Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Bana-phul

Chattapadhyay, Mohinimohan · 2009/11/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বনফুল ।
"Full many a flower is born to blush unseen,
And waste its sweetness on the desert air."
শ্ৰীমােহিনীমােহন চট্টোপাধ্যায়
প্রণীত।
খাগড়া, মুর্শিদাবাদ
সন ১৩১৬ সাল।
মূল্য । আট আনা।

প্রকাশক-গোবিন্দপ্রসাদ চক্রবর্ত্তী
ম্যানেজার “উপাসনা”, কাশিমবাজার।
কাশিমবাজার, সত্যরত্ন যন্ত্রে
ললিতমােহন চৌধুরী প্রিন্টার দ্বারা মুদ্রিত

অবতরণিকা • উপাসনা, ঐতিহাসিক চিত্র, কণিকা প্রভৃতি পত্রিকায় যে সকল কবিতা প্রকাশিত হইয়াছিল তাহারই কতকগুলি এবং অপর দুই একটি অপ্রকাশিত কবিতা একত্রিত করিয়া “বন-ফুল” প্রকাশিত হইল। পরম পূজনীয় সাহিত্যাচাৰ্য শ্রীযুক্ত চন্দ্রশেখর মুখােপাধ্যায় ও ঐতি- হাসিক সাহিত্যেন্দু পরম শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত নিখিলনাথ রায় মহাশয়ের উৎসাহেই এই ক্ষুদ্র লেখকের কাব্য-জীবনে প্রাণ উন্মােষিত হইয়াছে। তাহাদের কথা স্মৃতি পথে উদিত হইলেই নির্জন পৰ্বতারণ্যে সদ্য-প্রবাহিত নিঝরিণীর প্রথম সঙ্গীতােচ্ছাসের ন্যায় কি জানি কি গভীর আকুলতা হৃদয়মধ্যে কুলু কুলু করিয়া উঠে। কতিপয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের তুচ্ছ কথায় বা ধন্যবাদে গ্রন্থকার সেই অভিব্যক্তির মর্যাদা নষ্ট করিতে চাহে না। মান্যবর শ্রীযুক্ত আশুতােষ ভট্টাচাৰ্য্য ও শ্রীযুক্ত গােবিন্দপ্রসাদ চক্রবর্তী মহাশয়দ্বয় এবং সুহৃদ-প্রধান সাহিত্য রসিক, শ্ৰীযুক্ত প্রভাতচন্দ্র দত্ত ও “কিরণময়ী” ও “কমলাবতী”র লেখক মুহ শ্ৰীযুক্ত সতীশচন্দ্র সরকার “বন-ফুল” প্রকাশের যাবতীয় পরিশ্রমের ভার গ্রহণ করায় আমাকে কিছুই খাটিতে হয় নাই। উপকার সামান্যই হউক আর বেশীই হউক উল্লেখ করিয়া থাকা যায় না। খাগড়া, শ্ৰীমােহিনীমােহন চট্টোপাধ্যায়। মুর্শিদাবাদ।

No text on this page.

উৎসর্গ।
বঙ্গের দ্বিতীয় বিদ্যোৎসাহী
রাজর্মি-কর মাননীয়
শ্রীল শ্রীযুক্ত মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী
মহােদয়ের করকমলে
গ্রন্থকার

No text on this page.

সুচী। বিষয়। পৃষ্ঠা। r ৫৮ ২ ৫০ ১। অবসানপ্রবাহ ২। সমীরের প্রতি ফুল ৩। খণ্ডিতা ৪। প্রেমবিহ্বলা ৫। নাথের ছবি ৬। নবীনার শেষ কথা ৭। পাঁচের কথা ••• p ৮ ••• ... c ৮। ভুল । । ১৮ : ••• ২১ ২২ • ৯। শরৎ-বর্ণনা ১০। অৱদেশ ১১। রাণী পুষ্পবতী ১২। যাত্রা ১৩। নিরাকারের প্রভাব ১৪। মিলনােকষ্ঠিত ১৫। স্থান মাহাত্ম্য ২৮ ১৬। তােমার স্বরূপ ••• ৩৪ ১৭। পরিচয় ৩৬

[ খ ]
বিষয় ।
পৃষ্ঠা।
•••
৪১
৪৪
৪৬
৪৮
১৮। আলাউদ্দীনের পদ্মিনী দর্শন
১৯। বাসর নৈবেদ্য
২০। প্রার্থনা
২১। উদ্ভ্রান্ত
২২। ভাগ্যহত
•
২৩। আহ্বান
২৪। উদ্দেশে
•
২৫। মহাকাশ
•••
২৬। শান্ত পান্ত
২৭। বিশ্ব সৌন্দর্যের প্রতি
। ।
৪৯
।
৫২
| |
৫৪
এ ৫ .
••
৫৮

'ফুল।
অবসান-প্রবাহ।
কাননে কোকিলকুল যতই কুহরে
বসন্ত ততই অবসান,
মলয় যতই বয় কাল বৈশাখীর
ঝঞ্চা-বায়ু তত আগুয়ান।
পাতাটি মৰ্ম্মরে যত তত তার দিন
অলক্ষ্যেতে আসে ঘনাইয়া-
মুকুল যতই যাচে ফল-পরিণতি
মৃত্যু আসে ততই ছুটিয়া।
সুখ আসে সীমা ল’য়ে, ছায়া ল'য়ে আলাে,
আরম্ভে সূচিত হয় শেষ
প্রেম-কপােতীর পাশে বিধির বিধানে
বিরহ-গ্রেনের সমাবেশ।
ধরণীর হিয়া-প্রান্তে শত স্বর্ণপুরী
ধীরে ধীরে হতেছে প্রকাশ,
একি দেখি ? তাহাদের বেড়িয়া কখ
তিরােধান বেঁধেছে আবাস।

বনফুল।
সমীরের প্রতি ফুল।
তুমি ত অমর, আমি এখনি যে যাব ঝরে।
শেষের সঙ্গীত ওই শুনাইছে পাখী মাের।
এই রবি আজিকার দেখিতে দেখিতে হায় !
বৃন্তটি একেলা ফেলি, ঝরিব ধরার গায় ।
মাের মত কত ফুল তুমি কত চুমিয়াছ,
তাহারা ঝরিয়া গেছে তুমি শুধু হাসিয়াছ।
বৃন্ত কাদিতেছে দেখি দিয়া তুমি টিটকারী,
হাসিয়া ছুটেছ কুঞ্জে, অন্য ফুলে লক্ষ্য করি।
এক ফোঁটা অশ্রুজল, একটি দীরঘশ্বাস,
তাও আমি তব কাছে কভু নাহি করি আশ ।
দ্বিযাম নিশির শেষে, জ্যোছনায় জ্যোছনায়
ভ'রে যাবে পৃথ্বী যবে, কামনায় কামনায়
ছেয়ে যাবে বিরহীর আকুল তাপিত প্রাণ,
বাহিরিবে কুঞ্জ হ'তে চ্যুত-মুকুলেরি ঘ্রাণ,
হে সুন্দর! যবে আমি তব স্মৃতিমাত্ৰ ল'য়ে।
পড়ে র’ব ধরা পরে শতধা বিক্ষিপ্ত হয়ে ।

বনফুল
তােমারে চুমিতে আর থাকিবে না অধিকার,
তােমার পরশ আশে জাগিবেক হাহাকার !
অনাদরে একবার আমার সমাধি-বুকে,
তুমি দু’টি গেয়াে গান মরিতে পারিব সুখে।
ভেবাে এ আকাশতলে, চুমেছিলে একজনে,
সে তােমারে ভালবেসে ঝরে গেছে এই খানে
ভেবাে তার ক্ষুদ্র প্রাণ, ফুটিয়া সােহাগ-ভরে
সৰ্বস্বই দিয়াছিল, শুধু দুদিনেরি তরে।

বনফুল।
খণ্ডিত।
১
তপােবন-উপকণ্ঠে
বসন্তের প্রথম প্রভাত
উঠে তরঙ্গিয়া,
সরসীর থির নীরে
নভসের প্রতিবিম্বটিও
উঠে শিহরিয়া ।
গুঞ্জনে, গানে ও গন্ধে কঙ্কন-ঝঙ্কারে বনরাণী
উঠেছে জাগিয়া-
বল্লরী-বিতানে কিবা
মদালস মলয়-মারুত
পড়ে মুরছিয়া !
আছে দীর্ঘিকার পারে
কুজন-মুখর বেণুবন
ছায়া বিথারিয়া
ওই তারে দেখা যায়, শকুন্তলা আকুল-কুন্তলা
ওই দাড়াইয়া
সে শুধু তাহাই জানে, শাখাটিতে বসেছিল পাখী,
গেয়েছিল গান ;
সে শুধু তাহাই জানে, মালঞ্চে কে এসেছিল প্রাতে,
ছুটেছিল ঘ্রাণ।
১

বনফুল
স্মরণ রয়েছে মাত্র, লাজনম্র আঁখি আপনার
তুলিতে পারেনি।
স্মরণ রয়েছে মাত্র, বলি বলি করি কত কথা
বচন সরেনি।
কে অাসিয়া স্পর্শে স্পর্শে
মুগ্ধ তৃপ্ত পরাণীরে তার
সঙ্গীতে ভরিয়া
আবার আসিব বলি, ওই তমালের ঘন ছায়ে
গিয়াছে চলিয়া !
বেতসকুঞ্জের ফাকে শিশু রবি কঁপে আর ফুটে
তৃণাঞ্চিত মাঠে;
ধেনুর দোহনরবে
ঝঙ্কারিত ওঙ্কার-সঙ্গীতে
বিশ্ব জেগে উঠে
হেরি তারে অসহায় হেরি তারে অধিক বিবশ।
অধিক চঞ্চল ;
বিদ্রোহী চরণ তার আজি তারে এনেছে বহিয়া
বেণু-কুঞ্জল।
পেলব সে কান্তনু তরুকাণ্ডে লগ্ন করি দিয়া
বুঝি তার প্রাণ ;
আবার আসিব বলি, ওই তমালের ঘন ছায়ে
করেছে পয়ান।

বনফুল।
প্রেমবিহ্বল।।
ওই বুঝি আসে কৃষ্ণ! লুকান কি যায়,
তটিনীর বাঁকে বাঁকে রব বাঁশরীর,
সুরভিত বায়ুস্তরে নাচি পায় পায়,
অলসে ভরিয়া দিল আমার শরীর
বংশীধ্বনি নহে উহ! বংশছিদ্রপথে,
পেতেছে প্রবল গতি দুরন্ত মারুতে!
ওই বুঝি আসে কালা ! ওই শুনা যায়,
চরণে বাজিছে তার মুখর নুপুর,
রিনিকি ঝিনিকি রিনি দিব্য
মূচ্ছনায় ;
শীতলিছে প্রাণ মাের বিরহ বিধুর!
মুখর নূপুর নহে! ফুল গর্ভ হতে,
সুপ্ত অলিদলে ফেলি দিয়াছে মারুতে।
৬

বনফুল
ওই বুঝি আসে বঁধু ! ওই ত অদূরে
কেকারবে ভাষে শিখী ললিত সম্ভাষা-
বিস্তারি পেখম কিবা ঘাড় উচ্চ করে
আনন্দ-নৰ্ত্তনে মগ্ন-পূরিল কি আশা !
কৃষ্ণের সম্ভাষা নহে, পশ্চিম গগনে
কৃষ্ণ মেঘখণ্ড ওই উদিছে এক্ষণে।
৪
ওই বুঝি আসে কান্ত ! শান্ত সুশীতল
কেয়ুর-কুণ্ডল-লগ্ন মণি-রত্ন-ভাতি-
এই আসে ওই বাহি মিন্ধ বনতল ;
আজি না পােহায় যেন এ সুখের রাতি।
কোথা কান্ত হায়! অতিবাহি বনপথে,
আসিছে খদ্যোতচয় পবনের রথে !
ওই বুঝি আসে প্রিয়! গন্ধ মিষ্টতম,
বরবপু হ’তে তার আনিছে পবন ;
রােমাঞ্চ হইয়ে গেছে একি দেহ মম !
আনন্দাশ্রুধারে একি ভিজিছে নয়ন।
পুণ্য গন্ধ নহে! দূরে শেফালীর বন,
ফুটিয়া উঠেছে চুমি নিশীথ পবন !
৭

বনফুল
নাথের ছবি ।
আসে
তরুণঅরুণ-কনককিরণ
যেই খানে আগে যেই খানে,
আমি রাখিয়া এসেছি নাথের ছবিটি
সেই খানে ওগাে সেই খানে!
অতনু-পবন-পরশিত মাধবী-কুঞ্জ হরষিত
করে নিবেদন পরিমল ধন
যেই খানে আগে যেই খানে,
আমি রেখেছি মানসমােহনের ছবি
সেই খানে ওগাে সেই খানে।
পাখী তারি নাম সাধিয়াছে, সারাদিনমান গাহিয়াছে
মিশিয়াছে তার স্বর-ঝঙ্কার
যেই খানে আগে যেই খানে,
আমি রাখিয়া এসেছি নাথের ছবিটি
সেই খানে ওগাে সেই খানে !
৮

বনফুল
২
আজি আমি পরবাসী।
হৃদয়ের কাছে ছিল যারা
কত দূরে পড়ে গেছে তারা,
কঁদি ঝঝরে আসিয়াছে দূরে
নিঝর বারিরাশি ।
আশা-হীন পরবাসী।
গলে ছিল ফুলমালাটি কে যেন করিল কুটী
ঝরে গেছে ফুল, গ্রীবা বেষ্টিয়া
রয়েছে ভােরের ফাঁসি
প্রেমহীন পরবাসী।
কবে-বরযা হয়েছে গত,
আলাে করি তীর তটিনীর কাশ তুলিয়াছে নিজ শির,
উষার অনিল সরস পরশে
শেফালী ঝরিছে কত
বরষা হয়েছে গত।
শরতের আলাে নলােভরা নয়নে বহিছে জলধারা,
বিরহ-ক্লিন্ন পরাণী ছুটিছে
সেই খানে ওগাে সেই খানে-
আমি রাখিয়া এসেছি নাথের ছবিটি
যেই খানে ওগাে যেই খানে!

বনফুল
নবীনার শেষকথা।
(প্রথম উচ্ছাস।)
দেখ
ওই
গাছের আগার রােদের মত
কাঁপছি বসে শেষের সীমায়।
ওপার হতে আছে খেয়া
এবার বুঝি নিতে আমায় ।
যেমন—নিশা-শেষের সন্ধ্যামুনি
অবসাদে মুছড়ে পড়ে,
আমিও কখন পড়বে ঢ'লে
সামনে তােমার তেমি করে !
বলবাে দুটো শেষের কথা-
—ওকি!:ভাবৃছ কেন? ভাবছ কি !
ফুটলে পরেই ঝরুতে যে হয়
জগতের ত নিয়মই!
তাই
দেখ
যখন আমি থাকবে না কো !
চরণ শবদ শুনে তােমার

বনফুল।
ওগাে
ছুটে যখন আববা না কো--
ধরা-দেওয়া স্বর্গে আমার ।
অবশ করা পরশ যাচি
সাথে সাথে ফিক্ব না কো,
সজল দুটি আঁখি লয়ে
তােমার পানে চাইবাে না কো !
তখন যদি আমার স্মৃতি
জেগে উঠে তােমার প্রাণে
এই খানে কে ছিল বলি
তাকিয়ে ফেলই গৃহের পানে !
ববাে দুটো শেষের কথা,
ওকি! ভাবছাে কেন ? ভাবুছ কি!
আসলে পরেই যেতে যে হয়
জগতের ত নিয়মই ।
যদি
তাই
দেখ
আমি
ঘুমটি ভাঙ্গা পাখীর মত
উষায় যখন উঠবে জাগি,
জাগতে যখন পাব না আর
চেতন দেওয়া পরশ লাগি ।
সেই সময়ে থাকবে একা
ঠেকবে প্রাণে ফাঁকা ফাঁকা
নদীর বাঁকে থেকে যাওয়া
কাহার কোমল-চরণ-লেখা,
যেন

বনফুল।
যেন
তাই
শূন্য খাঁচার মধ্যে পাওয়া
কবেকার কোন্ পাখীর পাখা,
ব’বাে দুটো শেষের কথা
ওকি! ক’ছ কি গাে? কছ কি?
উঠলে পরেই পড়তে যে হয়
জগতের ত নিয়মই ।
স্তব্ধ অন্ধ রাত্রে যবে
শেফালিকার পত্র গুলি-
* * * * *
;
কানের কাছে প্রাণের কাছে
মমরিয়া উঠবে খালি ।
বালা নদীর বাঁকে বাঁকে
বানের বারি উঠবে ডাকি,
বাতায়নের মধ্য দিয়া
চাটি যখন মারূবে উকি
ওগাে যখন আমি থাকব না।
ঝঞ্চারিত প্রাণের বীণায়
সুর মিশাতে পাব না;
উচ্ছসিত ভাব-যমুনায়
সিনান ক’তে পাব না কো।
প্রাণের পাতায় নামটি তােমার
ছন্দে ছন্দে লিখবাে নাকো !
আমার
১২

বনফুল
বলবাে দুটো শেষের কথা
ওকি। আঁখি তােমার সজল কি?
প্রকাশ হলেই হয় তিরােধান,
জগতের ত নিয়মই !
(দ্বিতীয় উচ্ছসি।)
প্রিয় । করিও না ভুল। দেহ বিসর্জিয়া
ধরণীর বিশালত্বে যাবনা মিশিয়া !
পাতা শুধু কুসুমেরে পারে ঢাকিবারে-
কি সাধ্য নিবারে তার মুক্ত সুরভিরে!
আমারে পাবে না বটে দেখিতে দুদিন,
কিন্তু আমি নব নব রাজ্য সীমাহীন
রচিয়া, অলক্ষ্যে বহি বক্ষে ধরিত্রীর
তােমারি নয়নপথে ফুটিব সুধীর !
যে গান শুনিয়া তুমি কহিবে সুন্দর,
যে ফুল দেখিয়া তুমি কবে মনােহর,
যে পবন স্পর্শে তুমি হবে হরষিত,
যে পানীয় পান করি হবে পুলকিত,
যে গন্ধে পরাণ তব হইবে ব্যাকুল
তােমারি প্রেয়সী সেথা—তব প্রেমাকুল,
লিঙ্গা ঈপ্সা সেই খানে ঈপ্সিতেরে ঘিরি
উঠিবেক ফুটি, প্রিয় ! দিবা বিভাবরী।
বাদল নামিবে যবে শ্রাবণের দিনে,
শুন সখে মিলনের সেই শুভক্ষণে
-

বনফুল
অম্বরে মেঘােৰ্ম্মিরূপে আমি উদাসিনী,
বেষ্টিয়া ভবন তব, আদিবা-যামিনী
ভরমিব, দৈন্যে পূর্ণ বহি ক্ষুন্ন হিয়া
কহিব-জলদ-মন্দ্রে, “আমি তব প্রিয়া।”
তটশালিনীর তটে বাসন্তী বৈকালে
ভ্রমণ করিবে যবে, আমি সেই কালে
ঢেউরূপে তটভূমে পড়ি আছাড়িয়া
চূর্ণি আপনারে ক’ব “আমি তব প্রিয়া !”
জ্যোৎস্নাপুলকিত রাতে নয়ন তােমার
যখনি নিবন্ধ হবে আকাশে উদার
দেখিবে তারকাক্ষরে সে নভঃ জুড়িয়া
কে যেন লিখিয়া গেছে, আমি তব প্রিয়া ।”
যেই প্রেম-দীপ সখে! হৃদয়ে আমার
দেছ জ্বেলে, উপেক্ষিয়া মৃত্যুর ফুৎকার,
সেই দিব্য দীপেন্দ্রানী রশ্মি বিচ্ছ রিয়া
আলােকিবে পথ তব ; সেই পথ দিয়া
আসিবে আসিবে নাথ সাম্রাজ্যে মহা-
মিলন সে রাজ্যে রাজা-নাহি তিরােধান।
সারা বিশ্বে আর সখে ! নাই কিছু নাই,
তুমি আর আমি পূর্ণ দেখি সর্ব ঠাঁই।
১৪

বনফুল।
পাঁচের কথা।
রূপ কহে, একা আমি শত মূর্তি ধরি,
জগতের তীরে ধীরে বিচরণ করি।
রস কহে, জানি শুধু আমি অতি নীচু,
যে আমারে ডাকে আমি ধাই তার পিছু
গন্ধ কহে, আমি ভাই, নিজ প্রাণটিরে,
বিলাইয়া দিতে চাই সংসারের তীরে।
শব্দ কহে, হাঁক ছাড়ি তাড়াতাড়ি ছুটি,
জগতের কানে আর প্রাণে যদি ফুটি।
স্পর্শ কহে, আমি স্পর্শ থাকি স্তব্ধ হয়ে,
মাের দিন কাটে পরমুখ চেয়ে চেয়ে।

বনফুল ।
ভুল।
১
সে দিন যখন শ্রাবণের ধারা রােধেছিল মাের গতিটি,
জন-বিরহিত পল্লীর পথে পড়েছিনু যবে একটি
ছিল দামিনীর স্ফরিতাধরে অশনির ভীম ঘােষা,
ছিল বানডাকা নদীর পাথার পথধারে অতি ভীষণ ;
সে আসি কহিল মােরে-
“আজি দাও, দেবি, তব সাথে সাথে
ওই পথে চলিবারে”।
গরবে কহিনু “না-
আমি তােমারে নাহিক চাই,
আজি মন বলে হায়
আমি কেমনে তাহারে পাই ।
V
সে দিন যখন গভীর নিশীথে নিদ্রা নাহিক চোখে,
অজ্ঞাত কোন আকুল বেদনা গর্জিতেছিল বুকে !
আঁধার ভেদিয়া পরাণের কাছে হি হি করে হাওয়া হাঁকে,
বুকের মাঝারে কে যেন কাহারে সারা দিয়া দিয়া ডাকে ;

বনফুল
সে আসি কহিল ধীরে
“আজি দাও মােরে হে রাণি আমার
তব সাথে কাঁদিবারে”।
ফিরিয়া কহিনু “না
আমি তােমারে নাহিক চাই,
আজি মন বলে হায়
আমি কেমনে তাহারে পাই।
সে দিন যখন দীঘির পাহাড়ে অশােকের ঘনছায়ে,
অতি মন্থর চলেছিনু যবে লঘু ভার পায়ে পায়ে।
বনে বনে বহে উতলা বাতাস, মনে মনে উঠে ঢেউ,
নিখিল বিশ্বে আমার বলিতে নাহি কি রে মাের কেউ
ধীরে সে কহিল আসি—
“তব নন্দনে
লহ মােরে টানি
অনুরাগ পরকাশি।”
শিহরি কহিনু “না-
“আমি তােমারে নাহিক চাই,
আজি মন বলে হায়
আমি কেমনে তাহারে পাই।
১৭

বনফুল।
শরৎ-বর্ণনা।
যেথা
বুঝি
সে যে
( ১ )
কূজন-আকুল বকুল-বীথিকা
আছে ছায়া বিহারিয়ে,
শরৎ এসেছে গোপনে গােপনে
সেই পথখানি দিয়ে।
( ২ )
ফুটিয়া উঠেছে গগনে ভুবনে,
তাহারি কিরণ-হসনে
ওই পলাইছে মেঘ-গজ-যুথ
হিমগিরি-গুহা-ভবনে।
( ৩ )
শেফালী-মুকুল হ’তেছে ব্যাকুল
উষানিলে শুধু ঝরিতে,
শিশু পিকগুলি যেতেছে উড়িতে
ঝোপে-ঝাপে শুধু পড়িতে।
আজি

বনফুল।
আজি
( ৪ )
তরণীর পালে ফুঙ্কার দিয়া
বাঁকে বাঁকে বায়ু ছুটিয়া
শুভ্র কোমল কাশ-কুসুমে
পড়িছে লুটিয়া লুটিয়া।
আজি
তটেরে বেড়িয়া কাঁদিছে তটিনী
কিনারে নামিতে নামিতে ;
তট ভাবে শুধু এসেছিল প্রিয়া
লাঞ্ছনা বুকে রাখিতে
যেথা
আজি
আজি
সঙ্কেত করি কল-হংসিনী
উপাড়ে মৃণাল শলাকা-
সেই দীঘি পারে বেলা যত বাড়ে
কোথা হতে নামে বলাকা।
( ৭ )
কেয়া-ফুল-রেণু অঙ্গে মাখিয়া
সিত কলেবর লভিয়া,
মুদিত কমল-বন উদ্দেশে
অমর চলেছে ছুটিয়া।
( ৮ )
যাপিছে প্রােষিতভর্তৃকা যেথা
বিরহ-গহন-রাত্রি,
১৯.

বনফুল।
শুধু
সুখের শরৎ কহে তারি কানে
এসেছি মিলন-দাত্রী।
( 9 )
ছুটে দিশি দিশি হাসি কলরব
কত না হরষ কাকলী,
নীপ-মূলে শিখী নাচিছে না আর
জলদ-মন্দ্রে আকুলি'।
( ১০ )
আজিকার প্রাতে সাড়া দিয়া উঠে
চির বিরহীর মত,
পরিচিত স্বরে বছরের পরে
‘বউ কথা কও কত।
( ১১ )
স্বাগত ওহে চির সুখ-ঋতু
নবীন জীবন ফুটাতে ;
সজনি-সঙ্গ-ভস-বহুলা
মিলন-কাহিনী রটাতে

বনফুল
অসুদ্দেশ।
১
অযুত বৎসর ধরি
পাখী-জগতের মাঝে
কবে কেবা ঝঙ্কারি প্রথম
বিহগের কণ্ঠ দেছে খুলে,
সেই হ'তে কত গান
ধ্বনিতেছে মৌন বনস্থলে।
সাড়া দিয়া কহে মাের প্রাণ,
আমি গাই কার গাওয়া গান।
ফুল-জগতের মাঝে সর্ব অগ্রে কে আত্ম বিকাশি
খুলে দেছে কুসুম-ভাণ্ডার,
সেই হতে কত ফুল
অযুত বৎসর ধরি
ফুটিতেছে সংখ্যা নাহি তার।
প্রাণ কহে কোথা সে বাঞ্ছিত,
মােরে যেবা করেছে মুদিত!
২১

বনফুল
রাণী পুষ্পবতী।
কত যুগ যুগান্তর শতাব্দীর ঢেউ
গিয়াছে বহিয়া—তবু কাব্যকর কেউ
তােমার চরিত-মধু হর্ষে করি পান
করেনি গুঞ্জন, দেবি, করে নাই গান
কাব্যের কাননে। তুমি আছ উপেক্ষিতা
শারদ-পাৰ্বণ গতে পুলিনে পতিতা
দেবী-পঞ্জরার মত! বিজয়ার সুরে
ক্ষীণ স্মৃতিটির গীতি কাদে আর ঘুরে
ক্ষুব্ধ ইতিহাস বুকে। আমি ক্ষুদ্র অতি
আসিয়াছি উদ্বোধিতে তােরে পুষ্পবতি।
२
বিন্ধ্যগিরি-পদতলে নাম চন্দ্রাবতী
প্রসিদ্ধ নগরী-রাজা ধৰ্মশীল অতি ;
তরি গৃহে অজানিত সুমুহূর্তে কোননা
লভিয়াছ জন্ম তুমি। সেথা যে কখনাে
তপােবন উপকণ্ঠে স্নাতকের মুখে
শুনি উচ্চ বেদধ্বনি, শুক শারি সুখে

বনফুল।
বসিয়া বন-বীথির শ্যামল প্রচ্ছায়ে
করে নাই প্রতিধ্বনি কার সাধ্য কহে।
সেথা যে কখনাে নীল শান্ত নিরাময়
স্বচ্ছ দীৰ্ধিকার পারে, নিশীথ সময়,
শব্দহীন তালী-কুঞ্জ মৃদু মর্মরিলে,
কুজনিলে কুঞ্জসখী, পবন স্বনিলে,
বিয়ােগ-বিধুরা কোন ধীরে অতি ধীরে
জাগিয়া, ঢালেনি প্রাণ দীর্ঘিকার নীরে
কে পারে কহিতে তাহা? কে বলিতে পারে
সসামন্ত বসন্তের প্রথম সঞ্চারে-
সেথা যে তরুর শাখে পাখিটী গাহিত
সৰ্ব্ব অগ্রে, যে তরুটী প্রথমে ফুটিত,
সেই তরুতলে কোন প্রােষিতভর্তৃকা
সঙ্গিনী-বেষ্টিতা, মৌন-যৌবন-চারিকা,
বসন্ত-উৎসবকালে প্রাণ-কান্তে স্মরি
সজল জলদ মত গুমরি গুমরি
কাঁদে নাই ? জন্মভূমি তব পুষ্পবতি।
স্বর্গসমপূণ্যভূমি শােভান্বিত অতি ।
৪
কল্পনার নেত্রে কবি হেরিয়াছে তােরে
প্রফুল্ল শরৎ কালে উঠি ভরে ভােরে

বন-ফুল।
শেফালী-নিকুঞ্জতলে কুড়াইছ ফুল
কুমারী-পূজার, লুটে রক্তিম দুকূল ;
দ্বিপ্রহরে বেণুবন কীচকে কূজনে
যবে মুখরিত, দেখি নৰ্ম্মসখী সনে
আত্মহারা স্তব্ধ মৌন রয়েছ বসিয়া
প্রতি গানে গুঞ্জরণে পূর্ণ ধরা দিয়া।
সায়াহ্রে দীঘির পারে জননীর মত
শুভ্র রাজহংস দলে সম্বােধিছ কত
তীরে আগমন হেতু, নীবার কণিকা
স্বর্ণ থালে, সবে তুমি কিশােরী বালিকা।
ধূসর সন্ধ্যায়, যবে ধীরে চক্রবাকী
যেতেছে উড়িয়া পদচিহু তীরে আঁকি,
নদীর পাষাণ ঘাটে বিশাল মন্দিরে
সাজের আরতি-ধ্বনি ললিত গভীরে
উঠেছে বাজিয়া, ভেদি কুঞ্জতল আর
পূর্ণিমার চন্দ্র সবে জ্যোছনা বিস্তার
করিতেছে; হেন কালে সেই নদী পারে
অভ্রভেদী মন্দিরের অলিন্দের দ্বারে
ঘৃত-সিক্ত দীপগুলি প্রজ্বলিত করি
আছ তুমি দাড়াইয়া হে দিব্য-সুন্দরি !
গাত্র তব কণ্টকিত, চোখে তব জল,
করুণায় উচ্ছলিত শ্রীমুখমণ্ডল !
২৪

তােমার রূপের কথা গুণের কাহিনী
ভুমি বহু জনপদ, কানন, তটিনী,
অবশেষে একদিন আনিল ডাকিয়া
উপযুক্ত পতি তব ভারত খুজিয়া।
শৈশবে কৈশােরে ভ্রমি বনে উপবনে
নদীতীরে, শৈলে শৈলে, রম্য তপােবনে,
মাতৃ-অঙ্কে, হৃদয়ের প্রান্তে যেই মধু
সঞ্চয় করিয়াছিলে—তুমি নব বধু
নিমেষে ঢালিয়া দিয়া পতির চরণে
শঙ্কিত কম্পিত-বক্ষে রহিলে স্তবনে।
কুসুম-যুবক-ভারে নম্র অবনত,
লতাইলে পতিবক্ষে লতিকার মত।
৭
কঙ্কণ-সঙ্কেতে তব পতির ভবনে
উড়িয়া আসিত কিনা ললিত কূজনে
খাদ্যলােভী পক্ষিকুল, তব জলসেকে
ফুটিয়া উঠিত কিনা পাদপ বিশেষে
নব বসন্তের প্রাতে, কর-তালি তালে
নাচাইতে কিনা তুমি তালী-কুঞ্জ-তলে
ভবন-শিখীরে, দেবি, সংবাদ তাহার
গ্রাসিয়াছে অতীতের মহা পারাবার !
২৫

বনফুল।
ইতিহাস কহে শুধু ছিলে পতিপ্রাণা—
একখানি পূর্ণিমার অনন্ত জোছনা
একটী বিশ্বের মুখে! কৌস্তুভ-রতন
বৈকুণ্ঠ-পতির মাত্র বক্ষোবিনােদন ।
বসন্তের অন্তে যথা মলয় পবন
ভীম প্রভঞ্জনরূপে দিয়া দরশন
পুষ্পিত কানন ভাঙ্গে, নিয়তি তােমার
অলক্ষ্যে ফিরায়ে দিল গতি আপনার।
সৌরকররাশি যেই জল কণাটীরে
লয়েছিল বাম্পাকারে স্বচ্ছ নীলাম্বরে,
আজি তারে নিক্ষেপিলা বহু উচ্চ হ'তে
আঁধার পাতাল গর্ভে কাঁদিয়া ভ্রমিতে
অবরুদ্ধ জলদলে ! আহা আচম্বিতে
খসিল সিন্দুর তব সীমন্ত হইতে !
আসন্ন-প্ৰসবা হেতু রাখিলে জীবন,
রবিহীন দেশে সূর্যমুখীটী যেমন।
!
একদা বসন্ত-প্রাতে মালিয়া গিরির
স্তব্ধ শালবন-প্রান্তে, শিখা চিতাগ্নির
উঠিল জ্বলিয়া ; ক্ষুব্ধ প্রচ্ছন্ন গুহায়
নিজ পুত্রটীরে সঁপি ঋষিপত্নী পায়—
দাড়াইলে রাজেন্দ্রাণী চিতাগ্নির পাশে,
নিশিশেষে শুকতারা উষার সকাশে
২৬

বনফুল যেমতি জ্যোতিবিহীন! ধ্বনিল অমনি প্রণবঝঙ্কার আর রুদ্র শঙ্খধ্বনি সংযত তাপসদলে। মৃদু মন্দ হাসি’ বিধুনিত বহিমুখে নিজ তনু নাশি অপার আনন্দরাজ্যে করিলে গমন- মরু অতিক্রমি পাখী নন্দনে যেমন। ২৭

বনফুল
যাত্রা।
১
তােমার বাগান করেছে যাহারা আলাে,
গন্ধ তাদের পেয়েছি সুদূর হতে ;
আপনারে তাই রাখিতে পারিনি বেঁধে
ভাসায়ে দিয়াছি অজানা নদীর স্রোতে।
তােমার বাগান তলে,
এ নদী যদি না চলে!
সেও ভাল মাের ওগাে মনচোর!
যেন থাকি তব ধ্যানে,
তুমি কত দিন র’বে স্নেহহীন
দেখা যাবে সেই ক্ষণে।
তােমারে পূজিতে কত-না মরণ-পথে,
আমার পরাণ-বধূটি ফিরিছে একা ;

বন-ফুল।
জাতি-কুল-মান সকলি তােমার তরে
মেহ-সঙ্কেতে ডাক বা না ডাক সখা
যদি মাের পূজা-রীতি,
নাহি পায় তব প্রীতি।
সেও ভাল মাের
ওগাে মনচোর!
যেন থাকি তব ধ্যানে,
তুমি কত দিন
র’বে মেহহীন
দেখা যাবে সেই ক্ষণে।
২৯

বন-ফুল
নিরাকারের প্রভাব।
বাঞ্ছিতারে হেরি দূরে, কহিছে নয়ন,
“সকল ইন্দ্রিয়-শ্রেষ্ঠ আমি সার ধন”।
শ্রবণ কহিছে, “আমি সর্ব অগ্রে গণি
শুনেছি নূপুর আর কাকনের ধ্বনি।”
ভ্রাণের ইন্দ্রিয় কহে ইঙ্গিতে আভাষে,
“প্রিয়ার অলক-গন্ধ পেয়েছি বাতাসে”।
অন্তরে হাসিয়া কন প্রেম সে চতুর--
“সকলের বিদ্যা বুদ্ধি জানি যতদূর ;
চক্ষে দেখি, কানে শুনি, নাকে পাই বাস,
আমি একচ্ছত্র রাজা-তােরা মাের দাস।

বনফুল মিলনােকন্ঠিতা। ১ আমি বুঝি তুমি কেন বাসন্তী প্রভাতে আনমনে পথ ভুলি গিয়া, আমারি আঙ্গিনা মাঝে আসি যাও চলি লক্ষ্যহীন মুহুৰ্ত্ত থামিয়া। তুমি নাহি বুঝ প্রিয়, সে স্তব্ধ প্রহরে মুখরি সে নিভৃত ভবন- কঙ্কণ-সঙ্কেতে কেন শারি উঠে গাহি- “আসিলে কি রে মন-মােহন!” আমি বুঝি তুমি কেন হে চির-সুন্দর! মিছামিছি ফুল-তােলা ছলে, বিনম্ৰ বচনহারা আসি দাও দেখা এ বিজন তালী-কুঞ্জ তলে।

বনফুল
তুমি নাহি বুঝ তব কুসুম-চয়ন
ছলটীরে সত্য করিবারে।
যতনে রােপিল কেবা এ বন-ভবনে
প্রসূনের পাদপনিকরে।
নব মেঘে নভঃ ভরা, আমি জানি কার
মন আজি করিছে কেমন
কে কারে বেড়িয়া ভ্রমে বনে উপবনে,
কে করিছে নীরবে রােদন।
তুমি শুধু জান সখে, সহকার-শাখে
মাধবীরে দিতে জড়াইয়া-
বন হ’তে বনান্তরে ত্বরিতে চকিতে
ফিরিবারে বেণু বাজাইয়া।
৩২

বনফুল
স্থান-মাহাত্ম্য।
বীর হস্তে লৌহ চির বজ্রশক্তি ধরে,
বণিকের তুলাদণ্ডে শস্য মাপ করে;
যন্ত্রাগারে অগ্নিসনে নিত্য করে খেলা,
অশ্বখুরে কাটে দিন গায়ে মেখে ধুলা ;
ধনাগারে মণি-মুক্তা-সুবর্ণ-রক্ষক,
কামারের কর্মশালে শব্দে ভয়ানক ;
একি নর কর্মক্ষেত্রে বিচরণ করে,
স্থানের মাহাত্মে কভু উঠে কভু পড়ে।

বনফুল
তােমার স্বরূপ
১
নন্দন-আনন্দ তুমি ত্রিদিবের নহ পারিজাত,
কিম্বা সুখ-হেমন্তের নহ তুমি প্রােজ্জ্বল প্রভাত,
শরৎ-আকাশে তুমি নহ মুক্ত হাস চন্দ্রিকার,
কিম্বা তুমি নহ চিত্রা নীলাকাশে চৈত্র পূর্ণিমার ;
সবারে প্রকাশ করি আপনারে অতি সঙ্গোপনে
লুকায়ে রেখেছে নাথ, কোথাকার সুপ্ত নিরজনে।
===
বীণাধ্বনি নহ তুমি, নহ তুমি রাগিণী মূচ্ছনা,
যমুনার তীর-ভূমে নহ তুমি বাঁশরী-বাজনা,
জগাই মাধা’-উদ্ধারি তুমি কি গাে প্রেম নিতা’য়ের?
শারদ পাৰ্বণকালে তুমি কি গাে প্রার্থনা ভক্তের.?
বড়ই সুন্দর তুমি, তােমার স্বরূপ কোথা পাই,
লভিতে স্বরূপ তব মনে হয় তব কাছে যাই।

বন-ফুল
in
তুমি কি যােগীর কানে অনাহত সুররূপে বাজ ?
তুমি কি দ্বিদলে নাথ ! নানাবেশে নানারাগে সাজ ?
ব্ৰহ্মানন্দ-ব্যাকুলতা অনুরাগী কৰ্মীপুরুষের
তুমি কি গাে? তুমি কি গাে বাহমূর্তি অন্তর্জগতের ?
যত করে অভিনয় তত বলে বিশ্বের অন্তর,
বড়ই সুন্দর তুমি, ওগাে তুমি বড়ই সুন্দর ।

বনফুল
পরিচয়
সেই শুধু বুঝে চরণের গতি,
উদ্দাম কিবা কম,
যদি কোন দিন কেহ তার তরে
নিদ্রিত ধরা শিহরিত করে
চুপি চুপি আসি শিয়রের পরে
বলে থাকে “প্রিয়তম”।
সেই শুধু বুঝে চরণের গতি
উদ্দাম কিবা কম।
সেই শুধু চিনে নম্র-আকুল
মদ-চঞ্চল নয়নে,
যদি কোন দিন ঘন তার পানে
চেয়ে গিয়া থাকে কেহ আনমনে
৩৬

বনফুল
কোথাকার কোন বেণু-বন-ছায়ে
কোথাকার স্বন-ভবনে-
সেই শুধু চিনে নম্র-আকুল
মদচঞ্চল নয়নে।
সেই বুঝে ঘন শিঞ্জিত-ধ্বনি
কিবা যাচে কিবা ভাষে,
যদি কেহ সিত অৰ্দ্ধ নিশায়
সুপ্তোখিতা প্রিয়ার কৃপায়
ঘন শিঞ্জিত-মঞ্জীর-রবে
জেগে থাকে মালসে-
সেই জানে ঘন শিঞ্জিত-ধ্বনি
কিবা যাচে কিবা ভাষে।
৩৭

বন-ফুল
আলাউদ্দীনের পদ্মিনী-দর্শন।
বিশাল দর্পণ-অঙ্কে পদ্মিনীর ছায়া
সুবিম্বিত, দেখে নাই নীল পেশােয়াজে
আবৃত করিতে গিয়া কুন্দ-কান্তি-কায়া
রূপের তরঙ্গ তন্বী শুধু বৰ্ধিয়াছে।
স্বর্গ ছাড়ি, ভাবে মনে যবনভূপতি,
ও রূপ-সাগরে তৃপ্তি করেছে বসতি
!
বিমুক্তিয়া বেণীবন্ধ ভাবে নাই স্বতী
কুঞ্চিত-অলক-কুঞ্জে মুখ কান্তি তার
নগ্ন শুত্র ফুলসম হবে স্ফুর্তিমতী,
সীমন্ত-সিন্দুর রক্ত কেশর তাহার।
যবনভূপতি ভাবে, অলক-অঞ্চলে
সৌন্দৰ্য-শিশুটী বুঝি ঘুমায় বিরলে !
।

বনফুল।
ইন্দীবর আঁখি-যুগে দু’টি কৃষ্ণ তারা
স্থির অচঞ্চল, আহা বুঝে নাই সতী
মধুমত্ত ভৃঙ্গ যেন আছে জ্ঞানহারা
তাহারি নয়ন-পদ্ম মকরন্দে মাতি।
আলা ভাবে, ওই কালাে তারা-ভৃঙ্গ দু’টি,
জীবনের কুঞ্জে তার গুঞ্জে যদি ছুটি !
৪
নীল পেশােয়াজাবৃত উরস বিস্তৃত
রােষে ক্ষোভে অভিমানে উঠিছে কাপিয়া,
বুঝে নাই দলে দলে বেলা প্রতিহত
নীলােৰ্ম্মি উঠিছে যেন দুলিয়া দুলিয়া।
আলা ভাবে, ওই নীল তরঙ্গের দলে
জীবনের তরি যদি চিরদিন চলে !
খুলিয়াছে সীমন্তিনী কাঞ্চী ও কিঙ্কিণী,
মঞ্জীর, শিঞ্জিত-ভয়ে, রেখেছে কঙ্কণ
আয়তি রক্ষিতে শুধু, বুঝেনি ভামিনী
সেটি কি গভীরতম প্রেম নিদর্শন।
আলা ভাবে, ওই প্রেম-অমৃতের নদী,
জীবন-কান্তারে তার বহে যেত যদি
!

বন-ফুল।
মন্ত্রমুগ্ধ অহি সম যবন-ঈশ্বর
আত্মহারা, পার্শ্বদেশে সুবর্ণপিঞ্জরে
সারিটী গাহিয়া গেল, শ্রবণ সত্বর
ধরি সেই গানখানি চিত্তের দুয়ারে
আঘাতিল; প্রকৃতিস্থ দেখিলা মুকুরে
পদ্মিনীর ছায়াখানি আর না বিহরে।

বনফুল বাসর-নৈবেদ্য জীবনে ছিল না কিছু ছিল তাহা অনাবিল জীবন নদীর, ঢেউ হয়ে নাচিতাম কভু, কভু শান্ত প্রশান্ত গম্ভীর। আলেখ্য সকলি সুলক্ষিত স্বচ্ছ ছিল এত সে জীবন, আনন্দের একটি হিল্লোলে, ভরে যেত মুখ বুক মন। নিজ গণ্ডী ক্ষুদ্র বিশ্বমাঝে, যাহা নিত্য পেতাম কুড়ায়ে, তাই ল’য়ে দ্বার রুদ্ধ করি' ছিনু মুগ্ধ জাগিয়ে ঘুমায়ে । হে নিৰ্ম্মল, এ সুবর্ণ যুগে তব কথা মনে যা পড়ি, আমার সে রুদ্ধ দ্বারে আসি ঘুরে গেছ করাঘাত করি। বার বার মাের প্রত্যাখ্যানে, কি জানি গাে ক্ষুদ্র হৃদি দহি যদি পড়ে থাকে ক্ষুদ্র শ্বাস, হে দুর্লভ, আজি তাই কহি :- “আনমনা বালিকার সেই, সেই সে পুরানাে অপরাধ- হে নিৰ্ম্মল, ক্ষমা কর আজি মাের আদি আকিঞ্চন সাধ । বাড়িতে লাগিল মাের বেলা, গৃহাশিত তােমার বল্লরী গ্রহিলে ভাব কৈশােরের দু’ চারিটী নব পত্র ছাড়ি। ৪১

বনফুল।
গগন বেড়িয়া নিতি নিতি দেখা দিত নবীন প্রভাত,
করে, রাগে, গন্ধে, গানে, গানে, আচ্ছন্ন হইল দিন রাত
কাহার কৰ্ম্মঠ হাত দুটি, দিল মাের রুদ্ধ দ্বার খুলে,
পূর্ণ হ’ল হৃদয়-মন্দির সুরভিত দখিনা অনিলে।
একদিন হেমন্ত প্রভাতে নিষঘ্নিত আপন ভবনে,
তােমারে লইয়া মাের পিতা উপনীত হলেন সেখানে।
সম্বােধিয়া জননীরে মাের কহিলেন জনক যে বাণী,
সরমে মরিয়া গিয়াছিনু বুঝি মাের না ছিল পরাণী ।
ক্ষিপ্রগতি ত্যজিতে সে স্থান সরে গেল চঞ্চল চরণ,
তারপর কিবা ঘটেছিল ছিলনাকো আমার চেতন।
হে দর্শক, মাের সে আঘাতে যদি ব্যথা পেয়ে থাক মনে-
শত ভিক্ষা সে স্মৃতি বিলােপে, শতপ্রাণ সে সমবেদনে।
গুরুবাক্য-শঙ্খ দিল সাড়া, শ্রবণে পশিল তব গান,
ক্রমে কার ধ্যান-ধারণায় ভরে গেল এ হৃদয় খান !
বসন্তের রঞ্জিত প্রভাতে, নিদাঘের ধূসর সন্ধ্যায়,
কত আশা নিরাশার কথা শুনিতাম বসি নিরালায়।
পল্লীর সংকীর্ণ পথখানি, জনস্রোত বড়ই বিরল,
সে সান্নিধ্যে কভু হ’ত দেখা মন্ত্রমুগ্ধ পথিকযুগল।
তরঙ্গিত পল্লব-পয়ােধি দুই ধারে বায়ু কল্লোলিত ;
হিল্লোলিত ফুলদল যেন ফেনপুঞ্জ উঠিত পড়িত।
স্তব্ধতা ভাঙ্গিয়া সে বনের বিহগের ছুটিত রাগিণী,
অদূরবর্তনী প্রবাহিনী পাঠাইয়া দিত কলধ্বনি।
৪২

বনফুল
সে মােহন—না গাে না ভয়াল, সে দুরন্ত পথ অতিবাহি’
ঝঙ্কত চরণ যেত চলে, তাহার কর্তব্য ভুলে নাহি।
তারপর সেই পল্লী-পথে বন্ধ্যা সন্ধ্যা নামিত যখন,
নিজাবাসে ফিরে যেতে তুমি লয়ে’ হিয়া সন্ধ্যার মতন!
হে সাত্ত্বিক ! সেই অপূর্ণতা আজি এই ব্যক্ততার তটে
বিসর্জিয়া, মুগ্ধ হিয়াটিকে আশ্বস্ত করিলে অকপটে।
আজি এক ভিক্ষা মাগি ল’ব, দিও দেব! বিরাট-বন্ধন!
সে বন্ধন-সন্ধিতে সন্ধিতে করি যেন আত্ম-বিসর্জন!

বন-ফুল।
প্রার্থনা।
ঊর তবে বিশ্বরমে, উর দেবি, ত্রিলােক-বন্দিতা,
হে মানস-সুন্দরী কবিতা।
প্রসূনের পরকাশে যে নন্দনে নাহি তিরােধান,
বৈশ্বানর-স্পর্শ বিনা ধূপ যেথা গন্ধ করে দান,
নাহি পিক তবু কুঞ্জ মুহুর্মুহু কুহু-কুহরিত,
বাদক-বিহনে যেথা শত বীণা স্বতঃই ঝঙ্কৃত,
উষা যেথা দিনমান, নিশি লক্ষ্মী-পূর্ণিমার নিশি,
ভ্রাম্যমান স্বররূপে ভ্রমে যেথা বাঁশী আর হাসি,
যে নিকুঞ্জে নিবসেন পদ্মাসনা বাণী বীণাপাণি
আন দেবি, সেথা হ’তে নব গান নবীনা রাগিণী ।
শক্তি ভক্তি ল'য়ে যথা এসেছিল গােয় নদীয়ায়,
এস তুমি সেই সে প্রথায় ?
৪৪

বনফুল
বজনীর মৃত্যু-গাথা বিহগের কলকণ্ঠে শুনে,
প্রাচী দিগীশ্বরী উষা যথা তার কিরণ-চুম্বনে,
সারাটী বিপিন-বদ্ধ অন্ধকার দেয় সরাইয়া
অজ্ঞান-তিমির মাের নাশ তুমি তেমতি করিয়া !
।
শারদ পার্বণে যথা আসে বঙ্গে উমা চন্দ্রাননা,
এস তুমি তেমতি শােভনা।
দিব্য গন্ধে আমােদত হ’ক মাের হৃদয়-মন্দির,
সুগন্ধি কুসুমকুলে ভ’র যা’ গর্ভ সাজিটীর ;
কল্যাণ-প্রদীপ জ্বালি’ কর, দেবি, জয়মন্ত্র পাঠ
সে মন্ত্রে দেখা মােরে অনন্তের ছায়া সুবিরাট ;
“শান্তি শান্তি” বলে’ শিরে ঢাল সপ্ততীর্থ-বারিধার,
উপাধানে মুখ-ঢাকা ঘুচে যাক ক্রন্দন আমার !
৪৫

বনফুল
উদ্ভ্রান্ত
স্বপ্ন দেখি প্রিয়া যবে
গাঢ় নিদ্রাবেশ-ভরে,
মদির পরশে তার
আমারে অবশ করে-
জড়ের ও চেতনার
সেই নব সমাধানে,
আমার নয়নে এক
দিব্য স্বপ্নরাজ্য আনে।
সে রাজ্যের মাঝে এক
বসন্তের আছে দেশ,
সে বাসন্তী দেশে আছে
একটি উপনিবেশ,
সেই সে উপনিবেশে
আছে এক উপবন,
সেই উপবনে আছে
রম্য এক নিকেতন,

বনফুল সেই রম্য নিকেতনে সুসজ্জিত কক্ষ মাঝে, নিদ্রা আর জাগরণ একত্রে দেহে বিরাজে। সে ত সেথা জড় মৌন— সেথায় চেতনা আমি, সে বলে, ঘুমায়ে যাও আমি বলি, জাগ তুমি ! সে বলে, সমাধি লহ- আমি বলি, উঠ জাগি জগৎ সাধনা করে দরশ পরশ লাগি । ৪৭ বনফুল ভাগ্য-হত। লুকায়ে কাঁদে কতনা নদী বালুকা-বন-তলে, বনের পথ মিলায়ে থাকে বনে ; কণ্ঠহীন গায়ক-হৃদে যে গান মাথা তােলে— সে গান শুধু লুকায়ে থাকে মনে। নদীটি কহে হায়, মাের বুকেতে নাহি ঢেউ- বনের পথ কহে, মাের নাচেনা বুকে কেউ। নিয়ে থাকে কতনা তারা সুনীলাকাশ-ভাগে, পাতার মাঝে কতনা ফুল রহে ; জলদ-ঘেরা গগনতলে যে উষা যবে জাগে- সে শুধু বুকে বেদনা রাশি বহে। তারকা কহে হায়, আমি কেমনে আলাে দিব ! কুসুম কহে কঁদি, আমি কেমনে বাহিরিব । - ৪৮

বন-ফুল।
আহ্বান।
যদি
বন্ধন দাও খুলে
তব চম্পক-অঙ্গুলে,
তবে মাের প্রাণ গাহে তব গান
নিজ ক্ষুদ্রতা ভুলে--
যদি বন্ধন দাও খুলে।
নীল আকাশের তলে
মেঘ চলে দলে দলে,
যেথা
রবি জাগে ভাের বেলা,
তারাল করে খেলা,
মােরে লয়ে চল ।
ওই গেহ-তল
ওই অসীমের কুলে
দেবি, বন্ধন দাও খুলে !
জনম ধরে গােমরণের রূপ
চির শান্তির দেশ।
৪৯

বনফুল।
আপনার পর যেথা ভেদ নাই,
সবাকার গৃহে সবাকার ঠাই,
সকলি
নূতন
সবি পুরাতন,
নাহি আদি নাহি শেষ ;
যেথা গেলে সবে আত্ম হারায়
লােক-প্রসবিনী মহতী মায়ায়,
প্রতি হিয়ামাঝে একটি চেতনা
শুধু থাকে অবশেষ ;
ফেলে আসা যায় যাদেরে ধরাতে,
সবি মনে হয় রয়েছে বুকেতে,
মাের প্রাণ হ'তে যেন এ বিশ্ব
লভিয়াছে উমেষ ;
মােরে লহ দেবি, সে সুখ-রাজ্যে
সেই শান্তির দেশ!
সেথা
সেথা
সাগরে সাগরে উঠিতেছে ঢেউ
নিরাবিলি সারাবেলা,
গগনে গগনে ছুটিতেছে মেঘ
সবি যে আমারি খেলা!
আমরি এ প্রাণ সকলের সনে
রহিয়াছে বাঁধা শত বন্ধনে,
আজি আমি পড়ি সসীমের মাঝে
একান্ত প্রাণহীন

বনফুল।
আপনার মাঝে আপনি বিকল
অজ্ঞাত উদাসীন।
দেবি,
বন্ধন দাও খুলে
তব চম্পক-অঙ্গুলে,
গা’ক মাের প্রাণ তব জয় গান
নিজ ক্ষুদ্রতা ভুলে
দেবি, বন্ধন দাও খুলে !

বন-ফুল।
উদ্দেশে।
গভীর গভীর স্তব্ধ বরষা রাতি,
দৰ্দর দূরে
বিরাম নাহিক জানে,
কল-কলে জল উচ্ছলে চারিদিকে,
গুরু গুরু মেঘ গর্জিছে খণে খণে ;
মিলন আসিয়া হাকিল এমনি রাতে,
“তােমারি লাগিয়া এসেছি হে প্রিয় কবি,
নয়ন মেলিয়া তাহারে দেখিনু হায়,
সে নহে মিলন, সে যে বিরহের ছবি।
গগনে তখন ঝরিতেছে জলধারা,
দুজনে পীড়িত দোহার বিজন সঙ্গে,
কল-মুখরিত মঞ্জীর দু’টি ছাড়ি
শত সঙ্গীত শিহরিছে তার অঙ্গে ;
দ্বিধা ভরে তবে ভাষিল কাতর কণ্ঠ
‘মিলন—আমি যে মিলন, হে প্রিয় কবি,

বনফুল
তবুও হেরিনু আকুল নয়ন যন্ত্রে
সে নহে মিলন, সে যে বিরহের ছবি !
তাহার মালার গন্ধে আকুল গেহ,
মােহিত মানস তাহারি বচন ছন্দে,
নয়ন কহিছে, যা আছে সকলি দেহ,
রূপ-বিভা তার নিদিছে শত চন্দ্রে ;
তবু কম্পিত কণ্ঠ কহিল যবে-
“মিলন-আমি যে মিলন, হে প্রিয় কবি”,
শেষের দেখাটি নীরবে দেখিনু হায়,
সে নহে মিলন—সে যে বিরহের ছবি।
৫৩

বনফুল
মহাকাশ।
শশধর-কর-লেখা নৃত্যপর তােমারি উরসে
হে শান্ত উদার,
এক হ’তে একান্তরে তব বক্ষে করে ছুটাছুটি
রশ্মি তারকার।
আবরি কনকাঞ্চলে আরক্তিম শৈশবী রবিরে
মুগ্ধা উষা রাণী
তােমারি চরণ-প্রান্তে প্রকৃতির শ্রেষ্ট শিশুটিরে
নিত্য দেয় আনি।
ধরণীর প্রতিকথা, প্রতিগান, কুজন গুঞ্জন
সত্বঃ আকর্ষিয়া,
নিশি দিন আছ জাগি, রাশি রাশি বিশ্বের সংবাদ
গুনিয়া গুনিয়া!
শূন্য তুমি মহা শূন্য, বিচঞ্চল বায়ুর সাগর
বক্ষে তব শ্বসে-
৫৪

বনফুল। পূর্ণ তুমি মহা পূর্ণ, তব বক্ষে কোটি বিশ্ব নাচে রভস-উল্লাসে। ক্ষুদ্র তুমি মহাক্ষুদ্র, আত্ম ভুলি খণ্ড ঘটাকাশে বন্ধন-আতুর- রূপে, রসে, গন্ধে মহ, তবু তুমি নির্লিপ্ত-অতীত হে মুক্ত চতুর! ওহে শান্ত, ওহে সচ্ছ, সর্বলোেক তোমার অতিথি তুমি সৰ্ব্ব ঘটে— এ বিশ্বের সর্ব গানে, সব হাস্য, হে সত্ত্ব-প্রধান তব বাক্য রটে।

ফুল।
শ্রান্ত পান্থ।
শুভ্রতা, কালিমালয়ে, লয়ে সীমা লয়ে দেহ,
কত যুগ ঘুরিতেছি জানিনা, না জানে কেহ।
দিন আসে দিন যায়, ফুল পরিণত ফলে,
আপনার মাঝে আমি আপনি অাছি বিফলে।
নিৰ্বর হইল নদী, নদীটি হ’ল সাগর,
আপনার মাঝে আমি যথাপূৰ্ব্ব তথা পর।
আবর্তনে বিবর্তনে এক হ’তে একান্তরে,
ঘুরিতেছি অনিবার কামনা-কামিনী-ক্রোড়ে।
ফুল রূপে যতবার জনমিনু বিশ্বেদ্যানে,
হই নাই নিয়ােজিত দেবতার শ্রীচরণে।
সুকোমল করে কভু বাসর শয়নােপরি,
কেটে গিয়াছিল মাের ফুল-জন্ম-বিভাবরী।
বারি রূপে ছিনু যবে পাদ্য অর্ঘ রূপে মােরে-
করে নাই ব্যাবহার তপঃসিদ্ধ ঋষিবরে।
অপ্সরার কক্ষলগ্ন কলসীতে উছলিয়া,
বাখানিতু রূপ তার কল-ভাষ আরস্তিয়া।
***

বনফুল।
দেব-দ্বারে দীপ রূপে জ্বলেনি আমারে কেহ,
লভে নাই ভাগ্য মম দেব-সঙ্গ দেব-মেহ !
তাই গুণ দোষ বহি, বহি সীমা বহি দেহ,
কত যুগ ঘুরিতেছি, এবে শ্রান্ত বীতস্পৃহ।
নিহত আশা-সমাধি আছে কত হৃদে যার,
আমি যেন ঘুরিতেছি দীর্ঘশ্বাস মত তার ।
মরণ এনেছ তুমি বহু রূপে বহুবার,
এন দেব, চিরসুপ্তি এবারেতে সঙ্গে তার।
বহুবার দেখিয়াছি অমানিশা-অন্ধকার,
এবারে দেখায়াে নাথ, নিশা লক্ষ্মী-পূর্ণিমার ।
স্নিগ্ধ সান্ধ্য ছায়া ঢাকা পর পারে তবাশ্রমে,
বিশ্রামের শয্যাসনে যেন পাই সেই ঘুমে—
রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ যে ঘুমের দ্বারে
নব বধুটির মত বিচরিতে নাহি পারে।
৫৭

বনফুল।
বিশ্ব-সৌন্দর্যের প্রতি।
(১)
হেরি নিত্য তব মূর্তি, হে সৌন্দৰ্য্য, কত যে বিধানে,
ক্ষুদ্র নর কেমনে বাধানে!
নৈশাকাশ হতে যবে তারার কুড়াতে কুড়াতে
কর আত্ম বিসর্জন প্রকটিত বাসন্তী উষাতে
ছন্দে ছন্দে বেজে উঠে ধরণীর হৃদিতন্ত্রীচয়,
লাজনম্র নববধু ঝঙ্কত চরণে বাহিরয়
শয়ন মন্দির হ'তে, পিঞ্জর আবদ্ধ পােষা পাখী,
‘বউ কথা কও' বলে তীব্র কণ্ঠে উঠে তবে ডাকি,
ফুট কুসুমের ঘ্রাণে ভারাক্রান্ত প্রভাত সমীর
ধীরে মূরছিয়া পড়ে পল্লবিত গাত্রে বল্লরীর,
তটিনীর তটভূমে ঢেউ গুলি পড়ি আছাড়িয়া
আপনারে চুর্ণ করে কি জানি কি ভাবে উচ্ছাসিয়া,
সে মুহুর্তে দেবি, তব বিশ্বভরা বিশ্বরূপ দেখি,
আত্মহারা স্তব্ধ মৌন, সহস্রের মাঝে ডুবে থাকি
সম্বিত বিরাগী।

বনফুল।
অজ্ঞাতে হৃদয় নদ উঠে তরঙ্গিয়া
কি যেন প্রার্থিয়া !
(২)
রে সুন্দরি, রে মােহিনি, রে গৰ্বিতা, তুমি সৰ্ব্ব কাজে
অন্তরে বাহিরে বিশ্ব মাঝে!
নয়নে নয়ন দিয়া, জীবনেতে ঢালিয়া যৌবন,
গােপনে নির্জনে কত দাও দেবি প্রণয়বন্ধন।
বাদল নেমেছে মর্তে দিনমানে সন্ধ্যা লাগিয়াছে,
তুমিই ত স্মিতহাস্যে ঘুরিতেছ দম্পতির পাছে।
নিভৃত মাধবীকুঞ্জে নয়নে আনিয়া কার ছবি,
আবেশে শিহরি উঠ প্রিয়জন পদশব্দ ভাবি।
আগমন আশা প্রাপ্ত প্রােষিতার গৃহ-বাতায়নে,
তৃষাওঁ আকুল নেত্রে চেয়ে থাক পল্লীপথ পানে,
বাঞ্ছিত দর্শনে।
সৰ্ব্ব ঘটে বিচ্ছুরিত জোছনার মত
তুমি হাস্য রত ।
(৩)
কবে তুমি সৌরবংশ জানকী বধুরে সঙ্গে করি
বন পথ মঞ্জীরে মুখরি,
চলেছিলে পাখীডাকা গন্ধমাখা গভীর গহনে
নীতল শীতলনীরা সরসীর পুলিনে পুলিনে।
রাজবধু উর্মিলার দীর্ঘ বিরহের শেষ দিনে
শত মুখে হেঁসেছিলে পুনলব্ধ বাসর শয়নে।

বনফুল।
অতীতের বৃন্দাবনে মিছামিছি জল আনা ছলে
প্রেরণ করিতে কত ব্রজাঙ্গনা কালিন্দীর কূলে
মঞ্জু-নীপ-মূলে !
ধরণীর নৰ্মসখী তুমি বিশ্বনােভা
নন্দন-সৌরভ।
(৪)
হেলেনার রূপমুগ্ধ রাজপুত্র তােমারি লাগিয়ে,
জেলেছিল কি অনল টুয়ে!
সের আফগান মৃত্যু তুমিই ত সংঘটন করি,
দিল্লীর প্রাসাদ হ'তে নেহারিতে যমুনা লহরি।
ইন্দুমতী স্বয়ম্বরে রক্তস্রোতে রঞ্জি’ ধরণীরে
শুনিতে কি কলধ্বনি গিয়াছিলে সরযুর তীরে?
তােমারি তাড়না ক্রমে সূর্পনখা পঞ্চবটী বনে
সুচিত করিয়াছিল রক্ষকুল-নিধন-সাধনে
মদাৰূ যৌবনে।
তােমার বাঁশরী কভু গায় আচম্বিতে
প্রলয় সঙ্গীতে ।
(৫)
গানে, গন্ধে, গুঞ্জরণে কবে কোন্ পূর্ণ পূর্ণিমায়
জেগে গেছ তুমি অমরায়।
নবােদ্যমে নব স্বাস্থ্যে একাকিনী আকুল পুলকে,
সহস্রে মিশিয়া গেলে মিশে গেলে দ্যুলােকে ভূলােকে ;
গিরি বিদারিয়া সেই পুণ্য দিনে বহিল নিঝর,

বন-ফুল।
•
•
সে দিন প্রথম পুষ্প প্রসবিল পাদপনিকর
সে দিন এ বিশ্ব প্রান্তে বসন্তের শুভ আগমন
মূক মৌন পিকক কল কণ্ঠে করিল কীৰ্ত্তন
প্রথম তরঙ্গশিশু দেখা দিল প্রবাহ-শিখরে,
প্রথম প্রণয় বার্তা ফুটে গেল রমণী অধরে,
অলি-গুঞ্জ-স্বরে !
সেই দিন হ'তে গাহে তব জয়গান
সারা বিশ্বখান।
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Bana-phul

Author
Chattapadhyay, Mohinimohan
Title
Bana-phul
File name
Bana-phul
Text
OCR done
Citation
1909
Published
2009/11/28
Publisher
Gobindraprasad Chakrabarti,murshidabad
Language
Sanskrit
Pages
76
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Bana-Phul
DLI number
512362
Barcode
4990010019446.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
7fhsgLWbw3d
Download PDF

Bana-phul