Makardah Saraswat Library, Howrah

Leniner Smriti

Chakrobarty, Latika · 2009/08/21

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

লেনিনের স্মৃতি
ক্লারা জেটকিন
( ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক ভূমিকা লিখিত)
অনুবাদ : লতিকা চক্রবর্তী
পুথির
২২, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট;
কলিকাতা

প্রথম প্রকাশ-চৈত্র, ১৩৫২
দাম দেড় টাকা
২৫, রায়বাগান ষ্ট্রীট, কলিকাতা, ইকনমিক প্রেস হইতে নগেন্দ্র বর্ধন কর্তৃক মুদ্রিত
২২, কর্ণওয়ালিস দ্রুট, কলিকাতা, পুথিঘরের পক্ষ হইতে
সতীশ রায় কর্তৃক প্রকাশিত

ভূমিকা
আজকাল বাঙ্গলা ভাষাতে কমুনিষ্ট এবং সাধারণ
মাক্স বদীয় সাহিত্য প্রচুর ভাবে অনুবাদিত হইতেছে।
এতদ্বারা বাঙ্গালী পাঠক রাজনীতিক ও অর্থনীতিক
সমস্যাগুলির বিজ্ঞানসম্মত পরিচয় লাভ করিতেছেন এবং
বঙ্গসাহিত্যের কলেবরও তাহাতে বহুল পরিমাণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত
হইতেছে। এই অবস্থায় কুমারী লতিকা চক্রবর্তী “লেনিনের
স্মৃতি” নামক ক্ষুদ্র পুস্তিকাটি ইংরেজী হইতে অনুবাদ করিয়া
বঙ্গভাষী পাঠকদের উপহার প্রদান করিতেছেন। এই গ্রন্থের
লেখিকা ভূতপূৰ্ব্ব জাৰ্মাণ কমুনিষ্ট নেত্রী বৈপ্লবিক জগতে
“ক্লারা সেটকিন” নামে পরিচিত ছিলেন তিনি লেনিনের
বহুকালের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন এবং তাহার সহিত
ব্যক্তিগত আলাপ-পরিচয় প্রভৃতি এই পুস্তিকাতে লিপিবদ্ধ
করিয়াছেন।
কমরেড ক্লারা সেটকিন জাৰ্ম্মাণির একজন অতি পুরাতন
সােস্যালিষ্ট কর্মী ছিলেন। তিনি প্রথমে শিক্ষয়িত্রী ছিলেন,
কিন্তু সােস্যালিষ্টদের প্রতি জাৰ্ম্মাণির তৎকালের চান্সেলর
বিসমার্কের নির্যাতনের ফলে তাঁহাকে বিদেশে বহুদিন
ছদ্মনামে বাস করিতে হয়। তিনি সােস্যালিষ্ট আন্দোলনের
মধ্যে বরাবরই বামপন্থীয় ছিলেন এবং জাৰ্মাণ বিপ্লবের সময়ে

{
“যদি আমরা বুর্জোয়া শ্রেণীর বিপক্ষে সংগ্রাম করিয়া জয়ী
হইতে চাই তাহা হইলে আমরা কবিতা লিখিব না এবং স্বপ্ন
দেখিব না। আমরা অতি ধীর ভাবে জগতের অর্থনীতিক
ও রাজনীতিক পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করিব, আর আমরা অবশ্য
জয়লাভ করিব।”
আবার এই ব্যাপারে কতিপয় জাৰ্মাণ শ্রমজীবী-সম্বের
কমরেডদের সহিত কথােপকথন-কালে লেনিন গণশ্রেণীর
মধ্যে প্লানানুযায়ী সংঘবদ্ধভাবে কৰ্ম্ম এবং কেন্দ্রীভূত কৰ্ম্মের
ও কঠোর বাধ্যতার প্রয়ােজনীয়তা বুঝাইয়া দেন। এতদ্বারা
একটি বৈপ্লবিক পার্টি কি ভাবে পরিচালিত হইবে
লেনিনের কথায় তাহারই ইঙ্গিত পাওয়া যাইতেছে।
লেনিনের আন্তর্জাতিকতার মধ্যে মূল জাতিগত কোন
সংস্কার ( Racialism} ছিল না। যখন সেটকিন তাহার
বক্তৃতার ভঙ্গির সহিত টলষ্টয়ের সত্য ব্যক্ত করার ভঙ্গির সহিত
সাদৃশ্য অবলােকন করিয়া বলেন : “হয়ত ইহা শ্লাভদের
মূল জাতিগত বৈশিষ্ট্য?” তাহার উত্তরে লেনিন বলেন ।
“আমি ইহা জানি না। আমি কেবল এই জানি যে বক্তৃতা
দিবার সময়ে আমি দর্শকদের অপেক্ষা শ্রমিক ও কৃষকদের
বিষয়েই সৰ্ব্বদা চিন্তা করি। যখন একজন কমুনিষ্ট বক্তৃতা
করিবে, তখন গণশ্রেণীর হইয়াই সে কথা কহিবে।”
ইহা আশ্চর্যের কথা যে জগত লেনিনকে বামপন্থীদের
নেতা বলিয়াই জানে। কিন্তু ইহা আপেক্ষিক ভাবেই প্রযােজ্য।
সােস্যালিষ্ট আন্দোলনের মধ্যে লেনিন বামপন্থীয় ছিলেন, কিন্তু

কমুনিষ্ট আন্দোলনের তথাকথিত অত্যধিক বামপন্থীদের তিনি কটাক্ষপাত করিতেন। তাহার রচিত “Left-handed radicalism-An infantile disorder” নামক পুস্তকই তাহার সাক্ষ্য প্রদান করে। পুনঃ সেটকিনের স্মৃতি” পুস্তিকাতে লেনিনের সহিত কথােপকথনে তাহা স্পষ্ট ব্যক্ত হইয়াছে। এই বিষয়ে তাহার ডায়লেকটিক জ্ঞান ও তাহার গভীর দূরদৃষ্টিরই পরিচয় পাওয়া যায়। এই জন্যই সাম্রাজ্য- বাদের অধীনস্থ শােষিত ও নিপীড়িত দেশসমূহের স্বাধীনতা- কৰ্ম্ম ও কর্মীদের জন্য তাহার “ঔপনিবেশিক দেশসমূহে কৰ্ম্ম বিষয়ে মন্তব্য” (Thesis on colonial countries) নামক গ্রন্থে অধীনতা শৃঙ্খলে আবদ্ধ প্রাচ্যের দেশসমূহে তথাকার রাজনীতিক বাতাবরণ অনুযায়ী কৰ্ম্মপ্রণালী প্রদত্ত হইয়াছে। এই স্থলে ইহাও জ্ঞাতব্য যে ১৯২০ খ্রী°তে মস্কোতে হাত- রাসের কুমার মহেন্দ্র প্রতাপ, অধ্যাপক বরকতউল্লা প্রভৃতি কতিপয় ভারতীয় বৈপ্লবিক লেনিনের সাক্ষাৎ লাভ করেন। মহেন্দ্র প্রতাপ ইতঃপূৰ্বেই তাহার“প্ৰেমধৰ্ম্ম বিষয়ক পুস্তিকা- সমূহ লেনিনের পাঠাৰ্থ তাহার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন । সাক্ষাৎ কালে তিনি লেনিনকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি এই পুস্তিকাগুলি পাঠ করিয়াছেন কিনা এবং এ বিষয়ে তাঁহার অভিমত কি? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, “ইহার দ্বারা তােমাদের দেশের মুক্তিসাধন হইবে না, আমাদের দেশেও টলষ্টয় প্রভৃতির। ধৰ্ম্ম দ্বারা মুক্তি আনয়নের প্রচেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু কৃতকার্য হয় নাই। যাও, দেশে ফিরিয়া

ly০
যাও এবং শ্রেণীসংগ্রাম প্রচার কর, তাহা হইলেই তােমাদের
দেশের স্বাধীনতার পথ নিকটতর হইবে”। তৎপর,
লেনিন শুনিলেন যে এই ভারতীয়দলের সমভিব্যাহারী
ইব্রাহিম ( অধ্যাপক বরকতউল্লার চাকর ) হইতেছেন
পাঞ্জাবের একজন কৃষক শ্রেণীর লােক। তাহা শুনিয়া
তিনি এই বাবুদের দিকে পশ্চাৎ ফিরিয়া ইব্রাহিমের সঙ্গে
অর্ধঘণ্টা ধরিয়া ভারতের কৃষকের অবস্থা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ
করেন। (ইব্রাহিম সাহেব এখনও জীবিত আছেন এবং
সগৌরবে এই ঘটনাটি স্মরণ করেন)।
১৯২১ খ্রীতে আমি যখন মস্কোতে যাই তখন শ্রবণ করি,
লেনিন ভারতের কৃষকদের অবস্থা বিষয়ে জ্ঞাত হইবার
জন্য তৎসম্বন্ধের পুস্তকসমূহ পাঠ করিতেছেন। এসিয়ার
মূলসমস্যা কৃষকের সমস্যা, ইহা তাহার মনে তখন স্পষ্টভাবে
অঙ্কিত হইয়াছে। এইজন্যই উক্ত বৎসরে ভারত সম্বন্ধীয়
আমার Thesisএর উপর তাহার কঠোর মন্তব্য তিনি
আমাকে ইংরেজী ভাষায় লিখিত পত্ৰদ্বারা জানান এবং
সেই সঙ্গে আমায় নিম্নলিখিত অনুজ্ঞা প্রদান করেন : “we
should not talk about the social classes. I think
we should abide by my thesis on colonial
question. Gather statistical facts about the
peasant movement if there be any in India.”
ইহার সরলার্থ : সামাজিক শ্রেণীবিষয়ে বাদানুবাদ করিয়া
কালক্ষেপ করার প্রয়ােজন নাই। ভারত বিষয়ে আমার

ly/
Thesis গ্রহণ করিয়া কৰ্ম্ম কর আর ভারতে যদি কৃষক
আন্দোলন থাকে তাহা হইলে সেই বিষয়ের সংখ্যাশাস্ত্রানুযায়ী
সংবাদ সংগ্রহ কর। এতদ্বারাই প্রতীত হয় দেশসমূহের
অর্থনীতিক রাজনীতিক বাতাবরণানুযায়ী ডায়লেকটিক জ্ঞান
তাহার কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল।
আবার সেটকিনের কাছ হইতে আমরা এই সংবাদ পাই
যে, লেলিন বলিয়াছেন, স্ত্রীলােক তাহার সামাজিক সাম্যের
অবস্থা প্রলেটারীয় রাষ্ট্রেই পাইবে। ইহার অর্থ স্ত্রীলােক
তাহার যথার্থ মৰ্যাদা ও পদ সৰ্বহারাদের দ্বারা স্থাপিত
সমাজেই প্রাপ্ত হইবে। এই সঙ্গে তিনি ইহাও নির্দেশ
দিয়াছেন যে ফ্রয়েড দ্বারা সৃষ্ট তথাকথিত “যৌন বিজ্ঞান”
তিনি মানিতেন না; বুর্জোয়া সমাজের অপবিত্র জমি—
“the dirty soil of bourgeois society” ইহার উপযুক্ত
উদগমস্থান বলিয়া তিনি ঘৃণা প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি
স্পষ্ট ভাবে বলিয়াছেন কমুনিষ্ট পার্টি এবং শ্রেণীজ্ঞানযুক্ত
সৈনিক প্রলেটারিয়েটের মধ্যে ইহার স্থান নাই।
এই কথা এই স্থলে আমাদের বিশেষ করিয়া অনুধাবন
করিতে হইবে, কারণ বলশেভিক আন্দোলনের বিপক্ষে নানা
প্রকারের যৌন অপকর্মের অপবাদ প্রদত্ত হয়, এমন কি এই
সঙ্গে শত্রুরা অম্লান বদনে লেনিনেরও নানা বদনাম দিয়াছে।
কিন্তু সেটকিনের কাছে হইতে আমরা লেনিন বিষয়ে তাঁহার
নিজের মন্তব্য শুনি যে তিনি একজন “gloomy ascetic”
(কঠোর সংযমী ) আর যৌনস্বাধীনতা বিষয়েও তাহার

|| ০ মত হইল “This liberation of love is neither new nor Communistic” (প্রেমের এই স্বাধীনতা নূতন ব্যাপারও নয়, কমুনিষ্ট মতানুযায়ীও নয় )। এই যৌন- বিজ্ঞানের আলােচনার পরিবর্তে তিনি তরুণদের স্বাস্থ্যজনক খেলা, সাঁতার, দৌড়, বিভিন্ন প্রকারের শারীরিক ব্যায়াম এবং নানাবিধ মানসিক চৰ্চা প্রভৃতি করিতে বলিয়াছেন। কুমারী লতিকা চক্রবর্ত্তী সেটকিনের “লেনিনের স্মৃতি” বাঙ্গলায় অনুবাদ করিয়া সাধারণ পাঠকের এবং মার্ক্সবাদীদের ধন্যবাদের পাত্র হইয়াছেন। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদই এই পুস্তিকার মূল্য নির্ধারিত করে, তাহা ছাড়া এই গ্রন্থে সৰ্ব্ব- হারাদের গঠিত রাষ্ট্রে নৃতন সমাজগঠনের সূত্রগুলি লেনিনের নিজ মুখে ব্যক্ত হইয়াছে। আশা করি এই পুস্তিকা পাঠে এই দেশের নিরপেক্ষ সমাজ-হিতাকাঙ্ক্ষী ভবিষ্যৎ সমাজ- সংগঠনের ইঙ্গিত পাইয়া নিজের কর্মের পথে অগ্রসর হইবেন। ৩নং গৌরমােহন মুখার্জী দ্রীট, কলিকাতা, ১২।৩১৯৪৬ শ্রীভূপেন্দ্রনাথ দত্ত।

বিপ্লবের সূচনার পরে রুশ বিপ্লবের ঢেউ যখন সমস্ত
পৃথিবীকে আন্দোলিত করছে তখন লেলিনের সঙ্গে মস্কোতে
আবার আমার সাক্ষাৎ হয়। ১৯২০ সনের শরৎকালের
প্রারম্ভে, ক্রেমলিনের স্বেরডলােব হলে,
স্বেরডলােব হলে, আমি মস্কোতে
পৌছার অব্যবহিত পরেই পার্টির যে সভা বসে, খুব সম্ভব
তাতেই এই সাক্ষাৎ ঘটে ।
কিন্তু লেনিনের বিশেষ কোন পরিবর্তন দেখতে পেলাম না।
এমন কি বয়সে তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন বলেও মনে হয়নি।
আমার প্রথম সাক্ষাৎকালে তিনি যে পরিষ্কার কোটটি
পরিধান করেছিলেন, সেটা যেন তখনাে তার গায়ে ছিল
বলেই আমার মনে হচ্ছিল। ১৯০৭ সালে ষ্টাটুগাটে দ্বিতীয়
আন্তর্জাতিক সভাতে রােজা লুক্সেমবুগ (Rosa Luxemburg)
লেনিন সম্বন্ধে আমার কাছে একটা মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন ?
তিনি লেনিনকে দেখিয়ে তখন আমাকে বলেছিলেন যে, “ঐ
যে মানুষটি দাড়িয়ে আছেন, তাকে ভালরূপে লক্ষ্য করুন।
ইনিই লেনি। তার ইচ্ছাশক্তির প্রতীক ঐ মস্তকটি দেখুন।
কিছু কিছু এশিয়াই রেখা সহ প্রকৃত রুশীয় কৃষকের মতই
ঐ মস্তকটি। ঐ লােকটি অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করতে
প্রচেষ্টিত হবেন। তিনি নিজকে একেবারে নিঃশেষ করে
দেবেন, কিন্তু তবুও পেছুপা হবেন না।”

লেনিনের স্মৃতি
চেহারায় ও আদবকায়দায় লেনিন ঠিক আগেকার মতই
ছিলেন। তার আলােচনা জীবন্ত জ্বলন্ত ভাষায় পরিপূর্ণ ছিল।
পূৰ্বে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সভাগুলােতে লেনিন যে রকম
তার স্বভাবসিদ্ধ শান্তভাব ও দৃঢ়তার সঙ্গে সমস্ত ব্যাপার
পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পৰ্যবেক্ষণ করেছিলেন, এ সভাতেও তিনি
সবসময়ই সেরূপ স্বতঃস্ফূর্ত অটল শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন।
অন্যের বক্তৃতায় তিনি মাঝে মাঝে যে মন্তব্যগুলাে করছিলেন
এবং যে বড় বড় বক্তৃতাগুলাে তিনি নিজে দিয়েছিলেন,
সেগুলো শুনেই একথা বুঝা যাচ্ছিল যে দর্শনােপযােগী
কোন জিনিসই তঁার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও বুদ্ধি এড়াতে পারে না।
সমিতির অধিবেশনের কালে এবং তার পরেও আমি
বুঝেছিলাম যে, সমস্ত কমরেডদের সঙ্গে তার ব্যবহার সরল ও
ঐকান্তিক ছিল। আমি বলবাে, এটিই ছিল তার স্বভাব।
এই লােকটি কখনাে কোন ভান করতে পারেন না বলেই
আমার দৃঢ়বিশ্বাস।
লেনিন ছিলেন সেই বিশেষ পার্টির অদ্বিতীয় নেতা, যেই
দল তাদের চরম উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সম্পূর্ণ মাত্রায় সচেতন থেকে
কৃষকদের ক্ষমতার্জনের পথে পরিচালিত
করেছিল। এই দলই মজুর ও কৃষকদের বিশ্বাসভাজন হয়ে
তাদের নিজেদের দেশে সর্বহারার রাষ্ট্রাধিপত্য (Proletariat
Dictatorship) প্রতিষ্ঠা করেছেন। জগতের যে বৃহৎ
রাষ্ট্রটা সৰ্ব্বপ্রথম মজুর কৃষকদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে,
লেনিন ছিলেন সেই রাষ্ট্রের স্রষ্টা ও নেতা।
রুশীয় মজুর ও
এমন কি

লেনিনের স্মৃতি সােভিয়েট রুশিয়ার বাইরেও লেনিনের চিন্তাধারা ও ইচ্ছাশক্তি অগণিত লােকের মনে সর্বদা সজীব হয়ে থাকতাে। প্রত্যেক প্রত্যেক বিশিষ্ট ব্যাপারেই তাঁর মতানুযায়ী মীমাংসা করা হত। পৃথিবীর নির্যাতিত জনসমাজ তার নাম মাত্র শ্রবণে আশা ও মুক্তির স্বাদ পেত। “কমরেড লেনিন সাম্যবাদকে ( কমিউনিজম) প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য আমাদের পরিচালনা করছেন, শত বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হয়েও আমরা সেই পথেই চলব”, এই ছিল রুশ মজুরদের প্রতিজ্ঞা। তারা শীতে কাঁপছে, ক্ষুধায় মরছে, কিন্তু চোখে তাদের মানুষের মহামৈত্রীর স্বপ্ন। তাই অবর্ণনীয় বাধা- বিপদ উপেক্ষা করে তারা ছুটছে সংগ্রামের পুরােভাগে কিংবা শিল্প পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে । “কেন আমরা ভয় করব যে, আমাদের প্রভুগণ ফিরে এসে আমাদের জমিজমা কেড়ে নিয়ে যাবে ? আমাদের পিতৃস্বরূপ লেনিন এবং ট্রটস্কি তার লালফৌজের সাহায্যে আমাদের রক্ষা করবেন, এ ভাবেই কৃষকরা সব সময় চিন্তা করত। “লেনিন জিন্দাবাদ” এই কথাটি রুশীয় বিপ্লবে মজুর-কিসানদের মুক্তির পথের বিপদ- সঙ্কুল অভিযানে বিস্ময়াভিভূত হয়ে ইতালির শত শত মজুর তাদের দেশের অনেক গির্জার দেওয়ালে লিখে রেখেছিল। লেনিনের অধিষ্ঠিত পতাকাতলেই আমেরিকা, জাপান ও ভারতবর্ষের নির্যাতিত অধিবাসীরা তাদের প্রভুদের নাগপাশ হতে নিজদের মুক্ত করবার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। এই সেই লেনিন যিনি ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায়

৪
লেনিনের স্মৃতি
স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবার মত অনেক মহৎ কাৰ্য সাধিত
করেছিলেন, যার উপর জনগণের বিশ্বাস ছিল অগাধ, আর
যার উপর অফুরন্ত দায়িত্বসম্পন্ন কাজের গুরুভার ন্যস্ত ছিল।
কিন্তু তাকে দেখলেই বােঝা যেত তিনি অতিমাত্রায় সরল
এবং বিনয়ী। তিনি যেন সমস্ত কমরেডদেরই একজন
এভাবেই সর্বদা সবাইকার সঙ্গে আচরণ করতেন। তার
মধ্যে কোন বিশেষত্ব আছে বলে তার কোন কাজে বা ভাবে
কখনাে প্রকাশ পেত না; তিনি সত্যিকারের মহামানুষ
ছিলেন বলেই কখননা এ জাতীয় ভাব প্রকাশ করতেন না।
বিভিন্ন প্রদেশ হতে প্রেরিত সামরিক এবং বেসামরিক
বিবৃতিগুলো রাষ্ট্রদূতগণের নিকট শুনে তিনি তার উত্তর
প্রায়ই খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দিতেন। লেনিন সর্বদাই
অত্যন্ত প্রফুল্ল থাকতেন, তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে
সবাইকেই অভিনন্দিত করতেন কার্যপ্রণালী নির্ধারণ
প্রসঙ্গে অবশ্য মাঝে মাঝে বিশিষ্ট নেতাদের সঙ্গে একটু
বাদানুবাদ ও হত। আলোচনার মাঝে মাঝে তার বিশ্রামের
যে সময়টুকু নির্ধারিত ছিল, তখনাে সবাই মিলে লেনিনকে
বড় বেশী বিরক্ত করত। মস্কো, পিটার্সবুর্গ এবং যেখানে
এই নূতন মতের সুরের রেশ এরি মধ্যে গিয়ে পৌঁছেছিল,
বহুদূরের সে সব নানাদেশের পুরুষ এবং নারী করেডরা
তাকে চারদিকে বেষ্টন করে দাঁড়াত। “ভাডিমির ইলিচ,
একটু অনুগ্রহ করে...” করেড লেনিন, আপনি অমত
করবেন না: ” “ইলিচ, আমরা জানি যে আপনি...

লেনিনের স্মৃতি
কিন্তু...” এভাবে অনুরােধ, প্রশ্ন এবং প্রস্তাব সমকণ্ঠস্বরে
সবাই তাকে চারদিক থেকে তখন করতে থাকত। লেনিন
শান্তভাবে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে সবাইকার এসব
শুনতেন, এবং সব সময় ধীরভাবে সেগুলাের উত্তর পর্যন্ত
দিয়ে যেতেন, কখনাে তিনি একটু বিরক্ত পৰ্যন্ত বােধ
করতেন না। শুধুমাত্র নিজেদের পার্টি-বিষয়ক প্রশ্নগুলােই
যে অত্যন্ত মনােযােগ সহকারে শুনে তিনি সে সম্বন্ধে সঠিক
উত্তর ও পরামর্শ দিতেন তা নয় ; সবাইকার ব্যক্তিগত
সুখ দুঃখ সম্বন্ধেও তিনি সব সময় গভীরভাবে চিন্তা
করতেন। বিশেষতঃ যুব-সম্প্রদায়ের সহিত তার ব্যবহার
ছিল অতিমধুর, যেন সমানে সমানে বন্ধুভাবে মিশছেন,
অন্তরের প্রত্যেকটি সূত্রে যেন তারা বাধ্য। এমনিভাবে
লেনিন তার সহকর্মীদের সাথেও চলাফেরা করতেন, কোথাও
তার বয়সের জন্য ভারিক্কী চালের বা মুরুব্বিয়ানার
চিহ্নও থাকতাে না; বয়সে বড় হওয়াটাই সর্বাপেক্ষা বড়
গুণ, এমন ধারণাও জন্মত না। তার চাল-চলনে বা
কথাবার্তায় কখনাে প্রভুত্ব করবার কোন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ
পেত না। পার্টির লােকদের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ
পিতার ন্যায় ; তিনি তার নিজের মতকেই কখনাে চূড়ান্ত
কথা বলে মনে করতেন না, অন্যান্যদের মতবাদ এবং ধারণা
বুঝতে সৰ্ব্বদাই তিনি সচেষ্ট হতেন। এ জাতীয় আবেষ্টনীতে
লেনিনকে দেখে আমার তখনকার জার্মানীর “সােশ্যাল
ডেমােক্রেটিক পার্টির” ‘দলাধিপতির’ কৃত্রিম জাঁকজমকের
;

৬
লেনিনের স্মৃতি
কথা বেশ একটু তিক্ত ভাবেই মনে পড়ল। বিশেষ করে
মনে পড়ল সােশ্যাল ডেমােক্রেট এবাটের কথা, বুর্জোয়া-
পরিচালিত জার্মান প্রজাতন্ত্রের সভাপতিরূপে তিনি সে
সময়ে নীচ তাবেদারের মত উচ্চবর্গের কর্তাদের হাঁচিকাশি
নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এই দাস মনােভাবের ফলেই
সৰ্বহারার ঐতিহাসিক গুরুত্বে ও মানুষের গরিমায় এবার্ট
কিছুমাত্র গৰ্ববােধ করতে পারেন নি।
অবশ্য স্বীকার করতে
যে এসব ভদ্রলােকেরা
লেনিনের ন্যায় “বিদ্রোহাগ্নি জ্বালিয়ে তুলবার জন্য নির্বোধ
ও নির্ভীক” ছিলেন না। হেনরিক হাইন (জার্মান
গণতান্ত্রিক কবি) পুরাতন “রােম সাম্রাজ্যের শৈশব ক্ষেত্র”
এই জাৰ্মাণীতে তখনকার বত্রিশ জন রাজার রাজত্বকালে
যতটুকু শান্তি ও স্বস্তি পেয়েছিলেন, এখনকার দিনে
জার্মান পুঁজিবাদীর অধীনে এবার্ট প্রভৃতি তার চেয়ে বেশী
নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করতে পারেন। ক্রমবিবর্তমান
ঐতিহাসিক তাড়নায় এবং সামাজিক প্রয়ােজনে বিপ্লব যতদিন
পূর্ণমাত্রায় প্রকাশিত না হয় ততদিন তাদের এই শান্তি টিকে
থাকবে আর সমাজ সে দেশেও বজ্রস্বরে ঘােষণা করবে-
“মানুষের আত্মা, কোথায় তুমি?”

২
পার্টি সম্মেলনের অধিবেশনে লেনিনের সম্বন্ধে আমার যে
ধারণা জন্মেছিল তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ে
তা আরাে দৃঢ়তর হয়। পরবর্তী সময়ে পুনঃ পুনঃ আলােচনায়
আমার সেই ধারণাই গভীরতর হয়েছে। একথা অবশ্য
সত্য যে লেনিন বাস করতেন ভূতপূৰ্ব্ব জারের প্রাসাদ-দুর্গ
ক্রেমলিনে। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে প্রহরীদের পাশ
কাটিয়েই যেতে হত। কিন্তু এ নিয়মের কারণও ছিল—
বিরুদ্ধাবলম্বীরা তখন পর্যন্ত বিপ্লবী নেতাদের জীবন নাশের
চেষ্টা করছে। দরকার হলে লেনিন ওসব রাজকীয় প্রকোষ্ঠেই
সাক্ষাৎকারীদের সম্ভাষণ করতেন। কিন্তু তার নিজের
বাসস্থানটি ছিল একেবারেই সাধারণ, সাদাসিধে। “মস্কোর
সৰ্বনিয়ন্তা” এই নেতার আবাসের চেয়ে অনেক শ্রমিক কর্মীর
গৃহ বেশী সুসজ্জিত থাকত--আমি নিজেই তা দেখেছি।
আমি একবার লেনিনের স্ত্রী ও ভগ্নীর নৈশ ভােজনের সময়
উপস্থিত হওয়াতে তারা দুজনেই আমাকে তাদের সঙ্গে
খাওয়ার জন্য আন্তরিকতার সহিত অনুরােধ করেন। খাদ্য
সামগ্রী ছিল অত্যন্ত সাধারণ, নিতান্তই দুর্দিনােপযােগী ও
চা, কালাে রুটি, মাখন ও পনীর ব্যতীত আর কিছুই সেখানে
ছিল না। লেনিনের ভগ্নী নিমন্ত্রিতকে কিছু মিষ্টি পরিবেশন
করতে গিয়ে মােরব্বার পাত্রটিই শুধু পেয়েছিলেন। একথা
সবাই জানত যে, কৃষকেরা তাদের ‘ইলিচ’কে পরিষ্কার
আটা, শূকরের মাংস, ডিম এবং ফল প্রভৃতি সন্তুষ্টচিত্তে
}

৮ লেনিনের স্মৃতি ; ; উপহার দিত। কিন্তু এটাও সকলেরই জানা ছিল যে, লেনিন নিজের জন্য সে সব কিছুই নিতেন না সব কিছুই চিকিৎসালয় ও শিশুসদনগুলােতে পাঠিয়ে দিতেন ; লেনিনের পরিবার মজুরদের ন্যায় কঠোরভাবে দিন যাপন করতেন। ১৯১৫ সালে মার্চ মাসে বার্ণে সমাজতন্ত্রী মহিলাদের যে আন্তর্জাতিক অধিবেশন হয়েছিল ( ইন্টার ন্যাশনাল সােশ্যালিষ্ট উম্যানস কনফারেন্স ) তার পরে লেনিনের স্ত্রী কমরেড, ক্রুপস্কায়াকে আমি আর দেখি নি। দুরারােগ্য ব্যাধির কবল হতে তার মুক্ত হবার কোন আশাই ছিলনা। পীড়ার ছাপ তার কমনীয়তাপূর্ণ মুখমণ্ডল হতে তখনাে লােপ পায়নি। তিনি কিন্তু ঠিক আগেকার মত তখনাে সরলতা এবং শিষ্টতার প্রতীক ছিলেন। তঁার চুলগুলাে পেছন দিকে শক্ত করে জড়ানো থাকত, এবং তার পােষাক ছিল অতি সাধারণ। তাকে হঠাৎ দেখলে একজন সাধারণ গৃহকত্রী বলে মনে হত। তিনি সর্বদাই সময় বাঁচাবার জন্য অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকতেন। বুর্জোয়াদের ভাষায় ইনিই তখন “সুবৃহৎ রুশ সাম্রাজ্যের প্রধান মহিলা”। কিন্তু আত্ম- ভােলা এই নারীই আবার নির্যাতিত এবং নিষ্পেষিত জন- সাধারণের ও শ্রমিকদের জন্য নিজকে বলি দিতে সর্বপ্রথম এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতিই তঁাকে লেনিনের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছিল। সে জন্যই ক্রুপস্কায়াকে না ভেবে লেনিনকে ভাবতে গেলে লেনিন অসম্পূর্ণ থেকে যান। তিনি ছিলেন লেনিনের দক্ষিণ হস্ত লেনিনের স্মৃতি ঃ স্বরূপ”--তার প্রথম এবং প্রধান সেক্রেটারী । লেনিনের চিন্তাধারায় সর্বাধিক বিশ্বাসী কমরেড ছিলেন ক্রুপস্কায়া ; তিনি লেনিনের মতবাদকে সর্বত্র আপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা ও প্রচার করতেন ; তার জন্য বহু একান্ত বন্ধু সংগ্রহ করতেও যেমন তার শ্রান্তি ছিল না, তেমনি শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে তার মতবাদ প্রচারেও তার আলস্য ছিলনা। ছাড়াও তার একটি নিজস্ব কৰ্ম্মক্ষেত্র ছিল। তিনি সমস্ত অন্তর দিয়ে সেখানে আত্মনিয়ােগ করেছিলেন। সেই ক্ষেত্ৰ জন- সাধারণের শিক্ষার ক্ষেত্র। কমরেড ক্রুপস্কায়া শুধুমাত্র ক্রেমলিনেই লেনিনের প্রতিনিধি ছিলেন ভাবলে পরে অন্যায় করা হবে। লেনিন আর তিনি এক সঙ্গে কাজ করতেন, একসঙ্গে দু’জনায় নানা চিন্তায় উদ্বিগ্ন হতেন ; আবার লেনিনের কথামত তিনি কাজও করতেন এবং তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে থাকতেন। এরূপে তিনি শুধু সাময়িক ভাবে চলেছিলেন তা নয়, তিনি সারাজীবন ব্যাপীই এরূপ করে এসেছেন ; লেনিনের নির্বাসন বা কারাবাসের দরুণ বারবার দু’জনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও তার ব্যতিক্রম হত না। তার মাতৃ- সুলভ হৃদয় লেনিনের গৃহকে প্রকৃতই সৰ্বাঙ্গসুন্দর করে তুলেছিল। অবশ্য এ কাজে লেনিনের ভগ্নীর সাহায্যও ছিল প্রচুর। ঘর-সংসার বলতে জার্মান ফিলিষ্টাইনরা যা বােঝে লেনিনের ঘর সেরূপ ছিল না। এ গৃহে সমাগত লােকদের সঙ্গে এ গৃহের অধিবাসীরা এমনি একটি হৃদয়ের নিগূঢ় বন্ধনে এমন কি ১০ লেনিনের স্মৃতি সব সময়ই জড়িত হয়ে পড়তেন যাতে করে এ গৃহ হয়ে উঠেছিল একটা আধ্যাত্মিক আবাস। এখানে পরস্পর পরস্পরের সহিত আত্মীয়তাসূত্রে গ্রথিত হয়ে উঠত শুধুমাত্র তাদের সারল্য, সত্যানুরাগ, জ্ঞান এবং মহত্ত্বের জোরে। ব্যক্তিগত ভাবে করে ড ক্রুপস্কায়ার সঙ্গে আমি তখন খুব বেশী পরিচিত হয়ে উঠি নি। তথাপি তার গৃহে গিয়ে কোন রকম অসুবিধাই আমাকে ভােগ করতে হয় নি—তিনি আমাকে বন্ধুর ন্যায় পরম যত্ন করেছিলেন। লেনিন ঘরে ঢুকবার একটু পরেই পরিবারের সকলের দ্বারা অভিনন্দিত হয়ে একটা বড় বিড়াল এই “সন্ত্রাসবাদী নেতার কাধে লাফিয়ে উঠল, এবং পরক্ষণেই তার কোলে এমন পরম নির্ভাবনায় বসে পড়লো যে তখন সত্যি সত্যি আমার মনে হয়েছিল আমি আমার নিজের গৃহে অথবা রােজা লুক্সেমবুর্গের সঙ্গে বসে আছি, এবং রােজার বন্ধুমহলে সুপরিচিত তার ইতিহাস প্রসিদ্ধ বিড়াল ‘মিমি' যেন আমার সামনে। লেনিন এসেই দেখলেন আমরা তিনজন মেয়ে বসে শিল্প- বিদ্যা এবং শিক্ষাপ্রণালী সম্বন্ধে আলােচনা করছি। শেভিকরা এরি মধ্যে দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিরাট পরীক্ষা আরম্ভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। উদ্ভাবনী বুদ্ধি এবং সৃজনী শক্তির প্রেরণায় ও প্রচেষ্টায় তারা শিল্পকলার ও শিক্ষার নূতন পথ ইতিমধ্যেই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন বলে আমি মহোৎসাহে তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলাম। - লেনিনের স্মৃতি ১১ অবশ্য আমি একথাও গােপন করি যে, এ সব কাজ- গুলাের মধ্য দিয়েও তাদের অনেক অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতা, দ্বিধা ও পরীক্ষামূলক প্রয়াস দেখা যাচ্ছিল। নূতন কথাবস্তু, নূতন রূপ ও সংস্কৃতির নূতন পথের জন্য তাদের মধ্যে প্রাণময় পিপাসা জাগবার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক পাশ্চাত্যসুলভ কৃত্রিম রীতিনীতিও তাদের সাংস্কৃতিক জীবনে প্রবেশ লাভ করছিল। লেনিন তক্ষুনি খুব উৎসাহিত হয়ে আমাদের আলােচনায় যােগদান করলেন। প্রথমেই এই বলে লেনিন আলােচনা আরম্ভ করেছিলেন, “এই নবজাগরণ, এই সৃজনীশক্তি যা সােভিয়েট রুশিয়াতে এক নূতন শিক্ষা ও সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে সমর্থ হবে, তা ভালো, খুবই ভালাে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ঝড়ের মতাে বেগে এই যে বিকাশ চলেছে তাও সহজবােধ্য, এবং তা অত্যন্ত প্রয়ােজনীয়। যুগ যুগ ধরে যা কিছু অবহেলিত হয়ে আসছে আমাদেরই সে সব জিনিসগুলােকে আবার নূতন করে গড়ে তুলতে হবে। এই উদ্বেল আলােড়ন, নূতন সমাধানের ও নূতন শিল্পসূত্রের এই অস্থির অনুসন্ধান, কোনাে একটি শিল্প বা আধ্যাত্মিক ধারার “আজ জয় জয়কার”, আবার কালই তাকে জাহান্নামে পাঠানো এ সবই অনিবার্য। “কঠিন বন্ধনে আবদ্ধ শক্তিসমূহকে বিপ্লব আজ মুক্ত করে দিচ্ছে, আর গহন অতল থেকে তুলে সে শক্তিকে নিয়ে আসছে চোখের সম্মুখে। উদাহরণ নিতে পারি, একটু ভাবলেই দেখতে পাবেন, আমাদের দেশের চিত্রাঙ্কনবিদ্যা, ভাস্করবিদ্যা লেনিনের স্মৃতি এবং স্থপতিবিদ্যার প্রকাশ হয় ঠিক সেভাবেই যেভাবে জারের পারিষদগণের ফ্যাশান্ ও খেয়াল ছিল। যেমন ছিল অভিজাতদের ও পুজিপতিদের রুচি ও সখ। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভিত্তির উপর স্থাপিত সমাজে শিল্পী তার শিল্পকে ঠিক সেভাবেই রূপ দেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, যেভাবে সেটা বাজারে কাটতি হবে ; কারণ শিল্পীর এখানে ক্রেতা চাই। আমাদের এ বিপ্লব শিল্পীর উপর থেকে এই কঠিন স্কুল ব্যবস্থার চাপ সরিয়ে দিয়েছে। সােভিয়েট রাষ্ট্রকেই এখন তা শিল্পীদের অভিভাবক এবং পৃষ্ঠপােষকরূপে নিযুক্ত করেছে। প্রত্যেক শিল্পীই, এমন কি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক মানুষই, এখন তার আদর্শানুযায়ী নূতন জিনিস সৃষ্টির দাবী করতে পারেন- সে সৃষ্টি এখন সার্থক হউক আর ব্যর্থ ই হউক তাই আজ দেখতে পাচ্ছেন এত আলােড়ন, এত পরীক্ষা, এত ঘূর্ণাবর্ত । “কিন্তু আমরা সাম্যবাদী। তাই চুপ করে বসে থেকে বিশৃঙ্খলাকে যেমন খুশী গুলিয়ে উঠতে দিতে আমরা রাজী নই। সে বিষয়ে পূর্ণ মাত্রায় সচেতন হয়ে এই নূতন অভি- ব্যক্তিকে পরিচালিত করা, তাকে রূপদান করা, তার পরিণতি সুনিয়ন্ত্রিত করাই আমাদের কর্তব্য। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা এখনাে পেছনে পড়ে রয়েছি। আমার মনে হয় আমাদের মধ্যেও ডাক্তার কার্লষ্টাড এর মতন লােক আছে। আমরাও পুরাতনকে বড় বেশী ধ্বংস করতেই ব্যস্ত। পুরাতন হলেও যা সুন্দর তা আমাদের সংরক্ষণ করতেই হবে। তাকে আমরা নিদর্শনস্বরূপ গ্রহণ করব, কিছুতেই পরিত্যাগ করব,

লেনিনের স্মৃতি
না। শুধু পুরাতন বলেই কোনাে সত্যকারের সুন্দর জিনিসকে
কেন বর্জন করব ? চিরদিনের মত বিসর্জন দেব ?
তাকে আরাে নূতন বিকাশের উপাদানরূপে ব্যবহার করব না?
নূতনকে শুধু নূতন বলেই বা কেন দেবতার মত পূজা করতে
বসব ? এ তাে মূখত, নিতান্ত মূখ। তা অনেকাংশেই
আটের নামে ধরাবাঁধ ভণ্ডামি মাত্র। অনেকাংশেই শুধু
পাশ্চাত্য আট-ফ্যাশনের পূজা। নিশ্চয়ই তা জেনে বুঝে
করা হচ্ছেনা। আমরা খাটি বিপ্লববাদী কিন্তু বলতে বাধ্য,
সমসাময়িক সংস্কৃতির শীর্ষস্থানে আমরা দাঁড়িয়েছি। নিজেকে
“অসভ্য” বলে স্বীকার করতে আমি ভয় পাই না। আমি
এক্সপ্রেশনিজম ( প্রকাশবাদ ), ফিউচারিজম্ ( ভবিষ্যবাদ ),
কিউবিজম ( ত্রিফলকবাদ) প্রভৃতি অন্যান্য ইজকে
শিল্পপ্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলে মূল্য দান করতে পারি না।
ওসব আমি বুঝি না, ওসবে আমি কোন আনন্দ লাভ করিনা।”
আমাকেও স্বীকার করতে হল যে এ আমারও বুদ্ধির
অতীত--কেন উৎসাহবশে নাকের শিল্পরূপ ত্রিকোণ বলে
প্রতিভাত হবে, কেনই বা বৈপ্লবিক ঘটনার সংঘাতে মানুষের
দেহ দুটি রণ-পা’র উপর বসানো একটা রূপবান জড়পিণ্ড
হয়ে উঠবে, দুজোড়া হাত হয়ে উঠবে খাবার টেবিলের দু’
জোড়া কাটা। এ কথা শুনে লেনিন
উচ্ছ্বসিত হয়ে হেসে
আবার বলে উঠলেন, "হঁা ক্লার। আমরা দুজনে বুড়ো হতে
চলেছি।
এ বৈপ্লবিক আন্দোলনে আরও খুব অল্প কিছুদিন
নিজেদের তরুণ বলে চালাতে পারলেই আমাদের পক্ষে

১৪
লেনিনের স্মৃতি
যথেষ্ট।
এ শিল্পের সঙ্গে আমরা আর যেন সমান তালে
চলতে পারছিনা; কোনাে রকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছি।”
লেনিন আবার বলতে লাগলেন, “কিন্তু শিল্প বিষয়ে
আমাদের ব্যক্তিগত মতামত কিছু গুরুতর ব্যাপার নয়।
আমাদের দেশের মত এত বড় দেশে শিক্ষিত মাত্র কয়েক শত
লােককে অথবা হাজার কয়েক লােককেও শিল্পবিদ্যা যা
পরিবেশন করতে সমর্থ হয়, তাতেও কিছুই এসে যায় না।
শিল্প জনসাধারণের জিনিস। তার গভীর
গভীর মূল শ্রমিক
সাধারণের জীবনে থাকা চাই। তারা যাতে শিল্প বিদ্যার
প্রয়ােজনীয়তা বােঝে, তা ভালবাসতে শেখে, তাই করা
দরকার। তাদের চিন্তা, অনুভূতি এবং আকাঙ্ক্ষার মধ্যে
শিল্পবিদ্যার শিকড় থাকবে, তদনুযায়ী তা গড়ে উঠবে ;
তাদের মধ্যে যে শিল্পী রয়েছে শিল্প তাকে সচেতন করবে,
তাকে প্রকাশিত করে তুলবে । যখন অগণিত শ্রমিক ও
কৃষক সামান্য কালাে রুটিও খেতে পাচ্ছেন না তখন আমরা
স্বল্পসংখ্যক লােককে সুস্বাদু পিঠে ও চিনি খেতে দেব নাকি ?
শুধু বাস্তব ক্ষেত্রেই এই আমাদের নীতি তা বলছি মনে
করবেন না—শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই আমার কথা
শ্রমিক শ্রেণী এবং কৃষকদের কথা সর্বদাই আমাদের চোখের
সামনে রাখতে হবে। তারাই আমাদের হিসাবে অগ্রগণ্য,
তাদেরই স্বার্থে আমরা সব কাজ পরিচালনা করব – শিল্প ও
সংস্কৃতির বেলায়ও ঠিক এই আমাদের নীতি।
“শিল্পবিদ্যাকে জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে বলে

লেনিনের স্মৃতি
১৫
আমাদের সর্বাগ্রে প্রয়ােজন সাধারণ শিক্ষা ও সংস্কৃতির
স্তরকে উন্নত করা। সে দিকে আমাদের দেশের অবস্থা কি ?
দেশের শাসন-প্রণালী হস্তগত করে, এরি মধ্যে আমরা দেশের
সংস্কৃতিকে উন্নততর করবার জন্য যে সব বিরাট কাজ সম্পন্ন
করে ফেলেছি, তা দেখে আপনারা বিস্মিত হয়েছেন। বড়াই
করেও আমরা বলতে পারি যে, এ বিষয়ে আমরা
অনেকটাই এগিয়ে গেছি। মেনশেভিকগণ এবং তাদের নেতা
কৌটস্কিজ ( Kautskeys ) সৰ্ব্বদাই আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার
করে বেড়ান যে আমরা অনেক মানুষকে খুন করেছি। কিন্তু
আমরা শুধু খুন করিনি, মানুষের মন আলােকে উজ্জ্বলও
করেছি। অনেক মানুষের মন আলােক লাভ করেছে। কিন্তু
“অনেক” এই শব্দটি আমি বললাম শুধুমাত্র অতীতের এবং
তখনকার দিনের শাসকশ্রেণীর ও শাসকচক্রের পাপের সঙ্গে
তুলনা করে। মজুর ও কৃষকশ্রেণীর শিক্ষা ও সংস্কৃতির জন্য
প্রয়ােজন মত ব্যবস্থা করা আজ আমাদের কাজ-আমরাই
তাদের প্রাণে শিক্ষা ও সংস্কৃতির এ তীব্র আকাঙ্ক্ষা জ্বালিয়ে
দিয়েছি। শুধুমাত্র শিল্প কেন্দ্র মস্কো ও পেট্রোগ্রাডেই নয়,
তার বাইরে গ্রামগুলােতে পর্যন্ত এ সব ব্যবস্থা করতে
হবে। আমরা অতি দরিদ্র জাতি, প্রায় ভিক্ষুকের জাতি।
আমরা চাই বা না চাই বেশীর ভাগ বৃদ্ধ লােকই এখননা
সংস্কৃতির হিসাবে একেবারেই অবজ্ঞাত, তাদের উত্তরাধিকার
থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। অবশ্য জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাকে
ছড়িয়ে দেবার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। ছোট

"১৬ লেনিনের স্মৃতি ছােট শহর এবং গ্রামগুলােতে আমরা গ্রন্থশালার (Library) ও পাঠকেন্দ্রের ( Reading Huts ) আয়ােজন করেছি। নানা বিষয়ে ধারাবাহিক শিক্ষা দেবারও বন্দোবস্ত করেছি। সুন্দর সুন্দর নাটক অভিনয়ের এবং সঙ্গীতের জলসার ব্যবস্থা করেছি। সমস্ত দেশে শিক্ষার উদ্দেশ্যে মূকাভিনয় ( Tableaux ), ঘুরে দেখাবার মত ভ্রাম্যমান প্রদর্শনীরও বন্দোবস্ত আমরা করেছি। কিন্তু অবশ্য জ্ঞাতব্য প্রাথমিক জ্ঞান এবং প্রাথমিক সংস্কৃতি থেকেও বঞ্চিত কোটী কোটী নরনারীর পক্ষে তা কত সামান্য ! আজ এখন মস্কোতে দশ হাজার—অথবা কালকেই যখন আরো দশ হাজার লােক- আমাদের অভিনয়-নৈপুণ্য-পূর্ণ নাটক দেখে তার প্রশংসায় মুখরিত হয়ে উঠছে, তখনই আবার লাখ লাখ লােক উদগ্রীব হয়ে রয়েছে জানতে শুধুমাত্র কি করে বানান করতে শিখতে হয়, কি করে তাদের নিজেদের নাম লিখতে হয়, কি করে গুণতে হয়। তারা সংস্কৃতি চায়, শিখতে চায়, জানতে চায়, কেননা জগৎটা যে প্রাকৃতিক নিয়মে চলে, ‘স্বর্গাধিষ্ঠিত পিতা” বা তার যাদুকর বা ডাইনীর মন্ত্রেতন্ত্রে চলেনা, এ গভীর সত্য তারা এখন বুঝতে আরম্ভ করেছে।” আমি লেনিনের কথার মাঝখানেই বললাম “কম্‌রেড লেনিন, দেশবাসীর অজ্ঞতার জন্য এত বেশী ক্ষুব্ধ হবেন না। বিপ্লবকে এগিয়ে নেবার পথে এই অজ্ঞতাও কতকাংশে আমাদের সাহায্য করেছে। বুর্জোয়া ভাবধারায় ও কল্পনায় কৃষক ও মজুর শ্রেণীর মন আবদ্ধ ও কলুষিত হবার ৫।

লেনিনের স্মৃতি
১৭
--
পথে তা অন্তরায় হয়েছে। আপনাদের মতবাদ ও
আন্দোলন একেবারে নূতন জমিতে ফলপ্রসূ হচ্ছে। যেখানে
সমস্ত বন-জঙ্গল প্রথম উৎপাটন করতে হয় না, সেখানে
বপন করে ফসল ফলানোও অপেক্ষাকৃত সহজ।”
লেনিন উত্তর দিলেন, “হঁ্যা, এ কথা সত্য, কিন্তু এই
কথা খাটে অত্যন্ত সীমাবদ্ধরূপে, আর খাটবেও একটা
সীমাবদ্ধ সময়ের জন্য আমাদের বৈপ্লবিক আন্দোলনের
মধ্যে ; যতক্ষণ আমরা রাষ্ট্রক্ষমতা অধিকার করছি, পুরাতন
রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করছি, ততক্ষণ পর্যন্তই অজ্ঞতা নিয়েও
কাজ চলে। কিন্তু আমরা কি শুধু ধ্বংস করবার জন্যই
ধ্বংস করছি ? তাত নয় । আমরা উন্নততর এবং সুন্দরতর
সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই ধ্বংস করছি। গঠনমূলক কাজে অজ্ঞতার
উপযােগিতা একটুও নেই। মাক্স বলেছেন, মজুরদের
নিজেদেরই তাদের মুক্তির জন্য লড়তে হবে, আমি সে সঙ্গে
কৃষকদেরও নাম জুড়ে দিচ্ছি। আমাদের সােভিয়েট রাষ্ট্রে
আজ এ লড়াই সম্ভব হচ্ছে। সােভিয়েট ব্যবস্থা হয়েছে
বলেই বিভিন্ন প্রদেশের লাখ লাখ শ্রমিকেরা নানা
সােভিয়েট ও সােভিয়েট প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গঠনমূলক
কাজ শিখে উঠছেন। তারা সকলেই আপনারা যাকে বলেন
কাঁচা বয়সের স্ত্রী পুরুষ—তাই তার মানে, তাদের মধ্যে
বেশীর ভাগ লােককেই পূর্বের শাসনপদ্ধতির অধীনে দিন
কাটাতে হয়েছে, কাজে কাজেই শিক্ষা ও সংস্কৃতি হ'তে বঞ্চিত
হয়ে থাকতে হয়েছে। এখন তারা সমস্ত প্রাণের আগ্রহ
;
২

১৮
লেনিনের স্মৃতি
দিয়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে আয়ত্তে আনবার জন্য চেষ্টা করছে ।
আমরাও সােভিয়েট কৰ্ম্ম-প্রতিষ্ঠানগুলােতে নূতন নূতন মেয়ে
পুরুষ ভত্তি করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, কারণ এভাবেই তারা
‘থিওরিতে’ ও হাতে কলমে শিক্ষালাভ করতে সমর্থ হবে।
শাসন-প্রণালীতে এবং গঠনমূলক কাৰ্যে নূতন লােকের
চাহিদা আজ আর অস্বীকার করা যায় না। পুরাণাে ধারায়
পরিপুষ্ট আমলাতন্ত্রীদের আজও আমরা নিযুক্ত করতে বাধ্য
হচ্ছি, এভাবেই আবার আরেকটা
নূতন আমলাতন্ত্র গড়ে
ফেলছি। কোনাে একটি বিশেষ আমলার কথা বলছি না,
সে হয়ত খুব ঘুঘু কর্মচারীও হতে পারে, কিন্তু আমি এই
আমলাতন্ত্র পদ্ধতিকেই ঘৃণা করি। কারণ, উপর থেকে ও তল
থেকে দুদিক থেকেই তা আমাদের পঙ্গু এবং দূষিত করে
তােলে। এই আমলাতন্ত্র শাসনপ্রণালীকে নিৰ্ম্মল করার
একমাত্র পথ হল জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা পরিব্যাপ্ত করে
দেওয়া।
এখন ভবিষ্যতে আমাদের আশা কি ? আমরা অনেক
সুন্দর সুন্দর শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠিত করেছি, এবং সর্বহারার ও
দরিদ্র কৃষকের সন্তানগণ যাতে করে লেখাপড়া শিখে
সংস্কৃতিবান হতে পারে তার জন্য সত্যই অনেক ভালাে
ব্যবস্থাও করে দিয়েছি। কিন্তু এখানেও সেই গভীর
দুঃখদায়ক একই প্রশ্ন আবার জেগে ওঠে—এত লােকের
পক্ষে তা কতটুকু? বরঞ্চ আরাে খারাপ। আমাদের প্রাথমিক
শিশু বিদ্যালয় ( Kindergarten), শিশুসদন এবং প্রাথমিক

লেনিনের স্মৃতি
বিদ্যালয় এখনো অতি অল্প ; লাখ লাখ শিশু তাদের পিতা ও
প্রপিতামহের ন্যায়ই বিনা শিক্ষায় আজ বড় হয়ে উঠছে।
এভাবে কত প্রতিভাই না ব্যর্থ হবে, কত উচ্চাদর্শের স্বপ্নই না
সুযােগের অভাবে নষ্ট হবে। আগামী যুগের যুবক-যুবতীর
সুখ ও শান্তির পথে এই এক বৃহৎ অন্তরায়। সােভিয়েট রাষ্ট্র
ভাবীকালে সাম্যবাদী সমাজে পরিণত হবে ; তারও অমূল্য
সম্পদের এ অপব্যয়; ভবিষ্যতের পক্ষে এ এক গুরুতর বিপদ।
লেনিনের স্বভাবশান্ত স্বরে তখন ফুটে উঠেছিল একটা
অপ্রকাশিত বিক্ষোভ। আমি ভাবছিলাম কি গভীরভাবেই
তিনি এ ব্যাপারে বিচলিত ও চিন্তাগ্রস্ত হয়েছেন যে
আমাদের তিনজনের সামনে এ বিষয় নিয়ে এভাবে আলােচনা
করতে প্রণােদিত হলেন। কে আমার মনে নেই, সেই
সময়কার পরিস্থিতির উল্লেখ করে তখনকার
শিল্প ও
শিক্ষাসম্বন্ধীয় বৈশিষ্ট্যগুলাে সেই অবস্থাচক্রেরই দোষ বলে
ব্যাখ্যা করতে চাইলেন। লেনিন উত্তর দিলেন ?
“হাঁ আমি জানি, অনেক লােকেরই প্রকৃত দৃঢ় বিশ্বাস যে
জনসাধারণকে পেট ভরে রুটি মাখন খেতে দিতে পারলেই
আজকের সকল বিপদ-আপদ চুকে যাবে। রুটি—তাতে
নিশ্চয়ই। সার্কাস—তা বেশ ! কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে
যে, সার্কাস ছােটখাটো একটা আমােদ মাত্র, সত্যিকারের
বড় বিশেষ শিল্পবস্তু, তা নয়। একথাও আমাদের ভুললে
চলবে না যে, আমাদের মজুর-কৃষকের রােমের ইতর সাধারণ
মাত্র নয়। রাষ্ট্র তাদের ভরণ পােষণ করে না, তারাই বরঞ্চ

০
লেনিনের স্মৃতি
রাষ্ট্রকে রক্ষা করে। বিপ্লব সম্ভব করেছেন তারাই, এবং
তাদের সংঘটিত সেই বিপ্লবকে সফল করে তুলবার জন্য
নিজেদের রক্তের বন্যা বইয়ে তারা অতুলনীয় আত্মত্যাগের
অধ্যায় খুলে দিয়েছিল। সার্কাস দেখালেই আমাদের মজুর
কৃষকদের পক্ষে যথেষ্ট হবে না, সত্যকারের মহৎ শিল্লো-
পভােগে তাদের পুরােমাত্রায় অধিকার আছে। তাই অন্য
সব কিছুর আগে চাই আমাদের জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার
গভীর ও ব্যাপক প্রসার। তারাই সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি—
অবশ্য ধরে নিচ্ছি প্রথমেই রূটির ব্যবস্থা স্থির করতে হবে,
সেই ভূমির উপরে গড়ে উঠবে সত্যকারের নূতন সুমহৎ
শিল্পকলা—আমাদের কমিউনিষ্ট শিল্পকলা—তার শিল্পবস্তুর
সঙ্গে সুসমঞ্জস হবে তার শিল্পরূপ। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের
সামনে আজ অতি বিরাট এবং অতি গৌরবের কাজ।
সে কাজের গুরুত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়ে তা সুসম্পন্ন করতে
পারলে তারা সর্বহারার বিপ্লবকে সত্যকারের মর্যাদা দিতে
পারবেন ; কারণ, এ বিপ্লব তাদেরও পূর্বতন গ্লানিগঞ্জনাময়
অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে, তাদের সামনেও মুক্তির দ্বার
খুলে দিয়েছে। তাদের সেই দুঃখগ্লানিময় জীবনের কথা
‘কমিউনিষ্ট ম্যানিফেষ্টো'তে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
সেদিন রাত্রিবেলা নানাবিষয়ে আলােচনা করাতে আমার
বাড়ী ফিরতে বেশ দেরী হয়ে গিয়েছিল। শিল্প, সংস্কৃতি
ও গণশিক্ষা সম্বন্ধে লেনিনের মন্তব্যগুলো ছাড়া অন্য সব
কিছুই আমি ভুলে গিয়েছি। সেদিন, সেই শীতের রাত্রে,

লেনিনের স্মৃতি
;
বাড়ী ফিরবার পথে আমি বারবারই মজুরদের জন্য লেনিনের
আন্তরিক ও সুগভীর ভালবাসার কথা অবাক হয়ে
ভাবছিলাম। অথচ এমন অনেক লােক আছে, যারা মনে
করে লেনিন
বুঝি নিস্পন্দ বুদ্ধিবাদী যন্ত্রমাত্র ; কঠিন
মতবাদে অন্ধ, মানুষকে শুধু ঐতিহাসিক সূত্রানুযায়ী’ই তিনি
বিচার করেন, সেই ভাবেই তাদের গণ্য করেন, তাদের
নিয়ে মমতাহীন খেলা খেলেন—যেন তারা তার সেই খেলার
নিছক ঘুটি মাত্র।
লেনিনের সঙ্গে আমার আরেকদিনের আলােচনার কথা
আমি কোন দিনই ভুলতে পারবে না। পাশ্চাত্য দেশসমূহ
হতে মস্কোতে যারা এসেছিলেন, তাদের অনেকেরই মত,
আবহাওয়ার পরিবর্তনের দরুণ আমারও শরীর সয়ে উঠতে
পারলাে না; বাধ্য হয়ে আমাকে শয্যা গ্রহণ করতে হয়েছিল।
লেনিন তখন আমাকে দেখতে এলেন, স্নেহময়ী মায়ের মতই
আমি পুষ্টিকর খাদ্য পাই কিনা, আমার যত্ন নেওয়া হয় কিনা
এবং ঠিকমত ভালাে ডাক্তারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে কিনা,
ইত্যাদি প্রশ্ন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমার আর
কোন জিনিসের দরকার আছে কিনা, তা উৎসুকভাবে জানতে
চেয়েছিলেন। তার ঠিক পেছনেই কোমলহৃদয়া করে
ক্রুপস্কায় দাড়িয়ে ছিলেন। আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না,

২২ লেনিনের স্মৃতি ; একথা আমি বলা সত্ত্বেও লেনিন আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। বিশেষ করে, রাশিয়ার যে বাড়ীটার পাচতলায় আমি ছিলাম, সেটায় নামে মাত্র একটা লিফট ( আরােহণ যন্ত্র) থাকলেও, তা কোন বিশেষ কাজে আসতে না বলে, তিনি বেশ একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ; 'লিফট’টার সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে লেনিন বিপপূর্ণম্বরে মন্তব্য করেছিলেন, “এটাও যেন ঠিক সেই নামে বিপ্লবকামী কটুস্কিবাদীদের মতই”। এভাবে সাধারণ কথা বলতে বলতে আমাদের আলােচনা বয়ে চন্দ্র রাজনীতিক খাদে। প্রথমদিকে ওয়ারসতে ( Warsaw ) সােভিয়েট সৈন্য- বাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতার সহিত ও এত দ্রুত প্রবেশ করতে সক্ষম হওয়াতে বিপ্লবের প্রসার সম্বন্ধে আমরা যে কল্পনা করেছিলাম, পোল্যাণ্ড থেকে অচিরেই লালফৌজের পশ্চাদপসরণে আমাদের সে আশা মুকুলে শুকিয়ে গিয়েছিল । জাৰ্মাণীর সীমান্ত প্রদেশে সােভিয়েটচিহ্ন রক্ততারকায় ভূষিত আমাদের কমরেডরা যখন হানা দিয়েছিল, তখন তাদের পরিধানের পােষাক পুরাতন ও অব্যবহাৰ্যসাধারণ মানুষের বা সৈনিকের পরিত্যক্ত পরিচ্ছদ—তাদের পায়ে সেলাইখস। ছেড়া বুট। তথাপি তাদের চলন্ত অশ্ব ছুটিয়ে লালফৌজ যখন সীমান্তে এসে পৌছে, তখন জাৰ্ম্মাণীর বিপ্লববাদী শ্রমিকশ্রেণীর এবং দিম্যান (Dithmann) শিম্যানের ( Schidemann) মত ছােট বড় বুর্জোয়াদের মনে কি রকম এবং কতটা প্রভাব তা বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল, লেনিনের স্মৃতি আমি বিস্তারিতভাবে লেনিনের কাছে সে সব বর্ণনা করেছিলাম। “তারা কি পােল্যাণ্ড অধিকার করেই আসবে, না পােল্যাণ্ডের সীমান্ত ছাড়িয়েও আসবে ?—আর এলে তারপর ?” ঠিক এ সব এ সব প্রশ্নই তখন জাৰ্মাণীর সমস্ত অধিবাসীদের মন ব্যতিব্যস্ত করে ছিল, এবং এরই সমাধান করবার জন্য ঘরে ঘরে সৌখীন যুদ্ধবিশারদরা তুমুলভাবে তর্কবিতর্ক করছিলেন। তখন স্পষ্টই প্রতীয়মান হচ্ছিল যে, জাৰ্মাণীর সমস্ত শ্রেণী, সমাজের সমস্ত স্তর, তখন চিরশত্রু ফ্রান্সের থেকেও বেশী ঘৃণা করতে সাম্রাজ্যবাদী পােল্যাণ্ডকে, তাদের “স্বদেশী শ্বেত-পল্টনকে”। তথাপি তাদের সেই পােল্যাণ্ডের প্রতি অশেষ ঘৃণা ও ভার্সাই সন্ধির ( Treaty of Versailles ) অক্ষুন্নতা রক্ষা করার ইচ্ছাকেও ছাপিয়ে উঠেছিল আসন্ন বিপ্লবের ভয়। বাক্যবীর দেশপ্রেমিকরা ও নিষ্ক্রিয় শান্তিবাদীরা বিপদ দেখে চুপে চুপে সরে পড়েছিলেন। এদিকে আবার তখন খানিকটা সন্তুষ্ট এবং সঙ্গে সঙ্গেই খানিকটা ভীত হয়েই বুর্জোয়া আর পেটি- ; বুর্জোয়ারা তাদের সংস্কারকামী শ্রমিক অনুচরদের নিয়ে পােল্যাণ্ডের তৎকালীন অবস্থাকে অত্যন্ত মনােযােগের সহিত পৰ্যবেক্ষণ করছিলেন। এ বিষয়ে আমার বক্তব্য, বিশেষ করে সাম্যবাদী দল { কমিউনিষ্ট পার্টি ), সংস্কারে দল ( Reformist পার্টি ), এবং ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে আমি যে মন্তব্যগুলো করেছিলাম, সেগুলো লেনিন অত্যন্ত মনােযােগ- ২৪ লেনিনের স্মৃতি। । সহকারে শুনেছিলেন। গভীরভাবে চিন্তান্বিত হয়ে, কয়েক মিনিট একেবারে নিস্তব্ধ থেকে, অবশেষে তিনি বললেন, “হ্যা, পােল্যাণ্ডে এরূপই ঘটেছে, আর যে ভাবেই হােক্, এ ঘটনা ঘটতেই। তখনকার পরিস্থিতি সবই আপনি জানেন। আমাদের অগ্রণী যােদ্ধাদের সাহস অসীম ও আত্মবিশ্বাস প্রচুর ছিল, কিন্তু তাদের পশ্চাতে মজুত সৈন্য বা অস্ত্রশস্ত্র কিছুই ছিল না। এমন কি শুকনাে রুটি পর্যন্ত তারা খেতে পায়নি। পােল্যাণ্ডের কৃষকদের এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত লােকদের কাছ থেকে তাদের রুটি ও অন্যান্য অতি- প্রয়ােজনীয় দ্রব্যগুলাে সংগ্রহ করে নিতে হতাে। তাই লালফৌজকে পােল্যাণ্ডবাসীরা তাদের শত্রু হিসেবেই গণ্য করতে,—ভাই বা মুক্তিদাতা বলে কখনােই তাদের তারা মনে করতে পারতো না। সামাজিক ও বৈপ্লবিক ধারায় পােলরা মােটেই তখন ভাবেনি, অনুভব করেনি, কাজও করেনি, কারণ তারা ছিল জাতীয়তাবাদী এবং সাম্রাজ্য- বাদী। পােল্যাণ্ডে যে বিপ্লব ঘটবে বলে আমরা এতটা আশা করেছিলাম, তা মােটেই ঘটে নি। শ্রমিকশ্রেণী এবং কৃষকগণ পিলসুস্কি (Pilsudsky) দাজিস্কির ( Daszynsky) দলের লোেকদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে, তাদের নিজেদের শত্রুশ্রেণীর পক্ষ অবলম্বন করে, আমাদের লালফৌজকে অনাহারে রাখে, তাদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়, তাদের নিহত করে। “সমস্ত পৃথিবীতে অশ্বারােহী সৈন্যদের অধ্যক্ষদের মধ্যে লেনিনের স্মৃতি ••• আমাদের বুদেনি ( Rudyonny) হলেন সর্বপ্রধান। তিনি একজন অল্পবয়সী কৃষক—আপনি জানেন সে কথা? ফরাসী বিপ্লবীবাহিনীর সম্বন্ধে বলা হয় যে তাদের মার্শালের { সেনাপতির ) চিহু ছিল তাদের সেনাদের থলিতে ( মানে সাধারণ সৈন্যদের থেকেই সেনাপতি বেরােত ), বুদেনির বেলাও এই কথাই খাটবে—শুধু তার ব্যাট ছিল ঘােড়ায় বাঁধা সওয়ারের থলিতে যুদ্ধবিজ্ঞান সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ কোন ান ছিল না, কিন্তু সমরনীতি ও কৌশল সম্বন্ধে একটা অসাধারণ স্বাভাবিক জ্ঞান তার মধ্যে নিহিত আছে। তার সাহস বেপরােয়া-বলতে গেলে তা প্রায় দুবুদ্ধির সামিল তিনি তার সৈন্যদের সঙ্গে থেকে অশেষ দুঃখভােগ করেন, সমস্ত বিপদে তাদের সঙ্গে একত্র থাকেন, তার সৈন্যরাও তার জন্য স্বেচ্ছায় নিজেদের বলিদান করতে পৰ্যন্ত দ্বিধাবােধ করে না। তিনিই একাই একশাে, কিন্তু সামরিক এবং যুদ্ধপদ্ধতি সংক্রান্ত ব্যাপারে পােল্যাণ্ডে আমাদের কতক- গুলো ভুল হয়ে যায়, তাই বুদেনি ও তার ন্যায় আমাদের অন্যান্য সাহসিক বৈপ্লবিক সৈন্যাধ্যক্ষগণ পৰ্যন্ত সেখানে কিছুই করে উঠতে পারলেন না। অবশ্য ‘পােল্যাণ্ডে একটা বিপ্লব বাঁধবেই এ রাজনৈতিক প্রমাদটাও কতকাংশে দায়ী যে ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এরূপ যে ঘটবে রাদেক ( Radek ) পূৰ্বেই সেই ভবিষ্যদ্বাণী করে আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলেন। এর জন্য আমি রাদেকের উপর তখন খুব চটে গিয়েছিলাম, এবং তাকে জন্য

লেনিনের স্মৃতি
‘পরাজয়বাদী’ বলে অপবাদও দিয়েছিলাম। এখন দেখতে
পাচ্ছি—মূলতঃ তার ধারণাই সত্যে পরিণত হয়েছে।
রুশিয়ার বাইরের, বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশসমূহের ব্যাপার,
রাদেক আমাদের থেকে অনেক বেশী জানেন আর চমৎকার
তার মাথা, তাকে দিয়ে আমাদের খুব কাজ হচ্ছে।
কিছুদিন আগে আমাদের দু'জনের মধ্যে বােঝাপড়া হয়ে
গেছে। এই মিল হলো গভীর মধ্যরাত্রে, বলতে গেলে
প্রায় ভােরের দিকেই, টেলিফোনে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে
তার সঙ্গে বহুক্ষণ ধরে আলােচনা করতে করতে।
“আপনি জানেন পােল্যাণ্ডের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ
হবার কথায় প্রথমে পার্টির মধ্যে বিশেষ আপত্তি উঠে।
ঠিক ব্রেষ্ট-লিটভস্কের ( Brest Litovsk ) সন্ধির মতই।
পােলিশদের অনুকূল এবং আমাদের প্রতিকূল সন্ধিসূত্রে
আবদ্ধ হচ্ছিলাম বলেই আমাকে এ ভাবে আক্রান্ত হতে
হয়। পােল্যাণ্ডের অবস্থা দেখে, বিশেষ করে সেখানকার
দুরবস্থা দেখে বিশেজ্ঞরা সকলেই মনে করেন,
আমরা যদি আরাে কয়েক দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতাম, তা
হলে আরাে অনেক বেশী সুবিধাজনক সৰ্ত্তেই সন্ধি সংস্থাপন
করতে সমর্থ হতাম। তারা এটাও মনে করেন যে তা হলে
আমরা সম্পূর্ণরূপে জয়লাভ করতে সমর্থ হতাম। যুদ্ধটা
আরাে কিছু সময়ের জন্য চললে পর আভ্যন্তরীণ বিবাদ ও
পূৰ্ব্ব গেলিসিয়ার ( East Galicia ) বিরােধের দরুণ
সাম্রাজ্যবাদী পােল্যাণ্ডের সরকারী সৈন্যসামন্ত অধিকতর
আর্থিক দুরবস্থা

লেনিনের স্মৃতি
নি।
দুৰ্বল হয়ে পড়তো। ফরাসীদের নিকট হতে তারা সকল
রকমের ঋণ ও অর্থসাহায্য পেলেও যুদ্ধের ভারে দিন দিন
লােকের দুঃখ বেড়ে যেত এবং অর্থনৈতিক দুর্গতি বেড়ে গিয়ে
সমস্ত কৃষকমজুরকে একতাবদ্ধ হতে বাধ্য করত। আরো
কতকগুলো অবস্থার বিশ্লেষণ করেও তারা প্রমাণ করতে
চান যে, আমরা যদি আরাে কিছুদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতাম
তা হলে আমাদের আরো অনেক সুবিধা হতাে।”
একটু চুপ করে থেকে লেনিন আবার এ কথার সূত্র ধরেই
বলতে লাগলেন, “আমি নিজেও বিশ্বাস করি যে, যে কোন
সৰ্তে সন্ধি করার মত দুরবস্থা আমাদের তখন পর্যন্ত হয়
আমরা সমস্ত শীতকালটাই
যুদ্ধ
চালিয়ে যেতে
পারতাম। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করে সন্ধি
করাটাই আমার ভালাে বলে মনে হল ; যুদ্ধ
হল ; যুদ্ধ চালিয়ে
নেওয়ার থেকে সাময়িক ত্যাগ স্বীকার করেও কঠিন সৰ্ত্তে
সন্ধি করাটাই প্রয়ােজনীয় বলে মনে করেই আমি তখন
পােলদের সঙ্গে সন্ধি-সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলাম। পােলর
ও তাদের বন্ধুগণ সকলেই সাম্রাজ্যবাদী। তাদের সাম্যবাদী
বুলি কপচানাে একটা কৌশলমাত্র। নিতান্তই তা কৌশল,
তাতে কোন সন্দেহ নেই। সকলেই ওরাঙ্গেলের (Wrangel)
দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু পােল্যাণ্ডের সঙ্গে সন্ধি
করতে পারায় আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি ওরাঙ্গেলের
বিরুদ্ধে নিয়ােজিত করব, তাকে এমনভাবেই পরাজিত
করব, যাতে সে আর কোনদিন আমাদের শান্তিভঙ্গ করবার

লেনিনের স্মৃতি মত সামর্থ্য অর্জন করতে না পারে। বর্তমান অবস্থায় সােভিয়েট রুশিয়াকে জয়লাভ করতে হলে পর সব সময়েই তার চালচলনে দেখিয়ে দিতে হবে যে, শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য এবং বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যই তাকে এভাবে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গেই বুঝিয়ে দিতে হবে যে, সােভিয়েট রুশিয়াই হ'লো পৃথিবীর মধ্যে শান্তিকামী একমাত্র বৃহৎ রাষ্ট্র, যার পরের জমি কেড়ে নেওয়ার, অন্যান্য জাতিকে দমন করবার বা সাম্রাজ্যবাদী অভিযানে বের হ’বার মত কোন অভিসন্ধিই নেই। সর্বপ্রথম আমাদের দেখা উচিত যে, সত্যসত্যই একেবারে বাধ্য না হলে পর আরেক- বছরও শীতকালব্যাপী যুদ্ধ করে রুশিয়ার জনগণকে আরো অকথিত দুঃখযন্ত্রণা ভােগ করতে বাধ্য করা আমাদের পক্ষে উচিত হতো কি ? যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের বীর লালফৌজ, গৃহে আমাদের মজুর ও কৃষকশ্রেণী অনেক দুঃখকষ্টই সহ্য করেছেন। বহু-বৎসর-ব্যাপী এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, তারপরে গৃহযুদ্ধ চলল, সেগুলাে শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরেক- বৎসর শীতকালব্যাপী যুদ্ধ করা মানে–আরো লাখ লাখ লােককে নিঃশব্দে, না খেয়ে, শীতে নিঃসাড় হয়ে গিয়ে মরতে বাধ্য করা। খাদ্য ও পােষাকের চাহিদা এখনই ঠিকমত মেটানাে যাচ্ছে না। শ্রমিকশ্রেণী অসন্তোষ প্রকাশ করতে আরম্ভ করে দিয়েছে, এবং কৃষকরাও এই বলে বিরক্তি প্রকাশ করছে যে, তাদের কাছ থেকে আমরা সমানে নিয়েই চলেছি, কোন সুখ-সুবিধা তাদের আমরা করে দিচ্ছি না...

লেনিনের স্মৃতি
২৯
•••না, আরেক বছর শীতকালব্যাপী যুদ্ধ চালাবার কথা
আমি ভারতে পারছিলাম না, আমাদের সন্ধি করা ছাড়া
উপায় ছিল না।”
এই আলােচনা লেনিন যখন করছিলেন, তখন তার
মুখ বেদনায় শুকিয়ে উঠছিল। ছােট বড় অসংখ্য রেখা
তখন সে মুখে ফুটে উঠেছে। প্রত্যেকটি রেখায় অশেষ
দুঃখযন্ত্রণার আভাস। কত অকথিত, অবর্ণনীয় বেদনারই
সে মুখে ছাপ পড়েছে। মধ্যযুগের শিল্পীগুরু গুয়ে-
বাডের (Gruenwald ) অঙ্কিত ক্রুশদ্ধ খ্রীষ্টের একখানা
চিত্র আমার তখন মনে পড়ছিল। যতদূর স্মরণ হয়, সে
চিত্রের নাম বােধ হয় “বেদনার দেবতা”। গীদে। রেণির
( Guido Reni ) প্রসিদ্ধ খ্রীষ্টচিত্রের সঙ্গে গয়েডের
খ্রীষ্টের কোন মিল নেই। গীদো রেণির খ্ৰীষ্ট মধুর, ক্ষমাশীল,
আত্মদানের দেবতা—যাকে ‘আত্মার প্রেমাস্পদ’ বলে
চিরকুমারী বৃদ্ধা আর বিবাহিতা অভাগিনী নারীরা আরাধনা
করেন। গয়েডের খ্ৰীষ্ট হলেন আত্মদানকারী বেদনা-
পীড়িত দেবতা, নিষ্ঠুরভাবে তিনি নিহত হচ্ছেন, “পৃথিবীর
সকল পাপের বােঝা তিনি বহন করছেন।” লেনিনকে
দেখে তখন আমার মনে হল তিনিও যেন সেই ‘বেদনার
দেবতা', রুশিয়ার শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়ই অশেষ দুঃখদৈন্যে
জর্জরিত, নিপীড়িত ও ভারাক্রান্ত। একটু পরেই লেনিন
চলে যান। কথাপ্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, সমুদ্র হতে
পেরিকোপ যােজক ( Perekop) আক্রমণ করবার জন্য যে

লেনিনের স্মৃতি সমস্ত লালফৌজকে নিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের জন্য দশ হাজার চামড়ার কোট আঁটা-বােতাম সহ তৈরী করতে দেওয়া হয়েছে। এই কোট গুলাে তৈরী হওয়ার পূর্বেই আমরা এই সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম যে, অসীম সাহসী তেজস্বী কমরেড পিয়াটাকভের ( Piatakov) নেতৃত্বে লালফৌজ সেই যােজক দখল করে ফেলেছে। সত্যি সৈন্য ও সেনাপতি দুই-ই সেদিন একটা অসাধ্য সাধন করেছিলেন। দক্ষিণ-সীমান্তেও এই শীতের সময়ে তখন আর যুদ্ধ ছিল না। এবং কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের তৃতীয় সম্মেলন ও সাম্যবাদী মহিলাদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অধিবেশনের সময়ে আমার দ্বিতীয়বার মস্কোতে আরও বেশী দিন থাকতে হয়েছিল। তখন গ্রীষ্মকাল। অধিবেশনগুলাে হয়েছিল জুনের মাঝামাঝি ও জুলাইএর প্রথম দিকে । মস্কোর গৃহমালার রঙিন গম্বুজগুলাে তখন সূৰ্যকরে ঝসে উঠছে। গরমটা আমি বেশী বােধ করছিলাম সেজন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সাম্য- বাদী সম্মেলনের আবহাওয়ায়, বিশেষতঃ জাৰ্মাণীর কমিউনিষ্ট পার্টির সভাগুলােতে তখন উত্তেজনার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ঝড়-তুফান, বিদুৎ-বজ্র তখন তার নিত্যকর্মের ধারা। কোন একটা গােলমালের আঁচ পেলে পার্টির যে সব লেনিনের স্মৃতি নৈরাশ্যবাদীদের উৎসাহ জেগে ওঠে, তারা তখন থেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন যে, পার্টিতে ভাঙ্গন ধরেছে, শীঘ্রই পার্টি একেবারে লুপ্ত হয়ে যাবে। জাৰ্ম্মাণ পার্টির মত ও কাৰ্য্যধারা আলােচনা করতে গিয়ে যে তুমুল বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়, তা অন্যান্য দেশের কমরেডদেরও উত্তেজিত না করলে আন্তর্জাতিকের এই সংগঠিত সাম্যবাদীরা মিথ্যা আন্ত- র্জাতিকতাবাদী ছিলেন বলেই প্রতিপন্ন হতেন। জাৰ্ম্মাণীর সমস্যা’ সে সময়ে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদীদেরই নিজেদের সমস্যা—এমন কি তাদের প্রধান সমস্যা হয়ে উঠেছিল। মার্চ-অভিযান। জাৰ্ম্মাণীর প্রতিক্রিয়াশীলদের কোপ আক্রমণের পরে জাৰ্মাণ শ্রমিকদের ১৯২০ সনের মার্চ মাসে এ বিদ্রোহ হয় এবং সে অভিযানের মূলস্থিত ও তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িত “আক্রমণ-নীতি-বিষয়ক মতবাদ” তখন আলোচ্য হয়ে ওঠে। এই মতবাদ অবশ্য “মার্চ- অভিযানকে সমর্থন করবার জন্য পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণরূপে প্রকটিত হয়। কিন্তু সেই ‘অভিযান’ ও ‘আক্রমণ- তত্ত্ব সম্মেলনের সমস্ত আন্তর্জাতিক সাম্যবাদীদিগকে পৃথিবীর সমস্ত দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা পৰ্যবেক্ষণ করতে বাধ্য করেছিল। শ্ৰমিকসাধারণকে বৈপ্লবিক ধারায় সংহত ও সক্রিয় করে তুলবার জন্য তখনই একটা বিশেষ প্রােগ্রাম ও ট্যাটিসের ( মানে, কার্যক্রম ও সংগ্রাম-কৌশলের) ভিত্তি দৃঢ়ভাবে স্থাপন করবার প্রয়ােজন হয়ে পড়েছিল।

লেনিনের স্মৃতি
সেই ‘মার্চ-অভিযান’ জনগণের দ্বারা সংগঠিত বিদ্রোহ
তাে ছিলই না, অধিকন্তু তা ভ্রান্ত ভাবধারায় অনুমিত, ভ্রান্ত
পথে সংহত ও বিশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত শুধু পার্টির প্রয়াস
বলে আমি ছিলাম এর তীক্ষ্ণ সমালােচকদের মধ্যে একজন।
“তথাকথিত আক্ৰমণত” স্থির করা হয় নিরাশায় ও
দুর্ভাগ্যের বশে, আমি তার ভীষণ বিরােধী ছিলাম। তদুপরি,
আমার ব্যক্তিগত একটা আপত্তি ও মীমাংসা করার দরকার
ছিল।
লিভার্ণোতে ( Liverno) অনুষ্ঠিত ইতালীর
সােশ্যাল ডিমােক্রোট কংগ্রেসের সম্বন্ধে এবং কৰ্ম্ম-পরিষদের
সংগ্রাম-কৌশলের সম্বন্ধে জাৰ্মাণ-পার্টির নেতারা কোন
নির্দিষ্ট নীতি অবলম্বন না করাতে প্রতিবাদ স্বরূপ আমি
জাৰ্মাণ কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্যপদ পরিত্যাগ করেছিলাম।
এ রকমভাবে সবাইকার অজানায় হঠাৎ সদস্যপদ পরিত্যাগ
করাতে, রুশিয়াতে আমার যে সকল অতি নিকট রাজনীতিক
ও ব্যক্তিগত বন্ধুবান্ধব ছিলেন, তারা যে আমার “শৃঙ্খলা-
ভঙ্গে” অত্যন্ত চটে যাবেন, একথা ভেবে আমি সত্যি তখন
বড় বেশী চিন্তিত হয়েছিলাম।
“মার্চ-অভিযান’কে লাখ লাখ কৰ্ম্মঠ ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ
শ্রমিকদের তথা জনগণের বিপ্লব বলে বিশ্বাস করেন এমন
অনেক লােক কেন্দ্রীয় পরিষদে ও রুশিয়ার পার্টিতে এবং
আন্তর্জাতিক সাম্যবাদীদের আরো অনেক বিভাগেও তখন
ছিলেন। সেই আক্রমণ-নীতিকে তখন বিপ্লবের নূতন মন্ত্র
বলে সবাই অভিবাদন করছিলো। অনেক বিপদ আমার
?

লেনিনের স্মৃতি
সম্মুখে, একথা সুনিশ্চিত ভাবে জেনেই আমি ঠিক করে -
ছিলাম যে জয়ী হই বা না হই, সত্যিকারের কমিউনিষ্ট
ভাবধারানুযায়ীই আমি এই তত্ত্বের তর্কে যােগ দেব, ও তার
শেষ মীমাংসায় পৌছাব।
এ সমস্যাসমূহে লেনিনের মত ছিল কিরূপ? মার্ক্সের
বৈপ্লবিক মতবাদগুলােকে সত্যিকারের কার্যক্ষেত্রে প্রয়ােগ
করতে লেনিনই সব থেকে বেশী সমর্থ, ঐতিহাসিক
ধারানুযায়ী মানুষ ও তার পরিস্থিতিকে তিনিই সহজে
বুঝতে পারেন, এবং যে কোন শক্তির সঙ্গে অন্য শক্তিগুলাের
সম্বন্ধ নির্ণয় করতে তাকে কোন অসুবিধাই ভােগ করতে
হয় না। এই সমস্যায় তিনি কোন দলে ছিলেন -“বামে” না
“দক্ষিণে” ? (“মার্চ-অভিযান” এবং “আক্ৰমণতত্ত্ব” যারা
সমর্থন করত না তাদের “দক্ষিণ” এবং “সুবিধাবাদী” বলে
অভিহিত করা হত)। অধীর আগ্রহের সহিত এ প্রশ্নের
সঠিক উত্তর জানবার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম।
কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের উদ্দেশ্য, কাৰ্যশক্তি, এমন কি
তার অস্তিত্ব পৰ্যন্ত এ প্রশ্নের উত্তরের
উত্তরের উপর নির্ভর
করছিল। আগে থেকেই জার্মান পার্টির কেন্দ্রীয় পরিষদ
পরিত্যাগ করায় রুশিয়ার বন্ধুদের সঙ্গে আমার চিঠি-পত্র
আদান-প্রদানের সূত্র ছিন্ন হয়ে যায়। মার্চ-অভিযান এবং
আক্ৰমণতত্ত্ব সন্ধন্ধে লেলিনের ধারণা যে কি, সে বিষয়ে শুধু
জনরব এবং অনুমানই সর্বদা শুনতে পেতাম, সেই সব গুজব
কিছু বা বাজে, কিছু বা বেশ জোরালাে। আমার মস্কোতে

৩৪
লেনিনের স্মৃতি
পৌছার কয়েকদিন পরে, একদিন দীর্ঘ আলােচনার ফলে
আমি এর নিভুল উত্তর পেয়ে গেলাম।
সৰ্ব্বপ্রথমেই লেনিন সাধারণভাবে জার্মানীর অবস্থা এবং
বিশেষ করে জার্মান পার্টির সঠিক অবস্থা সম্বন্ধে একটা
বিবরণ শুনতে চান। ঘটনা ও তথ্য উল্লেখ করে আমি
জাৰ্ম্মাণীর তৎকালীন অবস্থা লেলিনকে পরিষ্কাররূপে ও
বাস্তব দৃষ্টিতে বােঝাবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি। লেনিন
মাঝে মাঝে কতগুলো বিষয় আর একটু পরিষ্কার করে
বােঝাবার জন্য প্রশ্ন করছিলেন এবং সংক্ষেপে নােট্ টুকে
নিচ্ছিলেন। বিশ্বসম্মেলন যদি ( কমিউনিষ্ট, আন্তর্জাতিকের)
আক্ৰমণতত্ত্ব সমর্থন করে, তা হলে জার্মান পার্টি ও কমিউনিষ্ট
আন্তর্জাতিকের যে বিপদ ঘটবে বলে আমার ধারণা, আমি
তখন তা লেলিনের নিকট গােপন করি নি। তিনি তা শুনে
হাসলেন, শান্ত আত্মপ্রত্যয়শীল তার সেই হাসি।
“কখন থেকে আপনি নৈরাশ্যবাদীদের দলে যােগ দিলেন?”
লেনিন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। “ওনিয়ে ভাববেন না।
যে আক্ৰমণতত্ত্ব গজিয়ে উঠছে কংগ্রেসে তা শিকড় গাড়তে
পারবে না। আমরা তাে এখনাে আছি। আপনি কি মনে
করেন, বিপ্লবের থেকে শিক্ষালাভ না করেই আমরা বিপ্লব,
“সৃষ্টি করতে পারতাম ? আমাদের এও ইচ্ছা যে, আপনিও
এর থেকে শিক্ষালাভ করতে সমর্থ হন। একি একটা তত্ত্ব ?
নিশ্চয়ই নয়, এতে রােমান্টিকতা (কল্পনাবাদ), নিছক
রােমান্টিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়; সেজন্যই এই তত্ত্ব সৃষ্টি

লেনিনের স্মৃতি হল সেই দেশে (জার্মানি) যেটা কবি ও ভাবুকদেরই দেশ। আমাদের প্রিয় কমরেড বেলাও (হাঙ্গেরিয়ান কমিউনিষ্ট নেতা বেলা কুন্) এর সৃষ্টিতে সাহায্য করেছেন, কারণ তার জাতিও ( হাঙ্গেরিয়ান্ ) কবির জাতি, তা ছাড়া তিনি নিজে আবার একেবারে ‘বামপন্থীরও বামপন্থী। আমাদের কিন্তু পদ্য রচনা করলে এবং স্বপ্ন দেখলে চলবে না। বুর্জোয়াদের সঙ্গে লড়াই করে সফলকাম হতে হলে আমাদের ধীরভাবে, বিশেষ স্থিরতার সঙ্গে, পৃথিবীর আর্থিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পৰ্যবেক্ষণ করতে হবে। আমরা তা হলে সফলকাম হব, নিশ্চয়ই আমরা সফলকাম হব। বিশ্ব কংগ্রেসকে আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিস্থিতির সম্বন্ধে আমাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের কর্ম ও তৎসংক্রান্ত বিষয়গুলাের ব্যাপারে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সমস্ত সিদ্ধান্ত মিলে একটা সম্পূর্ণ জিনিস হবে। আমরা তাে 92677 2176gat ( Thalheimar ) @ 670719 (Bela) থেকে মাক্সকে বড় মনে করি –যদিও থাহেইমার একজন সত্যিকারের জ্ঞানী ও থিউরিতে বিশেষজ্ঞ, এবং বেলাও একজন প্রকৃত বিপ্লবী। জার্মানদের ‘মার্চ অভিযান’ অপেক্ষা রুশীয় বিপ্লব থেকেই আরো অনেক কিছু শেখা যাবে। আমি আগেই বলেছি যে, কংগ্রেস কি ভাবে এ তত্ত্ব দেখবে, সে বিষয়ে আমার মােটেই ভয় নেই।” এ কথার পরেই আমি লেনিনকে বললাম, মার্চ- অভিযান এই আক্রমণতত্ত্বের ঐতিহাসিক উদাহরণ স্বরূপ,

লেনিনের স্মৃতি
তারই ফল, কার্যক্ষেত্রে তারই প্রয়ােগ মাত্র।
এ ‘তত্ত্ব
সম্বন্ধে কংগ্রেস এখনাে মতামত প্রকাশ করেনি। থিওরি ও
কাজ, ও সম্পাদিত কাৰ্য্যকে কি পৃথক করা সম্ভবপর ?
কিন্তু তবু ‘আক্রমণ-তত্ত্বের বিরােধী এমন অনেক কমরেডকে
আমি জানি, যারা মার্চ-অভিযানকে মনে প্রাণে সমর্থন
করেন। এটা আমার কাছে একেবারেই অসঙ্গত বলে মনে
অবশ্য হােয়ের্সিংএর ( Horsing) (জার্মান প্রতি-
ক্রিয়া নেতা) বর্বরদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিজেদের
অধিকার অক্ষুন্ন রাখবার জন্য যে সমস্ত শ্রমিকেরা সে
অভিযানে যােগ দিয়েছিলেন, তাদের আমরা যথাসাধ্য সহানু-
ভূতি দেখাব। এ সব শ্রমিকদের সংখ্যা কয়েক হাজারই
হােক্, কিংবা (কল্পনাবলে অনেকে যেমন বলেন) লাখ
লাখই হােক, যাই হােক না কেন, আমরা সকলে যে সব
সময়ে তাদেরই সঙ্গে আছি এ কথা ঘােষণা করতেই হবে।
কিন্তু উক্ত অভিযানের মূলতত্ত্ব এবং কৌশল সম্বন্ধে কেন্দ্রীয়
পরিষদের ( সেন্ট্রাল কমিটির ) ধারণা কি, তা হলাে
একেবারেই ভিন্ন প্রশ্ন। সে অভিযান ছিল নিছক একটা
আকস্মিক প্রয়াস—একটা বিচ্যুতি। কোন তত্ত্বগত
ঐতিহাসিক, এমন কি রাজনৈতিক, কথা দিয়ে তার চূণকাম
করা চলে না-বাস্তব ঘটনাকে ঢাকা চলবে না।”
লেনিন তক্ষুণি তাড়াতাড়ি সুনিশ্চিত
“অবশ্য সংগ্রামমুখী শ্রমিক শ্রেণীর এই আত্মরক্ষানীতি এবং
ভ্রান্তি-পরিচালিত পার্টির, বরং তার নেতাদের, এই আক্রমণ
কণ্ঠে বলেন,

লেনিনের স্মৃতি ৩৭ নীতি বিভিন্নরূপে সমালােচিত হবেই। সমালােচনা না করার জন্য আপনাদের মত মার্চ-অভিযানের বিরােধীরাই বরং দায়ী, কেন্দ্রীয় পরিষদের ভ্রান্ত নীতি ও তার কুফল- গুলােই আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কিন্তু মধ্য জার্মানীর সংগ্রামপন্থী শ্রমিকদের প্রতি আপনারা লক্ষ্যই করেন নি। তদুপরি, পল লেভির ( Paul Levi) নেতিমূলক সমালােচনায় পার্টির সহিত ‘একাত্মতার কোনাে চিহু ছিল । তার সমালােচনার বক্তব্য বিষয় থেকে তার বলার ধরণ কমরেডদের আরও বেশী তিক্ত করে তুলেছিল, আসল প্রশ্নের থেকে অবান্তর সমস্যাগুলাে নিয়েই তাতে ঘাঁটাঘাঁটি বেশী হয়েছে ; মার্চ-অভিযানের ব্যাপারে কংগ্রেসের মতামত কি হবে তা যদি জানতে চান, তা হলে মনে হয় মিটমাটের একটা পথ আমাদের বের করাই এখন অবশ্য কর্ত্তব্য। রকম ভাবে আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকাবেন না ; ভাববেন না, এ খুব অন্যায় কথা; আপনি ও আপনার বন্ধুদের মিটমাট মেনে নিতেই হবে। কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের প্রধান অংশটাই আপনাদের স্বপক্ষে হবে, তা নিয়েই আপনাদের সন্তুষ্ট হতে হবে। একথা সুনিশ্চিত যে, শেষ পর্যন্ত আপনাদের মূল-নীতিই জয়যুক্ত হবে এবং তাতে “মার্চ অভিযানের” পুনরুক্তি বন্ধ হবে। কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত পালন আপনাদিগকে করতেই হবে। কৰ্ম্মপরিষদ (এসিকিউটিভ ) সে দিকে লক্ষ্য রাখবে—অামার সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। “এই প্রসিদ্ধ “আক্রমণ-তত্ত্বকে” কংগ্রেস সম্পূর্ণরূপেই

লেনিনের স্মৃতি
বাতিল করে দেবে, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই আপনাদের
ধারণামত কৌশল অবলম্বন করবে, কিন্তু সেই কারণেই
এই “আক্রমণ তত্ত্বের” সমর্থনকারীদেরও সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য
এক আধটুকু ছিটে ফেঁটা কথা দেবে । “মার্চ অভিযানের
সমালােচনা করতে গিয়ে আমরা যদি এই কথাটায় জোর
দিই যে, বুর্জোয়াদের ভাড়াটে চাকরদের দ্বারা উত্তেজিত
হয়েই শ্রমিকেরা লড়াই করেছিলেন, এবং আমরা যদি ঐতি-
হাসিক ধারানুযায়ীই খানিকটা পিতৃসুলভ ভৎসনার সঙ্গে
স্নেহও তার সমর্থকদের দেখাই, তা হ'লেই মিটমাট সম্ভব
হবে। ক্লারা, আপনি আপত্তি করবেন এই বলে যে, এ
হচ্ছে প্রশ্নটাকে ধামা চাপা দেওয়া, ইত্যাদি। কিন্তু তাতে
আপনাদের লাভ হবে না। কংগ্রেসের স্থিরীকৃত নীতি যদি
আমরা তাড়াতাড়ি সকলে মেনে নিই, তা নিয়ে বিশেষ ঝগড়া-
ঝাটি না বাধাই, তা হলে তা সকল কমিউনিষ্ট পার্টির
আন্দোলনের নির্ধারিত কাৰ্যনীতি হয়ে উঠবে, তা হলে
আমাদেরই ‘বামপন্থী বন্ধুগণও অপমানিত বােধ করে তিক্ত
মনে চলে যাবেন না। পাটির ভিতরে ও বাইরে যে সমস্ত
সত্যিকারের বিপ্লবী আছেন—তাদের মনােভাব সম্বন্ধেও
আমাদের বিবেচনা করতে হবে। তাই বরং করতে হবে
সকলের আগে। আপনিই আমার কাছে একবার লিখেছিলেন
যে, রুশীয়দের পাশ্চাত্য দেশের মানুষের মনােভাব প্রথমে
কিছু বােঝা উচিত, সে সব জনসাধারণের কঁাধে আমাদের
রূঢ়, কঠিন রুশ কার্যপদ্ধতি একবারে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক

লেনিনের স্মৃতি নয়। আমি তা মনে রেখেছি”—এই কথা বলে লেনিন বেশ স্বচ্ছ হাসি হাসলেন। “মােট কথা, আমরা বামপন্থীদের প্রতি কঠিন হব না, বরং তাদের মনে একটু সান্ত্বনার প্রলেপই দেব। তা হলেই তারা আপনাদের সঙ্গে একত্র হয়ে, আমাদের আন্তর্জাতিকের তৃতীয় কংগ্রেসের নীতি অনুসারে সানন্দে ও সােৎসাহে কাজ করে যাবেন ; তার অর্থ নানা দলের শ্রমিক সাধারণকে কমিউনিষ্ট নেতৃত্বে আপনাদের নীতির স্বপক্ষে একত্র করা, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাদের নিযুক্ত করে রাষ্ট্র- ক্ষমতা অর্জন করা—এ দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে । “আপনি কেন্দ্রীয় পরিষদে যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন ভবিষ্যৎ মূল-নীতির মূল কথা তাতে বিশদভাবে আলােচনা করা হয়েছে। পল্ লেভির ( Paul Levi) রচিত ক্ষুদ্র পুস্তিকাটির ন্যায় উক্ত প্রস্তাব কোনরকমেই অপলাপকারী নেতিবাচক নয়, বরং আপনার সমালােচনায় কৰ্ত্তব্যের নির্দেশ আছে। ওটা কি ভাবে অগ্রাহ্য হলো? কি আলােচনার পর ও কোন যুক্তির ভিত্তিতে ? এটা কি রকম একটা অরাজনৈতিক ভাব ! আপনার সমালােচনা আর লেভির সমালােচনায় তফাৎ নেতিবাচক সমালােচনার সঙ্গে কৰ্ত্তব্য- নির্দেশক সমালােচনার যা তফাৎ। তা না দেখে আপনাকে লেভির সঙ্গে এক করে দেওয়া হল।” লেনিনের একথা শেষ হত না হতেই তার কথায় বাধা দিয়ে আমি তাকে বললাম, “কমরেড লেনিন,

৪০
লেনিনের স্মৃতি
আপনি হয়তাে ভাবছেন আমাকে মিটমাট মেনে নিতে
হবে বলে আমাকেও একটু সান্ত্বনা দেওয়া দরকার।
কিন্তু তা নয়। সান্ত্বনা ও প্রলেপ ছাড়াই আমার চলবে।”
লেনিনও উত্তর দিলেন, “না, এরকম কিছু আমি মনে
করি নি। প্রমাণ দেখবেন, আপনাকে আমি বেশ একটু
জব্দও করব। বলুন তাে, আপনি কেমন করে নিতান্ত
গণ্ডমূখের মত, হঠাৎ কেন্দ্রীয় পরিষদ্ ত্যাগ করলেন?
গণ্ডমূখ নয়ত কি ? কোথায় ছিল তখন আপনার বুদ্ধি-
বিবেচনা ? এজন্য সত্যি,
এজন্য সত্যি, আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল।
আমাদের কিছু না বলে, আমাদের কোন উপদেশ না
নিয়ে, এবং এরূপ কার্যের ভবিষ্যৎ ফল সম্বন্ধে পর্যন্ত
কিছু চিন্তা না করেই আপনি এমন একটি অবিবেচনাপূর্ণ
কাজ করে বলেন। আপনি জিনােভিয়েভের (Zinoviev)
কাছে লিখলেন না? আমার কাছেও তো লিখতে পারতেন ?
আর তা না হলেও অন্ততঃ একটা তারও তাে করতে
পারতেন ?”
তৎকালীন অবস্থানুযায়ী যে যুক্তিতে আমি হঠাৎ কেন্দ্রীয়
পরিষদ ত্যাগ করেছিলাম তা লেনিনকে বিশদ্ভাবে বুঝিয়ে
বলাম । তথাপি তিনি তার যুক্তি কোন মতেই স্বীকার
করেন নি।
“কি বললেন ?” তিনি বেশ তীক্ষ্ণভাবেই এবার
বললেন, “আপনি কেন্দ্রীয় পরিষদ কর্তৃক উক্ত পদে নিযুক্ত
হন নি, নিযুক্ত হয়েছিলেন সমস্ত পার্টির দ্বারা ? বিশ্বাস,

লেনিনের স্মৃতি
৪১.
করে আপনার উপর যে ভার ন্যস্ত করা হয়েছিল, এমনি
করে তা অবহেলা করা আপনার কোন রকমেই উচিত
হয় নি।”
এ কথার পরেও আমি
আমার কাজের জন্য
মােটেই অনুশােচনা বােধ করলাম না। তিনি আবার
আমার কেন্দ্রীয় পরিষদ পরিত্যাগ করার জন্য আমাকে
তীব্রভাবে সমালােচনা করলেন, সঙ্গে সঙ্গেই বললেন,
“গতকাল মহিলা-সম্মেলনের অধিবেশনে চূড়ান্ত সুবিধাবাদী
বলে অভিহিত করে আপনাকে যে আক্রমণ করা হয়েছে,
তা কি আপনার পক্ষে উপযুক্ত শাস্তি নয়? সেই মহিলা-
অধিবেশনে রয়টেন ফ্রীজল্যাণ্ডের (Reuten Friesland)
ব্যক্তিগত নেতৃত্বে আপনার সম্বন্ধে এ জাতীয় সমালােচনা
আরম্ভ হয়—রয়টেন বােধ হয় এ দিয়েই প্রথম মহিলাদের
মধ্যে সাম্যবাদী কাজ আরম্ভ করলেন। মহিলা-সম্মেলনে
আপনাকে আক্রমণ করলেই আক্ৰমণতত্ত্বকে বাঁচিয়ে রাখা
যাবে মনে করা অবশ্য মূখতা—একেবারেই মূখতা, সে
বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। অবশ্য আরাে অনেক আশা
ও কল্পনাই তারা করেছিলেন। আমার মনে হয়, এসব
যতই বিশ্রী লাগুক, রাজনীতিক দৃষ্টিতে দেখে, সন্তুষ্টচিত্তেই
এসব সমালােচনা আপনি গ্রহণ করবেন। কিন্তু ক্লারা,
শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের প্রতি সর্বদাই লক্ষ্য রাখবেন।
সৰ্ব্বদাই তাদের কথা মনে রাখবেন এবং আমাদের উদ্দিষ্ট
লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি রাখবেন, তা হলেই দেখবেন, এ সব

৪২ লেনিনের স্মৃতি । তুচ্ছ ব্যাপার কোথায় উড়ে যাবে । সমালােচনা আমাদের কার ভাগ্যে না জুটেছে ? আপনি জানবেন, আমাকেও তা অনেক সইতে হয়েছে। যে বলশেভিক পার্টিকে আপনারা এত প্রশংসা করেন, তা কি সহজে গড়েপিটে তৈরী করা সম্ভব। হয়েছে ? বন্ধুরাও অনেক সময়ে অবিবেচকের মত কাজ করেছেন। কিন্তু আপনার কথাতেই আসা যা : আজ আপনাকে আমার কাছে কথা দিতে হবে যে, আপনি আর না ভেবে চিন্তে এরূপ কাজ করবেন না, তা না হলে এখানেই আমাদের বন্ধুত্বের অবসান হবে।” এ সকল কথাবার্তার পর আমরা আবার মূল প্রশ্ন নিয়েই আলােচনা শুরু করি। এ সময় লেনিন আমার নিকট সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের সংগ্রাম-কৌশলের মূল তত্ত্বসমূহ ব্যাখ্যা করেন। এগুলােই তিনি পরে বিশদ ও বােধগম্য করে তার বক্তৃতায় কংগ্রেসের নিকট পেশ করেছিলেন। তার পূর্বে, কমিশনের আলােচনার সময়ে, তর্ককালে তিনি তীক্ষ্ণ সংক্ষিপ্ত ভাষায় সেই খসড়াকে সমর্থন করেছিলেন এ ভাবে ? “বিশ্ববিপ্লবের প্রথম প্রথম সংগ্রাম শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় সংগ্রামের এখনো সূচনা হয় নি। সে বিষয়ে কোন ভ্রান্ত ধারণা থাকা আমাদের পক্ষে বড় বিপজ্জনক হবে। আমরা জাক্সেস্ (Xarxes) নই যে সমুদ্রকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে চাইব। ( পারস্য-সম্রাট জাক্সেস্ (Xarxes) গ্রীস

লেনিনের স্মৃতি
আক্রমণ করতে গিয়ে সমুদ্রের সামনে বাধা পেলেন।
তিনি ভাবলেন সমুদ্র বন্ধন করবেন সমুদ্রকে শৃঙ্খলে বেঁধে )।
ঘটনাবলী ও তার যথার্থতা নির্ধারণ করতে হবে বলে
অথবা সে সবের প্রতি মনোেযােগী হতে হবে বলে,
তার অর্থ এই নয় যে, আমরা নিষ্কর্মা হয়ে বসে পড়েছি
এবং লড়াই ত্যাগ করেছি। তা কখনাে হতে পারে না।
‘শেখে, শেখাে, শেখো, আর কাজ করো, কাজ করাে,
কাজ করাে'- এই আমাদের
মন্ত্র। সামনে যে বিপ্লব
আছে, তাকে
তাকে সম্পূর্ণরূপেই আমাদের কাজে লাগাবার
জন্য, সর্বদাই অত্যন্ত সচেতন হয়ে, সমস্ত শক্তি প্রয়ােগ
করে নিজেদের প্রস্তুত করে তুলতে হবে। এটাই হলো
এখন আমাদের প্রধান কর্তব্য। চাই পার্টির অশ্রান্ত
আন্দোলন ও পার্টি-প্রচার ;-পার্টির অভিযানে তা চূড়ান্ত
রূপ লাভ করবে। কিন্তু জনগণের অভিযানের স্থলে
ভ্রান্তিহীন পার্টি অভিযান হলেই হবে, এই ভ্রান্ত ধারণা
যেন আমাদের না পেয়ে বসে। আমরা এতদূর এগিয়ে
এসেছি। আরাে এগিয়ে চলাে –এ কথা যতক্ষণ আমরা
বলশেভিকরা নিজেদের বলতে না পারি ততক্ষণ আমরা
কি করে মনে করব যে জনতার মধ্যে আমরা কাজ করছি।
তাই চাই জনগণকে। রাষ্ট্রশক্তি আয়ত্ত করবার আগে
প্রথমেই চাই জনগণের মন জয় করা। কংগ্রেসের এ জাতীয়
ভাবধারা আপনাদের মত প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরিতৃপ্ত করবার
পক্ষে নিশ্চয়ই যথেষ্ট।”

৪৪
লেনিনের স্মৃতি
“আর পল লেভি ? তার
তার সম্বন্ধে
সম্বন্ধে আপনার এবং
আপনার বন্ধুবান্ধবদের কি ধারণা তা জানবার জন্য আমি
বহুদিন যাবৎ উগ্রীব হয়ে ছিলাম। কংগ্রেসই বা তার
ব্যাপারে কি নীতি অবলম্বন করবে ?” আমার জিহ্বাগ্রে
এসে গেল এই সব প্রশ্ন।
উত্তরে লেনিন বললেন, “পল লেভি নিজেই একটি
আলােচ্য বিষয় হয়ে উঠেছেন। এ দোষ অবশ্য তার
নিজেরই। আমাদের থেকে নিজেকে তিনি একেবারে
বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে অন্ধ একগুয়ের মত চোরাগলিতে
গিয়ে সেধিয়েছেন। প্রতিনিধিদের কাছে প্রচারকাৰ্যকালে
আপনি নিজেই তা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন। তার বিষয়ে
আমাকে কিছু আর আপনার বুঝাতে হবে না। আপনি
জানেন, আমি পল্ লেভি ও তার কাৰ্যদক্ষতাকে কত
মূল্যবান মনে করি। সুইজারল্যাণ্ডে তার সঙ্গে আমার
প্রথম পরিচয় হয়। তখনই তার উপরে আমি অনেক
আশা ভরসা রাখতে থাকি। সৰ্ব্বাপেক্ষা দুঃসময়েও তিনি
নিজের কাছে নিজে খাটি ছিলেন, আর ছিলেন নির্ভীক,
চতুর ও স্বার্থত্যাগী। আমি জানতাম শ্রমিকদের সঙ্গে
ব্যবহারে তিনি কোনাে কোনাে জায়গায় উদাসীনতার
পরিচয় দিয়েছেন, তাঁর ভাবটা ছিল অনেকটা এইরূপ
‘একটু দূরেই তােমরা থাকে, কিন্তু তবুও তিনি বিশেষ
ভাবেই জনগণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে আমার বিশ্বাস
তার এই পুস্তকখানি প্রকাশিত হওয়া মাত্রই কিন্তু
ছিল।

লেনিনের স্মৃতি ৪৫ তাকে আমি সন্দেহ করতে শুরু করেছি। তিনি অত্যন্ত আত্মাশ্রয়ী এবং অহংভাবাপন্ন হয়ে যাচ্ছেন বলেই আমার ভয় হয়, লেখাপড়ার জন্য দাম্ভিকতাও দেখা যাচ্ছে। ‘মার্চ-অভিযান’কে নিম্মমভাবে সমালােচনা করবার প্রয়ােজন ছিল, সত্য। কিন্তু পল লেভির দান, সেদিক দিয়ে বিচার করলে কিরূপ? তিনি পার্টিকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছেন। সমালােচনা তাে করেন নাই-ই, তার সমালােচনা একদেশ- দর্শী, অত্যুক্তিবহুল, এমন কি বিদ্বেষমূলক। পার্টির কাজে আসতে পারে এমন কিছুই তিনি দিলেন না। পার্টির সহিত তিনি একাত্মতা অনুভব করেন না। এ জন্যই সাধারণ কমরেডরাও অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তার সমালােচনার যথার্থতায়, বিশেষ করে তার শুদ্ধ রাজনীতিক নীতিগুলােতে কোন রকমেই কর্ণপাত করতে বা দৃষ্টিপাত করতে রাজি হন নি। “জাৰ্মান কমরেড ও অন্যান্য কমরেডদেরও মনে তাতে এমনি একটা ভাবের সৃষ্টি হয়েছে যে, তারা ‘আক্রমণ- তত্ত্ব’ ও ‘বামপন্থার’ ভ্রান্ত ধারণা ও তার কাৰ্য্যগত ফলাফল নিয়ে পর্যন্ত কোন আলােচনা না করে, পল্ লেভিকে ও তার রচিত ক্ষুদ্র পুস্তকটির সম্বন্ধেই সমালােচনা করতে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা যে এখন পর্যন্ত সুখে আছেন, তার কারণও পল্ লেভি। পল লেভি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড়শত্রু।” লেনিনের শেষ মন্তব্যটির সত্যতা আমাকে স্বীকার করতে হল। কিন্তু আমি তার অন্যান্য মন্তব্যগুলােকে

৪৬
লেনিনের স্মৃতি
তীব্রভাবে অসমর্থন করে বললাম, “পল্ লেভি শুধু দাম্ভিক,
আত্মসন্তুষ্ট লেখক মাত্র নন। এমন কি, রাজনীতি-ক্ষেত্রে
নেতৃত্ব করবার মত উচ্চাকাঙ্ক্ষাও তিনি রাখেন না।
অল্প বয়সেই তিনি পার্টির যে নেতা হয়ে গেছেন—তা
শুধুমাত্র ভাগ্যবশে, নেতৃত্ব করবার আকাঙ্ক্ষায় নয়। রােজা
(Rosa Luxemburg), Ptof (Liebkneeht) 47: 717773
(Leo Jogisches) হত্যার পরে তাঁকেই নেতৃত্বভার গ্রহণ
করতে হয়েছে। তিনি প্রায়ই এজন্য দুঃখ করেন। এইটিই
আসল কথা। আমাদের কমরেডদের সঙ্গে তিনি খুব
আন্তরিকভাবে মেশেন না, বরং তিনি কুণে। স্বভাবেরই
মানুষ।
তা সত্ত্বেও শ্রমিকশ্রেণী ও পার্টির সঙ্গে তার
প্রাণ যে প্রতিটি গ্রন্থিতে এখনো জড়িত, সে বিষয়ে আমার
কোন সন্দেহ নেই। সেই শােচনীয় ‘মার্চ-অভিযানে
তাঁর সমস্ত অন্তরাত্মা ছিন্নভিন্ন হয়েছে। তিনি সত্যি সত্যিই
মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন যে, ঐ অভিযানে হেলায় খেলায়
পার্টির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়েছে। যার জন্য কাল, রােজা,
লিয়ে এবং আরাে অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন, তার বৃথা
অপব্যয় হয়েছে। পার্টি একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে,
এই আশঙ্কায় তিনি কঁদছেন—সত্য সত্যই তিনি এজন্য
কেঁদেছেন। তীক্ষ উপায় অবলম্বন না করলে আর উদ্ধার
নেই বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। উপাখ্যানে যেমন আমরা
পড়ি-মাতৃভূমিকে রক্ষা করবার জন্য রােমের বীর অতল
গহ্বরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, লেভিও ঠিক তেমনি প্রেরণায়,

লেনিনের স্মৃতি
৪৭
জেনে শুনেই এই পুস্তিকাখানি লেখেন। সত্যি, তার
উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই স্বার্থহীন, নির্মল।”
লেনিন উত্তর দিলেন, “এ বিষয় নিয়ে আপনার সঙ্গে
আমি আর তর্ক করবােনা, লেভির থেকেও আপনি তার
ওকালতি আরও ভাল করতে জানেন। কিন্তু এ আপনি
নিশ্চয় বােঝেন যে, রাজনীতি ক্ষেত্রে কোন ব্যাপারে
উদ্দেশ্য আমাদের বিচার্য নয়। আমাদের বিচাৰ্য ঘটনার
ফলাফল । প্রবাদ আছে না “নরকের পথ সদিচ্ছায়
বাঁধানাে?” কংগ্রেস পল্ লেভিকে দোষী সাব্যস্ত করবেন,
তার উপর কঠিন হবেন। কিন্তু তা ছাড়া উপায়ান্তর নেই।
তবে তাকে শাস্তি পেতে হবে শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে, তার
মূল রাজনীতিক মতবাদের জন্য নয়। সেই নীতিগুলাে যখন
খাঁটি বলে প্রমাণিত হচ্ছে, তখন আর তাকে এখন সেজন্য
শাস্তি দেওয়া যায় কি করে ? যদি পল্ লেভি নিজে সে
পথ রুদ্ধ না করেন, তা হলে তিনি ইচ্ছা করলেই আবার
ভবিষ্যতে আমাদের কাছে ফিরে আসতে পারবেন ; রাজনীতি
ক্ষেত্রে তার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপেই তার নিজের উপর নির্ভর
করছে। সুনিয়ন্ত্রিত সাম্যবাদীর মত কংগ্রেসের মীমাংসাকে
মেনে নিয়ে, কিছুকালের জন্য রাজনীতি ক্ষেত্র হতে তার
অদৃশ্য হওয়াই উচিত। অবশ্য তা তার পক্ষে খুবই কষ্টদায়ক
হবে। সত্যি বলছি, আপনি বিশ্বাস করুন, এ জন্য তার
প্রতি আমার সম্পূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে। তার জন্য সত্যই
আমি দুঃখিতও হচ্ছি। তা সত্ত্বেও তাকে এই পরীক্ষাকাল

৪৮
লেনিনের স্মৃতি
থেকে আমি রেহাই দিতে পারি না। জারদের আমলে
আমরা রুশিয়াবাসীরা যে রকম করে নির্বাসনদণ্ড ও
কারাদণ্ড গ্রহণ করতাম, পলেরও ঠিক সে ভাবেই এ দণ্ড
গ্রহণ করতে হবে। গভীর অধ্যয়নে ও স্থির আত্মবিচারে
এ সময়টা তিনি কাজে লাগাতে পারেন। তার বয়স
এখনাে অল্প, পার্টির মধ্যেও তিনি অল্পদিনই এসেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক তত্ত্ব বিষয়ক ধারণায় এখনাে অনেক ফাক
রয়েছে, মার্ক্সীয় অর্থনীতিতেও তিনি এখন পর্যন্ত প্রাথমিক
শিক্ষাস্তরে রয়েছেন। আরাে গভীর ভাবে জ্ঞান লাভ করে
এবং রাজনীতিক মতবাদে পরিপক্ক হয়ে, তিনি আবার
আমাদের কাছে ফিরে আসবেন—পাটিরই একজন দক্ষ,
অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে। তাকে হারানাে আমাদের চলবেনা,
আমাদের কাজের জন্য তাঁকে চাই—তার নিজেরও চাই
আমাদের। মাথাওয়ালা লােকের সংখ্যা আমাদের মধ্যে
খুব বেশী নেই, কাজেই আমাদের যা আছে, তার মধ্যে
যতটা সম্ভব ততটা সংরক্ষণ করা অত্যন্ত দরকার। প
সম্বন্ধে আমার ধারণা যদি সত্য হয়, তা হলে বিপ্লববাদী
শ্রমিকশ্রেণী হ'তে পূর্ণমাত্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তিনি অত্যন্ত
আঘাত পাবেন। বন্ধু ভাবে তার সঙ্গে সব কথা বলবেন ; এবং
‘আমি ঠিকই করেছি, এ জাতীয় ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গীতে উক্ত
ঘটনাকে বিচার না করে তিনি যাতে সাধারণ দৃষ্টিতে এ
ঘটনাকে দেখতে পারেন, সেজন্য তাকে সাহায্য করবেন।
আমিও আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করব পল লেভি যদি

লেনিনের স্মৃতি ৪৯ শৃঙ্খলা রক্ষা করতে রাজী হন এবং যথারীতি চলাফেরা করেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, তিনি বেনামীতে পার্টির পত্রিকায় লিখতে পারেন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্তিকাও রচনা করতে পারেন ; তাহলে তিন চার মাসের মধ্যেই তাকে পার্টিতে পুনগ্রহণের দাবী আমি প্রকাশ্যভাবেই উত্থাপন করবে। তার সম্মুখে অগ্নিপরীক্ষা। তিনি এ পরীক্ষায় যেন উত্তীর্ণ হন, এ কামনাই করি।” আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। যা অলখ্য এবং যার। ফলাফল দুলক্ষ্য তার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছি বলে একটা অনুভূতি আমার মনে জাগছিল। আমি লেনিনকে বললাম, “লেনিন, যা সম্ভব করুন, আপনারা রুশিয়াবাসীরা যুদ্ধ করতে যেমনি সৰ্ব্বদাই প্রস্তুত, তেমনি আবার সবাইকেই মিত্রভাবে গ্রহণ করতেও পারেন। আপনাদের দেশের বাষ্পচ্ছন্ন প্রান্তরের (steppes) উপর দিয়ে যেমন পরিবৰ্ত্তমান বাতাস নিমেষে প্রবাহিত হয়ে যায়, তেমনি অভিশাপ এবং আশীৰ্বাদ আপনাদের জীবনে এই আসে, এই যায়—এ কথা আমি পার্টির ইতিহাস পড়ে জেনেছি। আমাদের পশ্চিমদেশ- বাসীদের মন কিন্তু কোন জিনিস তত স্পর্শ করে না। আমাদের মনের উপর চেপে আছে আল্পসের ( Alps ) পৰ্বত-পাহাড়-( আমাদের মন তাই সহজ ও সচল নয় ) মাক্স ও এই কথা বলেছেন। পল্ লেভিকে যাতে আমরা আমাদের সঙ্গে রাখতে পারি, যথাশক্তি তার চেষ্টা করতে আমি আবার আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরােধ করছি।” ৪ লেনিনের স্মৃতি লেনিন উত্তর দিলেন, “চিন্তা করবেন না। আমি আপনাকে যে কথা দিয়েছি, সে কথা রক্ষা করবাে। এখন পল্ লেভি নিজে স্থিরচিত্ত হলেই হয়”–লেনিন তার সেই পুরণে সাধারণ টুপিটি তুলে নিয়ে শান্ত দৃঢ়পদে চলে গেলেন। । জার্মান প্রতিনিধিবর্গের মধ্যে সুবিধাবাদী” নামে বর্ণিত কম্‌রেডগণমালজাহ (Malzahn), নয়ম্যান্, (Neumann), ফ্রাঙ্কেন (Franken) এবং মূলার (Muller)- “মার্চ-অভিযানের” স্বরূপ ও ফলাফল সম্বন্ধে লেনিনের সঙ্গে আলােচনা করবার জন্য এ সময় অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ে- ছিলেন। কমরেড ফ্রাঙ্কেন (Franken ) রাইন দেশের কোন একটি জেলা হতে এসেছিলেন, এবং বাকী তিনজন ট্রেড ইউনিয়নের লােক। তারা আন্তর্জাতিক সাম্যবাদীদের সৰ্বস্বীকৃত নেতা লেনিনকে বহু অংশের শ্রেণী-সচেতন বিপ্লবী শ্রমিক কর্মীদের মনােভাব জানানাে জরুরী মনে করছিলেন। আক্ৰমণতত্ত্ব সম্বন্ধে, আবশ্যকীয় সংগ্রাম-কৌশল সম্বন্ধে তাদের নিজেদের মতবাদ লেনিনের সঙ্গে আলােচনা করবার প্রয়ােজনও তারা এ সময় অনুভব করছিলেন। স্বভাবতঃই এসব বিষয়ে লেনিনের মতবাদ জানবার জন্যও তারা অত্যন্ত উৎসুক ছিলেন। লেনিনও তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজী

লেনিনের স্মৃতি
হলেন। দিনক্ষণ স্থির হল, আমার বাসাতেই তারা সকলে
মিলিত হবেন। জাৰ্ম্মান করেডরা লেনিনের আগেই এলেন।
কারণ, কংগ্রেসের তর্ক-বিতর্কে আমরা কিভাবে অংশ গ্রহণ
করবে, সে বিষয়ে আমাদের কাৰ্য-পদ্ধতি স্থির করতে হয়।
লেনিন সর্বদাই সময়নিষ্ঠ ছিলেন। ঠিক সময়ে, এক
মিনিট পর্যন্ত এদিক ওদিক না করে, তিনি অতি
সাধারণ ভাবেই কমধ্যে প্রবেশ করে বললেন –“সুপ্রভাত
করেছগণ।” অন্য কমরেডগণ তখন গভীরভাবে আলাে-
চনায় নিবিষ্ট, তাকে লক্ষ্য করবার সময়ও পান নি।
তিনি তাদের সঙ্গে করমর্দন করে তাঁদের সঙ্গে বসে পড়লেন,
ও তখনি আলােচনা শুরু করলেন। আমার কিছু মনে
হয় নি, লেনিনকে সব কমরেডই চেনেন বলে আমি
ধরেই নিয়েছি। সেজন্যই লেনিনকে তাদের সঙ্গে পরিচিত
করে দেবার কথাও আমার মনে পড়ে নি। প্রায় দশ
মিনিটকাল সাধারণভাবে আলােচনা হয়ে যাওয়ার পর
তাদের মধ্যেই একজন আমাকে একদিকে টেনে নিয়ে
জিজ্ঞাসা করলেন, “করেড ক্লারা, ইনি কে?”
“সেকি! আপনি একে চিনতে পারেন নি? ইনিই
হলেন কমরেড লেনিন,” আমি উত্তর দিলাম।
বন্ধুটি সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, “সত্যি বলছেন! আমার
মনে হয়েছিল অনেক বড় বড় লােকের মত উনিও বুঝি
আবার আমরা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে না উঠা পর্যন্ত
আমাদের বসিয়ে রাখবেন। সবচেয়েও যে সাধারণ করে,

লেনিনের স্মৃতি
তিনিও তাে ওঁর মত এত অমায়িক নন। চ্যান্সেলার হয়ে
আমাদের পুরাণণা করেড হারম্যান্ মূলার (Hermann
Muller) তঁার লম্বা লেজওয়ালা কোট পরিধান করে
রাইখষ্টাগে (Reichstag) কেমন গম্ভীরভাবে ঘুরে বেড়ান,
তা আপনার একবার দেখা দরকার।”
আমার মনে হয়েছিল যেন লেনিন ও এই প্রতিপক্ষ
কমরেডরা পরস্পরকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করছেন।
নিজে কথা বলার চেয়েও লেনিন বেশী চেষ্টা করছিলেন,
তাদের মন্তব্যগুলাে শুনে ভাল করে তুলনা করে নিজে
জেনে-বুঝে নিতে। অবশ্য স্বীয় মতবাদকে তাঁদের কাছে
উদঘাটিত করতে তিনি একটুও অবহেলা করেন নি ; কিন্তু
মােটেই সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় প্রবন্ধের মত গুরুগম্ভীর
ভাবে তিনি কিছু বলেন নি। তিনি ক্রমাগত একটার
পর একটা প্রশ্ন করে তাদের মন্তব্যগুলাে বিশেষ আগ্রহে
সহিত শুনছিলেন এবং মাঝে মাঝে সেগুলােকে ব্যাখ্যা
করতে বলে অপ্রাসঙ্গিক আরো কতকগুলো খবরাখবর
জিজ্ঞাসা করছিলেন। তিনি বিশেষ
দেন
পরিকল্পনানুযায়ী সুনিয়ন্ত্রিত কাজের উপর, আর কেন্দ্রীকৃত
সংগঠন-নেতৃত্বের উপর, এবং সুদৃঢ় শৃঙ্খলার উপরও তিনি
তেমন ভাবেই জোর দেন। লেনিন নিজেই পরে আমাকে
বলেছিলেন যে এই বৈঠকটি তাকে বিশেষ আনন্দ দিয়েছিল।
তিনি বলেছিলেন, “মালজাহ (Malzahan) ও তার বন্ধু
এই জার্মান শ্রমিকেরা চমৎকার কর্মী ; স্বীকার করি-যদি

লেনিনের স্মৃতি
মুখের জোরের পরীক্ষা হয়, তা হলে এরা কখনাে জিততে
পারেন না। আকস্মিক বাহিনীর কাজও এর পারবেন
কিনা, ঠিক জানি না। কিন্তু আমি ধ্রুব-নিশ্চিত যে তাদের
মত অটল, শৃঙ্খলাবদ্ধ লােকেরাই হলাে বিপ্লবী জনগণের
সৈনিকশ্রেণী, তারাই হলাে কলকারখানা ও ট্রেড ইউনিয়নের
প্রধান অবলম্বন ও ভিত্তি। এরূপ লােকদেরই একত্রিত
ভাবে কর্মঠ করে ভােলা হলো আমাদের কাজ। তারাই
জনগণের সঙ্গে আমাদের মিলনসূত্র।”
একটু রাজনীতি বহিভূত কথা এ প্রসঙ্গে বলছি-
লেনিন যেদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন,
সেদিন বাড়ীর সকলেই ছুটির দিন বলে আনন্দ উৎসব
আমি তখন যে বাড়ীতে ছিলাম, তা মস্কো
কমিউনের ( বিপ্লবী গােষ্ঠীর ) সম্পত্তি। নিকট ও দূর
প্রাচ্যের অনেক প্রতিনিধিরও সে বাড়ীতেই তখন বাসস্থান
স্থির হয়েছে। রুশীয় বিপ্লবের পূর্বে তা একজন ধনী
শিল্পপতির বৃহৎ বাড়ী ছিল। সে বাড়ীর রাঁধুনী মেয়েটি
থেকে বাড়ীর পাহারায় নিযুক্ত লালরক্ষীরা সকলেই আগে
থেকেই লেনিনকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিল।
“ভাডিমির ইলিচ এসেছেন” এই খবরটি একজনার মুখ হতে
আরেকজনার কাছে পৌছতে একটুও দেরী হল না। লেনিনকে
অভিনন্দন জানাবার জন্য লােক জল সেই বাড়ীর বড়
হল ঘরে, কেউ বা এল দরজায় দাড়িয়ে তাকে একটু দেখতে,
আর কেউ একবার শুধু তাকে নমস্কার জানাতে। সকলের
করেন।

৫৪
লেনিনের স্মৃতি
তাদের
কাছেই গিয়ে লেনিন যখন কাউকে দু’একটি কথা বললেন,
কাউকে তার সুন্দর আন্তরিক হাসিতে অভিনন্দন জানালেন,
তখন তাদের সকলকার মুখই আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
তাদের মুখে একটুও অবনতির বা হীনতা বােধের চিহ্ন
দেখিনি। লেনিনের আচরণেও বিন্দুমাত্র মুরুব্বিয়ানার চাল
বা কৃত্রিম
দেখিনি। লালফৌজের সৈন্যগণ, শ্রমিকগণ,
দাগিস্থান পারস্য প্রভৃতি স্থান হতে আগত কংগ্রেস
প্রতিনিধিগণ, কিংবা পল্ লেভির জন্যই যারা অত প্রসিদ্ধ
হয়েছিলেন সেই “তুর্কিস্থানীরা”—যেন রূপকথার দেশের
মানুষ, এমনিতর
পােষাক-পরিচ্ছদ—সকলেই
লেনিনকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। তাদের মনােভাব
ছিল লেনিন যেন তাদেরই একজন ; লেনিন নিজেও নিজকে
তাদেরই একজন বলে মনে করতেন; ভ্রাতৃত্বের সুগভীর বন্ধনে
তারা সকলেই যেন এক হয়ে গিয়েছেন।
আর্থিক অবস্থা ও সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের নূতন
কর্মধারার বিষয়ে ট্রস্কির (Trotsky) তীক্ষ্ণ ও সুন্দর
কাৰ্যবিবরণ (রিপাের্ট) নিয়ে সেখানে একটা তর্কবিতর্ক হয় ;
কিন্তু তাতে কিংবা বৃহৎ সম্মেলনের কমিশন-পরিষদের
আলােচনায়, কোনাে বিষয়েই ‘আক্রমণ-তত্ত্বের প্রচারকেরা
কিছুমাত্র জয়লাভ করতে পারেন নি। কিন্তু সাম্যবাদী
আন্তর্জাতিকের কৌশল-পদ্ধতি’ নামীয় প্রবন্ধটিতে কিছু
সংশােধন এনে ও তার সঙ্গে আরাে নূতন কিছু সংযােগ
করে জয়লাভ করা যেতে পারে এই আশা তখনাে তারা

লেনিনের স্মৃতি পােষণ করেন। জার্মান, অষ্ট্ৰীয় ও ইতালীয় প্রতিনিধিগণ তঁাদের সেরূপ সংশােধনী প্রস্তাবসমূহ পেশ করেন। কমরেড টেরাসিনি (Terracini) সেসব সমর্থন করেন, সেগুলাে গ্রহণ সাপক্ষে বিশেষ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত কি হবে ? ক্রেমলিন হলের পুরাতন সম্রাট-প্রাসাদের জাঁকজমকের সােনালি রং ছাপিয়ে উঠেছে নূতন কমিউনিষ্ট জনগৃহের অগ্নিবর্ণ রক্তচ্ছটা ! শত শত প্রতিনিধিগণ ঘেষাঘেষি করে বসে অখণ্ড মনোেযােগ ও সােৎসুক অন্তরে সভার আলােচনা শুনছেন! লেনিন বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন। বক্তৃতাটি ছিল বাগ্মিতার একটি সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। তাতে ছিল সুস্পষ্ট চিন্তার ধারা, যুক্তির অখণ্ডনীয় শক্তি, সুনিবদ্ধ সুসমঞ্জস ব্যাখ্যা। তার এক একটি বাক্য যেন অভেদ্য, অচ্ছেদ্য প্রস্তরের মত বর্ষিত হচ্ছে। সব মিলে যেন তা অখণ্ডিত একটি রূপ পরিগ্রহ করল। লেনিন কাউকে বাকচ্ছটায় চমৎকৃত করে দিতে চান নি, তিনি চেয়েছিলেন তাঁদের সন্দেহভঞ্জন করতে। তিনি জানতেন কেমন করে সন্দেহ- ভঞ্জন করতে হয়, আর কেমন করে তাই বিমুগ্ধও করা যায়। সুন্দর সুদৃঢ় শব্দ প্রয়ােগ করে তা করা যায় না তাতে কথার ঝঙ্কারেই মানুষ বিস্মিত হয়; কিন্তু মানুষকে বিমুগ্ধ করতে হয় বুঝিয়ে, উজ্জ্বল মনের শক্তি দিয়ে। তার আত্মবঞ্চনাবিরােধী মন সামাজিক জগতের ঘটনাবলী থেকে তার বাস্তবরূপ উদঘাটিত করে ধরত, নিৰ্মম সত্যনিষ্ঠার লেনিনের স্মৃতি সঙ্গে যথাযথ অবস্থাবলী প্রকাশ করে দিত। ‘ন্যায়-অন্যায় নিয়ে যারা খেলা করে, সত্যিকারের জয়ের পথ যারা বুঝতে পারে না, তাদের উপর লেনিনের প্রত্যেকটি কথা বেত্রাঘাতের মত, লগুড়ের আঘাতের মত বর্ষিত হত। “আমাদের লড়াইতে অধিকাংশ শ্রমিকশ্রেণীকে, শুধু অধিকাংশ শ্রমিক- শ্রেণীকে কেন, এমন কি, অধিকাংশ নিপীড়িত ও শোষিত জনসমাজকেও যদি আমরা আমাদের দলভুক্ত করতে পারি, তবেই, তবেই শুধু হবে আমাদের জয়।” সকলেই বুঝল চূড়ান্ত আঘাতটিই দেওয়া হয়েছে। আমি উৎসাহের আতিশয্যে লেনিনের করমর্দন করে না বলে থাকতে পারলাম না, “লেনিন আপনি কি জানেন যে, কোন বক্তা এমন অবস্থানে বক্তৃতা দিতে হলে লজ্জায় ভয়ে আপনার মত বােধগম্য ও সাদাসিদে ভাবে কথাই বলতে পারবে না ? তিনি ভয় পাবেন এই মনে করে যে, লােকে ভাববে তিনি বুঝি উপযুক্ত রকমে শিক্ষিত নন। আপনার বক্তৃতা-পদ্ধতির সঙ্গে আর একটি জিনিসের মাত্র তুলনা হয়—টলষ্টয়ের মহৎ শিল্পের। তার মতই আপনার মধ্যেও প্রশস্ত সুস্থ মনের ও অপরাজেয় সত্যকে জানবার দুর্নিবার আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়। আসলে এই সত্যই সুন্দর। সম্ভবতঃ শুধু মাত্র শ্লাভ জাতির মানুষই এই বিশিষ্ট প্রকৃতির অধিকারী?” “জানি না”, লেনিন উত্তর দিলেন, “কেমন করে আমি বক্তা হ’লাম তাই শুধু আমি বলতে পারি। আমি যখন কথা বলি তখন সর্বদাই শ্রোতাদের কথা না ভেবে ভাবি লেনিনের স্মৃতি শ্রমিক এবং কৃষকদের কথা। যখনি কোন সাম্যবাদী কোথাও বক্তৃতা দেবেন, তখনই তার জনগণের কথা মনে রাখতে হবে, তাদের উদ্দেশ্যেই বক্তৃতা করতে হবে। কিন্তু ভালই হল, আপনি যে জাতীয় বৈশিষ্ট্যের কথা আমায় বললেন, তা আর কেউ শুনতে পায় নি ; নতুবা অনেকেই হয়তাে বলতাে, “দ্যাখাে, দ্যাখো, বুড়ােটা প্রশংসার লােভে কেমন ফাদে পড়ে গেছে। আমাদের সর্বদাই অত্যন্ত সাবধানে থাকতে হবে, যাতে করে অন্যের সন্দেহ না করে যে আমরা দুই সেকেলে বুড়ো মিলে বামপন্থীদের বিরুদ্ধাচরণ করবার উপায়ই বুঝি খুজছি। অবশ্য সত্য যে, পন্থীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবারও কিছু নেই”—এই বলে লেনিন স্বচ্ছন্দ মনে হাসতে হাসতে সেই ঘর থেকে নিজের বাম- কাজে চলে গেলেন। আমার চলে আসার দিন লেনিন আমার কাছে বিদায় নিতে আসেন। তাঁর মতে আমার পক্ষে বিশেষ প্রয়ােজনীয় কতকগুলাে উপদেশ লাভ করার ছিল ; আমার বিদায় মুহূর্তে সেই প্রয়ােজনীয় উপদেশগুলো লেনিন আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি বললেন-“কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে অবশ্যই আপনি সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। পল্ লেভির রাজনীতিক নীতি ও কৌশল-প্রণালীকে সমর্থন করা সত্ত্বেও পল লেভিকে ৫৮ লেনিনের স্মৃতি পার্টি থেকে বাইরে রাখা যে যুক্তিসঙ্গত হয়নি, আপনার এই মত জানাতেও আপনি কসুর করেন নি। এ ব্যাপারের আরও কিছু সংশােধন করাও অত্যন্ত দরকার। লেভির যে ভুলগুলাে একটু আগে আমি নির্দেশ করেছিলাম, শুধু সেগুলাের কথাই আমি ভাবছি না। জনগণের মনকে জয় করবার পথে লেভি যে বাধাবিপত্তিগুলাের সৃষ্টি করেছেন- বিশেষ করে সেগুলাের কথাই আমি ভাবছি। তাকে তার নিজের ভুলগুলাে বুঝতে হবে। স্বীকার করতে হবে। তা হ'লেই তিনি নূতন করে জনগণের থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবেন। সেই শিক্ষাই তার রাজনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে শীঘ্রই আবার পার্টিকে সুপরিচালিত করবার মত শক্তি দেবে।” এ কথার উত্তরে লেনিনকে আমি বললাম, “আমার মনে হয় এক কাজ করা যায়, যাতে, প নিজ মতবাদকে পরিত্যাগ না করেই সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের আনুগত্য মেনে চলতে পারেন। তিনি প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন থেকে সরে দাড়িয়ে একটি সাময়িক সংবাদপত্রের প্রকাশ করতে পারেন—তাতে তিনি তৃতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের কর্মধারার যথার্থতা ঐতিহাসিক দৃষ্টিক্ষেত্র থেকে বাস্তব চক্ষে বিচার করতে পারবেন। তাতে কংগ্রেসের কৰ্ম্ম-কৌশলের সমালােচনা বাদ দেওয়া হবে না, সেই সমালােচনাও করা যায়। তিনি বলতেও পারেন-কংগ্রেস তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায় ও যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত করেছে, তা তিনি জানেন। কিন্তু তা

লেনিনের স্মৃতি
সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ লড়াইয়ে যাতে কোন বাধাবিঘ্নের সৃষ্টি না
হয়, তার জন্য তিনি কংগ্রেসের আনুগত্য মেনে চলবেন।
এভাবেই আত্ম-সংযমের ও সৎসাহসের পরিচয় দিয়ে পল
রাজনীতিক কর্মী ও মানুষ হিসেবে কিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না
বরং জয়লাভ করতে পারতেন। তা হলেই তার বিরুদ্ধে
তার বিরুদ্ধমতাবলম্বীদের সমস্ত কুৎসিত সন্দেহ তিনি
অপ্রমাণিত করতে সমর্থ হতেন ও সকলকে দেখাতে পারতেন
যে, সাম্যবাদই তার কাছে সৰ্ব্বপ্রধান জিনিস।”
লেনিন বলেন, “এ অতি সুন্দর প্রস্তাব, তাতে কোন
সন্দেহ নেই। তবে কিনা, এ প্রস্তাব কি মেনে চলা হবে ?
আশা করি, লেভির সম্বন্ধে আপনার আন্তরিক শুভেচ্ছাই
যেন শেষ পর্যন্ত সার্থক হয় ; যারা লেভির সম্বন্ধে নিরাশ
হয়েছেন, তাদেরই যেন ধারণা ভুল হয়ে যায়
আমি।
আপনাকে আবার কথা দিচ্ছি, লেভি নিজে যদি কোন
বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি না করেন, তবে আমি আবার তাকে
পার্টিতে গ্রহণের জন্য প্রকাশ্যেই পত্র লিখব। কিন্তু আসল
কথা, সব দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাচ্ছে যে, তৃতীয়
কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত সত্যসত্যই অত্যন্ত সন্তোষজনক। এই
মতামতগুলাের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী। তা ছাড়া
এই মতবাদগুলােতে দেখা যাচ্ছে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকও
একটা পথের মােড়ে এসে পৌছাচ্ছে। বিপ্লবী জনতার পার্টি
রূপে বিকাশের পথে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের প্রথম অধ্যায়
যে সমাপ্ত হয়েছে, কংগ্রেসের এই সকল মতামতগুলােই

লেনিনের স্মৃতি প্রমাণ। বিশ্ব-বিপ্লব তার প্রাথমিক উগ্রতায় ঝড়ের মতন বয়ে যাবে, আমরা বিপ্লবের দ্বিতীয় তরঙ্গে অগ্রবর্তী হয়ে যাব, শুধুমাত্র আমাদের পার্টি ও তার অভি- যানের বলেই শেষ পর্যন্ত জয়ী হব-বামপন্থীদের এই বিভ্রান্ত মতবাদগুলােকে কংগ্রেস একেবারেই এবার উড়িয়ে দিয়েছে। এ কথা ঠিক, জনগনের অভিযান বাদ দিয়ে পার্টির গৌরব ময় কীৰ্ত্তি হিসাবে ‘বিপ্লব’ তৈরী করা যায়, কিন্তু তা শুধু কংগ্রেসের এই বৃহৎ প্রকোষ্ঠে বসে, কাগজের পাতায়। তা বলে এ তত বৈপ্লবিক পন্থা নয়, এ হচ্ছে মূঢ়দের ( ফিলিষ্টাইন) পন্থা। জার্মানদের এই ‘মার্চ অভিযান’ ও ‘আক্ৰমণতত্ত্বকে ভিত্তি করেই ‘বামপন্থী মূঢ়তার আসল রূপ প্রকাশ পেয়েছে। সেই মূঢ়তাকে এখন নিৰ্ম্মল করতে হল- অবশ্য তার জন্য দাম দিতে হল আপনাদের জার্মানদের। কিন্তু সত্যি সত্যি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতেই এ সিদ্ধান্ত করা হয়েছে। “ঐক্যবদ্ধ ও সুদৃঢ় পার্টির পক্ষ থেকে যে সকল রীতিনীতি স্থিরীকৃত হয়েছে, সেগুলো জার্মানীতে আপনাদেরই এখন সুসম্পন্ন করতে হবে। আমরা আপনাদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য যে সন্ধিপত্র” রচনা করে দিলাম, শুধু তাতে শান্তি স্থাপিত হবে না। ‘দক্ষিণপন্থী’ ও ‘বামপন্থীরা উভয়েই শুভ ও সদিচ্ছার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, এক পার্টি রূপে সুস্পষ্ট সুনিশ্চিত এই রাজনীতিক কাৰ্য্যধারায় যুক্ত হয়ে, যদি একই চেষ্টাকে শক্তিশালী না করেন, তবে এই সন্ধির কোন মানে হয় না। সুতরাং শত অনিচ্ছা ও বাধা বিপত্তি

লেনিনের স্মৃতি
৬১
থাকলেও আপনি কেন্দ্রীয় পরিষদে আবার ফিরে যান।
আপনি মনে করতে পারেন, কেন্দ্রীয় পরিষদ পরিত্যাগ করার
সম্পূর্ণ অধিকার আপনার আছে, তা পরিত্যাগ করাও কর্তব্য।
কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি আর কেন্দ্রীয় পরিষদ পরিত্যাগ
করবেন না। গুরুতর মুহূর্তে আপনার অধিকার আছে শুধু
পার্টির জন্য কাজ করবার, আর তাই শ্রমিকদের জন্য কাজ
করবার, আপনার তাদের ত্যাগ করবার কোন অধিকার নেই।
পার্টির মধ্যে কিছুমাত্র ভাঙনও যাতে না লাগে, আর
লাগলেও যাতে তা যৎসামান্য হয়, সেজন্য দায়ী থাকবেন
ব্যক্তিগতভাবে আপনি। আমাদের যুবক কম্‌রেডদের জ্ঞান
এখনো গভীর নয় ; কার্যক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাও তাদের নেই।
এই কমরেডদের প্রতি আপনার কঠোর হতে হবে, কিন্তু
তাদের ব্যবহারে ধৈৰ্য্য হারালেও চলবে না। বিশেষ করে
কমরেড রয়টেনের (Reuten) সম্পর্কে আপনাকে সতর্ক
হ'তে আমি বলছি। বহুদিন তিনি আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত
উৎসাহের সহিত কাজ করেছেন। তবে বার্লিনের “রেডি-
কেলদের নেতা হিসাবে তিনি কেন্দ্রীয় পরিষদে নিশ্চয়ই
থাকবেন। একমাত্র তা হলেই তাদের ও কেন্দ্রীয় পরিষদের
মধ্যে একটা ভালাে সম্পর্ক সৃষ্টি হতে পারে। আমি রয়টেনকে
যতটা চিনি, তাতে বলতে পারি, তিনি ঐক্য স্থাপনের জন্য
“সন্ধিপত্র” সহজ ভাবে মেনে নেবেন, এমন কি তথাকথিত
দক্ষিণপন্থীদের সহিত একত্র কাজও করবেন। কংগ্রেসের
অধিবেশন কালে আমি লক্ষ্য করেছি যে, তার মধ্যে একটা

লেনিনের স্মৃতি
একগুয়েমি ও সঙ্কীর্ণতা রয়েছে, এ থাকলে নেতা হওয়া
সহজ নয়। তার ওপরে এগুলাে একবার কারুর ভিতরে
ঢুকলে, সে আর সহজে তা ছাড়াতে পারে না।”
লেনিনের এই ‘সুশিক্ষার উপদেশে হঠাৎ বাধা দিয়ে
আমি তাকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “ব্যক্তিগত ভাবে
কি আপনার সেরূপ সন্দেহ হয়েছে ?” তিনি হেসে বলেন,
“না, সন্দেহ নয়, অভিজ্ঞতার ফলেই আমি বুঝতে পেরেছি”।
তারপরে লেনিন আবার বলতে লাগলেন, “শ্রমিক শ্রেণীর
আন্দোলনে যে সব করে যােগ্যতা দেখিয়েছেন তাদের
সাহায্য করা আপনার বিশেষ কর্তব্য হবে। আমি এডলফ
হফম্যান্ ( Adolf Hofmann ), ফ্রিজ, গেইন্ ( Fritz
Geyn ), atatafa (Dauming ), f25 ( Fries ) 972
অন্যান্য কমরেডদের কথাই ভাবছি। তঁাদের সঙ্গে কাজে
আপনার ধৈৰ্য্য রাখতে হবে। মনে করবেন না যে, সাম্যবাদী
চিন্তাধারার পরিষ্কার ও প্রখর ব্যাখ্যায় তারা মাঝে মাঝে
নিজেদের অক্ষমতার পরিচয় দিলেই “সাম্যবাদের পবিত্রতা”
নষ্ট বা বিপদগ্রস্ত হবে। তারা প্রকৃতই খাটি সাম্যবাদী
হওয়ার জন্য আগ্রহান্বিত। তঁাদের এই প্রয়াসে তাদেরকে
সাহায্য করাই আপনার একান্ত কর্তব্য। অবশ্য একথা সত্য
যে, “সংস্কারবাদী চিন্তাধারার পুনরভ্যুত্থানের প্রতি অনুকম্পা
দেখানাে যুক্তিসঙ্গত হবে না। কোনাে মিথ্যার রঙ মেখে
যাতে ‘সংস্কারবাদ’ গােপনে ঢুকে না পড়ে, তা দেখতে হবে।
আপনাকে এ জাতীয় কমরেডদের এমন একটা অবস্থায়

লেনিনের স্মৃতি
উপনীত করতে হবে, যেখানে তারা কেবল সাম্যবাদীরূপেই
আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। সম্ভবতঃ—বেশী সম্ভাবনাই
সেরূপ—এ প্রচেষ্টায় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তা সত্ত্বেও আপনাকে
নিরাশ হতে হবে। তথাপি যদি এ ভাবে একজন করেড
পূৰ্ব্ববৎ থেকে যান, দেখবেন, আপনার সঙ্গে সঙ্গে দু'চার
দশজন কমরেড অগ্রসর হয়ে সত্যিকারের সাম্যবাদী হতে
সমর্থ হয়েছেন। এডলফ, হফম্যান ( Adolf Hofmann ),
দাউয়েমিং (Dauming) প্রভৃতি কমরেডরা পার্টিতে এসেছেন
তাদের শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে—সব চেয়ে বড়
কথা এই, শ্ৰমিকসাধারণের আস্থা তারা অর্জন করেছেন ;
তারাই আপনাদের আর শ্রমিক সাধারণের মধ্যে জীবন্ত
বন্ধনসূত্র। জনগণের কথাই সকল সময়ে আমাদের ভাবতে
হবে। বামপন্থী মূঢ়তা’ বা ‘দক্ষিণপন্থী ভীরুতা’ কোনটার
দ্বারাই তাদের ভয় দেখানো উচিত নয়। ছােট বড় সমস্ত
ব্যাপারে খাটি সাম্যবাদীর মত কাজ করলে, জনগণের মন-প্রাণ
আমরা জয় করতে পারবই। জনগণকে জয় করবার পরীক্ষা,
আপনাদের জার্মানীতে এখন দিতে হবে। গােড়াতেই পার্টির
মধ্যে ভাঙন লাগিয়ে দিয়ে আমাদের সে আশা বিনষ্ট করবেন
। ক্লারা, আপনারা সর্বদাই জনগণের কথা মনে রাখবেন।
আমরা যে ভাবে বিপ্লব এনেছি, দেখবেন, সে পথেই
আপনারাও ঠিক তেমনি ভাবেই বিপ্লব আনতে সমর্থ হবে-
জনগণের সঙ্গে সঙ্গে চলে জনগণের সহায়তার বলে।

লেনিনের সঙ্গে এই বিদায়কালীন কথাবার্তার পর আমি আরও দুই দুইবার মস্কোতে গিয়েছি। কিন্তু সে দুইবারই আমার মনে একটা দুঃখচ্ছায়া আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, কারণ লেনিনের সঙ্গে তখন আমার দেখাশােনা হতে পারেনি। রােগযন্ত্রণার গুরুভারে তখন তার সবল অটল দেহ ভেঙ্গে পড়েছিল। কিন্তু সকল অশুভ জনরব ও অশুভ আশঙ্কা কাটিয়ে তিনি আবার ভাল হয়ে উঠতে থাকেন। ১৯২২ সনের অক্টোবর মাসের শেষ ভাগে সাম্যবাদী আন্ত- র্জাতিকদের ( কমিউনিষ্ট ইন্টারন্যাশানাল) চতুর্থ বিশ্ব কংগ্রেসে আমি গিয়েছিলাম। আমি জানতাম এখানেই আবার লেনিনের সঙ্গে আমার দেখা হবে। তিনি তখন এতটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন যে, “রুশীয় বিপ্লবের পাঁচ বছর ও বিশ্ব-বিপ্লবের সম্ভাবনা” সম্বন্ধে রিপাের্ট দেবেন। বিপ্লবী সৰ্বহারাদের অগ্রণীদের (ভ্যানগার্ড) প্রতিনিধিদের নিকটে রােগশয্যা হতে আরােগ্যলাভ করে রুশ বিপ্লবের প্রতিভাশালী নেতা সেই বিপ্লব সম্বন্ধে রিপাের্ট দিচ্ছেন, এর চেয়েও রুশীয় বিপ্লবের স্মরণার্থে আর কোন্ সুন্দরতর অনুষ্ঠান হতে পারে? আমি মস্কোতে পৌছলে পর তার একদিন পরে একজন করে ছুটে আমার ঘরে এলেন। তিনি পুরাতন শাসন- প্রণালীর চোখ রাঙানোকে উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে নতুন পদ্ধতি স্বীকার করে নিয়েছিলেন। সে বাড়ির তিনিই লেনিনের স্মৃতি ছিলেন পরিদর্শক। আমায় তিনি ব্যস্ত হয়ে জানালেন, “কমরেড, ভাডিমির ইলিচ আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। মানে, লর্ড লেনিন আসছেন। একটু পরেই তিনি এখানে এসে পড়বেন।” খবরটা তখন খবরটা তখন আমাকে এত বেশী ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল যে, ‘লর্ড লেনিন' এই রসিকতাপূর্ণ কথাটিও তখন আমার কানে গেলনা। লেনিন এসে গেলেন। তার পরিধানে জাহাজী শ্রমিকের ধূসরবর্ণের কোট। রােগের পূর্বে যেমন ছিলেন তেমনি বরাবরকার মত সুস্থ ও স্বচ্ছন্দ তার দেহ। আমি তাঁর স্বাস্থ্য সম্বন্ধে খবরাখবর জিজ্ঞাসা করাতে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “চিন্তা করবেন না ; আমি আজকাল বেশ জোর পাচ্ছি, ভাল হয়ে উঠছি। ডাক্তাররা যাকে বলবেন ‘কথা শােনা, আমি তাও আজকাল শুনি। অবশ্য কাজ যা করার করি, কিন্তু ডাক্তারদের উপদেশও আমি কঠোর সংযমের সঙ্গে মেনে চলি। অশেষ ধন্যবাদ, কিন্তু আমি আবার অসুখে পড়তে চাই না। সত্য সত্যই তা বড় সাঙ্ঘাতিক। এখনও অনেক কাজ করার আছে। নাদেজদে কনষ্টান্টিনােভা ( Nadezhda Konstantinova ) মেরিয়া ইলিয়িনিশনাকেও (Maria Ilyinishna) আর বিপদে ফেলতে চাই না...আমি না থাকলেও রাশিয়া ও অন্যান্য দেশে বিশ্ব-রাজনীতি এগিয়ে চলেছে। সব চেঞ্জ- বড় কথা হলাে এই যে, আমাদের পার্টির প্রধান প্রধান কমরেডরা সত্য সত্যই একযােগে অনেক কাজ করছেন। ;

লেনিনের স্মৃতি কিন্তু সামর্থ্যেরও অতিরিক্ত কাজ তাদের করতে হয়েছে। এখন তাদের গুরুভার অনেকটা লঘু করতে পারব বলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি।” সৰ্ব্বদাই লেনিনের সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্রই তিনি আমাকে আমার পুত্রদের কথা আগ্রহের সহিত জিজ্ঞাসা করতেন, এবং জার্মানী ও জার্মান পার্টি সম্বন্ধে খবরাখবর জানতে চাইতেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হ’ল না। যাতে তিনি পরিশ্রান্ত হয়ে না পড়েন, সেজন্য আমি এসব বিষয়ে আমার রিপাের্ট সেদিন খুব সংক্ষেপে দিলাম। ইন্টার- ন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেস কালীন আমাদের কথাবার্তার থেকেই আবার আলােচনা শুরু হল। “লেভির ব্যাপারে” তিনি আমার “দরদী মনােভাবের” সমর্থন করতেন। তিনি এবার বললেন, “মনােভাবের থেকে রাজনৈতিক কাৰ্য বেশী গুরুতর। রুশীয় বিপ্লব বিষয়ে রােজার মনোভাব নিয়ে লেভির সঙ্গে আপনার যে তর্কবিতর্ক হয়েছিল তাতেও প্রমাণিত হয় যে, একথা আপনি জানেন। ভুলটা আপনার হাতে সংশােধন হওয়াতেই ঠিক হয়েছে। লেভি নিজের সৰ্ব্বনাশ নিজেই ডেকে এনেছেন। তার অতি বড় শত্রুও তার এত বেশী ক্ষতি করতে পারতাে না। দেখতে না দেখতে চিরদিনের মত শেষ হয়ে গেলেন। আমাদের কোন ক্ষতিই তিনি আর করতে পারবেন না। এখন তিনি সােশ্যাল ডিমােক্রাটদের যে কোন একজনের মত। তার বেশী তিনি আর আমাদের কাছে কিছুই নন। অন্য কিছু তিনি

লেনিনের স্মৃতি
৬৭
;
আর হতেও পারবেন না কোনদিন। সােশ্যাল ডিমোক্রাটরা
এখন অবনতির পথে, এ অবস্থায় তিনি হয়তাে সেখানে একটা
বিশেষ স্থান অধিকার করতেও সমর্থ হতে পারেন। কিন্তু
তা হলেও তিনি আমাদের আর কোন ক্ষতি করতে পারবেন
। কিন্তু কাল ( Karl) ও রােজার ( Rosa) একজন
কম্‌রেড ও পরম বন্ধুর এরূপ কলঙ্কময় পরিসমাপ্তি ঘটবে, এটা
সত্যই অভাবনীয়। সত্যই বড় কলঙ্কের এই পরিসমাপ্তি
লেভির । এজন্যই তার এই দলত্যাগ ও বিশ্বাসঘাতকতা
সাম্যবাদী পার্টিকে বিশেষ কোনরূপে বিপদগ্রস্থ বা বিচলিত
করতে পারেনি। দুই একটা জায়গায় একটু কোলাহল
হয়েছে ; কিংবা দুই একজন লোেক পার্টি ছেড়ে দিয়েছে। তার
বেশি বিশেষ কিছুই ঘটেনি। পার্টি আজ বেশ সবল, তার মূল
বেশ শক্ত, দৃঢ়। পার্টি জনগণের পার্টি হতে চলেছে এখন।
জার্মান সৰ্বহারার বিপ্লবী মূখ্য পার্টি হিসাবে তা গড়ে ওঠবার
জন্য ঠিক পথে যাচ্ছে।”
কিছুকাল চুপ করে থেকে লেনিন জিজ্ঞাসা করলেন,
“আপনাদের সেই বিরােধী দলের খবর কি? তারা কি
এখন “রাজনীতি” বুঝতে পেরেছেন বিশেষ করে সাম্যবাদী
রাজনীতি
বুঝতে
শিখেছেন?”
আমি লেনিনকে সে সব বিষয়েও সংবাদ দিলাম।
‘বার্লিনের বিরােধী দল’ ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসের
সিদ্ধান্ত পুনরালােচনা করে তাকে রহিত করবার জন্য চতুর্থ
কংগ্রেসের নিকট যে নিবেদন দাখিল করেছেন তার বিবরণও

৬৮
লেনিনের স্মৃতি
মনে
আমি লেনিনের কাছে দিলাম। “দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে
ফিরে যাও” এই হলাে “বিরােধী দলের” এখনকার আওয়াজ।
এই শিশুসুলভ অদ্ভুত সরললাক্তিতে লেনিন বেশ
আমােদ পেলেন। তিনি হেসে ফেললেন, “এ সব বামপন্থী
কমরেডরা এই কমিউনিষ্ট ইন্টারন্যাশনালকে ইউলিসিসের
সাধ্বী স্ত্রী পেনিলােপের
করেছেন। কিন্তু
আমাদের এই আন্তর্জাতিক পার্টিটি পেনিলােপের মত নয়
যে, দিনের বেলায় সব কাজ করবে আর রাত হলে সে কাজ
বাতিল করবে—এক পা এগিয়ে দিয়ে আবার তা পিছিয়ে
নেবে। এত সময় ও বিলাসিতার অবসর তার নেই। কি
ঘটে যাচ্ছে তা কি এই সকল কমরেডরা বুঝতে পারেন না ?
এমন কি ঘটেছে ইতিমধ্যে যে, জনগণের মনপ্রাণ জয় করার
আর আমাদের দরকার নেই ? বুরে রাজাদের ( ফ্রান্সের
বুরে। রাজার বংশ ) মতই এই সকল “বামপন্থীরা নতুন
কিছু শেখেন নি বা পুরনাে কিছুই ভুলে
কিছুই ভুলে যান নি।
আমি দেখছি এই সব “বামপন্থী” সমালােচকেরা সম্মিলিত
রাষ্ট্রের ( United Front) রণকৌশলের প্রয়ােগের দোষ
ত্রুটি দেখতে গিয়ে আসলে সেই রণকৌশলকেই আমূল নাকচ
করতে চান। না ? তৃতীয় কংগ্রেসে গৃহীত কর্মধারাকে
এই চতুর্থ কংগ্রেসে কোন রকমেই বাতিল করা চলবে না।
বরং সেই মতবাদকে সমর্থন ও শক্তিশালী করে তােলাই এই
কংগ্রেসের উচিত। দ্বিতীয় কংগ্রেসের থেকে অনেক এগিয়ে
গিয়েছে তৃতীয় কংগ্রেস। আমরা সেই তৃতীয় কংগ্রেসের

লেনিনের স্মৃতি
উপর ভিত্তি করেই নূতন কর্মপন্থা রচনা করব।
তা না
হলে আমরা জনগণের পার্টি হতে পারব না। সৰ্ব্বহারা
শ্রেণীর বিপ্লবী পাটির মধ্যে সৰ্বসাধারণ হয়ে উঠতে পারব
। বলুন, আপনার রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করতে চান কিনা?
শ্রমিক শ্রেণীর অধিনায়কত্ব (Dictatorship of the
Workers), বিপ্লব কি আপনাদের কামনা নয় ? ‘হ কি
‘না’ এক কথায় বলুন। যদি এগুলো আমাদের অভীতি
হয়, তাহলে তৃতীয় কংগ্রেসের নির্দেশানুযায়ী কাজ করা ছাড়া
গত্যন্তর নেই।
পরে কংগ্রেসের অধিবেশনে আর একদিন
আর একদিন লেনিন
জার্মানীর এই “বামপন্থী বিরােধীদের কথা নিয়ে ইতিমধ্যে
আলােচনা করেছিলেন। বামপন্থী বিরােধীরা যে মতামত
পােষণ করতেন সেগুলােকে ব্যাখ্যা করবার জন্য বামপন্থী-
দের প্রতিনিধি ও নেতা হিসেবে
কমরেড
কোয়েনিগ ও ফিসার
( Com. Konig Fischer ) spruta afufafeaosta
অধিবেশনে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে
কেন্দ্রীয় পরিষদ ও অধিকাংশ পাটি সভ্যের সঙ্গে তাদের
মতবিরােধ কি নিয়ে তাও ব্যাখ্যা করেছিলেন। সেই
অধিবেশনে লেনিনও যােগ দিয়েছিলেন। বামপন্থীদের এই
মতবাদগুলাে রাজনীতির দিকে থেকে অতিমাত্রায় দুর্বল
ছিল। তারা তা ব্যাখ্যাও করেছিলেন খুব শিষ্ট ও বিনীত
ভাবে। রাজনীতিতে তাদেরই উৎকট ও দাম্ভিক ব্যবহারের
সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে, এখানে বামপন্থী বিরােধীরা
পাটির

৭০
লেনিনের স্মৃতি
বেশ একটু অতি মাত্রায়ই সংযত ছিলেন।
হাতের উপর
মাথা রেখে লেনিন একটু ঝুকে বসে অত্যন্ত মনােযােগের
সঙ্গে সভার কার্যবিবরণী শুনেছিলেন। আলােচনায় তিনি
বিশেষ যােগ দেন নি। তবে মাঝে মাঝে বিরােধী দলের
মতামতের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়েই দুই একটি মন্তব্য
করেছিলেন। এ সম্মেলন তার মনের উপর কি রেখাপাত
করল? তাঁর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়াতে আমি
তাকে এই প্রশ্ন করলাম।
লেনিন উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি বেশ বুঝতে পারি,
এ অবস্থায় বামপন্থীদের বিরােধিতা থাকা উচিত। একথা
সত্য যে এখনও সাম্যবাদী শ্রমিকদলের (Communist
Labour Party) অনেক শ্রমিককেই অশান্তি ও কষ্টের ভিতর
দিয়ে দিন যাপন করতে হচ্ছে।
তারা যে বৈপ্লবিক ভাবাপন্ন
হয়ে পড়েছে তাতেও কোন সন্দেহ নেই ; কিন্তু রাজনৈতিক
বিষয়ে তারা এখনও একেবারেই অজ্ঞ। কাজ বড়ই ধীরে
ধীরে এগিয়ে যায়। পৃথিবীর ঐতিহাসিক ধারা-পদ্ধতি
এগুতে যেন আর চায় না। কিন্তু অসন্তুষ্ট শ্রমিকদল মনে
করে পাটির নেতারাই ইচ্ছা করে এত দেরী করাচ্ছেন।
পৃথিবী-বিপ্লবের অগ্রগতি তাদের ইচ্ছানুযায়ী দ্রুতগতিতে
অগ্রসর না হওয়াতে এই শ্রমিকদল অন্যায়ভাবে পাটির
নেতাদের উপর দোষারােপ করছেন। আমি এর সব কিছুই
বুঝতে পারি। কিন্তু সকলের আগে একথাই আমি বুঝতে
পারছিনা যে এই বামপন্থীদের’ নেতা কে ?

লেনিনের স্মৃতি ৭১ ; অবশ্য এ জাতীয় প্রশ্ন আমি আগেও শুনেছিলাম । তারপর লেনিন তীক্ষ্ণ বিদ্রুপের সহিত এ বিষয়ে তার মতবাদ প্রকাশ করেছিলেন, “না, এ জাতীয় বিরােধিতা বা নেতাগিরি আমাকে কোন রকমেই প্রভাবান্বিত করতে পারেনি, কিন্তু আপনাকে খােলাখুলিভাবে একথা আমি বছি যে, আপনাদের কেন্দ্রীয় পরিষদও আমার মনের উপর কোন প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয় নি ; কেননা এ জাতীয় ছােট ছােট জন- নেতাদের পর্যন্ত দাবিয়ে রাখবার মত জীবনীশক্তি আর নেই। এ জাতীয় বিপ্লবী শ্রমিকদের রাজনৈতিক ভাব প্রণালীতে শিক্ষা দেওয়া প্রকৃতই অতি সহজসাধ্য ; কারণ বৈপ্লবিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ এই শ্রমিক দল নামে প্রজাতন্ত্রী হলেও সত্যি সত্যি সবচেয়ে ঘৃণ্য সুবিধাবাদী।” অবান্তর বিষয়ে চলে যাচ্ছি। লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ এখন দোব। সোভিয়েট রাশিয়ায় ধীরে অথচ নিশ্চিত গতিতে অর্থ- নৈতিক জাগরণ হওয়ার দরুণ লেনিন তার আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন এবং নানা ঘটনার বিশ্লেষণ করে সত্যিকারের উন্নতির আভাস দিয়েছিলেন। তারপর চিন্তাধারার রাশটাকে টেনে তিনি বলেছিলেন, “আমার বিবৃতিতেই এসব বিষয় নিয়ে আলােচনা করবাে। রােগের হাত হতে সবেমাত্র মুক্ত হয়েছি। দেখতেই পারছেন, আমি কি রকম নিয়মাধীন হয়ে চলছি। কিন্তু আপনি তা শুনে খুব সন্তুষ্ট হবেন জানি। একটা বিষয়ে আপনাকে আমি এখন বলব ? কিছুদিন আগে দূরের একটি ছােট গ্রাম থেকে একখানা চিঠি পেয়েছি।

৭২
লেনিনের স্মৃতি
।
( গ্রামের বিদঘুটে নামটা আমি একেবারেই ভুলে গেছি বলে
দুঃখিত )। সেখানকার একটা শিশুসদনে কয়েকশত ছেলে-
মেয়ে আছে। তারা আমাকে লিখেছে, “লেনিন দাদু,
আমরা আপনাকে বলতে চাই যে, আমরা খুবই ভাল হয়ে
গিয়েছি। আমরা মনোেযােগ দিয়ে লেখাপড়া করছি।
ইতিমধ্যে আমরা লিখতে ও পড়তে শিখেছি। সুন্দর সুন্দর
নানা রকমের জিনিস নিজেদের হাতে আমরা তৈরি করতে
পারি। প্রতিদিন সকালে ভাল করে স্নান করি, খাওয়ার
আগে আমরা সব ভাল করে হাত ধুয়ে নি। আমাদের
মাষ্টার মশায়কে সন্তুষ্ট করতে আমরা চেষ্টা করি। আমরা
নােংরা থাকলে তিনি রাগ করেন, ইত্যাদি।” তাহলে
দেখছেন ক্লারা, আমরা সবদিকেই বিশেষ উন্নতি লাভ করেছি।
সত্যসত্যই এগিয়ে চলেছি। সভ্য হতে শিখছি।
আমরা
স্নান করি, হাত ধুই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকি—প্রতিদিন স্নান
গ্রামের ছােট ছােট ছেলে মেয়েরাও সােভিয়েট
রুশিয়া গঠনের কাজে আমাদের সাহায্য করতে আরম্ভ
করেছে। তা হলে আমরা জয়ী হতে পারব না বলে ভয়
পাবার কি কারণ থাকতে পারে ?” একথা বলে লেনিন তার
স্বভাবসিদ্ধ অনাবিল মৃদু হাসি হাসলেন। কি শুভ্র সেই
হাসি, আর জয় সম্বন্ধে কত সুনিশ্চয় !
লেনিনের মুখ থেকে আমি রুশবিপ্লবের বিষয়ে বক্তৃতা
শুনলাম। বক্তৃতা সে মানুষের যিনি মৃত্যুর করাল ছায়াকে
পিছনে ফেলে নূতন স্বাস্থ্য লাভ করেছেন, ‘সৃষ্টিময় সামাজিক
করি।

লেনিনের স্মৃতি १७ জীবনকে পৃথিবীর সামনে উদঘাটিত করে দেবার জন্য বেঁচে থাকতে যিনি দৃঢ়সঙ্কল্প। অবশ্য এই কথা তার মুখেই আমি শুনতে পেয়েছিলাম। মৃত্যুর নির্মম বাহু যাকে ঘিরে ধরতে তখন উদ্যত হয়েছে, তার শেষ জীবনের এই কয়েকটি ঐতিহাসিক উপলক্ষ্য, আর মাঝে মাঝে হঠাৎ সাক্ষাৎকালে দুই একটি মতামত ছাড়াও লেনিনের সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ ও আলাপের কথা আমার মনে চিরকালের জন্য একটা অম্লান স্মৃতি রেখে গেছে। এই সবে মিলে তা একটি সমগ্র ও অসম্পূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করেছে। যেমন অন্যত্র তেমনি এখানেও দেখি লেনিন বরাবরই লেনিন- ক্ষুদ্রের ভিতর তিনি বৃহতের সন্ধান পান, আবার আবার ক্ষুদ্রকেও দেখতেন সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে বদ্ধ, জড়িত। মার্ক্সবাদী লেনিন মার্ক্সের নীতি অনুযায়ী বুঝেছিলেন যে, গণশিক্ষা ও বিপ্লব পরস্পর পরস্পরকে প্রভাবিত করে। তাই লেনিন গণশিক্ষা বলতে বুঝতেন বিপ্লব, তেমনি আবার বিপ্লব বলতে বুঝতেন গণশিক্ষা। লেনিন নিঃস্বার্থভাবে অন্তর দিয়ে শ্রমিকদের ভালবাসতেন ; চেয়েও বেশী ভালবাসতেন জাতির ভবিষ্যৎ মুখপাত্র শিশুদের। সাম্য- বাদের ভবিষ্যৎ ও জনগণের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে এই ভাবী মানুষেরা। লেনিনের হৃদয় তার প্রাণের ও মনের শক্তির মতই ছিল মহৎ। তারই বলে তিনি জনগণের সর্বপ্রধান ও মহান্ নেতা হতে সমর্থ হয়েছিলেন। লেনিন ছিলেন সাহসী, শক্তিময় ও চিরবিজয়ী । লেনিনের জীবনে অন্য সব

৭৪
লেনিনের স্মৃতি
;
সবই হার মেনেছিল, সত্য ছিল শুধু এই পৃথিবীর শ্রমজীবী
সাধারণের জন্য তাঁর অগাধ ভালবাসা ; অশেষ আস্থা
সেই শ্রমজীবী জনতার উপর ; যে মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি
জীবন বিসর্জন দিলেন, সেই উদ্দেশ্যের উপর অগাধ বিশ্বাস ;
আর বিশ্বাস তার সাফল্যে, জয়ে।
৮
মেয়েদের প্রশ্ন নিয়ে কমরেড লেনিন প্রায়ই আমার
সঙ্গে আলাপ আলােচনা
গণ আন্দোলনকে
সাফল্যমণ্ডিত করে ভােলার জন্যই যে নারী আন্দোলনের
অত্যন্ত প্রয়ােজন, তিনি জানতেন। তিনি মনে করতেন,
কোন কোন ক্ষেত্রে নারী আন্দোলনই জন আন্দোলনের
ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতই মেয়েরাও যে সামাজিক
জীবনে পুরুষেরই সমকক্ষ, একথা সাম্যবাদীর নিকট প্রমাণ
করার দরকার হয় না। এ বিষয়ে ১৯২০ সনে শরৎকালে
ক্রেমলিনে লেনিনের পাঠাগারে আমাদের প্রথম সুদীর্ঘ
আলােচনা হয়। লেনিন বসেছিলেন তার টেবিলে। তার
সামনে লেখার টেবিলের উপর বইপত্র ছড়িয়ে রয়েছে-
বােঝা যায় তিনি লেখাপড়া ও কাজ করছিলেন, কিন্তু সে
সবে কোন প্রতিভাশালী “বড়লােকের অগােছাল ভাব”
দেখাবার চেষ্টা ছিল না।

লেনিনের স্মৃতি
৭৫
আমাকে অভ্যর্থনা করে লেনিন বললেন, “সুস্পষ্ট নীতির
উপর ভিত্তি করে আমাদের শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নারী
আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
মাক্স বাদ ছেড়ে কোন
সত্যকারের কৰ্ম্মপদ্ধতি উন্মেষ লাভ করে না—এ কথা
পরিষ্কার। আমাদের সাম্যবাদীদের নারী আন্দোলনের
নীতিগুলি সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। অন্যান্য
পার্টি থেকে সাম্যবাদী দলের (কমিউনিষ্ট পার্টির) বৈশিষ্ট্য
থাকবারই কথা। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের আন্তর্জাতিক
দ্বিতীয় কংগ্রেসে এ বিষয়ে কোন আলােচনাই হয়নি।
প্রশ্নটা তখন উঠেছিল, কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে
যায় নি। প্রশ্নটা এখনও আমাদের কমিশনের সামনে
রয়েছে, কিন্তু এবার তাদের একটা আশু প্রস্তাব, কোন
নিবন্ধ ও নির্দেশ প্রণয়ন করা উচিত। এখন পর্যন্ত
তারা সেদিকে এগুতে পারেন নি। এ কাজে আপনার
সাহায্য দরকার।”
লেনিন যা বললেন তা আমি আগেই জানতাম। অবস্থা
এ রকম দেখে আমি বিস্ময় প্রকাশ করলাম। রুশীয়
বৈপ্লবিক আন্দোলনে রুশনারীরা কাজ করেছেন, তখনন
রুশিয়ার ক্রমােন্নতির বিপ্লবকে রক্ষা করতে, তা আরাে
প্রসারিত করতে তারা চেষ্টা করছিলেন, এ কথা জেনে আমার
উৎসাহের অন্ত ছিল না। বলশেভিক দলের সভ্যা মেয়েদের
পার্টিতে স্থান ও তাদের কর্মতৎপরতা দেখে সেই দলটিকে
আমি আদর্শ স্থানীয় বলেই মনে করতাম।
একমাত্র তারাই

৭৬ লেনিনের স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী নারী আন্দোলন ( ইন্টারন্যাশন্যাল কমিউনিষ্ট উত্তম্যাস্ মুভমেন্ট) গঠন করতে পেরেছেন- তাদের সেই আন্দোলনের শক্তিসমূহ ও কার্যক্ষম ইতিহাসে একটা নূতন নিদর্শন রূপে উপস্থিত হবে। লেনিন হেসে বলেছিলেন, “যা আপনি বললেন, তা সমস্তই অতি সত্য এবং সুন্দর। বিপ্লবের সময়ে পেট্রোগ্রাড, মস্কো ও অন্যান্য শিল্পকেন্দ্রে মহিলা কর্মীরা যে ভাবে কাজ করেছিলেন তা সত্যই প্রশংসনীয়। আমার মতে তাদের সাহায্য ছাড়া আমরা জয়লাভ করতে সমর্থ হতাম না। তারা প্রকৃতই সাহসী, তাদের কষ্টসহিষ্ণুতার কাহিনী সত্য- সত্যই রােমাঞ্চকর। মুক্তির আস্বাদ পাওয়ার জন্য এবং সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তােলার জন্যই তারা এ ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের এই দরিদ্র মেয়েরা নিপুণভাবে যুদ্ধ করতে পারেন। তারা সব রকমেই আমাদের ভালবাসা ও প্রশংসা পাওয়ার যােগ্য। আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই, জাঙ্কাররা (Junkers ) আমাদের বিরুদ্ধে যে অসীম সাহসিকতার সহিত লড়েছে, তার চেয়েও বেশী সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন পেট্রোগ্রাডের ব্যবস্থাপক কেডার’ মতের (মধ্যবিত্ত গণতন্ত্রীদলের) মেয়েরা। একথা সত্য, আমাদের পার্টিতে কনিষ্ঠ, নির্ভরযােগ্যা অনেক অক্লান্ত মেয়ে কমরেড আছেন। সােভিয়েট পরিচালনায়, Gaffect athast affece (Executive Committee), রাষ্ট্র-জনশাসন-বিভাগ ( পিপলস কমিশারিয়েট) কিংবা ৭৭ লেনিনের স্মৃতি অন্যান্য শাসন বিভাগে আমরা এই সব মেয়েদের নিয়োেগ করতে পারি । জনগণের মধ্যে, মজুর শ্রেণী, কৃষক ও লাল ফৌজের মধ্যে কিংবা পাটির কাজে এরা অনেকেই অকাতরে দিনরাত পরিশ্রম করেন। তাদের সাহায্য আমাদের অনেক কাজে লেগেছে। পৃথিবীর নারী সমাজের পক্ষেও তাদের দান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তারা নারীদের কর্মশক্তির পরিচয় দিয়েছেন, সমাজে নারীশক্তির মূল্য প্রমাণিত করেছেন। পৃথিবীর এই প্রথম প্রতিষ্ঠিত সর্বহারার অধিনায়কত্বই ( Proletarian Dictatorship ) 9919 sntist starfs জীবনে নারী জাতির সম-অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য অগ্রণী হয়েছে। নারী স্বাধীনতাবাদীদের (ফেমিনিষ্ট) শত শত পুস্তকও যে অন্ধ কুসংস্কার দূর করতে পারে নি, আজ এই রাষ্ট্রই তা দূর করেছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী নারী আন্দোলন এখনও গড়ে উঠতে পারেনি। শীঘ্রই আমাদের তা গড়ে তুলতে হবে। এখনই সে কাজ সুরু করা দরকার। আমাদের আন্তর্জাতিকের (কমিউনিষ্ট ইন্টারন্যাশনালের) ও পাটির কাজ তা না হলে সম্পূর্ণ হবে না, সম্পূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু বিপ্লবের আয়ােজন যে করেই হােক আমাদের সুসম্পূর্ণ করতে হবে। বলুন তাে সাম্য- বাদীদের কাজ বাইরে কি রকম চলছে ?” সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের অন্তভুক্ত পাটি গুলাের অবস্থা তখন শিথিল ও অনিয়মিত ছিল। আমি সে বিষয়ে অল্প কিছু যা জানতাম, তা লেনিনকে বললাম। লেনিন সামনের দিকে

৭৮
লেনিনের স্মৃতি
সামান্য একটু ঝুকে বসে মনােযােগ দিয়ে আমার কথা শুনতে
লাগলেন। নানা প্রাসঙ্গিক কথা শুনতে শুনতেও তার মুখে
সামান্যতম বিরক্তি, ক্লান্তি বা অধৈর্য্যের চিহ্র দেখা গেল না।
আমি আর কখনও তার মত এমন শ্রোতা দেখি নি, যিনি
এমন মনােযােগ দিয়ে সমস্ত ব্যাপার শুনে সমস্ত কথাকে
গুছিয়ে বুঝে নিতে পারেন, তার সমস্ত পরম্পরা ঠিকমত
উপলব্ধি করতে পারেন। মাঝে মাঝে তিনি ছােট ছােট যে
দুই একটা পরিষ্কার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছিলেন, এবং আলাে-
চনার কোন অংশ লক্ষ্য করে পরে আবার যেরূপ প্রশ্ন
করেছিলেন, তা হতেই আমি এই সত্য বুঝে ছিলাম। তিনি
আলােচনায় একটু একটু ‘নােট’ও করছিলেন।
আমি অবশ্য জার্মানীর বিষয় নিয়েই বিশদ আলোচনা
করেছিলাম। বৈপ্লবিক আন্দোলনে নারীদের যােগদান যে
রােজা লুক্সেমবুর্গ কত প্রয়ােজনীয় মনে করেন, সে কথা
আমি লেনিনকে বলি। কমিউনিষ্ট পাটি স্থাপিত হওয়ার পর
রােজা মেয়েদের জন্য একটি স্বতন্ত্র পত্রিকা প্রকাশিত করতে
বার বার অনুরোধ করেছিলেন। লিও যােগিশ, এর (Leo
Jogisches) সঙ্গে আমার যেদিন শেষ কথাবার্তা হয়
তার দুইদিন বাদেই তিনি গুপ্ত ঘাতকের হাতে মারা যান।
সেদিন আমরা পার্টির আশুকৰ্ত্তব্য নিয়ে আলােচনা করি।
অনেক কাজের ভারই তিনি তখন আমায় দিয়েছিলেন।
তার মধ্যে বিশেষ করে ছিল মেয়ে মজুরদের সংগঠনের একটি
পরিকল্পনা।

লেনিনের স্মৃতি
৭৯
প্রথম বে-আইনী সভাতেই পার্টি এ প্রশ্ন নিয়ে
আলােচনা করে। যুদ্ধের সময় ও যুদ্ধের পূলেও যে সব
নারীনেত্রীরা অত্যন্ত পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, এবং
প্রচার কাৰ্যে যে সমস্ত মেয়ে কৰ্ম্মী সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ
হয়েছিলেন, তারা প্রায় সকলেই সােশ্যাল ডিমােক্রাটদের
(Social Democrats ) দলে থেকে গেলেন। সজাগ্রত
আরও অনেক কৰ্ম্মঠ মহিলা কর্মীরাও তাদেরই অনুবৰ্ত্তী
হয়েছেন। কিন্তু খুব উদ্যমশীল ও খুব উৎসাহী নারী
কমরেডের একটি ছােট গােষ্ঠী আমরা পেয়েছি—তারা
পার্টির মধ্যে মিলিত হয়ে পার্টির সমস্ত কাজে, সমস্ত সংগ্রামে
যােগদান করেছেন। ইতিমধ্যেই তারা নারী শ্রমিকদের
মধ্যে নিয়মিত কাজ আরম্ভ করে দিয়েছেন, তাবশ্য এ সব
সবেমাত্র আরম্ভ হয়েছে, কিন্তু তবুও আরম্ভ যে ভালভাবে
হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
লেনিন বললেন, “মােটের উপর এ মন্দ নয়, ভালােই
বলতে হবে।
পার্টি যখন একেবারে অবৈধ বা প্রায়
অবৈধ, তখনও আমাদের মেয়ে কমরেডদের এই কর্মশক্তি,
অদম্য ইচ্ছা, দুৰ্ব্বার অনুপ্রেরণা, অসীম সাহস ও তীক্ষ্ণ
বুদ্ধি দেখে বুঝতে পারি আমাদের কাজের ভবিষ্যৎ
ভালাে, তা বিস্তার লাভ করবে। পার্টিকে বিস্তৃত করার পক্ষে,
তার শক্তি বাড়ানাের জন্য, জনগণের মনপ্রাণ জয় করবার দিক
থেকে এবং আমাদের কাজ প্রসারিত করবার জন্য যে এদের
সাহায্যের অত্যন্ত প্রয়ােজন তাতে মতদ্বৈধা নেই। কিন্তু

৮০
লেনিনের স্মৃতি
এই সকল পুরুষ ও নারী কমরেডদের কি ভাবে শিক্ষা
দেওয়া হবে এবং কাজের মূলনীতি সম্বন্ধে কি করে তাদের
পরিষ্কার ধারণা জন্মাবে, সে বিষয় কিছু করেছেন কি ?
জনগণের মধ্যে কাজ করতে হলে এ সবের উপর বিশেষ
গুরুত্ব আরােপ করতে হবে জনগণের কি যে বেশী স্বার্থ,
কি করে তাদের মন প্রাণ জয় করা যাবে, কি উপায়ে তাদের
উৎসাহী করে তােলা সম্ভব ইত্যাদি। আমার ঠিক মনে নেই,
কে যেন বলেছিলেন, মহৎ কিছু করে তুলতে গেলেই চাই
উৎসাহ। আমাদের এবং পৃথিবীর সমস্ত শ্রমজীবীদের সত্যই
অনেক বৃহৎ ও মহান কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তাই
জিজ্ঞাস্য,—জাৰ্ম্মাণীর মেয়ে মজুর কমরেডরা উৎসাহিত হয়ে
করে ? শ্রমিকের শ্রেণীস্বার্থ সম্বন্ধে তারা সচেতন হয়েছেন
উঠলেন কি কি ? রাজনৈতিক দাবী-দাওয়া সামনে রেখেই
কি তারা তাদের আগ্রহ ও কর্মশক্তি একত্রিত ও নিয়োজিত
করেছেন ? তাদের আদর্শের মূল
উৎস কি ?
“রুশীয় ও জাৰ্মান কমরেডদের কাছ থেকে আমি এ
বিষয়ে কতগুলাে অদ্ভুত খবর শুনেছি। সেগুলাে আপনাকে
আমার বলা দরকার। শুনলাম হামবুর্গের এক বিদুষী নারী
গণিকাদের বৈপ্লবিক সংগ্রামের জন্য সংগঠিত করতে
চান। গণিকাদের জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশ করছেন।
গণিকারা তাদের নিষ্ঠুর ব্যবসা চালাবার পথে পুলিশের বাধা
নিষেধ লঙ্ঘন করে যখন কারারুদ্ধ হয়েছিল তখন এক
প্রবন্ধে রােজা (লুক্সেমবুর্গ ) তাদের পক্ষ হয়ে লড়াই

লেনিনের স্মৃতি
করেন। এতে রােজা তার সাম্যবাদী মনের ও কাজের
প্রমাণ দিয়েছেন। ধনিক ( বুর্জোয়া সমাজ এই অভাগিনী-
দের দুই দিক দিয়েই সর্বনাশ করছে। প্রথমত করছে এ
সমাজের অভিশপ্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিষয়ক আইন-কানুনের
দ্বারা, দ্বিতীয়ত করছে এই সমাজের অভিশপ্ত নৈতিক ভণ্ডামির
দ্বারা। এ অত্যন্ত পরিষ্কার সত্য। একেবারে নির্দয় ও
অদূরদর্শী না হলে একথা কেউ ভুলতে পারেনা, কিন্তু কি করে
কথাটা বুঝাব ?—তাই বলে গণিকাদের একটা বৈপ্লবিক
শক্তিকেন্দ্র বলে গণ্য করা, এবং তাদের সংগঠন করার উদ্দেশ্যে
কারখানা থেকে গণিকাদের জন্যই একটা ভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ
করা—এ এক কথা নয়। জার্মানীতে কি সত্য সত্যই অর
এমন কোন মেয়ে মজুর নেই, যাদের ঠিক পথে সংগঠন করে
এবং তাদের জন্য একটী পত্রিকা প্রকাশ করে আপনারা
আপনাদের বৈপ্লবিক আন্দোলনে তাদের যােগদান করতে
অনুপ্রাণিত করতে পারেন ? গণিকারা সেই বৃহৎ নারী
সমাজের আবর্জনার অংশমাত্র। এ কাজে, আমার মনে পড়ছে,
শিল্পীদের একটা ঝোঁক ছিল প্রত্যেক গণিকাকে খৃষ্টজননী
ম্যাডােনা রূপে কল্পনা করার ও অঙ্কিত করার। গােড়াতে
এই ঝোঁকটা সুস্থ ঝোঁকই ছিল। তখন এর অবলম্বন ছিল
সামাজিক সহমর্মিতা (গণিকাদের জন্য ) এবং ধনিক
(বুর্জোয়া) ভদ্রলােকেদের নৈতিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
কিন্তু এই সুস্থভাবটুকু দূষিত ও বিনষ্ট হয়ে গেল। তাছাড়া,
গণিকাদের প্রশ্ন উঠলে আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন

লেনিনের স্মৃতি
এজন্য
হতে হবে। তাদের উৎপাদনের কর্মপদ্ধতিতে প্রবেশের
অধিকার আবার দিন,
সমাজের আর্থিক
বিন্যাসের মধ্যে
তাদের স্থান করে দিন—এই হবে আমাদের কাজ। কিন্তু
বৰ্ত্তমান আর্থিক ব্যবস্থায় এবং প্রচলিত আবহাওয়ার দরুণ
এ কাজ সম্পন্ন করা একটা কঠিন ও জটিল ব্যাপার। সৰ্বহারা
রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করার সঙ্গে সঙ্গেই নারীসমস্যার এই
এক এক দিককার প্রশ্ন গুলো আরও স্পষ্টভাবে দেখা দিচ্ছে।
তার একটা কার্যকরী সমাধান আমাদের করা চাই।
সােভিয়েট রাশিয়াতেও আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।
সে কথা থাক, আপনাদের জাৰ্মানীর কথাই হােক। পার্টির
পক্ষে তার সভ্যদের এ সব অপকর্ম (গণিকাদের জন্য
পত্রিকা প্রকাশ ) কোন রকমেই নীরবে সহ্য করা চলবে না।
এ সব চললে আমাদের পার্টি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, তার শক্তি
বিভক্ত হয়ে যাবে। আচ্ছা, আপনি নিজে এর বিরুদ্ধে কি
করেছেন ?”
আমি উত্তর দেওয়ার পূর্বেই লেনিন আবার শুরু করেন,
“ক্লারা, আপনাদের অপরাধের সংখ্যা কিন্তু আরও বেশী।
আমি শুনেছি, নারী কর্মীদের সান্ধ্য আলাপ আলােচনার
প্রধান বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে যৌন প্রশ্ন ও বিবাহ-সমস্যা।
রাজনৈতিক এবং অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয় আলােচনা করতেই
তারা উৎসাহ পান। একথা
একথা শুনেও আমি প্রায় বিশ্বাস
করতে পারিনি। সর্বহারার এই রাষ্ট্র এখনাে চারিদিকেই
পৃথিবীর প্রতিবিপ্লবীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই তো

লেনিনের সুতি
জার্মানীতেই আজ প্রতিবিপ্লবী দলের ক্রমবর্ধমান ক্রমবিস্তৃত
শক্তিকে বিনষ্ট করবার জন্য সর্বহারার মিলিত চেষ্টার এবং
বিপ্লবী শক্তির সর্বাধিক সংগঠনের প্রয়ােজন।
কিন্তু এ
সময়েই আমাদের নারী কর্মীরা যৌন প্রশ্ন সম্বন্ধে এবং
অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল যুগের বিবাহপদ্ধতি নিয়ে
আলােচনা করতে মত্ত হয়ে রয়েছেন। মজুর মেয়েদের এ
সমস্ত বিষয় শিক্ষা দেওয়াই তারা তাদের প্রধান কর্তব্য বলে
মনে করেন।
যৌন প্রশ্ন নিয়ে ভিয়েনার একজন নারী
কমরেড যে ক্ষুদ্র পুস্তিকাটি লিখেছেন তাই সব চেয়ে এখন
বেশী পঠিত হয় বলে আমার ধারণা। কি ভাবেই না মিছামিছি
সময় নষ্ট হচ্ছে। যেটুকু খাঁটি কথা সেই পুস্তিকার
মধ্যে আছে, সে সব তো অনেক আগেই মেয়ে মজুররা বেবেলের
( Bebel) লেখায় পড়েছেন। অবশ্য বেবেলের লেখা অমন
ক্লান্তিকর ও দুষ্পাঠ্য নয়। বেবেল ধনী সমাজকে আরাে
তীক্ষ, সরল, কঠোরভাবেই বিদ্রুপ ও সমালােচনা করেছেন।
ফ্রয়েডের মতবাদ এভাবে ফলিয়ে বাড়িয়ে তোেলা, দেখে মনে
হয় বুঝি তা বেশ শিক্ষিত-জনােচিত, এমন কি বুঝি বা
বিজ্ঞান-সম্মত। কিন্তু আসলে এ অজ্ঞতাপূর্ণ সব গুলিয়ে
ফেলা। ফ্রয়েডের মতবাদ নিয়ে আলােচনা করা হল আজ
কালকার ফ্যাশন। ধনিক সমাজের আবর্জনাভরা ক্ষেত্রে
আগাছার মত বেড়ে উঠেছে এই সাহিত্য, যৌনালােচনার
পুস্তিকা প্রভৃতি। এ সব মতবাদে আমার
নিজের কোন বিশ্বাস নেই। ভারতবর্ষের যােগীরা যেমন
প্রবন্ধ,
তর্ক,

৮৪
লেনিনের স্মৃতি
নাভিতে নিবদ্ধদৃষ্টি হয়ে আর সব ভুলে থাকেন, তেমনি
এরাও সৰ্ব্বদা এ জাতীয় প্রশ্ন গুলাে নিয়েই মজে থাকেন।
এদের উপর তাই আমার কোন আস্থা নেই। যৌন ব্যাপারে
এসব ফলাও-করে-বল। মতবাদ আমার কাছে প্রায়ই
অপ্রমাণিত এবং মনগড়া আনুমানিক বলে মনে হয়।
নিজেদের ব্যক্তিগত যৌনজীবনের বিকৃতি ও উগ্ৰ কামলিঙ্গাকে
ধনিক সমাজের নৈতিক আদর্শবাদের কাছে ‘সঠিক বলে
প্রমাণ করবার ইচ্ছার থেকেই বােধ হয় এ চেষ্টার উৎপত্তি।
ধনিকদের নৈতিক আদর্শের প্রতি এই ছদ্মবেশী ভক্তি-
পরায়ণতা যৌন ব্যাপারে অকারণে কৌতূহলের মতই
আমাদের ঘৃণার উদ্রেক করে। বাহ্যতঃ দেখতে যতই উগ্র ও
বৈপ্লবিক হােক না কেন, আসলে এটা ধনিক সমাজের
আদর্শানুবর্তী বুর্জোয়া বিলাস মাত্র। এটা হল বুদ্ধিজীবী এবং
তাদের মত স্তরের লােকেদের একটা কিম্ভুত খেয়াল ।
আমাদের পার্টি কিংবা তার শ্রেণীসচেতন বিপ্লবী জনগণ
কখনই এ সব বরদাস্ত করবে না।”
এ কথায় আমি বাধা দিয়ে বললাম যে, “ব্যক্তিগত
সম্পত্তির উপর স্থাপিত ধনিক সমাজে যৌনসমস্যা ও বিবাহ
সম্বন্ধীয় প্রশ্নসমূহ হতেই নারী জীবনের নানা সমস্যার
সঙ্ঘর্ষের ও অশেষ দুঃখ-জ্বালার উৎপত্তি হয়। যুদ্ধ ও যুদ্ধের
কালে মেয়েদের যৌনজীবনের সংঘাত এবং বিক্ষোভ আরও
উগ্র হয়ে উঠেছে, যে সমস্ত সমস্যা এদিকে এতদিন একে-
বারেই অজ্ঞাত ছিল। সেগুলো আজ ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে

লেনিনের স্মৃতি
৮৫
পড়ছে। তার সঙ্গে আবার বিপ্লবের ঘাতপ্রতিঘাতও এসে
যুক্ত হয়েছে। পুরােনাে অনুভূতি এবং চিন্তাধারা আজ
ধ্বংসােম্মুখ, পুরােনাে সামাজিক বন্ধন জড়িয়ে যাচ্ছে, আবার
আস্তে আস্তে ছিড়ে পড়ছে, আর মানুষের সঙ্গে মানুষের এক
নতুন ভাবের, নতুন মতাদর্শের অনুযায়ী সম্বন্ধ স্থাপনেরও
আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ সমস্ত প্রশ্ন নিয়ে যে এত বেশী
আলাপ আলােচনা আজকাল হচ্ছে, তাতে একথারই স্পষ্ট
পরিচয় পাওয়া যায় যে, নূতন আলােকে ও নূতন ভাবে
জীবন গঠনের সত্য সত্যই আজ বেশী প্রয়ােজন। এর থেকে
এটাও বােঝা যায় যে ধনিক সমাজের ভণ্ডামি ও মিথ্যার
বিরুদ্ধেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ধনিক সমাজের রীতি-
নীতি “সনাতন”, এরূপ যে অন্ধ ভক্তি শ্রমিক মেয়েদের
এতদিন মন প্রাণ অধিকার করে ছিল, আজ বিবাহের ও
পরিবারের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক কারণ পরিষ্কার হয়ে
ওঠায় সে ভুল আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যাচ্ছে ।
এই সকল
সমস্যার দোষগুণ ঐতিহাসিক ধারানুযায়ী বিচার করলে আজ
নির্মম ভাবেই ধনিক সমাজকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করতে
হবে, তার প্রকৃত রূপ ও ফলাফল এবং তার তথাকথিত
যৌনাদর্শ ও মিথ্যাচারের কুফলও জগতের সম্মুখে উদঘাটিত
করে দিতে হবে। যে পথেই পা বাড়াই গিয়ে পৌছি সেই
একখানে।
“যদি সত্যকারের মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে সমাজের মতাদর্শগত
যে কোনাে একটি উচ্চ ব্যবস্থারই বিশ্লেষণ করি, কিংবা কোনাে

৮৬ লেনিনের স্মৃতি একটি প্রধান সামাজিক অবস্থারই বিচার করি, যাই করি, তা হলে দেখব তাতে বুর্জোয়া ( ধনিক) সমাজের বিশ্লেষণও দরকার হয়ে হয়ে পড়বে, তার সম্পত্তিগত ভিত্তির পরীক্ষা প্রয়ােজন হয়ে উঠবে, এবং শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তেই এসে পৌছুতে হবে, এ সমাজ ধ্বংস হউক।” লেনিন হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, “যা বলেছেন ! দেখছি, আপনার পার্টি ও আপনার নারী কম্- রেডদের হয়ে আপনি বেশ ওকালতি করতে পারেন। অবশ্য আপনি যা বলছেন, তা খুবই সত্য। কিন্তু জার্মানীতে যে সব অন্যায় হচ্ছে এটা তার ব্যাখ্যা মাত্র ! তাতে সে অন্যায় ন্যায়সঙ্গত বলে প্রমাণিত হয় না। অন্যায় অন্যায় অন্যায়ই, অন্যায়ই তা থেকেও যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। যৌন প্রশ্ন ও বিবাহ সম্বন্ধে ঐ সমস্ত আলাপ আলােচনা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মূলতত্ত্বের দিকে স্থির পরিণত লক্ষ্য রেখে করা হ’তে বলে আপনি কি আমাকে সুনিশ্চয় করে বলতে পারেন? যৌনতত্ত্ব ও বিবাহ সম্বন্ধে সেরূপ আলােচনা করতে হলে অগাধ জ্ঞান ও বহুমুখী দৃষ্টির অত্যন্ত প্রয়ােজন। “বহু বিষয়ের উপর মার্ক্সীয় পদ্ধতিতে অধিকার অর্জন করতে হয়। আপনারা সে রকম জ্ঞানের অধিকারী কাকে পাবেন ? যদি সত্যিই কাউকে পাওয়া যেতো, তবে যে পুস্তক- খানির কথা একটু আগে বললাম, সে জাতীয় পুস্তক পড়বার ও আলােচনা করবার জন্য আমাদের পাঠচক্রে সবাই এত উন্মুখ হয়ে থাকত না। এ সব বইকে কঠিনভাবে সমালােচনা

লেনিনের স্মৃতি
৮৭
।
করে উল্টো বরং এগুলাের প্রশংসাই আপনারা করেন।
আর এই রকম ব্যর্থ অ-মার্ক্সবাদী পদ্ধতিতে এ প্রশ্নগুলাের
বিচার করার কি অর্থ দাড়ায় ? তা এই নয় কি যে, যৌনতত্ত্ব
ও বিবাহ সম্পর্কিত সমস্যাগুলাের বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের .
সঙ্গে কোন যােগাযােগ নেই ? না, তার অর্থ আরও বেশী।
মনে হয় প্রধান সামাজিক সমস্যাটাই যেন যৌনসমস্যার একটা
পরিশিষ্ট, একটা অংশ মাত্র। এভাবে যা মুখ্য, তাই হয়ে
উঠছে গৌণ। এরকম করলে সমস্যাটাকে গুলিয়ে দেওয়া
হয়। শুধু তাই নয়, শ্রমিকশ্রেণীর নারীদের ও সাধারণভাবে
শ্রমিকশ্রেণীর চিন্তা ও শ্রেণীচেতনাও গুলিয়ে যায়।
“শেষ কথা বলছি,—শেষ কথা বলে কথাটা কিন্তু সামান্য
এমন কি বুদ্ধিমান রাজা সলােমনের ও পরামর্শ এই
যে, প্রত্যেক কাজেরই একটা সময় আছে। অ'চ্ছিা,
আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনিই বলুন, কে আমাকে
কেমন ভালবাসে, কাকে আমি কতটা ভালবাসি, কাকে
বিয়ে করব, কে আমাকে বিয়ে করবে, এসব বিষয় নিয়ে
গল্প আলােচনা করে নারী শ্রমিকদের আমােদ জোগানাের
সময় কি এখন আমাদের আছে ? যৌন সম্পর্কের এই
অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ – আমাদের সগর্বে বলতে হবে কি
এরই নাম “ঐতিহাসিক বাস্তববাদ” ! এখন বরং সমস্ত
নারী কমরেড ও নারী শ্রমিকদের চিন্তাধারাকে সৰ্বহারার
বিপ্লবের উদ্দেশ্যেই প্রয়ােগ করতে হবে। তা করতে সমর্থ
হলে তবেই যৌনপ্রশ্ন ও বিবাহ সমস্যায় নববিধান প্রবর্তনের
নয়।

bbr
লেনিনের স্মৃতি
মত ক্ষেত্র তৈরী হবে : মাওরিদের (পলিনেশীয় আদিম
জাতি) বিবাহপ্রথা বা প্রাচীনকালের ভ্রাতাভগ্নী বিবাহপ্রথা
প্রভৃতির আলােচনা করা অপেক্ষা অন্য সমস্যার আলােচনা
করা বর্তমানে অনেক বেশী দরকার। জার্মান সর্বহারার
কাৰ্য্যধারায় এখনো সােভিয়েট গঠনের সমস্যা অসমাপ্ত
রয়েছে। ভাসাই সন্ধি ও নারী শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় তার
ফলাফল বুঝা দরকার ; ছাটাই, বেকারী, মজুরি-কাটা,
ট্যাক্স বৃদ্ধি এবং এ জাতীয় আরাে অনেক কঠিন সমস্যার
মেয়েদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সংক্ষেপে আমি বলতে
চাই যে, এ জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা’ ( যৌন
সমস্যার গল্প ) থেকে শ্রমিক মেয়েদের কোন লাভই হবে না।
তাদের দিক থেকে এ সব একেবারে ঝুটা জিনিস। আপনি
এ ব্যাপারে কেমন করে একেবারে চুপ করে রয়েছেন ?
আপনার শক্তি দিয়ে আপনার এসব বন্ধ করা উচিত।”
বিভিন্ন জেলা সমূহে প্রধান প্রধান নারী কমরেডদের
নিয়ে এই সব ব্যাপারের প্রতিবাদ এবং সমালােচনা করতে
আমি যে অবহেলা করিনি, তা আমার ক্রুদ্ধ বন্ধুবরকে
(লেনিনকে) বললাম।
তবে তিনি নিজেও বুঝতেন যে,
গেঁয়াে যােগী ভিখ পায় না। এ সবের সমালােচনা করতে
গিয়ে আমি “সােশ্যাল ডেমোেক্রাট মতাদর্শ ( ইডিয়ােলজি )
ও “ইতরমূখের আদর্শবাদ” ( ফিলিষ্টাইনিজম) পুনরুজ্জীবিত
কছি, এরূপ অভিযােগে অভিযুক্ত হতে হয়েছিল। কিন্তু
শেষে আমার প্রচেষ্টা সফল হতে সুরু করেছিল। যৌনপ্রশ্ন

লেনিনের স্মৃতি
৮৯
ও বিবাহ সম্বন্ধীয় আলােচনা এ সময়ে আর প্রধান আলােচ্য
বিষয় বলে গণ্য হত না। কিন্তু লেনিন তার এই চিন্তাসূত্র
আরও বিশদ করে প্রকাশ করলেন।
“আমি সে কথা জানি। আমি শুনেছি। আমাকেও
অনেকে এ ব্যাপারে নিরেট মূখ ( ফিলিষ্টাইন ভাবাপন্ন ) বলে
অভিযুক্ত করেছে, যদিও আমার কাছে তা একেবারেই
অসহ্য। অনেকখানি ভণ্ডামি ও সংকীর্ণ চিত্ততা তাদের এ
অভিযােগের পিছনে আছে। থাকুক, আমিও তা নীরবেই
সহ্য করছি। বুর্জোয়া মনােবৃত্তির ডিমের খােসা ছাড়িয়ে
সবে এই হলদে ঠোটওয়ালা বাচ্চারা আমাদের বেরিয়েছে
-খুব তারা চালাক! কিন্তু এসব আমাদের ছাড়তে হবে।
আমাদের যুব আন্দোলন ও যৌন-সমস্যার চিন্তা আধুনিকতার
মােহে আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছে, এ বিষয় নিয়েই তারা বড়
বেশী মেতে উঠেছে।”
“আধুনিকতা” কথাটির উপর লেনিন বেশ জোর দেন
এবং সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রপসূচক বিশেষ মুখভঙ্গীও করেন।
“আমি শুনেছিলাম আপনাদের যুবক প্রতিষ্ঠানগুলোও যৌন
আলােচনাতেই বিশেষ উৎসাহিত হন। তারা ভাবছে, এই
বিশেষ বিষয়ে উপযুক্ত বক্তার বড় অভাব। যুবআন্দোলনে
এ জাতীয় ভুল ধারণা অত্যন্ত ক্ষতিকর, ভয়ানক মারাত্মক ;
তাতে করে যুবকেরা তাদের যৌনজীবনে অত্যধিক উত্তেজনা
ও অসংযমের বশ হয়ে নিজেদের যৌবনসুলভ স্বাস্থ্য ও
শক্তির অপচয় করবে। এর বিরুদ্ধেও আপনাকেই লড়তে

হবে।
লেনিনের স্মৃতি
হবে। নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুব আন্দোলনের
ঘনিষ্ঠ
যােগাযােগ রয়েছে। আমাদের নারী কমরেডদের যুবকদের
সঙ্গে মিলিত হয়ে যথারীতি কাজ করতে হবে। এভাবে
তাদের মাতৃত্বভাব প্রবাহিত হবে, আরও প্রস্ফুটিত হবে ;
তা ব্যক্তিগতভাবে একজনের প্রতি নিবদ্ধ না থেকে সমস্ত
সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। ফিলিষ্টাইনদের আদর্শানুযায়ী
যেন শুধু নিজ নিজ গৃহ এবং সংসারের ক্ষুদ্রগণ্ডীতে মেয়েরা
আবদ্ধ না থাকেন এ জন্য মেয়েদের সামাজিক জীবনের
আয়ােজনের সমস্ত প্রয়াসে আমাদের উৎসাহ দান করতে
এ বিষয়ে আমি পরে আলােচনা করছি।
“আমাদের এখানেও যৌন ব্যাপারে ‘বুর্জোয়া মনােবৃত্তি
ও নৈতিক আদর্শকে বাতিল করবার জন্য যুবকেরা অনেকে
বিশেষ উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। এ প্রসঙ্গে আমার একথাও
বলা উচিত যে, তারা অনেকেই আবার আমাদের শ্রেষ্ঠ
যুবক কৰ্ম্মী, আমাদের ভবিষ্যতের আশা; আপনি আগে যা
বলেছেন তা সত্য। যুদ্ধ ও বিপ্লবের ফলে যে অবস্থার
উদ্ভব হয় তাতে পুরােনাে আদর্শের
মূল্য শেষ হয়ে গিয়েছে,
তার আর কোনাে আকর্ষণ নেই। নূতন মূল্যবোেধ ধীরে
ধীরে দানা বেঁধে উঠছে। পুরুষে পুরুষে কিংবা পুরুষে-
নারীতে সম্পর্কের বিষয়ে মনােভাব ও চিন্তাধারায় বিপ্লব
ঘটছে। ব্যক্তির অধিকার ও সমষ্টির অধিকার এই দুইয়ের
মধ্যে ব্যক্তির কর্তব্যবােধ আজ নতুন সীমারেখা রচনা করছে।
অবশ্য সব কিছুই এখনো অস্পষ্ট, অনিশ্চিত, জটিল অবস্থায়

লেনিনের স্মৃতি রয়েছে। এখনাে পরস্পর-বিরােধী শক্তিগুলাের ক্রম- পরিণতি ও দিগনির্ণয় সুস্থিররূপে করা হয়নি। ধীরে ধীরে এবং নানারূপ ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়েই অবস্থা রূপপরিগ্রহ করে। যৌনসম্বন্ধ, বিবাহ, এবং পারিবারিক সম্পর্কের বেলায় একথা আরও বিশেষ করে খাটে। ধনিক সমাজের বিবাহপ্রথার অবনতি, তার কলুষিত অবস্থা, তার জঘন্যতা, বিবাহ-বিচ্ছেদের কঠিন আইন-কানুন, পুরুষের অতিরিক্ত স্বাধীনতা, নারীর দাসত্ব-সমতুল্য বন্ধন, ও যৌনসম্বন্ধীয় নৈতিক আদর্শের ও সম্পর্কের কুৎসিৎ ভণ্ডামি এখন চিন্তাশীল ও উদ্যোগশীল মানুষের মনে গভীর ঘৃণার উদ্রেক করে। “ধনিকসমাজের বিবাহ-প্রথার নানা বাধানিষেধ ও পুজিবাদী রাষ্ট্রের পরিবার-সম্পর্কিত নানা আইন-কানুন এ সকল পাপ ও বিরােধকে বাড়িয়ে তুলছে। তাদের ‘পবিত্র বিষয়-সম্পত্তির’ এই হল দান। ব্যক্তিগত সম্পত্তি এ ভাবেই ব্যভিচার, অধঃপতন ও কলুষকে পৰ্যন্ত তাদের চোখে পবিত্র করে তুলছে। যা বাকী থাকে, তা সম্পূর্ণ করে তােলে ‘সততা-প্রবণ এই ধনিকসমাজের নিয়ম-বাঁধা মিথ্যাচার। এ সব প্রচলিত পাপ ও মিথ্যার বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহ ঘােষণা করতে সবেমাত্র শুরু করছে। মানুষের ব্যক্তিগত ভাব ও অনুভূতি খুব তাড়াতাড়িই পরিবর্তিত হয়, এবং ভােগের নেশা সংযম হারিয়ে তখনই অতি সহজে দুর্বার হয়ে ওঠে যখন শক্তিশালী রাষ্ট্র চূর্ণ হতে থাকে, পুরাতন প্রথা-নিয়ম ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়, গােটা সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন

১২
লেনিনের স্মৃতি
হতে শুরু করে। পুজিবাদী দৃষ্টিতেও তাদের যৌনসম্পর্ক
ও বিবাহ-প্রথা মােটেই সন্তোষজনক নয়। সৰ্বহারা বিপ্লবের
ফলে তারই অনুরূপ এক বিপ্লব বিবাহ ও যৌনসম্বন্ধীয়
নিয়ম-পদ্ধতিতেও আস্তে আস্তে আসছে।
এ কথা সহজেই
বুঝা যায় যে, যৌন ও বিবাহসম্বন্ধীয় যে অত্যন্ত ঘােরালো
ও জটিল সমস্যাগুলো দেখা দিয়েছে, তা যুবকদের, এমন কি
নারীদেরও, একটা বিশেষ চিন্তার বিষয় হবে। বিশেষ
করে বর্তমান সমাজের যৌনসম্বন্ধীয় কঠিন নিয়মগুলাের
বিরুদ্ধে তাদের অনেক ক্ষোভ আছে। এজন্যই তারা
যৌবনসুলভ উগ্রতার সহিত এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে।
তাদের এ মনােভাব আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না।
অবশ্য ধনিকসমাজের কুৎসিৎ ভণ্ডামিপূর্ণ নৈতিক আদর্শে এই
সমস্ত যুবকদের উদ্বুদ্ধ করার এবং মঠবাসী যােগী ব্রহ্মচারী
হতে উপদেশ দেওয়ার মত মিথ্যা আর কিছু নেই। কিন্তু
যে বয়সে যৌনবােধ অত্যন্ত উগ্র তখন সমস্ত চিন্তাধারাই
বিশেষভাবে যৌনসম্বন্ধীয় সমস্যা সমাধানে নিয়ােজিত হলে
বড় আশঙ্কার কথা। কত ভয়ঙ্কর ক্ষতিই না তাতে হতে
এ সম্বন্ধে কমরেড লিলিনার (Lilina) সঙ্গে
আপনি আলােচনা করবেন। নানা জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্রে
কাজ করে তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। আর,
তিনি যে মনে-প্রাণে সাম্যবাদী ও একজন কুসংস্কারহীন
নিরপেক্ষ সমালােচক, এ কথা তাে আপনি জানেনই।
“যৌনজীবন সম্বন্ধে যুবকশ্রেণীর পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গীর

লেনিনের স্মৃতি পিছনে তাদের একটা নীতি’ ও ‘তত্ত্ব আছে। যুবকদের মধ্যে অনেকেই এই দৃষ্টিভঙ্গীকে ‘বৈপ্লবিক এবং সাম্যবাদী ( কমিউনিষ্টিক) ব'লে বলে থাকেন। এবং সত্যি সত্যি তারা একে সে রকম বলেই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন। আমাদের মত বৃদ্ধদের মনে অবশ্য তাতে বিশেষ দাগ কাটে না। যদিও ( এদের মতে) আমি একজন সন্ন্যাসী” বিশেষ, তবুও আমার মনে হয়, যুবকদের এবং কোনাে কোনাে বৃদ্ধদেরও প্রচারিত এই তথাকথিত ‘নতুন যৌন- জীবনের আদর্শ আসলে নিছক ধনিক সমাজেরই জিনিস ; ধনিকতন্ত্রের গণিকাশালা থেকেই তার আমদানী । আমরা সাম্যবাদীরা “প্রেমের স্বাধীনতা” বলতে যা বুঝি, এর সঙ্গে তার এতটুকুও সম্পর্ক নেই। আপনি হয়ত তাদের এই প্রসিদ্ধ মতবাদ শুনে থাকবেন,—সাম্যবাদী সমাজে প্রেম এবং কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করা হবে এক গেলাস জল পান করার মতই সহজ এবং তুচ্ছ ব্যাপার। এই “এক গেলাস জল পানের” প্রচলিত মতবাদটি আমাদের যুবকশ্রেণীকে উন্মাদ করেছে। তারা একেবারে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে। অনেক যুবক-যুবতী তাতে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই মতাবলম্বীরা মনে করে যে এই বুঝি মার্ক্সবাদী মতবাদ। সামাজিক সৌধ-শিখরের ( super-structure) মতাদর্শ-ঘটিত যা কিছু পরিবর্তন, তার জন্য প্রত্যক্ষ ও সরাসরি ভাবে সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই দায়ী করা—এ রকম মার্ক্সবাদকে নমস্কার । পৃথিবীর কোন ব্যাপার অত সহজ নয়। ফ্রেডারিক ৯৪ লেনিনের স্মৃতি এঙ্গেলস্ ( Frederick Egels ) নামে লােকটি অনেক দিন আগেই ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্বন্ধে আলােচনা করতে গিয়ে এ কথার উল্লেখ করে গেছেন। আমার মতে “এই এক গেলাস জলের মতবাদ” সম্পূর্ণরূপেই মার্ক্সবাদের পরিপন্থী, তার উপরে তা সমাজ- বিরােধী। যৌনজীবন বুঝতে হলে শুধুমাত্র সহজাত ইন্দ্রিয়- পরিতৃপ্তির কথা ভাবলেই হবে না। উচ্চ বা নীচ সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গেও তা জড়িত, এ কথা বুঝতে হবে। এঙ্গেলস্ ( Engels ) তার পরিবারের সূত্রপাত” (Origin of the Family) নামক পুস্তকে দেখিয়েছেন, প্রাণীমাত্রেরই যে সাধারণ যৌনমিলনাকাঙ্ক্ষা তাই মানবসমাজে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি যৌনপ্রেমরূপে বিকশিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। সমাজের অর্থ নৈতিক অবস্থা এবং মানুষের দেহের ক্ষুধা, এই উভয়শক্তির ঘাত প্রতিঘাতই শুধু বিশেষ বিশেষ নরনারীর যৌনসম্বন্ধের ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হয়, এরূপ কথা ঠিক নয়। দৈহিক নিয়মকে একমাত্র সত্য বলে এ ভাবে তাকে মনে মনে বিচ্ছিন্ন করে দেখলেই ও রকম ভুল হয়। নারীর যৌনসম্বন্ধের এই পরিবর্তনকে সমাজের সমগ্র আদর্শ থেকে বিযুক্ত করে নিয়ে একমাত্র সমাজের আথিক সংগঠনের ভিত্তির সঙ্গেই কাৰ্যকারণসূত্রে সম্পর্কিত বলে বুঝতে চেষ্টা করাটা মােটেই মার্ক্সবাদের অনুমােদিত গবেষণা-পদ্ধতি নয় ; অ-মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদীরা’ই এরূপ করে থাকেন। তৃষ্ণা মেটানাে অত্যন্ত প্রয়ােজন। কিন্তু সেজন্য কি সুস্থ অবশ্য

লেনিনের স্মৃতি
সাধারণ মানুষ তৃষ্ণার্ত হলেই নর্দমার জলপান করে ? না
বহু-ওষ্ঠ-স্পর্শিত অপরিষ্কার পাত্র থেকে জলপান করতে
রাজী হয় ? কিন্তু এর সামাজিক দিকটাই হল সব থেকে
গুরুত্বপূর্ণ। জলপানটা অবশ্য একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার।
কিন্তু ভালবাসায় দু’জনের জীবন একত্র জড়িত হয়ে পড়ে,
তার ফলে আবার উদ্ভব হয় তৃতীয় এক নতুন জীবনের।
এজন্যই এর সামাজিক গুরুত্ব, এজন্যই সমাজের নিকটে
নরনারীরও এ বিষয়ে দায়িত্ব।
“যদিও এর নাম দেওয়া হয়েছে প্রেমের পরিতৃপ্তি’, তবু,
কমিউনিষ্ট বলেই আমি “এক গেলাস জল” এই মতবাদকে
সমর্থন করতে পারি না। সে যাই হােক্ না কেন, ‘ভালবাসার
বন্ধনমুক্তির এই প্রয়াস নতুন তাে নয়ই, অধিকন্তু
কমিউনিজমের সঙ্গেও এর কোন সম্বন্ধ নেই। আপনার
নিশ্চয়ই মনে আছে, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি রােম্যান্টিক
সাহিত্যে একেই “মানবহৃদয়ের মুক্তি” বলে শেখান হয়েছিল।
বুর্জোয়া সমাজের আচরণে কাৰ্যতঃ তা হয়ে উঠেছিল দৈহিক
ভােগাকাঙ্ক্ষার উচ্ছঙ্খলত। এখনকার থেকে তখনকার
দিনে তাদের মতবাদ প্রচারে তারা অন্ততঃ বেশী বুদ্ধি দেখিয়ে
গেছেন। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য কারা কি দেখাচ্ছে, আমি তা
বলতে পারি না। এরূপ সমালােচনা করছি বলে আমি
সন্ন্যাসধৰ্ম্ম প্রচার করতে চাই, তা নয়। সত্যই সে ইচ্ছা
আমার একটুও নেই। কারণ, কমিউনিজম আত্মনিগ্রহরূপ
কৃচ্ছসাধনা চায় না। কমিউনিজম চায় জীবনে আনন্দ

লেনিনের স্মৃতি
আনতে, শক্তি দিতে, আর মানুষের প্রেমাকাঙ্ক্ষার পূর্ণ
পরিতৃপ্তিতেই তা সম্ভব হয়। আমার মতে আজকাল যে
অসংযত যৌনাকাঙ্ক্ষা বিস্তার লাভ করছে, মানুষের জীবনে
তা আনন্দ ও শক্তি দান করে না, বরং তা অপহরণ করে
নেয়। বৈপ্লবিক যুগে এ ইন্দ্রিয়পরতন্ত্রতা খুবই খারাপ, তা
ভয়ঙ্কর কথা।
“যুবক যুবতীদের জীবনে চাই বিশেষ করে আনন্দ ও
শক্তি। স্বাস্থ্যকর খেলাধূলা,
সাতার, দৌড়ঝাপ, ভ্রমণ,
সকল রকমের দৈহিক ব্যায়াম ও বুদ্ধিবৃত্তির বহুমুখী অনুশীলন,
এ সব চাই।
আর চাই লেখাপড়া, অধ্যয়ন, সকলের
সম্মিলিত ভাবে জানবার আগ্রহ। এসবের ভিতর দিয়েই
তারা আনন্দ লাভ করবে -- যৌনসমস্যার তত্ত্ব নিয়ে
আলােচনা করেও নয়, তথাকথিত “পরিপূর্ণ জীবন ভােগেও
নয়। আমি চাই সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন। মঠবাসী সন্ন্যাসী ও
নয়, ডন জুয়ানও নয়, কিংবা এই দু’য়ের মাঝামাঝি
জার্মান ফিলিষ্টাইনদের যে মনােভাব তাও আমি চাই না।
আপনি তত আমাদের তরুণ কমরেড ‘—'কে জানেন ?
চমৎকার যুবক, বুদ্ধিমান্, সুচতুর। তবু আমার ভয় হচ্ছে,
কোনাে ভাল কাজ করতে সে সমর্থ হবেনা। নতুন নতুন
প্রেমের ঝড়ে সে মেতে ভেসে বেড়াচ্ছে। রাজনীতিক সংগ্রাম
এবং বিপ্লবের ক্ষেত্রে এরূপ করলে চলবে না।
নারীরা তাদের ব্যক্তিগত রােমান্সকে ভুল করে বিপ্লবের সঙ্গে
জড়িত করে ফেলেন, প্রকৃত বিপ্লবের সময়ে তাদের বিশ্বস্ততা
যে সমস্ত

লেনিনের স্মৃতি ও সহনশীলতা কতটা টিকবে সে আমি বলতে পারি না। আর যে যুবক শাড়ী (পেটিকোট ) দেখলেই তার পিছনে ছােটে, তরুণী দেখলেই প্রেমে পড়ে, তাকেও আমি বিশ্বাস করি না। না, না, বিপ্লবের সঙ্গে এসব মানায়না।” একথা বলে লেনিন টেবিলের উপর চাপড় দিয়ে উঠে দাড়ালেন। খানিকটা সময় ঘরের মধ্যেই এদিক ওদিকে একটু পায়চারী করতে লাগলেন। বিপ্লবের জন্য দরকার একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, শক্তিসঞ্চয়। প্রত্যেক ব্যক্তির থেকে তা চাই, চাই তা সমগ্র জনগণের থেকে। উচ্ছ, স্থল ইন্দ্রিয়পরায়ণতা বিপ্লব সহ্য করতে পারে না—ওসব দানুৎসিওর (D' Annunzio) পচ ধরা সমাজের নায়ক-নায়িকার পক্ষেই স্বাভাবিক। যৌন- উচ্ছ,ঙ্খলতা একটা বুর্জোয়া ( ধনিকতন্ত্রী ) লক্ষণ, তা পতনের চিহ্ন। কিন্তু শ্রমিকশ্রেণী উদীয়মান শ্রেণী। কোনো উত্তেজক নেশার প্রয়ােজন তার নেই—মদের নেশারও নয়, যৌন উচ্ছঙ্খলতার নেশারও নয়। শ্রমিকশ্রেণীর কিছুতেই পুজিতন্ত্রের কলঙ্ক, তার আবর্জনা, তার বৰ্ব্বরতার কথা ভুললে চলবে না। সংগ্রামের জন্য তাদের সব চেয়ে বড় তাগিদ হচ্ছে শ্রেণীগত তাড়না, কমিউনিষ্ট আদর্শের প্রেরণা। শ্রমিক শ্রেণীর চাই স্বচ্ছতা স্বচ্ছতা, স্বচ্ছতা, আরও স্বচ্ছতা। এজন্যই আবার বলছি কোন দুর্বলতা, শক্তির কোন রকম অপচয় বা কোনােরূপ শক্তিক্ষয় আমরা সহ্য করব না। আত্মসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মানে দাসত্ব নয় ; এমন কি ৭

৯৮
লেনিনের স্মৃতি
ভালবাসার বেলায়ও তা দাসত্ব নয়। কিন্তু ক্লারা, ক্ষমা
করবেন, মূল প্রতিপাদ্য বিষয় থেকে আমি অনেক দূরে চলে
এসেছি। আপনি কেন মাঝপথে বাধা দিলেন না ? বলতে
বলতে আমি অন্য সব কথা ভুলে গেছি। আমাদের যুবকদের
নিয়ে আমার চিন্তার শেষ নেই ; তাও বিপ্লবেরই একটা
অংশ যে। যদি দেখি ক্ষতিকর লক্ষণ তার মধ্যে দেখা দিচ্ছে,
আগাছার মত বুর্জোয়া সমাজ থেকে এসে অনিষ্টকর জিনিস
আমাদের বৈপ্লবিক জগতে শিকড় গাড়তে চাইছে, তা হলে
এখনি, এই গােড়াতেই, তা উপড়ে ফেলা ভালো। নারী-
সমস্যার আলােচনা করতে গেলে পর এজাতীয় প্রশ্নগুলােও
এসে পড়ে।”
লেনিন প্রভূত আবেগ এবং সজীবতার সহিত একথাগুলাে
বললেন। আমার মনে হচ্ছিল, তার প্রত্যেকটি কথা যেন
তার অন্তর-প্রসূত; তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রত্যেকটি ভাবে তার
সেই অনুভূতি যেন আরাে প্রবলতর রূপে প্রকাশিত হচ্ছিল।
মাছে মাঝে হয়তাে তার হস্তের কোন বলিষ্ঠ বিশেষ ভঙ্গী
তার এক একটি বিশেষ চিন্তাকে আরও উন্মােষিত করে
তুলছিল। তাকে সর্বদা অত্যন্ত জরুরী এবং জটিলতাপূর্ণ
রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তথাপি এসব
গৌণ সমস্যায় তিনি এত মনােযােগ দেন, এমনভাবে তা
বিশ্লেষণ করে দেখেন, এ দেখে আমি খুবই আশ্চর্য হয়ে
গিয়েছিলাম। শুধুমাত্র সােভিয়েট রুশিয়ার এই সমস্যার কথাই
তিনি ভাবতেন না, এখনাে যে সব রাষ্ট্র পুজিবাদী সেখানেও

লেনিনের স্মৃতি
;
;
এ সমস্যা কিরূপ তাও তিনি লক্ষ্য করতেন। তিনি ছিলেন
সত্যকারের মার্ক্সবাদী; খাঁটি মার্ক্সবাদীর মতই যে কোন
বিশেষ ব্যাপারের নিজ রূপ তিনি লক্ষ্য করতেন, সাধারণ
অবস্থার সহিত তার সম্বন্ধ দেখতেন, আর সমগ্র পরিস্থিতির
পক্ষে তার অর্থ কি তাও বুঝে নিতেন। প্রাকৃতিক শক্তির
মতই তিনি ছিলেন অটল, অবিচলিত, অনিবাৰ্যগতি ; তার
জীবনের সঙ্কল্প ও তার লক্ষ্য ছিল একটি মাত্র জিনিস
জনগণকে বিপ্লবের পথে এগিয়ে নেওয়া। তাই তিনি
প্রত্যেকটি কাজকে বিপ্লবের পথে তা কতখানি সচেতন শক্তি
জোগাবে, এই একটি মাপকাঠিতেই বিচার
করতেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতীয় কোনো অবস্থা বিচারেই তিনি তা
বাদ দিতেন না। কারণ, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক
বৈশিষ্ট্য ও ক্রমবিবর্তনের বিভিন্ন স্তর যেমন তিনি মানতেন,
তেমনি বিশ্ব-বিপ্লবের এক ও অভিন্ন সূত্রও তঁার চক্ষে সর্বদা
সুস্পষ্ট ছিল।
উচ্চকণ্ঠেই আমি বললাম, “কমরেড লেনিন, আমার
দুঃখ হচ্ছে, আপনার কথাগুলাে শুনবার জন্য এখানে আরাে
লক্ষ লক্ষ লােক কেন উপস্থিত নেই! আপনি জানেন,
আমাকে আপনার মতভুক্ত করবার জন্য চেষ্টা করার কোন
দরকারই নেই। কিন্তু শত্রু মিত্র সকলেই আপনার এসব
মতাবলী শুনলে আরও ভালাে হত।” লেনিন আমার একথা,
শুনে একটু হাসলেন, বললেন, ‘সম্ভবতঃ একদিন এসকল
প্রশ্নাদি নিয়ে আমি আলোচনা করবাে এবং লিখবাে। কিন্তু

১০০
লেনিনের স্মৃতি
এখন নয়। এখন আমাদের সমস্ত সময় ও শক্তি অন্য কাজে
প্রয়ােগ করতে হবে। আরও অনেক বড় ও গুরুতর সমস্যার
সমাধান করা এখনাে বাকী রয়েছে। বিপ্লবকে অক্ষুন্ন রাখার
এবং সোভিয়েট রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে তুলবার দায়িত্ব
শেষ হতে এখনাে অনেক দেরী। পােল্যাণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধের
ধাক্কা আমাদের কাটিয়ে উঠতে হবে, তার ফলাফলকে
আমাদের কাজে লাগাতে হবে। ওর্যাঙ্গেল (ব্রিটেনের
সাহায্য-পুষ্ট বিপ্লববিরােধী রুশ সেনাপতি ) এখনাে দক্ষিণে
আছে। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে, তাকে আমরা শীঘ্রই
খতম করতে পারব। তখন দেখবেন, ইংরেজ ও ফরাসী
সাম্রাজ্যবাদীরা এবং তাদের অনুগত ছােট ছােট রাষ্ট্রসমূহ
বেশ দুর্ভাবনায় পড়বে। কিন্তু, আমাদের সবচেয়ে কঠিন
এবং দরকারী কাজটাই এখনাে বাকী রয়ে গেছে—তা হচ্ছে
গঠন-কাৰ্য। গঠন-কার্যে হাত দিতে গেলেই যৌন সম্পর্ক,
বিবাহ এবং পরিবার সম্বন্ধীয় সমস্যাগুলাে উপস্থিত সমস্যা
হয়ে দাড়াবে। ইতিমধ্যে যখনই যেখানে আপনি দরকার
বােধ করবেন তখনই সেখানে এ প্রশ্নগুলাে নিয়ে আলাপ
আলােচনা ও তর্ক করবেন। সে তর্ক, আলােচনা, বিরোধ
যাতে মার্ক্সবাদ-পরিপন্থী পদ্ধতিতে না চলে, তা দেখবেন।
আর যাতে তা দল পাকানাের ও প্রমাদের ভিত্তিরূপে
নিয়ােজিত না হতে পারে, তাও আপনি লক্ষ্য রাখবেন।
এখন আপনার কাজের কথায় আসা যাক্।”
লেনিন ঘড়ির দিকে তাকালেন, বললেন, “আপনার সঙ্গে

লেনিনের স্মৃতি
১০১
কথা বলবার জন্য যে সময়টুকু নির্দিষ্ট করে রেখেছিলাম,
তার অর্ধেক সময় এরি মধ্যে পার হয়ে গেছে। আমি
কেবল বকছিই। মহিলাদের মধ্যে সাম্যবাদী কাজ কিভাবে
করা হবে; তার প্রস্তাবগুলাের একটা খসড়া আপনাকে
করতে হবে। এ বিষয়ে আপনার মূলনীতি ও বাস্তব
অভিজ্ঞতার কথা আমি জানি। কাজেই তা নিয়ে আর
বেশী আলােচনার দরকার নেই। এখন কি জাতীয় প্রস্তাব
আপনি করবেন ঠিক করেছেন ?” আমি সংক্ষেপে একটা
বিবরণ দিলাম। লেলিন বাধা দিলেন না। বারে বারে
মাথা নেড়ে আনার কথায় তিনি সায় দিচ্ছিলেন। কথা শেষ
করে আমি তার দিকে জিজ্ঞাসুনেত্রে তাকালাম।
লেলিন বললেন, “বেশ তাই হবে। জিনােভিয়েভের
( Zinoviev) সঙ্গে আরো আলােচনা করবেন। আপনি
যদি প্রধান প্রধান মহিলা কমরেডদের আহ্বান করে একটা
সভায় আপনার প্রস্তাবগুলাের সবিশ আলােচনা করেন
তবে ভাল হয়। কম্‌রেড ইনেসা ( Inessa ) উপস্থিত নেই,
থাকলে খুব ভালো হত। তিনি পীড়িত হয়ে পড়েছেন ;
তাই এখন ককেশাসে গিয়েছেন। আলোচনার পর আপনি
প্রস্তাবগুলো লিখে ফেলবেন। তারপর একটা কমিশন
বসিয়ে সেগুলো বিচার করা হলে পর ব্যবস্থাপক কমিটি
( এসিকিউটিব ) তার সিদ্ধান্ত জানাবে। আমি
আপনার সঙ্গে কয়েকটা প্রধান বিষয়ে কথা বলতে চাই।
আমি ভাল করেই জানি, সেগুলো নিয়ে আপনার সঙ্গে

১০২ লেনিনের স্মৃতি আমার কোন মতদ্বৈধ নেই। আমাদের বর্তমান আন্দোলন ও প্রচার-কাৰ্য্যকে কর্মক্ষেত্রে সার্থক করতে হলে এ বিষয় গুলাের কথা চিন্তা করা অত্যন্ত প্রয়ােজন। “নিবন্ধতে পরিষ্কার করে বলা চাই যে, শুধুমাত্র সাম্য- বাদের মধ্য দিয়েই সত্যিকারের নারী-স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভবপর। সামাজিক ভাবে ও মানুষ হিসাবে নারীর অবস্থা যে উৎপাদনযন্ত্রে ব্যক্তিগত স্বত্ব-স্বামিত্বের ব্যবস্থার সঙ্গে অবিচ্ছিন্নরূপে জড়িত, তাও বেশ পরিষ্কার করে বলতে হবে। তবেই “ফেমিনিজম্” (“নারী-বিদ্রোহ”রূপ নারী আন্দোলনের নাম ) ও আমাদের কর্মনীতির (পলিসি) মধ্যে প্রভেদ সুস্পষ্ট ও অনপনেয় রেখায় চিহ্নিত হয়ে যাবে। সামাজিক সমস্যা ও শ্রমিক সমস্যার সঙ্গে মেয়েদের প্রশ্ন ও যে জড়িত আছে, এরূপ করলে এই মূল কথাও বিশেষভাবে প্রকটিত হবে। তার ফলে শ্রমিকের শ্রেণী-সংগ্রাম ও বিপ্লবের সঙ্গে স্ত্রী- স্বাধীনতাও যে একই সূত্রে জড়িত আছে, তা দেখা যাবে। সাম্যবাদী নারী-আন্দোলনকে জনগণের আন্দোলন হতে হরে ; জনগণের আন্দোলনের একটা অংশ হিসেবে তা পরিগণিত হতেই হবে, শুধু সৰ্বহারাদেরই আন্দোলনের অংশ হলে হবেনা। সেই নারী-আন্দোলন পুজিবাদী ও অন্যান্য মুনিব শ্ৰেণীদের দ্বারা শােষিত ও নিপীড়িত সমস্ত জনরাশিরও সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া চাই । সৰ্বহারার শ্রেণী- সংগ্রাম ও সে সংগ্রামের ঐতিহাসিক পরিণতি যে সাম্যবাদী সমাজ তার দিক থেকে দেখলে এই হলাে নারী-আন্দোলনের

লেনিনের স্মৃতি
১০৩
তাৎপৰ্য। আমাদের পার্টিতে, আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী দলেই,
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী মেয়েরা আছেন, এজন্য সত্যি সত্যি
আমরা এই গর্ব অনুভব করতে পারি অবশ্য তাই যথেষ্ট
নয়। গ্রাম ও শহরের শত শত শ্রমজীবী মেয়েদেরও আমাদের
দলে টানতে হবে। সংগ্রামের জন্য, বিশেষ করে সাম্যবাদী
সমাজ-গঠনে সাহায্য করবার জন্য, মেয়েদের আমাদের
দলভুক্ত করতেই হবে। নারীদের বাদ দিয়ে কোনাে প্রকৃত
গণ-আন্দোলন হতে পারে না।
“আমাদের সংগঠন বিষয়ক নীতি আমাদের মতাদর্শ
অনুযায়ীই হয়। তাই বিশেষ করে কোন নারী-সংগঠন
আমাদের নেই। আমাদের পার্টিতে একজন পুরুষ সভ্যও
যা, একজন মেয়ে সভ্যও তা। দুয়েরই সমান অধিকার, সমান
দায়িত্ব। এই সম্বন্ধে কারো কোনাে মতদ্বৈধ নেই। তবু
ভুললে চলবেনা, আমাদের পার্টির ও মেয়েদের জন্য নানা
বিভাগ থাকা চাই—যেমন তার কার্যকরী সমিতি, কমিশন,
কমিটি, দফতর, শাখা। এ সবের প্রধান ও প্রথম কাজ
হবে মেয়ে শ্রমিকদের উদ্বুদ্ধ করা ও তারা যাতে পার্টির
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয় ও পার্টির দ্বারা প্রভাবান্বিত হয় তার ব্যবস্থা
করা। তার জন্য একটা বিশিষ্ট রীতিতে ধারাবাহিক ভাবে
কাজ করতে হবে। যাদের এমনি করে আমরা উদ্বুদ্ধ ও
দলের সঙ্গে সংযুক্ত করি, কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে সর্বহারার
শ্রেণীগত সংগ্রামের জন্য তাদেরকে আমাদের শিক্ষিত ও প্রস্তুত
করে তুলতে হবে। শুধুমাত্র ঘরের বা কারখানার কর্মী

১০৪
লেনিনের স্মৃতি
মেয়ে-মজুরদের কথা আমি ভাবছিনা। পুজিবাদীদের
নাগপাশে যারা আবদ্ধ—বিশেষ করে এই যুদ্ধের শেষে
যাদের অবস্থা আরও অসহ্য হয়েছে—সেই দরিদ্র কৃষক ও নিম্ন
মধ্যবিত্ত (পেটি বুর্জোয়া) দলভুক্ত নারীদেরও রক্ষা করবার
দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে । এ সমস্ত মেয়েদের মনােবৃত্তি
অসামাজিক, অ-রাজনৈতিক ও অনগ্রসর, কর্মক্ষেত্র বিচ্ছিন্ন
সমস্ত জীবন-যাত্রা-প্রণালী অনুন্নত -- এই হল তাদের
বাস্তব অবস্থা। সে কথা বিস্মৃত হওয়া অসম্ভব-একেবারে
অসম্ভব। আমাদের পক্ষে এদের মধ্যে কাজ করবার জন্য
উপযুক্ত সমিতি চাই; আন্দোলনের বিশেষ পদ্ধতি
সংগঠনের বিশেষ আকার দানও অত্যন্ত প্রয়ােজন।
নাম “ফেমিনিজম” ( বা নারী-বিদ্রোহ ) নয়, এটা হলো
কার্যক্ষেত্রে বিপ্লবিক প্রয়ােজনানুরূপ ব্যবস্থা।”
লেনিনকে আমি জানালাম, তার কথায় আমি বিশেষ
উৎসাহ লাভ করেছি। কিন্তু, মহিলাদের মধ্যে ধারাবাহিক
রূপে কাজ করবার জন্য যে বিশেষ ব্যবস্থা করা অত্যন্ত প্রয়ােজন,
তা অনেক বড় বড় কমরেডও স্বীকার করতে চান না। তারা
এ জাতীয় কাজকে “ফেমিনিজম” বা “নারী-বিদ্রোহ” মাত্র মনে
করে তা “নিষিদ্ধ করতে চান। ভাবেন যে, এ জাতীয় কাজ
করা মানে আবার মােশ্যাল ডিমােক্রেটদের স্তরে ফিরে
যাওয়া। তারা মনে করেন, স্ত্রী পুরুষকে সম-অধিকার দান করা
সাম্যবাদী পার্টিগুলাের মুলনীতি। তাই তারা এই বলে তর্ক
করেন, এই মূলনীতি অনুসারে পার্টিকে, স্ত্রী পুরুষের মধ্যে

লেনিনের স্মৃতি ১০৫ কোন প্রভেদই না। রেখে সমগ্রভাবে সমগ্র জনগণের মধ্যে কাজ করতে হবে। পুরুষদের মত মেয়েদেরও একই অবস্থায় একই ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। লেনিন মেয়েদের অবস্থা গণনা করে মেয়েদের তাদের আন্দোলন ও সংগঠনের জন্য যে ভাবে বিশেষ দৃষ্টি দিতে বলেছিলেন, অন্য মতাবলম্বীরা তাকেই বলতেন, 'সুবিধাবাদিতা, আত্ম- সমর্পণ এবং বিশ্বাসঘাতকতা । লেনিন বললেন, “এটা কিছু নূতন নয়। এতে কিছু প্রমাণ হয় না। এসব দেখে আপনিও আবার যেন ভুল করবেন না। সােভিয়েট রুশিয়ায় কোন কালেও কমিউনিষ্ট পার্টিতে মেয়ে সভ্যদের সংখ্যা পুরুষদের সমান হয় না কেন? ট্রেড-ইউনিয়নে সংঘঠিত নারী শ্রমিকদের সংখ্যা এত কম কেন? বাস্তব ঘটনাবলী আমাদের চিন্তার বিষয় হওয়া চাই। আমাদের “কমিউনিষ্ট লেবার পার্টির” » উগ্রতম বন্ধুরা গোড়া নীতিবাদগ্রস্ত। মহিলাদের জন্য কোন বিশেষ সংগঠনের একটুও প্রয়ােজন নেই, এই মত হবে তাদের মতের অনুরূপ। তাদের মতে একমাত্র প্রতিষ্ঠান থাকবে শ্রমিকদের ইউনিয়ন। আমি তাদের জানি। নিজেদের যখন ধারণা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে, অনেক বিভ্রান্ত বিপ্লবীই তখন মূলনীতির দোহাই দিয়ে থাকেন। তার মানে, তখন সহজ ঘটনা যা বােঝা দরকার একটি ছােট গ্রুপ,; এর মতবাদে গোড়া ছিলেন, বাস্তব অবস্থা বুঝতে চাইতেন না। অনুবাদিক।

লেনিনের স্মৃতি তা তারা আর দেখতে পান না। ঐতিহাসিক বিবর্তনের দরুণ যে বৈপ্লবিক কৰ্ম্মনীতি (পলিসি) অবলম্বন করতে আমরা বাধ্য হই, কেমন করে বিশুদ্ধনীতির এই প্রবক্তারা তার সঙ্গে তাঁদের ধারণার সামঞ্জস্য বিধান করেন? অনিবাৰ্য প্রয়ােজনের তাড়নার সম্মুখে তাঁদের এ জাতীয় তর্ক বিতর্ক খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মেয়েরা যদি আমাদের সঙ্গে যােগদান না করেন, তাহলে সর্বহারার অধিনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভবপর নয় ; আমরা সাম্যবাদী পদ্ধতিতেও কিছুই গঠন করতে পারব না। মেয়েদের নিকটে আমাদের পৌঁছতেই হবে—চিন্তা করে চেষ্টা করে সে পথ আমাদের খুঁজে বার করতেই হবে। “সে জন্যই মেয়েদের মঙ্গলজনক দাবী-দাওয়া পেশ করাটা আমাদের পক্ষে যুক্তিসঙ্গত। তার অর্থ এই নয় যে, আমরা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সােশ্যাল ডিমােক্রেটদের এইভাবে “সর্বনিম্ন দাবী” রেখে একটা সংস্কারবাদী কৰ্ম্ম- তালিকা গ্রহণ করছি। এ জাতীয় দাবী দ্বারা এটাও প্রকাশিত হয় না যে, বুর্জোয়াদের এবং তাদের রাষ্ট্রের শাসন “শাশ্বত” বলে আমরা বিশ্বাস করি। সংস্কারের দ্বারা নারীদের সন্তুষ্ট করে বিপ্লবের পথ থেকে তাদের সরিয়ে নেবার চেষ্টাও এরূপ কাজে কখনাে করা হয় না। সেরূপ বা অন্য কোনােরূপ সংস্কারবাদী প্রতারণা এটা নয়। পুঁজিবাদী সমাজের দ্বারা অবমানিত ও অসহায় এই নারীজাতির জ্বলন্ত প্রয়ােজনের তাগিদ মেটাবার জন্যই আমরা কাৰ্য্যক্ষেত্রের উপযােগী এই

লেনিনের স্মৃতি
১০৭
সব সিদ্ধান্ত স্থির করেছি। তার দ্বারা একথাই প্রতিপন্ন হয়
যে, আমরা মেয়েদের এই প্রয়ােজন সমূহ স্বীকার করি, এবং
পুঁজিবাদী সমাজে পুরুষের আধিপত্য ও নারীর অপমানকর
অবস্থা সম্বন্ধে আমরা যথেষ্ট সচেতন। হাঁ, সত্য কথাই, নারী
শ্রমিকদের, গৃহস্থ ঘরের স্ত্রীদের, কৃষক স্ত্রীদের, দোকানী
পশারীর স্ত্রীদের, এমন কি অনেক ক্ষেত্রে বিত্তবান্ পরিবারের
স্ত্রীদেরও যা কিছু নির্যাতন অপমান সইতে হয় আমরা
মনে প্রাণে সেই সবকে ঘৃণা করি। আমরা সে সব একেবারে
নিঃশেষ করব। নারীজাতির জন্য যে অধিকার ও সামাজিক
বিধি-বিধানের দাবী আমরা পুজিবাদী সমাজের কাছে করে
থাকি, তাতে একথাই প্রমাণিত হয় যে, নারীজাতির অবস্থা
ও স্বার্থ আমরা বুঝি এবং সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত
হলে তাদের বিষয়ে আমরা সুবিবেচনা করতে সমর্থ হব।
, নিশ্চয়ই সংস্কারবাদীদের মত আমরা তাদের কর্মশক্তি
লােপ করে দিতে চাই না, তাদের নিষ্ক্রিয় করে ঝিমন্ত
কলের পুতুল করেও রাখতে চাই না। না, তা আমরা মােটেই
চাই না।
প্রকৃত বিপ্লবী হিসাবে সমস্ত নারীজাতিকে আমরা
আহ্বান করছি আমাদের সমকক্ষরূপে পুরাতন মতাদর্শ ও
অর্থনীতিক ব্যবস্থার রূপান্তর সাধন করতে।”
আমি জানালাম, লেনিনের মতামত আমি সম্পূর্ণরূপে
সমর্থন করি ; তবে কিনা এতে অনেক বাধা বিঘ্নের সম্মুখীন
হতে হবে। দ্বিধাগ্রস্ত ও ভীরু স্বভাবের লােকেরা এসবকে
বিপজ্জনক সুবিধাবাদিতা বলে মনে করবে। একথাও আবার
•

১০৮
লেনিনের স্মৃতি
অস্বীকার করা যায় না, নারীজাতির জন্য আমাদের এই সমূহ
দাবী-দাওয়া ভুলভাবে স্থির করা ও প্রণয়ন করা হতে পারে।
লেনিন প্রায় ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, “বাজে কথা ! আমরা
যাই করি বা বলিনা কেন, সব কিছুতেই বিপদ আছে।
যা কর্তব্য ও প্রয়ােজনীয় তা সম্পন্ন করতে গিয়ে আমরা যদি
ভয়ে বিচলিত হয়ে পড়ি তবে আমাদের ভারতের ধ্যানী
যােগীদের মত প্রস্তরবৎ নিশ্চল হয়ে থাকতে হবে –‘নড়ােনা,
চড়ােনা, উচ্চশিখরে বসে আমাদের মহৎ আদর্শের ধ্যান
করে। অবশ্য দাবী-দাওয়ার বিষয় কি কি শুধু তা ভাবলেই
চলবে না; কি প্রণালীতে সেগুলো উপস্থিত করতে হবে তাও
আমাদের ঠিক করতে হবে। আমার মনে হয় আমি তা
বেশ পরিষ্কার ভাবেই বুঝিয়ে বলেছি। অবশ্যই মালা জপ
করার মত করে আমাদের নারীদের দাবী-দাওয়াগুলো শুধু
একটার পর একটা উপস্থিত করলেই হবে না। কাল ও
অবস্থানুযায়ী আমাদের কোনাে সময়ে এ-দাবীর জন্য, কোননা
সময়ে ও-দাবীর জন্য লড়াই করতে হবে; কিন্তু সব সময়েই
তা করতে হবে সর্বহারার সাধারণ স্বার্থের প্রতি দৃষ্টি রেখে।
“এ জাতীয় প্রত্যেকটি লড়াইতেই বুর্জোয়াদের সম্মানিত
সম্পর্কসমূহের ও তাদের সম্মানিত সংস্কারবাদী বন্ধুদের
বিরুদ্ধে আমাদের দাড়াতে হবে। এই সংস্কারবাদীরা হয়
তার ফলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাদের নেতৃত্বে আমাদের সঙ্গে
একত্র মিলে লড়াই করতে বাধ্য হবে, আর তা না হলে
তাদের আসল স্বরূপ উদঘাটিত হয়ে পড়বে। তার মানে,

লেনিনের স্মৃতি ১০৯ অন্যান্য দলগুলাের সঙ্গে আমাদের যে তফাৎ রয়েছে, তা এর ফলে পরিষ্কার হবে, আমাদের কমিউনিজ বা সাম্যবাদ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সমস্ত বুর্জোয়া সমাজ, মালিক শ্রেণীর ক্ষমতা ও পুরুষজাতির প্রভুত্বের দরুণ যে সমস্ত নারীরা শােষিত, পদানত ও নিস্পেষিত বােধ করেন, এরূপ লড়াইয়ের দ্বারা তাদের আস্থা আমরা অর্জন করব। নারীশ্রমিকেরা সকলের দ্বারা প্রবঞ্চিত ও পরিত্যক্ত; তারা বুঝবেন যে আমাদের সঙ্গে একত্র হয়েই তাদের লড়াই করতে হবে। আমার কি আবার শপথ করা দরকার,-“না আপনারই সে শপথ করতে হবে যে,-নারীদের দাবী-দাওয়া নিয়ে এই যে আমাদের সংগ্রাম, সে সংগ্রামও রাষ্ট্রক্ষমতা অধিকারের সংগ্রামের, সৰ্বহারাদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত হবে ? সৰ্বহারাদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করাই হল আমাদের বর্তমান সময়ের আদি-অন্ত উদ্দেশ্য। সে তাে স্পষ্টই বােঝা যায় ; খুব স্পষ্ট তা। কিন্তু, যদি আমরা সব সময়ে সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের দাবীই একমাত্র দাবী বলে উত্থাপন করি, তা হলে যত জোরেই না সেই জয় ঢাক পিটোই, নারী শ্রমিকেরা আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতা অধিকারের সংগ্রামে অনিবার্যভাবে এগিয়ে আসবেনা। মেয়েদের আমাদের সম্পূর্ণরূপে সচেতন করতে হবে যে, তাঁদের দুর্ভোগ, প্রয়ােজন, আশা ও আকাক্ষার সঙ্গে আমাদের এই দাবীর রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সর্বহারার একনায়কত্ব তাদের জন্য কি করবে তা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে : আইনতঃ ও ১১০ লেনিনের স্মৃতি কাৰ্যতঃ তাঁর পরিবারে, রাষ্ট্রে ও সমাজে (এই সৰ্বহারার রাষ্ট্রাধিপত্য প্রতিষ্ঠার ফলে ) সমকক্ষতা লাভ করবেন ; ধনিকতন্ত্রের সমস্ত ক্ষমতা বিলুপ্ত হবে।” “সােভিয়েট রুশিয়াই তাে তার প্রমাণ,”—আমি মাঝখানে ৰাধা দিয়ে লেলিনকে বললাম। লেলিন বলতে লাগলেন, “তা’ই ( সােভিয়েট রুশিয়াই) হবে আমাদের শিক্ষার প্রধান দৃষ্টান্ত স্থল। মেয়েদের জন্য আমাদের যে দাবী-দাওয়া, সােভিয়েট রুশিয়া নূতন উপায়ে তার রূপদান করছে। সৰ্বহারার রাষ্ট্রাধিপত্য স্থাপিত হলে তখন এ সকল দাবী- দাওয়া আর বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সর্বহারাদের সংগ্রামের বিষয় থাকেনা; সাম্যবাদী সমাজের পূর্ণ দেহের তা অঙ্গ- বিশেষ হয়ে পড়ে। তাই অন্যান্য দেশের নারীদের কাছে তা ( সােভিয়েট রুশিয়ার নারীব্যবস্থা) সৰ্বহারার একনায়কত্ব স্থাপন করার একান্ত প্রয়ােজনের আভাস দান করে। সৰ্ব্ব- হারার শ্রেণীগত বৈপ্লবিক সংগ্রামে নারীদের পূর্ণ সহযােগিতা লাভ করার জন্য এ পার্থক্য (বুর্জোয়া রাষ্ট্রে ও সর্বহারার রাষ্ট্রে নারীদের অবস্থার পার্থক্য) সম্পূর্ণরূপে উদঘাটিত করে দিতে হবে। মূলতত্ত্বগুলাে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়ে, সুদৃঢ় সংগঠনের ভিত্তিতে এ সব মেয়েদের একত্রিত করা কমিউনিষ্ট পাটি ও তার সাফল্যের জন্য অত্যন্ত দরকার। কিন্তু আমরা যেন আমাদের নিজেদের সম্বন্ধে ভুল ধারণা পােষণ না করি। আমাদের রুশীয় শাখাগুলিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়টা সঠিক- ভাবে বুঝতে পারে নি। কমিউনিষ্ট অধিনায়কত্বে শ্রমিক

লেনিনের স্মৃতি
১১১
মেয়েদের নিয়ে একটি গণআন্দোলন সৃষ্টি করার বিশেষ
কাজটা এখনো বাকী রয়েছে। তারা (রুশীয় কমিউনিষ্টরা।
নিষ্ক্রিয় ভাবে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তা দেখছে। এখনাে এই
কথাটাই তারা বুঝতে পারে না যে, এ ধরণের গণআন্দোলনকে
ক্রমােন্নত ও পরিচালনা করা পাটির কাজেরই একটা বিশেষ
অংশ ; এমন কি পার্টির সাধারণ কাজের অর্ধেকই হলো এ
কাজ।
মাঝে মাঝে অবশ্য তারা শক্তিশালী ও সুচিন্তিত
সাম্যবাদী মহিলা-আন্দোলনের মূল্য ও প্রয়ােজনীয়তা স্বীকার
কিন্তু সে শুধু একটা বুদ্ধির বিলাস, শুধুমাত্র মৌখিক
স্বীকৃতি, পাটির সর্বক্ষণের প্রয়াস নয়, কর্তব্য বলে তা গণ্য
করে।
হয় না।
“নারীদের মধ্যে আন্দোলন ও প্রচারকার্য এবং তাদের
জাগরণ ও বৈপ্লবিক বিবর্তন একটা আনুষঙ্গিক কাজ বলে
এরা মনে করেন—যেন এটা শুধু মেয়ে কমরেডদেরই
করণীয় একটা কাজ মাত্র। এদিকে কাজ খুব তাড়াতাড়ি
এগুচ্ছেনা, জোর কাজ হচ্ছেনা বলে মেয়ে কমরেডদেরই
তারা দোষী সাব্যস্ত করেন। কিন্তু এটা খুবই অন্যায়।
হচ্ছে খণ্ডিত দৃষ্টি—ফরাসীরা যাকে বলে “উল্টো নারী-
বিদ্রোহ”—ফেমিনিজমের ওপিঠ (পুরুষ-বিদ্রোহ ), এ হচ্ছে
আমাদের দেশের শাখাগুলাের এই ভুল ধারণার
মূলে
কি কারণ আছে? বিশ্লেষণ করে শেষ পর্যন্ত দেখবেন,
আছে নারীজাতি ও তাদের কর্মশক্তির যথার্থ
মূল্য
সম্বন্ধে
জ্ঞানের অভাব। হাঁ, এই হল আসল কারণ। দুর্ভাগ্যবশতঃ

লেনিনের স্মৃতি
;
হয় ;
আমাদের মধ্যে এখনও এমন অনেক কমরেড আছেন,
যাদের সম্বন্ধে এ কথা খাটে, “কমিউনিষ্টের পােক ছাড়ালেই
ধরা পড়বে একটি ইতর ফিলিষ্টাইন।” অবশ্য তা ধরতে
হলে তাদের দুর্বল স্থলটি আপনাকে খুজে বের করতে হবে।
সেই স্থানটি হল মেয়েদের সম্বন্ধে তাদের মনােভাব।
জন্য আর বেশী কি প্রমাণের দরকার যখন পুরুষেরা বেশ
শান্ত নিশ্চিন্ত ভাবে দেখছে মেয়েরা কেমন করে ছােটখাটো
একঘেয়ে গৃহকর্মের মধ্যে দিন দিন জীর্ণ ও শীর্ণ হয়ে পড়ে ;
কেমন করে তাদের শক্তি ও সময়ের অপচয় হয় ; তঁাদের
মন কেমন করে সঙ্কীর্ণ ও নীরস হয়ে যায় ; প্রাণ অসাড়
ইচ্ছাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে । আমি অবশ্য বুর্জোয়া
মহিলাদের সম্বন্ধে একথা বলছিনা। বাড়ীর কাজকর্ম এমন
কি ছেলেমেয়েদের তত্ত্বাবধানের ভার পর্যন্ত চাকর-চাকরানী-
দের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা নির্বিঘ্নে দিন কাটায়। কিন্তু
আমি বলছি অগণিত দুঃস্থ নারীদের, শ্রমিক স্ত্রীদের, যারা
সারাদিন কারখানায় কাজ করেন সেই মেয়ে মজুরদের কথা।
তাদের সম্বন্ধে আমি যা বলছি, তাই সত্য।
“খুব অল্প লােকেই, এমন কি সৰ্বহারাদের মধ্যেও খুব
অল্প শ্রমিকই বুঝতে পেরেছেন যে, তারা যদি নারী
আন্দোলনে একটু সাহায্য করেন, তবে যথেষ্ট পরিমাণেই
মেয়েদের বাধা-বিপদের লাঘব হয়; এমন কি, মেয়েদের
একেবারেই সে সব দূর হয়ে যায়। কিন্তু না, তা হতে পারে
তাতে যে “পুরুষের অধিকার ও সম্মানে” ঘা লাগবে।
;

লেনিনের স্মৃতি
১১৩
পুরুষরা তাদের নিজেদের শান্তি ও সুখটাই শুধু চায় ।
গার্হস্থ্য জীবনে ছােটখাটো নগণ্য
নগণ্য কাজকর্মের
কাজকর্মের জন্যই
মেয়েরা দিন দিন আত্মবলিদান করে থাকেন। পুরুষেরা
“স্বামীত্বের প্রভুত্বের ইচ্ছ।” এখনাে মনে মনে গােপনে পােষণ
করেন। “দাসীরাও তাই প্রতিশােধের ইচ্ছা মনে মনে
পােষণ করে তেমনি গােপনে। নারী পশ্চাৎপদ থেকে
পুরুষের সংগ্রামের আনন্দ ও দৃঢ় সঙ্কল্পকে নিস্তেজ করে
দিচ্ছে। তারা ছােট ছােট পােকার মত একেবারে অদৃশ্য
থেকে আস্তে আস্তে অথচ নিশ্চিতরূপেই সব কিছু ক্ষয় ও জীর্ণ
করে দেয়। আমি শ্রমিকদের জীবনের কথা জানি, শুধু বইতে
সে কথা পড়িনি। নারীদের মধ্যে আমাদের সাম্যবাদী কাজ,
রাজনীতিক কাজ করতে হলে পুরুষদের মধ্যে সে বিষয়ে
অনেক শিক্ষা দান করতে হবে। সেই পুরাতন স্বামী”
ধারণাকেই সৰ্বাংশে সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। পার্টির
থেকেও তা দূর করতে হবে, জনগণের মন থেকেও তা দূর
করতে হবে। শ্রমিক মেয়েদের মধ্যে পার্টির কাজকর্ম
করার জন্য যেমন মূলনীতিতে সচেতন ও হাতে-কলমে শিক্ষিত
একটি বিশিষ্ট স্ত্রী-পুরুষ কর্মী-দল গঠন করা প্রয়ােজন,
কাজ করাও তেমনি আমাদের একটা প্রধান রাজনীতিক
কৰ্ত্তব্য।”
সােভিয়েট রুশিয়ায় এই বিষয়ে মেয়েদের কি রকম
অবস্থা আমি লেনিনকে তা জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বললেন,
“সৰ্ব্বহারার রাষ্টশক্তি কমিউনিষ্ট পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়নের

১১৪
লেনিনের স্মৃতি
সহিত এক যােগে স্ত্রী পুরুষের অনুন্নত চিন্তাধারা ও পুরানাে
সাম্যবাদ-বহিভূত মনােভাবকে উচ্ছেদ করবার জন্য কোন
কাজই বাকী রাখছেনা। আইনের চক্ষে স্বভাবতঃই পুরুষ
ও মেয়ের সম্পূর্ণ সম-অধিকার লাভ করেছেন। সব
জায়গাতেই এই সমাধিকারকে কাৰ্যে রূপ দেবার জন্য
ঐকান্তিকতা ও আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। সামাজিক-আর্থিক
ব্যবস্থায় আমরা মেয়েদের টেনে এনেছি ; আইন-প্রণয়ন ও
শাসন পরিচালনায় আমরা তাদের গ্রহণ করছি। সমস্ত
শিক্ষামন্দিরের দ্বার আজ তাদের কাছে উন্মুক্ত ; তাদের
সামাজিক শক্তি ও বৃত্তিগত কাৰ্যদক্ষতা তঁার। তাই বাড়াতে
পারেন। আমরা নানা ধরণের লঙ্গরখানা ও সাধারণ
ভােজনশালা, ধােবীখানা, জিনিসপত্র মেরামতের দোকান,
শিশুসদন, শিশু শিক্ষালয় ( কিণ্ডার গার্টেন ), শিশুভবন ও
সকল প্রকার শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করছি। সংক্ষেপে বলতে
পারি, আমাদের কর্মধারায় যে সব দাবী ছিল সেই সব
দাবী অনুযায়ী আর্থিক ও শিক্ষা বিষয়ক কার্যভার স্বতন্ত্র
স্বতন্ত্র পরিবারের হাত থেকে নিয়ে আমরা তা সমাজের
হাতে সমর্পণ করছি। এটা করতে পারলেই মেয়েরা
গার্হস্থ্য জীবনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি ও একঘেয়েমি থেকে এবং
পুরুষের অধীনতা থেকে মুক্ত হতে সমর্থ হবেন। তবেই
মেয়েরা তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধি ও প্রবণতা সম্পূর্ণরূপে কাজে
লাগাতে পারবেন। গৃহে শিশুদের যেভাবে রাখা হত
তার চেয়ে অনেক সুন্দর ভাবে আমাদের শিশুদের এখন,

লেনিনের স্মৃতি
১১৫
মানুষ করা হচ্ছে। নারী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার জন্য
আমরা পৃথিবীতে সর্বাপেক্ষা অধিক অগ্রসর আইন-কানুন
প্রণয়ন করেছি আর শ্রমিক
সংগঠনের কর্মীরাই সে সব
আইন কার্যক্ষেত্রে প্রয়ােগ করছেন। আমরা প্রসূতিসদন
প্রতিষ্ঠা করেছি; নারী ও শিশুদের আবাস-ব্যবস্থাও করছি ;
আমরা সন্তান-পালন সম্বন্ধে ধারাবাহিক বক্তৃতার আয়ােজন
করছি ; মাতার নিজের ও তার সন্তানের স্বাস্থ্যনীতি বুঝবার
এবং অন্যান্য এ রকম ব্যাপারের প্রতি লক্ষ্য রাখবার জন্য
প্রদর্শনীর দ্বারা শিক্ষার ব্যবস্থাও আমরা করছি। বেকার ও
সংস্থানহীন মেয়েদের ভরণপােষণের জন্য প্রচেষ্টাও আমরা
সর্বপ্রকারে করছি।
“আমরা বেশ জানি যে, শ্রমিক মেয়েদের প্রয়ােজনের
তুলনায় এ বিশেষ কিছু নয় ; তাদের সত্যিকারের স্বাধীনতা
অর্জনের দিক থেকে এ মােটেই যথেষ্ট নয়; কিন্তু তবুও জারের
আমলের পুজিবাদী রুশিয়ার সঙ্গে তুলনা করলে বলতে হয়,
সুমহৎ উন্নতিই ইতিমধ্যে সাধিত হয়েছে । যে সব দেশে
পুজিবাদীদের শাসন অব্যাহত, সে সব দেশের তুলনায়ও
রুশিয়ায় প্রচুর উন্নতি হয়েছে, তা মানতে হবে। প্রারম্ভটা
ভালােই হয়েছে, ঠিক পথেই হয়েছে । এখন আমাদের
আরাে এগিয়ে যেতে হবে। আপনি বিশ্বাস করুন, আমরা
পূর্ণ উদ্যমেই এগিয়ে যাব। প্রত্যেকটি দিন সােভিয়েট রাষ্ট্র,
যেমন টিকে থাকছে, তেমনি তাতে আমরা বুঝতে পারছি
যে-মেয়েদের বাদ দিয়ে আমাদের পক্ষে আর অগ্রসর হওয়া

১১৬ লেনিনের স্মৃতি জন্য চেষ্টা সম্ভবপর নয়। ভেবে দেখুন তাে, যেখানে শতকরা ৮০ জন কৃষক সেখানে এর অর্থ কি ! ছােট ছােট কৃষকদের জীবন- যাত্রার আর্থিক রূপ হচ্ছে এই যে, তাদের প্রত্যেকেরই পৃথক পৃথক ঘর-সংসার আছে, আর এই ঘর সংসারে আবার মেয়েরা রয়েছে শৃঙ্খলাবদ্ধ। এদিক থেকে দেখলে আমাদের ( রুশদের) থেকে আপনাদের ( জার্মানদের) সুবিধা বেশী আছে—অবশ্য যদি ধরে নেন যে, আপনাদের সর্বহারা মেয়েরা ইতিহাসের প্রকৃত মুহুর্তে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করবার জন্য, বিপ্লব বাধাবার করবেন। আমরা কিন্তু সেজন্য ( আমাদের অবস্থার জন্য) নৈরাশ্য বােধ করছি না। বাধাবিঘ্ন যত আসে, আমাদের শক্তিও তত বেড়ে যায়। বাস্তব ঘটনাবলীর শক্তি নারীজাতির স্বাধীনতার্জনের জন্য আমাদের নব নব উপায় অবলম্বন করতে অনুপ্রাণিত করবে। সােভিয়েট রাষ্ট্রের সহকারিতা করে তার সহযােগিতায় অনেক কিছুই করা যাবে। “সহযােগিতা” কথাটা আমি কমিউনিষ্ট বা সাম্যবাদী অর্থে বলছি—বুর্জোয়া অর্থে বলছি না। সংস্কার- বাদীরা সেই (বুর্জোয়া ) অর্থে ই এ কথাটি প্রচার করত, আর তাদের বিপ্লব-বিমুখ উৎসাহও তাই সস্তা নেশার মত দু’দিনেই উবে গেছে। এইরূপ সহযােগিতার মধ্যেই ব্যক্তিগত কর্মতৎপরতাও থাকবে, সেই তৎপরতা এ পথে বেড়ে সামাজিক কর্মধারার সঙ্গে মিশে এক হয়ে যাবে। সৰ্বহারার রাষ্ট্রধিপত্যের আমলে স্ত্রী-স্বাধীনতা সাম্যবাদের ক্রম-সংগঠনের সঙ্গে সঙ্গে সৰ্ব্বত্রই, এমন কি গ্রামগুলােতেও, প্রতিষ্ঠিত

লেনিনের স্মৃতি
১১৭
হবে। আমার এই আশা পূরণের জন্য চাই শিল্পে ও
কৃষিকাৰ্যে বৈদ্যুতিক শক্তি নিয়ােগের ব্যবস্থা। সে এক
অতি বিরাট কাজ। বাস্তবক্ষেত্রে তা সম্ভব করতেও বিরাট
বাধা আছে ; গুরুতর সে সব বাধা। একাজ সম্পন্ন করবার
জন্য জনগণের সমস্ত শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে ;
বাস্তবক্ষেত্রে তা প্রয়ােগ করতে হবে। লক্ষ লক্ষ নারীর
শক্তি ও সাহায্যও এ জন্য দরকার।”
লেনিন যখন কথা বলছিলেন তখন শেষ দশ মিনিটে
দরজায় দু’বার টোকা পড়ে।
টোকা পড়ে। এবার লেনিন দরজাটা খুলে
বাইরের লােকদের বলেন, “আমি এখনই আসছি, দেরী
নেই।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
“জানেন ক্লারা, একজন মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছলাম,
এই কথাটা এখন কাজে লাগবে—আমার দেরীর জন্য।
মেয়েদের চিরকালের বাক্-প্রবণতার দোহাই দোব। যদিও
এক্ষেত্রে মেয়ের থেকে পুরুষই বকেছে বেশী। তবে আপনি
যে একজন অতিনিবিষ্ট শ্রোতা, সে বিষয়ে আমি হলপ করে
বলতে পারি। খুব সম্ভব এজন্যই আমি এত কথা বলে
ফেলেছি” –এভাবে ঠাট্টা করতে করতে লেনিন আমাকে
আমার কোটটা গায়ে পরতে সাহায্য করলেন, এবং একটু
চিন্তিতভাবে বললেন, “আপনার আরো গরম পােষাক পরা
উচিত। মস্কো (Moscow) তো আর ষ্টাটুগার্ট ( জার্মানীর
এক শহর ) নয়। আপনাকে আরাে একটু সাবধান হতে
হবে। দেখবেন ঠাণ্ডা যেন না লাগে। আবার দেখা

১১৮
লেনিনের স্মৃতি
হবে”-এই বলে আন্তরিকতার সঙ্গে আমার করমর্দন করে
লেনিন বিদায় নিলেন।”
প্রায় দুই সপ্তাহ পরে নারী আন্দোলন নিয়ে লেনিনের
সঙ্গে আমার আবার কথা হয়। লেনিন নিজেই আমার
সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। প্রায়ই তার আসবার কথা
থাকত না, তিনি এসে পড়তেন অপ্রত্যাশিতরূপে। বিজয়ী
বিপ্লবের নেতা লেনিনকে এ সময়ও আগেকার মতই অসম্ভব
কাজের ভারে সর্বদা অতি ব্যস্ত থাকতে হত ; তাতেই শেষ
পৰ্যন্ত আমরা তাকে হারাই। কিন্তু তখনাে মাঝে মাঝে
কাজের ফাঁকে এরূপ তিনি এক-একবার হঠাৎ দেখা করতে
এসে যেতেন। সেদিন লেনিনকে অত্যন্ত পরিশ্রান্ত ও
চিন্তান্বিত বলে মনে হল। ওয়ারেঙ্গেলের ( Wrangel )
পরাজয় তখনাে পর্যন্ত ধ্রুব হয়ে ওঠেনি। এদিকে আবার
বড় বড় শহরগুলােতে খাদ্য সরবরাহ করার সমস্যা তখন এক
রাক্ষসী সমস্যার মত হয়ে দাড়িয়েছে।
লেনিন আমাকে সেই নিবন্ধ বা নির্দেশাবলীর কথা
জিজ্ঞাসা করলেন। আমি তাকে জানাই - মস্কোতে অবস্থিত
প্রধান প্রধান সমস্ত নারী কমরেডর এক বৃহৎ কমিশনের
অধিবেশনে তাদের এ সমস্যা বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন।
কতকগুলো প্রস্তাব
প্রণীত
হয়েছে, এখন সেগুলাে ছোট

লেনিনের স্মৃতি ১১৯ - কমিশনের বিবেচনাধীন। লেনিন আমাদের মনে রাখতে বললেন যে, তৃতীয় বিশ্ব-কংগ্রেস এই সমস্যা উপযুক্ত যত্নের সহিত সৰ্বরকমে আলােচনা করবে। “এই সত্য ( বিশ্ব- কংগ্রেসের আলােচনার কথা জানলেই অনেক কমরেডের অন্ধ ধারণা দূর হয়ে যাবে। বাকী কাজ, মহিলা কমরেডদের কাজে লাগাতে হবে ; সে কাজে তাদের অনেক কষ্টও স্বীকার করতে হবে। স্নেহশীল মাসী-পিসীদের মত শুধু “আহা উহু’ করলে চলবে না। প্রকৃত যােদ্ধার মত উচ্চকণ্ঠে এবং পরিষ্কারভাবে তাদের সব কিছু বলতে হবে”- বলতে লেনিনও সজীব হয়ে উঠলেন। তারপর আবার বললেন, “কংগ্রেসের বৈঠকগুলো তো বিদুষীদের আলাপ- কক্ষ { salon ) নয় যে, নবেল-রােমান্সে আমরা যেমন পড়ি, মেয়েরা শুধু সেখানে তাদের কমনীয়তার ও সৌন্দর্যের জোরেই শোভা পাবেন। এ ( কংগ্রেস) যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা জ্ঞানলাভের জন্য সংগ্রাম করি এবং বৈপ্লবিক পথে কি ভাবে কাজ করা যায় তার চেষ্টা দেখি। প্রমাণ করুণ যে, আপনারাও যুদ্ধ করতে পারেন, অবশ্য প্রথমতঃ শত্রুর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে পারেন, তা দেখান। কিন্তু দরকার হলে তারপরে নিজেদের পার্টির সঙ্গেও বােঝাপড়া করুন। লক্ষ লক্ষ নারীর সমস্যা আমাদের সমাধান করতে হবে। তাঁদের জয়ের জন্য যে সমস্ত প্রস্তাব ও কৰ্ম্মনীতি কাজে লাগবে, আমাদের রুশিয়ার পার্টি সে সব সম্পূর্ণ সমর্থন করবে। যদি মেয়েরা সঙ্গে না আসেন, তা হলে প্রতিবিপ্লবীরা তাদের আমাদের

১২০
লেনিনের স্মৃতি
বিরুদ্ধেও কাজে লাগাতে পারেন।
এ কথা সৰ্ব্বদা
আমাদের মনে রাখা দরকার যত বাধাই আমাদের সম্মুখে
আসুক, নারী-সাধারণকে আমাদের পক্ষে অামাদের
আনতেই হবে।”
বিপ্লবের মধ্যে বিপ্লবী-জীবন যখন বহু ঐশ্বর্যে বিকশিত
হয়ে উঠছিল, শিরায় শিরায় যখন চাঞ্চল্যের সাড়া জাগছিল,
তখন আমি সাধারণ নারী-শ্রমিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক
কাৰ্য্যধারা সম্বন্ধে একটা কাজের পরিকল্পনা করছিলাম।
আমি বল্লাম, “আপনাদের ( রুশিয়ার ) অ-দলীয় মেয়েদের
সম্মেলন ও সমিতির সভাগুলো দেখেই আমার এ বিষয়ে
প্রধান প্রধান কথাগুলাে মনে হয়েছে। আমরা একটি বিশেষ
জাতির ক্ষেত্র ( রুশিয়া) হতে এখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ
সমস্ত ভাবধারাকে প্রয়ােগ করতে চাই। বিশ্ব-সংগ্রাম ও
তার ফলাফল যে সমাজের সমস্ত শ্রেণীর ও সমস্ত স্তরের
মেয়েদেরই ভোগ করতে হয়েছে, এ অতি সত্য কথা।
আলােড়ন ও আন্দোলনের ভেতর দিয়েই তঁাদের দিন
কাটাতে হয়েছে। কেমন করে বাঁচতে হয় এবং কি করে
জীবনকে কাজে লাগানাে যায়, এই গভীর চিন্তা সুতীক্ষ্ণ
সমস্যারূপে তখন তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। কিছুদিন পূর্বেও
অবশ্য জীবন সম্বন্ধে এ জাতীয় চিন্তা ছিল তাদের স্বপ্নেরও
অগােচর, তারা কেউ প্রায় এ জাতীয় সমস্যা বুঝতেও
পারত না। বুর্জোয়া-সমাজ এ জাতীয় প্রশ্নের সন্তোষজনক
উত্তর দিতে পারে না, সে উত্তর দিতে পারে শুধু, সাম্যবাদ।

লেনিনের স্মৃতি ১২১ পুজিবাদী দেশের সমস্ত নারীগণকে আমাদের এ বিষয়েই সচেতন করে তুলতে হবে। তার জন্যই একটি অ-দলীয় “আন্তর্জাতিক নারী কংগ্রেসের আয়ােজন করা চাই। লেনিন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। আমার কথাটা তিনি যেন ভেবে দেখতে লাগলেন—তাঁর দৃষ্টি যেন অন্তর- নিবদ্ধ হল, ঠোটে ঠোট চেপে ধরলেন, নীচেকার ঠোট একটু সামনে বেরিয়ে এসেছে। শেষে তিনি বললেন, “হ্যা আমাদের একাজ করতে হবে। এটি ভালো পরিকল্পনা। কিন্তু শুধু ভালো পরিকল্পনা কেন, সৰ্বাঙ্গসুন্দর পরিকল্পনাও ঠিকভাবে প্রয়ােগ না করলে তা কোন কাজে আসে না। কি করে তা কাজে লাগানাে যায়, তা আপনি ভেবেছেন কি ? সে দিকে আপনার বক্তব্য কি ?” লেনিনের কাছে এ বিষয়ে আমার মতামতগুলাে সবিশেষ বর্ণনা করলাম। সর্বপ্রথম কাজ হলো বিভিন্ন দেশের নারী কমরেডদের নিয়ে একটা কমিটি গড়ে তােলা। এই নারী কমরেডরা তাদের বিভিন্ন দেশীয় পার্টিশাখার সঙ্গে সর্বদা ঘনিষ্ঠ সংযুক্ত থাকবে। তাদের তাদের কমিটি একটি কংগ্রেসের ব্যবস্থা করবে, তার অধিবেশন ডাকবে। উক্ত কমিটি এখনই প্রকাশ্যে যথানিয়মে কাজে নামবে কিনা, সে কথা অবস্থানুরূপে ঠিক করতে হবে। সে যাই হােক্ না কেন, এ কমিটির সদস্যদের প্রথম কাজ হলো, ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে সংগঠিত নারী শ্রমিকদের নেত্রীদের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন, শ্রমিকশ্রেণীর নারীদের সমস্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের

১২২
লেনিনের স্মৃতি
গঠন করা।
পরিচালিকাদের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন, এবং নারী ডাক্তার,
শিক্ষয়িত্রী, নারী সংবাদপত্রসেবী প্রভৃতি বুর্জোয়া নারীদের
নানাজাতীয় সংগঠনগুলাের সংস্পর্শে আসা ও বিভিন্ন দেশে
প্রত্যেক দেশের মেয়েদের নিয়ে এজন্য একটি অ-দলীয়
“আয়ােজন সমিতি” ( Arrangements Committee )
এসব নানা দেশের কমিটির সদস্যদের মধ্য
হতেই আবার সদস্য নিয়ে একটা “আন্তর্জাতিক পরিষদ”
গড়ে তুলতে হবে। এই সব দেশীয় কমিটি আন্তর্জাতিক
কংগ্রেসের আয়ােজন করবে, তার অধিবেশন ডাকবে,
কংগ্রেসের কর্মসূচী, অধিবেশনের স্থান, কাল ও আলোচ্য
বিষয় নির্ধারণ করবে।
আমার মতে জীবিকার্জন সংক্রান্ত কাজকর্মে স্ত্রীজাতির
অধিকার নিয়ে আন্দোলন শুরু করাই কংগ্রেসের প্রধান ও
প্রথম কর্তব্য হােক। এ নিয়ে আন্দোলন শুরু করতে
গেলেই বেকার সমস্যা, পুরুষের সমান কাজের জন্য পুরুষের
সমতুল্য পারিশ্রমিক, আইনসঙ্গত ভাবে “আটঘণ্টা রােজ”
কাজ স্থির করা, মেয়েদের রক্ষা
করা, মেয়েদের রক্ষা করবার জন্য যথাযােগ্য
আইন প্রণয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন ও কর্মচারী সংগঠন, মাতা ও
শিশুদের জন্য সামাজিক সুব্যবস্থা, এবং গৃহিণীদের ও মাতাদের
জন্য সামাজিক নানা প্রতিষ্ঠান স্থাপন প্রভৃতি সমস্যার
আমাদের সম্মুখীন হতে হবে। আইনতঃ বিবাহের পরে
এবং পারিবারিক জীবনে নারীদের অবস্থা কিরূপ, দেশের
সাধারণ রাজনৈতিক আইনের দৃষ্টিতেই বা নারীজাতির স্থান

লেনিনের স্মৃতি
১২৩
;
কোথায় তাও আলােচ্য বিষয়ের মধ্যে গণ্য হবে। এই
সব প্রস্তাব বিশদভাবে বুঝিয়ে দিয়ে, কি করে বিভিন্ন দেশের
কমিটিগুলো সংবাদপত্র ও সভাসমিতির সাহায্যে একটা
ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে কংগ্রেসের আয়ােজন সুসম্পন্ন
করতে পারে, সে সম্বন্ধে আমি কিছু কিছু কথা বলি।
আন্দোলন এভাবে চললে অধিকতম সংখ্যক সাধারণ মেয়েদের
নিকট তা পেঁৗছুবে ; সেই মেয়েরা তখন আলােচ্য সমস্যাগুলো
নিয়ে সত্যসত্যই ভাববেন; এবং সাম্যবাদ ও সাম্যবাদী
আন্তর্জাতিকদের পার্টির প্রতিও তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে।
এখানেই হল উক্ত আন্দোলনের বিশেষত্ব। সমাজের বিভিন্ন
স্তরের কৰ্ম্মঠ এবং শ্রমিক মেয়েদের মধ্যে উক্ত আন্দোলন
চালাতে হবে। দেখতে হবে যেন নারী শ্রমিক ও কৰ্ম্মচারী-
সংগঠনের প্রতিনিধিরা কংগ্রেসে উপস্থিত হন, সহযােগিতা
করেন; এবং নারীদের সাধারণ সভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও
তাতে যােগদান করেন, সহযােগিতা করেন। কংগ্রেসকে
সত্যসত্যই “জনগণের প্রতিনিধি” হতে হবে ; বুর্জোয়া
পালিয়ামেন্টের মত তথাকথিত “জনগণের প্রতিনিধি” হলে
পর চলবে না।
অবশ্য এই প্রাথমিক কাজকর্মগুলাের সম্পাদনেও
কমিউনিষ্ট মেয়েদের শুধু সক্রিয় হলেই হবেনা, তাদেরই
অগ্রণী হতে হবে। আমাদের দলগুলো তাদের পূর্ণশক্তি
দিয়ে সাহায্য করবে। অবশ্য আন্তর্জাতিক কমিটি ও
কংগ্রেসের নিজের কাজ ও সে কাজের সুব্যবহার করা—এ সব

১২৪
লেনিনের স্মৃতি
সব
কংগ্রেসের
সম্পর্কেও এই কথা খাটে। সবক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য
করতে হবে। কংগ্রেসের আলােচ্য বিষয়গুলাের উপর যে
সব সাম্যবাদী নিবন্ধ ও মতামত স্থির হয়, তা সামাজিক
চতি পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক
দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে সরল ও অকপটভাবে সুস্পষ্ট ভাষায়
লিখে আবার কংগ্রেসের কাছে পেশ করতে হবে।
“আন্তর্জাতিকের” কর্মপরিষদ ( এসিকিউটিব ) এ
নিবন্ধ আগেই আলােচনা ও অনুমােদন করবে। সাম্যবাদী
মূল ধ্বনি ও প্রস্তাবগুলােই হবে কংগ্রেসের কাজের প্রধান
বিষয়বস্তু ও জনগনের বিশেষ আকর্ষণবস্তু।
পরেই সমস্ত নারীগণের মধ্যে যথাসম্ভব বিস্তৃতভাবে এগুলাে
ছড়িয়ে দিতে হবে, এবং মেয়েদের আন্তর্জাতিক গণ-প্রচেষ্টার
ধারা নির্ধারণ করতে সাহায্য করতে হবে।
অবশ্য কমিটি-
গুলােতে যে সব কমিউনিষ্ট মেয়েরা আছেন, তারা এবং
কংগ্রেসস্থ নারীরা যদি একসঙ্গে সুনিয়ন্ত্রিত এবং স্থিরীকৃত
পদ্ধতিতে দৃঢ়ভাবে কাজ করেন, তবেই কাজ ভাল হবে,
নইলে হবে না। এরা কেউ কাজ থেকে সরে পড়লে
চলবে না ।
আমি এসব কথা বলবার সময় লেনিন মাঝে মাঝে ঘাড়
নেড়ে তার সম্মতি জানান অথবা সম্মতিসূচক ছােট ছােট
দু’চারটি মন্তব্য করেন। তিনি বললেন, “করে, দেখতে পাচ্ছি
আপনি এ বিষয়ের রাজনৈতিক দিকটা ভালভাবেই বিচার
করেছেন, সংগঠন পরিচালনার প্রধান সমস্যাগুলাের দিকেও

লেনিনের স্মৃতি
১২৫
দৃষ্টি রেখেছেন। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, বর্তমান পরিস্থিতিতে
এ জাতীয় একটা কংগ্রেস অনেক গুরুতর কাজ করতে পারে ।
এ জাতীয় কংগ্রেসই হয়তাে বেশীর ভাগ সাধারণ নারীকে
আমাদের প্রতি আকৃষ্ট করতে সমর্থ হবে। এরূপ কংগ্রেসে
আসবেন -- চাকুরে ও বৃত্তিজীবী নারীরা, কারখানার নারী-
শ্রমিকরা, ঘরকন্নার গৃহিণীরা, শিক্ষয়িত্রীরা এবং এরূপই
আরাে অনেকে। তা হলে বেশ হয়, চমৎকার হয়। ভাবুন,
একবার ব্যাপক শ্রমিক ধৰ্ম্মঘট অথবা রাজনীতিক ধৰ্ম্মঘট
বাধলে পরে কি অবস্থা হবে। বিপ্লবী সর্বহারাদের সঙ্গে
সচেতন বিপ্লবী নারীরা যােগ দিলে সর্বহারাদের ক্ষমতা
আরো কত বেশী বেড়ে যাবে । অবশ্য, কি করে সেই
মেয়েদের আমাদের স্বপক্ষে আনতে হবে এবং আমাদের সঙ্গে
সংযুক্ত রাখতে হবে, তা জানলে পরেই এটা সম্ভবপর।
এটা করতে পারলে আমাদের প্রভূত লাভ হবে, অদ্ভুত লাভ
হবে। কিন্তু কতকগুলো প্রশ্ন আছে। সম্ভবতঃ প্রত্যেক
রাষ্ট্রের প্রভুর ঐ নারী কংগ্রেসের কাজ সন্দেহের চক্ষে দেখবে,
তাতে বাধাদানের চেষ্টা করবে। কিন্তু তারা সম্পূর্ণরূপে
কঠোরভাবে তা দমন করতে সাহসী হবেন না বলেই আমার
ধারণা। তারা যাই করুক তাতে আপনার ভয় পাবার মত
কিছু নেই। কিন্তু, সেই কমিটির কমিউনিষ্টদের ও গােটা
কংগ্রেসকে, অধিকসংখ্যক বুর্জোয়া এবং সংস্কারবাদী সদস্যদের
অধীনে থেকে তাদের সুদৃঢ় কার্যতালিকা মত কাজ করতে
হবে বলে কি আপনি ভয় পাচ্ছেন? আর সর্বশেষ এবং

লেনিনের স্মৃতি
হবে।
সর্ব প্রধান কথা হল এই যে, আমাদের নারী কমরেডদের
মার্ক্সবাদী শিক্ষাপদ্ধতির উপর আপনার কি এতটা দৃঢ়
আস্থা যে, আপনি মনে করেন তাদের মধ্য থেকে এমন দল
গঠন করা যাবে যারা লক্ষ্যসিদ্ধ সৈনিকের ( শক্ টপস্ )
মত সমস্ত সংঘর্ষ সগৌরবে উত্তীর্ণ হতে পারবেন ?”
এ কথার উত্তরে আমি বললাম, খুব সম্ভব কংগ্রেসের
বিরুদ্ধে কোন কঠোরনীতি অবলম্বন করতে রাষ্ট্রীয় প্রভুরা
সাহস পাবেনা। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অপকৌশল বা
অত্যাচারমূলক নীতি অবলম্বন করলে পর তা কংগ্রেসের
প্রচার কার্যেরই সহায়ক
কংগ্রেসের অভ্যন্তরে
অ-কমিউনিষ্ট সভ্যরা সংখ্যায় ও পদবলে বেশী হলেও আমরা
কমিউনিষ্টরা সামাজিক সমস্যাগুলাের আলােচনায় ও ব্যাখ্যায়
আমাদের বিজ্ঞানসম্মত ঐতিহাসিক বাস্তববাদের সাহায্য
নােব ; আমাদের দাবী ও প্রস্তাবগুলো সর্বদাই যুক্তিসঙ্গত
হবে, অধিকন্তু রুশিয়াতে সর্বহারাদের বিপ্লব সাফল্যমণ্ডিত
হওয়াতে নারী স্বাধীনতার প্রয়াস সেখানেই সর্বাগ্রে জয়যুক্ত
হচ্ছে—এ সব কারণে কংগ্রেসেও আমরা অসুবিধায় পড়ব
। বিশেষ বিশেষ কমরেডদের শিক্ষায় যে সমস্ত ত্রুটি
বিচ্যুতি রয়েছে, আমরা নির্দিষ্ট পন্থানুসরণ করে নিজেদের
প্রস্তুত করলে ও একযােগে চললে তা দূর করা যাবে।
আমাদের রুশ কমরেডদের থেকেই এদিকে আমি বেশী
সহায়তা পাব বলে বিশ্বাস করি। তারাই হবে আমাদের
বাহিনীর মূল কেন্দ্র। তাদের সাহায্য পেলে আমি শুধু এই

লেনিনের স্মৃতি
১২৭
কংগ্রেসের যুদ্ধ কেন, আরও অনেক কিছুই করতে পারি।
তা ছাড়া কংগ্রেসে এখন যদি বা আমরা পরাজিত হই, সেই
লড়াইয়ের ফলে সাম্যবাদ সকলের চোখের সামনে এসে
ভবিষ্যতে নূতন নূতন নারীশক্তির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক
স্থাপন করার পক্ষে অত্যন্ত কার্যকরী প্রচারকার্য স্বরূপ
হয়ে উঠবে।
লেনিন প্রাণভরে হেসে
বললেন, “রুশীয় বিপ্লবী
নারী সম্বন্ধে আপনি বরাবরই মহা উৎসাহী। না, আপনার
এই পুরনাে প্রেম আর লােপ পাবেনা দেখছি। তবে, হঁ্যা,
আমারও বিশ্বাস আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। বর্তমানে
যথােচিত লড়াই করে যদি বা আমরা পরাজিত হই, তা হলেও
তাতে আমাদের সুবিধা হবে, শ্রমিক মেয়েদের ভবিষ্যতে
আমাদের স্বপক্ষে পাবার পক্ষে আমরা এভাবে আয়ােজন।
করতে পারব। সব দিক দিয়ে বিচার করে দেখা যাচ্ছে, এ
কাজের জন্য এরকম ঝুকি নেওয়া ঠিকই হবে। এতে করে
আমরা কিছুতেই একেবারে পরাজিত হব না;—যদিও জয়ী
হব বলেই আমি আশা করছি, সমস্ত অন্তর দিয়ে সে আশা
আমি পােষণ করছি। এরূপ করলে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি
পাবে, আমাদের সংগ্রামবাহিণী বিস্তৃত ও বর্ধিত হবে, এবং
আমাদের কর্মীদের মমে নব জীবন, উদ্দীপনা ও কর্মপ্রচেষ্টা
জাগবে। এ সবের খুব দরকার। তা ছাড়া এই কংগ্রেসই
বুর্জোয়াদের ও তাদের সংস্কারবাদী বন্ধুদের মধ্যে অনিশ্চয়তা,
বিভেদ, বিরােধ ও শত্রুতা সৃষ্টি করবে। আমাদের “বিপ্লবের

১২৮
লেনিনের স্মৃতি
বাঘিনীদের সঙ্গে যারা মিলিত হবেন, তাদের কথা একবার
চিন্তা করে দেখুন। যদি আমাদের আশানুযায়ী সব কিছু
সুসম্পন্ন হয়, তাহলে আমাদের এই “বিপ্লবের বাঘিনী”দেরই
নেতৃত্বে একত্র হবেন শিডম্যান্ ( Scheidemann ),
fugata (Dittmann ) ও লিজেনের (Legien )
শিবির হতে আগত শান্ত, শিষ্ট, ভদ্র এই সােশ্যাল ডিমােক্রেট
মেয়েরা, পােপের আশীৰ্বাদপ্রাপ্ত অথবা লুথারের অনুগত
ধার্মিক খ্রীষ্টান নারীরা, প্রিভি কাউন্সিলরদের ও সদ্য ক্ষমতা-
প্রাপ্ত সরকারী কর্মচারীবৃন্দের করি, ভদ্রমহিলাসুলভ ভদ্র
শান্তিবাদী ইংরাজ নারীরা এবং আবেগ-উৎসাহে সৰ্ব্বদা ভরপুর
ফরাসী নারী-স্বাধীনতা-আন্দোলনকারীগণ (ফেমিনিষ্ট)।
এ জাতীয় কংগ্রেস বুর্জোয়া কংগ্রেসের এক ধ্বংসের চিত্রস্বরূপ
হবে।
সে সমাজের ব্যর্থতা ও নৈরাশ্য তাতে স্পষ্ট হয়ে
এ জাতীয় কংগ্রেস প্রতিবিপ্লবীদের বিভেদ বৃদ্ধি
করে তাদের শক্তি ক্ষয় করে দেবে। শত্রুর শক্তিক্ষয়ের সঙ্গে
সঙ্গেই আমাদের শক্তিও বৃদ্ধি পায়। কংগ্রেসের বিষয়ে আমার
মত আছে, এ বিষয়ে আপনি গ্রেগরীর ( জিনােভিয়েভ,
গ্রেগরী) সঙ্গে কথা বলুন। তিনিও নিশ্চয়ই এ বিষয়ের
প্রয়ােজনীয়তা বুঝতে পারবেন। আমরা খুব জোরের সঙ্গে
এ প্রস্তাব সমর্থন করব । তা হলে, উঠে পড়ে লেগে যান—
এ প্রচেষ্টায় জয়ী যেন হতে পারেন, এ কামনাই করি।”
জার্মানীর অবস্থা নিয়ে আমাদের কথা হল। বিশেষ
করে, আগেকার পারটাকিষ্ট (Spartacists ) ও স্বতন্ত্র”
উঠবে।

লেনিনের স্মৃতি
( Independents) বামপন্থীদের নিয়ে যুক্ত কংগ্রেসের যে
অধিবেশন হবার কথা চলছিল, সে সম্বন্ধে আমরা আলােচনা
করি। তারপর লেনিন তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে যান। একটি
ছােট ঘরে বসে কয়েকজন কমরেড কি লিখছিলেন। যাবার
পথে লেনিন তঁাদের তঁার সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে গেলেন।
কমরেড জিনােভিয়েভও (Zinoviev) আমার পরিকল্পনা
অনুমােদন করেন। আমি খুব আশা নিয়ে প্রারম্ভিক
কাজকর্মে মেতে উঠলাম। রুশিয়ার বাইরে সে সময়ে
জার্মান ও বুলগেরীয় নারী কমরেডরাই সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্যবাদী
নারী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের জন্যই কিন্তু
কংগ্রেসে কিছু হলনা, তারা কংগ্রেসকে বাতিল করে দিলেন।
লেনিনকে একথা বললে তিনি উত্তর দিলেন, “দুঃখের বিষয়।
ভয়ানক দুঃখের বিষয় ! ভয়ানক দুঃখের বিষয় যে, সাধারণ
শ্রমিক মেয়েদের নিয়ে একটা আশানুরূপ পথ গড়ে তুলবার
এক সুবর্ণ সুযােগ কমরেডগণ হেলায় হারালেন। সঙ্গে সঙ্গেই
শ্রমিকশ্রেণীর বৈপ্লবিক আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সংযুক্ত
করবার সুযােগও হারাতে হল।
আবার শীঘ্র এরূপ সুযােগ
আসবে কিনা, কে জানে ? লৌহ উত্তপ্ত থাকাকালীনই
তাকে পিটোতে হয়। কিন্তু কাজ এখনাে অসম্পূর্ণ ই রয়ে
গেছে, পুজিবাদীদের জন্য যে সব মেয়ে ভয়াবহ দুঃখজ্বালাময়
অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, তাদের মুক্তির ব্যবস্থা আপনাদেরই
করতে হবে। এ কাজ আপনাদেরই করতে হবে।
কৰ্ত্তব্য থেকে আপনাদের রেহাই নেই। কমিউনিষ্ট নেতৃত্বে

লেনিনের স্মৃতি
সুনিয়ন্ত্রিত গণআন্দোলনের সাহায্য ছাড়া পুজিবাদকে
পরাজিত করা বা সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভবপর নয়।
এজন্যই শেষ পর্যন্ত নারীগণও সকলেই বিপ্লবে যােগদান
করতে বাধ্য হবেন।”
বৎসর
লেনিনকে ছাড়া বৈপ্লবিক সর্বহারাদের প্রথম
(১৯২৫) অতিবাহিত হচ্ছে। তাঁর সম্পাদিত কাৰ্যগুলাের
অতি প্রয়ােজনীয়তা ও নেতা হিসেবে তার অদ্ভুত প্রতিভার
সাক্ষ্য দিয়েছে—এই এক বছর। তার মৃত্যুতে আমাদের
এই এক বছর আরাে বেশী সচেতন করে দিয়েছে। একটু
আগেই গম্ভীর গম্ভীর শােকাতুর কামান-গর্জনে ঘােষণা করা
হয়েছে যে, ঠিক এক বছর হল আমাদের লেনিন চিরতরে
ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার সেই তীক্ষ্ণ সন্ধানী দৃষ্টি এ পৃথিবীর
বুকে চোখ মেলে আর তাকাবে না। লেনিনের সমাধি-
ক্ষেত্রের চারিদিকে অফুরন্ত শােকগ্রস্ত নরনারীর পদরেখা
আমার চোখের সামনে ভাসছে। তাদের দুঃখ শুধু আমারই
দুঃখ নয়, লক্ষ লক্ষ বুকের দুঃখ। কিন্তু সদ্যজাগ্ৰত এই
বেদনা থেকে স্মৃতি আরও শক্তি নিয়ে জেগে উঠছে, বর্তমান
দুঃখ-বেদনা সব পিছনে পড়ে যাচ্ছে। লেনিন আমাকে যে-
সব কথা বলেছিলেন, তার প্রত্যেকটি শব্দ যেন আমি এখন
শুনতে পাচ্ছি। তার মুখের প্রত্যেকটি রেখার পরিবর্তন যেন
আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। বিপ্লবের শহীদদের
রক্তে রঞ্জিত পতাকাগুলাে লেনিনের সমাধির সম্মুখে অবনত

লেনিনের স্মৃতি
১৩১
হচ্ছে। অসংখ্য পুষ্পমাল্য তাঁর সমাধির স্থলে উৎসর্গীকৃত
হয়েছে। কিন্তু যত মাল্যই তাকে দান করা হােক না কেন,
তবু কোন দানই এখানে বাহুল্য হবে না। আমি আমার
এই সামান্য পাতা কয়টিও সেই সব মালার সঙ্গে তার স্মৃতির
উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি।
মস্কো, জানুয়ারীর শেষ,
ক্লারা জেটকি।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Leniner Smriti

Author
Chakrobarty, Latika
Title
Leniner Smriti
File name
Leniner Smriti
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/08/21
Publisher
Satish Roy, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
146
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Political Parties And Movements
Keywords
Literature on Marxist
DLI number
512855
Barcode
4990010019889.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
8uthj35XWDb
Download PDF

Leniner Smriti