Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Kal Baisakher Jhar
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
‘প্রহেলিকা-সিরিজের চতুর্দশ গ্রন্থ
ENSUS
লাইব্রেরী
বসিরহাট।
4MM
圓圖
প্রকাশক-সুবােধচন্দ্র মজুমদার
দেব-সাহিত্য-কুটীর
২২াবি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
জ্যৈষ্ট—১৩৫২
প্রিন্টার—এস সি. মজুমদার
দেব-গ্রেস
২৪, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কাল-বৈশাখীর ঝড়
ছুরির ঝকঝকে ফলাটা ঠিক নাকের সামনে ধরে,
[ পৃঃ-৪৭
কাল-বৈশাখীৱ ৰ
ক
ব্রডওয়ে হােটেলের ঘটনা চুকে যাবার পর রণজিৎ সামন্ত
চঞ্চলকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসে বললেন, তুমি এখন কী
করবে?
চঞ্চল বললে, তাই তাে ভাবছি। অনেক চেষ্টায় যা-ও
একটা চাকরি জুটিয়েছিলাম, কপালে টিকলাে না।
: ‘ও-কাজ তােমার গেছে ভালােই হয়েছে। কী বলেই বা
মেসের চাকরের কাজ নিয়েছিলে।
কেন, পঁচিশ টাকা মাইনের কেরানিগিরির চেয়েও কি তা
খারাপ?
‘খারাপ বইকি! কেরানিগিরিতে তবু ভদ্রতা বজায় থাকে।
লােকে “আপনি” বলে। চেয়ারে বসতে দেয়।
‘আমি তাে কোনাে তফাৎ দেখতে পাইনে।
‘অত হতাশ হয়ে পােড়াে না, চঞ্চল। তােমার মতাে
বুদ্ধিমান শ্রমশীল ছেলের জীবনে উন্নতি হওয়া উচিত।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
‘উন্নতি অনেক পরের কথা—আপাতত কাল কি খাবাে
তা-ই ভাবছি।
‘কেন, 'তার জন্যে আর ভাবনা কী! যতদিন তােমার
কোনাে কাজ-কর্ম না জোটে, আমার এখানেই থাকবে।
রণজিৎবাবু এত সহজে কথাটা বললেন যে, চঞ্চল ‘না’
বলতে পারলে না। মনে-মনে ভারি কুণ্ঠা বােধ করলাে, কিন্তু
রয়ে গেলো। তবে এটা মনে-মনে ভেবে রাখলাে যে, যত
শিগগির পারে যে-কোনােরকম কাজ জুটিয়ে নিয়ে কোনাে
একটা মেসে উঠে যাবে। পরায়ে বেঁচে থাকার মতাে দুঃখ
কিছু নেই, এই তার ধারণা।
রণজিৎবাবু অবশ্য তাকে লালবাজারের ডিটেকটিভ
ডিপার্টমেন্টেই কাজ দিতে চেয়েছিলেন। প্রথমে অবশ্য খুব কম
মাইনেতে ঢুকতে হবে, তবে তার মতাে তুখােড় ছেলের উন্নতি
হবেই। বিশেষত, গােয়ন্দাগিরিতে তার মাথা বেশ খেলে
এ তাে দেখাই গেছে। রণজিৎবাবু তাকে বােঝাবার চেষ্টা
করলেন যে এটাই তার লাইন।
কিন্তু চঞ্চল পুলিশে কাজ নিতে রাজি হলাে না।
রণজিৎবাবু একটু দুঃখিত হয়তাে হলেন, কিন্তু পিড়াপিড়ি
করলেন না। কয়েকদিন পর তিনি আর একটা চাকরির খবর
এনে দিয়ে চঞ্চলকে বললেন, ‘দ্যাখাে এটা তােমার পছন্দ
হয় কিনা।
চাকরিটা একটু নতুন রকমে। রণজিৎবাবুর এক বন্ধু-
কাল-বৈশাখীর ঝড় অটল দত্ত তাঁর নাম—একজন সেক্রেটারি চান। তিনি অবশ্য রাজনৈতিক কি সাহিত্যিক কি ব্যবসায়ী নন, কাজ-কর্ম কিছুই তিনি করেন না, প্রচুর পৈতৃক সম্পত্তির তাকিয়ায় হেলান দিয়ে, পায়ে পা তুলে দিন কাটান। ভদ্রলােক বিপত্নীক, ছেলেপুলে নেই, মস্ত বাড়িতে চাকরবাকর নিয়ে একা রাজত্ব করেন। সেইজন্য সেক্রেটারি চাই, আসলে সঙ্গী। একটু চিঠিপত্র লেখা, বই-টই পড়ে শােনাননা, মাঝে-মাঝে গল্প-গুজব করা কাজ বলতে গেলে এ-ই। মাইনে দেবে মাসে একশাে টাকা। চঞ্চল হাঁ হয়ে গিয়ে বললে, এই কাজের জন্য তিনি মাসে- মাসে একশাে টাকা খরচ করবেন।' ভদ্রলােক কি পাগল? ‘তার বাপের পয়সা তিনি যদি খরচ করেন তােমার আপত্তি কী? ‘না-না-আপত্তি কিছু নেই, তবে একশো টাকা তাে অনেক টাকা—অত দিয়ে আমি কী করব! ‘তাছাড়া’, রণজিৎবাবু বলতে লাগলেন, তােমাকে ও- বাড়িতেই অবশ্য থাকতে হবে। খাওয়া-দাওয়াও অটলবাবুর টেবিলেই চলবে। ঐ একশাে টাকা স্রেফ হাত-খরচ হিসেবেই তিনি দেবেন। বলেন কী! এ যে আলাদিনের প্রাীপের মতাে শােনাচ্ছে। অবশ্য অসুবিধেও আছে। তােমার চাকরিতে বাঁধা কাজ যেমন কিছু নেই তেমনি বাধা সময়ও নেই। দিনে কাল-বৈশাখীর ঝড় রাত্তিরে যখন-তখন তােমার ডাক পড়তে পারে—মাঝ-রাত্তিরে ঘুম থেকে ডেকে তােলাও অসম্ভব নয়। ভদ্রলােক এমনিতেই একটু খেয়ালি, কখন কী মরজি হয় ঠিক নেই। তার উপর তিনি চিররুগ্ন—তাই তার মেজাজও খুব নির্ভরযােগ্য নয়। ‘তার অসুখটা কী? রণজিৎবাবু হেসে বললেন, ‘বড়ােলােকের কি আর অসুখের অভাব আছে, ভাই! সত্যি না-থাকলে মিথ্যে অসুখ বানিয়ে নিতে কতক্ষণ? তা তার জন্যে তুমি ভেবাে না—ডাক্তার- নর্সের ঘনঘটা যথেষ্ট আছে—তুমি শুধু মিহি ধুতি-পাঞ্জাবী পরে বাড়িতে ঘুরে বেড়াবে আর বাবুর মেজাজ খােশ রাখবে। অর্থাৎ—রাজসভার ভাড় গােছের একটি জীব হতে হবে আমাকে। বেশ, তা-ই হবে। এমন লােভনীয় চাকরি ছেড়ে দেয়া কোনােকাজের কথা নয়। ‘তাহলে চলল আজ বিকেলে তােমাকে নিয়ে অটলবাবুর ওখানে একবার যাই। ‘বেশ, চলুন। ‘কিছু মনে কোনাে না—অটলবাবুর ওখানে খুব ধােপ-দুরস্ত হয়ে যাওয়া চাই। তােমার জন্য একখানা তাঁতের ধুতি আর একটা সিল্কের পাঞ্জাবী কিনে রেখেছি। আর তােমার চাকরি হলেই কিছু ভালাে-ভালাে জামা-কাপড় কিনে নিয়ে আমার চেনা দোকান আছে—মাইনে পেয়ে দাম দিলেই চলবে। ফিটফাট হয়ে থাকা চাইবুঝলে?
কাল-বৈশাখীর ঝড়
বিকেল পাঁচটা নাগাদ রণজিৎবাবু চঞ্চলকে নিয়ে অটলবাবুর
বাড়িতে উপস্থিত হলেন।
শশাভাবাজার অঞ্চলে তার বিরাট পৈতৃক বাড়ি—প্রাসাদ
বললেও চলে। গারাজে চার-পাঁচখানা গাড়ি ঝকঝক করছে।
ঘাসের জমি, ফোয়ারা, মর্মরমুর্তি, পামগাছ—কিছুরই অভাব
নেই। এই পৌরাণিক ঐশ্বর্যের কারাগারে বন্দী হয়ে
থাকতে হবে ভাবতে চঞ্চলের 'একটু মন খারাপ হয়ে গেলাে।
কার্পেট-মােড়া সিড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় প্রকাণ্ড বসবার
ঘরে তারা বসলাে। লাল মখমল-মােড়া পুরােনাে আমলের
আসবাবপত্রে ঘরটি সাজানাে। দেওয়ালে অতীতযুগের
দত্তকুলপ্রদীপদের বড়ােবড়াে তেলের ছবি। সীলিং থেকে ঝুলছে,
ঝাড়লণ্ঠন, তবে তাতে ইলেকটিকের বালব বসানাে হয়েছে।
তারা যাওয়া মাত্রই একজন চাপকান-পরা চাকর এসে
রণজিৎবাবুর ভিজিটিং কার্ড নিয়ে চলে গেলাে। বেশিক্ষণ
অপেক্ষা করতে হ’লল না—মিনিট পাঁচেক পরেই স্বয়ং গৃহস্বামী
ঘরে এসে ঢুকলেন।
অটল দত্ত মানুষটা মস্ত। যেমন লম্বা তেমনি চওড়া, তার
উপর মুখভরা ঘন দাড়ি-গোঁফে চেহারা আরাে জমকালাে
হয়েছে। মাঘের শেষ, কলকাতায় শীত পালাই পালাই করছে,
কিন্তু দত্তমশায়ের পােষাক যেন দারজিলিং-এর উপযােগী।
মঞ্জ ঢোলা সিল্কের পাজামা পরেছেন, পায়ে মােজা আর
কার্পেটের চটি, গায়ে মটকার পাঞ্জাবি তার উপর কোমরে দড়ি
কাল-বৈশাখীর ঝড় বাঁধা কালাে কাপড়ের আলখাল্লায়, গলা থেকে পা পর্যন্ত জড়ানাে। মােটের উপর নাক, চোখ, কপাল আর হাত দু'খানা বাদ দিয়ে শরীরের যতটা সম্ভব তিনি টেকে রেখেছেন, হয় কাপড়ে নয় দাড়িগোঁফে। মাথায়ও তার লম্বা-লম্বা বাবরি চুল, যেটুকু দেখা যায় গায়ের রং টুকটুকে লাল, সব মিলিয়ে হঠাৎ দেখলে রবীন্দ্রনাথ বলে ভুল হওয়া অসম্ভব নয়। বয়েস পঞ্চাশ হবে। চঞ্চল অবাক হলাে এই ভেবে যে এই বিরাট পুরুষের দেহে এমনকী সাংঘাতিক রােগ লুকিয়ে থাকা সম্ভব যার জন্য ভদ্রলােক সব সময় ডাক্তার-ন-পরিবৃত হয়ে থাকেন। অভিবাদন ও প্রত্যভিবাদনের পর অটলবাবু বললেন- এই বুঝি—এই বুঝি সেই ছেলেটি—যার কথা আপনি বলছিলেন ? চঞ্চল লক্ষ্য করলে যে অটলবাবুর চেহারার সঙ্গে তার কণ্ঠস্বরের কিন্তু মােটেও মিল নেই। তার গলার আওয়াজ দুর্বল থেমে-থেমে, আহে-আস্তে কথা বলেন, তাকে চোখে দেখে শুধু তার কথা শুনলে এ-ধারণাই হবে যে তিনি একজন রােগী। রণজিৎবাবু বললেন, “হাঁ, এর নাম চঞ্চল নাগ, এর বিষয়ে সব কথা তত আপনাকে বলেছি। ছেলেটি ভারি ভালাে। আমার মনে হয় অটলবাবু বাধা দিয়ে বললেন, “থাক, থাক, আপনাকে আর
কালবৈশাখীর ঝড়
বলতে হবে না। আমি একেই নেযয স্থির করেছি। কাজ
ততা কিছু নয়—একা-একা শূন্যপুরীতে থাকি, মন ভালাে লাগে
, কাছে কেউ থাকলে কথাবার্তা ক’য়ে সময় কাটাতে
পারি। কী হে, পারবে তাে এই রুগ্ন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের সঙ্গী
--
চঞ্চল মনে-মনে বললে, আপনি রুগ্নও নন, বৃদ্ধও নন
আর নিঃসঙ্গ যদি হন তারও কারণ আপনারই খেয়াল। মুখে
বললে, ‘পারবাে না কেন, নিশ্চয়ই পিরবাে।
‘তাহলে কাল সকালেই চলে এসাে।
চঞ্চল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাে।
‘হ, ভালাে কথা—তুমি কীরকম পাবে-টাবে সে-কথা তত
রণজিৎবাবুর মুখে শুনেছে। ওতে চলবে তত?
চঞ্চল হেসে বললে, “আজ্ঞে অত টাকা দিয়ে আমি কী
করবো তাই ভাবছি।
অটলবাবু শুকনাে একটু হেসে বললেন, “নেহাৎ ছেলেমানুষ
আহোঁ, তাই ও-রকম মনে হয়। কয়েক বছর পরেই বুঝবে
যে ও-টাকা কিছুই টাকা নয়।
• এর পরে রণজিৎবাবুর সঙ্গে কিছু খুয়াে আলাপ করে
জটলবাবু তাঁদের বিদায় দিলেন, কিন্তু তার আগে চা আর
সন্দেশ না খাইয়ে ছাড়লেন না।
বাইরে এসে চঞ্চল বললে, ‘ভদ্রলােক ভারি চমৎকার মানুষ
মনে হলাে।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
রণজিৎবাবু বললেন, হ্যা, ভালাে মানুষ বলে ওঁর বিশেষ
একটু সুনামই আছে।
‘কিন্তু কেমন যেন ম্রিয়মাণ! অমন প্রকাণ্ড জাদরেল
শরীর, অথচ মনে-মনে একেবারেই যেন মিইয়ে আছেন।
“ওঁর কী একটা ব্যামাে আছে—সেই জন্যেই উনি কেমন
যেন হয়ে গেছেন! যাই হােক, কাজটা তােমার মন হলাে
, কী বলে?
‘মন্দ হ’লল না কী বলছেন ? চমৎকার! এর চেয়ে
ভালাে কিছুই হতে পারে না।
দুই পরের দিন সকালে উঠে এক পেয়ালা চা খেয়েই চঞ্চল তার নতুন কর্মস্থলে চলে গেলো। সঙ্গে তার নতুন স্যুটকেস, নতুন ধুতি পাঞ্জাবি গেঞ্জি রুমাল তােয়ালে জুতােয় ঠাসা, আয়না সাবানও বাদ পড়েনি। আগের দিন অটলবাবুর বাড়ি থেকে ফেরবার পথে রণজিৎবাবু ও-সব কিনে দিয়েছিলেন, বড়াে- লােকের বাড়ির কাজ, সব সময় ফিটফাট থাকা চাই। রণজিৎ- বাবু বার-বার বললেন, ‘প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই আমার এ টাকা শােধ করে দিয়ে কিন্তু, কারণ তা নাহলে চঞ্চল ও-সব নিতে কিছুতেই রাজি হতাে না। তারপর চঞ্চল যখন রিকশায় উঠছে, রণজিৎবাবু চঞ্চলের হাতে একটি খাম দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে যাও। ‘কী এটা? বলেই চঞ্চল খামটা খুলে দেখলল ভিতরে দু’খান্য দশ টাকার নােট। সে অবাক হয়ে বললে, এ দিয়ে কী হবে? ‘রেখে দাও—যদি দরকার হয়। এক মাসের আগে তাে আর মাইনে পাবে না। ‘কী আশ্চর্য ‘আহা—আমি তাে আর তােমাকে দিয়ে দিচ্ছি না। ফিরিয়ে দিয়ােনা হয় সুদ দিয়াে, তাহলেই তাে হবে। চঞ্চল আর-কিছু বললে না। রণজিৎবাবুর প্রতি কৃতজ্ঞতায়
কাল-বৈশাখীর ঝড়
তার চোখ ছলছল করে উঠলাে। অনেক কপালগুণে এ রকম
বন্ধু পাওয়া যায়।
অটলবাবুর বাড়িতে পৌছিয়ে দেখলাে তার জন্য সমস্ত
ব্যবস্থাই প্রস্তুত। তাকে অভ্যর্থনা করলে কর্তার গােমস্তা
তিনকড়ি। বেঁটে খাটে। শুকনাে বুড়ােমতাে মানুষটি, তিরিশ
বহর এ-বাড়ির কাজে লেগে আছে, এখানকার যা-কিছু খুঁটিনাটি
আঁটঘাট সব তার জানা।
সে তাকে নিয়ে গেলাে সােজা তেতলায়, সেখানে এক
কোণায় তার জন্য যে-ঘরটি ঠিক করে রাখা হয়েছে, তা দেখে
তার তাে চক্ষুস্থির।
সে কি হঠাৎ বর্ধমানের মহারাজা হয়ে গেলাে? সে কি
স্বপ্ন দেখছে? মস্ত ঘর, মেঝে শাদা-কালাে পেটেন্ট স্টোনের,
এত পরিষ্কার যে পা ফেলতেই ভয় হয়—আর আসবাব পত্র,
তার তাে কথাই নেই। স্প্রিং-এর গদি-পাতা খাট, ড্রেসিং
টেবিল, মন্ত-মস্ত দেরাজ, ছােটো-বড়াে মানা ছাদের টেবিল,
ইজি-চেয়ার, সােফা, তাছাড়া বিছানার পাশে ছােট্ট টেবিলে
দুটি টেলিফোন একটি কালাে, একটি শাদা। পাশেই ঝকঝকে
বিলেতি বাথরুম, সেটি এত বড় যে অনায়াসে থাকবার
ঘর হতে পারে। এত ঐশ্বর্য, এত বিলাসিতা চঞ্চল কখনন
ছাখেনি, তার মাথার ভিতরটা যেন ঝিমঝিম করতে লাগলাে।
তিনকড়ি বললে, ‘কেমন? আপনার কোনাে অসুবিধে,
হবে না তাে?
কাল-বৈশাখীর ঝড়
}
হবে বইকি, চঞ্চল গভীরভাবে বললে, খুবই অসুবিধে
হবে। ও-বিছানায় শুয়ে কি আমার ঘুম হবে ভেবেছেন?
না ঐ বাথরুমে স্বাধীনভাবে নাইতে পারবাে? মেসের
তাপােষে পড়ে থাকা অভ্যেস, কলতলার চৌবাচ্ছায় ঘটি
দিয়ে জল তুলে দুমদাম করে চান করা—হঠাৎ এত সুখ সইবে
কেন? আপনাদের এখানে অন্যরকম ব্যবস্থা বুঝি হয় না?
একতলায় কোনাে ঘর-টর খালি নেই? রােয়ানের ঘর
হলেও চলে।
তিনকড়ি বললে, 'না, না, এর আর বদল হবার
উপায় নেই। কর্তার হুকুমেই এ-সব হয়েছে।
পাশেই তার মহল—তিনখানা ঘর নিয়ে তিনি থাকেন।
আপনাকে যখন-তখন দরকার হতে পারে, তাই আপনার
ঠিক পাশেই থাকা চাই। ঐ দেখুন, আপনার লেখবার টেবিলের
ধারে দেয়ালের গায়ে ইলেকট্রিক বেল বসানাে আছে, ওটি
যখন বাজবে বুঝবেন কর্তা তলব করেছেন। টেবিলের ডান
দিকের দরজা দিয়ে বেরােলেই তাঁর মহলে গিয়ে পড়বেন।
ওঁর খাশ টেলিফোনটি আপনার ঘরেই রাখা হলাে—ওঁর
ঘরেও এক্সটেনশন আছে, কিন্তু নেহৎ দরকার না-হলে ওঁকে
বিরক্ত করবেন না। টেলিফোনে ওঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে
চাইলে আপনি ফোন রেখে দিয়ে শাদা টেলিফোনটি তুলবেন।
সেটির কনেকশন শুধু আপনার ঘূরের সঙ্গে ওঁর ঘরের। তিনি
যদি নিজে কথা বলতে চান, তাহলে ওঁকে কনেকশন দিয়ে
কাল-বৈশাখীর ঝড়
।
দেবেন, নয়তাে যা বলবার আপনাকেই বলতে হবে। এ ছাড়া
আর যা আপনার কাজ, তা উনি নিজেই আপনাকে বলে
দেবেন।
চঞ্চল জিজ্ঞেস করলে,‘এখন কি আমাকে কিছু করতে হবে?
তিনকড়ি হেসে বললে, না, না, এই তাে এলেন। এখন
একটু বিশ্রাম করুন। এদের কাজ তাে আপিশের কাজের
মতাে টাইম-বাঁশ নয় হয়তাে দিনের পর দিন নড়েও বসতে
হচ্ছে
—আবার হঠাৎ এমন চাপ পড়লাে যে দিনে খাওয়া
হয় না, রাত্তিরে ঘুম চুলােয় যায়। হা—একটা কথা, আমাকে
ততা সব সময় পাবেন না, যখন যা দরকার তাকে ডেকে
বলবেন—সে আপনারই খাশ চাকর, আপনার দরজার বাইরে
সব সময় সে মােতায়েন থাকবে। ঐ টেবিলের গায়ে লাগানাে
বেলটা একবার টিপুন।
চঞ্চল বেল টিপতেই দরজার বাইরে ক্রিং ক্রিং করে শব্দ
হ’লল, আর সঙ্গে-সঙ্গেই বছর বারাে-তোেের ফুটফুটে একটি
ছেলে ঘরে ঢুকে সেলাম করে দাঁড়ালাে।
তিনকড়ি বললে—এই যে, এর নাম তারা। একে দরকার
হলেই ঐ বেলটা টিপবেন, হাঁকডাক না-করাই ভালাে। কত্তা
যাঁচামেচি একেবারেই সইতে পারেন না। এখন কি আপনার
কোনাে দরকার আছে?
না, না, দরকার আর কী-ওকে না হলেও আমার
চলতাে।
')
১২
কাল-বৈশাখীর ঝড়
4
তিনকড়ি গম্ভীরভাবে বললে, আপনার চলতে পারে, কিন্তু
শােভাবাজারের দত্তদের চলে না। তাদের একটা মান-সন্ত্রম
আছে তাে। তা, এক কাজ কর, বাবুর স্যুটকেস খুলে
জামা-কাপড়গুলাে দেরাজে গুছিয়ে রাখ। চাবিটা ওকে দিন।
‘ওটা খােলাই আছে।
তারা স্যুটকেস খুলে সমস্ত কাপড়চোপড় চটপট দেয়াজে
গুছিয়ে ফেললাে—অতটুকু ছেলের নৈপুণ্য দেখে চঞ্চল অবাক
-হয়ে পারলে না।
“ঠিক আছে। এখন তুই যা।
তারা চলে যাওয়ার পর তিনকড়ি বললেন, “আমিও এখন
যাই—আপনার খাবারটা পাঠিয়ে দিইগে।
চঞ্চল অবাক হয়ে বললে, খাবার! এখন খাবার কেন ?
মােটে তাে নটা বাজলল! •
‘এখনই তাে খাবার সময়। দুপুরের খাওয়ার দেরি
আছে—একটার সময়। তখন আপনি কত্তার সঙ্গে বসেই
খাবেন—তিনি তা-ই বলেছেন।
‘তা হােক, এখন আমার কিছু না খেলেও চলতে পারে।
‘না, না, তা কি হয় ! আপনি ব্যস্ত হবেন না, এবাড়ি
হালচাল দু’দিনেই বুঝে নেবেন।
এই বলে তিনকড়ি বেরিয়ে গেলাে। মিনিট কুড়ি পরে
টোকা পড়লাে ঘরের দরজায়। চঞ্চল ব্যস্তসমস্ত হয়ে দরজা
খুলে দিতেই দেখলাে একজন উর্দি-আঁটা চাকর ধবধবে শাদা
কাল-বৈশাখীর ঝড়
কাপড়ে ঢাকা মস্ত একটি ট্রে হাতে নিয়ে দাড়িয়ে। তাকে
সেলাম করে সে ট্রে-টি রাখলে কঁচ-সানাে গােল টেবিলের
উপর। তারপর ট্রের উপরকার কাপড়টি ভুল নিয়ে আবার
সেলাম করে একটি কথা না-বলে বেরিয়ে গেলাে—যাবার
সময় ঘরের দরজাটি ভেজিয়ে দিতেও ভুললাে না।
এ কী কাণ্ড! দু'দিন আগেও যে ছিলাে মেসের চাকর,
তার কিনা আজ এই রাজার হাল! বিলিতি বাসনে করে
চা, ডিম, রুটি-মাখন, সন্দেশ, সরভাজা, কলা, আপেল—একজন
মানুষ কি এত খেতে পারে! সুসজ্জিত সুদৃশ্য খাবারগুলির
দিকে চঞ্চল খানিকক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলােবাস্তবিক, এ
দেখেও সুখ! তারপর আস্তে-আস্তে খেতে আরম্ভ করলাে,
বাসনগুলাে নাড়াচাড়া করতেও তার ভয় হলাে—পাছে টুক
করে কোনােটা ভেঙে যায়! যাহােক, আস্তে-আস্তে খেতে
খেতে আধঘণ্টার মধ্যে সে সবই খেয়ে উঠলাে—সত্যি যে তার
পেটে এত খিদে ছিলাে তা আবিষ্কার করে সে নিজেই গেলাে
অবাক হয়ে। তারা এসে বাসনগুলাে নিয়ে চলে গেলাে,
তারপর চঞ্চল গদি-আঁটা মস্ত ইজি-চেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে
শুয়ে একখানা নভেল খুলে বসলাে—তার স্যুটকেসে খানকয়েক
বইও সে নিয়ে এসেছিলাে। চারদিক চুপচাপ, জানলা দিয়ে
প্রথম বসন্তের ঝিরঝিরে হাওয়া গায়ে এসে লাগছে, বইয়ের
পাতার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে চঞ্চল মনে-মনে বললে-
এত সুখ আমার কপালে সইলে হয়!
তিন ঠিক একটার সময় গং করে একটা গম্ভীর মধুর ঘণ্টা বাজলাে। তারা এসে বললে-খাবার দেয়া হয়েছে। চলুন। ইতিমধ্যে চঞ্চল স্নান করে, ধােপদুরস্ত জামাকাপড় পরে যথাসম্ভব ফিটফাট হয়ে নিয়েছিলাে। তারার পিছন পিছন সে অটলবাবুর খাশ মহলে এসে ঢুকলাে। পাশাপাশি তিনটে ঘর, সংলগ্ন চওড়া বারান্দা বরাবর চলে গেছে। প্রথম ঘরটি —এটি চঞ্চলের ঘরের ঠিক পাশে—তার শােবার ঘর। দ্বিতীয় ঘরটি ছােটো, সেটি খাবার ঘর। তারপরে আর-একটি মস্ত ঘর, সেটি বসবার ঘর, কিন্তু তার ব্যবহার বড় একটা হয় । দোতলায় পুরােনাে আমলের বৈঠকখানাতেই অটলবাবু লােকজনের সঙ্গে দেখা করেন। চঞ্চলকে ঢুকতে হলাে খাবার ঘরে। গােল টেবিল দু’জনের মতাে সাজানাে, আশে-পাশে চাকররা ঘােরাঘুরি করছে। দেয়ালে ঝুলছে ভারতীয় চিত্রকলার কয়েকটি নিদর্শন। চঞ্চল তারই একটি ছবি মন দিয়ে দেখছে, এমন সময় অটলবাৰু ঘরে ঢুকে তার নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। চঞ্চলও তাড়াতাড়ি সরে এসে তার পাশের জায়গাটিতে বসতে যাবে, হঠাৎ অটলবাবু অদ্ভুত উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন—এ কী! এ- সব কী?
কাল-বৈশাখীর ঝড় . চাকর তাড়াতাড়ি ছুটে এসে বললে, হুজুর ! ‘এ-সব. কী? ব’লে অটলবাবু টেবিলের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন। চঞ্চল ঠিক বুঝতে পারলে না ব্যাপারটা কী। চাকরটিও হাঁ করে তাকিয়ে রইলাে। কোথেকে তিনকড়ি ছুটে এসে বললে, “আজ্ঞে ভুল হয়ে গেছে। ও-লােকটা নতুন, ওকে বলে দেয়া হয়নি। এই হুজুরের ছুরি-কাটা সরিয়ে নিয়ে যাও। কোনদিন আর ও- সব দেবে না। চাকরটি নিঃশব্দে আদেশ পালন করলে। চঞ্চল বললে, ‘তাহলে আমার গুলােও তুলে নিতে বলুন। কোনােদিন ছুরি-কাঁটা দিয়ে খেয়ে অভ্যেস নেই— ‘বেশ তাে’,তিনকড়ি বললে, “আপনি হাত দিয়েই খাবেন। একটু পরে অটলবাবু বললেন, ‘ও-জিনিসগুলাে আমি দু’চক্ষে দেখতে পারিনে। যত সব বিজাতীয় উপদ্রব। এদিকে বাবার আমল থেকে ও-সব জিনিস অনেক রয়ে গেছে ওগুলােকে ফেলে দিতেও পারিনে। তিনকড়ি, এ-রকম ভুল চাকররা যেন আর কক্ষনাে না করে, বুঝলে? ‘আজ্ঞে ওদের ভালাে করে বুঝিয়ে বলে দেবে। ‘এসাে হে চঞ্চ হে চঞ্চল, আরম্ভ করা যাক’, ব’লে অটলবাবু শুক্তো দিয়ে একটু ভাত মাখলেন। ভদ্রলােকের এই ছুরিকাটা-বিদ্বেষ চঞ্চলের, কিন্তু একটু
কাল-বৈশাখীর ঝড--
“এরকম ভুল চাকররা যেন আর কক্ষনাে না করে।”
পৃঃ--১৬
No text on this page.
কালবৈশাখীর ঝড়
অস্বাভাবিক ঠেকলাে। হয়তাে তিনি দিশি আচার-ব্যবহারের
পক্ষপাতী, হয়তাে সেটা ভালােই, কিন্তু চাকরটা ভুল করে
ছুরি-কাটা সাজিয়ে দিয়েছিলাে বলে এমন উত্তেজিত হবারই
বা কী কারণ হতে পারে ? অটলবাবুর মুখ পর্যন্ত যেন একটু
ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলো, কথা বলতে গিয়ে গলার স্বরও
কঁপছিলাে। কী জানি, চঞ্চল মনে-মনে ভাবলে, বড়লােকরা
বােধ হয় এইরকমই, তাদের বাধা নিয়মের পান থেকে চুণ
খসলেই বােধ হয় তারা চটে যান।
অটলবাবুর খাওয়া কয়েক মিনিটের মধ্যেই হয়ে গেলাে।
তিনি খেলেন ঠিক দু চামচে ভাত, একটু শুক্তো, একটু
মাছের ঝােল, খানিকটা পুডিং। অত অল্প খেয়ে অত বড়াে
মানুষটা বেঁচে থাকেন কী করে? এদিকে রান্নার বিপুল
আয়ােজন, কত রকম মাছ-মাংস তরকারি, সে আর ফুরােয় না
—এত সব রান্না কি শুধু চঞ্চলেরই জন্য? চঞ্চল মনে-মনে
অত্যন্ত লজ্জিত হলাে।
যেন তার মনের কথাটা আঁচ করে নিয়ে অটলবাবু বললেন,
‘তুমি তাড়াহুড়াে কোরাে না, আস্তে-আস্তে খাও, আমি
বসছি। টেবিলে বসেই তিনি হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে একটা
মােটা চুরুট ধরালেন।
চঞ্চল ভয়ে-ভয়ে বললে, ‘অপরাধ না নেন তো একটা কথা
বলি।
‘বলল, বলল, যা ইচ্ছে তা-ই বলল। তােমার কাজই তো
১৭
কাল-বৈশাখীর ঝড় আমার সঙ্গে কথা বলা। আমার চেহারাটা ভয়ঙ্কর হতে পারে কিন্তু মানুষটা আমি নেহাৎ মন্দ নই। চঞ্চল বললে, আপনি তাে কিছুই খেলেন না, তাহলে অনর্থক এত সব ‘অনর্থক কেন? তুমি খাবে। ‘আমার জন্যে এত সব কেন ? আপনি যা খান আমি তাে তা-ই খেতে পারি। অটলবাবু হাে-হ করে হেসে উঠে বললেন, ‘পাগল নাকি! আমার অসুখ বলে অনেক কিছুই খাওয়া বারণ, তাই বলে তুমি কেন কষ্ট করবে ? খাও, খাও, লােককে খেতে দেখতে আমার খুব ভালাে লাগে। চঞ্চল সাহস পেয়ে জিজ্ঞেস করলে, কী অসুখ আপনার ? অটলবাবু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, ‘সে আছে নানারকম। তারপর, একটু চুপ করে থেকে আবার হেসে বললেন, তুমি নিশ্চয়ই মনে-মনে ভাবছো আমি সব সময় এরকম ভারি কাপড়চোপড় পরে থাকি কেন? চঞ্চল প্রথমেই লক্ষ্য করেছিলাে যে এই দুপুরবেলাতেও অটলবাবুর পরনে সেই সব ভারি কাপড়চোপড়। পায়ে মােজা, গলা থেকে পা পর্যন্ত আলখাল্লা। মাঘের শেষ, দুপুর- বেলাটা রীতিমতাে তেতে ওঠে, এ-সময়ে এ-রকম পােষাক পরে বাড়িতে বসে থাকা একটু আশ্চর্য বইকি। চঞ্চলের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে অটলবাবুই আবার ১৮
কাল-বৈশাখীর ঝড়
বললেন, এরও কারণ আমার অসুখ। বারােমাস আমাকে
এইরকম কাপড়চোপড় পরে থাকতে হয়।
‘গ্রীষ্মকালেও ?
‘হ, গ্রীষ্মকালেও। আর বলাে কেন—আমার মতাে স্বাস্থ্য
নিয়ে বেঁচে থাকাই এক বিড়ম্বনা।
চঞ্চল বললে, আপনাকে দেখে কিন্তু একটুও অসুস্থ মনে
হয় না।'
‘সেটাই তাে আরাে খারাপ। আমাকে দেখে কেউ
বিশ্বাসই করতে চায় না যে আমার কোনাে অসুখ থাকতে
পারে। অথচ
অটলবাবু অত্যন্ত আকস্মিকভাবে থেমে গেলেন।
চঞ্চলের মনে হলাে তার অত বড়ো শরীর যেন
মুহূর্তের জন্য একটু কেঁপে উঠলাে। একটু পরে, নিজেকে যেন
সামলে নিয়ে তিনি বললেন, এখানে তােমার বােধ হয় খুব
ভালাে লাগবে না, সমবয়সী কেউ নেই।
না, না, কিছু খারাপ লাগবে না।
‘তােমার যখনি বেরােবার ইচ্ছা হবে আমাকে বােলাে-
লজ্জা কোরাে না। মাঝে-মাঝে বেড়িয়ে-টেড়িয়ে এসাে।
সিনেমা দেখতে ভালােবাসাে?
‘আপনি কি সব সময় বাড়িই থাকেন?
বেশির ভাগই। এক-আধ সময় গঙ্গার ধারে হাওয়া
খেতে যাই। ঘরেই আমার ভালাে লাগে।•••আচ্ছা, আমি
কাল-বৈশাখীর ঝড়
উঠি এখন। তুমি একটু বিশ্রাম করে গিয়ে, আধঘণ্টাখানেক
পরে তােমাকে ডেকে পাঠাবে।
খাওয়ার পরে চঞ্চল স্প্রিংএর গদি-আঁটা বিছানায় একটু
গড়িয়ে নিলে। ঠিক আধ ঘণ্টা পরে তার ঘরের ঘণ্টা বেজে
উঠলো। চঞ্চল এক মুহূর্তও দেরি করলে না, গিয়ে হাজির
হলাে অটলবাবুর শােবার ঘরে।
প্রকাণ্ড ঘর। আর তাতে আসবাবপত্র যে কত রকম,
তার বর্ণনা না-দিলেও চলবে। জানলার ধারে একটি বিশাল
জি-চেয়ারে অটলবাবু ডুবে আছেন। হাতের কাছে টেবিলে
কয়েকটি বই। তা থেকে একটি মােটা বই তুলে নিয়ে
তিনি বললেন, ‘এসাে, চঞ্চল। নতুন “রবীন্দ্র-রচনাবলী
এসেছে। “লক্ষীর পরীক্ষাটা আমাকে একটু পড়ে শােনাও
চঞ্চল বইখানা হাতে নিয়ে বললে, ‘পাতাগুলাে কাটা
নেই। একটা ছুরি',
অটলবাবু কেমন যেন চমকে উঠে বললেন, 'না, না, ও-সব
নেই, ও-সব আমার কাছে থাকে না।
চঞ্চলের মনে হলো ‘ছুরি” কথাটাও তিনি যেন উচ্চারণ
করতে চান না।
‘ঐ টেবিলের উপর দ্যাখাে একটা paper-cutter আছে,
তা দিয়ে যা-হয় করে নাও।
ভদ্রলােক কি ঘাের বৈষ্ণব ? চঞ্চল মনে-মনে ভাবলে,
কাল-বৈশাখীর ঝড়
ছুরি, কাটা, এ-সব কথা মুখে পর্যন্ত আনতে চান না ! না,
তা তাে হতে পারে না! এদিকে মাছ-টাছ তাে খান।
পাতা কেটে নিয়ে চঞ্চল ‘লক্ষীর পরীক্ষা পড়তে আরম্ভ
করলাে। 'অটলবাবু খুব মন দিয়ে শুনতে লাগলেন, তার যে
খুব ভালাে লাগছে সেটা বেশ বােঝা গেলো। কিন্তু আদ্ধেক
পড়া হ’তেই তিনি বললেন, ‘আজ এই থাক, কাল আবার
শুনবাে। রেডিওটা উনিশ মিটারে একটু দাও তে—তিনটের
সময় মস্কো থেকে ইংরিজিতে খবর বলে-কী বলে ওরা শােনা
যাক।
দেয়াল ঘেঁষে প্রকাও একটি রেডিওগ্রাম দাড়িয়ে ; চঞ্চল
বই বন্ধ করে উঠে উনিশ মিটারে মস্কো ধরলে। দামি সেটে
কথাগুলাে এত পরিষ্কার আসতে লাগলাে যেন কেউ ঘরে বসে
কথা বলছে।
মিনিট কুড়ি রুশ খবর শােনা হলাে, তারপর অটলবাবু
বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথের নতুন বই ক’টা আনতে হবে। একটা
চিঠি লিখে দাও তাে দোকানে। ঐ টেবিলে কাগজ-কলম সব
আছে।
চঞ্চল টেবিলের ধারে বসে দেখলাে নানা আকারের নানা
হঁদের দামি-দামি চিঠির কাগজ সাজানাে। কিন্তু আশ্চর্যের
বিষয় কলম বলতে আছে কয়েকটা পালকের কলম, আর মাটির
দোয়াতে দিশি কালি—একটা ফাউন্টেন পেন কি একটা
নিবের কলম কি একটা পেন্সিল পর্যন্ত নেই। আজকালকার
২১
কাল-বৈশাখীর ঝড়
দিনে কেউ যে পালকের কলমে লেখে, তা তার ধারণা ছিলো
। বিশেষত অটলবাবুর মতাে ধনী, সব বিষয়েই সবচেয়ে
ভাললটি না-হলে যার চলে না, তিনি কেন আদ্যিকালের
পালকে লিখতে যাবেন ! সে জিজ্ঞেস না-করে পারলে না,
‘আপনি এই কলমে লেখেন!
অটলবাবু একটু যেন লজ্জিতভাবে বললেন, আমরা
সেকেলে লােক, ও-সব সেকেলে জিনিসই আমাদের ভালাে ।
তুমি অবশ্য ইচ্ছে করলে ফাউন্টেন-পেনে লিখতে পারাে।
তােমার নিজের না থাকে, আমি আনিয়ে দেবােখন।
না, না, কী আশ্চর্য, আমি এমনিই জিজ্ঞেস করলুম
কথাটা। ফাউন্টেন-পেন দরকার হলে আমি নিজেই কিনে
নেবাে•••হা, কী-কী বই আনাবেন, বলুন।
অটলবাবু বইগুলাের নাম বলে গেলেন, আর চঞ্চল চিঠিটা
লিখে ফেললাে। তারপর আরাে দু'একটা চিঠি লিখতে হ’লল,
একটা ওষুধের দোকানে, একটা কর্পোরেশনের আপিশে।
শেষেরটা ইংরেজিতে, তাই টাইপ করে দিতে হলাে।
“কলকাতা হরকরা”র আপিশে কাজ করবার সময় এসব
কাজই সে অল্প-বিস্তর শিখেছিলো।
টাইপ-রাইটারটা বন্ধ করে রাখতে-রাখতে চঞ্চল বললে,
‘কলমের ব্যাপারে আপনি এত সেকেলে, অথচ টাইপরাইটার
তত রেখেছেন।
ইংরেজি লেখার জন্য আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতে দোষ
কাল-বৈশাখীর ঝড়
নেই। ও-সব যাবনিক ভাষা কিনা, তাই লেখবার উপায়ও
দানবিক। পবিত্র দেবভাষার কন্যা আমাদের বাংলাভাষাকে
কি বিশুদ্ধ পালকের কলম ছাড়া অন্য কিছুতে মানায়!
চঞ্চল হেসে বললে, ‘চমৎকার থিওরি! এ-বিষয়ে আপনি
একটি প্রবন্ধ লিখলে মন্দ হয় না।
অটলবাবুও হেসে বললেন, তােমরা ছেলে-ছােকরা মানুষ,
তােমরা তাে এ নিয়ে হাসিঠাট্টা করবেই। সে যাকগে, এখন
তােমার ছুটি। সাড়ে চারটের সময় আমাকে “মাসাজ করবার
জন্য লােক আসবে, তার আগে একটু বিশ্রাম করে নিই।
চঞ্চল আর-কোনাে কথা না-বলে নিজের ঘরে চলে এলাে।
এই নাকি তার একদিনের কাজ! এ তাে কিছুই নয়।
চার
চঞ্চলের নতুন চাকরির প্রথম সপ্তাহ কেটে গেলো। কাজ
তার নামমাত্র ; দিনে পাঁচবার রাজার হালে খাওয়া আর
মসৃণ বিলাসিতার মধ্যে সময় কাটানাে—এ-অবস্থা তার পক্ষে
একান্তই অবিশ্বাস্য। ইতিমধ্যেই তার চেহারায় সুখে থাকার
চিহ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে । তার গাল উঠেছে ভরে এবং
সে-গালে লেগেছে লালের অভা। এভাবে যদি মাসখানেক
চলে, চঞ্চল মনে-মনে বললে, তাহলে আমি রীতিমতাে মােটা
আর রীতিমতাে ভোতা হয়ে যাবাে।
কিন্তু বেশিদিন এই আরামে কাটানাে চঞ্চলের কপালে
ছিলাে না। হঠাৎ এমন ভয়ঙ্কর এক দুর্ঘটনা ঘটলাে যা কখনাে
কল্পনাও করা যায় না।
তবে ভবিষ্যৎ তাে কেউ দেখতে পায় না, তাই চঞ্চল এখন
বেশ নিশ্চিন্তই। আপাতত সে অটলবাবুর সম্বন্ধে মনে-মনে
কতগুলাে কথা ভেবে নিয়েছে। সেগুলাে এই
প্রথমত, ভদ্রলােক জীবনটা কাটান একেবারেই কিছু না-
করে। বিষয়-সম্পত্তির দেখাশােনার ভার সম্পূর্ণ কর্মচারীদের
পরেই ন্যস্ত, হয়তাে তারা প্রচুর চুরিও করে (তিনকড়ির
নাকি দেশে তিনখানা পাকা বাড়ি আর বিস্তর জমি-জমা ),
কিন্তু সে-বিষয়ে ভদ্রলােক একেবারেই উদাসীন। তার একমাত্র
২৪
কাল বৈশাখীর ঝড়
।
;
কারণ—চঞ্চল যতদূর বুঝতে পেরেছে—তার অগাধ শারীরিক
আলস্য। এত অলস মানুষ চঞ্চল কখনাে ছাখেনি। যে-সব
কাজ করবার জন্য তাকে রাখা হয়েছে, তা কোনাে কাজই
নয়; কিন্তু ভদ্রলােক এতই অলস যে বইয়ের পাতা উল্টিয়ে
দেবার জন্যও লােক দরকার—ব’সে-শুয়ে থাকা ছাড়া কিছুই
যেন তিনি পারেন না। সেইজন্যই চঞ্চলের কপালে এমন
সুখের চাকরিটা জুটেছে । কিন্তু এত অল্প কাজ তার আবার
ভালাে লাগে না—শরীর-মন প্রায়ই ছটফট করে।
দ্বিতীয়ত, অটলবাবু লােক সত্যি খুব ভালাে। শুধু যে
ভালােমানুষ তা নন, বেশ বুদ্ধিমান ও উচ্চশিক্ষিত। লেখাপড়া,
গান-বাজনা, চিত্রকলা সবটাতেই খুব উৎসাহ আছে। বাড়ি-
ভরা বই, ছবি, গ্রামােফোনের রেকর্ড। কখনাে বই পড়েন--
কিংবা চঞ্চল পড়ে শােনায়—কখনাে রেডিও কি রেকর্ড
শশানেন, এইভাবেই মােটামুটি তার সময় কাটে। কিন্তু
কিছুতেই যেন নিবিষ্ট হতে পারেন না, থেকে-থেকে অন্যমনস্ক
হয়ে পড়েন, খানিক পরেই যেন ক্লান্তি আসে। সত্যিকারের
কোনাে আনন্দই যেন তার জীবনে নেই, একটু পরে সবই
বিস্বাদ হয়ে পড়ে। চঞ্চলের মনে হয় তাঁর মনের মধ্যে
কোনাে-একটা গােপন কথা সব সময় ঘুরপাক খাচ্ছে, সে-কথা
কাউকে বলতেও পারেন না, অথচ সইতেও পারেন না। এত
টাকার মালিক হয়েও জীবনে যে তার সুখ নেই, এ-কথা
নিঃসন্দেহ।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
;
তৃতীয়ত, এটা চঞ্চল খুব ভালাে করে লক্ষ্য করে দেখেছে
—অটলবাবুর মৃত্যুভয় অসাধারণ। মরবার ভয়ে তিনি যেন
আগে থেকেই মরে আছেন। রােজ সকালে ডাক্তার আসছে,
হার্ট পরীক্ষা করছে, নিচ্ছে ব্লাড প্রেশার ; অকারণে রাশি-রাশি
ওষুধ গিলছেন তিনি, বিকেলে নিচ্ছেন মাসাজ, শরীরের
সাধারণ অবস্থা ডাক্তারের কাছে রিপাের্ট করবার জন্য একজন
মাইনে-করা নর্স ই আছে—মােটের উপর এক তুমুল কাণ্ড,
তাছাড়া টাকার যা শ্রাদ্ধ তা আর বলবার নয় ।
শুধু এই নয়, যে-কোনােরকম ধারালাে কি তীক্ষ্ণ যন্ত্র
অটলবাবু তার ধারে-কাছে আসতে দেন না, খাবার ছুরি-কাটা,
পেনসিল-কাটা ছুরি, কি একটা আলপিন পর্যন্ত নয়। এমন
কি, তিনি যে নিবের কলম কি ফাউন্টেনপেন কি
পেনসিল ব্যবহার করেন না, তারও কারণ ঐরকম ব'লে
চঞ্চলের সন্দেহ হয়-ও-সব জিনিসেরও তীক্ষ অগ্রভাগে যেন
তাঁর অবিশ্বাস। এর প্রমাণ প্রথম দিন থেকে : চঞ্চল এত
বার এত ভাবে পেয়েছে যে, এ-বিষয়ে তার মনে তিলমাত্র
সন্দেহ নেই যে ধারালাে কি তীক্ষ্ণ জিনিস সম্বন্ধে অটলবাবুর
মনে অসম্ভব আতঙ্ক। তিনি যে দাড়ি রেখেছেন—চঞ্চলের
দৃঢ় বিশ্বাস—তাও চেহারাটা রবীন্দ্রনাথের মতাে করবার
জন্য নয়, ক্ষুর ব্যবহার করতে তিনি ভয় পান বলে।
এর মধ্যে একদিন নর্স তার নখ কেটে, চুল ছেটে দিলে—
ও-সব কাজেও সাধারণ নাপিতকে তিনি বিশ্বাস করেন
কাল-বৈশাখীর ঝড়
, সপ্তাহে একদিন নর্স ই নাপিতের কাজ করে দেয়,
আর সে-সময়ে অটলবাবু কেমন যেন ঘাবড়ে জবুথবু হয়ে
যান-অপারেশন করাতে হলে লােকের যে-অবস্থা হয়,
অনেকটা সেইরকম। ঐ একই কারণে—চঞ্চলের মনে হয়
তিনি সব সময় ও-রকম ভারি-ভারি জামা-কাপড় পরে থাকেন;
মৃত্যু যেন কিরাতের মতাে সব সময় তাকে শরসন্ধান করে
ওৎ পেতে আছে—কখন তীর ছেড়ে ঠিক নেই, ভারি কাপড়
পরেও হয়তাে সেই তীরকে খানিকটা ঠেকিয়ে রাখতে
পারবেন।
কিন্তু এরকম হবার কারণ কী ? ভদ্রলােকের কি মাথা
খারাপ ? চঞ্চল শুনেছে যে কোনাে-কোনাে লােকের রােগ
সম্বন্ধে এমন প্রবল আতঙ্ক থাকে যে সেটাই একটা ব্যাধিতে
দাড়িয়ে যায়। কিন্তু এমনিতে তাে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে
তাকে মােটেও অপ্রকৃতিস্থ মনে হয় না, ঐ একটা বিষয়ে ছাড়া
তিনি সম্পূর্ণ ই প্রকৃতিস্থ। নাকি, তার জীবনের এমন-কোনাে
গুপ্ত রহস্য আছে, এমন কোনাে ভয়ানক শত্রু আছে যে তিনি
সব সময়ই ভয়েভয়ে থাকেন যে কেউ তাকে খুন করে
ফেলবে। মানুষের প্রাণ নিতে খুব বেশি কিছু লাগে না,
একটা খাবার ছুরি দিয়েও খুন করা যায়।
দিয়েও খুন করা যায়। হয়তো সেই
রকমই কোনাে আতঙ্ক ভদ্রলােকের জীবন বিষময় করে
তুলেছে।
আর-একটা কথা চঞ্চলের প্রায়ই মনে হয় : ভদ্রলােকের
৭
२१
কাল-বৈশাখীর ঝড়
অসুখটা কী ? কেন তিনি অত অল্প খান, অত সাবধানে
থাকেন? হয়তাে কোনাে অসুখই নেই, অসুখের আতঙ্কই
তাঁকে কাবু করে রেখেছে। যে-ডাক্তারটি বােজ আসেন,
তার সঙ্গে এ-বিষয়ে কথা বলবার চেষ্টা সে করেছে, কিন্তু
সুবিধে হয়নি। অটলবাবুর নিয়ম-কানুনের কড়াক্কড় খুব ?
ডাক্তার কি নর্স যখন আসবে তখন আর-কেউ ঘরে
যেতে পারবে না, চঞ্চল যখন ঘরে থাকে তখনও অন্য-কেউ
আসে না—সকলের জন্যই তার সময় ভাগ-ভাগ করা
আছে।
একদিন বিকেলের দিকে তিনকড়ি চঞ্চলের ঘরে এসে
বললে, ‘কর্তা বললেন আপনি যদি বেরােতে চান বেড়িয়ে
আসতে পারেন। আপনি মােটেও বেরােন না বলে তিনি
উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন—হয়তাে আপনার কষ্ট হবে।
‘না, না, আমি বেশ আছি। আপনি বসুন না। আপনার
সঙ্গে একটু কথা আছে।
‘কী কথা বলুন।
‘আচ্ছা, আপনি কি জানেন অটলবাবুর অসুখটা কী।
কী যেন, তা তাে জানিনে। তাছাড়া জেনেই কী
করবো বলুন, বড়ােলোকের কত রকমের অসুখ—আমরা তার
কী বুঝবাে ?
‘তবু-কিছু মনে হয় না আপনার ? এত ডাক্তার-নুরে
আনাগােনা, জলের মতাে পয়সা খরচ-এর কি কোনাে ন
২৮
কাল-বৈশাখীর ঝড় নেই? আপনি তাে অনেকদিন আছেন—কী মনে হয় আপনার ? ‘এ-রকম কিছু-একটা না-হলে সংসার চলবে কেমন করে বলুন? অটলবাবুর অগাধ সম্পত্তি, খরচ তাে কিছু নেই ভগবান এ-ভাবেই তার খাজনা আদায় করে নিচ্ছেন। ‘আচ্ছা, উনি কি বরাবরই এ-রকম একা-একা থাকেন ? ‘বরাবর থাকবেন কেন—মা-ঠাকরুন যদ্দিন ছিলেন, ঘর- বাড়ি ভরাই ছিলাে। আত্মীয়-স্বজনের, বন্ধু-বান্ধবের আনাগােনা ছিলাে সব সময়। কিন্তু ঘরের লক্ষীও বিদায় হলেন, সঙ্গে- সঙ্গে সবই গেলাে। বিশাল পুরী এখন খাঁ-খাঁ করছে। ওঁরও মন-মেজাজ বিশেষ ভালো নেই—লােকজন এলে বিশেষ পছন্দও করেন না, নিজের মনে একা-একাই পড়ে আছেন। ‘ওঁর তাে ছেলেপুলেও নেই ? ‘না, তা থাকলে আর ভাবনা ছিলল কী, বাড়িঘর ভরা থাকতাে। কিন্তু এমন কপাল, একটা ছেলে পর্যন্ত হলাে না। এত ঐশ্বর্য ভােগ করে কে? থাকবার মধ্যে আছেন এক বিধবা বােন, তিনি তার একটিমাত্র মেয়ে নিয়ে কেন্টনগরে থাকেন। এই ভাগনিকে উনি খুব ভালােবাসেন। ‘ওঁরা এখানে আসেন না মাঝে-মাঝে ? ‘বিশেষ না। তবে কত্তাই মাঝে-মাঝে যান ভাগনিকে দেখতে। আগে তাে খুব ঘন-ঘনই যেতেন। ইদানিং খুব কমে এসেছে, বছরে দু’একবারের বেশি দেখাশােনা হয় না।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
‘তাই নাকি?
‘এ আর আশ্চর্য কী বলুন। দু'দিন পরে ভাগনির বিয়ে
হয়ে যাবে, তখন আমার সঙ্গে বছরে ক’বার দেখা হবে ভেবে
দেখুন। লীলার এই ষােলাে বছর বয়েস হ’লল, ম্যাট্রিক পাশ
করলো এবারে। এখন মেয়েটার বিয়ে, হয়ে গেলেই কি
কত্তার নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয় ?
সে তাে বটেই। বিয়ে হচ্ছে বুঝি শিগগিরই।
‘সে-কথা আর বলেন কেন, ওখানেই তো যত গােলমাল,
ব’লে তিনকড়ি হঠাৎ চুপ করলাে।
চঞ্চল জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকাতেই তিনকড়ি গলা
খাটো করে বলতে লাগলাে, আপনি আজ নাহােক কাল
সবই জানতে পারবেন—আপনাকে বলতে বাধা নেই। ভাগনির
বিয়ে দিতে কত্তার একেবারে মত নেই।
‘তার মানে ?
‘মানে আর কী! তিনি পণ করে বসেছেন লীলার বিয়ে
দেবেন না।
‘কোনােদিনই না?”
কোনােদিনই না।
চঞ্চল একটু চুপ করে থেকে বললে, ‘এমন অদ্ভুত কথা তাে
কখনাে শুনিনি।
তবেই বুঝুন! কত্তার এক বাল্যবন্ধু আছেন হরেনবাবু
হাওড়ার মিত্তির ওঁরা, মস্ত ঘর—তিনি তার ছেলের সঙ্গে
কাল-বৈশাখীর ঝড়
লীলার বিয়ে দিতে চান। ছেলেও চমৎকার, রূপে-গুণে
কোনাে খুতই নেই, বি. এ. পাশ করে এম. এ., ল. পড়ছে
যাকে বলে একেবারে ঘরে-বরে সমান। বাপ নেই মেয়েটার
—এখানে বিয়ে হলে একটা গতি হয়। আপনিই বলুন ঠিক
বলছি কিনা।
এ-রকম একটা ব্যাপারে চঞ্চলের মতামত দেবার কথাই
ওঠে না, নেহাৎ ভদ্রতা করেই সে বললে, তা তাে ঠিকই।
“ঠিক নয়!' তিনকড়ি উৎসাহিত হয়ে বলতে লাগলাে,
‘এ তাে ছেলেমানুষেও বােঝে। এদিকে লীলার মা-ও দাদাকে
ঘন-ঘন তাগাদা দিয়ে চিঠি লিখছেন। অথচ ওঁর ঐ এক অদ্ভুত
জেদ-লীলার বিয়ে দেবেন না, কিছুতেই না।
এর কারণ কিছু অনুমান করতে পারেন?
‘কারণ আবার কী? খেয়াল, বড়ােমানুষের খেয়াল !
হরেনবাবু পাটনায় ওকালতি করেন, তিনি তাে সেদিনও
লম্বা চিঠি লিখেছেন দেখলুম।
‘আপনি দেখলেন সে-চিঠি ?
‘হাঁ, আমি ওঁর বাবার আমলের চাকর—তাই উনি অনেক
কথাই আমাকে বলেন। হরেনবাবু কী যে অনুনয়-বিনয় করে
লিখেছেন—ছেলের বাপ হয়ে কেউ ও-রকম করেন না।
‘আর অটলবাবু?
‘অটলবাবু অটল। কিছুতেই না—এ ছাড়া তার মুখে কথা
নেই। হরেনবাবু লিখেছেন শিগগিরই কয়েকদিনের জন্য
৩১
কাল-বৈশাখীর ঝড় কলকাতায় আসবেন—তখন এ-ব্যাপারটা একেবারে পাকা করে যেতে চান। চঞ্চল হঠাৎ বললে, “আচ্ছা, অটলবাবুর কোনাে ভাই-টাই নেই ? ‘এক ভাই ছিলো, সে মারা গেছে। ‘কী হ'য়ে ? ‘তা ঠিক জানিনে-ড্যালহৌসি না আলমােড় কোথায় গিয়েছিলাে বেড়াতে, সেখান থেকে আর ফেরেনি। অটল- বাবুর বডড লেগেছিলাে। বছর দশেক তাে হয়ে গেলাে, কিন্তু এখনাে ভায়ের কথা কেউ বললেই অস্থির হয়ে পড়েন। ‘তাহলে এই ভাগনিই এই বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধি- কারিণী ? ‘তাই তাে দাঁড়াচ্ছে। লীলাকেই উনি উইল করে যথা- সর্বস্ব দিয়ে যাবেন, আমরা তাে তা-ই জানি। হরেনবাবুর এত বেশি গরজের কারণও বােধ হয় তা-ই ? তিনকড়ি বললে, একথা বললে, অন্যায় হয়। হরেনবাবু অতি সাধু পুরুষ, কর্তার বিশেষ বন্ধু-শীলাকে ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছেন, এবং তাকেই যে পুত্রবধূ করবেন অনেক আগে থেকেই বােধ হয় মনে-মনে এ-কথা ভেবে রেখেছেন। চঞ্চল একটু চুপ করে থেকে বললে, ‘অটলবাবুর এই অদ্ভুত জেদের একমাত্র কারণ যা হতে পারে-
কাল-বৈশাখীর ঝড়
তিনকড়ি উদ্গ্রীব হয়ে বললে, “কী? কী কারণ আপনার
মনে হয় ?
‘পরের ছেলে এত বড়াে সম্পত্তির মালিক হবে তাতেই
বােধ হয় তার আপত্তি। তিনি বােধ হয় চান যে তার
ভাগনি সারাজীবন অবিবাহিতা থেকে এই সম্পত্তি ভােগ
করুক।”
‘কিন্তু তার পরে? সে গত হ'লে ? তখন তাে সাত
ভূতে লুটে খাবে?
চঞ্চল বললে, তাও তাে বটে। ভদ্রলােকের একটি ছেলে
থাকলেই ঠিক হতাে।
‘সে আর বলতে! আমি তো তাকে অনেকদিন বলেছি-
“সংশের ভালাে একটি ছেলেকে পুধি নিন, ঘরে বৌ আসবে,
নাতি-নাৎনি হবে, তখন দেখবেন খুবই ভালাে লাগবে।” তা
এতদিন তাে আমার ও-কথায় তিনি মােটে কর্ণপাতই
করেননি।
‘এখন কি তার মত বদলেছে
বদলেছে ?
তিনকড়ি খুব নিচু গলায় চুপি-চুপি বললে, 'মনে তাে হয়।
সেদিন তিনি নিজেই আমাকে ডেকে বললেন, “বুঝলে
তিনকড়ি, ভাবছি পােষ্যপুত্ৰই নেবাে।” আমার মনে হয় কী
জানেন-ব’লে তিনকড়ি একটু থামলাে।
চঞ্চল কিছু বললে না, তিনকড়ি একেবারে ফিসফিস করে
বললে, আমার মনে হয় যে আপনাকে দেখে তার এত পছন্দ
কাল-বৈশাখীর ঝড়
হয়েছে যে—যে—তিনি বােধ হয় আপনাকেই পুষ্টি নেবার
কথা ভাবছেন।
চঞ্চল বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতাে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাে।
‘আঁ! বলেন কী!
‘ও-কথা বলেই তিনি আপনার অনেক সুখ্যাতি করলেন।
তাইতেই আমার মনে হলাে-
‘না-না—এ হতেই পারে না, হতেই পারে না। এ
আপনার একেবারেই ভুল ধারণা।
‘তা হতে পারে।
এর পর আর বেশিক্ষণ কথাবার্তা চললাে না। তিনকড়ি
তার নিজের কাজে চলে গেলাে, আর চঞ্চল একা ঘরে বসে
আকাশ-পাতাল কত কী ভাবতে লাগলাে।
পাঁচ
হরেনবাবুর শিগগিরই আসবার কথা ছিলাে, কিন্তু আসা
হ’লল না। তিনি চিঠি লিখে জানালেন যে এপ্রিল মাসে
ঈষ্টরের ছুটিতে আসবেন, এবং তখন বিবাহের প্রস্তাবটা
একেবারে পাকা করে যাওয়া তার ইচ্ছা। যাতে বৈশাখেই
শুভকর্ম সমাধা হতে পারে।
তিনকড়িই চঞ্চলকে এ-খবর জানালে। কিন্তু চঞ্চল
কথাটা বিশেষ গ্রাহ করলে না—আদার ব্যাপারির জাহাজের
খবরে কাজ কী, তার মনের ভাবটা অনেকটা এইরকম।
সেদিন তিনকড়ির সঙ্গে যে-সব কথাবার্তা তার হয়েছিলাে
সে-সব সে মন থেকে মুছেই ফেলেছিলাে; অটলবাবু তাকে
পােষ্যপুত্র করতে চান এটা অবশ্য একটা বিরাট ঠাট্টা ছাড়া
কিছু নয়, ও-কথা সে মােটে আমলেই আনলে না।
মাস দেড়েক চুপচাপ কেটে গেলাে। ইতিমধ্যে চঞ্চল
এক মাসের মাইনে পেলাে—একসঙ্গে একশাে টাকা উপার্জন
তার জীবনে এই প্রথম। টাকাটা পেয়েই প্রথমে সে
রণজিৎবাবুর ধার শােধ করে দিলে-মাঝে-মাঝে সামন্তমশায়ের
বাড়িও সে যায় এবং একদিন কথায়-কথায় তিনকড়ির
মুখে যা শুনেছিলাে তা তাকে জানিয়ে দিয়েছিলাে।
শুনে রণজিৎবাবু বলেছিলেন, ‘বড়ােললাকের বাড়িতে
কাল-বৈশাখীর ঝড় নানারকম গােলমাল থাকেই। থাকেই। তুমি ও-সবের যেয়াে না, চঞ্চল, চুপচাপ নিজের কাজ করে যাও। চৈত্রমাস পড়লাে। প্রতিদিনই একটু-একটু করে গরম বাড়ছে। অটলবাবুর ঘরে “ঠাণ্ডাই-যন্ত্র” বসানাে হয়েছে, কারণ গরম যতই পড়ক, গা থেকে ও-সব ভারি জামা-কাপড় তিনি ছাড়বেন না। চঞ্চল মনে-মনে ভাবলে যে এসব হাঙ্গামা করার চাইতে পাহাড়ে চলে গেলেই তাে হয়। কিন্তু তিনকড়ি তাকে বললে—অটলবাবু নাকি গেলে দশ বছরের মধ্যেও পাহাড়ে যাননি। কলকাতার বাইরেই তিনি খুব কম যান—এই শূন্যপুরীতে কী যে তার ভালাে লাগে তিনিই জানেন। অটলবাবুর মনে কোনাে গুপ্তরহস্য কিংবা মাথায় ঈষৎ ছিট হয়তাে থাকতে পারে, কিন্তু চঞ্চলের সঙ্গে তার ব্যবহার একেবারেই নিখুত। সম্প্রতি তিনি মাঝে-মাঝে চঞ্চলের সঙ্গে বসে-বসে অনেকক্ষণ গল্প করেন—তার দেশের খবর, তার মা-বাবার কথা—খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এ-সব জিজ্ঞেস করেন। আর চঞ্চল যখন বলে যে তার মা-বাবা নেই, নিকট আত্মীয়ও কেউ নেই, দেশের সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই সে সম্পর্ক- ছাড়া, অটলবাবুর মুখের চেহারা যেন কেমন হয়ে যায় তখন চঞ্চলের সন্দেহ হয় যে তিনকড়ি যা বলেছিলো তা হয়তাে একেবারে অমূলক নয়। তারপর, কলকাতা হরকরায় চাকরি নেবার পর থেকে তার জীবনে দু' একটা যা অদ্ভুত E
কাল-বৈশাখীর ঝড়
ঘটনা ঘটেছে, তারও গল্প অটলবাবুর কাছ সে করেছে।
শুনে তিনি বলেছেন, বাঃ, তুমি তাে দেখছি বেশ বাহাদুর
ছেলে!
একদিন বিকেলের দিকে চঞ্চল বসে-বসে অটলবাবুর সঙ্গে
ঐরকমই নানা গল্প করছিলাে। সেদিন তারা বসেছিলাে
ঘরের পাশের চওড়া বারান্দায়, হু-হু করে দক্ষিণের হাওয়া
দিচ্ছিলাে—কলে-ঠাণ্ডা-করা দরজা-জানলা-বন্ধ-করা ঘরের চাইতে
এই খােল হাওয়া অনেক ভালাে—অন্তত চঞ্চলের তা-ই মনে
হচ্ছিলাে।
হঠাৎ অটলবাবু বললেন, ‘চঞ্চল, একটা কথা তােমাকে
অনেকদিন থেকেই বলবাে ভাবছি। বলি-বলি করে বলা
হচ্ছে না।
চঞ্চল সন্ত্রস্ত হয়ে বললে, “বলুন।
অটলবাবু আস্তে-আস্তে বলতে লাগলেন, আমার যা অবস্থা
দেখছে তাে। শরীরের যা হাল, কোনদিন টুপ করে
শুকনাে পাতার মতাে জীবনের ডাল থেকে ঝরে পড়বে!
এই বাড়ি খা-খা করবে, রাশি-রাশি টাকা ব্যাঙ্কে পড়ে
পচবে। আমার আপনজনের মধ্যে আছে এক ভাগনি-
তাকে অবশ্য অনেক দিয়ে যাবে কিন্তু তবু অনেক বাকি
থাকবে
এখানে চঞ্চল আস্তে বললে, “কেন, তাকেই সব দিয়ে
যান না।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
অটলবাবু সংকপে বললেন, না, তা হয় না। আমি
ভাবছি কোনাে-একটি বুদ্ধিমান চরিত্রবান ছেলেকে আমার
উত্তরাধিকারী করব। তােমার যদি আপত্তি না থাকে,
তােমাকেই আমি আমার জায়গায় বসিয়ে দিতে চাই। আইনত
যা-যা দরকার, তা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই করা যেতে
পারে।
এ-কথা শুনে চঞ্চলের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলাে,
অনেকক্ষণ সে কোনাে কথা বলতে পারলে না। যে-কথা
একান্তই অবিশ্বাস্য, তাই কি তাকে স্বকর্ণে শুনতে হলো?
এই বিরাট ঐশ্বর্যের মালিক হওয়া লােভনীয় সন্দেহ নেই,
কিন্তু কোনাে এক ধনীর পােষ্যপুত্র হয়ে জীবন কাটানাে
এতেও চঞ্চলের মন সায় দিতে পারলে না, কিছুতেই না।
যেন নিজের সর্বস্ব বিকিয়ে দেয়া।
অটলবাবুই আবার বললেন, তােমাকে এক্ষুনি হানা
কিছু বলতে হবে না, তুমি ভেবে দ্যাখাে। দু চারদিনের মধ্যে
আমাকে জানালেই চলবে। আমার দিক থেকে বলতে
পারি যে আমার মন স্থির করাই আছে, এখন তুমি রাজি
হলেই হয়।
চঞ্চল টোক গিলে বললে, “আচ্ছা, ভেবে দেখি।
‘হ্যা, ভেবে দ্যাখাে। আমার এক বন্ধু আসছেন পাটনা
থেকে—কাল এসে পৌছবেন—তিনি থাকতে-থাকতেই
এব্যাপারটা ঠিক হয়ে গেলে ভালাে হয়। তিনি উকিল,
কাল-বৈশাখীর ঝড়
আইনের দিকটা ঠিক করে দিতে পারবেন। তিনি দিন-চারেক
মাত্র থাকবেনা। বুঝেছো?
চঞ্চল অন্যমনস্কভাবে বলে ফেললাে, হরেনবাবু কাল
আসছেন তাহলে ?”
অটলবাবু একটু যেন চমকে উঠে. বললেন, ‘আঁ? তুমি
তঁার নাম জানলে কেমন করে ?
চঞ্চল বললে, 'তিনকড়িবাবু বলছিলেন ওঁর কথা।
‘তিনকড়ি বলছিলাে? কী বলছিলো সে ?
চঞ্চল আর-একবার টোক গিলে বললে, আপনার একজন
বাল্যবন্ধু পাটনা থেকে শিগগিরই আসছেন—এই আরকি।
‘ও, এই! আর-কিছু বলেনি?
চঞ্চল এ-কথার কী-জবাব দেবে ভাবছিলাে এমন সময়
অটলবাবু হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এ কী! হাওয়াটা হঠাৎ
পড়ে গেলে যে বড্ড গরম হচ্ছে।
চঞ্চল বললে, ‘হ্যা, বডড
কিন্তু তার মুখের কথা শেষ হলাে না। অটলবাবু
আকাশের উত্তর-পশ্চিম কোণে তাকিয়ে ভীতস্বরে বলে
উঠলেন—‘দেখেছে! ঝড় আসছে—ঝড়! কী রকম কালাে
হয়ে মেঘ করেছে! ঘরে চলাে, শিগগির ঘরে চলাে।
বছরের এ-সময়ে সন্ধের দিকে মাঝে-মাঝে কালবৈশাখী
ওঠেই, তা নিয়ে এত ব্যস্ত হবার কী আছে চঞ্চল ভেবে
পেলাে না। কিন্তু অটলবাবু কথা বলতে বলতেই উঠে
কাল-বৈশাখীর ঝড়
দাঁড়িয়েছিলেন। যেই তিনি ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছেন,
অমনি কড়কড় শব্দে বাজ পড়লল, আর ঘন ধুলাের ঝড় উঠে
আকাশের মুখ একেবারে ঢেকে দিলে। চক্ষের পলকে
প্রকৃতিতে এই বিপর্যয় শুরু হয়ে গেলাে।
চঞ্চল তাকিয়ে দেখলে, অটলবাবু দুই কানে হাত চেপে
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তার মুখ একদম শাদা হয়ে
গেছে। তার কাছে গিয়ে সে বললে, “চলুন, ঘরে চলুন, এখানে
আর বসা যাবে না।
আস্তে-আস্তে পা ফেলে অটলবাবু ঘরে এলেন, এসেই
তার ইজি-চেয়ারটিতে আশ্রয় নিলেন। খানিকক্ষণ চোখ বুজে
তিনি চুপ করে পড়ে রইলেন, তার নিঃশ্বাস জোরে-জোরে
ওঠা-পড়া করতে লাগলাে।
চঞ্চল মৃদুস্বরে জবাব দিলে, আপনি কি অসুস্থ বােধ
করছেন? ডাক্তারকে খবর দেবে?
‘না, না, ঠিক আছি, ঠিক হয়ে গেছে।
‘আপনার কী হয়েছিলাে। হঠাৎ যেন•••
অটলবাবু বললেন, “ও কিছু না। ঝড়-টড় আমার মােটে
ভালাে লাগে না—এই আরকি। আর ঐ বাজের
শব্দটা...' শব্দটা স্মরণ করেও তিনি যেন একবার শিউরে
উঠলেন।
‘ও-রকম আবার হবে না তো? বাজের শব্দ আপনার খুব
খারাপ লাগে বুঝি?
৪০
কাল-বৈশাখীর ঝড়
খারাপ মানে? অসহ্য লাগে। মনে হয় যেন আমার
বুক ফুড়ে কী-একটা চলে গেলাে। উঃ !
আজকালকার ঝড় বেশিক্ষণ থাকে না, এক্ষুনি কমে
যাবে। আবার বাইরে যাবেন, না এখানেই•••
‘না, না, আর বাইরে গিয়ে কাজ নেই। তুমি এক কাজ
করাে তাে, আলােটা জ্বালাে, তারপর আমাকে একটা বই-টই
প’ড়ে শােনাও। একটা হাসির গল্প-টল্প কিছু। সত্যি, কী
বিশ্রী আওয়াজ, এখনাে আমার বুকটা ঢিপঢিপ করছে।
চঞ্চল আর-কিছু বললে না। আলাে জ্বেলে রবীন্দ্রনাথের
‘হাস্য-কৌতুক’ পড়ে শােনাতে লাগলাে।
ছয়
পরের দিন সকালে হরেনবাবু এলেন। লােগা, লম্বা, মাথায়
টাক, চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। দেখে খুব তীক্ষ্ণবুদ্ধির মানুষ
মনে হয়। তার অভ্যর্থনা দেখাশােনা ইত্যাদির অনেকখানি
চঞ্চলকেই করতে হলাে। তাকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
‘তুমি আবার এ-বাড়িতে কবে থেকে?
‘এই তাে অল্পদিন।
কী-নাম তােমার ?
‘চঞ্চল নাগ।
‘কী-কাজ করে?
তিনকড়ি বুঝিয়ে বললেন যে ইনি বাবুর নতুন
সেক্রেটারি
সেক্রেটারি! হেঃ—আবার সেক্রেটারিও বহাল করা
হয়েছে ! বেশ, বেশ। লােকে কত ভাবেই যে পয়সা ওড়ায় !
তা বেশ ভালােই আছো তােমরা, অটলকে বেশ শুষে
খাচ্ছে তােত ?
ভদ্রলােকের চাল-চলন কথাবার্তা চঞ্চলের একটুও ভালাে
লাগলাে না। কেমন একটা অমার্জিত রূঢ়তা তার প্রত্যেক
কথায় যেন ফুটে ওঠে। আর বন্ধুর সম্পত্তির প্রতি তার
দরদটা যেন বড়ােই বেশি।
৪২
কাল-বৈশাখীর ঝড়
স্নান ও চা-পানের পরে হরেনবাবু সেই যে অটলবাবুর
ঘরে ঢুকলেন, বেরলেন দু' ঘণ্টা পরে। ঘরের দরজা বন্ধ
করে এতক্ষণ তারা কী-কথা বললেন তারাই জানেন।
তিনকড়ি চঞ্চলকে নিভৃতে বললে, হরেন মিত্তির শক্ত
লােক, ঘাগি উকিল। কর্তাকে রাজি না-করিয়ে ছাড়বে বলে
মনে হয় না।
চঞ্চল বললে, ‘ভদ্রলােককে আমার কিন্তু বিশেষ ভালো
লাগলাে না।
হরেনবাবুর মুখটা কিছু ঢিলে, নয়তাে লােক কিছু খারাপ
নন। আমাদের কত্তার ওঁর প্রস্তাবে রাজি হওয়াই উচিত।
চঞ্চলের মনে পড়লে তাকে পুষি নেবার কথা অটলবাবু
নিজের মুখে বলেছেন। মনে পড়লাে শিগগিরই তাকে
এ-বিষয়ে মন স্থির করতে হবে। একবার ভাবলে, তিনকড়িকে
কথাটা বলে, কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলাে, থাক, ব’লে কাজ
নেই। রণজিৎবাবুর সঙ্গে এ-বিষয়ে পরামর্শ করতে পারলে
ভালাে হয়, কিন্তু কথাটা এতই আজগুবি যে কাউকে বলতেও
লজ্জা করে। থাক, দেখা যাক কী হয়। চঞ্চলের এমনও
আশা হলাে যে ঝোকের মাথায় কথাটা বলে ফেলে অটলবাবু
হয়তাে ভুলেও যাবেন।
কিন্তু তিনি যে ভােলেননি তার প্রমাণ পাওয়া গেলে
পরের দিন সকালেই, যখন চঞ্চলকে ডেকে তিনি বললেন,
‘কী হে, ও-বিষয়ে মন স্থির করতে পারলে ?
৪৩
কাল-বৈশাখীর ঝড়
চঞ্চল কাতর স্বরে বললে, “আজ্ঞে আর দুটো দিন
সময় দিন।
‘কেন, এত তােমার ভাববার কী আছে বলাে তাে? আজ
সন্ধের মধ্যে তােমার জবাব চাই—বুঝলে? যদি তােমার মত
হয়, সে-কথাই স্পষ্ট করে বলবে, আমি একটুও রাগ
করবাে না।
চঞ্চল বললে, আচ্ছা।
আর শােননা—যদি তােমার মনে কোনােরকম দ্বিধা
কি সংশয় থাকে, আমার সঙ্গে সে-বিষয়ে মন খুলে আলাপ
করতে পারাে। আমি তাে তােমার আপত্তি হবার কোনাে
কারণ দেখিনে। এতে তােমার স্বাধীনতা কিচ্ছু নষ্ট হবে না,
বরং নিজের জীবনটা যেমনভাবে খুশি চালাতে পারবে
পয়সার অভাবে পদে-পদে ধাক্কা খেতে হবে না। এদিকে
আমি এটুকু জানবাে যে আমার অবর্তমানে এত বিষয়-সম্পত্তি
ছারখারে যাবে না। তােমার সঙ্গে আমার চেনা অল্পদিনেরই,
কিন্তু তােমার বুদ্ধি ও সততার উপর আমার বিশ্বাস জন্মে
গেছে, তুমি এ-সমস্তর ভার নিলে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে
পারবাে।
শেষের দিকে অটলবাবুর কণ্ঠস্বর করুণ হয়ে উঠলাে।
‘অবশ্য আমার পুত্র বলে তােমাকে পরিচয় দিতে হবে,
আমার নাম তােমাকে গ্রহণ করতে হবে—সেটা হয়তাে
তােমার ভালাে লাগছে না। কিন্তু তাতে তােমার এমনকী
০৪
কাল-বৈশাখীর ঝড়
ক্ষতি ? তােমার নিজের মা-বাবা নেই, ভাই-বােনও নেই,
কাজেই কারাে মনে কষ্ট দিয়ে তােমাকে এ-কাজ করতে
হবে না। আমি আর ক’দিন-ওপারে যাবার জন্য তো
পা বাড়িয়েই আছি—তারপর সবই তােমার হাতে। এতে
তােমার লাভ বই ক্ষতি নেই, এদিকে আমার যে কত বড়াে
উপকার তা তুমি বুঝবে না। আমার এটুকু উপকার কি তুমি
করবে না?কী, কিছু বলছে না যে?
‘আজ সন্ধেবেলা আপনাকে নিশ্চয়ই জানাবাে, বলে
চঞ্চল তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাে।
এ এক মহা সমস্যাতেই সে পড়েছে। পােষ্যপুত্র হবার কথা
কল্পনা করতেও তার কী যে খারাপ লাগে, তা বলবার নয়।
প্রথমে তার ঝোক হলাে স্পষ্ট ‘না’ বলে দেবে—তার ফলে যা
হবার হবে। বড়াে জোর এই চাকরিটি যাবে, তার চেয়ে
খারাপ তাে আর কিছু হবে না। কিন্তু আস্তে-আস্তে অন্য
নানা কথা তার মনে উকিঝুকি দিতে লাগলাে। এই বিরাট
সম্পত্তির মালিক হবে—সে-কথা তো আছেই। তাছাড়া
এ-ক’দিনে এই প্রকাণ্ড, অলস, অসহায়, ভালােমানুষ লােকটির
উপর তার কেমন একটু মমতাও জন্মে গেছে। তিনি অত
করে বলছেন, ‘না’ বললে মনে কষ্ট পাবেন—এ-কথা ভাবতে
চঞ্চলের নিজের মনেই যেন কষ্ট হয়। আবার যখনই ভাবে
নিজের সমস্ত পরিচয় মুছে ফেলে, নিজের নাম পর্যন্ত বদল
করে হঠাৎ শােভাবাজারের দত্তদের বিপুল বিত্তের অধিকারী
০৫
কাল-বৈশাখীর ঝড়
হ’য়ে বসতে হবে, তখনই তার সমস্ত অন্তরাত্মা বিদ্রোহ
করে ওঠে। সে হাব। নয়, অক্ষম নয়, অলস নয়, পরিশ্রমে
তার আপত্তি নেই, যে-কোনাে অবস্থায় নিজেকে বাঁচিয়ে
রাখবার মতাে অর্থোপার্জন সে করতে পারবেই, হয়তাে
কোনােদিন নিজের চেষ্টায় ভাগ্যের মােড়ও ফেরাতে
পারবে—পুরুষের পক্ষে তার চেয়ে বড়াে সার্থকতা আর-কী
হতে পারে? জীবন-সংগ্রাম বলে যদি কিছু না থাকে,
তাহলে জীবন থেকে সমস্ত স্বাদই চলে যায় যেন।
চঞ্চল কিছুতেই মন স্থির করতে পারে না।
বিকেলবেলা পাঁচটার কিছু পরে, চঞ্চল তার ঘরে বসে
চা খাচ্ছে এমন সময় ইলেকট্রিক বেলটি বেজে উঠলাে।
তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে নিয়ে সে অটলবাবুর ঘরে গিয়ে
দেখলাে সেখানে হরেনবাবু বসে আছেন। তাকে দেখেই
মুখে একটা বিদ্রুপের ভঙ্গি এনে হরেনবাবু বললেন, ‘আসুন
সেক্রেটারি-সাহেব! আমরা আপনারই প্রতীক্ষায় বসে আছি।
চঞ্চল কিছু বিস্মিত হয়ে অটলবাবুর মুখের দিকে
তাকালাে। তিনি শান্তভাবে বললেন, সকালে তােমার সঙ্গে
যে-বিষয়ে কথা হচ্ছিলাে, সে-বিষয়ে তুমি মন স্থির করতে
পেরেছে কি ?
হরেনবাবু ঠোট বেঁকিয়ে বললেন, ‘চটপট মনের কথাটা
বলে ফ্যালাে—দেরি কোরাে না।
কালবৈশাখীর ঝড়
ভদ্রলােকের কথা বলবার ধরনে এমন একটা বিশ্রীরকমের
ঝাজ ছিলো যে চঞ্চলের মাথায় হঠাৎ রক্ত উঠে এলাে।
কী বলছে তা যেন ভালাে করে না বুঝেই অটলবাবুর
মুখের দিকে তাকিয়ে সে বললে, আপনার যা ইচ্ছে তা-ই হবে।
সঙ্গে-সঙ্গে হরেনবাবুর মুখ লাল হয়ে উঠলাে। টেবিলের
উপর থেকে অটলবাবু মস্ত মােটা একটা চুরুট তুলে নিয়ে নিজের
পকেট থেকে তিনি বােরকম একটা ছুরি বের করলেন।
তারপর ছুরি দিয়ে আস্তে-আস্তে চুরুটের একটা মুখ কেটে নিয়ে
সেটা মুখে তুলে ধরালেন। এ-কাজগুলাে করতে সব সুদ্ধ তার
প্রায় পাঁচ মিনিট লাগলাে।
অটলবাবু এতক্ষণ নিঃশব্দে তার বন্ধুকে লক্ষ্য করছিলেন,
এইবারে বললেন, ‘হরেন, ও-জিনিসটা সব সময় তােমার
পকেটেই থাকে নাকি ?
‘কোটা ? এটা ? ছুরির ঝকঝকে ফলাটা ঠিক নাকের
সামনে ধরে হরেনবাবু বললেন, হ্যা, এটা আমার পকেটেই
থাকে।
‘কেন, ও-রকম একটা বিদঘুটে যন্ত্র পকেটে নিয়ে বেড়াও
কেন ?
‘ছেলেবেলাকার অভ্যেস এখনাে কাটিয়ে উঠতে পারিনি
বােধহয়। তা এটা কাজেও লাগে নানারকম,' বলতে-বলতে
হরেনবাবু খােলা ছুরিটা হাতের তেলাের উপর নাচাতে
লাগলেন।
৪৭
কাল-বৈশাখীর ঝড়
ও-রকম কোনাে না, হরেন বলে উঠলেন অটলবাবু।
‘আমার গা কেমন শিরশির করে।
হরেনবাবুর মুখে একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠলাে। আস্তে
বললেন, “সেইজন্যই তাে ও-রকম করছি। কিন্তু তার পরেই
চকচকে ছুরিটা টেবিলে চুরুটের বাক্সের উপর রেখে দিয়ে
বললেন, হ্যা—তােমার সঙ্গে কথাটা তাহলে শেষ করে ফেলি।
অটলবাবু বললেন, ‘চঞ্চল, তুমি তাহলে এখন
হরেনবাবুর হাব-ভাক চঞ্চলের মােটে ভালাে লাগছিলাে না,
এদের দু’জনের কথাবার্তায় উপস্থিত থাকতে পারলেই সে
খুশি হতাে। কিন্তু কর্তার আদেশ অমান্য করবার উপায় নেই,
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে যেতে হলাে।
সে যখন দরজার কাছে, অটলবাবু আবার তাকে ডেকে
বললেন, ‘শােননা, চঞ্চল, আবার তােমাকে দরকার হতে পারে।
বাড়িতেই থেকো।
চঞ্চল অনুমতি না নিয়ে কখনােই বেরােয় না, সুতরাং
একথা বলাই বাহুল্য। তবু সে যেতে-যেতে বললে, “হ্যা,
থাকবে।
ঘরের বাইরে এসেই সে শুনলে, হরেনবাবু ক্রুদ্ধ উগ্ৰস্বরে
বলছেন, অটল, তােমার কি বুদ্ধিসুদ্ধি সব লােপ পেয়েছে ?
অটলবাবুও গলা চড়িয়ে (তার পক্ষে যেটা খুবই
অস্বাভাবিক) বললেন, ‘নিজের চরকায় তেল দাও, হরেন,
আমাকে ঘাটাতে এসাে না।
৪
কাল-বৈশাখীর ঝড়
“দেখেছো! • কী রকম কালাে হয়ে যে করেছে!"
প?
No text on this page.
কাল-বৈশাখীর ঝড়
হরেনবাবু বললেন, ছেলের বাপ হয়ে তােমাকে এত
খােশামােদ করছি, এত হীনতা স্বীকার করছি তােমার কাছে,
আর তুমি কিনা—তুমি কিনা—
রাগে হরেনবাবুর কথা শেষ হলাে না। অটলবাবু
বললেন, আমি আমার ভাগনির বিয়ে দেবাে না, এর উপরে
আর কথা কী! তুমি আমাকে আর জ্বালিয়ে না।
কী! এত বড়ো কথা! আচ্ছা, এ-অপমানের প্রতিশােধ
আমি যদি না নিয়েছি বাকি কথাগুলো শােনা গেলাে না।
চঞ্চলের ইচ্ছে হলাে দাঁড়িয়ে-দাড়িয়ে আরাে কিছু শশানে,
কিন্তু দরজায় আড়ি পাতা নিতান্তই গর্হিত কাজ, কিছুতেই
সে তা পেরে উঠলাে না। বিরস মনে নিজের ঘরের দিকে
চলে গেলাে।
সাত
ঘরে এসে চঞ্চল দেখলো তার টেবিলের উপর একখানা
চিঠি পড়ে আছে। খামের উপরকার লেখা তার সম্পূর্ণ
অচেনা। চিঠি খুলে তাড়াতাড়ি নিচের দিকে তাকালে
চিঠিখানা লিখেছেন হরেনবাবু।
‘তুমি একটি গর্দভ। অটলের যে মাথা-খারাপ, তা
কি তুমি এখনাে বােঝােনি? ওর প্রস্তাবে যদি রাজি
হও তাতে তােমার তাে ভালো হবেই না, অটলেরও
তাতে মহা ক্ষতি। আজ রাত্তিরে খাওয়ার পর আমার
ঘরে এসো, আমি সব কথা বুঝিয়ে বলবে। ইতি
হরেন্দ্রকুমার মিত্র’
চিঠিখানা চঞ্চল একবার, দু’বার, তিনবার পড়লাে, তারপর
তার টেবিলের সঙ্গে লাগানাে বেল টিপলাে।
তারা ঘরে ঢুকতেই সে জিজ্ঞেস করলে, ‘এ-চিঠি কখন
এলাে ?
‘আপনি কত্তার ঘরে গেছেন, তার একটু পরেই।
কে দিয়ে গেলাে?
‘হরিপদ।
‘ডাকো তাকে।
মিনিট পাঁচেক পরে হরিপদ এলাে। দোতলার ঘরগুলাে
কাল-বৈশাখীর ঝড়
পরিষ্কার রাখা তার কাজ, না-ডাকলে সে তেতলায় আসেই না।
হরেনবাবুকে থাকতে দেওয়া হয়েছে দোতলার একটি ঘরে, তার
দেখাশােনা হরিপদই করছে।
চঞ্চল জিজ্ঞেস করলে, ‘এ-চিঠি তুমি নিয়ে এসেছিলে ?”
‘আজ্ঞে হা।
হরেনবাবু তােমাকে কখন দিয়েছিলেন এ-চিঠি ?
‘আজ্ঞে তিনি তেতলায় আসবার আগেই আমাকে
চিঠিখানা দিয়ে বলেছিলেন—“চঞ্চলবাবুর ঘরে দিয়ে এসাে”।
‘তুমি দিতে একটু দেরি করেছিলেন?
‘আজ্ঞে, বাবু আমাকে কয়েকটা ডাকে দেবার চিঠিও
দিয়েছিলেন, সেগুলাে ডাকঘরে ছেড়ে দিয়ে এসে তারপর
আমি এখানা নিয়ে এলুম।
‘আচ্ছা, বেশ। তুমি যাও।
চিঠিখানা সামনে নিয়ে চঞ্চল গুম হয়ে বসে রইলাে।
সন্ধে হয়-হয়, কিন্তু চঞ্চলের মনে হলাে সন্ধে হবার আগেই
যেন চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। জানলা দিয়ে
তাকিয়ে দেখলল আকাশ থমথমে হয়ে আসছে, গাছের
পাতা নড়ে না, এক্ষুনি কালবৈশাখীর ঝড় উঠবে।
সেদিন একটু ঝড়ের আভাসেই অটলবাবু কেমন বিচলিত
হয়েছিলেন সে-কথা মনে পড়ে চঞ্চল উদ্বিগ্ন বােধ করলাে। তার
ইচ্ছে হলে এখনি আবার অটলবাবুর ঘরে যায়, কিন্তু তাকে
ডেকে না-পাঠালে ও-ঘরে যাবার অনুমতি তার নেই।
.
কাল-বৈশাখীর ঝড় জানলার ধারে দাড়িয়ে-দাড়িয়ে সে লক্ষ্য করলে হঠাৎ গাছের পাতাগুলাে আন্দোলিত হয়ে উঠলাে, ধুলাের ঝড় উঠলাে রাস্তায়, সমস্ত আকাশে একটা মরা হলদে আলাে ছড়িয়ে পড়লাে। জানলার শার্সি বন্ধ করে দিয়ে সে স’রে এসে দাড়ালাে। ঠিক সেই মুহূর্তে অটলবাবুর ঘর থেকে একটা রক্ত-হিম- করা চীৎকার সে শুনতে পেলে-মেরে ফেললাে, খুন করে ফেললাে—বাঁচাও, কে আছো বাঁচাও ! সঙ্গে-সঙ্গে দারুণ শব্দে একটা বাজ পড়লাে, চারদিক এলাে অন্ধকার হয়ে। দু’এক মিনিট চঞ্চল যেন একেবারে বিমূঢ় অবস্থায় স্তব্ধ হয়ে রইলাে। তারপর হঠাৎ তার সম্বিৎ ফিরে এলাে, সে ছুটে গেলে অটলবাবুর ঘরের দিকে। ঘরের দরজার ধারে হরেনবাবুর সঙ্গে তার মাথা প্রায় টুকে গেলাে। হরেনবাবু তার হাত ধরে বললেন, “কী হে, এত ব্যস্ত হয়ে ছুটেছে কোথায় ? চঞ্চল হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, আপনি শােনেননি কিছু কোনাে চীৎকার— হরেনবাবু বললেন, না তাে! আমি এইমাত্র এলুম। আপনি কি মাঝে নিচে গিয়েছিলেন? ‘হ, এইমাত্র ফিরে আসছি। ‘একটা ভয়ানক চীৎকার শুনলুম-হাত ছাড়ুন আমার
কাল-বৈশাখীর ঝড়
‘চীৎকার আবার কোথেকে শুনলে? তুমিও কি পাগল
হ'লে ? শােনােতােমার সঙ্গে কথা আছে-
এখন আমার সময় নেই, ব’লে চঞ্চল এক ঝটকায় হাত
ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকলাে।
ঘরের মধ্যে রাতের মত অন্ধকার, হঠাৎ ঢুকে কিছুই
ঠাহর হয় না। কিন্তু তারই মধ্যে চঞ্চলের চোখে পড়লাে
যে অটলবাবু তালগােল পাকিয়ে মেঝের উপর পড়ে আছেন
আর তার পাশেই গােল ছাদের সেন্টার-টেবিলটি উল্টিয়ে
পড়ে আছে।
চঞ্চলের পিছনে দাঁড়িয়ে হরেনবাবু বললেন, ‘আলােট।
জ্বালাে।
চঞ্চল দেয়ালে নির্দিষ্ট জায়গায় একটার পর একটা সুইচ
টিপলে, কিন্তু আলাে জ্বললো না।
হরেনবাবু বললেন, ‘লাইন খারাপ হয়ে গেছে বােধ হয়।
টর্চ আছে ?
কয়েক মিনিটের মধ্যে অনেকগুলাে টর্চ আর লণ্ঠন নিয়ে
তিনকড়ি, আর তার সঙ্গে বাড়ির সমস্ত চাকর সে-ঘরে এসে
জড়াে হলাে।
অটলবাবুর দেহ স্থির, নিঃস্পন্দ, তাতে প্রাণের
কোন লক্ষণ নেই। উবু হয়ে হাঁটু-ভাঙা অবস্থায়
তিনি পড়ে আছেন, আর তার ঘাড়ের উপর কানের ঠিক
তলায় ছােটো একটা ক্ষত, তা দিয়ে রক্ত পড়ে-পড়ে
কাল-বৈশাখীর ঝড়
তার গায়ের কাপড় তো লাল হয়েইছে, মেঝের কার্পেটের
একটা সবুজ ফুলও পলাশের মতাে রঙিন হয়ে উঠেছে। আর
তিনি যেখানে পড়ে আছেন, তার পাশেই পড়ে আছে
হরেনবাবুর সেই ছুরিটি—ডাটের উপর তার নামের আদ্যক্ষর
H. M. খােদাই করা ।
হরেনবাবুর মুখ কাগজের মতাে শাদা হয়ে গেলাে।
তিনি ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বললেন, ‘চঞ্চল, ভালো
করে দ্যাখাে তাে—কিছু বােধ হয় হয়নি—বােধ হয় ফিট হয়ে
পড়েছেন।
চঞ্চল কঠিন কণ্ঠে বললে, “ফিট হ'লে কি ও-রকম রক্ত
বেরােয় ?
‘রক্ত, কই আমি তো
চঞ্চল একটা জোরালাে টর্চ ফেলে বললে, “দেখুন।
হরেনবাবু আগে বােধ হয় এটা লক্ষ্য করেননি, সেদিকে
চোখ পড়তেই তার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট আর্তস্বর
বেরলাে।—‘তাই তাে! এ কী! এ কেমন করে হ’লল?
বলে তিনি নিচু হয়ে বােধ হয় ছুরিটাই কুড়িয়ে নিতে,
যাচ্ছিলেন, চঞ্চল গর্জন করে উঠলো-খবরদার! কোনাে
জিনিসে হাত দেবেন না। ডাক্তার আর পুলিশ এসে যা
করবার করবে। চুপ করে ওখানে বসে থাকুন, নড়েছেন তাে
রক্ষে নেই।
হরেনবাবুর চোখে-মুখে যে ভীত ভাব ফুটে উঠলে তা
.
৫৪
কাল-বৈশাখীর ঝড়
৮
বলবার নয়। এমন নির্জীব ভঙ্গিতে তিনি সােফার উপর
বসে পড়লেন যেন তাঁর দেহ থেকে সমস্ত শক্তি চলে
গিয়েছে।
হঠাৎ ঘরের সমস্ত আলাে একসঙ্গে জ্বলে উঠলাে।
‘বাঃ চঞ্চল বলে উঠলাে, কারেন্ট ফিরে এসেছে দেখছি।
বােধ হয় ঝড়ের জন্য কিছু গােলমাল হয়েছিলাে।
উজ্জ্বল আলােয় এই লােমহর্ষক দুর্ঘটনার পরিষ্কার ছবি
সকলের চোখের সামনে ফুটে উঠলাে। অটলবাবু নিশ্চয়ই
তাঁর প্রিয় ইজিচেয়ারটিতেই বসে ছিলেন, আততায়ী পিছন
থেকে তার ঘাড়ে হঠাৎ ছুরি বি ধিয়ে দেয়, এবং সঙ্গে-সঙ্গে
তিনি চীৎকার করে ওঠেন। সামান্য ধ্বস্তাধ্বস্তিও হয়তাে
হয়েছিলাে যাতে গােল সেন্টার-টেবিলটি উল্টিয়ে যায়।
টেবিলের উপর ছাইদান আর চুরুটের বাক্স ছিলাে—
ছাইদানটি কাৎ হয়ে পড়ে আছে, আর চুরুটগুলি সারা
মেঝেতে ছিটানাে। তারপরেই অটলবাবু মেঝেতে পড়ে
যান এবং মৃত্যু এসে তাঁর সব যন্ত্রণা হরণ করতে দেরি
করেনি। ছুরির আঘাত আকারে ছােটো হ'লেও নিশ্চয়ই
খুব প্রাণান্তকর জায়গায় লেগেছিলাে, হয়তাে এমন-কোনাে
নাড়ি কেটে গেছে যার পরে মানুষ আর বাঁচতে পারে না।
হঠাৎ ঘরের মধ্যে কে যেন যন্ত্রসহযােগে গান গেয়ে
উঠলল! চঞ্চল এত চমকে উঠলো যে আর-একটু হ'লে
চেঁচিয়েই উঠতাে। কিন্তু একটু পরেই সে বুঝতে পারলে
কাল-বৈশাখীর ঝড়
যে গানটা আসছে রেডিও থেকে। রেডিওটা বােধ হয়
খােলাই ছিলাে—অটলবাবু সন্ধেবেলা গান-বাজনা শুনতে
ভালােবাসতেন।
চঞ্চল রেডিওটা বন্ধ করে দিলে, তারপর দুটো টেলিফোন
করলে, একটা ডাক্তারকে, আর-একটা রণজিৎবাবুকে।
আট
দিন সাতেক পরে চঞ্চল আর রণজিৎবাবু একদিন হাজতে
হরেনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাে। এ-ক’দিনেই
ভদ্রলােকের চেহারা ভয়ানক খারাপ হয়ে গেছে, চোখ
গেছে বসে, গালে খােচা-খোঁচা দাড়ি, গলা দিয়ে ভালাে করে
আওয়াজ বেরােয় না। পুলিশ তাকে ‘বেইল পর্যন্ত দেয়নি,
গ্রেপ্তার করেই একেবারে হাজতে নিয়ে পুরেছে।
রণজিৎবাবু বললেন, হরেনবাবু, আপনি আপনার অপরাধ
স্বীকার করুন, তাহলে কোর্টের হয়তাে দয়া হতে পারে।
‘আমি তাে আপনাদের কাছে অনেকবারই বলেছি যে
আমি ও-কাজ করিনি, ও-বিষয়ে আমি কিছুই জানিনে।
‘আপনি ছাড়া আর কে করবে, বলুন।
‘তা আমি কেমন করে বলবাে ? কিন্তু আমি যে করিনি
তা শপথ করে বলতে পারি।
রণজিৎবাবু বললেন, আপনি যে এ-কাজ করেছেন তার
এত প্রমাণ পাওয়া গেছে যে আপনার বাবার কোনাে
উপায়ই নেই। আপনি নিজে একজন বড়াে উকিল,
এ-বিষয়ে আপনাকে বেশি বলা বৃথা। তবে যদি অপরাধ
স্বীকার করেন এবং কোর্টের দয়া প্রার্থনা করেন, তাহলে
হয়তাে ফাসির বদলে দ্বীপান্তর হতে পারে।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
হরেনবাবু শিউরে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘তবু আপনি স্বীকার করবেন না?
হরেনবাবু ক্লান্তস্বরে বললেন, ‘এক কথা আর কতবার
বলবাে ?
রণজিৎবাবু বললেন, আগামী সােমবার কেস কোর্টে
উঠবে। আজ বেস্পতিবার, এ ক’দিন ভাববার সময় পেলেন।
দেখুন, এর মধ্যে যদি মত বদল হয়।
যাবার আগে চঞ্চল হরেনবাবুকে বললে, আপনার
আত্মীয়রা আপনার পক্ষে উকিল লাগিয়েছেন, তিনি কাল
সকালে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।
‘উকিল দিয়ে আর কী হবে?
‘কেন, আপনি কি কেস ডিফেণ্ড করবেন না?
“কী হবে ডিফেন্ড করে ? অপরাধ স্বীকার করা ছাড়া
তাে উপায় দেখিনে।
তার মানে আপনি ঠিকই ও-কাজ করেছেন?
তার মানে-ও-কাজ আমি করিনি; কিন্তু যদি বলি
করেছি, তাহলে হয়তাে ফাসি না হয়ে দ্বীপান্তর হবে।
দ্বীপান্তর—উঃ! হরেনবাবু দু’হাতে মুখ ঢাকলেন।
বাইরে এসে রণজিৎবাবু বললেন, ‘লােকটা একটা
স্কাউঙুেল !
‘তাই তাে মনে হচ্ছে।
‘মনে হচ্ছে মানে! তােমার মনে কি এখনাে সন্দেহ আছে?
৫
কাল-বৈশাখীর ঝড়
‘আমার মনে নানারকম সন্দেহই হচ্ছে।
‘কীরকম?
চঞ্চল সে-কথার জবাব না দিয়ে বললে, আপনি এখন
কোনদিকে যাবেন ?
‘আমাকে একটু লালবাজার যেতে হবে। তুমি ?
‘আমি একবার অটলবাবুর বাড়ি যাবে।
কেন, ওখানে আবার কী দরকার?
‘আমার দু একটা জিনিস ফেলে এসেছি।
আগেই যাবে আপনার ওখানে। (ঐ হত্যাকাণ্ডের পরে
চঞ্চল আবার রণজিৎবাবুর বাড়িতেই এসে উঠেছে, এবং
একদিন সেখানেই আছে।)
রণজিৎবাবু বললেন, আমার গাড়িতেই এসাে, তােমাকে
পৌছিয়ে দিয়ে যাই।
গাড়িতে উঠে চঞ্চল বললে, হরেনবাবুর পক্ষে শুধু একটা
কথা আছে।
‘কী সেটা?
‘পােস্টমর্টেমের রিপােট। ওরা বলছে—Death due
to heart-failure.'
‘কিন্তু সেই সঙ্গে এ-ও বলছে যে ছুরির আঘাতে ঘাড়ের
একটা নাড়ি কেটে গিয়েছিলাে। তারপর যে রক্তপাত
আরম্ভ হয় তার জন্যই হৃদূষন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু তুমি এ নিয়ে এত ভাবছে কেন বলাে তাে?
কাল-বৈশাখীর ঝড়
হরেন মিত্তিরকে বাঁচাবার কোনাে উপায়ই নেই। আর
ও-রকম সাংঘাতিক লােক-যে তার বাল্যবন্ধুকে অর্থের লােভে
অনায়াসে হত্যা করতে পারলে তাকে বাঁচানাের চেষ্টা করাও
তবে কিনা -
‘সে তাে ঠিক কথাই।
তবে কিনা ?
‘আমার সাক্ষীর উপরেই তাে সমস্ত কেস নির্ভর করছে।
‘তা তাে করছেই।
‘সেইজন্যেই আমার মনটা যেন কেমন লাগছে। আমার
মুখের কথার ফলে একটা লােকের ফাসি হয়ে যাবে!
রণজিৎবাবু বললেন, ‘চঞ্চল, তুমি এখনাে ছেলেমানুষ আছে।
চঞ্চল বললে, ‘তা তাে আছিই।
অটলবাবুর বাড়ি এসেই চঞ্চলের সঙ্গে তিনকড়ির দেখা।
তিনকড়ি জিজ্ঞেস করলে, কী খবর, চঞ্চলবাবু।
‘খবর কিছুই নেই। আপনারা কেমন আছেন তাই দেখতে
এলুম।”
‘কেমন আর আছি! নেই বললেই চলে। যা সর্বনাশ হয়ে
গেলাে, এর পরে আর আমাদের থাকা! এই রাজপ্রাসাদ,
এত ঐশ্বর্য—কী হবে এ-সব এখন? কত্তার জ্যাঠতুতাে ভায়ের
ছেলেরা তাে এর মধ্যেই এসে দাবি জানিয়ে গেছে—এই সমস্ত
বিষয়-সম্পত্তির তারাই নাকি উত্তরাধিকারী।
তিনকড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেললাে।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
‘তা ওরা যদি আইনত উত্তরাধিকারী হয় তাে ওরাই
পাবে—এ নিয়ে মন খারাপ করা বৃথা।
‘কিন্তু তা তাে হতে পারে না—কত্তার বােন আছেন,
ভাগনি আছে, তাদের কি কোনােই দাবি নেই ?
‘আইনত নেই হয়তাে।
‘আমার মনে হয় কী জানেন? কত্তার ভাইপােরাই
খুনে হরেনের পক্ষে উকিল লাগিয়েছে—বােধ হয় প্রমাণ
করতে চাইবে যে অটলবাবুর মাথা খারাপ ছিলাে, এবং
পাগলামির ঝোকে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।
‘তাতে হরেনবাবু বাঁচতে পারেন, কিন্তু ওদের লাভ কী?
লাভ এই যে কত্তার উইল-টুইল যদি কিছু বেরােয়, সেগুলাে
নাকচ করে দেয়া যায়। ওরা ভয়ানক ধূর্ত লােক, কেননা
আইনের প্যাচ কষে লীলাকে ঠকাবার মতলবেই আছে
বােধহয়।
কাগজপত্র কিছু বেরিয়েছে নাকি?
‘তা বেরােয়নি, তবে এমন কতকগুলাে কাগজ পেয়েছি,
যাতে
চঞ্চল উৎসুক স্বরে বললে, “কী কাগজ? দেখি।
তিনকড়ি টেবিলের দেরাজ থেকে দু'খানা হাতে লেখা
কাগজ বের করলে। একটা চঞ্চলকে পােষ্যপুত্র নেবার
দলিল, আর একখানা অটলবাবুর উইল, তাতে তার ভাগনিকে
দেওঘরের বাড়ি আর যাবজ্জীবন মাসে পাঁচশাে টাকা মাসহারা
কাল-বৈশাখীর ঝড় দেয়া হয়েছে—এই সর্তে যে সে কোনােদিন বিয়ে করবে না। বিয়ে করলে মামার সম্পত্তি থেকে এক পয়সাও সে পাবে না। কাগজ দুটো অবশ্য পাকা দলিল নয়, খসড়া মাত্র, সই-টই কারুরই নেই। চঞ্চল বললে, হাতের লেখাটা হরেনবাবুরই মনে হচ্ছে। ‘হ্যা, তারই লেখা। তিনি যে ঘরে ছিলেন, তার বিছানার তলা থেকেই কাগজ দুটো বেরিয়েছে। ‘এ তো বড় আশ্চর্য ! ‘আশ্চর্য কাকে বলছেন ? ‘এই খসড়া দুটো করতে হরেনবাবু যে রাজি হয়েছিলেন তা কি আশ্চর্য নয় ? এ আর আশ্চর্য কী, বলুন। ঐ খসড়া দুটো যাতে দলিল হয়ে উঠতে পারে, সেইজন্যই তাে এমন একটা পৈশাচিক কাণ্ড তিনি করলেন। লােকটা এত বড়াে শয়তান, তা কে জানতাে! চঞ্চল বললে, ‘চলুন একটু কার ঘরে যাওয়া যাক, চাবি- গুলাে সব নিয়ে চলুন। ‘আর ও-ঘরে গিয়ে কী করবেন? ‘চলুন একটু খুঁজে-খুঁজে দেখি আর-কোনাে তথ্য উদ্ধার হয় কিনা। তিনকড়ির সাহায্যে অটলবাবুর সমস্ত দেরাজ বাক্স-টাক্স খুলে চঞ্চল কাগজের স্তুপের মধ্যে ডুবে গেলাে। আট ঘণ্টা সময় কেমন করে কেটে গেলাে সে টেরও পেলাে না। রণজিৎ- বাবুর বাড়ি ফিরতে রাত দশটা হয়ে গেলাে তার।
নয় আজ সােমবার। বেলা দশটা থেকেই ব্যাঙ্কশাল কোর্টের সামনে ছােটোখাটো একটি ভিড় জমেছে। খুনের মামলা হলেই লােকের কৌতূহল হয়—তার উপর খুন হয়েছেন কলকাতার একজন নামজাদা ধনী, আর খুন করেছেন তারই বাল্যবন্ধু, সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন বিখ্যাত উকিল—তাই এ মামলা শােনবার জন্যেও শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি অনেকে এসেছেন। তাছাড়া বেকার, উকিল ও খবরের কাগজের লোেক তাে আছেই। কোট বসলাে। আসামীর কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ালেন হরেন মিত্তির। রণজিৎবাবু তার সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে প্রস্তুত, সাক্ষীরা এক ধারে বসে অপেক্ষা করছেন। পারিক প্রসিকিউটর কেসটি আরম্ভ করলেন। তিনি বললেন : ‘গত ২০শে মার্চ তারিখে শােভাবাজারে ২নং রামকানাই লেনে বিখ্যাত ধনী অটল দত্তকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে যে খুন করা হয়েছিলো তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে, এবং হত্যাকারী বলে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেই হরেন্দ্রকুমার মিত্রই যে এ-কাজের জন্য দায়ী, তারও প্রমাণের অভাব নেই। অটলবাবু ছিলে, বিপত্নীক ও নিঃসন্তান। তাঁর এক-
কাল-বৈশাখীর ঝড়
মাত্র ভগ্নী কৃষ্ণনগরে থাকেন তার একমাত্র কন্যাকে নিয়ে।
এই কন্যার সঙ্গে নিজের পুত্রের বিবাহ দেবার জন্য হরেন্দ্রবাবু
উঠে পড়ে লেগেছিলেন। তিনি মৃত ব্যক্তির বাল্যবন্ধু, তার
উপর নিজে উকিল। নিজের ছেলের সঙ্গে লীলার বিয়ে দিয়ে
অটলবাবুর বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হওয়াই তার উদ্দেশ্য
ছিলাে, সমস্ত প্রমাণ থেকে তা-ই মনে হয়। এদিকে, যে
কারণেই হােক, হরেন্দ্রবাবুর ছেলের সঙ্গে ভাগনির বিয়ে
দেবার ইচ্ছা অটলবাবুর একেবারেই ছিলাে না। তিনি নাকি
বলতেন যে ভাগনির বিয়েই তিনি দেবেন না—সেটা নিশ্চয়ই
হরেনবাবুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবার একটা অছিলা মাত্র।
খুব সম্ভব, তাঁর বন্ধুর চরিত্র তিনি জানতেন, তাই এ প্রস্তাবে
অনেক চেষ্টা করেও তাঁর সম্মতি হরেন্দ্রবাবু পাননি।
এদিকে এই ঘটনার মাস দেড়েক আগে অটলবাবু চঞ্চল
নাগ নামে একটি যুবককে তার সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন।
ছেলেটিকে দেখে শুনে তার বড়ো ভালাে লাগে—তিনি স্থির
করেন একে পােষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করবেন। এ-প্রস্তাব
চঞ্চলের কাছে তিনি নিজমুখে করেন, এবং তাকে দু'তিন দিন
সময় যেন ভেবে দেখবার জন্য।
সেই সময়েই ঈষ্টরের ছুটিতে হরেন্দ্রবাবু তার কর্মস্থল
পাটনা থেকে কলকাতায় আসেন, 'এসে অটলবাবুর বাড়িতেই
ওঠেন। ছেলের বিবাহের প্রস্তাবটা পাকা করবার উদ্দেশ্যেই
তিনি এসেছিলেন। তাঁর আসবার পরের দিন বিকেলের
৩১
কাল-বৈশাখীর ঝড়-
.
“খবরদার! কোনাে জিনিসে হাত দেবেন না
No text on this page.
কাল-বৈশাখীর ঝড় দিকে অটলবাবুর ঘরে বসে চঞ্চল তার পােষ্যপুত্র হবার সম্মতি জানায়। তখন সে-ঘরে হরেন্দ্রবাবু উপস্থিত ছিলেন, এবং এ-ব্যাপারে চঞ্চলের প্রতি তিনি স্পষ্টতই খুব বিরক্তি প্রকাশ করেন। তারপর চঞ্চল ঘর থেকে বেরিয়েই শুনলে ঘরের মধ্যে দুই বন্ধুতে বেশ চটাচটি চলেছে। সে তার ঘরে এসে হরেন্দ্র- বাবুর নিজের হাতে লেখা ও স্বাক্ষরিত একখানা চিঠি পেলে -তাতে তিনি রীতিমত শাসিয়ে লিখেছেন যে অটলবাবুর প্রস্তাবে, অর্থাৎ তার পােষ্যপুত্র হ’তে রাজি হলে, চঞ্চল কিংবা স্বয়ং অটলবাবু কারুরই ভালাে হবে না। এর খানিক পরেই চঞ্চল পাশের ঘর থেকে একটা ভীষণ চীৎকার শুনতে পেলাে—“মেরে ফেললো! খুন করে ফেললো! কে আছে! বাঁচাও!” সে ছুটে পাশের ঘরে এলো, কিন্তু দরজার ধারে হরেন্দ্রবাবু তার হাত চেপে ধরলেন—কিছুতেই ঘরের মধ্যে যেতে দেবেন না। সে জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরে গিয়ে দেখলো অটলবাবু মৃত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন—রক্তে তার গায়ের জামা ও মেঝের কার্পেট লাল হয়ে গেছে ! পাশে পড়ে আছে একখানা খােলা ছুরি- এই যে, এই সেই ছুরি—তার ভাঁটে হরেন্দ্রবাবুর নামের আদ্যক্ষর খােদাই করা—এই দেখুন, H. M. খানিক আগেই চঞ্চল হরেন্দ্রবাবুর হাতে ঠিক এই ছুরিটাই কালবৈশাখীর ঝড় দেখেছিলো। তর্কাতর্কি হ'তে হ'তে রাগ সামলাতে না পেরে হরেনবাবু তাঁর বন্ধুর ঘাড়ে এই ছুরি বসিয়ে দিয়েছিলেন- ঘাড়ের একটা রগ কেটে গিয়েছিলাে আর তারই ফলে অটলবাবুর মৃত্যু হয়। হরেন্দ্রবাবু কাণ্ডটা করেই ভয় পেয়ে ঘর থেকে ছুটে পালিয়েছিলেন, কিন্তু একটু পরেই তার মনে পড়লো যে ছুরিটা নিয়ে আসা হয়নি। তক্ষুনি আবার ছুটলেন, কিন্তু ঘরের দরজাতেই চঞ্চলের সঙ্গে দেখা। অনেক চেষ্টা করলেন চঞ্চলকে ঠেলে সরিয়ে দিতে, কিন্তু কিছুতেই যখন পারলেন না, অগত্যা অদৃষ্টের হাতে আত্মসমর্পণ করলেন। ছেলের বিয়ে দিয়ে যে বিরাট লাভ করবেন বলে হরেন্দ্রবাবুর মৎলব ছিলাে, অটলবাবু চঞ্চলকে পােষ্যপুত্র গ্রহণ করলে সেটা ফসকে যায়, তাই তিনি আর-কোনাে উপায় ভেবে না-পেয়ে বাল্যবন্ধুকে একদম খুন করেই ফেললেন—তার দিক থেকে এতে এক ঢিলে দু’পাখি মারা হ’লল—প্রথমত, চঞ্চল অটলবাবুর পােষ্যপুত্র হ'তে আর পারলাে না, আর তা ছাড়া আমার অবর্তমানে ভাগনির সঙ্গে নিজের ছেলের বিবাহ দেবার কোনাে বাধাও আর রইলাে না। এ হত্যা যেমন নিষ্ঠুর তেমনি হীন স্বার্থপ্রণােদিত—এ-অবস্থায় হত্যার জন্য আইনে যে-চরম শাস্তির ব্যবস্থা আছে, তা-ই হওয়া উচিত। পাব্লিক প্রসিকিউটরের কথা শুনে কোর্টে উপস্থিত সকলের
কাল-বৈশাখীর ঝড়
মধ্যে একটা শিহরণের ঢেউ খেলে গেলো। ম্যাজিস্ট্রেট আসামির
দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার কিছু বলবার আছে ?
হরেনবাবু বললেন, মাননীয় পাব্লিক প্রসিকিউটর যা
বলেছেন তার বেশির ভাগই সত্যি। আমার ছেলের সঙ্গে
লীলার বিয়ে দিতে আমি খুব উৎসুক ছিলুম, আর বিবাহের
প্রস্তাব পাকা করবার উদ্দেশ্যেই ঈস্টরের ছুটিতে পাটনা থেকে
আসি। তবে একথা সত্য নয় যে অটলের সম্পত্তির মালিক
হবার জন্যই আমার এই ব্যগ্রতা। অটল আমার বাল্যবন্ধু,
লীলাকে ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি, এমনকি ওকে
পুত্রবধূরূপে অনেকদিন ধরেই কল্পনা করছি—আমার আগ্রহের
এ ছাড়া আর কারণ নেই। কিন্তু অটলের এই এক অদ্ভুত
গে। ছিলাে—কিছুতেই লীলার বিয়ে দিতে সে রাজি ছিলো
। বিশেষভাবে আমার সম্বন্ধে, কি আমার ছেলের সম্বন্ধে
ষে তার আপত্তি ছিলাে তা নয়, ভাগনির বিয়েই সে কখনাে
দেবে না, এই ছিলাে তার মত। এ-কথা সে যে শুধু আমাকে
ফেরাবার জন্যই বলেছে তা নয়, এ-কথা সে আশে-পাশে সকলের
কাছেই অনেকবার বলেছে। আমার সন্দেহ হ’তে যে তার
হয়তাে মাথায় একটু ছিট আছে—তার অনেক আচার-ব্যবহারই
অদ্ভুত ছিলাে-বাপ-মরা ভাগনির জীবনটাই হয়তাে সত্যি-
সত্যি সে নষ্ট করে দেবে। এইজন্যও আমি লীলার
বিয়ের জন্য খুব জেদ করছিলুম। চঞ্চলকে অটল পােষ্যপুত্র
নেবে তা শুনে আমি অবশ্য খুশি হইনি—
কাল-বৈশাখীর ঝড়
এখানে পাব্লিক প্রসিকিউটর জিজ্ঞেস করলেন, কেন খুশি
হননি?
‘অটলের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের অনেক
দিনের মােগাযােগ। এত বড়াে একটা বনেদি ঘরে হঠাৎ
কোথাকার কে উড়ে এসে জুড়ে বসবে, আমাদের সেটা ভালাে
লাগে না।
‘আর-কোনাে কারণ নেই ? যে-সম্পত্তি নিজে বাগাতে
চেয়েছিলেন সেটা পাছে হাতছাড়া হয় সেজন্য আপনি চিন্তিত
ছিলেন না ?
কোটে অনেকে মৃদুস্বরে হেসে উঠলেন। ম্যাজিস্ট্রেট
বলে উঠলেন, ‘Order ! Order !
গােলমাল থামলে হরেনবাবু বললেন, না, তা ছিলুম না। .
পাব্লিক প্রসিকিউটর ঠোট বাঁকিয়ে বললেন, এর পরে
আপনি নিশ্চয়ই বলবেন যে কোন ভূত এসে অটলবাবুকে
খুন করে গেছে ?
‘ভূত করেছে কিনা জানিনে, কিন্তু আমি করিনি। সেদিন
বিকেলে চঞ্চল ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরে অটলের সঙ্গে
আমার কথা-কাটাকাটি হয় তা সত্যি। তার ফলে আমার
মেজাজ এত খারাপ হয়ে যায় যে একটু পরেই আমি দোতলায়
নিজের ঘরে চলে আসি। চঞ্চল যে-চীৎকার শুনেছিলাে তা
আমি শুনিনি। খানিক পরে আমার মনে হ’লল, খামকা ওর
সঙ্গে ঝগড়া করলুম—যাই, মিটমাট করে আসি। অটলের ঘরের
।
কাল-বৈশাখীর ঝড়
করবার উদ্দেশ্যও যথেষ্ট আছে। অতএব উনিই এ-কাজ
করেছেন এ-কথা মনে করা ছাড়া উপায় কী ?
এর পরে প্রধান সাক্ষী চঞ্চল নাগকে ডাকা হলাে। চঞ্চল
বেশ শান্ত মুখেই উঠে দাড়ালাে, তার হাতে ব্রাউন পেপারে
মােড় একটা প্যাকেট। বিচারালয়ের শপথবাক্য উচ্চারণ
করে সে আস্তে-আস্তে বললে, ‘আটলবাবুর জীবনের রহস্য, আমি
আবিস্কার করেছি।
সমস্ত কোর্টে একটা চঞ্চলতার সাড়া পড়ে গেলো।
বিপক্ষের উকিল জিজ্ঞেস করলেন, কী সেই রহস্য?
‘তার জীবনের যা রহস্য তার মৃত্যুর রহস্যও তা-ই।
বিপক্ষের উকিল বললেন, ‘অত বেশি রহস্য না করে সাদা
কথায় বলুন।
চঞ্চল বলতে লাগলো, বলছি। আমি একদিন শর
বাড়ির সমস্ত কাগজপত্র ঘেঁটে তার জীবনের ইতিহাস উদ্ধার
করেছি। কেউই জানে না যে অটলবাবুর ডায়েরি লেখবার
অভ্যেস ছিল। সেই খাতাগুলাে আমি সঙ্গে করে নিয়ে
এসেছি—তার নিজের হাতে লেখা। কাজেই আমার কথার
সত্যতা প্রমাণ করবার কোনো অসুবিধে নেই।
‘আমি যখন অটলবাবুর সেক্রেটারি হয়ে এলুম, তার
কোনাে-কোনাে অভ্যেস আমার ভয়ানক অদ্ভুত লেগেছিলাে।
প্রথমেই আমি লক্ষ্য করি যে তাঁর মৃত্যুভয় অসাধারণ।
কোনােরকম ধারালাে কি ছুঁচলো যন্ত্র তিনি তার কাছাকাছি
কাল-বৈশাখীর ঝড়
আসতে দিতেন না—একটি আলপিন পর্যন্ত নয়। পেন্সিল
কি কলমের বদলে পালক দিয়ে শিখতেন। ভাত খেতেন
হাত দিয়ে। “ছুরি” কথাটা শুনলেও শিউরে উঠতেন। তার
চুল ছেটে দিতে আর নখ কেটে দিতে মাইনে-করা নর্স।
ডাক্তারের আনাগােনা ছিলো সব সময়। অত্যন্ত অল্প খেয়ে
অতি সাবধানে থাকতেন। তাছাড়া অত্যন্ত গ্রীষ্মেও ভারি-
ভারি জামা-কাপড় পরতেন, সব সময় মােজা পরতেন, শরীরের
যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে না-পারলে তিনি শান্তি পেতেন না।
‘তার এসব অভ্যেস সকলেই বড়ােলােকের অদ্ভুত খেয়াল
বলে মেনে নিয়েছিলাে। কিন্তু এর অন্য কারণ ছিলাে।
সে-কারণ খুব বাস্তব। তিনি হিমােফিলিয়ার রােগী ছিলেন।
হিমােফিলিয়া খুব বিরল আর খুব অদ্ভুত লােগ। তাতে
এমনিতে শরীরের কোনাে ক্ষতিই হয় না, কিন্তু কোনাে
কারণে একটু রক্তপাত হলে সে-রক্তপাত আর সহজে থামতে
চায় না।
অনেক সময় খুব সামান্য কারণ থেকেই মৃত্যু হয়।
পাব্লিক প্রসিকিউটর জিজ্ঞেস করলেন, কী করে আপনি
জানলেন যে তাঁর হিমােফিলিয়া ছিলাে? পোস্টমর্টেমে কি
তা ধারা পড়তো না ?
‘একটু ধৈর্য ধরুন, সবই বলছি। এই রােগের উল্লেখ তার
ডায়েরির পাতায়-পাতায়। দশ বছর আগে তার ভাই
ড্যালহৌসি পাহাড়ে গিয়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কারণ
হিমােফিলিয়া—ও-রােগ এক ভাইয়ের থাকলে প্রত্যেক
१२
কাল বৈশাখীর ঝড় ভাইয়েরই থাকতে হবে। সামান্য একটা দাঁত তুলতে গিয়ে অজস্র রক্ত-উদগীরণ করতে-করতে ভাইকে যখন চোখের সামনে মরতে দেখলেন তখন থেকে অটলবাবুর জীবনের সমস্ত স্বাদ চলে গেলাে। এ-রােগ যে তাঁর মাতুল-বংশে আছে এ-রকম তিনি শুনেছিলেন, কিন্তু তার নিজের শরীরে যে ঐ রােগ সত্যি- সত্যি বাসা বেঁধেছে তার এমন মর্মান্তিক প্রমাণ পেয়ে তার মন একেবারে বিকল হয়ে যায়। ভাইয়ের মৃত্যু তার মনকে এমন দারুণ নাড়া দেয় যে তার পরে তিনি কখনাে কোনাে পাহাড়ে পর্যন্ত যাননি। তিনকড়িবাবু জানেন যে গত দশ বছরের মধ্যে অটল- বাবুর প্রত্যেক গ্রীষ্ম কলকাতাতেই কেটেছে। আসলে, সেই থেকে নিষ্ঠুর মৃত্যুভয় তাঁর জীবন বিষময় করে তুলেছে, এবং এই আতঙ্কের ফলে তার স্বাস্থ্যও সত্যি-সত্যি খারাপ হয়ে যেতে লাগলের হার্টের অবস্থা যে ভালাে ছিলাে , তা তাে ডাক্তারই বলেছেন। ‘ভাইয়ের মৃত্যুর কিছুদিন পরেই অটলবাবুর পত্নীবিয়ােগ হ'লাে, আর তখন থেকে তিনি শূন্যপুরীতে নিজেকে বন্দী করলেন। ছুরি কাঁচি আলপিন পেনসিল সম্বন্ধে তার আতঙ্ক এখন বেশ বােঝা যাচ্ছে না কি ? তার বদ্ধমূল ধারণা ছিলাে যে কোনােরকমে তাঁর গা থেকে এক ফোটা রক্তও যদি বেয়ােয়, তাহলে সে-রক্তপাত কাল-বৈশাখীর ঝড় আর থামানো যাবে না—তাতেই তার মৃত্যু হবে। সমস্ত শরীর সব সময় ঢেকেও রাখতেন ঐ কারণেই। বলা কী যায়—কখন কোথায় একটু কেটে যায় ! এই ভয় প্রায় একটা ব্যাধিতে দাড়িয়ে গিয়েছিলো—এ-ভয়ের কথা কাউকে বলতেও তিনি ভয় পেতেন, মুখ ফুটে কাউকে কক্ষনাে বলেননি—এক ডায়েরির পাতায় মনের কথা লিখে যেতেন। “একটা আলপিনের খোঁচায় যে জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে, সে-জীবন ধারণ করে লাভ কী?” “এ-আতঙ্ক আর কতকাল সইবাে। এর চেয়ে মৃত্যু ভালাে।” এ-রকম কথা প্রায়ই তার ডায়েরিতে পাওয়া যায়, আবার পরের পাতাতেই হয়তাে লিখছেন, “না, না, বেঁচে থাকবাে। যেমন করে পারি, যতদিন পারি বেঁচে থাকবাে। জীবনে কোনাে সুখ নেই, তবু বাঁচবাে।” চঞ্চল একটু থামল। পাব্লিক প্রসিকিউটর জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আপনি বলতে চান যে হরেনবাবু অটল- বাবুকে খুন করতে চাননি—এমনি আদর করে গলায় ছুরির corts দিয়েছিলেন, তারপর অটলবাবু মারা গেলেন হিমােফিলিয়ায় ? চঞ্চল বললে, আমাকে শেষ পর্যন্ত বলতে দিন, বেশি সময় নেব না। হিমােফিলিয়া ভারি অদ্ভুত রােগ—তা বংশানুক্রমিক, কিন্তু মেয়েদের ও-রােগ হয় না। মেয়েরা নিজেরা ও-বােগ থেকে মুক্ত, কিন্তু—এটাই সব চেয়ে আশ্চর্য-ও-রােগ বহন ৭৪ কাল-বৈশাখীর ঝড় করে তারাই—অর্থাৎ রােগটা আসে মা-র দিক থেকে। এই জন্যেই অটলবাবুর এই অদ্ভুত পণ যে কিছুতেই ভাগনির বিয়ে দেবেন না। তাঁর ভগ্নী নিজে সম্পূর্ণ নীরােগ, ভগ্নীর কন্যাও তাই, কিন্তু তার বােনের যদি ছেলে হ’তে সে ও-বােগ নিয়েই জন্মাতাে, এবং তার ভাগনির যদি বিয়ে হয় এবং ছেলেপুলে হয়, তাহলে সেই ছেলেদের ও-রােগ হতে বাধ্য। এই রােগ নিয়ে আবার কেউ পৃথিবীতে জন্মাবে, এ-চিন্তা অটলবাবুর পক্ষে ছিলাে অসহ-ভাগনির বিয়ে যে তিনি কিছুতেই দিতে চাননি, এই অদ্ভুত রহস্যের সমাধান এইখানে। পাব্লিক প্রসিকিউটর বললেন, ‘সবই বুঝলুম, কিন্তু অটল- বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারটা কিছুই পরিষ্কার হলাে না। ‘এইবার হবে। তিনি স্বাভাবিক ভাবেই হঠাৎ হার্টফেল করে মারা গিয়েছেন, তার মৃত্যুর জন্য হরেনবাবু একেবারেই দায়ী নন। কথাটা উচ্চারিত হওয়ামাত্র কোর্টে মহা সােরগােল পড়ে গেলাে, ম্যাজিস্ট্রেট বারবার বলতে লাগলেন, ‘Order ! Order: ওদিকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানাে হরেনবাবুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলাে, আর রণজিৎবাবু অত্যন্ত অবাক হয়ে চঞ্চলের মুখের দিকে তাকালেন। পাব্লিক প্রসিকিউটর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এ-কথা আপনি প্রমাণ করতে পারেন?
কাল-বৈশাখীর ঝড় চঞ্চল বললে, ‘অটলবাবুর মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়েছিলাে আমি বলে যাচ্ছি, তাহলেই বুঝতে পারবেন। সেদিন বিকেলবেলা—আমি তাে চলে এলুম ঘর থেকে তারপর দু’ বন্ধুতে কথা-কাটাকাটি শুরু হলাে। ইনি বললেন, “আমার ছেলের সঙ্গে তােমার ভাগনির বিয়ে দিতেই হবে”, উনি বললেন, “কিছুতেই দেবাে না।” খানিক পরে হরেনবাবু বিরক্ত হয়ে তার নিজের ঘরে চলে গেলেন। অটলবাবুর মনটাও নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে উঠেছিলাে, গান-টান শােনবার আশায়—তিনি খুব সংগীতপ্রিয় ছিলেন—তিনি রেডিও খুললেন। রেডিওতে একটা রােমাঞ্চকর” নাটক হচ্ছিলাে। আমি আগেই বলেছি, মৃত্যুভয়ে অটলবাবু কেমন যেন আধ- মরা হয়ে গিয়েছিলেন--আকাশে ঝড় উঠলে কি মেঘ ডাকলেই তাঁর প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাবার অবস্থা হতাে—হার্টও তার দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাে। রেডিওতে ঐ নাটক চলেছে, ইতিমধ্যে বাইরে কাল- বৈশাখীর ঝড় উঠলাে। দু’দিন আগেই আমি স্বচক্ষে দেখেছি ঝড় উঠলে তিনি কী ভয়ানক ব্যাকুল হয়ে পড়েন ! ভয় পেয়ে হয়তাে ভেবেছিলেন আমাকে ডাকবেন, কিন্তু তক্ষুনি ঘরের মধ্যে এক প্রচণ্ড চীৎকার শােনা গেলাে‘মেরে ফেললে, খুন করে ফেললে, কে আছে বাঁচাও! ঐ চীৎকারই আমি শুনেছিলুম-ওটা রেডিওর নাটকেরই একটা কথা। পরমুহূর্তেই কড়কড় শব্দে বাজ পড়লল, সঙ্গে-সঙ্গে কাল-বৈশাখীর ঝড় ঘরের ইলেকটিক কারেন্ট গেলাে বন্ধ হয়ে—ঝড়ের সময় প্রায়ই ইলেকট্রিসিটির গােলমাল হয়—রেডিও গেলাে থেমে, আর অটলবাবু যে কী প্রচণ্ড ভয় পেলেন তা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও বােধ হয় সম্ভব নয়। প্রথমত ঐ উৎকট চীৎকার, আর সঙ্গে-সঙ্গে বাজ পড়ার শব্দ—তারপর রেডিও গেলাে বন্ধ হয়ে। অটলবাবুর ঠিক কী মনে হয়েছিলাে জানিনে, হয়তাে ভেবেছিলেন তার ঘরের মধ্যে সত্যি-সত্যি কেউ কাউকে খুন করে ফেলছে, হয়তাে মনে হয়েছিলাে ঐ চীৎকার তার নিজেরই গলা দিয়ে বেরিয়েছে -কিন্তু সে যাই হােক, অত ভয় তিনি সহ্য করতে পারলেন , তক্ষুনি হার্টফেল করে মরে গেলেন। তাঁর দেহ ঢ'লে পড়লাে মেঝের উপর, সঙ্গে-সঙ্গে গােল সেন্টার-টেবিলটি উল্টিয়ে গেলাে, আর তার উপরে যে-ছুরিটি হরেনবাবু ভুল করে ফেলে এসেছিলেন সেটি ছিটকে গিয়ে তার ঘাড়ে বেশ জোরে চেপে বসলাে, একটা রগ কেটে গিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরতে লাগলাে। পাব্লিক প্রসিকিউটর জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু তাহলে কি ছুরিটার বিধে থাকা উচিত ছিলাে না? ওটা তাে মৃতদেহের পাশে মাটিতে পড়ে ছিলাে, তা-ই নয় ? চঞ্চল বললে, ছুরির মুখটা লাগেনি, লেগেছিলাে ধারালাে দিকটা, কেটে দিয়েই পড়ে গিয়েছিলাে। খানিক আগে হরেন- বাবু যখন ছুরিটা বের করে চুরুটের মুখ কাটলেন, তখনই ৭৭ কাল-বৈশাখীর ঝড় ঐ অটলবাবু বেশ ভয় পেয়েছিলেন বলে আমার মনে হয়। ও-সব জিনিস দেখলেই তার হৃৎকম্প উপস্থিত হতাে। আমি যেদিন প্রথম ও-বাড়ি গেলুম, নতুন চাকর ভুল করে খাবার টেবিলে ছুরি-কাটা সাজিয়ে দিয়েছিল, তা দেখে তিনি এমন আঁৎকে উঠেছিলেন যেন ছুরি-কাটাগুলাে সব জ্যান্ত সাপ! বােধ হয় ঐরকম চরম ভীত অবস্থায় টেবিলের উপর চকচকে ছুরিটা তার চোখে পড়েছিলাে, এবং তাতেই বােধ হয় তার দাঁতে দাঁতে লেগে যায়। আপনারা তাে জানেন যে মৃতদেহ দাতে দাত- লাগা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিলাে। ঐ ছুরিটা অটলবাবুর সামনে বের করাই হরেনবাবুর অন্যায় হয়েছিলাে, আরাে বেশি অন্যায় হয়েছিলাে ওটা ভুলে ঘরে ফেলে যাওয়া—কিন্তু এ ছাড়া আর-কোনাে অপরাধ তিনি করেননি। ‘আচ্ছা, ঐ চীৎকারটা রেডিওর নাটকের, সে-বিষয়ে আপনি নিঃসন্দেহ ? ‘সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ। আমরা যখন ও-ঘরে ঢুকলুম তখন ইলেকট্রিক কারেন্ট ছিলাে না। খানিক পরে যখন কারেন্ট ফিরে এলে, রেডিওতে গান বেজে উঠলল। তাতে প্রমাণ হয় রেডিওর চাবিটা আগে থেকেই ভােলা ছিলাে। বেতারের প্রােগ্রামে দেখলুম সেই সময়ে একটা নাটক হচ্ছিলো—একটা “thriller”। পরে আমি রেডিওর আপিশে গিয়ে সেই নাটকের পাণ্ডুলিপি দেখে এসেছি, তাতে একজন পুরুষের মুখে ঠিক ঐ কথা আছে, আর সেটা খুব চেঁচিয়ে বলবার নির্দেশও আছে। ৭
কাল-বৈশাখীর ঝড়
‘আচ্ছা, চীৎকারটা না-হয় মিথ্যে, কিন্তু তাই বলেই কি
প্রমাণ হয়ে গেলাে যে অটলবাবু স্বাভাবিকভাবে মরেছেন?
‘তা হয় না, কিন্তু তারও প্রমাণ আছে। পােস্টমর্টেমের
facetté 2765—"Death caused by heart-failure” |
অবশ্য প্রচুর রক্তপাত হতে-হ’তেও মানুষের হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া
বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু এক্ষেত্রে অটলবাবু আগে মরেছিলেন,
তারপর তার গলায় ছুরি লেগেছিলাে। তা যদি না হ’ততা,
তাহলে হিমােফিলিয়া রােগীর এত রক্তপাত হতাে যে
কার্পেটের শুধু একটা সবুজ ফুল নয়, সমস্ত কার্পেটই লালে
লাল হয়ে যেতাে। ঐ কাটা ঘা থেকে রক্ত পড়া যে খানিক
পরেই থেমে গিয়েছিলাে তাতেই প্রমাণ করে যে, ঐ আঘাত
লাগবার আগেই তিনি ম'রে ছিলেন, অর্থাৎ ছুরিটা বসেছিলো
মৃতদেহের গায়ে।
‘কিন্তু অটলবাবুর হয়তাে হিমােফিলিয়া ছিলােই না, হয়তাে
তার ধারণা ভুল ছিলাে।
‘তা হতেই পারে না। এক ভাইয়ের ও-লােগ থাকলে
আর-এক ভাইয়ের থাকতেই হবে।
‘তাহ'লে পােস্টমর্টেমে ধরা পড়লাে না কেন?
‘হিমােফিলিয়ার জন্য রক্তের যে বিশেষ রাসায়নিক পরীক্ষা
করা দরকার তা করা হয়নি বলে। ও-রকম সন্দেহ তো
কারাে হয়নি। কিন্তু হার্ট যে দুর্বল ছিলাে তা তাে পরীক্ষায়
ধরা পড়েছে।
৭৯
কাল-বৈশাখীর ঝড় পাব্লিক প্রসিকিউটর বললেন, ‘বেশ, আপনার আর-কিছু বলবার দরকার নেই। চঞ্চল বললে, আর একটি কথা বলে আমি শেষ করবাে। হরেনবাবুর নির্দোষিতার আর-একটা প্রমাণ আমি পকেটে এনেছি। এই দেখুন- এই বলে সে পকেট থেকে সেই দলিলের খসড়া দুটো বের করলে। এ দুটোই হরেনবাবুর নিজের হাতের লেখা, তার বিছানার তলায় পাওয়া গিয়েছিলাে। দেখুন। পাব্লিক প্রসিকিউটর কাগজ দুটোর উপর চোখ বুলিয়ে হরেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন-এ আপনার হাতের লেখা ? ‘হ। ‘কবে লিখেছিলেন ? ‘অটল মরবার আগের দিনই। তার ইচ্ছেমতােই খসড়া করা হয়েছিলাে—ইচ্ছে ছিলাে আমি চলে যাবার আগেই দলিল পাকা করা হবে, কিন্তু তা তাে আর হলাে না। চঞ্চল বললে, “এই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে অটলবাবুর হরেনবাবুর সম্পত্তির উপরে লােভ ছিলাে না ? আমাকে পােষ্যপুত্র নেবার দলিল তত তিনিই করেছিলেন তার নিজের এ-বিষয়ে খুবই অমত ছিলো কিন্তু বন্ধুর ইচ্ছেমতাে উকিলের কাজটুকু করে দিয়েছিলেন। এদিকে অটলবাবুর উইলের খসড়াতেও বােঝা যায় যে ভাগনির বিবাহে তাঁর অনিচ্ছা
কাল-বৈশাখীর ঝড়
হরেনবাবুকে ফেরাবার অছিলামাত্র নয়—বিয়ে করলে ভাগনি
কিছু পাবে না এ-কথাই স্পষ্ট লেখা আছে। এই উইল
হরেনবাবুর সাহায্যেই তৈরি করা হচ্ছিলো—এতে বােঝা যায়
অটলবাবু বন্ধুকে যথেষ্ট বিশ্বাস করতেন—তাছাড়া এই উইলের
খসড়া লেখা হবার পরেও তাে হরেনবাবু বিবাহের প্রস্তাব
নিয়ে পিড়াপিড়ি করছিলেন। যদি টাকার উপরেই তাঁর
লােভ, তাহলে তাে তখনই তার স’রে পড়া উচিত ছিলো।
এই বলে চঞ্চল বসে পড়লাে।
কোট যখন ভাঙলল, চঞ্চলকে ছােটো একটি দল ঘিরে
ফেললাে। সকলেই তার সঙ্গে কথা বলতে চায় বিশেষ করে
খবরের কাগজের লোেকরা তাকে কিছুতেই আর ছাড়ে না।
অনেক চেষ্টায় সেই ভিড় ঠেলে চঞ্চল, রণজিৎবাবু আর
হরেনবাবুর সঙ্গে বেরিয়ে এলাে রাস্তায়।
রণজিৎবাবু তার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘সাবাস ছেলে!
তুমি একেবারে পাকা ডিটেকটিভ হয়ে উঠেছে দেখছি।
আমার তো এ-সব কথা কিছুতেই মনে আসতো না।
চঞ্চল বললে, “উঃ, এর জন্যে কি এ কদিন আমাকে কম
খাটতে হয়েছে ! নাওয়া-খাওয়া ছিলাে না। প্রথম থেকেই
আমার মনে হয়েছে যে ব্যাপারটা যত সহজ মনে হচ্ছে তত
সহজ নয়—ভিতরে কিছু গােলমাল আছে। তালা ভুলবার
সঙ্গে-সঙ্গেই রেডিওতে যেই গান বেজে উঠলাে, অমনি চট করে।
--- কালবৈশাখীর ঝড় আমার সন্দেহ হলাে। রেডিওটা তাহলে ভােলা ছিলাে! কেন খােলা ছিলাে ? কে খুলেছিলাে? এই ভাবতে-ভাবতেই খোজ নিলুম সেই সময়ে কী প্রােগ্রাম হচ্ছিলাে। হচ্ছিল নাটক। অমনি আমার মন ছৎ করে উঠলাে—ঐ চীৎকার তাহলে রেডিওর নয় তাে? ছুটলুম রেডিওর আপিশে। যে-হূর্তে প্রমাণ হ’লল যে চীৎকারটা মিথ্যে, অমনি লেগে গেলুম অন্যান্য তথ্য সন্ধানে। অটলবাবুর কাগজপত্র ঘেঁটে সে-সব বেরুলাে। ‘তুমি তাে কম চাপা নও, চঞ্চল’, বললেন রণজিৎবাবু। ‘আমাকে একটি কথাও বলেনি। ‘ইচ্ছে করেই বলিনি। নিজে নিজে সবটা করবাে এই ইচ্ছে ছিলাে। রণজিৎবাবু আবার বললেন, ‘সাবাস! চঞ্চল বললে, রেডিওটা যদি তখন বেজে না-উঠতাে, তাহলে আমারও মনে কোনাে সন্দেহ হতাে না। এ রেডিওই আপনাকে বাঁচালো, হরেনবাবু! হরেনবাবু হেসে বললেন, ‘সেটা বললে ভুল বলা হয়, কারণ ঐ রেডিওর গান তাে আরাে অনেকে শুনেছিলাে। আমাকে বাঁচালাে তােমার বুদ্ধি আর তােমার পরিশ্রম—নয়তাে তােমার, বন্ধু রণজিৎবাবু তাে আমাকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবার ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণই করে গুনছিলেন। রণজিৎবাবু বললেন, ‘সতি আপনার উপর দিয়ে কী ঝড়ই গেলাে! আমি অত্যন্ত দুঃখিত, হরেনবাবু—কিন্তু মানুষ- ৮২
কাল-বৈশাখীর ঝড়
মাত্রেরই ভুল হয়। তাছাড়া কেসটার চারদিকের ঘটনা
আপনার বিরুদ্ধে এমন মিলে গিয়েছিলাে যে, এতে যে কোনাে
গলদ থাকতে পারে তা কারুর মনে হবারই কথা নয়—অবশ্য
চঞ্চলের কথা আলাদা। যাকগে, এ-সব কথা এখন ভােলবার
চেষ্টা করুন, চলুন কোনাে ভালাে রেস্তোয় গিয়ে কিছু খাওয়া
যাক।
।
শেষ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.