Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rajputkushum

Ray,nikhilnath · 2009/10/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রাজপুতকুসুম।
(FLOWERS OF RAJPUT CHIVALRY.)
দ্বাদশটা সুপ্রসিদ্ধ রাজপুত-বীরের বীর-কাৰ্য্য-বর্ণন
গীতিকাব্য।
মানিনা
না?' বা
“দ্যাখ, রে জগৎ মেলিয়ে নয়ন,
দ্যাখ, রে চন্দ্রমা , দ্যাখ রে গগন,
স্বর্গ হতে সব দ্যাখ,
দেবগণ
অলদ অক্ষরে রাখ গাে লিখে।”
সরোজিন
কলিকাতা
আশুতােষ চক্রবর্তী কর্তৃক প্রকাশিত
৩৭নং মেছুয়াবাজার ষ্ট্রীট-বীণাযন্ত্রে,
শ্রীশচন্দ্র দেব কর্তৃক মুদ্রিত।

No text on this page.

जान रिटेल सौ
s"
বাগ্মিপ্ৰবৰ
যুক্ত বাবু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধায়।
দেশ-প্রেমিক।
৭ । বাজ৩ৈ ব ণগনেব ঘা। অন্ধকার দে ববি।
অ• ব শ ৫ •ভা দি দণন্ত বিবণ হইছে। তবে
হি•ে •-স্বজা•ি 1 উন্নতি * ন্য-জামিব মুখাে ল
" শির। শণ (T ৰূপ মাদশ দেখাছেন তাহা প্রত্যেক
* • বানী। ইদা? ৮ অম এ সব অঙ্কিত পারবে।
সামি
* •ে একটা ক্ষুদ-প্রাণ সপ্তান-উন্মভূমির উপবাবেব নিনিও
আনার নিকট কৃতজ্ঞতা পশে বদ্ধ , কিন্তু এ সঙ্কীর্ণ হৃদযে এমন
একই নাহ, দ্বিাবা অ। • • ১ ৪ ৩া প্রৰ 'শ ব লতে
*।। ter1 শুক্তিপূর্ণ হদযে অনাব বলে
नन हे मागाना
• {1} ছড। * আপ• বি বি কমণে অপ খিলাম, আশাব
প। বিr ২৭ কি
লেখ।

No text on this page.

ভূমিকা -- যাহাদিগের কীৰ্ত্তি-চন্দ্রমার উজ্জ্বল কিরণে সমস্ত ভারতভূমি উদ্ভাসিত হইয়াছিল—যাহাদিগের অমােঘ বীৰ্যে দিল্লীর সিংহা- সন বিলােড়িত হইয়া যমুনার অতল জলে নিমজ্জিত হইবার উপক্রম হইয়াছিল—যাহারা স্বদেশ, স্বধর্ম রক্ষার জ্বলন্ত মন্ত্রে প্রণােদিত হইয়া সমস্ত অবনীমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছেন— যাহারা শত শত বৎসর যবনগণের কঠোর অত্যাচার বক্ষে ধারণ করিয়া সমভাবে আপনাদিগের পূর্বপুরুষগণের বিশ্ব- ব্যাপিনী কীৰ্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন-অদ্যাপি যাঁহাদের প্রাতঃ- স্মরণীয় নাম রাজপুতানার পৰ্বতে পর্বতে, বনে বনে, নগরে নগরে পরিকীৰ্ত্তিত হইয়া থাকে—আজি আমরা তাহাদিগকে বঙ্গবাসিগণের নিকট অনিয়া উপস্থিত করিলাম। মহাত্মা কর্ণেল টডের সংগৃহীত অমূল্য রত্ন ইতিপূর্বে বঙ্গ- ভাষায় বিভিন্ন প্রকারে প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু তাহার অধিকাংশই গদ্যে লিখিত ; অধিকন্তু এরূপ অমূল্য রত্নের বিভিন্ন প্রকারে বহুল প্রচার নিতান্ত আবশ্যক। তাই আমরা আজি এই গীতিকাব্যখানির অবতারণা করিলাম। ইহাতে যে সম্যক সফল-প্রযত্ন হইব, এমত আশা নাই; তবে লেখক যত দূর পারিয়াছেন, সাধ্যানুসারে চেষ্টার ত্রুটী করেন নাই। ভারতের কৃতী-পুত্রগণের অপূৰ্ব চরিত্র গাহিতে ইচ্ছা হয় বলিয়াই তিনি হৃদয় ভরিয়া গাহিয়াছেন। তাহার গীত সুললিত হউক, Tre • বা নাই হউক, তাহাতে তিনি লজ্জিত নন। স্বজাতির নিকট স্বজাতির গুণ কীর্তনে লালিত্যের কিছু মাত্র আবশ্যকতা নাই । লেখক সেই সাহসে আজ প্রকাশ্যে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ভরসা, করি শিক্ষিত বঙ্গভ্রাতৃগণ এই নবীন লেখকের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করিবেন। পুস্তকখানি মুদ্রাঙ্কনের পূর্বে যােগেশকাব্য-প্রণেতা কবি- বর ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট প্রেরিত হইয়াছিল ; তিনি পুস্তকখানি আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া মুদ্রাঙ্কিত করিতে বিশেষ উৎসাহ প্রদান করিয়াছেন। আমরা তাহারই উৎসাহে এই কাৰ্যে ব্রতী হইলাম। পরিশেষে কৃতজ্ঞ চিত্তে স্বীকার করিতেছি, কাশিমবাজার- নিবাসিনী দানশীলা ঐশ্ৰীমতী মহারাণী স্বর্ণময়ী মহােদয়। এই পুস্তকখানি মুদ্রিত করিতে যথেষ্ট অর্থ-সাহায্য প্রদান করিয়া- ছেন। ইতি। শ্ৰীআশুতােষ শর্মা, প্রকাশক। বহরমপুর কলেজ। ১৫ই বৈশাখ, সন ১২৯১ সাল।

গ্রন্থকারের দুই একটা কথা। নবীন গ্রন্থকার তাহার গ্রন্থে যে সহস্ৰ দোষ আছে। তাহা অবগত আছেন। যে কয়টা ফুল লইয়া এই মালা ছড়াটি গাঁথি- য়াছেন সে গুলি তাঁর কঠোর ও অপবিত্র হস্তে পড়িয়া হয়ত ছিন্ন ও বিকৃত হইয়া গিয়াছে। যে গুণে সেই ফুল কয়টী গ্রথিত হইয়াছে, তাহাও হয়ত-হয়ত কি নিশ্চয়ই-অতি হস্ব ও অতি কঠোর, কোমল ও পবিত্র ফুলগুলির সম্পূর্ণ অনুপযােগী। যেটী যেমন ভাবে সাজান উচিত ছিল, সেটা তেমন ভাবে সাজান হয় নাই—দেবাদপি মহান্ বীরগণের জীবন-নাটকের যে অঙ্কের অভিনয় দেখান উচিত ছিল হয়ত তাহা দেখান হয় নাই তাহা হয় নাই তাহা গ্রন্থকার বিশিষ্টরূপে অবগত আছেন। রাজপুতানার বীররমণী ও বীরপুরুষগণের সেই পবিত্ৰাদপি পবিত্র, সেই উজ্জ্বল হইতেও উজ্জ্বল, সেই অপূৰ্ব অব্যক্ত চরিত্র চি,এত করা কবির সাধ্যায় কি না সন্দেহ। হৃদয়ে এমন ভাব নাই, ভাষায় এমন শব্দ নাই, যাহাতে সেই ভাব পরিস্ফুট রূপে অঙ্কিত হইতে পারে। পারিজাত অপেক্ষাও কত কত সুন্দর সুগন্ধি ফুল রাজপুতানার মরুভূমিতে অজ্ঞাতভাবে ফুটিয়া নিজ নিজ বিমল সৌরভে মরুভূমির উত্তপ্ত বক্ষকে শীতল করিয়াছে ; কত পুরুষ কত রমণী স্বদেশ ও স্বধর্ম রক্ষার জন্য হাসিতে হাসিতে বিন্দু বিন্দু করিয়া হৃদয়ের সমস্ত শােণিত ঢালিয়া দিয়াছে ;- ইতিহাসবেত্তা তাহাদের সংবাদ লয় নাই—উন্মত্ত কবি সে দিকে ফিরিয়াও দেখে নাই। রাজপুতানার ভাণ্ডার অক্ষয়, রাজপুতা- নার দেব-মানব চরিত্র অবর্ণনীয়-অনন্ত কাল ধরিয়া তাহাদের উদ্দেশে অনন্ত কালিদাস ও অসংখ্য সেক্ষপীর বীণা বাজাইলে তবে শোভা পায়। তবে গ্রন্থকারের এই ভগ্ন বীণা, ভগ্ন সুর অথবা বালকের খেলাইবার বীণা ও অস্ফুট সুর লইয়া সেই ন মহৎ চরিত্র গীত করিতে—সেই পবিত্র চরিত্রে কলঙ্কের আরোপ করিতে-এ উন্মত্ত চেষ্টা কেন ? ‘কেন ? ভারতবাসী! তাহা তুমি ভিন্ন কে আর বুঝিবে ? তুমিই কেবল জান, অনাদৃত, পদ-বিমর্দিত, হৃতসৰ্বস্ব ভারত- বাসীর ভগ্ন-হৃদয়ের কেবল সেই একমাত্র সান্ত্বনাদায়ক স্মৃতি কি ছিলাম? যখন হৃদয় জ্বলিয়া উঠে তখন সেই পূৰ্ব্বস্মৃতির গান গাহিয়া হৃদয় জুড়াই। গীত ভাল হউক আর মন্দ হউক তাহাতে আমার কি ? আমি যশ চাহি না, মান চাহি না, ধন চাহি না। আমি চাই, সকলে মিলিয়া উন্মত্ত হইয়া সেই গীত গান করুক। কি আর বলিব ? পাঠক! এই গান শুনিয়া যদি তােমার ইহা অপেক্ষা ভাল করিয়া গাহিতে ইচ্ছা হয়, এই মালা দেখিয়া যদি তােমার ভাল করিয়া মালা গাঁথিবার ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে আমি আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করিব—তাহা হইলে আমার সকল শ্রম সার্থক হইবে। পরিশেষে যাহারা রাজপুত-কুসুমের প্রতি বিশেষ যত্ন করি- আছেন, তাহাদিগের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারিলাম না। স্বনামখ্যাত কবি ঈশানচন্দ্র সবিশেষ শ্ৰম স্বী- কার করত ইহার আদ্যোপান্ত দেখিয়া দিয়া আমাকে অপরি- শােধনীয় ঋণে আবদ্ধ করিয়াছেন। আর এই গ্রন্থের প্রকা- শক যাহারই যত্নে রাজপুতকুসুম মালাকারে পরিণত ও সাধা- রণের নিকট প্রকাশিত হইয়াছে, তাহার প্রতি আমার হৃদয়- ভাব ব্যক্ত করিতে পারি না। অলমতিবিরেণ- গ্রন্থকার।

সূচিপত্র
পৃষ্ঠা
বিষয়
১। বাপ্পা রাও
২। সমর সিংহ
৩। পৃথীমল্ল,
১৭
৫ । ।
৪।
বাদল।
৫। হামির
৪১
চণ্ড
•
৭। কুম্ভ
৪৯
৫৭
৮। পৃথ্বীরাজ
সংগ্রাম সিংহ
১০।
জয়মল ও পুত্ত
১১।
প্রতাপ সিংহ
•••
৮১
১২। রাজসিংহ

No text on this page.

রাজপুতকুসুম।
বাপারাও
হিন্দু সূৰ্য’ আর ‘রাজগুরুদেব,
হইল বীরেন্দ্র বাপার নাম ;
ভবেশের দাম, দেবের চিহ্নিত,
আজ অমর, ।
চারু অরণ্যানী হাসেমক্ষে
শ্যামল বিটপী হৃদয়ে ধরে ।
হাসিতেছে তরু, নবীনা লতিকা,
হৃদে হৃদে বাঁধি’ অনিন্দ
২
ফুলজ পরি, সমীর হিমেল
তরু সুশোভিনী লতিকা বালা,
দুলিয়া দুলিয়া নাচিয়া নাচিয়া,
মনের সোহাগে করিছে খেলা।

রাজপুতকুসুম।
লতিকা বালার সােহাগ দেখিয়া,
হরষিত চিত বিহগ চয়
বলিয়া শ্যামল বিটপীর শাখে,
ছড়াই’ছে তান কাননময় ।
৪
নিবিড় কানন, কোন খানে তার,
হরিণ খেলিছে হরিণী সনে ;
আবার কোথাও শশক নিচয়,
করি’ছে ভ্রমণ অভয় মনে।
উন্নত মস্তকে -গগন ভেদিয়া,
সেই শান্তিময় কানন মাঝ,
দৃঢ় কলেবর করিয়া ধারণ,
শােভি’ছে ত্রিকূট অচলরাজ।
একটা বালক রাখালের বেশে,
সেই সে বিজন নিভৃত বনে,
দাড়া’য়ে একাকী সহাস্য বদনে-
চরাই’ছে ধেনু প্রফুল্ল মনে।

বাপ্পারাও।
৩
কখন হাসি’ছে—কখন নাচি’ছে,-
কখন গাহিছে ‘ভবানী’ নাম,
কখন খেলিছে গাভীগণ সনে,
কভু বা ছিড়ি’ছে লতিকা-দাম।
৮
দেখিতে দেখিতে সে বন মাঝারে,
পশিল কতটী সরলা বালা
সহসা যেন সে আঁধার কানন,
রূপের আভায় হইল আলা।
ক্ষণকাল ধরি চঞ্চল চরণে,
কি যেন খুঁজিল বালিকা সবে
পরে সে বালকে হেরিয়া নয়নে,
কহিতে লাগিল মধুর রবে।
শুন রে রাখালগুন একবার,
রাখ আমাদের একটী বাণী
রাজার নন্দিনী খেলিবে ঝুলনী
পার দিতে রজ্জ, একটু খানি?”

রাজপুতকুসুম।
মধুর হাসিয়ে কহিল বালক,-
“শুনলো যতেক সরলা বালা,
কর যদি মােরে পতিত্বে বরণ,
দিব রজ্জ, তবে করিতে খেলা।
১২
কহিলা কৌতুক-রাজবালাগণ
*এস তবে ওহে রাখালরাজ ;
আমরা তোমায় প্রফুল্ল অন্তরে,-
পতিত্বে বরণ করিব আজ।”
এতেক কহিয়া রাজকুমারীর
বন বাঁধিয়া তাহার বাসে,-
নাচিতে লাগিল ধ্বনিয়া কানন,
নূপুর-নিৰুণে-মধুর হাসে।
১৪
কানন ভিতরে-সহকার-তলে,-
বিবাহ-ব্যাপার সাধিত হয় ;
এয়াে হ’ল যত লতিকাসুন্দরী,
হুলুধ্বনি করে বিহগচয়।

বাপ্পারাও।
পরে সবে মিলি’ ঝুলনী খেলিয়া,
গমন করিল প্রসন্না হয়ে ।
গােপাল (ও) তখন কানন ত্যজিয়া,
চলিল হরষে গােপাল লয়ে।
দেখিতে দেখিতে কতই বরষ,
অনন্ত কালেতে মিশা’য়ে গেল ।
শেষেতে শােলাকিরাজতনয়ার
বিবাহ বয়স আগত হল ।
১৭
একদা জনেক গণক আসিয়া,
নিরখি ভুপতি বালার হাত,
কহিল গণিয়া-“বিবাহ ইহার
হয়েছে নিশ্চয় কাহার (ও) সাথ।”
১৮
এই কথা শুনি’ শশালাঙ্কিভূপতি,
আদেশি ক্রোধে হইয়া ভাের
“কর অন্বেষণ কাহার সহিত,
পরিণীতা হ’ল তনয়া মাের।”

রাজপূতকুসুম।
অনেক সন্ধানে হইল প্রকাশ,
‘রাজকুমারীর রাখাল পতি;
শুনিয়া রাখাল গিরির গহ্বরে
মাইল আশ্রয় ত্বরিত গতি।
সেই তা চলৰ তন্যতম দেশে,
শিবলিঙ্গ এক আছিল স্থিত ।
এক পান মুখে
উপবিষ্ট ধ্যানে একাগ্রচিত।
তঁাহার,
একদা রাখাল ভ্রমিতে ভ্রমিতে,
সেই গুহামাঝে প্রবেশ করি’
ভকতির সহ করিল বন্দনা
সেই তপােধনে চরণে ধরি।
২২
সেই তপােধন-মহর্ষি
-মহর্ষি হরীত,
হইয়া নদয়-রাখাল পর,
‘মাহেশ্বর মন্ত্রে করিয়া দীক্ষিত,
সমরে অজেয় দিলেন বর।

বাপ্পারাও।
৭
প্রবাদ-শিবও হইয়া সদয়,
আপনি আসিয়া রাখাল সনে,
বৰ্ম্ম, চর্শ, শস্ত্রে করিয়া সজ্জিত,
বর দেন “হও অভেদ্য রণে”।
২৪
তখন রাখাল সে নিভৃত গুহা
ত্যজিয়। চলিল সমর সাজে ;-
গােরক্ষ নামক সিদ্ধপুরুষেরে,
করিল দর্শন পথির মাঝে।
তাহার নিকট হইতে রাখাল,
লভে একখানি দ্বিধার অলি,
যাহার ভীষণ প্রচণ্ড আঘাতে
পড়ে গিরিশৃঙ্গ ভুতলে খসি।
অবশেষে আসি’ চিতাের নগরে,
হইল রাখাল সৌভাগ্য-যুত ;
ক্রমে সবে তার পেয়ে পরিচয়,
জানিল রাজার ভগিনী-সুত।

রাজপুতকুসুম।
রাখাল এখন, রাজভাগিনেয়
পাইল রাজার সামন্তপদ ;
ভীষণ দ্বিধার কৃপাণ সহায়ে,
করিল যতেক অরাতি-বধ।
ক্রমে চিতােরের নৃপতিমুকুট,
রাখাল বাপার শিরেতে উঠে ;
নামে-মহিমা যাহার
রাজস্থান ময় আজিও ছুটে ।
কপিল কাশ্মীর, গান্ধার, গজনী,
কাপিল ইরাণ, তুরাণ আজ,
ভারত জুড়িয়া হ’ল জয়ধ্বনি
‘জয় বাপ্পারাও চিতাের-রাজ।

সমর সিংহ।
সমর সিংহ।
“মুচ্ছিত হইয়া পড়ি অচল উপর
শােণিতে অরিক্ত কায়,
অস্ত গেলা রবি হায়
অন্ত গেল ভারতের গৌরব-ভাস্কর ।”
পলাশীর যুদ্ধ।
দিল্লী নগরীর চরণ প্রক্ষালি’
বহিছে যমুনা মধুর স্বরে ।
যমুনা-হৃদয়ে তরঙ্গ লহরী,
খেলি’ছে দুলিছে সমীরভরে।
একদিন এই দিল্লীর আসনে,
ছিলেন নৃপতি অনঙ্গপাল
আজিও বিশাল ভারতে যাহার
বিস্তৃত অমীম মহিমা জাল।

রাজপুতকুসুম।
অয়স শরীর ভােলা ভীমরায়
পত্তননগরে অসন’পরে ;
রণক্ষেত্রে ধ্রুব তারকার ন্যায়
বীরজিৎ-আবু অচল শিরে।
৪
সুপ্রচণ্ড লৌহ-শলাকার ন্যায়
মিবারে সমর যবন-অরি ।
ভীষণ মরুর প্রতাপ স্বরূপ
মুন্দারে নাহুর কিরীটধারী।
৫
কাপিত সকলে ভয়ে থরহরি,
যেই অনঙ্গের বিক্রম ভরে,
এখন তাহার দুহিতা তনয়,
দিল্লী আসন’পরে।
আজি পথ,ঘাট দিল্লী নগরীর,
ঘাের কোলাহল জনতাময় ।
যেখানে সেখানে মিলিয়া সকলে,
গাহিছে আনন্দে রাজার জয় ।

সমর সিংহ। ৭ নগর-বাহিরে দুর্গের সমুখে শ্যাম তৃণময় প্রান্তর মাঝে, দাড়া’য়ে যতেক রাজপুতগণ, সজ্জিত হইয়া সমর সাজে। হেন কালে তিন সমর-কুশল- বীরবর তথা আসিল ধীরে ; অমনি ‘জয় মা ভবানী’ আরাব, ধ্বনিল সকলে ভীষণ স্বরে। একজন তার জটাজুটধারী, বিভূতিভূষিত, আয়ুধ করে ;- আর জন যুবা, বৰ্ম্ম-পরিহিত, উলঙ্গ কৃপাণ বিক্ৰমেধরে । তাপর কিরীট, রাজবেশধারী, বিশাল উরস, মৃদুল গতি, যেন বা শঙ্কর কাৰ্ত্তিকেয় সনে অসুর-নিধনে ত্রিদিব-পতি।

রাজপুতকুসুম।
১১
অই জটাধারী যােগী সমর
যুবক কল্যাণ -তনয় তঁার,
তৃতীয় বীরেন্দ্র রাজা পৃথ্বীরায়
কম্পিত যবন বিক্রমে যার।
১২
যােগীন্দ্র-আদেশে-রাজপুত-চমূ,
ত্যজিয়া দিল্লীর তােরণ-দ্বার,
চলিল প্রচণ্ড গিরিনদী মত,
নিকোষিয়া অসি সুতীক্ষ্ণ ধার।
.
অস্ত্রের ঝননে,তুরদের রবে,
বীরের বিরাট-চরণ-ভরে,
কাপিতে লাগিল বসুন্ধরা সতী,
রণ-মাতঙ্গের ভীষণ স্বরে।
ঃ
এদিকে দুর্দান্ত যবন নিকর
পূত হিন্দু ধর্ম উচ্ছেদ তরে,
নিষ্কোষি-কৃপাণ হ’ল অগ্রসর,
কৃতান্ত-কিঙ্কর মূরতি ধরে।

সমর সিংহ।
পবিত্র সলিল দৃষদ্বতী তীরে,
তিন দিন ধরি হইল রণ;
তৃতীয় প্রভাতে করিল ছলনা,
বিশ্বাসঘাতক যবনগণ।
আজ শেষ দিন, রক্তিম তপন,
আৰ্য-পরাক্রম দর্শন তরে,
উঠিলেন যেন পূরব অম্বরে,
ভারত ভুবন উজল করে।
১৭
সহলা সম্মুখে যবন-দামামা,
হ’ল নিনাদিত ভীষণ রবে ;-
না হ’তে সে রব শূন্যেতে বিলীন,---
নাজিল অমনি ক্ষত্রিয় সবে।
।
১৮
একদিকে উঠে ‘আল্লাহাে’ শবদ,-
অপর দিকেতে ‘ভবানী’ রব,
বিদীর্ণ করিয়া অনন্ত গগন,
কঁপায়ে সঘনে দিগন্ত সব ।

১৪
রাজপুতকুসুম।
‘জয় মা ভবানী” বলিতে বলিতে,
আনন্দে যতেক ক্ষত্রিয় বীর,
হানি, খরশান ভীষণ কৃপাণ,
ছেদিতে লাগিল যবন শির।
সেই স্রোত মাঝে যােগী সমর,
ধরি করবাল ভীষণ শূল,
ছুটিয়া ছুটিয়-ভীষণ আঘাতে,
নাশিতে লাগিল অরাতিকুল।
“কোথায় যবন সাহেব উদ্দীন
বলি ঘন ঘন গর্জন করি,
বীরেন্দ্র কল্যাণ লাগিল যুঝিতে,
শাণিত কৃপাণ সানন্দে ধরি।
২২
সহসা কয়টি যবন সেনানী
আমি কল্যাণে দ্বিগুণ বলে,
ব্যর্থ করি’ তাঁর ভীম পরাক্রম,
করিল শায়িত সমরস্থলে।

সমর সিংহ।
আবার এদিকে রাজা পৃথ্বীরায়,
যুঝি বহু ক্ষণ বিক্রম ভরে,
ক্রমে রণশ্রমে ক্লান্ত হয়ে বীর,
হইলেন বন্দী যবন-করে।
তখন যােগীন্দ্র ক্রোধে গরজিয়া,
হৃদয়ে বাঁধিয়া দ্বিগুণ বল,-
প্রভঞ্জন বেগে হয়ে অগ্রসর,
দ্রুত আক্রমিল যবন-দল।
২৫
সমরের সেই ভীষণ মরে
ব্যথিত হইয়া যবনগণ,
একটি একটি করিয়া তখন,
লাগিল পলা'তে ছাড়িয়া রণ।
সহসা ছুটিল অলক্ষ্যে সবার,
ফ্লেচ্ছদল হতে একটী তীর ;
সেই শরাঘাতে-অনন্ত শয্যায়,
হলেন নিদ্রিত সমর বীর ।

রাজপুতকুসুম।
২৭
3
বন্দী পৃথীরায়,-নিদ্রিত সমর,
ভারতের আশা বিলীন প্রায়
ডুবিল ভারত-গৌরব-তপন,
আর না উদিল ভারতে হায়! "
২
যেই দৃষদ্বতী-পুলিনে বসিয়া,
মহানন্দে-আর্য-মহর্ষি চয়,
সামবেদ গানে এ তিন ভুবন,
করিয়াছিলেন মঙ্গলময়।
২৯
আবার সে গান করিয়া শ্রবণ,
যেই দৃষণী মনের সুখে,
নাচিতে নাচতে কুলকুলম্বরে
করিত গমন সাগর-মুখে।
আজি তার তীর-ভীষণ শ্মশান,
শকুনি, গৃধিনী, আনন্দে ভ্রমে,
বিষাদে তপন হলেন আবৃত,
সেই শ্মশানের চিতার ধূমে।

পৃথীমল।
১৭
পৃথ্বীমল।
‘শাণিত কৃপাণ করে চল যাই রণে
স্বজাতির, স্বদেশের, স্বধৰ্ম্মের তরে,
নিবাই কৃপাণ-কৃষা যবন-শােণিতে।”
রঙ্গমতী
মহাতীর্থ ভূমিপূত গয়া-ধামে,
সমবেত আজি বীরেন্দ্র সব ;
প্রতি হৰ্ম্ম-শিরে উড়ি’ছে নিশান,
করি পত পত মধুর রব।
২
বিক্রম কেশরী-আ-বীরগণ,
সমর-সজ্জায় সজ্জিত কায় ।
মনের উল্লাসে গগন ভেদিয়া,
ডাকিছে সঘনে ভবানী মায় ।
পাপ ম্লেচ্ছগণ পূত গয়া-ধামে
সনাতন ধর্ম বিলােপ তরে,
করি’ছে নিয়ত কতই যতন,
ভীম পরাক্রম প্রকাশ করে।

রাজপূতকুসুম
s
যুবনের বল করিতে বিফল,
খ্যাতনামা পাঁচ চিতাের-বীর,
বিপুল বিক্রমে যুঝি’ বহু দিন,
একে একে রণে দিয়াছে শির।
তথাপি যবন না হয়ে বিরত,
সমর-সজ্জায় আবার সাজি’,
‘আল্লাহো’ শবদে মাতাইয়া দিশি,
পুণ্য গয়াধামে আগত আজি।
যেই বিষ্ণু-পাদপীঠে আৰ্যগণ,
করে পিণ্ড দান ভকতি ভরে,-
আজি কি না সেই সুপবিত্র শিলা,
অপবিত্র হবে যবন-করে ?
থাকিতে শোণিত আৰ্য-ধমনীতে,
ক্ষত্রিয়ের করে থাকিতে আসি,-
স্পর্শিতে সে শিলা না দিবে যবনে
পুণ্য গয়াধামে বিক্রমে পশি।

পৃথীমল্ল।
পৃথ্বীমল
তাই চিতােরের গৌরব-ভাস্কর
বীর সজ্জিত হয়ে,
ব্যর্থ করিবারে যবন-বিক্রম,
সমাগত যত বীরেন্দ্র ল’য়ে ।
সেই হেতু আজি আৰ্য বীরগণ,
গাহিছে আনন্দে আৰ্যের জয় ;
সেই জয়-নাদ করিয়া শ্রবণ,
ভয়ে কম্পমান যবন চয়।
১০
চিতাের ঈশ্বর-পৃথীমল্ল বীর,-
সমর পিপাসু সেনানী সবে,
করি দরশন, হয়ে অগ্রসর,
বলিলেন তবে গভীর রবে।
* বীরেন্দ্রনিকর!
পাপিষ্ঠ যবন,
প্রচণ্ড বেগেতে আগত প্রায় ;
আৰ্য্যধৰ্ম্ম-লােপ হইবে ভারতে,
দাড়া’য়ে সকলে দেখিবে হায়

२०
রাজপুতকুসুম
“দেবের মন্দির চূর্নীকৃত হয়ে,
স্লেচ্ছের মসিদ উত্থিত হবে,
থাকিতে শােণিত-ধমনী ভিতরে,
আৰ্য বীরগণ নীরব রবে ?
“শাণিত-কৃপাণ খেলনা যাদের,
গিরি উপত্যকা—ক্রীড়ার স্থল,-
সেই বীর জাতি থাকিতে হেথায়,
পশিবে পিশাচ যবন দল?
১৪
“ভবানী মায়ের বাছনি’ বলিয়া
করে অহঙ্কার যাহারা সবে,
যবনের ছার পরাক্রম দেখি,
আজি সেই জাতি নীরব রবে ?
অই দেখ অই মন্দির উপরে,
আৰ্য্যধৰ্ম্ম-ধ্বজা-মধুর স্বনে,
সঙ্কেত করি’ছে-হেলিয়া দুলিয়া-
অবতীর্ণ হতে—পবিত্র রণে।

পৃথীম। “হও অগ্রসর-অৰ্য্য বীরগণ, বিজয়-নিশান-ধরিয়া করে । যবন-বাহিনী-করিয়া দলন- তুল কীর্তি-ধ্বজা-অবনী’পরে। শুনিয়া সে কথা ক্ষত্রিয় গণের শিরায় শােণিত উছলি’ উঠে ; ‘জয় মা ভবানী’-বলিতে বলিতে, নিষ্কোষি কৃপাণ, অমনি ছুটে। ১৮ দেখিতে দেখিতে-‘আল্লাহাে’শবদে- ঝাপিল যতেক যবনগণ ; দেখিতে দেখিতে—মুহূর্ত ভিতরে ক্ষত্রিয় যবনে বাধিল রণ। আর্যবীরগণ দ্বিগুণ-প্রতাপে, নাশিতে লাগিল যবন চয়ে ; আবার যবন ভীম পরাক্রমে, লাগিল যুঝিতে অকুতােভয়ে।

২২
রাজপুতকুসুম
পুরাকালে যথা রাখিতে অমরা,
যুঝিয়াছিলেন ত্রিদিবরাজ;
তেমতি পবিত্র গয়া রক্ষিবারে ,
পৃথ্বীম বীর যুঝি’ছে আজ।
একবার আনি’ যবন নিকর,
আক্রমণ করে ক্ষত্রিয় গণে;
পরক্ষণে পুনঃ রাজপুত চমূ,
আক্ৰমে যুবনে নির্ভয় মনে।
২২
‘জয় শিব শম্ভো’, ‘আল্লাহাে’, শবদে,-
মিশিয়া একটা ভীষণ রব,
ঘন ঘন উঠে আকাশ ভেদিয়া,
কম্পিত করিয়া দিগন্ত সব ।
ক্ষত্রিয় কৃপাণ উঠিল ঝলসি',
পতিত হইল যবন-শিরে,
অমনি কতই শ্মশ্রুধারী বীর,
হইল শায়িত ধরণী পরে।

পৃথীম।
२8
ক্রোধে গরজিয়া অবননিকর,
ক্ষত্রিয় উপরে পড়িল আসি,
হইল তথায় অপূৰ্ব সমর,
স্থূপীকৃত মৃত সেনার রাশি।
সহসা বীরেন্দ্র পৃথী-শিরে এক
উঠিল কৃপাণ সুতীক্ষ্ণ ধার,
পুণ্য গয়াধামে স্বধৰ্ম্মের তরে
ত্যজিলেন বীর জীবন-ভার।
তখন যবন ‘আল্লাহ’ শবদে,-
অনন্ত গগন বিদীর্ণ করি,-
ভীমা অসি-ঘাতে ক্ষত্রিয়-বাহিনী
করিল পাতিত ধরিত্রী’পরি ।
२१
যদি ও যবন রাজপুতগণে
দলিত করিয়া লভিল জয়,
তথাপি পবিত্র পুণ্য গয়াধামে
প্রবেশ করিতে পাইল ভয় ।

২৪ রাজপুতকুসুম। ২৮ দেখিল তাহারা, আৰ্যবীরগণ, স্বদেশ-স্বধৰ্ম্ম-রক্ষার তরে, অমূল্য জীবন দিতে বিসর্জন অণুমাত্র কভু নাহিক ডরে। আজি চিতােরের পৃথীমল্লবীর,- আপন শোণিত করিয়া দান, রক্ষিলেন পূত পুণ্য গয়াধামে, রাখিলেন আৰ্য্য ধর্মের মান। ত্রিদিব হইতে অমর নিচয়, দেখিলেন আজি পুলক ভরে, —জীবন্ত আদর্শ—ধন্য আত্মত্যাগ- আৰ্য সনাতন ধর্মের তরে।

বাদল। বাদল। চপলার প্রায় যথা তথা, অতিবেগে ধায় মহারথ, যেন প্রলয়ের ঝড়ে, অসংখ্য ষষন পড়ে, বিক্রমের কি কহিব কথা।” পদ্মিনী উপাখ্যান। . আজি চিতোর দুর্গের সমুখে দাড়ায়ে, বিষাদিত চিত বীরেন্দ্র সব ;- চিন্তার তরঙ্গে ভাসি’ছে হৃদয়, কার(ও) মুখে নাহি একটি রব। ২ পদ্মিনী রতনে লভিবার তরে, পাপ আলাদীন যবন-রাজ- অগণন সেনা করিয়া সহায়, চিতাের পুরীতে আগত আজ।

২৬
রাজপুতকুসুম।
একে ত যবন পশুর অধম,
তাহে মহিষীর হেরিয়া রূপ,
ধ্বনসি চিতাের লভিতে সে ধনে,
পাগল হয়েছে যবন-ভূপ।
যে উজ্জ্বল রত্ন—ভারত ভুবনে,-
বিকাশি’ছে নিজ বিমল কর ;-
সে রত্ন না পরি’ স্বীয় কণ্ঠদেশে,
পারে কি থাকিতে যবন বর ?
বন্দী ভীমসিংহ যবন শিবিরে,
তাই আজি তঁার উদ্ধার তরে,
রাজরাণী বীরা পদ্মিনী সুন্দরী
গিয়াছেন তথা ছলনা করে।
চিন্তার তরঙ্গে হয়ে বিচলিত,
কহে মনে মনে ক্ষত্রিয় ঢয় ;--
‘কর মা মঙ্গল--শিবলি, শঙ্কর,
সেন আশা আজি সাল হয়।

বাদল।
२१
এমন সময় দেখিতে দেখিতে,
দ্রুতগামী দুই তুরগ’পরে,
একটি পুরুষ,একটা রমণী,
আসিল উলঙ্গ কৃপাণ করে।
অমনি পুলকে মাতিয়া তখন,
করিল নিনাদ ক্ষত্রিয় চয় -
আকাশ ভেদিয়া উঠিল সে রব---
‘জয় মহারাণী—রণার জয়।
মুক্ত ভীম সিংহ-রাণীর কৌশলে ;
আনন্দের মদে সকলি ভাের ;-
সহসা কিন্তু সে ভাব দূরে গেল,
উদিত হইল বিষাদ ঘাের।
বিমুক্ত রাণায় অনুসরি’ এবে,
সশস্ত্র একটী যবন দল,
বিপুল বিক্রমে ঘেরিল আলিয়া
চিতাের দুর্গের সম্মুখ সুল।

রাজপুত কুসুম অকস্মাৎ সেই ভীম দরশনে, স্তম্ভিত হইল ক্ষত্রিয় সবে । কিন্তু ক্ষণ ব্যাজে নিষ্কোষিলা অদি, আস্ফালি বিক্রমে ভীষণ রবে। ১২ হইল ধাবিত বীরেন্দ্র নিকর, প্রভঞ্জন বেগে যবন’পরি ;- ঘূর্ণিত করিয়া জ্যোতির্ময়ী অসি,- শত্রুগণে খণ্ড বিখণ্ড করি”। অমনি সঘনে আল্লাহাে’ নিনাদ- করিয়া যতেক যবন বীর । বিপুল বিক্রমে মাতিল সমরে, জয় পরাজয় নাহিক স্থির। -- ক্ষত্ৰ বীরগণ মনের উল্লাসে, হানিতে লাগিলভীষণ অসি ; আঘাতে আঘাতে যবনের শির, পড়িতে লাগিল ভুতলে খসি।

বাদল। ২৯ । বীর পদভরে কম্পিত মেদিনী,- ভীম রবে নভ বিদীর্ণ হয়, মহাপ্রলয়ের যেন আবির্ভাব নিখিল ব্ৰহ্মাণ্ড করিতে লয় । কাহারাে মস্তক যায় গড়াগড়ি, কারাে হাত খসি’ পড়িল ভূমে, কাহারাে চরণ গিয়াছে ছিড়িয়া, কেহ বা পড়িয়া ধরণী চুমে। ১৭ সেই ভয়ঙ্কর সমর-সাগর মর্থিত করিয়া মনের সুখে, দুইটী বীরেন্দ্র নির্ভীক হৃদয়ে, হয়েছে ধাবিত অরাতি-মুখে। ১৮ একটী তাহার গােরা বীরধর, ভ্রাতুস্পুত্র তার অপর জন- দ্বাদশ বর্ষীয়, বালক বাদল, ক্রীড়াই যাহার কেবল রণ।

রাজপুতকুসুম
শুনেছি দ্বাপরে কুরুক্ষেত্ৰ-রণে-
ব্যুহভেদে ভীম অক্ষম হয় ;
শিশু অভিমন্যু ভেদিয়া সে ব্যুহ,-
মথিয়াছিলেন কৌরব চয়।
কিন্তু আজি দেখি গােরায়, বাদলে,
বােধ হয় ভীম আঞ্জুনি সহ
নিপাত করি’ছে অরাতি কটক,
বীর পরাক্রমে ভেদিয়া ব্যুহ ।
২১
সবার অগ্রণী বীরবর গােরা,
পিছে বীরশিশু বাদল চলে;
যবন-বাহিনী হয়ে বিদলিত,
পড়িতে লাগিল সমরস্থলে।
২২
বহুক্ষণ ধরি’ যুঝি’ ঘােরতর;
নাশি’ অগণন যবন-বীরে,
বীর-সিংহ গােরা হলেন শায়িত
ভাসায়ে চিতােরে বিষাদ-নীরে।

বাদল।
প্রবল আশ্বাস হ’ল ভঙ্গ এবে,
নেতৃহীন হ’ল ক্ষত্রিয় সব ।
গগন ভেদিয়া, হইল উখিত,
‘জয় দিল্লীশ্বর’ ‘আল্লাহাে’ রব।
২৪
তখন দ্বিগুণ বিক্রমে বাদল,-
সেই অগণন অরাতি সনে,
লাগিলেন একা সাহসে যুঝিতে,
বিমথিত করি’ যবনগণে।
কিন্তু অবিলম্বে যবন নিকর,
চৌদিকে বাদলে ঘেরিল আনি’,
চারি দিক হতে লক্ষ্য করি তায়,
হানিতে লাগিল আয়ুধ রাশি।
দেখিতে দেখিতে আগতা রজনী,
আঁধার হইল সমর-স্থল,
কেহই কিছুই না পায় দেখিতে,
ব্যাকুল হইল যবন-দল।

२२ রাজপুতকুসুম । বাদল তখন সময় বুঝিয়া, ‘বম্ হর হর’-বলিয়া মুখে, অৰ্য্য-বীর দাপে শ্লেচ্ছের সহিত, লাগিল যুঝিতে মনের সুখে। ২৮ বীর শিশু আজি উন্মত্ত সমরে, হানে ভীম শূল অশনি সম । বিজলী সমান ঘুরি’ছে কৃপাণ, চমকি নিশির ভীষণ তম। শ্লেচ্ছ অনিকীনী মাঝারে পড়িয়া, শত অস্ত্রাঘাত উপেক্ষা করে, শাণিত অসির শােণিত পিপাসা,- মিটান বীরেন্দ্র আনন্দ ভরে। ‘জয় মা ভবানী” বলিতে বলিতে, কাটি অগণন যবন-শির, নির্বিঘ্নে ভেদিয়া যবনের বৃহ- উত্তরিলা দুর্গে বাদল বীর।

হামির।
৩৩
হামির।
‘দুর্বিনীত-দেব-দ্বেবি-দনুজ পরশে,
পবিত্র অমরপুরী কলঙ্কিত অজি ;
জ্যোতি-হৃত,
স্বর্গচ, স্বর্গ অধিবাসী,
দেববৃন্দ ভ্রান্ত চিত্ত পাতাল প্রদেশে।”
বৃত্রসংহার।
Bত,
ধীরে ধীরে ধীরে রক্তিম তপন,
তৃতীয় আশ্রমী তাপস বেশে,
সৌম্য মূর্তি ধরি’ বসিলেন আসি,
অস্ত-অচলের শিখর দেশে।
ভুবন-মােহিনী গােধূলি সুন্দরী,
ধূষর বনে ঘােমটা টানি’
ধীরে আবরিত করি’ছেন নিজ
কমনীয় চারু বদন খানি।

৩৪
রাজপুতকুসুম।
অদূরে উন্নত ভূধর শিখরে,
ঝিকিমিকি করে তপন-কর ।
যেন পীত-রাগ-কনকে মণ্ডিত,
হইয়াছে এবে অচলবর।
৪
সেই মনোেহর গিরিপাদ দেশে
দাড়ায়ে একটী তরুণ বীর,
বিশাল উরা-প্রশস্ত ললাট,
ভীম ভুজদ্বয়, উন্নত শির।
আজি চিতােরের স্বর্গীয় সুষমা
করেছে হরণ যবনগণ ;
অনল-শিখায় হয়েছে আহুত,-
রাজপুতানার সর্বস্ব ধন।
আৰ্য-কুল-লক্ষ্মী শৃঙ্খলিতা আজি,
পিশাচ-প্রকৃতি, যবন-করে ;
একটী প্রদীপ-জ্বলি’ছে কেবল,-
শিশােদীয়কুল রক্ষার তরে ।

হামির। ৩৫ সেই চিতােরের গৌরব-প্রদীপ বীর-চূড়ামণি হামির একা, দাড়াইয়া এক গিরিপাদ দেশে, ললাটে বিষম চিন্তার লেখা। ৮ চিন্তার তরঙ্গ হইলে স্থগিত, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি’ হামির বীর, চীৎকারি’ বলিতে লাগিলেন তবে, ভুলি’ বীরদর্পে উন্নত শির। “হায় রে, চিতাের। যবনের দাস উপবিষ্ট তব আসন’পরে । শিশােদীয়-রাজ-কুল-লক্ষ্মী আজ- শৃঙ্খলিত তারি ঘৃণিত করে ! “বীর বাপ্পা রাও, যােগী সমর, পবিলি যেই আসন, হায়, যবনের দাস পাপ মালদেব, কলঙ্কিত আজি করি’ছে তায়!

রাজপুতকুসুম।
১১
“আমি নিৰ্ব্বাসিত চিতাের হইতে,
আমার রাজত্ব অপরে করে,
ধন্য রে নিয়তি, ধন্য বলি তােয়,
অপরূপ লীলা দেখা’স নরে।
১২
“না, না, তা কখন হবে না, হবে না,
থাকিতে হামির কইলবারে ।
কার সাধ্য আজি নিশ্চিন্ত হৃদয়ে,
সেই সিংহাসনে বসিতে পারে ?
“পাপ মালদেব ?-শ্বশুর আমার ?
শ্বশুর বলিয়া ছাড়িব তায় ?
ম্লেচ্ছ ক্রীতদাসে রাজত্ব অর্পিয়া,
জড়পিণ্ড সম রহিব, হায় ?
১৪
“প্রতিজ্ঞা,—উদ্ধার করিব চিতাের,
ধরিয়া কৃপাণ সুতীক্ষ্ণ ধার ।
মালদেব সহ যবন নিকরে,
অচিরে পাঠা’ব চম্বল পার।”

হমির।
এতেক কহিয়া বীরেন্দ্র হামির
গেলা ধীরে ধীরে প্রাসাদ মুখে ;
চিন্তা, ক্রোধ, ক্ষোভে হইয়া পীড়িত
পশিল ভবনে মনের দুখে।
বাছিয়া বাছিয়া নিপুণ সৈনিক,
বহু দিন ধরি’ করিয়া স্থির,
পৈতৃক আসন করিতে উদ্ধার,
সাজিলেন ত্বরা হামির বীর।
১৭
হেথা মীর গণে করিতে দমন,
সমর-সজ্জায় সজ্জিত হয়ে,
গিয়াছে চলিয়া মালদেব ভূপ,
যতেক প্রধান সেনানী লয়ে।
১৮
হামির তখন সময় বুঝিয়া,
ভবানী-চরণ-কমল স্মরি’
চিতাের উদ্দেশে নিজ সৈন্য সহ,
চলিলেন ভীম মূরতি ধরি।

রাজপুতকুসুম।
কানন, ভূধর করি’ বিলােড়িত,
চলিতে লাগিল বীরেন্দ্র চয় ;
তাহাদের সেই বীর-পদ-ভরে,-
সৰ্ব্ব রাজস্থান কম্পিত হয়।
তােরণ সমুখে ক্রমে উপনীত,
বীর হামিরের সেনানীগণ ।
চিতােরের যত রণ-ধুরন্ধর,-
আস্ফালি বিক্রমে চাহিল রণ।
অমনি তখন হামিরের সেনা,
তাদের প্রার্থনা পূরণ করে,
নিষ্কোষিত করি’ শাণিত কৃপণ,-
অগ্রসর হল প্রতাপ ভরে।
২২
নগর বাহিরে তুমুল সমর,
নন্দিত যত চিতােরবানী ;
বীরেন্দ্র হামির পিতৃ-সিংহাসন,
লইবেন আজি অরাতি নাশি'।

হামির।
তবু রাজপুত বিশ্বাসঘাতক,
এই অপবাদ বড়ই ডরে ;
ভাবী ভূপ সহ প্রাণপণে আজি,
যুঝি’ছে বিপুল সাহস ভরে।
২৪
অসিতে অলিতে লাগিয়া আঘাত,
অগ্নি-শিখা বেগে নির্গত হয় ।
বর্ষার আঘাতে—বণ বরিষণে,
সবারি শরীর শােণিতময়।
বীরেন্দ্র হামির বীর পরাক্রমে,
মথি’ছেন নিজ অরাতি দল ।
বহি’ছে হিল্লোলে শােণিত-লহরী
প্লাবিত করিয়া সমর স্থল।
বহু ক্ষণ ধরি’ করিয়া সমর,
নিঃশেষ চিতাের সেনানী চয় ;
রণাঙ্গন মাঝে উড়িল নিশান,
বীর হামিরের ঘােষিল জয়।

৪ ০
রাজপুতকুসুম।
२१
ধীরে ধীরে বীর প্রফুল্ল হৃদয়ে,
চলিলেন এবে প্রাসাদ মুখে ;
গগন ভেদিয়া-সৈনিক নিচয়,
করে জয়নাদ মনের সুখে।
২৮
হেথা হামিরের প্রেমের প্রতিমা,
কুসুম স্তবকে ভরিয়া ডালা,
প্রাণ-পতি-শিরে করিতে বর্ষণ,
অপেক্ষা করি’ছে সুন্দরী বালা।
২৯
ধীরে ধীরে ধীরে মৃদু পদক্ষেপে,
আগত হামির আনন্দ ভরে ;
অমনি সুন্দরী বরষে কুসুম,
জীবন-নাথের মস্তক’পরে।
বদন তুলিয়া হেরিল হামির,
হৃদয়-উদ্যান-লতিকা-ধনে
নয়নে নয়নে হইল মিলন,
সুখের লহরী বহিল মনে।

চণ্ড
৪১
“পিতার বিবাহ হেতু করি অঙ্গীকার ;
আজি হৈতে রাজ্যে মম নাহি অধিকার।”
মহাভারত।
দুর্নিবার কালচক্র নিষ্পেষণে,
বাপ্পার পবিত্র আসন’পরে,
বিরাজে এখন রাঠোর ভূপতি,
বাপ্পাকুলে পদে দলিত করে।
২
আজি চিতােরের বৃদ্ধ নরপতি,
লাক্ষরণা নিজ শশাণিত দানে,
উদ্ধার করিতে পূত গয়াধামে,
গিয়াছেন বীর নিভীক প্রাণে।

৪২
রাজপুতকুসুম।
কনিষ্ঠ কুমার পঞ্চম বর্ষীয়
বালক মুকুলে রাজত্বে বরি’,
গিয়াছেন চলি’ মিবার ঈশ্বর
লাক্ষ মহারাণা দলিতে অরি।
৪
লাক্ষ ভূপতির প্রথম তনয়,
বীরবর চণ্ড আনন্দ ভরে ,
অভিষেক করি’ কনিষ্ঠ ভ্রাতায়,
স্থাপিলেন রাজ আসন’পরে।
জনকের এক রহস্য কথায়,
বীর চণ্ড ছাড়ি’ রাজ্যের আশ,
কনিষ্ঠ ভ্রাতায় দিলেন আসন,
নিজ ভােগ-লিপ্সা করিয়া নাশ।
যথা পুরাকালে শান্তনুনন্দন,
বৃদ্ধ জনকের সুখের ভরে,
ত্যজি রাজপাট কীৰ্ত্তি সুবিমল
গিয়াছেন রাখি’ অবনী’পরে।

চণ্ড।
৭
সেইমত আজি চণ্ড বীরবর,
পিতার আদেশ শিরেতে ধরি,
বেড়িলেন পৃথ্বী কীর্ভি-মেখলায়,
বিমাতৃ-তনয়ে রাজত্বে বরি”।
৮
হেন অপরূপ আত্মত্যাগ আর,
কেহ না কোথাও দেখিতে পায়,
রাজপুতানার ভিখারী, চরণে,
আজিও তাহার কাহিনী গায় ।
অন্তিম বয়সে ক্ষত্র রাজগণ,
বিষয় বাসনা তেয়াগ করি’,
পরমার্থ-তত্ব লভিতে কাননে,-
যেতেন তাপস মূরতি ধরি।
যে দিন যুবন উদিল ভারতে,
সে ভাব ত্যজিল রাজন্ট দল ;
শতদ্রু, কাগার তরঙ্গিণী তীর,
হইল তাদের সাধন হল ।

৪৪
রাজপুতকুসুম
গয়ার উদ্ধার সাধনা বলিয়া,
গণিল এখন ভূপতিগণে ;
অরণ্য-নিবাসী তাপসের ব্রত,
পরিণত হল ভীষণ রণে।
তাই চলিলেন লাক্ষ গয়াধামে,
দিয়া রাজ্যভার চওের করে ।
মুকুল বালক তাই চণ্ড বীর
শাসন বাির তাহার তরে।
চণ্ডের প্রভু ত্ব
করিয়া দর্শন,
হলেন পিতা মুকুল-মাতা ;
গেলা মান্দু মুখে চণ্ড বীরবর,-
ছাড়ি’ রাজ্যভার, কনিষ্ঠ ভ্রাতা।
১৪
.
হেথা মুকুরে মাতামহ কুল,
রাঠোর বংশীয় ক্ষত্রিয়গণ ,
ধীরে ধীরে আনি পশিল চিতােরে,
স্বকার্য্য ধতে করিয়া মন।

চও।
বালক মুকুলে পুতুলের মত,
প্রতিষ্ঠিত করি আসন’পরে,
মনের হরিষে রাঠোর নিকর
চিতাের নগরী শাসন করে।
ক্রমে জানিলেন মুকুলের মাতা,
তার পিতৃকুল রাঠোরগণ,
চিতাের আসন করিবে হরণ,-
বিনাশি’ তাহার অঞ্চল ধন।
০
১৭
অশনি সম্পাতে মর্মাহত প্রায়
হলেন অধীরা বিধবা সতী ;
কে রাখিবে এবে মুকুলের প্রাণ?
চিতােরের হায়, কি হবে গতি?
১৮
এ ঘাের বিপদে করিতে উদ্ধার,
নাহি চণ্ড বিনা দ্বিতীয় জন ;
আবার তখন মুকুল-জননী,
সপত্নী-সুতের শরণ লন।

রাজপুত কুসুম।
ভাতার জীবনে শুনিয়া বিপদ,
ব্যাকুল-হৃদয় হইল বীর ;
চিতােরাভিমুখে হলেন ধাবিত
সদুপায় এক করিতে স্থির।
মুকুল-জননী চণ্ডের সহিত,
গােপনে গােপনে মন্ত্রণা করি,
মুকুল সহিত হলেন বাহির
ত্যাগ করি’ পাপ চিতাের পুরী।
২১
আজি কৃষ্ণপক্ষ চতুর্দশী নিশি,
সমস্ত জগৎ আঁধারময় ;
শুধু শিরােপরি নীল নভস্তলে,
জ্বলে মিটি মিটি তারকা চয়।
२२
••
নিবিড় আঁধারে আবৃত সকল, .
পথ ঘাট সব আঁধারে ঢাকা
যেন ধরিত্রীর রাত্রি-বাস খানি,
অসিত বরণ আঁধারে মাখা।

চও। ১৭ সেই তামসীর আঁধার ভেদিয়া, চলি’ছে কতটা ক্ষত্রিয় বীর ; ক্রমে চিতােরের রামপােল দ্বারে, আসিয়া সকলে হইল স্থির। 28 জিজ্ঞাসা করিল প্রহরী নিকর- ‘কে তােমারা পুরী পশিতে চাও ? উত্তর,‘রাখিব রাজার কুমারে, ত্বরা করি দ্বার ছাড়িয়া দাও। २९ হেরি রণবেশ গণিয়া প্রমাদ, রােধিল যতেক প্রহরীগণ। নিমেষে অমনি আগন্তুক চয়, আরম্ভ করিল তুমুল রণ। বীরবর চণ্ড নায়ক তাদের, ‘বম, হর হর’-বলিয়া তবে নগর ভিতরে, পাড়ি’ ধরাতলে প্রহরী সবে। মুহূর্তে পশিল

৪৮
রাজপুত কুসুম।
২৭
অমনি তখন রাঠোর নিকর,
হুহুঙ্কার করি’ আসিল ছুটে ;
নৈশ নীরবতা করিয়া বিদার,-
সেই ভীম রব গগনে উঠে।
।
২৮
সেই হুহুঙ্কার করিয়া শ্রবণ,
বীর চণ্ড নিজ দৈনিক সনে,
নিষ্কোষি কৃপাণ আরম্ভিল রণ,
নিৰ্ম্মল করিতে অরাতিগণে।
২১
অচিরে বীরেন্দ্র চণ্ডের প্রতাপে,
নিঃশেষ হইল রাঠোর চয় ;
অমনি তখন কঁাপায়ে চিতাের,
উঠিল আকাশে-চণ্ডের জয়।
রাঠোর গণের হৃদয়-শােণিতে,
চিতাের আসন হইল পূত ;
বীর চণ্ড সেই পবিত্র আসনে-
স্থাপিলেন পুনঃ বিমাতৃ-সুত।

কুম্ভ।
পশে যদি কাকোদর গরুড়ের নীড়ে,
ফিরি কি সে যায় কভু আপন বিবরে—”
মেঘনাদবধ।
ভীম প্রভঞ্জন উঠিয়া গগনে,
যেমন ভীষণ গর্জন করে,
নিবায় প্রদীপ্ত অনল শিখায়,
করে ধূম শেষ বিক্রম ভরে।
२
আবার যখন সে ভীম ঝটিকা
হয় মন্দগতি, অনল তবে
বিদারিয়া সেই ঘন ধূম রাশি,
প্রজ্বলিত হয় প্রবল রবে।

রাজপুতকুসুম।
তেমতি প্রচণ্ড প্রভঞ্জন সম,
যবন নিকর ভারত ভূমে
আৰ্য-বীৰ্য-বহ্নি করি’ নিৰ্বাপিত,
ঢাকিল ভারত বিষাদ-ধূমে।
৪
সে ঘাের বাত্যার প্রচণ্ড বিক্রম,
মন্দীভুত এবে ভারত’পরে ।
মিবার হইতে আর্য-বীৰ্য-বহ্নি
উঠিল জ্বলিয়া গভীর স্বরে।
সেই অনলের উজ্জ্বল কিরণে
হাসি’ছে চিতাের নগরী আজ ;
আর্য-কুল-লক্ষ্মী পুলকে মাতিয়া,
ধরেছেন মনােমােহিনী সাজ।
উপবিষ্ট আজি কুম্ভ
বীরবর ,
চিতােরের রাজ-আসন’পরে ;
সমগ্র ভারত-ভূপতি-নিকর
কম্পিত যাহার বিক্রম ভরে।

দিল্লীর সম্রাট দিল্লীর আসনে
কুম্ভের প্রতাপে কম্পিত কায় ;
আজি হিন্দুস্থানে যবন নিকর
বিষদন্ত হীন ভুজঙ্গ প্রায়।
৮
‘ককেশশ’ গিরি শিখর হইতে,
যে প্রচণ্ড স্রোত নিঃসৃত হয়ে
প্লাবিত করিল ভারতবরষ,
বিপর্যস্ত করি’ পাঠান চয়ে।
==
১
একবার সেই স্রোত দুর্নিবার,
কুম্ভ নৃপতির বিক্রম ভরে,
প্রতিহত হয়ে ককেশশ মুখে
গিয়াছিল পুনঃ উজান ধরে ।
সেই দৃষদ্বতী তরঙ্গিণী তীরে-
ভারতের সেই ভীষণ রণে
‘যােগী সমর’ হলেন বিলীন
ভারত-গৌরব-ভাস্কর সনে।

রাজপুতকুসুম।
১১
সেই প্ৰবাহিণী তীরে পুনর্বার
নাচিয়া নাচিয়া সমীর ভরে
উড়িল কুম্ভের বিজয় নিশান,
নীল নভােদেশ উজল করে।
১২
কুম্ভ নৃপতির বীর পরাক্রমে
ভারত-জননী সহাস্য মুখ,
হাস্যময়ী আজি চির অভাগিনী
বিদূরিত করি’ মনের দুখ ।
ভারতের বেশ দেখি’ছেন আজি
ত্রিদিব হইতে অমরগণ ;
পিতৃলােক হতে পিতৃ দেবগণ
হেরিয়া সে শােভা প্রসন্ন মন।
১৪
এবে মিরের গৌরব-চন্দ্রিমা
শেতে শীর্ষ দেশে আনন্দ ভরে,
আর আর যত নৃপতি নিকর
প্রভাহীন সেই চাদিমা-করে।

সে বিমল ভাতি না পারি’ সহিতে,
মালব ভূপতি, গুজ্জর-রাজ,
কুম্ভের প্রতাপ প্রতিহত তরে,
আগত হয়েছে মিবারে আজ।
অসূয়া-বিদগ্ধ হইয়া যবন,
অগণন সেনা সংগ্রহ করে,
চিতাের নগরী বিধ্বস্ত করিতে-
উপনীত আজি জিগীষাভরে।
১৭
বিলস্থ নিরীহ অহিবরে যথা
অদোষে আঘাত করিলে কেহ,
অমনি ভুজঙ্গ ফণা প্রহরণে
পাঠায় তাহারে শমন-গেহ।
অথবা যদ্যপি খগেন্দ্র-কুলায়ে
পশে উরঙ্গম সাহস ভরে,
তা হলে যেমতি হয় তার প্রাণ
নিৰ্বাপিত চির দিনের তরে।

রাজপুতকুসুম
তেমতি যখন কুম্ভ বীরবর
ছিলেন আরূঢ় মিবারাসনে,
সে সময় দুই যবন তনয়
আসিল তথায় নির্ভীক মনে।
কিন্তু অবিলম্বে কুম্ভ বীর-করে
পাইল দুজনে উচিত ফল ;
ক্ষত্রিয়ের সহ সমুখ সমরে
হইল বিনষ্ট যবন দল।
স্বাধীনতা লীলা-নিকেতন সম
মিবার ভূমিতে আগত আজ,
মালব ঈশ্বর, গুর্জর ভূপতি,
শুনিলেন যবে চিতাের-রাজ,
২২
অমনি বীরেন্দ্র ক্রোধে গরজিয়া
আদেশ করিল সেনানী চয়ে,
সমর সজ্জায় হইয়া সজ্জিত
অগ্রসর হতে অরাতি ক্ষয়ে।

কুন্ত।
বিবিধ আয়ুধে হ’য়ে বিভূষিত,
যুঝিবারে আজি যবন সাথ
হলেন ধাবিত সেনাগণ সহ
কুম্ভ বীরবর চিতোর নাথ ।
২৪
মিবার ভূমির সীমান্ত প্রদেশে
ক্ষত্রিয় যবনে হইল রণ;
যার অনুপম বীরত্ব কাহিনী
গায় অদ্যাবধি চরণ গণ।
উভয় বাহিনী যুঝে ঘােরতর,
হানে অবিরাম কৃপাণ ভীম
শােণিতাক্ত হয়ে ধরণী উপরে
পড়িছে সেনানী অপরিসীম।
যতক্ষণ বল আছিল হৃদয়ে,
সাহলে সবাই যুঝিল আজি
ক্রমশঃ হইয়া শিথিল বিক্রম
নিঃশেষিত হ’ল যবন-রাজি।

রাজপুতকুসুম।
২৭
যবন-বাহিনী দলিত দেখিয়া,
ক্ষত্ৰগণ জয় নিনাদ করে ।
উড়িল কুম্ভের বিজয় নিশান
হেলি’ দুলি’ রঙ্গে সমীর ভরে।
২৮
শৃঙ্খলিত আজি ভীষণ সমরে
পাপ মহম্মদ মালব-পতি ;
আনিলেন তারে চিতোর নগরে
বীর কুম্ভ হয়ে প্রফুল্ল মতি।
সেই সময়ের ঘটনা অবলী
করিতে খােদিত চিতাের-রাজ
নিরমিলা এক অভ্রভেদী শির
শুম্ভ সুবিশাল মিবার মাঝ ।
আজিও মিবারে সেই ‘জয়স্তম্ভ’
শনি অভেদ্য মূরতি ধরি’
করি’ছে কুম্ভের বিজয় ঘােষণা,
হিমালয় পানে কটাক্ষ করি।

পৃথ্বীরাজ।
পৃথ্বীরাজ।
“সাজিলা রাবণবধ, রাবণ-নন্দন,
অতুল জগতে দেহে, বামা কুলােত্তমা
প্রমীলা, পুরুষােত্তম মেঘনাদ বলী।”
মেঘনাদবধ
হাসি’ছে চন্দ্রমা সুনীল গগনে,
পরিয়া হরষে তারকা-হার ।
লভি’ছে আনন্দ প্রকৃতি সুন্দরী
পান করি’ শশি-পীষুষ-ধার।
२
সরােবরে বলি’ কুমুদিনী সতী
খুলি ধীরে ধীরে বদন খানি
হেরি’ছে আপন হৃদয়-রতনে,
লােক লাজ ভয় নাহিক মানি।

রাজপুতকুসুম।
উড়ি’ছে চকোর পুলকে মাতিয়া
নীল সুবিমল গগনােপরি ।
মনের হরিষে করিতেছে পান
চাদিমা-কিরণ হৃদয় ভরি।
৪
হেন মনােহর নিশীথ সময়ে,
বেদনের রাজপ্রাসাদ মাবে
দাড়ায়ে একটা সুন্দর যুবক
সজ্জিত হইয়া সমর সাজে।
সুমুখে তার ইন্দুপ্রভা জিনি’
বিকাশি’ মােহিনী রূপের ডালা
বসুমতী পানে করিয়া বদন,
দাড়ায়ে একটি সরলা বালা।
মুহু অতীত, উভয়ে নীরব,
পরে সে যুবক বদন তুলি
বলিতে লাগিল সুন্দরীবালয়
আপন হৃদয়-কবাট খুলি।

পৃথ্বীরাজ।
“ৰিদায়—বিদায় সরল ললনে।
চলিলাম আজি ভীষণ রণে,
তােমার লাগিয়া বিপদ-সাগরে
দিলাম সাঁতার নির্ভয় মনে।
৮
“তােমার লাগিয়া চলিলাম আজি
নিপাত করিতে যান চয়,
সাবধান যেন মম আশালতা
নিরাশে বিশুষ্ক নাহিক হয়।”
৯
সে কথা শুনিয়া সরলা সুন্দরী
তুলি ধীরে ধীরে বদন খানি
কহিতে লাগিল যুবক প্রবরে
যােড় করি কম যুগল পাণি।
“বীরবর! এই দুখিনীর মন,
পূজি’ছে সতত ও পদ দ্বয় ;
আপনার লাগি’ অভাগী হৃদয়
দিবস রজনী আবেগময়।

রাজপুতকুম।
শুধু অভাগীর এই নিবেদন,
যেই ভীম ব্রত সাধন করে
অবতীর্ণ আজি ভীষণ আহবে,
পিতার নিকট প্রতিজ্ঞা করে।
১২
“স্বীয় বীৰ্য্য বল করি’ প্রদর্শন,
নিপাত করিয়া অরাতি চয়,
রাখুন অক্ষয় কীর্তি ভূমণ্ডলে,
ভারতে সবাই ঘােষুক জয়।
“চলুন বীরেন্দ্র! আপনার সনে
এই অভাগীও যাইবে আজ ।
অভাগিনী তারা অনেক সময়
করেছে ধারণ সমর-সাজ।”
১৪
এতেক কহিয়া বীরাঙ্গনা তারা
করিয়া ধারণ পুরুষ বেশ
পৃথ্বীরাজ সনে চলিল তখন
উদ্ধারিতে নিজ পিতার দেশ।

পৃথ্বীরাজ।
সজ্জিত হইল বীরেন্দ্র নিকর
প্রফুল্ল অন্তর হইয়া তবে,
হ’ল অগ্রসর হােড়াতঙ্ক মুখে
‘ব হর হর ভৈরব রবে ।
আজ ‘মহরম তােড়াতঙ্ক পুরে,
সজ্জিত নগরী সুন্দর বেশে;
হােসেন’ ‘হোসেন’ বলিয়া মনে
ভমি’ছে আনন্দ-সাগরে ভেসে।
যতেক যবন মহােৎসবে মাতি
উলঙ্গ কৃপাণ সতেজে ধরি
পরস্পর সবে খেলি’ছে কৌতুকে,
তােড়াতঙ্ক পুরী কম্পিত করি।
এবে নগরীর চত্বর হইতে
সানন্দ অন্তরে যবন গণ
‘তাজিয়া লইয়া হইল বাহির,
মহােদবে মত্ত সবার মন।

৬২
রাজপুতকুসুম।
সেই জনতায় ক্ষত্ৰ বীরগণ
নগর-প্রাকারে অলক্ষ্যে পশি’
হ’ল অগ্রসর রাজবাটী মুখে,
লুক্কায়িত করি’ কোষ অসি
বেশ ভুষা করি’ যবন ভূপতি
ছিলেন দাড়ায়ে অলিন্দ’পর ।
অমনি তারার কোদণ্ড হইতে
নিমেষে ছুটিল একটী শর।
পৃথীও তখনি তুলি’ ভীম শূল
মুহূর্তে হানিল বিক্রম ভরে ।
শেই শূলাঘাতে যবন ভূপতি
হলেন শায়িত ধরণী’পরে ।
অমনি যতেক ক্রোধান্ধ যবন
চারি দিক হতে আসিল তবে,
গভীর নিনাদে গরজন করি,
আক্রমিল ক্ষত্ৰ বীরেন্দ্র সবে।

পৃথ্বীরাজ।
২৩
নিস্তেজ নহেক ক্ষত্ৰ বীরগণ,
তারাও তখন দ্বিগুণ বলে
শায়িত করিতে লাগিল যবনে,
ভীমা অলিঘাতে বসুধাতলে।
२
বীর পৃথ্বীরাজ বীরাঙ্গনা তারা,
জয় মা ভবানী’ বলিয়া মুখে,
শাণিত অলির শােণিত-পিপাসা
মিটাতে লাগিল মনের সুখে।
তাহাদের সেই ভীম পরাক্রম,
পারি’ সহিতে যবনগণ
পলা’তে লাগিল চারিদিকে সবে
ভঙ্গ দিয়া সেই ভীষণ রণ।
যেমন প্রচণ্ড করি-কাঘাতে
পাড়ে ধরাপৃষ্ঠে বিটপী চয়,
সেই রূপ পৃথ্বী পশ্চাতে ধাইয়া
যতেক যবনে করিল ক্ষয়।

৬৪
রাজপুতকুসুম।
२१
নিৰ্ম্মল করিয়া পাপ ম্লেচ্ছগণে,
অপহৃত ধন উদ্ধার করি,
বিজয় নিশান তুলিয়া গগনে
তারা পৃথ্বীরাজ ত্যজিল পুরী।
২৮
আসিয়া দু’জনে করিল প্রণাম
বেদনাের নাথ ভূপতিবরে ;
আনন্দে তখন সুরতান রায়
অর্পিল। তারায় পৃথীর করে।
২৯
যে সুর সুন্দরী দেবতা বলিয়া
পুজনীয়া রাজপুতানাময়,
আজিও সকলে হৃদয় ভরিয়া
করয়ে কীৰ্ত্তন যাহার জয়।
সেই তারা আজি পৃথ্বীরাঙ্গ সনে
পরিণয় পাশে আবদ্ধ হয়ে,
সেবিতে লাগিল আনন্দিত মনে
নিজ প্রাণেশের চরণদ্বয়ে।

সংগ্রাম সিংহ।
সংগ্রাম সিংহ।
——নিম্নে চ্ছ পৃথী কবি এবার
তুপাকারে র’বে পড়ি সমর-প্রাঙ্গণে
রাবণের চিতা সম মেচ্ছ ভস্মসার।”
চিত্তমুকুর
পীত’ তরঙ্গিণী তটোপরি আজ
যবন-শিবির বিরাজ করে।
শিবির মাঝারে যবন নিকর
অবস্থিত ঘাের বিষাদ ভরে ;
২
ক্ষত্রিয়-কেশরী সংগ্রাম সিংহের
দোর্দণ্ড প্রতাপে দলিত প্রয়,
বীর বাবরের অনিকিনী আজ
মহা হব ভয়ে কম্পিত কায় ।

রাজপুতকুসুম।
সেনানী নিকরে হতাশ্বাস দেখি,
বীরেন্দ্র বাবর গম্ভীর স্বরে
আরম্ভিলা তবে বলিতে সকলে,
সবার হৃদয় স্তম্ভিত করে।
-
৪
“বীরগণ—আজি কাফেরের ভয়ে
নিস্তেজ হইয়া রয়েছ বসি ?
জড়ের মতন অবস্থিত সবে,
কটি তটে বাঁধা থাকিতে অাস ?
না
“যেই বীরগণ হিন্দুকুশ শিরে
ভীম পরাক্রমে অরাতি চয়,
নিপাত করিল অমির আঘাতে,
আজি তারা সবে বিষাদময় ?
* “ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত তোমরা,
বিসজ্জিবে সবে সে ধৰ্ম্ম ধনে,
ইন্দ্রিয় সেবনে থাকিয়া নিরত,
মজিয়ে
কষে
বীরেন্দ্রগণ ?

সংগ্রাম সিংহ।
“ভাঙ্গ সুরাপাত্র,—দুর কর সুরা,
চিত্ত শুদ্ধ আজি করহ সবে ;
কোরাণ ধরিয়া-শপথ করিয়া,
নাশ হিন্দুগণে ভীষণ রবে।”
সেই ওজম্বিনী বক্তৃতা শ্রবণে
নাচিয়া উঠিল যবন গণ ;
‘কোরাণ ধরিয়া করিল শপথ,
উন্মত্ত হইল করিতে রণ।
১
দ্বিগুণ সাহস করিয়া আশ্রয়
বাণিরিল সবে সমর সাজে ।
ক্ষত্রিয় যবনে তুমুল সংগ্রাম
আরম্ভ হইল অনতি ব্যাজে।
কিন্তু ক্ষত্রিয়ের ভীম আক্রমণে
অস্থির হইল যবন চয়,
ভঙ্গ দিয়া সবে করিল প্রস্থান,
উঠিল গগনে “রাণার জয়।

রাজপুতকুসুম।
তখন বারর ব্যথিত হৃদয়ে,
সেই ভীম রণ নিৰ্ব্বাণ ভরে,
রাণার নিকট সন্ধি প্রস্তাবিতে
পাঠাইলা এক সন্দেশহরে।
হেথায় শিবিরে বসি’ ফুল্ল মনে,
বীরেন্দ্র কেশরী চিতােরপতি ;
তাহার সমুখে দাড়াইলা আসি’
বাবরের দূত করিয়া নতি।
১
দুত প্রমুখৎ বাবর সাহের
সন্ধি-প্রস্তাবনা শুনিয়া তবে,
কহিলেন দুতে চিতাের ভূপতি
ক্রোধে গরজিয়া ভীষণ রবে।
১৪
“চাহিনে শুনিতে থাকিতে জীবন,
সন্ধি-প্রস্তাবনা লেন্থের সহ,
প্রতিজ্ঞা-যবনে কৰি নিৰ্ম্মল,
যাও দূত তব বাবরে কহ।”

সংগ্রাম সিংহ।
ধীরে ধীরে দত করিয়া প্রস্থান,
জ্ঞাপন করিল যবনরাজে ।
তখন বাবর নিজ সৈন্য সহ
আবার নাজিল সমর সাজে।
“আল্লা’ ‘আলা’ রবে যবন সেনানী
আক্রমিল আনি’ ক্ষত্রিয় গণে,
‘মা ভই’ ‘মা ভই’ ভীষণ নিনাদে
রাণাও তখন মাতিল রণে।
১৭
নাচিল তুরঙ্গ হেঁষা রব করি”
ছুটিল যতেক তুরগ-গামী ;
মাতঙ্গ নিকর করিয়া বৃংহন
মাতাইল। সেই সমর-ভূমি।
তাহার মাঝেতে গরজি’ ঘনে
ভীষণ নিনাদী কামান চয়,
মুহুত্ত ভিতরে সমর অঙ্গন
করিল নিবিড় আঁধারময়।

৭
রাজপুতকুসুম।
অমল বরণ গােলক সমূহ
সেই রণস্থল কম্পিত করি,
নিমেষে শতেক রাজপুত সনে,
ফেলিতে লাগিল ধরণী’পরি।
তথাপি নির্ভীক ক্ষত্রিয় সকল
বিক্রমে-“জয় মা ভবানী’ বলি,
নাশিতে লাগিল যবন-বাহিনী,
অগ্নিপ্রসবিনী কামান দলি।
২১
দ্বিগুণ সাহসে করিয়া আশ্রয়,
হানিল সঘনে শাণিত অসি ।
পড়িতে লাগিল তাহার প্রভাবে
যবনের শির ভূতলে খসি।
২২
সহসা আবার গর্জিল কামান
অাধার করিয়া সমর-স্থল,
মুহূর্তে যবন-সেনায় মিলিল,
ক্ষত্র সেনা হ’তে একটী দল।

সংগ্রাম সিংহ।
৭১
অমনি বীরেন্দ্র সতের হৃদয়
হইল শুতি নিমেষ তরে ;
আবার আঁধারি সমর-অঙ্গন,
গর্জিল কামান গভীর স্বরে।
২৪
সেই ধূম রাশি মিশিলে বিমানে,
দেখিলেন চাহি চিতাের-রাজ,
শিলাদিত্য নামে জনেক সেনানী
মিলেছে বদলে যবন মাঝ ।
সেই ভীম দৃশ্য করিয়া দর্শন,
বিষাদে রাণা স্তম্ভিত হ’ল ;
নিমেষে সে ভাব করি পরিহার,
আশ্রয় করিল দ্বিগুণ বল ।
সঙ্গের বিক্রমে ক্ষত্রবীর-দাপে,
কম্পিত হইল যবন চয়;
মুহূর্ত ভিতরে পীত তরঙ্গিণী
হইল যবন শোণিত নয়।

রাজপুতকুসুম
২৭
কিন্তু অগণন অরাতির সহ
কতক্ষণ আর যুঝিতে পারে;
ক্ষণেক যুঝিয়া একে একে সব
হইল নিহত যবন-করে।
২৮
ধীরে ধীরে তবে বীরেন্দ্র সংগ্রাম
চলিল ত্যজিয়। সমর স্থল ;
তুলিল তখন বিজয়-নিশান
আনন্দিত মনে যুবন দল।
আজি যদি সেই পাপ শিলাদিত্য,
নাহিক মিশিত যবন দলে,
তা হলে নিশ্চয় বাবরের শির
দলিত শৃগালে চরণ-তলে ।
শিলাদিত্য, তব এ কলঙ্ক
রবে চিরদিন অঙ্কিত ভবে ;
তব পাপ নামে করিবে ধিক্কার,
প্রতিক্ষণ আৰ্য-তনয় সবে।

জয়ম ও পুত্ত।
জমল ও পুত্ত।
অতীর তিমিরে ধিরে জল স্থল সর্বচরাচর,
চিতাম ঘন ছায় রে গগন,
বিষাদে বিষাদময় চিতাের নগর।”
সরােজিনী।
মােগল-কেশরী বীর আকবর
চিতাের নগরী করিতে জয়
উপস্থিত আজি দুর্ণিবার বেগে,
লইয়া প্রমত্ত সৈনিক চয়।
২
বার যখন মােগল সম্রাট
রােধিলেন আসি’ চিতাের পুরী,
করিল বিমুখ বীরাঙ্গনা এক
কৃপাণের বলে বিনাশি’ অরি।

৭৪
রাজপুতকুসুম।
রমণী সমরে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে
পলাইলা সবে ছাড়িয়া রণ;
তার প্রতিহিংসা লইতে আবার
সমবেত আজি যবন গণ।
৪
চিতােরের রাণা কাপুরুষরাজ
নিজ রাজধানী ছাড়িয়া হায়,
শৃগালের ন্যায় করিল প্রস্থান
চিতের নগরী বিধ্বস্ত প্রায়।
•
হায়! কতবার এ চিতোর ধাম,
করেছে শ্মশান যবন দলে ;
আবার যেন বা ভস্মরাশি হতে,
নব অভ্যুদয় স্বর্গীয় বলে ।
আজি মহারাণা যবনের ভয়ে
করিল প্রস্থান কানন পারে ;
বীর শাহিদাস নিজ সৈন্য সহ
দাড়াইলা সূৰ্য্য তােরণ’ দ্বারে।

জয়মল ও পুত্ত
৭
প্রভঞ্জন বেগে যবন নিকর
দলে দলে তথা জুটিল আসি।
বীর শাহিদা রােধিল সে দল
আকবর পানে ঈষৎ হাসি।
তখন যবন-পতি আকবর
ক্রোধে গরজিয়া মাতিল রণে।
প্রচণ্ড বিক্রমে লাগিল নাশিতে,
অসি, শূলাঘাতে ক্ষত্রিয় গণে।
কামানের ধূমে আচ্ছন্ন মেদিনী,
নাদি’ছে বিকট যবন সব,
রাজপুতগণ করি’ছে সঘনে
‘বম্ হর হর ভবানী’ রব।
গোলার বর্ষণে, অমির আঘাতে,
পড়িতে লাগিল ক্ষত্রিয় চয় ;
আনন্দ অন্তরে যবন-বাহিনী,
ছাড়ে নাদ ‘জয় দিল্লীর জয়।

রাজপুতকুসুম।
;
তথাপি নির্ভীক আৰ্য্য-বীরগণ
অচল সমান রহিল স্থির
যত ক্ষণ দেহে থাকিল জীবন,
ছাড়িল দ্বার একটী বীর।
যেমন হিমাদ্রি অটল হৃদয়ে
শত বজ্রাঘাত হৃদয়ে ধরে
সেইরূপ আজি বীর শাহিদা
উপেক্ষি’ছে শূল, কপাণ, শরে।
শেষ রক্তবিন্দু ছিল যত ক্ষণ,
যুঝিল বীরেন্দ্র নির্ভীক-মতি।
ক্রমে অবশেষে মুদিলেন আঁখি,
পশিল চিতােরে যবন-পতি।
১৪
অমনি তখন যােড়শ বর্ষীয়
বীরবর পুত্ত সমর-সাজে,
হলেন উদিত ক্ষত্র-পুরােভাগে,
যেন কার্ত্তিকেয় অমর মাঝে।

জয়মল্ল ও পুত্ত ।
অবিলম্বে পুনঃ জননী ভাহার,
পুত্র-বধূ আর দুহিতা লয়ে,
নামিলা ভীষণ যবন-সমরে-
রণচণ্ডী-বেশে—সজ্জিত হয়ে ।
ভীম পরাক্রমে লাগিল যুঝিতে,
বীরবর পুত্ত প্রফুল্ল মনে ;
কামানের গােলা চরণে দলিয়া,
নাশিতে লাগিল অরাতি-গণে।
সহসা আবার ক্ষত্রিয়-কেশরী,
বীর জয়মল রাঠোর-রাজ ;
স্বদেশ রক্ষিতে নামিলেন রণে,
ধরিয়া অপূৰ্ব সমর-সাজ।
এবে জয়মল পুত্ত বীর আর
খর করবাল পুলকে ধরি,
মিলি’ দু’জনায় লাগিল যুঝিতে,
যবন-বাহিনী দলিত করি ।

৭৮
রাজপুতকুসুম
কামানের ধূমে আঁধার চৌদিক
তবুও আনন্দে ক্ষত্রিয়গণ
‘জয় মা ভবানী’ বলি’ ঘন ঘন,
করিতে লাগিল ভীষণ রণ।
২০
ক্ষত্রিয়গণের প্রচণ্ড প্রতাপে
শ্লেচ্ছ-অনিকিনী কম্পিত কায়
ভীষণ কৃপাণ ভীম শূলাঘাতে
হইতে লাগিল নিঃশেষ প্রায়।
২১
এমন সময় ভীম গরজনে,
উল্কা সম ধূম বিদীর্ণ করে,
একটী গােলক জয়মল্ল বীরে
শায়িত করিল বসুধা’পরে।
২২
ভশন (ও) মুমুর্ষ ধরাশায়ী বীর
চিতােরের ভরে চিন্তিত হায় ;
ক্ষণেক মুদিয়া নয়ন যুগল,
ডাকিলেন উচ্চে ভবানী মায় ।

জয়মল ও পুত্ত।
৭৯
নগর রক্ষার না দেখি’ উপায়,
ত্যজি’ দুই বিন্দু নয়ন-জল,
মুদিলেন আঁখি জয়মল্ল বীর,
পাথারে ভাসায়ে ক্ষত্রিয় দল।
২৪
তবু ক্ষত্রগণ নহে নিরুদ্যম,
লাগিল যুঝিতে বিক্রম ভরে ;
সঘনে হানি’ছে জ্যোতির্ময়ী অলি,
সমর-অঙ্গন কম্পিত করে।
কিন্তু যবনের ভীম আক্রমণে,
ক্রমে ক্রমে যত ক্ষত্রিয়গণ
মুদিতে লাগিল নয়ন-পল্লব,
রহিল তথা একটী জন ।
হেথায় যতেক রাজপুত-সতী
সতীত্ব-রতন রক্ষার তরে,
বিনজ্জিল তনু অনল-শিখায়,
সহস্র-কিরণে প্রণাম করে।

রাজপুতকুসুম।
২৭
যেন চিতােরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী,
উদয় সিংহের পাপেতে আজ,
এতদিন পরে চলিলেন ছড়ি’
চিতােরের শিরে হানিয়া বাজ।
২৮
শ্মশান হইল চিতাের নগরী,
আচ্ছন্ন আকাশ চিতার ধূমে ।
জয়ী আকবর আনন্দ অন্তরে
উপনীত সেই বিজন ভুমে।
২৯
দেখিল চৌদিকে ধূ ধূ করে চিত।
জ্বলি’ছে কেবল ভীষণ রূপে,
সেই ভীম দৃশ্য বিভীষিকাময়,
স্তম্ভিত করিল যবন-ভূপে।
অমরাবতীর স্বরূপ চিতাের,
বিজন শ্মশান হইল আজ ;
তার মাঝে তুলি’ বিজয়-নিশান,
জমিতে লাগিল যবন-রাজ।

প্রতাপ সিংহ।
প্রতাপ সিংহ।
“ নাহি প্রতাপের শোনাে অন্য কোন বল,.
হৃদয়ের বীৰ্য্য আর কৃপাণ সম্বল।
যবন বিপুব মাঝ , কিসের ভাবনা আজ,
ধ্রুবতারা রূপে যবে প্রতাপ উদয়,
চন্দ্রসূর্য থেকে সাক্ষী, অাবার বিজয় লক্ষ্মী,
প্রতাপের গুণে শুধু হবেন সদয়।
অশ্রুমতী।
উন্নত ভূধর-নিবিড় কানন,
বিরাজে ভীষণ মূরতি ধরি,
যেন বা নীরবে কালের তরঙ্গ
করি’ছে গণনা পুলক ভরে।
বিশাল গিরির শিখরে দাড়ায়ে,
যে দিকে ফিরাও নয়ন দ্বয়,
বােধ হয় যেন অসীম জগৎ,
শুধুই অচল কাননময় ।

| ৮২
রাজপুতকুসুম।
সেই দুরগম গিরি-পাদদেশ,
দলিয়া যতেক ক্ষত্রিয় বীর,
রয়েছে দাড়ায়ে বিপুল সাহসে,
তুলি’ বীর-দাপে উন্নত শির।
নীরব কানন, নীরব ভূধর,
নীরব যতেক ক্ষত্রিয় চয়,
নীরব পাখীর মধুর কুজন,
সমীর এখন নীরবে বয়।
সহসা উঠিল গভীর আরাব,
বিলােড়িত করি’ অচল, বন ;
করিল গর্জন বীরেন্দ্র
প্রতাপ
আম্বানি’ আপন সৈনিকগণ।
“বীরগণ !
আজি শ্মশান মিবার,
প্রেত-ভুমি দেখ সােনার দেশ;
পিশাচ যবন করেছে মলিন,
বীর-প্রসূতির সুন্দর বেশ!

প্রতাপ সিংহ।
৭
“যেই মিবারের ভীম গরজনে
হিমাদ্রি-শিখর কঁাপিত ভয়ে,
নীলাম্বু-নিধির তরঙ্গ-লহরী
যাইত সভয়ে উজান ব’য়ে।
উচ্ছলিত হ’ত জাহ্নবীর জল,
কাপিত দিল্লীর সম্রাটগণ,
আজি কি না সেই বীর প্রসবিনী,
ভীষণ শ্মশান-বিজন বন,
.
“মনের জড়তা কর পরিহার,
উলঙ্গ কৃপাণ ধরহ করে ।
আর্যের প্রতাপ দেখাও যবনে,
ভীষণ সংহার মূরতি ধ’র ।
১০
ছিড় ক যবন গ্রহ তারা গণ,
ডুবাক বসুধা সাগর-জলে,
তথাপি তথাপি নাহিক পারিবে
কম্পিত করিতে ক্ষত্রিয় দলে।

৪
রাজপুতকুসুম।
১১
“কি ছার যবন ?-মানব তাহারা,
আসে যদি আজি অসুর-সবে
তবুও দেখিবে ক্ষত্রিয়-নিকর
অমাত্র ভীত নাহিক হবে।
এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ফেলুক বিদারি
হানিয়া দম্ভোলি ত্রিদিবরাজ,
তথাপি ক্ষত্রিয় পাতিয়া হৃদয়
করিবে ধারণ সে ভীম বাজ।
দ্বাদশ আদিত্য হউক উদয়,
আসুক পবন সংহার-বেশে,
তবুও নাহিক পারিবে কাপাতে,
ক্ষত্রিয়গণের একটা কেশে ।
১৪
“প্রলয়ে ব্রহ্মাণ্ড হউক বিলয়,
বিনষ্ট হউক শরীরিগণ,
তথাপি নিভীক ক্ষত্রিয় নিকর
তিলেক নাহিক ছাড়িবে রণ।

প্রতাপ সিংহ।
জানুক জগৎ ক্ষ-বীরগণ
অবতীর্ণ হলে সমর-সাজে,
পারে বসুন্ধরা দিতে রাতুলে
ভীম পরাক্রমে মুহূর্ত মাঝে।
‘কর জয়-নাদ বদন ভরিয়া,
হউক কম্পিত যবন দল ;
অনন্ত গগন হউক বিদার,
উঠুক উছলি জলধি-জল ।
“ডাক উচ্চরবে ‘জগৎ-জননী’
স্মরহ যুগল চরণ তার ।
তিল মাত্র কৃপা পাইলে তাহার,
কি ভয় মােদের জগতে আর ?”
অমনি যতেক ক্ষত্রিয়-সেনানী
নিষ্কোষি কৃপাণ নিমেষে সৰে
কম্পিত করিল কানন, ভূধর,
‘জয় মা ভবানী’ ভীষণ রবে।

রাজপুতকুসুম।
সেই ভীম নাদ মা হতে বিলীন,
গড্ডিল কামান গভীর স্বরে ;
যেন ক্ষত্রিয়ের হর্ষ-নিনাদের
উত্তর করিল বিক্রম ভরে।
সহসা বাজিল বিজয়-বাজনা,
উঠিল সে রব আকাশ মুখে ।
আনন্দে যতেক মােগল-সেনানী
আসিল ছুটিয়া মনের সুখে।
ছুটিল অমনি রাজপুতগণ,
উলঙ্গ কৃপাণ ধারণ করি ;
আক্রমিল আসি যবন নি করে,
ভীষণ সংহার মূরতি ধরি।
२२
‘দুরুম’ করিয়া গরজে কামান,
আঁধারে দিগন্ত ভরিয়া যায় ;
তার মাঝে মাঝে ঝলসে কৃপণ,
যেন বা বিজলী মেঘের গায়।

প্রতাপ সিংহ।
উভয় পক্ষের সেনানী নিকর
ঘুঝি’ছে বিপুল বিক্রম ভরে ;
থাকিয়া থাকিয়া তর্জন আরাব
উঠিছে গগনে অফুট স্বরে।
২৪
যেন বাৱিধির তরঙ্গ-লহরী
যুঝি’ পরস্পর ভীষণ বলে,
ঘাের গরজনে নিখিল জগৎ
ডুবাইতে চায় অতল জলে।
অথবা নাশিতে ব্রহ্মাণ্ড সহিত
গ্রহ উপগ্রহ তারকা সবে,
যেন প্রলয়ের প্রবল ঝটিকা
বহিছে ধরায় গভীর রবে।
কামানের গােল। চরণে দলিয়া
যুঝি’ছে নির্ভীক ক্ষত্রিয় দল ;
ক্ষত্রিয়গণের বীর-পদভরে
উঠিছে কাপিয়া বসুধা-তল।

রাজপুতকুসুম
যবন নিকর হুহুঙ্কার রবে
বিনাশ করি’ছে ক্ষত্রিয়গণে;
তবু রাজপুত অটল ভাবেতে
হানি’ছে কৃপাণ নির্ভয় মনে।
২৮
সেই ‘হদী ঘাট সমর প্রাঙ্গনে,
ছুটি’ছে প্রতাপ মিবারপতি ;
কি ছার যবন ? অমরনিকর
অশক্ত রেধিতে সে ভীম গতি।
প্রতাপ সিংহের প্রিয় তুরঙ্গম
নির্ভীক চৈতক আনন্দ ভরে
নাচিয়া নাচিয়া ছুটিছে চৌদিকে
লইয়া প্রতাপে পিঠের’পরে।
কামানের গােলা ধরি’ দুই করে
নিক্ষেপি’ছে পুনঃ প্রতাপ বীর,
যাহার অব্যর্থ ভীষণ আঘাতে
বিচূর্ণিত কত যবন-শির।

প্রতাপ সিংহ।
যেন বা প্রলয়ে নাশিতে জগৎ
সংহার-পুরুষ অসীম বলে
ছিন্ন করি’ গ্রহ তারকা মণ্ডলী
করি’ছে নিক্ষেপ সাগর-জলে।
শ্লেচ্ছ সেনাপতি মানসিংহ লাগি”
ছুটিয়া চলিল নিবর-নাথ ;
কতক্ষণ পরে হইল সাক্ষাৎ,
সম্রাট-নন্দন সেলিম সাথ ।
সম্রাট-তনয়ে নিরখি’ অমনি
হানিল প্রতাপ ভীষণ শূল।
অদৃষ্ট প্রনয় ভাইতে এবার
হইল রক্ষিত মােগল কুল।
৩৪
সেলিম সাহের রণ-মাতঙ্গম
প্রভুকে লইয়া ছাড়িল রণ ;
বীরেন্দ্র প্রতাপে ঘেরিয়া তখন
বুঝিতে লাগিল যবনগণ।

রাজপুতকুসুম
প্রবল প্রতাপে যুঝি’ছে প্রতাপ
জ্যোতির্ময়ী অমি ধারণ করি,
আঘাতে আঘাতে অগণ্য মােগল
শায়িত হইল বসুধা’পরি।
টলিল সে তেজে দিল্লীর আসন,
কঁপিল ত্রিদিবে অমর চয় ;
দিগন্ত সকল হ’ল প্রকম্পিত,
সমুদ্রের জল উজান বয়।
বােধ হয়, যেন হিমালয়-চূড়া
খসিয়া পড়িল সাগর-জলে,
শায়িত হইল ভারতবরষ
মহাসাগরের গভীর তলে।
বীরেন্দ্র প্রতাপ যুঝি’ছে একাকী,
সহসা চমকে যবন চয়;
ঝালাপতি মান্না পশিল তথায়
মুখে শুধু ‘জয় রাণার জয়।

প্রতাপ সিংহ।
রাণার বিপদ দেখি’ মান্না বীর
নিল রাজচ্ছত্র আপন করে ।
সেই ছত্র হেরি’ ‘রাণ’ অনুজ্ঞানি’
বাপিল মোগল তাহার’পরে।
৪ ০
০
হেথায় প্রতাপ অম্বর-ঈশ্বৰে
পেয়ে তখন উন্মত্ত প্রায়,
মথিতে মথিতে যবন-বাহিনী
আরােহি’ চৈতকে বিক্রমে ধায়।
৪১
রুদ্র সম তেজে মান্না বীরবর
অগণ্য অরাতি বিনাশ করে
বিসর্জিলা তনু হলদিঘাটায়
প্রতাপের—নিজ দেশের তরে।
8२
তবু ক্ষত্রগণ নহে বিচলিত,
‘ভবানী মায়ের' করুণা মাগি
প্রত্যেক বীরেন্দ্র প্রাণান্ত পর্যন্ত
যুঝিলেক আজি মিবার লাগি ।

রাজপুতকুসুম।
৪৩
যত দিন রবি হইবে বিকাশ,
বহিবে পবন মধুর সুরে,
তত দিন বীর প্রতাপের নাম
রহিবে অঙ্কিত জ্বলদাক্ষরে।
৪ ৪
যাও রাজস্থানে তরঙ্গিণী-তীরে
দাড়ায়ে শুনিবে একাগ্র মনে
প্রতাপের গাথা করি’ছে কীর্ত্তন
প্ৰবাহিণী-কুল মধুর স্বনে।
৪৫
আরাবলী গিরি উন্নত শিখরে
দাড়াইয়া দেখ, জিজ্ঞাসা করি,-
“কাহার কারণ সন্দ্ব রাজস্থান
ভাসি’ছে গৌরবে বসু’পরি ?”
১৬
নাচিতে নাচতে পবন-হিল্লোলে
তামিবে উত্তর গভীর রবে ;
“ক্ষত্রিয়-ভূষণ প্র তাপের গুণে
ন রাজন বিখ্যাত ভবে।”

রাজ সিংহ।
রাজ সিংহ।
কোথায় কোরেছ আশা পাপিষ্ঠ পামর,
শৃগাল হইয়া চাহ সিংহতকর?”
শূরসুন্দরী।
শােভে আরাবলী অচল-প্রবর
অশনি অভেদ্য শরীর ধরে ;
শ্যামল বরণ বিটপী নিকর
হাসি’ছে গিরির হৃদয়’পরে।
আরাবলী গিরি-পাদদেশে এক
শাভি’ছে নগরী সুন্দর সাজে ।
‘রূপ নগরের’ রূপের গরিমা
বিখ্যাত সমগ্ৰ মিবার মাঝে।

৯৪
রাজপুতকুসুম
এবে নগরীর রাজ-তনয়ার
অলােক-সামান্য রূপের তরে
বিচলিত পাপ আরংজীব সাই
দিল্লীর ময়ুর আসন'পরে।
৪
সে কম কুসুম চয়নের তরে
শঠ-শিরােমণি যবন-রাজ
বিংশতি শত মোগল-সেনানী
করেছে প্রেরণ মিবার মাঝ ।
উপনীত হয়ে ম্লেচ্ছ-সেনাপতি
কহিল তখন রাজার কাছে
“দিল্লীর সম্রাট শাহ আলুগীর
তব তনয়ার প্রণয় যাচে।”
শুনিয়া তখন সমস্ত ভূপতি
বজ্রাহত সম স্তম্ভিত হয় ।
জীবন-লতিকা হইল বিক,
হেরিল জগৎ আঁধারময়।

ব্রাজ সিংহ।
৭
পিতার অবস্থা করি নিরীক্ষণ
প্রভাবতী বালা তনয়া তার
চিন্তে মনে মনে এবিপদ মাঝে
লইবে এখন শরণ কার।
ভাবি’ছে বালিকা একাকিনী বনি’,
গিয়াছে শুখায়ে বদন খানি ;
যেন রে নিদাঘে শুল্ক শতদল
রাখিয়াছে কেহ হেথায় আনি'।
বিধাতঃ! আমার এ পােড়া কপালে
এ ভবিষ্য ৰাণী আছিল লেখা,
যবন-কিঙ্করী হয়ে অভাগিনী
রাখিবে জগতে কলঙ্ক-রেখা।
“সত্য কি মিবার বীর-শূন্য এবে?
বীর-প্রসবিনী শ্মশান আজ?
নাহি কি কেহই রাজপুতানায়
উদ্ধারিতে এই বিপদ মাঝ ?”

রাজপুতকুসুম।
১১
কে যেন অমনি বালিকার কানে
কহিল তখন মধূর স্বরে-
ভেব না সরলে ! রাণা রাজসিংহ
অপেক্ষি’ছে তব উদ্ধার তরে।
চমকি’ তখন সরলা বালিকা
লিখি’ লিপি এক প্রফুল্ল মনে
রাণার সমীপে করিল প্রেরণ,
দিয়ে নিজ পুরোহিতের সনে।
সত্বর গমনে আমি পুরােহিত
অর্পিল পত্রিকা রাণার করে ।
মিবার-ঈশ্বর পাইয়া সে লিপি
পড়িতে লাগিলা পুলক-ভরে।
১৪
“মহারাজ !
রাজহংসী হ’বে বক-সহচরী,
রাজপুত বীর নীরব রবে ?
রাজপুত-বালা বানর-বদন
সবনের অঙ্ক-শায়িনী হবে ?

প্রতাপ সিংহ।
তাই মহারাজ! বিপন্ন। অবলা
লইল তােমার শরণ আজ ;
রক্ষহ, অন্যথা ত্যজিব জীবন,
নিশ্চয় কহিনু মিবার-রাজ।”
পাঠ শেষ করি’ পুরােহিত-মুখে
শুনি’ সবিশেষ মিবার-পতি,
গর্জিয়া উঠিল গভীর আরাবে
হইয়া অতীব ক্রো ধান্ধ-মতি।
“রে পাপ যবন! শৃগাল হইয়া
কেশরী-নন্দিনী লভিতে চা’?
দানব হইয়া করেছ পামর
সুর-সুন্দরীর প্রণয়-আশ ?
১৮
“জানি না মূঢ়! রাজপুত-সন্তী
নিজ কুলমান রক্ষার তরে,
পারে হৃৎপিণ্ড করিতে ছেদন;
পশে বহি মাঝে আনন্দ ভরে।
৯

রাজপুত কুসুম
এতেক কহিয়া সমর-সজ্জায়
হয়ে সজ্জীকৃত মিবার-পতি,
হলেন ধাবিত সেনাগণ সহ
উদ্ধার করিতে সরল সতী।
২০
আবার মিবার বহু দিন পরে
বীর-পদ-ভরে জাগিল আজ ;
অস্ত্রের ঝনন, বীর-কোলাহল,
হইল ধ্বনিত মিবার মাঝ ।
হেথায় যবন-সেনানীনিকর
করি’ছে ভ্রমণ আনন্দ-ভরে ;
অমনি সহসা উঠিল চমকি’
‘বম্ হর হর ভবানী’ স্বরে।
२२
নিমেষে দেখিল রাজপুত-চমূ,
নিষ্কোষি কৃপাণ আসি’ছে সবে
অমনি যতেক মােগল-সেনানী
চলিল ছুটিয়া ‘আল্লা হাে’ রবে ।

প্রতাপ সিংহ।
ক্ষত্রিয় যবনে বঁধিল সমর,
যুঝিছে বিক্ৰমে ক্ষত্রিয় চয় ;
ক্ষত্রিয়গণের তরবারি-ঘাতে
যবন-শরীর শােণিতময় ।
२8
বীরর রাণা অসীম বিক্রমে,
একে একে অরি করিল নাশ ।
কতটী যবন করিল প্রস্থান
পরিহার করি’ বিজয়-আশ ।
সমরে বিজয় লভিয়। তখন
রাণা রাজসিংহ প্রফুল্ল মনে,
চলিলেন নিজ রাজধানী মুখে
লভি’ প্রভাবতী ললনা-ধনে ।
প্রতাপসিংহের দেহত্যাগ পরে
আছিল মিবার নির্জীব প্রায় ;
আবার এখন হ'য়ে জাগরিত
দিল্লীর আসন গ্রাসিতে ধায়।

রাজপুতকুসুম।
আরাবলী গিরি-শিখরে শিখরে
উড়িল নিশান সমীর-ভরে ;
কঁপিয়া উঠিল ত্রু র আরংজীব
বনিয়া ‘ময়ূর-আলন'পরে ।
সম্পূর্ণ।
Printed at the Viria Press --Calcutti

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rajputkushum

Author
Ray,nikhilnath
Title
Gitikabya
File name
Rajputkushum
Text
OCR done
Citation
1884
Published
2009/10/20
Publisher
Ashutosh Chakrabarti,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
116
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Lyrics
Keywords
Hamir
DLI number
513137
Barcode
4990010020143.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
7Xg8mzr26cQ
Download PDF

Rajputkushum