেড়াইবার একটী মনােরম
স্থান। ছাত্রদিগের সুবিধার জন্য গুটিকত বাছা
বাছা গাছপালা Natural Order অনুসারে রােপিত
হইয়াছে। যে কোন গাছ দেখ, তাহার টিকি-
টের রং দ্বারা সে গাছ ঔষধে, কি শিল্পকার্যে
৬০ ফ্রান্স ভ্রমণ। ( ব্যবহৃত হয়, কিম্বা তাহা বিষাক্ত কি না, বুঝিতে পারা যায়। সরকারি চিড়িয়াখানাও (zoological Gardens ) এই বাগানের ভিতর। এইরূপ একস্থানে নানা দেশের ও নানা যুগের জীয়ন্ত বা মরা প্রাণী (উদ্ভিদ এবং জন্তু) একত্রিত থাকাতে জীবতত্ত্বানু সন্ধায়ী ছাত্রদিগের পক্ষে বড় সুবিধা হয়। শুধু তা নয়—আরও অনেক সুবিধা। এখানে পারি- সের কাতরফা, গড়ি প্রভৃতি বড় বড় বিজ্ঞান- বিং পণ্ডিতেরা মনুষ্য-বিদ্যা, প্রাণী-বিদ্যা, রসায়ন, ভূ-বিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়া থাকেন। তাঁহাদের বক্তৃতা শুনিতে পয়সা দিতে হয় না; বর্ণমেণ্ট হইতে তাঁহারা বৃত্তি পান। যেখানে সচরাচর তাহাদের বক্তৃতা হয়, হাজার বার শ লােক সেখানে অক্লেশে বসিতে পারে, শিক্ষা দিবার সময় তাঁহারা যাদুঘর হইতে হাড়- গােড়, পাথর ইত্যাদি আনিয়া উহাদের গূঢ়তত্ত্ব বুঝাইয়া দেন। আমাদের কলিকাতার যাদুঘরে এরূপ বক্ততার বন্দোবস্ত কি হইতে পারে না? যতদিন না হয়, ততদিন লােকে কেবল ২৪ ঘণ্টা যাদুঘর, বিজ্ঞানচর্চা। হাড়গোড়, কি পাখী পকালী দেখিয়া কেবল, ক্ষণিক আমােদ পাইবে মাত্র, কোন শিক্ষা লাভ করিবে না কোন স্থায়ী ফল ফলিবে না। পারি- সের যাদুঘরে, ছাত্রদিগের জন্য জন্তু কাটাকুটি ও পরীক্ষা করিবার স্থান (Laboratory), এবং একটা উৎকৃষ্ট পুস্তকাগার আছে। এখানে যাহার খুশী, গিয়া পড়িতে পারে। বলা বাহুল্য যে, শিল্প ও বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় যাদুঘর ও চিড়িয়াখানায় প্রবেশের কোন দাম নাই। গবর্ণমেন্ট হইতে সব খরচ। এ ছাড়া শিল্পবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য গবর্ণমেন্ট বৃত্ত বা পুরষ্কার দিয়া থাকেন। পূৰ্বে পারিস পাশ্চাত্য বিজ্ঞান চর্চার প্রধান স্থান ছিল। কুবিয়ের, লামার্ক, প্রভৃতি মহাপুরুষেরা পারিস- বাসী ছিলেন। • ইহাদিগকে প্রাণীবিদ্যার সৃষ্টি- কৰ্ত্তা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। এখনও এখানে বিজ্ঞানের যথেষ্ট সম্মান, বিশেষ আদর; কিন্তু এখন আর বিজ্ঞান পারিসের একচেটে নাই। ক্ষ্যাস সম্বন্ধে, রুচি সম্বন্ধে, পারিস আজিও ইউরােপের রাজ্ঞী ; পারিসের পােষাক সমুন্নায় 'চ ফ্রান্স ভ্রমণ। ইউরােপের আদর্শ ; ফরাসির রানা জগদ্বিখ্যাত, অতুলনীয়। কিন্তু বিজ্ঞান সম্বন্ধে জৰ্ম্মানের। ফাকে পশ্চাৎ ফেলিয়া যাইতেছে। খাওয়া দাওয়া রুচি সম্বন্ধে জম্মনেরা ইংরেজদের চেয়েও বর্বর। কিন্তু বিজ্ঞানের উৎকট সাধনে আজ কাল তাহারা ইউরােপের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। -(::o::)- জাতীয়-স্বভাব। ফরাসীরা খুব আলাপী বলিয়া প্রসিদ্ধ। রলের গাড়ীতে, এক ঘরে, ইংরেজের সঙ্গে এক দিন ২৪ ঘণ্টা সুখখামুখি বসিয়া থাক, সম্ভ- ৰত একটাও কথা হইবে না। ফরাসীরা রেলের গাড়ীতে, হােটেলে, খাবার আড্ডায় খুব আপ্যা- চিত করে। খোঁজ খবর নিতে, গল্প করিতে, অনেকটা আমাদের মত। “আপনি কোন্ টেণীয়” এ প্রশ্নের উত্তর আমাকে অনেকবার দিতে হইয়াছে। ইংলণ্ডের পাড়াগায়, লণ্ডনের রাস্তায়, আমাদের দেখিয়া ঘােট লােকদিগকে • জাতীয়-স্বভাব। “ব্রাকি” (কেলে) বলিতে অনেকবার শােনা গিয়াছে ; কখনও কখনও ‘াকি’ বলিতে বলিতে ছেলেরা পাছে পাছে দৌড়িয়াছে। কিন্তু ফান্সে এরূপ সমাদর কখনও পাই নাই!)এখানে ইতা- লীয়, পার্ট গীজ প্রভৃতি অনেক অপেক্ষাকৃত কৃষ্ণ- বর্ণ বিদেশীয়ের সমাগম হইয়া থাকে। ফরাসীরা প্রথমত আমাদিগকে তাহাদের দলে ফেলে। একদিন আমি পাড়াগায় বেড়াইতে গিয়া রাস্তা হারাইয়াছি; সেখানকার একটি লোকের সহিত সাক্ষাৎ হইল। তাহাকে পথ জিজ্ঞাসা করি- লাম ; সে পথ দেখাইয়া আমার সঙ্গে চলিল ; কথাবার্তা হইতে লাগিল। আমি কোন দেশীয় তাহা জানিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিল ; আমি বলি- লাম “তুমি ঠিক কর।” সে ইতালি, পােটুগাল, ব্রেজিল প্রভৃতি দেশের ক্রমান্বয়ে নাম করিলে, আমি যখন কোনটাই ঠিক হয়নি বলিয়া ভারত- বর্ষের নাম করিলাম, তখন সে অবাক্ হইল ; ভারতবর্ষ যে কোথায় ভাবিতে লাগিল। ভারত- বর্ষ কোথায় ঠিক করিতে না পারিয়া, আমার উপর তার যত্ন যে বাড়িল ; আমার সহিত নিজে
ফ্রান্স ভ্রমণ।
অনেক দূর আসিয়া, পরে আমি যে সহরে যাইব,
সেখানে পৌঁছিয়া দিবার জন্য একজন লােক
সঙ্গে দিল।
আবার আড়ায়, কফির দোকানে, রেলওয়ে
স্টেশনে সব যায়গায় হট্টগােল। ফরাসীরা
ইংরেজদের মত আস্তে আস্তে কথা বলিতে
পারে না; চেঁচাইয়া, হাত নাড়িয়া সম্ভাষণ করে,
আলাপ পরিচয় করে, গল্প করে। ইংরেজের
মত কথা বঁাচাইবার চেষ্টা তত দেখা যায় না।
পরিচিত ইংরেজের সহিত দেখা হইলে তিনি
হাত নাড়ানাড়ি করিয়া হাউ ডু ইউ ডু” (তুমি
কেমন অ'ছ) জিজ্ঞাসা করিবেন। “হাউ ডু
ইউ ডু” জিজ্ঞাসা করিতে ৪৫ সেকেণ্ড সময়
লাগে। কিন্তু তাহা উচ্চারিত হয় ‘হা-ডু-ডু
কিম্বা ‘হা-ডু’ তাহাতে এক সেকেণ্ড বই সময়
লাগে না। ফরাসীরাও “তুমি কেমন আছ,”
কিন্তু তাহা ফরাসী ভাষায় বলিতে
অন্ততঃ ৫। ৬ সেকেণ্ড সময় লাগবে।
ইংলণ্ডে নিমন্ত্রণে লজ্জা করিয়া খাইলে বড়
ঠকিতে হয়, আধূপেটা বাড়ী ফিরতে হয়। কিন্তু
জিজ্ঞাসা করে;
জাতীয়-স্বভাব। স ফরাসীরা দেখিলাম অনেকটা জিন্ করিয়া খাও- য়ান ; এক জনের অতিথি হইলাম, তিনি ২। ৪ দিন রাখিবার জন্য বিশেষ যত্ন দেখাইলেন ; “আরে মশাই, আর এক দিন থাকিয়া যান, এইরূপ প্রকারে জি করিতে লাগিলেন। ইংরে- জেরাও বেশ অতিথি সেবা করেন, কিন্তু বাপ হয় ফরাসীদের মত অত মনোগত ইচ্ছার সহিত নয়। তবে এ বিষয়ে মত দেওয়া শক্ত। | ফরাসি সম্রাট, ইংরেজদিগকে তুচ্ছ করিয়া “দোকানদারের জাতি”,রলিয়াছিলেন। ইহাতে ফরাসিলিগের দোকানদারির উপর ঘণা না থােক, ভালবাসা যে খুব কম, তাহা বেশ বুঝা যায় । তাহাদের ধনলিপ্সা তত বলবতী নয়। টাকার ঙ্গের, টাকার অহঙ্কার, সব দেশেই কিছু না কিছু দেখা যায় ইংলণ্ডে বেশী, এখানে কম। ইংলণ্ডে যেমন একদিকে ক্রোরপতি কুলের, তেমনি অন্যদিকে ক্ষুধাপীড়িত দরিদ্র ; যেমন একদিকে টাকার ছড়াছড়ি, তেমনি অন্যদিকে টাকার টানাটানি। এদেশে লােকবৃদ্ধির হার কম বলিয়াই হউক, আর যে জন্যই হউক, এরূপ ফ্রান্স ভ্রমণ। (যে বৈষম্যভাব দৃষ্ট হয় না, সকলেরই “মােটাভাত মােটা কাপড়ের” সংস্থান আছে। ধনী আছে, নির্ধন আছে,—সব দেশে থাকিবে; কিন্তু তাদের মধ্যে আকাশ পাতাল প্রভেদ নাই ) যে দেশে বংশৰ্য্যাদা এত কম, সে দেশে বংশােচ্চতা হেতু অহঙ্কারও কম হইবে। সাম্য- ভাবের প্রভাবে সামাজিক উচ্চনীচতা সমতল হই- য়াছে। কিন্তু ইংলণ্ডের মত এখানেও জাত্যইঙ্কার বেশ লক্ষিত হয়। ইংরেজেরা বলেন “পৃথিবীর মধ্যে আমরাই সভ্যতম জাতি- ফ্রান্স! পাপপূর্ণ, নাস্তিক, চঞ্চল ; আজ ভাঙ্গিতেছে, কাল গড়ি- তেছে; আজ রাজতন্ত্র, কাল প্রজাতন্ত্র ; আt- দের রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না, আমাদের ভাষা পৃথিবীর অর্ধেক স্থানে চলে, ইত্যাদি।” ফরা- সীরা বলেন “আমরাই সর্বেসর্বা ; রাজনৈতিক উন্নতি বল, আর বৈজ্ঞানিক উন্নতিই বল, সক, লেরই মূল আমাদের দেশে ; আমাদের অপেক্ষা সভ্যতর জাতি কখনও হয় নাই, কখনও হইবেও না। ইংলণ্ড ! সে ত ত দোকানদারের দেশ, সভ্য তার কি ধার ধারে ? জগৎকে আমরা রুচি শিখা- জাতীয়-স্বভাব। ৬৭ ইতেছি, সাম্যভাব শিখাইতেছি, স্বাধীনতা শিখা- ইতেছি ; সভ্যজগতের যেখানে খুসী আমাদের ভাষা বলিও সকলে বুঝিবে, ইত্যাদি। আবার ইউরােপ হইতে আসিয়ায় যাও, চীনের বলিবে “ইংরেজ! ফরাসি! বৰ্ব্বর! তারা ত সে দিনের। চীনই সভ্যতম দেশ ; চীনের স্বর্গীয় রাজ্য যখন অরম্ভ হয়, তখন ইংরেজেরা কোথায় ছিল? কাপড় পরিত কি? রাঁধিয়া খাইত কি ? ইত্যাদি।” ইহারা সকলেই যা বলেন তার মধ্যে কিছু না কিছু সত্য থাকিতে পারে—আছে, সন্দেহ নাই। এরূপ জাতীয় অহঙ্কারে, জাতীয় জীবনের উন্নতিসাধনও হইতে পারে। তবে যেখানে সেখানে, খবরের কাগজে বক্তৃতায়, নাটকে, কফির দোকানে, রেলের গাড়িতে, সব- জায়গায় এরূপ গর্ব ক্রমাগত পড়িয়া ও শুনিয়া ত্যক্ত হইতে হয়, কান ঝালাপালা হয়, বিশেষত যখন আমাদের কেবল চুপ করিয়া শুনিতে হয়— আমরা কিসের জাক করিব ? পূর্বপুরুষের দোহাই দিব ? তাহারা যে সকল কীৰ্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন, তাহার দরুণ আমাদেরও ইউরোপে ফ্রান্স ভ্রমণ। শিক্ষিত সম্প্রদায়ে মান সন্ত্রম আছে। কিন্তু কতকাল আর আমরা বাপের নামে বিকাইব। পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে ফান্সে সব সরকারি বাড়ীতে (“স্বাধীনতা,” “সাম্যভাব, ভ্রাতৃভাব,”) এই কয়টী কথা বড় বড় অক্ষরে লেখা। তােমরা স্বাধীন হইয়াছ, প্রজাতন্ত্র রাজ্যস্থাপন করিয়াছ, ভালই ; সাম্যভাব ও ভ্রাতৃভাব সম্বন্ধে তােমরা ইউৰােপকে শিক্ষা দিয়াছ, খুব প্রশংসার কথা। কিন্তু তাই বলেই যে ঢাক ঢোল বাজাইয়া আপ- নাদের গুণকীৰ্ত্তন করিতে হইবে, তার কোন অর্থ নাই, আমার চোখে ইহা ভাল লাগিল না। (বিলাতীয় (ইউরােপীয়) জাতিদের জেঁকো- মির দরুণ তাঁহারা স্ব স্ব জাতির দোষ সম্বন্ধে অন্ধ ; দেখাইয়া দিলেও সম্ভবত বুঝিবে না, বুঝিলেও স্বীকার করবে না। আপনাদের সো.দেখিতে পায় না, কিন্তু পরের খুঁত ধরিতে বড় পটু; অপর জাতিকে অবাধে অক্লেশে গালি দেয় ; কিন্তু ভিন্ন জাতির প্রতি কটুক্তিটা অনেক সময় ছুঁচের ফুটা দেখিয়া আঁজরার ঠাট্টা বিজপের ন্যায় বােধ হয়।
জাতীয়-স্বভাব।
৬৯
ইংরাজ ফরাসি উভয়েই ভাল যােদ্ধা, সাহসী।
রণক্ষেত্রেই যে কেবল সাহস, পরাক্রম, বীৰ্য্য,
সহিষ্ণুতা প্রদর্শিত হয় তাহা নয় ; রাজনৈতিক
কাৰ্য্যে, সামাজিক কাৰ্যে, পরস্পর ব্যবহারেও
ইহার পরিচয় পাওয়া যায়। তােমাকে যদি
কেহ বকেন বা গালি দেন, তুমি যদি তাহা চুপ
করিয়া শােন কিম্বা তাহার প্রত্যুত্তর আস্তে আস্তে
দেও, তাহা হইলে তােমার উপর তাহার বিশেষ
ঘৃণা জন্মিবে; কিন্তু যদি রােষ করিয়া তাহার
উচিত জবাব দেও, যদি চড় খাইয়া থাক,চাপড়টা
লাগাও, তাহা হইলে তুমি ভাহার শ্রদ্ধাস্পদ,
ভক্তিভাজন হইবে। আমরা যাহাকে “ভাল
মষি” বলি, বিলাতে তাহা ঘটে না। তােমার
যদি কেহ হানি করিয়া থাকে, চুপ করিয়া
থাকিলে ঠকিবে; লেখনী দ্বারা বা বাক্য দ্বারা
যুদ্ধ কর, কালে প্রতীকার পাইবে। আর
গালি সহি, চড়টা চাপড়টাও সহি, কারণ আমরা
“ভাল মানুষ” অর্থাৎ ভীতু কিম্বা আসে,
গােলযােগের মধ্যে যাইতে চাহি না। ইংলণ্ডে
যদি কোন সম্প্রদায় পার্লমেন্টের কাছ হইতে
ফ্রান্স ভ্রমণ। কোন হানির প্রতীকার বা কোন নূতন আইন চান, তাহা হইলে অম্নি দেশের চারিদিকে ঢি ঢি পড়ে। তাঁহার সমাজবদ্ধ হন, চাদা তােলেন, কাগজ বার করেন, যত দিন অভীষ্ট সিদ্ধ না হয় যুদ্ধ করতে থাকেন। ইংলণ্ডে রবিবারে যাদুঘর খােলা হয় না; কতকগুলি লােকের ধারণা হইল যে, খেলা উচিত, খুলিলে উপকার হইবে। অনি তাহারা সভা করিলেন ; হাজার হাজার টাকা সংগ্রহ করিলেন; জন- সাধারণের মতামত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন ; পার্টমেন্টে গবর্ণমেন্টকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাইয়া ত্যক্ত বিরক্ত করিয়া তুলিলেন। ইহা অপেক্ষা কত গুরুতর হানির প্রতীকার বাঞ্ছ- নয়!—এই যাদুঘর খোলা লইয়া বৎসরের পর কত টাকা ব্যয় হইল, কত বড় বড় লােকের সময় গেল। এইরূপ করিয়া আদা জল খাইয়া, উঠিয়া পড়িয়া, লাগিয়া থাকিয়া অভীষ্ট সাধন করিতে হয়। ভারতবাসীরা এ শিক্ষাটা ভাল করিয়া শিখিলে তবে ভারতের মঙ্গল হইবে। যত দিন না শিখিবে, যত দিন বৎসর জাতীয়-স্বভাব। ৭১ মধ্যে মধ্যে থাকিয়া থাকিয়া, ঢিমে তেতালা গােছে, কোন বিষয়ের আন্দোলন করিবে, তত- দিন বিশেষ ফল ফলিবে না। যখন আমরা, যাহা ধরিব, তাহা ছাড়িব না, ছেলে মানুষের মত মিষ্ট কথায় বা খেলুনায় ভুলিব না, জুজু দেখাইলে ভয় পাইব না, তখন ভারতবর্ষের জাতীয় উন্নতি আরম্ভ হইবে। ফরাসীরা কিছু উগ্ৰপ্রকৃতির লােক, একটু বাতিকগ্রস্ত বলিয়া বােধ হইতে পারে। হটাৎ মাতিয়া উঠে, ক্ষেপিয়া যায়, ক্ষেপিলে জ্ঞান থাকে না। ফরাসী-প্রুসিয় যুদ্ধে শত্রুরা পারি- সের যত ক্ষতি করে নাই, ফরাসীরা আপনি তাহা অপেক্ষা বেসী করিয়াছেন। একশত বৎসরের মধ্যে ফান্সে প্রজাতন্ত্র গবর্নমেন্ট স্থাপিত হইল ; এইবার যেন একটু স্থায়ী বলিয়া বােধ হইতেছে, তবে ফরাসীদের বড় বিশ্বাস নাই নাই।) -::o::)-
পাতাল পারিস।
অনেকেই বােধ হয় শুনিয়াছেন, "যে লণ্ডনে
মাটির নীচে রেলের পথ ; উপরে গাড়ি, ঘোড়া,
লােক চলিতেছে, নীচে অসংখ্য-লােকপূর্ণ রেলের
গাড়ি দ্রুতবেগে, যাইতেছে। ছেলে বেলায়
আমরা টেমস নদীর নীচে রেল পথের কথা
পড়িয়া অবাক হইতাম, মনে মনে কিছু সন্দেহও
হইত। এখন ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ব্যবহিত
সমুদ্রের নীচে দিয়া রেলের পথ করিবার কথা
হইতেছে ; ইংরাজদের ভয়, ফরাসীরা কোন
দিন ঐ পথ দিয়া আসিয়া ইংলণ্ড আক্রমণ করিবে,
নতুবা এত দিন উহা আরম্ভ হইত। যাহারা
“টনেল’ (পাহাড়ের ভিতর দিয়া রেলের রাস্তা)
দেখিয়াছেন, তাহারা এ সব অনায়াসে বুঝিতে
পালিবেন। (পাতাল পারিলে, পাতাল লণ্ডনের
মত লােক গমনাগমনের জন্য রেলের পথ নাই,
তত ভিড় নাই। কিন্তু এখানকার ব্যাপার আরও
অদ্ভুত; কারণ এরূপ আর কোথাও দেখা
যায় না।
পাতল পারিস।
৭৩
;
নাই।
পাঠক! কলিকাতার রাস্তা দিয়া যাইতে
যাইতে রাস্তার মাঝখানে, একজন লােক প্রবেশ
কতে পারে এরূপ চওড়া চৌকোনা ফোকর,
এবং তার চারি দিকে দু চার জন ধাঙ্গড় ও রাশী-
কৃত এক প্রকার কালো পদার্থ দেখিয়া থাকিবে ;
এ পদার্থ টী যে কি, আর বােধ হয় বর্ণনার প্রয়াে-
জন নাই ; প্রয়ােজন থাকলেও আমি করিতে
অক্ষম, কারণ আমি তাহা দূর হইতে দেখিয়াছি
মাত্র, তার কাছে গিয়া পরীক্ষা করিতে পারি
তার পাশ দিয়া যাইতে হইলে পকেট
হইতে রুমাল যেন আপনিই উঠিয়া সজোরে
নাসিকা রন্ধে খৃত হয়, মুখ দিয়া কোন রকমে
নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হয়, এবং পায়ের
গতি অন্তত চারি গুণ বাড়ে। পাঠক। তুমি ঐ
ফুটার ভিতর দিয়া কোথায় যাওয়া যায় জান কি ?
সেখানে যাইতে কি তােমার কখনও সাধ যায় ?
পারিসের মত প্রশস্ত, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, পয়ঃ
প্রণালী বােধ হয় পৃথিবীর আর কোন নগরে
নাই। ধাড়দের নরদামার ভিতর যাইতে হয়—
পেটের দায়ে। কিন্তু তুমি আমি সখ, করিয়া
ফ্রান্স ভ্রমণ।
যেমন পারিসের নাচঘর কি প্রমােদ-উদ্যানে
গেলাম, তেমনি নরদামার ভিতর বেড়াইতে যাইব
শুনিলে লােকের যে, বিশ্বাস হইবে না, তা
আশ্চর্য্য কি ?
পারিসের প্রধান প্রধান নদামাগুলি ১২ হাত
প্রশস্ত, ১১ হাত উচ্চ ; যেগুলি নিতান্ত ছােট,
তার ভিতর দিয়াও অক্লেশে অনেক লােকের সমা-
গম হইতে পারে। সমুদায় নরদামা একত্র করিলে
বােধ হয় ৮০ ক্রোশের কম লম্বা হইবে না।
বড় বড় নামা পরিষ্কার করিবার বন্দোবস্ত অতি
পরিপাটী। তাদের ভিতর জল পূরিয়া খানকত
নৌকা ছাড়িয়া দেওয়া হয়। প্রত্যেক নৌকা
হইতে এক খানি Slide ঝুলিতে থাকে ; ইহার
পরিসর, নরদামার মেজের সহিত সমান ,
নরদামার ময়লা সজোরে নদীর দিকে—ঐ দিক
টাল-টানিয়া লইয়া যায়। ঘােট ঘােট নরদা-
মতে জলের তত স্রোত থাকে না; তজ্জন্য
সেখানে নৌকা চলিতে পারে না; তাদের ভিতর
রেলপথে গাড়ি চালাইয়া পরিষ্কার কাৰ্য্য সমাধা
করা হয়।
ইহা
পাতাল পারিস।
?
(নরদামা দেখাইবার জন্য সপ্তাহে এক দিন
নিরূপিত আছে। নামিবার জন্য উত্তম সিড়ি ;
চলিতে কোন কষ্ট হয় না, পাকা রাস্তা; হাওয়া
এবং আলাের নিমিত্ত মধ্যে মধ্যে ছাদে প্রকাণ্ড
ঝাজরা। বন্দোবস্ত এত ভাল যে ভদ্রমহিলারাও
এখানে আসিয়া থাকেন।) বড় নরদামাগুলি যেন
সদর রাস্তা এবং ছােটগুলি 'গলী ঘুজি ; এক
রাস্তা হইতে অপর রাস্তা; রাস্তা হইতে গলি,
এক গলি হইতে আর এক গলি ; এইরূপ করিয়া
সমুদয় পাতাল পারিসে ভ্রমণ করা যাইতে পারে।
যুদ্ধ বিদ্রোহের সময় শুনিয়াছি এখানে পাহারা-
ওয়ালারা পাহারা দেয়।
পাতাল পারিসে ‘Catacomb' নামক আর
একটা বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান আছে। পূর্বে ইহা
পাথরের খনি ( Quarry) ছিল, এক্ষণে একটা
বিস্তীর্ণ গােরস্থান। ছাদ ধসিয়া না পড়ে তজ্জন্য
বড় বড় থাম ; বাতাস এবং আলােক প্রবেশের
জন্য এখানেও মধ্যে মধ্যে ঝাঁজরা।) মাসের
মধ্যে ২ দিন প্রবেশ করিতে পারা যায়। ১৭৮৯
খ্রষ্টাব্দের প্রসিদ্ধ • রাজ্যবিপ্লবের সময় এখানে
৭ ৬
ফ্রান্স ভমণ ।
;
অনেক মৃতদেহ নিক্ষিপ্ত হয়। তাদের হাড়গােড়
সংগ্রহ করিয়া চারি দিকে দেয়ালে সাজাইয়া
রাখা হইয়াছে। শ্মশানে গেলে ভয়ের উদ্রেক
হয় ; সংসারের অনিত্যতা, দেহের ক্ষণভঙ্গরত্ব,
ইত্যাদি নানারকমের চিন্তা আপনা হইতেই
আসে, বুও সেখানে মৃতদেহের চিহ্নমাত্রও হয়
ত দেখা যায় না। কিন্তু পারিসের ‘ক্যাটাকুম্ব’
একে পাতালে, অন্ধকারময় ; তাহাতে আবার যা
কিছু আলো আছে তাহাতে চারি দিকে কেবল
হাড়গােড় দেখিতে পাওয়া যায় । ইহা এক অপূর্ব
শ্মশান ।
{::::--
দুপুরে মতিন।
লণ্ডনে নাচ শিখিবার বিদ্যালয় আছে।
অনেক পয়সা খরচ অনেক অর্থের শ্রাদ্ধ ।
নস্থ আমার একজন বাঙ্গালী বন্ধু নাচ শিখিয়া
বলিয়াছিলেন, যে দেশের পুরুষো স্ত্রীলোকের
সহিত একত্রে নাচে না, সে দেশ অসভ্য !!
লণ্ডন অপেক্ষা প্যারিস সভ্যতর—নাচেরও এখানে
ধূম বেশী। নাচ ঘর গণ্ডা, গণ্ডা ;—গণিয়া উঠা
ভার।তন্মধ্যে মাবিল’ একটী প্রধান। এখানে
সপ্তাহে তিন দিন সুন্দরীরা বিনা পয়সায় যাইতে
পারেন; আর অন্য কয় দিন তাদের প্রবেশের
দাম, পুরুষদের অর্ধেকেরও কম।
ম। ইহাতেই
বুঝিয়া লও, এখানে কত স্ত্রীলােক আসিয়া রঙ্গভূমি
উজ্জ্বল করেন, আর তাঁহাদের আনিবার জন্য
নাচঘরের অধ্যক্ষদের আগ্রহ ও যত্নই বা কত।
কলেজের ছেলেদের পল্লীতে আর একটী ।
সুপ্রসিদ্ধ নাচঘর আছে। আমাদের দেশের
'গোঁড়, ভীল প্রভৃতি অসভ্য জাতীয়—(আমরা
বলি অসভ্য) নাচ দেখিয়াছি কিন্তু ফান্সের দুপুরে
৮ ফ্রান্স ভ্রমণ। (দুপুর রাতের) মাতনের কাছে, ইহাদের নাচ কোথায় লাগে ?) পারিসের সকল স্থানই—বিশেষত নাচ ঘর- গুলি সুচারু-সজ্জিত ও উত্তমরূপ আলােকমালায় বিভূষিত। নাচ ঘরের এক দিক একেবারেই খােলা,—সে দিকে,সুরভি বাগান, নিকুঞ্জকানন, লীলা-খেলার স্থান, তরুলতামণ্ডপে বসিবার বেঞ্চ, কৃত্রিম পাহাড় ও কৃত্রিম ফোয়ারা; এখানেও আলাে কাছে,—কিন্তু কম, মধ্যে মধ্যে লতা- ছাদের ভিতর অন্ধকার ; টক্ টা পানীয় সাম- গ্রীও এখানে অপৰ্যাপ্ত। রাত্রি আটটার পর কাফে হইতে যুবক যুবতীর। কাতারে কাতারে, যুগলমূর্তিতে, যে'ড়ে যােড়ে, আসিতে আরম্ভ করিল ; যুবকদিগের মধ্যে কাজের ছেলেদের সংখ্যাই অধিক। দুর্ভাগ্যক্রমে যাহারা বে-ঘােড়, তাহার আসিবামাত্রেই তাহাদের যুড়ী মিলি- •তেছে। ক্রমে নাচঘর গুজার; সুমধুর ব্যাণ্ড বাজিতে লাগিল; যুগলমূৰ্ত্তিদের হৃদয়তন্ত্রী তালে তালে নাচিয়া উঠিল ; অমনি হাত ধরিয়া, গা ধরিয়া, কোমর ধরিয়া,—পা তুলিয়া, পা দোলা- দুপুরে মাতন। ইয়া, কখন বা ঘুরিয়া ঘুরিয়া, কখন বা সুখী- সুখী আগিয়া পিছিয়া, কখন জোরে, কখন ধীরে, তালে তালে, দলে দলে, যুবক যুবতীরা নাচিতে আরম্ভ করিল। এক এক দলের চারি দিকে লােকের ভিড়—তাহারা আমােদ দেখি- তেছে,-নৰ্তক নর্তকীদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর অনিমিষ লােচনে চাহি রহিয়াছে। বাগানেও লােকের ভিড় বড় কম নহে। যাহাদের যুড়ী মিলিয়াছে, তাহারা অপেক্ষাকৃত অন্ধকার স্থানে, ফোয়ারার কাছে, লতা-ছাউনির নীচে, “রিফেশ- মেন্ট” লইতেছে ; আর ফিস ফিস করিয়া কথা কহিতেছে। যারা এখনও বিষােড়, তাহারা ফ্যা ফ্যা করিয়া এদিক, ওদিক চাহিতেছে, ও পদচালনা করিতেছে। কেহ কেহ হাঁ করিয়া, কোন দিকে ‘কি—যেন—বিশেষ—কিছু লক্ষ্য করিয়া তাকাইয়া রহিয়াছে। প্রেমিক যুগলের ফিস্ ফিস্ শব্দ, গল্পের কিলিবিলি কোলাহল, হাসির হাঃ হাঃ রব, আর নর্তক, নর্তকীদের জুতার ধধপানি, দর্শক মণ্ডলীদের বাহবাধ্বনি—ক্রমে নিকুঞ্জকাননকে মাতাইয়া তুলিল। ব্যাণ্ডের বাজনা ফ্রান্স ভ্রমণ। রাত্রির সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে লাগিল—রাত্রি দুপুর । তবু নাচনার ধূম দেখে কে? দুই এক গ্লাস লঘু গুরুসকলেরই পেটে পড়িয়াছে,—সেই সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের স্মৃৰ্ত্তি ও নাচের তেজ ও বাড়িতে লাগিল, লম্ফ ঝম্ফে মেদিনি কল্পবান, শ্যাম্পেন রসে নিকুঞ্জকানন ভাসমান; হুঙ্কার শব্দে আকাশ ফাটিল; যুবক যুবতীর। দুপুরে মাতনে মাতিল। বাঙ্গালী পাঠক! তুমি বলিবে “একেই কি বলে সভ্যতা?” কিন্তু তুমি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর রাখ কি ? (FAN ( Clermont), facit (Lyon) | এ সব দেশে বেড়ান আদৌ কষ্টকর নহে। কোন হ্যাঙ্গাম নাই; চাকর বাকর সঙ্গে লইবার প্রয়ােজন করে না। ক্লেরমের ষ্টেশনে পৌছি- লাম ; যে হােটেলে যাইব ঠিক করিয়াছি, তাহার চাকর হাজির। সে আমার জিনিসপত্র ঠিক ঠাক করিয়া হােটেলের গাড়ীতে উঠাইল। আমি হােটেলে আসিলাম, পছন্দমত ঘর লই- লাম। ডিনারের সময় হইল ; নানাবিধ চৰ্ব, চোষ্য, লেহ পেয় প্রস্তুত।
দুপুরে মাতন। ১ •• আমি এখন যে অঞ্চলে আসিলাম, বাঙ্গালি ইহার পূর্বে সেখানে কখনও আসিয়াছে, কি না সন্দেহ। পারিসে যত দিন ছিলাম, এক জনও বাঙ্গালি দেখি নাই। তবে সেখানে মধ্যে মধ্যে" বাঙ্গালির সমাগম হয়। কিন্তু ক্লেরমাের নামও হয় ত অনেকের কাছে অপরিচিত। কিন্তু এখানে দেশ বিদেশ হইতে অনেক লােক আসিয়া; থাকে ; কারণ, ইহার নিকটে কতকগুলি তীর্থস্থান। প্রথমতঃ, স্নান করিবার জন্য অনেক যাত্রীর আগমন। সভ্যদেশে পয়সা রোজগার করিবার অনেক রকমের ফন্দি দেখা যায়। ক্লে রমে। অঞ্চলে ধাতব জলের { Mineral water') অনেক- গুলি প্রস্রবণ আছে ; সেই জলে স্নান করিলে পুণ্য হয়,চিররােগ আর হয় । বড় বড় অট্টালিকাতে সেই জল আনা হইয়াছে ; যাত্রীরা ঘণ্টাপিছে বার আনা, এক টাকা, বা ততােধিক করে দাম দিয়া তাহাতে স্নান করে। স্নানা- গারের অধ্যক্ষদের বেশ লাভ হয়। দ্বিতীয়তঃ, এককালে যুগযুগান্তরে, এখানে
৮২
ফ্রান্স ভ্রমণ।
অগ্নিদেবের আবির্ভাব হইয়াছিল ; অনেক কীর্তি
রাখিয়া গিয়াছেন। সে সব দেখিবার জিনিস,
দেখিতে অনেকে আসেন। সুইদডেম, পুইদ
“পারিউ প্রভৃতি পাহাড়ে, যে সকল গহ্বর (Cratct)
দিয়া পৃথিবীর অধস্তল প্রদেশ হইতে, উষ্ণ ধাতব
নিঃস্রবে, চতুঃপার্শ্বস্থিত দেশ প্লাবিত ও দগ্ধ
করিয়াছিল, সে সব গজার এখনও বিদ্যমান।
পৃথিবীর অন্যান্য অনেক স্থানে এই রকমের
নিস্তেজ ভকেননা “আগ্নেয়-গহ্বর” ) আছে ;
কিন্তু আর কোথাও উহাদের আকৃতি, গহ্বর
ইত্যাদি এরূপ স্পষ্টমপে দেখা যায় না। আমা-
দের দেশে দাক্ষিণাত্য এবং মালব প্রদেশে
আগ্নেয় প্রস্তরদ্বারা অনেক উচ্চ উচ্চ পাহাড়
পর্বত নির্মিত হইয়াছে; কিন্তু যে নিঃস্রব (Lava)
জমাট বঁধিয়া এখন প্রস্তর হইয়াছ, কোথা
হইতে, কিরূপে, তাহা নির্গত হইয়াছিল ঠিক করা
দুঃসাধ্য। এখানে, কোন্ নিঃস্ৰবের পর কোন্
নিঃস্রব, কোন গহর হইতে কোন নিঃস্রব বাহির
হইয়াছিল, তাহা পৰ্যন্তও চেষ্টা করিলে দেখা
ঘয়।
দুপুরে মতিন। ৬৩ এ অঞ্চলে যতগুলি নিস্তেজ ভসকেনো আছে, তার মধ্যে পুইদভােম সর্বাপেক্ষা উচ্চ ; ইহার শিখর দেশে একটা মানমন্দির স্থাপিত হইয়াছে। পুইড়ােমের উপর উঠিবার জন্য উত্তম রাস্তা। তাহার চূড়ায় দাঁড়াইয়া চারি দিকের অপূর্ব শােভ দেখিলাম। যেখানে, এককালে অগ্নি- দেবের একাধিপত্য ছিল, যাহার চতু-পাশ্বে কত ক্রোশ পৰ্যন্ত, ধাতুনিঃস্রবের উত্তাপে এবং উদগত প্রস্তর খণ্ডের উৎপাতে, প্রাণী তিষ্ঠিতে পারিত না, আজ সেখানে ঘাস, গাছপালা জন্মিতেছে, প্রকৃতির শােভাবর্ধন করিতেছে ; আজ সেখানে পাখীরা আনন্দে গাইতে ছ, জন্তুগণ হর্ষে চরি- কেছে ; আমরা বেড়াইতে, “চড়ুইভাতি” করিতে আসিতেছি। যে গহ্বর দিয়া আগ্নেয় পদার্থ নিঃসৃত হইয়াছিল, তাহা পৰ্য্যন্তও দেখিতেছি। পারিসের পরই, লিয়ে। ফ্রান্সের বড় শহর। কিন্তু পারিস বর্ণনার পর ফ্রান্সের অন্যান্য নগরের বিশেষ বর্ণনার প্রয়ােজন করে না। কারণ, অন্যান্য ছােট বড় সব স্থান পারিসের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ;-সেখানকার মত কাফে, যাদুঘর, বিশ্ব-
৮
ফ্রান্স ভ্রমণ।
বিদ্যালয় ইত্যাদি। এখানে বিশেষ দৃশ্যের মণ্যে
চীন, জাপান, এবং ভারতবর্ষ সম্বন্ধীয় একটী যাদু-
ঘর। ইহা গবর্ণমেন্টের নয়, এখানকার এক জন
*ধনাঢ্য লােক নিজের খরচে ইহা নিৰ্ম্মা কয়িা-
ছেন এবং ইঙ্কার সংগ্রহ একত্রিত করিয়াছেন।
ইহার জন্য তাঁহার খুব উৎসাহ। তিনি বৌদ্ধ
ধৰ্ম্মেস পক্ষপাতী। ফ্রান্সে বুদ্ধের এবং বৌদ্ধধর্মের
বড় অদ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.