Amta Public Library,howrah

Kavya-parimiti Ed.1

Sengupta,jatindranath · 2010/03/26

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কাব্য-পরিমিতি
শ্ৰীষতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
মৃল। ।
টা বা

১ সি, লেক রােড, কালীঘাট
সচক্র সাহিত-সংসদ হইতে
শ্ৰীবাধেশ রা কর্তৃক
প্রকাশিত।
প্রথম সংস্করণ-অঢ়, ১৩৩৮
উপাসনা পেস, ২, ওয়েলিংটন লেন, ধৰ্ম্মতলা,
কলিকাতা হইতে
শ্ৰীসাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, বি-এ
কর্তৃক মুদ্রিত।

বন্ধুবর সুকবি
কালিদাস রায়কে
অপিত হইল।

কাব্য-পরিমিতি ১৩৩৭ ও
১৩৩৮ সালে “উপাসন”
পত্রিকায়
ধারাবাহিক
ভাবে প্রকাশিত হইয়া-
ছিল।
বর্তমানে পুস্তকা-
কারে থিত হইল।

1 ২।]end 1 কাব্য-পৱিমিতি সূত্র আমাদের পূর্বপুরুষগণ সংসার-রূপ বৃক্ষে দুইটা মাত্র অমৃত-ফলের সন্ধান পাইয়াছিলেন,-একটী কাব্যরস, অপরটা সাধুসঙ্গ। জীবনে আমরা নানা ফলের আস্বাদ গ্রহণ কবি সত্য, কিন্তু তাহার কোনটাকেই জোর করিয়া অমৃত-ফল বলা যায় না। সাধুসঙ্গ এ যুগে একান্ত দুল্লভ। এখন যাহারা অমৃত-ফলের আস্বাদ লাভ করিতে অভিলাষী, তাহাদের কাব্যরসই একমাত্র ভরসা। কিন্তু দেখা যায় এই কাব্যরস-রূপ অমৃতফলের আস্বাদন- প্রয়াসীদের মধ্যে নানা মতভেদ, বৈষম্য, এমন কি—বিস- স্বাদ। এই মতভেদের কাব্যাতিরিক্ত ব্যক্তিগত কাবণগুলি ছাড়িয়া দিলেও যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহার পরিমাণ অল্প নহে। তঁহাদের মধ্যে রস আস্বাদন অনেকেই করিয়াছেন, তাহার পথও অনেকের পরিচিত। তৎসত্ত্বেও এত মতভেদ দেখিয়া, এই বিচিত্র কাবারসের উৎস, ধারা ও প্রকৃতির অনুসন্ধান করিবার বাসনা মনে জাগিয়া উঠে।

২
কাব্য-পরিমিতি
সংস্কৃত আলঙ্কারিকদের মতে রসের স্থান অতি উচ্চে, -
তাহা না-কি ব্ৰহ্মাস্বাদ-সােদর। কিন্তু এ রস থাকে কোথায় ?
কবিচিত্তে, না কাব্যে, না পাঠকচিত্তে; অথবা কাব্যের ভিতর
দিয়া কবিচিত্তধারা ও পাঠকত্তিধারার যে মিলন তাহারই
নাম রস? কোন্ কাব্যে কি পরিমাণে রস আছে তাহার
শেষ মীমাংসা যে আজও হইল না, তাহার কারণ কি এই নয়
যে—এ প্রশ্নেব মুলে ভুল আছে ? কাব্য ও রস হয়ত
আধার আধেয় সম্বন্ধবিশিষ্ট নহে।
এ সমস্ত প্রশ্নের সমুচিত মীমাংসা করিয়া রসের স্বরূপ
বােঝান ঠিক সম্ভবপর মনে হয় না। কারণ রস অনুভূতিব
বিষয়। কাব্য বুঝা যায় ও অনেকাংশে বুঝান যায়, কিন্তু
রস অনুভব করতে হয়। রস কেন বুঝা যায় না, এই
আলােচনাই বােধ হয় রসের আলোচনা।
কাব্য কি বস্তু এবং রস কেন বুঝা যায় না, ইহাৰ
আলােচনা করিতে গিয়া দেখা যায়, যে এই ব্যাপারে দুইটি
পৃথক ধারা কাজ করিতেছে।
প্রথমটী-কবিচিত্তধারা, যাহা কাব্য সৃষ্টি করে।
অপরটী—পাঠকচিত্তধারা, যাহা কাব্য উপভােগ করে।
এই দুইটী ধারার পথে রসের হ্রদ কোথায়? কোন্ গহনের
অন্তরালে তাহা আপনার অপার বিস্তৃতি ও অগাধ গভীরতা
লইয়া বিরাজ করিতেছে ? এ সন্ধান কাব্যের ভিতর দিয়াই

কাব্য-পরিমিতি করিতে হইবে, কারণ কবিচিত্ত ও পাঠকচিত্তের মিলন কাব্যের ভিতর দিয়াই সংঘটিত হয়। কাব্যই পাঠকচিত্তের পক্ষে রসে পৌছিবার উপায়, আর কবিচিত্তেব পক্ষে রস- মানের পর তীরে উঠা । কথাটা বিশদ করিবার জন্য প্রথমে কবিচিত্তধারার অনুসবণ করি। মানুষ মাটীর উপর দাড়াইয়া আছে ; তাহার প্রথম ও শেষ পরিচয় এই বস্তু-জগতের সহিত। কাব্যজগত ও এই বস্তু-জগতের উপর প্রতিষ্ঠিত। কবিচিত্তধারা কবিচিত্তধারা বস্তুজগত হইতে উপাদান সংগ্রহ করিয়া কাব্য রচনা কবে, সুতরাং কাব্যের মূল বস্তুর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। এই বস্তু-জগৎ কবি, পাঠক, রসিক, অরসিকের সাধারণ বিচরণক্ষেত্র। বস্তু বা বিষয়ের সহিত মানবমনের ঘাত প্রতিঘাতে 'ভাব’এর উৎপত্তি। ইংরাজীতে ইহাকে emotion বলা বাংলায় আমরা emotionকে কখনও ভাব চিত্তবৃত্তি, কখনও ভাবাবেগ বলিয়া থাকি। কিন্তু কাব্যবিচাবে সংস্কৃত 'অলঙ্কার-শাস্ত্রে ব্যবহৃত ‘ভাব কথাটাই প্রশস্ত। কেবল সাবধানে থাকিতে হইবে, আমরা কোন লেখাব ভাব বা ভাবার্থ বলিতে যাহা বুঝি, কাব্যতত্ত্ব- বিচাবে ‘ভাব’ বলিলে সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু বুঝিতে হইবে। ভাৰ অর্থে আমরা অনেক সময় ideaকে ও বুঝি। কিন্তু ভাব’

৪
কাব্য-পরিমিতি
বলিতে আমরা এখন বস্তু বা বিষয়-সংঘাতে চিত্তের ভাবাবেগ
বুঝিব।
মানবমন একান্ত জটিল ও অপরূপ সৃষ্টি। তাহার কোন্
স্তরে কোন বস্তু বা বিষয়ের আঘাত লাগিয়া কোন্ সূক্ষ্ম
ভাবের সৃষ্টি হয় তাহা আমাদের দুজ্ঞেয় ; আর তাহার
সম্যক জ্ঞানের বিশেষ প্রয়ােজনও উপস্থিত নাই। একথা
সকলেই বুঝিতে পাবি, মানব-মনের ‘ভাব’ সংখ্যায় অনেক।
আমাদের পূর্ববর্তীগণ তাহাদিগকে প্রধানতঃ নয়টী গােষ্ঠীতে
বিভক্ত করিয়াছেন রতি, হাস, শােক, ক্রোধ, উৎসাহ,
ভয়, জুগুপ্সা, বিস্ময় ও শম। ইহাদিগকে স্থায়ী ভাব বলা
হইয়াছে। এতদ্ভিন্ন নানা অপ্রধান ভাব স্থায়ী ভাবগুলির
সহচর-রূপে মানব-মনে যাতায়াত করে,-তাহাদের ‘সঞ্চারী
ভাব’ বলা হইয়াছে। ভাবকে স্থায়ী ও সঞ্চারী এই দুই ভাগে
বিভক্ত করার উদ্দেশ্য বোধ হয় এই যে, তাহাদের মতে
কতক গুলি ভাব মানবমনের চিরন্তন সম্পত্তি। অতীতে
তাহারা ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকিবে।
আর সঞ্চারী ভাব যুগে যুগে প্রবল দুৰ্বল হইতে পারে,
তাহারা স্থায়ী ভাবের আশ্রয়ে নিজেদের ধারা বজায় রাখিয়া
চলে; কখনও বা ভাব-বিশেষ একেবারে লুপ্ত হইয়া যায়,
আবার যুগধর্মে নুতন সঞ্চারী ভাবেরও অভ্যুদয় হয়। কিন্তু
মানুষ মাত্রেরই মনে রতি, হাস্য ইত্যাদি নয়টী ভাব চিরদিন
;

কাব্য-পরিমিতি
ছিল ও থাকিবে। যাহা হউক, সাধারণ মানবচিত্তের ন্যায়
কবি-চিত্তও এই সমস্ত ভাব’এর অধীন; প্রভেদ এই যে কবি-
চিত্তে এই সমস্ত ভাবকে দশজনের উপভােগ্য করিয়া ভাষায়
প্রকাশ করিবার ইচ্ছা জন্মে ; অর্থাৎ কবিচিত্ত ভাবকে রসে
পরিণত করিতে চায়। এই ইচ্ছা জন্মে কেন ? ইহার সঠিক
উত্তর সম্ভব নয় । যাহার প্রেরণায় বা তাগিদে কবিচিত্তে
ভাবকে দশজনের উপভোেগ্য করিয়া, অর্থাৎ
প্রতিভা
রসে পরিণত করিয়া, প্রকাশ করিবার ইচ্ছা
জন্মে, তাহাকেই আমরা কবিপ্রতিভা বলি। যে অলৌকিক
শক্তি সাধারণ মানবচিত্তধারা হইতে কবিচিত্তকে পৃথৰ
করিয়া, ভাব হইতে তাহাকে রসে উঠিবার জন্য নিরন্তর
উত্তেজিত করে, তাহাই কবিপ্রতিভা। যে অচিন্ত্য শক্তিবলে
ধরিত্রী তাহার সাধারণ মৃৎবসকে গােলাপে, চম্পকে, বকুলে
গন্ধায়িত করিয়া তুলিতেছে, সেই শক্তি বােধ হয় মানবচিত্তে
ভিন্নরূপে সক্রিয় হইয়া ভাবকে রসে রূপান্তরিত করিবার
ইচ্ছা জন্মায়। অর্থলােভে ও যশােলােভে কাব্যনির্মাণের ইচ্ছা
স্বতন্ত্র বস্তু, সে কথা এখানে বলিতেছি না।
বলিয়াছি, ভাবকে উপভােগ্য করিয়া ভাষায় প্রকাশ
করিবার ইচ্ছা কবিচিত্তের বিশেষ ধৰ্ম্ম। কিন্তু ভাষায় ‘ভাব’-
এর প্রকাশমাত্রই কাব্য নহে। ক্রুদ্ধ হইয়া ভৃত্যের প্রতি
তর্জন-গর্জন ক্রোধভাবের প্রকাশ হইলেও ইহ। ভাবের

৬
কাব্য-পরিমিতি
লৌকিক প্রকাশ মাত্র। কবিচিত্তেব সহিত তাহার সম্বন্ধ
নাই, কারণ ক্রোধকে উপভােগ্য করিয়া প্রকাশ করিবার
ইচ্ছা ক্রুদ্ধ মনিবের চিত্তে কথনও জাগে না। ক্রন্দনে
প্রিয়বিয়ােগের যে প্রকাশ, তাহা শোকের লৌকিক
প্রকাশ। কবিচিত্তধারা সে পথে চলে না। সে ভাবকে
উপভােগ্য করিয়া তবে প্রকাশ করিতে চাহে।
এই সব লৌকিক ভাবকে কবি কি উপায়ে উপভােগ্য
করেন ? কোন্ মন্ত্রে এমন অসম্ভব সম্ভব হয় যে রামসীতা-
বিরহের অসহ দুঃখ হইতে আমরা আনন্দ লাভ করিতে
পারি ; অপরের শোক হইতে আনন্দ পাইবার
কল্পনা
অভিলাষে রঙ্গালয়ে ছুটিয়া যাই ? কবিচিত্ত
যে উপায়ে এই অসাধ্যসাধন করে তাহাকে আমরা কল্পনা’
বলি। কবিমানসে কল্পনা নামে যে মায়াবিনী বাস করে,
সেই এই মায়া-রাজ্যের সৃষ্টি করে—যেখানে পুত্রশোক ও
প্রিয়া-মিলন উভয়ই উপভােগ্য হইয়া উঠে।
কিন্তু ভাব অর্থাৎ emotionএর উদ্রেক মাত্র কি কবি
কল্পনালােকে উপনীত হন ? পুত্রশােক হইবামাত্র কেহ
কবিতা লিখিবার উদ্দেশ্যে কল্পনার আশ্রয় লইতেছেন, ইহা
শােনা যায় না। বস্তু-সংবাতে চিত্তে যখন যে ভাবের উদয়
হয়, তাহার পরও সেই সেই ভাবের স্মৃতি মানব-মনে জমা

কাব্য-পরিমিতি হইয়া থাকে। কবি সেই ভাবস্মৃতি হইতেই তাহার কল্পনার খােরাক গ্রহণ করেন। ভাব-লােকের পর বাসনা ভাবস্মৃতির জগৎ আছে—তাহাকে পণ্ডিতেরা ‘বাসনা’ বলিয়াছেন। রতিভাব হইতে মনে ‘রতি-বাসনা, ক্রোধভাব হইতে ক্রোধ-বাসনা শােকভাব হইতে ‘শােক- বাসনা ইত্যাদি সঞ্চিত হইয়া থাকে। এই সব বাসনা 'ভাব’এর ন্যায়ই লৌকিক। মানবচিত্তে শােক যেমন দুঃখপ্রদ, শশাকের স্মৃতি বা বাসনাও প্রায় সেইরূপই দুঃখ- প্রদ। কবিচিত্ত বাসনা-লােকেও সাধারণ মানবচিত্ত হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন হয় নাই। কেবল ভাব বাসনার ক্ষেত্রে উঠিয়া, সাধারণ মানবচিত্ত অপেক্ষা কবিচিত্তে অধিকতর সংহতরূপ ধারণ করে, অর্থাৎ দানা বাঁধিয়া উঠে। কবিচিত্ত ভাব হইতে বাসনাস্তরে উঠিবার সময় প্রতিভার দ্বারা পরােক্ষভাবে কথঞ্চিৎ ভাবিত হয় বলিয়াই এই সংহতি সম্ভব হয়। কিন্তু বাসনার উর্দ্ধে যে কল্পনা-লােক, সেখানে প্রবেশের অধিকার কবিচিত্তেরই আছে। কল্পনা-লােকে আসিয়াই কবিচিত্ত বিশেষত্ব লাভ কবে। কোন বস্তু বা বিষয়ের আঘাত মাত্র যে ‘ভাব’বিশেষ উৎপন্ন হইল সেই ভাবকে অবলম্বন করিয়াই উত্তম কাব্য লেখা হইয়াছে, ইহার দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু সে সব ক্ষেত্রে বুঝিতে হইবে যে ভাবের নূতন আঘাতে কবিচিত্তে পূর্ব-

কাব্য-পরিমিতি
সঞ্চিত তজ্জাতীয় ‘বাসনা আলােড়িত হইয়াছে বলিয়াই
কল্পনা-সাহায্যে সে কাবের উৎপত্তি সম্ভবপর হইয়াছে।
ভাবলােক ও কল্পনালােকের মধ্যে বাসনা-লােকের অবস্থান
কল্পনামাত্র নহে।
‘ভাব’এর মধ্য দিয়া আহৃত বস্তু বা বিষয়কে ‘বাসনা’য়
সঞ্চিত করিয়া, প্রতিভার প্রেরণায় কবিচিত্ত কল্পনালােকে
পৌছিয়াছে। অনুসন্ধিৎসু মানবচিত্ত বুঝিতে চায়, কল্পনা
লােকে পৌছিয়া কবিচিত্ত কোন্ কৌশলে কাব্য সৃজন
করে। কবি-চিত্ত-ধারার অনুসরণে এই মায়ার জগতে
পৌছিয়া বুদ্ধি যদিও কতকটা দিশাহারা হয়, তথাপি সে
এখনও একেবারে অভিভূত হয় না। তীক্ষ দৃষ্টি বলে সে
ধরিতে পারে, যে এ রাজ্যে কবিচিত্তের প্রধান সম্বল
বিভাব অনুভব
তিনটী ;—বিভাব, অনুভাব ও উপভাব।
উপভাব কবিচিত্ত কল্পনালােকে বসিয়া এই
বিভাব, অনুভাব ও উপভাবের সাহায্যে ভাবস্মৃতি বা
বাসনাকে উপভােগ্য, অর্থাৎ রসে রপান্তরিত করিবার প্রয়াস
পায়। রতি বা অনুবাগ-বাসনা রূপান্তরিত হইয়া শৃঙ্গার
অর্থাৎ মধুর রসে, হাস্য-বাসনা হাস্য রসে, শােক-বাসনা
করুণ রসে, ক্রোধ-বাসনা রৌদ্র রসে, উৎসাহ-বাসনা বীব
রসে, জুগুপ্সা-বাসনা বীভৎস রসে, বিস্ময়-বাসনা অদ্ভুত রসে
ও শম-বাসনা শান্ত রসে পরিবর্তিত হইতে থাকে। প্রকাশ

কাব্য-পরিমিতি তখনও কবিচিত্তে আবদ্ধ, শব্দ তখনও শ্রেণীবদ্ধ হয় নাই, অলঙ্কার তখনও ঝঙ্কার তুলে নাই, অর্থ তখনও বাক্যকে ছাড়াইয়া যায় নাই। কল্পনালােকস্থ বিভাব, অনুভাব ও উপভাবের ইন্ধনে বাসনা তখন পাক হইয়া কবিচিত্তে রস উৎপাদন করিতেছে। গায়ে গায়ে বাসমা সোণা প্রতিদিন আমি কোরেছি রচনা তোমার ক্ষণিক খেলব লাগিয়া যুবতি নিত্যনব। ইহা অনেকটা কবিচিত্তের আত্ম প্রকাশ। বিভাব, অনুভাব, উপভাব কি ? বিশেষ বিশেষ ভাবের উৎপত্তির বিশেষ বিশেষ কারণ থাকে,—যেমন সুন্দরীর সংস্পর্শ রতিভাবের কাবণ। বাসনাপুষ্ট কবিচিত্তে সেই কারণের প্রকাশ-কল্পনার নাম ঐ ভাবের বিভাব। প্রিয় বিয়ােগ শােকভাবের কাণ, কিন্তু তাহা শােকভাবের বিভাব নহে। শােক-বাসনাপুষ্ট কবিচিত্ত শােকভাবের কারণস্বরূপ প্রিয়বিয়ােগের প্রকাশ বা বর্ণনা যে রূপে কল্পিত করে, তাহাই শােক ভাবের বিভাব। কবিপ্রতিভার তার- তম্যানুযায়ী বিভাব উত্তম অধম হয়। চিত্তে কোন ভাব উৎপন্ন হওয়ার পর দৈহিক কাৰ্যে বা বহিলক্ষণে তাহা প্রকাশ পায়,-যেমন শােকভাব ক্রন্দনে।

কাব্য-পরিমিতি কবিচিত্তে সেই সেই কাৰ্য্য বা লক্ষণের প্রকাশ-কল্পনাকে ‘অনুভাব বলা যায় । ক্রন্দন শােকভাবের বহির্লক্ষণ মাত্র, —অনুভাব নহে। কবিচিত্তে সেই ক্রন্দন-প্রকাশের বিশিষ্ট কল্পনাকে শােক ভাবের ‘অনুভব’ বলা হয় । পূৰ্বে বলা হইয়াছে প্রধান ভাবগুলি ছাড়াও অনেক গৌণ ভাব মানব-মনে যাতায়াত করে—যাহাদিগকে ‘সঞ্চারী ভাব বলা হয়। এই সমস্ত সঞ্চাবী ভাব প্রধান ভাবকে পুষ্ট করে। রাজার চিত্তে রাজ্যনাশজনিত শােকভাবের সহিত রাজজনোচিত গৰ্ব্ব ভাবও মিশ্রিত থাকে। রাজার শােক ভাব এই সঞ্চারী গৰ্ব্ব-ভাবের দ্বারা পুষ্ট হইয়া বিশেষত্ব লাভ করে। কবিচিত্তে প্রধান ভাবকে পুষ্ট করিবার জন্য এই সঞ্চারী-ভাবের প্রকাশের কল্পনাকে ঐ প্রধান ভাবের উপভাব’ বলি। ‘কাঙালিনী’ কবিতায় কবি কল্পনা একটী বিশেষ শােক- ভাবকে করুণ রসে পরিণত কবিয়াছে। এই কাব্যের কল্পনাকে বিশ্লেষণ করিলে দেখিতে পাই, কবিচিত্ত প্রথমে বিভাবের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। হের ওই ধনীর দুয়ারে দাঁড়াইয়া কাঙালিনী মেয়ে। বাজিতেছে উৎসবের বাণী কানে তাই পশিতেছে আসি,

কাব্য-পরিমিতি
স্নান চোখে তাই ভাসিতেছে
দুরাশার সুখের স্বপন।
কত কে যে আসে কত যায়,
কেহ হাসে কেহ গান গা,
কত বরণের বেশভূষা
ঝলকিছে কাঞ্চন রতন,
কত পরিজন দাস দাসী
পুষ্প পাতা কত রাশি রাশি,
চোখের উপর পড়িতেছে
মরীচিকা ছবির মতন।
উৎসবমুখরিত ধনীর দুয়ারে দাড়াইয়া শূন্যমনা কাঙালিনী
মেয়ের মনে শােকভাব জাগিবার কারণগুলির এই যে বিশেষ
কল্পনা,—ইহাই এ কবিতায় শােকভাণের বিভাব।
শােকের কারণ কল্পিত হইবার পর, শােকভাবের কার্যে
বা বহির্লক্ষণে কল্পনার লীলা আরম্ভ হইল।
তাই বুঝি আঁখি ছল ছল
বাপে ঢাকা নয়নের তারা।
চেয়ে যেন মার মুখপানে
বালিকা কাতর অভিমানে
বলে-মাগো এ কেমন ধারা।
এত বাঁশী, এত হাসি-রাশি,
এত তাের তিন ভূষণ,

১২ কাব্য-পরিমিতি তুই যদি আমার জননী মোর কেন মলিন বসন? . * * বালিকা দুয়ারে হাত দিয়ে তাদের হেরিছে দাড়াইয়ে, ভাবিতেছে নিঃশ্বাস ফেলিযে আমি ত ওদের কেহ নই। ছল ছল নয়নে, দীর্ঘ নিশ্বাসে, কাঙালিনী মেয়ের শােক- ভাবাবিষ্ট মনের বহিঃপ্রকাশের এই যে কল্পনা, ইহাই এ কাব্যে শােক-ভাবের ‘নুভব। কাঙালিনী মেয়ের মনের শােক’বিশেষ এ কবিতার ভাব। তাহার মন দুঃখ-কাতর। কিন্তু আবার দেখিতে পাই— বালিকা কাতব অভিমানে বলে- “মাগো এ কেমন ধারা ? এত বাশী এত হাসি-াশি এত তাের রতন ভূষণ, তুই যদি আমার জননী মোর কে মলিন বসন ? এই যে অভিমানরূপ সঞ্চারীভাবের প্রকাশ-কল্পনা, ইহাই এ কবিতার ‘উপভাব। এ কবিতার প্রধান ভাব, শােক- ভাব, অভিমানজনিত উপভাব দ্বারা সমৃদ্ধ হইয়া রসকে কাব-পরিমিতি বিশেষত্ব দিতেছে। এ সঞ্চারী ভাবটী বাদ দিলে কবিতা বৈশিষ্ট্যহীন হইত। আর একটা উদাহরণ দ্বারা বিভাব, অনুভাব ও উপভাব- সাহায্যে রসে রূপান্তর বুঝিবার চেষ্টা করিব। কালি, মধুযামিনীতে জ্যোৎস্না-নিশীথে কুঞ্জ-কাননে সুখে, ফেনিলােচ্ছল যৌবন-সুর। ধরেছি তোমার মুখে। মধুযামিনী, জ্যোৎস্না নিশীথ, ফেনিলােচ্ছল, যৌবন-সুরা -এই সব রতিভাবােঘদ্বাধক বাক্য বা বিষয়ের কল্পনা কবি- চিত্তের ‘রতিবাসনা’কে মধুব রসে পরিণত হইবার জন্য আহ্বান করিতেছে। ইহাই এখানে রাতভাবের ‘বিভাব। অবগুণ্ঠন খানি আমি খুলে ফেলেছিনু টানি, ভাবে নিমীলিত তব যুগল নন, মুখে নাহি ছিল বাণী। এই সব রতিভাব-লক্ষণের কল্পনা কবিচিত্তের ‘রতি বাসনা’কে মধুর রসে প্রতিষ্ঠিত করিতেছে ; এগুলি এখানে রতিভাবের ‘অনুভাব। তব আনমিত মুখ খানি সুখে থুয়েছিনু বুকে আনি, তুমি সকল সোহাগ স’য়েছিলে সখী হাসি-মুকুলিত মুখে।

১৪
কাব্য-পরিমিতি
ইহার মধ্যে রতি বের ‘সঞ্চারী'রূপে যে উভয় মনের
হর্ষ ও লজ্জা-ভাব প্রধান রতিভাবকে মধুরতর করিতেছে,
কবিচিত্তে ইহাদের প্রকাশ-কল্পনাই ‘উপভাব। এখানে
উদ্দিষ্ট মধুর রসের উপযোগী পরিবেষ্টনী ( atmosphere)
বচনা করিবার জন্য কবিকল্পনা বিভাবের আশ্রয় লইয়াছে ;
‘অনুভাব দ্বারা রস ঘন হইয়াছে এবং ‘উপভাব’ রসকে
রঞ্জিত করিতেছে। যে রতিভাব বাক্তির চিত্তে পশুভব
মাত্র, মাত্র ভাবরূপে যাহার প্রকাশ সমাজচিত্তে একান্ত
কাজ্জাজনক, যে ‘ভাবে’র সঞ্চিত স্মৃতি অর্থাৎ 'বাসনা’ অধি
কাংশ ক্ষেত্রে মানবমনকে অধােগামী করে, কল্পনার মায়া -
লােকে তাহাই রূপান্তরিত হইয়া শৃঙ্গার’ বা
‘মধুর রসে পরিণত হইতেছে। ইহা যে রতি
ভাব বা রতি-বাসনা নহে, পরন্তু মধুর রস, তাহার প্রমাণ এই
কাব্য হইতেই দেওয়া যাইতে পারে। কবি-কল্পনা রতি-ভাব
ও রতি-বাসনাকে রসলােক বা আনন্দলােকে উঠাইতে সমর্থ
হইয়াছে বলিয়াই সে পরমুহুর্তে পুনরায় কবি-চিত্তকে আনন্দ
হইতে আনন্দান্তরে, রস হইতে রসান্তরে চালিত করতে
সক্ষম হইয়াছে। কবিকল্পনা এখানে কি বিচিত্র পথে কবি-
চিত্তকে লইয়া চলিয়াছে।
রস
আজি, নির্মল বায় শান্ত উষায়
নির্জন নদীতীরে,

কাব্য-পরিমিতি ১৫ সুন-অবসানে শুভ্রবসনা চলিয়াছ ধীরে ধীরে। বাম করে স’য়ে সাজি তুলিছ পুষ্পরাজি, দূরে দেবালয়তলে উষার রাগিণী বাশীতে উঠেছে বাজি, নির্মল বায় শান্ত উষায় জাহ্নবী-তীরে আজি । ইহার প্রত্যেক কথাটীর কল্পনা শান্তভাবের উদ্বোধক বা বিভাবরূপে শমভাবকে শান্তরসে উঠিবার জন্য উদ্বোধিত করিতেছে। কাব্যের পূর্বাব্ধে কবিচিত্ত যদি রতিভাৰ- লােক বা রতিবাসনালােকে নিবদ্ধ থাকিত, অর্থাৎ সে যদি আপনার মধ্যে ঐ ভাবকে কল্পনাকৌশলে ‘রসে রূপান্তরিত করিয়া প্রকৃত আনন্দরূপ দিতে না পারিত, উত্তরঙ্গ ভা। ও বাসনা-জলধির বিক্ষোভ মিটাইয়া তাহাকে শান্ত স্বচ্ছ রসসাগরে পরিণত করতে সক্ষম না হইত, তবে সে চিত্তে সম্পূর্ণ বিরােধী অপর একটী ভাবের, অর্থাৎ শমভাবের, পরিকল্পনা উদিত হইতে পারিত না, কিম্বা উদিত হইলেও তাহা একেবারে বেনুর বলিত। বস্তু এক, সুন্দরী নারী; সে অবস্থাবিশেষে মানব- মনকে ভাব হইতে ভাবান্তরে টানিয়া লইয়া যায় ; আর ভাবসমুহের বাসনাপুষ্ট কবিচিত্ত যথােচিত বিভাব-অনুভাৰ-

কাব্য-পরিমিতি
উপভাব-সমৃদ্ধ অপরূপ কল্পনার সাহায্যে তাহাকে অরূপ রসে
পরিণত করিতেছে।
কবিচিত্তধারা এখন বসলােকে বিচরণ করিতেছে।
অর্থাৎ প্রতিভা যদি উত্তম শ্রেণীর হয়, তবে কবিচিত্ত এখনও
বসলােকে তাহাব আস্বাদ গ্রহণ করিতেছে-কাব্য এখনও
লেখা হয় নাই। পণ্ডিতেরা বলেন—রস ইহা নয়, উহা নয়,
কেবল নিজের সম্বিতের আনন্দময় চৰ্বণ-ব্যাপার, নিজের
সত্ত্বার একটী বিশেষ আনন্দময় আস্বাদন। এখান হইতে
আমাদের ফিরিয়া আসাই সঙ্গত। কারণ ব্যাপারটা প্রায়
অলৌকিক। কবি এখনও কাব্য লেখেন নাই, তাহার
পূৰ্ব্ব মূহুর্তে তিনি নিজের সত্ত্বার ইক্ষুদণ্ডকে চৰ্বণ করিতে
ছেন, যাহার আস্বাদনই রস।
আমি বলিয়াছি প্রতিভ উত্তম শ্রেণীর হইলে, অর্থাৎ
তাহা উৎকৃষ্ট কাব্যের জননী হইলে, কবিচিত্ত রসলােকে
উত্তীর্ণ হইয়াছে, কিন্তু কাব্য এখনও লেখা হয় নাই। কল্পনা-
সাহায্যে রসাস্বাদ, ও কাব্যে তাহার প্রকাশ, দুটি স্বতন্ত্র
ব্যাপার। বসলােক হইতে প্রত্যাবৃত্ত রসসিক্ত কৰিচিত্তই
উৎকৃষ্ট কাব্যরচনায় সমর্থ হয়। তখন চলিতে থাকে
‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে
অন্তর হ'তে আহরি’ বচন
আনন্দ-লোক করি বিরচন।

কাব্য-পরিমিতি
১৭
আর সেই মধুচক্র নির্মিত হইয়া উঠে যাহাতে কেবল
‘গৌড়জন’ নহে, বিশ্বের সমস্ত বসিকজন নিরবধি আনলে
মধুপান করিবে। তখন মধুমক্ষিকার ন্যায় কবি পুন:
পুনঃ রসসিক্ত অন্তরের কুসুমকাননে উড়িয়া যায়, আর
ছন্দিত, অলঙ্কৃত এবং ব্যঞ্জিত বচনামৃত আহরণ করিয়া
কাব্যের মধুচক্রে রাখিয়া যায় । মাঝে মাঝে পাঠকের চিত্ত
লইয়া আপনার নির্মাণ-কৌশল দেখিয়া পুলকিত হয়-
কত যে বরণ কত যে গন্ধ,
কত যে রাগিণী কত যে ছন্দ,
গাগিয়া গাথিয়া করেছি বয়ন
বাসব-শযন তব।
কখনাে সংশয় দোলায় দোলে
সোণার ছলে পাতিযাছি ফাদ,
বাশীতে ভ'রেছি কোমল নিখাদ,
তবু সংশয় জাগে মনে
ধরা দিলে কি ?
কখনও ক্ষুব্ধ হয়-
মনে যে গানের আছিল আভাস,
যে তান সাধিতে ফরেছিনু আশ,
সহিল না সেই ব ঠিন প্রয়াস
ছিড়িল তাব।

১৮ কাব্য-পরিমিতি উঠে। বসলােক হইতে কাব্যক্ষেত্রে অনিবার যাতায়াত চলিতে থাকে, আর অনুপম কাব্যের মধুচক্র রচিত, হইয়া সে কাব্যে ছন্দ, অলঙ্কাব, অর্থ এবং অন্যান্য কাব্য- কৌশল রসের অনুগত হইয়া চলে। সেই অবিরাম যাতায়াতের আয়াস কবিচিত্তকে ক্লান্ত করে না—আনন্দ দেয় এবং সে আয়াস কাব্যেও ধরা পড়ে না ; কারণ আনলে যাহার পরিকল্পনা, আনন্দের মধ্য দিয়াই যাহার গতি, আনন্দেই তাহার পবিণতি ঘটে । কুশলী নৰ্ত্তকের পদ-বিক্ষেপ-শ্রম যেমন পথশ্রম নহে, নিপুণ নৃত্যের ছন্দে ও ভঙ্গীতে যেমন শ্রমের লক্ষণ ফুটিয়া উঠে না, বরং তাহার চতুর্দিকে আনন্দই হিল্লোলিত হইয়া উঠে, তেমনি বসলােক হইতে কাব্যক্ষেত্রে কবির এই এই যাতায়াতের আয়াস কবিচিত্তকে শান্ত কবে না, বা কাব্যে তাহার চিহ্ন রাখিয়া যায় না। কবিচিত্তে ও কাব্যে তাহা আনন্দেরই কারণ- স্বরূপ হয়। উত্তম-প্রতিভাচালিত কবিচিতের কাব্যনিৰ্মাণকালে বসলােক হইতে কাব্যক্ষেত্রে যাওয়া-আসার ব্যাপারটাও অনুভূতির বিষয় ; বুদ্ধি দ্বারা তাহার পূর্ণ পরিচয় লাভ করা যায় না; কিন্তু কাব্যক্ষেত্রে নামিয়া আসিলে কবিচিত্ত যে রূপ গ্রহণ কবে বুদ্ধি দ্বারা তাহার বিশ্লেষণ করা যায় এবং পণ্ডিতেবা তাহা করিয়াছেন।

কাব্য-পরিমিতি ১৯ শষ হইতেছে কাব্যের কঙ্কাল, বীতি ( Style) তাহার অবয়ব, অলঙ্কারই তাহার ভূষণ, বাচার্থ তাহার মন, ব্যঞ্জনা তাহার বুদ্ধি ও রস তাহার আত্মা। বুদ্ধি দিয়া বুদ্ধি পর্যন্ত বুঝা যায়, আত্মার সন্ধান পাওয়া যায় না। কাব্যেরও বাঞ্জনা পৰ্যন্ত দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বুঝান যায় ;-আত্মার কথা, রসের কথা, আপনা হইতে বাদ পড়িয়া যায়, বা অরসিকের কাছে তাহা প্রলাপের মত শুনায়। তবে জীবজগতের ন্যায় কাব্যজগতেও বৈচিত্র্য অসীম। মানব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, অথচ এক মানবের মধ্যেই বৈচিত্র্য কত ! কাব্য আত্মা হইতে কঙ্কাল পর্যন্ত সমস্তই মানুষে পূর্ণত্ব লাভ করিয়াছে। তথাপি যেমন দুটি মানুষ ঠিক একরকমের নয়, তেমনি অনন্তবৈচিত্র্যময় কবিপ্রতিভার সৃষ্ট দুখানি উৎকৃষ্ট কাব্যও এক রকমের নয়। তাহার পর জীবজগতে যেমন সহস্ৰ পৰ্য্যায় চলিয়াছে—মন আছে ত বুদ্ধি নাই, অবয়ব আছে ত শ্ৰী নাই ;-তেমন ব্যঞ্জনা-বিহীন, রীতিহীন, অলঙ্কারশূন্য, অথবা ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণে তাহাদের সমবায়ে উৎপন্ন বহুবিধ কাব্য উৎপন্ন হইয়াছে ও হইবে। মানবের তুলনায় অন্যান্য জীব যেমন নিকৃষ্ট, তেমনি সৰ্বাবয়ব- বিশিষ্ট কাব্যের তুলনায় এসমস্ত কাব্য নিকৃষ্ট। রসকে কাব্যের আত্মা বা হইয়াছে। আত্মাহীন জীব হয় না, সুতরাং রস না থাকিলে কাব্যও হয় না।

२० কাব্য-পরিমিতি নিকৃষ্ট কাব্যে রস আছে কিনা, এ প্রশ্নেব উত্তরে বলিতে হয়,-রসকে যে উচ্চ পদবী পূৰ্বে দেওয়া হইয়াছে সে রস অবশ্যই নিকৃষ্ট কাব্যে নাই ; রসের ব্যবহারিক অর্থই এখানে করিতে হইবে। এবং এ হিসাবে সামান্য পরিমাণে নিকৃষ্ট রসের আস্বাদও যে কাব্যে পাওয়া যায়, তাহাকেই সাধারণত কাব্যসংজ্ঞা দেওয়া হইয়া থাকে। দর্শনাতীত দর্শনে আত্মার যে সংজ্ঞাই দেওয়া হউক, জীবশৈবালের ( Protoplasm) আত্মা ও মানবাত্মার মধ্যে যথেষ্ট প্রভেদ সাধাৰণ বুদ্ধিতে বুঝা যায়। মানবাত্মা ব্রহ্মসামীপ্য পর্যন্ত লাভ করিতে পারে,—কোন ইতর জীবের সে সম্ভাবনাও এইরূপ রসে রসে তারতম্য আছে এবং কাব্যের স্তরভেদও ইহার উপর নির্ভর করে। জীবশৈবালের দেহ ও আত্ম উভয়ই নিতান্ত দুর্বল বলিয়া যেমন তাহা জীব হইয়া ও নির্জীব, তেমনি দুৰ্বল বাক্য ও রসের সমবায়ে উৎপন্ন কাব্যকে অকাব্যই বলা যায়। অতি নিকৃষ্ট কাব্যই নাই। অকাব্য। বলা হইয়াছে, শকই কাব্যের কঙ্কাল। কঙ্কাল যদি অসমঞ্জস হয়, তবে রীতি সুন্দর হইতে পারে না। সুতরাং প্রত্যেক উৎকৃষ্ট কবিপ্রতিভার প্রধান লক্ষণ এই যে, সে ভাববাপযােগী সার্থক শব্দচয়ন করিতে সক্ষম হয়।

কাব্য-পরিমিতি
শব্দচয়নের অক্ষমতা কবিচিত্তের প্রথম ও প্রধান অক্ষমতা।
কুম্ভকার দেবীপ্রতিমা গঠন কবিবার পূর্বে
শব্দ
বাঁশ, দড়ি ও খড়ের সাহায্যে প্রথমে কাটামাে”
গড়িয়া লয়।
যে কুম্ভকার উৎকৃষ্ঠ কাটামো গঠন করিতে
সক্ষম নহে, কাদার হাত’ তাহার যতই ভাল হউক, মূর্তি
উৎকৃষ্ট হয় না। কাব্যগঠনে শব্দের প্রাধান্ত অবিসংবাদিত।
শব্দসমষ্টি যদি অক্ষম এবং দুর্বল হয়, অথবা তাহাবা যদি
ভাবােপযােগী না হয়, তবে কাব্যও উচ্চ স্তরে উঠিতে পারে
।
কাব্য বলিতে আমরা সাধারণতঃ ছন্দোবদ্ধ বাক্য
অর্থাৎ কবিতা বুঝি। কিন্তু কাব্যের ব্যাপক অর্থ গ্রহণ
করিয়া ও বিচার চলিতে পারে, এবং প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস,
নাটক, সমস্তই কাব্যপৰ্যায়ে পড়িতে পাবে। কাব্যের
ন্যায় ইহাদের প্রত্যেকটীতে শব্দরূপ কঙ্কাল
রীতি ও ছন্দ
আছে, বীতিরূপ অবয়ব আছে, বাচ্যার্থরূপ
মন আছে, ব্যঞ্জনারূপ বুদ্ধি আছে এবং রস বা আত্মাও
আছে।
প্রবন্ধে, গল্প, উপন্যাসে ছন্দ নাই, কবিতায় তাহা
আছে। কিন্তু ছন্দকে যদি রীতিব’ অঙ্গ মনে করা যায়,
তবে নিতান্ত ভুল করা হয় না। শব্দের কঙ্কালের উপর যে
বিশেষ অঙ্গসংস্থান যােজনা কবিলে সাহিত্য কবিতারূপ
গ্রহণ করে, তাহারই অপর নাম ছন্দ।

কাব্য-পরিমিতি
ছন্দোবদ্ধ বাক্যের অর্থাৎ কবিতার ভিন্ন ভিন্ন
বিশিষ্ট রীতি হওয়ার বাধা নাই; কিন্তু তাহাদের মধ্যে
ছনোরূপ সাধারণ রীতিটি বর্তমান থাকা চাই।
হিসাবে রীতিকে প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত করা যাইতে
পাবে,—ছন্দিত ও মুক্ত। প্রতিভা ছন্দিত রীতির সাহায্যে
ভাবকে বাসনা ও কল্পনার মধ্য দিয়া রসে রূপান্তরিত কবিতে
প্রয়াস পাইলে তাহাকে সাধারণতঃ কবি প্রতিভা বলি।
কিন্তু সে যখন মুক্ত রীতির সাহায্যে ভাবকে রসে উঠাইবার
চেষ্টায় গদ্য ভাষার সাহায্য গ্রহণ করে, তখনও তাহাকে কবি-
প্রতিভা বলিবার বাধা নাই। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভাকে
আমরা যে কবিপ্রতিভা বর্ধতে আবম্ভ করিয়াছি, সে
তার 'বন্দেমাতরম' গানটার জন্যই নহে,-উপন্যাসের
মধ্য দিয়া ভাবকে রসমূত্তি দিব সফল- প্রত্নতার জন্যই।
তবে বঙ্কিমের কবিপ্রতিভা মুক্ত রীতির আশ্রয়ে ভাবকে
রসে উঠাইয়াছিল।
দেখা গেল রীতিকে মুক্ত ও ছন্দিত এই দুই প্রধান ভাগে
ভাগ করা যায়। রীতি-বিচাবে শ্রবণেন্দ্রিয় আমাদের প্রধান
সহায়ক। যাহার ‘কান আছে সেই রীতি ধৰিতে পারে।
এইরূপ সুক্ষ্ম-কানওয়ালা পাঠকের কাছে মুক্ত বাতিতেও
যে এক প্রকারের ছন্দ আছে তাহা ধরা পড়ে। উত্তম
গদ্য সাহিত্যের যে কোন অংশ পাঠ করিলে বুঝা যাবে যে

কাব্য-পরিমিতি
তাহার একটা ছন্দ আছে। তবে সে ছন্দ কবিতার ছন্দ
হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সেই জন্যই তাহাকে মুক্ত এই
সংজ্ঞা দেওয়া হইতেছে ; যদিও ‘মুক্ত’ অর্থে ‘ক্ষিপ্ত’ বুঝিলে
চলিবে না। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের গদ্যবচনা
হইতে একথা প্রমাণ করা অপেক্ষাকৃত সহজ। বিদ্যাসাগরের
সীতার বনবাসের অংশ উদ্ধৃত করিয়াও একথা প্রমাণ করা
যায়। “রাম রাজপদে অভিষিক্ত হইয়া অ প্রতিহত প্রভাবে
রাজ্যশাসন ও অপত্যনির্বিশেষে প্রজাপালন কবিতে লাগি-
লেন।” এ কাব্যে শব্দসমষ্টি মুক্ত তির সাহায্যে এথিত
হইয়াছে ; কিন্তু ইহারও একটা ছন্দ আছে—তাহাতে সন্দেহ
নাই। ছন্দ যে আছে তাহার প্রমাণ এই, যে শব্দ-বিপর্যয়
ঘটাইয়া ইহার ছন্দ-পতন কব যায়। রাম’ না বলিয়া
যদি বলা হয়, কাকুৎস্থ রাজপদে অভিষিক্ত হইয়া’, তবে
ইহাব ঈষৎ ছন্দপতন ঘটে; রীতি পবিবর্তিত না হইলেও
তাহা দুৰ্বল হইয়া যায়। যদি বলি ‘রাজতকায় বোসে’, তবে
যে ছন্দে কবি এখানে বক্তব্য বিষয় বলিতে ইচ্ছা করিয়া-
ছেন—তাহা হইতে ভিন্ন ছন্দের আশ্রয় গ্রহণ করা হয় ;
রীতি পরিবর্তিত হইয়া যায়। মুক্ত বা ছন্দিত উভয় রীতিতেই
‘যতি’ ‘মাত্রা’ জ্ঞান যাহার নাই সে সুকাব্য অর্থাৎ সুসাহিত্য
রচনা করিতে পারে না। মুক্ত রীতির বিভাগ অনেক
এবং সে মুক্ত বলিয়াই তাহার উপবিভাগ অসংখ্য হইতে

২৪
কাব্য-পরিমিতি
পারে,-হইয়াছেও। ইহাকে কোন আইনের শৃঙ্খলে
বাঁধিবার চেষ্টা আজ পর্যন্ত হয় নাই।
কিন্তু ছন্দিত রীতির নানা বিভাগ উপবিভাগ থাকিলেও
সে স্বেচ্ছায় শৃঙ্খল বণ করিয়া লইয়াছে বলিয়া তাহার বিধি-
নিষেধ দেশে দেশে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। এখানে বাংলা
কাব্যে ছন্দের রূপবিচার করবার প্রয়াস না করিয়া ছন্দের
সাধারণ ধৰ্ম্মসম্বন্ধে ২১টা কথা বলিলেই যথেষ্ট হইবে।
উৎকৃষ্ট কাব্যে ছন্দোরূপ কাব্যকৌশল মূল ভাবকে
রসে উঠাইবার অনুকুল পরিবেষ্টনী রচনা করিয়া রাখে।
এক্ষেত্রে ইহা কল্পনালােকের ভিবেব সহায়ক, এবং অনু
ভাব ও উপভাবে পরিপােষক। বিভাব ভাবকে উদ্দিষ্ট
রসে উঠাইবার উপদেসী পরিবেষ্টনী সৃষ্টি করে ; সুনির্বাচিত
ছন্দ এই কার্যে তাকে সবিশেষ সহায়তা করে।
‘নব বর্ষায় কবি প্রতিভা বর্ষার গুরু-গম্ভীব নৃত্যে
ভাবটীকে বসায়িত করিতে চাহিতেছে,
গুরু গুরু মেন গুমাব গুমরি
গরগে গগনে গগনে
গরজে গগনে।
ধেয়ে চলে আসে বাসের ধারা,
নবীন ধান্য দুলে দুলে সারা,
কুশায়ে কপিছে কাতর কপােত
দাদুরী ডাকিছে সঘনে।

কাব্য-পরিমিতি
২৫
গুরু গুরু মেণ গুমরি মবি
গরজে গগনে গগনে।
ছন্দ এখানে বিভাবকে বিশেষ সহায়তা করিয়াছে।
ছন্দে বর্ষার গাম্ভীর্য অক্ষুন্ন রাখিয়াও নৃত্যের দোলা আছে।
ছন্দ যদি কুনির্বাচিত হইত, অর্থাৎ যদি অতিমাত্রায়
গাম্ভীর্যের দিকে ঝোঁক দিত, কিংবা একেবারে নৃত্য-চপল
হইত, তবে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্লোক দুইটীর বিভিন্ন বিভাব-দ্বয়কে
প্রকাশিত করিতে পারিত না ;-
ঘাট ছেড়ে ঘ
ওগো নদীকূলে তীব-তৃদলে
কে ব'সে অমল বসনে
শ্যামল বসনে ?
সুদুর গগনে কাহারে সে চায ?
ঘট কোথা ভেসে যায় ?
নবমালতীর কচি দলগুলি
আনমনে কাটে দশনে।
ওগো নদীকূলে তীর-তৃণ-দল
কে ব'সে শ্যামল বসনে ?
ইহার বিডাব বর্ষার উদাস-বিহ্বল ভাবটীকে রসমূর্তি
দিতে চাহে—ছন তাহাতে বাধা দেয় নাই। আবার,
ওগো নির্জনে বকুল শাখায়
দোলায় কে আজি দুলিছে
দোদুল দুলিছে ?

২৬
কাব্য-পরিমিতি
ঝরকে ঝলকে ঝরিছে বকুল
আচল আকাশে হতেছে অকুল,
উড়িয়া অলক ডাকিছে পলক,
কববী খনিয়া খুলিছে।
ওগো নির্জনে বকুল শাখায়
দোলা কে আমি দুলিছে ?
এই শ্লোকের বিভব বর্ষার নৃত্য-দোদুল ভাবটীকে বসায়িত
করিতে চাহিতেছে, এবং ছন্দ তাহাকে বিশেষ সাহায্য
করিতেছে। এ কবিতা যদি ‘বর্ষশেষে’ কবিতার ছন্দে
লেখা হইত, তবে কবিচিত্ত বর্ষা দেখিয়া ময়ূরের মত আনন্দে
নাচিবার সময় পদে পদে বাধা পাইত। আবার ঝঞ্চার
রুদ্র নৃত্য ‘বর্ষশেষের’ ছন্দে যেমন ফুটিয়াছে, এ ছন্দে তেমন
ফুটিত না :-
আনন্দে আতঙ্কে মিশি’ ক্রন্দনে উল্লাসে গরজিয়।
মত্ত হা হা রবে,
ঝঞ্চাব মীর বাধি’ উন্মাদিনী কাল-বৈশাখীর
নৃত্য হােক তবে।
ছন্দে ছন্দে পদে পদে অঞ্চলের আবর্ত-অঘাতে
উড়ে হােক ক্ষয়,
ধূলি-সম তৃণ-সম পুরাতন বৎসরের যত
নিস্ফল সঞ্চয়।
ভাবকে রসে উঠাইতে বিভাব যে পরিবেষ্টনীর সৃষ্টি করে,
৭

কাব্য-পরিমিতি २१ সুনিৰ্বাচিত ছন্দ তাহার সহায়ক হয়। আবার একই কবি- . তার বিভাব পরস্পর-বিরােধী না হইয়া বিভিন্ন রূপ ধারণ করিতে পারে ; সে সময় ছন্দই মূল ভাবটীব সুর টানিয়া রাখে। কবিচিত্ত কল্পনালোকে সুর-সপ্তকের বিভিন্ন পর্দায় বাগিণীর ব্যতিক্রম না ঘটাইয়া ( অর্থাৎ ভৈরবীতে পূবা ধৈবৎ দিয়া) নব নব বিভাবের উপর কণ্ঠ খেলাইয়া চলিয়া যাইতে পারে ; কিন্তু ছন্দ তানপূরার ন্যায় তাহার মুল সুরটী রক্ষা করিয়া চলে। মাঝে মাঝে বিভাব অপেক্ষাকৃত দুৰ্বল হইয়া পড়িলেও ছন্দ সে অভাব কিয়ৎ পরিমাণে পূর্ণ করিয়া আনন্দের ধারা বজায় রাখে। ছন্দ কুনিৰ্বাচিত হইলে গান জমে না, মাঝে মাঝে রসভঙ্গ হয়। আবাব বিভাবব দ্বাৰা রসােপযােগী পরিবেষ্টনীর সৃষ্টি হওয়ার পর অনুভব ও উপভাবের খেলা আরম্ভ হইলে ছন্দ সেই পরিবেষ্টনীকে রক্ষা করিয়া চলে। দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘে মিট-পর। ঐ ছায। ভুলালো রে ভুলালে। মাের প্রাণ : ইহার একটানা ছন্দ ভারাক্রান্ত ‘শেষ খেয়াকে অনুভাব- পরম্পরার মধ্য দিয়া যেন টানিয়া লইয়া চলিয়াছে ; কোথাও তাহা বাধা পায় নাই। বিভাব অনুভব উপভাবকে ছন্দ এইরূপে সাহায্য করে বলিয়াই কবিতায় ছন্দের মূল্য অনেক। কিন্তু কবিচিত্ত ২৮ কাব্য-পরিমিতি যখন ভ্রম, নিৰ্বদ্ধিতা, খেয়াল বা অক্ষমতা প্রযুক্ত ছন্দকে বিভাব অনুভাব উপভাবের উপর স্থান দেয়, অর্থাৎ গন্তব্য ভুলিয়া পথের উপর ঘুবিয়া বেড়ায়, তখন পাঠকচিত্ত পীড়িত হয়। সঙ্গীতের আসরে তানপুরার স্থান নিম্নে নহে, গায়- কের স্কন্ধের উপরেই,—কিন্তু কেবল তানপূরা কে কতক্ষণ শুনিতে পারে ? কবিচিত্ত যখন গান শুনাইতে আহ্বান কবিয়া কেবল তানপুরা ভাঁজিতে আরম্ভ কবে, অথবা গানের মধ্যে বাজনাকে প্রনল করিয়া তুলে, তখন পাঠক- চিত্তের ধৈৰ্য্যচ্যুতি অবশ্যম্ভাবী। অলঙ্কার লইয়া বিচারের প্রয়োজন এখানে দেখি না, এবং শব্দার্থ অথবা বাচ্যার্থ লইয়াও কোন গােল নাই। কিন্তু ব্যঞ্জনা বুঝিবার ও বুঝাইবার প্রয়ােজন আছে। কোন কাব্যে বাক্যার্থকে ছাড়িয়া যে অর্থান্তরের ইঙ্গিত ফুটিয়া উঠে তাহাই সে কাব্যের ব্যঞ্জনা ব্যঞ্জনা। খাচার পাখী ছিল সোনার খাঁচাটিতে বনের পাখী ছিল বনে। কবির বলিবার ভঙ্গী হইতেই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আসিতেছে, যে ইহা পাখীর কথাতেই পর্যবসিত হয় নাই বা হইবে না- বন্ধ-জীব ও মুক্ত-জীবের কথাই ইহার বক্তব্য। ইহাই না।

কাব্য-পরিমিতি
২৯
‘নিরুদ্দেশ যাত্রায় বিদেশিনীর সহিত কবিচিত্ত যখন
অকূল সিন্ধুর মধ্যে তরী ভাসাইয়া চলিতেছে :-
তার পরে কভু উঠিয়াছে মেঘ
কখনো রবি,
কখনাে ক্ষুব্ধ সাগর কখনো
শান্ত ছবি।
তখন সতত-পরিবর্তনশীল সমুদ্রের বর্ণনারূপ বাক্যার্থকে
ছাড়িয়া অদৃষ্টসাথী চিরচঞ্চল মানবজীবনের অবস্থাবিপর্যয়ের
কথাই ফুটিয়া উঠিতেছে। ইহাই এ কাব্যাংশের ব্যঞ্জনা।
যখন পরশপাথর’এর ক্ষ্যাপ।
সন্ন্যাসী চমকি ওঠে, শিকল সােণার বটে,
লােহা সে হয়েছে সোণা জানে না কখন।
তখন লোহা ও সােনার বাচ্যার্থকে একেবারে ঢাকিয়া
দুঃখময় পার্থিব জীবন ও আনন্দময় অপার্থিব জীবনের কথা
মনে আসে—ইহা এই কাব্যাংশের ব্যঞ্জনা।
ব্যঞ্জনা-ঘু, গুরু, গভীর ইত্যাদি নানা পর্যায়ের হইতে
পারে। পৃথক পৃথক কাব্যাংশের মূল-রসাভিমুখী পৃথক্‌
পৃথক্‌ ব্যঞ্জনা থাকিতে পারে, যেমন ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’র উদ্ধত
অংশে ; অথবা সমপ্র কাব্যের একটি মাত্র ব্যঞ্জনা থাকিতে
পারে, যেমন ‘পরশপাথর। কাব্যবিচারে ব্যঞ্জনার স্থান
অনেক উচ্চে।

কাব্য-পরিমিতি কবিচিত্তধারা অনুসরণ করিয়া শব্দ-রীতি-অলঙ্কার এই বহিরঙ্গবিশিষ্ট, এবং বাচ্যার্থ-ব্যঞ্জনা, এই অন্তরঙ্গবিশিষ্ট কাব্য- ক্ষেত্রে পৌছিয়াছি। তাহার পূর্ণতর পরিচয় লইয়া শ্রেণী- বিভাগ করিবার পূর্বে, পাঠকচিত্তধাবার গতি ও রীতির আলােচনা প্রাসঙ্গিক মনে কবি। কঙ্কাল হইতে আত্মা পর্যন্ত সমস্তই বর্তমান থাকা সত্ত্বেও পাঠকচিত্তধারা জীব বাঁচিতে পারে না, যদি না তাহার খাদ্যসংগ্রহের ব্যবস্থা থাকে। কাব্য বঁচিয়া থাকে পাঠক- চিত্ত হইতে পােরাক সংগ্রহ করিয়া ; সুতরাং কাব্যপরিচয়ে পাঠকচিত্তধাবার অনুসরণ একান্ত প্রয়ােজনীয়। যেমন কবিচিত্তের, তেমনি পাঠকচিত্তের মূও সেই বস্তু ও বিষয়-জগতে প্রতিষ্ঠিত। বস্তু বা বিষয়ের সংঘর্ষে পাঠকের মনেও নানারূপ ‘ভাব' বা emotion উৎপন্ন হয়, এবং তাহার মনে সেই সেই ভাবের স্মৃতি বা বাসনা সঞ্চিত হয়। বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও ভাব ও বাসনার ক্ষেত্রে কবি ও পাঠকের মন প্রায় সমধর্মী। পূৰ্ব্বে বলিয়াছি কল্পনা কবির বাসনাকে রসে পরিণত করে। ভাব যতক্ষণ ভাবমাত্র থাকে, ততক্ষণ তাহা কবি- করনার উপযুক্ত উপাদান নহে। কিন্তু নিকৃষ্ট স্তরের কাব্য রচনা ভাবােদ্রেকের সঙ্গে সঙ্গে হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব নহে। পূর্বযুগের কবিওয়ালাগণকে রাগাইয়া দিতে পারিলে এক,

কাব্য-পরিমিতি
৩১
প্রকারের রৌদ্র ও অদ্ভুতরসাত্মক কাব্য পাওয়া যাইত।
যদিও অপেক্ষাকৃত উচ্চ-কাব্য-রচনায় বাসনাই কবিচিত্তেব
উপাদান, তথাপি ভাবের ক্ষেত্র হইতে ভাবস্মৃতি বা বাসনাব
ক্ষেত্রে না উঠিয়াও কাব্য রচিত হইতে পাবে।
কিন্তু বাসনা-ব্যতিবেকে পাঠকচিত্ত কাব্যাম্বাদনের
উপযােগী হয় না। রতি শােক ইত্যাদি ভাবের স্মৃতি যে
পাঠকেব চিত্তে বাসনা-জাকারে সঞ্চিত নাই, তাহার মনে
মধুর বা করুণ রসের কাবা প্রতিফলিত হইতেই পারে না।
শঙ্করাচার্যের অসাধারণ মনীষা ও পাণ্ডিত্য ও উভয়-ভারতীর
রতিভাৰাত্মক সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে সমর্থ হয় নাই,
কারণ আগন্ম ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীর মনে রাতভাবের বাসনা
সঞ্চিত ছিল না। ভাবের মধ্য দিয়া বাসনা সঞ্চয় করিয়া
তবে তিনি প্রশ্নের মম্ম বুঝিতে সক্ষম হইয়াছিলেন।
বাসনালোক হইতে পাঠকচিও কাব্যক্ষেত্রে উঠিয়া বসের
সন্ধান করে। কবিচিত্ত ও পাঠকচিত্ত এই কাব্যক্ষেত্রে
মুখােমুখী হইয়া আপন আপন প্রকৃতি ও যােগ্যতা অনুসারে
পরস্পরের পরিচয় গ্রহণ কবে। যে পথ দিয়া কৰিচিত্ত
রস হইতে কাব্যে যাতায়াত কবিয়াছে, কাব্যেহ তাহার ইঙ্গিত
থাকে, কারণ সেই চলাচলের পথে অস্পষ্ট পায়ের দাগ
পড়িয়া যায় । সমধর্মী ও সমবাসনবিশিষ্ট পাঠকচিত্ত
কাব্য হইতেই সেই পথের সঙ্কেত পায়। সে পথ স্পষ্ট নহে,

৩২'
কাব্য পরিমিতি
সাঙ্কেতিক মাত্র ; আভাসে, ইঙ্গিতে তাহার সন্ধান মিলে।
সেই পথ বাহিয়া পাঠকচিত্ত বসলােকে উত্তীর্ণ হয় এবং
সেখানে আবার সেই ‘আপন সম্বিতের আনন্দময় চৰ্বণব্যাপার
আরম্ভ হয়—যেখান হইতে আমরা একবার
একবার ফিরিয়া
আসিয়াছি। রসলােকে কবিচিত্ত ও পাঠকচিত্তের এই যে
মিলন, ইহাই নিৰ্ম্মল আনন্দের কারণ এবং কবিচিন্তধারা ও
পাঠকচিত্তধারার এই মিলনের নামই কাব্যবস।
একাকী গাকেব নহে ত গান,
মিলিতে হবে দুই জানে।
হিবে এক জন খুলিয়া গল।
আরেক টন গবে মনে।
টব বুকে লাগে তলেব ঢেউ
তবে সে কসতান উঠ।
বাতাসে বনসভা শিহরি কাপে
তবে সে মৰ্ম্মর ফুটে।

No text on this page.

৭ ৮
tn btur
বা বিলাস ৮
৬৭ ও ১০
ব্যঞ্জনা
অনুভাব
কল্পনা
উপসব
কাব্য। বাধা
বিধ
২৭
বাসনা
বাসনা
विभ
মুনা
সাহ
ভাব
ভাব ।
শােক
राम
কবি ৮ি ধল
পাঠক 6ি3 ধাধা
९
কব-বনিত-ক্ষণ গণ্য।

অঙ্কন
প্রথিতযশা নাট্যকার পূজনীয় ক্ষীবােদ প্রসাদ বিদ্যা-
বিনােদ পূর্বে
রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপনা করিতেন।
কলেজে তখন যন্ত্রপাতি বেশী ছিল না, থাকিওে তাহা
ক্লাশে আনিয়া দেখাইবাব মত সহকারী ছিল না। অধ্যাপক
বাক্যেব সাহায্যে বসায়নশাস্ত্রের পরীক্ষা গুলি বিশদভাবে
বুঝাইবাব চেষ্টা করিয়া যখন বুঝতেন, ব্যাপার আমাদের
হৃদয়ঙ্গম হয় নাই, তখন তিনি তা মুষ্টিবদ্ধ বামহও সম্মুখে
তানিয়া তাহার অঙ্গুষ্ঠটী উচ্ছিত করিয়ঃ পবিতেন। তৎপরে
দক্ষিণ হস্তের তর্জনী সেই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ঠেকাইয়া বলিতেন -
Suppose this is a tost tubo; I fill one-third of
it with Sodium Chloride :–ধর ইহা এক টী টেষ্ট,
টিউব, আমি ইহার এক তৃতীয়াংশ লবণ দ্বারা পূর্ণ কলিাম ।
অমনি ব্যাপারটা পরিষ্কার হইয়া আসিবার পথে দাড়াইত ;
মানবমন এমনই প্রতিমা উপাসক।
আমার প্রথম রসায়ন-শিক্ষা উক্ত অধ্যাপকের নিকট
হইয়াছিল বলিয়াই, বােধ হয়, যখন দেখিলাম কাব্যসম্বন্ধে
এত কথা বলিয়াও ব্যাপারটী ঠিক উপলব্ধ হইতেছে না,
তখন কাগজ পেন্সিল লইয়া মনকে বলিলাম,-ধর এইটী
কবিচিত্তের গতিপথ, আর এইটী পাঠকচিত্তের গতিপথ ; ইহা

৩৪
কাব্য-পরিমিতি
ভাবলােক, ইহা বাসনা-লােক, এইটী কল্পনা-লােক। এইরূপে
আমার প্ল্যান-অঙ্কনে অভ্যস্ত চিত্ত লােকের পর লােক
আঁকিয়া লোকোত্তর রসের সন্ধানে ব্যপূর্ত হইল। নিজেকে
বুঝাইবার উদ্দেশ্যে অনেক পরিশ্রমে কাব্য-দর্শনের যে
রেখাচিত্র অঙ্কিত হইল তাহার মূর্তি দেখিলাম ( চিত্র দেখুন)
ডিম্বাকার। প্রথমেই মনে হইল এই চেষ্টার ফলে শাহ।
বুঝিয়াছি তাহার প্রতীক কি এই অশ্বডিম্ব ! পরক্ষণেই
মনে হইল ব্ৰহ্মাণ্ডই অণ্ড মাত্র, সুতরাং আমার লজ্জিত
হইবাব কারণ নাই। বরং দেখিলান --কণি, কাব্য ও
পাঠকের যে ধারণ ও শ্রেণী বভাগ আমার মনের কোণে
অনেক দিন ইহঁতে অস্পষ্টভাবে সঞ্চিত ছিল, তাহা এই
বেখাচিত্রে 1 সাহায্যে বুঝ। ও বুঝান সহ -সাধ্য হইয়াছে।
চিত্রে দেখিতেছি কবি চত্তা ও পাঠ কচিওধাবা
উভয়েরই উৎপত্তিস্থল বস্তুজগৎ । 1 : কবিচিত্তধারা
ও পাঠ কচিত্তধারা ভাবলােকে পৌছিয়াছে। এ ভাবলোক ও
অভিন্ন ; কেবল উভয়চিত্তধারার মধ্যস্থলে ভাবলােক-পবিধির
ঈষৎ সঙ্কোচের দ্বারা কবিচিত্ত ও পাঠ কচিত্তে ভাবের ঈষৎ
বিভিন্ন প্রভাব সূচিত করিতেছে। তাহার পর উভয় ধারাব
বাসনালােক ভিন্ন হইলেও পরস্পর স্পর্শ করিয়া আছে।
কবিচিত্তের ভাবম্মুতি ও পাঠকচিত্তের ভাবস্মৃতি মূলতঃ
একশ্রেণীস্থ হইলেও তাহাদের প্রকৃতিব ভেদবেখা সুস্পষ্ট।

কাব্য-পরিমিতি ৩৫ যায়। কবিচিত্ত বাসনা হইতে কল্পনায় ও পাঠকচিত্ত বাসনা হইতে কাব্যে উঠিয়াছে। সর্বোপরি রসলােক। চিত্রে কবিচিত্তপাৱা বস্তু হইতে কাব্যে দক্ষিণাবর্তে (Clockwise) দেখান হইয়াছে, এবং পাঠকচিত্ত বাম'- বর্তে দেখান হইয়াছে। ইহাতে বুঝা যায় কাব্য-সৃষ্টি ও তাহার আস্বাদ গ্রহণ পরস্পর বিপরীতাভিমুখী। কবিচিত্ত ধারা বস্তু হইতে কাব্যে পৌছিতে রস অতিক্রম করিয়া যায়, আর পাঠকচিত্তধারা রসে পৌঁছিতে কাব্য অতিক্রম করিয়া একের যাহা গন্তব্য, অপবের তাহা পথিমধ্যস্থ বিশ্রাম স্থান। কবিচিত্তের উদ্দেশ্য বস নহে, রস আনিয়; কাব্যে সঞ্চয় ; আর পাঠকচিত্তের উদ্দেশ্য কাব্য নহে, কাব্য হইতে রস-সংগ্রহ। যে কাব্যরসকে ব্রহ্মস্বাদেব তুল্য বলা হইয়াছে সেই রসের কথাই কহিয়া আসিতেছি। কিন্তু সাধারণ হিসাবে রসের পৰ্য্যায় ও স্তরভেদ আছে। অতি সাধারণ কাব্য পাঠে অতি সাধারণ পাঠকও যে আনন্দ পায় ইহা সত্য। ইহাকে রস বলা চলে না। উপস্থিত আনন্দই বলিব, যদিও ইহাতেও আপত্তি উঠিতে পাবে। পূর্বে যে কবিচিত্তধারার পরিচয় দিলাম, যাহা বস্তু হইতে উৎসারিত হইয়া ভাব, বাসনা ও কল্পনার পথে রসে উঠিয়া কাব্যে ঝরিয়া পড়িতেছে, তাহ। উত্তম প্রতিভা-প্রেরিত কবিচিত্তেব ধারা। পাঠক-

কাব্যপরিমিতি
চিত্তেব ধাবা ও ভাব ও বাসনাব মধ্য দিয়াই কাব্যে পৌছে
এবং উৎকৃষ্ট পাঠকচিত্তধাবা সেখান হইতে বসলােকে
উত্তীর্ণ হয়। পাঠকচিত্ত যদি কে বল রস না হইয়া রসজ্ঞ
ক্রিটিক্‌ উভয়ই হয়, তবে সে বসলােকেই থামিয়া যায় না,
সেখান হইতে রসসিক্ত অন্তরে কবিচিত্তধারার প্রতিবন
করিয়া কবির বিচিত্র কল্পনারাজ্যে নামিয়া আসিবার প্রয়াস
পায়।
রস- প্রত্যাবৃত্ত কাব্যই উচ্চ শ্রেণীর কাব্য, আর তাহার
মৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে পারে,-রসেব সমুচ্চ লােকে উঠিবার
শক্তিবিশিষ্ট পাঠকচিত্ত। উত্তম শ্রেণীর বিপরীতাভিমুখী এই
দুই ধারা রসলােকে পরস্পরের মধ্যে নিলীন হইয়া যে আনন্দ
উৎপন্ন কবে তাহাই ব্রহ্মানন্দম্বরূপ বলিয়া কথিত হইয়াছে।
কিন্তু এতদ্ভিন্ন কবিচিত্তধারা ও পাঠকচিত্তধারার অন্যান্য
পথও থাকিতে পারে, এবং তাহাদের মিলনজনিত ভিন্ন
বর্গেব আনন্দও স্বাভাবিক। এই কথাই চিত্র-সাহায্যে
বুঝিতে চেষ্টা করিব।
কাব্য রচনা করিবার জন্য যেমন কবির প্রয়ােজন,
তেমনি তাহার আস্বাদন জন্য পাঠকের প্রয়ােজন।
কাব্য কল্পিত হইল, কিন্তু লিখিত হইল না, তাহা সুকাব্য
কি অকাব্য একথা উঠিতে পারে না। যে কাব্য রচিত
হইয়াছে কিন্তু কখনও পঠিত হইল না, তাহার সম্বন্ধেও ঐ

কাব্য-পরিমিতি ৩৭ ও একই কথা। কবিচিত্তধারা ও পাঠকচিত্তধারার মিলনের ফলই কাব্যরস। এই দুই ধারা যে পথেই প্রবাহিত হউক, যদি প্রথমটীর সহিত দ্বিতীয়টীর মিলন হয়, তবেই আনন্দ জন্মে। যে ক্ষেত্রে মিলন হইল না, সে ক্ষেত্রে কাব্য বিফল । সম ও বিষম ( positive & negative) তড়িৎ যদি কোন পবিবাহচক্রে (cyclo) অব্যাহত ভাবে প্রবাহিত হইতে পাবে, তবেই তাড়িৎ শক্তি প্রকাশ পায় ; চক্রের মধ্যে অবচ্ছেদ (break) থাকিলে তাহা ব্যর্থ হয়। সেইরূপ কবিচিত্তধারা পাঠকচিত্তধারাব অয়ন-চক্র যেখানে অব্যাহত থাকে, সেইখানেই আনন্দ উৎপাদিত হয়। এড়িৎ প্রবাহের বেগ, প্রকৃতি ও পবিমাণ যেমন তাহাদের উৎপাদক সম ও বিষম শক্তিদ্বয়ের উপর নির্ভর কবে, তেমনি কাব্যায়নচক্রে উৎপাদিত আনন্দের প্রকৃতি ও পরিমাণ তাহাদের উৎপাদক কবিচিত্তধারা ও পাঠকচিত্তধাবার উপর নির্ভর করে। কথাটী বিশদ করি। চিত্রে দেখা যায়, কবিচিত্তধারা বস্তু হইতে উদগত হইয়া প্রথমে ভাবলােকে পৌছে ; সেখান হইতে সবাসরি কাব্য- ক্ষেত্রে যাইবার একটা পথ রহিয়াছে। ভাব হইতে ঋজু রেখায় কাব্যে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব কিনা সন্দেহ হইতে পারে । কিন্তু পূর্বে যে উল্লেখ করিয়াছি, কবি বা তর্জাওয়ালাদের বাগাইয়া দিলে তৎক্ষণাৎ রৌদ্ররসের একপ্রকার কাব্য জন্মে, কাব্য-পরিমিতি তাহা সম্ভবত এই শ্রেণীর। ভাব অর্থাৎ emotionএব জন্মমাত্র কাব্যরচনা একান্ত অসম্ভব মনে হয় না। কলি- কাতার রাজপথে যখন হাঁকিয়া যায়, বাপবে বাপ, বিষম কাণ্ড, ভন্টে বুঝি যায় ব্রাও ! পেটের ছেলে আপন হাতে কাটলে মাযে নিশুৎ বাতে একটী পসা খরচ কোবে, বাবুবা সব দেখুন পড়ে । তখন কবিচিত্ত সে কাব্যে ভাব হইতে বাসনালােকে উঠিয়াছিল বলিয়াও মনে হয় না। কোন ব্যাপার ঘটিবামাত্র ভাবটী কবিচিত্তে স্মৃতির জগতে, অর্থাৎ বাস- ভাবসমুখ নায়, রূপান্তরিত হইবার পূৰ্বেই এই শ্রেণীর কাব্য কাব্য জন্মলাভ করে। ইহাদিগকে ভাবসমুখ- কাব্য’ বলা যায়। প্রাণীজগতে মেরুদণ্ডহীন জীব যে শ্রেণীর, কাব্য-জগতে ভাবসমুথ কাব্য ও প্রায় সেই শ্রেণীর। ' কিন্তু কে অস্বীকার করিতে পারে যে এ শ্রেণীর কাব্যেরও পাঠক আছে এবং তাহারা ইহা হইতেই আনন্দ পায় ? আনন্দ যখন পায়, তখন ব্যাপারটীকে উড়াইয়া দেওয়া চলে না। আনন্দ পাইবার কারণ এই, যে এক শ্রেণীর পাঠকচিত্ত আছে, যাহারা কাব্য হইতে কেবল কাব্য-পরিমিতি ; emotion, ভাবেই, নামিতে চাহে ; কল্পনা কি রসলােকের খোজ তাহারা রাখে না। বীর-রসের কাব্য পড়িয়া তাহারা সরাসরি ‘উৎসাহে’ নামিয়া আসে, হয়ত বিপ্লবীব দলে নাম লেখায় ; রৌদ্ররসের অভিনয় দেখিয়া ক্রুদ্ধ হইয়া জুতা খুলিয়া মারে ; মধুর-বসের কাব্যে তাহারা কেবলই রতিভাব খোজে। এ শ্রেণীর পাঠ কচিত্তধারা রস বা ভাবমুখী কল্পনায় উঠিতে সমর্থ নয় এবং ইহাদের ‘ভাব- চিত্ত মুখী পাঠকচিত্ত’ বলা যায়। ভাবসমুখ কাব্যে কবিচিত্তধারা যেমন ভাব হইতে কাব্যে সিধা উঠিয়া গিয়াছে, ভাবমুখী পাঠকচিত্তের ধারাও সেইরূপ কাব্য হইতে ভাবে সিধা ফিরিতে চায় ; সুতরাং অয়ন চক্র সম্পূর্ণ হইয়া এক প্রকারের আনন্দস্রোত প্রবাহিত হইতে থাকে। বসােম্মুখী পাঠকচিত্তধারা কাব্য হইতে রসে উঠিতে চাহে, তাহার পথ ভিন্ন ; ভাবসমুথ কবিচিত্তধারার সহিত চক্র সম্পূর্ণ না হওয়ায় আনন্দ বহে না। ভাবসমুখ কাব্য যে ছন্দে, অলঙ্কারে, শ্রীহীন হইবে, এমন কোন কথা নাই। বাচ্যার্থ ছাড়া ব্যঞ্জনা ও থাকিতে পারে। কিন্তু তাহা রসের ব্যঞ্জনা নহে, ভাবের ব্যঞ্জনা। হেমচন্দ্র যখন রেলগাড়ী দেখিয়া লিখিয়াছিলেন,

৪০
কাব্যপরিমিতি
এস কে বেড়াতে যাবে, শীঘ্র ক সাজ,
ধরায পুষ্পক রথ এনেছে ইংবাদ ।
শীঘ্র উঠ, ত্বরা করি’,
বাক্স ব্যাগ তল্পি ধরি,
এখনি বাজিবে বঁাশী,
ঠং ঠং ঠং কাশি...
কিম্বা,-
ছেলাম টেম্পল চা5', আচ্ছ। ম নিলে,
(ভাজং দিয়ে ভোটীং খুলে মিউনিসিপাল বিলে ।
তখন তিনি বাসনা-লোকেও উঠেন নাই।
মাযের দেওয়া মোটা কাপড়
মাথায় তুলে নেরে ভাই!
এই জাতীয় অধিকাংশ জাতীয় সঙ্গীতের কাব্যাংশ
ভাবসমুখ কাব্যের দৃষ্টান্ত হইতে পারে ।
সসঙ্কোচে উল্লেখ করিতে হয়, আদি-কবির প্রথ•
শ্লোকটী কোন্ শ্রেণীর কাব্য? কামমােহিত ক্রৌঞ্চমিথুনের
একটাকে ব্যাধ শববিদ্ধ করায় তাঁহার মুখ হইতে তৎক্ষণাৎ
যে শ্লোক নির্গত হইল, তাহাতে তিনি ব্যাধকে অভিসম্পাত
দিয়াছেন। ইহা তাহার শােকার্ত হৃদয়ের স্বতঃ ও সদ্য।
নিসৃত ছন্দোবদ্ধ বাক্য। তঁাহার সেই শােকভাব স্মৃতির
স্তর বাহিয়া কল্পনাস্তরে উঠিবার অবসর পায় নাই। ইহাকে
ভাবসমুখ কাব্য বলিলে নিতান্ত অন্যায় হয় বলিয়া মনে হয়

কাব্য-পরিমিতি
৪১
। আদি কবির এই প্রথম রচনাকে যদি কাব্য-জগতের
জীব-শৈবাল (protoplasm) বলা হয়, তবে তাহাতে
আপত্তিরই বা কি কারণ থাকতে পারে ? জীব-শৈবালে
জীব-জগতের অসীম বৈচিত্রের কোন চিহ্নই নাই ; তথাপি
তাহা জড় হইতে জীবের প্রথম অভিব্যক্তি বলিয়া সমস্ত
বৈজ্ঞানিকের আদরের বস্তু। কবিগুরুর মুখনিঃসৃত এই
প্রথম শ্লোকও প্রত্যেক কবি ও রসিকের কাছে সেই হিসাবে
আদবের জিনিষ। ইহার বেশী আর কিছুই এ শ্লোকে নাই
এবং কবি গুরুর পরজীবনের রচনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু।
বলা বাহুল কবিচিত্তধারাব বিশ্লেষণ করিয়া আমি
কবিদের জাতি বিভাগ করিবার প্রয়াসী নহি
শ্রেণীবিভাগ করাই আমার উদ্দেশ্য । কোনও কাব্যে
কবিচিত্তের যে রূপ প্রকাশিত হইয়াছে, সে কাব্যে কবিচিত্তের
জাতি ও কাব্যের জাতি অভিন্ন, অর্থাৎ ভাবসমুখ কাব্যে
কবিচিত্তও ভাবসমুখ। কিন্তু কোন বিশেষ কবির চিত্তকে
স্থায়ীভাবে ভাবসমুথ চিত্ত বলা অতীব দুঃসাহসের কথা এবং
তাহা সত্যও নহে।
ভাবলােকের উর্দ্ধে স্মৃতির জগৎ,-বাসনালােক। যে।
কাব্যে কবিচিত্ত বাসনা’ হইতে সিধ। কাব্যক্ষেত্রে চলিয়া
গিয়াছে, তাহাকে ‘বাসনাসমুখ কাব্য
বাসনাসমুখ কাব্য ও
বলা যায়। এ শ্রেণীর কাব্য ভাবসমুখ
বাসনামুখী চিত্ত
কাব্য হইতে বিশেষ উন্নত না হইলেও
ইহার ধারা বিভিন্ন। কবিচিত্ত ভাব বা emotion হইতে

82 কাব্য-পরিচিতি প্রত্যক্ষভাবে মালমশা সংগ্রহ না করিয়া তাহাব স্মৃতি বা বাসনা হইতে কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করে। এ কাব্যে ‘রসােম্মু সী’ পাঠকচিত্ত তৃপ্ত হইতে পারে না। বাসনামুখী পাঠকচিত্ত -যা কাব্য হইতে প্রত্যক্ষ ভাবে বাসনালােকে নামিবার পক্ষে উপযােগী ও তারই জন্য উন্মুখ, তাহ- এইরূপ কবিতা হইতে আনন্দ লাভ করে। এখানেও কবি- চিত্তধারা ও পাঠ কচিত্তধাৰাৰ অয়ন চক্র বাসনার মধ্য দিয় সম্পূর্ণ হইয়াছে বলিয়া এ কাবের আনন্দ এই জাতীয় পাঠকের মনে প্রতিভাত হইয়া উঠে। বাসনমুখী পাঠক, চিত্ত ভামুখী পাঠকচিত্তকে অপেক্ষাকৃত অশ্রদ্ধা করে এবং রসােম্মুখী পাঠকচিত্তকে সম্রম কবে, অথবা অগ্রাহ্য কবে । রতিবাসনাজা ৩ কাব্য বাসনামুখী পাঠকচিত্তে রতিবাসনা- জনিত আনন্দ দ্যায় এবং তাহাতেই তাহারা সন্তুষ্ট। এ কাব্য বা পাঠক মধুর রসের ধার ধরে না। ইহাতে ছন্দ, অলঙ্কার, এমন কি ব্যঞ্জও-- যাহা বাসনার ব্যঞ্জনা, রসেব নহে - থাকিতে পারে। ভারতচন্দ্রে বিদ্যাসুন্দরের অনেক অংশ এই বাসনাসমুখ কাব্যে উজ্জ্বল উদাহরণস্থল। শঙ্করা- চার্যের মোহমুদ। নিব ভাবের ( শমভাবের উপভাব) বাসনাসমুখ কাব্যের উদাহরণ। ঈশ্বরগুপ্তের ‘পাটা বা ‘তপসে মাছ’, হেমচন্দ্রের বাঙ্গালীর মেয়ে এবং রবীন্দ্রনাথের কণিকা'র অনেক কবিতা এই বাসনাসমুথ কাব্য-পৰ্য্যায়ে কাব্য-পরিমিতি ৪৩ পড়িতে পারে। অল্পশক্তি-বিশিষ্ট কবিদের অনেক কাব্য ছন্দ, অলঙ্কান, এমন কি ব্যঞ্জনা-সংযুক্ত হইয়াও বাসনা-সমুখ পর্যায়ের উর্ধ্বে স্থান পাইতে পাবে না। ভাবসমুথ ও বাসনাসমূথ কাব্যকে এক গোষ্ঠীর অন্তর্গত বলা যাইতে পাবে। কারণ অয়নচক্র সম্পূর্ণ করিয়া এই দুই জাতীয় কাণের আস্বাদ গ্রহণ করিতে হইলে পাঠক- চিত্তকে কাব্যক্ষেত্র হইতে নিম্নাভিমুখে ভাব বা বাসনালােকে নামিতে হয়। বতিভাব বা রতিবাসনা দুই এর কোনটাই উচ্চাঙ্গের বস্তু নয়। আর রসশাস্ত্রের মাপকাটিতে কাম- ভাবের উদ্রেক আর বৈরাগ্যভাবের উদ্রেক এক শ্রেণীতেই পড়ে, কারণ মধুর রস ও শান্ত বস সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিষ । এ রাজ্যে ভাব ও বাসনার স্থান নিম্নে, কল্পনালােক তাহাদের উর্ধে এবং রসলােক শীর্ষে অবস্থিত। সেই জন্য ভাবসমুখ ও বাসনাসমুথ কাব্য একই গােষ্ঠীর অন্তর্গত নিম্নজাতীয় কাব্য। ভাবমুখী ও বাসনামুখী পাঠকের অভাব কোন কালেই হয় নাই, সেইজন্য এই জাতীয় কাব্যের ও অসদ্ভাব নাই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহার নিম্নস্তরের জীবদেহের ন্যায় ক্ষণে জন্মে, ক্ষণে মরে ; আর কোনও রূপে আপনাদের খারাটী বজায় রাখিয়া চলে। লতা স্বভাবতঃ উদ্ধদেশে উঠিতে অক্ষম। মাটীর উপর লইয়া বেড়াই তাহার ধর্ম এবং গো-মহিষাদির ভক্ষ্য ৪৪ কাব্য-পরিমিতি হওয়াই তাহার ভাগ্য। কিন্তু দণ্ডসাহায্যে সে উর্ধে উঠিতে পারে, এবং মাচায় উঠাইয়া দিলে গো-মহিষাদির মুখ হইতে আত্মরক্ষা করিয়া ফল ফলাইতেও পারে। শক্তিশালী কবিব রচিত অনেক বাসনাসমুখ কাব্যও মধুর ছন্দ, চতুর অলঙ্কার ও সবল রীতির আশ্রয় পাইয়া বাচিয়া আছে এবং ফলও ফলাইয়াছে ; কিন্তু তাহা কোন দিনই অমৃতল নহে। এইবারে যে দেশের কথা কহিব - কল্পনালােক-সেখানে বুদ্ধির প্রবেশ নিষিদ্ধ না হইলেও সে মাঝে মাঝে দিশা হারা- ইয়া ফেলে। কবিচিত্তধাবা যখন কল্পনা- কল্পনাসমুথ কাব্য ও লােক হইতে বিভাব, অনুভাব ও উপ- কল্পনামুখী চিত্ত ভাব দ্বারা পুষ্ট হইয়া সনশীর্ষে অবস্থিত কাব্যক্ষেত্রে ছন্দ, রীতি, অলঙ্কার ও অর্থ সমৃদ্ধ হইয়া প্রকাশ পায়, তখন কার কাব্য ভিন্ন বস্তু। আম বা ইহাকে কল্পনা- সমুথ’ কাব্য বলিব।কবিচিত্ত কল্পনার fতর দিয়া গিয়াছে, সুতরাং সাধারণ লৌকিক মনের উর্দ্ধে সে উপচার সংগ্রহ করিয়াছে। কল্পনাসমুখ কাব্যের কবিচিত্তধারা অয়নচক্র সম্পূর্ণ করে,-কল্পনামুখী পাঠকচিত্তধারার সহিত ; সুতরাং এ কাব্যের আনন্দ কল্পনামুখী পাঠকচিত্তেই সম্পূর্ণ প্রতিভাত হয়। রসোন্মুখী পাঠকচিত্ত ইহাকে প্রকৃত শ্রদ্ধা করিতে পারে না, আর বাসনামুখী কিম্বা ভাবমুখী পাঠকচিত্ত আভিজাত্যের জন্য ইহাকে সমীহ করিলেও আনন্দ পায় না।

কাব্য-পরিমিতি ৪৫ রসের উদ্বোধ অয়নচক্র সম্পূর্ণ হওয়া না হওয়াই এই আনন্দ বা অবজ্ঞার কারণ ; যেহেতু কবিচিত্তধারা ও পাঠকচিত্তধারাব অবচ্ছেদ- হীন প্রবাহই আনন্দ। কল্পনাসমুখ কাব্যে কবিচিত্ত বৃদ্ধি দ্বারা মার্জিত; বিভাব- অমুভাৰ-উপভাব সম্বন্ধে জাগ্রত ; শব্দচয়ন, ছন্দোবন্ধন, অলঙ্কা-নিৰ্বাচন, বাচার্থবােধ ও ব্যঞ্জনাব প্রয়ােজন- ইহাদে যথাযথ জ্ঞান তাহাব আছে। এক কথায় কবিচিত্ত তাহার আদর্শ ও কর্তব্য সম্বন্ধে সজাগ। তাহাকে করিতে হইবে, এবিষয়ে তার সন্দেহ নাই । কিন্তু তাহার প্রতিভা কাব্যজনকালে বসাকাঙ্ক্ষী হইলেও রসোন্মুখী না হওয়ায় রসের দিকে উঠিবার চেষ্টামাত্র কবি যাই কাব্যে নামিয়! আসে। কল্পনায় বিভাব এক অংশে সবল হই, কিন্তু অপর অংশ হয়ত তাহাকে খণ্ডিত করিল ; বিভাব উপযােগী হইলেও, অনুভাক-উপভাব বিরুদ্ধ হইয়া বেসুর বাজাইয়া দিল ; শব্দ রীতি অলঙ্কার সুন্দর হইয়াও অর্থ ব্যঞ্জনার ধাপে উঠিল না, অথবা ব্যঞ্জনা দুর্বল হইল ; ছন্দ ও রাতি অর্গকে চাপা দিল ; অলঙ্কার ব্যঞ্জনাকে ভাঙিয় দিল ; কিম্বা বিশ্লেষণ-বুদ্ধি দ্বারা কোন মহৎ দোষ ধরা না পড়িলেও বস দানা বাধিল না। ইহার একমাত্র কারণ – কবিচিত্তধাবা সেই কাব্যবিশেষে পৌছিবার পূর্বে রসলােক ঘুরিয়া আসে নাই ; হয় তাহার অভিনয় করিতেছে, নগ্ন = = ৪৬ কাব্য-পরিমিতি রসােদ্বোধ সাধ্যাতীত বুঝিয়া কাব্যের বহিরঙ্গে বিলাস করি- তেছে। কল্পনাসমুথ কাব্যের সম্বন্ধে যাহা বলা হইল তাহাতে বুঝা যাইতেছে --বিভাব, অনুভাব, উপভাব, শব্দ, ছন্দ, বীতি, অলঙ্কার, বাচার্গ, ব্যঞ্জনা সমস্তই ইহাতে কৰ্ত্তমান থাকিলেও তাহাদের সামঞ্জস্যেৰ অভাব থাকে এবং তাহাৰ সুসংস্থিত হয় না। মুল ভাবটা এসে পরিবর্তিত হইলে উক্ত কাব্য- কৌশল-পরম্পরা পরিমাণে, মাএায় ও বিন্যাসে স্বতঃই যথাযথ হয়, কিন্তু কল্পনাসমুখ কাণে এই গুলিব অভাব ঘটে। কল্পনামুখী পাঠকচিত্ত বলিতে সেই চিত্ত বুঝিতে হইবে, যাহা এই সামঞ্জস্যের অভাব লক্ষ্য করে না, বা তাহা দ্বারা পীড়িত না হইয়া অসমঞ্জস কাব্যকৌশল হইতেই আনন্দ লাভ করিতে পারে। বলিষ্ঠ রীতিমত্ৰ যাক সচকিত কবে, সুন্দর ছন্দই যাহাকে মুগ্ধ করে, চতুর অলঙ্কার যাকে বিস্মিত করে, সবল বিভাব-অনুভব-উপভাব মূল ভাবেব বিরােধী হইলেও যাহাকে ভাসাইয়া লইয়া যায়, ইহাদের পরস্পরের মধ্যে অসামঞ্জস্য ও রবিমুখীন তা যাহার গােচরীভূত হয় না, অংশের আনন্দই যাহার পূর্ণের তৃষ্ণাকে শমিত করে, তাহাই কল্পনামুখী পাঠকচিত্ত। বলা বাহুল্য, কল্পনাসমুখ কাব্যই জগতে সর্বাপেক্ষা অধিক, আর কল্পনামুখীচিত্তসম্পন্ন পাঠক ততােধিক।

কাব্য-পরিমিতি ৪৭ পারে। সংখ্যায় বহু এবং আভিজাত্যসম্পন্ন বলিয়া এই কাব্যে নানা স্তরবিভাগের চেষ্টা হয় ; কোন্ কবি কাহার অপেক্ষা বড়, কোন্ কাব্যের ওজন কত, তাহার বিচার লইয়া বিতণ্ডা উপ- স্থিত হয়। চিত্রে সমর্শীর্ষে অবস্থিত কল্পনা-লােক ও কাব্য ক্ষেত্রের উপর এবং বসলােকের নিম্নে বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র পড়িয়া আছে,—যাহার মধ্যে সংখ্যাতীত বক্ররেখা কল্পিত হইতে রসগােক হইতে তাহাদের দূৰত্বানুযায়ী কাব্যকে উচ্চ-নীচ মর্যাদা দেওয়া চলিতে পাবে। কিন্তু ইহাদের মধ্যে কোন রেখাটী রসলােক ঘুরিয়া আসে নাই; সুতরাং সােম্মুখী পাঠকচিত্তের সহিত অয়ন-চক্র সম্পূর্ণ না হওয়ায় আনন্দ উৎপন্ন হয় না। অল্পসংখ্যক রসােম্মুখী পাঠকচিত্ত বলে—ইহাতে রস কোথায় ? সংখ্যাভূয়িষ্ঠ বুদ্ধিমান কল্পনা- মুখী পাঠকচিত্ত বলে—আমরা আনন্দ পাইতেছি, সুতরাং রস আছে,-খুঁজিয়া দেখ। কল্পনামুখী ও রসেম্মুখী পাঠকচিত্ত সম্বন্ধে আর একটা কথা এইখানে বলা উচিত মনে করি। একই পাঠকের চিত্ত কোনও কাৰ্যে রসােম্মুখী, কোনও কাব্যে কল্পনামুখী হওয়া বিচিত্র নয়। ইহাব কারণ ‘বাসন’র তাবতম্য। ভাবের বাসনা যে চিত্তে দুৰ্বল, সে চিত্তে উক্ত ভাবের রসমূর্তি পূর্ণ প্রতিভাত হইতে পারে না। সুতরাং পাঠকবিশেষের চিত্ত কোনও এক রসের কাব্যে রসসন্মুখী হইলেও অপর

৪৮
কাব্য-পরিমিতি
রস-সম্বন্ধে সে কল্পনামুখী হইতে পারে। তবে রসােম্মুখী
পাঠকচিত্তের পক্ষে কখনও বসবিশেষে স্থায়ীভাবে বানামুখী
বা ভাবমুখী হওয়া সম্ভবপর মনে হয় না; যেহেতু পূর্বেই বলি
মাছি, বাসনাসমুখ কাব্য ও ভাবসমুখ কাবা নিম্নতর গােষ্ঠীর
অন্তর্ভুক্ত। একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা একথা বুঝিতে .চষ্টা কবি ।
ইহা অসম্ভব নহে যে শান্ত, করুণ, মধুৰ ৰসেব অধিকাৰী
কোন বসেন্মুিখী পাঠকচিত্ত ‘ক্ষুধিত পাষাণ’এ কবিপ্রতিভা
‘ভূতভয়-ভাবটীকে যে অপরূপ ‘ভয়ানক রা’এ রূপান্তবিত
করিয়াছে, তাহার পূর্ণ আস্বাদ গ্রহণ করিতে পারিল না ;
কাবণ তাহার অন্তবে ভূতভর-ভাবে বাসনা দুৰ্বল ছিল ।
এক্ষেত্রে সেই পাঠকচিত্ত ‘কল্পনামুখী
ঠকচিত্ত ‘কল্পনামুখী হইয়া কল্পনার
আনন্দই লাভ করিবে। কিন্তু তাই বলিয়া সে একে বার
ভাবলােকে নামিয়া আসিয়া 'ভাবমুখী পাঠকচিত্তের ন্যায় ‘ভূত
ভয়-ভাব খুজিবে ইহা অসম্ভব। এক রসে রসিক চিত্ত অন্য
রসে পূর্ণ মাত্রায় অরসিক হইতে পারে না।
কবিচিত্ত যখন রসলােকে উথিত হইয়া কাব্যে প্রত্যাবৃত্ত
হয়, তখন কাব্যকে ‘রসােত্তীর্ণ কাব্য’ বলা যায়। এ কাব্যের
পূর্ণ বিচার বুদ্ধিদ্বারা চলে না, ইহা অনু-
রসােত্তীর্ণ কাব্য ও
ভূতিসাপেক্ষ। রসােত্তীর্ণ কাব্যের প্রকৃত
রসােম্মুখী চিত্ত
বােদ্ধা - রসােম্মুখী পাঠকচিত্ত, কারণ
বসলােকের মধ্য দিয়া এই দুই ধারার অয়ন-চক্র সম্পূর্ণ ও

কাব্য-পরিমিতি
৪৯
সার্থক হইয়াছে। এই মিলনের আস্বাদ সেই নিজের
সম্বিতের আনন্দময় চৰ্বণ-ব্যাপাব। সুতরাং এই লােকোত্তর
লােকে দাড়াইয়া বিচার করিবার অধিকার নাই। पक्षान
হইতে নামিয়া কাব্যক্ষেত্রে দাড়াইয়া রসােত্তীর্ণ কাব্যের
যৎসামান্য আনন্দপরিচয় গ্রহণ করা যাইতে পারে ।
কথা কও, কথা কও।
অনাদি অতীত, অনন্ত রাতে
কেন চেয়ে বসে রও?
কথা কও, কথা কও।
যুগ যুগান্ত ঢালে তার কথা
তোমার সাগর-তলে ,
কত জীবনের কত ধারা এসে
মিশায় তোমার জলে।
হেথা এসে তার স্রোত নাহি আর,
কল-কল ভৰ নীরব তাহার,
তরঙ্গহীন ভীষণ মৌন
তুমি তারে কোথ। লও ?
হে অতীত তুমি হৃদয়ে আমার
কথা কও, কথা কও।
অতীতের প্রতি যাহার কোনদিন কোন দরদ নাই,
অর্থাৎ যাহার চিত্তে এই ভাবের বাসনা সঞ্চিত নাই, তাহার

কাব্য-পরিমিতি
কথা একেবারেই বাদ দিতে হইবে; কারণ বাসনাহীন
পাঠকচিত্ত কাব্যবিচারের বাহিরে। কিন্তু অতীতের প্রতি
দরদসম্পন্ন চিত্তে সন্দেহ থাকে না, যে কবিচিত্ত এখানে
অতীতের বাসনাসাগরে স্নান করিয়া এইমাত্র উঠিয়া আসিল।
ইহার শব্দ, রীতি, অলঙ্কার, ব্যঞ্জনার বিচার পৃথভাবে কে
কবে? কি ইহার বিভাব, কি অনুভাব, তাহাতেই বা
কাহার প্রয়ােজন ? কেবল বুঝা যায় কবিচিত্ত এইমাত্র
লােকোত্তর তীর্থে অতীতের যে রসমূর্তি প্রতাক্ষ করিয়া
আসিল, আপনার শব্দ-ছন্দ-অলঙ্কার-অর্থ সমস্তই একমুখী
করিয়া সেই অতীতের বােধন করিতেছে। পাঠকচিত্তে
বসলােকস্থিত সেই অতীতের ভীষণ-কান্ত মুত্তি ছত্রে ছত্রে
ফুটিয়া উঠে :-
যুগযুগান্ত ঢালে তার কথা
তোমার সাগর-তলে।
ইহার মধ্যে দেশ ও কালকে অতিক্রম করিয়া যে ব্যাপ্তি,
নাহার আনন্দ মনকে প্রসারিত কবিয়া দ্যায়।
সেথা এসে তার স্রোত নাহি আর,
কল-কল ভাষ নীরব তাহার।
ইহার বিপুল নিস্তব্ধতা ও প্রশান্তি চিত্তকে অভিভূত
করে।

কাব্য-পরিমিতি
তরঙ্গহীন ভীষণ মেনি।
'ভয়ের ভাব নয়, ভয়ের বাসনা নয়, ভয়ের কল্পনা নয়,
ভয়ের আনন্দ ইহাতে জাগিয়া উঠে,—যাহাকে ‘ভয়ানক রস’
কবিচিত্ত আর একবার বসলোকে ডুব দিয়া আসিয়া
বলিতেছে-
=
তব সঞ্চার শুনেছি আমার
মর্মর মাঝখানে,
কত দিবসের কত সঞ্চয়
রেখে যাও মোের প্রাণে !
কে একথা অবিশ্বাস করিতে পারে ? পাঠকচিত্ত
আপনা হইতে অমুখী হইয়া আপনার মৰ্ম্মে অতীতের
সঞ্চয় দেখিয়া বিস্মিত হইয়া উঠে। এমনি করিয়া কবিচিত্ত
ধারা ও পাঠকচিত্তধারার মিলনে রসের আস্বাদন চলিতে
থাকে—যাহা সংসাৰ-বৃক্ষের অমৃতময় ফল; আর যে ফলে
নিয়াধিকারী পাঠকচিত্ত চিরবঞ্চিত।

সিদ্ধান্ত
চিত্র-সাহায্যে বুঝিবার ও বুঝাইবার চেষ্টা করা হইল যে
কবিচিত্ত, কাব্য ও পাঠ কচিত্ত ইহাদের প্রত্যেকটা চার
শ্রেণীতে বিভক্ত। সৃষ্ট কাব্য হইতে যে চিত্তের পরিচয়
পাওয়া যায় তাহাই সে কাব্যের কবিচিত্ত, সুতরাং কবিচিত
ও কাব্যের পৃথক ভাবে শ্রেণীনির্দেশ নিষ্প্রয়ােজন।
বসােত্তীর্ণ কবিচিত্ত ও রসােত্তীর্ণ কাব্য সমসংজ্ঞায় পড়ে।
কাব্যের বিভাগ,
(১) 'ভাবসমুখ কাব্য।
(২) বাসনাসমুখ কাব্য।
(৩) কল্পনাসমুখ কাব্য।
(৪) রসােত্তীর্ণ কাব্য।
পাঠকচিত্তের বিভাগ,
(১) ভাবমুখী চিত্ত।
(২) বাসনামুখী চিত্ত ।
(৩) কল্পনামুখী চিত্ত।
(৪) রসােম্মুখী চিত্ত।
ইহাদের মধ্যে ভাৰসমুখ কাব্যের সহিত ভাবমুখী চিত্তের,
বাসনাসমুখ কাব্যের সহিত বাসনামুখী চিত্তের, কল্পনাসমুখ
কাব্যের সহিত কল্পনামুখী চিত্তের, রসােত্তীর্ণ কাব্যের
=

কাব্য-পরিমিতি সহিত রসােম্মুখী চিত্তের অয়নচক্র সম্পূর্ণ হওয়ায় আনন্দের উৎপত্তি হয়, যদিও সেই সেই আনন্দের প্রকার ও পরিমাণের তারতম্য আছেই। রসােত্তীর্ণ কাব্যের সহিত (অর্থাৎ কাব্য- বিশেষে প্রকাশিত রসােত্তীর্ণ কবিচিত্তের সহিত) রসােম্মুখী ( পাঠক) চিত্তের যে মিলন, তাহাই শ্রেষ্ঠ আনন্দের কারণ- স্বরূপ হয় ; এই আনন্দেরই অপর নাম ‘রস'। পূৰ্বে বলা হইয়াছে ভাৰসমূথ কাব্য ও বাসনাসমুখ কাব্য এক-গােত্রীয় এবং হীন-গোত্রীয়। তজ্জনিত আনন্দকে ‘আনন’ না বলিয়া ‘বিলাস’ বলা সমীচীন মনে করি, নচেৎ ‘আনন্দ শব্দটীর জাতি নষ্ট করা হয়। তাহা হইলে সূত্র এইরূপ দাড়ায় :- ১। ভাবসমুথ কাব্য + ভাবমুখী চিত্ত=ভাববিলাস । ২। বাসনাসমুখ কাব্য + বাসনামুখী চিত্ত = বাসনাবিলাস। ৩। কল্পনাসমুখ কাব্য +কল্পনামুখী চিত্ত = কল্পনানন্দ। ৪। বসােত্তীর্ণ কাব্য + রসােম্মুখী চিত্ত= রস। যে চারটা পৃথক্ অয়নচক্র উৎপন্ন হইয়াছে তাহাদের নাম যথাক্রমে-১। ভাববিলাস চক্র বিলাস-চক্র ২। বাসনাবিলাস চক্র কল্পনানন্দ চক্র বা আনন্দ-চক্র ৪। রসচক্র -রাখা যাইতে পারে।

কাব্য-পরিমিতি
ভাব হইতে কাব্যে পৌঁছিবার রেখাপথ একাধিক
কল্পিত হইতে পারে, সুতরাং ভাববিলাস চক্রও একটী নহে—
অনেক। কিন্তু এই চক্রের অধিকাংশ রেখাপথ বাসনালোক
খণ্ডিত না করিয়া যাইতে পাবে না। ইহা দ্বারা বুঝিতে
হইবে যে খাটি ভাববিলাস চক্র অতি অল্প। প্রত্যেক
চক্রেই বাসনার অম্লাধিক মিশ্রণ থাকে।
বাসনালােক হইতে কাব্যক্ষেত্রে পৌছিবার বহু রেখা-
পথ অঙ্কিত হইতে পারে, সুতরাং বাসনাবিলাস চক্রের
সংখ্যাও অনেক। ইহাদের আপেক্ষিক গুণবিচার রেখা-
চিত্রে চক্রের অবস্থান অনুসারে স্থির করা যাইতে পারে।
অর্থাৎ বাসনার উচ্চস্তর হইতে সমুন্থিত কবিচিত্ত কাব্যে
পৌছিলে যে বিলাসচক্রের উৎপত্তি হয়, তাহা বাসনাব
নিম্নস্তরসমুথ চক্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বুঝিতে হইবে।
বিলাসচক্র সম্বন্ধে যে কথা বলা হইল কল্পনানন্দচক্র
সম্বন্ধেও সেই কথা সম্পূর্ণ খাটে এবং রসচক্র সম্বন্ধেও না
খাটিবার কথা নাহ। বস বলিতে বতই লােকোত্তর
ব্যাপারে সুচিত হউক, রসােত্তীর্ণ কাব্যেও হাস্যরস ও
করুণরসে গভীরতার পার্থক্য আছে স্বীকার করিতেই
হইবে। সুতরাং রসােত্তীর্ণ কাব্যমাত্রই একই রসচক্র
উৎপাদন করে না। তবে প্রকৃতি ও কবিপ্রতিভার
পার্থক্য অনুসারে রসচক্ৰ বিভিন্ন হয়। কেবল ইহাদের

কাব্য-পরিমিতি মধ্যে সাধারণ ধৰ্ম্ম এই, যে কবিচিত্ত কাব্যে পৌঁছিবার পূর্বে সেই সেই রসের আস্বাদ গ্রহণ করিয়া আসিয়াছে। ইহা ছাড়া ভাবলােক, বাসনালোক, ও কল্পনালােকের সীমান্ত হইতে চক্রের উদ্ভব হইতে পারে এবং সে-সব ক্ষেত্রে চক্র ‘মিশ্র চক্রে পরিণত হয়। এমন কাব্য আছে যাহার চক্র অংশতঃ ভাববিলাস ও অংশতঃ বাসনাবিলাস ; অথবা অংশতঃ বাসনাবিলাস ও অংশতঃ কল্পনানন্দ হইতে পারে। এ সমস্ত কথা বলিবার উদ্দেশ্য এই, যে কবি প্রতিভা কত বিচিত্র এবং তাহার পূর্ণ পরিচয় ও শ্রেণী বিভাগ করা কত দুঃসাধ্য, তাহা কল্পিত রেখাচিত্র হইতেই বেশ স্পষ্ট হইতেছে। ইহাও বলা সঙ্গত যে, অধিকাংশ কাব্যই মিশ্র চক্রের উৎপাদন করে। কাব্যের যে চারিটী বিভাগ করা হইয়াছে তাহা হইতে বুঝিতে হইবে, যে কাব্যাংশের পক্ষে ঐ কথা সত্য হইলেও কোনও কাব্যে তাহার সমস্ত অংশ একই চক্রের উৎপাদন না করিতে পারে। তবে যে কাব্য ভাবধান তাহাকে ভাবসমুখ, যাহা বাসনা প্রধান তাহাকে বাসনা- সমুথ, যাহা কল্পনাপ্রধান তাহাকে কল্পনাসমুখ এবং যে কাব্যে মুখ্য ভাবটী রস অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে, গৌণ কাব্য- কৌশলে অধিক বিচ্যুতি থাকিলেও, তাকেই রসােত্তীর্ণ কাব্য বলিতে হইবে।

কাব্য-পরিমিতি
এইখানে শিশু-সাহিত্যের পর্যায় আলােচনা করা
যাইতে পারে। শিশুর মনে ত বাসনার বিশেষ বালাই নাই,
কারণ সে জগতে ভাবের সহিত পরিচয় লাভ
শিশুসাহিত্য
করিতেছে মাত্র, ভাবের স্মৃতি তাহার চিত্তে
এখনও সঞ্চিত হইয়া উঠে নাই। যে পাঠকচিত্তে বাসনা
নাই তাহা কাব্যক্ষেত্রে উঠিতেই পারে না। সুতরাং কোন
কাব্যের আস্বাদন তাহার পক্ষে অসম্ভব। তবে শিশুকাব্যের
সহিত শিশু-পাঠকচিত্তেব অয়নচক্র কিরূপে সম্পূর্ণ হয় এবং
আনন্দই বা কি উপায়ে উৎপাদিত হয় ?
এখানে আমাদের বিচাব কবিতে হইবে শিশুসাহিত্য
কোন ‘ভাবের কারবার করে। শিশুসাহিত্যের কারবার
প্রধানতঃ বিস্ময় ও কৌতূহল ভাব লইয়া।
বিস্ময় ও
কৌতূহল এমন শ্রেণীর ‘ভাব’ যাহা বাসনার অভাবই সূচিত
করে। বিস্ময় বা কৌতূহল বোদ্বোধক বস্তুর পুনঃ পুনঃ
সংঘাতে মনে বিস্ময় বা কৌতুহলের লাঘবই ঘটায়।
চিত্ত জীবনে যত বেশী বাব বিস্মিত হইয়াছে, তাহার বিস্মিত
হইবার শক্তি তত কমিয়াছে। সুতরাং এই শ্রেণীর ভাবের
স্মৃতি যাহার চিত্তে যত কম সে ইহার উপভােগে তত বেশী
অধিকারী। অতএব বিস্ময় বা কৌতুহল ভাবের স্মৃতির
অভাবকেই এই ভাবের বাসনা বলা যাইতে পারে এবং
সেই জন্যই শিশুপাঠকচিত্ত কৌতুহল ভাবলােক হইতে শিশু-
কাব্যলােকে উত্তীর্ণ হইবার অনধিকারী নহে।

কাব্য-পরিমিতি
শিশুসাহিত্য-ক্ষেত্রে কবিচিত্তধারা ভাব ও বাসনালোকের
সীমান্তপ্রদেশ হইতেই কাব্যক্ষেত্রে যাত্রা করে বলিয়া মনে
হয়। বাসনা ও কল্পনা দ্বাৰা পরিপুষ্ট কবিচিত্ত হইতে উদগত
শিশুসাহিত্য কোন দিনই শিশুপাঠকচিত্তের মনােরঞ্জন
করিতে পারে নাই, বরং তাহাদের পিতাদের আনন্দ
দিয়াছে ইহার উদাহরণ প্রচুর। রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’
কবিতাপুস্তকের অনেক কবিতাই ইহার সমর্থন করিবে।
থােক। মাকে শুধায় ডেকে
এলেম আমি কোথা থেকে,
কান্ খান তুই কুড়িযে পেলি আমারে।
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে
খােকারে তার বুকে বেঁধে ,
“ইচ্ছা হয় ছিলি মনের মাঝারে।
ছিলি আমার পুতুল খেলায়,
ভােরে শিব-পূজার বেলার
তোরে আমি ভেঙেছি অব গড়েছি।
তুই আমার ঠাকুরের সনে
ছিলি পুজার সিংহাসনে
তারি পূজায় তােমার পূজা করেছি।”
ইহার সমতুল্য কবিতা মােটেই সুলভ নহে। কিন্তু
এখানে শিশু শিশু নয়, মা মা নয় এবং কাব্য শিশুকাব্য
নহে। যে কবিচিত্ত শিশু না হইয়াও ভাব ও বাসনার সীমান্ত
৭

৫৮ কাব্য-পরিমিতি দেশে বাস করিতে জানে, তাহাই শিশুকাব্য রচনা কবিবার উপযােগী। আমাদের পুরাতন ছড়ার সহিত আধুনিক শিশুকাব্যের তুলনা করিলেই একথা স্পষ্ট হইবে। অখ্যাত- নাম ছড়ার কবিগণ এখন কার নামজাদা শিশু কাব্য-লেখক- গণের ন্যায় ইচ্ছাপূৰ্ব্বক বােকা স'জিয়া কাব্য রচনা করিত বলিয়া মনে হয় না। তাহারা বয়সে বৃদ্ধ হইলেও শিশুর ন্যায় সরল ও কৌতুহলী ছিল, অথবা সময়ে সময়ে শিশু হই - বার দুলভ ক্ষমতা তাদের ছিল - যেমন স্নেহাতুবা জননী শিশুর সহিত শিশু হইয়া (কল্পনাবলে নহে) নিরর্থক শব্দের পর শব্দ যােজনা করিয়া সার্থক শিশু-সাহিত্যের সৃষ্টি করেন। ঘরে ঘরে জননীরা শিশু সন্তানের মুখ চাহিয়া যে প্রলাপােক্ত করেন তাহার সুনিৰ্বাচিত চয়নিকা করিতে পারিলে হয়ত পূৰ্ব্ব প্রচলিত ছড়ার সমকক্ষ আধুনিক শিশু- সাহিত্য প্রকাশিত হইতে পাবে। একটী নমুনা সইয়া বিচার করা যাক। ওপারে রে জন্তী গাছটী, জন্তী বড় ফলে, গোজীর মাথা খেয়ে প্রাণ কেমন করে। প্রাণ করে আইঢাই, গলা করে কাঠ, কতক্ষণে যাব রে ভাই হরগৌরীর মাঠ ? হরগৌরীর মাঠে রে ভাই পাকা পাকা পান, পান কিনলাম চূণ কিনলাম ননদেভেজে খেলাম।

কাব্য-পরিমিতি
একটী পান কম হ’ল দাদাকে বলে দেবো,
দাদা দাদা ডাক পাড়ি, দাদা নেই ঘরে,
সুবল সুবল ডাক পাড়ি সুবল আছে ঘরে।
আজ সুবলের অধিবাস, কাল সুবলের বিয়ে,
সুবলকে নিয়ে যায় দিগনগর দিয়ে।
দিগনগরের মেযেগুলি নাইতে নেমেছে,
চিক চিকণ চুলগুলি ঝাড়তে লেগেচে ।
দুই দিকে দুই কাৎলা মাছ ভেসে উঠেচে,
একটা নিলেন গুরুঠাকুর, এক টী নিলেন টিয়ে।
টযের মার বিয়ে,
গায়ে হলুদ দিয়ে,
গৌরী বেটী কানে,
নকা বেটা বব,
কুডকুড় বাদ্যি বাজে, চড়কডাঙ্গায় ঘর।
}
এই ছড়ার অন্তরে কবিচিত্তধাবার অনুসরণ করিলে
দেখা যায়, কবিচিত্তের বয়স বেশী নয় এবং তাহা একটা
অর্ধস্ফুট বালিকাচিত্ত। তাহা না হইলে একটা পানের
জন্য দাদাব কাছে নালিশ করিতে ছুটিত না এবং পরক্ষণেই
সুবলের বিবাহ-ব্যাপারে অমন মশগুল হইয়া যাইত না।
জীগাছ হয়ত আছে, কিন্তু ‘গােজীর মাথা কেহ কস্মিন্
কালে দ্যাখে নাই, সুতরাং ইহার ভাবস্মৃতি বা বাসনা কবি-
চিত্তে সঞ্চিত নাই। অন্যবিধ গাছের মাথা, যাহা খাইয়া

কাব্য-পরিমিতি ‘প্রাণ কেমন’ কবিতে পাবে অথবা গলা কাঠ হইয়া আসে (যেমন তামাক পাতা) তাহারই অৰ্দ্ধ'ফুট বাসনা কবিচিত্তে ভাব ও বাসনার সীমান্ত-প্রদেশে হয়ত অবস্থান করিতেছিল, সেইখান হইতেই কবিচিত্ত সরাসবি কাব্য- ক্ষেত্রে উঠিতে চাহিতেছে। চুণ দিয়া পান খাওয়ার বাসনা কবিচিত্তে প্রস্ফু, কিন্তু বিবাহ হইলেও তৎসম্পর্কীয় ভাব পরিপাক হইয়া এখনও বাসনা-লােকে বেশ ভিত গাড়ে নাই বলিয়াই মনে হয় । দিগনগর, কালা মাছ, চিকণ চিকণ চুল, ইহাদের বাসনা স্পষ্ট হইয়াছে, কিন্তু টিয়ের মা’র বিয়ে বিস্ময়ভাবেব কথা এবং ইহার অভাবই বিস্ময়বাসনাব রূপ। ‘ঝামকুড়কুড়বাদ্যি’ বাসনার নিম্নস্তরের কথা, কারণ এই বাদ্যি-ভাবের স্মৃতি বা বাসনা যখন মানব- চিন্তে বেশ প্রতিষ্ঠিত হইয়া যায়, তখন তাহা আর কাব্য- গঠনােপযোগী উপাদান থাকে না, তাহাকে থামাইবার জন্যই চিত্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে। সুতরাং দেখা যাইতেছে -- কবিচিত্ত এ ছড়ায় কখনও ভাব-লােকে এবং কখনও বাসনা লােকে অর্থাৎ তাদের সীমান্ত প্রদেশে বিচরণ করিতেছে । শিশুপাঠক চিত্তধারার অনুসরণ করিলে দেখব-জন্তীগাছ, গোজীর মাথা, প্রাণ কেমন, হরগৌরীর মাঠ, পাকা পাকা পান, ননদভাজে তাহার ভক্ষণ ইত্যাদি সমস্তই তাহার পক্ষে অনাস্বাদিতপুৰ্ব্ব সুতরাং কৌতুহলের বস্তু। পাঠকচিত কাব্য-পরিমিতি '? এখানে অভাবাত্মক কৌতূহলবাসনার মধ্য দিয়া কাব্যে ছুটিয়াছে। এ চিত্ত জগতে ভাবের সহিত পরিচয় স্থাপন করিয়া বাসনাসঞ্চয়ে সতত উন্মুখ, সুতরাং অংশতঃ ভাবমুখী অংশত: বাসনামুখী অর্থাৎ ভাবলােক ও বাসনালােকের সীমান্ত প্রদেশে পৌছিবার জন্য ইহার টান বেশী। অতএব কবিচিত্ত ও পাঠকচিত্তের অয়নচক্র সম্পূর্ণ হইয়া এখানে আনন্দ অর্থাৎ বিলাস উৎপাদিত হইতেছে । এ ছড়া হিসাবী লোক ইচ্ছাপূৰ্ব্বক হিসাব ভুলিয়া লিখিতে পারে না, যেমন সাতার-জানা লােক ইচ্ছা কবিলেও সাঁতার ভুলিয়া ডুবিয়া মরিতে পারে না। এ কাব্য শিশুমনে যতই উপভােগ্য হউক, কাব্যবিচাবে ইহার আনন্দ বা বিলাস নিম্ন স্তরের, ইহাতে মতভেদ হইবার কারণ নাই। শিশু- সাহিত্য বলিতে আমি বালক সাহিত্য বলি নাই এ কথা উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করি। যদি এমন কথা বলা হয় যে শিশুচিত্ত ছড়ারূপ শিশু- সাহিত্য হইতে যে আনন্দ লাভ করে তাহা সম্পূর্ণরূপে সুর- জাত, ছড়ার কথা হইতে সে কোন আনন্দ পায় না, তবে আমার যুক্তি-পরম্পরা অসত্য না হইলেও নিপ্রয়ােজন বলিতে হইবে। অতএব দেখা গেল--কবিচিত্তধারা ও পাঠকচিত্তধারার অয়নচক্র সম্পূর্ণ হইলেই কাব্যোপলব্ধি সম্ভব হয় এবং তাহাতে বিলাসচক্র, আনন্দচক্র, রসচক্র বা মিশ্রচক্র অবলম্বন করিয়া এই চারিশ্রেণীর যে-কোন এক শ্রেণীর আনন্দ উৎপন্ন হইয়া থাকে।

দৃষ্টান্ত
দৃষ্টান্ত
এইবার কয়েকটা দৃষ্টান্ত-সাহায্যে আমাদের কাব্যের
শ্রেণীবিভাগ বুঝিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে এবং
তাহারই অনুসঙ্গে কবিচিত্ত ও পাঠকচিত্তের অপরাপর
বিশেষত্বের পরিচয় লওয়া যাইতে পারে ।
খাঁটি ভাবসমুখ কাব্যের উদাহরণ দেওয়া কঠিন ইহা
পুর্বেও বলিয়াছি এবং এই শ্রেণীর কাব্যের কয়েকটা
ভাবসমুখ
দিবার চেষ্টা করিয়াছি। হেমচন্দ্রের ‘রেল
কাব্য গাড়া’ কবিতার আনন্দ নিশ্চয়ই বিলাসচক্রের
অন্তভুক্ত; তবে তাহাতে ভাববিলাসের সহিত বাসনা,
বিলাসের যোগ আছে। ভাবসমুখ কাব্য সম্বন্ধে যাহা
বলিয়াছি তাহার অবিক না বলিলেও চলিবে ।
বাসনাসমুথ কাব্যের দৃষ্টান্ত সুলভ। বিদ্যাসুন্দরে
কতক অংশ রতবাসনসঞ্জাত এবং তাহার আনন্দ রতি
শাসনাবিলাস মাত্র, যদিও তাহাতে ছন্দ,
অলঙ্কাণ ও ব্যঞ্জনার অভাব নাই। যে
পাকশালে রাতবাসনা পাক হইয়া মধুর রসে পরিণত হয়,
সেখানে এ কাব্য পৌছে নাই বলিয়া রসেম্মুখী ও কল্পনামুখী
পাঠকচিও ইংকে অশ্লীল বালয়া আসিতেছে ।
ঈশ্বর গুপ্ত তপসে মাছে লিখিয়াছেন—

কাব্য-পরিমিতি প্রাণে নাহি দেরী সয় কাটা আঁস বাচা, ইচ্ছা করে একেবারে গালে দিই কাচা। কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা, টপাটপ, খেয়ে ফেলি ছাঁকা তেলে ভাজা। ইহা লােভবাসনাসমুখ এবং ইহাব আনন্দ লােভবাসনা- বিলাস। লােভ-ভাবের ইহা একটী ‘অশ্লীল’ কবিতা। হাস্য-রসের কবিতা ইহা নহে। হেমচন্ত্রের সুপরিচিত কবিতা ‘অশােকতরু বাসনাসমুখ কাব্যেরই উদাহরণ স্থল। কে তোমাবে তকবর কোবে এত মনোহব বাখিল এ ধরাতলে ধরা ধন্য কোরে এত শোভা গাছ কি এ পৃথিবী ভিতরে ? দেখ দেখ কি সুন্দর পুষ্পগুচ্ছ গবে থর বিরাজে শাখার পর সদা হাস্যভবে সিন্দুরের বাবা যেন বিটপী উপরে। ইহাতে অশোকতরুর যে শােভা বর্ণিত হইয়াছে তাহা অশােকতরু-দর্শনের সাধারণ ভাবস্মৃতি মাত্র, কল্পনালােকে তাহা জারিত হয় নাই। তাহার পর কবিচিত্ত স্বকীয় ও মানব সাধারণের দুঃখের কণা যাহা বলিয়াছেন, তাহাও দুঃখেব ভাবস্মৃতি বা বসনামাত্র। তাহা কল্পনাসমৃদ্ধ নহে। সৰ্বশেষে যখন বলিতেছেন- ৬৪ কাব্য-পরিমিতি এ দেব কাহারও নয়, অামিই কলঙ্কম, আমার অন্তর হায় কসঙ্কেতে ভরা, আমি তর বড় পাপী তাই ঠেলে তারা। তখন ইহা নিতান্তই মন্তব্যের মত শােনায়। কলঙ্কময়, পাপী প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত কবিচিত্তের ভাব কোনরূপ বিভাব অনুভাবের দ্বারা পবিপুষ্ট করিবার চেষ্টা পর্যন্ত কবিতায় নাই। পূর্বে বলিয়াছি লত। নিজে মেরুদণ্ডহীন হইলেও দণ্ড ও মঞ্চের সাহায্যে উচ্চে উঠিয়া গো-মহিষাদির মুখ হইতে আত্মরক্ষা করিতে এবং ফল ফলাইতেও সক্ষম হয়। অনেক বাসনাসমুথ কাব্য মধুর ছন্দ, চতুর অলঙ্কার ও সবল রীতির আশ্রয়ে বাচিয়া থাকে। সত্যেন্দ্রনাথ যখন বলিতেছেন- এস তুমি বাদল বায়ে ঝুলন ঝুলবে, কমল চোখে কোমল চেয়ে কুজন ভুলাবে। শীতল হাওয। নিতল রসে বনের পাখী ঘনিয়ে বসে, আজ আমাদের এই দোসাতেই দুজন কুলাবে। এস তুমি নুপুব পায়ে ঝুন ঝুলাবে। এস তুমি য, গীর বনে দুকুল বুলাবে, কোল দিয়ে ঐ কেলিকদম মুকুল খুলবে, কাব্য-পরিমিতি বাইবে অজি মলিন ছায়া মলিদা মেঘের মায়। অন্তরে আজ বসের ধারা বঙিন গুলাবে। এস তুমি মোহের হাওয়া মিহিন বুলাবে। তখন কবিচিত্ত কল্পনার অভিনয় করিলেও কবিতা বাসনা- সমুখের উর্দ্ধে উঠে নাই। বর্ষায় দুটি প্রাণীর দোল খাইবার সাধারণ ভাবশ্বতি হইতে ইহার সম্ভব এবং সেই স্থানেই ইহার শেষ। সেই বাসনাও আবার এলােমেলো কল্পনার (ভজালে একেবাবে অস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। দেবেন্দ্র সেন যেখানে বাজাইতেছেন- ঝম ঝম ঝম্ ঝম ঝমাৎ ঝম্ বাজে ওই মল, কিম্বা গােবিন্দদাস যখন ডাকিতেছেন- অষি বালিকা খেলবি যদি, এই এক নুতন খেলা। তখনও কবিচিত্ত বাসনােক ছাড়াইয়া গিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। এ সব কবিতা কেবল ছন্দ, অলঙ্কার ও রীতির সাহায্যে বাচিয়া আছে। রবীন্দ্রনাথ কণিকার মধ্যে বলিতেছেন-- কুড়ালি কহিল, ভিক্ষ। মাগি আমি শাল, হাতল নাহিক, দাও একখানি ডল। ডাল নিয়ে হাত প্রস্তুত হ'ল যেই তারপরে ভিক্ষুকের চাওয়া চিন্তা নেই

কাব্য-পরিমিতি
একেবারে গােড়া ঘেসে লাগাইল কোপ,
শাল বেচারীর হ’ল আদি অন্ত লোপ।
ইহাতে বুদ্ধির পরিচয় অলঙ্কারের কৌশল আছে, কিন্তু
কবিচিত্ত বাসনার উন্ধে উঠিয়াছে বলিয়া মনে হয় না; মাত্র
চতুরতার সায্যে আনন্দ-সৃষ্টির প্রয়াস পাইয়াছে। ইহা
বিলাসচক্রের অন্তর্গত। তবে এ কবিতা উত্তম কবি
প্রতিভার লীলামাত্র --অক্ষত নহে।
উত্তম কবিপ্রতিভার পক্ষে নিম্নস্তরে শীলা করা অসম্ভব
নহে। চিত্রে দেখা যায় রসেম্মুখী কবিচিত্তের গতিপথে
বাসনাচক্র ও আনন্দচক্র পড়ে। সুতরাং খেয়াল হইলে
সে রসে না উঠিয়া মধ্যে মধ্যে ভাব, বাসনা বা কল্পনা হইতে
কাব্যে চলিয়া যাইতে পারে। 'আবার উচ্চচক্রের অধিকারী
পাঠকচিত্তের পক্ষেও বাসনাচক্রে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়।
রসেম্মুখী পাঠকচিত্তের পথে বিলাসচক্র পড়ে এবং খেয়ালের
বশে সে কাব্য হইতে সিধা ভাব বা বাসনায় নামিয়া
আসিতে পারে। এইজন্যই রসেম্মুখী পাঠকচিত্তও কখন
কখন নিম্নস্তরের কাব্যে বিলাস করিতেছে দেখা যায়, যেমন
রসােত্তীর্ণ কৰিচিত্তও মধ্যে মধ্যে ভাব ও বসনান্তর হইতে
কাব্য উৎপাদিত করিতেছে দেখা যায়।
কিন্তু তাই বলিয়া ভাবমুখী বা বাসনামুখী চিত্তের পক্ষে
আনন্দচক্র বা রসচক্রে ভ্রমণ সম্ভবপর নহে। বিলাসচক্র

কাব্য-পরিমিতি
আনন্দচক্র বৃহত্তর রসচক্রের অন্তঃস্থিত সুতরাং রসচক্রের
অধিকারীর ক্ষুদ্রতর চক্রেও অধিকার আছে ।
অব বৃহত্তর
চক্র ক্ষুদ্রতর চক্রের বহিঃস্থিত হওয়ায় ভাবমুখী বা বাসনামুখী
পাঠকচিত্তের পক্ষে কল্পনানন্দ বা মস লাভ করা সম্ভব হয়
রেলপথে প্রথম শ্রেণীর টিকিট কাটিয়া খেয়াল হইলে
যে কোন শ্রেণীতে ভ্রমণ করা চলে, কিন্তু তৃতীয় শ্রেণীর
টিকিটধাবীর পক্ষে অন্য কোন শ্রেণীতে ভ্রমণ নিষিদ্ধ।
গঙ্গোত্রী-প্রনার্থী যাত্রীর পক্ষে হরিদ্বারের টিকিট কেনা
থাকিলে, রাবড়ির লােভে একদিন কাশীবাস করিয়া, ঠুংরি
শুনিতে দুই দিন লক্ষ্মেী এ থাকিয়া, জ্যোৎস্নারাত্রে তাজ
দেখিবার মানসে আগরায় নামিয়া, পরে নির্দিষ্ট পুণ্যদিনে
হরিদ্বারে পৌছিয়া গঙ্গাস্নানে বাধা নাই। কিন্তু যে লিলুয়ার
টিকিট কাটিয়াছে তাহার পক্ষে ঐ সমস্তই নিষিদ্ধ ; আর
কাশীর টিকিটেও আগবার তাজ দেখা যায় না।
সুতরাং চিত্র ও যুক্তির সাহায্যে বুঝা গেল উত্তম শ্রেণীর
কবিচিত্ত কিরূপে সময়ে সময়ে অতি নিম্নস্তরের কবিতা লিখে
এবং অতিশয় রসিক পাঠকচিত্তও কিভাবে তথাকথিত
অশ্লীল কাব্যের রস’ গ্রহণে সমর্থ হয়।
কল্পনাসমুখ কাব্যের সাধারণ লক্ষণ পূর্বে সংক্ষেপে
বলিয়াছি। এই শ্রেণীর কাব্যে অঙ্গাধিক মাত্রায় কাব্যের
অধিকাংশ গুণ বৰ্তমান থাকিলেও তাহা প্রকৃত রস উদ্রেক

৬৮
কাব্য-পরিমিতি
}
?
করিতে পারে না, কারণ কবিচিত্ত এ স্থানে রস উত্তীর্ণ হইয়া
কল্পনাসমুখ
কাব্যে পেীছে নাই। অথচ কবিচিত্ত রস
কাব্য সম্বন্ধে সজাগ থাকায় বসলােকে উঠিবার
পুনঃপুনঃ প্রয়াস করে, যে প্রয়াস অধিকাংশ সময় কাব্যেও
প্রকট হইয়া উঠে। সেই রসহীন অয়াসের ফলে ছন্দ,
অলঙ্কার, রীতি প্রভৃতির মাত্রাঙ্কন কমিয়া যায়, অর্থাৎ
তাহাদের পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব ঘটে ।
কবি গােবিন্দদাসের ‘আমার ভালবাসা’ বাটি
লইয়া বিচার করিলে এ সম্বন্ধে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হইতে
পারে। কবি আরম্ভ করিলেন :-
আমি তাকে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ,
বুঝিন। আধ্যাত্মিকত।
দেহ ছডিং প্রেমকথা,
কামুক লম্পট ভাই যা কহ তা কহ।
অাত্মায় আত্মায় যোগ,
বুঝিনা সে উপভোগ,
অদেহী আত্মার আগে কিস ছুয়ে সহ ?
কবির চিত্তধারা নারী এই বস্তু হইতে রতিভাব ও
বতিবাসনার উঠিয়া সেই ভাবের যে বিশেষ রূপটিকে মধুর
রসে পরিণত করিতে চায় তাহা এই,-রমণীর রূপ ও প্রেম

কাব্য-পরিমিতি অভিন্ন ও অচ্ছেদ্য ; রূপব্যতিরিক্ত প্রেমের অস্তিত্ব নাই; প্রেম আসলে রূপপ্রধান ব্যাপার। কবিচিত্ত এখানে এমন একটি বিষয় নির্বাচিত করিয়াছে যাহার বাসনা দৃঢ়। তাহার পর উপযােগী শব্দ, বলিষ্ঠ রীতি ও বিবিধ অলঙ্কারের সাহায্যে বক্তব্য বিষয়ে একেবারে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। } আমি ও নারীর রূপে অমি ও মাংসেব ওপে কামনার কমনীয় ফেলি কালীদহ- ও কমে ওই পঙ্কে ওই রেদ ও কলঙ্কে কালীয় নাগের এত সুখী অহরহ। কল, ক্লেদ, পঙ্ক এ সমস্ত অলঙ্কার মাত্র। বক্তব্য-নারীদেহের রূপ, লাবণ্য, স্পর্শ, আস্বাদ এই সমস্ত দেহসাহায্যে নিবিড় ভাবে উপভােগ করা । বক্তব্য fষয়ে মতান্তর থাকিলেও কল্পনালােকে কবিচিত্তের লীলা ও প্রয়াস প্রশংসনীয়। কিন্তু কবিচিত্ত এখানে জানে-এই ভাবটিকে যতক্ষণ রসে পরিণত করতে না পারিতেছে ততক্ষণ তাহার মূল্য কম এবং সে এখনও বসলােকে উঠিতে পারে নাই। তথন নূতন বিভাব অনুতাৰ উপভাবের সাহায্যে সে সঙ্গেকে উঠিবার চেষ্টা করিতেছে।

কাব্য-পরিমিতি আমাদের কেলিভরে পৃথিবী উলটি পড়ে, ও নহে সাগরে বান, তোমরা যা কহ। মর্দনে মন বুকে, অগ্নি উঠে নিরিখে, ভূমিকম্পে কাপে বিশ্ব ভযে অহবহ । আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ। আরম্ভ হইয়াছিল--লৌকিক পুরুষচিত্ত লৌকিক রমণী- দেহকে যেরূপে সাধারণতঃ ভােগ কবে তাহারই কথায়, কবির বক্তব্যও তাহাই। কিন্তু কবিচিত্ত কল্পনালােকে উঠিয়া দেখিল, সাধারণ বিভাব অনুভাব লইয়া সে ইহাকে বসলােকে উঠাইতে পারিল না ; তখন ব্যাপারটাকে একেবারে দেহাতীত, ৰূপাতীত, universal কবিবার কৌশল অবলম্বন করিল, যদি তাহাতেই ভাবটি বসে পরিণত কবিকল্পনা ক্রমে একেবারে বন্ধ। ছাড়িয়া দিল- এস সুধা এস বিষ, এর পুশ কি কুলিশ, এম আঃ এল এস বহ। কবিচিত্তের একাগ্র আহ্বানে ও বলি বার বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে সমস্তই হয়ত আসিয়াছে, কিন্তু রস আসিতেছে না অর্থাৎ -তাহার উদ্দিষ্ট ভাবটা রসে পরিবর্তিত হইতেছে না।

কাব্য-পরিমিতি
৭১
তখন আবার নিজের বক্তব্য বিষয়ে সােজা নামিয়া গিয়া
অন্য উপায়ে চেষ্টা করিতেছে-
চোখে চোখে চোখ সোজ।
হাতায়ে পীরতি খে,
তার চেয়ে এ যে সােজা চোখে দেখে সহ।
সে আমাৰ অ'মি তার,
নাহিক বাকল সার ,
এক আত্মা দুজনাব অনাদি অব।
জমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
কুশলী কবি চত্ত তাহার এই রসলােকে উঠিবার প্রয়াস
কাব্যে যাহাতে প্রকট না হয় সে চেষ্টা যথারীতি করিয়াছে
এবং সে বিষয়ে অনেকাংশে কৃতকার্যও হইয়াছে। কিন্তু
ফলে কি হইল? আরম্ভ হইয়াছিল
অত্মিায় আত্মায় যােগ
বুঝিনা সে উপভোগ
এই ভাবটিকে রসমুক্তি দিবার পরিকল্পনায়, আর সমাপ্তি
এক অায়। দুই নার
অনাদি আবহ।
‘আআয় আত্মায় যােগ চির প্রসিদ্ধ এই ভাবটীকে শ্লেষ
করিয়া যাহার আরম্ভ, সেই ভাবটিকে প্রতিষ্ঠিত প্রতিপন্ন

৭২
কাব্য-পরিমিতি
করিয়া কবিতা প্রায় শেষ হইল। তাহার পর যাহা হইতেছে
তাহা দেহের রূপাত্মক ভােগকে একেবারে উড়াইয়া দিয়া
আয় আত্মায় যােগ” এর ভােগকেই অর্থদান।
হন্দব কুৎসিত হোক,
উলঙ্গ অবৃত রোক,
কুকছি বলিয়া কর কলঙ্ক নিগ্রহ ,
থাক তার মহা কুষ্ঠ
আমি যে তাতেই তুষ্ট,
তোমরা দেখ না, নয় ভযে দূরে বহ।
চন্দন আতর সম
তাব পূs প্রিয় মম,
শরীরে মাখিলে যায় যাতনা দুঃসহ।
“অত্ময় আত্মায় যােগই প্রেম” এই ভাবটীর অনুভাব
পূৰ্বোদ্ধত কাব্যাংশে যেমন চমৎকার ব্যক্ত হইয়াছে এমন
খুব কম দেখা যায়। কিন্তু কবির উদ্দেশ্য ছিল ইহার
বিপরীত ভাবটীকে রসে পরিণত করা। কবি প্রতিভা
এক্ষেত্রে পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করিয়াও যথেষ্ট শক্তির অভাবে
কবিচিত্তকে বসলােকে উত্তীর্ণ করিতে পারিল না ; পরস্পর
বিরােধী বিভাব অনুভবের জালে জড়াইয়া কাব্যে আসিয়া
পৌছিল। কবিচিত্ত নিজে রস ঘুরিয়া কাব্যে আসে নাই
বৰিয়াই চেষ্টা-চিছু বুদ্ধিগােচর হইতেছে এবং যথেষ্ট নিপুণতা

কাব্য-পরিমিতি
१७
সত্ত্বেও তাহার চিন্তা ও চেষ্টা উদ্দিষ্ট রসের অনুগত হয় নাই।
কবিচিত্ত রসােত্তীর্ণ হইলে কবিতার প্রথম দুইটি ছত্র এমন
পরস্পর-বিরােধী হইতে পারিত না।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ,
অমৃত সকলি তার মিলন বিরহ।
অস্থিমাংসময় দেহের পরস্পর বিচ্ছেদেরই অপর নাম
‘বিরহ। বিরহে অস্থিমাংস কে কোথায় পায় ? বিরহ যখন
অমৃত হয় তখন আত্মায় আত্মিয় যােগের বাকী থাকে কি ?
কল্পনাসমুখ কাব্যের অনেক কথা এই আলােচনা হইতে
বুঝা যাইতেছে।
এ কবিতা বাসনাসমুখ বলিতে পারি না ;
কারণ খণ্ড খণ্ড করিয়া দেখিলে ইহার বিভাব অনুভব
উপভাব ভাবােপযােগী, ইহার প্রত্যেক ছত্রে কবিচিত্তের ছাপ
পড়িয়াছে, ইহার প্রতীতি দৃঢ়, রীতি বলিষ্ঠ, গতি সাবলীল,
অলঙ্কার সুন্দর, অর্থ সুস্পষ্ট। অর্থসম্পর্কে বলতে হয় যে
সমগ্র কবিতার কোন অর্থ হয়ই না, ইহা আমার বক্তব্য নহে।
আমি বলিতে চাই, ইহার মূলভাব রসে রূপান্তরিত হয় নাই
বলিয়াই এক অংশের সহিত অপরাংশের অসঙ্গতি ধরা পড়ে
এবং বুঝা যায় কবিচিত্ত এ কাব্যে রসােত্তীর্ণ নহে।
উচ্চস্তরের কল্পনাসমুখ কাব্যে কবি-প্রতিভা অনেক
সময় সমগ্র কাব্যের মূল ভাবটাকে রসে রূপান্তরিত করিতে

৭৪
কাব্য-পরিমিতি
না পারিলেও কাব্যাংশে প্রকাশিত সঞ্চারী ভাবকে বসায়িত
করিতে সক্ষম হয়।
রসে পাঁছিবাব চেষ্টার মধ্যেও আনন্দ
আছে, যদিও সে আনন্দের প্রকৃতি ও গভীরতা রসােক
হইতে কাব্যক্ষেত্রের পথে যাতায়াত-জনিত আনন্দের
প্রকৃতি ও গভীরতা হইতে বিভিন্ন । কবি-প্রতিভা রসে
উঠিবার এই সানন্দ প্রযত্নদ্বার মধ্যে মধ্যে রসলােক স্পর্শ
করিয়া আসে এবং তাহারই ফলে কাব্যাংশ হীরার টুকরার
ন্যায় ঝক্ঝক্ করে, যদিও সমগ্র কাব্য রসােত্তীর্ণ হয় না।
সত্যেন্দ্রনাথের ‘ছ-হিন্দোল’ কবিতাটা লইয়া বিচার কব:
যাইতে পারে।
মেঘলা থম থম্ সূৰ্য্য ইন্দু
ডুবল বাদলায়, দুলল সিন্ধু !
হেম-কদম্বে তৃণস্তম্বে
ফুটল হর্ষের অশ্রুবিন্দু।
মৌন নৃত্যে মগ্ন খঞ্জন,
মেঘসমুদ্রে চলছে মন্থন।
দগ্ধদৃষ্টি বিশ্বসৃষ্টির
মুগ্ধনেত্রে স্নিগ্ধ অঞ্জন।
- এ কাব্যে কবি-চিত্ত ঘনায়মান বর্ষার একটা বিশেষ
ভাবকে রসমৃর্তি দিতে চাহিতেছে। এই ভাবটীকে বর্ষার
“হিন্দোল ভাব” বলা যাইতে পারে। বর্ষার সাধারণ ভাবে

কাব্য-পরিমিতি ৭ বাসন কবিচিত্তে স্পষ্ট ; কিন্তু হিন্দোল ভাব”এর বাসনা অস্পষ্ট। বাসন-স্তরে যাহা অস্পষ্ট, কল্পনার মায়ালােকে তাহ কুহেলিকাচ্ছন্ন হইয়া যাইবার সম্ভাবনাই অধিক। দেখা যায় কবিচিত্ত প্রথমে বর্ষার এই হিন্দোল ভাবকে ধরিবার প্ৰয়াস করিতেছে। যখন থম্ থম্ মেঘাচ্ছন্ন অস্তমিত সূৰ্য্য চন্দ্রের নীচে সিন্ধু দুলিতেছে, তখন কদম ফুলের ও ঘাসেব চোখে আনন্দাশ্রু ফুটিয়া উঠিতেছে। এদিকে অতি ক্ষুদ্র খঞ্জন পাখী নীরবে নৃত্য করিতেছে, ওদিকে মেঘসমুদ্রে মন্থন আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। এইরূপ ব্যবধানাত্মক বিভাবের দোলা দিয়া তিনি হিন্দোল ভাবটীকে রসে তুলিবার চেষ্টা করিতেছেন। কিন্তু পরের শ্লোকে এ দোলা প্রায় থামিয়া গেল- ভাসছে বিল খাল, ভাসছে বিলকুল ! ঝাপসা ঝাপটায় হাসছে জুইফুল, বান্ত শিষ তার কাছে বিস্তাব তলিয়ে বন্যায় জাগছে জুলজুল। ইহা বর্ষার সাধারণ ভাবেব বিভাব ; দোলাব বিভাব নাই বা একান্ত অস্পষ্ট। বাছ শূন্যে অপ্রস্তু কাছে অম্বব কাপছে অধু ।

৭৬ কাব্য-পরিমিতি লক্ষ ঝর্ণায় উঠছে ঝঙ্কার “ওম্ স্বয়ম্ভ ” “ওম্ স্বয়ম্ভ *! ঝরূছে ঝঝ ঝরছে ঝন্ঝ বজ্র গর্জায়, ঝঞ্চা গম গম লিখছে বিদ্যুৎ মন্ত্র অদ্ভুত, বলছে তিনলােক বম্ বব বম্। বর্ষার সাধারণ ভাবের চমৎকার বিভাব, কিন্তু কবিচিত্ত তাহার হিন্দোল ভাব হারাইয়া ফেলিয়াছে অথবা তাহা ইয়া বিপন্ন হইয়াছে। পূর্বের শ্লোকটীর সহিত তুলনা করিলে এই দুই শ্লোকের বিভাবে অবশ্যই পার্থক্য আছে। কিন্তু এখানেও সেই ব্যবধানাত্মক কৌশল অবলম্বনে হিন্দোল ভাবটীকে রসমূর্তি দেওয়ার প্রয়াস। তবুও যে হিন্দোল ভাব পাঠকচিত্তে মূর্তি পাইতেছে না তাহার কাবণ – একবার নিম্নতম মধ্যবিন্দু এবং পরক্ষণে, অথবা কিয়ৎক্ষণ পবে, শীর্ষবিন্দুদ্বয়ের বর্ণনা কবিলেই দোলার সব কথা বলা হয় না। এই বিন্দুত্রয়ের মধ্যে ওঠানামার বিচিত্র গতি, ভঙ্গী, আশা-আকাঙ্ক্ষার বিভাব অনুভাব না থাকিলে ছন্দ নাচিয়া চলিলেও অর্থ দুলিয়া উঠে না। আমি যে কথা বলিতে চাহিতেছি, তাহা রবীন্দ্রনাথের ঝুলন বা মরণ- দোলার অংশবিশেষ পাঠ করিলেই প্রতীত হইবে।

কাব্য-পরিমিতি
৭৭
দুলিছ গো দোলা দিতেছ,
পলকে অলোকে তুলিয়া, পলকে
আঁধারে টানিয়া নিতেছ ।
সমুখে যখন আসি,
তখন পুলকে হাসি,
পশ্চাতে যবে ফিরে যায় দোল।
ভয়ে আঁখিজলে ভাসি।
ছন্দ-হিন্দোলের কবিচিত্ত অবশেষে যখন
সান্দ্র বর্ষণ হর্ষ-কল্লোল,
ঝিল্লীগুঞ্জন মঞ্জু হিল্লোল !
হইতে
মূচ্ছে বীণ অর মুচ্ছে বীণকার,
মুচ্ছে বর্ষার ছলহিন্দোল !-
এই অনুভাবটীব মধ্যে পড়িয়া গেল, তখন বর্ষার হিন্দো-
বটী প্রকৃতই মুচ্ছাহত হইল। তাহার আর রসে উঠা
সম্ভবপর হইল না। কবিচিত্ত রসােত্তীর্ণ হইলে এক
হইতে পারিত না। কবিচিত্তকে এখানে উচ্চ স্তরের কল্পনা
সমুখ বলিলেও হয়ত আপত্তি না হইতে পাবে, কিন্তু তাহা
বসােত্তীর্ণ নহে। বিভাব-পরম্পরায় যে পরিবেষ্টনী টয়া
উঠিবে তাহা মূল রসের অনুগামী হওয়া প্রয়ােজন ; আর
অনুভাবও রসানুগ হওয়া চাই। অনুভা এবং বিভাব
কার্যকারণ সম্বন্ধযুক্ত। সান্দ্রবর্ষণ, হর্ষ কল্লোল, ঝিল্লী গুঞ্জন,

৭৮ কাব্য-পরিমিতি মঞ্জু হিল্লোল, এই বিভাব হইতে ‘বীণ, বীণকার ও বর্ষার ছহিন্দোল’এর এক সঙ্গে মুচ্ছারূপ অনুভাব অস্বাভাবিক, অপ্রাসঙ্গিক। যদি একাব্যে কবিচিত্ত বর্ষার সাধারণ ভাবটীকে রসে পরিণত করিতে চাহিতেছে এমন হইত, তাহা হইলে শেষের কয়েকটী ছত্র আসিত না এবং কবিতাটী হয়ত রসােত্তীর্ণ কাব্যত্বের দাবী করিতে পারিত। কিন্তু কবিচিত্ত বর্ষার হিন্দোল ভাবকেই রসমূর্তি দিতে চাহিয়াছিল, তাহার সাধারণ ভাবকে নহে। উদ্দিষ্ট ভাবের বাসনা কবিচিত্তে দৃঢ় ও সুস্পষ্ট না থাকায় ভাব রসের স্তরে উঠিল না। কিন্তু তৎসত্ত্বেও ইহার মধ্যে বর্ষার সাধারণ ভাব- যাহা একাব্যের পক্ষে সঞ্চারী ভাব—অনেক স্থলে রসলােক স্পর্শ করিয়া আসিয়াছে ; বৃন্তে থম্ থম্ গুব্ধ জঘীর ! র্ষায় মানব-মনের বিস্ময়-জড়তার ভাবটি এই বিভব দ্বারা চমৎকার বসায়িত হইয়াছে। এখানে কাব্যাংশ আপনার উজ্জ্বলতায় আপনি ঝিমি করিতেছে। একাব্যে বসােনূখী পাঠকচিত্ত চমৎকার ছন্দের মধ্য হইতে বসেব গন্ধ পাইয়া রসলােকে উঠিতে চাহে, আর পথের অভাবে কল্পনালােকে ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হয় বলিয়া ক্ষুন্ন হয়, আনন্দ লাভ করিতে পারে না। কিন্তু কল্পনামুখী পাঠকচিত্তের সন্তুষ্ট হইবার পক্ষে বাধা হয় না।

কাব্যপরিমিতি ৭৯ এ কবিতায় প্রকৃত রসেদ্বোধ যে হইল না তাহার কারণ আমার মনে হয়-যে কবিচিত্তে এ ভাববিশেষের বাসনা ছিলই না বা একান্ত অস্পষ্ট ছিল। সাধারণ ভাষায় বলিতে গেলে বলতে হয় ইহার মূলেই কৃত্রিমতা ছিল। এ কাব্যসম্পর্কে যদি বলা হয় যে ইহা ছন্দহিন্দোল’ মাত্র, বর্ষার হিন্দোল ভাবকে রসমূর্তি দিবার চেষ্টা বা অনুরূপ কোন প্রয়াস কবিচিত্তে ছিল না, তবে কবি ও কাব্যের মৰ্যাদা হানি করা হয় বলিয়াই মনে হয়। কিন্তু কাব্যের শেষে স্পষ্টই বলা হইয়াছে ইহা বর্ষাব ছহিন্দোল। কল্পনাসমুখ কাব্যের আর একটী প্রধান লক্ষণ এই দেখা যায় যে উদ্দিষ্ট ভাবটীর বাসনা কবিচিত্তে দৃঢ় প্রতীত না থাকায় নানা অবান্তর ভাব- যাহাদের বাসনা কবিচিত্তে অপেক্ষাকৃত দৃঢ়—তাহাই আসিয়া জুটে। কাব্যরসিকেরা সুন্দরী রাণীর অঙ্গশােভাব উপমা মাতঙ্গে ও গৃধিণীতেও পাইয়া থাকেন। সুতরাং তাহারা পবন- নন্দনের পার্থিবরূপ ভুলিয়া যদি তাহার রসরূপ গ্রহণ কবিতে স্বীকৃত হন, তবে আমি উক্তবিধ কল্পনাসমুখ কাব্যের সহিত বিশল্যকরণী আনিতে গন্ধমাদন আনার উপমাটী প্রয়ােগ করিতে পারি। এ সব কাব্যগন্ধমাদনে ক্ষ ওষধির গন্ধে চিত্ত বিভ্রান্ত হওয়ায় বিশল্যকরণীব সন্ধান মিলিতে রাত্রি শেষ হইয়া যায় এবং সেই বিশল্যকরণীর রস

কাব্য-পরিমিতি
যখন মিলে তখন সংসার-বিষবৃক্ষের বিষশল্যাহত রসােম্মুখী
পাঠকচিত্ত হইতে আগ্রহের শেষ রক্তবিন্দু নিঃসরিত হইয়া
গিয়াছে, ওষধির রস তখন বিফল। কবিচিত্ত শক্তিশালী
হইলেও, তাহাতে বিশল্যকরণী সম্পর্কে বাসনার অভাব
ও অস্পষ্টতাই এ বিপত্তি ঘটায়। এরূপ কাব্যের দৃষ্টান্তের
অভাব নাই এবং দিবার প্রয়ােজন বােধ করি না।
রসােত্তীর্ণ কবিচিত্তের বসলােক হইতে কাব্যক্ষেত্রে
সানন্দ যাতায়াতের ফলে রসােত্তীর্ণ কাব্যের উৎপত্তি হয়।
সুতরাং এ কাব্যের প্রধান লক্ষণ এই যে কবিচিত্তের কোন
আয়াস বা শান্তির পবিচয় ইহাতে থাকে না। ছন্দ, অলঙ্কার,
ব্যঞ্জনা সমস্তই রসানুগ হয়, কারণ রসসিক্ত কবিচিত্তেব
রসােত্তীর্ণ সংস্পর্শে তাহারা জন্মলাভ করিয়াছে।
কাব্য কবিচিত্ত এখানে রসসিক্ত হয় বলিয়া নিজেকে
হারাইয়া ফেলে তাহা নহে, বরঞ্চ উত্তম প্রতিভাব লক্ষণই
এই যে অন্তর হইতে বনামৃত আহরণ করিয়া আনন্দকে
বিরচন করিবার সময় সে আত্মসম্বন্ধে বেশ সচেতন থাকে।
কবিচিত্ত যদি আপনার সৃজনক্ষেত্রে আপনি ডুবিয়া যায় তবে
তাহার সৃষ্টিশক্তি বা প্রতিভার দুর্বলতাই সূচিত হয়।
এমন কবিচিত্তের পরিচয় আমরা মাঝে মাঝে পাই যাহা
শক্তিশালী হইলেও আত্মসচেতনতার অভাবে সামর্থোচিত
কাব্যসৃষ্টি করিতে পারে নাই। আত্মসচেতন বলিতে ইহা

কাব্য-পরিমিতি
বুঝিব না যে আমরা যেমন কাব্যের বিভাব, অনুভাব,
উপভাব বিশ্লেষণ করিয়া কাব্য বুঝিবার চেষ্টা করিতেছি,
কবিচিত্ত সেই সমস্ত বিষয়ে পূর্ণ চেতনা রাখিয়া কাব্য সৃষ্টি
করে। রসােত্তীর্ণ কাব্যে এ সমস্ত ব্যাপার স্বতঃই রসানুগ
হয়। আত্মসচেতন বলিতে ইহাই বুঝিব-রসলােক ও
কাব্যক্ষেত্রে আনন্দময় যাতায়াতের সময় রসােত্তীর্ণ
কবিচিত্ত কখনও ভুলিয়া যায় না যে তাহার উদ্দেশ্য রসকে
ভােগ করা নহে, রসকে অপরের ভােগ্য করা; সে ভােক্তা
নয়, সে স্রষ্টা; সে প্রজাপতি নহে, সে মধুমক্ষিকা; রসের
মধ্যে ডুবিয়া থাকিবার আনন্দ তাহার নহে, রসসমুদ্র সন্তরণ
করিয়া তাহাকে তীরে উঠিতে হইবে। মহাপ্রভুর চিত্ত
রসসাগরে ডুবিয়া গিয়াছিল কাবণ সে চিত্ত কবিচিত্ত ছিল না,
প্রমিকচিত্ত ছিল।
বষােত্তীর্ণ কাব্যে কবিচিত্তের আয়াসের কোন লক্ষণ
থাকে না বলিয়াছি। তাই বলিয়া একথা সত্য নহে যে
উৎকৃষ্ট কাব্যরচনায় কবিচিত্তের কোন
প্রযত্ন থাকি বার
প্রয়ােজন হয় না, একবার বসলােক ঘুরিয়া আসিলেই তাহা
নিঝ’রের মত স্বতঃ নিঃসারিত ইয়া চলে। রসকে
হইতে কাব্যক্ষেত্রে পুনঃপুনঃ যাতায়াত করিতে তাহার
আয়াস অবশ্যম্ভাবী। কবিচিত্তধার বস্তু হইতে বহুদুবে
বহিয়া আসিয়াছে, আসিবার পথে বাসনা-বােঝাই কল্পনার

৮ কাব্য-পরিমিতি তরী টানিয়া আনিয়াছে, তাহাব উপর অনিবার ওঠা-নামা, জোয়ারভাটায় যাওয়া আসা ;-শ্রম হইবার কথা বটে। কিন্তু সেই যাতায়াত যদি অনিন্দমূলক ও আনন্দের কারণ- স্বরূপ হয়, তবে কবিচিত্তে আয়াস আব আয়াস থাকে না এবং কাব্যেও তাহা আনন্দরূপ গ্রহণ করে। অল্পায়াসে অন্তর হইতে বচন আহরণ,-কখন ও হয়, কখনও হয় না। অন্তরের গহন রসকাননে কোথায় কোন ফুল ফুটিয়াছে, গন্ধ ধরিয়া তাহার সন্ধান করিতে হইবে ; বিবিধ কুসুমের বিচিত্র মধু আনিয়া কাব্যচক্রকে সমৃদ্ধ করিতে হইবে; ইহা ত অনায়াসসাধ্য হইবার কথা নহে। এ কাজ যাহারা কবে তাহারা মধুপ্রিয় প্রজাপতি নহে, মধুচক্রের নির্মাতা মধু মক্ষিকা। মধুমক্ষিকা কোনদিন অলস বা আয়াসবিমুখ নহে। মধুমক্ষিকার পাখা যে ক্লান্ত হয় না, তার কারণ সে জানে, মধু বহন করিতেছে ; তাহার রচিত মধুচক্র যে সৃষ্টিকৌশলে অদ্বিতীয় হইয়াও সহজ-সুন্দর, তাহার কারণ মধুমক্ষিকা নিতান্ত নিপুণ, একান্ত নিরলস । প্রশ্ন উঠতে পাবে,—রসলােক হইতে কাব্যক্ষেত্রে অনিবার যাতায়াতের ফলে যখন রসােত্তীর্ণ কাব্যের সৃজন হইতে থাকে, তখন কি কবিচিত্তকে কল্পনালোক, বাসনা- লোক বা ভাবলােকে আর উঠা-নামা করিতে হয় না? যে লােকে বাসনায়িত ভাব কল্পনার সাহায্যে রসরূপ গ্রহণ করে

কাব্য-পরিমিতি
তাহারই নাম রসলােক। কবিচিত্ত কোন ভাবসম্বন্ধে
রসােত্তীর্ণ হইয়াছে একথা বলিবার তাৎপর্য এই যে উক্ত
ভাবের বাসনা, কল্পনা ও রস তখন অভিন্নরূপ গ্রহণ
করিয়াছে অর্থাৎ বসলােকে বসিয়াই কবিচিত্ত ঐ ভাবসম্বন্ধে
প্রয়ােজনীয় বাসনা ও তদুপযোগী কল্পনাব যােগান
পাইতেছে। নিপুণ। গৃহিণী পাকশালে বসিয়াই যেমন
রন্ধনােপকরণ প্রাপ্ত হন, হাঁড়ি চড়াইয়া হাটে বা শস্যক্ষেত্রে
ছুটাছুটি যেমন হাস্যকর অব্যবস্থা মাত্র, তেমনি রসােত্তীর্ণ
কবিচিত্তের পক্ষে বসলােকেই কাব্যের সমস্ত উপকরণ মজুত
থাকে, তাহাকে আর পুনঃপুনঃ বাসনা বা কল্পনালোকে
ছুটাছুটি করতে হয় না। কাব্যবিশেষেব উদ্দিষ্ট ভাবসম্বন্ধে
বদলােক কল্পনাকে বাসনালােক ও ভাবলােক তখন
অভিন্ন ও একত্রোভূত হইয়া থাকে ।
এইবার রসােত্তীর্ণ কাব্যের দুই একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া
যাইতে পারে।
সত্যেন্দ্রনাথের ‘চম্পা' কবিতাটিতে দেখা যায় কবিচিত্ত
রস ঘুরিয়া কাব্যে পৌছিয়াছে।
আমাবে ফুটিতে হ’ল বসন্তের অন্তিম নিঃশ্বাসে
বিষন্ন যখন বিশ্ব নিন্মম গ্রীষ্মের পদানত,
রুদ্র তপস্যার বলে আধ-ত্রাসে অধেক উল্লাসে,
একাকী আসিতে হ’ল-সাহসিক অপরার মত।

৫৪
কাব্য-পরিমিতি
বনানী শোষণ-ক্লিষ্ট মর্মরি উঠিল একবার,
বারেক বিমর্ষ কুঞ্জে শােনা গেল ক্লান্ত কুহুর ;
তন্ম-যবনিকা-প্রান্তে মেসি’ নব নেত্র সুকুমার
দেখিলাম জল স্থল--শূন্য, স্তব্ধ, বিহ্বল জর্জব।
তবু এ বাহিবিয়া-শ্বাসেব বৃন্তে বেপমান,
চম্পা আমি,—খব তাপে আমি কভু ঝরিযা না মবি,
উগ্র মদ্যসম বৌদ্র,—যার তেজে বিশ্ব মুহমান,
বিধার আশীর্বাদে আমি তা সহজে পান করি।
ধীরে এনু বাহিরিয়া, উষার আতপ্ত কর ধরি,
মূচ্ছে দেহ, মোহ মন, মুহুর্মুহু করি অনুভব।
সূৰ্য্যেব বিভূতি তবু লাবণ্যে দিতেছে তনু ভরি,
দিনদেবে নমস্কার—আমি চম্পা সূর্যের সৌরভ।
যে কবিতা রসােত্তীর্ণ বলিয়া অনুভূত হয় তাহা কেন
রসােত্তীর্ণ এ বিচার করা ঠিক সম্ভবপর নহে, সে চেষ্টা করিব
না।
সে কাব্য কেন ভাবসমুথ নহে, বাসনাসমুখ নহে,
কল্পনাসমুখ ও নহে, তাহার বিচার হয়ত চলিতে পাবে; কিন্তু
এ কবিতাটা লইয়া সেই দীর্ঘ আলােচনার প্রয়ােজন দেখি
না। নব-নিদাঘের খর সূর্যতাপে শূন্য শুষ্ক বিহ্বল জর্জর
অবণ্যানীর মধ্যে বসন্ত যখন মুমু, তখন যে কুসুমবাল
সাহসিক অগ্রার ন্যায় বিশ্বাসের বৃন্তে আধ-ত্রাসে আধেক
উল্লাসে ফুটিয়া উঠিল, সাধারণ কুসুমের মত রৌদ্রের মদ্যপানে

কাব্য-পরিমিতি
৮৫
বিহ্বল না হইয়া যে অনুভব করিল স্বর্গের অপরার ন্যায়ই
তাহার অঙ্গের লাবণ্য ফুটিয়া উঠিতেছে, সেই কুসুম উষার
কর ধরিয়া সুৰ্য্যেব পানে মুখ তুলিয়া যখন বলিয়া উঠে,
“আমি চম্পা সূর্যের সৌরভ-তখন বিশ্লেষণ-বুদ্ধি তাহার
সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র ফেলিয়া নতজানু হইয়া সেই বিজয়িনীকে
প্রণাম করে।
“আমার ভালবাসা” শীর্ষক কবিতায় যে-কবির চিত্ত
কল্পনালােকে আপনার খেলায় আপনার খেই হারাইয়া
ফেলিল, সেই কবির চিত্ত অপর এক টী কাব্যে রসােত্তীর্ণ
হওয়ায় কি অপরূপ রসসৃষ্টি কৰিতে সক্ষম হইয়াছে তাহা
দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়। গােবিন্দ দাসের “কস্তুবী”-
কাব্যে “অতুল” শীর্ষক কবিতাটীব কথা বলিতেছি। বিধবা
মায়ের একমাত্র শিশুপুত্র অতুল ছুটি-অন্তে মাকে ছাড়িয়া
বিদেশে যাইতে চাহে নাই, তথাপি তাহাকে পাঠাইতে
হইল। অতুল অব মায়ের কোলে ফিরিয়া আসে নাই।
এই অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ কবিতার প্রতি পংক্তির বিভাব,
অনুভাব যে কত দূর মূল রসের অনুগামী হইয়া চলিয়াছে
তাহা সমগ্র কবিতাটী পাঠ না করিলে বুঝা যাইবে না।
মাতৃহৃদয়ের যে অপরূপ বিয়ােগব্যথা এই কবিতায় রসমূর্তি
পাইয়াছে তাহার তুলনা পাওয়া কঠিন। অতুল বিদেশে
যাইতেছে ;

৮৬
কাব্য-পরিমিতি
একখানি ছােট নাও বেয়ে যায় ধীরে,
আকুলা জননী দেখে দাড়াইয়া তীরে।
মেহময় সে চাহনি—সে বন্ধন হায়,
পড়ের ব্যাঘাতে যেন ছিড়ে ছিড়ে যায়।
মায়ে পােয়ে হায় সেই শেষের বিদায়
গােধুলির কোল হ'তে রবি অস্ত যায় !
;
তাহার পর বাঙ্গালীর ঘরে আশ্বিন মাস আসিয়াছে ;-
অতুল বাড়ী আসে নাই।
শরতের শুক্লা ষষ্ঠী—যামিনী সুন্দর
লইয়া পাথালিকোলে শিশু শশধব,
ছাড়িয়া সূতিকাগার-তমে। সুগভীর,
গগন-অঙ্গনে যেন হয়েছে বাহির।
কবিচিত্ত রসােত্তীর্ণ হওয়ায় মাতৃস্নেহ যেন তাহাকে
পাইয়া বসিয়াছে। করুণরসােপেত কৰিচিত্তধারা জাৰী
ধারার ন্যায় সুদীর্ঘ বিচিত্র পথে প্রবাহিত হইয়া চলিয়াছে,
আর অগ্রগামী মাতৃস্নেহেব শঙ্খনিনাদ তাহাকে মুহূর্তের জন্য
বিপথগামী হইতে দিতেছে না। সমগ্র কবিতাটী উদ্ধও
করা সম্ভব নয়। রসােত্তীর্ণ হইলে পরিচিত সাধারণ ভাব
সাধারণ ছন্দেই কেমন অপরূপ কাব্যমণ্ডিত হইতে পারে
-এ কবিতা পাঠ করিলে তাহা বুঝা যাইবে। কবিচিত্ত
দশমী রাতের বর্ণনা করিতেছে-

কাব্য-পরিমিতি ৮৭ অন্ত গেছে দশমীর দীপ্ত শশধর ; আচ্ছাদিয়া অন্ধকারে আকাশ-গর ; যেন কার ভবিষ্যের ভীষণ উদরে, তারকার স্বপ্নগুলি হাবুডুবু করে। এ বর্ণনা চন্দ্রহীন আকাশের বর্ণনা, না পুত্রহারা জননী- হৃদয়ের বর্ণনা—কে বলিবে? ভাবের বিশেষত্ব বা নূতনত্ব না থাকিলে কাব্য রত্তেীর্ণ হইতে পারে না, এমন সন্দেহ করিবার কারণ নাই। হেম- চন্দ্রের দশমহাবিদ্যা কাব্যের প্রথম কবিতাটীতে দেখিতে *ই-কবিচিত্ত রসােক ঘুরিয়া আসিলে সুপরিচিত ভাব ইহই কেমন রসসৃষ্টি করিতে সক্ষম হয় । দশমহাবিদ্যা কাব্যের প্রথমেই কবি সতীশূন্য কৈলাসে শবেব শােক বর্ণনা করিতেছেন- সতী দক্ষারে দেহত্যাগ করিবার পর শিব সতীদেহ কন্ধে করিয়া উন্মাদেব ন্যায় ত্রিজগৎ পরিভ্রমণ করিতে হলেন। বিষ্ণু সুদর্শনে সতীদেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া পৃথিবী, ময় ছড়াইয়া দিলেন। ছিন্ন হইল সতীদহ শূন্য হইল শিবগেই বামদেব বিরসবদন। চাহেন কৈলাসময়, দেখেন কৈলাস নয়, অন্ধকার বিমোর ভুবন।

কাব্য-পরিমিতি সতীমুখ-বিভাসিত, যে আলোক শােভা দিত, পুলকিত কুসুম-কানন, পেযে যে কিরণমালা সুবৰ্ণ মণি উজলা, সে আলোক নহে দরশন। শুষ্ক কল্পতরুসারি, শুষ্ক মন্দাকিনী-বারি, শূন্যকোল সতীসিংহাসন। নিস্তব্ধ জগৎ-প্রাণ নিক সৌৰভ ঘ্রাণ, কণ্ঠে বদ্ধ বিহা কুন। নন্দী শুয়ে রেণুপর, কান্দিছে বৃষভব, প্রাণশূন্য মৃগলবাহন। হেরি। ত্রিপুরহব দূরে রাখি বাসার বসিলেন মুদি ত্রিনয়ন। ses দিগম্বব বাহ্যজ্ঞানহীন, কবে জপমালা চলে মুখে বব বম্ বলে অন্য শব্দ সকলি মলিন। লম ফণিমালা মিলাইয়ে ডিবিল। লুকাইল ভ টার ভিতর, নিস্পন্দ পবনস্বন নিরানন্দ পুষ্পণ অপ্রস্ফুট ঝবে রেণুপর। থামিল গঙ্গার রব নির্বাক প্রমথ সব কৈলাস জগৎ অচেতন, কদাচিং মা মা নদে অসম্বিৎ নন্দী কাঁদে, ব শব্দ সহ সন্মিলন।

কাব্য-পরিমিতি
কৈলাস রময়
তারা সূৰ্য অনুদয়
ক্ষণকালে নিবিল সকল,
মঃচ্ছন্ন দিগাকাশ কেবলি করে উল্লাস
নীলকণ্ঠ-কণ্ঠেব গরল।
ধ্যানমগ্ন ভোলানাথ স্কন্ধে কভু তুলি' হাত
সতীরে করেন অম্বেষণ,
বশিতে পুনৰ্ব্বাব
সুকুমার তনু তার,
মমতার অভ্যাস যেমন।
এখন নয়ন ঝবে
পূৰ্ব্বক মনে সবে
ঝরে যথা নদী প্রবণ।
বিশ্বনাথ শোকম
নিমীলিত নেয
প্রস্ফুটিয়া করেন ক্রন্দন ।
হ য অর্ধাঙ্গ সতী
দেন কৈলাসপতি
কেবল সতীর কথা মনে,
: ৰ "
ডুব বদিছেন হেলি' শিব
কদি: লাগিল তাৰ সনে।
হেমচন্দ্রের অন্যান্য গীতিকবিতার আড়ষ্ট ভাব ও ভাষার
গতি তুলনা করিলে দেখিতে পাই কবিচিত্ত রস ঘুরিয়া
সিলে শব্দ, ছন্দ, অলঙ্কার সমস্তই সহজ অনাড়ম্বব
ইয়া ও কেমন রসানুগ হয় এবং পূর্বপরিচিত বিভাব
অনুভাবই কেমন রসােদ্রেকে সমর্থ হয়।

অনুশীলনী
রসােত্তীর্ণ কাব্যের আর একটি লক্ষণ এই যে কবিচিত্তে
ভাবের বাসনা দৃঢ় ও স্পষ্ট হওয়ায় কাব্যে সত্যকার
অস্পষ্টতাদোষ আসে না। অনেক সময় বাসনা গভীর
বলিয়া প্রথম দৃষ্টিতে কাব্য অস্বচ্ছ দেখাইতে পারে, কিন্তু
পৰ্যবেক্ষণ করিলেই বুঝিতে পারা যায় যে এ কাব্য
কোনদিন পল-সলিলের ন্যায় মলিন নহে।
রসচক্রের অধিকারী কবিচিত্তও অনেক সময় রসে
উঠিতে সক্ষম না হইয়া আনন্দচক্রে ভ্রমণ করে। তাহার
কারণ একাধিক :-
১। প্রতিভার জোয়ার ভাটা আছে। ভাটার সময়
তাহা কৰিচিত্তকে ভাসাইয়া রসলোক পর্যন্ত তুলিতে সক্ষম
হয় না।
২। প্রতিভা হয়ত স্থায়ীরূপে হ্রাস প্রাপ্ত হইয়াছে এবং
কবিচিত্ত তাহাব পূর্ব পরিচিত রসলােকের স্মৃতিমাত্র সম্বল
করিয়া নকল রসচক্রের সৃষ্টি করিতেছে, যাহা আসলে
আনন্দচক্ৰমাত্র।
৩। প্রতিভা সবল হইলেও হয়ত অলস অর্থাৎ
অনেকাংশে নিষ্ক্রিয়। আলস্যবশতঃ কিম্বা পারিপার্শ্বিক
অবস্থার প্রতিকূলতায় সে তাহার সমগ্র শক্তিকে সক্রিয়
করিতে পারিতেছে না। ফলে আনন্দচক্রের বেশী কিছুই
সৃষ্ট হইতেছে না।

কাব্য-পরিমিতি
৯১
৪। দুর্ভাগ্য বা দুৰ্বদ্ধিবশতঃ কবিচিত্ত এমন ভাবকে
রসে তুলিতে চাহিতেছে যাহা তাহার প্রতিভার শক্তিতে
কুলায় না। হরিদ্বারের গঙ্গাস্রোত শিলাখণ্ড ভাসাইয়া
লইতে সক্ষম, কিন্তু সুন্দরবনের ভাগীরথী বালুকণাটীকেও
চড়ায় ফেলিয়া যায়। প্রতিভা ও শক্তিমাত্র ; ভাববিশেষের
'আর যদি তাহার পক্ষে বেশী ভারী হয়, তবে তাহাকে
বসলােক পর্যন্ত ভাসাইয়া লইতে সে সমর্থ হয় না এবং
অল্পবীৰ্য্য উৎসের মত কল্পনালােকে উঠিয়াই কাব্যে
ঝরিয়া পড়ে।
ভাববিশেষের গুরুত্ব-সম্পর্কে আর একটা কথা এখানে
প্রাসঙ্গিক হইবে। রতিভাব, শােকভাব বা শমভাবকে
সে পৰিণত করিতে হইলে প্রতিভার প্রকৃতি ও শক্তি যে
যে পৰ্য্যায়ের হওয়া প্রয়ােজন, হাস্যভাব, ক্রোধভাব, বিস্ময়
ভাব প্রভৃতিকে রসায়িত করিতে হইলে প্রতিভার প্রকৃতি ও
শক্তি ঠিক সেই সেই পর্যায়ের হওয়ার প্রয়ােজন নাই। ভিন্ন
ভিন্ন ভাবের আপেক্ষিক গুরুত্ব ( specific gravity)
ভিন্ন, সুতরাং তাহাদের রসে ভাসাইয়া লইতে ভিন্ন ভিন্ন
প্রকৃতি ও শক্তি-বিশিষ্ট প্রতিভার প্রয়ােজন হয় এবং তৎপন্ন
রস আস্বাদে ও গাঢ়ত্বে সকলে সমান নহে। স্ব প্রতিভার
প্রকৃতি ও শক্তির সহিত ভাবের আপেক্ষিক গুরুত্বের
হিসাব না করিয়া যদি কবিচিত্ত বিষয় নির্বাচন করে, তবে

কাব্য-পরিমিতি সে উদ্দিষ্ট রসে উঠিতে পারে না, অথবা পুনঃ পুনঃ রসাভাস ঘটায়। পূৰ্বে বলিয়াছি কবিচিত্ত তাহার কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করে-বাসনালোক হইতে। উৎকৃষ্ট কবিচিত্তেব বাসনা বিচিত্র ও গভীব। এরূপ কবিচিত্তেব আশৈশব 'ভাবস্মৃতি বাসনালোকে ব গভীর স্তরে অতি দৃঢ় ভাবে মুদ্রিত হইয়া থাকে। এই বিচিত্র গভীর বাসনা-সাগর হইতে প্রতিভা স্বীয় শক্তি অনুসারে যেরূপ উপাদান সংগ্রহ করিয়া অনে, কাব্যের উৎকৰ্ষাপকর্ষের সাস'-লে কি সম্ভাব্য প্রধানতঃ তাহার উপর নির্ভর করে। যে বিশ্ব প্রতি কাব্যের প্রধান ভাণ্ডার বলিয়া কথিত হয়, তাহা উপলক্ষ্য মাত্র ; বাসনালােকই কাব্যের ভাণ্ডার। প্রাকৃতিক ব্যাপারে সংঘাতে কবিচিত্তে যে ভাব উৎপন্ন হয়, তাহা কবি প্রতিভাকে বাসনা-সাগরে ডুব দিবার প্রেরণা যোগায় মাত্র। তৎকালিক ভাবের প্রেরণায় প্রতিভা বাসন- সাগরের তলদেশ হইতে কি রত্ন উদ্ধার করিবে করিবে তাহা অপর মানবচিত্তের অগোচর। সাধারণ দৃষ্টি হইতে কবির দৃষ্টি পৃথক। কিন্তু এই কবিদৃষ্টি আর কিছুই নহে,—বিশেষ কবিপ্রতিভাব বাসন-সাগরে ডুব দিবার বিশেষ শক্তি। ১৩০৫ সালে ৩০শে চৈত্র ঝড় হইল। ঝড়ের আঘাত কবি- চিত্তে ভয়বিমিশ্র বিস্ময়ভাবের উৎপাদন করিল, সকলের কাব্য-পরিমিতি মনেই তাহা অল্প-বিস্তর করে। কবিচিত্ত সাধারণ ঝড়ের বর্ণনা করিয়া ভাবসমুখ কাব্য রচনা করিতে পারিত, অথবা পূৰ্বদৃষ্ট ঝড়ের বাসনার সহিত মিলাইয়া বাসনা- সমুখ কাব্য রচনা করিতে পারিত। বাসনা-সাগরে ডুব দিয়া কল্পনা-সাহায্যে সাধারণ কল্পনাসমুখ কাব্যরচনা করিতেও কোন বাধা ছিল না। রবিচিত্তের প্রতিভা তাহাতেও ক্ষান্ত হইতে পারে নাই; সেই ঝড়ের দিনে সে <সিনাসমুদ্রের গভীর দেশে ডুব দিয়া নিশ্চিত, নিষ্ঠুর, সহজ- কদ্দম নূতনের যে মূর্তি উদ্ধার করিয়া আনিল, ঝড়ের সহিত তার কোন একান্ত-নিকট সম্বন্ধই ছিল না। ইহাকেই আমরা সচবাচর কবিদৃষ্টি বলিয়া থাকি ; কিন্তু ইহা দৃষ্টির কাজ নহে, বিশেষ কবি প্রতিভার বিশেষ বাসনাসাগরে ডুব দিবার বিশেষ ক্ষমতার ব্যাপার ; প্রাকৃতিক ঝড় নিমিত্ত ইয়া প্রতিভাকে বাসনা-সাগরে ডুব দিবার প্রেরণা দিয়া- ছিল। বাসনার ভারত ও ব্যাপকতা এবং প্রতিভার বৈশিষ্ট্যের উপর কাব্যের স্তরভেদ নির্ভর করে। বিশ্ব- প্রকৃতির সহিত কবিচিত্তবিশেষের সম্বন্ধ যতই ঘনিষ্ঠ ও জীবন্ত বলিয়াই অনুভূত হউক, কাব্যের, বিশেষতঃ উচ্চ কাব্যের, ভাণ্ডার বাসনার মধ্যেই সঞ্চিত থাকে ; প্রকৃতি চিরদিনই উপলক্ষ্য। উৎকৃষ্ট কবিচিত্ত কখনও কখনও বাসনার এমন গভীর ৯৪ কাব্য-পরিমিতি স্তর হইতে উপাদান সংগ্রহ করে যাহার ভাব এ জীবনের অর্জিত বলিয়াই মনে হয় না। তাহা যেন পূর্বজন্মেব, জন্ম-জন্মান্তরের আস্বাদিত ভাবের বাসনা। কবি তাহার অত্যুৎকৃষ্ট প্রতিভার প্রেরণায় এইরূপ জীবনান্তবে আস্বাদিত ভাবের বাসনাকে কল্পনা-সাহায্যে অপরূপ রসমূর্তি দিতে সক্ষম হন। কালিদাস বলিয়াছেন, ‘মেঘ দেখিলে সুখী ব্যক্তিদের চিত্ত ও এক প্রকার ব্যথায় ভরিয়া উঠে, তাহার কারণ জন্মান্তরের স্মৃতি। আর এক কবিচিত্ত যেখানে বলিতেছে গভীর চিত্তে গোপনশাল, সেগা ঘুমায ষে বাজ বালা তানিনে সে কোন্ জনমের ওয়া। অথবা আজ জেগেছে যে সব ব্যথা, এই জীবনে নেইকো তাহার হেতু। সেখানেও সেই গভীব বাসনা-স্তরের কথাই স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করিতেছে। জন্মান্তর যাহার না মানেন, তাহাদেরও herodity, উত্তরাধিকার, মানিতে হয়। মানব-মনের সমস্ত বাসনা একটী খণ্ডিত জীবনে অর্জিত ভাবস্মৃতি মাত্র হইতে পারে। জন্মান্তরে বা যুগযুগান্ত-প্ৰবাহী মানব- বংশের অতীত ধারায় যে যে ভাবের উদ্ভব হইয়াছে, তাহা উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের অজ্ঞাতসারে বাসনায় পরিণত কাব্য-পরিমিতি হইয়া আছে। সাধারণতঃ তাহারা নিষ্ক্রিয় বা তন্দ্রাচ্ছন্ন, কিন্তু তাহাদের অস্তিত্বের সম্বন্ধে সন্দেহ করা যায় না। তব সঞ্চার শুনেছি আমার মৰ্ম্মের মাঝখানে। কত দিবসের কত সঞ্চয় রেখে যাও মােব প্রাণে। তুমি জীবনের পাতায় পাতায় অদৃশ্য লিপি দিয়া পিতামহদেব কাহিনী লিখিছ মজ্জায মিশাইয়া। ইহা বাসনাললাকের সেই স্তরের কথা যেখানে ‘বিস্মৃত যত নীরব কাহিনী স্তম্ভিত হইয়া আছে। সুতরাং বাসনকে দুইভাগে ভাগ করা যাইতে পারে- অর্জিত ও লব্ধ। কবিচিত্ত বিশিষ্ট প্রতিভার বলে এই গভীব লব্ধবাসনার স্তর হইতেও কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করিয়া কল্পনালােকে রসের পাক চড়ায়। যে-সব ভাবেব সহিত পরিচয় জীবনে হইয়াছে, যে-সব বাসনা অর্জিত, তাহাদের রসে উঠানই কঠিন ; আবার যাহাদের সহিত এ জীবনে সাক্ষাৎ পরিচয় হয় নাই, সেই সব লব্ধবাসনাকে রসমূর্তি দেওয়া নিশ্চয়ই কঠিনতর। কিন্তু কবিচিত্তে এই লব্ধ- বাসনা সম্বন্ধে দৃঢ় প্রতীতি থাকে বলিয়াই তাহাকে রসারিত ৯৬ কাব্য-পরিমিতি করা সম্ভব হয়। উত্তঙ্গপ্রতিভা-মন্থিত কবিচিত্তের অতল স্পর্শ বাসনা-সাগর হইতে যে রসমূর্তি উঠিয়া আসে, তাহ। রসিক চিত্তেরও বিস্ময়ের কারণ রবীন্দ্র-প্রতিভা এমনি একটি রসমূর্তির সৃষ্টি করিতে সক্ষম হইয়াছে - তাহার নাম জীবনদেবতা। কবি প্রতিভা তাহার গণীর লব্ধ- বাসনার স্তব হইতে শুক্তি তুলিয়া সেই জীবন-দেবতাকে মুক্তামালায় সাজাইতে আজিও একে বারে ক্ষান্ত হইতে পারে নাই। বলা বাহুল্য এই কবিচিত্তের পূর্ণ পরিচয় সেই পাঠক, চিত্তেই সম্ভব যাহা বাসনালােকের গভীর স্তরসম্বন্ধে সজাগ, এবং যেখানে অনুরূপ লব্ধবাসনা সঞ্চিত আছে। কিন্তু কবিচিত্ত কখনও কখনও লব্ধবাসনাব এমন স্তর হইতে কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করে যাহা কখনও ভাবরূপে বর্তমান ছিল বলিয়াই মনে হয় না, সুতরাং যাহার সম্বন্ধে কোন বাসনার অস্তিত্ত্বেই সন্দেহ করিবার কারণ উপস্থিত হয়। কবি যখন বলেন- আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী, দিন চলে যায়, আমি আনমনে তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে, ওগো প্রাণে মনে আমি যে তাহার

কাব্য-পরিমিতি
৯৭
পরশ পাবার প্রয়াসী,
আমি সুদূরের পিয়াসী।
তখন সীমাবদ্ধ মানব-মনের এই যে অসীমের জন্য
ব্যাকুল পিপাসা, ইহার বাসনা কোথায় ? ইহার ভাব এ
জীবনে অর্জিত হয় নাই নিশ্চয়। জন্মান্তরে বা মানবেতি-
হাসের অতীত ধারায় চিত্ত যে-যে ভাবের সহিত সম্ভবতঃ
পরিচয় স্থাপন করিয়া আসিয়াছে, এ তৃষ্ণার মূলে ত তাহাদের
কোনটীর বাসনা বর্তমান দেখা যায় না। ইহার মূলত
অতীতে যাহা পাইয়াছি তার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত মনে হয় না,
বর্তমানে যাহা পাই নাই, ভবিষ্যতে যাহা পাইতে চাই
তাহার সহিত ইহার সম্পর্ক। এই যে
অসীম চাহিছে সীমার নিবিড় সঙ্গ,
সীমা চায় হ'তে অসীমের মাঝে হাব।
ইহার ভাবস্মৃতি কোথায় ?
লবাসনার অতলস্পর্শতার মধ্যে ডুবিয়া চলিলে আমরা
অনুভব করিতে পারি যে এ আকাঙ্ক্ষা সাহাকে কখনো
পাই নাই ঠিক তাহার জন্য নহে; জীবচৈতন্যোদয়ের অতি-
প্রত্যুষে যে অসীম চৈতন্যসাগর হইতে আমরা বিচ্ছিন্ন হইয়া
পড়িলাম, তাহাকেই পুনরায় পাইবার জন্য এই আকাঙ্ক্ষা।
অসীমের সাগরে যেদিন প্রথম ঘট ভরা হইল, সেইদিন উভয়
জলে ঘটের যে আঘাত লাগিয়াছিল, তাহার ভাব বাসনা

৯৮ কাব্য-পরিমিতি আকারে ঘটের জলে সঞ্চিত আছে, হয়ত-বা সাগরের জলেও ঘুমাইয়া আছে। সে ঘটের জল যেখানে রাখ, যেখানে ফেল, যেখানে উঠাও, তাহা অনিবার নিম্নাভিমুখে সাগরেই মিশিতে চাহিতেছে। বাষ্প করিয়া আকাশে উড়াও--মে হইয়া নিম্নে বর্ষিত হইবে; তুষার করিয়া পৰ্ব্বতে উঠাও- নিঝর হইয়া নামিয়া আসিবে ; মাটী খুঁডিয়া পুকুরে ভর--- তলে তলে নদীর সন্ধান করিয়া সাগরের উদ্দেশে ছুটিবে। উত্তঙ্গ হিমাদ্রির চিরহিমরেখার উর্জে জমাইয়া রাখিলেও সে সাগরের ধ্যানে মগ্ন থাকিবে, যুগযুগান্তে সুযােগ পাইতেই তুষাবনদীরূপে সহস্র বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করিয়া সাগরে •ানে প্রবাহিত হইবে। অসীম সাগরকে পাইবার জন্য ঘটের জলের যে তৃষ্ণা, তাহা অপ্রাপ্তকে পাইবার তৃষ্ণা নহে, অতিদূর অতীতে যাহ হারাইয়াছি, ইহা তাহারই বেদনা। আমরা অসীমের কথা কহিতেছি, যেখানে অঙ্কশাস্ত্রে। নিয়মানুসারেই সমান্তরাল রেখাদ্বয়ের অন্তরাল লুপ্ত হয় ; সুতরাং হারানাের বেদনা ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখানে হয়ত একই →ি নিষের ভিন্ন প্রকাশ মাত্র, একই বৃত্তাভাসের দুই কেন্দ্র। তথাপি একথা অনুভব করা কঠিন নহে, যে সীমাবন্ধের চিত্তে অসীমের জন্য এই যে ব্যাকুলতা ইহা লৌকিক বিরহ না হইলেও অসীম অতীতের মধ্যে আদি- মিলনের ভাবশ্বতি হইতে উদ্ভূত বিরহ। বর্তমানে তাহ।

কাব্য-পরিমিতি ৯৯ "আমাদের অনধিগম্য হইলেও অতীতে তাহার সহিত পবি- চয়ের অভাব ছিল না। কোন পরিচয়ই যদি না থাকিবে তবে কবিচিত্ত কেন পরক্ষণেই বলে- আমি উৎসুক হে, হে সুদূব অামি প্রবাসী। তুমি দুন্নত দুরাশার মত কি কথা আমায শুনাও সতত ? তব ভাব। শুনে তোমার হৃদয ঙ্গে নেছে তাহাব সুভাশী, হে সুর আমি প্রবাসী : ঘটের জলকে ভাড়াব-ঘরের জলচৌকির প্রবাসে রাখা ইয়াছে, কল কলোখ স্বষা সে ভুলিয়াছে, কিন্তু এখনও একেবারে ভুলিতে পারে নাই—অতি প্রত্যুষে নদীজলধারায় সে বহিয়া চলিয়াছি, সহসা কে যেন ঘটের আঘাতে ঢেউ তুলিয়া তাকে সেই নদীধারা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া তুলিয়া অনিল। নির্জন পল্লীপথে গমনান্দোলিত সুন্দরীর কক্ষে ভুজতাবেষ্টনলব্ধ আনন্দে সে মুখরিত হইয়াছে ; গৃহস্থের গৃহে আসিয়া নিৰ্ম্মল-কপূর্ণ সহযােগে সে স্বাদগন্ধ অর্জন করিয়াছে ; কিন্তু ঘটের ঘায়ে যে ঢেউ উঠিয়াছিল সেই ঢেউ, এব কথা ত সে একেবারে বিস্মৃত হয় নাই। পল্লীর গৃহস্থ- বধুবা আজিও জানে-ঢেউ দিয়া জল ভরিলে মৃৎকলসেব

কাব্য-পরিমিতি
মিষ্টি ক
নিস্তরঙ্গ নিথর বদ্ধ জল ও ভাড়ার-ঘরে বসিয়াই হঠাৎ কখন
কলস ভাঙিয়া গড়াইয়া চলিবে। নদীতীরপল্লীর প্রতি
গৃহস্থ বধূ জল ভরিবার সময় বিশেষ সাবধান হয় যেন জলের
সহিত ঢেউ না আসে, কারণ সে মাঝে মাঝে প্রত্যক্ষ
করিয়াছে কুম্ভের জলে
ঢেউ-এর স্মৃতি
कपिटा
থাকিয়াই যায় ; বদ্ধ ঘরের নিস্তব্ধ সন্ধ্যার
অন্ধকাবে ঢেউ তুলিয়া ছুটিয়া চলিবার আকাঙ্ক্ষা যদি কুম্ভের
জলে জাগিয়া উঠে, বুঝিতে হইবে প্রত্যুষে ঢেউ দিয়া জল
ভরা হইয়াছিল। ঢেউ-এব মধ্য দিয়া নদীধারার সহিত যে
বিচ্ছেদ কুম্ভজলের ঘটিয়াছে, তাহারই ভাবস্মৃতি বা বাসনা
বাসনার যে অতি গভীর স্তরে ঘুমাইয়া থাকে তাহাকে
‘অতিবাসনা’ বলা যাইতে পারে। যে কবি প্রতিভা এই
অতিলব্ধ বাসনার অতলতা হইতে ঢেউ-এর গান তুলতে
সক্ষম হয় তাহাকে আমরা mystio কবিপ্রতিভা বলি
সে প্রতিভা ঘটের জলকে জানায়-
নাহি জানে কেউ
রক্তে তাের নাচে আজি
সমুদ্রের ঢেউ।
অপূর্ব অনুভূতি ও কল্পনার সাহায্যে সে ঘটের জলকে
লােভ দেখায়-

কাব্য-পরিমিতি
১১
ওরে দ্যাখ, সেই স্রোত হয়েছে মুখর,
তরণী কাপিছে থরথর।
তীরের সঞ্চয তোর পড়ে থাক্ তীবে,
তাকানে ফিরে ,
সমুখের বাণী
নি তোরে টানি
মহাশ্রোতে,
পশ্চাতব কোলাহল হতে
অতল আঁধাবে, অকূল আলোতে।
এই mysticism যদি ভাবমূলক না হইয়া নিরবচ্ছিন্ন
অভাবাত্মক হইত, অর্থাৎ যাহাকে কখনাে পাই নাই তাহাকে
পাইবার ব্যাকুলতাই যদি ইহার একমাত্র উত্তেজক কারণ
ইত, তবে mystic কাব্যে অসীমের সহিত লীলার প্রকাশ
দেখিতে পাইতাম না। এ লীলায় মিলনের বস্মৃতি আছে
লিখা বিবই গভীব ও মধুর হইয়াছে। বাসক শয়ন পবে’
সীমা যখন অসীমের বাহুতে বাধা ছিল তখন ঘুম-ঘাবে
অচেতন থাকিলেও তাহার বাসনা আজও একে বাবে লুপ্ত
হয় নাই। কারণ সে অন্য মুহূর্তে বলিতেছে,
তোমায় জানিনা চিনিনা একথা বলত
কেমনে বলি?
খনে খনে তুমি উকি মাৰি চাও,
খনে খনে যাও চলি।

কাব্য-পরিমিতি অসীম যখন সীমার দুয়ারে আসিয়া, শুধালো কাতরে সে কোথায় সে কোথায় ব্যগ্র চরণে আমারি দুয়ারে নামি’ সবমে মরিযা বলিতে নারিনু হায, নবীন পথিক সে যে আমি সেই আমি। এই সরমের কল্পনা মিলনভাবের অতিলব্ধবাসনা- সঞ্জাত, ইহা অভাবাত্মক বিরহ মাত্র নহে। কাহার ঘট মহাসাগরের কোন্ সমুদ্রে ভরা হইয়াছিল তাহা কে বলিবে? প্রশান্ত সমুদ্রে না অতলান্তিকে, লােহিত সাগরে না পীত সমুদ্রে ? কাহার ঘট কোন্ সময়ে ভরা হইয়াছিল তাহাই বা কে জানে? বিক্ষুদ্ধ বাত্যায় না প্রশান্ত চন্দ্ৰকিবণে? সুতরাং চিত্তে চিত্তে অতিবাসনা বিভিন্ন হইবার পক্ষে বাধা দেখা যায় না এবং mysticism ভিন্ন ভিন্ন রূপ গ্রহণ করিতে পারে। Mystic কবিতার চক্র সম্পূর্ণ করিতে mystic পাঠক চিত্তের প্রয়ােজন; অর্থাৎ যে পাঠকচিত্তে সেই ঢেউ-এর ভাবস্মৃতি একেবারে ঘুমাইয়া পড়ে নাই এবং অনুরূপ ঢেউ- এর দোলা যে চিত্তকে আজিও মধ্যে মধ্যে নাড়া দেয়, সেই পাঠকচিত্ত সহধৰ্ম্মী mystic কাবাের রস গ্রহণ করিতে সক্ষম হয়।

কাব্য-পরিমিতি খাটি mystic ও নকল mystic কবিচিত্তের প্রধান প্রভেদ এই যে নকল mystic কবিচিত্তে অতিলৰূবাসনা সম্বন্ধে প্রতীতি বা প্রকৃত অনুভূতি নাই, তাহা তাহার শােনা কথা মাত্র। বাসনালােকে দাঁড়াইয়া আর একটা প্রশ্নের মীমাংসা করা যাইতে পারে-কাব্যে তত্ত্বের স্থান আছে কিনা? কিন্তু এ প্রশ্নই সঙ্গত মনে হয় না। কাব্যে সকল বস্তু ও বিষয়েরই স্থান আছে, এবং তত্ত্বের ও আছে, প্রতিভা যদি তাহাকে বাসনা হইতে কল্পনার মধ্য দিয়া রসে পোঁছাইতে পারে। এক এক শ্রেণীর সাধারণ ভাবই চিন্তাশীল ব্যক্তির চিত্তে বাসনাস্তবে উঠিয়া দানা বাঁধিয়া যে বিশেষ রূপ গ্রহণ করে তাই সে চিত্তে উক্ত ভাবের তত্ত্ব। তত্ত্বীভূত বাসনা বিশিষ্ট কল্পনা দ্বারা জারিত হইলে রসলােকে উঠতে পারে ; আবার সুচিন্তিত যুক্তি দ্বারা চালিত হইলে দর্শনক্ষেত্রে স্থান পায় ;সে দোষ বা গুণ তত্ত্বের নহে, তাহা চিত্তের। বরং ইহাই সম্ভব যে ভাব- বিশেষের বাসনা চিন্তাশীল কবিচিত্তে দৃঢ় হইলে দানা বাঁধিয়। প্রথমে এক একটী তরূপই গ্রহণ করে এবং সেই তত্ত্ব উৎকৃষ্ট কবিপ্রতিভার নিকট এসে উঠিবার যোগ্যতর ও উচ্চতর উপাদান হইয়া উঠে। কদ্দমসাহায্যে ঘরের দেওয়াল দেওয়ায় বাধা নাই, কিন্তু কর্দম হইতে ইষ্টক প্রস্তুত ১০৪ কাব্য-পরিমিতি করিয়া তৎসাহায্যে দেওয়াল দেওয়া অপেক্ষাকৃত উন্নততর প্রথাই মনে হয়। ইষ্টক ত আর কিছু নহে, সে এক- প্রকারের মৃৎতত্ত্ব মাত্র। রবীন্দ্র-কাব্যে অনেক ভাবই প্রায় রূপ গ্রহণ করিয়া পরে রসে উঠিয়াছে। তাহার রসােত্তীর্ণ কবিতাসমষ্টি হইতেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে জীবন সম্বন্ধে তাহাব একটী তত্ত্ব আছে, মরণ সম্বন্ধে তাহার একটী তত্ত্ব আছে, এমন কি বর্ষা সম্বন্ধে, গ্রীষ্ম সম্বন্ধে, সন্ধ্যা সম্বন্ধেও তাহার এক একটী তত্ত্ব আছে। আর সেই জন্যই তাহার অসংখ্য ক্ষুদ্র কবিতার মধ্যেও ঐ ঐ বিষয় এক একটী বিভিন্ন অথচ সুস্পষ্ট রূপ গ্রহণ করিতে পারিয়াছে। শ্রেষ্ঠ নাট্যকারদের সৃষ্টির মধ্যেও অনেক চত্রি আছে যাহারা এক একটা তত্ত্ব মাত্র। রসে উঠিবার পথে তত্ব অবশ্য- প্রয়ােজনীয় না হইলে ও তাহা ঐ পথের অন্তরায় নহে। কেবল অল্পশক্তি কবিপ্রতিভা তত্ত্বের ভার সম্যক বহন করিতে পারে না বলিয়া কাব্য রবিমুখী ও দর্শনমুখী হইয়া পড়ে। রােত্তীর্ণ কাব্য বাহিয়া রসলােকে কবিচিত্তের সহিত পরিচয় স্থাপন করিতে পাবিলেই রসেম্মুখী অর্থাৎ সুরসিক পাঠকচিত্তের কাজ শেষ হইল। কিন্তু এই সুরসিক পাঠক- চিত্তের মধ্যে যাহারা রসাস্বাদের পর বসলােকে বিশ্রাম

কাব্য-পরিমিতি
না করিয়া কবিচিত্তধারার প্রতিকূলে তাহার প্রতিবর্তন
করিবার প্রয়াস পায়,
এবং কবিচিত্তের
ক্রিটিকচিত্ত
কল্পনােক, বাসনালােক ও ভাবলােকের
সম্যক পরিচয় পাইবার জন্য রসচক্র সম্পূর্ণ পরিবেষ্টন করিয়া
একেবারে স্বক্ষেত্রে ফিরিয়া আসে, তাহাকে ক্রিটিচিত্ত
বলা যাইতে পারে। উৎকৃষ্ট কবিচিত্ত যেমন বসে পৌঁছিয়াও
স্থির থাকে না, কাব্যে নামিয়া। তবে শান্তিলাভ কবে,
ক্রিটি কচিত্ত তেমনি রসূলােকে পৌছিয়াই পূর্ণ তৃপ্তি পায়
না, কবিচিত্তধারার প্রতিবৰ্তন করিয়া নূতন আনন্দলাভের
চেষ্টা করে। কবিচিত্তধারার সম্যক্ পরিচয় লাভ করাই
ক্রিটিক্‌চিত্তের ধর্ম।
কৰিও পাঠক, সুতরাং কবির মধ্যে কবিচিত্তধারার
পাশে পাশে পাঠ কচিত্তধারাও বর্তমান। কোন কবির
কবিচিত্ত সাধারণতঃ ভাবসমুথ, বাসনাসমুখ কিম্বা কল্পনাসমুখ
ইলেও তার অভ্যন্তরস্থ পাঠকচিত্তের রসােম্মুখী হইবার
পক্ষে কোন বাধা নাই। বরং ইহাই দেখা যায় যে অধিকাংশ
ক্ষেত্রে কবিরা প্রায় সকলেই রসােম্মুখী। তাহাদের
অভ্যন্তরস্থ পাঠকচিত্তের এই রসােম্মুখীনতাই অনেক সময়
তাহাদের কবিচিত্তের প্রেরণা যােগায়। প্রতিভার অল্পতায়
কবিচিত্ত বিলাসচক্রে বা আনন্দচক্রে ভ্রমণ করিতে বাধ্য
হইলেও তঁাহাদের পাঠকচিত্ত চিরদিনই সচক্রের

১০৬
কাব্য-পরিমিতি
অধিকারী। উচ্চ কবি প্রতিভা একান্ত দুর্লভ। কিন্তু
রসােম্মুখীচিত্ততাও জগতে সুলভ নহে।
বসলোকে উঠিবার সৌভাগ্য যাহাদের হইয়াছে তাহারাই
যে পথে হউক
আয়াস সহ কারে অথবা অনায়াসে যে সমস্ত কাব্যের
অর্থবােধ হয়, তৎসম্পর্কিত বিচিত্ত ও পাঠকচিত্তের
অনুসরণ এতক্ষণ কবিলাম। কিন্তু এমন কাব্যও মাঝে
মাঝে দেখা যায়, যাহার কবিচিত্তকে উন্মাদ কবিচিত্ত বল।
যাইতে পারে। সে পূর্ণ-নিরঙ্কুশ কবিচিত্তের গতিপথ কোন
নিয়মের ধব ধবে না বলিয়া সুচিত্তে তাহার অনুসরণ
অসাধ্য।
সে কাব্যের সম্যক্ অর্থ করা সম্ভব হয় না, কারণ
তাহা প্রলাপ-প্রধান। অথচ এই প্রলাপচক্র সম্পূর্ণ করিতে
পারে এমন পাঠকচিত্তও এই বিচিত্র জগতে ৰ্ত্তমান আছে।
কিন্তু সে ‘মদসমুথ’ কাব্যের fষয় আমাদের বক্তব্যের
অন্তভুক্ত নহে।
কাব্য-পরিমিতি লিখিয়া যে অপরাধের ভাগী হইলাম
তাহার উল্লেখ করিয়া ইহার উপসংহার করি। প্রথম
অপরাধ-রসচক্রের রেখারূপ অঙ্কনের প্রয়াস। সমস্ত
অপরাধের মূলে মানবচিত্তের দুর্বলতা বৰ্তমান। অনুভব
যােগ্য রসকে ‘বুঝিবার চেষ্টার ফলেই এই রসচক্রের উদ্ভব।
কিন্তু অবােধাকে বুঝিবার চেষ্টা মানবমনের চিরন্তন

কাব্য-পরিমিতি দুৰ্বলতা। তথাপি রসজ্ঞদের নিকট আমি আমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। দ্বিতীয় অপরাধ আমার অন্তরঙ্গ কয়েকটী বন্ধুকবিদেব সম্পর্কে। পাঠকচিত্তধারা অনুসরণ সম্বন্ধে যাহাই বলি, কৰিচিত্তধারার অনুসরণ আমার পক্ষে মােটেই সম্ভবপর হইত না, যদি কয়েকটা সহৃদয় কবিচিত্তে সহিত আমাৰ অন্তরঙ্গতা না থাকিত। বসে আলােচনাসম্পর্কে তাহারা নিজ নিজ চিবে দ্বার আমার নিকট পুনঃপুনঃ অকপটে মুক্ত কায়া দিয়াছেন বলিয়াই আমি বিডিএ-সুনব কবি- চিত্তপারার যা-কিছু পরিচয় লাভ করিতে পারিয়াছি। সত্য হউক, মিথ্যা হউক, আমার বক্তব্য বিষয়ে প্রতীতি সেই বন্ধু কবিদের সংস্পর্শেই আসিয়াছে। আমার অনেক কথাই রস তত্ত্বালোচনাকালে তাহাদের মুগ্ধ অন্তরের কথা। বলিয়া-ও না-বলিয়া সংগৃহীত তাহাদের সেই সব অন্তরের কথা কম্পাসে চিত্রিত করিয়া সাধারণের গােচর করিবার অপরাধ আমার হইয়াছে—সেজন্য আমি আমার সেই অন্ত- রঙ্গ বন্ধু-কবিদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kavya-parimiti Ed.1

Author
Sengupta,jatindranath
Title
Kavya-parimiti Ed.1
File name
Kavya-parimiti Ed.1
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2010/03/26
Publisher
Boschakra Sahitya-sansad,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
122
Library
Amta Public Library,howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Sengupta,Jatindranath
DLI number
511159
Barcode
4990010018331.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
7mzrX1fthls
Download PDF

Kavya-parimiti Ed.1