Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Sabitri Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সাবিত্রী।
{ পৌরাণিক নাটক।
[ ষ্টার থিয়েটারে অভিনীত { }
শ্ৰীক্ষীরােদপ্রসাদ বিদ্যাবিনােদ এম, এ,
প্রণীত।
=
--:
কলিকাতা-
২০১ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট হইতে
শ্ৰীযুক্ত গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
২৮নং বিডন রো, উইলকিন্স মেসিন প্রেসে
জে, এন, বসু দ্বারা মুদ্রিত।
১৩১১।
মুল্য ॥ আট আনা।
No text on this page.
পুৰুষ।
যম।
নারদ।
মাগুব্য।
সত্যবা।
হ্যমসেন
সত্যবানের পিতা।
অশ্বপতি
সাবিত্রীর পিতা।
সনাতন
অক্ষিরার স্বামী।
মালাকার।
কফুকা, ঋষিগণ, তাপসকুমার, কাঠুরিয়াগণ,
দূত ইত্যাদি।
স্ত্রী।
সাবিত্রী।
অলিরা
মালবী
শৈব্য।
মালিনী
মাওব্যের পালিত কন্যা।
সাবিত্রীর মাতা।
সত্যবানের মাত ।
তুম্বুরুর স্ত্রী।
সপ্ত সতী, কাঠুরিয়া-স্ত্রী ইত্যাদি।
No text on this page.
প্রস্তাবনা।
পরমা প্রকৃতি তুমি, সতী তুমি, গতি তুমি সার।
(তুমি) চির মধুময় সােণার স্বপন, সুধা চির পিপাসার
তুমি সংসার তুমি প্রাণ,
অনাদি জীবনে আপন গান,
তুমি স্নেহ মায়া, পতি সু জায়া, তুমিই জননী তার ।
(তুমি) আপন অঙ্গে জড়িত রঙ্গে জলদে বিজলী হার।
এ ।
No text on this page.
সানির
প্রথম
অঙ্ক
X
প্রথম দৃশ্য—নগরপ্রান্ত।
কধুকী।
কঞ্চকী। এক এক করে সমস্ত ভাট দেশে ফিরে এলো।
কেউ রাজকুমারীর পাত্র আন্তে পাকূলে না। এত বয়স,
হ’ল, এমন অদ্ভুত ব্যাপার ত কখন দেখিনি। রাজার
মেয়ে,--তায় রূপে লক্ষ্মী,এমন সৰ্ব্বাঙ্গসুন্দরী কন্যার
পাত্র মিললো না ! কেন? কি দৈব-বিড়ম্বনায় ? কোন্
বিধাতার কি প্রহেলিকাময়ী ইচ্ছায় ? কন্যার ষােল বৎসর
বয়স উত্তীর্ণ হয় হয় হয়েছে। কন্যার চিন্তায় রাজা ও
রাণী এক রূপ উন্মাদ বল্লেই হয়। এরূপ অবস্থায় ভাটেরা
অমনি অমনি ফিরে এসেছে শুনলে, তারা হতাশায়
জ্ঞানশূন্য হবেন।
কি বলি ? কেমন করে বলি ?
৪ সাবিত্রী। * * । । । । । । । প্রতিদিন রাজা আমাকে ভাটেদের প্রত্যাগমনের কথা জিজ্ঞাসা ক’ছেন, কিন্তু কোন্ মুখে বলবো—মহারাজ, এ পৃথিবীতে আপনার কন্যার পাত্র নেই। যদি কোন দেবতা মানুষের মূর্তি ধরে বিবাহ করতে আসেন, তবেই এ মেয়ের বিবাহ হবে, নতুবা উপায় নাই। { তুরুর প্রবেশ।) তুম্বুরু। যা বলেছে। ঠাকুর!—আপনা আপনি মনের দুঃখে যা প্রকাশ করে বলছে, সব ঠিক। কধুকী। কে ও, তুম্বুরু ? তুম্বুক। আর তুম্বুরু। বাপের বড় পুণ্যি ছিল, তাই মানে মানে যে তুম্বুরু সেই তুম্বরু ফিরে এসেছি, নইলে জগঝম্পে। হয়ে গিয়েছিলুম আর কি। কধুকী। জগঝশো কিরে তুমু। অার কিরে!--পিঠে অনবরত বাড়ি পড়লে, জগ- ঝম্পােই বা কেন—ঢাক হয়ে যেতুম । কেবল “য: পলাতি স জীবতি” করে, পায়ে এসে বেঁচেছি। শাস্ত্রে ব’নেছে অখো ধাবতি, গৌ শব্দায়তে, আর চৌরঃ পলায়তে। ধাবতিই কর, আর শব্দাতেই কর বাবা, চোর যে, সে চিরকাল যেমন সমভাবে পালিয়ে আছেন, আজ ও পর্যন্ত সে নিয়মের ব্যতিক্রম করলেন না। তা সিদই দিন আর গাঁটই কাটুন, ধরাং ন পড়তি। পালাতে শিখেছিলুম, তাই বেঁচে এসেছি। তােমরা হলে ধরা পড়েছিলে আর কি।
প্রথম অঙ্ক AAAAA কফুকী। ধরূতে এসেছিল কে ? তুম্বুরু। ওই ওরা। কঞ্চুকী। ওরা ? ওরা?--ওৱা কারা? তুম্বুরু। বাবারা। কখুকী। বাবারা কিরে পাগল ? তুম্বুক। এলেই দেখতে পাবেন। তারা সব আজই রাজ- বাটীতে আগমন করছেন। এলে আপনার সঙ্গে কোন্ দেখা হবে ? শুনলুম-দিদিরাণীর যে পাত্ৰ সন্ধান করে এনে দিতে পাবে, সে অর্ধেক রাজ্য পুরস্কার পাবে। ভাবলুম অল্প মেহনতে যদি বড় মানুষ হয়ে যাই, তা হলে বাজে খেটে মরি কেন? এই না ভেবে কধুকি মশায়, পাত্রের সন্ধানে ত বেরুলুম। কঞ্চুকী। তার পর ? তার পর গ্রামের পর গ্রাম, দেশের পর দেশ,-সাত সমুদ্র তের নদী—কোন জায়গা খুঁজতে বাকি রাখলুম । বাবা। কধুকী। তার পর? তুম্বুরু। তার পর বাবা! যেখানে যাই, সেইখানেই একটা করে মানুষ ধরি, আর তার কাছে দিদিরাণীর রূপের কথা বর্ণনা করি, অমনি একটা করে বাবাজী লাভ হয়। সম্পর্কটা নতুন পাতান গেল কধুকি মশায়। দিদিরাণীর রূপের বর্ণনা শােম্বা মাত্রই তারা অমনি ভুয়ে সাষ্টাঙ্গ হয়ে মা বলে প্রণাম করে। আর সেই সঙ্গে আমাকেও একটা। বলে-এ শুভ সংবাদ নিয়ে কে তুমি
সাবিত্রী।
rn A A +5 * * * * । । । ।
বাবা!-কে তুমি আমাদের ছল তে এসেছ বাবা? কঞ্চুকি
মশায়, ব’ কি? দিদিরাণীর বের সম্বন্ধ ক’তে ক’রুতে
লাখ লাখ বাবাজী যােগাড় করে এসেছি। শেষে বাবাদের
জ্বালায় প্রাণ যায় যায় হয়ে উঠলো। যেখানে যাই,
সেইখানেই বাবা!-লােকের ঘরে ঢুকি, সেখানে শুনি
না বাবা। বনে পালাই, দেখি না বাবা জঙ্গল হয়ে জমে
আছে। গাছে উঠি, দেখি না বাবা ফল হয়ে ঝুলছে !
জলে ডুবলুম, কঝুকি মশায়, সেখানেও দেখি না এক
বাবা!-তুই কে রে বাবা ? আজ্ঞে আমি গাঙ্গদাড়া।
তা গাঙ্গদাড়া বাপধন, তুমি এখানে কেন ? তিনি এমনি
বলে উঠলেন,—“আমি মীনবংশাবতংস ! তুমি মায়ের
দাস, সুতরাং তোমার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ।” এই
কথা বলেই, গাঙ্গদাড়া বাপধন চেঁাৎ ক’র অগম জলে
প্রবেশ করলেন। জল থেকে উঠে, কাণ ঝাড়তে ঝাড়তে
-বলব কি কঞ্চুকি মশায় !-ফড়ফড় করে হাজার
খানেক বাবা বেরিয়ে গেল।
ককী। দূর পাগল, নে পথ ছাড় ।
তুপুরু! দোহাই কষ্টুকি মশায়, মিথ্যে নয়। সমস্ত পৃথিবী
ঘুরে, এক গাদা বাবা শব্দ কাণে ঢুকেছিল। ছােট কাণ,
তাতে অত বাবার জায়গা কোথায় ? কাজেই একটু নাড়া
পড়তেই সত অতিরিক্ত বাবা ছেল, সব ফফড় করে
বেরিয়ে গেল। নানা কারণে প্রাণটা বড়ই চটে গেল।
শেষে মনে ক’লুম---বয়স্থ পা ও পাওয়া যাবে না,
অথচ পাত্র না পেলে আমার রাজ্য লাভও হচ্ছে না, এই
৪.
প্রথম অঙ্ক।
= ৬, ৭
না ভেবে কষ্টুকি মশায়, এক বুদ্ধি করে ফেললুম।
আচ্ছা ঠাকুর, আমার একটা কথার জবাব দাও
দেখি।
কফুকী। কিসের ? তাের পাগলামীর জবাব দেবে!
তুম্বুরু। পাগলামী নয় ককি মশায়—পাগলানী নয়।
বেষ্পতি ঠাকুরের টোল থেকে আমদানী করা বুদ্ধি।
তুমি জবাবই দাও না। বল দেখি, পাত্রের বয়স কত
হলে ভাল হয় ?
কঞ্চুকী। এই চব্বিশ পঁচিশ।
তুম্বুরু। উঃ ! তা হলে ভারি লােকসান করে এসেছি কধুকি
মশায়, ভারি লােকসান করে এসেছি। হাতে পেয়ে পাত্র
ফেলে দিয়েছি ।
কধুকী। সে কি রকম ?
চমৎকার চমৎকার !
ককী। বলিস কিরে! .
তুম্বুরু। খাটি চব্বিশ বছর।
কধুকা। আসতে চায় ?
তার 'ঘার তাস! অ!সি কি, নলেই হলো।
ক ধুকী। দেখৃত কেমন ?
তুরু। পাঁচ মিশলি—নিক { রস, খা িক ট কাল,
খানিকটে বা মেটে মেটে, বানি করে বা চাপফুলের
মতন । কথা কয়-খনিকটে ২াধ অধ, খানিকটে
ব্যাক। ক, খালি কটে নি। খা, খানিকটে বা
কলকণ্ঠ। বুদ্ধি-~-খানি কটে নেই বলেই হয়, খানিকটে
সাবিত্রী ।
টন্টনে। খানিকটে বেম্পতি, খানিকটে তুমি, খানিকটে
আমি,-এই রকম।
কধুকী। এ সব কি বলছিস্?
তুম্বুরু। বুঝতে পাছ না, তবে বলি শোন। পৃথিবী ঘুরে ঘুরে
যখন দেখলুম, একটাও পাত্র মিললো না, তখন গােটা
চেরেক ছ-বছরের ছেলে জোগাড় করলুম। ব’লব কি
কধুকি মশায়, যে ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করি ‘বে কবি?
সেইটেই বলে ‘কৰ্ব্বো”। আমি মনে ক’রুলুম-এইবারে
ঠিক হয়েছে। একেনে চব্বিশ বছর যখন পাওয়া গেল
না, তখন চারটের চব্বিশ করে নিয়ে যাই। এই না
ভেবে চারটে ছেলেকে একটাকে মাথায়, দুটাকে দু
বগলে, আর একটাকে শিকে করে গলায় ঝুলিয়ে আতে
লাগলুম। বেশ আসছিলুম, চারটে ছেলেকে চুরি করে
বেশ গােছ-গাছ করে আনছিলুম, পথে আসতে আসতে
শিকে ছিড়ে গলার ছেলেটা ঢিপ করে পড়ে গেল,
সামলাতে গিয়ে মাথার ছেলেটা টাউরি খেয়ে গড়াতে সুরু
ক’রূলে। দেখতে দেখতে বগল ও ফসকে গেল। তখন
এটা সামলাতে গুটা যায়, এটা সামলাতে সেটা যায়। চ্যা
ভা লেগে গেল—দেখতে দেখতে হুলস্থুল কাণ্ড!
যাদের ছেলে চুরি করে আনছিলুম, তারা না শব্দ শুনে
‘মাভৈঃ মাভৈঃ করে আমার দিকে ছুটে এলো—আমিও
অমনি ‘বাবারৈ বাবারৈ’ করতে করতে দে ছুট।
কধুকী। বুঝতে পেরেছি--এইবারে থাম্।
কধুকি মশায়, রাজকুমারীর পাত্র ত চব্বিশ
==
}
তুরু। সত্যি
প্রথম অঙ্ক।
বছুরে একটা পাওয়া যাবেই না--এই রকম চার পাঁচটায়
চব্বিশ চাও ত, যত চাও এনে দিতে পারি। কধুকি
মশায়, সরে পড়, সরে পড়–ওই এক বাবা আসছেন।
উনি বরাবর আমার সঙ্গ নিয়েছেন । উনি ধাড়ী
বাবা,—ওঁর সঙ্গে দু-চারিটী খুচরো বাবাও আছেন।
উনি যদি করেন ‘মাভৈঃ', তারা করেন ‘মাস্ম
তৈষী:--বাপ! প্রাণটা গিয়েছিল আর কি! কি
বিভীষিকা !
কধুকী। কোন মহাপুরুষ যেন এদিকে আছেন না ?
তুম্বুর। নিশ্চয়—মহাপুরুষ, তাতে আর সন্দেহই নেই। তবে
কি জান কঞ্চুকি মশায়, ওঁকে যে বাগিয়ে গায়ে হাত
টাত বুলিয়ে, তুমি রাজকুমারীর পাত্র করে ববে, আর
সেই সঙ্গে মজা করে অর্ধেক রাজ্য মেরে দেবে, সেটা
হচ্ছে না -সে গুড়ে বালি। ওঁর কাছে গিয়ে যেমন
প্রস্তাব করলুম যে, বুড়ো ঠাকুর, একটা কন্যা আছে,
সেটার যােক বৎসর পার হয়ে যায়, কাজেই বাপ মার
ধৰ্ম্ম যায়, কেউ তাকে বে করতে চায় না—তুমি সেটাকে
বে কর না। শুনেই বুড়ো ঠাকুর বল্লে ‘ষােল বছরের
মেয়ে ? আমি ব’লুম-হ দেবতা।
‘কেউ বে ক’তে
চায় না? আমি বলু’ম–না দেবতা। তখন ঠাকুর মেয়ের
রূপের কথা জিজ্ঞেস করলে। আমি মনে করলুম, বুঝি
ঠাকুর বাগে এলো। এই নভবে, দেদার রূপ বর্ণনা
করূতে লাগলুম। রূপের বর্ণনা শুতে শুতে ঠাকুরের
চোক বুজে আসতে লাগল । দেতে দেখতে টস্ টস্
সাবিত্রী।
4,254
জল-দেখৃতে দেখতে দমবন্ধ–পেট ফুলে ঢাক—গেল
গেল—মনে ক’লুম বুঝি ব্রহ্মহত্যা হলো ! কাজেই
ঠেলাঠেলি করতে লাগলুম।
অনেক ঠেলাঠেলির পর
হুম্ করে এক দীর্ঘ নিশ্বাস । তার পর না উঠেই,
আমাকে একেবারে—এই যেমন সেয়াকুলে কাপড় জড়ায়
-এই এমনি করে (কঞ্চুকীকে বেষ্টন) জড়িয়ে ধ’লে।
বলে—তুম্বুরুরে! এতদিন কোথায় ছিলিরে!.
ককী। হাঁ হুঁ-করিস কি—করিস কি !
তুম্বুরু। রস, ভাল করে বুঝিয়ে দিই।
কধুকী। আরে গেল—ছাড়, ছাড়।
তুম্বুরু। শেষে জড়াজড়ি থেকে গড়াগড়ি-সেটা কি রকম
দেখিয়ে দেবো ?
কঞ্চুকী। যা, যাঁ, আর দেখাতে হবে না।
তুম্বুরু। যে আজ্ঞে—ঐ ঠাকুর আসছে, তা হলে জড়াজড়িটে
ওঁর কাছেই দেখে নিয়ো। ওঁর শুনেছি নাছােড়বান্দা
পিরীত। শুনেছি-এক বার উনি শূলে বসেছিলেন।
কধুকী। শূলে বসেছিলেন ?
তুম্বুরু। হা--তা এমনি কৌশল করে বসেছিলেন যে, বসবা-
মাত্রই ঘুম। হাজার বৎসর সে ঘুম ভাঙ্গেনি।
কধুকী। শূল!—তবে কি উনি মহাতপা মাওব্য ?
তুম্বুরু। এই—তবে ত তুমি সব খবর রাখ। ওই গো ঠাকুর,
উনি আপনাকে দেখে এই দিকেই আছেন। তুমি ওঁর
সঙ্গে আলাপ কর, আমি পলায়ন করি।
| তুম্বুরুর প্রস্থান।
প্রথম পঙ্ক। (মাগুব্যের প্রবেশ।) কফুকী। আসুন দয়াময়!—আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। মাওব্য। বিষ্ণবে নমঃ।আপনি কে ? ককী। অধীন-রাজকঞ্চুকী। মাণ্ডব্য। মহারাজ কি রাজধানীতে অবস্থান করছেন ? কখুকী। আজ্ঞে হাঁ প্রভু। কোথায় আপনার গমন হচ্ছে? মাপ্তব্য। তীর্থ পৰ্য্যটনে। ককী। মহারাজের প্রতিনিধিস্বরূপ রাজগৃহে আপনার পদ- ধূলি ভিক্ষা করি । #মাণ্ডব্য। পদধূলি নয় ব্রাহ্মণ,-মহারাজ অশ্বপতির ঘবই আজ আমার গন্তব্য তীর্থস্থান। দ্বিতীয় দৃশ্য—রাজবাটী। অশ্বপতি ও মালবী। মালবী। মহারাজ, আর ত লােককে বুঝিয়ে রাখতে পারিনি। অশ্ব। বিষয়টা কি মহিষি যে, লােকেরা তােমার কাছে বােঝ- বার জন্য এত উদগ্রীব হয়েছে ? লােকের উদগ্রীব হবার কারণ কি, মহাবাজ কি জানেন না? কন্যা যে ষােল বচ্চর পার হয়। বাড়ীতে যে আসে, সেই জিজ্ঞাসা করে—রাজকুমারীর বিবাহ- যােগ্য বয়স উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, অথচ তাকে পাত্রস্থ করা মালবা। হচ্ছে না কেন?
সাবিত্রী।
Ar ho
অশ্ব। সে কি আমাকেও জিজ্ঞাসা করছে না মহিবি ? কিন্তু
কি ক’ব, আমি ত চেষ্টার ত্রুটী করছিনি। সমগ্র
ভারতের মধ্যে এমন স্থান নেই, যেখানে সাবিত্রীর
পাত্রের অনুসন্ধানে লােক না পাঠিয়েছি। নানা দেশ
থেকে কত সুলক্ষণযুক্ত পাত্রও ত এলো, কিন্তু কেহই ত
তােমার মেয়েকে বিবাহ করতে চায় না। তােমার
মেয়ের অদৃষ্টে পাত্র জুটে ও জুটছে না, তা আমি কি
করব ?
মালবী। এ কথা কি লােকে বিশ্বাস করে ? তারা মনে করে,
আপনি ইচ্ছা পূৰ্ব্বক কন্যাকে কুমারী রেখেছেন।
অশ্ব। মনে যদি করে, তা হলেই বা কি করব ? লােকের
মনের উপর আধিপত্য ক’রূতে পারব, এমন পুণ্যই বা
কি করেছি। যথার্থ কথা বলতে কি মহিষ, এক
সাবিত্রীর জন্য আমার এত সৌভাগ্যেও সুখ নাই।
সাবিত্রীর জন্য দিবরাত্র চিন্তাভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি
জীবন্মত হয়ে অবস্থান ক’বৃছি। মনে মনে ভাবছি যে,
করলুম কি ? আঠার বৎসরের কঠোর সাধনায় দেবতার
দ্বারে ভিক্ষা করে, অশান্তি ঘরে নিয়ে এলুম! যৌবনস্থা
কন্যা, কুমারী অবস্থায় চক্ষের উপর বিচরণ করছে।
চক্ষের উপর যেন পিতৃপুরুষের অধােগতি দেখতে পাচ্ছি।
দশম বর্ষ পর্যন্ত বালিকাদের কন্যাকাল। মায়ের আমার
সে কন্যাকাল বহুদিন উত্তীর্ণ। এখন দেখছি কুমারী-
কাল পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়ে যায়। আমি নিজেই আমাকে
কি বলে যে প্রবােধ দিব, তাই বুঝতে পারছি না; তা
প্রথম অঙ্ক। nary AAAAAAAAAAAAA অশ্ব। তােমাকে আবার কি প্রবোধ দিব প্রাণেশ্বরি। দেবতা- আরাধনায় কন্যাপ্রাপ্তি। যদি আমার ধর্মলােপই তাঁর অভিপ্রায় হয়, তা হলে বৃথা অনুশােচনায় ক’ব কি ? মালবী। তবে কি আমার সাবিত্রীর বিবাহ হবে না? অশ্ব। হবে কি না হবে, বিধাতাই বলতে পারেন। আর যদিই বিবাহ হয়, তা হলেই, ষােড়শ বর্ষ উত্তীর্ণ হয়ে হলেই বা ফল কি? আমাকে ত ধৰ্ম্মে পতিত হ'তে হ'ল। মালবী। হা ভগবান্, এ কি বিড়ম্বনা ! এমন সৰ্ব্বসুলক্ষণা, ধীর, সাধ্বী—এমন ভক্তিমতী—দেখলে বোধ হয় যেন সাক্ষাৎ কৈলাসেশ্বরী সতী কন্যারূপে আমার ঘরে অব তীর্ণ।। আমার এমন কন্যা কি না পতিভাগ্যে বঞ্চিত। সে দুঃখ আর আমার কাছে করে কি করবে? আর আমার কাছে দুঃখ জানিয়েই বা লাভ কি ? সৰ্বসুলক্ষণা হয়েই ত মা আমাকে বিপন্ন করেছেন। মা আমার শক্তিস্বরূপিণী, প্রভাতারুণবর্ণ, সকল কোমলতার আধার হয়েও তেজোময়ী। যে দেখে, তারই মনে দেবীভ্রমে ভক্তির উদ্রেক হয়। মাতৃজ্ঞানে সকলেই তার চরণ- প্রান্তে মস্তক অবনত করে। এরূপ অবস্থায় তোমার মেয়ের কেমন করে বিবাহ হয়? সাবিত্রী দেবীর আরাধনায় আমি এ কন্যার লাভ করেছি। জানি না, দেবীর মনে কি আছে। মালবী। দেবীর মনে কি আছে, সে বুঝতে কি আর এতকাল যায় ? কুলরক্ষার জন্য পুত্র কামনায়, আপনি আঠার বৎসর ধরে কঠোর তপস্যায় সাবিত্রী দেবীর অর্চনা সাবিত্রী। ১। L. • ৮'। 6 WNW ক’লেন, কোথা থেকে প্রজাপতি ব্রহ্মা কিনা ওপর-পড়া হয়ে বর দিতে এলেন। আরে রাম রাম, দেবতারাও কিনা আমার অদৃষ্টে প্রতারক হ’ল ! কুলধৰ্ম্ম-রক্ষার জন্য তপস্যা-পুত্রের কামনায় যজ্ঞ,—ফল হ’ল কিনা কন্যা! তা হােক, সাবিত্রীকে পেয়ে আমি শতপুত্র- লাভের আনন্দ পেয়েছিলুম। কিন্তু মহারাজ, তাকে এ অবস্থায় দেখে কেমন করে নিশ্চিন্ত থাকি। চক্ষের উপর কুলনাশ কেমন করে দেখি। পিতৃপুরুষের অধো- গতি স্মরণ করে প্রাণ আমার বড়ই কাতর হয়ে উঠেছে। মহারাজ, হতাশ হলে চলবে না। এখনও সময় আছে। আর একবার চেষ্টা করুন। পাত্রের সন্ধানে আর এক- বার দেশবিদেশে লােক প্রেরণ করুন। অবশ্যই সাবিত্রী দেবী আপনার মনস্কামনা পূর্ণ ক’রূবেন। আমি কি নিশ্চিন্তই আছি প্রাণেশ্বরি! আবার আমি দেশ বিদেশে লােক পাঠিয়েছি। দেখি তারা কতদূর কি করে ওঠে। তারা যখন না পারবে, তখন নিজে আমি একবার পাত্রের সন্ধানে বহির্গত হব । তাতেও যদি না হয়, তখন কুলধৰ্ম্ম-রক্ষার জন্য শাস্ত্রের যে আদেশ, তাই পালন ক’ব। মালবী। কি ক’বেন ? অশ্ব। কি করব,—কি ক’ব-মালবি, জিজ্ঞাসা করােনা। রমণী তুমি-কোমল। তুমি সে কঠোর বাক্য শােবার যােগ্য নও। মালবী। তবু শুনি।
প্রথম মঞ্চ।
অখ। সে বাক্যের একটা একটা অক্ষর, সহস্ৰ বজ্রের বলে
তােমার কোমল বক্ষে আঘাত করবে। মালবি, তুমি
সহ করতে পাবে না।
মালবী। যখন সে কাৰ্য্য করবেন, তখন যদি সহ ক’রুতে
পারি, তাহলে এখন শুনে সহ্য ক’তে পারব না কেন?
অশ্ব। শাস্ত্রে বলেছে-কুরক্ষার জন্য যদি লােক পরিত্যাগ
ক’তে হয়, তা হলে লোেক পরিত্যাগ কৰে। গ্রামের
জন্য কুল ত্যাগ করূতে হয়, কুলত্যাগ করবে। দেশের
জন্য যদি গ্রাম ত্যাগ প্রয়োজনীয় হয়, ত গ্রাম ত্যাগ
ক’রূবে। আর আত্মার জল যদি পৃথিবী পরিত্যাগের প্রয়াে-
জন হয়, তাহলে যে দণ্ডে আত্মার বিভীষিকা উপস্থিত
হবে, সেই দণ্ডেই এই স্বর্গাদপি গরীয়সী জন্মভূমিকেও
পরিত্যাগ করূতে কুণ্ঠিত হবে না। রাণি, সাবিত্রীর
জন্য যদি কুলধৰ্ম্মনাশের সম্ভাবনা দেখি, তাহলে অমন
সােণার মেয়েকে ও আমাকে বিসর্জন দিতে হবে।
মালবী । হা ভগবান্, এই কি স্বামীর আমার কঠোর তপস্যার
পরিণাম ! মহারাজ, সমগ্র রাজ্য যৌতুক দেবার ঘােষণা
দিয়ে পাত্রের সন্ধানকরুন না কেন ?
অশ্ব। রাণি, সাবিত্রীকে যে পত্নীরূপে গ্রহণ কর্তে সমর্থ, সে কি
তুচ্ছ রাজ্যের ভিখারী।
( দূতের প্রবেশ
অশ্ব। কি সংবাদ ?
দূত। সংবাদ শুভ নয়। সমস্ত ফ্লাট বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে
এসেছে।
সাবিত্রী। LEA+ ANA Ah**১।।। ®, ' * ২৫।।।।। ,/ 4 , ••• • • • ***** মালবী। সমস্ত ভারতের মধ্যেও আমার কন্যার একটা পাত্র মিল না ? দূত। রাজপুত্রদের উন্মত্ততার সংবাদ সমস্ত ভারতে রাষ্ট্র হয়েছে ? কোন রাজপুত্র রাজকুমারীকে বিবাহ করিতে স্বীকৃত হয় না। কোন রাজাও আপন সন্তানকে মন্ত্র- দেশে পাঠাতে চায় না। অশ। তাহলে কন্যার বিবাহের অাশা পর্যন্ত লাঞ্জলি। দুত। তাই ত কাৰ্যতঃ দেখছি মহারাজ ! এত বয়স হ’ল এরূপ বিচিত্র ব্যাপার ত কখন দেখিনি ! ভাটেরা বল্লে -মায়ের নাম শােবামাত্রই লোকে সেই দূরদেশ থেকে উদ্দেশে তাকে প্রণাম করে। কেউ কি তাহাদের কাণে কাণে বলে দেয় যে, দেবী আমাদের ঘরে কন্যারূপে অবস্থান করূছেন ? মালবী। তা হলে কি হবে ? মহারাজ, কি হবে ? মহারাজ, দাসীর প্রতি দয়া করুন। মায়ের প্রাণ-অভাগিনীর মায়ের প্রাণের দিকে একবার দয়া করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন। অশ্ব। দারুণ কৰ্তব্য-প্রজারঞ্জন, লৌকিকতা-ধৰ্ম্ম-রক্ষা। বুঝতে পেরেছি, আমার জীবনের সমস্ত সাধ আকর্ষণ করে, অকুল দুঃখসাগরে নিমজ্জিত ক’বার জন্য, আমার কামনার শাস্তি দিতেই যেন বিধাতা আমার গৃহে এ কন্যা পাঠিয়েছেন।–সােৎসুক নয়নে সমস্ত প্রজা আমার পানে চেয়ে আছে। আজ আমা হতে যদি সমাজ-ধৰ্মনাশ হয়, তাহলে সর্বনাশ হবে—সর্বনাশ হবে। মানুষ একে
প্রথম অঞ্চ।
স্বভাবতই স্বাধীনতাপ্রিয়। সুতরাং তারা যদি একবার
আমার আচার দেখে প্রশ্রয় পায়, তাহলে অল্পদিনের
মধ্যে কুলস্ত্রীগণ আপন আপন মৰ্যাদার হানি করবে।
বর্ণসঙ্কটের সৃষ্টি হয়ে পাপের প্রখর স্রোতে চক্ষের নিমেষে
সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
মালবী। মহারাজ, বহুশাস্ত্রজ্ঞ ত্রিকালদর্শী ব্রাহ্মণও ত আপনার
সহায় আছেন। এ দারুণ-বিপত্তি-সময়ে তাহাদের শরণা-
পন্ন হােন না কেন।
(কখুকীর প্রবেশ।)
কধুকী। মহারাজ, মহাতপা মাপ্তব্য ঋষি আপনাকে আশী-
ৰ্ব্বাদ ক’তে এসেছেন।
অশ। মালবি, সত্বর ঋষিরাজের জন্য পাদ্য অর্ঘ্য নিয়ে এসো।
মা জগদীশ্বরী এতদিন পরে সন্তানের প্রতি কৃপা-কটাক্ষে
চেয়েছেন। শীঘ্র যাও, শীঘ্র যাও।
[ প্রস্থান।
মালবী। নারায়ণি ! মা! এ কুলক্ষয়ৰূপ মহাপাতক হতে
স্বামীকে আমার রক্ষা কর।
তৃতীয় দৃশ্য—অলিন্দ্য।
মা ব্য।
মাওব্য। তাইত ভাবি, এ কি বিচিত্র ঘটনা। প্রতি প্রভাতে
যথারীতি স্নানান্তে আহ্নিক করি, তথাপি প্রাণে তৃপ্তি
পাই না কেন? আমি নিজেই কি যথারীতি দেবার্চনা
১৮ সাবিত্রী ক’তে অসমর্থ হয়েছি ; না নিত্য নিত্য এ তৃপ্তি আমার, কেন নিশাচর কিংবা নিশাচরী কর্তৃক অপহৃত হয়েছে। প্রতিদিন চিন্তা করেছি, কিন্তু কোন উপায়েই এতদিন আমার এ ভাবনার মীমাংসা হয় নি। ধ্যানান্তে উন্মী- লিত চক্ষে ভগবতী গায়ত্রীর চিদাভাস দেখতে আকাশ পানে চেয়েছি, দেখি আকাশস্থল ম্লান!-প্রাণের আবেগে নবােদিত অৰুণের অভ্যন্তর অনুসন্ধান করেছি, দেখি আদিত্য হৃদয়ে জবাকুসুমসঙ্কাশ। দ্যুতিময়ী ভুবনােজ্জল- করী কুমারীশ্রীর কিরণময় সিংহাসন শূন্য! প্রাণের যাতনায়, মায়ের অনুসন্ধানে আমি ভুবন প্রদক্ষিণ করে এসেছি, সমস্ত পরিশ্রম নিস্ফল। মা যে আমার ধ্যানের সীমান্তে অবস্থান করছেন, তা কেমন করে জানবাে? কিরণমালিনি! বেদরূপ। জননি! অধম সন্তানকে লুকিয়ে ষােল কলায় পূর্ণ হয়ে তুমি যে মদ্ররাজগৃহে অবস্থান ক’ছ, তা ত জান্তুম না মা! কিরণময়ী আজ পতিব্রতা মাহাত্ম-প্রচারের জন্য মানবী-মূর্তিতে ধরায় অবতীর্ণ। মা, মা, ইষ্টদেবি সাবিত্রি ! অধম সন্তান আজ তাের মানবী মুক্তি দেখতে এসেছে। দেখা দিবি কি মা? কন্যা হয়ে মদ্ররাজের ঘর কেমন করে আলো করে আছ, দেখ বার জন্য প্রাণে আমার বড়ই অস্থিরতা। মা । দেখা দে, দেখা দে । ( অশ্বপতির প্রবেশ ) অশ্ব। আসুন দয়াময়, আসুন, এ দাসের গৃহ পবিত্র করুন। ( প্রণাম।
প্রথম অক। " " *. » ««« Air, মাওব্য। জয়ােহ মহারাজ। ( মালবীর প্রবেশ ও পত্র পুষ্প মাণ্ডব্য-চরণে প্রদান।) সৰ্বাভীষ্ট পূর্ণ হাে’ক মা, চিরায়ুষ্মতী হও। মালবী। প্রভু, আসনে উপবেশন করুন। মাতব্য। এই যে বছি মা, তার জন্য ব্যস্ত হবার কোনও প্রয়ােজন নেই। তুমি মা, ত্রিলােক- বিতা ধৰ্ম্মরত। তোমার গৃহে আতিথ্য গ্রহণ, অতিথির বহুভাগ্যের কথা। মহারাজ! আমি বহুদেশ, বহুরজ্য, বহুতীর্থ পর্যটন করে এই পথ দিয়ে পুণ্যতীর্থ কাশী গমন ক’ছিলুম। পথে আসতে আসতে শুলুম--তােমার গৃহে পবিত্র। ভক্তিময়ী, সদনুষ্ঠানচারিণী, ষােড়শী কুমারী অবস্থান করছেন। শুনেই বুঝলুম, মা অন্নপূর্ণ। যখন নিকটেই, তখন তাকে দর্শন করতে আবার অতদূরে যাবার প্রয়ো- জন কি ? অশ। বলেন কি প্রভু ! মা ব্য। শাস্ত্রসম্মত কুমারী যদি ষােড়শী হন, তিনি স্বয়ং অম্বিকা। তিনি পার্থিব জীবনে, নারীদেহে মাতৃ-মূর্তি। সৰ্ব্বজীবের—সৰ্ব্ব মানবের--এমন কি, সৰ্ব্বদেবতার ও নমস্যা। এমন কন্যাকে যিনি বিবাহ করেন, তিনি নরদেহে উমাপতি। মহারাজ! আপনি গিরিপতি হিমালয় তুল্য ভাগ্যধা। মা মদ্ররাণি ! তুমিও উম- জননী মেনকার ন্যায় মহাভাগ্যবতী।
সাবিত্রী ।
৫
বলেন কি প্রভু, এ সব কি কথা! আমি যে আপনার
এ অদ্ভুত লােমহর্ষণকর বাক্যে জ্ঞানশূন্য।
মাণ্ডব। আমি শাস্ত্র-কথাই ব’ছি মহারাজ ।
মালবী। আপনার কোন্ শাস্ত্র মান্বাে দেবতা? আপনি
এখন দেবী দর্শন করতে কাশী যাওয়া বন্ধ করে এখানে
এসে উপস্থিত হয়েছেন। আমরা কিন্তু যে দেবীর
জ্বালায় যাই ।
মাগুব্য। সে কি রকম মা? মা কি আমার চঞ্চলা ?
মালবী। চঞ্চলা হলেও দুঃখ ছিল না। মা যদি আমার যথা-
র্থ ই দেবী হন, তা হলে রণ-রঙ্গিণী মূর্তি ধরে এলেও,
আমি বুকের ধন বুকে তুলে নিতুম । যদি মা আমার এ
অভাগিনীর ঘরে আবার সময়ে দয়া করে তার দেবা-
টাকে ও তার সঙ্গে করে নিয়ে আতেন! আপনার
দেবী যে এখন আমাদের চতুর্দশ পুরুষ পৰ্যন্ত নরকস্থ
করতে বসেছেন।
মাওব্য। এসব কি বলছ মা, আমি যে সম্যক প্রণিধান করতে
পারছি না।
অশ্ব। ঠাকুর, কন্যাদায়ে অস্থির হয়ে পড়েছি।
মালবী। ঠাকুর, শত চেষ্টা করেও, সাবিত্রীর আমার বর
জুটলো না ! কি হবে দেবতা ? কি করে ধৰ্ম্ম রক্ষা
হয়। কি করে লােকনিন্দার হাত থেকে নিস্তার পাই !
মাওব্য। বর জুটলো না ! মা কি আমার কুৎসিত?
মালবী। বড় কুৎসিত। ঠাকুর, বড় কুৎসিত।। আপনাদের
শচী, লক্ষ্মী, সরস্বতীই বা কি কুৎসিতা!—আপনাদের
প্রথম অঙ্ক। + A A A\n\r\ মালবী। উমারাণীই বা কত কুৎসিতা ? অন্তর্যামী ঠাকুর, প্রাণের যাতনায় কাতর হয়ে আপনার শ্রীচরণে আশ্রয় গ্রহণ ক’লুম, আপনিও কিনা সময় বুঝে রহস্য কর্তে এলেন। মা আমার কুৎসিতা ? ব্রহ্মাণ্ডের সৌন্দৰ্য্য মা আমার ক্ষুদ্র দেহে আয়ত্ত করেছে --সে মা আমার কুৎসিতা ? মণ্ডব্য। ভাল, মাকে একবার আন দেখি। দেখে নে বুঝে দেখি, ব্যাপার খানা কি অশ্ব। যাও মহিষি, শীঘ্র সাবিত্রীকে এখানে নিয়ে এস। ও সব ব্যাপার বােঝাবুঝি আমি বুঝি না। যখন কৃপা করে আপনার দাসদাসীর গৃহে পদার্পণ করেছেন, তখন আমাদের একটা গতি না করে পায়ে ঠেলে যে চলে যাবেন, সেটি হচ্ছে না। অশ্ব। ভাল, আগে সাবিত্রীকে নিয়েই এস, তার পর যা বল- বার বলল। [ মালবীর প্রস্থান। মাওব্য। (স্বগত). মায়ের আগমনবার্তা জানবার জন্য প্রাণে বড়ই কৌতুহল জেগে উঠেছে। ( প্রকাশ্যে ) সাবিত্রী- সাবিত্রী-কি সুন্দর নাম! এ নাম কোথা পেলে মহারাজ ? অশ্ব। সাবিত্রী দেবীর আরাধনা করে মাকে পেয়েছি, তাই সাবিত্রীর প্রসাদস্বরূপ কন্যার নাম রেখেছি সাবিত্রী । মণ্ডব্য। যদি বাধা না থাকে, তা হলে ঘটনাটা জানতে পারি কি ? ঘশ্ব। আপনি গুরু; আপনার কাছে বলতে বাধা কি ? ;
সাবিত্রী। *6*666********* পুত্রকামনায় আমি কুলদেবতা সাবিত্রী দেবীর আরাধনা করি। আঠার বৎসরের তপস্যায় দেবী দাসের প্রতি প্রসন্না হন। অপূৰ্ব্ব মূর্তি ধারণ করে আমার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, আমাকে বর গ্রহণ করতে আদেশ করেন। আমি ধৰ্ম্মরক্ষার্থ মায়ের কাছে কুলােজ্জল পুত্র কামনা করি। দেবী সেই কথা শুনে বলেছিলেন-“তােমার অভিপ্রায় পূর্ব হতেই অবগত হয়ে আমি প্রজাপতি ব্রহ্মার নিকট তােমার জন্য পুত্র প্রার্থনা করি। তিনি তােমাকে একটা কন্যা দান করতে প্রতিশ্রুত হয়েছেন। মহারাজ, ব্রহ্মা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে তােমাকে শীর্বাদ করি, অচিরে তুমি একটা তেজোময়ী কা লাভ কর। দ্বিরুক্তি না করে এই মুহূর্তেই তুমি গৃহে প্রতিগমন কর।” এই কথা বলেই দেবী দেখতে দেখতে অন্তর্ধান ক’- লেন। গৃহে ফিরে এলুম। মায়ের আশীর্বাদের ফলে অচিরেই এক কন্যারত্ন লাভ ক’লুম। বব কি দেবতা! জগতের সকল সৌন্দৰ্য্য একত্র হয়ে দেখতে দেখতে আমার গৃহে নয়নানন্দকরী নব তিলােত্তমারূপে প্রস্ফ- টিত হলেন। কিন্তু দুঃখের কথা কি বলব প্রভু! ষােড়শ বর্ষ অতিক্রান্ত হতে চললো, তথাপি আজ ও পৰ্যন্ত মাকে পাত্রস্থ ক’বৃতে পালেম না । মাওব্য। এমন কন্যার পাত্র মিল না । অশ্ব। বহুপাত্রের সন্ধান করেছি, বহু সুলক্ষণযুক্ত যুবাকে কন্যা দান কবার জন্য গৃহে এনেছি; কিন্তু লজ্জাভার-নমি- তাঙ্গী কুমারীকে আজ ও পর্যন্ত কোনও পুরুষ প্রেমচক্ষে - প্রথম অঙ্ক। দেখতে সাহস করেনি। অদ্যাবধি যত রাজপুত্র বিবা- হার্থী হয়ে এসেছে, সকলেই আমার কন্যাকে মাতৃজ্ঞানে ভক্তিসহকারে দূর থেকে প্রণাম করে প্রস্থান করে। মাণ্ডব্য। পা মেলেনি বলে, গৌরী কিনা আজও পর্যন্ত কুমারী! তা মহারাজ, এতদিন চেষ্টা করেও তােমরা নিজে যখন কিছু করূতে পারনি, তখন মাকে নিজের ওপর পতি-নির্বাচনের ভার প্রদান কর নি কেন? অশ্ব। তাই ত প্রভু! একথা ত এক সময়ের জন্য ও আমার মনে উদয় হয়নি। মণ্ডব্য। শুভদিন শুভক্ষণ দেখে, যত শীঘ্র পার, মাকে পতি- অন্বেষণে প্রেরণ কর। আশীৰ্ব্বাদ করি, মহারাজ, আপ- নার গৃহে শান্তি ও ধৰ্ম্ম চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত হােক। ( মালবী ও সাবিত্রীর প্রবেশ।) মাণ্ডব্য। (স্বগত) আসছি মা আনন্দময়ি ! সন্তানের আকুল আগ্রহের কাতর স্বর তাের কাণে কি পৌছাল মা! মহেশবদনোৎপন্না, বিষ্ণুহৃদয়সম্ভব, বেদ প্রসবিত্রী গায়ত্রী! দিবাকরের হৃদয়-আসন শূন্য করে--মদ্ররাজগৃহে প্রচ্ছন্ন- বেশে-অবলা-বালিকাসুলভ কোমলতায় কার প্রাণ গলাতে এসেছ মা ? মা! দূর হতে অধম সন্তান তােমার চরণারবিন্দে কোটী কোটী প্রণাম করে। তুমিই না হয় কন্যারূপিণী-পিতা মাতার মমতাজালে সৰ্বাঙ্গ জড়িয়ে ইচ্ছাপূৰ্ব্বক আপনাকে বিস্তৃত হয়েছ। তাতে আমার কি জননি! আমি তােমার সঙ্গে আত্মবিস্মৃত হতে ২৪ সাবিত্রী। ১৮ যাব কেন ? মা, আবার——আবার-বারবার আমার প্রণাম গ্রহণ কর। মালবী। এই নিন প্রভু, আপনার দাসী। মা, ঠাকুরকে প্রণাম কর। প্রণাম করে পদধূলি মাথায় নিয়ে, ঠাকুরের কাছে স্বামি-সৌভাগ্য প্রার্থনা কর। যেন মনােমত পতিলাভ করি, যেন আমা হতে মদ্র বংশের কুলধৰ্ম্ম রক্ষা হয়। ( সাবিত্রীর প্রণাম ) মাণ্ডব্য। বেটা! চুপ করে থাকবে মনে করেছো? কল্যাণ- রূপিণি ! শুধু কি নয়নেন্দ্রিয়ের চরিতার্থতায় আত্মার তৃপ্তি হয়। যে বিদােষ্ঠের ঈষৎকম্পনে চতুর্বেদের সৃষ্টি হয়েছে, অক্ষরমঝি! সেই তুমি, আমার পিপাসু আত্মার সমীপস্থ হয়ে নীরব থাকবে ! দেখি বেটী, সন্তানকে ছলনা করে কতক্ষণ থাকতে পার। মালবী । কি মা, ঠাকুরের কাছে বর প্রার্থনা না করে নীরব বইলি যে? মাগুব্য! নীরব কি সাধে থাকে। মহারাজ, এখন বুঝতে পেরেছি যে, এ কন্যার বিবাহ হয় না কেন। বােবা মেয়েকে কে বে কবে ! মালবী। ও সাবিত্রি, কথা কওনা মা? অশ্ব। মা, দেবতার কাছে আশীৰ্বাদ গ্রহণ কর। সাবিত্রী। প্রভু শাস্ত্রে শুনেছি-কামনা ত্যাগ করে ভগবানের আরাধনাই হচ্ছে সৰ্বশ্রেষ্ঠ আরাধনা। যদিই বা কামনা করতে হয়, তা হলে অগ্রে দেবতার যথাশক্তি আরাধনা করা প্রয়ােজন। আরাধনায় তুষ্ট হয়ে যদি দেবতা প্রথম অঙ্ক। 0 6, A স্বেচ্ছায় বর প্রদান করেন, তা হলে সেই আরাধনাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ কাম্যধৰ্ম্ম। নতুবা ভিক্ষা দেবতার কাছেও নিন্দনীয়। তবে এও শুনেছি-জনক জননীর বাক্য বেদস্বরূপ ; আজ্ঞা, শাস্ত্রের আদেশের ন্যায় অলঙ্ঘনীয়। যে পিতা মাতার আদেশ লঙ্ঘন করে, সে দেবাসনে উপ- বিষ্ট হলেও ধৰ্ম্মে পতিত হয়। তাই আজ জননী কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে, আপনার কাছে প্রার্থনা করি, যেন আমা হ’তে মদ্রবংশের কুলধৰ্ম্ম নষ্ট না হয়। মাণ্ডব্য। শাস্ত্র ব্রাহ্মণের উপর আশীর্বাদের যেটুকু অধিকার দেছেন, তাইতে বলি, মা তােমার মনােভীষ্ট পূর্ণ হােক। মালবী। আরাধনা করতে পাওনি বলে দুঃখু ? তার জন্য দুঃখ কি মা! তুমিই না হয় আজকে এই অতিথি সেবার ভার গ্রহণ কর। অশ্ব। সাবিত্রি, কাল পৰ্ব্বাহে তুমি উপবাসিনী ছিলে; সুতরাং আজ এই দেব অতিথির সৎকার করে তার প্রসাদ গ্রহণ কর। আর শােন তােমার সম্প্রদানকাল উপস্থিত, অথচ কোন ব্যক্তি আমার নিকট প্রার্থনা করছেন না। অতএব তুমি স্বয়ং আপনার গুণসদৃশ স্বামী অন্বেষণ কর। যে পুরুষ তােমার প্রাথিত হবেন, আমার কাছে তাঁর কথা নিবেদন করো; পরে আমি বিবেচনা করে তােমাকে সম্প্রদান ক’ব। ক ল্যাণি! আমি ধৰ্ম্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণগণকে যে বচন পাঠ ক’তে শুনেছি, তা তােমাকে বলছি শােন- যে পিতা কন্যাদান না করেন, তিনি নিন্দনীয় হন ; যে সংসারী বিবাহ না করেন, তিনিও নিন্দাহ হন; আর যে
সাবিত্রী
পুত্র স্বামহীন। জননীর প্রতিপালন না করে, সেও নিন্দা-
ভাজন হয়ে থাকে । তুমি আমার এই কথা শুনে, যত
শাম্র পার, স্বামীর অন্বেষণ কর। যাতে আমি দেবগণের
নিন্দনীয় না হই, তাই কর। আজই শুভদিন। আমি
তােমার যাত্রার উপযােগী বাহনাদি আয়ােজন ক’তে
আদেশ প্রদান করি।
সাবিত্রী । কোথায় যেতে আদেশ করেন ?
তােমা; ধৰ্ম্ম যেখানে তােমায় আকষ্ট করে নিয়ে যাবে,
সেই খানেই যাবে। ফল কথা, স্বামীর সংবাদ না গ্রহণ
করে তুমি আর ঘরে ফিরে না। যদি অকৃতকার্য হও,
তা হলে মদ্র বংশের সঙ্গে সম্বন্ধ জন্মের মত পরিত্যাগ
সাবিত্রী ।
যথা আজ্ঞা।
( পুরবাসিনীগণের প্রবেশ • গীত।)
তবে য{ও তাৰে যাও আসিতে।
একা চলে সরলে খুগলে ফিরিতে।
ব্যধি গলে গলে বাহুলত-হারে,
অচেনা দেশ হতে কান ধরে তরে,
সে প্রিয় মােহন মন মোহিতে --
সুখ-দারিদ-প্লাবিত হয়ে ভাসিতে
দ্বিতীয় অঙ্ক।
*,।।।।। ** । । । ।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য-পথ ।
তুম্বরু ও মালিনী।
তুম্বরু। দেখ, দেখি বউ, কি কলি ! রাজকুমারী বনবাসে
চলেছে বলে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্ত হয়ে ছুটে এলি, এখন
কোথায় এসে পড়লি বল দেখি। অার পথ চিন্তে
পাছিনি।
মালিনী। কি ক'ব ? অামি স্ত্রীলোক, চলেই না এসেছি;
তুই পুরুষ মানুষ, তুই পথ ঘাট চিহিনি ---তা আমি কি
ক’?
তুম্বরু ! বেশ, আর্ম তণে পথের মাঝখানে দু’জনে হাত পা
মেলিয়ে মনি।
মালি না; দিদিরাণী যে দণ্ড থেকে আমাদের ত্যাগ করে
এসেছে, সে দণ্ড থেকে আমরা কি বেঁচে আছি ! তা
আর মরণের ভয় দেখাচ্ছি কি ? ভয় হােগে তাের।
আমি ত তােকে রেখে মরতে পারলে বঁচে যাই ।
তুম্ব রু। ভারি সুবিধার কথাটাই কইলি ! ক্ষিদে নাড়ী ঝ ঝ।
করছে~-তেষ্টায় প্রাণ টা টা করূছে, তার ওপর অর্ধেক
রাজ্যটা পৈতুম, সেটা হলো না বলে মন খাঁ খাঁ করূছে।
নিজে নিজেকে নিয়েই নড়তে পারছিনি, এমন সময়
সাবিত্রী। A raA তুমি মলে এই সারা পথটা তােমায় কঁাধে করে নিয়ে বেড়াই। ভারি সুখের কথাই কইলি বউ। মালিনী। বলিস্ কি মিসে, এত দয়া! তুম্বুরু। না বউ, মরবার কথা বলিনি। অনেক দিন তাের মিষ্টি মিষ্টি গালাগালি খাইনি। গালাগলের সাধ এখনও অামার মেটেনি। আগে দিদিরাণীকে খুঁজে বার করি, তার পর মতে হয় দুজনেই এক সঙ্গে মারা যাবে। এখন ক্ষিধেয় মরি তার কি ? সঙ্গে করে কতক গুলাে চিড়ে এনেছিলি, দে না। মালিনী। শুধু চিড়ে কেন হাড়ের মতন চিবিয়ে খাবি, একটু অপেক্ষা করু-পথের ধারে আসতে আসতে একটা গরু চতে দেখে এলুম-রােস্ সেইটেকে টেনে এনে দিই। তুম্বরু। যা, তা হলে আর দেরি করিনি। করিনি। ( মালিনীর প্রস্থান না বাবা, আর নয়, চেষ্টার চূড়ান্ত হয়েছে । রাজা রাজকুমারীকে এক রকম বনবাসেই দিয়েছে। বর মেলে ত দিদি রাণী দেশে ফিরবে, নইলে আর তাকে দেখতে পাব না। বউ তা হলে আমার আর দেশে ফিছে না। সে নিত্যি নিত্যি রাজকুমারীর শিবপুজোর ফুল যুগিয়ে এসেছে। তার এতদিনের ফুল যােগান বৃথা হলো। দিদিরাণীকে দেখতে না পেলে সে কি বাচবে ? —অমনিতেই ত সে আধমরা হয়ে আছে। আর অমন বউ গেলে কি ছাই আমিও আর বাব! আহা বউ ত নয় -যেন পৈতৃক বউ! দরদ 'কি !– মায়া কি !—যা বাবা, ভাবলে আর জ্ঞান থাকে না। কাজেই বউ যত-
As://•••• vna3A1%
ক্ষণ না আসে, ততক্ষণ এই চিড়ে কটার সাহায্যে একটু
অন্যমনস্ক হয়ে যাই। ও বাবা–আবার সেই মাভৈঃ
এদিকে আসছে যে! লুকুবাে এমন জায়গাও ত নেই, কি
করি ?. ও বাবা! এসে পড়লো যে। তা হলে কি করি?
দূর ছাই, কি আর করব, তা হলে এই করি— চিড়ে
ভক্ষণ)।
( মাণ্ডব্যের প্রবেশ )।
মাওব্য। মা আমার শুভক্ষণে পতি-অন্বেষণে গৃহ থেকে যাত্রা
করেছেন। মায়ের স্বামি-সম্মিলন যতক্ষণ না দেখ
পাচ্ছি, ততক্ষণ কিছুতেই প্রাণে শান্তি পাচ্ছি না। একি!
কে তুমি? পথের ধারে-গাছের তলায়—আধ আঁধারের
ভেতর বসে, কে তুমি?
তুম্বরু। ধরেছে, ঠিক ধরেছে। সুমুখে পেছনে চোক, ওর
হাত এড়িয়ে যাবার যো কি।
মাগুব্য। কে তুমি? কথা কচ্ছনা কেন ?
আমি।
মাগুব্য। আমি কে?
তুম্বরু। চিনে নাও।
মাওব্য। নাম কি ?
তুম্বরু। রাস্তা বন্ধ-গলা দিয়েমি বৈরুবার পথনৈই।
মা ওব্য। সে কি রকম ?
তুম্বরু। আজ্ঞে, খাওয়া' চছে দেখে, কথাগুলো আবার
সুবিধে পাচ্ছে না।
সাবিত্রী।
মাণ্ডব্য। তা হলে এতগুলাে কথা এলাে কি করে?
তুম্বরু। আজ্ঞে, কতক গুলো পিছলে এসেছে, আর কতক গুলাে
ঠোঁটের ডগায় এসে বসেছিল, ঠোট নাড়তেই বেরিয়ে
পড়েছে।
মাওব্য। আর কেওতুম্বরু !
তুম্বরু। আজ্ঞে, আর তুম্বরু নেই, এখন ডুগডুগি।
মাওব্য। সে কি রকম?
তুম্ব। আজ্ঞে, প্রাণের তার ছিড়ে এখন বেসুরো মেরে
গেছি দেবতা।
মাণ্ডব্য। ত রাজকুমারীর বরের সন্ধানে গিয়েছিলে ?
তুম্বর। আজ্ঞে গিয়েছিলুম।
মাওব্য। তার পর ?
তার পর এই চিড়ে খাচ্ছি।
মাওব্য। চিড়ে খাচ্ছ কিপাত্রের সন্ধান পেলে না?
তুম্বরু। পাব না কেন, হাজার হাজার।
মাওব্য। তবে অমনি অমনি ফিছ কেন?
তুম্বরু। আজ্ঞে দেবতা, চিঁড়ের পক্ষে ধামিই ভাল, চিকে
পাত্রে বড় সুবিধে হয় না।
মণ্ডব্য। পাত্রের সন্ধানে বেরিয়ে দেশ বিদেশ ঘুরে, শেসে কি
এই চিড়ে নিয়ে এসে উপস্থিত ক'লে।
তুম্বরু। আর কি করি দেবতা? রাজকুমারীর বরাতে বর নেই
বলে কি আমাদের ক্ষিধেও থাকবে না।
মাতব্য। তা এখন যাচ্ছ কোথায় ?
তুম্ব। যেখানে দু চোক যায়।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
মাগুব্য। তা হলে বল বৈরাগ্য। কেন তােমার সংসারে কি
কেউ নেই?
তুম্বরু। সেকি দেবতা, থাকবে না কেন? আমার সংসারে
কেবল আমিই নেই।
মাণ্ডব্য। স্ত্রী পুত্র নেই ? .
তুম্বক। স্ত্রী! সধবা না বিধবা ?
মাওব্য। স্ত্রী--বিধবা।
তুম্বক
আজ্ঞে হাঁ দেবতা, আমার এক বিধবা স্ত্রী আছে।
মাওব্য। বিধবা স্ত্রীলােক বল।
তুস্থ,রু। আজ্ঞে না দেবতা,স্ত্রী। যে দিন থেকে তাকে ধরে
এনেছি, সেই দিন থেকেই তার গুণে মরে আছি।
স্বােয়ামী মরে গেলেই ত স্ত্রী বিধবা হয় দেবতা।
মাওব্য। তা হয়। কিন্তু অমন স্ত্রীকে যে একাকিনী ফেলে
আসতে নেই । তাতে যে পাপ হয়।
বল কি দেবতা ।
মাতব্য। স্ত্রী হচ্ছেন গৃহ-দেবতা-বংশজননী। তাকে পরি-
ত্যাগ আর জননী পরিত্যাগ দুইই সমান।
তুম্বরু। বল কি দেবতা। স্ত্রী জননী ?
মাণ্ডব্য। বংশজননী-কুলরক্ষত্রিী দেবী । জননীও যে বলতে
পারা যায়, এমন নয়। শাস্ত্রে বলছে-
পতির্জায়াং প্রবিশতি গর্ভে ভূহে মাতরং।
তস্যং পুনর্নবো ভূত্ব। দশমে মাসি জায়তে ।
আর বলতে হবে না দেবতা। শােনবামাত্রেই প্রাণে
আমার ভক্তি-রস পাক মেরে উঠছে।
তুম্বরু ।
4.
সাবিত্রী। An; 4, তুম্বরু । তুম্বরু । মণ্ডব্য। দেখ তুই, তােমার কাছেই আমি মায়ের সন্ধান পেয়েছি। তােমার এ মহােপকার আমি জীবনে বিস্তৃত হব না। তুম্বুরু, যদি গৃহত্যাগেই তােমার অভিরুচি হয়, তা হলে তােমার স্ত্রীকে নিয়ে আমার আশ্রমে চল। আমার বিশ্বাস, সেখানে তুমি রাজকুমারীকে দেখতে পাবে। তুম্ব রু। পাব দেবতা-দিদি রাণীকে দেখতে পাব ? মাওব্য। দিদিরাণীকেও পাবে, আর তার বরকেও পাবে। বল কি দেবতা। মাওব্য। শীঘ্র যাও, তােমার স্ত্রীকে নিয়ে এস। দেখাও দেবতা---দিদিরাণীকে দেখাও। রাজ্যলােভে দিদিরাণীর বর খুঁজতে গিয়ে বরও হারিয়েছি, দিদি- রাণীকেও হারিয়েছি বরের লােভে গেলে বরও পেতুম দিদিরাণীকেও হারাতুম না। দেখাও দেবতা,স্বামী স্ত্রীতে তােমার দোরে হত্যা মেরে পড়ে থাকবো। মাগুব্য। তা হলে আর বিলম্ব করো না। [ প্রস্থান। ও বউ, বউরে ! বউ আমার গর্ভভূহে মাতরং! ও বাবা, শাস্ত্র দেবতায় লিখেছে ; ওতে কি আর ভুল হবার যে আছে। মালিনীর প্রবেশ) আছ বউ-আছ ? ও বউ, বউরে ! মালিনী। কি হ’ল--কি হল ? বড় কি নয় বউ-বড় কি নয়। ইতিমধ্যে ভারি কাণ্ডকারখানা হয়ে গেছে। তার বড় 'উচু পায়া বই- বড় উচু পায়।। তুই আমার মহাগুরু। ম এ আকায়।
দ্বিতীয় অঙ্ক। ।।।।। 56. ( গীত ) তােমায় কি বলে ভাব বই । তুমি নাই যার নাই তার কেউ । অাটির ভিতরে তালের শাঁস, তার ভেতরে জল- - তার ভেতরে তোমার বাস, কল কল কল জলে টেও। (তুমি) বিরহ-কাননে মধুর ক— (কিন্তু) ঘরের ভিতরে ঘুঘুর ডাক, ধরা গলায় তুমি বিস্মিশাক, ভরা পেটে তুমি হেউ। মালিনী । ও মা, এ বলে কি! ক্ষেপে গেলে নাকি ? এক বার দাড়া বউ, তােকে একটা প্রণাম করে নিই। মালিনী। ও মা, এ মিসে করে কিগো ! তুম্বরু। শাস্ত্র বলেছে বউ-দেবতায় বলেছে। মালিনী। শাস্ত্রে কি বলেছে ? তুম্বুরু। শাস্ত্রে বলে--তুই আমার মএ আকার । মালিনী। এমন পােড়া কপালে শাস্ত্র কোথায় পেলি ? দেবতায় বলে দিয়েছে। বলে --তুই গর্ভ ভূহে মাতরং। দশমে মাসী জায়তে । অর্থাৎ এখন আছিস মএ অকার, আর দশ মাস পরেই হবি মাসী । মালিনী। শাস্ত্রে বলেছে? তুম্বুরু। মিথ্যা নয় বউ-শাস্ত্রে বলেছে। মালিনী। তাই ত ভাবি, জানা নেই শােনা নেই—পরের ছেলে -তার ওপরে এত মায়া হয় কেন ? শাস্ত্রে বলেছে।
; ৩৪ সাবিত্রী। নাও আর কষ্ট করতে হবে না। আর পথের ধারে থাকতে হবে না। নীলমণি আমার ঘরে চল। শাস্ত্রে বলেছে, তবে আর কি । আমার এতদিনের সাধ মিটে গেল। আঁটকুড়ী নাম খণ্ডন হয়ে গেল। একাধারে পতি-পুত্র ! নাও--দুধ এনেছি খাও। তুম্বুরু। ভক্তিরস খেয়েই পেট ভরে গেছে বউ--আর দুধ খেতে হবে না। নে এখন চল্। যে বাবা ঠাকুর তােকে আমায় চিনিয়ে দিয়েছে, তার ঘরে যাই চল্। সেখানে দিদিজাণীকে ও দেখতে পাবি, তার বরকেও দেখতে পাবি । মালিনী। বলিস্ কি ? তুম্বুরু। আর বলাবলি কি ? পতি পেলি, পুত্র পেলি, আজ তােকে একবারে চোদ্দ পুরুষ পাইয়ে দেব। টলে চ- চলে চল্। { গীত ) শেলো প্রেমের খনি। তুমিলে। আমার ম এতে আকার, অমিলো বাছনি। মালিনী। আগেই বুঝেছি , থামো থামো যাদু, বলতে হবে ন, এন লি প প । তুম্বুরু। তবে খাব আমি গরি ননী, গেছে চিড়ে খেয়ে ছিড়ে মুখখানি। মালিনী। তবে, আঁচল ধরে এস যাদু ঘরে, এস ধীরে চার নীলমণি ॥
দ্বিতীয় অঙ্ক। • * * * * * * ।। L. দ্বিতীয় দৃশ্য—কাননপথ'। কধুকী ও সাবিত্রী। কধুকী। একি করূলে রাজনন্দিনি ! মহারাজ তােমার সঙ্গে যান বাহন, ধন রত্ন, অসংখ্য অনুচর পাঠিয়ে দিলেন, তুমি সে সমস্ত ত্যাগ করে, এই দুঃখিনীর বেশে, পৃথিবী ভ্রমণ করতে চলে ? সাবিত্রী। ব্রাহ্মণ, আপনি মদ্রবংশে চিরহিতাকাঙ্ক্ষী। আমার বর্তমান অবস্থা ত আপনি সবই বুঝতে পারছেন। কি কৰ্তব্য, আপনিই আমাকে বুঝিয়ে বলুন না কেন। ককী। তুমি বুদ্ধিমতী-শাস্ত্ৰদর্শিনী, তােমাকে আমি কি বােঝাব মা? তবে তােমার এ অবস্থা দেখে, আমি প্রাণে কেমন করে ধৈৰ্য্য ধরি। সাবিত্রী। সপ্তাহ পরে আমার কি ব্যবস্থা হতে পারে, তা কি বুঝতে পেরেছেন ব্রাহ্মণ ? করুকী। ভবিষ্যতে কার কি অবস্থা হতে পারে, কেইব। বলতে পারে রাজ কুমারি ! অতি দূর ভবিষ্যৎ কেন, কালকের কথা আজকে ব’তে পারে, এমন ভবিষ্যদ্দশীই বা কে আছে ? সাবিত্রী। ব’তে পারুক আর নাই পারুক, সকলেই ভবিষ্য- তের অস্তিত্বে একটা না একটা বিশ্বাস আছে। তার সেই বিশ্বাসে আত্মনির্ভর করে মানুষে চিরদিনই কাৰ্য করে আছে। ভবিষ্যতে জ্ঞানী বলে প্রতিষ্ঠালাভ করবে বলে, লােকে বিদ্যা অর্জন করে। বংশরক্ষার } সাবিত্রী। AAAA0 জন্য পুত্র কামনা করে। দারিদ্র্যের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্য অর্থসঞ্চয় করে রাখে ভবিষ্যতের অস্তিত্ত্বে বিশ্বাস না থাকলে সংসারের পথে মানুষ কখনও এক পাও চ’তে পাত না। কঞ্চুকী। তবে কি মা তােমাকে সন্ন্যাসিনীর বেশেই থাকতে হবে, তােমার বিশ্বাস হয়েছে ? সাবিত্রী।, আমাকে বিবাহিত। দেখবার জন্য পিতা সমগ্র ভারতে পাত্রানুসন্ধান করেছেন, তথাপি পাত্র মেলেনি। রাজরাজেশ্বরের সন্তানগণের ভেতরে এমন কেউ নেই যে, আমাকে ভাৰ্য্যাত্বে গ্রহণ করে। কাজেই যোগিনী-বেশ ধারণ ভিন্ন আমার গত্যন্তর নাই। যদি স্বামী পাই, নিশ্চয় তিনি বনবাসী-সন্ন্যাসী! যদিই না পাই--যদি কুমারী অবস্থাতেই আমার ষােড়শবর্ষ উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তাহলে মদ্রবংশের সঙ্গে আমার এ জন্মে র মত সম্বন্ধ-বিচ্ছেদ। ককী। সম্বন্ধ-বিচ্ছেদ !- সে কি ! এ কি কেউ কখনও স্বপ্নেও মনে স্থান দেয় ? তুমি রাজা ও রাণীর নয়নস্বরূপ—জন- পদ বাসার প্রাণ-ব্রাহ্মণ গণের মন্ত্রস্বরূপ। বাৎসল্যে- মায়ায়-ধৰ্ম্মে,-তুমি যে সিংহাসন প্রতিষ্ঠা করে বসে আছ, স্বয়ং বিধাতাও যে তােমাকে সে সিংহাসন থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। সাবিত্রী। কিন্তু ঠাকুর, সর্পদষ্ট অঙ্গুলি লােকে হাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে। আমার ষােড়শ বৎসর উত্তীর্ণ হতে সপ্তাহমাত্র অবশিষ্ট। এই সময়ের মধ্যে, স্বামীর পাদ দর্শন যদি আমার ভাগ্যে না থাকে, তা হলে মদ্রবংশের
দ্বিতীয় অঙ্ক।
। 515 A+ +++ ।।
• • • NAA
কুলধৰ্ম্ম-রক্ষাৰ্থ আমিও পিতা মাতার কাছে এ মুখ
দেখাতে পাব না,-পিতা মাতাও কন্যাকে গৃহে স্থান
দিতে পারবেন না। বিধাতার ইচ্ছায় আমি বনবাসিনী।
বনবাসিনীর আবার যান-বাহনাদি ঐশ্বর্যের প্রয়ােজন
কি ? ওই সম্মুখে উপবন। ফলমূলাশী ব্ৰহ্মর্ষি রাজর্ষিগণ
ওই উপবনে অবস্থান করেন। ব্ৰহ্মৈখৰ্যে তঁারা ধনী।
সেখানে অকিঞ্চিৎকর রাজৈশ্বর্যের অভিমান নিয়ে যাওয়া
কেন? তরুলতাশ্রিতা, বনলতা কুসুম-ভূষণা ঋষিকন্যা-
গণের চরণরেণু-স্পর্শে ওই স্থান পবিত্র। ওরূপ স্থানে
পদব্রজে ভক্তিসহকারে প্রবেশই শাস্ত্র লঙ্গত। ব্রাহ্মণ,
অনুমতি করুন। আপনি অনুমতি না করলে ত আমি
এস্থান ত্যাগ করতে পারি না। আপনি পিতৃস্থলাভি
ষিক্ত। আপনার অনুমতি গ্রহণ ব্যতিরেকে ত আমি
এস্থান ত্যাগ করতে পারব না। ক’রুলে ধৰ্ম্মে পতিত
হব।
ককী! হা ভগবান, এই ক’রতেই কি বাড়ীথেকে বরাবর
মায়ের সঙ্গে সঙ্গে এলুম?
সাবিত্রী। প্রভু, চিন্তার সময় নেই। দুঃখ করে ফল নেই।
কধুকী। এ তুমি কি ব’ছ সাবিত্রি? আমি যে বাল্যকাল
থেকে তােমাকে বুকে করে মানুষ ক'রে এসেছি।
সাবিত্রী। মায়া-মায়া-জ্ঞানবৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ! মায়া পরিত্যাগ
করুন । সমস্ত সংসার এক মাত্র ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত।
মায়। সেখানে অদৃষ্ট-আকাশে, মানুষের তীব্র ভােগবাসনা-
স্বরূপ ঘনঘােরা কাদম্বিনীর গায়, চঞ্চল চপলার হাসিমাত্র।
সাবিত্রী ।
** ৭।।
-
জ্ঞানে নিবে নায়, অজ্ঞানতায় ঘন ঘন নূতন শ্রী ধারণ
করে মানুষের হৃদয় আকর্ষণ করে। মায়া-মায়া-
বড় প্রলােভন-মানুষকে দুর্ভেদ্য অন্ধকারে ফেলবার জন্য
মুহুর্মুহুঃ কম্পিত। বিজলী। ব্রাহ্মণ ! মায়া পরিত্যাগ
করুন, আমাকে পরিত্যাগ করুন, মদ্রবংশের একমাত্র
ভিত্তি-ধৰ্ম্মের দিকে লক্ষ্য করুন।
কধুকী। তবে আর আমি কি বলব মা!-হৃদয়ে একটা
পৰ্ব্বতের ভার নিয়ে ফিরে চলুম ।
সাবিত্রী। অশীৰ্বাদ করুন, ফিরে আপনাদের যেন চরণ দর্শন
কতে পারি।
কঞ্চ,কা। একান্ত মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, পিতার
মৰ্যাদা রাখতে-বংশের মর্যাদা রাখতে-শান্ত্রের মর্যাদা
রাখতে-তুমি যেমন এই অতুল স্বার্থত্যাগ দেখালে,
কায়মনােবাক্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি-মৰ্যাদা-
ময়ি ! তােমা হতে যেন সমগ্র নারীজাতির মর্যাদা রক্ষা
হয়। তা হলে আসি মা! তােমার আগমন-প্রতীক্ষায়
কাননের প্রান্তভাগে আমি এই সপ্তাহকাল পর্যন্ত যানাদি
নিয়ে অবস্থান করি।
[ প্রস্থান।
সাবিত্রী। পিতার আদেশ শুনেই চলে এসেছি। কোথায়
যাব, কি কব-কিছুমাত্র বিচার করার অবকাশ
পাইনি। এইবার বিষম পরীক্ষা! সম্মুখে গভীর বন--
বিভীষিকা দেখিয়ে আমাকে নিরস্ত করার জন্যই যেন,
চারিদিকে প্রকাণ্ড বাছ বিস্তার করে অর্ধগগনভেদী
গ
মস্তক সঞ্চালনে, আমার গন্তব্যপথের মহাবিপ্ন-স্বরূপ হয়ে দাড়িয়ে আছে সূর্যকিরণ প্রতিহত—সমস্ত পথ অন্ধ- কারে আচ্ছন্ন হয়েছে। এই পথে এখন আমায় একা চলতে হবে। সঙ্গে চিরহিতাকাঙ্ক্ষী ব্রাহ্মণ ছিলেন, কৰ্তব্যানুরোধে তাকেও পর্যন্ত নিরস্ত করূলেম। দেবতাকে দেখতে হলে ঐকান্তিকতার প্রয়ােজন। সন্সরহিত না হতে পালে সে একাগ্রতা আসে না। দেবতা দর্শনােদ্দেশে পথ চলেছি,-শাস্ত্রাদেশে নিঃসঙ্গ হয়েছি। তবে মন, আজ তুমি এত চিন্তাকাতর কেন ? প্রফুল্ল হও-ইষ্টদেবতার স্মরণ কর। পিতা মাতার আশীৰ্বাদ–দেবতা ব্রাহ্মণের আশীৰ্বাদ --বৰ্মস্বরূপ হয়ে তােমার অঙ্গের চতুর্দিকে বেষ্টন করে আছে। মা মদ্র: কুলের ইষ্টদেবী সাবিত্রি! তুমি স্বয়ং এই নির্জন বনপথে আমার পথপ্রদর্শিকা হও। (গীত। ভীষণ ঘন অধিয়ার। জানিনা কোথায় চলি, আলাে কি আঁধার চলিতে এসেছি চলেছি তাই, নিরাশে কি ভাসি কূল কি পাই, জানিতে নাই মা অধিকার ;- শুধু চলিতে এসেছি চলিয়া যাই অভয় চরণ কয়িা সার ( অক্ষিরার প্রবেশ ) । পিতা • বললেন-নবােদিত অরুণের কিরণমালা পুঞ্জীকৃত হয়ে জীবনময়ী পুত্তলিকামূৰ্ত্তিতে এই বন প্রান্তে সাবিত্রী। mina ~~~~~~~ বিচরণ করছে। কিন্তু কইকোথায়? এখনও যে আমি চারিদিক অন্ধকার দেখছি। আহা কি সুন্দর-- কি সুন্দর। বনবিলাসিনি। এই দরিদ্রা ভগিনীর প্রতি কৃপা করতে এসে, দ্বারসমীপস্থা হয়ে বিলম্ব ক’ছ কেন? অদূরে এই গভীর বনাভ্যন্তরে আমার পিতা মহাতপা মাওব্য মুনির আশ্রম। এস, তােমাকে সে স্থানে নিয়ে যাই। সাবিত্রী। আশ্রয়-রূপিণী কল্যাণ ! আমি অশ্রয়দান-যােগ্য। কি না, আপনি বিবেচনা করুন। অলি। তুমি ব্যজ্যেশ্বরীই হও, কি ভিখারিনীই হও-দেবীই হও কিংবা মানবীই হও—ব্রাহ্মণকন্যাই হও, কি চণ্ডাল- কুমারীই হও,-আমার আশ্রমসমীপে যখন নিরাশ্রয়ার মত বিচরণ কছ, তখন তুমি আমার ইষ্টদেবী। সাবিত্রী। দেবী- অলি। ভগিনী—দেবী কেন ?—এই ত তােমাতে আমাতে কি সম্বন্ধ, প্রকাশ করে বললুম্। তবে সাংসারিক জীবনের যদি একটু মধুর আস্বাদ অনুভব করতে আমাকে অনুমতি কর, তা হলে তুমিও আমার দেবী নও, আমিও তােমার দেবী নই। আমরা দুটী ভগিনী। আমি ব্রাহ্মণকন্যা—আর তুমি- সাবিত্রী। ক্ষত্রিয়নন্দিনী। অলি। সুতরাং আমি জ্যেষ্ঠা—আর তুমি কনিষ্ঠা। এস বােটী আমার ! কোন স্বপ্নরাজ্যের কোন স্বপ্নময় গগনের সােণার ফুল! ভূতলবতীর্ণ হয়ে কৃপা করে দ্বিতীয় অঞ্চ। তােমার দুঃখিনী ভগিনীটাকে দেখা দিতে এসেছ ! তােমায় কি আর আমি ছাড়তে পারি। এস, সঙ্গে এস। সাবিত্রী। ভগিনী! এ প্রাণ যদি তােমাকে দান ক’বার আমার অধিকার থাকত, তা হলে এখনি তােমাকে সৰ্বস্ব সমর্পণ করে, চিরজীবনের জন্য তােমার দাসীত্ব গ্রহণ ক’তুম। এরূপ আনন্দ আমি জীবনে কখনও অনুভব করিনি। কি বলব, আমি সঙ্কল্প করে ইষ্ট- দেবের মন্দিরে আমার এ প্রাণ-পুষ্প উপহার দিতে চলেছি। অলি। ভাল, আগে উৎসর্গ হােক, তার পর আমি না হয় দেব- তার দ্বারে এ পবিত্ৰ নিৰ্ম্মাল্যটী ভিক্ষা করে নেবো। এখন ত সঙ্গে চুল। ( গীত।) পথহারা শুকতারা তুমি মধুযামিনী-ফুল। মধু-বাতাসে এসেছ ভেসে করেছ আকুল। ( প্রাণ মন ক'রেছ আকুল ) মুখ দেখে কঁাদে প্রাণ, জাগে অতীতের গান, দূর তটিনীর সেই ছায়া ভরা কূল। { এস) বেঁধে আঁচলে, নে যাই চলে, জীবন ভরা ভুল।
82
সাবিত্রী।
• ''।।। ।। ।। ।।।।।।।।।
• AA
তৃতীয় দৃশ্য—তপােবন-সান্নিধ্য।
তাপস-কুমারগণ।
১ম তা, কু। দেখ
দেখ ভাই, অজ অধ্যয়নের দিন। সুতরাং
যখন আচার্য্যগৃহে পাঠ নাই, তখন সকলে মিলে কিঞ্চিৎ
কিঞ্চিৎ ফল সংগ্রহ করা যাক। যেহেতু শাস্ত্রে বলেছে
--ব্যাকরণের সুত্রাদি দ্বারা ক্ষুধারূপ দুস্তর সাগর পার
হওয়া যায় না।
২য় তা, কু। তাতে কিঞ্চিৎ হস্তপদ সঞ্চালনে বৃক্ষরােহণ
ক’রূতে হয়। আর পক্ক হরীতকী, বিভীতকী, আমলকী
দাড়িম্ব ইত্যাদি ফল-বদন ব্যাদন করত তন্মধ্যে নিক্ষিপ্ত
ক’তে হয়। তার পর একটা বার কোনও প্রকারে
উদর মধ্যে প্রবিষ্ট করতে পারুলেই
সকলে। দুস্তর। ক্ষুধা-সাগর পার।
১ম তা, কু। হঁ হক’রলে কি-ক'লে কি
একটা
ব্যাকরণদুষ্ট। কথা কয়ে ফেললে !–সাগরকে দুস্তর।
বলে ফেললে !
২য় তা, কু। সৰ্ব্বনাশ ! ব্যাকরণ-দোষ? ব্যাকরণ-দোষে সৰ্ব্ব
নষ্ট-কাব্য নষ্ট, বিজ্ঞান নষ্ট, ক্ষুধা নষ্ট। ব্যাকরণ দুষ্ট।
রসনা দিয়ে ফুল , আস্বাদন করলেই অগ্নিমান্দ্য, অন্ন,
অজীর্ণ, উদরাধান, বিচিকা-
১ম তা, কু। এমনকি, সূতিকা পৰ্যন্ত হতে পারে।
সকলে। বেশ! তবে আমরা দুশুর ক্ষুধা-সাগরের এপার।
-
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪৩
১
২য় ত, কু। ওহে ভাই, তা হলে কিং কৰ্তব্য ?
১ম তা, কু। কোন বনে প্রবেষ্টব্য।
২য় তা, কু। আমি বলি কি, আজ আর বনে প্রবেষ্টব্য নয়।
আজকে চল কোন প্রতিবাসীর আশ্রম-বৃক্ষে।
১ম তা, কু। সে কি ! তাতে যে অপহরণ করা হবে।
২য় তা, কু। আগে হলে অপহরণ হত। এখন গুরুগৃহে যে
শিক্ষালাভ করেছি, তাতে অপহরণ আর হতেই
পারে না।
১ম তা, কু। কি শিক্ষা লাভ করেছ বল।
২য় তা, কু। শাস্ত্রশিক্ষা।
১ম তা, কু। বল-বল, এমন শাস্ত্র কথা শুনলে সদ্য ফললাভ
করা যায়।
সকলে। শুধু ফল ? ফলানি। যথা—ফলম্ ফলে ফলানি। ইতি
বিদ্যাসাগর।
২য় তা, কু। তবে বলি শােন, শাস্ত্রটা গুরুমুখেই শ্রবণ কর।
হয়েছে।-এক দিন অামার আচাৰ্য পথে যেতে যেতে
একটা বৃক্ষে একটা সুন্দর কঁাটাল ফল পকাবস্থায় দেখতে
পান। যেমন সেই পক ফল দশন, অমনি তার রসনায়
জল সঞ্চরণ। আমাকে আদেশ করলেন-বৎস, ক্ষুধা
প্ৰবলা, জঠর-জ্বালা নিবারণ করতে তুমি সত্বর ঐ বৃক্ষা-
রােহণ করে কন্টাল ফলটী আনয়ন কর। আমি বললুম
-প্রভু ওটা যে পরের সামগ্রী। এই কথা না শুনেই
প্রভু ক্রোধে অগ্নিস্ফুলিঙ্গবৎ হয়ে, রােষ কষায়িত-লােচনে
আমাকে বললেন—ওরে মুখ ! এ সংসারে সব আপনার,
স
৪৪ সাবিত্রী। ।।। ।। । । । পর কে? তুই যদি সত্বর ঐ ফল না পেড়ে নিয়ে আসিস, তা হলে তৎক্ষণাৎ তােকে ভস্মীভূত ক’ব। কি করি, ভয়ে ভয়ে কাটালটী পেড়ে আনয়ন কলেম। প্রভুও অমনি ধ্যান-নিমীলিত চক্ষে সেই কাটলটা-কোষ, ভুতুড়ি, মায় আটীগুলি পর্যন্ত—সৰ্বসমেত উদরস্থ করে ফেলেন, আর বলতে লাগলেন—“অম্বং নিজ পরে। বেতি গণনা লঘুচেতসাং।” এ আমার, ও, এ আমার, ও, পর; এসব লঘুচিত্ত লােকেই বলে থাকে। “উদারচরিতানান্তু বসুধৈব কুটুম্বকং।” যে সব লােক উদার, তাদের পৃথিবী- শুদ্ধ লােক কুটুম্ব। সেই অবধি তাঁর প্রিয় শিষ্য ও যৎ- সামান্য উদারচরিত হতে আরম্ভ করেছেন। আজ কয়দিন ধরে বড়কুটম্বদের উদ্যান থেকে কাটাল, পেয়ারা, রসাল—এই গুলো দিয়েই উদরের জ্বালা নিবারণ করে আসছেন। সকলে। সাধু-সাধু-মহাজনাে যেন গতঃ স পন্থা। ১ম তা, কু। এস আমরা সবাই মিলে আজ সেই পথই অবলম্বন করি। ২য় তা, কু। ওহে ভাই! দেখ দেখ, এক দম্পতী এদিকে আগমন করছেন। ১ম তা, কু। সত্যই ত হে-এক জায়াপতী-জম্পতী বা দম্পতী। সকলে। ইতি নিপাতনৎ সাধু। ২য় তা, কু। সুতরাং ওঁরা যখন নিপাতনে সিদ্ধ হয়েছেন, তখন নিশ্চয়ই সাধু।
বিতীয় অঙ্ক
৪৫
সকলে। সাধু সাধু-
১ম তা, কু। তবে এস আমরা সসম্রম ও সলজ্জ হয়ে দণ্ডায়-
মান হই।
(তুম্বরু ও মালিনীর প্রবেশ)
তুম্বুরু। বুঝতে পেরেছিস্ বউ, আমারা কোথায় এসেছি ?
এই হচ্ছে সেই দেবতার আশ্রম।
মালিনী। প্রণাম কর। বল--- বাবা আশ্রম ! আমি মা ষষ্ঠীর
দাস, আমায় বাঁচিয়ে রাখাে । ওগাে কারা সব ওখানে
দাড়িয়ে আছে দেখনা। ঐ বুঝি দেবতারা গে !
তুম্বুরু। দেবতার বাচ্ছা! ভয় নেই, এগিয়ে চল্। হাঁ দেবতা,
বাবা ঠাকুরের আশ্রম এখান থেকে কতদূর?
১ম তা, কু। বাবা ঠাকুর। তার আশ্রম !
২য় ত, কু। বাবা ঠাকুর! তিনি ত চিরকালই গাছের তলায়
বাস করেন।
সকলে। বেল-তলায় সন্ধান কর।
মালিনী। ওগাে এই যে বেশ সুপাত্র রয়েছে। এদের ভেতর
থেকে এক জনকে জিজ্ঞেস কর না। দেখ না, যদি
দিদিরাণীর বর এর ভেতর থেকে মেলে।
তুম্বুরু। ভাল কথা মনে করে দিয়েছি বউ। জিজ্ঞেস ক—
জিজ্ঞেস কর্।
মালিনী। আমি যে লজ্জাশীল। ও বাবা, আমি কেমন করে
ব’!
তুম্বুরু। ভয় নেই—ভয় নেই—আমি তােকে নির্লজ্জা করে
}
০
১৬ সাবিত্র। * * * * « ০ + ! * * * * * * * দিচ্ছি। দেবতা, অধীনের একটা নিবেদন আছে। এই যে আমার সঙ্গে মেয়েটা দেখছেন- আমি এটীর বর। ১ম, তা, কু। আর ওটী তােমার কন্যা ? তুম্বুরু। আজ্ঞে সেটা আমি কেমন করে বলব দেবতা। আমি মুরুক্ষু-শাস্তর জানি না। শাশুরে যদি বলে, তবে তাই। ১ম, তা, কু। অবশ্য—ব্যাকরণ শাস্ত্র এ বিষয়ে তন্ন তন্ন করে বলেছে। ২য়, তা, কু। যথা—পিতা মাতা, ভ্রাতা ভগিনী – বর কন্যা। সকলে । আজ আই, বলদ গাই। ১ম, তা, কু। তা যা হােক, হা সাধ্বী মালিনী। আজ্ঞে দেবতা, আমি সাধ্বী নই—মালিনী। সাধ্বী আমায় পি শাশুড়ী। ২য়, তা, কু। বেশ বেশ! তা আপনার এ পথে কোথা গন্তব্য। তুম্বুরু। কোন বিশেষ জায়গায় যে গন্তব্য, তা নয়। ১ম, তা, কু? তা হলে ইতস্ততঃ ভ্রমণশীলা। সকলে। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তুম্বুরু। । দেবতা, আপনাদের একটা কথা নিবেদন করব ? সকলে। তুম্বুরু। আপনারা কি বিবাহ করেননি দেবতা ? ১ম, তা, কু। কি! আমরা বিবাহ করিনি। ২য়, তা, কু। বিবাহ ! কোন বিবাহ ? বি পূৰ্ব্বক বহ ধা; ঘ,? তুম্বুরু। আজ্ঞে ৰং কি ঘড় ঘড়,, তা জানিনা। তবে–বিবাহ
দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪৭
আমরা বিবাহ করিনি।
সকলে। অষ্ট প্রহরই বিবাহ করছি। আমরা বিবাহ করিনি ।
২য়, তা, কু। গুরুগৃহে যা পাচ্ছি, তাই বিবাহ কছি ।
১ম, তা, কু। সাত দিন ধরে বৃদ্ধা পিতামহীকে বিবাহ করছি ।
এই ত তােমার ভাৰ্য্যা পথভ্রান্ত। তুমি বল, এখনি
আমরা সবাই মিলে ওঁকে বিবাহ করে, ওঁকে আশ্রমে
নিয়ে চলে যাই।
মালিনী। ওরে মিসে !
তুম্বুরু। হা হা--বুঝেছি, আর কেন ?
সকলে। তাই ভাল, এস সকলে আজ পুণ্য সঞ্চয় করি। এস
সকলে মিলে একে বিবাহ করে ফেলি।
! মালিনী! ও মিসে! এ কোথায় এনে ফেল্লি ?
তুম্বুরু। রক্ষা কর বাবারা—আমি নিজে আবার বিবাহ ক’ছি।
আয় বউ, পালিয়ে আয় ।
সকলে। সলজ্জা ভীত চকিতনয়না পলাতিকা।
[ সকলের প্রস্থান।
{ মাণ্ডব্যের প্রবেশ )
মাওব্য। মায়ের অন্বেষণে যেমন আমি অস্থির হয়ে সমস্ত
সংসার পরিভ্রমণ করে বেড়িয়েছি, তেমনি মা আমার
পতি-দেবতার অন্বেষণে অস্থির হয়ে সন্তানের আশ্রমে
ছুটে এসেছেন। পাছে ব্যথা লাগে বলে, যে পায়ে
রক্তচন্দনচর্চিত জবাকুসুম অতি সাবধানতার সহিত
অঞ্জলি দিয়েছি, সেই চরণ আজ আশ্রমপথকণ্টকে ক্ষত
৪৮
সাবিত্রী।
AA WA
বিক্ষত ! শিরীষ- কুসুমের ন্যায় কোমল শষ্যায় শয়ন
করে ও যে মায়ের অঙ্গ নিপীড়িত হয়েছে, তিনি আজ
পৰ্যটনশ্রমে কাতর হয়ে তরুতলে ধূলি শয্যায় শয়ন
ক’বার জন্য ব্যস্ত হয়ে বেড়াচ্ছেন ! বেশ হয়েছে-বড়
সন্তুষ্ট হয়েছি। হবে না-কষ্ট হবে না! ঐচরণের দর্শন
দিতে তুমি যেমন সন্তানগণকে অনন্ত কাল ধরে কষ্ট
দিয়ে আছ, তার ফল পাবে না। ইষ্টদেবতার অনুসন্ধানে
মানুষকে কত কষ্ট পেতে হয়, তা একবার বােঝ। কত
যােগীন্দ্র মুনীন্দ্র আজীবন ধ্যান করে, অনাহারে, দেহকে
শুক--এমন কি, বল্মীক স্তুপে পরিণত করেও তােমার
দর্শন পায় না। নরদেহ-ধারিণি ! দেহীর সে দারুণ কষ্ট
একটু হৃদয়ঙ্গম কর। দেখে একটু সমবেদনার আনন্দ
অনুভব করি।
(সাবিত্রীর প্রবেশ)
!
সাবিত্রী। প্রভু! ব’তে পারেন--এ স্থানে বিশ্রামযােগ্য স্থান
কোথায় পাই ? এ কি! আপনি! প্রভু! ( প্রণাম )
মাওব্য। কে ও-মা মদ্ররাজনন্দিনী
সাবিত্রী। ‘া প্রভু ।
মাওব্য। স্বামী-অন্বেষণার্থে এই স্থানেই এসে উপস্থিত হয়েছ ?
সাবিত্রী দেবতার অবস্থানযােগ আর স্থান কই ?
মাগুব্য। স্বামি-দর্শনলাভ ঘটেছে ?
সাবিত্রী! সত্বরেই ঘটবে, বিশ্বাস। এ দাসী সতীর আশ্বাস ও
আশ্রয় পেয়েছে।
দ্বিতীয় অঙ্ক। nam And A মান্তব্য। এত বিশ্বাস ? সাবিত্রী । সতী-ধৰ্ম্মেও যদি বিশ্বাস স্থাপন না করতে পারি, তা হলে কোন্ ধর্মে বিশ্বাস করি প্রভু! তা হলে কোথায় দেবতা—কোথায় শাস্ত্র ? ধৰ্ম্মনাশ কে করে ? অধার্মিকের শাস্তি কে দেয় ? তা হলে কুলধৰ্ম্ম-নাশভয়ে পিতাই বা আমাকে ত্যাগ করবেন কেন? আমিই বা পিতা মাতার মমতা ছিন্ন করে ঐশ্বৰ্য্যসম্ভোগের লীলাস্থল রাজপ্রাসাদ পশ্চাতে ফেলে, বনে প্রবেশ করব কেন ? ম্যৎব্য। মা ! চির-কৌমাৰ্য-ব্ৰতাবলম্বী সংসারী আমি। সতী-ধৰ্ম্মের মর্যাদা আমি কি বুঝব, তবে অনুমানে এটা বুঝতে পারি—যার রােষরঞ্জিত কমললােচনের কটাক্ষে, যিনি বিধাতা-সৰ্বজীবের সৃষ্টিকর্তা-সৰ্ব্ব- শক্তিমান্—সেই ব্রহ্মার পুত্র যজ্ঞ-সভাস্থলে—সর্বদেবতার সম্মুখে ছাগমুণ্ড লাভ করেছিলেন, তার কৃপায় তার আশ্বাসে কি না সাধিত হতে পারে ? তার অতিক্ষুদ্র প্রাণহীন কোমল অঙ্গের ভার এক দিন ধরিত্রীর ও অসহ হয়েছিল। তাই জগৎরক্ষার জন্য স্বয়ং নারায়ণ স্বহস্তে সুদর্শন চক্রে সেই অঙ্গ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। সেই এক একটী ছিন্ন অংশ ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হয়ে ভারত বর্ষে একপঞ্চাশৎ পীঠের সৃষ্টি করেছে। ধরণীর যে যে স্থান সতী-দেহ স্পর্শ করেছে, আজ সেখানে এক এক মহাতীর্থ। তাদের তাদের মৃত্তিকার কণায় কণায় পুঞ্জীকৃত ধৰ্ম্মরাশি।
সাবিত্রী।
ও
* ৬
সাবিত্রী। এমন স্থানে এসেও যদি ধর্মলােপ হয়, তা হলে
ধৰ্ম্মের লােপই—আমার চক্ষে মহাধৰ্ম্ম ।
মাগুব্য। তা মা, সেই সতী জননী আছেন কোথায় ?
সাবিত্রী। আমাকে দেখে তার যে আনন্দ হয়েছে, তাই তাঁর
পতিকে উৎসর্গ করতে, আমাকে এই স্থানে অপেক্ষা
ক’তে বলে চলে গেছেন। কিঞ্চিৎ ক্লান্তিবােধ হচ্ছিল
বলে কোন বিরামস্থানের অনুসন্ধান ক’ছিলুম।
মাওব্য। আপাততঃ
আপাততঃ ওই অশােক-মূলে কিছুক্ষণের জন্য
বিশ্রাম কর।
তার পর মা সাবিত্রি-ব’লতে পারি
না-এই অত্যল্প সময় পূৰ্বে তােমার নিকটে আতিথ্য
গ্রহণ করে এসেছি—সে রাজোচিত সেবা—আমি নিত্য
ভিক্ষান্নভােজী ফলমূলাশী সে ভােজনসুখ এক মুখে
কেমন করে বর্ণনা ক’ব মা! আমি তােমাকে
কি বলে নিমন্ত্রণ করূবে মা!
সাবিত্রী। আমি যে দাসী প্রভু।
মণ্ডব্য: বেশ, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি—অদ্যই তুমি
সফলকাম হও। তার পর আমার আশ্রমে গিয়ে প্রসাদ
প্রহণ কর।
সাবিত্রী ।
যথাঅজ্ঞা।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
২৫, vnA5AAAAAA
,rshava
চতুর্থ দৃশ্য--তপােবন।
অলিক্ষমা ও সনাতন।
অলি।
সনা। বলি, আর কতদূর আমায় যেতে হবে ?
অলি। আস্তে আস্তে। গােল করো না। হয়ে এলো এলাে
হয়েছে।
সনা। হয়ে এলো এলো করে ত একক্রোশ পথ নিয়ে এলে !
অলি। তাতে কি হয়েছে—অক্ষিরাকে যখন চোখে দেখনি,
তখন যে হাহুতাশে একদণ্ডে কত বিশক্রোশ মেরে
দিয়েছ ! এখন—এই সামান্য দেড়গজি ক্রোশ—এও তুমি
স্ত্রীর হাত ধরে আসতে পার না!
সনা। আরে গেল, আমার যে ফল পাড়া হ’ল না।
তবে এতক্ষণ ধরে পম্পা-সরােবর-তীরে কি ক’ছিলে ?
সনা। জল-হিল্লোলে নীলপদ্মের লীলা দেখছিলুম।
অলি। কেন, নীলপদ্ম দেখে ত্রেতা যুগের কথা মনে পড়ে
গেল নাকি? ওঃ! প্রভু একেবারে তন্ময়! চুল ধরে
টানি, তবু প্রভুর সাড় নাই। একেবারে নিশ্চল—নিষ্কম্প।
মাথা আর নড়ে না। , যেন মাথায় গন্ধমাদনের ভার ।
সনা। এ ত ভেলা বিপদ-ফল আনি।
অলি। গােল করো না-সঙ্গে চল—একেবারে পুণ্যফল
পর্যন্ত তােমাকে পাইয়ে দিচ্ছি।
সনা । বল কি ?
ও আর বলাবলি কি ?—তোমরা মজা করে খাটবে
খুটবে, আর আমরা একটু কষ্ট করে তোমাদের জন্য
অলি ।
সাবিত্রী। ** ** ** *** একটু পুণ্যসঞ্চয় ও যদি না করতে পারব, তবে শাস্ত্রে আমাদের সহধৰ্ম্মিণী বলবে কেন ? নাও—আর একটু খানি পা চালিয়ে চল। সনা। কোথায় যেতে হবে, না বলে, সনাতন শৰ্ম্মা আর পাদমেকং ন গচ্ছতি। অলি। যেতে হবে কেন ? কোথাও যেতে হবে না। সঙ্গে যখন আমি রয়েছি, তখন আর যাওয়া হল কোথায় ? গৃহিণী গৃহমুচ্যতে। আমার সঙ্গে পথে চলছ-সে ত ঘরেই আছ। প্রান্তরে তৃণশয্যায় আকাশ পানে চেয়ে গা ঢেলে পড়ে আছ—যেন স্বর্ণ অট্টালিকায় দুগ্ধফেননিভ শয্যার হাবুডুবু খাচ্ছ । গাছের ওপর তুড়ুক তুটুক করে লাফাচ্ছ—যেন নন্দনকাননের পারিজাত-কুঞ্জের দোদুল্য- মান ফল। সনা। আর তুমি সেই বৃক্ষের তলদেশে ভ্রমণশীলা রম্ভা। অলি। না—এই যে দেখছি তােমার দিব্য জ্ঞান জন্মে গেছে! আমাকে একেবারে অপ্সরা ঠাউরে ফেল্পে। হােক না সে ভুবনমােহিণীরা স্বৰ্ব্বেশা—তুমি কিনা তার সঙ্গে আমার তুলনা করলে তুমি কেন তার চেয়ে কোন পতিপরায়ণা চালিনীর সঙ্গে আমার তুলনা করলে না? যাও, তোমার সঙ্গে আর কথা কইব না। সনা। ক্রোধ করে না-ক্রোধ করো না-রূপে তুমি রম্ভা, হৃদয়ে বিশ্বেশ্বরীর প্রাণ। অলি। আবার রম্ভা---- সনা। মৰ্তমান, মৰ্ত্তমান-রাগ কর কেন? আমি কোথায়
দ্বিতীয় অল্প।
তােমার জন্য দূর বনে আহারের অন্বেষণে কত পরিশ্রম
করে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আর তুমি কিনা পতিবিয়ােগ-বিধুর
হয়ে মনের সাধে দেশবিদেশে পরিভ্রমণ কচ্ছ।
অলি। তবে কি তোমার প্রত্যাশায় ঘরের ভেতরে আশপথ
চেয়ে বসে থাকতে হবে ?
সনা। থাকবে না ?
অলি ।
কেমন করে থাকব প্রাণেশ্বর!—আমি যে পুটে
একছটাকে বিরহিণী। কাজেই একটুমাত্র বিরহ
পেলেই--গণ্ড,ষ-জলমাত্রেণ শফয়ী ফফরয়তে—অর্থাৎ
চারিদিকে কিলির বিলির করে ছুটে বেড়াই। গভীর
বিরহের অগম জলের রুই কাৎলা বিরহিণী ত নই যে,
কখনও কালে ভদ্রে সরােবরের মাঝখান থেকে—হুড়ম
করে একটা ঘাই মারবো।-নাও, চল—আর দূর
নেই।
যাক, গল্প করতে করতে-কথায় কথায়
অনেক দূরে এনে ফেলেছি। প্রভুর সখাটীকে অনেক
ক্ষণ সঙ্গীহার করেছি। দেখি সত্যবান্ সখার অদর্শনে
কতক্ষণ পম্পা-সরােবর-তীরে বসে থাকতে পারে।
এখনি তাকে আসতে হবে। চির-সত্যাশ্রয়ী মহাত্মা
দুমৎসেনের পুত্র সত্যপ্রিয় সত্যবান্ ভিন্ন সাবিত্রীর যােগ্য
স্বামী আর কে আছে ? আমার প্রাণ ব’ছে যােগ্য পাত্র।
পিতাও এ শুভ মিলন কার্যে সাহায্য করতে আমাকে
অনুমতি দিয়েছেন। প্রজাপতি। এ শুভকাৰ্য্যে আমার
সহায় হও। এ শিবপাৰ্ব্বতী-মিলন দেখে আমি জীবনকে
ধন্য করি।
৫; সাবিত্রী। r/A 0 \sh, wake৭৭৭ সনা। তবে সত্য কথা বলি অলিরা! সখাকে একলা পম্পাতীরে রেখে এসে কাজ ভাল করিনি। তুমি এত দূর আবে জানলে, তাকে সঙ্গে করে আনতুম। জানইত, তার পিতা মাতা স্বল্পক্ষণ মাত্র তার অদর্শনেই কাতর হন। এই জন্য দূরদেশে ফল আহরণ করতে নিষেধ করেন। অলি। তা জানি; কিন্তু পিতৃস্নেহই বল, আর মাতৃস্নেহই বল- কমলকহলারের লীলাস্থল—পশার তীর থেকে টেনে আনায়,-এ দুইটা যােগ্য আকর্ষণ নয়। তার শােভার প্রলােভন থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে—একটী সখী চাই। সনা। স্বস্থানচ্যুত-বনবাসী-অন্ধ রাজার পুত্রকে কোন্ রাজা কন্যা-দানে স্বীকৃত হবে অক্ষিরা ? অলি। আর আমি যদি একটী পাত্রী জোগাড় করে দিই ? সনা। অসম্ভব! তুমি বনবাসিনী-তুমি রাজাদের অভিমান বুঝবে কি ? অলি। যদি দিই । সনা। তা হলে অক্ষিরা! তোমাকে জটায় বেঁধে, মহেশ্বরের মতন আমি একবার ত্রিভুবন ঘুরে বেড়াই। অলি। বস, শুনে একেবারে অঙ্গ জল ! সনা। আহা! এ অঙ্গ কবে জল হবে অক্ষিরা ? তা হলে এ পুণ্য জলতরঙ্গ জটায় বেঁধে, ভাঙ্গড় ভােলানাথের মতন আমি চিরজীবন নেশায় বোদ হয়ে বসে থাকি। অলি। নাও, তামাসা রাখ। রেখে, একবার ওদিক পানে দ্বিতীয় অঞ্চ। ।। LAT চেয়ে দেখ দেখি । দেখ দেখি ওখানে-ওই দূরে মাল্য- বান্ পৰ্বতের অধিত্যকায়,--কি একটী অপূৰ্ব্ব সামগ্রী অবস্থান করছে। সনা। কই ? কোথায় কি ? কিছুই ত দেখতে পাচ্ছি না। অলি। দেখতে পাচ্ছ না! সেকি ?-ওই অশােক-তরুচ্ছায়ায় অবস্থিত। যেন মাল্যবানের গলদেশে নন্দনবিচ্যুতা সন্তানকের মালা ! দেখতে পাচ্ছ না? (সত্যবানের প্রবেশ।) সত্য। সনাতন-সনাতন—সখা! দেখেছ ? এমন অদ্ভুত প্রকৃতিলীলা আর কখুন কি দেখেছ ? সনা। কি সখা ? কোথায় সখা ? সত্য। পম্পাতীরে। অদ্ভুত-অদ্ভুত !-শীঘ্র এস ---দেখবে এস। সন। কি দেখবে? সত্য। ব’তে পারব না—কিছুই ব’তে পাব না। ভাষায় সে সৌন্দৰ্য্যবর্ণনার সংস্থান নাই। বল্লে বৈচিত্র্য ভেঙ্গে যাবে—শীঘ্র দেখবে এস।-কোথায় কিছু নেই— অকস্মাৎ পম্পা যেন এক নূতন প্রাণে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। পম্পার সেই অগণ্য শ্বেত শতদল কে যেন সহসা সিন্দুররাগে রঞ্জিত করে দিয়েছে। হিল্লোলে ঝঙ্কার—ভ্রমরে ঝঙ্কার-~পম্পাতীরের তরুলতা সহসা ফলিত ও কুসুমিত হয়ে অগণ্য পক্ষীর ঝঙ্কারে মুখরিত। অলি। শুধু এই ! এ ত আমরা গেলেও দেখতে পাই। আমি মনে করলুম-না জানি আরও কত কি দেখেছ ! শুধু এই দেখে উন্মাদের মত ছুটে এলে ?
সাবিত্রী সত্য। আর দেখেছি কিন্তু সে কি দেখলুম! সেই স্বচ্ছ পম্পা- হৃদয় আলো করে গভীর জলাভ্যন্তরে, অশােকমুল- সিংহাসনে ধ্যানস্তিমিত নেত্রা-অশিক্ষরে । আমি কি দেখলুম! অলি। বুঝি কোন দেবীমুর্তির ছায়া। সনা। এসব কি কথা সখা!—এসব কি কথা অক্ষিরা। একি! একি! সখা সত্যবান্ একি অদ্ভুত ! দেখ দেখ সহসা অকালে অশােক তরুমঞ্জরিত হয়ে উঠলো । সত্য। সেই সেই ! যেন দেখা--কত দেখা! দণ্ডে দণ্ডে—পলে পলে--অবিচ্ছিন্ন,মিলনে কত দেখা! কত মাখামাখি । দূরে—অতি দূরে—পৃথিবীর সীমার পারে-পূৰ্বাচল- শিখরে কত দেখা! সেই চিরমধুময়ী দামিনীলতা—কত মাখামাখি ! সনাতন-সনাতন-ভাই! কোথায় তুমি ? অলি। কি সখা ! দিভ্রম হয়ে গেল নাকি? সত্য। আমি কোথায় ? এখানে--এতদূরে ? কেন ? তুমি কোথায় ? এখানে–এতদূরে ? কেন ? অলি। কাকে ব’ছ সখা ? সনা। একি! একি! এ তুমি কি বলছ সখা ? সত্য। মােহিনী-মােহিনী ! কোন মহা প্রলােভনে মুগ্ধ হয়ে, সংসারের কঠিন মৃত্তিকায়, শশিকলা আবৃত করতে, এত দূরে চলে এসেছ ? [ প্রস্থান। সনা। ও সখা। ও সখা। কোথায় যাও ? কি হল? কি দ্বিতীয় অঙ্ক। insen d; ? অলি। এখানে দাড়িয়ে, সখা সখা করে চিৎকার করে হাত পা ছুড়লে কি হবে ? সঙ্গে যাও—ছুটে যাও-ধর। ব্যাপার কি সংবাদ নাও, প্রতিকার কর। [ সনাতনের প্রস্থান [ পট-পরিবানে। (মাগুব্যের প্রবে মাওব্য। অলিক্ষ-মা আমার ! দেখছ কি ? আমূলতে বিদ্রুমরাগতাম্রং সপবং পুষ্পচয়ং ং কুন্ত্যশোক। হৃদয়ং সশােকংনিরীক্ষ্যমাণ! নবযৌবনানীং৷ মূল থেকে আরম্ভ করে অকালে মুকুলিত অশােক কোন পুণ্যময়ী বরবর্তিনীর শুভাগমন সূচিত করেছে–একবার দর্শন কর। দেখ দেখ চারিদিক দেখ। করবীর-বন, জব-বন, কুল, মালতী, সেফালিকা নবপ্রফুল্ল পুষ্পভারে অবসন্না--যেন চারুরূপা বরাঙ্গনগণ বরণডালা মাথায় লয়ে, কোন নববধূর গৃহপ্রবেশ প্রতীক্ষায় দাড়িয়ে আছে! বিক্ষুব্ধ জলনিধির হৃদয়ােচ্ছাস, শুভ্ৰজলদমূর্তিতে সমস্ত মাল্যবান্ শৈলকে আবৃত করে, পৰ্বতনন্দিনীর মস্তকে ছত্রস্বরূপ হয়ে অবস্থান করছে ! দেখ মা- চেয়ে দেখ । অলি। পিতা! এ সমস্তই ত আপনার আনন্দময় বিশাল হৃদ- য়ের প্রতিবিম্ব।
৫৮ সাবিত্রী। AAMA , : মণ্ডব্য। যাও মা কল্যাণময় । চির-আকাঙ্কিতের ক্ষণিক দর্শনে অবসন্ন। মাকে আমার জাগরিত করে আশ্রমে নিয়ে এস। [ প্রস্থান। অলি । ( অগ্রসর হইয়া) সাবিত্রি-সাবিত্রি! উঠবেলা হয়েছে—আশ্রমে চল। সাবিত্রী।. (উঠিয়া ) চল ভগিনি-গুরুর পদারবিলে সৰ্বাঙ্গ অঙ্কিত করে জীবন সার্থক করি । পঞ্চম দৃশ্য-পথ । নারদ ও মাণ্ডব্য। নারদ। তাই ত বলি, সম্মুখে একটা অন্ধকারের জাল ফেলে কে আমার ভবিষ্যদৃষ্টি রােধ করে বসে আছে। ভুবনপালিনী--ত্রিসন্ধ্যারূপিণী—তুমি? পতিব্রতা-মাহাত্ম্য- প্রচারের জন্য মা আমার ধরায় অবতীর্ণ—মদ্ররাজগৃহে। প্রচ্ছন্নবেশে যােল বৎসর কুমারী মূর্তিতে অবস্থান করছেন। এ ষােল বৎসরের ভিতর একটা দিনের জন্য ও আমাকে কৃপা করবার অবকাশ পাননি। রাজা অশ্বপতির অস্তিত্ব পর্যন্ত আমার স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। পাছে আমি ভুলে কোন দিন এ পথে পদার্পণ করি ; পাছে কন্যাদায়গ্রস্ত রাজা, কন্যার পাত্রানুসন্ধানের জন্য আমাকে অনুরোধ করে বসেন। এবারে তােমারই দ্বিতীয় অঙ্ক। ++ অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন। মা এবারে পতিনির্বাচনের ভার তােমারই ওপর প্রদান করেছেন। মাণ্ডব্য! মায়ের চিরসেবক-গায়ত্রী-সাধক—তুমি আমার পরমাত্মীয়। সুতরাং 'যােগ্য ব্যক্তিতেই এ ভার সমর্পিত। আত্মীয়- প্রিয়-তপস্বি-প্রধান! তােমার এ সৌভাগ্য আমি নিজেরই সৌভাগ্য জ্ঞান করি। তাই বা কেন ? আমি নিজে এ ভার প্রাপ্ত হলে যত না আনন্দিত হতুম, তােমার পাওয়ায় তা হতে শত গুণ আনন্দ লাভ করিছি। যাক, এখানে আর বেটীর সঙ্গে দেখা করব না। দেখা, একেবারে তার পিতৃভবনে মদ্ররাজ সম্মুখেই করা যাবে। পথে আর তার গমনের বিঘ্নস্বরূপ হয়ে দাড়াব না। বৎস, কায়মনােবাক্যে আশীর্বাদ করি—তুমি সফলকাম হও। মায়ের কৃপায় আপনি এক বার শিবশক্তি-মিলনের অধিকার পেয়েছিলেন। দক্ষমুখে পতিনিন্দা শুনে যে দিন সতী অভিমানে দেহত্যাগ করেন, সতীবিয়ােগ- কাতর উন্মত্ত ভােলানাথকে প্রকিতিস্থ দেখবার জন্য, মায়ের অনুসন্ধানে আপনি একবার ত্রিভুবন পরিভ্রমণ করেছিলেন। সে দিন আপনার কি দিন !যে দিন নগেন্দ্র-কদরে কুসুমিত কুঞ্জবন মধ্যে সখীগণ-পরিবৃতা শিবাৰ্চন-নিরত। আনন্দময়ীকে আপনি প্রথম দর্শন করেন,“প্রভু, সেদিন আপনার কি দিন ! শৈলশিখরের সুধাহিল্লোলময় সরােবরতীরে অগণ্য-শ্বেত-শতদল পরিমল- নিষেবিতা কমলেশ্বরী নগেন্দ্ৰনন্দিনী অষ্টমবর্ষীয়া গৌরী যেদিন, দুৰ্ব্বা চন্দন বিল্বপত্র করপল্লবে—অর্ঘ্যগ্রহণ করে সাবিত্রী -নিমীলিত নয়নে শিব শিব শব্দে সমস্ত মেদিনী কল- ঝঙ্কারে মুখরিত করেছিলেন, বীণাধর! তখন আপনি আত্মবিস্মৃত জননীর সম্মুখে আত্মবিস্মৃত-চিত্ৰপুত্তলিকাবৎ নিশ্চল। স্মরণেই যে মহাভাগ, সৰ্ব্বশরীর রােমাঞ্চিত হয়ে উঠে। নারদ। ঋষিরাজ, তুমিই বা দেখতে বাকি রাখলে কই ? অভাগ্য আমি অভিমানান্ধ চক্ষে মায়ের সম্মুখে দাঁড়িয়েও যা দেখতে পাইনি,অতুল লাবণ্যময়ীর সে সময়ের সমস্ত সৌন্দৰ্য্য এইমাত্র তােমার মানসচক্ষের আয়ত্তীভূত হয়েছে। আমি তােমার কৃপায় আবার দেখতে পাচ্ছি যা তখন দেখিনি, তাও দেখতে পাচ্ছি। সেই বহু দূরের -যুগ যুগান্তরের-- ভক্তিবিনম্র। উমাশশীর জলভারাক্রান্ত নয়ন যেদিন শৈলশিখরে অমিয়-নিঝরিণীর সৃষ্টি করেছে —ঋষিরাজ, তােমার কৃপায় শত গুণ সৌন্দর্য্যে সে শােভা আমার মানসপটে অঙ্কিত হয়ে উঠেছে। তুমি ধন্য ! আবার বলি-তুমি ধন্য !! মণ্ডব্য। আমি আপনার শিষ্য—দাস । দেবর্ষি, যার নাম স্মরণে মানব হৃদয়ে ভক্তিরস প্রবাহিত হয়, আমি ভাগ্য- বশে আজ সেই আপনার শ্রীচরণ-সমীপে উপস্থিত। যদি কিছু দেখতে পাই, সে আপনার ওই শ্রীচরণেরই কৃপায় বই ত নয়। নারদ। ভাগ্যবান্, তুমি আঙ্গ প্রত্যক্ষ পরােক্ষে মায়ের চরণ দর্শন ক’ছ। শুধু তাই নয়,-আমি অষ্টমী গৌরীর ঘটকালী করেছি,তুমি যােড়শী অম্বিকার স্বামি-সম্মিলনে দ্বিতীয় অঙ্ক। a da ব্যবস্থা করছে। আমার সময়ে বেটী কচি আট বছরের মেয়ে -- চঞ্চলা-সংসারের কোন কথাই জানে না, বােঝে না; তােমার সময়ে বেটী ষােড়শী ধীরা গম্ভীরা জ্ঞানময়ী মাতৃরূপিণী। আমার সময়ে মা অফুটন্তু কমলকোরক । আর তােমার সময়ে মা আমার সহস্রদলে প্রস্ফুটিত ভুবনব্যাপি-সৌরভময়ী। আমার সময়ে যােগেশ্বর মায়ের অনুসন্ধানে সহস্ৰক্রোশ দূরে যােগাসনে উপবিষ্ট ; আর তােমার সময়ে যােগেশ্বরী নিজেই পতি-অন্বেষণে নিরতা। ঋষিরাজ, ঋষিরাজ, তবে আমাদের মধ্যে অধিক ভাগ্যবান্ কে ? মাগুব্য। আমি কি এ শিবশক্তি-মিলনের যােগ্য ঘটক নারদ। নিশ্চয় ; নইলে মা খুঁজে খুজে তােমাকেই বা এসে ধরবেন কেন ? ভক্তিরসের আধার-মায়ের প্রিয় সেবক --তুমি যােগ্য নও! তবে যােগ্য কে ? তা হলে ঋষিরাজ, আমাকে অনুমতি কর, আমি বিদায় হই। যখন এতদূরে এসেছি, তখন আর মাকে না দেখে কেমন করে ফিরব। মাকে দেখবার জন্য প্রাণ আমার বড়ই ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। মাওব্য। এ কথায় আমি আর কি বলব! আপনার সঙ্গসুখ- স্বর্গসুখ হতেও মধুর। দেবর্ষে ! সে যে চিরদিনের উপ- ভােগ্য সামগ্রী ! চিরদিন পাশে থাকলেও যে, এ সুখসাধ মেটাবার নয়। আপনার ইচ্ছায় বাধা দিই, আমার এমন শক্তি কি! তা হলে আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। [ প্রণাম ও প্রস্থান।
সাবিত্রী।
An/
( প্রস্থানেছত নারদ-সম্মুখে তুম্বরু ও মালিনীর
প্রবেশ। )
তুম্বুরু। বস ! এইবারে বেঁচে গেছিস, আর ভদ্র নেই। নে,
এইবারে এই ঠাকুরকে মনোযােগ দিয়ে প্রণাম কর্।
ঠাকুর দয়াময়,-তােকে এখনি এই গোলকধাঁধা থেকে
বার করে নিয়ে যাবে এখন।
মালিনী। বাবা ঠাকুর, প্রণাম হই।
[ উভয়ের প্রণাম।
নারদ।
কে তুমি ভদ্রে ?
মালিনী। না বাবা ঠাকুর, আমরা ভদ্রে নই—শূদ্রে।
নারদ। ভাল, তােমরা এখানে কি করতে এসেছ ?
তুম্বুরু। আজ্ঞে, আমরা ছুটোছুটি এসেছি
নারদ। ছুটোছুটি আমরা সবাই ক’তে এসেছি।
তুম্বুরু। যা-বল কি দেবতা ! তুমি শুদ্ধ, ছুটোছুটি ক’ছি !
নারদ। আমি শুধু কেন, সমস্ত সংসার ছুটোছুটি ক’ছে।
তুম্বুরু। মা-ও বউ ।
মালিনী। তাই ত গো! তা হলে আমাদের সংসার ?
তুম্বুরু। আর সংসার ! সে ত একখানা কুঁড়ে ঘর ; সে এতক্ষণ
ছুটোছুটি করে, কার পাদাড়ে হয় ত হাড় গােড় মুচড়ে
পড়ে আছে।
নারদ। কোথায় যাবে ?
আর কোথায় যাব! যে সংবাদ দিলে, তাতে ত যাবার
দফা রফা।
}
দ্বিতীয় অঙ্ক।
নারদ। ভাল, কোথায় যেতে চাও বল। আমি তােমাদের
সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি।
মালিনী। গিয়ে কি করব দেবতা! আমি অবলা,সংসারের
সঙ্গে ছুটতে পাব কেন ?
নারদ। (স্বগত) হেঁয়ালিতে কথা কইতে গিয়ে দেখছি বিপদ
করে বসেছি। ( প্রকাশ্যে ) তােমাদের যাতে না ছুটতে
হয়, তার উপায় করে দেবাে, এখন চল,—কোথায় যাবে
বল, আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাই।
তুম্বুরু। তবে মনের দুঃখের কথা বলি শােন দেবতা।-এই যে
এটীকে আমার সঙ্গে দেখছো, এটা আমার চৌদ্দপুরুষের
পিণ্ডির হাড়ী।
নারদ। সে কি ? এই না তুমি ওকে বন্ধু বলে সম্বােধন ক’রূলে?
সে ত চিরকালই ক’ব। তুমি বল্লেও ক’ব আর
না। বল্লেও ক’ব। বাবা আমাকে মৃত্যুকালে এই
সামগ্রীটা শুধু দিয়ে গিছলো। ব’লে গিছলো—এটীতে
বংশের পিণ্ডি রইলাে; খুব সাবধানে যত্ন করে রেখো-
যেন ভেঙ্গে ফেলো না। কাজেই ওটীকে পুত পুত্ করে
—শিকেয় তােলার মতন করে তুলে রেখেছিলুম।
এখন কোন কারণে এ দেশে এসে বড়ই বিপদে পড়ে
গেছি দেবতা।
নারদ। বিপদ!- মায্যের আশ্রম,এখানে বিপদ!
তুম্বুরু। ভয়ঙ্কর বিপদ দেবতা,ভয়ঙ্কর বিপদ ! আর ওই যে
দেবতার নাম করলে, সেই দেবতাই যত নষ্টের মূল।
সেই দেবতা কতকগুলো সম্পর্ক বউএর ঘাড়ে চাপিয়ে
৩৪
সাবিত্রী।
s, A; 6 ***
}
দিয়েছে ;-কচি বউ সে ভারী ভারী সম্পর্কগুলো সামলে
উঠতে পারছে না। বলে—‘গর্ভ ভূহে মাত—দশমে
মাসী। আবার তার ব্যাকরণ-পড়া চেলগুলো বউকে
আমার ধরে—এই বিবাহ করে ত, এই বিবাহ করে।
নারদ। তা হলে বিপদের কথা বই কি।
তুম্বুরু। এত তুচ্ছ বিপদ। শেষকালে শুনি, আমি এখানে এসে
অবধি বউএর প্রাণের সর হয়ে গেছি। আমি যখন সর
হয়ে গেলুম, তখন বউএর প্রাণ ত নিশ্চয়ই দুধ হয়ে
গেছে। চারিদিকে টকো কামরাঙ্গা গাছ-বউ কোন
দিন তলায় যেতে যেতে জমে যদি দই হয়ে যায়, কিংবা
আলগা প্রাণ-যদি বুনাে বেরালে চক্ চক্ করে কোন
দিন মেরে দেয়, তাহলে আমার দশা কি হবে
দেবতা!
নারদ। ভয় নেই, তােমরা আমার সঙ্গে চল।
তুম্বুরু। আমি চ'ম্লে কি হবে দেবতা! বউ কি আমার আর
চলতে পারবে।
নারদ। আমি এমন করে তােমার বউকে নিয়ে যাব যে, বউ
তােমার পথের কোনও কষ্ট টের পাবে না।
মালিনী। তা হলে কি বাবা ঠাকুর তুমিও আমাকে বিবাহ
করে নিয়ে যাবে।
তুম্বুরু। বাবা ঠাকুর কেনরে পাগলী! শুনলুম-বাবা ঠাকুরের
এক টেকি আছে, সেই তােকে বিবাহ করবে।
নারদ! বিবাহ ক’ব কি ?
তুম্বুক। তােমায় কি বিবাহ ক’তে বলতে পারি দেবতা!
দ্বিতীয় অঙ্ক। আমার সতী লক্ষ্মী স্ত্রী তােমার কাঁধে চাপিয়ে কি মেরে ফেলব। নারদ। ওঃ! বিবাহ। তুম্বুক্ত। আজ্ঞে, বি-পূৰ্বে দিয়ে বয়ের ধাতে ঘড় ঘড়। নারদ। ঘড় ঘড় ! তুম্বরু। আজ্ঞে, তারা বলেছিল ঘং; কিন্তু আমি এখন দেখছি ঘড় ঘড়র। মালিনী। আর ঘড়র ঘরও নেই দেবতা, এখন সাঁই সাঁই —ছুটোছুটি করে এখন গলা সাঁই সাঁই করছে। নারদ। বি-বাহ! বিশেষ প্রকারে বহন করে নিয়ে যাওয়া। মালিনী। হঁদেবতা! তোমার চেঁকিকে হুকুম কর, সে আমা- দের বিবাহ করে নিয়ে যাক। নারদ। সে যা ভাল বিবেচনা হয়, করা যাবে এখন। এখন কোথায় যাবে বল। তুম্বরু। মদ্র দেশে। নারদ। তােমরা কি রাজকুমারী সাবিত্রীর সঙ্গে এসেছিলে ? তুম্বরু। আজ্ঞে, সঙ্গে আসিনি। আমরা এসে দেখি রাজ- কুমারী এখানে ! সেই বাবা ঠাকুর, রাজকুমারী আর তার বরকে দেখাবে বলে, আমাদের এখানে আসতে বলেন। মালিনী। এসে রাজকুমারীকেও দেখলুম, আর তার বরকেও দেখলুম। কিন্তু বে দেখলুম না। কেবল মালা গেঁথে ঘুরে বেড়ালুম। নারদ। তােমরা মালাকার ?
সাবিত্রী।
5 + 4/
মালিনী। হঁ দেবতা, আমি আর আমার স্বােয়ামী—দুজনে
রাজকুমারীর শিবপূজার ফুল যােগাতুম ।
নারদ। বটে! তবে ত তােমরা ভাগ্যবতী ভাগ্যবান।
তুরু। আজ্ঞে আগে বাণ ছিলুম, এখন দিদিরুণীর ব্যাপার
দেখে তেউড়ে ধনুক হয়ে গেছি। বর দেখলে,আমা-
দেরও দেখলে ; কিন্তু বে করলে না!
মালিনী। আমাদের মালাও নিলে না।
নারদ। বােধ হয়, এখনও সময় হয়নি।
তুম্বরু। দেখ দেবতা, অভিমানে আর আমরা দিদিরাণীর সঙ্গে
কথা কইনি।
মালিনী। দিদিরাণী সঙ্গে যেতে অনুরােধ করেছেন, আমরা
যাইনি।
নারদ। মালা কি করলে?
মালিনী। দিদিরাণী যখন নিলে না, তখন করি কি, মালা সঙ্গে
নিয়ে চলেছি।
নারদ। কই দেখি। (মালিনীর মালা প্রদর্শন) বাঃ বাঃ।
এখনও ত অটুট রয়েছে মা!
তুম্ব। কি ! এ মালা শুকুবে? দিদিরাণী আর বরের নামে
গাঁথা মালা-এ মালা শুকুবে? তা হলে দিদিরাণীর মুখ
দেখবো না ।
মালিনী। কি। এ মালা শুকুবে? এ মালা শুকুলে আমরা
দুজনে জলে ঝাঁপ দেবাে না।
নারদ। না না, শুকুৰে কি ! সাগর শুষ্ক হবে, সহস্ৰ সূৰ্য্য
কিরণবিতরণে নিষ্প্রভ হবে, তথাপি তােমাদের রচিত
দ্বিতীয় অঞ্চ।
এ মালা শুকুবে না। দেখ মা, এখনও গলদেশে ধারণের
সময় হয়নি বলে তােমাদের দিদিরাণী এ মালা গ্রহণ
করেনি।
এক বৎসর পরে সেই সময় আসবে, তখন
চিরদিনের জন্য অটুট সৌরভে এই মালা তােমার দিদি-
রাণী ও তার বরের গলদেশে আশ্রয় করবে। এখন
আমার সঙ্গে চল।
[ প্রস্থান।
}
(গীত।)
পিরীতি লাঞ্ছনা অতি মনােব্যথা কারে কই।
তার, কাছে রাখ। দূরে থাকা কিছু না যাতনা বই।
রও যদি প্রাণ দূরে দূরে
প্রাণ জ্বলে বিরহ জ্বরে,
কাছে এনে রাখলে পরে হই তপ্ত খােলায় ভাজা খই।
মালঞ্চে কামিনী ফল, দূরে থেকে হয় প্রাণাকুল
ছুতে গেলে বেজায় ভুল, যেন পাকা ধানে মই ।
দেখতে যেন দুধের বাটী, সরপুরিয়া পরিপাটী,
হাতটী দিলে হওলাে খাটি, বাঘ তাড়ান টক দই।
}
-রাজবাটী।
ষষ্ঠ
দৃশ্য
নারদ ও অশ্বপতি।
নারদ। মহারাজ, তোমার গুণে দেব দানব গন্ধৰ্ব্ব সকলেই
মুগ্ধ ; আমিও যে তােমার ভক্তির দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে
তােমাকে দেখতে এসেছি, এতে বিস্মিত হবার কি আছে।
তুমি রাজর্ষি জনকের তুল্য নিষ্কাম সংসারী। রাজর্ষি
৩৮ সাবিত্রী। জনকের কাছে জ্ঞানশিক্ষার্থ আমি একদিন নারায়ণ কর্তৃক প্রেরিত হয়েছিলুম। সেই মহাত্মার কাছে আমি যে শিক্ষা লাভ করেছিলুম, আমি এতদিনের যােগ-সাধনায় তার শতাংশের একাংশ ও শিক্ষা পাইনি। সুতরাং তােমার এখানে আগমনে আমরাও যে কিছু স্বার্থ নেই, এটা বােধ করে না। মহারাজ! তুমি মহাপ্রাণ- যােগীরও পূজ্য। তােমার রাজ্য-ধৰ্ম্মরাজ্য, প্রজা - চিরসুখী, কালে পজ্জন্য বর্ষণশীল, পৃথিবী শস্যশালিনী-- চির শ্যামলা। স্ত্রী মালবী-যেন স্বয়ং সতী: জননী প্রসূতি। পুণ্য তীর্থের ন্যায়--তােমার রাজ্য-দর্শনেও পুণ্য সঞ্চিত হয়। অখ। বহু বৎসর আপনার এ দাসের গৃহে পদধূলি পড়েনি। নিজ গুণে আমাকে এই যে সুমিষ্ট বাক্য দ্বারা পরিতুষ্ট করলেন, আমি যদি এ সমস্ত গুণের কথা মাত্রেরও অধিকারী হয়ে থাকি, তাও শুধু আপনার চরণের কৃপায়। সুতরাং আমার গার্হস্থ্য জীবনে যদি কিছু ধৰ্ম্ম সঞ্চিত হয়ে থাকে সে সমন্তের অধিকারী আপনি। আমি আপনার চরণ ধ্যান করে সে সমস্তই আপনাতেই সমর্পিত করি, আপনি গ্রহণ করুন। কিন্তু এই পর্যন্ত গুরুদেব ! যদি রাজবংশে কিছুমাত্রও অধৰ্ম্ম স্পর্শ করে, অনুমতি করুন, শুদ্ধমাত্র আমি যেন তার ফলভােগ করি। দয়াময়, এইটা ভিক্ষা—এইটা দেখবেন—যেন আমার পিতৃপুরুষকে সে পাপ স্পর্শ না করে। নারদ। সে কি, তোমার বংশে পাপস্পর্শ ! আবার সে পাপের
দ্বিতীয় অঙ্ক।
কিনা তােমা হতে উৎপত্তি হবে ? এ যে অসম্ভব কথা
মহারাজ।
অশ্ব। প্রভু, আপনাকে উপদেশচ্ছলে কোন কথা কওয়া ধৃষ্টতা।
আপনি জানেন না,-এ কুথা মনেও বিশ্বাস করা
উন্মত্ততা। দয়াময়, মদ্রবংশে এক মহান্ অনর্থ সংঘটিত
হবার উপক্রম হয়েছে। ত্রিরাত্র মধ্যে আমাকে এক
দারুণ পাপ অধিকার করবে। এই আশঙ্কায় আমি বড়
ভীত হয়ে আছি।
নারদ। বলতে যদি আপত্তি না থাকে, তা হলে কথাটা কি
শুনতে পাই না কি ?
অশ্ব। কিন্তু ভয়-কেন ভয় ? আমার এই সঙ্কট সময়ে ভবভয়-
হারী স্বয়ং ভগবান্ আমার গৃহে। মােহান্ধ আমি, তাই
ভীত হচ্ছি। এই ভীতিপ্রকাশেই আমাতে পাপস্পর্শ
করছে।
নারদ। এমনি ভক্তিমান্ই তুমি বটে! মহারাজ, তােমার পবিত্র
হৃদয়ে যদি কখন পাপ স্পর্শ করে, আমার বিশ্বাস—সে
পাপ স্পর্শমাত্র সহস্র তীর্থ ভ্রমণরূপ মহাপুণ্যে পরিণত
হবে। কিন্তু মহারাজ! বিষয়টা কি, জান্বার ইচ্ছা
হয়েছে যে।
(বেগে মালবীর প্রবেশ।)
মালবী। মহারাজ! মহারাজ! সাবিত্রী আমার ফিরে আসছে।
কে ও-প্রভু !-দয়াময়!—আপনি? তাইত বলি, আমার
এ সৌভাগ্য কে আলে? আমার নয়নের নিধি-আজ
সাবিত্রী ।
AAAAA/
আবার আমার সংসার আনন্দময় করতে ফিরে আসছে।
আমার হারানিধিকে কে ফিরিয়ে এনে দেয়—কে তাকে
ফিরিয়ে আনালে। তুমি-দয়াময়—তুমি না হলে এ
অঘটন কে ঘটায়? আর ভয় কেন মহারাজ! স্বয়ং অভয়-
দাতা নারায়ণ আপনার সম্মুখে। কৃপাসিন্ধু ! কৃপা কর ;
এই দেখুন, আমার এই সুখের সংসার এতক্ষণ অন্ধকার
ছিল। যােগিরাজ তুল্য অটল অচল মহানুভাব হয়ে ও,
স্বামী আমার কন্যা বিয়ােগে বালকের ন্যায় দিবারাত্র
অশ্রুজল বর্ষণ ক’র ছিলেন। সেই আনন্দময়ী মা আমার,
আবার আমার ঘর আলো করতে ফিরে আসছে ।
কৃপানি ধান ! দয়া করে মদ্ররাজগৃহের চারিধারে তােমার
চরণরেণুর একটা গণ্ডী দিয়ে যাও,আর যেন কোনও
ক্রমে আমার ঘরে নিরানন্দ না প্রবেশ করে।
নারদ। কন্যা, কি বলছ ? নিরানন্দের কথা কি বলছ? আমি
ত কিছুই বুঝতে পারছি না মা।
মালবী। কেন প্রভু! জ্ঞানের চাপে ভিমরতি হয়ে গেছেন
নাকি ? সে দিন এক প্রভু এলেন, তিনিও কিছু জানেন
ন; আপনি এলেন, আপনিও কিছু জানেন না। অথচ
বিপদ বুঝে, একটা একটা করে ধীরে ধীরে এসে এখানে
পদধূলি দিচ্ছেন। বলি, সমস্ত জগতে জ্ঞান বিলিয়ে
নিজের জ্ঞানের ঘর খালি করে ফেলেছেন নাকি? তা
বেশ,বুঝতে পারুন আর নাই পারুন মন্ত্রীরূপে আমার
স্বামীকে দুটো একটা সৎপরামর্শও ত দিতে পারেন।
তাতে ত আর আপনার ভূত ভবিষ্যৎ বােঝবার দরকার
দ্বিতীয় অঙ্ক । * * * * * হবে না! দয়াময়! রক্ষা করুন। মন্ত্রণায়, আশীর্বাদে, দাস দাসীর হিতকর কাৰ্য্যে মদ্রবংশের ধৰ্ম্ম রক্ষা করুন। কন্যা আমার ফিরে আসছে-তিরাত্র অরণ্যবাস করে আবার রাজধানীতে ফিরে আসছে। শুভ সংবাদ কি অশুভ সংবাদ লয়ে ফিরে আসছে, তা বলতে পারি না। প্রাণ কঁপছে! একমাত্র নন্দিনী-কুলের প্রদীপ-স্বরূপ। তথাপি তাকে প্রত্যুদগমন করে আতেও প্রাণ কাপছে ! ভবভয়হারী! ভয় দূর করুন কিছুক্ষণের জন্য মাতৃ- হৃদয়ের, সন্তানজনিত আশঙ্কা উদ্বেগের সহস্র তরঙ্গ, আপ- নার বিশাল হৃদয়ে ধারণ করুন-সন্তানের জন্য মায়ের প্রাণ কি করে বুঝুন, বুঝে, অভাগিনী মাকে রক্ষা করুন । ভয় করূছে—আমার বড় ভয় ক’ছে-মাকে যে বক্ষে ধরে চুম্বন ক’, তা পরের কথা-মায়ের মুখের দিকে চাইতেও আমার সাহস হচ্ছে না। নারদ। মা আছেন –ওই সন্তানকে কৃপা করে দেখা দিতে আসছেন। আহা কি রূপ ! ষােল কলায় পূর্ণ হয়ে সুধাময়ি ! একি নিতুই-নব মােহিনী মূর্তি ধারণ করেছ ? পাগল ভােলাকে ভােলাতে তাের এত রূপ কেন মা! তিনি যে তাের রণরঙ্গিণী মূর্তি দেখলেও প্রেমানন্দে ধরায় বিলুণ্ঠিত হন! ( সাবিত্রীর প্রবেশ ।) মালবী। মা আমার! সম্মুখে তােমার মদ্রবংশের কুলগুরু- দেবর্ষি নারদ । অগ্রে তাঁকে প্রণাম কর । ( সাবিত্রীর প্রণাম।)
११ সাবিত্রী। '।।।।।।। নারদ। কন্যাটীকে কুমারী দেখছি না মহারাজ ? অশ্ব। হাঁ প্রভু! কন্য। আমার এখনও কুমারী। নারদ। এ কন্যা কোথায় গিয়েছিলেন, কোথা হতেইবা আগ- মন ক’রূলেন ? আর এমন যুবতী কন্যাকে তুমি স্বামী- হস্তে সম্প্রদান করছ না কেন? অশ। ইনি এই কার্যের জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন, সম্প্রতি এই আগমন ক'লেন। ইনি যে ভর্তাকে বরণ করে- ছেন, আপনি কন্যার কাছেই তার বৃত্তান্ত শ্রবণ করুন। মা আমার ! কি করে এলে না এলে, দেবষির কাছে বিস্তারিত রূপে বর্ণন কর । সাবিত্রী । পিতৃবাক্য আর দেববাক্য উভয়ই তুল্য। সুতরাং প্রতি গ্রহ না করলে ধৰ্ম্মে পতিত হতে হয়। দেব! পিতৃ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে আপনাকে নিবেদন করি, শ্রবণ করুন।-শাদেশে দুমৎসেন নামে বিখ্যাত এক ধৰ্মাত্মা ক্ষত্রিভূপতি ছিলেন। কালক্রমে তিনি অন্ধ হয়ে পড়েন। যে সময় এই ধীমান্ মহীপতির নয়ন বিনষ্ট হয়,তখন তার পুল নিতান্ত বালক। সুতরাং নিকটবর্তী কোন রাজা--পূৰ্ব্ব- শত্রু—এই ছিদ্র পেয়ে তার রাজ্য অপহরণ করে। রাজা মৎসেন ভাৰ্যা ও শিশু পুত্রকে সঙ্গে লয়ে বনে গমন করেন। এখন তিনি সেই মহাবনে অবস্থিত হয়ে মহাব্রত- নিষ্ঠ—তপশ্চারণ-পরায়ণ রাজর্ষি । তার পুত্র সত্যবান্, নগরে জন্মগ্রহণ করে ও তপােবনে ঋষিগণ মধ্যে তপস্যার আবরণে বর্ধিত হয়েছেন ; অতএব তিনিই আমার উপ যুক্ত ভর্তা জ্ঞানে আমি তাকে মনে মনে বরণ করেছি।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
And
মালবী। মা মঙ্গলচণ্ডী! ষােড়শােপচারে তােমার পূজা দেবে
মা! তুমি আজ মদ্ররাজের মুখ রক্ষা করেছে।
নারদ। মৎসেন-পুত্র সত্যবান্ ! তাকে বরণ করেছ! কি
করলে সাবিত্রী ! হায় হায় হায় ! মহারাজ, সাবিত্রী না
জেনে মহং পাপ করেছেন।
মালবী। সে কি দয়াময় । সাবিত্রী কি করেছে। হা সাবিত্রি
অভাগিনি! কি ক'রে এলি ?
অশ্ব। কেন দেবর্ষে ? সত্যবাকে জামতা করলে আমার
কৌলীন্যের কি হানি হবে ?
নারদ। তা নয় মহারাজ,-মৎসেনের তুল্য কুলীন রাজা
আর কে আছে ?
মালবী। তবে ?
অশ্ব। সত্যবান্ কি গুণহীন?
নারদ। তাও নয় মহারাজ,-সত্যবানের তুল্য গুণবান যুবক
আমি সমস্ত পৃথিবীর মধ্যেও দেখতে পাই না।
মালবী। তবে ? সত্যবান্ গুণবান্-কুলীন, তথাপি সাবিত্রীর
বরণের কথা শুনে আপনি হায় হায় করে উঠলেন কেন?
নারদ। সত্যবানের পিতা ও মাতা উভয়েই সত্য বলেন, পুত্র ও
সত্যাশ্রয়ী ; এই জন্য ঋষিগণ তার নাম রেখেছেন
সত্যবান্।
মালবী। তবে প্রভু! তার দোষ কি ?
নারদ। সত্যবান মহেন্দ্রের ন্যায় শৌৰ্যসম্পন্ন, বৃহস্পতির
তুল্য বুদ্ধিমান্, সূৰ্যসদৃশ তেজস্বী, পৃথিবীর ন্যায় ক্ষমান্বিত।
মালবী। এমন সদগুণযুক্ত স্বামী ত বহু তপস্যার ফলে পাওয়া
৭৪
সাবিত্রী।
AA
যায়, তবে মেয়ে আমার মহাপাপ করেছে-একথা
বললেন কেন?
অশ্ব। রাজঘােগ্য সমস্ত গুণই যখন তাতে বর্তমান, তা হলে
দেবর্ষে ! তার দোষ কি ?
নারদ। রাজকুমার দাতা, ব্রহ্মনিষ্ঠ, সত্যবাদী, রূপবান, মহানু
ভাব, প্রিয়দর্শন।
( অক্ষিরার প্রবেশ।)
অলি। বস্! তবে সে কেমন করে সাবিত্রীর বর হয় ।
নারদ। তাতে সারল্য নিত্য-প্রতিষ্ঠিত। মৰ্যাদাও নিশ্চল।
অলি। সাবিত্রী! ভগিনী! বেচে বেচে এমন মহাপুরুষকে ও
আত্মসমর্পণ করে এসেছ ! দেবর্ষি ঠাকুরকে এ কাৰ্য্যের
জন্য ঘটক নিযুক্ত করতে হয়। চিরদিন ওর যেমন
করে আসা অভ্যাস, এবারে ও তাই ক’তেন—তােমাকে
কোথা থেকে একটা ভস্মমাখা ভুতুড়ে বুড়ো বর যােগাড়
করে এনে দিতেন। এবারে ত আর সেটার সুবিধে
হ’ল না- চখের ওপর সােণার বিজলী নবজলধরে সংলগ্ন
হ’ল,-এও কি ওর প্রাণে সহ্য হয় ।
অশ্ব। একি মা ! কে তুমি ?
মালবী। সাবিত্রী !–সাবিত্রী!-মা আমার ! এই অপরূপ
তেজস্বিনী বালিকাটা কে? মায়ের মধুর কথায় আমার
হৃদয়ে আবার নববাৎসল্যের সঞ্চার হ’ল। সাবিত্রী ।
আজ যেন আমি আর এক টী নূতন সৰ্বশােভাময়ী কন্যা
লাভ ক’লুম । কে মা তুমি ?
দ্বিতীয় অঙ্ক।
। * "fair
• • • • • • A
সাবিত্রী। ওটা আমার পূর্বজন্মের পুণ্যাজিতা ভগিনী।
নারদ। উনি মাওব্য-নন্দিনী, ওর নাম অক্ষিরা।
অলি। মা! নন্দিনী কাছে এসেছে-সুতরাং কন্যাই আমার
পরিচয়। তারপর চুপ করে রইলেন যে ঠাকুর ?
সাবিত্রীর সম্প্রদানে রাজাকে অনুমতি প্রদান করুন।
নারদ। কেমন করে করি । একটা মাত্র মহৎদোষ সত্যবানের
গুণরাপিকে অভিভূত করে রেখেছে। সত্যবান্ স্বল্পায়ু।
সুতরাং এ সমস্ত গুণ এক ক্ষণস্থায়ী পাত্রে রক্ষিত হয়ে
নিস্ফল। শুধু তাই নয়-দুঃখের কারণ হয়ে পড়েছে।
সকলে। স্বল্পায়ু ! সেকি স্বল্পায়ু।
নারদ। আজ হ’তে ঠিক এক বৎসর পরে সত্যবান্ সহসা শিরো
রােগে আক্রান্ত হয়ে দেহত্যাগ কবে।
সকলে। বলেন কি ?
নারদ। বিধিলিপি ! এত সশুণের আধার রাজকুমার বৃদ্ধ
অন্ধ পিতাকে ও বৃদ্ধা জননীকে অকুল শােক-সাগরে
ভাসিয়ে পরলােকে প্রস্থান করবেন।
অলি। কেউ ধরে রাখতে পাবে না ?
নারদ। আজও পর্যন্ত ত কেউ পারেনি জননী
অশ্ব। সাবিত্রী ! সত্যবাকে পতিত্বে স্বীকার করবার সঙ্কল্প
ত্যাগ কর।
মালবী। হা ভগবান পূর্বজন্মে এত কি কঠোর পাপ করে-
ছিলুম যে, প্রতিদিন আমি এই কঠোর যন্ত্রণানলে দগ্ধ
হচ্ছি।
আর নয়--অসহ। নারী আমি কত সহ্য
ক’ব। আমার সর্বশরীর কেমন কচ্ছে। পারলুম না
সাবিত্রী। আর বুঝি কিছু রাখতে পারলুম না। ধর্ম গেল- কন্যা গেল-মায়া মমতা স্নেহ। তােরাই বা থাকিস কেন? সব যা—একেবারে যা—আর এ অভাগিনী রমণীর দুর্বল হৃদয় পীড়ন করতে আসিস নি। অশ। সাবিত্রী । অভাগ্য সত্যবানকে পতিত্বে স্বীকার করবার সঙ্কল্প জন্মের মত পরিত্যাগ কর। অলি। আপনারও কি এই মত প্রভু ? নারদ। জেনে শুনে একজন স্বল্পায়ুর হস্তে কেমন করে রাজাকে কন্যাদানের পরামর্শ দিই মা । অলি। তা হলে মদ্রবংশের কুলধৰ্ম্ম ? তা তো আর রক্ষা হয় ! তিন দিনের ভিতরে সাবিত্রীর কুমারী-কাল উত্তীর্ণ হবে। ধর্মলােপের কাছে কি সাবিত্রীর বৈধব্যের তুলনা হল! নারদ। ধৰ্মলােপ হ’তে যাবে কেন ? এখনও যে সময় আছে, তাতে সহস্র সহস্র সাবিত্রী-যােগ্য বর এই রাজ সভায় উপস্থিত করা যায়। সাবিত্রী স্বয়ম্বরা হােন। তাদের মধ্যে যােগ্য পাত্রকে মনােনীত করে স্বামিত্বে বরণ করুন। অলি। পৃথিবীর মধ্যে এক সত্যবান্ ভিন্ন সাবিত্রীর যােগ্য বর আর দ্বিতীয় নাই। নারদ। বেশ, পৃথিবীতে না থাকে, স্বর্গে ত আছে। ইচ্ছা কর, স্বর্গ থেকে সহস্র বর চক্ষের নিমেষে এখানে এনে উপস্থিত করছি। ইন্দ্র, চন্দ্র, বায়ু, বরুণ কারে চাও ? অলি। তাদের একজনও সাবিত্রীর পদরেণু স্পর্শের যযাগ্য নয়।
দ্বিতীয় অঙ্ক। অশ্ব। কি কঠোর গৰ্ব্ববাক্য !-বল কি কল্যাণী । অলি। দেবতার ভিতর নিষ্কলঙ্ক-চরিত্র কে আছে ? গুরুপত্নী- হারী ইন্দ্র চন্দ্র কি পবিত্ৰতাময়ী সাবিত্রীর সম্মুখে দাড়া তেও সাহস করে ! অশ্ব। সাবিত্রী ! তুমি নীরব কেন ? বক্তব্য যা থাকে বল। আমার আর চিন্তা করবারও অবকাশ নেই। সাবিত্রী। ঠাকুর, সম্পত্তি-বিভাগ-নির্ণামিকা গুটিকা একবার মাত্র ভূমিতে নিক্ষিপ্ত হয় ; লােকে কন্যাকে একবার মাত্র প্রদান করে; এবং দান করলুম—একথাও লােকে একবার মাত্র বলে থাকে। অতএব আমি যাকে এক- বার পতি বলে বরণ করেছি, তিনি দীর্ঘায়ুই হউন বা অল্পায়ুই হউন--গুণবাই বা নিগুণই হউন-তিনি ভিন্ন অপর ব্যক্তিকে আর আমি বরণ করতে পারি না। এ সঙ্কটে কি করি প্রভু ? সাবিত্রী। মন-মহারাজ,-মন। সাবিত্রীর মনের দিকে লক্ষ্য করুন। লােকে অগ্রে কোন বিষয় মনে নিশ্চিত করে তবে কথায় তাকে প্রকাশ করে ; অবশেষে কার্যে তাহা অনুষ্ঠিত হয়। কন্যার মন নিয়েই স্বয়ম্বর-প্রথার প্রতিষ্ঠা। কন্যা কর্তৃক মনােনীত, নিগুণ কদাকার পাত্রকেও কোন রাজা কখন প্রত্যাখ্যান করতে পারেন অশ্ব। । অশ্ব। কি আদেশ দয়াময় ? নারদ। বড় বিষম সমস্যা! আদেশ–কি দেবে?
৭ সাবিত্রী। সাবিত্রী । কেন,—প্রশস্ত অসীম বিস্তৃত ধৰ্ম্মপথ আপনার চক্ষের উপয় পড়ে রয়েছে। সে পথের কোথায় কি, আপনি নখদর্পণের ন্যায় দেখতে পাচ্ছেন। আমাকে সেই ধর্ম- পথে অগ্রগামিনী দেখবার জন্য যা আদেশ করবেন, আমি তাই করতে প্রস্তুত আছি। আদেশ করুন। নারদ। মহারাজ ! তােমার কন্যা সাবিত্রীর বুদ্ধি অবিচলিত এই সতীত্ব-ধৰ্ম্ম হতে একে বিচলিত করি, আমার এমন সাধ্য নাই। এদিকে সত্যবানে যে গুণ আছে, অন্য কোন পুরুষে তা দেখতে পাওয়া যায় না। অতএব আমি ইচ্ছা করি, তুমি সত্যবানকেই এই কন্যা সম্প্রদান কর। আশীৰ্বাদ করি, তােমার কন্যা সাবিত্রীর সম্প্রদানে যেন কোন বিপ্ন না হয়। অশ্ব। আপনি গুরু, আপনার আদেশ লম্বন করা পাপ। এস মা অদ্যই তােমাকে সত্যবানের হস্তে সমর্পণ করতে যাত্রা করি। অলি। মা, আমি ব্রাহ্মণকন্যা-ব্রাহ্মণপত্নী, আশীর্বাদ করি— তােমার কন্যা সাবিত্রী যেন চিরায়ুষ্মতী হয়। মালবী। কে তুমি মা, মঙ্গলচণ্ডিকার মূর্তিধরে আমার গৃহে উদয় হয়েছ ?
তৃতীয় অঙ্ক।
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য—আশ্রম।
অলিরা ও সাবিত্রী।
সাবিত্রী। সুখের সংসারে বাস করেও স্বামীর পরিণাম চিন্তায়
আমার মনে এক দণ্ডের জন্যও শান্তি নাই। দেবর্ষি
নারদের সেই বজ্রনির্ঘোষ তুল্য কঠোর ভবিষ্যদ্বাণী
স্বপ্নে—জাগরণে—প্রতি মুহূর্তেই আমার কর্ণে ধ্বনিত
হচ্ছে। “সত্যবান্ আজ হতে এক বৎসব পরে, করল
কালক বলে নিপতিত হবে”। এখনও যেন সে গম্ভীর স্বর
বর্ণে বর্ণে আমি শুনতে পাচ্ছি! শুনে আমি স্তম্ভিতা,
জ্ঞানশূন্যা-- এক মুহূর্তের ভিতর সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার
দেখেছিলুম। হৃদয়ের শােণিত তরঙ্গ যেন এক মুহূর্তে
নিশ্চল হয়ে গিয়েছিল। সব্বশরীরে কম্পন—কণ্ঠ
অবরুদ্ধ–কিছুক্ষণের জন্য যেন আমার অস্তিত্ব পৰ্য্যন্ত
বিলুপ্ত হয়েছিল, শুধু মা সরস্বতী কণ্ঠে অধিষ্ঠিত হয়ে,
আমার অজ্ঞাতসারে আমার মনের কথা বার করে, সে
সঙ্কট সময়ে মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। তার পর আজ
এক বৎসর অতীত প্রায়। আর চার দিন মা অবশিষ্ট।
সম্মুখে সেই ভীষণ কৃষ্ণা চতুর্দশী।মনে হচ্ছে, আর
সৰ্বাঙ্গ শিউরে উঠছে—চার দিক আবার আমি অন্ধকার
দেখছি। আমার অদৃষ্টে সে রাত্রি কি নিঝিম্নে অতি-
সাবিত্রী বাহিত হবে !-না,-মন বলছে-‘না’ । আমার ধর্ম- বিস বলছে-‘না’ । দেবর্ষির বাক্য মিথ্যা হবে । হলিনাম উচ্চারণে চির-বিশুদ্ধ রসনা--সত্যের অধিষ্ঠান- ভূমি —সে রসনা থেকে মিথ্যাবাক্য নির্গত হবে ! কেমন করে বিশ্বাস করি !–অশিক্ষরে, বিশ্বাস করায় যে মহাপাপ! কেমন করে বিশ্বাস করি। কি এ কাল চতুর্দশী রাত্রি কিছুতেই নির্বিঘ্নে তিবাহিত হবে না ? কিছুতেই হবে না। অলি। এ নিয়তির গতি কি রোধ হয় না? বিধিলিপির কি খণ্ডন নেই ? সাবিত্রী। দেবর্ষি বলেছেন—গতায়ু ব্যক্তিকে কেউ কখন ফিরতে দেখেনি। অলি। তুমিও কি তাই জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকবে ? সাবিত্রী। কি করব, আদেশ কর। অলি। আমি আদেশ করব কি! আমার হুকুমেই কি চন্দ্র-সূৰ্য্য গ্রহ-তারা সকলে চলা ফেরা ক’চ্ছে যে, এই নিয়তির ভীষণ আক্রমণ থেকে তােমাকে আত্মরক্ষার উপায় বলে দেব ? সাবিত্রী। উপায় - আত্মরক্ষার উপায় । অকালমৃত্যুর হাত থেকে স্বামীকে নিস্তার দান-সম্ভব!—অলিক্ষরে সই। এ কি সম্ভব ? প্রকৃতির আক্রমণ-~-আমি অবলা—এ ভীষণ যুদ্ধে আমি কি তার যোগ্য প্রতিদ্বন্দিনী ? অলি! শুধু দুটো হাত পা নাড়াতেই কি প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক- তৃতীয় অঞ্চ। ৮১ শেষ হ’ল! মানসিক বল কি বল নয়? মহিষাসুরের বিক্রমে যখন সমস্ত দেবতারা প্রাণ নিয়ে সুমেরু-করে গরের ভেতর মুখ লুকিয়ে বসেছিল, কে তাদের সে দারুণ বিপদ থেকে মুক্তি প্রদান করে, আবার অমরা- বতীতে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেছিল ? সাবিত্রী। এ তুমি কি ব’ছ ? অলি। শুম্ভ-নিশুম্ভ-দলনী অবলাটী তােমার চেয়ে কত বড়? সে ত তােমারই মতন একটী অর্ধ প্রস্ফুটিত কুসুমকলি। হিমালয়ের শীতল সমীরণে শুধু একটু রূপের লহর তােবার জন্য, আপনার মনে, বন্য কুসুমরাশির সঙ্গে খেলায় নিযুক্ত ছিল। সাবিত্রী। তাই ত ! ঠিক বলছ ত সখি ! অলি। সেই জীবন্ত ফুলটীর সৌরভে আকুল হয়ে, দৈত্যরাজ শুম্ভ তাকে তুলে আনতে সামান্য অনুচর প্রেরণ করে- ছিল। ভেবেছিল—একটা ছােট মেয়ে-শুধু রূপ বই ত নয়—তার ওপর অসহায় একাকিনী--সে শুধু দৈত্য- রাজের অন্তঃপুরস্থ উদ্যানের শােভাবর্ধনের জন্যই জন্ম গ্রহণ করেছে। এই না ভেবে, সামান্য দুই একজন অনুচর দিয়ে মেয়েটাকে আসতে আদেশ করেছিল। কিন্তু সাবিত্রী, জাননা কি ? কত দানব-কত দৈত্য-- কত ধূম্রলােচন—কত রক্তবীজসমূলে ধ্বংস প্রাপ্ত হ’ল তবু সে অবলার কিছুমাত্র স্থানচ্যুতি হ’ল না! সৰ্ব্বনাশী যে হিমালয়-শিখরে, সেই হিমালয় শিখরে । তার পর কত চণ্ড গেল, মুণ্ড গেল, ইন্দ্রবিজয়ীধরণীর ৮২ সাবিত্রী N\\, অধীশ্বর—তপােবলে বলীয়ান্দৈত্যপ্রধান শুম্ভ নিশুম্ভ দুই ভাই গেল, দৈত্যকুল একেবারে সবংশে নিৰ্ম্মল হল, তথাপি ধরণীর কোন শক্তি সে অবলাকে স্থানচ্যুত ক’তে পালে না। সাবিত্রী। এ তুমি কি বলছ ?-অলিক্ষরে ভগিনি! এ তুমি কি ব’ছ ! অলি। ব’লব কি-মাথা আর মুণ্ড,! সব বােঝ। বুঝে যে অজ্ঞান, তাকে বােঝায় কে ? ঘুমুস্তকে তুলতে পারি, তুমি যে জেগে ঘুমুচ্ছাে! দেবর্ষি বলেছেন—কেউ কখন দেখেনি, তাইতে তুমি একেবারে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছ। কেউ দেখেনি—কেউ কি দেখবেও না ? দেবর্ষি ত এমন কথা বলেননি যে, কেউ দেখবেও না। সাবিত্রী। কই—তা বলেননি। অলি। তবে ? দেবর্ষির বাক্যে বিশ্বাস কর -- তার ভবিষ্যদ- বাণীতে বিশ্বাস কর, কেবল শাস্তুবাক্য বিশ্বাস করতে পাছ মা! তবে আর ব্রত নিয়মাদি কেন--স্বস্ত্যয়ন শান্তি কেন ? শাস্ত্রে বলেছে—কৰ্ম্মযােগে নিয়তির আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। এই জন্যই ত দৈবের সঙ্গে পুরুষকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সাবিত্রী। দৈবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অলি। হ-যমের সঙ্গে লড়াই । সাবিত্রী। তাও ত বটে ! শাস্ত্রার্থদশিনী সতী, আজ তুমি আমার চোক ফুটিয়ে দিলে । সত্যই ত! যা ঘটবে, তা নিশ্চয়ই যদি সংঘটিত হয়, তবে তার জন্য শুধু শুধু চিন্তায় ফল
তৃতীয় অঙ্ক।
কি ? অবশ্যম্ভাবী পরিণাম শুধু চক্ষু-জলে ত মুছে ফেলা
যায় না।
অলি। চক্ষুজল!---চক্ষুজলে কি হয়! তাতে শুদ্ধমাত্র কাঁদবার
অভিলাষ বৃদ্ধি করে। চক্ষুজলে, মসীবর্ণ অন্ধকারময়
পরিণাম, আর ও গাঢ়তা প্রাপ্ত হয়—বিধিলিপি উজ্জ্বলতর
অক্ষরে মানুষের বিভীষিকা উৎপাদন করে। জেনে
শুনে দেবর্ষির ভবিষ্যদ বাক্য অগ্রাহ্য করে, পিতার
আদেশ পর্যন্ত অমান্য করে, সত্যবাকে পতিত্বে বরণ
করেছ-ইচ্ছাপুৰ্ব্বক অকালবৈধব্য শিয়রে প্রতিষ্ঠিত
করেছ। এখন ভাবলে কি হবে ভাই ?
সাবিত্রী। আর ভাবব না। জ্ঞানদাত্রী শিক্ষয়িত্ৰী সতী।
অধম। ভগিনীকে পদধূলি প্রদান কর।
অলি। চিরায়ুষ্মতী হও।
সাবিত্রী। একদিকে নিয়তির আদেশ, অন্যদিকে সতীর আশী-
ৰ্বাদ।
দুই মহাশক্তির পরস্পরে জীবন-সংগ্রাম। মন
ব’লছে--বুঝি সতীর আশীর্বাদেরই জয় হবে ।
অলি। তােমার মন বলবেনা ত ব’লবে কার ? তুমি যে
ভগিনী—সতীকুল রাণী। তােমার কাছে এ কথা না
শুলে তৃপ্তি পাব কেন ? সতীত্ব-বিধাতার সর্বশ্রেষ্ঠ
রত্নভাণ্ডারের মহামূল্য উজ্জ্বলতম রত্ন। ভাঙ্গলে আর
গড়ে না। দেবত্ব হারালে দেবত্ব ফিরে পাওয়া যায়,
ইন্দ্রত্ব গেলে আবার ইন্দ্ৰত্বেরও সৃষ্টি হয়; কিন্তু যে অমূল্য
নিধি রমণী হৃদয়ের প্রিয়তম সম্পত্তি, সে সতীত্ব একবার
গেলে, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর-সমেত ব্ৰহ্মাণ্ড-বিনিময়েও আর
৮৪
সাবিত্রী।
পাওয়া যায় না । এমন মহাশক্তির কাছে অন্য তুচ্ছ
শক্তির তুলনা! কায়মনােবাক্যে সতী তুমি, তুমি কিনা
অদৃষ্টের আক্রমণে চিন্তাকাতরা ! মুছে ফেল—ললাট
থেকে বিধিলিপি মুছে ফেল। স্বেচ্ছায় মনােমত অদৃষ্টের
সৃষ্টি কর।
সাবিত্রী। যথা আজ্ঞ।
অলি। এই--এই ত তােমার যােগ্য কথা।
বৈধব্যকে
দেয় ? আসুক দেখি বিধাতা-স্পর্ধার সঙ্গে তাকে
আহ্বান করি। বৈধব্য গ্রহণ—সে ত রমণীর নিজের
হাতে। পত্নী যদি নিজে ইচ্ছা না করে, তাহলে তাকে
পতি-বিয়ােগিনী করা বিধাতারও সাধ্য নাই।
সাবিত্রী। নিশ্চয় ; তােমার আশীৰ্বাদ সর্বাঙ্গে বেঁধে কবচ
করেছি--প্রস্তুত হয়েছি। মনে মনে কার্য্যের পথে
বহুদূর অগ্রসর হয়েছি--ত্রিরাত্র ব্রত গ্রহণ করেছি।
অলি। অগ্রসর হও-তােমার আদেশে মৃত্যু দ্বার থেকে এসে
ফিরে যাক। বিশ্বজননীর আয়তি রক্ষা করবার জন্য,
সমুদ্রমন্থনে আকণ্ঠ হলাহল পান করেও বিশ্বেশ্বর মৃত্যুকে
জয় করেছিলেন। সেই অবধি নাম তঁার মৃত্যুঞ্জয়।
সখি! তুমিও সেই অলৌকিক কাৰ্য্য নিষ্পন্ন কর।
দানব গন্ধৰ্ব্ব--সকলে সমস্বরে সতীর জয় গান করুক।
সমস্ত জগৎ সাবিত্রীর জয়ধ্বনিতে পূর্ণ হােক । (নেপথ্যে
–সাবিত্রী !)। ওই ভাই, তােমার স্বামী আসছেন। তা
হলে আমি আসি তােমায় আমি বােঝাব কি ! তুমি
জ্ঞানময়ী--তােমাকে বােঝাতে যাওয়া আমার ধৃষ্টতা।
তৃতীয় অঙ্ক। সাবিত্রী। তুমি আমার গুরু—তুমি আবার আমার প্রণাম গ্রহণ [ অশিক্ষার প্রস্থান। (নেপথ্যে–সাবিত্রী) (সত্যবানের প্রবেশ।) সত্য। এই যে—এই যে। সাবিত্রী সাবিত্রী করে আমি এত ডাকছি, আর তুমি নীরবে এস্থানে দাড়িয়ে আছ ! সাবিত্রী। কোনও বিশেষ প্রয়ােজন আছে কি ? সত্য। প্রয়ােজন-তােমাকে প্রয়োজন ! কি প্রয়ােজন, তা কি জান না। অন্ধরাজা একমুহূৰ্ত্ত তােমার কথা না শুনলে কত কাতর হন তা কি জাননা প্রাণেশ্বরী ? তার ওপর তুমি ব্রতচারিণী-উপবাসিনী । সাৰিত্রী। আমি ত তার অনুমতি নিয়ে এসেছি। সত্য। তোমাকে অদেয় তার কি আছে ? অনুমতি চেয়েছ অনুমতি পেয়েছ; কিন্তু কত কষ্টে প্রাণ ধরে যে তােমাকে অনুমতি দিয়েছেন, তা কি বুঝতে পার? তােমায় পাঠিয়ে তিনি পূজায় নিযুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তুমি কাছে না থাকাতে পূজায় মনােনিবেশ করূতে পারছেন না। ( শৈব্যার প্রবেশ।) শৈব্যা । এই যে, এই যে। ওমা! কি করে এসেছ মা! এক- দণ্ড কাছে না থাকলে যার যুগ বলে জ্ঞান হয়, তাকে কিনা তুমি এতক্ষণ একাকী রেখে এসেছ ! দেখবে এস বৃদ্ধ রাজার ব্যাপার খান। দেখবে এস। ইষ্টদেবতার নাম
সাবিত্রী।
জপ করতে তিনি বেল সাবিত্রী সাবিত্রী নাম মুখে
উচ্চারণ করছেন। দু-গণ্ডদিয়ে তঁার দশ ধরা পড়ছে ।
কি করলে মা! ‘দ্ধ রাজর্ষি—সৰ্ব্বত্যাগী সন্ন্যাসী
সংসারের সমস্ত সামগ্রীতে লােভ ত্যাগ করে গাছের
তলায় আশ্রম নিয়েছিলেন, তুমি কিনা শেষকালটা
তাকে ইষ্টমন্ত্র ভুলিয়ে দিলে ।
সাবিত্রী। তাই ত—তাই ত—তা হলে কি হবে মা !
শৈব্যা । কি আর হবে! সোণার পুতুল সােণান্ন সিংহাসন
ছেড়ে বনে পড়েছ, দুগ্ধ-ফেন-নিভ শয্যা ত্যাগ করে
আশ্রমের কঠোর মৃত্তিকায় গড়াগড়ি খাচ্ছ। এ ননীর
দেহে কি কষ্ট হচ্ছে, তিনি ত বুঝতে পাচ্ছেন। তাই
দিবারাত্র তােমার কথাই চিন্তা করেন। চিন্তা ক’রুতে
করতে তন্ময় হয়ে গিয়ে, ইষ্টদেবতার নাম স্মরণ ক’রুতে
তোমার নাম স্মরণ করে বসেছেন।
সাবিত্রী। আমার যে বড় ভয় করছে। পিতা যে আমার
জ্ঞানবৃদ্ধ ঋষি, তিনি এমনটা করলেন কেন ?
শৈব্য। ভয় কিসের মা! স্বামী আমার অর্চনার সময়েও যদি
তােমাকে স্মরণ করেন, সে ত তােমাকে আশীর্বাদ।
মায়ার পুতুল-তুমি তার মায়ার ঘরটা দখল করেছ।
তােমাকে পেয়ে রাজা 'আবার সংসারী-বনে বসেও
ভবিষ্যতের একটা সােণার সংসারের ছবি তঁার মনের
ভেতর জেগে উঠেছে। তুমি যে দয়া করে শারাজের
কুরক্ষার জন্য এসেছে। মা! পিতৃপুরুষের জলগঙুষের
আশা তোমা হতে। তার ওপর তুমি ত্রিরাত্ৰ-ব্ৰত গ্রহণ
তৃতীয় অঙ্ক। ninam করেছ। তোমার বিষয় দিবারাত্র তিনি ভাববেন না ত, কার ভাবনা ভাববেন ! সত্য। নাও-চল-পিতাকে সান্ত্বনা করবে চল। [ প্রস্থান। দ্বিতীয় দৃশ্যপম্পা সরােবর। মণ্ডব্য ও সনাতন। মণ্ডিব্য। সনাতন জান কি ? কত অসংখ্য তীর্থের প্রলোভন পরিত্যাগ করে, এই মাল বানের তলদেশে যে এতকাল। পড়ে আছি, তার কারণ জাব কি ? সনা। কিছুইত জানিনা প্রভু! বমি মনে করি, বুঝি, মাল্য- বানের ভুবনমোহন সৌন্দর্য আকৃষ্ট হয়ে আপনি এই স্থান যােগাসনের উপযােগী স্নানে অবস্থান করেন। মাওব্য। সৌন্দৰ্য্যই বটে, তবে এ পবিত্র ভারততীর্থে বহিঃ- সৌন্দর্যে মাল্যবান অপো যে রমণীয়তর স্থান নাই, একথা বলতে পারি না। তবে অন্তঃসৌন্দর্যে মাল্যবান আমার মনশ্চক্ষে যে মহতী শােভা ধারণ করে আছে, সনাতন! মন্দাকিনীনিষেবিত নন্দনেও বুঝি সে শােভার অভাব। এস্থানের একটা ক্ষুদ্র করবী গন্ধাতিশয্যে দেব- কুসুম পারিজাতকেও পরা করে। কেন জান সনাতন ? মা ব্য। শােন তবে, মন দিয়া শােন। সহস্র পুণ্যতীর্থ ভ্রমণ, গােকোটী দানের পুণ্য সঞ্চিত হবে। সনাতন! অবহিত সাবিত্রী। ৯৮। *** , MA চিত্তে শ্রবণ কর। স্মরণেই আমার প্রাণ বিগলিত হয়ে আসছে !—আমি দিব্যচক্ষে দেতি পাচ্ছি! সম্মুখে হংস- কারণ্ডব-সেবিতা কমলােৎপলশালিণী শুভজলা পম্পা। ঠিক ওইখানে—সনাতন! ঠিক ওই পহৃদয়ের তরঙ্গ সিংহাসনে-যুগযুগান্ত চলে গেছে; স্বামী বিয়ােগবিধুরা সতীর নয়ন কমল থেকে এক ফোঁটা জল পড়েছিল। সেই জলকণার লোভে দেবতারা চাতক মুর্তিতে ওই সমীরণে উন্মত্তের মত ছুটাছুটি করেছিল। সনা। কেমন করে পড়ল, কোথা থেকে পড়ল! পিতা পিতা! সে কোন দেবতার চক্ষের জল ? ‘মাণ্ডব্য। এই যে বললেম বাপ সতী-দেবতা। আমার এ পম্পা, আমার এই অরণ্যবেষ্টিত মাল্যবান, সতী দেবতার লীলা- ভূমি। মা আমার যখনই আসেন, তখনই এক আধ ফোটা চখের জল, এই দরিদ্র সন্তানের আশ্রমে নিক্ষেপ করে যান। সেই জলসিক্ত মৃত্তিকায় এ স্থানের তরুলতা * সমস্ত সৃষ্ট হয়েছে। সনাতন এ হ’তে পবিত্র স্থান কি আর জগতে আছে ! আমি নিম্নে পম্পাতীরে ধ্যানমগ্ন, সহসা দূর আকাশে যেন ত্রিদিববাহিনী অলকনন্দার কনকল্লোল আমার কর্ণে প্রবেশ করলে। হা রাম, কোথ। রাম! মুহূৰ্ত্ত মধ্যে কাননে মাল্যবানে পম্পাজলে সেই অপূৰ্ব্ব শােকময় নাম অপূর্ব প্রাণোন্মদকর প্রতি ধ্বনি তুলে মনের গতিতে ত্রিভুবনে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ল। রাম রাম! কোথা রাম কোথা রাম! চেয়ে দেখি গগন- মার্গে মায়াময় রথে দুরাত্মা রাবণ কর্তৃক কেশপাশে তৃতীয় অঙ্ক। ৭ ।।।। নিগৃহিত, রামহৃদয়-বিহারিণী জনকনদিণী বিচেতনা, তথাপি পতিশােকে স্কুরিতাধরা, রাম রাম বলে রােদন করছেন। সনাতন চক্ষে দেখিছি, কর্ণে শুনেছি, সে তপস্বিনীর কাতর রােদন আজও পর্যন্ত পম্পা-জল-কল্লোল সপ্তস্বরে গান করে। যে একবার সে কাতর রােদন শুনেছে—সে হৃদয়ের গভীর যাতনায় উখিত রাম নাম একবার শুনেছে, সেকি আর আছে। তার পর এই সরােবর তীরে, সীতাহারা রাম–দুর্ভর নিরাশায় অবসন্ন নবজলধর-হা সীতা হা সীতা করে কমল লােচন বিগলিত সুধায় যে সময় পম্পার কলেবর বৃদ্ধি করেন, সেদিনও আমি এই স্থানে। তারপর রাবণ সবংশে নিহত হ’ল, সীতার উদ্ধার হল, কিন্তু শােকোচ্ছাসময় সীতা রাম নাম আর ধরণী থেকে বিলুপ্ত হ’ল না। সন। পিতা জগতে এ স্থানের তুলনা কোথায় ? মাওব্য। আর একদিন, সনাতন আর একদিন। এই স্থানে, ঠিক এই স্থানে আমি ধ্যানমগ্ন। এক রমণী গলিতকুষ্ঠ- গ্রন্থ স্বামীকে স্কন্ধে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। স্বামী মহাপাপী, এক বেশ্যার প্রেমে উন্মত্ত হয়ে স্ত্রীকে তার গৃহে বহন করে নিয়ে যেতে আদেশ করে। পতিপরায়ণা, স্বামীর আদেশ পালন করতে স্বামীকে স্কন্ধে ল’য়ে সেই পাপাত্মার অভিলষিত স্থানে গমন করছিলেন। রাত্রি অন্ধকার-সুতরাং চলতে চলতে পথভ্রান্তা রমণী আমার যােগাসন সমীপে উপস্থিত হন। পাপাত্মার ক্ষত পদ কোনও প্রকারে আমার অঙ্গ স্পর্শ করে। পাপম্পর্শে
সাবিত্রী।
annnn
Man
••••••
মুহূর্ত মধ্যেই আমার বােগভঙ্গ হয়। ক্রোধে, আমি সেই
পাপিষ্ঠকে অভিশাপ প্রদান করি, যেন রজনী প্রভাতে
সূর্যোদয়ের সঙ্গে তার মৃত্যু হয়। স্বামীর অপমানে
কূপিতা সতীও তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, আপনি ব্রাহ্মণ,
তাতে ভগবানের অর্চনায় নিযুক্ত সুতরাং আপনাকে
প্রত্যভিশপ প্রদান করলুম না। তবে যদি আমি সতী
হই,তাহলে আমিও বলি যেন রাত্রি আর প্রভাত না হয়।
সনা। তারপর ?
মণ্ডব্য। তারপর দণ্ডের পর দণ্ড গেল, দিন যায়, সূৰ্য্য আর
উদয়াচল পরিত্যাগ ক’বার অবকাশ পান না। সৃষ্টিলােপ
পায়। সমস্ত দেবতা-ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর সকলে এই
স্থানে সমবেত হলেন। সবার অনুরােধে আমাকেই
পরাভব স্বীকার ক’তে হ’ল। সূৰ্য্য উঠলো। সতীর
কৃপায় নরাধম স্বামী পাপক্ত রোগমুক্ত দিব্যদেহ ধারণ
করে, সতী সঙ্গে স্বর্গে স্থান প্রাপ্ত হ’ল। সনাতন, সতী
ধৰ্ম্মেই আর্যাবর্তের প্রতিষ্ঠা; আর্যাবর্তেই সতীর আশ্রয়
স্থান ; আৰ্য্যাবর্তই লীল। এই মাল্যবানের উপত্যকায়ই
আবার সেই লীলাভূমির হৃদয় আমার তীর্থ, আমার
স্বর্গ, আমার সৰ্ব্বস্ব। যতদিন এ দেবরাজ্যে সতীর
অধিষ্ঠান, ততদিন সহস্র কোটা রাক্ষসের অত্যাচারে ও এ
ভারতের কোনও অনিষ্ট হতে পা’রূবে না।--নাও
সনাতন, এই চিরপবিত্ৰ পম্পার জল গ্রহণ কর। আর
এক সতী ত্রিরাত্র ব্রত গ্রহণ করে প্রায়ােপবেশনে
উপবিষ্টা আছেন। আমি এই মহাব্রতের হোতা-
তৃতীয় অঙ্ক।
হােমানলে পূর্ণাহুতি প্রদান করে এসেছি। এই পম্পা-
জল শান্তিরূপে তার মস্তকে প্রদান করলে তবে মা
আমার জল গ্রহণ করবেন।
সনা। যথা অাজ্ঞা
( অলিরার প্রবেশ।
মাতব্য। অশিক্ষরে! আর বিলম্ব কছ কেন মা? তােমার
সখী যে তিন দিন নিরন্থ উপবাসে অর্ধমৃতা। যাও মা শীঘ্র
যাও, এই জল গ্রহণ কর। এই সপ্তসতী-গৃহীত জলে
অভিষিক্ত করে শীঘ্র মাকে রক্ষা কর।
তৃতীয় দৃশ্য—আশ্রম।
মৎসেন, শৈব্যা ও সাবিত্রী ।
দুমৎ। কেমন করে যে প্রাপধরে তােমাকে এই ব্রত গ্রহণে
অনুমতি দিয়েছি, তা তােমাকে কি করে বােঝাব মা।
তুমি স্বামীর মঙ্গলার্থে ব্ৰত গ্রহণ করেছ, “ব্ৰতভঙ্গ কর”
এমন কথা বলা আমার মত লােকের কোন ক্রমেই ত
যুক্তিযুক্ত নয়, তাই ‘ব্রত সমাপ্তি কর, এই কথা আমাকে
বলতে হয়েছে। কি কঠোর ব্রত! তিনদিন নিরন্থ উপবাস।
শৈব্যা। তিন দিন কই মহারাজ! চতুর্থ দিনেরও তৃতীয় প্রহর
যায় যায় হয়েছে । সোণার প্রতিমা কাঠের পুতুল হয়ে
গেছে উঠ; গাত্রোখান কর। ভবানীর কৃপায়
তুমি যে জীবনে ব্রত উদ্যাপন করেছে। এই আমাদের
বড় সৌভাগ্য। তােমার মুখের দিকে একবার করে
১২ সাবিত্রী। vada চেয়েছি, আর ঠক্ ঠক্ ক'রে কেঁপেছি। আর কেবল মাকে ডেকেছি, যে মা, সতীরণী, সতীর মর্যাদা তুমি রক্ষা কর। সাবিত্রীকে আমার প্রাণে বাঁচিয়ে রেখ। মৎ। ভগবান্ আমাকে অন্ধ করেছেন—জগতের কোনও কিছু দেখার অধিকার বঞ্চিত। তথাপি মা আমি যেন দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি ; তােমার দেহের কি অবস্থা হয়েছে। যে দিন সর্ব প্রথম মা লক্ষ্মী, পূর্ণশশীকলা মূর্তিতে আমার গৃহে অবতীর্ণ হয়ে, আমাকে প্রণাম করেছিলে, আমি তােমাকে আশীর্বাদ ক’তে গিয়ে মস্তকে হত্যার্পণ করে, স্পর্শমাত্রেই এক অপূৰ্বরূপ রাশির আভাস অনুভব করেছিলুম। আর আজ মা আশীর্বাদ করতে গিয়ে সর্বশরীর অামার আতঙ্কে শিহরে উঠেছে। মনে হয়েছে যেন সে পূর্ণিমার পূর্ণগগনের গলিত-সুবর্ণ- ধারারূপিণী-কৌমুদী, দ্বিতীয়ার ক্ষীণচন্দ্র-লেখায় পরিণত হয়েছে। কেন মা, এমন কঠোর ব্ৰতে তোমার অভিরুচি হ'ল ? সাবিত্রী। পিতা সন্তাপ করবেন না। ব্ৰত সমাপ্তির একমাত্র কারণ নিশ্চল উৎসাহ। আমিও অবিচণিত উৎসাহ সহকারে ইহা অবলম্বন করেছি। বাবা, আপনাদের আশীৰ্ব্বাদে আমি উপবাসের যৎসামান্য কষ্টও অনুভব করিনি। (মাণ্ডব্যের প্রবেশ ) শৈব্যা । অ ! বঁাচ,লুম ! ঠাকুর আসছেন। আসুন প্রভু, মাকে আমার শান্তিজলে অভিষিক্ত করুন।
তৃতীয় অঙ্ক। মাওব্য। আত্রেয়ী ভারতী গঙ্গা যমুনা চ সরস্বতী। সরযুর্গণ্ডকী পুণ্যা শ্বেতগঙ্গা চ কৌশিকী। ভােগবতী চ পাতালে স্বর্গে মন্দাকিনী তথা। সৰ্ব্বাঃ সুমনসে। ভূত্ব। ভৃঙ্গারৈঃ স্নাপন্তু তাঃ । সিন্ধু-ভৈরব-শােণাদা যে হ্রদ। ভূবি সংস্থিতাঃ। সৰ্বে সুমনসে ভূত্বা ভৃঙ্গারৈঃ পয়ন্তু তে। লবণেন্ধু-সুরাসর্পিদধিদুগ্ধ-জলাত্মকাঃ। সপ্ততে সাগরাঃ সর্বে ভৃঙ্গারৈঃ পিয়ন্তু তে। সমস্ত বসুন্ধরার মধ্যে,-আকাশে পাতলে-দেব- লােকে—সপ্তর্ষিমণ্ডলে--ব্রহ্মাণ্ডের যে যে স্থলে শান্তি দায়ীনী শক্তি আছ, সকলে আজ সাবিত্রীর শুভ প্রদানের জন্য শান্তি জল রূপে অবতীর্ণ হও। সকলে সুমনা হয়ে সাবিত্রীকে নারীর চিরসৌভাগ্য-অবৈধব্য প্রদান কর । ( অলিরা ও সতীগণের প্রবেশ) সাবিত্রী-মস্তকে জল সেচন। (গীত ) এস শুভদায়িনী গঙ্গে। উথলি আকাশ তটে, পশ ঘটে সংঘট তরল তরঙ্গে। এস চির শুভকারী বারি- যমুনা বরুণ। উছলিত করুণ। নর্মদা সিন্ধু কাবেরী ; মানস সরােবর পুষ্ট জলধর- শুভ ঝর ধাধার সঙ্গে। শুভ গ্রহ তারা শশাঙ্ক ধারা ঝর ঝর শুভ সতী অঙ্গে।
সাবিত্রী। AAAAAA15 •১/\+^^•••• /\\//\\\\. চতুর্থ অঙ্ক। আশ্রম সম্মুখ। বান্। সত্য। প্রভাতে যে সমস্ত ফল সংগ্রহ করেছিলুম,সাবিত্রী ব্রাহ্মণ ভােজ নে সমস্তই নিঃশেষিত করেছে। ব্রাহ্মণভােজন- বশিষ্ট যা কিছু আছে, তাতে বালিকা আজকের মতন কথঞ্চিৎ প্রাণধারণ করতে পারবে। তার পর কাল !-- কালকে না খেতে পেলে সাবিত্রী কেমন করে বাঁচবে। প্রাণময়ী সৰ্বস্ব আমার, স্বামীর জন্য দেহত্যাগ করূতেও কুষ্ঠিত নয়। উপবাসক্লিষ্টা পতিপরায়ণার যে মুখ দেখে এসেছি, তাতে আমার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠেছে ! এমন অপূৰ্ব্ব রত্ন লাভ করে, বনবাসী ভিখারী হয়েও আমি মহেশ্বরের ভাগ্যে ভাগ্যবান্ ! এ রত্ন পেয়ে, অবহেলায় কিনা হারিয়ে ফেলব! এ দিকে অগ্নিরক্ষার কাষ্ঠের পর্যন্ত অভাব। সমস্ত কাষ্ঠ হােমানলে দগ্ধ হয়ে গেছে যাই—বেলা অবসান প্রায়---আর বিলম্ব করা উচিত নয় সাবিত্রীর প্রবেশ। ) একি সাবিত্রী, উঠে এলে যে ! সাবিত্রী। বাবা ও মাকে আহার করিয়ে এসেছি। সত্য। আর তুমি ? সাবিত্রী। আমার এখনও কিঞ্চিৎ বিলম্ব আছে । f
চতুর্থ অঙ্ক।
সত্য। সে কি সাবিত্রি ।
সাবিত্রী। আর যখন তিন দিন কেটে গেল—তখন আর একটু
সময়ের জন্য মনে খুত খুব কেন ?
সত্য। স্বামীর মঙ্গলের জন্য কাৰ্য্য করছ, কিন্তু কাৰ্যতঃ
পিরীত কছ সাবিত্রী ! তােমার কিছু অমঙ্গল হলে
কি আমি প্রাণ ধারণ ক’ব, মনে করেছ ?
সাবিত্রী! ভয় নেই, আমি মরব না।
সত্য। আর আমাকে স্তোকবাক্যে ভুলিয়ো না। আমি বেশ
বুঝতে পাচ্ছি, আমার মঙ্গলের জন্য নয়--আমাকে
চিরজীবন যন্ত্রণানলে দগ্ধ কার জন্য তুমি আমার ঘরে
উদয় হয়েছ।
সাবিত্রী! ভয় নেই আমি মব না ! আপনার শ্রীচরণের
শীতল ছায়ায় যে আশ্রয় পেয়েছে, সে কখনও কি ম’তে
চায় ! বিশেষতঃ এখনও আমার শ্বশুর শাশুড়ীর সেবার
আকাঙ্কা মেটেনি। তারা আমাকে অনুমতি দিয়েছেন।
ত। যা হােক, এমন অসময়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে ?
'সত্য। অগ্নিহােত্র কার্যের জন্য কাছের অভাব।
তা হলে নিশ্চয়ই যেতে হবে তা হলে আমিও
সঙ্গে যাব।
সত্য। সে কি ।
সাবিত্রী । আজ একলা ছেড়ে দিতে আমার ইচ্ছে হচ্ছে না।
সত্য। সে কি ! তুমি ইতিপূর্বে কখন ও বনে যাওনি।
অতি ক্লেশকর। বিশেষতঃ ব্রতােপবাসে তুমি কৃশ হয়েছ,
সুতরাং পদব্রজে কেমন করে যাবে?
সাবিত্রী।
সাবিত্রী ।
*******
। • • • • •
has •
সাবিত্রী। কেমন করে যাবে’---দেতেই, পাবে এখন
চল না।
সত্য। এ কি বিপদ! এদিকে যে সন্ধ্যা হয়।
সাবিত্রী। তা হলে আর দেরি করা কেন ? একেবারে দুর্গ।
বলে যাত্রা কর। কুড়ল আমার কাঁধে দাও।* মুখপানে
চেয়ে দেখছ কি? আমার উপবাস জন্য পরিশ্রম কিম্বা
গ্লানি কিছুই নাই। তার ওপর তােমার সঙ্গে যাবার
আমার একান্ত ইচ্ছা হয়েছে, সুতরাং আমাকে বাধা
দিও না।
সত্য। ভাল, বন-গমনে যদি তােমার একান্তই উৎসাহ হয়ে
থাকে, তা হলে আমিও তোমার এই প্রিয়কার্য করব।
কিন্তু এই দোষ আমাকে স্পর্শ না ক’তে পারে, এজন্য
তুমি জনক জননীর নিকট অনুমতি গ্রহণ কর।
(দ্যুমৎসেন ও
শৈব্যার প্রবেশ )
মৎ। কে কথা কয় ?
সাবিত্রী। পিতা, আমি ।
মৎ। আমি !
শৈব্যা। আপনার পুত্রবধূ।
দ্যুমৎ। আহা মা! এত দুর্বল হয়েছ যে, তােমার বীণা-
বিনিন্দিত কণ্ঠস্বর শুনেও আমি অনুভব করতে পারিনি।
এখানে কি ক’বৃছ মা ?
সাবিত্রী। আৰ্য্যপূত্র গুরু ও অগ্নিহােত্রের কাৰ্যে কাষ্ঠ সংগ্রহের
জন্য বন-গমন ক’ছেন।
চতুর্থ অঙ্ক।
5 + 5,
সত্য।
দ্যুমৎ। এই অপরাহু সময়ে ?
সমস্ত কাষ্ঠ হােমের জন্য ব্যবহৃত হয়ে গেছে। সমস্ত
রাত্রি অগ্নিপ্রজ্জ্বলিত থাকবে, এমন কাষ্ঠও নাই ।
দ্যুমৎ। তা হলে অধিক দূর বনে যেন গমন করো না।
কাজকে রাত্রের মতন যা প্রয়ােজন, তাই আন। তার
পর কাল প্রাতঃকালে গেলেই চলবে।
সাবিত্রী। পিতা, কন্যার একটা প্রার্থনা আছে।
দ্যুমৎ। প্রার্থনা-কি প্রার্থনা মা! এসে অবধি একদিনের
জন্যও কখন কিছু প্রার্থনা করনি। কি প্রার্থনা মা।
শৈব্য। আর প্রার্থনা করলেই বা দেব কি মা? শুধু আমরা
আশীর্বাদ দিতে পারি।
মৎ। কি প্রার্থনা মা?
সাবিত্রী। দেখুন পিতৃগৃহ থেকে আসা অবধি প্রায় এক
বৎসর আমি আশ্রম থেকে বহির্গত হই নাই, সুতরাং
কুসুমিত কানন দেখতে আমার বড়ই কৌতুহল হয়েছে।
পিতা! অনুমতি করুন, স্বামীর সঙ্গে যাই। কেননা, অদ্য
ব্ৰতউদ্যাপনের দিন। পতি-বিরহ আমার কোনমতেই
উপযুক্ত নয়।
দ্যুমৎ। রাণী ! সাবিত্রী পিতৃগৃহ থেকে এখানে এসে কখন যে
কিছু চেয়েছেন, তা ত আমার স্মরণ হয় না।
শৈব্যা। কৈ? আমারও ত স্মরণ হয় না।
মৎ। তা হলে কি কৰ্তব্য ?
শৈব্যা। যে নাছােড়বান্দা মেয়ে--ওকি অনুমতি না নিয়ে
ছাড়বে। এখনি কত শাস্ত্রের দোহাই দেবে।
১৮
সাবিত্রী।
t
শাস্ত্র বুঝিও না ছাই। কাজেই জবাবও দিতে পারি
।
সাবিত্রী। শাস্ত্রে বলেছে-
আর শাস্ত্রে কাজ নেই মা। যেতে ইচ্ছা হয়েছে,
যাও। শাস্ত্র আবার কি? পতিপরায়ণা সাধ্বী তুমি,
তুমি যে বাক্য মুখে উচ্চারণ করবে, তাই শাস্ত্র। মহারাজ
বউমাকে অনুমতি দিন।
দুমং। মা সাবিত্রী! সন্তুষ্ট মনে অনুমতি ক’ছি—তুমি স্বামীর
অনুগমন কর । চল মহিষী, আর বিলম্ব করো না।
আমাকেও পম্পাতীরে নিয়ে চল। সন্ধ্যার সময় যেন
উত্তীর্ণ না হয়।
কুচিটি
দ্বিতীয় দৃশ্য—বন।
কাঠুরিয়াগণ।
১ম। আজকে এবনে সমস্ত শুকনাে কাঠ নির্মূল করে ফেলা
গেছে। কি বলিস্ দাদা?
২য়। আজকে আর যে কেউ এখানে এসে কাঠের
পৰ্যন্ত নিয়ে যাবেন, এমন অবস্থা রাখিনি।
৩য়। না দাদা, অমন কথাটা বলােনা এবনের গুণ তােমরা
কেউ জান না।
এ বনে শুকনাে কাঠ গজায়।
১ম। বলিস্ কি ।
৩। আমি স্বচক্ষে দেখিছি দাদা-স্বচক্ষে দেখিছি।----পাহাড়ের
তলায় সেই যে একটা অশােক গাছ দেখেছিলি, যেটার
চতুর্থ অঙ্ক। ডাল পালা সব শুকিয়ে গিয়েছিল—কতকালের বুড়ো গাছ—মাথায় কেবল একটু শিখের মতন দু'চারটে পাতা। একদিন মনে ক’লুম—শরীরটে সেদিন ভাই ম্যাজমেজে ছিল-তাইতে মনে করলুম-বেশি দূর আর যাব না, ওই শুকনাে গাছ থেকে খানিকতক কাঠ কেটে নিয়ে আসি। এই না মনে করেরে ভাই ! কুড়লটী না কঁাধে করে টুকটুক ক’তে ক’রুতে গাছের কাছে যাচ্ছি! কাছ বরাবর গেছি!—ওই ওখানে গাছ আর আমি এখানে!—এমন সময় বাকি রে ভাই! একটী ফাস করে শব্দ হ'ল । সকলে। সেকিরে! সেকিরে!-শব্দ কি! ৩য়। ভয় নেইরে ভাইবলি শােন-ভয়ের কথা হলে কি এই বনের ভেতর দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলি ! এ দেবতার বন এখানে ভয় কি। ভয় নেই— একথা আগে বলতে হয়। তা হলে ব্যাপার- খানা কি ভেঙ্গে বল। * সকলে। আমরা আগাগােড়া শুবে। ২য়। তার পর আবার একটা ফ্যাস। সকলে। আবার ফ্যাস। ৩য়। প্রথম প্রথম মনটায় একটু ভয় হ’ল। এই চেনা যায়গা দুবেলা যাতায়াত ক’ছি, এখানে ফাস করে কি !—এই না ভেবে রে ভাই। একটু থমকে দাড়িয়েছি, এমন সময় চারিদিক থেকেই ঐ শব্দ—যেদিকে চাই, সেই দিকেই
সাবিত্রী ।
সকলে! ওই ফাস।
৩য়। হঁ দাদা! ওই ফাস-ষত সব শুকনো কাঠে ডাল
গজাতে লাগল। একটা করে ফাস করে শব্দ হয়,
আর একটা করে ফ্যাকড়া বেরােয়। সে অশােক
গাছটায় হ’ল কি জানিসরে ভাই—একেবারে হাড়ে হাড়ে
ফুল গজিয়ে গেল।আমি ত অবাক! তার পর যেদিকে
চাই, সেই দিকেই গজায়।
সকলে। বলিস্ কি!
১ম। হাঁ হুঁ—এঘটনাটা ঘটেছিল, শুনেছিলুম।
৩। সে আজ এক বছরের কথা হল ।
সকলে। তুই স্বচক্ষে দেখেছিস ?
স্বচক্ষে দাদা-স্বচক্ষে।
২য়। তাহলে ত বড় আশ্চর্যের কথা দাদা।
সকলে। আশ্চৰ্য-আশ্চর্য
৩। শুনলুম-একটা বেদের বউ নাকি সেই বনের ভেতরদে
যাচ্ছিল। সে মতে মরুতে বেঁচে গেছে।
সকলে। কেন, কেন ?
৩য়। তার মাথায় ছিল তাল পাতার চাঙড়া-তাতে করে সে
শুকনাে পাতা কুড়তে এসেছিল। দেখতে দেখতে তাতে
পাতা বেরুতে সুরু করলে।
সকলে। তার পর, তার পর ?
৩য়। তার পর—এই এত বড় গুড়ি।
সকলে। বউএর মাথায়।
৩। দেখতে দেখতে সেই গুড়ি বাড়তে লাগিল।—যায় যায়
চতুর্থ অঙ্ক।
এমন সময় কে কোথা থেকে এসে বউএর চুলের গােছা
ধরে তড়াক করে সেই গাছের ওপর উঠে-হাতে
দা ছিল, তাই দিয়ে গাছের মাথাটা কেটে ফেললে।
নইলে কাদি গজালে বউটো ত একেবারে গেছেলো।
১ম। আর ভাদ্র মাসে সেই বউ-গাছের তলা দে গেলে কি হ'ত।
বেন্ধ ভেদ।
৩য়। তাই বলি এ বনের মর্ম কিছু বােঝা যায় না দাদা, কিছুই
বােঝা যায় না-এবনে মানুষ পুতলে গাছ হয়। এই রে
বউ আছে, তা হলে কি একটা কাণ্ড ঘটেছে।
( জনৈক স্ত্রীলােকের প্রবেশ।)
বউ ?
স্ত্রী। ওগো, তুমি কোথায় গো?
৩য় । কি হয়েছে--কি হয়েছে বউ ।
স্ত্রী। আছ—এখানে আছ গা?
সকলে। কি হয়েছে—কি হয়েছে
ওগাে ঠাকুরপো ! পালিয়ে এসো-পালিয়ে এসো।
আবার তাই।
সকলে। আবার গজান ?
স্ত্রী। এবারে যেমন তেমন গজান নয় গো-যেমন তেমন গান
নয়। শুনলুম-ধন বাদীর বউ একটা কঁাটাল কাটের
পিড়ির ওপর বসে ভাত খাচ্ছিল। তার পর দেখতে
দেখতে সেই পিড়ি-গুড়ি ডাল পালা নিয়ে একেবারে
এক বিরােদ গাছ ।
৩য়। ওই শােন ভাই।
সাবিত্রী। । সকলে। আর, আর, বউ ? সে এচোড় হয়ে ঝুলছে গো-এচোড় হয়ে ঝুলছে। আহ। কচি বউ-সে আর কত বাড়বে—হতুম আমরা,ত একে- বারে খাজা কাটাল হয়ে যেতুম। এমন অদৃষ্ট কি করেছি যে, কাটাল-কাটের পিঁড়িতে বসে ভাত খাব। চেটাইএর ওপর বসে কোন্ দিন কি ছাই তালের আঁটি হয়ে যাব। শেষকালে বরাতে কি এই আছে। নাও-কাঠ কাটা রেখে অন্য দেশে যাই চল—এ ভূতের দেশে থাকে না। ও দাদা, ঘাড়ের কাঠ যে খড়, খড়, করূছে ! স্ত্রী। চারিদিক থেকে যে আবার ফঁাসের শব্দ হয়। ওই বুঝি গজালো—ওই বুঝি গজালো ! সকলে। ওই বুঝি গজালো দাদা-হাতে পাতা ঠেছে। স্ত্রী। ওরে মিসে পালিয়ে আয়—ওরে পালিয়ে আয়—শেষ- কালে কি গজিয়ে উঠে ফল হয়ে ঝুলবি। কোন্দিন অন্যমনস্কে পেটে পুরে ফেলব! পালিয়ে আয়—পালিয়ে আন্থ। [ প্রস্থান। সকলে। ( সাবিত্রী ও সত্যবানের প্রবেশ।) সত্য। কি হ’ল সাবিত্রী! সমস্ত বন অনুসন্ধান ক'লুম, তবু ত কোথাও শুকনো কাঠ দেখতে পেলুম না। সাবিত্রী। তাই ত-বড়ই ত বিস্ময়ের কথা। সত্য। এতটা পরিশ্রম করে কি শুধু হাতে ফিতে হবে !
চতুর্থ অঙ্ক ।
. । । । । । । ।
সাবিত্রী। তাও কি হয়,-দেবগুরুর কাৰ্য্য-শুধু হাতে ফেরা
কি চলে!
সতা। তা হলে ত দূরবনে প্রবেশ করূতে হবে ?
সাবিত্রী। তা ভিন্ন ত আর উপায় দেখতে পাই না।
সত্য। কিন্তু সাবিত্রি । এদিকে যে অন্ধকার হয়ে এলো।
সাবিত্রী । বনে প্রবেশ করতে কি ভয় ক'বৃছ ?
সত্য। রাজ্যহারা হয়ে আছি বলে কি, সাবিত্রি। ক্ষত্রিয়ের
জীবন পর্যন্ত হারিয়ে বসে আছি !-ভয় নয়। তবে
তুমি সঙ্গে আছ-তার ওপর কৃষ্ণা চতুর্দশীর রাত্রি
সম্মুখে ঘাের অন্ধকার।.'
সাবিত্রী। তুমি যে আমার সঙ্গে আছ-এটা কি ভুলে গেছ ?
আমি যে পূর্ণিমার চাঁদ ললাটে বেঁধে চলেছি, তা কি
তুমি জান না ?
সত্য। বেশ, তবে এস-দুর্গা স্মরণ করে এই সম্মুখস্থ গভীর
বনাভ্যন্তরে প্রবেশ করি।
তৃতীয় দৃশ্য—বন
সত্যবান্ ও সাবিত্রী ।
সত্য। কি গভীর অন্ধকার ! আর ত কুিছ ‘দখা যায় না
সাবিত্রী!
সাবিত্রী। কেন, আমি ত এখনও বেশ
তুমি দেখতে পাচ্ছ না?
সত্য। কই না-কিছু না!--কেমন যেন একটা
১০৪ সাবিত্রী। ANA , , * * * * * 11: । । । LAWAAAA কি হ’ল প্রাণেশ্বরী। সহসা দৃষ্টিশক্তি অবরুদ্ধ হ’ল কেন ? সাবিত্রী! এক দৃষ্টে অবিশ্রাম কাষ্ঠের সন্ধানে প্রতি বৃক্ষ পানে চেয়ে আছ, তাই বােধ হয়, চোখে বাধা ঠেছে। চোখটা মুছিয়ে দি। এইবারে দেখ দেখি। সত্য। হা, আবার দেখতে পাচ্ছি—বেশ দেখতে পাচ্ছি । ওই যে সম্মুখের গাছে একটা নীরস শাখা দেখা যাচ্ছে। সাবিত্রী। বােধ হচ্ছে। সত্য। বােধ হচ্ছে কেন—ঠিক দেখতে পাচ্ছি। তােমার পবিত্র করকমল-ম্পর্শে আমার চক্ষু এক নূতন জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হচ্ছে। তুমি ক্ষণেকের জন্য অপেক্ষা কর, আমি কাষ্ঠ সংগ্রহ করে আনি। সাবিত্রী। কি ব’র্ব ?-না ছাড়লে নয়, তাই তােমাকে ছেড়ে দিচ্ছি । নইলে কিছুতেই তােমার সঙ্গ ছাড়তে আমার মন সরছে না। অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে। বাবা ও মা হয় ত এতক্ষণ আমাদের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। সত্য। যখন দেখতে পেয়েছি, তখন আর ভাবনা কি। যাব। আর ডাক্টা কেটে নিয়ে আসবে। সাবিত্রী । দেখ স্থান ভাল নয়, সময় ভাল নয়-রাক্ষসী বেলা। একটু সাবধানে পথ চলে। আর গাছেই যদি উঠতে হয়, অতি সাবধানে উঠো। (স্বগত । স্বামীর মুখের ভাব পরিবর্তিত হয়ে আসছে ! যেন ঘন অন্ধকারের পূর্বাভাস সন্ধ্যার ধূসর ছায়া- সত্য। ভাল সাবিত্রী! একটা কথা তােমায় জিজ্ঞাসা করি-
চতুর্থ অঙ্ক।
বহুক্ষণ ধরে ব’ব ব’ব মনে ক’ছি, কিন্তু কেমন বাধ
বাধ ঠেছে বলে বলতে পারছি না।
সাবিত্রী। কি বলবে, বলেই ফেল না। আমাকে বলবে, তার
আবার লজ্জা কি !
সত্য। সমস্ত পথটা তুমি কেবল আমার মুখের দিকে চেয়ে
এসেছ।
সাবিত্রী। এই কথা !
সত্য। কথাটা বড় এই নয় । বাড়ীতে তুমি বললে যে, আমার
কানন-শােভা দেখবার বড় ইচ্ছে হয়েছে। পথে আসতে
আতে, তােমাকে কত অপূর্ব প্রাকৃতিক শােভা দেখা-
লুম-পুণ্যজননী নদী দেখালুম, পুষ্পিত তরুলতা দেখালুম,
অমন শৈলােত্তম মাল্যবানের সর্বশােভাধার উপত্যকা
দেখালুম। সেই অশােক-মাগুব্য-আশ্রম-প্রবেশমুখে
যার তলদেশে তুমি পথশ্রম-কাতর হয়ে বিশ্রাম গ্রহণ
করেছিলে—অপুৰ্ব্ব ফুলভারে যে তােমার পবিত্র সমাগম
আজ ও পর্যন্ত সকলকে জ্ঞাত করছে-তাও দেখালুম,
কিন্তু দুই একটা প্রশ্ন করেই, তােমার উত্তরের ভাবে
বুঝলুম, তুমি কিছুই দেখনি। সমস্ত পথ কেবল আমার
মুখের পানে চেয়ে চলেছ। কেন বল দেখি সাবিত্রী ?
সাবিত্রী ।
কেন ?-কি ব’ব ?—একদিন বৈশাখের এক নব
জলধর একটা চাতকীকে এই রকম একটা কথা জিজ্ঞাসা
করেছিল। বাবছিল—“পৃথিবীতে অনেক নদ নদী, হ্রদ
সরােবর, এমন কি স্বচ্ছজলা গিরিপ্রবিণী থাকতে
চাতকী! তুমি আমার মুখ পানে চেয়ে থাক কেন?”
-
সাবিত্রী।
* * * *
চাতকী কি উত্তর দিয়াছিল জানি না। কি বলেছিল
-তুমি জান কি প্রাণেশ্বর ? তুমি ত সৰ্ব্বশাস্ত্র বিশারদ
আমি শিয়া--আমায় বলে দাও না। কেন-কেন?
কি ব’ব প্রভু! হতে পারে সমস্তই সুন্দর; কিন্তু
অপাং হি তৃপ্তায় ন বারিধারা।
স্বাদুঃ সুগন্ধি স্বদতে তুষার।
তােমার রূপ দেখে যে তৃপ্তি লাভ করেছে সে কি আর
অন্য সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়।
সত্য। মিষ্ট কথায় ভুলিয়ে দিলে সাবিত্রী! ভাল, আগে কাঠ
কেটে নিয়ে আসি -তুমি এই স্থানেই অপেক্ষা কর।
{ সত্যবানের প্রস্থান।
সাবিত্রী। দুর্গা দুর্গা ! বুক কাপছে,“প্রাণ কেমন কচ্ছে ! সেই
কাল সময় উপস্থিত। চক্ষে দেখলুম-কে যেন কোথা
থেকে ঘন ঘাের অন্ধকারের জাল ধীরে ধীরে আমার
স্বামীর জীবনের চারিদিকে বেষ্টিত কচ্ছে। কি হবে ?
ও মা! মঙ্গলচণ্ডী কি হবে মা! দুর্গে শিবে জগজ্জননি
ভবানি! তােমার নামস্মরণে শুনেছি সকল ভয় দূর হয়
মা! শুনেছি—স্বামীর মর্যাদা-নাশ দেখে, অনিমন্ত্রিত।
হয়েও তুমি একদিন পাগলিনীর মত পিতৃগৃহে ছুটে
গিছলে। সেখানে পিতৃমুখে পতিনিন্দা শুনে অসহ
যন্ত্রণায় মুহূর্ত মধ্যে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলে। মরণেও
সে জ্বলার নিবৃত্তি হয়নি। দই দেহাবসানে উত্তপ্ত
প্রাণের শান্তির সন্ধানে, তুষারে প্রাণ আবৃত করূতে
হিমালয়ের ঘরে গিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলে। এমন
চতুর্থ অঙ্ক। । পবিত্রতায় সর্বতীর্থময় সৰ্ব্বদেবতাময় পতি আমার বিপন্ন। ঈশানি! এ দাসীর মনের অবস্থা তুমি না বুঝলে কে বুঝবে মা? এ সঙ্কট-সময়ে তুমি ভিন্ন দাসীকে রক্ষা করতে আর কে আছে। করাল কাল আমার চখের সানে আমার স্বামীকে গ্রাস করতে ছুটে আসছে, শক্তিস্বরূপিণী । এ দারুণ সঙ্কটে আমি তােমার শরণাপন্ন হ'লেম। দাসীকে রক্ষা কর—মা,দাসীর মর্যাদা রক্ষা কর। ( সত্যবানের প্রবেশ।) সত্য। সাবিত্রী,-সাবিত্রী । সাবিত্রী! কি প্রভু ? সত্য। কোথায় তুমি ? সাবিত্রী। এই যে প্রভু! আমি যাই—দারুণ শিরঃপীড়া! ধর—আমায় ধর- প্রেমময়ী ! শেষ মুহূর্তের জন্য জামাকে একবার দেখাদাও, আশ্রয় দাও। দেখতে পাচ্ছি না-সাধ মেটেনি। সােণার সংসার—বাবা-মা-তুমি। (ভুমিতে পতন। সাবিত্রী কর্তৃক সত্যবানের মস্তক অঙ্কে রক্ষণ) কারে রেখে গেলুম ! সাবিত্রী—সাবিত্রী—উঃ! সাবিত্রী। আর্যপুত্র, হৃদয়-সৰ্ব্বস্ব, প্রাণেশ্বর!--সব শেষ ! দেবর্ষির বাক্য সেই দিন, সেই বেলা, সেই ক্ষণ, সেই মুহূৰ্ত্ত। সবশেষ। কি হল ! কি হ’ল ! কি করলুম ! রাখতে পারলুম-কিছুতেই তােমাকে রাখতে পার- লুম না। চলে গেলে, দাসীকে বনে একা ফেলে চলে গেলে। আৰ্যপুত্র-জীবিতেশ্বর ! কথা কও ওঠ। রাজা !
১০৮
সাবিত্রী।
ও রাণী তােমার আগমন-প্রতীক্ষায় পথ পানে চেয়ে বসে
আছেন। তারা যে তােমাকে এক দ চক্ষের অন্তরাল
করতে কাতর হন । মা যে তােমাকে সন্ধ্যা না হতেই
ঘরে রুদ্ধ করে রাখেন। জেনে শুনে সম্মুখে রাত্রি
দেখেও, তুমি এখানে শয়ন করলে কেন ? এই দেখ,
তামসী নিশা উপস্থিত। নিশাচরগণ নিষ্ঠুর নিনাদ আরম্ভ
করেছে, বন্যজন্তু ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করছে। চতুর্দিকে
শিবাগণের ভয়ঙ্কর চীৎকার শুনে আমার বুক কাপছে।
ওগাে! ওঠ-ওঠ—জাগো–আমার ভয় দূর কর! আমায়
একবার সাবিত্রী বলে ডাক! আমাকে নির্জনে পেলে,
কত মধুর বাকে—কত সােহাগ আদরে-আমার প্রাণে
কত যে নূতন নূতন সাধ জাগিয়ে তুলতে ! আমাকে কত
কি চাইতে যে অনুরােধ করতে। আমি না চাইলে যে,
বিমর্ষ-মুখে ফিরে যেতে। তাই কি আমার পুৰ্বাচরণের
প্রতিশােধ নিচ্ছ ? প্রাণেশ্বর ! ক্ষমা কর । চরণাশ্রিত।
দাসী কাতর প্রাণে তােমায় অনুরােধ করছে, আজ
একটী বার আমাকে সাবিত্রী বলে ডাক।
( গীত )
অন্ধের নয়ন তুমি এ কথা কি নাই মনে।
তাই কি হে যােগীবর আছ ঢলে যােগাসনে ।
ভুলেছ কি একেবারে
তোমারে ক্ষণ না হেরে,
অকুল। জননী তব আঁধার হেদী নয়নে।
এস নাথ এম ফিরে, ভুলনা হে অধিনীরে,
গলহার দামিনীরে
কভু কি ছাড়েহে ঘনে।
চতুর্থ অঙ্ক ।
h,
ওগো! আমার শােবার সাধ যে কিছুই মেটেনি।
প্রাণেশ্বর ! প্রাণেশ্বর! অপূর্ণ সাধে আমাকে অনাথিনী
করে যেয়াে না। তবু শুছো না-তবু ফিরছে না !
হে জনার্দন! স্বামীকে আমার ফিরিয়ে দাও। আজীবন
তপস্যায় তােমাতে আত্মসমর্পণ করে এতকাল স্বামী
আমার, তােমারই সেবা করে এসেছেন। তাকে এ
অকালমৃত্যু দিও না। রক্ষা কর–ফিরিয়ে দাও। হে
জনার্দন! হে শঙ্কর! হে ধৰ্ম্ম ! এ সঙ্কটে আমি তােমা-
৫ দের আশ্রয় ভিক্ষা করি, আয় দাও-অনাথিনীকে
আশ্রয় দাও।
মা
( যমের প্রবেশ )
একি! রক্তবস্তু-পরিধায়ী, বদ্ধমুকুট, সূৰ্য্যসদৃশ তেজস্বী,
শ্যাম গৌরবর্ণ, লােহিত-লােচন কে ইনি মহাপুরুষ
পাশ হস্তে আমার স্বামীকে নিরীক্ষণ করতে করতে
আগমন করছেন। ভয়ে সৰ্ব্ব শরীর কাঁপছে।
শক্তিরূপা সনাতনি। শক্তি দাও~ সাহস দাও। (যমের
প্রতি) বােধ হচ্ছে, আপনি কোন দেবতা।
কেন, না,
আপনার শরীর অলৌকিক। হে দেব, যদি ইচ্ছা হয়,
বলুন--আপনি কে, এবং কি নিমিত্তই বা হেথা আগমন
করেছেন।
যম। সাবিত্রী ! তুমি পতিব্রতা ও তপােনুষ্ঠান-সমন্বিতা, এই
জন্য তােমার সঙ্গে সম্ভাষণ করছি। আমি যম। তােমার
স্বামীর আয়ুক্ষয় হয়েছে, তাই তাকে বেঁধে নিয়ে যেতে
এসেছি।
সাবিত্রী।
****
।।।।
সাবিত্রী। ভগবন! শুনতে পাই—আপনার দূতেরাই মানুষকে
নিতে আসে, তা ঠাকুর! আপনি এসেছেন কেন ?
যম। সত্য বান্ ধর্মাত্মা, রূপবা ও গুণসাগর। এরূপ লােককে
নিয়ে যেতে আমি নিজেই আসি। তার ওপর তুমি তাকে
স্পর্শ করে রয়েছ। এইজন্য আমি নিজেই এসেছি।
সাবিত্রী। দয়াময়! যদি দাসীকে কৃপা করে দেখা দিয়েছেন,
তা হলে আপনার কৃপা অসম্পূর্ণ রাখবেন না। আপনার
নিকটে আমি স্বামীর জীবন ভিক্ষা করি।
( গীত। )
দয়া করে দেছ দেখা সে দয়া নিয়োনা তুলে।
অধিনী হৃদয়-মণি ভিক্ষা চায় পদমূলে ।
সকল সংসার ঘুরে, এসে কানন ভিতরে,
পেয়েছি হৃদয় ভরে হৃদয় রতন;
দিওনা হে ডুবাইয়ে সে মণি অতল জলে॥
যম। ত। যে হতেপারে না সাবিত্রী মৃত কথন ও ত পুনর্জীবিত
হয় না ।
সাবিত্রী । ধর্মের করুণায় কি না হতে পারে দয়াময় ?
যম। এ নিয়তির ক্রিয়া-করুণার কথা নয় বালিকা! তুমি
সতাবানকে পরিত্যাগ কর। আমি তার প্রাণ গ্রহণ করি।
সাবিত্রী। আমার ধৰ্ম্ম, পুণ্য, জীবন-সমস্ত গ্রহণ করুন্।
তােমার ধর্ম তােমারই সহায়-জীবন-পথে তােমারই
সহচর, অপরে তার ফল ভাগী হতে পারে না। যাও
সত্যবানের জীবনের মমতা পরিত্যাগ করে ঘরে ফিরে
যাও।
চতুর্থ অঙ্ক।
১১১
. ****
।
সাবিত্রী। আর আমার ঘর কোথায় ?--আপনি আমার ঘর
ভেঙ্গে দিয়েছেন। আবার বলছি-
ব’লছি—প্রভু! দেবতা।
ধৰ্ম্ম! দয়া করুন---আমাকে অকালে পতিহীন।
করবেন না।
যম। অন্যায় উপরোধ করো না সাবিত্রী! স্বামীকে পরিত্যাগ
করে ঘরে ফিরে যাও।
সাৰিত্ৰী। কেমন করে ফিরব ? বৃদ্ধ অন্ধ বনবাসী রাজার যষ্টি
নিয়ে বনে এসেছি-আশাপথ চেয়ে অন্ধ বসে আছেন।
একা সেখানে কেমন করে ফিবো। প্রতি পদশব্দে
রাজর্ষি আমার স্বামীর আগমন, প্রশ্ন করছেন, সেখানে
একা কেমন করে ফিরবো! আমায় যখন জিজ্ঞাসা
ক’রবেন–সাবিত্রী ! কই--কই আমার জীবন কই ?
অন্ধের সর্বস্ব ধন--আমার চক্ষরত্ন—আমার সত্যবান্
কই ? -ধৰ্ম্মরাজ! তুমিই আমায় শিখিয়ে দাও--আমি কি
বলব? কোন প্রাণে ব’ব যে, মহারাজ! তােমার
পুত্রকে আমি যমের হাতে সমর্পণ করে এসেছি।
ধৰ্ম্মরাজ! চরণে ধরি—ভিক্ষা দাও। আমাকে দয়া প্রকাশ
করতে যদি আপনি অশক্ত, বৃদ্ধ পরম ধার্মিক রাজার
প্রতি কৃপা করুন। এ বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে পুত্ৰ-বিয়ােগী
কবেন না। তার কেউ নেই—কিছু নেই—চক্ষুরঙ্গ,
তাও নেই। দয়া করুন।
দয়া করুন। আবার ভিক্ষা করছি স্বামীর
জন্য নিজের জীবন প্রদান করছি-- ক্রীতদাসী হতে
প্রতিশ্রুত হচ্ছি। স্বামীকে আমার ফিরিয়ে দাও।
যম। সাবিত্রী! অন্যায় উপরােধে আমার সময় নষ্ট করে।
সাবিত্রী।
16 ***
না। এই দণ্ডেই স্বামীকে পরিত্যাগ কর। আমি
সত্যবানের প্রাণ গ্রহণ করি। আমি বিধির আদেশ
পালন করতে এসেছি। বিধিলিপির খণ্ডন নেই।
সাবিত্রী। বেশ, তবে, গ্রহণ করুন! ( সত্যবানের মস্তক
ভূতলে রক্ষা, সাবিত্রী দণ্ডায়মানা, যম কর্তৃক সত্যবানের
বক্ষে হস্তক্ষেপ, প্রাণ গ্রহণের অভিনয় ও গমনােযােগ
এবং সাবিত্রীর পশ্চাদনুসরণ )
ষম। তুমি আর আমার সঙ্গে আসছ কেন ? প্রতিনিবৃত্ত হও,
সত্যবানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন কর। যতদুর পয্যন্ত
তােমার আসা সম্ভব, তুমি ততদূর এসেছ। যাও—স্বামীর
নিকটে তােমার কোনও ঋণ নাই।
সাবিত্রী। জীবনে মরণে স্বামীর অনুবৰ্ত্তিন হওয়াই স্ত্রীর কর্তব্য।
যেহেতু এই হচ্ছে সনাতন ধর্ম।
যম। অামার সঙ্গে যাওয়া ত তোমার সম্ভব নয়।
সাবিত্রী। আমার স্বামী যখন যাচ্ছেন, তখন আমিই বা যেতে
পারব না কেন?
যম। তােমার স্বামী সূক্ষ্ম দেহে পাশবদ্ধ হয়ে আমার সঙ্গে
যাচ্ছেন। ঐ দেখ—তার স্থূল দেহ—পক্ষি-হীন পিঞ্জরের
ন্যায়—ভূমিতে নিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আছে। দেহীর এ
পথে গমন অসম্ভব। ফিরে যাও।
সাবিত্রী। আমার স্বামী যেথায় যাচ্ছেন, আপনিও যেখানে
যাচ্ছেন, আমার ও সেখানে যায়। কর্তব্য যে হেতু এই
হচ্ছে সনাতন ধর্ম। তপস্যা, গুরুভক্তি, পতিস্নেহ ব্রত ও
আপনার প্রসাদ দ্বারা আমার গতি অপ্রতিহত হােক।
চতুর্থ অঙ্ক।
১১/ \\ ///* * * * *
.........
অন্য কোন দেবতা হলে আমার গমনে বাধা দিলেও
দিতে পারতেন, কিন্তু আপনি পারেন না।
যম। আমি পারি না! এ তুমি কি বলছ ?
সাবিত্রী। আমি ঠিকই বলছি, শাস্ত্র যা বলে তাই ব’ ছি
আপনি পারেন না। আর সেইজন্য কার্যত জপর
কেউও পারেন না। অর্থাৎ আমি যদি ইচ্ছা করি,
তেত্রিশ কোটী দেবতা একত্র হয়েও আমার গর্বতল্লা
ক’তে পারেন না।
যম। ক্ষুদ্র বালিকা! এ তুমি কি বলছ।
সাবিত্রী। আপনি যেমন আমার প্রিয়তম বস্তুটীকে পা আবদ্ধ
করে নিয়ে যাচ্ছেন, আমিও তদ্রুপ আপনাকে কঠিন
পাশে আবদ্ধ করে রেখেছি -কৰ্ম্মবন্ধন ছিন্ন করে
জন্য আমার স্বামী যে সমস্ত ধর্মাচরণ ক’ছেন, আর
তার সহধর্মিণী হয়ে আমার আয়তি রক্ষার জন্য আমিও
যে সমস্ত কার্য করেছি তাতে আপনার এ রজ্জ, সম্পূর্ণ
ছিন্ন না হোক, বহুস্থানে দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু আমি
যে পাশে আপনাকে আবদ্ধ রেখেছি, ধৰ্ম্মরাজ, তা আজও
পৰ্য্যন্ত অটুট। তবে শুনুন।তার্থদশী পণ্ডিতেরা
বলে থাকেন,-সপ্তপদ মাত্র ভূমি একত্র সঞ্চরণ ক’রূলেই
মিত্ৰতা হয়। আমিও আপনার সঙ্গে সাত পা চলেছি।
অতএব মিত্ৰকে অগ্রবর্তিনী করে আমি আপনার
সঙ্গে কিছু আৱাপ করব, আপনি স্থির হয়ে শুনুন।
যম। এ কি!—এক কথায় আমার গতি রুদ্ধ !--শক্তিময়ী-
এ তেজস্বিনী কে ?
১১৪ সাবিত্রী। ।।।।1" •• ২০১৭। * * * * • ২ , , , } সাবিত্রী। দেখুন, সাধুরা সর্বদেবতার মধ্যে ধর্মকেই সর্বশ্রেষ্ঠ আসন প্রদান করেছেন। ইন্দ্রাদি দেবতারাও ধৰ্ম্মহীন হলে, নিজ নিজ আসন হতে বিচ্যুত হন। বিচ্যুত হন। শাস্ত্রের বচন—যেখানে ধৰ্ম্ম, সেখানে জয়। ধর্মের সঙ্গে জয়ের নিত্য সম্বন্ধ। বৃত্ৰাদি অসুরগণও ধর্মকে আশ্রয় করে স্বর্গ পর্যন্ত জয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। যিনি সর্বশক্তিমান্সৰ্বনিয়ন্তা—সেই নারায়ণকেও একমাত্র ধর্মবলে দৈত্যরাজ বলি, নিজ অট্টালিকার দ্বারদেশে দ্বারীরূপে আবদ্ধ করে রেখেছেন। সুতরাং ধৰ্ম্মহ এক- মাত্র বলবা। এদিকে আবার সংসারীর ধই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। অবশ্য -ধৰ্ম্ম না হলে চিরব্রহ্মচর্যও হয় না, সন্ন্যাসও হয় না। কিন্তু অতি জিতেন্দ্রিয় না হলে সংসারধর্ম করা যায় না। সংসারে এত বাধা-এত প্রলােভন ! এইজন্য ধাৰ্মিকদিগের মধ্যে জনকরাজষির শ্রেষ্ঠ স্থান। ধার্মিক গৃহস্থের আশ্রম---ঋষি-তপস্বিগণের তীর্থ। আমি সেই গৃহস্থাশ্রমের সন্ন্যাসিনী। আপনি দণ্ডায়মান হন। যম। (স্বগত) একি! এযে আমি ক্রমেই শক্তিহীন হয়ে পড়ছি। আমার সর্বশরীর যে কম্পিত হয়ে উঠছে। কি করে এ বালিকার হাত থেকে নিস্তার পাই। প্রলােভন দেখান ভিন্ন দেখছি অন্য উপায় নাই। ( প্রকাশ্যে ) সাবিত্রী তােমার যুক্তিযুক্ত বাক্যে আমি পরম পরিতুষ্ট হয়েছি। তুমি বন্ধু, প্রার্থনা কর—আমি সত্যবানের জীবন ভিন্ন তােমাকে আর যে কোনও বর দিতে প্রস্তুত আছি, তুমি বর গ্রহণ কর।
চতুর্থ অঙ্ক।
সাবিত্রী ! আমার শশুর রাজ্যচ্যুত ও অন্ধ হয়ে আছেন।
আমার প্রার্থনা এই যে, আপনার প্রসাদে তিনি নয়ন
লাভ করুন ।
যম। তথাস্তু। যাও এইবারে ফিরে যাও। একি-তথাপি
অনুসরণ করছ যে ! বর দান করলুম, আবার
কেন ?
সাবিত্রী। স্বামীর যে গতি, আমারও তাই। আপনি যেখানে
ওকে নিয়ে যাবেন আমিও সেইখানে যাব। সম্প্রতি যেতে
যেতে আমার আর একটা কথা শুনুন। পণ্ডিতেরা ব'লে
থাকেন, যে সাধুদের সঙ্গে একবার মাত্র সঙ্গ হওয়াও
প্রার্থনীয়, তাদের সঙ্গে মিত্রতা--তার তুল্য বাঞ্ছনীয়
বিষয় ত জগতে আর নেই। সৎপুরুষের সমাগম কখনও
নিষ্ফল হয় না।
যম। এ তুমি কি বলছ সাবিত্রী!
সাবিত্রী। আপনি আবার সাধুতার প্রতিমূর্তি-সুতরাং নিষ্পাপ ।
আপনার সংসর্গে বাস করাই সনাতন ধৰ্ম্ম। সুতরাং
আমি যদি কোন ফল পাই, তা কেবল শাস্ত্রের আদেশে ।
যম। সাবিত্রী ! তােমার ইষ্টসাধনবিষয়িণী বাণী আমাকে আজ
যথেষ্ট জ্ঞান দান করলে। এরূপ তেজোময় বাক্য
আমি আর কখনও শুনিনি। হৃদয়ে অপূৰ্ব আনন্দ।
মা ! সত্বর এ আনন্দের ফলভােগ কর। সত্যবানের
জীবন ব্যতিরেকে, তুমি দ্বিতীয় বর প্রার্থনা কর ।
সাবিত্রী। আমার শ্বশুর যেন আবার নিজের রাজ্যলাভ করেন,
আর তিনি যেন স্বধৰ্ম্ম হ'তে পরিভ্রষ্ট না হন।
!
. সাবিত্রী। ।।।। ** ** *, - যম। তথাস্তু। এই বারে যাও মা, তােমার ত কামনা পূর্ণ করে দিলুম। সাবিত্রী। তা দিয়েছেন—এবং এই জন্য আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞ। আপনি আমার প্রণাম গ্রহণ করুন, এবং হৃদয়ের আনন্দে মনে যে সমস্ত ভাবের উদয় হয়েছে, আপনাকে নিবেদন করি, শুনুন-যেহেতু আত্মতৃপ্তি দেবতাকে নিবেদন করতে হয়। আপনি যে কাৰ্য্যই করুন না না কেন, চিরদিন নিয়মের বশীভূত হয়ে করেন, নিজের ইচ্ছাপূৰ্ব্বক করেন না। এইজন্যই আপনার নাম যম । সৰ্ব্বভূতে ভালবাসা, অনুগ্রহ ও দান- ইহাই সাধুদিগের সনাতন ধৰ্ম্ম। মানুষে শক্তি অনুসারে কোমল হয়, সৎপুরুষেরা শত্রুকে ও দয়া করেন। সুতরাং আপনার দয়া-এ নূতন কথা নয়। যম। তৃষ্ণার্ত লোকের পক্ষে জল যেমন, আমার পক্ষে তােমার মধুর অথচ জ্ঞানপূর্ণ কথা সেই রকম বােধ হচ্ছে । অতএব যদি ইচ্ছা হয়, তা হলে সত্যবানের জীবন ভিন্ন তুমি পুনরায় বর প্রার্থনা কর। সাবিত্রী। আমার পিতা-রাজা অশ্বপতি পুত্রহীন আছেন। অতএব কুলােজ্জ্বলকর, তার একশত পুত্র হউক-এই তৃতীয় বর আপনার কাছে প্রার্থনা করি । যম। তথাস্তু -তােমার পিতার কুলসন্তানকারী তেজস্বী একশত পুত্র হােক্। আর নয়-তােমার কামনা পূর্ণ হয়েছে, এই বার ফিরে যাও। সাবিত্রী। স্বামীর সঙ্গে থাকায় এ আমার দূর বলে বােধ হচ্ছে * চতুর্থ অল্প। ১১৭ * * * * না। বিশেষতঃ আপনি স্বয়ং ধৰ্ম্মরাজ। সৎপুরুষের প্রতি লােকে যত বিশ্বাস করে নিজের আত্মার প্রতিও তত করে না। এইজন্য লােকে সৎপুরুষের প্রণয় প্রার্থনা করেন,--আপনিও সৎপুরুষ। তার ওপর বহুক্ষণ আমি আপনার সঙ্গে আলাপ করেছি, আপনিও করেছেন। সুতরাং শাস্ত্রাদেশে আপনি আমার সঙ্গে সম্বন্ধ-বন্ধনে আবদ্ধ। কাজেই আমার অনিচ্ছায় আপনি আমাকে নিবৃত্ত করতে পারেন না। যম। না,দেখছি এ বালিকার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া বড়ই কঠিন কথা। একে নিরস্ত করি আমার এমন শক্তি নাই । অবলাতীব্র দৃষ্টির আঘাত সহ্য ক’তে অসমৰ্থ-সে কিনা যুক্তিতর্কে, জ্ঞানে, মধুর বচন বিন্যাসে আমাকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করলে ! এই অবলার কথায় আমাকে পরিচালিত হতে হচ্ছে এযে ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তি বালিকা যেন নিঃশেষে আকর্ষণ করে নিয়েছে, আমি জ্ঞানশূন্য । বাহিরে স্থির, শান্তিময়ী, নতমুখী—কিন্তু বাক্যে বিশ্ব- বিমোহিনীর ভুবন-বশীকরণের শক্তি ! কে এ তেজস্বিনী ? সাবিত্রী! এই শেষ বক্তব্য—তােমার প্রতি মেহে আমি আরও এক বর প্রদান করতে প্রস্তুত আছি। সুতরাং সত্যবানের জীবন ভিন্ন তুমি চতুর্থ বর প্রার্থনা কর। সাবিত্রী। বেশ, এতই যদি ভাগ্যবতী আমি যে, আপনার প্রসাদ পাবার উপযুক্ত জ্ঞানে, আপনি আমাকে স্বেচ্ছায় বর প্রদানে উদ্যত হয়েছেন, তবে এই প্রার্থনা করি- যেন
১১৮
সাবিত্রী।
৭ ।। ।। ।। ।। ।। ।। ।। ।। ৯ ।।।
মর্তে এসে আমি নিষ্ফলা নামে জগতে না পরিচিত হই।
কেননা, গৃহস্থ-কন্যা নিষ্ফলা—এ হতে বুঝি অপবাদ
আর নাই ।
ষম। বেশ, এই কথা! তা হলে যদি আমি তােমাকে শত
পুত্রের বর দান করি, তা হলে ত আমাকে নিষ্কৃতি
দাও ?
সাবিত্রী। তদণ্ডেই।
যম। সাবিত্রী, তুমি সূর্যসদৃশ, তেজস্বী শত পুত্র লাভ কর।
সাবিত্রী। আপনি পুনরায় আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।
( প্রণাম)।
যম। তােমার মঙ্গল হােক।
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য-বনপথ ।
( মাগুব্য ও সনাতনের প্রবেশ)।
সনা। বৃথা অন্বেষণ,—এত বন ঘুরেও যখন সন্ধান পেলুম না,
তখন আর কি তাদের পাব ?
মণ্ডব্য। পাব না-সেকি সনাতন! পাব না কি ? আজই যে
আমি যুবকদম্পতীর মাথায় শাস্তিজল ঢেলেছি--সাবিত্রীকে
অবৈধব্য আশীর্বাদ প্রদান করেছি, তার ফল কি এই
হ’ল ! আশীর্বাদের পর মুহূর্তেই কিনা বৃদ্ধ রাজা ও
পঞ্চম অঞ্চ। * * * )}", se/ রাণীর সর্বনাশ হবে ! পাব না—কি ব’ছ সনাতন- পাব না কি! যদি ধরণী নিজ বক্ষে লুকিয়ে রাখে, ধরণী:বক্ষ বিদীর্ণ করে তাদের খুঁজে আন্। সাগর যদি গ্রাস করে, অগস্ত্যের ন্যায় গণ্ডষে সাগর উদরগত ক’ব। যম কর্তৃক যদি অকালে নিস্পীড়িত হয়, যম মন্দির চূর্ণ করবো-আর না যাতে লােককে যমভবন যেতে হয়, তার ব্যবস্থা ক’ব। পাব না?—পাব না কি! সনা। প্রভু! শুধু না ফিতে হয়, তার উপায় করুন । রাজা ও বৃদ্ধা রাণী যখন আমাদের প্রত্যাগমন-বার্তা শুনে, ছুটে এসে জিজ্ঞাসা করবে-সনাতন, আমার পুত্র ও পুত্রবধু ? পিতা! তাদের কেমন করে বলব যে, রিক্তহস্তে ফিরে এসেছি। মাওব্য। সাবিত্রী সত্যবাকে না নিয়ে ফিরব না, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। প্রয়োজন হয়, যম-ভবনে প্রবেশ করব। একবার নিজের জন্য প্রবেশ করেছিলুম-নিরপরাধে শূলদণ্ড বিধান করেছিল বলে, আমিও তাকে দাসীপুত্র হবার শাপ দিয়েছিলুম। আমি আবার আমি আবার সাবিত্রীর অবৈধব্যের জন্য প্রবেশ করব। সনা। পিতা-পিতা। মাণ্ডব্য। কি সনাতন? সনা। আর নয়—আর অনুসন্ধানের প্রয়ােজন নাই। সব শেষ। মা ব্য। সব শেষ ? সনা। সখার প্রাণহীন দেহ ধূলি-বিলুষ্ঠিত। মাওব্য। হ !——আর সাবিত্রী ?
১২০ সাবিত্রী। সনাতন। তাকে ত দেখতে পাচ্ছি না প্রভু! বুঝি অভাগিনী স্বামীবিয়ােগে উন্মাদিনী হয়ে কোথায় চলে গিয়েছে। সখা! সখা! কি করলে ! কি সৰ্ব্বনাশ করলে ! মণ্ডব্য। সনাতন ! ঋষিকুমার হয়ে এ তুমি কি অজ্ঞােচিত কাৰ্য্য ক’বৃছ ? ঋষিগণ শােক ক’বার জন্য জন্মগ্রহণ করেনি। এস আমরা সাবিত্রীর অনুসন্ধান করি। সাবিত্রী কই ? সতীরাণী, নিজের অবৈধব্য প্রতিষ্ঠা করতে, তিন দিনের নিবন্ধু উপবাসের ব্রত উদযাপন করেছে। সে সাবিত্রী কই ? পিঞ্জর পড়ে আছে, নিশ্চয় সে তেজস্বিনী এ পিঞ্জরের পাখীকে ফিরিয়ে আনতে, ভীষণ ব্যাধের অনুসরণ করেছে। সাবিত্রী-সাবিত্রী-মা আমার । কোথায় তুমি ? -- কত দূরে ? মা, মা, সন্তান আমি—এ অপূৰ্ব্ব জীবন প্রতিষ্ঠা দেখবার আমার বড় সাধ হয়েছে। দেখাদাও।—চিরদিন যে মৃত সঞ্জীবনী সুধার সন্ধানে উন্মত্তের মত ভুিবন পরিভ্রমণ করিছি, সেই সুধাভাণ্ড, জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ রত্নাধার সতীর হৃদয়--আমাকে এক- বার দেখাও। সনা। পিতা! সত্যবানের দেহ সম্বন্ধে কি করব, আদেশ মণ্ডব্য! আমি দেহ রক্ষার ব্যবস্থা ক’ছি। দেহের চতুর্দিকে গণ্ডী দিচ্চি। ভূত প্রেত পিশাচ রাক্ষসাদি পিশিশী জীব দূর হও, সত্যবানের প্রাণহীন দেহ-সমীপে কেউ এসােনা। সাবধান, এই গণ্ডীস্পর্শ মাত্রেই সকলে চক্ষুর নিমেষে ভষ্মীভূত হবে।
পঞ্চম অঞ্চ।
ভূতাঃ প্রেতাঃ পিশাচাশ্চ রাক্ষসাশ্চ সরীসা।
অপসপ তে সৰ্বে চণ্ডিকাস্ত্ৰেণ তাড়িতাঃ।
দ্বিতীয় দৃশ্য—আশ্রম সম্মুখ।
শৈব্যা ও মৎসেন।
দ্যুমৎ। কি করলুম শৈব্যা ! কেন অসময়ে পুত্রকে বনে পাঠা-
লুম ! রাজ্য গেছে, চক্ষু গেছে, অন্ধের যষ্টি পুত্ররত্ন
অবশিষ্ট ছিল, তাও গেল ! ও শৈব্যা! কি ক’লুম, কেন
অসময়ে তাকে বনে যেতে আদেশ ক’লুম। তুচ্ছ কাঠ
একরাত্রের জন্য ঋষিদের ঘর থেকে ভিক্ষা করে
আলুম না কেন ?
শৈব্যা। মহারাজ, উতলা হবেন না। আপনি উতলা হলে এ
অভাগিনীর উপায় কি—আমি যে দশদিক অন্ধকার
দেখছি।
মৎ। আর অন্ধকার—আমি চক্ষুহীন হয়েও দেখার সমস্ত
সুখ অনুভব করেছি ।ভগবান্ যে এ অন্ধ বৃদ্ধকে
সাবিত্রী সত্যবাপ দুটা প্রজ্ঞ-চক্ষু প্রদান করেছিলেন।
আমি দু-জনের মাথায় হাত দিলেই, সমস্ত ব্ৰহ্মাণ্ড অপরূপ
সৌন্দর্য্যে যে আমার দৃষ্টির সম্মুখে উপস্থিত হত ! রাণী,
ইচ্ছা করে সেই তারকাযুগল স্বহস্তে উৎপাটিত করে
বনে নিক্ষেপ করলুম ! না না—ওই আসছে। ওই যে
সাবিত্রী। LOVyvM কার পদ শব্দ শুনতে পাচ্ছি না? কেওকেও—সত্যবান্ এলি ! শৈব্যা। কে-সাবিত্রী আমার আছ ? ( অক্ষিরার প্রবেশ।) অলি। না, মা-আমি অলিরা। শৈব্যা । কি করলুম মা অতিক্ষরা!--আমি যে হাতে হাতে আনন্দময়ীকে স্বামীর অনুগমন করতে অনুমতি করেছি। পম্প। সরােবরের তীর ধরে, আমার হর গৌরী যে, সমস্ত বন আলাে ক’তে ক’রূতে, দেখতে দেখতে চক্ষু অন্ধ করে মিলিয়ে গেছে। এ চক্ষু কি আর মিলবে না অলিরা ? মৎ। যা ঘটেছে, আমি সব দেখতে পাচ্ছি—সব দিব্য চক্ষে দেখতি পাচ্ছি। মা আমার চারদিন উপবাসিনী—অর্ধ- মৃতা ! সতী মনের উৎসাহে স্বামীর সঙ্গিনী হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্বল দেহ, পরিশ্রমের ভার সহ করতে পারেনি। দেখতে পাচ্ছি -- রাণী রাণী, ঠিক দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে, সে সােণার লতা কঠিন বনপথে ধূল্যবলুষ্ঠিত। মা আমার স্বামীর পায়ে মাথা রেখে স্বর্গে চলে গেছেন। অলি। স্বামীর পায়ে মাথা রেখেই যদি সাবিত্রীর মৃত্যু হয়, তা হলে মহারাজ, তার তুল্য ভাগ্যবতী আর কে আছে ? এমন দেবতার ও বাঞ্ছনীয় তীর্থ মৃত্যু যার তার জন্য আর দুঃখ কি? পুত্র আপনার সুস্থ শরীরে ফিরে আসুন—এই আমাদের একমাত্র কামনা। ০
পঞ্চম অঞ্চ।
Anr
দ্যুমৎ। অক্ষিরা, সত্যবান্ আমার সাবিত্রী বিহনে বেঁচে আছে
-এটা কি বিশ্বাস কর ?-মাধবী শুকিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে
সহকারও শুকিয়েছে আমার সাধের বাগান আবার যে
মরুভূমি, সেই মরুভূমিতেই পরিণত হয়েছে।
অলি। আমার পিতা ও স্বামী তাদের অনুসন্ধানে বনে প্রবেশ
করেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ফিরে আসেন,
আমার অনুরােধ --অন্ততঃ ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈৰ্য্যধারণ
করুন।
শৈব্যা! তােমরাই এতকাল অন্ধরাজাকে রক্ষা করে এসেছ।
তােমরা এখন এ বিপদে তাকে রক্ষা না করলে, কে
করবে মা!
দুমৎ।
অন্ধ হয়ে, রাজ্যহারা হয়ে, বালবৎসা স্ত্রী নিয়ে তােমার
পিতার আশ্রমে এসেছিলুম : নিজ তপস্যার আশ্রয়ে
স্থান দিয়ে, তিনি আমাকে সন্ন্যাসী করেছিলেন। তুমি
আবার কোথা থেকে এক সােণার প্রতিমা এনে আমার
পুত্রকে উপহার দিয়ে, আমাকে ভবিষ্যতের এক অপূর্ব
ছবি দেখিয়ে, এই বৃদ্ধ বয়সে আবার সংসারী করেছ।
সে অপূৰ্ব ছবি যে, দুর থেকেই মিলিয়ে যায় মা।
অলি। ভয় নেই মহারাজ!-আমার মন নিরাতঙ্ক।
শৈব্যা দাও মা সতীলক্ষ্মী,-অভয় দাও মা,-অভয় দাও।
অলি। সাবিত্রীর ত্রিরাত্র ব্রত-আমার পিতা আবার সে যজ্ঞের
হােত-সাধুত্তম ঋষিগণও পিতার সঙ্গে এ যজ্ঞে ব্রতী
হয়েছিলেন। যজ্ঞ নির্বিবাদে সুসম্পন্ন হয়েছে। ঋষিগণ
আপনাদের পুত্রবধূকে অবৈধব্য আশীর্বাদ দিয়েছেন।
১২ সাবিত্রী। AAAAA%। এমন শুভদিনে কখনও কি অমঙ্গল হতে পারে ? যম- বিজয়ী পিতা--তার আশীৰ্বাদ--সে আশীৰ্বাদ নিস্ফল হবে ? তা আবার কিনা-যে দিনে ব্রত উদযাপন, সেই দিনে ! আমরা সাত এয়ােতে পিতার আজ্ঞায় সাবিত্রীর মাথায় জল ঢেলেছি। তােমার পুত্রবধূর কেশকলাপ এখনও যে, সে জলে সিক্ত হয়ে আছে মহারাজ ! যম এসে কিনা সেই সিক্ত কেশে হস্তাপণ করবে। ( ঋষিগণের প্রবেশ।) শৈব্যা। মহারাজ, ঠাকুরেরা সব এখানে আছেন। মৎ। ঠাকুর, রাজ্যচ্যুত অন্ধ ভৃত্যকে এতকাল শ্রীচরণের আশ্রয়ে রেখে এসেছেন, আজকে এই বৃদ্ধ বয়সে তাকে আশ্রয়চ্যুত করবেন না। সকলে। ভয় কি-ভয় কি? ১ম ঋষি। তোমার পুত্র পুত্রবধুর কোন অমঙ্গল হবে না মহারাজ! সকলে; এ আমরা দিবচক্ষে দেখতে পাচ্ছি । ১ম ঋষি। এই আমরা সবাই মিলে অগ্নিতে আহুতি ঢেলে, তােমার পুত্রবধূকে আশীৰ্ব্বাদ করে এলুম- ২য় ঋষি। অগ্নি অমনি প্রত্যক্ষৰৎ সহ লহ জিহ্বা বা’র ক'রে, সেই সমস্ত ঘৃত পান করলে ৩য় ঋষি। কাষ্ঠখণ্ড সব দেখতে দেখতে অঙ্গারবৎ হয়ে গেল ১ম ঋষি। প্রশান্ত দিও মণ্ডল মৃগ-পক্ষীর কলরবে পরিপূর্ণ হয়ে গেল।
৭ । - * * * * * * * * ২৪ ঋষি। বৃক্ষলতার পত্র সমস্ত সরসর, শব্দে দিগন্ত মধুময় করে তুললে- ৩য় ঋষি। আর লাজ গুচ্ছের ন্যায়--কুন্দ, মালতী, শেফালিকা, মধুপবনে আন্দোলিত হয়ে, ঝরঝর ঝরে গেল- ১ম ঋষি। এমন সময়ে আপনার পুত্র-পুত্রবধূর অমঙ্গল হবে! সকলে। কখনই নয়-কোন প্রকারে নয়। ২য় ঋষি! বােধ হয়, পতি-পরায়ণা পতি-সঙ্গে ভ্রমণ করতে করতে কঞ্চিৎ ক্লান্ত হয়েছেন। ৩য় ঋষি। অথবা ভ্রমণ করতে করতে বহুদুরগতা হয়ে, পথ হারিয়েছে । ১ম ঋষি। তাই রাত্রের জন্য, হয় ত উভয়ে বনমধ্যে কোন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। সকলে। মহারাজ, ভয় করবেন না। ১ম ঋষি। অশিক্ষরে, তােমার পিতা কোথায় ? অলি। তিনি রাজকুমারের অনুসন্ধানে গমন করেছেন। সকলে। তবে আর কি।-যমবিজয়ী মণ্ডব্য যখন অনুসন্ধানে গেছেন, তখন আপনি নিশ্চিন্ত হন। আমরাও সকলে অনুসন্ধানে যাচ্ছি। সকলে। অবশ্য——-অবশ্য। ২য়। অনুসন্ধান করতে করূতে যদি যম-ভবনে গমন করতে হয়, আমরা তাতেও প্রস্তুত আছি। ৩য়। চল, চল--আর বিলম্বে প্রয়ােজন নাই। অলি। আসুন মহারাজ,--আমরাও এই সব মহাপুরুষদের অনুগমন করি ।
সাবিত্রী।
A
মৎ! একি হ’ল-একি হ’ল দয়াময়, দয়াময়-এ আমার
সকলে। কি হল—কি হ’ল মহারাজ !
মৎ। সহসা আমার দৃষ্টিশক্তি কে ফিরিয়ে দিলে ? আমি
আবার দেখতে পাচ্ছি—সব দেখতে পাচ্ছি-এই
আপনাদের চরণ দর্শন করছি।
শৈব্য। মহারাজ, মহারাজ ! এ আপনি কি বলছেন।
ঋষিগণ। অপূর্ব দৈবশক্তি!
অলি। সতী-সতী-মহারাজ, সতী আপনার গৃহে অবতীর্ণা-
ত্রিরাত্ৰ-ব্রতে উপবাসিনী সতী আপনার গৃহে শান্তিময়ী-
রূপে অবস্থিত। মহারাজ-আপনাকে দর্শন ক'লে
ভয় দূরে পলায়ন কবে ! সেখানে কিনা আপনার ভয়।
মৎ। কি সুন্দর ! চরিদিক কি সুন্দর! রাণী! এই তুমি।
অলিরা! এই তুমি--এই তুমি-আহ! তুমি এই
অক্ষিরা! দয়াময় । এই চারিদিকে দেখতে পাচ্ছি।
এই আপনাদের দেববাঞ্ছিত মুর্তি। বিংশতি বৎসর পূর্বে
যে মনােমােহিনী প্রতিমার সৌন্দর্য দেখে দেখেও আমি
তৃপ্তি পাইনি, এই সেই শৈব্যা রাণীর ছায়া।
অলি রার মিষ্ট বাক্য কর্ণে প্রবেশ করে, আমার হৃদয়ে
এক মধুময় রূপের আভাস দেখাত, এই সেই আরও
সুন্দর কত সুন্দর এক মুখে বলতে পাচ্ছি না--কত
সুর অলিরা।
অলি। আর আপনার পুত্রবধু! শত অক্ষিরার এক
সমাবেশে সে সর্বনাশীর রূপের একাংশ প্রস্তুত হয়।
পঞ্চম অঞ্চ।
মহারাজ! চক্ষু পেয়েছেন। যৌবনে আপনার পুত্র কত
সুন্দর হয়েছে দর্শন করবেন চলুন। আর তার পাশে
শােভাময়ী ভুবনমােহিনী সাবিত্রী-মহারাজ, হরগৌরী
হরগৌরী ।
শৈব্যা । ঠাকুর! স্বামীকে চক্ষু দিয়েছেন এখন তাকে চক্ষের
তারা দিন। দেখবেন দয়াময়! যেন স্বামীর আমার
হর্ষে বিষাদ না হয় ।
সকলে। কখনই নয়। শুভলক্ষণ-দৈবশক্তি
অলি। সতী-সতী-
সকলে। এস মহারাজ, চক্ষু পেয়েছ, আর কেন ? এস সকলে
সন্ধান করি।
তৃতীয় দৃশ্য।
যম ও তৎপশ্চাৎ কিঞ্চিৎ দূরে সাবিত্রী ।
যম।
সে সর্বনাশীর হাত থেকে যে নিস্তার পাব, এ আমার
বিশ্বাস ছিল না। বাপ-কি বিপদেই পড়েছিলুম !
আর একটু পীড়ন করলেই সত্যবানের প্রাণ হস্তচ্যুত
হয়েছিল আর কি ! বালিকাকে আমার অদেয় কিছুই
ছিল না। কিন্তু কি ক’ব, নিয়মের বশীভূত হয়ে অমন
সাধ্বীকে ও আমাকে পতি
পতি দু’তে বিচ্ছিন্না করতে
হয়েছে। সন্তা-প্রলােভনে মুগ্ধ হয়ে সর্বনাশী মুহূর্তের
জন্য জননীরূপিণী স্বামীকে বিস্মৃত হয়েছিল ; আমিও
সেই অবকাশে পালিয়ে এসেছি।
ক
১২৮ সাবিত্রী। * * * * * * * • :: । । ।।।।।।।।।।। * *। । । । । । । ।। ।। ।। ।।।।।।।, সাবিত্রী। প্রভু, এস্থানের নাম কি ? যম। যা ! সাবিত্রী। এস্থানের রমণীয়তা আমাকে বড়ই মুগ্ধ করেছে । আমি যেন এক অপূৰ্ব আনন্দের আভাস পাচ্ছি, যেন কোন অদৃষ্টপূৰ্ব্ব মধুময় প্রদেশের সন্নিকটবর্তিনী হয়েছি। পবনে মধু, ঋতু মধুময়, ওষধী সকল মধুপূর্ণ। বৃক্ষে বৃক্ষে মধুসঞ্চার ! এমন কি, পথের ধূলায় মধু মাখা। এ কোথায় এসে উপস্থিত হলুম দয়াময় ? যম। তুমি এখানে পর্যন্ত আমার অনুসরণ করেছ ! এস্থান যে মনুষ্যের অগম্য। সাবিত্রী। ধর্ম যার সহায় ও জীবন-পথের সঙ্গী, ত্রিভুবনে তার অগম্য স্থান কোথায় প্রভু। যম। তুমি যে আমাকে নিষ্কৃতি দিয়েছ সাবিত্রী! সাবিত্রী। আমি ত দিয়েছি, কিন্তু আপনি নিজেই যে নিষ্কৃতি গ্রহণ ক’ছেন না প্রভু! হে দেব ! আপনি প্রজ্ঞাচক্ষু আপনিই বলুন, আমার গতি কোথায় ? যম। নৃপনন্দিনি ! আর অগ্রসর আর অগ্রসর হয়ােনা-নিবৃত্ত হও। মুহূর্তে তােমার চক্ষে এক মহা অন্ধকারের আবরণ পড়বে। আর আমাকে ও দেখতে পাবেনা, আপনাকেও দেখতে পাবে না। অগ্রপশ্চাৎ গতিরুদ্ধ হয়ে বিষম সঙ্কটে পতিতা হবে। ফিরে যাও—ফিরে যাও। তােমাতে পরম প্রীতি প্রযুক্তই এই কথা বলছি। নতুবা আমার কথা পৰ্যন্ত আর তুমি শুনতে পেতে না। ফিরে যাও-আর মুহুর্ত- মাত্রও বিলম্ব করাে না।
পঞ্চম অঙ্ক। ১২৯ সাবিত্রী। আপনি যম ; কিন্তু নিজে নিয়ম ভঙ্গ করে নামের সার্থকতা নষ্ট কছেন ! ধৰ্ম্মরাজ ! এবারে নিজের জন্য নয়-জগতের কল্যাণ-সাধনের জন্য আমি আপনার সঙ্গে চলেছি। যেহেতু জগতের ভিত্তিস্বরূপ যে পৰ্ম্ম, তিনি যদি চঞ্চল হন, তা হলে সমস্ত জগৎ এক মুহূর্তে ধ্বংস- প্রাপ্ত হবে। তাই আমি আপনাকে স্বপদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ক’তে এতদূরে এসেছি। যম। য! সে কি বলছ সাবিত্রী। সাবিত্রী। আপনি আমাকে শতপুত্রের জননী হবার বর প্রদান করেছেন, অথচ আমার স্বামীকে নিয়ে যাচ্ছেন। সত্য করে নিজেই সে সত্যপালনের অন্তরায় হচ্ছেন। আপনি যম,---চিরদিন নিয়মাধী। মায়াবশে আপনি আমাকে বরপ্রদান করেন নি। আমার পুণ্য বল আপনাকে আকৃষ্ট করে বর প্রদানে বাধ্য করেছে। সুতরাং মিত্ররূপে আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনি স্বধৰ্ম্ম পালনের জন্য আমাকে পঞ্চম বর প্রদান করুন। আমি নিজে বলছি--সনাতন ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষা করে আপনি পুরীপ্রবেশ করুন। নতুবা সেখানে আপনার আর প্রবেশাধিকার নাই। যম। যi! তুমি কে ? কে তুমি? কোন্ ভুবনপালিনী শক্তি ধৰ্ম্মকে আজ জ্ঞান শিক্ষা দেবার জন্য স্বেচ্ছায় আপনাকে পতিবিরােগিনী করেছ ? মা-মা! উজ্জ্বলতর আলােক সন্নিহিত হলে, স্বল্পালােক যেমন অন্ধকারময় হয়, জ্ঞান- ময়ি। তদ্রুপ তােমার সমীপন্থ হয়ে আমার সমস্ত জ্ঞান সাবিত্রী। • 54 55 5, 4 = , , , , , , , , , , , * 1 * * * * * * * বিলুপ্ত হয়ে আসছে। ধৰ্ম্মকে ধর্মশিক্ষা দিতে, কে তুমি করুণাময়ী! তার পুরীর দ্বারদেশ পৰ্য্যন্ত উপস্থিত হয়েছ ? সাবিত্রী। আমি সত্যবানের প্রিয়তমা ভাৰ্য্যা-শাস্ত্রে আমার নাম সতী। আমার অস্তিত্বে তােমার অস্তিত্ব। ধৰ্ম্মরাজ । শাস্ত্রাদেশে আমি তোমাকে আদেশ ক’ছি—আমার পদ গৌরব রক্ষা করে স্বপদে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হও! যম। মা! এই নাও--সতী! জগতে মহিমা প্রচার করবার জন্য পুরুষ শ্ৰকৃতি-রূপে সৃষ্টিরক্ষার জন্য ~~তােমার চিরন্তন সামগ্রী পতিধন গ্রহণ কর। আর সেই সঙ্গে আমার কোটা কোটা প্রণাম গ্রহণ কর। আমি ধন্য- আমার পুরা ধন্য—আর এই অপূৰ্ব্ব পতিব্রতার মাহাত্মে এই আয্যাধিষ্ঠিত যে ভারতভূমি, তিনি ও ধন্য। সাবিত্রী। কতদূরে এসেছি ধৰ্ম্মরাজ ? যম। মা, আমার প্রিয়তমা দয়িতাঃ মৃতসঞ্জীবনী পুরীর দ্বারদেশে উপস্থিত হয়েছ। যদিই মা, কপূর্ণ করে এতদূর এসেছ, তা হ একবার সাবিত্রী । অদ্ভুত এ কি দেখলুম ধৰ্ম্মরাজ। যম। সম্মুখে উত্তপ্তজা বৈতরণী, তার উপরে ওই মায়া-সেতু। দেখছ মা–কি অপুর্ব বিবিধ বিচিত্র বর্ণে রঞ্জিত।
পঞ্চম অঞ্চ। ১৩১ পুণ্যাত্মা যখন এই স্থানে উপস্থিত হন, তখন এই সেতু কুসুমাচ্ছন্ন পবিত্র পথ। পাপাত্মারা যখন উপস্থিত হয়, তখন এই সেতু পাপভেদে বিভিন্নমুর্তি ধারণ করে। ওই দেখ মা-ওই দেখ কাঞ্চনময়। ওই দেখ—ওই দেখ—আবার বিবিধবর্ণ কুসুম-সমাকীর্ণ। ওই দেখ, আবার ভীষণ অগ্নিময়-সঙ্কর্ষণের মুখানলের ন্যায় নীল জিহ্বা বিস্তার করে পাপীকে গ্রাস করতে আছে। দেখ মা--- আবার দেখ-- প্রবেশ-পথে অগ্নি-অক্ষরে কি লেখা আছে দেখ--*জীব ! এখানে চিন্তা ক’রবার অবসর নাই।” পাপী, সম্মুখে এই কণ্টকাকীর্ণ পথে যেতে সাহস করে, নদীতে ঝম্প প্রদান করে। আর অমনি উত্তপ্ত জলে দগ্ধ হতে হতে, জলস্রোতে অন্ধকারময় নরক-কুণ্ডে নিপতিত হয়। মা! এই বারে আমাকে অনুমতি কর। রাত্রি প্রহরাবশেষা—অনুমতি কর মা- পুরী প্রবেশ করি। সাবিত্রী। করুন – যমের প্রস্থান) -তার পর? জ্ঞানশূন্য হয়ে যমের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটে এসেছি। কোন্ পথে এসেছি, কিছুই ত জানি না! এখন কেমন করে ফিরি !-গুরুদেব! কোথায় তুমি ? এ সঙ্কটে তুমি ভিন্ন রক্ষা করবার যে আর কেউ নাই। এ প্রাণ-পুষ্পধার মলিন না হতে হতে আমাকে ফিরতে হবে—কোথায় আছ দয়াময় ? --অভাগিনী নন্দিনীকে রক্ষা কর- জ্ঞানাঞ্জন-শলাকায় চক্ষু উন্মীলিত করে অজ্ঞান-অন্ধকার পথ দেখাও-পথ দেখাও।
সাবিত্রী । • ' • • • • •••••••••••••• f} ( মাণ্ডব্যের প্রবেশ।) মাওব্য। মা, মা–কই তুমি? সাবিত্রী। এসেছ—এসেছ—পিতা এসেছ ?-কই তুমি? আর যে আমি তােমাকে দেখতে পাচ্ছি না। মাগুব্য। ভয় কি মা, এই যে আমি এই যে আমি। কই- আমার প্রাণ কই—সাবিত্রী! আমার প্রাণ কইআমার প্রাণ কই ? সাবিত্রী! এই নাও-শীঘ্র নাও -অঞ্জলি নাও-তব দন্ড সামগ্রী তুমি গ্রহণ কর (গীত ।) জীবন-তটি না-কূলে এসে আবার পাছে ভেসে যাই। ভয়ে ভয়ে আসি, চরণে দাসী, রাখিল জীবন-কুসুম তাই । মুছে নিয়ে গিয়েছিল শমন অকালে শট-বিন্দু, চকিতে চাহিতে, দেখি চারিভিতে, অপার ধার সিন্ধু, দুর কর ভয় দয়াময়, আর না হারাইন হারাই--- অভয় চরণে রাখিনু যতনে, তুলে লও কোলে হে গোঁসাই - চতুর্থ দৃশ্য। অশ্বপতি ও মালবী। মালবী। কই মহারাজ, সাবিত্রী কই ? আমার জামাতা কই? বৃদ্ধ অন্ধ রাজা, আর বৃদ্ধা মহিষী শৈব্যা --তারাই বা কই ঋষিগণ- তারাই বা কোথায় ? সব অন্ধকার ! ?
AAAAA। আশুম শূন্য। কার কাছে আশ্রয় গ্রহণ ক’ব-কাকে আমার জামাতার কথা জিজ্ঞাসা ক’ব ? কে বলবে- সত্যবান বেঁচে আছে, আমার মেয়ে বেঁচে আছে। মহারাজ-মহারাজ ! কোথায় যাই ? কি করি? সম্মুখে গভীর বন-কৃষ্ণা চতুর্দশীর ঘাের অন্ধকার-কাল আব- রণে যেন আমাদের গন্তব্য পথ রোধ করে বসে আছে। কি হবে মহারাজ-কি হবে? অশ্ব। উতলা হয়ােনা মহিষী! এক বৎসর থেকে বিপদের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছ। বিপদের সম্মুখে এসে আত্মহারা হয়ােনা। মালবী। ওগো অমন কথা বলেনা-দোহাই মহারাজ, আশ্বাস দাও। বল, আমার জামাতা বেঁচে আছে- সাবিত্রীর সিথের সিদুর অটুট আছে। অশ্ব। কেমন করে থাকবে মহিষী! দেবষির বাক্য মিথ্যা - নয়। ( তুম্বরু ও মালিনীর প্রবেশ।) তুম্বুরু। কখনই নয়, দেবষি ঠাকুরের বাক্য-সেকি মিথ্যে হবার যো আছে! কি বলিস বউ। মালিনী। ও বাবা-চেঁকি ঠাকুরের কথা মিথ্যা হবে! যেমনি একটা বছর গেছে, অমনি মালার ফুল আবার চচ করে ফুটে উঠেছে। তুরু। বাতাস অমনি ফুলের গন্ধ মাথায় করে বন্ করে দিদিরাণীর কাছে ছুটে গেছে।
১৩৪
সাবিত্রী।
মালিনী। ভােমরা পুটলীর ধারে বন্ করে ঘুরছে।
তুম্বুরু। আর বউ এর প্রাণ ঝন্ ঝন্ করছে--দেবর্ষি ঠাকুরের
কথা কি কখন মিথ্যে হয় !
অশ্ব। কিরে তুম্বুরু, কি বলছিস ?
আর বলাবলির সময় নেই মহারাজ । এখন থেকে
গলাগলি। দিদিরাণী আর তার বরকে গলায় গলায়
মালা দিয়ে বাঁধব, তবে আমরা ঠাণ্ডা হব।
অশ্ব। অ, হতভাগ্য অজ্ঞান ! কে তােদের এ বৃথা আলাস
তুম্বুরু।
দিয়েছে ?
উভয়ে। টেকি ঠাকুর।
মালবী। টেকি ঠাকুর কি বলেছে ?
মালিনী। দিদিরাণী আর বরের জন্য মালা গেঁথেছিলুম। ঠাকুর
বলেছিল—এক বৎসর পরে মাল এখানে নিয়ে
আসতে।
তুম্বরু। দিদিরাণীর বরের নাকি আজ যমের বাড়ী নেমন্ত্রণ
আছে ।
নেমন্ত্রণ সেরে ফিরে আসবে, দিদিরাণীর পাশে
বসবে, আর আমরাও অমনি মালা নিয়ে হাজির
হব।
মালবী।
এসব কি বলছিস! তুম্বুরু-তুম্বুক, স্পষ্ট করে বল
মহামূল্য পুরস্কার দেবো। সত্য করে বলদেবষি কি
বলেছেন। সাবিত্রীর বর কি বেঁচে আছে ?
তুম্বুক।
বেঁচে আছে—তবে এখনও যমের বাড়ী আছে, কি
গাছতলায় ফিরে এসেছে, সেটা বলতে পাছি না। ওই
বাবাঠাকুর আসছে-ওর কাছে খবর নাও মহারাজ।
পম অঞ্চ।
• •|•
।। fr", A
}
( মাণ্ডব্যের প্রবেশ।)
মালবী। দয়াময় দয়াময়, কোথায় ছিলে ? তােমার দাস,
দাসী যে অভয়পদ দেখতে না পেয়ে জগৎ অন্ধকার
দেছিল!
অশ্ব! দয়াময়, দাসের প্রণা গ্রহণ করুন।
মাগুব্য। কে ও-মহারাজ ! কন্যাকে দেখৃতে এসেছ ? জামা-
তাকে দেখতে এসেছ ? এস মহারাজ, এস রাণী, দেখবে
এস। তােমার নন্দিনী ধৰ্ম্মরাজকে পরাস্ত করে, তার
হাত থেকে স্বামীকে উদ্ধার করে এনেছে। দেখবে
এস—স্বর্গীয় আলােকে উজ্জ্বলাঙ্গ পতির পাশে সতীরাণীর
কি অপূৰ্ব্ব শােভা !
মালবী। প্রভু-প্রভু, বলছেন কি?
বুঝতে পারছিনা।
আমার মাথা ঘুরছে। নন্দিনী জ্ঞানশূন্য, তাকে রক্ষা
করুন ।
অশ্ব। ধন্য আমি, এমন কন্যাকে লাভ করেছি। রাণী ! ধন্য
তুমি, সাবিত্রীকে গর্ভে ধারণ করেছ। প্রভু! সে
শােভা দেবার জন্য আমি আকুল হয়ে উঠেছি।
মাওব্য। আসুন মহারাজ ! তুম্বুরু, তুমি নীরব কেন ? মালা
কই? মালার অপেক্ষায় তােমার দিদিরাণী যে ব'সে
আছে। মালিনী, তুমিও নীরব কেন মা!
মালিনী। হাঁ দেবতা—কিছু নীরব আছি। যখন যমের বাড়ী
থেকে বর আঁছে, তখন যমদুত গুলো ত বরষাত্র হয়ে
এসেছে !
ক্রোড় অঙ্ক
( আপনােপরি উপবিষ্ট সাবিত্রী সত্যবান।
সম্মুখে মাণ্ডব্য ; উভয়পাশ্বে অশ্বপতি, মালবী,
দ্যুমৎসেন, শৈব্যা, অক্ষিরা, তুঘুরু ও
মালিনী )
অলি ।
কেমন সাবিত্রী-কেমন ভগিনী! যমের সঙ্গে কে যুদ্ধে
জিতুলে ? তবে নাকি বিধিলিপির খণ্ডন নেই ? তৰে
কৰ্ম্ম কেন? ব্রত-নিয়মাদি কেন? ভগবান্ নিজমুখে
কর্মের অজস্র প্রশংসা করেছেন। এ জগতে কৰ্ম্মই
বলবা।
কৰ্ম্মণ জায়তে জন্তুঃ কৰ্মণৈব প্ৰলীয়তে।
সুখং দুঃখং ভয়ং ক্ষেমং কৰ্ম্মণৈবাভিপছতে।
সাবিত্রী। ভগিনি। এ সমস্তই ত তােমার আশীর্বাদ।
অলি । সাবিত্রি ! অসাধারণ অধ্যবসায়, অবিচলিত উৎসাহ,
গুরুভক্তি, পতিস্নেহ ও ব্ৰত-নিয়মাদি দ্বারা তুমি যে
অলৌকিক কাৰ্য্য সাধন করেছ, অনন্তকাল ধরে তুমি
ক্রোড় অঙ্ক। ১৩৭ Ad/ সেই কুৰ্ম্মফল ভােগ কর। স্বরচিত এই পবিত্র সংসার- উদ্যানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হয়ে সমস্ত সংসারে আলােক বিকীর্ণ কর। শতভ্রাতার ভগিনী হও, শতপুত্রের জননী হও। অ , দেখাও-যেখানে, যে সময়ে, তুমি যে ভাবেই অবস্থিতি কর না কেন, তুমিই গীতা, তুমিই গায়ত্রী, তুমিই ভগবতী । তুমিই জননী, তুমিই কন্যা, তুমিই ভগিনী । সহধৰ্ম্মিণী রূপে ধৰ্ম্মরক্ষার জন্য তুমি গৃহে গৃহে মূর্তিমতী হও। পৃথিবীতে সােণার সংসারের প্রতিষ্ঠা হোক। সুধার লহরে ধরণী ভেসে যাক । (গীত ।) তারে তারে বাঁধা প্রাণ। মিলনে মিলনে তােলে জীবনে ললিত গান। সােণার সুখের প্রাতে, আঁধারে আবরিতে, কাল নিশি করে অভিযান ; জাগো সতী জাগে। সতী, যুচাও তামসী-বাতি, দাও জ্ঞান রাখ মান, আকুলে কুল কর দান। মণ্ডব্য। তুম্বুরু, নীরব কেন? আনন কর। তুম্বুরু। আমি যে মুরুক্ষু দেবতা। মাওব্য। আমার আশীর্বাদে তােমার কণ্ঠে সরস্বতী নৃত্য করুন।
সাবিত্রী।
(গীত )
প্রভাত অরুণক। রঞ্জিত কানন,
বিকসিত কমল পাশে।
মত্ত মলয়ানিল
সেবিত সরােবর
শীর নিকর অভিলাষে।
কোকিল পঞ্চম মুখরিত কুঞ্জে, মধুকর চুম্বিত সুমনস পুঞ্জে,
বিহরতি মদন বিলাসে।
ত্যজ আলস, কুরু লালস জাগৃহি জাগৃহি পীতবসে?
পতন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.