Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Guru Ramdas
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
গুরু রামদাস
ছেলেদের নাটক
শীষমতাশঙ্গ
কলিকাতা
১৩৩৬ সন
মুল্য-আট আনা
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
১৮ নং আমার লেন,
কলিকাতা।
ছেলেদের নাটক
প্রত্যেক পংক্তি ভাব ও ভাষার
সৌন্দর্য্যে ঝ ম।
মূল্য
প্রিচার-বিজয়কৃষ্ণ দাস
লক্ষীবিলাস সে
১৪নং জগন্নাতের লেন কলিকাতা
মেহের বনওয়ারিলাল,
ভাইটি আমার, কবে তুই চলে গেছিল। হঠাৎ একটা
দুঃখের দিনে তাের টুক টুকে মুখানি মনে পড়ে গেল। তাই
তাের স্মৃতির উদ্দেশে এই গ্রন্থখানি উৎসর্গ কলেম। ইতি
No text on this page.
০ ০ ০ ০ ০ s পরিচয় গুরু রামদাস, তুকারাম, শিবাজী, আওরঙ্গজেব, মৌলনা আহাম্মদ কল্যাণপুরের সুলতান জয়সিংহ জয়পুরাধিপতি (আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি) সাহজি শিবাজীর পিতা রামহিংহ জয়সিংহের পুত্র ••• গঙ্গাধর ••• রামদাসের জ্যেষ্ঠতা তানজি শিবাজীর সেনাপতি আবাজি রঘুজি মাওলী সর্দার মুন্না ইয়াকুৎ ফকির (আওরঙ্গজেবের সভাসদ) সেক মুহম্মদ উদার ধর্মপ্রাণ জনৈক মুসলমান কল্যাণ দত্ত, রামদাসের শিষ্যগণ . . . ও ৮০ . . . ৪০০ ৪০০ মতিলাল ও জহরলাল গ্রামবাসী রহিম ভৃত্য ব্রাহ্মণগণ, মাওলী সৈন্যগণ, মারাঠাগণ, বিশ্বনাথের সেবকগণ, প্রহরিগণ, অনুচরগণ ইত্যাদি।
ছেলেদের নাটক
শুভ শতদলের মত সুন্দর, সুরভি, পেলব পবিত্র
মূল্য
জরুলস
{{{iffithegunjultilltinuifliullHD
প্রথম অঙ্ক।
*
প্রথম দৃশ্য।
স্থান-গগাদাবরী তীর। কাল--উষা।
রামদাস স্বামী।
রাম।
হে পদ্মপলাশলােচন নারায়ণ ! ত্রেতাযুগের
পুরুষপ্রধান ! হে ভক্তবৎসল! আমায় দয়া কর দয়াময় ।
আর যে পারি না প্রভু!--এই শীর্ণ শরীরে আর শক্তি নেই, এই
শঙ্কিত হৃদয়ে আর সাহস নেই ; দেখা দাও দেব !—কত
রৌদ্রতপ্ত রুদ্র বৈশাখের স্তব্ধ মধ্যাহ্রে জলন্ত আকাশ পানে
প্রতি ফুল
রুরামদাস
তােমার সন্ধানে চেয়ে রয়েছি, কত শীতার্তা যামিনীর নীরবতা
করে হিমানীর মধ্য দিয়ে তােমায় ডেকে
ফিরেছি, অনাবৃত আকাশতলে বাদল-আকুল কত আষাঢ়
রাত্রির অত্যাচার তােমার ধ্যানে মাথা পেতে নিয়েছি ; তবু
ত দেখা দাও না দেব! এই গােদাবরী, এই পঞ্চবটী
ছেড়ে আমার মন ত কোথাও যেতে চায় না প্রভু !-
গােদাবরীর প্রতি সলিলকণায়, এই পঞ্চবটীর
পল্লবে তােমার করুণ আঁখির জল যে মিশে আছে! নৈশ
বায়ু হিল্লোলে গােদাবরী যখন উচ্ছাসিত বক্ষে ক কল
করে ওঠে, আমার মনে তােমার সে বিরহবিধুর
হৃদয়ের একটা গভীর হাহাকার ঐ কল্লোলের সঙ্গে শ্বসিয়ে
উঠছে। শরতের অরুণচর্চিত,
অরুণচর্চিত, নবােদ্ভিন্ন স্থলপদ্ম মধ্যে
যখন শিশিরবিন্দু ট টস্ করে ওঠে, তােমার অশ্রুসজল
ইন্দিবর আঁখি দুটি মনে পড়ে যায় ! দেখা দাও, দেখা দাও
হে নবদুর্বাদল শ্যামসুন্দর ! আমি স্ত্রী চাই না, পুত্র চাই না, এই
মােহন ভুবন চাই না। হে কমল আঁখি। তুমি শুধু দু’টি আঁখি
তুলে আমার পানে চাও।
[ ধ্যানাসনে উপবেশন ।
রাম। ও রাম ও রাম, ও রাম। আমার অভীষ্ট পূর্ণ
কর নারায়ণ।
২
গুরু রামদাঙ্গা
নেপথ্যে-তােমার অভীষ্ট কি ?
রাম। এই ভারতবর্ষে ধৰ্ম্ম রাজ্য স্থাপন।
নেপথ্যে-শুধু কি দেবতার আশীর্বাদে তা’ হবে বৎস?
রাম। কি চাই প্রভু ?
নেপথ্যে-সংযম, নিষ্ঠা, এক প্রাণতা, আত্মত্যাগ।
রাম। সব দেব প্রভু!
নেপথ্যে—তােমার অভীষ্ট পূর্ণ হবে।
রাম। এতদিন--এতদিন পরে দয়া হল নারায়ণ ? হে
আমার তপস্যার ফল! হে আমার সাধনার সিদ্ধি! যদি
এতদিন পরে দেখা দিলে দেব ! একবার আমার সম্মুখে
তােমার সে নবদুৰ্ব্বাদল শ্যাম রূপ নিয়ে দাড়াও ; আমি নয়ন
ভরে একবার তােমায় দেখি ! [ চোখ মেলিয়া ] একি!
কোথায় গেলে দয়াময়? এই দীন অভাজনকে চকিতে দেখা
দিয়ে কোথায় লুকালে লীলাময়? আমি আবার নয়ন দু'টি
নিমীলিত কচ্ছি, আমার মুদিত আঁখির সম্মুখে আবার
তেমনি করে দাড়াও প্রিয়তম! { নয়ন নিমীলিত করিয়া ]
ওঁ শুদ্ধব্ৰহ্ম পরাৎপর রাম।
কালাত্মক পরমেশ্বর রাম।
ওঁ রাম, ওঁ রাম, ও রাম।
দৃশ্য।
দ্বিতীয়
স্থান--পথ। কাল-মধ্যাহ্।
গঙ্গাধর।
গঙ্গা। কিরে এস, ফিরে এস ভাই! কিরে এস স্নেহের
দুলি । ,সে আসবে না,শুধু প্রতিধ্বনি ফিরে এল।
স্নেহাতুরা মা আমাদের কেঁদে কেঁদে আকুল হয়ে লুটিয়ে পড়েছে,
সমস্ত পৌরজন তােমার সন্ধানে ঘুরে ঘুরে সারা হচ্ছে । ফিরে
এস, ফিরে এস ভাই ! বিবাহ উৎসবের আনন্দ আলয় হতে তুমি
কোন অলক্ষ্য পুরুষের সাবধান বাণী শুনে পালিয়ে গেছ ; সে
আজ কত দীর্ঘ কাল গত হল । শ্রান্ত প্রাণে, ক্লান্ত কলবরে
তােমার অন্বেষণে কতদিন নগর কান্তারে ছুটো ছুটি কচ্ছি! ফিরে
এস, ফিরে এস প্রিয়তম ! ফিরে এস ভাই।
[ তুকারামের প্রবেশ ]
তুকারাম। কা’কে ফিরাতে চাইছ গঙ্গাধর ?
গঙ্গা।
কত দিন হল, ভাইটা আমাদিগকে ছেড়ে গেছে ।
তার অন্বেষণে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি ;-যদি তাকে
ফিরাতে পারি।
তুকারাম। যার প্রাণে মহানের আকুল আহ্বান এসে পেীছে,
সংসারের ক্ষুদ্র গৃহকোণে তাকে কেমনে ফিরাবে ?
গঙ্গা। মায়ের চোখের জলে যে ধরণী সিক্ত হয়ে যাচ্ছে ।
৪
গুরু রামদাস
তুকারাম। মায়ের চোখের জলে যদি ধরণী সিক্ত না হয়
ধরণীর সরসতা আবে কোথা হতে ? মাতৃস্নেহ স্বর্গের
অমৃতধারা,-এই কঠোর পৃথিবীকে স্নিগ্ধ কৰ্তে স্বর্গ হতে
নেমে এসেছে।
গঙ্গা। এই স্বর্গীয় সম্পদকে যে সে দলিত করে গেল ।
তুকারাম। এত দলিয়ে যাওয়া নয় গঙ্গাধর -এযে গলিয়ে
দেওয়া। তােমার মায়ের বক্ষের জমাট স্নেহটুকু আজ সে
গলিয়ে দেছে।—রাম শােক-বিধুরা-জননী-বক্ষের গলিত
স্নেহধারায় একদিন এমনি করে অযােধ্যার শােকসন্তপ্ত প্রাণকে
স্নিগ্ধ করে দিয়েছিল।
গঙ্গা। মা’কে যে কিছুতেই প্রবােধ দিতে পাচ্ছি না।
তুকারাম। তােমার মা কি মহাত্মা একনাথ স্বামীর ভবিষ্যত
বাণী ভুলে গেছেন? যাও গঙ্গাধর, তােমার মাকে বল,--
তিনি যে মহাপুরুষের জননী। ব্ৰহ্মজ্ঞ পুরুষ প্রধান একনাথ
স্বামীর বাণী বিফল হতে পারে না, তিনি যে তােমার ভাইয়ের
মধ্যে মহাপুরুষের সত্ত্বা দেখে ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন। যার
প্রাণ মহান অনন্তের পানে ছুটে চলেছে, তাকে সংসারের
সংকীর্ণ সীমার মধ্যে কেমন করে টেনে আবে?
গঙ্গা। তবে কি তাকে আর ফিরে পাব না ?–মার আকুল
বক্ষ মাঝে বাঁপিয়ে পড়তে সে কি আর ফিরে আসবে না?
গুল রামদাস তুকারাম। আবে বৈকি।-মার বুকে ফিরে আসবে না ? কিন্তু সে দিন এমন পুত্রের জননী বলে তােমার মায়ের বক্ষখানি আনন্দে, গর্বে স্ফীত হয়ে উঠবে। গঙ্গা। রামদাস এখন কোথায় সে সন্ধান আপনি কিছু জানেন কি ? তুকারাম। জানি বৈকি!-ঐ নীল আকাশে ঐ যে উজ্জ্বল তপনদেব অ, অন্ কচ্ছেন, ওঁর সন্ধানের জন্য কি কারাে কষ্ট পেতে হয় ? তুমি যাও গঙ্গাধর, তােমার মাকে সান্তনা দাওগে। রামদাস তপস্যায় সিদ্ধ হয়ে এখন ভারতের তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তার জন্যে চিন্তা কর্তে বারণ করগে। যিনি ভক্তবৎসল ভগবানের আশীৰ্বাদ লাভ করেছেন তার জন্য চিন্তা কেন ? [ করজোড়ে ] এই অভাজনকে কৃপা কর ভগবান! ত্বমেকং শরণ্যং, ত্বমেকং বরেণ্যং ত্বমেকং জগৎ কারণং বিশ্বরূপ। তৃতীয় দৃশ্য। স্থান-বারাণসী। বিশ্বেশ্বরের মন্দির সম্মুখস্থ পথ। কাল-প্রভাত বিশ্বেশ্বরের সেবকগণ কলসীপূর্ণ গঙ্গা-জল মন্তকে লইয়া মন্দিরাভিমুখে যাইতেছিল- সেবকগণ। জয় শঙ্কর, জয় বিশ্বেশ্বর, হর, হর, বম বম্
গুরু রামদাস
[ দুইজন রামায়েৎ সন্ন্যাসীর প্রবেশ ]
রামায়েৎগণ। জয় রাম, জয় রাম, রাম রাম হরে হরে -
প্রঃ সেবক। সরে যা’, সরে যা’, মাথায় আমাদের গঙ্গা-জল ;
দুসনে, ছুসনে!
প্রঃ রামা। আমরা ছুলে কি গঙ্গা-জল অপবিত্র
দ্বিঃ সেবক। হবে না ? তােরা হলি হীন রামায়েৎ, আমরা
হলেম পবিত্ৰ শৈব ; তাতে আবার শিব পূজার গঙ্গা-জল
মাথায়, তােরা কি আমাদের ছুয়ে অশুচি করে’দিবি ?
দিঃ রামা। আরে তােদর শিবঠাকুরেরইত কোন আচার
নেই,-শ্মশান চারী, অস্থিমালা ধারী ;-তােদের আবার শুচি,
অশুচি বিচার ?
প্রঃ সেবক। আরে, মুখ সামলে কথা করে। কাশীধামে
মর্তে এসেছিস শ্মশানকে আবার অশুচি বলি? শ্মশান-চুল্লিতে
ঘুমােবার দিনের বড় বাকি নাইরে তাের ।
দ্বিঃ রামা। আমার যেন বাকি নেই, তুই বুঝি তাের
বিশ্বেশ্বর ঠাকুরের কাছ থেকে অমর বর পেয়েছিস ?
প্রঃ সেবক। তা’ আর পাইনি। আমরা বেঁচেও শিব, মলেও
শিব।
প্রঃ রামা। কি শিব শিব কচ্ছিস? তােদের শিবত অশিবে
গুরু রামদাস ভরা ;-কণ্ঠে গরল, কপালে অনল, বাঘ ছাল ; হাড়-মাল এইত সম্বল ! দ্বিঃ সেবক। আরে হতভাগার, বাবা বিশ্বনাথের আনন্দ- পূরীতে এসে আবার তাঁকে নিন্দা কচ্ছি? মরণেও যে গতি হবে না ! তাে’দের রামরঘুপতির কেমন মতি সব আমাদের জানা আছে,-শূদ্ৰক বেটা বনের মাঝে তপস্যা কচ্ছিল বিনা বিচারে তার গলাটা কেটে নিলে ; অপরাধ তার,-দৈবাধীন সে শূদ্রবংশে জন্মেছে। বাবা বিশ্বনাথের কাছে ব্রাহ্মণ শূদ্র, উচ্চ নীচ ভেদ নাই,দেবাদিদেব মহাদেব ভােলানাথ হীন শ্মশান চণ্ডালকেও কোল দিতে শঙ্কা করেন না। দ্বিঃ রামা। অত বকিনারে, বকিস্ না। রাম রঘুপতি কেন যে শূদ্ৰককে সংহার করেছিল, কেন সে অনধিকারীকে এমন প্রাণান্তকর শাস্তি দিয়েছিল, সে রাজনীতি ভিখারী ভাঙ্গর কিংবা তার সেবকগণ বুঝতে পাৰ্ব্বে না। প্রঃ সেবক। হতভাগাদের সাহস ত কম নয় ! বেটার। বাবার পুরীতে এসে, বাবার মন্দির সম্মুখে দাড়িয়ে বাবাকেই নিন্দা কচ্ছে, আর আমরা পঁড়িয়ে তা’ শুনছি। দ্বিঃ সেবক। মার বেটাদের। হাড় গুড়ো করে দাও, কাল ভৈরবের কুকুর লেলিয়ে দাও। লেলিয়ে দাও। মার মার-মার-- রামাগণ। মারমার- গুরু রামদাস [ উভয় দলের ঝগড়া, কোলাহল ও লাঠালাঠী ] [ রামদাসের প্রবেশ ] রাম। জয় বিশ্বেশ্বর, জয় বিশ্বেশ্বর, জয় বাবা বিশ্বনাথ। এ কি! তিষ্ঠ, তিষ্ঠ- প্রঃ সেবক। আরে ভাই শঙ্করলাল, আর এক বেটা ভণ্ড এসেছেরে,-রামায়েতের বেশ, মুখে কিন্তু বাবা বিশ্বনাথ দ্বিঃ সেবক। মার বেটাকে। সব রামায়েৎকে বারাণসী হতে বের করে দাও। রাম। জয় বিশ্বনাথ ! বাবা, একি লীলা তােমার ? প্রঃ সেবক। বাবা বিশ্বনাথের লীলা আর দেখতে হবে না এখনি তাের ভবের লীলা ঘুচিয়ে দিচ্ছি-[প্রহার করিতে উদ্যত] দ্বিঃ সেবক। সংহার কর না, সংহার কর না। কাশীতে মারা গেলে বেটা শিব হয়ে যাবে যে ! রাম। তােমরা ধর্ম নিয়ে একি কলহ কচ্ছ? এতদিন বিশ্বনাথের সেবা করেও কি বিশ্বপ্রেম আয়ত্ত কর্তে পালে ? কে শিব ? কে রাম ? এক অনন্ত জ্যোতির্ময় পুরুষের বিভিন্ন রূপের প্রকট নয় কি? আমি ত বিশ্বনাথের পাষাণ মুর্তির মাঝে অনাদি অনন্ত পুরুষের যে সত্ত্বা দেখেছি, পুরীধামে জগন্নাথ দেবের দারু মূর্তির মাঝেও সে একই সত্ত্বা দেখে এসেছি। রামচন্দ্রজির মূর্তি যেমন আমার হৃদয়ের
গুরু রামদাস
।
পরতে পরতে আঁকা, এই বিশ্বনাথ দেবের বিরাট মূর্তিও
আমার ক্ষুদ্র হৃদয় সিংহাসনে শান্ত, সংযুত হয়ে বসে
আছেন। আমি সেই মহান পুরুষকে কভু রাম রূপে হেরি,
কভু বিশ্বনাথ রূপে জড়িয়ে ধরি-
প্রঃ সেবক। তুমি
কি বলছ ?
বিশ্বনাথ তােমার হৃদয়
সিংহাসনে বসে আছেন ?
রাম। আছেন বৈ কি!
প্রঃ সেবক। কিন্তু আমরা মন্দিরে যেয়ে যদি তাকে দেখতে
পাই; মিথ্যা কথা বলবার জন্য তােমায় এমন মজা দেখাব
যে চোখের সুমুখে শুধু সরষে ফুল দেখতে পাবে। যাও ত
ভাই শঙ্করলাল, মন্দির মধ্যে বিশ্বনাথজির মূর্তি আছে কিনা
একবার দেখে এসত।
দ্বি সেবক। আমি এখনই দেখে আছি, তুমি একে ছেড়ে
দিও না।
[ প্রস্থান ]
রাম। ভগবান! ভগবান! তােমায় নিয়ে মানুষ একি
খেলা খেছে ? হে দেবতা ! আজ ভারতের বড় দুর্দিন,-
ভাই ভাইকে বিশ্বাস করে না; প্রতিবাসীর ঐশ্বৰ্য্য প্রতিবাসীর
চোখে হিংসার বহুি উজ্জ্বল করে তােলে ; হিন্দু হিন্দুকে
লাঞ্ছিত কচ্ছে, দেবধৰ্ম্ম বিরােধী বিধর্মীগণ তাদের নিষ্ঠুর
১০
গুরু রামদাস ! দেশ আঘাতে ভারতের কীর্তি, যশঃ, গৌরব সকলকে ধূলার মাঝে লুটিয়ে দিচ্ছে! জানি, তুমি হে পরম পুরুষ ! যেখানে ধম্মের গ্লানি সম্ভব হয়, যেখানে পাপ প্রবল হয়ে ওঠে সেখানে তােমার ঐশী-শক্তি প্রবুদ্ধ করে তােল ; আজ পাপে ভরে উঠেছে ; ওঠ দেবতা, জাগ্রত হও, অমঙ্গলকে বিনাশ কর্নার জন্য আজ তোমার অকাল বােধনের প্রয়ােজন হয়েছে। এস দেব ! আবার পাঞ্চজন্য ধ্বনিত করে এই ভারত-বক্ষে এসে দাড়াও। দ্বিতীয় সেবকের প্রবেশ ] দ্বিঃ সেবক। সৰ্ব্বনাশ! সৰ্ব্বনাশ ! বিশ্বনাথের মূর্তি মন্দিরে নেই— সেবকগণ। সে কি ? সে কি ? দ্বিঃ সেবক। সত্য, সত্য। রজতপীঠ শূণ্য- রাম। যিনি শূণ্যের প্রতি অণুপরমাণুতে মিশে আছেন । হা-রে মােহান্ধজীব, তার মন্দির শূণ্য দেখছ ? প্রঃ সেবক। সাধু! তুমি কোন মহাজন বিশ্বেশ্বরের সিংহাসন টলালে রাম। আমি দীন অভাজন; আমার কি সাধ্য যে ভগবানের আসন টলাই? নয়নের সম্মুখ হতে মায়ার যবনিকা সরিয়ে মন্দির শূণ্য, শূণ্য, সব ? ১১ গুরু রামাস দাও, বিশ্বেশ্বরকে সমস্ত বিশ্বে ব্যাপ্ত দেখতে পাবে। বল- জয় শিব রাম, জয় শিব রাম । সকলে। জয় শিব রাম, জয় শিব রাম । রাম। পূজার সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায় ; চল বিশ্বনাথের মন্দিরে যাই। জয় বিশ্বনাথ, জয় বিশ্বনাথ । প্রঃ সেবক। মন্দিরে বিশ্বনাথকে দেখতে পাব কি ? রাম। পাব বইকি! চিন্ময় যখন পাষাণময় হয়েছেন, যাবেন কোথায় ? যদি দেখা না পাই, যদি সে অরূপ রতন আপনাকে গোপন করে রাখেন ; এমন ডাকা ডাকব যার গভীর গম্ভীর ধ্বনিতে এই বারাণসীর পাষাণ-প্রাচীর বিদীর্ণ হয়ে যাবে, নীলিমা লিপ্ত ঐ অনন্ত আকাশ অসহ আবেগে কেঁপে উঠবে ; কল কল নাদিনী তটপ্লাবিনী পুণ্য সলিলা জাহ্নবীর কল কল্লোল স্তব্ধ হয়ে যাবে! জয় বিশ্বনাথ, জয় বিশ্বনাথ। সকলে। জয় বিশ্বনাথ, জয় বিশ্বনাথ। [ সকলের প্রস্থান । চতুর্থ দৃশ্য। স্থান-সহাদ্রির সন্নিহিত উপত্যকা। 'কাল-প্রভাত। শিবাজী ও তানাজি। তানাজি। রজনীর অন্ধকার অপসারি’ ঐ দেখ সখা, নববাদিত ; ১২
গুরু রামদাস
ভাস্কর তার অপূর্ব কিরণমালায় সহাদ্রির সমস্ত শীর্ষকে আচ্ছন্ন
করে দেছে ! কি সুন্দর এই সূর্যোদয় !
শিবাজী। কিন্তু ভারতের যে গৌরব-ভাস্কর অস্ত গেছে,
ভারতের এই গাঢ় অন্ধকারকে লুপ্ত করে ভারতের ভাগ্য-গগনে
তা’ বুঝি আর কখনাে উদিত হবে না। কি দুঃখ তানাজি!
নাজি। তােমার নয়নে, তােমার মুখের উপর আমি কিন্তু
অ শার আলোেক বিকাশ দেখতে পাচ্ছি।
শিবাজী। দেখছ, সে আলেয়ার আলো।
তানাজি। একি কখনাে সম্ভব হতে পারে না সখা ?
শিবাজী। কি সম্ভব ?
তানাজি। এই বিভিন্ন, বিচ্ছিন্ন হিন্দুগণকে এক মহান
উদ্দেশ্যে একটা জাতি গড়ে তােলা?
শিবাজী। সে একটা সুন্দর স্বপ্ন বটে।
তানাজি। সত্য কি সখা, এই চিন্তা একটা স্বপ্নের
খেয়াল মাত্র ?
শিবাজী। সত্য বৈকি! যেখানে এক জাতি অপর জাতিকে
স্মৃণিত কুকুরের ও অধম জ্ঞান করে, সেখানে একটা জাতি
গঠন করার কল্পনা স্বপ্নের খেয়ালইত বটে।-এখনো দেখছি
আচার ভ্রষ্ট ব্রাহ্মণগণ শুধু জন্মজাত অধিকারের উপর নির্ভর
করে শান্ত, শিক্ষিত, শৌর্যবান শূদ্র নামে খ্যাত জাতিটাকে
গুরু রামদাস -- দলিত কৰ্তে দ্বিধা করে না। এখনাে দেখছি এই শূদ্রগণ চণ্ডালকে ছুঁলে স্নান না করে শুদ্ধ হয় না। শৈব বৈষ্ণবকে ঘৃণা করে, বৈষ্ণব রামায়েৎকে ঘৃণা করে, ঘরে ঘরে দ্বন্ধ, জাতিতে জাতিতে বিরােধ- তানাজি। কিন্তু অর্ধ লক্ষ মােগল পাঠান এসে পঞ্চদশ কোটি হিন্দুকে চোখ রাঙ্গিয়ে তাদের স্বেচ্ছাচার শাসনের অধীন করে রাখবে, যার ধমনী দিয়ে একটা উষ্ণ শােনিত-কণাও বইছে সে কি করে এই অত্যাচার সহ্য কৰ্বে ? শিবাজী। যতদিন মানুষ হতে না পারি ততদিন এই স্বেচ্ছাচার শাসনের কাছে মস্তক নত কৰ্ত্তে হবে বৈকি। নাজি। মানুষ কবে আর হব? শিবাজী। তা বলতে পাচ্ছি না বন্ধু ! কিন্তু যখন ইতি- হাসের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি, আমার চোখের সম্মুখে আমরা যে মানুষ নই তার প্রকট ছবি ফুটে ওঠে।যে দিন কণােজর জয়চাঁদ পৃথ্বীরাজের বিরুদ্ধে মহম্মদ ঘােরীকে কাগাড় তীরে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এল সে দিনের ইতিহাস সাক্ষী দিলে, আমরা মানুষ হয়নি ; যে দিন ভারতে সর্বশ্রেষ্ঠ নূর পুণ্যশ্লোক প্রতাপের মস্তক লক্ষ্য করে মানসিংহ মােগলের শাণিত তরবারখানা তুলে, সে দিন প্রমাণ হলাে যে আমাদের মানুষ হতে দেরী আছে ; আজ আমি যে অসহনীয় অত্যাচারের . ; ১৪
গুরু রামদাস
বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে, উন্নত শীর তুলে, দাড়াতে চাইছি,
আমার এই শির নুইয়ে দেবার জন্য আওরঙ্গজেব তরবার
পাঠাবে কাকে দিয়ে জান ?-রাজা জয়সিংহ কিংবা মারাবার
পতি যশােবন্ত সিংহকে দিয়ে।
তানাজি। কেন এমন হয় ?
শিবাজী। হবে না? এখনাে আমরা নিজের সুখ স্বার্থের
জন্য দেশের স্বার্থকে দলিত কৰ্তে দ্বিধা করি না, এখনাে
আমরা জনসাধারনকে পশ্চাতে ফেলে নিজেদের পুষ্পিত
প্রতিমূর্তি উর্ধে তুলে পূজা পাবার জন্য ব্যস্ত হই। যতদিন
নিজের সর্বস্বকে দেশের কল্যাণ-ব্ৰতে বলি দিতে না পাৰ্ব্ব
ততদিন নিজেও লঞ্ছনা ভােগ কৰ্ব্ব, দেশের লাঞ্ছনাও নিৰ্বাক
হয়ে স’য়ে থাকব।
তানাজি। দেশের কল্যাণব্রতে তােমার যেমন একান্ত নিষ্ঠা
দেখছি; আমার মনে হয় তােমাকে দিয়ে দেশের এই লাঞ্ছনার
অবসান হবে।
শিবাজী। হবে কিনা জানি না। কিন্তু তার জন্য
আমি হৃদয়ের রক্ত-ধারা ঢেলে দেব। হে মা, জননী
জন্মভূমি!
সন্তানের রক্ত যেন ব্যর্থ না যায়, এই আশীর্বাদ কর মা!
তানাজি। তুমি পূজনীয় প্রভু, তুমি আমাদের প্রিয়তম
ভাই ; তুমি এই অধম অভাজনকে সখা বলে সম্বােধন করেছ ।
গুরু রামদাস
তুমি সবার আগে আমার মাওলী ভাইগণকে তােমার কাছে
আহ্বান করেছ, এমন উদার, এমন সরল প্রাণ যার তিনি
মায়ের আশীৰ্বাদ হতে বঞ্চিত হবেন না।
শিবাজী। তানাজি! এই সহাদ্রির সানুদেশে ভারতের
ভবিষ্যৎ চিন্তায় একদিন আমি বিভাের হয়ে ছিলেম ; কখন যে
-সূর্য অস্ত গেছে, কখন যে সন্ধ্যার বিষন্ন আলোক মাঝে সহাদ্রির
শােভা লুপ্ত হয়ে গেছে কিছুই জানতে পারিনি ; হঠাৎ
একটা কোমল স্পর্শে আমার চিন্তা টুটে গেল, চোখ দুটি
ফিরিয়ে দেখ লুম,আমার পশ্চাতে এক মহান পুরুষ
দণ্ডায়মান,—গৈরিক বেশ, প্রশান্ত মূর্তি, প্রশস্ত ললাট, তার
উপর চারুদর্শন চোখ দুটি ধক্ ধক্ করে জ্বলছে ! ভয়ে বিস্ময়ে
তার চরণ মূলে মস্তক নত কলেম, তিনি সন্ধ্যার স্তব্ধতা
ভঙ্গ করে গম্ভীর উদাও স্বরে আমায় বলেন- “এই ভারতবর্ষে
বৰ্ম্মরাজ্য স্থাপনের জন্য তােমায় বরণ কল্লাম বৎস, যাও, এই
পূণ্যব্রত উদ্যাপন করগে !” এই আদেশ করে’ আঁখির পলকে
অন্ধকার মধ্যে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
তানাজি। তিনি বােধহয় স্বয়ং ভগবান।
শিবাজী। না তানাজি, তিনি ভগবান নন,--ভগবানেরই
প্রেরিত পুরুষ রামদাস স্বামী। আমি সে দিন আমার
সমস্ত সত্ত্বা তার পুণ্যপদমুলে নিবেদন করে তাকে গুরুপদে
১৬
ও রামদাস
বরণ করেছি। চল তানাজি, শ্রীভগবানের আদেশ যার মধ্যে
দিয়ে নেমে এসেছে তার বাণী সফল করিগে।
তানাজি। তানাজি তােমারই চরণমূলে বিকিয়ে আছে বন্ধু।
নেপথ্যে গীত--
নাজি। আমার মওলী ভাইগণ আসছে-
[ গাইতে গাইতে মাওলীগণের প্রবেশ ]
গীত
কি যাদু জান বঁধু, বুঝিতে না পারি,
মােদের যা কিছু আছে দিতেছি চরণে ভারি।
সহ পরাণের আশা,
অধরের ভাষা,
আজি মিটেছে সকল পিয়াস
পিইয়ে তােমারি প্রেম বারি।
বঁধু, তুমি মহাজন,
হীন অভাজনে করেছ আপন,
তুমি হে তপন আঁধার গগন,
তুমি তমহারী।
শিবাজী। এস, এস আমার প্রিয়তম ভাইগণ, এস, আমার
দেশের শক্তিমান সন্তানগণ, এই লাঞ্ছিত, অবনত ভারতকে
১৭
গুরু রামদাস
.
?
ওঠাবার জন্য তােমাদের আহ্বান করেছি। আমি যাদু জানি
, কুহক জানি না ; জানি,-সরল, উদার উন্মুক্ত হৃদয়ের
সঙ্গে আমার এই হৃদয়খানি মিলিয়ে দিতে
[ মুন্নার হাত ধরিয়া রঘুজির প্রবেশ }
রঘু। আজ মাওলীগণের গৃহে গৃহে ডাক পড়েছে আমায়
কেন ডাকলে না শিবাজি ?
শিবাজি। তুমি বৃদ্ধ, তােমার একটা মাত্র ছেলে
শিশু ; আমরা যাচ্ছি মরণকে বরণ কৰ্ত্তে, তাই তােমায় ডাকিনি।
রঘু। মরণ কি আমার গৃহে কখনাে আসবে না? কেন
মরণকে নিয়ে ভয় দেখাচ্ছ ? হে আমার মাথার ঠাকুর শিবাজি
আমরা কি বেঁচে আছি ?-পদাঘাতে নত এই লুঙ্গীত শির যার
তুলবার ক্ষমতা নেই, হৃদপিণ্ড তার ধুক ধুক কচ্ছে বলে কি
সে বেঁচে আছে ? না শিবাজি! পুত্রের মুখের পানে চেয়ে
দেশকে ভুলতে পাৰ্বনা, তুমি দেশের কাজ নিজেকে নিবেদন
করেছ, আমি তােমার চরণে পুত্রকে নিবেদন কলাম ।
মুন্না। আমি বর্ষা ছুড়তে - জানি রাজা। সেদিন একটা
বাঘের ছানাকে আমি বর্ষায় বিদ্ধ করেছি।
শিবাজী। বৃদ্ধ রঘুজি ! তােমার এই মহৎ দান আমি
গ্রহণ কলাম। মা ভবানী তােমার মঙ্গল করুন। তানাজি।
এই বৃদ্ধের মত দাতা এ দেশে কয়জন আছে ?
গুরুরামদাস
তানাজি। তােমার মঙ্গল পরশে জন্মভূমির মলিন ললাট
হতে অভিশাপের কালিমা মুছে যাচ্ছে ; রঘুজির মত আজ সকলের
মন, প্রাণ উদার হয়ে উঠবে। সেদিন বন্ধু, তুমি উচ্চ, নীচ
ভেদজ্ঞানের অবসান করে আমাদিগকে কোল দিয়েছ সেদিন
আমাদের সর্বস্ব,—আমাদের ধন দৌলত, পুত্র পরিজন তােনার
চরণে উৎসর্গ করেছি।
শিবাজী। তােমাদেরে পেয়ে বন্ধু, আশা, উৎসাহে আমার বুক
ভরে উঠেছে। জয়-জয়-মা ভবানী!
সকলে। জয়-জয় মা ভবানী।
[ সকলের প্রস্থান ]
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান-ভবানীর মন্দির সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণ। কালরাত্রি
মুন্না ও মাওলী বালকগণ।
গীত।
লক্ ল রসনা নাচিছে অধরে,
ধক ধক্ অনল নয়ন উগারে,
মাভৈঃ মাভৈঃ
ধ্বনি ওঠে ঐ
গুরু রামদাস
মতি।
আর কি সন্তান মরণে ডরে ?
এনেছি মা, জবা রক্তে রাঙিয়।
এনেছি ভক্তি পরাণ ভরিয়া
তাথিয়া তাথিয়া
ওঠ মা নাচিয়া,
ঝলকি উঠুক অসিটি করে।
[ মতিলাল ও জহরলালের প্রবেশ ]
কে তােমরা বালক ? এখানে কেন এসছ ?
জহর। সরে যাওত বাছারা ! আমরা মার পুজো দিয়ে বলিটা
উৎসর্গ করি।
মুন্না। বলি কোথায় ?
মতি। ঐ ছাগ শিশু দেখছ না, ঐ মাকে উৎসর্গ কৰ্ব্ব ।
মুন্না। আহা! সুন্দর ছাগ শিশু ! নেচে নেচে আছে,
এখনই যে খঙ্গের আঘাতে তার জীবন শেষ হবে সে জানে
না। হাঁগা, মা কি এই বলি গ্ৰহণ কৰ্বেন ?
মতি। কৰ্ব্বেন না ?
[ আবাজির প্রবেশ।]
আবাজি। কখনাে না !
জহর।
এত দিন কি করে গ্রহণ কলেন ?
আবাজি।
এত দিনও করেন নি। এত দিন যদি সত্যরূপে
মার পূজা কর্তে পাত্তে, দেশের এই দুর্গতি হত না। যদি মার পূজা
গুরু রামদাস
সার্থক কর্তে চাও, মার চরণে নিজেকে উৎসর্গ কর। “ধনং দেহি
পুত্রং দেহি” এই স্বার্থপর মন্ত্র ভুলে’ ভাইকে ভালবাসার, দেশকে
ভালবাসার, স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালবাসার কামনা মার কাছে প্রার্থনা
কর। দেখবে, তখন ঐ নৃমুণ্ডমালিনী, বিকট করাল বদনা মার
ভীমা কালীমূৰ্ত্তি আবার প্রসন্না, বালারুণদ্যুতিময়ী, পূর্ণ স্তন্যভাবে
প্রফুল্লা, স্নেহময়ী মাতৃমূর্তিতে প্রকট হয়ে উঠবে।
মতি। কে আপনি মহাজন ? মার একি নূতন পূজা
শেখাচ্ছেন।
আবাজি। নূতন পূজা নয়। মায়ের এমন পূজা মেওয়ারের
রাণা প্রতাপসিংহ করেছিলেন তাই তাঁর পূজার যজ্ঞ হতে রাণা
রাজসিংহের উদ্ভব হয়েছে। যদি প্রকৃতই মায়ের পূজা কৰ্বার
বাসনা হৃদয়ে জেগে থাকে, ঐ বাহিরের ঢং দূরে ফেলে দিয়ে মায়ের
পূজায় নিজেকে উৎসর্গ কব্বার মন্ত্র শিখে নাও।
জহর। সে মন্ত্র কে শেখাবে ?
আবাজি। আমার সঙ্গে এস আমি তােমাদের দীক্ষা গুরুকে
দেখিয়ে দেব।
জহর। চলুন, আপনি সাধু, আপনার সঙ্গ ত্যাগ কৰ্ব্বনা।
মুন্না। আমরাও যাব।
আবাজি।
এস।
[ সকলের প্রস্থান।
২১
গুরু রামদাস ষষ্ঠ দৃশ্য। স্থান-বিঠোবাদেবের মন্দির সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণ। কাল-প্রভাত। মন্দিরের সােপান সম্মুখে যুক্ত করে রামদাস, প্রাঙ্গণে জন মণ্ডলী। অদূরে শিবাজী ও মাওলী সৈন্যগণ- রাম। ওঠ, ওঠ, জাগ্রত হও দেবতা! দিকে দিকে ভারতকে আবার তেমনি করে তােমার পাঞ্চজন্য ধ্বনিত কর, আবার তেনি করে ক্ষতেজ, ব্ৰহ্মতেজের অপূৰ্ব্ব সমাহার,-পরশুরামের মত ভীম কুঠার উদ্যত করে সংহার মূর্তিতে ধেয়ে এস। এই ক্ষত হৃদয়ের উদগ্র পিপাসা নিয়ে উদাত্ত স্বরে তােমায় ডাকছি নারায়ণ ! ওঠ, ওঠ! তােমার কণ্ঠের ঐ শু, সুরভী ফুলের মালা দূরে ফেলে দাও, তােমার হাতের ঐ মােহন বাঁশী নর্মদার জলে ভাসিয়ে দাও। ত্রেতাযুগে, তুমি দক্ষিণ সাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা ভেদ করে পাপ-পঙ্কিল গর্বিত লঙ্কাকে দলিত করে পুণ্যের জয়পতাকা তুলেছিলে ; আবার তেমন করে, তােমার ঐ বঙ্কিম ত্রিভঙ্গ ঠাম ছেড়ে দুর্জয় ধনুর্বাণ হস্তে জেগে ওঠ। তুমি না প্রবুদ্ধ হলে তােমার এই লীলাভূমিতে ধৰ্ম্ম জেগে উঠবে না নারায়ণ ! २२
গুরু রামদাস
[ গাইতে গাইতে কীৰ্ত্তনের দলসহ তুকারামের প্রবেশ ]
গীত
আজি মন্দিরে এসেছে ওগাে, মৰ্ম্মেরধন।
চিত চঞ্চল আঁখিয়া আকুল
হেরিতে সে অরূপ রতন।
আমি গাঁথি নাই মালা,
তুলি নাই ফুল,
শূন্য ফুল-ডালা,
পরাণ ব্যাকুল।
পূজাত হল না,
কি করি বল না,
কেমনে পা’ব দরশন?
রাম। সত্য
সত্য সাধু তুকারাম ! আজ যেন কুরুক্ষেত্র
মহাযজ্ঞের সেই প্রধান হােত এই মন্দিরে আবির্ভূত হয়েছেন ;
চারদিকের বাতাস যেন নবীন উৎসাহে ভরে গেছে।
তুকারাম। ভক্তি, প্রেমে আজ সকলের মন ভরে উঠেছে,
প্রেমময় ঠাকুরের কাছে এলে শুষ্ক, কাঠোর প্রাণও প্রীতির
চলনে আদ্র হয়ে ওঠে। আমার কিছুই হলো না। জীবনের
গুরু রামদাস সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল । কিছুই হল না। [ সুরে ] “আমি গাঁথি নাই মালা, তুলি নাই ফুল, ওগাে শূন্য অর্ঘ্য ডালা পরাণ আকুল- পুজাত হল না কি করি বলনা, কেমনে পাব দরশন” ? রাম। সধু তুকারাম ! শুধু ফুল চন্দনে ভগবানের পূজা করে ভারতের প্রাণকে কোমল করে দিওনা,-রক্ত দিয়ে প্রাণ দিয়ে পূজার আয়ােজন কর ! তুকারাম। যিনি প্রেমের ঠাকুর, যার মধুর মুরলীর মােহন ধ্বনি যমুনা পুলিন হতে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতকে প্রেমে মুগ্ধ করে রেখেছে, তিনিত রক্ত চান না,-ভক্তির চন্দনে তার অতুল তৃপ্তি । রাম। যদি না চাইবেন তবে বাঁশরী ফেলে কেন কুরুক্ষেত্রে পাঞ্চজন্য ধরেছিলেন, কেন জটাধারী ধনুর্ধারী হয়ে, সমুদ্রে পাষাণ ভাসিয়ে লঙ্কায় অভিযান করেছিলেন? সাধু তুকারাম! ভগবানকে ভক্তি দেবে যখন নিখিল বিশ্ব ভক্তি পিয়াসী হয়ে উঠবে ;-চেয়ে দেখ আজ চারদিক হতে বিশ্বের রক্ত লেলিহান ক্ষুধিত রসনা ভারতের বুকের রক্তের জন্য লােলুপ হয়ে উঠেছে। এই বিপদকালে, পাপের পূর্ণ গ্রাস হতে ভারতকে রক্ষা কৰ্বার জন্য রক্ত যজ্ঞের আয়ােজন কর,-প্রাণ ভরে ভাক সেই বিপদভঞ্জন, কেশী-কংস-নিসুদন মুকুন্দ মুরারে। বল হরে মুরারে মধুকৈটভারে— ২৪ গুরু রামদাস রাম। [ নেপথ্যে ভীষণ কোলাহল ] সকলে [ ভীতরে ] একি ? একি ? নেপথ্যে—আল্লা, আল্লা হে, আল্লা ব্লা হাে-- জনৈক ব্যক্তি পালাও, পালাও সুলতানের সৈন্যগণ বিঠোবা দেবের মন্দির আক্রমণ কৰ্ত্তে আসছে। পালাও, পালাও- সকলে। সৰ্ব্বনাশ, সৰ্ব্বনাশ! কি হবে গাে, কোথায় যাব গো, পালাও পালাও। [ সকলের ক্রন্দন ও কোলাহল ] কেন কাদছ ? জনৈক ব্যক্তি। কঁাদ নাত কি প্রাণ দেব ? রাম। ক্রন্দনে কি সুলতান সৈন্যগণ ফিরে যাবে ? জনৈক ব্যক্তি। তা যাবে না সত্য। কি হবে গাে পালাই, পালাই রাম। পালাচ্ছ ? কাথায় পালাচ্ছ ? এই বিঠোবা দেবের কাছে এসছ তােমরা ইহকালের সৌভাগ্য, পরকালের পরমাত্র লাভ কৰ্বার জন্য, আজ সেই বিঠো দেবকে একদল উন্মত্ত আততায়ীর সম্মুখে ফেলে কোথায় পালাবে? সুলতানের সৈন্যগণের ধমণী দিয়ে যেমন রক্ত ধারা বইছে তােমাদের ধমণী দিয়েও কি তেমন রক্তধারা প্রবাহিত হয় না ? নেপথ্যে—আল্লা-ল্লা-হহ, আল্লা-ল্লা হাে- ২৫ গুরু রামদাস সকলে। ঐ এলাে, ঐ এলাে, ও মাগাে, কি হবে গাে? পালাও পালাও- রাম। পালাবে? কোথায় পালাবে ?-স্ত্রীর অঞ্চলের আড়ালে ?--মায়ের মিগ্ধ ক্রোড়ে? কিন্তু সেওত তােমাদের নিরাপদ স্থান নয়।তােমাদের মাতা, ভগ্নী; স্ত্রীর চোখের জলে সুলতানের হারাম সিক্ত হয়ে যাচ্ছে। যাও বিঠোবাদেবের মূর্তি রক্ষা কর; আততায়ীগণকে তাড়িয়ে দাও ; না পার প্রাণ দাও। এই রক্তপাত ভগবান কখনাে বিফল করে দেবেন না। জনৈক ব্যক্তি। না না আমরা প্রাণ দিতে পারব না। চল ভাই সকলে পালাই। সকলে। চল; চল, পালাও পালাও। আমরা প্রাণ দিতে পাৰ্ব্ব না। রাম। প্রাণ দিতে পাৰ্বে না? কিন্তু প্রাণটাকে চিরদিন ধরে রাখতে পাৰ্ব্বে, কি ? যখন জরা, ব্যাধি, মহামারি—তােমার দরজায় এসে হানা দেবে, এমন কোন স্থান আবিষ্কার করেছ যেথায় নিজের প্রাণটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পাৰ্ব্বে ? নেপথ্যে—আলাল্লা-হো, আল্লা-লা হাে- জনৈক ব্যক্তি। কেন বাজে বকুনি শুছিস? ঐ এলােরে ও শেতলা, ও বিদ্ঠন, চল, চল পালাই [ দ্রুত প্রস্থান ] গুরু রামদাস যাও হতভাগ্য ভীরু কাপুরুষের দল, তােমাদের প্রাণ এতই অপদার্থ যে তা দিলেও কোন দরকারে আসবে না। পালাও, তােমাদের আরাধ্য দেবতাকে, তােমাদের মঙ্গলকে অত্যাচারী আততায়ীর পদতলে ফেলে দিয়ে কোন নিভৃত, বিলাস কুঞ্জের সন্ধান করগে। কিন্তু এই জন সঙ্ঘের ভিতর এমন কি দশটা প্রাণীও নেই যারা নির্ভয়ে মরণকে বরণ করে দেশের মান, এই বিঠোবা দেবের সম্মান, মা, ভগ্নীর মর্যাদা, ভীষ্মৰ্জ্জুন বন্দিত এই ভারতের গৌরব রক্ষা কর্তে পারে ? শিবাজী। [ সম্মুখে অগ্রসর হইয়া ] আমি যাব প্রভু! আমায় আশীৰ্বাদ করুন শুরুদেব । রাম। যাও বৎস! দেশের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ কর । শ্রীভগবান তােমার মঙ্গল কৰ্বেন। কতিপয় ব্যক্তি। আমরাও সঙ্গে যাব। শিবাজী। এস ভাইগণ- [ নেপথ্যে কোলাহল ] শিবাজী। ঐ কোলাহল শােন, ঐ উন্মত্ত উদ্দাম সুলতান- সৈন্যগণ প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে। বল-জয় মা ভবাণী— সকলে-"জয় মা ভবাণী । [ অসি নিষ্কাষিত করিয়া শিবাজীর মাওলী সৈন্যগণ সহ প্রস্থান ] তুকারাম। কে এই অপূৰ্ব্ব বীর পুরুষ ? ২৭
গুরু রামদাস
রাম। ভারতের উদীয়মান ভাস্কর, মহারাষ্ট্র গৌরব
শিবাজী। সাধু তুকারাম, তুমি এর প্রাণে ভক্তি দাও, আমি এর
হন্তে খড় দিই। উভয়ের মিলিত আশির্বাদ দিয়ে একে দিয়ে
এই ভারতবর্ষে আবার ধর্মরাজ্য স্থাপন করি।
[ নেপথ্যে ভীষণ কোলাহল ]
তুকারাম। কি ভীষণ কোলাহল! নারায়ণ ! নারায়ণ ! এই
পৃথিবীর মঙ্গল কর, মানুষের রক্ত লিপ্সাকে সংযত কর।
রাম। ভীষণ যুদ্ধ বেধেছে । হে বিঠোৰা দেব ! তুমি
যদি জাগ্রত হও, আমার শিবাজী এই যুদ্ধে নিশ্চয় জয় লাভ
কৰ্বে। ওঁ রাম, ওঁ রাম, ওঁ রাম।
সপ্তম দৃশ্য।
স্থান-কক্ষ। কালরাত্রি ।
সাহজি ও শিবাজী।
শিবাজী। আমি যুদ্ধে জয়ী হয়ে এসেছি ; আমায় আশীর্বাদ
করুন পিতা।
সাহজি। পুত্র, তুমি বিদ্রোহী।
শিবাজী। বিদ্রোহী কাকে বলে পিতা ?
সাহজি। যে নিয়ম নিয়ন্ত্রিত রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাড়ায়,
সেই বিদ্রোহী।
७ शांघमांज শিবাজী। তবে পিতা! আমি বিদ্রোহী নই। সাহজি। তুমি বিজাপুর নবাবের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছ। তুমি বিদ্রোহী নও? শিবাজী। পিতা! যে দেবালয় ধ্বংস করে, কুল নারীর সতী- ধর্মে আঘাত দেয়, যে দুর্বলের রক্ত শােষণ করে, নিজের বিলাস লালসার পরিচর্যা করে, তাকে রাজা বল ? তার শক্তিকে রাজ- শক্তি বলে সম্মান কর্তে বল ? রাজশক্তির কি নিয়ম রক্ষার জন্য বিজাপুর সুলতানের বিঠোব। দেবের মন্দির ধ্বংস চেষ্টার প্রয়ােজন হয়েছিল? কি রাজ প্রয়ােজনে সুলতানের হারামে মহারাষ্ট্রের অভূল লাবণ্যময়ী রমণীগণ লাঞ্ছিত হচ্ছে ? পিতা ! দেশের এই হীন দুর্দশার কথা যখন ভাবি আমার সর্বাঙ্গের স্নায়ুগুলির মধ্যে দিয়ে উষ্ণ রক্তধারা বইতে থাকে ; আমি দিশেহারা হয়ে যাই। সাহজি। দিশেহারা হলে চলবে না শিবাজি! আমি এখনাে বিজাপুর সরকারের নিমকে দেহ পুষ্ট কচ্ছি; আমার ধন দৌলত সব বিজাপুর সুলতানের প্রসাদে। শিবাজী। পিতা! তুমি এই নিয়ে গর্ব কচ্ছ; কিন্তু লজ্জায় স্মৃণায় আমার মস্তক নত হয়ে যাচ্ছে।সারা দেশকে উপবাসী রেখে তােমার মুষ্টিগুলি সুবর্ণে ভরে দিচ্ছে, এর সার্থকতা কি? সারাদেশকে লাঞ্ছিত করে তােমায় সম্মানিত কচ্ছে, এই সন্মানের
গুরু রামান
?
মূল্য কি? না, পি! নবাবের এই ঘৃণ্য গােলামী ত্যাগ করে
দেশের কাজে আজ যারা দুঃখকে বরণ কৰ্ত্তে অগ্রসর হয়েছে
তাদের পার্শ্বে এসে দাড়াও। এই শ্মশানের
এই শ্মশানের মধ্যে কিসের
সম্মান ? এই ধূধূ মরুবিস্তার মধ্যে কিসের ধন দৌলত? পঞ্চমহল
প্রাসাদের আমাদের কি প্রয়ােজন ? পর্ণ কুটীরে কি জ্যেৎস্নার
আলাে এসে পড়ে না? স্নিগ্ধ হাওয়া বয়না ? শ্যাম দুৰ্বাদল
হতে কি শুভ্র সুকোমল শয্যা বেশী উপাদেয় পিতা?
সাহজি। পুত্র! তুমি একটা অসম্ভব উদ্দেশ্য নিয়ে অনন্ত
বিপদ মাথা পেতে নিচ্ছ? মনে রেখ পুত্র! এ ছেলা খেলা
শিবাজী। পিতা! যে দিন গুরুদেব মহাত্মা রামদাস স্বামী
আপনার পুত্রের ললাটে দেশের কল্যাণ ব্রতের পূতটীকা পরিয়ে
দেছেন, যে দিন মঙ্গলময়ী মা ভবানীর ভীম অসিনা আপনার
পুত্রের হস্তে অভিষিক্ত হয়েছে সে দিন হতে আপনার পুত্র ছেলে
খেলা ভুলে গেছে।
সাহজি। পুত্র ! তােমার এই ঔদ্ধত্যের জন্য তোমার
পিতাই বিপন্ন হবে
শিবাজী। পিতা! ভারতবর্ষের গতক, শতাব্দীর ইতিহাসের
পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখুন, একটা ধ্বংসের ইতিহাস ভিন্ন আর কিছুই
চোখে পড়বে না।—ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, প্রাচীন কীর্তি,
গুরু রামদাস অনন্ত জ্ঞান, অতীত গৌরব সব আজ ইস্লামের ক্রোধাগ্নিতে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে।-তীর্থে দেব মন্দির গুলি ধূলায় গড়াচ্ছে, দেবতার পীঠ স্থান মােগল পাঠানের পদ ধূলিতে আছন্ন । দেশের এই দুর্দশা দেখে বুক আমার ফেটে যেতে চাইছে। এস বাবা, যারা হিন্দু- ধৰ্ম্ম দেবতাকে পদদলিত কর্তে দ্বিধা করে না, তাদের উচ্ছিষ্ট ত্যাগ করে, চল দেশের সেবায় নিজেকে সঁপে দিই। কয় দিনের সংসার? কয়দিনের সুখ স্পৃহা বাবা? এই প্রাসাদ তুল্য অট্টালিকা একদিন ছেড়ে যেতে হবে, এই সুপুষ্ট সুঠাম শরীরকে একদিন ভস্ম করে দিতে হবে- সাহজি। শিবাজি! তােমার প্রাণে একি প্রেরণা এসেছে? শিবাজী। পিতা! গভীর নিশায় যখন নিখিল বিশ্ব সুপ্তির মাঝে ডুবে যায়, তােমার পুত্র ব্যাকুল বক্ষে তন্দ্রা বিহীন চোখে সারানিশি জেগে থাকে, তার জীবনের শান্তি চোখের নিদ্রাকে হরণ করেছে জান ?—জননী জন্মভূমি !-দীনা, হৃত-সৰ্বস্বা বিস্ত বসনা, লুলিত কুন্তলা, ধূলায় লুষ্ঠীতা! মায়ের এই বিষাদ মলিন বিশীর্ণ মূর্তি তার শীর্ণ হাতখানি তুলে রাত্রি দিন আমায় যেন ডাকছে- সাহজি। একি ? পুত্র ! শিবাজী। কি বাবা? সাহজি। একি অপূর্ব দৃশ্য?
গুরু রামদাস
শিবাজী। কি দৃশ্য বাবা?
সাহজি। তােমার মুখে একি জ্যেতি? এমন ত কখন
দেখিনি? কি উজ্জল, কি তীব্র চোখ দুটি ? পুত্র! পুত্র।
শিবাজি আমার
শিবাজী। আমায় আশীর্বাদ করুন পিতা। মাতা, পিতার
আশীৰ্বাদ দুর্ভেদ্য কবচের মত সন্তানকে শত বিপদ হতে রক্ষা
সাহজি। আশীৰ্বাদ করি পুত্র ? তােমার মনােবা পূর্ণ
হৌক। তােমাহতে মহারাষ্ট্রের, গৌরব, এই ভারতের গৌরব
বর্ধিত হৌক। অথৰ্ব্ব দুৰ্বল আমি, আমার দিন চলে গেছে
বংস ? কিন্তু আমার এই স্থবির বক্ষে, এই শিথিল শরীর মধ্যে
একি স্পন্দন জাগালে পুত্র? একি আনন? একি উৎসাহ ?-
শিবাজী। পিতা আমার সভক্তি প্রণাম গ্রহণ করুন।
আপনার আশীর্বাদ পেয়ে আজ ধন্য আমি, কৃতার্থ আমি।
সাহজি। মা ভবানী তােমার মঙ্গল করুন।
অষ্টম
দৃশ্য।
স্থান-পথ। কাল-প্রভাত।
মুক্ত অসি হস্তে মাওলী সৈন্যগণও মুন্না গাইতে গাইতে কুচ,
করিয়া যাইতেছিল। দূরে দাঁড়াইয়া রঘুপতি পলকহীন চোখে
চাহিয়া আছে-
৩২
গুরু রামদাস
গীত
ঐ বাজে ভেরী আসে মহা আহ্বান,
মরণের ডাকে কে দিবিরে সাড়া ?
রক্ত করিবি দান ?
আজি আগুন লেগেছে তুষারে,
গলিছে পাষাণ শত ধারে,
শােন, শােন, শােন মত্ত আরাবে
রুদ্র বীণায় উঠেছে তান।
ঐ বাজে ভেরী আসে মহা আহ্বান,
মরণে বরিয়া বাচিবি যে জন
আয় আয় ঢালিগে পরাণ ।
টুটে’ দিয়ে সব হীন দৈন্য,
সার্থক করি মাতৃস্তন্য,
মােরা নইরে দীন, নই নগন্ত
কেন সহি এত অপমান।
[ মুন্নাও সৈন্যগণের প্রস্থান ]
রঘু। যাও বীরগণ ! বিজয়ী হয়ে ফিরে এস। মা ভবানী
তােমাদের মঙ্গল করুন। আনন্দে, গৰ্ব্বে, উৎসাহে প্রাণ আমার
নেচে উঠছে! আমার এই শীর্ণ শরীর এই শুষ্ক প্রাণ একট।
অপূৰ্ব উন্মাদনায় যেন তরুণ হয়ে উঠছে ! মুন্না যখন সপাদপে,
গুরু রামদাস বুক ফুলিয়ে তরবারি ঘুরিয়ে আমার পানে চেয়ে হেসে হেসে চলে গেল, আমার এই লােল বক্ষখানি গর্বে স্ফীত হয়ে উঠল। যাও বৎস, দেশের কাজে জীবন উৎসর্গ করে জনম সফল করগে। যাই তাদের বিজয় যাত্রা দেখিগে। [প্রস্থান] নবম দৃশ্য। স্থান—সভাগৃহ। কাল—মধ্যাহ্ব। শিবাজী, ভানাজি ও সভাসদগণ। শিবাজী। আজ বড় আনন্দের দিন তানাজি । তানাজি। কল্যাণপূর আজ মহারাষ্ট্রের পদানত ; আনন্দের দিন বইকি। শিবাজী। আমার আনন্দ সে জন্যে নয় তানাজি,-আনন্দ আমার মহারাষ্ট্র শক্তির বিকাশ দেখে।—মহারাষ্ট্রের নিরীহকৃষক- গণ, মহারাষ্ট্রের ঐশ্বৰ্য্য গর্বিত বিলাসী সন্তানগণ আজ এক মহা সন্ধিতে মিলিত হয়ে এক লক্ষ্যে, এক প্রাণে ছুটেছে ! কল্যাণের যুদ্ধে তাদের অম্লান মুখ, অপূৰ্ব শোৰ্য অতুল স্বদেশ ভক্তি সর্বোপরি প্রাণ দেওয়ার জন্য একটা উৎকট উন্মদনা আমার চোখের উপর একটা বিরাট চিত্র ফুটিয়ে তুলছে, এই চিত্রখানি এত বিরাট যে সহাদ্রির পৰ্বত করে তার স্থান হচ্ছেনা, ৩৪
গুরু রামদাস
বিশাল দাক্ষিণাত্যের সীমা অতিক্রম করে ভারতব্যাপি ছড়িয়ে
যেতে চাইছে।
[ ধান্য দুৰ্বা হস্তে ব্রাহ্মণগণের প্রবেশ ]
ব্রাহ্মণগণ। ওঁ স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধ শ্রবাঃ
স্বস্তি নঃ পুষা বিশ্ব বেদাঃ ।
স্বস্তি নস্তাক্ষ্যো অরিষ্ট নেমিঃ
স্বস্তি নাে বৃহস্পতির্দধাতু।
ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি ওঁ স্বস্তি।
[ শিবাজীর মস্তকে আশীৰ্বাদ দান ]
জনৈক ব্রাহ্মণ। তােমায় আশীৰ্বাদ ও সম্বৰ্ধনা কৰ্তে এলাম
শিবজি।
শিবাজী। আপনারা আমার প্রণাম গ্রহণ করুন ; আমার
পরম সৌভাগ্য। আপনাদের আশীৰ্বাদ পেয়ে কৃতার্থ আমি।
জনৈক ব্রাহ্মণ। সৌভাগ্য ভােমার নয় শিবাজি ? সৌভাগ্য
এই ভারতের যে তুমি দেব, ধৰ্ম্ম, দেশ, রক্ষার জন্য খঙ্গ
'তুলেছ।
[ মৌলনা আহাম্মদকে বন্দী করিয়া সেনাপতি
আবাজি ও রক্ষীগণের প্রবেশ ]
আবাজি। মহারাজ! আপনার চিরদাস আজ আপনার
আদেশ পালন কৰ্ত্তে পেরে নিজেকে ধন্য মনে কচ্ছে। আজ
গুরু রামদাস
কল্যাণপুরের দুর্গ প্রাকারে মহারাষ্ট্রের বিজয় কেতন সগর্বে
আন্দোলিত হচ্ছে ; কল্যাণপুরের অধিপতি এই মৌলানা
আহাম্মদ মহারাষ্ট্রের বিজয় পতাকা মূলে বন্দী, কল্যাণপুরের
মণি, রত্নে আজ মহারাষ্ট্র ভাণ্ডার পূর্ণ
শিবাজী। ধন্য সেনাপতি! তােমার অপূৰ্ব শৌর্য আজ
ভারতলক্ষ্মীর ললাটের স্লানিমা মুছে দিয়ে ললাটকে উজ্জ্বল
কিরণে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। আশীৰ্বাদ করি বিজয় বিধায়িণী
মা ভবাণীর কৃপা লাভ কর। আবাজি।
আবাজি। মহারাজ !
শিবাজী। একখানা শিবিকা এদিকে আসছে না?
আবাজি। হাঁ প্রভু।
শিবাজী।
ও কার শিবিকা ?
আবাজি। আপনার ভােগের জন্য একটা অপূৰ্ব্ব সামগ্রী
সংগ্রহ করেছি।
শিবাজী। কি সামগ্রী ?
আবাজি। অপূৰ্ব্ব, অপূৰ্ব্ব, বসােনার প্রস্ফুটিত গােলাপ !-
এই মৌলানা আহাম্মদের পুত্রবধু।
আহাম্মদ। কাফের, কাফের, শয়তান, আমার বধ কর ।
আমি তােদর বিচার চাই না, আমায় বধ কর, আমি
তােদের দয়া চাইনা, তােদের তরবারে আমার শির উড়িয়ে
গুরু রামদাস
দে। কৈ? শয়তানের দল, এখনাে আমায় বধ কলি না? তবে
এই লৌহ শৃঙ্খল মাথায় মেরে মস্তক আমার চূর্ণ করে ফেলব।
শিবাজী। শৃঙ্খল মুক্ত কর।
[ রক্ষীগণ শৃঙ্খল খুলিতে লাগিল ]
আবাজি। ওরে, শিবিকা এইখানে নিয়ে আয়।
শিবাজী। না, না, ঐখানেই থাক। হাঁ ঐ খানেই রাখ।
আবাজি। শিবিকা হ'তে বেরিয়ে আসতে বল।
আহাম্মদ। এখনাে আমায় বধ কলিনা কাফের, দুষমন্
শয়তান
শিবাজী। এ কি ? এ কি? একি অপরূপ রূপের
সমারােহ ? শত শশধরের শারদ লাবণ্য, শত শত শতদলের
রক্তিম আভা অঙ্গে অঙ্গে উদ্ভাসিত ! একি রূপ ? একি ?
একি ভূবন মনমােহিণী মাধুরী ? মা! মা! এত রূপ কোথায়
পেলি মা ? তাের ঐ অতুল রূপের মধ্যে আমি আমার সেই
রূপসী মায়ের ছায়া দেখছি!-“তপ্তকাঞ্চণ বর্ণাভাং সূপ্রতিষ্টাং
সুলােচনাম্ নবযৌবন সম্পন্নাং সৰ্বাভরণ ভূষিতাম্”-মা !
মা! অমনি করে দাঁড়াও মা! আমি মস্তক নত করে
একবার ঐ রূপের পূজারি। [ যুক্ত করে ]-“অশেষ
রূপ রূপন্থে জগদ্ধাত্রি নমােহস্তুতে।” যাও মা! মুক্ত তুমি !
গুরু রামদাস
মা ।
মা !
তােমায় বেঁধে রাখব এমন নিগড় আমার নাই, পূজা কৰ্ব্ব এমন
মন্দির আমার নাই।
মৌলনা আহাম্মদ !
আপনিও মুক্ত । আপনার পুত্রবধূ
আমার ঐ মাকে নিয়ে আপনি আপনার সৌভাগ্যের মাঝে,
আপনার সিংহাসনে ফিরে যান।
রূপসী মা
আমার ! তাের গর্ভে যদি জন্ম নিতে পাৰ্ত্তেম, তাের ঐ অতুল
রূপের আভা সঙ্গে আমার ছড়িয়ে পর্ত, আমি ধন্য হয়ে যেতেম।
যাও মা! সগৌরবে তােমার ঐশ্বর্যের মাঝে তুমি ফিরে যাও।
আহাম্মদ। শিবাজী! তুমি কাফের না পগম্বর, তুমি
শয়তান না স্বর্গের দুত? উদার ! মহৎ! আমায় একবার
আলিঙ্গন কর । | শিবাজীকে আলিঙ্গন করিল ]
তানাজি। সুন্দর ! সুন্দর! এই শুভ লগ্নে তােমরা হিন্দু,
মুসলমান তােমাদের সহস্ৰধা বিক্ষিপ্ত, বিভিন্নতাকে দূর করে
এক প্রাণে এক হৃদয়ে মিশে যাও। কিসের ভেদ, কিসের দ্বেষ ?
এক পৃথিবী, এক চন্দ্র-সূর্ঘ্য, এক ভগবান, এক মানবজাতি।
এমন একটা মহান সন্ধিতে যদি পৃথিবীর মানবজাতি মিশে যেতে
পাওঁ, কত হাহাকার, কত ব্যথা, ধরার বক্ষ হতে লুপ্ত হয়ে যেত।
হায় ভগবান !
[ রামদাস স্বামীর প্রবেশ ]
রাম। ওঁ রাম, ওঁ রাম, ওঁ রাম। ধন্য! ধন্য।
গুরু রামদাস
শিবাজী। এ কি ? প্রভু ? রাত্রিদিন নগরে কান্তারে
যার সন্ধানে ফিরেছি, আজ তিনি আমার দুয়ারে ? দেবতা!
প্রভু ! [ স্বর আবেগে কাপিতে লাগিল ।
রাম। বৎস! ধন্য ! ধন্য তুমি ! ধন্য তােমার জননী।
ধন্য এ দেশ যেথায় তুমি জন্ম নিয়েছ! মহানুভব জিতেন্দ্রিয়
তুমি !
আমি আকাবাইয়ের মুখে ঐ কিশােরী কন্যার আগমন
সংবাদ শুনে অস্থির হয়ে পড়েছিলেম, তাই ছুটে এসেছি, এসে,
আড়ালে দাড়িয়ে তােমার মহিমা দেখে ধন্য হলেম ।
শিবাজী। যদি দয়া করে দাসকে দেখা দিয়েছেন, আর
চরণ ছাড়া কৰ্ব্বেন না।
রাম। একটা উন্নত, মহৎপ্রাণ খুঁজবার জন্য আমি সারা
ভারতবর্য ঘুরেছি। আজ আমার শ্রম সার্থক। এস শিবাজী,
আজ গুরু শিষ্য মিলে এই ভারতবর্ষে আবার ধর্মরাজ্য স্থাপনের
সুচনা করি। তােমরা ভারতের সমস্ত হিন্দুমুসলমান এই মহৎ
কাজের স্বহায় হও। যে অত্যাচারী তার বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে
দাড়াও, পরকে নিরর্থক পীড়া দিতে যার বক্ষ কম্পিত হয় না,
তার মস্তক লক্ষ্য করে খড় তোেল। হোক সে শক্তিমান পুরুষ,
তােমাদের মিলিত অভিশাপে তাকে লুটিয়ে দাও। জয় ধৰ্ম্মের
জয়।
সকলে । জয় ধর্মের জয়।
দ্বিতীয়
অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
স্থান-শিবির-কক্ষ। কাল-প্রভাত।
রাজা জয়সিংহ ও জনৈক মােগল সেনানী।
জয়সিংহ। অপূৰ্ব্ব শৌর্য্য এই শিবাজীর, অপূৰ্ব্ব সাহস এই
মহারাষ্ট্র জাতির! আমি আনন্দে, বিস্ময়ে অবিভূত হয়ে পড়েছি।
সেনানী। হওয়ার কথা বটে।
জয়সিংহ। দাক্ষিণাত্যের মুসলমান সাম্রাজ্য কি শক্তির
সংঘাতে এত দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কি শক্তির সম্মুখে এসে
মােগলের বিজয়ী সেনানীগণ মস্তক নত করে বিফলে ফিরে গেল
আজ তা সম্পূর্ণ বুঝতে পেরেছি। দিল্লীর শক্তিমান সম্রাটের
বিশ্ববিজয়ী সৈন্য নিয়ে আমি অনাহত বেগে হিমাচল অবধি
ভারতের প্রায় সর্বস্থানে মােগলের বিজয় পতাকা চালিয়ে
নিয়েছি, আমার সেই গতি বাধা পেলে এই সহাদ্রির সানুদেশে
এসে।
সেনানী। কিন্তু মহারাজ! এবার আমরা যুদ্ধে সম্পূর্ণ
জয়ী হয়েছি। আজ শিবাজীর সুরক্ষিত অনেক দুর্গ আমাদের
হস্তগত।
৪e
গুরু রামদাস
;
জয়সিংহ। যুদ্ধে জয়ী হয়েছি বটে, একটা বিপুল বাহিনী
নিয়ে এই মুষ্টিমেয় মারাঠাগণকে দলিত মথিত করেছি সত্য ;
কিন্তু শিবাজীর শৌর্য আমার সমস্ত বিজয় গৌরবকে ম্লান করে
দেছে। ক্ষুদ্র একটা তড়াগের বুকের উপর দিয়ে প্রবল বন্যার
জলোচ্ছাসের মত লক্ষ লক্ষ সৈন্য নিয়ে এই ক্ষুদ্র মারাঠা জাতির
উপর আপতিত হয়েছি, তাদের দলিত করেছি। কিন্তু একি
যুদ্ধ জয়?
{ শিবাজীর প্রবেশ }
শিবাজী। জয় বই কি! এমন লক্ষ লক্ষ সৈন্য নিয়ে শায়েস্থা
খ। প্রমূখ মােগল সেনানীগণ এই মারাঠা দেশ হতে পরাজয়ের
অপমান ঘাড়ে নিয়ে নত শিরে ফিরে গেছে। হে ভারতগৌরব
মহারাজ জয়সিংহ আপনি আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।
জয়সিংহ। কে ? ভারতের উজ্জ্বল আশা শূরশ্রেষ্ঠ শিবাজী!
বৰ্ত্তমান ভারতের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলে আমি আপনাকে সম্বর্ধনা
কচ্ছি, আমার সাদর সম্ভাষণ গ্রহণ করুন।
শিবাজী। আপনার আজ্ঞাবহ দাসকে কি আজ্ঞা পালনের
জন্য আজ আবান করেছেন ?
জয়সিংহ। বিনয়ী বটে। আপনার সৌজন্যে মুগ্ধ হলেম।
মনে কাম,-করাল কৃতান্তের মত তার মুর্তি যা’কে দিল্লীতে
পার্বত্য দশবলে অভিহিত কচ্ছে। কিন্তু দেখছি ভগবান যার
৪১
গুরু রামদাস
ললাটে রাজটীকা লিখেছেন তঁাকে সৰ্বগুণে মণ্ডিত করে
দেছেন।
শিবাজী! এ দাসকে যে আপনি মেহের চক্ষে দেখেন তা
দানের অবিদিত নাই। তাই মহারাজের আজ্ঞা পেয়ে কোন
যুক্তি তর্কের ভিতর না যেয়ে মহারাজের সান্নিধ্যে ছুটে এসেছি।
দাসকে আদেশ করুন।
জয়সিংহ। শিবাজি ! আপনার শক্তির উপরই আৰ্য্যধৰ্ম্ম,
আৰ্য গৌরব পুনরুত্থানের আশা নির্ভর করে। মেবার, মারা
বারের শিশুর ইসলামের অসির আঘাতে নত হয়ে গেছে, একমাত্র
মারাঠা শিবাজীর পাণে আজ সমস্ত হিন্দুস্থান মাথা উচু করে
চেয়ে আছে। আমার একান্ত অনুরােধ এই নব বিকাশিত
শক্তিকে এমন ভাবে ক্ষয় হতে দেবেন না। মােগলের দাস
হয়েছি, তাদের অনুগ্রহে সুখ সম্পদ ভােগ কচ্ছি না বলে মিথ্যা
কথা বলা হয়। কিন্তু যখন অতীতের কথা ভাবি, যখন পৃথীরাজ
প্রতাপের কথা স্মৃতির মাঝে উদয় হয়, ক্ষোভে ঘৃণায়, ব্যথায় বুক
কেটে যেতে চায় ; নিজেকে শতবার ধিক্কার দিই। কত শত
শতাব্দির গৌরবকে নষ্ট করে দিইছি। তাই যখন এই নষ্ট গৌরবকে
কেউ উদ্ধার কৰ্ত্তে উদ্যত হয় শ্রদ্ধা, ভক্তির অর্ঘ্য দিয়ে তার কল্যাণ
কামনা করি। স্বেচ্ছায় আপনাকে ডেকে অনুরােধ কচ্ছি।
আপনি শক্তি সম্পূর্ণ সঞ্চয় কৰ্বার পূর্বে তার অপব্যয় কৰ্ব্বেন না।
৪২
গুরু রামদাস
শিবাজী। কি কৰ্ব অনুমতি করুন।
জয়সিংহ। এমন ধ্বংসকারী যুদ্ধে না মেতে আপনি সন্ধি,
করুন।
শিবাজী। কি সৰ্ত্তে
জয়সিংহ। সৰ্ত্ত এই যে, আমরা দিল্লীর সম্রাটের পক্ষে যে
সব দুর্গ জয় করছি, সেগুলাে দিল্লীর সম্রাটকে ছেড়ে দিন, বাকী
গুলাে আপনি নিরাপদে ভােগ করুন। সম্রাটের সঙ্গে সৌহার্দ্য
স্থাপন করুন। ভবিষ্যতে সম্রাট কখনাে আপনার রাজ্য আক্রমণ
কৰ্ব্বেন না।
শিবাজী। মহারাজ, ধৃষ্টতা মার্জনা কৰ্কেন।
বােধ হয়
আপনি ভুলে যাচ্ছেন, বর্তমান দিল্লীর সম্রাট আওরঙ্গজেব।
জয়সিংহ।
শিবাজী বােধ হয় জানেন না যে মহারাজ
যশােবন্ত সিংহও জয়সিংহের বাহুবলের উপরই আওরঙ্গজেবের
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত।
শিবাজী। তা’ দাসের অবিদিত নাই।
কিন্তু শুছি
আওরঙ্গজেব, উপকারীর নিকট কখনাে কৃতজ্ঞ থাকেন না।
জয়সিংহ। তাহৌক। সম্রাট আওরঙ্গজেবের এমন সাহস
নেই যে, যে সন্ধি সাম্রাজ্যের মঙ্গলদায়ক মনে করে জয়সিংহ
করেছেন তা লঘন করেন।
শিবাজী। ভাল। এই সন্ধিতে আমি স্বীকৃত আছি।
৪৩
জয়সিংহ। আপনার দূরদর্শিতা ও ব্যবহারে সত্যই আমি
আনন্দিত হলেম। আপনি সত্ত্বর দিল্লী চলে যান, আমি দু’পাঁচ
দিনের মধ্যে আপনার অনুগমন কৰ্ব্ব।
শিবাজী। দিল্লী যেতে হবে ? এই আদেশ কেন মহারাজ ?
জয়সিংহ।
এ অনুরােধ এই জন্য কচ্ছি,-সম্রাটের সঙ্গে
আপনার দেখা হলে, উভয়ের মধ্যে যে বিদ্বেষটুকু বর্ধিত হচ্ছে
তা দূর হবে।
শিবাজী। মহারাজের আজ্ঞা অবহেলা করা অন্যায়। কিন্তু
আমার অন্তরের কথা এই যে আমি আওরঙ্গজেবকে বিশ্বাস করি
। যার হস্ত ভ্রাতৃরক্তে কলঙ্কিত তাকে কি করে বিশ্বাস
করি ?
জয়সিংহ। তা আমি জানি। কিন্তু আপনার কোন
আশঙ্কার কারণ নেই। জীবন বিপন্ন হবে মনে কচ্ছেন?-তার
জন্য আমি প্রতিভূ রইলেম। ঈশ্বর না করুন, যদি তেমন কোন
অমঙ্গল ঘটনা সূচিত হয়, জানবেন শিবাজি! জয়সিংহের
মৰ্ম্মবিদারী অভিশাপের উষ্ণ নিশ্বাসে ভারতব্যাপী এমন আগুণ
কালে উঠবে যাতে মােগল সাম্রাজ্য পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে।
শিবাজী। মহারাজের এই প্রস্তাবেও স্বীকৃত হলেম।
জিয়সিংহ। আমার সম্মান রক্ষা করে আমায় সুখী কলেন।
বেলা অনেক হল আর আপনাকে কষ্ট দেব না। আমায় আলিঙ্গন
৪৪
গুরু রামদাস
দিউন। আজ হতে আমাকে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু বলে মনে
রাখবেন। [ শিবাজীকে আলিঙ্গন ]
শিবাজী। এ দাসের সৌভাগ্য। যাই, আমার নমস্কার
গ্রহণ করুন।
জয়সিংহ। আসুন।
[ শিবাজীর হস্তধারণ করিয়া দরজা পর্যন্ত অনুগমন
করিলেন।
দ্বিতীয় দৃশ্য
স্থান—পঞ্চবটী। কাল—অপরাহু।
রামদাস স্বামী।
রামদাস। পঞ্চবটী যেন আমায় তার সর্বাঙ্গ দিয়ে জড়িয়ে
রেখেছে। এই পুণ্য তীর্থে, আমার জীবনের এক নবীন উষা-
লােকে আমার আরাধ্য দেবতা আমায় দেখা দিয়েছিলেন।
আমার জীবনের সে কি শুভ দিন! যেখানেই ছুটে যাই এই
পঞ্চবটীর আকর্ষণ আমি কিছুতেই ছাড়াতে পারি না। এর
শ্যাম সৌন্দর্য্যে আমার সেই অতীন্দ্রিয় সুন্দর পুরুষের রূপের আভা
দেখতে পাই।
[ সেক মহম্মদের প্রবেশ ]
রামদাস। কে ? মহম্মদ ?
৪৫
গুরু রামদাস
মহম্মদ। হাঁ জনাব !
রামদাস। হঠাৎ এইখানে ?
মহম্মদ। আপনাকে খুজতে।
রাম।
কেন ?
মহম্মদ। আমার একটা আরজ আছে।
রামদাস। কি আরজ,?
মহম্মদ। আরজ এই যে আমি হিন্দুদের দরজায়, দরজায়
ফিরেছি, কেউ আমায় ঠাঁই দেয় না, অপরাধ আমার,-আমি
যবন।
রামদাস। তার জন্য দুঃখ কর না মহম্মদ ! তারা ঠাই
না দিক, আমি ত তােমায় স্থান দিয়েছি।
মহম্মদ। তারা দেবে না কেন? এই কি উদার হিন্দুধর্ম ?
আপনি বলেন হিন্দুধর্মের মূল কথা সৰ্ব্বভূতে নারায়ণ দর্শন।
এই কি তাই।
রামদাস। ধর্মের নিগুঢ় মৰ্ম্ম যাহাই হৌক ; মানুষ দোষ
দুর্বলতার মধ্যে দিয়েই নিজের জীবন গঠিত করে তুলেছে।
হিন্দুরা যদি আজ যবন বলে কাকেও ঘৃণার চোখে দেখে থাকে
সে হিন্দুদের একার দোষ নহে মহম্মদ! তােমাদের জাতির
পূর্ব পুরুষ মহম্মদ বীন কাসেম যে দিন প্রথম ভারতবর্ষে পদার্পণ
করেন সে দিন হতেই ভারতের উপর দিয়ে একটা প্রলয় বয়ে
৪৬
গুরু রামদাস যাচ্ছে। সেই প্রলয় লীলার প্রথম আঘাত কোটি কোটি হিন্দুর পূজিত, শত শতাব্দির স্মৃতি চর্চিত সােমনাথের মস্তকের উপর পতিত হয়। সেই যে আরম্ভ তার এখনাে শেষ হয় নি। চেয়ে দেখ মহম্মদ, হিন্দুর কীর্তি, হিন্দুর ধর্ম, হিন্দুর দেবতা প্রত্যহ লাঞ্ছিত হচ্ছে। যে হিন্দুগণ ফুণ, শক পল্লভকে ঠাঁই দিয়ে আপন করে নিয়েছে আজ তারা নিতান্ত মৰ্ম্মবেদনায় মুসলমানকে প্রত্যাখ্যান কচ্ছে। মহম্মদ মজিদের আজান ধ্বনি মন্দিরের মন্ত্রপাঠ কি একই পরমেশ্বরের উদ্দেশ্যে উদীরিত হয় না; মহম্মদ, তােমার মন পবিত্র, তােমার দেহ পবিত্র, তুমি হিন্দুও নও, যবন ও নও, তুমি মুক্ত পুরুষ । ভগবান তােমাকে দুহাত বাড়িয়ে কোলে নেবেন, তােমার ঠাঁইয়ের অভাব কি? মহম্মদ। বান্দা নিজের ঠাইয়ের জন্য হুজুরের কাছে আরজ কৰ্তে আসিনি, এসেছিলাম মুসলমানদের উপর হিন্দুদের যে বিদ্বেষ জন্মাচ্ছে তা দূর কব্বার জন্য। রামদাস। মহম্মদ, শুধু তুচ্ছ কারণে এত বড় একটা জাতির মন বিগড়ে যেতে পারে না। যে হিন্দুগণ একদিন দিল্লীর উদার সম্রাট আকবরশাকে—“দিল্লীশ্বর ও বা জগদীশ্বর বলে সম্বর্ধনা করেছে আজ তারা কত অত্যাচারে লাঞ্ছিত হয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেবের পানে রক্তচক্ষু তুলে চাইছে ত’ কি বুঝতে পাচ্ছ না?
গুরু রামদাস
মহম্মদ। বুঝতে পেরেছি জনাব। আমার আর কোন
ক্ষোভ নেই। আজ হতে আমি মুসলমানদের দুয়ারে দুয়ারে
ফিরব, দেখি এই দু’টি জাতিকে এক কর্তে পারি কি না।
রামদাস।
তােমার অভিলাষ পূর্ণহৌক।
মহম্মদ। যাই, আমার আদাব গ্রহণ করুন। বন্দেগি ।
[ প্রস্থান ।
রামদাস। সাধুপুরুষ এই সেক মহম্মদ। হরিনামে পাগল
হয়ে ওঠে। বিটোবা দেবের এমন ভক্ত সেবক হিন্দুদের মধ্যেও
দু’জন মিলে না।
[ দত্ত্বর প্রবেশ ]
দ। পদ্ম ফুল কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না প্রভু।
রামদাস। বংস দত্ত ! আবার খুজে দেখ, যেমন করে
হৌক, আমার জন্য দু’টি কমল নিয়ে এস, আমি কমল আঁখির
উদ্দেশে নিবেদন করি।
দ। যাই, প্রভু।
[ প্রস্থান ]
রামদাস। দস্তু হীন বংশে জন্মেছে বটে, কিন্তু তার হৃদয়
মধ্যে যে অনাবিল ভগবদ্ভক্তি রয়েছে তা অতুলনীয়। ব্রাহ্মণ,
ক্ষত্রিয় ! তােমরা উচ্চ বংশে জন্মেছ বলে স্পর্ধাকর, কিন্তু
আমি স্পর্ধা করে বলতে পারি এই নীচ বংশােদ্ভব দত্তর মহৎ
প্রাণের কাছে তােমাকে নিশ্চয় পরাজয় স্বীকার কৰ্ত্তে হবে।
৪
[ কল্যাণের প্রবেশ ]
রামদাস। সংবাদ কি কল্যাণ ?
কল্যাণ। সংবাদ তেমন শুভ নয়।
রামদাস। শুভ নয়? আমার শিবাজীর কি কোন অমঙ্গল
ঘটেছে ?
';
কল্যাণ। অমঙ্গল ঘটেনি। তবে তার সূচনা হয়েছে।
রামদাস। কি রকম?
কল্যাণ। সায়েস্থাখার শশাচনীয় পরাজয়ের প্রতিশােধ
নেবার জন্য সম্রাট আওরঙ্গজের শিবাজীর বিরুদ্ধে এক বিরাট
বাহিনী সহ অম্বরাধিপতি জয়সিংহকে পাঠিয়েছেন।
রামদাস। তা জানি কল্যাণ
কল্যাণ। জয়সিংহ মহারাষ্ট্র শক্তিকে বিদ্ধস্ত করে তুলেছেন।
অনেকগুলি দুর্গ মােগলের অধিকারে গেছে।
রামদাস। যাবে না ? হিন্দু, হিন্দুধর্ম ও দেবতার বিঘ্নকারী
আওরঙ্গজেব বাদসার হিতের জন্য হিন্দুর মস্তক লক্ষ্য করে
তরবার তুলেছে, দেবতার অভিশাপ আসবে না,-হিন্দু রাজ্য
কি করে গড়ে উঠবে ?
কল্যাণ। শিবাজী নানা দিক চিন্তা করে জয়সিংহের সঙ্গে
সন্ধি করেছেন। সন্ধির সর্তানুসারে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ
কৰ্বার উদ্দেশে তিনি দিল্লী যাত্রা করেছেন। তাই মাতা
৪১
৪
জিজাবাই উৎকন্তীত হয়ে আপনার শ্রীচরণ দর্শন প্রার্থনা
জানিয়েছেন।
রামদাস। কল্যাণ, তােমরা আমার শিষ সেবক সকলে
ছদ্মবেশে শিবাজীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটে যাও। সাবধান আমার
শিবাজীর যেন কোন অকল্যাণ না হয়।
কল্যাণ। যে আজ্ঞে প্রভু।
রাম। ও রাম, ওঁ রাম, ওঁ রাম, মঙ্গল হোক, মঙ্গল হোক।
হে স্বর্ণ লঙ্কা বিজয়ী সূৰ্য্যবংশের উজ্জল বিবস্বান! ভারতের
এই অন্ধযুগ অপসারি তােমার তেজোবিভা উদ্ভাসিত করে
তােল! ও রাম, ওঁ রাম, ও রাম।
তৃতীয়
দৃশ্য।
স্থান-পথ। দিল্লী। কাল-সন্ধ্যা ।
প্রদীপ হন্তে শিবাজী, রামসিংহ ও তানাজী।
রামসিংহ। ঐ উচ্চ ভূমির উপর, ঐণ যে গুম্বজ দেখছেন
এইটিই দিল্লীর প্রসিদ্ধ পীরের সমাধি মন্দির, ঐ খানেই দীপ দান
শিবাজী। রাজকুমার রামসিংহ। আপনি হয়ত আশ্চৰ্য্য
হচ্ছেন, আমি হিন্দু হয়ে কেন মুসলমান পীরের সমাধি মন্দিরে
প্রদীপ জ্বালিয়ে দিচ্ছি, হয়ত মনে কচ্ছেন, মুসলমানের রাজধানীতে
এসে তাদের মন রাখবার জন্য একটা রঙ্গ দেখাচ্ছি।
রামসিংহ। সত্যই আমি কিছু আশ্চর্য হয়েছি। আমার
ধারণা, এই ভারতবর্ষে বর্তমানে কেউ যদি মুসলমান বিদেষ্টা
থাকেন, তিনি মহারাজ শিবাজী।
শিবাজী। তাহলে শিবাজী সম্পর্কে কুমার একটা ভুল
ধারণা পােষন করে আসছেন। শিবাজী বীরের উপাসক।
যেখানে মহৎপ্রাণ দেখে হিন্দু, মুসলমান ভেদ না করে জাতিবর্ণ
বিচার না করে শিবাজী মন্তক নত করে। একটু অপেক্ষা
করুন। দীপটা দিয়ে আসি।
[ প্রস্থান
রামসিংহ। সেনাপতি তানাজী! এতদিন পরে বুঝতে
পারুলেম পিতা কেন যেচে এই তেজৰী শূরের সঙ্গে সৌহার্দ্য
স্থাপন করেছেন।
তানাজি। যিনি সম্মান ভাজন তিনি মানীর মানকে
কখনাে তাচ্ছল্য করেন না।
[ শিবাজীর প্রবেশ ]
শিবাজী। সত্য কুমার সমাধি মন্দিরের সম্মুখে যেতেই
সৰ্বাঙ্গ আমার শিহরে উঠল।
তানাজি। দেখুন কুমার ? সন্ধ্যার স্নান আলােকে কুতুব
মিনারকে একটা প্রকাণ্ড দৈত্যের মত দেখাচ্ছে।
রামসিংহ। হিন্দুর দুর্ভাগ্য-হিন্দু সম্রাট পৃথ্বীরাজের এই
গগনস্পর্ধী অতল কীৰ্ত্তি স্তম্ভ আজ মুসলমান সম্রাট মহাবুদ্দিন
মহাম্মদ ঘােরর সেনাপতি কুতুবুদ্দিনের নামে খ্যাত
হচ্ছে!
তানাজি। কুতুবুদ্দিনও ত সম্রাট হয়ে ছিলেন।
রামসিংহ। হৌন সম্রাট কিন্তু তিনি যে একজন ক্রীতদাস
সে নাম কিছুতেই ঘুচাতে পারেন নি।তার বংশ দাসবংশ
নামেই খ্যাত।
শিবাজী। সম্রাটের শক্তি যার মধ্যে বৰ্ত্তনীম তাকে কি
ক্রীতদাস বলে অবজ্ঞা করা সমীচীন? শ্রীরামচন্দ্র চণ্ডাল গুহকের
সঙ্গে মিতালী করেছিলেন, এভগবান ভৃগু পদচিঃ বুক পেতে
নিয়েছেন, কুমার! মনুষ্যত্বের পূজা কর্তে ভগবান কখনাে দ্বিধা
করেন না, মানুষ কেন তাতে নানা বাধা সৃষ্টি করে পরাজুখ
হয় ?
রামসিংহ। শিবাজী মহারাজ, আপনার সঙ্গে যতই আলাপ
হচ্ছে আপনার উদার হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে ততই
মুগ্ধ
হচ্ছি।
শিবাজী। সম্মুখে, এ. যে প্রকাণ্ড মসজিদ দেখছি, ওটা
কোন মসজিদ ?
রামসিংহ। হতভাগ্য সম্রাট সাজাহানের কীর্তি জামা-মজিদ।
লক্ষ আরফি ব্যয়ে ছয় হাজার লােক ছয় বৎসরে এই
মসজিদের গঠন সম্পূর্ণ করে ।
শিবাজী। সুন্দর মসজিদ। চলুন মসজিদটা ভাল করে
দেখে আসি। তানাজি পাদুকা খুলে ফেল।
রামসিংহ। পাদুকা খুলতে হবে কেন?
শিবাজী। দেবালয়ে যাচ্ছি, পাদুকা খুলতে হবে না।
রামসিংহ। এই কি দেবালয়।
শিবাজী। হাঁ। এ ত দেবালয়। হিন্দু ও মুসলমানের কি ।
একই পরমেশ্বর নহে কুমার ?
রামসিংহ। বিস্ময়ে আমার অভিভূত করে তুল্লেন। এই
কি সেই যা’কে দিল্লীর সকলে শঠ, কপট পরস্পাপহারী পরদ্রোহী
পার্বত্য দ্য বলে ঘৃণা কৰ্ত্ত ?
[ রহিমের প্রবেশ }
রহিম। { কুণিশ করিয়া সংবাদ সত্য কুমার বাহাদুর।
সম্রাট সাজিহানের মৃত্যু হয়েছে। সম্রাট আওরঙ্গজেব আগ্রায়
চলে গেছেন।
রামসিংহ। শিবাজী মহারাজ! তবে আমাদের আগ্রায়
যেতে হবে। এইখানে আসা ব্যর্থ হল। এই সংবাদ আমি পথে
শুনেছিলাম। দিল্লীর প্রায় সকল সংবাদই রহস্য জালে আবৃত
গুরু রামদাস
বলে রহিমকে সঠিক সংবাদ জানাবার জন্য পাঠিয়েছিলাম।
চলুন, আমরা কালই রওনা হই।
শিবাজী। এতদূর এলাম যখন যােগমায়া দেবীর শ্রীচরণটা
একবার দেখে যাব। মায়ের মন্দির এখান থেকে কতদূর?
রামসিংহ। বেশী দূর নয়। তাই হবে। চলুন।
[ সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থান-যমুনা তীর। কাল-সন্ধ্যা
গাইতে গাইতে কল্যাণের প্রবেশ
গীত
বঁশী ত বাজে না,
কেন বহিছ যমুনা
আবেগ ভরে ?
নাহি প্রাণ ধন,
আকুল পরাণে ডাকিছ কাহারে ?
পল্লব ঘন,
তমাল বন,
ঘিরেছে গভীর আঁধারে ?
হিয়াটি দলিয়া
আর কি আসিবে ফিরে ?
শূন্য পুলিন
সে গেছে চলিয়া
পারনি ত যমুনা ব্রাখিতে তাহারি বাঁধিয়া, কুলু কুলু করি কেন বিফলে মরিছ কঁদিয়া, ওগাে সকল বাঁধন ছিড়িয়া সে যে গাে আছে অতি সুদূরে। কল্যাণ। এই যমুনায় এলে অতীতের কত কথা মনে পড়ে। এমনি মেঘ লেশহীন নির্মল নীল আকাশ, স্তিমিত নক্ষত্ৰালােক- দীপ্ত যমুনার বক্ষে বিলােল জ্যোৎস্নার উৎসব চলেছে ; যমুনা পুলিন মুখর করে মধুর মুরলী বেজে উঠল, ধীরে ধীরে সেই কান্ত পুরুষের অচঞ্চল ছায়া যমুনার স্বচ্ছ সলিলের উপর চঞ্চল হয়ে ভাসতে লাগল, গােকুলের বুকে টক’ পড়ল, ঘরে আর কারাে মন রয় না! সেই সচ্চিদানন্দ শ্যামসুন্দরের উদ্দেশে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ছুটে এল। তাকে পেতে হলে এমনি করেই ত সব বন্ধন ‘টুটে’ দিয়ে ছুটতে হবে। হা নারায়ণ, আকিঞ্চনের আশা পূর্ণ হবে কি ? নেপথ্যেবংশীধ্বনি। তারা এসে পৌঁছেছে। আমি ও বংশীধ্বনি করে তাদের জানিয়ে দিই। [ বংশীধ্বনি ] ৫৫
[ পাঁচজন ছদ্মবেশী সন্ন্যাসীর প্রবেশ ]
কল্যাণ। তােমাদের সকলের বস্ত্র মধ্যে তরবার লুকাইত
আছে?
প্রঃ ছদ্ম। আছে।
কল্যাণ। সাবধান সকলের অলক্ষ্যে আগ্রা প্রবেশ কর।
স্বামীজির আজ্ঞা,—শিবাজীকে যেমন করে হােক উদ্ধার কর্তে
হবে। এতে হয়ত প্রাণ দিতে হবে। তার জন্য সকলে প্রস্তুত
হও।
দ্বিঃ ছদ্ম। আমরা প্রাণ দেব বলেই এসেছি।
কল্যাণ। রাত্রি হয়ে এসেছে, এই সুযােগ। অন্ধকারের
আবরণে অঙ্গ আবরিয়ে চল অগ্রসর হই। জয় গুরুদেব ।
সকলে। জয় গুরুদেব।
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান-আগ্রার প্রাসাদ কক্ষ। কালরাত্রি।
সম্রাট আওরঙ্গজেব, ইয়াকুৎ ও ওওগণ।
আওরঙ্গজেব। পার্বত্য মুষিকটাকে অত বড় প্রাসাদ
তুল্য গৃহে না রেখে একখানা ছােট্ট কুটরীতে রাখলে তার পক্ষে
শােভন হত।
প্রঃ ওমরাও। সম্রাটের মেহেরবাণী।
ইয়াকুৎ। মেহেরবাণী না শয়তানী ?
আওরঙ্গজেব। ইয়াকুৎ, তােমায় মেহেরবাণী করে বল
তােমার শয়তানী ক্রমশঃ বেড়ে যাচ্ছে।
ইয়াকুৎ।
তা হবে জাঁহাপনা ! সৎসঙ্গের ফল কিনা,
হবে না কেন?
আওরঙ্গজেব। শয়তানী কি দেখলে ইয়াকুৎ ?
ইয়াকুৎ। কিছুই দেখিনি জাঁহাপনা! শিবাজীর মত এমন
চক্ষুষ্মন লােক দেখতে পেলে না, আমরা ত অন্ধ।
আওরঙ্গজেব। শিবাজী খুব চক্ষুস্মান নাকি
ইয়াকুৎ। লােকে ত বলে।
আওরঙ্গজেব। লােকে কাণা ছেলের নাম পদ্মলােচন রাখে।
ওরাওগণ। তা’ বৈ কি-তা’ বৈ কি!-
ইয়াকুং। কিন্তু জাহাপনা ! এ ছেলেটা নেহাৎ কাণ
নয়। কাণা ছেলের নাম পদ্মলােচন রাখে তার মা বাপ আদর
করে ; কিন্তু শত্রু মিত্র সকলেই এই ছেলেটাকে চক্ষুষ্মন বলে ভয়
কচ্ছে।
আওরঙ্গজেব।
কচ্ছে নাকি।
ইয়াকুৎ। যদি ভয় না করে তবে এত কৌশলের কি
প্রয়ােজন ?
৫৭
ও রামদাস
;
আওরঙ্গজেব। কি কৌশল ইয়াকুৎ? তুমি সাবধানে কথা
কও; আওরঙ্গজেব কৌশল জানে না। সে ইসলামের সরল
ভক্ত ; যে এই ইসলামের ইজ্জৎ নষ্ট কৰ্তে উদ্যত হয়েছে তাকে
ক্ষমা করেনি; হৌক সে ভ্রাতা, হোক সে পিতা। সরলভাবে
তাদের শান্তি দিয়েছে।
ইয়াকুৎ। আমাকে না হয় ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখলেন
জনাব ! কিন্তু বাহিরের জনমতকে চোখ রাঙিয়ে চুপ করিয়ে
রাখতে পাচ্ছেন কৈ ?
আওরঙ্গজেব। জনমত কি বলছে ?
ইয়াকুৎ। জনমত এই বলছে যে সম্রাট আওরঙ্গজেব মিথ্যা
সন্ধির ছল করে শিবাজীকে বন্দী করেছেন, এবং যখন সুযােগ
পাবেন তাকে গােয়ালিয়াড় দুর্গে পাঠিয়ে দিয়ে হতভাগ্য
বাদশাজাদা মুরাদের জীবন লীলার অভিনয় দেখাবেন।
ওওগণ। চুপ, চুপ।
ইয়াকুৎ। ওওগণ ! ইয়াকুৎ দুনিয়াতে কা’কেও ভয় করে
না। সেও সরল মুসলমান, একমাত্র খােদার কাছে সে শির নত
করে। সম্রাট তার ভাড়া করা তরবারি গুলি এই দীন ফকিরের
মস্তক লক্ষ্য করে তুলতে পারেন, কিন্তু আখেরে একদিন তাকেও
যিনি দুনিয়ার মালিক, সম্রাটের সম্রাট, পাপ পুণ্যের বিচারকা
তার কাছে শির নত করে দাড়াতে হবে।
৫৮
আওরঙ্গজেব। সত্য ইয়াকুৎ সরল মুসলমান বলে আমি
তােমায় সমাদর করি।
ইয়াকুৎ। সম্রাটের মেহেরবাণী ।
আওরঙ্গজেব। ইয়াকুৎ, সত্যই কি জনমত বলছে যে আমি
শিবাজীকে হত্যা করাব ?
ইয়াকুৎ। তা” বলছে জাহাপনা।
আওরঙ্গজেব। এখন হত্যা কচ্ছি না কেন?
ইয়াকুং। কেন? কেমন করে জনাব ? হয়ত জয়সিংহ,
যশােবন্ত সিংহকে ভয় কচ্ছেন।
আওরঙ্গজেব। যিনি ভারতের শক্তিমান সম্রাট সাজাহানকে
ভয় করেন নি, যিনি দারা সেকোর বিপুলবাহিনীর সম্মুখে বুক
ফুলিয়ে দাড়িয়েছেন, কাফের জয়সিংহ, যশােবন্তসিংহকে তিনি
ভয় করেন ? ইয়াকুৎ, তােমার মাথা বিগড়ে
বিগড়ে গেছে।
আওরঙ্গজেব সরল মুসলমান ; যদি শিবাজী সম্বন্ধে ছলনা কচ্ছি
বলে জনমত হয় ; আমি তাকে কালই হত্যা করাব।
[ কুর্ণিশ করিয়া রামসিংহের প্রবেশ ]
রামসিংহ। কা’কে হত্যা করাবেন সম্রাট ?
আওরঙ্গজেব। শিবাজীকে।
রামসিংহ। সে কি ?
আওরঙ্গজেব। হাঁ রামসিংহ।
গুরু রামদাস
রামসিংহ। তবে কি সন্ধির কথা একেটা মিথ্যা ছল ?
আওরঙ্গজেব। হাঁ, মিথ্যা একটা ছল।
রামসিংহ। কিন্তু সম্রাট। শিবাজীর মন্তকের জন্য আমার
পিতার মস্তক জামিন আছে।
আওরঙ্গজেব। কুমার রামসিংহ, তুমি ছেলেমানুষ, তাই
নিতান্ত নির্বোধের মত কথা কইছ। সম্রাট আওরঙ্গজেব এই
ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা কর্তে কত পুত্র পিতৃহারা হয়েছে
তা বােধহয় তােমার অজানা নাই।
রামসিংহ! ত’ নেই জনাব ? কিন্তু একটা বিশ্বাস
আওরঙ্গজেব। বিশ্বাস ? সে ত একটা মনের দুর্বল
সংস্কার মাত্র।
রামসিংহ। সম্রাট ? সত্যই আমি নির্বোধ, আপনার
কুটিল রাজনীতি বুঝবার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু আমার
তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা হতে আমি দেখতে পাচ্ছি, --আপনি
আপনার সাম্রাজ্য নিতান্ত চোরা বালির উপর গঠিত কচ্ছেন
জাহাপনা? জানি আপনি ভ্রাতৃরক্তের কর্দমের উপর সিংহাসন
স্থাপিত করেছেন, জানি, আপনি সরল উদার সম্রাট সাজাহানকে
সিংহাসনের লােভে পিতা বলে ক্ষমা করেন নি। কিন্তু আমার
সর্বজন প্রিয় পিতা ত তেমন কোন অপরাধ করেন নি।
আজন্মকালের প্রভুভক্ত সেবকের উপর একি ব্যবহার ?-
আওরঙ্গজেব। কুমার ? শিবাজীকে বলি দেওয়ার প্রয়ােজন
হয়েছে। তা না হয় তােমার পিতার উপর এতটা অন্যায় আমি
কৰ্ত্তেন না। পৃথিবীতে একটা ধৰ্ম থাকবে,সে ইসলাম, একটা
জাতি থাকবে,সে মুসলমান। কাফের শিবাজী মাথা তুলে
এর বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে, তাই তার মস্তকের প্রয়ােজন হয়েছে।
রামসিংহ। পিতা জয়সিংহও আপনার আজ্ঞাধীন এই
দাসও ত সেই কাফের।
আওরঙ্গজেব। হৌক। যারা দাস তাদের মক ত
উচুতে ওঠে না।
রামসিংহ। ঠিক বলেছেন জাহাপনা? আপনার এই
সরল উক্তির জন্য আপনাকে অগণ্য ধন্যবাদ। কিন্তু জাবেন
জাহাপনা! আপনার এই স্বেচ্ছাচার অবনত মস্তকে পিতা
জয়সিংহ কখনাে সইবেন না। বেয়াদপি মাপ কৰ্বেন জনাব ?
যেদিন জানব শিবাজীর রক্তে গােয়ালিয়াড় দুর্গের প্রাচীর রঞ্জিত
হয়েছে সেদিন লাঞ্ছিত হিন্দু জাতির পক্ষ হতে এই রামসিংহ
বুক ফুলিয়ে দাড়াবে। দেখি মােগলের তরবার কত শক্তি
রাখে। যাই জনাব? আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।
[ কুর্ণিশ করিয়া প্রস্থান ]
আওরঙ্গজেব। কি রকম? ইয়াকুং?
ইয়াকুৎ। জাহাপনা ? একটা অভিনয়।
লাল
আওরঙ্গজেব। সত্য বলেছ, একট! অভিনয় বটে। মুমূষু”
হিন্দু জাতি মাটিতে পড়ে ছটফট কচ্ছে আর মাঝে মাঝে দু’
একটা আড়মােড় খাচ্ছে। কিন্তু সত্বরই আমাকে একটা বড়
রকম অভিনয়ে নাবতে হবে।
ইয়াকুৎ। তা জানি।
আওরঙ্গজেব। কি জান ?
ইয়াকুৎ। জানি, আপনি রঙ্গমঞ্চে নেমে একটা পার্বত্য
মুষিক বধ কৰ্বেন।
আওরঙ্গজেব। হােঃ, হােঙ, হােত। তুমি সত্যই বলেছ,
যা’র তরবারি ভারতের বড় বড় মস্তক দ্বিখণ্ডিত করেছে সে
একটা মূষিক বধ কৰ্বে। অভিনয় ত বটে। হােঙ, হােঙ, হােঙ।
ওমরাওগণ। হােঃ, হােঃ, হাের। মজার অভিনয়।
[ কুর্ণিশ করিতে করিতে নাজির প্রবেশ ]
তানাজি। শাহানশা বাদসা মহামান্য আলমগীরের জয়,
হোক।
আওরঙ্গজেব। কি চাও তুমি তানাজি ?
তানাজি। শিবাজী মহারাজ জাহাপনার কাছে একটা
নিবেদন পাঠিয়েছেন।
আওরঙ্গজেব। কি নিবেদন ?
তানাজি। নিবেদন এই যে আগ্রার জল বা ৰামী
মহারাজের সহযাত্রীগণের সহ্য হচ্ছে না, তাই তাহাদের আগ্র।
ত্যাগের অনুমতি
অনুমতি প্রার্থনা কচ্ছেন। মহারাজ নিজেও
পীড়িত, তবু তিনি তাঁর পুত্র শজিকে নিয়ে আগ্রাতেই
থাকবেন।
আওরঙ্গজেব। বেশ। তিনি একাই থাকুন, আমার কোন
আপত্তি নেই, অন্য সহযাত্রীগণ দিল্লী ত্যাগ কর্তে পারেন।
তানাজি। জাহাপনার জয় হোক। { প্রস্থান
আওরঙ্গজেব। খােদা, খােদা?
খােদ, খােদা? তুমিই সত। ইয়াকুৎ,
দেখ এই দুষ্মনকে ধ্বংস কৰ্বার কেমন সুযােগ খোদা করে
দিলেন। অন্য সব চলে যাবে শিবাজী একাই থাকবে। ভারি
মজা হবে। তােমরা যাও আমার নেমাজের সমস্তু হল।
খোদা—খােদা-তুমিই সত্য।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
কক্ষ-দ্বার।
দুইজন প্রহরী।
প্রঃ প্রহরী। তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দাও আমি
এখানে একটু নিদ যাই। তা না হয়, তুমি এখানে দাড়িয়ে
পাহারা দাও আমি ওখানে নিদ নাই। এই ভাবে পালা করে
রাত ভাের হুসিয়ারী কৰ্ব ।
দ্বিঃ প্রহরী। বহুৎ আচ্ছা। আজ রাতটা কোন রকমে
কাটাতে পার্লে, ব্য। রাত্তিরও ভাের, শিবাজীর জীবনের ভাের।
প্রঃ প্রহরী। আচ্ছা ভাই, এনা বকত দিাত পাহারা
বসিয়ে শিবাজীকে বাঁচিয়ে রাখবার কি দরকার ছিল ?
দমে কতুল্ করে দিলে হত না?
দ্বি প্রহরী। বাদসাহী চাল আমরা কি সম্ঝাব বল ?
শিবাজী বিমারে পড়েছিল, তাই বুঝি খুন করে নি ! বিমারে
মারা পলে লেঠা
চুকে যেত।
প্র প্রহরী। কাল ত মর্তে হবে হতভাগাটার কিন্তু বিমার
‘ভাল হয়েছে বলে কেৎসা ফুর্তি ? ঝুড়ি ঝুড়ি শুধু সিন্নিই
পাঠাচ্ছে। যত বেটা মােল্লারা খেয়ে খেয়ে বদহজমে পড়েছে।
আর আমরা দু'বেলা পাহারা দিচ্ছি, আমাদের বরাত শুধু ফেল
ফে করে চেয়ে থাকা।
দ্ধি প্রহরী। বরাত! বরাত!
প্রঃ প্রহরী। আজ রাত্তিরে যদি কোন দরগায় সিন্নি পাঠায়
কেড়ে নেব। কি বল ভেইয়া?
ছিঃ প্রহরী। তােবা, তােবা! দরগার সিন্নির উপর লােভ
কৰ্ত্তে নেই।
।
.
গুরু রামদাস
[ শিবাজীর দুইজন অনুচরের প্রবেশ ]
প্রঃ প্রহরী। খবরদার! কে বাবা তােমর সােণার উঁদ ?
এই রাত দুপুরে কোন ঘরে হানা দেবে ?
প্রঃ অনুচর। তােমাদের সন্ধানে এসেছি ভাই।
দ্বিঃ প্রহরী। কেন? পালাবার মতলব কিছু ফঁদছ নাকি ?
আমাদের দু’ভাইকে দেখছ ত ? কেমন ষণ্ডা, কোসা জোয়ান ।
হেথায় কোন কারসাজি খাটবে না প্রাণ !
প্রঃ প্রহরী। দূর হতভাগা, চুপ কর না। আরে ভেইয়া,
তােমার হাতে ও কিসের ভাণ্ড।
দ্বিঃ অনুচব। কি আর বােলব! তােমর আমাদিগকে
ভাগিয়েই দিচ্ছ। শিবাজী মহারাজ আমাদিগকে বলে দিলেন
যে-‘আমি আরােগ্য লাভ করে সকল দরগায় সিন্নি দিলাম,
আমার দু’জন প্রহরী যে এত কষ্ট করে রাত দিন জেগে জেগে
আমার পাহারা দিচ্ছে তা’দিগকে এই পর্যন্ত কিছুই দেওয়া হয়
নি। তােমরা যাও, সােলেমানের দরগায় আমার দু’টি বড়
সিন্নি যাওয়ার পূর্বে তা’দিগকে আচ্ছা করে খিলায় দাও।
প্রঃ প্রহরী। বহুৎ আচ্ছা আমী তােমাদের মহারাজ! বহুৎ
মেহের বাণী
দ্ধি প্রহরী। বরাত, বরাত।
ও রামদাস
প্রঃ প্রহরী। সােললমানের দরগায় বহুৎ উন্দা সিন্নি যাকে
বুঝি ?
প্র: অনুচর। হাঁ ভাই, এই আখেরি সিন্নি ; এই সিন্নিতে
মহারাজের হাজার সিক্কা পেয়া খরচ।
দ্বিঃ প্রহরী। আখেরি সিন্নিই বটে।
প্রঃ প্রহরী। চোপরাও, চোপরাও। বাজে বকিস না।
কি এনেছ দাও ভাই, আমার জিহ্বা জলে ট ট কচ্ছে।
দ্বিঃ অনুচর। এই নাও ভাই, পেট পুরে খাও, আর
আমাদের মহারাজকে দোয়া কর।
দ্বিঃ প্রহরী। দোয়া খুব কচ্ছি। আখেরে তার গতি হােক।
প্রঃ অনুচর। তােমরা বসে বসে খাও। আমরা যাই ভাই,
আবার সিন্নি নিয়ে বেরুতে হবে। [ উভয়ের প্রস্থান }.
প্রঃ অনুচর। [ খাইতে খাইতে ] আরে ভাই, এ কি ?
দ্বিঃ প্রহরী। রকরা।
প্রঃ অনুচর। রসকরা না মসকরা? চিবুতে চিবুতে জিভে
যে পড়ছে কড়া।
[ প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঝুড়ি মস্তকে লইয়া শিবাজীর অনুচরগণ
চলিয়া গেল ]
প্রঃ প্রহরী। কেনা বড় বুড়ি! মােল্লাদের দু’বছরের
যােগাড় হয়ে গেল।
ছিঃ প্রহরী। ইয়ে লাড্ড, ইয়ে পেঁড়া, খালে, খালে
ভেইয়া, দিল খােস, হােই যায়গা।
প্রঃ প্রহরী। সব বেটারা ভেগে গেল নাকি? ঘরের
ভিতর সাড়া শব্দ নেই যে।
যি প্রহরী। জানলার ফাক দিয়ে দেখ, দেখি ।
প্রঃ প্রহরী। আমি খাচ্ছি, তুই দেখ না।
দ্বি: প্রহরী। আমি কি না খেয়ে বসে আছি, তুই দেখ না।
প্রঃ প্রহরী। তবে চল, দুজনেই দেখি ।
ছিঃ প্রহরী। তাই চল।
[ উভয়ে জানালার ফাক দিয়া দেখিল ]
উভয়ে। সৰ্ব্বনাশ! সর্বনাশ ।
প্রঃ প্রহরী। দরজা খােল, দরজা খােল।
দ্ধি প্রহরী। আরে ভেইয়া, ঘরজা? আমার ভেউ, ভেউ
করে কঁদতে ইচ্ছা কচ্ছে। সব কটাই ভেগেছেরে ভেগেছে।
সম্রাটের কাছে খবর দে।
প্রঃ প্রহরী। খবর দিলে আমাদের গর্দান দিতে হবে।
চল পালাই।
দ্ধি প্রহরী। কনে পালাবি?
প্রঃ প্রহরী। সােঝ চল, আঁখ দুনকো সানা যে যে
সরকু মিল যায়গা, ঐ সরক সে চল ।
৪ রাক্ষস
ছিঃ প্রহরী। তাই চল, তাই চল। হাে, হাে। ঐ বড়া
বুড়িকে বিয়ে দোনাে দুষমন বঠকে ভাগ গেয়া হা।
[ উভয়ের প্রস্থান ।
সপ্তম দৃশ্য।
স্থান--রামদাস স্বামীর আশ্রম। কাল-প্রভাত।
রামদাস।
রামদাস। সালেহার’ যুদ্ধ জয় ভারতের বিজয়লক্ষ্মীর ব্লানতি
ললাটকে অপূৰ্ব কিরণে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। এমন প্রচণ্ড
আঘাত মােগলের মতকে আর কখনাে পড়েনি। মােগলের
কবল হতে মুক্ত হয়ে শিবাজী মােগল সাম্রাজ্যে দাবানল
জেলেছে। দাক্ষিণাত্যের সমস্ত দুর্গ আজ মােগলের হস্তচ্যুত।
দীর্ঘায়ু হও শিবাজী! নারায়ণ তােমার মঙ্গল করুন। পরাজয়ের
সংবাদ শুনে শুনে আওরঙ্গজেব ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। উন্মাদের
মত সে এই ভারতের বক্ষ হতে বিশাল হিন্দুজাতিকে মুছে
গুরু রামদাস ফেলবার জন্য ছুটেছে।-হিন্দুর শ্লাঘার সর্বস্ব বারাণসীর বিশ্ব- নাথের মন্দির, হিন্দুর জ্ঞানস্তুপ, পাঠাগার, হিন্দুর যজ্ঞশালা আওরঙ্গজেবের খপ্পঘাতে আজ ধূলায় গড়াচ্ছে ! হে নারায়ণ । তােমার অবতার গ্রহণের লীলাভূমি অযযাধ্যা মােগলের পাদুকা প্রহারে জর্জরিত, তােমার কীৰ্ত্তিমুখর সরযূর জলকল্লোল আর নৈশ নীরবতার মধ্যে দিয়ে করুণ সঙ্গীত তােলে না, রাত দিন। যেন তার বুকে একটা হাহাকার শসিয়ে উঠছে। জানি, আর্তের ক্রন্দনে হে ভগবান! তােমার সিংহাসন টলে যায়, তাই, বুঝি সৰ্বত্ৰ সংহার মূর্তিতে প্রকট হয়ে উঠছে। [ শিবাজীর প্রবেশ } শিবাজী। গুরুদেব! গুরুদেব! প্রভু! দেবতা! [ ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম ] রামদাস। বৎস! প্রিয়তম। অভিষেকের রাজটীকা ললাটে পরে, মস্তকে রাজমুকুট ধারণ করে এসছ বৎস! দাড়াও, আমি একবার চোখভরে তােমার রাজশ্রী দেখি । শিবাজী। প্রভু! এ দাস, এই রাজমুকুট আপনার শ্রীচরণে উৎসর্গ কৰ্তে এসেছে। রামদাস। সে কি বৎস? তােমার মস্তকে এই উজ্জল মুকুট কেমন ঐ ধারণ করেছে। সন্ন্যাসী উদাসীনের পদপ্রান্তে ফেলে তার দুর্গতি করা কেন? বৎস! সম্মুখে অনন্ত কর্মক্ষেত্র, জীবন
গুরু রামদাস
তােমার সীমাবদ্ধ। ভাবের আবেশে এই স্বল্প সময়টুকু নষ্ট
শিবাজী ! আর পাচ্ছি না প্রভু! এই দু’টি বাহুতে কি
শক্তি আছে ? দাক্ষিণাত্যের শ্যামল ভূমিকে রক্তে রঞ্জিত করে
দিয়েছি। কিন্তু কি ফল লাভ হল ?
রামদাস। অসমাপ্ত কর্মক্ষেত্র পশ্চাতে ফেলে রেখে একি
বৈরাগ্য তােমার বৎস? নিষ্কাম হয়ে কৰ্ম্ম কর, ফলভাগ নারা-
যুণকে সমর্পণ করে,
শিবাজী। প্রভু! এতদিন কর্মক্ষেত্রে প্রাণ ঢেলে দিয়ে
-কি কলেম? ধৰ্ম্মরাজ্য স্থাপন কর্তে পালেম কৈ? এখনো
এই ভারতের বক্ষের উপর দিয়ে মােগন্স পাঠান তাদের অত্যা-
চারের রক্তাক্ত অসি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, এখনাে হিন্দুর দেবধৰ্ম্ম
প্রতি পলে লাঞ্ছিত হচ্ছে, আর সে লাঞ্ছনার সাহায্য কচ্ছি,
আমরা হিন্দুরা। এই অযােগ্য হস্ত হতে আপনি রাজদণ্ড
ফিরিয়ে নিউন। আমি বৈরাগ্য নেব প্রভু! জীবনের কয়টা
দিন দণ্ড কমণ্ডলু নিয়ে আপনার পশ্চাতে পশ্চাতে ফিরে
কাটিয়ে দেব।
রামদাস। বৎস! কার্যের সূচনায় কেউ ফললাভের আশা
করে না। তুমি কার্যের সূচনা করেছ, তােমার পরবর্তীর এর
ফলভাগী হবে।
৭০
গুরু রামদাস
শিবাজী। প্রভু! ক্লান্তি এসে দেহকে আক্রমণ করেছে ।
‘সিংহগড়ের যুদ্ধে সহােদর প্রতিম নাজিকে হারিয়েছি,আমার
একটা বাহু ভেঙ্গে পড়েছে। যম-দ্বারে মহাঘােরে তপ্তা বৈতরণ
নদীর কল্লোল শুনতে পাচ্ছি, বুক ভরা উৎসাহ নিয়ে, তরুণ
প্রাণে কর্মক্ষেত্রে নেমেছিলাম ;-আজ ব্যথায় বুক ভরে গেছে,
প্রাণেও স্থবিরতা এসেছে, আমায় অবসর দিউন প্রভু!
রামদাস। অবসাদ ঝেড়ে ফেল বৎস!
এক তানাজি
গেছে, শত তানাজি মাটি ফুড়ে উঠবে। কিসের ব্যথা? কেন
ঔদাসিন্য? ভারতের হিন্দুদের মধ্যে আজ চারিদিকে সাড়া
পড়েছে ;-আওরঙ্গজেবের অত্যাচারে জর্জরিত আজ সমস্ত
হিন্দুগণ গা ঝাড়া দিয়ে মাথা তুলেছে।-হােথায় মেওয়ারে
রাণা রাজসিংহের ভৈরব আহ্বানে সমস্ত রাজপুত বীর তাদের
অলস নিদ্রা হতে জাগ্রত হয়েছে, পঞ্চনদের পুণ্যক্ষেত্রে শিখদের
নবম গুরু তেগ বাহাদুরের পূত শােনিতের টীকা ললাটে ধারণ
করে এক অপূৰ্ব শৌৰ্য্যবান সম্প্রদায় কৃপাণ হস্তে গুরু গােবিন্দের
নেতৃত্বে গড়ে উঠছে। হেথায় তােমার অলৌকিক উদ্দীপনায়
তেজন মারাঠাগণ বুক ফুলিয়ে মােগল সাম্রাজ্যের পানে
ধেয়ে চলেছে। কেন বিষাদের গভীর কালিমাকে নিরর্থক হৃদয়
মধ্যে রেখা টাতে দিচ্ছ ?
শিবাজী। প্রভু! শুধু অবসাদ নয়, আমি নিজের উপর
৭১
ও রামদাস বিশ্বাসও হারিয়েছি। তাই আশঙ্কায় বিচলিত হয়ে আপনার আশীর্বাদে প্রাপ্ত রাজ্য আপনার চরণে নিবেদন কত্তে এসেছি। রামদাস। কেন বিচলিত হচ্ছ? কিসের আশঙ্কা ? শিবাজী। যখন আমার রাজ্যভিষেক হয়, যখন আমি হীরক- খচিত মুকুট মাথায় দিয়ে স্বর্ণছত্র তলে সিংহাসন পেতে বসি,- সম্মুখে স্তুতিপাঠকগণ যখন স্তুতিবাদ কৰ্তে লাগল, চারিদিক ঘিরে লক্ষ কণ্ঠ হতে জয়ধ্বনি উঠল ;-দম্ভে, অহঙ্কারে, ভােগ স্পৃহায় আমায় বিহ্বল করে তুলে।-উৎসবের অবসানে যখন নিজেকে কুড়িয়ে পেলুম,—দেহ মন গ্লানিতে অনুশােচনায় জর্জরিত হয়ে গেল। তাই আপনার পদপ্রান্তে সৰ্ব্ব সমর্পণ করে নিজেকে সকল রকমে কাঙাল কৰ্বার জন্য ছুটে এসেছি। প্রভু। মানুষের আকাঙ্খা অনন্ত, মন দুৰ্বল। আমার নিবেদন গ্রহণ করে আমায় মুক্তি দিউন। আপনার গড়া রাজ্য আপনি গ্রহণ করুন। রামদাস। তন্তু। তােমার এই দান আমি গ্রহণ কলেম। এখন আমায় এই দানের দক্ষিণা দাও দেখি ? শিবাজী। দক্ষিণা দেব? আমার এই দেহ ভিন্ন আর ত কিছু নেই প্রভু! দানের দক্ষিণার পরিবর্তে এই দেহখানি আপনার চরণে সমর্পণ কলেম। রামদাস। রাজ্যদানের দক্ষিণা দেহ অর্পণ ত শাস্ত্রের বিধান নয় শিবাজি। ৭২
গুরু রামদাস
শিবাজী.। তবে কি উপায় হবে? আমার যে আর কিছু
নেই।
রামদাস। কিন্তু দক্ষিণা যে দিতে হবে শিবাজি! দক্ষিণা
দিয়ে এত বড় দানকে বিফল কৰ্ব্বে ?
শিবাজী। হ ভগবান! একি কলে?
রামদাস। দক্ষিণা দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে কাতর হচ্ছ
কেন?
শিবাজী।
ক্ষমতা আছে। দুর্ভাগ্য আমার,-গুরুদেব
আমায় ব্যঙ্গ কছেন !
রামদাস। ব্যঙ্গ নয় শিবাজি! এই দাক্ষিণাত্যে যে সব
দেশ এখনাে মোগল দখল করে আছে তুমি সেগুলাে দক্ষিণার
স্বরূপ আমায় দাও! তােমার এই মহৎ দান সার্থক হবে।
শিবাজী। প্রভু! আমার মর্মদাহী দুর্ভাবনা দূর কলেন।
এই দক্ষিণা আমি দেব। মা ভবানীর কৃপাণখানি আর
একবার ঝলসে উঠুক।
রামদাস। তােমার নিষ্টা দেখে বড় সুখী হলেম শিবাজি।
তােমায় আমি আর একটা কর্মে নিয়ােজিত কচ্ছি
শিবাজী। কি কৰ্ম্ম ?
রামদাস। বৎস! আমি উদাসীন সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীকে
দিয়ে রাজ্য শাসন সম্ভবে না। তুমি আমার প্রতিভূ হয়ে এই
গুরু রামদাস
রাজ্য শাসন কর। প্রতিভূ হয়ে পরের রাজ্য শাসন কৰ্ব্বে, এতে
ভােগ বাসনায় তােমায় ব্যাকুল করে তুলতে পাৰ্বে না। এই
আমার গৈরিক উত্তরীও নাও, এই উত্তরীয় দিয়ে মহারাষ্ট্রের
জাতিয় পতাকা তৈরি কর। যদি কখনাে ভােগ বিলাসের
আহ্বানে মন চঞ্চল হয়ে উঠে, ঐ গৈরিক পতাকার পানে চেয়ে
গুরুর উপদেশ স্মরণ কর,-রাজ্য ভােগের জন্য
পরের কল্যাণের জন্য। যাও বৎস। বুকে ভক্তি যােগ রেখে
কৰ্ম্মযােগ সমাধা করছে। কর্মক্ষেত্রের ভীম কলরবে বিচলিত
না হয়ে, তার মধ্যে যে সন্ন্যাস ব্রত উদযাপন কৰ্তে পারে, সেই ত
পুণ্যশ্লোক মহাজন। যাও বৎস! সম্মুখে বিস্তার কর্মক্ষেত্র।
নবীন উৎসাহে সেথায় ফিরে যাও।
শিবাজী। আপনার আজ্ঞা লঙ্ঘন কৰ্ব্বে হেন সাধ্য
শিবাজীর নেই। আশীৰ্বাদ করুন প্রভু! যেন আমাকে
দিয়ে আপনার আদেশের অবমাননা না হয়।
রামদাস। নারায়ণ তোমার কল্যাণ করুন। ওঁ রাম,
৪ রাম, ওঁ রাম।
৭০
ও রামপাল
অষ্টম দৃশ্য
স্থান-চিতাভূমি। কাল-সন্ধ্যা।
মুন্নার রক্তাক্ত মৃতদেহ কোলে রঘুজি, কয়েকজন মাওলী
সর্দার স্তব্ধ হইয়া বসিয়া আছে।
রঘু। বৎস, প্রিয়তম, মুন্না আমার,অন্ধের যষ্টি আমার।
আমার এই জীর্ণ বক্ষের মর্ম বস্তু! আজ কোথায় চলেছ বাবা!
বতে অবগাহন করে কোন দেব কাৰ্য্য সাধনের জন্য প্রস্থান কচ্ছ।
প্রঃ সর্দার। সর্দার রঘুজি! তােমার পুত্র দেশের জন্য
প্রাণ দিয়েছে, তার জন্য শােক কর না। এমন মৃত্যু যে
মহারাঠার সকলেরই বাঞ্ছনীয়।
রঘু। কোথায়
মৃত্যু ? মৃত্যু
কি এমন সুন্দর ? মৃত্যু
दि
মুন্নার ঠোঁটের হাসি রেখাটি মুছে দিতে পারে নি। এ ত মৃত্যু
নয়, এ যে মহা প্রস্থান।
প্রঃ সর্দার। সত্য বলেছ সর্দার রঘুজি, সত্য এ মৃত্যু নয়,
এত বাঁচবার উপায়। মুন্নার মত যদি আজ সকলে দেশের জন্ত
প্রাণ দিতে পারি, কে এই মারাঠা জাতির মৃত্যু ঘটাতে পারে।
রঘু। মৃত্যু নয়, কিন্তু তবু এই বৃদ্ধ পিতাকে সে ছেড়ে
যাবে। দুলাল আমার শ্রান্ত জীবনের শান্তি আমার। আমার
আঁধার গৃহের জ্যোৎস্নার আলো, কোথায় যাবে? কোথায়
*
।
# রামদাস
যাবে ? এই বুকের ঘেরা দিয়ে তােমায় ঘিরে রাখব, কে
তােমায় কেড়ে নেবে? যম? পিতার স্নেহ-বন্ধন ছিন্ন কৰ্বার
শক্তি কোথায় তার ? এই তােকে আমি বাহুপাশে বেঁধে
রাখলুম, দেখি, যম কেমন করে ততাকে ছিনিয়ে নেয় ?
[ মুন্নার মৃতদেহ জড়াইয়া ধরিল ]।
দ্বিঃ সর্দার। অস্থির হবেন না সর্দার। আপনার পুত্র
গৌরবের মুকুট পরে স্বর্গে গেছে, তার জন্য শােক কৰ্ব্বেন না।
বঘু। আমার পুত্র ত মরে নি, কেন আমি শােক কৰ্ব ?
যমের কি সাধ্য তাকে কেড়ে নেবে ! আমার এই লােল বক্ষ,
এই শীর্ণ শরীর দেখে কি বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে এই
পাঁজরের ভেতর স্নেহের কি শক্তি আছে তুমি জান না।
[ মুন্নাকে জোরে বুকের মাঝে চাপিয়া ধরিল ]
প্রঃ সর্দার। আপনি কি পাগল হলেন ? রাত্রি হয়ে এল,
চিতা সজ্জিত করেছি, আপনি ফিরে যান, আমরা সংকীর শেষ
করে ফিরে আসছি, শশাকে কাতর হলে কি তাকে মৃত্যুর হাত
হতে ফিরাতে পাৰ্বেন না ।
রঘু। তবে সত্যই কি তার মৃত্যু হয়েছে। সত্যই কি
ষম তাকে কেড়ে নিয়েছে ? পুত্র আমার ! হােহােহাের ?
[ রক্ত বমন ও মাটিতে পতন ]
সর্দারগণ। এ কি হল!
গুরু রামদাস
প্রঃ সর্দার। রঘুজির অঙ্গ স্পর্শ করিয়া ] হিম-কঠিন
সব শেষ। শােক-বাষ্প হৃদপিণ্ডকে বিদীর্ণ করে দেছে। হা
ভগবান! এই স্নেহাতুর পিতাকে তােমার কোলে ঠাই দিও।
দ্বি সর্দার। রাত্রি গভীর হচ্ছে, এদের সৎকার শেষ
করে নিই। গণপৎ, আর একটা চিতা সজ্জিত করে নিই এস।
প্রঃ সর্দার। কি অপার স্নেহ ! হায় ভগবান! এমন
স্নেহাতুরকে এত বড় কঠিন শাস্তি দিলে
দ্বিঃ সর্দার। কিন্তু এমন স্নেহকেও ছাপিয়ে গেছে তার
স্বদেশ ভক্তি। একমাত্র সুকুমার সন্তানকে তিনি দেশের কল্যাণে
উৎসর্গ কৰ্তে দ্বিধা করেন নি।
প্রঃ সর্দার। হায় মা
দুর্ভাগিনী জননী জন্মভূমি ! এই
নিষ্পাপ শিশুর পূত রক্তে তাের মলিনতা ধুয়ে যাক।
তৃঃ সর্দার। রাত্রি হয়ে এল, চল সৎকার শেষ করে নিই।
[ সর্দারগণ চিতা সজ্জিত করিতে লাগিল ]
( মুক্ত অসি করে রক্তাক্ত কলেবরে শিবাজীর প্রবেশ।]
শিবাজী। তাে এ কম্পিত ক্ষুধিত করবাল সংবরণ কর্ মা !
রক্তে রক্তে যে ধরণীর শ্যামলতা ধুয়ে গেল ; দেখ, দেখ, মা, তাের
তৃষিত খপর পূর্ণ হয়ে রক্তধরায় তাের সর্বাঙ্গ স্নাত! ক্ষান্ত দে মা,
এই রণরঙ্গ,-পৃথিবীর বুকে প্রফুল্ল শ্ৰী ফুটে উঠুক, মানুষ শান্তির
নিশ্বাস ফেলুক
[ উদ্ভ্রান্ত ভাবে প্রস্থান ।
৭৭
তৃতীয়অঙ্ক প্রথম দৃশ্য। স্থান-কক্ষ। কাল-রাত্রি। মুমূষু শিবাজী শায়িত ; পার্শ্বে আবাজি ও অন্যান্য সর্দারগণ- শিবাজী। শ্বাস ফেতে পাচ্ছি না। দিন বুঝি ফুরিয়ে এল আবাজি। আবাজি। এই ঔষধ টুকুন্ খান দেখি। শিবাজী। আর ঔষধ ! রাত্রি কত ? আবাজি। নিশীথ। শিবাজী। চাদ উঠেছে ? আবাজি। না মহারাজ!—শুধু রাশি রাশি অন্ধকার। শিবাজী। এত অন্ধকার কেন? মৃত্যু সময়েও আলাের কি একটা ক্ষীণ রশ্মি-রেখাও দেখতে পাব না? আবাজি। আবাজি। মহারাজ। শিবাজী। কি দুর্ভেদ্য এই ভারতবর্ষ !—উত্তরে গগনস্পর্ধী, তুষার- মৌলি, বিরাট হিমালয় ; দক্ষিণে অনন্ত-বিস্তার ক্ষুব্ধ বারিধি ; ৭ গুরু রামদাস পশ্চিমে ভৈরব তরঙ্গ সমাকুল, কল্লোলিত সিন্ধুনদ ; পূৰ্ব্বে গভীর অরণ্যাচ্ছন্ন দুর্লঙ্ঘ্য পৰ্বতমালা।-এমন সুদৃঢ় দুর্গ পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর আছে কি ? আবাজি সত্য মহারাজ ! শিবাজী। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী অতীত হচ্ছে এই দুর্ভেদ্য দুর্গের অধিবাসিগণ স্বাধীনতা হারিয়ে পরপদতলে লুষ্ঠিত হয়ে পড়ে আছে। আবাজি, একদিন ভারত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের শৌর্যের নিকট বিশ্ববিজয়ী গ্ৰীক সৈন্যগণ মস্তক নত করেছিল, একদিন মহারাষ্ট্র সম্রাট পুলকেশীর প্রতাপে পারস্য সম্রাটকে সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল,“উঃ! উঃ ! আবাজি। আপনি বেশী কথা কইবেন না, যন্ত্রণা বেড়ে যাবে। গিবাজী। আর কইতে পাচ্ছি না, কথা কওয়ার দিন ফুটিয়ে এল। আবাজি ! এই জাতি আজ মাথা তুলে’ সােঝা হয়ে দাড়াতে পাচ্ছে না কেন জান? - এদের মেরুদণ্ডে, এদের অস্থি পাঁজরে ঘুণ লেগেছে।--বিলাসের, স্বার্থপরতার কীটগুলি এদের সর্বাঙ্গে ছেয়ে গেছে। অত্যাচারের উদ্যত খঙ্গের তলে জননী জন্মভূমিকে ফেলে রেখে, এরা আপনার ভাইয়ের বুকে ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য ছুরি বসাতে ছুটে যায়। আবাজি। আপনার কঠোর সন্ন্যাসব্রত সাধনায় এ জাতির মােহ কেটেছে। ৭১
গুরু রামদাস
শিবাজী। ভুল! ভুল ! আবাজি, ভুল বুঝেছ। কে আমার
সন্ন্যাসব্রত গ্ৰহণ কৰ্বে ?-আমার হতভাগ্য পুত্র কলে না, দেশ
কৰ্বে ? আবাজি! সব ব্যর্থ। বৈতরণীর তটপ্রান্তে দাঁড়িয়ে
আজ আমি পুত্র শস্তৃজির জন্য বেশী আকুল হয়ে উঠেছি। ঐ
বিলাসী, উচ্ছল, উদ্দাম যুবক তার অবিমৃষ্যকারিতায় এই মহারাষ্ট্র
শক্তি ধ্বংস করে দেবে। আমি জানি তাকে আবাজি, তাই
‘পানালা’ দুর্গে তাকে বন্দী করে রেখেছিলেন। তাকে সাবধান!
, আর কইতে পাচ্ছি না, কণ্ঠ শুফ, জিহ্বা আটকে যাচ্ছে।
আবাজি, তােমর যাও, আমায় একটু নিরিবিলিতে থাকতে দাও।
আবাজি। আপনাকে একা রেখে চলে যাব ?
শিবাজী। যাও। একা রেখেই যে যেতে হবে, বেশী দেরী নেই।
[ আবাজি প্রভৃতির প্রস্থান ]
শিবাজী। জীবনের অভিনয় শেষ হল। মৃত্যুর কিনারায়
এসে পড়েছি। হে আমার সর্ব নিয়ন্তা! আমার সুৰ্ব্ব কর্মের ফল
দাতা! একবার শিয়রে এসে দাড়াও! দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে গেছে,
চোখের উপর অন্ধকার দুলছে, এই তমিস্রার মধ্যে একবার তােমার
জ্যোতির্ময় রূপ নিয়ে প্রকট হয়ে ওঠ
- [ সহসা গুরুরামদাসের উজ্জ্বল ছায়ামূৰ্ত্তির আবির্ভাব।]
শিবাজী। একি ? একি ? এসেছ ? এসেছ ?
[ মূচ্ছ।]
গুরু রামদাঙ্গা
দ্বিতীয়
দৃশ্য।
গান-পথ।
কাল-পরাহু।
মারাঠাগণ ।
গীত।
?
ভেঙ্গেছে কপাল ভেঙ্গেছে পরাণ,
সকল আশার হল অবসান।
কে ঘুচাবে আর হীন দৈন্য
সফল করিয়া দেশের জন্য
কে করিবে আর শােণিত দান?
সূর্য ডুবিল, জ্যোছনা নিভিল,
আঁধারে ঘিরিল দেশ।
যুগ যুগ ধরি কদিনু ফুকারি,
কাদার ইল না শেষ।
তিমির অপসারি, মুছাতে নয়ন বারি
আর কি আসিবে ফিরি, সে মহান্ প্রাণ!
[ প্রস্থান ।
[ কল্যাণের প্রবেশ ।
কল্যাণ। আজ সমস্ত মারাঠা শােকে উন্মাদ হয়েছে।
সত্যই একটা ইন্দ্রপাত হল। ছত্রপতি শিবাজীর মৃত্যু, হিন্দু
৮১
গুরু রামদাস ধর্মের উপর, হিন্দুজাতির উপর একটা অশনি সস্পাত। মৃত্যু- শয্যায় শায়িত সেই ধীর, স্থির প্রশান্ত মূর্তি এখনাে মনে পড়ে। করাল কাল ছত্রপতি শিবাজীর দেহকে জীর্ণ করেছিল বটে, কিন্তু তার চোখের জ্যোতিঃ, মুখের আভাকে স্নান কর্তে পারে নি। মা ভবানীর উপর কি অটল বিশ্বাস। কণ্ঠে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে , মুখে কিন্তু অহঃরহ মা ভবানী। গুরুদেব কিন্তু বড় বিচলিত হয়েছেন। যে তরুণ উৎসাহ নিয়ে তিনি স্থবির দেহকে ঋজু করে রেখেছিলেন শিবাজীর মৃত্যুতে তা ভেঙ্গে পড়েছে। তাহার স্নেহা চোখ দুটি শুষ্ক, কঠোর হয়ে গেছে। গুরুদেব যে এতবড় একটা শােক বেশীদিন সইতে পাৰ্বেন তাত মনে হয় না। যদি তেমন কিছু হয়, এই হতভাগ্যের কি উপায় হবে? মন চঞ্চল হয়ে উঠছে। যাই তঁাকে দেখে আসি। [ প্রস্থান } তৃতীয় দৃশ্য। কাল-উষা স্থান--রামদাস স্বামীর আশ্রম। রামদাস স্বামী। রামদাস। কৃষ্ণা নবমীর ক্ষীণ চন্দ্র রেখার উপর হিমানীর কুষ্মাটিকার আবরণ এসে পড়েছে। বিষঃ আলােক মাঝে বিষাদ মাখা প্রকৃতি নৈশবায়ুর সঙ্গে হাহাকার করে উঠছে! উঠবে না ? ৮ গুরু রামদাস এই মহাশােক কি ভুলবার ? এই ভারতের উপর দিয়ে যে, বিধাতার এত বড় অভিশাপ আসবে কল্পনাও করিনি। ধীরে ধীরে পূর্ধ্বাকাশে উষা দেখা দিচ্ছে, কিন্তু তার সেই ' হিরন্ময় জ্যোতির বিকাশ কৈ ? একটা বিরস লাবণ্য নিয়ে স্নান রশ্মিগুলি দিগন্তের শ্যাম শােভাকে শােকাচ্ছন্ন করে তুলেছে! হা ভগবান! একি কলে ? আমার কঠোর তপস্যা, আজন্মের সাধনা সফল হ’ল কৈ ? তােমার সে আশাবাণী সার্থক হ’ল কৈ ?-ধৰ্ম্ম রাজ্য স্থাপন হ’ল কৈ ? দেহ জীর্ণ, মৃত্যু আসন্ন, দেশ, ধৰ্ম্ম উদ্ধারের ভার যার উপর ন্যাস করেছিলাম, সে স্বদেশ প্রেমিক সন্ন্যাসী আজ পরপারে। হা নারায়ণ ! কি প্রায়শ্চিত্তে ভারতের বক্ষ হতে পরাধীনতার এই মদাহী অভিশাপ দূর হবে ? [ হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া ] এ কি ! একি ! তুমি ভগবান, তােমার মধুময় কণ্ঠের প্রতিধ্বনি এই মরণাহত হৃদয় মধ্যে ধ্বনিয়ে তুলছ? সে কি দেবতা! প্রায়শ্চিত্ত এখনন শেষ হয় নি? এত রক্তপাতেও পাপের মলিনতা ধূয়ে গেল না? তুমি ডেকে বলছ,-“নীচ স্বার্থ, ক্ষুদ্রতা, ভ্রাতৃদ্রোহিতা, জাতি বৈরিতার মহাপাপে এখনাে ভারত পঁচে মচ্ছে”! প্রভু, নারায়ণ ! কি করে এই মহাপাপ হতে ভারত উদ্ধার হবে? এই সব পাপ পরিহার কৰ্তে শিক্ষার প্রয়ােজন। কে শেখাবে ? জগতের গুরু ভারতকে কে শিক্ষা দেবে ? একদিন যার কাছে, সুদূর প্রাচী, গুরু রামদাস প্রতিচী শিক্ষা পেয়ে ধন্য হয়েছে, তাকে কে এসে এই মহাপাপ হতে উদ্ধার হওয়ার মন্ত্র শেখাবে ? বর্তমান ভারতবর্ষে যে সাম্রাজ্য স্থাপন করে সম্পদের অধিকারী হয়েছে, সে ত ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসে হৃদয়কে আবিল করেছে, তার কাছে শিক্ষার কোন আশা নাই ; তার স্বেচ্ছাচারের কঠোর আঘাতে ভারতের পাঠাগার, বিদ্যামন্দির আজ ধূলিসাৎ। তবে কি শ্বেতদ্বীপের যে সুঠাম, সুন্দর তরুণের দল তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ সাগরবক্ষ ভেদ করে তাদের অর্ণবযানকে ভারতের তটপ্রান্তে এনেছে, তারাই কি ভারতের গুরু হয়ে দাঁড়াবে ? জানিনা ভগবান! ভারতের ভবিতব্য কি! না, দেহকে আর টেনে তুলতে পাছি না । জীবনের তটপ্রান্তে এসে পৌছেছি ; আজ বােধ হয় শেষ দিন, এই সংসার হতে আজ বিদায় নিতে হবে। জীবনযজ্ঞ সমাপ্ত কলেম,--হে নারায়ণ ! হে বরেণ্য ভূমা ভগবান! তুমিই ফল দাতা, তুমিই ফলগ্রাহী! ও রাম, ও রাম ও রাম। কল্যাণ, দত্ত, উদ্ভব, তোমরা এস, একবার শেষ দেখা দেখে নি। [ কল্যাণ, দত্ত, প্রভৃতি শিষ্যগণের প্রবেশ ) কল্যাণ। প্রভু! গুরুদেব- রামদাস। বিদায়, বিদায়। কল্যাণ। যার চরণাশ্ৰিত আমরা তাকে কেমন করে বিদায় • দেব ? ৮৪
গুরু রামদাস
রামদাস। কল্যাণ ! কালের আহ্বান এসেছে, আর যে
থাকতে পাৰ্ব্ব না। ওঁ রাম, ও রাম, ও রাম।
দত্ত। এই অভাজনদের উপায় কি হবে?
রামদাস। উপায়ের কর্তা সেই ঈপ্সিত পুরুষ,—যিনি অণু
হতে অণু, মহান হতে মহত্তর। মন প্রাণ সেই পরম পুরুষের
পাদপদ্মে সমর্পণ কর।
দত্ত। কিন্তু প্রভু! আপনি ভিন্ন যে আর কা’কেও জানি
, আপনাকেই ত সেই পরম পুরুষ জ্ঞানে পূজা করি। আপনার
বিয়ােগে মনকে কি দিয়ে বুঝাব ?
রামদাস। বস দত্ত! ভাল করে আমার ‘দাসবােধ’ খানা
পড়। তার প্রত্যেক পংক্তিতে আমাকে পাবে, পরম পুরুষেরও
সন্ধান পাবে। কল্যাণ !
কল্যাণ। কি আজ্ঞা প্রভু।
রামদাস। প্রাণ আমার যখন দেহ ছেড়ে যাবে, এই
দেহকে অগ্নিতে দাহ করাে, কখনাে সমাধিস্থ করাে না। এই
আদেশ তােমাদের গুরুতর আদেশ, এর যেন অন্যথা না হয়।
কল্যাণ। এই আদেশ কেন প্রভু ? আমাদের অভিলাষ
আপনার দেহান্তে, আপনার পবিত্র শরীরকে সমাধিস্থ করে
তার উপর মৰ্ম্মর-মন্দির তৈরি করে জলে, ফুলে, বি-দলে
আপনার পূজা করে ধন্য হব।
৮৫
গুরু রামদাস রামদাস।' সে আশঙ্কাতেই বলছি,-তােমরা ভগবানকে অতিক্রম করে আমার পূজা কৰ্বে। এমন ঘটনা যেন এমন ঘটনা যেন কিছুতেই হয় কল্যাণ ! না। আর কথা কইতে পাচ্ছি না। কল্যাণ, করুদ্ধ হয়ে আসছে [ ক্ষীণস্বরে ] ও রাম, ও রাম ও রাম। সময় হয়ে এসেছে, সেই গানটা একবার তােমরা গাও কল্যাণ ! ও রাম, ও রাম, ও রাম! কল্যাণ প্রভৃতিরা গাহিল- গীত। আমি চেয়েছি সকলি, চাহিনি তােমায় অভিমানে গেছ ফিরিয়া ; নারায়ণ! নারায়ণ । রুদ্ধ করেছি নয়ন, আমায় থাক আঁকড়িয়া। মিটাতে শত বাসনা, তােমায় কভু করিনি কামনা, মরণ শয়নে, পড়িছে স্মরণে, নারায়ণ ! নারায়ণ ! ছিন্ন করে মায়ার বাঁধন, কোলে মােরে নাওহে টানিয়া। ঘবনিকা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.