Bally Sadharan Granthagar
Roy Choudhury Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ব্রায়চৌধুরী
শ্রীশৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায়
বেঙ্গল পাবলিশার্স
১৪, বমি চাটুজে ষ্ট্রীট,
কলিকাতা-১২
প্রথম সংস্করণ—আষাঢ়, ১৩৫৩
প্রকাশক -শচীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
বঙ্গল পাবলিশাস’
১৪, বঙ্কিম চাটুজ্জে স্ট্রীট
প্রচ্ছদপট-শিল্পী-
অাও বন্দ্যোপাধ্যায়
মুদ্রাকর-শম্ভুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
মানসী প্রেস,
৭৩, মাণিকতল। ট্রট,
কলিকাতা
ব্লক ও প্রচ্ছদপট মুদ্রণ
ভারত ফোটোটাইপ ষ্টুডিও
বাঁধাই
বেঙ্গল বাইণ্ডাস।
দুই টাকা চারি আনা
অনেক চেষ্টা করে চৌধুরীদের ছেলে বিজয় একটা ময়না পাখী ধরেছে। বারাে-তেরাে বছরের ছেলের পক্ষে এটা বড় কম বাহাদুরীর কথা নয়। পাখীটাকে ভালাে করে দুহাতে চেপে ধরে মনের আনন্দে সে বাড়ী ফিরছিল। এমন সময়ে হঠাৎ তাকে পিছু ডাকলো রায়েদের মেয়ে বিমলা : বিজয়দা! বিজয়দা!-পাখীটা আমাকে দাও না বিজয়দা। বিমলার আব্দার দেখে অবাক হয়ে যায় বিজয়। রায় আর চৌধুরীতে ভীষণ ঝগড়া, এ-বাড়ীর সঙ্গে ও-বাড়ীর কথাবার্তা বন্ধ। এমন অবস্থায় বিমলার বাবা যদি জানতে পারে যে বিমলা বিজয়ের সঙ্গে কথা বলেছে তাহলে বিমলাকে যে সে মেরে খুন করে ফেলবে সে আলেও কি হয় নি মেয়েটার? তাছাড়া বিজয়ের এত সাধের পাখী, ‘দাও' বললেই অমনি দেওয়া যায়! বিজয় মুখ ঘুরিয়ে বলে—বারে! এত কষ্ট করে ধরলুম, তােকে দেব কেন? বিমলা বলে—আমি:পুষবাে। বিজন বলেন, আমি পুষবো। দেখবি কি রকম কথা বলবে। বিশ্বাস হয় না বিমলার।-বলে-হা-ওই পাখী “আবার কথা ব’লবে ! বিজয় বলে-দেখবি কথা বলে কিনা! কী বলবে জানিস? বলবে ‘অশ্বিনী রায়—খালি ঘাস খায়। বিমলা ভয় দেখায় : বাবাকে বলে দেবে। বিজয়ের তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। বলে -বললি তাে বয়ে গেল। বল তাে ময়না, ব, “রায়েদের বিমলা, খায় কঁচকলা। বিমলা বলে—আমিও বলবাে-চৌধুরীদের বিজয়—খায়--ব্যস, ঐ পর্যন্ত ৮ মিলিয়ে মিলিয়ে বলতেই পারে না বিমলা। শেষ অবধি ঠোট আয়-চো—১ ফুলিয়ে চোখ ঘুরিয়ে বলে-না দিলে তাে না-দিলে ! ভারী তো একটা পাখী! আমি চ’লুম। বিমলা সত্যিই রাগ করে চলে যাচ্ছে দেখে বিজয়, ডাকলে : বিমলা! বিলি ! বিমলা ফিরে আসতেই কী ভেবে বিজয় পাখীটা ভুলে দিলে তার হাতে। বললেন, তােকে দিয়ে দিলাম। ব্যস্ত হয়ে যেই বিমলা হাত বাড়িয়ে পাখীটা নিতে গেছে, অমনি বিমলার হাত ফসকে পাখীটা ঝটপট করে উড়ে পালালো। কাণ্ডটা দেখে গা জ্বলে গেল বিজয়ের। রাগে দুঃখে ঠাস্ করে সে এক চড় বসিয়ে দিলে বিমলার গালে। ধমক দিয়ে বললে—হতভাগা মেয়ে ! বেরাে! দূর হ’। একে পাখী- হানাের দুঃখ, তার ওপর বিজয়দার চড় ও বকুনী ! বিমলা আর চুপ করে থাকতে পারলে না। ঝরঝর করে কঁদতে কঁদতে ফিরে গেল নিজেদের বাড়ীতে। বিজয়াদশমীর দিন। এমন পুণ্যদিনে পরম শত্রুর সঙ্গেও ঝগড়া- মারামারি করতে নেই। একথা অশ্বিনীরায়ের মত একরােখা লােকও জানে এবং মানে। চণ্ডীমণ্ডপ থেকে উঠোনে প্রতিমা নামাতে গিয়ে মুখ লােকগুলাে নিজেদের মধ্যেই হাতাহাতি লাগিয়েছে। অশ্বিনী রায় এগিয়ে এলো। বললে : আঃ, বিজয়া দশমীর দিনে এসব হচ্ছে কী! মারামারি করিসনে, মারামারি করিস্ নে, কাজ ক। এমন সময়ে বিমলা এলাে সেখানে কাদতে কাদতে। মেয়েকে কঁদতে দেখে বিরক্ত হয়ে অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলে—আরে, তুই আবার কাদতে কাদতে কোখেকে এলি ?. বিমলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললে–বিজয়দা মারলে।
–বিজয়দা মানে? ভবানী চৌধুরীর সেই ছেলেটা? -হ্যা। —আজ বিজয়াদশমীর দিনে মারলে তােক ? কপালের শিরাগুলাে কুঁচকে উঠলাে অস্বিনীর। দাতে দাত চেপে সে বললে-ই! অচ্ছা যা বাড়ীর ভেতর যা। আজ কঁদতে নেই। বিমলা চ'লে গেল। অশ্বিনী দেখলে, বড় রায় ওদিকে ইজিচেয়ারে শুয়ে গড়গুড়া টানছে আর কার্তিক তার পা টিপতে টিপতে আলাদে আটখানা হয়ে কিসের যেন গল্প করছে। কাণ-খাড়া করে শুনলে অশ্বিনী, গল্প হচ্ছে চৌধুরীদেরই দুর্গ- প্রতিমার সম্বন্ধে। প্রতাপ রায় জিজ্ঞেস করছেন—কেমন প্রতিমা ? ভালাে ? কার্তিক একেবারে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো: ভালাে বলে ভালাে! আর তাছাড়া লম্বা-বড়াে। ‘বড়ো বলেই প্রতাপরায়ের মুখের দিয়ে কার্তিক চেয়ে দেখলে—কথাটা বিশেষ ভালাে লাগছে না তার। চৌধুরীদের প্রশংসা রায়েদের কাণে ভালো লাগবার কথাও নয়। তাড়াতাড়ি কথটা সে সামলে নিয়ে বললে : বড়ে। তবে বেশি বড় নয়, আধ হাতখানে বড়াে হবে আপনাদের চেয়ে। মুখে হাসি টেনে প্রতাপ রায় বললেন, বেশ বেশ, তবে বেশি বড় হওয়া ভালাে নয়, পড়ে যাবার ভয় থাকে। কথাটা শেষ হতেই এদিক থেকে অশ্বিনী ডাকলে-কার্তিক! অশ্বিনী রায়ের গুরুগম্ভীর ডাক শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে এলাে কার্তিক কাছে আসতে অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলে কী বলছিলি বাবাকে ?
আমৃতা আতা করে কার্তিক বললে, আপনাকেই খুঁজছিলাম। বলি
নি তাে কিছু, তবে এই দেখে এলাম কিনা!
-কী দেখে এলি ?
–চৌধুরীদের পিতিমে, দুগগগ পিতিমে! তা—আপনাদের চেয়ে
প্রায় আধহাতখানেক বড়ো হবে।
-তা সেকথা বাবাকে বলতে গেলি কেন? বুড়াে হলে গায়ের রক্ত
ঠাণ্ডা হয়ে যায়, তা জানিস?
কথার ওপর রঙ চড়িয়ে কথা বলা কার্তিকের চিরদিনের অভ্যেস।
সে বললে, তা আর জানিনা? আর তাছাড়া বুড়ো হলে হাত-পাও
• ঘর থর করে কাপে।
রং তমা শুনবার মতাে মনের অবস্থা তখন অশ্বিনীর নয় ।
মনে সে তখন অন্য মতলব আঁটছিল। কার্তিককে সে জিজ্ঞেস করলে
প্রতিমা তাে ওরা এইদিক দিয়েই নিয়ে যায় বরাবর, এ-বছরও যাবে তাে?
কাত্তিক ব্যাপারটা তলিয়ে বােঝে না। সে বললে-বাঃ, যেদিক
দিয়ে প্রতিবছর যায় সেইদিক দিয়েই তো যেতে হবে। আপনাদের এই
সদর দিয়েই তাে নিয়ে যাবে।
আর কিছু শুনবার বা জানবার দরকার করে না অশ্বিনীর। হিন্দুস্থানী
দরােয়ান গিরিধারী আর কিষণ সিংকে সঙ্গে নিয়ে গটগট করে সে বাইরে
বেরিয়ে যায়।
.
মশাল জ্বলছে, ঢাক বাজছে, বাজনার তালে তালে ‘রাইবেশে’-নাচ
হচ্ছে—পালােয়ানদের লাঠিখেলা হচ্ছে। খুব ঘটা করে প্রতিমা আসছে
চৌধুরীদের। প্রতিমার পেছনে আসছেন-ভবানী চৌধুরী, তার ছেলে
বিজয়, আর নায়েব বনমালী। সঙ্গে আছে একজন গুখা চাপরাশী-গণেশ,
বাহাদুর আর একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী সুবল।
৪
হঠাৎ একটা হৈ-হৈ রব উঠলল। থমকে দাঁড়ালাে সব লােজন। নায়েব বনমালী সামনে এসে দেখে, এগিয়ে যাবার পথ নেই আর। রাস্তা জুড়ে দেবদারু পাতা আর শালের খুটা দিয়ে একটা ফটক তৈরী হয়েছে। প্রতিমার চালি আটকে গেছে সেই ফটকে। কাটলে পেরুবার উপায় নেই। বনমালী হুকুম দিলে : গণেশ বাহাদুর গেটু কাটো! হুকুম পেয়ে গণেশ যেই তার ভােজালি দিয়ে এক কোপ বসিয়েছে খুটীর গায়ে, অম্নি কাছারী-বাড়ীর দোতলা থেকে গর্জন করে উঠলাে অশ্বিনী রায় : খবরদার! আর একটি কোপ মেরেছ কি এই বন্দুক দিয়ে মাথাটি দেবে উড়িয়ে ! অশ্বিনীর হাতে দু’নলা বন্দুক দেখে কারুর আর বুঝতে বাকী রইল না, যে ব্যাপারটা অশ্বিনী রায়েরই কীৰ্ত্তি। নিজের বাড়ীর সামনে সদর-রাস্তায় ফটক তৈরী করে গায়ে-পড়ে সে একটা ঝগড়া বাধাতে চায়। বনমালী জিজ্ঞেস করলে, এ আবার কী করেছেন এবছর? চৌধুরীদের প্রতিমা প্রতিবছর এইদিক দিয়েই যায়, কই গেট তত থাকে না! অশ্বিনী জবাব দিলেআমার বাড়ীর সামনে আমি যা খুশী তাই করবাে। তােমার কী ? ভবানী চৌধুরী নিজে এগিয়ে এসে বললেন এ কী ব’ছে অশ্বিনী, গেট না কাটলে প্রতিমা পেরুবে কেমন করে? অশ্বিনী বললে—রায়েদের বাড়ীর দরজা দিয়ে চৌধুরীরা মাথা হেঁট করে পেরুবে—হামাগুড়ি দিয়ে পেরুবে; বুকে হেঁটে পেরুবে। ভবানী চৌধুরী দেখলেন, অশ্বিনীর মতলব, ভালাে নয়। ঝগড়া করবার এক নতুন ফিকির সে বের করেছে। ওর সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে কোন ফল হবে না। তার চেয়ে সমস্ত বিষয়টা একবার অশ্বিনীর বাবা প্রতাপ রায়কে জানানাে দরকার।
ডাকাডাকি কুরুতেই বৃদ্ধ প্রতাপ রায় বেরিয়ে এলেন। ছেলের কাণ্ড দেখে অনেক চেষ্টা করলেন তিনি ছেলেকে নিরন্থ করতে। কিন্তু অশ্বিনী কারও কথা শুনবার পাত্র নয়। সে বললে, তুমি কিছু জানােনা বাবা, তুমি ভেতরে যাও। আজ ঐ চৌধুরীর ছেলেটা তােমার নাতনী বিমলাকে মেরেছে, আর তাছাড়া আমাদের চেয়ে বড়ো প্রতিমা করে ওরা আমাদের ওপর টেক্কা দিতে চায়। বা’র করছি আমি ওদের টেক্কা দেয়া ! বনমালীর ইসারায় গণেশ-বাহাদুর আবার খুটীতে কোপ বসাতে সুরু করেছিল। ভবানী চৌধুরী বললেন, থাক আজ বিজয়ার দিনে রক্তারক্তি হাঙ্গামায় কাজ নেই। প্রতিমা ফেরাও। এত সহজে ছেড়ে দেওয়াটা মনঃপূত হলাে না বনমালীর । বললে, না না তা হয় না। প্রতিমা প্রতিবছর যেদিক দিয়ে যায় এবছরও সেই পথ দিয়েই যাবে। অশ্বিনী ধমক দিলে ! তােমার কথাতেই যাবে? কই যা দেখি । বনমালীও রুখে দাড়ালাে, যায় কিনা এই দ্যাখাে।—নিজেই সে ভােজালিটা কেড়ে নেয় গণেশের হাত থেকে, ঝপাঝপ কোপ মারতে আরম্ভ করে শালখুটীর গায়ে। অশ্বিনী বন্দুক উচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল : বনমালী ! ভবানী চৌধুরী এসে আড়াল করে দাঁড়ালেন বনমালীকে। হাত বাড়িয়ে বনমালীকে আড়াল করে দিয়ে বললেন ! বন্দুক চালাতে চাও তত আমার বুকেই চালাও অশ্বিনী। ‘বাবা, বাবা বলে চীৎকার করতে করতে ছুটে এলো বিজয়। প্রতাপ রায় দেখলেন একী সৰ্ব্বনাশ ! অশ্বিনী হয়তো ভবানী চৌধুরীর বুকেই গুলি চালাতে পিছপা হবে না। তাড়াতাড়ি তিনি অশ্বিনীর হাত থেকে বন্দুকটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করলেন। হাতাহাতি করতে গিয়ে বন্দুক থেকে প্রচণ্ড শব্দে গুলী ছুটে গেল। বন্দুকের আওয়াজ শুনে ভয়ে কেঁপে উঠলো সবাই। কার্তিক এতক্ষণ দূরে মুড়িয়ে মজা দেখছিল। পড়ি কি মরি অবস্থায় সে ছুটে পালিয়ে গেল সেখান থেকে। বন্দুকের গুলী কারও গায়ে না লাগলে কি হবে, চারিদিকে একটা তুমুল হট্টগােল পড়ে গেল। সুবল ছুটেছে লাঠি হাতে অশ্বিনীর মাথা ফাটাতে, বন্দুক নিয়ে ছুটেছে কিষণ সিং, বাবাকে বাঁচাবার জন্যে ছুটোছুটি করছে বিজয়। বনমালীও প্রাণপণে.গেট কেটে চলেছে। দেখতে দেখতে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লাে গেট। চেঁচিয়ে উঠলাে বনমালী, যাও যাও, তােমরা প্রতিমা নিয়ে এগিয়ে যাও তাড়াতাড়ি—এখানে আর পঁড়িয়ে থেকো না। বাঁধভাঙা স্রোতের মতাে চক্ষের পলকে লােকজন সবাই চলে গেল প্রতিমা নিয়ে। শুধু সুবল তখনও কিষণ সিংয়ের হাত থেকে বন্দুকটা কাড়বার জন্যে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে চলেছে। আর বিজয় ভবানী চৌধুরীর হাত ধরে টানছে চলে এসাে বাবা, চলে এসাে। বনমালীও ডাকতে লাগলাে, বাবু, বাবু চলে আসুন আপনি।শীগগির চলে আসুন। সুবলকে একলা ফেলে যেতে ভবানী চৌধুরীর মন, সরছিল না। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই হাত মুচড়ে সুবল তার বন্দুকটা কেড়ে নিলে। রাগে অপমানে কিষণ সিং পাগলের মত ছুটে এলে বিজয়ের দিকে। বিজয়ের জন্যেই তাে এত হাঙ্গামা ! বিজয়কে কোলুপাজা করে তুলে নিয়ে তরতর করে নহবৎ-খানার সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল কিষণ সিং। দাঁত কড়মড় করে বলতে লাগলাে, চল তােকেই এবার শেষ করি। কিষণ সিংয়ের কবলে পড়ে বিজয় কঁদছে, ‘বাবা বলে করুণ কণ্ঠে কাকুতিমিনতি করছে—এ দৃশ্য দেখে ভবানী চৌধুরী আর স্থির থাকতে পারলেন না। বন্দুক টেনে নিলেন তিনি সুবলের হাত থেকে। যে এমন একটা মুহূর্তে কিষণ সিং বিজয়কে তুলে ধরে একতলায় আছড়ে ফেলতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তেই ভবানী চৌধুরীর হাতের বন্দুক কিষণ সিংয়ের বুকের পাঁজর লক্ষ্য করে গর্জন করে উঠলো। ইষ্ট দেবতার নাম স্মরণ করবার সময়ও আর কিষণ সিং পেলে না। তার প্রাণহীন দেহটা একেবারে সিড়ির ওপর দিয়ে গড়াতে গড়াতে এসে পথের ধূলােয় মুখ থুবড়ে পড়লাে। বিজয়ও কিষণের কোল থেকে পড়ে যাচ্ছিল—তাড়াতাড়ি এসে তাকে লুফে নিল সুবল। ভবানী চৌধুরী কাপতে লাগলেন থবৃথর করে। ভয়ানক কাণ্ড ঘটবে তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। তিনি তাে কিষণ সিংকে মারতে চান নি, তিনি শুধু চেয়েছিলেন তার একমাত্র ছেলে বিজয়কে বাঁচাতে। বনমালী তার হাত ধরে টানতে টানতে তাকে সরিয়ে নিয়ে গেল খুনের জায়গা থেকে। বড় রায় এলেন, অশ্বিনী এলাে। অশ্বিনী দেখলাে কিষণ সিংয়ের তখন আর কিছু করবার নেই, সব শেষ হয়ে গেছে। নিজের হাতের ওপর ঘুসি মেরে অশ্বিনী ব’ললে, চৌধুরীকে যদি না ফাসি কাঠে ঝােলাতে পারি তাে আমার নাম অশ্বিনী নয়। প্রতাপ রায় বললেন—চৌধুরীকে ফাঁসি দিলেই কি কিষণ সিং আবার বেঁচে উঠবে অশ্বিনী ? অশ্বিনী বললে—যা হবার হবে—তুমি শুধু চোখকাণ বুজে বসে থাকো। চুপ ক'রেই গেলেন প্রতাপ রায়। বাড়ীর ভেতর থেকে ছুটতে ছুটতে এলো বিমলা : কী হোল দাদু, কথা বলছো না যে? বড় দুঃখে ম্লান হাসি হেসে বৃদ্ধ রায় বললেন, না বিশেষ কিছুই হয় নি দিদি, আজ আমাদের বিজয়া দশমী হােল। খুনের খবর সদরে পৌছুতে দেরী হােল না। মােটর-বাইক হাঁকিয়ে পুলিশ-সুপারিন্টেন্ডেন্ট, এলেন একোয়ারিতে। যথেষ্ট খাতির যত্ন করে অশ্বিনী তাকে জানালে : রায় আর চৌধুরীদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ বংশানুক্রমেই চলে আসছে। দু'পক্ষই প্রবল জমিদার বংশ। তবে চৌধুরীদের এখন পড়ন্ত অবস্থা। আর বরাবরই চৌধুরীরা রায়েদের হিংসে করে—গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধায়। বিশেষ করে রায়েদের জমিতে কয়লা ওঠার পর থেকে ওদের আক্রোশ আরাে বেড়ে গেছে রায়েদের ওপর। ওরা কলিয়ারী করতে পারলে না, রায়েরা করলে--এই হােল ওদের গাত্র দাহের আসল কারণ। পুলিশ-সুপারকে আদ্যোপান্ত সমস্ত বিবরণ দিলে অশ্বিনী, আর সেই সঙ্গে অনেক করে অনুরােধ করলে : ভবানী চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে হাতে হাতকড়া দিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে আমাদের এই সদর দিয়ে নিয়ে যেতে হবে স্যার ! This is my earnest request. তার জন্যে যদি কিছু মনে না করেন, আমি কিছু খরচপত্র ক'তেও রাজী আছি। ঠিক এই আশঙ্কাই করছিল বনমালী। ভবানী চৌধুরীর মতাে একজন মানী লােককে পুলিশ এসে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে যাবে একথা ভাবতেও তার সারা গা রী-রী করছিল। সে তাই পালাবার পরামর্শ দিলে চৌধুরীকে। ব’ললে, আসুন আমার সঙ্গে, আপনাকে আমি নিরাপদে সরিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু ধর্মভীরু লােক ভবানী চৌধুরী। পালাতে তার কিছুতেই মন ওঠেনা। আক্ষেপ করে তিনি বললেন এত বড় একটা অন্যায় করলাম, তার শাস্তি পাবনা ? ভবানী চৌধুরীর স্ত্রী মহামায়া বুঝতে পারলেন না এতে অন্যায়টা কোন্খানে। স্বামীকে বােঝালেন তিনি। ছেলেটাকে বাঁচাতে গিয়ে লােকটাকে মেরে ফেলেছ, তুমি তাে ইচ্ছে করে মারাে নি।
চৌধুরী বললেন, ইচ্ছেয় হােক অনিচ্ছেয় হােক মেরে তাে ফেলেছি। তার প্রাণ তাে গেছে আমারই হাতে। বনমালী বললে, ভালােই হয়েছে। অতি বজ্জাত লােক ছিল ব্যাটা। আপনার হাতে প্রাণ গেছে—ব্যাটার স্বর্গবাস হয়ে গেছে। আপনি এখন আসুন তাে আমার সঙ্গে। চৌধুরী বললেন, বলছাে যখন চল, কিন্তু পালিয়ে আর কতদিন থাকবাে ? বনমালী বললে, পালিয়ে থাকতে হবে কেন ? পথের ধারে নামিয়ে দেবে আপনাকে, কাঞ্চনপুর ষ্টেশনে গিয়ে আপনি ট্রেণ ধরবেন। তারপর কলকাতায় গিয়ে আপনার উকীল ব্যারিষ্টারের সঙ্গে পরামর্শ করে তারা যা বলবে তাই করকেন। তবু কিন্তু যাবার বেলায় চৌধুরী বরাবর করে সবাইকে মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন : আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তােমাদের আমি বলে গেলাম, ওই যে-লােকটি মারা গেল, তার পরিবারের ভরণপােষণের জন্যে যত টাকা লাগে, দেবে। শ্রদ্ধায় চোখ ছলছল্ করে উঠলাে মহামায়ার। এমনি আপনভােলা স্বামী তার! নিজের এত বড় বিপদ সে-কথা একবারও না ভেবে কোথাকার কে একজন সামান্য চাপরাশী, তার দুর্গত পরিবারের জন্যে অস্বস্তির শেষ নেই। বিজয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আশীৰ্বাদ করলেন ভবানী চৌধুরী, মহামায়াকে আশ্বাস দিয়ে গেলেন কিছু ভেবাে না তােমরা। তার যা ইচ্ছে তাই হবে। আমি চললুম। খিড়কীর দরজায় জুড়ি গাড়ী তৈরী হয়েই দাড়িয়ে ছিল। বাড়ীর পেছনের বাগানের ভেতর দিয়ে লুকিয়ে এসে বনমালী আর ভবানী চৌধুরী গাড়ীতে উঠলেন। গাড়ী ছাড়বে ঠিক এমন সময় কোখেকে । একটা কনেষ্টবল এসে পথ আটকে দাড়ালো। তার ডিউটা ছিল আসামীর ওপর কড়া নজর রাখার যাতে সে কিছুতেই না পালাতে পারে। গাড়ীর দরজা ধরে কনেষ্টবল বললে, উতর যাও, উতরাে! নায়েব বনমালী বললে, উতর যাব কি রে ! তােদের বাবুর কাছেই তো যাচ্ছি। তুইও আয়না ওই পাদানিতে চড়ে। কনেষ্টবল যেই পাদানিতে চড়বে বলে পা বাড়িয়েছে, বনমালী এক ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিলে রাস্তার ওপর। কনেষ্টবল উলটে পড়ে গেল, গাড়ী ছেড়ে দিলে ঝড়ের বেগে। পুলিশ ইন্সপেক্টর আসছিল ঘােড়ায় চেপে। কোনমতে উঠে, ছুটতে ছুটতে গিয়ে কনেষ্টবল তাকে খবর দিলে : আসামী পালিয়েছে। কোন্ পথে পালিয়েছে জেনে নিয়ে পুলিশ-ইন্সপেক্টর সেইদিকে ঘােড় ছােটালাে। যাবার সময়ে কনেষ্টবলকে বলে গেল সুপারিন্টেণ্ডেন্টকে খবর দিতে। তারূপর দেখতে দেখতে গ্রামের রাস্তায় যেন গাড়ীঘােড়র ‘রেস’ সুরু হয়ে গেল । পই পই করে জুড়ি-গাড়ী ছুটছে, তার পিছু পিছু ইন্সপেক্টরের ঘােড়া ছুটছে টগবগ, টগবগ করে—আর দূরে ধূলো উড়িয়ে ভটভট শব্দ করে আসছে সুপারিন্টেন্ডেন্ট-সাহেবের মােটর সাইকেল। দৌড়ের পাল্লায় কেউ কারুর চেয়ে কমৃতি যায় না। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মােটর সাইকেলই আগে বেরিয়ে গেল ইন্সপেক্টরের ঘােড়াকে পেছনে ফেলে। চৌধুরীদের জুড়ি-গাড়ী কিন্তু তখনও অনেক দূরে। মােটরসাইকেলের ‘স্পীড আরাে বাড়িয়ে দিলেন সুপারিন্টেন্ডেন্ট- সাহেব। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চৌধুরীর গাড়ীকে ধরে ফেললেন তিনি। কিন্তু গাড়ী থামলে কি হবে? অনেক আগেই গাড়ী থেকে ভবানী-চৌধুরীকে নামিয়ে দিয়েছে বনমালী।
সাহেব ভবানী চৌধুরীকে চেনেন না। বনমালীকে গাড়ীতে দেখে তিনি
তাকেই আসামী ভেবে পাকড়াও করলেন। কয়েক কথা জিজ্ঞাসাবাদ
করতেই ইন্সপেক্টর এলাে ঘােড়ায় চড়ে। বনমালীকে দেখে সে বললে,
এ কি! এতাে চৌধুরী নয়—এযে চৌধুরীর ম্যানেজার।
বনমালী বললে, আমিও তো তাই বলছিলাম এতক্ষণ। আমি কেন
চৌধুরী হ’তে যাব? আমি চৌধুরীর নায়েব বনমালী। চৌধুরী গেছেন :
কলকাতায়, আমি যাচ্ছি সদরে—জমিদারীর কাজে।
পুলিশ কর্তারা দেখলাে আসল আসামী হাতছাড়া হয়ে গেছে। অগত্যা
বনমালীকেই তারা গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল।
মহকুমার আদালতে হাজির করা হােল বনমালীকে। খুনী নিজে
ফেরার, তাছাড়া আগামী পক্ষের প্রভাব-প্রতিপত্তি অসাধারণ।
সমস্ত সাক্ষী নষ্ট করে দেয়, তাই কোট -ইন্সপেক্টর বনমালীর জামিন মঞ্জুর
করাতে একেবারেই নারাজ। বরং চৌধুরীর নামে যাতে একটা ওয়ারেন্ট’
বের করা যায় তারই চেষ্টা সে করছিল। কিন্তু ওয়ারেন্টে’র আর দরকার
হােল না। ভবানী-চৌধুরী ব্যারিষ্টার সঙ্গে নিয়ে নিজেই এসে কোর্টে
ধরা দিলেন। ব’ললেন, আমিই ভবানী-চৌধুরী। পালাইনি আমি,
নিজেই এসে সারেণ্ডার করছি।
ম্যাজিষ্ট্রেট জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কিছু বলবার আছে ?
চৌধুরী বললেন, যা বলবার আমার ব্যারিষ্টার বলবেন।
কোট-ইন্সপেক্টর জেরা করলে, আপনিই কি কিষণ-সিংহকে খুন
করেছেন?
অকপটভাবে স্বীকার করলেন ভবানী চৌধুরী : আজ্ঞে হ্যাঁ, আমিই
খুন করেছি।
ভবানী চৌধুরীর শালা কালােবরণ ঘােষ ওরফে কালু আদালতের
খবরটা নিয়ে এলাে মহামায়ার কাছে। বললে, একেবারে আদালতেই
১২
গিয়েছিলুম দিদি। জামাইবাবু নিজে হাজির হ'য়ে দিলে কবুল করে। বললে, হ্যা, আমিই খুন করেছি। মহামায়া বললেন, মিছে কথা ও যে কিছুতেই বলবে না সে তাে আগে থেকেই জানি। জামিন কি কোন উপায়ে পাওয়া গেল না, কালু? কালু বললে, জামিন আর দেয় কখনাে ! পুলিশ বললে, বড়লােক, সাক্ষী ভাঙ্গিয়ে দেবে। তবে আমিও আবার চেষ্টা করে দেখি— –সহজে ছাড়বাে না। হাজার খানেক টাকা আমাকে দে তত তো! নৈবেদ্যের থালা হাতে পূজোর ঘরে যাচ্ছিলেন মহামায়া। জিজ্ঞেস করলেন, টাকা কি এক্ষুনি চাই ? কালু বললে, তা এদিকে যতো দেরী করবি, ওদিকেও তত দেরী হয়ে যাবে। মামলা মােকদ্দমার ব্যাপার। কোনরকম গড়িমসি করা উচিত নয় ভেবে মহামায়া কালুকে তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতর ডেকে নিয়ে গেলেন। শােবার খাটের গদীর নীচে ছিল সিন্দুকের চাবি। দেখিয়ে দিয়ে বললেন, আমি এখন সিন্দুক ছোঁবে না। এইখানে সিন্দুকের চাবি আছে, তুই নিজের হাতে সিন্দুক খুলে টাকা বের করে নে। সিন্দুক খুলে ? নিজের হাতে ?—কালু তো একেবারে অবাক ! এতখানি বিশ্বাস তাে কেউ তাকে করে না। একটু কিন্তু করে সে বললে, বলছিস যখন, নিচ্ছি। তুই না-হয় মা’র পেটের ভাইকে বিশ্বাস করে বললি, কিন্তু তাের সেই নায়েবটা -ওই যে পাকা পাকা গোঁফ, কি নাম নে ছাই বনমালী -হ্যা, বনমালী। তাকেও তো দেখলাম আসামীর কাঠগােড়ায় দাড়িয়ে। সে আবার কিছু না বলে । -না না সে কিছু বলবে না, তুই নে। কালুকে অভয় দিয়ে মহামায়া পূজোর ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
সিন্দুকের চাবি হাতে পেয়ে কালুর আর কোন দিকে চাইবার অবসর ছিল । একটা জমিদার বাড়ীর টাকার সিন্দুক হাতে পাওয়া কি সােজা কথা ! তাড়াতাড়ি করে কাজ হাসিল করতে না পারলে কে আবার কোথা থেকে দেখে ফেলবে, তাই চাবি দিয়ে সিন্দুক খুলে কালু যা সামনে দেখলাে তাই হাতাতে সুরু করলাে। সঙ্গে সঙ্গে মুখেও তার খই ফুটতে লাগলাে। আমি এত তাড়াতাড়ি করছি কি আর সাধে? ভবানী চৌধুরীর মতন অতবড় একটা লােক-চোর-চণ্ডালের সঙ্গে গারদরে পােরা থাকবে, যত তাড়াতাড়ি জামিনটা হয়ে যায় ততই ভালো। কথা বলতে বলতে একবার আড়চোখে দেখে নিলে কালু, ধারে কাছে কেউ কোথাও নেই, দিদিও চোখের আড়ালে চলে গেছে। মনের আনন্দে সে তখন তা পারলে তাড়াতাড়ি নােট বের করে এ-পকেট সে-পকেট বােঝাই করতে লাগলো। হাত সাফাই করার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে নিজের সাধুগিরিও জাহির করতে সে বাকী রাখলাে না: পরের জিনিষ, কাজ কি বাবা কম-বেশী নিয়ে? গুণে গুণে ঠিক হাজার টাকাই নিচ্ছি। সিন্দুক বন্ধ করে চাবিটাও আবার ঠিক জায়গামতই রেখে যাচ্ছি। গদীর নীচে চাবিটা রেখে, বুকে মাথায় আলােয়ান জড়িয়ে কালু যেমনটা এসেছিল তেমনই আবার গুটগুট করে সরে পড়ার তালে ছিল। যাবার মুখে মহামায়া বললেন, জামিনের জন্যে খুব চেষ্টা করিস কাল। কালু বললে, এলুমই তাে সেই জন্যে । মহামায়া বললেন, আমার আবার ভয় হচ্ছে, ওই যে পুলিশ কি সব বলেছে বললি । কালু বললে, কী আর বলবে? বলছে-ইনফুলাে শিয়াল লােক- মহামায়া কালুর কথাটা বুঝতে পারেন না। কালু নিজেও জানে না যে কথাটা আসলে কী। কোর্ট-ইন্সপেক্টর যে ইমফুলােশিয়া বলে নি, ১৪ বলেছিল Influential যার মানে প্রতিপত্তিশালী-অত শত বুঝবার মতাে বিদ্যে কালুর পেটে নেই। ভুল কথাটাই আবার আওড়ায় সে। বলে, ইনফুলােশিয়াল লােক, ওসব ইংরেজী কথা, তুই বুঝবি না। সােজা কথায় পুলিশ বললে বাইরে থাকলে জামাইবাবু সাক্ষী ভাঙ্গিয়ে দেবে। বিজয় আবার এমন সময়ে খবর নিয়ে এলাে রায়ের সাক্ষীদের সব শিখিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছে। মহামায়া আরাে ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, ওরা শেখাচ্ছে, আমাদের কী হবে? কালু বললে—আমরাও শেখাব। তবে, সাক্ষীদের কিছু কিছু ইয়ে দিতে হবে যে। সে টাকা তাে নেওয়া হােল না। মহামায়া ব্যস্ত হয়ে বললেন, নাও না তােমার যত মই। নিতে তত বলছি। কালুর ভয় হয়, বেশী লােভ করতে গিয়ে পাছে সে ধরা পড়ে যায়। ভিজে বেড়ালটীর মতাে ঢোক গিলতে গিলতে সে বলে, বলছাে ততা নিজে ; কিন্তু আমার যে ভয় করে। পরের টাকা, নিজের হাতে বারবার সিন্ধুক খুলে। না দিদি, সে তুমি পরে দিও। ও টাকা পরে দিলেও চলবে। আর সাক্ষী পিছু কী ই বা এমন হাতীঘােড়া দেবে ওরা! হয় পাঁচ টাকা, নয়তাে দশটাকা। সে আমি নিজের পকেট থেকেই চালিয়ে নেবাে এখন। আর বেশী বাক্যব্যয় না করে নিজের পকেট সামলাতে সামলাতে কালু একপা একপা করে বেরিয়ে গেল দিদির বাড়ী থেকে। কালু যখন আদালতে এসে পৌছুলো তখন পুরােদমে সাক্ষীদের শুনানী চলেছে। লােকজনের ভীড়ে থম্ থম্ করছে আদালত ঘর। ঘরের ভেতরে দর্শকদের গ্যালারীতে আর তিল রাখবার জায়গা নেই। কালু যততা ঘরে ঢুকবার জন্যে পেড়াপীড়ি করে কনেষ্টবল ততই বাধা দিয়ে বলে, নেহি নেহি বাবু মাপ কিজিয়ে।
মহামুস্কিল। কালু ভালাে হিন্দী বলতে পারে না, কেমন করে সে হিন্দুস্থানী পাহারাওলাকে বােঝাবে যে এ মামলায় তার কতখানি মাথাব্যথা! কনেষ্টবলকে সে বলে, নেহি নেহি বলছো কেন বাবা, আসামী আমার বেনাই হােতা বােনাই, ঘরের লােক ; আমাকে ভেতরে যেতে দেবে না! সে কি হয় ? কনেষ্টবল বলে, হাঁ হাঁ ঘরের লােক তো সব হি আছে। কালু তবু বােবায়, না বাবা, ঘরের লােক ত সবাই নেহি আছে, সব গাঁকা লােক আছে, ঘরকা লােক আমি একাই আছে। তুম্ বােনাই বুঝ, তা নেহি? ভগ্নিপতি-মানে ভগ্নিক পতি হ্যায়। গােলমাল করে গা নেই বাবা, চুপকে চুপকে যায়ে গা, আর চুপকে চুপকে বসে গা। কালু একেবারে নাছােড়বান্দা। কনেষ্টবল কতক্ষণ আর তাকে ঠেকিয়ে রাখবে ? একবার ফাক পেয়েই কালু ভেতরে ঢুকে পড়ে । • লাফাতে লাফাতে হাঁপাতে হাঁপাতে লােকজন সরিয়ে বেঞ্চির মাঝখানে এসে বলে : একটু জায়গা দিন মশাই বসি। দায়রাকা বিচার হােত, সাক্ষীকা জেরা হােতা, বুক ধড়া ধড়াস্ করত। বুক ধড়াস ধড়াস্ করবারই কথা বটে । কলকাতার জবরদস্ত ব্যারিষ্টার তখন জেরায় জেরায় বিবাদী পক্ষের সাক্ষীদের একেবারে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিলেন। রায়-বাবুদের বাড়ীর সামনের গেটটি যে বিজয়া দশমীর দিনেই আড়াআড়ি করে তৈরী হয়েছিল, কিষণসিংকে গুলী করবার আগেই যে চৌধুরীর ছেলে বিজয়কে নিয়ে কী-একটা হাঙ্গামা হয়েছিল এসব রায়েদের সাক্ষীদের মুখ থেকেই ফাক করাতে তার বেশীক্ষণ সময় লাগলাে না। শেষ পর্যন্ত সাক্ষীর কাঠগড়ায় এসে উঠলো কার্তিক । যেমন বকের মতন চেহারা তার, তেমনি একটা ঠাকুর্দার আমলের শততালি-দেওয়া কালাে কোট পরে তাকে একেবারে বহুরূপীর মতাে দেখাচ্ছিল। কাঠগড়ায় উঠেই সে ছটফট করতে লাগলো : তাড়াতাড়ি করুন মশাই, তাড়াতাড়ি করুন, আমার আবার হাই উঠছে। নেশা ভাং করি কিনা !. ব্যারিষ্টার জিজ্ঞাসা করলেন, কী নেশা করেন ? কার্তিক একটু বিব্রত হয়ে বললে, ওই দেখুন, ওসব কথা এখানে কেন ; আজ্ঞে, বড় তামুক খাই। -বড় তামুক ! “আজ্ঞে হ্যা, কলকে ছােট, তামুক বড়। একটান টেনেছেন কি, একেবারে ত্রিভুবন দেখিয়ে দেবে। ওই যে ম'রে গেল কিষণ সিং, ওরই সঙ্গে খেতাম রােজ সন্ধ্যাবেলা। —কিষণ সিং তাহলে আপনার বন্ধু ছিল ? “আজ্ঞে হঁ্যা। সেইজন্যই তাে রায়বাবুদের এদিক দিয়ে আজকাল আঁধার রাতে আমার আর যাবার জো নেই হুজুর। অপঘাতে ম'রে ব্যাট। ভূত হয়েছে যে ! ব্যারিষ্টার জিজ্ঞেস করলেন, তা কে ওকে মারলে বলুন তো ? একগাল হেসে কার্তিক বললে, আজ্ঞে জানেন তাে সবই, তবে আর. চালাকি করছেন কেন? ভবানী চৌধুরী মেরেছেন গুলী করে। -ভবানী চৌধুরীর ছেলেকে চেনাে? —বিজয়কে ?—খুব চিনি। -সে তখন কোথায় ছিল? -থাকতাে নাকি? এচোড়ে-পাকা ছেলে, বাবা, বাবা ক'রে ছুটে গিয়ে ঢুকেছিল সেই ভীড়ের মাঝখানে। বাস, যেই দেখা আর অমনি আড়কোলা করে তুলে কিষণ সিং বলে কিনা দোবাে আছড়ে ফেলে। দিতে-মিছে কথা বলবাে কেন, নিশ্চয়ই দিতত, তবে চৌধুরী মশাইয়ের হাতের টিপ ব’লতে হবে—একেবারে সড়ক দুম্। বাস, কিষণ সিংকে আর মা বলতে হােল না ; উলুটে পালুটে একেবারে ডিগবাজি খেয়ে ১৭ রায়-চো-২ খুব একচোট হাতমুখ নেড়ে কার্তিক কিষণ সিংয়ের মৃত্যুদৃশ্য বর্ণনা করতে সুরু করছিল, ব্যারিষ্টার তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, থাক আর বলতে হবে না। গেটটা কেন তৈরী হয়েছিল বলেই আপনি চলে যান। আচ্ছা বিপদেই পড়লোকার্তিক। এসব তার বলবার কথা নয়। তাছাড়া একভরি গাঁজার দাম তার খামােখা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। টাইম বাধা নেশা, টাইমে না খেলে যে পেট ফুলে জয়ঢাক হয়ে যায়, সেততা আর বিলেত ফেরত ব্যারিষ্টার বােঝে না। বিরক্ত হয়ে সে বললে, ও-গেট হতাে নাকি ? আমি বললাম, তবে তাে হােল !—দু-বাড়ীতেই দুর্গোপূজো হয় কিনা, তা’ এবছর চৌধুরীদের পিতিমে একটু বড় হয়েছিল। —চৌধুরীদের প্রতিমা বড় হয়েছিল ? -আজ্ঞে না, বেশি বড় নয়, আধ হাত খানেক। তা মিছে কথা কেন বলবাে, আধহাতের চেয়ে আঙুল দুই বরং ছােট হবে। ব্যারিষ্টার বললেন, তাই বুঝি এই গেটটা তৈরী হােল—প্রতিমার চালিটা গেটে আটকে যাবে বলে ? কার্তিক দেখল ব্যারিষ্টার সাহেব সব জেনে শুনে ন্যাকা সাজছেন। অনুনয় করে সে বললে—এই তত, জানেন সবই, কেন অযথা আমাকে হায়ণ করছেন? ছেড়ে দিন না আমাকে, দেরী হয়ে যাচ্ছে। আর বেশী জেরা করবার দরকার ছিল না ব্যারিষ্টারের। কার্তিকের টাইম-বাধা নেশার খাতিরে তিনি সেদিনকার মতাে রেহাই দিলেন তাকে। সাক্ষী দিয়ে কার্তিক যেন একেবারে লঙ্কা-বিজয় করে এসেছে। মহা ফুর্তিতে আদালতের বাইরে বেরুতেই অশ্বিনী রায় ধমক দিয়ে বললে, তুই সব মাটি করে দিলি হতভাগা, ওসব কথা বলতে গেলি কেন ? কার্তিক দমবার পাত্র নয়। সে বললে, যা বলেছি ওতেই দেখাে চৌধুরীর ফাসি হয়ে যাবে। ১৮ অশ্বিনী রায় বিদ্রুপ ক'রে বললে, হ্যা, ফাসি হয়ে যাবে না ঘােড়র ডিম হবে ! কার্তিক দেখলে তার কথায় বাবুর বিশ্বাস হচ্ছে না। জামার তলা থেকে সে তার পৈতাটা তাড়াতাড়ি টেনে বের করলো। পৈতে ধরে বললে এই আমি পৈতে ছুয়ে বলছি—ফাসি যদি না-হয় তত আমি বামুন থেকে খারিজ । এমন ভবিষ্যদ্বাণীতে অশ্বিনী রায় নিশ্চয়ই নিশ্চিন্ত হয়েছে ভেবে কার্তিক তখন আসল কথাটা পাড়লাে : গাঁয়ে এবার ঝুমুর-নাচ লাগাই গিয়ে তাহলে। আসবার সময়েই আমি তার বায়না দিয়ে এসেছি। অশ্বিনী রায় বললে, বেশ করেছিস, তাের যা খুসী তাই কর। কার্তিককে আর পায় কে ? ইচ্ছেয় হােক অনিচ্ছেয় হোক বাবু একবার যখন বললে তাের যা খুশী তাই কর, তখন বাবুর হুকুম হয়েই গেছে বলত হবে। গাঁয়ে ফিরে এসেই কার্তিক ঝুমুর-নাচের আসর বসিয়ে দিলে। সবাইকে বললে, বাবুর হুকুম হয়ে গেছে। যতাে খুশী ফুর্তি লাগাও । রায়েদের চণ্ডীমণ্ডপ কয়েকদিন ধরে লােকজনের ভীড়ে, আর নাচগানের হুল্লোড়ে একেবারে জজমাট হয়ে উঠলাে। কার্তিক একাই একশো লােকের উৎসাহ নিয়ে ঘুরে ফিরে বাহবা দিয়ে আসর মাতিয়ে তুললাে। মামলায় যে রায়েদেরই জিত, একেবারে সুনিশ্চিত, এবিষয়ে ছােট বড় কারুরই আর কোন সন্দেহ রইল না। কার্তিক তােত নিজেই বড় গলা করে বলতে লাগলাে যে, এমন সাক্ষী সে দিয়েছে যাতে ভবানী চৌধুরীর ফাসি না হয়ে আর যায় না। ভগবানের ইচ্ছা কিন্তু অন্যরকম। নাচের আসরেই একজন খবর নিয়ে এলাে, ভবানী চৌধুরী খালাস পেয়ে গেছেন। কার্তিক তাে ক্ষেপে আগুন। যে-লােকটা খবর এনেছে তাকে সে তেড়ে মারতে মারতে যায় আর কি। বলে, তাের কথাতেই খালাস পেয়ে গেল? খালাস অমনি পেলেই হােল কিনা! খুন করে কখনাে খালাস হয় ? লােকটা বললে, হয় কিনা একবার দ্যাখ না রাস্তায় গিয়ে। ভবানী চৌধুরী জুড়ি-গাড়ীতে চড়ে ড্যাং-ড্যাং করে বাড়ী যাচ্ছে, আমি নিজের চোখে দেখে এলুম। কার্তিকও তাড়াতাড়ি দেখতে ছুটলাে ব্যাপারটা সত্যি কিনা। রাস্তায় বেরিয়ে দেখে, সত্যিই তাে বটে! ভবানী চৌধুরীর জুড়ি-গাড়ী একেবারে ঝম্-ঝম্ করে চলেছে, গাড়ীতে বসে আছেন ভবানী চৌধুরী, তার শাল কালু, আর নায়েব বনমালী। কার্তিক ভেবে দেখলাে এতবড়াে একটা মামলা থেকে রেহাই পেয়ে চৌধুরীদের মেজাজ এখন দিলদরিয়া থাকবার কথা। তাছাড়া কার্তিকের কাছে রায় জিতলেও যা, চৌধুরী জিতলেও তাই। বরং এই সুযােগে একটু চালাকী করলেই চৌধুরীবাবুর কাছ থেকে কিছু বখশিস আদায় করা চলে। কার্তিক তাই বাবু-বাবু ব’লে ছুটতে ছুটতে গিয়ে গাড়ী থামালাে। তাড়াতাড়ি ভবানী চৌধুরীর পায়ের ধূলাে নিয়ে সে বললে, আমি জানি আপনি বেকসুর খালাস পেয়ে আসবেন হুকুর। মা-কালীর কাছে আমি মানৎ করেছিলুম যে ! সঙ্গে সঙ্গেই নায়েবের সামনে হাত পাতলো কার্তিক : কই, দশটা টাকা দাও, মায়ের মানং শােধ করতে হবে। পথের মাঝে গাড়ী দাড় করিয়ে টাকা চাওয়াটা বাবুর শালা কালুর বরদাস্ত হচ্ছিল না। কিন্তু কার্তিকের সঙ্গে কথায় পেরে ওঠা তার সাধ্য নয়। কার্তিক তাগিদ দিতে লাগলাে। মায়ের পূজোর টাকা দিতে আর ফষ্টি-নষ্টি কোরাে না, বাবা। এ মা তাে আর সহজ মা নয়, একেবারে মা-কালী, সব সময়ে জিব বের করেই আছে। মায়ের মৃত্তি দেখলেই বুকের রক্ত জল হয়ে যায়। কার্তিকের কথার ঢং দেখেই সবাই বুঝলাে যে একটা কথাও তাব সত্যি নয় তবু একবার যখন সে ধরেছে তখন টাকা না আদায় করে যে সে কিছুতেই ছাড়বে না—এও ভবানী চৌধুরী ভালাে করেই জানতেন। কাযেই আর কথা না বাড়িয়ে তিনি নায়েবকে বললেন, দিয়ে দাও ওকে দশটা টাকা দশটা টাকা পেয়ে কার্তিকও মনের আনন্দে ফিরে চললাে তার নিজের আড়ায়। চৌধুরী-বাড়ীর এতবড় একটা বিপদ কেটে গেল। মহামায়ার ইচ্ছা যে, বাড়ীতে এবার একদিন একটা যাত্রা গান-টান হয় কিন্তু সেকথা নিজের মুখে কৰ্ত্তাকে জানাবার সাহস ছিল না তার। তাই কালুকে ডেকে তিনি কর্তার কাছে কথাটা পাড়তে বললেন। কালুরও জামাইবাবুকে ভয় কম নয়। যেরকম রাসভারী লােক তিনি, তা’তে নাচ-গানে পয়সা নষ্ট করার ব্যাপারে তিনি সহজে সায় দেবেন না। তবু ছােট ছেলে বিজয় আব্দার করছে শুনলে হয়তাে তার মন ট’লতে পারে এই ভেবে বিজয়কে সঙ্গে নিয়ে কালু জামাইবাবুর কাছে গিয়ে হাজির হােল। ভবানী চৌধুরীর শরীর, মন কোনটাই বিশেষ ভালাে ছিল না। কয়েকদিন হাজতবাসের অনিয়ম গেছে, তাছাড়া কিষণ সিংয়ের স্ত্রী-পুত্রের দুর্ভাবনা কিছুতেই তিনি মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না। নায়েবের কাছ থেকে যদিও তিনি শুনেছেন যে আপনার জন বলতে কিষণসিংয়ের কেউ কোথাও নেই, তবুও তার পূরােপুরি স্বস্তি হচ্ছিল না। কিষণসিংয়ের ঘরসংসার সম্বন্ধে ভালাে করে খোজ খবর করাবার জন্য মনটা তার ছটফট করছিল। এমন সময়ে কালু এলাে আমােদ-আলাদের প্রস্তাব নিয়ে। বললে, তােমার ফাসিটাসি হবে ভেবে রায়েরা ক’দিন খুব ফুত্তি লাগিয়েছিল, টাকা দাও, এবার আমরাও দেখিয়ে দি ফুত্তি কাকে বলে ! চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন, না রে না, মানুষ খুন করে ফুৰি করতে নেই। কালু বললে, বা-রে ! রায়েরা করেছিল যে ! চৌধুরী বললেন, সেইজন্যেই তো আরাে বেশি করে আমাদের কিছু করা উচিত নয়। কালু দেখলে তার জামাইবাবুটি নিতান্তই বেরসিক। বলা কওয়ায় কিছু সুবিধে হবে না দেখে কালু চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ নায়েব বনমালী তাকে পিছু ডাকলােত টাকার হিসেবটা আমাকে দিয়ে যাও তাে, কালুবাবু। আমরা যখন হাজতে ছিলাম, মােকর্দমা তদ্বির করবার নাম করে পাঁচটি হাজার টাকা তুমি নিয়েছ আয়রণ চেষ্ট খুলে। সেই টাকার হিসেব না পেলে আমি হিসেব লিখতে পারছি না। কালু বিরক্ত হয়ে বললে, আচ্ছা ফ্যাসাদে লােক তাে তুমি! হিসেব দাও বললেই দাও! আদালতের এলােপাথাড়ি খরচ—আমি এক বার ঘাড়ী যাব বাড়ী থেকে ফিরে এসে সে সব দেখা যাবে। এত তাড়াতাড়ি কিসের ? কত টাকাই বা নিয়েছি ? বনমালী বললে, বাবুর টাকা কত যে নিয়েছ তার ঠিক-ঠিকানা নেই, বাবু ঠিক বলতেও পারছেন না। সিন্দুকের ওপরের থাকে ছিল আমার টাকা, তাই থেকেই তাে নিয়েছ পাঁচ হাজার। কালু বললে, বললেই হােল পাঁচ হাজার ? আমি পাঁচহাজার নিই নি, নিয়েছি এক হাজার। চল তুমি দিদির কাছে, আমি এখুনি মােকাবিলা করে দিচ্ছি। দিদির কাছে আর যেতে হল না। ভবানী চৌধুরীই মীমাংসা করে বলেন, থাক তােকে আর হিসেব দিতে হবে না, তুই যেখানে যাচ্ছিলি যা। ২২ কালু তাে পালিয়ে বাঁচলল। চৌধুরী নায়েবকে বললেন, তুমিও যেমন ! সিন্দুক খুলেই হাতের কাছে দেখেছে নােটের তাড়া, ওর কি আর তখন হিসেব করে নেবার অবসর ছিল। হাতের মুঠোয় যা এসেছে তাই নিয়েছে। এখন তােমার হিসেবে যা কম পড়ছে ওর নামে খরচ লিখে দাও। বনমালী জিজ্ঞেস করলে, পাঁচ হাজার টাকাই খরচ লিখে দেবাে? চৌধুরী হেসে বললেন, পাঁচ হাজার কী বলছে বনমালী ? মামলায় জিতে গেলাম তাই, নইলে আমি নিজেই তাে খরচের খাতায় গিয়ে পড়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে, দিনরাত্তির খুনের কথা ভেবে ভেবে চৌধুরীর শরীর ভেতরে ভেতরে একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। দিনের দুশ্চিন্তা আর রাতের দুঃস্বপ্নের হাত থেকে কিছুতেই তিনি রেহাই পাচ্ছিলেন না। ঘুমের ঘরে স্বপ্ন দেখতেন, কিষণ সিং সিড়ির ওপর থেকে আছড়ে ফেলে দিচ্ছে বিজয়কে, আর বিজয়কে বাঁচাতে গিয়ে তিনি গুলী চালাচ্ছেন কিষণ সিংহের বুকে। আর্তনাদ করে তার ঘুম ভেঙে যেত। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠতেন : না-না-না, আমি তােমাকে মারতে চাই নি–আমি তােমাকে । মারতে চাই নি। শুধু একরাত্রেই নয়, প্রতিরাত্রে এই একই ধরণের দুঃস্বপ্ন যেন ভূতের মতন তাকে পেয়ে বসেছিল। মহামায়া তাকে দুর্ভাবনা করতে বারণ করতেন, তিনি নিজেও সব কিছু ভুলে থাকবার চেষ্টা কম করেন নি, তবু কিছুতেই কিছু ফল হােত না। দিনের বেলাটা কোনবকমে কাজকর্মে কেটে গেলেও, রাত্রির বিভীষিকা যেন কিছুতেই শেষ হতে চাইতাে না। একদিন স্বপ্নটা হােল আরাে ভয়ঙ্কর রকমের। স্বপ্ন দেখলেন, কিষণ সিং তার বুকের উপর হাঁটু গেড়ে বসেছে, দু’হাত দিয়ে প্রাণপণে গলা চেপে ধরেছে তার, তিনি না পারছেন উঠে বসতে, না পারছেন কাউকে চেঁচিয়ে ডাকতে। ঘুমের মধ্যেই তার দম প্রায় বন্ধ f হবার যােগাড়। অনেক কষ্টে তিনি গোঁ-গোঁ করতে করতে উঠে বসলেন। দেখলেন, নিজেই নিজের গলা টিপে ধরেছেন তিনি—ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। গেলাসে গেলাসে জল গড়িয়ে খেলেন তিনি কুজো থেকে। তারপর আবার গিয়ে শুয়ে পড়লেন বিছানায়। এই যে শয্যা নিলেন ভবানী চৌধুরী, সে শয্যা ছেড়ে আর উঠে বসবার সামর্থ্য হােল না তার। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন, হার্ট খুব দুর্বল। ভবানী চৌধুরী নিজেও বুঝতে পারছিলেন, তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। বনমালীকে ডেকে তিনি বললেন, তুমি একটি কাজ কর, বনমালী। রায়েদের বাড়ী যাও। অশ্বিনীর বাবা বড় রায়কে গিয়ে বল, তাকে আমি ডেকেছি। বনমালী বুঝতে পারলাে না এই মরণাপন্ন অসুখের মধ্যে বড় রায়ের সঙ্গে কৰ্ত্তামশাইয়ের কী এমন দরকার। সে বললে, এই অসুখের ভেতর ওঁকে আবার ডাকাডাকি কেন? চৌধুরী বললেন, ওঁকে ডেকে আমি বলব—আমাদের এই রায় আর চৌধুরীদের বিবাদ-বিসম্বাদটা মিটিতে ফেলতে। বনমালী সন্দেহ প্রকাশ করলাে, উনি কি আসবেন। চৌধুরী বললেন, আমি যদি সুস্থ থাকতাম, আমি নিজেই যেতাম। তুমি গিয়ে বল, বােধ হয় না এসে পারবেন না। বনমালী চলে গেল। মহামায়াকে কাছে ডেকে চৌধুরী বললেন, আমি তাে চললুম। ভবিষ্যতে যখনি সুযােগ পাবে, আমাদের এই ঝগড়াটা মিটিয়ে নিও। নইলে এই পুরন্দরপুরে রায় আর চৌধুরী বংশের কোন চিহ্ন পৰ্যন্ত থাকবে না। রায় কতক্ষণে আসেন তারি জন্যে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে ২০ লাগলেন চৌধুরী। তার ভেতর চমকে চমকে উঠে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন মহামায়াকে, রায় এলে নাকি ? মহামায়া বললেন, আসবামাত্রই আমি তােমাকে ডেকে দেবােখন। তুমি একটু চুপ করে ঘুমােবার চেষ্টা কর। এদিকে বনমালীর কাছে খবর পেয়েই প্রতাপ রায় চৌধুরীদের বাড়ী আসবার জন্যে বেরুচ্ছিলেন। অশ্বিনী এসে তাকে বাধা দিল । আমি বারণ করছি তুমি যেয়াে না বাবা। চৌধুরীর অসুখবিসুখ মিছে কথা । তােমাকে বাড়ীতে ডেকে সে অপমান করবে। অশ্বিনীর বারণ শুনলেন না প্রতাপ রায়। অশ্বিনীকে বলেন, মানুষকে তুই বড় ছােট ভাবিস অশ্বিনী। চৌধুরী ডাকছে যখন, আমার যাওয়া উচিত। আমি একবার শুনে আসি সে কী বলতে চায়।' অশ্বিনী রাগে গজ গজর করতে লাগলাে, যাও, তােমার যা খুশী তাই কর। অপমান করলে খন যেন আমাকে কিছু বলতে এসাে না। প্রতাপ রায় বুঝলেন, কথা না রাখায় অশ্বিনীর অভিমান হয়েছে। মৃদু হেসে তিনি বললেন, তাের বয়সে আমিও অমনি ছিলাম রে, ঝগড়া- মারামারি অনেক করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখলাম, ওর ভেতর একটুও মজা নেই। কথা বলতে বলতে তিনি বেরিয়ে পড়লেন বাড়ী থেকে। চৌধুরীদের বাড়ীতে পৌছে ডাকাডাকি করতেই কালু যেন তেড়ে মারতে এলাে একেবারে : তুমি কোত্থেকে? মজা দেখতে এলে নাকি? রায় জিজ্ঞাসা করলেন, কাকে বলছাে? কালু খেকিয়ে উঠলাে, তােমাকেই বলছি, আবার কাকে বলবাে! বুড়াে হয়ে মরতে বসেছ, এখনও মজা দেখবার ইচ্ছেটি তাে যায় নি। আজ চৌধুরী-বাড়ীর দরজায় এলে যে বড় ? দেব নাকি একটি চড় কসিয়ে । রায় দেখলেন, অশ্বিনী ঠিকই বলেছিল। এ শুধু বাড়ী ব'য়ে অপমান হ'তে আসা ছাড়া আর কিছু নয়। ভবানীর শালা তাকে দূর-দূর করে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলে। যাবার সময় রায় চেঁচিয়ে বলে গেলেন, ওরে কে আছি, চৌধুরীকে বলে দিস আমি এসেছিলাম। চেঁচামেচি শুনে মহামায়া ততক্ষণে দোতলার জানলায় এসে দাড়িয়েছেন। তিনি দেখলেন রায় ফিরে যাচ্ছেন আর কালু তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে বাইরের ফটক পর্যন্ত। কালুর শেষ কথা কানে এলাে মহামায়ার : যাও, আর যেন কোনদিন এ-রাস্তা মাড়িয়ে না। মহামায়া ডাকলেন, কালু ! কালু! উনি চলে গেলেন কেন? ফটকের কাছ থেকেই কালু চীৎকার করে জবাব দিলে, বুড়াের ভীমরতি ধরেছে। মজা দেখতে এসেছিল, দিলাম তাড়িয়ে। কিছু না জেনে শুনে কালু বড়ো রায়কে তাড়িয়ে দিলে ! যাতে এখনও তঁাকে ফিরিয়ে আনা যায়, সেইজন্যেই মহামায়া তাড়াতাড়ি নীচে যাচ্ছিলেন কাউকে দিয়ে তাকে ডাকতে পাঠাতে। কিন্তু যাবার মুখেই তিনি শুনলেন কর্তার ঘর থেকে বিজয় তাকে ডাকছে। ডাক শুনেই ডাক শুনেই বুকটা যেন ছাৎ করে উঠলাে তার। কাছে যেতেই বিজয় বললে, এই দ্যাখাে, বাবা আর কথা বলছে না। বাবা-বাবা বলে ডাকতে লাগল বিজয়, স্বামীর বুকের ওপর লুটিয়ে পড়লেন মহামায়া। আর্তনাদ করে বললেন, কথা কও, ওগাে কথা কও। চুপ করে থাকতে বলেছি বলে কি একেবারেই চুপ করে গেলে তুমি ? একটি কথাও কি আর বলবে না ? কিন্তু সাড়া যিনি দেবেন, তিনি তখন স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন তার পরম আদরের স্ত্রী-পুত্রের দিকে—হৃদপিণ্ডের শেষ স্পন্দনও থেমে গেছে তার। ভবানী চৌধুরীর মৃত্যুর পর পনেরো বছর কেটে গেল। চৌধুরীর ছেলে বিজয় এখন বড়াে হয়েছে, ডাক্তারী পাশ কুঁরেছে। পাড়া- প্রতিবেশীর চিকিৎসা করবার জন্য গ্রামের বাড়ীতেই সে ডাক্তারখানা খুলে বসেছে। ভালাে ডাক্তার বলে নামডাকও তার কম হয়নি। অনেক দূর থেকেও রুগী দেখতে যাবার জন্যে ডাক আসে তার। সেদিনও এক সাঁওতাল কুলি তাকে ডাকতে এলাে : তুখে একবার যেতে হবে বাবু আমার সঙ্গে। জিজ্ঞেস করে বিজয় জানলে যে কুলিটা রায়েদের কলিয়ারীতে কাজ করে। কলিয়ারীর মাইনে-করা ডাক্তার আছে, তা’সত্ত্বেও বিজয়কে কেন সে ডাকতে এলে বিজয় ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কুলিটা বলে, আমাদের ডাক্তারের কথা আর বলিস না বাবু, উ আসে না। বিজয় অবাক হয়ে যায়। বলে, সে কি রে ? তােদের কলিয়ারীর ডাক্তারবাবু যে আমার চেয়ে অনেক বড় ডাক্তার, খুব ভালাে ডাক্তার । কুলটা বলে, ই, ভালাে রইছে ! ছ’ ছটা রুগী পট পট করে মরে গেল আমাদের ধাওড়াতে, কিছুই করতে লারলে, ভালাে করে’ ওষুধই দিলেক নাই। উর কথা বাদ দে। তুই চল্ আমার সঙ্গে, তুখে আমি ভিজিট দিব। বিজয় বললে, ভিজিট আমি তােদের মত লােকের কাছ থেকে নিই । চল্-আগে তােদর ডাক্তারের কাছেই যাই একবার। কলিয়ারীর ডাক্তার মদেই ডুবে থাকে দিনরাত। ছেড়া সার্ট, ময়লা প্যান্ট, একমাথা উস্কোখুস্কো চুল আর একগাল দাড়িতে পাগলের মতই চেহারা হয়েছে তার। নিজের খাওয়া-দাওয়া কিম্বা কাজকর্মের দিকে কোন ভ্রুক্ষেপই তার নেই। ঘরখানা যেন তার নরক কুণ্ড! বইপত্তর এলােমেলাে ছড়ানাে, এটো ভাতের থালায় মাছি ভন্ ভন্ করছে, বােতলের পর বােতল নির্জলা মদই খেয়ে চলেছে সে। ২৭ বিজয় এসে তাকে ডাক্তারবাবু বলে ডাকতেই ঘরের ভেতর থেকে চীৎকার করে উঠলাে সেঃ আঃ! হাজার বার বললুম বাইরের দোরটা বন্ধ করে দে—আমাকে বিরক্ত করিস নে—করিস নে, তা না—ডাক্তার- বাবু! আমি ডাক্তার নই—বাবা, আমি ডাক্তার নই, মানুষ নই, আমি কিছু নই। বেরােওসব, দূর হও এখান থেকে। নিজেই উঠে সে দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল। হঠাৎ মুখ তুলেই দেখে বিজয় এসেছে ভবানী চৌধুরীর ছেলে বিজয়। বিজয়কে দেখেই সমস্ত বিরক্তি কেটে গেল ডাক্তারের। হাসতে হাসতে সে বললে, আরে বিজয় যে! এসাে-এসাে-এসাে; কী খবর? বিজয় বললে, আপনার কলিয়ারী থেকে একজন সাঁওতাল আমাকে ডাকতে গিয়েছিল। ডাক্তার একটু চিন্তিতভাবে বললে, হু, খুব টাইফয়েড হচ্ছে। কতগুলাে মরবে। বিজয় জিজ্ঞেস করলাে, তা আপনি দেখতে যান না কেন? ডাক্তার বললে, কেন-টেন জানি না, আমি যাই না,বাস! অনেক দিন পরে এলে, এসাে একটু গল্প করা যাক। বিজয় বললে, না, আমি যাই, রুগীটা দেখে আসি। ডাক্তার বিরক্ত হয়ে বললে, যাবে? কী জন্যে যাবে? ওষুধ দিয়ে রুগী বাঁচাবে? পারবে বাঁচাতে ? বিজয় বললে, পারি না পারি, একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? ঢক ঢক করে খানিকটা মদ গলায় ঢেলে ডাক্তার বললে, যদি মরবার হয়, তােমার হাজার চেষ্টাতেও সে বাঁচবে না, আর যদি বাঁচবার হয়, তােমার ওষুধ না খেলেও সে বাঁচবে। ডাক্তারকে মদ খেতে দেখে বিজয় বললে, শুনছি, আপনি নাকি আজ- ৩ ২৮ কাল দিনরাত—বিজয়ের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ডাক্তার বললে, হ্যা, দিনরাতই খাই। শুধু ওই ঘুমােবার সময়টা বাদ থাকে। বিজয় কী একটা কথা বলতে গিয়ে চুপ করে গেল। হেসে বললে, থামলে কেন? বল। বল—দিনরাত খাওয়া ভাল নয় ওরকম করে খাবেন না, খেলে লিভার-য়্যাবসেস্ হবে, মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে, ফটু করে কোনদিন মরে যাবেন।-এই তাে? বিজয় মাথা নেড়ে বললে—হ। ডাক্তার বিজ্ঞের হাসি হেসে বললে, আমি এসব জানিনা, না? -জানি। তােমার চেয়ে হয়তো বা কিছু বেশিই জানি। জানি, তবু খাই। কেন খাই এইটিই শুধু জানি না। পাগলের সঙ্গে বক্ বক্ ক'রে কিছু লাভ নেই, দেখে বিজয় চলে যাচ্ছিল। ডাক্তার পিছু ডাকায় আবার তাকে ফিরতে হােল। কাছে আসতে বিজয়কে ডাক্তার জিজ্ঞেস করলে, আচ্ছ। ' বিজয়, কিছুদিন থেকে শুনছি, লােকে নাকি আমাকে পাগল বলছে । আমার কথাবার্তা শুনে আমাকে কি তােমার পাগল বলে মনে হােল ? বিজয় একথার কী জবাব দেবে ! সে আশ্বাস দিয়ে বললে, না-না, মাথা আপনার ঠিক আছে। বিজয়ের কাছে মাথা ঠিক আছে শুনে আবার শুরু হােল ডাক্তারের বক্তৃতা : দ্যখাে বিজয়, কিছুদিন থেকে এই পৃথিবী সম্বন্ধে আমার ধারণাটা কেমন যেন একটুখানি বদলে গেছে।-এই যে আমি, তুমি, এ-গ্রামের জমিদার প্রতাপ রায়, অশ্বিনী রায়-এরা এ পৃথিবী তাে চালাচ্ছে না, চালাচ্ছে এমন একটা শক্তি—যার ওপর আমাদের কারও কোনও হাত নেই। বিজয় হেসে বললে এ আর নতুন কথা কী? এসব আধ্যাত্মিক আলােচনা তাে আমাদের দেশের ছােট ছেলেটি পৰ্য্যন্ত জানে ২১ * আবেগ-কম্পিত গলায় ডাক্তার বলে চললল, জানে—কিন্তু জেনেও তােকই সে বিরাট শক্তির কাছে কেউ আত্মসমর্পণ করে না ! নিজের শক্তিরই বড়াই করে প্রত্যেকে। জানে না, আমরা কত দুৰ্বল, কত অসহায়! আমার পরমাসুন্দরী স্ত্রীর মৃত্যু আমি নিজের চোখের ওপর দেখেছি। বিজয়, কী সুন্দর স্বাস্থ্য ছিল তার! সামান্য একটু জ্বর হােলওষুধ দিলাম। এরকম কত রুগীকে আমি সারিয়েছি। ওষুধের পর ওষুধ দিলাম, তার জ্বর কিন্তু কিছুতেই সারলাে না। দিনে দিনে বেড়েই চলাে। তেরােদিনের দিন ঠিক এইখানটীতেই সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে তারও জীবন অস্ত হয়ে গেল। পাঁচ বছরের ছেলে মুকুল- তার শিয়রের কাছটিতে চুপ করে বসে। একদিকে ছেলে, একদিকে আমি, কী যেন সে বলতে চাইলে, কিন্তু কিছুই তার বলা হােল না, চোখ দিয়ে শুধু দরদর করে জল গড়িয়ে এলাে। বাস, তার পরেই সব শেষ!- বলতে বলতে নিতান্ত অসহায়ের মতাে ডাক্তার তার ভাঙা খাটিয়াটার ওপর ধপ করে বসে পড়লাে। তার বুকফাটা তার বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসে এক মুহূর্তেই যেন ভারী হয়ে উঠলাে ঘরের আবহাওয়াটা। এই করুণ দুঃখের কাহিনী শুনে বিজয়ও একটু বিচলিত না হয়ে পারলাে না। সেও দীর্ঘশ্বাস চেপে বললে, জানি আমি, সবই শুনেছি। বিজয়ের কথা শুনে ডাক্তারের বুকের আগুন আবার যেন দাউদাউ করে জ্বলে উঠলাে। আবার সে বাষ্পরুদ্ধ স্বরে বলতে লাগলাে, জানাে তুমি? আমার সেই একটিমাত্র ছেলে মুকুল, ফুলের মতন পবিত্র, ফুলের মতনই সুন্দর! মা-কে ছেড়ে সাতটি দিনও সে আমার কাছে রইল না। তারও হােল, সেই একই অসুখ। রাতের পর রাত জেগে বসে রইলুম তার শিয়রের কাছে, ডাক্তারী বিদ্যে আমার যতদূর জানা ছিল, চেষ্টার ত্রুটী করলুম না। ওষুধ দিলুম, ইঞ্জেকসন দিলুম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হােল ।
, কোন ওষুধই তাকে বাঁচাতে পারলে না। আঘাতের পর আঘাত পেয়ে মনের জোর আমার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এখন শুধু ইচ্ছে করে ভােগ্যটাকে ছুড়ে ফেলে দি’ জাহামের পথে আর অভিসম্পাত, দি’ সেই সর্বশক্তিমান্ ভগবানকে। উত্তেজনায় আত্মহারা হয়ে পড়েছিল ডাক্তার। হঠাৎ তার চৈতন্য হােল, এসবকথা বিজয়কে শােনাবার নয় । তার একার দুঃখ একার একার থাকাই ভালাে। নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে সে বিজয়কে বললে, কী সব মাথামুণ্ডু বক ছিলাম এতক্ষণ ও নিয়ে তুমি মাথা ঘামিও না; বিজয়, তােমার দেরী হয়ে যাচ্ছে, তুমি যাও—ভালাে করে রুগী দ্যাখােত গে, যাও। কুলি-ধাওড়ায় এসে ভালাে করেই রুগীকে পরীক্ষা করে দেখতে লাগলে বিজয় । দশ-বারাে বছরের লিকলিকে চেহারার একটা কালো ছেলে, রােগে ভুগে ভূগে’ অবস্থা তার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কুলিটা কাকুতি করতে লাগলাে, ভালো করে দ্যাখ, বাবু। আমার ওই একটি ছেলে, উয়াকে বাচাই দে বাবু, তুই যা বলবি তাই করব। বিজয় বললে, তাতো করবি, কিন্তু তােদের এই ধাওড়ার আশে পাশে, ময়লাজলের যে গর্তগুলাে দেখে এলাম, ওগুলাে পরিষ্কার করতে পারিস না? কুলিটা বললে, কখন করব বাবু, দিনরাত আমরা তত খাদেই কাজ করছি। বিজয় বললে, তােদের মনিবকে বলতে পারিস না? অশ্বিনীরায়কে ? অশ্বিনীরায়ের নাম শুনেই আঁতকে উঠলাে কুলিটা।' বললে, ওরে বাবা, বলতে গেলে তেড়ে মারতে আসে। বিজয় বললে, কিন্তু ওগুলাে যতদিন থাকবে, ততদিন এরকম অসুথ বিসুখের হাত থেকেও তাে নিস্তার নেই তােদের। আরেকজন কুলি মুখ তুলে বললে, এই অসুখে আমারও একটা ছেলে মরে গেইছে বাবু, বলিস তো ‘ডিনামাটি দিয়ে ওই সব নর্দামা-টর্দমা উড়েই দিই। বিজয় জিজ্ঞাসা করলাে, তুই বুঝি ডিনামাইটের কাজ করিস? কুলিটা জবাব দিলে, হু’ বাবু, আমরা পিলার বেলাষ্টের কাজ করি। বিজয় আবার প্রশ্ন করলে, তা ডিনামাইট কাটাতে গিয়ে যদি ধরা পড়িস, কী বলবি? কুলিটার মুখে আর রা নেই, ধীরে ধীরে সে মাথা হেঁট করলাে। বিজয় বুঝলো অশ্বিনী রায় এমনই কড়া মনিব যে এসব কথা ঘুণাক্ষরে টের পেলে আর রক্ষা নেই কারাে। হাতে হাতে ওষুধ পাঠিয়ে দেবার জন্যে ছেলেটার বাপকে সঙ্গে নিয়ে বিজয় তাড়াতাড়ি বাড়ীর দিকে চললাে। কুলি-ধাওড়া পেরিয়ে এসে কলিয়ারীর ইঞ্জিনঘরের পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল বিজয় আর কুলিটা। ঠিক সেই সময়েই লিফটে করে পিটের মখে এসে উঠলাে অশ্বিনী রায়। বিজয়কে দেখে দূর থেকেই হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলাে সে: এই! এই বিজয় ! বিজয় কে-ডাকছে দেখবার আগেই চক্ষের নিমেষে সঙ্গের কুলিটা দৌড়ে পালালাে। অশ্বিনী রায় এগিয়ে এলো। বিজয়ের আপাদমস্তক একবার শ্যেনদৃষ্টিতে দেখে নিয়ে সে সরাসরি জেরা সুরু করলাে, বলি, এদিক দিয়ে আবার কবে থেকে হাঁটাহাটি শুরু করেছ ? বিজয় জবাব দিলে, এদিক দিয়ে বড় একটা আসবার দরকার হয় না, আজই এসেছিলাম। —কেন এসেছিলে ? —আপনার কলিয়ারীর একজন-সর্দার ডাকতে গিয়েছিল। -কেন ? -তার ছেলের টাইফয়েড হয়েছে।
—কোথায় সে? -আপনাকে দেখে পালালাে। —আমার কলিয়ারীর ডাক্তার আছে, বােধ হয় জানো? -জানি। -তবু তুমি এলে কেন? —আসতে চাই নি, লােকটা নেহাৎ ছাড়লে না, তাই এলাম। চৌধুরী-বাড়ীর ছেলে এসে রায়েদের বিধিব্যবস্থার ভেতর নাক গলাবে এটা অশ্বিনীরায়ের চক্ষুশূল। বিজয়ের কথা শুনে আত্মসম্মানে ঘা লাগলো তার। নিজের মনেই সে বলে উঠলাে, ব্যাটারা কেন যে এরকম করে বুঝতে পারি না, তাদের সুখ-সুবিধার সব ব্যবস্থাই তাে করে দিয়েছি। বিজয়ও মুখফেঁড় কম নয়। ঘাড় নেড়ে সে বললে, হ্যা তা করেছেন বটে! মদের ভাটি, গাঁজা আফিংএর দোকান—সবই আছে। এইবার দয়া করে ওই যে ধাওড়ার আশেপাশে ময়লাজলের গর্তগুলাে করে দিয়েছেন ওইগুলাে যদি পরিষ্কার করিয়ে দেন তো বড় ভাল হয়। অশ্বিনী কুটি করে জিজ্ঞেস করলাে, কার ভালাে হয় ? তােমার ? বিজয় বললে, আজ্ঞে না। জানােয়ারের মত যারা আপনার ওই সব কুলি-ধাওড়ায় বাস করে, যাদের না হলে আপনার একদিন চলে না, কলিয়ারী বন্ধ হয়ে যায়—তাদের। কুলি-মজুরদের ওপর এতটা দরদ সন্দেহজনক বলে মনে হয় অশ্বিনীর। বিদ্রুপ করে সে বললে, বেশ বুলি শিখেছ তাে? এইসব ওদের শিখিয়ে এলে বুঝি ? বিজয় জবাব দিলে, আজ্ঞে না । কিন্তু আজ্ঞে-না বললে শুনছে কে ? অশ্বিনীর মেজাজ তখন গরম হয়ে গেছে। চোখ রাঙিয়ে সে বিজয়কে শাসিয়ে দিলে, খবরদার বলছি এরকম করে আমার পেছনে লেগাে না, ভাল হবে না। রায়চৌ৩ মিছামিছি অশ্বিনীর মাথা-গরম করা দেখে হেসে ফেললে বিজয়। রহস্য করে বললে, আজ্ঞে না, কারও পেছনে লাগার অভ্যেস আমার নেই, লাগতে হলে সাসানি লাগি। অশ্বিনী পুরানাে ইতিহাসের জের টেনে বললে, আমাদের সঙ্গে লাগতে গিয়েই তােমাদের এই দুরবস্থা, জানাে তো? বিজয় বললে, আজ্ঞে না, আমাদের দুরবস্থার কারণ—আমার মামা। কিন্তু সে সব কথা তুলে আমি এখন সময় নষ্ট করতে চাই না। আমার হাতে অনেক রুগী রয়েছে, আমি চলুম । একটা শুষ্ক নমস্কার জানিয়ে চলে যাচ্ছিল বিজয়। হঠাৎ তার কানে এলাে অশ্বিনীরায়ের কথা : হঁা যাও। ভবিষ্যতে এদিক দিয়ে তুমি আর এলেই ভালাে হয়। কথাটা শুনেই ঘুরে দাড়াতে হোেল বিজয়কে। একটুও ইতস্ততঃ না করে পাল্টা জবাব দিলে সে, ময়লাজলের গর্তগুলাে যদি আপনি বন্ধ করে দৈন তাে আরাে ভালাে হয়। অশ্বিনী বাড়ী যাবার জন্যে মােটরে উঠে বসেছিল। গাড়ীর যাকৃসিলারেটরটা পায়ে চেপে ধরে সে বললে, আমার কিসে ভাল হয় -হয় তা আমি বেশ ভালো করেই জানি। তােমার কাছে পরামর্শ নেবার দরকার হবে না। তুমি যেখানে যাচ্ছ, যাও। গাড়ীতে ষ্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল অশ্বিনী। একটু হেসে বিজয়ও ফিরে চললাে তার বাড়ীর দিকে। সাঁওতাল কুলিটা আগেভাগেই বিজয়ের বাড়ীতে এসে বিজয়ের জন্যে অপেক্ষা করছিল। বিজয় না এলে তাে আর ওষুধের ব্যবস্থা হতে পারে । নায়েব বনমালীর ওপর কম্পাউণ্ডারীর ভার। সে তাই তাগিদ দিচ্ছিল কুলিটাকে : দ্যাখ না একবার বাইরে গিয়ে, বাবু আসছে কিনা ? বাইরে আর যেতে হােল না কুলিটাকে। হন্তদন্ত হয়ে বিজয় এসে ৪ ঘরে ঢুকলাে। অনেক দেরী হয়ে গেছে দেখে তাড়াতাড়ি ওষুধের প্রেক্রিসটা করে দিল বনমালীকে। কুলিকে জিজ্ঞেস করলাে, এই রকম লুকিয়ে লুকিয়ে কতদিন তুই ওষুধ নিয়ে যাবি? ছেলের জন্যে কিছু করতেই আর ভয়ডর ছিল না কুলিটার। বললে, রােজই নিয়ে যাব, বাবু। তু আমার ছেলেটাকে বাঁচাই দে। যে-করেই হােক ছেলেটাকে যে বাঁচাতেই হবে, বিজয়ও মনে মনে সেই সঙ্কল্পই করেছিল। কলিয়ারীর ডাক্তারের নৈরাশ্য আর গরীবের দুঃখে অশ্বিনী রায়ের উদাসীনতা দেখে রােগ সারাবার জন্যে রােখ চেপে গিয়েছিল বিজয়ের। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সে কুলি-ছেলেটার পরিচৰ্য্যায় লেগে গেল। শুধু প্রেসক্রিপসন্ করা নয়, ওষুধ-পথ্যি খাওয়ানাে থেকে শুরু করে সেবাশুশ্রুষার সমস্ত কাজই সে নিজের হাতে তুলে নিল। চিকিৎসা তাে নয়, ক’দিন ধরে যেন যমে-মানুষে টানাটানি চললাে ছেলেটাকে নিয়ে। বােগ যততা বেড়ে যায়, বনমালীও তত কাটায় ফাটা ওজন করে ওষুধ তৈরী করে। মিশ্চারের অনুপাত যাতে এক ফোটা কম-বেশী হয় তার জন্যে সে কি তার প্রাণপণ চেষ্টা! সমস্ত চেষ্টাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে গেল। গলা দিয়ে আর ওষুধ নামলো না ছেলেটার, মুখের পাশ দিয়ে সমস্ত ওষুধ গড়িয়ে পড়লাে মাটীতে। দেখতে দেখতে সব শেষ হয়ে গেল দেখে কুলি-সর্দার কেঁদে উঠলাে হাউহাউ করে। কলিয়ারীর ডাক্তার কিন্তু ছেলেটার মৃত্যু-সংবাদ শুনে একটুও দুঃখিত হােলাে না। এমন যে হবে তা সে আগেই জানতাে। পাগলের মতন সে তাই হেসে উঠলো হো-হাে করে। হাসতে হাসতে সে বিজয়কে বললে, পারলে ? পারলে বাঁচাতে ? চেষ্টার তাে ত্রুটী কর নি । পরাজয়ের লজ্জায় মাথা হেঁট করে দাড়িয়ে ছিল বিজয়। ডাক্তারের কথায় মাথা তুলে সে বললে, রুগীকে বাঁচাতে পারলুম না, তবে এ নােগ যাতে আর না হয়, এবার আমি সেই চেষ্টাই করবাে।
ডাক্তার জিজ্ঞেস করলো, কেমন করে ? বিজয় বললে, ময়লা জল যেখানে জমে সে-জায়গাগুলাে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেবাে। রােগের ব্যাসিলি আর তাহ'লে জন্মাতে পারবে না। এই ধরণের একটা মতলব বােধ হয় ডাক্তারের মনে মনে ছিল। বিজয়ের কথায় তাই সে খুব উৎসাহিত হয়ে বললে, ভালাে। এ যদি করতে পার তত খুবই ভালাে হয়। কথাটা ডাক্তারেরও মনে ধরেছে দেখে, বিজয় তাড়াতাড়ি সব যােগাড়-যন্তর করতে লেগে গেল। ব্যাপারটা অত্যন্ত গােপনীয়। পিলার ব্লাষ্টিংএর কুলি মানা-সর্দারকে অনেক কষ্টে সবার নজর এড়িয়ে একটা ডিনামাইট হাত-সাফাই করতে হােল। চুপি চুপি বিজয়ের হাতে ডিনামাইট দিয়ে সে বললে, এই লে বাবু, ডিনামাইটি একটো চুরি করে এনেছি। মান সর্দারের ভয় ছিল, মনিব জানতে পারলে জেল খাটিয়ে দেবে। অই বিজয়ের হাতে ডিনামাইট গছিয়ে দিয়ে সে পালাতে পারলে বাঁচে। কিন্তু পিছন ফিরতেই সে একেবারে মুখখামুখি পড়ে গেল খাদ-সরকারের। খাদ-সরকার এসে খপ করে তার হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলাে, কার সঙ্গে কথা বলছিলি রে ? মানা-সর্দার ভয়ে ভয়ে বললে, বিজয় ডাক্তারের সঙ্গে। সরকার জিজ্ঞেস করলাে, কী বলছিলি ? মুখ কাচুমাচু করে মানা বললে, কিছুই না তাে। কিন্তু মানা-সর্দার অস্বীকার করলে কী হবে, সরকার নিজের কানে শুনেছে যে বিজয়ের সঙ্গে তার ডিনামাইট নিয়ে কী কথা হচ্ছিল। মানাকে ছেড়ে দিয়ে সে তাই তাড়াতাড়ি অশ্বিনী রায়কে খবরটা জানাতে ছুটলাে। অশ্বিনী রায়ের বাড়ীতে গিয়ে সে জানালাে, তাজ্জব কাণ্ড হুজুর।
যাচ্ছিলাম তেলগুদোমের দিকে, দেখি কি না—ওই বিজয়ছেড়াটা মানা- সর্দারের সঙ্গে ফুসুর-ফুসুর গুজুর-গুজুর করছে। ডিনামাইটের কথা কাণে যেতেই আমি আর থাকতে লারলাম, পা টিপে টিপে ‘ফলাে’ করে দেখলাম কী যেন একটা বিজয়ের হাতে দিলে মানা সদ্দার। অশ্বিনী রায় হুকুম দিলে, ডাকো মানা-সর্দারকে, আমি ব্যাটাকে একেবারে জন্মের মতাে শায়েস্তা করে দিই। সরকার বললে, আপনাকে কিছু করতে হবে না হুজুর। আপনার দু’জন চাপরাশী আমার সঙ্গে দিন—আমি আসামীকে একেবারে ‘রেভ, হগু, কষ্ট করে আপনার কাছে হাজির করে দিচ্ছি। অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলাে, কাকে পাকড়াও করবে ? মান-সর্দারকে ? সরকার মাথা নেড়ে বললে, মানা-সর্দার কেন হবে? বিজয়। বিজয়কে। অশ্বিনী দেখলাে, সরকারের বুদ্ধিই ঠিক। বিজয়ই যখন যত নষ্টের গােড়া, তখন তাকেই একটু ভালােরকম শিক্ষা দেওয়া দরকার। বিজয়কে হাতে-নাতে ধরে ফেলবার জন্যে চার-পাঁচজন লােক সে বন্দোবস্ত করে দিল সরকারের সঙ্গে। পরদিন সন্ধ্যাবেলা ডিনামাইট ফাটাতে আসবার কথা ছিল বিজয়ের। মানা-সর্দার তাই আগে থেকেই এসে পথে দাড়িয়ে ছিল বিজয়কে সাবধান করে দেবার জন্যে। শাবল আর ডিনামাইট হাতে বিজয়কে আসতে দেখে সে বললে, তু যাস্ না বাবু। খাদ-সরকার কাল আমাদের দেখে ফেলেছে। কিন্তু দুঃসাহসে আর গায়ের জোরে কারাে কাছে হার মানবার পাত্র সে বললে, দেখুক না। কী করবে? যাব যখন বলেছি, তখন আমি যাবই। বিজয় নয়।
জলকাদা ভেঙে নির্ভয়ে এগিয়ে চললল বিজয়। মানা-সর্দার তার সঙ্গে আসতে চাইলাে, কিন্তু কিছুতেই সে তাকে আসতে দিল না। জলা-জমির মাঝামাঝি একটা সুবিধে মত জায়গা বেছে নিয়ে শাবল দিয়ে গর্ত করতে সুরু করলো বিজয় ! সন্ধ্যার আবছায়াতে ছম ছম করছে চারিদিক। এ-সময়ে এদিকে কারও আসবার কথা নয়, আর এলেও সহজে কেউ দেখতে পাবে না বিজয়কে। গুড়ি মেরে বসে বিজয় একমনে তার কাজ সারছিল। আড়াআড়ি একটা গর্ত করে 'তার মধ্যে ডিনামাইটটাকে মাটী চাপা দিয়ে রেখে যেই সে আগুন লাগাবে বলে প’লতেটা হাতে নিয়েছে অমনি হৈ-হৈ করতে করতে অশ্বিনী রায়ের লােকজন এসে চড়াও হলাে তার ওপরে। বাঁধের ওপাশে ঝােপেঝাড়ের আড়ালে তারা এতক্ষণ ওৎ পেতে বসেছিল। সকলের শেষে ছুটতে ছুটতে এলাে দলের পাণ্ডা খাদ-সরকার। বিজয়কে দেখে সে যেন আকাশ থেকে পড়লাে একেবারে। ভয়ানক আশ্চর্য হবার ভাণ করে সে বললে, আরে বিজয় বাবু যে! এখানে, এমন, অসময়ে ? ব্যাপার কী বটে ? ঘাবড়াবার ছেলে বিজয় নয়। বাঁ-হাতে প’লতের মুখটা চেপে ধরে সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললে, ব্যাপার কিছুই নয়। এদিকে কেউ আসে না, তাই একবার জায়গাটা দেখতে এলাম। সরকার বললে, কিন্তু বাবুর হুকুম, বাবুর সঙ্গেও যে আপনাকে দেখা করতে হবেক আজ্ঞা। আপনাকে তাে ছাড়া হবেক নাই। বলতে বলতেই চাপরাশিরা টানাটানি শুরু করলাে বিজয়কে ধরে। বিজয় বললে, পাকড়াও করতে হবে না। চলাে কোথায় যেতে হবে। বলেই পকেট থেকে সিগারেট বের করে সে খাদ-সরকারকে একটা দিলে : নাও, সিগারেট খাও একটা। বিজয়ই দেশলাই জেলে সরকারের সিগারেটটা ধরিয়ে দিলে। নিজের ৩৮ সিগারেটটাও ধরিয়ে নিয়ে সে জ্বলন্ত কাঠিটা ফেলে দেবার সময় আগুন লাগিয়ে নিলে বাঁ-হাতের প’লতেটার মুখে। তারপর নিতান্ত ভালল- মানুষটীর মত বললে, বাস, আমার কাজ হয়ে গেছে, এবার চলল। তারাও এগিয়ে চললাে, এদিকে আগুনের ফুলকি ছাড়াতে ছাড়াতে পলতেটাও পুড়তে পুড়তে এগিয়ে চললল। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ আকাশ-বাতাস কাপিয়ে একটা প্রচণ্ড আওয়াজ হােল ডিনামাইট ফাটবার। সবাই পিছন ফিরে দেখলাে, ধোঁয়ায় আকাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। খাদ-সরকার বিজয়ের দিকে ঘুরে দাড়িয়ে বললে, আচ্ছা সর্বনাশা লােক তাে দেখছি আপনি? হাসতে হাসতে বিজয় বললে, সৰ্ব্বনাশটা দেখলে কোথায়? এতে তােমাদের কী উপকার হােল তা এখন না বুঝলেও, পরে বুঝতে পারবে। বিজয়কে খাদ-সরকার কতক্ষণে পাকড়াও করে নিয়ে আসে, দোতলার ঘরে বসে তারি জন্যে অপেক্ষা করছিল অশ্বিনী। খাদ-সরকার প্রসে বাবু- বাবু বলে ডাকতেই সে একটা জামা গায়ে চড়িয়ে তাড়াতাড়ি নীচে নেমে যাচ্ছিল। অশ্বিনীর স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে, কোথায় যাচ্ছ ? অশ্বিনী যেতে যেতে বললে, সবই কি তােমাকে বলতে হবে নাকি ? দরকার আছে, তাই যাচ্ছি। অশ্বিনী সিড়ি দিয়ে নেমে গেল একতলায়। কেন জানি না। অশ্বিনীর স্ত্রীর মনে হােল তার স্বামীর মনে আবার কোন অশুভ বুদ্ধি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তার অনুমান যে মিথ্যে নয় একটু পরে তার মেয়ে বিমলার কথাতেই তা’ প্রমাণ হয়ে গেল। বিমলা এসে খবর দিলে, চৌধুরীদের বিজয় তার ছােট বেলার বিজয়দা’কে ধরে নিয়ে এসেছে রায়েদের চাপরাশীরা। ব্যাপার কী হয় দেখবার জন্যে বিমলা ছুটলাে নীচের তলায়। বিমলার ছােট ভাই কমলও দিদির কিছু পিছু মজা দেখতে যাচ্ছিল। মা তাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললে, তুই ছেলে মানুষ, তুই ওসব হাঙ্গামার ভেতর যাসনে বাবা। ভয়ে আমার বুক দুর-দুর করছে। বেশ ছিল যাদ্দিন, আবার তাের বাবা কী কাণ্ড করকে কে জানে? দোষ যখন পাওয়া গেছে, সহজে ছেড়ে দেবার লােক অশ্বিনী রায় নয়। কুলি মজুরদের দুঃখকষ্টের কথা তুলে বিজয় যততই তাকে তার কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন করবার চেষ্টা করছিল, সে ততই হাড়ে হাড়ে জ্বলে যাচ্ছিল বিজয়ের ওপর। রাগের মাথায় সে বললে, আমার ছাগল যদি আমি লেজের দিকে কাটি তাতে তােমার কী ? * বিজয় বললে, যে-সব কুলি-মজুর আপানার কলিয়ারী চালায়, তারা ছাগল-ভেড়া হ'লে আমি কিছুই বলতাম না। তারাও ঠিক আপনার আমার মতই মানুষ। অশ্বিনী দেখলাে বিজয়ের ঘাড়েও সাম্যবাদের ভূত চেপেছে। মনে মনে প্রমাদ গণলাে সে। মুখে বললে, ওই যে কী-সব ধুয়া তুলেছ আজকাল কমিউনিজম না ঘােড়ার ডিম-ওরা দুঃখী, ওরা গরীব, ওদের ওপর আমরা জুলুম করি—এই সব বলে বলে দাও ওদের ক্ষেপিয়ে, তারপর ওরা যেদিন আমাদের মাথায় চড়ে আমাদেরই মুখের ওপর পটাপট জবাব দিয়ে দেবে সেইদিন বুঝবে মজা। বিজয় বললে, ভুল করছেন আপনি। আমি কোন দলের লােক নই। আপনি যদি ওদের সুখ-সুবিধার কথা সত্যিই ভাবেন তত ওরাও কোনদিন বেইমানি করবে না। অশ্বিনী ঠোট বাঁকিয়ে বললে, না করবে না? কারবার তােত কোনদিন কর নি ওদের সঙ্গে, তুমি কী করে জানবে হে দু’দিনের ছােকরা? দ্যাখাে, মাথার ওপরে সূর্যির তাত, সহ্য হয়, কিন্তু সেই তাতে পায়ের নীচের বালি যখন গরম হয়ে ওঠে, সে বালিতে আর পা দেওয়া যায় না। বিজয়ের মত হুজুগে মাতা ছেলে যে এসব কথা বুঝেও বুঝবে না তা -~- ও?
অশ্বিনীর জানতে বাকী ছিল না। তাছাড়া, বিজয়ের সঙ্গে রাজনীতি বা
সমাজনীতি আলােচনা করবার জন্যে তাকে দরােয়ান দিয়ে ধরে আনায় নি
. অশ্বিনী। তাই তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গটা বদলে ফেললাে অশ্বিনী : যাকগে।
ওসব কথা থাক, এখন যে অপরাধ তুমি করেছ তার কী কৈফিয়ৎ দেবে,
দাও।
বিজয় জবাব দেয়, আমি অপরাধই করি নি। কৈফিয়ৎ কিসের?
—তুমি যা করেছ তা অপরাধ নয়?-অবাক হয়ে যায় অশ্বিনী
বিজয়ের আস্পর্ধা দেখে।
বিজয় বলে, না, মােটেই অপরাধ নয়।
অশ্বিনী শাসায়, জানাে–এর জন্যে তােমাকে আমি জেল খাটাতে
পারি।
বিজয়েরও মুখে বলতে আটকায় না: পয়সা থাকলে অনেক কুকাজই
করা যায়। আপনার পয়সা আছে, আপনি সবই পারেন।
কথা-কাটাকাটির ঝেকে দুজনের গলাই ঝাঁঝালাে হয়ে উঠতে
লাগলাে ক্রমে ক্রমে। অশ্বিনী জানতে চাইলাে, বল তুমি ডিনামাইট
কোথায় পেলে ?
বিজয় বললে, সে কথা আপনি না-ই বা জানলেন। যেখান থেকে
হােক পেয়েছি।
—শুধু পেয়েছি বললে চলবে না। কার কাছ থেকে পেয়েছ তােমাকে
বলতে হবে।
রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি।—বললে বিজয়।
অশ্বিনী ধমক দিয়ে বললে, রাস্তায় কুড়িয়ে পাবার জিনিষ ডিনামাইট,
নয়, বাজে বােকো না। বল কার কাছ থেকে পেয়েছ?
বিজয় জবাব দিলে, এর বেশি আর কিছুই আমি বলতে পারবাে না।
তার মানে? তুমি বলবে না কোথায় পেয়েছ ?
৪১
না।
—কিছুতেই বলবে না?
-আজ্ঞে না।
শেষবারের মত অশ্বিনী সাবধান করে দিল বিজয়কে ? দ্যাখাে,
তােমার বাবার মৃত্যুর পর থেকে চৌধুরীদের সঙ্গে আমাদের ঝগড়া-বিবাদ
একরকম ছিল না বললেই হয়, তুমি তাকে আবার নতুন করে খুঁচিয়ে
তুলল না। 'বল, যা জিজ্ঞেস করছি।
বিজয়েরও একেবারে ধনুকভাঙা পণ : বলবাে না।
-বলবে না?-দাতে দাত চেপে আবার জিজ্ঞেস করলো
অশ্বিনী।
বিজয়ও আবার মুখ ফিরিয়ে জবাব দিলে-না।
অশ্বিনীরও ভীষণ জেদ চেপে গেল। সে বলে উঠলাে, কেমন করে
বলাতে হয় তা আমি জানি।
বিজয় বললে, বেশ তাে, চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
ভুরু কুচকে অশ্বিনী বললে, তােমার সাহস তো কম নয়।
বিজয় একটু বিনয়ের হাসি হেসে বললে, আমার আর কিছু নেই,
শুধু ওই সাহসটুকুই আছে।
অশ্বিনী বুঝলাে, এ ছেলে ভাঙবে তবু মচকাবে না কিছুতেই। অশ্বিনী
হক দিল, শুকুল!
কাছেই ছিল খাদ-সরকার। সে এগিয়ে এসে বললে, আমি রইছি
আজ্ঞা, আমাকেই বলেন না কী করতে হবে ?
অশ্বিনী আঙুল দিয়ে কোণের একটা ঘর দেখিয়ে দিয়ে বললে, একে
ঘরের ভেতর বন্ধ করে রাখাে। আমি থানায় যাচ্ছি।
বিজয় বললে, বন্ধ করে রাখবার কী দরকার? আমিও যেতে পারি।
আপনার সঙ্গে।
প
৪২
অশ্বিনী বললে, না তােমাকে আসতে হবে না। পুলিশ এসে তােমাকে হাত কড়া দিয়ে নিয়ে যাবে এখান থেকে। বলতে বলতেই অশ্বিনী রায় বেরিয়ে গেল বাড়ী থেকে। খাদ-, সরকার এসে বিজয়ের হাতখানা চেপে ধরতেই এক ঝাঁকুনী দিয়ে বিজয় হটিয়ে দিলে তাকে। বিরক্ত হয়ে বলে, থারে বাবা ‘থা, আমি চোর- ডাকাত নই। টানাটানি করতে গেলে পারবি না আমার সঙ্গে, চল, কোথায় যেতে হবে। এক ঝটকাতেই বিজয়ের গায়ের জোর মালুম হয়েছিল খাদ-সরকারের। সে আর উচ্চবাচ্য না করে সামনের ছােট কুঠরীর দরজাটা খুলে দিল। বিজয় নিজে থেকেই ঢুকলে গিয়ে সেই ঘরের ভেতর। সরকার বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে দেখে বিজয় বললে, ভেতরে বড় অন্ধকার যে রে ! একটা আলাে দিয়ে যা। কিন্তু কয়েদীকে আলো দিয়ে আপ্যায়িত করবে এমন দরদী কেউ সেখানে না থাকারই কথা। একজন অবিশ্যি থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে আগাগােড়া সমস্ত ব্যাপারটা এতক্ষণ লক্ষ্য করছিল। পরের বাড়ীর ছেলের সঙ্গে এমন করে দুর্ব্যবহার করাটা তার ভালাে লাগছিল মােটেই। খাদ-সরকার দরজা বন্ধ করে চলে যেতেই থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাে সে। সে বিমলা। বিমলা ভাবলল, দোরটা এই সময় খুলে দিলে মন্দ হয় না। খানিকটা এগিয়েও গেল সে। কিন্তু এখন তাে, আর সে বিজয়ের ছেলেবেলার খেলার খেলার সাথী সাত-আট বছরের কচি-খুকীটি নয়। বয়স্ক মেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দরজা খুলছে দেখলে বিজয়দা’ই বা কী • ভাববে তার? চক্ষুলজ্জার ভয়ে দরজা না খুলেই ফিরে যেতে হােল বিমলাকে। বুড়ো ঠাকুরদা নিজের ঘরে আরাম কেদারায় শুয়ে শুয়ে বই ৪৩ পড়ছিলেন। তারই শরণাপন্ন হােল এসে বিমলা। হাঁপাতে হাঁপাতে সে এসে বললে, দাদু, দাদু, দেখবে এসাে বাবা কী করলে ! অশ্বিনীর কাৰ্যকলাপে তিক্তবিরক্ত হয়েই ছিলেন বৃদ্ধ প্রতাপ রায়। বৃদ্ধবয়সে আর নতুন কোন ঝঞ্চাট নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রবৃত্তি তার ছিল । বিমলার কথাশুনে তিনি বললেন, তােমার বাবার কীর্তি আমাকে তােমরা কেউ আর দেখতে বােলাে না। ওর যা খুশী তাই করুক। তােমরা ভেবাে-আমি মরে গেছি। যাও। আমাকে আর বিরক্ত কোরাে না। বিমলার দিকে চোখ না তুলেই বড় রায় যেমন বই পড়ছিলেন তেমনি নিজের মনে বই পড়ে যেতে লাগলেন। দাদু যে কথাটা না শুনেই এমন করে খিটমিটিয়ে উঠবেন তা বিমলার ধারণার বাইরে ছিল। ভেবেছিল সমস্ত দেখেশুনে দাদু নিজেই বিজয়কে ছেড়ে দেবার ব্যবস্থা ববেন ! তাই বড় মুখ করে সে দাদুকে ডাকতে এসেছিল। কিন্তু দাদুর কাছে প্রথমেই কতকগুলাে কড়া কথা শুনে তার মুখে আর কথা যােগাল । কী করবে ভেবে না পেয়ে সে চুপচাপ দাদুর সামনে মাথা নীচু করে দাড়িয়ে রইল। খানিকক্ষণ বাদে মুখ থেকে বই নামাতে বড় রায় দেখলেন বিমলা নও কাঠের পুতুলের মত দাড়িয়ে রয়েছে। বললেন, এই নাও, মুখ ভার ক'রে দাড়িয়ে রইল। আমার কি আর এদের জন্য মরবার জো আছে। চল দেখি, তােমার বাবা আবার কী ফ্যাসাদ বাধালে দেখে আসি। গায়ে আলােয়নটা জড়াতে জড়াতে উঠে দাড়ালেন প্রতাপ রায়। এতক্ষণে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লাে বিমলার। দাদুর কাছে সে নালিশ জানালাে : বাবা আবার ঝগড়া লাগিয়েছে চৌধুরীদের সঙ্গে। দারােয়ান দিয়ে বিজয়দাকে ধরে এনে নীচের একটা অন্ধকার ঘরে আটকে রেখেছে। এখন নিজে গেছে থানায় পুলিশ ডাকতে। - ৪৪ বিজয় করেছিল কী? জিজ্ঞেস করলেন প্রতাপ রায়। বিমলা বললে, আমি জানি না, তুমি ওকেই জিজ্ঞেস করবে চলাে। কী-সব ডিনামাইট না-কি বলছিল আমি ঠিক বুঝতে পারলুম না। হাত ধরে হিড়হিড় করে দাদুকে টানতে টানতে চললাে বিমলা। রায় যততা বলেন, আমি বুড়ো মানুষ—আমি কি তাের সঙ্গে ছুটতে পারি, বিমলা সেকথা গ্রাহই করে না। তার মন তখন পড়ে আছে বিজয়দার কাছে। নীচের অন্ধকার ঘরে কত কষ্টই না হচ্ছে বিজয়দার! যাবার মুখে দাদুর লাঠিখান দাদুর হাতে এগিয়ে দেয়, আর নিজে একটা টর্ডের আলল নিতেও ভােলে না সে। নীচে কয়েদঘরের সামনে এসে বিমলা দাদুকে তাগি,দেয় : খােললাই দরজাটা খুলে ডাকো। ডাকলেই বেরিয়ে আসবে। রায় ছিটকিনি খুলে দরজার ভেতর মুখ বাড়িয়ে ডাকেন : বিজয় ! বিজয়! কারাে কোন সাড়াশব্দ নেই ঘরের ভেতরে। রায় বললেন, ঠিক দেখেছি তাে? –হ্যা, দেখেছি বৈকি? জোর দিয়ে বললে বিমলা। রায় একটু চিন্তিত ভাবে বললেন, দেখিস্ আবার ! বয়েসটা খারাপ ! এই বয়েসে একটু-আধটু দৃষ্টিবিভ্রমও হতে পারে। • বিমলা বুঝলল, দাদু ঠাট্টা করছেন তার সঙ্গে। লজ্জায় রাঙা হ'য়ে সে বললে, যাঃ ও! আমি দেখছি। ঘরে ঢুকে চারিদিকে টর্চ ফেলে ফেলে সে বিজয়দাকে খুঁজতে লাগলাে। চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলাে–বিজয়দা! বিজয়দা। হঠাৎ একটা জানালার ওপর টর্চের আলাে ফেলতেই তার মুখের ডাক মুখেই থেকে গেল ! অবাক হয়ে সে দেখলাে জানালার বড, বাকান। জিয়দাই যে জানালা ভেঙে পালিয়েছে তা বুঝতে আর বাকী রইল না ৪৫
বিমলার। হাসতে হাসতে সে বাইরে বেরিয়ে এসে বললে, দাদু, দাদু
বিজয়দা’ পালিয়েছে ।
—পালিয়েছে কীরে?-দাদু তাে শুনে অবাক।
বিমলা পরম উৎসাহে বলতে লাগলাে, হ্যা, ঠিক পালিয়েছে। দেখবে
এসাে জানালার রড়, বকানন। বিজয়দার গায়ে কী-রকম জোর দেখেছ
দাদু !
দাদু দেখলেন তাঁর নাতনীটি বিজয়ের প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ
হয়ে উঠেছে। বাবা যাকে পুলিশে দিতে চায় মেয়ে তার গায়ের জোর
দেখে এতটা উল্লসিত হয়ে উঠবে এটা যেন বেশ একটু সন্দেহজনক
ঠেকলাে বুড়াের কাছে। পরিহাসটুকু চেপে তিনি বললেন, এত জোর
কিন্তু ভালাে নয়, দিদি।
—ভালাে নয় ! মুখ ঘুরিয়ে বললে বিমলা, চোর-ডাকাতের মত
তােমরা তাকে ঘরের ভেতর আটকে রাখবে আর সে পালাবে না!
পালাবে?
—হ্যা, পালাবেই তােত।
—রায়েদের বাড়ী থেকে ?
—রায়েরা একেবারে লাট-বেলাট, না রাজা মহারাজ।? রায়েরা কী ?
ভুরুদুটো কপালে তুলে রায় বললেন, তুমি শত্রুপক্ষের হ'য়ে কথা
বলছে দিদি। সাবধান।
বিমলা বললে, বয়ে গেছে আমার সাবধান হতে।
-তােমার বাবা যদি শশানে এই সব কথা—
তুমি
রাঁয় বললেন, ভালাে ভালো। তােমায় সাহস আছে দিদি।
এসাে তো আমার সঙ্গে।
বিমলা জিজ্ঞেস করলো,কোথায় ?
৪৬
—যেখানেই হােক, এসােই না। ব’লে বড়াে রায় বিমলার হাত ধরে টানতে টানতে তাকে বাড়ীর বাইরে নিয়ে চললেন। বিমলাকে নিয়ে প্রতাপ রায় সরাসরি এসে হাজির হলেন বিজয়দের বাড়ীতে। বিজয়ের মা মহামায়ার সঙ্গে দেখা করে, তিনি বললেন, এই মেয়েটি রায়েদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে মা, তাই আজ আমি ওকে চৌধুরীদের বাড়ীতে নিয়ে এলাম। পছন্দ হয় তাে একে তুমি নিতে পার। রায়-মহাশয়ের কথার ইঙ্গিত বুঝতে দেরী হােল না মহামায়ার। রায়ের প্রস্তাবে তাই সায় দিয়ে তিনি বললেন, রায় আর চৌধুরীদের বিবাদ-বিসম্বাদ যদি মিটিয়ে ফেলতে হয় তাে এমনি একটা কিছু করতেই হবে! রায় বললেন, মরবার আগে সেই ব্যবস্থাটাই করে যেতে চাই। মহামায়া বললেন, বিজয়ের বাবাও মরবার আগে ঠিক এইজনেই আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মহামায়া পাছে দোষ ধরেন তাই ব্যস্তসমস্ত হয়ে রায় বললেন, আমিও এসেছিলাম মা। কিন্তু তােমার সেই ভাইটা আমাকে সদর থেকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। ভাইয়ের জন্যে মহামায়াকেও কম দুর্ভোগ ভুগতে হয় নি। ভবানী চৌধুরীর মৃত্যুর পর নাবালক ভাগ্নের অভিভাবক সেজে এত বড় জমিদারীটা কালু লুটে পুটে খেয়েছে। এখন সম্পত্তি ব’লতে চৌধুরীদের বসতবাড়ী- খানা ছাড়া আর কিছুই সে রাখে নি। এমন কী, বিজয়কে ডাক্তারী পড়ানাের খরচ মহামায়াকে নিজের গায়ের গয়না বিক্রী করে যােগাতে হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি তাই বললেন, সেই ভাইয়ের জন্যেই আজ আমাকে সর্বস্বান্ত হতে হয়েছে। একথা বড় রায়ও জানতেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় সেটা, আর আসে এখানে ? ৪৭
-আর-তত তার আসবার কোন দরকার নেই, বললেন মহামায়া।
ভেবেছিলুম মার পেটের ভাই, আপনার লােক—
ক্ষতি যে আপনার লােকেই বেশি করে মা! সমবেদনায় ভারী
হয়ে উঠলাে রায়ের কণ্ঠস্বর। একটু থেমে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বিজয়
কোথায় ?
মহামায়া বিজয়-বিজয় বলে ডাকতেই বাড়ীর ভেতর থেকে বেরিয়ে
এলো বিজয়। প্রতাপ রায়কে দেখে অবাক হয়ে গেল সে : এ কি ।
আপনি !
রায় বললেন, হ্যা, তােমাকেই খুঁজছি। ঘরের ভেতর তােমাকে
আটকে রাখা হােল, তুমি জান্নার শিক্ ভেঙ্গে পালিয়ে এলে যে !
-আপনাদের বাড়ীতে যা মশা! হাসতে হাসতে বললে বিজয়।
এক অন্ধকার, তার ওপর মশার কামড় সহ হােল না, তাই পালিয়ে
এলাম।
হঠাৎ তার নজর পড়লাে বিমলার ওপর : একি! বিমলাও এসেছে
দেখছি! রায় বললেন, বিমলা বলছে—এবার তােমাকে এমনভাবে
আটকাতে হবে যে, হাজার মশায় কামড়ালেও যেন তুমি পালাতে
পারাে।
বিমলার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বিজয় বললে, তা বাঁধন যদি
শক্ত হয় তাহলে নাও পালাতে পারি।
রায় বললেন, বেশ, কথাটা জানা রইল। আমরা এবার উঠি
তাহলে। বিজয় তখনও বিমলার দিকে তাকিয়েছিল। বিমলার
হাত ধরে রায় উঠে দাঁড়াতেই চমক ভাঙলাে তার : হ্যা তাড়াতাড়ি যান,
আপনার ছেলে গেছে থানায়, দারােগা আসবে আসামীকে গ্রেপ্তার করতে।
বিমলাকে সঙ্গে নিয়ে রায় চলে গেলেন। যাবার মুখে কয়েকবার
চোরা-চাউনিতে বিজয়কে দেখে নিতে ভুলল না বিমলা।
৪৮
এদিকে অশ্বিনী ততক্ষণে দারােগা-কনেষ্টবল সঙ্গে নিয়ে বাড়ীতে এসে হাজির। কয়েদ-ঘরের সামনে সবাইকে নিয়ে এসে সে বললে, আসুন দাবােগাবাবু আপনাকে এত কষ্ট দিয়ে নিয়ে এলাম শুধু আসামীকে হাতে-নাতে ধরিয়ে দেবাে বলে। ডিনামাইটের মতন জিনিস মশাই চুরি করে দিলে আগুন লাগিয়ে ! খাদকে খাদ উড়িয়ে দেবার মতলব। এই ঘরের ভেতর ওকে জোর করে আটকে রেখেছি। আসুন, আপনি নিজের হাতে- হঠাৎ দরজার দিকে চোখ পড়লাে অশ্বিনীর। একি, দরজা খােলা কেন? কে খুললে ? শুকুল শুকুল ব'লে হাঁকাহাঁকি সুরু করলাে অশ্বিনী। হিন্দুস্থানী দরােয়ান শুকুল এসে সমস্ত দেখে-শুনে আতা আতা করতে লাগলো। কে যে দরজা খুলে দিয়েছে তা সে বিন্দুর্গিও টের পায়নি। অশ্বিনী ধমকাতে লাগলাে, কী জন্যে তােদের মাইনে দিয়ে রেখেছি বলতে পারিস? আমার আসামী কোথায় গেল বল শীগগীর, নইলে কী আর করবে শুকুল? ঘরের ভেতর এদিক ওদিক ভালাে করে খুজে-পেতে দেখলে ঘরে কেউ নেই। ফিরে এসে মুখ কাচুমাচু করে বললে, ভাগ, গয়া হুজুর। আগুন হয়ে উঠলাে অশ্বিনী : ভাগ, গিয়া? ভেগে অমনি গেলেই হােল? তােকেই আজ আমি পুলিশের সঙ্গে চালান করে দেবে। টাঙ্গির মত একজোড়া গোঁফ দেখেই আমি ভুলে যাবাে ভেবেছিস? বল শীগগির, কে খুললে ! আমি !-আমি খুলেছি, আমি খুলে দিয়েছি। বলতে বলতে ঠিক এই সময়ে বিমলাকে সঙ্গে নিয়ে এসে পড়লেন প্রতাপ রায়। দারােগা- পুলিশের ভীড় দেখে বিমলা আর সেখানে না দাঁড়িয়ে সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। ৪১ রায়চৌ-৪ অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলাে, তুমি কেন দরজা খুললে, বাবা? প্রতাপ রায় বললেন, খুলে ফেলেছি তার আর কী হবে? অশ্বিনী নরম হয়ে বললে, খুলে ফেলেছ, বেশ করেছ, কিন্তু বিজয়কে যেতে দিলে কেন ? ছেলের কাছে কোন কাজের জন্য জবাবদিহি করবেন বুড়ো হলেও এতখানি নিস্তেজ প্রতাপ রায় হন নি। ঘাড় সােজা করে তিনি বললেন, তােমার কাছে কৈফিয়ৎ দিয়ে পারবাে না অশ্বিনী, আমি তােমার বাবা। তারপর দারােগার দিকে ফিরে যথারীতি সৌজন্য দেখিয়ে তিনি বলেন, কেন মিছে আর দাড়িয়ে রয়েছেন আপনারা, থানায় ফিরে যান। আপনাদের মিছামিছি কষ্ট দেওয়া হলাে। শুকুলকে ডেকে গাড়ীতে করে দারােগা-পুলিশ সবাইকে থানায় ধুছে দেবার ব্যবস্থা করলেন প্রতাপ রায়। পুলিশের লােকজন চ'লে যাবার পর তিনি অশ্বিনীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, নাও এবার কী বলছো বলাে। অশ্বিনীর সমস্ত মতলব মাটি হয়ে গিয়েছিল । নিতান্ত নিরুৎসাহ দেখিয়ে সে বললে, ধ্যেৎ, দারােগাকে বিদেয় করে, দিয়ে—এখন কী বলছাে বল ! বিজয় কী করেছে জানাে ? -জানি। —সেই জন্যেই ভেবেছিলাম দারােগাকে দিয়ে—দিই ওকে একটুখানি ভয় খাইয়ে। নইলে ও যেরকম হয়ে উঠছে —কী হয়ে উঠছে ?—জিজ্ঞেস করলেন প্রতাপ রায়। হাতমুখ নেড়ে অশ্বিনী বললে, ‘পপুলার’‘পপুলার। গাঁয়ের সবাই ওকে ভালবাসে। এর ভেতরে অশ্বিনীর আপত্তির কী থাকতে পারে ভেবে পাচ্ছিলেন প্রতাপ রায়। তিনি ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে চললেন।।
অশ্বিনীও তার পেছন পেছন বলতে বলতে চললাে’ হতভাগা, একেবারে
হতচ্ছাড়ার একশেষ। গাঁয়ের লােকের চিকিচ্ছে করে, একটি পয়সা
নেয় না।
—প্রতাপ রায় বললেন, ভালােই তাে !
-ভালাে? অশ্বিনী অবাক হয়ে গেল বাবার বিবেচনা দেখে।
সমস্ত ব্যাপারটা বাবাকে তলিয়ে বােঝাবার চেষ্টা করতে লাগলাে সে।
একে তাে সেই কেলােটা দিয়েছে ওর সব্বনাশ করে, তার ওপর নিজের
তেমন রােজগার নেই, ভাগ্যিস সংসারে তিনজন লােক, তাই বুঝতে
পারছে না, নইলে ও যতাে গরীব হবে ততই ও পেছনে লাগবে আমাদের।
তারপর একবার যদি সেই লাল ঝাণ্ডার দলে গিয়ে মেশে, তখন দেখবে
শ্ৰমিকস, হেনাে তেনাে সাত-সতেরাে করে একেবারে বিদিকি
কাণ্ড করে বসবে।
নিশ্চিন্ত মনে নিজের আরামকেদারায় বসে প্রতাপ রায় বললেন,
-না ওসব কিছু ও করবে না।
করছে, আবার বলৈ করবে না !-বাবার কথায় চুপ করে না,
থাকতে পেরে অশ্বিনী জবাব দেয়।
প্রতাপ রায় বলেন, আচ্ছা আচ্ছা সে ব্যবস্থা আমি করেছি। বিমলার
সঙ্গে আমি ওর বিয়ে দেবো।
—আমার মেয়ে বিমলার সঙ্গে ? বিয়ে? অসম্ভব কথাটা বিশ্বাসই
করতে পারে না অশ্বিনী।
বড়ো রায় পরিষ্কার করে বলেন,হা, হ্যা, তােমার মেয়ের সঙ্গে
বিজয়ের বিয়ে।
—তাই কখনও হতে পারে ?
--কেন পারে না ?
“তুমি কি পাগল হয়েছ ?
—পাগল এখনাে হইনি বলেই বলছি। মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে অশ্বিনী বলে’-না না এ অসম্ভব। আমার মেয়ের বিয়ে আমি ওরকম করে দেব না। রাগ দেখিয়ে চলে যাচ্ছিল অশ্বিনী, প্রতাপ রায় ডাকলেন, অশ্বিনী। অশ্বিনীকে ফিরতে হােল : কী ? -আমার কথা শশান্। না, শুনবে না।বেপরােয়া হয়ে জবাব দেয় অশ্বিনী প্রতাপ রায় বলেন, আমি এখনাে বেঁচে আছি, অশ্বিনী। প্রতাপ রায় এখনাে মরেনি। —তা জানি।—অশ্বিনীও সমানে সমানে জবাব দেয়। কাপতে কাপতে প্রতাপ রায় বলেন, এই সব বিষয়-সম্পত্তি, বাড়ীঘর টাকাকড়িঘতদিন বেঁচে আছি-সব আমার। মরবার আগে আমি উড়িয়ে পুড়িয়ে নষ্ট করে ছতিচ্ছন্ন করে দিয়ে যাব। ভয় দেখান তিনি অশ্বিনীকে, তােমাকে আমি পথের ভিকিরী করে দিয়ে যাব যদি তুমি আমার কথা না শোেনন। অশ্বিনী কিন্তু কোন কিছুতেই টলে না। নিজের গোঁ সে আঁকড়ে ধরে থাকে । তুমি যা খুশী তাই করতে পারে, এ বিয়ে আমি কিছুতেই দেবাে না। প্রতাপ রায়ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, বিয়ে তিনি দেবেনই। তিনি বলেন, তুমি না দাও, আমি বিয়ে দেবাে। অশ্বিনী বলে, কন্যা তো সম্প্রদান করতে হবে আমাকেই। প্রতাপ রায় বলেন, না তাও দরকার হবে না, আমি—আমি নিজেই কন্যা সম্প্রদান করবাে। প্রতাপ রায়ের যেই কথা, সেই কাজ। অশ্বিনীর কোন ওজর- আপত্তি গ্রাহ্য না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিজয়ের সঙ্গে বিমলার । বিয়ের আয়ােজন করে ফেললেন তিনি। কন্যা সম্প্রদান করতেও এসে বসলেন তিনি নিজেই। অশ্বিনী আর কতক্ষণ মুখ গােড়া করে থাকবে। হাজার হােক নিজের মেয়ের বিয়ে। তাছাড়া নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটির কথা বাইরের পাঁচজনের কাছে জানাজানি হয়ে যাবে এটাও ভালো দেখায় শেষ পর্যন্ত গরদের চাদর গায়ে জড়াতে জড়াতে ভীড় ঠেলে বিবাহ-মণ্ডপে এসে হাজির হােল সে। বাবাকে বললে, যাও, ওঠো তুমি। আমি এসেছি। বাপ থাকতে দাদু এসে সম্প্রদান করছেন দেখে সবাই মনে একটু : খুতখুতি ছিল। এখন অশ্বিনী এসে বসায় খুশী হয়ে উঠলাে সবাই। পুরােহিত আনন্দ প্রকাশ করে বললে, হা-হা, সেই ভালাে। বাপ- ছেলেতে মনােমালিন্য-বিশেষতঃ এই আনন্দের দিনে পুরােহিতের বাচালতা ভালাে লাগে না অশ্বিনীর। একে তাে তার রাগ তখনাে পড়ে নি, তার ওপর আবার যােগ হয়েছে পরাজয়ের লজ্জা পুরােহিতকে ধমক দিয়ে সে বললে, থাক্ থাক, খুব হয়েছে। তুমি তােমার নিজের কাজ কর। মন্ত্র বলে তাড়াতাড়ি। এক ধমকেই আক্কেল হয়ে গেল পুরােহিতের। সে আর কোন দিকে না তাকিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গরগর করে মন্ত্র পড়াতে লেগে গেল ! বিয়ের পরদিন বর-কনেকে সঙ্গে নিয়ে প্রতাপ রায় নিজেই এসে উপস্থিত হলেন চৌধুরী-বাড়ীতে! মহামায়াকে ডেকে বললেন, কই গাে মা—এই নাও তােমার ছেলে নাও, তােমার বৌ নাও। আমি আমার কথা রেখেছি। আনন্দে দু’চোখ ফেটে জল এলাে মহামায়ার। নিজের ছেলে আর ছেলে-বৌকে দু’হাত বাড়িয়ে কোলের মধ্যে টেনে নিলেন। বিমল । শাড়ীর পায়ের ধুলাে নিতে যাচ্ছিল। মহামায়া বাধা দিয়ে বললেন, না মা, আমাকে প্রণাম করবার আগে এসাে আমার সঙ্গে। বিজয় আর বিমলার হাত ধরে তিনি তাদের ভেতরে নিয়ে চললেন। প্রতাপ রায় বুঝলেন, স্বামীর ঘরে দুজনকে নিয়ে চলেছেন মহামায়া । স্বর্গগত স্বামীর তৈলচিত্রের সামনে দাড়িয়ে সবার আগে এই নব-দম্পতির জন্যে আশীৰ্বাদ ভিক্ষে করতে চান তিনি। আত্মপ্রসাদে ভরে উঠলো প্রতাপ রায়ের মন। এতদিনে দুই পরিবারের ভেতর যে একটা পবিত্র যােগাযােগ প্রতিষ্ঠিত হােল—সেই আনন্দে তার মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। চৌধুরীর নায়েব বনমালী ধীরে ধীরে তার কাছে এসে বললে, আপনি আজ যা করলেন, কারও ঠিক এই ইইে ছিল। প্রতাপ রায় সেকথা জানতেন। ভবানী চৌধুরী বেঁচে থাকতে এমন মিলনটা দেখে যেতে পারলেন না সেজন্যে তার মনেও বড়ো আফশােষ হচ্ছিল। আবেগভরা কণ্ঠে ধীরে তিনি বললেন, মৃত্যুর পরে মানুষের কিছুই তো জানি না বনমালী, যদি কিছু অস্তিত্ব থাকে তাে তার আত্মা শান্তি পাবে। বিয়ের পরের দিনগুলাে খুব আনন্দেই কাটবে বলে আশা করেছিল বিমলা। ছেলেবেলার খেলার সাথী এলাে জীবন-সাথী হয়ে। শ্বশুর- বাড়ীটিও বেশ নিরিবিলি, আত্মীয়-স্বজন চাকর-বাকরের ভীড় নেই, শুধু শ্বাশুড়ী আর স্বামী। নতুন-বউ এখানে গলা ছেড়ে গাইলেও পাড়ার লােক নিন্দে করতে আসবে না। তাই বলে যে শ্বশুর-বাড়ীতে এসে বেহায়াপনা করতে নেই তাও বিমলা ভালো করেই জানে। তবু মনের খুসী সে কিছুতেই চেপে রাখতে পারছিল না। বারান্দার এককোণে একটা নিরালা জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনমনে একটা, আনন্দের গান গাইছিল সে। কখন যে বিজয় পা টিপে টিপে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে ৫৪ গান শুনছিল তা সে টেরও পায় নি। গানের শেষে হঠাৎ বিজয়কে দেখে ভারী লজ্জা লাগলাে তার। ফিক করে হেসে ঘােমটা টেনে মাথা নীচু করে দাড়িয়ে রইল সে। বিজয় বললে, মনে আছে বিমলা, ছেলেবেলায় একদিন আমার একটা ময়না পাখী উড়িয়ে দিয়েছিলে তুমি ! সে-পাখী যে আর কোনদিন ফিরে পাব আশাও ছিল না। আজ দেখছি সেই পাখীটাই গান গাইতে গাইতে আমার কাছে এসে নিজে থেকেই ধরা দিল । পাখী-হারানাের কথা বিমলার বেশ ভালাে করেই মনে ছিল। সেদিন. যার কাছে পাখী দাও পাখী দাও বলে আব্দার করতে একটুও লজ্জা করে নি, আজ কেন জানি না চোখ তুলে তার দিকে তাকাতেই পারছিল না, বিমলা। বিজয় জিজ্ঞেস করলাে, ভালো লাগছে তােমার এখানে এসে ? বিমলা জবাব দেয় না তবু। পিছন ফিরে দাড়িয়ে থাকে চুপটী করে। -চুপ করে রইলে যে? দু’হাত দিয়ে বিমলার মুখখানা নিজের দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে বিজয় বলে, বলো কেমন লাগছে! বিমলা তখনও মাথা হেঁট করে রইলো দেখে একটু অভিমান দেখালে বিজয় : ববে না? বেশ, চলুম আমি তাহলে। বিজয় চলে যাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি তার হাতখানা চেপে ধরলো বিমলা। বিজয় বললে, বারে! যেতেও দেবে না, কথাও বলবে না, বেশ মজা তাে! বল—তুমি এ-বিয়েতে খুশী হয়েছ কিনা! মুখ খুলতেই হােল বিমলাকে। হাসতে হাসতে সে বললে, হয়েছি, হয়েছি, হ'য়েছি। হােললা তাে! ঠিক এমনি সময়েই বাড়ীর ভেতর থেকে মহামায়া ডাকলেন, বৌমা ? ডাক শুনেই বিমলা আর এক সেকেণ্ডও সেখানে দাড়ালাে না। মা ডাকছেন, আমি যাই-বলেই তাড়াতাড়ি ছুটলাে শ্বাশুড়ীর কাছে।
বিজয় বললে, কথাটা শুনেই ফিরে এসাে। আমি এইখানেই
অপেক্ষা করছি।
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বিমলা চলে গেল। বিজয় একা একা
পায়চারি করতে লাগলাে সেখানে।
।
রান্নাঘরে বসে লুচি বেলছিলেন মহামায়া। বিমলা আসতেই তিনি
জিজ্ঞেস করলেন, রাত্তিরে তুমি কী খাও বৌমা ? ভাত, লুচি, রুটী
না পরোটা ?
বিমলা বললে, আপনারা যা খাবেন আমিও তাই খাবাে।
-তা নাহয় খেলে,কিন্তু একটা অভ্যেস তাে আছে! বড়লােকের মেয়ে
বড়লােকের মেয়ে বলে ঘরানা অভ্যেস আমার কিছু নেই। সত্যি
করছি মা, আমি যা পাই তাই খাই। বলতে বলতে শ্বাশুড়ীর পাশে বসে
বিমলা বললে, আপনি উঠুন মা, আমি লুচি বেলবাে।
মহামায়া তাে অবাক : ওমা সেকি কথা। বিয়ের কনে, আজই
তােমার হাতে কাজ তুলে দেবাে ?
-তা হােক, আমি বেবাে। ছােট মেয়েটীর মতাে আব্দার
করে বিমলা।
মহামায়া বলেন, তােমাদের বাড়ীতে বামুন, চাকর-ঝি—কত লােক।
এসব কি তােমার অভ্যেস আছে ?
বিমলাও আড়াআড়ি করে বলে, আচ্ছা দেখুন আমি পারি কি-না।
বলেই সে বেলুন-চাকী টেনে নিয়ে লুচি বেলতে সুরু করে। বৌমার
এই ছেলেমানুষি ভারী মিষ্টি লাগে মহামায়ার। শুধু একটা জিনিস তার
পছন্দ হয় না। একদিনেই এত আপনা-আপনি ভাব দেখিয়ে মুখে
‘আপনি’ বলে কথা বলাটা কেমন যেন বেসুরাে লাগে তাঁর কানে। তিনি
বলেন, আমাকে আপনি-আপনি বলছো কেন বৌমা ?
-কী ব’লবাে? জিজ্ঞেস করে। মহামায়া বলেন, আমার আমার নিজের মেয়ে থাকলে কী বলতাে? “তুমি বলবে। বিমলা ঘাড় নেড়ে বলে, আচ্ছা, তাই বলবাে এবার থেকে। তাড়াতাড়ি একখানা লুচি বেলে সে মহামায়াকে দেখায় : এই দেখুন -না-না, দ্যাখাে তাে মা, হয়েছে ? -ওমা, এযে বেশ হয়েছে। খুশী হয়েই বলেন মহামায়া—আমি যাই ঘি-টা নিয়ে আসি। বিমলা বাধা দিয়ে বলে, না, আমি তােমাকে কিছু করতে দেবাে না মা। তুমি বল কোথায় ঘি আছে, আমি আবাে। এমন করে যে কেউ কোনদিন মহামায়ার কাছে থেকে কাড়াকাড়ি করে সমস্ত সংসারের কাজের ভার নিজের হাতে তুলে নেবে আর তার বদলে মহামায়ার প্রাণ ভরে এত সুখ, এত শান্তি এনে দেবে তা তিনি কখনন কল্পনাও করতে পাৰূেন নি। নিজের মনেই তিনি তাই আক্ষেপ করতে লাগলেন, আজ আমার এত সুখ, এত শান্তি—সবই হােললা, উনি শুধু দেখে যেতে পারলেন না। তারপর বিমলাকে তিিন বুঝিয়ে বললেন, আজ আমি তােমার হাতের কাছে সব এনে দিচ্ছি, কাল থেকে তুমি নিজেই সব কোরাে। মহামায়া গেলেন ঘি আনতে। বিমলাও শ্বাশুড়ীর কথামতাে আবার তার নিজের জায়গায় ফিরে এসে লুচি বেলতে বসলাে। বিমলার জন্যে অপেক্ষা করে করে বিজয় ওদিকে অস্থির হয়ে উঠেছে। এখানে একবার দাঁড়াচ্ছে, ওখানে একবার দাড়াচ্ছে, বারে বারে ভেতরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু বিমলার আর আসবার নামই নেই। বিমলা কী করছে দেখবার জন্যে শেষ পর্যন্ত বিজয় পা টিপে গিয়ে হাজির হােল রান্নাঘরের পেছনে। রান্নাঘরের জানলা বন্ধ করা ছিল ভেতর দিক থেকে। শুধু শার্সির একখানা কঁাচ বরাত গুণে ভাঙা ছিল। তারই ফাক দিয়ে বিজয় দেখলাে, পেছন ফিরে বসে বসে বিমলা লুচি বেলছে একমনে ঘরে আর কেউ নেই। ঠক্ করে জানলায় একটা শব্দ করলাে বিজয়। আওয়াজ শুনে বিমলাও চট করে একবার দেখেই লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। বিমলার দৃষ্টিআকর্ষণ করবার জন্যে হাতছানি, চোখ-ইশারা, মুখভঙ্গী কিছু করতেই আর বিজয় বাকী রাখলাে না। বিমলা তবু মুখও তােলে না—কথাও বলে না। মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে সে শুধু মাথা হেঁট করে লুচি বেলতেই লাগলাে। অধৈর্য হয়ে বিজয় শেষ পর্যন্ত গলা খাকারি দিলে কয়েকবার। বিমলাও তার হাতের বেলুনটা তুলে মার লাগাবার ভঙ্গী করে বােঝালাে, আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিপদ হবে বিজয়ের। দেখতে দেখতে মহামায়া এসে পড়লেন ঘিয়ের টিন হাতে করে। --বিজয় তাে সঙ্গে সঙ্গেই দে-ছুট । ঘিয়ের টিন নামিয়ে দিয়ে মহামায়া বললেন, এই নাও বৌমা, সাবধানে কাজ কোবরা। বিয়ের কনে, দেখাে যেন হাত-পা পুড়িয়ে বসােনা। কিন্তু বিয়ের কনে হলে হবে কী? বিমলা কোন কাজই করতে আর বাকী রাখলাে না। কুটনাে কোটা, বাটনা বাঁটা সব সেরে নিজেই গেল দুহাতে দুটো বড় বড়ড়া বালতি নিয়ে জল তুলে আনতে। জল নিয়ে ফিরতে দেখে মহামায়া বললেন, একী করছে বৌমা ? লােকে দেখলে বলবে কী ? আমাকে দোষ দেবে যে ! জল টানতে টানতে হাঁপিয়ে পড়েছিল বিমলা। একটা বালতি সিড়িতে নামিয়ে রেখে এসে হাসতে লাগলো খিখিল করে। হাসি দেখে মহামায়া বললেন, আবার হাসছে দ্যাখাে! দাও, আমাকে একটা বালতি দাও। বিমলা বললে, না-না মা, তােমার দুটী পায়ে পড়ি—আমিই নিয়ে ৫ ৫৮
যাব। ভালাে করে কোমরে আঁচলটা জড়িয়ে বালতি নিয়ে হাসতে
হাসতে বিমলা সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল ।
বৌ-য়ের পাগলামি দেখে মহামায়া রাগ করবেন, না হাসবেন ভেবে
পেলেন না। তিনি শুধু মুখ টিপে বললেন, দাঁড়াও না, আমি বিজয়কে
সব বলে দিচ্ছি গিয়ে।
.বিজয়কে আর কিছু বলে দিতে হােলো না। এমনিতেই সে বউয়ের
সঙ্গে খুনসুটি করতে ওস্তাদ। রাত্রিবেলা মা-র ঘরে ঢুকে সে দেখলাে,
মা শুয়ে আছেন বিছানায় আর তার পায়ের কাছে বসে পা টিপে
দিচ্ছে বিমলা।
টিটকিরী দিয়ে বলে উঠলাে বিজয়, বা-বা! এই তাে চাই।
রায়েদের বাড়ীর মেয়ে চৌধুরীদের বাড়ীতে এসে ঝি-এর কাজ করছে,
পা টিপছে।
বিমলাও রাগের ভাণ দেখিয়ে বললাে, যাও, আমার যা খুশী তাই
কোরবাে। তােমার কী
মহামায়া ভাবলেন, মুখে ঠাট্টা করলেও নতুন-বৌ শ্বাশুড়ীর পা টিপে
দেবে এটা হয়তো মনে মনে বিজয়ের ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। নিজের ,
দিকটা বাঁচিয়ে তিনি তাই বলেন, ও কিছুতেই শুবে না। যতত বারণ
করছি, ও তত বেশি বেশি করছে। আমাকে জোর করে শুইয়ে
ওই দ্যাখনা—পা টিপতে বসলো।
বিজয় নালিশ জানালাে, অথচ আমি একটা কাজ করতে বলি,
কিছুতেই শুনবে না।
—হু, শুনবে !
ঠোট বেঁকিয়ে বললে বিমলা।
মহামায়া হেসে বললেন, না বাবা, মিছে কথা বলি নি। ও খুব
লক্ষ্মী মেয়ে।
বিমলাকে আর পায় কে? শ্বাশুড়ী নিজেই যখন তার পক্ষে তখন
?
}
বিজয়ের নিন্দায় তার কী-ই বা আসে যায়? হাবভাবে বিজয়কে সে বুঝিয়ে দিল । কেমন শুনলে তাে-আমার সম্বন্ধে কত ভালো ধারণা আছে মা-র ! মহামায়া বিজয়কে বললেন, আমি শুধু ভাবছি কাল ওকে নিতে আসবে, বৌমা চলে গেলে আমি থাকবাে কেমন করে ? বিমলাকে ছেড়ে থাকা বিজয়ের পক্ষেও কম ভাবনার কথা নয়। তবু মনের ভাবটা গােপন করার জন্যে সে হেসে উঠলাে হাে-হাে করে : বাবা, য্যাদ্দিন ছিলে কেমন করে? তেমনি করে থাকবে। বিজয় মুখে উপহাস করলেও, তার চোখের ভাষাটা ছিল অন্যরকম। সেটা একা বিমলাই বুঝতে পারলে। বিজয় চলে যাওয়ার পর শ্বাশুড়ীর হাত ধরে বিমল তাই বললে, না মা! এত শীগগির আমি কিছুতেই যাবাে না। কাল পালকি এলে তুমি ফিরিয়ে দিও। মেয়ের শ্বশুরবাড়ী থেকে সত্যি-সত্যিই পালকি ফিরে এসেছে শুনে অশ্বিনী রায় তত একেবারে ক্ষেপে আগুন। আমার পালকি ফিরিয়ে দেবে? পালকি ফিরিয়ে দেওয়া আমি বের করছি। চৌধুরীদের আস্পর্ধার কথাটা সে বাবাকে জানাতে এলে তাড়াতাড়ি । বিমলার বিয়ে তত দিলে খুব আনন্দ করে, কী করেছে জানো? -কী করেছে? জিজ্ঞেস করলেন প্রতাপ রায়। —পালকি ফিরিয়ে দিয়েছে। মেয়ে পাঠায় নি। এতে তেমন দোষের কিছু দেখতে পেলেন না প্রতাপ রায়। বললেন, বেশ তাে, মৈয়ে যতাে শ্বশুরবাড়ীতে থাকে ততই ভালো। -তাই বলে ওই বাড়ীতে? কথাটা ভাবতেও অশ্বিনীর গা রী-বী করতে লাগলােত একটা চাকর নেই, ঝি নেই, রাঁধুনী নেই, রায়েদের বাড়ীর মেয়ে চৌধুরীদের বাড়ী গিয়ে দাসী বাদির মতাে খেটে খেটে মরবে, ০
দু’বেলা পেট ভরে খেতে পর্যন্ত পাবে না, আর আমি তাই চুপ
করে দেখবাে ?
-তা’ কী করবে তুমি? জিজ্ঞেস করেন প্রতাপ রায়।
অশ্বিনী তাল ঠুকে বলে, ক’রব মানে? করেছি। সেই পালকি
আমি আবার পাঠিয়ে দিয়েছি—বিজয়ের মাকে আচ্ছা করে চিঠি লিখে
দিয়েছি ওই সঙ্গে। আসুক এক বার, তারপর দেখাচ্ছি মজা।
-কী মজা দেখাবে ?
-মেয়েকে আর কখখন ও-মুখাে হতে দেবো না। কিছুতেই
পাঠাব না।
প্রতাপ রায় যুক্তি দেখান, ছেলে আবার বিয়ে করবে তাহলে।
—বিয়ে করবে? এগাঁয়ের বাস তুলে দেবাে না?
এমন সময়ে অশ্বিনীর ছেলে কমল এসে খবর দিল, দিদিকে নিয়ে .
এলাম। বিজয়দাও এলাে সেই সঙ্গে।
বিমলার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়কেও আসতে হয়েছে দেখে মনে মনে খুবই
গর্ববােধ করতে লাগলাে অশ্বিনী। বাবাকে ডেকে বললে, ওই শােনন।
আমার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, ও তাে ধন্য হয়ে গেছে। বিয়ে ওর
দিত কে নইলে ?
হঠাৎ খেয়াল হােল তার যে কমলের সামনে এসব কথা বলা তার
উচিত হচ্ছে না। কমলকে সে তাই ভাগিয়ে দিয়ে বললে, আমার
বাড়ীতে যদি থাকতে চায় তো ঘর-জামাই হয়ে থাক না ও; কে
বারণ করছে?
প্রতাপ রায় বললেন, মা-র ওই একটিমাত্র ছেলে, ছেলে-বৌ নিয়ে ঘর
করবে না সে? থাকতে দেবে কেন এখানে!
অশ্বিনী বললে, বেশ তাে, আমার মেয়েকে নিয়ে ঘর করতে চায়,
অবস্থা ভালাে করুক, রােজগার করুক, আর নইলে বলুক আমাকে, ওর
৬১
মামা সেই কেলেটাকে ধরে এনে আচ্ছা করে ঠেঙ্গিয়ে আদায় করে দিচ্ছি -ওর যা কিছু নিয়েছে সব। প্রতাপ রায় দেখলেন, এতক্ষণে একটা সত্যিকারের কাজের কথা বেরিয়েছে অশ্বিনীর মুখ থেকে। তিনি আরেকটু উস্কে দিলেন অশ্বিনীকে, বলতে হবে। তােমার জামাই-এর সম্পত্তি উদ্ধার করবে তাও তােমার হাতে-পায়ে ধরে বলতে হবে ? অশ্বিনী বুঝলল, এ-ব্যাপারে সম্পূর্ণ মত আছে বাবার। হু ব’লে সে তক্ষুণি সব ব্যবস্থা করবার জন্যে উঠে দাড়ালাে। প্রতাপ রায় জিজ্ঞেস করলেন, কী হােল, চললে কোথায় ? অশ্বিনী বললে, দারােয়ান পাঠাচ্ছি, কেলােকে ধরে আনুক, তারপর আমাদের চণ্ডীমণ্ডপের হাড়িকাঠে পুরে ওকে বলিদান করে দিই। অশ্বিনী চলে গেল। ছেলের চরমপন্থী পরিকল্পনা দেখে প্রতাপ রায় একটু হাসলেন মনে মনে। চাপরাশী দিয়ে কালুকে বাড়ী থেকে আনিয়ে বিজয়ের শ্বশুর খুব মারধাের করছে শুনে ভয়ানক ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন মহামায়া। • একটা খোঁজখবর করবার জন্যে বিজয়কে বলতে এলেন তাড়াতাড়ি। বিজয় তাে প্রথমটা বিশ্বাসই করতে চায় না যে তার কালুমামাকে পাচুণ্ডি থেকে আনিয়ে মারধাের করতে পারে কেউ। সে বললে, ধ্যে, তাই কখনও পারে? কে বললে? কোথায় শুনলে তুমি ? মহামায়ার সব কিছু গােলমাল লাগছিল দুশ্চিন্তায়। তিনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ওই যে রে নাপিতের ছেলেটা—কি নাম ছাই প্রভাকর। প্রভাকর বলে গেল, কালু নাকি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তােকে খবর দিতে বলেছে। প্রভাকর যখন ব'লে গেছে, তখন কথাটা একেবারে মিথ্যে হয়তো না-ও হতে পারে। ভাবনায় পড়লাে বিজয় : তাহলে তাে দেখতে হয় একবার। ৬২ মহামায়া তাগিদ দিলেন, হ্যা বাবা, যা একবার দেখে আয়। সার্টের ওপর কোটটা চাপাতে চাপাতে বিজয় বললে, কিছু বিশ্বাস নেই মা, আমার শ্বশুরটি করতে পারে না এরকম কাজ পৃথিবীতে কিছু আছে বলে তো আমার মনে হয় না। বিজয় তাড়াতাড়ি তার শ্বশুরবাড়ীর দিকে চললাে।, বিজয়ের দিকে চেয়ে আপন মনেই বললেন মহামায়া, বিয়েটা এখানে দেওয়াই বােধহয় আমার ভুল হােলাে। কালুর হাতে মােচড় দিয়ে টানতে টানতে অশ্বিনী তাকে নিয়ে এলাে তাদের চণ্ডীমণ্ডপে। কালুর গায়ে গলাবন্ধ কোট, গালৈ-মাথায় কম্ফার্টার জড়ানাে। প্রাণপণে চীৎকার লাগিয়েছে সে। অশ্বিনী ধমক দেয়, অত চেঁচাচ্ছাে কেন? কঁদো কাদো সুরে কালু বলে, চেঁচাবাে না? একে আক্কেল দাঁত উঠেছে তার যন্ত্রণায় মরছি, তার ওপর জরে কেঁা-কেঁা করছি তিন দিন ধরে। এখন আবার তােমার মােচড়ের ঠেলায় হাতখানা ভেঙে গেল যে ! অশ্বিনী বলে, যাক না। মাথাটাও তাে যাবে। হাড়িকাঠ দেখছাে? সামনেই দেখা যাচ্ছিল’-একটা রাক্ষুসে হাড়িকাঠ। কালু বললে, হু। -ওইখানে তােমার মাথাটা গলিয়ে দিয়ে বলিদান করবাে। ভয়ে ভয়ে একটু অবিশ্বাসের হাসি হাসলে কালু। অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলাে, বিশ্বাস হচ্ছে না? শুকুল! শুকুল! -জি! বলে সেলাম দিয়ে শুকুল এসে দাড়ালাে। অশ্বিনী হুকুম দিল, পাঠা কাটবার খাড়াটা নিয়ে এসাে। শুকুল খাঁড়া আনতে গেল। অশ্বিনী কালুকে বললে, বিজয়ের টাকাকড়ি, বিষয়-সম্পত্তি যা-কিছু তুমি নিয়েছ সব ফেরৎ দিতে হবে। ভিজে-বেড়ালটির মতাে কালু বললে, কিছুই তাে আমি নিই নি।
-না, কিছুই তুমি নাও নি ! পাঁচুণ্ডী, গড়বেতা, চণ্ডীপুর আর
বিজয়নগর—এই চারটে বড় বড় জমিদারী মেজো ভবানী চৌধুরীর
ছিল কি-না?
-হ্যা, ছিল।
-সেগুলাে তােমার স্ত্রীর নামে গেল কেমন করে ?
তাড়াতাড়ি জিব কেটে কালু বললে, আরে রাম বল। আমার স্ত্রীর
নামে তো নয়। আমার এক ভায়রাভাই আমার শালীর নামে নিলেম
খরিদ করেছে। আমি তার কিছুই জানতাম না। পরে শুনেছি।
-হ্যা, কিছুই জানতে না, পরে শুনেছাে! আমার রাগ বাড়িয়ে
কালু, আমি তােমাকে আজ এখান থেকে জ্যান্ত ফিরে যেতে দেবাে না।
তাতে আমার যা-হয় হবে।
শুকুল এমন সময়ে খাড়া নিয়ে ফিরলাে। কালুর হাত ধরে হিচড়ে
টেনে অশ্বিনী বললে, এসাে তুমি, ওই খাড়া এসে গেছে।
আর্তনাদ করে উঠলাে কালু, উ, গেলাম, গেলাম।
অশ্বিনী বললে, কোন কথা শুনবাে না। আমার গাড়ী আছে, গাড়ীতে
চ’ড়ে আমার সঙ্গে তােমার বাড়ী যাবে, দলিল নেবে, বৌ হােক শালী
হােক, যার নামে বেনামী খরিদ করেছ তাকে নেবে, তারপর রেজেষ্ট্ৰী
আপিসে গিয়ে আমার মেয়ের নামে সব লিখে দেবে। রাজি ?
চি-চি করতে করতে কালু বলে, কী যে বলছাে বেয়াই, আমি
নিই নি
এখনও বলছে নিই নি ?
—হ্যা, এখনাে বলছি, সত্যি আমি নিই নি।
অশ্বিনী বললে শুকুল, দাও তাে খাড়াটা। মুণ্ডু আর কাটব না,
ধরে ওর হাতখানা হাড়িকাঠের ওপর চেপে, আঙুলগুলাে কেটে উড়িয়ে
দি। সহজে ও দেবে না বুঝতে পারছি।
৬৪
শুকুল নিজেই খাঁড়াটা উঠিয়ে বললে, আপ জোসে পাকড়, লি জিয়ে, হাম কাট দেতা। অশ্বিনী বললে, সেই ভালাে, তুমিই কোপ, লাগাও। কালুর হাতটা জোর করে হাড়িকাঠের ওপর চেপে ধরলাে অশ্বিনী। কালু দেখলাে, সর্বনাশ! খােট্টাই বুদ্ধি! আর এক সেকেণ্ড দেরী হ'লেই হয়তাে ঝপ করে কোপ বসিয়ে দেবে। তাড়াতাড়ি প্রাণের দায়ে সে চেঁচিয়ে উঠলাে, দেব-দেব, চল-চল আমার সঙ্গে চল। শুকুলকে খাড়া নামাতে ব’লে অশ্বিনী কালুকে বললে, চল শীগগির তাহলে। কালুকে নিয়ে অশ্বিনী এগুতে যাবে, ঠিক এমন সময়ে মামা-মামা বলে ডাকতে ডাকতে বিজয় এসে উঠলাে চণ্ডীমণ্ডপে। শুকুলের হাতে খাঁড়া, আর মামার জড়ােসড়ো অবস্থা দেখে সে অশ্বিনীকে জিজ্ঞেস করলাে, এ কীকরছেন? অশ্বিনী জবাব দিল, তােমার মামাকে কাটবাে ভেবেছিলাম। নেহাং তােমার সবকিছু ফিরিয়ে দিতে রাজী হােল তাই, নইলে আজ আমি ওকে বিজয়কে দেখে এতক্ষণ ধড়ে প্রাণ এলাে কালুর। সে বিজয়কে বললে, স্থাখাে বাবাজি, দ্যাখাে, তােমার শ্বশুরের কাজ দ্যাখাে। আমি কি নিয়েছি যে ফিরিয়ে দেবাে? বলছি আমার এক শালীর নামে অশ্বিনী ধমক দিল, চুপ,। বিজয়কে দেখে আবার সুর পালটাচ্ছ! এসাে তবে এদিকে। খাড়াটা আনাে শুকুল! হাড়িকাঠের কাছে নিয়ে যাবার জন্যে কালুকে ধরে আবার টানা- হেঁচড়া সুরু করলাে অশ্বিনী। কালু চেঁচাতে লাগলাে বিজয়-বিজয় বলে। বিজয় অশ্বিনীকে বললে, আঃ, ছাড়ন, ছাড়ুন। কী করছেন এসব? নিজেই সে জোর করে অশ্বিনীর হাত থেকে ছাড়িয়ে দিলে কালুকে। যেই ছাড়া পাওয়া, কালুও অমনি ছুটে পালাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাে রা-চৌ-৫ । ছিটকে। কঁাচা-কেঁচা খুলে গেল তার। সেই অবস্থাতেই দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল সে। কালুকে বিজয় ছাড়িয়ে দিলে দেখে অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলাে, ওকে ছেড়ে দিলে যে বড়াে? বিষয়-সম্পত্তি তুমি চাও না? ও কিন্তু দিতে রাজী হয়েছিল। বিজয় হেসে বললে, আপনার চেয়ে ওকে আমি বেশী চিনি। শেষ পর্যন্ত দিতনা। —ওর বাপ দিত। মরে যাবার ভয়ে দিত। বিজয় নিজের মনে কী ভেবে বললে, না দিয়েছে ভালই হয়েছে। ভগবান আমাকে রক্ষা করেছেন। তার মানে ? অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলাে। বিজয় ম্লান হেসে বললে, মানে খুব সােজা। জমিদারী আমার ধাতে সইবে না। অশ্বিনী ভুরু কুচকে জিজ্ঞেস করলাে, জমিদারীর দোষটা কী আমাকে বলতে পারাে ? পাল্টা প্রশ্ন করলে বিজয়, বিদেশী গভর্ণমেন্টের কী দোষ আপনি বলতে পারেন, যা থেকে মুক্তি পাবার জন্য সারা ভারতবর্ষ ছটফট করছে ? বিদেশী গভর্ণমেন্টও যা, আপনার ওই জমিদারীও তাই। একই যন্ত্রের বড়াে চাকা আর ছােট চাকা। অশ্বিনী বললে, তােমাদের ও-সব হেঁয়ালী বুঝবার মতাে বিদ্যে-বুদ্ধি আমার নেই। আসল কথা তুমি তাহ'লে বলতে চাও—টাকাকড়ি বিষয়- সম্পত্তি নিয়ে সুখে তুমি থাকতে চাও না। —আমার যা আছে তাই নিয়ে আমি খুব সুখে আছি। নিশ্চিন্তভাবে উত্তর দিল বিজয়। বিদ্রুপ করে উঠলাে অশ্বিনী : তােমার আছে কী যে সুখে থাকবে!
একটু ভেবে নিয়ে একটা নতুন প্রস্তাব করলে সে বিজয়ের কাছে ।
আমার কলিয়ারীতে চাকরি করবে ?
বিজয় মাথা নেড়ে বললে, আজ্ঞে না। এখনও সেরকম দুরবস্থা
আমার হয় নি।
—তাহলে আমার বাড়ীতেই থাকো তুমি।
—ঘর-জামাই হ'য়ে ?
—হ্যা, দোষ কি?
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বিজয় বললে, আপনি তাে আমাকে চেনেন,,
কেন এসব কথা বলছেন বলুন তাে?
অশ্বিনী কিছু জবাব দেবার আগে বিজয়ই একটু থেমে আবার বললে,
আমি বুঝতে পেরেছি। রায়েদের মেয়ে চৌধুরীদের বাড়ীতে যাবে-
আপনার দন্তে কোথায় যেন আঘাত লাগছে!
অশ্বিনী বললে, হ্যা ঠিক তাই। তােমার অবস্থার উন্নতি যতদিন
না করতে পারাে আমার মেয়ে ততদিন তােমাদের বাড়ীতে যাবে না।
—আপনার মেয়ে আপনি না পাঠাতে পারেন, কিন্তু আমার স্ত্রী আমি
জোর করে নিয়ে যাব।
-জোর করে ?
-আমার বাড়ী থেকে ?
-হঁ্যা।
অশ্বিনী হেসে বললে, পারবে না।
বিজয় বললে, নিশ্চয়ই পারবাে।
অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলাে, যদি না পারে ?
–আমিও আর আপনার বাড়ী আসবাে না। জিদের বশে হঠাৎ
প্রতিজ্ঞা করে বসলাে বিজয়।
কমলকে
বাড়ী ফিরবার মুখে বিজয় তার শালা কমলের হাত দিয়ে একটুকরাে
চিঠি পাঠালো বিমলার কাছে। বিমলা তখন মায়ের কাছে দাড়িয়ে
শাড়ী পছন্দ করছিল। কমল এসে লুকিয়ে জামাইবাবুর চিঠিটা দিদিকে
দিতে যাবে, এমন সময়ে মা দেখে ফেললাে। কাগজের টুকরােটা কেড়ে
নিয়ে মা পড়ে দেখলো তাতে লেখা আছে ---
বিমলা, চট করে একবার এসাে।
বিজয়।
সলজ্জ ভাবে একটু হেসে চিঠিটা মা বিমলার হাতে দিল।
বললে, তা এর জন্যে এত লুকোচুরি কিসের?
জামাই মেয়ে একটু নিরিবিলিতে কথা বলতে চায় দেখে কমলকে
মা সরিয়ে নিয়ে গেল সেখান থেকে।
বিমলা চিঠিটা পড়লাে। চিঠির ওপর থেকে চোখ তুলে দেখে
জানলার সােজাসুজি দূরের বারান্দায় দাড়িয়ে বিজয় তাকে হাতছানি দিয়ে
ভাসছে। ঘরে কেউ নেই, তা সত্ত্বেও বিজয় ঘরে আসছে না দেখে
বিমলা নিজেই শেষপর্যন্ত এগিয়ে গেল বিজয়ের কাছি।
বিজয়ের সামনে এসে বিমলা বললে, এ আবার কি ! চিঠি দিয়ে
এইখানে দাড়িয়ে,-মা চিঠিখানা দেখে ফেললে যে
যে ।
বিজয় বললে, দেখুক গে !
-হ্যা, দেখুক গে ! লজ্জার ভাব দেখিয়ে বিমল বললে, দাড়িয়ে রইলে
কেন? এসাে ঘরে এসাে।
-না ঘরে যাবনা। তুমি আমার সঙ্গে যেতে পারে ?
বিমলা জিজ্ঞেস করলাে, কোথায়?
বিজয় বললে, যেখানে আমি বলবাে।
বিমলা মাথা নেড়ে সায় দিল, হু, খুব পারি।
বিজয় বিমলার হাত ধরে বললে, এসাে তাহলে আমার সঙ্গে।
‘চল’ বলে বিমলাও বিজয়ের দৌড় কত দেখবার জন্যে এগিয়ে
চললল। খানিকদূর গিয়ে দেখে বিজয় সত্যিসত্যিই তাকে টানতে
টানতে বাড়ীর বাইরে নিয়ে চলেছে। বিমলা তাড়াতাড়ি থামালাে
বিজয়কে : একি ? সত্যি চললে ?
বিজয় বললো।
বিমলা জিজ্ঞেস করলোে, এক্ষুণি ?
—হ্যা হ্যা। দ্বিগুণ জোরের সঙ্গেই বললে বিজয়
বিমলা অবাক হয়ে গেল। একটু কিন্তু করে সে বললে, দ্যাখাে
তত। আমি মনে করলাম তুমি হাসি-রহস্য করছে।
বিমলা যে শেষ পর্যন্ত এই ধরণেরই কোন ছুতাে করবে তা বিজয়
আগেই আন্দাজ করেছিল। বিরক্ত হয়ে সে বললে, তাহলে তুমি
যেতে পারাে না বল।
বিমলা তবু সাহস দেখায় : কেন পারবো না ?
বিজয় বলে, যাচ্ছনা, আবার বলে কেন পারবাে না!
বিমলা বলে, মা-কে একবার বলে আসি। খুঁজে মরবে যে !
বিজয় বাধা
দক্ষ।
না, কাউকে বলতে পাবে না।
চোখ ঘুরিয়ে বিমলা বলে, বাবা বকবে না বুঝি ?
বিজয় হাত ছেড়ে দেয় বিমলার : তাহলে তােমার যাওয়া হােল না।
আমি চললুম। কোনদিন আর তােমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না।
বিমলাকে ফেলে বিজয় চলে যাচ্ছিল। বিমলা আবার ফেরালাে
তাকে : ওগাে, শােননা! শােননা।
-কী শুনবে? পিছু ফিরে দাড়ালাে বিজয়।
বিমলা জিজ্ঞেস করলাে, আমার ওপর রাগ করে চলে যাচ্ছ ?
-না, আমি কারও ওপর রাগ করি না। মনের ভাব মনেই চেপে
রাখলাে বিজয়।
বিমলা আবার প্রশ্ন করলাে, তবে যে আর আসবে না বলছো? গম্ভীর হয়ে বিজয় বললে, হ্যা, আমি আর আসতে পারবাে না। বিমলাকে আর কিছু বলবার অবসর না দিয়েই বিজয় চলে গেল। বিমলা পথের দিকে চেয়ে দাড়িলে রইল চুপটা করে। তারমনে হতে লাগলাে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে তার মাথায়। হাসি-ঠাট্টার ভেতরে হঠাৎ কেন যে এমন বিপর্যয় ঘটে গেল—কেন যে রাগ করে চলে গেল বিজয়, ভেবে ভেরে সে তার কিছুই কুলকিনারা পেল না। বিমলাকে একলাটি দাড়িয়ে থাকতে দেখে মা এসে জিজ্ঞেস করলাে, কীরে, বিজয় কি চলে গেল নাকি? মায়ের কথা শুনে চমক ভাঙলাে বিমলার। ‘হু” বলে মাথা নীচু করে ঘরে ফিরে গেল সে। মা বুঝে উঠতে পারলাে না বিজয়ের এমন হঠাৎ এসে হঠাৎ চলে যাওয়ার কারণ কী। জামাই থাকবে ভেবে তার জন্যে খাবার তৈরী করতে বলে এসেছিল সে। দোতলা থেকেই রাধুনীকে ডেকে সে, তাই বারণ করে দিল, থাক, আর খাবার করতে হবে না পদ্মর মা। জামাই এসেছিল, বিমলা বলছে, চলে গেল। কথাটা শুনতে পেয়েই বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাড়াল অশ্বিনী। —বিজয় এসেছিল ? বিমলার মা বললে, হ্যা, এইমাত্র দেখলাম—এলো আর চ'লে গেল। -তােমার মেয়ে কোথায় ? জিজ্ঞেস করলে অশ্বিনী। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিমলার মা, ওই তাে, ওই ঘরে। বিমলা বিজয়ের সঙ্গে, যায়নি দেখে আনলে লাফিয়ে উঠলাে অশ্বিনী। -বা বা, এই নইলে আমার মেয়ে! বিজয় বলে-ওকে সে জোর করে নিয়ে যাবে। আমার বাড়ী থেকে আমার মেয়েকে জোর করে নিয়ে যাবে। -শােনাে কথা !
হাে-হো করে হাসিতে একেবারে ফেটে পড়লাে অশ্বিনী। বিজয়ের উচু মাথা নীচু হয়েছে জানতে পেরে হাসি আর তার থামতেই চায় না। পাশের ঘরে মনের দুঃখে খাটের এক টী কোণ ধরে বসেছিল বিমলা। বাবার হাসি যেন তীরের মতো এসে বিধতে লাগলাে তার কানে। স্বামীর অবহেলা, বাবার বিদ্রুপ সে আর সহ্য করতে পারলাে না। অপমানে দুঃখে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠলাে সে। রায়েদের বাড়ী থেকে ফিরে এসেই বিজয় মা’র কাছে সব কথা জানালাে। বললে, তােমার বউ যদি এ-বাড়ী না আসে তুমি কি করতে চাও বল। ছেলের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যান মহামায়া : ওকি কথা রে? বৌ কেন আসবে না! বিজয় বলে, আমি বলছি আসবে না, আসতে পারবে না, ওর বাবা ওকে পাঠাবে না। কথাটা বিশ্বাস হয় না মহামায়ার।-না পাঠাবে না ! তাের যেমন কথা! বাপ হয়ে মেয়ের সর্বনাশ করবে ? বিজয় বলে, হ্যা করবে, ও এক অদ্ভুত ধরণের মানুষ। মহামায়া বলেন, না না ও যেমনই হােক, তাের শাশুড়ী দেখবি কারও কথা শুনবে না, জোর করে পাঠিয়ে দেবে। বিজয় তবু মাথা নাড়ে। পারবে না-পারবে না। আমার শ্বশুরের ভয়ে সব থর থর করে কাপে। ওর কথার ওপর কথা বলবার সাহস কারও নেই। মহামায়া জিজ্ঞেস করলেন, আসল কথা, কী বললে তাের শ্বশুর বস্ততা। বিজয় বললে, কী আর বলবে? বলে, আমরা গরীব। রায়েদের বাড়ীর মেয়ে চৌধুরীদের বাড়ীতে এসে দাসীবাদীর কাজ করতে পারবে না। ঘরের কাজকর্ম করা নিয়ে কথা উঠেছে শুনে মনে আঘাত পেলেন মহামায়া। বললেন, কে বলছে কাজ করতে। এত করে তখন বারণ করলাম-বৌমা কাজ কোরাে নাকোরােনা—কিন্তু শুনলে কারও কথা! ৭১ বিজয় দেখলাে মা সমস্ত ব্যাপারটাকে নিজের অপরাধ বলে ভুল করেছেন। সে মা-কে বােঝালাে, না মা না, ও-সব কথা আমার শ্বশুর জানে না। এখানে বিয়ে দেবার ইচ্ছেই ওর ছিল না, হয়ে যখন গেল, কী আর করবে, এখন আবােল তাবােল বকছে। বলছে, আমার মেয়ে যাবে , তুমি আমার বাড়ীতে ঘর-জামাই থাকো। অশ্বিনী এমন উদ্ভট প্রস্তাব করেছে শুনে ব্যঙ্গ না করে পারেন না মহামায়া : ওমা আমার কে রে! আমার একটি মাত্র ছেলে ঘর জামাই থাকতে যাবে কী দুঃখে। আমি ছেলে-বৌ নিয়ে ঘর করবাে না ? চিন্তিতভাবে বিজয় বলে, সে সাধ তােমার এ বৌ নিয়ে মিটবে বলে তাে মনে হয় না। বিজয় মুসড়ে পড়েছে দেখে মহামায়া ভরসা দেন তাকে : তুই তাে আমার মেয়ে নােস বিজয়, আমার ভয় কিসের ? দরকার হয়, আমি আবার তাের বিয়ে দেবাে। কালু-মামা এতক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সব কথা কাণ পেতে শুনছিল। বিয়ের কথা শুনেই সে এগিয়ে এলাে ঘরের ভেতর। বললে, বল না দিদি, কালই বিজয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। কালুকে দেখে মহামায়া অবাক হয়ে বললেন, ওমা, তুই বাড়ী যাবি বললি, যা নি এখনও ? কালু বললে, না গেলুম আর কই, সব শুনলুম যে ! মহামায়া ভাইয়ের কাছে পরামর্শ চাইলেন, দ্যাখ দেখি কাণ্ড, এখন আমি করি কি ? কালু বললে, বিয়ে দাও। মহামায়া বললেন, কিন্তু আমার বৌ-টি যে বড় ভালাে। ঝপ করে বিয়ে না দিয়ে আমি বলি কী, বিজয় কিছুদিন চুপ করে থাকুক দেখি। জামাই যদি শ্বশুরবাড়ীতে না যায়, মেয়ে নিয়ে কতদিন. আর থাকতে १२ পারবে ও? এবুদ্ধিটা বেশ ভালােই লাগলাে কালু-মামার। সেও বার বার ভাগ্নেকে সাবধান করে দিল : সেই ভালাে ভাগ্নে, ওদিক দিয়ে আর তুই হাঁটবি না, ও-রাস্তা আর তুই মাড়াবি না। বিজয় হাঁ-ও বলে না, না-ও বলে না। চুপচাপ শুধু মা-আর মামার হুকুমটা শুনে যায়। দু’চার দিন বিমলার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ না হওয়াতেই কিন্তু বিজয়ের মন হাঁপিয়ে উঠলাে একেবারে। নিজের প্রতিজ্ঞা, মা ও মামার হুকুম কিছুই সে আর রাখতে পারলাে না। লুকিয়ে লুকিয়ে একদিন সে গিয়ে হাজির হােল রায়েদের খিড়কীর রাস্তায়। দূর থেকে বিজয়কে আসতে । দেখেই কমল ছুটে এসে তার দিদিকে খবর দিল : দিদি দিদি, তুমি বলেছিলে জামাইবাবু আর এ-রাস্তা মাড়াবে না, ওই দ্যাখাে কে আসছে! বিমলা দেখে সত্যিই বিজয় এসে উপস্থিত। দিদি ভগ্নীপতির আলাপ- আলােচনায় থাকতে নেই বুঝে কমল আগে থেকেই স’রে পড়েছিল। বিজয় বিমলার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলাে, কী করবে ঠিক করলে, বিমলা? বিমলা বললে, এখানে এমন করে দাড়িয়ে কথা বলে না। এসাে। বিজয় বাড়ীতে ঢুকতে চায় না : তােমার বাবা যখন তােমাকে আমাদের বাড়ী পাঠাবে না, তখন আমিই বা তােমাদের বাড়ী ঢুকবাে কেন ? সেইখানেই একটা গাছের গুড়ির ওপর বিজয় বসলাে। বিমলা জিজ্ঞেস করলো, কে বললে বাবা আমাকে পাঠাবে না ? তবে আর সেদিন শুনলে কী? আমরা গরীব, আমাদের বাড়ীতে মেয়ে পাঠালে তােমার বাবার মান যাবে। ৭৩
—তাহলে আমিও যাব না, তুমিও আসবে না? ব্যাকুলভাবে প্রশ্ন
করলাে বিমলা।
দৃঢ় কণ্ঠে বিজয় বললে, না।
নিরুপায় বিমলা, মেয়েদের শেষ অস্ত্র প্রয়ােগ করলে সে আমাকে
তা'হলে আর দেখতে পাবে না।
-কী করবে? জিজ্ঞেস করলাে বিজয়।
বিমলা বললে, মরে যাব—যেমন করে পারি। তুমি দেখাে, আমি
কিছুতেই আর বেঁচে থাকবে না।
বিজয় বললে, ছি ছি, ও আবার কী কথা? মরণের কথা কি মুখে
আনে ?
—তাহলে আমি কি করবাে বলাে।
-বলবে তােমার বাবাকে।
বাবার নাম শুনেই ভয় পেয়ে যায় বিমলা : ওরে বাবা, সে আমি
পিরবাে না। বাবাকে ভীষণ ভয় করে আমার
—মা-কে তাে বলতে পারবে ?—দাদুকে ?
-কী বলবাে?
-বলবে, তুমি যাবে আমাদের বাড়ী।
এমন কথা মা কিম্বা দাদুকে বলতে হবে ভাবতেই লজ্জা করে।বৰণাম।
সে বলে, ধ্যেৎ, লজ্জা করবে যে !
হাল ছেড়ে দিয়ে বিজয় বলে, বেশ, থাকে তাহলে যেমন আছাে।
-তুমি আসবে না আর? ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে বিমলা।
মুখ ফিরিয়ে বিজয় বলে, না, আমার কাজ আছে, আমি আর আসতে
পিরবাে না।
বিজয় চ'লে গেল।
৭ঃ
পরদিন বিকেলে ঠিক তেমনি সময়ে খিড়কীর দরজা খুলে বিমল
দেখতে এলে বিজয় আর আসে কি না। এদিক ওদিক তাকিয়ে একটু
এগিয়ে আসতেই দেখে, বিজয় কাল যেখানে বসেছিল ঠিক সেইখানেই
বসে আছে চুপটী করে।
মুচকি হেসে বিমল বললে, আসবে না বললে, আবার এলে যে !
বিজয়ও হাসি চেপে বললে, তুমিও মরবাে বললে, কই ম’রলে না তো?
বিমল বললে, দেখাে মরি কিনা।
বিজয় বললে, পরে দেখবাে। যতক্ষণ বেঁচে আছে—এসসা, ব’সাে
এইখানে। আঁতকে উঠে পিছু স’রে গেল বিমলা : ওরে বাবা, না,
এখানে বসবাে না। সাপ আছে।
—কাল তাে বসেছিলে। সাপের কথা তাে বল নি।
হাসতে হাসতে বিমল বললে, কাল মরতে চেয়েছিলাম যে !
—আর আজ? জিজ্ঞাসু চোখে তাকালাে বিজয়।
আব্দারের ভঙ্গীতে বিমলা বললে, আজ মরতে ইচ্ছে করছে না।
চল ঘরে চল।
-ঘরে ?
-হ্যা।
—কিন্তু
-না, কোনাে কিন্তু টিন্তু শুনবাে না, তুমি এসাে। বিজয়ের হাত
ধরে টানতে লাগলাে বিমলা।
বিজয় বললে, কেউ যদি দেখে ফেলে !
বিমলা বললে, ওরে বাবা, কী পাপই না করছে! কেউ দেখলে
একেবারে ফাসি হবে যেন!
যেতে যেতে হঠাৎ কী ভেবে বিজয় বললে, না থাক। যাব না।
বিজয়কে আর বেশী টানাটানি করতে সাহস হােল না বিমলার।
৭৫
চারিদিক চেয়ে একটা বেশ নির্জন গাছতলা খুঁজে বের করলাে। আঙুল
দেখিয়ে বললে সে, ঘরে যদি না যাবে তােঐখানে চলে।
চারিদিকে গাছপালা আড়াল করে দাড়িয়ে আছে। মাঝখানে একটা
খড়ের গাদা। নিরিবিলিতে বেউ যেন গদী পেতে বিছানা করে রেখেছে
দু’জনের জন্যে। সেই খড়ের গাদার ওপর গিয়ে গা এলিয়ে দিলে বিজয় ;
আর বিজয়ের কাধে মাথা রেখে বিমলা বসলাে তার পাশে।
বিজয় বলতে লাগলাে, দ্যাখাে বিমলা, এখন মনে হচ্ছে, বিয়েটা যেন
আমাদের না হলেই ভালাে হত।
বিমলা জিজ্ঞেস করলাে, কেন?
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বিজয় বললে, তুমিও সুখী হতে পারলে না,
আমিও সুখী হতে পারলাম না।
বিমলা বিজয়ের দিকে চোখ তুলে বললে, আমি কিন্তু তােমাকে পেয়ে
সুখী হ'য়েছি।
—আমাকে আর পাচ্ছ কোথায় ? ম্লান হাসি হেসে জিজ্ঞেস করলাে
বিজয়।
দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বিমলা বললে, এই তাে পেয়েছি।
বিজয় বললে, এমন লুকিয়ে লুকিয়ে চোরের মত?
বিমল চুপ করে রইলাে। বিজয় বলতে লাগলাে, আমি কিন্তু
এলুকোচুরি পছন্দ করি না। অন্তরের সত্যকে গােপন করে লাভ নেই।
পাপ যেখানে, অপরাধ যেখানে, সেইখানেই তাে ভয়।
এসব নীতিকথা শুনতে ভালাে লাগছিল না বিমলার। সে বললে,
তােমার ওসব কথা আমি বুঝতে পারি না।
বিজয় বললে, কোনদিনই পারবে না বুঝতে।
দুষ্টুমির হাসি হেসে বিমলা বললে, বুঝতে আমি চাইও না। তুমি এমনি
করে আমার কাছে থাকো, আমি হাসতে হাসতে সব দুঃখু সহ করবে।
৭৬
No text on this page.
No text on this page.
বললে, কাল আর আসবে না বলে চলে গেলে যে বড়াে! আমাকে এরকম করে কষ্ট দিতে ভারী ভাল লাগে, না ? কাল রাত্তিরে ভাল করে ঘুমােতেই পারি নি। বিজয় বললে, আচ্ছা, আজ ব’লে গেলাম, কাল থেকে আর কক্ষণাে আসবাে না। ভালাে করে ঘুমিয়ে ! বিমলা বুঝলল, বিজয় তাকে রাগাবার জন্যেই আসবাে না বলে ভয় দেখায়। যাং-ও! বলে সে বিজয়কে হাত ধরে খাটের ওপর নিয়ে বসালো। তারপর তার মনের কথাটা পাড়লাে বিজয়ের কাছে : দ্যাখাে, কাল একটা কথা ভাবছিলাম, শােনন। বিজয় বললে, বলল। -বাবা তােমাকে রােজগার করতে বলেছে, বড়লােক হতে বলেছে, এই তাে! -হ্যা। -তা অন্যায়টা কী বলেছে ? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে বিমলা। -রােজগার তুমি করবে না? বিজয় জবাব দেয়, করি তাে ! বিমলা বিদ্রুপ করে বলে, কী করে তা আমি জানি মশাই জানি। ডাক্তারী কবরী, গরীবদের কাছে পয়সা নাও না। তা এ-গাঁয়ে বড়লােক ক’জন আছে, সবাই তাে গরীব। বিজয় বলে, চলে তাে যাচ্ছে। বিমলা বলে, চলে তাে সবারই যায়। আমাদের বাড়ীর চাকর- দারােয়ানদেরও চলে যায়। বিমলার মা এমন সময়ে ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। জামাই-মেয়ের কথা শুনে জানালার খড়খড়ি তুলে উকি মেরে দেখলাে সে। তারপর মুচকি হেসে খানিক দূরে গিয়ে বারান্দার রেলিং ধরে সে দাড়িয়ে রইলাে, যাতে চট করে এদিকপানে কেউ না এসে পড়ে তাই দেখবার জন্যে। বিজয় বা বিমলা কেউই তা জানতে পারলাে না। আগের মতই গল্প করতে লাগলাে তারা। বিজয় বললে, ও তুমিও তাহলে চাও আমি অনেক টাকা রােজগার করি—খুব বড়লােক হই! বিমলা বললে, কোন্ মেয়ে চায় না! সব মেয়েই চায় তার স্বামী খুব রােজগার করুক। বিজয় বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রােজগার করবাে বললেই তাে আর বলতে বলতে থেমে গেল সে। হঠাৎ বাইরে কী যেন সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি জানালার কাছে গিয়ে খড়খড়িটা একটু ফাঁক করে দেখতে লাগলাে। বিমল।ও তার কাঁধে হাত দিয়ে মুখের পাশে মুখ দিয়ে উকি ঝুকি দিতে লাগলাে। বাইরে তখন বিমলার মা’র সামনে দাড়িয়ে হাত-মুখ নেড়ে অশ্বিনী বলছে, বিজয় ! বিজয় ! তােমার জামাই। বিমলার মা চাপা গলায় বলে, না না, আসে নি। কী সব কথা বলেছ। শুনছি, মেয়ে পাঠাবে না নাকি, আসবে কেন? অশ্বিনী তবু জোর দিয়ে বলে, না না তুমি জানাে না, আসে। বােজ আসে লুকিয়ে লুকিয়ে, আবার লুকিয়ে লুকিয়ে চলে যায়। ঘরের ভেতর থেকে একথা শুনে বিজয় আর বিমলা মুখ চাওয়া- চাওয়ি করে হাসে। বিমলার মা বলে, আসে তাে আসুক না, ভালই তাে। মেয়ের বিয়ে, দিয়েছ, আসবে না? অশ্বিনী বলে, আসতে তত বারণ করছি না। কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে কেন আসবে? সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে আসুক, সবাই জানুক যে চৌধুরীদের বাড়ীতে মেয়ের বিয়ে আমি দিয়েছি, কিন্তু মাথা হেঁট করে মেয়ে যায় না, ছেলেই থাকে আমার বাড়ীতে-ঘর-জামাই হয়ে অন্নদাস হয়ে। অশ্বিনীর শেষ কথাগুলাে যেন চাবুকের মত বিজয়ের গায়ে লাগে। বিমলাকে সে টানতে টানতে সরিয়ে আনে জানালার পাশ থেকে। দুঃখে- অপমানে কাপতে কাপতে সে বিমলাকে বলে, এখনও তুমি বলছাে বিমলা, এমনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমি তােমাদের বাড়ী আসবে, আর তুমি যাবে না ? বিজয়ের মুখের দিকে চেয়ে ভয়ে বিমলার গলা শুকিয়ে যায়। যে কী বলবে তা ভেবে পায় না। থর থর করে তার ঠোঁট দুটো শুধু কাপতে থাকে আর দুচোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে টপ. টপ করে। বাইরে তখনাে অশ্বিনী শাসিয়ে চলেছে । আমার মেয়ের ভালােমন্দ আমি জানি। আমার কথার ওপর কেউ কথা বলবে না বলে দিচ্ছি।' এমন সময়ে হঠাৎ কমলকে আসতে দেখে সে বললে, কমল, তুই চট করে যা দেখি একবার বিজয়দের বাড়ী ! দেখে আয়—বিজয় বাড়ীতে আছে কিনা। থাকে যদি, আমার নাম করে ডেকে আন। যা, চট করে, যাবি আর আসবি। হুকুমটা করেই অশ্বিনী চলে গেল গটমট, করে। বাবা চলে গেছে দেখে কমল জুতাে পরতে পরতে হাত-ইসারায় মাকে ডাকলাে। মা কাছে আসতেই কমল বললে, বিজয়দা’ তত দিদির ঘরেই আছে মা, আমি দেখেছি। মা চাপা গলায় বললে, আঃ, তাের অতসব কথায় দরকার কী? তাের বাবা যা বললে তাই কর। তুই যা না যেখানে যাচ্ছি। কমল বুঝলাে না তাকে এমন মিছিমিছি হয়রাণ করার মানে কী? তবু কথাটী না বলে সে তাড়াতাড়ি বিজয়দের বাড়ীর দিকে চললল । ৮১ রায়চৌ৬
বিজয়দের বাড়ী এসেই ডাকাডাকি করতে লাগল কমল : বিজয়দা।
বিজয়দা।
ডাকাডাকি শুনে বেরিয়ে এলেন মহামায়া :
কে রে, কমল! বিজয়
তত বাড়ীতে নেই। অনেকক্ষণ বেরিয়েছে বাড়ী থেকে।
কমল বললে, , থাকবে না আমি জানি। ও ঠিক আমাদের বাড়ীতেই
আছে।
মহামামা মাথা নেড়ে বললেন, না, তােমাদের বাড়ী তাে সে
যাবে না।
কমল বললে, যাবে না! তাহলে তুমি সব জানাে! আমি নিজে
দেখলুম দিদির ঘরে ঢুকলে চুপি চুপি। রােজ যায়।
মহামায়া তাে অবাক : রােজ যায় ? তুমি দেখেছ ?
কমল আরাে জোর দিয়ে বললে, হা হা রােজ যায় ।
সব কথা ভালাে করে জানবার জন্যে মহামায়া কমলকে বললেন,
দাড়িয়ে রইলে কেন বাবা ? বােসস।
কমল বললে, না বসবাে না। বাবা ব’কবে।
কমলের কথায় আঘাত পেলেন মহামায়া : আমাদের বাড়ীতে
বসলেও তােমার বাবা ব’কবে?
কমল চালাক ছেলে। কথাটা তাড়াতাড়ি ঘুরিয়ে নিল সে : না-না,
বাবাকে চট করে গিয়ে বলতে হবে কিনা বিজয়দী এখনও বাড়ী ফেরে
নি, তাই। আমি চললুম।
যাবার মুখে আর একবার সে নিজের মনে মনেই বলে গেল, বিজয়দা
ঠিক দিদির ঘরে খিল বন্ধ করে বসে আছে।
কমল চলে যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ সেখানে থমকে দাড়িয়ে রইলেন
মহামায়া। তারপর চেঁচিয়ে ডাকলেন, নায়েব মশাই! নায়েব মশাই!
বনমালী এলাে।-মা! কিছু বলছে?
৮২
মহামায়া বললেন, বড় রায়ের সঙ্গে চুপি চুপি একবার দেখা করতে বলেছিলাম, গিয়েছিলে ? বনমালী বললে, হ্যা মা গিয়েছিলাম। তারপর একটু থেমে মাথা চুলকে সে বললে, বিজয়ের বিয়ে আবার দিতেই হবে মা। অভিমানে ভেঙে পড়লেন মাহামায়া ? কিন্তু কার বিয়ে দেবে বাবা? ছেলে যে আমার এরই মধ্যে পর হ'য়ে গেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে রােজ সেখানে যাওয়া-আসা করছে। কথাটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না বনমালী।-না, না, আপনি ভুল শুনেছেন মা। বিজয় আমাদের বনমালীর কথা শেষ হবার আগেই বিজয়ের তাক শােনা যায় । মা! মহামায়া বনমালীকে বলেন, ওই আসছে। ওকেই জিজ্ঞাসা কর। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বিজয় বলে, কী জিজ্ঞাসা করবে, মা? খুব ক্ষিদে পেয়েছে, আগে কিছু ক্ষেতে দাও দেখি। মহামায়া খোঁচা দিয়ে বলেন, যেখান থেকে এলে, সেখানে বুঝি খেতেও দেয় না ? বিজয় হঠাৎ হকচকিয়ে যায়। বুঝতে পারলাম না কী বলছ। মহামায়া বলেন, বুঝতে তত পারবিনে বিজয়। মা কি আর তাের সে মা আছে ? মায়ের কথাগুলাে যেন কেমন বাকা বাকা মনে হয় বিজয়ের। অনুযােগের কারণ কী ভেবে না পেয়ে সে বলে, ওকি কথা বলছ মা? মহামায়া গম্ভীর হয়ে বলেন, ঠিক কথাই বলছি বাবা। মা-যে তাের এত করে বললে রায়েদের দোর মাড়াস নি, ওদিক দিয়ে যাসনি, কিছুদিন চুপ করে থাক, দেখি কেমন করে মেয়ে না পাঠায়, তা কি মা’র কথা তুই শুনলি ?
বিজয় কী বলবে? অশ্বিনীর অপমান তখনাে সে মন থেকে মুছে ফেলতে পারে নি। তার মনে হয় সমস্ত ব্যাপারটা মা-র কাছে খুলে বলাই উচিত। একটু থেমে সে বলে, আচ্ছা মা, শােন তাহলে বলি- বিজয়ের কোন কৈফিয়ৎ শুনবার আর উৎসাহ ছিল না মহামায়ার । তিনি বাধা দিয়ে বললেন, থাক আর বলতে হবে না বাবা, সব শুনেছি। বােজই তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে সেখানে যাও, আজও তুমি সেইখান থেকেই আসছে। অন্যায় কিছু করনি, তবু মা হয়ে আমি কেন যে বাদ সাধছি তা যদি তুমি বুঝতে বিজয়, তাহ'লে কখনাে এ-কাজ করতে না। বলতে বলতে মহামায়ার দু’চোখ জলে ভ'রে এলাে। বিজয় এতক্ষণ মাথা হেঁট করে মায়ের তিরস্কার শুনছিল। মুখ তুলে সে বললে, মা তুমি আমার কথা শুনবে? বিজয়ের , ওপর অভিমানে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন মহামায়া। বিজয়ের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন তিনি। না না, তােমার কোন কথা আমি শুনবো না। বিজয়কে আর কিছু বলবার অবসর না দিয়েই তাড়াতাড়ি তিনি চলে গেলেন সেখান থেকে। একে শ্বশুরের অপমান তার ওপর মায়ের গঞ্জনা-ঘৃণায়-লজ্জায় ধিকার লাগলাে বিজয়ের মনে। মনে মনে সে সঙ্কল্প করলাে মায়ের কথা না শুনে যে পাপ সে করেছে যেমন করেই হােক তার প্রায়শ্চিত্ত সে করবেই। সেদিনকার রাত্রিটা নানারকম দুর্ভাবনায় কাটলাে বিজয়ের। ওদিকে বিমলাও কী-যেন একটা দুঃস্বপ্ন দেখলে শেষরাত্রিতে । ঘুম ভেঙে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাে সে। বিছানায় বসেই ডাক দিল : কমল! কমল । কমলও তখন সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। দিদির ডাক শুনে সে এসে জিজ্ঞেস করলাে, আমাকে ডাকছাে ? 1 ৮৪ বিমলা বললে, হ্যা। লক্ষ্মী ভাইটি আমার, চট করে একবার যাও তত তােমার জামাইবাবুর কাছে। সাতসকালে জামাইবাবুর জন্যে দিদির এতখানি আদিখ্যেতা ভালাে লাগে না কমলের। গররাজীর ভাব দেখিয়ে সে বলে এক্ষুনি যেতে হবে ? মামি এখনও চা খাইনি যে । বিমল তার পিঠে হাত বুলিয়ে আদর দেখায় : যাও লক্ষ্মীটি, এসে খাবে। আমি একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখলাম—তােমার জামাইবাবু আমার সঙ্গে খুব খানিকটা ঝগড়া করে চলে গেল, বললে—আর আমি তােমার মুখ দেখবে না। এটা কিছু নতুন খবর নয় কমলের কাছে। সে জানে জামাইবাবু, রােজই দিদির সঙ্গে ঝগড়া করে চলে যায় আবার রােজই ফিরে আসে। এরকম সখের ঝগড়ার ভেতরে মাথা ঘামাবার কিছু’দেখতে পাচ্ছিল না কমল। তবু দিদির ক্রমাগত, তাগিদে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে ছুটতে হােল বিজয়দের বাড়ীর দিকে। বিজয়দের বাড়ীতে ততক্ষণে খোজাখুজি পড়ে গেছে বিজয়ের জন্যে। চায়ের পেয়েলা হাতে করে বিজয়ের ঘরে গিয়ে মহামায়া দেখেন, বিজয় নেই। শশাবার ঘরে নেই, বসার ঘরে নেই, এত সকালে উঠে কোথায় যে সে গেল ভেবে পান না মহামায়া। নায়েব-মশাইকে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, নায়েব মশাই! নীচের ঘরে বিজয় রয়েছে ? নীচের থেকে বনমালী সাড়া দিল, না মা, বিজয় তাে এখানে নেই। এদিক সেদিক তন্ন তন্ন করে দেখতে লাগলেন মহামায়া। টেবিলের ওপর চায়ের পেয়ালাটা রাখতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখে পড়লাে একটুকরাে কাগজ। চিঠি লিখে রেখে গেছে বিজয়- মা, আমি এ গ্রাম ছেড়ে কিছুদিনের জন্যে চলে যাচ্ছি। কিছু মনে কোরাে না। ০ ৮ আঘাতের পর আঘাত পেয়েছেন মহামায়া । তবু বিজয়ের মুখ চেয়ে সবি তিনি সহ্য করে এসেছেন এতকাল। শেষ পর্যন্ত সেই বিজয়-ই যে এমন করে তাকে ছেড়ে চলে যাবে এ তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। সংসারের অশান্তিতে যদিই বা দু-একটা শক্ত কথা তিনি বলে থাকেন। তাই বলে ছেলে হয়ে মা-কে এতবড়ো শাস্তি দেওয়া কি উচিত হােল বিজয়ের? এতদিনের স্নেহ-মমতার বাঁধন একমুহূর্তে ছিড়ে গেল দেখে সারা মন তার অব্যক্ত ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো। আমাকে ছেড়ে তুইও শেষে চলে গেলি বিজয়। বাঁধভাঙা চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেল তার দৃষ্টিপথ । নিতান্ত নিরুপায় হয়েই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হােল বিজয়কে ! তার পক্ষে শ্বশুরের খামখেয়াল বরদাস্ত করা যেমন অসম্ভব ছিল, মায়ের হুকুম মেনে চলাও তার চেয়ে কম অসাধ্য ছিল না। গ্রামে থাকতে নিজের স্ত্রী বিমলার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ না করে থাকবার চেষ্টা বার বার সে করেছে, কিন্তু থাকতে পারে নি। পারে নি এইজন্যে যে বিমলার ওপর রাগ করবার কোন কারণ সে দেখতে পায় নি কখনো। দুই জমিদার- বংশের মজ্জায়-মজ্জায় পুরুষানুক্রমিক বিবাদ-বিসম্বাদের তুষানল জ্বলছে, আর তা'রি মাঝখানে মিলনের সেতু বাঁধতে এসে আহুতি হয়ে জ্বলে মরবে বিমলা, এতবড়াে বিজয়ের অবিচার বিজয়ের বিপ্লবী মন স্বীকার করতে পারছিল না কিছুতেই। গ্রামে থাকলে পাছে মায়ের বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হয় শেষ পর্যন্ত, তাই বিমলার ওপর তার দুর্বলতাটাকে এড়াবার জন্যে সে এলাে কলকাতায় । কলকাতায় এসে কোন জানাশােনা লােকের বাড়ীতে উঠল না বিজয়। রাস্তার দু’দিকের সাইনবােড় দেখতে দেখতে সে ফুটপাত দিয়ে চললাে যদি কাছাকাছি একটা হােটেল বা মেস-টেস্ কিছু পাওয়া যায়। হঠাৎ
তার নজরে পড়লাে রাস্তার ও ফুটপাতে একই দরজার ওপর পাশাপাশি
দুটো সাইনবােড়?
সুলভ বােডিং
খাইবার ও থাকিবার
COMMERCIAL
* COLLEGE
Short hand-Typewriting
বন্দোবস্ত আছে।
গাড়ী-ঘােড়া বাঁচিয়ে রাস্তা পার হয়ে বিছানা সুটকেশ হাতে বিজয়
ভেতরে ঢুকে পড়লাে সেই দরজা দিয়ে।
ভেতরে ঢুকে দেখে দূরে একজন লােক টাইপ করছে আর বিড়ি
টানছে। তার পরণে ছেড়া পাতলুন, গায়ে হাফসার্ট, কালে পােড়া সিগ্রেট।
দোরের কাছে হাতের সুটকেশটা ও বালিশ-বিছানা নামিয়ে রেখে
বিজয় তার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাে, এখানে খাবর থাকবার
জায়গাটা কোথায় বলতে পারেন ?
লােকটী সেকথা কানেই নিল না। নিজের মনে সে টাইপ করছে তো
করছেই। হঠাৎ মুখের বিড়িটা নিবে যেতে তার নজর পড়লাে বিজয়ের
দিকে। বিজয় আবার বললে, আপনি কি সুলভ বাের্ডিং-এর মালিক?
বিজয়ের কথার কোন জবাব না দিয়ে ভদ্রলােক ডাকাডাকি শুরু
করলাে : শতদল! শতদল !
ঘরের পেছনদিকে একটা পর্দা টাঙানাে ছিল। সেই পর্দা সরিয়ে
হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলাে একটা মেয়ে। আটপৌড়ে শাড়ী-পরা
গেরস্তঘরের মতাে শ্রী তার। বয়েস হ'লেও মাথায় এখনাে সিদূর পড়ে
নি। টাইপ-বাবুর কাছে এগিয়ে এসে বেশ একটু চেঁচিয়ে সে বললে,
আমাকে ডাকছাে কাকাবাবু ?
কাকাবাবুটি হাত ইসারা করে বললে লিখে নে।
৮৭
বলেই সে বিড়ি ধরাতে ধরাতে আবার আগের মতন টাইপে মন দিল। সামনের টেবিলের ওপর থেকে মােটা একটা বাঁধানাে খাতা দুহাতে করে বয়ে নিয়ে শতদল বিজয়কে ডেকে আনলাে ঘরের এককোণে। খাতাখুলে কলম হাতে করে সে জিজ্ঞেস করলাে, নাম?—দাড়িয়ে রইলেন কেন? বসুন। বিজয় দাড়িয়ে দাড়িয়ে জবাব দিলে, তা হােক, আপনি লিখুন। বিজয় চৌধুরী। নাম লেখা শেষ করে শত দল জিজ্ঞেস করলো, ঠিকানা ? ঠিকানা বলতে একটু ইতস্ততঃ করছিল বিজয়। সে হাঁ করবার আগেই তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শতদল বলল, নতুন এসেছেন বুঝতে পেরেছি। দেশের ঠিকানা বলুন। বিজয় বললে, পুরন্দরপুর। বর্ধমান জেলা। ঠিকানাটা.টুকে নিয়ে শতদল হাত নেড়ে বললে, ছ'মাস, তিনমাস আর মান্থলি—তিনরকমের আছে। কোনটা আপনার পছন্দ? বিজয় দেখলাে ছ’মাস বা তিনমাস বড্ড দেরী হয়ে যায়। একটু ভেবে সে বললে, না আমি মাসে মাসেই দেবাে। খাতায় ‘মান্থলি’ লিখে শতদল আবার প্রশ্ন করলাে, শর্টহাণ্ড-টাইপরাই- টিং কই, না শুধু শটহাণ্ড? বিজয়ের ধরণা ছিল এতক্ষণ হােটলের বােডার হিসাবেই নাম লেখাচ্ছে সে। হঠাৎ শতদলের মুখে শটহাণ্ড-টাইপরাইটিং-এর নাম শুনে সে যেন আকাশ থেকে পড়লাে একেবারে।-মানে? আপনি কি ভাবলেন আমি শর্ট-টাইপরাইটিং শিখতে এসেছি ? ছছাটমেয়ের মতাে খুব জোরে ঘাড় নেড়ে শতদল বললে, হ্যা, এখানে তাে তাই-ই শেখানাে হয়। ঐ তত আমার কাকা-প্রিনসিপাল্। হকচকিয়ে যায় বিজয়। আতা আন্তা করে সে বলে, তাহলে ঐ যে বাইরে সাইন বােড়, দেখে এলাম, সুলভ বােডি, সেটা কোথায় ? ৮ এতক্ষণে শতদল বুঝলে বিজয় পথ ভুল করেছে। সুলভবােডিং-এর খোঁজে সে কমার্শিয়াল কলেজের ঘরে ঢুকে পড়েছে। শতদল হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দিল, ঐ যে ঐদিকে সুলভ বাের্ডিং ও পাইস হােটেল। বিজয় খুশী হয়ে সেদিকে তাকাতেই মুখভার হয়ে গেল শতদলের। কলমের ডগাটা দাতে চেপে সে বললে, কিন্তু কলেজের পাকা খাতায় আপনার নামটা লিখে ফেলুম, কাকা তাে ব’কবে। তারপর একটু ভেবে নিয়ে খুব উৎসাহ দেখিয়ে শতদল বললে, তা শিখুনই না শর্টহ্যাণ্ড-টাইপরাইটিং—চাকরির ভারী সুবিধে হবে। অচেনা মেয়েটির এই প্রগতা বড় মজার লাগছিল বিজয়ের কাছে। সে একটু বিস্মিতভাবে বললে, শর্টহাণ্ড! উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাে শতদল : হ্যা, ভাববার কিছু নেই। বেশী টাকা থাকে, টাইপরাইটিং লিখে দিই। পাকাখাতায় নামটা লিখে ফেললুম, কাকা এখুনি জমার টাকাটা চেয়ে বসবে, না দিতে পারলেই ব’কবে। একটা জিনিষ ভারী আশ্চৰ্য্য লাগে বিজয়ের! এদিকে বিজয়ের সঙ্গে শতদলের এত কথাবার্তা হচ্ছে, শতদলের কাকার কিন্তু সেদিকে ইস নেই। নিজের মনে সে খালি টাইপ করেই চলেছে। বিজয় শতদলকে। জিজ্ঞেস করলাে, আচ্ছা, আপনি এত জোরে জোরে কথা বলছেন, উনি শুনতে পাচ্ছেন না। খিলখিলিয়ে হেসে নীচুগলায় শতদল বললে, না। শতদল বললে, না। কালা-কানে কম শােনে। এমন কাকার এমন হাসিখুসী ভাইঝিটীকে দেখে কেমন যেন মনে ধরে যায় বিজয়ের। সে জিজ্ঞেস করে শতদলকে, কত টাকা জমা দিতে হবে আমাকে? বিজয় টাকা জমা দিতে রাজী হয়েছে দেখে শতদল যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়। সে বলে, মাত্র দশটাকা।—লিখে নিই?
পকেট থেকে দশটাকার একখানা নােট বের করে দিয়ে বিজুয় ব’ললে লিখুন। লিখতে লিখতে বিজয়ের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে শতদল বললে, বাঁচালেন আমাকে। খুব বেঁচে গেছি। তারপর সেই 'মােটাখাতা আর দশটাকার নােটখানি হাতে করে সে তার কাকার কাছে চললাে। বিজয় তাকে ডেকে বললে, কিন্তু আমার থাকবার-খাবার ব্যবস্থাটা ? –ঠিক আছে সেসব। পেছন ফিরে ইসারা করে জানিয়ে দিল শতদল। কাকার সামনে মােটা খাতাটা খুলে ধরে শতদল বললে, এই নাও টাকা। সই করে দাও, নইলে ব’লবে টাকা পাইনি। ভুলে যাবে। কাকা কি শুনলাে, কী বুঝলাে সে-ই জানে। লাফিয়ে উঠলাে সে। ভুল ? ভুল হবে আমার ? জীবনে কোনদিন কোন ভুল হয়েছে আমার যে তুই বলছিস আজ আমার ভুল হবে ! কই একটা ভুল বের কর দেখি, গুণে গুণে সাত হাত নাকখৎ দেবাে। আঙুল দিয়ে কাকা তার টাইপকরা কাগজটা দেখাতে লাগলাে সগর্বে। বিজয় চেয়ে দেখলাে তা’তে অসংখ্য বানান ভুল আর অজস্র কাটাকুটি ! শতদল তবু কাকার মেজাজ ফুণ্ডা করবার জন্যে বললে, না, তােমার টাইপের ভুল বলি নি। এইখানে একটা সই করে দাও। কলমটা এগিয়ে দিতে কাকা বুঝলাে যে সই করতে হবে। শতদল যে তার টাইপের ভুল ধরেনি তাই বুঝে নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে সে সই করে দিল খাতায়। কাকার কানের কাছে মুখ নিয়ে শতদল বললে, এইখানে থাকবাে বলছেন। থাকবার কথা শুনেই আবার খ্যাক খ্যাক করে উঠলাে কাকা । থাকবে অনি বললেই হােলল! ব’লে দে, জায়গা নেই। শতদল কী বলতে হবে না হবে তা আগেই গুছিয়ে নিয়েছিল মনে . মনে। সে তাড়াতাড়ি মনে করিয়ে দিল কাকাকে : কেন, ঐ দু'নম্বর ঘরটা... কাকা মাথা নেড়ে বললে, না-না, ওখানে আমি কেলাস্ করবাে। তারপর বিজয়কে ডেকে সে বললে, বলি ওহে ছােকরা, শশানো! এখানে থাকতে চাইছাে কেন ? বিজয় বললে, আর কোথাও থাকবার জায়গা নেই বলে। বিজয়ের গলার আওয়াজ কানে ঢুকলাে না কাকার। শতদলের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো, কী বলছে ? গলাটা আরাে এক পৰ্দা চড়িয়ে দিয়ে শতদল বললে, আর কোথাও পাকবার জায়গা নেই। গুরুগম্ভীর মুরুব্বিয়ানার ঢঙে কাকা বললে, তােমার মতাে 'ইয়াংম্যাকে আমি রাখবাে কেন হে ? আমার এই এত বড়ো ভাইঝি রয়েছে বাড়ীতে। নিজের কথা ওঠায় লজ্জা পেয়ে যায় শতদল। কাকাকে ধমক দিয়ে বলে, কাকাবাবু! কী যা-তা কথা বলছে। চুপ করাে। কথা কইতে জানাে না, কেন মিছেমিছি চেঁচাচ্ছ? তুমি যা করছাে তাই করে। ধমক খেয়ে চুপ হয়ে যায় শতদলের কাকা। কাকার দিকে পেছন করে বিজয়কে শতদল পরামর্শ দেয়, আপনি আপনার টাকা দশটা ফেরত চান না! বলুন, আপনারা ঝগড়া-মারামারি করুন, আমি চলুম। বিজয় বললে, সেই ভালাে। কতটা জোরে চেঁচিয়ে বললে শতদলের কাকা কথা বুঝতে পারে তার একটা আন্দাজ এতক্ষণে বিজয় করে ফেলেছিল। ঠিক তেমনি জোরে সে বললে, দেখুন, আমার থাকাই যখন এখানে হােল না-দিন আমার টাকা দশটা ফিরিয়ে দিন—আমি অন্য কোথাও চেষ্টা দেখি। কাকা মহামস্কিলে পড়ে যায়। বিজয়ের দিকে ফ্যা ফ্যা করে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করে দশটাকা advance দিয়েছ ? আমি রেখেছি? ০১ বিজয় বলে, হ্যা ওই পকেটে রেখেছেন, দেখুন হাত দিয়ে। কাকা পকেট হাতড়াতে সুরু করে। একটা চালেই কাকা জব্দ হ'য়েছে দেখে শতদলের মুখে আর হাসি ধরে না। কাকা জিজ্ঞেস করে, হু, খাতায় লেখা হয়ে গেছে ? হাসি চেপে শতদল বলে, হ্যা-হ্যা, তােমার সই পৰ্যন্ত হয়ে গেছে। কাকা তখন কী আর করে ? নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে বলতে হােল, টাকা তাে তাহলে আর ফেরত দেওয়া চলে না। যা দি’গে দু’নম্বর ঘরটা খুলে। শতদল পা বাড়িয়েই ছিল। কাকার মুখ থেকে কথাটী খ’সতেই সে মুচকি হেসে বিজয়কে ডাকলাে-আসুন আমার সঙ্গে। ‘আসছি’-ব’লে সুটকেশ বিছানা হাতে নিয়ে বিজয়ও তার পিছু পিছু সিড়ি দিয়ে দোতলায় চললাে। নীচে থেকে কাকা চেঁচিয়ে বলতে লাগলাে, সিটরেন্ট, সমেত চল্লিশ ' টাকা লাগবে, ভালাে করে বুঝিয়ে বলিস। ওপরে উঠতে উঠতে শতদল বললে, আচ্ছা, আচ্ছা আমি জানি। তুমি থামাে। দুম দুম করে শতদল আর বিজয় দোতলায় উঠে যায়। সব বিষয়ে ভাইঝির এই কর্তৃত্ব যেন বাড়াবাড়ি বলে মনে হয় কাকার। সমস্ত দেখে শুনে মেজাজটা তার বিগড়ে যায়। আপন মনেই সে গজ গজ করতে থাকে, কোলে পিঠে করে মানুষ করলুম—সেই মেয়ে আমাকে ধমকায় ! বলে কিনা, যা করছাে তাই করাে! বলতে বলতে গায়ের জোরে টাইপ করতে লেগে যায় সে- সি, টি, এস- মাথা গরমের ফলে ভুল হয়ে যায় টাইপে। হঠাৎ খেয়াল হ'তেই চীৎকার করে ওঠে। এ-হে-হে-হে, ভুল হয়ে গেল। ১২ আঙুলের ডগায় থুতু নিয়ে প্রথমে মুছতে সুরু করে ভুলের জায়গাটা। তারপর তাতেও মুছলাে না দেখে প্রাণপণে রবার ঘষতে লাগলাে সেখানে। দেখতে দেখতে ফুটো হয়ে গেল কাগজটা।‘ধ্যেৎ তেরি' তাের কাগজের নিকুচি করেছে বলে তখন টাইপরাইটার থেকে কাগজটা টেনে খুলে দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল সে। তারপর মাথা ঠাণ্ডা করবার জন্যে সে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসলাে তার চেয়ারের ওপর। দোতলার একটা ঘরে এসে বিজয় দেখলো কে একজন মশারির ভেতর শুয়ে শুয়ে খালি হাতে ব্যায়াম করছে। বিজয় আর শতদলকে ঘরে ঢুকতে দেখে কোন কথাবার্তা না বলে মশারির ভেতরে থেকেই সে খালি গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে লাগলাে। শতদল হেসে বললে, থাক্ আর গোঁ-গোঁ করতে হবে না। ও-ঘরের চাবিটা নিয়ে গেলাম। বিছানার তলা থেকে চাবি বের করে নিয়ে শতদল চলে গেল বাইরে। বিজয় দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখতে লাগলাে ঘরের চারিদিকে নানা ধরণের আজব আজব হিতােপদেশ লেখা। দেওয়ালের মাঝখানে একখানা প্রকাণ্ড সাইজের মহাবীর হনুমানের ছবি। তার আশে পাশে ছােটবড়া অনেকগুলাে হাতে-লেখা কাগজ লটকানাে। কোনটায় লেখা: ‘ব্যায়াম করিবার সময়ে কথা কহিবে না। ব্যায়ামের পর তিনটি নিমপাতা চিবাইয়া জল খাইবে। আবার কোনটায় লেখা : ‘বিবাহ করিবে না। নারী- জাতিকে মা কিম্বা ভগিনী সম্বোধন করিবে।—ইত্যাদি, ইত্যাদি। সামনের দু’নম্বর ঘরের তালা খুলে শতদল ডাকলাে, কই আসুন । হাসতে হাসতে ও-ঘর থেকে বেরিয়ে এলাে বিজয়। বললে, দেওয়ালে লেখাগুলাে পড়ছিলুম। শতদল বললে, ও-ঘরে আর-একজন আছেন, বেরিয়ে গেছেন বাে হয়। এক্ষুণি আসবেন।—এই আপনার ঘর। আসুন !
তারা দুজনে ঘরের ভেতর ঢােকে। বিজয় দেখে একজনের থাকা
পক্ষে ঘরটা খুবই খােলামেলা। হাতের সুটকেশ-বিছানা নামিয়ে রেখে
সে বলে, বাঃ, বেশ ঘর। কিন্তু ওঘরে ব’লছেন দুজন, আর এইঘরে
এলাম আমি। এতে আপনাদের লাভ হয় ?
শতদল হেসে বলে, লাভের কারবার আমরা করি না। আর তাছাড়া
আমার কাকাবাবুও পছন্দ করেন না।
-কী পছন্দ করেন না? জিজ্ঞেস করে বিজয়।
হঠাৎ এরকম সােজাসুজি প্রশ্নে একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায় শতদল।
তবু সে সামলে নিয়ে বলে, এই এখানে লােকজন রাখতে চান না। শুনলেন
তাে সব।
যে-কথাটা এড়িয়ে যেতে চায় শতদল, সেই কথাটাই টেনে বের করবার
জন্যে বিজয় বলে, হঁ্যা, সেতো আপনার ভয়ে।
শতদল হালকাভাবে হাতদুটো ছড়িয়ে দিয়ে বলে, আমি কিন্তু ভয়-ডর
করি না কাউকে। মেয়ে হয়ে জন্মেছি, আমার বাবা প্রায়ই বলতেন
আমি মরে গেলে তােকে যেন কারও মুখ চেয়ে বসে থাকতে না হয়।
সামান্য একটু লেখাপড়া শিখেছি, নার্সিং পাশ করেছি-
-নাসিং পাশ করেছেন! গায়ের কোটটা খুলতে খুলতে বিজয়
চমকে তাকায় শতদলের দিকে।
নখ খুটতে খুটতে শতদল বলে, হ্যা, মিডওয়াইফারি পড়বার ইচ্ছে
ছিল কিন্তু তার আগেই আমার বাবা-
মারা গেলেন ? জিজ্ঞেস করে বিজয়।
শতদল ঘাড় নেড়ে বলে,-হ্যা।
শতদলের কথা বলার ভঙ্গী, তার টানা টানা চোখের সলাজ চাউনী
ভারী মিষ্টি লাগে বিজয়ের। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ শতদলের মুখের দিকে
তাকিয়ে থেকে সে বলে, আপনি বেশ মেয়ে—চমৎকার ?
৪
সপ্রতিভ-ভাবে হাত নেড়ে শতদল বারণ করে, বাস বাস ওই পর্যন্ত, অর না। আমি পালাই। যাবার মুখে দরজার কাছে দাড়িয়ে দরকারী কথাগুলাে সে জানিয়ে যায় বিজয়কে। বলে, চাকর পাঠিয়ে দিচ্ছি, যা যা দরকার আনিয়ে নিন । চান করতে হলে নীচে যেতে হবে। খাবার—বলেন তাে এখানেও পাঠিয়ে দিতে পারি, নয়তাে নীচে গিয়েও খেয়ে আসতে পারেন। বিজয়ের দিকে চেয়ে আর একবার অকারণে হেসে ওঠে সে খিলখিল করে। তারপর দুদ্দাড় করে সিড়ি দিয়ে নেমে যায় একতলায়। সিড়ির মুখেই শতদলকে থমকে দাঁড়াতে হয় হঠাৎ। বংশধরবাবু ওপরে আসছে। প্রকাণ্ড একটা কালাে কম্বলের অলেষ্টার গায়ে মাথায় মঙ্কিক্যাপ, গালে আর গলায় কস্ফাটার জড়ানাে। ভয়ে আর ভাবনায় : সবসময়েই যেন জুজুবুড়ী হয়ে আছে সে। হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে ভাঙা কঁসির মত গলায় সে শতদলকে জিজ্ঞেস করলাে, এই ঘরে লােক এলাে ? শতদল বললে, হ্যা। বংশধর অনুযােগ জানালাে, এই ঘর আমি চেয়েছিলুম, দাও নি । -কাকাবাবু তখন ক্লাস করতে চেয়েছিলেন যে! কোনমতে বংশধরের পাশ কাটিয়ে নেমে যেতে পারলে বাঁচে শতদল। পা বাড়িয়ে বলে সে- আমার কাজ আছে। আমি যাই। শতদলের পথ জুড়ে দাড়ায় বংশধর : দ্যাখাে, সকাল থেকে কপালের এই জায়গাটা একটু টিপ টিপ করছে, ভাত খাব? শতদল বলে, তা আমি কেমন করে বলবাে ? আমি তো ডাক্তার নই।—হ্যা, ঠিক বলেছ। বংশধর বলে। ডাক্তারখানা গিয়েছিলাম, ওষুধ দিলে, খুব দামী ওষুধ। খাব?
হাঁ করে বংশধর যেন শতদলকেই কামড়ে খেতে যায়! সিড়িয়া রেলিংয়ে একেবারে কোণঠাসা হয়ে দাড়াতে হয় শতদলকে। বিরক্ত হয়ে সে বলে, আচ্ছা বিপদ তত ! আপনার শরীর, আপনার অসুখ আর আমি বলে দেবে আপনি ওষুধ খাবেন কি না! শতদলের কথায় হঠাৎ যেন দুঃখ উথলে ওঠে বংশধরের। নিজের মনে সে আক্ষেপ করতে থাকে, যাক্, তােমার অদৃষ্ট! আমার মনের কথা কেউ বুঝলে না! বংশধর আর না দাড়িয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে যায়। সুযােগ বুঝে শতদলও তাড়াতাড়ি নেমে যায় নীচের তলায়। বিজয় এতক্ষণ তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত লােকটির হাব- ভাব লক্ষ্য করছিল। বংশধর বাবু ওপরে উঠে বিজয়ের আপাদমস্তক একবার চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাে, আপনি এলেন এই ঘরে ? বিজয় বসলে, আজ্ঞে হ্যা। হঠাৎ হাতের শিশিটা দেখিয়ে বংশীধর বিজয়কে জিজ্ঞেস করলাে, ওষুধ যে খাব, তা এই ওষুধের সঙ্গে যে বিষ মিশিয়ে দেয় নি তা আমি জানবাে কেমন ক'রে! বিজয় হেসে বললে, বিষ কেন মিশিয়ে দেবে?.৭ই দিতে পারে কখনও? বংশধর জোর দিয়ে বললে, পারে পারে, খুব পারে। আমার ভাইপােদুটিকে আপনি চেনেন না, তাই বলছেন। ঘরে চলুন, বলছি সব কথা। বিজয়ের ঘরে ঢুকে বংশধর ব’লতে সুরু করে, আমার ভাইপাে দুটো হয়তাে আমাকে দেখিয়ে ওষুধের দোকানে বলে দিয়ে গেছে, ওই লােকটা যদি কোনদিন ওষুধ নিতে আসে, দেবে বিষ মিশিয়ে। সেই ওষুধ খেয়ে আমি মরে যাব, বাস, আমার টাকাকড়ি বিষয়-সম্পত্তি সবই তারা পেয়ে যাবে।
-কেন, আপনার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ?—জিজ্ঞেস করলাে বিজয়।
হতাশ হয়ে বংশধর বললে, না, আপনার চেহারাটি ভাল, কিন্তু বুদ্ধি
ভারি মােটা; মাথায় কিছু নেই।
বিজয় হেসে বললে, কেন বলুন তাে?
হাতমুখ নেড়ে বংশধর বললে, আমার স্ত্রী নেই, ছেলেমেয়ে নেই,
কেউ কোথাও নেই। ছিল। একটি মেয়ে ছিল, সেও মরে গেল ।
বিজয় বললে, তাহলে তাে আইনতঃ ভাইপােরাই সম্পত্তি পাবে ?
মহা খাপ্পা হয়ে গেল বংশধর । পাবে? পাবে বললেই পাবে ?
আমি দেবাে না। কিছুতেই দেব না। কেন দেবাে।
তারপর নিজের অলেষ্টারের বােম খুলতে খুলতে সে বিজয়কে
বললে, আসুন, দেখবেন আসুন।
-কী দেখব? জিজ্ঞেস করলাে বিজয়।
বংশধর বললে, বাণ মেরেছে।
-বাণ মেরেছে! বিস্ময়ের আর শেষ থাকে না। বিজয়ের।
বংশধরও পরম উৎসাহে গায়ের জামা খুলে খুলে দেখায় : হ্যা, বাণ ।
মেরেছে এইখানে!এইখানে আর এই পেটে। শরীরটাকে একেবারে
জেরবার করে দিলে !
অবিশ্বাসের সুরে বিজয় বলে, বাণ মেরেছে কি মশাই ?
বিজয়ের প্রশ্ন শুনে গা জ্বলে যায় বংশধরের : জানেন না, বাণ মারা
কাকে বলে ?
বিজয় বলে, না।
বংশধর গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞেস করে, বাড়ী কোথায়? সহরে, না -
বিজয় বলে, পাড়াগাঁয়ে।
পাড়াগাঁয়ে বাড়ী, অথচ বাণ মারা কাকে বলে জানে না-এমন
লােককে কী বলে ধিক্কার দেবে ভেবে পায় না বংশধর। কম
করে বিজয়ের দিকে একবার তাকিয়ে সে নিজের
ঘরের
দিকে
পা বাড়ায়।
বিজয় তাকে চলে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করে, চললেন ?
যেতে যেতে একবার মুখ ফিরিয়ে বংশধর বলে, হুঁ, আপনার সঙ্গে
কথা বলা চলে না।
বংশধর ঘর থেকে বেরুতেই দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল বিজয়, এমন
সময় চাকর এলো চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। চা দেখে প্রথমেই হাত
বাড়ালাে বংশধর : দিদিমণি পাঠিয়ে দিলে বুঝি ?
বােব চাকর, কথা বলতে পারে না। হাত মুখের ভঙ্গী করে সে
বিজয়কে দেখিয়ে দিল। বংশধর বুঝলল বিজয়ের জন্যই চা এসেছে।
চায়ের কাপটা বিজয়ের হাতে এগিয়ে দিল সে : নিন, আপনার চা।
ভদ্রতা দেখিয়ে বিজয় বললে, আপনিই খান না।
চা খাবে কি ? সমস্ত কাণ্ডকারখানা দেখে বংশধরের মাথায় তখন
আগুন ছুটছে। ‘না’ বলে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সে চলে
গেল সেখান থেকে ।
নীচের ঘরে প্যান্টের দু’পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে লাংতে ল্যাংচাতে
পায়চারি করছিল শতদলের কাকা। বংশধর এলাে তারি’ কাছে নালিশ
জানাতে।
পটপটি বাবু! পটপটি বাবু ! ডাকতে ডাকতে সিড়ি দিয়ে নেমে
এলাে বংশধর।
কাকা ঘাড় ফিরিয়ে বংশধরের দিকে দেখে বললে, কী
বললে? পটুপটি ?
বংশধর বললে, হ্যা।
-আমার নাম পটপটি ? কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো কাকা।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল বংশধর। নিতান্ত ভালােমানুষের মত প্রশ্ন
করলাে, তবে কী ?
১৮
বুড়াে হতে চলেছে অথচ পটুপটি যে কারও নাম হতে পারে না এটুকু বুঝবার মতাে সাধারণ বুদ্ধিও বংশধরের নেই দেখে চ’টে যায় শতদলের কাকা। বুঝিয়ে বলে, টাইপ-মেশিনগুলো পট পট করে আওয়াজ করে—তাই পাড়ার ছেলেগুলাে ‘চটপটি’ ‘পটপটি’ বলে আমাকে রাগায়, তাই ব'লে তুমিও-মানে আপনিও বলবেন? ঘাট স্বীকার করতে হয় বংশধরকে ? বেশ তা বলবাে না।কিন্তু ওই যে ওপরের ঘর আমি চাইলাম, আমাকে তখন দিলেন না, আর এখন দেখছি খুলে দেওয়া হােলাে। কথাটা ঠিক শুনতে পেল না পটপটি। মাথা ঝাকুনী দিয়ে বললে, না না, ওপরের ঘরে খাবার পাঠাবার নিয়ম নেই। নীচে, এসে খেয়ে যেতে হবে। বলেই সে এগিয়ে চললাে নিজের মনে। বংশধর বুঝলাে কালা- মানুষের সঙ্গে কথা বলা কী ঝকমারি ! তবু ব্যাপারটার একটা বােঝাপড়া, হওয়া দরকার। তাই পটপটির পিছু নিল সে, বলি ও পটপটিবাবু, শুনুন-শুনুন ! পটুপটি আবাররে দাড়ালাে, কী ? বংশধর বললে, ঘর না-হয় থাকগে, কিন্তু চা? আজ যে চা পৰ্য্যস্ত গেল’ নীচে থেকে । -কী বললে? চা? কাণখাড়া করে জিজ্ঞেস করলো পটপটি। চা-এর কথাটা কানে ঢুকেছে দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাে বংশধর। আগ্রহের সঙ্গে আবার বললে, হঁ্যা, চা। কিন্তু ঐ চা পর্যন্তই! চা ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় নি পটুপটি। বংশধরের মুখ:চাখের ভাব লক্ষ্য করে সে যা বুঝলাে তাতে বেশ আত্ম- প্রসাদের সঙ্গেই সে বললে, ভালো তো হবেই। নগেন কেবিনের চা, ভালাে হবে না? আমার নাম করবেন, দুধচিনি একটু বেশি করে দেবে। ১১ দাত বের করে হাসতে হাসতে চলে গেল পটপটি। বংশধর দেখলাে এমন লােকের সঙ্গে কথা বলা নিতান্তই পণ্ডশ্রম। এককথা বললে সে আরেক কথার জবাব দেয়। নালিশটা-ই যার কাণে ঢােকেনা, তার কাছে সুবিচারের আশা করা দুরাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই আর পটপটির পিছু পিছু না ঘুরে হতাশ মনে ফিরে যাচ্ছিল বংশধর। সিড়ির দিকে পা বাড়াতেই শতদল তাকে পিছু ডাকলে, বংশধরবাবু। পিছন ফিরে শতদলকে দেখেই থমকে দাড়ালাে বংশধর। বংশধরের মুখচোখের বিরক্ত ভাবটা শতদলের নজর এড়ালাে না। আড়াল থেকে কাকার সঙ্গে বংশধরের কথাবার্তা সবই শতদল শুনেছিল। বংশধরের কাছে এগিয়ে এসে সে জিজ্ঞেস করলো, কী, সহ্য হচ্ছে না? মনের দুঃখে গাল ফুলিয়ে বংশধর বললে, না। আমি আর কাউকে কিছু বলব না। আমার অদৃষ্ট বড় মন্দ। শতদলও জানতে যে দুরদৃষ্ট না হলে অনর্থক বংশধরের মতাে সাধ ক'রে কেউ এত দুর্ভোগ ভুগতে পারে না। গরমের দিনে গরমজামা- কাপড়ে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে থাকলে সুস্থ মানুষের মাথা খারাপ হয়ে যায়। বংশধরের জামাকাপড়ের বােঝর দিকে আঙুল দেখিয়ে সে তাই বললে, তাতো বুঝতেই পারছি। অদৃষ্ট মন্দ না হলে এই গরমে কেউ এইসব পার কখনও ? জামাকাপড়ের কথায় বংশধরের দুঃখ আবার উথলে উঠলো : কেন যে পরেছি জিজ্ঞাসা করবার লােকটি পর্যন্ত নেই। রাত্তিরে জানলা খুলে ঘুমিয়েছিলাম, সকালে দেখি—ঠাণ্ডা লেগেছে। কথাটা বলেই বংশধর একবার শতদলের মুখের দিকে চাইলাে, যদি একটা সহানুভূতির কথা তার মুখ থেকে বেরােয়। কিন্তু শতদল কিছুই বলছে না দেখে হঠাৎ নিজের মনেই সে বলে উঠলাে, না, আমি আর এখানে থাকবে না, চলেই যাব।
-চলে যাবেন ? এমন অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাে শতদল, যে মনে হোল বংশধর চলে গেলে তার বিশ্বসংসার একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবে। বংশধুর কিন্তু ততক্ষণে চলে যাবার জন্যে ঘুরে দাড়িয়েছে। শতদলের কথার জবাব না দিয়েই কয়েক পা এগিয়ে গেল সে। হঠাং তার কী হােল, দু’হাতে পেট চেপে ধরে ‘উঃ বলে, চীৎকার করে সে বসে পড়লাে একেবারে। ‘কী হােল’ বলে শতদল তাড়াতাড়ি ছুটে গেল তার কাছে। কাৎরাতে কাৎরাতে কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে বংশধর বলে, মেরেছে। আবার বাণ মেরেছে। বাণ মেরেছে কিনা ভগবান জানেন, তবে বংশধরকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন ভেতরে ভেতরে একটা অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তার। কিছুতেই সে আর দাড়িয়ে থাকতে পারছিল না। কোনমতে টলতে টলতে সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলাে সে। বংশধরের জন্যে সমবেদনা হওয়া দূরের কথা, মিথ্যে আতঙ্কেই লােকটা, ছটফট করছে দেখে শতদল আর হাসি চেপে রাখতে পারলাে না। বংশধরের দিকে ছুয়ে চেয়ে নীচে দাড়িয়ে সে হাসতে লাগলো । হি হি করে। সিড়ির মাথায় পৌঁছে বংশধর দেখে তার রুমমেট কানু তড়বড়িয়ে কোথায় যেন চলেছে। বংশধরের সঙ্গে মুখােমুখি হতেই একগাল হেসে কানু জিজ্ঞেস করলাে, কোথায় গিয়েছিলেন ? একে পেটে বাণমারার যন্ত্রণা, তার ওপর কানুর দাত বেরকরা হাসি, দেখে শুনে গা জ্বলে যায় বংশধরের। মুখ গম্ভীর করে সে বললে, আপনি আর আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। কানুর তবু লজ্জা নেই। ন্যাকার মতাে সে জিজ্ঞেস করলো, কেন, এত রাগ কেন ? ১০১ রাগ যে কেন তা’ কার না জানার কথা নয়। কানু বলেছিল তার জানাশােনা একজন রােজা আছে, তুক তাক করে সে বংশধরকে বাণ- মারার হাত থেকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু তাকে নিয়ে আসার আ নাম নেই কানুর। ক্ষোভের সঙ্গে তাই বংশধর বললে আপনি যে রােজার কথা বলেছিলেন আলেন কই তাকে ? মাথা চুলকে কানু বললে, অনেক টাকা চায় যে ! টাকা খরচ করতে বংশধরের আপত্তি নেই। যন্ত্রণাটা দূর হলেই হােল। কানুকে সে কথা দিল, তা কাজটি যদি ক'রে দিতে পারে তে দেবাে টাকা। কানুও এই টাকার পাকাপাকি করার অপেক্ষাতেই ছিল। বংশধরকে ভরসা দিয়ে বললে, ব্যাস, এইবার একদিন ডেকে আনবে। টাকার কথা ঠিক হয়ে গেল, তবু যে কানু কেন একদিন-একদিন করছে—এখনও তাড়াতাড়ি দিনটা ঠিক করে ফেলছে না, তা বংশধর বুঝে উঠতে পারেনা। সে মুখ কাচুমাচু করে বললে, আবার একদিন কেন? তার আগে মরেই যদি গেলাম— কানু বাধা দিয়ে বললে, না না মরবেন কেন, মরবেন না। কঁদো কাদো হ'য়ে বংশধর বললে, ম’রতে শিঝার বাকি আছে? বাণ মেরে মেরে দিলে দেহটাকে জেরবার করে। বুকে তাল ঠুকে কানু বললে, মারুক না বাণ,কত মারবে! আমিও রােজা ডেকে আনছি। আমরা কামান দাগবাে। শতদল ওপরে আসছিল। কানুর আস্ফালন দেখে সে দাড়িয়ে গেল। শতদলকে দেখে কানুও তাড়াতাড়ি সামরিক কায়দায় অভিবাদন করলাে তাকে, এই যে ভগিনী, ‘জয় হিন্দ! ‘জয় হিন্দ’ বলে শতদলও প্রত্যভিবাদন জানালাে। তারপর হাসতে হাসতে সে জিজ্ঞেস করলাে, হঠাৎ এত কামান দাগছেন কেন ? ১০২ কানু বললে, বারে ! আমাদের বংশধরবাবুকে বাণ-মারবে, আর আমরা কামান দাগবাে না ? বংশধরের দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে নিয়ে শতদল কানুকে বললে, কিন্তু উনি তো আমাদের ওপর রাগ করে চলেই যাচ্ছেন এখান থেকে। শতদলের কথা শুনে কানু যেন আকাশ থেকে পড়লাে। সে বললে, সেকি বংশধরবাবু, যাবেন কোথায়? যেতে আপনাকে দেবে কে ? মুখ গােমরা করে বংশধর বললে, হ্যা, আমি চলেই যাব । বংশধরের অতিরিক্ত গাম্ভীর্য দেখে হেসে ফেললে শতদল। কানুকে ডেকে বললে, ঐ শুনুন ! কানু দেখলাে শতদল যখন বংশধরের, পেছনে লেগেছে তখন আর তার নিজের এখানে না থাকলেও চলে। কানুর বেরােতে দেরী হয়ে যাচ্ছিল, সে তাই হাসতে হাসতে চলে গেল তাড়াতাড়ি কানু চলে যেতে শতদলও পা বাড়ালো বিজয়ের ঘরের দিকে। বংশধরকে শুনিয়ে শুনিয়ে নিজের মনে সে বললে, আমি এখন বিজয়বাবুর কাছে যাচ্ছি। বিজয় বাবু! বিজয় বাবু! ব’লে সত্যি সত্যিই বিজয়ের ঘরে গিয়ে ঢুকলাে শতদল। বিজয়ের ওপর শতদলের এত টান, অথচ বংশধরাবুর সঙ্গে হাসিমুদে. এটুা কথা বলারও সময় হয় না তার—এতে কারই বা না রাগ হয় ? -না, আর এখানে থাকা চলে না। বলে নিজের মনে গজরাতে গজরাতে বংশধর গিয়ে নিজের ঘরে ঢােকে। এদিকে শতদল এসে ঢেকে বিজয়ের ঘরে। বিজয় তখন তার সুটকেশ থেকে জিনিষপত্র বের করছিল। মনে মনে একটা মতলব ভেঁজে শতদল তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, আপনার বিয়ে হয়েছে বিজয়বাবু ?
হঠাৎ এমন প্রশ্নে চমকে উঠলাে বিজয় : উ” ফিস্ ফিস্ কবে শতদল তাকে পরামর্শ দিল, বলুন-হয় নি। তারপর বেশ জোরে জোরেই আবার প্রশ্নটার পুনরাবৃত্তি করলে। বলছি, আপনার বিয়ে হয়েছে ? শতদলের শেখানাে জবাবই আউড়ে গেল বিজয়, না হয় নি। – বিয়ে করবেন তো ? হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলে দল। বিজয় বুঝলাে নিশ্চয়ই কাউকে রাগাবার জন্যে এইসব কথা শােনাচ্ছে শতদল। কী মজা হয় দেখবার জন্যে বিজয়ও শতদলের যড়যন্ত্রে যােগ দিল । গম্ভীরতার ভাণ করে বললে, তা মনের মতাে মেয়ে যদি পাই করতে পারি। শতদল বললে, মনের মত ?-তা ধরুন, আমার মত হলে চলবে ? এম অবাধে শতদলকে এসব কথা বলতে দেখে হেসে ফেললো বিজয়। পাশের ঘরে ততক্ষণে ওষুধের ক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আধেক-খােলা দরজার আড়ালে দাড়িয়ে বংশধর এতক্ষণ কান পেতে সমস্ত কথাবার্তা শুনছিল। কোথাকার কে এক ছােকরা, বাড়ীতে আসতে না আসতেই একদিনে শতদল তার সঙ্গে এমন প্রেমালাপ জমিয়ে তুলবে-এ, একেবারে অসহ্য লাগছিল তার কাছে। নিজের ওপর ঘেন্নায়-ধিকারে সে যে কী:ক’রবে ভেবে পাচ্ছিল না। রাগের মাথায় নিজের হাতের ওষুধের শিশিটাই সে আছাড় মেরে ভেঙে ফেললাে। সংসারে কোথায় কী ঘটছে তা নিয়ে মাথা ঘামা বার ফুরসুৎ নেই, পুটুপটিবাবুর। সারাদিন তার কমাশিয়াল কলেজ নিয়েই মেতে আছে সে। নীচের তলায় তার ক্লাস বসে। তার ধারণা তার মতন টাইপ, বিশারদ ভূভারতে আর নেই। ‘A’ থেকে ‘z' পর্যন্ত একসঙ্গে টাইপ করবার একটা নতুন ‘ফরমূলা’ সে আবিষ্কার করেছে। রােজই একই কথা সে প্রত্যেক ছাত্রকে টাইপ করতে বলে। সে বলে, প্রত্যহ একশো- আটবার করে তিনমাস ধরে এই ফরমূলা’টা প্র্যাকটিশ, করলে পঞ্চাশ ১০৪ টাকা মাইনের একটা চাকরী কেউ আর ঠেকাতে পারবে না। ফরমূলাটাও খুবই সােজা : A quick brown fox jumps right over a lay dog. ‘A’ থেকে ‘Z পর্যন্ত সব কটা অক্ষরই এতে সাজানাে আছে। ছাত্রেরা সবাই চাকরীর আশায় পাতার পর পাতা। এই ফরমূলা’ই টাইপ করে যায়। পটপটি দেখে, সব ছাত্রই তার ক্লাস করতে আসে, আসে না শুধু সেই নতুন ছাত্রটি। পটপটিবাবুর নামডাক শুনে দেশ থেকে সে কলকাতায় এসেছে, অথচ ক্লাসে যে কেন তার আসবার নাম নেই তা ভেবেই পায় না পটপটি। দু’চার দিন যাবার পরে সে শতদলকে ডেকে বললে, দ্যাখ, তাে শতদল, সেই নতুন ছেলেটি ক্লাসে আসে না কেন ? বিজয়ের কাছে যাবার জন্যে শতদনা তাে সবসময়ে পা বাড়িয়ে আছে। ‘দেখি’ বলে তাড়াতাড়ি সে বিজয়ের খোঁজ করতে চললো। ওপরে গিয়ে শতদল দেখে দরজা বন্ধ করে বংশধরের ঘরে তখন তুমুলকাণ্ড চলেছে। ধূপের ধোঁয়ায় সারাঘর অন্ধকার। ঘরের মাঝখানে বংশধরকে খালি গায়ে দাড় করানো হয়েছে। বংশধরের কোমরে মােটা একটা দড়ি বেঁধে সেই দড়ি ধরে বসে আছে কান্ত, আর এক জটা-ত্রিশূল- ধারী কিস্তৃত কিমাকার সন্ন্যাসী বংশধরের চারপাশে ঘুরে ঘুরে চিমটে জিয়ে তাণ্ডবনৃত্য লাগিয়ে দিয়েছে। যেমন তার নৃত্য, তেমনি তার -তন্ত্র ! কান টানা চীৎকার করে কী-যেন সব শ্লোক আওড়াচ্ছে সে । -চলি যা চলি যা একদম চলি যা। ভাগে পিরেত, ভাগে ভূত, আর ভাগে পিরেতের মা। বাণ মারে, বর্শা মারে আর মারে সরষে ফুল । আর আমি সে ভূতের পেটে মারলাম ত্রিশূল ॥ কার আজ্ঞা? বােম্ বােম্ ভােলানাথ, আর কাউর কামাখ্যা মা! চলি যা চলি যা একদম চলি যা••• একদম চলি যা।
খানিকক্ষণ জানলার ফাক দিয়ে এই সব ভুতুড়ে ক্রিয়াকাণ্ড দেখলাে
শতদল। এমন হট্টগােলের
ভেতরেও বিজয় যে পাশের ঘরে চুপচাপ
বসে আছে কেমন করে তা সে বুঝে উঠতে পারলাে না। বিজযুকী
করছে দেখবার জন্যে দরজা ঠেলে শতদল বিজয়ের ঘরে গিয়ে ঢুকলাে।
বিজয় কী-যেন লিখছিল ঘরে বসে। শতদল ঘরে ঢুকতেই চমকে
উঠলাে সেঃ কে ?—ও তুমি !
‘তুমি বলেই আবার তাড়াতাড়ি সে শুধরে নিল,—আপনি হঠাৎ?
শতদল বললে, “তুমিই বলুন না। আমি আপনার চেয়ে অনেক
ছােট। চলুন-কাকাবাবু ডাকছে। কলেজে ভর্তি হয়েছেন, ক্লাস
করবেন চলুন।
বিজয় হেসে বললে, আজ থাক্।
বিজয় একটু ঘুরে ব’সতেই শতদল দেখলাে বিজয়ের গলায় একগাছা
ফুলের মালা।.. সে জিজ্ঞেস করলাে, গলায় ফুলের মালা কেন?
বিজয়ের খেয়ালই ছিলনা তার গলায় ফুলের মালা রয়েছে। তাড়া-
তাড়ি মালাটা খুলতে খুলতে সে বললে, ওই যে ওই ঘরের কাবাবু পরিয়ে
দিয়ে গেলেন। খুলে রাখতে ভুলেই গেছি।
হঠাৎ কী দুষ্টুবুদ্ধি এলাে শতদলের মাথায় ! বিজয়কে সে বাধা দিয়ে
বললে, থাক্ থাক্, খুলবেন না, খুলবেন না।
-কেন? জিজ্ঞেস করলাে বিজয়।
শতদল বললে, আছে-কাজ আছে। ওঘরে কী হচ্ছে দেখলেন না?
বিজয় বললে, দেখলাম তােত সন্ন্যেসীর মতন কে একজন এলাে।
শতদল হেসে বললে, রােজ-রােজা। ভূত ছাড়ানাে হচ্ছে।
দেখুন, আপনার ঘাড়ে যদি ভূত-টুত চ’ড়ে থাকে তাে এই সময় ছাড়িয়ে
নিতে পারেন।
—ভূত কিন্তু মেয়েদের ঘাড়েই বেশি চাপে। বিজয়ও ঠাট্টা করতে
ছাড়ে না। শতদল জবাব দেয়, সে ভূতকে খ্যাংরা মেরে কেমন করে ছাড়াতে হয় সে-বিদ্যেও মেয়েদের জানা আছে।-এখন দয়া করে একবার উনি তাে দেখি ! -কোথাও যেতে হবে? জিজ্ঞেস করে বিজয়। -বেশি দূর নয়, এই বারান্দায়। হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় শতদল। কী-হয় দেখার জন্যে বিজয়ও শতদলের কথামতাে তার পিছু পিছু বারান্দার দিকে যায় । বংশধরের জানলার সামনে গিয়ে শতদল চুপি চুপি বিজয়কে বলে, দোহাই আপনার, দুটি পায়ে পড়ি বেশি চেঁচামেচি করবেন না। আপনি শুধু ওই বংশধরবাবুকে দেখিয়ে দেখিয়ে আপনার গলার মালাটি আমার গলায় পরিয়ে দিন। বিজয় বুঝলাে বংশধরকে ক্ষেপাবার জন্যে এ এক নতুন ফন্দী বের করেছে শতদল। হাসতে হাসতে সে বললে, ওকে, তােমরা পাগল না করে ছাড়বে না দেখছি। এই নাও। সরুল মনেই সে শতদলের গলায় মালা পরিয়ে দিল। বংশধরের জানলার কপাটটা ভালাে করে খুলে দিয়ে শতদল বললে, আস্তে আস্তে দেখিয়ে দেখিয়ে পরিয়ে দিন। বিজয় শতদলের গলায় মালা পরাচ্ছে দেখে বংশধরের তত চক্ষুস্থির। • নিরুপায় ভাবে সে কানুর শরণ নিল : কানুবাবু, ওই দেখুন। কানু ব্যাপারটা দেখতে পেয়েই ছুটে এলাে শতদলের কাছে। ভগিনী, ভগিনী! ওকি হােললা ? মালাবদল হয়ে গেল যে ! মালাটা খুলে ফেল । শতদল কিন্তু দু’হাত দিয়ে মালাটা চেপে ধরলাে বুকের ওপর। মাথা ঝাঁকুনী দিয়ে বললে, না খুলবাে না। পাছে কেউ মালাটা টেনে খুলে ফেলে সেই ভয়েই যেন সে একছুটে পালিয়ে গেল সবার সামনে থেকে। ১০৭ একতলায় নিজের ঘরের নিরালা কোণে এসে বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে দেখতে লাগলাে মালাটীকে। কখনাে তাকে বুকে চেপে, কখনাে গালে ছুইয়ে, কখনো বা তার গন্ধ শুকে সে যেন একটা অজানা আনছে রােমাঞ্চিত হয়ে উঠতে লাগলাে। নারীজীবনের সবচেয়ে মধুর স্বপ্ন বােধহয় এক গাছি ফুলের মালার ভেতরেই লুকোনাে থাকে। তাই বিজয়ের বুকের মাল। নিজের বুকে জড়িয়ে সারা হৃদয়ের তৃষ্ণা যেন জুড়িয়ে গেল শতদলের। বংশধরকে উপলক্ষ্য করে বিজয়ের যতখানি সান্নিধ্য সে পেয়েছে তারই তৃপ্তিতে গুনগুনিয়ে গান গেয়ে উঠলে! সে । শতদলের মনের খবর জানবার আগ্রহ বা অবসর বিজয়ের ছিল না। ছল-চাতুরী যে শুধু বংশধরকে জ্বালাতন করবার জন্যই নয়, হাসি-মাসার ভেতর দিয়ে আরেকটি মনেও যে রঙ, ধবাতে চায় শতদল, বিজয় তা জেনেও না জানার চেষ্টা করছিল । বিজয়ের স্ত্রী আছে, সে তাকে খুব ভালােও বাসে। কাজেই নতুন করে কারাে সঙ্গে প্রেমে পড়ার আর শখ ছিল না তার। সে শুধু অবাক হয়ে দেখছিল, কী বিচিত্র এই বাের্ডিং- বাড়ীটী। পটপটি, বংশধর, কানু সবাই যেন এক একটি চিড়িয়াখানার জীব। যেমন এখানকার মানুষগুলি, তেমনি উদ্ভত এখানকার ব্যবস্থা! নীচে একদিকে আছে টাইপরাইটিং কলেজ—আর একদিকে পাইস হােটেল। পাইস হােটেলটি তো লোকজনের আনাগােনা আর চাকরবাকরের . হাঁক ডাকে সব সমরে গুলজার হয়েই আছে। টেবিলের পাশে-পাশে বেঞ্চি পাতা, চাকরেরা সেখানে পরিবেশন করছে। ভাত-তরকারী যেমন যেমন দিচ্ছে, তেমন তেমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে তারা। কেউ বলছে, তিন নম্বর আলুভাজা চারপয়সা। কেউ বা হাঁকছে, সাত নম্বর মুড়িঘট—তিন আনা। দরজার কাছে একটা লােক টেবিল-চেয়ার পেতে পা পেন্সিল নিয়ে ১০৮ বসি আছে। দুটী কাণ তার সব সময়েই খাড়া হয়ে আছে, চাকরদের একটা কথাও যাতে না ফায় । শুনবামাত্র খাতার নম্বরে নম্বরে ভাত-ডালের হিসেব টুকে যাচ্ছে সে। যাদের খাওয়া শেষ হচ্ছে হিসেব মতন তাদের কাছ থেকে সে দাম আদায় করছে। কিন্তু একা লােক, কত আর চারিদিকে নজর রাখবে সে। শত চেষ্টা করেও এক কানুর সঙ্গেই সে পেরে ওঠে না। ফাকি দিয়ে খেয়ে যাবার নিত্য নতুন ফন্দী : বের করে কানু। রােজ যেমন খায় সেদিনও এক কোণে ঘাপটি মেরে বসে খেয়ে যাচ্ছিল কানু। চাকরদের পাচমিশেলী চীৎকারও চলছিল সমানে ? ন’ নম্বর ডাল তিন পয়সা- দু'দফা, একুশ নম্বর দই চাইছে, সতের নম্বর চিংড়িমাছ-সাত পয়সা। ক্যাশিয়ার-বাবু হিসেবটা তাে লিখছেই, ওদিকে নামতা পড়ার মত করে হিসেব পড়ে পড়ে লােকের কাছ থেকে দাম জমা নিচ্ছে, মাঝে মাঝে আবার চাকরদের ওপর এটা-সেটা হুকুম চালাচ্ছে। একসঙ্গে চার-পাঁচজন এলাে তার কাছে পয়সা দিতে। তেইশ নম্বরে যে খেয়েছে সে তাকে এক টাকার একটা নােট দিল। গুণে গুণে তাকে পয়সা ফেরত দিল ক্যাশিয়ার : তেইশ নম্বর, আপনার সাত আনা হয়েছে, ফেরত, ন’ আনা ! । ধরুন। তারপর একে একে পাঁচ নম্বরের বারাে আনা, সাত নম্বরের সাড়ে সাত আনা জমা নিতেই কানু এসে মুখ মুছতে মুছতে দাড়ালাে। বললে : উনিশ নম্বরটা দ্যাখাে। ক্যাশিয়ার খাতা দেখে বললে, উনিশ নম্বর তিন আনা। মুখ তুলে কানুকে দেখে সে জিজ্ঞেস করলাে, এত কম খেলেন কেন? তাড়াতাড়ি তিন আনা পয়সা বের করে দিয়ে কানু বললে, যে ঝাল ঠুকছে, বেশি খাবার জো কি ? ১০১ দামটা দিয়েই কানু স’রে পড়তে চেষ্টা করে। ক্যাশিয়ার তাকে পিছু ডেকে তাগাদা দেয়, কানু বাবু, আপনার পেছলি বাকি চারটাকা দু’ আনা, অনেক দিন হয়ে গেল। ঘুরে দাঁড়িয়ে কাম জিজ্ঞেস করে, কত বললে ? ক্যাশিয়ার আবার বলে, চার টাকা দু’ আনা। " . নেহাৎ ভালমানুষী দেখিয়ে কানু বলে, যাক খুব মনে পড়িয়েছ। তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে পয়সার বাটি থেকে গুণে গুণে পয়সা তুলে নেয় কানু। বলে, এই আট আর চার—বারাে আর দুই চোদ্দ—মােট চোদ্দ আনা নিলাম তাহলে। --তার মানে? ক্যাশিয়ার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে। হাসতে হাসতে কানু তাকে বুঝিয়ে দেয় : ভাঙাভর্তি আর কেন দাদা, “চার টাকা দু’ আনা আর এই চোদ্দ আনা, একেবারে পুরােপুরি পাঁচ টাকা দিয়ে দেবাে। পয়সা চোদ্দ-আনা পকেটে ফেলে কানু কেটে পড়ে সেখান থেকে । কানুর চালাকী দেখে হা হয়ে যায় ক্যাশিয়ারবাবু। কিন্তু জায়গা থেকে নড়বার সময় নেই তার। দু’তিনজন খদ্দের এসে ঘিরে দাড়িয়েছে তাকে। একজন এসে দাড়ালাে : উনিশ নম্বর। ক্যাশিয়ার বললে, আপনার নম্বর ভুল হয়েছে। উনিশ নম্বর পয়সা দিয়ে গেছে তিন আনা। পরের লােকটীর পয়সা নিতে নিতে প্রথম লােকটাকে দেখিয়ে ক্যাশিয়ার হাঁকলাে, ভজু, এর নম্বর কত ? চাকর ভজু চেঁচিয়ে বললে, উনিশ। তিন আনা ক্যাশিয়ার বললে, উনিশ তিন আনা তাে আমাদের কানুবাবু দিয়ে এ - গেল। ভজু বললে, কানুবাবু কুড়ি নম্বরে খেয়েছেন তেরাে আনা।
}কথাটা শুনে একেবারে বেকুব বনে গেল ক্যাশিয়ার। কী আর কমে? উনিশ নম্বরের আসল খদ্দেরীকে সে বললে, দিন আপনি তিন আনাই দিয়ে যান। তারপর চাকর ভজুকে ডেকে সে হুসিয়ার করে দিল, কাল থেকে কাবাবুকে আলাদা বসাবি। একটু নজরে নজরে রাখবি। কিন্তু কুবুদ্ধিতে কানুর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া বড় সােজা কথা নয়। দিনরাত সে পরের মাথায় হাত বুলােবার ফন্দী ফিকিরেই ঘােরে। এই বংশধরবাবুকে রােজা দেখানাের ব্যাপারটাই কি তার কম বুজরুকী। রােজা নয়, কোথাকার এক জোচ্চোরকে ধরে এনে বংশধরের কাছ থেকে বেশ কিছু মােটা টাকা খাবার তালে ছিল সে। স্রেফ রােজা ডেকে দেবার নাম করেই তাে একশাে টাকা সে বংশধরের কাছ থেকে আদায় করেছে, ওদিকে আবার রােজার পাওনাগণ্ডা থেকেও তার বখরা নেওয়া চাই। রােজা তাে কিছুতেই ভাগ দেবে না। কিন্তু কানু ছাড়বার পাত্র নয়। দস্তুরী-আদায়ের জন্য রােজার বাড়ী পর্যন্ত ধাওয়া করলে সে . রােজার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কানুর বচসা শুরু হয়ে গেল। রােজা বলে, না-না না,যা হয় না, তা হবে না, তাই নিয়ে কেন চেঁচাচ্ছি বল্ দেখি ! আমার টাকা থেকে তােক আমি একটি পয়সা দিতে পারবাে না। -সব টাকা তুই একাই নিবি?-কানু জিজ্ঞেস করে। রোজা বলে, নােবাে না? তুই যদি ফোকোটুসে আমাকে শুধু ডেকে দেবার জন্যে একশাে টাকা নিতে পারিস, আর আমার এত ঝাট ঝামেলা, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মুখে রক্ত উঠে গেল, আর তাছাড়া এই চুল !—মাথা থেকে পরচুলােটা খুলে টাক চুলকোতে চুলকোতে সে বললে,--টাকের ওপর কুটকুট করছে তো করছেই। ছারপােকা ঢুকলে কিনা তাই বা কে জানে! আর তার জন্যে দু’শ টাকা কি খুব বেশী হােল নাকি ? ১১১
কক
কানু বাধা দিয়ে বলে, দু'শাে মানে? তিনশ’ টাকা।
রােজা বলে, আরে বাবা আজকের একশাে টাকা তাে বশীকরণের জন্যে।
বশীকরণ ! অবাক হয়ে যােজার মুখের দিকে চাইলাে কানু।
এ-ব্যাপারটার কথা আগে কিছু শােনে নি সে।
রােজা বললে হা-হা, বশীকরণ। তােদের হােটেলে ওই যে মেয়েটি
আছে না, ওকে বশ করে দিতে হবে।
—বিয়ে থা করবার মতলব আছে নাকি বংশধরের? জিজ্ঞেস
করে কামু।
রােজা বলে না না সে সব কিছু নয়। বেচারা বলতে বলতে কেঁদে
ফেললে। বললে—সারাজীবনে কোন দিন কোন মেয়ের ভালবাসা সে
পায় নি। তাই ওই শতদল নাকি নাম মেয়েটির
কানু বললো শতদল।
রােজা বললে, তা’ ও যদি একটু আদর যত্ন করে, এই ধর খাবার
সময় যদি কাছে গিয়ে বসে, দুটো মিষ্টি কথা বলে-হেসে হেসে কথা
কয়-এই আর কী!
কানু জিজ্ঞেস করলাে, ওকে জড়ি-বড়ি তুকতাক্ কিছু দিয়েছিস তুই?
রােজা বললে, সিদূর প'ড়ে দিয়েছি, নিজের কপালে পরবে।
কানু বললে, আচ্ছা, এরকম বশীকরণের ব্যবস্থা আমি ঠিক করে
দিতে পারবাে।
রােজা বললে, তা যদি পারিস তাে এই নেপঁচিশটে টাকা।
কানু দেখলাে, যথা লাভ! পঁচিশটা টাকাই হাত পেতে নিল সে।
টাকাটা টাকে খুঁজে সে চলে যাচ্ছিল, বােজা জিজ্ঞেস করলাে, মেয়েটাকে
তুই কী বলে ডাকিস যেন—মাসিমা না কি!
যেতে যেতে কানু বললে, দূর ব্যাটা, মাসিমা কেন বলববা!—ভগিনী ।
ভগিনী!
১১২
হােটেলে ফিরে এসে কানু শতদলকে সব বুঝিয়ে বললে। শতদলও
এককথাতেই কানুর পরামর্শমতে বংশধরকে আদর-আপ্যায়ন করতে
ব্রাজী হয়ে গেল। দু’চার দিন শতদলের সঙ্গে দেখা হলেই সেই কথাটা
স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলাে কামু।
দুপুরবেলা বিজয়ের ঘরের দিকেই যাচ্ছিল শতদল ।
ডেকে বললে,
ভগিনী । ভগিনী : ঠিক যেমনটি বলেছি মনে থাকে যেন। শতদল
হেসে বললে, খুব মনে আছে। তুমি যেখানে যাচ্ছ যাওতাে।
নিজের ঘরে বসে মায়ের কাছে দু'ছত্র চিঠি লিখে কুশল সংবাদটা
জানাচ্ছিল বিজয়।
শতদল আসতেই বিজয় তাকে বলে, কী সুরু করেছে তােমরা ওই
ভদ্রলােককে নিয়ে ?
শতদল বলে, আমাদের দোষটাই দেখলেন, আর উনি যে আমাদের
সঙ্গে কী রকম করেন দেখতে পান না ?
বিজয় কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বংশধরবাবুর পাগলামির আসল
কারণটা ধরে ফেলেছিল। সে তাই শতদলকে বুঝিয়ে বললে, দ্যখাে,
তােমাদের ওই বংশধরবাবুকে আজকালের মধ্যে এখান থেকে সরাও,
নইলে তােমরা মহা-বিপদে পড়ে যাবে। ওঁকে নিয়ে এরকম করে ছেলে-
খেলা আর কোরাে না।
-কেন? কী হয়েছে ? জিজ্ঞেস করে শতদল।
বিজয় বলে, যা’ হয়েছে তা তুমি বুঝবে না। হাসপাতালে নিয়ে
গিয়ে তাড়াতাড়ি যদি অপারেশনের ব্যবস্থা না করাে তাে হুট করে
এইখানেই কোনদিন মরে যাবে তখন বুঝবে মজা।
হাসপাতাল, অপারেশন এসব শতদল কারুর চেয়ে কম বােঝে না।
বিজয়কে ওস্তাদি করতে দেখে সে বললে, আমি না-হয় না বুঝবাে,
কিন্তু আপনি বুঝলেন কী করে? আপনি ডাক্তার ?
১১৩
রায়চৌ-৮
। -হ্যা, আমি ডাক্তার। বিজয় বললে। -বললেই আমি বিশ্বাস করবাে ? বিজয় বললে, বিশ্বাস কর না কর, আমি বলছি আমি ডাক্তার। শতদল হেসে বললে, ভাল। জানা রইল গ্রামের ডাক্তাররা শটহা ও শিখতে কলকাতায় আসে। শট হ্যাণ্ড তো শুধু তােমার জন্যে। বিজয় বললে তােমার খাতায় আমার নামটা ভুল করে লিখে ফেললে বলে । শতদলের হঠাৎ খেয়াল হয়, শুধু কলেজের খাতায় নয় নিজের মনের খাতাতেও হয়তাে সে ভুল করেই বিজয়ের নামটা লিখে ফেলেছে। অন্য- মনস্কের মত সে বলে, সত্যি। আমার খাতায় আপনার নাম আমি ভুল করেই লিখে ফেলেছি। ধীরে ধীরে চলে যাবার জন্যে পা বাড়ায় শতদল। বিজয় বাধা দেয়, চলে যাচ্ছ কেন? উদাসদৃষ্টিতে ফিরে তাকায় শতদল : যাব না ? বিজয় বলে, না। বলে যাও কী করবে? চিন্তিতভাবে শতদল বলে, দেখি চেষ্টা করে—আপনার নামটা আমার খাতা থেকে কেটেই ফেলবাে। শতদলের কথা তলিয়ে বুঝবার দিকে তখন মন ছিল না বিজয়ের। 'সে, বললে, নাম কাটার কথা বলি নি। বলছি—বংশধরবাবুর পেট কাটার কথা। তাড়াতাড়ি না কাটলে কথার মাঝখানেই শতদল বলে, তা আমি কী করবাে? -ওকে ভাল করে বুঝিয়ে বল। তােমার কথা উনি শুবেন। না। আমি কিছু করতে পারবাে না। শতদল মাথা নেড়ে বলে। বিজয় বলে, তাহলে আমাকেই সব করতে হয়। ১১৪ শতদল বলে, করুন। কিন্তু আমার মনে হয় হাসপাতালে যেতে উনি চাইবেন না সহজে। '—সহজে না যান, জোর করে নিয়ে যেতে হবে। বিজয় প্রতিজ্ঞা করে যে-করেই হােক বংশধরের রােগযন্ত্রণা উপশমের ব্যবস্থা সে করাবেই। • জোরজবরদস্তি করেই বিজয় বংশধরকে ভর্তি করে দিল হাসপাতালে। বংশধর তাে কিছুতেই কেবিনে ঢুকবে না। সে চেঁচামেচি করতে লাগলাে। আমি অপারেশান করাবাে না বলছি তবু তুমি জোর করে নিয়ে যাবে? বংশধরকে কোলপাজা করে ধরে বিজয় বললে, আজ্ঞে হ্যা, অপারেশন না করালে আপনি ম'রে যাবেন। বংশধর বললে, মরি মরবাে, তােমার কী ? পাশেই হাসপাতালের ডাক্তার দাড়িয়েছিল, সে বললে, মরতে আপনাকে আমরা দেবাে কেন ? খিচিয়ে উঠলো বংশধর : উদয়ার সাগর, তুমি কে হে? ডাক্তার বললে, আমি এই হাসপাতালের ডাক্তার। শুয়ে পড়ুন তাে। বিজয়, ডাক্তার ও আরেকটী নাস মিলে ধরাধরি করে বংশধরকে টেবিলের ওপর শুইয়ে দিলে । ডাক্তারকে বিজয় আগে থেকেই জানতত। একই বছরে ডাক্তারী পাশ করেছে তারা। ডাক্তারকে বংশধরের ওপর একটু ভালােরকম নজর রাখতে বলে বিজয় নিশ্চিন্ত মনে ফিরে এলাে বাের্ডিং-এ। যাহােক তবু ডাক্তারের কর্তব্যটা সে করতে পেরেছে বলে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাে। এমন শিকারটা হাতছাড়া হয়ে গেল দেখে পাশের ঘরের শ্রীমান্ কানু তাে মহাখাপ্পা! রােজই এসে সে শাসিয়ে যেতে লাগলাে বিজয়কে। বিজয়ের তা’তে হৃক্ষেপ-ই নেই। সে তখন নিজের চিন্তাতেই ব্যস্ত। এদিকে পটপটি বাবু রােজ তাগিদ দিচ্ছিল ক্লাসে যাবার জন্যে। টাইপ শিখতে যে সে কলকাতায় আসে নি পটপটিবাবু তা' জানবে কেমন করে? যে-ব্যাপারের মীমাংসা করতে বিজয়কে পালিয়ে আসতে হয়েছিল তার কী হােল জানবাব । জন্যেই উদ্বিগ্ন হয়ে ছিল সে। অনেকদিন হােল মাকে সে একখানা চিঠি দিয়েছে। এখনাে তার কোন জবাব এলাে না কেন সে ভেবেই পাচ্ছিল না। ঘরে বসে বসে সে কথাই সে ভাবছিল। শতদল যে পা টিপে টিপে কখন তার কাছে এসে বসেছে তা সে টেরই পায় নি। হঠাৎ পটপটিবাবুর ডাকে তার চমক ভাঙলাে : শতদল ! শতদল! বিজয়চৌধুরীর টেলিগ্রাফ। দরজা দিয়ে, টেলিগ্রামটা ঘরের ভেতর ছুড়ে দিয়ে গেল পটপটি ? শতদল সেটা কুড়িয়ে এনে বিজয়ের হাতে দিল : পড়ুন। বিজয় পড়লাে : Colliery subsiding. Apprehending danger. Come Sharp. শতদলের দিকে চেয়ে সে বললে, আমার মা টেলিগ্রাম করেছে। কলিয়ারীর নাম শুনেই অবাক হয়ে গিয়েছিল শতদল। সে বললে, কলিয়ারী ! বিজয় বললে, হ্যা, কলিয়ারী। রায়েদের কলিয়ারীর নীচে ধ্বসে যাচ্ছে। কলিয়ারী !—মাটীর নীচে সুড়ঙ্গ করে যেখান থেকে কয়লা ভােলা হয়—সমস্ত সভ্য জগতের কাঠামাে দাড়িয়ে আছে যার ওপর—সেই কলিয়ারী ধ্বসে যাচ্ছে! ভারী আশ্চর্য লাগে শতদলের ! আগ্রহের সঙ্গে সে বলে ওঠে, কলিয়ারী আমি কখনাে দেখি নি। কিরকম বলুন তাে ? বিজয় বলে, না দেখলে বুঝতে পারবে না। কলিয়ারী দেখবার ঝোঁক চেপে যায় শতদলের। বিজয়ের কাছে ১১৬ কচি খুকীর মত আকার ধরে, আমি কিন্তু যাব আপনার সঙ্গে। কলিয়ারী কখনাে দেখি নি, দেখে আসবাে। • বিজয় জিজ্ঞেস করে, দেবে যেতে? শতদল বলে, কে ? বিজয় বলে, তােমার কাকা। নিশ্চিতভাবে মাথা নেড়ে শতদল বলে, হঁা দেবে। কথাটা বিশ্বাস হয় না বিজয়ের। সন্দেহ প্রকাশ করে সে বলে, এত বড় আইবুড়াে মেয়ে, আমি কে কোথাকার, চেনা নেই পরিচয় নেই শতদল বাধা দিয়ে বলে, সে ভাবনা তাে আপনার নয়। আমি যাব ব’লছি--আপনি নিয়ে যাবেন কিনা তাই বলুন। শতদল বিজয়ের সঙ্গে যেতে চায়, মনে মনে এতে খুশিই হয়ে ওঠে বিজয়। সামনে পূজো আছে, গ্রামের দুর্গোৎসব কত আনন্দের ব্যাপার। বাংলাদেশের নিঃস্ব-নির্জীব নিভৃত গ্রামগুলো যেন আনন্দময়ীর আগমনে নতুন প্রাণ পেয়েবেঁচে ওঠে। পাঁচজনকে ডেকে দেখাবার মতই গ্রামের সেই সুন্দর রূপ। বিজয় শতদলকে জিজ্ঞেস করে, গ্রামের দুর্গোৎসব কখনাে দেখেছ ? শতদল বলে, গ্রামই দেখিনি তা দুর্গোৎসব ! পূজোর তাে আর দেরি নেই। আপনাদের গ্রামে দুর্গোৎসব হয় ? -হয়। ব’লেই চুপ করে যায় বিজয়। তার মনে পড়ে, অবস্থা, খারাপ হওয়ার পর থেকে আগের মতন সেই মহা-সমাবরাহের দুর্গোৎসব বন্ধ হয়ে গেছে তার নিজের বাড়ীতে। রায়েদের বাড়ীতে প্রতিবৎসর যখন একসঙ্গে সাত-সাতটা ঢাক বেজে ওঠে, চৌধুরীবাড়ীর চণ্ডীমণ্ডপের দিকে তখন আর চাওয়াই যায় না। নহবৎখানা, নাটমণ্ডপ সব কিছু যেন জনশূন্য শ্মশানপুরীর মতাে খা-খা করতে থাকে। দেশে যখন এবার যেতেই হবে, বিজয় মনে মনে সঙ্কল্প করলাে যেমন করেই হােক এবার একবার দুর্গোৎসবের আয়ােজন করবে সে। ১১৭ জিনিষপত্র বাধাহঁাদা ক'রে পরের দিনই বিজয় দেশের দিকে যাত্রা করলাে। শতদলও কাকাকে বলে কয়ে চললাে তার সঙ্গে। যাবার মুখে পটুপটিবাবুকে বিজয় নমস্কার করতেই পটপটিবাবু বললে, তাহ’ সত্যিই যাচ্ছ ? আবার এসাে। শেখবার জন্যে এলে কিন্তু কিছুই শেখা হােল না। শতদল জীবনে এই প্রথম তার কাকাবাবুর কাছছাড়া হতে চলেছে। কাকাবাবুকে সে আশ্বাস দিয়ে বললে, আমার জন্যে ভেবাে না কাকাবাবু, আমি গিয়েই চিঠি লিখব। তুমিও চিঠি লিখাে। শতদলকে বিদায় দিতে একটু বিচলিত হয়ে পড়েছিল পটপটি । কথাটা বুঝতে না পেরে সে ভাবলাে শতদল বােধহয় তাকে ঠিকমতাে খাওয়া দাওয়া করতে বলছে। ঘাড় নেড়ে সে তাই বললে, হা, খাব- খাব। দিনে ভাত খাব, রাত্রে রুটি খাব। দুঃখের ভেতরও না হেসে পারলাে না শতদল। বিজয়কে বললে, ওঁর সঙ্গে আর বেশি ব’কে লাভ নেই। দরজার বাইরে পা বাড়াতেই তারা দেখে, একটি পাের্ক শতদলের থোজে এসেছে বংশধর চক্তবর্তীর কাছ থেকে। বংশধরবাবুর মরণাপন্ন অসুখ। হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে চলে গেছে সে। তার শেষ ইচ্ছা, শতদল একবার তার সঙ্গে দেখা করে । লােকটির একান্ত * অনুরােধ উপেক্ষা করতে পারলাে না বিজয়। সে ঠিক করলাে দেশে যাবার আগেই বংশধরবাবুকে একবার দেখে যাবে তারা। মানকর ষ্টেশনে নেমে নডিহা নারায়ণপুরে বংশধরের বাড়ীতে তারা তিনজনে এসে পৌছুলাে। বংশধরবাবুর বাড়ীঘর, বিষয় সম্পত্তি এমন বিরাটধরণের যে তা দেখে অবাক হয়ে গেল বিজয়। এতবড়াে বড়লােক যে ঘরবাড়ী ছেড়ে কেমন করে এতকাল একটা তৃতীয় শ্রেণীর বাের্ডিং-এ পড়ে থাকতে পারে, বিজয় তা কল্পনাও করতে পারে না। বাড়ীর ভেতরে ১১৮ ঢুকতে ঢুকতে বিজয় সঙ্গের লােকটিকে জিজ্ঞেস করলাে, এই বাড়ী বংশধরবাবুর ? : ', সঙ্গের লােকটি বললে, আজ্ঞে হাউনিই এখানকার জমিদার। তবে ওই যে বললুম রাস্তায়, মাথার একটু গােলমাল আছে। এটা ছিল না, মানে এই এতটা ছিল না, হয়েছে ওঁর মেয়েটি মারা যাবার পর থেকে। কথা বলতে বলতে তারা দোতলার বারান্দা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল । সুমুখের একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন ডাক্তার। ডাকলেন, নগেন! বিজয়দের সঙ্গের লােকটির নামই নগেন। সে জিজ্ঞেস করলাে, কী বলছেন, ডাক্তারবাবু? ডাক্তার শতদল ও বিজয়কে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এরাই বুঝি ? নগেন বললে, হ্যা, এরাই। এদেরই নিয়ে এলাম কলকাতা থেকে। তারপর শতদলকে দেখিয়ে বললে, এরই নাম-শতদল। শতদলের আসার অপেক্ষাতেই ছিলেন ডাক্তাববাবু। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে তিনি বললেন, আসুন আপনারা, ভেতরে আসুন। ঘরের ভেতর এক পাশে একখানা দামী খাট পাতা, তারই ওপর শুয়ে ছিল বংশধরবাবু। ডাক্তারের পিছু পিছু নগেন, শতদল ও বিজয় এসে ঘরে ঢুকলাে। দূর থেকে বিজয়কে দেখেই চীৎকার করে উঠলাে বংশধর, না না আমি যাব না, আমি যাব না, হাসপাতালে আমি কিছুতেই যাব না। . শতদল ইসারায় বিজয়কে সরে যেতে বলে নিজে গিয়ে বংশধরের শিয়রের কাছে বসলাে। সান্ত্বনা দিয়ে বললে, না না হাসপাতালে আপনাকে যেতে হবে না। আমি এসেছি আপনাকে দেখতে। শতদলের কথায় আশ্বস্ত হােল বংশধর। খানিকক্ষণ একদৃষ্টিতে শতদলের মুখের দিকে চেয়ে থেকে সে বলৰুে, * তুমি এসেছ ? শতদল? তুমি ? । ১১৯
শতদল ঘাড় নেড়ে বললে, হ্যা, আমি এসেছি।
বংশধর বললে, আমি কিন্তু চললাম! আর দেরি নেই।
শতদল বাধা দিয়ে বললে, ওকি কথা বলছেন?
একটু থেমে সে জিজ্ঞেস করলাে, হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এলেন
কেন ?
বংশধর কোন জবাব দিল না। চোখ বুজে চুপ করে পড়ে রইল
সে। অনেকক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই দেখে শতদল ডাক্তারকে জিজ্ঞেস
করলে, এ কি হচ্ছে ? এরকম করছেন কেন?
t
ডাক্তারও রােগীর অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। চিন্তিতভাবে
তিনি বললেন, সকাল থেকে দেখছি- ঠিক এইরকম। মাঝে মাঝে জ্ঞান
হচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে বেস।
সবকথা ভালাে করে শুনবার জন্যে ডাক্তারবাবুকে বাইরে ডেকে নিয়ে
গেল বিজয়।
বারান্দায় এসে বিজয় জিজ্ঞেস করলাে, আপনি ডাক্তার ?
বিজয়ের প্রশ্নে একটু বিব্রত হয়ে পড়লেন ডাক্তারবাবু। মুখ কাচুমাচু
করে বললেন, ডাক্তার বলে আর লজ্জা দিচ্ছেন কেন ? হােমিওপ্যাথী বই
পড়ে কিছু ওষুধ নিয়ে বসেছিলাম এই গাঁয়ে, ওঁরই দয়ায় এখন ডাক্তার
হয়ে গেছি। উনিই বাড়ীঘরদোর করে দিলেন, বিয়ে দিয়ে দিলেন এই
গ্রামে—কাজেই রয়ে গেলাম।
-ওঁর কী হয়েছে বলতে পারেন? জিজ্ঞেস করলাে বিজয়।
ডাক্তার বাবু বললেন, পেটের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা। ওকি আজকের
ব্যামাে মশাই ?
রােগের ইতিহাস বলতে সুরু করলেন ডাক্তারবাবু, পাঁচবছর ধরে
সমানে ভুগছেন—উনি বলছেন, ভাইপােরা বাণ মারছে, আর আমি বই
১২০
পড়ে পড়ে হােমিওপ্যাথি ওষুধ খাওয়াচ্ছি। কিছুই যখন করতে পারলাম , মেয়েটা ম'রে যাবার পর থেকে মাথাটাও খারাপ হয়ে গেল, আমিই পাষ্ঠালাম কলকাতায় চিকিচ্ছের জন্য, ফিরে এসেই শুয়ে পড়লেন, বললেন- এক ব্যাটা ডাক্তারের পাল্লায় পড়েছিলাম,-হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিল - পালিয়ে এলুম। বিজয় হেসে বললে, সেই ব্যাটা ডাক্তার আমিই। —আপনি ?—আপনি ডাক্তার ?-অবাক হয়ে গেলেন ডাক্তারবাবু। ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, আজ্ঞে কী হয়েছে ওঁর ? বিজয় বললে, Billiary colic-ব্লাডারটা পচে গেছে। গােবেচারার মতাে ডাক্তারবাবু বললেন, আজ্ঞে ওই দেখুন, ওসব কি আর আমরা জানি ? ডাক্তারবাবুটি যে আন্দাজে ওষুধ দেওয়া ছাড়া শরীরতত্ত্বের কিছুই জানে না বিজয় তা অনেক আগেই বুঝেছিলে। সে বললে, আর কোনও আশা নেই। যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। এমনি করতে করতেই হার্ট ফেল করবে। ডাক্তার উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, উনি কি তাহলে - বিজয় বললে, আজ্ঞে হ্যা, আজকালের মধ্যেই মারা যাবেন। বিজয়ের কথাটা বিশ্বাস হয় না ডাক্তারের। বংশধরের বাইরের অবস্থা দেখে সত্যিই কেউ ভাবতে পারে না যে এত শীগগির সে মারা যাবে। ডাক্তারবাবু ভাই বিজয়কে বললেন, না না কী বলছেন আপনি! টনে জ্ঞান রয়েছে- বিজয় জোর দিয়ে বললে, ঠিকই বলছি। ওঁর আপনার লােকজন যদি কেউ থাকে তাে ডাকুন। ডাক্তার বললেন, আপনার ব’লতে তাে ওই ভাইপাে দু’জন, তাদের এ-ত্রিসীমানা মাড়াবার জো নেই।
বাইরে ডাক্তারের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে বিজয় ভেতরে ততক্ষণে বংশধরের শেষ-অবস্থা। অনেকক্ষণ বাদে একবার জ্ঞান হােল তঁার। মায়া। মায়া! বলে সে চেঁচিয়ে উঠলাে। কাকে ডাকছে বুঝলল না শতদল। শতদলের কানে কানে নগেন বললে, মেয়েকে ডাকছেন। যে মেয়ে মরে গেছে। অবিকল তােমার মতাে দেখতে ছিল সে। হঠাৎ যেন নগেনের কথায় ভুল ভাঙলাে শতদলের। তার মনে হােল বংশধরকে ভুল বুঝে এতকাল কী অন্যায়ই না করে এসেছে তারা। লােকের বাইরের চালচলনটাই শুধু তারা দেখেছে আর বিদ্রুপ করেছে, অন্তরের পরিচয় নেবার চেষ্টাও কখনাে করে নি। মেয়ের মত সে এত- কাল ভালােবেসেছে শতদলকে, শুধু শতদলের মুখ চেয়েই শত কষ্ট সহ্য করেও সে বােডিং-এ পড়ে ছিল এতকাল—এসব কথা ভেবে শতদলের মনে সত্যি সত্যিই আজ অনুতাপ হতে লাগলাে। • কিন্তু অনুতাপ করেই বা আর লাভ কী? নিজের যন্ত্রণাতেই আচ্ছন্ন হয়ে আছে বংশধর। কিছু দেখবার শুনবার বা বুঝবার মতাে মনের অবস্থা আর তার নেই। একবার শুধু চোখ মেলে চারিদিকে তাকালে সে। হাতড়ে হাতড়ে বিছানার চারপাশে কী যেন খুজতে লাগলাে। নগেন বুঝলল, টাকার পুটলিটাই খুজছে বংশধর। সমস্ত টাকাকড়ি ‘পুটলি বেঁধে এতদিন আগলে আগলে বেড়িয়েছে সে, বিশ্বাস করে কারও হাতে তা ছেড়ে দিতে পারে নি। এখন এই মরণের মুখেও সেই পুটলিটী তার চাই। বংশধরের হাতে পুটলিটা এগিয়ে দিল নগেন । এই নিন, আপনার হাতের কাছেই তাে রয়েছে। কাপতে কাপতে পুটলিটা হাতে নিল বংশধর। তারপর সেটা শতদলের হাতে দিয়ে বললে, এইটি তােমাকে দিলাম। তােমরা দু’জনে বিয়ে করাে। তুমি আর ১২২
আর বােধয় বিজয়ের নামটীই সে বলতে চেয়েছিল। কিন্তু মুখের
কথা মুখেই থেকে গেল। হঠাৎ দমবন্ধ হয়ে গেল তার, চোখের তারা
স্থির হয়ে গেল, নিথর নিস্পন্দ পাথরের মূর্তির মতন পড়ে রইল সে।
বিজয় বাবু! বিজয় বাবু! বলে চেঁচিয়ে উঠলাে শতদল।
ডাক্তার ও বিজয় দুজনেই ছুটে এলাে তাড়াতাড়ি। বংশধরের হাত,
বুক দেখে বিজয় বললে, সব শেষ হয়ে গেছে।
শতদলের দু'চোখ বেয়ে তখন দর দর করে জল গড়াচ্ছে।
কাদতে কাঁদতে সে বললে, উনি কি আমাকে দেখবার জন্যেই এতক্ষণ
বেঁচেছিলেন?
চোখ মুছতে মুছতে নগেন বলেন, আর ঐ পুটলিটি তােমাকে দেবার
জন্যেই বােধ হয় আমাকে পাঠিয়েছিলেন।
কান্নাকাটা করা ছাড়া বংশধরের জন্যে এখন আর কিছু করবার নেই
দেখে বিজয় ব’ললে, নিন, ভাইপােদের ডেকে আপনারা সৎকারের
ব্যবস্থা করুন, আমরা চলি।
শতদলকে ডেকে সে বললে, ওঠো শতদল।
শতদল একটু কিন্তু করে বললে, এই সময়ে এমনি করে চলে যাওয়া
কি আমাদের উচিত ?
-হ্যা, উচিত। বিজয় বললে, ওদিকে আমার মা যে পথ চেয়ে বসে
আছেন।
বিজয়ের কথায় উঠতে হােল শতদলকে। পুটলিটী না নিয়েই চলে
যাচ্ছিল সে। নগেন সেটা তুলে নিয়ে শতদলের হাতে পৌঁছে দিয়ে এলাে
ট্রেণের দেরী হয়ে যাচ্ছে দেখে আর দাড়ালাে না বিজয়। শতদলকে
সঙ্গে নিয়ে তাড়াতাড়ি রেলষ্টেশনের দিকে চললাে
সবার আগে কমলই ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল অশ্বিনীকে।
বাবা! বাবা ! জামাইবাবু এলাে।
১২৩
অশ্বিনী তাদের কালিয়ারীর ম্যানেজারের সঙ্গে বৈষয়িক কথাবার্তায় ব্যস্ত ছিল। মুখ তুলে সে জিজ্ঞেস করলাে, বিজয় ? কোথায় এলাে? কমল বললে, ওদের বাড়ী গেল দেখলুম। এ-খবরে বিশেষ উৎসাহ দেখালাে না অশ্বিনী। কমলকে সে বললে, আচ্ছা যা তুই। ' কমল চলে যেতে কলিয়ারী-ম্যানেজারের কাছে আবার সে দরকারী কথা পেড়ে বললো, বলি—কলিয়ারী আপনার না আমার ? ম্যানেজার বললে, একী ছেলেমাষি কথা বলছেন? আমি আপনার কলিয়ারীর ম্যানেজার, কলিয়ারীর ভালােমন্দ আমাকে দেখতে হবে তো! -তা মন্দটা কী হােল যে আপনি চট করে রিজাইন দিতে চাইছেন? ম্যানেজার জবাব দিল, মন্দ কী হােল বুঝতে পারছেন না? কয়লার বাজার যেই গরম হােল অনি পিলারগুলো এলােপাথাড়ি উড়িয়ে দিয়ে মােটা টাকা অবশ্য লাভ করলেন সত্যি, কিন্তু এই যে আগুন লেগে এতটা জায়গা ধ্বসে গেল, এ আগুন কি আপনি কখনাে নেবাতে পারবেন? অশ্বিনীর গোঁয়ার্তুমি তবু যায়না : পারি না পারবাে, তাতে আপনার কী ক্ষতি শুনি? ম্যানেজার বললে, ক্ষতি আমার কিছুই নেই, কিন্তু মনে রাখবেন -তেরাে নম্বর গ্যালারি আপনার এই বাড়ীর নীচেই। এরও ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা একদিন আছে। অশ্বিনী প্রতিবাদ করলাে, আজ্ঞে না। তেরো নম্বর কাথি গেছে চৌধুরীদের বাড়ীর দিকে। ম্যানেজার বললে, সেও তাে আপনার জামাই-এর বাড়ী! আর তাছাড়া আইনতঃ ওদিকে তাে আপনি যেতে পারেন না-ও আপনার সম্পত্তি নয়। তবু গেছেন খানিকটা, তাও আমি জানি। কিন্তু এটা ভুল বলছেন, আজ সকালে বিজবাবুর নায়েব সেই বুড়ো বনমালী এসেছিল ১২৪ আমার কাছে, খুব ভাল করে সার্ভে ম্যাপ দেখে ব'লে দিয়েছি-ওদিকটা একেবার Solid, 'ম্যানেজারের কথা শুনে হাড় জ্বলে যায় অশ্বিনীর। কোথায় এই সুযােগে চৌধুরীদের খানিকটা ভয় খাইয়ে কাবু করা যেত, তা নয়, আগে থেকেই মাপজোক করে তাদের নিশ্চিন্ত থাকবার ভরসা দিয়ে বসে আছে ম্যানেজার! ম্যানেজারকে বিদ্রুপ করে উঠলাে অশ্বিনী : খুব ভাল করেছেন। মাথাটা একেবারে কিনেছেন আর-কী ! ম্যানেজারের কাছ থেকে ভালাে করে বুঝে সুঝে নিয়ে বনমালী এসে মহামায়াকে বললে, আমি নিজে দেখেছি, কলিয়ারীর ম্যানেজার কাগজপত্র দেখে আমাকে খুব ভাল করে বলে দিয়েছে-আমাদের কোনও ভয় নেই, এদিকের মাটি কখনাে বসবে না। বিজয়ের জন্যে থালায় করে মুড়ি আর শসা নিয়ে আসছিলেন মহামায়া। নিজের মনেই বললেন তিনি, কলিয়ারীতে যে আগুন লাগে তা তাে বাবা কখনও জানতাম না। বনমালী বললে, কলিয়ারীতে আগুন লাগে নি মা, আগুন লেগেছে। আপনার বেয়াই অশ্বিনী রায়ের কপালে । কথাটা বলে বনমালী চলে যাচ্ছিল। মুড়ির থালা নামিয়ে রেখে মায়া জিজ্ঞেস করলেন, বিজয় গেল কোথায়? বিজয়। আর সেই মেয়েটি-ই বা কী নাম যেন—হ্যা, শতদল ! শতদলের নাম শুনে যেতে যেতে ফিরে দাড়ালাে বনমালী। বললে, মেয়েটিকে দেখেছিলুম খিড়কির পুকুরে চান করছিল। কিন্তু মা, ওই মেয়েটিকে দেখে এরই মধ্যে গাঁয়ের লােক সব বলাবলি করছে—বিজয় ওকে বিয়ে করে এনেছে। চান করে গামছা দিয়ে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ঘরে ঢুকছিল শতদল।
বিয়ের কথা শুনেই দরজার বাইরে থমকে দাড়ালাে সে। ভেতরে
তার সম্বন্ধে আর কী কথাবার্তা হয় শুনবার জন্যে দরজার আড়ালে সে
আড়ি পেতে দাড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। মহামায়া বললেন, যার যা ইচ্ছে
বলুক। আমি ভাবছি হাতেই পূজো। ষষ্ঠীর দিন বৌমাকে আনতে
পাঠাবাে, এবারেও যদি না পাঠায়, শতদলের সঙ্গেই বিয়ে দেব বিজয়ের।
বনমালী জিজ্ঞেস করলাে, পূজো কি তাহলে সত্যিই হবে এ-বছর?
বিজয়ও বছিল ।
মহামায়া বললেন, বিজয়কে আমি বলেছি যে! বলেছি আমি স্বপ্ন
দেখেছি—আবার ঠিক আগের মতই আমাদের চণ্ডীমণ্ডপে পূজো হচ্ছে।
বনমালী ব’ললে, কিন্তু মা, বিজয় যে বললে চণ্ডীমণ্ডপে পূজো হবে
—আবার সেই কী যেন সরজমিন পূজো নাকি ?
মহামায়া বললেন, হ্যা-হ্যা, আমাকেও বলছিল, সরজামিন নয়,
সম্মাজানি পূজো।
শতদল আর বাইরে থাকতে পারল না কথাটা শুনে।
ঘরে ঢুকে
হাসতে হাসতে সে জিজ্ঞেস করলাে, কী পূজো ?
—চান হােল?—শতদলকে দেখে মহামায়া জিজ্ঞেস করলেন।
শতদল বলল, হ্যা হােল। কী পূজো আর-একবার বলুন মা-
মহামায়ার মুখে ভুল কখাটা শুনতে খুব মজা লাগছিল শতদলের।
মহামায়া বুঝলেন যে আসল কথাটা তিনি গুলিয়ে ফেলেছেন
তিনি আরেকবার বললেন-‘সম্মাজানি পূজো।
হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল শতদল। নায়েবমশাইকে জিজ্ঞেস
করলাে, আপনি জানেন না? আপনি একবার বলুন।
বনমালী বললে—সরজামিন পূজো।
দু’জনেরই স্মরণশক্তি সমান দেখে শতদলের হাসি আর থামতেই চায়
চায় না। এমন সময়ে ঘরে এসে ঢুকলাে বিজয় : এত হাসি কিসের?
মহামায়া হেসে বললেন, ওই যে সেই তুই কী পূজো ব'লে গেলি
আমরা বলতে পারছি না, তাই হাসছে।
শতদল বললে, শুনুন না কী বলছেন। বলুন না মা আর-একবার !
মহামায়া বললেন, সম্মাজানি পূজো না-কি-
মায়ের কথা শুনে বিজয়ও না হেসে পারলাে না। শতদল বললে,
শুনুন-শুনুন, আরাে আছে।
নায়েব-মশাইকে সে বললে, আপনি বলুন তাে!
বনমালী
বললে, সরজামিন
পূজো।
বিজয় হাসি চেপে বললে, না-না, ‘সম্মাজানিও নয়, ‘সরজামিনও নয়-
সাৰ্বজনীন দুর্গোৎসব। সাৰ্বজনীন—মানে সকলের।
এতক্ষণে তবু ব্যাপারটা কিছুটা পরিষ্কার হােল মা আর বনমালীর
কাছে । মুড়ির থালাটা বিজয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে মহামায়া বললেন,
মুড়ি খেতে চেয়েছিলি – খা।
বিজয় বললে, শতদল, তুমি খাও। এখানে ও ছাড়া আর কিছু
পাবে না।
মা আর বনমালী চলে যেতেই মুড়ির থালা নিয়ে বসলো দুজনে।
শতদল গল্প সুরু করলাে, পূজোর সময় আপনার স্ত্রী-কে আনবেন না ?
বিজয় বললে, না। কলকাতায় তুমি বিশ্বাস কর নি, এখন বিশ্বাস
হলাে তাে আমার স্ত্রী আছে!
কোন জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলাে শতদল। বিজয় ঠাট্টা করে
বললে, এত কষ্ট করে এলে, সব বৃথা হ'য়ে গেল ?
বিজয়ের কথাটা গায়ে লাগলাে শতদলের। সে বললে আমি বুঝি
এই জন্যেই এলাম এখানে ? আপনার স্ত্রী আছে কিনা দেখতে।
ঠোঁট চেপে বিজয় বললে, তাইতাে মনে হয়।
শতদল কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললে, যা !
১২৭
অনেক দুরাশা নিয়ে বিজয়ের সঙ্গে গ্রামে এসেছিল শতদল। শুধু কলিয়ারী আর দুর্গোৎসব দেখাই নয়, বিজয়দের ঘর-সংসার দেখবে সে, বিজয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আরাে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে, এমনি অনেক কল্পনাই সে মনে মনে করে রেখেছিল। বিজয়ের স্ত্রী আছে শুনে তার মনটা একটু মুসড়ে পড়েছিল সত্যি, তবু সহজে মনের কথা বুঝতে দেবার মেয়ে সে নয়। বিজয়কে উল্টো চাপ দিয়ে সে বললে, আপনার মন, যা খুশী তাই ভাবতে পারেন আমার সম্বন্ধে, কিন্তু বাড়ীতে ডেকে এনে লজ্জা একটু কম দিলেই ভালাে হােত না? বিজয় কিছু বলবার আগেই শতদল বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দরজার সামনেই মহামায়ার সঙ্গে দেখা। তখনাে মনের ভাবটা ঠিক সামলে নিতে পারে নি শতদল। জোর করে মুখে হাসি টেনে সে বললে, জানেন মা! খুব ধুমধাম করে পূজো হবে এ-বছর। কী পূজো সেটা তখনাে আয়ত্ত হয় নি মহামায়ার। তিনি কথাটা স্মরণ করবার চেষ্টা করছিলেন। সেই যে কী বলছিলে–সেই শতদল মনে করিয়ে দেয় তাড়াতাড়ি, হঁ্যা, সার্বজনীন মহামায়া বলেন, ও কী রকম পূজো, আমাকে একদিন বুঝিয়ে দিও তাে মা ! শতদল হেসে বলে, বুঝিয়ে দিতে হবে না, স্বচক্ষে দেখবেন। এইটুকু এখন জেনে রাখুন, সার্বজনীন মানে সকলের। সত্যি সত্যি, সকলের জন্যই এবার পূজোর আয়ােজন করলে বিজয়। চণ্ডীমণ্ডপে নয়, বাড়ীর সামনে পােড়ােজমিটা পরিষ্কার করে সেখানে চালাঘর বেঁধে প্রতিমা বসানাে হােল। গ্রামের কুলি-মজুর, মুচি-মেথর, সবাই যাদের ছােটলােক আর ছােটজাত বলে, তারা সবাই ১২৮ পদ্মর মা বললে, ও কী অলক্ষুণে কথা বলছো মা, ছি! চোখ ফেটে জল এলাে বিমলার মার : ব’লবাে না? পাঁচটা নয়, দশটা নয়, একটি মাত্র মেয়ে, স্বামী নিয়ে সংসার নিয়ে কোথায় সুখে-স্বচ্ছন্দে ঘর করবে তা নয়, বিয়ের পর থেকে কিরকম ঝকমারি হচ্ছে বল দেখি! এবার যদি-ই বা বাপ রাজি হলাে তাে মেয়ে একেবারে বেঁকে বসলেন ধনুক ভাঙা পণ করে—কিছুতেই যাবেন না। মায়ের আক্ষেপ শুনে সামনের ঘর থেকে কঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এলাে বিমলা। বিজয় এসেছে শুনে অবধি মনে মনে সে ছটফট করে মরছিল । নিজের মনের সঙ্গেই লড়াই চলছিল তার—কী করবে সে? বিজয় যদি তাকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারে সে-ই বা বিজয়কে ছেড়ে থাকতে পারবে না কেন? রায়েদের বাড়ীর মেয়ে সে, স্বামী হলেই তার অবহেলা- অপমান মাথা পেতে নিতে হবে এমন শিক্ষা সে বাবার কাছে পায় নি। কিন্তু সব জেনে শুনে মা যে কোন প্রাণে তাকে সতীনের ঘর করতে ঠেলে পাঠাতে চায় তাই বিমলা বুঝতে পারছিল না। দুঃখে-রাগে মুখচোখ রাঙা করে সে এসে -কে বললে, যেতে যে বলছ, সতীনের পায়ে তেল দিতে যাব—না সতীনের সেবা করব গিয়ে? বল কী করতে হবে, আমি যাচ্ছি বিমলা শ্বশুরবাড়ীতে গিয়ে সতীনের ঘর করবে বিমলার মা-ও তা চাইছিল না। বিজয়ের মত ছেলে হুট করে আবার বিয়ে করবে এটাই তার ধারণার বাইরে ছিল। লােকের মুখে শােনা কথা, তাই সে বলছিল বিমলা নিজে একবার সেখানে গিয়ে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ঘুচিয়ে আসুক। সেই কথাই আবারও সে বিমলাকে বললে, বিজয় আবার বিয়ে করবে সেকথা যে আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। বিজয়কে আমি এই এতটুকু বয়েস থেকে জানি। তাই বলছি—নিজে গিয়ে একবার দেখে এলেই তােত পারতিস।
.
-দেখে আসতে হবে না বিরক্তভাবে বিমলা বললে।
কমল!
কমলকেই এ-ব্যাপারে সাক্ষী মানলাে বিমলা। কমল এসে ।
জিজ্ঞেস করলাে, কী ব’ছে?
মায়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বিমলা ব’ললে, কী দেখেছিস
কমল বলে, বা-রে ! যখন এলাে আমি তখনই দেখেছি।
ধপধপে গায়ের রঙ-ভারি সুন্দর মেয়ে-দিদির চেয়ে অনেক ভাল
ঠিক এই মুহূর্তেই একটি নতুন মেয়ে এসে ঘরে ঢুকলাে: না
তুমি দ্যাখাে নি-তােমার দিদির চেয়ে সুন্দরও নয়, ভালও নয়।
ঘরশুদ্ধ সবাই তাকে দেখে অবাক। বিমলার মা জিজ্ঞেস কর
তুমিই কি?
-হ্যা মা, আমিই। ব’লে বিমলার মায়ের পায়ে হাতে দিয়ে ৫
করলাে শতদল।–বিজয় বাবুর সঙ্গে আমিই এসেছি কলকাতা থেে
প্রথমেই শতদলের সি থির দিকে নজর পড়লাে বিমলার মা’র। শত
বুঝলে বিমলার মা কেন তার সিথির দিকে তাকাচ্ছে। শতদল ,
সিথিতে সিদুর আছে কিনা দেখছেন? বিয়ে এখনও হয় নি।
বিমলার মা জিজ্ঞেস করলাে, তাহলে এই যে শুনছি বিজয় ?
বিয়ে করে
-- ভুল শুনেছ মা। শতদল বললে।-আমি এসেছি গ্রাম
পূজা দেখতে, আর এই,বিমলার দিকে হাত দেখিয়ে সে বল
একে দেখতে! এই আপনার মেয়ে তাে ?
বিমলার মা বললে, হঁ্যা। ওই আমার মেয়ে বিমলা।
বিমলার হাত ধরে শতদল বললে, এসাে ভাই একটু আড়ালে
তােমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
পাশের ঘরে গিয়ে তারা ব’সলে দুজনে। হাসতে হাসতে শতদল বললে, ভয় পেয়েছিলে ? শতদলের এমন মিষ্টি ব্যবহার দেখে বিমলার রাগ-হিংসা অনেক আগেই জল হয়ে গিয়েছিল। সেও হেসে জবাব দিল, হ্যা। -এখন ভয় গেল তাে ? জিজ্ঞেস করলাে শতদল। কোন কথা না বলে বিমলা একটু হাসল শুধু। অভয় দিয়ে শতদল বললে, ভয় নেই, তােমার বিজয়বাবুটি বিয়ে কখনও করবে না। বিমল জিজ্ঞেস করলাে, জানলে কেমন করে ? শতদল বললে, যদি বলি চেষ্টা করেছিলাম- হেরে গেছি। বিজয়ের সঙ্গে শতদলের কোথায় কেমন করে আলাপ-পরিচয় হােল সব কিছু আগাগােড়া জানবার কৌতুহল আর চেপে রাখতে পারে না বিমলা। শতদলকে সে জিজ্ঞেস করলাে, তােমাকে উনি পেলেন কেমন করে ? -সেকথা তাকেই জিজ্ঞেস কোবরা। মুচকি হেসে জবাব দিল শতদল। তারপর তার এ-বাড়ীতে আসার আসল উদ্দেশ্যটা সে খুলে বললে, আমি কিন্তু তােমাকে শুধু দেখতে আসি নি, নিতেও এসেছি, যাবে তত? যেতে খুবই ইচ্ছে করছিল বিমলার। তবু শতদলের মুখ থেকে সমস্ত কথা আগে জেনে শুনে নেবার জন্যে সে বললে, আজ তুমি থাকো এইখানে ; দুজনে গল্প করি, কাল যাব। -আবার কাল কেন ? শতদল তাগিদ দিয়ে বললে, আজই চল না, কতদিন দ্যাখাে নি তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে না? ম্লান হেসে বিমলা বললে, ইচ্ছেটা কি একা আমারই ? শতদল বুঝলাে ব্যথাটা কোথায়। তবু আজ পূজো-আর্চার দিনে স্বামী-স্ত্রীর ভেতর একটা মন-কষাকষি থাকবে, তার নিজের কাছেই এটা বড় বিশ্রী লাগছিল। সে তাই বিমলাকে বুঝিয়ে বললে, মিছি মিছি রাগ করে কি হবে? তার চেয়ে দেখবে চলল কি রকম পূজো হচ্ছে • ১৩৩ এবছর। যেখানে যতাে গরীব-দুঃখী কুলি মজুর—মুখে যাদের কখনাে হাসি দেখা যায় না, আজ তারাই দ্যাখাে গিয়ে হেসে গেয়ে কিরকম আনন্দ করছে। এ-যেন তাদেরই উৎসব। বলতে বলতে শতদলের নিজের মুখখানাই যেন আনন্দে ঝম করে ওঠে। গ্রামের ছােটবড় সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে আমােদ-আলাদ t এ ছবি যেন স্পষ্ট ভেসে ওঠে তার চোখের ওপর। সত্যিই, এতবড় সাৰ্বজনীন উৎসব এর আগে গ্রামে আর কখনাে হয়নি। সারা গ্রাম একেবারে মাতােয়ারা হয়ে উঠেছিল, লােকজনের প্রাণ- খােলা হাসিহল্লা, নাচ-গান আর ফুর্তিতে। কুলি-লাইনে তাে গান বাজনার শেষই ছিল না দিনরাত্রের ভেতর। খালি ঢােল বাজছে, মাদল বাজছে, আর তার সঙ্গে কান-ফাটানাে গান চলেছে ‘রামা হাে, রামা হাে’— গানের সঙ্গে সঙ্গে নাচও আছে তেমনি। দৈত্যের মতাে চেহারার কালাে কুচকুচে একটা কয়লাকুলি একটা লিলিকে চেহারার মজুরণীর কোমর জড়িয়ে ধরে ধেই ধেই করে নাচ জুড়ে দিয়েছে। যতাে লােক জমেছে সবাই খালি তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে আর হাততালি দিয়ে বাহবা দিচ্ছে। হুল্লোড় যখন পুরােদমে চলছে এমন সময়ে হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর আওয়াজ হােল কড়-কড়-কড় কড়, করে। মনে হােল যেন একসঙ্গে একশােটা বজ্রপাত হােল গ্রামের চারিদিকে। আওয়াজটা একেবারে অজানা নয় কুলি মজুরদের। নাচ-গান বন্ধ হয়ে গেল, ভয়ে ভার্নোঙ্গ দিশেহারা হয়ে পড়লে সবাই। চ’ক্ষের নিমিষে যে যেদিকে পারলাে পাগলের মতাে ছুটোছুটি শুরু করে দিল। মুহুর্তে মুহূর্তে গ্রামের রূপ যেন বীভৎস হয়ে উঠতে লাগলাে। আতঙ্কে আর্তনাদে ছেয়ে গেল চতুর্দিক । ছেলেরা কঁদছে, মেয়েরা কঁদছে, জোয়ান মরদের সবাইকে বাঁচাবার জন্যে মরিয়া হ'য়ে দৌড়ােদৌড়ি করছে। দ্বিগুণ জোরে লিফটের চাকা ঘুরছে কলিয়ারীতে-কলিয়ারীতে। খাদের ১৩৪ নীচে যারা কাজ করছে, দেরী হলে আর তাদের কাউকেই বাঁচানাে যাবে । হুশ-হুশ, ক'রে ধীম-ইঞ্জিনের পিষ্টন চলছে। প্রকৃতির সঙ্গে বিজ্ঞানের যেন আড়াআড়ি চলছে প্রাণপণে। বাঁধ ডিঙিয়ে, মাঠ পেরিয়ে লােকজন যে-যার বাড়ীর দিকে উদ্ধশ্বাসে ছুটছে। কিন্তু মানুষের সাধ্য কী যে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে পাল্লা দেয় ? পায়ের নীচের মাটি পৰ্য্যন্ত চড়-চ্চ, করে দু’ভাগ হয়ে সরে যায়, আর তার ভেতর থেকে গল গল করে ধোঁয়া বেরােতে থাকে অনর্গল। লাফ ঝাঁপ দিয়ে কতকলােক সেই ফাটল পার হয়ে যায়, আর কতকলােক সেই অতল গহ্বরের ভেতরে পড়ে জীবন্ত-সমাধি লাভ করে। কয়লার ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাসে আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। এ-দুর্যোগের মধ্যেও বারােয়ারী পূজামণ্ডপে উচ্চকণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শােনা যায় : ‘সৰ্বমঙ্গলামঙ্গল্যে শিবে সৰ্বার্থ সাধিকে— দেবী দুর্গা যেন সত্যি সত্যিই এতক্ষণে অসুরনাশিনী, দনুজদলনী মূর্ত্তি ধারণ করছেন। ধূপের ধোঁয়ায়, দীপের আলােয় তার মুখের অট্টহাসিটী যেন আরাে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার ওষ্ঠাধরে। লােকজন ছুটতে ছুটতে এসে বিজয়কে খবর দিল, বাবু! বাবু! রায়েদের বাড়ী নেমে যাচ্ছে মাটীর নীচে। -বাড়ীর লােকজন সব বেরিয়ে এসেছে ? উৎকণ্ঠিত ভাবে জিজ্ঞেস করে বিজয়। কিন্তু সে-কথা কেউই সঠিক বলতে পারে না। কালবিলম্ব না করে , দু’হাতে ভিড় ঠেলে যে-অবস্থাতে ছিল সেই অবস্থাতেই বিজয় ছুটে যায় রায়েদের বাড়ীর দিকে। বিজয়কে বিপদের মুখে ছুটে যেতে দেখে মায়ের প্রাণ আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। তিনিও বিজয়ের পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে এগিয়ে যান কিছুদূর পর্যন্ত। চেঁচিয়ে সাবধান করে দেন বিজয়কে, বিজয় ! বিজয় ! দেখি যেন নিজে বিপদে পড়ি নি! ১৩৫ সবাই বার বার করে বারণ করে বিজয়কে, আপনি যাবেন না, বাবু, যাবেন না। কিন্তু কারাে কথায় কর্ণপাত করে না বিজয়। দুর্জয় সাহসে, দুৰ্বাৰ গতিতে একলাই সে এগিয়ে চলে বিপজ্জনক এলাকার দিকে। ওদিকে রায়েদের চক্মেলানাে তিনমহল বাড়ী তখন ভিশুদ্ধ, নড়তে সুরু করেছে থর থর করে। ঝঝ মড়মড় শব্দ হচ্ছে চারদিকে। বাইরের গেট, নহবৎখানা, কাছারীবাড়ী একে একে সব বসে যাচ্ছে মাটীর তলায়। ভেতরের বাড়ীতেও ভীষণ এক-একটা ঝাঁকুনী লাগছে। জানলা দরজার কপাটগুলাে ঠক-ঠক্ করে উঠছে, বাসনপত্র ঝনঝন করে পড়ে যাচ্ছে মাটীতে, দুম্ দাম করে দেয়াল থেকে চুপবালির চাপড়া আর ছাদের থেকে টালি-বরগা ভেঙে ভেঙে পড়ছে। একে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে তার ওপর ধোয়ায়-গ্যাসে চারিদিক ঢাকা। ঘরে-চাতালে সিড়িতে-বারান্দায় সবাই সবাইকে ডাকাডাকি করে খুজে বেড়াচ্ছে। খালি হাউ-মাউ চীৎকার আর ছুটোছুটি হুটোপুটির ভেতর কে যে কোথায় যাবে, কী করবে কিছুই ঠিক করে উঠতে পারছে না। ‘মা’‘মা’ বলে এঘর-সেঘর ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে বিমলা। অশ্বিনী ওদিকে বিমলাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে হন্তদন্ত হয়ে। ছেলে, মেয়ে, স্বামী কাউকে না দেখতে পেয়ে সারা বাড়ী তােপাড় করে ফিরছে বিমলার ম'। বারান্দা দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল কমল। মা তাকে থামালাে, এই যে কমল! তাের বাবা কোথায় ? বাবা আসছে। এখানে দাড়িয়ে না, পালিয়ে এসাে।-মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় কমল। ঠিক সেই মুহূর্তেই অশ্বিনীর ঘরের সেজবাতিটা ঝন্ঝন শব্দে উন্টে পড়ে গেল টেবিলের ওপর থেকে। চক্ষের পলকে দাউদাউ করে আগুন - ১৩৬
।
জ্বলে উঠলো বিছানার চাদরে। সেই ঘর থেকেই বেরিয়ে আসছিল
শতল। বিমলাকে দেখতে পেয়ে সে বললে, এই যে ! তােমাকেই খুঁজছি
ভাই।
কান্নায় ভেঙে পড়লাে বিমলা : একী হােল শতদল? এ সময় তুমি
কেন এলে এ-বাড়ীতে ?
বিমলার হাত ধরে শতদল বললে, মরি তে একসঙ্গেই মরবো। চল,
আর দাড়িয়াে না।
ছুটতে ছুটতে তারা নেমে যায় এক তলায়। দোতলার বারান্দায়
দাড়িয়ে অশ্বিনী তখনাে ডাকাডাকি করছে : বাবা! বাবা !-বিমলা!
বিমলা !
বিমলা আর শতদল একতলায় এসে বাইরে যাবার পথই আর খুজে
পায় না কিছুতে। যে-দরজা খুলতে যায় সেখানেই দেখে ধোয়া আর
আগুনের হলকা। একটা ঘরের ভেতর দিয়ে দৌড়ে যেতে যেতে একটা
জ্বলন্ত কড়িকাঠ ভেঙে পড়লাে তাদের দুজনের মাঝখানে।
ওপাশ থেকে বিমলা ডাকতে লাগলো, শতদল! শতদল !
শতদল এদিকে থমকে দাড়িয়ে গেল একেবারে ।
সে শুনলাে কে যেন
ডাকতে ডাকতে আসছে : বিমলা ! বিমলা।
ঘাড় ফিরিয়ে বিজয়কে দেখতে পেয়েই শতদল ছুটে গেল বিজয়ের
দিকে : এসেছ ? তুমি এসেছ ?
বিজয় কিন্তু শতদলের দিকে ফিরেও চাইল না একবার। ঘরের পেছন
দিক দিয়ে ঘুরে সে জলন্ত কড়িকাঠের ওপাশে গিয়ে বুকের ভেতর জড়িয়ে
ধরলাে বিমলাকে।
-তুমি ! আবেগে-উত্তেজনায় গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গেল
বিমলার।
বিজয় বললে, হ্যা, আমি । কথা বলবার সময় নেই।
এসাে।
১৩৭
বিমলাকে দু'হাতে আড়কোলা করে তুলে নিয়ে বিজয় বেরিয়ে গেল
তাড়াতাড়ি। দূরে দাঁড়িয়ে শতদল শুধু কাঙালীর মত চেয়ে রইল
তাদের দিকে। ঝরঝর করে চোখের জলে যেন বান ডাকলাে তার।
-
বাইরে তখন প্রলয়কাণ্ড সুরু হয়েছে। গাছপালা, বাড়ীঘর ভেঙে
ভেঙে লুটিয়ে পড়ছে মাটীতে। ভীষণ জোরে দো খেতে খেতে রায়েদের
কলিয়ারীর হেড-গীয়ারটা গােড়াশুদ্ধ উপড়ে নিয়ে ভেঙে পড়লাে কুলিবস্তির
ওপর। আওয়াজ শুনে পথ দিয়ে ছুটতে ছুটতে থমকে দাড়ালো বিমলার
মা। তার স্বামীর এত সাধের কলিয়ারী ধূলিসাৎ হচ্ছে দেখে বুক যেন
তার ভেঙে যেতে লাগলাে।
যেতে লাগলাে। কমল বললে, দাড়াচ্ছে কেন মা?
চলে এসাে।
মায়ের হাত ধরে টানতে লাগলাে কমল। মা বললে, যাচ্ছি, কিন্তু
তাের বাবা
-বাবা ঠিক আসবে। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে কমলের। এই সর্বনাশা
জায়গা থেকে সে পালাতে পারলে বাঁচে। হঠাৎ বিমলাকে আসতে দেখে
সে বলে উঠলো, ওই তাে দিদি !
বিমলাকে মায়ের কাছে পৌছে দিয়ে গেল বিজয়। শ্বাশুড়ীকে সে
বললে, যান মা, আপনারা তাড়াতাড়ি পালান এখান থেকে। সােজ।
আমার বাড়ীর পাশে চলে যান—যেখানে পূজো হচ্ছে-
বিমলার মা ব্যস্ত হয়ে বললে, কিন্তু বিমলার বাবা?
বিজয় বললে, আমি দেখছি। যান আপনারা।
বিজয় আবার ছুটে চললাে বিমলাদের বাড়ীর দিকে। বিজয়কে একলা
ছেড়ে দিতে আর ভরসা হচ্ছিল না বিমলার। পিছন পিছন তাকে আসতে
দেখে ধমক দিয়ে উঠলাে বিজয়, আঃ, তুমি আবার কেন ?
শুকনাে-মুখে বিমলা বললে, তুমি একা যাবে?
}
১৩৮
বিজয় ব’ললে, হা হা, আমি একাই যাবাে। তুমি চলে যাও কমলদের সঙ্গে। তবুও বিমলা কথা শােনে না দেখে শ্বাশুড়ীকে ডেকে বিজয় বললে, একে এখান থেকে নিয়ে যান তাে মা। বিমলার মা ডাকতে লাগলাে, আয় বিমলা, চলে আয়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফিরতে হােল বিমলাকে। যতদূর পর্যন্ত বিজয়কে দেখা গেল সে ফিরে ফিরে তাকাতে লাগলাে তার দিকে। মা’কে বললে, শতদল যে আমার সঙ্গে আসছিল মা, সে আবার কোথায় গেল? -তাইতাে, কোথায় গেল সেই মেয়েটি ? মায়ের মন হঠাৎ ঘঁৎ করে উঠলে শতদলের জন্যে। তবু আর দেরি করা উচিত নয় ভেবে সে বললে, যাক গে, তুই আয় । তিনজনে তারা এগিয়ে চললাে বিজয়দের বাড়ীর দিকে। চোখের জল মুছতে মুছতে শতদল তখন রেলষ্টেশনের পথ ধরেছে। গ্রাম দেখবার শখ তার মিটে গেছে একেবারে। আজকের এই বিপর্যয়ে শুধু যে রায়েদের বাড়ীই ধ্বসে যাচ্ছে তা নয়, শতদলের মনের স্বপ্ন প্রাসাদও ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। বিজয়ের জীবনে যে আর তার কোনাে জায়গাই নেই তা সে মর্মে মর্মে বুঝেছে এবার। বিজয় আর, বিমলা সুখী হােক, বিরহ-বিচ্ছেদের শেষে হাসিমুখে আবার তারা ভালাে বাসার বাসা বাঁধুক, নিজের দুঃখ শতদল নিজের বুকেই বইবে চিরকাল, মনে মনে এই সঙ্কল্প নিয়েই নীরবে সে ফিরে যাচ্ছিল নিজের আশ্রয়ে। শেষ বিদায়ের আগে একবার গ্রামের দিকে আর একবার রেলষ্টেশনের দিকে তাকালাে শতদল, বুঝবার চেষ্টা করলাে দু’য়ের ভেতর কোনদিকে তার বেশি আকর্ষণ। দূরে সিগন্যালের গােলাপী আলোটাই যেন হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকতে লাগলো বারে বারে। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা ১৩১ না করে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই মিশিয়ে গেল শতদল। । বিজয়ের চোখের সামনে রায়েদের বিরাট বাড়ীটা তখন ধ্বসে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। অশ্বিনী তখনাে বেরুতে পারে নি বাড়ী থেকে। প্রাণের চেয়েও টাকার সিন্দুকের ওপর তার বেশি মায়া। বাড়ীর থাম, খিলান, কড়ি, বরগা সবই যখন ভেঙে পড়ছে দুপ, দাপ, করে তখনও সে সিন্দুক থেকে টাকাগুলাে বের করবার জন্যে ছুটেছে দোতলায়। নিজের ঘরে গিয়ে সিন্দুকের দিকে হাত বাড়াতেই সিন্দুক শুদ্ধ ঘরের কোণটা একেবারে ঝপাং করে নেমে গেল নীচের দিকে। আমার টাকা আমার টাকা বলে অশ্বিনীও হুমড়ি খেয়ে পড়লাে সেইখানে। তারপর বাড়ীর সঙ্গে সঙ্গে কেমন করে কোথায় যে সে তলিয়ে গেল নিজে তার কিছুই বুঝতে পারল না। অনেক খোঁজাখুজির পর বিজয় শুনতে পেল ইটকাঠের স্কুপের নীচে গর্তের ভেতরে কে যেন বাবা ! বাবা!' বলে কাৎরাচ্ছে। তখমাে ধোঁয়া বেরুচ্ছে সে গর্ত থেকে। বিজয় তবু অনেক কষ্টে নামলাে সেই গর্তের ভেতরে। নীচে গিয়ে দেথে একটা থাম চাপা পড়ে অশ্বিনী ... গােঙাচ্ছে। প্রাণপণ চেষ্টায় থামের একটা দিক একটু উচু করে ধরলো বিজয়। অশ্বিনীকে বললে, আমি থামটা তুলে ধরছি, আপনি বেরিয়ে যান ধীরে ধীরে। গলার আওয়াজ শুনে চোখ মেলে চাইল অশ্বিনী। বিজয়কে দেখে বললে, কে ? তুমি বিজয় ! আমাকে বাঁচাতে এসেছে? বিজয় বললে, হ্যা। আপনি আস্তে আস্তে উঠুন ওখান থেকে। আমার হাত ধরে উঠে আসুন। ঠেলে ঠেলে অশ্বিনীকে গর্ত থেকে ওপরে তুলে দিল বিজয়। চেঁচিয়ে বললে, আপনি চলে যান, এ-মাটি আবার বসবে। ১৪ ০ ওপরে উঠে অশ্বিনী সােজা হয়ে দাড়াবার চেষ্টা করতে লাগলাে। কিন্তু হাঁটু আর কোমরে এত ব্যথা যে দাড়াতে সে পারলো না কিছুতেই। শুয়ে শুয়ে সে হাত বাড়িয়ে দিল নীচে বিজয়ের দিকে। বললে, তােমাকে ছেড়ে চলে যাব ? ধরােআমার হাতখানা চেপে ধরে। এখনাে তােমাকে টেনে তুলবার মত গায়ের জোর আমার আছে। বিজয় ওপরে উঠবার জন্যে চেষ্টা করছিল প্রাণপণে। কিন্তু গর্তের ভেতর নামতে যা কষ্ট হয়েছিল, গর্ত থেকে ওপরে ওঠা তার চেয়ে ঢের বেশি কষ্টকর। দেয়াল বেয়ে বেয়ে কিছুদূর যদি বা সে উঠে আসে, এক- আধটা আলগা ইটে হাত দিলেই টাল সামলাতে না পেরে পা ফসকে অনেকটা নীচে আবার তলিয়ে যায় সে। ‘বিজয় ! বিজয় !' বলে ডেকে ডেকে অশ্বিনী বিজয়ের আর সাড়াই পাচ্ছিল না। তবু সে সমানে ডেকে চলেছিল, বিজয় ! বিজয়! কোথায় তুমি ? অনেকক্ষণ বাদে বিজয়ের সাড়া পাওয়া গেল নীচের থেকে : আপনি সরে যান ওখান থেকে পালিয়ে যান-আমি উঠছি। অনেকক্ষণ হােল, বিজয় কিম্বা বাবা কেউই আসছে না দেখে বিমলা এদিকে অস্থির হয়ে উঠলো। মা-কে বললে, , আমি একবার দেখবে? বাবাকে সেই যে খুজতে গেল, কই এখনও তাে এলাে না। মেয়েকে বাধা দেবার মতাে মনের জোর আর মায়ের ছিল না। বললে, যাও, দেখে এসাে গে। বিমলা চ'লে যেতে কমলকে বুকে চেপে ধরলাে মা! স্বামীকে ফেলে পালিয়ে আসতে তার মনেও কষ্ট হচ্ছিল ভয়ানক। দরুদ করে দু’চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলাে তার । বাড়ীর পথে দাদুর সঙ্গে দেখা হােল বিমলার। অক্ষত শরীরে বাড়ী থেকে বেরুতে পেরেছেন তিনি। বিমলাকে দেখে বড় রায় বললেন, এই যে দিদি, তােরা সব বেঁচে আছিস তাে? ১৪১ বিমলা ব্যস্তভাবে বললে, বাবাকে যে খুঁজে পাচ্ছি না, দাদু! বড় রায় বললেন আমিও তো তাকেই খুঁজছি দিদি। দেখি একবার ঐদিকটা ভালাে করে । দাদু একদিকে বিমলা আর-এককিকে খুঁজে বেড়াতে লাগলাে বাবাকে। বাবার চেয়ে বিজয়ের জন্যেও কিছু কম দুশ্চিন্তা ছিল না বিমলার। বিজয় এদিকে অতিকষ্টে গর্ত থেকে ওপরে উঠে এসেছে। টানাহেঁচড়ার চোটে কপাল কেটে গেছে র, হাতে মুখে তার রক্ত আর কালিঝুলি মাখা। অশ্বিনীর অবস্থা আরো মারাত্মক। সারা শরীর তার কেটে- ছি’ড়ে তো গেছেই, সােজা হয়ে দাড়াবার ক্ষমতাটুকুও আর নেই তার। বিজয় তার হাত ধরে দাড় করালাে ! বললে, আসুন আমার সঙ্গে। বিজয়ের কঁাধে ভর দিয়ে অশ্বিনী বাড়ীর বাইরে পা বাড়াতেই দেখে বিমলা এসে হাজির। বিজয় বিমলাকে বললে, বারণ করলুম, তবু তুমি কি জন্যে এলে বলল তাে ? কোন জবাব দিল না বিমলা। মাথা নীচু করে বিজয় আর অশ্বিনীর পিছু পিছু চললাে সে। কমল তার মাকে নিয়ে আগেই এসে পৌঁছেছিল বিজয়দের বাড়ীতে। বিমলা এসে বাড়ীর দরজায় পা দিতেই মহামায়া নিজে এগিয়ে এলেন তাকে ভেতরে নিয়ে যেতে। হাসিমুখে বললেন, এলে বৌমা ! সেই তাে আসতে হােল । স্বামীর ঘর ছাড়া মেয়েদের কি আর উপায় আছে মা? তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন বিমলাকে, বিজয় কোথায় ? পূজামণ্ডপের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিমলা : ওই তে।। ৪২
মহামায়া দেখলেন, বিজয়ের কঁাধে ভর দিয়ে অশ্বিনী এসে পূজামণ্ডপের
পাশে দাড়িয়েছে। নিশ্চিন্ত হয়ে বিমলাকে সঙ্গে করে বাড়ীর ভেতরে
চলে গেলেন মহামায়া !
-
}
পূজামণ্ডপে লােকজন গিস গি করছে। সবাই তারা চেয়ে চেয়ে
দেখছে অশ্বিনীরায়ের কী দুরবস্থা ! যে চৌধুরীদের সঙ্গে একদিনের জন্যও
সদ্ভাব ছিল না তার, তাদেরই দরজায় আজ আশ্রয় নিতে আসতে হয়েছে
তাকে। অশ্বিনী নিজেও সেজন্যে লজ্জিত হয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে সে
বিজয়কে বললে, আজ তােমারই কাধে ভর দিয়ে তােমারই দরজায় আমাকে
আসতে হোেল বিজয়।
-এমনিই হয়। বিজয় বললে। ধ্বংসের দেবতা কখন যে কেমন
করে মানুষের দর্পচূর্ণ করেন তা কেউ বলতে পারে না, একথা জীবনে
বারবার টের পেয়েছে বিজয়।
অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলো, আমাকে তুমি কেন বাঁচালে? 'তােমার স্ত্রী
বিমলার বাবা আমি, সেইজন্যে ?
বিজয় বললে, আজ্ঞে না। যারা দুর্গত, যারা দুঃস্থ তাদের দুঃখ-বেদনা
দূর করাই আমার জীবনের এক মাত্র লক্ষ্য।
পরের করুণার প্রত্যাশী হয়ে বেঁচে থাকতে হবে, তা ভাবতেও
অশ্বস্তি লাগছিল অশ্বিনীর। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সে বললে, আমাকে
তুমি না বঁাচালেই পারতে। আজ আমার মাথা গুজবার ঠাইটুকু
পৰ্যন্ত নেই।
বিজয় আশ্বাস দিল, আছে।
-আছে ? বিস্ময়ের অবধি রইল না অশ্বিনীর।
বিজয় আবার জোরের সঙ্গে বললে, হ্যা, আছে।
অশ্বিনী জিজ্ঞেস করলাে, কোথায় ?
? হাত বাড়িয়ে সামনের লােকজনদের দেখিয়ে দিয়ে বিজয় বললে, এই এদের সঙ্গে। সামনে দাড়িয়েছিল অশ্বিনীদেরই আশ্রিত কুলিমজুর, প্রজাখাতকের দল। সবাই তারা অবাক হয়ে গেল বিজয়ের কথা শুনে। এতবড় কলিয়ারীর মালিক, এমন নামজাদা জমিদার অশ্বিনীরায়—সেও কিনা শেষ পৰ্যন্ত হাত মেলাবে এসে তাদেরই সঙ্গে। অশ্বিনীর অনুচর কার্তিক তত ভীড়ের ভেতর থেকে হেসেই উঠলাে হে-হে করে। তেজের আগুন নিভে গিয়েছিল অশ্বিনীর। ধমক দিতে গিয়ে সে আর ধমক দিতে পারলাে না। নরম হয়ে বললে, হাসি হচ্ছে, কার্তিক কার্তিক তাড়াতাড়ি সামলে নিল, আজ্ঞে না, হাসি নি তাে। তারপর মিথ্যে করে পাশের লােকটাকে সে ধমক দিয়ে বললে, এই! হাসছিস কেন ? আজ আমাদের বাবুর দুঃখের দিনে হাসে? অশ্বিনীর দিকে চেয়ে বললে, এরা বলছে-ওই পিতিমে নিয়ে যাবে আপনাদের দুয়াের দিয়ে। তা আমি বলছি—যা দেখে আয় গে—বাবুদের সে-দুয়াের কি আর আছে ? বাড়ীশুদ্ধ তলিয়ে গেছে। আর বাবুদের পিতিমে? আহা, মায়ের কী সুন্দর চেহারাই না হয়েছিল এবছর, তা মা-ও নজ্জায় হব হববর করে একেবারে পাতাল প্রবেশ করলেন। কার্তিকের কথা বলবার ঢঙ দেখে সবাই হেসে উঠলাে হাে-হহ করে। বিজয় ধমক দিল, এই কার্তিক, কী হচ্ছে? নিজের দোষ ঢাকতে কার্তিকও সবার দিকে মুখ খিচিয়ে বললে, আ, দাত বের করে হাসছে দেখুন না! নিমকহারামের দল যতাে সব! দুঃখের হাসি হেসে অশ্বিনী বললে, এই এদের কাছে আমাকে আশ্রয় নিতে বলছে। বিজয় ? বড় রায় এতক্ষণে পূজামণ্ডপে এসে পৌছেছিলেন। অশ্বিনীর কথা শুনে তিনি বললেন, না-না, আয় যদি নিতেই হয় অশ্বিনী, আয় আমার সঙ্গে। ১৪৪ অশ্বিনীর হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রতিমার পায়ের কাছে তিনি বসিয়ে দিলেন তাকে। বললেন, এইখানে বােস্ তুই। এর চেয়ে মানুষের নিরাপদ আশ্রয় আর কোথাও নেই। বিজয় বড় রায়ের দিকে চেয়ে বললে, সেটা আপনার জন্যে হতে পারে কিন্তু ওঁর জন্যে নয়। বড় রায় জিজ্ঞেস করলেন, কেন ? বিজয় বললে, আপনার হয়তো বিশ্বাস আছে, কিন্তু যে অবিশ্বাসী তার কাছে ৭ প্রাণহীন মাটির পুতুল। তার চেয়ে এই যে অস্পৃশ্য মূর্খের দল আপনাদের দুঃখদুর্দশায় যাদের এতটুকু সহানুভূতি নেই-- আজ যারা আপনার দুঃখে হে-হে করে হাসতেও লজ্জা বােধ করে না—নেমে আসুন, আপনার সিংহাসন থেকে--হাত বাড়িয়ে দিন ভাই বলে—ওরাই আপনাকে রক্ষা করবে, প্রয়ােজন হলে অকাতরে প্রাণ দিয়ে দেবে আপনাকে বাঁচাবার জন্যে। বড় রায় জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে এই প্রাণহীন মাটির প্রতিকে এখানে প্রতিষ্ঠা করে ওদের এই উৎসবের আয়ােজন তুমি কেন করেছ, বিজয় ? বিজয় বলে, এ শুধু উপলক্ষ্য মাত্র, ওদের সঙ্গে এক হয়ে দাড়াবার উপলক্ষ্য।আপনারা এতকাল টাকার জোরে পৃথক হয়ে ছিলেন, আজ এই আকস্মিক বিপদ আপনাদেরও এইখানে টেনে এনে ওদের সঙ্গে এক করে দিয়েছে।--ওই মাটির ঠাকুরের কাছে আশ্রয় নেবার ছল করে বৃথা আর সময় নষ্ট করবেন না,আসুন, জীবন্ত মানুষের পাশে এসে দাড়াবেন আসুন। .. তুমিও একে মাটির ঠাকুর ব’লছে? সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেন বড় রায়। —অনেক দুঃখে ব’লছি। বলতে বলতে আবেগে কেঁপে ওঠে বিজয়ের গলা।—এইরকম ছত্রিশ কোটি দেবতার সেবক আমরা, ছত্রিশ ১৪৫ রায়চৌ—১.
কোটি জাতের সৃষ্টি করেছি। দেবতার নামে ধর্মের ধ্বজা উড়িয়ে মানুষের ধর্ম ভুলে গেছি, পশুর ধর্ম গ্রহণ ক'রে শেষে জানােয়ারের মত খাওয়া- খাওয়ি মারামারি করে আমাদের উন্নতির পথ-মুক্তির পথ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে বসে আছি। এতবড়াে সত্য কথা এমন স্পষ্টভাবে এর আগে কখনাে শােনেন নি প্রতাপ রায়। বিজয়ের ঐকান্তিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান তিনি। বিজয়ের কাছে এগিয়ে এসে তিনি বলেন, বিজয় ! বিজয় ! তােমার মুখে এসব কথা তাে আমি কোনােদিন শুনি নি। তুমি-তুমি কি চাও বিজয় ? মনের কথা বলতে বিজয়ের আর ভয় ছিল না কাউকে। তার মনে হচ্ছিল সে আজ দিগ্বিজয় করে এসেছে, তার চিন্তা-তার সাধনা দিয়ে সকলকে অনুপ্রাণিত করে ভােলাই এখন তার কাজ। দৃপ্তকণ্ঠে দীপ্তচোখে সে বলতে লাগলো, আমি চাই—কিছুদিনের জন্যে অন্ততঃ আমাদের দেশ থেকে সমস্ত দেবতা অন্তর্হিত হােন-একমাত্র দেবতা জেগে থাকুন শুধু আমার দেশ, আমার হিন্দুস্থান, আমার ভারতবর্ষ ; আর এই দেশের মাটিতে যে-মানুষ জন্ম গ্রহণ করেছে সেই মনুষ্যজাতি! এই মানুষের কল্যাণ কামনায়—আর এই পরাধীন দেশের শত সহস্র লক্ষ কোটি মানুষের মুক্তি কামনায়, আশীৰ্বাদ করুন, আমি যেন আমার শেষ রক্তবিন্দুটি পৰ্য্যন্ত, উৎসর্গ করে দিতে পারি। বিজয়ের কথায় উপস্থিত সকলেই যেন প্রাণের উন্মাদনায় চঞ্চল হয়ে উঠলো। বিজয় যে বিরাট কাজে আত্মােৎসর্গ করেছে, অনুতপ্ত অশ্বিনীর ইচ্ছে হােল সে-ও এবার তারি সঙ্গে যােগ দেয়। সমস্ত গায়ের জোর একত্র করে ঠেলে উঠলাে সে মাটীর থেকে। বিজয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বললে, বিজয় ! আমাকে তােমার সঙ্গে নাও ! বিজয়ও অশ্বিনীর হাত ধরে বললে, আসুন! তারপর গরীব-দুঃখী, কুলিমজুরদের সে ডাক দিয়ে বললে, এসাে ১৪৬ । -- তােমরাও এস। এইখানে এই জননী জন্মভূমির নামে এসাে আমরা সবাই মিলে শপথ গ্রহণ করি-ভারতের মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক আমরা, পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য থােক। বল, হয় স্বাধীনতা, নয় মৃত্যু।-বন্দেমাতরম ! মিলিতকণ্ঠে সাড়া দিল সবাই : বন্দেমাতরম্ । পূজামণ্ডপের চূড়ায় ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয়-নিশান তখন শান্ত বাতাসে পতপত করে উড়ছে। সমাপ্ত- ১৪ ৭ ৫, বীতংস ২, অতুলচন্দ্র গুপ্তের দিল্লী চলে ২০ পরম তৃষ্ণা 8, ২। ১ শনি চক্র ১০ ৩. । শ্যামাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়ের নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিমিরতীর্থ পঞ্চাশের মন্বন্তর ( ৪র্থ সং) ২, ২৩ হাঁসুলী বাঁকের উপকথা রাষ্ট্র সংগ্রামের এক অধ্যায় ২ দুঃশাসন ২, হারাণ সুৰ (২য় সং) ডাঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের স্বর্ণসীতা ২• সূর্যসারথী ৩, চৈতালী ঘূণি (৪র্থ সং) বৈদেশিকী(২য় সং) গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দার দ্বীপান্তর (২য় স° ) মা (ঋষিদাস অনূদিত) ২০ গোপাল ভৌমিকের সমাজ ও বিবাহ , আজাদ হিন্দ গ্রন্থমালা ১া ভারতের মুক্তিসাধক (২য় সং ২০ নেতাজী সুভাষচন্দ্রের সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের মহেন্দ্র রায়ের সমাজ ও সাহিত্য (২য় সং) ২০০ নীগররঞ্জন গুপ্তের .প্রেমেন্দ্র মিত্রের ম্যাক্সিম মকী ২. ভাবীকাল (২য় সং) মুক্তি পতাকা তলে শৈল চক্রবর্তীর জ্যোতি প্ৰসাদ বসুর কুড়িয়ে ছড়িয়ে যাদের বিয়ে হ’ল (৩য় সং} ৩ • নেতাজী ও আজাদ কুহকের দেশে কাটুন ২, কৌতুক ১৫০ নীহার রঞ্জন গুপ্তের হিন্দ ফৌজ ২৪ যাদের বিয়ে হবে শান্তিলাল রায়ের অদৃশ্য শত্রু শ্ৰচপলাকান্ত চার্যের ১ আরাকান ফ্রন্টে কংগ্রেস-সংগঠন বাংলা রাসবিহারী বসুর রক্ত সংঘ sho ওয়েল উইল্কির ড্রাগন বিপ্লবীর আহ্বান ওয়ান ওয়াল্ড (২য় সং) সরােজকুমার রায় চৌধুরীর নৃপেন্দ্রনাথ সিংহের ভবানী মুখোপাধ্যায়ে মহাকাল ভারত ছাড় একালিনী নায়িকা '৫২-র সেরাগঞ্জ সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রমথনাথ বিশীর নন্দগোপাল সেনগুপ্তের জাপানী বন্দ-শিবিরে বাঙালী ও বাংলা সাহিত্য যৌবন জলতরঙ্গ উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ডাকিনী কাছের মানুষ রবীন্দ্রনাথ ১৫০ ছদ্মবেশী ৩ রাজপথ ৪, পরিহাস বিজল্পিত আশাবরী ৩০ দিকশূল ৪|• ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের বনফুলের ভাগীরথী বহে ধীরে অমূল তরু (২য় সং) বনফুলের গল্প (২য় সং) মনোজ বসুর নঞতৎপুরুষ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের শত্রু পক্ষের মেয়ে বিষের ধোঁয়া ( ৩য় সং) ভূগেদর্শন (২য় সং) দৈনিক (চৰ্থ সং) আরও কয়েকটি পঞ্চভূত ১• লাল পাঞ্জা ১• ভূলি নাই (৯ম সং) নবেন্দু ঘােষের গােপন কথা ২• বুমেরাং ২• ওগাে বধু সুন্দরী ডাক দিয়ে যাই (যু সং) অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের একদা নিশীথকালে (৩য় সং) ২• এই সীমান্তে ২• কালাের কাঠ-খড়-কেরােসিন নুতন প্রভাত (৩য় সং) নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত আসমান জমিন ২া প্লাবন (২য় সং) ১০ ১৩৫১র সেরাগল্প এবােধকুমার সান্যালের পৃথিবী কাদের ( ২য় সং) • মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফরান্ত ২ স্বাগতম (৩য় সং) ২, বনমৰ্ম্মর (৩য় সং) বা প্রতিবিম্ব ১ চিন্তামণি ১৭ পঞ্চতীর্থ (২য় সং) নরখ(৩য় সং) দিবারাত্রির কাব্য (২য় সং ২ বেঙ্গল পাবলিশাল-১৪, বঙ্কিম চাটুজ্জে স্ট্রীট, কলিকাতা-১২ ২১ ১০ ১া ২, ৩, ২ অ• qs • ১৮ ১৭
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.