Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Maya-kajal
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মান্না-কাজল শ্ৰী হেমেন্দ্রলাল রায়
প্রকাশক--
বারিদকান্তি বসু
আৰ্য সাহিত্য-ভবন
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট,
কলিকাতা
জন্মাষ্টমী
১লা ভাদ্র-১৩৩৭
মুদ্রাকরশ্ৰীশশধর ভট্টাচাৰ্য্য
মাসপয়লা প্রেস
১৫/এ ঝামাপুকুর লেন,
কলিকাতা
দাম-দেড় টাকা
বৌদি’ সুশীলা দেবীর স্মৃতির উদ্দেশে
মায়া-কাজলের অঙ্গ-সৌষ্ঠব সম্পর্কে শিল্পী-
বন্ধু শ্ৰীমান প্রভাত নিয়ােগী ওঁ শ্ৰীযুক্ত ফণী-
গুরে কাছে আমি বিশেষ ভাবে ঋণী।
তা ছাড়া বিখ্যাত কথা-সাহিত্যিক বন্ধুবর
শ্ৰীযুক্ত মণীন্দ্রলাল বসুও এ ব্যাপারে আমাকে
যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। প্রেস-কপি প্রস্তুত
করা, প্রুফ দেখা ইত্যাদি ব্যাপারে সাহায্য
পেয়েছি আমি আমার বাল্যবন্ধু শ্ৰীযুক্ত
বিজয়কৃষ্ণ সিংহ ও প্রীতি-ভাজন
কমলকৃষ্ণ রায়, শ্ৰীমান্ সুধীন্দ্রনারায়ণ নিয়ােগী
ও শ্ৰীযুক্ত ক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছ থেকে।
এইসব অযাচিত সাহায্য কেবল ‘মায়া-কাজলের
ভেতরেই ছাপ রেখে যায়নি, আমার মনের
ভেতরেও ছাপ রেখে গেছে। তাই এদের
সকলের কাছেই আমি আমার অন্তরের অকপট
কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
শ্ৰীযুক্ত
*।
৪ ১৪ ১৮ ৩৯ মায়া-কাজল মান্ত গড়িবে স্বর্গ দীপালী পুষ্প ও মুকুল সম্ভাবনা শরতের দ্বিপ্রহর সিন্ধুর প্রেম নদীর নিশ্বাস প্রকৃতির স্নেহ উকণার অভিশাপ জীপসী স্বেচ্ছাচারী মেঘের প্রেম বর্ষা-বরণ তড়িৎ লতার মঞ্জরী বর্ষায় জ্যোৎস্না রাতে রাতের ইতিহাস সাফাই অপরূপ অভিব্যক্তি তনু অখি কলহাস্য ৪৮ ৪৯ ৫৪ ৩৪ ৬৮ ৭১ ৭২ অকূল পাথার অনন্ত স্বপন কথামৃত চিত্রন্তন আগমনী বৈষ্ণব কবিতা ৭ ৪ ৭৭ ৭৮ ওমরের স্বপ্ন মাস-পহেলা ভাদ্রমাসের গান ফাগুন-বরণ কলাপী শিশু শরৎ-প্রশস্তি মরীচিকা ক্ষ্যাপার খেয়াল রাজরাজেশ্বরী নারী নদী ও নারী পথ নাহি জানি খেয়াপার অসমাপ্ত সাগরিকা ১০৪ ১০৭ ১০৯ ১১৩ ১১৫ মায়াবাজল **
No text on this page.
} মানস-তুলির আলপনাতে রঙ-ঝরানাে যাহার কাজ সেই পরালাে মায়া-কাজল-কল্পনাররা ভাঙল লাজ। উধাও হয়ে চিত্ত উড়ে আকাশ মরু সমুদ্রে !••••••• মায়া-কাজল খুলছে ব'সে অপরূপের রূপের ভঁজ। খুলছে ব’সে আলাের লেখা পদ্মদলের পাপড়িতে, জরির আঁচল জড়িয়ে দিল অন্ধকারের পাঁজড়িতে। কালাের মাঝে ছড়িয়ে গেল অচিন আলাের আনন্দ- উপচিয়ে সে উছলে পড়ে—উথলে পড়ে চারভিতে। জানিনে তার কারসাজি কি -মিছেই চোখে জল আনে, মেঘের সাথে মেঘ লাগিয়ে কড়-ড়িয়ে বাজ হানে, বাজের বুকে জাগায় আবার বিদ্যুতেরই দীপ্তি গাে। মায়া-কাজল এতও কি সে মায়াপুরীর ছল বনের বুকে ফুলের দোলায় সেই তাে দোলায় বসন্ত, ফাগুন থাকে তারি বুকের আগুন শিখায় ঘুমন্ত, সাপের মাথার সবুজ মণি তারও লাগি’ হাত বাড়ায় মনের মরু ফুলে ফুলে হঠাৎ করে ফুলন্ত। জানে ! ১
মায়-কাজল
মায়া-কাজল—মায়-কাজল সেই জাগালাে অন্তরে,
জালে তাহার জড়িয়ে গেল স্বপ্ন-লােকের ছন্দরে।
তিলােত্তমা উঠছে গড়ে নিখিল রূপের লাবণ্যে—
মদনে সে ভস্ম করে ফের বাঁচালাে মন্তরে ।
:
কালাে তুলি-কাজল তুলি-নীল তুলিতে রূপ ঝরায়,
নীহারিকার বুকের মাঝে ইন্দ্রধনু টিপ পরায়।
কবির আঁখি রাঙিয়ে ওঠে স্বপ্নে এবং সত্যে গাে-
মায়া-কাজল-ছন্দ গাঁথি তাই তাে বসে তার ছায়ায়।
বুলিয়েছে রে মায়া-কাজল—চোখে তুলি বুলিয়েছে,
মরীচিকার মায়ার রঙে নিখিল ভুবন ভুলিয়েছে,
দু’কূল-হারা অচিন পথে হঠাৎ দিয়ে হাতছানি
যাদুকরের যাদুর মালা গলায় গেছে দুলিয়ে যে !
২
মানুষ গড়িবে স্বর্গ
বিধাতা গড়েছে বিশ্ব—তারি সাথে গড়েছে মানুষ
যে মানুষ উড়ায়েছে স্পর্ধা ভরে বিদ্রোহ পতাকা,
যে মানুষে দীপ্তি আছে, তবুও যে নহে নিষ্কলুষ,
রহস্যের কুহেলিতে খেয়ালী অন্তর যার ঢাকা।
মানুষের স্বর্গ ভূমি আনন্দে গড়িতে গিয়া তাই,
সহসা থামিয়া গেছে বিধাতার দীপ্ত করতল,
যে স্বর্গ সহজ ছিল মানুষ তাহারে পায় নাই,
বিদ্রোহী মানুষ তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি করেছে নিষ্ফল।
তবু সে কল্পনা আছে—আছে তার গড়িবার আশা,
আকাশে ছড়ায়ে আছে তার দিব্য আলাের বিভব,
ধরণীর মধুচ্ছন্দে আছে তার লাবণ্য-বিলাস।
স্বর্গেরে গড়ার লাগি’ তপস্যা করিছে ভালােবাসা,
বিধাতা বিদ্বিষ্ট নহে—স্বর্গ গড়া নহে অসম্ভব।
মানুষ গড়িবে স্বর্গ–পেয়েছে সে তাহার আভাস।
৩
দীপালী
আকাশের হাসি মর্ত্যে নেমেছে—ফুটেছে তারার ফুল,
রাতের আঁধার দিন হয়ে গেল বিস্ময়ে বিকুল।
বাতাসের মাঝে ধূলাের ধোয়ায়,
লাল আবিরের আমেজ ঘনায়,
দেয়ালীর রাত খেয়ালী মনের দেয়ালাতে মশগুল।
সন্ধ্যা না হ’তে ভােরের আলােক ভিড়েছে ধরার বুকে,
তড়িতের ধারা উতরােল হ'লাে ঝার কৌতুকে।
কালাে নয়নের চাহনির আলাে,
দিকে দিকে আজ আগুন জ্বালালাে,
চিত্তের তলে যে ছিল সে এলাে বিশ্বের সম্মুখে।
বাসুকী জেগেছে অতল পাতালে–মেলেছে হাজারাে ফণা,
কালাের পাথারে তারি মাথে জ্বলে লাখাে মাণিকের কণা।
বসন্ত বায় বনান্তে আজ,
ভেঙেছে কুঁড়ির ভয়ে ভরা লাজ,
রাত্রির বুকে আলাের কমলে ঝমলি ঝলে সােনা।
৪
দীপালী
কুমে আঁকা অশােকের থােকা হেথায় হােথায় লুটে,
রাঙা হয়ে ওঠে পলাশের চুমা রাতের ওষ্ঠ পুটে।
লাল করবীর
বুকের
স্বপন,
দুই হাতে আজ ছড়ায় পবন,
ধরার দুয়ারে দানা বেঁধে তারা দীপ হয়ে ওঠে ফুটে
দিনের আলাের পরশে যেখানে রাতের অলক দোলে,
সেথা হতে আজ আলাের ঝর্ণা ঝরিছে মৰ্ত্ততলে।
রয়েছে দীপ্তি-জ্বালা নাহি তার,
মরেনি রাত্রি—মরেছে আঁধার,
অসম্ভবের ললাটে তাহার জয়ের চিহ্ন জ্বলে।
দীপালী ও নয়—দীপের মালায় দাড়ায়েছে উর্বশী,
তাহারি দেহের বিদ্যুৎ বিভা দিকে দিকে পড়ে খসি’
শিহরণে তার স্তনের চূড়ায়,
স্বর্গের বনে কুসুম ঝরায়,
গড়ে ওঠে ঝরা কুসুমের দলে দীপালীর তারা-শশী ।
৫
মায়া-কাজল
জ্যোতির দেবতা আছ—তুমি আছ—সে কথা মিথ্যা নয়,
আজের রজনী তােমারি রূপের অপরূপ পরিচয়।
স্বর্ণ-খচিত তব অঞ্চল
আলাের শিখায় করে ঝম,
আঁধারেও তব দেউলের চূড়া জ্বলিছে জ্যোতির্ময় !
প্রদীপ জ্বালায়ে চির সুন্দর তােমারে সুমুখে ধরি,
অনল শিখায়, দীপালী লেখায় তােমারে প্রণাম করি।
যে শিখা জ্বলিছে তােমার তােরণে,
তার ছোঁয়া যদি নাহি পাই মনে,
আলাের ধেয়ানে মিলা মােদের বিষন্ন শর্বরী।
৬
পুষ্প ও মুকুল
ওরে শিশু, ওরে বাছা, নিমীলিত, আঁখিপুট খােল ,
জাগার তাগিদে ভরা প্রভাতে বয়েছে সমীর,
দ্বারে সে হানিছে কর, পথে পথে তুলিয়াছে রােল ,
আলােকের রথে রথে আকাশেতে জমায়েছে ভিড়।
অনন্তের প্রান্ত হতে কত কি যে এনেছে সে ব’য়ে
বিশ্বের তােরণ তলে, তাই তােরে দিবে উপহার,
সুপ্তিভরা রজনীর অন্ধকার অবসাদ লয়ে,
ঘরে থাকিস্ নে পড়ে—ঘুমুস নে—ঝিমুস্ নে আর
আঁখিপুট খােত্ ওরে, চিত্তদল মেলে ধরূ তাের,
প্রভাতের বায়ু তােরে ঐ শােন্ ফিরিতেছে ডাকি,
তােরই তন্দ্রা ভাঙিবে না, ঘুচিবে না স্বপনের ঘাের?
বিশ্ব জেগে উঠিয়াছে—তুই শুধু মেলিবি না আঁখি ?
আঁধার পাথার মথি’ রবি সেও এসেছে ফিরিয়া,
মৌন পাখী—সেও গাহে উচ্ছসিয়া আনন্দের গান।
উদ্বেলিত আলােকের অকুণ্ঠিত ধারায় গলিয়া,
নিজেরে নিঃশেষ করি' চাদ তারে করে গেছে দান।
৭
পুষ্প ও মুকুল
জীবনে উঠিতে জাগি’ সকলেরে ডেকেছে ধরণী,
অসহায়পুষ্প-শিশু, তােরেও সে দেয় নাই বাদ,
প্রাণের স্পন্দনে সূরা ঐ শােঐ তার ধ্বনি,
কে জাগাে প্রভাতে আঁজলহ মাের—লহ আশীর্বাদ
জীবন যাত্রার পথে ভ্রমরেরা ফিরিতেছে ডাকি,
উড়ায়ে আলাের পাখা প্রজাপতি এসেছে দুয়ারে,
কৰ্ম্মের তােরণ-তলে এ জগৎ মেলিয়াছে আঁখি,
তুই শুধু জাগিবি না—তুই শুধু মেলিবি না তারে ?
মূচ্ছিত ধরার তন্দ্রা—আঁখিপুট খােল—ওরে খােল,
জীবনের কেন্দ্র হতে জাগিবার এসেছে আহ্বান,
শীতের শীর্ণতা শেষে বসন্তের হাসির হিল্লোল,
জ্বণে জ্বণে দুলিতেছে বিকাশের—প্রকাশের গান।
বনের কামনা যাচে-নির্নিমেষ তারি পানে চাও,
দখিনের স্পর্শ কহে—তার বুকে গন্ধ দিতে হবে,
সৌন্দৰ্য ঘুমায়ে আছে তুমি জেগে তাহারে জাগাও,
আপনারে লুকাবার স্থান নাহি বিকাবার ভবে।
যৌবনের তীর হ'তে জাগিবার এসেছে আন,
ধৌত করি’ লহ আঁখি সদ্য-ঝরা শিশিরের ললারে,
মায়া-কাজল
পূজারীর পুষ্প-পাত্র ঐ তােরে করিছে সন্ধান,
পূজা-অবদান তারাে হয় তাে গড়িতে হ'ৰে তােরে।
গগনে বাড়িছে জ্বালা, অগ্নি হনে রবির কিরণ,
কোন্ সে অজানা পথে নাহি জানি যেতে হবে স্বায়।
শঙ্কায় শিহরি’ ওঠে স্নেহাতুর জননীর মন,
তবু ছেড়ে দিতে হবে—দিতে হবে নিঃশব্দ বিদায়।
ওরে বাছা, আয় বুকে, জননীর পরিপুষ্ট স্তন
আয় তুলে দিই মুখে-মুখে তুলে দিই শেষবার,
হােক্ ক্ষীর অফুরন্ত ক্ষুধা-হরা সুধার মতন,
পথের দারুণ দাহে তৃষ্ণা যেন নাহি লাগে আর।
এ বুকে রয়েছে ছায়া অন্তহীন নিবিড় শীতল,
তবু এ ছায়ার তলে আর তােরে বাঁধিব কেমনে?
কর্মের স্পন্দন ভারে জাগিয়া উঠেছে ধরাতল,
বিশ্ব তােরে ডাকিতেছে কাজ তাের রয়েছে ভুবনে!
সম্ভাবনা
আমি ছােট বীজ আছি চিরকাল বিশ্ব-ধরায় নগণ্য,
কোষের মাঝারে স্নান মৃয়মান—ধূলির অতলে বিপন্ন।
বাতাসে আমার কাঁপে কায়,
পরশে এ দেহ গুড়ে যায়,
চারিধারে ঘেরা ঘন কুজঝটি গভীর নিবিড় নিষঃ।
তবু এই মাের মাঝখান হ’তে গান গাহে ঐ অনন্ত,
উকি মারে হেথা গভীর আঁধারে জ্যোতিলেখাটি জ্বলন্ত ।
মনে হয় হেথা আছে লীন,
সৃষ্টি নবীন সীমাহীন,
আছে অভিনব রূপের মাধুরী বিপুল চপল জীবন্ত।
সম্ভাবনা
মনে হয় হেথা আছে অপরূপ চির ছায়াময়ী ধরিত্রী,
পুষ্পের হাসি আছে মাের মাঝে মনােমন্দির পবিত্রি।
আছে উৎসব অনাবিল
গগনের মায়া ঘন নীল,
দহে বু মােরে করে সার্থক অমৃত-উৎস সবিতৃ।।
ঐ শােননা ডেকে কে কহিছে মােরে—ফ্যাল্ মুছে’ ফ্যা
আতঙ্ক,
ক্ষুদ্র তবুও ব্যর্থ নহিস্নােস্ এ ধরার কলঙ্ক।
আললা জেগে আছে তাের তরে,
রস-ধারা আছে ধরা ভ'রে,
তােরই লাগি’ জেগে আছে নীল মেঘে সলিল-সিন্ধু অলঙ্ঘ্য।
ভয় নাই ওরে—কোনাে ভয় নাই—এ জীবন নহে নিরর্থ,
রুদ্রের মত রৌদ্র সে আছে—আমারে যােগাবে সামর্থ্য।
মাের তরে আছে সুশীতল,
মেঘের হৃদয়ে মধু জল,
ধরণীর বুকে আছে রস-ধারা পূর্ণ প্রচুর অব্যর্থ।
১১
মায়া-কাজল
আমি হ’ব বড়—আমি হ’ব জয়ী বিলাবার ঘন আনন্দে,
মৰ্ম্মের আলাে পুষ্পে ফুটায়ে ঢেকে দিব দি সৌগন্ধে।
দিব আমি ছায়া সুমধুর,
ক্লান্তিরে করে দিব দূর,
কল ছল ছল দিব আমি ফল ক্ষুধিত আতুর নিস্পলে।
আমারও বুকে পাবে সান্ত্বনা স্নেহ-গেহহীন নিরন্ন,
একি উন্মাদ আনন্দে আজ অলােড়িত মন-অরণ্য !
আমারি এ দেহ পরশিয়া,
বাতাসে উঠিবে সরসিয়া,
আমারাে মাঝারে রয়েছে জগৎ শ্যামল শােভন অগণ্য।
১২
শরতের দ্বিপ্রহর
মুগ্ধ নেত্রে চেয়ে আছি দুপুরের দিকে
শরতের দ্বিপ্রহর-রৌদ্র-মাখা মায়া।
দিকে দিকে উচ্ছ্বসিয়া উঠিয়াছে ফিকে,
দেহহীন কামনার পরিপূর্ণ কায়া।
ধানের অঞ্চলে দোলে ধরণীর স্তন,
অসহিষ্ণু আলিঙ্গন কঁপে থর থর।
গলে গলে ঝরিতেছে তৃষার্ত্ত তপন,
অসন্থ প্রেয়সীর বুকের উপর।
বিশ্বের উন্মুখ দৃষ্টি চেয়ে আছে জাগি’,-
গগনের নীল আর ঘন বন তল,
রচিয়াছে আচ্ছাদন তাই রি লাগি',....
আরক্ত লালসা হােথা ঈষৎ শ্যামল।
চারিধারে যৌবনের উদ্বেল সাগর,
আশ্চর্য এ শরতের দিবা দ্বিপ্রহর।
সিন্ধুর প্রেম
*
কোন যুগে দেবাসুরে করিয়া মন্থন,
অন্তরের লক্ষী হায় নিয়েছে কাড়িয়া,
ব্যথায় বিক্ষিপ্ত তাই সমুদ্রের মন।
নিশ্বাসে নিশ্বাসে তার ভেঙে পড়ে হিয়া !
শান্তি নাই—আছে শুধু তাশান্ত ক্রন্দন,
উন্মাদ ছুটিয়া আসে ধরিত্রীর পানে,
তরঙ্গের তালে তালে দোলে আলিঙ্গন,
চুম্বন ছড়ায়ে যায় ধূলির শয়ানে।
প্রিয়ার প্রসাদ-রিক্ত—যা যেখানে পায়,
কুড়ায়ে হৃদয়ে বাঁধে আগ্রহের ভরে,
অকস্মাৎ মােহ টুটে, ফেলে দিয়ে যায়
সমস্ত নিঃশেষে ফের সৈকতের পরে।
হৃদ্-লক্ষীহীন সিন্ধু বক্ষে অবিরল,
বহিছে প্রিয়ার শােকবাড়ব অনল!
১৪
নদীর নিশ্বাস রাক্ষসী তৃষায় সূৰ্য্য করিতেছে পান- নদীর বুকের রক্ত পিয়াইছে সুখে। গভীর ব্যথায় ফেটে টুটে’ পড়ে প্রাণ, বিদারণ চিহ্ন আঁকা তরঙ্গের বুকে। বিবর্ণ বিশীর্ণ তনু-বালির কঙ্কাল, মরুর প্রান্তর রচে জলের লেখায়, দীর্ঘ তট প্রাণহীন ধূলির জঞ্জাল, জীবনের বেলাতটে মরণ ঘনায়। দীর্ঘ তট প্রাণহীন আনন্দ বিহীন-- নদী সে মৃত্যুর পথে চলে পলে পলে, বিগলিত অশ্রু-বাষ্পে অন্তর বিলীন, জমাট নিশ্বাস শুধু জেগে ওঠে বলে । ব্যথায় বিদীর্ণ করি’ তরঙ্গের বুক, নদীর নিশ্বাস জাগে কঠিন শুশুক।
প্রকৃতির স্নেহ
বৈশাখের দ্বিপ্রহর জ্বালায়ে দিয়েছে চারিদিক্।
নিভৃত নীড়ের মাঝে বসন্তের মধুকণ্ঠ পিক
পিপাসায় মূৰ্ছাহত। অবসন্ন অধীর বাতাস
উৎকণ্ঠিত শস্য শিরে উগারিছে মরণ নিশ্বাস
দ্বিধা-ভরা বেদনায়। নদীর নিবিড় তনুখানি
তীব্র-জ্বর-জ্বালা ভরে তরঙ্গের নীলাঞ্চল টানি’
ছুঁড়িয়া ফেলেছে দূরে-নগ্ন ক্ষীণ দেহে ক্ষণ তরে
তবু জ্বালা নাহি ঘুচে, মুহুর্মুহুঃ মূরছিয়া পড়ে
স্পন্দহীন স্তদ্ধতায়। আসন্ন মৃত্যুর ছায়া-ভরা
অ-অঞ্চল তলে ধুকিয়া সিছে বসুন্ধরা !
সহসা ঈশান কোণে ঘিরে’ এল ঘন মেঘ রাশি,
বিদ্যুৎ-চমক-দীপ্তি অকস্মাৎ উঠিল বিকাশি।
প্রসন্ন হাসির মতাে শতধার শুভ্র বারিধারা
ঝঝরে পড়িল ঝ'রে গানিহীন বাধা-বন্ধ-হারা
বিশ্বের বুকের পরে; স্নিগ্ধ স্বরে সচকিত করি’
নিদাঘ-পাণ্ডুর রেখা পিক-কণ্ঠ উঠিল শিহরি।
প্রকৃতির স্নেহ
শ্যামলিমা ফিরে এলাে দগ্ধ স্নান শুষ্ক শস্য শিরে ;
দুর্দম আবেগে বায়ু আলিঙ্গিল উচ্ছল নদীরে ।
দীর্ঘশ্বাস শেষে ধরা ধীরে ধীয়ে দেখিল চাহিয়া
নিজের বুকের মাঝে আপনার গ্লানি-মুক্ত হিয়া।
আমি মুগ্ধ বাক্যহীন!—দূরে বসে ভাবিতেছি মনে
মিথ্যা জড় বলে এরে অবহেলা করিব কেমনে?
মানব মনের ধ্রুব দ্বিধাহীন নির্ভর-নিলয়-
একি তারি মৰ্ম্মকোষ আঘাতিয়া পায়নি আশ্রয় ?
উপবাস-ছিন্ন-পুষ্প বিধবা কন্যার পানে চাহি’
মা’র বুকে যে যন্ত্রণা—ঐ মেঘ মাঝে তা’ কি নাহি ?
লীন দেহ বুকে তুলে অশ্রুজলে ধুয়ে দেওয়া ব্যথা-
ধারাপাতে নাহি কি সে জননীর মৰ্ম্ম-কাতরতা ?
কল্পনায় দেখিতেছি বিশ্ব-মাতা বসি’ উদ্ধললকে
অশ্রু-অর্জ।—দেখি আর বারিধারা ছেপে ওঠে চোখে।
১৭
ঊর্বশীর অভিশাপ
আমি উর্বশী স্বর্গ-বেশ্যা
চুম্বনে মাের স্বর্গ গড়ে,
অমৃতের ধারা মৰ্তে বহাই,
হাসিতে লীলার পদ্ম ঝরে।
আমি ইন্দ্রের ডাহিন হস্ত,
নিমেষে অরির সমাধি রচি,
স্বর্গের সেরা সুন্দরী আমি,
হিংসা যে করে আমারে শচী।
এ দুটি চোখের তীক্ষ্ণ শায়ক
বিধে গিয়া ঠিক বুকের মাঝে,
লক্ষ্য তাদের নিষ্ফল করে
জানি নাই কেহ ভুবনে আছে।
কত স্বর্গের গর্ব ভেঙেছে
লীলায় ললিত এ বাহু মম,
স্বর্গ-সভায় যত নটী নাচে
আমি নাকি তার শ্রেষ্ঠতম
১৮
উর্বশীর অভিশাপ
তখন মেঘের স্থির বিদ্যুৎ
সুদূর স্বর্গ ঝলকি’ জ্বলে,
দেবতারা সব মিলেছে আসিয়া
চাদের স্নিগ্ধ চাঁদোয়া-তলে
জ্বলে মােতি-মালা--তারকার দীপ
দেবতা-সভার প্রান্ত ঘিরি,
নীলের পাথারে রক্ত আলােক
মৃদু হয়ে ধীরে আসিছে ফিরি’
হাজারাে কোরক ফুটেছে সেদিন
এক সাথে পারিজাতের বনে,
ক্ষ্যাপা পবনের পিকারী তারি
গন্ধ ঢালিছে সভাঙ্গনে।
মানবের লাগি’ মিলেছে দেবতা
তারি অস্বানে বসেছে সভা,
নর-কীর্তির গৌরব-জ্যোতি
ছাড়ায়ে উঠেছে দেবের প্রভা
মায়া-কাজল
মানুষেরা যাচে দেবতার প্রীতি
তপের তিমির রাত্রি জাগি,
আজি দেবতারা মগ্ন ধেয়ানে
নর-দেবতার তৃপ্তি মাগি।
যাহা কোথা কভু নহে সম্ভব
স্বর্গ তাহাই ঘটাতে জানে,
ওগাে স্বর্গের উদার দেবতা,
এরি লাগি ধরা তােমারে মানে
বাসবের পাশে দ্বিতীয় বাসব
মরি মরি সে কি মূর্তিখানি !
অঙ্গ ঘেরিয়া ঝরে লাবণ্য,
মৰ্ম্মে সে যায় চিহ্ন হানি'।
দেবতার মাঝে আছি চিরকাল,
নিবাস আমার দিব্য-লােকে,
দেবতার বাঁড়া এত রূপ কই
কোনাে দিন-কভু পড়েনি চোখে
২০
এs.
উর্বশীর অভিশাপ
দু’টি অনিমিখ নেত্র ছাপায়ে
ঘন আনন্দ ঝর্ণা ঝরে,
দেব-দুর্লভ দীপ্ত বিভার
সিন্ধু মেতেছে অঙ্গ-পরে।
নয়নে অধরে গ্লানি-স্লানিহীন
স্নিগ্ধ কৌতুহলের ঝুড়ি,
মুখের আভায় ফুটে আছে যেন
গােটাকত পারিজাতের কুঁড়ি !
কখন উঠি—কখন নাচিনু,
নূপুর কেমন উঠিল বাজি’,
পায়ে বিদ্যুৎ জেগেছিল কি না—
এতটুকু মনে নাই তা আজি।
উর্বশী নামে যে যশ রয়েছে
জানি নে ক্ষুন্ন হয়েছে কি না,
জানি নে তাহার কণ্ঠে সেদিন
বেজেছে অথবা বাজেনি বীণা।
মায়া-কাজল
শুধু মনে আছেসহসা স্বপন
ঘিরে দিল তনু সােহাগ ভরে,
শুধু মনে আছে—চটুল চাহনি
দু’টি অচপল চক্ষু-পরে !
চোখের চাহনি—সেই ঘিরে’ নিল
সারা তনুখানি কুহক দিয়া,
চোখের চাহনি মায়াবীর মতাে
লুটে নিল মাের মুগ্ধ হিয়া !
মূৰ্চ্চার মতাে সে কি মূচ্ছ না—
তাহারে বুঝাব কেমন করে ?
দেবতার মনে যে মােহ জাগে না
তারি মােহে গেল হৃদয় ভরে
কামনা যে জাগে স্বর্গের মনে
জীবনে কখনাে জানিনি কেহ,
ধন্য তােমারে—ধন্য মানব,
স্বর্গে করেছ মৰ্ত্ত-গেহ।
২২
উর্বশীর অভিশাপ
ওগাে মর্ত্যের অতুল মানব,
মাের পানে কেন চাহিলে তুমি ?
হাসির মতন চাহনি তােমার
অণু-পরমাণু রয়েছে চুমি।
চাহনি তােমার তীরের মতন
বিধে আছে মাের মৰ্ম্মতলে,
চাহনি তােমার বহ্রির মতাে
চিত্ত আমার জ্বালায়ে জ্বলে।
প্রতি পলে তাহা মূরতি লভিছে
দূরে কাছে মাের মুখে পিছে,
বসনের মতাে দেহ ছেয়ে আছে,
রক্তের মতাে বহিছে নীচে।
আজ মনে হয়, সারা দেহ কেন
নৃত্যে সে দিন ওঠেনি নেচে,
হৃদয়ের প্রতি শিরা-উপশিরা
শুধু সঙ্গীতে ওঠেনি বেজে ।
মায়া-কাজল
উর্বশী-রূপে যত আলাে ছিল
একবার—এক নিমেষ লাগি’--
সারা জীবনেরে নিঃস্ব করিয়া
ঘন হয়ে যদি উঠিত জাগি।
হায়রে দেবতা !—বৃথা গৌরব
পিপাসায় সেও চাহে যে বারি,
উর্বশী-তারাে স্পর্ধা ঘুচায়ে
তারে অন্তরে জাগিছে নারী!
কিনেছি হৃদয়-বিকাইনি কভু,
বিকানাের সুখ-তাহার ব্যথা,
এতদিন ধরে মিছে ছিল যাহা
আজ আর নহে কথার কথা।
তাই অভিসারে বাহিরিয়া এনু,
যাচিয়া প্রণয় চাহিমু কাছে,
হয় তাে আমারে নিলাজ ভাবিয়া
পার্থ, শিহরি’ উঠিছ লাজে।
২৪
উৰ্বশীর অভিশাপ
স্বর্গ তােমার মর্ত্য নহে গো
মােরে ফাল্গুনী, ভেবাে না হীন,
মােরা ক্ষীণ-প্রাণা মানবী তাে নই,
ব্যথা চাপি বুকে’ হই না লীন।
দেবতা আমরা আমাদের হিয়া
ছলা-কলা-বাঁধ কিছু না জানে,
প্রেম আমাদের বজের মতাে
ব্যক্ত করিতে লাজ না মানে।
যে প্রণয় যেচে পায় না ইন্দ্র,
সে প্রণয় দিনু তােমারে যেচে,
পুঞ্জ মেঘের ঘন বিদ্যুৎ
তবু তাে ও চোখে ওঠে না নেচে!
আননে তােমার কোথা দিশাহারা
অতি উচ্ছল আলাের লেখা ?
সব সম্বিৎ শেষ করে দিয়ে
মূচ্ছা এখনাে দিল না দেখা !
মায়া-কাজল
থ-কম্পিত চিত্তের মাঝে
আলিঙ্গনের স্পর্শ মেঙে,
অরুণ এ দু’টি চরণের কাছে
এখনাে ও জানু এলাে না ভেঙে ?
থির হয়ে তুমি রয়েছ দাড়ায়ে
পটে অর্পিত মূর্তিখানি !
“বিস্ময়ে প্রেম ভাবিও না দেবী”-
হে মানুষ, এ কি তােমারি বাণী ?
শুধু বিস্ময় !-সেদিনের চাওয়া
শুধু বিস্ময়-মিথ্যা কথা !
পার্থ, আমারে করাে না ব্যর্থ
হানিও না অপমানের ব্যথা।
যে-চাওয়া তােমার রাঙিয়ে তুলেছে
রক্তে এ হৃদপিণ্ড মম,
তার মাঝে আর কিছু ছিল নাকো
বলো না এ কথা মিথ্যাতম।
২৬
উর্বশীর অভিশাপ
সত্য যদি এ-থাক্ তবে থাক্-
তােমারি হৃদয়ে থাক্ সে ঢাকা,
মিছে যদি হয়-মিছে করে বলল
আরাে কিছু ছিল তাহাতে আঁকা
আমি উর্বশী স্বর্গ-বেশ্যা
চুম্বনে তুলি’ স্বর্গ গড়ে,
অমৃতের ধারা মর্ত্তে বহাই,
হাসিতে লীলার পদ্ম ঝরে।
আমার এ আঁখি মদনের ধনু,
শর-সন্ধানে করে না দেরী,
বসন্ত তার পুষ্পের ভারে
দেহ-বল্লরী দিয়েছে ঘেরি।
কত দপীর দর্প ভেঙেছে
আমার এ রূপ দীপ্ত শিখা,
জয়ের মাল্য ললাটে পরেছি,
পরি নাই পরাজয়ের লিখা।
২৭
মায়া-কাজল
।
শিরায় তােমার বহে না রক্ত,
কামনায় নাহি হৃদয় দহে,
যে ব্যথা ধরার আদিম অমােঘ—
তােমারি কারণ সে ব্যথা নহে!
এত কাল ধরি’ এত স্তুতি-গীতি-
সকলি কি তবে মিথ্যা খেলা,
ঊর্বশী-সে কি দেউলিয়া আজ
স্থির-যৌবন মাটির ঢেলা ?
রূপের দেবতা অঙ্গে যে ছিল
সে কি গেছে মােরে করিয়া খালি ?
মদে উচ্ছল পান-পাত্রের
সবটুকু সুরা পড়েছে ঢালি’ ?
এরি মাঝে মাের ফুরায়েছে সব,
ঝরা ফুল সম পড়েছি ঝ'রে ?
অপমান মােরে ক'রাে না পার্থ,
দিও না লজ্জা এমন করে !
পুরুষের মন নারিনু ভুলাতে-
ধিক্ শত ধিক্ এ রূপে মম,
২৮
উর্বশীর অভিশাপ •
ভেবো না সহজে ক্ষুব্ধা নারীর
ক্ষমা পাবে তুমি হে নিৰ্ম্মম !
সূর্যের পানে চেয়ে থাকে ফুল,
ঝরে পড়ে শেষে রৌদ্রে দহি',
বৃন্তের বুকে অভিমানহীন
আমি বিহ্বল পুষ্প নহি।
আমি ঝঞার গর্জন কভু,
কভু উন্মনা গন্ধবহ,
খেয়ালের খােসে ফুসে উঠি রােয়ে,
খেয়ালে বিলাই অনুগ্রহ।
আমার আদরে অপমান করে
কেহ কোনাে দিন পায়নি ছাড়া,
করুণা আমার সুন্দর যত,
ঘৃণা কুৎসিত তাহারাে বাড়া।
তবু আজ তব মুখ পানে চেয়ে
মনে হয় শুধু আমি যে নারী,
ক্ষমা আমাদের ধর্ম কেবল,
দণ্ড মােদের অশ্রুবারি।
মায়া:কাজল
।
শুধু মনে হয় আমাদের কাজ
সৃষ্টি কেবল ধ্বংস নহে,
ছোট কুড়িটিরে ফুটাবার লাগি
আমাদেরি বুকে রক্ত বহে।
আজ মনে হয়-নয়নের কোণে
এতদিন যত জ্বেলেছি জ্বালা,
সবগুলি তার ব্যর্থ হয়েছে,
পরায়েছে মােরে বহি-মালা।
যত অভিশাপে এত দিন ধরি
উগারিয়া বিষ দিয়েছি ঢালি’,
আমারি জীবন-পথে শুধু তারা
লেপিয়া গিয়াছে গভীর কালি
পার্থ, তােমার শক্তি অসীম,
চলভরা তুমি সুকৌশলী,
ঊর্বশী—তারো চিত্ত তােমার
রূপের বহ্নি নিয়েছে বলি।
উর্বশীর অভিশাপ
স্পর্ধা তাহার করিয়াছ গুড়া,
গর্বে তাহার হেনেছ বাজ,
রূপের রুধিরে রাঙায়ে তুলেছ
মাথার তরুণ দীপ্ত তাজ।
ক্ষুদ্র তােমার ক্ষণিক দৃষ্টি
নারী করে তারে তুলেছে গড়ে,
রমণীর স্নেহ-সরস-বরষা-
তারি মােহে গেছে হৃদয় ভরে।
দেবতারে তুমি রমণী করেছ
ধৈর্য্যে যাহারা ধাত্রী-সমা,
ভালােবাসা শুধু ধৰ্ম্ম যাদের,
ধৰ্ম্ম যাদের কেবল ক্ষমা।
রেখা পড়ে কভু দেবতার বুকে
এ কথা শােনেনি স্বর্গ-ভূমি,
ধন্য তােমারে ঐন্দ্রজালিক,
ধন্য তােমারে,ধন্য তুমি !
রমণী করেছ তবু মনে রেখাে
হেন অপরাধ জগতে আছে,
মায়া-কাজল
।
যার ক্ষমা নাই ক্ষমার মূর্তি
স্নেহ-নিঝর নারীরাে কাছে। '
লাখাে নৃপতির নিধি সম্মান
ভারি সে মনের মাণিক দিয়া,
সাত স্বর্গের সম্পদ ত্যজি’
রমণী তাহারে করেছে বিয়া।
সব লাঞ্ছনা ক্ষমা করে নারী,
বুকে সহে তার সকল তাপ,
অসম্মানেরে করে না সে ক্ষমা,
অপমানে শুধু করে না মাপ।
ভূমিকম্পেতে কেঁপে ওঠে ধরা
ঝায় যার নড়ে না চুল,
এত বুঝে তবু শুধু এইখানে
পার্থ, তােমার হয়েছে ভুল।
উৰ্বশীর অভিশাপ
যে লাজ নারীর চরম দুঃখ,
সেই লাজ তুমি দিয়েছ মােরে,
মরণের বাড়া যে বেদনা তাহে
চিত্ত আমার দিয়েছ ভরে।
শুষ্ক পুরুষ, তাই হােক তবে,
লহ স্পর্ধার পুরস্কার,
ঊর্বশী-সে তত জড় জীব নহে,
ক্রীড়নক নহে প্রণয় তার।
অভিশাপ তার কঠোর কঠিন,
অভিশাপ তার ভীষণতম,
আগুনের মতাে জ্বালাময় সে যে,
দুঃসহ সে যে বজ্র সম।
দিনু অভিশাপ-র’বে চিরকাল
ক্লীব হয়ে রূপে তােমার আঁখি,
চির-অপরূপ রমণীর রূপ
হবে তব কাছে মিথ্যা-ফাকি।
মায়া-কাজল
আমি দিনু শাপ—মনের অতলে
চিরদিন রবে বুড়ার বুড়া
রঙিন মদের মতাে যৌবন
নেশাহীন হবে তাহারাে সুরা।
দিনু অভিশাপ মানবের ছাপ
মৰ্ম্মে তােমার কিছু না রবে,
আমারে যেমন রমণী করেছ
তুমিও নিরেট দেবতা হবে ।
৩৪
জীপসী
জীপ সী মােরা দীন-দুনিয়ার স্বাধীন সেনানী,
গৃহ মােদের গাছের পাতার ছায়ার বােনানী,
শঙ্কা-সরম ভয়-ভাবনা কিছু না জানি !
ঘূর্ণী বায়ুর ঘাের লেগেছে—আমরা মােরিয়া,
ঘুরে বেড়াই ঝা-ঘােড়ার বক্সা ধরিয়া,
মােদের কেহ নেই কো সাথী—আমরা পারিয়া।
রুদ্র দেবের বহ্নিশিখা ধূলায় উড়ায়ে,
‘লু চলেছে মরু-বুকের বেসাদ কুড়ায়ে,
তার মাঝে কে ?—তারও মাঝে জীপসী দাঁড়ায়ে !
৩৫
মায়া-কাজল
জীপসী যুবা হয় না বুড়া শ’য়ের কোঠাতে,
মনের চাবি আমরা রাখি আপনারি হাতে,
পাকা চুলেও তরুণ মোরা মনের নেশাতে।
ঝাপসা নহে চোখের কোঠায় মােদের দৃষ্টি,
পড়া পুথির আলাে সেথায় হয়নি বৃষ্টি,
মনে মােদের আলাে দেছে নিজেই সৃষ্টি।
হাতের কোঠায় লক্ষ লােকের ভাগ্য গণিয়া
জীপসী যুবা ঘুরে বেড়াই বিরাট দুনিয়া,
নিজের হাতের হরপ শুধু নেইনি চিনিয়া।
কার অভিশাপ মিলায়নি কো কালের বাতাসে,
ঘাের লেগেছে প্রাণে তাহার তারই নিশাসে।
ঝড়াে হাওয়া ঘুরে বেড়ায় ঝড়ের পারা সে।
জীপসী
অভিশাপের উল্কা তারা থামতে জানে না,
সাগর মরু পাহাড় তাদের সমস্ত চেনা,
দূর-সুদূর জীপসী যুবা কিছুই বাছে না।
ঘরের লাগি গৃহহীনের কেনই বা বাঞ্ছা ?
তাই হয়েছি ভাগ্য-পাশায় পড়েছি দান যা,
দীন-দুনিয়ার ছেলে এই মােদের পঞ্জা।
বিশ্ব-মায়ের বুনাে ছেলে জীপসী মােরা গাে,
ধরার বুকে কোথাও নাহি মােদের জোড়া গাে,
মােদের চেয়ে বুনাে নহে বন্য ঘােড়াও।
রাত-সাগরে নেচে চলে বিজলী তুড়ন্ত,
জীপ সী সে ওই বিদ্যুতেরি মতন দুরন্ত,
মেঘলা রাতেও জীপ সী যুবা নয়কো ঘুমন্ত
আইন-কানুন বিধি-বাঁধন আমরা মানি কি?
আমরা চলি মজ্জিমত খেয়ালে ঈপি’,
বাজের মতাে অব্যাহত স্বাধীন জীপসী।
৩৭
মায়া-কাজল
জীপ সী মাথা খাড়া রাখে চিত্তেরি তেজে,
উচু মাথা নােয়ায় না সে কারও কাছে যে।
মােড়ল শুধু চিত্ত মােদের ভৃত্য করেছে!
দলের মােড়ল—মনের মােড়ল—সব সে আমাদের,
তারে হেলা করবে সে কোন্ বিদ্রোহী কাফের!
সেলাম—সেলাম—হাজার সেলাম-সেলাম তারে যে
ঝড়াে হাওয়া ঘুরে বেড়াই ঝড়ের সমানি,
ঘুরে বেড়াই—ঘুরে বেড়াই—কিচ্ছু না মানি,
জীপসী মােরা দীন-দুনিয়ার স্বাধীন সেনানী।
স্বেচ্ছাচারী
মেঘের শিকারী মাতিয়াছে আজ প্রলয়ের গানে যে,
সূৰ্য্য ও সােমে ভাসিয়ে দিয়েছে বরুণের বাণে সে।
মনের আগল খুলে গেছে তার বিকল বাতাসে গাে,
খেয়ালেরে আজ করেছে দরাজ চিত্ত-আকাশে ও।
অথই আঁধার-দোলে কেশে তার বিদ্যুৎ-ফণিণী,
পাগল মেঘের ধরণ দেখিয়া কম্পিতা মেদিনী।
মেঘের মাতাল ভিড় করে আছে আকাশের পাথারে,
ভিড় করে আছে—শক্তি কাহার রােখে,আজ তাহারে
আপন বুকের মাঝখান হ’তে খানিকটা চিরিয়া,
অট্টহাসির উৎসবে ফেলে আকাশেরে ঘিরিয়া।
নিমেষ না যেতে অমনি আবার সুগভীর বেদনে,
চড় চড় করে ফেটে ভেঙে পড়ে বজ্রের কঁাদনে।
৩৯
মায়া-কাজল
আজিকে পেয়েছে কালাে কালাে কালাে দৈত্যেরা ছাড়া
দোলা দিয়ে দিয়ে গােটা বিশ্বটা গুড়ােয় যে তারা গাে
ছন্দহীনের ছন্দে নাচিয়া ফেরে তারা আকাণে,
দেবতারা সব স্বর্গ ছেড়েছে দৈত্যের তরাসে।
বর্শা বাগায়ে বর্ষা-রমণী আকাশেরে ভাঙিয়া,
বৃষ্টি-সূতায় গড়িয়ে ধরার বক্ষের আঙিয়া।
দেবতারা সব বক্ষে কাহার বজেরে হেনেছে,
বর্শা হস্তে যুদ্ধে তাই তাে বর্ষা সে নেমেছে।
ওরি কালাে কেশ নীল আকাশের গর্ব ভেঙেছে গাে,
ওরি আলাে রাশি হাসিটির রঙে পুষ্পে রেঙেছে গাে।
অতি আচমকা চকমকি ওর চুমকি জ্বেলেছে যে,
সৃষ্টি-ভাঙার মন্ত্রে ও আজ সৃষ্টিরে রেখেছে।
ছিন্নমস্তা মাতিয়াছে আজ রক্তের পিপাসায়,
রক্ত তাহার লক্ষ ধারায় ফিনকি হানিছে হায় !
রক্তের লাল নিয়েছে তাহার সন্ধ্যা-সবিতৃ,
রক্তের জলে ভিজিয়া শ্যামল সবুজ ধরিত্রী।
৪০
স্বেচ্ছাচারী
জমাট সে জল-রূঢ় তুষারের কঙ্কর কুঁড়ায়ে,
ঘাের উন্মাদ বাতাস দু’হাতে দিয়েছেরে ছড়ায়ে।
ক্ষ্যাপা উম্মাদ জাগিয়াছে আজ ঝঞ্ঝার পবনে,
ভাঙা-গড়া ভার চলিয়াছে তার গগনে ও ভুবনে।
হাসিয়া কাঁদিয়া জীবনের কাঠি মরণের কাঠিতে,
মর্জি মতন জীবন মরণ দুয়েরেই বাঁটিছে।
মর্জি তাহার স্বেচ্ছাচারিণী—আজ্জি মানে না গো
খেয়াল তাহার কি যে চাহে আজ নিজেই জানে না ও।
৪১
মেঘের প্রেম
নীল নিৰ্ম্মল স্নিগ্ধ সুদূর গগনে
দু’টি প্রান্তর ঢাকি,
সহসা দুখানি জলদ সে কোন্ লগনে
মেলিল মলিন আঁখি !
হাজার যােজন তাহাদের ছাড়াছাড়ি,
গুরু ভার বুকে গুমরে অশ্রু বারি।
আর্দ্র বাতাস কঠোর স্পর্শ হানিয়া,
মাঝে মাঝে যায় শিথিল বস্ত্র টানিয়া।
অসীম আকাশে ছােট দু’টি মেঘ
কাঁপিতেছে থাকি থাকি,
অতি অসহায় এ উহারে চায়
মেলিয়া মলিন আঁখি।
৪২
মেঘের প্রেম
বিকল হৃদয় ব্যাকুল প্রণয় পরশে
উম্মাদ তারা আজি,
চরণে দলিয়া ছুটিয়া চলেছে হরষে
পথের বিঘ্ন রাজি।
দুরু দুরু হিয়া কঁপিয়া উঠিছে বুকে,
কখনাে বা ভয়ে কখনাে গভীর সুখে।
স্বপ্ন-অলস নিবিড় নয়ন লুটিয়া,
কত ছন্দের স্পন্দন ওঠে ফুটিয়া।
চির জীবনের মিলন রাগিণী
হৃদয়ে উঠেছে বাজি।
আজি তারা পায় দলিবারে চায়
পথের বিঘ্ন রাজি।
কাছে—অতি কাছে, পাশাপাশি—শেষে পলকে
উভয়ে আত্মহারা,
মধু মিলনের মদির দীপ্ত আলােকে
ঝপায়ে পড়িল তারা।
৪৩
মায়া-কাজল
বিদ্যুতে আঁকা তৃষিত তপ্ত কর
দু’জনা দোহারে বাঁধিল বক্ষ-পর।
রুদ্ধ রােদন পুলকে পড়িল ভাঙিয়া,
চকিত হাস্যে ওষ্ঠ সে গেল রাঙ্গিয়া।
মুগ্ধ নয়ন প্লাবিয়া ঝরিল
মিলন অশ্রু-ধারা,
মিলন যখন ফুরালাে তখন
নিমিষে মিলালাে তারা !
৪৪
বর্ষা-বরণ এস—নেমে এস সঘন বাদল- সিক্ত সজল আঁখি, কুজঝটিকার চিকুরে তােমারে ধরণীরে দেহ ঢাকি। নব জীবনের প্রসব ব্যথায় ধরা আজি শিহরায়, রুদ্ধ নিশাসে অধীর বাতাস তারি কথা হেঁকে যায় ! জল-চঞ্চল অঞ্চল তল নেমে এস নিঙারিয়া, ধরার রুক্ষ কঠিন বক্ষ কম করে পরশিয়া। হরিৎ শস্য ক্ষেত্রের মাঝে হােক তব আগমন, পুষ্প-মালার অর্ঘ্য ডালায় ধরা করে আবাহন। ৪৫
মায়া-কাজল
বিধুরা বধূর
তড়িৎ চমক চকিত ঠমক,
কুটিল বক্র গতি !
অশ্রু-মধুর
লহ প্রীতি-পূজারতি।
বঁধুর দেহের
পরশ তাহার।
তােমার অঙ্গে আছে,
বিরহী হিয়ার
অশ্রর ভার
বিরহিনী আজি যাচে।
কান্ত নবীন
বিচিত্র তনু
ইন্দ্র-ধনুর
লক্ষ বরণে আঁকা,
সীমা-শেষ হীন
তােমার অতনু পাখা।
নির্ভরি’ তাহে
এস নেমে ঝাকে ঝাকে,
চরণ কেয়ুর
মুগ্ধ ময়ুর
তােমারে যাচিয়া হকে।
মুক্ত প্রবাহে
৪৬
বর্ষা-বরণ
এস নিদাঘের
নিঝর-নদী
সলিলে পূর্ণ করি,
এস এ ধরার
দুর্ভাবনার
পাণ্ডুরতায় হরি।
অধরে ছড়াও
চূর্ণ পরাগ তব,
দাও টেনে দাও মেঘের নয়নে
কজ্জ্বল অভিনব।
কেতকী ফুলের
অশ্রু-ধারার
পরশ তােমার
যেমনি হৃদয়ে লাগে,
ভুবনের জ্বণ
তন্দ্রার মাঝে
হঠাৎ শিহরি’ জাগে।
তারি শিহরণে
কদম কেশর
পলে পলে হয় গড়া-
ওগো বর্ষার
বিপুল পাথার,
এসএস ডাকে ধরা!
৪৭
তড়িৎ লতার মঞ্জরী
তড়িৎ লতার মঞ্জরী,
হৃদয় আমার হ’রে নেছে
রুদ্র রূপের সুন্দরী।
হাহা হাহা মেঘের গানে,
আকাশ ঘিরে’ বজ্র হানে,
রুদ্র রূপের মধ্যখানে
হৃদয় ওঠে গুঞ্জরি'।
বরী-ছেড়া ঘােড়ার মতাে
নেচে চলে ঝঞ্চারে,
দিগ্বিদিকে ছুটে বেড়ায়
ক্রন্দনেরি বারে।
হুহু হুহু ধারার কোলে,
অন্ধকারের মর্ম দোলে,
রুদ্র রূপের ঐ অতলে
চিত্ত ফেরে সন্তরি’!
৪৮
বর্ষায়
এলাে বরষার প্রথম প্রভাত
মিলন-যজ্ঞ-হােতা।
কাঁদিয়া গাহিছে অন্তর আজি
তুমি কোথা -তুমি কোথা?
ঝরঝর-ঝর ঝরিছে বাদল,
নীপের কেশরে কঁপে পরিমল,
দিকে দিকে নীল জলদের দল
এলায়েছে তনু-লতা।
আজি বরষার প্রথম প্রভাত
তুমি কোথা -তুমি কোথা!
৪৯
মায়া-কাজল ধরার মৰ্ম্ম গুমরিয়া ওঠে-- কি করুণ তার ভাষা। গভীর ছন্দে মেঘের মন্দ্র শুধু করে যাওয়া-আসা। পথে পথে ফেরে পথ-হারা বায়, তড়িতের আলাে কালাে হয়ে যায়, জল-ভরা আঁখি শত ছলে গায় বিরহের কল-কথা। আজি বরষার প্রথম প্রভাত- তুমি কোথা—তুমি কোথা ! মিলন-পিয়াস দেহের দুয়ারে শিহরি’ শিহরি’ ঝরে, নীরব নিশাস খ’সে মিশে যায় শূন্য শয়ন পরে। সবখানি হিয়া বুঝাবারে চাই, বুঝিবার লােক খুঁজে নাহি পাই, কেহ নাহি পাশে—নাই-কিছু নাই- কি ক’ব সে কি যে ব্যথা।
বর্ষায় আজি বরষার প্রথম প্রভাত তুমি কোথা—তুমি কোথা ! • যে ব্যথা জাগিছে আমার এ বুকে আজি তা ফুটেছে মেঘে, ঘন-ঘাের দু’টি বারি-ভরা আঁখি তারি সাথে ওঠে জেগে ! আঘাতি’ কপাট মাের জানালার করের শব্দ আসে বার বার, চমকিয়া উঠে খুলে দেখি দ্বার অকারণ আকুলতা। এলাে বরষার প্রথম প্রভাত তুমি কোথা—তুমি কোথা! প্রভাতের আলো ম্লান হাসিহীন প্রভাত প্রদীপ সম, কেশ-ঘন-ঘাের আজি এ আকাশ- নিবিড় চিত্ত মম।
মায়া-কাজল দিমােহানায় জেগেছে কি বান— কে আজ তাহার রাখে সন্ধান ? বাতাসে ঝরাই বৃথা অভিমান এমনি এ ব্যর্থতা। হায় বরষার প্রথম প্রভাত-- তুমি কোথা—তুমি কোথা? কুসুমের স্তন-তট হ’তে খসি’ সুরভি বাতাসে ভাসে, চেনা পরশের হারানাে হরষ তারি সাথে ভেসে আসে। সারা দেশ আজি স্তব্ধ নিজন, শুধু দূরে জাগে কপােত কূজন, মুখে মুখ তারা করিছে সৃজন মিলন-বিহ্বলতা। আজি বরষার প্রথম প্রভাত- তুমি কোথা—তুমি কোথা? ৫২
বর্ষায়
তুমি আস নাই—ছায়া শুধু তক
করিতেছে আনা-গােনা,
মায়া-মরীচিকা গরি সাথে যেন
মাের যত জানা-শােনা !
সারা হিয়া আজি বিবশ বিকল,
কূলে কূলে তার জল-ছল-ছল,
তােমার হাসির শ্বেত শতদল
তাই খুঁজি হেথা-হােথা।
এলাে বরষার প্রথম প্রভাত
তুমি কোথা -তুমি কোথা!
জ্যোৎস্না রাতে
আলগােছে আর সখি,
বােস পাশটায়,
কেউ নেই দূরে কাছে
দোরে জালায়।
থাকে যদি—তুই কেন
বােস চঞ্চল ?
দেহ চায় দেহটারে
কে না জানে বল !
চারি ধারে যুথী-জাতী-
কুন্দ-অশােক,
নীল সাগরের মায়া
তােল দুটি চোখ।
মিছে খু . তাের সখি,
সবই অদ্ভুত,
মেঘে মেঘে চির দিনই
জাগে বিদ্যুৎ।
৪
জ্যোৎস্না রাতে
ঠোঠে তাের ভেঙেছে কে
রাঙা কুকু? •
লােভী মন চায় ওরই
গােটা-কত চুম্।
ঐ দেখ, কত চুমা
ঝরে জ্যোৎস্নায়
তুই শুধু মরে যাস
মিছে লজ্জায় !
বাহু মূলে উচ্ছলে
স্রোত তড়িতের,
বুকে বুকে বীণ বাজে
পানি সে টের ?
তনু-মন অনুখন
তােরে চায় আজ,
গাঙে যদি বান ডাকে
সে কি তার লাজ ।
রাতের ইতিহাস
কত রাত ?
সবে সাঝ ।-
-বইখানা ?
-থা আজ।
-সেই বেশ।
কাছে বােসাে।
আরাে কাছে ।
-যাই রােসাে।
কেয়া ফুল
-কোথা হাঁকে ?
—পাপিয়াটা••
খাসা ডাকে।
-কি হলো গাে ?-
*চুমা দাও।
-ফের ফকি?
এই নাও।
৫
৬
রাতের ইতিহাস
যে ।-
কত রাত ?
-বারােটা
সে কি কথা!•••
এরি মাঝে !-
ও হােথা ?
কি
ও নড়ে ?
-কিছু নয়,
পাতা ঝরে।
-আকাশটা
আঁধিয়ার।
-প্রিয়া নেই
বুকে তার।
-চুমাে চাই।
ক'টা চাও ?
-মােটে দু’টো ?-
আরাে নাও।
মায়-কাজল
কত রাত ?
তা কে জানে
-আজ কথা•••
কানে কানে -
ওকি কে ?
-জুড়িদার।
চায় কি ও ?
সাথী তার।
বেল কুঁড়ি...
এনেছে কে ?
-দু’টি ঠোটে
ফুটেছে সে ?
-কথা শােনাে !
চোখ, চাও।
-দু’টি চুমাে।
-এই নাও !
রাতের ইতিহাস
কত রাত ?-
নেই আর !
-ওগাে দেখাে।
কি আবার ?
চোখে জল ?-
--ভারি জানাে।
মুখখানি
কাছে আমাে।
পাখীগুলাে
চুপ করাে।
-ঘুমিয়েছ ?--
-আহা সরাে।--
-আরাে কাছে ।
-চুমাে দাও।
আরাে•••আরাে-
নাও•••নাও !
৫৯
সাফাই
গােপনে সে চেয়েই যদি থাকে
চুপটি করে আমার মুখের পানে,
আমার আঁখি মিশেই থাকে যদি
নীরবে তার চকিত নয়ানে ;
আমাদের সেই অতি গােপনটাকে
তফাৎ থেকে কাউকে দেখে নেবার
অধিকার তাে দেইনি মােটেই মােরা,
বলিওনি কো ঢাক বাজিয়ে দেবার।
তাের তবে তারেই নিয়ে কেন
নাড়া চাড়া করিস্ মিছে এতাে ?
সে চেয়েছে আমার মুখের পানেই
ততাদের মুখে চায়নি কভু সে তাে !
আড়ালে সে আমার সাথে যদি
বলেই থাকে গােটা কয়েক কথা,
সাফাই
আর আমি না করেই যদি থাকি
তাহার প্রতি কঠোর কৃপণতা ;
মনের ভুলে নানা কথার ছলে
পেরিয়ে থাকি বুড়ি-গাঙের চর,
তাতে তােদের কি-ই বা আছে ক্ষতি,
কেন ঝরা অত কথার ঝড়!
পরের কথা—তারেই নিয়ে কেন
চিত্ত তােদের টাটিয়ে ওঠে এত ?
আমার সাথেই হয়েছে তার কথা-
তােদের সাথে কয়নি কথা সে তত ?
;
নিজনে সে নিয়েই থাকে যদি
হাতটি আমার তুলে নিজের হাতে,
আর আমি না সরে গিয়েই থাকি .
গভীর রাগে—গভীর লাজের সাথে
হাতের পরে মিঠে হাতের পরশ
সময় তাতে অম্নি ব’য়েই যায়•••
তােরা কেন দেখবি তারেই চেয়ে,
হাবি আরাে চোখের ঈশারায়।
৬১
মায়া-কাজল
মােদের মিলন আমাদেরই ব্যাপার,
মাতামাতি তােদের কেন এত?
আমার হাতেই হাত সে রেখেছিল—
তােদের হাত ধরেওনি কো সে তাে !
আবেগটিরে রুখতে গিয়ে যদি
মাের মুখে সে চুমাের রেখা আঁকে?
আচম্বিতে আমার অধরটিও
অধরে তার ঝুকে পড়েই থাকে,
মাখামাখি তরুণ-তরুণীর
সে যে শুধু অকস্মাতের মার,
আড়াল থেকে কে-ই বা বলে দেখাে-
দেখিস্ যদি হল্লা কিসের তার ?
পরের ব্যাপার-তারেই নিয়ে বল্
তােদের কেন মাথার ব্যথা এতো ?
সে খেয়েছে আমার মুখেই চুমাে-
তােদের মুখে খায়নি চুমাে সে তত !
অপরূপ :
তার চেয়ে বেশী সুন্দর বলি আমি তাে জানিনে কারে,
প্রতিটি অঙ্গ পরখাে করিয়া বিচার করিনি তারে,
আমি শুধু বুঝি—লয়ে যখন বাঁধে মােরে বাহু-লতা-
সে বাহুর তার তুলা নাহি আর—মুখে নাহি সরে কথা।
কেহ না মানুক—আমি মানি ওরে, সুন্দর সে যে কত,
যদিও তাহারে নিক্তিতে তুলি’ দেখিনি দেখার মতাে।
অধরে তাহার ঘন চুম্বন নত হয়ে নামে যবে,
অমৃত-পাথার সে ঠোঁঠের তার তুলনা কেমনে হবে।
জগতের মাঝে সব চেয়ে সেরা সুন্দর সৈ যে জানি,
যদিও তাহার কষ্টিপাথর আমারি দৃষ্টি খানি।
হরিণের মতাে নয়নে যখন তাকায় মমতা মাখি’,
সে আঁখির তার জোড়া কোথা আর বিস্ময়ে চেয়ে থাকি।
চাদের মাধুরী মাপিবার লাগি’ বৃথা চাওয়া তারা পানে,
অপূর্ব সে যে—সুন্দর সে যে—মাের মন তাহা জানে।
অতি অপরূপ মনের দেবতা তারি রূপে দিশাহারা,
তাই তাে তাহার জোড়া নাহি আর হৃদয় পেয়েছে সাড়া!
অভিব্যক্তি
কদম তাহার কেশরে শিহরি”
বাতাসে ডাকিয়া কয়,
হে বাতাস, মাের তনু-মন-প্রাণ
সকলি যে তােমা-ময়।
সে ভাষা শুনিয়া থমকিয়া চায়
পুরুষ মুগ্ধ হিয়া,
আলিঙ্গনের আড়ালে সহসা
বাঁধিয়া সে নিল প্রিয়া !
তৃণ-মঞ্জরী জাগিয়া সে কয়
ফাগুনের কানে কানে,
কত আঁধারের মরু পার হয়ে
পেনু তব সন্ধানে।
৬৪
অভিব্যক্তি
রমণীর কানে সহসা বাজিল
সে ভাষা অতুলনীয়
পুরুষের মাঝে লভিল নিমেষে
প্রিয় সে
প্রাণের প্রিয়।
তার পরে হায় যেমন করিয়া
ধরার বক্ষ পরে,
মেঘ নেমে এসে আপনারে সপে
বিহবল মৰ্ম্মরে,
একটি চুমার মাঝারে সপিয়া
সে মাধুরী অনুপমা,
লুব্ধ প্রণয়ী কহিল কেবল
অতি ছােট-‘প্রিয়তমা।
আর আলােকের রেখাটি যেমন
আকাশেরে কহে ডাকি’-
নয়নের পথে হৃদয় এনেছি,
কিছু তাে রাখিনি বাকী ;
৬৫
মায়া-কাজল
স্নিগ্ধ আঁখির কোলে ভরে নিয়।
সে নিরুপম
মুগ্ধা প্রেয়সী কহিল কেবল
অতি ছােট-‘প্রিয়তম !
:-
অতল গভীর দু’টি হৃদয়ের
উতলা উৰ্ম্মি রাশি,
কথার মাঝারে সেই তাে প্রথম
উঠিয়াছে উচ্ছ্বাসি।
ছােট দু’টি সেই আদিম কথায়
যে ছবি হয়েছে গড়া,
আজিকার এই হাজারাে কথায়
সে ছবি পড়ে না ধরা।
পরিপূর্ণ পুষ্প-তনু আঁখি মেলি’ চায়— 'কামনার পঙ্কে গড়া প্রেমের কমল, বিকাশের শিহরণে চকিত চঞ্চল, অরূপ পড়েছে বাঁধা রূপের মায়ায়। তরঙ্গ মূরছি পড়ে সৈকতের পায়— দেবতা পেয়েছে সুধা-দৈত্য হলাহল, বসন্ত ছড়ায়ে যায় দেহ-পরিমল, নিদাঘের জ্বালা ঝরে স্তনের চূড়ায় । নত হয়ে নামিয়াছে সুদূর বিমান, ধরণী নভের পানে বাড়ায়েছে কর, মৃত্যুর পাথারে দোলে জীবনের গান, জীবন লুটায়ে পড়ে মৃত্যুর ভিতর। অতনু হয়েছে ভস্মতার পুষ্প বান- রেখে গেছে তরুণীর তনু মনােহর !
. আঁখি দু’টি আঁখি—দু'টি দীপ্ত প্রভাত অরুণ, অজানা রহস্য ওরি মাঝে করে বাস, পলে পলে দেয় নব সৃষ্টির আভাস, দৃষ্টি দিয়ে গড়ে তােলে প্রসন্ন ফাল্গুন। দুটি আঁখি—মদনের দু’টি ধনুগুণ, তুণ তার শূন্য করে দৃষ্টির বিলাস, সহসা ঝরায়ে যায় অজস্র নিশ্বাস- কখনো বা ঝরে ধারা-কখনাে আগুন! দু’টি আঁখি—মেঘ আর জ্যোৎস্না ঘনায়,- নিখিল ভুলের বােঝা করিছে চয়ন, কে জানে কি বল আছে চোখের মায়ায় ! তারায় তারায় দোলে আলাের কঁাপন। তরঙ্গিত নীল সিন্ধু অন্তরে ফেনায়- নীল চোখে জাগে তারি ছন্দের স্বপন।
কল হাস্য
অনিন্দিত কল হাস্য অধরের তীরে-
অভিনব আনন্দের রসে ভরপূর !
কল্পনা রেখেছে তারে ছায়ালােকে ঘিরে,
বাস্তব করেছে আরাে বিচিত্র মধুর।
আলাে নয়—আলেয়ার আগুনের শিখা,
বিমুগ্ধ বিশ্বের আঁখি ভয়ে ভয়ে চায়,
দীপ্ত দাহে গড়ে ওঠে মায়া-মরীচিকা,
কেহ পথ পায়—কেহ পথরে হারায়।
কে জানে ও কার পানে মেলেছে নয়ন ?
দশন-শাসন বৃথা—শুধু অর্থহীন।
চিত্তের অতলে আছে পরশ রতন,
বাহিরে ফুটেছে তারি গুটি-কত চিন্।
চারি পাশে ঝরে পড়ে চঁাদের কিরণ•••
স্বপ্ন দিয়ে গড়েছে কে সােনার হরিণ।
৬৯
অকুল পাথার
যেথা আছে ধরণীর যা কিছু বিভব,
সব ছেকে গড়ে তোেলা তনু দেহখানি।
এক তনু-তট তলে মিলিয়াছে সব
সুখের অজস্র হাসি--বেদনার গ্লানি।
আকাশ পড়েছে ভাঙি নীল দুটি চোখে,
মুখে জাগে সমুদ্রের লাবণ্য-জোয়ার,
জ্যোৎস্নাঞ্জমায়ে তারি অকুণ্ঠ কৌতুকে
বক্ষে ডানা মেলিয়াছে পুষ্পের পাহাড়।
কখনাে মনের বনে ফোটে শতদল,
কভু সেথা জেগে ওঠে মেঘের ময়ূর,
অধরে অরুণ হাস্য, আঁখি-ভরা জল,
বসন্ত ও বরষার বিচিত্র সে সুর !
কে বলে সসীম দেহ, আমি দেখি তার
সীমা নাই—শেষ নাই-অকূল পাথার !
৭০
এ দেহ মাটির দেহ-ধুলি দিয়ে গড়া,
ধূলির সহিত ধূলি মিশে’ হবে লয়,
এই বসন্তের হাসি পত্র-পুষ্পে ভরা,
কে জানে হবে না কাল বিস্মৃত-বিস্ময় !
তাই আজ যত পারাে করে নাও পান,
ধরার অধর-সুরা-সুধা সমুচ্ছল,
কাল যদি শেষ হয় জীবনের গান,
তবু মনে হবে জন্ম হয়নি নিস্ফল।
পরিপুষ্ট দ্রাক্ষা সম দুঃসহ উচ্ছ্বাসে
যৌবন তনুর তটে মেলিছে নয়ন,
নিপীড়িয়া নিঙারিয়া নিশ্বাসে নিশ্বাসে,
তারি মধু করি’ লহ নিঃশেষে শােষণ।
কুসুমের দল ঝরে বাতাসে বাতাসে,•••
জীবন ধরার বুকে অনন্ত স্বপন !
৭১
কথামৃত
কথা কই—অন্তরের অমৃতের রাশি
অধরে উঠুক ছেপে প্রচুর মধুর,
যে আলাে রয়েছে বুকে বাহিরে বিকাশি’
আঁধারের ঐরাবত করুক সে দূর।
কথা কহ-হৃদয়ের নিভৃত গােপনে
যে কথা রয়েছে ঢাকা-কহ বার বার,
যে কথা জাগিয়া ওঠে চুম্বনে গুঞ্জনে,
সে ভাষা ধ্বনিত হােক্ অধরে তােমার ।
কথা কহ-বাহু-পাশ যে কথার ভাষা,
নিখিল হারায়ে যায় যে কথার মাঝে,
যে ভাষার বুকে জাগে দুরন্ত দুরাশা,
সে ভাষায় কথা কহ নিঃশঙ্ক নিলাজে।
তান্তরে উচ্চারে মন্ত্র দ্বিধাহীন মন
কথা কহ-টুটে যাক্ গােপন বাঁধন।
৭২
চিরন্তন
বিদায়ের দূত এলাে ঘনীয়ে দুয়ারে
তুমি লিখিয়ায় লেখা সারা দেহময়,
তাই তাে পড়িনি ভেঙে বেদনার ভারে,
জাগেনি মৰ্ম্মের মাঝে মৃত্যুর প্রলয়।
বৃথা বিদায়ের বাণী—চকিত চঞ্চল,
এ চোখে তােমারি দিঠি হানে শিহরণ,
কত সে কালের ছোয়া—হয়নি শীতল,
উদ্যত তেমনি আছে উত্তপ্ত চুম্বন।
তােমারে বেসেছি ভালাে—ভালােবাসি তাই
তােমার পরশে ছাওয়া এই তনুখানি,
এ তনুর তীরে তীরে কোথ। তুমি নাই ?
তাই তাে একান্ত মিথ্যা বিদায়ের বাণী।
ঐ তব স্পর্শ আর এই আলিঙ্গন
আমার দেহের মাঝে এরা চিরন্তন।
৭৩
আগমনী
বঁধু এলাে দরজায় কি করিস্ বসে?
বুকের বসন খানি পথে দে এলায়ে,
পড়ুক পায়ের ধূলা তারি পরে খসে,
ধ্বনিটি জড়ায়ে যা তারি গায়ে গায়ে।
তারপর তাই দিয়ে বেঁধে নে হৃদয়,
ঢেকে দে গরবে দু’টি ঘন পীন স্তন
যদি চলে যায় যাক—কি তাহাতে ভয় ?
সে যাক- যাবে না তার গাঢ় আলিঙ্গন।
সে যাক—যাবে না তার ললিত পরশ,
সর্বাঙ্গে জড়ায়ে র'বে চকিত তড়িৎ,
সে যা—যাবে না তার লীলার রভস,
তনুর সুগন্ধে ঘেরা র’বে চারিভিত।
অন্তরের ফন্তু হ’তে অফুরানাে রস
রাখিবে শ্যামল করে মিলন-সম্বিৎ।
৭৪
‘বৈষ্ণব কবিতা
কি ছবি এঁকেছু কান্ত কোমল আঁখরে !
পদে পদে তারি মাঝে চিত্ত দিশাহীন,
নিখিল-বাসনা রাশি ফুটে থরে থরে,
নর-নারী মনােমধু হোথায় নিলীন।
দুরু দুরু কাঁপে বুক, সঘনে জঘন,
যমুনা উজান পানে ফিরে যেতে চায়,
আবেশে শিহরি’ ওঠে নব নীপ-বন,
বঁধুরে বাঁধার লাগি’ বেপথু হিয়ায়।
গুরু গুরু ডাকে মেঘ-হিয়া বেপমান,
প্রেম সে হয়েছে মূর্ত ওরি মাঝখানে,
অজস্র হৃদয় নদী বয়েছে উজান,
কত ঘট ভেসে গেছে সে কথা কে জানে!
ঐ গানে চিরন্তনী রমণীর প্রাণ,
রয়েছে অমর হয়ে নরের ধেয়ানে।
৭৫
ভারতচন্দ্র
কোনােখানে রাখাে নাই কোনাে অন্তরাল,
বৈষ্ণবের রাধা-কৃষ্ণ কেহ নহে তব,
লাজ সে তােমার কাছে ভীরুর খেয়াল
মুখে জাগে মদনের মন্ত্র অভিনব ।
দগ্ধ কাম প্রাণ পেয়ে ধীরে ওঠে বসি,
গানের আগুনে ভস্ম সুরুচি যুগের,
হৃদয়ের পুষ্প-পুটে বস্ত্র পড়ে খসি’,
চোর সে ধারে না ধার বাধা-বাঁধনের।
নিমিষে মিলায়ে যায় বুকের বসন,
পাহাড় নুমিয়া দেহে দেহ টানি লয়,
দুঃসহ আবেগে কঁপে সারা তনু-মন,
তারি সাথে কেঁপে ওঠে বিশ্বের হৃদয়।
যে কথা কেবল শশানে নিশীথ-শ্রবণ,
তাই দিয়ে সভা কবি, করে নিলে জয় ।
৭৬
ওমরের
স্বপ্ন
পরিপূর্ণ করি’ দেহ পানের পেয়ালা,
দলিত দ্রাক্ষার রসে পাত্র দেহ ভরি’,
নামে সন্ধ্যা সঙ্গীহীন নিঃশব্দ নিরালা,
তারি ছোঁয়া সারা হিয়া তুলিছে শিহরি'।
তরুণী ইরাণী সাকি, ঢালাে সুরা–ঢালে,
আরাে দাও—দাও ভরি’ কণ্ঠের গেলাস,
বাহিরে ঘনা রাত্রি আঁধার ঘেরালো,
হৃদয়ে উঠুক জাগি আলাের বিলাস ।
বৃথা ঐ বেশ-বাসদেহ আভরণ,
মাতাল বেতাল সখি—খেয়ালে বিহবল,
অধরে জেগেছে তার অগস্ত্য-চুম্বন,
ঢালল সুধা ক্ষুধা-হরাও নহে গরল।
ঢালল সুরা-আরাে ঢালে—আঁখি মুদে আসে,
অধরে পেয়ালা থাক, তুমি থাকো পাশে !
৭৭
মাস-পহেলা
মাস-পহেল আজকে রে ভাই, মাসের প্রথম দিন,
ফুল-শিশুরা সব পরেছে ফাগেরি কৌপীন,
গাছের পাতা সবুজ হলাে, মন হ'লাে নবীন ।
দীপ্তি দোলে ফুলের বুকে—দোলে হৃদয়ময়,
মন-মরা যে তাদের তরে আজের এদিন নয়,
বাতাসে আজ সাঁৎরে বেড়ায় ডানপিটেদের জয়।
আজের দিনেই অগস্ত্য তাে বাইরে দিলেন পা,
সেই অগস্ত্য গঙুষে যে শুষলে সাগর গা,
আর ফেরেননি—না-ফেরাটাই মস্ত কথা না।
মাস-পহেলা মাসের প্রথম—খোস্ করাে আজ দিল,
দুপুর রােদের মদ্য পিয়ে ঐ যে চেঁচায় চিল,
বি ধছে কানে ?—তবু দোরে আজ দিও না খিল।
৭৮
মাস-পহেলা
খিল দিও না দোরে তােমার—একটু পাতা কান,
চিলের গানেই বাজচে আজি ঘর-ছাড়াদের গান,
ঐ গানে আজ যােগ দিয়েছে নিখিল ধরার প্রাণ।
দিখােলাসা নিখিল আজি—যা পাও তুলে নাও,
ক্ষুধা যদি লেগেই থাকে নাও খেয়ে যা পাও,
নইলে অথির হাওয়ার সাথে মন করে উধাও।
মাস-পহেলা-পয়লা প্রভাত মাস-কাবারের পর,
কার চোখেতে অাজও ঝরে অশ্রুরি নিঝর ?
নতুন দিনের নিকট হতে নি চেয়ে সে বর।
নিটোল রবি—নিতল দুখে সেও তাে শুয়েছে,
সারা রাতি তারও চোখে ঝর্ণা ঝরেছে,
ভাের না হতেই তার হাসিতে বানও ডেকেছে ।
একটি তারা হারিয়েছে কাল আঁধার দরিয়ায়,
তারই লাগি’ ডুকরে কেঁদে করছে কে হায় হায় ?
মাস-পহেলার মন-ভুলানী ডাক দিয়েছে তায়!
৭৯
মায়া-কাজল
মাস-পহেলা মাসের প্রথম-মন-হারানাে সুর
ছড়িয়ে দেছে দিগ্বিদিকে অশান্ত রৌদ্র ;
সেই রােদে ঐ জ্বলছে দূরে ময়দানবের পুর।
ময়দানবের জ্বলছে পুরী-সােনার পালঙ্কে,
লুটছে দেহ রাজকুমারীর—অসাড় আতঙ্কে,
জীয়ন-কাঠি তার ললাটে আজ ছোঁয়ালেন কে ?
রাজকুমারীর নি টুটেছে—চোখ মেলে সে চায়,
দু’টো চোখের পাতার তলে কি সুখ শিহরায় !
বেপরােয়া রাজকুমারের জয়-গানই সে গায়।
*
মাস-পহেলা আজকে রে ভাই, মাসের প্রথম দিন,
শিমূল শাখা উচিয়েছে আজ বিদ্রোহ সঙ্গীন,
অশােক বনেও ঐ দেখা যায় ঝড়াে-হাওয়ার চিন্।
ঝড়াে-হাওয়া মনরে মাতায়, পথ পানে দেয় ডাক,
মাস-পহেলার ঝেড়ো-হাওয়া চিত্তে লাগায় তাক,
গানে গানে ভরে ওঠে মনেরি মৌচাক ।
৮০
ভাদ্র মাসের গান
ভাদ্র মাসে মাঠের মাঝে অথই সমুদ্র,
মাঝির গানে উছলে ওঠে ভাটিয়ালের সুর।
স্রোতের টানে তীরে তীরে ফিরে ফেরে জল,
দাড়ের ব’ঠে হীরের ঝােরা ঝরায় অবিরল।
নৌকা চলে পালের ভরে বাধা-বাঁধনহীন—
গাঁয়ের কথা মনে পড়ে মন যে উদাসীন।
ভাদ্র মাসে ডগমগ কর্মী-লতাগুলি
লাখাে ফুলে চোখে বুলায় মায়া-লােকের তুলি।
জলের মাঝে উচিয়ে মাথা জাগে ‘আমন ধান,
গাঁয়ের চাষার চিত্ত নাচায় সুখ-সায়রের বান।
মনের মদে মাতাল হয়ে “শাফলা বন্ধু চায়,
দূর-প্রবাসে বাড়ীর লাগি মন যে শিহরায় !
৮১
মায়া-কাজল
ভাদ্র মাসে এলা-মেঘের খােলা কেশের পাশ ;
হাল্কা হাওয়ায় উড়ে চলে—গুরে ফেলে শ্বাস ।
রােদের চুমাে আগুন জ্বালে দীপ্ত দিনের বুকে,
সেই আগুনে ঝাপিয়ে পড়ে পাখীরা কৌতুকে।
শরৎ শিশুর সজল চোখে ঘনায় শ্যামলতা
মন যে কাঁদে স্মরণ করে প্রিয়জনের কথা ।
ভাদ্র মাসে আকাশ ছেয়ে ছড়িয়ে পড়ে নীল,
নীল পাথারে প্রিয়ার চোখের পাই যে খুঁজে’ মিল ।
দীপ্ত তারার পদ্মগুলি জ্ব-জ্বলিয়ে হাসে,
নিখিল-ধরা জ্যোৎস্নালােকে একশা হয়ে ভাসে।
পথ-চাওয়া কার চোখের আলাে পাগল করে মন
চোখের কথা মনে করে মন যে উচাটন।
ফাগুন-বরণ
ফাগুন আসিয়া দাঁড়ালাে আজিকে তােদের ঘরের দ্বারে,
ওরে উন্মন, জাগা তাের মন—বরণ করে নে তারে।
দুরন্ত ঐ দক্ষিণে বায়,
চুপে চুপে পিক সাড়া দিয়ে যায়,
নব যৌবন জয় করে নিল জরার পতাকাটারে।
শঙ্খ বাজায়ে, অর্ঘ্য সাজায়ে বরণ করে নে তারে।
বরণ করে নে ফাগুন এসেছে—এনেছে মহােৎসব,
আমের মুকুলে ঝরিয়া পড়িছে বকুলের সৌরভ।
লক্ষনী-মায়ের চরণের রেখা,
তৃণ-পল্লবে গেছে আজ দেখা,
বন হ’তে বনে পথ ভুলে’ বুলে ভূঙ্গের কলরব।
ফাগুন এসেছে হরণ করিয়া ধরার অগৌরব।
শীত-শিশিরের মুখে সে দিয়েছে হাসির হিরণ টানি,
রাঙিয়া উঠেছে রভসে পেলব পলাশের পাণি-খানি।
রূপের বন্যা ঝরিছে আকাশে,
দোলে কাঞ্চন রৌদ্রে বাতাসে,
মায়া-কাজল
বুলবুল আর দোয়েলের দলে হানাহানি কানাকানি।
ফাগুন এসেছে ফসলের দলে হাসির ফোয়ারা হানি!
এত কারসাজি এত-তাড়াহুড়া—কেহ তো পাইনি সাড়া,
গােপন মেঘের কোথা ঢাকা ছিল এ মায়া-মদের ধারা ?
বলা-কহা নাই বেগে একেবারে,
দাড়ায়েছে আসি’ ঘরের দুয়ারে,
নিখিল জগৎ নিরখি’ নিমিষে বিস্ময়ে মাতােয়ারা।
কোথা দিয়ে আজ ফাগুন এসেছে কেহ তাে পাইনি সাড়া !
উড়ায়ে নিশান, বিষাণ বাজায়ে রাজা সে আসেনি আজি,
স্বর্ণ-ঝলক মুকুট বাহিয়া আসে নাই গজ-বাজি।
লােক-লস্কর আনে নাই মেলা,
তা’ বলে কে তারে করে অবহেলা ?-
পথিকের মতো এসেছে সে আজ অতিথির বেশে সাজি,
বন্ধ্যা-ধরার বুকের দুলাল বন্ধু এসেছে আজি।
কানন-বধূর মাথার মাণিক, ওরে তােরা ফুলদল,
খুলে দে আজিকে রুদ্ধ উৎসবক্ষের পরিমল।
৮৪
ফাগুন-বরণ
স্বপন দেশের সঙ্গীত-ঝােরা,
ওরে বিহঙ্গ, আয় আয় তােরা,
আলােড়িয়া আয় অরুণ পাখায় অগাধ আকাশ-তল,
ফাগুন এসেছে—মদির-গন্ধী আয় তােরা ফুল দল।
মিলনের সুখে বঁধুয়ার বুকে যে আছিস্ ওরে আয়,
বিরহের মাঝে যে রয়েছে সেও বাদ যেন নাহি যায়।
মিলনের তরে এনেছে সে হাসি,
বিরহের তরে অশ্রুর রাশি,
হাসি ও অশ্রু মেলা-মেশা আজ এক সাথে গায় গায়।
রৌদ্র ও মেঘে কোলাকুলি আজ আনন্দ বেদনায় ।
ফাগুন এসেছে ক্ষণিকের বঁধু-দূরে কেহ রােস্নারে,
রঙনের রাগে আঙিনা ভরেছে—বরণ করে নে তারে।
আলাের কণ্ঠে বাজিছে বেয়ালা,
পূর্ণ অযুত পুষ্প-পেয়ালা,
মনের অমৃতে মদনে জীয়ায়ে ফাগুন এসেছে দ্বারে।
ওরে উন্মন, জাগা তাের মন-বরণ করে নে তারে !
৮৫
কলাপী
রাত-ময়ূরীর পায় না নড়ে নীল পাথারের অন্তরে,
রূপের লহর উথলে ওঠে ময়দানবের মন্তরে।
মরকতের দ্যুতির লেখা জ্বলজ্বলিয়ে জুছে গো-
কালাে মেঘের ঘন কেশে তড়িৎ-শিখা সন্তরে।
রাত, ময়ূরীর পাখার পরে লক্ষ আঁখির লাঞ্ছনা,
তারার হারে তুলছে গড়ে কল্পলােকের আল্পনা।
অন্তবিহীন আঁধার সাগর বাঁধার লাগি’ চলছে গো,
ইন্দ্রধনুর রেণু দিয়ে ছায়াপথের জল্পনা।
কলাপী
বন-ময়ূরী তাহার পাখাও রূপ হ'তে নয় বঞ্চিত,
ফাগুনের ঐ তূণের আগুন সব যে সেথায় সঞ্চিত।
ফুটছে সেথায় কুন্দ অশােক শিউলী বহু-বল্লভা,
অপরাজিতার চন্দ্রকেতে বৰ্হ তাহার রঞ্জিত।
বন-ময়ূরী নাই বা পেলাে শূন্য-লােকের স্বৰ্গরে,
তার লেখা যে চোখের কাছে জ্বলছে আলাের অক্ষরে
শ্যামল রূপে ছুপিয়ে গেছে কানন ঘন-পল্লব,
সে রচিছে মর্ত্যলােকের মৃত্যু-বিহীন অর্ঘ্যরে।
মন-ময়ূরী, মন-ময়ূরী কিন্তু তুমি অতুল্য,
রৌদ্র-মেঘের নিত্য-দোলায় চিত্ত তােমার দোদুল্য।
নীলার পাতে ফুটাও তুমি পদ্মরাগের তারুণ্য,
পর্দাতে তাের নীল-পরীরা পাখনা পেয়ে প্রফুল্ল।
মন-ময়ূরী, মন-ময়ূরী, প্রণাম তােরে মন জানায়,
বনের, শিখি সৃষ্টি যে তাের কল্পনারি কারখানায়।
তােরই মাঝে জন্ম নিল রাত-কলাপীর লাবণ্য,
নিখিল শিখি পুচ্ছ মেলে মগ্ন যে তাের বন্দনায়।
৮৭
মায়া-কাজল
কে পেরেছে স্বরূপ তােমার মন-ময়ুরী, বর্ণিতে
মন-ময়ূরী, নিবাস তােমার মনের গােপন কোটিতে।
স্বর্গে এবং মর্ত্তে তােমার আনাগােনা নিত্যগাে,
মায়ার রাজা ময়দানবও চায় তােমারে বন্দিতে।
মন-ময়ূরী, অজর তুমি অমর-লােকের বন্দিতা,
মানস-লােকের দেবতা তুমি, কাব্য-লােকের নন্দিতা,
তােমার নাচে মূর্তি নিল নটরাজের নৃত্য গাে-
ছন্দে তােমার বিশ্বকবির বীণার বাণী ছন্দিতা।
স
শিশু
মায়া-লােক হতে তুমি পড়েছ কি খসি’ ?
সাথে কি এনেছ বহি’ স্বর্গের বারতা ?
ম—তবু আছে নির্বিকার বসি,
খানে নাই কোনাে দ্বিধা কি দীনতা
বেপরােয়া–চেয়ে আছছা পলক-বিহীন,
ক্ষেপ মােটেই নাই মর্ত্যের মানবে,
উপরে নীলাভ নভ দিগন্ত-বিলীন
তারি মাঝে কি দেখিছ নিঃশব্দে নীরবে ?
ভাবিছ কি—ঐ নভ ছিল তব স্থান ?-
মানব-দানব ছিল বহু নিম্নে পড়ি,
ক্ষীণ-কণ্ঠ তাহাদের দীনতম তান,
প্রতিদিন পদ-প্রান্তে উঠেছে শিহরি’ ।
৮৯
মায়-কাজল
ভাবিছ কি-এলে যদি তাহাদেরি মাঝে-
সেই চির ভীরু নর-তাদেরে কি ডর?
তাই কি অধরে তব উচ্ছ্বসিয়া রাজে,
হাসি-রাশি উপেক্ষার অনন্ত নিঝর !
একি স্পর্ধা—একি দম্ভ !এতটুকু দোষ
হয়েছে কি কোনােখানে-কোথা যাবে আর ?
নয়ন দু’টিতে জাগে তীব্র অসন্তোষ,
অধরে ঝাঝিয়া ওঠে প্রাণান্ত ঝঙ্কার।
থরথরি গৃহবাসী কেঁপে ওঠে ভয়ে,
কে যে কি করিবে খুঁজে ভাবিয়া না পায়।
সন্ত্রস্ত-পূজার পুষ্প-অর্ঘ্য রাশি লয়ে,
বিচ্ছুরিত পদতলে নীরবে জোগায়।
কি কৌশলে অত ক্ষুদ্র—এত ক্ষুদ্র তুমি
বিপুল এ বিশ্ব-রাজ্য করিছ শাসন ?
কি মায়ায় ঐ দু’টি পদ্ম-পদ চুমি
ছুটে আসে নিখিলের হরষ-ক্রন্দন ?
শিশু
কোথা রঞ্জু ?—তবু ও কি অটুট বন্ধনে
বাঁধিতেছ মানবের নিভৃত হৃদয় ?
কোথা মুক্তি ?-তরঙ্গিত দৃঢ় আলিঙ্গনে
স্বেচ্ছায় কিনিছে নর চির পরাজয় !
ধন্য তুমি হে মায়াবী, ধন্য তুমি শিশু,
সর্বব-জাতি-সমন্বয় তুমি নিয়ে এলে,
প্রেমে যাহা পারে নাই চৈতন্য ও যিশু,
সে বিশ্ব-বিজয়-শক্তি কোথা হতে পেলে ?
তাও বলি—আজিকার এ মহাগৌরুব,
এই হাস্য, এই লাস্য, এই অহঙ্কার,
এই জয়ােদ্ধত দৃষ্টি,আনন্দ-উৎসব,
নহে চির দিবসের সম্পদ তােমার।
আমাদেরই মতাে তুমি চির পরাধীন
দেবতা তুমিও নহ-মর্তোর মানব।
যে বেদনা আমাদেরে করিছে মলিন,
তােমারও ভাগ্যে জমা রয়েছে সে সব।
৯১
মায়া-কাজল
শ্যামল শালে গড়া এই বসুন্ধরা,
হাস্যালসে লীলায়িত ঐ নীলাকাশ,
পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন স্নেহ-ভরা,
শুধু দু’দণ্ডের এর অমৃত আভাস!
কেবল দু’দিন মাত্র—তারপর নয়,
তারপর সব শূন্য—সব অন্ধকার,
শুধু ছায়া-মায়া-ভরা—মিথ্যা সমুদয়,
দু’দণ্ডেই রুদ্ধ হয় স্বর্গের দুয়ার।
দু’দিনের স্বর্গ শেষে অনন্ত নরক,
তারপর অতি দীর্ঘ মানব জীবন।
সত্য-মিথ্যা ভালাে-মন্দ সহ পরখ,
কল্পনার স্বপ্ন শেষে ক্লান্ত জাগরণ।
থা—আজ এই শুভ মিলনের ক্ষণে
কাজ নাই সে অশুভ অমঙ্গলে ডাকি,
ভবিষ্যের অতি সত্য কঠোর জীবনে
কাজ কি এ বৰ্ত্তমান চিত্রপটে আঁকি’ ?
৯২
শিশু ভাগ্যে যাহা আছে তাহা থাক্-লিখা থাক, আজ যাহা করিবার করে ফেললা শেষ, মুগ্ধ বিশ্ব আত্মহারা নিস্তব্ধ নির্বাক- মুহূর্তের তরে তবু ভুলে যাক্ ক্লেশ। শুধু আললা—শুধু গান-বীণার ঝঙ্কার, একটি হাসির রেখা মানব জীবন, একটি সুখের স্বপ্ন শেষ নাহি যার, একদণ্ড ভেবে নিই তােমার মতন। হায় যদি চিরদিন এই স্বপ্ন ল’য়ে- -থা—থা—এই দেখাে মানব হৃদয়, যেমনি হাসিতে চায় আনন্দে বিস্ময়ে, চিন্তায় তাহার জাগে দ্বিধার প্রলয় ! তথাপি এ সব কথা ভাবিও না আজ, আমিও ভবিষ্য দুঃখ আঁকিব না কিছু, আজ তুমি স্বর্গ-শিশু-নাহি ভয় লাজ, ধরাে হাসি, কিম্বা ছােটো ক্রন্দনের পিছু।
মায়া-কাজল
সেই অবসরে মােরা মামুলী নিয়ম
তােমারে আহবান-করা করে নিই শােধ,
এস বৎস, এস লক্ষমী, এস প্রিয়তম,
এস জীবনের সুখ, আনন্দ, প্রবােধ !
এস বুক-জোড়া ধন, উজ্জ্বল মাণিক,
-কালাে হও যদিও তা কে কহিবে আসি ?-
এস বসন্তের চির সুধা-প্লাবি’ পিক,
দেখিব না তা সে কণ্ঠ ঝাঁঝর কি কাশী।
এস ভবিষ্যের বীর, দেশের মঙ্গল,
বাপ-মার মুখােজ্জ্বল শােভন নন্দন,
এস মুক্তি—এস স্বর্গ-দীনের সম্বল,
এস ওগাে জননীর প্রাণের স্পন্দন!
যেথা দিয়ে যাবে তুমি পুণ্যের বাতাসে
ফুটাইয়া যেয়ে শুভ্র পুষ্প রাশি রাশি,
তােমার সুন্দর স্নিগ্ধ কীৰ্ত্তির আভাসে
মরণেরাে মুখে যেন জাগে দীপ্ত হাসি।
৯৪
বিশ্বের আদর্শ হয়ো-
-আশীষ আমায়,
—যদিও সে আশীর্বাদ না দিলেও চলে,
কারণ যা আছে ভাগ্যে একবিন্দু তার
এড়াইতে নারে কেহ সহস্র কৌশলে।
তবু কহি—আজি তুমি এনেছ বহিয়া
নন্দনের যে সৌন্দৰ্য সুরভি শীতল,
চির দিন থাক তাই তােমারে ঘেরিয়া
তােমার আকাশ হাে নিৰ্ম্মেঘ-নির্মল।
শরৎ-প্রশস্তি
শুক্তির মনের মাঝে মুক্তা কোথা রয়েছে গােপন
পেয়েছ তাহার বার্তা, অতলের ঘন অন্ধকারে
বন্দিনী যে মুক্তি পেলাে, সত্য হ’লাে যাহার স্বপন,
তােমারে দেয়নি ফাঁকি, তাহারাও এলাে তব দ্বারে।
তাই তাে রহস্য যেথা ঘনীভূত—কুয়াসায় ঢাকা,
বস্তু যেথা বাস্তবের বেলা-তটে হারায়েছে দিক,
চিত্ত যেথা প্রতিপলে তুলিতেছে বিদ্রোহ-পতাকা,
তােমার মনের আলাে সেখানেও কুড়ালাে মাণিক !
বসন্ত ধরায় আসে-কেন আসে কেই তা জানে না,
আমরা কুড়াই শুধু আললা তার, তার গন্ধ-গান ;
মুগ্ধ হয়ে বসে থাকি, শুনি তার বাণীহীন বীণা,
অকস্মাৎ দিয়ে ফেলি ছন-ভরা স্পন্দমান প্রাণ।
যে বসন্ত দোলা দেয়, তার বুকে দোলা জাগে কি না-
মরমী পথের পান্থ, তুমি তারি পেয়েছ সন্ধান !
শরৎ-প্রশস্তি
পঙ্কজের স্নিগ্ধ-কান্তি, গন্ধ তার মিথ্যা সেতাে নয়—
চিত্তের দুয়ারে তারা হানে কর, আনে শিহরণ।
মূলের কলঙ্ক-পঙ্ক—সেও তারি সত্য পরিচয়,
সে সত্য কঠোর, তবু জানে তারে—মানে তব মন।
প্রতিদিন পলে পলে সে ক্লেদ দিতেছে দ্বারে হানা,
আমাদের ভীরু মুন গাহে শুধু আলােকেরি জয়,
জীর্ণ শাস্ত্র-বাক্য দিয়া ঢেকে রাখি গ্লানির নিশানা,
ঢেকে রাখি গন্ধ-বাষ্পে অন্ধকারে পঙ্কের সঞ্চয় ।
দুঃসাহসী পথ-যাত্রী, যাত্রা তব অগ্নিময় রথে,
এক সঙ্গে পান করাে মন্থনের সুধা ও গরল,
তােমার আত্মজ যারা, তাই গড়া রক্ত-মাংস হতে,
আত্মারে ভােলেনি, তবু তারা মৰ্ত্ত-মানুষেরি দল।
তুমি জাননা স্বর্গ আছে এই মর্ত্তেনহে শূন্য পথে,
মানুষেরি বুকে জ্বলে নরকের দুস্তর অনল।
১৭
মায়া-কাজল
দ্বিধা যার বুকে আছে, নিত্য দ্বন্দ্ব ভালাে-মন্দ সনে,
স্বর্গের আকাঙক্ষা আছে—শক্তি নাই উঠিতে সেথায়,
কামনার পুষ্পে যারা গড়ে তােলে প্রেমের নন্দনে,
পথ-প্রান্তে দীপ্ত দীপ খদ্যোতের খেয়ালে খােয়ায়,
ওগাে মানুষের কবি, আজি সেই মানুষের মন,
অন্তরের প্রীতি-পুষ্পে মাল্য তার করেছে রচনা,
চিত্ত-ভরা ভালােবাসা আনিয়াছে অর্ঘ্য-উপায়ন,
এনেছে তার যা সত্য—আনেনি মিথ্যার বিড়ম্বনা।
প্রিয়জনে নর-চিত্ত চিরদিন চাহে অর্ঘ্য দিতে,
চাহে জানাইতে তারে অন্তরের সুখ-দুঃখ ভার ;
দীপ্তি হানে তৃপ্তিহীন যৌবন তােমার চারিভিতে,
আনন্দের ছন্দে তাই গড়ে ওঠে বন্দনা তােমার।
জরারে করেছ জয় সাধনায় মনের নিভৃতে,
যৌবনের জয়-মুগ্ধ বান্ধবের লহ নমস্কার ।
১৮
মরীচিকা
গােলাপের কুঁড়ি প্রথম ফুটিয়া
নীরবে সে হেসে চায়,
বাতাসের গায়ে ঢলে পড়ে আর
সরমেতে শিহরায়।
চায় সূর্যের আলােকের পানে
নয়ন নিমেষহীন,
নিখিল রূপের সুধা পান করে
কেটে যায় সারাদিন।
সহসা তাহার বুকে জাগে ব্যথা,
জলে ভরে ওঠে চোখ,
S
মায়া-কাজল
যে তারে ফুটালাে তারি লাগি তার
বুকে বুকে জাগে শােক।
চুমার পরশে সে যে জাগায়েছে,
গন্ধে ভরেছে হিয়া,
পাপড়ির ডানা রাঙায়ে দিয়েছে
বুকের রক্ত দিয়া।
সে কোথায় সে কোথায় ?
কোন্ গােপনের গুহায় সে আছে
ধরা তারে নাহি যায়।
পাণ্ডুর হয় গােলাপের আঁখি,
হাসি হয়ে আসে গ্লান,
অজানিত পথে অজানার লাগি
ঝরে পড়ে তার প্রাণ।
মরালের বুক আলােড়িয়া ওঠে
কোমল মধুর সুর,
সুরের পুলকে রৌদ্রের গাঙ,
কূলে কূলে ভরপুর।
১০০
মরীচিকা
গানের মাঝারে বিলায়ে সে দেয়
গােপন মৰ্ম্মটাকে,
আপনার গান আপনি শুনিয়া
বিস্ময়ে চেয়ে থাকে।
সহসা তাহার মনের পাথার
থমকিয়া ওঠে ফুলে,
সারা অন্তর একই প্রশ্নের
বৃন্ত ঘেরিয়া দুলে।
নিজের মনের আনন্দ আর
জমাট অশ্রু দিয়া,
যে গেঁথেছে সুর আর সেই সুরে
ভরিয়া দিয়াছে হিয়া-
সে কোথায়—সে কোথায় ?
তারি লাগি’ তার চিত্তের তলে
অশ্রু সে উথলায়।
কণ্ঠের স্বর ক্ষীণ হয়ে আসে
থেমে আসে তার বাণী,
১০১
মায়া-কাজল অজামার লাগি চঞ্চুর ঘায় বিদারে মর্মখানি। প্রথম নারীর পরম পরশ- দোলে পুরুষের মন, নূতন জগৎ গড়ে ওঠে চোখে পলে পলে অনুখণ। গাহে বন্দনা মহাআনন্দে, হানে নয়নের বাণ, কত বিচিত্র স্পন্দন তােলে মান আর অভিমান। রচে স্বপনের ইন্দ্র-ধনুক সহসা কি বুকে বাজে, মায়া-হরিণের মােহ টুটে যায় নব বিস্ময় মাঝে। দেহের বোঁটায় ফুল যে ফোটায় অরূপের আলাে দিয়া, ১০২
মরীচিকা
সােনার কাঠির পরশে জাগায়
সুপ্তি-বিভল হিয়া-
সে কোথায় সে কোথায় ?
অন্বেষণের মশাল জ্বালিয়া
অতি পতি খোজে তায়।
কালাে হয়ে আসে নয়নের আলাে,
মরণ ঘনায় দ্বারে,
অজানার লাগি’ দেহ ঝরে যায়
অচেনা পথের ধারে ।
ক্ষ্যাপার খেয়াল ছবি খানি ঝুলিতেছে দেয়ালের গায়। বিরহিনী বধূ বসি’ পতির চিন্তায় সংজ্ঞা-হারা ; এলায়িত ত্রস্ত বেশ ভার- মুক্ত কেশ, মুগ্ধা নারী-আলেখ্য 'তাহার। যুবতীর ক্ষুন্ন প্রেম কোন্ মেঘ-লােকে, অন্তরের ছন্দে গাঁথা শত শত শ্লোকে পাঠাইছে, বাষ্প-বার্তা—চারু চিত্রকর আলেখ্য একেছে তারি বিচিত্র সুন্দর। উন্মাদ সমস্ত দিন বিবশ বিহ্বল, বসি’ বসি’ ছবি খানি দেখিছে কেবল। কথা কহ’—মাঝে মাঝে জানাইছে আর করুণ মিনতি-কথা কহ একবার। হৃদ্-মৰ্ম্ম-টুটা সেই ব্যথার বিনানী, ক্ষ্যাপার খেয়াল শুধু—অর্থহীন বাণী ১০৪
রাজ-রাজেশ্বরী
হে সুন্দরী বসুন্ধরা, অনাদি ধরণী,
আজি মাের মুগ্ধ চিত্ত নীরবে আপনি,
লুটায়ে পড়িতে চায় পাদ-পদ্মে তব ;
আজ শুধু মনে হয়—তুমি অভিনব ।
বহু শত বর্ষ আগে এমনি মধুর
ছিলে তুমি, কণ্ঠে তব যে বিচিত্র সুর
নীরবে ধ্বনিয়া ওঠে-ভক্তের হৃদয়
সে দিনও সেই সুরে করেছিলে জয়!
আজিকে মিলায়ে যাবে। যুগান্তের শেষে
আবার আসিবে ভক্ত তব দ্বারদেশে।
যে সৌন্দৰ্য্য শতদল মেলিয়াছ আজ,
সেদিনও তারি মাঝে করিবে বিরাজ!
অফুরন্ত যৌবনের সুধা-পাত্র ধরি’
তুমি যুগ-যুগান্তের রাজ-রাজেশ্বরী।
.
নারী
নারী তুমি শ্রাবণের ঘন নীল মেঘ।
অফুরন্ত যৌবনের দুঃসহ আবেগ
সারা দেহে জাগে তব উগ্রতম সুখে,
বিদ্যুতের বাঁকা ছুরী বেঁধে রাখে বুকে,
আঁখি-মূলে, স্তন-তটে, বাহুতে, অধরে।
ক্ষণে ক্ষণে তারি আলাে ঠিকরিয়া পড়ে
খড়গ সম সমুজ্জ্বল—বিদারি আঁধার।
অন্তরে রয়েছে তব মহাপারাবার,
তাই তাে তাহার বার্তা কেহ নাহি জানে!
শুধু একদিন যবে প্রলয়ের গানে
নিদাঘের তপ্ত শ্বাসে ধরা স্পন্দ-হারা,
তুমি নামাে বরষার নিঝরের ধারা।
অমৃত তােমারি স্পর্শ আর কিছু নয়,
সে দিন ধরণী লভে তারি পরিচয়।
১০৬
নদী ও নারী
নদী বুকে নেমে আছো সারা সন্ধ্যাবেলা,
চম্পক আঙুলে জলে চলিতেছে খেলা
স্বচ্ছন্দে কৌতুকে—কভু তার মাঝখানে,
দ্রুত সঞ্চালিত কর বজুবান হানে।
শত ইন্দ্রধনু দিয়া ভরি’ নভ তল,
মুখের ফুৎকারে কভু ছুঁড়ে দাও'জল ;
কখনাে বা নব নীল ঘন বাস দিয়া
গৌর-কান্ত তনুখানি ঘষিয়া মাজিয়া
তারি পানে চেয়ে থাকে। নির্নিমেষ আঁখি।
আপনারে যত দেখাে-দেখা থাকে বাকি।
এলায়িত সদ্য-সিক্ত কেশ-পাশ ঘিরে,
অন্ধকার মেঘচ্ছায়া নেমে আসে ধীরে
তােমারে চিনেছে নদী তাই নাচে সুখে,
তুমি তারে চিনিয়াছ তাই বাঁধাে বুকে।
১০৭
মায়া-কাজল
নদী-নীরে নামাে যবে গাহন করিতে,
কেন হই নাই নদী তাই ভাবি চিতে।
মেলে দিয়ে যৌবনের শতদল-দলে,
নিঃসঙ্কোচে নেমে যেতে আমার অতলে
লজ্জাহীন রূপে লীন গরবী রূপসী।
নীবী-বন্ধ হ’তে ধীরে বস্ত্র যেত খসি’
অলস আবেশে। লীলায়িত তনুখানি
মত্ত স্রোত মােহ ভরে বক্ষে নিত টানি'।
দু’টি রক্ত অধরের চুম্বনের রেখা
তরঙ্গের তালে তালে হয়ে যেতে লেখা।
বসনের মতাে করি’ সারা দেহটির
চারি পাশে ঘিরিতাম গাঢ় নীল নীর।
একেবারে অন্তরের মাঝখান হতে
স্রোত আসি’ মিলে যেতাে ও রূপের স্রোতে।
১০৮
পথ নাহি জানি
রজকের গৃহ হ’তে আসেনি কাপড়,
নিমন্ত্রণ ব্যর্থ বুঝি যায়। কীল-চড়
ভাদ্রের তালের মতাে ভৃত্য-পৃষ্ঠ পরে
নিক্ষেপিয়া, সুধাইনু কস্তু ক্রুদ্ধ স্বরে
হতভাগা, বস্ত্র কেন রাখিসনি আনি ?
ম্লান মুখে সে কহিল-পথ নাহি জানি।
পথ নাহি জানি ?-আরে—আরে একি কথা?
সহসা বুকের মাঝে কেন বাজে ব্যথা,
জলে জলে ছেয়ে আসে চোখ,? উচ্ছ্বসিয়া
ব্যথিয়া কঁাপিয়া ওঠে উৎপীড়িত হিয়া
মায়া-কাজল কোন্গুপ্ত আশঙ্কার উগ্র নাগপাশে। অসীম উদ্বেগ রাশি অশান্ত নিশ্বাসে ছড়ায়ে পড়িতে চায়, অতি ক্ষুদ্রতম ঝাহত কুসুমের রেণুরাশি সম। পথ-পথ নাহি জানি। কে জেনেছে পথ ? এই সীমা-শেষহীন অসীম জগৎ- এর পথ কে জেনেছে ? কে বলিতে পারে স্পর্ধা ভরে এই বিশ্ব বিপুল পাথারে, সরণীর সেই একা পেয়েছে সীমানা ? নির্ভুল সে—তারি একা আছে শুধু জানা তাহার গৃহের পথ, এ জগৎ মাঝে যাহার অমৃত দীপ্তি স্থির হয়ে আছে ? আমিও তো নাহি জানি পথ। তােরই মত ওরে মাের ভক্ত ভৃত্য, ওরে অনুগত, আমারও কত কাজ হয় নাই শেষ। পথ নাহি জানি বলে পরিপূর্ণ বেশ, ১১০
পথ নাহি জানি
জীবনের যােগ্যতম শুক্ল বস্ত্রখানি,
এখনও হয় নাই আনা। শত গ্লানি
অচঞ্চল দ্বিধা ভরে বহিতেছি শিরে।
আমার যে প্রভু সে কি এ হীন-শক্তিরে,
এ অক্ষম ভৃত্যে তার সুধাবে না ডাকি
কেন কাজ হয় নাই শেষ ? কবে নাকি
রুদ্র রােষে রে আযােগ্য, রে দায়িত্বহীন,
কি করে কাটালি বৃথা এত দীর্ঘ দিন
জীবনের সুবর্ণ সুযােগ ? আমি তারে
তখন বুঝবি বলল কোন্ তর্ক ভারে,
কোনাে দোষ নাহি মাের—দণ্ড-ধৃত পাণি
মানিবে কি পথ আমি—পথ নাহি জানি।
এ সংসারে যদি কেহ প্রাণপণে যুঝি
পথটিরে না পারে জানিতে, খুঁজি’ খুঁজি
অবশেষে ঘৰ্ম্মাতুর শ্রান্ত কলেবরে
সাঙ্গ করে অন্বেষণ, ক্ষণেকের তরে
তন্দ্রার কোমল হস্ত মৃদু পরশনে
বিশ্রাম বুলায় তার বিনিদ্র নয়নে,
১১১
মায়া-কাজল
সংজ্ঞা বলে করে সংহরণ, তারাে তরে
দয়া নাই বিধাতার কঠিন অন্তরে ?
সর্বব-অন্তর্যামী সে কি দেখে না চাহিয়া
হৃদয়ের নিভৃত নিলয়ে ?
চমকিয়া
সহসা দেখিনু চেয়ে সাশ্রু আঁখি দু’টি।
সস্নেহে কহিনু ডাকি’—আজি তাের ছুটি
কোনো কৰ্ম্ম হবে না করিতে। অবসর
যথা ইচ্ছা ওরে ভৃত্য, আজি ভােগ কর
নিশ্চিন্ত নীরবে। দু’টি মুদ্রা দিয়ে করে
তাহারে বিদায় দিনু ব্যথিত অন্তরে।
১১২
খেয়া পার
.
ওরে অন্ধ, ওরে নেয়ে, ভাের থেকে আছাে জাগি
সােনা-করা কোন্ একখানি স্নিগ্ধ পায়ের লাগি।
কত জনরে পার করেছ, আলে এ-পার কত,
নিয়েছ পারের কড়াক্রান্তি ন্যায্য হিসাবমতাে।
তােমার নায়ে পার হয়েছে কতই ধনী-মানী,
সেও এসেছে নেই কো যাহার পারের কড়ি খানি।
কাউকে হয়তাে চাওনি তুমি তুলিয়া নিতে নায়ে,
বিকিয়ে দিলে চিত্ত তােমার আবার কারাে পায়ে।
এমনি করে পার করিতে করেছ তারেও পার,
কাঠের তরী হয়েছে সােনা চরণ লেগে যার।
হয় তাে তাহার মলিন বাসে অঙ্গ ছিল ছেয়ে,
ভস্মে ঢাকা আগুন—তারে তাই দেখােনি চেয়ে।
মায়া কাজল
হয় তাে পারের কানা-কড়িটি চায়নি কো সে দিতে,
বাক্যে তােমার বিষ ঝরালে আদায় করে নিতে।
ঈশারায় সে বললে বুঝি—আমি দিলেম দান,
জগৎ বিকায় যে ঈশারায় দেওনি তারেও মান।
এক মুহূর্তে এমনি করে হায়রে হতভাগা,
ব্যর্থ তােমার এতদিনের অহােরাত্র জাগা।
হাজার লােকের সাথে হেলায় করেছ তারেও পার,
কাঠের তরী হয়েছে সােনা চরণ লেগে যার !
১১৪
অসমাপ্ত
যে কথা বলিতে চাহি, চেয়ে দেখি হায়,
ফুল বনে ফুটেছে তা বায়ুর ভাষায়।
বলিতে অমনি সখি, থেমে আসে স্বর,
কি দিয়ে দেখাব তারে বুকের ভিতর!
যে হাসি ফুটাতে চাহি, না ফুটিতে মুখে,
জ্যোৎস্নায় ফুটেছে তা সাগরের বুকে।
হায় সখি, বেদনায় ভরে যায় হাসি,
কি দিয়ে বােঝাব তারে কি যে ভালােবাসি।
যে দিঠি হানিতে চাহি, না আনিতে চোখে
অরুণ হেনেছে তাহা ঊষার অলকে।
দিঠি হানা হলাে না তাে–চোখে আসে জল,
কি দিয়ে জানাব হিয়া—ব সখি, বল্ !
হিয়ার সহিতে যদি হিয়া না মিলায়,
হাসি দিয়ে, দৃষ্টি দিয়ে, মন জানা যায় ?
হৃদয় না শশানে যদি হৃদয়ের বাণী,
কথা দিয়ে বােঝননা কি যায় ব্যথা খানি!
১১৫
সাগরিকা
ছােট নাও খানি ভাসায়ে দিয়েছি
নীল সাগরের জলে,
ঘুরে ঘুরে সে যে মনের খেয়ালে
মাণিক কুড়ায়ে চলে।
নীল সে সাগর—ঢেউয়ে ঢেউয়ে যার
মূরছিয়া পড়ে মায়া,
তারি মাঝখানে মাের তরী খানি
এতটুকু রচে ছায়া।
কত লােকে বলে কুড়ালি’ ওরে,
ও গুলাে মাণিক নয়,
শুক্তির মাঝে নেই—নেই তাের
মুক্তার পরিচয়।
১১৬,
সাগরিকা) মুক্তা বলিয়া যা কুড়াই তার হয়ত সকলি ঝুটা, হয়তাে’ কেবলি ঝিনুকের হাড়ে ভরিয়াছি দু’টি মুঠা । যে সাগর-নীলার সাগর- সেও কি কেবলি ফাকি ? হােক ফাঁকি—তবু দু’আঁখি বাড়ায়ে তারি পানে চেয়ে থাকি। এ মায়া তাহার মরীচিকা কি না সে কথা কিছু না জানি, আমি জানি শুধু-ঘর ছাড়ায়েছে আমারে ও হাতছানি। হাতছানি দিয়ে ডাকে সাগরিকা সাগরতলের বালা, গলায় যাহার জড়ানাে রয়েছে নীল মুকুতার মালা, ১১৭
( 'মায়া-কাজল
যার কেশ-পাশ সুরভিয়া চলে
নীল আকাশের বাও,
তারি ঈশারায় আমি ভাসায়েছি ।
অকূলে আমার নাও।
ঝিনুকের নায় ক্ষ্যাপা দরিয়ায়
সাগরিকা দেয় পাড়ি।
তারি পথ চেয়ে নাও চলি বেয়ে•••
সে-চলা কেমনে ছাড়ি।
১১
আনন্দে কার মৰ্ম্ম মশগুল ?
মনের বনে ফুটেছে যার ফুল !
ব্যর্থ হয়েও ব্যর্থ নহে কেবা ?
সুন্দরে যে করিতে জানে সেবা।
বসন্ত কার জীবনে অক্ষয় ?
রসের সাথে যাহার পরিচয়।
এই লেখকের অন্যান্য গ্রন্থ
ফুলের ব্যথা (কবিতা)
মায়া-মৃগ (গল্প)
ঝড়ের দোলা (উপন্যাস)
slo
১০
পাঁধে. র ফুল (গল্প)
১০
গল্পের ঝরণা (ছেলেদের গল্প)
গল্পের আল্পনা ( ঐ )
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.