Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Gita-parichay
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
গীতা-পরিচয়
“গীতা মে হৃদয়ং পার্থ গীতা মে সারমুত্তমম্।”
শ্রীরামদয়াল মজুমদার, এম এ
প্রণীত।
করিকা, ৩১ রাজার লেন হইতে
শ্রীদেবকিশাের মুখোপাধ্যায় এম এ কর্তৃক প্রকাশিত।
কলিকাতা।
১১৪নং আমহাষ্ট স্ট্রীট, “নববিভাকর যন্ত্রে”
শ্ৰীগােপালচন্দ্র নিয়ােগী দ্বারা মুদ্রিত।
'বৈশাখ-১৩১২।
No text on this page.
ঐশ্রীগুঞ্জ নিবেদন। “গীতা-পরিচয় স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত হইল বটে, কিন্তু ইহা গ্রন্থকারের সম্পাদিত (যন্ত্রস্থ) সমগ্র “শ্রীমদ্ভগবদগীতার অংশ মাত্র। গ্রন্থকার নিজ ধৰ্ম্ম-জীবনের উৎকর্ষ বিধানকল্পে সব্বশাস্ত্রমন্ত্রী গীতার মহাজন-প্রদশিত যে সুপ্রশস্ত রাজপথ অবলম্বন করিয়াছেন এবং অনুভূত বিষয়গুলি দৃঢ় করিবার জন্য যে যে তত্ত্ব লিপিবদ্ধ করিয়াছেন—গীত পূৰ্বাধ্যায়রূপে গীত উপদিষ্ট হইবার স্থান, কাল, পাত্র অবলম্বনে প্রাচীন সামাজিক ছবি ও আৰ্য জাতির আদর্শ শিক্ষা, গীতা উত্তরাধ্যায়রূপে গীতােক্ত শব্দ সমূহের ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে মহাভারতাদি শাস্ত্রগ্রন্থ অবলম্বনে ধৰ্ম্ম-জীবন গঠনােপযাের্গী অনুষ্ঠান সমূহের বিশদ বিবরণ, গীতার পাঠক্রম, অধ্যায়-নির্ঘন্ট, মূল, অন্বয়, প্রধান প্রধান ভাষ্য অবলম্বনে সহজ সংস্কৃত টীকা, বঙ্গানুবাদ, প্রশ্নোত্তরচ্ছলে প্রতি শ্লোকের সংশয়-নিরাস, এক অধ্যায়ের সহিত অপর অধ্যায়ের সম্বন্ধ নির্ণয়, বর্ণমালা ক্রমে শ্লোক-নির্ঘন্ট, ভগবান্ শঙ্কর, মধুসূদন, নীলকণ্ঠ, রামানুজ ও শ্রীধরয়িকৃত সমগ্র পাঁচটা টীকা প্রভৃতি যাহা যাহা বহু বৎসর ধরিয়া সঙ্কলন করিয়াছেন—গ্রন্থকারের সেই হৃদয়-রত্নগুলি আমরা “শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা” নামে প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলাম- “গীতা-পরিচয়’ তাহারই অংশ মাত্র। ইতি-
No text on this page.
সূচী পত্র।
পৃষ্ঠা
০ ০ ০
•••
•••
২৫
১। মঙ্গলাচরণ
২। উৎসর্গ
৩। গীতার বিশেষত্ব
৪। গীতায় শক্তি সঞ্চার
৫। গীতার স্কুল পরিচয়
৬। গীতায় লক্ষ্য সঙ্কেত
৭। গীতার কর্ম সঙ্কেত
৮। গীতার স্থান কাল পাত্র
৪৬
০ ০ +
৪৯
৫ . .
•••
৮৩
No text on this page.
অশুদ্ধ সংশোধন পৃষ্ঠা পংক্তি ২৮ মনসে শান্তি ঐ নিঃশ্রেয় ৫ ১২ ৭ ১২ . ৮ মনসাে শান্তি নিঃশ্রেয়স তাৎমুত্তি শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ভগবান নি অন্তৰ্য্যামিরূপে বিগলিত করা নিষ্কাম কৰ্ম্ম, তমঃ ও সত্বগুণের নয় রিপু দ্বারা তস্মাহমুত্তিষ্ট শ্রীমদ্ভাগবদগীতায় ভগবান নিগুণ অন্তর্যামীরূপে বিগলিত করা, । নিষ্কাম কৰ্ম্ম- তমাে ও সত্ত্বগুণের ১৪ ঐ ১৭ ১৩ ১৪ ৫ 9 ৯ রিপুকর্তৃক বলেন। সংখ্যা ভবাে সুনিশ্চত ঐ ২ ১৭ ২০ a ১৮ ২৪ নং ১ মৌখাদ ভবেজ সুনিশ্চিত জ্ঞানং কল্পকোটি সামীপ্য আত্মাভিমান নচানন্যাহম্মুি বহুশতােবা। সম্প। ঐ ঐ কল্পকোটে সমীপ্য আত্মভিমান নচানন্যাণি २४ ১১ বহুভােব সম্পূর্ণ ঐ ১৩ ২৬ ৭ ঐ মােহ মােহগ্রহের শ্রীভগবান, নিত্যক্তো সংস্থাস্যা মাচ্চিত্তে। তন্মাদ মােহগ্রস্ত মােহস্তের শ্রীভগবান নিত্যস্যোক্তা সংস্যা মচ্চিতে তম্মাদ ২৮ ১৮ ২৬ ও ১৮ D অর্জুন চাপচাহিকম যাবওভং অর্জন চাপরাহিম যদিম ঐ २८ ৪ পৃষ্ঠা ৫০ । ৪০ ৪৪ ৪ ৫ ৪৮ ২৯ ১৪ ০ কৰ্ম্ম, চেষ্টা দ্বারা তি সত্তর রাখিয়া এযদুস্তাসাধ্য মাক্য সিদ্ধাসিদ্বেী লা গুরূপি যােগীনা মগতে নান্তরাত্মন ভগবান নিরহংঙ্কারঃ সমদুঃখমুখ যাতত্মা মর্পিত মধেই २४ কৰ্ম্ম ও চেষ্টা দ্বার। স্বতশ্চেতি সমন্বয় রাখিয়াও প্রযত্নস্যাসাধ্য पांडका সিদ্ধাবসিদ্ধে ল। গুণাহপি যােগিনা মগতে ৰান্তরাত্মনা ভগবান্ নিরহঙ্কারঃ । সমদুঃখমুখঃ যতাত্মা ময্যর্পিত মধ্যেই কৰ্ম্ম २२ . २४ দি ন্য এ ২১ ৬২ ১৩, ১৫, ১৬, ১৭ ২ কর্মেও কন্মেরও ৭০ ভূমিকার তাঁহাদিকে অভাস কখন গুণাত ভূমিকায় তাহাদিগকে অভ্যাস কখ গুণাতীত १२ ২০, ২১, ।
মঙ্গলাচরণ।
সং
শ্রীগণেশায় নমঃ শ্রীকৃষ্ণায় অর্পণমস্তু।
ব্ৰহ্মানন্দং পরমসুখদং কেবলং জ্ঞানমূৰ্ত্তিম,
দ্বন্দ্বাতীতং গগনসদৃশং তত্ত্বমস্যাদিলক্ষ্যম।
একং নিত্যং বিমলমচলং সর্বদা সাক্ষিভূত,
ভাবাতীতং ত্রিগুণরহিতং সদগুরুং তং নমামি ।
সদগুরু আনন্দ-ব্ৰহ্ম । আমি জীব, আমি তোমায় নমস্কার করিতেছি। তুমি পরম
সুখ-স্বরূপ, জীষকে প্রকৃত আনন্দ দানে তুমিই সমর্থ। তুমি কেবল। কেবল আনন্দ
ভিন্ন তােমাতে আর কিছুই নাই। জ্ঞান-মূৰ্ত্তি তুমি,-সুষুপ্তির জ্ঞানানন্দ তুমি নও,
তুমি সজ্ঞানানন্দ। শীতােষ্ণ, সুখদুঃখাদি দ্বভাব তােমাতে নাই। তুমি গগন-সদৃশ
সীমান্ত। ঐতি, ‘তত্ত্বমসি’-মহাবাক্যে তােমাকেই লক্ষ্য করিতেছেন। তুমি এক
'একমেবাদ্বিতীয়। এক বলিয়া তুমি স্বগত-ভেদ শূন্য, ‘এ’ বলিয়া তুমি জাতীয়
ভেদ হীন, এবং অদ্বিতীয় বলিয়া তুমি বিজাতীয়-ভেদ বর্জিত। নিত্যৰন্তু তুমিই, -
ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমানে একমাত্র তুমিই আছ,যাহা সর্বকালে থাকে না তাহা অনিত্য।
তুমি নিতান্ত নিৰ্ম্মল-অজ্ঞান-মল তােমাতে নাই। তুমি সর্বদা অন্তুরের ও বাহিরের
সকল চেষ্টার, সকল কার্ষের অষ্টা-সৰ্ববিষয়ের সাক্ষী তুমি। তুমি ভাৰতীত ও গুণাতীত।
ক্ষুরন্তি শীকরা যস্যদানন্দস্তান্বরেইবনে।
সর্বেষাং জীবনং তস্মৈ ব্ৰহ্মানন্দাত্মনে নমঃ ।
যে ব্ৰহ্ম হইতে আনলকণা আকাশে ও ভূমিতলে ফুরিত হইতেছে, সর্ব জীবের জীবন,
সেই আনন্দ-ব্ৰহ্মকে নমস্কার।
তব নিঃশ্বসিতং বেদান্তব স্বেদেহখিলং জগৎ।
বিশ্বভূতানি তে পদৌ শীর্ষোদ্যোঃ সমবৰ্তত।
নাভ্যা আসীদন্তরীক্ষং লােমানি চ বনস্পতিঃ।
চন্দ্ৰমা মনসােজাত শ্চক্ষুঃ সূৰ্যন্ত প্রভাে•
ত্বমেব সর্বং ত্বয়ি দেব সর্বং, স্তোতাস্তুতিঃন্তব্য ইহ ত্বমেব।
ঈশ। স্বয়াবাস্তমিদং হি সর্বং,নমােহস্তুভূয়ােহপি নমো নমস্তে।
No text on this page.
উৎসর্গ ওঙ্কারপিঞ্জর শকী মুপনিষদুদ্যানকেলীকলকন্তীম্। আগম বিপিন ময়ুরীং আৰ্য্যামন্তর্বিভাবয়ে গৌরী। ব্ৰহ্মস্বরূপাং পরমাং রাম-রামাং মনােরমাম্। নির্লিপ্তাং নিগুণাং নিত্যাং সত্যাং শুদ্ধসনাতনীম্। ওঙ্কার-পিঞ্জরে তুমি শুক-পক্ষিণী,উপনিষদ-উদ্যানে তুমি কেলী-কলকণ্ঠী, আগম বিপিনে তুমি ময়ুরী,—তুমি আৰ্যা,-তুমি গৌরী, আমি মানসে তোমায় ভাবনা করি। তুমি ব্ৰহ্মস্বরূপা, নিলিপ্ত, নিগুণা, নিত্যা, সনাতনী। তুমি মনােরমা—তুমি রাম-রামা- এ আয়ােজন তােমার জন্য। তুমি সৰ্ব্ববেদে প্রণব, তুমি ওঙ্কার-বীজারী, তুমি মহাবাশিষ্ঠ- রামায়ণে রাম-বশিষ্ঠ, শ্রীমদ্ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণার্জুন তুমিই। শ্রীঅর্ধনারীশ্বর তােমার সচ্চিদানন্দগঠিত মূর্তি-রাজগুহ্য ব্ৰহ্ম-বিদ্যা তােমার স্বরূপাভাস-জগতের সৃষ্টি-স্থিতি- নাশ-ক্রিয়া তােমার তটস্থ-ভঙ্গী,-বাক্য তােমার রূপগুণ প্রকাশে অসমর্থ। লীলা তােমার অনন্ত! তুমি সর্বদেবদেবী অলঙ্কত-কখনও পুরুষ, কখনও প্রকৃতি ভাবে তুমি সর্বত্র পুজিত। তুমি মায়ামানুষ—তুমি মায়ামানুষী। গীতাবস্ত্রান্তব্যঞ্জিত উপনিষদেবী তুমিই চার্কাগ্নি-সমানকুণ্ডলধরী গায়ত্রীদেবী তুমিই। হে গুরো ! হে মহাদেব-আলিঙ্গিত মহাদেব। হে সৰ্বনরনারী-বিজড়িত বিখমুৰ্ত্তে । এই চিরপ্রফুল্ল কুসুম-স্তবক তুমিই-উৎসর্গও তােমাকেই করা হইল। তােমায় ভুলিয়া মানবের তৃপ্তির জন্য যেন আমার কোন অনুষ্ঠান না হয়। কায়মনো- বাক্যোখিত আমার ভূমি-বিলুষ্ঠিত সাষ্টাঙ্গ-প্রণাম যেন তােমার বিশ্বরূপ-ঘনীভূত মুর্তি- চরণে নিরন্তর লগ্ন থাকে। তােমার তৃপ্তির জন্য সমস্ত লৌকিক কৰ্ম্ম অবসানে তােমার ‘সৰ্বজীবে নারায়ণ-অনুভূতি’-রূপ উপাসনা শেষে যেন আমি তােমায় জানিয়া তােমার সঙ্গে নিরন্তর ব্রাহ্মীস্থিতি লাভ করিতে পারি। আর যােগঙক্তিজ্ঞানের কণ্ঠমালা ধারণ করিয়া তোমার জগৎ যেন তোমার চরণতলে চির-বিশ্রান্তি লাভ করে। অলমতি শিশুরেণ। নমস্কারাে হষ্টাঙ্গঃ সকল দুরিত ধ্বংসন পটুঃ, কৃতং নৃত্যং গীতং স্তুতিরপিরমাকান্ত ত ইয়ম্। তব প্রীত্যৈ ভূয়াদহমপি চ দাস স্তববিভাে, কৃতং ছিদ্রং পূর্ণং কুরু কুরু নমস্তেহস্তভগবন্ ॥ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসে মনােৰদ্বাচোহবাচঃসউপ্রাণস্য প্রাণশ্চক্ষুষ ক্ষুঃ অতিমুচ্য ধীরাঃ প্রত্যাশ্মল্লোকাদম্বতা ভবন্তি। ওঁ শান্তুিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তি। ও হরিঃ ওঁ।
আমিই জীবকে মৃত্যু-সংসার-সাগর হইতে উদ্ধার করি, আমিই জুরকে আসুর যােনিতে নিক্ষেপ করি, আমিই দিব্য চক্ষু প্ৰদান করি, আমিই দুরাচারকে সাধু করি। কোথাও ব্রহ্মভাবে বলিতেছেন, “নমে ঘেযোহস্তি ন প্রিয়ঃ।” কোথাও ঈশ্বর-ভাবে বলিতেছেন “অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ”। কোথাও বলিতেছেন “প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্ম মায়য়া” (আমি স্বীয় প্রকৃতিকে আশ্রয় করিয়া আত্মমায়া বশতঃ প্রকাশিত হই)। আবার কোথাও বলিতেছেন “ভূমিরাপােহনলােবায়ুঃ খং মনােবুদ্ধিৱেব চ। অহঙ্কার ইতীয়ং মে ভিন্ন প্রকৃতিরষ্টধ ॥ অপরেয়মিতত্ত্বাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরা। জীবভূতাং- মহাবাহাে যয়েদং ধাৰ্যতে জগৎ ॥” ৭৪-৫। ইত্যাদি। দেহ-শূন্য আত্মা কেহ কি কখনও দেখিয়াছেন? সেইরূপ উপাধি-শূন্য ব্রহ্মের তত্ত্ব কে প্রকাশ করিবে ? নিৰ্বিশেষ-ব্রহ্মের সংবাদ যাহা পাওয়া যায়, তাহাতে দেখা যায় “যন্নবদা বিজানন্তি মনাে যত্ৰাপি কুণ্ঠিতম্। ন যত্ৰবা প্রভবতি” এই নিৰ্বিশেষ-ব্ৰহ্মকে বেদ জানেন না, মন হঁহার বিষয় চিন্তা করিতে গিয়া কুষ্ঠিত হইয়া ফিরিয়া আইসে, বাক্যের সাধ্য কি সে পর্যন্ত উঠিতে পারে। তিনি অবাত্মনস-গােচর—অচিন্ত্য—অব্যক্ত—নিগুণ। যিনি নিৰ্বিশেষ-ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে অধিক বলিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, “স্যামিদং কল্পিতমিন্দ্র-জালং, চরাচরং ভাতি মনােবিলাস। সচিৎসুখৈকাপরমাত্মরূপা, সাকাশিকাহং নিজ বােধরূপা” তিনি ‘নিজ বােধ-রূপ—এই পৰ্যন্ত ইহাদের উক্তি। ইনি দ্রষ্টা, ইহাতে এই অনন্ত কোটি ব্ৰহ্মাণ্ড ত্রসরেণুবৎ উঠিেেছ, লয় পাইতেছে। ইনি সৰ্বসাক্ষী—ইনি অন্তর্যামী, এরূপ উক্তিও আছে। নিষ্ক্রিয়-ব্ৰহ্ম হইতে জগৎ-ইন্দ্রজাল উৎপন্ন হইতেছে, জীব আপন আপন কৰ্ম্মফলে উৰ্দ্ধাধঃ গতি লাভ করিতেছে—ইহা যে গীতা বলেন নাই, তাহা নহে। “ন কর্তৃত্বং ন কৰ্ম্মাণি লােক সৃজতি প্রভু। ন কৰ্ম্মফল- সংযােগং স্বভাবস্তুপ্রবর্ততে ॥” প্রভু লােকের কর্তৃত্ব, কৰ্ম্ম বা ফল সংযােগ সৃষ্টি করেন না, স্বভাবই কর্মে প্রবৃত্ত হইতেছে, গীতা এ সংবাদ দিতেছেন, কিন্তু সবিশেষ-ব্ৰহ্ম আত্মমায়ায় ঈশ্বরভাব ধারণ করিয়া নাম রূপ গ্রহণ করিয়া আপন তত্ত্ব, আপন জন্ম, আপন কৰ্ম্ম, আপনি বুঝাইতেছেন, তাঁহার আশ্রিত জীবকে আশা দিতেছেন “অহং তেষাং সমুদ্ধা মৃত্যু-সংসার-সাগরাৎ”। বলিতেছেন, তুমি আমার আশ্রয় গ্রহণ কর, “অহং হৃং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ”। বলিতেছেন, তুমি যদি নিতান্ত দুরাচারও হও, তথাপি আমাকে ডাকিবার শক্তি তােমার যাছে, তুমি অনন্যভাক হইয়া আমাকে ডাক’, সাধু হইয়া যাইবে।
( 1 ) সংসার-চেষ্টা, পরিজন-পােষণ যদি তােমায় আমার কর্মে বাধা দেয়, মনে ভাব, আমায় বিশ্বাস কর’, সর্বচিন্তা ত্যাগ করিয়া আমাকেই ডাকিতে থাক’, আমিই তােমার যােগক্ষেম বহন করিয়া আনিব। আমিই তােমার অর্জন-রক্ষণের ভার লইয়াছি, তুমি আমায় নিশ্চিন্ত হইয়া ভজনা করিতে থাক।, ভগবানের এই আশ্বাস-বাণী আর কোথায় এত প্রবলভাবে জীব-হৃদয়ে ধ্বনিত হইয়াছে ? আর কোথায় এত প্রবল ভাবে শুনিতে পাওয়া যায়, “মামেবৈষসি সত্যংতে প্ৰতিজানে প্রিয়ােহসি মে,” আমি প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছি, তুমি আমার নিতান্ত প্রিয়, তুমি সত্যই আমাকে পাইবে? কোথায় শােনা যায়, “তস্মাত্বমুত্তিষ্ট যশােলভ, জিহ্বা শক্র ভুজ্জ রাজ্যং সমৃদ্ধ। ময়ৈবৈতে নিহতাঃ পূৰ্বমেব, নিমিত্তমাত্ৰং ভব সব্যসাচি”? এই সবিশেষ সৰ্বান্তৰ্য্যামী সৰ্ব্বচিত্তগামী সগুণ ব্রহ্মের আপন মুখে আপন মূৰ্ত্তিগ্রহণ, আপন মুখে জীবকে উৎসাহ-প্রদান, আর কোথায় এরূপ ভাবে শুনিতে পাই ? শ্রীমদ্ভাগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেন হস্ত প্রসারণ করিয়া ভক্তকে আপন ক্রোড়ে তুলিয়া লইতেছেন। আসুরী- রাক্ষসীযােনির মনুষ্য হউক, কাহাকেও হতাশ করিতেছেন না। যদি সমুদয় পাপকারী হইতেও তুমি পাপী হও “অপিচেদসি পাপিভ্যঃ সৰ্ব্বেভ্যঃ পাপত্তমঃ” • তথাপি ভগবান্ তােমায় আশ্বাসিতেছেন! তুমি স্ত্রীলােক হও, বৈশ্য হও, শূদ্র হও, ভগবান্ তােমাকেও হতাশ করেন নাই—বলিতেছেন “তেহপি যান্তিপরাং- গতিম্।” পাপীতাপীর এমন বন্ধুর কথা, কাঙ্গালের এমন ঠাকুরের কথা, এমন ভাবে আর কোথায় শুনিতে পাওয়া যায় ? যিনি এক দিকে আপন বিশ্বরূপ দেখাইঞ্জা ভক্তের ভীতি উৎপাদন করিতেছেন, তিনিই আবার অন্য দিকে সখারূপে আশ্বাস দিয়া বলিতেছেন “দেখ, আমি তােমারই আছি, তুমি আমার বড় প্রিয়, তুমি-শূন্য জগতে আমি ক্ষণকালও থাকিতে পারি না।” অভিমন্যু বিনাশের পর ভগবান্ দারুককে বলিতেছেন “অনৰ্জ্জুনমিমং লােকং মুহূৰ্তমপিদারুক। উদীক্ষিতুংনশকোহহং ভবিতা নচতৎতথা ॥ যস্তং দ্বেষ্টি সমাং দ্বেষ্টি যন্তং হনুসমামনু। ইতি সঙ্কল্প্যতাং বুদ্ধ্যা শরীরাৰ্দ্ধং মমাৰ্জ্জুনঃ ॥” আবার এই মায়ামানুষই বলিতেছেন “মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়। ময়ি সৰ্বমিদং পােতং সূত্রে মণিগণাইব।” তাই আমরা বলিতেছিলাম, অন্যান্য সংবাদ বাদ দিলেও এই আশ্বাসবাণীই গীতার বিশেষত্ব। আমরা গীতার কতকগুলি আশ্বাস-বাণী একত্র করিলাম, ইহা নিত্য-সেব্য :-
( ৮ )
সব ধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহংত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মাশুচঃ ॥ ১৮৬৬
মন্মনা ভব মভক্তো মজীমাং নমঞ্জুরু।
মামেবৈষসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়ােহসিমে। ১৮৬৫
যেতু
সর্বাণি কৰ্ম্মাণি ময়ি সংস্য মৎপরাঃ।
অনন্যে নৈব যােগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপিসতে ।
তেমহং সমুদ্ধৰ্তা মৃত্যু সংসার-সাগরাৎ।
ভবামি নচিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিত চেতসাম্। ১২৬-৭
নতু মাং শক্যসে দ্রষ্ট মনেনৈব স্বচক্ষুষা।
দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে রূপমৈশ্বরম্ ॥ ১১১৮
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যপাসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যােগক্ষেমংহাম্যহম্ ॥ ৯২২
তেষাংসতত-যুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূৰ্বক।
দদামি বুদ্ধিযােগং তং যেন মামুপন্তিতে ॥১০/১০
তেমেবানুকম্পার্থ মহ মজ্ঞানজং তমঃ।
নাশয়াম্যাবস্থাে জ্ঞান-দীপেন ভাস্বতা ॥ ১০/১১
অপিচেৎ সুদুরাচারী ভজতে মা মনন্যােক।
সাধুরেব স মন্তব্য সম্যগ ব্যবসিততাহি সঃ।
ক্ষিপ্রং ভবতি ধৰ্ম্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি নমে ভক্তঃ প্রণতি ।
আমরা আর অধিক উদ্ধৃত করিব না, কিন্তু এমন মধুর বাণী আর কোথায়?
যেখানে ভগবান বলিতেছেন,—“আমাকে যাহা দাও তাহাই আমি ভােজন
করিয়া থাকি; কিন্তু যাহা দিবে, ভক্তি-পূৰ্ব্বক প্রদান করিও।” ভক্তি করিবার
সামর্থ্য পাপী, তাপী, সুদুরাচারী সকলেরই আছে, যদি সুদুরাচারও ভক্ত
হইতে না পারিত, তবে কি ভগবান্ বলিতেন, অপিচেৎ সুদুরাচারােভজতেমা-
মনন্যভাও? সুদুরাচার হইয়াও একান্তু চিত্তে যদি কেহ আমাকে ডাকে ইত্যাদি,
•
( ৯ :) ইহাতেই বুঝিতে হইবে, সুদুরাচার হইলেও একাগ্রচিত্তে ডাকিবার সামর্থ্য থাকে। নরের জন্য নিতান্ত ব্যাকুল নারায়ণের আশ্বাস-বাক্য শুনিয়া কাহার না সাধ হয়'তাহাকে পূজা করি? নারায়ণ যে বলেন, “পত্রং পুষ্পং ফলং তােয়ং যাে মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি তদহং ভক্তপহৃত মশ্নামি প্রতাত্মনঃ। ৯২৬। “আমাদের কাতরােক্তি, আমাদের কাতর প্রার্থনা, তিনি কি শুনিয়া থাকেন?”-এই-না অবিশ্বাসীর সন্দেহ ? “আমি ভিখারী, তিনি সর্বেশ্বর, আমার পূজা তিনি কি গ্রহণ করিবেন ?”—এই-না দুৰ্বল বিশ্বাসীর সংশয় ? বিশ্বাসের কর্ণে ভগবানের আশ্বাস-বাণী শুনিলে সন্দেহ বা সংশয় কি আর থাকে ? আরও কত আশ্বাস-বাণী আছে। ভক্ত হইয়া নিরন্তর তাহাকে ডাকিতে থাকিলে তিনি সংসার যাত্রাও নিৰ্বাহ করিয়া দিয়া থাকেন, মােক্ষও দিয়া থাকেন। তাহার শরণাপন্ন হইয়া ভক্ত যে অন্য কর্ম চেষ্টা করিবে, ইহা ত তিনি সহ করিতে পারেন না, তাই বলেন - “অনন্যা শ্চিন্তয়ন্তোমাং যে জনাঃ পর্যপাসতে। তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যােগক্ষেমং বহাম্যহম্।” ভক্তের জন্য তিনি আপনিই যােগ ও ক্ষেম বহন করেন। যদি এখনও ভক্ত হইতে না পারিয়া থাক, যদি এখনও আমার কৰ্ম্ম ‘আমার কর্ম বলিয়া অভিমান আছে বুঝিতে পার, এ অবস্থায় তিনি তােমার যােগক্ষেম বহন করেন না সত্য, এই কর্তৃত্বাভিমানীদিগকে তিনি বলিতেছেন—“তােমার যতদিন ‘অহং কৰ্ত্তা বােধ আছে, তােমার যতদিন আমার কর্ম’ বােধ আছে, ততদিন তুমি তােমার সমস্ত কৰ্ম্ম আমাতে অর্পণ কর, আমার প্রীতি জন্য কৰ্ম্ম করিতেছ স্মরণ করিয়া সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম করিতে থাক, যৎকবােষি যদশাসি যজ্জহােষি দদাসি যং, যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎকুরুষ মদর্পণম্। আহার ভ্রমণাদি লৌকিক কৰ্ম্ম, যজ্ঞ, দান, তপস্যাদি বৈদিক কৰ্ম্ম যাহা যাহা তােমার কৰ্ম' বলিয়া অভিমান করিতেছ, তাহাই আমাতে অর্পণ কর। কৰ্ম্ম করিবার আদিতেই মনে মনে জিজ্ঞাসা কর—‘আমার এই কর্মে তুমি কি প্রসন্ন হইবে ? ইহা বলিলে বিহিতকর্ম ভিন্ন নিষিদ্ধকৰ্ম্ম তুমি আর করিতেই পারিবে না। তখন আমি তােমায় একান্তে মৎকর্মের ভার প্রদান করিব, আমার সেবায় অধিকার দিব। সে অবস্থায় তােমার আহারের চেষ্টাও করিতে হইবে না, যােগক্ষেম আমিই বহন করিয়া আনিয়া দিব।”—এমন আর কোথায় নিতে পাওয়া যায় ? . ২ । আশ্বস-বাণী সম্বন্ধে অধিক আর কি বলা যাইবে ? জীবের তপ্ত-হৃদয়ে ইহার কতই প্রয়ােজন! এ জগতে তাপী কে নয়? কাহার না আশ্বাস-বাক্য আবশ্যক? যাহাতে প্রাণ জাগিয়া উঠে, হৃদয় সবল হয়, বুদ্ধি সংশয়-শূন্য হয়, মন বিষয়-চিন্তা পরিত্যাগ করে, তাহাতে কাহার প্রয়ােজন নাই? যাহা সুপ্ত প্রাণকে জাগ্রত করে, হতাশকে আশা দেয়, অলসকে কর্মে নিযুক্ত করে, পাপী তাপীকে কুকৰ্ম্ম কুচিন্তা ত্যাগ করায়,—জগতে এমন সাধু হইয়া কে জন্ম গ্রহণ করিয়া- ছেন, যিনি “ অহং তেষাং সমুদ্ধা মৃত্যু-সংসার-সাগরাৎ ” এই আশ্বাস-বাণীর প্রয়ােজন বােধ না করেন? এই ‘অনাদি মােহ-নিশা-সুপ্ত’ জীবজগতে অনবরত কত দুঃস্বপ্ন উঠিতেছে, ‘জরামরণ-হর্ষামর্ষাদি-অনর্থসঙ্কুল কত বিভীষিকা প্রদর্শন করিতেছে, এই ‘তাপত্ৰিতয়-দাবানল-জ্বালা-মালাকুল সংসারণ্যে কত বিবেকান্ধ জীব নিরন্তর মােমুহ্যমান হইতেছে, ‘অরিষড়বর্গ-ব্যাধ-বধ্যমান প্রাণি-নিকর কণ্ঠ হইতে কতই কাতরােক্তি নিরন্তর উখিত হইতেছে, কে তাহার ইয়ত্তা করিবে ? নিতান্ত দুঃখী জীবকে আনন্দ-নিদ্রায় নিদ্রিত করিতে ভগবান্ ভিন্ন আর কে সমর্থ? ভগবদ্বাণী নির্জীব হৃদয়ের সঞ্জীবনী মহৌষধি। গীতার মধুর-গীতি শ্রবণে প্রাণ আনন্দে নিদ্রিত হয়, গীতার মৃদুবেদান্ত-রসাস্বাদে চিত্ত-বালক হেলিয়া দুলিয়া সুন্দর খেলা করে। ভগবান্ শঙ্কর আত্ম-রসাস্বাদী চিত্তকে লক্ষ্য করিয়া যাহা বলিতেছেন, তাহা গীতা-সুধা-পান-বিভাের সাধক- চকোরের গদ্গদ-মধুর ভাষা মাত্র, শঙ্কর বলিতেছেন যশােদা গীতমধুরৈ মৃদু বেদান্ত ভাষিতৈঃ। লালিত প্রাপিত নিদ্রাং মুকুন্দ ইব মােদসে ? নবনীতরস গ্রাস চমৎকারৈঃ স্বসম্বিদা অন্তরাপ্যায়িতত বালাে মুকুন্দ ইব খেলসি ? সায়ংকালে সমাধ্যাখ্যে স্নিগ্ধাং সর্বাঙ্গসুন্দরী। নিজ শক্তি মুমাং পশ্যন্ মহেশ ইব নৃত্যসি? দৃশ্যং নিপীয় গরলং পাচয়িত্ব তদাত্মনি। মৃত্যুঞ্জয়-পদ প্রাপ্তঃ কিং নৃত্যসি হরাে যথা? | যশােদার মধুর-গীতি শ্রবণে বাল-মুকুলের সুনিদ্রার ন্যায় গীতার মধুর ‘অশ্বাস-বাণী ব্যাকুল জীবকে আনন্দ নিদ্রায় নিদ্রিত করুক। গীতার নবনীত ‘রস গ্রাস সদৃশ আত্মস্বাদনের চমৎকারিতা অশান্ত চিত্ত-বালককে আপ্যায়িত (১১) করিয়া বাল-মুকুন্দের ন্যায় লীলাপরায়ণ করুক। বাসনাব্যাকুল জীব, গীতা- সাধনায় সিদ্ধি লাভ করিয়া সমাধি-সায়ংকালে মিগ্ধা সৰ্বাঙ্গসুন্দরী নিজ শক্তি উমার সর্শন করিতে করিতে মহেশের মত আনন্দে নৃত্য করুক। আর দৃশ্য প্রপঞ্চরূপ গরল পান করিয়া, আত্ম-বধে দৃশ্যজ্ঞানমাৰ্জন পূৰ্বক, দেবদেবের মত মৃত্যুঞ্জয় পদ প্রাপ্ত হইয়া, পরমানন্দ লাভ করুক, ইহাই আমাদের প্রার্থনা। এস্থানে আর একটা বিষয় উল্লেখযােগ্য-জগতের অন্যস্থানে যে যে মহাপুরুষ জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহারাও সময়ে সময়ে আপনাদিগকে ঈশ্বর বলিয়াছেন। কিন্তু গীতার সৰ্ব্ব স্থানেই শ্রীকৃষ্ণ আপনাকে,পুরুষােত্তম পরমেশ্বর”,‘অন্তর্যামী, ‘ভগবান’, ‘আত্মা’, ‘ক্ষেত্ৰজ্ঞ, ইত্যাদি বলিতেছেন। এই শ্রীকৃষ্ণ সাধুকে কৃপা করেন, অসাধুকে শাস্তি প্রদান করেন, সংসারে যাহারা নরাধম তাহাদিগকে অজস্র অশুভ যােনিতে নিক্ষেপ করেন। ভগবান্ বলিতেছেন “তানহং দ্বিশতঃ ত্রুরা সংসারেষু নরাধমান্। ক্ষিপাম্যজত্র মশুভানাসুরীষেব যােনিযু।” নিগুণ পরমাত্মা মায়া-আশ্রয়ে শ্রীকৃষ্ণমূৰ্ত্তি পরিগ্রহণ করিয়াছেন। তাহার পক্ষে আত্ম-তত্ত্ব, পরমাত্ম-তত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, ও গুণতত্ত্ব প্রকাশ করা দুঃসাধ্য কেন হইবে? যিনি অন্তর্যামীরূপে ব্রহ্মাণ্ডের অন্তরে বাহিরে বিরাজমান, তিনিই আত্মমায়ায় শ্রীকৃষ্ণমূর্তি ধারণ করিয়াছেন। পরমাত্মা স্ব-স্বরূপে অবস্থান করিয়াও মূৰ্ত্তি গ্রহণ পূৰ্ব্বক লীলা করেন, ইহাতে অসম্ভব কিছুই নাই। মানুষ আপনার গােপনীয় জঘন্য চরিত্র সর্বদা অবগত থাকিলেও এই চরিত্র গােপন করিয়া লােক সম্মুখে ভদ্রোচিত আচরণ করে, বৃদ্ধ আপন স্বরূপ সৰ্ব্বদা স্মরণ রাখিয়াও বালক সাজিয়া বালকের সহিত খেলা করিতে পারে, নট নটী আপন আপন অবস্থা বিস্মৃত না হইয়াও রঙ্গমঞ্চে রাজা রাণীর অভিনয়ে লােক-সমাজ মুগ্ধ করিতে পারে, এ সকল যদি অসম্ভব না হয়, তবে ব্ৰহ্মভাবে অবস্থান করিয়াও পরমাত্মার শ্রীকৃষ্ণমূর্তিতে লীলা করা অসম্ভব হইবে কি রূপে? বশিষ্ঠদেব বলিতেছেন :- চিৎ প্ৰকাশাত্মিকা নিত্যা স্বাত্মনন্যবাৰসংস্থিতা। ইদ মন্ত জগ দ্ধত্তে সন্নিবেশং যথা শিলা। যােঃ বাঃ মিঃ পূঃ ৩১৩৬ প্রকাশাম্মিকা নিত্যা চিৎ স্বরূপে অবস্থান করিয়াও স্ফটিকশিলা যেন ( ১২ ) আপনাতে বন-নদ্যাদির প্রতিবিম্ব ধারণ করে, সেইরূপ আপনার অন্তরে এই জগম্ভাব ধারণ করিতেছেন। অদ্বিতীয়া দধানেদং বিকারাদি-বিবর্জিত। নাস্তমেতি চোদেতি স্পন্দতে নাে ন বর্ধতে। ঐ ঐ ৩৭। অদ্বিতীয়া চিতি, নির্বিকার ভাবে এই জগদ্ভাব ধারণ করিলেও, কদাচ অস্তমিত, উদিত, স্পন্দিত বা বর্ধিত হইতেছেন না। সঙ্কল্লাৎ জীবতা মেত্য নিঃসঙ্কল্পাত্মনাত্মনা । চিজ্জড়ং নাে জড়ং ভাবং ভাবয়স্তি স্বসংস্থিতাঃ । ঐ ঐ ৩৭। সঙ্কল্প-বলে ঐ চিতি, জীব-ভাবধারণ করিলেও নিঃসঙ্কল্প ভাবে আপনাতে অবস্থান পূৰ্ব্বক, এই জড়-জগৎ, অজড় বাস্তব ভাবে ভাবনা করতঃ স্ব স্বরূপেই অবস্থিত আছেন। গীতায় শ্রীকৃষ্ণের অবতারত্বেও কিছু বিশেষত্ব আছে। যাহারা তাহাকে ঈশ্বর বলিয়া ধারণা করিতে পারেন, তাহারা দৈবীপ্রকৃতিযুক্ত, আর যাহারা তাহা পারে না, তাহারা মূঢ়, তাহারা রাক্ষসী ও আসুরী যােনি হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। গীতা বলিতেছেন- মহাত্মানস্তুমাংপাৰ্থ দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ। ভজন্তানন্যমনসাে জ্ঞাত্বা ভূতাদি মব্যয়ম্ । হে পার্থ ! দৈবীপ্রকৃতিযুক্ত মহাত্মারা অনন্ত-চিত্ত হইয়া আমাকে জগৎ- কারণ ও নিত্য স্বরূপ জানিয়া ভজনা করেন। আর :- অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনু মাশ্রিতম্। পরং ভাব মজান্তো মম ভূতমহেশ্বরম্ । মােঘাশা মােঘকৰ্ম্মাণাে মােঘ-জ্ঞানা বিচেতসঃ। রাক্ষসীমাসুরীঞ্চৈব প্রকৃতিং মােহিনীং শ্রিতাঃ । আমি ভূত-সমূহের পরমেশ্বর, আমার পরমভাব না জানিয়া মুঢ়গণ আমাকে মনুষ্য-শরীরধারী বলিয়া অবজ্ঞা করে। ইহাদিগের বিবেক থাকে না বলিয়া সমস্ত ফল প্রার্থনা মিথ্যা হয়। ইহারা ঈশ্বরবিমুখ বলিয়া ইহাদের কৰ্ম্মও নিল, ইহাদের জ্ঞানও কুতর্কায়ে নিষ্ফল হয়। ইহারা হিংসাদি বহুল তামসী- ( ১৩ ) প্রকৃতি প্রাপ্ত হয়, এবং কাম-দৰ্পাদি-প্রচুর রাজসী-প্রকৃতি ইহাদের বুদ্ধি- ভ্রংশ করে। ইহাদের হৃদয়ে রাক্ষসের মত অন্য জাতির ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম ও আচারাদির উপর একটা বিদ্বেষ থাকে। ইহারা শান্ত-নিষিদ্ধ-বিষয় ভােগ-জনিত আসুর- ভাবও প্রাপ্ত হয়, এবং ভ্রষ্ট-মার্গ আশ্রয় করে। সমস্ত যােড়শ অধ্যায় ধরিয়া এই আসুর ও রাক্ষস-ভাব-বিশিষ্ট মানবের ব্যবহার উল্লেখ করা হইয়াছে। এই স্থানেই বলা হইয়াছে, রাক্ষসী আসুরী যােনি-জাত মনুষ্য অল্পবুদ্ধি, মলিন- চিত্ত, উগ্ৰকৰ্মা ও অহিতকারী হইয়া জগতের ক্ষয়ের জন্য উদ্ভূত হয়। বলা হইয়াছে—“প্রভবন্তু্যগ্ৰকৰ্ম্মাণ ক্ষয়ায় জগতেহহিতাঃ।” ভগবান্ স্বহস্তে ইহাদিগের দণ্ড বিধান করেন। গীতার অবতার-বাদের এই সমস্ত বিশেষত্ব। সাধ্য বিষয়ের বিশেষত্ব প্রদর্শিত হইল। এক্ষণে সাধনার বিশেষত্ব উল্লেখ করা যাইতেছে। গীতােক্ত সাধন-মার্গসমূহের বিশেষত্ব নিষ্কামকৰ্ম্ম। লৌকিক বা বৈদিক কৰ্ম্ম, আত্ম-সংস্থযােগ, ভক্তিযােগ, এবং জ্ঞানযােগ, সাধক ইহার যে কোনটী অবলম্বন করুন না কেন, সৰ্ব্ব প্রকার সাধনাতেই নিষ্কাম কৰ্ম্মের ব্যব- হার রহিয়াছে। লৌকিক ও বৈদিক কৰ্ম্ম হইতে ফলকামনা বিগলিত করা, নিষ্কাম কৰ্ম্ম-উপাসনায় ও ভক্তিযােগে কেবল ঈশ্বর-প্রসন্নতা কামনা ও নিষ্কাম কৰ্ম্ম-জ্ঞানযােগে অহং অভিমান দূর করাও নিষ্কাম কৰ্ম্ম। কামনার স্থূল অবস্থাই কৰ্ম্ম। কৰ্ম্ম অভ্যস্ত হইয়া গেলে স্বভাবে পরিণত হয় ; এই স্বভাব অনাদিকাল সঞ্চিত কৰ্ম্ম-সংস্কারের সমষ্টি মাত্র। এই স্বভাব মনুষ্যের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কৰ্ম্ম-প্রবণ হয় না, কোনকিছু নিমিত্ত পাইলেই কৰ্ম্ম হইয়া যায়। যাহারা ভগবানের প্রীতির জন্য পুরুষকার অবলম্বন করেন, তাহারাই আপন পূৰ্বসঞ্চিত কর্মক্ষয় করিতে সমর্থ হয়েন। সৰ্ব্বতভাবে ভগবদ আশ্রয়ে স্থিতিলাভ করাই প্রারদ্ধক্ষয়। এই অবস্থায় পূৰ্ব্বকৃতকৰ্ম্ম হইলেও সে কর্মের লাভালাভ, জয়, পরাজয়, কোন ফল-কামনাতেই লক্ষ্য থাকে না, লক্ষ্য থাকে একমাত্র ঈশ্বর- প্রীতিতে। এইজন্য সমস্ত কর্মই নিষ্কাম ভাবে সাধিত হয়। পুস্তক মধ্যে এই বিষয় বিশেষ রূপে আলােচিত হইয়াছে, এজন্য এস্থলে ইহার বিবরণ নিষ্প্রয়ােজন। গীতায় যতগুলি সাধন-ক্ৰম উল্লেখ করা হইয়াছে, এস্থানে আমরা সংক্ষেপে তাহার উল্লেখ করিতেছি। কিন্তু ইহাও জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে—সাধন-ক্ৰম গুলি স্বাভাবিক না কাল্পনিক ? আমারা কৰ্ম্ম-সঙ্কেতে এই বিষয় বিশেষরূপে আলােচনা করিব, এখানে এই মাত্র সংক্ষেপে বলিয়া রাখি যে-ভগবান্ জীবকে ত্রিবিধ শক্তি প্রদান করিয়াছেন—প্রাণ,মন ও বুদ্ধি। ক্রম অনুসারে প্রাণ, মন ( ১৪ ) ও বুদ্ধি পরিচালিত করিলেই আমরা যােগ, ভক্তি ও জ্ঞান সাধনার এই ত্রিবিধ ক্রম প্রাপ্ত হই। যােগ সাধনার অত্যাবশ্যক কৰ্ম্ম প্রাণায়াম, ভক্তি সাধনার প্রধান কাৰ্য্য মানস-পূজা ও জ্ঞান, সাধনার ভিত্তি—আত্ম-বিচার। প্রাণায়ামে শরীরের ও মুনের বলাধান হয়, মানস পূজায় মন ভগবদ রস আস্বাদনে বিষয় ভােগ ত্যাগ করে, বিচারে আত্মা পরমাত্মার একত্ব স্থাপনে জীবন্মুক্তি লাভ করে। গীতা যে স্থানে এই ক্রম দেখাইতেছেন তাহা উল্লেখ করা যাইতেছে ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা । অন্যে সাখেন যােগেন কৰ্ম্ম-যােগেন চাপরে । অন্যেত্বেব মজানন্তঃ শ্রুত্বাহন্যেভ্য উপিসতে। তে হপি চাতিতন্ত্যেব মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণাঃ। ১০/২৫ উত্তম অধিকারী সমাধি-সহকৃত ধ্যান যােগে শুদ্ধান্তঃকরণ দ্বারা বুদ্ধিতে আত্ম-দর্শন করেন। মধ্যম অধিকারী সাজ্জ-যােগে এবং মন্দ অধিকারী কৰ্ম্ম- যােগে দর্শন করিয়া থাকেন। অতি নিকৃষ্ট অধিকারী পূর্বোক্ত সাধনা না জানিয়া আচার্যের উপদেশ শুনিয়া উপাসনা করেন। তাঁহারা শ্রদ্ধা পূৰ্ব্বক গুরূপদেশ-পরায়ণ হয়েন বলিয়া মৃত্যুময় সংসার-সাগর অতিক্রম করিয়া থাকেন। এখানে আমরা দেখিতেছি আত্ম-দর্শনমাত্রই লক্ষ্য, তজ্জন্য ধ্যান যােগ, সাঙ্খ-যােগ, কৰ্ম্ম-যােগ এবং উপাসনা, ইহাই ক্রম। প্রথমে উপাসনা—জ্ঞানী ও অজ্ঞানীর সম্পূর্ণ প্রার্থক্য থাকিলেও উহাদের কৰ্ম্ম দূর হইতে একরূপ বােধ হইতে পারে। স্কুল দৃষ্টিতে তমাে ও সত্ত্বগুণের সাদৃশ্য লক্ষ্য হয়। বিশ্বাসে ও ভক্তিতে পার্থক্য আছে - বিশ্বাসীর ভক্তি ও ভক্তের ভক্তি বিশ্বাসীর উপাসনা ও ভক্তের উপাসনা একরূপ হইতে পারে না। মুঢ় ব্যক্তি উহাদিগকে একরূপ মনে করিয়া বিষম ভ্রমে পতিত হয়। উপাসনা, কৰ্ম্ম-যােগ, সাজ্জ-যােগ এবং ধ্যান-যােগ সম্বন্ধে আমরা এখানে সক্ষেপে দুই একটা কথামাত্র বলিয়া রাখিব। গীতার লক্ষ্যসঙ্কেতে এই বিষয়ের সবিশেষ আলােচনা করা যাইবে। এককালে জপ, ধ্যান ও আত্মবিচার হয় না সত্য, কিন্তু প্রতিদিনের সাধনায় ইহাদের কাৰ্য্য চলিবে, শাস্ত্র ইহ উল্লেখ করিয়াছেন- ‘জপাচ্ছ্বান্তঃ পুনধ্যায়েদ্ধ্যানাচ্ছান্তঃ পুনর্জপেৎ। জপধ্যান পরিশ্রান্ত আত্মানং চ বিচারয়েৎ” এক্ষণে সাধনার কথা বলা যাইতেছে।
( ১৫ ) ১। উপাসনা। ভগবান্ স্বঘ্নং বলিতেছেন “মামেকং শরণং ব্রজ” আমার শরণাপন্ন হও। “অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মাশুচঃ”- মনের নিবৃত্তি করিতে পারিতেছ না, “লয় বিক্ষেপ দূর করিতে পারিতেছ না, ইহাতেই বা তােমার ভয় কি? তুমি কাহার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছ চিন্তাকর, আমি তােমার সমস্ত পাপরাশি দূর করিয়া দিব, তুমি শােক করিও না। সর্বদা আমাকেই লক্ষ্য কর, সৰ্ব্বকালে মনকে ইহা স্মরণ করাইয়া দিতে হইবে। মন যখন যখন অসুস্থ হইবে, তখনই ইহাকে আশ্রয় দাতার কথা স্মরণ করাইও, নির্ভয় হইয়া যাইবে। চিত্ত অপ্রসন্ন হইলেই ভগবান্ আত্মাকে স্মরণ করিয়া সুস্থ হইতে অভ্যাস কর। স্বামীর বিরহে কাতর হইয়া স্ত্রী যদি বাহিরে ঘূরিতে থাকে, তবে তাহার ব্যভিচার হয় মাত্র। এইরূপ ব্যভিচার তুমি করিও না।” গীতার সাধনা নিষ্কাম-কৰ্ম্ম হইতে আরম্ভ হইয়াছে, সকাম কৰ্ম্ম হইতে গী তা আরম্ভ হয় নাই। ২। কর্মযোগ। যে ব্যক্তি বিশ্বাসী, সেই উপাসক হইতে পারে। সাধনার প্রথম অবস্থায় ঈশ্বর সাকার কি নিরাকার, সগুণ কি নিগুণ, কিছুই বিচারের আবশ্যকতা থাকে না, কেবলমাত্র বিশ্বাস রাখিলেই হয় যে তিনি মঙ্গলময়, তিনি আমার মঙ্গল করিবেন।” উপাসন। দ্বারা মনকে বাহিরে সুস্থ করিয়া কৰ্ম্মযােগে ইহাকে ভিতরে স্থির রাখিতে হইবে। ষট্চক্র মধ্যে মনকে প্রথম রাখিতে হইবে, ক্রমে মন কূটস্থ মধ্যে নিরন্তর থাকিতে অভ্যস্ত হইবে। ইহাই আত্ম-সংস্থ যােগ। কি লৌকিক, কি বৈদিক, সকল কর্মই যখন সাধক নিষ্কাম-ভাবে করিতে অভ্যস্ত হয়, তখনই আত্ম-সংস্থযােগে আত্ম-রসাস্বাদনে আত্মদর্শনে সমর্থ হয়। কিন্তু আত্ম-সংস্থযােগ পরিপক করিবার জন্য ভক্তিযােগের আশ্রয় লইতে হইবে। ভক্তি যােগে মন ভগবদরসাস্বাদন করিয়া শম, দম, ইত্যাদি সাধনে সবল হইতে থাকে। এখানে কৰ্ম্মযােগের দুইটী বিভাগ করা হইল। একটা অষ্টাঙ্গ যােগ এবং দ্বিতীয়টী ভক্তিযােগ। ৩। সাঙ্খ্য-যোগ। মন, কর্ম ও ভক্তি দ্বারা যখন সুস্থ হইবে, যখন ঈশ্বর-রসাস্বাদনে আনন্দ পাইবে শরীর রােগদ্বারা পীড়িত হইবে না, প্রাণ রিপুকর্তৃক চঞ্চল হইবে না, ( ১৬ ) চিত্ত তখন আপনিই বিচার করিতে সমর্থ হইবে। যাহার জন্য কৰ্ম্ম করি, যাহাকে উপাসনা করি, যাহার ভজনা করি তাহাকে দেখিতে, তাহাকে বুঝিতে, কাহার না ইচ্ছা হয়? সাঙ্খাযােগে বিচার মাত্র অবলম্বন। ঈশ্বর কে, কাহার শরণাপন্ন হইয়াছি, কোথায় তিনি আছেন, কেমন করিয়া তিনি আমায় রক্ষা করিতেছেন, তিনিই ভগবান্ আত্মা, তিনি আমার অতি সমীপে, চিত্ত এই সমস্ত তত্ত্ব বিচার করিবে। বিচার করিতে করিতে বুঝিবে, তিনি এই দেহ নহেন, তিনি মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার নহেন—তিনি কৰ্ম্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় নহেন—জগতে যাহা কিছু দেখা যায় বা শােনা যায়, তিনি তাহার কিছুই নহেন, অথচ তিনি আছেন। তিনি না থাকিলে দেহ জড়, জগৎ জড়, কাহারও অস্তিত্ব থাকে না। এইরূপে “প্রকৃতের্ভিন্নমাত্মানং বিচারয়সদাইনঘ।” ভগবান্ আত্মা প্রকৃতি হইতে ভিন্ন, ইহা বিচার করিয়া গুরুমুখে “আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যা মন্তব্যা নিদিধ্যাসিতব্যঃ” ইহা আরম্ভ করিতে হইবে। ৪। ধ্যান-যোগ। ভগবান্ আত্মার কথা সৃষ্টি ও সংহার ক্রমে শুনিতে শুনিতে—গুরুমুখেও শাস্ত্রমুখে যাহা শ্রবণ করা হইল—একান্তে তাহারই মনন হইতে থা দৃঢ়রূপে মনন আসিলেই ধ্যানযােগ আরম্ভ হইল, তখনই “তত্ত্বমসি” সাধনা সম্পূর্ণ হইল। ইহাই আত্ম-দর্শন, ইহাই জীবন্মুক্তি। বিনা আত্মজ্ঞানে মুক্তি হইবে না, ইহাই সৰ্ব্বশাস্ত্রের অভিপ্রায়, শ্রুতি বলেন। “তমেব বিদিহতিমৃত্যুমেতিনান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।” জীব আত্ম-জ্ঞান লাভ করিলেই মৃত্যু-সংসার-সাগর অতিক্রম করে, ইহা ভিন্ন মুক্তির অন্য পথ নাই। ভগবান্ বশিষ্ঠ বলিতেছেন- সংসারােত্তরণে জন্তো রুপায়াে জ্ঞানমেবহি। তপােদানং তথা তীর্থমনুপায়াঃ প্রকীর্তিতাঃ। যাবৎ প্রবােধাে বিমলল নােদিতস্তাবদেব সঃ। মৌখ্যা দীনতয়া রাম ভক্ত্যা মােক্ষোহভিবাঞ্ছ্যতে। যােঃ উঃ ৭৩৩৭ একমাত্র জ্ঞানই জীবের সংসার-সাগর উত্তীর্ণ হইবার উপায় ; তপস্যা, দান • বা তীর্থ, ইহারা উপায় নহে। যে পর্যন্ত বিমল জ্ঞানের উদয় না হয়, সেই পৰ্য্যন্তই সেই জীব মূর্খতা বশতঃ ( ১৭ ) যে দীনভাবে ভক্তি দ্বারা মােক্ষ কামনা করিয়া থাকে। ইহাতেই বুঝা গেল, ভক্তি আত্ম-জ্ঞানের উপায় বটে, কিন্তু ভক্তি আনন্দ-স্বরূপে স্থিতি প্রদানে অসমর্থ। ভক্তি সম্বন্ধে বশিষ্ঠ দেবের উক্ত মত শ্রবণে, অনেকে যােঙ্গুবাশিষ্ঠমহা- রামায়ণের উপরে অভক্তি প্রকাশ করেন, এবং শঙ্করাচাৰ্যও ঐ মত প্রকাশ করিয়াছেন বলিয়া ভগবান্ শঙ্করকে “প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ” বলিতে কুণ্ঠিত হয়েন না। ইহাদের বিচারে -ভগবান্ ব্যাসদেব কোথাও ইহা প্রকাশ করেন নাই, ভক্তিতে মুক্তি হয় না। বাস্তবিক আপাতদৃষ্টিতে তাহাই বােধ হয় বটে। ব্যাসদেব অধ্যাত্ম-রামায়ণে বলিতেছেন “ভক্তিৰ্জনিত্ৰী জ্ঞানস্ত, ভক্তিমোক্ষদায়িনী ভক্তি হইতেই জ্ঞান জন্মে এবং ভক্তিই মােক্ষ প্রদান করেন। অঃ রাঃ যুদ্ধকাণ্ড ৭ ১৭। ভগবান্ ব্যাসের এই সমস্ত উক্তি সম্যক্ আলােচনা করিতে না পারিয়া এই সমস্ত সম্প্রদায়ভুক্ত লােকে ন্যাসী, যােগী, জ্ঞানী ইত্যাদির উপর, একটা ঘৃণা, প্রচার করিয়াছেন। ব্যাসদেব সৰ্ব্বত্র ভক্তির প্রাধান্ত স্থাপন করিয়াছেন বটে, কিন্তু তিনি যােগ, জ্ঞান বা ধ্যানের উপর কোথাও বিদ্বেষ প্রদর্শন করেন নাই, এবং ভক্তি মার্গের লােকে যােগ জ্ঞান ও ধ্যান সাধনা করিবেন না, একথা কোথাও বলেন নাই। “ভক্তিই মুক্তি” তিনি যে স্থানে 'বলিতেছেন, তাহা কোন্ অর্থে বলিয়াছেন, আমরা তাহার কথা দিয়া উহা প্রদর্শন করিব, এবং আশাকরি, ব্যাসদেবের মতটী পরিষ্কার করিয়া বুঝিতে পারিলে ভক্তি জ্ঞান ও মুক্তি এই ক্রম সম্বন্ধে বিবাদ মিটিয়া যাইবে। বিষ্ণোহি ভক্তিঃ সুবিশােধনং ধিয় স্ততে ভবে জ্ঞান মতীব নিৰ্ম্মলম্। বিশুদ্ধতত্ত্বানুভবে ভবেৎ ততঃ, সম্যগ্বিদিত্বা পরমং পদং ব্ৰজেৎ। অঃ রাঃ সুন্দর ৪।২২ ভক্তিতে সাধক কোন্ ভূমিকায় উপস্থিত হয়েন, ব্যাসদেব উপরের শ্লোকে তাহাই দেখাইতেছেন। ভক্তিদ্বারা চিত্তশুদ্ধি হয়, পরে জ্ঞান, পরে তত্ত্বানুভব হইলে পরম পদ প্রাপ্তি হয়। তথাপি তিনি যে বলিতেছেন “ভক্তিই মুক্তি” তাহার কারণ তিনি নিজেই বলিতেছেন- প্রথম সাধনং যস্য, ভবেৎ তস্য ক্রমেণ তু। ভবেৎ সর্বং ততো ভক্তি, মুক্তিরেব সুনিশ্চিত।” ।
( ১৮ ).
ভক্তির যে সমস্ত সাধনা আছে ক্রম অনুসারে প্রথমটী হইতে আরম্ভ করিলে
মুক্তি আসিবেই, এই জন্য ব্যাসদেব ভক্তিকেই মুক্তি বলিতেছেন। ব্যাসদেবের
মতে অষ্টাঙ্গযােগ এবং তত্ত্ববিচারও ভক্তি সাধনার অঙ্গ।
সাধনমার্গে ভক্তির স্থান কোথায়, ইহা নিশ্চয় করা নিতান্ত আবশ্যক এজন্য
আমরা ব্যাসদেব প্রদর্শিত ভক্তি সাধনার ক্রম এখানে উল্লেখ করিব।
তস্মাত্তামিনি সংক্ষেপাদ্বক্ষ্যেহহং ভক্তিসাধন।
সতাং সঙ্গতিরেবাত্ৰ সাধনং প্রথমং স্মৃতম্ ॥২২
দ্বিতীয়ং মৎথালাপ স্তৃতীয়ং মগুণেরণম্।
ব্যাখ্যাতৃত্বং মদ্বচসাং চতুর্থং সাধনং ভবেৎ। ২৩
আচাৰ্যোপাসনং ভদ্রে মদ্বুদ্ধ্যামায়য়া সদা।
পঞ্চমং পুণ্যশীলত্বং যদি নিয়মাদি চ৷ ২৪
নিষ্ঠা মৎপূজনে নিত্যং ষষ্ঠং সাধনমীরিতম্।
মম মন্ত্রোপাসকত্বং সাঙ্গং সপ্তমমুচ্যতে । ২৫
মদ্ভক্তেঘধিকা পূজা সর্বভূতেষু সম্মতিঃ।
বাহ্যার্থে বিরাগিত্বং শমাদিসহিতং তথা ২৬
অষ্টমং নবমং তত্ত্ববিচাররা মম ভামিনি।
এবং নববিধা ভক্তি সাধনং যস্য কস্য বা ॥ ২৭
স্ক্রিয়াে বা পুরুষস্যাপি তিগ্যােনি গতস্য বা।
ভক্তিঃ সঞ্জায়তে প্রেমলক্ষণা শুভলক্ষণে ॥ ২৮
ভক্তৌ সঞ্জাত মাত্রায়াং মত্তত্ত্বানুভব স্তথা।
মমানুভব-সিদ্ধ মুক্তি স্তত্রৈব জন্মনি। ২৯
স্যাত্তস্মাৎ কারণং ভক্তিঃ মােক্ষস্যেতি সুনিশ্চিত।
প্রথমং সাধনং যস্য ভবেৎ তস্য ক্রমেণ তু। ৩০
ভবেৎ সর্বং ততােভক্তি মুক্তিরেব সুনিশ্চতম্। অঃ, রাঃ
অরণ্য ১০ অধ্যায়
প্রেমলক্ষণা ভক্তির সাধনক্রম নববিধ-(১) মৎসঙ্গ,. (২) মৎ কথালাপ,
(৩) মদগুণ স্মরণ, (৪) আমার বাক্য ব্যাখা, (৫) আচাৰ্য্য ও আমি এক এই বুদ্ধিতে
( ১৯ ) ; আচাৰ্য্যোপাসনা ও যমনিয়মাদি যােগের বহিরঙ্গ-সাধনা, (৬) নিষ্ঠাপূৰ্ব্বক পূজা, (৭) মন্ত্রজপ (৮) ভক্তপূজা “সৰ্ব্বভূতে নারায়ণ-বােধ, বিষয়-বৈরাগ্য ও শম সাধনা (৯) তত্ত্ব বিচার। এই সমস্ত ভক্তি সাধনা দ্বারা প্রেম ভক্তি জন্মে। ভক্তি জন্মিলে আমার তত্ত্বের অনুভব হয়। আমার অনুভবই মুক্তি। এই কারণে ভক্তিকে মুক্তি বলা হইল; কারণ সাধনাক্রমের প্রথমটি হইতে আরম্ভ করিলে অন্য অন্য গুলি ক্রম অনুসারে আসিবেই। ব্যাসের এই মতের সহিত বশিষ্ঠ ও শঙ্করের মত একই। মূঢ় বুদ্ধিতেই গোঁড়ামি। আমরা ভাগবত হইতে ইহাই দেখাইতেছি। ভগবান্ ব্যাসদেব শ্রীমদ্ভাগবতে বলিতেছেন :- এবং প্রসন্ন-মনসাে ভগদ্ভুক্তিযােগ। ভগবত্তত্ত্ব বিজ্ঞানং মুক্তসঙ্গস্য জায়তে। ভিছতে হৃদয় গ্রন্থি চ্ছিদ্যন্তে সর্বসংশয়ঃ । ক্ষীয়ন্তে চাস্য কৰ্ম্মাণি দৃষ্টবাত্মনীশ্বরে। ১ম স্কন্ধ ৩২০-২১ পরম বৈষ্ণব শ্রীধরস্বামী টীকায় বলিতেছেন “এব কারেণ জ্ঞানানন্তর- মেবেতি চয়তি ” । নিষ্কাম কৰ্ম্মে ভগবৎ সেবা দ্বারা নৈষ্ঠিকী ভক্তি উৎপন্ন হয়। তখন রজস্তমাে- ভাব এবং কাম লােভাদি চিত্তমল দূরীভূত হয়। চিত্ত, তখন সত্ত্বগুণে অবস্থিত হইয়া প্রসন্ন হয়। ভক্তিযােগে চিত্ত এইরূপে প্রসন্ন হইলে আত্মতত্ত্বজ্ঞান লাভ হয়, ইহাই মুক্তি। এইরূপে আত্মদর্শন সাধিত হইলেই হৃদয়গ্রন্থি ভিন্ন হয়, সৰ্বসংশয় ছিন্ন হয়, কর্মক্ষয় হয়। টীকাকার শ্রীধরস্বামী কথাটী আরও পরিষ্কার করিয়াছেন। শ্রীধর বলেন “দৃষ্টএব” শব্দে আত্মদর্শন হইলেই হৃদয়- গ্রন্থি প্রভৃতি দূরীভূত হয়, নৈষ্ঠিক ভক্তি দ্বারা নহে এখানে ভক্তি-যােগের নিন্দা করা হইতেছে না, যাহারা মােক্ষলাভের ক্রম-বিপৰ্যয় করিয়া, উপায়কে উদ্দেশ্যরূপে পরিণত করিয়া, সাধনকে বাধন করিয়া আটকাইয়া রহিতেছেন, তাহাদিগকেই সাবধান করা হইতেছে মাত্র। -- ভগবান্ ব্যাসদেব অধ্যাত্ম-রামায়ণে বলিতেছেন— “তত্ত্বমস্যাদি বাক্যৈশ্চ সাভাসস্যামস্তথা। ঐক্যজ্ঞানং যদোৎপন্নং মহাবাক্যেন চমত্মনাের,
( ২০ )
-
তদাবিদ্যা স্বকাৰ্য্যৈশ্চ নশ্যত্যেব ন সংশয়ঃ ।
এবং বিজ্ঞায় মক্তো মত্তাবায়ােপপদ্যতে ॥
মদ্ভক্তিবিমুখানাং হি শাস্ত্রমাত্রেযু মুহতাম্।
ন জ্ঞানং ন চ মােক্ষঃ স্যাৎ তেষাং জন্মশতৈরপি।
ভক্তি, জ্ঞান এবং মুক্তি ইহাই ক্রম। বিনা ভক্তিতে জ্ঞানলাভের সম্ভাবনা
নাই, বিনা জ্ঞানে মুক্তি বা আনন্দস্বরূপে স্থিতি নাই। এই জন্যই বলা
হইয়াছে—
ভক্তিৰ্জনিত্ৰী জ্ঞানস্য ভক্তিমোক্ষ-প্রদায়িনী।
ভক্তিহীনেন যৎকিঞ্চিৎ কৃতং সমসৎ সমম্ ।
যে কালে ভগবান্ শঙ্কর ধৰ্ম্ম-প্রচার করেন, তখনও কৰ্ম্ম, ভক্তি ও জ্ঞান,
মুক্তির এই ক্রম সম্বন্ধে নানা প্রকার মত প্রচলিত ছিল। এই জন্য শঙ্করাচার্য্য
মুক্তির ক্রম স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বশিষ্ঠ ব্যাসাদি ঋষির মতই
সমর্থন করিতেছেন, বলিতেছেন
ন তু জ্ঞানং বিনা মুক্তি রস্তি যুক্তিশতৈপি।
তথা ভক্তিং বিনা জ্ঞানং নাস্তােয় শতৈরপি।
জ্ঞান ভিন্ন শত যুক্তিতেও মুক্তি হইবে না। আবার ভক্তি ভিন্ন শত উপায়
অবলম্বন করিলেও জ্ঞানের সম্ভাবনা নাই।
ভক্তিজ্ঞান তথা মুক্তি রিতি সাধারণঃ ক্রমঃ ।
জ্ঞানিনস্তু বশিষ্ঠাদ্য ভক্তাবৈ নারদাদয়ঃ ।
অগ্রে ভক্তি, পরে জ্ঞান, পরে মুক্তি ইহাই সাধারণ ক্রম। বশিষ্ঠাদি জ্ঞানী
এবং নারদাদি ভক্ত।
যাহারা বলেন যে ভক্তি ও জ্ঞানে কোনও পার্থক্য নাই, তাহাদের বুদ্ধির
পরিমার্জনা এখনও হয় নাই। তবে এ কথা সত্য, যে পরমজ্ঞান ও পরা ভক্তির
'কোন পার্থক্য নাই। পরম জ্ঞান ও পরাভক্তির কথা যথাস্থানে আলােচনা
করা হইয়াছে। এ স্থানে মুক্তি সম্বন্ধে তন্ত্রের অভিপ্রায়েরও কথঞ্চিৎ আভাস
দেওয়া যাইতেছে।
“কুর্বাণঃ সততং কৰ্ম্ম কৃত্বাকষ্টশপি।
তাব লভতে মােক্ষং যাবৎ জ্ঞানং ন জায়তে
( ২১ ) ০ ২ সাক্ষাৎ মােক্ষং বিজ্ঞানং জ্ঞনং পরতরং মত। তস্মাৎসর্ব প্রযত্নেন জ্ঞানং সর্বমুপাসিতম্ ॥ আতং তত্ত্ব বিচারেণ নিষ্কামেণাপি কৰ্ম্মণা। জায়তে ক্ষীণতমসাং বিদুষাং নিৰ্মলাত্মনাম্। পানং তরতে জ্ঞানং জ্ঞানাৎসত্যংহিলভ্যতে। তস্মাৎ সর্ব প্রযতুেন জ্ঞানমেব সমাচরেৎ। ন মুক্তি জপনাদ্ধোমাদুপবাসশতৈরপি। ব্ৰহ্মৈবাহমিতিজ্ঞাত্বা মুক্তোভবতি দেহভৃৎ | আত্মজ্ঞান মিদং দেবি পরং মােক্ষৈক সাধন। জানন্নিহৈব মুক্তঃস্যাৎ সত্যং সত্যং ন সংশয়ঃ । এই পীঠমালাতন্ত্রে মহাদেব আবার বলিতেছেন - আত্ম-ভিন্নং পশ্যতশ্চ কল্পকোটে শতৈরপি। নমুক্তি জায়তে দেবি তপােদানব্ৰতাদিভিঃ । সৰ্ব্বশাস্ত্রের যাহা মত, গীতার মতও তাহাই। তবে যে বলা হইয়াছে, ধ্যান- যােগ কৰ্ম্মযােগ বা উপাসনা ইহার কোন একটী অবলম্বন করিলেই মুক্তি, সে , কেবল আত্ম-জ্ঞান লাভের ক্রম মাত্র। সাধনার ক্রম সম্বন্ধে যথেষ্ট আলােচনা করা হইল। আমরা উপসংহারে মুক্তিকোপনিষদ হইতে আরও কতকগুলি উপায় দেখাইয়া এই আলোচনা শেষ করিলাম। রাম কেচিনিশ্রেষ্ঠা মুক্তিরেকেতি চক্ষিরে। কেচিং বন্নামভজনাৎ কাত্যাং তারােপদেশতঃ । কেচিত্ত সাখযােগেন ভক্তিযােগেন চাপরে। অন্যে বেদান্তবাক্যার্থ বিচারাৎ পরমর্ষয়। সালােক্যাদি বিভাগেন চতুৰ্দ্ধামুক্তি রীরিতা । এই সমস্ত উপায়ে সালােক্য, সারূপ্য, সমাপ্য, সাযুজ্য ইত্যাদি মুক্তিলাভ হয় বটে, কিন্তু কৈবল্যমুক্তি বিনা জ্ঞানে সাধিত হয় না। “অতএব ব্ৰহ্মলােকস্থা অপি ব্ৰহ্মমুখাৎ বেদান্ত শ্রবণাদিকৃত্বা তেন সহ কৈবল্য: লভন্তে, অতঃ সর্বেষাং কৈবল্যমুক্তিজ্ঞান- মাত্রেণােক্তা, ন কৰ্ম্মসাঙ্খ্যযােগােপাসনাদিভি রিত্যুপনিষৎ।
( ২২ ) ০ । পরমানন্দস্বরূপে অবস্থিতি ভিন্ন জীবের সর্বদুঃখ-নিবৃত্তি হইবে না। এই সৰ্ব্বদুঃখ-নিবৃত্তিই বা পরমানন্দে নিত্য স্থিতির নামই জীবন্মুক্তি বা বিদেহ মুক্তি। যােগ, ভক্তি, জ্ঞান রূপ উপায় দ্বারা ক্রমে ক্রমে জীব এই কৈবল্য-মুক্তি লাভ করিতে পারে, এইজন্য এই সমস্ত সাধনা ক্রম-অনুসারে আবশ্যক। শ্রুতি কৈবল্য- মুক্তির জন্য উপদেশ করিতেছেন। মুমুক্ষবঃ পুরুষঃ সাধনচতুষ্টয়সম্পন্নাঃ শ্ৰদ্ধান্ত সৎকুলভবং শ্রোয়িং শাস্ত্রবাৎসল্যং গুণবন্ত মকুটিলং সর্বভূত হিতেরতং দয়াসমুদ্রং সদগুরুং বিধিবদুপ সঙ্গম্যোপহার-পাণয়ােহষ্টোত্তর শততাপনিষদং বিধিব- * দধীত্য শ্রবণমনননিদিধ্যাসনাদি নৈরন্তর্ষেণকৃত্বাপ্রারব্ধ- ক্ষয়াদ্দেহত্ৰয়-ভঙ্গং প্রাপপ্যাপাধি-বিনিৰ্ম্মক্ত ঘটাকাশবৎ পরিপূর্ণতা বিদেহ মুক্তিঃ সৈব কৈবল্যমুক্তিরিতি” সাধ্যবিষয়ের কথাও বলা হইল, সাধনার বিষয়ও বলা হইল। জীব যে মুক্ত হইতে চায় না ইহাও নহে। কিছুই যে চেষ্টা করে না তাহাও ত বলা যায়না। তবে জীবের যাহা লক্ষ্য তথায় যাইতে পারে না কেন ? জীবের লক্ষ্য আর একবার চিন্তা কর। যিনি আত্মানুভব সন্তুষ্ট তিনিই জীবন্মুক্ত। লােক এই ‘আত্মানুভব সন্তুষ্ট হয় না কেন? এক সঙ্গে দুই রস ভােগ হইতে পারে না। যিনি বিষয়াস্বাদ করিতেছেন তিনি আত্মস্বাদ পাইবেন কি রূপে ? যিনি দেহাস্বাদ করেন, তাহার কি আত্মস্বাদ হয় ? আর এক সঙ্গে দুয়ের জ্ঞানও তিষ্ঠিতে পারে না। দেইজ্ঞান যাহার প্রবল তাহার আত্মজ্ঞান হইবে কি রূপে? দেহ দর্শন বা বিষয় দর্শন যাঁহার হয় তাঁহার আত্ম দর্শন হইবে না। দেহ দর্শন করিতে করিতে “আমার দেহ”, “আমার দেহ” বােধ হয়, তখন দেহে আত্মভিমান জন্মে। “দেহ আমি” “দেহ আমি এই বােধ প্রবল হইলেই মনুষ্যের সর্বপ্রকার দুঃখ উপস্থিত হয়। দেহাভিমানজ শােক ত্যাগ কর এবং আত্মানুভব সন্তুষ্ট হও। “আমি দেহ নহি”, “আমি আনন্দস্বরূপ” এই দুয়ের অনুভবেই জীবন্মুক্তি। “ধ্যানেনাত্মনি” ইত্যাদি শ্লোকে জীবন্মুক্তির সাধনার যে ক্রম গীতা দেখাইতেছেন, আমরা তাহার আলােচনা করিলাম । সাধনার ক্রম দুইটা। ।
( ২৩ ) (১) সৃষ্টি ক্রম, (২) সংহার ক্রম। আনন্দস্বরূপ ব্ৰহ্ম হইতে দুঃখী জীব কিরূপে আসিল ইহা বুঝিতে পারিলেই দুঃখী জীবের নিত্যানন্দ প্রাপ্তির পথ পরিষ্কার হইল। ইহা সৃষ্টি ক্রম। আবার জীবের মধ্যে যে সমস্ত উপাদান আছে তাহার বিচার দ্বারা যখন আনন্দ-স্বরূপ আত্মা পাওয়া যায় না, যখন প্রকৃতির কোন কিছুকেই আত্মা বলা যায় না অথচ আত্মা আছেন এই বােধ থাকে। আত্মার আভাস পাওয়া যায়, অথচ স্পষ্ট জানিতে পারা যায় না, এইরূপ অভ্যাস করিতে করিতে যখন দৃশ্যজ্ঞান মার্জনা হয় তখনই আত্মস্বরূপ দর্শন হয়। ইহা সংহার ক্রম। সৃষ্টিক্রম ধরিয়া জীবন্মুক্তির পথ গুলি আর একবার নির্দেশ করা যাইতেছে। (১) জীবন্মুক্ত জানেন যে- “অহং দেবােন চান্যোস্মিণ ব্ৰহ্মৈবাহং ন শােকভাক। সচ্চিদানন্দ রূপােহহং নিত্যমুক্ত স্বভাববান্ । জীবন্মুক্তের স্থিতি এই আনন্দের ধ্যানযােগে। (২) যিনি অহং “ব্ৰহ্মাস্মি” ধারণা করিতে পারেন নাই তিনি প্রকৃতের্ভিন্ন মাত্মানং বিচারয় সদানঘ” ইহাই অনুশীলন করিবেন। ইহাই সাংখ্য-যােগ। (৩) সাংখ্য যােগে যিনি স্থিতি লাভ করিতে পারেন নাই, তিনি উপাস্য বস্তুতে চিত্ত একাগ্র করিবেন, ইহাতেও অসমর্থ হইলে আত্মসংস্থ হইবার জন্য কৰ্ম্মযােগ অবলম্বন করিবেন। প্রাণায়াম ইত্যাদি বৈদিক কৰ্ম্ম দ্বারা ঈশ্বরের প্রীতি লাভ করিয়া আত্মসংস্থ হওয়াই কৰ্ম্মযােগের উদ্দেশ্য। (৪) যাহারা বৈদিক কৰ্ম্মযােগেও অসমর্থ, তাহারা লৌকিক কৰ্ম্মাদি করিবে, কিন্তু কর্মের আদিতে ও কৰ্ম্ম শেষে “তুমি প্রসন্ন হও” এই ভাব বিস্মৃত হইতে পারিবে না, ইহাই উপাসনা। সমস্ত কাৰ্যে ঈশ্বরের কৃপা ভিক্ষাই উপাসনার উদ্দেশ্য। হইবে, নতুবা উপরােক্ত সাধন ক্রমগুলি কখন কখন প্রত্যহ আলােচিত হওয়া উচিত। ভিন্ন ভিন্ন সাধন ক্রম মত কাৰ্য্য অভ্যাস কালে সর্বদা শেষ লক্ষ্য স্মরণ রাখিতে উপায়ই উদ্দেশ্য হইয়া যাইতে পারে। এজন্য আমরা শেষ উদ্দেশ্যটি পুনরায় আলােচনা করিয়া এই অংশের উপসংহার করিতেছি। অস্য দেবাধি দেবস্য পরস্য পরমাত্মনঃ। জ্ঞানদেব পরাসিদ্ধিত্বনুষ্ঠান দুঃখতঃ ।
( ২৪ )
ন হেষ দূরে নাভ্যাসে না লভ্যা বিষমেণ চ।
স্বানন্দাভাস-রূপােহসৌ স্বদেহাদেব লভ্যতে।
কিঞ্চিমােপ কৰােত্যত্র তপােদান ব্ৰতাদিক।
স্বভাবমাত্রে বিশ্রান্তিতে নাত্ৰাস্তি সাধনা।
সাধুসঙ্গম সচ্ছাস্ত্র পরতৈবাত্র কারণম্।
সাধনং বাধনং মােহ জালস্য যদকৃত্রিম।
অয়ং সদেব ইত্যেব সম্পরিজ্ঞান মাত্ৰতঃ ।
জন্তোন জায়তে দুঃখং জীবন্মুক্তত্বমেতি চ।
এই দেব দেব পরমাত্মার সহিত একত্বসিদ্ধি জ্ঞানযােগেই লাভ হয়। অন্য
ক্লেশকর অনুষ্ঠানাদিতে হয় না। তিনি দূরস্থ নহেন, নিকটস্থও নহেন সুলভও
নহেন, দুর্লভও নহেন। তিনি আপন আনন্দাভাস রূপ। নিজ শরীরেই
তাহাকে লাভ করা যায়।
তপস্যা দান ব্ৰতাদি, তত্ত্বজ্ঞানের উপকারী নহে। স্বরূপে অবস্থান ভিন্ন
ইহার অন্য সাধনা নাই।
সাধুসঙ্গ ও সৎশাস্ত্র এই দুইটি তত্ত্বজ্ঞানের কারণ। ইহারাই মােহজালের
অকৃত্রিম বিনাশ সাধন উপায়। ইনিই সেই দেব’ এই জ্ঞান জন্মিবামাত্র
জীবের আর কোন দুঃখ থাকে না। ইহাই জীবন্মুক্তি। তম্মদ্বিচারেণাত্মৈ-
বান্বেষ্টব্য উপাসনীয় জ্ঞাতব্যা যাবজ্জীবং পুরুষেণ নেতরদিতি। মুঃ ১৩১০
যথা সম্ভবয়াবৃত্তালােকশাস্ত্রাবিরুদ্ধয়া।
সন্তোষ সন্তুষ্টমনা ভােগ গন্ধং পরিত্যজেৎ | উঃ ৬১৬
যথাসম্ভব শাস্ত্র অবিরােধী জীবিকায় সন্তুষ্ট থাকিয়া ভােগগন্ধ ত্যাগ করিবে।
সচ্ছা সৎসঙ্গমজৈর্বিবেকৈ, স্তথা বিনশ্যন্তি বলাদবিদ্যাঃ।
যথাজলানাং কতকানুষঙ্গাৎতথা জনানাং মতয়ােহপি যােগাৎ ॥
যােঃ উঃ ৬২২
যেমন কতৃক ফল (নিৰ্ম্মল) দ্বারা জলের মালিন্য নষ্ট হয়, সেইরূপ যােগা-
ভ্যাসে বুদ্ধির মলিনতা দূরীভূত হয়। এবং সৎসঙ্গ ও সৎশাস্ত্রে যে বিবেক
• জন্মে তদ্বারা অবিদ্যা বা সংসারমায়া দূর হয়।
( ২৫ ) নশতি সংসৃতি-দুঃখমিদং তে, স্বাত্মবিচারণ কথয়ৈব। নাে ধনদানতপঃতবেদৈ, স্তকথননাদিত-যত্ন শতেন। যােঃ বাঃ, উঃ ৮২২ আত্মজ্ঞান ও আত্মকথা ভিন্ন দান, তপ, বেদপাঠ বা বৈদিক কৰ্ম্মানুষ্ঠান কিছুতেই সংসার ক্লেশ দূর হইবে না। দ্বিতীয় কথা। গীতায় শক্তিসঞ্চার। ০ শক্তি সঞ্চার কাৰ্য্য দ্বারাও সম্পাদিত হয় এবং জীবন্ত-বাক্য দ্বারাও হইয়া থাকে। এখানে শেষােক্ত শক্তি সঞ্চার আলােচিত হইবে। আলস্য এবং অনিচ্ছা জগতের কতই না অনিষ্ট করিতেছে। শাস্ত্র যথার্থই বলিতেছেন- আলস্যং যদি ন ভবেজ্জগত্যনৰ্থঃ, কোন স্যাদ্বহুধনাে বহুশ্রুতােবা আলসাদিয়মবনিঃ সসাগরান্তা, সম্পূর্ণ-নরপশুভিশ্চনিৰ্দ্ধনৈশ্চ আলস্যই যদি জগতের অনর্থভূত না হইত, তবে জুগতে বহুধন উপার্জন না করিত কে ? আর বহুজ্ঞান কে না লাভ করিত ? এই সসাগরা ধরা যে মুখ নরপশু ও দক্ষুিদ্র মনুষ্যে পূর্ণ, আলস্যই তাহার কারণ। সকলেই কিন্তু আলস্য ত্যাগ করিতে পারে, সকলেই চেষ্টা করিলে আপন অভীষ্ট বস্তু লাভ করিতে পারে। সর্বমেৰেহ হি সদা সংসারে রঘুনন্দন। সম্যক প্রযুক্তাৎ সৰ্বেণ পৌরুষাৎ সমবাপ্যতে । এই সংসারে সম্যকরূপে পৌরুষ প্রয়ােগ করিলে সকলেই সকল বিষয় সর্বদা প্রাপ্ত হইয়া থাকে এই উক্তি ভগবান বশিষ্ঠদেবের। সর্বশাস্ত্রে পৌরুষের কথা আছে। গীতার উত্তেজনা বড়ই প্রাণস্পর্শী। “ক্ষুদ্রং হৃদয়- দৌর্বল্যং ত্যজোতিষ্ঠ” ইহাই কুরুক্ষেত্র মহাসমরে বিমনায়মান অর্জুনের প্রতি শ্রীভগবানের প্রথম উপদেশ। উত্তেজনা জীবনে নিতান্ত আবশ্যক। ৪ ( ২৬ ) জীবন্ত-বাক্য নিমেষ মধ্যে সুপ্তপ্রাণকে জাগ্রত করে। “উক্তি”, “জাগ্রত ইত্যাদি জীবন্ত-বাক্য আদিতে শক্তি সঞ্চার করে, আবার অন্তে “তত্ত্বমস্যাদি” জীবন্ত-মহাৰাক্য পূর্ণশক্তি জাগ্রত করে, পূর্ণশক্তিকে শক্তিমানে মিশাইয়া জীব- মুক্তি প্রদান করে। জীবন্ত-বাক্য সর্বদা উপকারী। আবার যখন জীবন্ত বাক্য উপদেষ্টার অশ্বাস-সঞ্চারী মধুর হাস্যের সহিত মিলিত হয়, যখন ইহা সৰ্বসস্তাপনাশী শীতল করুণ দৃষ্টির সহিত জড়িত হয়, যখন গুরুর মৃদু অঙ্গুলী সঙ্কেতে দ্রুত সঞ্চারী কথা-তড়িৎ হৃদয় মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া হৃদয়-গুহাশায়ী তমঃ প্রকৃতিকে জালাইয়া দেয়, যখন তমঃ প্রকৃতি বিজলীমালা-বিজড়িত রক্তাম্বরে বিভূষিত হইয়া রজঃ প্রকৃতিতে পরিণত হয়, তখন জীব মােহ অপসারিত করিয়া কৰ্ম্ম করিবার জন্য সগর্বে উখিত হইয়া দণ্ডায়মান হয়। এই অবস্থায় কার্যসিদ্ধির অধিক বিলম্ব হয় না। মন জাগিয়া উঠিলে সাত্ত্বিক উপদেশ রজঃপ্রকৃতিকে শুভ্রবস্ত্র পরাইয়া দেয়, আর রজঃই তখন ধীরে ধীরে সত্ত্বরূপ ধারণ করে। এই অবস্থায় জাগ্রত-কৰ্মী শান্তভাবে আপন কৰ্ম্মটি বুঝিয়া লয়, এবং সতর্ক হইয়া ধীরে ধীরে প্রবল পুরুষকার সহকারে কর্তব্যের গন্তব্য পথে চলিতে থাকে। শ্রীগুরুর স্নেহপূর্ণ বাক্য, তাহার সহাস্য উপদেশ, দুর্বল চিত্তকে বল দিয়া উর্ধে উত্তোলন করে। কিন্তু বিনা সাধনায় চিত্ত অধিকক্ষণ উর্দ্ধে থাকিতে পারে না। পক্ষিশাবক যখন প্রথম উড়িতে শিক্ষা করে, তখন তাহার বিপদ যেরূপ, এই চিত্তের অবস্থাও সেইরূপ। চিত্তকে সর্বদা সবল রাখিবার জন্যই কৰ্ম্ম অভ্যাস আবশ্যক। বিনা অভ্যাসে গুরুদত্ত শক্তি জীবিত থাকে না। নিয়মমত কৰ্ম্ম করিতে করিতে গুরু-সঞ্চারিত শক্তি বর্ধিত হয়। এই অবস্থায় সৎসঙ্গ ও সৎশাস্ত্র শক্তির স্থায়িত্ব সাধনে বিশেষ উপকার করে। যেমন সংসার-সমরে সাধারণ জীব অনেক সময়ে কর্তব্যপরায়ুখ হয়, স্বধৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া পরধর্ম গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হয়, সেইরূপ অৰ্জ্জুন কুরুক্ষেত্র সমরারম্ভে মােহগ্রস্থ হইয়াছেন, কর্তব্যপরায়ুখ হইয়া যুদ্ধ করিবেন না স্থির করিয়াছেন, আর পরম কারুণিক ভগবান্ অৰ্জ্জুনকে প্রবুদ্ধ করিতেছেন, বলিতেছেন “উক্তি”। দেহ-রথে রথী অবসন্ন হইয়াছে, নিশ্চেষ্ট হইয়া সকল উদ্যম ত্যাগ করিয়াছে, আর ভগবান্ সারথি-রূপে রথীকে উত্তেজিত করিতেছেন- ( ২ ) 5 ‘রে জীব! তােমায় আপন আনন্দরাজ্য উদ্ধার করিতে হইবে। অজ্ঞান- অসুর তােমর জ্ঞান-রত্ন চুরি করিয়াছে, তুমি আপন আনন্দরাজ্য হইতে বিতাড়িত হইয়াছ, হৃতরাজ্য উদ্ধার করিবার এইত সময়। জাগ্রত হও। কি জন্য মূঢ়ের মত অবস্থান করিতেছ? গুরু কাৰ্যকাল উপস্থিত। এখন কি নিশ্চেষ্ট থাকিবার সময় ? উঠ, আপন পপৗরুষ প্রদর্শন কর আলস্য, অনিচ্ছা দূরে নিক্ষেপ কর। অন্য অভিলাষ ত্যাগ কর, অন্য উন্মত্ত-চেষ্টা দূর কর। এই অনাৰ্য্যসেবিত মােহ কি আৰ্য্যের উপযুক্ত ? মােহগ্রন্থের ইহ- লােকেও অযশ, পরলােকেও অধৰ্ম্ম। অর্জুন! তুমি কাতরতা ত্যাগ কর। তুমি কি ইহার যােগ্য? “ক্লৈব্যং মাস্মগমঃ পার্থ ! নৈতৎত্বযুপপদ্যতে”, তুমি ক্লীবত্ব ত্যাগ কর । শ্রীভগবান্ জীবের মঙ্গল জন্য যাহা যাহা অঙ্গীকার করিয়াছেন, তাহা আমরা তাহার আশ্বাস-বাণী উদ্ধার করিয়া দেখাইয়াছি। জীবকেও শ্রীভগবানের জন্য কিছু করিতে হইবে। তিনি যাহা যাহা আজ্ঞা করিতেছেন, জীবকে তাহা পালন করিতে হইবে। নিশ্চেষ্ট-জীবের প্রতি ভগবানের আশ্বাস-বাক্য কোন কাৰ্য্য করিবে না। শ্রীভগবান প্রথমেই অর্জুনকে উৎসাহ দিয়াছেন। অর্জুনকে যুদ্ধ করিতে হইবে—জীবকে ভগবানের কথামত কৰ্ম্ম করিতে হইবে। কিন্তু যেমন তেমন করিয়া কৰ্ম্ম করিলে চলিবে না। জীব বৈদিক বা লৌকিক যে কৰ্মই করুক কেন, কৰ্ম্ম নিষ্কাম হওয়া চাই। নিষ্কাম কৰ্ম্মই, গীতার প্রথম শিক্ষা নিষ্কাম কৰ্ম্মদ্বারা এককালে দুই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে। কৰ্ম্মদ্বারা জগতের অভ্যুদয় হইবে, জগচ্চক্র ঠিক পথে চলিবে। আবার কামনাত্যাগ জন্য জীবও জীবন্মুক্তি পথে চলিতে থাকিবে। নিষ্কাম কৰ্ম্মানুষ্ঠানই জগতের ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম, এই ত্রিবর্গ প্রাপ্তির প্রকৃষ্ট উপায় এবং জীবের সর্বদুঃখনিবৃত্তি ও পরমানন্দ প্রাপ্তির সােপান। এ স্থানে আমরা জীবের প্রতি ভগবানের আজ্ঞা-বাক্যগুলি একত্র করিতেছি। যেরূপ বিপদের অবস্থাতেই জীব পতিত হউক না কেন, ভগবানের আজ্ঞা স্মৃতিপথে জাগ্রত করিলেই ভগবান্ চক্ষুজল মুছাইবেন, জীবকে শান্ত করিবেন। তখন দুঃখ আর দুঃখ প্রদান করিতে পারিবে না, বিপদ আর বিপদ থাকিবে না। ভগবান্ সহায়—ইহা অনুভূত হইলে আর কি কোন বিপদ থাকে ?
( ২৮ ) } : ভগবানের আজ্ঞা গতাসূনগতাসূংশ্চ নামুশােচন্তি পণ্ডিতাঃ । ২০১১। তথা দেহান্তরপ্রাপ্তিধীর শুত্র ন মুহ্যতি ॥ ২১৩ মাত্ৰাম্পৰ্শাস্তু কৌন্তেয় শীতােষ্ণসুখদুঃখদাঃ । ‘আগমাপায়িনােহনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত। ২।১৪ সমদুঃখসুখং ধীরং সােহমৃতত্বায় কল্পতে ২০১৫ ভগবান্ বলিতেছেন মূর্থের মত শােক করিও না, ধৈৰ্য্য অবলম্বন কর। দুঃখ সহ্য করিতে অভ্যাস কর। সুখে দুঃখে যদি ধৈৰ্য্য রাখিতে পার, অমর হইয়া যাইবে। মানুষের যত প্রকার দুঃখ, তাহা দেহসম্পর্কেই জাত। আহার, নিদ্রা, মৃত্যুভয়-সমস্তই দেহ জন্য। কিন্তু তাবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তা শরীরিণঃ। অনাশিনােহপ্রমেয়স্য তস্মাত্মধ্যস্ব ভারত ॥ ২১৮ আত্মার বিষয় জান’ দেখিবে আত্মার বিনাশ হয় না, কিন্তু দেহ সকালেই বিনাশ-শীল। বল—শােক কাহার জন্য করিবে ? ‘ন ত্বং শােচিতু মহসি”, ভগবানের এই আজ্ঞা সৰ্ব্বদা স্মরণ রাখা কর্তব্য। আহার না পাইলে, নিদ্র। না হইলে, আত্মার কোন ক্ষতি নাই। কোন হিংস্র জন্তু হইতে আত্মার ভয় নাই। ভয় কেবল, দেহকে আত্মা ভাবিয়া লওয়া হইয়াছে বলিয়া, -“যাহার আত্মজ্ঞান জন্মিয়াছে তিনিই জীবন্মুক্ত, নির্ভয়। জ্ঞানী সকল অবস্থাতেই নির্ভয়, চিন্তাশূন্য, বিপদশূন্য। চিন্তা, বিপদ, ভয়- অজ্ঞানীর। সুখ দুঃখ সমস্তই অজ্ঞান-জনিত। “তস্মাদেবং বিদিনৈং নানুশােচিতুমহসি” ॥ ২২৪ ভগবান্ স্বধর্ম পালন করিতে বলিতেছেন, ইহা শাস্ত্রলিখিত বর্ণাশ্রমধর্ম। স্বধৰ্ম্মমপি চাক্যে ন বিকম্পিতু মহসি । ২।৩১ ততঃ স্বধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তিঞ্চ হিত্না পাপমবাষ্প্যসি। ২৩৩ স্বধর্ম ত্যাগ করিও না, কীৰ্ত্তি অগ্রাহ্য করিও না, ইহা পাপ জানিও। আবার বলিতেছেন :- হতাে বা প্রাপ্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভােক্ষ্যসে মহীম্। তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ ॥ ২৩৭
-
( ২৯ )
সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ে।
ততাে যুদ্ধায় যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাষ্প্যসি। ২৩৮
সুখ হউক বা দুঃখ হউক, লাভ হউক বা অলাভ হউক, জয় হউক বা
পরাজয় হউক, তুমি আমার আজ্ঞা মত চল। যদি এই কর্মে মৃত্যু হয় তবে স্বর্গ
লাভ হইবে, যদি জয়লাভ হয় পৃথিবী-ভােগ হইবে। মৃত্যু হয় হউক, কাজ
করিয়া চল। মৃত্যু বলিয়া বাস্তবিক কিছু নাই, আত্ম-জ্ঞানহীনতাই মৃত্যু।
সমস্ত গীতা ধরিয়াই উপদেশ। আমরা কতকগুলি সংগ্রহ করিতেছি :-
যােগস্থঃ কুরু কৰ্ম্মাণি সঙ্গং ত্যক্তা ধনঞ্জয় ॥ ২৪৮
সমাধাবচলাবুদ্ধি স্তদাযােগ মৰাপ্যসি। ২৫৩
তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ ॥ ২৬১
ন কৰ্ম্মণামনারম্ভান্নৈৰ্মং পুরুষােহশ্নতে। ৩৪
নিয়তং কুরু কৰ্ম্ম ত্বং কৰ্ম্ম জায়ােহ্যকৰ্ম্মণঃ ॥ ৩৮
এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবৰ্ত্তয়তীহ যঃ।
অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামে মােঘং পার্থ স জীবতি ॥৩১৬
আত্মন্যে চ সন্তুষ্টস্তস্য কাৰ্যং ন বিদ্যতে ॥ ৩১৭
ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কৰ্ম্মসঙ্গিনা।
যােজয়েৎ সব কৰ্ম্মাণি বিদ্বানযুক্তঃ সমাচরন্ ॥ ৩২৬
ময়ি সর্বাণি কৰ্ম্মাণি সংন্যাস্যাধ্যাত্মচেতসা
নিরাশী নিৰ্ম্মমাে ভূত্বা যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ ॥ ৩৩০
ইন্দ্রিয়স্যেন্দ্রিয়স্যার্থে রাগদ্বেষো ব্যবস্থিত।
তয়াে ন বশমাগচ্ছেৎ.তো হাস্য পরিপন্থিনৌ । ৩৩৪
জহি শত্ৰুং মহাবাহে কামরূপং দুরাসদম্৩৪৩
ছিনৈং সংশয়ং যােগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত। ৪৪২
সুহৃদং সৰ্ব্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিচ্ছতি ॥ ৫১২৯
উদ্ধরোত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ ॥ ৬৪,
মনঃ সংয়ম মাচ্চিত্তো যুক্ত আসীত মৎপঃ ৬১৪
আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ ॥ ৬২৫
-
( ৩০ )
তস্মাদ যােগী ভবাৰ্জ্জুন॥ ৬৪৬
শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যাে মাং স মে যুক্ততমােমতঃ ॥৬৪৭
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামমতাং তরন্তি তে ॥৭১৪
লভূতে চ ততঃ কামান্ ময়ৈব বিহি হি তান্। ৭২২
জরা মরণ মােক্ষায় মামাশ্ৰিত্য যতন্তি যে । ৭২৯
অধিক উদ্ধত করা বাহুল্য মাত্র। আমরা আর দুই একটি প্রধান উপদেশ
তুলি :-
যৎ করােষি যদশ্নাসি যজ্ঞহােষি দদাসি যৎ।
যত্তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ মদর্পণম্ ॥ ৯২৭
২। মন্মনা ভব মক্তো মদ যাজী মাং নমস্কুরু ॥ ৯৩৪
৩। মৎকৰ্ম্মকৃৎপরমােমক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।
নিরৈঃ সৰ্ব্ব-ভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব ॥ ১১৫৫
৪। মামেকং শরণং ব্রজ। ১৮৬৬
৫। তস্মাত্ত্বমুত্তিষ্ঠ যশােলভস্ব, জিত্ব শত্রু ভুঙ্খরাজ্যং সমৃদ্ধ।
ময়ৈলৈতে নিহতঃ পূর্বমেব, নিমিত্তমাত্ৰং ভব সব্যসাচি ।
১১৩
জীবের হতাশ হইবার কোন কথাই নাই। শ্রীভগবান্ অনন্ত প্রকারে
জীবকে উৎসাহ দিতেছেন, বড় আদর করিয়া পথ দেখাইয়া দিতেছেন, যাহা
যাহা করিতে হইবে সমস্তই বলিয়া দিতেছেন। যুদ্ধ কর’ কারণ এই কম্মে
জগতের অভ্যুদয় হইবে। নিষ্কাম হইয়া যুদ্ধ কর—ভগবান্ প্রসন্ন হইবেন বলিয়া
যুদ্ধ কর—তুমি মুক্তি পথে চলিবে। যেমন বিনা কৰ্ম্মে জগতের উন্নতি অসম্ভব
সেইরূপ বিনা সঙ্কল্পক্ষয়ে, বিনা কমনা ত্যাগে, কোটিকল্প বৎসর অতি উগ্র
তপস্যা করিলেও মুক্তি হইবে না। মুক্তি ভিন্ন অন্য উপায়ে পরমানন্দে স্থিতি
হওয়া অসম্ভব। কুরুক্ষেত্র সমরে ভগবান্ কোটি কোটি ক্ষত্রিয় বিনাশ
করিলেন, লােকে ভাবিতে পারে—আজ ভারতের দুর্গতি সেই জন্য। কিন্তু
বিচার করিয়া দেখিলে বুঝিতে পারা যায় যদি কুরুক্ষেত্র সমরে দুষ্কৃতের বিনাশ না
হইত, আর ধৰ্ম্ম সংস্থাপনার্থ গীতা প্রচারিত না হইত, তবে আমরা সত্যযুগের
আশা কখনও করিতে পারিতাম না। আজ অতি দুর্দিনেও গীতার প্রচার কি
( ৩১ ) সূচনা করিতেছে—সৰ্বজাতি মধ্যে গীতার ভাব প্রবেশ করিয়া কাহার আগমন সংবাদ দিতেছে, সুধী ব্যক্তি তাহা বুঝিবেন। জীবের মােহনিদ্রা ভাঙ্গাইবার জন্য মাতেব হিতকারিণী’ শ্রুতিও গীতার মত শক্তি-সঞ্চার করিতেছেন, বলিতেছেন— “উত্তিষ্ঠত জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্নিবােধত। ক্ষুরস্যধারা নিশিতা দুরত্যয়া, দুর্গং পথস্তৎ কবয়ে বদন্তি। আত্মদর্শনে যত্নশীল মুমুক্ষু ! উঠ, বিষয় ত্যাগ কর। তত্ত্বজ্ঞ গুরু লাভ করিয়া আত্মাকে জান। সেই জ্ঞান দ্বারা জাগ্রত হও। অজ্ঞান-নিদ্রা ত্যাগ কর। তীক্ষ ক্ষুরধারা যেমন দুরাক্রম্য, সেইরূণ উক্ত জ্ঞানের পথসমূহকে জ্ঞানিগণ নিতান্ত দুর্গম বলিয়া থাকেন। এখানে প্রশ্ন হইতে পারে শ্রুতি ত বলিতেছেন—বিষয় ত্যাগ করিতে, আর গীতা বলিতেছেন—যুদ্ধ করিতে, দুইই এক কথা কিরূপে ? জীবের লক্ষ্য জগতের উন্নতি ও জীবন্মুক্তি। যে মনুষ্য নিতান্ত অজ্ঞান তাহার গতি প্রবৃত্তি মার্গে । প্রবৃত্তি পথে কখনও জগতের উন্নতিও হইবে না জীবনন্মুক্তিও হইবে না—হইবে আত্মহত্যা এবং জীব হত্যা। আর যিনি জীবিতদ্দেশ্য অবগত হইয়াও বিষয় কামনা ছাড়িতে পারিতেছেন না, অথবা বিষয় কামনা উৎপাটন না করিয়া একে- বারে নিবৃত্তি মার্গে যাইতে চাহেন, ভগবান তাহাদের ভ্রম সংশােধন করিয়া গীতায় প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি পথ প্রদর্শন করাইতেছেন। কার যাঁহার আদৌ বিষয় বাসনা নাই, যাহার “ভুবি ভােগান বােচন্তে”, কেবল তাহারই জন্য নিত্তি মার্গের সাধনা। ইহা নাহুইলে জীবন্মুক্তি হইবে না। সত্যকথা, শ্রুতি বলিতেছেন— বিষয় ত্যাগ করিতে; কিন্তু বিষয় ত্যাগ, সকল মনুষ্যের একরূপে হইতে পারে না। সাময়িক উত্তেজনায় বৈরাগ্য কখন কখন উদয় হয়, সত্য-সাধু সজ্জনের কথা শুনিয়া, তাহাই শাস্ত্রে সমর্থিত হইতে দেখিয়া, ক্ষণ-কালের জন্য বৈরাগ্য উদয় হইতে পারে সত্য, প্রকৃতির তীব্র কষাঘাতে, প্রিয় পুত্র-কন্যাদির মৃত্যু- দর্শনে, ক্ষণকাল চিত্ত বিষয় ত্যাগ করে সত্য, কিন্তু ইহার নাম মর্কট-বৈরাগ্য। উত্তেজনা শিথিল হইলেই, ভােগবাসনা জাগিয়া উঠে। গীতা এই প্রবৃত্তির মনুষ্যকে নিবৃত্তি মার্গে লইয়া যাইতেছেন,-বলিতেছেন, যত দিন দেখিবে ভােগবাসনা আছে, ততদিন কৰ্ম্ম কর। কিন্তু ঈশ্বর-প্রীতির জন্য কৰ্ম্ম করিতে হইবে, ফল-কামনা ত্যাগ করিয়া কৰ্ম্ম করিতে হইবে। গীতার নিষ্কামু কৰ্ম্ম ( ৩২ ) কামনা ত্যাগের কৌশল মাত্র। বিষয়-কামনা দূর না হইলে কখন আত্মজ্ঞান জন্মিবে না—বিষয় আস্বাদনের কামনা থাকিতে থাকিতে কখনই আত্মস্বাদন কামনা জাগিবে না। শ্রুতি বিষয় ত্যাগরূপ মূল কথা বলিয়াছেন, গীতা উহার উপায় পর্যন্ত বলিতেছেন, বলিতেছেন—ফল-কামনা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধ কর। প্রবৃত্তি মার্গের জীবকে একবারে নিবৃত্ত মার্গের উপদেশ গীতা দিতেছেন না ; বলিতেছেন, প্রবৃত্তির কৰ্ম্ম ছাড়িতে পার না, প্রথম প্রথম কামনা ত্যাগ করিয়া কেবল ঈশ্বর প্রীতির জন্য কৰ্ম্ম করিতে অভ্যাস কর, এই নিষ্কাম কৰ্ম্মে একেবারে দুই কৰ্ম্ম সাধিত হইবে। কৰ্ম্ম দ্বারা জগচ্চক্র সঞ্চালিত হইবে এবং কামনা ত্যাগ দ্বারা জীব মুক্তিপথে চলিতে পারিবে। অদ্ভুত শিক্ষা এই নিষ্কাম কৰ্ম্ম যােগ ! যােগ, ভক্তি ও জ্ঞানভুমিকা কৰ্ম্মভুমিকার উপরে। জীব নিষ্কাম কৰ্ম্ম দ্বারা ক্রমে সাধনামার্গের উচ্চ উচ্চ স্তরে যত উঠিতে থাকিবে, ততই তাহার বিষয় ত্যাগ হইবে। সর্বোচ্চ ভূমিকায় উঠিলেই সম্পূর্ণরূপে বিষয় ত্যাগ হইয়া যাইবে। ইহাই আত্মজ্ঞানের সময়, আত্মস্বাদনের অবস্থা। গীতা ও শ্রুতি, এক কথাই বলিতেছেন। যদিও গীতা নিষ্কাম কৰ্ম্ম হইতে আরম্ভ করিয়াছেন, কিন্তু উচ্চ উচ্চ অবস্থা একটীও ত্যাগ করেন নাই। ‘হট’ করিয়া কোন কিছুই উপদেশ দেন নাই। পুনরুক্তি সকল স্থানে দোষের হয় না। জীবন্মুক্তির ক্রম-মতে প্রতিদিন সাধনা করিতে হইবে। ধাহা প্রতিদিন অভ্যাস করিতে হয়, তাহার পুন- রুক্তিই আবশ্যক। আমরা আর একবার ক্রমগুলি উল্লেখ করিব। যথায় যাইতে হইবে, যাহা করিতে হইবে, প্রতিদিন তাহার আললাচনা আবশ্যক। জীব! তােমাকে জীবন্মুক্তি লাভ করিতে হইবে। পথ বড় দুর্গম—কিন্তু পথ অনতিক্ৰমণীয় নহে! সংসার-সাগর পার হওয়া যায়, মৃত্যু অতিক্রম করা যায়, পুনর্বার জন্ম হওয়া রহিত হয়, নিত্য আনন্দে, নিত্যজ্ঞানে, স্থিতি লাভ হয়। তুমি অন্য অভিলাষ ত্যাগ কর পারিবেই। লৌকিক কৰ্ম্ম করিতে হয় করিও, কিন্তু সচ্চিদানন্দ-তৃপ্তি জন্য করিও। উপাসনা, আত্মসংস্থযােগ, ভক্তিযােগ, সাংখ্যযােগ ও ধ্যানধােগ অবলম্বন কর। ধ্যানযােগ গীতার সাধুনা। যেমন ভক্তিযােগ আত্মসংস্থ হইবার জন্য, সেইরূপ সাংখ্যযােগ ধ্যান জন্য। সমাধিধ্যানযােগে নিরন্তর থাকিতে না পার, সাংখ্যযােগে নিম্ন- ভূমিকায় আইস, সাংখ্য যােগে বিচার দ্বারা আত্মাকে প্রকৃতি হইতে পৃথক " জুল,, ( ৩৩ ) বােধ কর, আবার সমাধি-ধ্যানে স্থিতি লাভ করিতে পারিবে। সাংখ্য যােগেও প্রকৃতের্ভিন্নমাত্মানম” বিচার না আসিবে, তখন ভক্তিযােগ অবলম্বন কর। এই ভক্তিযােগ কেবল আত্ম-সংস্থযােগ দৃঢ় করিবার জন্য। মানস পূজা ভক্তি যােগের শেষ কথা। সৃষ্টি স্থিতি-প্রলয়-কর্তার বিশ্বরূপ চিন্তা কর, সৃষ্টি- স্থিতি-প্রলয়-কারিণীর মায়ামানুষ মূর্তি ধ্যান কর, অর্ধনারীশ্বরের কথা গান কর, গুণ স্মরণ কর, রূপ ধ্যান কর, ভগবান্ আত্মার যে রূপ তােমার প্রাণে লাগিয়াছে, তাহারই ধারণা ধ্যান করিতে থাক : যদি দেখিতে পাও ভিন্ন ভিন্ন রূপেও তােমার প্রীতি, তুমি সেই ক্ষেত্রে পরম ভাবে লক্ষ্য রাখিয়া কুলগুরুর আশ্রয় লইও। তঁাহার লীলা চিন্তা কর ; জীবশক্তি, আপন সহচরী সঙ্গে ভগবান্ আত্মার অপেক্ষা করিতেছে, অনুভব করিতে থাক; প্রিয়সম্ভাষণে যাহা যাহা আবশ্যক-সুন্দর পুষ্পশয্যা, সুন্দর রত্ন কল্পিত আসন, জ্ঞানার্থ পরিধান জন্য দিব্যার, পূজার জন্য চন্দন, মৃগমদ-পুষ্প, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, ভােজন, নৃত্য, গীত—এই সমস্ত মনে মনে সংগ্রহ করিয়া তাহার জন্য উৎকণ্ঠা- স্ফুটিত চিত্তে অপেক্ষা করিতেছ, আর অনুভব করিতেছ-তােমাকে ছাড়িয়া আর থাকিতে পারি না –এই ভাবনা করিতে ২ কাতর হইয়া পড়’; কখন ভাবনা কর, যখন তুমি আসিবে তখন আমি কিরূপ ব্যবহার করিব, কেমন করিয়া তােমার সহিত কথা কহিব ? কিরূপ ভাবে তােমার সেবা করিব । কখনও বা অভিমান করিব এত দেরী করিয়া আসিলে কেন ? তুমি ভিন্ন আমার আর যে কেহ নাই এই সমস্ত অভ্যাস করিতে থাক। এতদ্বারা আত্ম-সংস্থযােগ দৃঢ় হইবে। এই ভক্তিযােগও যখন না পার, তখন আত্মসংস্থ হইবার জন্য যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, ও প্রত্যাহার দ্বারা প্রাণকে ভগবান্ আত্মার গৃহে গৃহে উঠিতে নাবিতে অভ্যাস করাও, চক্রে চক্রে মনােযােগের সহিত ভ্ৰমণ করিতে থাক, শেষে আর উঠিতে নাবিতে ইচ্ছা হইবে না। তখন মন আজ্ঞাচক্রে স্থির হইয়া জ্যোতিঃ সমুদ্রে ডুবিয়া থাকিবে, মন আর কিছুই চিন্তা করিতে পারিবে না। “মনােনিবৃত্তি” হইবে, “পরম শান্তি” তুমি প্রাপ্ত হইবে, আবার আত্মসংস্থ হইয়া যাইবে। গীতা বলিতেছেন—“শনৈঃশনৈপরমে বুদ্ধ্যাধুতি গৃহীতয়া। আত্মসংস্থং মনঃকৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ। যােগের বহিরঙ্গ সাধন দ্বারাও মন যদি কখন কখন বিষয়ে ভ্রমণ করে “যতাে যুতত নিরতি মনশ্চঞ্চলমস্থির,” তখনই ভক্তিযােগ দ্বারা তাহাকে আবার আত্মসংস্থ কর তােমার সাধি লাগিবে ;
•• ( ৩৪ ) মন, যখন প্রাণায়ামাদিতে অসমর্থ হয়, যখন লয়বিক্ষেপেক্ষিপ্ত, মুঢ়, বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ক্লেশ পাইতে থাকে, তখন ইহাকে উপাসনা করিতে উপদেশ কর। বিশ্বাসে উপাসনা, ভক্তিতে মানস পূজায় প্রত্যক্ষ দর্শন। এ অবস্থায় সর্বদা মনকে স্মরণ করাইতে হইবে -রে মন! তুমি কাহার শরণাপন্ন হইয়াছ, তাহা কি তােমার মনে নাই ? তােমার কোন চিন্তা নাই, কোন ভয় নাই, তুমি সমস্ত সংশয় দূর কর—সমস্ত ভাবনা ত্যাগ কর, তােমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবেই। প্রতি দুর্বলতায়, প্রতি কৰ্ম্মে তঁাহার কৃপা ভিক্ষা কর। সকল কর্ম কর এবং কর্ম দ্বারা উপাসনা করিও। দেখা গেল, ক্রম অনুসারে উপাসনা, যােগ, ভক্তি, সাংখ্যজ্ঞান এবং সমাধি- ধ্যান দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভ হয়, আত্ম দর্শন হয়, জীবন্মুক্তি লাভ করা যায়। যিনি ভগবান্ আত্মার দর্শনলাভ করিতে পারিতেছেন না, তিনি নিরন্তর ধ্যান-যােগ অভ্যাসে, আত্মদর্শনার্থ আপনাকে উপযােগী করিবেন। ধ্যানে থাকিতে না পারিলে ভক্তিযােগ ও অষ্টাঙ্গযােগ সাহায্যে আত্মসংস্থ হইতে': হইবে, ইহাও না পারিলে উপাসনা দ্বারা যােগ, ভক্তি, ধ্যান-যােগ-সৌধে ক্রম- অনুসারে আরােহণ করিয়া আত্মজ্ঞান ও আত্মদর্শন লাভ করিতে হইবে, ইহাই মুমুক্ষুর কর্তব্য। ইহাই সনাতন ধর্ম। শ্রুতির উপদেশ মত গীতশাস্ত্রও জীবকে এইরূপে মুক্তি পথে লইয়া যাইতেছেন। গীতাও বলিতেছেন—জীব তুমি জীবন্মুক্তির জন্য পুরুষার্থ কর, অর্জুন রক্ষণের ভার তােমার আশ্রয় দাতাই গ্রহণ করিয়াছেন, তুমি নিশ্চিন্ত হইয়', নির্ভয় হইয়া, সাধনা করিতে থাক, তুমি পারিবেই। জীব “উত্তিষ্ঠতজাগ্রত,”। এই কার্যের জন্য উঠ আনন্দধামে স্থিতিই তােমার লক্ষ্য। লয় বিক্ষেপ পীড়া জন্মায়, ইহা তােমার পূর্ব দুষ্কৃতির পরিচয়। সাধক। ইহাতে হতাশ হইও না। “ত্যজদ্যমমুক্তা ন স্বকৰ্ম্মাণি কেচন” কোন উদ্যোগশীল পুরুষ স্বকর্মে উদ্যোগ ত্যাগ করে না। যাহা কল্য করিবে ভাবিয়া রাখিয়াছিলে, তাহা অদ্যই সম্পাদন করিবে। শাস্ত্র বলিঙেছেন-- শ্বকাৰ্যমদ্যকৰ্তব্যং পূর্বাহ্নে চাপচাহ্নিকম্। নহি প্রতীক্ষতে মৃত্যুঃ কৃভমস্য নবাই কৃতম্ ।
( ৩৫ । প্রতিদিনের কাৰ্য্যে লয়বিক্ষেপরূপ প্রাক্তন অশুভ যতক্ষণ না কাটাইতে পার, ততক্ষণ পুরুষাৰ্থ প্রয়ােগ করিবে। তাবৎ তাবৎ প্রযত্নেন যতিতব্যং সু পৌরুষ। প্রাক্তনং পৌরুষং যাব শুভং শ্যাম্যতি স্বয়ম্ । যতক্ষণ না ঐহিক সৎকৰ্ম্ম দ্বারা প্রাক্তন দুরদৃষ্ট পরাস্ত হয়, ততক্ষণ ঐহিক সৎকম্মে যত্ন করিবে। প্রাক্তন দোষ ঐহিক কৰ্ম্ম দ্বারা নিশ্চয়ই পরাস্ত হয়। ভাবী দোষ যে ঐহিক কৰ্ম্ম দ্বারা দূরীভূত হয়, তাহাই এ বিষয়ের দৃষ্টান্ত। দোষঃশাম্যত্যসন্দেহং, প্রাক্তনােহছতনৈগুণৈঃ। দৃষ্টান্তোহত্র হস্তনস্য দোষস্যাদ্যগুণৈঃ ক্ষয়ঃ । লয়বিক্ষেপরূপ পূৰ্ব্বকৰ্ম্মদোষ, প্রত্যহ পুরুষার্থ-প্রয়ােগে বিনাশ করিতে হইবে। ইহাই ভগবান, বশিষ্ঠ দেবের উৎসাহবাক্য। মানুষের এ সামর্থ্য আছে। দন্তে দন্তে নিষ্পেষিত করিয়া আলস্য, অনিচ্ছা, অনুদ্যম, ত্যাগ করিতে হইবে। “বুদ্ধি ও শাস্ত্র সহকারে পুরুষকার প্রয়ােগ করিয়া যাহা সিদ্ধ করা যায় না, এমন কাৰ্যই নাই''। যােঃ বাঃ নিঃ পূঃ ২৯ সর্গ অসর্দৈব মধঃ কৃত্বা নিত্যমুদ্রিয়া ধিয়া । সংসারােত্তরণং ভূত্যৈ যতেধাতু মাত্মনি। ন গন্তব্য মদ্যোগৈঃ সাম্যং পুরুষগৰ্দভৈঃ। উদ্যোগস্তু যথাশাস্ত্রং লােকন্দ্বিতয়সিদ্ধয়ে । আপন উদ্যোগশীল বুদ্ধি দ্বারা যাহা যাহা করিতে হইবে—তাহার আলােচনা কর, দৈব অধঃকৃত হইয়া যাইবে, পুরুষাৰ্থ জাগিবে, তখন সংসারােত্তরণ জন্য একদিকে মনননিগ্রহ, ইন্দ্রিয় নিগ্রহাদি কাৰ্য্যে লাগিয়া যাও, অন্য দিকে শান্তমন ও শান্ত ইন্দ্রিয়কে আপন প্রিয় আত্মাতে লাগাইয়া দাও—সংসার উত্তীর্ণ হইবে। পুরুষগর্দভের মত উদ্যোগহীন হইও না। শাস্ত্রানুযায়ী উদ্যোগ ইহ- লােক এবং পরলােক, উভয় লােকের উপকারী। অনর্থঃ প্রাপ্যতে যত্র শাস্ক্রিতাদপি পৌরুষাৎ। অনর্থকর্তৃ বলবৎ তত্র জ্ঞেয়ং স্বপৌরুষম্ পর পৌরুষমাশ্ৰিত্য দন্তের্দস্তান্ বিচুর্ণয়। শুভেনাশুভমুক্তং প্রাক্তন পৌরুষং জয়েৎ ॥
( ৩৬ ) যথায় শাস্ত্রনিয়ন্ত্রিত কৰ্ম্ম করিলেও অনিষ্টপাত হয়, তথায় বুঝিবে, অনিষ্ট জনক পূৰ্ব্বকৃত দুষ্কৰ্ম্ম তােমার প্রবল। তখন অতিদৃঢ়ভাবে প্রবল পুরুষার্থ দেখাইবে। জীবন যায় যাক্, আমি এই শাস্ত্রীয় কৰ্ম্ম করিবই, স্থির করিয়া দন্তে দন্ত বিচূর্ণ করিতে করিতে কর্মে লাগিয়া পড়িতে হইবে। ইহাতেই ঐহিক পুরুষার্থ দ্বারা প্রাক্তন পুরুষার্থ বা দৈব জয় হইবেই। পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব কৰ্ম্ম আমাকে দুঃখে নিপাতিত করিতেছে—ইহা মূঢ়ের উক্তি মাত্র। ভগবান্ পুরুষকার-রূপে সকলের মধ্যেই আছেন। গীতা বলিতেছেন -“পৌরুষং নৃষ”। পূৰ্বকৰ্ম্মফলে যাহা হয় হউক, তাহা অগ্রাহ্য করিয়া ঐহিক পুরুষার্থ প্রয়ােগ করিতে হইবে, নতুবা “পুরুষগর্দভ” হইয়া যাইবে। “আমার অদৃষ্টে ছিল, হইতেছে” ইত্যাকার বুদ্ধিকে জোর করিয়া নিপাতিত করিতে হইবে, ইহাই ভগবান বশিষ্ঠের অভিপ্রায়। কারণ, তিনি বলিতেছেন—প্রত্যক্ষ কর্মের নিকট উপরােক্ত বুদ্ধির প্রাবল্য নাই। ভগবান বশিষ্ঠ, পুরুষকারকেই অবলম্বন করিতে বলিতেছেন। গীতাও তাহাই বলিতেছেন। “মামেকং শরণং ব্রজ” ইহাই প্রবল পুরুষার্থ। স্বভাব- বশে সংসার করা পুরুষার্থ নহে। উন্মত্ত সাধারণলােকে যাহাকে ‘দৈব’ বলে তাহাও পূর্ব পূৰ্ব্ব জীবনের পুরুষার্থ মাত্র। সাধূপদিষ্ট-মার্গেণ যন্মনােহ-বিচেঙিতম্। তৎ পৌরুষং তৎ সফলমন্যদুন্মত্ত চেষ্টিত। সাধুউপদিষ্ট পন্থা অনুসারে মন, বাক্য ও শরীরের যে চালনা, তাহাই প্রকৃত পুরুষকার, তাহাই সফল। অন্য পুরুষকার উন্মত্তচেষ্টা মাত্র। দৈবং পুরুষকারেণ যাে নিবৰ্ত্তিতুমিচ্ছতি। ইহবাহমুত্র জগতি স সম্পূর্ণাভিবাঞ্ছিতঃ। যিনি পুরুষকার দ্বারা দৈব নিরাকরণ করিতে ইচ্ছা করেন, লােক ও পরলােকে সম্পূর্ণ অভীষ্ট লাভে সমর্থ হয়েন। যে সমূদ্যোগমুৎস্জ্য স্থিতা দৈব পরায়ণাঃ। তে ধৰ্ম্মমর্থং কামঞ্চ নাশয়ন্ত্যাত্মবিদ্বিষ। যাহারা দৈব পরায়ণ হইয়া নিশ্চেষ্ট হয়, সেই আত্ম-বিদ্বেষিগণ ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম, এই বিবর্গ হইতে বঞ্চিত হয়। তিনি ইহ
( ৩৭ )
এই জগতে যে যেখানে প্রকৃত উচ্চপদ প্রাপ্ত হইয়াছে, সে পুরুষার্থ বলেই
প্রাপ্ত হইয়াছে।
পুরুষার্থেন দেবানাং, গুরুবে বৃহস্পতি।
শুক্রোদৈত্যেন্দ্রগুরুং, পুরুষার্থেন চাস্থিত ।
দৈন্যদারিদুঃখার্তা, অপি সাধে নরােত্তমাঃ ।
পৌরুষে ণৈব যত্নেন যাতা দেবেন্দ্রতুল্যতাম্ ।
বৃহস্পতি পুরুষকার দ্বারা দেবগুরু হইয়াছেন, শুক্রাচাৰ্য পুরুষকার-বলে
দৈত্যগুরু হইয়াছেন। হে সাবধা। প্রযত্নশালী কত শত মনুষ্য, দৈন্যদারিদ্র্য
দুঃখে পীড়িত হইয়াও পুরুষকারের বলে ইন্দ্রতুল্য হইয়াছেন।
বিশ্বামিত্রেণ মুনিনা দৈবমুৎস্জ্য দূরতঃ।
পৌরুষেণৈব সপ্রাপ্ত ব্রাহ্মণ্যং রাম নান্যথা।
অম্মাভিরপরৈ রাম, পুরুষে মুনিতাং গতৈঃ।
পৌরুষেণৈব সম্প্রাপ্ত। চিরং গগন গামিতা।
বিশ্বামিত্র মুনি, একমাত্র পুরুষকার-বলেই দৈবকে দূরে পরিত্যাগ করিয়া
ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিয়াছিলেন, অন্য কোনপ্রকারে নহে। আমরাও পৌরুষ
বলে মুনি হইয়াছি ও এই ত্রিভুবন মধ্যে বহু সময় ব্যাপিয়া আকাশ-গমন
করিতে শিখিয়াছি।
উৎসাদ্য দেব-সঙ্ঘাতং চক্রস্ত্রিভুবনােদরে।
পৌরুষেণৈব যত্নেন সাম্রাজ্য দানবেশ্বরূঃ |
দৈতাগণ পৌরুষবলেই দেবসমূহকে উৎসাদিত করিয়া ত্রিভুবন মধ্যে
সাম্রাজ্য করিয়াছে। আবার
আনশীৰ্ণমাভােগ জগদাজরােজসা।
পৌরুষেণৈব যতেন দানবেভ্যঃ সুরেশ্বরাঃ ।
দেবগণ পৌরুষবলেই অসুরগণের নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন, বিশীণ এবং বিশাল
জগৎ আহরণ করিয়াছিলেন।
পৌরুষ অবলম্বন কর, জীবন্মুক্তি লাভ করিতে পারিবে, এই জগতের
প্রকৃত উন্নতি সাধন করিতে পারিবে।
যে যাে যথা প্রযততে স স তত্তৎ ফলৈকভা।
নতু তুষ্ণীং স্থিতেনেহ কেনচিৎ প্রাপ্যতে ফলম্ ।
৮ শুভেন পুরুষার্থেন শুভমাসাদ্যতে ফলম্ । অশুভে নাহশুভং রাম যথেচ্ছসি তথা কুরু। যে যে লোেক, যেমন যেমন পুরুষার্থ করে, সে সেইরূপ ফলই প্রাপ্ত হয়। চুপ করিয়া বসিয়া থাকিলে কি ফল লাভ হইবে ? শুভ পুরুষকারে শুভ ফল লাভ করা যায়, অশুভ পৌরুষে (উন্মত্ত চেষ্টায়) অগুভ ফল লাভ হয়। হে রাম ! তুমি যাহা ইচ্ছা করিবে তাহাই করিতে পার। দৈব কাহাকে বলে, তাহার বিচার না করিয়াই লােকে নানাপ্রকারে বিপদে পড়ে। বশিষ্ঠদেব বলিতেছেন-- পুরুষার্থাৎ ফল প্রাপ্তির্দেশ কালবশাদিহ। প্রাপ্তা চিরেণ শীঘ্রং বা যাসৌ দৈমিতিস্মৃত।। ন দৈবং দৃশ্যতে দৃষ্ট ন চ লােকান্তরে স্থিত। উক্তং দৈভিধানেন স্বলোকে কৰ্ম্মণঃ ফলম্ ॥ দেশ কাল বশেই পৌরুষবলে শীঘ্রই হউক, বিলম্বেই হউক যে ফল তাহাকেই দৈব বলে। দৈব কিন্তু চক্ষে দেখা যায় না, লােকান্তরেও নাই, স্বর্গে যে কৰ্ম্মফল ভােগ করা যায় তাহাই দৈব শব্দে কথিত। বশিষ্ঠদেবের মত এই যে— পুরুষাে জায়তে লােকে বর্ধতে জীৰ্যতে পুনঃ। ন তত্র দৃশ্যতে দৈবং জরা যৌবন বাল্যবৎ। অর্থ প্রাপক কাৰ্যক প্রযত্ন পর বুধৈঃ । প্ৰাক্তা পৌরুষ শব্দেন সর্বব মাসাছতেনয়া। পুরুষ এখানে জন্মিতেছে, বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতেছে, জরাগ্রস্ত হইতেছে, কিন্তু তথায় জরা যৌবন বাল্যের ন্যায় দৈবব্যর প্রত্যক্ষতা ত হয় না। পরমার্থ সাধক কার্যে যত্নপরতাকেই পুরুষার্থ বলে। এই পুরুষার্থে ই সৰ্বাভীষ্ট সিদ্ধ হয়। সংবিৎস্পন্দ, মনঃস্পন্দ, ইন্দ্রিয়স্পন্দ এই তিনটি পুরুষার্থের স্বরূপ, ইহা হইতেই ফলােদয় হয়। সংবিৎস্পন্দ তত্ত্বজ্ঞানের বিকাশ, মনঃস্পন্দ পুরুষার্থ সাধনেচ্ছা, অঙ্গস্পন্দ-অঙ্গচালনার্থ কৰ্ম্মেন্দ্রিয় প্রবৃত্তি। তত্ত্বজ্ঞান জন্য শাস্ত্রীয় উপায়ে মন ও শরীর চালাইতে হইবে। ব্যায়ামও শাস্ত্রমত করা আবশ্যক। উপাসনা, পূজা, ঈশ্বরসেবা নিজের ইচ্ছামত করিলে চলিবে না--কারণ নিজের ! ৪ ( ৩৯ ) চিন্তাকে শাস্ত্রচিন্তার দিকে প্রধাবিত করিলেই বুদ্ধির দোষ কাটিয়া যায় নতুবা আপন মনে চিন্তা করিয়া পুস্তক প্রণয়নে কোন ফল নাই। ইহাতেই নানা মত সৃষ্টি হয়, জীবন্মুক্তি এবং প্রকৃত সত্য ও প্রকৃত তত্ত্বের পথ আবৃত হয়। তাই শাস্ত্র বলিতেছেন— সংবিৎস্পন্দো মনঃ স্পন্দ ঐন্দ্রিয় স্পন্দ এব চ। এতানি পুরুষার্থস্য রূপাণ্যেভ্যঃ ফলােদয়ঃ । এই জন্যই শাস্ত্র বলিতেছেন যথা সংবেদনং চেতস্তথা তৎস্পন্দমিচ্ছতি। তথৈব কায় শ্চলতি তথৈব ফল ভােত । কি সুন্দর উপদেশ ! চিত্তে যেমন যেমন বিষয় ঘূৰ্ত্তি হইবে, চিত্তের স্পন্দনও সেইরূপ হইবে, শরীর চেষ্টাও সেইরূপ হইবে, কাজেই ফল ভােগও তদনুরূপ। মন্দ চিন্তা কর, চিত্ত মন্দভাবে স্পন্দিত হইবে, শরীর চেষ্টাও বিকৃত ভাবে চলিবে। কাজেই রােগ শােক আধি ব্যাধি আসিবেই। আবাল মেতৎ সংসিদ্ধং, যত্র যত্র যথা যথা। দৈবন্তু ন কচিদৃষ্ট, মতাে জগতি পৌরুষ। বাল্যাবধি যে যে বিষয়ে যেরূপ যত্ন করা যায় তাহাই পাওয়া যায়, দৈব কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না, কেবল মাত্র পৌরুষই বিদ্যমান। যদি এতদিনও কিছু না করিয়া থাক, এখন হইতে শাস্ত্রমত চলিতে পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করিতে থাক। তােমার দুরদৃষ্ট দূর হইবে—অর্থাৎ পূর্ব পূৰ্ব্ব মন্দ কৰ্ম্ম, চেষ্টা দ্বারা যে মন্দ স্বভাব বা দুর্দৈব বা কুপুরুষকার হইয়াছিল, তাহা ক্রমে ক্রমে দূরীভূত হইবে। কিন্তু উদ্যম কখনও ত্যাগ করিও না । হইবেই। একবার বিফল মনােরথ হইতেছ, দুইবার হইতেছ, কি তিনবার হইতেছ, ইহাতে নিরুৎসাহ হইও না। শাস্ত্র বলিতেছেন, ঠিক শাস্ত্রমত চলিতে থাক, যতক্ষণ না হয় চেষ্টা কর—হইবেই নিশ্চয়। শাস্ত্র বলিতেছেন— শাস্ত্ৰতাে গুরুতশ্চৈব, শ্বতশ্চেতি ত্রিসিদ্ধয়ঃ * সর্বত্র পুরুষাৰ্থস্য, ন দৈস্য কদাচন ॥ শাস্ত্রবাক্য, গুরুবাক্য ও নিজের অনুভব, এই তিনের মিলন কর, পুরুষাৰ্থ সিদ্ধি হইবেই ; ইহাতে দৈবের কোন প্রয়ােজন নাই। বশিষ্ঠদেবের এই ০ তােমার ( ৪ ) ! বাক্য যে জাতি গ্রহণ করিবে, সেই জাতি একদিকে জীবমুক্তি অন্যদিকে জগতের অভ্যুদয় সম্পাদন করিবে, ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই। রে পাপী দুৰ্বল জীব ! বশিষ্ঠ বাক্য হৃদয়ে ধারণ কর “হ্যস্তনী দুঙ্কিয়াভ্যেতি শশাভাং সৎক্রিয়য়া যথা। অদ্যৈবং প্রাক্তনী তস্মাৎ যত্নৎ সৎকাৰ্যবান্ ভবেৎ ॥” যেমন, পূর্ধ্বতন কুকাৰ্য্য সৎকৰ্ম্ম দ্বারা বিমল হইয়া শুভে পরিণত হয়, প্রাক্তন কৰ্ম্মও সেইরূপ শুতে পরিণত হয়। অতএব যত্নপূৰ্ব্বক শাস্ত্ৰবাক্য, গুরু- বাক্য ও আপন অনুভব মিলাইয়া কাৰ্য্য করিতে থাক। এই তিনটির কোন একটি বাদ দিলে তােমার পতন অবশ্যম্ভাবী। শুধু গুরুবাক্য যদি শাস্ত্রবাক্যের সহিত না মিলে, তবে গুরু ঈশ্বর পথে চলিতেছেন না নিশ্চয়, আর যদি শাস্ত্র লিখিত শ্লোক সৎগুরু বাক্যের সহিত মিলিত না হয়, তবে উহা শাস্ত্র নহে, মুখ লােকের উক্তি মাত্র, কোনরূপে শাস্ত্রে প্রবিষ্ট হইয়াছে। এই যােগবাশিষ্ঠ, এই গীতা, এই অধ্যাত্ম রামায়ণ, এই মহাভারত, এই ভাগবত, এই চণ্ডী, ইহারা একই উপদেশ দিতেছেন, ইহারা শ্রুতিবাক্য মাত্রই সমর্থন করিতেছেন। যেখানে বিরােধ মত বােধ হয়, সেখানে অগ্র পশ্চাৎ তুমি দেখিতেছ না তাই, বিবােধ। অগ্রপশ্চাৎ মিলাইয়া দেব, দেখবে ভগবান্ বশিষ্ঠ, বাল্মীকি, ব্যাস, শঙ্কর, এক কথাই বলিতেছেন। ইহাদের বাক্যে অশ্রদ্ধা যিনি করেন, তিনিই জীবের অনিষ্ট করেন। এইজন্য সংশাস্ত্র ও সদ্গুরু একান্ত আবশ্যক। সৎশাস্ত্রই ঈশ্বর বাক্য, সদগুরুই ঈশ্বর। এই ঈশ্বর আশ্রয় কর “মামেকং শরণং ব্রজ”, তুমি সৰ্ব্ব পাপ হইতে মুক্ত হইবে। ক্ষুদ্রবুদ্ধি মানবই শাস্ত্রের মধ্যে বিরােধ দেখিয়া সংশয় সৃষ্টি করে, ইহা ইহাদের বিচারের দোষ! ব্যাসদেব এবং বশিষ্ঠদেব এইরূপে দৈব ও পুরুষকারের সমান্তর করিয়াছেন। প্রকৃত পুরুষকার ঈশ্বর লাভ জন্য চেষ্টা মাত্র। সংসার কার্যের চেষ্টাকে পুৰুষকার বলে না—ইহা উন্মত্তচেষ্টা মাত্র। পূৰ্ব্ব পূৰ্ব সংস্কার জীবের স্বভাব সৃষ্টি করিয়াছে—এই স্বভাব আপনা হইতে বিষয়ের দিকে চলিবেই, ইহার জন্য কোন চেষ্টা করিতে হয় না। কাম, ক্রোধ, বিষয়-আসক্তি, ইন্দ্রিয়ের কাৰ্য্য -- ইহাদের জন্য কোন চেষ্টার আবশ্যক করে না, ইহা পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব কুচেষ্টার ফলে আপনারাই কাৰ্য্য করে। চেষ্টা কেবল ঈশ্বরলাভ জন্যই করিতে হয়- ইহাই পুরুষার্থ। সংসার চেষ্টাই যাহার সৰ্ব্বস্ব, ঈশ্বরলাভ চেষ্টা সময়ে যে বলে, ( ৪১ ) “যখন সময় হইবে তখন করিব” সেই রূপ মূঢ়-বুদ্ধি মনুষ্য আপনি ও নষ্ট হয়, অন্যকেও নাশের সদুপদেশ প্রদান করে। ঈশ্বরকে ডাকিবার সামর্থ্য সকল মনুষ্যের সকল কালেই আছে, ইহা আমরা “অপিচেৎসুদুরাচার ইত্যাদি” গীতার শ্লোক হইতে দেখিয়াছি। বশিষ্ঠদেব আবার বলিতেছেন- মুঢ়ানুমানসংসিদ্ধং, দৈবং যস্যাস্তি দুৰ্ম্মতে। দৈবাদ্দাহােহস্তি নৈবেতি, গন্তব্যং তেন পাবকে। যে দুৰ্ম্মতি, মূঢ়ব্যক্তির অনুমান-সিদ্ধ দৈব মানিয়া থাকে, তাহার “অগ্নিতেও দৈবাৎ দগ্ধ হইব না” এই স্থির করিয়া অগ্নিতে পড়া উচিত। দৈব মেবেহ চেৎ কর্তৃ, পুংসঃ কিমিব চেষ্টয়া। স্নানদানাসনােচ্চারা দৈবমেব করিষ্যতি | কিংবা শাস্ত্রোপদেশেন, মুকোহয়ং পুরুষঃ কিল। সঞ্চাৰ্যতে তু দৈবেন, কিং কস্যেহােপদিশ্যতে। এই জগতে দৈবেরই যদি কর্তৃত্ব থাকে, তাহা হইলে পুরুষের চেষ্টার প্রয়ােজন কি ? দৈবই কেন স্নান, দান, উপবেশন, মলত্যাগ প্রভৃতি কৰ্ম্ম করুক না ? শাস্ত্রোপদেশ কেন ? কাহাকে কোন উপদেশ দিবারই বা প্রয়ােজন কি ? দৈবই সকল কৰ্ম্ম করিবে, পুরুষ নিশ্চেষ্ট হইয়া থাকুক। এ বিষয়ে অধিক লেখা নিষ্প্রয়ােজন। কিন্তু ইহা সত্য যে, সকল বিষয়েই যত্নের আতিশয্য থাকিলে সর্বদা সৰ্ব্বত্র সকল প্রকার অভিলষিতই সফল হয়। শুভ উদ্যম পরিত্যাগ করা কখনই কর্তব্য নহে। নন্দী, বলি, সম্বৰ্ত্ত, বিশ্বামিত্র, উপমন্যু, খেতনামক মুনি, পতিব্রতা সাবিত্রী, ইহারা উদ্যমশীল হইয়াই অষ্ট লাভ করিয়াছিলেন। জগতে এমন কোন ব্যক্তিই দৃষ্ট হয় না যিনি অতিশয় শুভ উদ্যোগ করিয়াও ফললাভ করেন নাই। এজন্য আত্মজ্ঞান বিষয়েই দৃঢ় উদ্যোগ করা কর্তব্য। আত্মজ্ঞান ব্যতীত কদাচ কোন উপায়ে জন্ম-মৃত্যু- প্রবাহের উপশম হয় না—অন্য কোন উপায়ে জীবন্মুক্তি হইতে পারে না। শাস্ত্রে যেখানে দৈবের কথা উল্লেখ আছে এবং দৈবের প্রাধান্য কীর্তিত হইয়াছে, তাহা মূঢ়জনের বুদ্ধি-গ্রাহ্য নিশ্চেষ্টভাব নহে—ইহার নাম মহা- নিয়তি। এই মহানিয়তি ব্রহ্মের চিৎশক্তি। ইহা স্পন্দরূপিণী অবশ্যম্ভাবিণী। এই মহানিয়তি আদি সৃষ্টিকালে পরব্রহ্মর সঙ্কল্পাত্মকবৃত্তিরূপে উদ্ৰিক্ত হয়।
- ( ৪২ ) মহানিয়তি বলে ব্ৰহ্ম কর্তৃক জগৎ সমুহ তৃণের ন্যায় পরিবর্তিত হইতেছে। এই মহানিয়তি সৰ্বকালগামী ও সকল বস্তুব্যাপী। ইহার সহিত মােহের 'কোন সম্পর্ক নাই। ইহা বিশুদ্ধ ঈশ্বর সঙ্কল্প। এই মহানিয়তিকে জ্ঞানিগণ দৈব নাম দিয়া থাকেন। “এই পদার্থ এই প্রকার স্পন্দিত হইবে, এইরূপে, এই প্রকারে, এই সময়ে, উৎপন্ন হইবে” ইত্যাকার অবশ্যম্ভাবিতাকে দৈব কহে। ইহাকেই পুরুষস্পন্দ, নিখিল তৃণগুল্মদি, সমুদায় জীব, দিবারাত্রাদিকাল ও ক্রিয়া বলা হয়। এই নিয়তিবলে পুরুষাদৃষ্টের সত্তা এবং পুরুষাদৃষ্টদ্বারা এই নিয়তির সত্তা, ত্রিভুবনের অবস্থিতি কাল পর্যন্ত অবস্থিত থাকে। তাহার পর মহাপ্রলয় হইলে পুরুষাদৃষ্ট ও এই নিয়তি এক আত্মারূপে অবস্থিত হয়। কল্পারম্ভ হইতে কল্লান্ত পর্যন্ত পুরুষ-ক্রিয়ামুলক যে কিছু ব্যবহার চলিতেছে, তৎসমুদায় এই নিয়তি বশেই হইয়া থাকে। এই অবশ্যম্ভাবিনী নিয়তি দ্বারা যাহা হইবে, তাহা রুদ্র প্রভৃতিগণেরও বুদ্ধিদ্বারা লঙ্ঘনীয় হয় না। অতএব ধীমান্ ব্যক্তি এই নিয়তি আশ্রয় করিয়া পুরুষকার ত্যাগ করিবেন না। কারণ, নিয়তি পুরুষকার আকারেই, কর্মের নিয়ন্ত্ৰী হয়। এই নিয়তি যখন পুরুষ প্রযত্নে মিলিত না হয়, ঈশ্বর সঙ্কল্প মাত্রেই অবস্থিত হয়, তখন সে নিয়তি পদবাচ্য হয় এবং যখন সৃষ্টি ফল সম্পৃক্ত হয় তখন তাহাকে পুরুষকার কহে । অতএব পুরুষকার রূপে পরিণত না হইলে নিয়তি দ্বারা কোন ফল হয় না। পুরুষকারে পরিণত হইলেই নিয়তি সফল হয়। যে ব্যক্তি নিয়তি আশ্রয় করিয়া নিষ্ক্রিয় ভাবে অবস্থান করে, তাহার প্রাণবায়ুর স্পন্দ কোথা যাইবে ? অর্থাৎ ক্ষুধাতুর হইলেও, নিষ্ক্রিয় হইয়া অবস্থান করায় যখন কেহ ক্ষণকাল জীবিতও থাকে, তখন তাহারও প্রাণবায়ু সঞ্চালনের অনুকূল যত্ন ও পুরুষকার থাকে। যখন তাহার অভাব হয় তখন তাহারও অভাব হয়। নির্বিকল্প সমাধিস্থলে যে ব্যক্তি প্রাণবায়ুর রােধ করিয়া চিত্ত বিশ্রাম-পদে অবস্থান করে এবং সেই সাধু অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞ যে সকল পৌরুষের ফল স্বরূপ মােক্ষ প্রাপ্ত হয় তাহাও তাহার প্রাণনােধাদিরূপ পুরুষকারের ফল, সুতরাং “পুরুষকার ব্যতীত ফল, ইহা কিরূপে বলা যাইবে ? অতএব শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে পুরুষকার অবলম্বন করা শ্রেয়। জ্ঞানীদিগের নিয়তিতে কোন দুঃখের লেশ নাই। উহাতে অবিদ্যা নাশ হইয়া থাকে। এই নিদুঃখ নিয়তিরূপ ব্ৰহ্মভাবের স্ফুরণে যদি পরিণত হওয়া যায়, তাহা হইলে তাহাই পরমশুদ্ধ পরমপদ প্রাপ্তি ও পরম গতিলাভ, জানিবে। যেমন জলেরই দ্রবত্ব, তৃণ লতা বৃক্ষ প্রভৃতি রূপে ( ৪৩ ) ধরাতলে স্ফুরিত হয় সেইরূপ সৰ্ব্বগামী ব্ৰহ্মই উক্তপ্রকার নিয়তি বিভাগে স্ফুরিত হয়েন। এই কঠিন তত্ত্ব ধাহারা আলােচনা করিতে ইচ্ছা করেন; তাহারা যােগবাশিষ্ঠ উৎপত্তি প্রকরণের ৬২ অধ্যায় মনােযােগের সহিত পাঠ করিবেন। উপরে দেখান হইল—পুরুষকার বলেই জীবন্মুক্তি লাভ হয়। মুখ, ধারণাভ্যাসী ও যুক্তিমান্ এই যে তিন প্রকার মনুষ্য আছে, তন্মধ্যে মুখেরাই পুরুষকার স্বীকার করে না। আর যাহারা পুরুষকার স্বীকার করে, মনে মনে কামনা করিয়া শাস্ত্রানুযায়ী কর্মদারা তাহা সাধন না করে, তাহাদের ব্যবহার উন্মত্তের ক্রীড়া মাত্র। চিত্তে চিন্তয়তামর্থং যথশাস্ত্রং নিজেহিতৈঃ। অসংসাধয়তামেব মূঢ়ানা স্নিগদুরীতিম্। যে সকল মুঢ় মনে মনে কোন অভিলাষ করিয়া যথাশাস্ত্র স্বীয় চেষ্টা দ্বারা তাহা সিদ্ধ করিতে প্রবৃত্ত না হয়, তাহাদিগের ইষ্ট ভােগ লিগায় ধিক্। ইহা নিশ্চয়ই সত্য যে “যাতি নিষ্ফল যত্নত্বং ন কদাচন কশ্চন” । শাস্ত্রীয় কর্মে প্রযত্ন কখনই নিস্ফল হয় না, দৈব পরায়ণ সেই সেই ব্যক্তিই দীন হীন পামর ও মূঢ়, যাহারা লােভ পরবশ হইয়া প্রাক্তন কর্মের জয়ার্থ যত্ন করে না। কিন্তু পৌরুষেণ কৃতং কৰ্ম্ম দৈবাদদভিনশ্যতি । তত্র নাশয়িতুজ্ঞেয়ং পৌরুষং বলবত্তর। যথায় পুরুষকার-কৃত কৰ্ম্ম দৈবাৎ বিফল হয় তথায় বুঝিবে সেই কৰ্ম্মনাশক ব্যক্তির পুরুষকার আরও প্রবল। য যদভ্যস্যতে লােকে তন্ময়েনৈব ভূয়তে। ইত্যাকুমারং জ্ঞেযু দৃষ্টং সন্দেহবর্জিত। এই জগতে যাহা অভ্যাস করা যায় তাহাতেই তন্ময় হওয়া যায়-ইহার পরিচয় আবাল বৃদ্ধে জ্ঞাত আছে। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। অতএব তত্ত্বজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত গুরু, শাস্ত্র ও অনুভব দ্বারা নির্ণীত কৰ্ম্ম অভ্যাস কর, হইবেই। যাহারা জীবনের লক্ষ্য বুঝিয়াও তল্লাভে পৌরুষ প্রদর্শন না করে, তাহারাই প্রকৃত মূখ। বরং শরাব হস্তস্য, চাণ্ডালাগারবীথিযু। ভিক্ষার্থমটন রাম, ন মৈহত-জীলিম। = . ( ৪৪ ) বরং শরাক-হস্তে চণ্ডালভবনরখ্যায় ভিক্ষা করিতে যাওয়া ভাল, কিন্তু মূর্খতা-দূষিত জীবন কিছু নহে। আর মুক্তির পথ জানিয়াও সম্ভোগশন মাত্রেণরাজ্যাদিষু সুখে যে। সন্তুষ্ট। দুষ্টমনসাে বিদ্ধি তানহ্মদর্দনান্ যাহারা রাজ্যাদি সুখসম্ভোগ মাত্রেই সন্তুষ্ট, সেই দুষ্টামগণকে অন্ধ ভেক স্বরূপ জানিবে। অধিক আর কি বলা যাইবে—আত্মদর্শনে সচেষ্ট হও, আত্মজ্ঞান লাভ করিয়া জীবন্মুক্ত হও আর বিলম্ব করিও না। “উত্তিষ্ঠত জাগ্রত” ইহা স্মরণ রাখিয়া যে পাপী মােক্ষলাভাৰ্থকৰ্ম্মে ভীত হইয়া ভােগ রসে আসক্ত হয় সেই অধম নিজ মাতার বিষ্ঠার ক্রিমি তুল্য—সেই অধমগণের নাম কীৰ্ত্তনীয় নহে— এতাবত্যপি যে ভীতাঃ, পাপা ভােগরসেস্থিতাঃ। স্বমাতৃবিষ্ঠা ক্রিময়ঃ, কীৰ্ত্তনীয়া ন তেহধমাঃ । শাস্ত্র শক্তি সঞ্চার করিতেছেন—তুমি আপন লক্ষ্যও স্থির করিয়াছ, এক্ষণে প্রবল পুরুষার্থ সহকারে কর্মে নিযুক্ত হও। উদ্যম প্রবল রাখিবার জন্য প্রতিদিন বিচার করিও --দেহ নশ্বর, স্ত্রাদি ভােগ, কীটের ব্ৰণাস্বাদন ন্যায় ; লক্ষ্য বিস্মৃত হইয়া স্বেচ্ছাচার মত কৰ্ম্ম, উন্মত্ত চেষ্টা মাত্র। অন্য কৰ্ম্ম যখন তােমায় করিতে হয়, তখনও স্মরণ রাখা কর্তব্য, মােক্ষ-প্রাপক কৰ্ম্ম ভিন্ন সকল কৰ্ম্মই মিথ্যা। মিথ্যা বােধে যদি কখন কোন কৰ্ম্ম কর, তবে তােমার প্রকৃত কৰ্ম্মের ক্ষতি হইবে না। আমরা উপসংহারে এইমাত্র বলি যে শ্রীভগবান্ আয় দিলেন, তিনি শাস্ত্রমুখে, সাধুমুখে, গুরুমুখে পথ দেখাইয়া দিলেন। জীব ! আর তােমার ভয় কি ? তুমি এখন নিশ্চিন্ত হইয়া আনন্দধামে শুভযাত্রা কর। প্রবল উদ্যমে পথ অতিক্রম করিতে থাক’, শরীরের দিকে, ভােগের দিকে, আর চাহিও না। কোথাও সন্দেহ হইলে ভগবান্ আত্মাকেই জিজ্ঞাসা কর, তিনিই তােমার পথপ্রদর্শক; গুরুবাক্য, শাস্ত্ৰবাক্য তাহারই বাক্য। তুমি অধ্যবসায় কর, নিশ্চয়ই আনন্দ ধামে যাইতে পারিবে, নিশ্চয়ই এই জন্মেই জীবন্মুক্ত হইতে পারিবে। ভাবিও না যে এই ঘাের কলিযুগে জীবমুক্তি অসম্ভব কথা “সর্ব মেবেহ হি সদা, সংসারে রঘুনন্দন। সম্যক্ প্রযুক্তাৎ সর্বেণ, পৌরুষাৎ সমবাপ্যতে ॥
( ৪৫ ) টীকাকার বলিতেছেন “ননুশুকাদীনাং শমদমাদি সাধন সম্পন্নানাং শ্রবণং ফলিতং কমন্যেষামাধুনিকানাং তৎ ফলিষ্যতি, সাধনানাং দুঃসম্পাদক্বাদিত্যা- শঙ্ক্য পুরুষপ্রযত্নস্যাসাধ্য নাস্তীত্যাহ সর্বমেবেতি।” ভাগবতাদি শাস্ত্রে এবং অধ্যাত্ম-রামায়ণাদিতেও জীবন্মুক্তির কথা বলা হইয়াছে। এই সমস্ত শাস্ত্র কলির জীবেরই জন্য। গীতায় যাহা সুত্র মাত্র, অন্য অন্য শাস্ত্রে তাহার ব্যাখ্যা দৃষ্ট হয় ; সেই জন্য আমরা এতদূরে আসিয়া পড়িয়াছি। যেখানেই আসি না কেন, বিনা জীবন্মুক্তিতে কাহারও দুঃখনিবৃত্তি নাই। জীবন্মুক্তি সুখের জন্য, যাহা করিতে হইবে, তাহ উল্লেখ করিয়া এই অংশ শেষ করা গেল। “পরিস্পঃ শাস্ত্রবিহিত কায়বাকচিত্তচলনরূপং কৰ্ম্ম তস্য ফলং চত্তশুদ্ধি দ্বারা জ্ঞানং তৎপ্রাপ্তৌ সত্যাং হৃদি শীতলং কাম ক্রোধাদি সন্তাপাতিহুত , মাদনং জীবন্মুক্তিসুখমুদেতি। তথাচ শ্রুতিঃ- স একো ব্ৰহ্মণ আনন্দ শ্রোত্রিয়স্য চাকামহস্যেতি। স্মৃতিশ্চযচ্চ কামসুখং লােকে যচ্চদিব্যং মহৎসুখম্। তৃষ্ণাক্ষয় সুখসৈতে নাহঁত ঘষাড়শীং কলামিতি । তন্তু, সৰ্ব্বং পৌরুষাদেব ভবতি নান্যত ইতি পুরুষ প্রযত্ন এবনির্ভরঃ কাৰ্য্য ইতি ভাব।” যে শ্লোকের ব্যাখ্যা করিতে টীকাকার উপরি উক্ত কথা বলিতেছেন তাহা এই- ইহ হীন্দোরিবােদেতি শীতলাহলাদনং হৃদি। পরিস্পন্দ ফল প্রাপ্তৌ পৌরুষাদেব নান্যতঃ। শীতল কাম ক্রোধাদি সন্তাপ অপ্রতিহত যে আলাদকে জীবন্মুক্তি বলে, জীব সেই জীবন্মুক্তির জন্য পুরুষাৰ্থ করিয়া কোন্ ভূতের কাৰ্যে জীবন ব্যয় করিতেছে ? আর বিলম্ব করিও না “উষ্ঠিত জাগ্রত”।
তৃতীয় কথা । গীতার স্কুল পরিচয়। ১। ভগবান্ ব্যাসদেব শত সহস্র (১০০ x১০০০) বা লক্ষ শ্লোকে মহাভারত রচনা করিয়াছেন। অদ্বৈতামৃতবর্ষিণী গীতা মহাভারতান্তর্গত ভীষ্মপর্বের অংশ। ৭০০ শ্লোকে গীতা গ্রথিত। এই ৭০০ শ্লোকের মধ্যে একটী শ্লোক ধৃতরাষ্ট্রের উক্তি, ৪০টি সঞ্জয়ের, ৮৪টি শ্লোক অর্জুনের, এবং ৫৭২ বা ৫৭৬টি ভগবানের মুখপদ্মবিনিঃসৃত। অষ্টাদশ অধ্যায়ে ইহা বিভক্ত। প্রতি অধ্যায়ের শেষে বলা হইয়াছে ‘‘ইতি শ্রীমহাভারতে শতসহস্রাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং ভীষ্মপৰ্বণি শ্রীমদ্ভগবদগীতা সূপনিষৎসু ব্ৰহ্মবিদ্যায়াং যােগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণাৰ্জ্জুন সংবাদে” ইত্যাদি। গীতার স্কুল পরিচয় গীতাই দিতেছেন। ইহা শ্রীকৃষ্ণাৰ্জ্জুন সংবাদ, ইহা যােগশাস্ত্র, ইহা ব্রহ্মবিদ্যা, ইহা উপনিষদ। ২। গীতা শ্রীকৃষ্ণাৰ্জ্জুন সংবাদ। গীতার শেষ কয়েকটী শ্লোকে সঞ্জয় এই শ্রীকৃষ্ণাৰ্জ্জুন সংবাদ সম্বন্ধে বলিতেছেন- ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ। সংবাদমিমমশ্রীমদ্ভুতং লােমহর্ষণম্। ব্যাস প্রসাদাৎ তনিমং গুহ্যমহং পরম্। + যােগং যােগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ সয়ম। রাজন্ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদমিমমদ্ভূতম্। কেশবাৰ্জ্জুনয়ােঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চমুহুর্মুহুঃ । তচ্চ সংখৃত্য সংস্মৃত্য রূপমত্যদ্ভুতং হরেঃ। বিস্ময়াে মে মহান্ রাজন্ হৃষামি চ পুনঃ পুনঃ ॥ গীতার অদ্ভুত সংবাদ, গীতার অত্যদ্ভুত বিশ্বরূপ—কখনও কি স্মরণ করিয়াছ ? যদি না করিয়া থাক’ সাধনায় বসিবার পূর্বে স্মরণ করিয়া সাধনায় প্রবৃত্ত হইও, দেখিবে—স্মরণে চিত্ত কোন্ ভূমিকায় উপস্থিত হয় । সঞ্জয় বলিতেছেন—আমি মহাত্মা পার্থ ও বাসুদেবের এই অদ্ভুত লােমহর্ষণ ? ( ৪৭ ) সংবাদ শ্রবণ করিয়াছি। হে রাজন্ সাক্ষাৎ যজ্ঞেশ্বর কৃষ্ণ এই পরমগুহ যােগ কহিলেন, আমি ব্যাস প্রসাদে শ্রবণ করিলাম। কেশবাৰ্জ্জুনের এই অদ্ভুত সংবাদ মুহু মুহুঃ স্মরণ করিয়া পুনঃ পুনঃ হর্ষ প্রাপ্ত হইতেছি। হে রাজ শ্রীহরির সেই অদ্ভুত রূপ পুনঃ পুনঃ আমার স্মরণ হইতেছে এবং পুনঃ পুনঃ হর্ষ লাভ করিতেছি। সত্যই কি এক অদ্ভুত লােমহর্ষণ ব্যাপার এই কৃষ্ণার্জুন কথায় সন্নিবেশিত, কি এক অদ্ভুত বিশ্বরূপ এই গ্রন্থমধ্যে প্রকাশিত!! যদি এই অদ্ভুত সংবাদ, এই অত্যদ্ভুত বিশ্বরূপ আমাদের হৃদয় স্পর্শ করিতে না পারে, যদি ইহার স্মরণে মুহু মুহুঃ হর্ষ না আইসে তবে গীতা পরিচয়ে ফল কি সঞ্জয়ের ত মুহু মুহুঃ হর্ষ আসিয়াছিল, আমাদের আসে না কেন ? কারণ আছে। পুস্তকে উপদেষ্টার স্বর আঁকা থাকে না, সে স্নেহদৃষ্টি থাকে না, সে মধুর হাস্য থাকে না, সে সুন্দর হস্তভঙ্গী থাকে না। নির্জীব গ্রন্থ কথাগুলি মাত্র সংগ্রহ করিয়া রাখে ; যাহার কথা, সে যেমন করিয়া বলিয়া ছিল, পুস্তক সে প্রকারটি দিতে পারে না। কিন্তু যে ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের বিশ্ববিমােহিনী মূর্তি হৃদয়ে ধারণা করিতে পারেন, সেই হাসি, সেই ভঙ্গী, সেই ত্রিভঙ্গললাম ঠাম, সেই স্নেহভরা চাহনি, সেই অঙ্গুলি-সঙ্কেত, যে ভক্ত আপন মানসচক্ষে সেই ভরা-রূপের আভাসও প্রাপ্ত হয়েন, তিনিই ধন্য। তিনিই সেই বিশ্বরূপ স্মরণে সেই রূপজড়িত বাক্যে পুনঃ পুনঃ হর্ষ লাভ করেন। এ হর্ষ অন্তরের অন্তস্তলে অনুভূত হয়, এ আনন্দই ব্রহ্মানন্দ। ব্রহ্মানন্দ স্পর্শে শরীর ঝােমাঞ্চ হয়, চক্ষু অশ্রুজলে পূর্ণ হয়, স্বর গদগদ হইয়া যায়, কতই সাত্ত্বিক বিকার দেখা দেয়। গীতার উপদেশের সঙ্গে সঙ্গে এই সাত্ত্বিক বিকার যদি প্রকটিত না হয়, তবে গীতার অনুভূতি যেন ঠিক হয় না। কোন কিছু গ্রহণ করিয়া যদি রসে উপস্থিত না হওয়া যায় তবে বুদ্ধির ক্ষণিক তৃপ্তি বা চিত্তবিনােদন পৰ্য্যন্তই লাভ হয়। ভগবানের রূপের সহিত ভগবদ বাক্য স্মরণ কর, আনন্দ আসিবেই। এই অদ্ভুত বিশ্বরূপ, এই লােমহর্ষণ সংবাদ লইয়াই গীতা। বিশ্বরূপ, গ্রন্থ মধ্যে যথাস্থানে সন্নিবেশিত—ইহা বলিবার কথা নহে, অনুভবের কথা। সংবাদের পরিচয় আবশ্যক। ৩। গীতা যােগ শাস্ত্র। ইহার অষ্টাদশ অধ্যায়ে 'অষ্টাদশ প্রকার যােগের কথা বলা হইয়াছে। প্রথম অধ্যায়ে বিষাদ যােগ এবং শেষ অধ্যায়ে মােক্ষ, যােগ। “যিনি বিষাদকে যােগরূপে গ্রহণ করিয়াছেন তিনিই গীতােক ( ৪৮ ) { : পথে কাৰ্য্য করিয়া সৰ্ব্বদুঃখনিবৃত্তি এবং পরমানন্দ প্রাপ্তিরূপ মােক্ষ লাভে সমর্থ । এই অষ্টাদশ যােগ, তিন ষট্কে বিভক্ত। প্রথম ষকে বিষাদ যােগ, সাংখ্য যােগ, কৰ্ম্ম যােগ, জ্ঞান যােগ এবং ধ্যান যােগ। দ্বিতীয় ষট্কে বিজ্ঞান যােগ, অক্ষর ব্ৰহ্মযােগ, রাজবিদ্যা রাজগুহ্য যােগ, বিভূতি যােগ, বিশ্বরূপ দর্শন এবং ভক্তি যােগ। শেষ ষট্কে ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগ যােগ, গুণত্রয় বিভাগ যােগ, পুরুষােত্তম যােগ, দৈবাসুর সম্পদ্বিভাগ যােগ, শ্রদ্ধায় বিভাগ যােগ এবং মােক্ষ সন্ন্যাস যােগ। প্রতি যকেই কৰ্ম্ম ভক্তি ও জ্ঞান উল্লেখ থাকিলেও প্রথম ছয় অধ্যায়ে কৰ্ম্ম, দ্বিতীয় ছয় অধ্যায়ে ভক্তি, এবং শেষ ছয় অধ্যায়ে জ্ঞান উপদিষ্ট হইয়াছে। প্রতি ষট্কেই পরােক্ষ জ্ঞান, সাধনা ও সিদ্ধাবস্থা বর্ণিত। বেদ যেরূপ কৰ্ম্ম কাণ্ড, উপাসনা কাণ্ড, ও জ্ঞান কাণ্ডে বিভক্ত, গীতাও তাহাই। ইহার অধ্যায়ে অধ্যায়ে ক্রম, কাণ্ডে কাণ্ডে ক্ৰম, শ্লোকে শ্লোকে ক্রম, এমন কি শ্লোকের শব্দে শব্দে ক্রম লক্ষিত হয়। শ্লোকের জ্ঞাতব্য বিষয়ে এই ক্ৰম বুঝিবার প্রয়াস করা হইয়াছে। অদ্ভুত গ্রন্থ এই গীতা। ধৰ্ম্মময়ী সৰ্ব্বশাস্ত্র সারভূতা বিশুদ্ধা এই গীতা এই জন্যই এত আদরের বস্তু। গীতা বহু ভাষায় অনূদিত, বহুভাষ্যে অলঙ্কত, জগন্মান্য বহু পণ্ডিত আজও ইহার পূজা করেন। গুণ না থাকিলে এত আদর কি হয় ? আর সংসার সাগরং ঘােরং তমিচ্ছতি যাে নরঃ। গীতা নাবং সমাসাদ্য পারং যাতি সুখেন সঃ। ৪। গীতা ব্ৰহ্মবিদ্যা। যে বিদ্যার প্রকাশে আপন স্বরূপ অনুভূত হয় তাহাই ব্ৰহ্মবিদ্যা। যাহারা অবিদ্যার বশবর্তী তাহারা প্রভৃত্তি মার্গ নিরত, আর যাহারা বিদ্যা প্রাপ্ত হইয়াছেন তাহারা “নিবৃত্তিমার্গ নিরতা বেদান্তার্থ- বিচারকা। তদ্ভক্তিনির যে চ তে বৈ বিদ্যাময়াঃ সুতাঃ।” যাহারা বেদান্তার্থ- বিচারক, যাহারা ভগবানের ভক্ত তাঁহারাই নিবৃত্তিমার্গ নিরত। ইহারাই বিদ্যালাভে সমর্থ। পরমানন্দে নিত্যস্থিতি, ব্ৰহ্মবিদ্যাই কেবল প্রদান করিতে পারেন। এই পরমানন্দরূপে নিত্যস্থিতিই কৈবল্যমুক্তি। ব্রহ্মবিদ্যার অন্য নাম উপনিষদ বিদ্যা। মুমুক্ষুগণকে মুক্তি প্রদান করিতে এক একখানি উপনিষদই সমর্থ— মাণ্ডুক্য মেকমেবালং, মুমুক্ষণাং বিমুক্তয়ে। তথাপ্যসিদ্ধং চেক্ জ্ঞানং, দশােপনিষদংপঠ ।
( ৪৯ ) গীতা, সমস্ত উপনিষদের সার- সর্বোপনিষদো গাবাে দোগ্ধা গােপালনন্দনঃ। পার্থে বৎসঃ সুধীভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ ॥ ৫। গীতা উপনিষদ্ কেন? ‘উপনিষদ অর্থে সমীপসদন (উপ+নি + সদ + কিপ, )। উপ’ অর্থে সমীপে, ‘নি অর্থে নিশ্চয়রূপে, ‘স অর্থে অবস্থান নিশ্চয় রূপে সমীপে অবস্থান, ইহাই উপনিষদের ধাতুগত অর্থ। যে বিদ্যা “তিনি অতি সমীপে অবস্থান করিতেছেন” ইহা নিশ্চয়রূপে অনুভব করাইয়া দেয় তাহাই উপনিষদ বিদ্যা, ইহাই ব্ৰহ্মবিদ্যা। কে সমীপে অবস্থান করিতেছেন ? যিনি সর্বপ্রকার বিষাদের আত্যন্তিক নিবৃত্তি স্বরূপ, যিনি চিরস্থায়ী আনন্দ-স্বরূপ, যাঁহাকে জানিলে—দেখিলে তাহাই হইয়া যাওয়া যায়, সেই সচ্চিদানন্দরূপী; সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়-কৰ্তাই সমীপে। ইনিই পরমেশ্বর, ইনিই ভগবান্, ইনিই পরমাত্মা,। গীতা এই আত্মজ্ঞান প্রদান করিতেছেন বলিয়া ইহাকে ব্রহ্মবিদ্যা বলা হইয়াছে—ইহাকে উপনিষদ বলা হইয়াছে। এই ব্রহ্মবিদ্যা, এই উপনিষদ, এই যোগশাস্ত্র লইয়াই শ্রীকৃষ্ণাৰ্জ্জুন-সংবাদ। গীতার লক্ষ্যসঙ্কেত ও কর্মসঙ্কেতে এই সংবাদের পরিচয় দেওয়া হইবে। গীতার স্থান, কাল ও পাত্র বিবৃতিতে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন চরিত্রের কতক আলােচনা করা যাইবে। চতুর্থ কথা। গীতায় লক্ষ্য সঙ্কেত। জগতের অভ্যুদয় ও জীবের নিঃশ্রেয়স —ইহাই গীতার লক্ষ্য। অভ্যুদয় ও নিঃশ্রেয়স এই দুইটি শাস্ত্রীয় বাক্য। অভ্যুদয় অর্থে প্রকৃত আনন্দের দিকে জগতের উন্নতি, এবং নিঃশ্রেয়স অর্থে পরমানন্দে নিত্যস্থিতি, বা, মুক্তি। জীব একদিকে জগচ্চ আনন্দপথে পরিচালিত করিবে, সঙ্গে সঙ্গে আপনিও, পরমানন্দে স্থিতি লাভ করিবে—ইহাই গীতার লক্ষ্য।
( ৫০) মহাপুরুষের লক্ষ্য সর্বদাই জ্বলন্তভাবে তাহার চক্ষের সম্মুখে নৃত্য করিতে থাকে। লক্ষ্যই সৰ্ব্বদা তাহাকে আকর্ষণ করে। মানব জাতির দুঃখ নিবারণ যাহার লক্ষ্য, তিনি ক্ষুদ্র সংসার মমত্বে অভিভূত হইতে পারেন না। হৃদয় অন্ধ, বুদ্ধি পথ-প্রদর্শিকা। মহাপুরুষ যদি কখন আপন সতী স্ত্রীর যাতনা বা সদ্যোজাত শিশুর ভবিষ্যৎ দুঃখ ভাবিয়া কাতর হয়েন-কাতর হইয়া আপন ক্ষুদ্র সংসার মায়ায় যদি কখন জগতের দুঃখ দূর করিবার সঙ্কল্প শিথিল করেন, তখন সমস্ত প্রকৃতি তাঁহাকে উত্তেজিত করে, আকাশে নক্ষত্র ইঙ্গিত করিয়া তাহাকে জগতের দুঃখ দেখাইয়া দেয়। তাহার ক্ষণিক অন্ধ হৃদয়, তৎক্ষণাৎ চক্ষুষ্মতী বুদ্ধির হস্ত ধারণ করে, তিনি তৎক্ষণাৎ আপন গন্তব্য পথে অগ্রসর হয়েন। অভ্যুদয় ও নিঃশ্রেয়স এককালে আচরণ করিবার জন্য গীতা উপদেশ করিতেছেন। নিষ্কাম কৰ্ম্মই গীতার সাধন মার্গের বিশেষত্ব। যথাস্থানে ইহা অলােচিত হইয়াছে। এখানে এই বলিলেই পৰ্যাপ্ত হইবে, যে নিষ্কাম কৰ্ম্মের কর্মভাগ, জগতের অভ্যুদয় জন্য এবং নিষ্কামভাব, জীবের নিঃশ্রেয়স জন্য। বিনা কৰ্ম্মে জগতের উন্নতি অসম্ভব, বিনা কামনাত্যাগে জীবের পরমানন্দে স্থিতি সুদূরপরাহত। শাস্ত্র বলেন- যদি বর্ষসহস্রাণি তপশ্চরসি দারুণ। নান্যঃ কশ্চিদুপায়ােহস্তি সঙ্কল্লোপশমাদৃত। নিঃসঙ্কল্লোযথাপ্রাপ্ত ব্যবহার পরােভব। ক্ষয়ে সঙ্কল্প জালস্য জীবােব্ৰহ্মত্বমাপ্তয়াৎ ॥ অঃ রাঃ, উঃ জগতের অভ্যুদয় ও মানবের নিঃশ্রেয়স এই প্রবন্ধে, আলােচনার বিষয়। প্রথমে জগতের উন্নতির কথা আলােচনা করা যাউক। জগচক্র পরিচালন জন্য কৰ্ম্ম করিতে হইবে। গীতা এই জগচ্চত্রের কথা তৃতীয় অধ্যায়ের ১৪)১৫ শ্লোকে উল্লেখ করিয়াছেন। পরে বলিতেছেন— “এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবৰ্ত্তয়তীহ যঃ। অঘায়ুরিন্দ্রিয়ানামাে মােঘং পার্থ স জীবতি।” “মৎপ্রবর্তিত জগচ্চক্রের যে ব্যক্তি অনুবর্তী না হয় অর্থাৎ জগচ্চত্র পরিচালন জন্য কৰ্ম্মানুষ্ঠান যে ব্যক্তি না করে, তাহার আয়ু পাপম্বরূপ। পার্থ ! এতাদৃশ ব্যক্তি ইন্দ্রিয় উপভােগেই আরাম পায়, সুতরাং তাহার জীবন বৃথা।” মনুষ্যের বুদ্ধি অল্প। কোন্ কৰ্ম্মে জগতের ইষ্ট বা অনিষ্ট হইবে, কোন্ ( ৫১ ) কর্মে জগতের জীব সকলে সুখী হইবে, সঙ্কীর্ণ বুদ্ধিতে ইহা নিশ্চয় হয় না, জন্য, ভগবান্ কর্মের সহিত জীব সৃষ্টি করিয়াছেন। দেবতার সহিত মনুষ্যের সম্বন্ধও আছে। মনুষ্য কর্মদ্বারা দেবতাদিগকে সংবর্ধিত করিবে, এবং দেবতা- গণও বৃষ্ট্যাদি দ্বারা অনু উৎপাদন করিয়া মনুষ্যকে বর্ধিত করিবেন। এইরূপে দেবতা ও মনুষ্য পরস্পর সংবর্ধিত হইয়া পরম শ্রেয়ঃ লাভ করিবে। দেবা ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ। পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমব্যথ। কিন্তু জগতের উন্নতি কতদূর সম্ভব ? সমস্ত জগতের দুঃখ নিবৃত্তি ও সর্ব প্রাণীর পরমানন্দ প্রাপ্তি—ইহা প্রকৃতি বিরুদ্ধ। ইহা কখনও হয় নাই, হইতেও পারে না। জগৎ যে কোনও সময়ে সম্পূর্ণ দুঃখশূন্য হইয়াছিল কোন জাতির ইতিহাসেও ইহা দেখা যায় না আবহমান কাল হইতে বহু জ্ঞানী জগৎকে উপদেশ দিয়া আসিতেছেন, কিন্তু সর্ব প্রাণীর দুঃখনিবৃত্তি কি কখনও হইয়াছে ? ভগবান্ অবতার গ্রহণ করেন—কিন্তু সকল প্রাণীকে তিনি সাধু করিয়া দিয়া যান না। তিনি, সাধুর বিঘ্ন-বিনাশ করেন, সাধুদিগকে নিরাপদ করেন—কিন্তু অসাধুও থাকে। সত্য যুগেও অসুর ছিল, স্বর্গেও দৈত্য আছে, রমরাজ্যেও রাক্ষসের দৌরাত্ম্য ছিল, যুধিষ্ঠিরকেও ভ্রাতৃবিরােধে বিব্রত হইতে হইয়াছিল, আর কলির ত কথাই নাই। যতদিন জগত থাকিবে ততদিন পাপপুণ্য উভয়ই থাকিবে, ধর্মাধর্ম উভয়ই চলিবে। জগতের পূর্ণ সুখের অবস্থা তখন, যখন তত্ত্বজ্ঞানী, সৰ্ব্বভূতহিতৈষী, হিংসা- লােভন-পরিশূন্য ব্যক্তির উপদেশে মানব জাতি চালিত হয়। যখন অজ্ঞানী ভূত- প্রপীড়ক, হিংসা-লােভ-বিশিষ্ট, “আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপাদনকারী নৃপতিগণ বা ধৰ্ম্মরক্ষকগণ বা সমাজ-সংস্কারকগণ মানব জাতির শাসন কর্তৃত্বে নিযুক্ত হয়েন, তখনই জগতের দুঃখের অবস্থা। জগতের সুখের অবস্থা তখন, যখন পুণ্যের ভয়ে প্রাপ অন্ধকারে থাকে, জ্ঞানীর ভয়ে অজ্ঞানী দমিত থাকে, যখন সদাচারের প্রাবল্যে কদাচার প্রভুত্ব করিতে পায় না, যখন ধর্মের প্রতাপে ধৰ্মধ্বজিগণ লুকায়িত হয়, যখন সতীর তেজে অসতী আর দুষ্কৰ্ম্ম করিতে পারে না, যখন সতের দৃষ্টান্তে অসৎ আপন পথ পরিত্যাগ করিতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু যখন রাজা বা ধৰ্ম্মরক্ষক বা সমাজরক্ষক অদূরদর্শী, আত্মমুখান্বেষী আত্মগরিমা , ঘােষণে ব্যস্ত, ত্মত্ম প্রাধান্য স্থাপনে বদ্ধপরিকর হয়েন ; যখন ইহারা অহঙ্কারী ( ৫২ ) ; ; ও অত্যাচারী হইয়া উঠেন; যখন ইহাদের কুকার্যের দৃষ্টান্তে দুষ্টলােকের ক্ষমতা বর্ধিত হয়, ধর্মভীরু লােকের সুবিধা হ্রাস হয় ; কপটব্যবহার ব্যতীত সংসার চলে না, সরল ব্যবহারে জীবিকা নির্বাহ হয় না; যখন অসাধু কপটী প্রতারকের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়, সাধু সরল ব্যক্তি পদে পদে উংপীড়িত হয়েন ; যখন এক কথায় ধৰ্ম্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন যিনি সাধুর সাধু, রক্ষকের রক্ষক তিনি আত্মপ্রকাশ করেন-তখন ভগবান্ অবতার গ্রহণ করেন। ভগবান্ ধৰ্ম্ম-বিঘ্ন দূর করেন-সাধু-হৃদয়ে সনাতন ধৰ্ম্ম উজ্জ্বল কৌস্তুভমণির মত জ্বলিতে থাকে ; সেই কৌস্তুভাললাকে অন্ধকার দূরীভূত হয়, অত্যাচার অন্তর্হিত হয়— ইহাই জগতের রক্ষা, ইহাই জগতের অভ্যুদয়। যখন বহুলােকে অধৰ্ম্ম হইতে নিবৃত্ত হয়, যখন অধিকাংশ লােকেই নিষ্কাম কৰ্ম্ম করিতে থাকে, তখনই জগতের প্রকৃত সুখের অবস্থা। ইহা অপেক্ষা অধিক সুখ জগতে হয় না। কিন্তু মানুষের নিঃশ্রেয়স? মনুষ্য পৌরুষ সহকারে যত্ন করিলে সীমান্ত আনন্দলাভ করিতে পারে, সচ্চিদানন্দ পরব্রহ্মে স্থিতি লাভ করিতে পারে। মনুষ্য, জীবন্মুক্তির অধিকারী। মনুষ্যের স্বাধীনতা আছে—যে, যত্ন করিবে সেই পরমানন্দ লাভ করিবে। এই আনন্দই সকল বস্তুর জীবন। আনন্দের অভাবেই জীবের বিকৃতি। আনন্দের অভাব হইলে কাহারও স্বাভাবিক পরিপুষ্টি হইতে পারে না, জীব ক্রমে শুষ্ক ও বিকৃত হইয়া প্রাণত্যাগ করে। জীবের প্রয়ােজন একমাত্র আনন্দ। আনন্দে চিরস্থিতির নাম মুক্তি ; ইহাই সর্বদুঃখ নিবৃত্তি। গীতার প্রথমে বিষাদ যােগ, শেষে মুক্তিযােগ বা সন্ন্যাসযােগ। উন্নতির তারতম্যানুসারে উচ্চ নিম্ন শ্রেণীর আনন্দ প্রাপ্তিতে জীবের রুচি দেখা যায়। সৰ্বোন্নত জীবের লক্ষ্য, নিত্যানন্দ প্রাপ্তি, ইতর জীব, ক্ষণিক সুখেরই প্রয়াস করে। ব্যবহারিক জগতের আনন্দ অস্থায়ী। ব্যবহারিক জগতের আনন্দ, ইন্দ্রিয় দ্বারা ভােগ হয়। প্রবল ইন্দ্রিয় সুখে একটা সুখের মােহ আইসে। সেই সুখের অবস্থায় জীবের জ্ঞান পর্যন্ত আচ্ছন্ন হয়। উৎকট সুণে জীব ঘুমাইয়া পড়ে। কিন্তু ব্ৰহ্মানন্দ ভােগের জন্য কোন ইন্দ্রিয় নাই। সকল ইন্দ্রিয় সুপ্ত হইলে সজ্ঞানে এই আনন্দ রাজ্যে উপনীত হওয়া যায়। ধৰ্ম্ম-জগৎ এই আনন্দের সংবাদ দেয়। গীতা জীবকে এই আনন্দ ধামে লইয়া যাইতেছেন। নিত্য আনন্দে জীবের স্থিতি সম্ভব কি অসম্ভব এস্থানে ইহার বিচার অনাবশ্যক। বেদে ব্রহ্মকে সচ্চিদানন্দ বলা হইয়াছে। তিনি নিত্য, তিনিই ( ৫৩ ) জ্ঞান, তিনিই আনন্দ। নিত্য জ্ঞান ও আনন্দ যিনি, তিনিই ব্রহ্ম। আনন্দই ওম নিত্য আর কিছুই নিত্য নহে, তাহা নহে; জ্ঞানও নিত্য। জ্ঞান ও আনন্দ চির-সম্মিলিত। জীব এই নিত্য আনন্দ পাইলেই জরা মরণ অতিক্রম করিতে পারে। কেহ বলেন কৰ্ম্মেই আনন্দ, কেহ বলেন যােগেই আনন্দ, কেহ বলেন ভক্তিতেই আনন্দ, আর কেহ বলেন জ্ঞানেই আনন্দ। সৰ্ব্বশাস্ত্রময়ী গীতা বলেন কৰ্ম্ম, যােগ, ভক্তি ও জ্ঞান ইহারা পরে পরে আনন্দ প্রাপ্তির ক্রম বটে। কিন্তু পূর্ণজ্ঞান ভিন্ন পূর্ণপ্রেম সম্ভবে না। মহাদেব, বশিষ্ঠ, নারদাদি পূর্ণজ্ঞানীই পূর্ণপ্রেমিক। প্রেমের আরম্ভ বিশ্বাসে, এবং সমাপ্তি জ্ঞানে। পরমেশ্বরই পরম প্রেমস্বরূপ, পরম জ্ঞানস্বরূপ। গীতা জ্ঞান লাভের ক্রম দেখাইতেছেন। বিশ্বাসীর প্রথম কার্য নিষ্কাম কৰ্ম্ম ও উপাসনা, দ্বিতীয় কৰ্ম্ম আত্মসংস্থ যােগানন্দ, তৃতীয় কৰ্ম্ম ভজনানন্দ, এবং সর্বশেষে জ্ঞান। জ্ঞানেই স্বরূপে স্থিতি। নিষ্কাম কৰ্ম্ম বা উপাসনা, যােগ, ভক্তি, ও জ্ঞান ইহাই গীতার পথ। বেদে যেমন কর্মকাণ্ড, ভক্তিকাণ্ড, ও জ্ঞানকাণ্ড আছে গীতাও সেইরূপ কাণ্ডয় ভেদে ‘তত্ত্বমসি’র ব্যাখ্যা মাত্র। “ংলা চাপরং লাভং মন্ততে নাধিকং ততঃ” যাহা লাভ করিলে সকলই লাভ হয় অন্য লাভ-ইচ্ছা থাকে, না-গীতা বলেন মনুষ্য এই অবস্থা লাভ করুক। ইহারই জন্য মনুষ্যের সৃষ্টি। কিন্তু আরম্ভ করিতে হইবে, কৰ্ম্ম হইতে। সহ যজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্ট। পুৱােৰাচ প্রজাপতিঃ। অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বােষ্টি কামধু । “সৃষ্টির প্রারম্ভে, ব্রহ্মা যজ্ঞের সহিত প্রজাসৃষ্টি করিয়া বলিয়াছেন—এই কর্মদ্বারা তােমরা ক্রমোন্নতি লাভ কর, ইহা তােমাদের অভীষ্টভােগপ্রদ হউক।” কৰ্ম্ম সঙ্কেতে আমরা কৰ্ম্মের সঙ্কেত, ক্রম অনুসারে দেখাইব। নিষ্কাম কর্ম, যােগ, ভক্তি ও জ্ঞান মনুষ্যকে সীমান্য সুখের অবস্থা প্রদান করে। “এই অবস্থা পাইব” এই আশায় বিশ্বাসীর চিত্ত প্রলুব্ধ হয়। এই নিত আনন্দধামে গমন করিলে দেহ শীতে উষ্ণে পীড়িত হয় না, প্রাণ ক্ষুধায় তৃষ্ণায় অভিভূত হয় না, মন সুখেদুঃখে, লাভালাভে, জয়পরাজয়ে, মানাপ- মানে, কিছুতেই চঞ্চল হয় না। এই অবস্থায় বুদ্ধি অজ্ঞানের হস্তে বিড়ম্বিত ( ৫৪ ) ; হয় না; বিচায়ােজ্জল বুদ্ধি, আত্মা ও অনাত্মার পার্থক্য বুঝিতে পারে, কাৰ্য ও অকাৰ্য্য দেখিতে পায় ; নশ্বর বিষয় ত্যাগ করিয়া সর্বদা সেই নিত্যজ্ঞান ও নিত্য আনন্দ সাগরে নিমগ্ন থাকিতে ভালবাসে ; সৰ্ব্বদা সৰ্ব্বদেশে সর্ব বস্তু মধ্যে যেন কাহারও প্রকাশ দেখিতে পায়, সর্ব ব্যাপারে যেন কাহারও খেলা দেখিতে পায় ; জড় প্রকৃতি বা মানবপ্রকৃতি সর্বত্রই দেখিতে পায় কে ইহাদের সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় করিতেছেন; এই অবস্থায় হৃদয় সাত্ত্বিক ভাবে পূর্ণ হইতে থাকে। ক্রমে জগৎ আনন্দময় হইয়া যায়। এই সীমান্ত আনন্দ ; গীতার লক্ষ্য। গীতা তিন যকে বিভক্ত। এই তিন ষট্কে আমরা আত্মস:স্থ যােগী, ভগবন্নামরূপ-ভাবানুরাগী ভক্ত, এবং ভগবৎতত্ত্বজ্ঞ জ্ঞানীর সাধনা ও প্রতিমূর্তি দেখিতে পাই। প্রথম ছয় অধ্যায়ে স্থিতপ্রজ্ঞের প্রতিকৃতি, মধ্য ছয় অধ্যায়ে ভক্তের সহাস্যমূৰ্ত্তি এবং শেষ ছয় অধ্যায়ে পরম জ্ঞানীর শান্তমূর্তি, গীতার লক্ষ্য সুস্পষ্ট করিতেছে। যে সমস্ত শ্লোকে যােগী, ভক্ত ও জ্ঞানীর অবস্থা প্রকাশিত, তাহা নিত্য পাঠ করা অবশ্য ক। লক্ষ্য স্থির থাকিলেই কর্মোদ্যম শিথিল হয় না। আমরা পূর্বোক্ত অবস্থাজ্ঞাপক, কতকগুলি শ্লোক একত্র করিলাম। এগুলি কণ্ঠস্থ করিলেও বহু উপকার হয়। যােগী দুই প্রকার-বুখিত যােগী ও সমাধিস্থ যােগী। অহংকার জন্মিলেই সাধক ভ্রষ্ট হইয়া যায়। যদি তুমি যােগী অভিমান করিয়া থাক, তবে নিত্য বিচার করিয়া দেখিও গীতােক্ত যােগীর অবস্থা তােমার কতদূর লাভ হইয়াছে। গীতা বলিতেছেন- প্রজহাতি যদা কামান্ সর্বান্ পার্থ মনােগতা। আত্মবােত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞন্তদোচ্যতে। দুঃখেনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ। বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীমুনিরুচ্যতে। যঃ সব ত্রানভিস্নেহ স্তত্ত প্রাপ্য শুভাশুভ। নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত। বিহায় কামান্ যঃ সর্বান্ পুমাংশ্চরতি নিঃস্পৃহঃ। নির্মমাে নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি।
এইরূপ ব্যথিত যােগী কিন্তু নিষ্কর্মা নহেন- যাত্মরতিরেবস্যাদাত্মতৃপ্তশ্চ মানবঃ। আত্মবে চ সন্তুষ্টস্তস্য কাৰ্যং ন বিদ্যতে। তস্মাদসক্তঃ সততং কাৰ্যং কৰ্ম্ম সমাচর। অসক্তোহ্যাচরন্ কৰ্ম্ম পরমাপগতি পূরুষঃ । আবার বলিতেছেন— যস্য সৰ্বে সমারস্তাঃ কাম সঙ্কল্পবর্জিতাঃ । জ্ঞানাগ্নিদগ্ধ-কৰ্ম্মাণং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধা। ত্যক্ত কৰ্ম্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তে নিরাশ্রয়। কৰ্ম্মণ্যতি প্রবৃতোহপি নৈব কিঞ্চিৎ করােতি সঃ। নিরাশীৰ্ষতচিত্তাত্ম ত্যক্তসৰ্বপরিগ্রহঃ । শারীরং কেবলং কৰ্ম্ম কুববাগ্নেতি কিল্বিষম্। যদৃচ্ছ৷ লাভসন্তুষ্ট। দ্বন্দ্বাতীতে বিমৎসরঃ। সমঃ সিদ্ধাবসিদ্বেী চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে। যোগসংন্যস্তকৰ্ম্মাণং জ্ঞানসংছিন্নসংশয়। আত্মবন্তং ন কৰ্ম্মাণি নিবর্ধন্তি ধনঞ্জয় । তাই বলিতেছিলাম—যখন শুনি এরূপ অবস্থা আছে, যে অবস্থায় মানুষ আপনাতে অাপনি তুষ্ট থাকে ; দুঃথেও উদ্বেগ নাই, সুখেও স্পৃহা নাই ; যে অবস্থায় রাগ, ভয়, ক্রোধ কিছুই নাই, শুভ আসুক বা অশুভ আসুক কোন চঞ্চলত নাই ; যে অবস্থায় ইন্দ্রিয় সুখস্বরূপ ঈশ্বরে রমণ করে—আর রাগ দ্বেষশূন্য আত্ম-বশীভূত ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয় ভােগ হইলেও কখন অশান্তি আইসে ; সর্ব কৰ্ম্ম করিয়াও ঈশ্বর হইতে মন ক্ষণকালের জন্য সরিয়া আইসে না; যখন শুনি “পন্ শৃন্বন্ স্পৃশ জিন্নশন্ গচ্ছন্ স্বপন্স, প্রপন্ বিজ গৃহন্মিষন্ন মিষন্নপি, ইন্দ্রিয়ানীন্দ্রিয়াৰ্থে বৰ্ত্তন্ত ইতি ধারয়”-সমস্ত কাৰ্য্য করিয়াও ব্রহ্মে অবস্থিত থাকা যায়, আর যে অবস্থা লাভ করিলে গুরুদুঃখও বিচলিত করিতে পারে না। “যং লব্ধ চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ । যস্মিন্ স্থিতাে ন দুঃখেন গুরূপি বিচাল্যতে।
( ৫৬ ) তখন কার না ইচ্ছা হয় এই অবস্থা লাভ করি ? গীতায় আত্মসংস্থাকে যােগী বলা হইয়াছে। এই যােগ, তপস্বী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, পরােক্ষজ্ঞানী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, এবং কর্মী অপেক্ষা উত্তম। কিন্তু আত্মসংস্থ অবস্থ। যতদিন পর্যন্ত দৃঢ় না হয় ততদিন চিত্ত স্থির ভাবে আত্মস্থ থাকে না। চিত্ত আত্ম-রস আস্বাদন না করিলে কখনও স্থায়ী ভাবে আত্মসংস্থ হইতে পারে না। এজন্য যােগীকে ভক্ত হইতে হইবে। যােগীনামপি সর্বেষাং মগতেনান্তরাত্মন্। শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যাে মাংস মে যুক্ততমাে মতঃ ॥ যে যােগী অনুরাগে ঈশ্বর ভজনা করেন সেই ভক্ত যােগী সৰ্বযােগী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সপ্তম হইতে দ্বাদশ অধ্যায় পর্যন্ত মধ্য ষটক। এই মধ্য ষটুকে আমরা আমরা ভক্তের চিত্র দেখি। এখানেও দেখি ভগবান উপদেশ করিতেছেন কিরূপে ভক্ত হওয়া যায়, ভক্তির সাধনা কি এবং ভক্তের অবস্থা কি—অর্থাৎ পরােক্ষজ্ঞান সাধনা ও অপরােক্ষ জ্ঞানের অবস্থ। ভগবান বর্ণনা করিয়াছেন। যােগ, ভক্তি, জ্ঞান সম্বন্ধে গীতা পরােহ্মজ্ঞান সাধনা ও অপরােক্ষ জ্ঞানের অবস্থায় লক্ষ্য রাখিয়াছেন। ভক্তের সহাস্য মূর্তি দেখাইবার জন্য আমরা গীতা হইতে কয়েকটী শ্লোক উদ্ধৃত করিতেছি- সততং কীয়ন্তো মাং যন্তশ্চ দৃঢ়তাঃ। নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপিসতে। দ্বেষ্ট। সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ। নির্মমম নিরহংঙ্কারঃ সমদুঃখ সুখমী । ভক্ত ভগবানের বড়ই প্রিয়। ভগবান্ বলিতেছেন- সন্তুষ্টঃ সততং যােগী যাতত্ম দৃঢ়নিশ্চয়ঃ। মর্পিত মনােবুদ্ধিৰ্যো মে ভক্তঃ স মে প্রিয়। যায়ােদ্বিজতে লােকো লােকামােজিতে চ যঃ। হর্ষামর্ষভয়ােদ্বেগৈম্মুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ । অনপেক্ষঃ শুচিদক্ষ উদাসীননা গতব্যথা। সৰ্বারপরিত্যাগী যাে মক্তঃ স মে প্রিয়ঃ । { ( ৫৭ ) ০ যাে ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শােচতি ন কাঙক্ষতি। শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান্ যঃ স মে প্রিয়ঃ । সমঃ শত্রী চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়াের। শীতােষ্ণসুখদুঃখেযু সমঃ সঙ্গবিবর্জিত। তুল্যনিন্দাস্তুতিৰ্ম্মেনী সন্তুষ্টো যেনকেনচিৎ। অনিকেতঃ স্থিরমতিভক্তিমান্ মে প্রিয়াে নরঃ। যােগী হও বা ভক্ত হও উভয়কেই এক অবস্থা লাভ করিতে হইবে। আত্মসংস্থ যােগী পরিপক্কাবস্থাতে ভক্ত। এতদ্ব্যতীত গীতা জ্ঞানীর অবস্থা বলিতেছেন। ইহা গুণাতীতের অবস্থা। গীতা বলিতেছেন : প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মােহমেব চ পাণ্ডব। নদ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙক্ষতি। উদাসীনবদাসীননা গুণৈৰ্যোন বিচাল্যতে। গুণাবন্তইত্যেবং যােহবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে। সমদুঃখসুখঃস্বস্থঃ সমলােষ্ট্ৰাশ্মকাঞ্চন। তুল্য-প্রিয়াপ্রিয়ো ধীর স্তুল্য নিন্দাত্ম সংস্তুতিঃ । মানাপমানয়ােস্তুল্য স্বল্যো মিত্ৰারি পক্ষমােঃ । সর্বারস্ত পরিত্যাগী-গুণাতীতঃ সউচ্যতে । মাঞ্চমােহব্যভিচারেণ ভক্তিমােগেন সেবতে। স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্ৰহ্মভূয়ায় কল্পতে। ব্ৰহ্মণণাহি প্রতিষ্ঠাহ মমৃতস্তাব্যয়স্কচ। শাশ্বতস্যচ ধৰ্ম্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্যচ। গীতার শেষ লক্ষ্য এই। ইহার সঙ্গে সঙ্গে গীতা পরম জ্ঞান ও পরাভক্তির কথা উল্লেখ করিয়াছেন। নৈষ্কৰ্ম্মসিদ্ধির পরে পরম জ্ঞান, পরম জ্ঞানে ব্রহ্মে অবস্থান, তৎপরে পরাভক্তি। ব্ৰহ্মভূতঃ প্রসন্ন নশােচতি ন কাঙক্ষতি সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মক্তিং লভতে পরাম্। এই, পরাভক্তিদ্বারা তত্ত্বের সহিত ভগবানকে জানা যায়। এই তত্ত্বজ্ঞানে ৮ ( ৫৮ ) জীব ব্রহ্মের এক অনুভূত হয়, ইহাই জীবন্মুক্তি, জীবন্মুক্তিই গীতার লক্ষ্য। আবার বলি-অষ্টাদশ অধ্যায়ে সন্নাস মােক্ষ-যোগ। লক্ষ্য সঙ্কেতের উপসংহারে আমরা পূৰ্বোল্লিখিত বিষয়টা গুটাইয়া সম্মুখে ধরিব-গীতা কি এক আনন্দ মন্দির দেখাইতেছেন। ঐ আনন্দ মন্দিরের চারি পার্শ্বে আনন্দ কুঞ্জ-কুঞ্জে কুঞ্জে আনন্দময় তরুলতা কি এক আনন্দের হিল্লোলে নাচিতেছে, আনন্দ-লতায় আনন্দ-কুসুম, প্রতি আনন্দ-কুসুমে আনন্দময় ভ্রমর সদাননে উন্মত্ত হইয়া আনন্দে গুঞ্জন করিতেছে। এই আনন্দ মন্দিরে উপস্থিত হইলে মানুষ রােগ শশাকের হস্ত হইতে অব্যাহতি পায়, রাগ দ্বেষ হইতে মুক্ত হয়, শীত গ্রীষ্ম, সুখ দুঃখ, জয় পরাজয়, লাভালাভ, জঠর ভরণ, পরিবার পােষণ, সমাজ শাসন, রাজ্য পালন, কিছুতেই জীবকে চঞ্চল করিতে পারে না, গীতার লক্ষ্য সেই আনন্দধাম। সেখানে দেহ নীরােগ, মন রাগ-দ্বেষ শূন্য, জীব অজ্ঞান-শূন্য অবস্থায় সর্বদা বিহার করেন—সেখানে মিলন-বিচ্ছেদের হর্ষ-বিষাদ নাই, সেখানে জনন-মরণের বিভীষিকা নাই, সেখানে আনন্দের ক্ষণিকত্ব নাই—যেখানে নিত্যানন্দ বিরাজমান, গীতার লক্ষ্য সেই স্থান। সেখানে আত্মা কি, জগদাড়ম্বর কেন, মানবের কর্তব্য কি, এত- দ্বিষয়ে কোন সংশয় নাই, যে অবস্থায় কোনপ্রকার অজ্ঞান নাই, সেই অবস্থাই গীতার লক্ষ্য। ঋতুর পরিবর্তন, চন্দ্র সূর্যের গমনাগমন, মহাভূতগণের পরস্পর আক্রমণ—যেখানে কোনপ্রকার চলন নাই, যেখানে প্রকৃতি আপন গুণে কৰ্ম্ম করিলেও আত্মার কোন বন্ধন হয় না, গীতা সৰ্ব্ব মনুষ্যের জন্য সেই আনন্দ মন্দির লক্ষ্য করিয়াছেন। তুমি পাপী হও তাপী হও, দুরাচার হও কুৎসিত কৰ্মা হও, তুমি ধার্মিক হও বা অধাৰ্মিক হও, গীতার লক্ষ্যে লক্ষ্য স্থাপন কর -গীতার কৰ্ম্ম অভ্যাস কর, তােমার সর্ব অপরাধের ক্ষমা হইবে, তােমার সর্ব ভয় দূর হইবে - যদি দেহ মন জীর্ণও হইয়া থাকে, যদি শেষ সময়ও উপস্থিত হইয়া থাকে, তথাপি গীতা তােমায় নিরাশ করেন না, বলিতেছেন—“অপিচেৎ সুদুরাচারে ভজতে মামনন্ত ভাক” বলিতেছেন---“অপি চেদসি পাপিভ্যঃ সৰ্বেভ্যঃ পাপত্তমঃ” যদি সকল অপেক্ষাও অধিক পাপী তুমি হও--আমার শরণাপন্ন হও, আমি তােমাকে মৃত্যু সংসার সাগর হইতে উদ্ধার করিয়া দিব। বলেন—যখন সকলে তােমায় পরিত্যাগ করিবে, তখন সে তােমায় পরিত্যাগ করিবে না, যদি দেহত্যাগও করিতে হয়, তথাপি দেখিবে সেই সুন্দর ভগবান তাের হত্ত্ব ধরিয়া আপন আনন্দ ধাম, মুক্তি মণ্ডপে লইয়া যাইতেছেন, ইহাতে ( ৫৯ ) কি আর মৃত্যুতে দুঃখ থাকে?—সে মরণ ত সুখের, যে মরণে তােমার ভগবান্ তােমার পুরাতন দেহ ত্যাগ করাইয়া নূতন দেহ পরাইয়া দিবেন, তুমি জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করিয়া নূতন বস্ত্রে নুতন অলঙ্কারে সজ্জিত হইয়া নিরন্তর তাহার সঙ্গে থাকিবে। অজ্ঞান আর তােমায় স্পর্শ করিতে পারিবে না। কখনও তােমার নিরানন্দ আসিবে না, কখনও তুমি অনিত্য বিভীষিকায় ব্যাকুল হইবে না, ভগবদ্বাক্যে বিশ্বাসবান্ হও ভগবদ্বাকে বিশ্বাসবতী হও, অগ্রে ভগবানের হও, দেখিবে-ভগবান্ চিরদিনই তােমার রহিয়াছেন। গীতা বড়ই আশ্বাসদায়িনী! তুমি অজ্ঞানে দেখিতে পাওনা, ভগবান্ তােমায় কত স্নেহ করেন, ভগবানের স্নেহ অনুভব কর আপনিই ভক্ত হইয়া যাইবে। আরও লক্ষ্য কর-ভগবান্ অপেক্ষ। ভক্ত কে আছে ? কেহ অপরাধ করিলে সেই অপরাধী তােমার চক্ষুশূল হয়, সে নিকটে আসিলে তুমি বিরক্ত হও; আর ভগবান্“তুমি তাহাকে কত অভক্তি কর, কত অবিশ্বাস কর, তাহার অস্তিত্বে পৰ্য্যন্ত তোমার সন্দেহ, তথাপি তিনি একক্ষণকালও তােমায় ছাড়িয়া নাই, সৰ্ব্বদা তিনি তােমার সেবায় ব্যস্ত, তুমি ইহা অনুভব কর তাহার ভক্ত হইয়া যাইবে। কোন্ কৰ্ম্মদ্বারা গীতােক্ত আনন্দের অবস্থা লাভ করা যায়, আমরা এক্ষণে তাহার এক অংশের আলােচনা করিব। কৰ্ম্ম সঙ্কেত আরম্ভ করিবার পূর্বে আর একটা কথা বলিয়া রাখি, আধুনিক সময়ের সহিত প্রাচীন কালের কথঞ্চিৎ তারতম্য দৃষ্ট হয়, প্রাচীনকালে আত্মরক্ষাই জীবনের প্রধান লক্ষ্য, আত্মরক্ষার জন্য যে নিষ্কাম কৰ্ম্মের ব্যবস্থা প্রথমেই করা হইয়াছে, তদ্বারা জগদ রক্ষা হইত। প্রকৃতপক্ষে জীবন্মুক্তভিন্ন যথার্থ জগদ রক্ষা করিতে কেহই সমর্থ নহে। উপস্থিত সময়ে জগদ রক্ষাই প্রথম, আত্মরক্ষা একরূপ নাই, আত্ম রক্ষার জন্য কৰ্ম্মে লােকের দৃষ্টি পড়ে নাই, এই ক্রমবিপৰ্যয়ে বহুলােক জগতের জন্য কৰ্ম্ম করিতেছেন সত্য, কিন্তু তাঁহারা আত্মরক্ষায় অসমর্থ হইয়া অকালে নিজের প্রাণ বিসর্জন করিতেছেন এবং অল্পকালেই তাহাদিগের প্রদত্ত শক্তি জগৎ হইতে অপসারিত হইতেছে। এই জন্য জগতের স্থায়ী উন্নতি হইতেছে না। জীব গীতার উপদেশ লাভ করিয়া আত্ম রক্ষার সহিত জগদ রক্ষার কৰ্ম্ম করুক-নিষ্কাম কৰ্ম্ম অভ্যাস করুক, তাহার কর্মে জগৎ অভ্যুদয় পথে ছুটিবে, জীব আপনিও কামনা শূন্য হইতেছে বলিয়া ক্রমে ক্রমে জীবন্মুক্তি লাভ করিতে পারিবে। .
জগদ রক্ষাকারী ও জীবন্মুক্ত্যভিলাষীর সামান্য বিবাদের কথাও এখানে উল্লেখ যােগ্য। কৰ্ম্ম-বীরগণ সাধকগণকে অলস বলেন, আবার সাধকগণ কর্ম- বীরগণকে মুঢ় বলেন। এই উভয়প্রকার তিরস্কারই কতক অংশে সত্য। কৰ্ম্মবীর যদি ঈশ্বর প্রীতি জন্য কৰ্ম্ম না করেন, যদি তিনি নিষ্কাম ভাবে কৰ্ম্ম করিতে না পারেন, তবে তিনি আপনাকে আপনি রক্ষা করতে পারিলেন না ইহাই তাহার মূখতা। আবার সাধক যদি ক্রম ধরিয়া সাধনা না করেন, প্রথমে নিষ্কাম কৰ্ম্ম ও উপাসনা পরে যােগ ভক্তি জ্ঞান ইহা যদি তিনি না করেন, তবে তিনি সিদ্ধি লাভ ও করিতে পারেন না, পরম্ভ কৰ্ম্মেন্দ্রিয়বন্ধ করিয়া মনে মনে যখন ধারণা ধ্যান করিতে যান তখন তাহাও সম্পন্ন হয় না এজন্য ধৰ্ম্ম জীবনে তাহার মিথ্যাচার ঘটে। আত্মরক্ষা ও জগদুরক্ষার জন্য গীতার মীমাংসা বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি মাত্রেরই অনুমােদিত হইবে। গীতা বলিতেছেন আত্মরক্ষার জন্য যে সমস্ত কৰ্ম্মের ক্রম প্রদর্শিত হইয়াছে লৌকিক কৰ্ম্ম ও বৈদিক কর্মের কথা যাহা বলা হইয়াছে প্রথম অবস্থায় ঐ লৌকিক ও বৈদিক কৰ্ম্ম নিষ্কাম ভাবে কৃত হইলেই স্কুল স্থল ভাবে জগদ রক্ষার কৰ্ম্ম হইয়া থাকে। জ্ঞান লাভ করিয়া জীবন্মুক্ত আবার “জীবে দয়া প্রদর্শন জন্য যে সমস্ত কৰ্ম্ম করেন তাহাতেই যথার্থ ভাবে জগদ রক্ষা হইয়া থাকে। ভগবান্ অবতার হইয়াও জগদ রক্ষা করিয়া থাকেন। জনকাদি জীবন্মুক্ত ঋষিগণ লােক-সংগ্ৰহ জন্ত কৰ্ম্ম করিয়াছিলেন। ভগবান্ বলিতেছেন- “কৰ্মণৈব হি সংসিদ্ধি মাস্থিতা জনকাদয়ঃ। লােক সংগ্রহ মেপি সংপশন্ কৰ্ত্তমহসি। যদ্যদাচরতি শ্ৰেষ্ঠস্তত্তদেবেতরাে জনঃ। স যৎ প্রমাণং কুরুতে লােকস্তদনুবৰ্ত্ততে। ন মে পার্থাস্তি কৰ্ত্তব্যং ত্ৰিষু লােকে কিঞ্চন। নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বৰ্ত্ত এবচ কৰ্ম্মণি। যদি হহং ন বৰ্ত্তেয়ং জাতু কৰ্ম্মণ্যতন্দ্রিত। মমত্মানুবৰ্ত্তন্তে মনুষাঃ পার্থ সর্বশঃ । উৎসীদেয়ুরিমে লােকা ন কুৰ্যাং কৰ্ম্মচেদহ। সরস্য চ কৰ্ত্তাস্যামুপহামিমাঃ প্রজাঃ ।
ভগবানের কোন কর্তব্য নাই তথাপি তিনি যে কৰ্ম্ম করেন তাহা কেবল লোক শিক্ষার্থ। তিনি কৰ্ম্ম না করিলে তাহার প্রজা তাহার পথ অনুসরণ করিবে তিনি তখন সঙ্করজাতির সৃষ্টিকর্তা হইবেন। ইহাদিগদ্বারা জগতের ঘােতর অনিষ্ট হইবে এবং তিনি আপনিই আপন প্রজার বিনাশ কৰ্ত্ত হইবেন। জন্য তিনি কৰ্ম্ম করিয়া থাকেন। দেখা গেল আত্মরক্ষার আদিতেও কৰ্ম্ম--সে কেবল চিত্তশুদ্ধি জন্য । জীবন্মুক্তির পরেও কৰ্ম্ম-সে কেবল লােক শিক্ষার্থ। ভগবানের অবতার গ্রহণ করিয়া কৰ্ম্ম করা আর জীবন্মুক্তের কৰ্ম্ম করা একই কথা। কাজেই আত্মরক্ষা কার্যে যাহারা নিযুক্ত-তাহাদের সাধনাবস্থার মধ্য ভাগে কর্ম না থাকিলেও প্রবৃত্ত অবস্থায় ও সিদ্ধাবস্থার পরে কৰ্ম্ম আছে। এই কর্মদ্বারাই যথার্থরূপে জগৎ রক্ষা হয়। ইহা না বুঝিয়া যাহারা যােগী ভক্ত বা জ্ঞানীকে স্বার্থপর বলিয়া থাকেন, তাহারা কেবল আপন মূখত্বের পরিচয় দিয়া থাকেন, তাহাতে আর সন্দেহ কি ? এই সমস্ত লােকের মতে জগৎ রক্ষার জন্য কৰ্ম্ম করাই আত্মার যথার্থ উন্নতি সূচনা করে, কারণ আত্মা জগতের অন্তর্গত বলিয়া জগতের উন্নতিতেই আত্মার উন্নতি, এই মতটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আত্মার উন্নতি মােক্ষপথে, জগতের উন্নতি ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম, এই ত্রিবর্গ হইতে। তত্ত্বজ্ঞ ইহা জানেন যে, যে কর্মে জগতের প্রকৃত উন্নতি হয় সেই কৰ্ম্মেই যদি কৰ্ম্মী, জরা আধি ব্যাধি এবং মৃত্যু হইতে রক্ষা না পায় এবং অন্যকে জরা আধি ব্যাধি ও মৃত্যু হইতে রক্ষা করিতে না পারে, তবে ক্ষণিক সুখের অয়ােজনকে প্রকৃত উন্নতি বলা যায় না। তত্ত্বজ্ঞ জানেন-আত্মা জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নহেন, আত্মার মধেই জগৎ। এই বিশ্ব দর্পণদৃশ্যমান নগরীতুল্য, নিদ্রাকালে আপন মনের মধ্যেই নানা প্রকার স্বপ্নদৃষ্ট বস্তু অনুভূত হইলেও যেমন মনে হয় ঐ সমস্ত বস্তু বাহিরে বিদ্যমান রহিয়াছে—সেইরূপ জগৎ আত্মার মধ্যে অবস্থিতি করিলেও মনে হয় ইহা বাহিরে রহিয়াছে। আত্মার মধ্যেই এই জগৎ এজন্য প্রকৃত আত্মরক্ষা যিনি করেন তিনি যথার্থভাবে জগদ রক্ষাও করিয়া থাকেন। পূৰ্বে বলা হইয়াছে আত্মরক্ষার জন্য আত্মসংস্থ যােগ, ভক্তি-যােগ ও জ্ঞান-যােগ আবশ্যক। জগদ রক্ষার জন্য ধর্ম, অর্থ, ও কাম আবশ্যক। যেরূপ মনুষ্য হউক না কেন ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মােক্ষ ক্রম অনুসারে এই চারিটি জীবের প্রয়ােজন। ধারণ লােকে আত্মরক্ষা দ্বারা কিরূপে দেহ ও জগ রক্ষা হয় তাই!”
ধারণা করিতে পারে না, শুধু দেহ ও জগদ রক্ষার জন্য অর্থোপার্জন ও অর্থ- রক্ষণই ইহাদের ব্রত। অর্থ-রক্ষা অর্থ-বৃদ্ধি তদ্বারা ক্ষণিক সুখ, যশ মান ইত্যাদি ক্রয়, উত্তরােত্তর আপন অধিকার বৃদ্ধি, জগ, অধিকার জন্য শারীরিক সামর্থ্য বৃদ্ধি, মানসিক কৌশল প্রকাশ, কোথাও বা যথাসাধ্য ক্ষণিক পরােপকার দ্বারা চিত্তবিনােদন এই সমস্তই ইহাদের মতে মনুষ্যের কর্তব্য। কিন্তু অর্থ ও কামের মূলে যদি ধৰ্ম্ম না থাকে তবে তাহাতে অনর্থ ই উৎপন্ন হয়। জগদ রক্ষার জন্য অর্থও যেমন প্রয়ােজন যুদ্ধাদিও সেইরূপ প্রয়ােজন। যুদ্ধাদিজন্য অস্ত্রশস্ত্রাদি বিদ্যাশিক্ষা এবং বুদ্ধিকৌশলে অস্ত্রের সংহার প্রয়ােগও আবশ্যক। আবার অর্থাগম জন্য বাণিজ্য কৃষি পশুপালনাদিও আবশ্যক। পূৰ্বে বলা হইয়াছে আত্মরক্ষা ও জগদ রক্ষা উভয়ই জীবের প্রয়ােজন। আমরা কসঙ্কেতে জগদ রক্ষার কৰ্ম্ম উল্লেখ করিব না এজন্য এখানে ত্রিবর্ণ জন্য কৰ্ম্ম বলিয়া রাখিলাম । কষ্য ভিন্ন জগদ রক্ষা বা আত্মরক্ষা হইতে পারে না। কিন্তু কোন্ কন্য মনুষ্য করিবে ? মানুষ যে কৰ্ম্ম করিতে সমর্থ, তাহাই তাহার উন্নতির ভিত্তি। স্বভাবজ কম্মকে নিষ্কাম ভাবে করিতে পারিলেই মানবের প্রকৃত উন্নতি হইয়া থাকে। কিন্তু কোন একটি কর্ম সকল মনুষ্যের স্বাভবিক কৰ্ম্ম হইতেই পারে , যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন মনুষ্যের স্বভাব ভিন্ন ভিন্ন প্রকার। স্বাভাবিক ককে ভিত্তি না করিয়া যদি সকল মনুষ্যের জন্য এক প্রকার কৰ্ম্মের বিধি করা যায় তবে সমাজ অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে। স্বাভাবিক শক্তিকে ভিত্তি না করিয়া যদি সকল মনুষ্যের জন্য এক রূপ ঈশ্বরের সাধনা ব্যবস্থা করা যায়, তবে ধর্মও অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে। এই জন্য প্রকৃতির ভিন্নতা অনুসারে মনুষ্যদিগকে বিভক্ত করা হইয়াছে। প্রকৃতির গুণ অনুসারে মানুষের স্বভাবজ কর্মে ও বিভাগ হইয়াছে। এই গুণ-কৰ্ম্ম-জনিত বৰ্ণ বিভাগ স্বাভাবিক। উপস্থিত সময়ে কখন কখন শুক্ল ও কৃষ্ণ বর্ণ ধরিয়া জাতীর শ্রেষ্ঠত্ব নীচত্ব নিৰ্বাচিত হয়। শুভ্র-জাতি কৃষ্ণ-জাতি হইতে সৰ্ব্বতােভাবে উৎকৃষ্ট ইহা কতক- গুলি লােকের মত। এই মত যে ভ্রান্ত ইহাও অন্য কতকগুলি লােকে প্রমাণ করেন। প্রতিবাদকারিগণ বলেন যদি এই মত সত্য হইত, তবে কোন কৃষ্ণবর্ণ জাতি কোন শুক্লবর্ণ জাতিকে পরাস্ত করিতে পারিতেন না। ইতিহাস কিন্তু এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন। আর্য জাতির রামকৃষ্ণাদি অবতার কৃষ্ণবর্ণ, অর্জুমাদি রাজা কৃষ্ণবর্ণ, স্বয়ং ব্যাসদেব অঞ্জনের মত কুষ্ণবর্ণ ছিলেন।
যাহারা জাতি ও বর্ণ ভেদ ঈশ্বর-কৃত বিবেচনা করেন না “চাতুৰ্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকৰ্ম্মবিভাগশঃ” ইহার যাহারা কদৰ্থ করেন, তাহাদের উচিত “স্বভাবজ কৰ্ম্ম” নিশ্চয় করা। কোন মনুষ্যের স্বাভাবিক কৰ্ম্ম অধ্যয়ন অধ্যাপনাদি, কোন মনুষ্যের স্বভাবজ কৰ্ম্ম যুদ্ধাদি কাহারও স্বভাবজ কৰ্ম্ম অর্থোপার্জনাদি কাহারও স্বাভাবিক কৰ্ম্ম সেবা। মানবের যৈ যে কৰ্ম্ম স্বাভাবিক সেই সেই কৰ্ম্মকে নিষ্কাম ভাবে করিতে হইবে। কোন প্রকার নিষ্কাম কৰ্ম্ম নিষিদ্ধ কৰ্ম্ম হইতে পারে না। সমস্ত বিহিত কৰ্ম্মই নিষ্কাম ভাবে কৃত হইতে পারে। স্বভাবজ বিহিত কৰ্ম্মকে নিষ্কাম ভাবে করিতে হইবে ইহাই গীতার প্রথম উপদেশ। 2 গীতা বলিতেছেন সৃভাবজ কৰ্ম্ম সদোষ হইলেও তাহা ত্যাগ করিয়া কেহ কখন অন্য স্বভাবের নির্দোষ কৰ্ম্ম করিবে না। আপন স্বাভাবিক কর্মকেই নিষ্কাম ভাবে করিতে পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করাই প্রকৃত উন্নতি। অন্য প্রকৃতির উৎকৃষ্ট কৰ্ম্ম দেখিয়া অনুকরণ করিতে প্রয়াস পাওয়াই পরধৰ্ম্ম গ্রহণ। পর- ধর্ম গ্রহণে প্রকৃত উন্নতি হয় না কারণ ভিতরে স্বভাবজ সংস্কার থাকিয়া যায়, ঐ সংস্কার প্রবল হইয়া উৎকৃষ্ট পরধৰ্ম্ম করিতে দেয় না। তখন “ইতাে নষ্ট স্ততাে ভষ্ট হইতে হয়। প্রকৃতি প্রতিক্ষণেই পরিবর্তিত হইতেছে সত্য, সত্ত্ব রজঃ তমঃ এক প্রকৃতিতেই উদয় হয় সত্য, তথাপি যে প্রকৃতিতে যে গুণের আধিক্য তাহাকে তদনুরূপ নামে অভিহিত করা যায়। সাধককে যােগ ভক্তি জ্ঞান এক সময়েই যে অনুষ্ঠান করতে বলা হইয়াছে, অথচ সৰ্ব্বদা অনুষ্ঠানের জন্য একটিকে দৃঢ় করিয়া যে ধরিতে বলা হইয়াছে, প্রকৃতির পূর্বোক্ত পরি- বৰ্ত্তন তাহার অন্যতম কারণ। চিত্ত শুদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত রাগ দ্বেষ নিবারণ জন্য কৰ্ম্মদ্বারা এককালে আত্মার উন্নতি ও জগতের রক্ষা উভয় সাধিত হয়। চিত্ত শুদ্ধির পরে ভক্তি ও জ্ঞান অভ্যাস। এই সময়ে একান্ত আবশ্যক। এই কালে কামনা ত্যাগ হইতে থাকে বলিয়া কৰ্ম্মও ত্যাগ হইতে থাকে। আবার সিদ্ধাবস্থায় লােক-রক্ষার্থ কৰ্ম্ম করিতে হয়। এই অবস্থার কর্মে কোন বন্ধন থাকে না। ভগবান্, এবং জীবন্মুক্ত জনকাদি রাজা কৰ্ম্ম করেন কিন্তু সুখ দুঃখ লাভালাভ জয় পরাজয় রূপ আসক্তি সে সমস্ত কৰ্ম্মে থাকে না। বলা হইতেছে উপাসন ও যােগ, ভক্তি ও জ্ঞান এই সাধনা দ্বারাই পূর্ণ- ( ৬৪ ) শক্তির বিকাশ হয়। আপন সীমান্ত শক্তির পূর্ণানুভবই জীবন্মুক্তি। জগতকে প্রকৃত পক্ষে উন্নত করিতে জীবন্মুক্তই সমর্থ। আত্মরক্ষার জন্য কৰ্ম্ম করিলে অনেকদিন জগতের উদ্ধার জন্য কৰ্ম্ম বাদ দিতে হয়, এ কথা সত্য, যতদিন উপাসনার ভূমিকায় মানুষ থাকে ততদিন কৰ্ম্ম থাকে, কিন্তু ভক্তি ও জ্ঞান ভূমিকায় আসিলে কোন কৰ্ম্ম থাকিতে পারে এই সময়ে কর্ম ত্যাগ হইয়া যায়। এই সময়ে যিনি জগৎকে ভুলিয়া থাকিতে হয় বলিয়া দুঃখিত হয়েন জগতের দুঃখে বড়ই কাতর হয়ে তিনি না হয় জগতের জন্য চিরদিনই কৰ্ম্ম করুন, আর চিরদিনই জনন মরণ লাভ করুন। কিন্তু যাহারা জনন মরণ রূপ সংসার হইতে মুক্ত হইয়া পরমানন্দ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা রাখেন তাঁহাদের জন্য এই পর্যন্ত বলিলেই যথেষ্ট হইবে—যে জগৎস্রষ্টা সদেশ সংস্কারক অপেক্ষা জগতকে অধিক ভালবাসেন। সংস্কারক উপযুক্ত না হওয়া পৰ্য্যন্ত জগৎ রক্ষা না হয় ভগবানই করিলেন, তাহাতেই বা আপত্তি কি হইতে পারে। “হার এই জগৎ তিনিই ইহার জন্য পথ দেখিবেন” এই বিশ্বাস করিয়া স্বদেশ হিতৈষিগণ যদি আত্মরক্ষার কাৰ্যটি সারিয়া এবং সেই কাৰ্য্য করিতে করিতে জগদ রক্ষা সংগ্রামে নিযুক্ত হয়েন, তবে আর তাহাদিগকে এই ঘাের জগৎ-সংগ্রামে পরাস্ত হইয়া নিতান্ত দীনের মত এই সংসার হইতে বিদায় লইতে হয় না। এক্ষণে গীতার কর্ম সঙ্কেতের সার কথা আলােচিত হইবে। পঞ্চম কথা গীতার কৰ্ম্ম সঙ্কেত। কৰ্ম্ম সঙ্কেতের এক অংশ আলােচিত হইয়াছে। সংক্ষেপে কৰ্ম্ম সঙ্কেতের সমস্তই প্রায় বলা হইয়াছে। এক্ষণে জীবন্মুক্তি ও সাধনার কথা বিশেষরূপে আলােচিত হইবে। কৰ্ম্ম সঙ্কেতের সার কথা ব্রাহ্মীস্থিতি। পরমানন্দে নিত্য স্থিতির নাম ব্রাহ্মীস্থিতি। ইহাই জীবন্মুক্তি। “ব্রহ্মবিদ ব্ৰবৈ ভবতি” এই শ্রুতি অনুসারে ব্ৰহ্মকে জানিলেই ব্ৰহ্ম হওয়া যায়। পরমানন্দে' স্থিতি ভিন্ন জীবের সর্বদুঃখ- নিবৃত্তির অন্য পথ নাই। ৫ • ( ৬৫ ) ক মৃত্যু জরা ব্যাধি অতিক্রম করিতে হইলে ব্রাহ্মীস্থিতি আবশ্যক, ব্রাহ্মীস্থিতি ভিন্ন পূর্ণ শান্তি স্তুসম্ভব, পূর্ণভাবে দুঃখনিবৃত্তিও সুদূরপরাহত। প্রশ্ন হইতে পারে—জরা মরণ কি অতিক্রম করা যায় ? গীতাই এই প্রশ্নের উত্তর করিবেন-গীতা বলেন- “জরামরণ মােক্ষায় মামাশ্ৰিত্য যতস্তি যে।” ৭২৯ জরা মরণ অতিক্রম জন্য আমাকে আশ্রয় করিয়া যাহারা সাধনা করেন। ইহাতে বুঝিতে পারা যায় -মনুষ্য জরা মরণ অতিক্রম করিতে পারে। সাধনা চাই। গীতা আবার বলিতেছেন— গুণানেনতীত্য ত্ৰী দেহী দেহ-সমুদ্ভবা। জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোহমৃতমতে। দেহ সমুদ্ভব এই তিন গুণ অতিক্রম করিয়া জন্মমৃত্যুজরারূপ দুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া দেহী পরমানন্দ প্রাপ্ত হয়েন। এই পরমানলে স্থিতিই ব্ৰহ্মত্ব প্রাপ্তি। অনেকের ধারণা—জীব কখন ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হয় না, এই ধারণা ভ্রান্তিমাত্র। গীতা বলিতেছেন— “প্রশান্তমনসংহেনং যােগিনং সুখমুত্তমম্। উপৈতি শান্তরজসং ব্ৰহ্মভূতমকল্মষমু ॥ ৬২৭ রজোগুণ শূন্য প্রশান্তচিত্ত নিষ্পাপ এবং ব্ৰহ্মত্বপ্রাপ্ত এই যােগীকে উত্তম সুখ আপনিই আশ্রয় করে। “ব্রহ্মবি-হ্মৈব ভবতি” এই শ্রুতি বাক্যের সহিত গীতার ঐকমত্য আছে। গীতা বলিতেছেন- “নির্দোষং হি সমং ব্ৰহ্ম তস্মাদ্ব হ্মণি তে স্থিতাঃ।” ৫১১৯ ব্ৰহ্ম সর্বত্র সমান ও নির্দোষ, অতএব তাহারা ব্ৰহ্মভাবেই স্থিতিলাভ করেন। আবার বলিতেছেন- “স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্ৰহ্মবিদ ব্ৰহ্মণি স্থিত ।” স্থির-বুদ্ধি মােহহীন ব্যক্তি ব্ৰহ্মবিৎ হইয়া ব্রহ্মেই স্থিতি লাভ করেন। আরও কত আছে-- “ভন্তে ব্ৰহ্মনির্বাণমূষয়ঃ ক্ষীণকল্মষাঃ।” ৫২৫ ক্ষীণপাপ ঋষিগণ ব্ৰহ্মনিৰ্বাণ লাভ করেন। ৩০ ( ৮৬ ) কেহ বলেন ব্রহ্মনির্বাণ লাভ কি প্রার্থনীয় ? নিৰ্ব্বাণে ত কিছুই থাকে । এইরূপ উক্তি যে ভ্রান্তি মাত্র, তাহা গীতাই প্রদর্শন করিতেছেন। ব্ৰহ্ম হইয়া গেলেই জীবন্মুক্ত ভগবানের স্বরূপত্ব প্রাপ্ত হয়েন। ইদং জ্ঞানমুপাশ্ৰিত্য মম সাধৰ্ম্মমাগতাঃ। সহেপি নােপজায়ত্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ ৷ ১৪২ এই জ্ঞানলাভ করিলেই আমার স্বরূপত্ব প্রাপ্তি হয়, তখন তাঁহারা আর সৃষ্টি কালেও উৎপন্ন হয়েন না, প্রলয় কালেও প্রলয় দুঃখ অনুভব করেন না। ব্রহ্মের স্বরূপ সচ্চিদানন্দ—ইহাই পরমানন্দ প্রাপ্তি। ব্ৰহ্ম হইয়া গেলে মানুষ যে জড়ের মত অবস্থান করে, যাহাদের মত এই, তাহাদিগকে গীতা বলিতেছেন “সুখেন ব্ৰহ্ম সংস্পর্শ মত্যন্তং মুখমশ্নতে।” ৬৮ “সব্ৰহ্মযােগ যুক্তাক্স সুখমক্ষ্যমতে।” ৫২১ ব্ৰহ্ম সংস্পর্শ মাত্র যে সুখ, তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট সুখ। যােগ দ্বারা বন্ধে যুক্ত হইতে পারিলেই অক্ষয় সুখ লাভ হয়। ব্রহ্মই অক্ষয় সুখস্বরূপ। ব্রাহ্মীস্থিতি লাভ করিতে পারিলে সর্বদুঃখের নিবৃত্তি হয়, পৰমানন্দ প্রাপ্তি হয়, আর কখন তাহাকে পুনর্জন্ম ভােগ করিতে হয় না। কারণ যিনি ব্রহ্মে নিত্য অবস্থিত, যিনি পরমানন্দে নিত্য স্থিতি লাভ করিয়া ব্ৰহ্ম হইয়া গিয়াছিন, তাহার আর পুনর্জন্ম কোথায় ? আজ কাল অনেকেই পুনর্জন্ম বিশ্বাস করেন না। আবার কেহ কেহ পুনর্জন্মের বিকৃত অর্থও করেন। গীতা ইহাদিগকে নিরাশ করিতেছেন- গীতা বলিতেছেন— “বহুনি মে বাতীনি জন্মানি তব চার্জুন। তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেথ পরন্তপ । আমার ও তােমার বহুজন্ম অতীত হইয়াছে, আমি সে সমুদায় জানি, কিন্তু তুমি জান না। শত বিকৃত অর্থ করিলেও পুনর্জন্ম নাই, একথা হিন্দুশাস্ত্রে কোথাও দৃষ্ট হয় না। “অপরং ভবত জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ” আপনার জন্ম পবর্তী এবং সূর্যের জন্ম পূৰ্ব্ববর্তী, অর্জুনের এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ --অবতার লীলাকারী মায়া মনুষ্য—স্পষ্ট ভাবেই জন্ম জন্মান্তরের কপা বলিয়াছেন। আরও বহুস্থানে পুনর্জন্মের কথা উক্ত হইয়াছে। .
( ৬৭ ) আব্ৰহ্মভুবল্লোকাঃ পুনরাবৰ্ত্তিনােহৰ্জ্জুন। মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে ॥ ৮১৬ ব্রহ্ম লােক হইতে সকল লােক পুনরায় আবর্তনশীল, কিন্তু আমাকে পাইলে লােকের পুনর্জন্ম হয় না। পুনর্জন্মের অন্ত অর্থ হইতে পারে । একবার মনুষ্য হইলে আর যে মানুষ নিম্ন যােনিতে পতিত হয় না কথারও কোন যুক্তি নাই। গীতা বলিতেছেন - “ক্ষিপাম্যজমশুভানারীষেব যােনিযু।” ১৬১৯ আসুরীং যােনি মাপন্ন। মূঢ়া জন্মনি জন্মনি। মাম প্রাপ্যৈৰ কৌন্তেয় তলত যান্ত্যধমাং গতিম্ ॥ ১৬২০ আমি (আমার হিংসাকারী ক্রর নরাধম অশুভ সেই সকল ব্যক্তিকে) সংসারে আসুরী যােনিতে অনবরত নিক্ষেপ করিয়া থাকি। ভগবান্ শঙ্কর ব্যাখ্যাতে বলিতেছেন “আসুরীদেব ক্রর কৰ্ম্মপ্রায়াসু ব্যাঘ্ৰসিংহাদিযােনিযু ক্ষিপামি”। শ্রীধর স্বামী বলিতেছেন “আসুরীষেবাতিরামু ব্যাসপাদিযােনিযু”। শ্রীমৎ মধুসূদন সরস্বতী উপরােক্ত ব্যাখ্যা করিয়া শ্রুতি বাক্য উদ্ধার করিয়াছেন। শ্ৰতি বলেন “অথ কপূয় চরণাঃ অভ্যাসেহকপূয়াং যােনিমাপদ্যের শ্বােনিং বা শূকরযােনিং বা চণ্ডালযােনিং বেতি” কপূয়চরণাঃ কুৎসিতকৰ্ম্মাণঃ অভ্যাসেহ- শীঘমেব কপূয়াং কুৎসিতাং যােনিমাপদ্যের ইতি তেরর্থঃ। “ততে যান্ত্যধমাং গতিং” গীতার এই উক্তির ব্যাখ্যায় ভগবান শঙ্কর বলিতেছেন অধমাং নিকৃষ্টতমা” শ্রীমান্ স্বামী বলিতেছেন “অধমাং কৃমি কীটাদিগতি। অন্য অন্য শাস্ত্রও জীবের নানাযােনিভ্রমণের কথা বলিতে- ছেন, তথাপি যাহারা বলেন-পুনর্জন্ম নাই, মনুষ্য হইলে আর সিংহ ব্যাঘ্ৰ কৃমি কীটাদি হইতে হইবে না, তাঁহাদের বুদ্ধির প্রশংসা আমরা কিরূপে করি? মহাভারত বলিতেছেন - “ধামো ধামসহস্রাণি মরণাস্তানি গচ্ছতি। তিগযােনি মনুষ্যত্বে দেলােকে তথৈবচ।” শান্তিপর্ব ৩০৫২ জ্ঞানিগণের সিদ্ধান্তদ্বারাই জগতের অজ্ঞান নাশ হয়। রােগী ঔষধ- সেবনে চীৎকার করে বুলিয়া যদি ঔষধ পরিত্যাগ করা যায়, তবে রােগীর মৃত্যু ( ৬৮ ) অবশ্যম্ভাবী। অজ্ঞানীর জালা চিরদিনই থাকিবে। একটু প্রাণে ব্যথা লাগিবে বলিয়া জ্ঞানীর সিদ্ধান্ত চাপিয়া রাখা নিতান্ত মুঢ়ের কাৰ্য্য বলিয়া আমরা মনে করি। ইহাতে জগতের অনিষ্ট ই হয়। জগতের মঙ্গল হউক, ইহাই আমাদের প্রার্থনা। জীবন্মুক্তি সম্বন্ধে অজ্ঞানীর উক্তি নিরসন হইল। এক্ষণে কিরূপে জীবন্মুক্তি লাভ করা যায়, সেই বিষয়ের আলােচনা করা যাইবে। সাধনার কথা বলিবার পূর্বে জীবন্মুক্তিলাভকরণােপযােগী শক্তি জীবের আছে কি না ইহার আলােচনা আবশ্যক। ভগবান্ জীবকে ত্রিবিধ শক্তি দিয়াছেন—জ্ঞান শক্তি, ইচ্ছাশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি ক্রিয়াশক্তির আধার প্রাণ, ইচ্ছাশক্তির আধার মন এবং জ্ঞান শক্তির আধার বুদ্ধি। প্রাণ শরীরকে রক্ষা করে, মন ইচ্ছাশক্তি দ্বারা বিষয় ত্যাগ করিয়া ভগবদ রসে পূর্ণ হয় এবং বুদ্ধি বিচার দ্বারা আত্মার স্বরূপ নিশ্চয় করিয়া জীবন্মুক্তি প্রদান করে। প্রাণায়ামাদি যােগ, ভক্তি যোগ এবং সাংখ্য- জ্ঞান সাহায্যে মনুষ্য জীবন্মুক্ত হইতে পারে। কৰ্ম্ম, ভক্তি ও জ্ঞান ইহাদের সম্বন্ধ এতই ঘনিষ্ঠ যে একটির সাধনাতে তিনটিই আইসে, যদি সাধক কম্ম মধ্যে আটকাইয়া না যান। আর এই তিন শক্তি দ্বারা যে জীবন্মুক্তি লাভ হইবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। গীতা এই তিনটি পথ প্রথমে বুঝাইয়া দিয়াছেন, সঙ্গে সঙ্গে যে সাধনা দ্বারা ব্রাহ্মীস্থিতি লাভ করা যায় তাহাও বলিতেছেন। আমরা সাধনার কথা পরে বলিব, এক্ষণে যাহা করিতে হইবে তাহাই বুঝিবার চেষ্টা করা যাক। যে সাধক জীবন্মুক্তি লাভ করিয়াছেন, তিনি কৰ্ম্মই করুন বা কম্ম শূন্যই থাকুন সর্বদাই আনন্দে তিনি পূর্ণ। শাস্ত্রে দেখা যায়, বশিষ্ঠাদি ঋষি এবং রাম কৃষ্ণাদি অবতার যখন একান্তে থাকেন--যখন অন্য কোন কৰ্ম্ম না করেন, তখন ধ্যানতৎপর হইয়া সমাধি-বিশ্রাম করেন। আমরা একটি মাত্র দৃষ্টান্ত দেখাইতেছি :- সৌমিত্রিরেকদা রাম মেকান্তে ধ্যানতৎপরম্। সমাধিবিরমে ভক্ত্যা প্রণয়া বিনয়ান্বিতঃ ॥ অব্রবীদেব ইত্যাদি। জীবন্মুক্তি হইয়া গেলে সমাধি-সহকৃত ধ্যানান সৰ্ব্ব আয়ও হয়।
জীবমুক্তির নিকটে যাহারা গিয়াছেন, যাঁহারা ধ্যানানন্দ কচিৎ ক্বচিৎ ভােগ করিলেও সর্বদা ঐ অবস্থায় থাকিতে পারেন না, তাহারা যখন ঐ অবস্থায় না থাকিতে পারেন, তখন সাংখ্য-যােগে অবস্থান করিবেন। সাংখ্য-যােগ অর্থ, বিচার যােগ। বুদ্ধিই বিচার করে। বুদ্ধিই জীবের শক্তি সমূহের মধ্যে প্রধান। বুদ্ধি বিচার করিয়া দেখাইয়া দেয়--এই সংসাড়ম্বর মনােবিলাস মাত্র—ইহা চিত্তস্পন্দন কল্পনা মাত্র। আত্মা কিন্তু এই সমস্ত দৃশ্যমান মনােবিলাস হইতে ভিন্ন। এই ভূমিকায় সাধক “প্রকৃতের্ভিন্নমাত্মানং বিচারয় সদাহনঘ”। প্রকৃতি হইতে আত্ম। যে ভিন্ন ইহা পুনঃ পুনঃ বিচার দ্বারা অনুভব করেন। সাংখ্যের সদৃশ জ্ঞান আর নাই, যােগের সদৃশ বলও নাই। সাংখ্য ও যােগ, সিদ্ধাবস্থাতে একই ফল প্রদান করে বলিয়া উভয়কেই এক বলা হইয়াছে। যােগ অপেক্ষা শাস্ত্রে সাংখ্য জ্ঞানের অধিক প্রশংসা দেখা যায়। মহাভারত শান্তি পব্বে ৩০১ অধ্যায়ে দেখা যায়—“বিজ্ঞতম সাংখ্যমতাবলম্বীরা এই জ্ঞান বলেই পরমগতি লাভ করেন, ইহার তুল্য উৎকৃষ্ট জ্ঞান আর নাই। তুমি ইহাতে কিছুমাত্র সংশয় করিও না। মহাত্মা মনীষিগণ এই সাংখ্য মতকে অক্ষয়, ধ্রুব, পূর্ণব্রহ্ম ইত্যাদি নাম দিয়াছেন, উহা যােগ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। পরমর্ষি শাস্ত্র মধ্যে সাংখ্য মতকেই উৎকৃষ্ট বলিয়াছেন। বেদ, যােগ-শাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, ইতিহাস ও পুরাণে যে লৌকিক ও পারমাত্মিক জ্ঞানের কথা দৃষ্ট হইয়া থাকে, সে সমুদায়ই সংখ্য শাস্ত্র হইতে গৃহীত। সাংখ্য মতাবলম্বীরা আপনাদিগের মতানুযায়ী কাৰ্য্য-সমুদায় সম্যগুরূপে অনুষ্ঠান করিতে না পারিলেও তাহাদের অধােগতি হয় না। যাহারা সাংখ্যমত গ্রহণপূর্বক জ্ঞানান্বেষণে যত্নবান হন, তাহারা জ্ঞানের সম্যক্ উৎকর্ষ সাধন করতে না পারিলেও তাহাদিগকে তিযােনি- গমন, অধঃপতন বা পাপাত্মাদিগের সহবাস জনিত ক্লেশ সহ্য করিতে হয় না। যিনি মহার্ণব তুল্য অতিবিশাল এই পুরাতন সাংখ্য মত সমগ্রূপে অবগত হয়েন, তিনিই নারায়ণ-স্বরূপ”। সাংখ্য মতের প্রধান উপদেশ সব্বদা স্মরণ করিবে—দেহ, সংসার, জগৎ প্রভৃতি কোন বিষয়ে আস্থা প্রদর্শন করিবে না, ইহার কেহই আত্মা নহে, ইহারা মিথ্যা, এইরূপ ব্যবহার-পরায়ণ থাকিবে এবং আমিই আত্মা, আমি দেহ নহি, আমি সচ্চিদানন্দ স্বরূপ, আমি মনাে- বিলাসের দ্রষ্টা, সর্বদা ইহা আলােচনা করিবে। এই ভূমিকার স্থিতিলাভে অসমর্থ হইলে বুদ্ধি হইতে মনে নাবিতে হইবে। ভক্লিযােগ মনেরই কাৰ্য্য। মানসপূজা ভক্তিযােগের সার বস্তু। ভক্তিযােগ ( ৭ ) মন রসে পূর্ণ হইলেই জ্ঞানযােগে যাইতে পারা যায়, তৎপরেই আবার ধ্যান- যােগে উঠিতে পারা যায়। যাহারা ভক্তিযােগেও না থাকিতে পারেন, তাহাদিগকে মনের সাধনা হইতে প্রাণের সাধনায় আসিতে হইবে। এই প্রাণের সাধনায় প্রধান কাৰ্য প্রাণায়ামাদি। প্রাণায়ামাদি যাহারা অস্বাভাবিক বলেন, তাহাদিকে গীতার উক্তিই স্মরণ করাইয়া দিতে হয়। প্রাণায়াম সম্বন্ধে গীতা বলিতেছেন-- অপানে জুতি প্রাণং প্রাণেইপানং তথাপরে। প্রাণাপানগতীরুদ্ধা প্রাণায়াম-পরায়ণাঃ অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্ প্রাণেষু জুহতি ॥ ৪২৯ আবার বলিতেছেন- স্পর্শান কৃত্বা বহির্বাহ্যাং শ্চক্ষুশ্চৈবান্তরে বাের। প্রাণাপাণৌ সমৌ কৃত্বা নাসাভ্যন্তরচারিণৌ ॥ ৫২৭ অন্যত্র ভগবান্ বলিতেছেন— অহং বৈশ্বানরা ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ। প্রাণাপান-সমাযুক্ত পচাম্যম্নং চতুধি ॥ প্রাণ ও অপান বায়ুকে সাম্যাবস্থায় আনিলে দেহের মধ্যে অগ্নি উপলব্ধি হয়। ইহাতেই জীবন ধারণ হয়। বিনা অগ্নিতে জীবন ধারণ হয় না। আহার না করিয়াও যাহারা দেহে অগ্নি রাখিতে পারেন, তাহাদের আহারও আবশ্যক হয় না। সর্পাদি জীব শীতকালে ভূগর্ভে বাস করে, ভূগর্ভ অত্যন্ত উষ্ণ-সেইজন্য তাহারা ৫৬ মাস কোন কিছু আহার না করিয়াও জীবন ধারণ করিতে পারে। যাহারা যােগদি সাধনা করিতেও পারেন না, তাহারা নিষ্কাম কৰ্ম্ম অভ্যাসে আত্মসংস্থ যােগের উপযুক্ত হইবেন। উপাসন। নিষ্কাম কৰ্ম্মের নিম্ন অবস্থা। এই সাধনার ক্ৰম আমরা গীতা হইতে দেখাইয়াছি। এই কথার উপসংহারে আমরা বলি—প্রাণ শরীর রক্ষা করে, মন সঙ্কল্প বিকল্প তুলিয়া মনটরাজ্য রচনা করে এবং বুদ্ধি বিচার দ্বারা সৎ অসৎ ভেদ জানাইয়া দেয়। প্রাণ-স্পন্দন রহিত হইলে মনের বিষয়চিন্তাও শেষ হইল। মৰ আত্মসংস্থযােগে স্থির হইলৈ অন্য কোন চিন্তাই থাকে না। কিন্তু এই ৫ । ( ৭১ । অবস্থা স্থায়ী হয় না বলিয়া ভক্তিযােগ অবলম্বন করিতে হয়। ভক্তিযােগে মন ভগবসে সিক্ত হইলেই বুদ্ধি আত্মস্বরূপ জানাইয়া দেয়। এই অবস্থায় কোন কামনা থাকে না। মন সৰ্বসঙ্কল্পশূন্য হইলেই জীব আপন স্বরূপ উপলব্ধি করিতে সমর্থ হয়েন। এই অবস্থাকে জাগ্রত বলা যায় না, নিদ্রাও বলা যায় না, অথচ ইহা সর্বপ্রকার জাড্যবর্জিত অবস্থা—ইহাই স্বরূপাবস্থা। দঢ়রূপে সর্বকামনাবর্জিত অবস্থায় থাকাই ব্ৰাহ্মীস্থিতি। এই স্থিতি নিত্য, ইহা জ্ঞানস্বরূপ ও আনন্দস্বরূপ। স্থিতি নিত্যজ্ঞান ও আনন্দেই হয় । ব্রাহ্মী- স্থিতি লাভ করিয়াও ব্যবহার-পরায়ণ হইয়া থাকা যায়। জীবন্মুক্তি জন্য প্রধান সাধনা - “সঙ্কল্প-প্ৰভবান্ কামাংস্তাক্ত। সৰ্বানশেষতঃ। মনসৈকেন্দ্রিয়-গ্রামং বিনিয়ম সমন্ততঃ । শনৈঃশনৈরুপমেদ বুদ্ধ্যা ধৃতি-গৃহীতয়া। আত্মসংস্থং মনঃ কৃত্বা ন কিঞ্চিদপি চিন্তয়েৎ ॥ ৬২৫ অধ্যায়। এই সাধনার অঙ্গীভূত কাৰ্য্য গুলি এই-- (১) নিষ্কাম কর্ম দ্বারা কৰ্ম্মশূন্য অবস্থালাভ, একান্তে গমন, সঙ্কল্প-প্ৰভব কামনা ত্যাগ। (২) আত্মাতে মনোেযােগ করিয়া মনদ্বারা ইন্দ্রিয় নিয়মিত করা। (৩) বুদ্ধি দ্বারা আত্মার স্বরূপানুভব, মনকে আত্মসংস্থ করা। মােক্ষের জন্য চারি আশ্রম দৃষ্ট হয়—ব্রহ্মচর্য গার্হস্থ্য বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। এই চারি আশ্রম প্রায় সকলকেই অতিক্রম করিতে হয়। কিন্তু যদি কোন সাধক ব্ৰহ্মচর্যে স্থিত হইয়াই পরমানন্দে স্থিতি লাভ করিতে সমর্থ হয়েন, তাহার জন্য যেমন অন্য আশ্রম আবশ্যক হয় না, সেইরূপ কোন সুকৃতিশালী সাধক যদি আত্ম- সংস্থ সমাধিতে স্থির হইয়া যান, তখন তাহার অন্য সাধনা আবশ্যক হয় না। ঐ সমাধি হইতেই একবারে জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠে, তিনি জ্ঞান লাভ করিয়াই পরমানন্দে স্থিতি লাভ করিতে পারেন। কিন্তু আত্মসংস্থ যােগে স্থিতি স্বাভ সকলের ভাগ্যে হয় না, এই জন্য দৃঢ় ভাবে আত্মসংস্থ হইবার জন্যই ভক্তি যােগ ও সাংখ্যজ্ঞান। সাংখ্যজ্ঞানদ্বারাই সমাধিসহকৃতধ্যানযােগে স্বস্বরূপে “তদা দ্রষ্টঃস্বরূপেহবস্থান” হাই জীবন্মুক্তি। • আমরা জীবন্মুক্তি জন কর্মগুলি মােটামুটি বুঝিলাম। এক্ষণে সর্বপ্রকার ( ২২ ) অধিকারীর জন্য প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত ক্রমগুলি আলােচনা করিয়া এই প্রবন্ধ শেষ কবিব। যেমন পুনঃ পুনঃ অভাস সিদ্ধির প্রাণ, সেইপ পুনরুক্তি জীবন্মুক্তির জন্য নিতান্ত আবশ্যক। আমরা সকল প্রকার কৰ্ম্ম এস্থানে উল্লেখ করিব (১) যতদিন না জীব ও ব্রহ্মের একবােধরূপ জ্ঞানে জীব শান্তি লাভ করে, ততদিন ঈশ্বরে মন রাখিয়া কৰ্ম্মেন্দ্রিয় দ্বারা কৰ্ম্ম করিতে হইবে। যােগ, ভক্তি ও জ্ঞানের উদ্দেশ্য বিষয়সঙ্কল্পত্যাগ, আত্মরসাস্বাদন ও পরমানলে স্থিতি। ইহাই গীতার সাধারণ কর্ম। কিন্তু এই কর্মের জন্য আয়ােজন অনেক। প্রথমেই ভিত্তি—বিষাদ-যােগই সৰ্ব্ব উপ্লদেশের ভিত্তি। এ ভিত্তিতে না দাড়াইলে পরমানন্দ-পথের পথিক হওয়া যায় না। জন্মমরণভীতি হইতে যিনি মুক্ত হইতে চাহেন না—সর্ব প্রকার দুঃখেরআত্যন্তিক নিবৃত্তি যাঁহার লক্ষ্য নহে, তিনি কখন আত্মজ্ঞান ও আত্মা- নন্দের ভিখারী নহেন। দুঃখের ক্ষণিক নিবৃত্তি যাহার লক্ষ্য তাহার জীবন্মুক্তি হইবে না। মৃত্যু ভীতিতে ব্যকুলতাই বিষাদ যােগ। ২। বিষাদ-যােগ-ব্যাকুল চিত্তের প্রতিই সমস্ত আৰ্য্য-শাস্ত্রের উপদেশ। বশিষ্ঠের উপদেশ বিষাদ-যােগী রামচন্দ্রের প্রতি, গীতার উপদেশ বিষাদ- যােগী অর্জুনের প্রতি, চণ্ডীর উপদেশ বিষাদ-যােগী সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্যের প্রতি এবং ভাগধতের উপদেশ বিষাদ-যােগী মুমূর্ষ পরীক্ষিতের প্রতি। ৩। একটু স্থির ‘ইলেই দেখা যায়—সকল জীবই মৃত্যুভয়গ্রস্ত। ব্যাধি আধি সকলেরই আছে। কখন কোন্ ব্যাধি বা আধি মৃত্যুর অনুচর হইয়া আইসে, তাহার নিশ্চয় নাই। এতদ্ভিন্ন কোন্ দৈব কারণে কখন যে মৃত্যু আসিবে, কোন্ ভূতদ্বারা জীব কাল-কবলিত হইবে, কে ইহা নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারে? শত সাবধান হইলেও মৃত্যু হইতে সাধারণ জীব রক্ষা পায় না। যদি পাইত, তবে রাজা বা রাজপুত্রের মৃত্যু হইত না। ৪। মৃত্যু ভয় লইয়া সংসারের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেই বিষাদ জাগিবে। এই মধুর হাসিনী স্ত্রী, এই প্রিয় পুত্র, এই স্নেহাস্পদীভূত কন্যা–ইহারাও মরিবে—কখন মরিবে তাহার নিশ্চয় নাই। তবে আর কোন্ সুখের জন্য এই অস্থায়ী সংসার আড়ম্বর ? কেন এই বৃথা চেষ্টা ? স্বজন বন্ধু বান্ধবের মরণ চিন্তাতেই অর্জুনের বিষাদ-যােগ উপস্থিত হইয়াছিল। পুনঃ পুনঃ মৃত্যুচিন্তায় বাদ যােগ দৃঢ় হয়। ভগবান ।
( ৭৩ ) ৫। বিষাদ-যােগে যখন চিত্ত ব্যাকুল হয়, যখন প্রাণ সর্বদা কাতরতা অনুভব করে, মন যেন সর্বত্রই মৃত্যুর ছায়া দেখে, তখন চিন্তা আইসে—এই মৃত্যু-সংসার-সাগর হইতে কি উদ্ধার নাই ? কেহ কি আমার নাই ? জীব নিরাশ্রয় হইলেই আশ্রয় অনুসন্ধান করে। ৬। রক্ষার উপায় আছে। গীতা-শাস্ত্রে ভগবান্ বিষাদ-যােগীকে যে যে পথের মধ্যদিয়া লইয়া যাইতেছেন, তাহাই রক্ষার পথ। আত্মরক্ষার উপায় জানিয়া সংসার-কুরুক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে। পূর্বে বলা হইয়াছে-- সংসারের জন্য আত্মবলি দাও, এ কাৰ্যে প্রশংসা আছে—কিন্তু এইরূপ আত্ম- বলিতে সম্পূর্ণ কর্তব্য করা হইল না, ইহাতেও অজ্ঞান আছে। আত্মরক্ষা ও জগদরক্ষা উভয়ই আবশ্যক। ৭। রক্ষার উপায়গুলিও স্বাভাবিক হওয়া চাই। কর্তব্যটি পূর্ণ কর্ত্তব্য হওয়া উচিত। মনুষ্যের পূর্ণ কর্তব্য কি, ইহা ধারণা করা কঠিন। যে মনুষ্য- দেহ ভিন্ন অন্যদেহে জীবন্মুক্তি-সুখ লাভ হয় না, সেই দেহ যাহাদের নিকট লাভ করিয়াছি—যাঁহারা এই দেহরক্ষা জন্য সহায়তা করিয়াছেন—সুবুদ্ধি জীব আপনাহইতে তাহাদের নিকট কৃতজ্ঞ হইবে। বালক নিজ জীবনের জন্য বহু জনের নিকট ঋণী। পিতা মাতা প্রভৃতি পরিবারবর্গ, আত্মীয় স্বজনাদি, সমাজ এবং মানবজাতি ইহাদের সকলের উপর কর্তব্য পালনকরিতে না পারিলে কৃতঘ্ন হইতে হয়। আদি কবি ভগবান্ বাল্মীকি বলিতেছেন :- কৃতার্থাহ্যকৃতার্থানাং মিত্ৰাণাং ন ভবন্তি যে। তান্ মৃনপি ক্ৰব্যাদাঃ কৃতঘ্নান্নেপভুঞ্জতে। কে না স্বীকার করে—যে সমাজ, পরিবার, ও জাতির সাহায্য বিনা জীবন- ধারণ অসম্ভব। তথাপি: কাহারও সামর্থ্য-সত্ত্বেও যদি সে ব্যক্তি জগতের জন্য কোন কাৰ্য্য না করে, তখন সে ব্যক্তি কৃতঘ্ন। যাহারা স্বয়ং কৃতকার্য হইয়া অকৃতাৰ্থ মিত্রদিগের কাৰ্য্য-সাধনে যত্নবান্ না হয়, তাহারা কৃতঘ্ন। কৃতগ্ন মৃত হইলে ক্ৰব্যাদগণও তাহাদিগকে ভক্ষণ করে না। রামায়ণ কৃতগ্রসম্বন্ধে বড় কঠিন দণ্ড বিধান করিতেছেন। বলিতেছেনঃ- “কৃতন্নঃ সৰ্ব্ব ভূতানাম্ বধ্যঃ”। বলিতেছেন “গােস্নেচৈব সুরাপেচ চৌরে ভগ্নতে তথা । নিষ্কৃতির্বিহিতসদ্ভিঃ কৃতম্নে নাস্তি নিষ্কৃতিঃ ।” == ( ৭৪। কৃতঘ্ন সৰ্ব্ব প্রাণীর বধ্য। সাধুগণ গােয়, সুরাপায়ী ও ভগ্নব্রত ব্যক্তিদিগের নিষ্কৃতি বিধান করিয়াছেন, কিন্তু কৃতঘ্ন পুরুষের নিষ্কৃতিবিধান করেন নাই। জগতের নিকটে উপকৃত হইয়া যাহারা সামর্থ্যসত্ত্বেও জগতের কোন কাৰ্য্য না করে, তাহারা কৃতঘ্ন। কিন্তু জগতের জন্য কৰ্ম্ম যদি নিষ্কাম ভাবে কৃত না হয়, তবে তাহা অনিষ্টের কারণ হইয়া পড়ে। এই নিষ্কাম-কৰ্ম্মই আত্মজ্ঞান- লাভের প্রথম কৰ্ম্ম। এই জন্য বলা হয়-আত্মজ্ঞানের কাৰ্যে আত্মরক্ষা ও জগদ-রক্ষা উভয়ই সম্পাদিত হয়। ৮। আত্মার স্বরূপ জানাই আত্মজ্ঞান। সাংখ্য-জ্ঞানই আত্মজ্ঞান-লাভের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। আত্মার স্বরূপ জানিলেই জনন-মরণ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া নিত্য-আমনে স্থিতি লাভ হয় । ইহাই ব্রাহ্মীস্থিতি। “ব্ৰহ্মণি ভবেয়ং স্থিতি, সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম সংন্যস্য ব্ৰহ্মরূপেণৈবাবস্থানমিত্যেতৎ” ভগবান্ শঙ্কর ইহার এই অর্থ করিয়াছেন। ৯। সাংখ্য-জ্ঞান উপদেশ দিতেছেন “আত্মার মৃত্যু নাই, আত্মার কোন দুঃখ নাই, ভয় নাই, অজ্ঞান নাই—আত্মা আনন্দময়”। গীতা বলিতেছেন— ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ, নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ । অজো নিত্যঃ শাশ্বতােবয়ং পুরাণে, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥ ২২০ এই আত্মাকে শস্ত্রে ছেদন করা যায় না, অগ্নিতে দগ্ধ করা যায় না, জলে সিদ্ধ এই আত্মা হয় না, বায়ুতেও শুষ্ক হয় না। ইহার জননমরণাদি বা সংসার নাই, কোন অভাব নাই। আত্মার স্বরূপই এই। আমি দেহ নহি, জগতও নহি, আমিই এই আত্মা, কাজেই আমার জন্ম মৃত্যু নাই, অধি ব্যাধি নাই, ক্ষুধা তৃষ্ণা নাই, কোন অভাব নাই, সংসার নাই, আমি সচ্চিদানন্দ স্বরূপ। সাংখ্যজ্ঞানে ইহা যিনি অনুভব করিয়াছেন, তাহারই জীবন্মুক্তি হইয়াছে। জগৎসম্বন্ধে সাংখ্য- জ্ঞানী বলেন জগৎ সত্যই হউক বা মিথ্যাই হউক, এই জগৎ আমি নহি, ইহার কোন বস্তুও আমি নহি, আমারও নহে, কারণ আমি স্বরূপে সর্বত্র পূর্ণ। জগৎ যাহাই হউক --যাহাকে আমি সংসার বলি, যাহার ভাবনায় আমি পীড়িত হই, এ সংসার আমার মনবিলাস মা--ইহা আমার চিত্তস্পন্দনজন্য কল্পনা : ( ৭৫ মাত্র—এই মনােবিলাস হইতেই ভুল ‘আমি আমার' সৃষ্ট হইয়াছে। প্রকৃত “আমি”তে’যাহার দৃষ্টি, তাহার নিকট দুই চারিটা ব্ৰহ্মাণ্ড নষ্ট হইলেই বা কি, দুই দশটা ব্ৰহ্মাণ্ড নূতন হইলেই বা কি! জীবের স্বরূপই এই সচ্চিদানন্দ ভগবান্ আত্মা। মহাভারত বলিতেছেন— “মূঢ়ব্যক্তিরা শাশ্বত পরমাত্মাকে জীবাত্মা হইতে পৃথক্ বলিয়া বােধ করে, কিন্তু সাধুব্যক্তিরা তাহাকে জীবাত্মা হইতে অভিন্ন জ্ঞান করিয়া থাকেন। যােগী ও সাংখ্য-মতাবলম্বিগণ অবিনশ্বর জীবাত্মার সহিত পরমাত্মার অভেদ- জ্ঞানকেই সবিশেষ প্রশংসা করেন—শান্তিপর্ব ৩১৮ অধ্যায় –“তস্য দ্বাবনু- পশ্যেতাং তমেকমিতি সাধবঃ”। উপনিষদ্ বলিতেছেন- সর্বভূতাধিসঞ্চ যদ ভূতেষু সত্যধি। সর্বানু গ্রাহকত্বেন তদস্ম্যহং বাসুদেবঃ তদস্যহং বাসুদেব।” যিনি সর্বভূতের আশ্রয় হইয়াও আবার সর্বভূতেই বাস করেন, এবং যিনি সর্বলােকের প্রতি অনুগ্রহ করেন, আমিই সেই বাসুদেব স্বরূপ-এই প্রকারে জীব ও ব্রহ্মের অভেদ ভাবনা করিবে। আত্মা কিরূপে দেহ হইয়া যায়, সাংখ্য-জ্ঞানী তাহা নির্ধারণ করিয়া দেহ- হইতে মুক্ত হইবার কৌশল শিক্ষা দিয়া থাকেন। আত্মা দেহে প্রবিষ্ট হইয়া দেহের সুখকে আপনার সুখ এবং দেহের দুঃখকে আপনার দুঃখ বােধ করিতে থাকেন। এই সুখ ও দুঃখ অনুভূতি দ্বারাই আত্মা দেহে বদ্ধ হইতে থাকেন। পুনঃ পুনঃ এইরূপ সুখ দুঃখ অনুভব করিতে করিতে আত্মা দেহই হইয়া যান। চক্ষুরাদি যাহাকে সত্য বলে, দেহাভিমানী আত্মা তাহাকেই সত্য বলিয়া স্বীকার করেন। দেখাগেল-সুখ-দুঃখ-অনুভূতিই আত্মার দেহত্ব-প্রাপ্তির কারণ। সাংখ্য-জ্ঞানী তাই সুখদুঃখকে অবজ্ঞা করিতে বলেন, শীত উষ্ণকে অবজ্ঞা করিতে বলেন, যতই আপন স্বরূপ চিন্তা হইতে থাকিবে, ততই সুখ দুঃখ যে আমার নহে, ইহা দেহের এবং দেহ আমি নহি, আমি সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ— ইহা বােধ হইতে থাকিবে। দেহের সুখদুঃখের সহিত আমার কোন সম্বন্ধ নাই, দেহের ক্ষুধা তৃষ্ণা, দেহের নিদ্রা-আলস্যে আমার কোন প্রয়ােজন নাই, এই বােধ নিশ্চয়রূপে সিদ্ধ হইলেই সাংখ্য-জ্ঞানের কাৰ্য্য হইয়া গেল। “আমি আত্মা” সাংখ্য-জ্ঞানী বিচার দ্বারা এবং সাধনাদ্বারা ইহা পুনঃ পুনঃ অভ্যাস করিয়া স্ব-স্বরূপে অবস্থান করিতে সমর্থ হয়েন।
( ৭৬ ) ‘আর্মিই পরমাত্মা” এ বিষয়ে সাংখ্য-জ্ঞানীর উক্তি আমরা মহাভারত হইতে উল্লেখ করিতেছি :- 'মমাস্তুধিগবুদ্ধস্য যােহহং মগ্নমিমং পুনঃ। অনুবর্তিতবাােেহাদন্যমন্যং জনাজ্জনম্ ॥ ২৬ অয়মভবেন্ধুরনেন সহ মে ক্ষম। সাম্যমেকত্ব মায়াতে যাদৃশস্তাদৃশস্তৃহম্ ॥ ২৭ তুল্যতামিহ পশ্যামি সদৃশশাংহমনেন বৈ। অয়ং হি বিমলাে ব্যক্তমহমীদৃশক স্তথা ॥ ২৮ যােহহমজ্ঞানসম্মােহাদজ্ঞয়া সম্প্রবৃত্তবান্। সসঙ্গয়াহহং নিঃসঙ্গ: স্থিতঃ কালমিমংত্বহম্। হায়! আমি অজ্ঞান বশতঃ পরমাত্মাকে পরিত্যাগ করিয়া বারংবার প্রাকৃত দেহ আশ্রয় করিয়াছি, অতএব আমাকে ধিক্! পরমাত্মা আমার পরম বন্ধু। তাঁহাকে আশ্রয় করিলে আমি তাহার স্বরূপত্ব লাভ করিয়া তাহাহইতে অভিন্ন হইতেপারি। তাঁহাহইতে আমার কোন অংশে নিতা নাই। আমি তাহারই ন্যায় নির্মল ও অব্যক্ত, সন্দেহ নাই। মােহবশতঃ প্রকৃতির বশীভূত হওয়াতেই আমার এইরূপ দুর্গতি উপস্থিত হইয়াছে, আমি নির্ণ হইয়াও সগুণ প্রকৃতির সহবাসে এতকাল অতিক্রম করিলাম, আমার মত নির্বোধ আর কে আছে? 'কালী সিংহের অনুবাদ ৩০৮ অধ্যায় প্রকৃতি হইতে জীবাত্মা পৃথক্ –প্রকৃতিই গুণবিশিষ্টা, ৫ প্রকৃতির মধ্যে থাকিয়াও জীব যখন আপনাকে নিগুণ অনুভব করিতেপারেন তখনই তিনি বিশুদ্ধ। যখন জীবাত্মা প্রকৃতির সহিত মিশ্রিত না হন, তখন তিনি পরমাত্মা হইতে অভিন্ন। যখন মিশ্রিত হয়েন, তখন পরমাত্মা হইতে ভিন্ন। এই জন্য দেহের সুখ, দুঃখ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আহার, নিদ্রা, শীত, উষ্ণাদি অনুভব, এ সমস্ত আমার নহে, ইহারা দেহের বা প্রকৃতির, এই বােধ স্থায়ী হইলেই' সাংখ্য-জ্ঞান- সাধনা পূর্ণ হইল। ১০। জীব ও ব্রহ্মের একতাই সাংখ্যজ্ঞান। সমস্ত গীতাতে ‘তত্ত্বমসি' (তৎ স্ব অসি) ইহার বিচার প্রদর্শিত হইয়াছে। ব্ৰহ্ম আছেন, ইহা নিশ্চয় হওয়ার নাম পরােক্ষ-জ্ঞান। আমার আত্মাই ব্রহ্ম’ এতদনুভূতির নাম অপরােক্ষ- জ্ঞান। অপরােহ্মানুভূতিব্যতীত সৰ্ব্বদুঃধ-নিবৃত্তির অন্য উপায় নাই। .
( ৭৭ ) ১১। বিনা কৰ্ম্মে অপরােক্ষ-জ্ঞান-লাভের সাধনা হয় না। জ্ঞানলাভ- জন্য যে সমস্ত কাৰ্য্য আবশ্যক, তাহার প্রথম ভূমিকায় নিষ্কাম কৰ্ম্ম, দ্বিতীয়- ভূমিকায় আত্মসংস্থ-যােগ, তৃতীয়-ভূমিকায় ভক্তিযােগ এবং চতুর্থ-ভূমিকায় জ্ঞান- যােগ। এই সমস্ত সাধনার কথা পূৰ্ব্বেও উল্লেখ করা হইয়াছে। * ১২। পুস্তকে পড়িয়া যেমন যুদ্ধ করা যায় না, সেইরূপ পুস্তকে দেখিয়া যােগশিক্ষা করাযায় না। যতদিন না কৰ্ম্মেন্দ্রিয়দ্বারা কৰ্ম্ম করা না যায়, ততদিন জ্ঞান-লাভের সাধনা হয় না। ১৩। প্রথম ভূমিকা নিষ্কাম-কৰ্ম্ম। প্রথম-অবস্থায় লৌকিক ও বৈদিক কৰ্ম্ম ঈশ্বর-প্রীতির জন্য করিতে হইবে। কৰ্ম্মের আদিতে মধ্যে ও অন্তে স্মরণ রাখিতে হইবে—কৰ্ম্ম তােমাতে অর্পণ করিতেছি। নিষ্কাম কৰ্ম্মের সিদ্ধি তখন, যখন মন সর্বদা আত্মসংস্থ, কিন্তু ইন্দ্রিয়াদি আপন অভ্যাসে ব্যাবহারিক কৰ্ম্ম সম্পাদন করিতে সমর্থ হয়। তবেই দেখা গেল—আত্মসংস্থযােগ ভিন্ন নিষ্কাম-কৰ্ম্ম ঠিক ঠিক সম্পন্ন হয় না। গীতা বলিতেছেন—“যােগঃ কুরু কৰ্ম্মাণি”, “মােগঃ কৰ্ম্মসু কৌশলম।” বুদ্ধির সাহায্যে যতক্ষণ না মন আত্মাতে সমাধিলাভ করে, ততক্ষণ যােগ হয় না। বুদ্ধিও যখন অবিচলিত হইয়া আত্মাতে নিশ্চল না হইবে, ততক্ষণ যােগ হইবে না- “সমাধাচলা বুদ্ধি শুদা যােগমবাসি।” ১৪। কিন্তু মন সঙ্কল্পযুক্ত থাকিলে যােগ হয় না। যিনি কর্মের সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে না পারিয়াছেন, তিনি যােগী নহেন “নহ্যসংন্যস্তসঙ্কল্পে। যােগী ভবতি কশ্চন।” যিনি অসংযমী, তঁাহার ঘােগ হয় না। “অসংযতাত্মনা বােগাে দুস্পাপ ইতি মে মতি।” ১৫। ভােগেচ্ছার নাম কামনা। কামনাই আত্মসংস্থ হইতে দেয় না। বিষয়ভােগের কামনা থাকিতে কখন আত্মস্বাদ হইতে পারে না। কামনাই জ্ঞানস্বরূপ আত্মাকে আবরণ করিয়া রাখে। এইজন্য গীতা বলিতেছেন “জহি শত্ৰুং মহাবাহে কামরূপং দুরাসদম্।” ১৬। কামনা জয় হইবে কিরূপে? কামনার দুর্গ ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি- “ইন্দ্রিয়াণি মনবুদ্ধিরস্যাধিষ্ঠানমুচ্যতে।” D ( ৭৮ ) এজন্য ইন্দ্রিয়সমূহকে বিষয় হইতে ফিরাইতে হইবে। কিন্তু মন যতক্ষণ বুদ্ধির বিচার না শুনিবে, ততক্ষণ ইন্দ্রিয়জয় হইবে না। বুদ্ধি একদিকে বস্তু- বিচার দ্বারা বস্তুর অনিত্যত্ব দেখাইতেছে, অন্যদিকে শাস্ত্রোঙ্খলা বুদ্ধি নিত্যবস্তুর রূপ, গুণ ও স্বরূপ দেখাইতেছে। একদিকে বিষয়-বৈরাগ্য অন্য দিকে আত্মসংস্থ হইবার জন্য অভ্যাস। বৈরাগ্য ও অভ্যাস ভিন্ন ইন্দ্রিয়জয় হয় না। সৰ্ব্বকৰ্ম্মে কৃষ্ণ-স্মরণ ইহা কামনা- জয়ের প্রথম অবস্থা। ১৭। “জন্মকৰ্ম্ম চ মে দিব্যমেবং যাে বেত্তি তত্ত্বতঃ” ব্রাহ্মীস্থিতি লাভ করিতে হইলে ঈশ্বরের জন্ম ও কৰ্ম্মরূপ তটস্থ-লক্ষণ তত্ত্বতঃ জানা উচিত। ইহাই ভক্তির সােপান। বিনা ভক্তিতে জ্ঞানলাভ হইতেই পারে না। যােগও ভক্তিপূর্বক করিতে হইবে। প্রাণ-সংযমন একটি প্রধান সাধনা। বহু প্রকারে পাণসংযম হয়। গীতা দ্বাদশ-প্রকার যােগের কথা বলিয়াছেন। কিন্তু দ্রব্য যজ্ঞ অপেক্ষা জ্ঞান যজ্ঞ শ্রেষ্ঠ, আবার সর্বাপেক্ষা জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ। নিষ্কামভাবে যজ্ঞাদি আচরণ করিতে করিতে ক্রম-অনুসারে জ্ঞানের উদয় হইয়া থাকে। “যােগ সংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি।” ১৮। যােগ না করিয়া যদি কেহ সন্ন্যাস গ্রহণ করে-আত্মসংস্থ হইতে না শিখিয়া যদি কেহ কৰ্ম্ম-ত্যাগ করে, সে নিতান্ত দুঃখ পায়—“সংন্যাসন্তু মহা- বাহাে দুঃখমাপ্তমযােগতঃ”। যােগীর কৰ্ম্ম কেবল আত্মশুদ্ধি জন্য। যিনি যােগ গ্রহণে ইচ্ছুক, তাঁহাকে গুরু-উপদেশে প্রাণ-সংযম করিতে হইবে। প্রাণ- সংযম দ্বারা ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি-কামের এই তিন দুর্গ জয় কূয়। যখন প্রাণ- সংযম অভ্যাস হইতেছে, মন প্রাণ-সংযমে স্থির হইতেছে, তখন যােগারূঢ়- অবস্থা। যােগারূঢ় হইলে মনকে শম অভ্যাস করাইতে হইবে। যােগারূঢ় হইলেই একান্তে আত্মসংস্থ হইতে অভ্যাস করিতে হইবে। ১৯। যােগী নির্জন পবিত্রস্থানে সর্বদা স্থির-সুখ আসনে কায়গ্রীবাদি সমান রাখিয়া যুক্তাহার-বিহারী হইয়া আত্মসংস্থ হইতে অভ্যাস করিবেন। আত্মসংস্থের সাধনা পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে—“সঙ্কল্প প্রভাবা” ইত্যাদি। যদি কোন সুকৃতিশালী পুরুষ মনকে একবার চিন্তা-শূন্য করিয়াই আপনার দ্রষ্টাস্বরূপ অনুভব করিতে পারেন—আমি দ্রষ্টা, মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় যাহা করে, তাহাতে আমার সুখদুঃখাদি নাই—প্রকৃতির কৰ্ম্মের সহিত আমার কোন সম্পর্ক নাই— এই দ্রষ্টা-স্বরূপে যদি কেহ স্থিতি লাভ করেন, তবে তাহার অন্য সাধনার ( ৭৯ ) আবশ্যকতা নাই। কিন্তু প্রায় সাধকের ইহা হয় না --হয় না বলিয়াই দ্রষ্টা- স্বরূপে দৃঢ়তা জন্য ভক্তি আবশ্যক। ২০। তপস্বী, পরােক্ষজ্ঞানী এবং কর্মী অপেক্ষা আত্মসংস্থােগী শ্রেষ্ঠ। কিন্তু যে যােগী শ্রদ্ধাপূৰ্ব্বক ঈশ্বর-ভজনা করেন, তাহাকেই যােগ্রি শ্রেষ্ঠ বলা যায়। আত্মসংস্থভাবে দৃঢ়তা না হওয়া পর্যন্ত যােগীর মন বিষয়ে আসিতে পারে। দৃঢ় ভাবে আত্মসংস্থ হইলেই মন আর বিষয়ে আইসে না। উভয়েই যােগী। যেরূপ অবস্থাই হউক না কেন, গীতা ভজনকারীকেই প্রাধান্য দিয়াছেন। যােগিনামপি সর্বেষাং মদগতেনান্তরাত্মন। শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যযা মাং সমে যুক্ত তমাে মতঃ। ২১। আত্মসংস্থতা ও ভক্তি এই দুইটি নিষ্কামকৰ্ম্মযােগের প্রকার ভেদু মাত্র। এইগুলি আত্মজ্ঞান-লাভের নিকটবর্তী উপায়। এতদ্ভিন্ন স্থূল ভাবে যে সমস্ত লৌকিক কৰ্ম্ম করা যায়, তাহাতে “তুমি প্রসন্ন হও” এই শ্রীকৃষ্ণার্পণ করিবার চেষ্টামাত্র করা হয়। এইটুকু নিষ্কামকৰ্ম্মযােগের সর্বনিম্ন অবস্থা। গীতায় শ্রীভগবান্ কৰ্ম্ম-অর্থে লৌকিক ও বৈদিক কৰ্ম্ম, উভয়কেই লক্ষ্য করিয়াছেন। “বৎকবােষি যদাসি” এই শ্লোক ইহার প্রমাণ। কিন্তু বৈদিক- কৰ্ম্মই গীতার মুখ্য কৰ্ম্ম। শ্রীভগবান্ বলিতেছেন—“ভূতভাবােদ্ভবকরো বিসর্গঃ কৰ্ম্মসংজ্ঞিতঃ”। (ভূতানাং ভবধৰ্ম্মকাণাং স্থাবর-জঙ্গনাং জরায়ুজাদীনাং ভাব উৎপত্তি উদ্ভবং বৃদ্ধিং চ করােতি যঃ বিসর্গঃ দেবােদ্দেশন ত্যাগঃ শাস্ত্রবিহিত যাগদান হােমাত্মক। আদিত্যাজ্জাতে বৃষ্টি বৃষ্টেরম্নংততঃপ্রজাঃ ইতি ক্রমেণ স ইহ কৰ্ম্মসংজ্ঞিতঃ কশনোেক্তঃ।) শাস্ত্রবিহিত যজ্ঞদানতপস্যাদ্বারা মনুষ্য দেবতাদিগকে ভাবনা করেন, তাঁহারাও বৃষ্টি অন্নাদি দ্বারা স্থাবর জঙ্গমাদির উৎপত্তির ও বৃদ্ধির কারণ হয়েন। মনুষ্যের যে সমস্ত বিসর্জনদ্বারা জীবের কল্যাণ সাধিত হয়, তাহাই কৰ্ম্ম। অষ্টাদশ অধ্যায়ে বলিতেছেন— “যজ্ঞদানতপঃকৰ্ম্ম ন ত্যাজ্যং কাৰ্য মেবতৎ। যজ্ঞাে দানং পশ্চৈব পাবনানি মনীষিণা” । এই সমস্ত কৰ্ম্ম এবং অন্যবিধ লৌকিক-কৰ্ম্মও যখন “তুমি সন্তুষ্ট হও” স্মরণ করিতে করিতে সম্পাদন করতে পারা যাইবে, তখনই উচ্চ উচ্চ সাধনায় অধিকার জন্মিরে। ।
( ৮০ ) ২২। যাঁহারা ক্রম ধরিয়া সাধনা করিতে করিতে আত্মসংস্থ হইতে পারি- তেছেন এবং ভক্তি-যােগে নিরন্তর ভগবদ্রস আস্বাদন দ্বারা আত্মসংস্থ-যােগে স্থিতি লাভ করিতেছেন, তাঁহাদের সকল কর্মই স্বভাবতঃ নিষ্কাম হইয়া যাইবে। যৎ করােষি যদশ্নাসি যজুহােষি দদাসি যৎ। যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎকুরুষ দর্পণম্ । এই সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম ভগবানে অর্পণ আত্মসংস্থ-যােগীর স্বাভাবিক। মুখের অভ্যাসে ইহা স্থায়ী হইতে পারে না—বিনা ভক্তিতে পরমপুরুষকে লাভ করা যায় না। গীতা বলিতেছেন— “পুরুষং স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যনন্যয়া।” ৮২২ কিন্তু তত্ত্বের সহিত তাহাকে জানা এবং তঁাহার স্বরূপানুভূতি ও তৎস্বরূপে স্থিতি জ্ঞানযােগেই সম্ভব। ২৩। ভক্তি যােগে যে উপাসনা তাহারও প্রকারভেদ আছে। ভক্তি- সাধকের মধ্যে কেহ কেহ তাহাকে অভেদ ভাবনায়, কেহ বা পৃথগ ভাবনায়, অন্য কেহ বহু-ভাবনায় তাহার উপাসনা করেন। “একত্বেন পৃথনে বহুধা বিশ্বততামুখ” ৯১৫। এইরূপ ভক্তি-যােগে উপাসনা করিতে করিতে বিশ্ব- রূপের জ্ঞান জন্মিবে। যখন সৰ্ব্ব-জীবে নারায়ণ-বােধ হইবে, তখনই উপাসনা শেষ হইল। যতই ভগবদ-বিভূতিতে দৃষ্টি পড়িবে, ততই উপাসনা পরিপক্ক হইবে। যােগি-ভক্তের মধ্যে কেহ বা বিশ্বরূপের উপাসক, কেহ বা অব্যক্তের উপাসক। অব্যক্তের উপাসক আপন সামর্থ্যে ঈশ্বর লাভ করেন, আর বিশ্বরূপের উপাসক ভগবৎ-সাহায্যে জ্ঞান লাভ করেন। ইহারা ভগবৎ-কৃপা লাভ করিয়া বুদ্ধিদ্বারা জীব ও ব্রহ্মের অভেদ-জ্ঞান লাভ করিতে সমর্থ, অন্যে নহে। গীতা নিষ্কামকৰ্ম্মসাধকের সাধনার উপসংহারে বলিতেছেন- যে তু সৰ্বাণি কৰ্ম্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎ পরাঃ। অনন্যেনৈব যােগেন মাং ধ্যায় উপিসতে। তেষামহং সমুদ্ধৰ্ত্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ। ভগবান্ আত্মাই ব্ৰহ্ম, ইহা নিশ্চয় বােধ হইলেই মৃত্যুসংসারসাগর অতিক্রম করা যায়। ইহারই উপায় যােগ, ভক্তি ও জ্ঞান। “মার্গাস্ত্রয়াে ময়া প্ৰােক্তাঃ পুর। মােক্ষাপ্তি সাধকাঃ ইহাও ভগবানের উক্তি। যােগ, ভক্তি এবং জ্ঞান ভিন্ন নিষ্কাম কৰ্ম্ম সিদ্ধ হয় না।
- ( ৮১ ) ২৪। যােগি-ভক্তের সাধন-ক্রম দেখাইয়া গীতা বলিতেছেন ময্যেৰ মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়। নিবসিষ্যসি ময্যেৰ অত উৰ্দ্ধং ন সংশয়ঃ । যদি আমাতে মন ও বুদ্ধি স্থির করিতে না পার- “অভ্যাসযােগেন ততাে মামিচ্ছাপ্তং ধনঞ্জয়”। বিশ্বরূপের ধ্যানাভ্যাসেও যদি অসমর্থ হও, তবে–“মৎ কৰ্ম্ম পরমাে ভব” অর্থাৎ আমাতে মন রাখিয়া কৰ্ম্মেন্দ্রিয় দ্বারা আমারই কৰ্ম্ম কর। যদি ইহাও না পার, তবে–“কর্ল্ডং মদ্যােগমাশিতঃ" অর্থাৎ আত্মসংস্থ-যােগ অভ্যাস কর। এই সমস্ত দ্বারা তোমার সৰ্ব্ব-কৰ্ম্ম-ফল-ত্যাগ হইবে। সৰ্ব্ব-কৰ্ম্ম-ফল-ত্যাগই কৰ্ম্ম- যােগের শেষ। এক স্থানে ঈশ্বরদর্শন ও সৰ্ব্বত্র ঈশ্বরদর্শন, ইহাই ভক্তিযােগর সিদ্ধাবস্থা। এই ভক্তিযােগের শেষফল জীব ও পরমাত্মার অভেদজ্ঞান। এই জন্যই গীতা অদ্বৈতামৃতবর্ষিণী। ২৫। জীব ও ব্রহ্মের এক তা-জ্ঞানই জীবন্মুক্তি। গীতা বিংশতিপ্রকার জ্ঞান-সাধনা দেখাইয়াছেন। এয়ােদশ-অধ্যায়ে ইহা বর্ণিত হইয়াছে। ব্রহ্ম- সাক্ষাৎকার জন্য যাহা আবশ্যক, তাহাও ১৮৫১-৫৫ শ্লোকে বলিয়াছেন। এই সমস্ত পুস্তক-মধ্যে যথাস্থানে আলােচিত হইয়াছে, আমরা সংক্ষেপে কৰ্ম্ম সঙ্কেতের উপসংহার করিয়া এই প্রবন্ধ শেষ করিতেছি- ২৬। সৎসঙ্গ ও সংশাস্ত্র আশ্রয় না করলে কৰ্ম্মে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিবে না। বিনা কৰ্ম্মে বিষয়ের স্থায়ী অনুভব হইবে না। তাহার অনুভব বিনা ভজন হইবে না। বিনা ভক্তিতে “তুমি আমার কে” ইহার অনুভব হইতে পারে না। গুণাতীত না হওয়া পর্যন্ত জীব ও ব্রহ্মের একত্ব অনুভব হইতে পারে । না। এই গুণাতীতঅবস্থা-লাভ জন্য রজঃ ও তমকে প্রতিহত করিতে হইবে এবং নিত্য-সত্বস্থ হইতে হইবে। যােগ ও ভক্তি পথে নিষ্কামকৰ্ম্ম দ্বারা ইহা সাধিত হয়। ইহার পরে অব্যভিচারিভক্তিযােগে গুণাতীত হইতে হইবে। এই অবস্থায় জ্ঞানলাভ হইবে। জ্ঞানেই জীবন্মুক্তি। আরও সহজে গীতার ক্রম উল্লেখ করা যাইতেছে—নিষ্কাম-কৰ্ম্ম দ্বারা প্রথম কৰ্ম্মজা সিদ্ধি লাভ করিতে হইবে, দ্বিতীয় অবস্থায় একান্তে নৈৰ্মসিদ্ধি। এই অবস্থায় ক্রমে ক্রমে পরাভক্তি ও পরম জ্ঞান। জ্ঞানেই মুক্তি। গীতার লক্ষ্য ও কৰ্ম্ম বলা হইল। কিন্তু এত কথা বলিয়াও যেন তৃপ্তি • = ১১ ৮২ ) জীব যখন নাই। কি জানি কি এক অপুর্ব ভাব গীতা-মধ্যে সন্নিবিষ্ট আছে, যাহা শত প্রকারে প্রকাশ করিবার চেষ্টা করিলেও যেন প্রকাশ করা যায় না।' ভগবান্ সত্যই বলিয়াছেন—“গীতা মে হৃদয়ং পার্থ"। এত সূক্ষ্ম এই হৃদয়, এত বিশাল এই ভগবদ হৃদয়, কিছুতেই যেন ইহা ধরা দেয় না। ধরা দেয় অথচ যেন ধরা হইল না বলিয়া বােধ হয়। ভগবানের কৃপা না হইলে ভগবানকে ধরা যায়না। গীতাতে যােগ, ভক্তি ও জ্ঞান-সমস্ত সাধনার কথা থাকিলেও গীতাকে ভক্তি-গ্রন্থ বলাই সঙ্গত। ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ কর -ইহাই গীতার শেষ উপদেশ। ভগবান, জীব ও চিত্ত—এই তিন লইয়া জগৎ। সর্বদা আপন চিত্তের দ্রষ্টা স্বরূপে অবস্থান করিতে পারে, তখনই জীবন্মুক্ত হয়, তখনই আপন স্বরূপে অবস্থান করে, তখনই জীবাত্মা পরমাত্মার মিলন হয়। জীব কোন কোন অবস্থায় আপন চিত্তের দ্রষ্টা থাকিতে পারে, ইহা অনুভব করা যায়। কিন্তু কাম-ক্রোধাদি রিপুর আক্রমণে, নিদ্রাক্ষুধাদির সম্মোহনে অভিভূত হইয়া দ্রষ্টাম্বরূপে অবস্থান করিতে পারে না। সেই জন্য জীব ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করুক। ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া সাধনা করিতে করিতে ভগবানের সহিত এক হইতে পারিবে। প্রাণস্পন্দন- রােধ যােগের শেষ কথা। যােগ নিতান্ত কঠিন। সকল লােকে ইহা পারে না। মহাভারতে এবং যােগবাশিষ্ঠে প্রাণস্পন্দনরােধ কত দূর কঠিন, তাহা পুনঃ পুনঃ উল্লেখ করা হইয়াছে। সাংখ্যজ্ঞান নিতান্ত দুরূহ। আমি ব্ৰহ্ম’ মুখে বলা সহজ, কিন্তু যখনই আমি বলি—আমি সচ্চিদানন্দ, তখনই দেখিলে বুনিতে পারা যায়, যে কতটুকু জ্ঞান আমার আছে, কতটুকু আনন্দ আমার সম্বল। পরম কারুণিক শ্রীভগবান্ এই জন্য গীতাতে ভক্তিপথ অবলম্বন করিতে বলিতেছেন। ভক্তি আশ্রয় করিয়া যােগ ও জ্ঞান সাধনা কর। জীব আপন চিত্তের দ্রষ্টারূপে থাকিতে পারে না বলিয়া সৰ্ব্বদ। ভগবানের নাম উচ্চারণ করিয়া উপাসনা করুক, প্রার্থনা করুক, তাঁহার সাহায্যে আত্মার বিচার করুক। তিনিই কৃপা করিয়া উদ্ধার করিবেন, ইহাই তঁাহার আশ্বাস-বাণী।
ষষ্ঠ কথা। গীতার স্থান, কাল ও পাত্র। স্থান, কাল ও পাত্র কাব্য সম্বন্ধেই আলােচিত হইয়া থাকে। গীতা কি কাব্য? যদিও গীতা ধর্মগ্রন্থ, যদিও গীতা সৰ্ব্ব-উপনিষদের সার, যদিও গীতা সৰ্ব্বশাস্ত্রময়ী, তথাপি ইহার প্রথম অধ্যায়ে কাবের সমৃদ্ধ উপাদান দৃষ্ট হয়। পূজনীয় গীতা-রহস্যকার বলেন—“কাব্যাংশে ভগবদ্গীতা ভূতলে অতুল। স্থান, কাল ও পাত্র সম্বন্ধে এরূপ সমৃদ্ধ কাব্য আর কোথায় ? প্রথমেই স্থান-সম্বন্ধে আলােচনা করা যাউক। গীতার উৎপত্তিস্থান কুরুক্ষেত্রের মহাসমর-ক্ষেত্র। স্বচক্ষে দেখিয়া আইস - কি এক মহাশ্মশান এই কুরুক্ষেত্র ! কি এক দুর্বিষহ বিষাদগীতি এইস্থানে নিরন্তর গীত হইতেছে। আজিও এই কুরুক্ষেত্রের যেদিকে অবলােকন করিবে, সর্বত্রই দেখিবে বিনাশ- চিঃ। প্রাচীন বৃক্ষ প্রাচীন কুণ্ডতড়াগাদির কথা ছাড়িয়া দাও, নূতন যাহা কিছু হইতেছে, তাহাও যেন অক্ষুন্ন থাকে না। সমর-ক্ষেত্রে যে সমস্ত লতা- গুলাদি জন্মিয়াছে, দেখিলে বােধ হয়, যেন রুধির হইতেই ইহারা উৎপন্ন। এই স্থানেই ভগবান্ পরশুরাম একবিংশতি বার ক্ষত্রিয়শােণিতে পৃথিবীকে রুধিরাক্ত করিয়াছিলেন। যে শােণিতময় পঞ্চদে তিনি পিতৃলােকের তর্পণ করিয়াছিলেন এখনও সেই পঞ্চহ্রদ পুরাকালের ইতিহাস প্রচার করিতেছে। এখনও সমন্তপঞ্চকে কত লােক প্রতিবৎসর মানার্থে গমন করে। কাল- পুরুষ কর্তৃক তাড়িত হইয়া আজ অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা কুরুক্ষেত্রে সমবেত হইয়াছে। সম্মুখে রণ-নদ—এই রণ-নদীর বর্ণনা সুন্দর । ভীষ্ম-দ্রোণ-তটা জয়দ্রথ-জলা গান্ধার-নীলােৎপলা শল্য গ্রাহবতী কৃপেণ বহনী কর্ণেন বেলাকুলা। অশ্বথাম-বিকর্ণ-ঘােরমকরা দুৰ্য্যোধনাবৰ্ত্তিনী সােত্তীর্ণ খলু পাণ্ডবৈ রণ-নদী কৈবৰ্ত্তকঃ কেশবঃ। অত্যুচ্চ তটশালিনী সমরনদী দু’কুল প্লাবিত করিয়া ছুটিয়াছে। এই খ- হােতার জলে কোথাও প্রচণ্ড আবৰ্ত্ত; কোথাও ভয়ঙ্কর মকর কুন্তীর, কোথাও ( ৪ ) বা সুন্দর নীলােৎপল ! ভীষ্ম দ্ৰোণ ইহার তটভূমি, জয়দ্রথ ইহার জলরাশি, দুৰ্য্যোধন প্রচণ্ড আবর্ত, শল্য কুম্ভীর, কৃপ বহনী, কর্ণ বেলাভূমি, অশ্বত্থামা ও বিকর্ণ ঘােয় মকর । পাণ্ডবদিগকে এই রণ-নদীর পরপারে যাইতে হইবে । স্বয়ং কেশব ইহার কৈবৰ্ত্ত। সমষ্টি ভাবে যে ভগবৎ-সাগরে এই রণ নদী মিশিয়াছে, বিশ্বরূপ দেখাইবার সময়ে যাহা ভগবান্ ভক্তকে দেখাইয়াছেন, সেই ভগবান্ ব্যষ্টিভাবে পাণ্ডব-তরণীর কর্ণধাররূপে আজ আপন জলে আপনি ক্রীড়া করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন। জীবপুঞ্জকে তাড়িত করিয়া এই ভীষণ কুরুক্ষেত্রে আনয়ন করিয়াছেন। তাই বলিতেছিলাম—কুরুক্ষেত্রের মত ভীষণ সমরক্ষেত্র আর কোথায় ? তাহার পর গীতার কাল ? প্রবল ঝটিকার পূর্ব মুহূর্তে প্রকৃতি কত শান্ত, অনুভব কর ? নারায়ণ বিনাশ-কামনায় সমবেত নরপুঞ্জ নিরীক্ষণ করিতেছেন- আপন বিকৃত অঙ্গ আপনি ছেদন করিবেন, তাই আপনাকে আপনি অবলােকন করিতেছেন। এখনই রুধির-স্রোত প্রবাহিত হইবে, সমবেত জনসঘ বিনষ্ট হইবে, পৃথিবীর পাপভার দূর হইবে, ভারতরমণীর হাহাকারে দিগন্ত প্রত ধ্বনিত হইবে। এখনও কিন্তু সসৈন্য সমবেত রাজধ্যমগুলী স্থির, এখনও পরস্পর বিধ্বংসকারী দুই মহাসমুদ্র স্তম্ভিত-- মহাসমুদ্রে একটিও তরঙ্গ ভঙ্গ দৃষ্ট হইতেছে না। বিদ্যু বজ্র-পরিপূরিত দুই প্রলয় মেঘ পরস্পর পরস্পরকে দেখিতেছে। গভীর গর্জন এখনও পরস্পর পরস্পরের উপর ভাঙ্গিয়া পড়ে নাই। এখনও বিদ্বজ্রাঘাতের সহিত দুঃসহ বারিবর্ষণ আরম্ভ হয় নাই। প্রতি বীর হৃদয়ে অগ্নি জ্বলিতেছে। অচিরে এই সমরাগ্নি সমস্ত জীবপুঞ্জ দগ্ধ করিবে। অচিরেই সমরাঙ্গন রুধিরাপ্লুত হইবে। রুধিরাপ্লত কুরুক্ষেত্র প্রলয়কালের অনল-গােলকবৎ পৃথিবী মত প্রতীয়মান হইবে। এই লােক- ক্ষয়কর মহাযুদ্ধান্তের অব্যবহিত পূৰ্বে গীতা উপদিষ্ট হইয়াছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে গীতা উপদেশ সম্ভব কি অসম্ভব, ইহার বিচার পুস্তক মধ্যে করা হইয়াছে। এক্ষণে আমরা পাত্রের বিষয় আলোচনা করিব। ইহার আলােচনা বিশেষ ভাবেই করা উচিত। কারণ গীতার কাব্যাংশ মনন করিতে পারিলে। ভগবান্ ও অর্জুনের ব্যবহার হৃদয় মধ্যে অঙ্কিত করিতে পারিলে, সহজেই লয়- বিক্ষেপের হস্ত হইতে অব্যাহতি পাওয়া যায়—সহজে চিত্তশুদ্ধি লাভ করা যায়। আমরা প্রথমেই দেখি মদ্যুময় মহারাজ দুৰ্য্যোধন রণসজ্জা করিয়া সসৈন্যে কুরুক্ষেত্ৰ-মুখে সাজিয়া চলিলেন। সৈন্যসংখ্যা একাদশ-অক্ষৌহিণী।
( ৮৫ ) জৈমিনি ভারতে অক্ষৌহিণীর একটি সহজ তালিকা প্রদত্ত হইয়াছে। দশসহস্র হক্বীর প্রত্যেকটি রক্ষা জন্য একশত করিয়া রথ, প্রত্যেক রথ রক্ষা জন্য একশত করিয়া অশ্ব, প্রত্যেক অশ্ব রক্ষা জন্য একশত করিয়া পাদাতিক ইহাই অক্ষৌহিণীর স্কুল হিসাব। যে মণ্ডলাকার স্থানে যুদ্ধ হইয়াছিল, তাহার পরিমাণ পঞ্চ-যােজন অর্থাৎ বিশ ক্রোশ। উপস্থিত সময়ে যে স্থান টুকুকে কুরুক্ষেত্র বলে, সে স্থানে অষ্টাদশ-অক্ষৌহিণী সৈন্য সঙ্কুলান হয় না সত্য, কিন্তু যাহারা মহাভারত দেখিয়াছেন, তাহারা জানেন--পঞ্জাব প্রদেশের দূর দূরবর্তী স্থান জুড়িয়া এই সৈন্য সামন্ত অবস্থান করিয়াছিল। আমরা গীতা পূৰ্বাধ্যায়ে এই সমস্ত স্থান উল্লেখ করিয়াছি। আরও এক কথা—সমস্ত সৈন্য এককালে যুদ্ধ করে নাই, ভিন্ন ভিন্ন সেনানায়ক আপন আপন সৈন্য লইয়া ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সমরাঙ্গনে আসিতেছিলেন, ইহাও মহাভারতে উল্লেখ আছে। যাহা হউক একাদশ-অক্ষৌহিণী সৈন্য লইয়া দুর্যোধন কুরুক্ষেত্রের দক্ষিণ-পশ্চিম বিভাগে সেনানিবেশ সংস্থাপন করিলেন, আর পাণ্ডবের উত্তর-পূৰ্ব্বদিকে সপ্ত- অক্ষৌহিণী সৈন্য লইয়া যুদ্ধার্থ প্রস্তুত রহিলেন। মনে মনে গীতার এই প্রথম দৃশ্য অঙ্কিত কর, শরীর রােমাঞ্চিত হইবে। সম্মুখে বিস্তীর্ণ কুরুক্ষেত্র প্রান্তর। এই বিশাল কুরুক্ষেত্রে অগণিত কুরুসৈন্য যুদ্ধাৰ্থ সুসজ্জিত, কোথাও আর স্থান নাই। দ্বাপরযুগের প্রায় সমস্ত রাজন্যবর্গ এখানে পরিলক্ষিত হইতেছে, সঞ্জয় স্বচক্ষে যাহা দেখিয়া আসিয়াছিলেন, এবং দিব্য-চক্ষুতে যাহা দেখিয়াছিলেন, ধৃতরাষ্ট্রকে তাহারই সংবাদ দিতেছিলেন, বলিতেছিলেন—রাজ! ঐ দেখ, সসাগরা ধরণীর অধীশ্বর হইয়াও মহামানী রাজা দুর্যোধন রাজবেশে পদব্রজে আচার্যের নিকট গমন করিতেছেন। দ্রুত গমনে নানারত্ন-বিজড়িত শির- তাজ রাজমন্তকে কম্পিত হইতেছে। আজ পাণ্ডব-সৈন্য দেখিয়া নিজ- মৰ্য্যাদা ভুলিয়াছেন, সেনাপতিকে না ডাকাইয়া নিজেই দৌড়িয়া যাইতেছেন। ঐ দেখ, রাজনীতি-কুশল মহারাজ নিজের ভীতি সঙ্গোপন করিয়া সংক্ষিপ্ত অথচ বহু-অর্থযুক্ত বাক্যে আচাৰ্য্যকে অঙ্গুলি তুলিয়া পাণ্ডব-সৈন্য দেখা ইতেছেন। বলিতেছেন, হে গুরা ! ঐ দেখুন, আপনার শিষ্য ধীমান্ দ্রুপদ- পুত্র-বিরচিত পাণ্ডব-চম্ কিরূপে সজ্জীকৃত হইয়াছে। গুরুর ক্রোধােদ্রেক করাই দুৰ্যোধনের উদ্দেশ্য। (ধৃষ্টদ্যুম্ন শিষ হইয়াও গুরুর বধােপায় কৌশলে জানিয়া লইয়াছে। এক্ষণে সেমাপতিত্ব গ্রহণ করিয়া বিনাশার্থ আসিয়াছে ) আরও দেখুন, এই সৈন্যমধ্যে শুর, বাণক্ষেপকুশল যুদ্ধে ভীমার্জুন তুল্য মহারণ যুযুধান, বিরাট, দ্রুপদ, ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, কাশীরাজ, বীৰ্য্যবান্ পুরুজিৎ, কুন্তিভােজ, নরশ্রেষ্ঠ শৈব্য, বিক্রমশালী যুধাম, বীৰ্য্যবান্, উত্তমৌজা, সুভদ্রাপুর অভিমন্যু, এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ, ইহারা সকলেই মহারথ। শস্ত্র শাস্ত্র-প্রবীণ-মহারথ একাকী দশসহস্র ধনুর্ধারীর সহিত যুদ্ধে সমর্থ, এতদ্ভিন্ন শত শত অতিরথ, লক্ষ লক্ষ রথী ও অদ্ধরথ রহিয়াছে। পাণ্ডব-সৈন্ত দেখাইতে দেখাইতে দুর্যোধনের মনে ভীতির সঞ্চার হইয়াছে। বিশেষ ভিতরে অন্যায় আছে। রাজা অন্তভীতি আচ্ছাদন করিয়া অপনাকে আশ্বস্ত করিবার জন্য তখন আপন পক্ষের প্রধান প্রধান সেনানায়ক দিগের নামােল্লেখ করিতে লাগিলেন, বলিলেন—আমার পক্ষেও আপনি, ভীষ্ম, কর্ণ, যুদ্ধবিজয়ী কৃপ, অশ্বত্থামা বিকর্ণ, সােমদত্ত-পুত্র ভূবিশ্রবাঃ এবং রাজা জয়দ্রথ আরও অনেক অনেক বীর আমার জন্য জীবনত্যাগে কৃতনিশ্চয় হইয়াছেন ; ইহারা সকলেই অস্ত্রধারী ও যুদ্ধ-বিশারদ। আমাদের সৈন্য ভীয় কর্তৃক রক্ষিত এবং অপৰ্যাপ্ত। আপনারা সকলে স্ব স্ব বিভাগ অনুসারে ব্যুহ রচনা করিয়া ভীষ্মকে সর্ব প্রকারে রক্ষা করুন। ভীষ্ম যখন শত্রুর সহিত যুদ্ধ করিবেন, তখন যেন অন্যদিক হইতে কোন শত্রু তাঁহাকে আক্রমণ করিতে পারে। দুৰ্য্যোধন নানা কথা কহিলেন, কিন্তু আচাৰ্য কোন কথার উত্তর দিলেন না। দূর হইতে পিতামহ,দুৰ্য্যোধনকে লক্ষ্য করিতেছিলেন, দুর্যোধনের মনের অবস্থা বুঝিলেন, ভীষ্ম বহুদর্শী ও প্রবীণ ; ভীষ্ম পিতামহ—দ্রোণ-অপেক্ষা আত্ম- জন। ভয়ভীত দুর্যোধনের উৎসাহ জন্য তিনি শঙ্খধ্বনি করিলেন, তখন শত শত শঙ্খ, ভেরী, মাদল, পটই, গােমুখ প্রভৃতি রণবাদ্য একেবারে বাজিয়া উঠিল, তুমুল শব্দে আকাশ ও রণভূমি পরিপূরিত হইল। পুস্তক বন্ধ করিয়া এই দৃশ্য স্মরণ কর। একবার দু'টি চক্ষু উন্মীলন কর, আবার দেখ কি সুন্দর-দেখ শ্বেতাশ্বযুক্ত মহারথাসীন কৃষ্ণাৰ্জ্জুন আপন আপন শঙ্খধ্বনি করিতেছেন, শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চ জন্যের সহিত পঞ্চ পাণ্ডবের শঙ্খ নিনাদিত হইল, দ্রুপদাদি নরপতিগণ পৃথক পৃথক্ শঙ্খ বাদন করিলেন। অতিভৈরব সেই শঙ্খধ্বনি পৃথিবী ও আকাশ তুমুল করিয়া তুলিল, এবং পাৰ্তরাষ্ট্রগণের হৃদয় যেন বিদীর্ণ করিতে লাগিল। ক্রমে রণবাদী মন্দীভূত হইল, আবার সেই অগণিত সৈন্য অবৃষ্টিসংরম্ভ অম্বুবাহের ন্যায়, অনুত্তরঙ্গ জলরাশির ন্যায় গম্ভীর, হইল, গীতার দ্বিতীয় দৃশ্যে ( ৮৭ ) স্বতন্ত্র অভিনয় অনুভব কর। উৎকট শঙ্খনিনাদে কেহই রণে ভঙ্গ দিল না, বরং স্পৰ্দাসই দণ্ডায়মান রহিল। সমর-কেশরী অর্জন ক্রুদ্ধ ! বারণাবতের ভীষণ কু-অভিসন্ধি, দূতক্রীড়ার নৃশংস কপটাচাৰ, দ্রৌপদী- বস্ত্রহরণের দারুণ অপমান, অজ্ঞাতবাসের বিজাতীয় ক্লেশ সেই ক্রোধাগ্নিতে ফুৎকার দিতেছে। অর্জুন গাণ্ডীব উত্তোলন করিয়াছেন –অস্ত্র নিক্ষেপ করিবেন, সহসা অন্য বাসনা জাগিল। প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে ধনুরুদ্যম পাণ্ডব। হৃষীকেশং তদা বাক্য মিদমাহ মহীপতে ॥ অর্জুন সমরার্থে অবস্থিত রাজন্যবর্গকে দেখিতে চাহিলেন, হৃষীকেশকে বলিলেন হে অচ্যুত ! যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি যুদ্ধকামী, দুর্বুদ্ধি দুৰ্য্যোধনের হিতাকাঙ্ক্ষী এই নরপতি সমূহকে নিরীক্ষণ করি, তাবৎ কাল তুমি উভয়- সেনার মধ্যে রথ স্থাপন কর। শ্রীভগবান্ তাহাই করিলেন। দেখিতে দেখিতে রথ উভয়সেনার মধ্যস্থলে আনীত হইল। অর্জুন দেখিতেছেন—আত্মীয়, স্বজন, পিতৃব্য, পিতামহ, আচাৰ্য, মাতুল ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, সখা, শ্বশুর—সকলেই যুদ্ধার্থ সমবেত। সহসা মনের গতি পরিবর্তিত হইল—ক্রোধ দূরে গেল, আসিল নিৰ্ব্বেদ। এই অর্জুন-চরিত্রে আমাদের প্রয়াে- জন। সত্যকথা, অর্জুনের মত বাহুবল আমাদের নাই, অর্জুনের মত শূরত্ব আর কোথাও দৃষ্টিগােচর হয় না, অর্জুনের মত শাস্ত্র-মৰ্য্যাদা, অর্জুনের মত গুরু- মৰ্যাদা, অর্জুনেরত লােক মর্যাদা আর আমরা দেখিতে পাই না। তথাপি যখন দেখি, এই মহান চরিত্র প্রবল উৎসাহেকৰ্ম্মক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া কৰ্ত্তব্যের নিষ্ঠুরতা অনুভব করিয়া আমাদের মত চিত্তের দুর্বলতা দেখাইতেছেন, যখন দেখি কর্তব্যের গুরুভারে নিষ্পেষিত হইয়া-শােক-মােহ'চ্ছন্ন হইলে আমাদের যাহা হয়—অর্জুনের তাহাই হইতেছে, তখন অৰ্জ্জুনকে আমাদের মত ভাবিয়া অর্জনের সহিত সহানুভূতি দেখাইতে আমরা প্রস্তুত হই। বড় ব্যগ্র হইয়া শুনিতে চাই, অৰ্জ্জন কি বলিতেছেন ? অর্জন বলিতেছে দৃষ্টে মান্ স্বজনা কৃষ্ণ যুযুৎসূন্ সমবস্থিত । মুখঞ্চ পরিশুষ্যতি । বেপথুশ্চ শরীরে মে রােমহর্ষশ্চ জায়তে। গাণ্ডীবং এংসতে হস্তাৎ চৈধ পরিদহতে । সীদন্তি মমগাত্রাণি ( ৮৮ ) বলিতেছেন—হে কৃষ্ণ! হে কেশব! এই সমস্ত স্বজনকে যুদ্ধ করিতে আসিতে দেখিয়া আমার অঙ্গ অবসন্ন হইতেছে, শরীর কম্পিত হইতেছে, মেহর্ষ হই, তেছে, হস্ত হইতে গাণ্ডীব স্বলিত হইতেছে এবং ত্বক্ দগ্ধ হইয়া যাইতেছে। আমি আর অবস্থান করিতে পারিতেছি না, আমার মন বিঘূর্ণিত হইতেছে, নানাপ্রকার অমঙ্গল দেখিতেছি--অর্জুনের বিষাদ-শান্তির জন্য ভগবান্ ব্রাহ্মী- স্থিতি উপদেশ প্রদান করিলেন। ভগবান্ শঙ্কর ব্রাহ্মীস্থিতি—অর্থে বলিতেছেন “ব্ৰহ্মণি ভবেয়ং স্থিতিঃ, সৰ্ব্বকৰ্ম্ম সংস্য ব্ৰহ্মরূপেণৈবাবস্থানমিত্যেৎ” অর্থাৎ সৰ্ব্বকৰ্ম্ম সন্ন্যাসপূৰ্ব্বক ব্ৰহ্মরূপে অবস্থানের নাম , ব্রাহ্মীস্থিতি। ব্রাহ্মীস্থিতি, ব্ৰহ্মনিৰ্বাণ, আত্মজ্ঞান ইত্যাদি একই কথা। ব্রাহ্মীস্থিতি ভিন্ন শােকের চির- নিবৃত্তি হইতে পারে না। অন্য অন্য উপায়ে শােক দুঃখের ক্ষণিক নিবৃত্তি হইতে পরে সত্য, কিন্তু ক্ষণিক-নিবৃত্তি জন্য বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি ব্যাকুল নহেন। কারণ গুরুকৰ্ত্তব্যপালনে লঘুকর্তব্যের সুখ অবশ্যই লাভ হয়। আত্যন্তিক নিবৃত্তিই একমাত্র প্রয়ােজন। সাংখ্য-শাস্ত্রে এই আত্যন্তিক নিবৃত্তিই লক্ষ্য, যােগশাস্ত্রে এই আত্যন্তিক নিবৃত্তির উপায়, চিত্তবৃত্তি নিরোধ করিয়া দ্রষ্টার স্বরূপে অবস্থান বেদান্তে ইহারই জন্য ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসা। গীতা দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্রাহ্মীস্থিতির স্বরূপ কি, বুঝাইয়াছেন এবং বাকী অধ্যায়গুলি এই স্থিতি কিরূপে লাভ হইবে, তজ্জন্য সাধনার ক্রম দেখাইয়াছেন। আমরা অতিসংক্ষেপে গীতােক্ত ব্রাহ্মীস্থিতি বা মুক্তির আলােচনা করিব। গীতার প্রথম অধ্যায়ে বিষাদ যােগ, শেষ-অধ্যায়ে মােক্ষ যােগ। যেখানে অৰ্জন দুঃখ করিতেছিলেন -আত্মীয়স্বজন মরিবে, সেইখানে ভগবান্ বলিতেছেন—“আত্মার মৃত্যু নাই”। এই সমস্ত ব্যক্তির আত্ম।” অজর অমর। ন জায়তে মিয়তে বা কদাচিৎ, নায়ং ভূত্ব। ভবিতা বা ন ভূয়ঃ। অজানিত্যঃ শাশ্বতােহয়ং পুরাণে ন হন্যতে হন্যমানেশরীরে। জীবের আত্মা শরীর নষ্ট হইলেও মরে না। এই আত্মার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই। বালক যােদ্ধা প্রসিদ্ধ বীরপুরুষদিগের নিকট অস্ত্ৰপরীক্ষা দিতে গিয়া যেরূপ কম্পিত হয়, বালক বক্তা জগন্মান্য পণ্ডিতমণ্ডলী-মধ্যে প্রথম মুখ ‘খুলিবার সময় যেরূপ ঘর্মাক্ত-কলেবর হয়, শুষ্ক-মুখে আপন হৃদয়ে যেরূপ • গুরুতর ঘাত-প্রতিঘাত উপলব্ধি করে, অর্জনের । ততােধিকহইতেছে, অথচ ( ৮৯ ) অর্জুন বিশ্ববিজয়ী মহাপুরুষ। কিরাতরূপী ভগবান্ পিনাকপাণি এই অর্জনের পরাক্রমে রিতুষ্ট হইয়া বলিয়াছিলেন-- ভো ভো ফাল্গুন তুষ্টোহস্মি কৰ্ম্মণহপ্রতিমেন তে। শৌর্যেপানেন ধৃত্যা চ ক্ষত্রিয়াে নাস্তি তে সমঃ। হে অর্জুন! তােমার কৰ্ম্মে বড়ই তুষ্ট হইলাম, ধূতি ও শোৰ্যে তােমার মত ক্ষত্রিয় আর নাই। যখন কুরুক্ষেত্ৰযুদ্ধের অব্যবহিতপূর্বে এই অর্জুন বিরাট-রাজকুমার উত্তরের সারথ্য করিয়াছিলেন, যখন উত্তর ভীত হইয়া ক্লীব বৃহন্নলার ভীতি উৎপাদন জন্য পুনঃ পুনঃ কৌরবসৈন্য দেখাইতেছিলেন, পুনঃ পুনঃ ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্যাদি কুরুবীরগণের নামােল্লেখ করিতেছিলেন, আর বলিতেছিলেন- তুমি একাকী, কিরূপে এই প্রবল পরাক্রান্ত মহারথগণের সহিত যুদ্ধ করিবে, তখন যে অৰ্জ্জুন সগর্ধ্বে বিরাট-পুত্রকে উত্তর করিয়াছিলেন “উত্তর! যখন দ্রৌপদী-স্বয়ম্বরে লক্ষাধিক নরপতি আমার আক্রমণ করিয়াছিল, তখন আমি একাকে তখন আমার সহায় হইয়াছিল? যখন কালান্তক যমতুল্য অগণিত নিবাতকবচগণের সহিত আমি যুদ্ধ করিয়াছিলাম, কে তখন আমার সাহায্যার্থ আসিয়াছিল? যে অৰ্জ্জুন ঐ সময়ে উত্তরকে সারথি করিয়া বহুবার ভীষ্ম- দ্রোণাদি মহারথকে পরাস্ত করিয়াছিলেন, দুর্যোধনাদির প্রাণসংহারে সমর্থ হইয়াও যিনি সম্মােহন-অস্ত্রে কৌরব-শদিগকে মূচ্ছিত মাত্র করিয়াছিলেন, প্রাণসংহার করেন নাই, সেই অৰ্জ্জুন আজ বলিতেছেন- “নচ শক্লোম্যবস্থাতুং ভ্ৰমতীৰ চ মে মনঃ।” হে কৃষ্ণ! হে অচ্যুত ! আমি আর অবস্থান করিতে পারিতেছি না, আমার মন ঘূর্ণিত হইতেছে-বলিতেছেন- “ন কাঙেক্ষ বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ। কিং নাে.রাজ্যেন গােবিন্দ কিং ভােগৈ জীবিতেন বা ।” কৃষ্ণ! আমি রাজ্যও চাহিনা, ভােগও চাহি না, জীবনেও আমার প্রয়ােজন নাই। অৰ্জ্জুন মহাপুরুষ। মহাপুরুষও সাধারণের মত কাতরােক্তি করেন। সাধারণে আশান্বিত হয়, অর্জুনকে আপনাদের মত মনে করে। তথাপি অর্জুনের সহিত সাধারণের কোন বিশেষ সাদৃশ্য নাই। অর্জুন মহাপুরুষ, তাহারা কাপুরুষ। জীবন-গ্রামে ভীত হইয়া লােকে শতবার বলে “আর পারি না”, “মৃত্যু হইলেই ভাল হয়” অৰ্জ্জুন কিন্তু “পারি না” বলিতেছেন না, - ( ৯০ ) বলিতেছেন “বুদ্ধ করিব না” কারণ যুদ্ধ করা নিষ্ঠুরের কাৰ্য, আমি নিষ্ঠুর হইতে চাহি না। ক্লেশের ভয়ে বা প্রাণের ভয়ে কিন্তু অর্জুন যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইতেছেন না, হইতেছেন করুণায়—পাছে অপরের জীবন নষ্ট হয় এই জন্য-কিরূপে গুরুকে শরদ্বারা বিদ্ধ করিবেন, কিরূপে পিতামহকে অস্ত্রা- ঘাত করিবেন, এই জন্য। ভীষ্ম ও দ্রোণের কথা অৰ্জ্জুন একাধিক বার উল্লেখ করিয়াছেন। যে পিতামহের ক্রোড়দেশে উপবেশন করিয়া পিতৃহীন বালক পিতামহকে পিতা সম্বােধন করিত, আর ভীষ্ম সজলনয়নে বালকের ভ্রম সংশােধন করিয়া দিতেন, আজ যাহাকে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করিতে ইচ্ছা করে, তাহাকে বিনাশ করিব কিরূপে? অর্জুন এই জন্য শশাকে কাতর। যে আচাৰ্য অর্জুনকে সর্বপ্রধান করিবার জন্য অশ্বত্থামাকেও গােপন করিয়া অস্ত্রশিক্ষা দিয়াছিলেন—যে আচাৰ্য অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী কেহ না থাকে, এই eid একলব্যের নিকটে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই গুরুকে প্রাণে বিনাশ করিতে হইবে—অর্জুন কৃপা-পরবশ হইয়া যুদ্ধ হইতে প্রতি- নিবৃত্ত হইতেছেন। তুমি কি এই কৃপাবেশে আবিষ্ট হইয়া কৰ্ম্ম করিয়া থাক ? তুমি কি মনে ভাব—এই ধন তুমি গ্রহণ করিবে না, কারণ তুমি গ্রহণ করিলে অপর প্রতিদ্বন্দ্বীর মনঃপীড়া হইবে, অতএব গ্রহণ করা উচিত নহে—ইহা কি লােকের উক্তি? তাই বলিতেছিলাম কিছু পার্থক্য আছে। অর্জুনের বিষাদ অস্বাভাবিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করিবার জন্য বন্ধুবিনাশ প্রভৃতি হইতে উৎপন্ন হয় নাই, এ বিষাদের মূলে পাপ নাই, আছে গুরু বা আচাৰ্য্য বিনাশ- ভয়। যাহা হউক এই বিশ্ববিজয়ী মহাপুরুষ আজ যুদ্ধাস্ত্র ত্যাগ করিয়া দীন- ভাবে দণ্ডায়মান, যাঁহার সব্যসাচিত্বে দেবাসুরে কেহই তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইতে ও সাহস পাইত না, যিনি শৌর্যে সুরােন্মাদিনী উর্বশীকেও তুচ্ছ করিয়াছিলেন, এই শূর এই বীর আজ অত্যাগে উদ্যত হইয়া আর অস্ত্রত্যাগ করিলেন না অস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া কাতরে যােড়-করে দাঁড়াইয়াছেন, এই লােকয়কর সমর প্রারম্ভে তাঁহার হৃদয় করুণায় পূর্ণ হইয়াছে, যুদ্ধ ত্যাগ করিয়া আজ তিনি ভিক্ষাবৃত্তিগ্রহণে প্রস্তুত হইয়াছেন, আর সর্ব-লােক-মহেশ্বর, তরণীর কর্ণধার, দীনের বন্ধু, তাপিতের আশ্রয়, বিপন্নের মধুসূদন, এই কাতর জনের রথে সারথি। । কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কি ভগবান ? অবতারবাদ কত দূর সম্ভব ? দিব্য চক্ষু কি হইতে পারে ? অণিমাদি অষ্টসিদ্ধি কাহারও কি হইয়াছিল ? জীবন্মুক্তি কি ( ৯১ ) কথার কথা নহে? অধিকাংশ লােকেরই এই সন্দেহ। সন্দেহ হওয়াই উচিত। কর্মশূন্য জ্ঞান আলােচনায় যদি ইহা না হয়, তবে এই যুগাধিপতির দোষ পড়িবে। সংযম অভ্যাস না করিলে, যােগ-ধারণা করিতে না পারিলে, তপস্যা না করিলে—এক কথায় তন্ময়তা, একাগ্রতা এবং চিত্তশুদ্ধি আচরণ না করিলে, দিব্য চক্ষু, জীবন্মুক্তি, অবতার, অষ্টসিদ্ধি ইত্যাদিতে বিশ্বাস স্থাপন করা অসম্ভব। আমরা পূর্বে যাহা লিখিয়াছি, তাহাতেই স্পষ্ট বলা হইয়াছে, শ্রীকৃষ্ণ অবতার কি না ? এখানেও অবতারসম্বন্ধে গীতার মত যাহা, আমরা তাহাইবলিব। গীতার চরিত্র তিনটি (১) সঞ্জয় ২) অৰ্জন (৩) শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণ সর্বত্রই আপনাকে পরমাত্মা, পরমেশ্বর, ভগবান্, আয়া ইত্যাদি নামে অভিহিত করিতে ছেন, ইহা আমরা দেখিয়াছি। এখানে সঞ্জয় ও অর্জন যে নামে শ্রীকৃষ্ণকে ডাকিতেছেন, তদ্ভিন্ন অন্য কোন নামে মানুষ ভগবাকে ডাকে না। সঞ্জয় বলিতেছেন, হৃষীকেশ (১১৫,২০,২৪,২৯,১০) মধুসূদন (২১) ভগবান্ ( সর্বত্র ) গগাবিন্দ (২৯) হরি (১১৯,১৮৭৪) কেশব (১১৩৫,১৮৭৬) কৃষ্ণ (১১৩৫,১৮ ৭৫,৭৮) মাধব (১১৪) যােগেশ্বর (১১৯,১৮৭৫,৭৮) বাসুদেব (১১৫,১৮৭৪) আর অর্জুন? ইনি শ্রীকৃষ্ণের সখা, সখা হইয়াও বলিতেন অচ্যুত (১২) কেশব (১৩৩) মধুসূদন, গােবিন্দ, জনার্দন (১৩৫) মাধব, বাষ্ণের পুরুষােত্তম, পরব্রহ্ম (১১১২ পরমধাম, পরম পবিত্র, শাশ্বত পুরুষ, স্বপ্ৰকাশ, আদিদেব, অজ, সৰ্ব্ব- ব্যাপক, বিভু, ভগবান্ ১০/১৪) ভূতভাবন, ভূতেশ, দেবদেব, জগৎপতি (১০১৫) ইত্যাদি। ভগবানের এই সমস্ত নামেই বিশ্বাস করিয়া লােকে সংসারসাগর হইতে উত্তীর্ণ হইতে চেষ্টা করে। ভগবান্ যে জ্ঞানের উপদেশ করিতেছেন, শ্রীকৃষ্ণ যে তত্ত্ব প্রকাশ করিতেছেন, তাহা কোন মানুষের প্রকাশ করিবার শক্তি নাই, যে বিশ্বরূপ তিনি ভক্তকে দেখাইতেন, তাহা কোন মানুষেই দেখাইতে পারে না, তিনি আপন মহিমা আপনি প্রকাশ করিয়া বলিতেছেন—আমিই ভগবান্। তাহার ভক্ত তাঁহাকে শত নামে ডাকিতেছে, শত বার পরমাত্মা, বিভু, আত্মা বলিতেছে, ইহা অপেক্ষা আর অধিক প্রমাণ কি আছে ? যারা শ্রীকৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব প্রমাণ করা যাইবে। যাহারা শ্রীকৃষ্ণকে ভগবান্ বলিতে পারিল না, ভগবান্ তাহাদের প্রকৃতি আলােচনা করিয়াও বলিতেছে, তাহাদের গতি কি। ইহাতেও যদি লােকের বিশ্বাস না হয়, তবে তাহাদের যাহা অভিরুচি, তাঁহাই করুক, ইহাতে ভগবানেরই বা কি ক্ষতি, আঁহার ভক্তেরই বা কি অনিষ্ট হইতে পারে ? অল্পবিশ্বাসী এই সমস্ত সংশয়ের ( ৯২ ) কথা শুনিয়া অল্প বিশ্বাস টুকুও পরিত্যাগ করিয়া অধঃপাতে না যায়, এই জন্য লােককে সাবধান করা স্বভাবসিদ্ধ। লােকে অবতার বিশ্বাস করতে চায় , কিন্তু আৰ্য-ঋষিগণ অবতার স্বীকার করিতেন। তাঁহারা সাধারণ মনুষ্যের সহিত অবতারের এই পার্থক্য দেখাইতেছেন যে, অবতার আত্মজ্ঞান লইয়া অবতীর্ণ হয়েন, সাধারণ মনুষ্য অজ্ঞান লইয়াই জন্মে। অবতারের জন্ম ও কৰ্ম্ম কতক অংশে সাধারণ মনুষ্যের মত, কতক অংশে অলৌকিক। এই অলৌকিকত্ব আত্মজ্ঞানীর পক্ষে অসম্ভব নহে। সিদ্ধ পুরুষের কাৰ্যকলাপেও অনেক অলৌকিকত্ব দেখা যায়, আর ভগবানের কথা ত স্বতন্ত্র। অষ্টসিদ্ধি যাহার করায়ত্ত, যিনি যােগেশ্বর, তিনি ইচ্ছা করিলে না দেখাইতে পারেন কি ? মনুষ্য নিয়মে বাধ্য, কিন্তু ভগবান্ কোন নিয়মে বদ্ধ নহেন। জড়ই নিয়ম লান করিতে পারে না, কিন্তু যিনি স্বাধীন, তিনি নিয়মের অধীন কিরূপে হইবেন। তিনি আপন নিয়ম মতে জগৎ চালাইতেছেন সত্য, কিন্তু তাহার প্রয়ােজন পড়িলে ভগবান্ ও কি আপন নিয়ম আপনি অতিক্রম করিতে পারেন না? যিনি স্বাধীন, তাহার এ শক্তি থাকিবে না কেন? নতুবা স্বাধীনতার ত কোন অর্থ নাই। অবতারের কাৰ্যেও ত ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়। অগ্নি সকলকে দগ্ধ করে কিন্তু ভগবানের ইচ্ছায় ভক্ত প্রহ্লাদকে দগ্ধ করে নাই। অগ্নির দাহিকা শক্তির কাৰ্য্য না হওয়া, প্রকৃতির নিয়মের বিপরীত। কিন্তু ভগবামের ইহা অসম্ভব নহে। ভগবানের স্বাধীন ইচ্ছা। তিনি সর্বকালে একরূপ আচরণ করেন কি না, তাহা কে বলিবে ? তিনি কখন কখন মৎস্য, কখন কূৰ্ম্ম, বরাহ, নরসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কল্কিরূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন ও হইবেন—দুৰ্বল অবিশ্বাসী অজ্ঞানান্ধ মানবের হৃদয় যাহা বিশ্বাস করিতে অসমর্থ, তাহাই যে অসম্ভব, তাহাই যে প্রক্ষিপ্ত বা কাল্পনিক, ইহা বলিবার অধিকার কাহারও নাই। বলা হইতেছিল--যখন অৰ্জন শােকমােহে আচ্ছন্ন হইয়া যুদ্ধে বিরত হইলেন—জ্ঞাতিবিনাশ অপেক্ষা নিজের মৃত্যু শতগুণে শ্রেয়ঙ্কর ভাবিলেন, তখন সাধারণ মনুষ্য অর্জনের প্রশংসাই করিয়া থাকে, দোষ কিছুতেই দিতে পারে না। কিন্তু ভগবান্ অর্জনকে নিন্দা করিলেন, অর্জুনকে দুৰ্বল-হৃদয় বলিলেন অর্জনকে স্বধর্মত্যাগী বলিলেন। এ ক্ষেত্রে লােকে ভগবানের নিন্দাই করিবে। ইহাই লােকের অজ্ঞান। পরমাত্মার সর্বশক্তিমত্তা যাহারা স্বীকার , করেন, সর্বদশিক যাঁহারা স্বীকার করেন—তাহারা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ জগতের উপকারার্থ হইয়াছিল, ইহা বুঝিতে না পারিলেও সৰ্ব্ব-দ্রষ্ট। ভগবান্ ইহা বুকিয়া ছিলেন, একথা সকলকেই বলিতে হইবে। লোকের বিচারে যে কাৰ্য্য নিষ্ঠুর, ভগবানের বিচারে তাহা নিষ্ঠুর না ও হইতে পারে। মানুষ দুই দশ জনের মঙ্গল গণনা করিতে পারে, কিন্তু যিনি ত্রিলােকের হিতাহিত বিচার করেন, তিনিই জানেন, মনুষ্যের পূর্ণ কর্তব্য কি। জননীকে পুত্রহার করা জন- সাধারণের মতে নিষ্ঠুরের কাৰ্য্য, কিন্তু ভগবান্ যদি ইহা নিষ্ঠুরের কাৰ্য বিবেচনা করিতেন, তবে কি কোন জননী কখন পুত্রহারা হইত? অর্জন মনে করিতে- ছিলেন জ্ঞাতিবধ নিতান্ত নিষ্ঠুরের কাৰ্য, কিন্তু ভগবান্ দেখিতেছেন, আপাত- নিষ্ঠুর কাৰ্য্য দ্বারাও আত্মার উদ্ধার করা কর্তব্য। দেখিতেছিলেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জীবের মঙ্গলই সাধিত হইবে। যিনি মঙ্গলময়, প্রকৃত মঙ্গল তিনিই জানেন, এজন্য তাহার কোন কাৰ্যে অমঙ্গল থাকিতে পারে না। তিনি দয়াময়, প্রকৃত দয়া কি, তাহা তিনিই জানেন, তাহার কোন কার্যে নির্দয়তা থাকিতে পারে না। মানুষ অজ্ঞান, শরীরের অনিষ্ট হইলেই মনে করে কাৰ্যটী অমঙ্গল- ময়, কিন্তু আত্মজ্ঞানী মঙ্গল অমঙ্গল বিচার করেন, আত্মার উদ্ধাধােগতি দেখিয়া। যে আত্মা যত দেহাভিমানী—যে আত্মা দেহে ও জগতে যত অহংজ্ঞান স্থাপন করিয়াছে—দেহাভিমান, সংসার-অভিমান, জগৎ অভিমান, যাহার যত অধিক, সেই তত অজ্ঞান -সেই তত শােক-মােহের দাস। শুধু অর্জুনকে বিষাদগ্রস্ত দেখিয়া ভগবান্ যে তত্ত্বোপদেশ দিতেছেন, তাহাই নহে; সৰ্ব্বশাস্ত্রেই বিষাদ- গ্রন্তের প্রতি আহ্বানাত্ম-বিচার প্রথম উপদেশ। মােহগ্রস্ত যুধিষ্ঠিরকেও ভীষ্ম আত্মার স্বরূপ বিচার করিতে বলিতেছেন। সাধারণ মনুষ্যের বিচারে বিষাদ- গ্রন্তের প্রতি আত্মতত্ত্ব উপদেশ “ধান ভানিতে মহীপালের গীত” বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু ঋষিগণের বিচারে ইহাই এ অবস্থায় একমাত্র উপদেশের বিষয়। তুমি দুৰ্বল হও বা সবল হও; তােমার জন্য আদর্শ বিস্কৃত হইতে পারে না। ভগবান্ এইজন্য অর্জনকে সত্য তত্ত্ব জানাইয়া দিয়াছেন। ইহাই পরােক্ষজ্ঞান। পরে যে উপায়দ্বারা তােমার তত্ত্বজ্ঞান জন্মিবে, তােমার অপরােহ্মানুভূতি হইবে— সেই কাৰ্য ক্রম অনুসারে তােমাকে করা আবশ্যক। মৃত স্ত্রী বা মৃতপুত্র বা মৃত পিতামাতার দেহ অগ্নিসাৎ করা তােমার চক্ষে বর্বরতা, কিন্তু যাহার জানেন, কোন্ কাৰ্য্যদ্বারা আত্মার প্রকৃত কল্যাণ হয়, তাহাদের চক্ষে ইহাতে নিষ্ঠুরতা কিছুই নাই, বরং একান্ত কর্তব্য। শরীরের ক্লেশ কোন্ পদার্থ, কেন ইহা হয়, এই তত্ত্ব যিনি জানেন, তিনি দেহের নাশকে নাশ বলেন না। গীতা ;
( ৯৪ ) এই তত্ত্ব দেখাইয়াছেন। আমরা যথাস্থানে গীতার উপদেশ বুঝিতে প্রয়াস পাইয়াছি। অর্জনের অজ্ঞানতা দেখিয়া যিনি নারায়ণ—তিনি বিপন্ন নরকে মােহমুক্ত করিতেছেন পুরাতন শিক্ষার কালসঞ্চিত মােহান্ধকার দূর করিতেছেন-“তৎকালিক প্রাণশূন্য কৰ্ম্ম, ভক্তি ও জ্ঞানের আবর্জনা দূর করিয়া জ্ঞান, উপাসনা ও কর্মকে উজ্জল করিয়া দিতেছেন—সাধ্য ও সাধনার উজ্জ্বল আলােকে দশদিক আলােকিত করিয়া নিত্য পরমানন্দ রাজ গুহ সনাতন রাজ্যের রমণীয় পথগুলি ক্রম অনুসারে উদঘাটন করিতেছেন। বড় সুন্দর তাহার উপদেশ ! বড় সুন্দর সেই উপদেষ্টার রূপ ! সত্যই এই অদ্ভুত সংবাদ শ্রবণে হর্ষ আইসে, আর এই অত রূপ চিন্তনে মুহুর্মুহুঃ আনন্দ লাভ হয়। রূপ সম্বন্ধে ব্ল্যাসদেব বলিতেছেন:- নীলনীরদ প্ৰভ দিব্যাভরণভূষিত তেজঃপুঞ্জকলেবর-পরিধান পীতাম্বর। মাধব হেম-মণ্ডিত মণির ন্যায় অপূৰ্ব শােভা ধারণ করিয়াছেন! বক্ষঃস্থলে কৌস্তুভ মণি ধারণ করিয়াছেন—যেন উদয়ােম্মুখ সূৰ্য্যমণ্ডলে লাঞ্ছিত উদয়াচল। ত্রৈলােক্যমধ্যে এ রূপের তুলনা হয় না, আর তাহার গুণ? ভক্তমুখে গুণ শুনাই ভাল। রথী, সারথির রূপে গুণে উদ্ভাসিত; এস, ভক্তিভরে সারথি ও রথীকে প্রণাম করি, তুমিও কর । গীতাপরিচয় শেষ হইল। সাধুদিগের পরিত্রাণ ও দুস্কৃত-বিনাশ জন্ত ভগবানের অবতার। এতদ্ভিন্ন ধৰ্ম্মসংস্থাপনও ভগবানের কাৰ্য। ভগবল্লীলায় আমরা প্রথম দুইটি কাৰ্য দেখি, শেষটি লইয়াই গীতা। গীতাদ্বারা জগতের ধৰ্ম্মসংস্থাপন হইয়াছে। জগৎ ও গীতা-স্থাপিত ধৰ্ম্ম হৃদয়ে ধারণ করিবার জন্য অগ্রসর হইতেছে। গীতার ধৰ্ম্ম নূতন নহে। ইহা সনাতন ধর্ম। গীতােক্ত ধর্ম সম্বন্ধে আমরা মহাভারতের উক্তি এ স্থলে সংক্ষেপে সন্নিবেশিত করিলাম। যাহারা বলেন, গীতা মহাভারতের অনেক পরে রচিত হইয়া মহাভারত মধ্যে প্রক্ষিপ্ত, তাহাদের মতটি ভ্রান্ত—আমরা মহাভারত হইতে ইহাই দেখাইতেছি। গীতােক্ত ধর্মের নাম ঐকান্তিক ধর্ম। এই ধৰ্ম্ম নুতন নহে। বহুবার এই ধর্ম প্রচারিত হইয়াছিল, আরও কতবার প্রচারিত হইবে, কে বলিবে ? ইহাই সনাতন ধর্ম। মানবহৃদয়ের কলঙ্কচ্ছায়ায় এই ধৰ্মমুকুর কালে কালে কলঙ্কিত হয় মাত্র। ইহা মানব হৃদয়ের দোষ, ধর্মের দোষ নহে। ভগবান অবতার গ্রহণ করিয়া আবার এই সনাতন ধৰ্ম্ম উজ্জ্বল করিয়া দিয়া যান। এ ( ৯৫ ) মহাভারত বলিতেছেন-বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! কুরুপাণ্ডবীয় সংগ্রামে মহাবীর ধনঞ্জয় বিমনায়মান হইলে, মহাত্মা মধুসূদন তাহার নিকট যে ঐকান্তিক ধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন, আমি পূৰ্ব্বে তাহা আপনার নিকট কহিয়াছি। এই ধৰ্ম্ম অতিশয় দুবে। মূঢ় ব্যক্তিরা কখনই উহা পরিজ্ঞাত হইতে পারে না। সত্যযুগে ভগবান্ নারায়ণ সেই সামরে-সম্মত ঐকান্তিক ধর্মের সৃষ্টি করিয়া তদবধি স্বয়ং উহা ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। পূর্বে ধর্মপরায়ণ মহারাজ যুধিষ্ঠির ঋষিগণ-সমাজে বাসুদেব ও ভীষ্মের সমক্ষে তপাে- ধনাগ্রগণ্য নারদকে এই ধর্ম জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি তাহাকে যাহা কহিয়া- ছিলেন, আমার গুরু বেদব্যাস তৎসমুদায় আত্মার নিকট কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। ব্ৰহ্মা নারায়ণের বিভিন্ন অঙ্গ হইতে ছয় বার উৎপন্ন হইয়াছিলেন এবং এই ছয়বার এই সনাতন ব্রহ্মবিদ্যা নারায়ণ হইতে প্রাপ্ত হয়েন। প্রতিপ্রলয়ে এই বিদ্যা নারায়ণে বিলুপ্ত হইয়াছিল। সপ্তমবারে নারায়ণের নাভিপদ্ম হইতে ব্রহ্মা জন্মগ্রহণ করেন। নারায়ণ ব্রহ্মার নিকট এই ধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করেন। তৎপরে ব্রহ্মা দক্ষকে, দক্ষ স্বীয় জ্যেষ্ঠদৌহিত্র আদিত্যকে, আদিত্য বিবস্বান্কে উহা অধ্যয়ন করাইলেন। অনন্তর ত্রেতাযুগের প্রারম্ভে বিবস্বান্ মনুকে, মনু লাকপ্রতিষ্ঠা জন্ত স্বীয় পুত্র ইক্ষাকুকে ঐ ধৰ্ম সমর্পণ করেন। ইক্ষাকু বিলােক মধ্যে উহা প্রচার করেন। তদবধি অদ্যাপি ঐ ধৰ্ম বিদ্যমান রহিয়াছে। প্রলয়ে পুনরায় উহা নারায়ণে লীন হইবে। পূর্বে হরিগীতায় যতিধম্ম কীৰ্ত্তন সময়ে মহারাজ! আমি সংক্ষেপে তােমার নিকট ঐ ঐকান্তিকধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করিয়াছি। এই সনাতন ধর্ম সকলের আদি, দুজ্ঞেয় ও দুরনুষ্ঠেয় । কিন্তু সন্ন্যাস- ধর্মাবলম্বীরাই উহা প্রতিপালন করিয়া থাকেন। (শান্তিপৰ্ব্ব ৩৪৯ অধ্যায়, কালীসিংহের অনুবাদ) মনুষ্য আপন বুদ্ধি ও চেষ্টা দ্বারা জগতকে কখন উন্নত করিতে পারে নাই পারিবেও না। এই সনাতন-ধৰ্ম্ম-প্রভাবেই জীবের নিঃশ্রেয়স ও জগতের অভ্যুদয় হইবে; অন্ততঃ শাস্ত্রে ইহা দেখা যায়। ভগবান্ ব্যাস বলিতেছেন— এই পাপ জগৎ ঐকান্তিকধর্মাবলম্বী লােকসমুদায়ে পরিবৃত হইলে, হিংসা- পরিশূন্য, সৰ্ব্বভূত-হিতৈষী, তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি দ্বারা সত্যযুগ আবির্ভূত হইবে, এবং সমুদায় লােক নিষ্কামকর্মের অনুষ্ঠান করিবে। হে মহারাজ ! মহর্ষি বেদব্যাস কৃষ্ণ ও ভীষ্মদেবের সন্নিধানে, ঋষিগণের নিকটে এইরূপে ঐকান্তিক ধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন ।
( ৯৬ ) এস্থানে আমাদের একটু ত্রুটি স্বীকার করিতে হইতেছে। গীতার প্রতি শ্লোকের প্রতি শব্দের অর্থ জন্য মহাপুরুষদিগের ভাষ্য, টীকা ইত্যাদির আশ্রয় লওয়া হইয়াছে। শঙ্কর ভাষ্য, আনন্দগিরির ভাষ্যবিবেচন, মধুসূদনসরস্বতীকৃত গুঢ়ার্থ-দীপিকা, নীলকণ্ঠসুরিকৃত গীতাৰ্থ প্রকাশ, হনুমদ্ভাষ্য, রামানুজভাষ্য, বলদেবভাষ্য, বিশ্বনাথ কৃত টীকা, শ্ৰীধৰস্বামি-কৃত টীকা প্রভৃতি হইতে সংস্কৃত প্রতিশব্দ গুলি গৃহীত। এই সমস্ত মহাত্মার সৎশাস্ত্র- সন্মত মন্তব্যগুলি জ্ঞাতব্য বিষয়ে দেওয়া হইয়াছে। অন্যশাস্ত্রগত বিরােধী মতগুলির সমন্বয়েও প্রয়াস পাওয়া হইয়াছে। বঙ্গভাষায় যাহারা গীতা সম্বন্ধে সৎশাস্ত্রমত যাহা লিখিয়াছেন, তাহাও দেখা হইয়াছে। আনন্দচন্দ্র বেদান্তৱাগীশ, শশধর তর্কচূড়ামণি, নীলকণ্ঠ মজুমদার, গােপালচন্দ্র চট্টো- পাধ্যায়, দামােদর মুখােপাধ্যায়, শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন সেন, আৰ্য্যমিশনের গীতা, ভূধর চট্টোপাধ্যায়ের গীতা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কৃত প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়, গৌরগােবিন্দ সমন্বয় ইত্যাদি পুস্তক হইতেও শিক্ষার বিষয় আলােচিত হইয়াছে। প্রশ্নোত্তরচ্ছলে জ্ঞাতব্য বিষয় লিখিত হইয়াছে বলিয়া যেখান হইতে যাহা সংগ্রহ করা হইয়াছে, তাহা উল্লেখ করা অসম্ভব দাঁড়াইয়াছে। গীতা বুঝিতে চেষ্টাই লক্ষ্য, এ জন্য যিনি মূলে লক্ষ্য রাখিয়া সৎশাস্ত্র অবি- বােধী যাহা শিক্ষা দিয়াছেন, তাহাই গ্রহণ করা হইয়াছে। কথায় কথায় সমস্ত গৃহীতাংশ স্বীকার করা হয় নাই বলিয়া ত্রুটি স্বীকার করা হইল। আর এক কথা—নিজের জন্য এই অনুষ্ঠান হইলেও কেন ইহা প্রকাশ করা হইল ? এই প্রশ্ন উঠিতে পারে। পুস্তক প্রকাশ নামের জন্য নহে। প্রকাশের প্রধান কারণ—একটু ভিক্ষা। ভগবান্ প্রসন্ন হও' এই লক্ষ্যে কৰ্ম্ম করাকে নিষ্কাম কৰ্ম্ম বলে, ভগবানের প্রসন্নতা ও ভক্তের প্রসন্নতা প্রায় তুল্য যদি কোন সাধু মহাত্মা গীতা বুঝিবার প্রয়াস দেখিয়া সন্তোষ লাভ করেন- পূৰ্ব বিস্মৃত ভাব স্মৃতি পথে উদয় জন্য গ্রন্থকারের প্রতি ক্ষণকালের জন্য কৃপাকটাক্ষপাত করেন, মনে মনে যদি ক্ষণকালের জন্য একবার স্মরণ করেন, তবে গ্রন্থকার—যদি মােহমায়ায় ভগবানকে ভুলিয়াও থাকেন—তখন সাধু মহাত্মার স্মরণ মাত্রে তাহার হৃদয়ে ভগবদ্ভাব জাগরূক হইবেই। সাধু কৃপায় ভগবৎ কৃপা লাভ হইবে। ভগবৎকৃপাদৃষ্টিই প্রার্থনা। ০ ।
No text on this page.
No text on this page.