Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly

Patrapushpa

Mukhopadhyay, Girijanath · 2010/04/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

lookool

‘পত্ৰপুষ্প’-প্রণেতার
অপর দুইখানি গীতি-কাব্য
পরিমল
•••
মুল্য ১এক টাকা
মুল্য ১, এক টাকা

পত্ৰপুষ্প
ঐগিরিজানাথ মুখােপাধ্যায়
প্রণীত
সন ১৩২১ সাল
বৈশাখ

৮১৪..
গহিন
U* ''????! :'- .'. bry
২৬৬ 0 .... ১৫:৬, ৮৫
Acc;}
কুন্তলীন প্রেস,
৬১ ও ৬২নং বৌবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা ;
অপূর্ণচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

উদ্দেশে
এলাে-মেলাে ফুল-পাতা, মালা ত হয়নি গাঁথা,
ছিড়ে গেছে ডাের ;
মালতী, অপরাজিতা,
শুকাইছে মাের ।
কুন্দ, যুথী শুচিস্মিতা
তােমারে পাইনি কাছে, ফুল তাই পড়ে আছে
কে পরিবে কেশে !
পারিনিগাথিতে মালা, তাই গাে, জুড়াতে জ্বালা
দিতেছি উদ্দেশে।

No text on this page.

भखाक
১
১-২২
সর্বমঙ্গল্য
প্রেমের স্বরূপ
प
প্রেমের কামনা
মুক্তকণ্ঠ '.
বর্ষানিশি
অপ্রত্যাশা .
অপরাধ
৪
অনতা
১৭
১৮
প্রিয়া
কল্যাণী
গীতি-উপহার
२०
২
২৫-৩৬
২৫
२१
কবি
স্রষ্টা ও কবি
বিশ্বের প্রেম
কবিতার প্রতি
কবিপ্রিয়া .
২৯
৩৪

• পৃষ্ঠা নব বর্ষে প্রার্থনা . নব বর্ষ ৪১ ৪৩ ৪৫ যাও পুরাতন নব বর্ষের প্রতি প্রত্যাবর্তন প্রবাসী ৪৭ . ৪ ৭৬ ৪ ৭ অভিজ্ঞান . মিলন বিরহে গীত-শেষ সুখ-স্মৃতি . জীবন-বর্ষা . . শরতে মা ৬৮ ৭১ ৭৪ ফিরে যাও, হে মরণ অপরিচিত, ৭৯-৮৪ মরণে ৭৯ শােক-গীতি ৮২ • পৃষ্ঠা অনন্ত মিলন ৮৪ ৮৭-১১২ বউ কথা কও ৮৭ হাসি ও অশ্রু নবদ্বীপ ৯১ p আহ্বান ৯৪ পথে ৯৭ । সংসার-পথে যৌবনাবসান সঞ্চয় ১০৬ চিরন্তন তাবশেষ ৪ মালাকর গাও কবি . প্রতীক্ষা ১১৩ ১১৮ আর কত দূর উৰ্ম্মিকা ১২০ শেষ কথা। ১২১

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পশুপ সর্বমঙ্গল্য আমি কি বুঝিতে পারি, কেন সে করুণা ছদ্মরূপে বহে নিত্য। যাহারে অধুনা অমঙ্গল-রূপা ভাবি’ দূরে দূরে রই, সে যে জননীর মত কত স্নেহময়ী । পরিপূর্ণ মাতৃস্নেহে সে হয় ত মােরে বক্ষোঝে নিবে টানি’ বিঘ্ন দূর করে। যে নিশা প্রলয়-রূপা তমিস্রার ছবি- তারি কোলে ফুটে উঠে প্রভাতের রবি। চির-বিরহের ভয় আনে যে মবণ- অবিচ্ছেদ মিলনেরে করে সে বরণ।

প্রেমের স্বরূপ
আঁখির পিপাসা যদি প্রেম হত শুধু,
রহিম নয়ন মুদিয়া ;
বাসনার নদী যদি প্রেম বুঝিতাম,
গতি তার দিতাম রুধিয়া।
হ’ত যদি প্রেম-বহি, দিতাম তাহারে
আঁখি-জলে নিৰ্বাপিত করি;
বুঝিতাম প্রেম যদি রুদ্র রবি-তাপ,
মেঘে রে দিতাম আবরি।
বুঝিতাম যদি প্রেম পণ্য বিপণির,
বিকায়ে দিতাম বিনা পণে ;
নিশীথের স্বপ্ন যদি হত এই প্রেম,
দিনােদয়ে রহিত না মনে।
৪

প্রেমের স্বরূপ
হ’ত যদি মায়াপুরে মরীচিকা প্রেম,
নাহি তার ছুটিতাম পাছে ;
বুঝিতাম যদি প্রেম আকাশ-কুসুম,
পরশিতে না যেতাম কাছে !
শিরায় শােণিত প্রেম, নিশ্বাসে পবন,
দর্শনে আলােক হয়ে জাগে ;
পরশে পরশমণি, দুখে অশ্রুজল,
পুষ্প-অর্ঘ্য দেবতার আগে।

প্রেমের কামনা
;
আমি ত বুঝিনা—তারে কেন ভালবাসি ;
সেই আঁখি-ঢল-টল,
সেই মুখ-শতদল,
বিদাধরে বিকশিত সেই সুধা-হাসি,
আমি ভালবাসি তার সেই শােভারাশি।
যত দেখি, শােভা তত উথলে নয়নে।
প্রেম যেন মূর্ত হয়ে
আছে তারি রূপ ল'য়ে,
তাই সে আনন্দচ্ছবি সদা জাগে মনে,
প্রীতির নির্বর ঝরে তার দরশনে।

প্রেমের কামনা দূরাগত নিশীথের সঙ্গীত মধুর যেমন পাগল করে, যেমন মানস হরে, তেমনি সে রূপে বুঝি আছে কোন সুর, ভরিয়া রেখেছে মাের পরাণ বিধুর। যেমন বিশ্বের আলো, বাতাস যেমন, তেমনি গাে রূপ তার ব্যাপি মাের চারি ধার, তেমনি উদার আর প্রশান্ত তেমন, বাসি ভাল সেইরূপে থাকিতে মগন । সাধ যায়—ফুল হয়ে থাকি অনিবার- ফুটিয়া তাহারি তরে, তেমনি আনন্দ-ভরে ; আপনারে করে রাখি পূজা-উপহার, তাতেই কৃতার্থ করি জীবন আমার। ৭

মুক্তকণ্ঠ
জীবনের শত কাজে,
শত সুখে-দুখে বাজে
কা’র গান হৃদয়-বীণায় ?
কা’র নাম প্রাণ ভবি’ বেখেছি সৰ্ব্বস্ব কবি,
বহিভেছি শােণিতে শিরায় ?
কা’র রূপ---কা’র স্মৃতি, কা’র উচছু সিত প্রীতি
পবাণের উপকণ্ঠ ভরি’
কে দেছে জীবনে জয়, প্রেমেরে মহিমাময়
কে কবেছে আপন পাশবি’!
;
সে পশিল কোন্ ক্ষণে
মাের চিত্ত-কুঞ্জবনে
প্রভাতের আলোেক যেমন
তেমনি প্রফুল্লকর,
তেমনি সে মনােহর,
জাগাইল পুলক তেমন।
মুদে ছিল অন্ধকারে,
শত ফুল একবারে
ফুটিল কি হৃদয়ে আমার ?
হৃদে ধরি’ সেই আলো, আমি যে বেসেছি ভালাে,
এ জীবনে নহে ভুলিবার !
৮

মুক্তকণ্ঠ
জন্ম-জন্ম তারে চাহি, সে বিনা কামনা নাহি,
প্রেম দিয়া গড়িয়াছি তারে ।
অন্তরে অন্তরতম,
সে যে মাের নিরুপম,
তুল তার মিলে না সংসারে।
বিনিময়ে স্বর্গ পাই,
তাও আমি নাহি চাই,
দে বিনা যে নন্দন শ্মশান ;
তারি হাসি উষা হাসে, তারি মুখে স্বৰ্গ ভাসে,
তারি বুকে দেবতার স্থান।
সে নিৰ্ম্মাল্য দেবতার,
পবিত্র পরশ তার
বহি আনে ফুলগন্ধী বায় ;
বুকে রাখি—শিরে রাখি, সকল অঙ্গেতে মাখি,
তৃপ্তি যেন নাহিক কোথায়।
অণু---পরমাণু তার,
নহে যেন এ ধরার,
সে ফুটেছে ত্রিদিবের ফুল।
মত্তে সেই মন্দাকিনী,
অমৃতের প্রবাহিণী,
আমি মরু তৃষিত আকুল।
৯

পপুষ্প
সকল স্মরণ-মাঝে
তাহারি মূরতি রাজে,
আমি তার নামেতে বিরল।
বলি না ত চুপে চুপে বিশ্ব ভরা তারি রূপে,
আমি দেখি, তারেই কেবল।
নিশ্বাসের মত আছে
সে নিত্য আমার কাছে
পূর্ণ করি’ বাহির অন্তর ;
তেমনি অবাধ-গতি,
তেমনি সহজ অতি,
আমার সে তেমনি নির্ভর।
১০

বর্ষানিশি
আরাে কাছে—আরাে কাছে—আরাে কাছে, প্রিয়।
তােমার প্রাণের মাঝে মিশাইয়া নিয়ে
;
ঘন মেঘ ঘনতর,
মেঘ’পরে মেঘন্তর,
গাছে গাছে মেশামেশি, পাতায় পাতায়,
চারিদিকে একাকার ঘন মেঘচ্ছায় !
উতলা পবন ওই, শশ হাঁকে,
বিজলী জ্বলিয়া উঠে—মেঘ রুদ্র ডাকে।
শব্দে ফেটে গেল কান,
ভয়ে কেঁপে উঠে প্রাণ।
গেল গেল নিবে দীপ—গাঢ় অন্ধকার।
কই তুমি—কই আমি,-বল একবার!

পত্ৰপুষ্প
আকাশ-পৃথিবী-মাঝে নাহি ব্যবধান,
মেশামিশি এক-ঠাই দোহাকার প্রাণ ;
ঘন অন্ধকারে মিশি
হারায়ে গিয়েছে দিশি ;
এমন নিবিড়তম বিজন আঁধাবে-
ওগাে, তুমি, বাহু বেড়ি’ লহগাে আমারে।
থাক থাক্ চির-নিশি, চির-অন্ধকার,
দুটি প্রাণে মেশামিশি চিব-একাকার।
হেথা রােক্ বাহু-ডাের,
চির-মিলনের ঘাের ;
চির-ভুজপাশে বাঁধা চির-পরশন,
নয়নে নয়নে চির-প্রেমের স্বপন।

অপ্রত্যাশা
ফুটে ফুল ঝরে যায়,
সে ত কিছু নাহি চায়,
লুটায় ভূতলে।
ঘুরি’ বায়ু দ্বার দ্বার
চলে যায় শতবার,
ফিরে আসে ছলে
সন্ধ্যা যে, রবিরে চায়,
কবে তার দেখা পায় ?
তবু চেয়ে থাকে।
বসন্ত চলিয়া যায়,
তবু পিক কেন গায়-
সহকার-শাখে ?

পত্ৰপুষ্প
চাহিব না—চাহি নাই।
সেই সুখ, চাহি তাই,
নাহি যার শেষ !
তেমনি আগ্রহ-ভরা,
তেমনি পাগল-করা-
কাহারাে উদ্দেশ।
সেই আপনাতে ভুল,
তেমনি অজ্ঞাত-মূল,
“কেন”-বুঝি না’ক।
ভালবাসি, তাই জানি,
ভালবাসি, তাই মানি,
“কেন”-খুঁজি না’ক।
১৪

অপরাধ
পাছে অপরাধ হয়!
সদা ভয়েভয়ে থাকি, লুকাই সজল আঁখি,
চেপে রাখি আকুল হৃদয়।
যে কথা বলিতে চাহি, বুঝি তার ভাষা নাহি,
কি বলিব, জাগে শুধু ভয়-
পাছে অপরাধ হয়!
রিক্ত করি আপনারে
সৰ্বস্ব দিয়াছি তারে,
প্রাণ মন তৃপ্ত তবু নয় !
তবু কিছু দিতে বাকী
এখনাে রয়েছে না কি,
কেমনে তা বুঝিব নিশ্চয়।
পাছে অপরাধ হয়।
(F4-213"? Prlic Library se
Acca. l.2৬.9&p-ce.২৫:৬৬০

পত্ৰপুষ্প
সদা দূরে-দূরে থাকি, প্রাণপণে ঢেকে রাখি
মরমের নিভৃত নিলয় ;
তবু মাের ভালবাসা খুজি’ প্রকাশের ভাষা
উথলিতে চাহে যে হৃদয়!
পাছে অপরাধ হয় !
ভাল সেই-আঁখি-জল, হৃদয়ের চিতানল,
জীবনের চির-পরাজয়,
নিয়ে র’ব একধারে,
জানিতে দিব না কাবে,
হয় হাে শত দুঃখময়,
পাছে অপরাধ হয় !
যেথায় গােপন-পুরে
বেদনার মত সুরে
গীতি হয়ে ধ্বনিছে প্রণয়,
সেথা তার আকুলতা, কে বুঝিবে তার ব্যথা,
কোথা শেষ, কোথায় উদয়,
পাছে অপরাধ হয় !

;
তােমারে বরণ করি’ নিয়েছি যখন,
আর কারে নাহি চাহি; পাই বা না পাই
কোন প্রতিদান তার, নাহি আকিঞ্চন।
হৃদয়-কুসুম-রাশি শুধু দিতে চাই
দেবতারে। থাকে দৈন্য, করিয়া গােপন
পূর্ণ করি’ ল’ব প্রেমে ; কোন দুঃখ নাই,
ব্যর্থ যদি হয় সাধ ; নিগূঢ় বেদন
তুলিবে প্রগাঢ় করি প্রেমে আরাে ;তাই,
খু জি নাই অবগাহি হৃদয়ের তল--
কি যে চাহি! শুধু মাের নিভৃত অন্তরে
রেখেছি একটী দীপ করিয়া উজ্জ্বল
দিবা-সন্ধ্যা দেবতার আরতির তরে।
ভালবাসি,তাই মম জীবন সফল,
এতটুকু দৈন্য-দুখ নাহি মাের ঘরে।
২
১৭

৫ প্রিয়া তৃষ্ণার বারি-- তুমি কি আমার চির-সাধনার সঞ্চিত তপােফল ; তুমি কি আমার নিৰ্ম্মল—সুশীতল । তুমি কি আমার কণ্ঠের কলগতি ; তুমি কি আমার অতীত দিনের দুঃখের সুখ-স্মৃতি। তুমি কি আমার মনােমন্দিরে বিগ্রহ দেবতার ; তুমি কি আমার দুঃখে-কাতরা সান্তনা করুণার। তুমি কি আমার দুল্লভ রবি-রেখা ; তুমি কি আমার জনমান্তর- পুণ্য-মিলন-লেখা! মেঘ-দুর্দিনে sto

প্রিয়া
তুমি কি আমার অকূল সাগরে
উজ্জ্বল ধ্রুবতারা ;
তুমি কি আমার প্রীত দেবতার
মুক্ত আশিষ-ধারা ।
তুমি কি আমার নিঃস্ব দীনের
স্বপ্ন-অতীত ধন ;
তুমি কি আমার নয়নের আলাে,
নিশ্বাসে সমীরণ!
১১

কল্যাণী
প্রভাতে দেখেছি তােমা স্নাত-শুচি-বৈশে
তুলিতে পূজার ফুল পট্টার পরি;
পূজা-শেষে নিরমাল্য ধরি’ সিক্ত কেশে
পশিতে রন্ধন-গৃহে,—দেখেছি, সুন্দর
পুনঃ অন্নপূর্ণারূপে, দেখিয়াছি, বালা,
অতীত মধ্যাহ্নে তােমা তুষিতে যতনে
গৃহাগত অতিথিরে—রিক্ত করি’ থালা,
আপনি অভুক্ত থাকি’, প্রসন্ন-আননে।
আবার দেখেছি তােমা’—দিবা-অবসানে
ভক্তিভরে করি’ গৃহে সন্ধ্যাদীপ দান
নমিতে দেবতা-পদে,-কায়-মন-প্রাণে
যাচিতে নীরবে পতি-পুত্রের কল্যাণ !
হে কল্যাণ, যুগে-যুগে হাে তব জয়,
ওই রূপ বঙ্গ-গৃহে হউক অক্ষয়।
২

গীতি-উপহার
জীবনের কোন প্রাতে তুমি আমি একসাথে
বহুদিন নয়,
ধরি’ তব ভকর হয়েছিনু অগ্রসর
আজি মনে হয়।
তখন সােনার রবি
হৃদয়ে সােনার ছবি
এঁকেছিল সুখে!
তখন বিকচ ফুল,
বায়ু পরিমলাকুল,
মেহরাশি বুকে!
তরু যথা বাহশাখে লরে বাঁধিয়া রাখে
মেহ-আলিঙ্গনে,
স্নেহ-বক্ষে আঁকড়িয়ে রাখিনু তােমারে, প্রিয়ে,
আছে কি অরণে?
২১

পশুপ
জীবন-সর্বস্ব দিয়ে আপনারে বিকাইয়ে
পত্রি চরণে
তুমি বেঁধেছিলে ঋণে, বল, সেই শুভ দিনে
ভুলিব কেমনে?
আজি হৃদি উদ্বোধিত, সুখ-স্মৃতি উচ্ছসিত
প্রেম-যমুনায় !
তারি এতটুকু স্মৃতি আমার এ ক্ষুদ্র গীতি
দিলাম তােমায় !
২২

No text on this page.

No text on this page.

কবি সদা ভাবে-ভােলা , কিবা পর—কি আপন, সে চাহেনা কোন দিন কারাে পরিচয়। নাহি জানে কোন ভেদ, নাহি তার কোন খেদ, প্রেম-মন্দাকিনী-ধারা হৃদে সদা বয়। তরু লতিকার সনে কথা তার নিরজনে, পুষ্পগুচ্ছ বুকে ধরে সােহাগে আদরে। দলিতে দূর্বার দল আঁখি তার ছল-ছল, করুণার উৎস যেন উথলে অন্তরে। চাদ দেখি’ ভরে বুক, মনে ভাবে চাদ-মুখ, মেঘে এলাে-কেশ দেখে, চপলায় হাসি। কুলুকুলু নদী ধায়, তারি সনে গীত গায়, কত কথা বলে তারে, ফুটে ভারাশি। ২৫ পপপ তা’র যে প্রাণের বীণা, বাজে সে বিরামহীনা, শুনে কেহ, নাহি শুনে, মিশে সন্ধ্যাকাশে। সে কোন্ আরাধ্যা-লাগি সারা নিশি রহে জাগি, যদি তার স্পর্শ একবার আসে। হােক সে ধরার প্রাণী, নাহি তার জানাজানি, অতি তুচ্ছ তার কাছে স্তুতি, নিন্দা, যশ ; গৰ্ব তার—দীনতায়, ঘৃণা তারহীনতায়, বসুধা কুটুম্ব তার, সৰ্ব্ব ভুত বশ।

অষ্টা ও কৃবি পূর্ণ করিয়া কবিরে বসায়ে দক্ষিণ পাশে স্রষ্টা সুধান হাসি, “আমার জগত রেখেছি সুখের রাশি। সুখে পাখী গায়, সুখে বনফুল ফুটে; মুখে তরুকোলে সুখে নিঝর ছুটে। সমীরণ বহে, বল্লরী দোলে, ফুল কিরণে - সুখে শশী হাসে প্রাণে সুধা নাহি ধরে ; সুখে উচ্ছ সি’ সিন্ধু অধীর উথলে বেলার পরে। খে চঞ্চল প্রভাতের আলাে, ঝলমলে তরুশিরে; সুখে মধুর মত্ত-বিভাের, ফুলে গুঞ্জরি’ ফিরে। ২৭ পপুষ্প বিদ্রোহ-সুর তুমি তার মাঝে কেন তুলিয়াছ, কবি, মনের আঁধার পুঞ্জিত করি ঢাক’ বিশ্বের ছবি?” জুড়ি’ দুটি কর কবি কহে—“প্রভু, ক্ষম মম অপরাধ; দেছ যত সুখ, তৃষা ততধিক; মিটে না মনের সাধ ! সসীম করিয়া গড়িয়াছ সুখ, সীমা কোথা কামনার? অপূর্ণ সাধ, ব্যর্থ বাসনা করে তাই হাহাকার।”

বিশ্বের প্রেম ভালবাসে পাখী, প্রভাত-আলােক নিতি সে শুনায় গান; ভালবাসে তরু, ছায়াদানে মাের জুড়ায় তাপিত প্রাণ। ভালবাসে উষা, প্রতি নিশি-শেষে মাের গৃহে দেয় দেখা, নিমীল-নয়ন চুমিয়া সােহগে মুছে স্বপনের লেখা! নীল অঞ্চলে ভালবাসে মেঘ, দেয় রবিকর ঢাকি’; করে সে বীজন মলয়-পবন কুসুম সুরভি মাখি’ অন্ত-অচলে কনক তপন করুণ বিদায়-ছবি-- মাের পানে চাহি ডুবিতে না চায়, ভালবাসে মােরে রবি।

পত্রপুশ ভালবাসে নিশি, দিবা-অবসানে মাের কাছে আসে ধীরে, ছড়ায়ে-জড়ায়ে কুন্তলরাশি আমারে রাখে গাে ঘিরে। প্রিয়ার মতন বাঁধে মােরে তার নিবিড় প্রেমের পাশে; নিভৃতে তেমনি মিশে যাই যেন দোহে দোহাকার শাসে! বিশ্বের প্রেম, শতধারে আসি পশিছে আমার প্রাণে; আলােকে, আঁধারে, বরণে, গন্ধে কত রসে, কত গানে। মনের পাত্র ভরি’ লইয়াছি- আস্বাদ সে সবার। ধন্য আমি সে, কৃতার্থ আমি, নমি সবে বারবার। ৩০ কবিতার প্রতি তােমার বিচিত্র প্রেম বুঝিতে না পারি । সাধিলে না পাই দরশন; অলি যবে শােকানলে, চক্ষে তব বারি, কাছে এসে মুছাও নয়ন! কি যেন পাগল করি’ রেখেছ আমায়, ভাব-মুগ্ধকৰ্ম্মে উদাসীন। নির্জনে তােমার ধ্যানে দিন চলে যায়, রজনীতে নেত্র নিদ্রাহীন। ধরা কভু নাহি দাও, নাহি পর ফাস, নাহি মান’ কোন অনুরােধ; চাহি’ তব পথ-পানে ফেলি দীর্ঘশ্বাস, নিরাশায় অভিমান-বােধ। দেখা পেলে কত হর্ষ, সব ভুলে যাই, ক্ষুধা তৃষ্ণা থাকে না অরণ; নয়নে-নয়নে রাখি, শুনিবারে পাই- ছন্দে ছন্দে নূপুর-নিকণ! ৩১ পত্রপুপ • AL««« তাের বিরহ—সে যে মরণ আমার, শূন্য দেখি এ বিশ্বভুবন;- বৃথা মনে হয় তার সুষমা-সম্ভার ; শরতের জ্যোৎস্না অকারণ ; ব্যর্থ বিহঙ্গের গীত; মুগ্ধ নাহি করে পূৰ্বাকাশে উষার কিরণ ; আষাঢ়ের নব মেঘ মাের প্রিয়া-তরে প্রেম-বার্তা না করে বহন। দিয়েছি সর্বস্ব পদে,রিক্ত দীন-হীন, জানি শুধু তােমারি সাধনা ; নাহি গণি জীবনের সুদিন-দুর্দিন, করিয়াছি তােমারি কামনা। শােকে ভাঙ্গিয়াছে বুক, দহিয়াছে প্রাণ, নিরাশায় হয়েছি কাতর ; তুচ্ছ মানিয়াছি সৰ্ব্ব মান-অপমান, করিয়াছি তােমাতে নির্ভর। ৩২ কবিতার প্রতি তােমারে হৃদয়ে ধরি’,লােকে যাহা চায়, চাহি নাই সেই খর্ব সুখ ; দিয়েছ যে প্রেমমন্ত্রপূর্ণ মহিমায়, সেই গর্বে ভরিয়াছে বুক! চাহিনা সে খণ্ড-ক্ষুদ্র সংসারের দান, নহি আমি ভিক্ষুক তাহার; তব দ্বারে উপবাসী—সেই মাের মান, তাই মানি শ্রেয়ঃ শতবার!

কবিপ্রিয়া অতিক্রান্ত অন্ধ রাতি, তখনাে জ্বলিছে বাতি, রচনায় রয়েছি মগন ; সহসা-আঁধার ঘাের নিবে গেল দীপ মাের, মূঢ় হয়ে রহিনু তখন । বলিতে কোন কথা, কার দুটি বাহুলতা কণ্ঠ মাের করিল বেষ্টন; তার পর,—উচ্চ হাসি, সব রােষ গেল ভাসি, বরষিল শতেক চুম্বন! } বসিয়া নির্জনে—একা পাই কবিতার দেখা, এ কেমন তব ব্যবহার ? উদ্দাম অনিল-মত তুমি এলে-কাব্য গত, আর তারে খুঁজে পাওয়া ভার। কহিলা কবির প্রিয়া “শুধু কবিতারে নিয়া চাহ তুমি যাপিতে জীবন; ল’য়ে ভাব, ভাষা, মিল অবসর নাহি তিল, চাহ না ত আমার মিলন!” ৩৪ কবিপ্রিয়া কহিলাম—সে কি কথা? কানু বিনা গীত কোথা, যা লিখি, তা তব প্রতিধ্বনি! তুমি কায়াসে ত ছায়া, তুমি প্রেম, সেত মায়া, সে তটিনী, তুমি যে তরণী। উত্তরিল হাসি’ প্রিয়া কণ্ঠে মাের লইয়া- “তােমরা যে স্তাবকের জাতি। তােমরা পাতিলে ফাদ, পড়ে আকাশের চাঁদ, রবি উঠে না পােহাতে রাতি। ছােটরে করিতে বড় কবির কল্পনা দড়, তৃণ তরু করেছ সমান; শিশিরে মুক্তার তুল, তােমাদের কিনা ভুল, তাই বুঝি বাড়াইলে মান! দিন রাত মাথা কুটি, কবিতার পায়ে লুটি দেখা তার পাও কিনা পাও, কিসে তবে আমি উচ্চ, সে আমার কাছে তুচ্ছ, বুঝি না ত, বুঝাইয়া দাও।”

পত্রপুপ কহিনু ফাপরে পড়ি’ বুঝাব কেমন করি, চিত্তপটে তুমি দীপ্ত ছবি ; তােমার প্রেমের মূর্তি দিয়াছে কঙ্গনা-স্কৃত্তি, প্রিয়তমে, তাই আমি কবি।

No text on this page.

No text on this page.

• নব বর্ষে প্রার্থনা গেল বর্ষ;- নববর্ষে নূতন প্রভাত! সুপ্ত প্রাণ, মােহ-নিদ্রা টুটিল কি তার? কত আশা, কত হর্ষ, বেদনা-আঘাত লভিয়াছি, করিব না তাহার বিচার। মুছে দাও, আজি সব—হে মাের দেবতা। পেয়ে যদি থাকি সুখ, যদি কোন মান, তােমারি প্রসাদ তাহা, নহে গৰ্ব্ব-কথা! পেয়ে যদি থাকি দুঃখ, সে তােমারি দান। ক্ষুদ্র আমি, জনে জনে মাের নিবেদন ;- করিয়াছি যত ত্রুটি, অপরাধ যত, শত্রু হও, মিত্র হও,—যে হও আপন, চাহি ক্ষমা নতশিরে আজিকার মত। লহ প্রীতি, লহ প্রেম,ভুল’ বিসংবাদ, এস কাছে—অভিমানে যেবা আছ দুর ; এস বক্ষে—যে বঞ্চিত-মিলন-আস্বাদ, নব বরষের দিন কর সুমধুর! ৩১ পপুল দ্বারে আজি দাঁড়াইয়া বরষ নূতন ; নাহি জানি, নাহি চাহি কোন পরিচয়। লহ সমাদরে তারে করিয়া বরণ— : নূতন অতিথি সে যে, সৰ্ব্ব-দেবময়। গৃহী যদি হও তুমি পূর্ণ ধনে-জনে— অতিথির আশীৰ্বাদ হবে না বিফল ; হে সন্ন্যাসি, ইষ্টলাভ-ধ্যান তব মনে, লভ’ সেই ইষ্ট, যাহে বিশ্বের মঙ্গল। ৪ নব বর্ষ ১ এস এস, হে বর্ষ নূতন! মূতন কিরণ ঢালি’, আশার আলোেক বালি এস এস, হে অতিথি, করি আবাহন। বুক-ভরা প্রেমরাশি, ল’য়ে এস মধু-হাসি, আজি নতশিরে তােমা করি গাে বন্দন! এস এস, হে বর্ষ নূতন! এস এস, হে বর্ষ নূতন! উঠিছে তরুণ রবি, আকাশে সােনার ছবি, কাননে কুসুমবাল মেলিছে নয়ন ; আলােকে পুলকি’ প্রাণ বিহগ গাহিছে গান: তােমার বন্দনা ভরি’ নিখিল ভুবন ; এস এস, হে বর্ষ নূতন! এস এস, হে বর্ষ নূতন! দুলাইয়া ভূত কথা, মুছাইয়া মলিনতা আন নব বল দেহে-নূতন জীবন; শুনাও নূতন গীতি, বুক-ভরা দেও প্রীতি, পূর্ণ কর জীবনের আশা-আকিঞ্চন; এস এস, হে বর্ষ নূতন! ৪১ পত্রপুপ AAAA ২ এস এস, বরষ নূতন! দেখাও কর্তব্য-পথ, জীবনের ভবিষ্যৎ, ভেঙ্গে দেও সুখ-তা—অলস স্বপন ; দওে পেলে পলে, আয়ু ক্ষয়-মুখে চলে, কেবা জানে কত দূরে হবে সমাপন! এস এস, বরষ নূতন! এস এস, বরষ নূতন! তীরে-তীরে দিয়া পাড়ি, কৈশোের, যৌবন ছাড়ি, কোন্ খেয়াঘাটে তরী করিবে বন্ধন ; ফেলে যাবে কত গ্রাম, নয়নের অভিরাম, তালী-নারিকেল কুঞ্জ-ছায়ায় মগন ; এস এস, বরষ নূতন ! এস এস, বরষ নূতন! বল আর কত দূরে নিয়ে যাবে কোন্ পুরে, হয়ত, সন্ধ্যার ছায়া নামিবে তখন; তখন বাঁধিও তরী, যাত্রা সমাপন করি’ করিব নূতন দেশে, নব পদার্পণ; এস এস, বরষ নূতন! ৪২ যাও পুরাতুন যাও পুরাতন! ভেঙ্গেছে তােমার খেলা, যেতে হবে, নাহি বেলা, পশ্চিমে করুণ-মূৰ্ত্তি দিনান্ত তপন ; তরু-শির উঠে কাঁপি, তােমারি কি নিশ্বাস অমন? বল পুরাতন! বুকের বেদনা চাপি তােমারে বিদায় দিতে কত কথা উঠে চিতে, শেষ-চিন্তু তুমি তার করেছ ধারণ! তােমার বাতাস খুঁজি তার শ্বাস পাই বুঝি, কুসুমে সে হাসিটি তেমন, ওগাে পুরাতন! তােমার পাখীর গানে তারি গীত মনে আনে, বৈশাখী-চম্পকে তার পূজা-আয়ােজন; তার দিন, তার নিশি, তােমা’ সনে আছে মিশি,'— সুখ দুঃখ--বিদায়-মিলন; হায়, পুরাতন! ৪৩ পত্রপুপ যাবে পুরাতন, কোন্ অতীতের তীরে, আর কি আসিবে ফিরে ? অথবা কালের কোলে তুমিই নূতন। বর্ষে বর্ষে তুমি সেই, ‘নব’ ‘পুরাতন’ নেই, নাহি জরা, নাহিক যৌবন; ওহে পুরাতন! হারায়েছি—যারে বলি, সে হয় ত মােরে ছলি’ অনন্তের মাঝখানে পেয়েছে জীবন। সে হয় ত, আর বার পরিপূর্ণ রূপে তার দেখা দিবে তােমার মতন, মাের পুরাতন ! ৪৪ নববর্ষের প্রতি মঙ্গল-মুহূর্তে আজি—তরুণ প্রভাতে হে বৰ্ষ নূতন, দেখিলাম কিবা রূপ! জননী আমার প্রসন্ন-আনন। চরণে অম্লান অর্ঘ্য-পূজার কুসুম শােভে থরে-থর ; দুটি করে বরাভয়—দেখিলাম কিব মূৰ্ত্তি মনােহর। 3 যুগান্তের দীর্ঘ অমানিশা পরে, তুমি নূতন বয়ষ, এনেছ কি আজি নব-রবিকর-দীপ্ত উজ্জ্বল দিবস? তুমি কি মুছায়ে দিবে বহু বরষের কলঙ্ক-কালিমা ? তুমি কি ঘুচা’য়ে দিবে অভাগ্য দেশের মুখের গ্লানিমা? ৪৫ পত্ৰপুষ্প এনেছ বারতা যদি, শুনাও শ্রবণে সে অমৃত-বাণী, যে কর্ণে শুনেছি শুধু যুগ-যুগ ধরি’ নিন্দা আর গ্লানি। ব’লে যাও—পূরবের মহিমা-কিরণ ভাতিবে আবার; জ্ঞান-ধৰ্ম্ম-প্রেম-মন্ত্র জগতে ভারত- করিবে প্রচার। রাজরাজেশ্বরী রূপে হেরিব জননী -স্বদেশ আমার। রি লাগি সহি ক্লেশ, সুকঠোর ব্রত লইব আবার! যা করিব, তারি কাজ, তারি গাথা গাই, তারি নাম মুখে। রি পুণ্য-পদধূলি ধরিব মাথায়, তারি ব্যথা বুকে! ৪৬ প্রত্যাবর্তন আমি এসেছি আবার। লও মাগাে, লও কোলে, কবে গিয়েছিনু চলে, আবার এসেছি ফিরে চরণে তােমার। ভগ্ন ইষ্টকের স্তুপ, তারি মাগাে কত রূপ, এর কাছে তুচ্ছ মানি শােভা অলকার! আমি এসেছি আবার! হেথা সেই পুণ্য ধূলি ল’ব আজি শিরে তুলি’ সেই “শিশু তরুতল, শৈশব-বিহার। সেই শেফালীর শাখে কত ফুল ফুটে থাকে, পুরাতন স্মৃতি জাগে আজো গন্ধে যার। আমি এসেছি আবার! পিক-মুখে সেই গীত আজো করে পুলকিত, ফাগুনে উতলা বায়ু বহে অনিবার। তেমনি মধ্যাহ্ন বেলা পথে করে হােলি’-খেলা, বুকে মুখে ধূলা ছুড়ে—না করে বিচার। আমি এসেছি আবার। ৪৭ Kederlande Puislav পপুষ্প সেই পুরাতন বট, তেমনি নদীর তট, তেমনি অলসে খেয়া করে পারাপার ; তেমনি স্নাতক ঘাটে, বালক সঁতার কাটে, উতলা করিয়া জল করে তােলপাড়! আমি এসেছি আবার! একদা তরুণ পান্থ বাহিরিনু উভ্রান্ত লইয়া বিদায় মাগাে, চরণে তােমার! দূরে দীপ্ত ভবিষ্যৎ দেখিনু চিত্রিতবৎ, দেশে-দেশে ভ্ৰমিলাম বহি’ দুঃখ-ভার। আমি এসেছি আবার। বিশ্ব-জনতার মাঝে সংসার ডাকিল কাজে, গেল দিন—গেল মাস, গেল বর্ষ আর! অরি’ তব স্নেহমুখ পাইতাম কত সুখ, পরাণ উঠিত কাঁদি করি’ হাহাকার ; আমি এসেছি আবার। অপরিচিতের মত ঘুরি বিদেশে কত, কাটিল কত না দিন-আশা-নিরাশার। কে দেখিবে তােমা ভিন্ন, কে ফেলিবে মাের দুখে নয়ন-আসার ? আমি এসেছি আবার! বুকে কত ক্ষত চিঃ- ৪৮ প্রত্যাবর্তন তােমার কল্যাণ-স্পর্শ আবার আনিবে হর্ষ, ঘুচিবে হৃদয়-মাঝে বিরহ-আঁধার ; তােমার আনন্দচ্ছবি, তােমার আকাশ, রবি আবার করিবে মাগাে, পুলক সঞ্চার ; আমি এসেছি আবার! তােমার বাতাস এসে ঘ্রাণ ল’বে মাের কেশে, সর্বাঙ্গে বুলাবে কর আলােক তােমার ; তােমার আশিষ সম— সে যে নিত্য নিরুপম, তেমনি অক্ষয় আর তেমনি উদার ; আমি এসেছি আবার! ৪ ৪৯ প্রবাসী ; মনে পড়ে—প্রকৃতির শ্যামবাহু-ঘেরা পল্পিখানি মাের ; অবারিত মাঠ তার ; মুক্ত নীলাকাশ ; সঝে নীড়মুখে-ফেরা পাখীর কাকলী ; শস্য-ক্ষেত্রের বিস্তার হিল্লোলিত হেমন্তের সন্ধ্যা-সমীরণে মায়ের অঞ্চলখানি পড়ে মাের মনে! বাঁধা ঘাট, স্বচ্ছ বাপী, ঘনচ্ছায় বট ধেনুপাল, পিছে পিছে রাখাল-বালক ; গ্রাম-প্রান্তে শীর্ণা নদী, বালুময় তট,- তারি পানে দল বাঁধি’ উড়ে ও বক। কৃষক-দম্পতি তার পর্ণগৃহবাসী- সুখে ঘর করে—মুখে সারল্যের হাসি। সেই মাের প্রিয়ভূমি-জননীসমান, জন্ম-জন্ম তারি কোলে লভি যেন স্থান! ৫•

No text on this page.

No text on this page.

অভিজ্ঞান ; হেথা-সুরভিত বায়ু তারি কেশবাসে! এই পথ দিয়া গেছে,অঞ্চল-বাতাসে ব্যাকুলিত করি’ ফুলে ; অলক্তক-রেখা তৃণ-তৃণে এখনও রহিয়াছে লেখা। হরিণী চাহিয়া আছে মুগ্ধ আঁখি মেলি’ দূর পথ-পানে, তারে কে গিয়েছে ফেলি। ফিরে এল মধুকর গুঞ্জরি’ বিফল বৃথা তারে অনুসরি’! শূন্য তরুতল বিছাইয়া আছে তার ছায়া অকারণ, অঞ্চল পাতিয়া কেবা করিবে শয়ন ? নিতি যে গাহিত পিক বসি’ তরু’পর, মৌনী আজি;-কে ডাকিবে অনুকারি’ স্বর? যে লতাটি ঘিরে ছিল চরণ তাহার, তারি’ পবে আছে তার অশ্রু-উপহার। - মিলন সেই প্রাণ-মন আছে, শুধু মাের নাহি কাছে এক খানি তরুণ হৃদয়। আছে পড়ি কৰ্ম্মরাশি, পিছে নাহি মিগ্ধ হাসি, আছে যশ, নাহি তাহে জয়। আছে দিন নিশি-পরে, সে নয় আমার তরে, বহে তার আকুল-নিশ্বাস; দিন-শেষে নিশি আসে, ফিরিতে আপন বাসে শূন্য-শয্যা করে উপহাস। শুরু-সন্ধ্যা সেই আসে, আর না গবাক্ষ-পাশে হেরি তার মধুর মূরতি! দেখিত যে অনিমেষে চাদ যায় ভেসে ভেসে, নীল জলে মরাল যেমতি। আছে জ্যোৎস্না--আছে নিশি, আছে চির সপ্ত-ঋষি, শুধু সে-ই নাহিক ধরায় ; জীবনের কোন্ পারে- আজি সুধাইব করে- এক জন্মে আগে সে কোথায় ? ৫৪ भिनन রেখে গেছে প্রেম-পথ, সেই ধ্রুব ভবিষ্যৎ, চলিতে হইবে সেই পথে ; দোহা-মাঝে সেই সেতু হবে মিলনের হেতু, জন্মে-জন্ম, জগতে-জগতে। দীন আমি—ক্ষীণ-পুণ্য, মাের ভগ্যে থাকে শূন্য, প্রেমে ল’ব করিয়া পূরণ ; তাহাই পাথেয় করি’ ভেসে যাবে জন্মতরী সেই কুলে-যেখানে মিলন। আছে কম, আছে ক্ষয়, এক জন্মে শেষ নয়, কাল চির-অনন্ত জগৎ; জগতের তীরে-তীরে কত জন্ম যাবে ফিরে, কত জন্ম গেছে এ যাবৎ! ভরা প্রেম-রাশি নিয়া, মাের আগে গেছে প্রিয়া, কোন্ স্বর্গে রচিয়াছে নীড়; সেথা,মাের মনে হয়- পুরাতন পরিচয় প্রেম-পাশে বধিবে নিবিড়।

পত্ৰপুষ্প ! আছি তাই পথ চাহি’— জানিবার কিছু নাহি, আছে শুধু মিলন-প্রতীতি ; দুটি কুসুমের ঘ্রাণ মিশে যাবে দুটি প্রাণ, দুটি সুরে একখানি গীতি। হেথাকার ছন্দ-সুর সেথা হবে পরিপূর, সাঙ্গ হবে অসমাপ্ত গান ; জীবন-দুঃস্বপ্ন-শেষে প্রভাত উঠিবে হেসে, বিরহের হবে অবসান।

বিরহে পুণ্যপূত হৃদিখানি সে যে গাে নিবিড় প্রেমে বেঁধে ছিল চির মােরে দুটি বাহু দিয়া ; জীবনের অর্ঘ্য করে সঁপেছিল প্রিয়া । কৰ্ম্ম-মাঝে আপনারে রেখেছিল চিরদিন একান্ত গােপনে ; আজি সে গিয়াছে চলি’ কোন্ পরিচয়-হীন অজ্ঞাত ভুবনে। ছিল যবে গৃহ-মাঝে, করে নাই আপনার সুখ অন্বেষণ ; রিক্ত করে গেছে চলি; ভাবিতেছি, কোথা তার পাব দরশন ? আপনার যাহা ছিল, লয়নি কিছুই সাথে, সব গেছে দিয়ে। আমি ত পারিনি কিছু তুলে দিতে তার হাতে, যায় নি সে নিয়ে ৫৭ পত্ৰপুষ্প আজি ব্যর্থ প্রেমরাশি লুটায়ে কঁদিছে তাই হৃদয়ের তটে। এ প্রাণের শত সাধ উথলিত যারে চাহি, সে নাই নিকটে। আছে পড়ি শূন্য-গেহ, শুনিতে না পাই আর সম্ভাষণ-বাণী । মুকুরে দেখেছি বৃথা। কোথাও ত নাহি তার প্রতিবিম্ব-খানি। স্তব্ধ অর্ধ-রজনীতে শুনি পদধ্বনি কার ? সে বুঝি সমীর। চমকিয়া সম্ভাষিতে ভুল ভেঙে যায়, আর ঝরে আঁখি-নীর। পত্র-মর-মর শুনি’ মনে পড়ে তারি কথা, কিন্তু সে কোথায়! শয্যা’পরে জ্যোৎস্না পড়ে, ভাবি’ তার তনুলতা বৃথা বাহু ধায়। ৫৮ বিরহে অথবা সে অনুদিন আছে মাের কাছে-কাছে- পাই না সন্ধান;- যে মুখ মুকুরে নাই, সে মুখ অন্তরে আছে ভরি’ মনঃপ্রাণ। বহিছে শশাণিত-সনে শিরায় যে প্রেম মাের, ভুলিব কেমনে? বিরহ-জীবন-নিশা তারি ধ্যানে হবে ভাের, তাহারি স্মরণে।

গীত-শেষ। দেখিতাম তার হাসি, উপচিত প্রেম-রাশি, চেয়ে-চেয়ে তার পানে ভরিত না মন। সে রহিত পাশে বসি, লইয়া লেখনী, মসী— কি লিখিব ? ভুলিতাম হেরি’ সে আনন; কোথায় কল্পনা আর বাস্তব-স্বপন। ‘কি লিখেছ, দেখি দেখি, কারে প্রেমপত্র—একি প্রিয়তমে—প্রাণাধিকে।-একি সােধন?' -না-প্রেমপত্র নয়, কেন তব এ সংশয় ? ‘ধৈৰ্য্য নাহি পাড়বার’, - কর প্রত্যর্পণ ! কবির কল্পনা এ যে, রােব অকারণ।

গীত-শেষ করিয়াছ খণ্ড-খণ্ড, আর কিবা দিবে দণ্ড ? এইবার সপত্নীর হ’ল সপিণ্ডন। ছি ছি, তুমি মিছা রােষে কি করিলে বিনা দোষে ! একি নির্বিচাব ক্রোধ—কঠোর শাসন। ‘অবিশ্বাস’ ? লিখিব না—করিলাম পণ । সে কলহ নাহি আর, কে করিবে মুখ-ভার ছিড়ে দিবে খাতাপত্র না শুনি বারণ ? কাব্য রচনায় মাতি’ জাগি যদি সারা রাতি, কেহ ত সাধে না আব করিতে শয়ন । গলদেশে বাহুলতা করে না বেষ্টন। এবে দীর্ঘ অবসর, বাঁধি’ কল্পনার ঘর চেয়ে আছি শূন্য-মনে,-নাহিক বন্ধন। ৬১ পপুষ্প এত শােভা, এত আলাে, আর ত’ না লাগে ভালাে, এমন ফুলের গন্ধ, কূজন গুঞ্জন কিছুই আমার মন করেনা হরণ! সুখ-দুঃখ নাহি বােধ, গেছে যেন জন্ম-শােধ, নাহি সে বিরহ আর নাহি সে মিলন, গেছে প্রেম গরি সনে, শ্মশান জাগিছে মনে। গেছে কায়া,—নিয়ে ছায়া ভুলিবেনা মন, নিবেছে প্রাণের আলাে-আঁধার ভুবন। নাহি সে হৃদয়ে প্রতি, প্রাণে নাহি মধু-গীতি, সে দেবতা নাহি আর, শূন্য সিংহাসন । কাব্য ছিল যার ভাষে, সুধা ছিল যার হাসে, সে আজি কোথায়!—তার বৃথা অন্বেষণ ; কবিত্ব-কল্পনা-শেষ--শূন্য এ জীবন। ৬২ সুখ-স্মৃতি চির-সাথী বীণাখানি ছিল মাের করে ; প্রভাতে গাহিত পাখী, ফুলে ছেয়ে যেত শাখী, জাগিত হৃদয় মাের কি পুলক-ভরে ! আকাশ-বাতাস-ভরা কি যেন আকুল-করা। হরষ-প্লাবন আসি’ পড়িত অন্তরে আজি মনে পড়ে! গগনে প্রখর রবি, শ্যামল প্রান্তর-ছবি, অলস-মধ্যাহ্ন-বেলা,-পতঙ্গ-গুঞ্জন! নিবিড় প্রচ্ছায় বট, জনহীন নদীতট, বজ-তরী দুলে সােতে,—ব্যর্থ আকিঞ্চন- টুটিতে বন্ধন!

পত্ৰপুষ্প পাখী উড়ে নীলাকাশে, কৃষ্ণ বিন্দু যেন ভাসে, আঁখি দুটি তারি পানে,—সে যেন আপন। স্নেহতপ্ত-সুনিবিড় কোথা তার আছে নীড়, ক্ষুদ্র সুখ-দুঃখ তার—গৃহীর মতন কলহ-মিলন। ফুটিত সন্ধ্যায় তারা, দুগ্ধ-শুভ্র জ্যোৎস্না-ধারা। ( ঢালিত আকাশে চাদ হাসি’ সুধা-হাসি ; বসিতাম বীণা নিয়া, তৃপ্তিরূপা কাছে প্রিয়া ; ভাবিতাম,—প্রিয়ার সে ফুল্ল-রূপ-রাশি— কত ভালবাসি। বীণায় কঁপিত সুর, প্রেম-স্বপ্নে পরিপূর চাহিম প্রিয়-মুখ—সুষমার সার ! ৬৪ সুখ-স্মৃতি এই এই সুখ, জানি না,কোথায় দুখ, কোন শূন্যকোন দৈন্ত—নাহি প্রাণে আয়- এত মুখ কার। হেরি’ নিদ্রালস-ভরে আঁখি-পাতা চুলে পড়ে প্রিয়া আমার,-বীণা রাখিতাম পাশে! ঘুম-ঘােরে বাহু তার বাধিত গলায় হার! হায়, সে সুখের নিশি—যদি ফিরে আসে, এ বিরহ নাশে! ৩৫ জীবন-বর্ষা আমার সাধের বীণা পড়ে ছিল গীতহীনা; হে বন্ধু, দিয়েছ তুলে আজি মাের করে। যতনে শিথিল তার বাঁধিয়াছি আরবার, আজি কি মিলিবে সুর মাের কণ্ঠস্বরে কত দিন পরে। অঙ্গুলির সে তাড়না, তারে-তারে সে ঝনা, উঠিবে কি সে মূচ্ছনা—সে আবেগ প্রাণে? আজি কোথা মত্ত আশা, উচ্ছসিত ভালবাসা? বসন্তের সে রাগিণী বাজিবে কি গানে- আজি কেবা জানে ? নাহি সে াদিনী রাতি-- রজতের শুভ্র ভাতি, নাহি আর কণ্ঠে মাের প্রিয়া-বাহু-ডাের।

জীবন-বর্ষা ফুলের সুবাস নাহি, সে যে নাই—যারে চাহি, কে দিবে বীণায় সুর—প্রাণে গীতি মাের। সুখনিশি ভাের। বরষার এ দুর্দিনে- বাদল-রাগিণী বিনে আর কোন্ সুর, প্রিয়, বাজিবে বীণায় ? দিবানিশি জল ঝরে, বিরহিণী কেঁদে মরে শূন্য-পথ-পানে চাহি’; হেন বরষায় দয়িত কোথায়? কত না আগ্রহভরে দেছ বীণা মাের করে; সে দিন ত নাহি মাের-এসেছে বরষা। বুকভরা অন্ধকার, চক্ষে ঝরে বারিধার, কি বাজাব হেন দিনে?–মল্লার ভরসা। এসেছে বরষা। ৬৭ শরতে মা এসেছে শরত, চির-মনােথ পূরিবে কি মাের আজি! দিকে-দিকে হাসি, লয়ে ফুলরাশি— ধরণী ভরেছে সাজি। নীল-নির্মল নভ উজ্জ্বল, চন্দ্র-সনাথ রা ; ভাসাইয়া তীর বহে নদ-নদী-ধারা। পুলকে অধীর আজি প্রাণ চায়- আছে কে কোথায়, কাছে চাহিযেবা দুরে ; নেহ-মুখগুলি সাধ হয়, তুলি’ দেখি আজি প্রাণপূরে! নয়নের ল কেন উচ্ছল, কার কথা মনে হয়! যে গিয়েছে আগে, তার স্মৃতি জাগে, সে কোথা’ গাে, এ সময়!

শরতে মা মা আজি মরতে, হরষে ভাসিছে ধরা; ল’রে দুঃখ-শি আঁখি-জলে ভাসি, কোথা মাগাে, দুঃখহরা ! ভরি’ হেম ঝারি নয়নের বারি এনেছি মা, সযতনে, ও যুগল পদ- লিনি কোন ধুয়ে দিব—সাধ মনে! - শুন্য জীবন- শূন্য ভুবন এস মা, পূর্ণ করি’! দেবী দশভুজা জননীর পূজা হেরিব নয়ন ভরি’! রবে নাক আর প্রাণে হাহাকার, ঘুচে যাবে সব ব্যথা ; গত জীবনের আছে যত মলিনতা তাপিত মনের পপুষ্প উঠে ‘মা-মা’ রব জননীর তব মুখরিত করি’ নিশি; ধুপের সুবাস বহিছে বাতাস সুরভিত করি’ দিশি। অই মা আমার করুণা-আধার চরণে দলিয়া অরি ;- বিশ্বজননী দানব-দলনী হের, দশায়ুধ ধরি।

মৃত্যু হে নিশ্চিতহে অজ্ঞাত, হে ভীষণ, জানি আমি তুমি পুরাতন। তােমার নিবিড় প্রেম কোন্ রহস্যের মাঝে রেখেছ গােপন? তােমার স্বরূপ মূর্তি সে কি দেখা দিবে শুধু বিভীষিকা ধরি’? মর্মে মর্মে ভয়-কম্প দিবে ধমনীতে মাের রক্ত লােধ করি। দিবে কোন্ রূপে দেখা, সহসা কখন আসি’- তাই ভাবি মনে! জীবনের দুঃখ সুখ একান্ত নির্ভরে তবে সপিব কেমনে? তােমার অলক্ষ্য মুখে দেখিব না শান্ত-সৌম্য করুণা প্রকাশ ? বরাভ কৰে তৰ দেখিব না দুঃখ-দৈন্য- মােচন-প্রয়াস। ৭১ পত্রপুপ যে দিন আসিবে তুমি, ভেজে দিবে ক্ষণিকে মিলন-স্বপন, তখন কি গ্রহ-তারা, ধরণী-জননী-অঙ্ক রবে না অরণ? জীবনে জড়ান যত মেহ-মমতার গ্রন্থি হইবে শিথিল? তখন কি দৃষ্টিপথে নিরখিব মূৰ্ত্তি তব কুটি-কুটিল ? অপরিচিতের মত র’ব তব মুখ চাহি নিৰ্বাক্ অধরে ? কঠিন আদেশ তব শুনিব শ্রবণে শুধু, কম্পিত অন্তরে? নষ্টনীড় বিহঙ্গের শূন্য-পরিণাম শুধু জাগিবে কি মনে? অনিশ্চিত অবিষ্যৎ নিরাশার মুর্তি ধরি দাড়াবে সে ক্ষণে। ৭২ মৃত্যু -না-না, করুণাময়। সে পরম ক্ষণে তুমি দিবে যবে দেখা, দেখা দিয়ে ব্যক্তৰূপে অভয়-মূরতি ধরি’ মুখে শান্তি-লেখা। স্বস্তিবাণী উচ্চারিয়া তােমার আশিষ-স্পর্শ দিয়ে মাের মাথে! তার পর, মুক্ত করি’ সকল বন্ধন হতে নিয়ে মােরে সাথে ।

ফিরে যাও, হে মরণ “Go away, Death." Alfred Austin. ফিরে যাও, হে মরণ - আসিয়াছ ত্বরা অতিশয় ! এই ত জাগি আমি আলােকে সঙ্গীতে, হৃদয়ে শিশির বিন্দু রয়েছে ঝরিতে এস তুমি মধ্যাহ্ন সময় । ফিরে যাও, হে মরণ, দিয়েছিলে ক্ষুদ্র অবসর। কুয়াসা কাটিয়া গেছে ; সুন্দর ভুবনে এমিতেছি আপনার গৃহ ভাবি’ মনে ; এস তুমি প্রদোষের পর । ৭৪ ফিরে যাও, হে মরণ ফিরে যাও, হে মরণ, এখনও আলাে দেখা যায় ; শান্তি নেছে ধরণীরে টানি বক্ষতলে, বিষাদ-মাধুরী জাগে সমুদ্রের জলে, এস তুমি, গভীর নিশায়। এস তুমি, এস হে মরণ, রহিব না—রহিব না আর। পেচক ডাকিছে বুঝি,-থেমেছে পাপিয়া, জ্ঞানের বিলাপ উঠে তিমিরে ধ্বনিয়া, নিয়ে যাও মােরে এই বার। ৭ অপরিচিত জানি না, সে আসিবে কখ; নিতান্ত অপরিচিত, হ’ব কি তাহাতে প্রীত, অনিচ্ছায় লইব কি তাহার শরণ ; চিনিব কি দেখি’ মুখ, অথবা কাঁপিবে বুক, সহসা যখন কর করিবে ধারণ, ভাবিব কি, সে মম আপন? জন্ম জন্ম সেই এসে কত নব নব দেশে নিয়ে গেছে-দেখা’য়েছে কত কি নৃতন! কত তারা, কত গ্রহ ভ্রমিতেছে অহরহ, কত বর্ণ, কত শােভা, ঋতুর বৰ্ত্তন ; কত অশ্রু, কত হাসি, কত ভালবাসাবাসি, সুখে দুখে কত মাের ভুলায়েছে মন। ভাবিব কি, তারে সেই জন। ৭৬

No text on this page.

No text on this page.

স্মরণে সেই চির-পুরাতন পথে কি গিয়াছ তুমি, হে কবি নবীন। সেথা কি প্রকৃতি তােমা আপনার অঙ্কে তুলি ল’য়েছে সে দিন । যে অমর বীণা তুমি বাজাইলে নিজ করে, দিলে কার হাতে? গাহি' উন্মাদনা-গীত আর কোন্ ভাগ্যবান আসিবে পশ্চাতে ? একদা অসিলে তুমি বন-বিহঙ্গের মত মুক্ত-কণ্ঠে গাহি’! আকাশ, কানন, গিরি প্লাবি’ উচ্চ কল-গীতে ভয়-কুণ্ঠা নাহি ! সে দিন তােমার সেই প্রেমের মদির-গীতে মুগ্ধ দেশবাসী ; তরুণ প্রভাত-বেলা, চারি দিকে বসন্তের ফুল ফুলরাশি। * কবিবর নবীনচন্দ্র সেনের মৃত্যুপলক্ষে।

পপুষ্প পতিতের তরে অশ্রু, তার পর, দিলে কবি, বীণায় ঝঙ্কার তব ভূত কথা গাহি’; অশু, হায়, ভারতের ভাগ্য-পানে চাহি। গাহিলে অমর গীত, পলাশীতে ভারতের ভাগ্য-বিপৰ্যয় । অকে-অঙ্কে করুণার বহাইলে মন্দাকিনী, দ্রবিলে হৃদয়। জীবনের অপরাহ্নে গাহিলে উদাত্ত গান মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে মহাশােক, গীতার অমৃত-বাণী কর্তব্য পথের ! ভক্তিভরে কৃষ্ণ-লীলা গাহিলে, হে ভক্ত কবি, ভাসি’ প্ৰেমনীরে। আজি কি পেয়েছ স্থান বাঞ্ছিতের পদাঙ্কুলে গিয়া সেই তীরে ? ৮০ ন আজি গীত অবসান, অনন্তে উড়িয়া গেছে বন-বিহঙ্গম। ধনিবে না করি-কুঞ্জে সে কাকলী মধুবা, সে সুর পঞ্চম। সে বীণা নীরব আজি, কে গাহিবে নব তানে, কে দিবে ঝঙ্কার ? করুণ-ফোম কভু, কভু মেঘমন্ত্রে গুরু কে বাজাবে আর ? আজি প্রিয়-মূৰ্ত্তি তব মনে পড়িতেছে কবি, সুহৃৎ-বৎসল! প্রেম-প্রীতি-ভরা সেই শিশু-সম স্বচ্ছ হাসি উদার-সরল। উষার যুগল তারা উজল নয়ন দুটি দ্রব করুণাম ; শত-তি-মাঝে বসি আজি যে তােমার তরে করি হায়, হায় ! ৮১ শােক-গীতিঃ স্তব্ধ ‘সুরধাম। কোথা হাসি, কোথা বাঁশী প্রীতি অবিরাম ; কোথা সুধি-সম্মিলন, রঙ্গ-রস-আলাপন, কোথা কলকণ্ঠে গীতি,-মধুর বচন ;- আজি শূন্য—আঁধার ভবন। কোথা সুরসিক রঙ্গ-রহস্যের কবি-তেজস্বী নির্ভীক। হাসি-মুখে যার গালি দিল অমৃতের ডালি, বিপে বিদ্যুৎ-ছটা—অন্তরে অশনি, পৌরুষের অকম্প-লেখনী! কবিবর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মৃত্যুপলক্ষে।

শাক-অতি কার দেশমাতা- শুনিলা পুত্রের কণ্ঠে নিজ জয়-গাঁথা। শুনি সেই জয়-গান গৌরবে ভরিল প্রাণ ; কে ধরিল বক্ষঃ-মাঝে জননী-চরণ- মাতৃ-অঙ্কে যাচিল মরণ। সে যে নাই আর! ক্ষুব্ধ দেশ, স্তব্ধ বীণা—নীরব ঝঙ্কার। মা’র কোলে সুপ্ত কবি । দিগন্তে ডুবিল রবি ; হে জননি,হে ভারতি,-কবির স্বদেশ! উঠ, দেখ, প্রতিভার শেষ ।

অনন্ত মিলন ধীরে তার বাহুবন্ধ খুলিনু সভয়ে,- চাহি নিমেষ-হীন নিমীল-নয়নে। ঘুমাল কি জীবনের শেষ-কথা ক’য়ে ? আর জাগিবে না বুঝি-বাসব-শয়নে জীবনের শেষ-নিশা করিল যাপন। ছাড়াছাড়ি হবে,তাই এত আয়ােজন মৃত্যু নিয়ে যেতে চায়, দুয়ারে দাঁড়ায়ে । প্রহর বাজিয়া গেল, মিলনের ক্ষণ করি’ দীর্ঘতর বুঝি পড়িল ঘুমা’য়ে ; সে মিলনে আর বুঝি নাহি জাগরণ। ঘুমাও, ঘুমাও প্রিয়ে, আমি রব জাগি'। মুদিত-নয়নে থাক্‌ মিলন-স্বপন ; মরণ ফিরিয়া যা ; থাক তােমা লাগি অপ্ৰভাত নিশা আর অনন্ত মিলন। এই অগ্রহায়ণ, ১৩১৬।

No text on this page.

No text on this page.

বউ কথা কও সুপ্ত চারি দিক। শেন পাখী নাহি গায়, বিশ্ব যেন শূন্য প্রায়, গ্রাম-পথে চলে না পথিক। আসন্ন উষসি,- এখনাে নিবেনি তারা, পাণ্ডু চাদ জ্যোতি-হারা, সমীরণ উঠেনি নিশ্বসি', ফুলবনে পশি’! বিশ্ব তন্দ্রাতুর ! নিশি না হইতে ভাের, ভাঙ্গায়ে ঘুমের ঘাের, কোথা হতে উঠে যেন সুর- “বউ কথা কও!” বুঝি বা আদিম প্রাতে ধরিয়া প্রিয়ার হাতে বলে ছিল-“সুপ্রসন্ন হও, বধু, কথা কও।” ৮৭ পপুষ্প * 5671 = নিমীল-ময়ন- প্রকৃতি ঘুমায়ে ছিল, কে যেন জাগায়ে দিল, আজো তাই শুনি সেই স্বন, “বধু কথা কও!” তাই কি শিখেছে পাখী, দিকে-দিকে উঠে ডাকি সকরুণ—“বউ কথা কও; অকরুণ নও! ল’য়ে প্রেম-রাশি, শত অপরাধী হয়ে কবে কে গিয়েছে কয়ে, ‘কথা কও'—আছি উপবাসী। হে চির-সুন্দরি, নাহি প্রেম-নাহি স্নেহ, নাহি অন্তরের কেহ দিতে ভাষা ওষ্ঠপুট ভরি’- তােমার, সুন্দরি। হে অভিমানিনি, এত কি কঠিন পণ, যুগে-যুগে আকিঞ্চন, তবু তুমি মৌনী-উদাসিনী।

বউ কথা কও তােমারে চাহিয়া ব্যর্থ প্রেম-রাশি তাই আজিও বিরাম নাই দিকে-দিকে উঠিছে গাহিয়া “কথা কও, প্রিয়া।” অয়ি প্রেমহীনা, খুলিবে গুণ্ঠন কবে, কবে হায়, কথা কবে, থামিবে করুণ বিশ্ববীণা,- “বধু, কথা কও! হে মানিনি, হে সুন্দরি। কথা কও, ক্ষমা করি, সপি পদে প্রেম-অর্ঘ্য, লও। “বউ কথা কও।”

হাসি ও অশ্রু গভীর অতল, ওগগা হাসি, তুমি উৰ্ম্মির শিরে ফেন-সম লঘু অতি ; মৰ্ম্ম যেথায় সেথা তব নাহি গতি মেঘ-বিচ্ছেদে তুমি বরষার ক্ষণিকের শশিলেখা চপল সুখের তুমি সে বিকাশ, বিদ্যুৎ সম দেখা! ব অশ্রু আমার মুক্তার মালা, কণ্ঠের আভরণ পুণ্য-সলিল— পবিত্র-পরশন। দুঃখে কাতর, করুণায় দ্রব বহে জাহ্নবী-সম ! প্রেমে ছল-ছল, ভক্তিতে ধারা, সে আমার নিরুপম। ১০ নবদ্বীপ ব্যয়-দর্শনের তীর্থ কোথায় ভরিল চিত্ত, জ্ঞানের নিঝর-পিপাসায় ; ধরণী করিয়া ধন্য। বহিল প্রেমের বন্যা আচণ্ডাল-পাবনী ধারায় ? মুখরিত করি দিক কবি-কুঞ্জবনে পিক গীত-সুধা ঢালিল কোথায় ? ‘নবরত্ন’-সমপ্রভা নব নবরত্ন-সভা- ছিল কোথা ?—সে যে নদীয়ায়। ; - দিকে দিকে হিংসা-লােভ, স্বার্থ লয়ে দ্বন্দ্ব-ক্ষোভ, রক্তপাতে রাষ্ট্র-অধিকার ; শক্তি-প্রতিষ্ঠার তরে হানাহানি পরস্পরে, তুচ্ছ করি’ রুধিয়া দুয়ার, আলিল জ্ঞানের দীপ, সে যে এই নবদ্বীপ, হেন মান বঙ্গে ছিল কার ? ‘নব বারাণসী ধাম’ গৌরবে ধরিল নাম, জ্ঞান-ভক্তি করিল প্রচার। ১১ পপুষ্প - i কোথা ভক্তি-বৃন্দাবন, কোথা জ্ঞান-তপােবন, পুণ্যতীর্থ কে রাখে স্মরণে ? শাস্ত্র-ধ্যানে নিমগন কোথা গেল সে ব্রাহ্মণ-- ধনরাশি ঠেলিল চরণে ? আজি তার পুণ্য ধূলি ল’বে না কি শিরে তুলি, স্মৃতি যার জীবনে-মরণে? অতীতের পানে চাহি’ উঠিবে না কবি গাহি’- পুণ্যগাথা অমৃত-ক্ষরণে? ভুলিয়াছি আবাহন মাের দীন অকিঞ্চন, সারস্বত-সাধনা কোথায় ? সে দেবী নাহিক আর, সাধনায় প্রীতি যার, কে সঁপিবে প্রাণ-মন-কায়? দেবী-পাদপীঠ-তলে আর কি সে দীপ জ্বলে, পাদপদ্মে অর্ধ কে সাজায় ? নাহি সে সাধন-দীক্ষা কার কাছে পাব শিক্ষা? কোন্ মন্ত্রে আরাধিব মা’য় ? ১২ নবদ্বীপ সৰ্ব্বরিক্ত মােরা দীন ভজন-সাধন-হীন— আসিয়াছি চরণে তােমার ; আরতির নীপ করে, আনিয়াছি ভক্তি-ভরে বন ফুল-পূজা-উপচার ; জ্ঞান-শক্তি-বরাভয়, দেহ দেবি, পদাশ্রয়, কর মাগাে, অবিদ্যা সংহার ; তােমার করুণা লভি’ ধন্য হবে দীন কবি, মৌনী বীণা বাজিবে আবার। ৫ আহ্বান দূর পর পারে কে ডাকে আমারে পরাণ উতলা করি; সদা জাগে প্রাণে- সেই সুব কানে, উতরিতে ভয়ে মরি। নীল—ঘন নীল দুলিছে সলিল, বুঝি তার পার নাহি, উপরে আকাশ চির পরকাশ, দোহে দোহা পানে চাহি’! কোন্ পর পারে ! ডাকে সে আমারে, সেথা বুঝি ডুবে রবি তালীবন-ঘন- ছায়ায় মগন ধূসর বেলার ছবি। পাখী উড়ে যায়, তিমিরে মিলায় কোন্ তীর-তরু-কোলে, সেথা প্রাণারাম আছে কোন্ গ্রাম, সব দুখ যেথা ভােলে। ৯৪ আধ্যান শুনি চির দিন আহ্বান ক্ষীণ কত কথা জাগিয়াছে— কিশােরে-যৌবনে কত কথা মনে সংশয়ে ভরিয়াছে। সুখ-মরীচিকা, প্রেম-প্ৰহেলিকা, কবে সে দিয়েছে ধরা ? প্রাণ যাহা চায়, মিলে না ত, হায়, কেবল পাগল-করা ! অই পর পারে, ডাকে বারে বারে মধুর-কোমল সুরে । যেতে প্রাণ চায়, যদি সেথা, হায়, প্রাণের কামনা পূরে! যাব কি, যাব না, পাব কি, পাব না, অকূলে যাইব ভাসি’ গভীর অতল সীমাহীন জল লইবে আমারে গ্রাসি। ; ১ পত্ৰপুষ্প আছে—আছে পার’ ফুটতর কার ধ্বনি মাের কানে আসে ; ও বুঝি সমীর ? নহে নহে—নীর কল-কল রােলে ভাষে। অই যায় দেখা ঘন নীল রেখা, হেরি’ প্রাণ ভরি’ উঠে; মিলনে পিপাসা, পরশনে আশা, মনে হয়,যাই ছুটে।

পথে তখন তরুণী উষা-বাহিরিনু পথে । ফোট ফোট করে আলাে, সরিছে আঁধার কালাে, পাখী ডেকে উঠে, নিশি যাপি’ কোন মতে। বাহিরিনু পথে ! আকাশে ঝলসি’ উঠে নব রবিচ্ছটা; মেঘে-মেঘে দীপ্ত হাসি, জ্বলন্ত কিরণ-রাশি, দিবস খুলিয়া দেছে স্বর্ণময় জটা কি উজ্জল ঘটা । কমে বেলা বেড়ে যায়, না ফুরা পথ ; কোথা ঘন তরুচ্ছায়া- ক্ষণেক জুড়ায় কায়া ; কোথাও বা ধু-ধু মরুজলে বহিবৎ। অফুরন্ত পথ !

পপুল A6ae কেহ নাহি জানে—পথ কোথা হবে শেষ ; টুটে আসে পায়ে বল, তবু বলে “চল্ চল্‌” ; পিপাসায় শুফ-কণ্ঠ,-না পাই উদ্দেশ— কোথা পথ-শেষ ? কেহ পিছে পড়ে থাকে,--কেবা তারে চায় ? আগে-ভাগে পথ বাহি, কে দাড়ায় পিছে চাহি’? শুধু পথে চলিয়াছি, না জানি, কোথায় ! বেলা বেড়ে যায়। শিথিল খসিয়া পড়ে বাহুর বন্ধন। কাছে-কাছে ছিল যেই, সে ত আর কাছে নেই, নিঃসঙ্গ চলিতে হবে পথে একান মুছিয়া নয়ন!

পথে ক্রমে বেলা পড়ে আস, পথ না ফুরায়। শুধু পথে চলিয়াছি, শুধু আগে চেয়ে আছি ; ছায়া করি’ আসে সন্ধ্যা-রবি ডুবে যায় ; চলেছি কোথায় ? সম্মুখে প্রান্তর দীর্ঘ—আসন্ন রজনী। চির অনুত্তীর্ণ পথ পড়ে অজগর-বৎ! আর কত দূর'—হেথা সুধাই আপনি, মনে ভয় গণি। ఎన সংসার-পথে বড় ব্যথা-বড় দুঃখ জীবনের আদি অন্ত, এ যে বড় নির্মম সংসার। ইচ্ছা করে ছুটে যাই, পলাইতে স্থান কোথা', চারিদিকে দুঃখ দুর্নিবার ! শুধু পথ-শুধু পথ, আগে দীর্ঘ চলিয়াছে, নাহি ছায়া—পিপাসায় জল; এই কি জীবন, হায়, এই দূর-পৰ্যটন একি শুধু মরীচিকা-ছল । কোথা শান্তি—কোথা শান্তি, চাহি এক বিন্দু তার ছুটাছুটি করে নর নারী! পদতলে তপ্ত মরু, জ্বলন্ত আকাশ শিরে, পিপাসায় নাহি বিন্দু বারি ! এই শুষ্ক অকরুণ- এ নহে ত মাতৃক্রোড়, এ যে গাে, কঠোর নির্বাসন ; কে দিল নিয়তি এই, এমন নিষ্ঠুর ভাগ্য, অভিশপ্ত দুৰ্ব্বহ জীবন। ১০০ সংসার-পা কেহ কি দেখিতে নাই, এ লীলা যাহার হােক, সে কি আছে মুদিয়া নয়ন ? কেহ কি শুনিতে নাই, থাকে যদি, হাহাকারে সে কি আছে রুধিয়া শ্রবণ? পথে যে দিয়েছে ছাড়ি, সে যে তারি পথ, হায়, সে কি গাে, ভাবে না একবার ? চলিতে অজানা-পথে, দীর্ণ-বিদ্ধ পদতল, অবসর নাহি দাড়া’বার। সে কি ফিরাবে না ঘরে, লইবে না কাছে তার, দেখিতে পাব না প্রেম-মুখ! এমনি নির্মম হবে, বলিতে পাব না তারে পেয়েছি জীবন যত দুখ । কত সাধ গেছে ভেঙ্গে, কত ফুল ঝরিয়াছে, কত ফুল ফলে নাই আর ; হৃদয়ের আশা-পাত্র ভরিতে পারিনি যাহ, ভাঙ্গিয়া গিয়াছে কত বার। ১•১ পপুষ্প একদা আসিবে সন্ধ্যা, নিবিবে দিনের আলাে, পাখী যাবে নীড়ে আপনার। পথিক ফিরিবে ঘরে, জ্বলিবে সন্ধ্যার দীপ, শ্রান্তপদ চলিবেনা আর। তখন কি কাছে এসে, ধূলি হতে তুলি’ মােরে লইবে না—সে কি স্নেহ-ভরে। পেয়েছি যাতনা যত, মুছায়ে করুণাময়ী দিবে না কি সুকোমল করে !

যৌবনাবসান কোথা গেল, সাধের যৌবন। কোথা গেল সেই হাসি, বিকশিত ফুলরাশি, একি ঘাের অবসাদ—জড়তা বেষ্টন! প্রাণে আর নাহি সুর, সে মত্ততা চূর-দূর, নাহি সে কল্পনা-ভ্রান্তি, কবিত্ব-স্বপন? কোথা গেল সাধের যৌবন। ! সেই শশী, সেই রবি-- সেই সমুজ্জ্বল ছবি, শ্যামল আঁচল পাতি’ ধরণী তেমন। নবীন নীরদ-কোলে তেমনি বিজলী দোলে, তেমনি বসন্তে ফুল, ভ্রমর-গুঞ্জন। কোথা গেল সাধের যৌবন।

পপুষ্প নদী সেই কূলে-কূলে জল-কলতান তুলে উছলি উছলি চলে করিয়া নর্তন। সেই রৌদ্র পড়ে তীরে, সােনালী ঝলসে নীরে, সেই মেঘচ্ছায়া জলে নিকষ-বরণ ; কোথা গেল সাধের যৌবন । সেই প্রকৃতির হাসি, বিশ্বভরা শােভারাশি, সেই মত ঋতুচক্র করে আবর্তন ; সেই মধু, সেই পিক মুখরিত করে দিক, আম্র-মঞ্জরীর গন্ধে আকুল পবন ; কোথা গেল সাধের যৌবন। মাের তরে নহে কেহ, কেন তবে এ সন্দেহ ? আমি বুঝি সেই নহি,—কি পরিবর্তন।

যৌবনাবসান আপনার পানে চাহি সে হৃদয় আর নাহি ; জীবনুে-উৎসব বুঝি মাের সমাপন; কোথা গেল সাধের যৌবন। ভাঙ্গিছে স্বপন-ভ্রান্তি, বুঝে নিবে কড়া-ক্রান্তি যে দিয়েছে, হবে তারে করিতে অর্পণ। মিছে মৰ্ম্মে-মর্মে অলি, মিছে আপনারে ছলি, অতীতের তীরে বসি’ বৃথা এ ক্রন্দন । কোথা গেল সাধের যৌবন।

সঞ্চয় বেলা পড়ে এল অই, করে নে রে জীবনের বেচা-কেনা সায় ; খেয়া-তরী ঘাটে বাঁধা, যাবি যদি ত্বরা করি, এই বেলা আয় । পশ্চিমে দিগন্ত-কোলে নিবে আসে দিবসের শেষ অগ্নিশিখা; পর পারে গ্রাম-খানি দেখা যায় যেন-স্বর্ণ- মেঘ-পটে লিখা। কি দিলাম,—কি পেয়েছি, হারায়েছি কিবা তার, দেখি, ক্ষতি-লাভ ; যা গিয়াছে তাহা, পেয়েছি যা’, তাহে মাের র’বে না অভাব! লাভ কিছু নাই হ’ল হয়, সমানে গেছে সম বিনিময় ; হেসে যাহা পাই নাই, পেয়েছি কি আঁখি-জলে, কে জানে নিশ্চয়।

সয় আশা, স্মৃতি জড় করি’ তাই নিয়ে নাড়া-চাড়া, ফিরে-ফিরে চাই ; নূতন অর্জন কিছু করিবার অবসর নাই—আর নাই। মুঠা-মুঠা ধূলা লুটি’ করিনু শৈশবে খেলা কল-হাস্য তুলি; স্বপ্নমত কোথা গেল অনাবিল জীবনের স্বচ্ছ দিন গুলি। - কৈশােরের সুখচ্ছবি, যৌবনে প্রমত্ত আশা গেল কি ছলিয়া ? শুধুই কি মরীচিকা, পাই নাই সার কিছু আপন বলিয়া ? ওরে অন্ধ, খুঁজে দেখ— তাের পুজি-পাটা যত, ব্যর্থ কিছু নয়। ক্ষতি বলি’ ভাব যারে, জীবনের মাঝে তাই সফল-সঞ্চয়।” ১০৭, পপুল দিয়েছ অনেক বুঝি, এখন পাওনা খুঁজি, নাই—কিছু নাই। হৃদয় করিয়া শূন্য, রিক্ত করি প্রাণ-মন ভাবিতেছ তাই। “শূন্য নয়—রিক্ত নয়, ওরে আশাহত দীন, তুচ্ছ লাভ-ক্ষতি ; সকল আচ্ছন্ন করি’ চেয়ে দে দীপিতেছে প্রেমের মূরতি!” ১৮ চিরন্তন সমুজ্জ্বল রবি বৰ শেষ! চেয়ে দেখি, অন্তর-বাহিরে। নিদাঘের বহ্নি জলে বসন্ত-চিতায় ; ডুবে নিশার তিমিরে, প্রভাতে ফুটিয়া ফুল প্রদোষে লুটায় । নদে বালু উড়ে, মরু ভেসে যায় তটিনী প্রবাহ ছাড়ি’ বহে অন্য তীরে ভাঙ্গি’ পড়ে অদ্রি-চূড়া, সমুদ্র শুকায়, জগতে নিয়ম-নেমি যায় ঘুরে-ফিরে। কোন ক্ষতি নাই তাহে ! অশব্দ চরণে আমুনা দেহে মাের পরিবর্ত ধীরে শুভ্র করে দিক কেশ, ললাটে নয়নে একে দিক চিন্তা-রেখা! হৃদয়-মন্দিরে রাখিব সে-প্রেম চির-উজ্জল তেমন রাখে যথা অগ্নিহােত্রী যজ্ঞ-হুতাশন।

অবশেষ বসন্ত চলিয়া যায় থাকে পত্র-পুষ্প-স্মৃতি, কোকিলের গান ! হাহা করে ক্ষুব্ধ বায়ু আলাময় নিদাঘের হলে অবসান! বরষা কাঁদিয়া যায়, থাকে তার মেঘধ্বনি, শূন্য হাহাকার ; শরত বিদায় নিলে, তৃণে পড়ি থাকে তার নয়ন-আসার। রবি যবে ডুবে যায়, রক্ত মেঘে থাকে তার দীপ্ত অনুরাগ ! যামিনী পােহাম যবে, ফুলে-ফুলে থাকে তার স্বপনের রাগ । সরসী শুকায় যবে, থাকে তার পঙ্কজের বিস্মৃত কাহিনী ; ফুল যবে ঝরি’ যায়, থাকে পড়ি’ তরুতলে ছায়া উদাসিনী ।

অবশেষ কবি যাবে, রবে তার ফুলে-ফুলে রূপতৃষা, নিশ্বাস বাতাসে! কবি যাবে, মেঘে-মেঘে বিচিত্র-কল্পনা তার ভাসিবে আকাশে। কবি যাবে, র’বে তার চির-মধুময় গান তরু-মরমরে ; কবি যাবে, নদী তার অনাবিল প্রেমরাশি বহিবে সাগরে। ১১১ মালাকর। নহি আমি মণিকার-রতন-বণিক, মণি-মুক্তা ল’য়ে আমি নাহি করি ঘর ; ঘাটে মাের নাহি বাধা রতনের তরী, আমি শুধু মালঞ্চের দীন মালাকর ! রক্ত করবীর-মাের পদ্মরাগ মণি, নবােদ্ভিন্ন কিশলয়-পল্লব নধর মরত! পত্ৰপুষ্প সম্বল আমার । তাই ল’য়ে গাঁথি মালা—আমি মালাকর। স্বর্ণসূত্র নাহি মাের ; প্রভাত-শিশির ঝলমল করে যবে পত্র-পুষ্প’পর, শুনিতে শুনিতে মুগ্ধ মধুপ-গুঞ্জন, লতাসূত্রে গাঁথি মাল—আমি মালাকর । কোন্ রাজকুমারীর নত-নেত্ৰতলে লভিবে করুণ দৃষ্টি-সুকোমল কর- পরশন পাবে—হবে ধন্য মাের মালা ; রি লাগি’ গাথি মালা—আমি মালাকর। ১১২ গাও কবি ! গাও কবি, মুক্তকণ্ঠে তােমার সঙ্গীত, ওকি কণ্ঠ'—কপিছে যে স্বর। বাষ্পকুল নেত্ৰ কেন, বচন জড়িত, বল কবি, কি হেতু কাতর? নহ তুমি গৃহে বদ্ধ পিঞ্জরের শুক, মুক্ত-পক্ষ তুমি বিহঙ্গম। সচ্ছদ-বিহারী তুমি, সেই তব সুখ, কণ্ঠে ধর গীত অনুপম ! শিখিবে পড়ান-বুলি-মূর্থের প্রলাপ, সে ত নহে তােমার সাধনা ; খণ্ডীকৃত ধরামাঝে খণ্ড-ক্ষুদ্র মাপ, তুমি তার কর না কামনা ! ১১৩ পত্রপুপ উৰ্দ্ধ হ'তে উৰ্দ্ধতম, অখণ্ড আকাশ- সীমাহীন তব অধিকার ; বহে জ্যোতিঃস্রাত যেথা, গ্রহের বিলাস, সেথা হ’তে ঢাল’ গীতিধার। নহ তুমি যশােলুব্ধ—অর্থ-আকিঞ্চন তােমারে কি করিবে চঞ্চল। হাসি-অশ্রু এক-সূত্রে ক'রেছ গ্রন্থন, গলে তাই করে ঝলমল ! সুখের মদিরা-পাত্র ফেল গো, ভাঙ্গিয়া, দুঃখের গরল কর পান। হও মৃত্যুঞ্জয় কবি,-সৰ্বস্ব ভুলিয়া গাও সুখ-দুঃখাতীত গান। তােমার প্রতিভা-শিখা উচু জলিয়া, কপটতা পলা তরাসে ! নীচ স্বার্থপরতারে চরণে দলিয়া দহ’ তারে তব বহ্নি-শ্বাসে। ১১৪ গাও কবি আপনার সুখ-দুঃখ ক্ষুদ্র অতিশয়, তাই ল'য়ে করিছ জল্পনা। কোথা’ তব ত্যাগমন্ত্র হয়ে অভয়, কোথা তব পরার্থ-সাধনা। ভুলে যাও চাহি’—মহা মঙ্গলের পানে আপনার জয়-পরাজয় ; গাও তারি গীত, কবি,-কিসের সন্ধানে নরজন্ম করিতেছ ক্ষয় ।

প্রতীক্ষা সাঙ্গ করিয়া হাটের বেসাতী এমু খেয়াঘাটে—কেহ নাই সাথী, খেয়াতরী গেছে ফিরে। অস্ত রবির কিরণ তখন মৃত্যুর মুখে হাসির মতন মিলায় ধীরে। পারে যাব বলে এলাম তীরে। গৃহমুখী মন চাহি’ বার বার পর-পার-পানে, করে হাহাকার, খেয়াতরী গেল ফেলে । দিনের আলােক নিবিল এবার, সন্ধ্যা আসিয়া ঘিরে চারি ধার আঁচল মেলে। খেয়াতরী গেল আমারে ফেলে। ১১৬ প্রতীক্ষা শুধু পশে কানে জল-কল-কল, আশা-নিরাশায় আঁখি ছল-ছল, বুঝি তরী ফিরে আসে। আঁধাব গগনে একটি সে তার অসীমের মাঝে যেন গৃহহারা, দাড়াল ত্রাসে। কি কহিল যেন নীরব ভাবে ! গৃহহীন—তীরে রহিলাম বসি’- আকাশে তারকা—নাহি দেখি শশী, বহে নদী কলরবে। কাটিবে কি মাের এ নিশা এমনি, শুনিতে নিতে জল-কল-ধ্বনি, প্রভাত হবে। কাকলী-বে। চাহিব পূরবে ১১৭ আর কত দূর আর কত দূর ওগাে, আর কত দূর! কত পথ আসিয়াছি, কাদিয়াছি -হাসিয়াছি, বল না আমায়—আমি বড় শ্ৰমাতুর আর কত দূর? ব্যথিত চরণ মাের, প্রাণে অবসাদ ঘাের, ফুরায় না পথ তবু, চলি অবিরাম। সম্মুখে আঁধার রাতি, সঙ্গে মাের নাহি সাথী, দেখা তার পাব বলে করিনি বিশ্রাম চলি অবিরাম শুধু তার জানি নাম, নাহি জানি কোথা’ ধাম,- দেখা পাব একদিন জীবযাত্রা শেষে ; সেই আশা বুকে ধরি’ সেই নাম মনে অরি’ জানিনা’ক, চলিয়াছি কোন্ নিরুদ্দেশে তারে ভালবেসে। ১১৮ আর কত দূর আমি যে, ভুলেছি কভু, সে ত ভুলে নাই তবু, আঁধারে বিদ্যুৎ-সম দিয়াছে সে দেখা! জনকের আশীর্বাদে জননীর শুভ সাধে, পাইয়াছি তার স্বাদ-প্রিয়-মুখে লেখা- তারি প্রেম দেখা! মিটেনিক ক্ষুধা তায় - খুঁজি তাই সে কোথায়, চলিয়াছি তারি আশে দীন-রিক্ত বেশে। যা কিছু অপূর্ণ-শূন্য সে দিবে করিয়া পূর্ণ, কান্তের হাহাকার টুটিবে নিমেষে জীবযাত্রা-শেষে ! জন্ম-জন্ম দুঃখ সহি, তারি অপেক্ষায় বহি- সংযােগ-বিয়ােগ-ব্যথা জীবনে-মরণে। হে দেবতা, দেখা দিয়ে, পাপ-তাপ মুছে নিয়ে, মরণে শরণ তব দিয়াে হে চরণে- দীন-আৰ্ত্ত জনে। ১১১ উম্মিকা . বন্ধুর বেলার পরে উছলি পড়িছে এসে তােমার উৰ্মিকা! ফিরে যায় শতবার সরস পরশ দিয়া, নাহি অহমিকা। আসে আর ফিরে যায়, উপল-ব্যথিতা, তবু নহে ত কাতর ; নাইছে কলগীতে আপন মৰ্ম্মের কথা কারে নিরন্তব। তাই কি অচল তট বিমুগ্ধ পড়িয়া আছে সম্মুখে তােমার। লভি’ তব পরশন, শুনি’ তব গীত, কারে নাহি চায় আর! * কবি-সুহৃদ শ্রীযুক্ত রমণীমােহন ঘােষের 'উৰ্ম্মিকা কাব্য পড়িয়া। ১২০ শেষ কথা বলা হয় নাই সব, আছে শেষ কথা! বলিয়াছি কত কি-যে, সুখ-দুঃখ-ব্যথা সুদিনের দুর্দিনের ; কত আঁচা-আঁচি, বিশ্ৰব্ধ আলাপ কত ; তবু খুঁজিয়াছি— সব বলা হয় নাই, শেষ বুঝি আছে । বিমুগ্ধ নয়নে তাই থাকি কাছে-কাছে, বলিব বলিব ভাবি, মিটে না’ক আশ । কোকিল যে গেয়ে ফিরে সারা মধুমাস, কোথা তার শেষ গীত ? কলধ্বনি তুলি বহে নদী, গেছে সে-ও শেষ কথা ভুলি’ আকুল উচ্ছাস তাই নিরবধি তার। মেঘমন্দ্র-মাঝে শুনি সেই হাহাকার নিতান্ত নিল সারা বরষা যাপন গুমরি-গুমরি করে, কোথা সমাপন? • ১২১ বসন্ত গিয়াছে ছলি’ পুষ্প-পরিমলে ল’য়ে তার মলয়-পবন। ভাঙ্গিয়া প্রেমের স্বপ্ন, ফুলের অধরে রেখে গেছে বিদায়-চুম্বন ! এসেছিল একদিন ভাসাইয়া বেলা বরষার পূর্ণতা-প্লাবন ! সে কি আজি মনে নাহি ? কূলে-কূলে ভরা উছলিত ধরার যৌবন। এসেছে শরৎ লয়ে পত্ৰপুষ্প তার, মিথোজ্জল হাসিছে গগন! ভরিয়াছি করপুট কুসুমে-পল্লবে, দেবতারে করিব অর্পণ। ২১শে আবিন, ১৩২১ ১২২ ‘পত্ৰপুষ্প’-প্রণেতার অন্য দুই খানি কাব্য সম্বন্ধে পত্ৰসম্পাদক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিকগণের অভিমত ১ বেলা গীতি-কাব্য। আকার ফুলস্ক্যাপ ৮ পেজী ১১২ পৃষ্ঠা ; উৎকৃষ্ট বিলাতী বাঁধাই। মূল্য ১, এক টাকা। বঙ্গবাসী—গিরিজাবাবু কবিযশােভাগী হইয়াছেন। ইহার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতাগুলি বড় সুমিষ্ট। ছন্দ মিষ্ট, ভাব গৃঢ় ; অথচ হেঁয়ালি নহে। কবির কাব্যে কবিকে চেনা যায়। উৎসর্গের কবিতার প্রথমেই বুঝি, কবি মাতৃ-ভক্ত। কবির জননী স্বর্গে । কবি লিখিতেছেন ;- “মা আমার চিত্রপটে, মা আমার সর্বঘটে, অন্তরে-বাহিরে মা যে ব্যাপিয়া সংসার।” কবির স্বর্গীয় মা আজ সেই কবিকেশরী ভক্ত রামপ্রসাদের আরাধ্যা মা,—সৰ্বমঙ্গলে সৰ্বকালব্যাপিনী, সৰ্ব্বস্থান-ব্যাপিনী মহাকালী! রামপ্রসাদ গাহিয়াছিলেন, "মা বিরাজে সৰ্ব্বঘটে।” !

০ এ মাতৃময়ত্ব মাতৃ-ভক্ত কবির নিজস্ব। কবিতার আবাহনে কবি লিখিতেছেন, “এস গাে, ক্ষমার মত, সহজ সুন্দর স্বত- হৃদয়ে আমার।” কবি উদ্ধত নহেন, উচ্ছল নহেন,—শান্ত স্থির, ধীর, প্রত্যেক কবিতায় উচ্চ ভাবের পরিচয় পাই, চাঞ্চল্য কিঞ্চিত্র নাই ; আবাহন সার্থক হইয়াছে। ভাবপূর্ণ-প্রসাদ-গুণময় কবিতা, আধুনিক কোন কোন খ্যাত- নাম কবির কবিতায়ও বিরল। কবি শেষ গাথায় অঞ্জলি গম্ভীর। এরূপ উচ্চ দিতেছেন ; * “চারি দিকে হেলা ফেলা, ভাব সৌন্দর্য্যের মেলা, আমার এ ক্ষুদ্র প্রাণ গিয়াছে ভরিয়া । আজি বিশ্ব-উপকূলে, অনন্তের পানে তুলে আমার এ গীতি-গান দিনু অঞ্জলিয়া।” সৌন্দর্য্যে কবির প্রাণ ডুবিয়া গিয়াছে সত্য ; নহিলে তাঁহার কাব্যে এ সৌন্দর্যের সমাবেশ হইবে কেন ? নব্যভারত-গিরিজানাথ বাবুর পরিমল” পড়িয়া আমরা যেরূপ সুখী হইয়াছিলাম, এই “বেলা” পড়িয়াও সেইরূপ সুখী হইলাম। আজ কালকার দিনের অনেক কবির লেখাই অস্পষ্ট ভাব-যােজনায় দুষ্ট, তাহাতে শিল্পচাতুৰ্য্য থাকিলেও ভাবের পরিচয় পাওয়া তত যায় না। “বেলার” কবি, যেমন শিল্পী, তেমনি ভাবুক। তাঁহার হৃদয়ে যে পবিত্রতা আছে, দয়া আছে- ভাব আছে, তাহা অপরূপ সৌন্দর্য্যে এই “বেলায়” ফুটিয়া বাহির v০ হইয়াছে। লেখা যেমন সরল, তেমনি সুমিষ্ট। একটু একটু পরিচয় দিতেছি। পবিত্রতার পরিচয়—“নারী।” দয়ার পরিচয়- “ভিক্ষুক।” ভাবের পরিচয়—“অভেদ।” -“মৃত্যু।” —“সন্ধ্যা-তারা।” “ভারতী” পত্রিকায় যুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন উৰ্ম্মিচঞ্চল সমুদ্রের আঘাত সহিয়া বেলাভূমি শান্ত, স্থির ও দৃঢ়। ফেনােৎক্ষেপী চূর্ণতরঙ্গ বেলায় প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া যাইতেছে—বেলা শান্ত, স্থির ও দৃঢ়। বেলার এই শান্তির মধ্যে একটা সকরুণ ভাব আছে, এই শান্তি ধৈর্য্যের, অটুট ধৈর্য্যের ইহা সুখ-নিবাসের আরাম-শয়নেব হিল্লোলে পরিপুষ্ট নহে— ইহা ঝড়ের মধ্যে একটু বিরাম ও অবকাশেব রেখা আঁকিয়া দেখাইতেছে। যেখানে তরঙ্গ, আবৰ্ত্ত ও আলােড়নে-সমগ্র চিত্রটি চঞ্চল-এই শান্তি তাহারই মধ্যে থাকিয়া বৈপরীত্যে আপনার সত্ত্বাকে মহান্ করিয়া দেখাইতেছে। “বেলার কবিতাগুলি এই হিসাবে স্বনামের সার্থকতা করিয়াছে। সংসারের সুখ দুঃখের আস্বাদনে যাহার হৃদয় পুড়িয়া গিয়াছে, সুখের অমৃত ও দুঃখের হলাহল—এই দুই হইতেই যে নিষ্কৃতি ভিক্ষা করে, অথচ কাপুরুষের ন্যায় অভিভূত হয় না,—“বেলার কবিতা সেইরূপ হৃদয়ের বল ও নীরব ধৈৰ্য্য প্রকটিত করিতেছে।

• সমস্ত কবিতাগুলির সুরে জীবনে বীতস্পৃহ বিষাদের রেশ জাগিয়াছে, অথচ সে বিষাদে কটুত্ব বা আর্তনাদ নাই—সে বিষাদ অদৃষ্টের বিধান মান্থ করিয়া কাৰ্য্যের প্রেরণা প্রদান করিতেছে এবং কর্মশেষে ভগবৎ চরণে অশ্রুসিক্ত হৃদয়টি রাখিয়া চরম শান্তিলাভ করিবার প্রতীক্ষা করিয়া আছে। এই কবিতাগুলির প্রতিটি শব্দ যেন এক একটী শিশিরা ফুলের ন্যায় অবনত মস্তকে রৌদ্র বৃষ্টি সহিয়া দাঁড়াইয়া আছে—বেলার এই বিষন্নতা, এই সংযম ও এই ধৈৰ্য্য আমাদিগের হৃদয়কে কারুণ্যে পরিপূরিত করিয়া ফেলে ; কবিতার এই বিষাদের হাসি, ত্যাগের কামনা ও শুভ্র মহত্ত্ব আমাদিগের হৃদয় নীরবে আকৃষ্ট করে। এই বিষন্ন ভাবটি কচিৎ মাত্র ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে, যখন কবি দুঃখকে বরণ করিয়া বলিতেছেন, “বর্ণহীন রূপহীন, আপনাতে চিরলীন, আমি চাই অন্ধতম নিবিড় নিশা, মগ্ন মহিমায়। সে ত ভেদ নাহি জানে, আত্মপর বুকে টানে, সে মম দুঃখের মূৰ্ত্তি-নমি তার পায়, আয় দুঃখ, আয়।” কিন্তু মৃত্যুকে বলিতেছেন,-প্রিয়তমার কোমল ভুবন্ধনে আবদ্ধ থাকার সময়ও যদি তাহার আহ্বান শুনিতে পান, তবে তিনি দ্বিধাহীন হইয়া মৃত্যুর আলিঙ্গনে ধরা দিতে প্রস্তুত—তখন মনে হয়, তাহার ধৈৰ্য ক্ষণকালের জন্য টুটিয়া গিয়াছে। কবি সুনিপুণ শব্দ-শিল্পী ; অতি সংযত, সুসম্বন্ধ অতি সংযত, সুসম্বন্ধ পদাবলীতে তিনি / সুন্দর ভাবগুলি যােজনা করিয়াছেন; বর্ষাচিত্র হইতে এই কয়েকটি ছত্র পাঠ করুন- “নীলাঞ্জন নিলি-নীল-মেঘাঞ্চলে ঢেকে দাও রবি-দগ্ধ পাটল আকাশ। কুটজ-কেতকী-গন্ধে ভারাক্রান্ত করি দাও অর্জ-স্নিগ্ধ তােমার বাতাস।” বাঁকুড়া-দর্পণ—শ্রীযুক্ত বাবু গিরিজানাথ মুখােপাধ্যায় প্রণীত “বেলা” নামক একখানি অভিনব গীতিকাব্য আমাদের হস্তগত হইয়াছে। এই কাব্যখানিতে অনেক গুলি সুন্দর গতি-কবিতার সমাবেশ দেখিলাম প্রত্যেক কবিতাপাঠে আমরা অননুভূতপূৰ্ব আনন্দ লাভ করিয়াছি। গিরিজাবাবু প্রকৃতই প্রেমিক, সহৃদয় এবং উচ্চ শ্রেণীর কবি ; তাহার কবিতায় উচ্ছাস আছে—মাধুৰ্য্য আছে—মনােহারিত্ব আছে। প্রত্যেক কবিতার মধ্যে কবির আন্তরিকতা এবং সংযত ভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। গিরিজাবাবুর কবিতা পাঠ করিলে, তাহার ন্যায় আমাদেরও “বুকে মুখে অনুরাগে, কি বাতাস এসে লাগে, কি উদার, কি সঞ্চার দিগন্ত ব্যাপিয়া।" তাহার কবিতা পাঠে মনে হয় যেন “নয়নে অনন্তাভাস, ব্যোম, সিন্ধু পরকাশ, চরণে বিশাল তট রয়েছে লুটিয়া ?” শুদ্ধ তাহাই নহে, তাহার কবিতা ধীরভাবে, অনুরাগসহকারে অধ্যয়ন করিলে, কাব্যামােদী পাঠকের মনে হয়- ;

ly, “চারি দিকে হেলাফেলা, ভাব-সৌন্দর্য্যের মেলা, আমার এ ক্ষুদ্র প্রাণ গিয়াছে ভরিয়া?” যাহারা কবিতার আদর করেন, তাঁহাদের নিকট কবিতা, দেবীভাবে আসিয়া কি আনন্দের উৎস খুলিয়া দেন-তাহাদের মনে, প্রাণে, হৃদয়ে কি এক স্বর্গীয় ভাবের সঞ্চার করিয়া দিয়া থাকেন, বেলা’র “কবিতা” শীর্ষক প্রবন্ধে তাহার এক খানি অতি সুন্দর ও মনােহর চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন। কবি কবিতা- রাণীকে সুমধুর বাক্যে আহ্বান করিয়া বলিতেছেন— “এলে তুমি স্নিগ্ধ-জ্যোতির্ময়ী রূপে অমরীর মত জীবনের পথ কালাে করে; দাড়াইলে পাশে মম, শুনাইলে অশা-মন্ত্র কানে, চলিলাম সেই পথ ধ'রে। থেমে গেল ঝঙ্কাবায়ু, উড়ে গেল মেঘ কোন্ দিকে, শশী, তারা ভাসিল আকাশে ! পাশে তুমি, চির করণার মূৰ্ত্তি—ভরসা-রূপিণী, পূর্ণ প্রাণ-আনন্দ-উচ্ছাসে। ; কে প্রেম নিবদ্ধ ছিল গােমুখী-গুহায়, বহাইলে পতিত-পাবনী-ধারা রূপে! যে প্রেম মানবে ছিল–সংকীর্ণ সীমায়, প্রসারিলে ব্রহ্মাণ্ডের প্রতি রােমকূপে। তুমিই শিখালে প্রেমে নাহিক বিরহ-অবসাদ, প্রেম নিত্য-প্রেম সনাতন। দেবতার পদে প্রেম - পূজা-উপহার, শিখিলাম, পাইলাম নুতন জীবন।”

কি সজীব, পরিস্ফুট চিত্র! ভাবময় হৃদয়ের কি সুন্দর আলেখ্য। কবি নারীর সহিত কবিতার তুলনা করিয়া তুলনা” নামক যে কবিতাটী লিথিয়াছেন, তাহা অতি উপাদেয়। প্রেমের মদিরাময়ী ভাষায় লিখিতেছেন— গ * * “বেলা”র “আরাধ্যা” নামধেয় কবিতা, যখন আমরা সুবিখ্যাত মাসিকপত্র “বঙ্গদর্শনে” প্রথম পাঠ করি, তখন আমরা উহার যে অংশ সাদরে কণ্ঠস্থ করিয়া রাখিয়াছিলাম, তাহা এই- “আরাধ্যা” কবিতাটী, বাস্তবিকই কবির পবিত্র প্রণরের একখানি নিখুত ছবি নিৰ্ম্মল প্রেমের একটী সরল উচ্ছাস। লীলাময়ী প্রকৃতির বিশাল, বিরাট ভাব আমরা সহজে হৃদয়ে ধারণা করিতে পারি না; তাই ক্ষুদ্র হৃদয়ে ধারণার উপযােগী করিবার জন্য কবি, রমণীয় রমণী-মূর্তিতে প্রকৃতির চিত্র অঙ্কিত রিয়াছেন—“প্রকৃতির প্রতি পাঠ করিলে আমরা বুঝিতে পারি যেন প্রকৃতি চিত্তহারিণী, প্রেমময়ী, লাবণ্যবতী বঙ্গীয়া-নারীরূপে নয়ন-সমক্ষে বিরাজিতা থাকিয়া আমাদের মনঃপ্রাণ আকর্ষণ করিতেছে। বিবিধ সৌন্দর্যের আধারভূত প্রকৃতির সেই মনােহর চিত্রখানির এক অংশ পাঠকগণের নিকট উন্মুক্ত করিতেছি- সৌন্দৰ্য্য উপভােগ করুন। ক্ষ কবি যে প্রকৃতির এক জন প্রকৃত উপাসক, তাহা এই একটী কবিতা পাঠে বেশ উপলব্ধ হইতে পারে।

০ স্রোতস্বতী যেরূপ পৰ্বত হইতে বহির্গত হইয়া ক্রমে ক্রমে বিস্তৃতি লাভ করিয়া—তট-ভূমি উর্বর করিতে করিতে, সাগর- সঙ্গমে মিলিত হইয়া পূর্ণতা লাভ করে, প্রেমও তদ্রুপ হৃদয়- গােমুখী হইতে নিঃসৃত হইয়া ক্ৰমে প্রসারণশীল হইতে হইতে পরার্থপরতা-স্রোতে অপরের চিত্তক্ষেত্র সরস করিয়া অবশেষে ভাবের অনন্ত সমুদ্রে বিলীন হয়। প্রেমের উদ্ভব, প্রেমের বিস্তৃতি এবং প্রেমের পূর্ণতা, দেখাইবার জন্য কবি, “সম্পূর্ণ প্রেম” নামে একটী চতুর্দশপদী কবিতা লিখিয়াছেন—তাহা ভাষায় বর্ণনা করিবার নহে, অনুভবের সামগ্রী, অতি সুন্দর, অতি উপাদেয়। গিরিজাবাবু মাতৃভক্ত! “মা আমার” কবিতাটিই তাহার অসীম মাতৃ ভক্তির নিদর্শন। কবির সহিত এক বাক্যে আমরাও বলি- “মা আমার চিত্তপটে, মা আমার সর্বঘটে, অন্তরে-বাহিরে মা যে ব্যাপিয়া সংসার।” “বেলা”র সকল কবিতার পরিচয় দেওয়া, ক্ষুদ্র “দর্পণের পক্ষে কদাপি সম্ভবপর নহে ; দু’চারিটির কিছু কিছু পরিচয় দিলাম মাত্র। আধুনিক কবিগণের কাব্য পাঠে যাহারা আনন্দ অনুভব করেন, তাহাদের নিকট “বেলা” বিশেষ আদর প্রাপ্ত হইবে, সে ভরসা আমাদের আছে। গিরিজা বাবু প্রতিভাবান্ কবি—আমরা শ্রীহরির চরণে তাহার সর্বাঙ্গীন উন্নতি কামনা করি।

__ সাহিত্যাচাৰ্য মনস্বী শ্ৰীযুক্ত অক্ষয়চন্দ্র সরকার পূর্ণিমা পত্রিকায় লিখিয়াছেন ;- “বাঙ্গালার মুদ্রাযন্ত্রগগন হইতে, অবিরল কবিতা বৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বেলা’ ও ‘পরিমল’ সেরূপ সাধারণ বর্ষার বৃষ্টি নহে। দাশরথি বলিয়াছেন; “তুলারাশি মাসে, তিথি অমাবস্তে স্বাতি নক্ষত্রে,-যে বারি বরষে, সে বারি বরিষে কি বরিষার জলে ? কৃষ্ণের প্রেম কি পায় সকলে গাে? রাধার প্রেম কি পায় সকলে ?” কৃষ্ণের প্রেমও সকলে পায় না, গিরিজানাথের মত অপূর্ব কবিত্ব-শক্তি ও ভাবের অভিব্যক্তিও সকলে পায় না আমাদের সৌভাগ্যে আমরা স্বাতি নক্ষত্রের জলের মত এইরূপ কাব্য ভাইয়াছি।”

২ পরিমল (গতি-কাব্য) আকার ডিমাই ১২ পেজী ১৫০ পৃষ্ঠার উপর ; উৎকৃষ্ট বিলাতী বাঁধাই ; ; মূল্য ১০ এক টাকা চারি আনা। ; বঙ্গবাসী—লেখাতেও নূতনত্ব আছে খুব। প্রেমের কথা, অবসাদের কথা, বিষাদের কথা, কেমন যেন সাত্বিকতা মাখাইয়া, কেমন যেন এক অপূৰ্ব্ব মাধুর্যে মিশাইয়া লিখিত হইয়াছে। লেখায় যৌবনের উদ্দাম-মাদকতা নাই, বিচ্ছিন্নতা নাই, বিমূঢ়তা নাই ; সরস ভাবগুলি সরস পরিচ্ছন্ন ভাষায়, ভগবদ্ভক্তিতে মাখাইয়া পরিষ্কার পরিষ্কার করিয়া লিখিত হইয়াছে। কাব্যপ্রিয় রসপিপাসু পাঠকগণ এ পুস্তক পা” করিলে সুখী হইতে পারিবেন। নব্যভারত—প্রতিভা ও কৃতিত্বের স্ফট বিকাশদেখিয়া আনন্দিত হইলাম। জন্মভূমি—শ্রীযুক্ত গিরিজানাথ মুখােপাধ্যায় মহাশয় এক জন স্বভাব-কবি ও লিপিকুশল লেখক। তিনি চিন্তাশীল, ভাবুক তঁাহার হৃদয়-পারিজাতের সৌরভ ও মাধুরী ক্ৰমে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতেছে। এবং রসজ্ঞ।

শকুন্তলাতত্ত্ব’ ‘সাবিত্রীতত্ত্ব’ প্রভৃতি গ্রন্থ-প্রণেতা সমালােচকাগ্রগণ্য স্বর্গীয় চন্দ্রনাথ বসু মহাশয়ের অভিমত-প্রেমের এত উচ্চতা, উদারতা এবং গভীরতা আমি বাঙ্গালা সাহিত্য অতি কমই দেখিয়াছি। কয়েকটী কবিতার কোমলতা, মধুরতা, উচ্চতা, গভীরতা, উদারতা এবং পবিত্রতার তুলনা বাঙ্গালায় বােধ হয় সহজে পাওয়া যায় না। তােমার এই কবিতাগুলির একটা বিশেষ গুণ এই দেখিতেছি, এ গুলি তােমার নিজের, কোন রকম ছাঁচের ছায়া এ গুলিতে পড়ে নাই। বাঙ্গালী কবিদিগের মধ্যে তােমার স্থান অতি উচ্চ। কবিবর নবীনচন্দ্র সেন—তােমার কোমল কণ্ঠ, তরল হৃদয়, উধাও কল্পনা। অন্যের মতাপেক্ষী হইবার সয়, তােমার অনেক দিন অতীত হইয়াছে। সুপ্রসিদ্ধ সমালােচক ও লেখক গিরিজাপ্রসন্ন রায় চৌধুরী বি এল—“পরিমল” আদ্যন্ত পাঠ করিয়াছি। এই প্রকার কবিতা যিনি লিখিতে পারেন, তাহাকে আমি ক্ষমতাশালী উচ্চ শ্রেণীর কবি বলিয়া মনে করি। “অপরাহ্নে ও “আবাহন” পাঠ করিয়া মনে যে একটা গম্ভীর বিষাদের বা নৈরাশ্যের ছায়া হৃদয়-মধ্যে পতিত হয়, সেরূপ ছায়াপাতে শ্রেষ্ঠ কবির ভিন্ন অন্যের অধিকার নাই। আমি এবংবিধ ক্ষমতাকেই কবির প্রতিভা বলিয়া মনে করি। = মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনীকার শ্রীযুক্ত যােগীন্দ্রনাথ বসু—আপনি আপনার নিজের হৃদয় দেখাইতে পারিয়াছেন, পাঠকের হৃদয়ের ভিতর প্রবেশ করিতে সক্ষম হইয়াছেন; সুতরাং প্রকৃত কবির দুইটা লক্ষণ আপনাতে বর্তমান আছে। প্রেম-বিষয়ক কবিতাতেই আপনি সর্বাপেক্ষা নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছেন। বিদ্যাপতি, চণ্ডিদাসের দেশে যাহা প্রত্যাশা করা যাইতে পারে, আপনি তাহাই দেখাইয়াছেন। কলিকাতার প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে প্রাপ্তব্য।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Patrapushpa

Author
Mukhopadhyay, Girijanath
Title
Patrapushpa
File name
Patrapushpa
Text
OCR done
Citation
1914
Published
2010/04/17
Publisher
Purnachandra Das, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
154
Library
Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Poems
DLI number
511265
Barcode
4990010018430.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
7yNGTJxYA5o
Download PDF

Patrapushpa