Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Nepoliyon Ed. 2nd

Ghosh , Amulyakrishna · 2010/02/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

তিন-আনা সংস্করণ “কল্পতরু” গ্রন্থাবলী নং ৭
বঙ্গ প্রেসিডেন্সীর শিক্ষাবিভাগের ডিরেক্টার বাহাদুর কর্তৃক
লাইব্রেরী ও প্রাইজের জন্য নির্দিষ্ট। (কলিকাতা
গেজেট, ১৩ই আগষ্ট ১৯১৯)
নেপােলিয়ন ১
}
“যদ যদাচরতি শ্রেষ্ঠত্তদেবেতন জন।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লােকস্তদনুবর্ততে।”
"Lives of great men all remind us
We can make our lives sublime."
গােত্থলে, টাটা প্রভৃতি রচয়িতা
অমূল্যকৃষ্ণ যােষ এম, এ, প্রণীত
দ্বিতীয় সংস্করণ
ভট্টাচাৰ্য এণ্ড সন্
কলিকাতা ও ময়মনসিংহ
১৩২৭
মূল্য তিন আনা

কলিকাতা
১০৭নং মেছুৰাজার ট, এসে
করুণাময় আচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত
এবং
৫নং কলেজ ট, ভট্টাচাৰ্য এও সর পুস্তকালয় হইবে
দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক প্রকাশিত।

No text on this page.

No text on this page.

নেপােলিয়ম, প্রথম পরিচ্ছেদ বাল্য-কথা ইওরােপের নীচে ভূমধ্যসাগরের নীল জলে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ ভাসিতেছে, তাহার নাম কসিক। কর্সিকা ইটালির উপকূল হইতে ৫০ মাইল দক্ষিণে। এই দ্বীপের চারিদিকে নীল সাগরের ঢেউ, আর ইহার আকাশে নীল পাহাড়ের ঢেউ,-তাই কর্সিকা বড় সুন্দর। ইটালিতে জেনােয়া নামে এক রাজ্য ছিল ; কর্সিকা সেই জেনােয়ার অধীন ছিল। কিন্তু এই ক্ষুদ্র দ্বীপের লােকগুলি যেমন স্বাধীনতাপ্রিয় তেমনি যােদ্ধা ছিল, তাই তাহারা স্বাধীন হওয়ার জন্য জেনােয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। তাহাদের দলপতি পেওলির অধীনে কণিকার লােকগণ এমন সুন্দর যুদ্ধই করিল যে জেনােয়ার লোকেরা তাহাদের সঙ্গে পারিয়া উঠিল না। বেগতিক দেখিয়া তাহারা ফরাসী দেশের নিকট কনিকা বিক্রয় করিয়া ফেলিল। কর্সিকার লােক ইহাতে আরও বেশী চটিয়া গেল। তাহারা কি মানুষ নয় যে তাহাদিগকে এমন গরু বাছুরের মত বিক্রী করা হইল ? কসিকাবাসিগণ তাহাদের নূতন মুনিবকে কিছুতেই মানিল না, তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাইতে লাগিল। এই সমস্ত যােদ্ধাদের মধ্যে একটি লােক ছিলেন--তাহার নাম চার্লস্ মেরী বােনাপার্টি। চার্লসের বাড়ী আগে ইটালিতে ছিল কিন্তু বহুদিন হইল তাহারা কর্সিকাতে আসিয়া বাড়ী করিয়াছেন। তিনি ৪ নেপােলিয়ন সম্রান্তবংশের লােক ছিলেন বটে, তবে কর্সিকাতে উচ্চ ও নীচ বংশের লােকের মধ্যে পার্থক্য খুব অল্পই ছিল, কেন না তাহারা সকলেই দরিদ্র। চার্লসের স্ত্রীর নাম লেটিজিয়া। লেটিজিয়ার বয়স বেশী ছিল না এবং তিনি খুব সুন্দরী ছিলেন কিন্তু তাহার যে অসীম সাহস, যে তেজ, যে রকম বীর হৃদয় ছিল তাহা অনেক পুরুষেরও থাকে না। স্বামীর সঙ্গে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষেত্রে বিচরণ করিয়াছেন; বন্দুকের গােল। তাহার কাণের পাশ দিযা হুস্ করিয়া চলিয়া গিয়াছে, অদূরে কামানের গােল। ফাটিয়া পড়িয়াছে, কিছুতেই তিনি ভয় পান নাই। পৰ্বতের ভিতর দিয়া, জঙ্গলের মধ্য দিয়া, নদীর উপর দিয়া তিনি স্বামীকে অনুসরণ করিয়াছেন। কিছুদিন পর যুদ্ধ শেষ হইয়া গেল, কসিকা ফ্রান্সের বশ্যতা স্বীকার করিল, পেওলি সাগরপারে পলাইয়া গেলেন। এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন পূর্বে ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে লেটিজিয়ার একটি পুত্র হইল। পিতামাতা পুত্রের নাম রাখিলেন নেপােলিয়ন। তখন কি কেহ জানিত যে এই নেপােলিয়ন নাম ভুবনবিখ্যাত হইবে। নেপােলিয়নের অনেক ভাইবােন ছিল; তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাহাদের একটির বেণী চাকর ছিল না, তাই তাদের মা তাঁহাদিগকে একটি প্রকাণ্ড ঘর ছাড়িয়া দিয়াছিলেন, সেই ঘরে তাহারা ইচ্ছামত খেলা করিত। কিন্তু নােপােলিয়ন বিশেষ কোনাে খেলায় যােগদান করিতেন না, তিনি বসিয়া বসিয়া দেয়ালের গায় যুদ্ধের ছবি আঁকিতেন। তাহার খো ছিল একটি ঢাক ও একটি কাঠের তরবারি। পাড়ার ছেলেদিগকে লইয়া প্রায়ই তিনি যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলিতেন; এই যুদ্ধ অনেক সময় একমাস দু'মাস পর্যন্ত চলিত। নেপােলিয়ন ছিলেন তাহাদের দলপতি; তিনি কাহাকেও ভয় পাইতেন না; বড় হােক, ছােট হােক, যুদ্ধের সময় যাহাকে তিনি আক্রমণ করিতেন তাহাকে আঁচড়াইয়া, • বাল্য-কথা কামড়াইয়া, কিলাইয়া, চড়াইয়া অস্থির করিয়া তুলিতেন। নেপােলিয়ন তাঁহার দাদা জোসেফের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া ও মারামারি করিতেন। কিন্তু অতি ছেলেবেলা হইতেই তিনি আবার খুব গভীর ও চিন্তাশীল ছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি একা একা পায়চারি করিতেন ও চিন্তা করিতেন, তাহার সঙ্গীরা ডাকিলেও তাহাদের সঙ্গে খেলিতে যাইতেন না। পােষাক পরিচ্ছদের দিকে নেপােলিয়নের মােটেই নজর ছিল না। তাহার রুক্ষ চুলগুলি চোখের উপর আসিয়া পড়িত, মােজা জোড়া নামিতে নামিতে জুতার উপরে গিয়া পড়িত, জামায় বােতাম থাকিত না। পাঁচবৎসর বয়সে নেপােনিয়নকে একটি মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করিয়া দেওয়া হয় কিন্তু অল্পদিন পরেই সেই স্কুল ছাড়াইয়া তাহাকে ছেলেদের স্কুলে ভর্তি করিয়া দেওয়া হইল। সেই স্কুলে ইতিহাস পড়াইবার একটি সুন্দর নিয়ম ছিল। রােমের সঙ্গে কার্থেজের খুব যুদ্ধ হইয়াছিল, সেই যুদ্ধে নােম জয়লাভ করিয়াছিল। এই যুদ্ধের ইতিহাস পড়াইবার সময় ছাত্রগণকে দুই সারিতে ভাগ করা হইত, একদল রােমের পতাকার নীচে দাড়াইত, আর একদল কার্থেজের পতাকার নীচে দাড়াইত। নেপােলিয়নকে কার্থেজের পক্ষে দেওয়া হইয়াছিল। তিনি ইতিহাস পড়িয়া জানিয়াছিলেন যে কার্থেজ যুদ্ধে পরাজিত হইয়াছিল, তাই তিনি কার্থেজের পক্ষে থাকিতে সম্মত হইলেন না। তাঁহার দাদা জোসেফ রােমের পক্ষে ছিলেন, নেপােলিয়ন তাহার সঙ্গে পক্ষ বদল করিয়া রোমের পক্ষে চলিয়া আসিলেন, জোসেফ, বিনা আপত্তিতে কার্থে- দের পক্ষে গেলেন। ছেলেবেলা হইতেই তিনি সৈন্যদিগকে খুব ভালবাসিতেন এবং নিজের ও সৈনিক হওয়ার খুব সখ ছিল। স্কুলে যাওয়ার সময় নেপােলিয়নকে মােজ একটি সাদা রুটি দেওয়া হইত, তিনি তাহ পথে • নেপােলিয়ন একটি সৈনিককে দিয়া তাহার নিকট হইতে একটি লাল রুটি লইয়া আসিতেন। একদিন তার মা এজন্য একটু অসন্তুষ্ট হইয়া নেপাে- লিয়নকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি রােজই ভাল রুটিখানা দিয়ে বিশ্রী একটা লাল রুটি নিয়ে খাও কেন ?” নেপােলিয়ন উত্তর দিলেন, “আমি যদি সৈন্য হই তা হলে আমাকে ও ত ঐ রুটি খেতে হবে। তা ছাড়া লাল রুটি আমি খেতে ভালবাসি।” নেপােলিয়নের ঝোঁক দেখিয়া পিতামাতা মনে করিলেন তাহাকে সৈনিক হইতে দেওয়াই উচিত। তাই একদিন ডিসেম্বর মাসে চার্লস্ তাহার দুই পুত্র জোসেফ, ও নেপােলিয়নকে লইয়া ফ্রান্সে যাত্রা করিলেন। নেপােলিয়নের বয়স তখন দশ বৎসর হয় নাই। ফ্রান্সের ‘অটান্ সহরে একটি স্কুলে দুই ভাইকে ভর্তি করিয়া দেওয়া হইল। জোসেফ •একটু লাজুক স্বভাবের ছিলেন, তাই প্রথম তিনি ছেলেদের সঙ্গে মিশিতে পারেন নাই, কিন্তু ২৪ দিনের মধ্যেই তিনি সকলের সঙ্গে খুব ভাব করিয়া ফেলিলেন। নেপােলিয়ন ইচ্ছা করিয়াই কাহারও সঙ্গে মিশিলেন না। তিনি সর্বদা বিষন্ন ও গম্ভীর হইয়া বসিয়া থাকিতেন, মাঝে মাঝে একা একা বেড়াইতে যাইতেন। তিনি ছেলেদের সঙ্গে খেলায় কিম্বা আমােদ প্রমােদে যোগদান করিতেন না, স্কুলের ছেলেরা এজন্য তাঁহাকে অত্যন্ত বিরক্ত করিত। সকলেই তাহাকে “ভীরু কর্সিকা” বলিয়া ক্ষেপাইত এবং কর্সিকা ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধে হারিয়া গিয়াছিল বলিয়া ঠাট্টা করিত। নেপােলিয়ন কাহারও কথার কোনো উত্তর দিতেন না। জোসেফের আগেই নেপােলিয়ন ফরাসী ভাষায় লিখিত ও পড়িতে শিখিয়া ফেলেন। কর্সিকাতে তাহার ইটালিয়ান ভাষা শিখিয়া- ছিলেন সুতরাং ফরাসী ভাষা আগে কিছুই জানিতেন না। নেপােলিয়ন ফরাসী ভাষাতে বেশ কথা বলিতে পারিতেন বটে কিন্তু শুদ্ধ করিয়া বাল্য-কথা লিখিতে পারিতেন না। সমস্তটা জীবন তিনি বানান ভুল করিয়া গিয়াছেন। তাহার হাতের লেখা বড় খারাপ ছিল ; কেহ কেহ বলেন যে তঁাহার বানান-ভুল ঢাকিবার জন্য ইচ্ছা করিয়া তিনি ঐরূপ বিশ্রী করিয়া লিখিতেন। প্রায় তিন মাস পর তাঁহাদের পিতা নেপােলিয়নকে সেখান হইতে লইয়া যাওয়ার জন্য আসিলেন। নেপােলিয়ন ব্রিয়েনে সৈনিকদের স্কুলে ভর্তি হইবেন, জোসেফ অটানেই থাকিবেন। সুতরাং এবার ভায়ৈ ভা’য়ে ছাড়াছাড়ি হইবার পালা আসিল। দুই ভা’য়ে খুব ঝগড়া মারামারি হইত বটে, কিন্তু দু’জনে আবার খুব ভাবও ছিল। বিশেষতঃ দেশ ছাড়িয়া এই বিদেশে আসিয়া তাহাদের ভালবাসা যেন আরও বাড়িয়া গিয়াছিল। বিদায়ের সময় জোসেফ চোখের জল থামাইয়া রাখিতে পারিলেন না, তিনি খুব কঁদিতে লাগিলেন। কিন্তু নেপােলিয়ন এত সহজে চোখের জল বাহির হইতে দিলেন না; তিনি প্রাণপণ চেষ্টায় কান্না চাপিতে লাগিলেন ; তাহার গম্ভীর মুখ আরও গম্ভীর এবং কালো হইয়া গেল। কিন্তু তবুত ভাই!—এত চেষ্টা সত্ত্বেও এক ফোঁটা জল তাহার চোখ হইতে গড়াইয়া পড়িল। নূতন স্কুলে নেপােলিয়নের প্রথমে মােটই ভাল লাগে নাই। সেখানে তিনি সৈন্যদের মত পােষাক পরিতেন এবং শীঘ্রই একজন যােদ্ধা হইবেন তাহা জানিতেন বটে, কিন্তু তথাপি বাড়ীর জন্য তাহার মন কেমন করিত। সেই স্কুলে ছয় বৎসর থাকিবার নিয়ম ছিল ; নেপােলিয়ন ভাবিতেন কতদিনে না-জানি ছয় বৎসর হয়। এখানেও নেপােলিয়ন খুব গম্ভীর হইয়া থাকিতেন, কাহারও সঙ্গে হাসি-গল্প-তামাসায় যােগদান করিতেন না; তাই স্কুলের ছেলেরা তাহাকে খুব জ্বালাতন আরম্ভ করিল। কেহু বলিত-“তােমার নাকটা স্বর্গ-মুখাে” কেহ বলিত-“তােমাদের দেশ পরাধীন, তােমরা গােলামের জাত ;

নেপােলিয়ন ইহার প্রায় চার বৎসর পরের কথা বলিতেছি। স্কুলে তখন দুর্গ-অধিকার ও দুর্গ-রক্ষার প্রণালী শিক্ষা দেওয়া হইতেছিল। তখন শীতকাল দেখা দিয়াছে, চারিদিকে বরফ পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। নেপােলিয়ন বলিলেন-“বরফের একটা দুর্গ প্রস্তুত করিয়া একদল সেটাকে আক্রমণ করুক, অন্যদল তাহা রক্ষা করুক।” মাষ্টারের বলিলেন-“এত খুব ভাল প্রস্তাব।” ছেলেরাও ইহা শুনিয়া খুব আনন্দিত হইল। নেপােলিয়ন দুর্গের নমুনা আঁকিয়া দিলেন ; সকলে মিলিয়া কোদাল প্রভৃতি লইয়া কাজে লাগিয়া গেল এবং দেখিতে দেখিতে দুর্গ প্রস্তুত হইয়া গেল। দুর্গ শেষ হইলে ছেলেরা দুই দলে ভাগ হইয়া গেল এবং বরফের গােল প্রস্তুত করিয়া যুদ্ধ আরম্ভ করিল। নেপােলিয়ন হইলেন সেনাপতি। তিনি দুই দলকেই হুকুম দিয়া চালাইতে লাগিলেন, একদল দুর্গ আক্রমণ করিল, অন্য দল তাহা রক্ষা করিতে লাগিল। মাষ্টারেরা এই বুদ্ধ দেখিয়া খুব খুশী হইলেন এবং তাহাদিগকে খুব উৎসাহ দিতে লাগিলেন। এই যুদ্ধের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ি এবং নানা স্থান হইতে লােকজন আসিয়া ইহা দেখিয়া যাইতে লাগিল। সমস্ত শীতকাল ধরিয়া যুদ্ধ চলিল। শীত চলিয়া গেলে যখন গরম পড়িল তখন বরফ গলিয়া যাইতে লাগিল সুতরাং তাহাদের কৃত্রিম যুদ্ধ ও শেষ হইয়া গেল। ঠাণ্ডার মধ্যে লড়াই করিয়া অনেক ছেলের অসুখ করিয়াছিল কিন্তু নেপােলিয়নের কিছুই হয় নাই। তিনি এই কয়মাসে বেশ বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে সৈনিক জীবনটাই বীরের উপযুক্ত, এবং মানুষকে হুকুম দিয়া চালাইবার ক্ষমতা তাহার যথেষ্টই আছে। নেপােলিয়ন সাহিত্য ভাল জানিতেন না, কিন্তু গণিত ও জ্যামিতিতে খুব পাকা ছিলেন। ভূগোল তাহার কাছে খুব ভাল লাগিত কিন্তু ইতিহাসটাই ছিল তাহার সর্বাপেক্ষা প্রিয় জিনিষ। গ্রীস্ ও কৰ্ম্ম-জীবন ৯ রােমের বীরগণের কাহিনী পাঠ করিতে তিনি খুব ভালবাসিতেন। সময় পাইলেই তিনি ইতিহাস কিম্বা মহাপুরুষদের জীবনী পাঠ করিতেন। অনেক সময় দেখা যাইত যে তিনি খেলা ফেলিয়া বই লইয়া বসিয়া আছেন। এই জন্য তঁাহার স্বাস্থ্য ভাল ছিল না। নেপােলিয়ন খুব খাটো ছিলেন। তাহার কাঁধ দুইটি খুব চওড়া ছিল বলিয়া তাহাকে বেশ একটু মােটা দেখাইত কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তিনি খুব রােগা ও পাতলা ছিলেন। নেপােলিয়ন বলিতেন তঁাহার মাতা তঁাহার চরিত্রগঠনের প্রধান সহায় ছিলেন। ছেলেবেলা মায়ের মুখে যুদ্ধের গল্প শুনিয়া শুনিয়া তাহার দুঃসাহস বাড়িয়া উঠিয়াছিল। মায়ের নিকট ভাল শিক্ষা না পাইলে সন্তান কখন ও বড়লােক হইতে পারে না। তাই নেপােলিয়ন বলিতেন,-স্বদেশের উন্নতির জন্য উপযুক্ত মাতার যেমন প্রয়ােজন এমন আর কিছুই নহে। * * * দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ কর্ম-জীবন নেপােলিয়ন ভাবিতেছিলেন—তাঁহাকে ত আরাে এক বৎসর এই স্কুলে থাকিতে হইবে, এমন সময় সহসা একদিন তিনি জানিতে পারিলেন যে প্যারিসের ( Paris) সৈনিক-শিক্ষালয়ে তাঁহাকে ভর্তি করা হইয়াছে। ১৭৮৪ খৃষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর তিনি এবং আরও চারিজন ছাত্র প্যারিসের দিকে যাত্রা করিলেন। প্যারিস ফরাসী দেশের রাজধানী। সেখানকার স্কুলে গিয়া নেপােলিয়নের মনে হইল যেন এতদিন পর তিনি তাহার উপযুক্ত স্থানে আসিয়াছেন। প্যারিসের স্কুলটিকে তাঁহার স্কুল বলিয়াই বােধ হইল নেপােলিয়ন • । চারিদিকে সিপাই শান্ত্রীর ছুটাছুটি, অস্ত্রের ঝন্ঝনি; সকলেরই যুদ্ধের পােষাক পরা, সকলেই যুদ্ধের বিষয় আলাপ করিতেছে ; নেপােলিয়নের মনে হইল যেন তিনি এমন একটা সহরে বাস করিতেছেন যেখানে খুব যুদ্ধের আয়োজন চলিতেছে । এখন ঘুম হইতে উঠিবার সময় কিম্বা ক্লাসে যাওয়ার সময় আর ঘণ্টার শব্দ শুনিতে হয় না, তাহার পরিবর্তে এখন ঢাক বাজিয়া উঠে। প্যারিসে এক বৎসর থাকিয়া তিনি সব পরীক্ষা পাশ করিলেন এবং লা-ফেয়ার গােলন্দাজ সৈন্যদলের দ্বিতীয় লেফটেন্টের পদ পাইলেন। ১৭৮৫ খৃষ্টাব্দের ৩০শে অক্টোবর তিনি এবং তাঁহার আর একটি সঙ্গী তাঁহাদের সৈন্যদলে যােগদান করিবার জন্য ভেলেন্সের দিকে যাত্রা করিলেন। তাঁহাদের বয়স তখন ১৬ কি ১৭, কিন্তু বয়স কম হইলে কি হইবে, তাহাদের কোমরে তরবারি ঝুলিতেছিল, তাঁহাদের মনে হইতেছিল তাহার যেন মস্ত দুইজন বীর। লাফেয়ার গােলন্দাজগণ ফরাসী গােলন্দাজদের মধ্যে বিখ্যাত পরিশ্রমী ছিল। খুব ভােরে ঘুম হইতে উঠিয়াই তাহারা তাহারা “ড়িল” করিত, “মার্চ” করিত, গুলি ছুড়িতে শিখিত। নেপােলিয়ন তখনও একজন শিক্ষার্থী মাত্র, সুতরাং তাহাকে নিম্নতম সৈনিকের কাজ হইতে আরম্ভ করিয়া সকল কাজই শিখিতে হইয়াছিল ; সব শেখা হইলে তবে তিনি কর্মচারীর পদ পাইয়াছিলেন। এই সমস্ত শিক্ষা ছাড়া তিনি সমর সম্বন্ধে যেখানে যে বই পাইতেন তাহাই পড়িতেন। তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ম্যাপ আঁকিতে ও নক্সা আঁকিতে শিখিয়া ফেলেন এবং একজন খুব ভাল কৰ্ম্মচারী হইয়া উঠেন। ছাত্রজীবনে নেপােলিয়ন খুব গম্ভীর ও বিষয় ছিলেন, কিন্তু কাজে ঢুকিয়া অবধি তাঁহার সে স্নান মূর্তি আর নাই। মুর্তি আর নাই। এখন তিনি সকলের সঙ্গে হাসি, ঠাট্টা, তামাসা করেন ; নাচে, ভােজে, সঙ্গীতে কৰ্ম্ম-জীবন ১১ মােগদান করেন এবং বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলিয়া থাকেন। এই সময় নেপােলিয়ন মাঝে মাঝে বাড়ীতেও যাইতেন। তপন ফ্রান্সে হুলস্থুল কাণ্ড আরম্ভ হইয়াছে। যে সময়ের কথা বলিতেছি তখন ফরাসীর রাজা অত্যন্ত অত্যাচারী ছিলেন। দেশের লােক কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল, সকলের উপরে ছিলেন জমীদারগণ, তারপর পুরােহিতগণ—সকলের নীচে ছিল জনসাধারণ। জমীদার ও পুরােহিতগণকে কর দিতে হইত না। তা ছাড়া অন্য সকলকেই কর দিতে হইত। এদিকে রাজা ও জমীদারগণ প্রজাদের টাকায় ধনী হইয়া খুব বড় মানুষী চালে চলিতেন। তাহারা যে ভাবে খুসী টাকা খরচ করিতেন এবং টাকার অভাব হইলেই প্রজাদের উপর নূতন কর বসাইতেন। সুতরাং দেশের লোকের দুর্দশার সীমা ছিল না। তাহারা যে কত অত্যাচার সহ্য করিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু অবশেষে আর সহিল না। অন্যায়কে মানুষ কতদিন সহিয়া থাকিতে পারে ? তাহারা তখন বিদ্রোহী হইতে লাগিল; স্থানে স্থানে দাঙ্গা হইতে আরম্ভ হইল। অবশেষে ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে দেশময় আগুণ জ্বলিয়া উঠিল। প্যারিসের জনসাধারণ সদলবলে সেখানকার জেলখানা আক্রমণ করিয়া সকল কয়েদীকে ছাড়িয়া দিল। রাজা শুনিয়া বলিলেন, “এ যে রীতিমত বিদ্রোহ।” মন্ত্রী বলিলেন, “না, মহারাজ, এ বিদ্রোহ নয়—এ রাষ্টবিপ্লব।” দেখিতে দেখিতে বিপ্লবের আগুণ ভীষণ আকার ধারণ করিল; রাজাকে সিংহাসন হইতে তাড়াইয়া দেওয়া হইল, দেশে ঘোর বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইল; মানুষ কোন্ পথে চলিবে তাহা কেই ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিল না। এই সমস্ত গােলমালের মধ্যে নেপােলিমমের কোনো স্বার্থ ছিল না,কারণ তঁাহার বাড়ী ত ফরাসীতে নয়, সুতরাং ফরাসীতে যাহা ইচ্ছা হােক না কেন, তাহাতে সঁহার কি? তবে তিনি মনে নেপােলিয়ন করিয়াছিলেন যে ইহার ফলে তাঁহার মাতৃভূমি কর্সিকার কোন উপকার হইতে পারে। নেপােলিয়ান ছুটি লইয়া বাড়ী গেলেন। গিয়া দেখেন কলিকাতেও হুলস্থূল ব্যাপার। পেওলি আবার ফিরিয়া আসিয়াছে এবং সকলেই তাহাকে খুব আদর ও সম্মানের সহিত গ্রহণ করিতেছে। বাল্যকালে নেপােলিয়ন পেওলিকে খুব শ্রদ্ধা করিতেন, কিন্তু এখন বৃদ্ধ পেওলির সঙ্গে তাঁহার মত মিলিল না। পেওলি বলিলেন “ফ্রান্সে এখন যে রকম গােলযােগ এখন আব ফরাসীর অধীন থাকা নিরাপদ নয়। তাই তিনি কর্সিকার শাসনভার ইংলণ্ডের হাতে অর্পণ করিতে চাহিলেন। নেপােলিয়ন ইহার বিরােধী হইয়া দাড়াইলেন। পেওলি নেপােলিয়নকে বন্দী করিবার জন্য সৈন্য নিযুক্ত করিলেন। একদিন নেপােলিয়ন একা পথ চলিতেছিলেন, কয়েকজন সৈন্য সহসা তাহাকে বন্দী করিয়া লইয়া গেল। নেপােলিয়ন কৌশল করিয়া পলাইয়া চলিয়া আসিলেন। এদিকে ইংরেজরণতরী আসিয়া কর্সিকার বন্দর দখল করিয়া বসিল ; নেপোলিয়ন কিছু সৈন্য সংগ্রহ করিয়া তাহাদের সঙ্গে যুদ্ধ করিলেন, কিন্তু কিছুই করিতে পারিলেন না। সুতরাং যুদ্ধ । ত্যাগ করিয়া চলিয়া আসিলেন। তাহাকে বাধ্য হইয়া সপরিবারে কর্সিকা ত্যাগ করিয়া যাইতে হইল। তাড়াতাড়ি তাহারা বিশেষ কোনো জিনিষ সঙ্গে নিতে পারেন নাই। তাহারা চলিয়া গেলে পরেই একদল চাষা নেপােলিয়নের বাড়ী ঘর লুণ্ঠন করিয়া জিনিষপত্র সব নষ্ট করিয়া দিয়া গেল। নেপােলিয়ন অনেক কষ্টে, অনেক বিপদের হাত এড়াইয়া মার্জলসে পৌছিলেন এবং সেখানে তাহার মা ও বােন- দিগকে অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় রাখিয়া নাইস নগরে চলিয়া গেলেন। ‘নাহসে তখন তাহার সেনাদল অবস্থান করিতেছিল। নেপােলিয়ন এখন হইতে ফরাসীকেই তাঁহার স্বদেশ মনে করিতে লাগিলেন, কর্সিকার সহিত তাঁহার সম্বন্ধ শেষ হইয়া গেল।

কর্ম-জীবন } ফরাসীর লােকেরা তাহাদের রাজাকে রাজ্যচ্যুত করিয়া নিজেরা গভর্ণমেন্ট (Government ) স্থাপন করিল ; সেই গভর্ণমেন্ট এর নাম হইল কনভেশান্ (Convention )। ইওরােপের অন্যান্ত দেশের রাজগণ ফরাসীর রাজাকে সাহায্য করিবার জন্য দলবদ্ধ হইলেন। ব্রিটেন আগে এই দলে যােগ দেন নাই, কিন্তু ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ফরাসীরা যখন তাহাদের রাজাকে হত্যা করিল তখন ব্রিটেন্ আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলেন না, অন্যান্য রাজাদের সঙ্গে আসিয়া যােগদান করিলেন। টুল নগর কনভেশানের শাসন অমান্য করিয়া বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছিল, তাই ফরাসী গভর্ণমেন্টের একদল সৈন্য সেই নগর অবরােধ করিল । অনেক দিন চলিয়া গেলেও যখন নগর দখল হইল না তখন নেপােলিয়নকে সেখানে পাঠান হইল। তিনি গিয়া দেখিলেন, সেখানে সৈন্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা নাই, তাহাদিগকে হুকুম দিয়া চালাইবার মত ভাল কর্মচারী নাই এবং উপযুক্ত গােলাগুলি ও বন্দুককামান নাই। তিনি গিয়াই ভীষণভাবে কাজে লাগিয়া গেলেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই দুর্গ ও ৪টি কামান প্রস্তুত করিবার সকল আয়ােজন সম্পূর্ণ করিয়া ফেলিলেন। দেখিতে দেখিতে দুর্গ প্রস্তুত হইয়া গেল, অসংখ্য গােলা- গুলি আসিল, রীতিমত যুদ্ধ আরম্ভ হইল। এদিকে টুলনের বন্দরে ইংরেজদের কতকগুলি যুদ্ধজাহাজ আসিয়া সহরের অধিবাসীদের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করিতে লাগিল। নগরের দুর্গে মিলিত-রাজাদের সৈন্যদল ছিল, তাহারা কয়েক সপ্তাহ বেশ যুদ্ধ করিয়াছিল, কিন্তু অবশেষে আত্ম- সমৰ্পণ করিতে বাধ্য হইল। নেপােলিয়নের সঙ্গে কেহই পারিয়া উঠিল । ইংরেজদের জাহাজ যখন টুল ছাড়িয়া চলিল তখন টুলনবাসীদের শেষ আশাটুকুও নিভিয়া গেল। টুলনের অসংখ্য নরনারী সেই সকল জাহাজে চড়িয়া পলাইবার জন্য সমুদ্রতীরে ভিড় করিল। তাহাদের ১৪ নেপােলিয়ন ভিড়ে কত লােক যে ডুবিয়া মরি তাহার ইয়ত্তা নাই ; কানায় কানায় বােঝাই করা অনেক নৌকা উল্টিয়া গেল। নেপােলিয়ন বলিয়াছিলেন—“কাল কি পরশুই আমরা টুল নগরে বসিয়া খানা খাইব।” তাঁহার এ কথা মিথ্যা হয় নাই, কারণ ইংরেজ রণতরীগুলি চলিয়া গেলে পরই নেপােলিয়ন সসৈন্যে টুল নগরে প্রবেশ করিয়া নগর অধিকার করিলেন । একমাত্র নেপােলিয়- নের জন্যই টুল অধিকৃত হইল এবং এই নগর অধিকার করাতেই তাঁহার যশ চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। এই সময় নেপােলিয়ন যে রকম পরিশ্রম করিয়াছিলেন তাহা শুনিলে অবাক হইতে হয়। দিনরাত্রির মধ্যে কখনাে তিনি বিশ্রাম করিবার সময় পান নাই । এই যুদ্ধজয়ের পর মনে হইয়াছিল, বুঝিবা এতদিনে নেপাে- লিয়নের কপাল ফিরিল । কিন্তু কাহার কপালে কখন কি ঘটে কেহ বলিতে পারে না। কোনও মিথ্যা সংবাদ পাইয়া ফরাসী গভর্ণমেন্ট নেপােলিয়নকে গ্রেপ্তার করিলেন। বিচারে তাহার খালাস হইল বটে, কিন্তু সৈন্যদলে তাঁহার যে রকম উচ্চপদ ছিল তাহা আর তাহাকে । দেওয়া হইল না, নীচের দিকে তাঁহাকে অন্য একটি কাজ দেওয়া হইল। নেপােলিয়ন তাহা গ্রহণ করা অপমানজনক মনে করিলেন। সুতরাং বেকার অবস্থায় তাহাকে অনেক দিন প্যারিসে বাস করিতে হইয়াছিল। বহু চেষ্টা করিয়া ও তিনি একটা চাকুরী জুটাইতে পারিলেন না। একবার মনে করিয়াছিলেন, তুর্কিতে সুলতানের অধীনে চাকুরী করিতে যাইবেন। কিন্তু এদিকে তাঁহার মা, ভাই ও বােনেরা সব না খাইয়া মরিতে বসিয়াছে, নিজে ও অনাহারে অনেক কষ্ট পাইতেছেন, অথচ তঁাহার পকেটে তখন কেবলমাত্র একটি ফ্র্যাঙ্ক, আছে। নেপােলিয়ন আত্মহত্যা করিবার জন্য নদীতীরে গেলেন, কিন্তু আত্মহত্যা মহাপাপ একথা জানিতেন বলিয়া একটু ইতস্ততঃ করিতে কৰ্ম্ম-জীবন • লাগিলেন। এমন সময় সেখান দিয়া তাহার একজন পুরাতন বন্ধু যাইতেছিলেন; তিনি নেপােলিয়নের অবস্থা জানিতে পারিয়া তখনি তাঁহাকে ৬০০০ ডলার দান করিয়া গেলেন। সেই টাকাতে নেপাে- লিয়ন সপরিবারে বাঁচিয়া গেলেন। এই বন্ধুটির নাম ছিল ডিমেসি। নেপােলিয়ন সম্রাট হইয়া তাহাকে বহু সন্ধান করিয়া বাহির করেন। ডিমেসিস ইচ্ছা করিয়াই ১৫ বছর গা ঢাকা দিয়াছিলেন । পীড়াপীড়ি করিয়া নেপােলিয়ন তাঁহাকে ৬০০০ ডলার বার্ষিক আয়ের একটা চাকুরী গ্রহণ করিতে সম্মত করেন এবং তাহার ভাইকেও একটা কাজ প্রদান করেন। এদিকে প্যারিসে ভীষণ কাণ্ড উপস্থিত। দেশের নূতন শাসন- প্রণালী লােকের পছন্দ হইল না। শাসনের আবার নূতন রকম বলো- বন্তের প্রস্তাব হইল, কিন্তু সেই বন্দোবস্তও সকলের মনােমত হইল না। ইহা লইয়া দেশে দুইটি দলের সৃষ্টি হইল এবং দুই দলে ঘােরতর যুদ্ধ বাধিয়া গেল। প্যারিসের লােকেরা আবার অস্ত্র লইয়া গভর্ণমেন্ট, প্রাসাদ আক্রমণ করিতে চলিল। কর্তারা দেখিলেন—বিপদ! এখন উপায় কি ? তাঁহাদের সৈন্যদিগকে চালাইবেই বা কে? এমন সময় বেরাস্ নামক এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিল—“আমি জানি এখন আমাদের কা’কে দরকার ! সে হচ্ছে ছােট্ট একঠি কর্সিকান্ কর্মচারী-নেপােলিয়ন তার নাম।” তখনি নেপােলিয়নকে ডাকা হইল। নেপােলিয়নকে কেহ চিনিত না; সকলেই মনে করিয়াছিল তাহার চেহারা হয়ত খুব একটা পালােয়নের মত, কিন্তু যখন ছােট-খাট, মেয়েলি চেহারার ছিপ- ছিপে একটি বালক-সদৃশ যুবক ঘরে প্রবেশ করিল, তখন সকলেই খুব অবাক হইয়া গেল। নেপােলিয়নের বয়স তখন ২৫ বৎসর কিন্তু তাহার দাড়ি গোঁফ ছিল না বলিয়া তাহাকে ১৭ ১৮ বৎসরের বালকের মত দেখাইত। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, “তুমি কেমন গুরুতর কাজের নেপােলিয়ন ভার নিচ্ছ তা জান ?” নেপােলিয়ন অকম্পিত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “খুব জানি এবং আমি যে কাজে হাত দেই তা কখনো অসম্পন্ন রাখি না।” সেই কণ্ঠস্বরে সকলেরই বিশ্বাস হইল নেপােলিয়ন এ কাজের সম্পূর্ণ উপযুক্ত বটে। তখন অনেক রাত হইয়া গিয়াছে। নেপােলিয়ন আসিয়া কিছু মাত্র বিলম্ব না করিয়া কাজে লাগিয়া গেলেন; ভাের হইতে না হইতে রাজপ্রাসাদে যাইবার প্রত্যেক পথে কামান খাড়া করা হইল। ত্রিশ হাজার বিদ্রোহী প্রাসাদ আক্রমণ করিবার জন্য ছুটিয়া গিয়াছিল। তাহাদের কামান ছিল না কিন্তু প্রত্যেকের হাতেই বন্দুক ছিল। দুই পক্ষ মুখােমুখি হইয়া কয়েক ঘণ্টা চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। বেলা ৪টার সময় কে একজন সর্বপ্রথম একটা গুলি ছুড়িল । অমনি হাজার হাজার বন্দুক এক সঙ্গে গর্জিয়া উঠিল। নেপো- লিয়নের কামান গুলি অগ্নি-বৃষ্টি করিতে লাগিল, বিদ্রোহিগণ পরাজিত হইয়া পলায়ন করিল। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সব নীরব হইয়া গেল, নেপােলিয়ন যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন। এই যুদ্ধজয়ের ফলে তাহাকে একটি সেনাদলের প্রধান সেনাপতি করিয়া দেওয়া হইল। এই ঘটনার অল্প কয়েক দিন পর একটি বার বৎসরের বালক নেপােলিয়নের সঙ্গে দেখা করিতে আসিল। বালকের নাম ইউজেন্। গভর্ণমেন্টের আদেশ মত প্যারিসের লােককে নিরস্ত্র করিবার সময় ইউজেনের পিতার তরবারি নেপােলিয়ন লইয়া আসিয়াছিলেন। ইউ- জেনের পিতা বিপ্লববাদী ছিলেন বলিয়া তাহার প্রাণদণ্ড হইয়াছিল। পিতৃহীন ইউজেন পিতার তরবারি লইতে আসিয়াছে। নেপােলিয়ন বালকটির জন্য দুঃখ বােধ করিলেন এবং তাহাকে তরবারি ফিরাইয়া দেওয়ার জন্য হুকুম প্রদান করিলেন। বালক তরবারি লইয়া চলিয়া গেল। ইহার পরদিন ইউজেনের মা জোসেফাই নেপােলিয়নকে ধখাদ দেওয়ার জন্য তাহার সঙ্গে গিয়া দেখা করিলেন। জোসেফাইন্ কর্ম-জীবন অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন; তাঁহাকে নেপােলিয়নের খুব ভাল লাগিল এবং ক্রমে দুইজনের মধ্যে খুব ভাব হইয়া গেল। অবশেষে ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দের ৬ই মার্চ নেপােলিয়ন তাহাকে বিবাহ করিলেন। জাসেফাইন নেপােলিয়ন অপেক্ষা দুই বৎসরের বড় ছিলেন। নেপােলিয়নের বয়স তখন ২৬ বৎসর। এক মাস আগে নেপােলিয়নকে আমরা পথে পথে ঘুরিতে দেখিয়াছি, আর আজ ধনে, মানে, খ্যাতিতে তাঁহার সমান কে ? আজ তিনি যে মহিলাকে বিবাহ করিয়াছেন, কয়েক মাস আগে ইহা তাহার কল্পনারও অতীত ছিল। বিবাহের পরেই স্ত্রীকে ছাড়িয়া নেপােলিয়ন ইটালিতে চলিয়া গেলেন, কারণ ইটালির উত্তরে আল্পৰ্বতে তখন খুব যুদ্ধ চলিতেছিল। নেপােলিয়নকে সেখানে প্রবল দুই শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করিতে হইয়াছিল। নেপােলিয়ন দেখিলেন যে এই শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতিতে হইলে হঠাৎ গিয়া তাহাদিগকে আক্রমণ করা দরকার। কিন্তু সঙ্গে জিনিষপত্র থাকিলে সৈন্যেরা তাড়াতাড়ি চলিতে পারে না, তাই নেপােলিয়ন সৈন্যদের সঙ্গে খাদ্যদ্রব্য কিম্বা কাপড় চোপড় কিছুই নিতে দেন নাই। তিনি যখন যেখানে যাইতেন সেইখান হইতে সৈন্যদের খাদ্যদ্রব্য ও গাত্রবস্ত্র সংগ্রহ করিয়া লইতেন। নেপােলিয়ন জানিতেন যে শত্রুসৈন্যদের দল দুইটি যদি একত্র মিলিতে পারে, তাহা হইলে তাহাদের সঙ্গে তিনি কিছুতেই পারিয়া উঠিবেন না। তাই যাহাতে তাহারা মিলিত হইতে না পারে তিনি সেই রূপ চেষ্টা ও বন্দোবস্ত করিলেন এবং এক এক করিয়া উভয় দলকে পরাজিত করিলেন। তাঁহার মত এমন সুন্দরভাবে কেহই সৈন্য- পরিচালনা করিতে পারিত না। একে একে ইটালিতে অনেক যুদ্ধ হইল, নেপােলিয়ন সকল যুদ্ধে জয়লাভ করিলেন। ২ নেপােলিয়ন নেপােলিয়নের সৈন্যেরা তাহাকে অত্যন্ত ভালবাসিত। তাহারা জানিত যে তিনি যেমন সাহস ও দক্ষতার সহিত তাহাদিগকে সকল যুদ্ধে জয়ী করিয়াছেন এমন আর কেহ পারিবে না। তাই সকলে তাহাকে আদর করিয়া ডাকিত “লিল কর্পোরাল” (Litle Corporal'। এই নামটি তিনি প্রথম পাইয়াছিলেন এড়ানদীর উপর লােডি-সেতু : অধিকার করিবার সময়। এড়ানদীর এক তীরে ক্ষুদ্র লােডি সহরে ফরাসীসৈন্য অবস্থান করিতেছিল, অন্য তীরে অষ্ট্রিয়ার ১৬০০০ সৈন্য উপস্থিত ছিল। তাহাদের গােলার সম্মুখে ফরাসীসৈন্য নদীর তীরে আসিতে পারিতেছিল না। নেপােলিয়ন নিজে গিয়া নদীর তীর পরীক্ষা করিয়া আসিলেন এবং নদীর উপর যে সেতু রহিয়াছে তাহা পার হইয়া শত্রু-সৈন্যকে আক্রমণ করা ঠিক করিলেন। নেপােলিয়নের সেনাপতিরা শুনিয়া বলিল, “অসম্ভব। অশ্রান্ত গােলাবর্ষণের মধ্যে এই সেতু পার হওয়া অসম্ভব। নেপােলিয়ন বলিয়া উঠিলেন, “অসম্ভব?—ফরাসী ভাষায় অসম্ভব বলিতে কোনাে শব্দ নাই।” কাহারও নিষেধ না শুনিয়া তিনি সেতু ছাড়া হইতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। কাঠের সেতুটি বেশী বড় ছিল না, অষ্ট্রিয়ার ইচ্ছা করিলেই উহা কামানের গােলা দিয়া উড়াইয়া দিতে পারি, কিন্তু তাহা তাহারা দরকার বােধ করে নাই। ঐ অবস্থায় এই সেতু যে কোনাে মানুষ পার হইতে পারে, অষ্টিয়া সেনাপতি তাহা কল্পনাও করেন নাই। নেপােলিয়ন সৈন্যদিগকে সেতু আরােহণ করিতে হুকুম দিলেন। একদল সৈন্য কামানের গােলায় উড়িয়া গেল, আর এক দল আরােহণ করিল,- সেই দল ও উড়িয়া গেল। এই ভাবে মরিতে মরিতে সৈন্যেরা যখন সেতুর মধ্যখানে গিয়াছে তখন এমন ভীষণ গােলাবৃষ্টি হইতে লাগিল যে সৈন্যেরা হটিবার উপক্রম করিল। নেপােলিয়ন তখন হাতে একটি পতাকা লইয়া নিঙ্গে সকলের আগে অগ্রসর হইলেন এবং সৈন্যগণকে বলিলেন, “এসো, – মিশরে তােমাদের সেনাপতির সঙ্গে অগ্রসর হও।” লানে নামক একজন বীর সর্বপ্রথম সেতুটি পার হইলেন, তারপর নেপােলিয়ন পার হইলেন, তাহাদের পশ্চাতে সমগ্ৰ ফরাসীসৈন্ত অগ্রসর হইল। এদিকে নেপােলিয়নের কৌশলমত একদল সৈন্য অনেক দূরে এক জায়গায় নদী পার হইয়া অষ্টিয়ার সৈন্যকে পশ্চাৎদিক হইতে আক্রমণ করিল। দুই দলের মাঝখানে পড়িয়া অষ্টিয়া। হারিয়া গেল। তৃতীয় পরিচ্ছেদ মিশরে এই বিজয়ের পর নেপােলিয়ন যখন প্যারিসে ফিরিয়া গেলেন তখন সকলে তাহাকে সসম্মানে অভিনন্দন করিল। যে রাস্তার উপর তাহার বাস। ছিল সেই রাস্তার নাম পরিবর্তন করিয়া নূতন নাম রাখা হইল—“বিজয় সড়ক।” কর্তৃপক্ষগণ নেপােলিয়নের এই গৌরবে কিছু ভয় পাইলেন। তাহাদের মনে একটু হিংসার ভাবও ছিল, কেননা যেখানেই তাহার যাইতেন সেখানেই লােকেরা আসিয়া ইটালি-বিজেতা নেপােলিয়নকে সম্মান প্রদর্শন করিত, তাহাদিগকে করিত না। সৈন্যদলের প্রত্যেক সৈনিক বলিত, “কৰ্ত্তাদিগকে তাড়াইয়া দিয়া আমাদের ছােট্ট সেনাপতিকে রাজা করিবার দিন আসিয়াছে।” ফ্রান্সের সঙ্গে ইংলণ্ডের তখন খুব ঝগড়া। ইংলণ্ডকে জব্দ করিবার একটা উপায় নেপােলিয়ন অনেক দিন হইতেই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। উপায়টি হইল মিশর জয় করিয়া সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করা ; তাহা হইলে ইংলণ্ডের সহিত ভারতবর্ষ ও অনান্য পূৰ্ব্ব-দেশ সমুহের যে বাণিজ্য চলিত তাহার অনিষ্ট করা খুবই সহজ হইবে।

২০ নেপোলিয়ন সুতরাং ফরাসী গভর্ণমেন্ট নেপােলিয়নকে মিশরে পাঠাইলেন। গভর্ণমেন্ট নেপােলিয়নকে তখন ভয়ের চোখে দেখিতেন, সুতরাং তাহাকে তখন কোনাে উপায়ে বিদেশে পাঠাইতে পারিলে তাহারা বাঁচেন। সেই জন্য নেপােলিয়নের মিশর-যাত্রায় কেহ আপত্তি করিল না। নেপােলিয়ন খুব ভাল বাছাই করা কুড়ি হাজার সৈন্য লইলেন এবং খুব ভাল কতক- গুলি কৰ্মচারী লইলেন। নেপােলিয়ন এ সমস্ত কাজ যথাসম্ভব গােপনে করিতেছিলেন, কিন্তু ইংরেজ গভর্ণমেন্ট কি করিয়া যেন সমস্ত খবর পাইলেন। তাই তাহারা ইংলণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ নৌ-সেনাপতি নেসেকে (Nelson) ভূমধ্যসাগরে পাঠাইলেন। মে মাসে ফরাসী রণতরী যখন মিশরের দিকে যাত্রা করিবে, তখন প্রকাণ্ড একটা ঝড় হইয়া গেল। সেই ঝড়ে ইংরেজদের কতকগুলি যুদ্ধ জাহাজের এত ক্ষতি হইল যে, নেস মেরামতের জন্য সেগুলি সার্ডিনিয়া দ্বীপের একটি পােতাশ্রয়ে পাঠাইতে বাধ্য হইলেন। নেপােলিয়ন দেখিলেন মিশরের পথ এইবার পরিষ্কার হইয়াছে, সুতরাং তিনি কিছুমাত্র বিলম্ব না করিয়া যাত্রা করিলেন। নােপােলিয়ন টুল হইতে রওনা হইয়াছেন জানিয়াই নে তাহার সন্ধানে যাত্রা করিলেন এবং সমস্ত ভূমধ্যসাগর আঁতিপাতি করিয়া তাহাকে খুজিলেন, কিন্তু কোথাও নেপােলিয়নের সাক্ষাৎ পাইলেন না। ইতিমধ্যে নেপােলিয়ন মাল্টাদ্বীপ দখল করিয়া সেখানে একদল ফরাসীসৈন্য মােতায়েন করিয়া মিশরের দিকে যাত্রা করিলেন। ৩০শে জুন সন্ধ্যার সময় তিনি আলেজান্দ্রিয়াতে পৌছিলেন। সেখানে তখন এমন ঝড় বহিতেছিল যে পাহাড়ের মত উচু এক একটা ঢেউ গিয়া তীরে লাগিতেছিল। এমন সময়ে নেপােলিয়ন দূরে একটা জাহাজের পাল দেখিতে পাইলেন। তঁাহার মনে হইল, বুঝিবা ইংরাজরণতরী তাহাকে অনুসরণ করিয়াছে। তিনি তাড়াতাড়ি সেই ঝড়ের মধ্যেই সৈন্যদিগকে তীরে অবতরণ করিতে মিশরে হুকুম দিলেন। সেই ঝড়ে অন্ধকারের মধ্যে অনেক সৈন্ত ঢেউয়ে ভাসিয়া গেল। সেই রাত্রেই নেপােলিয়ন আলেঞ্জান্দ্রিয়া আক্রমণ করিলেন। নগরের অধিবাসিগণ নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাইতেছিল, বন্দুকের শব্দে তাহারা জাগিয়া উঠিল। জাগিয়া উঠিয়া নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে তাহারা খুব যুদ্ধ করিল, কিন্তু যুদ্ধে তাহারা হারিয়া গেল। নেপােলিয়ন নগরের উপর বিজয় পতাকা উড়াইয়া দিলেন। জুলাই মাসে নেপােলিয়ন আলেঞ্জান্দ্রিয়া হইতে কাইরে। রওনা হইলেন। কাইরে মিশরের রাজধানী, আলেজান্দ্রিয়া হইতে অনেক দূরে এবং সেখানে যাওয়ার পথ অত্যন্ত খারাপ। জন প্রাণীহীন, অনুৰ্বর মাঠের মধ্য দিয়া, বালু-ধূ-ধূ-করা মরুভূমির মধ্য দিয়া কাইরাে নগরে যাইতে হয়। নেপােলিয়নের সৈন্যেরা অনেকেই এখানে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল ; ইটালিতে তাহারা অনেক দুঃখকষ্ট সহ করিতে পারিয়াছে, কারণ সেখানে যেখানেই গিয়াছে সেখানেই প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পাইয়াছে, কিন্তু এখন চারিদিকে কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্ন দেখা যায় না, ক্ষুধার সময় খাদ্য পাওয়া যায় না, পিপাসার সময় জল পাওয়া যায় না। তাহারা দিনের পর দিন মরুভূমির মধ্য দিয়া চলিতে লাগিল, তাহাদের পা ফোস্কা পড়িয়া গেল, পিপাসায় গলা শুকাইয়া গেল, ক্ষুধার যন্ত্রণা দুঃসহ হইয়া উঠিল। মরুভূমির বালু দুপুর বেলা আগুণের মত গরম হইয়া উঠে, রাত্রে মশা মাছির কামড়ে সৈন্যেরা অস্থির হইয়া উঠে। এত কষ্ট সৈন্য ও কর্মচারীরা কেহই সহ্য করিতে পারিল প্রচণ্ড গ্রীষ্মে তাহারা শরীরের জামা খুলিয়া কেবল হাঁপাইতে লাগিল। কিন্তু নেপােলিয়ন একেবারে অচল, অটল; শত গরমের মধ্যেও তাহার কোটের বােতাম গলা পর্যন্ত আঁটা। তার শীত নাই, গ্রীষ্ম নাই, ক্ষুধা নাই, তৃষ্ণা নাই, ক্লান্তি নাই, মুখে একটি কথা পৰ্যন্ত নাই। ; ;

२२ নেপােলিয়ন অনেক সৈন্য পথে মরিয়া পড়িতে লাগিল। একেক দল আরব সৈন্য হঠাৎ একেক দিক হইতে আসিয়া কতগুলি সৈন্য বধ করিয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। সকলেই মহা ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিল। এই পথ যে কোনো দিন ফুরাইবে তাহা কাহারও মনে হইল না। কাইরো নামে কোনাে সহর আছে কি না, সে বিষয়েও অনেকের সন্দেহ জন্মিল। নেপােলিয়নের প্রতি এ পর্যন্ত কেহ বিশ্বাস হারায় নাই, এইবার তাহার প্রতি অনেকের অবিশ্বাসের ভাব আসিল। প্রায় পনর দিন পর মরুভূমির পরপারে কতগুলি খুব উঁচু মাঠের মত কি যেন অস্পষ্টভাবে দেখা গেল। সকলে বুঝিতে পারিল ঐগুলি “পিরামিড”। ঐখানে মিশরের সৈন্য “মেমেলিউক”গণ দাঁড়াইয়া ছিল। মিশরের সৈন্যদিগকে “মেমেলিউক” বলা হইত। তাহার শুনিয়াছিল যে নেপােলিয়ন তাহাদিগকে আক্রমণ করিতে আসিতেছেন, তাই পূৰ্ব্ব হইতেই তাহারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল। নেপােলিয়ন দূরবীক্ষণ দিয়া দেখিলেন, মেমেলিউকদের কতগুলি কামান আছে, কিন্তু কামানের নীচে চাকা নাই, সুতরাং সেগুলি ইচ্ছামত সকল দিকে ঘুরান যায় না। নেপােলিয়ন তাহার সৈন্যগণকে এমনভাবে সাজাইলেন যে শত্রুদের কামান হইতে সেদিকে গুলি চালান যায় না; কাজেই মেমে- লিউকগণ যুদ্ধে জয়লাভ করিতে পারিল না। তবু তাহারা খুব যুদ্ধ করিয়াছিল। যখন তাহাদের বন্দুক দিয়া গুলি করিবার শক্তি রহিল , তখন তাহার বন্দুকের বাঁট দিয়া ফরাসীদের মাথায় ও মুখে প্রহার করিতে লাগিল। এমন কি যাহারা হাঁটিতে পারে না, তাহারা খোড়াইতে খোঁড়াইতে গিয়া যাহাকে পাইল তাহার বুকেই ছুরী বসাইয়া দিতে লাগিল। ফরাসীরাও তাহাদের পিছনে পিছনে ছুটিয়া তাহাদিগকে বধ করিতে লাগিল। ফরাসীদের ভয়ে অনেকে নীল নদীর জলে ঝাঁপা- ইয়া ঋড়িয়াছিল। যাহা পলাইয়া গেল তাহারা নেপােলিয়নের বীরত্ব মিশরে , কাহিনী দেশময় প্রচার করিতে লাগিল। নেপােলিয়নকে তাহারা “সুলতান কেবির” অর্থাৎ অগ্নিরাজ উপাধি প্রদান করিয়াছিল। পিরামিডের যুদ্ধের চার দিন পর নেপােলিয়ন কাইরােতে প্রবেশ করিলেন। কাইরােতে কয়েক মাস তিনি রীতিমত রাজত্ব করিয়া- ছিলেন, কিন্তু তাঁহার সে রাজত্ব বেশী দিন টিকিল না। নেসা তাহাকে খুঁজিতে খুঁজিতে অবশেষে মিশরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নীলনদের মুখে ফরাসী রণতরীর সঙ্গে ইংরেজ রণতরীর যুদ্ধ হইল, সেই যুদ্ধে নে জয়লাভ করলেন। এই সংবাদ যখন কাইরােতে নেপােলিয়নের নিকট পৌছিল তখন তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইলেন । এই যুদ্ধের ফলে তুর্কিদের ভয় চলিয়া গেল। নেপােলিয়ন শুনিলেন, তাহাদের সৈন্যের নাকি সিরিয়াতে আসিতেছে। তিনি সিরিয়ার দিকে যাত্রা করিলেন; আবার সেই দুর্গম পথ, সেই কষ্ট, সেই অসুবিধা ভােগ করিয়া তাহার সৈন্যদল যুদ্ধযাত্রা করিল। পথে ঘােট ছােট অনেক যুদ্ধ করিয়া, দুই চারিটা সহর দখল করিয়া, অবশেষে তাহারা একার নগরে পৌছিলেন। একারের রাজা ছিলেন তখন জেসার পাশা; তিনি এমন নিষ্ঠুর ছিলেন যে লােকে তাঁহাকে “চামার” বলিত। নেপােলিয়ন সন্ধি করিবার জন্য তাহার নিকট একজন দূত পাঠাইলেন দূত জেসার পাশার সম্মুখে যাওয়া মাত্র তিনি তাহার মাথা কাটিয়া ফেলিলেন এবং তাহার মৃতদেহ একটা ছালয় ভরিয়া সমুদ্রের মধ্যে ফেলিয়া দিলেন। কাজেই নেপােলিয়নকে একার অবরােধ করিতে হইল। একারের তুর্কিগণকে স্যার সিনী স্মিথ (Sir Sidney Smith) নামক একজন ইংরেজ কানে খুব সাহায্য করিয়াছিলেন। ফরাসীদের যুদ্ধজাহাজগুলি তিনি পথেই আটক করিয়া রাখিয়াছিলেন। সেই সমস্ত জাহাজে নেপােলিয়নের বড় বড় কামান ছিল, সেগুলি না পাওয়াতে নেপােলিয়ন একারের দেয়ালগুলি ভাজিতে পারিলেন না।

নেপােলিয়ন একিকে সিনী স্মিথ জাহাজে বসিয়া ফরাসী সৈন্যদের উপর গুলি চালাইতে লাগিলেন। স্মিথের সাহায্য না পাইলে তুর্কিগণ নেপােলিয়নের কিছুই করিতে পারি না। এদিকে ফরাসীসৈন্যদের মধ্যে প্লেগ আসিয়া দেখা দিল, সুতরাং নেপােলিয়নকে সদলবলে সেখান হইতে প্রস্থান করিতে হইল। নেপাে- লিয়ন বলিয়াছেন, “যদি একারের পতন হইত তাহা হইলে পৃথিবীর ভাগ্য পরিবর্তন করিয়া দিতে পারিতাম।” মে মাসের এক অন্ধকার রাত্রে ফরাসী সেনা একারের অবরােধ তুলিয়া দিয়া চলিয়া গেল। তাহাদের এই প্রত্যাবর্তনের কথা শুনিলে শরীর শিহরিয়া উঠে। যাহারা যুদ্ধে আহত হইয়াছিল, অথবা ব্যারামে ভুগিতেছিল তাহাদের চলিবার ক্ষমতা ছিল না, সুতরাং নিজেরাই তাহাদিগকে ঘাড়ে করিয়া লইয়া যাইতেছিল। অনেক সময় তারা এত ক্লান্ত হইয়া পড়িত যে রােগীকে আর বহন করিয়া লইয়া যাইতে পারিত না, সুতরাং তাহারা পথের ধারে পড়িয়া মরিত অথবা তুর্কিদের হাতে বন্দী হইত । পিপাসায় কাতর হইয়া তাহারা কত সময় মরিচীকার পিছনে ঘুরিয়া মরিয়াছে তাহার ইয়ত্ত নাই। অনেক সময় তাহার জল পাইয়াছে বটে, কিন্তু তাহা এত বিশ্রী যে তাহা পাওয়া না পাওয়া সমান। ইহার উপর আবার আরব ও তুর্কিগণ আসিয়া তাহাদিগকে হঠাৎ আক্রমণ করিতে লাগিল। যাহা’হােক’ সকলে আসিয়া অবশেষে আবার কাইরােতে পৌছিল এবং নেপােলিয়ন এখানে কিছুদিন অবস্থান করিলেন। আবৃকীর উপসাগরে তুর্কিদের সঙ্গে তাহার আবার যুদ্ধ হইল; এই যুদ্ধে তিনি তুর্কিগণকে রাজিত করিয়া একারে পরাজিত হওয়ার শােধ তুলিলেন। এতদিন তিনি দেশের কোনাে খবরই রাখিতে পারেন নাই, বহুদিন পর কতগুলি পুরাতন পত্রিকা পড়িয়া জানিতে পারিলেন যে সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ইটালি আবার স্বাধীন হইয়াছে ;

সাল তিনি যে সব দেশ জয় করিয়াছিলেন, সেগুলি ছুটিয়া গিয়াছে। নেপােলি- মন বলিলেন, “মূর্খেরা ইটালি ত হারাইয়াছে বটেই, আমার সকল দেশ- জয়ের চিহ্ন পৰ্যন্ত মুছিয়া ফেলিয়াছে। আমাকে এখন মিশর ত্যাগ না করিলে চলিতেছে না। কিন্তু তাঁহার সমস্ত সৈন্য লইয়া দেশে ফিরিবার মত এত জাহাজ সেখানে ছিল না, তাই নেপােলিয়ন ঠিক করিলেন, তিনি কেবল মাত্র ৫০০ সৈন্য লইয়া স্বদেশ যাত্রা করিবেন। তাহার সৈন্যেরা ইহা শুনিলে মনে করিবে যে বুঝিব। তিনি তাহাদিগকে ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতেছেন, তাই একথা কাহাকেও জানিতে দিলেন না। সমস্ত সৈন্য- গণকে একজন সেনাপতির হাতে রাখিয়া তিনি ও পাঁচশত সৈন্য এ অন্ধকার রাত্রে দুই খানি জাহাজে উঠিয়া ফ্রান্সে ফিরিয়া চলিলেন। চতুর্থ পরিচ্ছেদ •• কাল নেপােলিয়ন ফ্রান্সে ফিরিয়া গেলে সকলে তাহাকে খুব আহলাদের সহিত গ্রহণ করিল। যখন তিনি প্যারিসে প্রবেশ করিলেন তখন নগরে একটা হুলস্থুল কাণ্ড আরম্ভ হইল। বাড়ীতে বাড়ীতে আলো জ্বলিয়া উঠিল, শত সহস্র বন্দুক কামান গৰ্জন করিয়া উঠিল ; থিয়েটারে কিছুকালের জন্য অভিনয় বন্ধ হইয়া গেল, সঙ্গীতালয়ে গান থামিয়া গেল, ম্যানেজার দর্শক ও শ্রোতাগণের নিকট নেপােলিয়নের আগমন-বার্তা ঘােষণা করিলেন। নগরের পথে পথে সহস্র কণ্ঠ একসঙ্গে হুঙ্কার করিয়া উঠিল “নেপােলিয়ন কি জয়। দেশে তখন সুশাসন ছিল না, প্রজাগণ ভাল শাসনের জন্য নেপােলিয়ন লালায়িত হইয়াছিল। নেপােলিয়ন স্থির করিলেন, দেশকে এই অরা- জকতা ও বিশৃঙ্খলা হইতে বাঁচাইতে হইবে। তিনি যে এ কাজের সম্পূর্ণ উপযুক্ত তাই তিনি খুব ভাল করিয়াই জানিতেন। নিজের শক্তির উপর নেপােলিয়নের প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল। ফরাসী জাতিকে শাসন করিবার ক্ষমতা যে তাহার আছে, এ সম্বন্ধে তাহার মনে কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু যাহাদের স্বার্থে আঘাত লাগিল তাহারা নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে দাড়াইল। অনেক গােলমালের পর নেপােলিয়নের জয় হইল এবং তিনি “ক” হইলেন। 'কন্সাল কাহাকে বলে তাহা বােধ হয় অনেকেরই জানা নাই। যে দেশে রাজা থাকে না সেই দেশের শাসনভার কয়েক জন লােকের মধ্যে ভাগাভাগি করিয়া লওয়া হয়, তাহাদিগকে ‘কন্সাল বলে। এক এক জন কন্সালের উপর এক এক প্রকার কাজের ভার থাকে। নেপােলিয়নের সময় তাহার সঙ্গে আরও দুইজন ‘ক’ নিযুক্ত হইয়াছিল, কিন্তু তাহারা শুধু নামে মাত্রই কন্সা’-নেপােলিয়ন একাই সমস্ত দেশ শাসন করিতেন। ফ্রান্স আট বৎসর যাবৎ ঘাের অশান্তিতে ছিল, আট বৎসর পর নেপােলিয়নের হাতে কিছুদিনের জন্য শান্তিলাভ করিল। ফরাসীর চারি সীমান্তে তথন ও যুদ্ধ চলিতেছিল। ব্রিটেন্ ও অষ্টিয়াই ছিল তাঁহার প্রধান শত্রু। নেপােলিয়ন ঠিক করিলেন, তিনি অষ্টিয়াকে এমন ভাবে ধ্বংস করিয়া ফেলিবেন যে সমস্ত ইওরােপ বােনা- পাটির নামে কঁপিয়া উঠিবে। নেপােলিয়ন সঙ্কল্প করিলেন যে তিনি এমন সব কৰ্ম্ম সম্পন্ন করিবেন, যাহা দেখিয়া সমস্ত জগৎ বিস্ময়ে অবাক হইয়া যাইবে, জগতের সকল জাতি স্তম্ভিত হইয়া যাইবে। ইটালিতে তাহার সেনাপতি মাসেন’ তখন পর্যন্ত বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালাইতেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জেনােয়াতে ছিলেন, তখন এক কল २१ দিকে ইংরেজ রণতরী ও অন্যদিকে অষ্ট্রিয়ান্ সৈন্য তাহাকে ঘিরিয়া ধরিল। এই ভাবে অবরুদ্ধ হইয়া খাদ্যাভাবে সকলে মরিতে বসিল। অষ্টিয়া মনে করিল, তাহাদের যুদ্ধে জয়লাভ করিতে আর বেশী বিলম্ব নাই, তাহারা শীঘ্রই প্যারিসে বসিয়া খানা খাইতে পারিবে। এদিকে ইটালিতে যুদ্ধযাত্রা করিবার জন্য নেপােলিয়ন তিন মাস যাব সৈন্যসংগ্রহ করিতেছিলেন। কিছু কিছু সৈন্য তিনি ক্রমে ক্রমে সুইজারল্যাণ্ডের দিকে পাঠাইয়াও দিয়াছিলেন। স্থলপথে ইটালিতে যাইতে হইলে আল্পস পর্বত পার হইয়া যাইতে হয়, কিন্তু আল্পস পার হওয়া সহজ কথা নয়। ইওরােপের মধ্যে উহা সৰ্ব্বাপেক্ষা বড় পৰ্বত ; হিমালয় হইতে ছােট হইলেও উহা হিমালয় অপেক্ষা বেশী ঠাণ্ডা ও ভয়ানক। উহার ভিতরে পথ-ঘাট খুব কম, যাহা আছে তাহাও অত্যন্ত খাড়া। সেই সকল পার্বত্য পথ পরীক্ষা করিয়া দেখিবার জন্য নেপাে- লিয়ন দুইজন এঞ্জিনিয়ারকে সেখানে পাঠাইয়া দিলেন। পরীক্ষা হইয়া গেলে নেপােলিয়ন একজন এঞ্জিনিয়ারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “পার হওয়া সম্ভব হবে ?” এঞ্জিনিয়ার বলিলেন, “সম্ভাবনা বড় কম। নেপােলিয়ন বলিলেন, “বহুৎ আচ্ছা, একবার চেষ্টা করে দেখা যাক্।” এই বলিয়া তিনি আল্পস্ আরােহণ করিতে আরম্ভ করিলেন। সে যে কি ভীষণ কাণ্ড তাহা ধারণা করাও কঠিন ইংলণ্ড ও অষ্টিয়ার লােক নেপােলিয়নের এই সঙ্কল্পের কথা শুনিয়া বিদ্রুপের হাসি হাসিয়াছিল ; সকলেই মনে করিয়াছিল ইহা অসম্ভব, কিন্তু নেপােলিয়নের অভিধানে অসম্ভব বলিয়া কোনাে শব্দ ছিল না। কঁাধে গাটুরী ঝুলাইয়া হাতে বন্দুক লইয়া সৈন্যগণ পৰ্বত আরােহণ করিতে লাগিল। পথ অত্যন্ত দুর্গম, স্থানে স্থানে পথের রেখা পৰ্য্যন্ত নাই ; সে পথে গাড়ী চলে না, কামানের চাকা চলে না। নেপােলিয়ন কামানগুলি চাকা হইতে খুলিয়া ফেলিলেন; খুব বড় বড় গাছ কাটিয়া ভিতরটা কুঁদিয়া ;

২ নেপােলিয়ন তাহার মধ্যে কামানগুলি ভরিলেন, সৈন্যেরা সেইগুলি বরফের উপর দিয়া টানিয়া লইয়া গেল। গাড়ীর চাকাগুলি খুলিয়া সৈন্যেরা তাহা কাধে করিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। সৈন্যদের রসদের বােঝা গাধায় পিঠে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছিল, কারণ সেখানকার গাধাগুলি বেশ পাহাড়ে চড়িতে পারিত। কিন্তু অশ্বারােহী সৈন্যগণ ঘােড়ার পিঠে উঠিয়া চলিতে পারিতেছিল না, তাই তাহারা মাটিতে নামিয়া ঘােড়াগুলিকে টানিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। এইভাবে সকলে পাঁচদিন চলিল। মানুষ, ঘােড়া ও গাধার অবিশ্রান্ত স্রোত আল্পসের সেই তুষার রাশির মধ্য- দিয়া নীরবে চলিতে লাগিল,-থাকিয়া থাকিয়া শুধু অশ্বখুরের শব্দ, অস্ত্রের শব্দ এবং রণ-ভেরীর শব্দ শুনা যাইতেছিল। উঠিয়া পড়িয়া, গড়াইয়া হাঁপাইয়া অবশেষে তাহারা আল্পসের চূড়াতে গিয়া পৌছিল । এইখানে প্রায় হাজার বৎসর পূর্বে সেন্টবাণার্জ নামক একজন সাধু একটি মঠ স্থাপন করিয়াছিলেন, বর্তমানে সেখানে অনেক সন্ন্যাসী থাকেন। যাহারা পৰ্বতে আরােহণ করিতে গিয়া বিপদে পড়ে, তাহা- দিগকে সাহায্য করা ইহাদের কাজ। ইহাদের নিকট এমন সুন্দর সুন্দর কুকুর থাকে যে সেই কুকুরগুলি পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরিয়া বেড়ায় ও বিপদগ্রস্ত লােককে মঠে লইয়া আসে; পথিক যদি অজ্ঞান হইয়া কিম্বা মরিয়া পড়িয়া থাকে, তাহা হইলে ঐ সমস্ত কুকুর তাহাকে পিঠে বহন করিয়া লইয়া আসে। সৈন্যেরা সেইখানে পৌছিলে মঠের সন্ন্যাসীরা তাহাদিগকে খাদ্য ও পানীয় আনিয়া দিল। নেপােলিয়ন আগেই সে সব বন্দোবস্ত করিয়া রাখিছিলেন। সৈন্যদের খাদ্য, পানীয় ও কাপড়চোপড় প্রচুর পরিমাণে ছিল। ৪০,০০০ সৈন্যের জন্য এমন বন্দোবস্ত করা সহজ কথা নয়, পাহাড়ের দুইদিকে দুইটি হাসপাতাল খােলা হইয়াছিল ; অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য জিনিস মেরামত করিবার জন্য একদল কারিগর নেপােলিয়ন কন্সাল আগেই পাঠাইয়া দিয়াছিলেন, তাহারা আল্পস শৃঙ্গের অপর পার্শ্বে দোকান খুলিয়া বসিয়াছিল। সৈন্যদের বন্দুক, কামান, গাড়ী প্রভৃতি যাহা কিছু নষ্ট হইয়াছিল, তাহারা সব মেরামত করিয়া দিল। নেপােলিয়ন সকলের পিছনে ছিলেন। সমস্ত সৈন্যগণকে রওনা করিয়া দিয়া সকলের শেষে তিনি পর্বতারােহণ আরম্ভ করিলেন। একটি গাধার পিঠে গম্ভীর মূর্তিতে তিনি বসিয়াছিলেন আর একজন চাষা তাহাকে পথ দেখাইয়া লইয়া চলিয়াছিল। সে যে নেপােলিয়নের ‘গাইড় হইয়া চলিয়াছে একথা বেচারী জানিত না। পথে যাইতে যাইতে সে তাহার মনের সকল কথা নেপােলিয়নকে বলিয়া ফেলিয়াছিল। সে একটি মেয়েকে বিবাহ করিবে সঙ্কল্প করিয়াছিল, কিন্তু বেচারী এত গরীব যে ইচ্ছাকে সে কার্যে পরিণত করিতে পারিতেছিল না। নেপাে- লিয়ন তাহাকে বিদায় দিবার সময় এক টুকরা কাগজে একটা পেন্সিল দিয়া দুই লাইন লিখিয়া উহার হাতে দিলেন, সে সেই কাগজখানি একজন রাজ-কর্মচারীকে নিয়া দেখাইল এবং তাহার ফলে প্রচুর ধনসম্পত্তি পাইল। পৰ্বত হইতে নামিলে পর তাহাদের আর এক বিপদ উপস্থিত হইল । পথে অষ্টিয়াদের একটি দুর্গ পড়িল, সেই দুর্গটি ছােট হইলেও তাহ পার হইয়া যাওয়া অত্যন্ত কঠিন, কারণ উহার কাছে যে পথটি ছিল তাহ এত সঙ্কীর্ণ যে, এক সঙ্গে বেশী সৈন্য গিয়া তাহা আক্রমণ করিতে পারিত না। ফরাসীরা অনেক যুদ্ধ করিল, কিন্তু কিছুতেই দুর্গ দখল করিতে পারিল না। দুর্গটি পাহাড়ের উপর এমনভাবে অবস্থিত ছিল যে, কেবলমাত্র ৪০০ অষ্টিয়া সৈন্যই তাহা রক্ষা করিতে সমর্থ হইল। নেপােলিয়ন দেখিলেন এখানে বেশী সৈন্য ক্ষয় করিয়া লাভ নাই, সুতরাং কি উপায়ে ফাঁকি দিয়া এখান হইতে পলায়ন করা যায়, তিনি তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। অবশেষে দেখা গেল, দুর্গের পাশ দিয়া একটি নেপােলিয়ন ; গাে-বাট চলিয়াছে, দুর্গ হইতে গুলি করিলে সেখান পর্যন্ত গিয়া পৌছে না। নেপােলিয়ন সৈন্যদিগকে সেই পথে একজন একজন করিয়া পাঠাইয়া দিলেন, কিন্তু পথটি এত ছােট যে সেখান দিয়া কামান, গােলা- গুলি ও অন্যান্য অস্ত্র-শস্ত্র লইয়া যাওয়া যায় না। তাই রাত্রে তিনি কতকগুলি সৈন্য গ্রামে পাঠাইয়া দিলেন, তাহারা গ্রামের সমস্ত পথে খড় বিছাইয়া দিল, একদিকে অন্যান্য সৈনােরা কামান, বন্দুক, তলােয়ার প্রভৃতি অস্ত্রগুলিকেও খড় দিয়া মুড়িল, কাজেই অষ্টিয়া। যখন নিশ্চিন্ত মনে নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে নেপােলিয়ন তখন নিঃশব্দে গ্রাম পার হইয়া গেলেন; পথে চাকার ঘর্ঘর শব্দ হইল না, অন্ত্রে অস্ত্রে ঠোকাঠুকি হইয়া টুং টাং শব্দ ও হইল না। অষ্টিয়া সেনাপতি পরদিন ঘুম হইতে উঠিয়া চোখ রগড়াইতে রগড়াইতে দেখিলেন—নেপােলিয়ন চলিয়া গিয়াছে। ইহার পর নেপােলিয়নের সৈন্যদল নদীর স্রোতের মত ইটালিতে গিয়া পড়িল। জেনােয়র মাসে শুনিলেন, তাঁহাকে সাহায্য করিবার জন্য সৈন্য আসিতেছে। সকলে আবার আশায় বুক বাঁধিল, কিন্তু দিনের পর দিন যাইতে লাগিল তথাপি কেহ সাহায্য করিতে আসিল । অবশেষে এমন অবস্থা হইল যে ঘাস ও পায়ের জুতা ছাড়া তাহাদের অন্য কোন প্রকার খাদ্য রহিল না। মাসেন। বাধ্য হইয়া আত্মসমর্পণ করিলেন। ইংরেজ সেনাপতি কেইথ বলিলেন “আপনি এমন বীরের মত যুদ্ধ করিয়াছেন যে আপনাকে বন্দী করা কাপুরুষতা।” তাই মাসেন ও তাঁহার সৈন্যগণকে তিনি সসম্মানে ছাড়িয়া দিলেন। নেপােলিয়ন এদিকে জেনােয়ার আশা ছাড়িয়া দিয়া খুব বড় রকম একটা যুদ্ধের আয়ােজন করিলেন, সেই যুদ্ধ হইল ম্যারেঙ্গোতে, অষ্টিয়ান্ সৈন্যদের সঙ্গে। ১৪ই জুন সমস্ত দিন ধরিয়া যুদ্ধ হইল। অষ্টিয়ারা সংখ্যায় ফরাসীদের দ্বিগুণ ছিল, সুতরাং নেপােলিয়ন সহজে তাহাদের সঙ্গে পারিয়া উঠিলেন না। ফরাসীরা দুইবার হটিয়া সাল গেল। বেলা ৩টার সময় অষ্টিয়ার বৃদ্ধ সেনাপতি মেলা মনে করিলেন, যুদ্ধে তাহার জয় হইয়াছে, তাই তিনি যুদ্ধক্ষেত্র হইতে চলিয়া গেলেন। ইহার অল্পকাল পরেই নেপােলিয়নের প্রিয় সেনাপতি ‘দেশাই’ ( Desaix) তাহার সৈন্যদল লইয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। ফরাসীদের দুরবস্থা দেখিয়া নেপােলিয়নকে বলিলেন, “যুদ্ধে আমাদের পরাজয় হয়েছে দেখতে পাচ্ছি।” নেপােলিয়ন তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন “যুদ্ধে আমাদের জয় হয়েছে।” তাহার আদেশমত ফরাসী সৈন্য সেই মুহূর্তে অষ্টিয়া সৈন্যকে সম্মুখ ও পশ্চাৎ হইতে ভীষণভাবে আক্রমণ করিল, অষ্ট্রিয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিল, নেপােলিয়ন জয়ী হইলেন। কিন্তু এই যুদ্ধে ‘দেশাই’র মৃত্যু হইল। দেশাইর মৃত্যুসংবাদ শুনিয়া নেপােলিয়ন পাগলের মত হইয়া গিয়াছিলেন। তাহাকে বলিতে শুনা গিয়াছিল, “উ, আমার চোখে জল আসে না কেন? এ যে বড় বেশী মূল্য দিয়ে এই জয় লাভ হ’ল।” এই যুদ্ধে অষ্টিয়ার এত ক্ষতি হইয়াছিল যে, ইহার পর দিনই তাহারা নেপােলিয়নের সঙ্গে সন্ধি করিয়া ফেলিল, সেই সন্ধি অনুসারে নেপােলিয়ন সমস্ত উত্তর-ইটালি দখল করিলেন । সমস্ত জগতকে এই ভাবে স্তম্ভিত করিয়া নেপােলিয়ন দুই মাসের মধ্যে আবার প্যারিসে ফিরিয়া আসিলেন। তাহার যশ চারিদিক ছড়াইয়া পড়িল । প্যারিসের পথ লােকে লােকারণ্য হইয়া গেল ; প্যারিসের বাড়ীতে বাড়ীতে তাহার সম্মানার্থে প্রতি রাত্রে দীপালি হইতে লাগিল। নেপােলিয়নকে এক বার দেখিবার জন্য তাহার প্রাসাদের চারিদিকে অসংখ্য লােক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়া দাড়াইয়া থাকিত। নেপােলিয়ন বলিলেন “এ রকম আর ২৪টা যুদ্ধ জিতিতে পারিলেই আমার নাম অমর হইয়া থাকিবে।”

৩২ নেপােলিয়ন পঞ্চম পরিচ্ছেদ সম্রাট সমস্ত ইওরােপের সঙ্গে ফ্রান্সের সন্ধি হইয়া গেল, কয়েক বৎসর পৰ্য্যন্ত নেপােলিয়ন শান্তিতে রাজত্ব করিলেন তিনি খুব ভাল শাসনকর্তা ছিলেন এবং এই কয় বৎসর ধরিয়া তিনি দেশের হিতকর অনেক কাজ করিয়াছিলেন। এই সময়টাই তাহার জীবনের খুব ভাল সময়, ইহার পর আর এতটা সুখসমৃদ্ধি তাহার ভাগ্যে ঘটে নাই। নেপােলিয়ন প্রথমতঃ দশ বৎসরের জন্য কল্ হইয়াছিলেন, তারপর তাহাকে যাবজ্জীবনের জন্য কন্সাল করিয়া দেওয়া হইল। ১৮০৪ খৃষ্টাব্দের ১৮ই মে নেপােলিয়নকে ফরাসীর সম্রাট বলিয়া ঘােষণা করা হইল। সেই “নিট কর্পোরাল” { Little Corporal) আমাদের সেই “ছােট্ট সৈনিক”—যে একদিন প্যারিসের পথে পথে ভিক্ষুকের মত ঘুরিয়া বেড়াইয়াছে--আজ সে সমগ্র দেশের হর্তা-কৰ্ত্তা-বিধাতা—তাহার মত বীর ও শক্তিশালী আজ সমস্ত ফরাসীর মধ্যে আর কে ? সম্রাটু উপাধি লওয়ার সময় তাহার অভিষেক ক্রিয়াটী সম্পন্ন হয় নাই, তাহা বাকী ছিল, এখন তাহারই আয়ােজন হইতে লাগিল। নেপােলিয়ন মনে করলেন যে, রােমের “পােপ” আসিয়া যদি তাঁহার অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া যান তাহা হইলেই ভাল হয়। “পােপ” তখনকার দিনে সমস্ত খৃষ্টানদের ধর্মরাজ ছিলেন ; তিনি রােমে থাকিতেন এবং সমস্ত খৃষ্টানদের উপর কর্তৃত্ব করিতেন। ইও- রোপের সমস্ত রাজারাও তাহাকে মানিয়া চলিত। ধৰ্ম্মজগতে তাহার উপরে অন্য কোন কর্তা ছিল না। সুতরাং নেপােলিয়ন মনে করিলেন যে পাপ” আসিয়া যদি তাঁহাকে সম্রাট পদে বরণ করিয়া যান, তাহা সম্রাট হইলে তাঁহার সম্রাট উপাধি গ্রহণ করার বিরুদ্ধে কেহ কিছু বলিবে না। সেই অনুসারে নেপােলিয়ন পােপকে ডাকিয়া আনার জন্য রােমে একজন বন্ধুকে পাঠাইয়া দিলেন। পােপ সপ্তম পায়াসের (Pope Pius vii) ইচ্ছা ছিল না যে নেপােলিয়ন ফ্রান্সের সম্রাট উপাধি গ্রহণ করেন, কিন্তু তিনি দেখিলেন যে ইওরােপের সমস্ত রাজারাই নেপােলিয়নকে ফরাসী সম্রাট বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন, সুতরাং তিনি আপত্তি না করিয়া প্যারিসে রওনা হইয়া গেলেন। ২রা ডিসেম্বর নেপােলিয়নের অভিষেক হইয়া গেল। সেদিন বড় ঠাণ্ডা পড়িয়াছিল, শীতে ও বরফে প্যারিস নগর আড়ষ্ট হইয়া গিয়াছিল ; তবু সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী যখন গাড়ী হাঁকাইয়া “নটারডে গির্জায় গমন করেন, তখন তাহাদিগকে দেখিবার জন্য অসংখ্য লােক ভিড় করিয়া পঁড়াইয়াছিল । গির্জায়ও অনেক লােকের ভিড় হইয়াছিল। বহুমূল্য পােষাক ও অলঙ্কার পর অনেক সম্ভ্রান্ত মহিলারাও সেখানে আসিয়াছিলেন। সম্রাট সম্রাজ্ঞী গির্জায় পৌছিলে সকলে চীৎকার করিয়া উঠিল— “সম্রাটের জয় হােক।” সেই মুহূর্তে গির্জার অর্গান বাজিয়া উঠিল, গায়কদল গান ধরিল, লােকজন ব্যগ্রভাবে সমস্ত ব্যাপার দেখিতে অবশেষে পােপ যখন নেপােলিয়নের মাথায় মুকুট পরাইতে গেলেন তখন তিনি হঠাৎ পােপের হাত হইতে মুকুটটা লইয়া নিজেই নিজের মাথায় পরিলেন এবং কিছুক্ষণ পর মাথা হইতে উহা লইয়া রাণীর মাথায় পরাইয়া দিলেন এবং রাণীর মাথা হইতে মুকুটটা একটা আসনের উপরে রাখিলেন। সকলেই কিছু অবাক হইল। এই ঘটনার কয়েক মাস পরে নেপােলিয়ন ইটালিতে গেলেন এবং মিলানের গির্জাতে আবার তাহার অভিষেক হইল। এবার তিনি ইটালির রাজা উপাধি গ্রহণ করিলেন। পােপ দেখিলেন, নেপােলিয়নের নিকট বিশেষ কোন লাভের ৩ নেপােলিয়ন আশা নাই সুতরাং এবার আর কোনমতেই অভিষেক-সভায় গমন করিলেন না। নেপােলিয়নের ক্ষমতা এইভাবে দিন দিন বাড়িতেছে দেখিয়া ইওরােপের সকল রাজার ভয় পাইয়া গেলেন। নেপােলিয়ন কবে যে কাহার রাজ্যে গিয়া আক্রমণ করেন তাহার ঠিকানা নাই, সুতরাং তাহাকে জব্দ করিবার জন্য তাহারা সকলে একটা দল পাকাইলেন। সকলেই সেই দলে যােগদান করিলেন, কিন্তু স্পেনের রাজা যােগ দিলেন না। স্পেনের সঙ্গে ব্রিটেনের শত্রুতা ছিল, তাই স্পেন ফরাসীদের পক্ষে চলিয়া গেল। আবার মহাদেশে মহাযুদ্ধ বাধিয়া গেল। রাশিয়ার জার (Czal) খুব বড় একদল সৈন্য অষ্ট্রিয়ায় পাঠাইয়া দিলেন। রাশিয়া ও অষ্টিয়ার সৈন্যেরা মিলিত হইয়া একসঙ্গে ফ্রান্সে গিয়া উঠিবার কথা ছিল, কিন্তু রাশিয়ার সৈন্য অষ্টিয়ান সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হইবার পূর্বেই অষ্টিয়া যুদ্ধ আরম্ভ করিয়া দিয়াছিল। নেপােলিয়নও এমন ফন্দী আঁটিলেন, যাহাতে শত্রুপক্ষীয়েরা তাহাকে ফরাসী দেশে আসিয়া আক্রমণ করিতে না পারে। তাই তিনি শত্রুকে আক্ৰমণ করিবার জন্য জার্মানীতে অগ্রসর হইয়া গেলেন এবং অষ্ট্রিয়ান- দিগকে “আল” নগরে অবরােধ করিলেন। অষ্টিয়ার সেনাপতি ম্যাক্ ভীরু ছিলেন না বটে, কিন্তু তিনি একটু বেশ বােকা ছিলেন। তাই যদিও তঁাহার হাতে খাদ্যদ্রব্য ও গােলাগুলি প্রভৃতি কোনাে জিনিসেরই অভাব ছিল না, তবু ছয় দিনের অবরােধেই তিনি আত্মসমর্পণ করিলেন । অষ্টিয়ারা প্রত্যেক যুদ্ধেই হারিতে লাগিল। নেপােলিয়ন অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। অষ্ট্রিয়ার রাজা ফ্রান্‌সিস্ নগর ছাড়িয়া পলাইয়া গেলেন, নেপােলিয়ন রাজপ্রাসাদে রাজার মত বাস করিতে লাগিলেন। কিন্তু এমন সময় খবর আসিল যে ‘ট্রাফে গার এর যুদ্ধে ফরাসী ও স্পেনিস রণবাহিনী ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। ।

সম্রাট ; নেপােলিয়ন দেখিলেন যে, তিনি যেখানে যাইতে পারেন না সেখানেই যুদ্ধে পরাজয় ঘটে। তাই তিনি ক্রুদ্ধ হইয়া বলিয়াছিলেন “সৰ জায়গায়ই ত আর আমি যেতে পারি না। এই পরাজয়-সংবাদে নেপাে- লিয়নের যুদ্ধ করিবার ইচ্ছা আরাে বাড়িয়া গেল ; তিনি ঠিক করিলেন, জলযুদ্ধে যে ক্ষতি হইয়াছে, স্থলযুদ্ধে তাহা পূরণ করিয়া লইবেন। অষ্টিয়া সৈন্যদল ত ইতিপূৰ্বেই ধ্বংস হইয়া গিয়াছে, বাকী আছে শুধু রাশিয়া ; নেপােলিয়ন মনে করিলেন, এবার রাশিয়াকে ভাল রকম শিক্ষা দিতে হইবে। অষ্টালিজে প্রকাণ্ড যুদ্ধ হইল, ইহাকে “তিন সম্রাটের লড়াই” বলা হয়, কারণ এই যুদ্ধে রাশিয়া, ফরাসী ও জাৰ্ম্মেনীর সম্রা উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়া ও জাৰ্ম্মেনীর সম্রাট এক পক্ষে ছিলেন, ফরাসীর সম্রাট নেপােলিয়ন অন্যপক্ষে ছিলেন। সমস্ত দিন দুই পক্ষে ভীষণ যুদ্ধ হইল, এমন যুদ্ধ খুব কমই হইয়া থাকে। উহাতে এত মারামারি কাটাকাটি হইয়াছিল যে ইহাকে যুদ্ধ না বলিয়া কসাইদের লড়াই” বলিলেও চলে। যাহা হােক, সন্ধ্যার পর অষ্টিয়া ও জার্মেনীর সৈন্য পরাজিত হইয়া পলায়ন করিল, ২০,০০০ অষ্টিয়াকে নেপােলিয়ন বন্দী করিলেন। ইহার পর অষ্ট্রিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের সন্ধি হইয়া গেল, রাশিয়া তাহাদের দেশে চলিয়া গেল, নেপােলিয়ন বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হইলেন। কিন্তু এই প্রকাণ্ড রাজ্য তিনি একা ভােগ না করিয়া তাহার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে ভাগ করিয়া দিতে লাগিলেন। তাঁহার ভাই জোসেফকে নেপলসের রাজা করিয়া দিলেন, তাহার আর এক ভাই লুইকে হল্যাণ্ডের রাজা করিয়া দিলেন, নেপােলিয়নের ভগ্নীপতি সেনাপতি মুরাটকে বার্গের শাসনভার অর্পণ করিলেন। নেপােলিয়নের ইচ্ছা ছিল, তাহার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কেউ গরীব না থাকে—বড় বড় নেপােলিয়ন রাজাদের সঙ্গে সম্পর্ক হয় এবং পরিবারের লােকজন যতটা সম্ভব বড় হইয়া উঠে। এই উদ্দেশ্যে তিনি ইউজেনকে ব্যাভিরিয়ার রাজকন্যার সঙ্গে বিবাহ দিয়াছিলেন। তাহার ভাই জেরেকে উটেম্বার্গের রাজকন্যা বিবাহ করাইয়াছিলেন। নিজের গৌরব বাড়াইবার জন্য নেপােলিয়ন চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ প্রাশিয়ায় ইহার পর প্রাশিয়ার সঙ্গে নেপােলিয়নের যুদ্ধ বাধিল । জেনার নিকটে দুই দলে ভীষণ যুদ্ধ হইল। নেপােলিয়নের অধীনে প্রায় ৮৩,০০০ সৈন্য ছিল, প্রাশিয়ার সৈন্য উহার অর্ধেকেরও কম ছিল, সুতরাং প্রাশিয়ার বেজায় রকম হারিয়া গেল। সেই দিন ঠিক সেই সময়েই জেনা হইতে ১৫ মাইল দূরে আরষ্ট্যাটে আরেকটা যুদ্ধ হইতেছিল। যুদ্ধে প্রাশিয়ার রাজা স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে প্রাশিয়াদের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশী ছিল, কিন্তু তথাপি তাহারা হরিয়া গেল, ফরাসী সেনাপতি জয়লাভ করিলেন। একদিনেই প্রাশিয়ার ক্ষমতা চূর্ণ হইয়া গেল। নেপােলিয়ন ক্রমে ক্রমে প্রাশিয়ার সকল দুর্গ দখল করিলেন। নেপােলিয়নের নাম শুনিয়া কেহই আর যুদ্ধে জয়ী হইবার ভরসা রাখিত , অল্পক্ষণ যুদ্ধ করিয়াই পরাজয় স্বীকার করিত। এইজন্য প্রাশিয়ার দুর্গগুলি দখল করিতে নেপােলিয়নের বেশী সময় লাগে নাই, কিছুমাত্র বেগ পাইতেও হয় নাই। নেপােলিয়ন বিজয়ী হইয়া রাজধানী বার্লিনে প্রবেশ করিলেন। প্রাশিয়ার রাজা সন্ধি করিতে চাহিলেন, কিন্তু নেপােলিয়ন এত বেশী বেশী প্রাশিয়ায় দাবী করিয়া বসিলেন যে সন্ধি হইয়া উঠিল না। এদিকে রাশিয়া প্রাশিয়াকে সাহায্য করিতে আসিতেছিল, সুতরাং যুদ্ধ থামিয়াও থামিল না। রাশিয়াদিগকে আক্রমণ করিবার জন্য নেপােলিয়ন পাে-ল্যাণ্ডে গেলেন। পাে-ল্যাণ্ডে যাইতে তাহার অত্যন্ত কষ্ট হইয়াছিল। সেখানে শীত খুব বেশী, ফরাসীদের সঙ্গে যে পােষাক ছিল তাহাতে শীত নিবারণ হইল না। এদিকে ভাল খাবার পাওয়া যায় না, ঘােলাজল পান করিতে হয়, গরু-ভেড়া-শূকরের সঙ্গে এক ঘরে ঘুমাইতে হয়, রাস্তার কাদায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়া যায়। ফরাসীরা ভারি বিরক্ত হইয়া উঠিল ; কেউ কেউ বলিল, “এটা নাকি আবার একটা দেশ !” এমনি অবস্থায় নেপােলিয়ন পাে-ল্যাণ্ডের রাজধানী ওয়ারশতে গিয়া পৌছিলেন এবং সেখানে একমাস কাল বিশ্রাম করিলেন। তার পর যুদ্ধ আরম্ভ হইল ; রাশিয়ারা খুব যুদ্ধ করিল। ফরাসী সৈন্যেরা বলিয়াছিল, “রাশিয়ারা নাকি যাঁড়ের মত লড়িয়াছিল। সেই যুদ্ধে প্রায় ৫০,০০০ লােক মারা গিয়াছিল, কিন্তু এত বড় যুদ্ধের পর কোন্ দল যে ঠিক জিতিল তাহা ঠিক করা কঠিন। রাশিয়া। বলে তাহারা জিতিয়াছে, ফরাসীরা বলে তাহারা জিতিয়াছে। এই যুদ্ধ করিয়া উভয় পক্ষই এত কাহিল হইয়া পড়িল যে শীত- কালে আর কোন যুদ্ধ হইল না। গ্রীষ্মকালে আবার যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ফ্রাইডল্যাণ্ডের নিকট একটা খুব বড় রকমের লড়াই হইয়া সেবাকার মত যুদ্ধ থামিল। ফ্রাইডুল্যাণ্ডের যুদ্ধের দিন নেপােলিয়ন ঘােড়ার পিঠে চড়িয়া সৈন্যদের মধ্যে গিয়া বলিতে লাগিলেন-“আজ বড় শুভদিন, আমরা এই তারিখে ম্যারেঙ্গোর যুদ্ধে জিতিয়াছিলাম।” ম্যারেঙ্গোর নাম শুনিয়া সৈন্যদের রক্ত গরম হইয়া উঠিল, তাহারা ভীষণভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিল। রুষসৈন্যেরা যদিও বেশ যুদ্ধ করিয়াছিল, তথাপি ফরাসীদের নেপােলিয়ন সঙ্গে পারিয়া উঠিল না ; ফরাসীরা রুষদিগকে পিছনে পিছনে তাড়া করিয়া নীসেন্ নদী পার করিয়া দিয়া আসিল। রুষ সম্রাটু দেখিলেন, নেপােলিয়নের সঙ্গে সন্ধি না করিয়া আর উপায় নাই, কাজেই নীসে নদীর তীরে তবু করিয়া তাহার নীচে দুই সম্রাট আসিয়া মিলিত হইলেন। দুই জনে কোলাকুলি করিলেন, হাসি- তামাসা করিলেন, গল্প করিলেন। সন্ধি হইয়া গেলে দুই সম্রাটই টিসিটে গেলেন। টিসিটে খুব নাচ-গান, পান ভােজন ও হাসি-তামাসার ধূম পড়িয়া গেল। নেপােলিয়ন যেমন সহজে যুদ্ধ জয় করিতে পারিতেন, তেমনি সহজে মানুষের মনও জয় করিতে পারিতেন। রুষ-সম্রাট দেখিতে বেশ সুন্দর ছিলেন, তাঁহার বয়সও কম ছিল এবং বিখ্যাত হইবার প্রবল ইচ্ছাও ছিল। এদিকে নেপােলিয়নের বয়স তখন মাত্র ৩৭, অথচ এর মধ্যেই তিনি পৃথিবীতে অদ্বিতীয় বীর ও যোদ্ধা বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছেন, সুতরাং দুইজনে ভাব হইতে বেশী সময় লাগিল না। সপ্তম পরিচ্ছেদ শেরে ও শর্ত গালে ইংরেদিগকে নেপােলিয়ন এ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধেই নরম করিতে পারেন নাই। তিনি দেখিলেন যে ইংরেজকে জব্দ করিতে হইলে তাহা- দের বাণিজ্যের ক্ষতি করা দরকার, কারণ বাণিজ্যের জোরেই তাহারা এত বড় হইয়াছে। তাই ইওরােপের প্রত্যেক দেশকে ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্য করিতে তিনি নিষেধ করিয়া দিলেন, পর্তুগালের রাজাকে বলিয়া পাঠাইলেন যে হয় ইওরোপের অন্যান্য দেশের মত পর্ব গাল স্পেনে ও পর্তুগালে ইংলণ্ডের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করুক, নতুবা প্রকাশ্যভাবে তাহার সঙ্গে যােগদান করুক। পর্তুগালে তখন বাস্তবিক কোনো রাজা ছিল না ; রাণী মেরী পাগল হইয়া গিয়াছিলেন, সুতরাং তার পুত্র প্রতিনিধি হইয়া রাজকাৰ্য চালাইতেছিলেন। পর্তুগালে তখন ইংরেজের পূর্ণ আধিপত্য। পর্তুগালের বন্দরে ইংরেজের যুদ্ধ-জাহাজ থাকিত, ইংলণ্ডের মন্ত্রীর পরামর্শে পর্তুগালের রাজকাৰ্য্য চলিত, সুতরাং পর্তুগালের রাজা ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে যাইতে পারিলেন না। এদিকে নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হওয়া পর্তুগালের সাহসে ও ক্ষমতায় কুলাইল না। সুতরাং যখন শােনা গেল যে নেপােলিয়নের সৈন্যবাহিনী পর্তুগালের দিকে আসিতেছে, তখন মাতাকে লইয়া রাজপুত্ৰ ব্ৰেজিলে পলায়ন করাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করিলেন। ব্রেজিল দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ, উহা পর্তুগীজদের একটি প্রকাণ্ড উপনিবেশ। ব্ৰেজিলের আয়তন ৫টি পৰ্ত্ত গালের সমান। ইংরেজগণ তাহাদিগকে এই পলায়নে সহায়তা করিলেন। ৩৬টি জাহাজে যত লােক ধরে সব তাহাদের সঙ্গে গেল। পলায়নের তাড়াহুড়াতে অনেক পিতামাতা তাহাদের পুত্রকন্যা হারাইয়া ফেলিলেন, অনেক স্ত্রী স্বামী হারাইলেন এবং অনেক স্বামী স্ত্রী হারাইলেন। রাজ প্রাসাদের সমস্ত আস্বাবপত্র এবং রাজকোষের সমস্ত টাকা তাহারা সঙ্গে লইয়া গেলেন। ফরাসী সৈন্য যখন পর্তুগালে পেীছিল তখন সমস্ত জাহাজে চলিছে, সুতরাং তাহারা বিনা যুদ্ধে পৰ্তুগাল দখল করিল। স্পেনের অবস্থা তখন নিতান্ত শােচনীয়। রাজা চতুর্থ চাল বৃদ্ধ ত হইয়াছিলেনই, তার উপর তিনি আবার বােকা ছিলেন। রাণীও লােক ভাল ছিলেন না, তার আবার গডয় নামে একজন বন্ধু জুটিয়াছিল, সে ছিল আরো বেশী খারাপ। ইহারা দুই জনে মিলিয়া দেশ শাসন করিতেছিলেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করিতেছিলেন। রাজার জ্যেষ্ঠ ৪০ . নেপােলিয়ন পুত্র ইহার বিরােধী হইয়া দাড়াইলেন, সুতরাং দেশের মধ্যে দুইটি দল সৃষ্ট হইল। উভয় দলের লােকেরাই ভাবিতেছিল যে তাহারা নেপােলিয়নকে ডাকিয়া আনিয়া বিপক্ষদলের ক্ষমতা চূর্ণ করিয়া দিবে। বৃদ্ধ রাজা ও রাণী ভাবিতেছিলেন যে পৰ্ত্ত গালের রাণীর মত আমেরিকায় পলাইয়া গেলে বেশ হয়; আমেরিকাতে তাহাদেরও কিছু সাম্রাজ্য ছিল। কিন্তু দেশের লােকেরা যখন বুঝিতে পারিল যে দেশের ভিতর খাল কাটিয়া কুমীর আনিবার বন্দোবস্ত হইতেছে, তখন তাহারা ক্ষেপিয়া উঠিল। রাণীর সেই প্রিয় পাত্রটির উপরেই সকলের রাগ ছিল, সুতরাং তাহারা গিয়া তাহার প্রাসাদ আক্রমণ করিল। বেচারা ভয়ে একটা মাদুরের নীচে লুকাইয়া ছিল, সুতরাং কেহ তাহাকে খুঁজিয়া পাইল না। রাগের চোটে তাহার বাড়ীর জিনিষপত্র সকলে ভাঙ্গিয়া ফেলিল। বেচারী গড মারের নীচে অনাহারে দুই দিন লুকাইয়া রহিল। দুই দিন পর সে চুপি চুপি পলাইতেছিল, ভাবিয়াছিল তাহাকে বুঝি কেহ দেখিতে পাইরে না, কিন্তু তার এননি দুর্ভাগ্য যে সে ধরা পড়িয়া গেল। তাহাকে একে বারে বলি দেওয়াই ঠিক হইয়াছিল, কিন্তু রাজকুমার ফার্ডিন্যাণ্ড আসিয়া তাহাকে বাঁচাইয়া দিলেন। গডয়কে জব্দ করিয়া সহরের লােক যেন আরাে বেশী ক্ষেপিয়া উঠিল। তাহারা রাজপ্রাসাদ লুঠ করিবার জন্য অধীর হইয়া উঠিল। রাজা দেখিলেন, মহা বিপদ। সেই বিপদ হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য তিনি এক চালাকি করিলেন। বৃদ্ধ রাজা প্রজাদিগকে ডাকিয়া বলিলেন যে আমি বুড়া হইয়াছি, রাজকাৰ্য্য আর তেমন ভাল রকম চালাইতে পারি না, সুতরাং ক্যার্ডিন্যাকে আমি রাজ্যশাসনের ভার অর্পণ করিলাম। ইহাতে প্রজাদের এত আনন্দ হইল যে তাহারা ফুর্তির চোটে গড়য়ের বাড়ীটাই আগুণ দিয়া পােড়াইয়া দিল। স্পেন্ ছিল ফ্রান্সের শত্রু। নেপােলিয়ন যখন জাম্মেণীতে যুদ্ধে স্পেনে ও পর্তুগালে ৪১ ব্যস্ত ছিলেন, তখন তিনি খবর পাইলেন, স্পেন ইংলণ্ডের সঙ্গে মিলিত হইয়া ফরাসী-আক্রমণের পরামর্শ করিতেছে। কিন্তু জেনার যুদ্ধে নেপােলিয়নের বিজয়-সংবাদ পাইয়া স্পেন্ তাহার শত্রুতাচরণ করিতে সাহস পাইল না। নেপােলিয়ন তখনি ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন, স্পেকে জব্দ করিতে হইবে। এখন পিতা-পুত্রে ঝগড়া করিয়া দু’জনেই সাহায্যের জন্য নেপােলিয়নের নিকট গেলেন। নেপােলিয়ন কাহার কি বক্তব্য আছে শনিবার জন্য দুই পক্ষকেই তাহার সম্মুখে উপস্থিত করিলেন। এক পক্ষে ছিলেন বৃদ্ধ রাজা, তাহার রাণী ও গডয়; অন্য পক্ষে ছিলেন ফার্ডিন্যাও ও তঁাহার একজন বিদ্বান্ শিক্ষক। নেপােলিয়নের সম্মুখে পিতাপুত্রে ও মাতাপুত্রে যে রকম গালাগালি হইল, তাহা শুনিয়া নেপােলিয়ন কাণে আঙ্গুল দিয়া পলাইয়া গেলেন। নেপােলিয়ন দেখিলেন, ইহাদের মত দুশ্চরিত্র ও অশিক্ষিত লােক সিংহাসনে বসিবার উপযুক্ত নয়। তাছাড়া ইহাদের মধ্যে কেহই ফরাসীর মিত্র ছিল না, স্পেনের সিংহাসনে বসিয়া ইহারা নিশ্চয়ই ফরাসীর সঙ্গে শত্রুতা করিবে। ফরাসীর এত নিকটে এমন শত্রু রাখা ভাল নয়, তাই নেপােলিয়ন ফার্ডিন্যাণ্ড ও চার্লসকে সুখে ও বিলাসে থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া তাঁহার ভাই জোসেফ, বােনাপার্টিকে স্পেনের রাজা করিয়া দিলেন। স্পেনের লােকেরা ইহাতে বিদ্রোহী হইয়া উঠিল, দেশে ভীষণ যুদ্ধ চলিতে লাগিল। নেপােলিয়ন নিজে স্পেনে ছিলেন না, তাহার সেনা- পতি ডুপােকে সেখানে রাখিয়া তিনি ফ্রান্সে গিয়াছিলেন। যখন তাঁহার নিকট সংবাদ গেল যে ডুপাে সসৈন্যে ধরা পড়িয়াছেন, তখন তিনি চীৎকার করিয়া বলিয়াছিলেন, “শেষে ডুপাে এমন কাজ করিল? তাকে যে আমি বড় ভালবাসিতাম! সে যুদ্ধ করিতে করিতে মরিল না কেন? সব ক্ষতিই পূর্ণ হয়, কিন্তু সম্মান হারাইলে যে আর ফিরিয়া পাওয়া যায় না।”

৪২ নেপােলিয়ন ইহার পর ফরাসীরা স্পেনে নগরের পর নগর অবরােধ করিতে লাগিল, কিন্তু স্যারাগােসার অবরােধই বিশেষ বিখ্যাত। স্কারাগাের লােকেরা ত যথাসাধ্য যুদ্ধ করিয়াছিলই, এমন কি সেখানকার মেয়েরা পর্যন্ত খুব যুদ্ধ করিয়াছিল। কিন্তু এত চেষ্টা সত্ত্বেও স্যারাগােসা রক্ষা করা গেল না। ফরাসীরা যখন উহা দখল করিল তখন স্যারাগােসা একটা প্রকাণ্ড ধ্বংসস্তুপ মাত্র। ইংরেজগণ স্পেনের লােককে সাহায্য করিবার জন্য সেখানে গিয়াছিলেন, সুতরাং স্পেনে ফরাসীদের সঙ্গে ইংরেজদের অনেক যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধকে “পেনিসুলার যুদ্ধ” (Peninsular War) বলা হয়। সারজ মূর (Sir John Moor) ইংরেজ সৈন্যের সেনাপতি ছিলেন। কোরাগার যুদ্ধে তাহার মৃত্যু হয়। ইংরেজগণ সেখানে বিশেষ সুবিধা করিতে পারিলেন না, সুতরাং যাহারা জীবিত ছিল সকলেই দেশে ফিরিয়া গেল। এদিকে টাইলে, ইটালিতে, পােলাওে, জাৰ্ম্মেণীতে -সকল স্থানেই নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আরম্ভ হইল। সকল স্থানেই খুব যুদ্ধ চলিতে লাগিল; নেপােলিয়নের দল কোথাও জিতিল, কোথাও বা হারিল, কিন্তু নেপােলিয়ন যখন যেখানে গিয়াছেন, সেইখানেই জয় লাভ করিয়াছেন, তিনি কোথাও পরাজিত হন নাই। তারপর অষ্টিয়ার সঙ্গে খুব বড় রকমের একটা যু হইল। ইহার চেয়ে বড় যুদ্ধ নেপােলিয়নের সময় আর হয় নাই। প্রায় ৫•••• সৈন্ত সেই যুদ্ধে মারা গিয়াছিল। যুদ্ধে নেপােলিয়ন জয় লাভ করিলেন। ফরাসী সৈন্য অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা নগরী দখল করিয়া বসিল, রাজা-রাণী নগর ছাড়িয়া পলাইয়া গেলেন। অষ্ট্রিয়ার রাজা অবিলম্বে নেপােলিয়নের সঙ্গে সন্ধি করিলেন, সেই সন্ধি দ্বারা তিনি এবার আরাে অনেক দেশ পাইলেন এবং সেই সমস্ত দেশ তাহার অধীন রাজন্যবর্গকে ভাগ করিয়া দিলেন। নেপােলিয়ন যে স্পেনে ও পৰ্ত্ত গালে কেবল ফরাসী সৈন্ঠ লইয়া যুদ্ধ করিতেন তাহা নহে, তিনি যখন যে দেশ জয় করিতেন সেই দেশ হইতেই সৈন্য সংগ্রহ করিতেন। প্যারিসে ফিরিয়া আসিলে নেপােলিয়নের আর একটা বিবাহ হইল। জোসেফাইন তখনও জীবিত ছিলেন এবং তাঁহাকে নেপােলিয়ন খুবই ভালবাসিতেন, তথাপি নেপােলিয়ন আর একবার বিবাহ করিলেন। নেপােলিয়ন যে জোসেফাইনকে কত ভালবাসিতেন তাহা ভাবিলে আশ্চর্য হইতে হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে যমদূতের মত এক একটা কামানের গােল আসিতেছে, আর তাহার মধ্যে নেপােলিয়ন ঘােড়ার পিঠে বসিয়া জোসে- ফাইনকে চিঠি লিখিতেছেন। তাঁহাকে চিঠি না লিখিয়া নেপােলিয়ন এক দিনও থাকিতে পারিতেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে এত তাড়াতাড়ি চিঠিগুলি লিখিয়াছেন তবু তাহাদের ভাষা ও ভাব এত মধুর যে সেগুলি পড়িলে মুগ্ধ হইতে হয়। ভাষার উপর নেপােলিয়নের আশ্চৰ্য্য দখল ছিল। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে একসঙ্গে ৪৫ জন লেখককে বিভিন্ন বিষয়সম্বন্ধে অনর্গল বলিয়া যাইতে পারিতেন। কামানের গােলা ফাটিয়া অনেক সময় চিঠির উপর বালু আসিয়া পড়িত, তাহাতে তাহাদের ব্লটিং কাগজের কাজ হইয়া যাইত। নেপােলিয়নের আর একটা আশ্চর্য গুণ ছিল—তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অশ্বপৃষ্ঠে বসিয়া ৫৭ মিনিট ঘুমাইয়া লইতে পারিতেন এবং প্রয়োজন ইলে না ঘুমাইয়া থাকিতে পারিতেন। নেপােলিয়নের সঙ্গে বিবাহের পর জোসেফাইনের কোনো সন্তান হয় নাই। নেপােলিয়ন দেখিলেন, তাহার মৃত্যুর পর ফরাসীর সিংহাসনে বসিবার মত তাহার কোনাে বংশধর নাই। সেই জন্যই তিনি অষ্ট্রিয়ার রাজকন্যা মেরী লুইসাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। এই বিবাহের আর একটা উদ্দেশ্যও ছিল; নেপােলিয়ন মনে করিয়াছিলেন যে অষ্ট্রিয়ার মত শক্রর কন্যাকে বিবাহ করিলে অনেক যুদ্ধ ও অনাবশ্যক রক্তপাত বন্ধ হইয়া যাইবে।

৪৪ নেপােলিয়ন জোসেফাইন যখন এই সংবাদ শুনিলেন তখন তিনি, অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া গেলেন। নেপােলিয়নের পক্ষ হইয়া যত কথাই বলা হউক না কেন ইহাই তাঁহার জীবনের সব্বপ্রধান কলঙ্ক। জোসেফাই নের সঙ্গে সঙ্গে সৌভাগ্যলক্ষ্মীও নেপােলিয়নকে ত্যাগ করিয়া গেলেন, তখন হইতেই নেপােলিয়নের পতন আরম্ভ হইল। মেরী লুইসার সঙ্গে নেপােলিয়নের মােটেই ভাব হইল না, লুইসও নেপােলিয়নকে দেখিতে পারিতেন না। নেপােলিয়ন লুইসার সঙ্গে ভাব করিতে মাঝে মাঝে চেষ্টা করিতেন। লুইসা একদিন ডিম ভাজিতেছিলেন, এমন সময় নেপােলিয়ন সেখানে হঠাৎ উপস্থিত হইয়া বলিলেন, “কি হচ্ছে এখানে? গন্ধ শুকে ত মনে হয় ডিমের কিছু একটা হচ্ছে।” তারপর উনুনের ধারে গিয়া বলিলেন, “দাও, আমি ভেজে দিচ্ছি।” ডিমের একটা দিক যখন ভাজা হইল, তখন উহা উল্টাইবার সময় আসিল, নেপােলিয়ন আর কিছুতেই তাহা উল্টাইতে পারেন না। অনেক চেষ্টার পর কড়া হইতে ডিম একেবারে ঘরের মাঝখানে গিয়া ছুটিয়া পড়িল, তখন সেখানে যে কেমন একটা হাসির ধূম পড়িয়া গেল তাহা অনুমান করা কঠিন নয়। বিশ্ববিজয়ী বীর নেপােলিয়ন কিনা শেষে একটা ডিমের বড়া উল্টাইতে পারিলেন না। জোসেফাইনকে থাকিবার জন্য নেপােলিয়ন তাঁহাকে প্যারীসে খুব বড় একটা প্রাসাদ দিয়াছিলেন এবং গ্রামে খুব সুন্দর একটা বাগান-বাড়ী দিয়াছিলেন। তা ছাড়া বৎসরে তাহাকে ৫ লক্ষ করিয়া ‘ডলার দেওয়া হইত। কিন্তু তাহার প্রতি যে গভীর অন্যায় করা হইয়াছিল, তাহার কি প্রতিকার করা সম্ভব।

'রাশিয়ায় ৪৫ অষ্টম পরিচ্ছেদ রাশিয়ায় ১৮১১ খৃষ্টাব্দের ২০শে মার্চ নেপােলিয়নের একটা ছেলে হইল। নেপােলিয়ন তাহাকে “রােমের রাজা” উপাধি প্রদান করিলেন। তাহার আনন্দের আর সীমা রহিল না। নেপােলিয়নের বয়স তখন ৪১ বৎসর। অন্যান্য দেশের মত রাশিয়াকেও তিনি ইংলণ্ডের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। রুষ-সম্রাটের হুকুমে তাহা একপ্রকার বন্ধও হইয়া গিয়াছিল, কিন্তু ক্রমে ক্রমে ইংলণ্ডে প্রস্তুত জিনিসপত্র রাশিয়ায় আসিতে লাগিল। নেপােলিয়ন এই সংবাদে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন। ক্রমে আরও এমন অনেক কারণ ঘটিল, যাহাতে নেপােলিয়নের সঙ্গে রুষ-সম্রাটের ভাব বজায় রহিল না । দেখিতে দেখিতে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়া গেল। নেপােলিয়ন স্থির করিলেন, রাশিয়ার প্রচণ্ড শক্তি তিনি চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া দিবেন এবং সেই উদ্দেশ্যে নানাদেশ হইতে ৬ লক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করিলেন। প্রাশিয়া, অষ্টিয়া, হল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, ইটালী, পােল্যাণ্ড, সুইজারল্যাণ্ড -এমন কি স্পেন ও পর্তুগাল হইতেও তিনি সৈন্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন। রাশিয়ার মত অদ্ভুত দেশ ইওরােপে নাই। রাশিয়া যে ইওরােপের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় দেশ তা বােধ হয় অনেকেরই জানা আছে, কিন্তু সেটা যে কিরকম জায়গা, সে ধারণা বােধ হয় অনেকেরই প্রথমত: রাশিয়া যত বড় দেশ সেই পরিমাণে লােক নাই, সুতরাং সেখানে পতিত ভূমির অভাব নাই । অভাব নাই। সেখানকার শীত এত বেশী যে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের লােক সেখানে গেলে শীতকালে গেদের নাই।

নেপােলিয়ন কাণ খসিয়া পড়ে। নেপােলিয়ন সেই জন্য গ্রীষ্মকালে রাশিয়ায় গিয়াছিলেন। রাশিয়ার লােক পলায়নে যেমন ওস্তাদ এমন আর কেহ নয়। তাহারা যখন শুনে যে শত্রু আসিতেছে, তখন সহর বা গ্রাম ছাড়িয়া এমন পরিপাটীরূপে চম্পট প্রদান করে যে শত্রুরা আসিয়া শুধু ‘হায় হায় করে। নেপােলিয়নের কপালে ও তাহাই ঘটিল। তিনি দিনের পর দিন কেবল শূন্য গ্রাম ও শূন্য সহরের শূন্য ঘর বাড়ীর মধ্য দিয়া চলিতে লাগিলেন, কোথাও জন-প্রাণীর সাড়া পাওয়া গেল না। এদিকে মাথার উপরে ভয়ানক রােদ, পথে হাঁটু পরিমাণ ধূলা; ক্ষুধার সময় খাদ্য মিলে , তৃষ্ণার সময় জল পাওয়া যায় না। চারিদিক নীরব, নির্জন কোথাও জন প্রাণীর চিহ্ন মাত্র নাই। এই ভাবে অনেক দূর গেলে পর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। নেপাে- লিয়ন যুদ্ধ করিতে করিতে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। বােয়ােডিনােত একটা ভীষণ যুদ্ধ হইল, নেপােলিয়ন এমন সাংঘাতিক যুদ্ধ আর করেন নাই। এই যুদ্ধে ২২ জন রুষ সেনাপতি ও ১৮ জন ফরাসী সেনাপতি হত হইয়াছিলেন, এইজন্য ইহাকে অনেকে সেনাপতিদের লড়াই” বলিয়া থাকে। শরৎকালে নেপােলিয়ন মস্কো নগরে প্রবেশ করিলেন। মস্কো খুব প্রাচীন ও সমৃদ্ধিশালী নগর ; এক সময় ইহা রাশিয়ার রাজধানী ছিল। মস্কোতে হাজার হাজার গির্জা ছিল বলিয়া উহাকে অনেকে তীর্থের মত পুণ্যস্থান বলিয়া মনে করিত। মস্কোবাসিগণ নেপােলিয়ন আসিতেছেন শুনিয়াই সহর ছাড়িয়া পলায়ন করিতে লাগিল। তাহার গাড়ী বােঝাই করিয়া যে यांश পারিল তাহা সঙ্গে সঙ্গে লইয়া গেল। সহরের সৈন্যরা ও নেপােলিয়ন আসিবার আগের দিনই চলিয়া গিয়াছিল। সৈন্যদের শেষ পণ্টন চলিয়া যাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে নাকি নেপােলিয়ন আলিয়া মস্কোতে পৌঁছিয়াছিলেন। নেপােলিয়ন আসিয়া রাশিয়ায় ৪৭ দেখিলেন, মস্কো একটা প্রকাণ্ড শ্মশানের মত পড়িয়া রহিয়াছে। রাস্তার ধারে দালানগুলির রুদ্ধ জানালা যেন অন্ধের দৃষ্টির মত তাহাদের দিকে চাহিয়া রহিল। নেপােলিয়ন দেখিলেন, সৈন্যদের রসদের গুদাম আগুণ দিয়া পােড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে—জেলখানা হইতে কয়েদীগণকে ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে ; তাহারা আরও কতগুলি ছােটলােকের সঙ্গে মিলিয়া মস্কোনগর আগুণ দিয়া পােড়াইবার আয়ােজন করিতেছিল। সহরের নানাস্থানে তাহারা গােলা বারুদ জমা করিতেছিল। ফরাসীরা তখন ব্যস্ত ছিল বলিয়া তাহা টের পায় নাই। সৈন্যগণ শূন্য বাড়ীগুলিতে ঢুকিয়া আহার ও পানীয় যেখানে যাহা পাইল তাহাই উদরসাৎ করিতে লাগিল। রাশিয়া ‘ভড়কা’ (Vodka) নামে একপ্রকার মদ খাইতে খুব ভালবাসে, ফরাসী সৈন্যেরা সেই মদ প্রচুর পরিমাণে পান করিল। সমস্তদিন এইভাবে গােলমাল করিয়া রাত্রে তাহারা কোচে, কুশনে ও খাটে পড়িয়া খুব ঘুমাইতে লাগিল। এতদিন তাহারা আকাশের নীচে ঘুমাইয়াছে, আজ তাহারা খুব আরাম করিয়া সিল্কের চাদর গায় দিয়া ঘরের মধ্যে ঘুমাইল। “আগুণ ! আগুণ ! গভীর রজনীতে সকলে শিহরিয়া জাগিয়া উঠিল, চাহিয়া দেখিল, আগুণের আলােতে সহর উজ্জল হইয়া উঠিয়াছে। দমকলগুলি ৰুষ-সৈন্যেরা নষ্ট করিয়া রাখিয়া গিয়াছিল, সুতরাং কেহ আগুণ নিবাইতে পারি না। পরদিন রাত্রেও আবার আগুণ লাগিল; শুধু এক জায়গায় নহে, বহু স্থানে আগুণ লাগিয়া মঙ্কো নগরে সুন্দর রােসনাইর সৃষ্টি করিল। প্রবল বাতাসে অগ্নিশিখাগুলি দাউ দাউ করিয়া জ্বলিতে লাগিল। দুই দিন অবিশ্রান্ত ভাবে আগুণ জ্বলিতে লাগিল, নেপােলিয়ন সবই দেখিলেন। অবশেষে তিনি যে প্রাসাদে থাকিতেন সেই বাড়ীতেও আগুন ধরিল। নেপােলিয়ন বহুকষ্টে প্রাণ লইয়া পলায়ন করিলেন। আগুণ কিছুতেই নিবিল না-একদিকে ১r নেপােলিয়ন নিবিতেই আরেকদিক জ্বলিয়া উঠিতে লাগিল। সহরের দমকলগুলি সব নষ্ট করিয়া ফেলা হইয়াছিল, সুতরাং আগুণ নিবান গেল না। নেপােলিয়ন দেখিয়া অবাক হইলেন যে কোনো সভ্যজাতি এমন করিয়া একটা প্রাচীন নগর নষ্ট করিতে পারে। রাশিয়ান গভর্ণমেন্টের হুকুমেই মস্কোর অধিবাসীরা নগর ছাড়িয়া পলাইয়া গিয়াছিল। ইহাতে তাহাদের যে কত দুর্দশা হইয়াছিল, তাহার সীমা নাই। অসংখ্য লােক মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল। গভর্ণমেন্ট কেমন করিয়া এমন অমানুষিক হুকুম প্রদান করিলেন, নেপােলিয়ন তাহা ভাবিয়া পাইলেন না। সহরের চারিভাগের তিনভাগ যখন পুড়িয়া ছাই হইয়া গেল তখন আগুণ নিবিল। নেপােলিয়ন সন্ধির প্রস্তাব করিয়া জারের নিকট লােক পাঠাইয়াছিলেন, তাহার উত্তর-প্রতীক্ষা করিয়া তিনি মস্কোতে বসিয়া রহিলেন। কিন্তু উত্তর আসিল না। এদিকে সৈন্যদের খাদ্যদ্রব্য সব ফুরাইয়া যাইতে লাগিল, তাহারা সকলে চলিয়া যাওয়ার জন্য অস্থির হইয়া উঠিল। নেপােলিয়ন জারের নিকট আরেকজন লােক পাঠাইলেন, কিন্তু সেও ফিরিয়া আসিল না। তখন কিছু কিছু বরফ পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে ; নেপােলিয়ন জানিতেন রাশিয়ার শীত বড় ভয়ানক, সুতরাং সেখান হইতে প্রত্যাবর্তন করা উচিত মনে করিলেন। সৈন্যের সােণা-রূপা, রেশম-পশম যে যাহা পাইল তাহা সঙ্গে লইল। কিন্তু পথে তাহাদের দুর্দশার সীমা রহিল না । এক দিকে শীত, অন্যদিকে কসাক সৈন্য আসিয়া তাহাদিগকে আক্রমণ করিল। অনেক সময় শীতে তাহাদের হাত এমন অবশ হইয়া যাইত যে হাত হইতে বসু খসিয়া পড়িত। রাস্তা ঘাট সব বরফে ডুবিয়া গেল; সকালে সৈনােরা ঘুম হইতে উঠিয়া দেখিত যে তাহাদের রীতিমত বরফের সমাধি ইঙ্গছে। এমনি ভাবে চলিয়া তাহারা রবিশফের নিকট একটা নদী এলবা দ্বীপে ৪১ তীরে পৌঁছিল। সেই নদীর উপর দুইটা অৰ্দ্ধভগ্ন সেতু ছিল। ফরাসী সৈন্যের তাহা পার হইতে গিয়া অনেকে নীচে পড়িয়া মরিয়া গেল। নেপােলিয়নের এমন সুন্দর ভুবনবিজয়ী সৈন্যদল যখন ভিলনাতে পৌছিল, তখন তাহাদের অবস্থা নিতান্ত কাহিল। ভিনাতে আসিয়া নেপােলিয়ন সংবাদ পাইলেন যে প্যারিসে নাকি বিদ্রোহ আরম্ভ হইয়াছে, সুতরাং তিনি সৈঙ্গদিগকে ভিন্নাতে রাখিয়াই প্যারিসে চলিয়া গেলেন। নবম পরিচ্ছেদ এল দ্বীপে ১৯শে নভেম্বর নেপােলিয়ন পারিসে পৌছিলেন। ইহার কিছুদিন পর ফ্রান্স শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হইল । নেপােলিয়ন মন্ত্রীগণকে বলিলেন, “শত্রুরা দেশ আক্রমণ করিয়াছে, আমি সৈন্যগণকে লইয়া যুদ্ধে চলিলাম, কিন্তু আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয় জিনিষ দুইটী তােমাদের কাছে রাখিয়া গেলাম।” এই বলিয়া নেপােলিয়ন তাহার স্ত্রী মেরী লুইসা ও তাহার শিশু পুত্রকে দেখাইলেন। দুইদিন পর নেপােলিয়ন যুদ্ধ যাত্রা করিলেন, কিন্তু লুইসার সঙ্গে তাঁহার আর দেখা হইল না, কারণ তিনি যখন প্যারিসে ফিরিয়া আসিলেন তখন আর তাহার সে ক্ষমতা ও গৌরব নাই। অহঙ্কারী লুইসা ইচ্ছা করিয়াই হতমান সম্রাটের সঙ্গে দেখা করিলেন না। সেই সময়েই নেপােলিয়নের যথার্থ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। কারণ এখন তাহার অধীনে সৈন্যসংখ্যা বেশী ছিল না, যাহারা ছিল তাহারাও অর্ধশিক্ষিত অথবা ছেলেমানুষ। কিন্তু এই সমস্ত সৈন্য লইয়াই তিনি শিক্ষিত বহুসংখ্যক সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া জয়লাভ করিতে লাগিলেন। নেপোলিয়ন নামের এমন একটা আকর্ষণী শক্তি ছিল যে তাহার নাম শুনিয়া অসংখ্য লােক যুদ্ধ করিতে ছুটিয়া আসিত। ৪ নেপােলিয়ন কিছুদিন যুদ্ধ চলিলে পর শত্রুগণ প্যারিসের দিকে আসিতে লাগিল। নেপােলিয়ন তখন প্যারিসে ছিলেন না, সুতরাং প্যারিস্ সহজেই শত্রুর নিকট আত্মসমর্পণ করিল। ১৮১৪ খৃষ্টাব্দের ৩১শে মার্চ রাশিয়ার সম্রাট ও প্রাশিয়ার রাজা একসঙ্গে প্যারিসে প্রবেশ করিলেন। মেরী লুইসা তাহার পুত্রকে লইয়া ইতিপূৰ্বেই সহর ছাড়িয়া পলাইয়া ‘গয়াছিলেন। ২রা এপ্রিল প্যারিসে ঘােষণা করিয়া দেওয়া হইল যে নেপােলিয়নের রাজত্ব শেষ হইয়া গিয়াছে, তিনি আর এখন ফরাসীর সম্রাটু নহেন। নেপােলিয়ন তখন শ্যাম্পেন যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন। তিনি তাড়াতাড়ি প্যারিসে আসিবার বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন। একন কৰ্ম্মচারী তাহাকে বলিল, “এখন আর গিয়ে কি হবে? সময় পার হয়ে গেছে ।” নেপােলিয়নের এতটা বিশ্বাস হইল না। তিনি ফন্টেতে তাঁর সৈন্যদল পরিদর্শন করিলেন। তাহার পুরাতন সৈনিকেরা বলিতে লাগিল—“প্যারিসে চল, পাারিসে।” যুদ্ধের জন্য তাহারা ক্ষেপিয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু নেপােলিয়ন প্যারিসে গেলেন না। তিনি প্যারিসে একটা চিঠিতে লিখিয়া পাঠাইলেন, “যদি তােমরা মনে কর আমিই দেশের অশান্তির কারণ, তাহা হইলে এই মুহুর্তে আমি সিংহাসন ত্যাগ করি- তেছি। দেশের জন্য আমি সব্বদাই প্রাণ দিতে প্রস্তুত।” ২০শে এপ্রিল নেপােলিয়ন তাহার সৈন্যদের নিকট বিদায় ইলেন। সৈন্যেরা তাঁহাকে এত ভালবাসিত ও শ্রদ্ধা করিত যে বড় বড় যােদ্ধাদের চোখ দিয়া ঝর ঝর করিম জল পড়িতে লাগিল। নেপােলন বললেন, “আমি তােমাদের প্রত্যেককে পৃথক ভাবে আলি- হন করিতে পারি না, তাই তােমাদের সেনাপতিকে আলিঙ্গন করিতেছি, তামরা মনে করিও যেন তোমাদের প্রত্যেককেই আমি আঙ্গিন করিতেছি।” এই কথা বলিয়া তিনি সেনাপতিকে আলিঙ্গন করিলেন এবং ফরাসীর জাতীয় পতাকাটা চুম্বন করিলেন। তাহার জন্য গাড়ী অপেক্ষা করিতেছিল, তিনি গিয়া গাড়ীতে উঠিলেন। ফ্রান্সের ভিতর যখন গাড়ী ছুটিয়া চলিল তখন দুই ধারের লােক তাঁহাকে অভিবাদন করিল, এবং তাঁহার সম্মানার্থে জয়ধ্বনি করিল। তিনি ফ্রান্স ছাড়িয়া এবাতে পৌছিলেন। এ ছছাট্ট একটা দ্বীপ, এই দ্বীপটা তখন পর্যন্ত তাঁহার অধীনে ছিল। এবার অধিবাসিগণ নেপােলিয়নকে আনন্দের সহিত গ্রহণ করিল। এই ছােট্ট দ্বীপে তিনি রাজত্ব করিতে লাগিলেন। সেখানে তার ছােট্ট একটি সৈন্যদল ছিল, একটী প্রাসাদ ছিল, একটা বিচারালয় ছিল। ফরাসীতে বিপুলায়তনে যাহা যাহা ছিল, এবাতেও ক্ষুদ্র আকারে তাহার সবই ছিল। দশম পরিচ্ছেদ যে লুইকে বলি দেওয়া হইয়াছিল তাহার ভাইকে ফরাসীরা আবার রাজা করিল। তিনি বুদ্ধিহীন ছিলেন না বটে, তবে তখন ফরাসীতে যে রকম সময় পড়িয়াছিল তাহার মধ্যে ভালমতে রাজ্যশাসন করা তঁাহার সাধ্য ছিল না। এদিকে সমস্ত ফরাসী সৈন্য জাৰ্ম্মেণীতে বন্দী হইয়াছিল, তাহারা মুক্তি পাইয়া দেশে ফিরিয়া আসিল এবং নেপােলিয়নকে রাজা করিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিল । নেপােলিয়ন ও এতে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিলেন। সেথানে ১১ মাস বাস করিয়াই তাহার ইচ্ছা হইল, তিনি আরেকবার ফরাসীতে আসিয়া নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করিয়া যান। ইচ্ছাকে কার্যে পরিণত করিতে তাঁহার বেশী দেরী হইল না। ১৮১৫ খৃষ্টাব্দের ১লা মার্চ তিনি ফরাসী রাজ্যে পদার্পণ করিলেন।

নেপােলিয়ন তাহাকে ধরিয়া আনিবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করা হইল। নেপােলিয়নের সঙ্গেও ছােট একটি সেনাদল ছিল, কিন্তু তাহা এত ছােট যে উহা দ্বারা যুদ্ধ চলে না। যাহারা নেপােলিয়নকে ধরিয়া আনিতে গিয়াছিল গ্রেনো- বলের নিকট তাহাদের সঙ্গে নেপােলিয়নের দেখা হইল। নেপােলিয়ন সৈন্যদিগকে পিছনে রাখিয়া একা অগ্রসর হইয়া গেলেন এবং শত্রুর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বুকের বােতাম খুলিয়া দিয়া বলিলেন, “সৈন্যগণ, তােমাদের সম্রাটকে যদি মারিতে চাও তবে এসাে, এই আমি বুক পেতে দিচ্ছি।” এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহার মুক্ত বক্ষ অগ্রসর করিয়া দিলেন। যে কে তখন এক আঘাতে নেপােলিয়নকে হত্যা করিতে পারিত, কিন্তু কেহ একটা হাত তুলিল না, সকলে সমস্বরে চীৎকার করিয়া উঠিল, “নেপােলিয়ন কি জয়।” তাহারা সকলেই নেপােলিয়নের পক্ষে চলিয়া গেল। লিয়নস নগরের রাজ সেনাপতিরা সকলেই পলাইয়া গিয়াছিল, নেপােলিয়ন অবাধে নগরে প্রবেশ করিলেন। নেপােলিয়নেরই একজন পুরাতন সেনাপতি ‘নে খুব আস্ফালন করিয়া বলিয়াছিলেন, “নেপােলিয়নকে আমি একটা লােহার খাঁচায় খাচায় সিংহের মত বন্ধ কিন্তু তিনিও কিছুদূরে গিয়ই নেপােলিয়নের পক্ষে যােগদান করিলেন। এমনি ভাবে নেপোলিয়ন যতই অগ্রসর হইতে লাগিলেন, ততই দলে দলে লােক আসিয়া তাহার সঙ্গে যােগ দিতে লাগিল। এই ছোট্ট মানুষটীর এমন আশ্চর্য্য শক্তি ছিল যে তাঁহার আকর্ষণে শত্রুপক্ষের সৈনােরা তাহাদের পােষাক পরিত্যাগ করিয়া নেপােলিয়নের পক্ষে চলিয়া আসিতে লাগিল। এইভাবে নেপােলিয়নের সৈন্যসংখ্যা দিন দিন বাড়িতে লাগিল। ১৯শে মার্চ গভীর রজনীতে রাজা প্যারিস হইতে বেলজিয়ামের দিকে পলায়ন করিলেন। ২০শে মার্চ নেপােলিয়ন প্যারিসে পেীছিলেন। করে আব শেষকথা ইংলণ্ড ও অষ্ট্ৰীয়া ফ্রান্সের সঙ্গে মিলিত হইয়া প্রাশিয়া ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার আয়ােজন করিতেছিল, এমন সময় খবর গেল নেপােলিয়ন আবার প্যারিস দখল করিয়া বসিয়াছেন। অমনি ফরাসীকে আক্রমণ করিবার জন্য তাহার সৈন্য প্রেরণ করিলেন। রাশিয়া, প্রাশিয়া, অষ্ট্ৰীয়া, সার্ভিয়া, হল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, জাৰ্ম্মেণী ও ব্রিটেনের সৈন্যরা ফরাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করিল । প্রায় একলক্ষ পঞ্চাশ হাজার প্রাশিয়ান সৈন্য লইয়া ব্লচার অগ্রসর হইতেছিলেন। অন্যদিকে রাশিয়া ও প্রাশিয়ার সৈন্যদ্বয় প্যারীতে যাইবার চেষ্টা করিতেছিল। আরেকদিকে ইংরাজ সেনাপতি ওয়েলিংটন কুচারের সঙ্গে মিলিত হইবার জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন। ইহারা সকলে মিলিয়া যদি একসঙ্গে পারী আক্রমণ করিতেন, তাহা হইলে আর উপায় ছিল । কিন্তু নেপােলিয়ন ওয়েলিংটনের সঙ্কল্পকে কার্যে পরিণত হইতে দিলেন না। তিনি ব্লচারকে সহসা ভীষণভাবে আক্রমণ করিলেন। ১৬ই জুন লিগাল যুদ্ধে রুচার পরাজিত হইয়া পলায়ন করিলেন। অন্যদিকে ফরাসী সেনাপতি নে এবং ডান ৪০ হাজার সৈন্য লইয়া ঐ দিনই ওয়েলিংটনকে আক্রমণ করিলেন। কিন্তু তাহারা জয়লাভ করিতে পারলেন না, ইংরেজ সেনাপতি ওয়েলিংটন যুদ্ধে জয়ী হইলেন। শত্রুরা যাতে ফরাসী আক্রমণ না করে, সেইজন্য নেপােলিয়ন ফরাসী ছাড়িয়া বেলজিয়ামে চলিয়া গেলেন। তাহার ইচ্ছা ছিল ঐখানে শত্রুগণকে একটা খুব বড় রকম লড়াইয়ে এমন ভাবে হারাইয়া দিবেন যে তাহাতেই যুদ্ধ শেষ হইয়া যাইবে। সেই বড় রকম লড়াইটা হইয়াছিল ওয়াটালুতে। ওয়াটার নামটা বােধ হয় অনেকেরই শুনা আছে। ওয়াটালু বেল- জিয়ামের রাজধানী ব্রুসে কইতে ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত একটা গ্রাম মাত্র। ১৭ই জুন প্রাতঃকালে ওয়েলিংটন প্রায় ৭০ হাজার সৈন্য লইয়া নেপােলিয়ন ওয়াটা অভিমুখে যাত্রা করিলেন এবং সন্ধ্যার সময় সেখানে গিয়া পৌছিলেন। সন্ধ্যার কিছু পরেই নেপােলিয়ন প্রায় ৭২ হাজার সৈন্স লইয়া ওয়েলিংটনের পিছনে পিছনে ওয়াটালুতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। রুচার যাহাতে ইংরাজ সৈন্যের সঙ্গে যােগদান করিতে না পারে, সেজন্য নেপােলিয়ন গ্রোসীকে সেদিকে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। সেই রাত্রে ভয়ানক বৃষ্টি হইল, ইংরাজ ও ফরাসী সেনা এই দুর্যোগের রাত্রিতে ঘুমাইতে পারিল না। ১৮ই জুন প্রাতঃকালে অল্প অল্প বৃষ্টি পডিতেছিল, আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল, বারুদ বৃষ্টির জলে ভিজিয়া গিয়াছিল, রাস্তাঘাট জল কাদায় বিশ্রী হইয়া উঠিয়াছিল, এই সমস্ত কারণে অনেকক্ষণ কেহ কাহাকেও আক্রমণ করিল না। কিন্তু ১১ টার সময় ফরাসীদের বন্দুক গৰ্জন করিয়া উঠিল, ইংরাজগণ ও চুপ করিয়া রহিল না, দেখিতে দেখিতে তুমুল যুদ্ধ বাধিয়া গেল । দুপুরবেলা ফরাসী সৈন্য ইংরাজদিগকে হটাইয়া তাহাদের স্থান অধিকার করিয়া বসিল। ফরাসী সেনার হুঙ্কারে ইংরাজ সৈন্তু কঁপিয়া উঠিল । কিন্তু নেপােলিয়নের মনে শান্তি ছিল না। তিনি জানিতেন যে বুচার যদি কোন রকমে এক বার আসিয়া ইংরাজদের সঙ্গে যােগদান করিতে পারে, তাহা হইলে জয়ের আশা নাই । তিনি ভাবিতেছিলেন গ্রোসীকে যে গুরুতর কাষের ভার দিয়া পাঠাইয়াছেন তাহা সে সম্পন্ন করিয়া উঠিতে পারিবে কি না, কে জানে! এই জন্য ফরাসী সেনার বিজয় কোলাহল তঁাহার কাণে পেীছিল না। ইংরাজ সেনার আনন্দ কোলাহলে নেপােলিয়ন চমকিয়া উঠিলেন। চাহিয়া দেখিলেন, পিপীলিকশ্রেণীর মত অসংখ্য প্রাশিয়ান সৈন্য লইয়া বুচার আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। নেপােলিয়ন জয়ের আশা ত্যাগ করিলেন। তখন বেলা ৪টা। ফরাসী সৈন্য তখনও ভীষণভাবে বুদ্ধ শেষকথা করিতেছে। কিন্তু ইংরেজ ও প্রাশিয়ান সৈন্য একসদে তাহাদিগকে আক্রমণ করিল, তখন তাহারা আর টিকিয়া থাকিতে পারিল না। সন্ধ্যার সময় নেপােলিয়ন যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। তিনি ৭২,০০০ সৈন্য লইয়া আসিয়াছিলেন, ৪০,০০০ সৈন্য লইয়া ফিরিয়া গেলেন। প্যারীসে ফিরিয়া নেপােলিয়ন দেখিলেন যে শত্রুর নিকট আত্মসমর্পণ করা ভিন্ন অন্য উপায় নাই। “বেলেরােফেন জাহাজের কাপ্তানের নিকট তিনি আত্মসমর্পণ করিলেন। কাপ্তেন তাহাকে সেই জাহাজে করিয়া ইংলণ্ডে চলিয়া গেলেন। জাহাজ যখন ফরাসী বন্দর হইতে যাত্রা করিল, তখন সম্রাট মাতৃভূমির নিকট হইতে শেষ বিদায় গ্রহণ করিলেন। তাহার চোখে মুখে কি অসীম বেদনার চিহ্ন। ছবিটি দেখিলে চোখের জল সম্বরণ করা কঠিন হইয়া পড়ে। ইংলণ্ডে নেপােলিয়নকে জাহাজ হইতে নামান হইল না। সেই জাহাজেই ইংরাজ গভর্ণমেন্ট হুকুম পাঠাইয়া দিলেন, নেপােলিয়নকে ‘সেন্টহেলেনা দ্বীপে বন্দীভাবে বাস করিতে হইবে। সেন্টহেলেনা আটলান্টিক মহাসমুদ্রে ছােট ' একটী দ্বীপ। ইহার আয়তন মাইল মাত্র দূর হইতে ইহাকে একটা ভাসমান পাথরের মত দেখায়। সেন্টহেলেন ফরাসী দেশ হইতে ৪০০০ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। এই ক্ষুদ্র দ্বীপে বিশ্ববিজয়ী বীর নেপােলিয়নকে ছয় বৎসর বাস করিতে হইয়াছিল। এই ছয় বৎসর যে তিনি কি কষ্টে কাটাইয়াছেন তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। সে সমস্ত কাহিনী পাঠ করিলে মানুষ মারেই চোখে জল আসে। ছয় বৎসর ধরিয়া নেপােলিয়ন তিলে তিলে মৃত্যুমুথে অগ্রসর হইতেছিলেন। তাঁহার স্বাস্থ্য ভাল ছিল না, মনে শান্তি ছিল না, তথাপি এই ভাগ্যবিপর্যায় তিনি যেভাবে বহন করিয়াছেন, অন্য কোনাে নেপােলিয়ন মানুষ তাহা পারিত না। তিনি বলিতেন, দুঃখের দিনেইত যথার্থ বীরকে চেনা যায়। অবশেষে ১৮২১ খৃষ্টাব্দের ৫ই মে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এই মহাপুরুষের জীবনসূর্য অস্ত গেল । নেপােলিয়ন মৃত্যুর পূর্বে শেষ কথা উচচারণ করিয়াছিলেন, “ফ্রান্স,-সৈন্যদল,-জোসেফাই” ;-জোসেফাইনের শেষ কথা ছিল, “এবা,-নেপােলিয়ন।” সেন্টহেলেনা হইতে তিনি মেরী লুইসকে বলিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে তিনি মেরী লুইসকে সত্যই খুব ভালবাসেন এবং সমস্ত জীবনই তঁাহার প্রতি ভালবাসা পোষণ করিয়া আসিয়াছেন। ইংরেজ সৈন্যগণ, সসম্মানে নেপােলিয়নকে সমাধি প্রদান করিল। ম্যারেঙ্গোর যুদ্ধে তিনি যে পােষাক পরিয়াছিলেন, সেই পােষাক ও তরবারি সহ তাহাকে সমাধি দেওয়া হইল । তাহার সম্মানার্থ ইংরেজ সৈন্য বন্দুক ফুটাইল, কামান ছাডিল, তাহাদের জাতীয় পতাকা অবনত করিয়া রাখিল। নেপােলষনের জীবন সম্বন্ধে যাহাদের সবিশেষ জানিবার ইচ্ছা আছে, তাহাদের সকলেরই এবটের বই পড' উচিত। পৃথিবীতে এমন জীবনচরিত বেশী নাই । আঠার বৎসর পরে ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে ফরাসীরা নেপােলিয়নের দেহাবশেষ, ইরজ গভর্ণমেন্টের অনুমতি ক্রমে, সেন্টহেলেনা হইতে তুলিয়া স্বদেশে লইয়া গেল এবং যথােচিত সম্মান ও আড়ম্বরের সহিত তাহাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বীরকে স্বদেশের মাটিতে সমাধিস্থ করল । সমাপ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nepoliyon Ed. 2nd

Author
Ghosh , Amulyakrishna
Title
Nepoliyon Ed. 2nd
File name
Nepoliyon Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1920
Published
2010/02/13
Publisher
Debtacharan Bhattacharyya , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
68
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Ghosh , Amulyakrishna
DLI number
511234
Barcode
4990010018402.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
94uIqSUAry8
Download PDF

Nepoliyon Ed. 2nd