Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Sur-hara
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সুৱ-হাৱা শ্ৰীঅজিতকুমার সেন, এম-এ।
মণীমােহন বাগচি
ইলাবাস’
বিন গাৰু লীগ
১৩৩০
মূল্যবার আনা
r
*
মুদ্ৰাক-ঐবিভূতভূষণ চট্টোপাধ্যায়
কালার প্রেস
১৬ নং টাউসে ( ৪ গুনাগুন, কলিকাতা
।
কবিতাগুলির প্রায় সবই অনেক আগেকার লেখা।
কোন-কোনটা ইতঃপূর্বে মাসিক-পত্রিকায় ছাপা হইয়া-
ছিল, পাঠ্যাবস্থায় প্রকাশিত কবিতা-গ্রন্থ “অস্ফুট” হইতেও
কয়েকটা গৃহীত। পূৰ্ব্ব-প্রকাশিত কবিতাগুলির একটু
আধটু পরিবর্তনও করা হইয়াছে।
No text on this page.
—সূচী ' অজানার ক ‘বিজলী-৫ই ভাদ্র, শুক্রবার, ১৩৩২) ১ নাম (প্রবাসী”—ফান, ১৩৩০) কবিতার প্রতি (মালঞ্চ-ভাদ্র, ১৩২৫) প্রথম দখিন হাওয়া সমাধি-মন্দির মরণ-কাঠি ও জীয়ন-কাঠি নৈশ প্রকৃতির প্রতি শক্ত ও মিত্র (“আল-মাঘ, ১৩২৩) বসন্তে বর্ষা অপূর্ব সাধ (“মাঞ্চ”-চৈত্র, ১৩২৫) ••• ১৪ ২২ অভাগা , রহস্য দোলের দিনে নব বর্ষে ২ ৯ । 82 “যেতে হবে শুধুই আমায়” (“মালঞ্চ-ভাদ্র, ১৩২৪) ব্যর্থ কাম" বিধবার কথা (মালঞ্চ-চৈত্র, ১৩২৪ ) অপেক্ষায় (শাল -আষাঢ়, ১৩২২) - T
•
ও ও ও
খেয়াল ঘােরে
চির বিজয়িনী
গান
বর্ষায় (“মানসী ও মর্মবাণী”, ১৩৩২)
কাব্যে বিপত্তি
লাভ-ক্ষতি
চরম সার্থকতা
9 ঃ
৩৯
৭।
গানের শেষে
।
-হাৱা
অজানার ডাক
চিরদিন যেই কথাটা জাগলাে প্রাণে,
আজ শুনি তায় বাদল হাওয়ার
উদাস গানে।
অনুখণ খোজা কারে আকুল চোখে,
অবিরাম নয়ন-ধারা তারি শােকে,
নিরাশার হৃদয়-জোড়া দীর নিশাস
করুণ তানে।
সুর-হারা
।
জীবনের..প্রভাত থেকে খুজি যারে,
বালক যে তার চোখের দেখা
পেলেম না রে !
চাদিমার পূর্ণ সুখের হাস্যখানি
প্রাণে মাের জাগায় অপূর্ণতার বাণী,
বিহগের বিমল গানে সেই কাহিনী
বাজে কানে।
ধরণীর যতেক আবেগ-চঞ্চলতা
জাগায় পরাণ-বিকল-করা
তাহার কথা।
বাঁধন-হারা নদীর মত
ছুটেছি তারি পানে অবিরত
পরাণের কোন্ অজানা গভীর টানে
কে বা জানে।
আমি যে
জানি ত’ আসা হেথা তারি তরে ;
তারি বাঁশী হৃদয় সদা
উদাস করে !
.
২
অজানার ভাব
বরণের মাল্য হাতে আমার লাগি
যাপে সে শুন্য প্রাণে নিশীথ জাগি ;
আকাশের তারা তারি ব্যাকুল চাওয়া
বহে আনে।
যেদিনে মিলন হবে তাহার সনে,
ঘুচবে জটিল দ্বন্দ্ব-দ্বিধা
লাগে মনে।
বুঝিব কেন হাসে প্রসূন-পাঁতি,
কেন যে ধানের ক্ষেতে মাতামাতি,
অনিমেষ করুণ-চাওয়া চায় যে গগন
কাহার পানে।
নাম
(Coleridge)
প্রিয়ারে আমার সুধামু একদা “ওগাে মাের প্রাণ-প্রিয়া,
কাব্যে তােমায় করিব প্রকাশ বল কোন্ নাম দিয়া?
ললিতা, কুন্দ, জ্যোৎস্না, সরলা,
নীলিমা, নমিতা, মীণ কি মূরলা,
মানসী, লতিকা, ছায়া, বীণা, লীলা,-বল যাহা চায় হিয়া।”
T
সােহাগে গলিয়া কহিল আমার প্রাণপ্রিয়া শুনি তাই,
যা লাগে তােমার ভাল বলি’, মাের মতামত কিছু নাই।
হােক্ সে লতিকা, কুন্দ কি বীণা,
মানসী, নীলিমা, ছায়া, লীলা, মীণা,
তােমারি বলিয়া ভাষিও আমায়,–এই শুধু আমি চাই।”
।
৪
কবিতার প্রতি
কৃপা-কটাক্ষেতে তুমি চেয়েছ যেদিন
হে সুন্দরি, হে কবিতা-রাণি, মাের পানে,
সে অবধি নিরবধি আনন্দের বীণ,
হৃদি-মাঝে ঝঙ্কারিছে সুমধুর তানে।
সে অবধি অনুখণ চঞ্চল পরাণ,
মাের পাশে সবি চির-নবীনের প্রায়,
তটিনীর “কুলু” রব,—বিহগের গান,
সে অবধি কত কথা ক’য়ে মােরে যায় ।
সে অবধি চাদিমার আলোেক-নিকর
মলয়-পবন—তারা কত অর্থে ভরা।
বিমান, বনানী-রাজি কত যে সুন্দর!
অসীম সৌন্দর্যে ঘেরা সারা বসুন্ধরা !
নয়নে পরায়ে দেছ কোন্ যে অঞ্জন,
যাহা হেরি সবি যে গাে নয়ন-রঞ্জন!
৯
প্রথম দখিণ-হাওয়া
আজকে প্রথম দখিণ-হাওয়ার মদির মধুর হিল্লোলে
আবেশ-করা রঙ্গীন নেশায় উলাস-ভরে দিল দোলে।
কোথা হতে কোন্ বারতা নিয়ে এল দূত এ যে।
খুলে দিল চির-নীরব আনন্দের ঐ উৎসে যে।
বসন্ত কি পাঠালাে তার আগমনীর সন্দেই ?
শীত-রাজের অত্যাচারের এবার বুঝি হয় শেষ-ই ?
রহি’ রহি তাই বুঝি তার জীর্ণ পাতার মর্মরে
মর্মভেদী দীর্ঘ-নিশাস উঠছে অসীম অম্বরে !
আশায় মাতি’ তাই তাে নাচে লতা দোদুল লাস্যেতে ;
তাই পুলকের রঙ্গীন আভা প্রসূন-বালার আস্যেতে।
নিদ্রা-মাঝে স্বপ্নে উঠি চমকি’ মােহন ভঙ্গীতে-
গভীর রাতে তাই বুঝি আজ কোকিল মাতে সঙ্গীতে।
কোথায় তােরা আছি ওরে, আলস-মাখা শয্যাপ।
ঋতু-রাণীর বার্তা এল, এবার বিলাস-সজ্জা কর।
প্রথম দখিন হাওয়া
এবার তােদর ঘুচলল দুখের তামসিনী শৰ্বরী ;
আনন্দ-ধন লুটতে হবে এবার দু’টি কর-ভরি’!
শ্যামল তৃণ-গদীর পরে বিছা কুসুম-সিংহাসন,
দিগ্বিদিকে জাগুক্ তাহার বন্দনারি সম্ভাষণ ;
পরভৃতে দে পাঠিয়ে আন্তে তাহার রথ টানি’;
কিংশুকেরি কোমল দলে সাজা তাহার পথখানি।
.
তাহার চরণ-রক্ষা লাগি তড়াগ ভরু উৎপলে,
কুঞ্জ উঠু স্নিগ্ধ সাজে সাজি রসাল কুটালে ।
বকুল-শাখের দোলনাটি তার সাজুক নবীন পল্লবে।
বিশ্ব ভুবন উইক মাতি’ উৎসবের ঐ কলরবে।
;
দীন-শয়নে শুয়ে আজো ওগাে কবি, কোন্ ভুলে।
“বিশ্ব ব্যাপি পল সাড়া চেয়ে দেখ চোখ তুলে।
মলয় আজো তােমার কানে সে কথাটা কয়নি কি?
বসন্তের ঐ সজ্জা তােমার আজো, কবি, হয়নি কি?
বন্ধুজনার মর্মভেদী দুর্ব্যবহার অন্তরে
এখনও তেমনিতর অহর্নিশিই সম্ভরে?
৭
সু-হারা
শত্ৰুজনার উপহাসের হীনতা-দীন হাস্য কি
ভঙ্গ করে আজো হৃদের পুলক-মাখা লাস্যটি ?
ওঠো কবি, তােমার লাগি’ সে সবাররা উচ্চস্থান ;
তােমার তরে নয়কো হওয়া তুচ্ছ ব্যথায় মুহ্যমান।
তােমার কভু সাজে কি হায়, দুঃখ-ব্যথার বন্ধ এ ?
স্পর্শে তােমার নাচবে ধরা মুক্তি-সুখের স্পন্দনে।
ওঠো কবি, বাঁধ তােমার সকল খানি অন্তরে
উলাস-ভরা তানটি ধর তােমার বীণা-যন্তরে ;
উঠুক তাহে রাগ-রাগিণী, চিত্র কত ছন্দ না!
বিশ্ব সনে গাও তুমিও বসন্তেরি বন্দনা।
সমাধি-মন্দির
মরণ-অন্তে আমার, কেহও শ্মশানে চিতার পরে-
মােহন সমাধি-মন্দির যদি রচনা কভুও করে,
আমার সকাশে নাহি হবে তাহা প্রীতিপ্রদ ততদূর,
হবে যত—যদি মরণ শ্মশান করে কারাে হৃদিপূর।
শয়নে, স্বপনে, জাগরণে আর সে মহাশ্মশানে যদি-
বিরাজে সমাধি-মন্দির সম স্মৃতি মাের নিরবধি।
৫
মরণ-কাঠি ও জীয়ন-কাঠি
ইচ্ছা হলেই রাখতে পারিস জীয়াইয়া মােরে,
মাতে পারিস যখন খুসী তাের,
তাের হাতেতেই রয়েছে যে, কুহকিনি ওরে,
মরণ-কাঠি, জীয়ন-কাঠি মাের ।
কৃপা-ভরে করিস যবে দৃষ্টিপ্রসাদখানি,
মাের মাঝারে খেলে জীবন শত,
বিরূপ যবে বিরাগ-বশে, তখন যেন মানি-
আমায় আমি প্রাণ-বিহীনের মত।
১০
নৈশ প্রকৃতির প্রতি
টুটিল,—নিশীথে টুটিল নি মাের আজি হতে ;
কি হেরিনু! তুলনা ইহার কিছু আছে এ মরতে?
তারকা-বেষ্টিত এই সুনীলিম উদার গগন,
এই শ্যামা বসুন্ধরা,-মৌন-ধ্যান-স্তিমিত-নয়ন,
বায়ু-পথে ভেসে-আসা এই রম্য বিহগের গান,
অদূরস্থ তটিনীর এই মৃদু-“কুলু-কুলু” তান,
এই বাতদোলায়িত বেণু-কুঞ্জ নয়নাভিরাম,
এই শান্ত নীরবতা সুগভীর—এ কি হেরিলাম।
ওগাে রাণি, ওগগা প্রাণ-বিমােহিনি, প্রকৃতি সুন্দরি।
গভীর নিশীথে আজি সাজিয়াছ একি সাজে, মরি।
পরেছ যতনে গলে তারকার মঞ্জুমালা-খানি,
কুসুমখচিত শ্যাম বাস দে’ছ বক্ষোপরি টানি,
সারা অঙ্গে মাখিয়াছ শেফালির সুরভি-মধুর,
শুভ্র চন্দ্র ললাটিকা শােভিতেছে স্নিগ্ধ ভাল-পুর ।
কার লাগি এত সাজ ? বিন্দু বিন্দু নয়নের বারি
ঝরিতেছে কার তরে? কার তুমি বিরহিনী নারী ?
১১
অর-হারা
হায় রাণি, এ গভীর এ নীরব নির্জন-নিশায়
কন এ মােহন সাজ? এযে হায় কেবলি বৃথায়!
স্বার্থ-পঙ্ক-মগ্ন ওই অধিবাসী যত জগতের
তারা কি পারিবে কভু বুঝিবারে কি যে মৰ্ম্ম এর ?
তারা বােঝে ভাল—কিসে যায় কার সর্বনাশ করা ;
তারা বােঝে মৰ্ম্ম ওই সিন্ধুকের—স্বর্ণরৌপ্যে ভরা ;
তারা বােঝে কি প্রকারে করা যায় দিবস যাপন
আরামে নিশ্চিন্ত ভাবে আলস্যেতে রহি নিমগন ;
তারা বােঝে—অপরেরে দেয়া যায় কোন্ মতে ফাঁকি
স্বর্গীয় সুষমা এই,—মূল্য তার বােঝে তারা তা কি ?
;
তাই হােক! তারা রাে’ মগ্ন সবে স্বার্থের চিন্তায়,
কিসে অর্থ আসে তার নিরূপণ করুক উপায় ;
সর্বনাশ করে যাক অপরের যে যতেক পারে ;
সুদূরেতে সরাইয়া আর শুধু রেখােনা আমারে।
আমারে করেছে হায়, উনমাদ, হে সৌন্দৰ্যরাণি,
অনুপম লাবণ্যেতে ঢল ঢল তব তনুখানি।
এমনি নিশায় আমি প্রতিদিন, চঞ্চল পরাণে
আসিয়া দাড়াব হেথা, চেয়ে রব তব মুখ-পানে ;
১২
?
নৈশ প্রকৃতির প্রতি
এ নির্জনে, সঙ্গোপনে, হে সুন্দরি, হে মাের প্রেয়সি,
হবে কথা আমাদের এইখানে মুখখামুখি বসি।
তুমি থেকো এমনিই অনিমেষে চেয়ে মাের পানে,
মুছে দিও দুখ-ব্যথা, বরষিও শান্তি-সুধা প্রাণে।
প্রেরিত মলয়ে যাবে দিয়ে মােরে তােমার চুম্বন,
আবেশে ভুলিব আমি আপনাকে, ভুলিব ভুবন !
১৩
শত্রু ও মিত্র
( Schiller)
মঙ্গল যেমন লভি প্রিয় বন্ধু হতে
তেমতি হতেও ঘাের শক্ত লভি হিত ;
দেখায় মিত্র সে শুধু কি পারি করিতে,
অরি সে শিখায় মােরে-করা কি উচিত।
১৪
বসন্তে বর্ষা
আজ যে দারুণ অতর্কিতে হঠাৎ শীতের শেষে,
বর্ষারাণী বুঝিই মনের ভুলে,
পল এসে ছুটে ধরার তােরণ-দুয়ার দেশে,
ঝােড়াে হাওয়ায় উড়িয়ে মেঘের চুলে
কীই না বিষম সর্বগ্রাসী জ্বালাময়ী তৃষা
নয়নে তার তীব্রতর জাগে।
চকি উঠে বিশ্ব-ভুবন, রঞ্জি’ উঠে দিশা
প্রবল তার ঐ দীপ্ত প্রখর রাগে।
আজ যে কভু ভ্ৰমবশেও চায়নিকো কেউ তাহে,
—এই ত শীতের কবল হতে সবে
মুক্তি লভি তৃপ্ত ধরা মুগ্ধ চোখে চাহে,
পুলক জাগে পাখীর কলরবে।
১৫
সুর-হারা
বনানী-পথ সাজলাে সবে কিংশুকেরি দল—
বসন্তেরে নিতে বরণ করে,
পাতার চিকের আড়াল থেকে মহা কৌতূহলে
ফুলের আঁখি ফিরে তাহার তরে।
জীর্ণ পাতার বক্ষ চিরে জাগলাে কচি পাতা,
এখন বাজে কোন্ অতিথির ভেরী ?
নবীন কোমল কিশল-বালা বলছে নেড়ে মাথা,
—“না-না, তােমার আরাে আছে দেরী।”
প্রসূন-বালা ফুটতে গিয়ে চমকে উঠি লাজে
দলের কোলে বদন বুঝি ঢাকে ;
তার চরণের শব্দে কোকিল হঠাৎ গানের মাঝে
নিরাশ প্রাণে স্তব্ধ হয়ে থাকে।
সবার হতে লভিয়া আজ এতেক অনাদরে
বর্ষা বুঝি বুঝলাে নিজের ভুলে।
সম্বরিয়া প্রস্তগতি তাই ত সরম ভরে
গুমােট মেঘের বাস-মুখে নেয় তুলে।
১৬
বসন্তে বর্ষা
করিস্ নে তায় আজকে তােরা করিসনেকো হেলা,
ব্যর্থ হৃদে ফিরতে দিই না যে।
হাস্যমুখে হৃদয়ে তায় বরে নে এই বেলা,
সে বুঝি ওই মরেই দ্বিধায় লাজে।
বকুল-শাখের দোলনাটা ওই নবীন কিশল কুলে
সাজলল যে আজ বসন্তেরি লাগি,
যতন ভরে তাহার পরে তারে নে আজ তুলে,
হাতে পড়া সােণাল ফুলের রাখী।
হরিপ্রিয়ার পরাগ যদি না জোটে, কি তাতে ?
যুথীর দলে শয়ন রচি তারি ;
আম-মউলের কীরিট তুলে দিস্ আজি তার মাথে ;
কৃষ্ণচূড়ায় পাওয়া যে আজ ভাই।
ঐ শােন আজ গগন-কোলে বাজে মাদলধ্বনি,
ক্ষুব্ধ বায়ু অন্ধ-বেগে ছােটে;
লক্ষ ফণা তুলে নাচে সৌদামিনী-ফণী,
লতার বীথি শিউরি’ দারুণ এ
১৭
২
রঙ্গে ওরি মারে আজি পরাণ ও মন রে
বসন্তের ঐ সজ্জা বারেক খুলে ;
শূন্য প্রাণে কেঁদে যেন ফিতে না হয় ওরে,
–এলই যদি ক্ষণের মনের ভুলে।
১৮
অপূর্ব সাধ
সাধ যে কত হৃদে আমার নিত্যি নব জাগে,
সাহস করে কইনি কারাে কাছে ;
কি জানি তা তাদের পাশে কেমন তরই লাগে,
হেসেই যদি ওঠে তারা পাছে।
যদিই ওঠে বলে তারা এমন ধারা ন্যাকা
সারা জগৎ জুড়ে কোনখানে
এ যাবৎ ত কোন দিনাে যায়নি পাওয়া দ্যাখা ।”
কাজ কি, তাহা থাকুক আমার প্রাণে।
ধানের ক্ষেতে ঢেউ তুলিয়ে দুলিয়ে গাছের পাতা
আজকে বহে হেমন্তেরি বায় ;
কঠিন হ’ল আজ যে আমার ঠিক রাখা এ মাথা!
গুহ কথা গােপন রাখাই দায়।
ওপারের ওই কুঞ্জ হতে আকাশ-পথ দিয়ে
আসছে যে ঐ পাখীর কলতান,
১৯
অ-হারা
সাধ হয়েছে আজকে আমার—ওই খানেতে গিয়ে
তাদের সনে আমিও ধরি গান।
গভীর বনে যেথায় খেলে কুরঙ্গম-চয়,
মনের সুখে বেড়ায় দিশি দিশি,
সেখানে সে নিবিড় বনে ইচ্ছা যেতে হয়,
সাধ মনেতে—তাদের সনে মিশি।
তাদের সনে হেথা হােথা বেড়াই আমি ছুটি
শ্রান্ত আমি পড়ব হয়ে যবে,
আমলকীর ঐ গাছের ছায়ে পড়বাে আমি লুটি
নিদ আসিবে পাখীর কলরবে।
সাধ যে আমার মিশে রহি সবুজ পাতার সনে,
ফুলের সনে আমিও হাসি, দুলি ;
মনের যত কথা আছে জানাই সমীরণে,
দুঃখেরে যাই এ জগতের ভুলি’!
বিশ্ব-মাঝে ছড়িয়ে আছে কতই যে আনন্দ,
কতই হাসি, কতই যে গান আর,
২০
অপূর্ব সাধ
সে সব কি হায়, আমার বেলা রইবে হয়ে বন্ধ ?
কেহই কি হায়, খুলবে না তার দ্বার ?
তােমরা সবে হাস্ছ বুঝি উপহাসের হাসি ?
কেউবা, সখা, কচ্ছ বুঝি রােষ?
আজকে আমার প্রাণের মাঝে বাজছে কিসের বাণী,
আজকে আমার নিওই নাকো দোষ।
২১
দান
বেলা দু’পহর; মাথার উপর রাজিছে অংশুমালী
ধরণীর পরে অবিরল ধারে প্রখর কিরণ ঢালি।
জন-কলরব-মুখরিত পথ ; আপন কাজে যে যার
চলিয়াছে ধেয়ে, নাহিকো সময় কোন পানে তাকাবার।
হেনকালে সেই কোলাহল ভেদি উঠিল করুণ তান,
“এক পাই মােরে দাও, বাবু, ভাল করিবেন ভগবান?”
সে আর্তনাদ কি মহা করুণ, অন্তর-ভেদী কি যে !
ব্যাকুল পরাণে ছুটিয়া আসিয়া বাহিরে দাড়ানু নিজে।
নেহারি যাহা, বরণিতে তায় আজিও শিহরে কায় ।
করুণা-আবেশে আঁখি দুটি মাের আজিও বুজিয়া যায়।
কুষ্ঠের এক রােগী চলিয়াছে দুই হাতে ভর করি,
শতেক ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে সারাটী অঙ্গ ভরি’ ;
পড়িয়া গিয়াছে খসি’ তার এক পায়ের অর্ধখান,
অবিরল ধারে ঝরিছে রুধির হতে সে ক্ষতের স্থান।
।
২২
পথের দু’ ধার বাহি চলিয়াছে পিপীলিকা-সারি মত
কত ভাবে কত অভিনব সাজে সাজিয়া মানব শত।
কাপাইয়া যত দুইটা পাশের অট্টালিকার সারি
সশব্দে অতি বেগে ধেয়ে যায় ধনিদের জুড়ী-গাড়ী ;
বিরক্তি-বশে কেহ হেরি’ তায় সুদূরেতে যায় সরে,
ত্ৰস্তগতিতে কেহ দেয় তারে ছাড়ি’ পথ ঘৃণাভরে।
বিব্রত সবে আপনাকে নিয়ে, আপনার ভাবনায় ;
এক কোণে বসি’ কঁাদে এক জন,—কার তাতে আসেযায় ?
হেন কালে মাের আঁখি পাশে ছবি স্বরগের একখানি
ধরিল কে যেন, বিশ্বাস কেহ করিবে কি তা না জানি।
হেরিলাম—আসে ভিখারিণী এক, দারিদ্র্য-মহাভার
অকালেতে হায় ফেলিয়াছে দেহ-লতা নােয়াইয়া তার ;
পরিধানে শুধু ছিন্ন ভিন্ন বিমলিন এক চীর ;
অকাল-পক কেশরাজি-ঢাকা অভাব-আনত শির ;
পিছনের দিকে জীর্ণ-শীর্ণ ঝুলানাে ঝুলির মাঝ
রহিয়াছে তার সম্বল—যা’তে চালাইতে হবে আজ।
আসিল সে যবে কুষ্ঠের নােগী আছিল সে যেইখানে-
শিহরিয়া উঠি, পিছাইয়া গেল দুই পা পিছন পানে;
সু-হারা
ন।
তার পর ভাবি, ক্ষণকাল কিছু,—কে বলিবে কি যে তাহা,
ভিক্ষাপাত্রে ..
মরি! মরি! মরি! আজিকে আমার আঁখির সমুখে একি
অঙ্কিত ছবি আত্মত্যাগের উজল বরণে দেখি।
বল দেখি মােরে, ওগাে ভিখারিণি, বল দেখি মােরে শুনি,
করিতে মহান্ হেন দান তােমা’ শিখাইল কোন গুণী ?
হেরিয়া যাহায় কত ধনী, জ্ঞানী হেলাভরে গেল সরে,
সৰ্বস্বটুকু সেই অভাগায় বিকালে কেমন করে ?
হয় ত তােমার জীর্ণ খােলার ঘরে আছে ছেলে মেয়ে,
আকুল পরাণে, ব্যাকুল নয়নে তব পথ পানে চেয়ে ;
—কখন আসিয়া আয়াস-লব্ধ তণ্ডুল-কণাগুলি
আঁধি তার পর দিবে তাহাদের ক্লিষ্ট বদনে তুলি।
যে এ দুর্দিন, কে বলিবে তুমি না জানি ক’ দিন ধরে
মুষ্টিভিক্ষা পাওনিকো হায়, আছ উপবাস করে।
হােথা রহিয়াছে যত ধনিজন মগ্ন বিলাস-মাঝে,
গরীব-দুখীর ব্যথা কি গাে কভু পরাণে তাদের বাজে?
দু’পহর যে গাে হয়েছে অতীত, পারিবে রমণি, আর
উপবাসী হয়ে ভিক্ষার লাগি’ ঘূরিবারে দ্বারে দ্বার?
তুমি দ্বিধাহীন ভাবে একবারাে না ভারি’ সে সব কথা
সারাটী সকাল ঘুরে যা পেয়েছ, বিকাইয়া দিলে হােথা ?
২৪
দান
এ জীবনে আমি পড়েছি দানের পুণ্য-কাহিনী শত ;
শুনেছি—“দিয়েছে অমুক ও কাজে অত শ’ হাজার অত।”
শতেক কাহিনী পূত সেই সব, মহান্ সে সব দান,
তােমরা, বন্ধু, বলিতে কি চাহ এর চেয়ে গরীয়ান্?
দিতে তারা পারে যাহাদের আছে দিবার মতন ধন ;
ভিক্ষাই শুধু সম্বল যার, দেয় হেন কোন্ জন?
২৫
অভাগা
বিপুল বিশ্বে
আমিই অভাগা,
লক্ষ্মী-হারা !
আমারে গড়েছে
সৃষ্টি-বিধাতা
সৃষ্টি-ছাড়া!
জানি না কি বিষ মাের মাঝে আছে হায় !
পরশে আমার সব হাসি টুটে যায়।
পলকে খায় যতেক পুলক,
প্রীতির ধারা।
.
আবেগের বশে যা কিছু হৃদয়ে
জড়ায়ে ধরি,
নিমেষের মাঝে ভুমি-তলে পড়ে
সকলি ঝরি’ ।
অন্তর দিয়া পাইতে যা কিছু চাই,
মরীচিকা প্রায় শূন্যে মিলায় তাই ;
আশা হটে যায় নিরাশা-শিলায়
ঠিকরি’ পড়ি।
২৩
অভাগ
‘আনন্দ যাচি
হৃদি জোড়া শুধু
মিলেছে দুখ!
হাসিতে চেয়েছি,
ব্যথায় ছাপিয়া
উঠেছে বুক!
মনের আমার একতারাটীর মাঝে
দুখের রাগিনী গুমরি গুমরি’ বাজে ;
অনুখণ ঝরে নয়নে তাহারি
চিহ্নটুক।
বিশ্ব ভুবন
ফিরেছি ঘুরিয়া,
চেয়েছি মন,
ব্যর্থ আমার
ব্যর্থ যতু সে
আকিঞ্চন।
মাের পানে সবে হাসি ব্যঙ্গের সুরে
কুটী-কুটিল নয়নেতে রয়
দূরে ;
ব্যবধানে রহে
বিরাগের বশে
বন্ধু-জন।
হায় রে জগৎ পরাণ-বিহীন,
নিঠুর ওরে,
২৭
সর-হারা
কোন দিনাে কভু কোনও কিছু কি
দিইনি তােরে ?
অন্তর ঝুলি আমার উজাড় করি
রাখিনি ডালিটী সমুখেতে তাের ধরি ?
বচনে-মননে
দিইনি সবাতে
বিকিয়ে মােরে ?
পরশে আমার কোনও দিনাে কি
কাহারাে কায়
পুলক-আবেশে শিহরি’ বারেক
ওঠেনি হায় ?
কেহ কি কভুও শুধু ক্ষণেকের ভুলে
আমার মালাটী নেয়নি গলায় তুলে ?
বারেক মাতেনি হৃদি তার প্রতি
মূচ্ছনায় ?
অথবা এ ঘাের ভালের লিখন,
এ ঘাের ভবী ;
সর্বগ্রাসী এ
উদাম আবেগ,
ব্যর্থ সবি।
২৮
অভাগা
হৃদয় মূরছি’ রহিবে ব্যথার সুরে,
এত কাছে তবু রহিব সবার দূরে,
এ জীবন শুধু—কেটে যাবে আঁকি
আকাশে ছবি।
২৯
রহস্য
রাত্রি-বেলায় বলে থাকি অনেক রকম কথা,
অনেক করি অভিমান আর অনেক করি ছল,
অনেক বারই দেখাই অনেক নিলাজ প্রগলভতা,
অকারণে অনেক বারই চোখে আসে জল।
ভােরের বেলা পাখীর রবে চমকিয়া জাগি,
নিজের পানে চেয়ে আমি নিজেই মরি লাজে।
রেতের কালে ব্যাকুল ছিনু যে দু’বাহুর লাগি
তখন যেন মাের গায়ে তা’ কাটার মতই বাজে।
সম্বরিয়া স্রস্ত বসন বাইরে আসি চলি’,
সরম ভরে চাইতে নারি নয়ন দুটী তুলে ;
নিজের এবং তােমার পরে দারুণ রাগে জ্বলি,
পূর্ব নিশায় সকল প্রাণে যেতেই চাহি ভুলে।
রাত্রি যখন আসে আবার তারার মালায় সাজি’,
অঙ্গে তাহার শেফালিকার গন্ধ মদির মেখে,
বনে নীরব যতেক পাখীর গীতিরাজি,
চাদের আলাে নদীর বুকে খেলে একে বেঁকে,
ভুলে তখন যাই যেন সে যতেক সরম লাজে,
পূৰ্ব নিশায় পরাণ চাহে আবার পেতে ফিরে ;
যতন ভরে আপনারে সাজাই ফুলের সাজে ;
শয়ন-পাশে তােমার পুনঃ ঈড়াই গিয়ে ধীরে।
দোলের দিনে
আজকে মােরা মান্বব নাকো, মাম্বাে নারে বিধি-বাঁধন,
আনন্দের ঐ মন্দিরে আজ যতেক মােদের সিদ্ধি-সাধন।
আজকে মােরা মাতাল সবে মাতাল আনন্দেরি সুরায়,
বিষাদের ঐ কৃষ্ণ রেখা ঢাবাে ফাগের রঙ্গীন গুড়ায়।
ধরণীর এই বছর-জোড়া যতেক ব্যথা, যতেক রােদন,
একটা দিনের পরাণ-ভরা আনন্দেতে কবব শােধন।
রুদ্ধ-দুয়ার-কক্ষ-মাঝে কে তােমরা বন্ধু, ভ্রাত?
সঙ্গোপনে সরে থাকা, আজ যে কভু চলবে না !
আজকে কভু চলবে নাকো মগ্ন থাকা গণিত মাঝে,
রসায়নের রসাস্বাদন, কিম্বা অমন অন্য কাজে।
বিষাদেরি বিরুদ্ধে এই বিষমতর অভিযানে
তােমাদেরে আসতে হবে, মিশতে হবে সকল প্রাণে।
৩২
দোলের দিন
স্বর্ণ শকট হ’তে তব নেমে, ওগো রাজ-অধিরাজ,
ক্ষণেক লাগি’ মােদের মাঝে আসতে হবে তােমারাে আজ।
দীন যাহারা, সঙ্কোচেরি আজ তােমাদের কোন্ বা হেতু?
কুঙ্কুম ও কাগ আজ আমাদের মিলনের যে মহা সেতু।
সমদশী আনন্দ যে, কারেও সে দেয় না ছাড়ি;
তার কাছে নেই বৃদ্ধ-যুবা, দুঃখী-সুখী, পুরুষ-নারী!
করজোড়ে আজকে ক্ষমা যাচি, পাড়া-প্রতিবেশী ।
শপথ করে বলতে নারি করবে না যে ক্ষতির লেশ-ই।
আজকে বলা শক্ত এটা একেবারেই কোন কাজে
মােদের সকল ব্যবহারে ত্রুটী আদৌ পাবেই না যে।
রেতের বেলা ঘুমের ব্যাঘাত নয়কো সেটা অসম্ভবও;
মদির ফাগুন পূর্ণিমাতে আজ কি মতে নীরব রবাে ?
ক্ষমা কোরাে ওস্তাদজী, ওগাে গীতি-বাদ্য-পটু,
কণ্ঠ মােদের নয়কো মিঠে, বরং কিছু শ্রুতিকটু ;
বিশেষ যদি আজ এ দিনে এটা কভু যায়ই ঘটে,
সকাল বেলায়ই গেয়ে ফেলি পুরবী কি ছায়ানটে ;
সাঁঝের কালে সাহানা কি ভৈরবী গাই রাত্রি বেলা ;
সুর-লয়েতে কি আসে যায়, প্রাণে যখন ভাবের খেলা ?
সুর-হারা
আজকে মােরা অধীর কিছু, এবং কিছু বেশী পাগল ;
মনের দুয়ার মুক্ত মােদের, নেইকো বাধা, নেইকো আগল।
খুসী হলেই উঠবাে গেয়ে, নাছব হবে ইচ্ছা যবে ;
কুটীটা তাহার লাগি, সেটা বিশেষ খারাপ হবে।
দোলের দিনে দোল পড়েছে ভিতর বাহির সকল পাশে;
স্বাধীনতার আজকে যে দিন বন্ধু-বাধা চলবে না সে।
শাস্ত্র-পুথি কি যে বলে সঠিক মােদের নেইকো জানা;
বৃন্দাবনে কে জানে কি হয়েছিল কাণ্ডখানা!
কৃষ্ণঠাকুর গােপ-বালক এবং গােপ-বালার সাথে
খেলেছিলেন হয় ত বা ফাগ এমনি ফাগুন পূর্ণিমাতে।
নাইবা যদি খেলে থাকেন বিশেষ আসে যায় না কিছু ;
শাস্ত্ৰ-পুরাণ মােদের গড়া, ফিবে মােদের পিছু পিছু।
এটা বেশই যাচ্ছে বােঝ রূপে, রসে, গন্ধে, সুরে,
একটা কিছু চলেছে যে সারা বিশ্ব ভুবন জুড়ে।
ফুলের যত ফাগের মত রঙ্গীন রেণু পল ঝরে,
উতাল পবন ছড়ায় তারে চোখের পরে মুখের পরে ;
প্রসূন-বালা শিউরে ওঠে দখিন হাওয়ার চুম্বনেতে,
কোমল তাহার পরশ পেয়ে উঠলাে ধরাদারুণ মেতে।
৩৪
দোলের দিনে
সারা ভুবন ব্যাপি জাগে কী-ই না গভীর চঞ্চলতা।
শাখে শাখে কোকিল ওঠে গাহি প্রাণের গােপন-কথা।
নদী ওঠে দুলে দুলে রুদ্ধাবেগে বইতে নারি,
কাশের ক্ষেতে লাস্য কি যে, বনে নাচন লতিকারি।
অশােক-শাখের পল্লবটা কী যে ভাবি, অপার সুখে
পাশের হার লজ্জা-অরুণ-কিশলটীরে জড়ায় বুকে।
ধরণী আজ প্রীতিময়ী, নেইকো ব্যথা নেইকো বেদন;
তাইত মােদের পরাণ আজি আনন্দেরই শ্রীনিকেতন।
বাহিরের ঐ যতেক আবেগ, যতেক উলাস পুলক ধারা
হৃদয়মাঝে কাঁপন তােলে, কল তারে পাগল-পারা।
আকাশ বাতাস জুড়ে আজি মহােৎসবের কী করােল।
মােদের প্রাণের দেবের দোলায় আজকে যে তাই আনন্দ দোল।
নব বর্ষে
যা কিছু তাের ডুবে গেছে কালের অতল-জলে,
তােরে ফাঁকি দিয়ে যারা গেছে দূরে চলে,
যারে সে সব যা!
তাদের লাগি ঘরের কোণে বদ্ধ নিজে রাখি,
রক্তবরণ অশ্রুজলে করে ভােলা আঁখি,
থাক্ রে তা” আজ থা!
পুরান-বরষ মিশে গেল কাল-সায়রের সনে ;
তার সাথে তুই দে ডালি তাের শােক-বেদনাগণে!
কণ্ঠেতে তাের উঠছে ওরে সঙ্গীত যে বাজি,
নূতন করে তারেও তুই তুলিয়া নে আজি ;
তাের বীণাটীর মাঝে
পুরানাে সে দুঃখ-ব্যথার করুণ গাথা যত
গুমরিয়া কেঁদে কেঁদে পূরবীরি মত
যেন আর বাজে।
নব বর্ষে
ঝঙ্কার তাের বীণাখানির, কণ্ঠের তাের গান,
আজ এ নবীন বরষেতে লভুক্ নবীন প্রাণ।
বিস্মরি তুই একেবারে যা আজিকে ওরে,
বেরিয়েছিলি অনেক বরষ আগে যাত্রা কোরে
অনেক জনার সাথে ;
তারা গেছে আগে, আছিস্ পিছনে তুই আজি,
পদে পদে বাধা পেলি,কতই বিপরাজি,
কতই ঝঙ্কাবাতে।
যাত্রা নবীন সুরু হ’ল আজ এ শুভখণে,
চল পুনরায় নিজের পথে, এই রাখিয়া মনে।
সেই সে বিপদ, সে ঝটিকা আবার ওরে ফিরে
এবারও হয়ত এসে ফেলবে তােরে ঘিরে।
কুঙ্কটিকায় ঘাের
আকাশ, বাতাস ফেলবে ছেয়ে, পথ পাবিনা খুজে,
নিরাশাতে চকু দুটী আসবেরে তাের বুজে,
আসবে চোখে লাের।
সে সব কথা নয় রে আজি, আজকে সে সব নয় ।
ভাবার সময় ঢের রয়েছে, আজ ছেড়ে দে ভয়।
৩৭
সুর-হারা
সন্দেহ সে, নিরাশা আর চলবে না তা হলে ;
আজকে যে তুই নবীন মানুষ, বলী নবীন বলে,
সতেজ নবীন রসে ;
ভয়-ভাবনা কারে বলে, শােক-যাতনা কি যে
নবীন মানুষ। চিন্তে তারে আজো পারিনি যে ;
বুঝতে নারিস্ ত সে।
তাের সকাশে আশায় আশায় পূর্ণ আজি ধরা,
বিশ্ব ভুবন নবীন আজি, আনন্দেতে ভরা।
“যেতে হবে শুধুই আমায়”
হাসি
যাইতে হইবে শুধু আমাকেই হায়!
প্রভাতে মধুরে
ফুটিবে কুসুমরাশি
উতলা মলয় আসি’ চুমিবে তাহায়।
সাজিবে প্রকৃতি-রাণী
নীহারের মালাখানি
গলে পরি’ প্রাতে নিতি অতুল শােভায়।
সবি রবে, যেতে হবে শুধুই আমায়।
যাইতে হইবে শুধু আমাকেই হায় !
সায়াহ্নে একটা দুটা
করিয়া উঠিবে ফুটি
তারকানিচয় ধীরে গগনের গায়।
নিশায় রজত-চঁাদ
পাতিবে সৌন্দৰ্য-ফাঁদ
অর-হারা
প্লাবিয়া ধরণী তার শুভ্র চন্দ্রিকায়।
সবি রবে, যেতে হবে শুধুই আমায় ।
যাইতে হইবে শুধু আমাকেই হায়!
আসিবে ঋতুর পতি
ফিরিয়া বরষে প্রতি
ত্রিদিবের শােভা দিয়ে সাজাতে ধরায়।
শরতে নলিনী-মালা
ভুবন করিয়া আলা
ফুটিবে মােহিয়া প্রাণে সরসীর গায়।
সবি রবে, যেতে হবে শুধুই আমায়।
যাইতে হইবে শুধু আমাকেই হায়।
দোয়েল, পাপিয়া, পিক
মুখরিবে দশ দিক্
এমনি মল-মন-মােহন গাথায়।
এমনিই যাবে বয়ে
নদী মৃদু গান গেয়ে
চিরদিন সিন্ধু সনে মিলন-আশায়।
সবি রবে, যেতে হবে শুধুই আমায়।
৪০
“যেতে হবে শুধুই আমায়
যাইতে হইবে শুধু আমাকেই হায়।
পরপার হ’তে জানি,
আসিবে সে মহাবাণী
ভাসি একদিন, “আয়, আয় চলে আয়।”
ত্যজি’ এই শ্যামা ধরা
প্রকৃতি এ মনােহরা
সেদিন মাগিতে হবে হায় রে, বিদায়।
তার পর কেবা জানে
যেতে হবে কোন্ খানে?
এমনি সৌন্দৰ্যরাজি রাজে কি সেথায় ?
সেথাও কি চাঁদ-তারা
এমনি জ্যোতির ধারা
বরিষে মােহিয়া প্রাণে অবাের-ধারায় ?
এমনি কুসুমরাশি
ফোটে কি সেথায় হাসি,
বিহগ কি এমনিই সেথা গান গায়।
তাই ভাবি কঁাদে প্রাণ,
এই হাসি, এই গান,
এই শ্যামা ধরা, বাসি ভালাে এত যায়,
সবি রবে, যেতে হবে শুধুই আমায়।
৪১
ব্যর্থ কাম
মাের পানে চাহি কত জন হাসে
ব্য-ভরে।
বিরাগের বশে
কত জন যায়
সুদূরে সরে ।
কত শত জন
অকাতর-চিতে
বিধিছে প্রাণে,
দিবস-যামিনী,
তীক্ষ যতেক
বাক্যবাণে।
তবু আমি জানি, সকল বচনে
সকল কাজে
মােরে বিকাইতে চেয়েছি নিয়ত
সবারি মাঝে।
সারাটা হৃদয়
দিয়ে আঁকিয়াছি
কতনা ছবি ;
তার কহিয়াছে ব্যঙ্গের সুরে,
স্ব্যর্থ সবি।”
৪২
ব্যর্থ কাম
মাের যত সেই
অন্তর-ধনে
ধরণী-তলে
হেলায় ছুড়িয়া ফেলে গেছে তারা
চরণে দলে।
তবু আমি জানি,
সকল বচনে
সকল কাজে
মােরে বিকাইতে চেয়েছি নিয়ত
সবারি মাঝে।
অন্তর দিয়া
বিহানের আলাে, নিশীথের শােভা,
সাঁঝের হাসি,
মাের প্রাণে তারা কত না সে সুরে
বাজায় বাণী।
কত না হলে
রচেছি গান।
জ্ব কুঞ্চি তারা কহে শুধু কথা,
নাহিকো প্রাণ।”
তবু
আমি জানি, সকলে বচন
সকল কাজে,
৪৩
সুর-হারা
মােরে বিকাইতে চেয়েছি নিয়ত
সবারি মাঝে।
প্রাণে নিতি কত বেদন-দুঃখ
উঠিছে জাগি,
নিদ্রা-বিহীন
কত নিশি কাটে
তাদেরি লাগি ।
মাের প্রতি গানে ফুটাতে চেয়েছি
সে সব ব্যথা ;
তারা কহে, “শুধু
কবি-কল্পনা,
মিথ্যা কথা।”
তবু আমি জানি, সকল বচনে
সকল কাজে
মােরে বিকাইতে চেয়েছি নিয়ত
সবারি মাঝে।
লুটি বন্ধুর
আবেগে পড়েছি
বক্ষোমাকে ;
সে বলেছে শ্লেষে, ন্যাকামি যে শুধু
সকল কাজে।”
৪৪
ব্যর্থ কাম
মিশেছি শত্রু সনে নিতে তারে
আপন করে,
সে শুধু গিয়েছে সন্দেহ-বশে
সুদূরে সরে,
আপন হইতে সবার চেয়েছি,
হয়েছি পর
শুনিয়াছি শুধু
ব্যঙ্গ-মাখাননা
তিক্ত স্বর।
তবু আমি জানি,
সকল বনে,
সকল কাজে
মােরে বিকাইতে চেয়েছি নিয়ত
র মাঝে।
বিকচ কুসুমে
বুকের মাঝারে
জড়ায়ে ধরি ;
সুরভি নিশাস ত্যজিয়া অমনি
যায় সে ঝরি।
থামিয়ে দিয়েছে
সঙ্গীত যত
বিহগ বনে,
৪৫
সুর-হারা
যখনি কণ্ঠ
মিশাতে চেয়েছি
তাদেরি সনে।
বুদ্ধির দোষে চাহিয়াছি এক,
হয়েছে আর,
ফেলিয়াছি শুধু
বেদন-তিক্ত
অশ্রুধার!
আমাকে যে কভু ফুটায়ে তুলিতে
পারিনি, হায় !
কত জনে তাই
কত ভাবে মােরে
বিচারি’ যায় !
তবু আমি জানি
সকল বনে,
সকল কাজে
মােরে বিকাইতে চেয়েছি নিয়ত
সবারি মাঝে!
ক্ষমিও আমায়,
ক্ষমিও তােমরা
বন্ধু, ভাই,
যেটুকু দিবার
হয়ত বা দিতে
পারি তা নাই।
৪৬
ব্যর্থ কাম
আমার লাগিয়া
নিয়ত তােমরা
অথির-চিত,
আমারি কারণে
হয়েছ নিয়ত
বিড়ম্বিত।
আমারে যাহারা পারনি ভাবিতে
আপন বলি’
তােমাদেরাে পাশে যাচি ক্ষমা, হয়ে
কৃতাঞ্জলি।
দীনতা যতেক রাখিতে পারিনি
গােপনে ঢাকি
সবলে যে তারা
বাহিরি’ এসেছে
ভিতর থাকি।
প্রতিপদে তাই
জ্বলেছ সবাই
দারুণ-রােষে !
আমি শুধু দায়ী, সে শুধু ঘটেছে
আমারি দোষে !
তবু আমি জানি, সকল বচনে,
সকল কাজে
মােরে বিকাইতে চেয়েছি নিয়ত
সবারি মাঝে!
৪৭
বিধবার কথা
কত বার ওরে করেছি বারণ, তবু কেন ভুলে যাস?
ওই খান্টারে মাড়াসনে আর, মাথা মাের তােরা খাস্।
তােরা কি বুঝিবি আমার সকাশে তুচ্ছ এ স্থানে কি যে।
অপরের কথা ছেড়ে দে, সে কথা আমিই বুঝি না নিজে।
যখন আঁধার কেটে নাহি যায়, কুলায়ে জাগে না পাখী,
উষায় এ হেন সময়েতে আমি উঠিয়া শয়ন থাকি,
ইষ্টদেবেরে করিবার ওরে, পরণাম বহু আগে-
ধূলি এখানের ভকতি-ভরেতে তুলে নেই শিরােভাগে।
সাঁঝে আশ্রয় অস্তগিরিতে লভিলে অংশুমালী,
লক্ষ্মীর দীপ জ্বালিবার আগে হেথা আমি দীপ জ্বালি।
নরনারী যত ত্যজি গৃহকাজ, শুনিতে আরতি-গানে
ধেয়ে যায় চলি মহা কলরবে দেব-মন্দির পানে,
আঙিনায় তার বেজে ওঠে শাখ, মৃদঙ্গ, করতাল ;
আমি হেথা বসি’ একা দি কাটায়ে সারাটি সন্ধ্যাকাল।
৪
বিধবার কথা
বিহানে বিকালে যবে কোন কাজ নাহিকো থাকিত হাতে,
কাটিয়ে সে দিত সময় তখন বসিয়া ওখানটাতে;
হেথা বসি’ মােকে বলেছে সে কত সােহাগ-আদর-কথা,
বলেছে কত যে সুখের কাহিনী, মনের কত যে ব্যথা।
তিনটী বছর হ’ল গেছে চলি এ মর-মরত থাকি
মাের সে সােয়ামী, প্রাণের দেবতা, আমারে একেলা রাখি।
কত আর কব, আজিও আমার আঁখিতে আসেরে পানি,
মরণ কালেও রেখেছিল তারা এই খানে তারে আনি।
নির্দয় ভাবে যবে তােরা যা, মাড়ায়ে ইহারে সবে,
পরাণ আমার কঁদিয়া তখন ওঠে যেন “
হাহা” রবে।
তাহার স্মিরিতি জড়াইয়া আছে ওইখানটারে, তাই
এ জগতে কিছু ইহার উপর প্রিয় মাের আর নাই।
১
৪
অপেক্ষায়
তােমার বিহনে প্রিয়, হৃদি দুখ-ময়,
জগতের সুখ-শান্তি ভালাে নাহি লাগে ;
বৃথা হাসে চাঁদ-তারা, পাখী বৃথা গায়,
থেকে থেকে শুধু মাের তােমা মনে জাগে !
নীরবে নিভৃতে বসি গাঁথি ফুল-মালা,
নীরবে নিভৃতে তাহা শুখাইয়া যায়।
কারে হায়, পরাইব? কাছে নাহি তুমি,
শূন্য এ পরাণ শুধু করে “হায়-হায়”।
আছি শুধু বসে তাই দীন ভাবে, নিয়ে
দুর্বহ শরীর আর শূন্য হৃদি-মন,
অপেক্ষি’ অধীর প্রাণে সেই দিন তরে
যবে হবে আমাদের সুচির-মিলন !
খেয়াল-ঘােরে”
আপন গানে মত্ত ছিনু, ছিলাম আপন অন্তরে,
কুহকিনি, মুগ্ধ আমায় কর্লিরে কোন মন্তরে ?
আমার বীণাখানির মাঝে
তাের গানই যে নিতিই বাজে,
হৃদ্-সায়রে তাের মূরতিই অহর্নিশি সন্তরে।
মিছাই গাহে দোয়েল, কোয়েল, পাপিয়া কি চন্দনা ;
স্বরখানি তাের মধুর কত, কতই যে তার ছন্দ না।
তারই বারেক পরখ লাগি
রয় কি তারা চন্দ্র জাগি’ ?
বিহান-সাঝে বিহগ বুঝি গায় তাহারি বন্দনা !
?
নেহারি যায় প্রসূন লাজে ধলো বরণ রক্ত গাে,
রূপেরে সে বর্ণিব কি,—সে যে বড়ই শক্ত গাে।
তাের মাধুরীর বার্তা পেয়ে
দক্ষিণা বায় আসে ধেয়ে,
খেয়াল-হারা কবিরে সেই করেছে তাের ভক্ত গাে।
শর-হারা
ভ্রমর যতেক বিস্ময়েতে ওঠে দারুণ গুঞ্জরি'—
হাসিয়া তুই চাহি যবে, ওরে আমার সুন্দরি।
হৃদয়-মাঝে নেহারি’ তায়
কতই কথার ঢেউ খেলে যায়।
—সে যে শােভা ফোটা ফুলের, গােলাপ, বেলী, কুল-রি!
দহন করি’ রূপ-অনলে এ হৃদয়-খাগুবে,
( বুঝতে নারি, কুহকিনি, একি এ তাের কাণ্ড যে!)
ছল করিয়া রইলি সরি’!
কই লাে তােরে চরণ ধরি’
ঢাললাে ত্বরা মিলন-বারি,শান্ত ক এ তাণ্ডবে।
চির বিজয়িনী
বিজয়-লক্ষ্মী অমুখণ যার
বন্দিনী,
অভিনব হেন রণ-সাজ আজি
কি লাগি তাহার, রঙ্গিনি।
বঙ্কিম বেণী দুলিছে পৃষ্ঠ-পরে,
চরণ-পরশে মাতিয়া উলাস-ভরে-
রহিয়া রহিয়া রণিয়া উঠিছে
মৃদু নিৰুণে শিঞ্জিনী।
মরাল গ্রীবাটী তুলেছ বক্র
ভঙ্গীতে ।
চমকি’ উঠিছে চটুল চাহনি
চপল চোখের ইঙ্গিতে।
তনুর গােলাপী আভা চাহে প্রতিপলে
আবরণ ভেদি’ বাহিরে আসিতে চলে,
মৃণাল বাহুতে সােণার বলয়
বাজে বিহ্বল সঙ্গীতে ।
.
৫৩
সুর-হারা
কণ্ঠে পরেছ বকুল-মালিকা,
সুন্দরি।
চিত্র বরণে চারি পাশে তব
প্রসূন উঠেছে মুঞ্জরি’!
সুনীল বাসের নিচোল লুটিয়া ভূমে
শিথিল পরশে তৃণ-অঞ্চল চুমে;
অলক্ত-রাগ-রাঙ্গা পদ-তলে
বন-পথ জাগে গুঞ্জরি’ ।
অন্তর-কথা বাহিরায় যেন
নিঃশ্বাসে !
—কোন্ অভিযানে
হয়েছ বাহির,
-কোন্ অভাগার চিন্নাশে?
উরস তাই কি শ্বাসে শ্বাসে ওঠে পড়ে?
বসন উড়িল উন্মাদ বায়ু-ভরে ?
ঝলকে শতেক অসি-খরশান
আঁখির বক্র-বিন্যাসে ?
একি নিপীড়ন
হায় রে নিঠুরা,
দুর্বলে
৫৪
চির বিজয়িনী ক্ষুদ্রের তরে এত আয়ােজন। রণ-নীতি হায় এই বলে ? আপনি যাচিয়া যে জন পড়িবে ফাঁসি, তার লাগি কেন কুটী কুটীল হাসি? নয়ন-শাণিত আঘাতে কি কাজ আবার সে চির-বিহ্বলে ? তার চেয়ে কর ভুজ-বন্ধনে বন্দী রে! ফেলে রাখ তব সঙ্গী-বিহীন অন্তর-কারা-মন্দিরে। কিম্বা বুকের দ্রুত স্পন্দনখানি তােমার বক্ষে মিলাইয়া ফেল আনি; চেতন ঘুচাও পরশে অধর- পুটের মােহ-নিস্যন্দী রে। ৫৫
গান
(১)
গােপন স্বপন মম
কেমনে আবরি’ রাখি ?
আজি যে বাদল-নিশা,
কেতকী মেলেছে আঁখি।
আজি এ অঝাের ধারা-
বুঝি তারি দিশাহারা
সজল চাহনি আনে
অচিন্ সে দেশ থাকি।
কাজল মেঘেরি মত
এলায়ে কবরী পাশে,
বুঝি কার কাটে রাতি
আমারি পরশ-আশে !
উদাস উতলা বায়
বুঝি শুধু বলে যায়
অধীর সে হিয়া-পুটে
কি ব্যথা সে রাখে ঢাকি।
৫৬
গান
(২)
আজ সাঁঝের ঐ রক্ত-অরুণ
করুণ ছবিখানি—
কার অপূরণ কোন্ স্বপনের
বার্তা দিল আনি।
কোন্ বিরহীর হিয়ার তলে
উতল ব্যথার আগুন জ্বলে,
কোন্ বিবাগীর বিফল খোঁজের
বেদন-মাখা বাণী ।
আজ গােধূলির আঁধার আলাের
নিবিড় মিলন-রাগে,
কোন্ সে যুগের প্রিয়ার আঁখি
মনের কোণে জাগে।
আমার লাগি উদাস-মাখা-
সকল যুগের নিশীথ-জাগা-
ঐ ফিরে তার দিশ্বলয়ে
দৃষ্টি অভিমানী।
৫৭
সুর-হারা
(৩)
কোন্ যুগে, শেষ রাতে,
শেষ দেখা তারি সাথে।
শুধু বলে গেল ধীরে,
“আবার আসিব ফিরে ;
নয়ন মুছিয়ে দিল
নীরবে প্রেমের হাতে।
সে অবধি আছি বসে
শুধু তার পথ চাহি,
বুকে বহি’ আশা-বাণী
মুখে তার গান গাহি,
তারি তরে মালা গাঁথি,
তারি তরে আলি বাতি,
তারি তরে জ্বালি হিয়া
স্মৃতি-মাখা বেদনাতে!
কত জন যায় ডাকি,
কতজন আসে কাছে ;
৫৮
গান তাহে মন দিতে নারি —এসে ফিরে যায় পাছে। কাটে দিন তারি লাগি, তারি লাগি উঠি জাগি মরণ-রজনী-শেষে, নবীন জীবন-প্রাতে। (৪) যদি দিন গেল হায়,ধূলিতে লুটায়—ছিন্নকুসুম-ডাের, যদি পথ চাহি তার-হবে অনিবার দীর্ঘ যামিনী তাের তবে কেন রচা আর শূন্য শয়ন- কেন সাজ-আভরণ? মিছে চন্দনা সবে মাখা কেন তবে—অকারণ তনু মাের ? কেন অধীর-নয়নে পথ চাওয়া আর, কেন বাঁধা কেশ-ভার? তবে কেন নীল-বাস, কেন ফুল-বাস, পরাণে পিয়াস ঘাের ? যদি ব্যর্থ সাধন ভালে শুধু লেখা, জনম কাটিবে একা, তবে অরঘের সাজি—ধূপদীপরাজি কি কাজে সাজাননা তাের
সুর-হারা
(৫)
গুরু গরজন
ঝরিছে অঝােরে
মনের যাতনা
আজি ত মানে না
কাহার করুণ
অন্তর কোণে
বিদারে গগন,
বারির ধার।
উছল কামনা
ধৈর্য আর।
আঁখি-তারা দু’টি
আজি ওঠে ফুটি’?
কোন্ সে বঁধুর
স্মৃতির ভার ?
তাররা দিনগুলি
উঠিছে আকুলি ?
বুঝি ক্ষণে ক্ষণে
বুকের তার।
পরাণে সুদূর
বিষাদ মধুর
বুঝি আমা-হারা
এমনি ব্যথায়
বজ্ৰ-বেদনে
ভাতিছে দাহন
৬০
গান
(৬)
কণ্ঠে খুজিয়া নাহি পাই বাণী,
ভাষাহীন তাই নীরব থাকি।
সবার ভিড়ের পিছনে গােপনে
চির-দীন নিজে লুকায়ে রাখি।
সবার পূজার অবসানে তাই
আমার অর্ঘ্য নিবেদিয়া যাই;
তব সভাতল হ'তে ফিরি গেহে-
কোন মতে নিজে যতনে ঢাকি।
•
ভীরু সে পূজার দীন আয়ােজনে,
সরম-কুণ্ঠ পূজার ফুলে,
পাছে ফেল দেখি’, রহি ত্রাসে তাই,
চাহিবারে নারি নয়ন তুলে।
রিক্ত, নিঃস্ব, অকৃতী-জীবনে
সরায়ে রাখিতে চাহি প্রাণপণে ;
পাছে যদি কভু হাস মনে মনে,
পাছে হেলাভরে ফিরাও আঁখি।
বর্ষায়
আজকে শুধু রহি’ রহি’ বাদল বরিষণ।
পাগল-পার হয়ে ফিরে উতল সমীরণ !
কাজল ঘন সজল মেঘে
থেকে থেকে উঠছে জেগে
চঞ্চলার ঐ নিবিড় চমক অথির করি মন!
সকল কথাই খুলে বলি, কবাে নাকো লাজ,
আজকে আমার ছিল অনেক করণীয় কাজ।
অনেক কিছুই বেচা-কেনা,
হিসেব-নিকেশ, পাওনা-দেনা !
এমন সময় গগন কোণে হ’ল মেঘের সাজ।
রইল কোথায় টাকা কড়ির হিসেবের ঐ খাতা।
কোন্ যে দারুণ ইন্দ্রজালে বিকল হল মাথা।
বিনা দ্বিধায় সেই সে ক্ষণে
স্থির করেছি মনে মনে,
বাইরে যাওয়া এমন দিনে-কভুই হবে না ।
৬২
বর্ষায়
পাওনাদারের আজকে এটা বিশেষ উচিত বােঝ,
আদালতে মােকদ্দমা হতেই পারে—সােজা।
সুহৃদ্-সুজন দয়া করে
র’ন যেন আজ দূরে
সরে’,
আমার দেখা আজকে নহে, বৃথাই মােরে খোজা।
তােমরা বুঝি ভাবছ বসে কিইনা যেন কাজে
নির্জনেতে সঙ্গোপনে মগ্ন রবে আজ এ!
হয়ত ও বা আনা ভুলে
দর্শনেরি গ্রন্থ খুলে
ছড়িয়ে নিজে দেবে জটীল তর্কজালের মাঝে।
নিদেন না হয় পড়বে বসে ‘মেঘদূতেরি শ্লোকে,
মনে মনে ঝালিয়ে নেবে যক্ষেরি সে শশাকে,
অজানা কোন প্রিয়ার সনে
করবে
বিহার মনে মনে।
তারি দারুণ বিরহেতে নামবে বারি চোখে।
নয়কো মােটেই কাজটা আমার বিশেষ রকম নীচু।
আজ ভেবেছি কাজ আদপেই কৰ্বো নাকো কিছু;
সুর-হারা
বসে বসে জালা পাশে
ছুটিয়ে দেব মনের রাশে;
অন্তরে আজ ছুটাবাে মাের মেঘের পিছু পিছু।
আজকে কেহ পাবে নাকো, পাবে না মাের সাড়া,
যতই কেন প্রবল ভাবে করুন্ আমায় তাড়া।
আজকে ধরার ধার না ধরি,
আজকে আমি বিমান-চারী,
আজকে আমি মেঘের মত উধাও আপন-হারা !
তােমরা কেহ জ্বলছ জানি বিষমতরই রাগে ;-
পরিহাসের নাচন কোন নয়ন কোণে জাগে !
ভাবছ—“এরি বাঁচা-মরায়
কিই না আসে যায় বা ধরায় ?
কাজের ভবে এ অকেজো কিই না কাজে লাগে?
জানি সখা জানি এটি, বুঝি বিশেষ মতে,
বিশ্ব পাবে নাকো কিছু কভুই আমা হতে!
বর্ষায়
কর্তে হবে জানি বেশই
এ জীবনের শেষাশেষি
জবাবদিহি বিশেষ ভাবে তার আদালতে।
তবু আমি পারি নাকে নিজের সনেই নিজে;
একটুখানি সজল-বায়ে ঘটেই যেন কি যে।
একটুখানি কৃষ্ণ মেঘে
হৃদয় নাচে উদাম বেগে ;
বাদল-ধারায় পরাণ উঠে কি-ই না রসে ভিজে।
কাব্যে বিপত্তি
খেয়ালে লিখেছি বসে যত ক’টি কবিতা,
ব্যর্থ হয়েছে নাকি আজ শুনি সবি তা”।
নাই নাকি ভাব-গুণ,
নাই যতি-ছন্দ ;
কথার প্রলাপ শুধু, নাই প্রাণ-স্পন্দ।
টিটকারি অরি দেয়,—প্রিয়জন ধিক্কার ;-
অন্দরে গিন্নীর শুনি ঘাের চীৎকার,
“কাণাকড়ি নাই, তবু খাতা কিনে রা রাশ
মাথা গুজে দিন রাত কেন লেখা ছাই পাঁশ ?”
চুরি করে ধরা-পড়া অপরাধী মতাে তাই
দূরে দূরে ঘুরে ফিরি,-কারাে পানে নাহি চাই
বাধাহীন ভেসে যাবে—ভেবে তুলে দিমু পাল,
মাঝখানে বাচাল,—একি ঘাের জঞ্জাল।
তবু মন অখণ কাঁদে এই শশাকে হায়,
“পড়িলনা এইটুকু কারাে কভু চোখে হায়,
৬৬
কাব্যে বিপত্তি
ধরা জুড়ে জাগে যেই সঙ্গীত হিল্লোল,
তার টানে জাগে প্রাণ—জাগে সুর-কল্লোল।
ভুলে যাই আপনারে-নাহি করি দৃ-পাত;
আমনে গান গাই—কোথা যায় দিন রাত ?
ভাললা তা না লাগে যার—দেইনা ত দোষ তার ;-
মাের পরে তবে কেন মিছা এই রােষ-ভার?
উন্মনা ভাবি বসে—চাহি মহা শূন্যে,
হয়ত বা করি নাই কভু হেন পুণ্যে—
বাদেবী সভাতলে, গুণীজন সঙ্গে
পাই যাহে একাসন, মাতি এক রঙ্গে।
নাহি কৃপা লক্ষ্মীর,ঘরে নাই অর্থ,
বাদেবী-অৰ্চনা—তাও মাের ব্যর্থ ;-
ভিতরেতে খিটিমিটি প্রিয়া সদা ক্রুদ্ধ ;
বাহিরেতে ঋণে ঋণে ধারি ধরা শুদ্ধ।
কেটে গেছে যদ্যপি জীবনের অর্থ,
জমাহীন আজো তার হিসাবের ফর্দ।
সুর-হারা বাকী শুধু আছে করা এইবার সম্বল সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে,লােটা আর কম্বল। চেয়ে দেখি বাহিরেতে গুণধর নন্দন- কবিতার খাতা করি রজ্জুতে বন্ধন নর্দমা মাঝে টেনে টেনে করে নৃত্য ; —পাতাগুলি সব ছেড়া, সব কিছু সিক্ত। নিশ্চল দৃষ্টিতে ভাবি বসে—এইবার পাপভার গেল মুছে,—বুঝি পেনু নিস্তার! মনে লয়,—ওরি মাঝে পেল বুঝি পুত্র- পুন্নামা-নরকের মাের ত্রাণ-সূত্র !
লাভ-ক্ষতি
কেহ বা ভিড়েছে নিকটে বাসিয়া ভালাে,
ফিরিল কেহ বা ব্যঙ্গের হাসি হেসে,
কেহ বা জ্বালিল পরাণে প্রেমের আলল,-
বেদন-বহ্নি কেহ বা হৃদয়-দেশে।
কাহারাে মদির নয়ন-তুলিকা-পাতে
শত কল্পনাছবি জাগে অন্তরে ;
কারাে বা কঠোর নির্মম সংঘাতে
অবসাদে হিয়া টুটিয়া লুটিয়া পড়ে।
কেহ বা গলায় পরালাে বরণ-মালা,
ধরিল সমুখে মান-অর্চনা-ডালি ;
কেহ কেড়ে নিয়ে সে উপহারের ডালা-
ক্রুর হাস্যেতে ভূমিতলে দিল ঢালি’!
রাগ-বিরাগের উৰ্ম্মি-ভঙ্গ মাঝে,
প্রেমের হেলার আলোেক ছায়ার তলে,
দিনগুলি মাের সাজিল রম্য সাজে,
জীবন-তরণী নাচিল কৌতূহলে।
সুর-হারা
আঁধার ঘনায়—নামিছে সন্ধ্যা ধীরে ;-
পারাপার ঘাটে অধীর খেয়ার তরী ;-
বিকি-কিনি শেষে, অতীতের পানে ফিরে
লাভ ও অলাভ বসে খতিয়ান করি ।
এই যে কেহ বা হৃদি মাের দিল ভরি’
প্রেমের প্রীতির অঝাের-বর্ষী দানে,
দুঃসহ দাহে অন্তর জর্জরি’
এই যে কেহ বা বিধিল বেদন-বাণে,
জীবনের মাের তারা যে আলােক-ছবি!
তাদেরি মাঝারে উঠিল আমার ফুটি
যা কিছু অর্থ, যত ব্যর্থতা সবি,
পরম যে লাভ চরম যা কিছু ত্রুটী।
-আজ দেখি, যারা ভিড়িল প্রাণের পরে,
জীবন-খাতায় তারা শুধু আছে জমা !
উজল আখরে লেখা খরচের ঘরে—
-কারা গেল ফিরে, নারিল করিতে ক্ষমা।
৭০
চরম সার্থকতা
প্রসূন-বালা, প্রসূন-বালা,
ভুবন রূপে কর্লি আলা ।
পরাণে তাের কোন্ পিপাসা,
কোন্ কামনার বহ্নি-জ্বলা ?
কিশলয়ের শয়ন থাকি-
কোন গরবে মেলি আঁখি ?
কোন স্বপনের ঘাের নয়নে,
রূপ-পসরা কিসের লাগি ?
গন্ধে বিড়ােল, পাগল-পারা
এই যে অলি আপন-হারা-
বরিষে তাের শ্রবণ-পুটে
প্রাণের গােপন কথার ধারা ;
এই যে মলয় গতির রাশে
চকিত্ থামায়,দাড়ায় পাশে,
৭১
সুর-হারা
থম ভরে স্তব্ধ রহে,
মূচ্ছি পড়ে মদির-বাসে;
সুধাই তােরে,—ওর মাঝারে-
পাস্ খুজে তুই আপনারে ?
তাই পুলকের কঁপন জাগে ?
পড়ি নুয়ে
সরম-ভারে ?
প্রােষিত কোন প্রিয়ের তরে-
সকল প্রাণের আবেগ-ভরে
ওই যে বালা গাঁথল মালা
সারা সকাল সন্ধ্যা ধরে ;
কোন্ নিরাশা-আশার দোলে-
বক্ষে তাহার কাঁপন তােলে?
কাহার তরে চকিতু চাহে,
রুদ্ধ দুয়ার চকি খােলে?
হরিণ দু’টি নয়নতারা
কোন্ স্বপনে আপন-হারা ।
৭২
চরম সার্থকতা
মধুর স্মৃতি কোন কপােল
জাগায় লাজের অরুণ-ধারা
তাহার সাধন যতেক যবে
পূর্ণ হবে—ধন্য হবে,
বন্ধু-জনার মিলবে দেখা,
মাল্যখানি গলায় লবে ;
সেই মিলনের প্রথম রাতে,
প্রেমের নিবিড় মূচ্ছনাতে,
বক্ষে-পেষা মালার ফুলের
শেষ বিদায়ের নয়ন-পাতে,
নিশীথ-জাগা অলস ভােরে
জীর্ণ শিথিল ছিন্ন ডােরে,-
তাের জীবনের অর্থ মেলে?
পূর্ণ করে তারাই তােরে ?
আচকিতে প্রদোষ-খণে
হঠাৎ-জাগা সমীরণে
৭৩
স্বহারা
শিথিল কায়ে ঝবি যবে
ধূসরতার সঙ্গোপনে ;
জাগবে বুঝি ধরার বুকে
কাপন বারেক নিবিড় দুঃখে,
মৌন ব্যথায় রইবে চেয়ে
সান্ধ্য-রবি তাের ঐ মুখে ;
ব্যর্থ অলি অধীর চিতে
খুজবে ফিরে চতুর্ভিতে ;
ঝবে আঁখি শিশির-কণায়
সাঁঝ-গগনের ধরণীতে;
শেষ বিদায়ের সেই সে ব্যথা-
সেই সে গভীর আকুলতা,
তার মাঝারে পাস্ কি খুঁজে
ততার জীবনের চরম-কথা ?
আয়ু-কালের আধেকখানে
ফেলে এলাম পিছন-পানে ;
৭৪
চরম সার্থকতা
হঠাৎ কবে শেষ বিদায়ের
জাগবে পালা কেই বা জানে ?
অতীত পানে ফিরে দেখি-
কতই স্মৃতির লেখা-লেখি ;
কে জানে তার কোনটুকু বা
সত্য হবে, কিম্বা মেকী।
দিনের কোলে দলের মত
উঠল ফুটে জীবন কত ;
থর থর কঁাপ্লাে হিয়া
পুলক ভরে অবিরত।
মদির-মধুর চাদনী রাতে
মিলল হিয়া হিয়ার সাথে ;
সুরার ঘােরের সমান সু
বিবশ কত নয়ন-পাতে।
আবেশ রঙ্গীন শিহরণে
দুলাে হৃদি ক্ষণে ক্ষণে ;
৭৫
সুর-হারা মাত্লাে পরাণ, টুটুলাে বাঁধন জাগলাে গীতি অকারণে। কত দিনের কান্না-হাসি, কতই সুরের কতই বাঁশী, জমাট-হৃদির অতল তলে, কতই আবেগ সর্বগ্রাসী। চিরন্তন এ চলার বাটে, এই যে বিকি-কিনির হাটে, কত জনার মিলাে দেখা, ভিড়লো তরী কতই ঘাটে । বিদায়-বেলায় নয়ন-নীরে অসীম ব্যথায় হৃদয় চিরে কত জনায় এলেম ফেলল- সুদূর স্মৃতির অতীত তীরে। কেউ বা এলাে ভালবেসে, ফিরলাে কেহ ব্যঙ্গ হেসে ;
চরম সার্থকতা
রাগ-বিরাগের ইন্দ্রজালে—
সাজলাে জীবন রঙ্গীন বেশে।
আজ ভেঙ্গেছে ভিড়ের মেলা ;
ঘুচিয়ে এ সকল খেলা ;
জীবন-নদীর তীরে শুধু
আজ আমি—মাের জীর্ণ ভেলা।
সন্ধ্যা নামে, ডুলাে রবি ;-
উদাস করুণ ধরার সবি ;
ওপার পানে তাকিয়ে দেখি-
অনিশ্চিতের ঝাপসা ছবি !
কোন্ সুদূরে—কি দেশ পানে
জবে পাড়ি—কেউ না জানে।
হয়ত কভু মিলবে না কূল,
ডুববে ভেলা মধ্যখানে!
আজ ভাবি—যে এই কতত না-
রং বেরঙ্গের কতই জনা—
সুর-হারা
জীবন ভরে কর্ল কেবল
মনের দ্বারে আনাগােনা ;
কান্নাহাসি, দুঃখ সুখে,
তুললাে তুফান কতই বুকে ;
আজতাে সবি শান্ত ছবি
সব কলরােল গগছে চুকে।
আজকে তবে তাদের ছাড়া
এই যে আমার জীবনধারা
ব্যর্থ সে কি ?—আজ হ’ল সে
উষর মরুর বক্ষে হারা ?
আজ মনে লয় জীবন ভরে
যাদের পেনু প্রাণের পরে,
আসা-যাওয়ার মাঝে তারাই
আমায় গেছে পূর্ণ করে।
জীবন আমার ফলবে বলে,
ফুটবে বলে শতেক দলে-
৭৮
চরম সার্থকতা
গরব ভরে হৃদ-শতদল,
সবার আসা জগৎ-তলে।
তাদের মাঝে নই ত হারা;
আমার মাঝে মিলল তারা,
আমার মাঝে মিশলে এসে
তাদের যতেক প্রাণের ধারা।
এই যে ফোটা, এই যে ফলা,-
এই গরবের উজল জ্বলা-
সকল রসের ইন্ধনেতে,
এই ত জীবন,—এই ত চলা।
সার্থকতা এরেই মানি,
এই ত পরম-তত্ত্ববাণী,
সকল রসে রসিক ধরার
কেন্দ্র আমার জীবনখানি ।
রূপপ, রসে, প্রেমে, গানে,
আপনাকে সে আপনি জানে।
সুর-হারা
প্রাণের ডালি ফুলের মত
মেলে ধরে অসীম-পানে।
কেই বা আসে যায় বা কে যে,
ধার ধারে না তার ত সে যে!
সার শুধু এই,—সব পরশে
জীবন-বীণা উঠলাে বেজে !
প্রসূনবালা, প্রসূনবালা,-
এই যে ভুবন কর্লি আলা,
প্রাণের বেগে উঠলি ফুটে,
—এই শুধু তাের জয়ের মালা।
গানের শেষে
সন্ধ্যা নামে
শান্ত ছবি ;
ধীরে
ওই
অস্তাচলে
ডােবে
এবে
ক্লান্ত রবি ;
গানের পালা
ক্ষান্ত, কবি ।
নিজে
धू
গেছ
পাশরি’ গিয়া
খেয়াল-ঘােরে
যে গান গাহি
দিবস ধরে,
কাহার লাগি ।
কিসের তরে ?
সারা
সে যে
বল
জাগে
যেই
নিয়ত প্রাণে
স্বপন-ছবি,
সুর-হারা যারি ভাতে চিত্র-রাগে মােহন সবি, পেরেছ গানে ফুটাতে, কবি? তারে কভু তারি জাগি কোন রসেতে রসি’ উঠিল কিনা সুপ্ত-বাণী মূৰ্ত্তি-হীনা ? ঝঙ্কারিয়া মনেরি বীণা ? ভাষা- सर्ट তাই তারি সে কি তারি রঙ্গের আভা, ভাষাতে ফুটে ? আশরী বাণী জাগিয়া উঠে? ভঙ্গী-গতি ছন্দ-পুটে ? সুরে তারি নাচে গানের শেষে মৃদু নীরব পাতে সুনীল আঁখি যুগে যে তোেমা বারেক ডাকি। এ আসা-যাওয়া তাহারি লাগি। গেছে বুঝি শুধু তারি তারি রাখে -দেখা ছবি, -শােনা বাণী, জাগায়ে হৃদে আঘাত হানি’! এ’ নিতি-চলা বিরাম মানি। তাই নাহি ও কি তারি শুনি তারি মর্মরিল পাতার কোলে ? চরণ-ধ্বনি? নূপুর রােলে ? নিচোল লুটে দিগঞ্চলে ? দূর ৩ স্বহারা ভরা তারি বুঝি তারি তারি ধানের ক্ষেতে লাস্য জাগে ? সুরভি বায়ে পরশ লাগে । কান্তি জ্বলে জ্যোৎস্না-রাগে। ম্লান হায়, কোথা তারি শ্রান্তি কোথা? শান্তি প্রাণে ? অধীর বাণী বাহিরি’ আনে। পথে তারি অবুঝ আঁখি বনে বিতানে টানে। সেই সেই সুপ্তি-হারা তৃপ্তি-হারা নিমেষ-রাজি, দিল কি তারা গানের সুরে প্রাণের সাড়া । নিজ ৮৪ গানের শেষে কভু তব সেই জাগিল, কবি, সুরের কোলে, ব্যথার দোলা হৃদয়ে দোলে ? নিরাশা-আশা তুফান তােলে ? কি যে কি যে বুকে শুধু শুধু যারা নিমেষ তরে, কৌতূহলে, ভিড়িল পাশে গিয়েছে চলে। কেহ ত নাহি আসর-তলে! সবে হের তব কি যে কি যে বুঝিল কেহ প্রাণের বেগে, আবেশ-মাখা সােহাগ লেগে, কণ্ঠে তব উঠিল জেগে ? নিতি গীতি ৮৫ সুর-হারা কি যে কি যে মােহের ঘােরে স্মৃতিরি ধ্যানে স্বপন লাগে, চোখে জাগে আবেশ প্রাণে। নিমেষে দিশা আসে টুটি অনবধানে। হলে হায় যারি হিয়া যারি অথবা, কবি, সে সুর-হারা, মদির ঘােরে পাগল-পারা, নিবিড় রসে গানের ধারা ? ঝরে বুঝি এ রচা কথা কথারি ছাদে । দিবে না ধরা ভাষারি বাঁধে। ব্যর্থ-আশা গুমরি’ কাঁদে। বুঝি বুকে ৬ গানের শে তবে চলগাে, কবি, চল ওই আসর তুলে ; সাঁঝের ছায়া- তটিনী-কূলে ; নামে নীরে पर्छ খেয়ার তরী দোদুল দুলে। শম-
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.