Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Nepale Banganari

Debi, Hemalata · 2010/02/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নেপালে বঙ্গনারী।
শ্ৰীমতী হেমলত৷ দেবী প্রণীত
প্রকাশক,
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায়।
২০১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
১৩: ৮।
মু-১,
টাকা।

২১১নং কর্ণওয়ালিস্ স্ক্রীট, কলিকাতা, ব্রাহ্মমিশন প্রেসে, অবিনাশচন্দ্র সরকার দ্বারা মুদ্রিত।

ভূমিকা। হিমালয় যে পয়ােধি-বেষ্টিত বিপুল দেশের শিরােভূষণ তাহা জগতে হিন্দুস্থান বলিয়া বিখ্যাত। এই হিন্দুস্থানবাসী হিন্দুদিগের সহিত পৃথিবীর আর কোন জাতিরই সাদৃশ্য কিম্বা জ্ঞাতিবন্ধন নাই। দুর্ভেদ্য নৈসর্গিক পরিখা ও প্রাকারে বেষ্টিত করিয়া বিধাতা যেন ইহাকে পৃথিবীর মধ্যে সর্ববিষয়ে স্বতন্ত্র এবং চিহ্নিত করিয়া রাখিয়াছেন। এই জাতির প্রাচীন ইতিহাস এবং মহত্ত্ব জগতে সর্বজনবিদিত, এস্থলে তাহার পুনরুক্তি নিপ্রয়ােজন। সেই আদিম সুসভ্য পরাক্রান্ত স্বাধীন হিন্দু জাতি আজ পরপদানত ও হীনবীৰ্য্য বলিয়া বৰ্তমান সুসভ্য জাতি সকলের কৃপাপাত্র হইয়াছে। কেবল দুইটী মাত্র রাজ্য এখনও পর্যন্ত স্বাধীনতার গৌরবময় উজ্জ্বল টীকা ললাটে ধারণ করিতেছে। তন্মধ্যে নেপাল প্রধান। ইহা হিমালয়ের ক্রোড়স্থ বিস্তীর্ণ প্রদেশ, প্রকৃতির রম্য কানন, বিবিধ নৈসর্গিক শােভা এবং সম্পদে সৌভাগ্যবান। ইহার উত্তরে চির-তুষারাবৃত হিমালয়ের শিখরমালা, তাহার চরণে গভীর পদসঙ্কুল অরণ্যানী। হিমাচল নরের অগম্য, পুরাণে ইহা দেবের আবাসস্থান বলিয়া পরিকীর্তিত হইয়াছে। বিধাতা নেপাল রাজ্যকে দুর্ভেদ্য প্রাচীরে বেষ্টিত করিয়াছেন, তাই ইহা আজও স্বাধীন। জগতবাসীর কথা দূরে থাকুক, এদেশ ভারতবাসীরও অজ্ঞাত। এ রাজ্য অতি বিচিত্র, ইহার প্রাচীন ইতিহাস অপূৰ্ব্ব • উপন্যাসের ন্যায়। এই লুক্কায়িত স্থানে অনেক প্রাচীন কথা গুপ্ত আছে। সুদূর চীন হইতে কোন্ যুগে কোন্ বােধিসত্ত্ব মহাত্মা আসিয়া কোন্ বিপুল হ্রদকে রমণীয় উপত্যকায় পরিণত করিয়া- ছিলেন, কোথায় সেই হ্রদের মধ্যে শতদল শােভা পাইল, শতদলের নিম্নে পবিত্র বারি উৎসারিত হইল, সেখানে স্বয়ম্ভু ভগবান দিব্য কিরণে প্রকাশিত হইলেন, অদ্যাবধি নেপালবাসী ও নানা স্থান হইতে ভক্তবৃন্দ আসিয়া তথায় পশুপতিনাথকে দর্শন করেন। কোথায় কোন দেবতার হস্তস্পর্শে দৈব বারিধারা উৎসারিত হইয়া নিঝরিণী সৃষ্টি করিয়াছে--কি অপূর্ব কথা সে সকল! যুগে যুগে কত মহাপ্রাণ হিন্দু, মুসলমানদিগের ভয়ে ভীত ও সংক্ষুব্ধ হইয়া এই দুর্ভেদ্য দুর্গে আশ্রয় লইয়াছিলেন, হিন্দুস্থান হইতে হিন্দু ধৰ্ম্ম উৎপীড়িত হইয়া ' এখানে আসিয়া আশ্রয় লাভ করিয়াছেন। ভারত 'বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের জন্মস্থান, এই উভয় ধৰ্ম্মই নেপালে আশ্রয় লাভ করিয়াছে। এক্ষণে' এই উভয় ধৰ্ম্মই নেপালের জন- সাধারণের ধৰ্ম্ম। ভারতের সর্বত্রই রেলপথ বিস্তৃত হওয়াতে কোন প্রদেশই আর ভ্রমণকারীর অজ্ঞাত নাই। কিন্তু নেপাল রাজ্য সকলের নিকটেই অদৃষ্টপূৰ্ব দেশ হইয়া রহিয়াছে। নেপালে অবস্থান কালে আমি নেপাল সম্বন্ধে প্রবাসীতে কয়েকটা প্রবন্ধ প্রকাশ করিয়াছিলাম। তাহাতে অনেকেই কৌতুহলী হইয়া আমাকে নেপাল সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন করিতেন। সেই হেতু আমার এই পুস্তকখানির জন্ম। আমি ডাক্তার ওলডফিলড, (Oldfield) রাইট, হাউট, হডসন, প্রভৃতির পুস্তকে নেপালের ।

•
বৃত্তান্ত পাঠ করিয়াছি। নেপালের ইতিহাস তাঁহাদিগের পুস্তক
হইতেই সংগৃহীত হইয়াছে। পাঠকপাঠিকাগণ এই পুস্তক পাঠ
করিয়া বিশেষ কিছু লাভ করিবেন বলিয়া আমি আশা দিতে
পারিতেছি না। যদি কেহ কিছু লাভ করেন, তবে আমার আর
আনন্দের সীমা থাকিবে না।
১ই মার্চ, ১৯১২
গ্রন্থকত্রী।

No text on this page.

সূচী পত্র।
প্রখম পর্যায়।
পৃষ্ঠা।
১৭
২৮
৪৫
বিষয়।
নেপাল যাত্রা
কাটমঞ্জু
নেপালের অধিবাসিগণ
নেপালের প্রধান তীর্থ পশুপতিনাথ
নেপালে বৌদ্ধ ধর্ম
নেপালের বৌদ্ধ মন্দির
নেপালের পূজা, পাৰ্বণ ও জাতীয় উৎসব
দ্বিতীয় পর্যায়।
নেপালের প্রাকৃতিক বিবরণ
নেপালের কয়েকটী প্রসিদ্ধ স্থান
নেপালের পুরাবৃত্ত ,
গুর্খা বিজয়
নেপালের বর্তমান গুখ। রাজগণ
নেপালের আদর্শ সতী স্বর্গীয়া বড় মহারাণী
৫৪
০৪
০০ ০
৭৬
০ ০ ০
৭৯
১০৭

চিত্রের সূচী
।
নেপালের প্রধান রাজমন্ত্রী মহারাজ সার চন্দ্র শামসের
জঙ্গ রাণ। বাহাদুর।
২। মহারাজ দেব শামসের ও দেবী কৰ্ম্মকুমারী।
৩। হনুমানঢোকা ও কাটমণ্ডু সহর।
৪। সিংহ দরবার।
৫। বীর হাসপাতাল।
৬। পশুপতিনাথের মন্দির।
৭। সিস্তু অর্থাৎ স্বয়ম্ভুনাথের মন্দির।
৮। বৌদ্ধন্তপবৌধ
৯। ভাটগাঁও।
১০। পাটন সহর।
১১। জঙ্গ বাহাদুর।
১২। বীর শামসের জঙ্গ রণ বাহাদুর।
১৩। রাজকুমারী ও রাজমাতা শ্রীপাচমহারাণী, রণদীপ সিংহ
ও তাহার পত্নী।
১৪। নেপালরাজ মহারাজাধিরাজ বিক্রমশাই ও
বৰ্ত্তমান নরপতি মহারাজাধিরাজ ত্রিভুবন বিক্রমশাহ।

প্রথম পর্যায় নেপালের প্রধান রাজমন্ত্রী মহারাজ সার চলশামসের ঙ্গে রাণা বাহাদুর।

নেপালে বঙ্গনারী নেপাল যাত্রা। আমরা সত্য সত্যই নেপাল রাজ্যের রাজধানী কাটমণ্ডুতে অবস্থান করিতেছি। সম্মুখে ভুবনবিখ্যাত এভারেষ্টের শুভ্র হিমানীমণ্ডিত শিখর রৌদ্রে চক্ চক্ করিতেছে। তাহার উভয় পার্শ্বেই সীমান্ত ব্যাপিয়া চিরতুষারাবৃত পর্বতমালা। আমাদের ভারতের উত্তর সীমা হিমালয় পর্বত। কে ইহার নাম হিমালয় রাখিয়াছিল? ইহা যে প্রকৃতই হিমালয়। আহা । ঐ শুভ্র নির্মল হিমালয়ে প্রাণ ছুটিয়া যায়। কিন্তু উহা মানবের অলঙ্ঘনীয়। 'এই সেই কাটমণ্ডু! বাল্যকালে ভূগােলে পড়িয়া ছিলাম নেপাল হিমালয়ের ক্রোড়স্থিত স্বাধীন রাজ্য, কাটমণ্ডু তাহার রাজধানী। তখন কাটমণ্ডু পড়িলেই শিহরিয়া উঠিতাম। কাটামণ্ডুতে গেলে বুঝি কেহ আর মুণ্ড ফিরিয়া পায়না। না জানি সে কি ভীষণ রাজ্য ! সে দেশের মানব বুঝি সাক্ষাৎ দানব। ক্রমে শুনিলাম নেপালে গিয়া লােকে ফিরিয়া আসিয়াছেন। কেবল শ্রত কথা নয়, নেপাল প্রত্যাবৃত্ত সাক্ষাৎ মানব দেখিলাম, কৈ মুণ্ডত ২ নেপালে বঙ্গনারী। যায় নাই, বরং কিছু লাভ হইয়াছে। তখন কাটমণ্ডুভীতি কিঞ্চিৎ প্রশমিত হইল। কিন্তু তখনও ভাবি নাই যে সেই কাটমণ্ডুতে এক দিন আসিতে হইবে। জুলাই মাসের এক দিন রাত্রি প্রায় ১০টার সময় হাবড়া হইতে রেলগাড়ী চড়িয়া নেপাল যাত্রা করিলাম। রাত্রি প্রভাত হইতে হইতে মােকামা ঘাটে পৌছিলাম। ষ্টীমারে করিয়া গঙ্গা পার হইবার সময় গঙ্গার বক্ষে অরুণােদয় দেখিলাম। সে বড় সুন্দর দৃশ্য। গঙ্গা পার হইয়াই পুনরায় রেল গাড়ীতে আরােহণ করিলাম। উভয় পার্শ্বের দৃশ্য দেখিতে দেখিতে মজঃফরপুর, মতিহারী ইত্যাদি ছাড়িয়া বৈকালে শিগাউলি পৌছিলাম। পৌছিলাম। এই সেই শিগাউলি, যেখানে ১৮১৬ খৃষ্টাব্দে ইংরাজ রাজের সহিত নেপাল রাজের সন্ধি হইয়াছিল। সেই দিন হইতে নৈনিতাল, মসুরি প্রভৃতি রমণীয় প্রদেশ সকল নেপাল-রাজের হস্তচ্যুত হইয়াছে। শিগাউলি হইতে অন্য রেলগাড়ীতে উঠিয়া দেখিতে দেখিতে সূর্যাস্তের সময় রালে পৌঁছিলাম। ষ্টেশনটী অতি ক্ষুদ্র, একখানি গৃহ মাত্র বলিলেও হয়। এখানে ইংরাজ রাজ্যের সীমান্ত। ষ্টেশনেই দেখিলাম ছােট ছােট পানসীর মত কি পড়িয়া রহিয়াছে। যান ত জীবনে কখনও দেখি নাই। জলপথ নয়। স্থলপথে এই নৌকায় চড়িয়া কিরূপে যাইব বুঝিতে পারিলাম না। শুনিলাম ইহার নাম কার্পেট। ইহার তলদেশ কার্পেটে আবৃত বটে। কার্পেটে শয্যা বিস্তৃত হইল। আমরা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন কার্পেটে বসিলাম। অমনি চারিজন তাহা স্কন্ধে করিয়া লইল। তখন বুঝিলাম এমন মহারাজ দেব শামসের ও দেবী কৰ্ম্মকুমারী।

No text on this page.

নেপাল যাত্রা।
এ ত নৌকা নয়, এ দোলা। উপকথায় যে দোলার কথা পড়িয়া-
ছিলাম এই বুঝি সেই দোলা। কার্পেটের মাথার উপর একটা কাঠের
ঢাকনা, তাহার চারিদিকে ঝালরের মত পর্দা। কার্পেটের দোলায়
দুলিতে দুলিতে নেপাল রাজ্যে প্রবেশ করিলাম। প্রায় এক মাইল
দূরবর্তী বীরগঞ্জের হাসপাতালে আসিয়া পোঁছিলাম। সেই খানেই
রাত্রি বাস করা গেল। পর দিন প্রাতে আহারাদি করিয়া পূনরায়
কার্পেটে আরােহণ করিয়া যাত্রা করিলাম। বীরগঞ্জে আসিতে
আসিতে পথে মহারাজার শীতকালের আবাস সুন্দর প্রাসাদ
দেখিলাম। বীরগঞ্জ একটী ক্ষুদ্র সহর। বীরগঞ্জ ছাড়িয়া বিশাল
প্রান্তরে আসিয়া পড়িলাম। আজ আমাদিগকে প্রায় দশ ক্রোশ
যাইতে হইবে। প্রান্তর ছাড়িয়া দিবা শেষে এক জঙ্গলের
ভিতর প্রবেশ করিলাম। শুনিলাম চারিক্রোশ ক্রমাগত এই
জঙ্গলের ভিতর দিয়া আমাদের গন্তব্যস্থানে পৌছিতে হইবে।
জঙ্গলের ভিতর এক এক ক্রোশ অন্তর একটী জলের কল
আছে। ভূতপূৰ্ব রাজমন্ত্রী মহারাজ দেবশামসের স্বর্গীয়া
পত্নী দেবী কৰ্ম্মকুমারীর স্মরণাৰ্থ এই সকল জলধারা নির্মাণ
করিয়াছেন। প্রত্যেক জলধারার উপর দেবনাগরী অক্ষরে
সেই স্বর্গবাসিনীর নাম লিখিত আছে।
ক্লান্ত পথিক দুই
হস্তে অমৃতশীতল জলধারা পান করে, আর মনে মনে
সেই সাধ্বীকে সহস্ৰ আশীৰ্বাদ করিয়া থাকে। আমদের
বাহকগণও এখানে জলপান করিয়া শীতল হইল। জনমানবহীন
শ্বপদসঙ্কুল জঙ্গলের ভিতর, রজনী সমাগত হইল। সঙ্গে
।

৪ নেপালে বঙ্গনারী। । । মশাল, লণ্ঠন কিম্বা অন্য কোন আলাে নাই। ঝিল্লীনিনাদিত গভীর অরণ্যে নিঃশব্দে ব্যাকুল চিত্তে কয়টী প্রাণী যাইতেছি। আমাদের মন ত্রাসে উৎকণ্ঠিত। শিশুসন্তানগণ ক্ষুধা এবং নিদ্রায় আকুল। আবার কোথা হইতে মাছির ন্যায় কি গায়ে পড়িতেছে। তাহার দংশনে সকলে আরও অস্থির হইয়া পড়িল। শ্রাবণ মাসে এতদঞ্চল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হয়। আমরা ব্যাকুল চিত্তে ক্রমে রাত্রি ৯টার সময় বিছাকরির পান্থনিবাসে পৌছিয়া নিশ্চিন্ত হইলাম। দোতলায় প্রশস্ত গৃহে বেঞ্চ টেবিল এবং শয়নের জন্য খাট রহিয়াছে দেখিলাম। তখনি শয্যা প্রস্তুত হইল। শিশুগণ শয়ন করিল, এবং সমস্ত রাত্রি নিদ্রায় অতিবাহিত করিল। আমরা দুইটী অন্নের প্রত্যাশায় রাত্রি ১০|| ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া অর্ধ সিদ্ধ দুটী ভাত খাইয়া শয়ন করিলাম । পর দিন প্রাতে আহার করিয়াই পুনরায় যাত্রা করিলাম। বিছাকরি হইতে বরাবর একটা পার্বত্য নদীর বারিশূন্য তল ধরিয়া চলিলাম। কেবল বালুকা এবং নুড়ি, মধ্যে মধ্যে ঝির ঝির করিয়া জল আসিতেছে। কাটমণ্ডু যাইবার পথ বরাবর প্রায় এই প্রকার। হয় নদীর মধ্য দিয়া না হয় নদীর ধার দিয়া যাইতে হয়। মধ্যে মধ্যে বাহকগণ আমাদের ' স্কন্ধে লইয়াই খরস্রোতা নদীতে অবতরণ করিয়া পার হইয়া যায়। বিছাকরি হইতে তিন ক্রোশ মাত্র দূরে চুরিয়ার পান্থনিবাসে আমরা আশ্রয় লইলাম। চুরিয়ার পান্থশালাটী যদিও বিছাকরির ন্যায় প্রশস্ত নয়, কিন্তু স্থানী নির্জন এবং সুন্দর। পর দিন প্রাতে আহারাদি নেপাল যাত্রা। ১ । সম্পন্ন করিয়া পুনরায় কার্পেটাৰােহণ। আজিকার পথে দৃশ্য বড় সুন্দর। ক্রমে যত যাইতেছি দুই ধারে গভীর জঙ্গলাবৃত পৰ্বতসকল অটল অচল হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। চারি দিক নিস্তব্ধ। দিবাভাগেই ঝিলিকাগণ ঝি ঝি শব্দ করিতেছে। মাঝে মাঝে পৰ্ব্বতের গাত্র বহিয়া ঝর ঝর করিয়া ঝরণার জল পড়িতেছে। প্রকৃতির কি স্তব্ধ সুগম্ভীর ভাব! চারি দিকের সুন্দর শান্ত সৌন্দর্য্যে আমাদের প্রাণ বিস্ময়ে ও পুলকে স্তব্ধ হইয়া গেল। কোথাও দেখি পাৰ্বত নদী:কল কল ছল ছল করিয়া যেন লাফাইতে লাফাইতে নামিয়া আসিতেছে। কি বিক্রম ! কি গর্জন! জল অতি স্বাদু, অতি নিৰ্ম্মল, অত্যন্ত শীতল। পথে কেবল পৰ্ব্বত এবং জঙ্গল। মধ্যে মধ্যে কেবল দুই এক ঘর বসতি দেখিলাম । বাহকগণ সেখানে আহার ও বিশ্রাম করে। পথে হেটুরা নেবুয়াটার প্রভৃতি স্থানে পান্থনিবাস আছে বটে, কিন্তু বর্ষাকালে সেখানে “আউল” নামে ভীষণ ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব হয়। এক বার তাহার কবলে পড়িলে আর রক্ষা নাই। আমরা এ সকল পান্থনিবাসে পদার্পণ করিলাম না। তৃতীয় দিন প্রায় ৯ক্রোশ পার্বত্য পথ অতিক্রম করিয়া ভীমফেদীর পান্থনিবাসে প্রায় সন্ধ্যার সময়ে উপনীত হইলাম। এখানে বিস্তর যাত্রীর সমাগম দেখিলাম। দ্বিতল গৃছে আশ্রয় লইলাম বটে কিন্তু স্বচ্ছন্দে বাস করিবার কোন বন্দোবস্ত নাই। আহারের ক্লেশ পথে যথেষ্ট। মােটা চিড়া ও মােটা চাউল ভিন্ন কিছুই মিলে না। সঙ্গে প্রচুর অাহ্বারের সংস্থান করিয়া না আসিলে বিলক্ষণ = ৬ নেপালে বঙ্গনারী। আহারের ক্লেশ পাইতে হয়। আমাদের সঙ্গে ভৃত্য ও পাচক ছিল বটে, কিন্তু পূর্বের অভিজ্ঞতা না থাকায় সঙ্গে যথেষ্ট আহাৰ্য আনা হয় নাই। সুতরাং সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ অসুবিধা ভােগ করিতে হইয়াছিল। ভীমফেদী উপত্যকার ন্যায়, চতুর্দিকে পৰ্বতমালা বেষ্টিত। পরদিন প্রত্যুষে আহারাদির কোন চেষ্টাই না করিয়া শিশুসন্তানদিগের জন্য মহিষের দুগ্ধের সংস্থান করিয়া আমরা যাত্রা করিলাম। পথের কষ্টে নাকাল হইয়া আজ আমাদের প্রতিজ্ঞা কাটমণ্ডুতে পৌছিতেই হইবে। ভীমফেদী হইতে বাহির হইয়া অতি অল্পক্ষণের মধ্যেই পৰ্বতে উঠিতে আরম্ভ করিলাম। ওঃ সে কি ভয়ানক পথ ! যেন সােজা ভাবে উচু হইয়া উঠিতেছে। পথে আছে গাছ পালা না আছে আশ্রয়। পথও কি তেমনি ? পা দিবা মাত্র নােড়া নুড়ি গড়াইয়া পড়িতেছে। কেবল ক্ষণে ক্ষণে ভয় হইতেছে বাহকগণ এইবার বুঝি আমাদের স্কন্ধে লইয়া গড়াইয়া তলায় পড়িয়া যায়। বাহকগণও গঘৰ্ম্ম, অতি কষ্টে সাবধানে উঠিতেছে আর মুখে “নারাণ” নারাণ” বলিতেছে। নিশ্চিত, নেপালী বাহক ভিন্ন সে পথে আর কেহ ভার বহন করিয়া যাইতে পারে না। পথ এমন সােজা যে আমাদের কার্পেট হইতে পড়িয়া যাইবার উপক্রম হইতেছে। ক্রোড়ের শিশুকে এক হস্তে চাপিয়া ধরিয়া আর এক হস্তে কার্পেট চাপিয়া ধরিয়াছি, আর বারংবার সকলকে সাবধান করিয়া দিতে হইতেছে। এই ভীষণ খাড়াই যেন শেষ হয় না। প্রায় ২৩০০ ফুট এই ভাবে উঠিলাম, ভয়ে যেন হৃৎপিণ্ডের শােণিত খর বেগে চলিতে চলিতে সহসা বন্ধ নেপালে বঙ্গনারী। হইয়া আসিল। এই ভাবে অতি কষ্টে শিখরে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। বাহকগণ কার্পেট নামাইয়া হাঁপাইতে লাগিল ; আমরা বাঁচিলাম। এই স্থানের নাম চিসাপাণিগড়ি। এখানে গড় এবং সৈন্য আছে। এই পথে শত্রুর আগমন প্রতিরােধ করিবার জন্য সমুদয় ব্যবস্থা আছে। স্থানটী খুব উচ্চ এবং শীতল। চিসাপাণিগড়ি হইতে নীচের পথে ভীমফেদীর উপত্যকা দেখা যায়। গড়িতে পৌছিয়া দেখিলাম আমাদের জন্য কাটম হইতে লােক আসিয়াছে। তাহাদের সঙ্গে ফল খাদ্যদ্রব্য ছিল। উহা আনিয়া শিশুগণ ও বাহকগণ সকলে আনন্দে ভােজন করিল। আজ আমাদের পথের শেষ দিন, আজ পথ যেরূপ কঠিন, দূরত্বও তদ্রুপ। গড়ি হইতে ক্ৰমে নামিয়া কুলিখানি নামক সুন্দর স্থানে আসিলাম। সেখানে খরস্রোতে গর্জন করিতে করিতে এক পাৰ্বত্য নদী নামিয়া যাইতেছে। তাহার উপর সুন্দর পুল। পুলের উপর দিয়া সকলে পদব্রজে পর পারে উপস্থিত হইলাম। সেখানে অতি সুরম্য পান্থ- নিবাস রহিয়াছে, কিন্তু আমাদের সেদিন বিশ্রামের সময় নাই। আজ ক্রমাগত পাহাড় ভাঙ্গা। একটা হইতে অন্যটা—সেটা হইতে আর একটা। এই প্রকারে ক্রমাগত তিনটা উচ্চ উচ্চ পাহাড় অতিক্রম করিলাম। ক্রমে সূৰ্যাস্ত হইল। কিন্তু আমাদের গন্তব্যস্থান বহুদূরে। আমরা চন্দ্রগিরি নামক শেষ পাহাড়ে নামিতে লাগিলাম। সে কেবলই নামা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যায় অবতরণ করিতেছি। চন্দ্রগিরি হইতে কাটমণ্ডুর উপত্যকা সন্ধ্যার অন্ধকারে অস্পষ্ট দেখা যাইতে লাগিল। ক্রমে অন্ধকার ঘনীভূত হইয়া আমাদের =..

-
নেপালে বঙ্গনারী।
দর্শনলালসা চরিতার্থ হইতে দিল না। চন্দ্রগিরি হইতে অবতরণ
করিয়া আমরা সমতলে পদার্পণ করিলাম। সে স্থানের নাম
থানকোট। সেখানে জনসমাগম এবং কাষ্ঠনির্মিত গৃহ দেখিয়া,
মনে হইল এইবার বুঝি কাটতে পৌছিলাম। কিন্তু থানকোট
হইতে অন্ধকারে তিন ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া প্রায় রাত্রি
৯টার সময় আমরা কাটমণ্ডু সহরে প্রবেশ করিলাম। কেবল
দু'ধারে গীতবাদ্যের শব্দ কর্ণে আসিতে আগিল। তখন আমরা
এত পরিশ্রান্ত যে পর্দা সরাইয়া—দুই ধারের দৃশ্য দেখিতে ইচ্ছা
হইল না। ইহা ভিন্ন এ সহরে * কলিকাতার ন্যায় পথপার্শ্বে
আলােক নাই, সব অন্ধকার—কেবল গীত বাদ্য কর্ণে আসিতে
লাগিল। বাসায় আসিয়া পৌছিতে প্রায় ১০টা বাজিয়া গেল।
আমরা সুসজ্জিত আলােকিত গৃহ এবং বন্ধুর পরিচিত মুখখানি
দেখিয়া যেন অবসন্ন দেহে প্রাণ পাইলাম।
এখন কাটমণ্ডতে বৈদ্যুতিক আলাের ব্যবস্থা হইয়াছে। সহর এখন
উজ্জ্বল।

"
হনুমানঢোকা ও
কাটমও সহর

No text on this page.

কাটমণ্ড নেপাল হিমালয়ের ক্রোড়স্থিত এক বিস্তীর্ণ পার্বত্য প্রদেশ। এই যে বিস্তীর্ণ প্রদেশ, ইহা স্বাধীন হিন্দু রাজার রাজ্য। একশত পঞ্চবিংশতি বৎসর পূর্বে এ দেশ বর্তমান হিন্দু রাজার অধীন ছিল না। তখন নেওয়ার নামধেয় বৌদ্ধধর্মাবলম্বী এক মিশ্রজাতি এদেশে রাজত্ব করিত। ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে গুবংশীয়, পৃথ্বীনারায়ণ নামে জনৈক হিন্দু নরপতি নেওয়ার রাজাদিগকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া সমুদয় নেপালে রাজ্য বিস্তার করেন। সম্প্রতি নেপালরাজ পৃথ্বীবীর বিক্রম শাহ গতানু হইয়াছেন। নেপালের বর্তমান নরপতি মহারাজাধিরাজ ত্রিভূবন বিক্রম ইহারই শিশুপুত্র। মোগলশাসন সময়ের মহারাষ্ট্রের ন্যায় বর্তমান নেপালেও মন্ত্রিরাজত্ব প্রচলিত। কাটম নেপালের রাজধানী। ইহা সমুদ্রতল হইতে ৪,৫০০ ফুট উচ্চ। এক বিস্তীর্ণ উপত্যকার এক অংশে কাটমণ্ডু সহর অবস্থিত। পূর্ব পশ্চিমে এই উপত্যকার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ মাইল হইবে ।—প্রস্থে, উত্তর দক্ষিণে প্রায় ১৫ মাইল হইবে। কাটমণ্ডু আগান কালে চন্দ্রগিরির শিখর । দেশ হইতে এই বিস্তীর্ণ উপত্যকাটী চিত্রপটের ন্যায় চক্ষের সম্মুখে উদঘাটিত হয়। ইহা চতুর্দিকে উন্নত পৰ্বতমালায় অবরুদ্ধ, কেবল দক্ষিণে বামতি নদীর নির্গমন স্থলে এক বিচ্ছেদ আছে। এইরূপ কিম্বদন্তী আছে, নেপালে বঙ্গনারী অতি পুরাকালে ইহা নাগবাস নামে এক প্রকাণ্ড পার্বত্য হ্রদ ছিল। মানজুশ্রী বােধিসত্ত্ব নামে চীন দেশ হইতে সমাগত এক মহাত্মা স্বীয় তরবারির আঘাতে পৰ্বত ভেদ করিয়া ইহার বারিরাশি নির্গমের ব্যবস্থা করিয়া দেন। তখন হইতে ইহা মনুষ্যের আবাসের উপযােগী হইয়াছে। এই কিম্বদন্তী অনেক কারণে নিতান্ত অমূলক বলিয়া মনে হয় না। কারণ এই উপত্যকা একেবারে সমতল। এবং কঙ্করশূন্য নদীতলের ন্যায় পল্ললময়। যদি এখনও কোন উপায়ে বাঘমতি নদীর বারি নির্গমের পথ একেবারে বন্ধ করিয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে এই রমণীয় উপত্যকা ভবিষ্যতে পুনরায় পার্বত্য হ্রদে পরিণত হইতে পারে। কাটমণ্ডু সহর পূর্বে কান্তিপুর নামে অভিহিত হইত। ৭২৩ খৃষ্টাব্দে রাজ গুণরাম দেব এই সহর প্রতিষ্ঠা করেন। একদা তিনি মহালক্ষ্মীর পূজা করিতেছিলেন এমন সময়ে স্বপ্নে দেবী তাহাকে দর্শন দিয়া বলিলেন “বাঘমতি এবং বিষ্ণুমতি নদীর সঙ্গম স্থলে এক সহর নির্মাণ করিতে হইবে। পুরাকালে তথায় নীমুনি তপস্যা করিয়াছিলেন। এই নূতন সহরের আকৃতি দেবীর খঙ্গের ন্যায় হইবে। এ সহরে প্রতিদিন লক্ষটাকার কারবার হইবে।” শুভলগ্নে রাজা পাটন হইতে কান্তিপুরে রাজধানী পরিবর্তন করিলেন। সহরে ১৮০০০ হাজার গৃহ নিৰ্ম্মিত হইল। লক্ষী প্রতিজ্ঞা করিলেন যতদিন না সহরে লক্ষটাকার কারবার হয় ততদিন তিনি এই সহরে অধিষ্ঠাত্রী দেবী হইয়া অবস্থিতি করিবেন। বর্তমান সময়ে কান্তিপুর নামের পরিবর্তে ইহা কাটমণ্ডু নামে কাটমুণ্ড। অভিহিত হইয়া থাকে। সহরের মধ্যভাগে পুরাতন রাজপ্রাসাদের সন্নিকটেই কাটমণ্ডু নামে এক কাষ্ঠের গৃহ অদ্যাবধি বিদ্যমান আছে। ১৬৯৬ খৃষ্টাব্দে রাজা লক্ষিণা সিংহ মল্ল ইহা ফকীরদিগের আবাসের জন্য নির্মিত করিয়াছিলেন। এই কাটমণ্ডু অর্থাৎ কাষ্ঠময় নিকেতন হইতে কাটমণ্ডু নামের উৎপত্তি। যদিও এই কাষ্ঠময় নিকেতন অত্যন্ত পুরাতন হইয়াছে, তথাপি ইহা এখনও ফকীরদিগের আশ্রয়রূপে দণ্ডায়মান আছে। কাটমণ্ডু বৰ্তমান গুর্খা রাজবংশের রাজধানী বটে, কিন্তু নেওয়ার রাজাদিগের রাজত্ব কালে পাটন, ভাতগাও, কীৰ্ত্তিপুর প্রভৃতি প্রধান সহর ছিল। এই সকল সহর পূৰ্ব্বে প্রাচীর বেষ্ঠিত ছিল, এবং ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া সহরে প্রবেশের পথ ছিল। সচরাচর এই সকল দ্বার উন্মুক্ত থাকিত, কেবল যুদ্ধবিগ্রহ বা অন্য কোনরূপ বিশেষ কারণে রুদ্ধ হইত। বর্তমান সময়ে প্রাচীর বা প্রবেশ দ্বার সকলের কোন চিহ্ন নাই। গুখা রাজত্বকালে তাহা ক্রমে লােপ পাইয়াছে। এইরূপে কাটমণ্ডু সহরে প্রায় ৩২টী প্রবেশদ্বার ছিল। যদিও প্রাচীর নাই কিন্তু সহরের সীমা নির্দিষ্ট আছে। এই সীমার মধ্যে কোন নীচজাতীয় ব্যক্তির বাস করিবার অধিকার এবং আরও অনেক নিয়ম অদ্যবধি প্রচলিত আছে। বাঘমতি এবং তাহার শাখা এই কাটমণ্ডু সহর বেষ্টন করিয়া প্রবাহিত হইয়াছে। সহরের ঠিক মধ্য ভাগে নেওয়ার রাজা- দিগের পুরাতন প্রাসাদ হনুমান ঢােকা অদ্যাবধি দণ্ডায়মান আছে। বৰ্তমান সময়েও এই বিচিত্র প্রাসাদমালা হনুমানটোকা নামেই অভিহিত হইয়া থাকে। সিংহদ্বারের সম্মুখে হনুমানের এক প্রকাণ্ড নাই।

নেপালে নারী । বিগ্রহ দণ্ডায়মান আছে। ঢােকা অর্থাৎ দ্বার। এই বিচিত্র প্রাসাদের দ্বার স্বর্ণনির্মিত। বাহির হইতে দেখিলে ইহাকে সৈন্যবাস বা কারাগৃহ বলিয়া মনে হয়। ইহার গঠন প্রণালী: বর্তমান রুচিসঙ্গত নয়। বর্তমান নরপতি এই প্রাসাদে অবস্থিতি করেন । হনুমানঢোকার সম্মুখে এবং চতুর্দিকে নানা সুদৃশ্য দেবমন্দির, স্তম্ভ প্রভৃতি পুরাকীর্তি সকল বিদ্যমান আছে। বস্তুতঃ এই স্থানের, দৃশ্যটী অতি মনােরম ; হনুমানঢােকার অদূরে ভৈরবের এক প্রস্তর- নিৰ্ম্মিত বীভৎস প্রতিমূর্তি আছে। তাহার চক্ষু গােলাকার, দন্ত- পংক্তি ভীষণ ভাবে প্রকটিত। হনুমানােকার প্রায় ৪০০ হাত দূরে কোট নামে এক নব্য ধরণের গৃহ দেখিতে পাওয়া যায়। বাহাক- তিতে ইহার কোন বিশেষত্ব নাই বটে কিন্তু বর্তমান ইতিহাসে ইহা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দের ১৪ই সেপ্টেম্বর এখানে এক ভীষণ, হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়। সেই দিনই সুপ্রসিদ্ধ জঙ্গ- বাহাদুরের অভূতপূর্ব গৌরবের দ্বার উদঘাটিত হইয়া যায়। তাই আজও কোটের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে রক্তাক্ত স্মৃতি হৃদয়কে ব্যথিত করিয়া তােলে। সহরের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ বাজার ইন্দ্রচক। ইন্দ্রচক কলিকাতার বড়বাজার বলিয়া ভ্রম হয়। বিলাতী পণ্যদ্রব্যে ইহা সুশােভিত। সহরের রাস্তা সকল অপ্রশস্ত এবং প্রস্তরনিৰ্ম্মিত এবং অধিকাংশ স্থান অত্যন্ত অপরিষ্কার। দুই পার্শ্বে উন্নত দ্বিতল গৃহ সকল দেখিতে পাওয়া যায়। এ সকল, গৃহ্ন আমাদের দেশের গৃহের ন্যায়, নহে। কারুকার্যখচিত কাষ্ঠের বারান্দা প্রত্যেক, গৃহের প্রধান সৌন্দৰ্য্য। গৃহ সকল ক্ষুদ্র,

সিংহ দরবার
xA
==*****
= =

No text on this page.

কাটমূখ। ১৩ অলােক শূন্য –গৰাক্ষ সকল ক্ষুদ্র ও বিচিত্র কারুকার্যে শােভাক্ত। বর্তমান সময়ে জনসাধারণের রুচির পরিবর্তন হইয়া এখন কাঁটম সহরে কলিকাতার ন্যায় প্রকাণ্ড সুশশাভিত অট্টালিকা সকল নির্মিত হইতেছে। সহরের বাহিরে উত্তরপূর্ব দিকে এক প্রকাণ্ড ময়দান আছে। উহা দৈর্ঘ্যে প্রায় এক মাইল হইবে এবং প্রস্থৈ প্রায় তাহার এক তৃতীয়াংশ। এই স্থানে সর্বদাই কাবাজ খেলা হয়। ইহাকে টুনিখিল বলে। ইহা অনেকটা কলিকাতার গড়ের মাঠের ন্যায়। টুনিলিখের মধ্যে তিনটী মুর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। (১) জঙ্গবাহাদুর (২) বীর শামসের (৩) ভীমসেন থাপা। টুনিখিলের দক্ষিণে প্রকৃত কাটমণ্ডু সহর। বর্তমান সময়ে টুনিখিলের চতুর্দিকে অনেক সুদৃশ্য প্রাসাদ এবং অট্টালিকা সকল নির্মিত হইয়াছে। এই সকল অট্টালিকা সম্পূর্ণ নূতন ধরণের। এই প্রশস্ত ময়দানের পূর্বদক্ষিণ কোণে বর্তমান প্রধান মন্ত্রী মহারাজ চন্দ্ৰশামসের বাহাদুরের সিংহ দরবার নামে শ্বেত সৌধমালা দণ্ডায়মান থাকিয়া শােভা বিস্তার করিতেছে। মহারাজ চন্দ্ৰশামসের সাহেবের প্রাসাদের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে ভূতপূৰ্ব্ব প্রধান মন্ত্রী সুপ্রসিদ্ধ জঙ্গবাহাদুর মহাশয়ের থাপাথলির দরবার দেখিতে পাওয়া যায়। বাঘমতির অপর তীর হইতে এই সকল প্রাসাদমালা কাটমণ্ডু প্রবেশ কালে দর্শকের নয়নগােচর হয়। এই স্থানে সম্প্রতি একটী নূতন পুল নির্মিত হইয়াছে। বীরসামসের মহারাজার সময়ে কাটমণ্ডু সহরের বিশেষ শ্রীবৃদ্বি সাধিত হইয়াছে।

১৪ নেপালে বঙ্গনারী। টুনিখিলের পশ্চিম দিকে তাঁহারই প্রতিষ্ঠিত বীর হাসপাতাল ও দরবার স্কুল শােভা পাইতেছে। উত্তরে রাণী পুকুর এবং মহারাজ বীরশামসের সাহেবের অতি সুশােভন লাল দরবার নামক প্রাসাদ। রাণীপুকুরের মধ্যে একটী দেবঘন্দির আছে। এই সুন্দর সরােবরটী প্রায় ৪০০ বৎসর পূর্বে রাজা প্রতাপমল্ল পুত্রশােক- কাতরা পত্নীর সান্ত্বনার জন্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন; এবং ভারতবর্যের সমুদায় তীর্থ হইতে পবিত্র বারি আনিয়া ইহাতে রক্ষিত হইয়াছিল। অদ্যাবধি এই সরােবরের দক্ষিণে এক প্রকাণ্ড প্রস্তরানৰ্মিত হস্তীর উপর প্রতাপমল্ল এবং তাহার রাণীর প্রতিমূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। পুষ্করিণীর পূর্ব পারে বীর লাইব্রেরী এব ঘটিকাগৃহ আছে। ইহার বীরশামসের মহারাজার কীৰ্ত্তি। তিনি কাটমণ্ডু সহরে ঢেণ এবং জলের কল নিৰ্মাণ করিয়া সহরবাসীর প্রভূত উপকার করিয়াঝেন। তিনি নানা উপায়ে কাটম সহরের শ্রীবৃদ্ধি সাধন করিয়া গিয়াছেন। মহারাজ চন্দ্র শমসের সম্প্রতি বৈদ্যুতিক আলাের ব্যাবস্থা করিয়া সহরের একটী বিশেষ অভাব মােচন করিয়াছেন। বীরশামসের মহারাজার লাল দরবারের উত্তরে রাণা পরিবারস্থ অনেক সুপ্রসিদ্ধ ব্যক্তির সুদৃশ্য প্রাসাদ সকল দেখিতে পাওয়া যায়। আরও উত্তরে বর্তমান নরপতি মহারাজাধিরাজ ত্রিভুবন বিক্রম শাহের রাজভবন। তিনি এখন হনুমানঢােকায় অবস্থিতি করেন । সহরের একেবারে উত্তরে পর্বতের পাদদেশে ব্রিটিশ রেসিডেন্সি।

কাটমুণ্ড। টুনিখিলের পশ্চিমদক্ষিণে কলিকাতার অকটারলনি মনুমেন্টের অনুরূপ একটী মনুমেন্ট দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা সুবিখ্যাত রাজমন্ত্রী ভীমসেন থাপা নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন। মনুমেন্টের নিকটেই তাহার বাঘ দরবার নামে প্রাসাদ অদ্যাবধি আছে। টুনি- খিলের পশ্চিম দিকে বীর হাসপাতালের সন্নিকটে আর একটি দ্রষ্টব্য স্থান আছে। ইহা মঙ্কালের মন্দির। স্বয়ং রাণা মহারাজ ইহার সম্মুখ দিয়া কখন ইহাকে দর্শন না করিয়া গমন করেন না। মন্দিরটী অতি পুরাতন। সম্ভবতঃ বৌদ্ধগণ ইহা স্থাপন করেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে বৌদ্ধ হিন্দু সকলেই ইহাকে আপনার করিয়া লইয়াছেন। ইহার প্রভূত সম্পত্তি এবং বিস্তর উপাসক। বিগত পঁচিশ বৎসরের মধ্যে টুনিখিলের চতুর্দিকের হাবলীর দ্বারা সহরের সৌন্দৰ্য্য বিশেষরূপে বর্ধিত হইয়াছে। আবহমান কাল হইতে টুনিখিল সৈন্যদিগের জন্য বিশেষ ভাবে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে। প্রতিদিন সূর্যোদয় হইতে না হইতে এই স্থানে রণবাদ্য এবং কাবাজ খেলার সময় সৈন্যদিগের অস্ত্রের ঝণ ঝনা শ্রুত হইয়া থাকে। কারণ সৈনিক বিভাগই নেপাল রাজ্যের সমুদায় অর্থ সামর্থ্য গ্রাস করিয়া আসিতেছে। কিন্তু ইহাদিগের বাহকৃতি চাল চলন কোনরূপ বীরত্ব কিম্বা গৌরব ব্যঞ্জক নহে। কাটমণ্ডু সহরের প্রাসাদ সকলের সৌন্দৰ্য্য অপেক্ষা ইহার প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য অধিকতর মনােহারী। দুর্ভেদ্য প্রকারের ন্যায় চতুর্দিকের সুনীল উন্নত পৰ্বতমালা উত্তর সীমায় দিগন্তপ্রসারিত হিমানীমণ্ডিত শিখর- ১৬ নেপালের অধিবাসীগণ। শ্রেণী, উজ্জ্বল আলােক মণ্ডিত সুনীল 'নভােমণ্ডল, শ্যামল পুষ্পিত বৃক্ষলতা, হৃদয় মন বিমুগ্ধ করিয়া রাখে। বাতায়ন উন্মুক্ত করিয়া এই সকল অপূৰ্ব শােভা দেখিলে হৃদয় আনন্দে উথলিয়া উঠে। তখন মনে হয় পুরাণে যে কৈলাসপুরীর বর্ণনা আছে তাহা বুঝি এই! হিমাচলের • অঙ্গে অঙ্গে এত সৌন্দৰ্যও বিধাতা ঢালিয়া দিয়াছেন। দেখিয়া দেখিয়া নয়ন পরিতৃপ্ত হয় না। দেখি আর ভাবি, কবি যথার্থই গাহিয়াছেনঃ- তুমি ধন্য ধন্য হে ;-ধন্য তব প্রেম ; ধন্য তােমার জগত রচনা।

编, বীর হাসপাতাল।

No text on this page.

নেপালের অধিবাসীগণ :0: নেপালের আয়তনের তুলনায় ইহার অধিবাসী বিভিন্ন জাতি সমুদায়ের সংখ্যা অত্যন্ত অধিক বলিয়া মনে হয়। একটী দেশে এরূপ বিভিন্ন জাতির সমাবেশ অতি অল্প স্থলেই দেখিতে পাওয়া যায়। বিজয়ী গুখগণ বর্তমান নেপালের প্রধান অধিবাসী হইলেও জনসংখ্যায় পূর্বতন অধিবাসী নেওয়ারগণই অধিক। গুর্খা এবং নেওয়ার ভিন্ন মগর, গুরুম, লিম্বু (Limbu) কিরাটী, ভুটিয়া, এবং লেপচা গণও (Lepcha ), এই প্রদেশের অধিবাসী। ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দে যখন পৃথ্বীনারায়ণ নেপাল রাজ্য জয় করেন তখন হইতেই গুখগণ এদেশে সৰ্ব্বতােভাবে আধিপত্য স্থাপন করিয়াছে। গুগণ হিন্দু এবং রাজপুতবংশােদ্ভব ; মুসলমান- দিগের অত্যাচারে ইহারা জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া ক্রমশঃ কাটমঞ্জুর বিশ ক্রোশ পশ্চিমে গােরখালি নামক পার্বত্য প্রদেশে আসিয়া বাস করিতে থাকে। গােরখালি হইতে ইহাদের গুখ নামের উদ্ভব। বর্তমান রাজবংশ, প্রধান রাজ-পুরুষগণ, এদেশের সমুদয় প্রধান ব্যক্তি গুখাবংশসস্তৃত। সৈনিক বিভাগের অধিকাংশ সৈনিক এবং প্রধান সৈনিক কর্মচারিগণ সকলেই গুখ। বিজয়ী নেপালে বঙ্গনারী। গুর্থাগণের চরণে, ধন, মান, সম্পদ, সকলই উৎসর্গীকৃত হইয়াছে তাহাতে আর বিচিত্র কি ? অধিকাংশ গুথা দেখিতে সুশ্রী। নেপালের উচ্চবংশের মহিলাগণ, দেখিতে অত্যন্ত সুন্দরী। ব্রাহ্মণদিগের আকৃতির পার্থক্য সহজেই বুঝিতে পারা যায়। ব্রাহ্মণগণ অপেক্ষাকৃত কৃশ, ক্ষিপ্র, এবং আৰ্য্যলক্ষণ যুক্ত। নেপালে যেমন বিচিত্র জাতির অধিবাস, কাটম ও সহরেও সেইরূপ বিচিত্র- মূৰ্তি মানবের সমাগম দেখিতে পাওয়া যায় । কেহ বা গৌরকান্তি দীর্ঘাকৃতি আৰ্য সন্তানের ন্যায়, কেহ বা বলিষ্ঠ দৃঢ় নাতিল নাতি- দীর্ঘ পীতবর্ণ মঙ্গোলীয় বংশােদ্ভব অনুমান হয়। আকৃতি এবং বর্ণের বৈচিত্র দেখিলে বিস্মিত হইতে হয়। কেহ বা উজ্জ্বল গৌরকান্তি, কেহ বা শ্যাম, কেহ বা কৃষ্ণবর্ণ। তবে এ কথা বলিতে হয়, হিন্দুস্থানের কৃষ্ণকান্তি এখানে বিরল। অধিকাংশই অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল বর্ণের। কি গুখ কি নেওয়ার স্ত্রী পুরুষের পরিচ্ছদ সুদৃশ্য এবং সুসঙ্গত। বাহিক বেশ বিন্যাসে নেওয়ার এবং গুর্খার পার্থক্য কিছুই নাই। পাজামা, এবং চাপকানের ন্যায় এক প্রকার জামা, তার উপর সাদা কাপড়ের কোমরবন্ধ, মস্তকে একটী কাপড়ের টুপী, সাধারণ পুরুষদিগের বেশ এই প্রকার। তবে বর্তমান বিলাতী সভ্যতার সংস্পর্শে অনেকের দেহে বিলাতী ছাঁটের কোট দেখিতে পাওয়া যায়। অত্যন্ত দীন দরিদ্র পথের ভিখারীর পর্যন্ত সমুদয় দেহ বস্ত্রাবৃত। তাহা শত ছিন্ন ধূলিধূসরিত হউক, কিন্তু অর্ধনগ্ন দেহ এ দেশের রাজপথে নেপালের অধিবাসীগণ ১৯ কখনও দেখা যায় না। নারীগণ সচরাচর বিশ ত্রি হস্ত দীর্ঘ বিচিত্র বর্ণের শাড়ী পরিধান করে। হিন্দুস্থানী মেয়েদের ন্যায় সম্মুখে কেঁাচা, তাহা প্রায় ভূমিতে লুটাইয়া পড়ে, উদ্ধাঙ্গে জামা। প্রায় দশ হাত লম্বা নাতিপরিসর কাপড় কোমরে জড়াইয়া রাখে। শাড়ী থানা কোচা করিতেই যায়। দেহের উপরাদ্ধ আবরণের জন্য চাদর বা ওড়না ব্যবহৃত হয়। কুমারী, সধবা, কি বিধবা কাহারও মস্তকে অবরণ নাই। নেপালী রমণী- দিগের কেশ বিন্যাসের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আমরা সম্মুখে সিতি কাটিয়া পশ্চাতে বেনী রচনা করি ; তাহার পশ্চাতে সিতী কাটিয়া কাপালের উপরে এক দীর্ঘ বেনী রচনা করে এবং তাহার শেষ ভাগে রক্তিম বর্ণের সুতার গুচ্ছ বাধিয়া অাপনাদের সৌভাগ্য প্রকাশ করে। বিধবাগ লাল সুতা বাঁধে না। বেনীতে লাল সুতা বাধা ভিন্ন সংবাদের অর দুইটী লক্ষণ আছে। হাতে কাঁচের চুড়ি, গলায় পুথির মালা। এই দুইটাই কিন্তু বিলাতি জিনিষ। সংবাদিগের প্রধান লক্ষণ এই দুইটী বিলাতি জিনিষ কিরূপে হইল তাহা বুঝিতে পারা যায় না। রাজরাণী হইতে পথের ভিখারিণী পৰ্যন্ত হাতে কাচের চুড়ি গলায় পুথির মালা ; নেপালে এবম্বিধ লক্ষণযুক্ত রমণী দেখিলেই তাহাকে ভাগ্যবতী পতিযুক্তা স্থির করিতে হইবে। হিন্দুস্থানী কিংবা বাঙ্গালী রমণীর ন্যায় নেপালি নারীকূলের অঙ্গে অলঙ্কারের প্রাচুৰ্য্য নাই মস্তকে সােনার গহনা, কাণে বড় বড় পাশার ন্যায় সােনার ফুল, গলায় পদকের ন্যায় গহনা। চরণে পায়জর ভিন্ন অন্য কোন নেপালে বঙ্গনারী। অলঙ্কার দেখা যায় না। উপর হাতে কোন প্রকার অলঙ্কার কিম্বা নাসিকায় নথ এদেশে কখনও দেখি নাই। রাজ পরিবারের এবং ধনী গৃহস্থদের মহিলাগণ সাধারণ স্ত্রীলােকদিগের ন্যায় কেঁচা করিয়া বস্ত্র পরিধান করেন না। তাঁহারা পাজামা, জ্যাকেট এবং ওড়না ব্যবহার করেন। প্রায় বিশ গজ কাপড়ে একটী পাজামা প্রস্তুত হয়। পরিধানকালে তাহাকে পাজামা বলিয়া বােধ হয় না অনেকটা পেটিকোট কিম্বা বেলুনের ন্যায় দেখায়। বিধবা ভিন্ন কেহ শুভ্র বসন পরিধান করে না। উচ্চ পরিবারের রমণীগণ সৰ্ব্বদা জুতা মােজা পরিধান করিয়া থাকেন, তাহাতে হিন্দু আচারের কোন ব্যতিক্রম হয়না। পূজা কিম্বা আহারের সময় জুতা মােচন করিলেই চলে। নেপালী সুন্দরীগণ যখন বেশবিন্যাস করিয়া শকটারােহনে রাজপথে বাহির হন তখন তাহাদিগকে পরীর দল কিম্বা প্রজাপতির ঝাঁকের ন্যায় দেখায়। কজ্জল শােভিত আয়ত নয়ন, তদুপরি অঙ্কিত যুগল, রাজ পরিবারের মহিলাগণ স্বাভাবিক জ্বর পরিবর্তে কজ্জ্বল দ্বারা অঙ্কিত করেন। রক্তাভ অধরােষ্ঠগণ্ডস্থলবিশিষ্ট শুভ্রমূৰ্ত্তি রমণীকুল যখন বিচিত্র বর্ণের পরিচ্ছদে সজ্জিত হইয়া রাজপথে দর্শন দেন এবং তাহাদের সূক্ষ্ম ওড়না বায়ুভরে উড়িতে থাকে তখন যে তাহাদিগকে পরীর দল বলিয়া ভ্রম হইবে, তাহাতে আর বিচিত্র কি ? নেপালীরা গোঁড়া হিন্দু বটে কিন্তু আমাদের দেশের আচার ব্যবহারের সহিত, ইহাদের পার্থক্য অনেক। শীতপ্রধান দেশ বলিয়াই বোধ হয় এখানে অবগাহন এবং বস্ত্র পরিবর্তনের রীতি সেরূপ নেপালের অধিবাসীগণ। ২১ নাই। উচ্ছিষ্টের বিচার আমাদের দেশের ন্যায় নহে। এদিকে আবার রন্ধনশালায় বসিয়া না আহার করিলে চলে না। অন্ন রন্ধনগৃহের বাহিরে ভােজন করা বিধেয় নহে। এই জন্য ভিন্ন জাতীয়েরা এক রন্ধনশালায় আহার করিতে পারে না। পতি হয়ত ক্ষত্রিয়, পত্নী ভােট সুতা, এমন এমন স্থলে পতি পত্নীকে ভিন্ন ভিন্ন রন্ধনের ব্যবস্থা করিয়া ভিন্ন ভিন্ন রন্ধনশালায় আহার করিতে হয়। তাহাদের সন্তানেরা তৃতীয় রন্ধনশালায় আহার করে। একই গৃহে তিন সংসার। বলা বাহুল্য এখানে অনুলােয অসবর্ণ বিবাহ চলিত আছে। অন্য জাতীয় ব্যক্তিকে স্পর্শ করিয়া পান, তামাক কিম্বা জল পর্যন্ত পান করা চলে না। নেপালে আমাদের দেশের ন্যায় অবরােধ প্রথা নাই (নেপালের বাহিরে ইহারা অবরােধ প্রথা মানিয়া চলেন)। শ্বশুর শ্বাশুড়ী কিম্বা অন্য গুরুজনের নিকট বধুগণ অবলীলাক্রমে উপনীত হন ও প্রয়ােজনীয় বাক্যালাপ করেন। কি স্ত্রী কি পুরুষ পূজা অর্চনায় এবং ধর্মাচরণে দিবসের অনেক সময় ব্যয় করিয়া থাকেন। গুখগণ সাহসী সৈনিক বটে, কিন্তু পরিশ্রমী, কাৰ্যকুশল জাতি নহে। তাহারা কৃষি কিম্বা শিল্পকর্মে অনুরক্ত নহে। দেশের যতপ্রকার শ্রম- সাধ্য কিম্বা সূক্ষ্ম কাৰ্য আছে তাহার অধিকাংশই নেওয়ারদিগের দ্বারা সম্পন্ন হইয়া থাকে। কি স্বদেশে কি বিদেশে ব্যবসা বাণিজ্য অধিকাংশই তাহাদিগের হস্তে ; সুতরাং তাহাদিগের মধ্যে অনেক সম্পন্ন ব্যক্তি আছে। লেখা পড়ার কাৰ্যেও অধিকাংশ স্থলে নেওয়ারগণই নিযুক্ত। কাটমধু এবং তাহার নিকটস্থ । ২২. নেপালে বঙ্গনারী। স্থান সমূহে অধিকাংশ নেওয়ারের বাস। নেপালের অন্যান্য অংশে তাহাদিগের সংখ্যা তাদৃশ অধিক নহে। নেওয়ারগণই বস্তুতঃ নেপালের : আদিম অধিবাসী। তাহারা অধিকাংশই বৌদ্ধ- ধর্মাবলম্বী ছিল। বর্তমান সময়ে হিন্দুরাজার রাজ্যে নেপালে বৌদ্ধধর্মের চরম দুর্দশা উপস্থিত হইয়াছে। আর কিছুদিন পরে ইহার অস্তিত্ব থাকিবে কিনা সন্দেহ। নেওয়ারগণকে কিছুতেই অসভ্য জাতি বলা যায় না। অপেক্ষাকৃত শান্ত, কাৰ্যকুশল, শ্রমনিপুণ হইলেও সামাজিক ও নীতিতে এ জাতি গুখাদিগের তুলনায় হীন। জনসাধারণের ভিতর : বিবাহবন্ধন অত্যন্ত শিথিল। নেওয়ারণীদিগের ভিতর পাতিব্ৰত্য ধর্মের বিশেষ আদর আছে বলিয়া মনে হয় না। অবশ্য উচ্চ পরিবারের নেওয়ারদিগের সম্বন্ধে একথা খাটে না। নেওয়ারদিগের কন্যা বিবাহযােগ্যা হইলে পিতামাতা সচারাচর বিবাহ দিয়া থাকে বটে, কিন্তু একই পতির গৃহে তাহাদের জীবনের অবসান হয় না। সুযােগ এবং সুবিধা হইলে যে কোন কারণে তাহারা পত্যন্তর গ্রহণ করে। বিধবা হইলে ত কথাই নাই। ধরিতে গেলে নেওয়ারনীগণ কখনই বিধবা হয় না। অনেকস্থলে সহােদর ভ্রাতাগণের ভিন্ন ভিন্ন পিতা। গুখাদিগের বিবাহবন্ধন কিম্বা সামাজিক নীতি এরূপ শিথিল নহে; অন্ততঃ নারীগণ সম্বন্ধে। যথায় বহুবিবাহ এবং দাসত্ব প্রথা বিদ্যমান, তথায় পারিবারিক জীবনে ধৰ্ম্মনীতির উচ্চ আদর্শ অন্বেষণ করা বাতুলতা মাত্র। নেপালীদিগের ভিতর গুরুভক্তি এবং ব্রাহ্মণভক্তি অতিশয় প্রবল। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতা

নেপালের অধিবাসীগণ।
মাতা কিম্বা অন্যান্য গুরুজনের চরণ মস্তকে ধারণ
করিয়া
অভিবাদন করিতে হয়। ব্রাহ্মণগণের পদরজঃ গ্রহণের ব্যবস্থা
কিঞ্চিৎ হাস্যোদ্দীপক। ধুলিতে মস্তক রাখিয়া পদরজঃ গ্রহণের
পূৰ্বেই তাহার অর্ধপথে মস্তকে চরণ তুলিয়া দেন।
দেন। সকল
প্রকার ক্রিয়া কৰ্ম্মে বার ব্রতে ব্রাহ্মণদিগকে অগ্রে দান করিতে
প্রত্যেক সম্পন্ন গৃহস্থ কুল পুরােহিতকে যথেষ্ট সম্মান এবং
দক্ষিণ দিয়া থাকেন।
অত্যন্ত গুরুতর
অপরাধ করিলেও
ব্রাহ্মণের প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা নাই। মহারাজ জঙ্গ বাহাদুরের
সময় হইতে এদেশে সহমরণের ব্যবস্থা স্থগিত হইয়াছে।
তৎপূৰ্বে দলে দলে গুর্গারমণীগণ পতির চিতানলে প্রাণ বিসর্জন
করিতেন। বর্তমান সময়ে নেপালে সহমরণ প্রথা একেবারে
পূৰ্বে নেওয়ারদিগের ভিতরও সহমরণ প্রথা ছিল।
কাটমণ্ডু সহরবাসীগণ ভিন্ন, নেপালের জনসাধারণ কোন প্রকার
বিলাসিতার ধার ধারে না। ভারতবর্ষের পুরাকালের অবস্থা
যদি কিয়ৎ পরিমাণে হৃদয়ঙ্গম করিতে হয়, তাহা হইলে নেপালের
অবস্থা দেখিলেই বুঝিতে পারা যাইবে। নেপালী মাত্ৰকেই কৃষক
বলিলে অত্যুক্তি হয় না। প্রত্যেক গৃহস্থ বৎসরের চাউল তরকারী
আপনার ক্ষেত্রে উৎপাদন করে। ভারতবর্ষের ন্যায় নিরন্ন
ব্যক্তির বাহুল্য এখানে নাই। গৃহে গাভী কিম্বা মহিষ, ক্ষেত্রে
মােটা চাউল, মক্কা গম, শাক তরকারী, অধিকাংশের গৃহেই
আছে। প্রভাতে গাত্ৰাথান করিয়াই দরিদ্র এবং ধনীর গৃহে অগ্নি
প্রজ্জ্বলিত হয়। তৎপরে সকলে দিবসের কার্যে নিযুক্ত হয়।
নাই।

২৪ নেপালে বঙ্গনারী। কাৰ্য্য করিতে করিতে ক্ষুধা পাইলেই শুষ্ক চিড়া বা অন্য কিছু জলযােগ করে। দিবাশেষে পুনরায় অন্ন গ্রহণ করে। অনেক দরিদ্র লােকের দুইবেলা অন্ন জোটেনা। কিন্তু সহজলভ্য ফল মূল দ্বারা উদরজালা নিবারণ করে। প্ৰাৰ্বত্য প্রদেশ হইলে কি হয় এদেশের মৃত্তিকায় ফল শস্য প্রচুর জন্মে। ভারতবর্ষের কুত্রাপি এত প্রচুর এবং সুলভ ফল শস্য জন্মে কি না সন্দেহ। নেপালে শীত এবং গ্রীষ্মপ্রধান দেশের ফল ও শস্যের একত্র সমাবেশ দেখিতে পাওয়া যায় । এদেশের নরনারী উপবাস ক্লেশ সহ করিতে পারে না। বৎসরের মধ্যে এক দিন ( তীজব্রতে । নেপালী রমণীর নীরাম্বু উপবাস করিবার ব্যবস্থা আছে। সেই দিন তাহাদিগের নিকট এক বিষম দিন—সেই এক দিনের অনশন তাহাদিগের নিকট বিষম বলিয়া মনে হয়। বঙ্গদেশের বিধবাদিগকে দেখিলে না জানি হাদিগের কি বিস্ময়ের উদয় হয়। নেপালের জনসাধারণ অত্যন্ত মাংসাহার প্রিয়, তাহাদিগের নিকট ইহা অপেক্ষা ঈপ্সিত আহাৰ্য্য আর কিছু নাই। ভারতবাসীর অলীক সভ্যতা, অভাব, দারিদ্র, উপবাস, ইহাদিগের নিকট অজ্ঞাত। নেপালের প্রজাবৰ্গ দরিদ্র বটে, কিন্তু ইহারা অর্থহীন দরিদ্র ; নিরন্ন, অনাহারক্লিষ্ট, করভারে প্রপীড়িত, জীর্ণ দেহ, মনুষ্যকঙ্কাল নহে। ইহারা দৃঢ় বলিষ্ট, কর্মঠ ও প্রসন্নমূৰ্ত্তি। তবে অত্যন্ত অপরিষ্কার থাকে বলিয়া ইহাদিগকে দেখিলে প্রতির উদয় হয় না। গন্ধগােকুলের ন্যায় : তাহারা যেখানে যায় দুর্গন্ধ বিস্তার করে। পূর্বেই বলিয়াছি নেপালের অধিবাসীগণ। । নেপালী মাত্রেই কৃষক। ব্রাহ্মণ শূদ্র সকলেই আপন আপন ক্ষেত্রের কর্মে নিযুক্ত। জন সংখ্যার এক অংশ মাত্র সৈনিক বিভাগে নিযুক্ত। নেপালের পশ্চিমাংশে অধিকাংশ মগর এবং গুরুমের বাস। তাহারা অপেক্ষাকৃত খৰ্ব্ব ও অত্যন্ত বলিষ্ঠ ইহাদিগের আকৃতি মঙ্গোলীয় জাতির ন্যায়। ইহারা সৈনিক কাৰ্য্যের বিশেষ উপযুক্ত। নেপালের পূর্বাংশে লিম্বু ও কিরাতিদিগের বাস। তাহারাও সৈনিক সৈনিক বিভাগে নিযুক্ত। ইহারাও মঙ্গোলীয় বংশজ এবং অতি উত্তম শিকারী। সিকিমের নিকট লেপচাদিগের বাস। ইহারা দেখিতে ভূটিয়াদিগের ন্যায় কুৎসিত নহে। তিব্বত এবং নেপালের মধ্যপ্রদেশে ভূটিয়াদিগের বাস, ইহারা অত্যন্ত দৃঢ়কায়, বলিষ্ট ও শক্তিশালী। কিন্তু আকৃতি বড় কুৎসিৎ। দুরারােহ পাৰ্বত্য পথে ইহারা সর্বদাই ভারবহন কার্যে নিযুক্ত। ইহারা এক এক জন অবলীলাক্রমে দুই মণ ভার পিঠের উপর লইয়া যায়। নেপালে বিদেশী লােকেরা প্রায় বাস করে না। কাটমণ্ডুতে বাণিজ্য ব্যপদেশে কাশ্মীরী মুসলমান ও মাড়বারীগণ বাস করেন। শীতঋতুর সমাগম হইতে না হইতে তিব্বত হইতে দলে দলে লােক ছাগল ভেড়া কম্বল লবণ কস্তুরি প্রভৃতি লইয়া কাটমণ্ড, উপত্যকায় উপস্থিত হয়। শীতকালে এখানে বাস করিয়া বসন্তের সমাগমে দেশে প্রত্যাবর্তন করে। নেপালে জাতিগত ভাষাগত আকৃতিগত এবং ধৰ্ম্মগত বৈষম্য অত্যন্ত অধিক। গুখাগণ হিন্দু আৰ্য্যবংশ সস্তৃত। তাঁহাদিগের পাৰ্বতীয় ভাষা সংস্কৃত ভাষার অপভ্রংশ, দেবনাগরী অক্ষরে লিখিত হয়।

নেপালে বঙ্গনারী। এই হেতু ভারতবর্ষীয়েরা অল্পায়াসে এই ভাষা আয়ত্ত করিয়া লয়। নেয়ারগণ আৰ্য এবং মঙ্গোলীয় জাতির সংমিশ্রণে উৎপন্ন হইয়াছে। তাহাদের ভাষা তিব্বতের সহিত জ্ঞাতি সম্বন্ধ প্রকাশ করে। সে ভাষা আমাদের নিকট দুর্বোধ্য। পূৰ্বে নেওয়ারগণ অধিকাংশ বৌদ্ধ ছিল বটে, কিন্তু এখন হিন্দুধৰ্ম্মের সহিত ইহার এরূপ সংমিশ্রণ ঘটিয়াছে যে বিশুদ্ধ বৌদ্ধ আর নাই। মগর গুরুম হিন্দু। অন্যান্য জাতিসকলের ভাষা বিভিন্ন ; তাহারা অধিকাংশই বৌদ্ধ। ভুটিয়া এবং লিম্বুরা তিব্বতীয় ভাষা ব্যবহার করে। দাসত্ব প্রথা নেপালে দাসত্ব প্রথা পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান। প্রত্যেক সম্পন্ন গৃহস্থের গৃহ ‘ক্রীত’ দাস দাসীতে পূর্ণ। কাহারও অবস্থা মন্দ হইলে দাস দাসী বিক্রয় করিবার রীতি আছে। দাস দাসীদিগের সন্তাণগণ জন্মের সহিত দাসত্বফাস গলায় করিয়া আসে। নেপালের দাসত্ব প্রথা ইউরােপীয়দিগের দাসত্ব প্রথার ন্যায় নহে। এখানে দাস দাসীগণের কোন কষ্ট আছে বলিয়া মনে হয় না। তাহারা সন্তান নির্বিশেষে প্রতিপালিত হয়। দাস হইতে দাসীর মূল্য অধিক—দাসীগণের ১৫০। ২০০ এবং দাসগণের ১০০ ১৫৫ পৰ্যন্ত মূল্য হইয়া থাকে। সুরূপা হইলে দাসীদিগের মূল্য অধিক হয়। দাসীগণ” প্রভুর সন্তান গর্ভে ধারণ করিলে তাহাদিগের পদমর্যাদা বৃদ্ধি হয় এবং চিরদিনের মত জীবিকার সংস্থান হয়।

নেপালের অধিবাসীগণ। ভুটিয়াগণ অতি সহজে আপনাদের সন্তান বিক্রয় করে। অনেক পিতা মাতা ঋণদায়ে সন্তান বন্ধক রাখে। ঋণ শােধ করিতে পারিলেই সন্তানদিগের দাসত্ব মােন হয়। নেপালে গণকঠাকুর এবং বৈদ্যের বিশেষ প্রতিপত্তি। নেপালে বিচারালয় আছে বটে কিন্তু বিচারের কোন পুথিলিখিত আইন আছে কি না জানিনা। সুবিচার সকল স্থলে না হইলেও মােটের উপর এক প্রকার বিচার হয়। গােহত্যা ব্রাহ্মণহত্যা করিলে তাহার মুণ্ডচ্ছেদন করিয়া পাপের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা হয়। হত্যা- পরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরও মুণ্ডুচ্ছেদ করা হয়। অপরাধ স্বীকার করাইবার জন্য অনেক নিষ্ঠুর অত্যাচারের ব্যবস্থা আছে। নেপালে শিল্পবাণিজ্যের তােপ শ্রীবৃদ্ধি নাই। দেশে অত্যন্ত মােটা সুতার এবং মােটা পশমী বস্ত্র নির্মিত হয়। নেপালীগণ সচরাচর বিলাতি কাপড় ব্যবহার করে। নেপালে এক প্রকার কাগজ হয় তাহা সহজে ছেড়া যায় না। পিতল কাঁসার বাসন এবং হাতির দাঁতের মােটা কাজ ভিন্ন বিশেষ কোন শিল্পের প্রচলন নাই। স্বাধীন রাজ্যের এ বিষয়ে এরূপ দুরবস্থা দুঃখের বিষয় সন্দেহ নাই।

নেপালের প্রধান তীথ পশুপতিনাথ। বৌদ্ধ ধৰ্ম্ম প্রচারিত হইবার পর ভারতবর্ষে পৌরানিক হিন্দু ধৰ্ম্মের অভ্যুত্থান হইয়াছে। বৈদিক সময়ে দেব মন্দিরও ছিল না বিগ্রহ পূজাও ছিল না। এখন হরিদ্বার হইতে কুমারীকা অন্তরীপ পৰ্য্যন্ত ভারতবর্ষে কত তীর্থ কত মন্দির ও কতই বিগ্রহ দেখিতে পাওয়া যায়। বৌদ্ধযুগের পূৰ্বে এরূপ ছিল না। মহাত্মা শাক্য- সিংহ তাহার শিষ্যদিগের জন্য কোন প্রকার পূজা অর্চনা যাগ যজ্ঞ, স্তব স্তুতির ব্যবস্থা দিয়া যান নাই। অথচ সেই বৌদ্ধধর্মের সংস্পর্শে আসিয়া হিন্দুধর্মের এইরূপ রূপান্তর হইয়া পড়িয়াছে। বৰ্তমান সময়ে ভারতের অনেক তীর্থ এবং অনেক দেব মন্দির এক সময়ে বৌদ্ধদিগের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহাতে আর সন্দেহ নাই। সম্রাট অশােক যে ৮৪০০০ স্তুপ নিৰ্মাণ করিয়া বুদ্ধের দেহাবশেষ রক্ষা করিয়া ছিলেন। তাহার অধিকাংশ স্তুপই যে এখন দেবমন্দিরে পরিণত হইয়াছে তাহাতে আর সংশয় কি ? নচেৎ সে সকল কোথায় অন্তর্হিত হইল ? হিন্দুধৰ্ম্মের কবলে যেমন বৌদ্ধধৰ্ম্ম লােপ পাইয়াছে। বৌদ্ধদিগের বিহার, স্তুপ

ক
৬
"
পশুপতিনাথের মন্দির

No text on this page.

নেপালের প্রধান তীর্থ পশুপতিনাথ । স্মৃতিচিহ্নসকল হিন্দুতীর্থ ও দেবমন্দিরে পরিণত হইয়াছে। পুরীর জগন্নাথ এবং নেপালের পশুপতিনাথ এই শ্রেণীর তীর্থ বলিয়া বােধ হয়। নেপালের ইতিহাসে পশুপতিনাথের জন্মকথা এইরূপ বিবৃত আছে। পুরাকালে নেপাল উপত্যকা বিশাল নাগবাস নামে হ্রদ ছিল। তথায় নাগকুল বাস করিত। সত্যযুগে বিপাশ্ব বুদ্ধ বন্দুমতি দেশ হইতে আসিয়া নাগবাসদের পশ্চিমে নাগার্জুণ নামে পৰ্বতে বাস করেন এবং হ্রদের জলে একটী পদ্মের মূল বােপণ করেন। তৎপরে তিনি শিষ্যগণকে, সেখানে রাখিয়া স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ঐ যুগেই পদ্মের মূল হইতে শতদল বিক- শিত হইল। এরং তন্মধ্যে স্বয়ম্ভু ভগবান প্রকাশিত হইলেন। এই বাণী শ্রবণ করিয়া শিখিবুদ্ধ আমরাপুরী হইতে আসিয়া সেই আলােকে বিলীন হইয়া যান। তৎপরে ত্রেতাযুগে অণুপম হইতে আসিয়া ফুলচক পৰ্বত হইতে জ্যোতি দর্শন করিয়া লক্ষ পুষ্পের অঞ্জলি দেন। উক্ত ত্রেতা যুগে মঞ্জুশ্রী বুদ্ধ চীন দেশ হইতে আসিয়া দিব্য জ্যোতি দর্শন করেন। এবং তিনি তরবারীর আঘাতে কাটওয়ার নামক স্থান দিয়া হ্রদের জল বাহির করিয়া দেন। হ্রদের জলের সহিত নাগগণ বাহির হইয়া গেলে, তিনি কর্কটক নামে নাগরাজকে অনুরােধ করিয়া টাউদা নামক জলাশয়ে স্থাপন করিলেন; এবং উপত্যকায় সমুদায় ধন সম্পত্তির উপর তঁাহার আধিপত্য অপ্রতিহত হইল। তিনি বিশ্বরূপের মধ্যে স্বয়ম্ভুজ্যোতি দর্শন করিলেন। এবং বিশ্বরূপের ভিতর গুহ্যেশ্বরীকে দর্শন করিলেন। বিশ্বভূ বুদ্ধ নেপালে বঙ্গনারী। করেন। পদ্মের মধ্যস্থিত স্বয়ম্ভুজ্যোতিকে পূজা করিলেন। এবং সেই পদ্মের মূল যে গুহেশ্বরীতে নিহিত ছিল তাহাও তিনি লক্ষ্য করিলেন । গৃহস্থ ব্যক্তিগণের বাসের জন্য তিনি মঞ্জুপাটন নামক সহর প্রতিষ্ঠা এবং ভিক্ষুদিগের জন্য বিহারও স্থাপন করিয়াছিলেন। পরিশেষে ধৰ্ম্মকরকে রাজা করিয়া তিনি চীনে প্রস্থান করিলেন মঞ্জুশ্রীর শিষ্যগণ মঞ্জুশ্রীর পূজার জন্য স্বয়ম্ভুর নিকট এক মন্দির নির্মাণ করেন। ত্রেতা যুগে করকাদ বৃদ্ধ ক্ষোবতী নামক স্থান হইতে আগমন করিয়া স্বয়ম্ভুজ্যোতির ভিতর গুহ্যেশ্বরীকে দর্শন করেন। তিনি ব্রাহ্মণ জাতীয় ৭০০ ব্যক্তিকে ভিক্ষুব্রতে দীক্ষা দেন। কিন্তু কোথায়ও আর জল দেখিতে পাইলেন না। তখন পৰ্বত গাত্রে অঙ্গুলি স্পর্শ করিবামাত্র বাঘমতি নদী নামিয়া আসিল। ৭০০ শিষ্যের কেশ লইয়া শুণ্যে ছড়াইয়া দিলেন অমনি কেশমতি নদীর জন্ম হইল । দ্বাপর যুগে কণকমুণি বুদ্ধ শােভাবতী হইতে আসিয়া স্বয়ম্ভু ও গুহেশ্বরীর পূজা করেন। তৎপরে কাশ্যপ বুদ্ধ কাশী হইতে আগমন করেন। তিনিও স্বয়ম্ভু ও গুহেশ্বরীর পূজা করিয়া কৃতার্থ হন তৎপরে তিনি গৌড়ে (বাঙ্গালা) গিয়া প্রচণ্ডদেব নামক রাজাকে স্বয়ম্ভু ও গুহেশ্বরীর পূজা করিতে আদেশ দেন। তাঁহার আদেশানুসারে ' প্রচণ্ডদেব শান্তশ্রীনাথ নাম ধারণ করিয়া ভিক্ষুব্রত গ্রহণ করিলেন। তিনি স্বয়ম্ভুজ্যোতি দর্শন করিয়া কৃতার্থ হইলেন। কিন্তু কলিযুগ সন্নিকট, জনিয়া নেপালের প্রধান তীর্থ পশুপতিনাথ। স্বয়ম্ভুজ্যোতিকে আচ্ছাদন করিয়া তদুপরি মন্দিব নির্মাণ করেন । কালে সেই স্বয়ম্ভুর মন্দির ধূলিসাৎ হয়, এবং স্বয়ম্ভুজ্যোতি ভগ্না- বশেষের ভিতর প্রােথিত হন। সকল চিহ্ন কালে; বিলুপ্ত হইল। একদা এক, গাভী নিত্য নির্জণে বনেব মধ্যে তথায় আসিয়া দুগ্ধধারা সেচন করিতে থাকে। একদিন গোপালক পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিয়া গােপনে সমুদয় ব্যাপার দর্শণ করিল এবং কৌতুহল পরবশ হইয়া সে স্থান খনন করিতে আরম্ভ করে। এবং খনন করিতে করিতে সহসা স্বয়ম্ভুজ্যোতি প্রকাশিত হইয়া তাহাকে ভষ্মসাৎ করিয়া ফেলিলেন। নীমুনি (যাহার নাম হইতে নেপাল নামের উদ্ভব ) এই গােপা- লকের পুত্রকে রাজা করিলেন। এবং ইহারই রাজত্ব কালে পশু- পতিনাথের পুনঃ প্রতিষ্টা হয়। পূরাকালে সেই স্বয়ম্ভু বর্তমান কালে এই পশুপতিনাথ। কিন্তু এখনও কাটমণ্ডু সহরের অদূরে স্বয়ম্ভুনাথের (স্বিনাথের) প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ মন্দির দেখিতে পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ে নেপালে প্রায় ২৭৩৩টী দেব মন্দির আছে ; তন্মধ্যে পশুপতিনাথের মন্দির সর্ব প্রধান। নেপালের উপ ত্যকায় কাটমণ্ড সহরের প্রায় তিন মাইল উত্তরপূৰ্বে বাঘমতি নদীয় পশ্চিমে পশুপতিনাথের প্রধান মন্দির অবস্থিত। বর্তমান মন্দিরটী কতদিন নিৰ্ম্মিত হইয়াছে তাহা নিশ্চিত বলা যায় না। তবে বৎসরের হিসাব না করিয়া শতাব্দীর হিসাব করিতে হয়। ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে উক্ত ধর্ম নেপালেও নেপালে বঙ্গনারী। ম্লান হইয়া আসিয়াছে এবং সমুদায় বৌদ্ধস্মৃতি বিসর্জন দিয়া উক্ত দেবালয় মহাদেবের মন্দির হইয়াছে। বস্তুতঃ পশুপতিনাথের বিগ্রহে মহাদেবের কোন বিশেষত্ব দেখা যায় না। তবে মন্দিরের প্রাঙ্গনে, ত্রিশূল, বৃষ, শিবলিঙ্গ সকলই বর্তমান। মন্দিরটী অতি সুদৃশ্য এবং উচ্চ। নেপালের সকল নৃপতি, সকল প্রসিদ্ধ ব্যক্তি, পশু- পতিনাথের মন্দিরের কিছু না কিছু শ্রীবৃদ্ধি করিয়া গিয়াছেন। নেপালরাজ সদাশিব দেব পশুপতিনাথের মন্দিরের ছাদ স্বর্ণ মণ্ডিত করিয়া গিয়াছেন। সুপ্রসিদ্ধ রাজমন্ত্রী, ভীমসেন থাপা কর্তৃক পশু- পতিনাথের মন্দিরের প্রাঙ্গণে সুবর্ণ মণ্ডিত একটী প্রকাণ্ড বৃষ স্থাপিত দেখিতে পাওয়া যায়। এতদ্ভিন্ন কত যে স্বর্ণময় বৃষ, কত যে শিবলিঙ্গ আছে তাহা গণনা করা দুঃসাধ্য। পশুপতি নাথের মন্দিরে স্বর্ণ রৌপ্যের অতিশয় প্রাচুর্য দেখা যায়। ভারতের প্রায় অন্য তীর্থ মুষলমানদিগের হস্তস্পর্শে হতশ্রী হইয়াছে। এই সকল তীর্থের ধন সম্পত্তি বারম্বার লুষ্ঠিত হইয়াছে—কেবল পশুপতিনাথ ইহার ব্যতিক্রম স্থল । নেপালে বুদ্ধ গিয়াছেন, অশােক গিয়াছেন, বিক্রমাদিত্য গিয়াছেন, শিলাদিত্য গিয়াছেন, শঙ্কর গিয়াছেন, কেবল যান নাই মুসলমান দিগ্বিজয়ীগণ। বৌদ্ধ এবং হিন্দুগণ নেপালে অনেক কীৰ্ত্তিস্থাপন করিয়াছেন, অনেক দেবালয়, অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। কিন্তু মুসলমান হন্তে কোন দিন তাহা স্পষ্ট হয় নাই। স্পর্শ করা দূরে থাকুক, দৃষ্টিপাতও করেন নাই। পশুপতিনাথের প্রভূত ঐশ্বৰ্য্য সহস্র সহস্র বৎসর ধরিয়া পূঞ্জীকৃতই হইতেছে, লুণ্ঠন করিতে কেহ আসে নাই। তাই সকল তীর্থ ।

নেপালের প্রধান তীর্থ পশুপতিনাথ। বােধ হয় অন্য কোন তীর্থে এরূপ স্বর্ণ রৌপ্যের প্রাচুর্য দেখা যায় । যে স্থানে পশুপতিনাথের মন্দিরী প্রতিষ্টিত আছে, বস্তুতঃ তাহা অতি রমণীয়। পশুপতিনাথের মন্দিরের নিকটে বহুদূর পৰ্যন্ত বাঘমতি নদীর উভয় পার্শ্বে প্রস্তর নির্মিত কত সােপান কত ঘাট,—গৌরী ঘাট, আৰ্য ঘাট, প্রভৃতি ! পশুপতির ঘাটে দাঁড়াইয়া দেখিলে বাঘমতির দৃশ্য কি সুন্দর ! উভয় পার্শ্বস্থিত উন্নত পৰ্ব্বতের মধ্য দিয়া যেন কোন অদৃশ্য লােক হইতে আঁকিয়া বাঁকিয়া পুণ্য তােয়া নিঝরিণী কুল কুল করিয়া নামিয়া আসিতেছে। যেন ব্রহ্মার পাদপদ্ম হইতে মন্দাকিণী নামিয়া আসিতেছে। অন্য সময় এই অপরিসর পার্বত্য নদীর জল অতি অল্প থাকে কিন্তু বর্ষায় তাহার কি খরস্রোত ! কি কল্লোল ! আৰ্যঘাটের পুলের উপর দাড়া- ইয়া বাঘমতির খরস্রোত ও, কল্লোল দর্শন করিলে প্রাণ এরূপ উচ্ছসিত হইয়া উঠে, যে সেই খরস্রোতের মুখে লম্ফ দিয়া পড়িয়া ভাসিয়া যাইতে ইচ্ছা করে। বাঘমতির এই নৃত্যময়ী লীলা দেখিয়া নয়ন পরিতৃপ্ত হয় না, এবং কল্লোলিনীর কল্লোল শুনিয়া শুনিয়া কর্ণ যেন আর তৃপ্ত হয় না। নেপালীদিগের নিকট পশুপতিনাথ অতি পবিত্র স্থান। মৃত্যুর সময়ে সকলে পশুপতি নাথের চরণ পাই- বার জন্য ব্যাকুল হয়। আবালবৃদ্ধবণিতা সকলকে মৃত্যুর পূর্বে পশুপতিনাথে লইয়া যাওয়া হয়। পশুপতির ঘাটে দুইখানি প্রশস্ত শিলা এরূপ ভাবে নিহিত আছে যে তাহার উপর কাহাকেও শয়ন করাইলে পদদ্বয় বাঘমতির বারি স্পর্শ করে। এই শিলা-দুখানির একখানি রাজ পরিবার সকলের জন্য, অপরখানি মন্ত্রীর পরিবারের ৩৪ নেপালে বঙ্গনারী। সকলের জন্য। রাজা মহারাজা মহারাণী সকলেই অন্তিমে এই শিলা শয্যায় শায়িত হন ও বাঘমতির জলে চরণ রাখিয়া পশুপতিনাথের নাম জপ করিতে করিতে দেহত্যাগ করেন। পূর্বে এই স্থানেই সতীদাহ হইত। এখন পশুপতিনাথের মন্দিরের চতুষ্পর্শ্বে ক্ষুদ্র বৃহৎ শত শত মন্দির আছে, বিশ্বরূপের মন্দির, গুহ্যেশ্বরীর মন্দির ইত্যাদি অসংখ্য মন্দির। গুহেশ্বরীর মন্দিরে একটী উৎস আছে। সেই উৎসের মুখ স্বর্ণময় আবরণে আবৃত, খুলিয়া হাত দিলেই হস্তে উৎসের জল লাগে। গুহেশ্বরীর মন্দিরে সর্বদাই পূজা অর্চনা চলিতেছে। পশুপতির প্রাঙ্গণে সাধু সন্ন্যাসীর অন্ত নাই কোথাও বা শাস্ত্রপাঠ হইতেছে, কোথাও ভজন গীত হইতেছে, কোথাও ঘণ্টাধ্বনি হইতেছে, কেহ বা পুস্পাঞ্জলি দিতেছে, কেহ বা মস্তকে পবিত্র বারি- সিঞ্চন করিতেছে। কেহ বা কপালে টীকা দিতেছে কেহ বা মন্দির প্রদক্ষিণ করিতেছে। দিবারাত্রি যাত্রীসমাগম দিবা- রাত্রি পূজাঅর্চনা চলিতেছে। এই লােকারণ্যের মধ্যে স্থূলাকার বৃষ মহাশয় সগর্বে বিচরণ করিতেছেন। পশুপতিনাথের মন্দিরের অদূরে পর্বতের উপরে মৃগালী নামক এক রমণীয় বন আছে। সেখানে বানরসকল দলে দলে বিহার করিতেছে। বৌদ্ধযুগে এই পশুপতিনাথের ' মন্দিরের সন্নিকটে বৌদ্ধবিহার বৌদ্ধমঠ সকল ছিল। এখন আর কিছুই নাই। পশু পতিনাথের নিকট এখন যে সকল পল্লী আছে তাহা অতি কদর্য। প্রতি বৎসর শিবরাত্রির সময় পশুপতিনাথের মন্দিরে বিপুল নেপালের প্রধান তীর্থ পশুপতিনাথ। সমারোেহ ব্যাপার হইয়া থাকে। সেই সময় প্রায় ২০,০০০ যাত্রী নানা দেশ বিদেশ হইতে পশুপতিনাথকে দর্শন করিবার জন্য আসিয়া থাকে এবং ছয় দিন নেপাল রাজ্যের দ্বার অবারিত থাকে। এই সময় পিপীলিকা শ্রেণীর ন্যায় যাত্রিদল পশুপতিনাথের উদ্দেশে ধাবিত হয় এবং নেপাল উপত্যকায় পদার্পণ করিয়া “জয় পশু- পতিনাথ” বলিয়া হুঙ্কার করিয়া উঠে। কি পথক্লেশ স্বীকার করিয়া লােক আসে, ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়। পশুপতিনাথ হিন্দুদিগের প্রসিদ্ধ তীর্থ। পূর্বেই বলিয়াছি নেপালে প্রায় ২৭৩৩টী দেব মন্দির আছে। ইহার অধিকাংশ বিদেশীরা কখনও দেখিতে পায় নাই।

নেপালে বৌদ্ধধর্ম -:0:- শাক্যসিংহের জীবদ্দশায় কিম্বা তাহার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই নেপালে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয়। যে কুশীনগরে তিনি দেহত্যাগ করেন, তাহা নেপালের অন্তর্গত ছিল, ইহাও অনেকে প্রমাণ করিতে আয়াস করিয়াছেন। কুশীনগর নেপালের অন্ত- গত ছিল কি না তাহা নিশ্চিত প্রমাণীকৃত না হইলেও, শুদ্ধোদনের রাজ্য যে নেপালের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাহাতে আর সন্দেহ নাই। যেখানে শাক্যসিংহ ভূমিষ্ঠ হন তথা হইতে নেপাল বহুদূর নয়, সুতরাং নেওয়ারদিগের কিম্বদন্তী অনুসারে শাক্যসিংহ সে রাজ্যে পদার্পণ করিয়াছিলেন তাহা অবিশ্বাস করিবার বিশেষ কোন কারণ নাই। বর্তমান সময়ে নেপালের অধিবাসীদিগের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ বৌদ্ধ, অবশিষ্ট হিন্দু। হিমাচলের ক্রোড়স্থ অধিকাংশ পার্বত্য রাজ্যসমূহে—যথা নেপাল, সিকিম, ভুটান প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধ- ধৰ্ম্মই লৌকিক ধৰ্ম্ম। কিন্তু নেপালের বৌদ্ধধর্মের যে বিশেষত্ব দেখিতে পাওয়া যায় তিব্বত, চীন, জাপান, সিংহল প্রভৃতি অপর কোন দেশে প্রচলিত বৌদ্ধধর্মের সহিত ইহার তেমন সৌসাদৃশ্য নাই। হিন্দুধৰ্ম্মের সহিত অপূর্ব সংমিশ্রণে ইহা এক অপূৰ্ব্ব বেশ ধারণ করিয়াছে। অতি পুরাকাল হইতে নেপালে বৌদ্ধধৰ্ম্ম। ৩৭ বর্তমান সময় পর্যন্ত নেপালে ভারতবর্ষ হইতে নানাবিধ সম্প্রদায়ের লােক আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। সেই সঙ্গে অনেক ধৰ্ম্মমত, অনেক প্রকার আচার ব্যবহার এই দেশে প্রচারিত হইয়াছে। শুধু প্রচারিত হওয়া নয়, সৰ্ব্বধৰ্ম্মের এবং সৰ্ব্বজাতির এক অপূৰ্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়াছে। বৌদ্ধ নেওয়ারগণের সহিত নেপালের আশ্রিত হিন্দুগণ বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হইয়া পড়েন এবং সেই সঙ্গে বৌদ্ধগণ অজ্ঞাতসারে হিন্দুভাবাপন্ন হইয়া পড়িয়াছেন। নেওয়ারদিগের ভিতর দুইটি সম্প্রদায় আছে,বৌদ্ধমার্গী এবং শিবমার্গী। শিবমার্গিগণ প্রকৃত পক্ষে হিন্দু। গুখগণের আগ- মনের পূর্বেই নেপালে এই উভয় সম্প্রদায় ছিল। নেওয়ার রাজাগণ সকলেই প্রায় হিন্দু ছিলেন। তাহারা বৌদ্ধ প্রজা- দিগের ধৰ্ম্মে কখন হস্তক্ষেপ করেন নাই, বরং অনেক সাহায্য করিতেন তথাপি হিন্দু প্রজাগণই যে অধিকতর অনুগ্রহ এবং সহায়তা লাভ করিতেন, তাহাতে সংশয় নাই। বর্তমান গুর্খরাজগণ বৌদ্ধ প্রজাদিগের ধৰ্ম্মে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করেন না বটে, কিন্তু তাঁহারা তাহাদের ধর্ম অতি অবজ্ঞার চক্ষে দর্শন করেন ; সুতরাং কি পুরাকালে কি বর্তমান সময়ে নেপালের বৌদ্ধগণ কখনই বিশেষভাবে রাজপ্রসাদ লাভে সমর্থ হয় নাই। কেবল এই কারণেই নয়, নেপালের বৌদ্ধগণের দোষেই ঐ ধৰ্ম্ম এখন তথায় অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হইয়াছে। যেরূপ লক্ষণ দৈখা যাইতেছে তাহাতে বৌদ্ধধৰ্ম্ম . তথায় শীঘ্রই লুপ্তধৰ্ম্ম হইবে। ;

নেপালে বঙ্গনারী। বৌদ্ধদিগের ভিতর দুইটি প্রধান শাখা আছে,-মহাযান বা উত্তরদেশীয়, হীনযান বা দক্ষিণদশীয়। মহাযান সম্প্রদায়ই বােধ হয় এই নামের গৌরব স্বয়ং গ্রহণ করিয়াছেন, নতুবা হীনযান সম্প্রদায়ের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের বিশুদ্ধতা অধিক পরি- লক্ষিত হয়। নেপালের বৌদ্ধদিগকে মহাযান বলিব কি হীনযান আখ্যা দিব তাহা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। অশােকের মহিমা এখনও তথায় ঘােষিত হয়, অশােকের প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধমন্দির সকল এখনও তথায় দণ্ডায়মান আছে; কিন্তু তিব্বতের সহিত নেপালের ধর্মগত এবং বংশগত সৌহৃদ্য অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নেপালের বৌদ্ধধর্মের আর এক বিশেষত্ব যাহা কুত্রাপি নাই তাহা এখানে আছে। নেপালের বৌদ্ধগণ হিন্দুদিগের ন্যায় বিভিন্ন বর্ণে বিভক্ত। এইরূপ জাতিভেদ তিব্বতেও নাই, চীনেও নাই, সিংহলেও নাই। ইহা নেপালের নেওয়ারগণের মধ্যেই বিবর্তিত হইয়াছে। এই কারণেই নেপালের বৌদ্ধগণকে মহা- যান বা হীনযান কোন বিশেষ সম্প্রদায়ভুক্ত বলিতে পারিতেছি । নেপালের বৌদ্ধদিগের ভিতর প্রচলিত বর্ণবিভাগ সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আভাস দিতেছি। বর্ণবিভাগ। পূৰ্ব্বে যাহারা ভিক্ষু সন্নাসী—বিহারবাসী ছিল, এখন নেপা- লের বৌদ্ধদিগের মধ্যে তাহারা ব্রাহ্মণের স্থান অধিকার করিয়াছে ; তাহারা “বাহরা” নামে অভিহিত হয়। “বদ্য” হইতে “বাহরা” নামের উৎপত্তি। বৌদ্ধদিগের মধ্যে ইহাই - নেপালে বৌদ্ধধৰ্ম্ম। সৰ্বশ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাহরাগণ অনেকস্থলে বিহারবাসী বটে, কিন্তু তাহারা সন্ন্যাসধর্ম বিসর্জন দিয়া ভােগাসক্ত গৃহী হইয়াছে। তাহারা অধিকাংশই আমাদের দেশের সুবর্ণ- বণিকের কর্মে নিযুক্ত। “অহিংসা পরমােধৰ্ম্ম” বাদী বৌদ্ধগণের ভিতর ক্ষত্রিয়ের স্থান অধিকার করিবার কোন জাতি নাই। বৈদিগের মধ্যে দ্বিতীয় জাতি “উদাসী” ইহারা সকলেই প্রায় ব্যবসা বাণিজ্যে লিপ্ত। চীন, জাপান, তিব্বত প্রভৃতি দেশেও ইহারা বাণিজ্যার্থে গমনাগমন করিয়া থাকে। উদাসীগণ নেপা- লের বৌদ্ধদিগের মধ্যে ধনিশ্রেষ্ঠ। ৩। “জাপু”—ইহারা শূদ্রদিগের ন্যায় কৃষিকৰ্ম্ম দাসবৃত্তি এবং নীচকার্যে লিপ্ত থাকে। নেওয়ারদিগের ভিতর এই প্রধান তিনবর্ণ আবার নানা শ্রেণীতে বিভক্ত। উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণের সহিত আহার বিহার আদান প্রদান করে না, করিলে জাতিচ্যুত হয়। এই প্রধান তিন জাতি ভিন্ন আট প্রকার অস্পৃশ্য জাতি আছে। তাহাদিগকে নছুনি জাত বলে, অর্থাৎ তাহাদিগের জলগ্রহণ করা যায় না। বাহরাগণ ১। আরহান ২। ভিক্ষু ৩। শ্রাবক ৪। চৈলাক এই চারিশ্রেণীতে বিভক্ত উদাসীদিগের ভিতর ৭টি শ্রেণী আছে। জাপুগণ ৩০টি শাখায় বিভক্ত। নেওয়ারদিগের এই বর্ণবিভাগ যেরূপ বৌদ্ধধর্মকে মলিন নেপালে বঙ্গনারী। এবং নিষ্প্রভ করিয়াছে এমন আর কিছুই নয়। নেপালে বৌদ্ধধর্মের পতনের ইহাই প্রধান কারণ। ধমত। বৌদ্ধদর্শনশাস্ত্র দুইটি প্রধান শাখায় বিভক্ত,—আস্তিক এবং নাস্তিক। এক সম্প্রদায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, অন্য সম্প্রদায় আদিবুদ্ধ এই নামে সৰ্ব্বজ্ঞ সৰ্বশক্তিমান্ জগতের স্রষ্টাপাতা বিধাতা পুরুষকে' অভিহিত করে। আদিবুদ্ধ অনাদিকাল হইতে শান্তভাবে অবস্থিতি করিতেছেন, অনন্তকাল এই ভাবেই স্থিতি করিবেন। আদিবুদ্ধ স্বয়ম্ভু ভগবান্ আদিধর্ম বা আদি প্রজ্ঞার (জড় শক্তির ) সহিত মিলিত হইয়া এই বিচিত্র জগৎ রচনা করিয়াছেন। ইহাই ইহাই নেপালের বৌদ্ধধৰ্ম্মের বৌদ্ধধর্মের মূল ধৰ্ম্মমত। ইহারা মানবাত্মার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকার করে। ইহা আদিবুদ্ধের অংশ এবং, সেই সত্তায় বিলীন হওয়াই মুক্তি বলিয়া বিবেচনা করে। আদিবুদ্ধ ইচ্ছাক্রমে পঞ্চবুদ্ধের সৃষ্টি করিয়াছেন। আস্তিক নাস্তিক উভয় সম্প্রদায়ই আদিশক্তির ত্রিত্ব স্বীকার করিয়া থাকেন। বৌদ্ধশাস্ত্রে তাহা ত্রিরত্ন নামে অভিহিত, যথা—বুদ্ধ, ধৰ্ম ও সংঘ। এই ত্রিরত্নের মধ্যে আস্তিকেরা বুদ্ধের এবং নাস্তিকেরা ধৰ্ম্মের প্রাধান্য স্বীকার করিয়া থাকেন। বুদ্ধ প্রাণ শক্তি অথবা চিৎধৰ্ম্ম জড়শক্তি এবং সঙ্ঘ উভয়ের, মিলন সদ্ভুত এই দৃশ্যমান্ জগৎ, কিন্তু অন্য এক অর্থে সকল সম্প্রদায়ই এই ত্রিরত্নের ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন ; যথা—বুদ্ধ—শাক্যসিংহ, ধৰ্ম্ম—তাঁহার বিধি নেপালে বৌদ্ধধর্ম। ৪s বা. শাস্ত্র, সদ্য অর্থাৎ সম্প্রদায় বা সাধকদল। এই ত্রিরত্নের সাঙ্কেতিক চিহ্নরূপে নেপালে এবং বৌদ্ধজগতে সর্বত্রই একটি মধ্যবিন্দু সমন্বিত ত্রিকোণ ব্যবহৃত হয়। এই ত্রিকোণের অনেক প্রকার গুহাৰ্থ আছে। সাঙ্কেতিক “ও” শব্দে এই ত্রিরত্ন বৌদ্ধ- জগতে ব্যবহৃত হয়। বৌদ্ধদিগের নিকট “ও” এই বাক্যের অর্থ বুদ্ধ, ধৰ্ম্ম ও সঙ্গ। সমুদায় বৌদ্ধজগতে “ওম্ মণিপদ্মে হুমু” বাক্যটি পদ্মপাণির পূজার মন্ত্ররূপে ব্যবহৃত হয়। ইহার প্রকৃত অর্থ লইয়া অনেক মতভেদ দৃষ্ট হয়। কিন্তু নেপালের পূর্বতন রেসিডেন্ট সুবিখ্যাত হড সন্ সাহেব ইহার এইরূপ অর্থ করিয়াছেন,“সেই ত্রিরত্নের অন্তরে পদ্ম, এবং মণি নিহিত আছে।” পদ্মের মধ্য স্থানে একটি মণি পদ্মপাণির চিহ্ন। পদ্মপাণির বৌদ্ধসঙ্ঘেরই মূর্তি। এই মন্ত্র মহাযান সম্প্রদায়েরই বিশেষত্ব। সিংহল প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধগণ এ মন্ত্র ব্যবহার করে না। নেপালে এই মন্ত্ৰ সৰ্ব্বদাই ব্যবহৃত হয়। আস্তিক বৌদ্ধগণ বিশ্বাস করে এক জন্মে না হউক জন্ম জন্মান্তরের পর বিশুদ্ধাত্মা ও নিষ্কাম হইয়া মানবাত্মা পরমাত্মা বা আদিবুদ্ধে বিলীন হইবে। এই জন্মান্তর বিশ্বাস বৌদ্ধধর্মের একটি মূলভাব। এই বিশ্বাসই “অহিংসা পরমােধৰ্ম্ম” এই বাক্যের প্রণাে- দক। এই হেতু জীবহিংসা বৌদ্ধশাস্ত্রে একান্ত নিষিদ্ধ। কিন্তু ইহা অপেক্ষা বিস্ময়কর ব্যাপার কি হইতে পারে যে, নেপালের বৌদ্ধগণ অতি নৃশংস উপায়ে সর্বদা জীবহিংসা করিয়া থাকে। বৌদ্ধধর্মের মূলভাব কিরূপে এরূপ ভাবে পদদলিত হয়, ইহাও == ৪২ নেপালে বঙ্গনারী। এক আশ্চর্য কথা। বৌদ্ধশাস্ত্রানুসারে পরলােকে স্বৰ্গভােগের ব্যবস্থা নাই। বৌদ্ধের স্বর্গ নিৰ্বান বা পরমাত্মায় বিলীন হওয়া। এই প্রকার মুক্তজীব বৌদ্ধশাস্ত্রে বুদ্ধ নামে অভিহিত হয়। বৌদ্ধ দেব দেবীগণ। যে ধৰ্ম্মে কোন প্রকার পূজা অর্চনা স্তব স্তুতির ব্যবস্থা নাই, সেই সাধনশীল ধৰ্ম্মেও অনেক দেব দেবীর আবির্ভাব হইয়াছে। আদিবুদ্ধ ইচ্ছাক্রমে পঞ্চবুদ্ধের সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহাদিগের সহিত আদিবুদ্ধের পিতাপুত্রের সম্বন্ধ। ইহারা অমর বুদ্ধ বা দেববুদ্ধ। সে সকল মানবাত্মা স্বীয় চেষ্টায় জন্ম জন্মান্তরের পর নির্বাণ লাভ করিয়াছেন তাহারাও মানবীয় বুদ্ধ। ইহারা পূজাৰ্হ বটে, কিন্তু দেবতা নন। মহাযান সম্প্রদায়- ভুক্ত বৌদ্ধদিগের মতে শাক্যসিংহ স্বয়ং মানবীয় বুদ্ধদিগের মধ্যে শেষ ব্যক্তি। সেই অবধি অন্য কেহ বুদ্ধত্ব লাভে সক্ষম হন নাই। নিম্নে আদিবুদ্ধ হইতে যে পঞ্চবুদ্ধ প্রসূত হইয়াছেন তাহাদের তালিকা প্রদত্ত হইল ;- আদিবুদ্ধ। বৈরচন অশ্বোভ রত্নসম্ভূ অমিতাভ অমােঘসিদ্ধ আদিবুদ্ধের সহিত এই পঞ্চবুদ্ধের পিতা পুত্র সম্বন্ধ। বৈরচন যেন জ্যেষ্ঠভ্রাতা—সেই হেতু তিনি এবং চতুর্থ ভ্রাতা অমি- তাভ পদ্মপাণির পিতা বলিয়া অধিক পূজা লাভ করেন। এই নেপালে বৌদ্ধধর্ম । পঞ্চবুদ্ধ হইতে আবার বােধিসত্ত্বগণ প্রসূত হইয়াছেন। এখানেও পঞ্চবুদ্ধের সহিত বােধিসত্ত্বগণের পিতাপুত্র সম্বন্ধ । এই বােধিসত্ত্বগণকে জন্ম দিয়া পঞ্চবুদ্ধ আদিবুদ্ধে লীন হইয়াছেন। এই বােধিসত্ত্বগণই দৃশ্যমান্ জগতের সাক্ষাৎ কর্তা। পঞ্চবুদ্ধের সহিত পত্নীভাবে পঞ্চবুদ্ধ-শক্তি মিলিত হইয়া পঞ্চ বােধিসত্ত্বকে জন্ম দিয়াছেন। নিম্নে পঞ্চবুদ্ধ, বুদ্ধশক্তি এবং পঞ্চ বােধিসত্ত্বের তালিকা প্রদত্ত হইল ;- ১। বৈরচন+বজদন্তেশ্বরী-সামন্ত ভদ্র ২। অখােত+লােচনীবস্ক্রপাণি ৩। রত্নসম্ভব+মামুখী—রত্নপাণি ৪। অমিতাভ+পানদারা—পদ্মপাণি ৫। অমােঘসিদ্ধ+তারা-বিশ্বপাণি ৬। ব্ৰজসত্ত্ব+বজসত্ত্বামিকা-ঘণ্টাপাণি নেপালে যে সকল বৌদ্ধ তান্ত্রিকসাধনপ্রণালী গ্রহণ করিয়া- ছেন তাঁহারা পঞ্চবুদ্ধের সহিত বজ্রসত্ত্ব যুক্ত করিয়াছেন। নেপালের বৌদ্ধদিগের তান্ত্রিসাধন গ্রহণ হিন্দুধর্মের প্রভাবের অন্যতম প্রমাণ। তান্ত্রিকসাধনের সর্বপ্রকার কুৎসিৎ অশ্লীলভাবও তাহারা গ্রহণ করিয়াছে কিন্তু গােপনভাবে এ সাধন সম্পন্ন হয় বলিয়া কদাচ কাহারো চক্ষে পড়ে না। এই পঞ্চবুদ্ধ ভিন্ন সাতজন মানবীয় বুদ্ধ আছেন ; তন্মধ্যে. শাক্যসিংহ শেষ। নেপালের বৌদ্ধদিগের মতে প্রথম তিন দেববুদ্ধ কাৰ্যসমাধান ৪৪ নেপালে বঙ্গনারী । করিয়া আদিরুদ্ধে বিলীন হইয়াছেন। চতুর্থ বুদ্ধ অমিতাভের পুত্র পদ্মপাণি মৎস্যেন্দ্রনাথের উপর বর্তমান জগতের ভার পড়িয়াছে। তিনি ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর প্রভৃতি দেব দেবীগণের সাহায্যে জগতের তাবৎ কাৰ্য্য পরিচালিত করিতেছেন। এইজন্য পদ্মপাণি মৎস্যেন্দ্র- নাথের নেপালের নেওয়ারদিগের নিকট এতাদৃশ সম্মান। অন্য সকল বুদ্ধ কেবল নামমাত্র আছেন ; পদ্মপাণিই সৰ্বত্ৰ পূজিত হয়েন। পদ্মপাণির কাৰ্য্য সমাধা হইলে তিনিও আদিবুদ্ধে লীন হইবেন। নেপালের নেওয়ারগণ মানবীয় বুদ্ধ ব্যতীত অন্যান্য মানবীয় বােধিসত্ত্বের পূজা করিয়া থাকেন। এই সকল মানবীয় বােধিসত্ত্বের মানবীয় বুদ্ধের সহিত পিতাপুত্রের সম্বন্ধ না হইয়া গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ। যে মহাত্মা চীন হইতে আগমন করিয়া নেপালে বৌদ্ধ- ধৰ্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন, সেই মাঞ্জুশ্রী এই শ্রেণীর বােধিসত্ত্ব। নেপালে মাঞ্জুশ্রীর অনেক মন্দির আছে; এবং পদ্মপাণির পরেই নেওয়ারদিগের হৃদয়ে ইহার আসন। এই সকল মানবীয় বােধি- সত্ত্বের নিয়ে আবার এক শ্রেণীর মানব আছেন যাঁহারা বিশুদ্ধ জ্ঞান, কঠোর সাধনা এবং পবিত্র জীবনধারা বুদ্ধত্ব লাভ করিয়া- ছেন। তাঁহারা কেহ বা জীবিত আছেন, কেহ বা গতাসু হইয়াছেন। তিব্বতের লামাগণ এই শ্রেণীভুক্ত। তাহারা বুদ্ধের অবতার বলিয়া পূজিত হয়েন, কিন্তু লামাদিগের অবতারবাদ প্রকৃত বৌদ্ধশাস্ত্র মতে অসম্ভব ব্যাপার ; কারণ, প্রকৃত বুদ্ধত্ব লাভ করিলে বা আদিবুদ্ধে লীন হইলে আর জন্মগ্রহণ সম্ভব নয়। কিন্তু ;

নেপালে বৌদ্ধধৰ্ম্ম। বৌদ্ধগণ অন্য ভাবে লামাদিগের বুদ্ধত্ব প্রমাণ করিয়া থাকেন। তাহারা বলেন, মানবজাতির উপকারের জন্য যে সকল বােধিসত্ত্ব বারম্বর জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন লামাগণ সেই শ্রেণীর অবতার। নেপালে তিব্বতের লামার বিশেষ সম্মান আছে বটে, কিন্তু তাহার সহিত ঐ দেশের বিশেষ কোন সম্বন্ধ নাই। নেপালের বৌদ্ধশাস্ত্র। তিব্বতের ন্যায় নেপালে বিস্তর প্রাচীন বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থ পাওয়া পাওয়া যায়। হড সন্ সাহেব বিস্তর ধর্মগ্রন্থ সংগ্রহ করিয়াছিলেন। এই সকল গ্রন্থ অধিকাংশই সংস্কৃত ভাষায় রচিত। নেপালের নেওয়ারদিগের দ্বারা এ সকল গ্রন্থ রচিত হয় নাই। তিব্বত হইতে আগত কোন লামা বা ভারতবর্ষ হইতে ধৰ্ম্মপ্রচারার্থ সমাগত সাধু মহাত্মাদিগের দ্বারা রচিত হইয়াছিল। এই সকল গ্রন্থ হইতে অনেক জ্ঞাতব্য বিষয় সংগ্রহ করা যাইতে পারে। দুঃখের বিষয় শঙ্কারাচাৰ্য্য বিস্তর বৌদ্ধধৰ্ম্ম গ্রন্থ নেপালে দগ্ধ করিয়াছিলেন। অনুসন্ধান করিলে নেপালের চতুর্দিকে এই সকল গ্রন্থ আজও পাওয়া যায়। গৃহস্থ এই সকল গ্রন্থ অত্যন্ত যত্নে রক্ষা করে। গৃহে অগ্নি লাগিলে সৰ্বস্ব ত্যাগ করিয়া গ্রন্থ বুকে করিয়া পলাইয়া যায় এবং এই কারণেই এখনও নেপালে বৌদ্ধগ্রন্থ বিনষ্ট হয় নাই। ধৰ্ম্মশাসন। তিব্বতের লামার ন্যায় নেপালের বৌদ্ধদিগের উপর কোন ব্যক্তিবিশেষের অপ্রতিহত শক্তি নাই। গুখরাজগুরু তাহাদিগের বর্ণসম্বন্ধীয় সমুদায় বিবাদ বিসম্বাদের মীমাংসা করিয়া থাকেন।

নেপালে বঙ্গনারী।
৫।
ধৰ্মসম্বন্ধীয় সমুদায় মীমাংসা বাহরাগণ সম্মিলিত ভাবে করিয়া
থাকেন। সামাজিক নিয়ম লঙ্ঘন করিলে সামাজিক ভাবে তাহার
প্রতিবিধান হইয়া থাকে ; ইহাকে নেওয়ারগণ “গতি” বলে।
কয়েকটি বিশেষ বিশেষ নিয়মানুসারে ইহা পরিচালিত হইয়া
থাকে।
১। প্রত্যেক গৃহস্থকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্বজাতীয়গণকে
ভােজ দিতে হয়। ইহা অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য ব্যাপার হইলেও ইহার
অন্যথা হইবার নহে।
২। স্বজাতি কাহারও মৃত্যু হইলে প্রত্যেক পরিবার হইতে
এক একজন ব্যক্তিকে মৃতের সকার এবং শ্রাদ্ধাদিতে যােগ
দিতে হয়।
গতির নিয়ম অগ্রাহ্য করিলে অর্থদণ্ড হইয়া থাকে। গুরুতর
সামাজিক অপরাধ করিলে তাহাকে জাতিচ্যুত করা হয়। জাতি-
চ্যুতকে আত্মীয় স্বজন পৰ্যন্ত ত্যাগ করে। তাহার মৃতদেহের
সৎকার কেহ করে না। ইহা অপেক্ষা গুরুতর শান্তি আর কি
হইতে পারে ? সুতরাং নেওয়ারদিগের ভিতর সামাজিক শাসনের
নিয়ম নিতান্ত শিথিল নহে।

নেপালের বৌদ্ধমন্দির। বৌদ্ধধর্মের জন্মস্থান এবং প্রধান লীলা ভূমি ভারতবর্ষ হইতে বহু শতাব্দী হইল উক্ত ধৰ্ম্ম একেবারে নির্বাসিত হইয়াছে। একটীও বিশুদ্ধ বৌদ্ধমন্দির ভারতের কুত্রাপি আর দেখা যায় না। লুম্বিনী, কপিলাবস্তু, গয়া, কুশীনগর, সকলই শ্মশান হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। ভারতবাসী আর সেখানে তীর্থ যাত্রা করে না। এক সময়ে যেখানে সহস্র সহস্র বিহারমন্দির ছিল এখন তাহা সমভূমি ; হয় ত শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যানী। ভারতে বৌদ্ধধর্মের এইরূপ শশাচনীয় পরিণাম হইয়াছে। কিন্তু নেপাল-উপত্যকায় পদার্পণ করিলে সহসা যেন দ্বিসহস্র বৎসর পূর্বের ছবি নয়নপথে উদ্যাটিত হয়। যে ধৰ্ম্ম ভারতবর্ষে এইরূপে লাঞ্ছিত হইয়াছে তাহা দুর্গম নেপালরাজ্যে অভ্রভেদী পৰ্বতমালাবেষ্ঠিত অপূৰ্ব শােভাময় বিচিত্র প্রদেশে, এখনও জনসাধারণের প্রধান ধৰ্ম্ম। দেড় শত বৎসর পূৰ্বে উহা ত সম্পূর্ণ রূপেই বৌদ্ধভূমি ছিল। চীন, জাপান, তীব্বত, ব্রহ্মদেশে যেরূপ বৌদ্ধধর্মের জয়পতাকা উড্ডীয়মান আছে নেপালে একদিন তাহাই ছিল। এখন নেপালে বৌদ্ধধর্মের হীনতার একশেষ হইলেও একেবারে তিরােধান হয় নাই। নেপাল-উপত্যকায় পদার্পণ করিলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধমন্দির দৃষ্টিগােচর হইবে। পূর্বেই বলিয়াছি পশুপতিনাথের মন্দির হয় ত এক সময় বৌদ্ধমন্দির ছিল, ৪৮ নেপালে বঙ্গনারী। কিন্তু এখনও নেপলে অত্যন্ত প্রাচীন বিশুদ্ধ বৌদ্ধমন্দির সকল অতি সুন্দর অবস্থায় আছে। এই সকল বৌদ্ধমন্দির তিন প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায় ;- ১। কতকগুলি আদিবুদ্ধের নামে উৎসর্গীকৃত। ২। কতকগুলি কোন বােধিসত্ত্ব মহাত্মার স্মৃতিচিহ্ন। ৩। অধিকাংশ মন্দির কোন মৃত মহাত্মার দেহাবশেষ বা চিতাভস্ম রক্ষার জন্য নির্মিত হইয়াছে। কাটমণ্ডু সহরের অদূরে স্বয়ম্ভুনাথের প্রসিদ্ধ বৌদ্ধমন্দির এই প্রথম শ্রেণীর অন্তর্গত। ইহা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী নেওয়ারদিগের অতি পবিত্র তীর্থ। নেপালের ইহা প্রাচীনতম মন্দির বলিলেও চলে। দুই সহস্র বৎসর পূর্বে ইহা প্রতিষ্ঠিত হয়, এই রূপ অনুমান করা অসঙ্গত নহে। কাটমণ্ডু সহরের এক মাইল পশ্চিমে একটী -ক্ষুদ্ৰ পৰ্বতের শিখরদেশে স্বয়ম্ভুনাথের বা আদিবুদ্ধের এই প্রসিদ্ধ মন্দির অবস্থিত। নেপাল উপত্যকা হইতে এই পৰ্বতটী প্রায় ৩০০ ফিট উচ্চ হইবে। কথিত আছে মাঞ্জুশ্রী বােধিসত্ত্ব যখন নাগবাস হ্রদের জল নির্গত করিয়া দেন তখন হ্রদে একটী শতদলের মধ্যে স্বয়ম্ভু ভগবান্ দিব্য- জ্যোতিতে প্রকাশিত হইলেন। সেই পদ্মের মূল পশুপতিনাথের নিকটবর্তী গুহেশ্বরীতে নিহিত ছিল, এবং পুষ্পটীর উপর বর্তমান স্বয়ম্ভুনাথের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। স্বয়ম্ভুনাথের মন্দিরের অদূরে মাঞ্জুশ্রীর মন্দির দেখিতে পাওয়া যায়। নেপালে মাঞ্জুশ্রীর অনেক মন্দির আছে। অনেক স্থলে বুদ্ধের চরণ এবং মাঞ্জুশ্রীর চরণ-মন্দিরে

*
IP
===
সিন্ধু অর্থাৎ সয়ম্ভুনাথের মন্দির

No text on this page.

নেপালের বৌদ্ধমন্দির। ১৬৩৭ অঙ্কিত দেখা যায়, মাঞ্জুশ্রীর চরণে চক্ষুও বুদ্ধের চরণে চক্র দেখা যায়। উপত্যকা হইতে প্রস্তরনির্মিত সােপানাবলী দিয়া পৰ্বতশিখরে স্বয়ম্ভুনাথের মন্দিরে উঠিতে হয়। এই সােপানশ্রেণী অতিক্রম করা বড়, সহজ ব্যাপার নহে। সােপানশ্রেণীর পাদদেশে বুদ্ধ, দেবের প্রস্তরনির্মিত ধ্যানমগ্ন এক প্রকাণ্ড মুক্তি দেখিতে পাওয়া যায়।' ইহার বামে ধৰ্ম্ম এবং দক্ষিণে সঙ্ঘের ক্ষুদ্র মূর্তি আছে। সালে এই বুদ্ধমূৰ্ত্তি নেপালরাজ প্রতাপমল্ল প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। সােপানাবলীতে আরও কিছু দূর অগ্রসর হইলে পথের উভয় পার্শ্বে সর্পোপরি গরুড়ের প্রস্তরমূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। গরুড়ের মস্তকে বুদ্ধ অমােঘসিদ্ধের ক্ষুদ্র প্রতিমূর্তি আছে। হিন্দুদিগের উপাস্য গরুড় বুদ্ধের বশ্যতা স্বীকার করিয়া মন্দিরের দ্বাররক্ষকরূপে নিযুক্ত হইয়াছেন ইহাই প্রতিপন্ন করা হইয়াছে। এই ভাবেই অনেক বৌদ্ধমন্দিরে গরুড় গণেশ প্রভৃতি হিন্দু-দেব- দেবীর প্রতিমূর্তি দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বৌদ্ধগণ পূর্বের উদ্দেশ্য বিস্মৃত হইয়া হিন্দু-দেবদেবীগণের পূজা করিয়া থাকেন। সােপানাবলী দিয়া উঠিয়াই মন্দিরের সম্মুখে প্রকাণ্ড স্বর্ণবর্ণের বজ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাও . নেপালরাজ প্রতাপমল্ল কর্তৃক স্থাপিত হইয়াছে। বৌদ্ধমন্দিরে বজের সার্থকতা কি তাহা প্রথমে নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। বজ্ৰটী ইন্দ্রের, বুদ্ধকর্তৃক হিন্দু- দেবতা ইন্দ্রের পরাজয়ের চিহ্নস্বরূপ আদিবুদ্ধের মন্দিরের দ্বার- দেশে বর্জটী স্থাপিত হইয়াছে। বজের সম্মুখে স্বয়ম্ভুর মন্দির ; কিন্তু ইহাকে মন্দির বলিলে ঠিক্ হইবে না, ইহা মন্দির নয়, প্রকাণ্ড স্তুপ।

নেপালে বঙ্গনারী। এই স্কুপের চারিদিকে সুন্দর মন্দির আছে বটে। তাহার কোনটা বা বুদ্ধ অমােঘসিদ্ধ কোনটা বা বৈরচন, কোনটা বা অমিতাভ প্রভৃতির মন্দির। প্রাঙ্গনে বৌদ্ধভিক্ষুদিগের জন্য বিহার সকল দেখিতে পাওয়া যায়। চারিদিকেই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঘণ্টা। মন্দিরের চতুর্দিকে বৌদ্ধদিগের জপযন্ত্র বা মণি আছে। দর্শকগণ ঘণ্টাধ্বনি করিয়া এবং জপযন্ত্র ঘুরাইয়া পূজার ফল লাভ করে। স্বয়ম্ভু অদ্যাবধি বৌদ্ধদিগের প্রধান তীর্থ। নেপালে শীতকালে বিস্তর তিব্বতবাসীর সমাগম হয়। তাহাদিগের নিকট স্বয় অতি পবিত্র স্থান। নেপালবাসী নেওয়ারগণ সর্বদা স্বয়ম্ভুনাথ দর্শন করিতে আসে বটে, কিন্তু হিন্দুদিগের নিকট এ স্থানের বিশেষ কোন সম্মান নাই। পশুপতিনাথের মন্দিরে হিন্দু বৌদ্ধ সকলেই গিয়া থাকে। এখানে জনসমাগম নাই বলিলেও হয়। প্রাঙ্গন প্রায় জনশূন্য দেখিলাম । বানরদল আনন্দে বিহার করিতেছে। স্বয়ম্ভুর মন্দির অত্যন্ত প্রাচীন। কথিত আছে দুই সহস্র বৎসর পূর্বে নেপালরাজ গােরাদাস ইহার প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের নিকট প্রস্তরফলকে লিখিত বিবরণ হইতে কোন্ সময়ে কোন্ মহাত্মা এই মন্দিরের সংস্কার করিয়াছেন তাহা নির্ণয় করা যায় ; যথা— ১৫৯৬ সালে নেওয়াররাজ শিবসিংহমল্ল ইহার পূর্ণ- সংস্কার করেন। ১৬৩৯ সালে লাসা হইতে আগত সিয়া না নামে জনৈক লামা ইহার পুনঃসংস্কার করেন। ১৮৫০ সালে নেওয়াররাজ বিখ্যাত প্রতাপমল্ল আদি- বৌদ্ধস্তৃপ-বৌধ

No text on this page.

নেপালে বৌদ্ধমন্দির । ৪। T ; স্তুপের চারিদিকে পাঁচটী অতি সুন্দর, মন্দির নিৰ্ম্মিত করিয়া পঞ্চ- বুদ্ধমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৫০ সালে লাসা হইতে দুইজন লামা আসিয়া এই মন্দিরের সংস্কার করেন। ইহার পরও অনেক বার. অম্লাধিক পরিমাণে ইহার সংস্কার হইয়া আসিতেছে। জানি না এই রূপ প্রাচীন মন্দির আর আছে কি না। কিন্তু বর্তমান সময়েও ইহার অবস্থা ভালই আছে। বােধনাথ বা বৌধ কাটমণ্ডু সহরের তিন মাইল দূরে তিব্বতবাসী বৌদ্ধদিগের সৰ্ব্বপ্রধান তীর্থ বােধনাথ প্রতিষ্ঠিত। স্বয়ম্ভুর মন্দিরে হিন্দুগণ কদাচিৎ গিয়া থাকে কিন্তু বােধনাথ খাটি বৌদ্ধতীর্থ। তিব্বতি- গণ ইহার চতুর্দিকে বাস করে। ইহা তাহাদিগের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, তাহাদিগেরই তীর্থ। ইহাও অতি প্রাচীন। অতি পুরাকালে লাসা হইতে কাশ নামে কোন তিব্বতী তীর্থভ্রমণােদ্দেশে নেপালে আগমন করেন, তাহারই দেহাবশেষ এই স্তপের গর্ভে রক্ষিত হইয়াছে ; ইহাও প্রকাণ্ড গােলকার এক স্থপ। ইহার ব্যাস ৯০ ফি এবং মধ্যভাগ উচ্চে ১৫৩ ফিট্‌ হইবে। নেপাল-উপত্যকার সৰ্ব্বত্রই ইহার স্বর্ণময় চুড়া এবং তন্নিম্নস্থিত চক্ষুদ্বয় দেখিতে পাওয়া যায়। এই প্রকাণ্ড পটীর চতুর্দিকেও জপযন্ত্র । ইহা তিব্বতীদিগের একটী ক্ষুদ্র সহর এবং অপরিচ্ছন্নতায় অতুলনীয়। বােধনাথের সহিত হিন্দুদিগের কোন সম্পর্ক নাই; তাহারা ইহার ত্রিসীমানায় পদার্পণ করে কি না সন্দেহ। ; ।

নেপালে বঙ্গনারী। পাটনে মৎসেন্দ্রনাথের মন্দির। নেপালের নেওয়ারগণ মৎসেন্দ্রনাথকে বােধিসত্ত্ব পদ্মপানির অবতার বলিয়া বিশ্বাস করেন। কথিত আছে আসামের কথপল পৰ্বত মৎসেন্দ্রনাথের আবাস ছিল। একবার নেপালে দ্বাদশবর্ষ- ব্যাপী অনাবৃষ্টি হয়। তখন ভাটগাঁওএর রাজা নরেন্দ্রদেব তাহাকে আহ্বান করিয়া আনেন এবং তাহার আগমনমাত্রে নেপালে প্রচুর বারিবর্ষণ হয় এবং প্রজাগণের প্রাণরক্ষা হয়। অদ্যাবধি মৎসেন্দ্র- নাথের যাত্রার দিবস এক পসলা বৃষ্টি না হইয়া যায় না। এই মন্দির পাটনের দক্ষিণে নরেন্দ্রদেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ৪।কটিম সহরে ছোট মহেন্দ্রনাথের মন্দির আছে। পাটনে অশােকের মন্দির। নেপালের ইতিহাসে দেখা যায় সম্রাট অশােক সপরিবারে সদলে নেপালে আগমন করেন। কাটম সহরের সন্নিহিত পুরাতন পাটন, অর্থাৎ ললিত পাটন তাঁহাদ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। তিনি সহরের মধ্যভাগে এবং চারিকোণে আদিবুদ্ধের যে সকল মন্দির নির্মাণ করাইয়াছিলেন তাহা অদ্যাবধি সুন্দর অবস্থায় আছে। এই সকল মন্দিরের গর্ভে অশােক যাহা নিহিত করিয়া- ছিলেন হা অদ্যাবধি কেহ স্পর্শ করে নাই। জানি না ভবিষ্যতে এই সকল মন্দিরের গর্ভ হইতে কত অমূল্য পুরাতত্ত্ব সংগৃহীত জ হইবে। ভাটগাঁওএ অশােকের প্রতিষ্ঠিত মন্দির আছে। কীৰ্ত্তিপুরে এবং ভাটগাঁওতে অসংখ্য বৌদ্ধমন্দির আছে। ইহার কোনটা বা আদি- নেপালে বৌদ্ধমন্দির। কোনটা বা মাঞ্জুশ্রী, কোনটা কোন বােধিস্বত্ত্বের উদ্দেশে উৎসর্গী- কৃত হইয়াছে। সংকীর্ণ স্থানে তাহার বর্ণনা এবং উল্লেখ করা দুঃসাধ্য। এরূপ অসংখ্য বৌদ্ধকীৰ্ত্তি ভারতে আর কুত্রাপি নাই। নেপাল বৌদ্ধদিগের অতি প্রিয়ভূমি তাহাতে আর সন্দেহ নাই।

নেপালের পূজা পার্বণ ও জাতীয় উৎসব, বাঙ্গালা দেশে আমরা বারমাসে তের পাৰ্বণ দেখিয়া আসিতেছি, এখানে ১২ মাসের পূজা পাৰ্ব্বণের সংখ্যা করিয়া উঠাই এক কঠিন ব্যাপার। কি গুখা, কি নেওয়ার, নেপালীদিগের ভিতর চির উৎসব চলিয়াছে। এত পূজা পাৰ্বন, আমােদ আহলাদ করিয়া কখন যে তাহারা জীবিকা উপার্জনের অবসর পায় তাহাই ত এক সমস্যা। গুখগণ হিন্দু, নেওয়ারগণ পূৰ্বে বৌদ্ধ ছিল। এই উভয় সম্প্রদায়ের উৎসব এখন নেপালের জাতীয় উৎসব হইয়া দাড়াইয়াছে। এই কারণেই নেপালে পূজা পার্বণের এত বাহুল্য দেখা যায়। বৌদ্ধদিগের দেবমন্দির হিন্দুদিগেরও দেবমন্দির হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বৌদ্ধদিগের উৎসব হিন্দুদিগেরও উৎসব হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিজয়াদশমী, হিন্দুর উৎসব হইলেও নেপালের আপামর সাধারণের তাহাই এখন প্রধান জাতীয় উৎসব। ১লা বৈশাখ হইতে নেপালীদিগের উৎসব আরম্ভ। সেই দিন ভােগমতিগ্রামে নেপালের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা মৎসেন্দ্রনাথের অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং রাজার তরবারি তাহাকে দেওয়া হয়। অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হইলে উচ্চ বিচিত্র বর্ণের পতাকালশাভিত কাঠের রথে বসাইয়া তাহাকে পাটনে আনা হয়। আসিবার সময় পথে বিস্তর জনসমাগম হয় এবং পথে এক একদিন এক নেপালের পূজা পার্বণ ও জাতীয় উৎসব। একস্থানে মৎসেন্দ্রনাথের অবস্থিতি হয়। সেই দিন সেই স্থানের লােকেরা মৎসেন্দ্রনাথের সেবকদিগের সেবা করেন। এই প্রকারে প্রায় ৭ দিন ধরিয়া মৎসেন্দ্রনাথের যাত্রাকার্য সম্পন্ন হয়। পাটনে এক মাস অবস্থিতি করিয়া পুনরায় শুভদিন দেখিয়া মৎসেন্দ্রনাথ ভােগমতিতে প্রত্যাবর্তন করেন। এই মহেন্দ্রনাথের যাত্রা বৌদ্ধ নেওয়ারদিগের উৎসব ! এখন ইহাতে সৰ্বসাধারণে যােগ দিয়া থাকে। ২। ৩রা বৈশাখ হইতে ব্ৰজযযাগিনী যাত্রা আরম্ভ হয়। কাটমণ্ডুর সন্নিকটে মুনিচর পৰ্বতে এই ব্ৰজযােগিনী দেবীর মন্দির অবস্থিত। প্রায় এক সপ্তাহ ধরিয়া এই উৎসব সম্পন্ন হইয়া থাকে। দেবীকে এই সময় ক্ষুদ্র কাঠমন্দিরে স্থাপন করিয়া সকলে তাহাকে স্কন্ধে করিয়া সহর প্রদক্ষিণ করিয়া থাকে। ইহাও নেওয়ার- দিগের উৎসব। ৩। ২১শে জ্যৈষ্ঠ সিবি যাত্রা—এই দিবসে কাটমণ্ড, সহরের পশ্চিমাংশে বিষ্ণুমতী নদীর তীরে বালকেরা দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া নদীর উভয় পারে থাকিয়া পরস্পরকে প্রস্তরখণ্ড মারিতে থাকে। পূৰ্বে এই পর্বোপলক্ষে জীবননাশ, অঙ্গহানি পৰ্যন্ত ঘটিত। এক- বার ইংরাজ-রেসিডেন্ট এই উৎসব দেখিতে আসিয়া দৈবাৎ গুরুতর আহত হন। তখন হইতে জঙ্গ বাহাদুর ইহাকে সংযত করিয়া এখন বালকদিগের ক্রীড়ামাত্রে পরিণত করিয়াছেন। এখন গুরুতর দুর্ঘটনা প্রায় ঘটে না। ৪। ঘাটে মঙ্গল—১৪ই শ্রাবণ নেপালের বালকগণ ঘাট- ।

" নেপালে বঙ্গনারী। ; সুরের কুশপুত্তলিকা নিৰ্মাণ করিয়া তাহাকে বাজারে প্রদক্ষিণ করে। সকলে পড়িয়া তাহাকে উত্তমরূপ প্রহার করে এবং সকলের নিকট ধান্য ভিক্ষা করে। সন্ধ্যার পর মহাসমারােহে উক্ত অসুরের দাহকার্য সমাধা হয়। এই প্রকারে দেশ হইতে ঘাটা- সুরের বিদুরণ ব্যাপার সমাধা হয়। ইহা বালকদিগেরই উৎসব। ৫। বাহরাযাত্রা—ইহা একেবারে নেওয়ারদিগের উৎসব এবং নেওয়ারগণ কর্তৃক বৎসরে দুইবার সম্পন্ন হইয়া থাকে ; যথা—৮ই শ্রাবণ এবং ১৩ই ভাদ্র। বৌদ্ধমার্গী নেওয়ারদিগের মধ্যে পুরােহিত অর্থাৎ ভিক্ষুকসম্প্রদায় বর্তমান সময়ে বাহরা নামে অভি- হিত হইয়া থাকে। এখন বৌদ্ধধর্মের দুর্গতির আর বাকী কিছু নাই। ভিক্ষুদিগের ভিক্ষুদিগের ভিক্ষাব্রত আর নাই কিন্তু এই দুই দিবস তাহাদিগের পূৰ্বব্রত স্মরণের দিন। এই দুই বিশেষ দিনে নেওয়ারগণ তাহাদিগের গৃহ বিপণি উত্তম রূপে সজ্জিত করে। নারীগণ গৃহদ্বারে ভাণ্ডপূর্ণ চাউল লইয়া বসিয়া থাকে। বাহরাগণ পূৰ্বপুরুষদিগের ভিক্ষাব্রত স্মরণ করিয়া দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার্থ উপস্থিত হয়। নারীগণ সকলকে ভিক্ষা দিয়া কৃতার্থ হয়। নেওয়ারগণ সময়ে সময়ে এই উৎসবে রাজাকে নিমন্ত্রণ করিয়া তাহাকে রৌপ্যময় সিংহাসন সুবর্ণ-ছত্র প্রভৃতি উপহার দিয়া থাকে। বর্তমান সময়ে বৌদ্ধ নেওয়ারদিগের ইহা এক মহা উৎসব। ৬। রাখীপূর্ণিমা–শ্রাবণের সংক্রান্তিতে এখানে রাখিপূণি- মার উৎসব হয়। এই উৎসবে হিন্দু বৌদ্ধ সকলেই যােগ দিয়া থাকেন। বৌদ্ধগণ: এই দিবসে নদীতে স্নান এবং দেবতা দর্শন নেপালের পূজা:পাৰ্বণ ও জাতীয় উৎসব। করেন। ব্রাহ্মণগণ সকলের হস্তে রাখী বন্ধন করে। এবং প্রতি- দানে বিস্তর দক্ষিণা লাভ করে। অনেকে এই সময়ে গোঁসাইথান নামক হিমালয়ের উন্নত শিখরে ভ্রমণ করে। ৭। নাগপঞ্চমী–৫ই শ্রাবণ নাগপঞ্চমীর পূজা সম্পন্ন হয়। এই দিবস নাগযুদ্ধে গরুড় জয়লাভ করিয়াছিল। পাটনে চন্দ্র- নারায়ণ নামে গরুড়ের যে প্রস্তর মূর্তি আছে এই দিবসে তাহা ঘর্মাক্ত হয়। পুরােহিতগণ একখণ্ড কাপড়ে সেই ঘৰ্ম্ম মুছিয়া রাজার নিকট প্রেরণ করে। লােকের বিশ্বাস সর্পাঘাতগ্রস্ত রােগী- কে এই কাপড়ের একটী সূতা জলে ডুবাইয়া পান করাইলে সর্পবিষ স্থালিত হয়। ৮। জন্মাষ্টমী–ভাদ্রমাসে শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে এই উৎসব হইয়া থাকে। জনসাধারণ এই দিবসে আপন আপন গৃহ সুসজ্জিত করে। ৯। গাইযাত্রা–ভাদ্রমাসের প্রথম দিবসে এই পাৰ্বণ হয়। ইহা নেওয়ারদিগের মধ্যেই প্রচলিত। বৎসরের মধ্যে যাহাদিগের গৃহে কাহারও মৃত্যু হইয়াছে তাহারাই এই পার্বণে যােগ দিয়া থাকে। এই দিবসে কোন ব্যক্তিকে সেই মৃত ব্যক্তির ন্যায় সজ্জিত করিয়া তাহাকে চতুষ্পদ বিশিষ্ট করিয়া রাজার বাড়ীতে লইয়া নৃত্য করে। ইহা এক অপূৰ্ব উৎসব। স্বয়ং মহারাণীর মৃত্যু হইলেও তাহার এক গাভীমূৰ্ত্তি এই দিবসে করা হয়। এই মূর্তিকে রাজ্ঞীর ন্যায় সুসজ্জিত করিয়া চতুষ্পদবিশিষ্ট করে। ১০। বাঘযাত্রা--ইহাও ভাদ্রমাসে হইয়া থাকে। ব্যা.

৫৯
নেপালে বঙ্গনারী।
মূর্তি গ্রহণ করিয়া লােকেরা বাড়ী বাড়ী নৃত্য করিয়া আমােদ
করিয়া বেড়ায়।
১১। ইন্দ্রযাত্রা—২৬শে ভাদ্র নেওয়ারদিগের মধ্যে এই
মহােৎসব সম্পন্ন হইয়া থাকে। এই দিবসে একটী উচ্চ কাঠের
স্তম্ভ রাজার বাটীর সম্মুখে রোপণ করা হয়। তখন সকলে
নানাপ্রকার মুখােস্ পরিয়া ইহার চারিদিকে নৃত্য করে। তৃতীয়
দিবসে কয়েকটী কুমারীকে রাজার সম্মুখে আনিয়া পূজা করা
হয়। কুমারীগণ পূজিত হইলে তাহাদিগকে রথে বসাইয়া
সহর প্রদক্ষিণ করা হয়। সহর প্রদক্ষিণানন্তর রাজবাটীর সম্মুখে
রথ উপনীত হইলে রাজার গদি কুরীদিগের সম্মুখে বিস্তৃত করা
হয়।
কখন কখন রাজা তদুপরি স্বয়ং উপবেশন করেন। রাজার
অবর্তমানে তাঁহার তরবারি তদুপরি রক্ষিত হয়।
নেওয়ারদিগের চিরস্মরণীয় হইয়া আছে। এই দিবস পৃথ্বীনারা-
য়ণ গুপ্তভাবে কাঠমধু সহরে কতিপয় সহচর সমভিব্যাহারে
প্রবেশ করিয়াছিলেন। নেওয়ারগণ এই উৎসবে এত মত্ত ছিল
যে, তাহারা কিছুই জানিতে পারে নাই। কুমারীগণ সহর
প্রদক্ষিণ করিয়া রাজবাটীর সম্মুখে উপস্থিত হইলে যখন রাজার
গদি বিস্তৃত হইল, তখন পৃথীনারায়ণ স্বয়ং তাহাতে উপবেশন
করিয়া আপনাকে রাজা বলিয়া ঘােষণা করিলেন।
১২। দশমী বা দুর্গোৎসব—বঙ্গদেশে যেমন দুর্গোৎসব হইয়া
থাকে সেরূপ এখানেও হইয়া থাকে। বর্তমান সময়ে ইহাই
নেপালের জাতীয় উৎসব। নেপালের সমুদায় • জনসাধারণ

নেপালের পূজা পার্বণ ও জাতীয় উৎসব।
৫৯
মনপ্রাণের সহিত এই
এই উৎসব-কাৰ্যে যােগ দিয়া থাকে।
বঙ্গদেশের ন্যায় এখানে দেবীর প্রতিমা নির্মিত হয় না।
সপ্তমীর দিনে সমুদয় সৈন্য ব্যহাকারে টুনিখেলে সজ্জিত হয়।
স্বয়ং রাজা, মন্ত্রী ও সমুদায় গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত হন।
রাণী পখরীর মন্দিরে যেমন নারীগণ ঘটস্থাপন করেন
অমনি দিগদিগন্ত কম্পিত করিয়া ভীমগন্জনে সমুদায় বন্দুক,
কামান ধ্বনিত হইয়া উঠে এবং দশমীব উৎসব আরম্ভ
দরিদ্র ধনী সকলের গৃহে গৃহে ছাগ মহিষ বলি
দেওয়া হয়। নেপালে দশমীর উৎসবের এই প্রধান, অঙ্গ।
এই সময়ে গৃহে গৃহে পথে হাটে ঘাটে সর্বত্রই বলি, সর্বত্রই
রুধিরােৎসব ; স্বয়ং রাজা মহারাজা প্রভৃতি স্বহস্তে বলি দিয়া
থাকেন। অষ্টমী ও নবমীতে সহস্র সহস্র ছাগ এবং মহিষ দেবােদ্দেশে
উৎসর্গীকৃত হয়। এই সকল পশু অধিকাংশই বহুদিন পূৰ্ব্ব
হইতে ভারতবর্ষ হইতে সংগৃহীত হয়। দশমীর দিন উৎসবের
অবসান। সেই দিন সকলে নববস্ত্র পরিধান করিয়া আত্মীয় স্বজনের
গৃহে সমাগত হয় এবং গৃহস্বামী সকলের কপালে টীকা দেন।
সেই দিন রাজকর্মচারিগণ রাজগৃহে সমাগত হয়, তাহাকে
অর্থ দিয়া দর্শন করে এবং তিনি সকলের কপালে টীকা দিয়া
আপ্যায়িত করেন।
৩। বঙ্গদেশের ন্যায় এখানেও শ্যামাপূজার সময় গৃহসকল
আলােকমালায় সজ্জিত কিন্তু শ্যামা পূজা হয় না, লােকে
করে এবং সমস্ত রাত্রি জুয়া খেলে। এই সময়
।
হয় ;

নেপালে বঙ্গনারী
তিনদিন নেপালীগণ উন্মত্তের ন্যায় পথে ঘাটে জুয়া খেলিয়া
বেড়ায়।
১৪। ১৬ই কার্ত্তিক নেপালীদিগের কুকুরপূজার দিন।
সে দিন পথে ঘাটে দেখি কুকুরের গলায় মাল্য, কপালে টীকা।
৩৬৪ দিন তাহারা সৰ্ব্বত্র প্রহারদ্বারা অভ্যর্থিত হয়; কিন্তু এই
একটী দিবস তাহারা সমাদর, আহার, পূজা সকলই লাভ
করে। বােধ হয় “অহিংসা পরমােধৰ্ম্মবাদী” বৌদ্ধগণ জীবগণের
প্রতি প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ এই উৎসবের প্রবর্তন করিয়া-
ছিলেন।
১৫। ভাইপূজা—আমাদের দেশে যেদিন ভগিনীগণ ভাইএর
কপালে ফোঁটা দেন সেই দিনই নেপালী-সুন্দরীগণ ভাইপূজায়
প্রবৃত্ত হন। ইহা রীতিমত ভাইপূজার ব্যাপার—জ্যেষ্ঠা ভগিনী
কনিষ্ঠ ভ্রাতাকেও এই দিবস পূজা করেন এবং নানাবিধ মিষ্টান্ন
আহার করাইয়া পরিতৃপ্ত করেন।
১৬। বালচতুৰ্দশ্য—এই দিবসে বানরদিগের উৎসব।
পশুপতিনাথের নিকটস্থ মৃগস্থলী নামক বনে গিয়া সকলে চাউল
প্রভৃতি খাদ্য দ্রব্য চতুর্দিকে নিক্ষেপ করে।
নিক্ষেপ করে। বানরেরা আসিয়া
আনন্দে আহার করে।
১৭। কার্তিক পূর্ণিমা—এই দিবস নেপালের সধবা সুন্দরীগণ
উপবাস
করেন এবং সকলে পশুপতিনাথ দর্শন করিতে
আসেন। পরদিন প্রাতে স্বামীর চরণ পূজা করিয়া জন্মগ্রহণ
করেন। ইহার অপর নাম তীব্রত।

৩
নেপালের পূজা পার্বণ ও জাতীয় উৎসব।
১৮। শণেশ চৌথ—৪ঠা মাঘ উপবাসান্তে সকলে উত্তম
আহার করিয়া থাকে।
১৯। বসন্ত শ্রীপঞ্চমীর উৎসব।
মাঘীপূর্ণিমাযহারা সমুদায় মাঘমাস বাঘমতীর জলে
অবগাহন করিয়া স্নান করেন, তাহাদিগকে সংক্রান্তির দিন
ডুলিতে করিয়া দেব মন্দিরে লইয়া যাওয়া হয় এবং তাহাদের
বক্ষে, হস্তে,চরণে প্রজ্বলিত প্রদীপ দেওয়া হয়। নেপালের দুরন্ত
শীতে বাঘমতীর হিম জলে অবগাহন বড় সহজ ব্যাপার নহে।
২১। হােলি বা বসন্ত উৎসব—ফানের সংক্রান্তির দিনে
রাজবাটীর সম্মুখে একটা কাষ্ঠের স্তম্ভে নানাবিধ পতাকা
প্রােথিত করিয়া রাখা হয়। নেপালে হােলি রাজবাটীরই
উৎসব। সকলে। বসন পরিধান করিয়া রাজবাটীতে
গমন করেন। সেখানে সকলে সকলকে ফাগ দিয়া রঞ্জিত
করে। স্বয়ং রাজাধিরাজ মন্ত্রী প্রভৃতির সহিত মহােৎসাহে
ফাগ খেলা করেন। সাধারণ লােকে ফাগ খেলা করে না।
রাজবাটীতেই ফাগখেলার স্থান।
২২! ১৫ই চৈত্র ঘােড়াযাত্রা—এই দিবস রাজা মন্ত্রী ও প্রধান
প্রধান রাজকর্মচারীগণ টুনিখেলে সমবেত হন এবং তাহাদের
সম্মুখে ঘােড়দৌড় হয় এবং নানাবিং ব্যায়াম কৌশল প্রদর্শিত হয়।
ঘােড়াযাত্রার পর নেপালীগণ দুই দিন জুয়া খেলায় মত্ত হয়। এই
সময়ও দীপান্বিতা ভিন্ন অন্য সময় জুয়া খেলিলে দণ্ডাৰ্হ হইতে হয়।

দ্বিতীয় পৰ্য্যায় নেপালের প্রাকৃতিক বিবরণ। নেপাল হিমাচলের ক্রোড়স্থ পার্বত্য রাজ্য—ইহা হিমাচলের মধ্যভাগে অবস্থিত।নেপাল রাজ্য দৈর্ঘ্যে ৫০০ মাইল প্রস্থে কোন স্থানেই ১৪০ মাইলের অধিক নয়,–গড়ে ১০০ মাইল মাত্র। সীমা।-ইহার উত্তরে তিব্বত, দক্ষিণে হিন্দুস্থান, পূৰ্বে সিকিম, পশ্চিমে কুমায়ুন ও রােহিলা প্রদেশ। পূৰ্বে নেপাল রাজ্য পশ্চিম সীমায় শত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু ১৮১৬ খৃষ্টাব্দ হইতে ইংরাজদিগের সহিত যুদ্ধের পর সিগাউলির সন্ধি দ্বারা সার ডেভিড অক্টারলনি কুমায়ুন রাহিলাখণ্ড প্রভৃতি প্রদেশ অধিকার করিয়া ইংরাজ রাজ্যভুক্ত করিয়া লইয়াছেন। তখন হইতে: সিমলা, নৈনি- তাল, মসুরি প্রভৃতি নেপালরাজ্যের অঙ্গচ্যুত হইয়াছে। এক্ষণে নেপালরাজ্য আয়তনে পঞ্জাবের ন্যায়, এবং জন সংখ্যা ৪: ৪,০০০ ০ লক্ষ হইবে। এক কাটমণ্ডুর উপত্যকায় ২৫০০০০ লােকের বাস। নেপালের উত্তরে চিরতুষারাবৃত পর্বতমালা অবিচ্ছেদে বিস্তৃত। এই সকল পর্বতমালা ১৬,০০০ ফিট হইতে ২৮,০০০ ফিট পৰ্য্যন্ত উচ্চ পৃথিবীর মধ্যে চারিটী অত্যুচ্চ শিখরই এই নেপাল প্রদেশে অবস্থিত। যথা,-নন্দদেবী, ধবলগিরি, গোঁসাইথান, এভারেষ্ট বা গৌরীশঙ্কর। পশ্চিমে ননদেবী কুমায়ুনের শিরােভূষণ রূপে অবস্থিত। নদেবীর ২v-মাইল পূৰ্ব্বে ধবলগিরি, ধবল- হইবে।

নেপালের প্রাকৃতিক বিবরণ। গিরির ১৮০ মাইল পূৰ্বে গোসাইস্থান। গোঁসাইস্থানের ১৩০ মাইল পূৰ্বে এভারেষ্ট বা গৌরীশঙ্কর। নেপালরাজ্য, হিন্দুস্থানের অনেকগুলি প্রসিদ্ধ নদীর জন্মস্থান। উপরিলিখিত চারিটী অত্যুচ্চ পৰ্বতশিখর এবং তন্নিস্থত নদী সকল নেপাল রাজ্যকে চারিটী বিভিন্ন প্রাকৃতিক অংশে বিভক্ত করিয়াছে, আমরা যথাক্রমে নেপা- লের নদীগুলির নাম উল্লেখ করিতেছি। ১ম পশ্চিমে কালী বা সৱষু নদী নন্দদেবী হইতে নিঃসৃত হইয়া পার্বত্য প্রদেশ হইয়া, ক্রমে অযযাধ্যা প্রদেশ দিয়া প্রবাহিত হইয়া ঘর্ঘর (বা কর্ণালি) নদীতে আত্মসমর্পণ করিয়াছে। ২। ঘৱা (বা কর্ণালি -হিমাচলের ক্রোড়ে ঘর্ঘরার অপর নাম কর্ণালি—হিন্দুস্থানে ইহা ঘর্ঘর নামেই প্রসিদ্ধ। মানস সরােবরের নিকট জন্মগ্রহণ করিয়া টিকলাখড় পাশ দিয়া নেপাল- রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছে। নেপালের অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পার্বত্য নদী ইহাকে পরিপুষ্ট করিয়াছে। ঘর্ঘরা নদী—হিন্দুস্থানে অযােধ্যা প্রদেশের পূর্ব প্রান্ত দিয়া প্রবাহিত হইয়া সরয়ু এবং কুশীর সহিত মিলিত হইয়া দানাপুরের একটু উপরে গঙ্গায় আসিয়া পতিত হইয়াছে। ৩। ব্রাপ্তিনদী—ধবলগিরিতে রাপ্তির জন্ম—অযযাধ্যার উত্তর পূর্বাংশ দিয়া গােরক্ষপুরের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইয়া রাপ্তিনদী অবশেষে ঘর্ঘরার সহিত মিলিত হইয়াছে।—গােরক্ষপুর ইহার দক্ষিণতীরে অবস্থিত। ৪। গণ্ডকী নদী নেপালের মধ্য প্রদেশ দিয়া প্রবাহিত হইয়া গঙ্গায় আসিয়া পড়িয়াছে নেপালে,বঙ্গনারী। । ৫। পূর্কে কুশী নদী -নেপাল রাজ্য এই তিনটী প্রাকৃতিক অংশে বিভক্ত। পশ্চিমে ঘটনা প্রদেশ—মধ্যে গণ্ডকী প্রদেশ পূর্বে কুর্শী প্রদেশ।—এই তিনটী প্রদেশ ছাড়া কাটমণ্ডু উপত্যকা নেপালের একটা বিশেষ অংশ, ইহার পশ্চিমে গণ্ডকী প্রদেশ, পূৰ্বে কুশী প্রদেশ। কাটমণ্ডুর উপত্যকায় বাঘমতী নদীর জন্ম হইয়াছে। বাঘমতী নদী ক্রমে দক্ষিণাভিমুখিনী হইয়া মুঙ্গেরের সন্নিকটে গঙ্গায় গিয়া পতিত হইয়াছে। পূৰ্ব সীমায় ক্ষুদ্র মিচী নদী নেপাল রাজ্যের পূৰ্ব্বতম সীমা। এই নদী নেপাল ও সিকিমের মধ্যে ব্যবধান স্বরূপ হইয়াছে। নেপাল হইতে তিব্বতে যাইবার কতকগুলি সঙ্কীর্ণ গিরিপথ হিমালয়ের মধ্য দিয়া আছে। আমরা পশ্চিম হইতে যথাক্রমে এই গিরিপথ গুলির উল্লেখ করিব। si fogantata appant ( Tiklakhar or Yaripass ) apartin দেবী এবং ধবলগিরির মধ্যে ইহা অবস্থিত। হিমালয়ের উত্তরে মানস সরােবরের নিকট ঘর্ঘর নদী জন্মগ্রহণ করিয়া এই পথ দিয়া নেপালে আসিয়া পতিত হইয়াছে। ২। মৎস্য পাশ—ধবলগিবির ৪০ মাইল পূর্বে এই পথটী অবস্থিত। ৩। কিরাং পাশ-- ৪। কুটী পাশ—এই দুইটা পথ যথাক্রমে গোঁসাইস্থানের পশ্চিমে এবং পূর্বে অবস্থিত। এই দুইটী পথ দিয়াই তীব্বত হইতে অধিকতর যাত্রী নেপালে যাতায়াত করিয়া থাকে। লাশ নেপালের প্রাকৃতিক বিবরণ। হইতে কাটমণ্ডু আসিতে হইলে কুটী এবং কিরাং পাশই সর্বাপেক্ষা প্রশস্ত পথ। কুটী পাশ দিয়া ৪৫ দিনের মধ্যে পদব্রজে লাশ যাওয়া যায়। এ পথে অশ্বারােহণে যাওয়া সম্ভব নয়। কুটী পাশ কাটমণ্ড হইতে ৯০ মাইল এবং কিরাং পাশ ১০০ মাইল হইবে । কিরাং পাশ দিয়া অশ্ব সকল অনায়াসে গমনাগমন করে, এই কারণে কিরাং পাশই বাণিজ্যোদ্দেশে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। কিরাং পাশ দিয়া লাশা যাইতে ৭৮ দিন লাগিয়া থাকে। একবার হিমাচল পার হইলে তীব্বতের পথ অতি সুগম হইয়া পড়ে, তখন আর যাত্রীগণের কোন কষ্টই হয় না। ৫। হাতীয় পাশ।কুটী পাশের ৪০৫০ মাইল পূর্বে হাতীয় পাশ। হাতীয়া পাশ দিয়া কুশীর একটী শাখা নেপালে আসিয়া পতিত হইয়াছে। ওয়ানাং পাশ নেপালের পূৰ্বতম গিরিপথ। কাঞ্চন- জঙ্ঘার পশ্চিমে ইহা অবস্থিত। এই সকল গিরিপথ কেবল তীব্বতের লােকদিগের দ্বারা ব্যবহৃত হয়। কাঠমণ্ডু উপত্যকায় শীতকালে দলে দলে তীব্বতীয়গণ বাণিজ্য দ্রব্য লইয়া আগমন করে। নানাবিধ কম্বল, পার্বত্য অশ্ব, কুকুর, মেষ, ছাগল, নানাবিধ প্রস্তর, চামরীর পুচ্ছ, স্বর্ণ, রৌপ্য, মৃগনাভি, লবণ প্রভৃতি তীব্বতীয়গণ নেপালে লইয়া আসে। নেপাল হইতে অনেক লােক এবং কাশ্মিরীগণ কিরাং ও কুটী পাশ দিয়া লাশায় গিয়া থাকে।

নেপালের কয়েকটি প্রসিদ্ধ স্থান
ঘৰ্থৱা প্ৰদেশ-জুমলা, ডােটা, এবং সালিয়ানি প্রদেশে
বিভক্ত, পূর্বে ইহা দ্বাবিংশটী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত ছিল এবং
বাইশ রাজ্যের অন্তভূত ছিল। বাইশরাজ জুমলার রাজার করদ
ছিলেন। বাইশ রাজ্যের উত্তর পশ্চিমে জুমলা রাজ্য স্থাপিত।
বর্তমান সময়ে জুমলা এবং বাইশ রাজ নেপালের গুখারাজার
সামন্ত রাজা। জুমলার দক্ষিণ পশ্চিমে ডােটি রাজ্য। ডােটি
নেপালের পশ্চিমতম প্রান্তে স্থিত--ইহার রাজধানীও ডােটা।
এখানে নেপাল রাজের গড় এবং সৈন্য আছে। ডােটী সহরে ৪৫
শত গৃহ আছে। ডোটী বারেলীর ৮৫ মাইল উত্তরপূর্বে অবস্থিত
এবং আলমােরার ৭০ মাইল দক্ষিণপূৰ্বে। ডােটী হইতে
কাটমণ্ডু যাইবার পথ ১৬২ ক্রোশ হইবে।
সালিয়ানি—ডােটী প্রদেশের পূর্বে সালিয়ানি। এই
প্রদেশ দিয়া রাপ্তি নদী প্রবাহিত। সালিয়ানি লক্ষৌর ১২০
ক্রোশ উত্তরে।
পেনটান।–সালিয়ানির পঞ্চাশ ক্রোশ উত্তরপূর্বে
পেনটানা সহর এবং কাটমণ্ডর ৮৬ ক্রোশ পশ্চিমে। এখানে
নেপালরাজের বারুদ বন্দুক প্রভৃতি নির্মিত হয়। এই প্রদেশে
বিস্তর সােরা আছে।
সপ্ত গণ্ডকী প্রদেশ—গণ্ডকী প্রদেশ চরিটি বিভিন্ন
।'

নেপালের কয়েকটি প্রসিদ্ধ স্থান। অংশে বিভক্ত; (১) মালিরাম, (২) কাচি, (৪) পালপা, (৩) ধবলগিরি। ধবলগিরি হইতে গোঁসাইথান পৰ্বতের দক্ষিণে, ইহাই সপ্তগণ্ডকী প্রদেশ। গণ্ডকীর সপ্তশাখা এই প্রদেশে প্রবাহিত। ইহা নেপালের মধ্যাংশ। গণ্ডকীর এই সপ্তশাখা যথাক্রমে (১) বরিগর (২) নারায়ণী (৩) সইত গণ্ডকী (৪) মারসংতি (৫) দারামদি (৬) গণ্ডী (৭) ত্রিশূলগঙ্গা। ত্রিশূলগঙ্গা—গণ্ডকী প্রদেশের পূর্বতম সীমান্তবর্তিণী নদী। গোঁসাইথান পৰ্বতের শিখরস্থিত দ্বাবিংশতি হ্রদের মধ্যে সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহত্তম হ্রদে ইহার জন্ম। গোসাইখান-নেপালের একটি উন্নত শিখর। গোঁসাই- থান নেপালীদের এক প্রধান তীর্থ। গোঁসাইথানের চিরতুষারাবৃত শিখরের নিম্নেই স্তরে স্তরে দ্বাবিংশতিটী তুষার বারিপূর্ণ হ্রদ আছে। এই সকল হ্রদের নিম্নে জিবজিবিয়া পর্বতমালা প্রকার স্বরূপ হইয়া দণ্ডায়মান আছে। এই জিবজিবিয়া দক্ষিনমুখী হইয়া অবশেষে কাঠমণ্ডু উপত্যকার উত্তরে ১৫••• ফিট উন্নত মস্তক উত্তোলন করিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছে। গোঁসাইথানের বৃহত্তম হ্রদই নীলকণ্ঠকুণ্ড নামে প্রসিদ্ধ। নেপালে এরূপ কথিত আছে,—সমুদ্র মন্থন কালে কালকুট পান করিয়া বিষের যন্ত্রণায় মহাদেব' হিমালয়ে প্রস্থান করিয়াছিলেন এবং গোঁসাইথানের হিমজলে অবগাহন করিয়া শীতল হইয়াছিলেন, তাঁহার ত্রিশূলের আঘাতে হিমালয়ের বক্ষ ভেদ করিয়া ত্রিশূলগঙ্গা প্রবাহিত হইল এবং ত্রিশূলগঙ্গার জল পান করিয়া নীলকণ্ঠের নেপালে বঙ্গনারী। জালা বিদূরিত হইল। এক্ষণে নীলকণ্ঠকুণ্ডের মধ্যে একটা পর্বত নিমজ্জিত আছে, তীর্থযাত্রীগণ তাহাকে প্রকৃত নীলকণ্ঠ বিবেচনা করিয়া ভক্তিগদ্গদ হৃদয়ে নিরীক্ষণ করে। কিন্তু সেই হ্রদের তুষার শীতলজল কেহই স্পর্শ করিতে পারে না। কাটম উপত্যকা হইতে শত শত যাত্রী গোঁসাইথানে তীর্থ করিতে যায়। গোঁসাইথানের পথ অতি বিপদজনক। পথে কোন আশ্রয় নাই, কোন প্রকার খাদ্যের সংস্থান নাই, শীতও অতি দুরন্ত। সেই ভীষণ শীতে যাত্রীগণ বাহিরেই রাত্রি যাপন করে। পথের দারুন কষ্টে অনেকের প্রাণ বিয়ােগ হয় ; তথাপি এই কষ্ট স্বীকার করিয়াও দলে দলে লােক গোঁসাইথানে গমন করে। নায়াকোট-নায়াকোটের উপত্যকা দিয়া ত্রিশূলগঙ্গা প্রবাহিত হইয়াছে। এই উপত্যকায় প্রচুর পরিমানে ফল শষ্য জন্মে। কিন্তু এখানে ম্যালেরিয়ার বড়ই প্রদুর্ভাব। গণ্ডকী নদীর পশ্চিম তটে পশ্চিম নায়াকোট। দ্বাদশ শতাব্দীতে মুসলমান অত্যাচারে অস্থির হইয়া রাজপুতগণ প্রথমে এখানে আশ্রয়লাভ করে। পরে গােরখালি নামক প্রদেশ অধিকার করিয়া স্থায়ীরূপে বাস করে। গােরখালি হইতে এই গােখা নামের উৎপত্তি পাল্প-কাটমণ্ডু হইতে ৬৩ ক্রোশ এবং বিটুলের নয় ক্রোশ উত্তর পশ্চিমে ইহা অবস্থিত। পালপার পাঁচ মাইল দূরে নেপাল রাজের একটী প্রধান সৈন্যাবাস আছে। পালপার শাসন- কওঁ সৰ্ব্বদাই রাজবংশসস্তৃত ব্যক্তিগণ হইয়া থাকেন। এই স্থানে মুদ্রাসকল প্রস্তুত হইয়া থাকে। পালপার অন্তর্গত গুলমি নামে -

নেপালের কয়েকটি প্রসিদ্ধ স্থান।
এক স্থান আছে। কাটমণ্ডুর গুখ। রাজা পালপা এবং গুলমি
জয় করিয়াছিলেন। রণবাহাদুর গুলমি অধিকার করিয়া গুলমি
রাজার কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন—রণবাহাদুর পালপার
রাজকুমারীরও পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন।
পােখরা-গােখা প্রদেশের দক্ষিণ পশ্চিমে,-পালপা
সন্নিকটে পােখরার উপত্যকা অবস্থিত। পােখরা সহরটী উক্ত
প্রদেশের প্রধান সহর। অন্যান্য প্রদেশ অপেক্ষা এখানকার
জনসংখ্যা অধিক ; পােখরায় তাম্র পাত্র প্রস্তুত হয়। এখানে
একটি বার্ষিক মেলা হয় তাহাতে প্রচুর শষ্য ও এই প্রদেশের
কৃষিজাত দ্রব্য আমদানি হইয়া থাকে। পােখরার উপত্যকা
কাটমণ্ডর উপত্যকা অপেক্ষা বিস্তীর্ণ ; এখানে অনেকগুলি
হ্রদ আছে এবং এই কারণেই স্থানটীর নাম পােখর হইয়াছে।
আমরা যাহাকে পুষ্করিণী বা চলিত ভাষায় পুকুর বলি নেপালীরা
তাহাকে পােখরী বলিয়া থাকে।
এই উপত্যকার বৃহৎ
হ্রদটী এত বিস্তৃত যে তাহাকে প্রদক্ষিণ করিতে দুই দিবস
সময় যায়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এই হ্রদের জল এতই নীচে যে কোন
প্রকারে ব্যবহৃত হইতে পারে না। কাঠমণ্ডুর উপত্যকার
ায় এস্থান নদী বহুল নয়। জলের অভাবে কৃষিকর্মের বিশেষ
অন্তরায় ঘটিয়া থাকে। অধিকাংশ স্থলে কোন চাষবাস হয় না।
কুশী প্রদেশ-নেপালের পূর্ধ্বাংশ দিয়া কুশী এবং
তাহার উপনদী সকল প্রবাহিত—এই হেতু ইহাকে কুশী প্রদেশ

নেপালে বঙ্গনারী । কহিয়া থাকে—গোঁসাইথান হইতে গৌরীশঙ্কর বা এবারেষ্ট পৰ্য্যন্ত পৰ্বত মালার দক্ষিণে কুশী প্রদেশ অবস্থিত। গণ্ডকীর ন্যায় কুশীরও সপ্ত শাখা আছে, এই জন্য ইহাকে সপ্তকুশী বলে। কুশীর সপ্তশাখা যথাক্রমে (১) মিলামচি, (২) ভুটিয়া কুশী, (৬) তামাকুশী, (৪) লিখু, (৫) দুধকুশী, (৬) আরান, (৭) তামাের। কুশী প্রদেশের উত্তর সীমায় কুটী, হংতিয়া এবং ওয়ানাং পাশ অবস্থিত। সিলিয়া পৰ্বতমালা দ্বারা কুশী প্রদেশ সিকিম হইতে বিভক্ত। মিচি নদীই উভয় রাজ্যের সীমা। নেপালের পূৰ্ব্বতম সীমায় ইলাম নামে একটা ক্ষুদ্র নগর আছে। সিকিম হইতে এবং দারজিলিং হইতে নেপালীগ সর্বদাই ইলাম হইয়া নেপালে বাতায়াত করিয়া থাকে।

নেপালের পুরাবৃত্ত খ্রষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে নেপালরাজ্য বর্তমান সময়ের ন্যায় বিস্তীর্ণ প্রদেশ ছিল না। নেপালের বর্তমান কাটমণ্ডু উপত্যকার চতুর্দিকেই কেবল ইহার স্বাধীন রাজ্য বিস্তীর্ণ ছিল। এই স্থানে নেওয়ার নামধেয় মঙ্গোলীয় এবং হিন্দুজাতির সংমিশ্ৰিত এক শান্ত- স্বভাব, নিরীহ, পরিশ্রমী জাতির আবাস স্থান ছিল। নেওয়ারগণ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিল। কথিত আছে নীমুনি নামে জনৈক মহা- আর নামে এই রাজ্যের নাম নেপাল হইয়াছে। নী+পাল- অর্থাৎ দেবতার আশ্রিত প্রদেশ। পশুপতিনাথ তীর্থের সহিত নেপালরাজ্যের ইতিহাস অতি দৃঢ়রূপে গ্রথিত। অতি প্রাচীন কালে নীমুনি এখানে গােপবংশের একজনকে রাজা করিয়া নেপালরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। উক্তবংশ এখানে বহুশতাব্দী রাজ্য করিবার পর আহীরবংশ কর্তৃক তাড়িত হয়। নিম্নে যথাক্রমে নেপালের রাজবংশসমূহের তালিকা প্রদত্ত হইল। ১। গােপবংশ। ২। আহীরবংশ। আহীরবংশের তিনজনমাত্র রাজা হইয়াছিলেন ; যথা— (১) বীর সিংহ। (২) জয়মতি সিংহ। (৩) ভবানী সিংহ। ৩। কিরাটীবংশ।

৭২
নেপালে বঙ্গনারী।
কিরাটীবংশ বহুদিন নেপালে রাজত্ব করেন। কথিত আছে
কিরাটীবংশের ৪২ জন রাজা ৮০০ বৎসর নেপালে রাজ্য করিয়া-
ছিলেন। কিরাটীবংশের চতুর্দশ নৃপতি স্থানকোর রাজত্বকালে
পাটলীপুত্রের রাজা অশোেক সপরিবারে নেপালে আগমন করেন।
কাটমণ্ডুর সন্নিকটে যে পাটন আছে তাহা ললিতপাটন নামে
তাহাদ্বারাই নির্মিত হয়। এখানে অদ্যাবধি অশােকের নির্মিত
অনেক বৌদ্ধমন্দির চৈত্য ও বিহার আছে। অশােক অনেকদিন
নেপালে বাস করেন। এখানে তাহার কন্যা চারুমতির সহিত
নেপালরাজ দেবপালের বিবাহ হয়। চারুমতি অবশেষে ভিক্ষুনী হন
এবং চারুবিহার' নামে এক বিহার নির্মাণ করেন। চারুমতিকে
নেপালে রাখিয়া অশােক সপরিবারে দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়া-
ছিলেন।
কিরাটীবংশের পর যথাক্রমে
(৪) সােমবংশ –
(৫) সূৰ্য্যবংশ
নেপালে রাজত্ব করেন --সোমবংশের পঞ্চ নৃপতি নেপালে
রাজত্ব করেন। সূৰ্য্যবংশের রাজত্বকালে দাক্ষিণাত্যে শঙ্করাচার্যের
জন্ম হয় তিনি তর্কযুদ্ধে সমুদয় ভারতবর্ষস্থিত বৌদ্ধদিগকে পরা-
জিত করিয়া নেপালে আগমন করেন। কিন্তু বৌদ্ধগণ কেহই
তাহার সহিত তর্কযুদ্ধে জয়লাভ করিতে পারিলেন না। শঙ্করাচার্য্য
নেপালে বৌদ্ধদিগের প্রতি অতিশয় নির্যাতন করেন, অনেক
বৌদ্ধকে হত্যা করেন। তিনি বৌদ্ধদিগকে জীব হিংসা করিতে

। নেপালে পুরাবৃত্তি। বাধ্য করেন। বিহার সকল ধ্বংশ করেন। বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুনী দিগের বিবাহ দেন। প্রায় ৮৪০০০ বৌদ্ধ গ্রন্থ ধ্বংশ করেন। দেব মন্দিরে বলি আরম্ভ হয়, নেপালে বৌদ্ধ ধর্মের পরিবর্তে শৈব ধৰ্ম প্রবর্তিত হয়। ইহাও কথিত আছে বিক্রমাদিত্য তাহার শকাব্দ নেপালে প্রচলিত করিয়া, ভাটগাঁওএ সূৰ্য্য বিনায়ক নামে যে গণেশ মুৰ্ত্তি আছে তাহা তিনি প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। শঙ্করাচার্য্যের পূর্বে হর্ষবর্ধন বা শিলাদিত্য নেপালে গমন করিয়াছিলেন এরূপ উক্ত আছে। সূৰ্য্যবংশের পর ৬। ঠাকুরী বংশ ৭। রাজপুত বংশ- ৮। কর্ণটকী বংশ ৯। মল্লরাজ বংশ। ঠাকুরী রাজা গুণ কৰ্ম্মদেবের রাজত্ব সময়ে একদা তিনি মহালক্ষীর পূজা করিতেছিলেন, এমন সময় স্বপ্নে দেবী তাহাকে দেখা দিয়া বলিলেন, বাঘমতী এবং বিষ্ণুমতী নদীর সঙ্গম স্থলে এক সহর নিৰ্মাণ করিতে হইবে, পুরাকালে এই স্থলে নীমুনি তপস্যা করিয়া- ছিলেন। এই নূতন সহরের আকৃতি দেবীর খড়ঙ্গর ন্যায় হইল। রাজা ইহার নাম কান্তিপুর রাখিলেন। শুভ লগ্নে রাজা পাটন হইতে কান্তিপুরে রাজধানী পরিবর্তিত করিলেন। সহরে ১৮০০০ গৃহ নির্মিত হইল। লক্ষ্মী প্রতিজ্ঞা করিলেন যতদিন না ঐ সহরে দিন লক্ষ টাকার কারবার হয়, ততদিন সেখানেই অধিষ্ঠান করিবেন। রাজা এ8 নেপালে বঙ্গমারী। দেবীর কৃপায় সুবর্ণ ধারা নির্মাণ করেন। তিনি রক্ষাকালী ও নবদুর্গা প্রতিষ্ঠা করেন। এইরূপে বর্তমান কাটমও সহরের প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল। নেপালে বৰ্ম্ম উপাধীধারী ক্ষত্রিয় রাজ বংশই মল্লরাজ বংশের পূৰ্ব্বে রাজত্ব করিয়াছিল। এই বৰ্ম্ম রাজগণের শেষ দুইজন নৃপতির অব্যবহিত পূর্বের রাজা, তিনটী পুত্র রাখিয়া গতানু হন। তঁাহার তিনটী পুত্র যথাক্রমে নেপালে রাজত্ব করেন। কিন্তু তাহাদের কোন পুত্র ছিল না। একজনের সত্যনায়িকা দেবী নামে কেবল এক কন্যা ছিল। এই কন্যাট নেপালের রাজ্ঞী হন। বারানসীর রাজা হরিশ্চন্দ্র দেবের সহিত নেপালের এই রাণীর বিবাহ হয়। ইহাদের রাজলক্ষ্মী নামে এক মাত্র কন্যা জন্মে। সত্যনায়িকা দেবীর মৃত্যুর পর রাজলক্ষ্মী নেপালের সিংহাসনে আরােহণ করিলেন। কিন্তু কতিপয় দিবসের মধ্যে জয়দেব নামে একজন জ্ঞাতি কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত হন। ১৩২১ খৃষ্টাব্দে মিথিলার অধিপতি হরিসিংহ দেব মুসলমানগণ কর্তৃক রাজ্যভ্রষ্ট হইয়া নেপালে আশ্রয় লাভ করেন। এই হরিসিংহ দেব নেপালে জয়দেবকে পরাজিত করিয়া নেপালের সিংহাসন অধিকার করেন। ইহাদের উপাধি মল্ল ছিল। পৃথ্বীনারায়ণের নেপাল আক্রমণের সময় পর্যন্ত এই রাজবংশই কাটমণ্ডুর উপত্যকায় রাজত্ব করিতে ছিলেন। ১৬৩৯ খৃষ্টাব্দে এই বংশেরই রাজা প্রতাপমল্ল কাটমুণ্ডের সিংহাসনে আরােহণ করেন। তিনি অতি পণ্ডিত এবং শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন। ইনি মহামারী নিবারণের জন্য রাজ বাড়ীর সম্মুখে নেপালের পুরাবৃত্তি। ৭৫ হনুমানের এক বিগ্রহ স্থাপন করেন। পশুপতিনাথের মন্দির সংস্কার করেন এবং পশুপতির মস্তকে সুবর্ণ ছত্র নির্মাণ করাইয়া দেন। প্রতাপমলের কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যুর পর তাঁহার পত্নী শশাকে অতিশয় কাতর হন। রাজা রাণীকে সান্ত্বনা দিবার জন্য এক দীঘি খনন করিয়া তন্মধ্যে গৃহ দেবতার প্রতিষ্ঠা করেন। নানা তীর্থ হইতে পবিত্র বারি আনিয়া এই পুষ্করিণীটী পূর্ণ করেন। এই পুষ্করিণী অদাপি রাণীপপাখরি নামে অভিহিত হইয়া থাকে। ইহার তীরে হস্তি পৃষ্ঠে রাজা ও রাণীর মূর্তি এখন পর্যন্ত দণ্ডায়মান আছে। ইতিপূৰ্ব্বে হরি সিংহের অধঃতম ৭ম পুরুষ অক্ষমল্লের ১৫৬৮ খৃষ্টাব্দে মৃত্যু হয়। অক্ষমল তিন পুত্র ও এক কন্যাকে আপনার সমুদয় রাজ্য বণ্টন করিয়া দেন। জ্যেষ্ঠ পুত্রকে ভাতগাঁও, ২য় কে বেনীপার উপত্যকা, ৩য় কে কাটমণ্ডু, কন্যাকে পাটন। প্রতাপ- মল্ল এই তৃতীয় পুত্রেরই বংশধর ছিলেন। ইহার ২০০ বৎসর পরে গুর্খা রাজা: পৃথ্বীনারায়ণ যখন নেপাল রাজ্য আক্রমণ করেন তখন তিনি এই তিন রাজ্য পৃথক দেখিতে পান, এবং পৃথকভাবে ইহাদিগকে পরাভূত করেন।

গুর বিজয় গুখারাজগণ উদয়পুরের রাজপুত বংশােদ্ভব বলিয়া আপনা- দিগের পরিচয় দেন। মুসলমানদিগের অত্যাচারে উদয়পুর ত্যাগ করিয়া ইহাদিগের পূর্বপুরুষগণ হিমালয়ের দুর্গম প্রদেশে রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন। পালপার নিকট গােরখালী নামক স্থানে বাস করিতেন বলিয়া,ইহার। আপনাদিগকে গােরখালি বা গুখ। নামে অভিহিত করিতেন। ওখাগণ ক্রমে সপ্তগণ্ডকী দেশে রাজ্য বিস্তার করিল। গুখগণ সর্বদাই প্রতিবেশী রাজ্যসমূহে উৎপাত করিত। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে পৃথ্বীনারায়ণ নামে এক রাজা খার সিংহাসনে আরােহণ করেন। ইনি অতি ক্ষমতাশালী পুরুষ ছিলেন। সিংহাসনে আরােহণ করিয়া ইহার দেশজয় পিপাসা অত্যন্ত বলবতী হইয়া উঠিল। পৃথ্বীনারায়ণ নেপাল জয় করিয়া নেপালের সহিত গুখরাজ্য মিলিত করেন। অনেকদিন হইতে ইংরাজের সহিত নেওয়ারদিগের ব্যবসাগত সম্বন্ধের সূত্রপাত হইয়াছিল, সেই হেতু পৃথ্বীনারায়ণ যখন নেপাল আক্রমণ করিলেন তখন কাটমুণ্ডের মল্লরাজ ইংরাজদিগের সহায়তা ভিক্ষা করিয়া- ছিলেন। সেই সময় পাটনে একটী রােমান কাথলিকদের মিশন ছিল এবং সেখানকার অধ্যক্ষ ফাদার গায়সপি (Father Guesseope) গুর্থবিজয় ব্যাপার গুখাবিজয় ব্যাপার স্বচক্ষে দর্শন করিয়া- ছিলেন। তাঁহাদিগের বৃত্তান্ত হইতে সেই সময়কার অনেক ঘটনা জ্ঞাত হওয়া যায়। পৃথ্বীনারায়ণ যে সময় নেপাল আক্রমণ করেন

r;
th
TM

No text on this page.

গুখ। বিজয়। শ তখন ভাটগাও, কাটমুণ্ড, পাটন প্রভৃতির রাজগণ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। এই গৃহযুদ্ধ ব্যাপারে ভাটগাঁওয়ের রাজা পৃথ্বীনারায়ণের সহায়তা ভিক্ষা করেন। পৃথ্বীনারায়ণ অবিলম্বে সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুত হন। তখন ভাটগাঁও এর রাজা আপনার ভ্রান্তি জানিতে পারিয়া সকল গৃহবিবাদ বিস্মৃত হইয়া একতাসূত্রে আবদ্ধ হইয়া এই সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হন। পৃথ্বীনারায়ণকে একে একে এই সকল রাজ্য পরাভূত করিতে হইয়াছিল। প্রথমে তিনি কীর্তিপুর আক্রমণ করেন। তিন বার চেষ্টার পর সাতমাস অবরােধ সহ করিয়া বিশ্বাসঘাতক ব্রাহ্মণদিগের সহায়তায় পৃথ্বী- নারায়ণ কীৰ্ত্তিপুর অধিকার করিতে সক্ষম হন। তিনি কীর্তিপুরের আবাল বৃদ্ধের নাসা ও ওষ্ঠ ছেদন করিয়া স্বীয় কীৰ্ত্তি ঘােষণা করেন। কীর্তিপুর নামের পরিবর্তে ঐ.সহরের নাম নাসাকাটা- পুর রাখেন। ত্বরায় পাটনও হস্তগত করিলেন। ভাটগাঁওয়ের রাজা আত্মসমর্পণ করিয়া এই প্রকার নৃশংস আচরণ হইতে আপনাকে রক্ষা করিলেন। ১৭ ৬৮ খৃষ্টাব্দের ইন্দ্রযাত্রার দিন অতি আশ্চৰ্য্য উপায়ে পৃথ্বীনারায়ণ কাটম হস্তগত করিলেন। সেই দিন কটমবাসীগণ উৎসবে উন্মত্ত, পৃথ্বীনারায়ণ কতিপয় সৈন্য সমবিত্যাহারে কখন যে লুকাইয়া সহরে প্রবেশ করিয়াছিলেন কেহই দেখিতে পায় নাই। ইন্দ্রযাত্রার সময় রথে উঠিয়া কুমারী গণ সহর প্রদক্ষিণ করিয়া রাজবাড়ীর সম্মুখে উপস্থিত হইলে, রথের সম্মুখে রাজার গদি বিস্তৃত হইলে রাজা বা তাহার অনুপস্থিতে তাহার তরবারি তদুপরি রক্ষিত হয়। সেদিন রথ নেপালে বঙ্গনারী। চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করিয়া যেই রাজবাড়ীর সম্মুখে উপস্থিত হইল, অমনি রাজার গদি তাহার সম্মুখে বিস্তৃত হইতেই স্বয়ং পৃথ্বীনারায়ণ সেই গদিতে উপবিষ্ট হইয়া বলিলেন, “আমিই এখন অধীশ্বর, আমিই রাজা, রাজা বলিয়া আমায় বরণ কর।” তখন এমন অবস্থা হইল, সমুদয় আনন্দ কোলাহল বিস্ময়ে পরিণত হইল। কাহারও আর বাক্যত্তি হইল না। বাধা দেয় এমন সাধ্য আর কাহারও রহিল না। বিনা রক্তপাতে কাটমণ্ড, পৃথ্বীনারায়ণের হস্তগত হইল। পৃথ্বীনারায়ণ পাটন অধিকার করিলে পর তথাকার রােমন কাথলিকগণ পৃথ্বীনারায়ণের এক পুত্রের সহায়তায় নির্বিবাদে পাটন পরিত্যাগ করিয়া সদলে যাইবার অনুমতি প্রাপ্ত হন। তাহারা বিটওয়ার নিকট পুরী নামক স্থানে অদ্যাবধি বাস করিতেছেন। সেখানে নেওয়ার খৃষ্টানগণ অদ্যাপি বংশ পরম্পরায় বাস করিতেছে। পৃথ্বীনারায়ণ দৃঢ় চেষ্টায় এবং চক্রান্ত- কারী ব্রাহ্মণদিগের সহায়তায় এই সকল রাজ্য অধিকার করিলেন। নেওয়ারগণ, বিশেষতঃ কীর্তিপুরের অধিবাসীগণ যে জাতীয় স্বাধীনতা লােপের সময় বীরের ন্যায় আত্মরক্ষ্মা করিতে চেষ্টা করিয়াছিল, তাহা কেহই অস্বীকার করিতে পারেনা। এবং পৃথিনারায়ণ চক্রান্তকারী ও বিশ্বাসঘাতক ব্রাহ্মণদিগের সহায়তা না পাইলে কখনই সহজে কৃতকার্য হইতে পারিতেন না।

nmr lo

No text on this page.

৪।
নেপালের বর্তমান গুর্খা রাজগণ
নেপালের গুখ। রাজা ও রাজমন্ত্রী গণের তালিকা
১। পৃথ্বীনারায়ণ।
২। সিংহ প্রতাপ।
রণ বাহাদুর সাহ।
গৃবাণ যুদ্ধ বিক্রম।
রাজেন্দ্র বিক্রম সাহ।
সুরেন্দ্র বিক্রম সাহ।
৭। পৃথিবীর বিক্রম সাহ।
৮। ত্রিভুবন বিক্রম সাহ।
রাজমন্ত্রী গণ।
বাহাদুর সাহ রণবাহাদুর সাহের পিতৃব্য এবং মন্ত্রী
২। দামােদর পাঁড়ে—রণ বাহাদুরের মন্ত্রী।
ভীম সাহ চৌতুরিয়া-
-রণ বাহাদুরের মন্ত্রী।
ভীমসেন থাপা।
রণ জং পড়ে।
৬। রঘুনাথ পণ্ডিত।
কতে জং চৌতুরিয়া ।
৮। মাতব্বর থাপা।
গগন সিং।
৪।
৭।
১০।
জঙ্গ বাহাদুর।

৮০ নেপালে বনার। ১১। রণদীপ সিং। ১২। বীর শামসের। ১৩। দেব শামসের। ১৪। চত্র শামসের। ১। পৃী নারায়ণ-নেপাল জয় করিয়া গুখী এবং নেপাল রাজ্য মিলিত করিয়া সমুদায় প্রদেশ নেপাল রাজ্যের অন্তভূক্ত করেন। পরে কিরীটী এবং লিমুদিগকে পরাজিত করিয়া পূর্বে মিচি নদী পর্যন্ত নেপালরাজ্যের সীমা বিস্তার করেন। ক্ষুদ্র নেপাল রাজ্য এই প্রকারে বর্তমান আকার ধারণ করিল। পৃথ্বীনারায়ণ নবজীতরাজ্যে অধিক দিন রাজত্ব করিতে পারেন নাই। ১৭৭১ খৃষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হয়। ২। সিংহ প্রতাপ—পৃথ্বীনারায়ণের মৃত্যুর পর তাহার জ্যেষ্ঠপুত্র সিংহ প্রতাপ পৈতৃক সিংহাসনে আরােহণ করেন। সিংহ প্রতাপ দক্ষিণে পৈতৃক রাজ্য কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি করেন। ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে তিনি রণ বাহাদুর সাহ নামে শিশু- পুত্র রাখিয়া পরলােক গমন করেন। ৩। কণবাহাদুর সাহ-সিংহ প্রতাপের পত্নী রাণী রাজেন্দ্রলক্ষী পুত্রের অপ্রাপ্ত বয়সকালে অতিশয় যােগ্য- তার সহিত রাজ্য শাসন করেন। এবং তাঁহার শাসন কালে রাজ্যের পরিসরও বৃদ্ধি পায়। রণ বাহাদুর বয়ঃপ্রাপ্ত হইবার পূর্বেই রাণী রাজেন্দ্রলক্ষ্মী পরলােক গমন করেন। তখন রণবাহাদুরের পিতৃব্য বাহাদুর শাহ বালক রাজার নেপালের বর্তমান গুখ রাজগণ। অভিভাবকরূপে রাজ্যশাসন করিতে থাকেন। কিন্তু রণবাহাদুর বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া পিতৃব্য বাহাদুর সাহকে কারারুদ্ধ করিয়া হত্যা করেন। রণবাহাদুর অতি অযােগ্য নিষ্ঠুর এবং রূঢ় প্রকৃতির নৃপতি ছিলেন। এই সময় হইতেই নেপালের সিংহাসনে ক্রমাগত শিশু রাজা উপবেশন করিয়া আসিতেছেন। অদ্যাবধি এ নিয়মের অন্যথা হয় নাই। রণবাহাদুরের অনেক কুকীৰ্ত্তি আছে। তাঁহার দুইটী পুত্র ছিল, একটী পরিণীতা রাণীর গর্ভজাত, অপরটি ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত জারজ পুত্র। প্রথমােক্তের নাম রণােদ্যতসাহ, দ্বিতীয়ের নাম গৃবান যুদ্ধ বিক্রম। এই ব্রাহ্মণী রাজ্ঞী বসন্ত রােগে লুপ্ত হইয়া আত্মহত্যা করেন। ব্রাহ্মণীর মৃত্যুতে রাজা শশাকে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া অনেক অদ্ভুত কৰ্ম্ম করেন, তন্মধ্যে দেবী মন্দিরের লাঞ্ছনা প্রধান কাৰ্য। তিনি সমুদায় শীতলার মন্দির অপবিত্র করিয়া, তথায় পূজা রহিত করিয়া দিয়াছিলেন, এবং ব্রাহ্মণদিগের উপরও বিবিধ অত্যাচার করেন। রণবাহাদুর প্রজাদিগের উপর বিবিধ অমানুষিক অত্যাচার করিতেন। ক্রমে তাহার মস্তিষ্ক একান্ত বিকৃত হইয়া পড়িল; তখন রাজমন্ত্রী দামােদর পাঁড়ে তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া কাশী প্রেরণ করেন। রণবাহাদুর ইতিপূর্বে তাহার পুত্র রণােদ্যত সাহকে অতিক্রম করিয়া ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত পুত্র গবাণ যুদ্ধ বিক্রমকে আপনার উত্তরাধিকারী মনােনীত করিয়া- ছিলেন। রণবাহাদুর কাণী গমন করিলে মন্ত্রিগণ পঞ্চমবর্ষীয় বালক (৪) গৃবণ যুদ্ধ বিক্রমকে রাজপদে অভিষিক্ত ৮২ নেপালে বঙ্গনারী। করেন। এবং রােদ্যতের জননীকে এই শিশু রাজার অভিভাবক মনােনীত করেন। জ্যেষ্ঠা রাজমহিষী ত্রিপুরাসুন্দরী রণবাহাদুরের সঙ্গে কাশী গমন করিয়াছিলেন। গৃবাণ যুদ্ধ বিক্রম রাজা হইলে ছয় বৎসর বয়স্ক বালক রণােদ্যত শাহ তাহার চৌতুরিয়া অর্থাৎ প্রধান মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত হন। রণােদ্যতের জননী এই উভয় বালকের অভিভাবক ছিলেন। কাশীতে রণবাহাদুর জ্যেষ্ঠা রাজমহিষী ত্রিপুরাসুন্দরীর উপর অশেষ অত্যাচার করিতেন। অবশেষে ত্রিপুরাসুন্দরী কাশি ত্যাগ করিয়া নেপালে আসিতে মনস্থ করিলেন। ১৮০২ সালে তিনি নেপালের সীমায় পদার্পণ করিলে কনিষ্ঠা মহারাণী একদল সৈন্য তাহার গতিরােধ করিবার জন্য প্রেরণ করেন। তাহারা মহিষীর অনুচরবর্গকে বন্দী করিল। রাণী অগত্যা ফিরিয়া গেলেন। পর বৎসর আবার তিনি: নেপালের পথে যাত্রা করিলেন। এবারেও তাহার বিরূদ্ধে সৈন্য সামন্ত প্রেরিত হইয়াছিল কিন্তু সৈন্যগণ অন্তরে ত্রিপুরাসুন্দরীর প্রতি অনুরক্ত ছিল। তাহার বিরুদ্ধাচরণ করা দূরে থাকুক, তাঁহাকে লইয়া সসৈন্যে তাহারা সহরে প্রবেশ করিল। কনিষ্টা রাজ্ঞী ভীত হইয়া শিশু রাজাকে লইয়া পশুপতিনাথের মন্দিরে আশ্রয় লইলেন। ত্রিপুরাসুন্দরী বালক রাজাকে আনিয়া সিংহাসনে বসাইয়া আপনাকে অভিভাবক বলিয়া ঘােষণা করিলেন। কনিষ্ঠা মহিষীও প্রকাশ্যভাবে সমুদায় ক্ষমতা জ্যেঠার হস্তে সমৰ্পণ করিয়া তাহার বশ্যতা স্বীকার করিলেন। ঠিক এই সময়েই কাপটেন নস্ক (Captain Knox) নেপালের বর্তমান গুর্খা রাজগণ। ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট কর্তৃক নেপালের রেসিডেন্ট রূপে প্রেরিত হইয়াছিলেন। তিনি নেপাল রাজের সহিত “বাণিজ্য এবং মৈত্রীর” একটী তর্কের মীমাংসার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। নেপাল দরবার মুখে তাহার প্রতি যথেষ্ট সৌজন্য এবং ভদ্রতা প্রকাশ করিতেন বটে, কিন্তু লেখাপড়ার ব্যাপারে বড় অগ্রসর হইতেন না। ক্রমে Captain Knoxএর ধৈৰ্য্যচ্যুতি হইতে লাগিল এই সময়ে জ্যেষ্ঠা মহারাণী ত্রিপুরাসুন্দরী নেপালে প্রবেশ করিয়াছেন এই সংবাদ শুনিবামাত্র কনিষ্ঠা মহারাণী কাপটেন নক্সের (Captain Knox) সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিলেন। কিন্তু ত্রিপুরাসুন্দরী অন্তরে ইংরাজদিগকে অতিশয় সন্দেহের চক্ষে দর্শন করিতেন ইংরাজের সহিত সংশ্রবে আসিতে প্রস্তুত ছিলেন না। কাপটেন নস্ক শীঘ্রই নেপাল দরবারের এই প্রকার বৈরীভাব বুঝিতে পারিলেন। তিনি সভা ভঙ্গ করিয়া চলিয়া আসিলেন এবং ইংরাজ গবর্ণমেন্ট কাশিতে মহারাজ রণবাহাদুরকে নেপালে আসিবার অনুমতি দিলেন। এত দিন ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট এক প্রকার জোর করিয়া রণবাহাদুরুকে কাশীতে রাখিয়াছিলেন। রণ- বাহাদুর অচিরে নেপালে উপস্থিত হইলেন। তখনও দামােদর পাড়ে মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত ছিলেন। তিনি একদিন সৈন্য লইয়া রাজার সম্মুখীন হইলেন। দামােদর অন্তরে রণবাহাদুরের একান্ত বিরােধী ছিলেন। রণবাহাদুরের সহিত ভীমসেন থাপা নামে এক যুবক ছিলেন। রাজার উপর এ বক্তির অপ্রতিহত ক্ষমতা ছিল। মহারাজ সৈন্যগণের সম্মুখীন হইলে তিনি তাহাকে ৮৪ নেপালে বঙ্গনারী। বলিলেন “মহারাজ। এমন সুযােগ ছাড়িবেন না, আপনি এই সৈন্যগণকে আপনার বশ্যতা স্বীকার করাইতে পারিলে চিরদিনের মত দামােদর পাড়ের ক্ষমতা চূর্ণ হইবে।” রণবাহাদুর ভীমসেনের প্রবােচনায় উত্তেজিত হইয়া নিজে সৈন্যদিগের সম্মুখীন হইয়া স্বীয় উষ্ণীষ ঊর্ধে উত্তোলন করিয়া বলিলেন “আমার বিশ্বাসী গুর্খা সৈন্যগণ! তােমরা তােমাদের মহারাজকে চাও, না দামােদর পাড়ের অধিনায়কত্ব স্বীকার করিতে চাও, তােমাদের রাজা কে ?” অমনি সৈন্যদল “জয় মহারাজাধিরাজ রণবাহাদুরের জয়" বলিয়া ঘাের জয়নাদে প্রাঙ্গন কম্পিত করিল। পতিপ্রাণা মহিষী ত্রিপুরাসুন্দরী মহারাজকে পরম আদরে গ্রহণ করিলেন। রণবাহাদুর আবার নেপালে তাঁহার সিংহাসনে আরােহণ করিলেন এবং অত্যাচার নিষ্ঠুরতায় আবার নেপাল- বাসীকে অস্থির করিয়া তুলিলেন। রণবাহাদুর রাজ্যে প্রবেশ করিয়াই দামােদর পাড়ে ও তঁাহার পুত্রকে কারারুদ্ধ করিলেন এবং শীঘ্রই ভীমসেন থাপার প্ররােচনায় দামােদর ও তঁাহার পুত্র এবং আরও অনেক পড়েকে হত্যা করিলেন। রণবাহাদুরভীমসেন থাপাকে প্রধান মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত করিলেন। একটী বড় আশ্চর্য কথা যে, গৃবান যুদ্ধ বিক্রমকে রাজা বলিয়া অস্বীকার করিতে প্রজাগণ কেহই প্রস্তুত হইল না। তখন অগত্যা রণ- বাহাদুর স্বীয় পুত্রের অভিভাবক হইয়া রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই রণবাহাদুরের অত্যাচার অসহনীয় হইয়া নেপালের বর্তমান গুখ রাজগণ। উঠিল। তখন রাজ্যের কতিপয় প্রধান পুরুষ রণবাহাদুরের বৈমাত্রেয় ভ্রা শের বাহাদুরের সহিত মিলিত হইয়া মহারাজের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য এক চক্রান্তে লিপ্ত হইল। রণবাহাদুর এ চক্রান্তের বিষয় অবগত হইয়া ভীমসেন থাপার পরামর্শে তৎক্ষণাৎ শের বাহাদুরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং নেপালের পশ্চিমাংশে যে সৈন্যদল প্রেরিত হইয়াছিল তাহাদের সহিত মিলিত হইতে আদেশ করিলেন । শের বাহাদুর অতি অবজ্ঞাসূচক ভাষায় এই আদেশ প্রত্যাখ্যান করিলে রণবাহাদুর অমনি তাহার মস্তকচ্ছেদনের আজ্ঞা দিলেন। এই কথা শুনিয়া শের বাহাদুর হস্তস্থিত তরবারির দ্বারা রণবাহাদুরকে আক্রমণ করিলেন। দিকে বালমুর সিংহ কনওয়ার নামে এক প্রধান থাপা তাহাকে হত্যা করিয়া ফেলিল। এক মুহূর্তের মধ্যেই দুই ভ্রাতাই নিধনপ্রাপ্ত হইলেন। এই বালমুর সিংহ কনওয়ারই সুপ্রসিদ্ধ জঙ্গ বাহাদুরের পিতা। বালমুর সিংহের এই কার্যের জন্য তাহাকে পুরুষানুক্রমে বিশেষ সম্মানিত করা হয়। রণবাহাদুরের মৃত্যুতে ভীমসেন থাপার ক্ষমতা অপ্রতিহত হইল। প্রধান মন্ত্রী রূপে তিনি এবং মহারাণী ত্রিপুরাসুন্দরী অতি যােগ্যতার সহিত রাজ্যশাসন করিতে থাকেন। রণবাহাদুরের মৃত্যুর সময় গৃবাণ যুদ্ধ বিক্রম দশ বৎসরের বালক মাত্র ছিলেন। রণবাহাদুরের সহিত কনিষ্ঠা মহারাণী সহমৃতা হইয়াছিলেন। ভীমসেনের বিশেষ ইচ্ছায় এইরূপ হইয়াছিল। রণবাহাদুরের মৃত্যুর পরও শের সাহের চক্রান্তে লিপ্ত এই অনুযােগ দিয়া ভীমসেন স্বীয় বিরােধীদিগকে হত্যা করেন। ইতিপূর্বে ৮৬ নেপলে বঙ্গনার। পাড়েগণকেও হত্যা করা হইয়াছিল। এই রূপে প্রধান রাজ পুরুষ দিগের দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইল। মহারাণী ত্রিপুরাসুন্দরী ইংরাজদিগের বন্ধু ছিলেন না। ইংরাজ- দিগের সহিত নেপালরাজ কোন সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন না ; অধিকন্তু গুখগণ সৰ্ব্বদাই ইংরাজরাজ্যে অল্পাধিক অত্যাচার করিত। পিণ্ডারী দদলকে দমন করিবার জন্য ইংরাজ গবর্ণমেন্ট বারম্বার নেপালরাজকে অনুরােধ করিয়াও কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। দুর্ভেদ্য নেপাল রাজ্যে অনেক দস্যু আশ্রয়লাভ করিয়া- ছিল। এই সকল নানা কারণে ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে নেপালের সহিত ইংরাজরাজ রণঘােষণা করিলেন। রণবাহাদুরের মৃত্যুর পর অমর সিং থাপা কুমায়ুন গাড়ওয়াল প্রভৃতি অধিকার করিয়া শতদ্রু পৰ্যন্ত নেপালরাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেন। এই যুদ্ধের পর নেপালরাজ ইংরাজদিগের সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইতে বাধ্য হন। ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে সিগাউলির সন্ধিতে নেপালের পশ্চিমাংশ ইংরাজের হস্তগত হইল। ১৮১৬ খৃষ্টাব্দে অনারেবল ই, গার্ডিনার (I. E. Gardiner ) নেপালের রেসিডেন্ট হইয়া আসিলেন। ইনিই প্রথম নেপালের রেসিডেট। গার্ডিনার সাহেব অসিবার দুই মাস পরেই মহারাজ গৃহাণ যুদ্ধ বিক্রম সাহ ২১ বৎসর বয়সে বসন্তরােগে গতানু হন। ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে তাহার দুই বৎসর বয়স্ক পুত্র (৫) রাজেন্দ্রবিক্রম সাহ নেপালের সিংহাসনে আরােহণ করেন। পূর্বের মহারাজদ্বয়ও শৈশবেই সিংহাসনে আরােহণ করিয়াছিলেন।

নেপালের সমান গুখ। রাজগণ। এই শিশুকে পাইয়া ভীমসেন থাপার শক্তি অপ্রতিহত হইল। এই ভীমসেন থাপা রাজ্যশাসনবিষয়ে অতি যােগ্যপুরুষ ছিলেন। ইনি যদিও অন্তরে ইংরাজদিগের বন্ধু ছিলেন না, কিন্তু ইংরাজের সহিত বিবাদে যে নেপালের স্বাধীনতা লুপ্ত হইবে তাহা বিলক্ষণ বুঝিতেন। এই হেতু কোন প্রকার অশান্তির কারণ উপস্থিত হইতে দিতেন না। ইংরাজের সহিত সদ্ভাব এবং শান্তি, নেপালের স্বাধীনতা রক্ষার এক মাত্র উপায় বলিয়া জানিয়াছিলেন। ইংরাজের সহিত ঘনিষ্টভাবে আসিতে কিছুতেই সম্মত ছিলেন ; এবং যাহাতে ইংরাজ প্রত্যক্ষ কিম্বা পরােক্ষ ভাবে কোন প্রকারে নেপালের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতে না পারেন, সে বিষয়ে দূরদর্শিতার সহিত ইংরাজের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। কি জঙ্গ বাহাদুর কি বর্তমান মন্ত্রিগণ এ পর্যন্ত সকলেই ভীমসেন থাপার প্রদর্শিত পন্থা অসুসবন করিয়া আসিতেছেন। নেপালের রাজমন্ত্রীদিগের বিষয় আর একটী বিশেষ কথা বলিতেছি ;--ইংরাজগণ প্রথম হইতেই নানা উপায়ে রাজমন্ত্রীদিগকে হস্তগত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন ; কিন্তু তাহারা যতই ক্ষমতাপ্রিয়, স্বার্থপর হউন না কেন, জাতীয় স্বাধীনতা বিসৰ্জন করিতে কিছুতেই প্রস্তুত হন নাই। পরস্পরের শক্রতা বিস্তর করিয়াছেন, স্বজনের রক্তে নেপাল বারম্বার কলুষিত হইয়াছে, কিন্তু দেশের বৈরিতা কেহই করেন নাই। ভীমসেন থাপার সময়ে নেপালের অনেক আভ্যন্তরীণ উন্নতি সাধিত হইয়াছিল। ১৮১৬ সালের সন্ধির পর যদিও নেপাল- ৮৮ নেপালে বঙ্গনারী । রাজ্যের একতৃতীয়াংশ ইংরাজের হস্তগত হইয়াছিল, তথাপি ভীমসেনের সুযােগ্য শাসনে এবং চেষ্টায় নেপালের বিবিধ উন্নতি সাধিত হয়। (১) সৈন্যসংখ্যাবৃদ্ধি, (২) ধনবৃদ্ধি। ইতিপূর্বে ব্রাহ্মণদিগের বিস্তর ব্রহ্মোত্তর জমি ছিল এবং অসংখ্য দেবমন্দিরের বিস্তর ভূসম্পত্তিও ছিল। ১৮১৪ সালের যুদ্ধের পূৰ্ব্বে তিনি সমুদায় পণ্ডিত ব্রাহ্মণদিগকে সমবেত কবিয়া দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ভূমি দান করিতে অনুরােধ করেন। অনেকে স্বেচ্ছায় স্বীয় সম্পত্তি দান করেন। কিন্তু ভীমসেন অধিকাংশ ব্যক্তিকে স্বীয় স্বীয় অংশ দিতে বাধ্য করেন। দেবমন্দিরের ভূসম্পত্তিও সৈন্যরক্ষার জন্য গ্রহণ করা হইল। এই প্রকারে রাজকোষে বিস্তর অর্থাগম হইল। এবং রাজ্যে শান্তি থাকাতে ব্যবসার উন্নতির জন্য ধনাগম হইতে লাগিল। ভীমসেন থাপার হস্তে নেপালের সৈনিকবল এবং অর্থবল বিলক্ষণ বৃদ্ধি পাইয়াছিল। তিনি সৈন্যগণকে সর্বদাই কৃত্রিম যুদ্ধ এবং গােল বারুদ বন্দুক প্রভৃতির নির্মাণে নিযুক্ত রাখিতেন। সৈন্যগণের হৃদয়ে ভীমসেনের অপ্রতিহত প্রভাব ছিল। মহারাণী ত্রিপুরাসুন্দরী যতদিন বাঁচিয়ছিলেন ভীমসেন থাপার প্রতাপ ততদিন অপ্রতিহত ১৮৩২ খৃষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যুর পর ভীমসেনের ভাগ্যাকাশ অন্ধকারময় হইয়া আসিল। মহারাণী ত্রিপুরাসুন্দরী অতি যােগ্যতার সহিত নেপালের রাজকার্য নির্বাহ করিতেন। ভীম- সেনের ভ্রাতা রণবীর সিংহ থাপা ভীমসেনের প্রতি অন্তরে ঈর্ষা পােষণ করিতেন। তিনি সেই সময় প্রধান সেনাপতি ছিলেন। ছিল।

নেপালের বর্তমান গুর্খরাজগণ। ৮৯ ; এবং বালক রাজা রাজেন্দ্র বিক্রমের উপর রণবীর সিংহের প্রভাব দিন দিন অধিক হইতেছিল। তিনি মহারাজকে সর্বদাই ভীমসিংহের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে চেষ্টা করিতেন। এই সময়ে মাতব্বর সিংহ নামে ভীমসেন থাপার এক ভ্রাতুপুত্র দিন দিন শক্তিশালী হইয়া উঠিতেছিলেন। রণবীর সিংহ, ভীমসেন থাপা ও মাতব্বর সিংহের ঘাের বিদ্বেষী ছিলেন ; কিন্তু স্বহস্তে কিছু করিতে পারেন নাই। যাহা হউক রণবীর সিংহ প্রমুখ দল দিন দিন শক্তিশালী হইয়া উঠিতে লাগিলেন। ১৮৩৭ খৃষ্টাব্দে মহারাজ রাজেন্দ্র বিক্রম সাহ ভীমসেনের দলের অনেক ব্যক্তিকে কচ্যুত করেন। দামােদর পাড়ের পুত্রকে উচ্চ রাজকার্যে নিয়ােগ করিয়া তাহাদের সমুদায় ভূসম্পত্তি পুনঃপ্রদান করেন। এই সময় হঠাৎ মহারাজ রাজেন্দ্র বিক্রমের সর্বকনিষ্ঠ একবৎসরবয়স্ক পুত্রটি মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অমনি মহারাজ বলিলেন যে, বালকটীর ভীমসেন থাপা কর্তৃক প্রদত্ত বিষভক্ষণে মৃত্যু হইয়াছে। কিন্তু এরূপ কথিত আছে মহারাজ স্বয়ং সেই পুত্রকে হত্যা করিয়া ভীমসেনকে দণ্ড দিবেন এই হেতু এরূপ কর্মে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ভীমসেন থাপার নামে এই অভিযােগ উপস্থিত করিয়া সমুদায় থাপা পরিবার, রণবীরসিংহ, মাতব্বর সিংহ, রাজবৈদ্য এবং আরও অনেক ব্যক্তির প্রতি অমানুষিক অত্যাচার সংঘটিত হয়। রাজবৈদ্য ব্রাহ্মণ বলিয়া তাহাকে হত্যা না করিয়া তাহার ললাট এরূপ দগ্ধ করা হয় যে মস্তকের ধৃত বাহির হইয়া পড়ে। এই সমুদায় ব্যক্তিকে জাতিচ্যুত করিয়া সৰ্বস্বান্ত করা হইল। একটি নেপালী নেপালে বঙ্গনারী। এক বৈদ্যের শরীরের চর্ম উন্মােচন করিয়া জীবিতাবস্থায় তাহার হৃদ যন্ত্র বাহির করিয়া ফেলা হইল কিন্তু এত অত্যাচারেও কেহ ভীমসেন থাপার বিরুদ্ধে অক্ষরও উচ্চারণ করিল না। রাজা স্বচক্ষে এই সকল অমানুষিক অত্যাচার দর্শন করিতেন। মহারাজ রাজেন্দ্র বিক্রম সাহের দুইটী মহিষী ছিল। জ্যেষ্ঠার গর্ভে তিন পুত্র, তন্মধ্যে কনিষ্টটির হত্যা হওয়াতে এই সকল পৈশাচিক কাণ্ডের অভিনয় হয়। কনিষ্টা মহিষীব দৃইটী পুত্র ছিল। জ্যেষ্ঠ মহারাণী পাড়েদিগের পক্ষপাতিনী, কনিষ্ঠা থাপাদিগের। ভীম- সেনের প্রতি এই সকল অত্যাচার লইয়া কনিষ্ঠা মহারাণী মহা- রাজকে অনেক অনুযােগ করিয়াছিলেন এবং তাহার চেষ্টায় কিছুদিনের জন্য ভীমসেন থাপাকে অব্যাহতি দেওয়া হইল। দুই বৎসর পরে ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দে দামােদর পাড়ের পুত্র রণজিৎ পাড়ে তদানীন্তন রাজমন্ত্রী হইয়া ভীমসেনের প্রতি এই হত্যার অভিযােগ আনয়ন করেন। পুনরায় অনেক প্রকার অত্যাচারের সুত্রপাত হইল। যন্ত্রণা সহ করিতে অপারক হইয়া ভীমসেন আত্মহত্যা করিতে প্রমাণ পনি এবং স্বীয় খুকরির অাঘাতে প্রাণত্যাগ করেন। যে ভীমসেন থাপ। নেপালরাজ্যের অশেষ প্রকার কল্যাণসাধন করিয়াছিলেন, যিনি এক সময়ে নেপালের দোর্দণ্ড ও প্রতাপান্বিত রাজমন্ত্রী ছিলেন, তাঁহার মৃতদেহের অবমাননা করিতে শত্রুগণ কুন্থিত হইল না। ভীমসেনের মৃতদেহ রাজপথে নিক্ষিপ্ত হইয়া শৃগাল কুকুরের ভক্ষ্য হইল। জ্যেষ্ঠা মহারাণী নেপালের বর্তমান গুখ। রাজগণ। এবং রণজিৎ পাঁড়ে অতিশয় নিষ্ঠুর এবং ন্যায়বিরুদ্ধ আচরণ সকল করিয়া প্রজাদিগকে রাজাধিরাজের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে চেষ্টা করিলেন। সৈন্যদিগের ভাতা কমাইয়া দিয়া বিদ্রোহের সূচনা করেন। রামনগর বলপূর্বক দখল করাতে ইংরাজের সহিত যুদ্ধের সূচনা হওয়াতে অগত্যা রামনগর ছাড়িয়া দিতে নপালরাজ বাধ্য হন। সেই সময়ে ইংরাজদিগের সহিত যে সন্ধি হয় তারা পড়েদিগকে মন্ত্রিপদ হইতে অপসারিত করিতে মহাব জি বাধ্য হন। তখন রঘুনাথ পণ্ডিত এবং তঁাহার ভ্রাতা রাজভক্ত কৃষ্ণরাম, ফতেজং চৌকুরিয়া তাহার ভ্রাতা গুরুপ্রসাদ, দলভঞ্জন পাড়ে এবং অভিরাম রাণাকে লইয়া এক মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। এই সময় রাজ্যে অত্যন্ত বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইল। রাজেন্দ্র বিক্রমের জ্যেষ্ঠা মহিষী পড়েদিগের সহিত গােপনে সৰ্ব্বদাই চক্রান্ত করিতেন। রাজাধিরাজ সকল কার্যের অযােগ্য হইয়াও প্রত্যেক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতেন। রাজকুমার তখন দ্বাদশবর্ষীয় বালকমাত্র ; কিন্তু তাহার নিষ্ঠুর এবং দুর্দমনীয় প্রকৃতিবশতঃ নিয়ত সকলের উপর অমানুষিক অত্যাচার করিয়া স্বীয় পৈশাচিক প্রকৃতি চরিতার্থ করিত। ইতি মধ্যে ১৮৪ ০ সালে জ্যেষ্ঠ মহারাণীর মৃত্যু হইল। দেশের আপামর সাধারণ লােক এই শাসনবিপর্যয়ে অস্থির হইয়া কনিষ্ঠা মহারাণীকে রিজেন্ট করিয়া রাজকুমারকে সিংহাসনে বইবার চেষ্টা করিতে লাগিল; কিন্তু চোতুরিয়াগণ এ প্রস্তাবের বিরােধী ছিলেন। যাহা হউক সৰ্ব্বসম্মতিক্রমে প্রকাশ্য দরবারে রাজা ৯২ নেপালে বঙ্গনারী। রাজেন্দ্র বিক্রম তাহার কনিষ্ঠা মহিষী মহারাণী লক্ষ্মী দেবীকে রাজরক্ষয়িত্ৰী করিয়া সুরেন্দ্র বিক্রমকে রাজাধিরাজ করেন; কিন্তু নিজেও রাজপদে অভিষিক্ত থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ্মী দেবী সকল ক্ষমতা আয়ত্তাধীন করিয়া স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্রকে রাজা- ধিরাজ করিতে সচেষ্ট হন ; কিন্তু চৌতুরিয়া এবং পাড়েগণ ইহার বিরােধী ছিলেন। লক্ষ্মী দেবী থাপাদিগের পক্ষপাতিনী ছিলেন। থাপাদিগের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাবান্ পুরুষ মাতব্বর থাপা তখন বিদেশে ছিলেন। মহারাণী তাহাকে প্রধান মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত করিবার প্রলােভন দেখাইয়া নেপালে আনয়ন করেন। এই সময় তাঁহার ভ্রাতপুত্র কাজি জঙ্গবাহাদুরও নেপালে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। জঙ্গ বাহাদুর পরে নেপালের ভাগ্যচক্র কিরূপ আত্মবশ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন, তাহা সকলেই জানেন। মাতব্বর খাপা দেশে প্রত্যাবৃত্ত হইয়াই স্বীয় পিতৃব্য ভীমসেন খাপার হত্যাকারীদের উপর বৈরনিৰ্যাতন করিতে আরম্ভ করেন। করবার পাড়ে, কুলরাজ পড়ে, ইন্দ্রবীর থাপা, কনক সিংহ প্রভৃতিকে হত্যা করা হয়, এবং সমুদায় পড়ে নেপাল হইতে বিতাড়িত হন। মাথব্বর থাপা প্রধান মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত হইয়া রাজা রাজেন্দ্র বিক্রম, রাজকুমার সুরেন্দ্র বিক্রম এবং মহারাণী লক্ষ্মী দেবী এই তিন ব্যক্তির তিনটী দোষ দেখেন। রাজা অতি অযােগ্য, অপদার্থ ; কিন্তু চক্রান্তকারী অবিশ্বাসী, রাজ- কুমার প্রচণ্ড ক্রোধনস্বভাব,ও অমানুষিক নিষ্ঠুর। মহারাণী কুচক্রী এবং স্বীয় পুত্রকে রাজপদে অভিষিক্ত করিবার জন্য নিয়ত সচেষ্ট নেপালের বর্তমান গুখ। রাজগণ। মাতব্বর প্রথমে মহারাণীকে রিজেন্ট করিয়া রাজকুমারকে রাজা- ধিরাজ পদে অভিষিক্ত করিবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু মহারাণীর অভিপ্রায় অন্যরূপ জানিয়া রাজকুমারের পক্ষ অবলম্বন করেন। মহারাণী মাতব্বর থাপাকে স্বীয় কাৰ্য্যসিদ্ধির অন্তরায় দেখিয়া তাহার উচ্ছেদসাধনে তৎপর হন। রাজকুমারের পক্ষাবলম্বী ছিলেন বলিয়া মহারাজাধিরাজ রাজেন্দ্র বিক্রম তাঁহার প্রতি বিমুখ হন। অবশেষে মহারাজ ও মহারাণী চক্রান্ত করিয়া, একদিন রাত্রে হঠাৎ মাতব্বরকে ডাকিয়া আনিয়া নিজেদের সমক্ষেই তাঁহাকে হত্যা করিলেন। কথিত আছে রাজাজ্ঞায়, জঙ্গ বাহাদুরই তাহাকে হত্যা করিয়াছিনে। এইরূপে মাতব্বর থাপাকে অল্পদিনের জন্য ডাকিয়া আনিয়া হত্যা করা হইল। মাতব্বর থাপার মৃত্যুর পর গগন সিংহকে প্রধান মন্ত্রী করিয়া আবার এক মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। (জঙ্গ বাহাদুর, অভিরাম রাণা, দলভঞ্জণ পাড়ে প্রভৃতিকে লইয়া) গগন সিংহ হীন কুলােদ্ভব হইয়াও মহা- রাণীর প্রসাদে এই উচ্চপদ লাভ করিল। স্বয়ং মহারাজই, মহা- রাণীর সহিত গগনসিংহের এই প্রকার ঘনিষ্ঠতায় অতিশয় বিরক্ত হইতেন এবং তাহারই প্ররােচনায় গােপনে গগন সিংহকেও হত্যা করা হইল। গগন সিংহ স্বীয় গৃহে পূজায় প্রবৃত্ত ছিলেন, এমন সময়ে নিকটবর্তী স্থান হইতে কে তাহাকে গুলি করিয়া হত্যা করিল। হত্যাকারীকে কেহই ধরিতে সমর্থ হয় নাই। মহারাণী লক্ষ্মী দেবী গগন সিংহের হত্যার সংবাদ শুনিবা- মাত্র সেই রাত্রেই পদব্রজে ‘কোট’ নামক দরবারগৃহে উপনীত ৯৪ নেপালে বঙ্গনারী। হইলেন এবং রাজসভার সমুদায় পদস্থ ব্যক্তিকে আহ্বান করিয়া পাঠাইলেন; সকলে ত্বরায় উপস্থিত হইলেন । মহারাণীর আজ্ঞায় জঙ্গ বাহাদুরের সহায়তায় সে দিন ভীষণ হত্যাকাণ্ডের অনুষ্ঠান হইল (১৯ সেপ্টেম্বর, ১৮৪৬)। ফতে জঙ্গ, দলঞ্জণ পাড়ে, অভিরাম রাণা, কনক বিক্রম শাহ প্রভৃতি ৩১ জন প্রধান ব্যক্তিকে হত্যা করা হইল। জঙ্গ বাহাদুর এবং তাঁহার ভ্রাতৃগণ এই হত্যা- কাণ্ডের প্রধান অভিনেতা ছিলেন। মহারাণী স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া এই হত্যাকাণ্ডে তাহাদিগকে উৎসাহিত করিয়াছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর জঙ্গ বাহাদুর মহারাণী কর্তৃক প্রধান মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত হইলেন। মাতব্বর থাপার ন্যায় জঙ্গ বাহাদুরও মহারাণীর অভিসন্ধির সহিত যােগ দিতে পারিলেন । মহারাণী লক্ষ্মী দেবী জঙ্গ বাহাদুরের দ্বারায় সুরেন্দ্র বিক্রমকে হত্যা করিয়া স্বীয় পুত্রকে রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য অনেক চেষ্টা করিয়াছিলেন । কিন্তু অকৃতকার্য হইয়া জঙ্গ বাহাদুরকে হত্যা করিবার জন্য শেষবারে চক্রান্ত করিলেন। চক্রান্তটী এইরূপ ছিল ;-বীর ধৌজ বুসনিয়াত এই চক্রান্তের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। স্থির হইয়াছিল যে, জঙ্গ বাহাদুর এবং তাহার ভ্রাতৃগণকে কোট নামক গৃহে ডাকাইয়া আনিয়া হত্যা করা হইবে। বিজয় রাজ পণ্ডিত নামে এক ব্রাহ্মণ এই চক্রান্তের বিষয় অবগত হইয়া জঙ্গ বাহাদুরকে বলিয়া দেন। জঙ্গ বাহাদুর অগ্রে জানিতে পারিয়া সাবধান হইলেন। বীর ধৌজ ও ১৪১৫ জন তাহার দলস্থ ব্যক্তিকে হত্যা করা হইল। জঙ্গ বাহাদুর এবং তাঁহার বংশ- নেপালের বর্তমান খ। রাজগণ। ধরগণ “রাণজু” এই উপাধিতে ভূষিত হইলেন। এই চক্রান্তের পর লক্ষ্মী দেবী তাহার পুত্রদ্বয় সমভিব্যাহারে কাশীতে চিরনিৰ্বাসিত হইলেন। মহারাণীর প্ররােচনায় মহারাজাধিরাজও তাহার সঙ্গী হইলেন। এবং কিছুকাল কাশীধামে বাস করিয়া অনেক চক্রান্ত করিলেন। অবশেষে একদল বিদ্রোহীদলের সহিত যােগ দিয়া নেপালে প্রবেশ করিলেন। কিন্তু অচিরে পরাস্থ এবং বন্দী হইয়া কাটমণ্ডুতে নীত হন। তাহার অনুপস্থিতে সুরেন্দ্র বিক্রম সাহ সর্বসম্মতিক্রমে নেপালের সিংহাসনে আরােহণ করিয়া- ছিলেন। রাজেন্দ্র. বিক্রম সাহ এক প্রকার বন্দী অবস্থায় জীবনের অবশিষ্ট দিন ভাটগাঁও এর রাজপ্রাসাদে যাপন করিয়াছিলেন। জঙ্গ বাহাদুরের সহায়তায় সুরেন্দ্র বিক্রম সাহ সিংহাসনারােহণ করিলেন এবং জঙ্গ বাহাদুর দ্বারাই নেপালের রাজবংশের ক্ষমতা চিরদিনের মত খৰ্ব্বীকৃত হইল। তখন হইতে রাজার ক্ষমতা লোপ পাইয়া মন্ত্রীর প্রাধান্য প্রবর্তিত হইল। সেই সময় হইতেই নেপালের রাজমন্ত্রীই নেপালরাজ্যের একমাত্র হর্তা কৰ্ত্তা বিধাতা হইলেন। রাজাধিরাজ সুরেন্দ্র বিক্রম সাহ এই প্রকার ভাবে রাজত্ব করিতে ইচ্ছুক ছিলেন না এবং একবার সিংহাসন ত্যাগ করিবার ইচ্ছাও করিয়াছিলেন। ১৮৪৭ খৃঃ সুরেন্দ্র বিক্রমের জ্যেষ্ঠপুত্র জন্ম- গ্রহন করেন। ১৮৫১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মহারাজাধিরাজের আর একটী পুত্র জন্মগ্রহণ করিল। ১৮৪৮ খৃঃ ইংরাজগণ দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। তখন জঙ্গ বাহাদুব একদল গােখা নেপালে বঙ্গনারী ১৮৪৯ সৈন্য লইয়া ইংরাজদিগের সহায়তা করিবার জন্য গবর্ণর জেনারেলকে প্রস্তাব করিয়া পত্র লিখিয়াছিলেন, কিন্তু ইংরাজগণ জস বাহাদুরের সৈন্যদলের সহায়তা গ্রহণ করেন নাই। খৃষ্টাব্দে শিখ দিগের মহারাণী চান্দা কঁয়াড় চুণার দুর্গ হইতে পলায়ন করিয়া নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। নেপাল সরকার তাহাকে আশ্রয় দান করিয়াছিলেন এবং মাসে ৮০০ টাকা ব্যয় নির্বাহের জন্য দিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাকে নেপালে এক প্রকার বন্দীর ন্যায় রাখা হইয়াছিল। ১৮৫০ খৃষ্টাব্দে জঙ্গ বাহাদুর তাহার ভ্রাতৃদ্বয় সমভিব্যাহারে ইংলণ্ড যাত্রা করিলেন। তাঁহার অনুপস্থিতে তাহার দ্বিতীয় ভ্রাতা বনবাহাদুর প্রধান মন্ত্রীর কাৰ্য করিয়াছিলেন। জঙ্গ বাহাদুর ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাবর্তন করিলে, তিনি জাতিচ্যুত হইয়াছেন এই বলিয়া তাহাকে হত্যা করিবার জন্য এক চক্রান্ত হয়, তাঁহাকে জঙ্গ বাহাদুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বদিনুর সিং, তাঁহার পিতৃব্যপুল জয় বাহাদুর, রাজাধিরাজের কনিষ্ঠ ভ্রাতা উপেন্দ্র বিক্রম সাহ যােগ দিয়াছিলেন। কাজি করবার ক্ষত্রি জঙ্গ বাহাদুরের সঙ্গে ইংলণ্ড গিয়াছিলেন, তিনি জঙ্গ বাহা- ছুরের জাতিচ্যুত হইবার কথা উত্থাপন করিয়াছিলেন। বনবাহাদুর এ চক্রান্তের বিষয় অবগত হইয়া জঙ্গ বাহাদুরকে অপূৰ্ণলােচনে এসকল জ্ঞাত করেন। প্রথমে চক্রান্তকারীদিগকে হত্যা করিবার কথা হয়। পরে তাহাদের চক্ষু নষ্ট করিবার প্রস্তাব হয়। শেষে জঙ্গবাহাদুরের অনুরােধে ব্রিটীশ, গবর্ণমেন্ট তাহাদিগকে এলাহাবাদে বন্দী স্বরূপ রাখিয়াছিলেন।

* st
.
---
- - -
জঙ্গ বাহাদুর

No text on this page.

নেপালের বর্তমান গুখ। রাজগণ। জঙ্গ বাহাদুর ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া অশেষ প্রকারে নেপালের উন্নতি সাধনে মনোেযােগী হইলেন। তিনি শাসন বিভাগে অনেক প্রকার সংস্কার আনয়ন করেন। পূৰ্ব্বে চৌৰ্য্যঅপরাধে অপরাধী ব্যক্তিকে নানা প্রকার নিষ্ঠুর উপায়ে অপরাধ স্বীকার করান হইত। হস্ত পদ নাসা প্রভৃতি কৰ্ত্তন করিয়া অপরাধী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হইত। জঙ্গবাহাদুর এ সকল শাস্তির ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রহিত করিয়া দেন। নেপালে সহমরণ প্রথাও এই সময় নিষিদ্ধ হয়। সুরেন্দ্র বিক্রমের পুত্র শাহাজাদা ত্রৈলােক্য বিক্রমের সহিত আপনার তিনটি কন্যার বিবাহ দেন। পৃথী- বীর বিক্রমশাহ তাঁহার মধ্যমা কন্যার গর্ভজাত ছিলেন। সুরেন্দ্র বিক্রমের জীবদ্দশায়ই ত্রৈলােক্য বিক্রম পরলােকগমন করেন। জঙ্গবাহাদুর চিরদিনই ভারতের ব্রিটীশ গবর্ণমেন্টের সহিত বন্ধুতা রক্ষা করিয়া আসিতেছিলেন। ইংলণ্ড গমনের পর ব্রিটীশ রাজ্যের সহিত তাঁহার হৃদ্যতা আরও ঘণীভূত হয়। কাটমঞ্জুর ব্রিটীশ রেসিডেন্টের সহিত তিনি সর্বদাই সদ্ভাবে যাপন করি- য়াছেন। বাস্তবিক জঙ্গবাহাদুর একজন একজন অসাধারণ ছিলেন। তাঁহার ন্যায় সাহসী উদ্যােগী পরিশ্রমী পুরুষ বর্তমান সময়ে দুর্লভ। এরূপ শ্রুত হওয়া যায় যে কেহ তাহার চক্ষে কখন জল দেখে নাই। তাহার আজ্ঞা তিলমাত্র অবহেলা করে এমন সাহস কাহারও ছিল না। অসমসাহসিক যে কোন কাৰ্য্যে তাহার অত্যন্ত উৎসাহ ছিল। বনের বাঘ, দুরন্ত বন্যহস্তী বশীভূত করা তাহার নিকট অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার ছিল।

নেপালে নারী।
কতদিন আমােদচ্ছলে ব্যাঘ্রের সহিত যুদ্ধ করিয়াছেন। কাটমঞ্জুর
ইংরাজ চিকিৎসকদিগের পুস্তকে পাঠ করিয়াছি তিনি কঠিন
অস্ত্রচিকিৎসা দেখিতে অত্যন্ত উৎসুক হইতেন। ইংরাজ
জাতি সাহসী বীরকে অত্যন্ত ভালবাসে, সেইজন্য জঙ্গবাহাদুরকে
ইংরাজেরা অত্যন্ত সম্মান করিতেন। শিথিলভাবে কোন কাৰ্য্য
সম্পন্ন করা জঙ্গবাহাদুরের প্রকৃতি ছিল না। তাঁহার প্রত্যেক
কাৰ্যে ভিতর তাঁহার ব্যক্তিত্ব উজ্জ্বল ভাবে ফুটিয়া উঠিত।
নেপালের ইতিহাসে জঙ্গবাহাদুরের নাম চিরদিন উজ্জ্বল অক্ষরে
মুদ্রিত থাকিবে সংশয় নাই। একবার একজন ইংরাজ রেসিডেন্ট
নেপালে ভাল পথ নির্মান করাইবার জন্য জঙ্গবাহাদুরকে অনু-
রােধ করেন, তাহার উত্তরে তিনি যে বাক্য উচ্চারণ করিয়া-
ছিলেন তাহা নেপালীদিগের নিকট চিরস্মরণীয় হইয়া আছে,
বলিয়াছিলেন “সাবে কি আমরা ভাল পথ করি না,--আমাদের
রাজ্যের দুর্গমতাই আমাদের আত্মরক্ষার প্রধান উপায়। প্রবল
প্রতাপান্বিত ব্রিটিশ রাজ্যের তুলনায় আমরা সিংহের সম্মুখীন
বিড়াল। সিংহ আক্রমণ করিলে বিড়ালের আর কি সাধ্য
আছে ? তবে আত্মরক্ষার জন্য তাহার চক্ষু উপড়াইতে পারে।”
জঙ্গবাহাদুরের
মৃত্যুর পর
তাঁহার
কনিষ্ট ভ্রাতা
রণদীপ সিংহ প্রধান
রাজমন্ত্রীর পদে
অভিষিক্ত হইলেন এবং সর্বকনিষ্ট ভ্রাতা ধীরশামসের প্রধান
সেনাপতি হইলেন । রণদীপ সিংহ মন্ত্রিপদাভিষিক্ত হইবার
কিছুদিন পর সুরেন্দ্র বিক্রমের মৃত্যু হইলে তাহার পৌত্র
১৮৭৭

রাজকুমারী
রণদীপ সিংহ
রাজমাতা শ্রীপাঁচ মহারাণী
তাঁহার পত্নী

No text on this page.

নেপালের বমান গুখ। রাজগণ । ১৯৯ পৃথ্বীবীর বিক্রমশাহ নেপালের সিংহাসনে আরােহণ করিলেন। রণদীপ সিংহ অতি ধৰ্ম্মপ্রাণ নিরীহ ব্যক্তি ছিলেন, শুনা যায় তিনি শিশু মহারাজ অধিরাজকে অত্যন্ত ভাল বাসিতেন। নেপালের মন্ত্রীপদ লইয়া চিরদিন যুদ্ধ বিগ্রহ হইয়া আসিতেছে। রণ- দীপ সিংহ যখন মন্ত্রীপদে সমারূঢ়, তখন ভিতরে ভিতরে মন্ত্রীপদ লইয়া তাঁহার ভ্রাতুস্পুত্রদিগের ভিতর নানা গুপ্ত চক্রান্ত চলিতেছিল। জঙ্গবাহাদুরের প্রবর্তিত নিয়মানুসারে রণদীপ সিংহের মৃত্যুর পর তাঁহারই কনিষ্ট ভ্রাতা ধীরশামসেরের রাজমন্ত্রী হইবার কথা; কিন্তু ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে রণদীপ সিংহের জীবদ্দশায় তাহার মৃত্যু হইল। তখন জঙ্গবাহাদুরের পুত্রগণের এবং ধীরশামসেরের পুত্রগণের ভিতর মন্ত্রীপদ লইয়া প্রতিদ্বন্দিতা দাঁড়াইল। ধীরশামসেরের জ্যেষ্ঠপুত্র বীরশামসের কিছুদিন কলি- কাতার ডবটন কলেজে শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন। তিনি অতি চতুর বক্তি ছিলেন ; তাহাদের ভিতরে ভিতরে নানা গুপ্ত চক্রান্ত চলিতে লাগিল। ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দের ২২ নবেম্বর রবিবার এই গুপ্ত চক্রান্ত অতি ভীষণভাবে ব্যক্ত হইয়া পড়িল ;—সেদিন রণদীপ সিংহ রাজবাড়ীতে উপস্থিত ছিলেন ; সহসা বীরশামসের প্রমুখ তাঁহার ভ্রাতপুত্রগণ উপস্থিত হইয়া তাহাকে হত্যা করিল। কথিত আছে সেই সময়ে তিনি ইষ্টদেবতার পূজায় ব্যাপৃত ছিলেন। বিদ্রোহীদল রণদীপকে হত্যা করিয়া জঙ্গবাহাদুরের জ্যেষ্ঠপুত্র জগৎজঙ্গকে এবং জঙ্গবাহাদুরের পৌত্র যুদ্ধ প্রতাপ, জঙ্গকে হত্যা করিল। জঙ্গবাহাদুরের পদ্মজঙ্গ , প্রভৃতি অন্যান্য পুত্রগণ ;

১০০ নেপালে বঙ্গনারী এবং রণদীপের একমাত্র পুত্র বােজনরসিং এবং রণদীপের দল অন্যান্য ব্যক্তিগণ রেসিডেন্সিতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া জীবন রক্ষা করিলেন; নচেৎ সেদিন আরও অনেকের জীবন নাশ হইত। এই হত্যাকাণ্ডের পরই বীরশামসের আপনাকে প্রধান মন্ত্রী বলিয়া ঘােষণা করিলেন। তিনি রাজমন্ত্রী হইয়া যথা নিয়মে রাজকাৰ্য্য পরিচালন করিয়াছিলেন। তিনি কাটমণ্ডু সহরের অনেক শ্রীবৃদ্ধি সাধন করিয়া গিয়াছেন। জলের কল ও ড্রেন নির্মান করিয়া বীরহাঁস- পাতাল, বীরলাইব্রেরী প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করিয়া প্রজাদিগের প্রভূত কল্যাণ সাধন করিয়াছেন। '৯০১ খৃষ্টাকে বীরশামসেরের মৃত্যু হয় ; তাঁহার মৃত্যুর পর যথা নিয়মে দেবশামসের রাজমন্ত্রী হইলেন। কিন্তু দুই মাস মাত্র তিনি উক্তপদ অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন। দুই মাসের মধ্যেই মহারাজ চন্দ্ৰশামসের প্রমুখ দল তাঁহাকে নানাবিধ চক্রান্ত দ্বারা পদচ্যুত করিয়া একেবারে নেপালরাজ্য ত্যাগ করিতে বাধ্য করেন। এখন তিনি ভারতবর্ষেই আছেন, তাহার নিজের ধনসম্পত্তি অধিকাংশই তিনি উপভােগ করিতেছেন। দেবশামসের পদচ্যুত হইয়াছেন বটে কিন্তু অন্য কোন প্রকারে তাহাকে ক্লেশ দেওয়া হয় নাই। নেপালের ইতিহাসে এই একমাত্র রক্তপাতশূন্য বিপ্লবের কথা শুনিতে পাওয়া যায়। এই ঘটনায় মহারাজ চন্দ্ৰশামসেরের বুদ্ধি এবং বিবেচনার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। নেপালের রাজমন্ত্রীর পদ লইয়া যুদ্ধ- বিগ্রহ রক্তপাত প্রভৃতি চিরন্তন রীতি হইয়া দাড়াইয়াছে। মহারাজ দেবশামসেরকে পদচ্যুত করিয়া ১৯০২ খৃষ্টাব্দে মহারাজ বীরসামসের জঙ্গ রাণা বাহাদুর

No text on this page.

নেপালের বর্তমান গুর্খা রাজগণ। ১০১ চন্দ্ৰশামসের রাজমন্ত্রী হইয়াছেন। বর্তমান সময়ে নেপালরাজ্যে ইনিও যে সৰ্ব্ব বিষয়ে সর্বতােভাবে যােগ্যতম পুরুষ, তাহাতে আর সংশয় নাই। এই একটি মাত্র ব্যক্তির উপর নেপালের আপামর সাধারণ লােকের সুখ দুঃখ নির্ভর করে ; এই একটি মাত্র ব্যক্তির দ্বারা নেপালরাজ্যের সর্ববিধ কল্যান সাধিত হইতে পারে ;-এই একটী মাত্র ব্যক্তি ১০ বৎসরে নেপালের যেরূপ শ্রীবৃদ্ধি সাধন করিতে পারেন তাহা ভারতে কুত্রাপি আর সম্ভব নয় -নেপাল স্বাধীন রাজ্য! আশার চিত্র যাহা তাহা আজও দৃশ্যতঃ এবং কাৰ্যতঃ সুব্যক্ত হয় নাই। নেপাল এতাবৎকাল কেবল ব্যক্তি- বিশেষের স্বার্থভিসন্ধিতে নানা বিদ্রোহের লীলাভূমি হইয়াছে ; যাহা হইতে পারে তাহা হয় নাই। মহারাজ চন্দ্ৰশামসের কাষ্ঠমণ্ডুর শ্রীবৃদ্ধি সাধনে তৎপর আছেন এখন কাটমণ্ডু সহর বৈদ্যুতিক আলােকে উজ্জ্বলতা প্রাপ্ত হইয়াছে। এইরূপে অম্লাধিক পরিমাণে নেপালের সর্বত্রই বাহ্যিক শ্রীবৃদ্ধি কিছু কিছু সাধিত হই.তছে, কিন্তু ভারতবর্যের প্রজাগণ ইংরাজরাজ্যে যে সকল সুখ সুবিধায় বাস করিতেছে নেপালে তাহার কিছুই নাই। ভারতের সনাতন অবস্থা কিরূপ ছিল, তাহা যদি কাহার দেখিবার সাধ থাকে ত নেপালরাজ্যে গমন করিলে হয়। গাড়ী নাই (নেপাল উপত্যকায় রাজপরিবারের আছে) রেল নাই—ত্বরিত ডাক নাই টেলিগ্রাম নাই—ভাল স্কুল নাই—কলেজ নাই—বালিকাবিদ্যালয় নাই—রীতিমত আদালত নাই। আছে শ্রমজীবী কৃষক, আছে। ভারবাহী মনুষ

১২
নেপালে বঙ্গনারী।
.
এবং পশু, আছে সুলভ যােদ্ধা এবং সৈনিক, আছে উচ্চ
রাজকর্মচারী রাণাপরিবার। যে জঙ্গবাহাদুর নেপালের
অশেষবিধ কল্যাণ সাধন করিয়া গিয়াছেন, তাহার পুত্র পৌত্রগণ,
হত এবং নেপাল হইতে তাড়িত হইলেও তাহার ভ্রাতুস্পুত্রগণ
বর্তমান সময়ে নেপালের সমুদয় উচ্চতম পদে অধিষ্ঠিত আছেন।
বর্তমান রাজমন্ত্রী জঙ্গবাহাদুরেরই ভ্রাতুস্পুত্র ; নেপালেএই রাণাপরি-
বারের দোর্দণ্ড প্রতাপ। নেপালরাজ পৃথ্বীবীর বিক্রম বিগত
ডিসেম্বর মাসে যখন পঞ্চমজর্জ ভারতে শুভাগমন করেন)
পরলােক গমন করিয়াছেন। এক্ষণে নেপালের সিংহাসনে পৃথ্বীবীর
বিক্রমের পঞ্চবর্ষীয় শিশুপুত্র ত্রিভূবন বিক্রমশাহ প্রতিষ্ঠিত আছেন।
নেপালের ভাগ্যে আবহমান কাল এইরূপ হইয়া আসিতেছে।
পৃথ্বীনারায়ণের সময় হইতে (একজন ভিন্ন) শিশু নৃপতি দ্বারা রাজপদ
শশাভিত হইয়া আসিতেছে। নেপালে রাজার কোন কর্তৃত্ত্বই
নাই ;—সুতরাং সেখানে শিশুপতিদ্বারা কোনরূপ ক্ষতি বৃদ্ধি
হইবার সম্ভাবনা নাই।
বৎসরাধিক কাল হইল মহারাজ চন্দ্ৰশামসের ইংলণ্ড ভ্রমণ
করিতে গিয়াছিলেন। জঙ্গবাহাদুরের ইংলণ্ডে ভ্রমণ নেপালের
ইতিহাসে অনেক শুভপরিবর্তন আনয়ন করিয়াছিল। বর্তমান
রাজমন্ত্রীর বিলাত ভ্রমণের ফল এত অল্পকালের মধ্যে আমরা
সমুদায় নির্ণয় করিতে পারি না। সম্ভবতঃ ইহার সুফলও নেপালের
ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হইবে। নেপালের ভবিষ্যৎ ইতিহাসে কি
আছে জানি না; সেই বিচিত্ৰ কৰ্মা
পুরুষের অপূর্ব লীলা
;

নেপালের বর্তমান গুখা রাজগণ। ; নির্ণয় করে সাধ্য কার ? বােধিসত্ত্বের এক তরবারির আঘাতে, নাগবাস হ্রদ আজ রমণীয় উপত্যকায় পরিণত হইয়াছে ; না জানি আবার কোন মহাত্মার তরবারির আঘাতে নেপালের সমুদায় কুরীতি পাপরাশি ধৌত হইয়া নেপাল ভূপৃষ্ঠে স্বর্গধাম বলিয়া কীৰ্তিত হইবে। নেপালের আভ্যন্তরীণ আর কোন কুরীতির কথাই উল্লেখ করিতে চাই না—কেবল দাসত্ব প্রথা আর বহু পত্নীগ্রহণের রীতি, আমার নিকট জাতীয় অবনতির মূল কারণ বলিয়া বােধ হইয়াছে। শুনিতেছি বর্তমান রাজমন্ত্রী অল্পে অল্পে এই উভয় প্রকার কুরীতি বৰ্জন করিতে চেষ্টা করিতেছেন। নেপালের জনসাধারণের ভিতর শিক্ষার আলােক তেমন ভাবে বিস্তৃত হয় নাই। উচ্চপরিবারের রমণীগণ নিরক্ষর নহেন তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ সংস্কৃত শিক্ষা করেন। পুরুষগণ সামান্য ইংরাজি শিক্ষা করেন। কয়েকজন নেপালী কয়েকজন নেপালী যুবককে রাজমন্ত্রী শিক্ষার জন্য জাপানে প্রেরণ করিয়াছিলেন। আমাদের যেমন জীবিকার জন্য বিদ্যাশিক্ষা করিতে হয় নেপালে তাহা নয়, সুতরাং সেখানে শিক্ষার অবস্থাও তদ্রুপ। নেপালে কৰ্ম্মচ্ছলে অনেক বাঙ্গালী আছেন। তাঁহাদের মধ্যে কেহ বা ডাক্তার কেহ বা শিক্ষক। শ্ৰীযুক্ত রাজকৃষ্ণ কৰ্ম্মকার নামে একব্যক্তি বহুকাল হইতে নেপাল রাজসরকারে বন্দুক কামান প্রভৃতি নিৰ্মাণ করিয়া আসিতেছেন। বুদ্ধিজীবী বাঙ্গালির অপ্রতিহত গতি সৰ্ব্বত্র ! নেপাল রাজ্যে পদার্পন করিয়া, একদিন এই বলিয়া আনন্দ করিয়াছিলাম, যে আজ স্বাধীন দেশের স্বাধীন বায়ু আসিয়া - ৪ নেপালে বঙ্গনারী। আমার দেহকে আলিঙ্গন করিল। এমন দিন আমার জীবনে আসিবে ভাবি নাই ত? দুই বৎসর নেপালে বাস করিয়া, দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বলিতে হইল, এযে আমার স্বাধীন রাজ্যের স্বপ্ন। স্বাধীনতায় এ জাতি কি লাভ করিয়াছে হায় ! আমি তাহা দেখিতে পাইলাম না । নেপালের ব্রিটীশ রেসিডেন্ট। নেপালের বর্তমান ইতিহাসের কথা বলিতে গিয়া কাটমঞ্জুর ব্রিটীশ রেসিডেন্টের কথা উল্লেখ না করিলে কাহিণী অসম্পূর্ণ থাকে। পূৰ্বেই উল্লেখ করিয়াছি পৃথীনারায়ণের নেপাল জয়ের পূর্ব হইতে কাটমণ্ডুর মল্লবাজার সহিত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা বাণিজ্যজাত সম্বন্ধ ছিল। সেই সূত্রে পৃথ্বী- নারায়ণ নেপাল আক্রমণ করিলে তাহারা ইংরাজের সহায়তা ভিক্ষা করিয়াছিলেন। পলাশীর যুদ্ধ এবং গুর্খা কর্তৃক নেপাল জয় প্রায় সমসাময়িক ঘটনা। ক্যাপটেন নক্স কাটমণ্ডুতে গিয়া নেপালরাজের সহিত বন্ধুতা সূত্রে আবদ্ধ হইতে চেষ্টা করিয়া বিফল মনােরথ হইয়া প্রত্যাবর্তন করেন। প্রথমে নেপালীরা ব্রিটীশ গবর্ণমেন্টকে অবজ্ঞার চক্ষে দর্শন করিত। শিখদিগের সহিত যুদ্ধের সময়, আফগানিস্থানের দুর্ঘটনায় তাহারা অত্যন্ত উৎফুল হইয়া উঠিয়াছিল। ১৮১৬ খ্রীষ্টাব্দের যুদ্ধের পর নেপালী- দিগের চৈতন্যের উদয় হয়। ভীমসেন থাপাই একথা স্পষ্টাক্ষরে স্বজাতিকে বুঝাইয়া বলেন, যে স্বাধীনতা রক্ষার একমাত্র উপায় ইংরাজের সহিত কোন প্রকার সংঘর্ষণ উপস্থিত না করা।

নেপালের বর্তমান গুখ রাজগণ। । কাটমণ্ডুতে যে ইংরাজ রেসিডেন্ট বাস করেন তিনি নেপাল- রাজ্যের আভ্যন্তরীন কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতে পারেন না। কাটমণ্ড বাসকালে তাঁহার গতিবিধি সমুদায় রাজমন্ত্রী নিয়মিত করিয়া দিয়াছেন। রেসিডেন্টের সহিত সকল রাজমন্ত্রী বন্ধু রক্ষা করিয়া চলেন বলিয়া রাজ্যশাসন সংক্রান্ত কোন বিষয়ে তিনি হস্তক্ষেপ করেন না। এই সৰ্ত্ত হেতু ইংরাজ রেসিডেন্টের চক্ষের সমক্ষে নেপালে কতবার কত বিপ্লব কত হত্যাকাণ্ড, সংঘটিত হইল ? এতাবৎকাল নেপালে অনেক সুবিখ্যাত ব্যক্তি রেসিডে- ন্টের পদে অভিষিক্ত হইয়াছেন। ইহাদিগের মধ্যে সুবিখ্যাত হডসন সাহেব একজন প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি প্রায় ২৫ বৎসর কাল কাটমণ্ডুতে বাস করিয়া নেপালের পুরাবৃত্ত সংগ্রহ করিয়া- ছিলেন। তিনি এই কাৰ্যে কত যে অর্থব্যয় করিয়াছিলেন তাহা বলা যায় না। নেপালের চতুর্দিক হইতে অর্থব্যয় করিয়া কত শত শত পুস্তক সংগ্রহ করিয়া লইয়া গিয়াছেন। আজও তাহা লণ্ডনে সযত্নে রক্ষিত আছে। রেসিডেন্টের সঙ্গে একজন ইংরাজ চিকিৎসক কাটমণ্ডুতে থাকেন। ডাক্তার রাইট (Wright ) ডাক্তার ওলড়, ফিল্ড (Old Field ) কত যত্ন পূৰ্ব্বক নেপাল সম্বন্ধে কত ঐতিহাসিক তত্ত্ব সংগ্রহ করিয়াছেন। ইহাদিগেরই পুস্তক হইতে নেপাল ইতিহাস সংগৃহীত হইয়াছে। এই সকল গুণ ইহাদের জাতীয় মহত্ত্বের পরিচায়ক সন্দেহ নাই। কাট- মণ্ডুর বর্তমান রেসিডেন্ট মেজর ম্যানার স্মিথ, (Major Manner Smith) অতি উপযুক্ত ব্যক্তি। নেপালের চতুর্দিকেই এখন নেপালে বঙ্গনারী। শান্তি এবং সমৃদ্ধির চিহ্ন দেখা যাইতেছে। নেপালের ভূতপূর্ব রাজাধিরাজ পৃথীবীর বিক্রম এবং বর্তমান শিশু নৃপতি ত্রিভুবন বিক্ৰমশাহের প্রতিমূর্তি এখানে সন্নিবিষ্ট হইল। এই শিশু নেপাল রাজের দীর্ঘজীবন এবং নেপালের সর্বাঙ্গীন কল্যান কামনা করিয়া গ্রন্থের উপসংহার করি ।

নেপালের আদর্শ সতী স্বর্গীয়া বড় মহারাণী। (মহারাজ চন্দ্র শামসের জঙ্গরাণা বাহাদুরের স্বর্গীয়া পত্নী) পূৰ্ব পরিচ্ছেদে বর্ণিত হইয়াছে নেপাল রাজ্যের ভাগ্যচক্র ইহার প্রধান মন্ত্রীই নিয়মিত করিয়া থাকেন। এক সময়ে মারাঠা প্রধান মন্ত্রী পেশােয়াগণ যেরূপ ক্ষমতা ধারণ করিতেন, বর্তমান নেপালরাজমন্ত্রীদিগের ঠিক সেই গৌরব এবং সেইরূপ ক্ষমতা। রাজমন্ত্রী চন্দ্র : শামসের জঙ্গরাণ। বাহাদুর বর্তমান বৰ্তমান সময়ে নেপালের ভাগ্যচক্র বিবর্তন করিতেছেন। এই পদের গৌরব ও দায়িত্ব অনেক। পার্থিব দিক হইতে ইনি' অতি ভাগ্যবান ক্ষণজন্মা পুরুষ সন্দেহ নাই, কিন্তু সুলভ হইলেও একদিকে দুর্লভ গার্হস্থ্য, সৌভাগ্যেও ইনি ভাগ্যবান। বিধাতা ইহাকে অশেষ গুণ সম্পন্ন লক্ষ্মীস্বরূপিণী ভাগ্যবতী পত্নীদানে কৃতার্থ করিয়াছিলেন। যদিও ইনি অসময়ে তাহাকে হারাইয়াছেন, তথাপি তিনি যে সৌভাগ্যের অধিকারী হইয়াছিলেন তাহা কে অস্বীকার করিবে ? ভারতেশ্বরী স্বর্গীয়া সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার অমৃতময় দাম্পত্য জীবনের বর্ণনা করিতে করিতে লেখক এক স্থলে বলিয়াছেন এইরূপ গুণসম্পন্ন পত্নী দীন দরিদ্রে লাভ করিলেও ভাগ্যবান হয়, ভিক্টোরিয়ার পতি এলবার্ট কি ভাগ্য- বান পুরুষ যে এমন পত্নী-রত্ন তিনি লাভ করিয়াছিলেন। আমরা মহারাজ চন্দ্র শামসের রাণা বাহাদুরের গুণবতী পত্নীর সম্বন্ধেও = ১০ নেপালে বঙ্গনারী। সেই কথা বলিতে পারি। এইরূপ পতিপ্রাণা নারী দরিদ্রের কুটীরে অতুল শােভা বিস্তার করে, রাজগৃহে কি কথা? এই মহীয়সী সৌভাগ্যশালিনী অশেষ গুণসম্পন্ন মহিলার জীবন রমণী- কুলের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলিয়া আমরা সাধারণের নিকট এই মােহন চিত্র উপস্থিত করিতেছি। হিন্দু রমণীর ধমনীতে আজও সীতা সাবিত্রীর পবিত্র শােণিত কিরূপে প্রবাহিত হইতেছে তাহা পাঠক পাঠিকা একবার দর্শন করুন। মহারাজ চন্দ্র শামসের রাণা বাহাদুর সুবিখ্যাত জঙ্গরাণা বাহাদুরের ভ্রাতুস্পুত্র—তিব্বতের যুদ্ধে প্রসিদ্ধ বীর ধীরশমসেরের পুত্র। বর্তমান সময়ে এই রাণা বংশই নেপালের সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়া আছেন। আমরা যাহার কথা বলিতে যাইতেছি তিনি মহারাজ চন্দ্র শামসের রাণা বাহাদুরের একমাত্র মহিষী ছিলেন। নেপালে বহু পত্নী গ্রহনের রীতি প্রচলিত আছে কিন্তু মহারাজ চন্দ্র শামসের রাণা বাহাদুর বােধ হয় ইহার এক মাত্র ব্যতিক্রম স্থল। তাহার গুণবতী পত্নী সম্পূর্ণরূপে তাঁহার পতির হৃদয় অধিকার করিয়াছিলেন, যে দিন তাহাকে সমুদয় নেপালের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ভাগ্যবতী রমণী বলিয়া দর্শন করিতে যাই সে দিন তাঁহার মুখেই শুনিয়াছি—“আমি সমুদয় নেপালের মধ্যে সৌভাগ্যবতী রমণী সন্দেহ নাই, কারণ বিধাতা যে শুধু আমাকে এমন পতি দিয়াছেন তাহা নহে, আমি আমার পতির একমাত্র মহিষী,-এ সৌভাগ্য আমার অন্য স্বদেশীয়া ভগিনীগণের নাই, কন্যা অপেক্ষা পুত্রেরই এদেশে অধিক সমাদর, বিধাতা আমাকে নেপালের আদর্শ সতী স্বর্গীয়া বড় মহারাণী । ১৮৮২ পাঁচটী পুত্র ও একটীমাত্র কন্যা দিয়াছেন। শােক তাপ আমি কিছুই পাই নাই, দেহ ভগ্ন হইয়াছে বটে কিন্তু পূর্ণ সুখ বিধাতা নরভাগ্যে রাখেন নাই, আমি ইহাতেই অত্যন্ত সুখী।” কি সুন্দর কথা ! কেমন পূর্ণ সন্তোষ । এই ভাগ্যবতী রমণী কাঠমুণ্ড সহরের ১৬০ ক্রোশ দূরে পাটান নামক স্থানে ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে ১০ই মার্চ রবিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি অতি সদ্বংশজাতা, শৈশবেই ইহার বিবাহ হয়। খৃষ্টাব্দে ৩১শে জুলাই ইহার প্রথমা কন্যা বজঙ্গী মহারাণী ভূমি হন। জ্যেষ্ঠ পুত্র মােহন শামসের জঙ্গ রাণ বাহাদুর ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে ২৬শে ডিসেম্বর শনিবার ভূমিষ্ঠ হন। হন। তৎপরে ক্রমে তাঁহার আরও চারিটী পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০০ খৃষ্টাব্দে কনিষ্ঠ পুত্রের জন্মের পর হইতেই তিনি নিদারুণ যক্ষারােগে শয্যাগত হন এবং প্রায় ৩ বৎসর ধীরতা এবং সহিষ্ণুতার সহিত অশেষ বােগযন্ত্রণ। ভােগ করিয়া ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে দেহ ত্যাগ করিয়াছেন। হিন্দু রমণীর জীবনে বর্ণনীয় বিশেষঘটনা প্রায় থাকেন; ইহার জীবনেও উল্লেখযােগ্য বিশেষ ঘটনা তেমন কিছু নাই। ইনি অতি ধৰ্ম্মপ্রাণা নিষ্ঠাবতী স্ত্রীলােক ছিলেন। রাজপতির সমভিব্যাহারে হরিদ্বার, বদরিকা, মথুরা, কুরুক্ষেত্র প্রয়াগ প্রভৃতি বহু তীর্থ ভ্রমণ করিয়াছিলেন। অনেক যাগ-যজ্ঞ, লক্ষ হােম, কোটী-হােম প্রভৃতির অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। দৈনিক জীবনে অতি নিষ্ঠার সহিত ধৰ্ম্মাচরণ করিতেন। রােগ শয্যায় পড়িয়াও এক দিনের তরে তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ;

নেপালে বঙ্গনারী। প্রত্যুষে চারিটার সময় উঠিয়া প্রাতঃকৃত ও পূজা সমাপন করিয়া তবে ঔষধ সেবন করিতেন। মহারাণী সকল বিষয়ে আদর্শ পত্নী ছিলেন। তিনি কিরূপ প্রাণ মন দিয়া একান্ত চিত্তে পতির হিত সাধন ও সেবা শুশ্রুষা করিতেন, যাহারা তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন তাহারাই মুগ্ধ হইয়াছেন। নেপালের রমণীগণ স্বামীর পদোদক পান না করিয়া জলগ্রহণ করেন না, তাহাত তাহার নিত্যকর্ম ছিল, যতদিন তাঁহার স্বাস্থ্য ভাল ছিল, ততদিন নিয়ত স্বামীর সেবা করিয়াছেন। নােগশয্যায় পড়িয়াও তিনি যে ভাবে স্বামীর সেবা শুক্রবার ব্যবস্থা করিতেন, তাহা শুনিলে বিস্মিত হইতে হয়। তাহার আহার নিদ্রার কোন অনিয়ম ও কোন ব্যাঘাত যাহাতে না হয় সর্বদা সে বিষয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতেন। স্বামী যথাসময়ে নিদ্রিত হইয়াছেন কিনা দাসীকে পাঠাইয়া তাহার তত্ত্ব লইতেন। অসুস্থ শরীরে শুইয়াও স্বামীর আহারের তত্ত্বাবধান করিতেন। পতির আরাম, পতির কল্যাণ সঁহার হৃদয়ের নিত্য চিন্তার বিষয় ছিল। হিন্দু রমণী সাধারণতঃ পতিপ্রাণা, কিন্তু তিনি এ সম্বন্ধে পরাকাষ্ঠা দেখাইতে সক্ষম হইয়াছিলেন। মহারাণী যেরূপ সাধ্বী ও পতিপ্রাণ ছিলেন, তাঁহার সুযােগ্য রাজপতিও তেমনি সৰ্ব্বতভাবে তাঁহার প্রেমের গৌরব রক্ষা করিয়াছিলেন। তিনি পত্নীর জন্য যাহা করিয়াছেন, সেরূপ দৃষ্টান্তও অতি বিরল। বিধাতা তাহার গুণবতী পত্নীকে অতি উচ্চ প্রকৃতি ও প্রখর মেধা দিয়া.এ জগতে পাঠাইয়াছিলেন সত্য, নেপালের আদর্শ সতী স্বর্গীয়া বড় মহারাণী । কিন্তু মহারাজ তাহাকে যত্নপূৰ্ব্বক সুশিক্ষা দিয়া তাঁহার প্রকৃতি ও চরিত্রের সৌন্দৰ্য্য আরাে ফুটাইয়া তুলিয়াছিলেন। মহারাজ তিন বৎসরকাল যেরূপ ভাবে মহারাণীর সেবা এবং চিকিৎসা করিয়াছেন তাহাতে তাহার পত্নীর প্রতি গভীর প্রেম সুন্দররূপে প্রকাশ পাইয়াছে। তিনি পত্নীর জন্য এই দীর্ঘকাল সকল প্রকার সুখ হইতে বঞ্চিত হইয়া নিয়ত মানসিক দুশ্চিন্তায় কালযাপন করিতেন। দুরারােগ্য দুরারােগ্য ব্যাধি তাহার কোমল দেহকে ক্ষীণ করিতেছে দেখিয়া মহারাজ আকুল হইয়া পড়িতেন। মানবের সাধ্যে যাহা কিছু আছে পত্নীর জীবনের জন্য তাহার কিছুই অচেষ্টিত রাখেন নাই। যেদিন মহারাণীর রােগের কোনরূপ বৃদ্ধি হইত, চিকিৎসকদিগের প্রাণ ভয়ে শুকাইয়া যাইত, মহারাজ হয়ত ভাবিবেন কোন ত্রুটি, কোন অনিয়ম হইয়াছে। স্ত্রীর বােগ যন্ত্রনা ও শীর্ণ দেহলতা দেখিয়া মহারাজ শশাকে কাতর হইতেন। যে প্রাণ বিশাল রাজ্যের ভার বহন করিতে পারে, যাহা বিপদে অচল অটল, তাহা পত্নীর নােগশয্যা পার্শ্বে স্থির থাকিতে পারিত না। ইহাদের দাম্পত্য জীবন অত্যন্ত সুখের ছিল, উভয়ের প্রতি উভয়ের গভীর প্রেম ছিল। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা কে প্রতিহত করিতে পারে ? এই সুদৃঢ় প্রেমের বন্ধন ছিন্ন করিয়া মৃত্যু রাজভবনকে শােকে আচ্ছন্ন করিল, মহারাজের সুখের সংসার অকালে অন্ধকার হইল। মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে তাহাকে পশুপতিনাথে লইয়া যাওয়া হয়। সেদিন রাত্রি দশ-

১১২
নেপালে বঙ্গনারী।
টার সময় মহারাজকে অনুরােধ করিয়া গৃহে পাঠাইলেন, রাত্রি
১২টার সময় তাঁহার শেষ সময় উপস্থিত হইল। ভগিনীকে
পতির প্রতিকৃতি আনিতে অনুরােধ করিলেন, একবার একদৃষ্টে
তাহা নিরীক্ষণ করিয়া মস্তকে ধারণ করিলেন, তারপর চক্ষু
মুদ্রিত করিয়া ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করিতে করিতে এই নশ্বর
দেহ ত্যাগ করিয়া গেলেন। চিতাভস্ম বাঘমতীর জলে মিশ্রিত
হইল, ধীর গম্ভীর নিনাদে কামান ধ্বনিত হইয়া এই নিদারুণ বার্তা
সহরবাসীকে জ্ঞাপন করিল, কত চক্ষে সেদিন বারিধারা বর্ষিত
হইল কে গণনা করে ?
একটী ঘটনা বলিলে নারীগণ মহারাণীর পতিভক্তি বুঝিতে
পারিবেন। মৃত্যুর পূর্ব হইতেই মহারাণী পতিকে
বিবাহ
করিবার জন্য বার বার অনুরােধ করেন। “আপনি বিবাহ
করুণ, আমি চক্ষে তাহাকে দেখিয়া যাই, আমি তাহাকে
আপনার সেবার সকল ব্যবস্থা শিখাইয়া দিয়া যাই। আমি
সকল বন্দোবস্ত করিয়া নিশ্চিন্ত মনে চলিয়া যাই।” শেষদিন
পৰ্যন্ত তিনি বার বার পতিকে বিবাহ করিবার জন্য অনুরােধ
করিয়াছিলেন। “আপনি যদি আমার জন্য শােকাৰ্ত্ত হৃদয়ে
কাল যাপন করেন, আমার আত্মা নরকগামী হইবে, আমি
পরকালের সুখে বঞ্চিত হইব। ইহকালে আপনাকে অনেক
কষ্ট দিলাম,
মৃত্যুর পরে যেন আর কষ্ট না
এই উক্তি নারীর পক্ষে কি কঠিন, কত গভীর প্রেম হৃদয়ে
থাকিলে পত্নী পতিকে এরূপ অনুরােধ করিতে পারেন? কত
দিই”।

নেপালের আদর্শ সতী স্বর্গীয় বড় মহারাণী। স্ত্রীলােক সপত্নী ভয়ে কাতর হইয়া মৃত্যুশয্যায় পতিকে আবার বিবাহ করিতে নিষেধ করে। কয়জন নারী আছেন যিনি প্রাণ খুলিয়া স্বামীকে এইরূপ অনুরােধ করিতে পারেন ? মৃত্যুর পূৰ্ব্বে একদিন তিনি কন্যাকে বলিয়াছিলেন, “আমি তােমার পিতাকে কেবল কষ্টই দিলাম। যদি তােমার পিতা আবার বিবাহ করেন, তাঁহাকে সম্মান করিও, আদর করিও। তিনি তােমার গুণবতী মাত হইবেন, তিনি তােমাদের শূন্য গৃহ পূর্ণ করিবেন, তােমার শােকার্ত পিতার অন্তরে শান্তি দিবেন।”—আমরা কখন শুনি নাই কোন মাতা এরূপভাবে কন্যাকে কখনাে উপদেশ দিয়াছেন। মহারাণী আদর্শ মাতা ছিলেন, সন্তানদিগের সুশিক্ষার প্রতি নিয়ত দৃষ্টি রাখিতেন। একদিন শিশু পুত্ৰটী কি অন্যায় করিয়া- ছিল, তিনি শুনিয়া চক্ষের জলে ভাসিয়া বলিয়াছিলেন, “আমি কি পাপিনী, আমার গর্ভের সন্তান কেন এরূপ করিল ?” শিশুর অপরাধ সকলেই তুচ্ছ করে কিন্তু তাহার নিকট শিশুর অপরাধ গুরুতর বােধ হইত। সন্তানেরা তাহাকে যেমন শ্রদ্ধা ভক্তি করিত, তেমনি ভয় করিত, এমনি তাহার সুদৃঢ় শাসন ছিল। এই চরিত্রবতী রমণীর প্রাণে অতি আশ্চৰ্য্য সৎসাহস ও তেজস্বিল ছিল। কোন প্রকার অন্যায়ের প্রশ্রয় তিনি দিতেন না। মহারাণী প্রচুর দান ধ্যান করিয়া গিয়াছেন, তাহার পরিমাণ নির্ণয় করা অসাধ্য। তুল-দান, সহস্র সহস্র গাভী দান, সুসজ্জিত গৃহ ও উদ্যান ব্রাহ্মণকে দান করিয়া গিয়াছেন। পতির নামে ১১৪ নেপালে বঙ্গনারী । নাই। দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করিয়া কত লােকের আশীৰ্বাদ- ভাজন হইয়াছেন, কত, অপরাধীর কারাবাস-দুঃখ মােচন করিয়াছেন। দেশের অর্থ অপহরণের অপরাধে দণ্ডিত জনৈক সুবাকে পঁচিশ হাজার টাকা দিয়া জল্লাদের হস্ত হইতে রক্ষা করেন। হিন্দু শাস্ত্রে যে সকল ক্রিয়াকর্মে পুণ্যসঞ্চয় হয় বলিয়া নির্দিষ্ট আছে, তাহার কিছুই তিনি অননুষ্ঠিত রাখেন নােগশয্যায় পড়িয়া শাস্ত্রকথা শ্রবণে তিনি কত সময় অতিবাহিত করিতেন। তাহার মত নারীপৃথিবীতে অতি অল্পই জন্ম- গ্রহণ করেন। তিনি এই বিশাল নেপাল রাজ্যের প্রধান রমণী ছিলেন; কিন্তু তাহার আত্মীয় স্বজন ও দূরাগত বিদেশী যাহার তাঁহার সংস্পর্শে আসিত, তাঁহারাই তঁাহার সৌজন্য, দয়া, মিষ্ট- ভাষিতা প্রভৃতি গুণে মােহিত হইত। তিনি অতিশয় দূর- দর্শিনী বুদ্ধিমতী রমণী ছিলেন ; তাহার প্রত্যেক কাৰ্য্য সুবুদ্ধি এবং সদ্বিবেচনার পরিচয় দিত। মহৎ প্রকৃতিই স্বীয় মহত্ত্ব উপলব্ধি করিতে পারে। তিনি সম্পূর্ণরূপে আপনার উচ্চ পদের গৌরব রক্ষা করিয়া গিয়াছেন। শুধু পদের গৌরব রক্ষা কেন, তিনি স্বীয় পদের গৌরব বৃদ্ধিও করিয়া গিয়াছেন। এরূপ নারী- রত্ন শুধু এদেশের কেন, সমস্ত হিন্দুরমণীর গৌরবস্থল। সমগ্র নারীমণ্ডলী তাঁহার দৃষ্টান্তে পতিভক্তি, পতিসেবা, গুরুভক্তি, সন্তানের শিক্ষা, প্রজাপালন প্রভৃতি সকল গুণই শিক্ষা করিতে পারে। এই দুর্ভেদ্য গিরি প্রদেশে, রাজান্তঃপুরে, নরচক্ষুর অগােচরে

নেপালরাঙ্গ মহারাজাধিরাজ পৃথীবীর বিক্রমশ
ও তৎপুত্র
বর্তমান নরপতি মহাবাজাধিরাজ ত্রিভুবন বিক্রমশাহ

No text on this page.

পালের আদর্শ সতী স্বর্গীয়া বড় মহারাণী।
এমন রমণী-রত্ন আবিভূত হইয়াছিলেন, যাহার নাম স্মরণ করিলে
হৃদয় শ্রদ্ধা ও ভয়ে অবনত হয় । মহারাজ চন্দ্র শামসের জঙ্গ রাণা
বাহাদুর ভাগ্যবান পুরুষসিংহ, যিনি এমন রমণীর লাভ
করিয়াছিলেন। তিনি ত অমব ধামে গমন করিয়াছেন, তাঁহার
পুণ্যচরিত অমর হউক, তাহার পুণ্য সকলকে রক্ষা করুক।

No text on this page.

No text on this page.

Nepale Banganari

Author
Debi, Hemalata
Title
Nepale Banganari
File name
Nepale Banganari
Text
OCR done
Citation
1911
Published
2010/02/14
Publisher
Gurudas Chattopadhya, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
156
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Culture
Keywords
Nepaler Bouddhadharmma
DLI number
511233
Barcode
4990010018401.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
9OpAbztqoXR
Download PDF

Nepale Banganari