Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dhruba-charitra Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শ্ৰীমতী ইন্দুরেখা দেবী প্রণীত
প্রথম সংস্করণ
সন ১৩৩৭, বৈশাখ।
মূল্য ১
প্রকাশক
প্রভাস চন্দ্র গুপ্ত।
১৩২, গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেন,
কলিকাতা।
প্রিন্টার—শ্রীশাকুমার চট্টোপাধ্যায়।
বাণী প্রেস।
৩৩এ মদন মিত্র লেন, কলিকাতা।
স্বামীভােলানন্দ গিরি মহারাজ।
No text on this page.
উৎসর্গ
প্রেম ভক্তি সরলতা
পরিপূর্ণ জ্ঞান কথা
ধ্রুবের চরিতামৃত করিনু কীৰ্ত্তন।
শ্রীগুরুচরণে ভিক্ষা, দাও প্রেম-ভক্তি শিক্ষা
ধ্রুব-জ্যোতিঃ হেরি যেন মুদিলে নয়ন।
পরমাত্মায় লয় পেয়ে, প্রেমেতে বিহ্বল হয়ে
যুগলচরণ প্রভু করি দরশন।
গাহি তব গুণ গান
পূর্ণ হাে’ক মনস্কাম
শ্রীগুরুচরণে ইহা করিনু অর্পণ।
No text on this page.
ভূমিকা। শ্রীশ্রীগুরুদেবের কৃপায় ধ্রুবচরিত্র পুস্তিকাখানি প্রকাশিত হইল। এই পুস্তকবিক্রয়লব্ধ অর্থ আমার চিরআরাধ্য, ইহ- পরকালের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, অহৈতুক কৃপাসিন্ধু গুরুদেব শ্রীশ্রীভােলানন্দ গিরির সেবায় অৰ্পণ করিলাম। বর্ণাশুদ্ধি বা মুদ্ৰাপ্রমাদজনিত কোনওরূপ ভ্রম দৃষ্ট হইলে পাঠক পাঠিকা কৃপাপূর্বক স্বীয় ঔদাৰ্যগুণে ত্রুটি মার্জনা করিয়া সংশােধন করিয়া লইবেন। পুস্তকের শেষভাগে একখানি শুদ্ধিপত্রও সন্নিবেশিত করিলাম। গ্রন্থকত্রী ।
No text on this page.
সরস্বতীর বন্দনা।
মা শুভ্রবসনা,
শ্বেতপদ্মাসনা,
অয়ি ! স্নিগ্ধোজ্বলবরণী।
কুবৃত্তিনাশিনী
সুবৃত্তিদায়িনী,
বাগেদবী মাতঃ বীণাপাণি।
বিশুদ্ধ উপরে
থাক মা শরীরে
বেদমাতা জ্ঞানদায়িনী।
নমঃ শ্বেতাঙ্গিনী
গায়ত্রী জননী,
কণ্ঠে বােস কণ্ঠশােভিনী।
No text on this page.
*
শ্রীগণেশায় নমঃ।
ববিত্র ।
ধ্রুবচরিত্র।
“পঞ্চম বর্ষীয় শিশু একা এ বিজনে,
কিবা প্রয়ােজন তরে আসিয়াছ বনে ?
সুন্দর মুরতি হেরি,
রাজপুত্র মনে করি ;
জিজ্ঞাসিতােমারে, বাছা, কিসের লাগিয়া
যুরিতেছ ছিন্ন বস্ত্রে কঁদিয়া কাঁদিয়া ?
২
“পিতা মাতা কেহ তব নাহি কি ভুবনে?
একাকী এসেছ বাছা নিবিড় কাননে ?
হিংস্র বনের পশু,
ঘুরিতেছে হেরি শিশু,
কে রক্ষিবে এ গহনে, না ভাব তা মনে ?
নির্ভয়-হৃদয়ে বসি কঁাদ ক্ষুন্নমনে।
“কাহার তনয় তুমি কিবা নাম হয় ?
বদন নিরখি তব অতি দুঃখময় ।
অবােধ শিশুর সনে,
প্রবেশ করিয়া বনে,
লুকাচুরি খেলা করি ছিলে কি লুকিয়ে ?
পথহারা হয়ে তাই কাঁদিছ বসিয়ে ?”
৪
“কে তুমি মা! নিরাশ্রয়ে আশ্রয়-দায়িনী,
অবােধ সন্তান আমি কিছুই না জানি।
বলেছিল। মাতা মােরে,
“ডাক সে জগদীশ্বরে,
সর্বদুঃখ-হারী তিনি, তাহারি কৃপায়
অপার সুখের রাজ্য পাইবে ধরায়”।
৫
রাজা সে উত্তানপাদ হন মাের পিতা,
সুনীতি সুরুচি নামে দুইজন মাতা,
ধ্রুব মাের নাম হয়,
হই সুনীতি-তনয়,
দুঃখিনী জননী মাের অরণ্যবাসিনী,
সতত নিরখি তারে নিতান্ত দুঃখিনী।
ক্ষুধায় কাতর হয়ে খেতে যদি চাই,
কাঁদিয়া কহেন মাতা, হায়! কিছু নাই।
বৃক্ষ হতে পাড়ি ফল,
নদীর পবিত্র জল,
লইয়া, কঁদিয়া তিনি কহেন কাতরে
“রাজপুত্র হয়ে সুখ না পেলি অন্তরে”।
খেলিম সখা সাথে বিবস্ত্র হইয়া,
ঘৃণা করেছিল তারা মােরে নিরখিয়া
:
আসিয়া মায়ের পাশে,
কাঁদিয়া কহিনু শেষে,
কাদিলেন মা আমার কতই কাতরে,-
অঞ্চল ছিড়িয়া এই বস্ত্র দেন মােরে।
৮
ছিন্নবস্ত্র হেরি সবে করে পরিহাস
“রাজার তনয় ! ছি ছি, একি চীর বাস।”
হেরি মােরে দুঃখময়,
প্রিয় সখা জন ছয়,
ছাড়াইতে চিরতরে দীন আভরণ,
মােরে ধরি লয়ে যায় রাজার সদন।
উপনীত হয়ে নিজ পিতার সদনে,
উঠিতে মানস হ’ল রাজ সিংহাসনে।
আসি অতি ক্রোধভরে
বিমাতা কহিলা মােরে,
‘রাজসিংহাসন তব নহে যােগ্য স্থান,
মাের পুত্র তরে ইহা হয়েছে নির্মাণ।
সুনীতির গর্ভে যবে লয়েছ জনম
হেন উচ্চ আশা কভু না হবে পূরণ।
অভাগীর পুত্র যবে
সেই মত রহ তবে ;
ভাগ্যগুণে মাের গর্ভে লইলে জনম,
পাইতে এ উচ্চপদ রাজসিংহাসন।
বিমাতা কহিলা কত কঠিন বচন
তবু নাহি তারে পিতা করেন বারণ।
“আয়, ধ্রুব, নেমে ভাই
হেথা থেকে কাজ নাই,
অভাগীর পুত্র যদি চল্ ভঁর ক্রোড়ে,
রাজপুরী হ’তে ভাল ছােট সেই কুঁড়ে।
এতেক কহিল যদা সমব্যথিগণ,
থাকিতে তথায় আর তিলেক তখন,
হইয়া অক্ষম আমি,
রাজ্যাসন হতে নামি
চলে এ ধীরপদে শির নত করি,
ক্ষোভে ম্রিয়মান পিতার আচরণ স্মরি।
ব্যথিত অন্তরে ফিরি আপন কুটীরে
কহিমু সকল কথা মাের জননীরে।
শুনি সে সকল কথা,
হৃদে পেয়ে বড় ব্যথা,
মাতা মােরে লয়ে বুকে চুমে শত শত
কপােল বহিয়া অশ্রু ঝরে অবিরত।
১৪
ক্ষণ পরে অভাগিনী কহিলা বচন,
দেখা দাও মােরে প্রভু কমল লােচন”।
এই ব'লে জোড় করে
ডাক “তারে” সকাতরে,
করুণা-নিধান তিনি দয়ালু হৃদয়
ভকতবৎসল স্থান দিবেন তােমায়।
১৫
তামসী নিশিতে মাতা ঘুমে অচেন,
পলায়ে এসেছে চুপে প্রণমি চরণ ;
৬
মার বাক্য ঠিক জানি,
নমিয়া সে জন্মভূমি,
এসেছে ডাকিতে “ঊরে” নির্জন কাতারে,
এখন বসিয়া ভাবে ডাকি কি প্রকারে ?
“দেখ বাছা উচ্চ গিরি উহার উপরে,
অবিশ্রান্ত ডে’কো তারে ব্যাকুল অন্তরে;
যােড় হাতে স্তব করি,
ক্ষুধা তৃষ্ণা পরিহরি,
নামামৃত সুধাপানে হইবে মগন,
তুচ্ছ এই রাজ্য সুখ চাবেনা তখন।
১৭
নির্ভয়ে উঠরে বাছা গিরি শৃঙ্গ পরে,
জগৎপতির দাসী রক্ষিবে তােমারে ;
হেরিছ যে অগণন,
বন্যপশু সর্বক্ষণ,
কুমতি কুবৃত্তি গণে না দিবে স্পর্শিতে,
হৃদাকাশে “রাধাকৃষ্ণ” পাইবে দেখিতে।
নারদের গােলোকে গমন।
লক্ষনীসহ লক্ষনীপতি
বসিয়া গােলােকে,
জগতের লীলা কথা
কহেন পুলকে।
দেবর্ষি নারদ কন
আসিয়া ত্বরায়,
“এই মালা রাখ প্রভু
ফেলে দিই পায়।
কঠিন হৃদয় তব,
জানিয়া কেমনে,
অহােরাত্র জপি নাম
রাখি সযতনে ।
দুগ্ধপােয় শিশু ওই
থাকি অনাহারে,
প্রখর রৌদ্রের তাপে
কাতর অন্তরে ;
সমভাবে সহে সদ।
গ্রীষ্ম বর্ষা শীত,
তথাপি তাহারে ব্যথা
দাও অনুচিত।
নানা ছলে কত কষ্ট
কিসের লাগিয়া,
সতত দিতেছ নাথ
পাষাণ হইয়া ?
দয়াময় বলে প্রভু
ডাকিব না আর,
পাষাণ হৃদয় তব
বুঝেছি এবার।”
হাঁসিয়া কহেন হরি
“কেন দূষ মােরে?
গুরুরূপে দীক্ষা তুমি
দিয়াছ কি ওরে ?
ওই দেখ উচ্চ স্থান
করেছি সৃজন,
ভক্তাধীন হয়ে আমি
করেছি স্থাপন।
রেখেছি উহার নাম
শ্রেষ্ঠ ধ্রুবলােক।
তপস্যার বলে উহা
হেরি নরলােক,
মুক্ত হয়ে চলে যাবে
সে বৈকুণ্ঠ-ধাম।
সযতনে এবে তবে
জপ হরিনাম।
নারদের দীক্ষাদান।
“নয়ন মেলিয়া ধ্রুব চাহ একবার,
দীক্ষার সময় তব হয়েছে এবার।”
মিষ্ট স্বরে চক্ষু মেলি,
“কমল-লােচন” বলি,
সম্বােধিয়া কহে শেষে, “একি দেখি হায়!
হৃদাকাশে যাহা হেরি ইহা তাহা নয়”।
“নারদ আমার নাম দেব ঋষি আমি
ঘুরিয়া বেড়াই সদা তিজগৎ ভূমি।
১০
উপদেশ দিতে তােরে,
অনুমতি দিলা মােরে,
কমল-লোচন তব হৃদয়ের স্বামী,
এই ইষ্টমন্ত্র বলে পাবে দেখা তুমি।
কাণে কাণে মন্ত্র দিয়া কহিলা গােপনে,
“স্থির চিত্তে লক্ষ্য রাখি জপ মনে মনে।
ভুবন মােহন রূপে,
দেখা দিবে চুপে চুপে,
জ্যোতির্ময় জ্ঞানসূৰ্য্য প্রকাশিত হবে,
হিরন্ময় মূর্তি এক তাহে নিরখিবে।
“গুরুরূপে শিক্ষা তিনি দিবেন অন্তরে,
বাহজ্ঞান শূন্য হয়ে হেরিবে তাহারে।
সাধনার বিধি মতে,
থাকি সদা শুদ্ধ চিতে,
ফল তৃণ পত্র জল অনিল সেবন,
তিন দিন পরে পরে করিবে ভক্ষণ।
“যমুনাসলিলে স্নান করি সমাপন,
শুদ্ধচিত্তে কর এবৈ আসন গ্রহণ।
১১
কোকনদ-পদ হেরে,
স্মরণ করিবে মােরে,
বীণাবিনিন্দিত স্বরে করিবে কীৰ্ত্তন
তুষ্ট তাহে হন অতি রাধিকারমণ ।
;
“এই মধুবন হয় প্রিয় স্থান তার,
সতত রাধিকাসনে করেন বিহার।
এই স্থানে থাকি তুমি,
ভজহ হৃদয়স্বামী,
পূর্ণ হবে মনস্কাম, হে বৎস! তােমার
তুচ্ছ ভাবিও না কভু মম কথা সার।
“দেব অংশে জন্ম তব রাজার নন্দন,
তথাপি তােমার দুঃখ হেরি অকারণ।
মনেতে করােনা দুঃখ,
পাইবে অপার সুখ,
যাহার চরণে তুমি লয়েছ শরণ,
সর্বদুঃখহারী তিনি বিপদভঞ্জন।
কহিলেন দেব ঋষি, “যাই নিজ স্থান,
সাষ্টাঙ্গে করিলা ধ্রুব তাহাকে প্রণাম।
১২
স্নান করি একাসনে,
বসিলেন
মধুবনে,
আভক্ত হয়ে ধ্রুব করেন সাধন,
ত্রিরাত্র পরেতে ফল করিয়া ভক্ষণ।
দ্বিতীয় মাসেতে ধ্রুব ছয় দিন পরে,
তৃণপত্র খান তিনি শীর্ণ কলেবরে।
প্রভুর অর্চনা করি,
থাকি দিবা বিভাবরী,
ভাবিতেন মনে মনে শ্রীগুরুচরণ,
স্বধৰ্ম্মে থাকিয়া আমি করিব সাধন।
তৃতীয় মাসেতে ধ্রুব করেন সাধন,
নয় দিন পরে জল করিয়া ভক্ষণ ।
ইষ্টদেবে হৃদে রাখি,
সমাধি যােগেতে থাকি,
করিতেন আরাধনা সুমধুর সুরে,
বেদবাক্যে তুষ্ট করি রাখিতেন তরে ।
চতুর্থ মাসেতে ধ্রুব করেন সাধন,
দ্বাদশ দিবসে বায়ু করিয়া ভক্ষণ,
জয় করি পঞ্চেন্দ্রিয়ে,
আপনাতে লীন হয়ে,
জ্যোতির প্রভায় “র” মুগ্ধ হয় মন,
ইষ্টদেবে উপাসনা করেন তখন।
পঞ্চম মাসের কিবা কঠিন সাধন,
দাড়াইয়া এক পদে রহেন তখন।
অঙ্গুষ্ঠ-পীড়ন ভারে,
ধরণী হেলিয়া পড়ে,
নিশ্বাস প্রশ্বাস কিবা বহে সুগভীর,
উনপঞ্চাশৎ বায়ু হয়ে গেল স্থির।
দিব্যজ্ঞানে মহাধ্যানে হইয়া মগন,
পরমাত্মায় লয় পেয়ে হন অচেতন।
জীবজন্তু দেবতার,
শ্বাস নাহি বহে আর,
কঠোরতপস্যাবলে যায় বুঝি প্রাণ,
গােলােকবিহারী হরি কর পরিত্রাণ ।
দাড়াইয়া একপদে করেন সাধন,
কি অদ্ভুত! কি কৌশল, একি প্রাণায়াম।
১৪
ব
“ধ্রুবের এ গুরুভার,
সহিতে না পারি আর,
থর থর কঁপে অঙ্গ শ্বাস নাহি বহে”
যােড় করে বাসুকি তা নারায়ণে কহে।
;
কহিলেন দেবগণ, “বিষম সাধন,
পঞ্চমবর্ষীয় শিশু, একি প্রাণায়াম!
কঠোর তপস্যা প্রভু,
হেরি নাহি হেন কভু,
নিশ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ করেছে সকলে,
ছয় মাসে মােক্ষপদ লভিল কৌশলে”।
সরল হৃদয়ে আমি থাকি সর্বক্ষণ,
ভক্তমধ্যে শ্রেষ্ঠ হয় সেই ধ্রুবধন।
আর্ন্তভক্ত হয়ে মােরে,
ডাকিতেছে সকাতরে,
তাই তারে দিয়াছি সে বুদ্ধিযােগ মাের,
ভক্তের লাগিয়া সদা কাঁদিছে অন্তর।
চতুর্বর্গ লাভ ধ্রুব করেছে এখন,
সরল শিশুরে এবে দিই দরশন।
সােহহং নিনাদে মন
মুগ্ধ হয়ে অচেতন,
পঞ্চশঙ্খনাদে তদা হইয়া মগন,
অপরূপ রাধাকৃষ্ণ করেন দর্শন।
যুগল চরণ ধ্রুব হেরিয়া তখন,
দর দর প্রেমবারি করে বরিষণ।
পরাপর মিলি দোহে,
ভক্তপানে র'ন চেয়ে
ভক্তের কি ভক্তিভােরে হৃদয় বাঁধিল,
গােলােকেতে শ্রীহরির আসন টলিল।
ধ্রুবকে ছল করিতে উৰ্বশী ও
কিন্নরীগণের প্রবেশ।
দেবগণ পরাপর করেন কল্পনা,
পঞ্চমবর্ষীয় শিশু কঠোর সাধনা
কেন যে করিছে হায় ? ।
মনে অতি ভয় হয়,
১৬
দানবপীড়নে কষ্ট পাইবার তার
বিধির লিখনে ভাগ্যে আছে কি এবার।
পুনরায় স্বর্গভােগ যায় বুঝি এবে,
মনাে দুঃখে ধ্রুব কিবা বর মাগি লবে।
উর্বশী কিন্নরীগণে,
নৃত্য গীত করি বনে,
সাধনার শেষ ফল করুক ছলনা,
আর ত উপায় কিছু ভাবিয়া পাই না।
গােলােকপতির মন টলেছে এখন,
উঠেছেন দোঁহে মিলি দিতে দরশন।
ভক্তের অধীন তিনি,
ভক্তগত প্রাণ জানি,
যাহা বর চাবে তাহা না করি লঙ্ঘন
“তথাস্তু” বলিয়া দোহে আসুন এখন।
অচল অটল মন টলিবার নয়,
নয়ন মুদিয়া ধ্রুব ভজে দয়াময় ।
উর্বশী কিন্নরীগণে,
নানা ছল করে বনে ;
নিঃস্বার্থ ভাবেতে ধ্রুব করেন সাধনা,
বিফল হইল সব কুটিল বঞ্চনা।
নিরাশ হইয়া আসি কহে দেবগণে,
সাধনা করেন ধ্রুব থাকি একমনে।
গুরু উপদেশ মতে,
ইষ্টদেব ধরি চিতে,
চারিদিকে হেরিছেন লক্ষীনারায়ণ,
এ কুটিল চিত্র তার না হেরে নয়ন।
ধ্রুবের শ্রীহরিদর্শন।
নয়ন মেলিয়া ধ্রুব হের একবার
এসেছি তােমারে দিতে প্রীতি উপহার।
চক্ষু উন্মীলন করি,
হেরিল প্রাণের হরি
সতৃষ্ণ নয়নে চাহি হেরে অনিবারু,
অঙ্গের ভূষণ কেন শােভে না তঁাহার।
১৮
মস্তকে ময়ুরপাখা বামে নাহি হেলে,
কর্ণের
কুণ্ডল নাহি দুল দুল দুলে।
চরণ নুপুরধ্বনি
রুনু রুনু নাহি শুনি ;
বক্ষোপরি বনফুল মালা নাহি দুলে
বাজে না বাজে না বাঁশী রাধা রাধা বলে
পূর্ণব্রহ্ম হন যিনি পূর্ণচন্দ্রসম,
কোটীসূৰ্যসমুজ্জ্বল তনু অনুপম।
সতত নিরখি যারে,
ধ্যানযােগে দেহান্তরে ;
আজিকে হেরি গাে কেন মলিন বয়ান,
মেটে না মনের আশ অতৃপ্ত পরাণ।
কহ দেব, কহ মােরে, কহ বিবরণ,
কেন হেন ভাব হেরি কিসের কারণ।
কোন দোষে হই দোষী,
কহ মােরে পূর্ণশশী ;
রাতুল চরণতলে করি নিবেদন,
পুরাও মনের আশ ভকতরঞ্জন।
;
১৯
পরম ভকত ধ্রুব হও রে আমার,
মিটাব মনের আশ আজিকে তােমার।
হের হেলে শিখিপাখা,
তাহে রাধা নাম লেখা ;
কর্ণের কুণ্ডল দুলে বাজিছে নূপুর,
‘রাধা রাধা বলে বাঁশী বাজে কি মধুর।
বক্ষোপরি ফুলমালা দুলিছে কেমন,
দেখ দেখ দেখ ধ্রুব মেলিয়া নয়ন।
মেঘের উপরে যেন,
সৌদামিনী শােভে হেন;
মৃদু মন্দ হাযুক্ত নিরখি বয়ান,
তথাপি আমার কেন অতৃপ্ত পরাণ?
হাঁসিয়া কহেন হরি রাজার তনয়,
ধ্যানস্থ হইয়া পুনঃ হের পুনরায় ।
কি ভাবে হেরিছ তুমি
হৃদয়ে হৃদয়স্বামী,
কিসের অভাবে রয় অতৃপ্ত হৃদয়,
ধ্যানযােগে তপােধন হের সমুদয় ।
২০
ব
শ্রীহরির বাক্যে ধ্রুব রহেন তখন,
স্থির চিত্তে মহাযােগী যােগেতে মগন।
শ্যামপাশে রাধারাণী,
প্রেমের প্রতিমাখানি,
বিজলি খেলিছে কিবা রূপের কিরণে,
রাধাশ্যাম মিলিঙ্গ হেরিল নয়নে।
রাধা বিনা রাধানাথে হেরি শােভাহীন
অঙ্গের ভূষণ তেঁই হয়েছে মলিন।
যুগলরূপেতে হরি,
দেখা দাও কৃপা করি ,
কোথায় রয়েছ পদ্মপলাশলােচন ?
ক্ষম অপরাধ দেব প্রণমি চরণ।
২১
ধ্রুবের শ্রীহরিদর্শন।
“মেলিয়া নেত্র বৎস চাহ একবার,
এসেছি তােমারে দিতে প্রীতি উপহার।”
চক্ষু উন্মীলন করি,
দেখে শুধু একা হরি ;
“এ নহে আমার সেই হৃদয়রঞ্জন,
নয়ন মুদিয়া যারে করি দরশন।”
ধ্রুবধন করিয়াছে চতুৰ্বর্গ লাভ,
ছলে তারে কেন প্রিয়ে দিই মনস্তাপ ?
ভক্তাধীন হই আমি,
সকলি জান ত তুমি,
যুগলরূপেতে ভক্তে দিই দরশন।”
বন আলাে করি দেহে দাঁড়ান তখন।
চাহ বাছা আঁখি মেলি, চাহ একবার,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে তাের সাধনার সার।
૨૨
কহিয়া সে বনমাতা
খুলি দিলা আঁখি পাতা;
নিরখি চমকি উঠি স্থির করি মন,
সাষ্টাঙ্গে প্রণত ধ্রুব রহেন তখন।
সমাধিস্থ ভাবে ধ্রুব রহেন তখন,
কিসুখ হৃদয়ে তাহে বর্ণিতে অক্ষম।
ভাবিছেন ভূমে পড়ি কর যােড় করে,
বাক্য নাহি সরে স্তুতি করি কি প্রকারে ?
সর্ব অন্তর্যামী তিনি দেব নিরঞ্জন,
বেদাত্মক শঙ্খশিরে করেন স্পর্শন।
বেদমাতা সরস্বতী বেদোক্তিদায়িনী,
বসিলেন কণ্ঠে দেবী সুবীণাবাদিনী।
উঠ বৎস চক্ষু মেলি কর দরশন
মনের বাসনা এবে কর হে পূরণ।
ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে গদগদ স্বরে,
করিলেন স্তুতি পাঠ সুমধুর সুরে।
২৩
ধ্রুবের স্তব।
জয় জনার্দন,
ব্রহ্ম সনাতন,
জগত জীবন হে।
জগতকারণ,
জগততারণ,
সৃজন পালন হে!
বিশ্ববিমােহন, নিত্য নিরঞ্জন,
পতিতপাবন হে!
তুমি ত্রিপুরারি, সে ত্রিশূলধারী,
সর্বত্র বিরাজ হে।
আঁধারনাশক, আলােকদায়ক,
তুমি পূর্ণব্রহ্ম হে!
তুমি হে সাকার, তুমি নিরাকার
তুমি গুণাতীত হে।
করি হে মিনতি, যেন মম মতি,
রহে ও চরণে হে!
কুমতিগ্রহনে,
কিঙ্করে ক্ষমিয়া হে!
বিনাশ স্বগুণে,
२४
যদি দেখা দিলে, অধমে তারিলে
রেখাে শ্রীচরণে হে।
শ্রীহরি। “মিষ্ট সুরে স্তব করি তুষিলে আমারে,
স্বর্গ হতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করে।
বর মাগি লও বাছা যাহা ইচ্ছা হয়,
শ্রেষ্ঠ ভক্ত তুমি ধ্রুব হয়েছ ধরায়।”
ধ্রুবের বরপ্রার্থনা।
কিছু নাহি লয় মনে, ধন জন আশ,
সম্পৎ দেবত্ব কিবা, স্বর্গ অভিলাষ।
দেবের দেবত্ব যায়, কালের গতিতে,
রাজাও ভিখারী হয়ে ভ্রমে পথে পথে।
স্বর্গ-ভ্রষ্ট হয় সব, পুণ্যক্ষয় হ'লে,
পঞ্চভূতে দেহ ধরে আসে ধরাতলে।
লক্ষ-লক্ষ বার গর্ভে, লইয়া জনম,
নরকযন্ত্রণা ভােগ, করে জীবগণ।
২৫
ওহে পদ্মনাভ দেব, হে মধুসূদন!
পরব্রহ্মে লিপ্ত হয়ে থাকি সর্বক্ষণ।
হেন উচ্চপদ প্রভু দাও কৃপা করে,
সম ভাবে থাকি যেন চিরদিন তরে।
ধ্রুবের প্রতি বরদান।
ক্ষত্রিয় বালক ওহে ধর্মপরায়ণ !
সরল প্রকৃতি তব মুক্তি মাগে মন।
হে ধ্রুব, সে ফলপ্রদ হলেও কঠিন,
তবু তা তোমারে দিব, হয়ে ভক্তাধীন।
গৌরবের পদ যাহা করিনু প্রদান,
ভ্রষ্ট নাহি ইহা হতে হবে কদাচন।
লভিলে যে উচ্চপদ পঞ্চম বরষে,
সমর্থ না হয় কেহ, কঠোর তাপসে।
রবি শশী গ্রহ তারা জ্যোতিষ্কের গণ,
রয়েছে সংলগ্ন হয়ে, তাহে সর্বক্ষণ।
ধৰ্ম্ম, অগ্নি, ইন্দ্র, মুনি, কশ্যপ, সপ্তর্ষি,
প্রদক্ষিণ করে সবে, তথা দিবা নিশি।
ব হে ধ্রুব, যজ্ঞই মাের, প্রিয়মূৰ্ত্তি হয়, ভূরি প্রদক্ষিয়া যজ্ঞে, পূজে যে আমায়। ইহকালে সুখ ভােগ, করিয়া ধরায়, চরমে শরণ লয়ে, স্বর্গধামে যায়। ঋষিগণ নমস্কৃত, উপরি সে স্থান- যােগীগণে সেই স্থানে করিলে প্রয়াণ ফিরিয়া আসিতে কেহ, নাহি চায় আর ; সেই যজ্ঞ তুমি বৎস, কর বার বার। বিমাতার বাক্যবাণে হইয়া ব্যথিত দারুণ মনের কষ্ট পেয়েছিলে কত। সুখী হয়ে যাও গৃহে প্রফুল্লিত মনে, বসাবেন এবে পিতা রাজসিংহাসনে। তব করে রাজ্যভার, করিয়া অর্পণ, যাবেন নিশ্চিন্ত মনে, শান্তিনিকেতন। ষট্ত্রিংশ সহস্র বর্ষ থাকি নিরাপদে পালিবে প্রকৃতিগণে বসি রাজপদে। যখন হইবে মনে বিবেক উদয়, মৃত্যুকে স্মরণ করি, স্মরিবে আমায়। পাইবে সে উচ্চপদ, মাের প্রিয়হান, তাের তরে ধ্রুবলােক, করেছি নির্মাণ।
আধ্যাত্মিক যােগে তােমা করিয়া দর্শন,
থাকিবে সচ্চিদানন্দে, যােগী ঋষিগণ।
মঙ্গল হউক তব, যাই নিজ ধাম,
সাষ্টাঙ্গ হইয়া ধ্রুব করিলা প্রণাম।
ধ্রুবের আক্ষেপ করিতে করিতে
স্বদেশে প্রত্যাগমন।
ভাবিছেন মনে মনে স্মরি নারায়ণে,
পরম আনন্দে আজি ছিনু মধুবনে।
নিরানন্দ করে নাথ রেখে চলে গেলে,
গৃহেতে যাইতে পুনঃ চরণ না চলে।
পরমাত্মা জয় করে হেরি নিরঞ্জনে,
ছার এই রাজ্যসুখ নাহি লয় মনে।
হায়, দেব! কোন পাপে হইল এমন,
• পবিত্র সুধার পরে গরল ভক্ষণ।
লভিনু পরশমণি সার্থক জীবন,
তবু অনুতাপানলে দহিতেছে মন।
২৮
কেন জেগেছিল মনে, বিষয়বাসনা,
প্রথম সাধনে বুঝি “দেবের ছলনা” !
ভাগ্যের লিখন কভু না হয় খণ্ডন,
চিরদুঃখী জন সুখ পায় কি কখন ?
বিষয়লালসাবৃত্তি বাড়িবে আবার,
আবার ঘিরিবে মনে মােহ অন্ধকার।
ধিক ধিক শত ধিক ধিক রে আমায়,
অনিত্য সংসার হেরি মরীচিকাময়।
“ওহে দেব ! তব পদে করি হে মিনতি,
যেন মাের ও চরণে সদা রহে মতি।
দেশে গিয়া পিতা মাতা সকলে পাইয়া
এ হেন অমূল্য ধনে না যাই ভুলিয়া।
কুসঙ্গ দোষেতে করি কুপথে গমন
কুবৃত্তি ফিরায়ে দিও চিত্তবিনােদন ।
মায়ামােহ পার্শ্বে পুনঃ করিলে বন্ধন
যজ্ঞ করি এই পাপ করিব মােচন।”
ভক্তিভরে ইষ্টদেবে স্মরিয়া তখন,
মাতৃগেহে ধীরে ধীরে করেন গমন ।
২৯
ধ্রুবের মাতৃগৃহে প্রবেশ।
(ধ্রুব) কৈ মা, কোথায় মাের দুঃখিনী জননী,
বলেছিলা তুমি মােরে যে গুপ্ত কাহিনী,
লভিয়াছি সে রতন প্রবেশি কাননে,
কিবা অপরূপ তাহা বর্ণিব কেমনে।
ঘাের রাত্রে ছিলে মাগাে ঘুমে অচেতন,
পলায়ে গিয়েছি চুপে প্রণমি চরণ,
সেই অপরাধ মাতঃ ক্ষম নিজগুণে,
দেখাব তােমারে আজি হৃদয়তনে।
(মাতা) কোথা বাপ কোলে আয় হৃদয়ের ধন,
তােমা লাগি ক্ষণে ক্ষণে হই অচেতন।
শুনেছি নারদমুখে মনে কষ্ট পেয়ে,
মধুবনে ছিলে তুমি মহাযােগী হয়ে।
পেয়েছি পরশমণি নিজ পুণ্যবলে,
পঞ্চম বরষে কীৰ্ত্তি প্রকাশ্য করিলে।
তাের “কৃষ্ণে” ধ্রুব মােরে দেখা একবার,
ঘুচে যাক, ঘুচে যাক, মােহ অন্ধকার।
৩০
এবেন স্তব।
ওহে ব্ৰহ্ম নিরঞ্জন তুমি নিরাকার,
অব্যয় অব্যক্ত তুমি ত্রিগুণ আধার।
জ্ঞান অজ্ঞান তুমি, তুমি মুলাধার
সর্বজীবে ব্যাপ্ত থাক সাধনার সার।
কৃপা করি খুলে দাও জ্ঞানচক্ষু মা’র
ভক্তাধীন হও তুমি জানি বার বার।
অক্ষম রমণীপ্রাণ না পারে সাধনা,
দরশন দিয়ে তার পুরাও বাসনা।
কৃপা করি, চাহ নাথ। দেব দয়াময়,
ভক্তিভরে করি স্তুতি ঠেলিও না পায়।
(কৃষ্ণ) ভক্তির শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছি এখন
যখন বলিবে যাহা করিব তখন।
(ধ্রুব) দেখ মাগাে চেয়ে দেখ হৃদয়রতন,
যুগল রূপেতে দেবে, কর দরশন।
১১
সুনীতির যুগলমূর্তিদর্শন ও স্তব।
সুনীতির জ্ঞানচক্ষু হ’ল উন্মীলন,
অপরূপ রাধাকৃষ্ণ করেন দর্শন।
প্রেমে মাতােয়ারা হয়ে গদ গদ স্বরে
ভক্তিভরে স্তব করে কাতর অন্তরে ;
‘অনুপম শ্যামতনু নয়নরঞ্জন।
ভুবনমােহন রূপে মুগ্ধ করে মন।
কোটী সূৰ্য্য উদিয়াছে এ ভগ্ন কুটীরে,
হেরিতেছি কিবা জ্যোতি অন্তরে বাহিরে।
বর্ণিতে অক্ষম হই হীনমতি নারী
অন্তিমে দিও হে নাথ ও চরণ তরী।
যুগল চরণে আমি করি প্রণিপাত,
ও চরণে মতি যেন সদা রহে নাথ।
নগরবাসীরা সব কহে প্ৰতিঘরে
পঞ্চম বরষে ধ্রুব প্রবেশিকান্তারে,
কঠোর তপস্যা করে লভেছে শ্রীহরি,
সবে মিলে চল রে দরশন করি।
৩২
নিমেষ মধ্যেতে কথা হইল প্রচার,
প্রকাশ হইল ক্ৰমে গেচিরে রাজার।
রাজদূত আসি কহে করি নিবেদন,
শুভদিন শুভবার্তা শুন হে রাজন।
শ্রীহরি চরণ ধ্রুব করিয়া দর্শন,
ফিরেছেন দেশে আজি ত্যজি পােবন।
(রাজা) একি শুভবার্তা আজি শুনালে আমারে
হৃদয়ের ধন মাের ফিরেছে নগরে ?
আনন্দের উপহার কিবা দিব তােরে
গজমতি, মুক্তাহার এই লও করে।
মনটদুঃখে বুঝি ধ্রুব বেশি কাননে
ডেকেছিলা জগদীশে থাকি একমনে।
সরল অন্তর জেনে দিয়ে দরশন
করেছেন সর্ব দুঃখ তাহার হরণ ।
সেইদিন সেই তার বিষয় বদন
ছল ছল আঁখি লয়ে চাহিল যখন।
সে দারুণ দৃশ্য তার হেরেছি নীরবে
আত্মজের মনঃকষ্ট কাতর অন্তরে।
ধিক মােরে, স্ত্রৈণ আমি, কাপুরুষ হই,
আপন আত্মজে ভয়ে কোলে নাহি লই।
৩৩
সে অবধি জ্বলে হৃদি ধ্রুবের লাগিয়া
আজিকে জুড়াব প্রাণ হৃদয়ে ধরিয়া।
চারিদিকে বার্তা দাও সাজাতে নগর
বিবিধ বাজনা সহ আন বাদ্যকর।
বাঁধিয়াছি এবে প্রাণ পুত্রস্নেহে আমি
মণিময় রথ মাের আন শীঘ্রগামী।
চল সবে যাই মােরা সুনীতিভবনে
নিস্পাপ সরল ধ্রুবে হেরিব নয়নে।
আহা যে বা রাধাকৃষ্ণ করে দরশন
সফল জনম তার সার্থক জীবন।
সুনীতির ভবনে মহারাজের গমন ও
শ্রীহরিদর্শন।
( ধ্রুব) দেখ গাে জননী এই গৃহেতে তােমার
এসেছেন পিতা আজি কি ভাগ্য আমার।
উদিয়াছে সুখবি ঈশ্বর কৃপায়
কুদিনের কাল মেঘ দূরে কেটে যায়।
(পিতা) এস, এস, হৃদে এস, হৃদিকণ্ঠহার
সস্নেহে হৃদয়ে লয়ে চুম্বি বার বার।
৩ঃ
সুনীতি সতৃষ্ণ
তােমারে নিরখি আজি জুড়াইল মন
পূৰ্ব্ব কথা এবে বৎস হও বিস্মরণ।
চোখে অভিমানভরে
কহিলেন ধীরে ধীরে সকরুণ স্বরে :
‘নিরাশ হৃদয়ে ছিনু এ ভগ্ন কুটীরে
মনে কি পড়েছে নাথ দুখিনী দাসীরে ?
শয়নে স্বপনে কিম্বা বসিয়া নির্জনে
অহর্নিশি কঁদিতাম ভাবি মনে মনে।
অন্তকালে শিরে লয়ে ও চরণধূলি
অখিজলে দিই যেন ভক্তিপ্রেমাঞ্জলি।
নিরাশ হৃদয়ে এই আশার সঞ্চার
ফুটেছিল ধ্রুবজ্যোতিঃ সাধনার সার।
তারি পুণ্যবলে আজি হেরিনু তােমায়
কণ্ঠরােধ হয়ে আসে স্থান দাও পায়।
লজ্জিত হইয়া রাজা কন ধীরে ধীরে :
‘রমণীর শ্রেষ্ঠ তুমি চিনেছি এবারে ;
মনঃকষ্ট আর প্রিয়ে দিব না তােমারে
কানন ছাড়িয়া চল নগর ভিতরে।
(পিতা) কই বৎস! তাের কৃষ্ণে দেখা না আমারে
সতত রয়েছি আমি ব্যাকুল অন্তরে।
কি বলে ডাকিয়া তুমি পেয়েছ তাহারে
শিখাইয়া দাও মােরে ডাকিব কাতরে।
(পুত্র) দেখা দাও মােরে প্রভু কমললােচন’
এই বলে ডেকেছিনু হয়ে একমন।
ওই যে দাঁড়ায়ে মাের হৃদয়ের ধন
যুগল রূপেতে পিতা কর দরশন।
(পিতা) কই কৃষ্ণ, কোথা কৃষ্ণ, দেখিতে না পাই
কিরূপ দেখিছ তুমি আছে কোন ঠাই?
কত পাপ করিয়াছি তাহার চরণে
তাই বুঝি দেখিবারে না পাই নয়নে।
(পুত্র) ওই যে সম্মুখে তব শ্রীকৃষ্ণ আমার
নয়নের মণি আর সাধনার সার।
ভকতবৎসল নাথ করুণা-আধার
দেখা দাও কৃপা করি জনকে আমার ।
ধ্রুবের গান।
কোথা ওহে ভক্ত-প্রাণ রাজীব-লোচন
আমার জনকে নাথ দাও দরশন।
তুমি ভবকর্ণধার,
ভবার্ণবে কর পার।
ওহে সৰ্বমূলাধার অধমতারণ,
করুণ কটাক্ষপাতে দাও দরশন।
(রাজা) ওহে দেব, দয়াময়, পতিতপাবন,
চরমে পরম গতি, সত্য সনাতন,
সর্বপাপবিনাশন, অধমতারণ,
অগতির গতি তুমি, নিত্য নিরঞ্জন।
পাপকলুষিত হৃদি করি পরশন
চিদাকাশে আসি প্রভু দাও দরশন।
নয়ন মুদিয়া স্তব করিতে করিতে
অপরূপ রাধাকৃষ্ণ পেলেন দেখিতে।
(রাজা) আহা কিবা শােভা ভক্তমনলােভা
(মরি ) নয়নরঞ্জন।
কোটিসূৰ্য্যসম
কিবা অনুপম
(আহা) মুগ্ধ করে মন।
৩৭
যে দিকে নিরখি কিবা জ্যোতিঃ দেখি
(ওহে) চিত্তবিনােদন।
তুমি নিরাকার হও নির্বিকার
( ওহে) ব্ৰহ্ম নিরঞ্জন।
কূটস্থ চৈতন্য তুমি, তুমি জ্ঞানময়,
তােমা হতে জ্ঞানসূৰ্য্য প্রকাশিত হয়।
অনাদি, অনন্ত তুমি, তুমি সর্বময়,
তােমা হতে আসে সব, তোমাতেই লয়।
দিয়াছ ভকতি সে তাে তােমারি করুণা,
দেখ যেন এ দাসেরে কর না বঞ্চনা।
ধৰ্ম্মপথে সদা যেন রহে মাের মতি
প্রেম ভক্তি সহ আমি করি হে প্রণতি।
(শ্রীকৃষ্ণ) উভয়ের স্তবে তুষ্ট হয়েছি এখন,
মনােমত বর মাগি লও হে রাজন।
(রাজা) মহিষীরে মনােকষ্ট দিয়াছি যখন
রাজা নাহি হই আমি অতি নরাধম।
আত্মজেরে মনঃকষ্ট দিয়াছি যখন
রাজা নাহি হই আমি অতি নরাধম ।
সেই অপরাধ সব ক্ষমি মনে মনে
অন্তিমে দিও হে স্থান তব শ্রীচরণে।
রাণী ও ধ্রুবকে লইয়া মহারাজের
দেশে গমন।
(রাজা) নিজ রাজ্যে চল প্রিয়ে রাজমাতা হয়ে
চিরসুখী হবে এবে স্বামী-পুত্র লয়ে।
চল বৎস, নিজ দেশে প্রফুল্লিত মনে
মনােবাঞ্ছা পূর্ণ কর বসি সিংহাসনে।
তব করে মম রাজ্য করিয়া অর্পণ
নিশ্চিন্ত মনেতে যাব শান্তিনিকেতন।
( ধ্রুব) ক্ষমা কর পিতৃদেব, প্রণমি চরণে
রাজ্যসুখ ধন আশা নাহি লয় মনে।
পেয়েছি পরশমণি হৃদয় মাঝারে
শয়নে স্বপনে কি আহারে বিহারে।
গুপ্তভাবে হৃদে রাখি হেরি সর্বক্ষণ
মুগ্ধ হয়ে সেইরূপে থাকি অনুক্ষণ।
সতত বাসনা এই জাগিছে অন্তরে
সাত্বিকভাবেতে পিতঃ পূজিব তঁাহারে।
জ্যেষ্ঠ সে উত্তমপদ অগ্রজ আমার
তাঁর করে দাও পিতা এই রাজ্যভার।
{
সুশিক্ষিত হন তিনি রাজদরবারে
তুষ্ট হবে প্রজাগণ তাঁহার আচারে।
ক্ষণকাল পরে রাজা কহে ধীরে ধীরে
“বিচার হইবে সব রাজদরবারে।
অনুমতি দেন রাজা পারিষদগণে
“সাজাও রাণীকে সবে বস্তু আভরণে।
প্রাণসম ধ্রুব মাের হৃদয়ের ধনে
বসাইব তারে আজি রাজসিংহাসনে।
রাজছত্র শিরােপরে শােভিবে তাহার
শ্রবণে সুনীতিমনে আনন্দ অপার।
কানন ছাড়িয়া যান আপন ভবনে,
মহারাজ সনে অতি আনন্দিত মনে।
ধ্রুব, রাজা, রাণী করে, রথে আরােহণ,
গজ অশ্বে উঠিলেন পারিষদগণ।
বিবিধ বাজনা বাজে সুমধুর স্বরে
নগরে বসিয়া সব শুনে প্রতিঘরে ।
দূতমুখে বার্তা শুনি সাজায় নগর,
ছড়াইছে রাজপথে গােলাপ আতর।
শােভিতেছে সিংহদ্বার কিবা মুক্তাহারে,
ঘট পাতি রাখিয়াছে প্রতি দ্বারে দ্বারে।
সাজায়াছে দীপমালা আর ফুলহারে
যােড়করে প্রজাগণ স্তুতি পাঠ করে।
করেতে লইয়া ডালা কুলবালাগণ
সাহানা রাগিণী সুরে গায় আগমন।
বাজিতেছে নহবত সুমধুর সুরে,
দিগন্তে রক্তিম রাগে রক্ত কলেবরে।
রবি অস্তমিত প্রায়, সন্ধ্যাদেবী ধায়,
নিদ্রা ভাঙ্গি ছোট রাণী উঠেন ত্বরায়।
সন্ধ্যাসমীরণ সেবি প্রমােদ উদ্যানে,
মহারাজ কেন নাহি আসেন প্রাঙ্গনে ?
চক্ষু হইছে স্পন্দন কিসের কারণ,
কোন পুণ্যবান লােক করে আগমন?
ঘট পাতি দীপাবলী জ্বালি প্রতিদ্বারে
আগমনী গীত গায় থাকি যােড়করে।
একহ বৎস সত্য কুহ ব্যাকুল অন্তর
‘শুন মাতঃ শুভবার্তা, আসে বংশধর।
বহুদিন বনবাসে করিয়া অর্চনা
লভেছেন শ্রীহরিরে করিয়া সাধনা।
সেই পুণ্যবান ধ্রুব করে আগমন,
যােড় হস্তে স্তুতি করে সবে সে কারণ।
৪১
বড়মাতা আসিবেন আজি শুভদিনে
রথােপরি যান পিতা আনিতে কাননে।
(সুরুচি) কি শুনালি হায় একি জাগ্রতে স্বপন,
সুখের সুনিদ্রা ভাঙ্গি মরমে মরণ।
সুখী হব বলে যারে দিমু বনবাসে
সেই রাণী হয়ে বসে মহারাজপাশে।
শত শত বৃশ্চিকে যে দংশিছে অন্তরে
দারুণ মনের দুঃখ জানাব কাহারে ?
ব্ৰত বুঝি করিয়াছে প্রবেশি কাননে,
নতুবা রাজন্ কেন গেলেন গােপনে ?
ডুবিল কি সুখবি মেঘের উদয়ে,
গভীর গর্জনে বজ্র পড়িল হৃদয়ে।
কঁপিতেছে বিদাধর ক্রোধে অভিমানে
বিদ্যুৎ চমকি ভয় দিতেছে পরাণে।
আশায় ভুলায়ে নাথ নিরাশ করিলে
আদরে হৃদয়ে ধরি চরণে দলিলে।
ওকি শুনি তুরী ভেরী বাজে নানা সুরে,
ত্বরায় ছুটিয়া যান বাক্ষের দ্বারে।
রমণীয় মণিময় রথ আসে ধীরে ০
উজ্জ্বল প্রভায় দিক আলােকিত করে।
82
সৌম্যকান্তি মুর্তিখানি হেরি কি সুন্দর
ইন্দ্রাণীর পাশে যেন শােতে ইন্দ্রবর।
ধ্রুবের সে জ্যোতিঃ হেরি বদনমণ্ডলে,
হিংসাবৃত্তি দূরে যায় ভাসি আঁখি জলে
ধন্য দিদি, পুণ্যবর্তী দেবী হও তুমি,
জানিয়া মনােকষ্ট দিয়াছিনু আমি।
ক্ষমা কর, ক্ষমা কর, কনিষ্ঠে তােমার,
এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে আমার।
পঞ্চামৃত, পঞ্চশস্য, দধি, দুগ্ধ লয়ে
ধ্রুবের মস্তকে দেন আনন্দিত হয়ে।
“স্বস্তি, স্বস্তি” উচ্চারণ করি ঋষিগণ
আতপ-তল, দুৰ্ব্বা, পুষ্প ও চন্দন,
ধ্রুবের মস্তকে দেন ঋষি-শ্রেষ্ঠ বলে,
শ্রবণে রাণীর মনে আনন্দ উথলে।
সবে মিলি স্তুতি পাঠ করে সমস্বরে
শুনেছেন ধ্রুব তাহা হরষ অন্তরে।
উপনীত হল রথ রাজদরবারে
শঙ্খধ্বনি হুলুধ্বনি রমণীরা করে।
শুভদিনে শুভক্ষণে গৃহেতে প্রবেশ
করিলেন রাজারাণী আনন্দ অশেষ।
৩
ভ্রাতৃদ্বয়ের মিলন ও নুতন
সংসারের খেলা।
দুই ভায়ে কোলাকুলি করে আলিঙ্গন,
মধুর আনন্দ আজি মধুর মিলন।
গলাগলি করি দেহে
দুয়ে একপ্রাণ হয়ে,
করিছেন পরস্পরে সুখ আলাপন
এক বৃন্তে দুটী ফুল শােভিছে কেমন।
রাজপুরী চতুর্দিক করি দর্শন
ধ্রুবের হইল অতি আনন্দিত মন।
হেন সুসজ্জিত পুরী,
আমি কভু নাহি হেরি,
মণিময় সিংহাসন রতন ভূষণ ;
জন্মাবধি হেরিয়াছি বন উপবন।
৪৪
স্নেহময় জননীকে করিব প্রণাম
আমারে লইয়া দাদা চল সেই স্থান।
হারি প্রসাদে আমি
লভেছি হৃদয়স্বামী ;
পুনরায় সে চরণ করি দরশন
ভক্তিভরে পদধূলি করিব গ্রহণ।
উত্তমের মনে ভয়
হইল এখন,
ক্রোধে অভিমানে পুনঃ কটু কথা ক'ন।
না জানি সুখের দিনে
বিধি কি প্রমাদগণে
শ্রীহরিচরণ মনে করিয়া স্মরণ
ধীরে ধীরে মাতৃগৃহে করেন গমন।
জননীকে দুই ভায়ে করিলা প্রণাম,
“জীব” বলে আশীষিয়া করেন কল্যাণ।
সস্নেহে হৃদয়ে ধরে
বদন চুম্বন করে ;
“আয় বৎস, কোলে আয়, হৃদয়ের ধন
না জানিয়া মনঃকষ্ট দিয়েছি তখন।”
৪৫
ব
সুখী হয়ে খেল দোঁহে প্রফুল্লিত মনে,
অভিন্ন হৃদয়ে এবে থাক দুই জনে।
জননীর পানে চাহি,
ধ্রুব কহে, দোষ নাহি;
প্রভাতে সুখের দৃষ্টি তরুণ তপন
দিবাঅবসানে রবি অস্তমিত যান।
সেইরূপ সুখ দুঃখ ভাগ্যের লিখন,
নিজ নিজ কৰ্ম্মফল লভে জীবগণ।
ভােগের লালসা ছাড়ি,
শ্রীহরিচরণ স্মরি,
থাকে যেই, সুখী সেই, হয় ধরাতলে,
সতত ভাসেন তিনি আনন্দসলিলে।
শিক্ষা দিলে তুমি ধ্রুব আজিকে আমারে,
মনের অনল মাের নিবিল এবারে।
লজ্জায় আছিনু ছেয়ে,
মরমে মরমে মরে,
কলঙ্কিত মুখ আমি দেখাব কেমনে?
দিয়াছি যে মনঃকষ্ট তােরে অকারণে।
১৬
স্বধর্মে থাকিলে জয় হইবে নিশ্চয়
শাস্ত্রের বচন কভু মিথ্যা নাহি হয়।
কুবুদ্ধির ভ্রমে পড়ে
মােহেতে আচ্ছন্ন করে,
রেখেছিল এ জীবন করে অন্ধকার
জ্বলিল হৃদয়ে দীপ বচনে তােমার।
সুরুচি, উত্তম, ধ্রুব সুনীতির গৃহে,
চলিলেন সবে মিলি আন্তরিক স্নেহে।
পরস্পর দুইজনে
চারি চক্ষু সম্মিলনে
নয়নের অশ্রুধার নীরবেতে ঝরে
নির্বাক রহেন দোহে বাক্য নাহি সরে।
মনােগত অভিপ্রায় বুঝিয়া তখন,
কহিলেন ধ্রুব কত সুমিষ্ট বচন।
স্মরিয়া সে সব কথা
বৃখা কেন পাও ব্যাথা ?
শুভদিনে শুভক্ষণে হইল মিলন,
পূৰ্ব্ব-কথা এবে মাতঃ হও বিস্মরণ।
৪৭
কর্মক্ষেত্রে আসি জীব নিজ কৰ্ম্মফলে
জন্ম, মৃত্যু, পাপ, পুণ্য ভগে নানা ছলে।
সুখ দুঃখ সমুদয়
কিছু চিরস্থায়ী নয়
অনিত্য সংসারে এই জলবিম্ব প্রায়
কদলীস্কন্ধের ন্যায় ক্ষণস্থায়ী হয়।
;
রবি শশী উঠে নিত্য গগনমণ্ডলে
সমভাবে নাহি রয় নিজ কর্মফলে।
ধরণীর তমাে নাশি
কভু কাঁদি, কভু হাসি,
প্রকৃতির গর্ভে আসি করেন বিহার
বিবিধ নিয়ম এই কি কহিব আর।
ধ্রুবের বচনে জ্ঞান হইল উদয়
দুঃখ অভিমান আদি দূরে সরে যায়।
এক স্থানে দুই জনে
রহিলেন হৃষ্টমনে
দ্বেষ হিংসা
শূশ্যময় পবিত্র
অন্তুর
বহিছে আনন্দস্রোত হৃদে নিরন্তর।
৪৮
এইরূপে কিছুকাল হইলে বিগত
উত্তমের মন মাতে মাতঙ্গের মত।
‘মৃগয়া করিতে আমি
যাইব মা বনভূমি ;
এসেছে বসন্ত ঋতু সেজেছে ধরণী
মৃগয়ার লাগি মাের নাচিছে পরাণী।
জনকজননীদ্বয়ে প্রণাম করিয়া
মৃগয়া করিতে যান বিদায় লইয়া।
বন উপবন কত
মিছেন অবিরত;
বন্য পশু পাখী নাশি থাকেন হরষে
এক দিন যান তিনি পর্বতপ্রদেশে।
হেরিছেন চতুর্দিক কিবা শােভাময়,
সুন্দর সুদৃশ্য কিবা কি আশ্চর্য্যময়।
কুরঙ্গশাবকগণ
সুখে করে বিচরণ ;
ডালে ডালে শােভে পাখী বিবিধ প্রকার
নানা সুরে গান করে মনােমুগ্ধকর।
;
শােভিতেছে চারিধারে উন্নত
তরু লতা ফলে ফুলে শােভে মনােহর।
ধায় গিরিনিঝরিণী
করি কুলুকুলু ধ্বনি,
তরঙ্গে তরঙ্গে নাচে কমলনিকর,
গুণ গুণ রব করে আসে মধুকর।
সারস সারসী জলে দেয় সন্তরণ,
উত্তম তন্ময়চিত্তে করেন দর্শন।
মৃগয়া করিতে আসি
ধনুক পড়িল খসি ;
‘জীবহিংসা বৃথা কেন করিতেছি হায় ।
কোনাে দোষে দোষী এরা মাের কাছে নয়।
‘আহা কি পবিত্রময় এই স্থান হয়,
মনের মালিন্য সব দূরে সরে যায়।
ঈশ্বরের প্রতি মন
ধাইতেছে প্রতিক্ষণ ;
নির্জন নিভৃত এই সুখময় স্থানে,
ধ্রুবের মতন আমি বসে থাকি ধ্যানে।
কে যেন ডাকিয়া বলে “কে-হে তুমি বল”
চমক ভাঙ্গিয়া গেল দৃষ্টি সচঞ্চল।
অদূরে আসিছে কেবা,
যােঙ্কুবেশে এক যুবা।
নিকটে আসিয়া কহে ভাবুকের মত,
যুদ্ধসাজে আসি কিবা ভাবে অবিরত হ!
‘কাহার তনয় তুমি কোন অভিলাষে
একা আসিয়াছ এই যক্ষরাজদেশে ?
‘রাজপুত্র হই আমি,
মৃগয়া করিয়া ভ্ৰমি,
ঘুরিতে ঘুরিতে আজি এসেছি এ দেশে
দুর্গম নিভৃত এই পর্বতপ্রদেশে।
সম্মুখযুদ্ধেতে যদি ইচ্ছা তব হয়,
ক্ষত্রিয়তনয় তাহে নাহি করে ভয়।
তুমি আমি আছি একা,
কারাে সনে নাহি দেখা,
সম্মুখসমরে আজি করি মহা রণ
জনম সার্থক করে ত্যজিব জীবন।
মহাযুদ্ধ দুই জনে হইল তখন
সুকৌশলশিক্ষা কিবা বাণবরিষণ !
পশু পাখী ভয় পেয়ে,
পলাইছে প্রাণ লয়ে ;
সিংহনাদ করি দেহে যুদ্ধের উল্লাসে
দুই জনে সমকক্ষ, কেহ নাহি ত্রাসে।
মায়াবী সে যক্ষপুত্র মায়ার কৌশলে
উত্তমের প্রাণ লয় নানাবিধ ছলে।
রাজপুত্র পড়ে রণে
আঘাত লাগিল প্রাণে,
স্নেহময়ী জননীর স্নেহের অন্তরে,
তনয়ের লাগি প্রাণ দিল কাতরে।
কাঁদিয়া পতির পাশে কহেন কাতরে,
কঁদিছে পরাণ আজি উত্তমের তরে।
কি জানি সে কার সাথে
গিয়াছে বা কোন পথে !
জানি দুর্গম স্থানে করেছে গমন;
কেন এত মন মাের হয় উচাটন
?
কুশল বারতা তার পাইব কেমনে?
উতলা হতেছে মন তাহার কারণে।
শুনি মহারাজা কন,
করুণাচঞ্চল মন ;
‘দরবারে মন্ত্রী সনে করিয়া বিচার
এখনি আনিয়া দিব শুভ সমাচার।
“জয় মহারাজ জয়” রাজদরশনে
কহিলেন সবে আজি বিষয়বদনে।
হেরি মহারাজ কন,
“উত্তমের সৈন্যগণ
দাড়ায়ে রয়েছে কেন নত শির করে ?
কুশলে আছে ত পুত্র ? শীঘ্ৰ কহ মােরে”।
বাক্য নাহি সরে কারাে, করে অশ্রুপাত,
উত্তানপাদের শিরে হ’ল বজ্রাঘাত।
“ওহে সেনাপতিগণ !
কহ মােরে বিবরণ,
কেননাশিল প্রাণাধিক তনয়ে আমার
কে ছিড়িল হৃদরের হৃদিকণ্ঠহার ?
৩
দুটী ফুল ছিল মাের সংসার উদ্যানে
একটীরে চ্যুত করি দলিল চরণে।
বল সেই কোন জন,
মনুষ কি পশুগণ—
হরিষে বিষাদ মাের কে করিল হায়,
কে হানিল হৃদে মাের শেল অসময় ?
‘মহারাজশ্রীচরণে করি নিবেদন,
প্রত্যুষে উঠিয়া নিত্য করেন ভ্রমণ।
মৃগয়া করিতে যান
রমণীয় এক স্থান ;
হিমালয় প্রদেশেতে যক্ষরাজদেশ
জানিয়৷ সেই দেশে করেন প্রবেশ।
‘কিছু নাহি জানি মােরা, করি অন্বেষণ,
নানা স্থানে গিরিশৃঙ্গে, করিনু ভ্রমণ।
দ্বিপ্রহর বেলা প্রায়
রবি খরতর হয় ;
উন্নত পর্বতােপরে করিমু দর্শন,
মহাযুদ্ধ হয় দেহে বাণবরিষণ।
সৈন্যহীন দুই দল, না জানি কারণ
ইঙ্গিতে মােদের তিনি করেন বারণ।
সূৰ্য্যদেব পাটে বসি
সিছেন ম্লান হাসি ;
মৃদু মৃদু বহিতেছে সান্ধ্য সমীরণ,
জীবনপ্রদীপ তার নিবিল তখন।
তথায় রয়েছে এক রজত ভূধর,
সূর্যের কিরণে তাহা কিবা মনােহর।
স্রোতস্বিনী বহে তার
কল কলে অনিবার ;
বম বম্ ঋষিগণ করে উচ্চারণ,
স্বর্গ তুচ্ছ হয় জ্ঞান করিলে দর্শন।
ক্ষত্রিয়নয় প্রভু রাখি নিজ মান
সম্মুখসমরে তিনি হারালেন প্রাণ।
সেই স্রোতস্বিনীতীরে,
ভাসি সবে অশ্রুনীরে
সুপবিত্র দেহ তাঁর লইয়া যতনে
বিসর্জন দিনু তায় কাতর পরাণে।
শােকাৰ্ত্ত হইয়া রাজা হন অচেতন,
চতুর্দিকে হাহাকার পড়িল তখন।
নিদারুণ বাণী শুনি
কঁদিছেন হােটরাণী,
‘হেলায় হারানু হায় হৃদয়রতন
ক্ষণে ক্ষণে মৃতপ্রায় হন অচেতন।
যখন হতেছে জ্ঞান কাদি অবিরত
ছুটেছে মানবপথে পাগলিনী মত।
‘মৃগয়া করিতে গেলে
গৃহে আর নাহি এলে ;
শােকাগ্নি জ্বালিয়া দিলে হৃদয়ে আমার,
সহিতে না পারি হয়। এ যাতনা আর।
‘ঘাের নিশি, সবে আছে ঘুমে অচেতন,
এবে আমি চুপে চুপে করি পলায়ন
প্রাণের তনয় মাের
ছিড়িয়া হৃদয়-ডাের,
পূর্ণ করি মনস্কাম গিয়াছে যথায় ।
জুড়াই যাতনা আমি যাইয়া তথায়।
পুত্রশােকে জ্ঞানহারা হয়ে উন্মাদিনী
গহন কাননে হায়, যান একাকিনী।
প্রবেশ করিয়া বনে
কাঁদেন কাতর প্রাণে,
‘কোথায় রয়েছে মাের প্রাণের তনয় ।
স্নেহের পুত্তলি বাছা আয় কোলে আয়।
সুষুপ্ত ধরণী ঘাের অন্ধকারময়
চারিদিকে তদুপরি মেঘের উদয়।
লুকায়ে রয়েছ কোথা
খুজিয়া না পাই হেথা।
উত্তম, উত্তম বলে কাঁদেন জননী
গগন ভেদিয়া ধায় সেই প্রতিধ্বনি।
‘এখনাে এলি না বাপ আজি শূন্য কোলে,
বুঝেছি বুঝেছি এবে নাহি ধরাতলে ।
ক্ষত্রিয় রমণী হই,
নিজ চিতা জ্বালি লই;
মরণে নাহিক ভয় প্রবেশি অনলে,
জুড়াই তাপিত প্রাণ অগ্নি-আহা কোলে।
ব
দিগভ্রান্ত জ্ঞানশূন্য হইয়া তখন
নিবিড় অরণ্যমাঝে করেন লােদন!
দারুণ শােকের ভার
সহিতে না পারি আর,
পেয়েছি হারাণ নিধি খুঁজিয়া খুঁজিয়া
সিংহ ব্যাঘ্ৰ পিছু ধায় কুমার বলিয়া।
বিলাপ করেন রাণী উন্মাদিনী মত
গহন কাননে হায়, কাঁদি অবিরত।
ধরিয়া বনের পশু
কহেন, আমার শিশু ;
শােকাতুরা জ্ঞানহার হের কি ভীষণ
হিংস্রক বনের পশু ভাবে না তখন।
হিছে হৃদয়ে আহা! পুত্রশােকানলে
আপন সুখের আশ সব গেছে ভুলে।
কুমার কুমার বলে
ডাকি কাঁদি অশ্রুজলে,
আপন মরণ ভিক্ষা করিছে স্মরণ,
তথাপি কুমার বলে করে অন্বেষণ।
১৮
অপত্যস্নেহেতে হের আছে কত সুধা
পুত্র কি মিটাতে পারে এ সুধার ক্ষুধা ?
ধন্য এ মানব দেহ,
কেবা হেন দিল স্নেহ,
হৃদয়ের স্তরে স্তরে দৃঢ়তা করিয়া
জননীর প্রাণে, হায়! শৃঙ্খলে বাঁধিয়া !
রাজপুরে চারিদিকে উঠে মহারােল
পুত্রশােকে ছােটরাণী হইয়া পাগল,
গিয়াছেন কোথা হায়
খুঁজিয়া না কেহ পায়।
শিরে করাঘাত করে কঁাদে প্রজাগণ
হায়! হায়! মাতাপুত্রে হারাল জীবন।
রাজন বিষগ্নমনে করেন রােদন,
সুরুচি পুত্রের লাগি হারাল জীবন।
স্নেহের হৃদয়নিধি
হরিলেন তারে বিধি ;
বের করেতে রাজ্য করিয়া অর্পণ
ঈশ্বর ভজিতে এবে যাই পােবন।
ওহে দেব তব মায়া বুঝিতে না পারি ।
জীবের সনেতে সদা কর হে চাতুরী।
ইহপরকাল লয়ে
ভাগ যােগ কর নিয়ে ;
ধৰ্ম্মাধর্ম পাপপুণ্য করিছ বিচার
অবােধ মানব মন দোষে বার বার!
সুনীতি। অপূৰ্ণলােচনেতে কহেন কাদিয়া,
মুখী হয়ে ছিনু এবে সংসারে আসিয়া।
সারাটা জীবন মাের
কঁদিয়া হয়েছে ভাের ;
সাঁঝের বেলায় রবি উদিল যেমন
অমাবস্যা নিশা আসি দিলা দরশন।
ঝরিয়াছে দুনয়নে শ্রাবণের ধারা
আছিনু মরমে মরে পাগলের পারা।
হৃদয়ের ধ্রুবনিধি
দয়া করি দিল বিধি ;
সুমিষ্ট বচনে তার জুড়াইত প্রাণ
ভুলিম সর্বদুঃখ হেরিলে বয়ান।
হারাইলে সে রতন জীবনের শেষে
শােকাতুরা হয়ে ভগ্নী গেলে কোন দেশে।
সুখ দুঃখ যাহা হয়
কিছু চিরস্থায়ী নয় ;
হৃদয়ের জ্বালা বােন সহিতে নারিলা
নিশীথে চলিয়া গেলে কোথায় একেলা ?
উত্তমের লাগি ধ্রুব করেন রােদন,
পর্বতপ্রদেশে ভ্ৰাতঃ ত্যজিলে জীবন।
মৃগয়া করিতে গেলে
পুনঃ গৃহে নাহি এলে,
ক্ষত্রিয়ের ধৰ্ম্মযুদ্ধ আপন গৌরবে
হারাইলে মহাপ্রাণ কীর্তি রাখি ভবে।
হায়! হায়! তব শােকে হয়ে উন্মাদিনী
কাঁদিয়া কাঁদিয়া কোথা গেলেন জননী।
হৃদয়ের কণ্ঠহার
ছিন্ন করে নিল তার ;
সহসা দারুণ জ্বালা জ্বলিল পরাণে
সহিতে না পারি প্রাণ ত্যজেন গােপনে।
ওব
ভ্রাতৃঘাতকের প্রাণ নাশিব নাশিব
ক্ষত্রিয়ের বল বীৰ্য্য দেখাব দেখাব।
করিয়াছি এই পণ
মনে মনে উদযাপন ;
হেরিব যক্ষের যুদ্ধ মায়ার কৌশল
সৃষ্টি স্থিতি লয় করা হইবে বিফল।
ক্রোধান্বিত হয়ে ধ্রুব দ্রুতপদে ধায়,
মন অভিলাষ তাঁর কহিতে পিতায়।
ভ্রাতৃহন্তকের প্রাণ
নাশিয়া রাখিব মান ;
অনুমতি দেহ পিতা পর্বতপ্রদেশে,
যাইতে আমারে দেব এসেছি সে আশে।
কঁদিয়া কহেন পিতা, ‘একমাত্র তুমি
হৃদয়ের কণ্ঠহার, ছিড়িব না আমি।
যক্ষপুত্র সনে রণ
করিলে হারাবে প্রাণ ;
পিতৃআজ্ঞা পূৰ্বে বৎস কর রে পালন
রাখিও পশ্চাৎ তব সে প্রতিজ্ঞাপণ।
‘বংশ লুপ্ত হবে মম তােমার বিহনে,
বিবাহ করিয়া রক্ষা কর সে কারণে।
শুভদিনে শুভক্ষণে
সুলক্ষণা কন্যা সনে,
বিবাহ দিইব তব করিয়াছি পণ,
পিতৃআজ্ঞা শিরােধার্য্য কর রে পালন।
সজলনয়নে ধ্রুব রহি নতশিরে
ভাবিছেন মনে মনে গুরুপদ স্মরে,
‘কত সাধ আছে মনে
খেলিতে আমার সনে ;
ইচ্ছাময় তব ইচ্ছা হউক পূরণ,
সাধিব আপন কৰ্ম্ম স্মরিয়া চরণ।
রাজসভা
সভাস্থলে আসি রাজা করেন প্রচার,
শিশুমার কন্যা এক আছে চমৎকার।
৩
ভ্রমিকা নামেতে কন্যা লক্ষীস্বরূপিণী
সৰ্বগুণসুসম্পন্না সবে কহে শুনি।
ধ্রুবের বিবাহ দিব আজি শুভদিনে,
শুভযাত্রা কর সবে গােধূলি লগনে।
রাজদূতে বাৰ্তা দাও সাজাতে নগর,
মঙ্গল বাজনা সহ আন বাহক।
গজ, অশ্ব, দোলা রথ, আর পদাতিক,
বিধির বিধানে দ্রব্য আন ততােধিক।
ধ্রুবের বিবাহে আজি সবে আনন্দিত,
নাচিছে গাহিছে কেহ সাজে মনােমত।
এ শুভ বারতা শুনি হরষিত মনে
শ্রীহরি পূজেন রাণী বসি কায়মনে।
স্বর্ণপাত্রে কুল ডালা সাজাইয়া করে
বরণ করেন পুত্রে হরষ অন্তরে।
পিতৃমাতৃপদদ্বয়ে প্রণাম করিয়া
শুভযাত্রা করিলেন শ্রীহরি স্মরিয়া ।
শুভদিনে শুভক্ষণে হইল মিলন,
আজিকে হইল তাঁর সংসার বন্ধন।
ধ্রুবের করেতে কন্যা করিয়া অর্পণ,
রাজা রাণী দোহাকার আনন্দিত মন।
জামাতা পেয়েছি মােরা বহুপুণ্যফলে
রূপে, গুণে, ধনে, মানে, ধৰ্ম্ম, কুল, শীলে।
বিবাহ বাসরে বসি আনন্দিত মনে
গান বাদ্য করিছেন সখীগণ সনে।
দুঃখ নিশি পােহাইল হাঁসিতে হাসিতে
বাসি বিয়ে কড়ি খেলা হ’ল বিধিমতে।
শুভযাত্রা করিলেন নববধূ সনে
করিছেন শুভাশীষ গুরুজনগণে।
জনক আসিয়া কন কন্যায় আপন,
আজিকে চলিলে মাতঃ শ্বশুরভবন।
শ্বশুর, শ্বাশুড়ী, আর গুরুজনগণে
শ্রদ্ধা ভক্তি করিবে তাঁদের কায়মনে।
সীতা, চিন্তা, দময়ন্তী সাবিত্রীর সমা
সুচরিত্রা, পতির হয়ে নিরুপমা।
দীন, দুঃখী, দাস, দাসী আর প্রজাগণে
তাদের তুষিবে অতি মধুর বচনে।
বদন চুম্বন করি কহেন কন্যায়,
কঁদিছে পরাণ আজি দিতে মা বিদায়।
পিত্রালয় আলাে করে ছিলে মা জননী
শ্বশুরভবনে আজি চলিলে নন্দিনী।
রমণীর শ্রেষ্ঠধর্ম সংসার ধরম,
গুরুজনে সুশ্রুষা ও অতিথিপালন।
অরুন্ধতী, সাবিত্রী তাঁহাদের মতন
নিত্যই পূজিবে মাতঃ স্বামীর চরণ।
পতিই পরম গুরু নারীর ভূষণ,
তিনি ব্রহ্ম, তিনি বিষ্ণু, হন নারায়ণ।
প্রভাতে উঠিয়া পূৰ্বে প্রণাম করিয়া
গৃহকর্মে রত হবে শ্রীগুরু স্মরিয়া।
হৃদয়ের আশীর্বাদ লহ মা কল্যাণী
উজলিও পতিগৃহ লক্ষীস্বরূপিণী ।
উত্তানপাদের নিজ রাজ্যে গমন।
পুত্রের বিবাহ দিয়া নববধু লয়ে
নিজরাজ্যে চলিলেন হরষিত হয়ে।
বিবিধ বাজনা বাজে কহে প্ৰজাগণে,
সুপ্রভাত হয় আজি রাজদরশনে।
মঙ্গল শঙ্খের ধ্বনি কুলবালাগণে
করিছেন চারিদিকে হেরি বর কনে।
৬
যৌতুক দিইয়া সবে করিছে প্রণাম,
ধ্রুব বলে, “সবে গাও হরিগুণ গান”।
কীৰ্ত্তনের মহারােল উঠিল নগরে,
বাজায় খরতাল খােল তালি দেয় করে
ভেরী শব্দে মহানন্দে কঁপায় গগন
স্বর্গ হতে পুষ্পবৃষ্টি করে দেবগণ।
ভাণ্ডার খুলিয়া রাণী করিছেন দান
বহুবিধ ধন রত্ন, বসন ভূষণ।
স্বর্ণপাত্রে কুলা ডালা সাজাইয়া করে
বরণ করিয়া লন পুত্রবধূ ঘরে ;
“এস মা গাে গৃহলক্ষী, এস মা জননী
এস এস, মা এস গাে, লক্ষীস্বরূপিনী।
চিরসুখী হয়ে দোহে করহ সংসার
হৃদয়ের স্নেহাশীষ এই মা আমার।
পিতার চরণ বন্দি মাতার চরণে
প্রণাম করেন দোহে ভক্তিপূর্ণমনে।
৩৭
ধ্রুবের রাজ্যাভিষেক।
আসি মহারাজ কন,
শুন, পাত্র মিত্রগণ !
বসাইব ধ্রুবে আজি রাজসিংহাসন।
আজিকার শুভদিনে সবে মিলি প্ৰজাগণে
আনন্দ উৎসব কর আনন্দিত মনে।
এসেছেন অগণন
দেশ দেশে রাজাগণ
মাতাও তাদের প্রাণ হরি সংকীৰ্ত্তনে।
বসালেন সিংহাসনে
বধূপুত্র দুই জনে
রাজত্বের গুরুভার করিনু অর্পণ।
রাজার মুকুট পরি রাজছত্র শিরে ধরি
রাজধৰ্ম্ম পিতৃধৰ্ম্ম কর রে পালন।
চিরদিন সুখে থেকো প্রজাপরি দৃষ্টি রেখাে
বংশের উজ্জ্বল দীপ সংসারের সার।
কি কহিব তােরে আর দিনু এই গুরু ভার
সতত রাখিও মনে আদেশ আমার।
তপস্যার মহাবলে
ঋষিশ্রেষ্ঠ তুমি হলে
পরম ভকত হয়ে গেলে উচ্চস্থান।
বদি রাজসিংহাসনে প্রীত কর প্রজাগণে
দেখাও ক্ষত্রিয় ধৰ্ম্ম ওহে মহাপ্রাণ।
হইল আকাশবাণী কাপাইয়া মর্ত্যভূমি
“স্বস্তি” “স্বস্তি” উচ্চারণ করি ঋষিগণ।
ধ্রুবের মস্তকোপরে দেন সবে সমাদরে
আতপ তণ্ডুল দুৰ্ব্বা পুষ্প ও চন্দন।
সভাস্থলে রাজগণ দিতেছেন যে যেমন
ধ্রুবের করেতে দ্রব্য মাণিক রতন।
উপহার দেন যাহা
সহাস্যবদনে তাহ
প্রণাম করিয়া দেহে করেন গ্রহণ।
তপস্যা করিতে উত্তানপদের ওসুনীতির
বনে গমন।
প্রণাম করিয়া ধ্রুব কহেন পিতায়,
“রাজনীতি শিক্ষা পিতঃ দিলেন আমায়!
তব আজ্ঞা শিরােধার্য্য করিব পালন,
এই মাের প্রতিজ্ঞা কভু, না হবে লঙ্ঘন।”
‘মঙ্গল হউক তব ; যাই তপােবন,
মনােসুখে রাজকৰ্ম্ম করহ পালন।
( রাণীর প্রতি )
রাজমাতা হয়ে প্রিয়ে করহ সংসার।”
রাজা।
রাণী।
-
“দারুণ কঠিণ বাণী কেমনে কহিলে,
সাথের সঙ্গিনী ফেলে যাবে তুমি চলে।
কায়া যথা ছায়া তথা থাকে সর্বক্ষণ
যাইব তােমার সাথে সেবিতে চরণ।”
রাজা। “কণ্টকসংকীর্ণ বনে কেমনে যাইবে ?
কোমল রমণীকায় সহিতে নারিবে।
কঠোর তপস্যা কভু নহে রমণীর
কর গাে সংসারধর্ম মন করি স্থির।”
রাণী। “জনকনন্দিনী সীতা গেলেন কেমনে
স্বামীর সহিত দেখ ভূধরকাননে ?
সেইরূপ তব সাথে যাব পােবন
নির্জনে বসিয়া সুখে পূজিব চরণ।”
রাজা। গুরুদেব, যাত্রাকালে নমি বার বার,
হৃদয়ে বহুক তব প্রেম পারাবার।
ব্রহ্মের কটাহে দেব স্থির লক্ষ্য করি
বিষ্ণুর তৎপদ প্রভু বিন্দুকূপে হেরি,
পূরে যেন হৃদয়ের বাসনা আমার
সম্মুখে পশ্চাতে আমি নমি বার বার।
পুরােহিতশ্রীচরণে করি নিবেদ,
পুরের মঙ্গল তব আশীষ বচন।
1
বালকতনয় মাের যদি করে দোষ
ক্ষমা কর নিজগুণে না করিও রােষ।
প্রণমি পিতার পায় করজোড়ে ধ্রুব কয়,
পিতৃআজ্ঞা শিরােধার্য্য, করিব পালন।
তপস্যায় দিয়ে মন এবে যান তপােবন
এ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা কভু না হবে লঙ্ঘন।
মাতার চরণধূলি মস্তকেতে লন তুলি,
“আশীর্বাদ করি দেহে হউক কল্যাণ।
আজি রাজসিংহাসনে
বসিয়াছ ফুল্লমনে
নিরখি জুড়াল মাের অতৃপ্ত পরাণ।
ধ্রুবের রাজ্যপালন
সুচারুরূপেতে রাজ্য করেন পালন
ধ্রুবের রাজ্যেতে সুখে থাকে প্রজাগণ।
ক্রমে ক্রমে হয় র
দুই চারি সুকুমার ;
পুত্রের কোমল মুখ করি নিরীক্ষণ
ঈশ্বরে ভুলিয়া হন বিষয়ে মগন।
ব
বিষয়বাসনারসে মজিয়াছে মন,
মায়ার পাশেতে ভঁর হয়েছে বন্ধন।
দিন আসে, দিন যায়,
মাস বর্ষ গত হয় ।
কিছুই তাহার আর নাহিক স্মরণ,
স্ত্রী পুত্র লইয়া সুখে কাটান জীবন।
সহসা চমকি হৃদি ভাঙ্গিল স্বপন,
আজিকে জাগিল র নিদ্রিত জীবন।
বহুকাল গত হ’ল
নাহি কিছু কৰ্ম্ম হ’ল,
জাগিল হৃদয়ে এবে সে প্রতিজ্ঞা পণ।
ভ্রাতৃঘাতকের আমি নাশিব জীবন।
সাজ, সাজ, যুদ্ধে সাজ সাজ সৈন্যগণ।
পর্বতপ্রদেশে আজি করিব গমন।
মদমত্ত হস্তী সম,
টলিতেছে মন মম ;
তাপিত হৃদয় মাের করিব শীতল,
এ আকাঙ্ক্ষা যেন দেব না হয় বিফল।
৭২
যক্ষের রাজত্বে আসি সিংহনাদ করে,
ভূধর কন্দর আদি জাগান সবারে।
উত্তানপাদের হয়
ধ্রুব নামে এ তনয়,
যুদ্ধের মানসে আজি এসেছি এদেশে
যক্ষরাজসনে আমি যুদ্ধ অভিলাষে ।
এস, এস, এস ওহে ক্ষত্রিয়নন্দন,
সম্মুখসমরে যক্ষ ভীত কভু নন।
বহুদিন হ’ল গত,
ক্ষত্রিয় বালকে হত
করেছিনু এই স্থানে, আজিকে তােমায়
পাঠাব শমনঘর জানিও নিশ্চয়।
হাসিয়া কহেন ধ্রুব, “শমনভবন,
কে কাহারে দেয় দেখ যক্ষের নন্দন।
প্রতিহিংসা নিবাইতে
এসেছি দুর্গম পথে,
বিলম্ব না সহে যুদ্ধ করহ সত্বর,
বৃথা বাক্য ব্যয় কেন কর নিরন্তর ?”
৫
বাজিল সমরবাদ্য মাতাইল মন,
দোঁহে মিলে যুদ্ধ হয় বাণ বরিষণ।
বাণে বাণ কেটে যায়,
কেহ নাহি পায় ভয়,
বর্ষিলেন অগ্নিবাণ যক্ষের নন্দন,
বরুণ বাণেতে ধ্রুব কাটেন তখন।
মন্ত্র পড়ি ব্রহ্ম-অস্ত্র এড়েন ত্বরিতে
নিরখি যক্ষের হৃদি লাগিল কঁপিতে।
বিদ্যুদবেগেতে বাণ
হইলেক ধাবমান ;
নিমেষমধ্যেতে হৃদি করি পরশন,
ব্ৰহ্ম অস্ত্রে যক্ষপুত্র হারাল জীবন।
পড়িল সমরে পুত্র, করি নিরীক্ষণ
উন্মত্তের ন্যায় রাজা কহেন তখন;
এস এস পুত্রগণ,
সবে মিলি করি রণ,
বল, বুদ্ধি, সুকৌশল দেখায়ে তাহারে
বিনাশ করিব ধ্রুবে আজিকে সমরে।
৭৪
বাজিল সমরবাদ্য মাতাইল মন।
বাণে বাণে অন্ধকার হইল তখন।
আসে যায় বাণ কত,
যক্ষপুত্র হয় হত,
ক্রোধান্বিত হয়ে যক্ষ কহেন তখন,
সৃষ্টি স্থিতি লয় আমি করিব এখন।
‘সন্ স মহা ঝড় উঠিল ত্বরিতে
ভূধর কন্দর আদি লাগিল কঁপিতে।
পূজ, রক্ত, মল, মূত্র,
গগা হাড় হয়ে একত্র,
মুষলধারার সম পড়ে অবিরত,
তথাপি যুঝিছে ধ্রুব নিরভয়চিত।
অকস্মাৎ অগ্নিগিরি ভাঙ্গিয়া পড়িল।
ঝলসি অগ্নির রাশি চৌদিকে ধাইল।
বিকট নিনাদ করে
বন্য পশু ঘুরে, ফিরে,
বৃক্ষনীড় ছাড়ি ডাকে হায় পক্ষীগণ
যেন হুতাশন করে খাণ্ডব দাহন।
ব
তথাপি ধ্রুবের যুদ্ধ কে রােধিতে পারে ?
ধনুকে টঙ্কার দিয়া যুঝে একাধারে।
যক্ষরাজ ভাবে মনে,
ধ্রুবকে বধি কেমনে?
ক্রোধে আসি অস্ত্রাঘাত করে শিরােপরে
খান খান হয়ে অস্ত্র ভূমিতলে পড়ে।
সামান্য নহে ত ধ্রুব, কি করি উপায়
জলের প্রবাহে এবে করি মহালয়।
মায়ার কৌশলবলে
নিমেষমধ্যেতে আসি দিলা দরশন,
অগাধ জলধিতলে ডুবিল কানন।
অগাধ সলিলমধ্যে অটল হইয়া
পদ্মপত্রে থাকি যুদ্ধ করেন হাঁসিয়া।
মিষ্ট হেসে ধ্রুব কয়,
কাহারে দেখাও ভয়?
ভৌতিক মায়ার বিদ্যা শিখে যক্ষরাজ
যুদ্ধস্থলে গর্ব করা অনুচিত কাজ।
যক্ষরাজ, তব বিদ্যা হইয়াছে শেষ,
ব্ৰক্ষ অস্ত্র এড়ি এবে শ্রীগুরুআদেশ।
হৃষ্টমনে ধ্রুব যান
ধনুকে জুড়িতে বাণ;
আসি পিতামহ কন, ওহে ধ্রুবধন,
ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও, ক্ষত্রিয়নন্দন।
যক্ষরাজ হয় বৎস্য কুবেরতনয়,
উহাকে বধিলে তার বংশ লুপ্ত হয়।
বংশলােপ মহাপাপ,
পিতৃগণে পায় তাপ,
জল পিণ্ডোদক নাহি পাবে তপােধন,
অনুচিত কৰ্ম্ম
কভু কোরাে না এমন।
একজন তব ভ্রাতা করেছে নিধন,
সমগ্র যক্ষের প্রাণ নাশ কি কারণ?
ক্ষমা করি যক্ষরাজে,
যাও এবে নিজ কাজে ;
ঋষিশ্রেষ্ঠ হও তুমি, ক্ষমা তব ধর্ম
সাধিয়া আপন কাজ কর হিতকৰ্ম্ম।
৭৭
বহু কাল রাজধৰ্ম্ম করিয়াছ ভবে
পুত্ৰকরে রাজ্য দিয়া স্বর্গে চল এবে।
নিজ রাজ্যে যাও ফিরে,
যজ্ঞ করি স্মরি তরে
সুবিখ্যাত বলােক হয়েছে নির্মাণ,
উজ্জ্বল কররে এবে বসি সেই স্থান।
;
পূৰ্ব্বকথা এবে তার হইল স্মরণ
উদয় হইল মনে বিবেক তখন।
পদধূলি লয়ে শিরে
পিতামহে কন ধীরে,
যক্ষহত্যা করে পাপ করেছি অপার,
যজ্ঞ করি এই পাপ নাশিব আমার ।
পিতা পিতৃব্যের আজ্ঞা করিনু পালন,
ক্ষমা করি নিজ রাজ্যে করিনু গমন।
হস্তদ্বয় যােড় করে
যক্ষরাজ কন ধীরে,
“বুদ্ধিভ্রমে কহিয়াছি বহু কটুবাণী
ক্ষমা কর নিজগুণে ঋষিচূড়ামণি।”
৭৮
ধ্রুবের নিজ রাজ্যে গমন ও
যজ্ঞারম্ভ।
জয়, জয়, নাদ করে যুদ্ধ করি যান ফিরে
নিজরাজ্যে এবে ধ্রুব প্রফুল্লবদনে।
“জয়, মহারাজ, জয়’ সব প্রজাগণ কয়
আনন্দের মহারােল উঠিল সঘনে।
আসি মহারাজ কন, শুন পাত্র মিত্রগণ
ভুরি সদক্ষিণ যজ্ঞ প্রিয় যজ্ঞ হয়।
করিয়াছি পাপ কত
যুদ্ধস্থলে করে হত
ভুরিভ্রদক্ষিণ যজ্ঞে হবে পাপক্ষয়।
দেবর্ষি মহর্ষিগণে বার্তা দাও স্থানে স্থানে
মহামহারাজগণে কর নিমন্ত্রণ।
আমি দেবগণে স্মরি সবে যেন কৃপা করি
শূন্যমার্গে থাকি যজ্ঞ করেন দর্শন।
আজিকার শুভদিনে সবে মেলি ফুল্লমনে
করুন আমার হৃদে আনন্দ বর্ধন।”
ধ্যান করি ইষ্টদেবে
অভিপ্রায় কন তবে
শঙ্খ, চক্র, গদা পদ্ম করেন দর্শন।
৯
ব
যজ্ঞ হয় বিধিমতে ঋষিগণ হৃষ্টচিতে
ঘৃতাহুতি দেন মন্ত্র করি উচ্চারণ ।
সােমরস পিয়ে কন আনন্দেতে দেবগণ
মঙ্গল ইউক তব হউক কল্যাণ।”
যু হলে সমাপন করযােড়ে ধ্রুব কন,
“পদরেণু দাও সবে মস্তকে আমার।”
আনন্দেতে ঋষিগণ
আশীর্বাদ করি কন,
‘মনােবাঞ্ছা পূর্ণ ধ্রুব হউক তােমার।”
বহুবিধ রত্নধন
করিছেন বিতরণ
তুষ্ট করি ঋষিগণে করান ভােজন।
আর যত রাজগণে
প্রণমিয়া হৃষ্টমনে
রাজসিক দ্রব্যে সবে তুষেন তখন।
উত্তম, মধ্যম আর দীন, দুঃখী, সবাকার
মনস্কাম পূর্ণ ধ্রুব করেন যতনে।
ধন্য ধন্য সমস্বরে
সব কহে একাধারে
পিতৃগণ আশীর্বাদ করেন শ্রবণে ।
আজিকার শুভদিনে হৃদয়ের পুত্রধনে
রাজত্বের গুরুভার করিনু অর্পণ।
ধৰ্ম পথে মতি রেখ প্রজাপরে দৃষ্টি রেখ
রাজধৰ্ম্ম ক্ষত্ৰধৰ্ম্ম করে পালন।
৮
দেব, দেবী, গুরুজনে স্নেহাশীষ কায়মনে
করুন পুত্রকে মাের, হউক কল্যাণ।
আশীষিয়া কন পুত্রে,
থাকিবে সংসারক্ষেত্রে
সতত হইয়া বৎস অতি সাবধান।
প্রণমি পিতার পায় করযােড়ে পুত্র কয়,
“পিতৃআজ্ঞা শিরােধার্য্য করিব পালন
ওহে দেব দয়াময়
যেন ধর্মে মতি রয়
এ বাসনা মাের প্রভু কর হে পূরণ।
জরা দেহ সহিবার ক্ষমতা নাহি আমার
কাটাই সংসারমায়া মায়ার বন্ধন।
ইষ্টদেবে হৃদে রাখি সমাধি যােগেতে থাকি
ধীরে ধীরে এবে করি মৃত্যুকে বরণ।”
ধ্রুবের গোলােকে গমন।
নির্জন উদ্যানে বসি ধ্রুব একমনে
মৃত্যুকে স্মরণ করি স্মরে নারায়ণে।
স্বর্গ হতে পুষ্পরথ আসে ধীরে ধীরে
উজ্জ্বল প্রভায় দিক আলােকিত করে।
৮১
দেবকন্যাগণে সবে করে মাল্য ল’য়ে
স্বগীয় সৌরভ কিবা দিছেন ছড়ায়ে।
দূর
হ’তে ধ্রুবধনে নিরীক্ষণ করে
আগমনী গীত গান সুললিত স্বরে।
ধীরে ধীরে রথােপরি করি আরােহণ
সমাধিস্থ হয়ে তিনি রহেন তখন।
অপরূপ জ্যোতিঃ কিবা করেন ধারণ
স্বর্গ হতে পুষ্পবৃষ্টি পড়িল তখন।
বিবিধ বাজনা বাজে সুমধুর স্বরে
সুসজ্জিত পুষ্পরথ উঠে ধারে ধীরে।
করিছেন ধ্রুব আজি গােলােকে গমন
নরলােকে হেরে হয় আনন্দে মগন।
আত্মীয় স্বজনে আর পরিজনগণে
অশ্রুপাত করি হে’রে সতৃষ্ণনয়নে।
সত্যলােক পিতৃলােক দেবলােকে আর
সকলে কহেন হেরি একি চমৎকার।
নারায়ণ সমতুল্য জ্যোতিঃ যে ইহার
শ্রেষ্ঠ ভক্ত হয়েছেন ধ্রুব যে তাহার।
ইহার চরণ যিনি করেন দর্শন
জীবন্মুক্ত হয়ে করে বৈকুণ্ঠে গমন।
৮২
আহ কিবা বংশীধ্বনি পশিল শ্রবণে
প্রেমে মাতােয়ারা হয়ে আনন্দিতমনে।
কোনাে দিকে লক্ষ্য নাই সেই পদ বিনা
বসিয়া থাকেন তিনি হয়ে একমনা।
প্রবেশ করিল রথ বৈকুণ্ঠ ভবনে
সম্মুখে হেলিয়া হেরি ক্ষমীনারায়ণে।
ভক্তিগদগদস্বরে কন যােড় করে
বেদবাক্যে স্তুতিপাঠ সুমধুরস্বরে।
ধ্রুবের প্রতি নারায়ণের উক্তি।
সমভাবে স্তব করি তুষ বার বার
ভক্তমধ্যে শ্রেষ্ঠ তুমি ধ্রুব রে আমার ।
করে ধরে কোলে ল’য়ে হৃদয়ে ধরিয়া
তােমা তরে ধ্রুবলােক রেখেছি সৃজিয়া।
ধ্রুবজ্যোতিঃ হ'য়ে তুমি থাক মাের পাশে।
ত্রিপাদে উদিবে তুমি নিৰ্ম্মল আকাশে।
থাকিবে আমার সহ জীবের অন্তরে
তােমা মধ্যে থাকি দেখা দিব হে সবারে
তােম। সম ভক্তি যদি কেহ দিতে পারে
১৩
হেরিবে অন্তরে সেই তােমাতে আমারে।
ধ্রুবলােক শােভাকর ফুটে ধ্রুবজ্যোতিঃ
দেব দেবী যােগী ঋষি সবে দিবা রাতি।
সুযশ গাহিবে তব অদ্ভুত শকতি
সরল হৃদয়ে কিবা সাত্বিক ভকতি।
শিক্ষা দিলে ধ্রুব তুমি সবার অন্তরে
মম অঙ্গে লিপ্ত করে রাখিনু তােমারে।
ধ্রুবলােকস্থিতি।
বাজিল কি পাঞ্চজন্য সুমধুর সুরে,
অপূর্ব ডমরু বাজে ভােলানাথ করে।
চতুম্মুখে চতুর্বেদ গান পদ্মযােনী,
চমক ভাঙ্গিয়া গেল দেবগণে শুনি।
নিজ নিজ যন্ত্র সবে করেতে লইয়া,
সকলে করেন নৃত্য আনন্দে মাতিয়া।
বম্ বম্ মহাশব্দে কাপে স্বর্গধাম,
নীলকণ্ঠ গান কিবা হরিগুণ গান।
পুলকে হেরেন গঙ্গা থাকি হরশিরে,
জটা ভেদি পূত বারি বহে ধীরে ধীরে।
৮৪
রবি, শশী, গ্রহ, তারা, জ্যোতিষ্কের গণ,
রয়েছেন ধ্রুবলােক করিয়া বেষ্টন।
ধৰ্ম্ম, অগ্নি, ইন্দ্র, বায়ু, কশ্যপ, সপ্তর্ষি,
প্রদক্ষিণ করিছেন সকলেতে আসি।
মঙ্গল আরতি হয় বাজিছে বাজনা,
সুমধুর গীত গান যত দেবাঙ্গনা।
উদিলেন ধ্রুব তারা নিৰ্ম্মল অম্বরে,
নর নারী হেরে সবে ভাসে প্ৰেমনীরে ।
ও শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ।
শােকোচ্ছাস।
নিদারুণ বাণী শুনি কাঁদিছে পরাণ
ভ্রাতা ভগ্নীগণ মিলি হারাইনু জ্ঞান।
রাতুল চরণ স্মরি
ঝরিছে নয়ন বারি,
মানসে চরণ ধৌত করিনু তাহার
প্রেমাঞ্জলি দিমু পায় হে দেব তােমার।
চন্দনচর্চিত বপু নিরখি তখন
রুদ্রাক্ষের মালা অঙ্গে গৈরিক বসন ।
গলদেশে দুলে মালা
যেন দিগম্বর ভােলা,
রজত গিরির পরে বসি যােগাসনে
সন্তানে অভয় দেন প্রসন্নবদনে।
অভয় চরণতলে শরণ লইয়া
সংসারসমুদ্র মাঝে রহিনু ভাসিয়া।
ভবের কাণ্ডারী হরি
পার কর ভবতী ;
জীবনতরণীখানি চলিছে ভাসিয়া
ধর হাল, তুল পাল, মাঝিটী হইয়া ।
লহ লহ লহ দেব এই অর্ঘ্য তুমি
হৃদয়ের প্রেমভক্তি হে হৃদয়স্বামী।
দাও ধৰ্ম্ম, দাও, জ্ঞান,
প্রেমভক্তিভরা প্রাণ ;
তােমার সন্তানগণে শােকাতুরপ্রাণে
শান্তিজলে সিক্ত কর স্নেহাশীষ দানে
হে মহাপুরুষ, মােরা চিনিতে না পারি
তব বাক্য মহাবাণী সদা যেন স্মরি।
ক্ষম অপরাধ প্রভু
সন্তানের প্রতি বিভু ;
অনাদি অনন্ত দেব, অনাথের নাথ
কোটী কোটী তব পদে করি প্রণিপাত।
গুরুদেব ত্রিসন্ধ্যায় করি নমস্কার
সম্মুখে পশ্চাতে মােরা নমি বার বার।
ইষ্টদেবে হৃদে রাখি
সমাধি যােগেতে থাকি,
জীবনের লীলা খেলা করি সমাপন
অন্তিমে হেরিতে যেন পাই শ্রীচরণ।
ও শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।
শুদ্ধি পত্র। পৃষ্ঠা পংক্তি শুদ্ধির ধরণ। এসেছি এসেছি ভাবি ৭ ৪র্থ ১১ ১৭শ ১৪ ১ম যমুনা জ্যোতিঃ নিখাদ, পূরাও निखनौ পূরাও রাজচ্ছত্র তুরি ৮ম ৯ম ১৭শ ৪৩ ১২শ ৪৭ বৃথা, ব্যথা শূন্যময় পুত্র ১৭শ ৪৮ ৮ম ওযা ৭০ ১৫ মাজচ্ছত্র সঙ্কীর্ণ ব্রহ্মের জ্যোতিতে মূষল পক্ষিগণ ১১শ ১৭
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.