Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Maru-pradip
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মরু-প্রদীপ
শ্ৰীঅশ্বিনীকুমার পাল, এম. এ.
প্রবর্তক পাবলিশিং হাউস
৬১ বহুবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রীরাধারমণ চৌধুরী বি. এ.
এবৰ্ত্তক পাবলিশিং হাউস
১ হাজার ৫ট, কলিকাতা।
ঐ 268
3
অমী! r"
23, 3, --
গুরু লাইব্রেরী
২০৪ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
দুই টাকা
ruarpars jaikrisana Pundic Library.
Accn. No৮a... Date.2.3.
মুদ্রাকর ।
এগুরুদাস বহু
প্রবর্তক এিটিং এ্যাও হাফটোন লিঃ
২৩, হাজার ট, কলিকাতা।
১৯৪১ খৃষ্টাব্দে জাপানের সমরশক্তি বর্মামুলুক আক্রমণ করে, এবং ১৯৪২-এর প্রথম দিকে ইংরেজরা বর্মা ছেড়ে এদিকে পালিয়ে আসে। কিন্তু ইংরেজশাসক- শক্তির ভরসায় যে-সকল ভারতীয় এতকাল ধরে বময় আশ্রয় নিয়েছিল, তারা নানাবিধ দুর্দশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সময় লক্ষ লক্ষ ভারতবাসী যারা বমাপ্রবাসী ছিল, তারা উত্তর-পশ্চিম এবং পশ্চিমের দুর্গম ও দুরারােহ পথে ভারতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তাদের মধ্যে বহু বাঙ্গালী পরিবারও ছিল। ‘মরু-প্রদীপ' বইখানির যিনি লেখক, তিনিও সেই পলাতক দলের মধ্যে অন্যতম ভদ্রলােক। বহু কষ্টে ও দুঃখের ভিতর দিয়ে তিনি বাঙ্গলায় ফিরতে সমর্থ হন, এবং ফিরে এসে কোনাে একটি মাসিক পত্রে তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেন। আমি তার সেই রচনা পাঠ করে বেদনা, উৎপীড়ন ও বিপর্যয়ের একটি বাস্তব চিত্র মনে মনে উপলব্ধি করি, সম্প্রতি অশ্বিনীবাবু তার কয়েকটি রচনা একত্র করে এই বইখানি প্রকাশ করছেন, সেজন্য আমি বিশেষভাবে উৎসাহবােধ করছি। তাঁর রচনায় ভাবাবেগের প্রাধান্য কিছু থাকলেও তাঁর রচনাশক্তিতে একটি সহজাত
চার
অন্তদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। এই বইয়ের অন্যান্য
গল্পগুলি সুপাঠ্য এবং কলাকুশলতায় সেগুলি সাধারণ
পাঠকদের সুদৃষ্টি লাভ করবে, এই আমার বিশ্বাস। তিনি
যদি তার বর্মপ্রবাসের অভিজ্ঞতাগুলি সযত্নে লিপিবদ্ধ
করেন, তবে সেগুলির সাহিত্যমূল্য লেখকসমাজে অবশ্যই
স্বীকৃত হবে।
জ্যৈষ্ঠ ১৩, ১৩৫২
প্রবােঘকুমার সান্যাল
সেদিন ছিল এমনি জ্যৈষ্ঠ মাস : চঞ্চল বালক বয়স : গ্রীষ্মতপ্ত আসন্ন সন্ধ্যায় ‘বৈশাখী’ আমতলায় আম কুড়ােতে গিয়েছি ;-পাশেই বাবার শেষ শয্যাভূমি।—সেদিকে চেয়ে নীরব স্তব্ধ ব্যথিত প্রাণে বলে উঠলাম । “কায়াহীন ছায়াহীন ভাষাহীন মিশে গেছ ধরার ধূলায়” সেদিন থেকে প্রাণ জেগে রইল কী এক অজানার সন্ধানে। তারই কথা ব্যক্ত করতে চাইলাম কবিতায়, গানে, গল্পে ও প্রবন্ধে। আজ তারই পূজার প্রথম নিবেদন এই মরু-প্রদীপ। দীর্ঘ রেংগুন-প্রবাসকালে চাকুরীজীবনের ফাকে ফাকে যে সাহিত্য প্রেরণা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে, তারই প্রয়াসম্বরূপ এই গল্পগুচ্ছের বর্তমান সামরিক-সভ্যতার চূড়ান্ত ধ্বংসাভিনয় ব্ৰহ্মদেশের শান্তিপূর্ণ ভূমিকে যেভাবে বিধ্বস্ত করেছে তারই আংশিক চিত্র আমার গ্ৰথম গল্পে চিত্রিত করেছি। এ ছাড়া কয়েকটি বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত গল্পও এতে সন্নিবদ্ধ হ'ল । পুস্তকের অধিকাংশ গল্পই ভারতবর্ষ, বসুমতী, প্রবর্তক, আনন্দবাজার প্রভৃতি নানা মাসিক ও দৈনিক পত্রে পত্রস্থ হয়েছিল। কতিপয় বিশিষ্ট বন্ধুর সংপরামর্শে সেগুলি একত্র সমাবেশ করে ‘মরুপ্রদীপে প্রকাশিত হ’ল। এই পুস্তক প্রকাশে যারা আমাকে উৎসাহদান করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে প্রবর্তক-সম্পাদক শ্রদ্ধেয় বন্ধু শ্ৰীযুক্ত রাধারমণ চৌধুরী মহাশয়ের নাম বিশেষ উল্লেখযােগ্য। তিনি স্বয়ং এই বইটির প্রকাশ-ভার না নিলে গল্পগুলি মাসিকের পৃষ্ঠা থেকে পুস্তকের পৃষ্ঠায় রূপান্তরিত হতাে না। এজন্য তার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। এ-প্রসঙ্গে সুকবি ও নাট্যকার শ্ৰীযুক্ত দেবনারায়ণ গুপ্ত মহাশয়ের ছয় নামও উল্লেখনীয়। তিনি আমাকে এ-বিষয় একাধিকবার উৎসাহদানে অনুগৃহীত করেছেন। বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী শ্ৰদ্ধাস্পদ শ্ৰীযুক্ত প্রবােপকুমার সান্যাল মহােদয় পুস্তকের একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় আমাকে যে উৎসাহ দান করেছেন, তা আমার পক্ষে একান্তই অভাবনীয় ব্যাপার। এজন্য কৃতজ্ঞচিত্তে তঁাকে আমার সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এছাড়া বইটির প্রচ্ছদ পট একে দিয়েছেন চিত্রশিল্পী-কুশল কুমারী রমা গুহ ও ছাপার যাবতীয় কার্য পর্যবেক্ষণ করেছেন বর্তমানের অন্যতম প্রসিদ্ধ গীতিকবি শ্ৰীযুক্ত বিনয়ভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয়। এজন্য তারাও আমার বিশেষ ধন্যবাদাহঁ । পরিশেষে আমার নিবেদন এই যে, পুস্তকাকারে ‘মরুপ্রদীপ প্রকাশ আমার জীবনের প্রথম প্রচেষ্টা ; কাজেই অল্পবিস্তর ত্রুটী-বিচ্যুতির সম্ভাবনা আছে। গল্পগুলি যদি কারও মনােরঞ্জনে সমর্থ হয়, তাহলে নিজকে ধন্য ও কৃতার্থ মনে করবাে। অশ্বিনী পাল
পরম শ্রয়ে ভারতবর্ষ”-সম্পাদক
শ্ৰীযুক্ত ফণীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায় এম. এ.
চরণকমলেষু
ফণিদা’,
বােমা-বিধ্বস্ত সুদূর বম। প্রদেশ থেকে যখন
প্রাণভয়ে পায়ে-হাঁটা পথে বাংলাদেশে ফিরে আসি,
তখন পথের শত বাধা-বিপত্তিকে ঠেলবার শক্তি দিয়েছিল
আমার কবিমন । সেদিনের সেই পথের কাহিনীকে
লিপিবদ্ধ করে যখন নিয়ে আসি আপনার কাছে,
আপনি সেদিন যে উৎসাহ দিয়েছিলেন, উত্তরকালে
সেই উৎসাহই আমার সাহিত্য-সাধনার পথকে সুগম
করে দিয়েছে। তাই আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ সশ্রদ্ধচিত্তে
আপনাকেই অর্পণ করলাম ।
স্নেহধন্য
অশ্বিনী পাল
সুচী
ইভাকুইজ, ফ্রম রেংগুন
বেসুর
৫ ও
অন্ধের প্রেম
শিল্পী
মনের পরশ
একটি মেয়ে
ইনফ্লুয়েন্স
বি. এ., বি. টি,
তবুও হলাে না জানা
প্রেমের অভিশাপ
৭৯
১৪
১০০
পল্লীপ্রান্তে
নারীর উক্তি
স্পাই
মরু-প্রদীপ ইকুইজ, ফ্রম্ রেংগুন স্বপ্ন। একটা বিরাট স্বপ্ন-সমুদ্রের প্রবাহস্রোতে ভেসে চলেছে সমস্ত সভ্যজগতের মানব-ইতিহাস ! বর্তমান শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি যত প্রকার ব্যবস্থা রয়েছে মানব-চরিত্র গঠনের জন্য, তার মূলে রয়েছে দুঃখবাদ ; উচ্ছংখল জীবন-স্বপ্ন। মানব-জীবনের মর্মভেদী করুণ আর্তনাদ। আজ প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে তারই বিষাদ ধ্বনি দিদিগন্তরে ধ্বনিত হচ্ছে। ১৯৪২। ২৩ ও ২৫ ডিসেম্বর বােম-বরিষণের পর রেংগুনের ঘরে-বাইরে, রাস্তায় ঘাটে যে দৃশ্য দেখলাম, সে সব বলে কোন লাভ নেই; তখন রেংগুন থেকে পালাতে পারলেই বরং লাভ। কিন্তু পালাতে চাইলে পালানাে যায় না। কোন্ পথে পালাতে হবে ? স্থলপথে, না জলপথে— এখন এ চিন্তাই বিপুল আকার ধারণ করে সম্মুখে এসে দাড়ালাে। তার উপর ন্যাশনাল ইন্ডিয়ান্ লাইফ অফিসে কাজ করি, অফিসের সমস্ত ভার আমার উপর। জেনারেল ম্যানেজার মিষ্টার বােসের কাছে টেলিগ্রাম করলাম কলকাতায়। জবাব এলো—প্রথম শ্রেণীর টিকেট করে’ জলপথে সত্বর চলে এসাে, অফিসের দরকারী কাগজপত্র নিয়ে। শুনতে পেলাম বংগােপসাগরে জাহাজ ডুবছে; ত্যাগ করলাম এ পথ। অফিসের দারােয়ান রামকিষণ ও পিয়ন মণীন্দ্রকে সংগে নিয়ে চলে গেলাম চায়লট। এখানে সংগী জুটুলে সতর-আঠাবােজন। সুরেশ, বন্ধু ডাক্তার পালের স্ত্রী, তার ছেলেপুলে এবং হাসপাতালের মরু-প্রদীপ ২ কম্পাউণ্ডারবাবু, তার স্ত্রী শকুন্তলা দেবী ও তাদের ছেলেপুলে। বসির ও সৈ—দু’জন ভৃত্যও এলাে। ১৩ই ফেব্রুয়ারী চায়লট থেকে আমরা ষ্টীমারে রওনা হয়ে এলাম হাজাদা। এখান থেকে আবার একটি বাংগালী পরিবার আমাদের সংগ ধরলাে। ভদ্রলােকের নাম সুধাংশুবাবু; সে নিজে, স্ত্রী, বয়স্থা মেয়ে নাম গৌরী। আমাদের দল বেশ ভারী হয়ে উঠলাে। হাজাদা থেকে আবার ষ্টীমারে দু’ দিনে এসে পৌছালাম প্রাম-রাত্রি এগারােটার সময়। অপরিচিত শহর ; ব্ল্যাক-আউটের রাত; এতগুলি লােক নিয়ে কোথায় যাই? প্রােমে একজন পরিচিত বন্ধু ছিলাে; অনেক খুঁজে তার বাসা পেলাম ; বললাম—ভাই, পরের কতগুলি মেয়েছেলে সংগ ধরেছে, আজ রাত্রের জন্য তােমার এখানে স্থান হবে ? কালই আবার এখান থেকে রওনা হব। বন্ধুটি আগুনের মতাে জ্বলে উঠে আমাকে একপ্রকার তাড়িয়ে দিলে ; তার বাসায় স্থান হবে না, রেংগুন থেকে নাগ-পরিবার এসে তার ওখানে উঠেছে ; সে দুশ্চিন্তায় তার রাত্রে ঘুম আসে না, অনেকগুলি ছেলেপুলেও নাকি আছে ; আছে ; শহরে কলেরা লেগেছে, কখন কি হয় বলা যায় না; ইত্যাদি কারণে সে স্থান দিতে অক্ষম। ফিরে এলাম। পথে এক বাংগালি ভদ্রলােকের সংগে দেখা হলাে : তাকে সব বৃত্তান্ত খুলে বললাম : শুনে তিনি বললেন, মেয়েছেলেরা এখন কোথায় ? ষ্টীমার থেকে নেমে নদীর পাড়ে বসে আছে। ভদ্রলােকের দয়া হলাে। নিজের স্ত্রী-পুত্র আগেই দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বললেন, আমি তাে এখন মেসে থাকি। তবে আমার ঘরটা খালি আছে : এই নিন্ চাবি, চলুন আপনাদের ঘরে পৌছে দিয়ে আসি। ভদ্রলােকের অনুগ্রহে অবশেষে স্থান পেলাম। কিন্তু সে রাতটা আমাদের ভয়ানক অশান্তিতে কাটলাে। রাত একটার সময় চার-পাঁচজন মরু-প্রদীপ বর্মী এসে আমাদের সম্বন্ধে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করে গেলাে। মনে হলাে, এদের কোন দুরভিসন্ধি আছে। এদিকে চারদিকে লুঠপাটের কথা শুনছি। তার উপর বন্ধুর কাছে শুনে এলাম কলেরার কথা : ছেলেপুলে আমাদের সংগেও একপাল । একটু আলাের যােগাড় না করলে চলে না: সমস্ত অন্ধকার ঘরটা যেন গিলে খেতে চাচ্ছে। সমুখের রাস্তায় একটা পানের দোকানে তখনও কোনােসিন লণ্ঠন জ্বলছে, কালাে কাগজে ঢাকনি দেওয়া : আলাে যেন বাইরে না পড়ে। সেখানে গিয়ে মােমবাতি পেলাম। একত্র চার-পাঁচটা মােম জেলে ঘরে আলাের ব্যবস্থা করলাম। মেয়েরা সব ছেলেপুলে নিয়ে বসে আছে : সকলের মনেই বিষাদের ছায়া : কারাে সংগে কথা বলতে সাহস হয় না। এদিকে ছেলেপুলের দল ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ভয়ানক কান্না ও বায়না শুরু করে দিয়েছে । কিছু খাবার কিনতে গেলাম, কিন্তু কোথাও কিছু মিললো না, সব দোকান বন্ধ। ষ্টীমারের চায়ের দোকানে বিস্কুট দেখে এসেছি। ষ্টীমার-ঘাট এখান থেকে প্রায় এক মাইল, শর্টকাট করে একটা রাস্তায় ঢুকতেই কয়েকজন বর্মী এসে পকেটে হাত দিতে চাইলাে ; ভয়ে এতটুকু হয়ে গেলাম ; সংগে ছিলাে কম্পাউণ্ডারবাবুর ভৃত্য বসির ; সেও এদের চেয়ে কম গুণ্ডা নয়। একজন বর্মীকে এক ঘুষিতে ‘পপাত ধরণী তলে করে দিলাে। বাকী সব দৌড়ে সম্মুখের আমবাগানে পালালাে। অক্ষত পকেটে সেখান থেকে ষ্টীমারে গিয়ে বিস্কুট কিনলাম । রাত্রে শােবার জন্য বিছানাপত্র কিছু নেওয়া হয়নি। বিছানা, ট্রাঙ, সুটকেস্ ও অন্যান্য মালপত্র নদীর পাড়ে নামিয়ে রাখা হয়েছে। রামকিষণ, মণীন্দ্র, সুরেশ আর সুধাংশুবাবু এরা ক’জন মালের কাছে বসে মাল পাহারা দিচ্ছেন। এত রাত্রে কুলী মিললাে না বলে’ মালপত্র আজ এখানেই থাকবে স্থির হলাে। সুরেশ, মণীন্দ্র আর সুধাংশুবাবুকে সেখানে মরু-প্রদীপ ৪ ; রেখে রামকিষণ ও বসিরকে বললাম—গােটা দুই বিছানা নিয়ে আমার সংগে আসতে। এসে দেখি প্রায় সবাই কাঠের মেঝের উপর ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেপুলের গায়ের জামা খুলে’ বালিশের পরিবর্তে মাথার নীচে দেওয়া হয়েছে; গৌরীর বালিশ একটা পিড়ি। এভাবে শু’লে নিশ্চয়ই মাথায় বেদনা হবে। পিড়িখানা সরিয়ে নিজের গায়ের শার্টটা খুলে মাথার নীচে দিলাম। গৌরী ঘুমিয়ে পড়ে নি ; চোখ মেলে আমার চোখে চাইলাে; লজ্জা-অরুণ পরশে সহসা ওর মুখখানা যেন রাঙা হয়ে উঠলো; অধরপ্রান্তে ফুলাে করুণ রেখার হাসি। ডাক্তার পালের স্ত্রীর মাথা তার দক্ষিণ বাহুর উপর। কম্পাউণ্ডারবাবুর স্ত্রী শকুন্তলাদি আর গৌরীর মা শুধু বসে। এদের বললাম, ডাকাডাকি করে সবার ঘুম ভাঙ্গিয়ে লাভ নেই: রাত অনেক হয়ে গেছে : আপনারা এই বিছানা পেতে শুয়ে পড়ুন। বিস্কুট এনেছি, ছেলেপুলে তাে ঘুমিয়ে পড়েছে; আচ্ছা থাক : ওদের জন্য রেখে দিন, কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে খাবে। দিনকাল ভালাে নয়, কলো লেগেছে। পরদিন সকালে উঠেই বাজার করতে গেলাম। চাল, ডাল, তরকারী যা পেলাম নিয়ে এলাম ; লবণ পেলাম মাত্র দু’ আনার, বেশী বিক্রী করবে না ; তাড়াতাড়ি রান্নাবান্না করে খেয়ে আবার রওনা হওয়ার যােগাড় করলাম। প্রােম নদী বয়ে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে গিয়ে নামতে হবে। একখানা বড় শাপান ( ঐদেশী নৌকা। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ভাড়া করলাম, আগে এ জায়গাটুকু যেতে মাত্র দু’ টাকা ভাড়া লাগতাে। নদী পার হয়ে যেখানে নামবাে, তার নাম পাড়া; নদীর পাড়ে একটা মাঠ। এ পাড়া থেকে একশাে দশ মাইল পাহাড়ের উপর দিয়ে হেটে গেলেংগুব পড়ে। এ রাস্তায় ভাত জল কিছুই পাওয়া যায় না। আমরা এক বস্তা চাল ও আনুষঙ্গিক মাল-মশলা কিনে নিলাম। জলের জন্য এগারােটা কেরােসিন তেলের টিনও এগারাে টাকা দিয়ে মরু-প্রদীপ । কিনে থােম নদী থেকে জল ভরে’ শার্পনে উঠলাম। নদীর পাড় থেকে মালপত্র এনে শাম্পানে উঠানাে হয়েছে। তাতে কুলী খরচ লেগেছে পাঁচ টাকার জায়গায় পচিশ টাকা। এ সময় আর একজন সংগী জুটলাে—নিতাই। আমাদের সকলেরই পূর্বের জানা-শোেনা। কম্পাউণ্ডারবাবু বললেন, ভালই হলাে। মেয়েছেলে নিয়ে চলেছি। বিপদসংকুল পথ, আমাদের অনেকটা সাহায্যই হবে। আর ছােরার সাহসও আছে, শক্তিও আছে। একবার একজন বর্মীকে ও এক ঘুষিতে নৌকো থেকে জলে ফেলে দিয়েছিলাে; বেশ সাহস! আমার তাে সাহস বল কিছুই নেই। যা ছিলাে এ যুদ্ধের ঠেলায় তাও আর নেই। বেলা একটার সময় পাডাং এসে পৌছালাম। দেখলাম, প্রায় হাজার দুই লােক এখানে জমা হয়েছে। এখানে সেখানে পড়ে রয়েছে। ফাগুনের দুরন্ত বােদ সবার মাথার উপরে। সেই রৌদ্রতপ্ত মাঠের মধ্যেই কেউ কেউ রান্না করে খাচ্ছে। আশেপাশে কলেরা রােগী, মৃত্যু-যাতনায় কেউ কেউ ছট ফট করছে। কিন্তু সেদিকে কে চায় ? সবাই ব্যস্ত যার যার জীবন নিয়ে ; সকলেই আপন প্রাণের মায়ায় এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় সরে পড়াই ভালাে। আশেপাশের দৃশ্য দেখলে প্রাণ আতংকে ভরে ওঠে। পীড়িত লােকদের মধ্যে প্রায় সবাই ছােট জাতির ; মাদ্রাজী কুলীশ্রেণীর লােক। টাকা পয়সা সংগে কিছু নেই, শুধু পরণের কাপড়খানা সম্বল। সম্মুখের সুদীর্ঘ পাহাড়ী পথ হেটে পার হওয়া অসম্ভব ভেবে তারা আর এগুতে সাহ পায়নি। এখানেই দিনের পর দিন পড়ে আছে। শেষে কলেরাক্রান্ত হয়ে কেউ মরছে, কেউ বা অসহ্য যন্ত্রণা ভােগ করছে। এই একশাে দশ মাইল পাহাড়ী পথ অতিক্রম করবার জন্য সেখানে গরুর গাড়ী পাওয়া যায়; কিন্তু ভাড়া অনেক! পঞ্চাশ-ষাট টাকা একখানা সচেষ্ট।
মরু-প্রদীপ গাড়ীর ভাড়া। পঞ্চাশ-ষাট টাকার কথা শুনে সুধাংশুবাবু দমে' গেলেন ; তিনি হ্যাজাদায় আবার ফিরে যাবেন ; এতাে টাকা তার সংগে নেই ; বললাম, চলুন টাকার জন্য ভাবতে হবে না। সকলে মিলে সাতখানা গাড়ী করলাম ; একখানা খাদ্যসামগ্রী বহন করে নেবার জন্য। গাড়ীর মধ্যে দেড় হাত পরিমাণ উচু খড় বােঝাই ; গরুর রাস্তার খাবার। তার উপরে বিছানা পেতে আমাদের বসবার জায়গা করলাম। উপরে কোনো ঢানি বা ছই নেই। গাড়ী—আমাদের মালপত্রেই ভরে গেলাে। কাজেই বর্মী গাড়ােয়ান ওদের ভাষায় গালাগালি করতে লাগলাে এবং একখানা গাড়ীতে দু’জনের বেশী উঠতে দিতে চাইলে না, আমরা বাধ্য হয়ে আর একখানা গাড়ী করলাম। টাকার দিকে এখন চাইবার সময় নেই, যে পথে বের হয়েছি এবং যে দৃশ্য চক্ষের সামনে দেখছি, আর এক মুহূর্তও দেরি করা চলে না। একত্র আটখানা গাড়ী চলছে মাঠের উপর দিয়ে, আমি একা একখানা গাড়ীতে উঠেছি, সকলের আগে চলেছে গাড়ীখানা, কারণ দলপতি আমি : কিন্তু বিপদের কথা কি বলবো, গরুর গাড়ীতে জীবনে কোনদিন উঠিনি। একটা জায়গা ভাংগা; গাড়ী সেখান দিয়ে যেতেই দুডুম করে’ নীচে পড়ে গেলাম; ভাগ্যি, হাত পা ভাংগে নি, তাড়াতাড়ি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আবার গাড়ীতে বসলাম ; পিছনের ওরা দেখে সব হাে হাে করে হেসে উঠলল, হাসলাে না শুধু গৌরী; আমার ঠিক পিছনের গাড়ীতেই সে বসে, ডেকে বললাে লাগেনি তাে? চুপ করে রইলাম : লজ্জায় যেন কিছু বলতে পারলাম না; শুধু সে “লাগেনি তাে” ” স্নান কণ্ঠস্বর আমার অংগে ভাষাময় ধ্বনি হয়ে বাজতে লাগলাে। রাত্রি বারােটার সময় একটা নির্জন কাশবনের ধারে এসে গাড়ী থামিয়ে দিলাে। মেয়েরা গাড়ীর উপরেই বসে রইলাে; আমরা চা তৈরী করতে লাগলাম। ভয়ানক শীত পড়েছে, দাউ দাউ করে আগুন জেলে •• মরু-প্রদীপ ? দিয়েছি। সকলেই আগুনের চারিদিক ঘিরে বসলাম, বসির আর রামকিষণ চা তৈরি করে গ্লাসে ঢেলে সকলকেই দিলে। রাত্রি ভাের হ’তেই গাড়ী ছাড়লাে। বেলা এগারােটার সময় এসে পৌছালাম একটা ছােট পাহাড়ের গায়। প্রকাণ্ড একটা কুলগাছ, তার নীচে গাড়ী রেখে রান্নার জোগাড় করা হলাে। এখানে আরও কেউ কেউ রান্না করে খেয়ে গিয়েছে, হাড়ি, পাতিল ও ইটের উনুন পড়ে রয়েছে, একটু দূরেই তুলাে-বের-হয়ে-পড়া বালিশ। শকুন্তলাদি’ বলে উঠলেন, এখানে নিশ্চয়ই কেউ মারা গেছে, দেখছেন না ঐ ছেড়া বালিশটা বললাম, মরণপথের যাত্রী আমরা সবাই, ভয় করলে চলবে না, এখানেই রান্না করতে হবে, এই উনুনেই। সামনে একটা কূয়া ছিলো, সেখান থেকে হাত মুখ ধুয়ে জল এনে রান্না করে খেয়ে বেলা চারটের সময় আবার পথ ধরলাম। এখন থেকে রীতিমত পাহাড় আরম্ভ হলাে ; শুধু পাহাড়ের মরুভূমি, উত্তপ্ত বহ্নিজলায় পরিপূর্ণ ; শুধু আগ্নেয় নিঃশ্বাসে ভরা, তারই পার্শ্বে আবার গহন অরণ্য : দিগন্তব্যাপী ; ভীষণ হিংস্র জন্তুর লীলাভূমি, মাঝখান দিয়ে সংকীর্ণ পথ, পাহাড় কেটে পথ বের করা হয়েছে, শুধু একখানি গাড়ী যেতে পারে সে পরিমাণ মাত্র প্রশস্ত। এক পার্শ্বে প্রায় চার হাজার ফিট উচু পাহাড়, অপর পার্শ্বে তলহীন গিরিগর, বিরামহীন এই দৃশ্য ; পাহাড়ের পর পাহাড় ; অরণ্যের পর অরণ্য ; গহ্বরের পর গহ্বর, এক বিরাট বিশাল নির্জনতায় পরিপূর্ণ ; সারা বিশ্ব যেন এখানে এসে পড়ে রয়েছে—সর্ব প্রাণশক্তিহীন হয়ে । ভয়ে বুক কাপে; গাড়ী একটু অসাবধানে চললেই হলাে, দু’ মাইল নীচে গিরিগহ্বরে শ্বাপদসংকুল অরণ্যের মাঝে মৃত্যুবক্ষে স্থান অনিবার্য। গাড়ী ক্রমাগত উপরের দিকেই উঠছে, গাড়ী থেকে নেমে মেয়েদের গাড়ী পিছন থেকে ঠেলে ধরতে হয়, আবার গাড়ী নীচের দিকে নামবার •• মরু-প্রদীপ সময়ও পিছন থেকে টেনে ধরতে হয়, নচেৎ গাড়ী উল্টে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। এর মধ্যেই একটি গুজরাটী পরিবার ছেলেপুলে সহ কোন গিরির সানুদেশের পাতালপুরীতে ঢুকে পড়েছে, তার কোন খোঁজ নেই। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু এখন আমাদের পিছন পিছন চলছে। ভয়ে গাড়ী থেকে নেমে হাটতে লাগলাম, মেয়েদের ও ছেলেপুলে শুধু গাড়ীতে রেখে, কারণ তাদের পক্ষে হেঁটে যাওয়াও অসম্ভব : প্রত্যেক গাড়ীর পিছনে আমরা একজন করে পুরুষ পাহারা দিয়ে চলেছি, একটু অসাবধান হলেই গাড়ী মারা যাবার কথা। যেখানে রাস্তা ভাংগা বা অত্যন্ত খাড়া, সেখানে মেয়েদের ছেলেপুলে সহ নামিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মেয়েরা আবার সব সময় ভয়ে নামতে চায়নি, রাস্তার দু' পাশে মৃতদেহ-পচা, গলা, মাংস বের হওয়া। দ্বিতীয় দিন রাত্রি বারােটার সময় জ্যোৎস্না অস্ত গেলাে; সকলেই আমরা গাড়ীর উপরে, হঠাৎ একটা জায়গায় এসে দেখি—সম্মুখে পঞ্চাশ-ষাটখানা গাড়ী রাস্তা বন্ধ করে দাড়িয়ে রয়েছে, পাশ কেটে কারাে আগে যাবার সাধ্য নেই ; কারণ রাস্তা সংকীর্ণ—দু’খানা গাড়ী পাশাপাশি চলতে পারে না। বাধ্য হয়ে সেখানে আমাদের গাড়ীও থামাতে হলাে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর জানা গেলাে, সকলের আগের গাড়ীর গরু ভয়ানক দুর্বল হয়ে জিব, বের করে রাস্তায় শুয়ে পড়েছে ; আজ আর কোন গাড়ী চলবে না। এখানেই থাকতে হবে। গাড়ােয়ানরা গাড়ী থেকে গরুগুলিকে ছাড়িয়ে নিয়ে পাহাড়ের গায়ে বাধলো, গাড়ী থেকে আমাদের নামিয়ে দিয়ে মালপত্র ও বিছানা যেমন খুশী ঠেলে সরিয়ে নীচে থেকে গরুর খড় টেনে বের করে গরুগুলিকে খেতে দিলো। আমাদের পাড়াবার পর্যন্ত এতটুকু স্থান নেই। একদিকে উচু পাহাড়, অপর দিকে সেই পাহাড়ের তলহীন গহর। একটু অসাবধান হলে রক্ষা নেই ; ছেলেপুলে কোলে নিয়ে গাড়ী ধরে’ মৃত্যুর হাতে প্রাণ-সমর্পণ করে’ ভয়ব্যাকুল চিত্তে রাস্তার মরু প্রদীপ উপর আমরা দাড়িয়ে রইলাম। কম্পাউণ্ডারবাবুর মেয়ে আভা আমার কোমর জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে ভয়ে কাপছে। ছেলেপুলেগুলি জল জল করে’ চীৎকার করছে। একটা জলের টিনে সামান্য একটু জল আছে ; তাই সকলকে একটু একটু দিয়ে ঠাণ্ডা করলাম। শোনা গেলােকাল বেলা বারােটার পূর্বে কোথাও জল পাওয়া যাবে না। ভেবে কোন ফল নেই, অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে। জলের অভাবেই শেষে দেখছি মরতে হবে। আভা একটু জল খেয়ে অমনি আবার বমি করে দিলাে। হঠাৎ কোখেকে ভয়ানক পচা গন্ধ এলাে, পকেটের টর্চটা জ্বেলে আশে- পাশে ভালাে করে চেয়ে দেখি—কয়েকটা মৃতদেহ ; পচে গলে’ পড়ছে। চুপ করে গেলাম কাউকে কিছু না বলে ; এমনিই ভয়ে অস্থির, তার উপর পাশের এ দৃশ্য দেখলে হয়তাে ফিট হয়ে পড়বে। গরুগুলির ঘাস খাওয়া শেষ হলাে। এখন আর খড় টেনে বের করতে হবে না; তাড়াতাড়ি মেয়েদের ও ছেলেদের গাড়ীতে উঠে বসতে বললাম। আমরা পুরুষেরা গাড়ীতে • উঠে বসতে চাইলে গাভােয়ানরা দা’ দেখিয়ে বারণ করে বললাে, কেটে ফেলবাে গাড়ীতে আমাদের পরিবর্তে তারাই উঠে আমাদের বসবার বিছানা তুলে তাদের শােবার ব্যবস্থা করলাে এবং শুলো। সারা রাত মৃত গলিত শবের গন্ধ সহ্য করে দাড়িয়ে দাড়িয়ে রাত্রি ভাের করলাম। পরদিন আবার গাড়ী চললাে : এবার একত্রে শ'খানেক গাড়ী। আমাদের সম্মুখের গাড়ীগুলি আগে আগে : মনে হলাে আমরা যেন জগতের আদিম অধিবাসী ; অসভ্য বর্বর গুহাবাসী, যেখানে যাই, দল বেঁধে যাই। যেখানে পাহাড়ে পর্বতে, অরণ্যে বাস করি ; দল বেঁধে বাস করি। যেখানে পাহাড়ের পুরাতন তরুশ্রেণীর ছায়াশীতল স্থানে বিশ্রাম করি, দল বেঁধে বিশ্রাম করি। এ পাহাড়, এ অরণ্য, গিরিগহ্বর আমাদের উঠলে ।
মরু-প্রদীপ জন্মস্থান ; এ অরণ্যের শ্বাপদকুল আমাদের ভক্ষ্য : আমরা হিংস্র জন্তুর মত মাংসাশী ; তাই সুসভ্য জগত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাডে, অরণ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি শিকারের সন্ধানে। সমস্ত বাহির বিশ্ব আজ আমাদের কাছে লুপ্ত ; সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমস্ত রাজনীতি, অর্থনীতি, সমস্ত প্রকার প্রগতিশীল আচার, ব্যবহার, চালচলন—সবই যেন আজ আমাদের কাছে অর্থশূন্য ; মৃত কংকালে পরিণত। শহরের স্কুল, কলেজ, কাছারি, আদালত, ধর্ম-মন্দির, পূজা-অর্চনা—সব এক মিথ্যার ছায়ায় ভরা। শুধু সত্যের তিক্ত জীবন-ছবি আমাদের নয়ন সম্মুখে । সেখানে দেবিহ্নিতপ্ত পথের ধূলি, বিশ্ববিহীন নির্জন পাহাড়ের গা ঘেঁষে অনিদিষ্টের পানে ছুটে চলা। পথ সংকীর্ণ ; পথশ্রান্ত ও উত্তপ্ত ক্ষুধিত তৃষিত দেহ, ধূলি-ধূসরিত জীর্ণ শীর্ণ প্রতি অংগ : পরিহিতে ছেড়া কাপড়, ছেড়া জুতা, এ রুক্ষ কেশ; পরিব্রাজকের অনাড়ম্বর বেশ, সন্ধানী আত্মার আকুল কান্না যাত্রাপথের প্রান্ত খোঁজে-এ সকলই যেন জীবনের পরিপূর্ণ মর্মভেদী সত্যের বাণী নিয়ে আমাদের সম্মুখে বিপুল বিরাট রূপে দাড়ালাে। আস্তে আস্তে গাড়ী উঠছে পাহাড়ের উপরে । ঠিক আগের মতো নেতা সেজে বসে আছি সম্মুখের গাড়ীতে, এবার রাস্তা নাক-বরাবর সােজা ; সম্মুখের প্রায় শ'খানেক গাড়ী স্পষ্ট দেখা যায়, সারবন্দী হয়ে চলছে, একেবারে সকলের আগের গাড়ীখানা সকলের পশ্চাতের গাড়ী থেকে প্রায় একশ' ফুট উপরে ; মনে হলাে, আমরা সব ভীমের বড় ভাইয়ের দল, সশরীরে স্বর্গারােহণ করছি। কিন্তু স্বার্গের পখ শুনেছি সুধার সরােবরে ভরা ; এ পথ তা নয় ; এ পথ মরুময়, সাহারার তপ্ত রুদ্ধশ্বাসে পরিপূর্ণ ; ধরার সামান্য একফোটা জলও এখানে নেই ; পিপাসা বুকের তল মরুভূমি করে মুখে চোখে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ছে। সমস্ত প্রশান্ত মহাসাগরের জলও যদি এখন সম্মুখে পেতাম, তবুও যেন ১১ মরু-প্রদীপ ; আমাদের এ শ'খানেক গাড়ীর লােকের দেহের জ্বালা শান্ত হতাে না। আমরা যেন ছুটে চলেছি পৃথিবীর নদ নদী, সাগর উপসাগর মহাসাগর খুজে বের করবার জন্যে, কিন্তু বৃথা চেষ্টা-সম্মুখে পশ্চাতে, ডাইনে, বাঁয়ে শুধু একটানা পাহাড় আমাদের মতােই ক্ষুধিত, তৃষিত পাষাণে পরিপূর্ণ। পাহাড়ের দেহ ভেদ করে সে পাষাণের শুষ্ক জিহ্বা যেন রাস্তার উপর বের হয়ে পড়েছে। গিলতে চায় যেন আমাদের। বেলা তখন বারােটা-একটা বাজে ; হঠাৎ সম্মুখের গাড়ী থেমে গেলাে ; সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গাড়ীও! ব্যাপারটা প্রথম বুঝতে পারলাম ! তবে কি বন্য জন্তু সামনে পড়লাে? কিছু দূরে সম্মুখের দিকে অসংখ্য লােকের কোলাহল শুছি; লােক দেখি না, শুধু কোলাহলধ্বনি ; সামনের পাহাড়টার ঐ পাশ থেকে আসছে। দেখলাম, সকল গাড়ীর গাড়ােয়ানরাই গরু ছেড়ে পাহাড়ের গায় বেঁধে ঘাস দিচ্ছে। গাড়ী থেকে নেমে কত দূর এগিয়ে গিয়ে দেখি—প্রায় দু' হাজার লোেক রাস্তার উপর বসে রান্নাবান্না করছে; এরা প্রায় সকলেই পায়ে হেঁটে এসেছে। তাদের কোলাহলে সমস্ত পর্বতভূমি মুখরিত। এত কোলাহলের কারণ কি? কারণ, এখানে নাকি জল পাওয়া যায়। আনন্দে নিজের বুকও ভরে উঠলাে নিঃশব্দে। তাড়াতাড়ি আমাদের ললাকের কাছে এসে বললাম—সব গাড়ী থেকে নেমে এসে ; রান্না করা হবে। এখানে জল পাওয়া যায়। সকলের মুখেই শুষ্ক ম্লান খুশীর হাসি। এসে একটা ভালো জায়গা খুঁজতে লাগলাম, রান্না করার জন্য ; কিন্তু অসম্ভব। আশে পাশে মড়ার অন্ত নেই। সে কি দুর্গন্ধ ! কিন্তু তাতেও কারাে ঘৃণা বা অপ্রবৃত্তি নেই, মৃত পচা দেহের কাছে বসে খেতে। দুর্গন্ধ ও পচা শবদেহ দৃশ্য আমাদের সয়ে গেছে। আমরা যেন গলিত স্থলিত পচা দেহের প্রবাহ-স্রোতেই ভেসে চলেছি ; আমাদের কাছে মৃত্যু ও মৃত্যুময় দেহই সত্য; জীবন, সমাজ, সংসার—সব মিথ্যা। ;
মরু-প্রদীপ ; মেয়েরা সব রান্না করতে বসে গেলাে; কিন্তু জল কোথায় ? এখানেও কোন সাগর সরােবর দেখি না; তবে লােকের এত আনন্দধ্বনি কেন ? শেষে শােনা গেলো, জল আছে—এ পথ ধরে অনেকখানি নীচে নামলে জল মিলবে। দু’ একজন ছাড়া আমরা সবাই এগারােটা জলের টিন নিয়ে জল আনতে গেলাম। গহন অরণ্য ; মাঝখান দিয়ে একজন লােক চলবার মত রাস্তা; প্রায় এক মাইল নীচে নেমে শেষে জল পেলাম। ঝরণা নয়, স্বচ্ছ নীল সরােবর নয়; অতি ছােট একটি গর্ত ; তার মধ্যে সামান্য টলটলে জল; টিনের গ্লাসে আর চায়ের কাপে করে আস্তে আস্তে জল তুলে টিনে ভরলাম। কিন্তু আশ্চর্য এই, যত ভােলা যায়, গর্তের জল নিঃশেষ হয়ে যায় না; যেমন আছে তেমনি থাকে। এ রকম জলের গত প্রায় সাত-আটটা, সবাই জল তুলে নিচ্ছে। কিন্তু এ জল যে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ তাও বলা যায় না। কারণ এ জলের কিনারাতেই দেখলাম কতগুলি মৃতদেহ। জল খেয়ে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছে চিরজীবনের তরে। এভাবে সমস্ত পাহাড়ী পথ পার হয়ে এলাম সাত দিনে। সাতটা জলন্ত শ্মশানবহি যেন আমাদের সকলকে অর্ধ দগ্ধ করে ছেড়ে দিয়েছে। মরে গেছি আধা : সন্দেহপূর্ণ আধা-জীবিত দেহ নিয়ে এসে পৌছালাম এখান থেকে ছােট জাহাজে আকিয়াব যেতে হবে। কিন্তু টাংগুবের দৃশ্য আরও মর্মভেদী। প্রকাণ্ড মাঠ ; প্রায় সত্তর পঁচাত্তর হাজার ভারতীয় এখানে খােলা মাঠে এসে জমা হয়েছে। দিনের বেলা প্রচণ্ড রৌদ্রের তাপ, রাত্রে ভয়ানক শীত। এ হেন মাঠের মধ্যে হাজার হাজার লােক এখানে সেখানে পড়ে। শহরে যাবার হুকুম নেই, কারণ আমাদের গায়ে মৃত্যু-গন্ধ ; ছোঁয়া লাগলে শহরের কপােরেশন- দেহ রুগ্ন হতে পারে। পড়ে আছি মাঠে, বিশ্বের অনাদৃত হয়ে ; ঘৃণা, অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্যে আমাদের জীবন নুয়ে পড়া। এতটা রাস্তা এসে হয়তাে এখানেই শেষে মারা যাবে। দিনে অন্তত দশবার করে’ খবর টাংগুব।
মরু-প্রদীপ নিতে যাই, ষ্টীমার এখান থেকে কবে ছাড়বে। এ মাঠের কিছু দূরেই ষ্টীমার ষ্টেশন, একটা খালের মতো ছােট্ট লবণাক্ত জলার ধারে। ষ্টীমার আজ তিন দিন যাবৎ নেই; এদিকে আমাদের সংগে এবং আর সকলের সংগে যে চাল ডাল ছিলাে, তা শেষ হয়ে গেছে। শহরে ঢুকতে দেয় না; চাল ডাল কিনবাে এমন সাধ্য নেই ; পৌণে দু’ সের চাল আড়াই টাকা দাম ; মুশুরী ডালের সেরও আড়াই টাকা, একটা দিয়াশলাইর বাক্স চার আনা ; বাধ্য হয়ে এ সুলভ মূল্যেই জিনিষপত্র কিনে জীবন বাচিয়ে রাখলাম। এখানে আবার সেই পাহাড়ের মতােই জল নেই। মনে করেছিলাম, ষ্টীমার ষ্টেশন, নদী যখন আছে, জলের চিন্তা দূর হবে ; কিন্তু জলের তো ঐ অবস্থা, মুখে দেওয়া যায় না—এত বিষাক্ত। গেলাম বস্তিতে জল আনতে, এক টিন জল এক টাকা। বােজ আমাদের দশ টাকার জল লাগতো। এখানেও জলের ও খাদ্যের অভাবে শত শত লােক মরতে লাগলো। এখান থেকে তাড়াতাড়ি জাহাজ পেলে লােকগুলি হয়তাে পার হয়ে গিয়ে বাঁচতে পারত, কিন্তু দৈনিক হাজার হাজার লােক এসে জমা হচ্ছে । চেহারা সকলেরই আমাদের মতাে কংকালসার। মাত্র হাড় ক'খানা কোন রকমে ঠেলে আনা হয়েছে, মানুষের চেহারা কারাে নেই। জীবনের উত্তপ্ত অভিশাপ সকলের চোখে মুখে। এখানে আমরা প্রায় কুড়িটি বাংগালী পরিবার একত্র হয়েছি, সকলেই একটা পাহাড়ী ঝােপের ধারে ক্ষেতের উপর বিছানা পেতে তিন-চার দিন যাবৎ বসবাস করছি। দিনের বেলা ঝােপের ভিতরে বসে’ থেকে রৌদ্রতপ্ত দেহ বাঁচাই আর রাত্রি বেলা কাপড়ের তাবু তৈরী করে’ তার নীচে শীতে বরফ হয়ে ঘুমােই। মিষ্টার সুরেশ বােস, হেড, মাষ্টার লাহিড়ীবাবু, অজিত ঘােষ, ডাক্তার দত্ত ইত্যাদি আমরা সকলে মিলে পরামর্শ করলাম—কেউ কাউকে ফেলে যেতে পারবাে না, যেতে মরু-প্রদীপ ১৪ হয় সকলে একত্র এক সংগে টিকেট করে যাবাে, হয় এখানে সকলে এক সংগে মরবাে। সংকল্প উদার, অন্তত বাংগালীর পক্ষে। পরদিন তিনখানা জাহাজ এক সংগে এলাে। লােক পাগলের মত ছুটোছুটি করতে লাগলাে টিকেটের জন্য । কিন্তু কার সাধ্য টিকেট ঘরের কাছে যায়; টিকেট ঘর থেকে প্রায় আধ মাইল পর্যন্ত লােকের ভিড় ; তার উপর পুলিশের তাড়না। বিনয়-নম্র বচনে এখানে টিকেট মিলে না; গায়ের বলেও নয়, শিক্ষার ছাপেও নয়, একমাত্র উপায় টাকা। আমরা একশাে টাকা ঘুষ দিলাম একশাে টিকেটের জন্য, মিললাে টিকেট অনায়াসে। পরে আমাদের মধ্যে টিকেট ভাগাভাগির পর জাহাজে উঠবার বন্দোবস্ত হলো। মালপত্র যা-কিছু সব নদীর তীরে এনে একত্র করে রাখা হয়েছে, জাহাজ একটু দূরে নােঙর ফেলে দাড়িয়ে রয়েছে, এখনও তীরে লাগে নি, আমরা সব প্রস্তুত হয়ে দাড়িয়ে রয়েছি ; কিন্তু যখন জাহাজ তীরে এসে ভিড়লো তখনকার অবস্থা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না, প্রায় হাজার তিনেক লােক এসে ঝুকে পড়লাে ; এদের মধ্যে টিকেট অনেকেই করে নি বা করতে পারে নি। মেয়ে- ছেলে নিয়ে ভীষণ চাপে পড়ে গেলাম ; রামকিষণ, বসির, নিতাই ও সুরেশ আমার আগে ভীড় ঠেলছে। আমার পিছনে—গৌরী আমার ডান হাত ধরে’, পরে ডাক্তার পালের স্ত্রী, শকুন্তলা দেবী, গৌরীর মা। সকলের পিছনে কম্পাউণ্ডারবাবু ও সুধাংশুবাবু। প্রত্যেকের কোলে ছেলেপুলে। কুলীরা সমস্ত মালপত্র নিয়ে অনেক পিছনে রয়েছে, এদিকে পুলিশ লাঠির চোটে ভীড় তাড়াচ্ছে। পকেটে দশ টাকার নােট গুজে দিতেই পথ ছেড়ে দিলাে। জাহাজে উঠতেই জাহাজ ছাড়বার বাঁশী বাজলাে। নইলে জাহাজ লােকের ভিড়ে ডুবে যায়, ছােট্ট জাহাজ আরােহী দ্বিগুণ। চেয়ে দেখি আমার দারােয়ান মণী, ভৃত্য শৈব আর মালপত্র সহ কুলী—কেউ উঠতে পারেনি। মেয়েরা কান্নাকাটি ১৫ মরু-প্রদীপ করলাে তাদের সর্বস্ব টাংগুবে পড়ে রইলাে। আমি মনে মনে কেঁদে আকুল হ’লাম দু’জন মানুষের জন্য। ওদের হাতে টাকা পয়সা নেই, খেয়ে মরবে নিশ্চয় ; পড়ে থাকবে ওদের মৃতদেহ বিজ্ঞান ও সমরের দুঃখবাদ-ব্যথা বক্ষে বহন করে। আকিয়াব তখনও শত্রুর বােমা হতে অনেক দূরে। দু’দিনে এসে পৌছালাম এখানে। এখানকার বাংগালীরা যথেষ্ট সাহায্য করলে ; প্রকাণ্ড একটা ঘর আমাদের জন্য ঠিক করে দিয়ে স্নান আহারের ব্যবস্থা করে দিলাে। তেইশ দিনে এসে আকিয়াব পৌছেচি। স্নান, আহার কাকে বলে ভুলে গিয়েছি। স্নান আহারের কথা শুনে মনে প্রশ্ন জাগলাে —আমরা এ কোন্ রাজ্যে এলাম। স্নান, আহার, সমাজ, সংসার, সভ্যতা, ভদ্রতা ? এ সকলের প্রয়ােজন আছে কি? পরদিন “বরদা” জাহাজে চট্টগ্রাম রওনা হলাম। বঙ্গোপসাগরের এক কোণ ঘেঁষে ভয়ে ভয়ে জাহাজ চলছে। অনন্ত জলরাশি : অনন্ত আনন্দ ও জীবনােচ্ছ্বাস আমাদের বুকে। গিরিমরুপথে যে জলের জন্য প্রাণসাগর সমুদ্র খুঁজে বেড়াচ্ছিলাে, এখন তারি বক্ষে। অথচ এখন একফোটা জলের পিপাসা নেই। বিচিত্র এ মানবজীবন ; বিচিত্র তার বক্ষের ক্ষুধা তৃষ্ণা। চট্টগ্রাম এসে পৌছালাম। ইভাকুইজদের জন্য রেলগাড়ীর ভাড়া নেই। কিন্তু আমাদের টিকেট করতেই হলাে, আমরা ইকুইজ, হ'তে চাই না; এখন আমরা সভ্য। অরণ্য ও মরুবাসীর পােষাক পরিচ্ছদ আমাদের আর নেই। ভুলে গেছি আমাদের আদিম ইতিহাস। চট্টগ্রাম থেকে সকলকে টিকেট করে দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দিলাম। সকলেই আন্তরিক আশীর্বাদ জানালাে। কিছুই জানাতে পারলাে না শুধু গৌরী : সে শুধু চোখ দু’টা মুছতে মুছতে মাথা নত করে রইলাে। আমার বুকে নেমে এলাে একটা মৌন দীর্ঘশ্বাস ! Uttarpura Jaškrishna Public Library Acco. No 292 Date. 2.8.... 2৪.৩ • v Geoman খাটতে হতাে? সারাদিন এ চীংকার আর ভালাে লাগে না ; বিরক্ত হয়ে গেছে মন। এক পাল মেয়ে নিয়ে গরু তাড়ানাে কাজ ক’দিন ভালো লাগে ? মানুষ তাে? মেসিন নয় যে দিনরাত একটানা অক্লান্ত চললেও এ দেহের কোন অংশ হানি হবে না। ইংরেজীর পর বাংলা ; বাংলার পর ভূগােল ; ভূগােলের পর আবার ইতিহাস। সেই বেলা দশটা থেকে আরম্ভ করে চারটা পর্যন্ত অনবরত মুখ নাড়তে নাড়তে মুখ ব্যথা হয়ে যায়। আর মেয়েগুলি যদি লেখাপড়ায় একটু ভালাে হতাে তবে কি এতো আমার ক্লাশের মেয়েগুলি যেন একেবারে সর্বশ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কহীন। এককথা পঞ্চাশ বার বুঝালেও মাথায় ঢােকেনা; হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে থাকে ; মাথায় কি কিছু আছে ? তবুও শিক্ষিতা হবেই; তবু ম্যাট্রিক পাশ করবেই। ম্যাটিক পাশের মূল্য কি শুনি? বি-এ পাশ করে তিরিশ টাকা মাইনেয় মাষ্টারী করি দিনরাত মুখ চালিয়ে। তা আবার দু'একদিন স্কুলে না এলে হেড মিসূট্রেসের সংগে কথা কওয়া যায় না; পাঁচ কথা জিজ্ঞেস করলে মুখভার করে এক কথার জবাব দেয়। ভারী তাে চাকুরী। নীলিমা শেষে ক্ষুন্ন ও তিক্ত মনে ক্লাসের মেয়েদের দিকে একবার বিরক্তির চোখে চেয়ে বলে, এ ঘণ্টায় ইতিহাস ; আচ্ছা খুব সুন্দর করে’ আকবরের চরিত্র খাতায় লিখে দাও। আধ ঘণ্টার মধ্যে লিখতে হবে। মেয়েরা লিখতে থাকে। নীলিমা ক্লাসের দক্ষিণ দিকের জানালার দিয়ে চেয়ে থাকে ; উদাস-কাতর করুণ চাহনি। তার বুকের তলে জমে উঠে বর্ষার নিবিড়তা। দুটি চোখ সিক্ত হয়ে উঠে গােপনে ; মনে পড়ে তার তপ্ত জীবনের স্মৃতি। সে-সব কথা আজ ভাবতেও তার খাস রুদ্ধ হয়ে আসে। অন্তরের নিভৃত কোণে জাগে কাতর স্পন্দন। সবে মাত্র সেবার সে ম্যাটিক পাশ করে কলেজে প্রথম বর্ষে ১৭ মরুপ্রদীপ ; ভর্তি হয়েছে। বাবা ওকালতি করেন, সামান্য আয় । মেয়ের বিয়ের জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এম. এ. পাশ সুদর্শন ও সুন্দর স্বাস্থ্যসম্পন্ন একটি ছেলের সংগে তার বিয়ে ঠিক করলেন ; সরকারী অফিসে চাকুরী করে ; একশ’ টাকা মাইনে। আজকালকার দিনে বেশ ভালাে পাত্র। কিন্তু সে কিছুতেই বিয়ে করতে রাজী হলাে না। আধুনিক মতে সে মত দিলে। প্রগতির যুগে বিয়ে করে কোন মেয়ে ? এ সােনার যুগে লােহার শিকল গলায় পরে কারাগার-বন্দী-ব্যথা কোন গেঁয়াে মেয়ে ডেকে আনে। এ যুগ অপরিসীম যুগ ; বিস্তীর্ণ পথঘাট ; ক্লান্তিহীন ট্রাম বাস ; অবাধ স্কুল কলেজ ; জীবন্ত জ্ঞান বিজ্ঞান ; প্রাণস্পর্শী সাহিত্য, শিল্প ; প্রেমপুঞ্জ সিনেমা, বায়স্কোপ ; উদার মাঠ ; লেকের স্বচ্ছ নীল জল ; যৌবন-পরিমল অফুরন্ত। এত নীল, এত সবুজ, এত রঙের উর্মিনাচানাে জীবনের ধারায় গা ঢেলে না দিয়ে কোন রুগ্ন রুচিসম্পন্ন মেয়ে বিয়ে করে’ এ জীবনটাকে একেবারে মাটি করে দিতে চায় ? সে বি. এ. পাশ করে স্বাধীন মনের স্বাধীন চিন্তা নিয়ে অবিবাহিতা থেকে জীবনটাকে গড়ে তুলবে নিজের ইচ্ছা মতাে ; সব বাধা-বন্ধহীন ; তবেই তাে এ জীবন ধরায় ধন্য। বিয়ে করে এ আধুনিক দিনে অল্প বয়সে বুড়াে হতে চায় কে? এমন অশিক্ষিত কল্পনা মনে আনতেও তার গা জ্বালা করে। কিছুতেই সে বিয়ে করলে না। কল্লোলময় নবীন জীবনের ঢেউ খেলানাে কল্পনার আনন্দই তার চোখে স্বপ্ন রচে’ দিলো অসীম সুরভিময়। ব্যর্থ হ'লে পিতার অনুবােধ প্রগতিশীল শিক্ষিত মেয়ের সুখ-বাদের কাছে। নীলিমা লেখাপড়ায় ভালাে। অনায়াসে সে শেষে বি. এ. পাশ করে’ বের হ’লল। আধুনিক মা হলেন সুখী; পৌরাণিক বিচক্ষণ পিতা হলেন মনে মনে দুঃখিত, চিন্তিত। বি. এ, তো পাশ করলে, কিন্তু বয়সও তাে সাথে সাথে পার করলে ; চব্বিশ বছর এখন মেয়ের বয়স ; বয়সে মরুপ্রদীপ ১৮ অবিবাহিতা মেয়ের স্বাস্থ্য থাকে? না ভাংগে। ভালাে বর কি আর মিলে ! তবু আর একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। এখন বি. এ. পাশ করেছে, বুদ্ধি হয়েছে একটু। কিন্তু নীলিমা শুধু পাশ করেছে, বুদ্ধি তার মােটেই বাড়ে নি। শেষে সকল চেষ্টাই বিফল হ'লাে। নীলিমা কিছুতেই বিয়ে করবে না; সে এখন শিক্ষয়িত্রীর কাজ করবে; সর্বদা পড়াশুনা নিয়ে থাকবে ; উচ্চ চিন্তায়, আদর্শ ভাবনায় তার জীবন হয়ে উঠবে ধন্য । শেষে নীলিমা পল্লী অঞ্চলে একটা বালিকা বিদ্যালয়ে চাকুরী নিলে। দিনরাত এক পড়ানাের কাজ ; আজ পাঁচ বছর পড়াচ্ছে ; শুধু এক অষ্টম ক্লাসেই; কচিৎ নবম, দশম ক্লাসে; যেদিন সে-সব ক্লাসের মাষ্টার আসে না, নইলে তার পড়ানাের কাজ এই এক ক্লাসেই বন্দী। একেবারে অসহ হয়ে উঠেছে। এই কি তার স্বাধীন জীবন? স্বাধীন চিন্তা? বাধা-বিহীন জীবনের গতি ? এই কি তার দু’টী স্বাধীন চোখের স্বাধীন স্বপ্ন ঐশ্বর্য ? একতলা টিনের ঘরে স্কুলের বাের্ডিং, মাটির মেঝ, তার উপর চৌকি পাতা, গরীব স্কুল, গরীব ঘর। চারিদিকে জংগল, কচুবন ; আগাছার ঝােপ; বরষার দিনে ভেকের মুখরতা ; বােডিং-এর নির্জনতায় জেগে উঠে যেন বিষাদকান্নার সুর। বিপুল বিশ্বের এক কোণে অবস্থিত ও নির্জীব ঘরটির দিকে চেয়ে সে কেঁদে উঠে। নীলিমা থাকে ঐ অন্ধকার কোণের সীটটায়। তার পাশে আবার বেতসের বন। দিনের বেলায়ও ঘাের অন্ধকার ; মশা ও মাছির পাহাড় যেন সর্বদা ভিড় করে তার ঘরখানায়। চৌকি থেকে নামলেই মাটিতে পা ফেলতে হয় ; ঘরটা এত ঠাণ্ডা যে, দিনরাত তার সর্দি-কাশি লেগেই আছে। সেই সুন্দর শরীরটা, সেই সুন্দর গােলাপী মুখখানার দিকে আজ আর চাওয়া যায় না। ছােট একখানা সস্তা মূল্যের আয়না, অনাদরে পড়ে থাকে টেবিলের একধারে। এই উনত্রিশ বছরের মুখ বার বার দেখে লাভ নেই। মনে পড়ে সেই কলেজ-জীবনে ড্রেসিং ১১ মরু-প্রদীপ • টেবিলের সম্মুখে দাড়িয়ে মুখ দেখার কথা ; কি সুন্দর স্নিগ্ধ শুভ্র আভায় ভরা ছিল চোখ দু’টি ; বিয়ে করবে না সে ; দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। কিন্তু তাতে কি ? সে জন্য তাে আর মনের কল্পনা-উৎস মরে যায়নি ? যদি এ মধুযামিনীকূলে দাড়ানাে রূপালী বয়সটাকে ক্ষণিক সুখী করা যায় ক্ষতি কি ? শত ত্যাগী পুরুষও ত্যাগের সংগে ভােগের কল্পনা করে ; কল্পনা- বিলাসী মন ; তাকে বেঁধে রাখা যায় না। কিন্তু আজ সে কল্পনার মনও নাই; সেই রামধনু-আঁকা স্বপ্নমাখা চোখের সামনে রাজপুত্রের পক্ষীরাজ ঘােড়াও নাই। আয়নার প্রয়ােজন কি ? মুখ চোখ দেখে আর কি হবে? এখন একঘেয়ে স্বাধীন জীবন ; একঘেয়ে পড়ানাের কাজ ; বৈচিত্রহীন বাের্ডিং-এর ঘর । বৈচিত্রহীন জীবনের তপ্ত প্রবাহে ভেসে যাচ্ছে সকল দেহ। আজ জীবনের এ রূপহীন স্বাধীনতা বহ্নি হয়ে দেখা দিচ্ছে চারিদিক থেকে। এখান থেকে পালাবার পথ আছে ? কোথায় ? অসম্ভব। তাকে তাে স্কুলের শিক্ষয়িত্রীর কাজ করতেই হবে ; এ-ছাড়া এ-বয়সে তার জীবনের উদ্দেশ্য আর কি থাকতে পারে? মেয়েরা স্বাধীন হয়ে কে কোথায় কি মহৎ-কাজ করেছে ? হয় মাষ্টারী, না হয় ধাত্রীগিরি। মেয়েরা শেষে আকবরের চরিত্র খাতায় লিখে নীলিমাকে দেখালে ; পড়ে’ বললে-মন্দ হয়নি। চারটা বাজে ; স্কুল ছুটী হয়ে যায়। নীলিমা তার বাের্ডিং-এর ঘরে ফিরে আসে। সেই একলা ঘরে, আপন নিরালা মনের সাথী হয়ে। অসহ নিঃসংগ জীবন। এমন সময় মন্ট, এসে ডাকে—মাসিমা, মা তােমাকে ডেকেছে ; চলাে আমাদের ঘরে। বাের্ডিং-এর ওপাশে রাদি’র বাসা; মন্ট, রাণুদি’র ছেলে। মিষ্টি মধুর মণ্ট কচি মুখখানা; ছােট্ট ছেলে। নীলিমা আদর করে কোলে তুলে নেয়। মন্টর মুখে চুম্বন ঢেলে দিয়ে বলে, আমি বুঝি তাের মাসীমা ? তাহলে তাের মেশােমশায় কোথায় ?
মরু-প্রদীপ মণ্ট নীলিমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। নীলিমা বলে, বােকা ছেলে ; তাের মেশােমশায়কে চিনিস না ? সেই সে বছর আমার সংগে যার বিয়ে হবার কথা ছিলাে; এম. এ পাশ, দেখতে সুন্দর ; কলকাতায় সরকারী অফিসে চাকুরী করতাে; একশ’ টাকা মাইনে। এতদিনে হয়ত দু’শাে টাকা মাইনে হত। তাের মাসীমা আজ কত বড়লােকের বউ হয়ে, কত সুখে থাকতে পারতাে। তাকে কি আজ এ তিরিশ টাকা মাইনে চাকুরী করে’ বাের্ডিং-এর এ ভিজে স্যাঁতসেতে ঘরে থেকে সর্দি, কাশি ও ম্যালেরিয়ায় ভুগতে হ’ত? এমন বােগা, এমন কংকালসার, এমন দীন চেহারা, এমন নুয়ে- পড়া দেহ, এমন অকাল-বৃদ্ধ, এমন অবাঞ্ছিত ? এমন স্থানে সর্ব আয়ােজনহীন স্বাধীনতা নিয়ে ? আজ আমার এমন রুগ্ন স্বাধীনতার কোন মূল্য আছে? সেই স্বাধীনতাই সুন্দর, সুশ্রী স্বামী আদর করে’ যেটুকু দেয়। মন্ট, হাঁ করে নীলিমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে ; শেষে কোল থেকে নেমে যেতে চায়। নীলিমার সর্বদেহে মাতৃহৃদয় কেঁদে উঠে; দু’টা বাহু দিয়ে মন্টকে জোর করে জড়িয়ে ধরে। তার অন্তরে কেঁপে উঠে মায়ের প্রাণ। অশ্রুসিক্ত চোখে নীলিমা শেষে বলে—মন্ট, আমি তাের মাসীমা আমি তাের ছােট মা। কেমন ? মন্ট, মাথা নেড়ে সাড়া দেয়। নীলিমা অমনি মন্টর চোখে-মুখে-গালে তপ্ত চুম্বন-বরষা ঢেলে দেয়। শেষে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলে—যাও লক্ষ্মী ছেলে, ঘরে ফিরে যাও ; মাকে বলে গিয়ে মাসীমার শরীর ভালাে না; আজ আর আসবে না। মণ্ট চলে যায়। নই ;
অন্ধের প্রেম •• আমি অন্ধ। আমি জন্মান্ধ। আমার কোন ভাষা নাই; আবার ভাষা কি? আমার ভাষা চির আঁধারে বন্দী। আমি তােমাদের ভাষায় আমার জীবনের অন্ধ-ছন্দের ঝংকার তুলবাে; আমি তােমাদের ভাষায় আমার কথা বলব। আমি বিশ্ব-সৃষ্টির মাঝে এক বিরাট বেদনা। বজ্র ছিটকে পড়ে নভঃ হ’তে আমার দুঃখের দুন্দুভি বাজিয়ে ; অসীম “না” দিয়ে ঘেরা আমার সমস্ত জীবন-প্রবাহ। শুধু এক সর্বশূন্য মহানিশি আমার চারিদিকে ব্যাপ্ত ; আমার কাছে সমস্ত বিশ্বটা একটা মহারাত্রি। এখানে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা নাই; নাই জ্যোতিষ্ক-সমাজ ; নাই আলাের সােনালি উৎসব। আছে শুধু শ্রাবণ-তিমির-শর্বরী-ঘেরা মহা অন্ধকার আমি যেন তমসাচ্ছন্ন গভীর রজনীর বুকে, গহন অরণ্যাভ্যন্তরে, অন্ধকার গিরি-গুহার অতল তলে একটি কালাে অন্ধ বিন্দু—চির আঁধারে বন্দী, চির অন্ধকার পাতালপুরবাসী আমি। এ ধরার আলাের খবর আমি কি জানি ! পৃথিবীতে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ- তারা আছে না আছে, সে খবর আমার কাছে মিথ্যা ; নিতান্ত দুঃসাহসিক কল্পনা। কখন পৃথিবীতে সন্ধ্যার কালাে ছায়া ঘনিয়ে আসে; কখন রাত্রি এসে পৃথিবীর বুক অসীম কালােয় ঢেকে দেয় ; কখন কর্মকোলাহলময় পৃথিবী এক অন্তহীন নীরবতায় থেমে যায় ; কখন মৃত্যুময় সুপ্তি এসে ধরণীর দু’টা চোখে শিথিল পরশ ঢালে ; কখন সমস্ত পশু, পক্ষী, জীব, জন্তু, তৃণ, তরু, লতা অবলুপ্তচেতন হয়ে পড়ে থাকে মৃত্যুরাজ্যে ; কখন আবার ঊষার অরুণ আলােক সােনার জাগ্রত পরশ ঢেলে জীবন্ত করে তােলে পৃথিবীর সমস্ত সুপ্ত নিশ্বাস। কখন রবি উঠে, চাদ ভাসে, নক্ষত্র হাসে; ধ্রুবতারা উষার আগমনী গায়—এ সকলই মরু-প্রদীপ ২২ ; আমার কাছে এক মহাসমস্যময় প্রশ্ন। উত্তর খুঁজে পাইনে ; শুধু চেয়ে থাকি অন্ধ নয়নে আঁধারের পানে গভীর বেদনায়। শুধু এ প্রশ্নময়, চোখ দু’টী কেঁদে আকুল হয় ; শুধু ভেসে চলি অন্তহীন আঁধার প্রবাহে। কি দরকার আমার উষার খবর শুনে ? রবি-শশিপ্রদীপ্ত পৃথিবীর উজ্জ্বল আয়ােজনে আর বসন্তের পুষ্পগন্ধে তােমাদের বিশ্ব জেগে উঠে সুরভিত হয়ে ; মধুপ্রবাহ ছােটে বন হতে বনান্তরে ; মধুলােভী মধুপের বক্ষে জাগে চুম্বনপিপাসা; ফুলের বুকে ঢালে সে তপ্ত অধরপরশ ; রােমাঞ্চিত হয় নাকি শতেক লাজুক ফুলবক্ষ। গ্রীষ্মে ফোটে আম্রমুকুল ; মানবের বুকে জাগে অমৃত রসপিপাসা। বকুল বনে পিক-বধূ প্রিয়ার বিরহে ঢালে আকুল কুহুধ্বনি আর ব্যাকুল ক্রন্দন-গীতি। বহুদূর থেকে কাণে এসে পশে সেই করুণ কান্নাগীতি। শুনে কঁাদে আমার বুক ; দেখতে ইচ্ছা করে সেই অভাগা পাখিটাকে ; কিন্তু দেখতে পাই না ; চোখের সামনে চির অন্ধকার কালো যামিনী যে! শুনেছি পাখিটা কালাে ; মনে মনে ভাবি, তবে সে আমার পরম বন্ধু। ওর কালো রং আমার জীবনের কালাে রংয়ের সাথে তাহ'লে বেশ মিল খেয়েছে। বেদনাভরা বুক আমার বুকে টেনে নিতে ইচ্ছা হয় ; ও যে হায়, আমার ব্যথার ব্যথী। তােমাদের জগতে বর্ষণ আসে ; আকাশ ঘনঘটায় ভরে উঠে; নিবিড় কালাে ছায়া নাকি ছড়িয়ে পড়ে ধরণীর বুকে ; ঘরে ঘরে জাগে বিষাদ-করুণ, বিরহ-বিপুল সুর। আসে শরৎ, ভেসে উঠে আকাশ নীল নব কান্তি-রেখায় ; গগনে গগনে আলাের মেলা ; তরুলতায় জীবনে আস আর মাঠে মাঠে সােনালি ধান এনে দেয় কৃষকের চির রিদ্র বুকে আশার আলাে। এই যে বর্ষব্যাপী ধরণীর রূপ-পরিবর্তন, কাল-পরিবর্তন, এ সব খবর আমি কি জানি ! দু’টো কান দিয়ে তােমাদের মুখে সব কথা শুনি, এর প্রদীপ ; বুঝি এবং অনুভব করি। আমার চোখের দ্বার বন্ধ ; সকল দৃশ্যমান জগৎ আমার কাছে মিথ্যা, অবলুপ্ত। একমাত্র স্পর্শমান ও শ্ৰয়মান জগৎ আমার কাছে কথঞ্চিৎ সত্য বলে মনে হয়। শক্ত ও কোমল দ্রব্যকে স্পর্শে অনুভব করে বলতে পারি, এ শক্ত আর এ কোমল। শায়মান পৃথিবীতে কান দিয়ে শুনে অনুভব করে’ বুঝি। কিন্তু সেই বুঝবার ও অনুভব করার মাঝে আবার কি যেন একটা অভাব থেকে যায় ; কি যেন একটা বেদনা থেকে থেকে জেগে উঠে। মনে হয় স্পর্শ করে যা বুঝলাম, শব্দ শুনে যা অনুমান করলাম, বােধ হয় তা সত্য নয়। এবং সত্যই তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। চক্ষুষ্মনের অনুভূতির কাছে আমার এ অনুভব অনেকখানি শ্রীহীন। আমি বুঝতে পারি, কি যেন একটা হারানাে ব্যথা বস্তুময় জগতে ঘুরে বেড়ায়। শব্দজগৎ কিন্তু অন্যরূপ। সে সম্পূর্ণ সত্যরূপে আমার কানে এসে প্রবেশ করে। সেখানে যে সত্যের পরশ পাই, বােধ হয় অন্য কেহ তা’ পায় না। সংগীত আনন্দ-নিঝর ঢালে আমার কানে ; চিত্ত মাতাল হয়ে উঠে মধুর উন্মাদনায়। যেখানে দেখবার প্রয়ােজন নাই, শুধু শুনবার প্রয়ােজন, সেখানেই আমি পূর্ণতাপ্রাপ্ত। কোকিলের কণ্ঠস্বর যদি ময়ূরের কণ্ঠে উৰ্গীত হয়, আমার তাতে কিছু এসে যায় না; যেহেতু, আমার কাছে শব্দ-মুখর-কণ্ঠকর্তা মিথ্যা ; কণ্ঠকর্তা কালাে পাখীই হােক বা বর্ণসমৃদ্ধ পাখীই হােক, সবার কণ্ঠরাগিণী আমার কাছে চিরমধুর চিত্তস্পর্শী; আমার চিত্তে প্রবেশ করে শুধু গানের প্রাণ আর সংগীতের অমৃতবার্তা। আমার এ অন্ধ-জীবনে শব্দ-ছন্দই একমাত্র সত্যধবনি নিয়ে প্রকাশ পায়। এমনি করে জীবনের পনেরটি বৎসর কেটে গেছে। এখন নাকি তােমাদের ভাষায়, পুষ্পিত ষােড়শী-রূপ আমার অংগে অংগে অবতরণ করছে। আমি নাকি এক অপূর্ব সুন্দরী হয়ে ফুটে উঠেছি এ অন্ধ মরু-প্রদীপ ২৪ ধরার বুকে ; অনেক রাজরাজার ছেলে নাকি আমায় দেখতে আসে; কিন্তু ফিরে যায় ব্যর্থ দুটী আঁখির দিকে অশ্রুসিক্ত নয়ন ফেলে। আমি কিরূপ সুন্দরী, তা আমি জানি না; তবে অনুভব করি প্রতি অংগে, প্রাণে-মনে কিসের যেন অপূর্ব শিহরণ-চাঞ্চল্য ! একটা অব্যক্ত আকর্ষণ অবিরাম আমায় উতলা করে তােলে। কেন বুঝি না, অহেতুক আমার প্রতি অংগ কেঁদে আকুল হয়। আমার সেই বাল্যের, কৈশােরের শায়মান ও স্পর্শমান জগতের সুন্দর, কোমল, নম্র, শান্ত অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার মাঝে নেমে এলো তপ্ত রূপ, তপ্তরস, উষ্ণ সৌন্দর্যবােধ আর বহ্নি-স্পর্শ। আমি এখন পূর্ণ ঘােড়শী। অংগে অংগে কিসের যেন সুগন্ধ। তােমাদের ভাষায় হয় তাে বলা যায়, বসন্তের অনুরাগ আমার সকল দেহে ফুল-সুরভি ঢালছে। সে মাধুরী যে কিসের, কার জন্য, কেন, প্রথম কিছুই বুঝতে পারলাম না। মন যেন দিবারাত্রি কি খুঁজে বেড়ায়; সমস্ত বহির্বিশ্ব জুড়ে কে যেন আড়াল থেকে আমাকে ডাকে ; যে কোন শব্দ শুনে চমকে উঠি ; যে কোন সুখস্পর্শ চিত্তে জাগায় অধীর কম্পন-দোলা। সেই বাল্যের, কৈশােরের শান্ত স্নিগ্ধ, নম্র-কোমল দোলা নয়, এ যেন বিদ্যুৎ-বহ্নিমাখা! আমার শব্দায়মান ও স্পর্শমান জগতে যেন প্রায়ই বিরহ-নৃত্য চলছে। বনে পাখী ডাকে ; মনে অকারণেই নেমে আসে কিসের জাগরণ ; শিহরিয়া উঠে প্রাণ, চকিত হয় চিত্ত। কে যেন পাখীর মাঝে লুকিয়ে থেকে আমাকে চঞ্চল করে তােলে। ফুলের বুকে হাত দিয়ে স্পর্শ নিই, বুকে জড়িয়ে ধরি ; কিন্তু আগের মতাে সেই স্নিগ্ধ কোমলতা কোথায় ? সেই প্রশান্ত মাধুরী ? আজ মনে হয়, ফুলের অংগে ঘিরে কার যেন তপ্ত অনুরাগে রােমাখি হয়ে উঠে সকল দেহ। আনমনে বসে বসে ভাবি -অন্ধের বুকে আজ আলােকের তীব্র এ পরশ কেন? আমি অন্ধ যামিনী-বধু; আমার কেন আজ এ উন্মাদনা প্রভাতগগনে চেয়ে মরু-প্রদীপ থাকবার? এ চক্ষুহীনের চক্ষুষ্মনের তীব্র দৃষ্টির আকাংখা কেন? এ ভুবন আজ আমার চোখে দৃশ্যমান হতে চায় কেন? প্রাণ আমার আজ কি চায়? কাকে চায় ? যাকে চায় তাকেও আমি বিগত সােল বৎসর ধরে’ই জানি, চিনি। কিন্তু সেই জানা-চেনার মধ্যে কোনাে বিশেষত্ব ছিলাে না। সে আমার বাল্যের ধূলি-খেলার আর কৈশােরে ফুল তােলার সাথী ছিলো ; এক পাড়ায় বাস, চিরপরিচিত সামান্য খেলার সংগী ছাড়া আর তাে কিছু তার মধ্যে এতদিন দেখি নাই। বাল্যের, কৈশােরের জীবনে তাকে জেনেছি, তাকে চিনেছি শুধু অনাসক্ত মন-প্রাণ দিয়ে, সরল সুন্দর নির্মলরূপে। মানসিক বা আন্তরিক মাদকতা তার মধ্যে খুঁজে নাই। কিশলয়দা’কে জেনেছি, চিনেছি শুধু প্রতিদিনের পুরানাে প্রতিবাসীরূপে ; শুধু আমার সমবয়সীরূপে ; শুধু স্কুলের ছাত্ররূপে ; শুধু আমার হারিয়ে-যাওয়া অচিন পথের পাশ থেকে তুলে এনে আমাকে বাড়ী পৌছে দেবার সাহায্যকারীরূপে। এর বেশী তত কিছু তার মধ্যে সেদিন জানতে বা বুঝতে পারিনি। কিন্তু আজ এমন হলাে কেন? কেন আজ তার নামের সাথে এত মাধুরী ? আজ তার পায়ের শব্দে প্রাণ চমকে উঠে কেন? আমার ঘুমন্ত জগতে আজ সে উষার জাগ্রত আলােক নিয়ে এসে কাছে দাড়ায় কেন? আমার এ সর্ব অবলুপ্ত জগতের মাঝে, অন্ধকারাচ্ছন্ন অসুন্দর পৃথিবীর মধ্যে কিশলয়দা’ আজ সুশ্ৰী রূপ নিয়ে প্রাণের দ্বারে বারবার এসে সাড়া তােলে। বুঝতে পারলাম, আমার এ মরে’-যাওয়া প্রাণে প্রাণের বন্যা, রূপের বন্যা এসেছে। আমার এ চক্ষু মরে গেলেও, চক্ষুর ভিতরে যেন প্রাণের আলােক খুঁজে পেলাম। আমার এ অন্ধ ভুবনে ফুটে উঠলে রবি-শশী, গ্রহ-তারা। সেই গ্রহ-তারার মাঝে দাড়িয়ে যেন আমার কিশলয়দা। তাকে ঘিরে যেন আমার অন্ধ প্রেম, চিরবন্দী আত্মা, চিররুদ্ধ ভালবাসা আজ মুক্তি পেলাে। অন্ধের উদগ্র অনুভূতি; চক্ষুহীনের প্রেম যে কি মরু-প্রদীপ ভয়ংকর তা চক্ষুষ্মন বুঝবে না; কেউ জানে না যে, সে প্রেম কত অনন্ত অধীর, সে প্রেম আগ্নেয়শিখা সম তীব্র, তী, উত্তপ্ত। প্রেমের আলােকে জ্বলে উঠলাে আমার দু'টা অন্ধ-বন্দী চোখ ; দেখতে পেলাম, আমার সুন্দর কিশলয়দা’ এ সুন্দর পৃথিবীর অপরূপ পুরুষ ! আর সুন্দর এই আমি। আমার সেই পূর্বের শব্দায়মান ও স্পর্শমান জগতে এসে যােগ দিলাে তােমাদের দৃশ্যমান ধরা। এখন আমি পরিপূর্ণ অংগ-সমৃদ্ধা, সুন্দরী রূপসী তন্বী তরুণী। সমস্ত বিশ্ব আজ আমার চোখে মূরতি-পরা। দৃশ্যে রূপে, গন্ধে বর্ণে, শব্দে সংগীতে, বাসনা-কামনার আনন্দোৎসবে আমি এখন পরিপূর্ণ ধরার মানুষ। আমার অন্ধ ভুবনে এলাে প্রভাতের ইসারা। প্রেম আমাকে করে তুললাে সূক্ষ্ম-তীক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন ; দেখতে পেলাম কিশলয়দা’কে আমার চোখের সামনে যেন এক জ্যোতির্ময় প্রিয়-সুন্দর বাঞ্ছিত পুরুষরূপে। অবশেষে একদিন কিশলয়দা'কে আমার মনের সব কথা, সব ইঙ্গিত বললাম। হেসে উড়িয়ে দিয়ে বললো সে-পাগলি, তাের আবার ভালােবাসা ? অন্ধের আবার প্রেম? ক্ষ্যাপা খােজে পরশ-পাথর ? বাম- কিশলয়দা’, ক্ষ্যাপাই পরশ-পাথর খোঁজে, চক্ষু যার নাই, সেই দেখে সুন্দরকে পরিপূর্ণরূপে; আমি তােমাকে দেখছি যেন এক অতুল পুরুষ, আমার হৃদয়ের দেবতারূপে। আমাকে ঘৃণা করাে না তুমি ; আমি অন্ধ, এ অপরাধ নিয়াে না। আমি বিশ্বের উপেক্ষিত। হতে পারি, কিন্তু তা বলে তােমার উপেক্ষিত হতে পারবাে না। আমি চক্ষু পেয়েছি, তােমার প্রেমের আলােকে আমার চক্ষু খুলে গিয়েছে। এই দেখ, তােমাকে কেমন সুন্দর দেখছি; শত রবির ঝলমল করছে তােমার দেহে। আমি আলােক পেয়েছি, আমি মুক্ত ; আমার আঁধার নিশি কেটে গেছে। আমি তােমার মতােই এখন ; ;
২৭ গরু-প্রদীপ এ সুন্দর ধরার সুন্দর মানুষ। আমাকে অন্ধ বলে’ আর উপেক্ষা করাে না কিশলয়দা’! কিন্তু থাক্ সে সব কথা। পেলাম না কিশলয়দা’কে। অনেকের মতােই সেও পাশ কাটিয়ে গেলো আমার জীবনপথ থেকে; চির অন্ধ যে, তার সংগে নাকি জীবনের মিল হয় না; আঁখির সাথে আঁখির মিলন যেখানে, সেখানেই নাকি জীবন সমৃদ্ধ। দৃষ্টি দিয়ে দৃষ্টিসুধাপান যেখানে, সেখানেই নাকি প্রাণ হয় মধুর। আমার মতাে একটা বিরাট বেদনাকে সে তার জীবনের সাথী করতে পারে না। সে চায় নয়নসুন্দর মেয়ে। হ’লও তাই; বিয়ে করলে সে সবিতাকে ; মেয়েটীর ডাগর দু’টী চোখের চারু চাহনি চাঞ্চল্য তুললে কিশলয়দা’র বুকে ; দু’টী দীপালী নয়ন দীপালীর আলােক আললে আমার কিশলয়দা’র অন্তরের মণিকোঠায় বিয়ে করলে তাকে। সে প্রেমে পড়লে তার দু’টা চোখের। ঘৃণা করলাে আমার দু’টা দরিদ্র-কাতর, অশ্রুসিক্ত অন্ধ নয়নকে ; তুচ্ছ করলে আমার দু’টা প্রেমসুন্দর আঁখিকে। বিরহী দু’টা চোখে আমার দু'ফোটা জল নিবিড় হয়ে উঠলাে। সেই দু'ফোটা বিরহী জলের ভিতর দিয়ে এ ধরাকে আবার দেখলাম নৃতন রূপে। কিশলয়া’র উপেক্ষা আমায় এক অভিনব দৃষ্টি দিলে। বুঝলাম, কিশলয়দা’ উপলক্ষ। মৃগ-কস্তুরীর মতােই এ প্রেম-সৌরভ আমারই অন্তরে বিরাজ করছে। এই অপূর্ব অনুভবের অনুসরণ করে আবার নিজের মধ্যে ডুব দিলাম। অন্ধনয়ন আর ইন্দ্রিয়বৃত্তির সহজ সংকোচন আমায় সাহায্যই করল। অদৃষ্টপূর্ব এক বেগবান্ জগৎ ভেসে উঠলাে আমার অন্তরদৃষ্টির সামনে। ভেসে উঠলাে এক অদৃষ্টপূর্ব জগৎ, যা অনুভব করা যায়, কিন্তু স্পর্শ করা চলে না। দেখতে পেলাম, এক অসীম প্রেম-প্রবাহ মহাকালের পথ বেয়ে ছুটে চলেছে । আমার সেই পূর্বের স্পর্শমান, শায়মান ও অধুনা অধুনা মরু-প্রদীপ ২৮ •• ? দৃশ্যমান জগৎ বা তার অনুভূতি-অভিজ্ঞতা আজ আর নাই; সেখানে আজ মহাপ্রলয় এসে সব চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে ; সেখানে নাই শব্দ, নাই স্পর্শ, নাই দৃশ্যমান বস্তুপ; নাই গীত-গন্ধ-গান ; শুধু এক অদৃশ্য উন্মত্ত প্রবাহ ছুটে চলেছে নিরুদ্দেশ যাত্রাপথে। সবার বক্ষতলে এক বিরা সিন্ধুর আলােড়ন; শুধু সবুজ-নীল-শ্যাম জলধিপ্রবাহ প্রতি অন্তরে। ছুবার, মিশবার, পাবার নীরব বিরহ-ব্যথা সবাইকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলেছে ; যেতে হবেই, পেতে হবেই। কোথা যাবে? কাকে পাবে ? সে প্রশ্নের অবসর নাই; কেবলই চলা আর পথচলা। আদিহীন, অন্তহীন এ পথ ; আদিহীন, অন্তহীন এই জীবন ; আদিহীন, অন্তহীন এ পথে চলার প্রেরণা ; আদ্যন্তহীন এই বিরহ। কে কিশলয়দা’? কোথায় সে? কে আমি? কোথায় আমি সবাই আমরা ভেসে চলেছি অসীম বিশ্বের বিরহ-প্রবাহে ; কোথায় এর শেষ কে জানে? শেষে বুঝতে পারলাম, এ বিরহ-অশ্রু শুধু আমার নয়, চরাচরময় না-পাওয়ার এই বেদন ঝরছে। না-পাওয়ার বেদনাতেই পৃথিবীর এ সব ব্যস্ত আয়ােজন; এই উঠা-পড়া, ভাংগা-গড়া, ধ্বংস- প্রলয়। বার বার সৃষ্টি, বিরহ আর প্রলয়। পেলাম না কিশলয়দা’কে। কিন্তু পেলাম এক সুন্দর, নির্মল, ভাস্বর চেতনাকে ; পেলাম এক সূক্ষ্ম-সুন্দর দৃষ্টি ; শুনলাম, বিশ্বময় বেগময় বিরহের বাণী ; বুঝতে পারলাম, আমি শুধু অন্ধ নই; শুধু আমার চোখে জল নয় ; বিপুল বিশ্বে সবার চোখেই আজ জল; সবাই কাদছে বিরহের কান্না। কিন্তু এই নিবিড় সংহৃত আত্মচৈতন্য আমাকে নিথর শান্তি ও সান্ত্বনা দিলাে। • শিল্পী ; দেবীদাস ছবি আঁকে। সে শিল্পী : আরটিষ্ট। কত বন-উপবন ; নদ- নদী-গিরি : গিরি-ঝরণা তার ছবিতে ফুটে বের হয়। কত সূর্যাস্তের রক্তগগন ; কত উষা-বিকশিত কুসুম-তপন তার তুলির কোমল পরশে পরিস্ফুট হয়ে উঠে। শহরের নির্জন এক কোণে তার ছােট নিরালা ঘরখানি; সুন্দর সুসজ্জিত, কোমল পরিশােভিত। নিজের অংকিত ছবিগুলি দেয়ালের গায়ে ঝুলাননা। সারা ঘরটিই যেন একটি চিত্র-প্রদর্শনীরূপে সাজানাে। কত সুন্দর সুশ্রী ছবি সে একেছে ; কত বিচিত্র বর্ণের ও রূপের মাধুরী তার ছবিতে ফুটে বেরিয়েছে। তার তুলি-ঝরণা হ'তে ঝরে পড়েছে কত নীল সাগর, কত নীল আকাশ, কত অসীম উচ্ছাস। সারাদিন সারারাত সে ঘরখানিতে একা থাকে; একা একা কত স্বপ্ন দেখে ; কত সৌন্দর্য-ঝলকে তার দু’টা চোখ ঝলসিত হয় ; অন্তরে কত আকুল প্রেরণা ; মনে অসীম কল্পনা, প্রাণে অসীম বন্যা ; সে যেন দিনরাত ছুটে চলেছে কোন সুন্দরের সুদুর আহ্বানে । তার সমস্ত তরুতল আকুল উৎসে ভরা ; আকুল রসে টলমল। তার নয়নের স্বপ্ন, মনের কনক-কল্পনা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে ফুটে বের হচ্ছে তার তুলিতে মুরতি পরে। সে নিজেই অবাক হয়ে দেয়ালের গায় ঝুলানাে ছবিগুলির দিকে চেয়ে থাকে। ঐ সূর্যাস্তের ছবিটা তার সব চেয়ে ভালাে লাগে যেন। সূর্যদেব পশ্চিম সমুদ্রে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে। আধখানি সূর্য জলের তলে ডুবে গেছে, বাকী আধখানি হ'তে রক্তরশ্মি ঝরে পড়ছে ; পশ্চিম আকাশ রক্তাভায় জলছে যেন। দেবীদাস সেদিকে চেয়ে কত কথা ভাবে ; ভাবে সে কত বড় একটা জীবন্ত সত্যের ছবি এঁকে তুলেছে তার তুলির সুনিপুণ বর্ণ-সিঞ্চনে।
মরু-প্রদীপ তার হাতের সরু চিকণ সূক্ষ্ম কোমল অংগুলি কতবড় একটা সত্যের সুন্দর আবিষ্কার করে রেখেছে। সে আপন মনের কল্পনার দিকে চেয়ে অধীর আনন্দে ভরে উঠে। বাস্তবিক সে শিল্পী, সে স্রষ্টা, সে একটা বিরাট ঐশ্বর্য। গর্বে উল্লাসে সচেতন হয়ে উঠে সারা বক্ষস্থল। সহসা তার মনে কি যেন একটা ছায়া এসে পড়ে। কি যেন একটু সন্দেহ সংশয় মনের কোণে ঘুরে মনের কোণে ঘুরে বেড়ায় প্রচ্ছন্নরূপে। আবার অস্তগামী সূযের দিকে নয়ন সূক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে চেয়ে থাকে। অনেকক্ষণ পর আপন মনে বলে’ উঠে—সত্যই কি এ ছবিটি সত্যের রূপ পরা ? গভীর প্রশ্ন জাগে মনে। ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সূর্যদেব যেন সত্যই সমুদ্রের জলে ডুবে গেছে। কিন্তু একি সত্য? সূর্য কি সত্য সত্যই জলে ডুবে যায় ? ঐ সমুদ্র-জল-কল্লোল হ’তে সূর্যদেব লক্ষ মাইল দূরে, সুদূর পশ্চিম সন্ধ্যা কোলে অজানা এক অদৃশ্যমান পথ বেয়ে ছুটে চলেছে—কোথায়? কে জানে। সে যে চোখ দিয়ে সূর্যটিকে জলের ভিতরে ঢুকতে দেখেছে, তার সে চোখ, তার সে চোখের স্বপ্ন। তার তৎকালীন মনের কল্পনা, সত্যই কি নগ্ন নয় ? ডুবে-যাওয়া সূর্যকে তখন সে যে দৃষ্টিভংগিতে দেখছে ; তার চোখের কিরণ-রশ্মি, তার কল্পনার কনকরশ্মি তখন সূর্যের ডুবে-যাওয়া পথে যে গতিতে বা যে আলােকে ভ্রমণ করছে, তা কি সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়? সমুদ্রজলের সীমা ছাড়িয়ে বহু লক্ষ কোটী মাইল দূরে অবস্থিত রবির অস্তগামী পথের নাগালের অনেক পিছনে ছিলাে তখন তার নয়নের দৃষ্টি, কল্পনার সৃষ্টি ; তার চোখের সীমা ও কল্পনার সীমা ছিলাে শুধু ঐ সমুদ্রের জলরেখা পর্যন্ত ; সেই জলরেখা ছাড়িয়ে বহুদূরে সূর্যের ডুবে-যাওয়া পথে পৌছাতে পারে নি ; সেই পথের সােনার ধুলি হ’তে বহু পশ্চাতে ঘুরে ফিরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে তার দৃষ্টি ; তার কল্পনার গতি। ফিরে এসে সাগর জলেই দেখেছে অরুণের অস্তাচলের মরু-প্রদীপ ? মিথ্যা গতি। কাজেই মিথ্যার কল্পনা রঙে তুলির রং করে সে যে অস্তগামী সূর্যের ছবি এঁকেছে তাও মিথ্যা হয়ে গেছে বিষাদরূপে। তার সমস্ত শিল্পকলা, শিল্পসৌন্দর্য ব্যর্থ হয়ে পড়েছে ঐ ছবিখানিতে। দেবীদাসের চোখে এলাে জল ; সত্যই তা হলে সে একটা বিরাট মিথ্যা; শিল্পীরূপে? প? আর্ট কি তা হলে শুধু আর্ট সত্যের বহু পশ্চাতে ঘুরে মরা? দেয়ালের গায় আর একখানা ছবির দিকে চোখ তুলে চাইলে—মা ও শিশু। মার কোলে শিশু শুয়ে ; ঘুমিয়ে পড়েছে। জননী নিদ্রিত শিশুর মুখচুম্বনরতা। মা চাইছে নিদ্রিত শিশুকে চুম্বন- স্পর্শে জাগিয়ে তুলতে। এ ছবিখানি আঁকবার পূর্বে তার কল্পনা ছিলাে নিদ্রিত শিশু যেন জননীর চুম্বনবরষাধারে সহসা জেগে উঠে। কিন্তু তার তুলিতে শুধু চুম্বনরতা জননী ও সেই নিদ্রিত শিশুই ফুটে রয়েছে আজ দশ বৎসর যাবত। কিন্তু কোথায় সে চুম্বন-বরষাঘায়ে জাগ্রত হাসি-মুকুলিত অধর-রাঙা শিশু? কোথায় সে উৎফুল্ল শিশুর জাগ্রত আবির্ভাব ? দশ বৎসর আগের নিদ্রিত শিশু আজও নিদ্রিত ; সর্ব অংগ চেতনাহীন ; তার সেই দশ বৎসর আগের জননী আজও সেই একই চুম্বনরতা ; সর্ব শিহরণ পরশন জাগরণহীন চুম্বন। কোথায় শিশুর অংগ-জাগরণ? কোথায় চেতনা ? কোথায় উৎফুল্ল বিকশিত জাগ্রত শিশু জননীর কোলে উদয় অরুণ ফোটাবে ? কোথায় আনন্দ মুখরিত শিশুর সেই হস্তপদ-সঞ্চালন আর কোথায়ই বা জননীর অধীর আকুল অধরহাসি জাগ্রত শিশুর কচি কোমল সােনার বরণ মুখখানির পানে চেয়ে ? শিশু আজও গভীর সুপ্ত ; জননী এখনাে গভীর চুম্বনরতা। তবে? গভীর প্রশ্ন দেবীদাসকে আচ্ছন্ন করে তােলে । তবে কি তার তুলির ছোয়ায় শিহরণ পরশন জাগরণ নাই? তপ্ত পরশের তুমুল কম্পন নাই? উত্তপ্ত জীবনের অগ্নিশিখা নাই? প্রাণশক্তির প্রাণময় লীলাচঞ্চলতা নাই ? তুলির স্পর্শে কেঁপে উঠে না ঐশ্বর্যময় মরু-প্রদীপ ৩২ ; জীবনীশক্তি ছবির প্রতি অংশ? তুলির প্রতিটি বর্ণধারায় রঞ্জিত হয়ে উঠে না ছবি-অংগের প্রতিটি কোণ? উত্তপ্ত নিঃশ্বাসবায়ু জেগে উঠে না ছবি-অংগ-বক্ষতল হ'তে ? নাই কি প্রাণপুঞ্জ রক্তধারা ছবিদেহের প্রত্যেক ধমনীতে ? জীবন্ত মানুষের জীবন্ত কথাবার্তা নাই কি ছবি-মনুষ্যদেহের অধরপ্রান্তে ? নাই কি প্রাণ ? প্রাণের তড়িৎ-শিখা ? নাই কি ছবি-দেহে প্রাণের জীবনের উচ্ছাস, আবেগ, অধীরতা, আশা, আনন্দ ? দেবীদাসের সমস্ত অংগে যেন নেমে এলাে গভীর বিষাদ ; গভীর অবসাদ ; বিপুল ক্লান্তিতে যেন তার সমস্ত মনপ্রাণ ভেংগে গেলো। শেষে পলকহীন চোখে দেয়ালের গায় ঝুলানো ছবিগুলির দিকে চেয়ে বললে : “তুমি কি কেবল ছবি? শুধু পটে লিখা ? ওই যে সুদূর নীহারিকা যারা করে আছে ভিড় আকাশের নীড় ; ওই যারা দিন রাত্রি আলাে হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী গ্রহ তারা রবি, তুমি কি তাদের মতাে সত্য নও? হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি, চির চঞ্চলের মাঝে তুমি যেন শান্ত হয়ে রও।” দেবীদাস প্রলয় ক্ষ্যাপামিতে ভরে উঠলো। তা’র সমস্ত তরুতলে যেন জেগে উঠলে ধূমায়িত অগ্নিশিখা ; অসহ্য যাতনা তার বুকে ; নয়নে বিপুল ব্যর্থ চাহনি; অবসাদ-আচ্ছন্ন সারা প্রাণ ; তবে কি তার এ আজীবন শিল্পধনা সব অর্থ তত্বহীন ? সর্ব মহিমাহত ? এতকাল কি সে শুধু মিথ্যার পশ্চাতে ঘুরে’ মরেছে ; শুধু এই প্রাণ স্পন্দহীন মৃত ছবি একে একে সে করেছে শিল্পের সাধনা? শুধু এক কায়াহীন ছায়া মরু-প্রদীপ ; নিয়েই একেছে তার জীবনের শিল্পচর্চা ? এ চিরচঞ্চল, জাগ্রত, প্রবহমান, গতিশীল পৃথিবীর কোন রূপই তার ছবিতে ফুটে উঠে না ? গিরি হতে ধাবিত ঝরণার কলকল স্ফটিক নির্মল ব্যগ্রগতি সমন্বিত কোন নিঝরের ছবিই তার তুলিতে ফুটে নাই ? সুমধুর কণ্ঠনিঃসৃত সংগীত- সমন্বিত কোন বিহংগই তার ছবিতে স্থান পায় নাই ? নিঝরিণীর ধারা সে তার ছবিতে একে রেখেছে ; কিন্তু সবই কল-গতিহীন ; নিশ্চল, নীবব; প্রাণহীন পাষাণ ; স্তব্ধতায় ভরা। শত শত বিহগ-বিহগী তার তুলিতে স্থান পেয়েছে । তার শিল্পকলায় রঞ্জিত অলংকৃত হয়েছে, কিন্তু কোথায় সে সংগীতধ্বনিমুখর পাখী? দেয়ালের গায় আর একখান উষা-রবির ছবি। দেবীদাস সে ছবিটার উপর হাত রেখে অনুভব করলাে। মানে সূর্যের গায় হাত রেখে উষ্ণতা বিচার করলাে; কিন্তু কোথায় উষ্ণতা? সূর্য-অতি-ছবির বুকে হাত দিয়ে দেখলে ব্যর্থ। নাই তাতে উত্তপ্ত অনুভূতি উষা-সূর্যের কিরণ-কনকপুঞ্জ তপ্ত স্পর্শে ভরা ; কিন্তু সে সব তপ্ত-পরশ-অনুভূতি তার নিজের অংকিত রবিচিত্রে নাই। দেবীদাস সম্মুখের রং তুলিগুলির দিকে চেয়ে শিউরে উঠলো। নির্জীব নিস্পন্দ এই তুলি-অঙ্কিত সমস্ত শিল্পকলা। জিনিষটাকে সে মিথ্যার আবরণে গড়ে তুলেছে ; সত্য হ’তে সে বঞ্চিত হয়ে শুধু তুলি দিয়ে নানা রঙ ছবির গায়ে ছিটিয়ে মিথ্যার সাধনা করেছে। তার শিল্প পদে পদে হয়েছে ব্যর্থ। শিল্প সত্য, শিল্প সুন্দর। শিল্পী সে সত্যের সাধক ; সত্য ও সুন্দরের সাধনার নাম শিল্প ; আর্ট। সত্য ও সুন্দরের উপাসক যে, তাকেই বলা হয় শিল্পী; সত্য ও সুন্দরের প্রতিমূর্তি যখন মূর্ত হয়ে তার ছবির অন্তরে জাগে, তখন সে শিল্পী নামের যােগ্য। তার তুলিতে তখন সত্য ও সুন্দরের ছবি জীবন্ত প্রাণময় প্রতিমূর্তি নিয়ে ফুটে উঠে তখন শিল্পীর শিল্প-সাধনা সার্থক, সত্য, সুন্দর। তখন শিল্পীর শিল্প প্রাণ-প্রাচুর্য নিয়ে জীবিত হয়ে উঠে, তখন ছবি শুধু ছবি মরু-প্রদীপ হয়ে, শুধু লাল নীল রেখার বন্ধনে নিশ্চল, বন্দী, স্তব্ধ, মৌন, মূক না হ'য়ে, অসীম প্রাণশক্তিসম্পন্ন হয়ে, জীবন্ত মানুষের মতাে মুখে পায় ভাষা, চোখে চাহনি, বুকে কল্পিত নিখিল আশা ও আনন্দ, চিত্তে চারু ভাব- বিকাশ, তখনি শিল্প হয় চারু, সত্য, সুন্দর। শিল্পী হয় স্রষ্টা, দ্রষ্টা, নির্মাতা। যে মুহূর্তে শিল্পীর সর্ব সাধনা চিরচঞ্চল গতিশীল জৈব বা বাস্তব সত্যের পৃথিবী থেকে চুল পরিমাণ ভ্রষ্ট, সে মুহূর্তে সে মিথ্যা, অসত্য, অসুন্দর। Art is life and life is artএর থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হলে শিল্পীর শিল্পমাধুরী সর্ব চঞ্চলতায় ভরে উঠে। দেবীদাস দেয়ালের গায় ঝুলানাে ছবিগুলির দিকে গভীর ব্যর্থ চাহনি মেলে চেয়ে রইলাে ; গভীর নৈরাশ্যে ভরে উঠলাে তার সমস্ত অন্তর। তুমি শুধু ছবি? প্রাণহীন ছবি? আর কিছু নয় ? দেবীদাস পাগল ক্ষ্যাপামীতে সবগুলি ছবি দেয়াল থেকে তুলে এনে পদদলিত করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করলাে। চাই না প্রাণহীন রেখার বন্ধন ; চাই না ব্যর্থ মসীরেখার বিপুল অর্থশূন্যতা? চাই প্রাণ, চাই ভাষা, চাই সত্য ; চিরসুন্দরের প্রাণময় জ্যোতিঃ ; বুকের জীবন্ত স্পন্দন ; জীবন্ত শিল্প । তবেই আমার শিল্প-সাধনা সার্থক। শিল্প হবে প্রাণময়, প্রেমময়, ফুটন্ত মাধুরীময়। প্রাণের নিঃশ্বাস স্পন্দনেই পরিস্ফুট হয় শিল্প-শ্রী। বাস্তব সত্যেই হবে শিল্প সত্য; বাস্তব জগতই হবে শিল্প-জগৎ। কিন্তু সে এতদিন কি করেছে ? বাস্তবতার নিঃশ্বাস স্পন্দনহীন, বাস্তবতার সর্ব জাগরণ পরশনহীন নিশ্চল নিস্পন্দ প্রতিচ্ছবি একেই সে করেছে শিল্পের বড়াই? কঠিন সত্য সুন্দর উন্মাদ বাস্তবের অকঠিন, অসত্য অসুন্দর অনুন্মাদ প্রতিকৃতি বা প্রতিচ্ছবি এঁকেই সে নিজের শিল্পকে ভেবেছে সর্বসাফল্যমণ্ডিত ? সত্যই কি তাই? শিল্পীর শিল্প শুধু ছায়া? শুধু স্বপ্ন? নাই কি তাতে কোন প্রাণ? বাস্তবের কঠোর স্পর্শ ?
মরু-প্রদীপ চলে গেলে দেবীদাস সুদূর পশ্চিমে ; সে দেশের শিল্প-মনীষিদের সংগে করলে দেখা ; করলে তর্ক বিতর্ক; কিন্তু মীমাংসা হলাে না কিছুই। শিল্পের প্রাণ খুঁজে পেলাে না কোথাও। ফিরে এলাে আবার দু’বছর পর বাংলায় ; বিশাল ব্যর্থতা নিয়ে বাসা বাঁধলে পুরীতে ; সমুদ্রের তীরে একখানি নির্জন গৃহে। সে অবিবাহিত ; একা। অসীম নিঃসংগ জীবন নিয়ে সে শিল্পের প্রাণ খুঁজে বেড়াতে লাগলাে ; সে যেন রিসার্চ করতে লাগলাে শিল্পের প্রাণ। শিল্প ও প্রাণ এ দু’য়ের সন্ধিস্থল, এ দু'য়ের মিলন। কেটে গেলাে পাঁচ বৎসর শুধু সমুদ্র দেখে ; সমুদ্রতীরের অসংখ্য বালুকণা দেখে। ঐ নীল অনন্ত জলধারা আর এ উত্তপ্ত বহ্নিবালুকণা- এ দু’য়ের মধ্যে শিল্পের স্থান কোথায় ? এ দুই মহাবাস্তবের বুকে শিল্পজ্ঞান কোথায় ? শুধু কি জল ? শুধু কি নীল শ্রোতােরা? শুধু কি বালুর পাহাড়? শুধু বহ্নিতপ্ত তীব্র ধূলিকণা? আর কিছু নয় ? নাই কি এর মাঝে প্রাণস্পন্দন ? বিপুল অবসাদে দেবীদাস আবার নুয়ে পড়ে। তখন তরুণ উষা নবীন আলাে নিয়ে উদয় গগনে বিপুল বিকশিত কনককিরণে ফুটে উঠেছে ; সমুদ্রজলরাশি, কনককিরণ-ঝড়ে তরংগ- দোলায় দুলে উঠেছে। এ পারে অনন্ত বালুরাশি, অরুণ কিরণ শুভ্র তরংগ যেন ছুটে চলেছে, দিদিগন্ত অসীম লাবণ্যকম্পে কম্পিত ; তরংগায়িত, জাগ্রত যেন। কে এক তরুণী সমুদ্রজলে স্নান সমাপন করে সমুদ্র-সৈকতভূমি বেয়ে’ ধীর শান্ত ন পদক্ষেপে পথ চলছে। বৈধব্য-ব্যথিত শুভ্র বাস অংগে ; মান-অবসানে সিক্ত ; সজল রূপ-সিক্ত-ধারা; যৌবন-প্রস্ফুটিত তনুরাগ প্রভাতী অরুণের তরুণ রাগে রঞ্জিত। তরুণীর অংগ-জ্যোতিঃ সিক্ত সুক্ষ্ম-বসন-গ্রন্থি ছিন্ন করে ফুটে বের হয়ে শেফালি-শু-তি- মরু-প্রদীপ কণায় সমস্ত সৈকতভূমি প্রাণচ্ছটায় যেন প্রাণবন্ত করে তুলছে। তরুণীর পদতলে বামপার্শ্বে অনন্ত শুভ্র বালুকাভূমি ; দক্ষিণপাশ্বে অনন্ত নীল-অম্বুনিধি ; শুভ্র উর্মি নৃত্যে রত। মাঝখানে বেলাভূমির নির্জন পথ বেয়ে চলেছে এ দিব্য রমণী । নয়নে অরুণদীপ্ত অনন্ত চাহনি ; বসনে ভূষণে সর্ব অংগে নিখিল প্রাণের উন্মত্ত ইসারা। দেবীদাস বিস্ময় বিপুল নেত্রে তরুণীর পানে চেয়ে ; দেবীদাস বিপুল প্রাণ সৌন্দর্য বিমুগ্ধ চক্ষে তরুণীর দিকে চেয়ে ; দেবীদাস গভীর উত্তপ্ত সৌন্দর্য তড়িৎ শিখায় সহসা সমুজ্জ্বল অভিভূত। সে দিব্য দৃষ্টি বিহ্বল হয়ে চারিদিকে চাইছে ; ঐ অনন্ত অম্বুনিধির নীলকম্পনে ভেসে চলেছে যেন অনন্ত প্রাণ ; নীল, শান্ত, স্নিগ্ধ। এ অনন্ত বালুকা-সমুদ্রে ভেসে চলছে যেন অনন্ত শুভ্র প্রাণ। এই তরুণীর প্রাণ-নিঃসৃত অনন্ত প্রাণের ধারা ভেসে চলছে যেন বিশ্বময়—সমস্ত তরল ও কঠিন জড় পৃথিবীর বুকে প্রাণ সঞ্চার করে। দেবীদাস যেন দেখতে পেলাে সমস্ত চন্দ্র-সূর্য-গ্রহতারা, সাগর- নদী-গিরি, বন-উপবন, তৃণ-তরু, ধূলি-কণা এক অনন্ত প্রাণসৌন্দর্যে কম্পমান, আলােড়িত, ঝংকৃত, মুখরিত ; এবং সেই অনন্ত প্রাণ এ নারী প্রাণ-অংগ হ'তেই যেন শত প্রবাহে ধাবমান। সে যেন দেখতে পেলাে সমস্ত জড় ও অজড় সৃষ্টির মূলে রয়েছে এ নারী-প্রাণ ; এ নারী- শক্তি; এ নারী-জ্যোতিঃ। একমাত্র এ নারীই এ জল-সমুদ্রে, বালুকা- সমুদ্রে ও ইথার-সমুদ্রের বুকে করতে পারে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা। সমস্ত জড়- সুন্দর ও অজড়-সুন্দর বিশ্ব একই। নারীর সূক্ষ্ম প্রাণ সৌন্দর্যে সৌন্দর্যময়। সৃষ্ট বিশ্ববক্ষে প্রাণহীন কোন বস্তু-জগৎ নাই। আকাশের ছুটে-চলা মেঘ, শরতের লাবণ্য সুন্দর চাদ, গিরিশিখর ধাবিত নিঝরের কলধ্বনি আর পথের এ নীরব ধূলিকণা, সকলি সে এক বিপুল প্রাণকম্পে কম্পমান। শিল্পীর চিত্রপটেও সে একই প্রাণ ঝংকৃত। দেবীদাস আজ যেন অন্তদৃষ্টি খুঁজে পেলাে; সে আজ খুঁজে পেলাে শিল্প-প্রাণ।
৩৭ মরু-প্রদীপ • ; তােলা ; শিল্পীর মণি-রেখা-অংকিত সমস্ত ছবির অন্তরেই রয়েছে এক নিখিল প্রাণের সাড়া; সে নিখিল প্রাণ হ'তে বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর কোন সৃষ্ট বস্তুই নাই; শিল্পীর শিল্পবস্তুও সে প্রাণেরই প্রতিচ্ছবি ; কিন্তু এ সবাইকে জুড়ে রয়েছে অনন্ত মহিমান্বিত এ নারী-প্রাণ ; একমাত্র এ প্রাণময়ী নারীই পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির পশ্চাতে দাঁড়িয়ে সত্য সুন্দর প্রাণের ঝংকার তুলছে। কাজেই শিল্পীর শিল্প শুধু নিঃস্ব জড় তুলির আঘাত নয় । এ একই নারীপ্রাণে প্রাণময় ও প্রেমময়। সৃষ্টিময়ী নারী, ভ্রষ্টা শিল্পী। নারী সৃষ্টি করে প্রাণ, শিল্পী গ্রহণ করে সে প্রাণ তার ছবিতে, তার চিত্রপটে, তার তুলিতে। দেবীদাস সম্রমে তরুণীর সম্মুখে দাড়িয়ে বললে—আমি শিল্পী ; কিন্তু শিল্পের প্রাণ নারী ; আমার জীবনের সাধনা প্রাণের প্রতিমূতি গড়ে কিন্তু সে মূর্তির অন্তরে তােমাকেই সংগােপনে গড়ে তুলি ; আমার সমস্ত জীবন সাধনা শুধু তােমাকেই পাওয়া। তরুণী হেসে বললে—আমি পতিতা, শুভ্রবসনা, বিধবা। এ অনন্ত বালুকারাশির তপ্ত নিঃশ্বাসবহ্নি আমার সারা অংগে ; বসনে, ভূষণে। দেবীদাস বললে–মিথ্যা কথা; আমি যেন দেখছি, ঐ অনন্ত নীল জলধারার নীল শ্যামস্রোতে ভেসে চলেছে তােমার সমস্ত তরুণ অংগের প্রাণ-প্রবাহ ; তীরে এ অনন্ত বালুসমুদ্রের অরুণদীপ্ত বক্ষ জাগ্রত নিঃশ্বাস নিয়ে জেগে উঠেছে তােমারি প্রাণ-নিঃশ্বাস-ঝড়ে। আমি যেন দেখছি তােমার ঐ শুভ্র বাস-পরিহিত অংগ অন্তরে লক্ষ সৃষ্টির জীবন্ত উৎসব ; আগত ও অনাগত সৃষ্টির আদি জননী তুমি। তরুণী হেসে দেবীদাসের হাতে হাত মিলালাে; সমুদ্রের তীরে দু’জনে বাঁধলো বাসা। এক বৎসর পর দেবীদাস তরুণীর কোলের শিশুটির দিকে চেয়ে হেসে বললাে—শিল্পপ্রাণ আজ মুক্তি পেয়েছে তােমার অংগে ।
মরুপ্রদীপ
তরুণী হেসে শিশুর অধরে ঢাললাে প্রাণসিক্ত পুষ্প-চুম্বন ; বললাে-
সৃষ্টিময়ী নারী, পুরুষ শিল্পীরূপে শুধু দ্রষ্টা।
দেবীদাস আজ আবার তুলি ধরলে প্রায় দশ বৎসর পর ; দশ
বৎসরের সাধনার পর আজ শিল্প-প্রাণ খুজে পেলাে। তরুণীর কোলে
শিশুটিকে তুলির সূক্ষ্ম রেখায় ফুটিয়ে তুললল। পরিস্ফুট প্রাণবন্ত শিশু
জননীর বুকে। দেবীদাস আজ মুগ্ধ, সে যেন দেখলে—নারীর বুকে
প্রাণ। তার ছবির অন্তরে সূক্ষ্ম জাগ্রত প্রাণ। দেবীদাস বলে উঠলাে-
তুমি ছবি ?
নহে নহে, নও শুধু ছবি ।
মনের পরশ সকালে পাঁচটার সময় উঠিয়াও রাণুর নিস্তার নাই; কত কাজ যে চারিদিকে ছড়াইয়া থাকে-না দেখিলে বিশ্বাস করা যায় না। মুহূর্তও চুপ করিয়া বসিয়া থাকিবার সময় নাই। স্বামী স্ত্রী হইলে কি হইবে ? এ সংসারে বাহিরের লােক আর পাঁচ সাতজন ; সকলেই যােগেশের ফার্মে কাজ করে। মাহিনা সামান্য পায় বলিয়াই যােগেশ উহাদের খাইবার ব্যবস্থা নিজের ঘরেই করিয়াছে। এত বড় একটা ধ-ফার্মের মালিক যােগেশ ; পাচ সাত জন লােক খাইবে ইহাতে তাহার কোন আপত্তিই নাই। কাজেই রানু সকালে যে পাঁচটায় উঠিয়া রান্না ঘরে ঢুকে, রান্নাবান্নার কাজ সারিয়া সকলকে খাওয়াইয়া নিজে খাইয়া বাহির হইয়া আসিতে বেলা দুইটা তিনটা বাজিয়া যায়। সকালে উঠিয়াই আগে উনান ধরাইয়া আলুসিদ্ধ আর ভাত চাপাইয়া দিতে হয় ; তাহা না হইলে যােগেশের চলে না। সকালে সাতটায় ফার্মে যাইতে হয় ; আবার ফিরিয়া আসিতে বেলা একটা হইয়া যায়। চা খাইয়া কি এতক্ষণ থাকা যায় ! তা ছাড়া চা-খাওয়া যােগেশ একেবারেই পছন্দ করে না। রানু যদি কোনদিন বলে, আজ না হয় একটু চা খাও। যােগেশ মুখ ফিরাইয়া বলে, ও-সব বদ-অভ্যাস। আলুসিদ্ধ ও ভাত নামাইয়া আবার চা করিতে হয়। রানু আবার চা না খাইয়া থাকিতে পারে না। আধুনিক বড়লােকের ঘরের মেয়ে ; ছােটবেলা হইতে চা খাওয়ার অভ্যাস, চা না খাইলে রাণুর মাথা ধরে । তা ছাড়া ভাের বেলা ঘুম হইতে উঠিয়াই কতগুলি ভাত খাওয়া—এ অত্যন্ত আধুনিক রুচিবিরুদ্ধ। বিশেষ করিয়া তাহার মত আই. এ. পাশ মেয়ের পক্ষে ইহা অত্যন্ত অশিক্ষিতার কাজ।
মরু-প্রদীপ ৪০ আজ সকালে রাণু রান্না ঘরে ঢুকিয়াই দেখিল, গত রাত্রির উচ্ছিষ্ট বাসনগুলি যে যেখানে বসিয়া খাইয়াছে, সেখানেই পড়িয়া রহিয়াছে। ঠিকা চাকরটা কাল রাত্রিতে আসে নাই। রাণুর গা জ্বলিয়া উঠিল ; ঠিক। চাকর দিয়া কি এ হােটলের কাজ চলিতে পারে ? সব কাজই নিজের করিতে হয়, কেবল বাসন ধােওয়া-মাজার জন্য একটা লােক রাখা হইয়াছে ; সেও মাসের মধ্যে দশদিন কামাই করে। এখন এসব কাজ করে কে ? সব সময়ের জন্য একটা লােক রাখা যায় না? তাহাদের কি টাকা পয়সার অভাব? একটির জায়গায় দশটি লােক রাখা যায়। যুদ্ধ বাধিবার পর হইতেই ফার্মের আয় দশগুণ বাড়িয়াছে ; এক টাকার ঔষধ দশ টাকা। এবার নাকি তিরিশ চল্লিশ হাজার টাকা লাভ হইবে। তবুও কি একটা চাকর সকল সময়ের জন্য রাখা যায় না? টাকাটাই কি সব? সে কি কিছুই না ? লােক রাখিবার কথা বলিলেই যােগেশ বলিয়া উঠে—আমি নিজে পরিশ্রম করে কাজ করে খেতে শিখেছি, তুমিও তাই শেখাে। হ'লেই বা বড়লােকের মেয়ে, নিজের কাজে লজ্জা কি ? রাণুর আপাদ-মস্তক জ্বলিয়া উঠে; কাজ করিয়াই যদি খাইতে হয় তবে বড়লােক হইবার অর্থ কি ? সবাইকে কি কুলী-মজুরের মত খাটিয়া খাইতে হইবে? রাণুর চোখে জল আসিতে চায়, শেষে নিজেই বাসনগুলি ধুইতে আরম্ভ করে। শীতকালের ভােরবেলা, জলগুলি এত ঠাণ্ডা যে, নিমিষের মধ্যে তার হাতের আংগুলগুলি অবশ হইয়া উঠে; বুকের তলায়ও যেন কি এক কম্পন জাগে। সাথে সাথে হেনার পাত্রের কথা মনে পড়িয়া যায়। হেনা তাহাকে পত্র লিখিয়াছে! কত কথা লিখিয়াছে। তাহার নাকি এতটুকুও কাজ করিতে হয় না, কাজ করিলেও স্বামী রাগ করে ; রাগ করিয়া কথা বলে না। তবু যদি সে কোনদিন স্বামী অফিস হইতে আসিলে ৪১ মরু-প্রদীপ ? তাড়াতাড়ি দুইখানা লুচি ভাজিতে যায়, তবে নাকি হীরেনবাবু তাহাকে বুকের কাছে তুলিয়া ধরিয়া-মুখে চোখে গালে চুমা দিয়া ছাড়িয়া দিয়া বলে—যাও, তােমাকে লুচি ভাজতে হবে না; চাকর রয়েছে কি জন্য ? রাণু আর ভাবিতে পারিল না, চক্ষু দুইটা জলে ভরিয়া উঠিল। সেই অশ্রু-কুয়াশার ভিতর দিয়া সুদূর অতীতের সৌধচুড়ার দিকে চাহিয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিল মাত্র। শেষে বাসনগুলি ধুইয়া মাজিয়া পরিষ্কার করিয়া সাজাইয়া রাখিয়া দিল। এইভাবে সব কাজ করিতে করিতে রাণুর আজ যােগেশের ভাত রধিতে দেরী হইয়া গেল। যােগেশ দুই তিনবার রান্নাঘরে আসিয়া ভাত রান্নার দেরী দেখিয়া একটু বিরক্তির সুরে বলিল—বেলা বাজে আটটা, এখনাে তােমার রান্না হলাে না? এতক্ষণ করছিলে কি রাণুর আর সহ্য হইল না; সেও তীক্ষ্ণস্বরে উত্তর দিল—করছিলাম আমার মাথা। একরাশি এঁটো বাসন ধু'তে মাজতে কি সময় লাগে ? আপনিই হয়ে যায় সব কাজ। তুমি তাে আমাকে সারাদিন বসে থাকতেই দেখাে ; কাজ করে শুধু দাসী চাকরে । যােগেশ যেন এতটুকু হইয়া গেল ; অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বলিল— ও ঠিকা চাকরটা বুঝি কাল আসেনি; বুড়াে মানুষ, শরীর হয়তাে ভাল নেই। থাক থাক্, আমি না হয় আরাে একটু দেরী করি ; তুমি রান্নটা সেরে ফেলল। আজ একজন মস্ত খদ্দের আসবার কথা; হাজার দশেক টাকার মাল কিনবে ; তাই একটু সকাল সকাল যাওয়া দরকার ছিলাে। তা থাক, একটু দেরী হলে কিছু হবে না। এ ভাবেই এবার ফার্মে মােটা লাভ হচ্ছে। হাঁ, এবার তােমাকে নিশ্চয় একটা কুই নেকলেস্; পাঁচ হাজার, সাত হাজার। যত দামই হােক••• বাইরে ফার্মের উন্নতির জন্য আমি যেমন দিনরাত খাটি, তুমিও যদি তেমনি ঘরের কাজ গুলি নিজে পরিশ্রম করে দেখে শুনে করে—তবে আমাদের নাগাল মরু-প্রদীপ ৪২ পায় কে ? চাকর-বাকর দিয়ে কি কাজ চলে? এ তুমি নিজেও বুঝতে পারে। দেখ তত থালা-বাসনগুলির দিকে চেয়ে—যেন সােনা ঝলমল করছে। গ্লাসটা দেখলে জল খেতে ইচ্ছে করে—এত পরিষ্কার। যদিও এটা হােটেল, কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণের হােটেল। সহসা রাণুর রাগ কমিয়া গেল ; কিন্তু তবু অভিমানের সুরে বলিল— যাও, আর প্রশংসা করতে হবে না; তার চেয়ে একটু চুপ করে বসে ; ভাত হয়ে গেছে, ফ্যানটা গেলে দিচ্ছি। যােগেশ বসিল না, রাণুর কাছে আসিয়া তাহাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া মুখের উপর মুখ আনত করিল; কিন্তু চুম্বন না করিয়া ছাড়িয়া দিয়া বলিল—না, কাজের সময় বিরক্ত করা ভালাে নয়, তাড়াতাড়ি ভাতটা নামিয়ে দাও, বেলা হয়ে গেলাে; খদ্দের এসে হয় তত ফিরে যেতে পারে। আজ যদি তার কাছে ঐ দশহাজার টাকার মাল বেচতে পারি, সন্ধ্যাবেলা তােমাকে সিনেমায় নিয়ে যাবে। রাণু যােগেশের সংগে একত্র বসিয়া অনেকদিন সিনেমা দেখে নাই যােগেশের নানা কাজ থাকে, বিশেষ করিয়া সন্ধ্যাবেলা ফার্মে লােক- জনদের বেশী ভীড়, অনেক খরিদ্দার আসে, যােগেশের আর সময় হইয়া উঠে না; কাজেই রাণুকে নানা বন্ধু-বান্ধবীর সংগেই সিনেমায় যাইতে হয়। আজ যােগেশ নিজেই বলিল যে, তাহাকে সিনেমায় লইয়া যাইবে ; এই কথা শুনিয়া রাণু খুব খুশী হইয়া বলিল—কথা ঠিক ? যােগেশ বলিল—ঠিক। তারপর যােগেশ তাড়াতাড়ি দু’টা ভাত মুখে দিয়া ফার্মে চলিয়া গেল। সেদিন দুপুরবেলা আর খাইতে আসিল না, খবর পাঠাইল- আজ অনেক কাজ, সেই খরিদ্দাটি আসিয়াছে, দশহাজার টাকার মালও কিনিয়াছে ; তাহার হিসাবপত্র করিতে অনেক রাত হইয়া যাইবে, বাণু যেন তাহার জন্য অপেক্ষা করে না; সিনেমায় যেন একাই যায়।
৪ মরু-প্রদীপ টাকাই সব ? রাণুর মন খারাপ হইয়া গেল-রাস্তার ঐ পার্শ্বেই সিনেমা ঘর। এতটুকু একাই যাইতে পারা যাইবে । কিন্তু কথা তাহা নয়, সে এখনও বুড়ী হইয়া যায় নাই যে, খানে সেখানে একা যাইবে ! তাহার বয়স অল্প, মাত্র আঠার-কাচা বয়স। এ বয়সে কোন স্বামী স্ত্রীকে একা ছাড়িয়া দিতে সাহস করে ? এ বয়সের স্ত্রী, স্বামীর একান্ত কাছের ধন, চোখের মণি, বুকের ঐশ্বর্য। কিন্তু তাহার স্বামী তাহা কি বুঝে? সে বুঝে শুধু তার ফার্ম। দিনরাত ঐ ফার্ম লইয়াই ব্যস্ত। ফার্মের কাজ তত রােজই আছে, থাকিবেও চিরকাল, কিন্তু তাই বলিয়া কি একদিনের জন্যও তাহার সংগে সিনেমায় যাওয়া চলে না? শুধু কি ব্যবসা আর সে কি কিছুই না ? ব্যবসায়ী স্বামী কি এমনই স্ত্রী- উদাসীন? ভালবাসার একটা কথা তাহার মুখ দিয়া এ জীবনে বাহির হইল না। রাণুর চোখে আসিল জল ; সে সিক্ত চোখের সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল—চাকুরীজীবী স্বামী ও তাহার স্ত্রীর একটা অপরূপ ছবি। অপরূপ ছবি নয় ত কি? স্বামী স্ত্রী হইয়া বাঁচিয়া থাকিতে হইলে এমনি করিয়া বাঁচিয়া থাকাই উচিৎ। পাশের বাড়ীর বীণাদিদিকে দেখিলে হিংসা হয়। স্বামী স্ত্রীতে মিলিয়া পুষ্পেজ্জল কি সমৃদ্ধ জীবন ! কি মধুর উচ্ছাসভরা জীবন-সংগীত ; ধরায় থাকিয়া কি অনন্ত জীবনস্বর্গ । উহাদের কাছে গা ঘেষিয়া দাড়াইলে সুন্দর সুশ্রী মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। মনে হয় উহাদের অংগ হইতে ঝরিয়া পড়িতেছে কুসুম-সুবাস। অংগের এই সুবাস কোথা হইতে আসিল ? উহাদের দুইটা হৃদয়ের প্রেম- পারিজাত হইতে নয় কি? দুইজনে মিলিয়া প্রাণের কত মিল। সেদিন দেখিলাম, পাশাপাশি দুইজনে বসিয়া রহিয়াছে ; বীণাদিদির কোমল কাধের উপর অনিলবাবুর বাহু লতাইয়া রহিয়াছে। রেডিও খুলিয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিতেছে; গানের সংগে যেন প্রাণ মিলিয়া গিয়াছে। মিলিবে না কেন? প্রেম-ভালবাসা-সােহাগ-আদর যেখানে মরু-প্রদীপ ৪৪ গভীর সেখানে এমনই হয়। শুধু কি প্রাণেরই মিল ? ঘর দুয়ারের দিকে চাহিলেও একটা মিলিত জীবনের সুশ্ৰীত খুঁজিয়া পাওয়া যায়। কুশানকরা চেয়ারগুলির দিকে চাহিলে প্রিয়জনের পার্শ্বে গা ঢালিয়া বসিয়া থাকিয়া প্রণয়-সম্ভাষণ করিতে ইচ্ছা হয়। জানালার গােলাপী পদাগুলির দিকে চাহিলে মনে হয়, প্রেমময় জীবনের পুষ্পকোমল আভা যেন সেখানে প্রতিবিম্বিত। ঘরের শ্বেতপাথরের শুভ্র মেঝখানির দিকে চাহিলে চোখের দৃষ্টি খুজিয়া বেড়ায় উহাদের জীবনেরই শুভ্রজ্যোতিঃ। হৃদয়ে বাহিরে এমনই উহাদের মিল। মিল। তাহা ছাড়া বীণাদিদি বােজ সন্ধ্যায় লেকের ধারে বেড়াইতে যায় ; কখনও কখনও সিনেমায়। অনিলবাবুর সন্ধ্যাবেলা কাজ থাকে না। দুইজনে যখন পাশাপাশি হাটিতে থাকে, মনে হয় যেন তাহারা চিরকালের জন্য প্রাণমিলাননা সাথী। বীণাদিদিকে কি সুন্দর দেখায় সেই মেঘবরণ শাড়ীখানায় । অস্ত-সুর্যের মৌন রক্তাভা যখন বীণাদিদির শাড়ীখানার উপর আসিয়া পড়ে, মনে হয় মেঘ-নগরে আগুন লাগিয়াছে ; সেই আগুনের তপ্ত রশ্মি অনিলবাবুর আদ্ধি-পাঞ্জাবীর উপর আসিয়া যখন ছিটুকাইয়া পড়ে, তখন দুইজনেই যেন ফুটিয়া উঠে দেবদেবী হইয়া। এমন দেবদেবী সেও হইতে পারিত। কিন্তু••••• | রাণু আর ভাবিতে পারিল না। সমস্ত ভাবনা যেন বুকের তলে রুদ্ধ হইয়া আসিতে চাহিল ; কিন্তু সে আজ সামান্য একজন ব্যবসায়ী স্বামীর স্ত্রী মাত্র। আজ দুই বৎসর হীরেনবাবুর সংগে হেনার বিবাহ হইয়াছে ; হেনা তাহারই বাল্যবন্ধু, সহপাঠিনী। হেনা কি তাহার অপেক্ষা সুন্দরী? মােটেই না। বিউটা কপিটিশনে সেবার সেইই প্রথম হইয়াছিল ; হেনা নয়। তবে ? রাণু দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিল—অদৃষ্ট! সন্ধ্যাবেলা রানু সিনেমায় গেল। যােগেশ আসিল না। একাই গেল ; একা যাইবার দুঃখ তাহার চিরকালই থাকিবে। রাস্তায় বাহির ৪৫ মরু-প্রদীপ ৩ হইয়া সে ভয়ানক নির্জনতা বােধ করিল ; রাস্তার এত লােকের মাঝেও সে যেন অসীম একেলা ; বার বার যােগেশের কথা মনে পড়িল। রাস্তার এইপার হইতে ঐপারে যাইতেই সে যেন ঘামিয়া উঠিল ; কতগুলি জ্বলন্ত চক্ষু তাহার দিকে ; চরিত্রহীন এ চোখগুলি তাহাকে যেন বি ধিয়া মারিল ; পুরুষের চোখ যেন অতৃপ্ত কামনা-শিখা। সম্মুখে সিনেমা ঘরের বিজলিবাতিগুলির দিকে সে একবার চাহিয়া লইল ; কামনাহীন এ বাতিগুলির উজ্জ্বল আলাে তাহার ভাল লাগিল। তাড়াতাড়ি সিনেমার বারান্দায় ঢুকিয়া দুই টাকার একখানা টিকিট কিনিয়া ভিতরে ঢুকিয়া সে যেন হাপ ছাড়িয়া বাঁচিল। এখনাে শশা আরম্ভ হয় নাই ; রাণু চুপ করিয়া বসিয়া আছে ; যােগেশের কথা আবার মনে পড়িল, সে যদি এখন পাশে বসিত। সহসা পাশের সীটের একজন কেরাণীর স্ত্রী বলিয়া উঠিল—স্বামী বুঝি আসেন নি ? রাণু আস্তে জবাব দিল—না, তার কাজ আছে। -অফিসে বুঝি ভয়ানক কাজ? রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয় ? -অফিস নয়, ফার্মের কাজ। -কিসের ফার্ম ? -মেডিসি। -ওঃ, অষুধের দোকান ? তা’তে সংসার খরচ চালিয়ে বাইরের সখ মেটানাে চলে ? বউটীর মুখে অবজ্ঞার সুর। কথা শুনিয়া রাণুর আপাদ মস্তক অলিয়া উঠিল। বউটীকে কয়েকটা কড়া কথা শুনাইয়া দিল। কেন, সিনেমা দেখার অধিকার কি শুধু কেরাণীর স্ত্রীর ? ব্যবসায়ী স্বামীর বউ কি শুধু বিনা পয়সায় সংকীর্তন শােনে? আমি তাে উদয়শংকরের নাচও দেখেছি দশ টাকার সীটে বসে ; ক’জন কেরাণীর বউ তা দেখেছে ?
মরু-প্রদীপ বউটী লজ্জায় এতটুকু হইয়া গেল। সেদিন রাত্রে রাণুর আর ঘুম হইল না। কত কথা তাহার মনের কোণে ভিড় করিয়া দাড়াইল। চল্লিশ টাকার কেরাণীর বউর যে সম্মান, তাহার সে সম্মান নাই। তাহা না হইলে এ বউটী তাহাকে এমন কথা শুনাইতে পারে ? দোকান করিয়া সংসার চালাইয়া বাহিরের সখ মিটানাে যায়? দশজন কেরাণীর টাকা রােজগার করিলেও ব্যবসায়ী স্বামীর নাম নাই ; দরিদ্র কেরাণী প্রধান বঙ্গীয় সমাজে তাহাকে সকলেই একটু অবহেলার চোখে দেখে। ব্যবসায়ী স্বামীর টাকা থাকিলে কি হইবে, বর্তমান আধুনিক রুচি ও শিক্ষা যদি তাহার সংগে না থাকে তবে সকলেই তাহাকে নিন্দা করে। সিনেমায় ঐ বউটী যে শাড়ীখানা পরিয়া আসিয়াছে, কমের পক্ষে তাহার দাম পচিশ টাকা হইবে। সে মাত্র দশ টাকার একখানা শাড়ী পরিয়া গিয়াছে। কাজেই বউটী তাহাকে এতবড় কথা শুনাইতে সাহস পাইয়াছে। বর্তমান সভ্যতা বাহিরের আবরণে আভরণে ; ব্লাউজে শাড়ীত ; প্যাটিকোটে, ভ্যানিটী ব্যাগে, হাই হিল সু’তে। কিন্তু এ সব কি তাহার আছে? কাজেই লােকে নানা কথা বলে। বাহিকতা ছাড়া বর্তমান সভ্যসমাজে মিশিতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র ; কিন্তু তাহার পক্ষে বাহিকতার কোন দরকার ছিল না; স্বামীর যাহা আয়, তাহাতে সত্যের রাণী সাজিয়া থাকিতে পারে; কিন্তু তাহা কি সে পারে ? ব্যবসায়ী স্বামীর মতে অধিক মূল্যের পােষাক পরিচ্ছদ একটা মর্মভেদী অপব্যয়। সােহাগভরা বর্তমান যৌবন জীবনটাকে মিথ্যা করিয়া দিয়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যতে যৌবনহীন জীবনটাকে এতবড় করিয়া দেখিবার প্রয়ােজন রাণু খুঁজিয়া পায় না ; বর্তমান সত্যকে রুগ্ন করিয়া পিছনের দিকে ঠেলিয়া দিয়া ভবিষ্যতে তাহাকে ঐশ্বর্যময় করিয়া তুলিবার আশায় বসিয়া থাকাটা রাণু নিজেও পছন্দ করে না ; হীরেনবাবুও কোনদিন পছন্দ করিতেন না। হীরেনবাবুও ;
৪৭ মরু-প্রদীপ ফেলিয়াছে বহুদূরে চাহিতেন বর্তমানকে লইয়া বাঁচিতে। সহসা আবার রাণুর হীরেনের কথা মনে পড়িয়া গেল। আজ এই নিদ্রাহীন নিঝুম নীরব রাতের অন্ধকার বক্ষে, প্রেমময় হীরেনের পুরাতন পরিচিত মুখখানা আলাে- সূর্যের মত ভাসিয়া উঠিল। এত কাছে পাইয়াও যাহাকে সে হারাইয়া ঐ সুদূর রেংগুন সহরে হীরেনের কর্মস্থলে। এই হীরেনের সংগে ছিল তাহার মনের মিল, রুচির মিল, আধুনিকতার মিল, বাঁচিবার মিল, জীবনের মিল। কিন্তু সে ছন্দ-মিলাননা মিল আজ আর নাই। সহসা একটা দমকা হাওয়া কোথা হইতে স্বপনের মত আসিয়া হীরেনকে উড়াইয়া লইয়া গিয়াছে হেনার কাছে, আর তাহাকে এই যােগেশের কাছে ; স্বপ্নহীন সুগভীর নিদ্রায় তাহার পাশে শুইয়া এখন সে ঘুমাইতেছে। হাঁ, রাণু সত্যই হীরেনকে ভালবাসিয়াছিল, হীরেনও রাণুকে ভালবাসিয়াছিল। হীরেন কবিতা লিখিতে পারিত, তাহার আগে লিখিতে পারিত না ; রাণুকে ভালবাসিয়া কবিতা লিখিতে শিখিয়াছে। ভালবাসিয়া কবিতা লিখিয়া রাণুকে পড়িয়া শুনাইত ; রাণু শুনিয়া যদি বলিত-বেশ হয়েছে। তবেই হীরেন নিজকে ধন্য মনে করিত। রানু মাঝে মাঝে বলিত—আপনার কবিতা কাগজে ছাপতে দেননা কেন? হীরেন বলিত-পঠিত কবিতা আমি ছাপতে ভালবাসি না; যে কবিতার বাণী তােমাকে পড়ে শােনাই, সে বাণী কাগজে ছাপিয়ে আর কাউকে শুনাতে চাই না। আমার বাণী তােমার কাছে থাকবে চির নূতন, চির সঙ্গোপন ; তােমার আমার কথা জগতের আর কেউ যেন জানতে না পারে। তােমার আমার ভালবাসা সােনার কৌটায় বন্দী একটি সদ্য ফোটা শ্বেতপদ্মের মত নিবিড় পবিত্রময় । এমনি করিয়া রাণু হীরেনকে পাইয়াছে কাছে; কিন্তু তাহাকে শেষ পাওয়ার দিন আর আসিল না। রাণুর বন্ধু হেনার সাথে হীরেনের •• মরু-প্রদীপ ৪ একদিন বিবাহ হইয়া গেল। কারণ সামান্য। হীরেন এম. এ. পাশ করিলে কি হইবে, রাণুর পিতা তখন বেকার হীরেনের কাছে মেয়ে দিতে কিছুতেই রাজী হইল না। পরদিন সকালে উঠিয়া রাণু দেখিল, একটা লােক কাজে আসিয়াছে ; রাণু লােকটার দিকে বিস্মিত চোখে চাহিয়া রহিয়াছে দেখিয়া যােগেশ বলিল-ওকে আমিই আসতে বলেছি ; ঠিকে বুড়াে চাকরটা দিয়ে কোন কাজ হয় না । ও আজ থেকে বাসন মাজা, রান্নাবান্না ইত্যাদি সব কাজ করবে। তােমার মতাে কলেজে-পড়া ও বড়লােকের আদুরে মেয়ের পক্ষে বােজ সকাল বেলা ভাত রান্না করা নিতান্তই অশােভনীয়। কথাটা যােগেশ রসিকতা করিয়া কহিল। কিন্তু রাণুর একেবারে অসহ হইয়া উঠিল। সারারাত এতটুকুও ঘুমাইতে পারে নাই ; মনটা এমনিই খারাপ হইয়া রহিয়াছে ; যােগেশের এ খোচা দেওয়া কথায় সে আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিল ; বলিল—আমি কি আর বােজ রান্না করে দিই, রান্না করে ঠাকুর চাকরে ; কথার শ্রী দেখ। বড়লােকের আদুরে মেয়ে নিশ্চয়ই ছিলাম ; এখন যেমন অদৃষ্ট তেমন জুটেছে। আমার চাকরের দরকার নাই। আমার কাজ আমিই করবাে। অত্যন্ত রুক্ষ স্বরে রাণু এই কথা বলিয়া নিজেই রান্না ঘরে ঢুকিয়া উনান ধরাইতে বসিল। যােগেশ বুঝিতে পারে নাই—এ সামান্য কথাটায় রাণু এত রাগিয়া যাইবে। সে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হইয়া এবং মনে মনে লজ্জিত ও দুঃখিত হইয়া আজ সকালে না খাইয়াই কাজে বাহির হইয়া গেল। সারাদিন আর আসিল না। যােগেশ চলিয়া গেলে রাণু চাকরটাকে ভখনই বিদায় দিবে বিয়া আবার ঠিক করিল যে, চাকর বিদায় দিলে তাহাকেই হােটেলের কাজ সমস্ত করিতে হইবে; নিজের মনের এত অশান্তির উপর আবার এত পরিশ্রম সে কিছুতেই করিবে না। কিসের জন্য সে ;
৪৯ মর-প্রদীপ বােজ বােজ এতগুলি লােকের রান্নাবান্না করিবে ? তাহার সুখ কোথায় ? শান্তি কোথায় ? শেষে সে চাকরটাকে বিদায় না দিয়া কাজেই লাগাইয়া দিল। নিজে সামনের ঘরে আসিয়া একা বসিয়া হেনা ও হীরেনের কথা ভাবিতে লাগিল। কত সুখের জীবন এই হেনার ! হেনার স্থান তত তাহারই পাইবার কথা ছিল ; হেনা কি সে কথা জানে? কখনও না। সে যে হীরেনকে ভালবাসিত, এ কথা সে কোনদিন হেনাকে বলে নাই। জানাজানি করিয়া কেহ কোনদিন ভালবাসে? এমন সময় দরজায় কে ঘা দিল। দরজা খুলিলে ডাকপিয়ন রাণুকে একখানা পত্র দিয়া গেল। হেনার পত্র। রেংগুন হইতে হেনা রাণুকে পত্র লিখিয়াছে। রাণু পত্ৰ পড়িতে লাগিল । ভাই রাণু, মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন তাহাকে নিজের দুঃখের কথা, অসীম অপরাধের কথা চোখের জলে ভিজাইয়া সকলের কাছে ব্যক্ত করিতে হয়। এখন আমার জীবনে সে সময় উপস্থিত হইয়াছে ; আজ চোখের জলে চিঠির সমস্ত অক্ষর ভিজাইয়া তােমার কাছে আমাদের জীবনের সমস্ত অন্যায় অসাবধানতার কথা বলিব ভাবিয়া এ পত্ৰখানা লিখিতেছি। এতদিন আমাদের জীবনের ছবি যাহা দেখিয়াছ, যাহা বুঝিয়াছ, তাহা যে কত বড় মিথ্যায় আসিয়া মিশিয়াছে সে কথাই লিখিতেছি। বিবাহের পর বধূ সাজিয়া যেদিন ঘর করিতে আসিলাম অত্যন্ত আধুনিক রুচিসম্পন্ন উচ্চ শিক্ষিত স্বামীর সাথে, সেদিন স্বপ্নেও ভাবি নাই স্বামীর সে আধুনিকতার মূলে থাকিবে চোখের জল, থাকিবে অসীম জীবন্ত মৃত্যু-ব্যথা। বর্তমানে আমরা সেই মৃত্যু-ব্যথাই পলে পলে ভােগ করিতেছি। শুনিয়া হয় তো দুঃখিত হইবে যে, আজ ছয় মাস হইল তােমাদের হীরেনবাবুর চাকুরী নাই; আজ সে এক মুষ্টি ভাতের জন্য কত কাংগাল। কি করিয়া আমাদের এই দশা হইল সে মরু প্রদীপ কথাই এখন বলিতেছি। তুমি হয় তাে জান যে, আমি কোনদিনও পােষাক-পরিচ্ছদে, বাহ্যিক আবরণে, আভরণে, অত্যধিক ষ্টাইল করিয়া চলিতে ভালবাসিতাম না। বর্তমান নগ্ন সভ্যসমাজে—বিশেষত কেরাণীকুলবাসী বংগসমাজের বধূদিগের মধ্যে যদিও ইহা মারাত্মক রুচি হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তথাপি আমি কেরাণীর বধু হইয়াও প্রথম প্রথম সে রুচির পরিবতন করিয়া সাদাসিধা ভাবেই চলিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। কারণ স্বামীর অল্প আয় অনুযায়ী ঘরের গৃহিণী যদি তদনুরূপ ব্যয়ভার সংকুচিত না করিয়া চলে, তবে সে ঘরের ভবিষ্যৎ দিনগুলি মরুশিখার মতই নিতান্ত ভয়াবহ হইয়া উঠে। আমাদেরও তাহাই হইয়াছে। আমি সামান্য সূতার কাপড় পরিয়াই থাকিতে ভালবাসিতাম ; যে সূতার কাপড় পরিয়া, হাতে সামান্য যে শাখা পরিয়া আমাদের অতীত ভারত-বধূরা রাজদরবারে উচ্চ স্থান পাইয়াছে, আমিও স্বামীর কাছে তাহাই দাবী করিয়াছিলাম; কিন্তু সে বিদ্বান, শিক্ষিত ; বর্তমান সভ্যতার ছাঁচে গড়া ; আমার সে সমস্ত সাজ-পােষাক সে কথনও পছন্দ করিত না ; আমাকে নিতান্ত সেকালের অসভ্য বলিয়া ঘৃণা না করিলেও অনেক সময় আমার উপর রাগ করিত। কাজেই আমি বাধ্য হইয়া ষ্টাইল করিয়া চলিতে শিখিলাম। সূতার কাপড় ও শাখা ছাড়িয়া অত্যন্ত আধুনিক বেশ ধরিলাম ; ষাট সত্তর টাকা দামের অত্যন্ত পাতলা মিহি সূক্ষ্ম শাড়ীর গােলাপী আঁচল দিয়া বক্ষস্থল অর্ধনগ্ন করিয়া ঢাকিতে শিখিলাম ; ব্লাউজের বুকের বােম ইচ্ছাপূর্বক শিথিল করিয়া লাগাইতে শিখিলাম ; শাঁখা সিন্দুর ছাড়িয়া দিয়া আধুনিকার বেশ ধরিল; ঘােমটা নামমাত্র না দিয়া চুলের খোপা নগ্নঝন্ধে ঝুলাইয়া দিলাম। কপর্দকহীন ভ্যানিটি ব্যাগ হাতে বা কঁাধে ঝুলাইয়া চলিতে চলিতে হাত এবং কঁধ ব্যথা করিয়া ফেলিলাম ; দশজনের সংগে সমান ভাবে সিনেমা, থিয়েটার দেখিয়া ; ঘরের সমস্ত কাজ দাসী চাকর ;
; ; মরুপ্রদীপ দিয়া করাইয়া অনাবশ্যক বন্ধু-বান্ধব ডাকিয়া আনিয়া টি-পার্টি করিতে শিখিলাম। আমাকে সাজাইতে যাইয়া সেও তেমনি সাজিয়া নানা অপব্যয় করিয়া বতমান সভ্যতার বাহিকতা রক্ষা করিতে সুরু করিয়া দিল। এদিকে ঋণের মাত্রা দিন দিন বাড়িয়া উঠিল। ইহার পর একদিন অফিস হইতে আসিলে তাহার হাতে দেখিলাম, একটা কালো বােতল ; জিজ্ঞাসা করিলাম, বােতল কিসের ? বলিল—মদ। শুনিয়া গা শিহরিয়া উঠিল ; বলিলাম—মদ কেন ? বলিল-খাব। তারপর কর্কশ অট্টহাসি তুলিয়া বলিল-মরিবার সময় মদই মহৌষধ। খাইয়া মরিতে পারিলে এ ধরায় জীবন ধন্য হয়। ভয় পাইতেছ ? আজ এই প্রথম নয়, মদ আমি আজ ছয়মাস যাবত ধরিয়াছি, আজও এক বােতল খাইয়া আর এক বােতল লইয়া আসিয়াছি-খাইবে ? খাও। বড় আরাম, বড় শান্তি ! বলিয়া বােতলটা আমার সামনে বাড়াইয়া ধরিল। বােতলটা হাত হইতে জোর করিয়া আনিতে গেলাম কিন্তু পারিলাম না, আমাকে জোরে ঠেলিয়া দিয়া সামনের ড্রেসিং টেবিলটার উপর ফেলিয়া দিল। কাচের আয়নাটা ভাংগিয়া চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া গেল। ভীষণভাবে কপালের কাছ দিয়া কাটিয়া গেল। রক্ত দেখিয়া বলিল —রক্ত! এত লাল! এত তাজা! ঋণের মত এত বিভীষিকাময় । বলিয়া আবার বিকট হাসিয়া উঠিল। ভয়ে চুপ করিয়া রহিলাম। যা সে সব কথা বলিয়া আর কাজ নাই, ভাল যে সে আমাকে না বাসিত তাহা নয়, তবে দারিদ্রের পীড়নে দেবতার মত স্বামীও দানব হয়। আমার স্বামী না হয় দানবই হইয়াছে নিজের অসাবধানতার দোষে, দারিদ্রের তাড়নায় ইত্যাদি ভাবিয়া ভাবিয়া মনকে প্রবােধ দিয়া চুপ করিয়া রহিলাম । ইহার কিছুদিন পরে আবার শুনিলাম, অফিসের বড় সাহেব তাহার কাজে দোষ টা পাইয়া তাহাকে নােটিশ দিয়াছেন;
মরু-প্রদীপ সত্যই যেদিন চাকুরী গেল, সেদিন ঘরে ফিরিয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া কাদিয়া ফেলিয়া বলিল—হেনা, এখন উপায় কর। উপায় আর কি করিব ভাবিয়া পাইলাম না। শেষে তােমার কথা মনে পড়িল, উপায় এখন তুমিই করিতে পার। বাংলা দেশে ফিরিয়া যাইতে চাই, যদি জাহাজের ভাড়াটা সাহায্য কর। ইতি তােমার হেনা। সন্ধ্যাবেলা যােগেশ ঘরে ফিরিয়া আসিল ; হাতে ভেলবেটের ছােট একটা কে। ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, চাকরটা রান্না করিতেছে আর রাণ সব দেখাইয়া শুনাইয়া দিতেছে। দেখিয়া যােগেশ সন্তুষ্ট হইয়া বলিল, চাকর যে একটা না রাখতে পারি, এমন নয় ; একটার জায়গায় দশটা রাখতে পারি ? তােমার পক্ষে এতগুলি লােকের রান্না-বান্না করা যে অত্যন্ত কষ্টকর ব্যাপার তা আমি বেশ জানি, কিন্তু জেনেও চাকর রাখি নি, তার কারণ কি জাননা? লােকের চিরদিন সমান যায় না; আজ যে অবস্থায় আছি, দু’দিন পর তা না-ও থাকতে পারে ; তখন হয় তাে আবার সব কাজ নিজের হাতেই করতে হবে; সে জন্যই তােমাকে আগে সব কাজে পাকা করে নিলাম ; ভবিষ্যতে অবস্থার পরিবতন হ'লেও আর কোন ভয় নেই। তােমার মতাে লক্ষ্মী যার ঘরে তার আর ভয় কি ? রানু মনে মনে খুশী হইল এবং অভিমানের সুরে বলিল-থাক, থা; দেবদেবীর সংগে আমাকে তুলনা করে কাজ নেই, এতদিন পর একটা চাকর রেখে দিয়েই এভাে আনন্দ ? যােগেশ বলিল—শুধু আনন্দ নয় ; আজ মহাসমারােহের দিন। আজ তােমার সী স্বামী তার সঞ্চিত ভাণ্ডারের দ্বার খুলে দিয়েছে। বলিয়া সে ভেলরেটের কে হইতে মুক্তার কণ্ঠহার বাহির করিয়া রাণুর গলায় পরাইয়া দিল। বিস্মিতা রাণু অপলক চোখে যােগেশের দিকে চাহিয়া রহিল। আনন্দোজ্জল তার মুখ ; ভাষাহারা, নীরব, সুন্দর ।
? এইভাবে কতক্ষণ কাটিলে যােগেশ আবার বলিল—আমার দিকে চেয়ে কি দেখছাে? জামাটা খুব ময়লা, না? আমি তাে চল্লিশ টাকা মাইনের অফিসের কেরাণী নয় যে, পাতলা ফুরফুরে পাঞ্জাবী পরে থাকবো; আর ঋণ করে’ বউকে যাট টাকা দামের শাড়ী পরিয়ে সন্ধ্যাবেলা বেড়াতে বেরিয়ে তার পিছনে পিছনে হাটবাে? লােকে দেখে বলবে—স্বামী স্ত্রীতে কি ভালােবাসা। সে-সব লােক-দেখানাে ভালােবাসা আমি চাই না। ভালােবাসবাে কিছু না বলে, কিছু না কয়ে’ অতি সংগােপনে। হ্যা, জামাটা ময়লাই বটে; ব্যবসায়ী মাত্রেরই ধূলাে বালির সংগে কারবার। ধান ব্যবসায়ী, চাল ব্যবসায়ী, পাট ব্যবসায়ী ও ভুলো ব্যবসায়ীর আদ্ধির পাঞ্জাবী পরলে চলে না। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ মাঠে মাঠে গরু চরা’ত ; মাঠে ঘাটে ধূলার অন্ত নেই ; তাকে কি সিল্কের পাঞ্জাবী সাজতে? এত নােংরা কাজ করেও সে হয়েছিলো রাধিকা হেন রূপসীর স্বামী। আর সেই রাধিকার প্রেমের ধনে ধনী হয়েই সে হয়েছিলাে এ দুনিয়ার রাজা ; এ দুনিয়ার প্রেমিক-সম্রাট। তবে? তবে আমার দোষ কি? তুমিও আমার রাধিকা, তােমার প্রেমে আমিও হববা সম্রাট, বিশ্ববিখ্যাত। কি সুন্দর দেখায় তােমাকে আজ এ মুক্তার মালায়, মনে হয় রাধিকার রূপ-অংগেই যেন লাবণ্যের ঢেউ। এ রূপ, এ লাবণ্য রাজার ঘরের বাঞ্ছিত ; আমার ঘরে তুমি যেন একটা জ্যোতির্ময় বিরাট আবিষ্কার ; তােমাকে পেয়ে আমি যেন স্বর্গের দ্বার খুঁজে পেয়েছি ; কিন্তু তােমার প্রেমের কাছে আজ আমার স্বর্গও তুচ্ছ বলে মনে হয়। তােমার প্রেম আমাকে দাহন করছে যেন বিকশিত কুসুমের বক্ষশিখার মতাে। তােমার প্রেম আমাকে দিনরাত তাড়া করছে ফার্মের উন্নতির জন্য ; ফার্মের আয় যত বেশী হবে, তােমার প্রেমের মূল্য দেবার ক্ষমতা তত আমার বেড়ে যাবে। তাই দিনরাত শুধু ফার্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকি ; কিন্তু সে ব্যস্ততা শুধু পূর্ণরূপে তােমাকে শপ্রদীপ ৫ পাবার জন্য ; নিঃস্ব হয়ে তােমাকে না হারাই এ ভয় সর্বদা মনে আসে। তােমাকে পেয়ে আমি পেয়েছি দিগ্বিজয়ী শক্তি, দেখবে পাঁচ সাত বছরের মধ্যে আমাদের ফার্ম হয়ে উঠবে টাটা আয়রন্ ফ্যাক্টরীর মত জগদ্বিখ্যাত। টাটার লােহায় গড়ে উঠছে আধুনিক বড় বড় সহর ; পুরাণে। জীর্ণ বাড়ীর পরিবর্তে লৌহ-শক্ত পাকা বাড়ী ; আমার ফ্যাক্টরীর নব আবিষ্কৃত ঔষধে গড়ে তুলবাে দেশে দেশে নতুন মানুষ, নতুন প্রাণ; বাংলার এ দুর্ভিক্ষপীড়িত অস্থি-চর্মসার জীর্ণ মানুষের বুকে কবুবাে নতুন রক্ত মাংস দান ; প্রাণময় নবীন মানুষ। তখন সেই নবীন মানুষ ও নবীন সমাজের ভিতর দিয়েই তােমার প্রেমের রূপ বিশ্বময় দেখবাে। সাজাহানের প্রেম বিকশিত হয়েছে তার তাজমহলে , তােমার প্রেম বিকশিত হবে নবীন মানুষে, নবীন মনুষ্য সমাজে। অন্ধকার নিশীথ রাত্রে পথহারা পথিক যেমন উষার আগমনে অরুণের রক্ত আলােকের মাঝে এক জ্যোতির্ময় উন্মেষণের মহত্ত্ব অনুভব করিয়া পূর্বাকাশে আকুল প্রাণের প্রণাম জানায় ; আপন মনের অন্ধকারে আপনাকে হারাইয়া ফেলা রানুও সে প্রকার যােগেশের কথা শুনিয়া এক জ্যোতির্ময় আকাশের নীচে আসিয়া দাঁড়াইল। যােগেশই সেই আকাশে অরুণ হইয়া ফুটিয়া রহিয়াছে ; রাণুর চোখের সম্মুখে যােগেশ আজ জ্যোতির্ময় মস্ত আবিষ্কার। রাণু নত হইয়া যােগেশের পদধূলি লইল ; তারপর তাহার বুকে মুখ ডুবাইয়া রাখিয়া বলিল—এ মুক্তার মালা আজ তুচ্ছ বলে মনে হয় তােমার কাছে, এ বক্ষ-সমুদ্রে এতাে প্রেম-সুধা ? এতাে গােপন আয়ােজন আমার জন্য? তােমার তুলনা আছে কি? আমায় ক্ষমা করাে। বলিয়া হেনার পত্ৰখানা যােগেশকে পড়িতে দিল। যােগেশ পত্র পড়িতে লাগিল, পড়িয়া শেষ করিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিল—আজই একশ’ টাকা পাঠিয়ে দাও।
একটি মেয়ে
;
একটি মেয়ে সেদিন আমার মেসে বেড়াতে এসেছিলাে—সেদিন
কেন, মাঝে মাঝে প্রায়ই আসে। কিছুদিনের জানাশুনা, বিশেষ
পরিচিত নয়।
বি. এ. পাশ, যুদ্ধের বাজারে অত্যন্ত স্বাধীন হয়ে
গেছে : চাকরী করে’ সত্তর টাকা মাইনে পায়। একটা ফ্যাক্টরীতে
কাজ করে, অনেক পুরুষের মধ্যে সে একা মেয়ে টাইপিষ্ট।
এসে বসতেই মেসের চাকরকে ডেকে বললাম-চা আর টোস্ট।
মেয়েটির নাম শিখা, সত্যই সে শিখা ; পলাশ ফুলের বক্ষশিখার মতো
মেয়েটির রূপশিখা, অপূর্ব সুন্দরী। বিধির নিজ হাতে গড়া সােনার
মূতি। শিখা বললে—কেবল টোস্ট, কেবল টোস্ট,; বাবা রক্ষে
করাে, টোস্টের দরকার নেই বরং একটা চপ। আবার চাকরকে
ডেকে বল্লাম—টোস্ট, নয়.•••••চপ চপ ; দু’টো চপ আর দুকাপ চা।
শীগগির।
শিখা বললে-বাঁচালেন : এক ঘেয়ে কিছুই ভালো লাগে না।
রুচির পরিবর্তন চাই—নতুন রুচি, নতুন প্রাণ, নতুন সংগ, নতুন
সিনেমা, নতুন প্লট।
বলাম, নতুন সংগ মানে?
-মানে, আজ আপনি আমার বন্ধু বা বান্ধব ; কাল হয়তো আর
একজন।
নতুন সিনেমা ?
বড়ুয়া, সাইগল, বিশ্বাস, ছায়া, যমুনা, প্রতিমা ইত্যাদির পরিবতে
আপনি, আমি, সে।
—আর নতুন প্লট, ?
মরু-প্রদীপ . ; -মানে, সিনেমার প্লটের কথাই বলছি। ঐসব পুরােণণা প্লট, আর ভালাে লাগে না। মানে-ওসব পুরােণাে প্রেম চক্ষের শূল হয়ে উঠেছে ; নতুন রকমের প্রেম চাই। প্রেমের অভিযানে নােবল প্রাইজ পাওয়া চাই। কেঁদে কেঁদে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে : নির্জন ঘরের নির্জন বাতায়ন পথে লুকিয়ে দাড়িয়ে নীচে ফুটপাথের দিকে চেয়ে প্রেমিকের অপেক্ষা করা আর চলে না। এসব ভীরু প্রেম করতে করতে অনেক যুবক যুবতীর স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে দেখেছি। এখন চাই নতুন ধরণের প্রেম- সংগ্রাম-বিজয়ী সৈনিকের মতাে স্ফীত উন্নত বক্ষে সাজতে হবে। সারা বিশেই চলছে সংগ্রামের পালা। শক্তি, সাহস আর রাজ্যের পর রাজ্য জয়, আর প্রাণের পর প্রাণ অধিকার। এই তাে হলাে জীবন। প্রেমই শুধু ম্যালেরিয়া রােগীর মতাে দিনরাত ভুগে ভুগে’ মরছে। বাঞ্ছিত পুরুষ নীচে ফুটপাথে মােটর নিয়ে দাড়াবে, প্রেমিকা উপরে বাতায়ন পথ থেকে লাফিয়ে মােটরে পড়বে ; দুজনে মিলে চলে যাবে বহুদূর ঐ কাশ্মীরের ছায়াবীথি-কুঞ্জে। “হনিমুন” করতে। শত কুতূহলী চক্ষের সামনে। বলাম-বিয়ে না হতেই কাশ্মীরে গিয়ে হনিমুন! —বিয়েটা একটা ফ্যাল কাস্টম ; ও-সব অচল হওয়াই উচিৎ। বিয়ে আবার কি? আমি তােমাকে ভালােবাসি, তুমিও আমাকে ভালোবাসাে, কি বিয়ে? ভালােবাসার মােহিত-যন্ত্র বিয়ের মন্ত্রের চেয়ে অনেক বড়। আমি কিন্তু বিয়ের মন্ত্র মােটেই পছন্দ করি না। না, কি বলেন আপনি? আপনারও তত এই মৃত ? এ প্রশ্নের উত্তরে হাসবাে না কঁদবাে, কিছুই ঠিক পেলাম না; যা হােক এমন সময় চাকর দু’কাপ চা আর দু'টো চপ, আনলাে। বললাম-আগে খেয়ে নিন। এর উপরে মন-প্রদীপ শিখা চপের এক টুকরাে কামড় দিয়ে বাকী অংশটা ডান হাতের দু’ আঙুলের অগ্রভাগে চোখের সামনে তুলে ধরে বললে—কোন দেশেতে জনম তাের চপ ! কোন্ দেশেতে এলি? হ্যা, ভালাে কথা : যে-জন্য আজ আপনার কাছে আসা । আমার ইচ্ছে করে হলিউডে গিয়ে নায়িকার পার্ট করতে ; আপনি বন্দোবস্ত করে দেবেন? টাকা পয়সা সব আমার। আমি দেখতেও সুন্দর, নিশ্চয় ওরা আমাকে চা দেবে। চায়ের কাপটা আমার হাতে কাপছে যেন, পড়ে যাবার ভয়ে রেখে দিলাম। বললাম—কিন্তু অত দূরদেশের সংগে আমার পরিচয় নেই, যদি বলেন তবে শৈলজাবাবুকে বলতে পারি। শৈলজাবাবু সিনেমা- গল্পগুলি বাংলাদেশের প্রাণ, তাতে কেবল প্রাণময়ী রূপসী নায়িকার অভাব : আপনার মতাে মেয়ে সেখানে নায়িকার পার্ট করলে সর্বাংগ- সুন্দর হয়। কিন্তু আপনি ভদ্রঘরের মেয়ে, শিক্ষিত, বি. এ. পাশ ; এ পথে নামতে চান কেন? শিখা বলে—কেন, এ পথ কি মহাপাপের পথ নাকি বলাম-লােকে কিন্তু তাই বলে। এ পথে যাওয়া ভারী অন্যায়। বলে—কিন্তু এর চেয়ে মহা অন্যায়ের পথে, মহা পাপের পথে যে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছি, সে কথা কি লােকে জানে? জানেন তাে আমি একটা ফ্যাক্টরীতে টাইপিষ্টের কাজ করছি : সেখানে আমি একাই মেয়ে ; কতগুলি লুব্ধ-চিত্ত পুরুষের তপ্ত নয়ন-শিখার তলে আমি পুষ্প- শি। দিনরাত জ্বলে পুড়ে মরছি। তাছাড়া ফ্যাক্টরীর ম্যানেজার একজন দুর্দান্ত চরিত্রের লােক। চাকুরী রাখতে হলে তাকে সন্তুষ্ট করতে মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর তার বাড়ী যেতে হয়। দু’টো তিনটের সময় নিজেই আবার ড্রাইভ করে আমাকে বাড়ী পৌছে দিয়ে যান। এ কলংক, এ মহাপাপ, এ মহা অন্যায় ভদ্রঘরের ? হবেই।
মরু-প্রদীপ ৫৮ মেয়ের বেশে গােপনে সহ করে যাওয়ার চেয়ে প্রকাশ্যভাবে সিনেমায় নামা আর গায়ে থেকে ভদ্রনাম মুছে ফেলা সহস্রগুণে ভালাে। পেটের দায়ে চারীই যদি করতে হয় এবং সে চাকরীতে যদি তিল তিল করে গােপনে জলে’ পুড়ে মরি, তার চেয়ে সিনেমার জন্য, বাংলার শিল্প-কলা বাঁচিয়ে রাখার জন্য সে কলংকিত প্রাণ বিসর্জন দেওয়াই শ্রেয়। নয় কি ? বাংগালী মেয়ের এ গােপন মৃত্যুর মর্মভেদী কাহিনী শুনতে শুনতে হাতের চায়ের কাপটা একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, ঠাণ্ডা হয়ে গেছে আমার দেহের সমস্ত উত্তপ্ত শিখা। বলাম—এমনি করে মরণের চেয়ে সিনেমায় গিয়ে একেবারে মরে যাওয়াই ভালাে। নিজে মরেও যদি দেশের শিল্প-প্রাণ বজায় রাখতে পারেন, মন্দ কি? আচ্ছা, তা হলে আজ আপনি যান। আগামী রবিবার শৈলজাবাবু আমার এখানে আসবেন, আপনার কথা বলবাে। বলে—বলতে হবে না কিছু। আমি নিজেই আসবাে। আমাকে দেখলেই তার পছন্দ হবে। তাছাড়া নায়িকার পার্ট নিশ্চয়ই পারবাে। এ বয়সে অভাবে পড়ে গােপনে অনেক প্রেমের অভিনয় করেছি, তাকি কেউ জানে ? যেহেতু আমি ভদ্রঘরের মেয়ে। তবে নাচতে জানি না। আর সে অংগ-বাঁকানো কাজটা আমি নিজেও হেটু করি ; নায়িকা আবার নাচতে যাবে কেন নায়কের কাছে। নায়িকার প্রেমমুগ্ধ আত্মাই কি যথেষ্ট নয়? নেচে আবার ভান করা কেন? আচ্ছা তবে উঠি। নমস্কার! হ্যা, আর একটা কথা প্রথম প্রথম আমার নামটা গােপন রাখতে হবে কিন্তু। অন্ততঃ বন্ধু-বান্ধবরা যেন জানতে না পারে। কারণ এ বিখে গােপনেই চলছে বাবাে আনা কলংক।
ইনফ্লুয়েন্স, মীরার সংগে সরলকুমারের যে কি সম্বন্ধ তা সে অনেকদিন ভেবেছে ; অনেকদিন পথে একা যেতে যেতে ভেবেছে, কোন কূল-কিনারা খুঁজে পায় নি। মীরার কথা মনে পড়লেই সে একা থাকতে ভালােবাসে ; কোন অন্তরের বন্ধু আসলে সে তখন নানা কাজের ভাণ করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। সােজা মাঠের দিকে গিয়ে একটা নির্জন স্থান দেখে, সেখানে বসে পড়ে। মীরার কথা নির্জনে বসে ভাবতেই ভালাে লাগে তার। এমন দিগন্ত ব্যাপী সবুজ মাঠ, এমন তৃণ-পত্রের শ্যামল ঐশ্বর্য, এমন উচ্ছ্বাসভরা উন্মুক্ত বাতাস, এমন নিবিড় ঘন সুদূর সুনীল, আকাশ আর আকাশের প্রাণবন্ত আলাে । মীরার স্মৃতিও যেন এখানে মৰু ঐশ্বর্যে ভরে উঠে। কিন্তু কেন? মীরার কথা ভেবে তার কি লাভ? মীরা তার কে? শুধু দু’দিনের জানা-শুনা ; মীরাদের বাড়ী থেকে সে এম. এ. পড়ত; মীরা পড়তে আই. এ.। তা’তে হয়েছে কি ? এমন তাে অনেকে অনেকের বাড়ী থেকে পড়ে এবং অনেক বাড়ীতে মীরার মতাে মেয়েও থাকে, সে কি তাদের মতােই একজন হতে পারতাে না? মেয়েদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন? নির্লিপ্ত ? আসক্তিহীন? কেবল অধ্যয়নই তপ? এম. এ. পাশ করে’ সে এখন কর্মক্ষেত্রে ঢুকেছে ; কলকাতাই তার কর্মস্থান। আর মীরাও চলে গেছে আগ্রায় একটা স্কুলের মিসূট্রেস হয়ে। মুছে গেছে সব অতীতের স্মৃতি। এখন সে-সব কথা ভেবে লাভ কি? সরলকুমার এ প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পায় না। সরলকুমার কবি। সে কবিতা লেখে কিন্তু কোন কাগজে তা” এখনাে ছাপা হয় নি। সম্পাদকের মতে এখনাে তার হাত কাচা। কিন্তু তাতে সরলকুমারের কোন দুঃখ নেই। তার কবিতার ভক্ত মরু-প্রদীপ একজন আছে--সে মীরা। সরলকুমার কবিতা লেখে, মীরা পড়ে। মীরা পড়লেই সে নিজেকে ধন্য মনে করে। কবিতা লিখে এক কপি নিজের কাছে রেখে, আর এক কপি মীরার কাছে পাঠিয়ে দেয় ; আর মীরার পত্রের আশায় পুষ্প-শুভ্র মন নিয়ে বসে থাকে। মীরার পত্রে নিশ্চয়ই তার কবিতার উচ্চ প্রশংসা থাকবে। ভেবে’ সরলকুমার আবার কবিতার কপিটা বার বার পড়তে থাকে । পরিস্ফুট কুসুমের রূপ-রশ্মি সর্বাংগে মাখিয়া, কাছে এসে দাড়াইবে একদিন সুদূরের প্রিয়া। বেশ হয়েছে এ লেখাটুক। মীরা পড়ে নিশ্চয়ই খুসী হবে। মীরাকে খুসী করতে পারলেই তার কবিতার সার্থকতা। দিনের পর দিন কেটে যায়, মীরার চিঠি আসে না—যত সব বাজে চিঠি আসে। পড়তে ইচ্ছে তাে করেই না বরং শরীর রাগে ভরে উঠে। ছােট বােন পারু লেখে-তার ছেলের অসুখ, পত্রপাঠ কুড়ি টাকা পাঠাতে। বড় পিসিমা লেখেন—তাঁর বড় মেয়ের বিয়ে, পঁচিশটা টাকা তাকে সাহায্য করতেই হবে। আত্মীয়স্বজনদের জালায় আর টেকা যায় না। দরিদ্র সারা বাংলা দেশ; ঘরে ঘরে দুভিক্ষ, ঘরে ঘরে অভাব, অভিযােগ, অনশন, অর্ধশিন ক্ষুধিত পীড়িত সারা দেশের ছবি। একেবারে অসহ হয়ে উঠেছে। প্রায় মাসখানেক পরে শেষে মীরার চিঠি আসে। চিঠিখানা পড়বার আগে সরকুমার কবিতার কপিটা আর একবার ভালাে করে পড়ে দেখে। বেশ সুন্দর হয়েছে। মীরার এ পত্রে নিশ্চয়ই কবিতার প্রশংসা এসেছে। চিঠি খুলে পড়তে থাকে। অন্তরে লক্ষ মাণিক্য জ্বলতে থাকে। ক্রমে সে মাণিক্য-আলােতে ঘনিয়ে আসে বরষা-ঘন মনের ছায়া ; কালাে, সিক্ত। কেবল দুনিয়ার বর্তমান খবর । গান্ধীর জেল, জহরলালের অসুখ, মহাদেব দেশাইএর মৃত্যু। এসৰ এক সংবাদ চিঠিতে লিখে লাভ কি? খবরের কাগজে এ সব সে আগেই জেনেছে।
সৰু-প্রদীপ এসব শুনতে কে চায়? এর মধ্যে নূতনত্ব আছে কি? চিঠি পড়া শেষ হয়ে যায়, সরলকুমারের দেহমন দুঃখে ও রাগে ভরে উঠে। চিঠিখানা ছুড়ে ফেলে দিতে গিয়ে দেখে—চিঠির অপর পৃষ্ঠে সামান্য একটু লেখা । আপনার কবিতা পড়লাম, মন্দ হয় নি। কিন্তু বস্তুহীন, শুধু স্বপ্ন । কবিতাটির দেহ আছে কিন্তু সে দেহের ভিতরে জীবনের সত্যসুর নেই। সরলকুমারের চোখ দু’টা ছলছল করে’ ওঠে; হয় তত গােপনে দু’এক ফোটা অশ্রু ঝরে পড়ে বক্ষতলে। তার কবিতা বস্তুহীন? শুধু স্বপ্ন ? প্রাণহীন দেহ ? মীরার এই অভিমত? তাহলে সত্যের কবিতা কি? কাব্য কাকে বলে? কবিতা তাে সুন্দরেরই উপাসনা। যা চির সুন্দর, চির আনন্দময়, চির বস-ছন্দে টলমল, পুষ্প-নম্র-পরশ-মাধুর্যে মধুর ; দয়িত-তাপিত-পীড়িত মনের অমৃত-আহারই তাে কবিতার পুষ্প-শুভ্র-স্বপ্ন- বিলাসী বাণী। তবে ? সরলকুমার ক্ষুন্ন হয়ে চুপ করে বসে থাকে। সেদিন সরলকুমার অফিস থেকে একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাে; বেন্টিক স্ট্রীট ধরে’ এপ্ল্যানেডের দিকে চললাে। সেখান থেকে ট্রাম ধরে’ লয়েডস ব্যাংকে যাবে। পারুর স্বামীর একটা চাকরীর খবর আছে, ম্যানেজারের সংগে দেখা করতে হবে। এসপ্ল্যানেডে যেতেই দেখে—এক ভদ্রলােক একটি গাছের তলায় নানা মাসিক, সাপ্তাহিক ও দৈনিক কাগজের দোকান সাজিয়ে বসে আছে। চারিদিকে তার লােক ঘিরে দাড়িয়ে সতৃষ্ণ নয়নে কাগজগুলির দিকে চেয়ে আছে ; কেউ হাতে দু’একখানা তুলে দু’এক পৃষ্ঠা দেখে আবার যথাস্থানে রেখে দিচ্ছে। পয়সা ব্যয় করে কেউ কিছে না ; দেখা গেল, এত ট্রাম বাস ভতি এ ঐশ্বর্যশালী এসপ্ল্যানেডের আঙিনায়ও বাংলার শত শত দরিদ্র গােপনে চলা ফেরা করছে। সরলকুমারও একখানা মাসিক পত্রিকা হাতে তুলে নিয়ে খুলতেই বেরিয়ে পড়লাে “কবিতার বিষয় বস্তু” নামক একটি প্রবন্ধ, লেখিকা মরু-প্রদীপ মীরা। সামান্য দু’পাতার প্রবন্ধ। সরলকুমার দাড়িয়ে দাড়িয়েই সবটা পড়ে ফেললাে। শেষে কাগজখানা আট আনা দিয়ে কিনে, একটু এগিয়ে গিয়ে মাঠের এক কোণে বসলাে। সংগে সংগে গভীর দীর্ঘশ্বাস ! বুকটা যেন ব্যথায় ভরে গেছে। মীরার কাছে তাহলে তার কবিতার কোন মূল্যই নেই? সব অর্থহীন। অথচ এই প্রবন্ধে কতকগুলি অখ্যাত কবিদের বিষয়বস্তু নিয়ে মীরার কত উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ! তার মতে বাস্তব জীবনের কঠোর কঠিন সত্যের ছবি ছন্দে গেঁথে তুললেই আসল কাব্য সৃষ্টি হয়। বহ্নিতপ্ত প্রবন্ধের সাথে সাথে ভৎসনাতপ্ত মীরার মূর্তিও সরলকুমারের চোখের সামনে ভেসে উঠলাে। সে উঠে দাড়ালাে। এসপ্ল্যানেড থেকে ট্রাম হু হু করে ছুটে চলছে নানাদিকে ; সরল- কুমার সেদিকে চেয়ে রইলাে। ইচ্ছা হয় ট্রামে বাসে উঠে শহরের অক্লান্ত মানব-প্রবাহ-স্রোতে সে মিশে যায় ; পশ্চাতে পড়ে থাক—এই স্বপ্নময় অর্থহীন মাঠের বিলাসিতা আর মীরার অনল স্মৃতি। সরলকুমার শেষে সােজা মাঠের উপর দিয়ে হাটতে সুরু করে চৌরংগীর এক পাশে এসে দাড়ালো। চোখের সামনে যেন সিনেমা চলছে। ব্যস্ত পৃথিবীর কর্ম-কোলাহল ধ্বনি। মীরার “কবিতার বিষয় বক্ত” প্রবন্ধটার জীবন্ত সুর যেন এখানে। সারিবন্দী ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি, লরি ব্যগ্রগতিতে সব ছুটে চলছে-ক্লান্তিহীন অবিরাম অবিশ্রান্ত শুধু ওঠা-পড়া, শুধু ছুটে-চলা, শুধু খোজ খবর, আকুল- অন্বেষণ, টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, মান-সম্মান ও অমৃতময় সুখের ও দুঃখময় দুঃখের পশ্চাতে। শুধু ক্ষুধা, তৃষ্ণা ; শুধু বুক-কাপানাে চপল- চিত্তচাঞ্চল্য হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে; অতুল উৎসব, আনন্দ পাওয়ার পুষ্পগন্ধে। মানবজীবন-প্রবাহ যেন এখানে বিক্ষুব্ধ জলধি-তরংগে বন্যার বেগে ছুটে চলেছে। মনে হলাে—সমস্ত পৃথিবী যেন একত্র জুটে গতি।
মরুপ্রদীপ এ চৌরংগীর বুকের উপর ঘা দিচ্ছে ; সমস্ত পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানবের অন্তহীন বক্ষের আশা ও নিরাশার খর-প্রবাহ যেন এই রাস্তাটার উপরই ঘাত-প্রতিঘাতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। পিচ ঢালা রাস্তা ; কৃষ্ণ-কালাে বরণ। বেশ সুন্দর মসৃণ ; আয়নার মতাে ঝলমল। ভিতর দিয়ে যেন সব দেখা যায়। কৃষ্ণের কালাে রূপের মাঝে যেমন সমস্ত বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড প্রতিফলিত, চৌরংগীর কালাে বুকের মধ্যেও তেমনি 'বিশ্ব-মানবের বক্ষ-চিন্তা-স্রোত প্রতিবিম্বিত, প্রতিফলিত, ঝংকৃত ও মুখরিত। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানবের উত্তপ্ত পদ-চিহ্ন এ পথের বুকে। লক্ষ লক্ষ হৃদয়ের লক্ষ লক্ষ আবেগ-শিখা এ পথের কোণে প্রদীপ্ত হয়ে রয়েছে। উন্মত্ত জীবন-গতির উত্তাল-তরংগ-ক্ষত-চিহ্ন দিয়ে এ রাস্তার ইতিহাস রচিত। এ রাস্তার প্রতি ধূলিকণায় লিখিত হচ্ছে অন্তহীন বিশ্ব-ধারার সুগভীর সুকঠিন বাণী ও ছন্দ। আদিহীন অন্তহীন যুগ যুগান্তরব্যাপী মহাকাল সৃষ্টি হচ্ছে এ রাস্তার মূক-ভাষা-সমৃদ্ধিতে। মানব-রচিত ইতিহাস মহাকাল-রচিত এ রাস্তার ইতিহাসের কাছে কত তুচ্ছ, কত অর্থহীন! কে তা বুঝে? কে তা’ কবিতার ভাষায় প্রকাশ করে? কবিতার বিষয়-বস্তু মীরার মতে এ রাস্তার উপরেই ছড়ানাে ; প্রকৃত কবি-চক্ষুর দরকার তা খুঁজে বার করা। সরলকুমার শেষে চৌরংগী পার হয়ে এপারে এসে হেটে হেটে লয়েডস ব্যাংকে ম্যানেজারের সংগে দেখা করলে। ম্যানেজার বললে- প্রশংসাপত্র সহ দরখাস্ত করতে বলুন, বিবেচনা করে দেখবাে। সরলকুমার ক্ষুন্ন মনে চলে এলো। এ বিবেচনা করে দেখার ফল প্রায়ই ভয়াবহ। চারী এখানে হবে না। পারুর কথা মনে পড়লাে : দুঃখের জীবন ওর চিরকালের জন্য। কবিতার বিষয়বস্তুর সুর পারুর জীবনেও পাওয়া গেলাে। কিছুদুর এগিয়ে আমি এও নেভি ষ্টোরের বাড়ীটা। সরলকুমারের মরু-প্রদীপ ৬৪ চোখের সামনে বিদ্যুৎ খেলে গেলাে-বােমা, বিমান, মেসি গান, ট্যাংক, সমর, সংগ্রাম, হিংসা, বিদ্বেষ, অত্যাচার, উৎপীড়ন, অপসরণ, ধ্বংস, প্রলয়, মৃত্যু। সরলকুমার ভাবলাে এই তত কবিতার শ্রেষ্ঠ ছন্দ। সরলকুমার চলতে লাগলাে পার্ক স্ট্রীট ধরে। কিছুদূর এসে বাম-পার্শ্বে প্রকাণ্ড প্যালেস্। সাহেবের বাস-ভবন। সামনে প্রকাণ্ড কম্পাউণ্ড, চারিদিকে প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীরের গায়ে গায়ে আইভি-লতার সুক্ষ্ম জাল ; স্নিগ্ধ সতেজ উৎস। কম্পাউণ্ডের মধ্যস্থলে ফুলের বাগান। নানা দেশী ও বিলাতী ফুলের মহা উৎসব, অজস্র সুরভি-ধারা। মধু-পরিমলমাখা যেন সমস্ত বাড়ীখানা। কত মালি, দাবােয়ান, বাবুর্চি, আয়া, চাকর ! সুন্দর সমৃদ্ধ ধরার জীবন। সরলকুমার ভাবলে কিন্তু এ সব স্বপ্ন, সব মিথ্যা। ক’জনের ভাগ্যে ঘটে এ অতুল ঐশ্বর্য ? কচিৎ দু'একজন রাজপুত্রের। তার মতাে যুগান্তরব্যাপী গলির ভিতরে নােংরা মেসের একতলা ঘরে থেকে রাস্তার ডাষ্টবিনের পচা গন্ধ শুকে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ লোেক এবং ধরায় এ লক্ষ লক্ষ লােকের জীবন-ছবিই কঠোর সত্য, কবিতার প্রাণ । দিনরাত ঐ মেসের জালার কাছে বসে শুধু আমগাছটার ফাক দিয়ে ঈষৎ-দৃষ্টি আকাশের দিকে চেয়ে সে স্বপ্ন দেখে, সে কবিতা লেখে । রাজারকুমার এলাে সােনার রথে, মুক্তা-মাণিক-দ্যুতি ছড়ায়ে পথে । অথচ তার এ দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনের সংগে এ কবিতার ছন্দের কোন মিল নেই। জীবনে তার কঠিন সত্যের ছায়া নিয়ত ঘনীভূত। মেসের ঘরটা ভয়ানক অন্ধকার, আলাে-বাতাসের নাম গন্ধ নেই, জান্নাটা চব্বিশ ঘণ্টাই খুলে রাখতে হয়, নচেৎ অন্ধকারে মৃত্যু অনিবার্য। তাপােষটাও ভাংগা, ছারপােকার ডিপো। সামনের আমগাছটা তার মরুপ্রদীপ • জালা-সংলগ্ন ; গাছের তলায় দুনিয়ার আবর্জনা। ছেড়া কাগজ, ছেড়া কাপড়ের টুকরা ; ভাংগা একটা কেরােসিন তেলের টিন ; একটা মরিচা-পড়া পুরাণাে জীর্ণ বালতি; একটা কাধ-ভাংগা মাটির কলসী ; একটা ছেড়া মােজা; হিল খসা একটা জুতা ; তার মধ্যে পিঁপড়ের বাসা। ভােরবেলা ঘুম থেকে উঠে সকলের আগে চোখে পড়ে এ সব দৃশ্য, মনে হয় দিনটা না জানি কি অকুশলে যায়। এ সবের ভিতর দিয়েই তার জীবন ছুটে চলেছে নিশিদিন এবং তার এ জীবনই সত্য, সম্পূর্ণ সত্য। তবু সে রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে ; তাকে দিয়ে তার কাব্য সুরু করে; কেন? লক্ষ লক্ষ যে জীবন আজ দুঃখ- দারিদ্র্যের কঠোর স্রোতে ভেসে চলেছে অনাদরে, লােকচক্ষুর অন্তরালে তাদের দুঃখের গান কি তার কবিতার প্রাণ হতে পারে না? মীরাই সত্য; সে সত্যই বলেছে তার কবিতা শুধু মরুমায়া-ছল; অর্থহীন। সরলকুমার মেসে ফিরে এলাে। সে আজ কবিতার বিষয়বস্তু খুজে পেয়েছে, সে লিখলাে : “দরিদ্রের বক্ষে আজ জ্বলে সদা ক্ষুধা-হােমানল, হে রাজন, এখনাে কি রবে সুপ্ত পুষ্প শয্যাতল ? হের তার জীবনেরে ঘেরি কত ভাঙা আয়ােজন, প্রতিদিন প্রতি পলে ক্ষত করে ছিন্ন তার মন। ছেড়া মােজা, ছেড়া জুতা বাতি কলসী সব ভাংগা, গৃহে তার ভিড় করে করে প্রাণ সদা বক্ত-রাঙা। আবর্জনা মহান্তপে কাদে তার জীবনের সুর, হে কবি, হে ধনী, তুমি তারি তরে কর ছন্দ পূর।” পরদিন সরলকুমার কবিতাটা মীরাকে পাঠালে। মীরা উত্তরে লিখলো : দরিদ্র বিশ্বের মাঝে এই তব ঐশ্বর্যের বাণী, চির সত্য রূপ দিয়ে তব কাছে নিল মােরে টানি।
বি. এ., বি. টি. বড়বাজার থেকে হারিসন রােড ধরে হেটে আসছি। গায়ে প্রায় ঠেকে’ ঠেকে’ ট্রাম-বাসগুলাে ছুটে চলেছে। ফানের রৌদ্রে শরীর পুড়ে যাচ্ছে, ইচ্ছা করে, পাশের ট্রামটায় উঠে পড়ি। কিন্তু পকেট খালি। একটি পয়সাও নেই। ক্লান্ত পায়ে আবার হাটি। পায়ের নীচে পিচ-ঢালা—আগুনে-তাতা রাস্তা ; পা পুড়ে যাচ্ছে, তবু হেটে যেতে হবে। পথের দুপাশে শত শত ভিখারী, দুর্ভিক্ষপীড়িত, অনাহারে অর্ধমৃত। পথের তপ্ত ধূলায় পড়ে আছে-উলংগ, বস্ত্রহীন, অন্নহীন। শুনাে কাঠির মত দেহ, ক্ষুধার অনলে দাউ দাউ করে’ অলছে—সভ্য-সমাজের চোখের সামনে। আধুনিক সভ্যতাকে উপহাস করেই যেন জলছে পথের পাশে দুর্ভিক্ষপীড়িত জীবনের চিতা! ট্রাম- বাস-ভতি সহরের লক্ষ লক্ষ সভ্য শিক্ষিত লোেক পথের মৃত্যু-দৃশ্য চোখে দেখেও কিছু না ভেবে অনায়াসে চলে যাচ্ছে। বাংলার ভিখারীরা সত্যই মানুষ কি না, কে তা ভাবে! -যতীনদা’! চমকে উঠলাম। কে ? চেয়ে দেখি, একখানা টু সিটার গাড়ী থেকে নেমে’ সামনে এসে দাড়িয়েছে শৈলেন। দেখে আমার চক্ষু স্থির। বিস্ময়ে স্তব্ধ নির্বাক ! কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বললাম—এ যে রাজপুত্রের বেশ ! শান্তিপুরী জরিপাড় ধুতি! সিল্কের পাঞ্জাবী! সােনার বােতাম! সােনার হাত-ঘড়ি ! পায়ে পাম্ সু!—এ ধারুণ দুর্ভিক্ষের দিনে এওঁ ঐশ্বর্য! লটারির ? না কন্ট্রাক্টের...? লজ্জা-নম্র স্নান একটু হাসি হেসে শৈলেন পকেট থেকে পেন বা’র করে এক টুকরাে কাগজে লিখলাে, কর্ণফিল্ড নােড়, বালীগঞ্জ।
মরু-প্রদীপ কাগজের টুকরাে আমার হাতে দিয়ে বললে—এখানে বাসা করেছি। কাল আপনার নিমন্ত্রণ রইলাে। কি করি, অমী যখন স্বীকার হলাে —শেষে একেই পশু বিয়ে করেছি। বি. এ., বি. টি. ; চমৎকার নম্র স্বভাব ; বিদ্যার গর্ব-অহংকার নেই। এ-কথা বলে’ টু-সিটারে-বসা মেয়েটাকে দেখালাে। দেখিয়ে আবার হেসে বললে-সাসেসফুল ম্যারেজ। কি বলেন? অমী তো আই. এ. পড়ে। কি বলবাে ভেবে পেলাম না। শৈলেন বললে, আসবেন তত ? বললাম-বিয়ে করেছে বেশ! বেশ! নিমন্ত্রণও করলে! কিন্তু কাল আমার বিশেষ দরকারী কাজ আছে, যেতে পারবাে না। আমার ছােট বােন অমিয়া উয়ােমেন্স কলেজে পড়ছে ; বাের্ডিংএ আছে । বাের্ডিংএ ভয়ানক বসন্ত হচ্ছে। ওকে অন্য কোন বাের্ডিংয়ে রিমুভ করতে হবে। আর একদিন তােমার ওখানে গিয়ে খেয়ে আসবে। কিছু মনে করে না। তােমার এমন রাজসিক ব্যাপারে নিমন্ত্রণ খাবাে না- খাবাে কি তবে লংগরখানায় গিয়ে ? আচ্ছা, তবে আসি। হ্যা, একটা কথা, বৌকে ভয় করে চলে না। থাক্ তার বিদ্যে, বিদ্যে থাকলে কি হবে—টাকাই সব। বৌয়ের বিদ্যে আছে, তােমার আছে টাকা মণি-কাঞ্চন যােগ ! জীবন-সংগ্রামে অনিবার্য জয়। শৈলেন হেসে নমস্কার জানিয়ে টু-সিটারে মেয়েটির পাশে গিয়ে বসলো। বসে নিজেই ড্রাইভ করে চলে গেলাে। ওর গাড়ীর চাকার চঞ্চল আবর্তন থেকে ঝড়ের বেগে আমার চোখের সামনে ভেসে এলাে পাঁচ বছর আগেকার কাহিনী, ওর জীবনের। তখন রেংগুনে কিং স্ট্রীটে পাঁচ-ছ' জন বন্ধু মিলে মেস করে’ আছি। সবাই অফিসে কাজ করি। অন্ ইয়ং মেন। মেসের পাশেই এক ভদ্র-পরিবার বাস করেন। হীরালালবাবু, তার স্ত্রী আর -প্রদীপ দু’টি মেয়ে। বড় সমী কলেজে পড়তাে ; ছােট অমী স্কুলে। আমরা সবাই বাংগালী। সুদূর প্রবাসে পাশাপাশি বেঁধেছি ঘর । একটি মেস—আর একটি ভদ্র-পরিবারের বাসা। দিন-রাত কল-কোলাহলে মুখর অশান্ত চঞ্চল জীবন-উচ্ছ্বাসে ভরা মেস ; তার পাশে শান্ত অচঞ্চল স্নিগ্ধ সুনিবিড় জীবনের ছন্দ-ভরা সুন্দর বাসা! দু’টি জীবন-ধারার বাহিক গতি বিভিন্ন হলেও আসলে আমাদের জীবন-ছন্দ ছিল এক। একই মহানন্দময় শান্তি আর সুখ-সম্পদে জীবন গড়ে তােলার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সকলের। কল-কোলাহলমুখরিত আমাদের জীবন- নদী ওঁদের গভীর অতল জীবন-সিন্ধুনীরে মিশে’ অসীম গভীর হয়ে যেতত! আমরা ছিলাম যেন ঝণার জলসদা কল-কল, সদা ছল-ছল ! ওঁরা ছিলেন মহাসাগরের বন্যা ; আমাদের ক্ষীণ কলকল-ধ্বনি ওদের মহা প্লাবনধারায় কোথায় ভেসে যেতাে! এমনি করে আমাদের চঞ্চল উন্মত্ত গতি-ধারা ওঁদের শান্ত-সুশীল প্রবাহ-ধারায় মিশে’ হয়ে উঠলাে সৌম্য, শান্ত ও সুন্দর! আমাদের তরুণ-চঞ্চল প্রাণ সত্যই শেষে ওঁদের পরিমার্জিত সুন্দর শিক্ষিত জীবনের স্পর্শে হলাে সুন্দর। আমরা যেন পেলাম নূতন প্রাণ, নৃতন মন, নূতন জীবন-জীবনের কল্যাণময় সুচারু অনুভূতি। সুদূর প্রবাসে বাস করে প্রাণে প্রাণে অনুভব করলাম, বাংগালী বাংগালীর জীবনে কত বড় সম্পদ! যৌবন জীবন-ভরা তরুণদের মেসের পাশে যৌবন-জীবন-ভরা তরুণী মেয়েদের নিয়ে ভদ্রলােকের বাস-বাংলা দেশে বিশেষ করে কলকাত হয়ে—এ একেবারে বধবনি-ভরা বহ্নি-কল্পনা যেন! এখানে কোন ভদ্র-পরিবারের বাসার পাশে মেসেয় অবস্থিতি হতে পারে না! হওয়া অসম্ভব! ছেলে-মেয়েদের মান-সম্রমের অরুণােল আকাশে আষাঢ়ের কালাে মেঘ জমে উঠবে।
মরু-প্রদীপ কিন্তু আমরা ক্রমাগত তিনটি বৎসর মেস আর বাসা পাশাপাশি বেঁধে বাস কছি—ওঁদের অরুণােজ্জল আকাশে কোনদিন বাদল ঘনায়নি। ওদের আকাশ আর আমাদের আকাশ একই স্নিগ্ধ, শান্ত আলােয় আলােকিত হয়েছিলো। ওঁদের হাসিতে আমাদের অধরে ফুটতে হাসি ; ওঁদের অশ্রুতে আমাদের চোখে নামতে বর্ষা ! ওঁদের মানে আমাদের মান ; ওঁদের গৌরবে আমাদের গৌরব, ওঁদের অপমানে আমাদের অপমান। ওঁদের জীবনে আমাদের জীবনের ছন্দ ছিল মিলানাে। এমনি করে ওঁদের জীবনের সংগে আমাদের জীবনের ছিল ঐক্যতান, ঐক্য ছন্দ, ঐক্য উচ্ছ্বাস, ঐক্য হাসি-কান্ন। মেস আর বাসায় মিলে এক হয়ে অতি সুন্দর বাসভবনে পরিণত হয়েছিলাে! আমরা যেন একই পরিবারের ভাই-ভগিনী। পরকে আপন করে পাওয়ার এই যে অসীম আনন্দ-অজানা অচেনার সংগে পাশাপাশি ঘর বেঁধে, একে অন্যের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করে জীবনকে সহজ করে তােলার যে আনন্দ, তা সেই প্রবাসী-জীবনে অন্তরে অন্তরে অনুভব করেছি। দেখেছি, প্রবাসী মানুষ অন্তরে অন্তরে একে অন্যের কাছে দেবতার মত। আচারে-ব্যবহারে, আদনে-প্রদানে, মেলায়-মেশায় প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছে পরম কাম্য ! কিন্তু আজ কলকাতা সহরে বাসা বেঁধে দেখি, পাশের ঘরের মানুষ চির-ঘৃণিত, অবহেলিত তুচ্ছ-তাচ্ছল্যে ভরা! অজানা! অচেনা! এর কারণ, আমরা এখানে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কাছে মিথুক, প্রবঞ্চক, ধাপ্পাবাজ, ভণ্ড, কপট! প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছে ছলনার ছদ্মবেশ-পরা, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ! সর্ব আবরণহীন সরল সুন্দর সুশ্ৰী মানুষের চেহারা যেন আমাদের কারাে নেই। কাজেই কলকাতা সহরে মেসের পাশে বাসা তত দূরের কথা, বাসার পাশে বাসা-ভদ্র পরিবারের পাশে ভদ্র পরিবার পর্যন্ত যেন ভীষণ সন্দেহের বােমা-ঘাটা ! পাশের বাড়ীর লােককে আমরা দেখি এ-প্রদীপ ৭ সন্দেহের চোখে—যেন তারা পাই। আর প্রবাসী বাংগালী প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছে কবির ভাষায় : “কত অজানারে জানাইলে তুমি কত ঘরে দিলে ঠাই, দূরকে করিলে নিকট-বন্ধু পরকে করিলে ভাই!” এমনি করে মেসে আর বাসায় মিলে-মিশে একত্র আমরা বাস করেছি তিন বৎসর। একদিন এই শৈলেন ছেলেটি যেচে এসে আমার সংগে দেখা করলাে। সকল অংগে জাহাজের খালাসীর মত কালো পােষাকপরা তা’র। কালাে রংয়ের ফুল-প্যান্ট, কালাে হাফ-সার্ট। কয়লার কালীতে সর্বাংগ কালিময়। দেখে মনে হলাে, এইমাত্র কোনাে কয়লার খনি থেকে উঠে এসেছে যেন! আমাকে বললাে—আপনাদের মেসে আমাকে থাকতে দেবেন? কি উত্তর দেবাে, খুঁজে পেলাম না। ছেলেটিকে অনেকদিন পথে একা ঘুরতে দেখেছি। কে, কোথায় এবং কি কাজ করে জানি না। আজ সব জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, সে সত্যই বিশিষ্ট ভদ্র এবং শিক্ষিত ঘরের ছেলে, লেখা-পড়া শেখেনি। পরিবারের কেউ পছন্দ করে না। মা-বাবা, ভাই-বােন, আত্মীয়-স্বজন সকলের কাছে সে লাঞ্ছিত, বিতাড়িত। ঘরে বিমাতা তাকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। পিতা সেই বিমাতার ইংগিতে চলাফেরা করেন। ক্লাসে বার-বার ফেল করে লেখাপড়া ছেড়ে সে ব্যায়াম-চর্চা করেছে। কিন্তু ব্যায়াম-চর্চায় দেহের উৎসাধন করে অল্পবস্ত্রের অভাব ঘুচাতে পারেনি, বর্ষায় এসেছে। গায়ে শক্তি আছে—একটা ফ্যাক্টরীতে শিক্ষানবিশী করতে ঢুকেছে। দিন-রাত লােহাপেটার কাজ ; এই শিক্ষানবিশী অবস্থায় মাসে আঠোরাে টাকা পায়। তাই একটু আশ্রয় খুঁজছে।
৭১ মরু-প্রদীপ শুনে মায়া হলো ! বললাম-বেশ, থাকো। আমাদের মেসে কিন্তু আঠারাে টাকায় চলবে না। জামা, কাপড়, জলখাবারের জন্য অন্তত আরাে দশ টাকা লাগবে। শৈলেন বললে—আমি জল-খাবার খাবাে না। জামা-কাপড় ? আমার এই ফ্যাক্টরীর পােষাকেই চলে যাবে। অসুবিধা হবে না। তথাস্তু বলে’ শৈলেনকে থাকতে দিলাম। মেসের অন্য বন্ধুদের ডেকে বলে দিলাম—ওর জলখাবারটা আমাদের সংগেই হবে। জন্য আলাদা টাকা আমরা নেবাে না। কি করা যায় ? বিপদে পড়েছে -ভদ্রঘরের ছেলে। শৈলেন সকাল আটটায় ফ্যাক্টরীতে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম, লােহা-পেটা কাজ। কিন্তু মুখে তার হাসি লেগেই আছে। ক্লান্তিহীন পরিশ্রম তার মুখে বেদনার রেখা না ফুটিয়ে হাসির রেখাই ফুটিয়ে তােলে। কঠোর পরিশ্রম—তবু ওর সর্বাংগে জ্যোতিঃ আর লাবণ্যের শিখ! চোখের দিকে চাইলে মনে হয়, চোখ-ভরা আলাে। দুই বাহুর শিরা-উপশিরা যেন রক্তের জীবন্ত- প্রবাহে ভরা। শৈলেন যেন শারীরিক কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার অনন্ত ঐশ্বর্য ! সন্ধ্যায় মেসে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে জলখাবার খেয়ে সেই চিরন্তন অবিনশ্বর ফ্যাক্টরীর কালাে পােষাকে মেসের বারান্দায় চুপ করে দাড়িয়ে থাকে রাত দশটা পর্যন্ত। কারাে সংগে কথা বলে না। কোন কথা জিজ্ঞাসা করলে সামান্য দু’-এক কথায় গম্ভীরভাবে জবাব দিয়ে আবার চুপ করে’ কি ভাবতে থাকে ! মেসে যতক্ষণ থাকে, বেশ হাস্য-মধুর মুখ ! কিন্তু যেই এসে এ বারান্দায় দাড়ায়, কি যেন বিষম ব্যথা ওর বুকে জেগে ওঠে। তখন ওর দিকে চাইলে মনে হয়—কালাে পােষাকের ভিতরে হয়তো সত্যই ওর বুকও বুঝি এমনি কালাে! কতদিন বলেছি- মরু-প্রদীপ १२ এ অপরিবর্তনীয় পােষাকটার একটু পরিবর্তন করে। কয়লার মতাে কালাে আবরণ চোখের সামনে কি সর্বদা ভালাে লাগে? গভীর ভাবে সে জবাব দিয়েছে-কয়লার এ কালো আবরণের মধ্যে জ্বলছে সােনার প্রদীপ। বলি—নতুন এসেছে এ মেসে। পাশের বাড়ীর মেয়েদের হয়তাে অসুবিধা হয়। তারা এ সময় তাদের বারান্দায় এসে দাঁড়ায় তাে, তােমাকে এ অবস্থায় দেখলে তারা ভূতের ভয়ে শিউরে উঠবে তেমনি গম্ভীর ভাবে শৈলেন উত্তর দেয়—সমস্ত মানব-জীবনটাই ভূতের মতাে রহস্যময় ! সবাই কালো আবরণে ঢাকা। আমার এমন সুন্দর চেহারা, সুন্দর স্বাস্থ্য, সুন্দর যৌবন, সুন্দর অন্তর-চেতনা—তা সত্ত্বেও নিজকে কালাে পােষাকে ঢেকে রেখে ফাকি দিচ্ছি সবাইকে। এমনি রহস্যময় সংগােপনে থাকি আমরা সমস্ত মানব। মানুষের আসল রূপ—সত্য আর সুন্দর। কিন্তু সেই সত্য সুন্দর মিথ্যার কালাে কলংকে ঢাকা। কার সাধ্য মানুষকে খুঁজে পায় ? হেসে ওর পিঠে চড় দিয়ে বললাম—লােহা-পেটার কাজ করে’ করে’ মানুষ সম্বন্ধে জ্ঞানও বেশ শক্ত হয়ে উঠেছে দেখছি। তারপর হঠাৎ একদিন রেংগুন সহরে জাপানী বােমা পড়লাে। নিমেষে সহরের কায়া গেল ছায়ার মতাে হয়ে ! আধুনিক সভ্যতার আনন্দ-উৎসবে গড়া বড় বড় ঘর-বাড়ী, সভাগৃহ, কাছারি, আদালত, স্কুল-কলেজ, মঠ-গির্জা মুহূর্তে হলাে ধূল্যবলুষ্ঠিত। আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে এলাে ধ্বংসের বাণী ! মানুষ হ'লাে লুষ্ঠিত, বিতাড়িত। বিজ্ঞান- প্রসূত মার রথ ছুটলাে জয়-যাত্রার পথে ; দেবতা হলাে মানুষ ; মানুষ হ’লাে দানব ; দানবের রথ-চক্রে দলিত হলাে পৃথিবী! নিমেষে জনশূন্য হ’লল রেংগুনকে কোথায় পালালাে, কে জানে! কোথায় গেল আমাদের মেস, কোথায় মেসের লােক, আর কোথায় বা পাশের বাসা !
৭৩ এ-প্রদীপ • বােমার নীচে কেউ পড়লাে না। কিন্তু বেঁচে থেকে কে কোথায় আছি, কারাে কোন খবর নেই। মনে হলাে, প্রলয়ের বেগে আমরা যেন কোথায় সব হারিয়ে গেছি। আমি পালিয়ে এলাম কলকাতায়। জাপানী বােমার আতংকে কম্পিত মানব-সভ্যতার আর এক বিশাল বুকে। এখনও কলকাতায় বােমা পড়েনি; কিন্তু প্রাসাদ-সদৃশ সহরের বাড়ীগুলির দিকে চেয়ে মনে হয়, কি যেন ভয়ে সব আড়ষ্ট হয়ে আছে। সুন্দর সুসজ্জিত বাড়ী- গুলির দিকে চেয়ে নিশ্বাস ফেলি ! ধ্বংসের পৃথিবীতে এদের স্থান আছে কি? পিছনে-ফেলে-আসা রেংগুনের সেই চঞ্চল মেস, সুখ-শান্ত সেই শান্তির নীড় ভেংগে গেছে। কোথায় গেল মেসের বন্ধুরা সব? মােনা, চিত্ত, শান্তু, থােকা, বুলু, রবি-কোথায় বা ফ্যাক্টরীর পােষাক-পরা সেই শৈলেন ছেলেটা ! আর কোথায় বা পাশের বাসার হীরালালবাবু, তার স্ত্রী, দুই মেয়ে সমী আর অমী-সব যেন স্বপ্ন ! বিপুল ভাংগা-গড়া দিয়ে ঘেরা এ জীবন শুধু ক্ষণিকের ব্যস্ত আয়ােজন ! প্রায় দু' বছর হয়ে গেছে কলকাতায় এসেছি। সেদিন ট্রামে বালীগঞ্জ যাচ্ছি। পাশের সীটে চেয়ে দেখি, হীরালালবাবু। সানন্দে পুলক শিহরণে বুকখানা ভরে উঠলাে। যাকে নিশ্চিত মরণের মুখে ভেবে রেখেছিলাম, তাকে ফিরে পেয়ে কি আনন্দ! হীরালালবাবুকে ট্রাম-ভর্তি লােকের মধ্যে সব চেয়ে ভালাে লাগলো। হেসে বললাম, জাপানী বােমা তাহলে দেখছি একেবারেই ব্যর্থ! কবে এলেন? হেটে ? , জাহাজে? হীরালালবাবুও তেমনি বিপুল আনন্দে আমাকে ফিরে পেয়ে বললেন-হেটেই এসেছি। পথে ভয়ানক কষ্ট পেয়েছি। অমী তত একদিন পথে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, চোখ উল্টে যায় আর কি। কিন্তু পাক সে কথাবালীগঞ্জে বাসা করেছি। সমী এবার বি. এ. পাশ মরুপ্রীপ ৭৪ করেছে, এখন সাপলাইয়ে কাজ করছে, অমী আশুতােষে আই. এ. পড়ছে। চলুন বাসায়—এদের সংগে দেখা করে আসবেন। হীরালালবাবুর সংগে সােজা তার বাসায় গেলাম। সমী, অমী দৌড়ে এসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আমাকে অস্থির করে তুললােকবে এলেন? কি করে এলেন? কেন এলেন? জাপানীদের হাতে পড়লে বুঝতেন, তারা কেমন ! কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়ে গেলাে, চলে এলাম। ! প্রায় মাসখানেক পরের কথা। মেসে একা চুপ করে বসে আছি, হঠাং শৈলেন এসে উপস্থিত। মুখে উই আছে! দু’হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে বললে—শুনলাম, আপনি এ মেসে আছেন। দেখা করতে এলাম। ভালাে আছেন ? ওর দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেলাম! সেই শৈলেন! ফ্যাক্টরীর কালাে পােষাক-পরা—আজ এই মূতি ! সিগারেট খায়—তাও আমার সামনে! গায়ের সেই মৃত্যুহীন কালে পােষাকটা কি হ’লল! আজ একেবারে খাটি সাহেব ! বিলিতী পােষাক। বিস্ময়-নেত্রে ওর দিকে কতক্ষণ চেয়ে রইলাম। শেষে বললাম, তুমি ভালাে আছে তাে? রেংগুন থেকে কবে এলে ? কি করে এলে ? হেটে, না জাহাজে ? তা এখানে এসে নিশ্চয়ই চাকরী-বাকরীর সুবিধা হয়েছে। এক গাল হেসে শৈলেন বললে—এখন আর সেই ত্যজ্যপুত্র নই। ইডিয়া আয়রণ ষ্টী ওয়ার্কসের চীফ, ইজিনীয়ার। তিনশাে টাকা মাইনে পাচ্ছি। হ্যা, যতীন-দা’, একটা কথা—আপনার খােজে মেয়ে আছে? আমি বিয়ে করবাে। আরাে অধিক অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে হেসে বললাম- কলকাতা সহরে আবার মেয়ের অভাব? বিশেষ বালীগঞ্জে।
৭৫
মরু-প্রদীপ
বালীগঞ্জের কথা বলতেই হীরালালবাবুর কথা মনে পড়ে গেলাে।
বললাম—হা হে শৈলেন, হীরালালবাবুও এখানে আছেন। সমী-অমী
সবাই। সমী চাকরী করছে, অমী আই এ. পড়ছে।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে একটু মলিন হাসিমুখে বললে—আপনি
ওঁদের বাসায় মাঝে মাঝে যান বুঝি ?
বললাম-হ, প্রত্যেক রবিবার। আসছে রবিবারেও যাবো।
কেন, কিছু দরকার আছে ?
কোন উত্তর দিলাে না। হাতের আধেক-খাওয়া সিগারেটটা
তাচ্ছলাের ভংগীতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে টান
দিয়ে চোখ বুজে উপরের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে কি যেন রহস্যভরা মন
নিয়ে নিঃশব্দে চলে গেলো।
ঠিক তার পরের দিন আবার এসে উপস্থিত। এসেই আমার হাত
দু’টো চেপে ধরে বিশেষ অনুরােধ করে’ বললে—আপনাকে আমার
একটা কাজ করে দিতেই হবে যতীনদা। আপনাকে আমি শ্রদ্ধা করি,
ভক্তি করি। কিন্তু আজ আমার লজ্জা-শরম কিছুই নেই ! শুনুন, আমি
অমীকে ভালবাসি। আমি জানতে চাই, সে আমাকে বিয়ে করতে
রাজী আছে কিনা! এই চিঠি । এ-চিঠিখানা দয়া করে অমীকে দেবেন
তার হাতে। আর কেউ না দেখে ? অমী যেন চিঠির উত্তর
আপনার হাতেই দেয়। আমি তাড়াতাড়ি উত্তর চাই। হ্যা, আপনি
এ-চিঠি পড়ে দেখতে পারেন।
আমার সর্বাংগ বয়ে যেন একটা বােমারু-বিমান উড়ছে। সেই সংগে
বােমাও পড়ছে যেন! আমার দেহের রক্ত-চলাচল একরকম বন্ধ। সেই
শৈলেনের এই কাণ্ড! অমীকে ভালবাসে! বলে কি? মাথা খারাপ
হয়নি তাে? রুক্ষ মেজাজে বললাম-তােমার এত দুঃসাহস? আমাকে
দিয়ে প্রেমের চিঠি পাঠাবে অমীর কাছে ?
মকপ্রদীপ ৭৬ বললে—সত্যি যতীনদা’, আমি সত্যি অমীকে ভালােবাসি, ভয়ংকর ভালােবাসি। আপনি চিঠিখানা পড়ে দেখুন-খারাপ কিছু লিখি নি ; ভদ্রলােকের মতােই লিখেছি। মৃদু স্বরে বললাম—ফিফথ, ক্লাসে পাঁচবার ফেল করেছে; লেখা- পড়ার কি জাননা? ভদ্রলােকের মতাে চিঠি লিখেছে বলছে । বললে বিশ্বাস না হয়, পড়ে দেখুন। হ্যা, আর একটা কথা অমীকে রাজী করাতে পারলে বিয়ের পরেই আমি দশ হাজার টাকার একটা লাইফ-ইসিওর করব আপনাদের ন্যাশন্যাল ইনডিয়ান লাইফ অফিসে এবং আপনার এজেন্সীতে । মনটা পাতলা হয়ে গেলাে। এজেন্সী করে মানুষের আয়ু বন্ধক রেখে দু’পয়সা পাই! একেবারে দশ হাজার টাকা! বেশ মােটা কমিশন পাবাে। আচ্ছা, পড়েই দেখি না, চিঠিতে কি লিখেছে। চিঠি পড়তে লাগলাম : স্নেহের অমি, যতীনদার কাছে শুনলাম তােমরা কলকাতায় আছে, তােমাদের সংগে দেখা করতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে তােমার সংগে। আমার কথা তােমার মনে আছে কি ? কত রাতের পর রাত রেংগুনের সেই মেসের বারান্দায় দাড়িয়ে কাটিয়েছি শুধু তােমার অপেক্ষায়। তুমি এসে কখন্ তােমাদের বারান্দায় দাড়াবে—সেই আশায়। কোন কোন সময় যে না এসেছে, এমন নয় ! চোখে চোখে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু সে-কথা ভালোবাসার কথা কি না জানি না। লেখাপড়া তেমন শিখিনি বলে’ তের সে চোখের কথার মানে বুঝতে পারিনি। কিন্তু আমার চোখ দিয়ে যে-কথা বলেছি, তার প্রত্যেকটি কথায় গভীর অর্থ ছিলাে। তুমি লেখাপড়া শিখেছে-সে-কথার অর্থ নিশ্চয়ই তুমি ধরে ফেলেছে এবং যা ধয়েছে, তা সত্য। আমার চোখ ভালােবাসার কথাই ৭৭ মপ্রদীপ বলতাে। বলতাে, আমি তােমাকে ভালােবাসি। কিন্তু সে সব কথা থাক—আমি এখন আর সে খালাসীর কালাে পােষাক-পরা ফ্যাক্টরীর ওয়ার্কার নই। আমি এখন বিলিতী পােষাক পরে’ কাজ করি। একটা মস্ত ফার্মের ইজিনীয়ার। আমি তিশাে তিনশাে টাকা মাইনে পাই। আমি বিয়ে করবে এবং রাতের পর রাত বারান্দায় দাড়িয়ে যাকে ভালােবেসেছি তাকেই বিয়ে করতে চাই। এ বিষয়ে তােমার মত জানতে চাই। যতীনদা’র কাছে তােমার মত জানালে সুখী হবাে। ইতি তােমার পাণিপ্রার্থী শৈলেন চিঠি পড়ে হেসে বললাম—মেসের বারান্দায় দাড়িয়ে তাহলে নীরবে এই কাণ্ড করতে! বারান্দায় দাঁড়াতে মানা করলে এজন্যই বুঝি বলতে-কালাে আবরণের ভিতরে জ্বলছে সােনার প্রদীপ! তুমি এত বড় শয়তান ! ভাগ্যে সে মেস ভেংগে গেছে—বাসাও ভেংগে গেছে- নাহলে তুমি কি যে করতে, ভাবতে গায়ে কাটা দেয় ! আচ্ছা, দশ হাজার টাকার ইনসিওরেন্সের প্রতিশ্রুতি যখন দিলে, একবার চেষ্টা করে আমি দেখবাে। পরদিন শৈলেনের চিঠি নিয়ে হীরালালবাবুর বাসায় গেলাম ; কিন্তু কি করে সে চিঠি অমীর হাতে দিই? ভাই-ভগিনী সম্পর্ক ওদের সংগে আমার চিরকাল। ভাই হয়ে বােনের হাতে দেবাে ঐ শৈলেনের প্রেমপত্র। বয়ে এনেছি কি করে—আর এখন বােনের হাতে সে চিঠি দিই কি করে? লজ্জায় মাথা নুয়ে পড়লো। কিন্তু এদিকে দশ হাজার টাকার কমিশন। চোখ-মুখ বুজে চিঠিখানা পকেট থেকে বার করে অমীকে একটু আড়ালে ডেকে বললাম—মেসের সেই শৈলেন তােমাকে চিঠি দিয়েছে। চিঠি পড়ে আমার কাছেই যা হয় একটা জবাব দিয়ে।
মরু-প্রদীপ ৭৮ চিঠি পড়ে’ অমী টুকরাে টুকরাে করে ছিড়ে ফেললাে চিঠিটা। ছিড়ে আমাকে বললে—এত বড় অসভ্য! চিঠিখানা আপনার কাছে দিয়েছে, নিশ্চয় আপনি পড়েছেন? অপরাধীর মতাে বাম-হ। বললে-ছি-ছি, কি লজ্জার কথা। আমি সত্যই ওকে ভালােবাসি নাকি? কখনাে না। শুনুন তবে একদিন দু’জনেই বারান্দায় দাড়িয়েছি—আমি অন্যদিকে মুখ করে দাড়িয়ে--ওর দিকে আমি সহজে চাইতাম না। ও আমায় ডেকে বললে—অমি, এদিকে চেয়ে দেখাে, কি সুন্দর ফুল ! চেয়ে দেখি, ওর হাতে একটা ক্রিশান্থিমাম ! চাইতেই ও ফুলটা বুকে চেপে ঠোটে ঠেকিয়ে আমার দিকে ছুড়ে দিলে—দিয়ে বললে, খােপায় পররা। আমি খােপায় না পরে’ ফুলটা কাণে গুজে রাখলাম ! এতেও ও বুঝতে পারলাে না যে, আমি ওর কথা অমান্য করলাম? ওকে অপমান করলাম? কিন্তু থাক সে কথা ! এখন সে তিশাে টাকার লােভ দেখিয়ে আমাকে বিয়ে করতে চায়। টাকা অবশ্য ভালােবাসি কিন্তু টাকাই সব নয় ! মন বলে একটা বস্তু আছে। আসল কথা মনের! আমি দু’দিন পরে আই. এ. পাশ করবাে ! ওর যখন টাকা আছে, পড়াশুনা করে হয়তাে পরে বি. এ., এম. এ.-ও পাশ করব। শেষে দু’জনের জীবনে ট্র্যাজেডি ঘটবে। সন্দেহ, সংশয়, শংকা, দ্বিধা, ঘ-পদে পদে ওকে দেবে বাধা। ও ভাববে, আমি কত বড় ; আর ও কত ছােটো! একটা মস্ত ব্যবধান গড়ে উঠবে দু’জনের মধ্যে। দু’জনের মনকে বিষাক্ত করে দেবে। আমার বুছ হারিয়ে ফেলবে ওর স্বামিত্ব। শুধু কাতর ভীত চাহনি নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকবে সসম্বমে। করুণাপরবশ হয়ে হয়তাে আমি বলবোেভয় নেই, কাছে এসে পাশে বসাে, এই চেয়ারে। ও হয়তাে ভুলেই যাবে আমি ওর স্ত্রী, হয়তাে বলবে, আপনি
৭১
মরু-প্রদীপ
বসুন আমি দাড়িয়ে থাকি। আপনার কাছে চেয়ারে বসতে আমার
লজ্জা করে।•••এমনি করে জীবন হয়ে উঠবে পদে পদে বিড়ম্বিত।
স্বামী, কে স্ত্রী, এ প্রশ্ন মনে জাগবে প্রতিদিন, প্রতি কাজে। ওর টাকা
হবে সর্ব-অর্থহীন! তার চেয়ে ওকে বলবেন—আই রিফিউজ ।
এসে শৈলেনকে বললাম—অমী রিফিউজ করেছে। দশ হাজার
টাকার বীমাটাও ফকালাে হে!
আজ শৈলেন হ্যারিসন রােডের উপর হঠাৎ টু-সিটার থেকে নেমে
আমাকে বললে-কাল আপনার নিমন্ত্রণ ! পশু একে বিয়ে করেছি
—বি. এ., বি. টি. ! সাকসেসফুল ম্যারেজ ! কি বলেন ? অমী তত
মােটে আই, এ. পড়ে!
বুও হলাে না জানা অঞ্জন এম. এ. পাশ করে কলকাতায় চাকরীর বাজারে ঘুরে দেখলে বাজার মন্দা। তার মতাে হাজার হাজার বি. এ., এম. এ. পাশ করে’ পথে ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ ডেকেও জিজ্ঞাসা করে না। পরিচিত যারা, তারাও সামনে পড়লে সামান্য মুখের আলাপ করে পাশ কেটে চলে যায়। যেন বি. এ., এম. এ. পাশ করে’ কত বড় অন্যায় করছে। বাংলা দেশের এ দুর্দিনে কোন কিছু পাশ না করে যারা দু’পয়সা রােজগার করে তারাই বরং সকলের চোখে প্রীতির ও সম্মানের। অঞ্জন দেখলে—চারী শী হওয়া অসম্ভব। এ অবস্থায় শহরে ক’দিন চলে ? মাস মাস মেসের টাকা দিতেই হবে। বেকার অবস্থায় তা সম্ভব নয়। অনেক ভেবে চিন্তে অঞ্জন একটা টিউশনী নিলে, থাকা আর খাওয়া। ছাত্রীটি ম্যাটিক দেবে। অন্ততঃ এক বছরের জন্য তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হলাে। সেদিন বেণু বাংলা বইখানা খুলে বললে, এ দু'টো লাইন বুঝিয়ে দিন : “কাছে আছে দেখিতে না পাও তুমি কাহার সন্ধানে দূরে যাও।” অঞ্জন বললে, বুঝতে চেষ্টা করো, অতি সহজ মানে। বেণু কতক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বললে, কবি বাতাসকে লক্ষ্য করেছেন : বাতাস আমাদের কাছে আছে, অথচ দেখতে পাচ্ছি না। অঞ্জন হেসে বললে, প্রকৃত কবির কবিত্ব শুধু আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ায় না, তার চেয়ে অনেক উপরে বাস করে। কথাটার মানে হচ্ছে-ভগবান তােমার কাছেই, এমন কি তােমার মধ্যেই রয়েছেন, তাকে দূরে গিয়ে খুঁজে বার করতে হয় না। ধরাে, তােমার এ বইখানা—এর মধ্যে যত গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা আছে, তার মাঝেই ভগবান ম-প্রদীপ বাতাসরূপে বিরাজ করছেন। এ বইয়ের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন থেকে যে ধ্বনি, যে ঝংকার, যে বাণী উচ্চারিত হচ্ছে, তার মধ্যেই তিনি গােপনে গােপনে বিরাজ করছেন। এ জন্যই মনীষীরা বলে থাকেন—তিনি ধ্বনিময়, বাণীময় ও ঝংকারময়। বেণু গম্ভীর হয়ে বলে, আপনি বড় সিরিয়াস। আমার ও-সব ভগবৎ- তত্ব ভালাে লাগে না। ভালাে লাগে চোখের সামনে যা দেখি, তাই অঞ্জন বলে, বেশ, খুব সুন্দর কথা। বাহির বিশ্বের সৌন্দর্যের মাঝেও ভগবান বিরাজ করেন সুন্দররূপে। বেণুর ঘােট বােন ঝর্ণা এসে ডাকে—দিদি, উপরে খেতে এসাে। বেণু উপরে চলে যায়। অঞ্জন বসে থাকে একা। দুনিয়ার শত ভাবনা তার মনে এসে জড় হয়। চাকুরীর কথা-এ এক বছরের ভিতরে নিশ্চয়ই তার চাকুরী হয়ে যাবে। হ'লে ভালো চাকুরীই হবে, অন্ততঃ একশাে টাকা মাইনে। সরকারী আফিসে চাকরী? না, কিছুতেই সে সরকারের কাজ করবে না। প্রত্যেক শিক্ষিত যুবকেরই ন্যাশন্যাল স্পিরিট থাকা চাই। দেশের মানুষ দেশের কথা ভাববে। দেশের উন্নতি, দেশের মান, দেশের গৌরব, দেশের ঐশ্বর্য প্রত্যেক দেশবাসীর ধ্যানের ছবি হওয়া উচিত। যে-কোন একটা জাতীয় ফার্মে সে চাকুরী করবে এবং সে ফার্মের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা ও পরিশ্রম করে কাজের উন্নতির সংগে সংগে দেশেরও ঐশ্বর্য বৃদ্ধি করবে, তবেই হবে তার শিক্ষার পরিচয়। সহসা ডাক-পিয়ন এসে চিঠি দিয়ে যায়। অঞ্জনের বুকটা কেঁপে ওঠে। বড় লম্বা খামে চিঠি। বেকার দারিদ্র্যপীড়িত জীবনে চিঠি এলেই ভয় হয়। দেশের বাড়ীতে বিধবা মা ও ছােট ঘােট দু'টা বােন ও একটি ভাই। হয়তাে টাকার জন্য মা চিঠি দিয়েছে, কিন্তু এত বড় লধা খামে কেন ? হয়তাে সংসারের দুঃখ কষ্টের অনেক কথা জানিয়ে মরু-প্রদীপ ২ টাকা চেয়েছে। কিন্তু টাকা কোথায়—সে যে বেকার! অঞ্জনের বুকটা আবার দুরু দুরু করে। শেষে অঞ্জন কাপতে কাপতে চিঠিখানা হাতে তুলে নেয়। যাক, বাঁচা গেলােমার চিঠি নয়। সেদিন একটা কোম্পানীতে চাকরীর দরখাস্ত করেছিল, তারই জবাব এসেছে, উপরে ঠিকানা—ইংরাজীতে টাইপ করা। তবে কি তার চাকরী হয়ে গেলাে? এতাে সহজে ? না হবে কেন ? সে উচ্চ শিক্ষিত, এম. এ. পাশ ; তার চারী হওয়া অতি সহজ। আনন্দে উৎসাহে অঞ্জনের বুক ভরে ওঠে। প্রতি তনুতলে আবার যেন শুনতে পায় জীবনের সাফল্যের মৃদু মধু ধ্বনি। আশা ও আনন্দে অঞ্জনের হাত আবার কাঁপতে থাকে, কম্পিত হন্তে চিঠিখানা খুলে পড়ে। প্রিটেড চিঠি। লিখেছে-‘রিগ্রেট, নাে ভেক্যাসি’। অঞ্জনের হাত অবশ হয়ে আসে, চিঠিখানা মাটিতে পড়ে যায়। ব্যর্থ বক্ষ হ'তে কাতর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কাছে আছে দেখিতে না পাও তুমি কাহার সন্ধানে দূরে যাও। মিথ্যা! সব মিথ্যা! ভগবান নেই, কাছেও নেই, দুরেও নেই। কোথায়ও নেই। দরিদ্রের কাছে, বেকার জীবনের কাছে, ব্যাধি-পীড়িত জরাজীর্ণ আজীবন দুঃখীর কাছে ভগবান নেই। দরিদ্রের ভগবান ঐ যারা ধনী। বেণুরা বড়লােক, অনেক টাকা পয়সা। বেণুকে সুখী করতে পারলেই বরং সে তার দ্বারা নানাভাবে উপকৃত হবে, কি কাজ অন্ধ ভগবানের আশ্রয় নিয়ে। বেণুই বরং তার বেকার-জীবনের ভাগ্যলক্ষ্মী। বেণু ম্যাটিক পাশ করলে। কিন্তু অঞ্জনের কিছুই হলাে না; অর্থহীন বেকার জীবন নিয়ে সে আজও অর্থহীন রইলাে। চাকুরী আর কোথাও জুটলাে না; সে আবার বেণুকে আই. এ. পড়াতে লাগলাে; শহরে খেয়ে পরে বেঁচে থাকবার এ সম্বলটুকু হারানাে যায় না। কিন্তু সহসা অঞ্জনের জীবনে এলে বৈশাখী ঝড়। হয়ে গেলাে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। বৃদ্ধা } মরুপ্রদীপ জননী অনশনে রােগাক্রান্ত হয়ে সহসা মারা গেলেন। অর্ধাশনে ঘােট একটি ভাই ও দু’টা বােন তখন তারই দিকে চেয়ে সুদুর পল্লীপ্রান্তে পড়ে আছে। অঞ্জনের চোখ দু’টী আজ তপ্ত অশ্রু-বন্যায় ভেসে উঠলাে; বুকের তলে আজ তার অসীম বেদনা, অসহ্য ব্যর্থ জীবন-মরু আজ তাকে পলে পলে দগ্ধ করছে ; সে আজ কিসের লােভে সামান্য একটা টিউশনি নিয়ে পড়ে আছে এখানে? দু'বেলা দু'টা খাওয়া ছাড়া সে আর কিছুই পায় । হাঁ বেণুকে তার বেশ ভালাে লাগে, বেণুর আচার ব্যবহার, কথাবার্তা, চাল-চলন সবই যেন তার হৃদয় স্পর্শ করে ; সেইটুকুই যেন তাকে কর্মময় জীবন-প্রবাহ থেকে বঞ্চিত করে এখানে বন্দী করে রেখেছে। কিন্তু তার মতাে একজন শিক্ষিত যুবকের পক্ষে এ সব কি উচিত? সামান্য একটি মেয়ের মাধুরীর পাশে ভুলে’ থেকে জীবনটাকে এভাবে অর্থশূন্য করে দেওয়া কখনােই উচিত নয়। জননী আজ তার মৃত। কেন ? যেহেতু দু’বেলা পেট ভরে খেতে পাননি; তার মতাে উপযুক্ত ছেলে থাকতে জননী মারা গেলেন না খেয়ে ! চেষ্টা করলে কি তার এতদিনে চাকুরী হত না? কিন্তু সেও তেমন ভালাে করে আপ্রাণ হয়ে চেষ্টা করেনি। কি যেন একটা দুর্বলতা, কি যেন একটা নগ্ন মােহ তাকে বার বার বাধা দিয়েছে ; মনে হত বেণুকে পড়ানােই যেন তার জীবনের একটা মস্ত সার্থকতা। আজ জীবনের একটা মস্ত বড় অভিশাপ তাকে ঘিরে রয়েছে। তাকে ঘিরে রয়েছে যৌবনের সর্ব অর্থশূন্য মাধুরীর স্বপ্ন ! সে স্বপ্ন তাকে করেছে পুরুষত্বহীন; শক্তিশালী পুরুষের কর্মপ্রবাহ থেকে তাকে করেছে বঞ্চিত। কিন্তু আর নয়। তাকে কর্মময় ; কার্যকুশলী জীবনের অধিকারী হতেই হবে; তাকে চাকুরী করতেই হবে ; তাকে পয়সা রােজগার করে দশজনের একজন হতেই হবে। দু’টা বােন ও একটি ভাইকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখে মানুষ করে তুলতেই হবে। তবেই হবে সে মনুষ্য নামের যােগ্য। প্রকৃত শক্তিশালী পুরুষ ; ;
অপ্রীপ ৪ পুরুষত্বহীন জীবন বহন করে বেঁচে থেকে আর লাভ কি ? বেণুকে তার ভালাে লাগে; কিন্তু সে ভালাে লাগার কি কোন মানে আছে ? কর্মহীন অলস দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের কাছে প্রেমের, ভালবাসার কি কোন মূল্য আছে ? প্রেম, ভালবাসা, প্রীতি, মেহ তখনই উজ্জল মহাশক্তিশালী যখন জীবন সর্বৈশ্বর্যময়। বেণুকে ভালবাসার মূল্য তখনই হবে যখন সে অতুল ঐশ্বর্ষের ও শক্তিময় জীবনের মালিক হয়ে হেসে দাঁড়িয়ে বেণুকে বলতে পারবে যে, সে দিগ্বিজয়ী পুরুষ, সকল বিশ্বের দৌলত, কর্মধারা তার ভিতরেই প্রবাহিত। তখনই তার ভালবাসার মূল্য হবে প্রচুর, তখনই সে জগৎসভায় সকলের কাছে মুক্তকণ্ঠে বলতে পারবে, ঐশ্বর্যময় ও প্রেমময় জীবনই ধরায় ধন্য । অঞ্জন চলে গেল রেংগুন, জীবনের ঐশ্বর্য কোথায় খুঁজে বার করতে। যাবার দিন বেণু কাছে এসে দাড়ালাে, নম্র নত সজল চোখে। অঞ্জনের পায়ের ধূলাে নিয়ে বললে, শরীরের দিকে দৃষ্টি রাখবেন, স্বাস্থ্য ভালাে থাকলেই জীবনে উন্নতি করা যায়। অঞ্জন শুধু বললে, চেষ্টা করবো। অঞ্জনের ভাগ্যলক্ষ্মী হেসে উঠলাে। রেংগুন গিয়ে ন্যাশন্যাল ইনডিয়ান্ লাইফ অফিসের রেংগুন শাখায় অরগ্যানাইজারের পদ পেলাে। চার পাঁচ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করায় বেশ মােটা টাকা বােজগার করলাে। ব্যাংকে এ্যাকাউন্ট খুলে দশ হাজার টাকা জমা দিলাে। বােন দু’টাকে ম্যাটিক পাশ করিয়ে উপার্জনক্ষম উচ্চ শিক্ষিত সৎপাত্রের সাথে বিয়ে দিলে। জীবন হয়ে উঠলাে সমৃদ্ধ ও সুশীল ; উজ্জল জীবন ছন্দ- মুখর বিপুল ভবিষ্যৎ আজ তার সম্মুখে। সহসা মনে পড়ে, বেণুর কথা। বেণুর বিয়ে হয়ে গেছে কি? দ্বিধায় ও সন্দেহে তার বুকের তলে জেগে উঠে ঘন দীর্ঘশ্বাস। সহসা তার কানে আসে, রেংগুন গেজেট। সিংগাপুরে বােমা- বরিষণ, হতাহত সামান্য। কাগজওয়ালা তেকে সে কাগজ নিলে মরুপ্রদীপ ব্রিটিশ জাপান যুদ্ধ। সত্যই সিংগাপুরে বােমা পড়েছে, লােকয় সামান্য। কিন্তু সামান্য হােক বা অসামান্য হােক, রেংগুন থাকা এখন আর উচিত নয়। ক্রমাগত সাইরেন পড়ছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেঞ্চে ঢুকে’ কাটাতে হয়, লােক আহার-নিদ্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধন-দৌলত, টাকা-পয়সা, ঘর-বাড়ী সব বিষবৎ ত্যাগ করে চারদিকে ছুটোছুটি করছে। চারদিকে ভেসে উঠছে যুদ্ধ-পীড়িত অসহায় মানব-জীবনের কাতর ভয়-বিহ্বল মৰ্ম্মন্তুদ দৃশ্য। বংগােপসাগর পাড়ি দেবার আজই শেষ জাহাজ। অঞ্জন এ জাহাজ ধরে কাতার হেড অফিসে এসে ম্যানেজারের সংগে দেখা করলে। ম্যানেজার বললে—আপনার অরগ্যানাইজেশনে কোম্পানী বিশেষ উন্নত ও লাভবান, এখন ইচ্ছা করলে সুপারিন্টেন্ডেন্টের পদ নিতে পারেন, মাইনে সাড়ে চারশাে টাকা। অঞ্জনের মুখে ফুটে উঠলে ঐশ্বর্যের হাসি, বিনয়-নম্র বচনে সে সম্মতি জানালে। নৃতন পদে নিযুক্ত হওয়ার মাসখানেক পর অঞ্জন দু'মাসের ছুটা নিয়ে চলে গেলাে মধুপুর স্বাস্থ্য বাতে। রেংগুনে থাকাকালীন অক্লান্ত পরিশ্রমে ও শেষে জাপানী বােমার বিভীষিকাময় অনুভূতিতে, অনাহারে, অনিদ্রায় শরীরটা একেবারে ভেংগে গেছে-বিশ্রামের দরকার। কি স্বাস্থ্য কি হয়ে গেছে। তার মনে পড়লাে বেণু একদিন বলেছিলাে- স্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টি রাখবেন। আজ স্বাস্থ্যই বা কোথায় আর সেই বেণুই বা কোথায়! মস্ত বড় পরিবর্তনের ক্ষত-চিহ্ন আজ তার দেহে ও মনে। একদিন বিকাল বেলা অঞ্জন বেড়াতে বেরিয়েছে, একটি ছােট্ট মেয়ে কাছে এসে বললে—আপনাকে দিদি ডাকছে। অঞ্জন বিস্মিত বিল চোখে মেয়েটীর দিকে চেয়ে বলে—কে তােমার দিদি ? এমন সময় বেণু নিজেই এসে বললে, মধুপুরে এসেছেন স্বাস্থ্য ফিরাতে, তা জানি, কোথায় আছেন তাও জানি। ভাবছিলাম, একদিন মরু-প্রদীপ গিয়ে প্রণাম জানিয়ে আসবে। আজ এ-পথে যেতে দেখলাম, তাই পাশের বাড়ীর ওই মেয়েটীকে দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছি। আসুন ভিতরে, ঘরে এসে বম্বন। বেণুর বাবা আশুবাবু মৃত্যুশয্যায় শুয়ে—অঞ্জনকে দেখেই তিনি বললেন—এসসা বাবা এসাে, ভালাে তাে? বেণু সেদিন বলছিলাে, তুমি মধুপুরে আছছ, বসাে বাবা ঐ চেয়ারটায়। বেণুর কথা তাে কিছুই জানাে , সে এক মস্ত বড় ট্র্যাজেডি! বলে আশুবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে’ থেকে পরে গভীর দীর্ঘশ্বাস টেনে বললেন-বেণুর বিয়ে হয়েছে। এ কথা বলেই আশুবাবু আবার সহসা একটু থেমে গিয়ে চীৎকার করে উঠে বললেন-না না না, বেণুর বিয়ে হয়নি, অমন আস্ত মাতালের কাছে কে মেয়ের বিয়ে দেয়। সে যে মাতাল, সে যে গুণ্ডা, সে যে আমার বেণুর জীবনে মহা-মৃত্যুময় ব্যাধি ! না, আমি চাই না তাকে, সে পালিয়েছে, তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি, সে মরে গেছে, সে নেই ! বলে আশুবাবু ক্লান্ত ও রুদ্ধশ্বাস অবস্থায় আবার শুয়ে পড়লেন। এমন সময় বেণু এক কাপ চা নিয়ে এসে অঞ্জনকে বললে—চাটুকু খেয়ে নিন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আমি রান্না বসিয়েছি—খেয়ে যাবেন আজ এখান থেকে। অঞ্জন বললে—চা তাে আর খাই না, তুমিই তােত মানা করেছিলে, মনে নেই ? বেণু হেসে বললে—বৌদি বুঝি সকাল বেলা আলু সিদ্ধ ভাত রান্না করে দেন ? অঞ্জন উঠে দাঁড়ায়। সিক্ত কণ্ঠে বলে, তেমন দরদী আজও কাকে খুঁজে পাইনি। সহসা বেণুর বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠে, হাত থেকে চায়ের কাপটা হঠাৎ শান-বধান মেঝের উপর ঠাস করে পড়ে যায়, ভেংগে হয় চুর্ণ- বিচুর্ণ। দু’টা ব্যর্থ হৃদয়ের ধ্বনি যেন বেজে উঠে সারা ঘরে।
প্রেমের অভিশাপ সুদূর পাড়া-গাঁয়ে মাষ্টারী ; একটা বালিকা বিদ্যালয়ে। জন কুড়ি ছােট ছােট ছেলেমেয়ে নিয়ে স্কুলগৃহটি রায়দের বাড়ীর এক পাশে দাড়াননা। এ ঘরখানার উপর নির্ভর করেই রেণুকা সেদিন তার নিজ দেশের ঘর ভেংগে এ গ্রামে এসে বাসা বাঁধলাে শিক্ষয়িত্রীরূপে। দশটা থেকে চারটে পর্যন্ত স্কুল ; কিন্তু গ্রামের স্কুল, কোন কড়াকড়ি নিয়ম নাই, যখন খুসী স্কুল করলেই চলে। তাছাড়া ছােট ছােট ছেলেমেয়ে, প্রায়ই স্কুলে আসতে চায় না। মেয়েদের মধ্যে যারা একটু বড়, তারাও বােজ সময়মতাে স্কুলে আসে না। ও বাড়ীর সুজলা প্রায়ই স্কুলে দেরী করে আসে। সময়-মতাে স্কুলে রওনা হ'তে চাইলেই মা রাগ করে নানা কথা বলে। বলেরেণুকা মাষ্টারণীকে এই মাত্র দেখে এলাম সাবান মেখে’ দীঘির জলে নাইতে। এরপর রান্না করবে, খাবে, শেষে স্কুলে যাবে। আর মেয়ের আমার রাত ভাের না হতেই স্কুল শুরু হয়। লেখাপড়া শিখে কোন্ ঋগগে যাবে শুনি? বিয়ে হয়ে গেলে এমনি পাড়াগাঁয়ে নিত্য অভাব-অনটনের ভিতর ঘর সংসার করতে হবে। চোখের সামনে রেণুকা মাষ্টারণী—কি ফল হ’লাে তার এত লেখাপড়া শিখে? মাত্র পঁচিশ টাকা মাইনে পায় ; যুদ্ধের বাজারে আধমণ চালের দামও নয়। চারটি সন্তান, বিধবা মা, বেকার স্বামী, নিজে। এতােগুলি লােকের এ পঁচিশ টাকায় কিছুই হয় না। কাজ নেই তাের স্কুলে গিয়ে। এদিকে ছােট ছেলেটার ক’দিন যাবত পেটের অসুখ, তার উপর ম্যালেরিয়া—বাঁচবে তাে নাইই, তবু যত্ব চেষ্টা করা। সে সব কি তােকে দিয়ে হয় কিছু; তাের কেবল রাত ভাের না হতেই স্থূল। ওকে আজ আর ভাত 'দিচ্ছি না, একটু সাঙ জাল দিয়ে দে। কপাল আমার ! এ সাগুগুলি এখানে পড়লে কি করে’! সারা ঘরময় সাপ্ত ! এখন ছেলে খাবে কি? হু’ টাকা সের সা; বাপের বয়সে যা শুনিনি কোনদিন ; এখন উপায়?
মরু-প্রদীপ ৫ রাগে ও অভাব-অনটনের দুঃখে সুজলার গালে এক চড় দিয়ে বলে— বলি, তােমাকে কোন সময় বলেছি থােকাকে সাগু করে দিতে! এখন এ সাগু এখানে ফেললে কে? তােমারই এ কাজ! সুজলার চুলে ধরে শেষে ঘর থেকে বের করে দিয়ে বলে- যাও, স্কুলে গিয়ে পণ্ডিত হয়ে এলাে গিয়ে। সারাদিন স্কুলের খাটুনির পর রেণুকা ঘরে ফিরে। স্কুল-ঘরে বন্দী হয়ে থাকতে থাকতে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে। ছােট ছােট ছেলেমেয়ে পড়ানাে যে জীবনে কত বড় অভিশাপজানে সে। এক পড়া পঞ্চাশ- বার পড়িয়ে দিলেও সে একই অবস্থা, কিছুই মনে থাকে না; মনে থাকে শুধু রাজ্যের যতত দুষ্টোমি আর শয়তানি। ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি লেগেই আছে। বুচি এসে নালিশ করে—মাসিমা, বোঁচা আমাকে কিল মেরেছে; ভজা এসে কাদতে কাদতে বলে, রাধা মেয়েটা তাকে চিমটি কেটেছে। একেবারে অসহ। স্কুল থেকে বেরুতে পারলেই যেন মুক্তি। চারটের পর রেণুকা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। স্কুল থেকে বার হলেই সম্মুখে ঠাকুরবাড়ীর পুকুর পড়ে। পুকুর পাড়ে একটা বহু পুরাতন বকুল গাছ। বৈশাখ মাস, বকুল পাতাগুলি নবজন্ম লাভ করে’ সতেজ সবুজ হয়ে ফুটে বেরিয়েছে। একবার গাছটার দিকে চেয়ে রেণুকার প্রাণ জুড়ায়। কী সুন্দর নতুন কচি জীবন্ত পাতাগুলি! নববর্ষের বিপুল আশীর্বাদ যেন ঝরে পড়েছে প্রতি তৃণ- তরুলতার পাতায় ! বকুল গাছটা থেকে সুরভিধারা ভেসে আসছে। সমীর সুগন্ধ ; অরণ্য অধীর চঞ্চল। নবীনের জীবন্ত পরশ চারিদিকে ছড়ানাে। পুরাতন দিন চলে গেছে ; চলে গেছে যেন পুরাতন ব্যথা। জীর্ণ শীর্ণ এক তরুশাখা আজ আর নাই। সতেজ সবুজ শ্যামল পত্র, পুল, প্রতি শাখায়, প্রতি বৃক্ষে। সুগন্ধ কুসুম-পুলকিত প্রতিটি ভ্রমর আজ সঙ্গীতমুখর। অনন্ত আনন্দ, অনন্ত মাধুরী, অনন্ত জীবন, অনন্ত পরমায়ু।
• কিন্তু•••••• । রেণুকার বুকে রুদ্ধ ব্যথা জাগে, নয়নকোণে নিবিড় হয়ে উঠে তিক্ত অশ্রুজল। কি যেন বলতে চায়, বলতে পারে না! হাঁ, কিন্তু সে মরতে পারলেই যেন বাঁচে। এ বিশ্বপ্রকৃতির আনন্দ ও অভিনবত্বের মাঝে সেই-ই যেন শুধু চির পুরাতন, চির জীর্ণ শীর্ণ, ক্ষত বিক্ষত, বেদনা-ব্যথিত, বৈচিত্র্যহীন, একঘেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত জীবন বহন করে। নববর্ষের নব-ঐশ্বর্য, নব প্রাণ, নব জীবন কি তার জন্য নয় ? সহসা বকুল গাছ থেকে ডেকে উঠে কালাে পাখীটা-কুহুকুহু•••। রেণুকার সর্ব শরীর আজ কণ্টকিত হয়ে উঠে? কুহুতান মুখরিত প্রেমগান আজ তার সর্বাংগে ঢেলে দেয় বিষাক্ত পরশ। কুহু-সংগীতে আজ আর সেই মাদকতা নেই; আছে শুধু বক্ষভেদী অগ্নিবাণ । তখন সে সবে মাত্র ম্যাটিক ক্লাশে উঠেছে, সুন্দর যােলােটি বৎসর তার বয়স। সুন্দর দু’টি চোখের কোণে কত নবীন নিখিল স্বপ্ন ; কত তরুণী কল্পনা তার তরুণ তপ্ত বুকে। কিছুদিন হ’ল এক রাজকুমার এসে বাসা বেঁধেছে তার হৃদয়ে। কুমারের প্রেম-সৌধ-চূড়ায় রেণুকার প্রাণ- প্রজাপতি পাখী হয়ে বার বার উড়ে বসে। এমনি গ্রামের এক প্রান্তে একটা বকুলগাছতলায় হত তাদের মিলন। এমনি বৈশাখের প্রান্ত বেলায় বিরহ কাতর দু’টা ক্লান্ত প্রাণ মিশতে এসে কুসুম-সুরভিত, পিক- বধূ-সংগীতমুখরিত বকুলতলায়। হত দু’জনে কত কথা ; কত ব্যথা ঝরে পড়তে অস্ত্র হয়ে। অমিয়কুমার বলতাে-রেণু, আমাদের এ অভিযান হবে গভীর ব্যথায় ভরা, হবে ব্যর্থ। আমার এমন কোন মােগ্যতা নাই তােমাকে পেতে পারি। নাই শিক্ষা, নাই চাকুরী, নাই অর্থ, এমন কি নাই আমার সুন্দর স্বাস্থ্য। বর্তমান পৃথিবীতে বাস করার কোন কুশলতাই আমার নাই, আমাকে বিয়ে করলে তােমার হবে দুঃখ, হয়তাে সুখী হতে পারবে কোনদিন। রেণুকা হেসে বলতাে-ভালােবাসা নিত্য ঐশ্বর্যময়, অন ; মন-প্রদীপ আনন্দের। শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরী-বাকুরী, টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত কত তুচ্ছ মনে হয় এ প্রেমের কাছে। তুমি সেজন্য ভেবাে না; নিঃস্ব তােমার মাঝেই খুঁজে পাবাে রাজার রাজপ্রাসাদ ; স্বর্গের সুখ শান্তি। টাকা পয়সাতেই কি জীবনে সুখী হওয়া যায় ? জীবনে সব থেকে বড় পাওয়া স্বামী স্ত্রীর মনের মিল। তুমি হবে আমার জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার ; মণি-মাণিক্য-খচিত কণ্ঠহার হবে তুচ্ছ তােমার ঐ দু’টা বাহু- কণ্ঠহারের কাছে। কিন্তু আজ? রেণুকার বক্ষ হ'তে নেমে আসে বৈশাখী ঝড়ের মতাে শুধু ঘন দীর্ঘশ্বাস। বৃদ্ধ পিতা, স্কুল মাষ্টার । মার কাছে একদিন এসে বললে- আমারই একটি পুরাতন ছাত্র কাগজের ব্যবসায় যথেষ্ট টাকা উপায় করে কলকাতায় একখানা বাড়ী করেছে। বি. এ. পাশ। স্বাধীনচেতা, চাকুরী না করে ব্যবসা করে বেশ উন্নতি করেছে। এ ছেলের সংগেই রেণুর বিয়ে ঠিক করেছি, এক কথায় সম্বন্ধ হয়ে গেছে, হবে না কেন? আমাদের রেণুর মতাে মেয়ে কটী মিলে বাংলাদেশে। যেমনি নাক মুখ, তেমনি চোখ ; ঠোট দুটো কোমল, সুন্দর পাতলা; জবাফুলের পাপড়ির মতাে রাঙা আভায় ভরা ; আর স্নানের পর চুলগুলি পিঠের উপর ছেড়ে দিয়ে যখন মেয়ে আমার রৌদ্রে গিয়ে বসে, মনে হয় আষাঢ়ের কালাে মেঘ ওর পিঠে এসে জমেছে। ফিগারটাও বেশ লম্বা, আধুনিক ছেলেরা এখন লম্বা ফিগারই পছন্দ করে; কাজেই এক কথায় সম্বন্ধ হয়ে গেছে। তােমার কোন আপত্তি নাই তাে? আপত্তি কারােরই নাই। শুধু তার প্রেমিক মন; প্রণয়-ব্যথাতুর প্রাণ, সেদিন সে পিতামাতার আপত্তিহীন মনের কাছে মাথা তুলে দাড়িয়ে বিদ্রোহ ঘােষণা করলে। কিছুতেই সে এ ছেলেকে বিয়ে করবে না। ব্যর্থ হলাে নেহাতুর অভিজ্ঞ পিতামাতা; সন্তান-বাৎসল্যে ভরে’-উঠা তাদের মমতাময় প্রাণ । মেয়ের অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে চেয়ে তারা ;
মরুপ্রদীপ ভুলে গেলাে ব্যবসাদার অর্থশালী বরের কথা; তাদের জীবনের স্বপ্নময় কল্পনা প্রেম-অভিজ্ঞতার কাছে হ’লাে ব্যর্থ। তারপর কেটে গেছে দশ বৎসর। ম্যাটিক পাশের সাথে সাথেই বিয়ে হলাে তার সেই বকুলতলার প্রিয় অমিয়কুমারের সাথে । বিয়ের বছরখানেক পর মারা গেল, ব্যথিত পিতা। বেকার আই. এ. ফেল স্বামীকে নিয়ে কিছুদিন দেশের বাড়ীতে ঘর-সংসার করলে। বছরে চারিটি সন্তানের জননী হ’ল; সংসারের খরচ বাড়লাে চারগুণ কিন্তু আয়ের ঘরে নাই জমা একটি পয়সা। ক'দিন আর বসে খাওয়া চলে? স্বামী অমিয়কুমারের কোন চাকুরী হলাে না। চাকুরী হওয়ার মতােও তার কোন কাৰ্যকুশলতা নাই। ভবঘুরে, ছিন্নমতি চঞ্চল যুবক। রেণুকার চোখে এলাে জল। স্বামী দেবতা, কিছু বলাও যায় না অথচ এ-দারিদ্র্য সহ করাও যায় না। ছেলেপুলের মুখের দিকে চাইলে কান্না আসে। শুষ্ক দীন মুখ, হাড় বেরিয়ে পড়া স্বাস্থ্য, ছিন্ন মলিন বেশ। এ দরিদ্র ঘরে এ শিশুগুলির জন্ম না হলেই ভালাে হত। না, এখন আর বসে থাকা চলে না। সে নিজেও দু’পয়সা রােজগার করতে পারে। ম্যাট্রিক পাশ সে; কোন বালিকা বিদ্যালয়ে মাষ্টারী করে’ ত্রিশ, চল্লিশ টাকা অনায়াসে উপার্জন করতে পারে। চলে এলাে রেণুকা তার দেশের বাসা ভেংগে সুদূর গ্রামে চাকুরী নিয়ে। কিন্তু মাহিনা মিললাে মাত্র পঁচিশ টাকা। স্বামী স্ত্রী, চারটি সন্তান, আর মা-এ ক’জনের পঁচিশ টাকায় কি করে চলে? চাল একমণ পঁচিশ টাকা, শাড়ী একখানা আট টাকা। যুদ্ধ কি শুধু ব্রিটিশ জাপানে? বিশ্বের প্রতি ঘরে আজ যুদ্ধ। বেঁচে থাকার জন্য আজ প্রতি গৃহে জীবন-সংগ্রাম। মহাযুদ্ধ পৃথিবী ব্যাপী; খণ্ডযুদ্ধ, খণ্ডপ্রলয় আজ ঘরে ঘরে। কিন্তু এমন দুর্দিনে প্রত্যেক গৃহেই মেয়েদের আশ্রয়, মেয়েদের আশা ভরসা, পুরুষের উপার্জনশীল প্রশস্ত বক্ষস্থল। রেণুকার দু চোখ বাঁধনহীন ব্যথাভাতুর মরুপ্রদীপ অশ্রুধারায় ভরে উঠে। সে আজ কত আশ্রয়হীন! অকুল সমুদ্রে ঝড়ের রাতে ভাসমান দিশাহারা একখানি তরণী যেন তার চোখের সমুখে ভেসে উঠে। রেণুকা ঘরে এসে তাড়াতাড়ি একটু চা খেয়ে আবার একটি মেয়েকে গান শিখাতে বের হয়। মাত্র তিন টাকা মাইনে, সপ্তাহে তিনদিন। পাড়াগাঁয়ের মেয়ে লেখাপড়াই শিখে না, গান তাে দূরের কথা-তবু বলে কয়ে বিশেষ অনুরােধ করে’ এ তিন টাকার চাকুরিটা সংগ্রহ করে নিয়েছে। কিন্তু ছাই গান ; মেয়েটার নাই সুর, নাই ভাল। কেবল হারমােনিয়ামটা নিয়ে একটু পোঁ পোঁ শব্দ করা। ঘণ্টাখানেক পর সন্ধ্যার একটু আগে রেণুকা আবার ঘরে ফিরে। দীঘির পাড়ে ঐ আমবাগানের ভিতর দিয়ে ছায়াঘন নিবিড় নির্জন পথ। রেণুকার মনের ছায়া ঘন আঁধার যেন এখানে এসে কেঁদে উঠে। রেণুকা আপন মনে গাইতে থাকে। দুঃখের বেলা ওই বয়ে যায়, দুখের নিশি সমুখে ঘনায় । জীবন ভরা আঁধার ছায়া মিছেরে আজ গৃহের মায়া, কে জানে এই জীবনধারা মিশবে সাহারায়। রেণুকার প্রাণস্পশী সংগীত-সুরে কেঁপে ওঠে সারা আত্ৰৰন কাপে দীঘির কালাে জল, কঁপে কলসী কাখে দীঘির ঘাটে দাড়ানাে গ্রাম্যবধূর বুক। শেষে সন্ধ্যার আঁধার কূলে মিশে যায় আঁধার তপ্ত রেণুকার সংগীত সুর। ঘরে ফিরে’ রেণুকা প্রাণ হ'তে প্রিয়, মায়াময়, শাড়ীখানা ব্যাকুল অন্তরে ছেড়ে যত্নসহকারে রেখে দেয়, ভাল কাপড় মাত্র এখানাই ; সারাক্ষণ পরা চলে না। ছেড়া আর একখানা বহু পুরাতন কাপড় পরে এ-প্রদীপ ভেসে উঠে আবার রান্না ঘরে ঢােকে। মা বৃদ্ধা, রান্না তাকেই করতে হয়। রান্না শেষ করে আগে ছেলেপুলেদের খেতে দেয়। কিন্তু আজকাল ছেলে- মেয়েগুলি এত রাক্ষুসে হয়েছে যে, কেবল বার বার খেতেই চায় । সম্পূর্ণ পেট না ভরা পর্যন্ত কিছুতেই উঠবে না। আজ রেণুকা শেষে বড় ছেলেটার গালে একটা চড় মেরে বললে, রাক্ষস হয়েছি! আঠাশ টাকায় পেট ভরে খাওয়া চলে না, সে জ্ঞানটুকু তােমার এতদিনেও হলাে না? অবােধ শিশু কিছুই বুঝতে পারে না; শুধু মার মুখের দিকে চেয়ে কেঁদে কেঁদে বলে, মা পেট ভরেনি। রেণুকার বক্ষ কি যেন দারুণ আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে যায় ; রক্তাক্ত হয়ে উঠে তার সকল তনু মন ; বেদনায় ভেংগে যায় তার মর্মস্থল। চোখের কোণে ভেসে উঠে নিপীড়িত মাতৃস্নেহের বেদনা-ধারা। চোখের সম্মুখে তার পিতার সেই ছাত্রীর কথা। হয়তাে আজ সে লক্ষপতির স্ত্রী হয়ে এ অবােধ ক্ষুধার্ত শিশুগুলির মুখে তুলে দিতে পারতো দুগ্ধ-অম; গড়ে তুলতে পারতাে রাজপুত্র করে। কিন্তু তার সেই যৌবন দিনের অন্ধ প্রেম, দীন ভালবাসা করেছিল তাকে মুগ্ধ। সেই অনভিজ্ঞ বিষাক্ত প্রেম আজ দুর্ভিক্ষপীড়িত চারটি সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করে তাকে কাদাচ্ছে বায়ােমাস। পিতামাতার অভিজ্ঞতাকে সে সেদিন করেছিলাে অবহেলা, দলিত মথিত, কিন্তু আজ সে নিজেই হয়ে গেছে চিরজীবনের তরে দারিদ্র্যের চরণতলে ক্ষতবিক্ষত। প্রেমের অভিশাপে আজ সে দলিত মথিত। অনভিজ্ঞ সেদিনের প্রেম আজ তার গৃহে চিরক্ষুধার্ত। চির অশ্রুময়। ক্ষুধার্ত ছেলেটিকে রেণুকা, শেষে কোলে তুলে অশ্রুসিক্ত চুম্বন ছেলেটীর অশ্রুসিক্ত নয়নতলে ঢেলে দিয়ে বলে, লক্ষ্মী ছেলে, আজ যাও, কাল পেট ভরে খেতে দেব।
চাইলে । ক্ষুধার্ত ভিখারী। কিন্তু এরাও আমার মতাে মানুষ, একটু দাড়িয়ে দেখতে আপত্তি কি ? দেখি ওরা কি করছে । ভয়ানক দুঃখ হয় ওদের দিকে রাস্তার উপর কি ভাবে পড়ে আছে। সামনেই আবার ডাষ্টবিনটা। কি বিশ্রী গন্ধ ! বলে প্রায় ঘণ্টাখানেক সিটী কলেজের সামনে রাস্তার ফুটপাথে দাড়িয়ে রইলাম। পায়ের তলে একবার ভালাে করে চেয়ে দেখলাম, কোন ময়লা নাই তাে? পচা-গলা কোন ইদুর, কোন বিড়ালের বাচ্চা অথবা কাদা; কারণ কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে, রাস্তার মাঝে মাঝে কাদা ও জল জমে রয়েছে। নতুন পাস্তু জোড়া সেদিন কিনেছি, বেশ মায়া আছে জুততা জোড়ার জন্য । কিন্তু রাস্তার এ জল-কাদা ও ডাষ্টবিটার কাছে ময়লা পচার উপর যে মানুষগুলি শুয়ে আছে, তাদের জন্য আমার সে মায়া নাই ; থাকলে নিজের পায়ের তলে না চাওয়াই উচিত ছিল। নিজের মনুষ্যত্বকে সন্দেহ করলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম, আমি বর্তমান সভ্যসমাজের শিক্ষিত মানুষ, মনুষ্যত্ব না থাকলেও আজকাল চলে। আমার ঠিক সামনেই কয়েকটি ভিখারী। ঠিক ভিখারী বলা চলে ; দেখে মনে হয় মধ্যবিত্ত ঘরের লােক, খেতে না পেয়ে এখন ভিখারীর বেশে পথে বেরিয়েছে। ওদের কিছু দূরে আরাে অনেকগুলি ভিখারী, বৃহৎ ভিখারীর সংসার যেন। রাস্তার উপর গায়ে গায়ে লেগে পড়ে রয়েছে। তাদের কথা ছেড়েই দিলাম । আমার ঠিক সামনের লােক ক’টির কথাই বলছি। মনে হলাে : স্বামী, স্ত্রী, একটি ছােট ছেলে, আর বায়াে তেরাে বছরের একটি মেয়ে। মেয়েটিকে উলংগ বলা চলে, সামান্য ছেড়া ন্যাকড়া কোমরে জড়ানাে মাত্র। পঁচিশ টাকা দামের শাড়ীপরা নিজের বিলাসিনী বােনটির দিকে মনে মনে একবার তাকালাম মরু-প্রদীপ সমস্ত অংগ শিউরে উঠলাে। চোখের সামনের ঐ মেয়েটা যদি আমার -বােন হত, তবে? সহসা মুখে হাসি ফুটে বের হলাে, এ মেয়েটি ভিখারিণী, আমার বােন নয় । ও-সব বাজে কথা চিন্তা করি কেন? আমি শিক্ষিত ভদ্রলােক, সংগে সংগে বােনের আর একখানা শাড়ী আরও একটু বেশী দামে কিনে দেবার কথা ভাবলাম। ছেলেটি শুয়ে আছে না মরে গেছে ঠিক বুঝা যায় না, শায়িত জীবিত দেহের চেয়ে শায়িত মৃতদেহের ভাব-লক্ষণই বেশী । স্বামী স্ত্রী পাশাপাশি বসে। মেয়েটি একটা ভাংগা বাসন হাতে করে দাড়িয়ে। একটু দুরেই সরে দাড়িয়ে আছি। যদি পয়সা চেয়ে বসে। মেয়েটি বার বার আমার দিকে চাইছে। কিন্তু সামনে এসে কিছু সাহায্য চাইতে সাহস পাচ্ছে না যেন। কারণ আমার সর্বাংগে ভদ্র-বিলাসী মানুষের আভিজাত্য। মেয়েটি যেন জানে—এ শ্রেণীর লােকগুলির কাছে সাহায্য চাইলে ধমক খেতে হয়। প্রাণটা আমার সত্যই কেঁদে উঠলাে। কী মলিন কাতর মৃত্যুময় ভীরু চেহারা। ছায়া, না কায়া ঠিক যেন বুঝা যাচ্ছে না, মানুষ না মানব-কংকাল বুঝা শক্ত। খেয়ে খেয়ে ক্ষয়িষ্ণু চেহারায় এসে দাঁড়িয়েছে; যে চেহারায় মানুষকে মানুষ বলতে ভ্রম হয়। সেই শত ছিন্ন ধূলি-লুষ্ঠিত দলিত পীড়িত চেহারা। সন্দেহ হলাে—সত্যই কি এরা মানুষ? মেয়েটি ঠিক আমার সামনে সােজা এসে দাড়ালাে, মুখখামুখি। অসহ ক্ষুধায় হাতের শুকনাে থালাটা বার বার চাটছে ; থালার খাদ্যবস্তু কিছুই নাই ; শূন্য থালায় শুধু ক্ষুধার্ত দীর্ঘশ্বাস, চোখের সামনে বাংলার জীবন্ত চিতা যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আমার মুখে দু পয়সা দামের একটা সিগারেট জ্বলছে, আকাশে ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে। আমার শিক্ষাকে উপহাস করে যেন মেয়েটি কাছে এসে’ বললে, সিগারেট খাবাে। বললাম, সিগারেটে কি পেট ভরে ?
১৬ বললে—আপনি খান কেন? পেট ভরে খাবার পর তাড়াতাড়ি হজম হবার সৌখিনতা, তুমি খাবে কেন? তােমার পেটে নেই ভাত; লজ্জা ঢাকবার মত কাপড় ; নগ্ন বক্ষস্থল। ক্ষুধার্ত মুখের উপর হতে নামিয়ে এনে বস্তু-কাংগাল নগ্ন বক্ষ দু’টি থালাটি দিয়ে সহসা ঢেকে দিল। একটা তীব্র যাতনায় মেয়েটির সর্ব অংগ যেন কাপতে লাগলাে। দু’টি চোখে বিষাক্ত কায়ার মুর; নীরব নিস্তব্ধ, অবিহীন, শুকিয়ে গেছে ওর সমস্ত অংগ পৃথিবীর সমস্ত রসধারা হ’তে। পাষাণ চোখ, পাষাণ বুক, পাষাণ ওর পদতল। সহসা শান-বাঁধানাে পথের উপর থালাটা ছুড়ে ফেলে দিলাে; থালাটা ভেংগে টুকরাে টুকরো হয়ে গেলাে। সংগে সংগে আমিও ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলাম। টুকরা টুকরাে হয়ে গেলাে আমার শিক্ষা, দীক্ষা, সভ্যতা, ভদ্রতা। সম্মুখের সিটী কলেজটাও যেন আমূল কেঁপে উঠলো। মেয়েটা শেষে তার মার কাছে ঝাপিয়ে পড়ে' চীৎকার করে বললাে মাগাে, মা•••মা ! সেই ক্ষুধার্ত “মাগাে, মা” কান্নার সুর যেন সারা বাংলায় ঘুরে’ বেড়াতে লাগলাে। অসীম বেদনাভরা ক্ষুধাক্লিষ্ট মুখে মেয়েটার মা আমার দিকে নীরবে চেয়ে কি যেন সাহায্য প্রার্থনা করলে ; কিছু বলল না, বলবার প্রয়ােজনও হয় না। ঐ বিরাট বেদনাভরা মুখ যার দিকেই তুলে ধরুক সেই বুঝতে পারবে-সে কি চায়। আগেই ঠিক করে রেখেছি এক পয়সা দিয়েও সাহায্য করবে না ; কারণ কোন ভদ্র শিক্ষিত লােকই সাহায্য করে না, কাজেই অমানুষের মতাে চুপ করে দাড়িয়েই রইলাম। ব্যর্থ হলাে সে। এমনি সে ব্যর্থ হয়েছে লক্ষবার। লক্ষ মানুষ তার পাশ কেটে চলে গেছে। দেখে গেছে তার ক্ষুধিত নগ্ন মুমু জীবন- প্রদীপ দিন দিন নির্বাপিত হ'তে ! কিন্তু সে দেখা শুধু চোখের দেখা- মুখ ফুটে মরু-প্রদীপ মানুষের সমাজের অসীম দৃষ্টি নিয়ে বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত লােককে কেউ - দেখে না। আমিও দেখলাম না। লােকটা বসে ছিলাে, এবার উঠে দাড়ালাে। দাড়াতেও পারে না; কাপতে কাপতে পড়ে যায় যেন। একটা শত ছিন্ন কঁাথার ভিতর থেকে একটা মাটির হাঁড়ি বার করে নিলাে। সামনের ডাষ্টবিষ্টার উপর ঝুকে পড়ে’ খাদ্য অনুসন্ধান করতে লাগলাে। কিছুই পেলাে না। একটা মরা ইদুর বার বার নেড়েচেড়ে শেষে রাস্তার উপর ছুড়ে ফেলে দিলো। চারিদিকের অন্যান্য ভিখারীরা ছুটে এসে ইদুরটা নিয়ে টানাটানি করলাে; ইদুরটা ছিড়ে টুকরাে টুকরাে হয়ে গেলাে। কেঁপে উঠলাে আমার পায়ের তলে সমস্ত সভ্য জগৎটা। কেঁপে উঠলাে সামনের প্রশস্ত রাস্তাটা। জীবন্ত জীবনের উন্মত্ত কোলাহল। উচ্চ শিক্ষিত আধুনিক তরুণ তরুণী। অসীম হৃদয়-বন্যা ঢেলে’ পথ চলেছে। লক্ষ প্রাণের সুর যেন দু’জনারই বক্ষ হ'তে ছুটে পড়ছে। তরুণী বলছে, আজ দেশের এ দারুণ দুর্দিনে প্রকাশ্য দিবালােকে পথের উপর দু’জনে মিলে প্রেমচর্চা না করে দেশের চিন্তা করাই অধিক প্রয়ােজন। তরুণ ভদ্রলােকটী তরুণীর সম্মুখে এসে পথরােধ করে দাড়িয়ে বললাে-কেন মানব-প্রেমের ভিতর দিয়েই দেশপ্রেমের পথ খুঁজে নিতে হয়। -বাবু, দয়া করে একটা পয়সা দেবেন? আজ কদিন ধরে না খেয়ে আছি। বলে মেয়েটীর মা তার হাতের হাঁড়িটা তরুণ তরুণীর সামনে তুলে ধরলো। ভিখিরীদের জ্বালায় রাস্তায় দাড়িয়ে দু’মিনিট কথা বলা যায় না। এই রিকসা ! ইধার আও। রিক্সাওয়ালা কাছে এলে দু’জনেই উঠে বসলো। তরুণীর নগ্ন কাধের উপর তরুণের বাম হাত লতিয়ে রইলাে। বললাে, চিত্রা সিনেমা মে চলল। ওদের উচ্ছঙ্খল প্রেমের লম্বা বক্তৃতা শুনে চিটা জ্বলে উঠলাে। কেঁপে উঠলাে যেন ভিখারিণীর হাতের শূন্য হাঁড়িটা। হাঁড়িটা থত্ব মরু-প্রদীপ ১ থর করে কেঁপে কংকাল হাতখানি থেকে পড়ে যেতে চায় যেন। অসহ বেদনায় এবার নিজেই ভেংগে পড়লাম। পকেট থেকে একটা দু’আনি -- তুলে এনে হাঁড়ির মধ্যে ফেলে দিলাম। সমস্ত অংগ-ধ্বংসী দারুণ ক্ষুধার কাছে এ দু’আনিটা যে কত তুচ্ছ, তা নিজে ভেবেও লজ্জিত হলাম। কিন্তু ভিখারিণীর মা এ দু’আনিটার দিকে চেয়ে রইলো অসীম রাজ- ভাণ্ডারের দিকে চেয়ে থাকার মত চোখে। ওদের কাছে আজ একটা দু’আনির মূল্য সমস্ত ভারত-সাম্রাজ্যের সমান। বাংলার আকাশ-ভরা বােমারু বিমানও আজ এ দু’আনির কাছে তুচ্ছ। শীর্ণ অবশ অংগুলি ক’টি দিয়ে মেয়েটির মা ঐ দু’আনিটি সজোরে চেপে ধরলাে। আকুল সাগ্রহে তুলে ধরে বার বার বুভুক্ষিত চোখে দেখতে লাগলাে ! সত্য ! না স্বপ্ন ! বিপুল বিস্ময় তার চোখের তলে। এমন সময় মেয়েটি মার হাত থেকে দু’আনিটি বাজ-পক্ষীর মত ছো মেরে তুলে নিয়ে ছুটে চললো। মা স্তব্ধনেত্রে সেদিকে চেয়ে রইলাে। পাশে ফুটপাতের উপর ছেড়া একখানা গামছা পরে বসা মেয়েটির বাপ চীৎকার করে বলে উঠলাে—পাজী মেয়েটা ক্ষিদের জ্বালায় আরও পাজি হয়েছে। দু’আনিটা নিয়ে পালালাে বুঝি ! ওর একা খেলেই চলবে? এদিকে আসুক না একবার, মেরে খুন করে ছাড়বাে না ওকে...। সম্মুখে একটা ছােট গলি, বিয়ে বাড়ীর শানাই বাজছে। সেদিকে মেয়েটির মা ছায়ার মত কায়া বহন করে এগিয়ে গেলাে। দু’টি পাণ্ডু চোখের সামনে যেন জ্বলছে জগৎ-শ্মশান ; লাল, নীল, কালাে- বহি ভরা সেই শ্মশান। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর বিয়ে বাড়ীর বাঁশীর আর্তনাদ শুনে’ কাংগালিনী মা ধনীর দুয়ার থেকে ফিরে এলাে। হ আর্তনাদই বটে! দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার বুকে ধনীর আমােদ- আহাদ, বিবাহ-উৎসব—আর্তনাদের মতই মনে হয়।
মরু-প্রদীপ ভিখারিণী মা ফিরে এলাে, হাতে একটি কচ্ছপের বুকের হাড়। - বিয়ে বাড়ীর দরজার সম্মুখে রাস্তার উপর থেকে কুড়িয়ে এনেছে। হাড়টা থেকে তাজা রক্ত পড়ছে, সদ্য কাটা। ক্ষুধাতুর বুকের রক্ত- রাঙা ছবি যেন কাংগালিনীর হাতে। স্বামীর পাশে বসে’ বললাে—রক্ত পেয়েছি! খাবে? বিয়ে বাড়ীর পাশে কুড়িয়ে পেয়েছি, মাংস তাদের ; রক্ত আমাদের। তীক্ষ্ণ অট্টহাসি হেসে বললে-খাও, খেতে হবে, বাঁচতে হবে । এমন সময় মেয়েটি হাতে করে খানকয়েক টুকরাে রুটা নিয়ে এসে বললাে—দু’ আনার রুটী এনেছি। –কি বললে ! রুটী! মা ঠিক তেমনি মেয়ের হাত থেকে রুটীর টুকরাে বাজ পাখীর মত ছোঁ মেরে’ তুলে নিয়ে কচ্ছপের বুকের রক্তাক্ত হাড়টার উপর রাখলাে, শেষে মা, মেয়ে ও বাপ তিনজনে একত্রে বসে খেতে আরম্ভ করলে। কচ্ছপের রক্তে রুটী ভিজিয়ে খেতে লাগলাে; কাচা কচ্ছপের হাড়, কাচা রক্ত, কাচা রুটী। পাশ্বে শায়িত ছেলেটাকে মা ডাকলাে—খােকা খাবি? আয় । কঁাথার নীচে ছেলেটি। কোন সাড়া শব্দ নেই, মা রক্তে মাখা একটু রুটী নিয়ে কথা তুলে’ খােকার মুখে দিতে গিয়ে দেখে থােকা নেই। পিতা মায়ের হাতের রুটির টুকরাে কেড়ে নিয়ে নিজের মুখে ফেলে দিয়ে পাষাণ হাসি হেসে বললাে—মরে নি, বেঁচেছে। এমন সময় কোথা থেকে একটা ক্ষুধার্ত কুকুর এসে ঠিক তেমনি কচ্ছপের হাড়খানা বাজপাখীর মত ছোঁ মেরে জোড়ে কামড় দিয়ে তুলে দৌড়িয়ে রাস্তার ওপাশে চলে গেলাে। মেয়েটি কুকুরটার দিকে কতক্ষণ চুপ করে চেয়ে থেকে কেঁদে কেঁদে বললােহাড়খানায় আয়াে অনেক রক্ত ছিলাে। পিতা গভীর বিষাদ চোখে কুকুরটার দিকে চেয়ে বললাে-ক্ষুধার্ত।
পল্পী-প্রান্তে ম্যাটিক পাশ করেই দেবপ্রসাদ চাকুরীতে ঢােকে—কলকাতা শহরের একটা ব্যাংকে। পাঁচ বছর কেটে গেছে অবিশ্রান্ত অফিসের খাটুনিতে। আজ এক মাসের ছুটী পেয়ে দেবপ্রসাদ বাড়ী রওনা হ’লল। সুদূর পাড়াগাঁয়ে বাড়ী। গাড়ী থেকে নেমেই লঞ্চে উঠলাে। ছােট নদী। বর্ষাকাল, শ্রাবণ মাস। জল-যৌবনে নদীবক্ষ টলমল। লঞ্চ চলছে লঞ্চটার সর্বাংগ শুভ্র, সুগভীর নীল জলের স্রোতে যেন শ্বেতপক্ষ রাজহংস। নদীর দু'ধারে বহুদূর পর্যন্ত বিল। শ্রাবণের বরষা-প্লাবিত, চারিদিক ঘিরে কূলহীন অনন্ত সমুদ্র যেন। দেবপ্রসাদের মনে আজ কত কথা ফুল হয়ে ফুটে উঠছে। চারিদিক থেকে ছুটে আসছে যেন শ্যামল স্নিগ্ধ বরষা-সিক্ত পল্লী-পরশ। শহরের এ পাঁচ বছরের কারারুদ্ধ জীবনের পর আজ এ উন্মুক্ত সুনীল আকাশ, এ টলমল ছােট নদীর জল, আর দু’পাশে নীল সাগরের মতাে দিগন্ত ব্যাপী এ ভরা বিল—সকলই আজ দেবপ্রসাদকে ছুটীর নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে। কিন্তু নদীটা আজ যেন অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে ; পথ ফুরােয় না যেন ; অবিরল লঞ্চের গতি ; তবু মনে হয়, কতদূর? সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শ্রাবণ সন্ধ্যা, গভীর ঘন অন্ধকার। লঞ্চটা আরাে একটু এগিয়ে এসে নদীর এ মােড়টা ছাড়াতেই সামনে স্পষ্ট দেখা গেলে-নদীর জলের উপর কতগুলি বাতি জ্বলছে, জোনাকীর মতাে দেখতে দেখতে লঞ্চটা ঐ বাতিগুলির মাঝে এসে ঢুকলাে ; আস্তে আস্তে থেমে গেলো। এখানেই লঞ্চের ষ্টেশন। কারণ বর্ষাকালে এ মধ্যনদীর জলের উপরই ষ্টেশন বসে। নদীর তীরে আসল ষ্টেশন এখন জলের নীচে। চারিপাশে এ ছড়িয়ে-পড়া বাতিগুলি নৌকার ১০১ মরু-প্রদীপ ; বাতি। প্রত্যেক প্যাসেঞ্জারের জন্য নিজ নিজ বাড়ী থেকে নৌকা নিয়ে চাকর এসেছে হারিকেন বা লণ্ঠনের বাতি জ্বেলে। যাদের চাকর নেই তাদের এসেছে হয়তাে ছােট ভাই বা আর কেউ। প্যাসেঞ্জাররা লঞ্চ থেকে ডাকাডাকি শুরু করছিলো—অঃ মনা, অঃ গদা! অঃ টেপা ! ল্যাংড়া ! প্রত্যেক নৌকো থেকে সাড়া এলাে এই যে এসেছি। নদীর জলের উপর ছােটখাটো একটা হাট বসলো যেন, এত কলরব! আস্তে আস্তে সব প্যাসেঞ্জার যে যার নৌকোয় নেমে চলে গেলে, ক্ষান্ত হলাে সব কোলাহল। দেবপ্রসাদ ভারী বিপদে পড়লাে ; নকড়িকে চিঠি লিখলে সে নিশ্চয়ই নৌকো নিয়ে আসততা, কিন্তু এখন উপায়? ভাড়া দিয়ে নৌকো পাওয়া যায় না! দেবপ্রসাদ নোকোর মাঝির অনুসন্ধান করলাে। শেষে মিললাে একটা নৌকো। মাঝি বলল-কোথায় যাবেন বাবু? দেবপ্রসাদ বললে—এই কাছেই আমাদের বাড়ী, এখান থেকে মাত্র পণেরাে মিনিটের পথ। —দু টাকা দেবেন। দু’ টাকা! বলল কি ? আজ্ঞে কত্তা, একসের চালের দাম মাত্তর। তেরশ’ পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ তখন, বাংলা দেশ শ্মশান। দেবপ্রসাদ আর কিছু না বলে’ নৌকোয় উঠে বসলাে। মাঝি নৌকো বেয়ে’ চললাে। নদী ছেড়ে নৌকো এসে ঢুকলাে একটা খালের ভিতরে। গভীর ঘন অন্ধকার; নৌকোর দু'ধারের কালাে জলস্রোতের মতাে অন্ধকার স্রোত চারিদিকে। আশে-পাশে অনেক গৃহস্থ বাড়ী। ছেলেপুলের কামা শােনা যায় ; কিন্তু বাড়ীগুলি গভীর অন্ধকারে ঢাকা। সন্ধ্যাপ্রদীপের শিখা নাই কেন ? দেবপ্রসাদ মাঝিকে বললে, গ্রামের বাড়ী-ঘরে আজকাল সাঁঝের বাতি কেউ জালে না?
মর-প্রদীপ ১০২ —বাবু, শহরে থাকেন, পাড়াগাঁয়ের খবর আপনারা কি রাখেন? দুনিয়া আজ আঁধারে ঢেকেছে ; কেয়ােসিনের অভাবে ঘরে কারাে বাতি জ্বলেনা; চালের অভাবে কারাে পেটে নেই ভাত। পেটে অন্ধকার, চোখে অন্ধকার ; দুনিয়াময় অন্ধকার। আলাে দেখবেন কোত্থেকে ? খালের দু’পাশে জলমগ্ন ঘন বেতসের বন ; মাঝে মাঝে হিজল ও মাদারের বৃক্ষসারি। হিজল মাদারের মুয়ে-পড়া ডালপালা আর বেতসের পাতাগুলি খালের উপর এসে ঝুকে পড়েছে। খালের উপর ভয়ানক জংগল জমে উঠেছে ; দেবপ্রসাদ মাঝিকে জিজ্ঞাসা করলাে- রাস্তা এত অপরিষ্কার কেন? এত বন-জংগল কি করে হ’লল। মাঝি বললে-এবার কি দেশে লােক আছে, দুর্ভিক্ষে লোেক গেছে মরে’; যারা ছিল তারাও ম্যালেরিয়ার ভয়ে পালিয়েছে শহরে। দেশে দিনের বেলা শেয়াল ডাকে ; বাবু, যুদ্ধ, দেশে ঘুঘু চড়িয়ে ছেড়েছে। মানুষ গেলাে সব না খেয়ে মরে, তবু যুদ্ধ থাম্লােনা। দেবপ্রসাদ নীরবে দীর্ঘ নিশ্বাস টানলো। আর একটু এগিয়ে একটা পতিত ভূমি। এ জায়গাটা অনেক উচু, জলে ডুবে যায় নি ; ঠিক খালের তীর ঘেঁষে। দেবপ্রসাদ সেদিকে চাইলে, এই জায়গাটা আবার একটু অস্বাভাবিক উচু। দেবপ্রসাদ বুঝতে পারলাে ; বললে- মাঝি, কে মরেছে? এ কবর কার? মাঝি এ খাল দিয়ে সর্বদা নৌকো বেয়ে আসা যাওয়া করে। খাল ধারের সব খবর জানে সে। বললে- বাবু, এখানে কি একটা কবর? এ উচু জায়গাটা ভর্তি কবর ; প্রায় দশ বারাে জন লােক মারা গেছে সামনের এ মুসলমান বাড়ীটা থেকে ; সব না খেয়ে মরেছে। সামনের যে কবরটা দেখছেন, এখানে মতালী মিঞাকে মাটি দেওয়া হয়েছে; বুড়াে বয়সে মিঞা না খেয়ে মারা গেলাে। দেবপ্রসাদের চোখের সামনে জেগে উঠলে দশ বছর আগের এই মতালীর কথা। এ গাঁয়ের একই পাড়ায় তাদের বাড়ী। দেবপ্রসাদ ১০৩ মরু-প্রদীপ তখন খুব ছােট ; কিন্তু আজও সব কথা স্পষ্ট মনে আছে। দেব- প্রসাদের বাবা ছিলেন একজন বড় দরের পাট ব্যবসায়ী। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে’ মুসলমান গৃহস্থদের বাড়ী থেকে পাট কিনতে এ মবতালীই ছিলাে তার একমাত্র দোসর। মণ প্রতি দু পয়সা কমিশন পেতে সে, তাতেই তার বেশ দু’পয়সা জমে উঠেছিলাে। বাড়ীঘরের চেহারা হয়ে উঠেছিলাে অবস্থাপন্ন মুন্সি সাহেবের মতাে। সাহেবের মতাে। দেবপ্রসাদের পিতাকে উদ্দেশ করে’ লােকের কাছে বলতাে, ও-বাড়ীর চাচা যতদিন আছে ততদিন মবতালীর ভাতের অভাব হবে না। সত্য সত্যই দেবপ্রসাদের বাবা যেদিন হঠাৎ কলেরায় মারা গেলেন, এ মবতালীই মৃতদেহের পাশে ধূলােয় লুটিয়ে পড়ে কেঁদে কেঁদে বলেছিলো, হায় আল্লা! একি করলে ! এবার না খেয়ে মারা যাব যে। এর পরও প্রায় বছরখানেক দেবপ্রসাদের পিতার শ্মশানের কাছে এ মবলীকে প্রায়ই একা একা ঘুরতে দেখা গেছে। এমনি ছিলাে একজন হিন্দুর ও একজন মুসলমানের এক অন্যের প্রতি প্রাণের আকুল টান, জীবনব্যাপী আকুল নির্ভরতা, আকুল প্রীতি ও ভালবাসা। দু’জনের পৃথক ধর্ম ছিল মিথ্যা ; দু’জনের একই মানব হৃদয় ছিল সত্য সুন্দর। আজ এ মবতালীর কবর দেখে দেবপ্রসাদের চোখে এলাে জল। মৃত পিতার ও মৃত মবতালীর উদ্দেশ্যে মাথা নত করে সে প্রণাম জানালাে। বললে, তােমরাই ছিলে বাংলার খাটি মানুষ। আজ বাংলার হিন্দু-মুসলমান কত অর্থশূন্য হয়ে পড়েছে। মবলীদের বাড়ী বাঁদিকে ফেলে, ডান দিকে ধােপ বাড়ী ও বাউল বাড়ী রেখে নৌকো এসে একটা বকুল ও বটগাছের তলে পৌছালাে। খালের তীর ঘেষে’ গাছ দুটো জড়াজড়ি করে দাড়ান। দেবপ্রসাদের গা ভয়ে ছমছম করে উঠলাে। এ গাছ দুটো আশ্রয় করে’ কি এক ভয়াবহ দেবতা বাস করে। এ গ্রামের লােক নিজেদের মংগলের জন্য মরু-প্রদীপ ১০৪ ; মাঝে মাঝে ঢাক ঢােল বাজিয়ে গাছতলায় এসে পূজো দেয়। গাছের গােড়ায় তেলসিন্দুর মাখে। মাখে। দেবপ্রসাদও ছােটবেলা ঠাকুমার সংগে এসে কতবার পূজো দিয়ে গেছে ; কত ফুল বেলপাতা গাছের গােড়া থেকে তুলে নিয়ে ঠাকুরমা তার কপালে ঠেকিয়ে নাতির দীর্ঘজীবন কামনা করেছে। দেবপ্রসাদ আজও ভয়ে ভয়ে গাছ দুটোর দিকে চোখ তুলে চাইলে; ছােটবেলার সংস্কার সে আজও ছাড়তে পারে নি। শেষে গাছের অজানা দেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালাে। “যার যার বঁায়”—সম্মুখ থেকে কণ্ঠস্বর শােনা গেলাে । দেবপ্রসাদের নৌকোর মাঝিও সাড়া দিলাে “যার যার বয়”। কিছুক্ষণ পর সম্মুখ থেকে একখানা নৌকো এসে দেবপ্রসাদের নৌকোর ডান পাশ দিয়ে চলে গেলাে। অন্ধকার রাতে নৌকোয় নৌকোয় কোন ঠোক্কর লাগলােনা। বেশ সুন্দর সহজ গতিতে নৌকো দু'খানা নিজ নিজ বা দিক্ ধরে চলে গেলাে। শহরের “কিপ, টু দি লেফট” কথাটা দেবপ্রসাদের মনে পড়লাে; দেবপ্রসাদ শিউরে উঠলো; দিনরাত শহরে তবু কত মােটর এসিডেন্ট। উচ্ছংখল সমস্ত শহর; শহরের সমস্ত যানবাহন ; সমস্ত পাশ্চাত্য লীলাভংগী । দেবপ্রসাদ খালের জলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে দিয়ে আঁজল ভরে জল তুললাে; চোখের সামনে ধরে’ বললাে কি সুন্দর টলমল করছে । হাতের জলের আয়নার ভেতর দিয়ে চাইলে; আকাশের তারাগুলি চোখের সামনে ঝলমল করছে যেন। একটা কলমীদলে নৌকো ঠেকলো ; কলমী ফুলগুলি সুন্দর ফুটে রয়েছে ; দেবপ্রসাদ হাত বাড়িয়ে একটা ফুল তুলে এনে নাকের কাছে ধরলল, গন্ধ নেই। হঠাৎ ফুলের বুকে আলাে জ্বলে উঠলল। দেবপ্রসাদ চমকে উঠে ফুলটা জলে ফেলে দিলাে। একটা জোনাকী আলাে জেলে’ জেলে’ উড়ে চলে গেলাে। শহরে তার ঘরের বিজলী বাতিটা এতদিন তাকে জেলে পুড়ে দিয়েছে যেন •• দেবপ্রসাদ ভালাে।
১৫ মরু-প্রদীপ খাল ছাড়িয়ে এবার নৌকো এসে দীঘিতে পড়লাে ; দক্ষিণ তীরে আমবাগানের ভিতরে ছােট বাড়ীখানাই দেবপ্রসাদের। দেবপ্রসাদ সেদিকে চাইলে, কি আকুল ব্যগ্র উল্লাস ভরা চাহনি। এতদিন পর “মাই সুইট, হােম্” দেবপ্রসাদ ভাবলাে। আমবাগানের স্নিগ্ধ শীতল মায়াময় আঁধারটুকু যেন তাকে নাম ধরে ডাকলে—দেবু এসাে, বাড়ী এসাে। নৌকো এসে ঘাটে লাগলাে। দেবপ্রসাদ তীরে ভিজা মাটির উপর নেমে পড়লাে। খালি পা, পায়ের তল যেন জুড়িয়ে গেলাে। স্নিগ্ধ শীতল দেশের মাটি। শহরের পাষাণ-গাঁথা তপ্ত ফুটপাথ পাষাণ করে দেয় সর্ব প্রাণ। দেবপ্রসাদ ঘরে এসে ঢুকলাে, মা আকুল অধীর ললাটে চুম্বন এঁকে দিয়ে বললেন—এসেছিস বাবা, এতদিন পর ! চোখ দু’টী তার আকুল স্নেহ-বন্যায় ভেসে উঠলাে। সম্মুখের জানালাটা খােলা। রাত্রি দশটা। গভীর নিদ্রা-নিমগ্ন চারিদিক। নিবিড় নিস্তব্ধ। প্রাণ আকুল-করা স্নিগ্ধ নীরব নিবিড় অন্ধকার। অংগ শীতল করা আঁধার সমুদ্রের মৌন পরশ। পল্লীমায়ের নীরব নিবিড় নিদ্রামগন স্নেহময় মুখখানি দেবপ্রসাদের চোখের সামনে ভেসে উঠলাে ; ; শান্ত সুনিবিড় পল্লীমায়ের আঁচলখানি যেন আকাশের অন্ধকারে উড়ছে ; সে আঁচলের সূক্ষ্ম গ্রন্থির ফাক দিয়ে দেখা যায় শত নক্ষত্রের আলাের দীপশিখা; পৃথিবীর অন্ধকারে দূরের শুভ্র আলাে। দেবপ্রসাদের মনে হলো—শহর থেকে বহুদূরে এ পাড়াগায়ে এসে বংগ- জননী নিভৃত ছায়া-মিগ্ধ গৃহকোণে অক্ষত দেহে বাস করে। শহরে তার বিদেশী মিলিটারী গাড়ীর চাপে ক্ষত বিক্ষত সকল অংগ। নয়নে তার সংগ্রাম-পীড়িত অসহ অশ্রুজল। দেবপ্রসাদ জানালা দিয়ে চেয়ে আছে। একটু দূরেই একটা কুলগাছ, ডালগুলি তার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কচি সবুজ নরম পাতায় গাছটা মরু-প্রদীপ আকুল জীবন্ত। ফাগুন চৈত্র মাসে প্রখর রৌদ্রের তাপে গাছটা শুকিয়ে মরে যায় যেন ; ছিন্নচ্যুত সকল পত্র। আষাঢ়ের বর্ষা আসে নব ধারা নিয়ে, গাছটা আবার ভরে উঠে নব রসে। দেবপ্রসাদ কি যেন দূরের মায়ায় গাছটার দিকে চেয়ে আছে। বহুদিনের পুরাতন এ কুলগাছটা। ছােটবেলায় দেবপ্রসাদ এ গাছটায় উঠে কত কুল খেয়েছে। কুলগুলি বেশ মিষ্টি রসে ভরা। গাছের কাটায় সমস্ত অংগ ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে, কিন্তু তবু কুল মিষ্টি, কঁাটার আঁচর নয়, সর্বাগে বসের প্রবাহ। নীচে গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকতত আভা, ছােট্ট মেয়ে ; পাশের বাড়ীর। বলতাে-দেবুদা, আমায় একটা কুল ফেলে দিন। দেবপ্রসাদ বলতাে, উঠে আয় না, নিজ হাতে পেড়ে খাবি। —কি যে বলেন, আমি কি গাছে উঠতে পারি? ভয় করে। আপনার দুটি পায়ে পড়ি, একটা ফেলে দিন। দেবপ্রসাদ তিন চারটে কুল নীচে ফেলে দিতে। আভা কুড়িয়ে নিয়ে উপরের দিকে চেয়ে আবার বলতো-এখন নেমে আসুন, পড়ে যাবেন কিন্তু ! ভয় করেনা আপনার ? কি কোমল মায়াময় কচি কণ্ঠস্বর । দেবপ্রসাদ একটা গভীর নিশ্বাস টালাে। সেই সরল সুন্দর স্বাধীন অলস ছােটকাল। সেই ভাবনা যাতনা বেদনা-বিহীন কুলগাছ আজ কত কন্টকময়, কত বেদনাময় বলে মনে হয়। সেইদিন আর এইদিনে কত ব্যবধান। আজ একমুষ্টি ভাতের জন্য সেই সকাল দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত অফিসে কি হাড়ভাংগা পরিশ্রম করতে হয় ; এক মুহূর্ত বিশ্রাম নাই। খা খা করে জ্বলছে যেন জীবনের চিতা! হু হু করে ছুটে চলেছে যেন জীবনের রক্ত-প্রবাহ! সে ছােটকাল, সে বালক বয়স, আর এ কর্তব্য-কন্টকময় যৌবন বয়স! সে পৃথিবী আর এ পৃথিবী! কি যেন একটা প্রলয় পরিবর্তন ঘটে গেছে মাঝখানে! Child is the father of man! No I deny it. শিশুর সরল শান্ত হাসি—যৌবনে চঞ্চল ১০৭ মরু-প্রদীপ মুখর-বার্ধক্যে শুকনাে ঝরা ফুল। সেই আভা কি আজও সেই আভা। কি যেন এক সরল বিহবল রাতের অন্ধকার পরশ নীরবে দেবপ্রসাদকে আচ্ছন্ন করে ফেললাে; চোখ দু’টি তার বুজে এলাে, ঘুমিয়ে পড়লাে সে। সপ্তাহখানেক পর। কুলগাছটার গা ঘেষে একটা শিউলী গাছ। পাঁচ বছর আগে এ গাছটা ছিলাে না, এর বয়স মাত্র তিন বৎসর। যৌবন-বয়সী মেয়ের মতাে প্রাণবন্ত এর শাখা-প্রশাখা। তরুণী মেয়ের মত এ গাছটার অংগ-সুরভি। সুমিষ্ট সুরভি যেন গাছটার ডাল থেকে ঝরে পড়ছে। শুভ্র শিউলীদলে সমস্ত গাছটা রূপালী হয়ে রয়েছে। শিশির-সিক্ত পুষ্পগন্ধে চারিদিক রােমাঞ্চকর। উদয় গগনে তখন সবে মাত্র নবারুণের রক্তাভা বিকশিত হচ্ছে ; বিহংগকুল তখনাে নীড় ত্যাগের জন্য পক্ষবিস্তার করেনি। দেবপ্রসাদ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মায়ের আদেশে তুলসীতলায় প্রণাম করে। আজ তুলসীমূলে প্রণাম করতে এসে দেখে, শিউলীতলে কে সাজি ভরে’ ফুল তুছে। —আভা না? দেবপ্রসাদের চোখে বিস্ময়ের মধুর পরশ। সেই আভা আজ এই আভা হয়েছে। বিকশিত অংগ হতে যেন যৌবন-লাবণ্য ঝরে পড়ছে। শেফালির মতাে শুভ্র হয়ে যেন ফুটে উঠেছে ওর সর্বাংগ। দেবপ্রসাদ কস্তু বক্ষে নষ পদে ওর কাছে এসে দাড়ালাে। আভা ফুল কুড়াতে কুড়াতে বললাে-কে দেবুদা’? শুনছি আপনি কলকাতায় চাকরী করেন, কবে এলেন? -সপ্তাহখানেক। কবে যাবেন? দেবপ্রসাদ বিস্ময়ে নীরব দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন আভার দিকে। মুগ্ধ তার দুটি আঁখিতে সহসা জেগে উঠলো রহস্যময় জীবন-শিখা। কুলতলার সেই ছােট আভা! সরল, সুন্দর, লজ্জাহীন, উম্মুক্ত, অনাবৃত, মরু-প্রদীপ sobo সেই মধুর অংগ আজ এমন সুসজ্জিত, পরিস্ফুট, লজ্জিত, সচকিত, কম্পিত, কুষ্ঠিত ? সেই সেদিনের সরল সুন্দর অবারিত দেহে কণ্টকিত যৌবনের আজ একি আরক্ত আবরণ ; একি লজ্জারাঙা শিহরণ । উন্মুক্ত উদার মুক্তির মাঝে একি কারারুদ্ধ বন্ধন-বেদনা। আভাও মুখ তুলে দেবপ্রসাদের চোখের দিকে চাইতে পারলাে না। নম্র নত নয়নে সে ভাবলাে সেই কূলগাছের ক্ষত-বিক্ষত দুরন্ত অশান্ত চঞ্চল বালক দেবুদা’ আজ এমন বিকশিত, সুন্দর শান্ত শ্যামকান্তি- উজ্জল-জ্যোতিস্নিগ্ধ ? কিন্তু নয়নের সেই সরল সুন্দর স্নিগ্ধ আলােকে আজ এ কিসের চিত্তস্পর্শী প্রখর কিরণ? সেদিনের দৃষ্টির কাছে আজকার দৃষ্টির একি পরিবর্তন ! সহসা আমার বুকে একি বিপুল বেদনা ভরা সুন্দর পুষ্পকোমল আঘাত? আভা শেষে মুখ তুলে বললাে- শুনছেন আমার কথা ? আবার কবে কলকাতা যাবেন ? সপ্তাহ তিনেক পর। এতদিন পর এসে আবার এত সকালেই যাবেন ? কালের বিপুল পরিবর্তনের মাঝে টিকে থাকা যায় ক’দিন ? বিপুল প্রশ্ন। আভা কিছু বুঝে, কিছু না বুঝে শিউরে উঠলাে। পূর্ব গগনের উদয় তােরণে অরুণ-আলাে তখন রক্তরাঙা হয়ে উঠেছে। প্রভাতীবায়ুর মৃদুমধুর স্পর্শ-সঞ্চালনে শিউলী ফুলগুলি আভা ও দেবপ্রসাদের অংগে ঝরে পড়তে লাগলাে। দু’জনেই হারিয়ে গেল এক শুভ্র সুদূরে। কিছুক্ষণ কাটলে এ ভাবে। শেষে আভা অ-টলমল সুন্দর চোখে দেবপ্রসাদের দিকে চেয়ে বললো—সত্যি আবার চলে যাবেন ? না গেলে হয় না? দেবপ্রসাদ সহজ কণ্ঠে বললো, না-যেতেই হবে। আমাদের বাস্তব পৃথিবী! এর এই কঠিন আবরণের অন্তরালে প্রবাহিত যে অশরীরি প্রেমের মাধুৰ্য্যধারা তাইতাে এই পৃথিবীকে সরস আর স্বপ্নময় করে রেখেছে। সেইখানেই আমাদের পরিচয়ের সার্থকতা আর তৃপ্তি।
নারীর উক্তি আজ এ ষাট বৎসর বয়সের মুখখানা আয়নার ভিতর দিয়ে দেখে থর থর করে কেঁপে উঠে বুক। কি যেন মৃত্যু-বিভীষিকায় বুজে আসে দু’টী চোখ। প্রলয়-কালের কি যেন এক ঘন অন্ধকার সম্মুখের দৃষ্টি তােলে কঁপিয়ে। সমস্ত মুখের উপর, সমস্ত চোখের উপর দিয়ে কত বড় ধ্বংস-প্রবাহ যেন ছুটে চলে গেছে : কি যেন নিদারুণ কঠোর আঘাতের কঠিন দাগ ফুটে উঠেছে সারা দেহে : শত ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে দেহের প্রতি কোণে । দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে গেছে ঘাত-প্রতিঘাত করে’ এ দেহখানি। কালের পাষাণ অংগুলির আঘাতের সুস্পষ্ট রেখা ফুটে রয়েছে যেন হিয়ায় হিয়ায়। মহাকালের মহাসংগ্রাম যেন বিষবন্ত করে দিয়েছে এ মুখ, এ চোখ, এ কপােলতল—এ দেহ, এ দেহের প্রতি অংগ। কালো কালাে রেখায় সর্বাংগে লিখে দিয়েছে মানবজীবনের বার্ধক্যের দারুণ পরিণাম। যাট বছরের মুখখানির দিকে চেয়ে আজ বার বার এই কথাই মনে হচ্ছে। যৌবনের সেই প্রদীপ্ত প্রাণ-বহ্নি আজ নির্বাপিত। বসন্তের সেই পুষ্প-উৎসব আজ ভীষণ ঝরাফুলের মৃত্যু-নীরবতায় ভরা ; সর্ব অংগে যেন আজ অন্তহীন মৃত্যুগন্ধ ; মৃত্যুর কালাে ছায়া আজ সর্বাংগে : এমন কি বসনে ভূষণে পর্যন্ত। আজ মুখের সে লাবণ্য কোথায়? চোখের সেই নীলাভ দ্যুতি কোথায় ? সেই চারু-সুন্দর নম্র আঁখি-পল্লব ? পুষ্প-কোমল অধরের সেই রক্তরাগ? সেই দীপ্ত কপােলতল; সেই চামেলী-সুন্দর চোখ-চাহনি ? বন্ধুরা চোখ দুটা দেখে কত হিংসা করত; বলতে এমন দু’টা চোখ যায় তার কাছে বন্দী হয় সকল বিশ্ব ; ঐ দু’টী চোখের চাহনির মধুম্পর্শে চঞ্চল হয় শত শত পুরুষ-চিত্ত; ঐ কাজল ভুরুর মায়ায় মুকুলিত হয় কত পুরুষের প্রেম- পুষ্প। শুনে’ সলজ্জ আনন্দের হাসি হাসতাম ; অন্তর ভরে উঠতো ; ;
মরুপ্রদীপ গৌরবে; হয়েছি বিপুল সুখী। কে না হয় ? কালাে কুৎসিতাকেও সুন্দরী বললে—সেও হয় সুখী। কিন্তু আমি ছিলাম প্রকৃতই সুন্দরী। আঠারাে উনিশ যখন আমার বয়স তখন আমি নাকি ছিলাম আমাদের কলেজের মেয়েদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা সুন্দরী ; আমার সকল অংগে ছিলাে রূপ ও যৌবনের বসন্ত-উৎসব ; ফাগুনের পলাশকলিকা আগুন জ্বলতে। আমার সমস্ত বসনে ভূষণে, আবরণে, আভরণে। লক্ষ মুদ্রার মণি-মুক্তার হার দুলতে আমার চারু-কণ্ঠদেশে ; একমাত্র কন্যা ছিলাম কোটপতি আমেরিকাবাসী পিতার। আমায় দেখে বন্ধুরা হেসে বলতাে-স্বর্গ থেকে নেমে এলি বুঝি? এত রূপ মর্তে সইবে না; যা আবার স্বর্গে চলে যা। ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী হয়ে থাক গিয়ে। দেখতাম, কলেজের ছেলেরা আমার সামনে অতুল সম্ৰমে থাকতাে । দূরে সরে দাঁড়িয়ে আমায় পথ ছেড়ে দিতে। তাদের লজ্জা-সুন্দর নয়ন নত হয়ে পড়তে আমার নারী-মাধুর্যের সম্মুখে ; করতাে তারা আমাকে শ্রদ্ধা, দেখাতে দেবীর সম্মান। গৌরবে আমার মন ভরে উঠতাে, সগৌরবে আমি তাদের মংগল-কামনা করতাম। তাদের ভবিষ্যজ্জীবন শরৎ-লক্ষ্মীর আগমনী-সংগীতে ভরে দিতে চাইতাম নিজে দেবীর বেশ ধরে; নিজে ওদের কল্যাণময়ী ভগিনী হয়ে। তাদের সাথে আমার যেন শেষে একটা পবিত্র বন্ধন দিন দিন দৃঢ় হয়ে উঠলাে; কি যেন একটা স্বর্গীয় শােভা ফুটে উঠতে লাগলাে তাদের মুখে চোখে দেখতাম, তার যেন সত্য সত্যই শক্তির উপাসক ; কল্যাণময়ী নারীর বীর ভক্ত। সুদৃঢ় চরিত্র-সৌন্দর্যে সবাই যেন দেব-অংগের মহিমাপ্রাপ্ত। ভেবেছি- এরাই হবে ভবিষ্যৎ ভারতের বীর ভগিনীর বীর সহােদর। কে বলে ছেলেমেয়ের একত্র মিলনে নৈতিক চরিত্রে দুর্বল কম্পন জাগে? সমাজ-চরিত্রের বিয়ের হয় অদৃশ্য উদ্ভব? কলেজে যেখানে মেয়েরা শক্তিময়ী, কল্যাণময়ী ভগিনীরূপে, ছেলেদের বক্ষ সেখানে নিজ •• ১১১ মরুপ্রদীপ ভগিনীর, নিজ জাতীয়, নিজ দেশের সম্মান রক্ষার প্রেরণায় নবশক্তিতে জেগে উঠে। যেখানে এ নিয়মের বিশৃঙ্খলা ঘটে, বুঝতে হবে মেয়েরা সেখানে অস্বাস্থ্যকর রুচির গুপ্ত-উপাসিকা : প্রকৃত শক্তির অধিকারিণী হতে পারে নি। দেশ, সমাজ, জাতি তখনই মংগলময় স্বাস্থ্যসম্পন্ন, যখন মেয়েরা বীররমণী—শিক্ষা দীক্ষায়, মেলামেশায়, আদানে প্রদানে। ছেলে মেয়ে যেখানে একত্র জীবনের সুন্দর রূপ, সেখানে প্রস্ফুটিত, সুবাসিত ; ফলে ফুলে বিভূষিত; মানব জীবনের পূর্ণ পবিত্ৰ সংগীতের সুর সেখানে মুখরিত, ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত। বিশ্ব সেখানে জেগে উঠে মানব জীবনের পূর্ণবাণী নিয়ে। পুরুষের পবিত্র সংস্পর্শে নারী হয় কল্যাণময়ী; নারীর পবিত্র সংস্পর্শে পুরুষ হয় প্রকৃত মনুষ্যত্বে বিকশিত ; প্রকৃত শক্তির অধিকারী; অনন্ত জীবনের ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যবান। কুমুদের বুকে কৌমুদীর মতাে চির পবিত্র রূপ ও আলােকরশ্মিতে দীপ্যমান। পুরুষকে বাদ দিয়ে নারীর মহিমা দীপ- নিভে-যাওয়া নিশীথ রাতের আঁধার মন্দির সম ; জীবনের ঠাকুর সেখানে অন্ধকারে লুপ্ত। আবার নারীকে বাদ দিয়ে পুরুষের মহিমাও তেমনি রাহুগ্রস্ত অরুণের মতাে কলংকময়। হােক পুরুষ দীপ্যমান জ্যোতির অধিকারী, কিন্তু নারী সম্মুখে দাড়িয়ে তার কল্যাণময় অপূর্ব রূপ শক্তি বরণ না করলে তার সমস্ত জ্যোতিঃ হয় রাহুগ্রস্ত, নির্বাপিত, অলংকৃত। স্ত্রী-পুরুষের বিশুদ্ধ মিলন-যজেই জীবন হয় অনন্ত মধুর, চারু স্নিগ্ধ, শান্ত সুশীল। আমিই গড়ে তুলেছি একজন দেশনেতা শ্রেষ্ঠমানব, যার নাম কখনও প্রকাশ করব না। আমার মতাে মায়ের জাতই গড়ে তুলেছে রবীন্দ্রনাথ, জগদীশ, গান্ধী, জহরলাল-জগদ্বিখ্যাত মানব যারা। আমারই সহপাঠী ছিল সে। তার শক্তি ছিল অনন্ত ; সে ছিল জ্যোতির্ময় পুরুষ। তার সেই সুপ্ত শক্তি-জ্যোতিকে আমিই ইন্ধন মরু-প্রদীপ ১১২ যুগিয়ে জীবন্ত ও প্রজ্জ্বলিত করে রেখেছি চিরকাল। সে আমাকে শ্রদ্ধা করতে, সম্মান করতে, সম্ভ্রমে দূরে সরে দাড়াতে। সে আমার নারীশক্তিকে আরাধনা করতাে, পূজা করতে আমার নারীত্বকে। আমিও শেষে তাকে চিনতে পারলাম-অসীম শক্তিসম্পন্ন একজন যুবক রূপে। ভাবলাম, এ যুবকই হবে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর, সম্মানযােগ্য, বিশ্ব-পূজ্য। মেয়েদের যে কল্যাণময়ী রূপে দেখে, শক্তিময়ী রূপে পূজা করে, সে কল্যাণময়ী নারীই দেয় তাকে শক্তি, সাহস ; মধ্যাহ্ন অরুণ-জ্যোতি জ্বলে তার ললাটে রাজটীকা। যে কথা জীবনে কোনদিন প্রকাশ করবােনা ভেবে সুদূর আমেরিকায় চলে এসেছিলাম ; জীবনের যে প্রেম-মাধুর্য আপন প্রাণের গুপ্তবাসে সযত্নে ঢেকে রেখেছিলাম, জীবনের যে পূর্ণ অভিনয় শুধু আমার অন্তরেই পূর্ণ জ্যোতিঃ নিয়ে গুপ্ত থাকতত চিরদিন, আজ তা জগতের সম্মুখে প্রকাশ করে যাবাে। আজ আমার এ ষাট বছরের মন সকল বন্ধনহারা হয়ে উঠেছে, প্রাণের সকল গুপ্ত অভিনয় বিশ্ব-মঞ্চে প্রকাশিত হ'তে চাইছে। আজ সর্ব দ্বিধাহীন হয়ে জগতের সম্মুখে বলবে- সেই ছিল আমারই উপাসক। আজ ভেসে উঠেছে সেই পুরাণণা দিনের অরুণ-দীপ্ত স্মৃতি। ভেসে উঠেছে সেই লেকের ধারে জ্যোৎস্না-যামিনী, সেই কৃষ্ণচূড়ার রাঙা গুচ্ছ, রক্ত-উদ্দীপক আমাদের দুজনের কথােপকথন। চৈত্রের মধু যামিনী ; চৈতালী হাওয়া চঞ্চল হয়ে বইছে দিগন্তরের চিত্ত চঞ্চল করে। আমি আর সে একটা কৃষ্ণচূড়ার তলে শ্বেতপাথরের বেঞ্চে বসে থাকতাম। মাথার উপরে বহু উধ্বে নীল নৈশ-আকাশ তারকাদীপ্ত আলােকে উজ্জ্বল; তার বহু নীচে কৃষ্ণচুড়ার আলােম্নান ছায়া। জগতে আর ঐ জগতে মিলে যেন গভীর মিলন-সম্ভাষণ। তার চিত্তে আর আমার চিত্তে তেমনি যেন একটা মিলন-আয়ােজন ; মিলিত সংগীত ;
মন-প্রদীপ সুর। কিন্তু গভীর নীরব ; স্তব্ধ মৌন সে সংগীত। আমাদের দু'জনের মিলিত আঁখি ; দীপ্ত চাহনি-সুষমা ; অসীম অন্তরতল ; অসীম অফুরন্ত ভাষা বুকের নিভৃত গহনে। কিন্তু দু’জনারি মুখ অতল নীরবতায় মৌন ; মুখে নেই কোন ভাষা, কিন্তু অধরতল নীরব স্পন্দন- মুখরিত। কি যেন একটা দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সন্দেহ সংশয় দু’জনকেই জড়িয়ে রয়েছে। তাই কিছু বলতে পারছিনা, শুধু দেখতে পাচ্ছি, বুঝতে পাচ্ছি, দু’জনই দু’জনকে। কি যেন একটা বহুদিনের না-বলা কথা তাকে চঞ্চল করে তুলেছে। বললে-দেবি, এ জীবন যেন শুধু তােমার দিকে চেয়েই অপেক্ষা করে রয়েছে। তােমার রূপ-প্রেরণার প্রবাহেই যেন আমি দিনরাত ছুটে চছি—জানিনা কোথায়, কি উদ্দেশ্যে। বললাম, আমিই তােমার ভাগ্য-বিধাত্রী। আমি তােমাকে প্রেরণা দিচ্ছি তােমার অসীম জীবনের পথ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। বললে-হা, সত্য সত্যই তােমার ঐ পবিত্র নারী-রূপ আমাকে দিনরাত শক্তিগামী করে তুলছে। কি যেন একটা পরম পবিত্র জাগরণ কেঁপে উঠেছে আমার এ রক্তপ্রবাহে। আমি কি দেখছি জানাে—আমি যেন দেখছি তুমি চির-জ্যোতির্ময়ী, অনন্ত শক্তিরূপিনী। চন্দ্র-সূর্য- গ্রহ-নক্ষত্র যেন তােমার ঐ দুটি আঁখিনীল-নভে আছে; সমস্ত জ্যোতিষ্ক- সমাজ যেন তােমার ঐ নয়ন-আকাশে পুঞ্জীভূত ঔজ্জ্বল্য নিয়ে জ্বলছে সমস্ত বিশ্বপ্রবাহ যেন তােমার সারা অংগে উন্মত্ত অধীর। দেবি, সত্যই কি তুমি চির শক্তিময়ী? সত্যই কি তুমি আমার বুকে বিশাল আসন পেতে? বললাম—হাঁ, আমি তােমার চিত্ত জয় করেছি ; তুমি করবে বিশ্ব-চিত্তজয় । যাও, দুঃখ-পীড়িত, বেদনা-দলিত কাতর তােমাকে ডাকছে। হও তার তেজস্বী বীর-পুরুষ। তােমার চরণ- তলে কেঁপে উঠুক সমস্ত পৃথিবী। বললে, কিন্তু তােমার ঐ জ্যোতির্ময় মরু-প্রদীপ ১১৪ ; রূপের আড়ালে আবার দেখছি তােমার সেই কুসুম-কোমল নারী-অংগ- সুলভ চিত্ত-চঞ্চল করা যৌবন-রাগ ; এ দুর্বলতা কেন ? কি যেন এক অহিতকর বাঞ্ছায় কেঁপে উঠে বক্ষস্থল। বললাম—এ সকল পুরুষের পক্ষেই খুব স্বাভাবিক। নারীর কাছে নর হয় ক্ষণিকের জন্য দুর্বল, দীন, তখন এ নারীই আবার শক্তিময়ী রূপ ধরে সেই দুর্বল মুহূর্তকে শক্তিপুঞ্জ করে দেয়। পুরুষ যেখানে দুর্বল নারী সেখানে বিশাল বিশ্বের পুঞ্জীভূত শক্তি নিয়ে সম্মুখে দাঁড়ায়। এখানেই সৃষ্টির পূর্ণ মাধুর্য ; তা না হলে বিশ্ব-সৃষ্টি এতদিনে লােপ পেয়ে যেতো। ভয় নেই, তােমার এ দুর্বলতার অপর নাম শক্তিহীন প্রেম ; যা সাধারণ মানুষের, রুগ্ন যার অভিরুচি, পরিণাম যার বিবাহ- বন্ধন। কিন্তু তােমার আমার প্রেম হবে অসীম-শক্তিসম্পন্ন : বিশ্বের কল্যাণরূপে। স্বামী স্ত্রী হয়ে বিশ্বের অকল্যাণ অবাঞ্চিত রুগ্ন শিশুদের জন্মদাতা রূপে নয়। তুমি হবে কল্যাণময়, এই ভােমার ললাটে দিলাম শক্তির রাজটীকা। বলে’ তার ললাটে অংগুলি স্পর্শ করলাম। বললাম- যাও বীর, সম্মুখে তােমার রুগ্ন পীড়িত অর্ধমৃত ভারত, তাকে নবীন প্রাণমন্ত্রে দীক্ষিত কৰাে ; পালন করে তার আদেশ। আজ আমি চলে যাচ্ছি বহুদূর, সুদূর আমেরিকায়। আমার পিতা সেখানে বিখ্যাত দার্শনিক ; একটা কলেজের অধ্যাপক। আমি তার কাছে দর্শন পড়বে। বিবাহ যে সমাজে শুধু দৈহিক মিলনের আকাংখা, সে বিবাহ আমি ঘৃণা করি। আমার প্রেম শক্তি-উদ্দীপক; সে প্রেমই আজ তােমাকে দিয়ে যাচ্ছি) যাও বীর ; বীর বেশে পালন করে ভারত বিশ্ব। তােমাকে যে নারী বিবাহ করবে, সে তার রূপ দিয়ে, তার অংগ দিয়ে তােমাকে সেরে’ হবে সন্তানের মা। আর আমি আমার নারীশক্তি দিয়ে গড়ে তুলবাে তােমার মধ্যে বিরাট পুরুষকে। শক্তির পূজারী হবে সে, ভারত হবে যার জন্য গর্বিত; আমার রূপ, আমার প্রেম, আমার ভালবাসা হবে ;
মরু-প্রদীপ শক্তির জন্মদাতা, জননী হব মহাশক্তির। বলে চলে এলাম আমেরিকায়, পিতার হলাম শিষ্যা, অধ্যয়ন করলাম-নারী ও সৃষ্টি খুঁজে পেলাম নারীর স্থান। তারপর কেটে গেছে বিশ বছর। একদিন শেষে সেই সুদূর আমেরিকার একটা ক্ষুদ্র শহর থেকে শুনতে পেলাম—সত্য সত্যই আমার সেই সহপাঠী আমারই নারীশক্তির প্রেরণার মাঝে খুঁজে পেয়েছে বিশ্ব-শক্তি; হয়েছে ভারতশ্রেষ্ঠ বীর। নিজকে ধন্য মনে করলাম আমার সেই চিরবাঞ্ছিত বীর প্রেমিকের দিকে চেয়ে। সেদিন আমার নারী-শক্তিকে মেনে নিলাম। সে আমার নারীত্বের মাঝেই পেয়েছে অনন্ত শক্তির গিরি-প্রস্রবণ। তার অতলস্পর্শী চোখ দু’টী খুঁজে পেয়েছে আমার প্রেমের মাঝে বিশ্ব-প্রেম ; আমার রূপের মাঝে বিশ্ব-রূপ ; আমার শক্তির মাঝে বিশ্ব শক্তি। তাই সে জয় করেছে বিশ্ব-চিত্ত ; ; হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ ভারত-নেতা। তার সংস্পর্শে সার্থক হয়েছে আমার নারীত্ব ; আমার সংস্পর্শে সার্থক হয়েছে তার পুরুষত্ব। আজ আমি ষাট বছর বয়সে উপনীত হয়েছি ; জরা-জীর্ণ সব তনু; মৃত্যু ধ্বংস-প্রবাহ নিয়ে আমার সর্বাংগে বিরাজিত। আজ আমার সেই রূপ, সেই যৌবন, সেই মােহিনী মুর্তি, অংগের সেই স্মিত জ্যোতি কিছুই নাই। আজ আমার এ ষাট বছর বয়সের নারীত্ব-শক্তিকে অভিনন্দন করছি এই বলে যে, আমার দেহ ছিন্ন চ্যুত হলেও তুমি শক্তি বেঁচে থাকবে প্রতি নারীতে ; প্রতি বীর পুরুষ, প্রতি বিশ্বের উত্থান পতনে।
স্পাই
শাহারাণপুরের একটা ষ্টেশনে গাড়ী ফেল করে বসলাম। যাবাে
হরিদ্বার, বিকেল পাঁচটায় একখানা মাত্র গাড়ী সারাদিনে। সময় মতাে
এসে ধরতে পারলাম না।
সামনে সুদীর্ঘ রাত্রি ; এখন যাই কোথা? ষ্টেশনে রাত কাটাবার
কোন ব্যবস্থা নেই। ছােট্ট ষ্টেশন, ঝড়ের বেগে বহুদূর হ'তে গাড়ী
আসে ; দু’ মিনিট থাকে, আবার প্রলয় বেগে চলে যায়। পেছনের
কান্না শােনবার সময় নেই; ষ্টেশন মাষ্টারকে বললাম।
ষ্টেশন মাষ্টারকে বললাম। এখানে রাত্রি-
বাসের কোন ব্যবস্থা আছে মশায় ?
নিশ্চয় আছে।
ওদিকটায় ধর্মশালা রয়েছে। ওদিকে যান,
থাকবার বেশ বন্দোবস্ত আছে। তবে চার্জ একটু বেশী ।
-কত ?
-একখানা রুম, ডেলি দশ টাকা। খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। শুধু
থাকা যাবে।
বললাম-তা’ হােলে খাবাে কোথায় ?
সামনেই আর একটা হােটেল আছে : মাছ মাংস যা চান সব
পাবেন।
ধর্মশালার দিকে পা বাড়াতেই সহসা একটি মেয়ে এসে বললে-
দেখুন, আমিও গাড়ী ফেল করেছি, আমিও আপনার সংগে ধর্মশালায়
যাব; মি একা, সঙ্গে কেউ নেই; ট্রাভেল করতে বেরিয়েছি যদি
দয়া করে ধর্মশালায় নিয়ে যান।
মেয়েটির কাধের উপর গােলাপী ওড়না উড়ছে ; পরণে শালওয়ার ;
গায় পাঞ্জাবী। স্বাস্থ্য ও যৌবন সর্বাংগে প্রচুর। আমি ধুতি-পাঞ্জাবী-
১১৭ মরু-প্রদীপ পরা বাংগালী। হরিদ্বারের যাত্রী-ধর্ম-অনুসন্ধানে নয়, দেবতার জন্য প্রাণ তখনাে কাদে না। কলেজে পড়ি, গ্রীষ্মের ছুটী, বাবার টাকা আছে, ছুটীটা তাই বেড়িয়ে কাটাবার জন্য বেরিয়েছি। বিস্মিত কণ্ঠে বললাম—আপনার নাম ? বললে-সুন্দরী। ওর দিকে চেয়ে মুগ্ধ হলাম। বললাম-বেশ, চলুন তাহলে, আজকের রাতটা ধর্মশালায় কাটানাে যাক, কাল আবার গাড়ী ধরা যাবে। রাজপুরীর মতাে ধর্মশালা, রাজকক্ষের মতােই ঘরগুলি আভিজাত্য- পূর্ণ ! দশ টাকায় একখানা ঘর খুব সস্তা বলেই মনে হলাে। সুন্দরী একখানা ঘর ভাড়া নিলে, আমি আর একটা ভাড়া নিচ্ছিলাম দেখে সে বললে, মাত্র একটা রাত, আপনার আর একটা ঘর নিয়ে কি দরকার? আমার এ ঘরেই একটু জায়গা করে নেবেন ; মিছিমিছি আরাে দশটা টাকা খরচ করতে যাবেন কেন ? অবশ্য আপনার যদি কোন অসুবিধা না হয়। বললাম-কিন্তু কথা তা তাে নয়। দু'জনেই বাংগালী অথবা পাঞ্জাবী হ'লে লােকে ভাবতে ভাই বােন অথবা স্বামী স্ত্রী। কিন্তু এখানে আমি বাঙালী আর আপনি... -আমি পাঞ্জাবী। কাজেই এখানে সম্পর্কটা সন্দেহজনক । সুন্দরী হাসলাে। সম্পর্কটা যাতে সম্ভব হয় তাই করি, বলে নিজের সুকেশ খুলে’ শাড়ী, ব্লাউজ বের করে পরলাে, তারপর হেসে বললে- দেখুন তত ঠিক মানিয়েছে কিনা? বেশ মানিয়েছে আপনাকে বাংগালী পােষাকে। কিন্তু একটা বিষয়ে আশ্চর্য হচ্ছি, আপনি পাঞ্জাবী হয়েও বেশ বাংলা বলতে পারেন তাে! আর বাংগালী পােষাকও আপনার সঙ্গে আছে দেখতে পাচ্ছি, এর মানে কিছু বুঝতে পাচ্ছি না তাে!
মরু-প্রদীপ ১১ সে হেসে বললে-বাংলাদেশে জন্ম কিনা, তাই। তাছাড়া আমি নানা দেশে ট্র্যাভেল করি, সব দেশের পােষাক-পরিচ্ছদ পরি, সব দেশের ভাষা জানি, এমন কি জাপানী ভাষা পর্যন্ত । বলতে বলতে সুন্দরী আমার বিছানাটা খুলে আমার খাটের উপর পেতে দিলে, তারপর বললে, তা হলে আসুন, খাওয়াদাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়ি। আমার এখন বাংগালী পােষাক পরা, সম্পর্কটা সােজা হয়েছে, সংকোচের কোন কারণ নেই ? কিন্তু কি যেন সংকোচে ও সন্দেহে আমার বুক কেঁপে উঠলাে। এ কে ? নানা দেশে ট্রাভেল করে? নানা ভাষা জানে? নানা দেশের পােষাক পরে?--নানা প্রশ্ন আমার মনে। ওর চুলের খোঁপায় গোঁজা ছিলাে একটি ফুল, লাল টুকটুকে। ফুলটা খোপা থেকে তুলে এনে আমার ধবধবে পরিষ্কার বিছানার উপর ফেলে দিয়ে বললে-বাসর-শয্যা। মুখে লজ্জাহীন পাতলা হাসি। ভুলে গেলাম আমার অস্তিত্ব। চোখের উপর যেন স্বর্গ নেমে এলাে। পুষ্প-শয্যা নিজ হাতে যে মেয়ে সাজিয়ে দেয়, সে যেই হােক আমাকে সে যে ভালবেসে ফেলেছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমার বুকের ভিতর তখন বিপুল আনন্দোচ্ছাস, প্রাণের নিভৃত কোণে সুরভিপূর্ণ মদির-আবেশ, সসাগরা পৃথিবীর রাজা যেন আমি। মেয়েটির এই প্রেম-নিবেদনে, সমস্ত চিত্ত আমার ভরপূর হয়ে গেলাে। ভাবলাম, ঘর ভাড়ার টাকাটা যখন সুন্দরী নিজেই দিল, আজকের রাত্রির দু’জনের খাওয়া-খরচটা তখন আমারই দেওয়া উচিৎ। সামনের হােটেলে গিয়ে দু’জনেই বেশ রিচ, প্লেট নিলাম। বিল এলাে। ছ টাকা বারাে আনা দিয়ে উঠে এলাম। ঘরে ঢুকে সুন্দরী সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে বললে, সমস্ত পৃথিবীর সন্দেহের ১১৯ মরু-প্রদীপ চোখ থেকে এখন আমরা মুক্ত : বলে সে আমার বিছানায় এসে বসলাে। বল্ল-আপনি শুয়ে পড়ুন, আমি আপনার পাশে বসে থাকি। অপূৰ্ব ! স্বর্গীয় এ প্রেম ! নেশাতুর জাগ্রত দু’টা চোখ নিয়ে শুয়ে পড়লাম। বুকের তুলে বিল-নিঃশ্বাসের আলােড়ন । বিছানার ঐ ফুলটি সুন্দরী আবার তুলে নিয়ে আমার নাকের কাছে ধরলে বল—গন্ধ মধুর জীবন, না? আমি তখন আত্মহারা। ভাব-উদ্বেল কণ্ঠে বল্লম, গন্ধ মধুর জীবন কিনা, তা জানিনে। কিন্তু আজ এই রাতে যে গন্ধ-নিবেদন করলে, সে যে চিরমধুর। ফুলটা আমার সারা বুকে বুলিয়ে দাও। বললে—শুধু ফুলের পরশ ? আর কিছু নয় ? আমার দু’ট অধরােষ্ঠ থর থর করে কেঁপে উঠল, ওর অধরপ্রান্তে মিশে। সুন্দরী বললে-বেশ, এখন ঘুমােও। এ ঘর আমরা ভাঙ্গব না কোনদিন, আমাদের এ নীড় চিরকালের। পরদিন ভাের না হতেই দেখি পুলিশে আমার ঘর ভর্তি : সঙ্গে সার্জেন্ট : গর্জন করে’ বললাে—কোথায় সে? সে কোথায় ? Or you will be shot dead! রিভলবারটা আমার বুকের সম্মুখে। ভয়ে জড়সড় হয়ে দু হাত তুলে দিলাম। কাপতে কাপতে বললাম- আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না, কার কথা বলছেন? সার্জেন্ট এবার চীৎকার করে উঠল, আপনার সঙ্গে যে মেয়েটি আজ রাত্রিবাস করেছে সে কোথায় ? নিশ্চয়ই সে আপনার স্ত্রী? রিভলভারের ভয়ে নিজের ও সুন্দরীর অস্তিত্বের কথা একেবারে ভুলে গেছি। এতক্ষণে সুন্দরীর কথা মনে পড়লাে। ঘরের চারিদিকে চেয়ে দেখলাম সুন্দরী নাই। ঝরা ফুলের মলিন ব্যথা আমার চোখের তলে। সার্জেন্টের দিকে চেয়ে আছি।
এর প্রদীপ
-সে আপনার কে হয় ?
মুমূর্য রােগীর মত শুষ্ক কণ্ঠে বললাম—আমায় ক্ষমা করুন : সে
কে আমি জানি না। বলেছিলাে সে একজন ট্রাভেলার ; প্রথমে তার
পাঞ্জাবী পােষাক পরা ছিলো, পরে বাংগালী পােষাক পরে আমার
ঘরে ঢোকে।
-আপনি এখন কয়েদী। মেয়েটি পাঞ্জাবী নয়, বাংগালী ;
জাপানী স্পাই।
এমন সময় ধর্মশালার পাণ্ডা পুলিশের ভিড় ঠেলে এসে বললে,
আমার ঘর ভাড়া দশ টাকা? মেয়েটি বলেছিল, আপনি তার স্বামী;
আপনিই টাকা দেবেন।
পকেট থেকে দশ টাকার একখানা নােট পাণ্ডার হাতে দিয়ে গ্রীষ্মের
ছুটিটা শ্রীঘর বাসে কাটাতে গেলাম।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.