Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Lord Kichenar

Ghosh ,amulyakrishna · 2010/02/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

লর্ড কিচেনার
-
}
=

No text on this page.

তিন-আনা সংস্করণ কল্পতরু গ্রন্থাবলী নং ১৬
লর্ভ কিচেনার
‘ব দারতি শ্রেষ্ঠত্তদেহেরী হন।
সৎ এবং কুরুতে লােগুদহুৰ্ততে।”
"Lives of great men all remind us
We can make our lives sublime."
অমূল্যকৃষ্ণ যােষ এম, এ, বি, এল
প্রণীত
ভট্টাচাৰ্য এণ্ড সন্
কলিকাতা ও ময়মনসিংহ
মূল্য তিন আনা

কলিকাতা
৬৫নং কলেজষ্ট্রীট, ভট্টাচাৰ্য্য এও সএ পুস্তকালয় হইতে
দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কর্তৃক প্রকাশিত
এবং
১০৭নং মেছুয়াবাজার ষ্ট্রীট, স্বর্ণপ্রেসে
ঐকরুণাময় আচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত।

No text on this page.

No text on this page.

লর্ড কীচনা
প্রথম পরিচ্ছেদ
বাল্যজীবন
২
আয়রে কেরীকাউন্টিতে লিষ্টোয়ে টাউনের নিকটে কীনারের
জন্ম হয়। ইংলণ্ডের লীদেষ্টা সায়ারে তাহাদের পৈতৃক বাড়ী ছিল।
কীচনারের পিতা আয়লণ্ডে সম্পত্তি কিনিয়া সেখানে বাস করিতে
আরম্ভ করেন, তাঁহাদের সেই নুতন বাসস্থানে ১৮৫০ খৃষ্টাব্দে
কীনারের জন্ম হয়। কীচারের পিতা ভারতবর্ষে সৈনিক বিভাগে
কিছুদিন কাজ করিয়াছিলেন। কীনারের চার ভাই ছিলেন।
তাঁহাদের একটি মাত্র বােন ; • তাহার ডাক নাম ছিল মিলি।
বিবাহের পর তিনি মিসেস পার্কার হইয়াছেন এবং অদ্যাপি জীবিত
আছেন।
লর্ড কীচনার বলিয়া যিনি আজ ভুবনবিখ্যাত, তাহার
নাম ছিল হয়েশিয়ােহার্বার্ট কীছর। ছােট বেলা সকলেই তাহাকে
মাষ্টার হার্বার্ট বলিয়া ডাকিত। তিনি চিরকাল খুব লাজুক ছিলেন।
কীচনানের পিতার বেশ ভয়াবনী শক্তি ছিল এবং তিনি
ধুৰ পাকা কাজের লােক ছিলেন। একবার তার বাড়ীতে
ব্যবহারের জন্য কতগুলি পাইপের দরকার হয়, কিন্তু সে অঞ্চলে
পাইপ কিনিতে পাওয়া যাইত না। অন্য জায়গা হইতে কিনিয়া

২
প্রথম পরিচ্ছেদ
আনিতেও অনেক খরচ পড়িয়া যায়-তাই তিনি নিজেই পাইপ
প্রস্তুত করাইতে আরম্ভ করিয়া দিলেন। ইহাতে সঁহার নিজের
অভাব ত দূর হইলই, পাড়াপ্রতিবেশীর নিকট সেগুলি বিক্রয়
করিয়া বেশ একটি কারবারও চলিতে লাগিল। এইরূপ আরাে
অনেক ব্যবসা করিয়া তিনি বিস্তর অর্থোপার্জনের পথ প্রস্তুত করিয়া
লইয়াছিলেন। কাজ সম্বন্ধে তিনি খুব কড়া প্রকৃতির লােক ছিলেন।
অলস লােক তিনি মােটে দেখিতে পারিতেন না, এবং সকলের
নিকট হইতেই তিনি কড়ায় গণ্ডায় কাজটি আদায় করিয়া লইতেন।
কীচনারও এ বিষয়ে ঠিক পিতার মত
মত হইয়াছিলেন।
বাল্যকাল হইতেই তাঁহার ঝোঁক ছিল কাজ কর্মের দিকে তাহার
অন্যান্য ভ্রাতাগণ যখন খেলায় মত্ত থাকিত, তখন তিনি তাহাদের
কারখানায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিতেন কোথায় কিরূপ কাজ হইতেছে।
খেলার দিকে তাঁহার মােটেই নেশা ছিল না। এদিকে কাজ নাই
তাহার খুব প্রিয় ছিল। গ্রামের কৰ্ম্মকার কেমন করিয়া ঘােড়ার
পায়ের নাল প্রস্তুত করে তিনি প্রায়ই দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাহা
দেখিতেন। কৰ্ম্মকারেরও এই বলিষ্ঠ বালককে বেশ পছন্দ হইয়াছিল।
সে একবার তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “কেমন, আমার কাছে
এসে কাজ শিখবে?” কীচনার হাসিয়া উত্তর দিলেন, “না, তবে
আমি বড় হলে আমার অধীনে এরকম ১২ জন কর্মকার নিযুক্ত
লােকটি খুসী হইয়া বলিল, “তা তুমি বেশ পারবে,
তুমি বেশ চালাক ছােড়া।”
ভবিষ্যৎ জীবনের কল্পনা লইয়া তিনি এত ব্যস্ত থাকিতেন
যে তাঁহার পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটিতে লাগিল ।
তিনি ক্লাসে পড়া
বলিতে পারিতেন না।
মাষ্টার গিয়া তাহার পিতাকে একথা
রাখব।” লােকটি খুসী

লর্ড কীচুনার জানাইলেন। পিতা কীচনারকে ডাকাইয়া বলিয়া দিলেন, “তুমি যদি এবার ভাল করে পরীক্ষা পাশ করতে না পার তা হলে তােমাকে নীচের ক্লাসে নামিয়ে দেওয়া হবে।”—কীচনারের অত্যন্ত ভয় হইল; তিনি খুব মন দিয়া পড়িতে লাগিলেন। কিন্তু সমস্ত বৎসরের ক্ষতি আর কিছুতেই পূরণ করা গেল না। পরীক্ষায় তিনি ফেল হইলেন। তাঁহার পিতার ও যেই কথা সেই কাজ ; পুত্রকে তিনি নীচের ক্লাসেই নামাইয়া দিলেন এবং বলিয়া দিলেন, “আবার যদি তুমি ফেল হও, তবে তােমাকে এক টুপিওয়ালার কাছে পাঠিয়ে দেবো, তার কাছে তুমি টুপি তৈরী করতে শিখবে। সেইটে তােমার উপযুক্ত কাজ হবে।” কীচনারের মত আত্মসম্মান-জ্ঞানসম্পন্ন তেজস্বী বালকের পক্ষে নীচের ক্লাসে অবনমিত হওয়া একটা মস্ত অপমানজনক ঘটনা। কিন্তু ইহার ফল ভালই হইল। তিনি বুঝিলেন, মানুষের প্রথম কৰ্তব্যই প্রধান কর্তব্য ; অবশ্যকরণীয় কাজ ফেলিয়া কোনাে মহৎ চিন্তা বা মহৎ কাজের নেশা লইয়া থাকাও সকলের পক্ষেই অন্যায় এবং তাহার ফল কখনই ভাল হয় না। যে কর্তব্য সম্মুখে উপস্থিত তাহাই আগে সম্পন্ন করিতে হইবে এবং সাধ্যমত তাহা সুসম্পন্ন করিতে হইবে। কিছুদিন পরেই খবর পাওয়া গেল কীচুনার পড়াশুনায় বেশ পড়াশুনায় বেশ ভাল হইয়াছেন এবং গণিতে বিশেষ বুৎপত্তি লাভ করিয়াছেন। তাহাদের পিতা ঠিক করিলেন যে অন্ততঃ দুই ভাইকে সৈনিক বিভাগে ঢুকাইতে হইবে। তদনুসারে তাহাদের শিক্ষার জন্য বিশেষ বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন। প্রথমতঃ তাহাদিগকে ইউরােপে পাঠান ঠিক হইল ; সেখানে অন্যান্য নানাপ্রকার শিক্ষার সঙ্গে ৪ প্রথম পরিচ্ছেদ আধুনিক ভাষা শিক্ষার বেশ সুবিধা হইবে। তদনুসারে আর্থার ও হার্বার্টকে সুইজারল্যাণ্ডে পাঠান হইল। সেখানে জেনেভা হদের তীরে বেনেট সাহেবের বাড়ীতে তাহার শিক্ষার্থীরূপে আশ্রয় লইলেন। বেনেট সাহেব অতি যত্ন সহকারে তাহাদিগকে গণিত, ইতিহাস ও ফরাসী ভাষা শিক্ষা দিতে লাগিলেন। ফরাসী ভাষায় তাহারা কিছু কিছু কথাও বলিতে শিখিলেন। তা ছাড়া সন্তরণ, নৌচালন ও পর্বতারােহণে তাহারা বেশ দক্ষ হইয়া উঠিলেন। কয়েক বৎসর পর হার্বাটকে লণ্ডনে জর্জ ফ্রষ্টের নিকট পাঠান হইল। সমরবিদ্যালয়ে প্রবেশ করিবার পূর্বে একটা প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করিতে হইত। ফ্রষ্ট, সেই পরীক্ষার জন্য হার্বার্টকে ভাল করিয়া প্রস্তুত করিলেন এবং ১৮৬৮ খৃষ্টাব্দে হার্বার্ট, কৃতিত্বের সহিত সেই পরীক্ষা পাশ করিয়া সমরবিদ্যালয়ে প্রবেশ করিলেন। দুই বৎসর তিনি খুব মন দিয়া সামরিক বিষয়গুলি অধ্যয়ন করিলেন এবং শেষ পরীক্ষা বেশ ভাল মতেই পাশ করিলেন। সেই বিদ্যালয়ের ছাত্রগণের মধ্যে তিনি গণিতে বিশেষ পণ্ডিত বলিয়া বিখ্যাত ছিলেন। সেখান হইতে রয়ে এঞ্জিনিয়ারে প্রেরণ করিবার জন্য হার্বার্টকেই মনােনীত করা হয়; তখন তাহার বয়স মাত্র কুড়ি। কলেজে প্রবেশ করিবার পূর্বেই কীচনারের মাতার মৃত্যু হয়। তাঁহার পিতা তখন আয়লণ্ডের সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া ব্রিটানীতে ডিলা নামক স্থানে বাস করিতেছেন। দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করিয়াছেন। কলেজ ছুটি হইলে হার্বার্ট, সেইখানে চলিয়া যাইতেন এবং পিতাপুত্রে যুদ্ধবিষয়ক নানাপ্রকার আলােচনা হইত। এমন সময় ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সের সঙ্গে জার্মেনীর যুদ্ধ বাধিয়া তিনি তখন ৫ লর্ড কীচনার গেল। পিতাপুত্র উভয়ের সহানুভূতিই ছিল ফরাসীদের পক্ষে। যুবক কীর যুদ্ধে অভিজ্ঞক্তা লাভ করিবার অভিপ্রায়ে এই যুদ্ধে যােগদান করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। তদনুসারে তিনি ফরাসী গভর্ণমেন্টের নিকট আবেদন করিলেন, যেন তাহাকে সৈনিকরূপে গ্রহণ করা হয়। ফরাসী গভর্ণমেন্ট তাহাকে গ্রহণ করিলেন। সে যুদ্ধে ফরাসীদের পরাজয় ঘটিয়াছিল এবং ঠাণ্ডা লাগিয়া কীচনারের অসুখ করাতে যুদ্ধ শেষ হইবার পূৰ্বেই তিনি ভিলানে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই তিনি সামরিক জ্ঞানের ও সাহসের জন্য বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিলেন। একবার তিনি দুইজন কর্মচারীর সঙ্গে একটা বেলুনে উঠিয়া শত্রুপক্ষের সৈন্যবল ও গতিবিধি সম্বন্ধে অনেক মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলেন । এখনকার তথন এরােপ্লেন্ প্রভৃতি হয় নাই ; বেলুনে উঠিয়া শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করা তখন অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক কাজ ছিল। কিছুদিন পরে ফরাসী গভর্ণমেন্ট কীচনারকে পদস্থ কর্মচারী করিবার জন্য ডাকিয়া পাঠাইয়াছিলেন। কীচনার বলিয়া পাঠাইলেন, “আমার প্রথম কৰ্তব্য জন্মভূমির প্রতি।” তাই তিনি ফরাসী গভর্ণমেন্টের অধীনে চাকুরী করিতে গেলেন না। এদিকে ইংলণ্ডের সমসচীব কীচনারকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। কীচনার ইংরাজ গভর্ণমেন্টের অনুমতি ছাড়া ফরাসীদের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করিয়াছিলেন, সুতরাং শাস্তিস্বরূপ ইংলণ্ডের সৈনিকবিভাগে তাহাকে কর্মচারীরূপে নাও নেওয়া হইতে পারে। তাই সমসচীব তাহাকে ডাকাইয়া- ছিলেন। কীচুনারকে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ সম্বন্ধে তােমার কি বক্তব্য আছে। কীচনার উত্তর করিলেন, “আমি মনে করিয়াছিলাম স্বদেশের কোন কাজে আমার এখন প্রয়ােজন নাই, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ তাই এই ফাঁকে কিছু শিখিয়া লই।” তাহার এই সরল ও নির্ভীক উত্তরে সমরসচীব খুসী হইয়া কীচনারকে জুনিয়র লেফটেন্টের পদ প্রদান করিলেন। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ প্যালেষ্টাইনে তিন বৎসর খুব মনােযােগ ও পরিশ্রমের সহিত কাজ করিয়া তিনি বেশ সুনাম অর্জন করিলেন। কিন্তু বিদেশে যাইবার জন্য তাহার প্রাণ বড় ব্যাকুল ছিল। এমন সময় ভগবান বিদেশে যাইবার এক মুখােগ थान করিলেন। প্যালেষ্টাইন্ জরিপ করিবার জন্য লেফটেনান্ট করের অধীনে একটা দল সেখানে প্রেরিত হইতেছিল। কীচনার জরীপের কাজ খুব ভাল জানিতেন, তাই তাঁহাকেও এই সঙ্গে প্রেরণ করা হইল। তদনুসারে ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দে তাঁহার প্যালেষ্টাইনে গেলেন। সেখানে তাহারা অনেক বার অনেকপ্রকার বিপদের হাতে পড়িয়াছেন। তন্মধ্যে একটি ঘটনা বিশেষ স্মরণীয়। লেফটেনান্ট কণ্ডর এক জায়গায় তাঁবু করিয়াছিলেন। তখন তিনি ম্যালেরিয়ায় ভুগিতেছিলেন, কাজেই সন্ধ্যার পরেই তিনি শয্যা গ্রহণ করিয়াছিলেন। সহসা রুক্ষ কণ্ঠস্বরে তাহার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। তিনি বাহিরে গিয়া দেখিলেন আলখাল্লাপরা, পাগড়ীমাথায় একজন সেখ তাহার ভৃত্যদের উপর ঢিল ছুড়িতেছে। তাহার ভৃত্য হাবিব, একটা তঁাবু খাটাইতেছিল, সেই সে তঁাবু ধরিয়া টানাটানি করিয়াছে ও বলিয়াছে, “তােদের মত ঢের কুকুর আমি আরাে দেখেছি। শুছিস্? তােদের বলছি তােরা সব খৃষ্টান কুকুর। সেই সেথের নিকট অনেকগুলি লর্ড কীনার স্থানীয় লােক দাড়াইয়াছিল। হাবিব প্রথম বিশেষ কিছু মনে করে নাই কিন্তু যখন সে দেখিল তাহার রিভলভারটি নাই তখন সে একটু কড়া সুরেই কথা কহিয়াছিল। ইহার ফলেই সেহ্ আলি আষা আল্লাহ্ তাহার উপর ঢিল ছুরিতে আরম্ভ করিয়াছিল। কণ্ডর সাহেব তাহাকে বুঝাইয়া বলিবার জন্য অগ্রসর হইলেন কিন্তু তিনি অগ্রসর হইবামাত্র সেখ আলি আঘা লাফাইয়া আসিয়া তাহার উপরে পড়িল এবং দুই হাতে করের টুটি টিপিয়া খুব জোরে ঝাঁকানি দিতে লাগিল। আর গালাগালির ত অন্তই ছিল না। কগুরের সঙ্গে কোনাে অস্ত্র ছিল না ; বেগতিক দেখিয়া তিনি এক ঘুসীতে আঘা আল্লাকে ভূমিশায়ী করিলেন। ধূলা ঝারিয়া সেখজি উঠিয়া গেলেন। কণ্ডর মনে করিয়াছিলেন লােকটা চলিয়া গেল বুঝি। কিন্তু পর মুহূর্তেই সে একটা হিংস্র জন্তুর মত তাহাকে তাড়া করিয়া আসিল। তিনি এবারেও তাহাকে ঘুসী মারিয়া ফেলিয়া দিলেন। তখন দেখা গেল সেখের বাম হন্তে এক ভীষণ হাের লুক্কায়িত ছিল। কগুরের দলের লােক অগ্রসর হইয়া সেখাকে বাঁধিয়া ফেলিল এবং তাহার হাতের ছোয়া কাড়িয়া নিল। অপমানিত হইয়া, সেখের ক্রোধ আরও বাড়িয়া গেল। সে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল “আমার ছােরারা কোথায় গেল ?”—এই কথা শুনিয়াই কত গুলি লােক সেখের দলের লােকদিগকে আনিবার জন্য সহরের দিকে দৌড়িয়া গেল, আর যাহারা সেখানে রহিল তাহারা সকলেই নানা প্রকার কুৎসিৎ গালাগালি দিতে লাগিল। লাগিল। কণ্ডর সেখকে ছাড়িয়া দিতে অনুমতি দিলেন। কিন্তু ইহাতেও লােক গুলি আশ্বস্ত হইল না ; তাহারা তখনাে তাবুতে ঢিল ছুড়িতে লাগিল। ক ওর গভর্ণরকে খবর দিবার জন্য হাবিবকে পাঠাইলেন কিন্তু হাবিব যাইতে পারিল না ; লােক গুলি তাহাকে ছিড়িয়া খাইবার উপক্রম করিয়াছিল কিন্তু সেখের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হুকুমে নিরস্ত হইল। কওর তখন অন্য একজন লােককে গুপ্তপাথে গভর্ণরের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। কীচুনারও জনতাকে শান্ত করিতে প্রয়াস পাইলেন কিন্তু তিনি বেশী সচেষ্ট ছিলেন তাহার দলস্থ লােকগুলিকে থামাইবার জন্য। তাহারা যুদ্ধ করিবার জন্য একেবারে ক্ষেপিয়া উঠিয়াছিল। ঘােড়ার সই বন্দুকে গােল ভরিতেছিল, কীচনার বন্দুকটা কাড়িয়া নিলেন। কীচনারের শরীরে অনেক ঢিল আসিয়া পড়িয়াছে তথাপি তিনি কিছুমাত্র উত্তেজিত হন নাই । এখন সময় একজন তুকি পুলিস দেখিয়া সকলের মনেই একটু জল আসিল। কিন্তু পুলিস প্রভু বেগতিক দেখিয়া পরিপাটি চম্পট প্রদান করিলেন। দেখিতে দেখিতে আগার দলস্থ লােক আসিঙ্গা উপস্থিত হইল এবং আসিয়াই আক্রমণ আরম্ভ করিল। তাহাদিগকে কিছুতেই নিরস্ত করা গেল না। কীচনার ভৃত্যগণের সাহায্যে সেই আক্রমণ প্রতিরােধ করিতেছিলেন। কর তাহাদিগকে সাহায্য করিবার জয় অগ্রসর হইয়াছিলেন কিন্তু এক পাপিষ্ঠের যষ্টির আঘাতে তাহার মাথা ফাটিয়া দরজর ধারে রক্ত পড়িতে লাগিল। পাপিষ্ঠ তাঁহার মস্তকে দ্বিতীয়বার আঘাত করিবার জন্য লাঠি উত্তোলন করিয়াছিল, কিন্তু মাথা সরাইয়া লইলেন, আঘাত তাহার ঘাড়ের উপর পড়িল। তিনি মাটিতে পড়িয়া গেলেন। তিনি মারা পড়িয়াছেন মনে করিয়া শত্রুরা উল্লাস ধ্বনি করিয়া উঠিল। কগুর ধূলা ঝাড়িয়া উঠিয়া পড়িলেন ; উঠিয়াই সেই লােকটার মুখে চাবুক দিয়া এমন আঘাত করিলেন যে বেচারী চোখে একেবারে অন্ধকার দেখিল আর চাবুকটা কওয়ের হাত হইতে ছুটিয়া গেল। কর তখন একেবারে নিরস্ত্র, কীচনারের সাহায্য না পাইলে কওর সে যাত্রা নিশ্চয়ই প্রাণ হারাইতেন।

লর্ড কীচুনার পারিল না ; তাহাকে বাঁচাইতে গিয়া কীনার মস্তকে ও বাহুতে গুরুতর আঘাত পাইলেন। তাহাকে শত্রুর বেষ্টন করিয়া ফেলিয়াছিল, কি করিয়া যে তিনি বাঁচিলেন তাহা বলা কঠিন। যাহাহােক, অবশেষে তাহারা একটা ছােট পাহাড়ের পদতলে গিয়া আশ্রয় লইলেন। তাহাদের উপর আক্রমণের বিরাম হয় নাই। কীচনারকে লক্ষ্য করিয়া একটা গুলি করা হইয়াছিল, সেটা ভে করিয়া তাহার কাণের পাশ দিয়া চলিয়া গেল। সহসা দেখা গেল আততায়ীরা একে একে পলায়ন করিতেছে। ইহার কারণ বুঝিতে বিশেষ বিলম্ব হইল না ; কারণ দেখা গেল ইংরাজ রাজ প্রতিনিধি কতগুলি সৈন্য লইয়া সেই দিকে অগ্রসর হইতেছেন। কিন্তু পলায়ন করিয়া তাহারা বাঁচিতে আলি আবা আল্লানের নয় মাস কারাদণ্ড হইল ; তাহার নিগ্রো ক্রীতদাসের দুই বৎসরের কারাদণ্ড হইল এবং সেই সরবাসীরা প্যালেষ্টাইন্ ফাণ্ডে প্রায় ৪০০০ টাকা জরিমানা প্রদান করিল। ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে এই সাফে সহরে কীচনার আবার প্রবেশ করিলেন । এবার এই সার্ভেপার্টির কর্তা ছিলেন তিনি; কারণ কণ্ডর অসুস্থতার জন্য লণ্ডনে রহিয়া গিয়াছিলেন। কীচনার যখন সাফেদে প্রবেশ করিলেন তখন তাহাকে সকলে অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া গেল। আথা আল্লানের সঙ্গেও তাহার দেখা হইল। সে তখন কারাগার হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছে। আধা আল্লানের মন তখন আত্মধিকারে পূর্ণ ; সে কীচনারের সম্মুখে নিজকে এমন অজস্র গালি দিতে লাগিল যে কীচনার হাস্য সম্বরণ করিতে পারেন নাই। প্যালেষ্টাইনে পৌছিয়াই কীচনার জরিপের কাজে মন দিলেন। তাহার সেই কর্মব্যস্ততার ইতিহাস শুনিলে বিস্মিত হইতে হয় । মাসের মধ্যে তিনি সমস্ত কাজ এমন সুন্দররূপে সমাধা করিলেন যে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ তাহাতে তিলমাত্র ত্রুটি রহি না। কীচনার যখন যে কাজে মন দিতেন তখন তাহাতেই একেবারে তন্ময় হইয়া যাইতেন সৰ্বাঙ্গসুন্দররূপে শেষ করিবার পূর্বে তিনি কদাপি বিশ্রাম করিতেন না। তিনি নিজে যেমন খাটিতেন অন্যকেও তেমনি খাটাইতেন। কৰ্ম্মই ছিল তাহার জীবনের ব্রত। তাঁহার মত কৰ্ম্মী-পুরুষ জগতে সচরাচর দেখা যায় না। এই কৰ্ম্ম-কঠোরতার জন্যই লােকে তাঁহাকে রুক্ষ, নীরস একটা কৰ্ম্মযন্ত্রমাত্র মনে করিত। কিন্তু তাহার ভিতরকার মানুষটির সহিত যাহারা পরিচিত তাহারা জানে যে তাহারও হৃদয় বলিয়া একটা জিনিষ ছিল এবং তাহাতে সহানুভূতি, অনুকম্পা প্রভৃতি মানবীয় গুণের অসদ্ভাব ছিল না। প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করিবার ক্ষমতা তাঁহার ছিল। গােলাপ ফুল তিনি বড় ভালবাসতেন। তাহার কতকগুলি চিঠিপত্র হইতে জানা যায় যে প্রকৃতির সৌন্দৰ্য্যদৃশ্য তাহার দৃষ্টি এড়াইত না এবং সেই দৃশ্যটিকে তিনি কয়েক কথায় বেশ আঁকিয়া ফেলিতে পারিতেন। তাঁহার মধ্যে কবিত্ব ছিল না বটে কিন্তু কবিত্ব উপলব্ধি করিবার শক্তিটুকু ছিল। তবে একথা স্বীকার করতেই হইবে যে এই সৌন্দর্য্য ও মস সরসতার দিকটা তাহার প্রকৃতিতে খুব ক্ষুদ্র স্থান অধিকার করিয়াছিল। কীচনার-চরিত্রের বিশেষত্ব ছিল তাহার কর্তব্যপরায়ণতা, তাঁহার কৰ্ম-মুখীনতা এবং তাহার কর্মব্যস্ততা। কৰ্ম্ম এবং কর্তব্য,-এই দুইটি ছিল তাঁহার জীবনের মূল মন্ত্র। তিনি যে এত বড় হইয়াছিলেন সে কেবল এই দুইটি গুণ ছিল বলিয়া। বাস্তবিক পক্ষে কীচুনার যে, একজন কর্মযােগী পুরুষ ছিলেন সে বিষয়ে আর সন্দেহ কি ! প্যালেষ্টাইনে তিনি এত পরিশ্রম করিতেন যে তাহার আহার নিদ্রার সময় ছিল না। এদিকে এই পরিশ্রম অন্যদিকে খাদ্যাভাব।

লর্ড কীচুনার ; সেখানে তাহাদের উপযুক্ত খাদ্য পানীয় কিছুই পাওয়া যাইত না। তদুপরি মাঝে মাঝে তাহার ম্যালেরিয়া হইত ; একবার সর্দি-গৰ্মিও হইয়াছিল, কিন্তু তিনি কিছুতেই দমিলেন না ; দুর্বার গতিতে আপনার কাজ করিয়া যাইতে লাগিলেন। সে সময় আবার তুকি ও কৃষিয়ার মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়াছিল। যুদ্ধ যদি ও তুর্কি আর রুষিয়ার মধ্যে কিন্তু তুর্কিরা মনে করিত ইহা যেন খৃষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে একটা ধম্মযুদ্ধ। কীচনারের ভয় হইল- কি জানি যদি হঠাৎ একদিন সমস্ত মুসলমান ক্ষেপিয়া খৃষ্টানদিগকে সংহার করিতে আরম্ভ করে ! তাই তাহাকে বড় সাবধানে চলিতে হইত। তিনি স্থানীয় লােকদের ভাষা ও আচার ব্যবহার শিক্ষা করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। মুসলমানদের মত তিনিও তখন লম্বা দাড়ি রাখিয়াছিলেন। শ্মশ্রুশােভিত কীচনার যখন আলখাল্লা পরিয়া বাহির হইতেন তখন তাহাকে একজন মােল্লা বলিয়া ভ্রম হইত। তিনি সুন্দর আরবী ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। এই সমস্ত কারণে তিনি স্থানীয় লােকের বেশ প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিয়াছিলেন। উত্তরকালে কীচনার যে প্রাচ্যভূভাগে এমন আধিপত্য বিস্তার করিতে পারিয়াছিলেন এখানেই তাহার কারণ নিহিত রহিয়াছে। যে শিক্ষার বলে তিনি প্রাচ্যজাতিসমূহকে চিনিতে পারিয়াছিলেন এখানেই সেই শিক্ষার আরম্ভ। এই শিক্ষা না পাইলে কীচুনার কখনই এমন বিজয়ী হইতে পারিতেন না। তৃতীয় পরিচ্ছেদ এশিয়া মাইনরে কীচনার প্যালেষ্টাইনের কাজ শেষ করিয়া যখন লণ্ডনে তৃতীয় পরিচ্ছেদ ন ফিরিলেন, তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে তখন ভীষণভাবে যুদ্ধ চলিতেছে। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই সন্ধি হইয়া গেল। জার্মেণীর রাজধানী বাগিন নগরে ইউরােপের প্রধান জাতিসমূহের প্রতিনিধিবর্গ মিলিয়া ঝগড়াটা মিটমাট করিয়া দিলেন। লর্ড, বকস্ ফিল্ড, তখন ইংলণ্ডের রাজমন্ত্রী। তিনি অতি তীক্ষ্ণবুদ্ধিশালী লােক ছিলেন। তিনি সেই সময় তুরস্কের সঙ্গে গােপনে একটা বন্দোবস্ত করিলেন যে কতগুলি বিশেষ অবস্থায় আবশ্যক হইলে ইংলণ্ড তুরস্ককে যুদ্ধব্যাপারে সাহায্য করিবেন এবং তার বিনিময়ে তুরস্কের সম্রাট ইংলণ্ডেশ্বরকে সাইপ্রাস দ্বীপ ছাড়িয়া দিলেন। সাইপ্রাস ভূমধ্যসাগরে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। উহা ১৪১ মাইল দীর্ঘ এবং ৬০ মাইল প্রশস্ত। এসিয়া মাইনর হইতে এই দ্বীপ ৬০ মাইল দূরে অবস্থিত। ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে ইহা ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের হস্তগত হয়। ইহা কিরূপে প্রথম ইংরেজরাজের দখলে আসে সে সম্বন্ধে একটি সুন্দর গল্প আছে। সুলতানের নিকট হইতে দ্বীপটি গ্রহণ করিবার জন্য নৌসেনাপতি লর্ড, হােতাহার নৌবহর লইয়া সাইপ্রাসে গমন করেন ; গিয়া দেখেন সেখানকার শাসনকর্তা তখন পর্যন্ত সুলতানের নিকট হইতে এ সম্বন্ধে কোনো আদেশ বা সংবাদ পান নাই। হােক, ইংরেজ সৈনিকেরা দ্বীপে অবতরণ করিল এবং সেখানে ব্রিটেনের জাতীয় পতাকা উডীন করিল, কেহ কোনো আপত্তি করল না। এই দ্বীপের রাজধানীর নাম ‘নাইকোশিয়া। লর্ড হােপ যেখানে অবতরণ করিয়াছিলেন নাইকোশিয়া সেখান হইতে ২১ মাইল দূরে। হাে মনে করিলেন, রাজধানীটাও দখল করা দরকার। সেখানে তুরস্ক গভর্ণমেন্টের সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল ; হােপ দেখিলেন সসৈন্যে সেখানে গেলে হয়ত একটা মারামারি কাটাকাটি হইবে, সুতরাং তিনি একটা কী আঁটিলেন। তিনি শুনিয়াছিলেন নাইকোশিয়ার কর্মচারী ও যাই- লর্ড কীছনার সৈনিকেরা কয়েক মাস যাবৎ তাহাদের বেতন পাইতেছে না। তিনি আগে সেখানে লােক পাঠাইয়া খবর দিলেন যে তাহাদের প্রাপ্য অর্থ তাহাদিগকে দেওয়ার জন্যই তিনি আসিতেছেন। তারপর কতগুলি গাধার পিঠে নূতন ছ’পেনী বােঝাই করিয়া তিনি সৈন্যদের সঙ্গে যাত্রা করিলেন। পেনী আমাদের ছয় আনার সমান। টাকশাল হইতে সেগুলি সবে মাত্র প্রস্তুত হইয়া আসিয়াছিল—তাই পেনীগুলি ঝক ঝ করিতেছিল। হোপ যখন রাজধানীতে পৌছিলেন তখন তুরস্ক সৈন্যেরা তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া গেল, এবং আদর করিয়া চা পান করিতে দিল। তুরস্কের জাতীয় পতাকা আগন্তুকদের সম্মানার্থে অবনমিত করা হইল এবং ব্রিটেনের ইউনিয়ান্ জ্যাক উড্ডীন হইল। এইরূপে সাইপ্রাস্ দ্বীপ আপােযেই দখল হইয়া গেল। সুতরাং ওলী যখন সসৈন্যে সেই দ্বীপ দখল করিতে গেলেন তখন তিনি দেখিলেন যে দ্বীপটি তৎপূৰ্বেই তাহাদের করতলগত হইয়া গিয়াছে। তুরস্কের সুলতানের নিকট হইতে যাহারা দ্বীপটি ইংরেজহস্তে অৰ্পণ করিতে আসিয়াছিলেন তাঁহারাও সেনাপতি হােপের কাণ্ড দেখিয়া বিস্ময়ে অবাক হইয়া গেলেন। সাইপ্রাস ইংরেজের হস্তগত হইলে দেখা গেল যে উহায় কোনাে ভাল ম্যাপ, বা মানচিত্র নাই, সেখানে ভাল রাস্তাঘাট নাই, লােক চলাচলের অসুবিধা সৰ্ব্বত্রই। এই সমস্ত কাজের ভার কীচারের উপর পড়িল। ম্যাপ প্রস্তুত করিতে তিনি খুব সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এই কাজের সঙ্গে তাহাকে আরাে অনেক কাজ করিতে হইয়াছিল। রাস্তাঘাট প্রস্তুত করা, বনজঙ্গল কাটিয়া পরিষ্কার করা প্রভৃতি কাজে তাঁহাকে সাহায্য করিতে ত হইতই, তা ছাড়া দেশীয় লােকদের ঝগড়া ঝাটির মীমাংসা করা ও ইংরেজের নুতন আইন সেখানে প্রবর্তন ১৪ তৃতীয় পরিচ্ছেদ • করা তাঁহাকে ছাড়া চলিত না। তিনি আরবী ভাষা জানিতেন বলিয়া এ সমস্ত কাজে তাহার মত পারদর্শী আর কেহ ছিল না। এই ভাবে একবৎসর কাজ করিবার পর সহসা এসিয়া মাইনরে তাহার ডাক পড়িল। রুফিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের পর এসিয়া মাইনরের অবস্থা নিতান্ত শােচনীয় হইয়া উঠিয়াছিল। সেখানকার লোকেরা খাদ্যাভাবে, পানীয়ভাবে এবং আশ্রয়াভাবে মরিতেছিল। চারিদিকে দুর্ভিক্ষ, মড়ক এবং চোর দস্যুর উপদ্রব আরম্ভ হইয়াছিল। তুরস্ক গভর্ণমেন্ট কিছুতেই সেখানে শান্তিসংস্থাপন করিতে পারিতে ছিলেন না। ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট তখন তুরস্করাজকে সাহায্য করিবার জন্য হস্ত প্রসারিত করিলেন । সার চার্লস উইলস এই কাজে নিযুক্ত হইয়াছিলেন ; তিনি কীনারের সাহায্য চাহিয়া পাঠাইলেন। তদনুসারে কীনার এসিয়া মাইনরে গেলেন এবং সেখানে দুইবৎসর কাজ করিলেন। কীচারের কাজ করিবার ক্ষমতা কিরূপ অদ্ভুত ছিল এই দুই বৎসরে তাহা বুঝা গেল। দেশের সকল অভাব অভিযােগ যেন যাদুমন্ত্রে দুর হইয়া গেল। সমস্ত লােক কীচনারের নিকট কৃতজ্ঞ হইয়া রহিল ; সুলতান তাহার কাৰ্যে খুসী হইয়া মুসলমানের সকল তীর্থস্থানে তাহাকে ভ্ৰমণ করিবার অনুমতি বা ‘ফারমা দিলেন। পরবর্তী কালে এই অনুমতি কীনারের অনেক কাজে লাগিয়াছিল, তাহা আমরা যথাস্থানে দেখিতে পাইব। এসিয়া মাইনরের কাজ শেষ করিয়া কীচনার আবার সাইপ্রাসে গেলেন। সেই সময় হইতে সাইপ্রাস্ দ্বীপ নামেমাত্র তুরস্কের অধীনে ছিল ; কাৰ্য্যত ইংরেজেরাই ছিলেন সেখানকার সব। কিন্তু ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে যখন ইংরেজরাজ তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন তখন হইতে এই দ্বীপ সৰ্বতােভাবে ইংরেজের অধীনে আসিয়াছে—এখন আর ইহার সঙ্গে তুরস্কের কোনো সম্পর্ক নাই। w লর্ড কীচুনার তুরস্কের অধীনতা ১৮৮২ খৃষ্টাব্দে কীচনার ছুটি লইয়া সাইপ্রাস্ হইতে মিশরে গমন করেন। মিশরের রাজনৈতিক গগনে তখন কালােমেঘ ঘনাইয়া আসিয়াছিল, সকলেই বুঝিতে পারিয়াছিল অচিরেই ঝড় উঠিবে। মিশরে মিশরের তদানীন্তন শাসনকর্তাকে “খেদিব” বলিত। খেদিবের ক্ষমতা আমাদের বড়লাট অপেক্ষা কিঞ্চিৎ বেশী অর্থাৎ তিনি কোনাে রাজা বা সম্রাটের প্রতিনিধি ছিলেন না, তিনি নিজেও একজন রাজাই ছিলেন, তবে কিনা তাঁহার স্বাধীনতা ছিল না; তিনি তুরস্কের সুলতানের অধীনতা স্বীকার করিতেন। সুলতানকে তিনি প্রতিবৎসর কর দিতেন, সুতরাং তাহাকে করদ রাজা বলা চলে। মিশরের লােক খেদিবের শাসনাধীনে সুখে ছিল না । স্বীকার করাটাকেও তাহারা অপমানজনক মনে করিত। তাহাদের ইচ্ছা ছিল তাহারা একটা স্বাধীন মিশর রাজ্য স্থাপন করিয়া নিজেদের শাসনাধীনে বাস করে। এই উদ্দেশ্যে সেখানে একটা দলের সৃষ্টি হয়; সেই দলের নায়ক ছিলেন আবি পাশা। আরবি পাশা খেদিবের অধীনে সমসচীবের কাজ করিয়াছিলেন ; তিনি বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লােক ছিলেন। সুতরাং মিশরের সৈনিক কস্মচারীদিগকে যখন তিনি হাত করিয়া ফেলিলেন তখন তিনি হইলেন সেখানকার সৰ্ব্বময় কর্তা। খেদিবকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া সেখানে অন্যলােক বসাইবার জন্য একটা ষড়যন্ত্র চলিল। খেদিব অগত্যা বাধ্য হইয়া মিশরের রাজধানী কাইরো ছাড়িয়া আলেকজান্দ্রিয়াতে চলিয়া গেলেন। আরবি পাশার ক্ষমতা এত বাড়িয়া গেল যে তিনি আলেক- জান্দ্রিয়ার দুর্গগুলি মেরামত করাইতে আরম্ভ করিয়া দিলেন। সুলতান তৃতীয় পরিচ্ছেদ নিষেধ করিয়া পাঠাইলেন, আকৃবি প্রথমে সেই আদেশানুসায়ে দুর্গের কাজ বন্ধ রাখিয়াছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই আবার তাহা আরম্ভ করিয়া দিলেন। কীচনার তখন আলেকজান্দ্রিয়াতে ছিলেন ; যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী দেখিয়া সেখান হইতে তাহার যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। তিনি আরো ছুটির জন্য সাইপ্রাসে আবেদন করিলেন। তাঁহার সেই আবেদন মঞ্জুর হইল না কিন্তু কীচনার যখন সেই সংবাদ পাইলেন তখন আর সাইপ্রাসে ফিরিয়া যাওয়ার উপায় নাই। কর্তৃপক্ষ অগত্যা বাধ্য হইয়া তাহাকে ছুটি দিলেন। ইংরেজ সেনাপতি সেমূর যুদ্ধের আয়ােজন বন্ধ করিবার জন্য আবি পাশাকে খবর দিলেন ; তাহারা বলিয়া পাঠাইল যে তাহা বন্ধ করা হইয়াছে। অবশেষে যখন দেখা গেল যে তাহাদের সেই সংবাদ মিথ্যা, তখন যুদ্ধ করাই উচিত বিবেচিত হইল। তদনুসারে ১১ই জুলাই ইংরেজ রণতরী আলেকজান্দ্রিয়া সহর আক্রমণ করিয়া তাহার উপর গুলি চালাইতে লাগিল। সমস্তদিন যুদ্ধের পর সন্ধ্যা ৬টার সময় ইংরেজদেরই জয় হইল ; শত্রুপক্ষের সকল গুলি কামান তখন নীরব হইয়া গিয়াছে। এই যুদ্ধে কীচনার উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ইভিসিবল বা জয় নামক রণপােতে। একবার তিনি খুব অল্পের জন্য বাঁচিয়া গিয়াছিলেন। একটা গােল। তাহার মাথায় এত নিকট দিয়া চলিয়া গেল ৰে তাহার বাতাসের ধাক্কায় তিনি একেবারে পড়িয়া গেলেন। গােলাটা তাঁহার পিছনে একজন নাবিকের উপর পতিত হয়, তাহাতে নাৰিকটির মৃত্যু ঘটে। যখন এইরূপ যুদ্ধ চলিতেছিল সেই সময় মিশরের সৈনিকের খেজিবের প্রাসাদে আগুণ ধরাইয়া গিয়াছিল। পরদিন এতে দেখা গেল কেহ কেহ ভগ্নদুর্গগুলি মেরামত করিবার আয়ােজন করিতেছে। ইংরেজের রণপাত হইতে কয়েকটি গুলি চালনা করাতেই তাহা সেই লর্ড কীচনার ১৭ চেষ্টা হইতে নিরস্ত হইল। কিন্তু সুলেমান্ পাশা নামক আৰি পাশারই একজন সহকর্মী জেলখানা খুলিয়া দিয়া সকল কয়েদিদিগকে ছাড়িয়া দিলেন। তাহারা মুক্তি ও সুযােগ পাইয়া চারিদিকে লুট পাট আরম্ভ করিয়া দিল। দেখিতে দেখিতে সমস্ত সহর আগুনে ছাইয়া ফেলিল। আরবি পাশার সৈন্যেরা ও সহরের নানা স্থানে অগ্নিসংযোেগ করিয়া সহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। সুলেমান পাশা এই সব অগ্নিকাণ্ডের মূল উৎসাহদাতা ছিলেন। যেখানে দাড়াইয়া তিনি এই কাজে উৎসাহ দিয়া- ছিলেন অবশেষে সেইখানেই প্রকাশ্যভাবে তাহাকে ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলান হয়। যাই হােক, ব্রিটিশ সৈন্যেরা সহরে অবতরণ করিয়া সেখানে শৃঙ্খলা ও শান্তি স্থাপন করিল। কীচুনারকে আর সাইপ্রাসে ফিরিয়া যাইতে হইল না, কারণ মিশরে তখন আরবী ভাষা জানা লােকের দরকার ছিল, সুতরাং কীচুনার মিশরেই রহিয়া গেলেন। এদিকে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট ঠিক করিলেন যে খেদিবকে সাহায্য করিয়া আরুবী পাশাকে দমন করিতে হইবে। তদনুসারে উল্লীর অধীনে একদল সৈন্য প্রেরিত হইল । প্রায় একমাস যুদ্ধ চলিল। আরূবী পাশার অধীনে এবার বেশ সুশিক্ষিত সৈন্য ছিল ; তাহার অস্ত্র শস্ত্রও ছিল যথেষ্ট, কাজেই সে ব্রিটিশ সৈন্যকে খুব বাধা প্রদান করিতে লাগিল। কিন্তু অবশেষে তেলেকবিরে বেশ একটা বড় রকমের যুদ্ধ হয়, সেই যুদ্ধে আরূবী পাশ পরাস্ত হইয়া ইংরেজের নিকট আত্মসমর্পণ করে। ইহার পর আরবী পাশার বিচার হয় এবং তাহাতে সে বিদ্রোহী বলিয়া প্রমাণিত শাস্তিস্বরূপ তাহাকে লঙ্কাদ্বীপে নির্বাসিত করা হয় ; সেখানে সে ১৯০১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল ; তৎপর দেশে গিয়া তাহার মৃত্যু ঘটে। এই যুদ্ধে কীচনারের অনেক শিক্ষা হয়। মরুভূমিতে কেমন করিয়া যুদ্ধ করিতে হয়, কীচনার এবার তাহা ভাল করিয়াই শিখিলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ ইংরেজ সৈন্তের সাদাপােষাক দেখিয়া শত্রুপক্ষ সহজেই তাহাদিগকে হইতে লক্ষ্য করিতে পারিত, সেই জন্য অবশেষে তাহাদের পােষাক লি চা এবং তামাকের জলে ভিজাইয়া লইতে হইয়াছিল। তাহার পর হইতেই থাকী পােষাকের সৃষ্টি। সৈন্যদিগকে খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে অনেক কষ্ট পাইতে হয়। অনেক সময় বাধ্য হইয়া তাহাদিগকে ডােবার কাদাজল পান করিতে হইয়াছে। এদিকে আবার ঘােড়াগুলিও খাইতে না পাইয়া অকর্মণ্য হইয়া পড়িয়াছিল । জিনিসপত্র চালান করিবারও সুবিধা ছিল না ; রেলওয়েগুলি সব আরবী পাশ দখল করিয়া বসিয়াছিল। অবশেষে যখন ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট তাহাদের সাহায্য করিবার জন্য যুদ্ধ সাজে সজ্জিত কত গুলি ট্রেন্ পাঠান তখন তাহাদের সকল অসুবিধা দূর হইয়া গেল। রণপােতের মত সজ্জিত সমর-শকট যুদ্ধে এই প্রথম ব্যবহৃত হইল। বালুভরা ছালা ট্রেনের উপরে রাখা হইয়াছিল, ইহার উপর শত্রুর গােলা পড়িয়া গাড়ীর কোনাে ক্ষতিই করিতে পারে না। তা ছাড়া ট্রেনের দেহ রক্ষার আরাে নানা প্রকার বন্দোবস্ত ছিল। এদিকে সবগুলি ট্রেনেই কামান বসান। এই ট্রে- গুলি গিয়াই শত্রুপক্ষকে অত্যন্ত জব্দ করিয়া ফেলে। আরবী পাশার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হইয়া গেলে ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট ঠিক করিলেন সেখানে তাহারা ১২০০০ হাজার সৈন্য রাখিবেন। সৈন্যৰলের সাহায্যে খেদিবের গভর্ণমেন্টও বজায় থাকিবে, সময় সময় যে সব বিদ্রোহ ও অরাজকতা দেখা দেয় সে সবও দমন করা চলিবে,-- ইহাই ছিল ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের উদ্দেশ্য। ইহা ছাড়া সেখানকার স্থানীয় লোক লইয়া একটা সৈন্যদল গঠনের প্রস্তাবও ঠিক হইল। কীচুনার হইলেন অশ্বারােহী সেনাদলের দ্বিতীয় সেনাপতি। একদল নিতান্ত আনাড়ি লােককে শিক্ষা দেওয়ার ভার তাহার উপরে পড়িয়াছিল।

লর্ড কীচুনার তিনি তাঁহার সমস্ত কাজ এমন সুন্দরভাবে সম্পন্ন করিয়াছিলেন যে অল্পদিনেই কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি তাহার উপর পতিত হয়। তিনি যে কালে বিশেষ খ্যাতি লাভ করিবেন এ কথা তখন অনেকেই বলিয়াছিল। চতুর্থ পরিচ্ছেদ মাদীর অদ্ভুদয় আব্বানীয়ায় মহম্মদ আলি নামে একজন বিখ্যাত তামাকের মহাজন ছিল। যে বৎসর নেপােলিয়া ও ওয়েলিংটনের জন্ম হয় ঠিক সেই বৎসর মহম্মদ আলিরও জন্ম হয়। মহম্মদ আলি অত্যন্ত ক্ষমতাশালী লােক ছিলেন। তিনি প্রথমে তুরস্কের সুলতানের প্রতিনিধি হইয়া মিশর শাসন করিতেন, অবশেষে বিদ্রোহী হইয়া তিনি সীরিয়া জয় করেন এবং কষ্টান্টিনােপ পর্যন্ত আক্রমণ করিতে চেষ্টা করেন। একমাত্র রুশিয়ার ভয়েই এই শেষােক্ত কাজ হইতে তাঁহাকে বিরত হইতে হয়। ইহার কিছুদিন পর ইংলণ্ড ও ফ্রান্স, সীরিয়া ত্যাগ করিবার জন্য মহম্মদ আলিকে বাধ্য করেন এবং তাহাদের অভিপ্রায় অনুসারে তিনি আবার সুলতানের প্রতিনিধি হইয়া মিশর শাসন করিতে থাকেন। তঁাহার অধীনে মিশরের ব্যবসা বাণিজ্য বিশেষ উন্নতি লাভ করে। তিনি সুদান রাজ্য জয় করিয়া খাটুমে তাহার রাজধানী স্থাপন করেন। খার্ট দাসব্যবসায়ের একটা কেন্দ্রস্থান হইয়া উঠে। মহম্মদ আলির পুত্র সৈদ পাশা যখন শাসনকর্তা তখন তিনি ফরাসীদিগকে সুয়েজ খাল খনন করিবার অনুমতি প্রদান করেন। সৈদ পাশার পর ইসমাইল পাশা শাসনকর্তা হন। তিনিই প্রথম “খেদিব” চতুর্থ পরিচ্ছেদ উপাধি লাভ করেন। “খেদিব” একটা পাশী শব্দ ; ইহার অর্থ “যুবরাজ।” এই উপাধি পাওয়ার জন্য ইনি সুলতানকে ৯ লক্ষ টাকার স্থলে ৯৯ লক্ষ্য ৭৫ হাজার টাকা কর দিতে সম্মত হন। ইহা ছাড়া তিনি আরাে নানারূপ অমিতব্যয়িতার কাজ করিয়া এত অর্থাভাবে পতিত হন যে সুয়েজ খালে তাঁহার যে অংশ ছিল তাহা তিনি ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের নিকট বিক্রয় করিয়া ফেলেন। যে মূল্যে তিনি সেই অংশ বিক্রয় করিয়াছিলেন আজ সেই অংশের মূল্য তদপেক্ষা পাচগুণ বর্ধিত হইয়াছে। মানুষ একবার অমিতব্যয়ী হইলে তাহার আর অর্থে কুলাইয়া উঠে না। যত উপায়েই সে অর্থোপার্জন করুক না কেন, তাহার অভাব কোনােদিন দূর হয় না। কাজেই তাহার দুরবস্থা অবশ্যম্ভাবী এবং শেষে এমন এক দিন আসে যখন আর কিছুতেই আবশ্যকীয় অর্থের জোগাড় হয় না। ইস্মাইল পাশার ও তাহাই হইল। প্রজাদের নিকট হইতে নানারূপ অত্যাচার করিয়া অর্থশােষণ করিয়াও তঁাহার অভাব অনটন দূর হইল না, অবশেষে তাহাকে দেউলিয়া হইতে হইল। গতিক দেখিয়া রাজস্বের আয়ব্যয়ের ভার ইংরেজ ও ফরাসী গভর্ণমেন্টের প্রতি- নিধিদের উপরে পড়িল। তাহারা দেখিলেন ইসমাইল পাশাকে না তাড়াইলে চলিতেছে না। তদনুসারে তাহার স্থলে তাহার পুত্র তুফি পাশাকে “খেদিব” করা হইল। এই ফিক্‌ পাশার সময়েই আৰি পাশার বিদ্রোহাগ্নি জ্বলিয়া উঠিয়াছিল। মিশরে শান্তি স্থাপিত হইল বটে কিন্তু সুদানে আবার অশান্তির অনল জ্বলিয়া উঠিল। দেশীয় সৈন্যের সুদান দখল করিয়া বসিয়া রহিল। এদিকে মহম্মদ আমে নামে এক ব্যক্তি “মাদী” উপাধি ধারণ করিয়া বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। সেখানে মুসলমানেরা ভগবানের অবতারকে লর্ড কীচুনার “মাদী” বলে। গোড়া মুসলমানগণ বলিতে লাগিল, লােকটা অবতার নহে, প্রতারক মাত্র ; কেহ তাহাকে “মিথ্যা অবতার” নামে অভিহিত করিতে লাগিল। কিন্তু সুদানের সাধারণ লােকেরা তাহাকে অবতার বলিয়াই বিশ্বাস করিল এবং তাহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে লাগিল। এই মাদী একটা সাধারণ লােকের সন্তান ; তাহার পিতার ব্যবসা ছিল নৌকা প্রস্তুত করা। উঙ্গোলা নামক স্থানে তাহাদের বাড়ী ছিল। সুশাসনের অভাবে সকল লােক মিশর গভর্ণমেন্টের উপর চটা ছিল। মাদী এই গভর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করিল। দলে দলে লােক তাহার অধীনে সৈন্যদলভুক্ত হইতে লাগিল। মাদীর সৈন্যদল ই ওবিদ সহর দখল করিয়া বসিল। ইংরেজ সেনাপতি হী তখন মিশরে ছিলেন। সেখানে তিনি হী পাশা নামে খ্যাত ছিলেন। খেদিব ১০,০০০ হাজার সৈন্য দিয়া তাহাকে মাদীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করিলেন।-হী হী মরু-অভিযানে চলিলেন বটে কিন্তু মরুপ্রদেশে কেমন করিয়া যুদ্ধ করিতে হয় তাহা তিনি জানিতেন না। কাজেই তাঁহার দুর্দশার আর সীমা রহিল না। রাস্তা দেখাইবার জন্য যে কয়জন লােক তিনি নিযুক্ত করিয়াছিলেন তাহারা সকলেই ছিল মাদীর গুপ্তচর। ইহারা তাহাকে নানা প্রকার ফাঁদে ফেলিতে চেষ্টা করিতে লাগিল। তিন দিন তিন রাত্রির মধ্যে তাঁহারা একটুও জল পাইলেন না। জলাভাবে অনেক লােক মারা গেল। যে সৈন্য অবশিষ্ট ছিল তাহারা এত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল যে মাদীর সৈন্যদের বিরুদ্ধে তাহারা দাড়াইতে পারিল না। হীস্ পাশা সসৈন্যে সেই যুদ্ধে নিধন প্রাপ্ত হইলেন। এই যুদ্ধ জয় করিয়া মাদীর প্রতিপত্তি অত্যন্ত বাড়িয়া গেল। তাহার এই বিজয় বার্তা দিকে দিকে রটিয়া গেল এবং সকলেই তাহাকে যথার্থ অবতার বলিয়াই মনে করিতে লাগিল। যাহারা ২২ চতুর্থ পরিচ্ছেদ একদিন তাহাকে অবিশ্বাস করিয়াছিল তাহাদের সেই অবিশ্বাস দূর হইয়া গেল। এই দিকে যখন এইরূপ গােলমাল চলিতেছিল কীনার তখন সীনাই ছিলেন। এই সংবাদ শুনিয়া তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। মিশরে পৌঁছিবার জন্য তিনি এত ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন যে ঠিক পথে না গিয়া তিনি মরুভূমির ভিতর দিয়া যাত্রা করিলেন। তাহার সঙ্গে তিনজন স্থানীয় লােক উটের পিঠে চড়িয়া চলিল, আর তিনি একটা আরব দেশীয় ঘােড়ায় চড়িয়া চলিলেন। পথে তাহাদের এত কষ্ট হইয়াছিল যে দুইজন আরব তাহাকে পরিত্যগ করিয়া চলিয়া গেল। কীচনার বলিয়াছেন যে এত কষ্টে তিনি কোনােদিন পথ চলেন নাই । যাই হােক অবশেষে তিনি ইলিয়াতে আসিয়া পৌছিলেন এবং সেখান হইতে ট্রেনে কাইরে গেলেন। কাইরােতে গিয়া শুনিলেন যে সুদানের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকেই চলিয়াছে। মাদীর ক্ষমতা ক্রমেই প্রসার লাভ করিতেছে। তাহাকে দমন করিতে হইলে এখন সেখানে ভালরকম যুদ্ধের আয়ােজন করা দরকার। কিন্তু ইংলণ্ডের রাজমন্ত্রী গ্ল্যাডষ্টোন্ ছিলেন ইহার বিরােধী। তিনি বলিলেন, মিশরের কোন্ মরুভূমিতে গিয়া ব্রিটেনের সৈঙ্গুেরা মারা পড়িবে । কাজ নাই আর যুদ্ধ করিয়া । যেদিবকেও তিনি সুদানের আশা ত্যাগ করিতেই বলিলেন। খেদিবে। অধীনে তখন যে সৈন্য ছিল তাহা সুদান বিজয়ের পক্ষে যথেষ্ট নয়, কাজেই তখনকার মত সকলকেই চুপ করিয়া যাইতে হইল। কিন্তু ইওরােপে ইহা লইয়া বেশ আন্দোলন চলিল। সকলেই বলিতে লাগিল যে মিশরের এত নিকটে যদি একটা ক্ষমতাশালী রাজ্য স্থাপিত হয় তাহা হইলে মিশরের বিপদ অবশ্যম্ভাবী। বিশেষতঃ মিশর লর্ড কীচনার ২৩ জয় করা যে মাদীর জীবনের একটা উদ্দেশ্য তাহাও সকলেই জানিত। লণ্ডনেও এ সম্বন্ধে পত্রিকাতে অনেক লেখালেখি চলিল। অবশেষে ঠিক হইল একজন খুব উপযুক্ত লােককে সুদানে পাঠান হইবে। উপযুক্ত লোক যিনি ঠিক হইলেন তাহার নাম জেনারেল গর্ড। ইনি চীন দেশে একটা বিদ্রোহ দমন করিয়া এমন বিখ্যাত হইয়া গিয়াছিলেন যে লােকে তাহাকে “চীনাগর্ভ” বলিত। তাছাড়া তিনি সুদানেও কিছুদিন কাজ করিয়া আসিয়াছিলেন। ইসমাইল পাশা যখন খেদিব তখন তিনি ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তাহার গভর্ণর ছিলেন। জেনারেল গর্ডন্ খুব সাহসী, ধীর ও গম্ভীর লােক ছিলেন। তাঁহার হৃদয় অত্যন্ত মহৎ ছিল ; দাসব্যবসায় তুলিয়া দিবার জন্য তিনি বহু চেষ্টা করিয়াছেন। এই সব উদারতা মহত্ত্বের জন্য তাঁহার সুনাম ছিল বলিয়া গভর্ণমেন্ট মনে করিলেন—সুদানে ইহাকে পাঠাইলেই যথার্থ কাজ হইবে। কিন্তু সুদানের অবস্থা তখন অন্যরূপ। যাহারা মাদীকে মানিত না তাহারাও এখন ভয়ে তাহার পক্ষ গ্রহণ করিয়াছে। যাহারা একদিন গর্ডকে খাতির করিত তাহারাও এখন আর তাহার পক্ষ সমর্থন করিতে অসমর্থ। ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে গর্ডকে সুদানে পাঠান হয়। তাহাকে বলিয়া দেওয়া হয় যে সুদানের অবস্থা লিখিয়া পাঠানই তাঁহার প্রধান কার্য্য, তাহাকে অন্য কিছু করিতে হইবে না। কোনাে প্রকার যুদ্ধ বা ঝগড়াঝাটিতে তিনি যেন লিপ্ত না হন। দ্বিতীয়ত, সুদানে ব্রিটিশ পক্ষের যে সব সৈন্য আছে তাহারা কি উপায়ে সেখান হইতে নিরাপদে চলিয়া আসিতে পারে তৎসম্বন্ধে গর্ডনকে কর্তব্য নির্ধারণ করিতে হইবে। গর্ডন প্রথম ভাবিয়াছিলেন যে তিনি মাদীর সঙ্গে ভাব করিয়া ফেলিবেন কিন্তু শীঘ্রই বুঝিতে পারিলেন যে ইহাতে তাহার কৃতকার্য ২৪ চতুর্থ পরিচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনা নাই। অথচ ভাব না করিয়া সৈন্য সামন্ত লইয়া পলায়ন করাও নিতান্ত অপমানজনক ; গর্ডনের মত সাহসী সেনাপতির পক্ষে ইহার চিন্তাও কষ্টকর। কিন্তু গর্ডকে আর কষ্ট করিতে হইল না। দেখিতে না দেখিতে খার্টমের সকল লােক মাদীর পক্ষ হইয়া সহর ছাড়িয়া চলিয়া গেল ; মাদীর সৈন্যেরা তখন সহর অবরােধ করিল। গর্ডন্ খাট ছাড়িয়া যাইতেছেন না দেখিয়া অনেকে তাঁহাকে দোষ দিতে লাগিল। তিনি তখন কর্তৃপক্ষকে লিখিয়া জানাইলেন, “গভর্ণমেন্টের আদেশ সত্ত্বেও আমি যে খাটু ছাড়িয়া যাইতেছি না তাহার কারণ খাটু ছাড়িয়া যাইবার উপায় নাই, আরবগণ আমাকে অবরােধ করিয়া রাখিয়াছে।” তখন ঠিক হইল, গর্ডনকে উদ্ধার করিয়া আনিবার জন্য লর্ড উলীকে সসৈন্যে প্রেরণ করিতে হইবে। কিন্তু ইহা নির্ধারণ করি- তেই এত সময় লাগিয়া গেল যে উলসলী গভর্ণমেন্টের হুকুম পাইলেন গড়ন অবরুদ্ধ হওয়ার পাঁচমাস পরে । তাহাকে বলিয়া দেওয়া হইল; শুধু গর্ভকে উদ্ধার করিয়া আনিতে হইবে, অন্য কোনো যুদ্ধ বা গণ্ডগােলে যেন তিনি লিপ্ত না হন। কীচনার তখন ইন্টলিজেন্স, ডিপার্টমেন্ট ভুক্ত ছিলেন। এই বিভাগের কাজ হইল নানাদিক হইতে সকল সংবাদ সংগ্রহ করা। ইহা অনেকটা দূতের কাজ ও আধুনিক গোয়েন্দার কাজের সংমিশ্রণ। ফীচনার এই বিভাগে থাকিয়া অনেক গোয়েন্দাগিরি করিয়াছিলেন। তাঁহার লম্বা দাড়ি ছিল, দরবেশের মত পােষাক ছিল এবং সঙ্গে সুলতা- নের এক কাৰ্ম্মাণ” ছিল, তাহাতে তঁাহাকে ‘আবদুল্লা বে’ নামে অভিহিত করা হইয়াছে। মােল্লার পোষাক পরিষা আবদুল্লা মাদীর পক্ষীয় লোকদের সঙ্গে মিশিয়া যাইতেন; পরিষ্কার আরবী বলিতে পারিতেন L লর্ড কীচুনার ২৫ বলিয়া কেহই তাহাকে চিনিতে পারি না। একবার একজন ইংরেজ সৈনিক তাঁহাকে শত্রুপক্ষের লােক মনে করিয়া গুলি করিতে উদ্যত হইয়াছিল। তখন তিনি বলিয়াছিলেন, “আমি কীচুনার।” সে যাত্রা তিনি বড় বাঁচিয়া গিয়াছিলেন। কীচনার গর্ডনকে সর্বদাই নানা প্রকার সংবাদ প্রেরণ করিতেন। কলে কৌশলে তাহার নিকট পত্রিকাও পাঠাইতেন। তাঁহাকে উদ্ধার করিবার কোনদিকে কি রকম আয়ােজন হইতেছে কীচনার সে সমস্ত গর্ডনকে লিখিয়া জানাইতেন। গর্ডনের বন্ধু কর্ণেল ষ্টুয়ার্ট ১০ই সেপ্টেম্বর ৪০ জন সৈন্য লইয়া একটা ষ্টিমারে খাটুম হইতে যাত্রা করেন। পথে একটা পাহাড়ে ধাক্কা লাগিয়া ষ্টিমারখানা ডুবিয়া যায়। স্টুয়ার্ট ও তাহার সৈন্যগণ তীরে উঠিয়া একটা ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করেন, সেইখানে তাঁহাদিগকে খুন করা হয়। ১৪ জন সৈনিক সেই ভাঙ্গা ষ্টিমারটাতে ছিল ; তাহারা মৃত্যুর হাত এড়াইয়া শত্রুর হস্তে বন্দী হয়। ষ্টুয়ার্টের এই মৃত্যুসংবাদ গর্ডন্ কীচনারের নিকট হইতে জানিতে পারেন। ডিসেম্বর মাসে লর্ড উললীর সেনাদল গর্ভকে উদ্ধার করিতে খাটুমের দিকে অগ্রসর হয়। কিছুদুর গিয়া সেনাপতি সৈন্যদিগকে দুই ভাগে বিভক্ত করিলেন; একদল জেনারেল আর্লের অধীনে বাবার সহরের দিকে যাত্রা করিল, অপর দল সার হাবা ইয়ার্ডের অধীনে মরুভূমি পার হইয়া খাটুমের দিকে চলিল। এই দ্বিতীয় দল মেতেস্মার নিকট নীলনদের তীরে পৌছিলে সার চার্লস উইলসনের অধীনে একদল সৈন্যকে ষ্টিমার সহযােগে খাটুমে পাঠাইয়া দেওয়া হইবে, এইরূপ পরামর্শ হইল।-কাচ,নার এই দুয়াটের দলভুক্ত ছিলেন। মরুপ্রদেশে যুদ্ধ করিতে হইলে জলের বন্দোবস্ত রাখা দরকার। } চতুর্থ পরিচ্ছেদ নতুবা সৈন্যেরা যদি পিপাসায় অস্থির হইয়া উঠে তাহা হইলে তাহার যুদ্ধ করিবে কেমন করিয়া ?—পথিমধ্যে জগদলে কতগুলি জলাশয় ছিল। সেগুলি শত্রুদের হস্তগত না হয় সেজন্য ১৩০০ সৈন্যকে উষ্ট্রপৃষ্ঠে করিয়া সেখানে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। কীচুনারও সেই সঙ্গে তথায় গমন করেন। সেখানে গিয়া কেহই আর জলাশয় খুঁজিয়া পায় না। অবশেষে কীচুনার তাহা বাহির করিয়া দেন।সেইপথে মাদীর সাহায্যার্থ খাদ্যদ্রব্যাদি যাইত, সৈনিকেরা সেগুলি আটকাইতে আরম্ভ করিয়া দিল। এদিকে কীচনার একটা পাহাড়ের গায় গুহার মধ্যে দরবেশের মত দিন যাপন করিতে লাগিলেন এবং সেখান হইতে শত্রুপক্ষের সকল খবর জানিতে আরম্ভ করিলেন। স্টুয়ার্ট তাহার সেনাদল সহ জগদলে পোঁহিলে কীচুনারকে সেখান হইতে ফিরিয়া যাইতে আদেশ করা হয়। অনিচ্ছা- সত্ত্বেও তিনি ফিরিয়া গেলেন। ৪র্ট ও সেখান হইতে আর ক্লিয়ার দিকে যাত্রা করিলেন। আবু ক্লিয়াতেও অনেকগুলি পানীয়জলের কূপ ছিল। আবু ক্লিয়াতে একটা যুদ্ধ হয় ; ঘুমাটের অধীনে ৭০০০ হাজার সৈন্য ছিল। শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশী ছিল, কাজেই ষ্টুয়ার্টের সৈন্যেরা তাহাদের সঙ্গে পারিয়া উঠিল না। কর্ণেল বার্ণেবী নামক একজন ইংরেজ কর্মচারী হত ও লর্ড, বেরেসফোর্ড, আহত হন। দ্বিতীয় যুদ্ধ হয় আবু-ডু নামক স্থানে। যুদ্ধে শত্রুরা হটিয়া গেল বটে কিন্তু সার হার্বার্ট, স্টুয়ার্ট স্বয়ং গুরুতর রূপে আহত হইলেন। সার চান্স উইনের উপর তখন সৈন্য চালনার ভার পড়িল। তাহারা গুবাতে পৌছিলেন ২৩শে জানুয়ারী। সেখান হইতে ষ্টিমার সহযােগ একদল সৈনিককে খাটুম হইতে গর্ডনকে লইয়া আসিবার জন্য প্রেরণ করা ঠিক হইল। খাটুমে গর্ডনের অবস্থা তখন নিতান্ত শশাচনীয় ইয়া উঠিয়াছে। দরবেশের দল চারিদিক হইতে সহর অবরােধ ;

লর্ড কীচনার ২৭ ; করিয়া বসিয়া আছে ; গর্ডনের রক্ত পান করিবার জন্য তাহারা তখন হিংস্র জন্তুর মত লালায়িত। এদিকে গর্ডন দিনের পর দিন ইংরেজ সৈন্তের আগমন প্রতীক্ষা করিয়া পথের দিকে চাহিয়া রহিয়াছেন। সহরে খাদ্য দ্রব্য সব ফুরাইয়া গিয়াছে। সৈন্যেরা গাধা, কুকুর, বিড়াল প্রভৃতির মাংস খাইতে আরম্ভ করিয়াছে। ক্ষুধার তাড়নায় লােকেরা গাছের পাতা-বাকল পর্যন্ত খাইতেছে। আর অন্নাভাবে কত লােক যে মরিয়াছে তাহারও ইয়ত্তাই নাই। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করিবার লােকাভাবে রাস্তাঘাট মৃতদেহে পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। এই আর্তনাদের লীলাভূমিতে দাড়াইয়াও গর্ডনের চিত্ত বিচলিত হয় নাই। বীর পুরুষদের মত এবং জ্ঞানীদের মত তিনি মৃত্যুকে ভয় করিতেন না। তিনি বলিতেন, “সকলেই যদি মৃত্যুকে একটি হাস্যোজ্জল বন্ধুর মত গ্রহণ করিতে পারিত তাহা হইলে আমি বড় খুসী হইতাম। মৃত্যু ত বাস্তবিকই আমাদের বন্ধু, কারণ সে আমাদিগকে এই সঙ্কট- কন্টকময় পৃথিবী হইতে আমাদের যথার্থ গৃহে আহান করিয়া লইয়া যায়। তিনি নিজের কথা ভুলিয়া গিয়া খাটুমের অধিবাসীদের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহাদের চিন্তায় তাঁহার সমস্ত চুল সাদা হইয়া গিয়াছিল। প্রতিমুহূর্তেই ব্রিটিশ সৈন্যের পৌছিবার কথা আছে বলিয়া তিনি সকলকে সান্ত্বনা ও আশা দান করিতেন। নিরাশ হইয়া হইয়া সকলে তখন হতাশ হইয়া গিয়াছিল। ব্রিটিশ সৈন্ত যে আর পৌছিবে এ কথা কেহই বিশ্বাস করিতে চাহিত না। তাহারা তখন মাদীর নিকট আত্মসমর্পণ করিবার জন্য গর্ডনকে পীড়াপীড়ি করিতে লাগিল। তথনাে তিনি বলিতে লাগিলেন, “কালই সৈন্যেরা আসিয়া পৌছিবে।” ২৫শে জানুয়ারী তিনি বলিয়াছিলেন, “আমি ইহাদিগকে আর কত আশ্বাস দিয়া রাখিব! আর ত কেউ আমার কথা বিশ্বাস করিতে পারে না।”

২৮ চতুর্থ পরিচ্ছেদ গর্ডনের নিকট হইতে সংবাদ ও চিঠি পত্র লইয়া যে চারিখানি স্টিমার গুৰাতে গিয়াছিল, তন্মধ্যে দুইখানি জাহাজ খাদ্যদ্রব্য, যুদ্ধের মাল-মশলা ও সৈন্য লইয়া ২৪শে জানুয়ারী খাটুমের দিকে যাত্রা করিল। পথিমধ্যে একটি জাহাজ পাহাড়ে লাগিয়া ডুবিয়া যায়, তাহাতে তাহাদের একদিন বিলম্ব ঘটে। ২৭শে জানুয়ারী তারিখে নীলনদের দুই তীর হইতে দরবেশের ষ্টিমারের উপর গুলি চালাইতে লাগিল। তখনাে তাহারা খাটুম হইতে এক দিনের পথ দূরে ; সকলেই আশা করিতেছে আগামী কল্যই তাহারা খাটুমে পৌছিয়া গর্ভনকে উদ্ধার করিয়া আনিবে। এমন সময় একজন আরব তীর হইতে চেঁচাইয়া বলিল, “খাটুম আত্মসমর্পণ করিয়াছে, গর্ডন আর বঁচিয়া নাই।” এ কথা কেহ বিশ্বাস করিল না ; সকলেই আশা করিতে লাগিল, আগামী কলা প্রাতেই গর্ভনের সঙ্গে তাহাদের দেখা হইবে । ২৮শে জানুয়ারী বেলা ১১ টার সময় যখন ষ্টিমার হইতে খাটু দেখা গেল তখন দলে দলে মাদীর সৈন্য নদীতীরে পৌছিতে লাগিল। ষ্টিমার নিকটবর্তী হইতেই সহস্র বন্দুক হইতে আগুণ জ্বলিয়া উঠিল। নদীর এক তীরে খাটু সহর এবং অন্য তীরে ওডারম্যান্ সহর । দুই সহর হইতে ষ্টিমার লক্ষ্য করিয়া কামান দাগা হইতে লাগিল। সৌভাগ্যের বিষয় একটি গোলও ষ্টিমারে লাগে নাই। ব্যাপার থানা কি যে দাড়াইয়াছে তাহা কাহারে বুঝিতে বাকী রহিল না। গভর্ণমেন্ট হাউলের উপরে মিশরের পতাকাও উডীন ছিল না । হায়! আর দুইদিন পূর্বেও যদি ষ্টিমারগুলি খাটুমে পৌঁছিত, তবে হয়ত গর্ডন রক্ষা পাইতেন। ষ্টিমার খাটুনে পৌঁছিবার দুইদিন পূর্বে মাদীর সৈন্যেরা সহরে প্রবেশ করে। গর্ডনের সৈন্যেরা তাহা- দিগকে বাধা দিবার চেষ্টা করিয়াছিল কিন্তু তাহাদের ক্ষমতা ছিল না।

লর্ড কীচুনার ২৯ শত্রুসৈন্যেরা সহস্র সহস্র নরনারী হত্যা করিয়া রাজপথে রক্তস্রোত প্রবাহিত করিয়াছিল। গর্ডন্ তাহার আপিসের বাহিরে দাড়াইয়া- ছিলেন ; মাদীর অনুচরেরা বর্শা দ্বারা তাহাকে আক্রমণ করিল। আক্রমণ করিবার সময় বলিয়াছিল, “দুশমন, তাের সময় হয়ে এসেছে!” গর্ডন্ দক্ষিণ হস্তের অসি কোষ-নিষ্কোশিত করেন নাই এবং বাম হন্তের রিভভারও ব্যবহার করেন নাই। উপর্যুপরি দুইটি বর্শার আঘাতে তাহার মৃত্যু ঘটে। এই দুঃসংবাদ যখন ইংলণ্ডে পেছিল তখন মহারাণী ভিক্টোরিয়া ইহা শুনিয়া হৃদয়ে নিদারুণ শেলাঘাত প্রাপ্ত হইলেন। সকলেই এ সংবাদে মিয়মাণ হইয়া পড়িল।—সকলেই বলিতে লাগিল “too late, too late”–গর্ডকে সাহায্য করিবার জন্য সৈনিকেরা অতি বিলম্বে খাটুমে পৌছিয়াছিল। এই “অতি বিলম্বের জন্য সংসারে কত সর্বনাশ হইয়া যায় তাহার ইয়ত্তা নাই। দুই দিন বিলম্বের জন্য গর্ডনের এই শােচনীয় পরিণাম হইল। পাঁচ মিনিট বিলম্বের জন্য নেপােলিয়া ওয়াটালুর যুদ্ধে হারিয়া গিয়াছিলেন। গর্ডনের মুতুর প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার জন্য সকলের প্রাণেই প্রতিহিংসার আগুণ জ্বলিতেছিল। কিন্তু নানা কারণে মাদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থগিত রাখিতে হইল। কীচনার গুবাতে গেলেন । তিনি ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের কৰ্ম্মপ্রণালীতে অত্যন্ত নিরাশ হইয়া পড়িলেন। যাহাহােক, সকলের একান্ত ইচ্ছা সত্ত্বেও আরাে তের বৎসর পর্য্যন্ত ব্রিটিশ গভর্ণ- মেন্টকে সুদান সম্বন্ধে নিলিপ্ত থাকিতে হইয়াছিল। মাদীও তাহার নবলব্ধ সাম্রাজ্য ও ক্ষমতা বেশীদিন ভােগ করিতে পারে নাই; ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের জুন মাসেই তাহাকে নলীলা সম্বরণ করিতে হয়। ;

পঞ্চম পরিচ্ছেদ মিশরে যুদ্ধ সংক্রান্ত ব্যাপারে গােয়েন্দাগিরি করিতে গিয়া কীচনার চমৎকার অভিনয় করিবার ক্ষমতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। অভিনেতা ভিন্ন আবদুল্লা সাজিয়া কে এমন সকলের চোখে ধূলি নিক্ষেপ করিতে পারি? অভিনয় ক্রীড়ায় তাহার বেশ রুচিও ছিল। ফিরিয়া গেলে ঢুরী লেন্ থিয়েটারে সার অগষ্টা হারিসের একটা যুদ্ধ বিষয়ক নাটক অভিনয়ের আয়ােজন চলিতেছিল। উহার পর্যবেক্ষণের জন্য কীচুনারকে ডাকিয়া নেওয়া হয় ; বিজয়ী সৈন্যদের স্বদেশে প্রত্যাগমন প্রভৃতি ব্যাপার তাহার তত্ত্বাবধানে এমন সুন্দর ভাবে অভিনীত হইয়াছিল যে দর্শকেরা সকলেই বলিয়াছিল, রঙ্গমঞ্চে এমন সমরসজ্জা। তাহারা আর দেখে নাই । এই সময়ে কীচুনারকে জাজিবারে প্রেরণ করা হয়। সেখানে জার্মা সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটা সীমানা ঠিক করা হইতেছিল। তিনি সেই কাজ সম্পূর্ণ করিয়া সুদানে ফিরিয়া যান। সেখানে সুয়াকি নামক স্থানে তিনি সৈনিকদের গভর্ণর জেনারেল নিযুক্ত হন। এই পদে তিনি দুই বৎসর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ওমা দিগনা নামক একজন তুর্কি দাসব্যবসায়ী সেখানে তখন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হইয়া উঠে। গর্ডনের বিরুদ্ধে মাদীর যুদ্ধের সময় সে মাদীকে অনেক সাহায্য করিয়াছিল। দাস ব্যবসা লইয়া ওসমানের সঙ্গে অনেকদিন ধবংই ইংরাজদের গােলমাল চলিতেছিল। কীচনারের সৈন্যদের সঙ্গে তাহার সৈন্যদের প্রায়ই মারামারিও হইত । অবশেষে ১৮৮৭ খৃষ্টাব্দে লর্ড কীচুনার ওমান সুয়াকি অবরােধ করিবার জন্য অনেক সৈন্য সংগ্রহ করিতে লাগিল। কীচনার সংবাদ পাইয়া একদল সৈন্য লইয়া ওমানের সৈনিকদিগকে ছত্রভঙ্গ করিয়া দিলেন, ওমান এখানে সেখানে পলাইয়া ফিরিতে লাগিল। এবং অবশেষে অতি কষ্টে প্রাণে বাঁচিয়া গেল। কীচুনারও সেবার আসন্ন মৃত্যুর হাত হইতে বাঁচিয়া গিয়াছিলেন। একটা গুলি তাহার চোয়ালে লাগিয়া ঘাড়ের ভিতর ঢুকিয়া যায়। ঘাড়ের মধ্যে ঐ গুলিটি তিন বৎসর পর্যন্ত ছিল। তাহার গালে এই গুলির দাগ মৃত্যু পর্যন্ত বর্তমান ছিল ; ইহা ঢাকিবার জনাই তিনি অত বড় বড় গোঁফ রাখিতেন। এই ক্ষত চিকিৎসার জন্য তাহাকে প্রথম কাইরােতে ও পরে লণ্ডনে যাইতে হয়। লণ্ডন হইতে ফিরিয়া গিয়া তিনি ওমান্ ডিগনার বিরুদ্ধে পুনৰ্ব্বার যুদ্ধ যাত্রা করিলেন। এই যুদ্ধে ওসমান্ একেবারে পরাভূত হয় এবং সুয়াকিন্ও চিরকালের জন্য আক্রমণের আশঙ্কা হইতে রক্ষা পায়। কীচনার এই যুদ্ধে এমন কৃতিত্ব দেখান যে তাঁহাকে “সি, বি,” (c. B.) উপাধি প্রদান করা হয় । সুয়াকি হইতে কীচনার কাইরােতে গমন করেন। সেখানে তিনি বিশেষ ভাবে ব্রিটিশ ক্ষমতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিবার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। ১৮৯২ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে সেখানকার প্রধান সেনাপতি সাক্ ফ্রান্‌সি গ্ৰেফে পদত্যাগ করেন। কীচনারকে সেই পদে নিযুক্ত করা হয়। প্রধান সেনাপতিকে মিশরের রীতি অনুসারে সর্দার বলা হইত সুতরাং কীচনার হইলেন মিশরের সর্দার। সেনাপতির পদ গ্রহণ করিয়াই তিনি সৈনিক বিভাগের শৃঙ্খলা স্থাপনের জন্য দৃঢ়-সঙ্কল্প হইলেন। সাধারণ সেনা হইতে আরম্ভ করিয়া উচ্চপদস্থ কর্মচারী পর্যন্ত, কেহই কীচুনারের শাসন এড়াইতে পারি না। তিনি অনেক সময় নিজে গোপনে অনুসন্ধান করিয়া অনেক তথ্য ৩২ পঞ্চম পরিচ্ছেদ আবিষ্কার করিতেন। অচিরে সকলেই জানিতে পারিল মিশরের সেনাবিভাগ একজন শক্ত লােকের হাতে পড়িয়াছে। কিন্তু তিনি কেবল কড়া শাসনই করিতেন না, সৈনিক বিভাগের সম্মান অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য তাঁহার যথেষ্ট চেষ্টা ছিল। সৈনিকবিভাগের অসম্মানকে তিনি নিজের অসম্মান বলিয়াই মনে করিতেন।১৮৯৪ খৃষ্টাব্দে খেদিব সেনাবিভাগ পরিদর্শন করিয়া অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ইহাতে কাঁচুনার নিজেকে অপমানিত বােধ করিষা চাকুরী ত্যাগ করিবার জন্য ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের নিকট দরখাস্ত প্রেরণ করেন। ব্রিটেনের গভর্ণমেন্ট কীচনাকের পক্ষই সমর্থন করিলেন। খেদিব তথন মহা মুস্কিলে পড়িয়া গেলেন। তিনি কীচনারকে পদত্যাগ না করিতে বাৰম্বার অনুরােধ করিতে লাগিলেন। কাঁচুনার বলিলেন খেদিব যে পর্যন্ত তাহার কথা উঠাইয়া না লইবেন তিনিও ততদিন পদত্যাগের দরখাস্ত ফিরাইয়া লইবেন না। কাজেই খেদিবকে বাধ্য হইয়া ইংরাজী, ফরাসী ও আরবী ভাষায় ঘোষণাপত্র প্রচার করিতে হইল যে তিনি মিশরের সৈন্যগণের শিক্ষায় ও উহার কর্মচারীদের কৃতিত্বে অত্যন্ত সন্তুষ্ট আছেন। এদিকে মহারাণী ভিক্টোরিয়া ও তাহাকে নাইট উপাধি প্রদান করিলেন। সুতরাং তখন হইতে তিনি হইলেন স্যার হার্বার্ট কীচুনার। সুদান জয় করিবার জন্য কীচনারের প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু ব্রিটিশগভর্ণমেন্ট এতদিন অনুমতি প্রদান করেন নাই বলিয়া তাহার ইচ্ছাকে কার্যে পরিণত করিতে পারিতেছিলেন না। ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে ব্রিটিশগভর্ণমেন্টের মত কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত হইল। তাহারা বুঝিতে পারিলেন যে খাটুমে যতদিন মাদীর ক্ষমতা অক্ষুন্ন থাকবে ততদিন মিশরে ইংরেজের আধিপত্য স্থায়ী হইবার সম্ভাবনা কম। সুতরাং ব্রিটিশগভর্ণমেন্ট ডঙ্গোলা প্রদেশ পর্যন্ত অধিকার করিবার জন্য কীচনায়কে লর্ড কীচুনার অনুমতি প্রদান করিলেন। এই সংবাদ বহন করিয়া যে টেলিগ্রাম মিশরে পৌছিল তাহা যখন কীচনারের কৰ্ম্মচারী ওয়ালনের হস্তগত হইল তখন তিনি বলিয়ার্ড খেলিতেছিলেন, টেলিগ্রাম পাইয়াই খেলা ফেলিয়া তিনি কীচুনারের নিকট দৌড়িলেন। গিয়া দেখেন বাড়ীটি অন্ধকার, কীচনার আলো নিবাইয়া ঘুমাইয়া আছেন। তাহাকে জাগাইবার অন্য কোনো পন্থা আবিষ্কার করিতে না পারিয়া অবশেষে তিনি কীচুনারের জানালায় চিল ছুড়িতে লাগিলেন। ঘুম হইতে এই ভাবে জাগরিত হওয়ায় কীচনারের মেজাজ কিঞ্চিৎ অপ্রসন্ন হইয়া গিয়াছিল । কিন্তু যখন তিনি টেলিগ্রামটি পড়িলেন তখন মনে বিরক্তির ভাব থাকা ত দূরের কথা, তাহার এত অধিক আনন্দ হইল যে, তিনি ওয়াটসনের হাত ধরিয়া সেখানে উদ্দাম নৃত্য আরম্ভ করিয়া দিলেন। তিন মাসের মধ্যেই উঙ্গোলা অধিকৃত হইয়া গেল। ইহা অধিকার করিতে কীচুনারকে তেমন কোনাে যুদ্ধ করিতে হয় নাই। তিনি রাত্রিকালে শত্রুপক্ষকে অকস্মাৎ আক্রমণ করিয়া তাহাদিগকে বিধ্বস্ত করিয়া দেন। বিশেষ যুদ্ধ না করিতে হইলেও কীচুনারকে অনেক অসুবিধা ও বিপদের সঙ্গে লড়াই করিতে হইয়াছিল। তাহার সেনাদলে কলেরা প্রভৃতি ব্যারাম দেখা দিয়া তাহাকে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত করিয়াছে । অপর দিকে সেখানে ট্রেন্ না থাকাতে যাতায়াতের অত্যন্ত অসুবিধা ছিল। মরুভূমির মধ্য দিয়া ঝড়বৃষ্টি মাথায় করিয়া সৈচালনা করা এক বিষম কঠিন কাজ। এক বার ১৪ ০ ০ সৈন্যের মধ্যে পথে ঝড়ে সকলে মরিয়া গিয়া কেবলমাত্র ৭০ জন শিবিরে ফিরিয়া গিয়াছিল। ট্রেনের অভাবে সৈন্যদের রসদ জোগাই বারও অনেক অসুবিধা ঘটিত। তাই কীচনার রেলপথ নিৰ্মাণে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গেলেন। কিন্তু সে কাজ ও বড় সহজ ছিল না। একবার এক বৃষ্টিতে কয়েক মাইল ৩৪ পঞ্চম পরিচ্ছেদ পৰ্যন্ত রেলপথ ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছিল।-তবে প্রকৃতির এই অত্যাচার যেমন নিদারুণ, কীনারের প্রতিজ্ঞাও তেমন ভীষণ। তিনি কিছুতেই দমিলেন না, জামার আস্তিন গুটাইয়া নিজে সকলের সঙ্গে কাজে লাগিয়া গেলেন । বন্যার জল হইতে তাহারা ডুবাইয়া ডুবাইয়া নিমজ্জিত জিনিসপত্র উদ্ধার করিয়াছেন। কীচনারের এই অগ্নিময় উৎসাহে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ মাইল দীর্ঘ এক রেলপথ প্রস্তুত হইয়" গিয়াছিল। তখনও তিনি খাটু পর্যন্ত অগ্রসর হইবার অনুমতি পান নাই। কীচনার সেপ্টেম্বর মাসে লণ্ডনে গিয়া সেখানকার কর্তৃপক্ষকে বেশ করিয়া বুঝাইয়া বলেন যে, সমগ্র সুদান বিজয় করিবার সময় আসিয়াছে ; মাদীর ক্ষমতাকে ধ্বংস করিবার কাকা এখনি উপস্থিত কর্তৃপক্ষ তাহার কথায় বিশ্বাস করিলেন। কীচনার খাটুম অধিকারের অনুমতি লইয়া ডিসেম্বর মাসে মিশরে ফিরিয়া গেলেন। গভর্ণমেন্ট সার রেডুভাস্বুলারকে এই যুদ্ধে কত খরচ লাগিবে তাহার একটা হিসাব দিতে বলিলেন। বুলার হিসাব করিয়া বলিলেন ৫,২৫০০,০০০, পাঁচ কোটি পচিশ লক্ষ টাকা লাগিবে ! তৎপর কীচনারের মত জিজ্ঞাসা করা হই ! তিনি বলিলেন, ৭৫০০,০০০, পচাত্তর লক্ষ টাকা হইলেই চলিবে। আশ্চর্যের বিষয় ঐ টাকাতেই তিনি সমস্ত খরচ চালাইয়া দিলেন। সকল বিষয়েই তাহার সুন্দর দক্ষতা ছিল । এদিকে দুষ্টবুদ্ধি ও তাহার কম ছিল না। शमान বিজয়ের পূর্বে তিনি মরুভূমির মধ্যে টেলিগ্রামের তার বসাইলেন। শত্রুরা বারম্বার সেই তার কাটিয়া দিতে লাগিল। কীচনার প্রত্যেক বারই নুতন করিয়া তার বসাইতে লাগিলেন। অবশেষে জানা গেল যে টেলিগ্রাফের যথা তার মাটির ভিতর দিয়া গিয়াছে। শত্রুর চোখে লর্ড কিচুর ধূলি নিক্ষেপ করিবার জন্য তিনি উপরের নকল তার ঘুড়িয়া দিতেছিলেন। কীচনার যখন সুদান বিজয়ে হস্তক্ষেপ করিলেন তখন তাহাকে নানাদিকে দৃষ্টি রাখিতে হইত। একদিকে যুদ্ধের কাজ ত রহিয়াছেই, অপরদিকে রেলপথ নির্মাণ করা, মরুভূমির মধ্যে কূপ খনন করা, খরচ- পত্রের দিকে দৃষ্টি রাখা—সমস্তই তাহাকে করিতে হইত। তিনি সকল কাজই অত্যন্ত দক্ষতার সহিত করিতে পারিতেন। তঁাহার মত এমন সুনিপুণ লােকের হাতে সুদান বিজয়ের ভার ছিল বলিয়াই সমস্ত কাজ এমন শৃঙ্খলার সহিত সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হইয়াছিল । নতুবা আফ্রিকার সেই মরুভূমিতে তাহার সৈন্যেরা খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মারা পড়িত। মরুভূমিতে জলকষ্টই সৰ্ব্বাপেক্ষা বেশী। এত সৈন্যের জল সরবরাহ করা সহজ কথা নয়। তাই কীচনার মনে করিলেন মরুভূমিতে কূপ খনন করাইতে হইবে। তাহার এই সঙ্কল্পের কথা শুনিয়া অনেকে হাসিল। তিনি পশ্চাৎপদ হইবার লােক নহেন। প্রথম দুইবারের চেষ্টা বিফল হইল কিন্তু তৃতীয় বারের চেষ্টায় জল বাহির হইল—এদিকে রেলপথ নিৰ্মাণ করিতে যে তিনি সিদ্ধহস্ত তাহার প্রমাণ আমরা পূর্বেই পাইয়াছি। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দের ৮ই এপ্রিল কীচনার আটবারার যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন। তৎপর তিনি খাটুমের দিকে চলিলেন। কেরেরীতে পৌছিয়া একটি পাহাড়ের উপর হইতে কীচুনার দেখিতে পাইলেন দূরে নীলনদের এক তীরে ওডারমা সহর, তাহাতে মাদীর প্রকাণ্ড সমাধি শােভা পাইতেছে এবং অপর তীরে খাটু সহর শােভা পাইতেছে। কীনারের স্থল-সৈন্যের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি ছােট যুদ্ধজাহাজ নীলনদের জলপথে অগ্রসর হইতেছিল। ১লা সেপ্টেম্বর পূর্বাহে সেই যুদ্ধজাহাজ পঞ্চম পরিচ্ছেদ হইতেই প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইল। কয়েকটা গােল। মাদীর সমাধিস্তম্ভে পড়িয়া উহার গুম্বজটা স্থানে স্থানে ভাঙ্গিয়া গেল। সন্ধ্যার পূর্বেই জাহাজগুলি পুনরায় প্রত্যাবর্তন করিল কেননা তখন পর্যন্ত প্রকৃত যুদ্ধ আরম্ভ হয় নাই। সেই রাত্রে কীচুনারের সৈন্যগণ রণসাজে সজ্জিত হইয়াই নিদ্রা গেল। খলিফা ও তাঁহার সৈন্যগণ সহ শিবিরে নিদ্রিত ছিলেন। সুদানের শাসনকর্তাকে খলিফা বলিত।-ইংরেজ শিবিরে শান্ত্রীরা পাহারা দিতেছিল; আর যুদ্ধ জাহাজের সার্চলাইট গুলি চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বহুদূর পর্যন্ত তাহাদের তীব্র রশ্মি বিকীণ করিতেছিল। খলিফা যেখানে সসৈন্য ঘুমাইতেছিলেন সেই তীব্র আলােক সহসা গিয়া সেইখানে পড়িল। খলিফা ও তাঁহার সেনাপতিগণ বিমল্লা বলিয়া লাফাইয়া উঠিল। চাহিয়া দেখিল চারিদিক অপূৰ্ব আলােকে উদ্ভাসিত আর বহুদূরে নদী- তীরে একটা প্রকাণ্ড আলােকের গােলা—যেন একটা বিকট দানবের চক্ষু। খলিফা তাহার সেনাপতি ওসমানের কাধে হাত রাখিয়া কাণে কাণে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ওহ্মান, ওটা কি?” ওমান বলিল, “হুজুর, ওরা আমাদের উপর নজর দিচ্ছে।”~-একথা শুনিয়া খলিফার মনে এত ভয় হইল যে তিনি তাহার তাবুটা ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। অনেকে ভয়ে চোখ ঢাকিয়া রাখিয়াছিল ; তাহাদের ভয় হইয়াছিল ঐ আলােকরশ্মিতে হয়ত তাহাদের চোখ অন্ধ হইয়া যাইবে। শেষরাত্রে রণভেরীর শব্দে কীচনারের সৈন্যগণ জাগিয়া উঠিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল। রাত্রি প্রভাতের সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধ আরম্ভ হইয়া গেল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হইয়া গেল, কীচনার জয়লাভ করিলেন। এক ফুৎকারে যেন সুদান জয় করা হইয়া গেল। মাদীর প্রভুত্ব চিরদিনের জন্য লােপ পাইল। সেই রাত্রেই লর্ড কীচুনার • কীচনার বিজয়ী বীরের বেশে ওভারমানে প্রবেশ করিলেন । অধিবাসীরা তাহাকে “লু! লু! লু!” শব্দে অভ্যর্থনা করিল। উহাই তাহাদের অভ্যর্থনার ভাষা। কীচনার শুক্রবার দিন যুদ্ধে জয় লাভ করিয়াছিলেন, রবিবার দিনই কয়েকজন পুরােহিত সঙ্গে লইয়া তিনি খাটুমে গেলেন। সেখানে গর্ভনের সমাধির পার্শ্বে তাহারা উপাসনা করিলেন এবং সমাধির পূরে- ভাগে ব্রিটেনের ও মিশরের জাতীয় পতাকা প্রােথিত করিয়া দিলেন। কীনার ও তাহার কর্মচারিগণ সামরিক প্রথানুসারে গর্ডনকে অভিবাদন করিলেন ; সৈন্যগণ তিনবার চতুর্দিক কম্পিত করিয়া জয়ধ্বনি করিল। হায়, চৌদ্দ বৎসর পূর্বে ঠিক এই স্থলেই গর্ডন্ এই জয়ধ্বনি শুনিবার জন্য দিনের পর দিন উৎকর্ণ হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতেন। সুদান অধিকার করিবার কিছুদিন পর কীচনার শুনিলেন যে একজন ফরাসী সেনাপতি কেসোডানামক স্থান অধিকার করিয়া বসিয়া আছেন। তিনি এই সংবাদ পাইয়াই কেসােড়ায় গেলেন এবং ফরাসী- সেনাপতিকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করিলেন। তৎপর তিনি সেখানে মিশরের জাতীয় পতাকা প্রােথিত করিলেন। সেখানে যে তৎপূৰ্বেই ফরাসী পতাকা উড়িতেছিল কীনার যেন তাহা দেখিয়াও দেখিলেন না। অনেক চিন্তা করিয়াই তিনি ব্রিটেনের জাতীয় পতাকা প্রােথিত কয়েন নাই। তিনি মিশরের সেনাপতি, সুতরাং মিশর গভর্ণমেন্টের পক্ষ হইয়াই তিনি সেখানে মিশরের পতাকা উড্ডীন করিলেন। কেসােভা ত্যাগ করিয়াই তিনি আরও ৬৩ মাইল দক্ষিণে গিয়া আরেকটি পতাকা স্থাপন করিলেন। ইহা লইয়া ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট ও ফরাসী গভর্ণমেন্টের মধ্যে কিছুদিন বাদানুবাদ চলিল; অবশেষে পরস্পর একটা মীমাংসা হইয়া ;

পঞ্চম পরিচ্ছেদ গেল, তদনুসারে ফরাসী সেনাপতি সুদান ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। কীচনার যখন লগুনে ফিরিয়া গেলেন তখন সেখানকার অধিবাসীরা তাঁহাকে বিরাট অভ্যর্থনা প্রদান করিল। মহারাণী তাহাকে নূতন নূতন উপাধি প্রদান করিয়া সম্মান প্রদর্শন করিলেন। হইতে তিনি হইলেন “লর্ড কীচনার অ খাটুম”। সে সময় তিনি এত লােকপ্রিয় হইয়াছিলেন যে যখন তিনি খাটুমে গর্ডনের স্মৃতিরক্ষার্থ একটি কলেজ স্থাপনের জন্য জনসাধারণের নিকট ১৫০,০০০ টাকা চান তথন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১৮০০,০০০, উঠিয়া যায়। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে কীচনার সুদানের বড়লাট হইয়া তথায় গমন করেন। কিন্তু তিনি সেখানে বেশ দিন থাকিতে পারেন নাই। ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দের ৯ই অক্টোবর বুয়ার যুদ্ধ আরম্ভ হয় ; উক্ত খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তিনি কৰ্ম্মত্যাগ করিয়া দক্ষিণ আফ্রিকায় গমন করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন লর্ড, রবার্টসকে প্রধান সেনাপতি করিয়া পাঠান হইয়াছে। কীচুনারকে তাঁহার অধীনে কাজ করিতে দেওয়া হইল। কীচুনার মিশরের প্রধান সেনাপতি, সুদানের বড়লাট, এত বড় একজন যােদ্ধা, তিনি নানা বিষয়ে কৃতিত্বের এত পরিচয় দিয়াছেন—তথাপি তাহাকে লর্ড, রবার্টসের অধীনে কাজ করিতে • দেওয়া হইল; অনেকে মনে করিয়াছিল কীচনার বােধ হয় ইহাতে ক্ষুন্ন হইয়াছেন। যাহারা ওরকম মনে করিয়াছিল তাহারা কীচুনারকে চিনিতে পারে নাই। কাঁচুনারের যথেষ্ট আত্ম-সম্মান জ্ঞান ছিল, কিন্তু তিনি দাম্ভিক ছিলেন না। তা ছাড়া কোনো কাজ করিতে তিনি অপমান বােধ করিতেন না। একজন বন্ধু নাকি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল,-রবার্টসের অধীনে কাজ করিতে হইবে বলিয়া তিনি লর্ড কীচুনার ‘কঞ্চিৎ দুঃখিত কি না। কীচনার উত্তর দিয়াছিলেন, “আমি স্বচ্ছন্দ- চিত্তে রবার্টসের জুতা পৰ্যন্ত ব্ৰাস করিতে পারি।” ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ দক্ষিণ আফ্রিকায় বুয়ারদের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে গিয়া ইংরেজ সৈনিকদের অত্যন্ত দুরাবস্থা উপস্থিত হইয়াছিল। ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে এক সপ্তাহেই ইংরেজগণ তিনটা বড় বড় যুদ্ধে পরাজিত হন। ইহার কারণ আর কিছুই নহে, সেখানে শৃঙ্খলা ও সুবন্দোবস্তের অভাব ছিল। তাই কীচনারের ডাক পড়িল। কীচনার সেখানে গিয়াই সব একেবারে নূতন করিয়া আরম্ভ করিয়া দিলেন। তিনি নিজেও খুব পরিশ্রম করিতে পারিতেন এবং যাহারা তাহার অধীনে কাজ করিত তাহা- দিগকে ও খুব খাটাইতেন। তিনি বলিতেন, “আমি শুধু এইটুকু চাই যে প্রত্যেকেই যার যার কর্তব্য ঠিক মত করিয়া যাইবে।” অন্যায় দেখিলে কাহাকেও উচিত কথা বলিতে তিনি ছাড়িতেন না। বার একজন কম্মচারী সৈনিকদিগকে ড্রিল শিক্ষা দিতেছিলেন। তিনি সামান্য ত্রুটিতেই সৈন্যদিগকে ভয়ঙ্কর গালাগালি দিতেছিলেন। কীচনার তাহা শুনিয়া কৰ্ম্মচারীটিকে বলিলেন,—“মানুষের সঙ্গে মানুষ এরকম ভাষায় কথা বলে না। ওরা সকলেই সৈনিক, ওদের সঙ্গে সৈনিকের মত কথা বল্‌তে হয়। এ রকম করে কোনো সৈন্যকেই শিক্ষা দেওয়া যায় না। আর যে সেনাপতি তার সৈন্যদিগকে সম্মান করে না—সে তাদের নামকও হতে পারে না।”—সকলের সম্মুখে ৪০ ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ কীচনার এই কথা বলিলেন । ইহা শুনিয়া সৈন্যগণ তাহার উপর যেমনি সন্তুষ্ট হইল, সেই কর্মচারটি তেমনি লজ্জায় একেবারে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন। যাহা হােক, কীচনার সেখানে গেলে অল্পদিনের মধ্যেই যানবাহনের এমন সুন্দর বন্দোবস্ত হইয়া গেল যে যখন যেখানে দরকার সেইখানেই প্রয়ােজন মত সৈন্য, অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদ সরবরাহ হইতে লাগিল। এই ভাবে প্রস্তুত হইয়া ইংরেজগণ জেনারেল ক্রঞ্জেকে অবরোধ করিলেন। ঐঞ্জে বুয়ারদের মধ্যে অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর ও বিবেচক সেনাপতি ছিলেন। তাঁহাকে বুয়ারগণ তাহাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ লােক বলিয়া মনে করিত। ক্ৰঞ্জে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া ও আত্মরক্ষা করিতে পারিলেন না। অবশেষে ২৭শে ফেব্রুয়ারী তাহাকে আত্মসমর্পণ করিতে হয়। ক্রঞ্জের আত্মসমর্পণে বুয়ার সমাজের যেন মেরুদ ও ভাঙ্গিয়া গেল। সকলেই জয়ের আশা ছাড়িয়া দিল। কিন্তু বুয়ারগণ সহজে হটিবার পাত্র নহে। তারা যেন হারিয়াও হারে না, মরিয়া ও মরে না। ইংরেজগণ একে একে বুষারদের প্রধান প্রধান সহরগুলি দখল করিতে লাগিলেন। রোয়েটে গেল, প্রিটোরিয়া গেল-বুয়ারগণ তবু পরাজয় স্বীকার করিল না। জেনারেল বেগ ও জেনারেল ডিয়েট অল্পসংখ্যক সৈন্য লইয়া ইংরেজদের বিশাল বিশাল সৈন্যদলকে ব্যতিব্যস্ত : করিয়া তুলিতে লাগিলেন।--বুয়ারগণ এক প্রকার যুদ্ধ জানি, তাহাকে “গেরিলা যুদ্ধ” বলে। বিশেষত্ব এই যে গেরিলা যোদ্ধাগণ কখনও শত্রুপক্ষের সম্মুখীন হইয়া বড় রকম যুদ্ধে লিপ্ত হয় না । অবসর বুঝিয়া ইহারা যখন তখন শত্রুপক্ষের অংশ বিশেষকে আক্রমণ করিয়া বিধ্বস্ত করিয়া ফেলে। বুয়ারগণ এই গেরিলা যুদ্ধে খুব সিদ্ধহস্ত ছিল। বুয়ার সেনাপতি বোথা এই যুদ্ধের গেরিলা যুদ্ধ ; লর্ড কীচুনার ৪১ ও ডিওয়েট এই জাতীয় যুদ্ধে খুব পাকা ছিলেন এবং ইংরেজদের সঙ্গে করিয়া তাঁহারা বিশেষ বিখ্যাত হইয়াছিলেন। ডিওয়েটের মত চতুর লােক অত্যন্ত বিরল। তিনি সর্বদাই রেলপথ ধ্বংস করিতে ও সংবাদবাহী দূতগণকে বন্দী করিতে চেষ্টা করিতেন। ইংরেজ সৈন্যগণ হয়ত একখানে শিবির করিয়া বসিয়া আছে, আশু যুদ্ধের কোনাে আশঙ্কা তাহাদের মনে নাই, এমন সময় ডি ওয়েট, সহসা সেই অপ্রস্তুত সৈনিক শিবির আক্রমণ করিয়া তাহাদিগকে বন্দী করিয়া ফেলিলেন। লর্ড কীচনার একবার ডি ওয়েটের হাতে প্রায় ধরা পড়িয়া গিয়াছিলেন আর কি! কীচনার একবার রাত্রিযােগে রেলপথে চলিয়াছেন রগণ পূৰ্ব্ব হইতেই এই রেলপথ আক্রমণ করিবে বলিয়া ঠিক করিয়া রাখিয়াছিল। রাত্রিকালে রেল লাইনের উপর যখন বুয়ারদের অজস্র গােলাবর্ষণ হইতে লাগিল, তখন কীচ নারের ট্রেখানি একটি ষ্টেশানের এক পাশে দণ্ডায়মান। কীচনার গতিক দেখিয়া তাহার কামড়া হইতে লাফাইয়া পড়িলেন এবং নিকটবর্তী একটি গাড়ী হইতে ঘােড় খুলিয়া লইয়া সেই ঘােড়ায় চড়িয়া অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। লর্ড, রবার্টস্ যখন ইংলণ্ডে ফিরিয়া গেলেন তখন তাহার স্থলে কীচনার হইলেন প্রধান সেনাপতি। বুয়ারদের সঙ্গে টুক টা করিয়া যুদ্ধ চলিতেই লাগিল, কিন্তু আর কোনাে বড় রকমের যুদ্ধ হইল না। কীচনার বুঝিতে পারিলেন—পরিণামে তাহাদেরই জয় হইবে, তবে আরও কিছুদিন পর্যন্ত যুদ্ধ চালাইতে হইবে। তাই তিনি নুতন সৈন্য চাহিয়া পাঠাইলেন। মহারাণী ভিক্টোরিয়া তখন স্বর্গারােহণ করিয়াছেন এবং সপ্তম এভােয়ার্ড, সবে মাত্র সিংহাসনে বসিয়াছেন। কীচনারের প্রার্থনা মত ৩০,০০০ সৈন্য ফেব্রুয়ারী মাসে (১৯০১ খৃ:) আফ্রিকায় পৌছিল।

৪২ সপ্তম পরিচ্ছেদ ইহার কিছুদিন পর বােথা ও কীচনার মিলিত হইয়া সন্ধির প্রস্তাব করেন। কীচনার বুয়ারদিগকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ১২ কোটি টাকা দিতে স্বীকৃত হইলেন এবং বললেন যে অচিরেই তাহা- দিগকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হইবে। বােথা ইহাতে সম্মত হইয়াছিলেন, কিন্তু বুয়ারগণ এ প্রস্তাবে রাজী হইল না। যুদ্ধ চলিতে লাগিল। অবশেষে ১৯০২ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসে বুয়ারগণ সন্ধির প্রস্তাব করিয়া পাঠাইল। ৩১শে মে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হইয়া যুদ্ধের অবসান হইল। কীচনার আবার নানা প্রকার রাজসম্মান ও লােকসম্মানে ভূষিত ইলেন। আফ্রিকা হইতে চলিয়া যাইবার পূর্বে তিনি কেটাউনে এক বক্তৃতা প্রদান করেন; তাহাতে তিনি বলেন, “বুয়ারদের সঙ্গে আমাদের ইতিপূব্বে যেরূপ সম্পর্ক থাকুক না—এবং তাহাদের সম্বন্ধে পূৰ্ব্বে আমরা যেরকম ধারণাই পােষণ করি না কেন, একথা স্বীকার করতেই হইবে যে তাহার! একট। পুরুষের জাতি।” সপ্তম পরিচ্ছেদ মহাসর ৫ মহাখা। ১৯০২ খৃষ্টাব্দে লর্ড, কীচনার প্রধান সেনাপতির পদ গ্রহণ করিয়া ভারতবর্ষে আগমন করেন। এই পদে তিনি ১৯৩২ হইতে ১৯০৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ভারতবর্ষে আসিয়া তিনি ইহা সমর বিভাগকে সম্পূর্ণ নুতন ভাবে গঠন কৰিবার কাজে নিযুক্ত হন। মিশরের মত ভারতের সেনা বিভাগেও তিনি অনেক উন্নতি ও লর্ড কীচুনার ৪৩ পরিবর্তন আনয়ন করিয়া গিয়াছেন। বর্তমান মহাসমরে বে ভারতের সেনা এমন কৃতিত্ব দেখাইতে পারিয়াছে, তাহা অনেকটা তাহারই জন্য। কীচনার যখন ভারতবর্ষে ছিলেন তখন তিনি ওয়াইল্ড, ফ্লাওয়ার হল” বা “বন-কুসুম-ভবনে বাস করিতেন। ইহা সিলার নিকট একটি শৈলশিখরে অবস্থিত । কীচুনার মনের মত করিয়া নিজের বাড়ীটিকে সাজাইয়াছিলেন। বাগান প্রস্তুত করিতে তিনি খুব ওস্তাদ ছিলেন। ওয়াইল্ড, ফুাওয়ার হলের বাগান বিশেষ বিখ্যাত ছিল। একবার একজন পাদ্রী তাহার সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিলেন ; কীচনারের সঙ্গে সঙ্গে আলাপ আলাপ করিয়া তিনি দেখিতে পাইলেন যে কীচনার সব রকম ফুলের খোঁজ রাখেন। গােলাপ ফুল তাহার অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ইংলণ্ডে কোন্ বৎসর কত রকম গােলাপের চাষ হইত কাঁচুনার তাহার খবর রাখিতেন। এদিকে সেই পাদ্রীর স্ত্রীর সঙ্গে কানার বসিয়া বসিয়া নানা প্রকার সূচিকার্যের সমালােচনা করিতে লাগিলেন। দেখা গেল তিনি সকল প্রকার সূচিশিল্পের সহিত পরিচিত। আবার দেখা গেল রাজমিস্ত্রীদের সঙ্গে কীচনার তাহাদের কাজ লইয়া আলােচনা করিতেছেন। পাদ্রীসাহেব কীচনারের অধীনস্থ প্রধান কক্সচারীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “যাহার মাথায় এমন গুরুতর কাজের বােঝা তিনি এত সব বিষয় হইয়া আলােচনা করেন কেমন করিয়া ?”-ভদ্রলােকটি উত্তর করিলেন, “তাত হবেই, যে জিনিস তাঁর সম্মুখে আসে সেটাকেই তিনি আয়ত্ত করিয়া ফেলিতে চান।” এইখানে বাস করিবার সময় তিনি একবার মহা বিপদে পড়িয়াছিলেন। কীচনার গিয়াছিলেন সিলার নিকট তাহার এক বন্ধুকে দেখিতে। ফিরিবার সময় পথে একটা সুরঙ্গ পার হইতেছিলেন।

৪৪ সপ্তম পরিচ্ছেদ সুরঙ্গের ভিতর দিয়া সেই সময় একটা কুলী বিপরীত দিক হইতে আসিতেছিল। অন্ধকারে তাহার ছায়া দেখিয়া কীচরের ঘােড়। লাফাইয়া উঠিল, তিনি পড়িয়া গেলেন ; তাহার এক পায়ের দুইটা হাড় ভাঙ্গিয়া গেল। কুলীটাও ভয় পাইয়া ছুটিয়া পলাইয়া গেল। কীচনার আধঘণ্টা পর্যন্ত সেই সুরঙ্গের মধ্যে পড়িয়া রহিলেন ; তাঁহার পায়ে তখন অসহ যন্ত্রণা, অথচ উঠিবার শক্তি নাই। অবশেষে একদল লোক বিশ লইয়া সেই পথে সিঙ্গা ফিরিতেছিল। কীচনার তাহাদিগকে ডাকিলে তাহারা তাহাকে সিল লইয়া গেল। সেখানে তিনি সহজেই আরােগ্য লাভ করিলেন । ১৯১১ খৃষ্টাব্দে মিশরের ব্রিটিশ এজেন্টের মৃত্যু হয়, সেই পদে কীচনারকে নিযুক্ত করা হয়। তিনি এই কাজে এমন ক্ষতা প্রদর্শন করেন যে মিশর হইতে তাহাকে স্থানান্তরিত করিবার প্রস্তাব করিলে কর্তৃপক্ষ বলিলেন “কীচুনারকে না হইলে মিশরের চলে না।” বাস্তবিক পক্ষেই মিশরে এই পদ গ্রহণ করিবার মত উপযুক্ত লােক কীচনার ছাড়া আর কেহ ছিল না। ভারতবর্ষে বড়লাট হইয়া আসিতেন। কীচনার কেবলমাত্র এক জন সৈনিক পুরুষ ছিলেন না, তিনি একজন বিচক্ষণ রাজনৈতিক ছিলেন। মিশরে তিনি যে সব সুকাজ করিয়াছেন তাহার মধ্যে সর্ব প্রধান হইল--সেখানকার প্রজাদের অবস্থার উন্নতি করিবার চেষ্টা। প্রজাদের কষ্ট দূর করিবার জন্য তিনি নিয়ম করিলেন যে গরীবের ঋণ শােধ করিবার জন্য তাহাদের বসতবাটি কেহ বিক্রয় করিতে পারিবে না। সেখানে তিনি অনেক সেভিং ব্যাঙ্ক, স্থাপন করিলেন । আরও অনেক লােকহিতকর কাজে হাত দিবার সঙ্কল্প তাহার ছিল এবং ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে ইংলও গিয়া নতুবা তিনি লর্ড কীচুনার ৪৫ এ বিষয়ে তিনি অনেক আলােচনা-পরামর্শ করিয়াছিলেন। এমন সময় সহসা ইউরােপে মহাযুদ্ধের আগুণ জ্বলিয়া উঠিল। দেখিতে না দেখিতে সে আ গুণ ইংলণ্ডের গায় আসিয়া লাগিল। তদানীন্তন রাজমন্ত্রী মিঃ এস্কিহ্ একটি সমরসভা আহ্বান করিলেন। সেই সভায় ঠিক হইল সমরবিভাগ এখন এমন একজন লােকের হাতে দেওয়া দরকার যাহার যুদ্ধব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে এবং রাজনৈতিক বিষয়েও জ্ঞান আছে। দেখা গেল কাঁচুনার ছাড়া এমন লােক আর কেহ নাই। কীচুনারকে তখনি প্রয়ােজন। কিন্তু কীচনার তখন লণ্ডন হইতে মিশরাভিমুখে যাত্রা করিয়াছেন। ডােভার গিয়াই তিনি এক জরুরী টেলিগ্রাম পাইয়া গুনে ফিরিয়া আসিলেন। পরদিন, ৩রা আগষ্ট, এস্কিথের সঙ্গে তাহার আলাপ হইল, কীচনার সমর-সচিবের পদ গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন। তৎপর দিন, ৪ঠা আগষ্ট, ব্রিটে জাৰ্ম্মেনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিল। এতদিন পর কীচুনারের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হইল। বহুদিন হইতেই তাহার ইচ্ছা ছিল যে এই পদটি একবার পাইলে ইংলণ্ডের সমর-বিভাগকে তিনি ইচ্ছামত গঠন করিয়া লইবেন। এইবার তাহার সেই ইচ্ছা পূর্ণ হইল। কিন্তু এই কাজ গুরুতর দায়ীত্বপূর্ণ, বিশেষতঃ যে অবস্থায় তাহার উপর এই কাজের ভার পড়িয়াছিল। তিনি জানিতেন তাহার কৃতকাৰ্যতার উপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জয় পরাজয় নির্ভর করে। তাই দিন রাত্রি তাহার আর বিশ্রাম ছিল না। নৃতন সৈন্য সংগ্রহ করা, সকল সৈন্যকে ভরণপােষণ করা, এবং তাহাদের সকল প্রকার অভাব অভিযােগ দূর করা—এ সমস্ত কাজের ভারই তাহার উপর ছিল। কোনাে কাজে ক্রটি হইলে শুধু যে ৪৬ সপ্তম পরিচ্ছেদ তাহার অপমান তাহা নহে, সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তাহাতে অপমান একথা তাহার স্মরণ ছিল। তাই স্বভাবতঃ কৰ্ম্মপ্রিয় কীচনার এবারে যেন কর্মসাগরে একেবারে ডুবিয়া গেলেন। তাঁহাকে আবার নানা কাজে নানা স্থানে যাইতে হইত। রােমে, গ্রীসে, গালিপােলিতে কীচনার গিয়া যে কাজ উদ্ধার করিয়া আসিয়াছেন, অন্য কোনাে লােক গেলে তাহা পারিত কিনা সন্দেহ। সৈন্যদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিবার জন্য ও তাহাদিগকে উৎসাহ প্রদান করিবার জন্য কীচনার মাঝে মাঝে ফ্রান্সে যাইতেন। তাঁহাকে দেখিলে সৈন্যদের মধ্যে যেন প্রেরণা আসিত। ব্রিটিশ সৈন্যের জানিত কীচনার যে কাজে शट দেন তাহা সম্পন্ন না করিয়া ছাড়েন না। তাই তাহাদের বিশ্বাস ছিল, তিনি যখন ইহাতে হাত দিয়াছেন তখন তাহাদের জয় অনিবার্য। তাহারা বলিত, “ “ধুদ্ধে যদি জয় হইবে না বুঝিতেন তাহা হইলে কীনার ইহাতে হাতই দিতেন না।”— ফরাসী সৈন্যেরা জানিত—তিনি কৈশােরে তাহাদের পক্ষ হইয়া একবার যুদ্ধ করিয়াছিলেন ; এবং আফ্রিকায় তাহার কীর্তির কথা ও তাহাদের, অবিদিত ছিল না; সুতরাং কীচুনারকে দেখিয়া তাহারাও প্রাণে প্রেরণা অনুভব করিত! কীচনার ফরাসীদের এত প্রিয় ছিলেন যে প্যারিসে তাহাকে দেখিবার জন্য লােক রাস্তায় বাহির হইয়া আসিত। কোনাে ফরাসী গ্রামের মধ্য দিয়া তিনি যাইবেন শুনিলে গ্রামের সকল লােক তাহার অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকিত। একজন সৈন্য তাহার আত্মীয়কে চিঠিতে লিখিয়াছিল, “কীচনার বলিতে আমরা কতখানি বুঝি তাহা তােমরা জান না। আমাদের নিকট কীচনার” মানে কৃতকার্যতা। সবাই জানে কীচনার যে কাজে হাত দেন তা অসম্পন্ন থাকিতে পারে না।*একজন এক লর্ড কীচুনার 89 আহত সৈনিক বলিয়াছিল,—কীচনার যেন টনিক ওষুধ। তাকে দেখিলে শরীরে শক্তি আসে।” একবার তিনি লণ্ডনে এক হাসপাতালে গিয়াছিলেন, সেখানে তাহার যাওয়ার কথা ছিল না সুতরাং সৈন্যের পূৰ্ব্ব হইতে প্রস্তুত হইতে পারে নাই। অকস্মাৎ তাহাকে দেখিয়া যাহাদের উত্থানশক্তি ছিল তাহারা সামরিক কায়দায় দাড়াইয়া গেল, আর যাহারা শয্যাশায়ী ছিল তাহারা মাথাটুকু তুলিয়া তাহাকে অভিবাদন করিল। তাহারা যে রােগী এবং হাসপাতালে রহিয়াছে সে কথা সেই মুহূর্তের জন্য সকলেই ভুলিয়া গিয়াছিল । একজন রােগীকে কীচনার জিজ্ঞাসা করিলেন,-“তােমার কোথায় লেগেছে ?” সৈনিকটি তাহার আহত স্থান দেখাইয়া বলিল, “এইখানে, কিন্তু ডাক্তার গুলিটি খুঁজেই পাচ্ছেন না ?” কীচনার বলিলেন,- “তাতে আর কি হয়েছে ? আজকাল গুলি লাগলে বেশি কিছু হয় না। আমি নিজে একটা গুলি তিন বছর ঘাড়ে করে ঘুরেছি।” সুদানে ওসমানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তঁাহার ঘাড়ে যে গুলি লাগিয়াছিল পাঠকের বােধ হয় তাহ স্মরণ আছে । স্বদেশে তাহাকে সহস্র রকমের কাজ ত করিতে হইতই, তা ছাড়া বিদেশে যখন গােল উপস্থিত হইত, তখন তাহার মীমাংসা করিতে কীচনারকেই যাইতে হইত। তিনি গেলে সব কাজ যে ভাবে সম্পন্ন হইত অন্য কেহ গেলে তাহা হইত না। তাই গ্রীসে কীনারের ডাক পড়িল। সেখানকার কাজ সমাপ্ত করিয়া তিনি রােমে গেলেন। গােমের রাজা তাঁহাকে নূতন উপাধি প্রদান করিলেন। ইতিপূর্বে বেলজিয়ামের রাজা ও ফরাসী গভর্ণমেন্ট তাহাকে উপাধি প্রদান করিয়াছিলেন। উপাধি জিনিসটা তাহার নিকট জলের মত সহজলভ্য হইয়া উঠিয়াছিল। মানুষ সামান্য একটা উপাধির জন্য কত লালায়িত Sb সপ্তম পরিচ্ছেদ আর কীচুনারকে সম্মানজনক উপাধিসমূহ ডাকিয়া নিয়া দেওয়া হইত। পঞ্চম জর্জও তাহাকে আবার একটা নূতন উপাধি প্রদান করিলেন। রােম হইতে ফিরিলে পর কীচুনারের রাসিয়াতে যাওয়ার প্রয়ােজন হইল। তিনি দিনক্ষণ ঠিক করিয়া রওনা হইলেন। তাহার স্বভাব ছিল যে কাজ যখন তিনি করিবেন স্থির করিতেন, তাহা ঠিক সেই সময় না করিয়া ছাড়িতেন না। সহস্র বাধাকেও তিনি গ্রাহ্য করিতেন না। তিনি ঠিক করিয়াছিলেন-বেলা ৪টার সময় জাহাজ ছাড়িবেন; কিন্তু সেদিন তখন এমন ঝড় উঠিল যে সকলেই মনে করিল কীচুনার তাহার যাত্রার সময় পরিবর্তন করিবেন। কিন্তু ঠিক ৪টার সময়েই যখন তাহার জাহাজ ছাড়িল তখন সকলেই অবাক হইয়া গেল। এমন দুর্যোগে যে মানুষ সমুদ্রপথে যাত্রা করিতে পারে তাহা ত আমরা কল্পনাও করিতে পারি না। আকাশে মেঘ গর্জন, সমুদ্র-তরঙ্গের প্রলয় নৃত্য, পবন ধ্বংস ক্রীড়া উন্মত্ত,-ইহরি মধ্যে কীচুনার জাহাজ খুলিলেন। সঙ্গে চারিটি ক্রুইজার যাওয়ার কথা ছিল, কীচনার বলিলেন,-“তােমরা যদি ভয় পাও, তবে আমার সঙ্গে গিয়া দরকার নাই। আমার সঙ্গে ক্রুইজার না গেলেও চলিবে।” যাহা হােক কুইজার সমভিব্যাহারে কীচনার হ্যাম্পশায়ার জাহাজে চড়িয়া রাসিয়া- ভিমুখে যাত্রা করিলেন। কিন্তু ক্রুইজার চারিটি বেশীক্ষণ তাহার সঙ্গে যাইতে পারিল না। প্রবল তরঙ্গাঘাতের মধ্যে অগ্রসর হওয়া তাহাদের নিকট অসম্ভব বলিয়া মনে হইল। কীচ নারের আদেশানুক্রমে পরদিন প্রাতে কুইজারগুলি ফিরিয়া আসিল। ' হ্যাম্পশায়ার সমস্ত দিন চলিয়া সন্ধ্যা ৭টার সময় একটা নিমজ্জিত “মাইন” লাগিয়া গেল। মাই ফাটিয়া জাহাজ বিদীর্ণ করিয়া দিল। দেখিতে দেখিতে কয়েক মিনিটের মধ্যে কীচনারকে লইয়া জাহাজখানি সমুদ্রগর্ভে ডুবিয়া গেল। তখনাে লর্ড কীচুনার ৪৯ প্রবল বেগে ঝড় বহিতেছিল, কাজেই বেশী লােককে বাঁচান গেল না। কেবল মাত্র ১২ জন লোেক মৃত্যুর করাল গ্রাস হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে। ইহার মধ্যে কেহ কেহ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কীচনারকে দেখিয়াছিল। মাইন্ ফাটিবার অব্যবহিত পরেই তিনি একজন কর্মচারীকে সঙ্গে করিয়া ডেকে আসিয়া উপস্থিত হন। কর্মচারিটি ডাকিয়া বলিল, “লর্ড- কীচ নারকে পথ ছাড়িয়া দাও।” সেই জাহাজের কাপ্তান ছিলেন- স্যাভি। তিনি কীচনাকে একটা নৌকায় উঠিতে বলিলেন কিন্তু ঝড়ের শব্দে কাপ্তানের কথা। তিনি শুনিতে পান নাই। কীচনার তখন কর্মচারীদের সঙ্গে কথা কহিতে কহিতে পায়চারি করিতেছিলেন। তাহার পরিধানে থাকী পােষাক ছিল, গায় ওভার কোট, ছিল না। তিনি শান্তচিত্তে জাহাজ ত্যাগ করিবার আয়ােজন সমাপ্তির অপেক্ষা করিতেছিলেন। তাহাকে একটুকুও অস্থির বা বিচলিত হইতে দেখা যায় নাই। নাবিকেরা নৌকাগুলি নামাইতে চেষ্টা করিতেছিল, কিন্তু দুরন্ত তরঙ্গের জন্য তাহাদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া যাইতে লাগিল। এক একটি নােকা নামাইবা মাত্রই ঢেউয়ের আঘাতে তাহা চুরমার হইয়া যাইতে লাগিল। সমুদ্র যেন একেবারে ক্ষেপিয়া উঠিয়াছিল। তাই কানার আর বাঁচিতে পারিলেন না। জাহাজটি সহসা তাহাকে লইয়া উল্টিয়া গেল। যাহারা নৌকায় চড়িয়াছিল, তাহারাও প্রাণ লইয়া তীরে পৌছিতে পারিল না। প্রবল শীতে তাহাদের রক্ত জমিয়া যাইতে লাগিল, তাহারা নৌকার মধ্যেই মরিয়া পড়িয়া রহিল। একটা নৌকাতেই ৪৩ জন নাবিকের মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছিল। কীচনারের মৃত্যু সংবাদে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সমস্ত লােক ত মর্মাহত হইলই, অন্যান্য দেশের অধিবাসীরাও তাঁহার শশাকে অত্যন্ত । ৪ সপ্তম পরিচ্ছেদ ক্লিষ্ট হইল। ফরাসী সৈন্যদের মনে হইল যেন তাহাদের নিজের একজন সেনাপতির মৃত্যু হইয়াছে। বাস্তবিক পক্ষেই তাহার স্থান পূর্ণ করিবার মত কেহ রহিল না। অত্যন্ত প্রয়ােজনের সময় কীচ নারকে ভগবান সরাইয়া লইয়া গিয়াছেন বলিয়া অনেকে বড় হতাশ হইয়া গিয়াছিলেন কিন্তু সেটুকু মানুষের বুঝিবার ভুল। তাহার কাজ সমাপ্ত হইয়াছিল বলিয়াই তাহার ডাক পড়িয়াছে। তাহার প্রধান কাজ তিনি সমাপ্ত করিয়াই গিয়াছেন। যাহা বাকী রহিয়াছে তাহা অন্যেরাও সম্পন্ন করিতে পারে। তাই তাহার মৃত্যুর পরেও ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট কীচনারের অভাবে অন্ধকার দেখেন নাই। কিন্তু তিনি যদি দুই বৎসর পূৰ্ব্বে মারা যাইতেন, তাহা হইলে অনেককেই হয়ত দু’চোখে অন্ধকার দেখিতে হইত। কেহ কেহ মনে করেন-কীচনারের মৃত্যুটি বড় শােচনীয় রকমের ; কিন্তু বীর সৈনিকেরা বলিতেছে—তাহার উপযুক্তই তাহার এই গৌরবময় অবসান। সমস্ত জীবন রণলীলা করিয়া অবশেষে প্রকৃতির রণলীলার মধ্যে তাহার মৃত্যুশয্যা পাতা হইল। প্রকৃতিরাণী যেন ইচ্ছা করিয়াই বীরের এই মৃত্যুশয্যা রচনা করিয়াছিলেন। অনন্ত সমুদ্রের ঝটিকাক্ষুব্ধ সুগম্ভীর বাণী অনন্তকাল তাহার কীৰ্ত্তি ঘােষণা করিবে। আমরা বিশেষভাবে তাহার কর্মজীবনের আলােচনাই করি- ছি, গার্হস্থ্য জীবনের কথা কিছুই বলি নাই। তাহার কারণ কাঁচ- নারের জীবনই কৰ্ম্মময় জীবন এবং তঁাহার গার্হস্থ্য জীবন বলিয়া কোনো জিনিষ ছিল না বলিলেও চলে। তিনি গৃহস্থ ছিলেন না; তাহার ত গৃহ বলিয়া কিছু ছিল না। তাহার সৈনিকজীবনের অন্তরালে গার্হস্থ্য জীবনে কোনাে ফম্ভধারাই প্রবাহিত ছিল না। তিনি আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। সংসারের কোনাে স্নেহ-দৃঢ় বন্ধন তাহার ছিল না। এই জন্যই তিনি এমন কৰ্তব্যকঠোর হইয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার লর্ড কীচুনার রুতাটা যে এমন প্রকট ছিল ইহাই তাহার প্রধান কারণ। জীবনের উগ্রতা ও কাঠিন্য স্নেহ-সলিলে সিক্ত হইয়া নরম হইবার ত কোনাে সুযােগ পায় নাই। কিন্তু তাঁহার মধ্যে রসচর্চার বীজ নিহিত ছিল, যদিও তাহা অঙ্কুরিত বা বিকশিত হইতে পারে নাই। তাহার পুষ্প- প্রীতি, তাঁহার উদ্যানরচনার সখ—এ কথার প্রমাণ দিতেছে। ইহা ছাড়া প্রাচীন জিনিষের প্রতি তাঁহার প্রবল আকর্ষণ ছিল। প্রাচীন শিল্পজাত দ্রব্য পাইলেই তিনি আহরণ করিয়া লইয়া যাইতেন। তিনি সৌন্দৰ্য্যরসগ্রাহী মানুষ ছিলেন বলিয়াই সমস্ত বিষয়ে শৃঙ্খলা রক্ষা করার এমন পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি যেখানে থাকিতেন সেস্থানে মূল্যবান জিনিষ থাক বা না থাক তাহাকে তিনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতেন। তিনি বলিতেন, “আমি শূকরের মত আবর্জনার স্তুপে ভুবিয়া কাজ করিতে পারি না।” বিলাতে তাহার বাড়ীটি সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। অণ্টা হইতে তিনি অনেক টাকা খরচ করিয়া সেই বাড়ীর জন্য একটি সিংহদরজা নির্মাণ করাইয়া নিয়াছিলেন। কীচনার যে অবিবাহিত ছিলেন তার একটি কারণ ছিল। একটি মেয়ের সঙ্গে কীচনারের বিবাহ ঠিক হয়, কিন্তু সেই মেয়েটির দুইটি বৃদ্ধা আত্মীয়র এমন অসুখ হইয়া পড়ে যে তাহাদিগকে দেখিবার লােক কেহ রহিল না। সুতরাং কীনার যদি তাহাকে বিবাহ করেন তবে আত্মীয় দুইটি একেবারে নিরুপায় হইয়া পড়েন। তাই কীনারের আর বিবাহ করা হইল না। তিনি অপেক্ষা করিয়া রহিলেন, সুবিধা হইলেই সেই মেয়েকে তিনি বিবাহ করিবেন, কিন্তু সে সুবিধা আর উপস্থিত হইল না। কীচনার যখনই বিলাত যাইতেন তখনি সেই মহিলাটির সহিত দেখা করিতেন। কীনারের যখন মৃত্যু হয় তখন তিনি কীচারের মৃত্যুর কিছুদিন পর তাহারও মৃত্যু ঘটিয়াছে বৃদ্ধা ;

৫২ সপ্তম পরিচ্ছেদ ; কীচনারের মৃত্যু সম্বন্ধে একটি অদ্ভুত কথা আমাদিগকে মনে রাখিতে হইবে। কীচনার বলিতেন, তাহার চিরকালই কেমন একটা ধারণা আছে যে সমুদ্রই তাঁহার যম। সমুদ্র দেখিলেই যেন তাহার শরীর ও মন কেমন কেমন করে। মন যেন বলিয়া উঠে—“মৃত্যু সম নীল নীর ওই বিরাজে।” শেষে ঘটিলও তাহাই। পত্রিকায় পড়িয়াছি কীচনারের কোনো আত্মীয়ার ঘরে কীচনারের একটি ছবি ঝুলান ছিল। একদিন হঠাৎ সেই ছবিটি মাটিতে পড়িয়া যায় ; আত্মীয়াটি সকলকে বলিলেন- “কীচনারের নিশ্চয়ই কোনো অমঙ্গল ঘটিয়াছে।” পরদিনই কীচনারের মৃত্যু-সংবাদ আসিল। কীচনার অত্যন্ত লাজুক ছিলেন। তাহার ছবি তােলা এক বিষম ব্যাপার ছিল ; তাঁহাকে কিছুতেই ছবি তােলাইতে রাজী করা যাইত না। বক্তৃতা দিতে গেলে বেশী কথা বলিতে পারিতেন না; বেশী কথা বলা তাঁহার অভ্যাসও ছিল না। অভাসও ছিল না। অতি অল্প কথায় তিনি বক্তব্য বিষয়টিকে চূড়ান্ত করিয়া বলিতে পারিতেন । কাজের লােকের স্বভাবই এই রকম । যাহারা বেশী কথা বলে, তাহারা কাজ কম করে ; কাজই যাহাদের জীবন, ব'কৃপটুতার দিকে তাহাদের মনোযােগ অত্যন্ত কম। কীচনার যে জীবনে এমন উন্নতি লাভ করিয়াছিলেন, তাহার একমাত্র কারণ ঠাহর কৰ্ম্মচেষ্টা। তিনি যে খুব অনুকূল অবস্থার মধ্যে পতিত হইয়া বড় হইয়াছেন, তাহা নহে; অথবা তাঁহার যে অনন্য- সাধারণ প্রতিভা ছিল, এমনও নহে। তাহার উন্নতির একমাত্র কারণ ছিল—দৃঢ় অধ্যবসায়, অবিশ্রাম চেষ্টা, অমানুষিক একনিষ্ঠা এবং সাধকের মত একাগ্রতা। জীবনের যে ক্ষেত্রে যিনি সাধনা করিয়া সিদ্ধি লাভ করেন তিনিই ত সাধক। এই হিসাবে কাচ,নারও সাধক ছিলেন । মানুষ মাত্রেরই উন্নতির মূলে এই সাধনা। সাধনা ছাড়া কেহই সিদ্ধি किन লর্ড কীনার লাভ করিতে পারে না। আমরা কেবল বাহিরের ফুলটিকে এবং ফলটিকেই দেখি, কিন্তু এই ফুল ফলকে বিকশিত করিবার জন্য বৃক্ষ যে নিয়ত রসাহরণের সাধনায় ব্যাপৃত আছে সেটি ত আমাদের চোখে পড়ে না। তেমনি একজন মানুষ যখন বড় হয়, তখন আমরা অবাক্‌ হইয়া মুগ্ধনেত্রে তাহার দিকে চাহিয়া থাকি ; কিন্তু তাহার এই কৃতকাৰ্যতার মূলে যে কত সাধনা রহিয়াছে, সে দিকে আমাদের দৃষ্টি ত সহজে আকৃষ্ট হয় না। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি যে সাহিত্য জগতে অমর হইয়াছেন, আমরা মনে করি তাহার কারণ শুধু তঁাহাদের আশ্চর্য প্রতিভা। কিন্তু সাধনা না থাকিলে শুধু প্রতিভাদ্বারা কিছুই হয় না। বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ সরস্বতীর আরাধনা যেমন করিয়া করিয়াছেন, এমন আর কয়জন লােক করিয়াছে ? কাজেই মানুষকে যথার্থ ভাবে বুঝিতে হইলে তাহার সাধনাটিকে ভাল করিয়া দেখিতে হইবে। কীচনারের অসাধারণ প্রতিভা ছিল না, কিন্তু তাহাকে কি করিতে হইবে এবং সেই কাজ সম্পন্ন করিতে হইলে তাহাকে কোন্ পন্থা অবলম্বন করিতে হইবে, তাহা তিনি সর্বাগ্রে ঠিক করিয়া লইতেন। তৎপর সেই কাজ সৰ্বাঙ্গসুন্দরভাবে সমাধা করিবার জন্য তাহার সমস্ত শক্তি নিয়ােজিত করিতেন। তাহার সেই চেষ্টার মধ্যে কোনো শৈথিল্য, কোনো আলস্য বা কোনাে ত্রুটি থাকিত না। ইহাই তঁাহার কৃতকাৰ্যতার মূল কারণ এবং এই কৰ্ম্মপ্রাণ মহাপুরুষের জীবনের ইহাই প্রধান শিক্ষা। সমাপ্ত।

তিন আনা সংস্করণ কল্পতরু গ্রন্থাবলী
বিদ্যাসাগর
হাজি মহম্মদ মহসীন
মাইকেল মধুসূদন
আনন্দমোহন বয়
৩। বঙ্কিমচন্দ্র
১৪।
জর্জ ওয়াশিংটন
রাজা রামমোহন রায়
প্যারীচরণ সরকার
লর্ড কিচনার
ঠাকুর রামকৃষ্ণ
বিবেকানন্দ
নেপােলিয়ান
ভূদেব
রমেশচন্দ্র দত্ত
জেমসেন্জী টাটা
রামদুলাল সরকার
গোলে
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ
২১। দ্বিজেন্দ্র লাল
কৃষ্ণদাস পাল
চে
ভট্টাচার্য এণ্ড সন্
ময়মনসিংহ লাইব্রেরী, ময়মনসিংহ
ভট্টচাৰ্য এণ্ড সন্
৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Lord Kichenar

Author
Ghosh ,amulyakrishna
Title
Lord Kichenar
File name
Lord Kichenar
Text
OCR done
Citation
1920
Published
2010/02/13
Publisher
Debtacharan Bhattacharyya , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
68
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Kichenar
DLI number
511185
Barcode
4990010018355.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
80XcQqvwOD6
Download PDF

Lord Kichenar