Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Abhijaan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
অভিযান শ্রলীলাময় দে
প্রকাশক-বরেন্দ্র ঘােষ
২০৪, কর্ণওয়ালিশ,
কলিকাতা।
মূল্য-১১
মুদ্রাকর-নীলকণ্ঠ ভট্টাচাৰ্য্য
দি নিউ প্রেস
১নং রমেশ মিত্র বােড়, ভবানীপুর,
কলিকাতা।
»
পরিচামিকা
3
।
গ্রন্থকার একেবারে বঙ্গসাহিত্যে অপরিচিত নহেন—কোন
কোন মাসিক পত্রে ইহার কবিতা প্রকাশিত হইয়া থাকে।
ইহাই তাহার প্রথম গ্রন্থ—সেজন্যই বােধ হয় ইনি একটু
পরিচায়িকা বা ভূমিকা চাহিয়াছেন। কবিতাগুলি পড়িয়া আমি
আনন্দ লাভ করিয়াছি। ভরসা করা যায়, উৎসাহ লাভ করিলে
এবং অবহিত সাধনা করিলে ইনি একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি হইতে
পারিবেন। ছন্দের বৈচিত্র্য সাধন, পদবিন্যাস, শব্দচয়ন ইত্যাদি
বিষয়ে লেখকের যথেষ্ট সতর্কতা আছে। রচনাগুলির মধ্যে যে
কবিমানসের পরিচয় পাওয়া যাইতেছে—তাহা এখনও অঙ্কুরিত
অবস্থায়। ভরসা করি একদিন ইহা পল্লবিত ও পুষ্পিত হইয়া
সকলেরই আনন্দবর্ধন করিবে।
রসচ-সাহিত্য-সংসদ,
দক্ষিণ কলিকাতা।
শ্রীকালিদাস রায়
No text on this page.
পুজনীয়া শ্ৰীনিৰ্ম্মল বসু (ছােড়দি)
আর
প্রিয়তমা—শ্রীলীলা দের
করকমলে
No text on this page.
অভিযান
যৌবন দীক্ষা
ম
বিদ্রোহীর সহচর হে মাের যৌবন
অতর্কিতে আনি দিলে উছল প্লাবন
ধীর স্থীর চিত্ত নদে। প্রতি ধমনীতে
রক্ত ধারা নৃত্য করি লাগিল বহিতে ।
মঞ্জুরী স্মলিত সিক্ত শেফালিকা মত
লাগিল ঝুরিতে রুদ্ধ তপ্ত অযত।
ওষ্ঠপুটে তুলিবারে গেনু ক্ষণে ক্ষণে
রমণীয় বিষ-পাত্র সুধা পাত্র ভ্রমে।
ঘন ঘটা অমানিশা একদা নিশীথে
স্বপনের দ্বার খুলি ডাকিয়া ইঙ্গিতে
সঙ্গোপনে কর্ণে ঢালি মরণের গীত
অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা দিল কোন্ পুরহিত ?
বিদ্রোহী পরাণ মম সেইদিন হতে
খুজিছে, মৃত্যুর রথ চলে কোন পথে ।
অভিযান
দুর্গম পথে যাত্রা তােমার হে বীর করেছ সুরু
চরণের গতি সংযত কর—বক্ষের দুরু দুরু।
নিশীথ শেষের শেষ চুম্বন
প্রিয়ার বুকের ভীরু কম্পন
মুদিত আঁখির মায়া অঞ্জন মুছে ফেল মন হতে
হে বীর আজিকে যাত্রা তােমার দুর্গম মরু পথে।
যৌবন জ্বালা রক্তে তােমার শৃঙ্খল ছেড়া মন
অচেতন চিতে অঙ্কিত রাকা সুন্দর অনুপম।
কাল নিশি জুড়ে প্রেয়সীর মনে
কত কি এঁকেছ গােপনে গােপনে
আজি মরুপথে বিষাদ আননে ভাবিতেছ বুঝি তাই
পশ্চাতে শােন মায়া ক্রন্দন সম্মুখে বাধা নাই।
মনের ফলকে জাগ্রত রাখি বেইমানী দুনিয়ার
অন্থর চুমি হৰ্ম্মের তলে দুঃখীর হাহাকার।
মুছে ফেলে দিয়ে লালসার আশা
গেঁথে নাও চিতে-বেদনার ভাষা
উন্নত শিরে সত্যের পথে সুরু কর অভিযান
দীপ্ত আঁখির অগ্নিছটায় কম্পিত শয়তান।
7
অভিযান 1 আজি হতে বীর পিনাক-পাণির রিক্ততা লয়ে বুকে বেদুইন বৈদ চিত্তেতে গাথি দিগন্ত আঁকি চোখে। কণ্টক বন কুসুমিত করি নিঝর ধারা অঙ্কেতে ধরি যাত্রা তােমার অঙ্কিত কর অরবিন্দের রাগে- নভ বাতায়নে সুর বালিকারা অভিনন্দিছে শাঁখে। প্রলয়ের শেষে শান্তি পয়ােধি অসীমের আবাহন অশ্রুত গানে এনে দেবে প্রাণে রক্তের জাগরণ। পথ চলা যবে শেষ হবে তব আঁখিতে ফুটিবে লেখা নব নব- বিশ্ব মায়ের অলকে দোলানাে বিদ্যুত থরে থর শােণিত তৃষার তৃষিত চাতক লুষ্ঠিত ভূমি পর।
জীবনের দুটো পাতা
জীবনের দু’টো পাতা
কল্পনা আর বাস্তব দিয়ে বিধাতার হাতে গাঁথা।
সাগরের উপকূলে
প্রথম পাতাটী খুলে
বালুকা বিছানাে কোমল আসনে থাকিতাম সব ভুলে।
কল্পনা পাখা মেলে
মন বিহঙ্গ বিহারে ছুটিত উৰ্মিরে পায়ে ফেলে।
অরুণ যেখানে ছড়ায়ে আবীর নীলিমার অঞ্চলে
চির-যৌবনা উষসীর সনে নাচে অসীমার জলে।
উৰ্ম্মিবালারা নাচিয়া নাচিয়া যেথায় করিছে খেলা
কণ্ঠে পড়িছে শ্বেত ফেনহার নীল জলধির বেলা।
যেখানে বসিয়া অসীমে অসীমে কথা কয় কানে কানে
কল্পনা মন চকিত চমকে ছুটে চলে সেইখানে।
সাগর বেলায় তরঙ্গ রেখা তুলি মৰ্ম্মর ধ্বনি
আল্তায় রাঙা কোন তরুণীর পদতল দু’টী চুমি
চলে যায় ফিরে সাগরের বুকে অতল জলধি জলে
সাগরিকা সেথা মালাটী গাথিছে শুভ্র মুকুতা ফলে।
বারুণী যেখানে পঙ্কজ বনে প্রবাল আসন পরে
বসি নিরালায় নিশি দিন কার কথাটী ভাবিয়া মরে
ফেলে বসে বসে লােণ আঁখি জল আর বেদনার শ্বাস
উৰ্ম্মি কপােত আনে তটে বয়ে সেই বিরহের ভাষ।
৪
অভিযান
তারি তীরে তীরে কত তরুণীর গােপন চাহুনি নিয়া
ভ্রান্ত আশায় দুলে দুলে ওঠে কত তরুণের হিয়া।
তারপর হায় গভীর উছাসে তরঙ্গদল সনে
মনােরম যত মনের বাসনা ভেঙে পড়ে প্রতিখনে।
আমি শুধু চেয়ে দেখি
অসীমে অসীমে ভালবাসা ছাড়া আর সবি যেন মেকি!
কল্পনা ভরা মন
আতত জলধি অসীম বক্ষে লুটে ফেরে সারাখন।
এমনি করিয়া ভেসে চলে মাের জীবনের দিনগুলি
লঘুপাখা মেলে আকাশে বাতাসে সাগরে শিহর তুলি।
একদা দিনের শেষে
কি জানি কে যেন এসে
প্রথম পাতাটী ছিড়ে নিয়ে গেল বাতাসে বিকট হেসে।
কাব্য কবিতা ভাব উচ্ছ্বাস সব গেল মােরে ফেলে
বাস্তব এসে দাড়ালাে সমুখে রঞ্জিত আঁখি মেলে।
কৰ্ম্মের রথে বাবা জুড়ে দিয়ে মাের জীবনের চাকা
কহেন বকিয়া কি হবে লিখিয়া ? যাও নিয়ে এসাে টাকা ।
বিয়ে করেছ’ দু’বছর হ’ল ছেলেও হয়েছে দু’টী
সবার অন্ন যােগাতে—আবার বুড়াে বয়সেতে ছুটী।
নিভাবনায় একালের ছেলে কেমনে কাটায় কাল
দেখে জ্বলে যায় সর্বশরীর যত সব জঞ্জাল।
গৃহিনী আমারে বড় ভালবাসে মুখভার করে থাকে
কাছে গেলে পরে কথা নাহি কহে—ভাত ঢাকা দিয়ে রাখে।
বাপের বকুনি বো’র হেলাফেলা আর সাহেবের গুতা
তিনে মিলে মােরে করিয়া তুলিল কেরাণীর ছেড়া জুতা।
{
৫
খেয়ালী
আমি খেয়ালী আমি খেয়ালী
জগতের চোখে রয়েছি রহিব
চিরদিন আমি হেঁয়ালী
খেয়ালের বসে কভু ছুটে যাই
কভু বা কঁদিয়া ভূমিতে লুটাই
কভু দরদেরে মত্ত পায়েতে দলি
প্রকৃতির কোলে লালিত হয়েছি
প্রকৃতির তালে চলি।
নব বৈশাখ আসে যবে নেমে
উদ্দাম মদ মত্তে
কাল-বৈশাখী ঝড় বয়ে যায়
মম চঞ্চল রক্তে।
মাতার রােদনে বাধা নাহি মানি
পাগলের মত ছুটি গিয়া আমি
মৃত সন্তানে ছিনাইয়া আনি
লেলিহান শিখা আগুনেতে ফেলি
হানি ঘাের করতালি
আমি উন্মাদ আমি খেয়ালী।
শ্রাবণ যখন স্তব্ধ নিশীথে
বরিষে নয়ন জলে
চিত্ত আমার কোন বেদনায়
করে ওঠে টলমল।
অভিযান
হারায়েছি হায় নহে বেশী দিন
প্রিয়তমা শশাকে বড় উদাসীন
নয়নের কোনে ঝরে নিশিদিন
অঝােরের ধারে সঞ্চিত ব্যথা যত
শ্রাবণ ধারার মত।
দুই কূল ছাপি চলিয়াছে নদী
গাহি কল কল গান
শুষ্ক তপ্ত মরুময় বুকে
পড়িল জোয়ারে টান।
রুদ্ধ প্রবাহ কঁপিয়া কঁপিয়া
উন্মাদ চিতে উঠিল নাচিয়া
খরতর বান আসিল রে ছুটে
সকল তন্ত্রী খুটে।
হল অবসান বরষার গান
শ্রাবণ মেঘের ঘটা
নৃত্য পাগল শিবশঙ্কর
বাঁধিল ক্ষিপ্ত জটা।
উন্মাদ চিত ছিল অস্থির
শরত পরশে হয়ে এলাে ধীর
উচ্ছল প্রাণে ভাবনা গভীর
শ্যামল আগনে আগমনী কলগান
অন্তরে মাের বিরহের অবদান
শীতের শীতল সােহাগের তলে
জমাট বাঁধিছে সবে
৭
অভিযান
র
আমার হৃদয় তন্ত্রী নাচিল
মৃত্যুর শাঁ-শ। রবে।
স্তব্ধ গভীর জীর্ণকুটির চকিতে সেথায় পশি’
দেখি দীন বালা পড়ে আছে একা—মৃত্যু শিয়রে বসি।
প্রলয়ের মত-ঝঙ্কার বেগে শিয়রে তাহার আসি
মৃত্যুরে তার দিনু—আগাইয়া হাসিয়া বিকট হাসি।
আমি উন্মাদ আমি খেয়ালী
নিজেরই নিকটে রহিয়া গিয়াছি
চিরদিন আমি হেঁয়ালী।
ফাগুন উতল আগুন জ্বলিল
ধরার চিত্ত বনে
বৃদ্ধ কেহ বা-কাটাতেছে কাল
মৃত্যুর দিন গনে।
মৃত্যু কুহেলী বিষাদিমা তলে দিল অঞ্চল খুলি
যমে ও মানবে নিত্য চলিল বিভৎস কোলাকুলি।
নীড় প্রাঙ্গন গহন কানন স্তব্ধ নদীর ধার
পথে ঘাটে বাটে কঁদিয়া উঠিল মৃত্যুর হাহাকার
দেখিনুত সবি বুঝিতে নারিনু দেবতা তােমার হেঁয়ালী
বল দেব বল, আমারি মতন তুমিও নাকি গাে খেয়ালী?
৮
ওগাে জীবনের সই
ওগাে জীবনের সই
চল ধীরে অতি ধীরে--
নিতি রাঙা ফুল ফুটিছে মনের কুঞ্জবনে
ঝাঁকে ঝাঁকে আসে প্রেম অলি মধুগুঞ্জরণে
রূপ রস মােহ প্রলােভন দিয়ে রাখাে রাখাে
তারে ঘিরে
ওগাে জীবনের সই
চল ধীরে অতি ধীরে
পুষ্পকুমারী চকিত সলাজে ঘেণ্টা খােলে
রক্ত কপােল তপ্ত হতেছে প্রেমের জলে।
অসীমের মায়া বক্ষে লুকানাে শােভন সুরে
নিতি আনাগােনা চঞ্চলতা জীবন জুড়ে।
উতল হাওয়ায় পরাণ তােমার ভেসে যেতে
চায় ফিরে ?
ওগাে জীবনের সই
চল ধীরে অতি ধীরে।
সাগরের বুকে কল্লোল তােলে বারুণী বালা
মেঘে মেঘে দোলে রাম ধনুকের রঙের মালা।
নভ বাতায়নে অঞ্জন মাখি নয়ন কোলে
দিক্ বালিকারা লুটাপুটি করে হাস্য রােলে।
অভিযান
সম্মুখে চাও প্রাণ ভরে নাও চেয়াে নাকো
পিছু ফিরে
ওগাে জীবনের সই
চল ধীরে অতি ধীরে।
7
তনুতলা বেয়ে পড়িছে তােমার রূপের ছটা
রূপ-দেবালয়ে পূজা আরতির কত না ঘটা।
মন-মন্দির দেহ-দেউলের চূড়ার তলে
লুটে পড়ে মাের মনের আগল কত না ছলে।
তব জয় গানে সজীবতা আনে দিকেদিকে
দিক-সমীরে
ওগাে জীবনের সই
এসাে ধীরে এসে বাহিরে।
জীবন ঘিরিয়া কল্প-প্রসূন ফুটিতে চায়
অকালে ঝড়িয়া পড়িবে যে তব মত্ততায়।
পরাণে শ্বসিবে শত শত ফণা ব্যর্থতার
ওষ্ঠে জ্বলিবে বিষচুম্বন রিক্ততার।
তব চরণের ক্ষীপ্র গতিতে কঁদিতেছে
চিত-অধীরে
ওগাে জীবনের সই
চল ধীরে অতি ধীরে।
সিন্ধু গরজে মত্ত ভাষে আকাশে বাতাসে
বিহগ কুলায় শঙ্কিত চিতে শাবক পাশে।
১০
অভিযান
কণ্টকময় বন্ধুর পথ পিচ্ছিল যথা তথা
শঙ্কা জাগিছে এই বুঝি বাজে চরণে ব্যথা
সবে হ’ল সুরু—বাকি বহুপথ পৌছিতে
নদী-তীরে
ওগাে জীবনের সই
চল ধীরে অতি ধীরে।
স
৮
১১
ওগাে সন্ধ্যা ওগাে সন্ধ্যা তুমি তুমি তুমি তুমি তুমি ওগাে সন্ধ্যা ওগাে সন্ধ্যা ধরণীর চোখে তন্দ্রা জড়ায়ে ফোটাও রজনী গন্ধা। অলকার মেয়ে অলকে তােমার তারার মণিকা জ্বলে ধরণীর কোলে ধ্যানের বালিকা কণ্ঠে গীতিকা দোলে। বেউদগতা বেদের মন্ত্র বেদনার বারিধার জপ তপ মম ধ্যান আরাধনা সাধনার মণিহার। কুষ্ঠিতা-প্রিয়া অবগুণ্ঠনে নাবাে অঙিনায় মাের দেবতার ঘরে বীণা ঝঙ্কারে টুটে তন্দ্রার ডাের। পল্লীবধুর অঞ্চল আঁড়ে কেঁপে ওঠে দীপ শিখা তুলসীর মূলে অবনত শিরে আঁকে আরতির লিখা। বেনুবনে কার বাঁশী ওঠে বেজে কে চলে যমুনা জলে যবে মম নব হের ১২
অভিযান
কা’র
অধীর চরণ কেঁপে কেঁপে ওঠে
আঁধার পাথার তলে।
রবির অধরে মিলায়েছে হাসি
কমল মুদেছে আঁখি
কাকলী কূজন নাহি ওঠে বনে
ঝিমায়ে পড়েছে পাখী।
আর
আজি আমি আর তুমি চলিব স্বপনে
বিরাট আঁধার বাহি
হেথা নাহি রবে ভাষা ধরণী বিবশ।
ধ্রুবতারা রবে চাহি।
চিত্ত মাের কাঁদে তার তরে-
চিত্ত মাের কাদে তার তরে
নগরের বজ্জিত প্রান্তরে
যে রমণী আপনারে সু-সজ্জিত করি
বিলাস ব্যসনে আর রত্ন আভরনে
বিলাসীর তরে দ্বারে রহে অপেক্ষায়।
সু-সুপ্ত নগরীর স্বর্ণ-সৌধ হতে
ভেসে আসে কলধ্বনি বারবণিতার
কে বুঝিবে অন্তরেতে কী বেদনা তার ?
দেহের বিলাস রঙ্গে অন্তরেরে রাখিছে ভূলায়ে।
ম্লান সন্ধ্যা নাবে যবে দ্বার হতে দ্বারে
লজ্জাবতী বধূদের অঞ্চলের আঁড়ে
প্রদীপ জ্বলিয়া ওঠে কম্পিত শিখায়
বিগ্রহের–পাদমূলে।
দিকে দিকে ওঠে বেজে শঙ্খ কলধ্বনি
প্রতিধ্বনি তার, কলঙ্কীর কর্ণে গিয়া
তােলে আৰ্তনাদ।
ওষ্ঠের আরক্ত আভা ম্লান হয়ে ওঠে।
শিথীল কবরী হ’তে কুসুমের দল
ঝরে পড়ে কঠিন ভূতলে।
ক্ষণিকের ক্ষণ জন্ম সে বিষাদ ছায়া
ক্ষণিকে মুছিয়া যায় তিক্ত চিত্ত হতে।
১৪
অভিযান
বিলাস বেলায় তরঙ্গিয়া ওঠে তার
যৌবনের রঙে রাঙা রােমাঞ্চিত দেহ।
মুকুরের মুখে রাখি নগ্ন দেহখানি
সাজাইতে বসে তারে বিলাস সম্ভারে।
তারপর
সারারাত্রি ব্যাপী চলে বিষাক্ত প্রকোষ্ঠে
প্রেমের বিচিত্র খেলা।
প্রেম কোথা ? প্রাণহীন দেহের বিপণী
খুলিয়া বসেছে নারী ছলিতে বৰ্ব্বরে।
কাম-গন্ধে অন্ধ যত পিশাচের দল
ক্লেদাক্ত দেহের ল’য়ে খেলে ছিনিমিনি
উল্লাসে আকণ্ঠ ভরে বিষ করে পান।
ধীরে ধীরে শুকতারা হয়ে আসে স্নান
ম্লানতর হয়ে—ওঠে কলঙ্কির মুখ
প্রভাতের পরিপূর্ণ রূপের সম্মুখে ।
অনাবিল আলােকের পথ রােধ করি
ছিন্নলতা লুটায় ভূতলে।
তখনি উঠিয়া বসে অবসন্ন দেহে
ঝালর মণ্ডিত স্বর্ণ পালঙ্কের পরে ;
প্রতিবিম্ব তার সহসা ঝলসি ওঠে
কনক মুকুরে।
লীলায়িত লালসার পরিপূর্ণ দেহে
যে রেখা রাখিয়া গেছে রাত্রি পদাঘাতে ;
হেরি সেই রেখা
সভয়ে শিহরি উঠি আৰ্তনাদ করি
•
১৫
অভিযান
তড়িতে লুকায় মুখ অঞ্জলির তলে।
চিত্ত মাের কঁাদে তার তরে
নিষ্ঠুর সমাজ যারে করেছে বর্জন
মােহাচ্ছন্ন ক্ষণিকের তুচ্ছ অপরাধে
খুলিতে হয়েছে যারে দেহের বিপণি।
বিবেকের টুটি চেপে ধরে
দেহেরে বেচিছে যারা বিলাস লীলায়।
ক্ষমা যদি নাহি রহে ক্ষণভ্রষ্ট। তরে
কলঙ্ক যে দিল তারে ক্ষমিলে কেমনে ?
পুরুষের ন্যায় দণ্ড অন্যায় নিষ্ঠুর
তাই তারে নারী টানে নরকের দ্বারে
আমি পুত্ৰ ধরিত্রীর
আমি ভালবাসি
ভালবাসি পৃথিবীর স্তব্ধ মৃত্তিকারে।
সে যে আমারি পৃথিবী—একান্ত আমার।
আমার এ দেহ,
অনুতে অনুতে তার রয়েছে জড়ানো।
পঞ্চভূত হতে একদিন
মাের তনু সৃষ্টি মাগি
ধরার জনেতে চুপে লইল আশ্রয় ।
শ্রাবণের মত্ত অর্ধরাতে,
ধরিত্রীর জড় দেহ ওঠে কেঁপে কেঁপে গর্ভ-যন্ত্রণায় ;
চ্ছয়া পড়িল মাতা প্রসব ব্যথায়।
প্রভাতের ডাকে,
মূচ্ছতুরা জেগে উঠে দেখে,
আকাক্ষার ধন তার লুটিছে ভূতলে।
নিষ্কলঙ্ক মুখে মাখা ত্রিদিবের হাসি,
আমি সেই তপস্যার ফল
জন্ম মম তামসী উষার
আমারে সাগ্রহে মাতা অঙ্কে নিল টানি।
চুম্বিল অধর ওষ্ঠ সহস্র চুম্বনে।
কাননে কুসুম ফোটে আমারি লাগিয়া
আমারে তুষিতে পাখী গাহে কণ্ঠ ছাড়ি
আমার গাহন তরে গঙ্গার জনম।
১৭
অভিযান
সাগর তরঙ্গ দল তুলি উদ্ধা-ফণা
গর্জিয়া গর্জিয়া নাচি আমার সম্মুখে
আমারি চরণ তলে পড়িছে লুটিয়া।
সৌম শান্ত মূর্তি লয়ে স্তম্ভিত ভূধর
নিত্য মাের কর্ণে ঢালে বৈরাগ্যের বাণী।
বেদনার বিস্তৃত-আকাশ
নিত্য সারাতে
সকাতরে ডাকে মােরে তার অন্ধকারে।
আমি পুত্ৰ ধরিত্রীর
আমার এ দেহখানি এ যে তারি দান
তাই তারে ভালবাসি মাের দেহ হতে।
১৮
-
তােমার আমার প্রেম
তােমার আমার প্রেম জানে প্রিয় মাধবী বিতান
আর জানে রাত্রির আকাশ
তােমার আমার প্রেম অমরার পূত বারিধারা
উদ্বেলিত তরঙ্গে প্রকাশ
তােমার আমার প্রেম চিরঞ্জীব চিরকাল
বয়ে চলে আকাশে বাতাসে
তােমার আমার প্রেম বিশ্বময় বিকশিয়া
প্রভাতের শতদলে হাসে।••••••
সেদিন মাধবী কুঞ্জে নেবেছিল মধুর যামিনী
গুচ্ছে গুচ্ছে ফুটেছিল ফুল
ধরণী মুখরা ছিল—আর ছিল বাতাসের বুকে
পুষ্প গন্ধ ফুটিতে ব্যাকুল।
আকাশের বুক ভরে পুঞ্জে পুঞ্জে ফুটেছিল তার।
চোখে ছিল উচ্ছ্বলিত হাসি
কলঙ্কিত চঁাদ হ’তে ভেসে এসে পড়েছিল হেথা-
অকলঙ্ক জোছনার হাসি।
১৯
অভিযান
নি
তুমি মােরে সেইদিন সেই পুষ্প পুলক নিশীথে
দিয়েছিলে যে প্রেম-চুম্বম
আজি হেরি ধরণীর বীথিতে উৰ্ম্মিতে জাগে
ক্ষণে ক্ষণে তারি শিহরণ।
তােমার সে বিদায়ের আঁখি, অশ্রুজলে ছলছল
সে করুণ রিক্ত কালো আঁখি
বিদায়ের ব্যথা ল’য়ে তামসী ঊষার ভালে
সকাতরে নিত্য রহে জাগি।
আমার এ অশরীরী প্রেম তােমার আকাশ চুমি
আমারেই করিছে মহান
নিত্য মােরে আঘাতে ফুটায়ে তুলে হে চিত্ত প্রেয়সী
কী সত্য করিছ তুমি দান?
২
২০
রাত্রির মৃত্যু
ধরণীর চোখে নাই ঘুমের আমেজ
দেহ তটে জাগে নব পুলক সঞ্চার
অশরীরী শিশু রাত্রি অঙ্কে এলাে নেবে
অকলঙ্ক আঁখি মেলি দেখিছে আকাশ।
স্তনিত পৃথিবী আর নীলাকাশ জুড়ে
ছড়ায়ে পড়িল তার স্নান কালােরূপ
শিশু রাত্রি তবু তার বিশ্বময় রূপ
সে রূপের ছায়া নাচে আঁখি তারকায়।
রাত্রির প্রথম রূপ অতীব মধুর
লজ্জায় জড়িত পদে নব বধূ সম
প্রথম বাসর ঘরে করিছে প্রবেশ
আধার গুণ্ঠন তলে কঁপে মৃদু হাসি।
সচপল হাসি জাগে তারায় তারায়-
ধীরে ধীরে কেটে যায় আরক্তিম লাজ
রাত্রির নয়ন হতে। জাগে চঞ্চলতা
স্তপদে ছুটে যায় সরসীর জলে।
এলাইয়া কেশ পাশ ওষ্ঠ পুটে চুমি
জাগাইয়া তােলে যত কুমুদ কলারে-
২১
অভিযান
নিশাকর হাসে বসি মেঘ অন্তরালে
সে হাসি ঝলসি ওঠে রাত্রির পাখায়
তার পর সান্দ্র রাত্রি শান্তরূপ ল’য়ে
জানায় প্রাণের নতি অরূপের পদে
নতশিরে। ফুটে ওঠে মরণের ডাক
উষার অনিত্য ভালে শুক তারা চোখে।
রাত্রি তার আঁখি দু’টি উদ্ধপানে তুলি
করুণ উদাস চোখে শুকতারা পানে
রহে চাহি, বিন্দু বিন্দু অশ্রু পড়ে ঝরি
ধরায় শ্যামল বুকে, শেষ চিহ্ন তার।
h
২২
হে মাের তাপসী প্রিয়া
অতনুর লীলা পাশ ছিন্নকরে হে তাপসী প্রিয়া
এলে তুমি মাধবী সন্ধ্যায়-
স্নিগ্ধ অন্ধকারে মনের শুভ্রতা তব খনে খনে
ওঠে ফুটে রজনী গন্ধায়।
তােমার অলকে কঁাদে অলকার কুসুমের দল
‘ঝরে পড়ে কঠিন ভূতলে
গ্রহে উপগ্রহে তারায় তারায় তােমার বিরহে
কারা যেন কঁদিছে উতলে।
তব অঙ্গবাস গৈরিক ধূসর—বৈরাগ্যের ছাপ
মূর্ত হেরি নয়ানে বয়ানে
দেহের দাহন তব অবসান চির অবসান
অতনুর তনু অবসানে।
হে মাের তাপসী প্রিয়া অভিশপ্ত জীবনের কূলে
আজি তব ক্ষণিক উদয়
ক্ষণিকের তরে জানি এসেছ’ ক্ষণিকা মাের কাছে
আমারে করিতে শুধু জয়।
আমার অন্তর তলে যে বেদনা কঁদিছে একেলা
আর তব নয়ন আকাশে
অভিযান
ওই শােন খনে খনে সেই ব্যথা মরিছে শ্বসিয়া
সাগরের তরঙ্গ উচ্ছ্বাসে।
আজিকার রাত্রিটুকু তােমারে রাখিব প্রিয়া ধরে
পূজিব একান্তে আঁখিজলে
তারপর চিররাত্রি চিরঞ্জীব হয়ে মাের তরে
চিত্ত ছেয়ে নামুক ভূতলে।
২৪
যৌবন কুড়ি নয়ন মেলিল
কু
শিউলী-মালার-রেণুকা কাহার দক্ষিণ সমীরণে
গন্ধের ভারে মাের বাতায়নে লুটাইল অকারণে?
তখন ভাঙেনি ঘুম
উষার শীতল আঁচিল সমীরে ধরিত্রী নিঝঝুম।
শুক্লা তিথির দশমীর চঁাদ ঝিমাতেছে পশ্চিমে
শুকতারা জ্বলি উঠিল উজলি নিভিবার অন্তিমে।
ধীরে নিবে আসে তারকার দীপ নিলীমার বাতায়নে
দীর্ঘ রজনী বৃথায় যাপিল বিরহিণী আনমনে।
চকিতে উদয়ে অরুণে হেরিয়া উষা নামে মুখ ঢাকি
সুপ্ত পরাণ স্বপনে কঁদিল কাহার পরশ মাগি ?
আকুল গন্ধে ভরিল চিত্ত সহসা উঠিমু জাগি
বিহ্বল নয়নে রহিনু চাহিয়া তারি দরশন লাগি।
কে তুমি চপলা সুন্দরী ?
চলিতে চলিতে থমকি দাড়ালে মাের বাতায়ন ধরি
তােমারি মালার ঝরা শেফালির রঙীন রেণুকা মাখি
উল্লাসে কিগাে নাচিয়া উঠিল চিত্তের সুর-সাকী ?
চির পবিত্র অন্তর তলে প্রথম পড়িল ছাপ
পরাণ প্রথম কহিতে শিখিল বুকভরা কলবাক।
নয়ন শিখিল কহিতে গােপনে অন্তর কানে কথা
চরাচর হল সহসা মুখরা মুছে গেল নীরবতা।
অভিযান
পড়িতে শেখালে প্রাণ-প্রেয়সীর চরণের রিণিরিণি
মিলন আকুল মৃণাল বাহুর কঙ্কন কিঙ্কিনী ।
ভুল করে মেরে কেন শিখাইলে এ সব করিতে পাঠ
এই অবেলায় পার হতে হবে কত উদাসীর মাঠ।
কে তুমি চঞ্চলিকা ?
উষা-ধূপ-ছায়ে মৃদু মৃদু হেসে পড়ালে প্রেমের টীকা ।
চিনি চিনি তবু চিনিতে পারিনি—এবার পড়েছে মনে
তােমারি স্নিগ্ধ মধুর মূরতি হেরেছি প্রভাত খনে।
স্বপনে তােমার চরণের ধ্বনি তব কণ্ঠের গান
পাগল করেছে হৃদয় তন্ত্রী আকুল করেছে প্রাণ।
তােমারি উছল গানে
যৌবন কুড়ি নয়ন মেলিল মৰ্ম্মের উদ্যানে।
তারে দ’লে তুমি চলে যেতে চাও কোন সে হৃদয় মাঝে
তুমি চলে যাবে একথা স্মরিলে অন্তরে কটা বাজে।
ফিরে যেতে হবে ? যাও তবে যাও মিছে দাড়ায়ােনা প্রিয়
যাবার বেলায় অঞ্জলি ভরি বিদায় অশ্রু নিও।
২৬
সিদ্ধার্থের সিদ্ধিলাভ
সংসার ত্যাজি সন্ন্যাসী এক বন্ধুর পথ বাহি
চলিয়াছে একা বন বনান্তে দেবতার মুখ চাহি
বসনে তাহার বেঁধেছে আবাস গৈরিক ধূলি যত
শত কণ্টকে আর কঙ্করে চরণ হয়েছে ক্ষত।
কুঞ্চিত কেশে বাঁধিয়াছে জটা বসন পড়িছে ছিড়ে
নদ নদী ফেলে সম্মুখে চলে চাহে নাকো পিছু ফিরে।
অনশনে মুখ শুষ্ক মলিন শীর্ণ নধর দেহ
কোথা গৃহ তার কিবা পরিচয় জানেকি ধরার কেহ ?
কপিলাবস্তু আঁধার করিয়া রাজার দুলাল এ যে
জড় দেহ জ্বালা অবসান তরে চলেছে ভিখারী সেজে।
একদা সে এক নব বসন্তে ফান্তুন ফুলবনে
যশােধারা হল মত্ত প্রমদে শত সখিদের সনে
শ্বেত মৰ্ম্মর সােপানে রাখিয়৷ মালা গাঁথা ফুলদলে
এলায়িত কেশে ঝাঁপ দিল সবে শান্ত সরসী জলে
যৌবন ভরা দেহের আঘাতে শিহরি শিহরি টুটে
উর্মি মালার সকরুণ রেখা তটের ওষ্ঠ পুটে
শত ললনার কল উচ্ছ্বাস কমলের বনে ভাসে।
মুক্তদলের রক্ত আভায় সূর্য কিরণ হাসে
সহসা শুনিয়া ঘর ঘর রব তীরে সব ওঠে গিয়া
বৃদ্ধ রাজার রথ চলে যায় সরসীর বাঁধ দিয়া ।
२१
অভিযান
গােপার রূপের একটী ঝলক রাজার নয়নে লাগে
অন্তরে তার নীরব বাসনা প্রবল হইয়া জাগে
ভাবে মনে মনে বধূমাতা করে গােপারে আনিলে ঘরে
উদাসী পুত্র লিপ্ত রহিবে ভােগ বিলাসের পরে।
তার পর এক মাধুরী লগ্নে মধুর বাসর ঘরে
প্রাণ-পুত্ররে সপি দিল রাজা প্রিয় যশােধরা করে।
প্রেয়সীর ভূজ বল্লরী তলে বন্দী হইয়া কাটে
স্বর্ণ সৌধ প্রাসাদ কক্ষে ভােগ বিলাসের হাটে।
বিরাগী চিত্ত বিলাস কক্ষে বাঁধা রবে কতকাল
মােহ অঞ্জল মুছে গেল ধীরে ছিড়ে গেল মায়াজাল।
নগর তখন ঘুমে অচেতন বিরাট অন্ধকারে
তারারা জাগিছে জাগার নেশায় নীল সায়রের পারে
কৌমুদীবালা কলার বনে কাল কেশ পাশ খুলি
জোছনার হাসি করিছে হরণ উৰ্ম্মির সাথে দুলি।
ঘুম পরীদের অঙ্কে ঘুমায় প্রাসাদের নর নারী
গৌতম শুধু শয্যায় জাগে ঘুম নাই চোখে তারি ।
প্রেয়সীর মুখ দেখে বারেবার পুত্রেরে আরবার
পত্নী পুত্রে ছেড়ে যেতে জাগে বক্ষেতে হাহাকার।
তবু তারে সব ত্যায়াগীতে হবে বিশ্ব মানব তরে
জরার কবলে কঁদিছে মানব ওই শােন ঘরে ঘরে।
শয্যা ত্যাজিয়া শাক্য সিংহ মায়া নিঃশ্বাস ছাড়ি
শেষবার দেখি ঘর ছাড়ি পথে বাহিরিল তাড়াতাড়ি।
২৮
অঙিযান
পুত্র ঘুমায় পত্নী ঘুমায় ঘুমায় নগরী সুখে
রাজার দুলাল চলে একাপথে জড় মানবের দুখে।
চলিছে একাকী অন্ধকারের সম্মুখ পথ বাহি
দেবতা কোথায় কোথা নিৰ্বাণ কিছু তার জানা নাহি।
তবু চলা তার বিরাম বিহীন সত্যের সন্ধানে
ঘর ছেড়ে আজ পথে পথে ফেরে দেবতার আবানে।
শত ঝঙ্কার ঝটিকা সহিয়া একদিন বেলা শেষে
নৈরঞ্জনা নদীর কূলায় শাক্য দাড়ালাে এসে।
শত সাধনার সিদ্ধি আসিয়া দাঁড়ালাে সমুখে তার
প্রকৃত জ্ঞানের তত্ত্ব হরিল ধরণীর ব্যথা ভার।
A
২৯
ফুটপাথ রিজার্ভ
( ব্যঙ্গ কবিতা)
শনিবার রাতে স্বপ্নে হঠাৎ ফুটপাতে এসে দেখি
মােড়ে মােড়ে সব পাহারা বসেছে বিষম কাণ্ড একি ?
চোখের নিমিষে ভিড় জমে ওঠে—কারণ বুঝিনা কিছু
লােকের আড়ালে নিজেরে লুকাই মাথা করে থাকি নীচু।
কিজানি কখন হুঙ্কার ছাড়ি বংশ উচায়ে ধরে
ভুড়িটি নাচায়ে ধেয়াে মেড়ােদল ঘাড়ে এসে যদি পড়ে
পৈতৃক প্রাণ বিষম বিপাকে রয়ে যাবে ফুটপাতে
কোষ্ঠির ফল হয়ত এখুনি ফলে যাবে হাতে হাতে।
f
হয়ত বা কোন চরমপন্থী নিজেরে গােপন করে
বাঁচিবার লাগি লুকায়ে রয়েছে ইহাদের কোন ঘরে—
গন্ধে গন্ধে সেই সন্ধানে আসিয়া জুটেছে সবে
‘চল্ চলে চল’ হারুরে কহিনু ‘জানিয়া কি ফল হবে ?
কেঁচাটি যতনে তুলিয়া পকেটে আমি আর হারশশী
চলিতে চলিতে সমুখের এক চায়ের দোকানে পশি
দেখিনু চায়ের টেবিলে বিষম বহিছে কথার ঝড়
লােকে লােকাময় কথার আঘাতে ভেঙে পড়ে বুঝি ঘর ।
‘মেট্রো’ ‘চিত্রা' ‘রূপবাণী’ দেখে পেকেছে যাদের চোখ
রাস্তায় ঘাটে ফিল্ম-ফিগার খুজিয়া বেড়ানাে রােগ
চায়ের টেবিলে পকেট শূন্য এমন তরুণ দল
ফাকা গর্জনে টেবিল গুতায়ে দেখায়ে দেহের বল
অভিযান
বলে হুঙ্কারি-বেশী বাড়াবাড়ি লাল পাগড়িতে ঘেরা
সম অধিকার দাবী করে কেন পৃথক হইয়া ফেরা !
বুড়ােরা বলিছে-বেঁচে থাকা মিছে কত কি ঘটিবে হায়
ট্রাম বাস ছেড়ে রাস্তা চলাও আজি হতে হল দায়।
ঘরের মেয়েরা ঘরে ছিল যবে বেশ ছিল মাের মতে-
এখন তাহারা বাহিরে আসিয়া বাদ সাধে পদে পদে।
হঠাৎ ওপারে চোখের পলকে জমিয়া উঠিল ভিড়,
গোঁফ জোড়া নেড়ে ভুরিটি কপায়ে বেটে মােটা মেড়ােবীর
ফুটপাতে ঠুকে লাঠি বার বার বলিছে-“দেখতা নাই
জানানাকা লিয়ে আজ সে ইধার একদম নােক হায়।”
সব রাস্তার সকল বাঁদিক প্লানেডের মােড় থেকে
‘লেডিজ অলি’ প্লাকার্ডে লিখিয়া রাতে কে গিয়াছে রেখে
তখন দশটা লােকের ভিড়েতে ট্রাম বাস গেল থেমে
দলের নেত্রী রঞ্জিতা রায় ফুটপাতে এলো নেমে
পশ্চাতে তার হাজারে হাজার আলােক প্রাপ্তানারী
দখল জানায়ে নীরবে গরবে চলিয়াছে সারি সারি ।
দোকানীরা সব দোকান মেলিয়া গালে হাত দিয়া ভাবে
বেচা কেনা সব হয় বা বন্ধ কি তবে তাহারা খাবে ?
মেয়েদের ‘পাথ’ ‘রিজার্ভ করার কারণ কিছুই নয়
পুরুষের সাথে চলায় তাদের সম্মান নাহি রয়
মেয়েরা যখন চলে নিজ কাজে পুরুষ তখন নাকি
‘পুষ’ করে মিছে চলে যায় আগে পিছনে তাদের রাখি।
শাড়ির সে ভঁজ ভেঙে যায় তাতে দেহেতে আঘাত লাগে
হাই-হিল জুতাে স্লিপ করার পদে পদে ভয় থাকে
৩১
উপ সংহার
মফঃস্বলের মতিলাল বাবু গাড়ী থেকে নেবে সােজা
কলেজষ্ট্রিটের মােড়ে এসে নাবে সাথে ল’য়ে বউ বােঝ
আগামী আঠাশে শালিকার বিয়ে ‘সুষি’ বলে দেব সাড়ী
নিজে চোখে দেখে কিনিবে বলিয়া সঙ্গ ল’য়েছে নারী
পান্না লালের বাঁধা ফুটপাথে যেমন দিয়েছে পাও
ভােজপুরী ভায়া রুখে উঠে বলে—“তুম কঁহা হাটো
মতিলাল বাবু ধমকেই কাবু বুঝিতে কিছুই নারে
সুষি ফুটপাতে মতিবাবু নীচে মাঝে মেড়াে লাঠি ঘাড়ে
সুষমার চোখে জল ওঠে ভেসে—কি বিপদ হ’ল হায়
শেষে কালে বুঝি স্বামীতে তাহাতে বিচ্ছেদ ঘটে যায়।
‘আপ কাহে নােতা? যাইয়ে’--বলিয়া পথ দিল যেই ছাড়ি
সুষমারে লয়ে মতি তাড়াতাড়ি লইয়া ট্যাক্সী গাড়ী-
সােজা একেবারে হাবড়ায় উঠে হাপ ছেড়ে বলে—“বাপ,
তােমারে যে ফের পেয়েছি ফেরত এই ত’ বাপের ভাগ।
?
৪
৩২
অসিত আর অতসীর একটা সকাল
আর ঘুমায়াে না, আঁখি মেলি চাহ লজ্জা-জড়িত আঁখি,
বেয়ারা কখন সকালের চা টেবিলেতে গেছে রাখি।
ওঠ ওঠ প্রিয়া, এই নাও ধর ওষ্ঠের চুমা দাও,
অবসাদ যত দূরে চলে যাবে, বেড-টিটা খেয়ে নাও।
তারপর যাও বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে,
দেহটি তােমার নিপুণ হস্তে সাজাও নিখুত বেশে।
আঃ কী যে কর, লক্ষ্মীটি ছাড়, আঁচল টেন না শােন,
গায়ে কিছু নেই, শাড়ীও অবশ, চাকর-বাকর কোন
ঘরে ঢুকে যদি দেখে ফেলে কিছু, মরে যাবাে লজ্জায়-
ঠাণ্ডা যে হিম ! ছুয়েই দেখ না এ কি ছাই খাওয়া যায় ?
কোচে বসে বসে হাসছ যে বড় ? হাসি পেল কিসে শুনি?
শীগগীর বল—বলবে না? বেশ চললুম এক্ষণি।•••
কী যে লােক তুমি এখন ত কৈ বল নি বয়কে ডেকে,
এক কাপ চা, তাও শেষকালে খেতে হবে নাকি মেগে ?
বলতে বলতে মুখ ভার করে শয্যায় উঠে বসে,
সংযত করে দেহের বসন কোমরে আঁচল ক’ষে ;
চুলের গােছাটা বাঁধিতে বাঁধিতে ‘স্যাণ্ডেল’ পায়ে দিয়ে,
রণ-রঙ্গিণী অভিমান ভরে দাড়ালাে সিড়িতে গিয়ে।
আরে কোথা যাও রাগ হ’ল নাকি—অসিত শুধালাে হাসি,
বেয়ারাকে বলে চা আনিয়ে রাখ, বাথরুম থেকে আসি।
}
?
অভিযান
দেখি কটা বাজে—ও মা সাড়ে সাত! উঠিয়ে দাওনি কেন ?
‘অষ্টিন’ খান ফটকে এখুনি ঠিক করে রাখে যেন।
সে কি গাে প্রেয়সী ? অভিসারে যাবে ‘অষ্টিনে’ করে শেষে ?
তাই যদি হয় ভয় পেলে নাকি? দাড়াও বলছি এসে
বলেই অতসী দিয়ে বাঁকা হাসি বাঁকা চাহুনির ছলে
চটির চটকে মুখর করিয়া সিঁড়ি বেয়ে গেল চলে।
অসিতকুমার লাফ দিয়ে উঠে, অ্যাস্ গুলাে ঝেড়ে ফেলে,
সিগারেট মুখে বসিল চেয়ারে সুমুখে কাগজ মেলে।
হঠাৎ কি এক মধুর গন্ধ ছড়ায়ে পড়িল ঘরে
অসিত ব’ললাে—আসলে কখন ‘টয়লেট’ শেষ করে ?
এই ত এখুনি, চা কোথায় বল পেয়েছি—শুনবে তবে?
নারী-জাগরণী সভার মিটিং প্রেসিডেন্ট হতে হবে।
সাড়ে আটটায় মিটিং বসবে, তুমিও চলনা সাথে,
যেতে পারি—শুনি ফিরবে কখন ?—বেলা সেই বারটাতে ?
না তবে আমি রইলাম ঘরে, তুমি দেবী যাও একা,
আমার আবার একটার আগে করতেই হবে দেখা।
ফোনেতে ‘সাহু’কে বার বার করে থাকতে বলেছি ঘরে,
যদি বইখানা ‘রূপবাণী’ ঘরে ভাল ভাবে যায় তরে।
ব্যাস বাজীমাৎ নামে ও টাকায় নিমিষে হইব বড়...
শেষ হ’ল বলা ? কোচে গিয়ে বস যেতে দাও মােরে সর।
৩৪
আমি শিস্য ওমরের
অতীতের পুঞ্জীভূত কঙ্কালেরে ঠেলে,
শৈশবের স্মৃতিগুলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
ভবিষ্যের স্বর্ণ-সৌধ সম্মুখে আমার,
চিরাবৃত অন্ধকার হতে বারম্বার
মুক্তি যাচে মাের হাতে। পরিত্যক্ত সম
ভবিষ্যৎ কেঁদে ফেরে দুয়ারেতে মম।
আমি শিষ্য ওমরের, প্রিয় শিষ্য আমি,
বর্তমান ল’য়ে মাের কাটে দিবা-যামি।
প্রিয়ারে পাইনি কাছে, পেয়েছি পেয়ালা,
আরক্ত আঙ্গুর রস পরিপূর্ণ ঢালা।
সেই সুধা নিত্য আমি করিতেছি পান,
মরণের পূর্বক্ষনে করে যাবাে দান
রিক্ত পাত্রখানি মাের তােমাদের করে,
আমারে উদ্দেশ করি অশ্রুজলে ভরে
পাঠায়ে দিওগাে বন্ধু তােমাদের স্নেহ ;
অলস মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে দেহ
প্রিয়াহীন প্রাণ ল'য়ে বেঁচে কিবা সুখ?
মরণ-প্রেয়সী তাই মুছে ল’য়ে দুখ
চিরতরে লয়ে চলে বিশ্ব হ’তে মােরে—
অনিত্যের চিরানন্দ আলােকের ঘরে।
যেমনটি আমি চাই ! হঠাৎ সে দিন যেই না বলেছি মুখ খানি করে কালাে, বিয়ে করা মাের কিছুতে হবে না, একক জীবনই ভাল ; বন্ধুরা ধরে জিগগেস করে বলতে কি কঁাটা মনে ? হেলা করে তাের মূল্য বােঝেনি, কোন সে রূপসী ক’নে ? মাথা নাড়া দিয়া উঠি বলিয়া বুঝেছিস তােরা ভুল- মনের মতন ক’নে না মেলাই বিয়ে না করার মূল ! হাসলি যে বড়! আস্থা হল না ? বলতে চাস্ত বল- বাংলা দেশে কি মেয়ের অভাব বিয়ে না করার ছল। ছল আমি কিছু করিনে কো ঠিক, বলি তবে শােন ভাই- পারিস যদি বা খোঁজ দিস তবে, যেমনটি আমি চাই। আমি চাই খুবই সাধারণ মেয়ে, ডানা কাটা পরী নয়- ৩৬
অভিযান
:
অর্ধেক কোন রাজ্যের সাথে,
রাজকন্যাও নয়
তাই বলে আমি চাইনে কো আর,
পথের কুড়ানাে মেয়ে ;
বুঝবে না কিছু মুখ পানে রবে
ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে।
একটু কিছুতে নাকে কাদা, আর
টেনে আনা চোখে জল ;
জীবন পথের ভারি বােঝ ও
কেমনে বইব বল ?
যারে-তারে আজ বিয়ে করে যদি
না হয় মনের মিল
বল দেখি তবে খুলবে কেমনে
মনের রুদ্ধ খিল ?
বাইরের সাথে হানাহানি করে,
মনে-দেহে ব’য়ে ক্লান্তি,
ঘসে এসে যদি না পেলাম কভু
এত টুকু সেবা-শান্তি ;
সাধ করে তবে সে বাঁধন পরে
কাজ কি আমার বল ?
তার চেয়ে ভাই ভােগ করা ভাল
বিয়ে না করার ফল।
কথার ভুমিকা ছেড়ে দিয়ে বলি
মন দিয়ে তবে শােন,
৩৭
অভিযান
ঘরের ঘরণী কেমনটি হলে
খুসী হবে মাের মন
মেয়েলি ছাদের মেয়ে হওয়া চাই,
গড়নটা চাই দোহারা;
নম্রতা সনে লজ্জাশীলতা,
সুরূপ সুশ্রী চেহারা।
তাই বলে আমি চাইনেক’ ঠিকই
রূপসী তিলােত্তমা,
রংটা ফর্সা হলেই যে হয়
লাবণ্যে অনুপমা।
বাতাসে দোলানাে ফিনফিনে দেহ,
‘হাই হিল জুতাে পায়,
পুরুষেরে ঘেসে চলে একা পথে,
কুঞ্চিত চোখে চায়।
আরাে বলি শােন—পুরুষের মতাে
লাফ দিয়ে ওঠে ট্রামে,
মুখে রং মেখে খাসা সং সেজে
‘ষ্টেজে এসে যারা নামে ;
তাদের চেহারা দেখলে গা জ্বলে,
দু’ চোখেতে জ্বলে বিষ
নষ্ট তত করে ওরাই জানিস
বাঙালী ঘরের ‘পীস।
কিন্তু তাব’লে চাইনেকো আমি
পুরুষালি কোন মেয়ে
অভিযান
ফ্রী-হাণ্ড করা ‘ডেভলাপ, বডি’
চাইনেকো তার ঠোঁয়ে।
নাচ-গান জানা, কাব্যি ফিগারে
মাের কোন কাজ নাই;
সুস্থ সবল গৃহিনী পেলেই
জীবনে বর্তে যাই।
‘বব কাটা চুল, ‘রুজ’ মাখা গাল,
ফ্লার্ট করা যার ব্যবসা
রূপখানা যার কয়লার মতাে,
চেহারাটা গােল ঢ্যাপসা ;
হেঁসেলেতে গেলে যাদের মনেতে
দেখা দেয় নানা রােগ,
আবার যাদের মাসিকেতে আছে
গল্প লেখার ঝোঁক ;
পুরুষের সাথে সম-অধিকারে
দিতে চায় যারা ভােট,
ক্যালকাটা মাঠে খেলা দেখে গিয়ে
গায়ে দিয়ে রে-কোট ;
হাততালি দিয়ে গােল গােল বলে
চিৎকার করে যারা,
সত্যি বলছি জানিস আমার
দু’চোখের বিষ তারা।
০
পাস করা মেয়ে? ডিগ্রী ধারিণী ?
না ওতে কাজ নাই
অ্যারিস্ট্রোকেটিক চালটা তাদের
ধাতে সয় নাকো ভাই।
নিজের গর্ত নিজে খুঁড়ে মরা
ভেবােনা করবাে বিয়ে-
হয়ত বা কোন মনের অমিলে
‘ডাইভাের্স’ করে দিয়ে,
ঘর কাণা করে ঘরের ঘরণী
একা চলে যাবে শেষে,
মাষ্টারি নিয়ে ভারতের কোন
অজানিত দূর দেশে।
আরাে চেয়ে দেখ, পাশকরা মেয়ে
জ্ঞানের গুমরে মরে,
পদে পদে তারা পুরুষগুলাের
এটিকেটে ভুল ধরে।
বিয়ে হলে তারা হেঁসেলে ঢোকে না,
রং পাছে কালাে হয়-
শুধু বসে বসে পুরুষের সাথে
চোখে-মুখে কথা কয়।
অমন মেয়েতে কাজ নেই মাের,
আমি চাই সাদাসিধে।
পারবে যে মােরে সরল পরাণে
আপনারে সঁপে দিতে।
লেখা-পড়া-জানা মেয়ে আমি চাই,
মৃদু ভাষী যদি হয় ;
অভিযান
পাশ-করা। সে ত স্পেশাল ফেভার,
মেয়েদের তরে রয়।
গয়না যাদের কেবলি বায়না,
পেলে মুখটি ভার—
এ সব মেয়েকে ঘরে তুলে আনা
সাধ যায় বল কার ?
আমি চাই যার মুখে সদা হাসি,
চলন-চালন সােজা ;
জীবনের সাথী সাথে সাথে রবে
হবে নাকো ভারি বােঝ।
প্রশ্ন কি করিস? বিয়েতে আমার
পণ টন কিছু চাই ?
তা ভাই সত্যি বলছি এ আমি,
আছে মাের কিছু খাই।
বিয়ের পরেই ‘ষ্টাবলিসড় হতে
যে খরচটুকু লাগে,
(আর যা ইচ্ছে) সেটুকু কিন্তু
দিতে হবে মাের আগে।
ব্যস হয়ে গেল আর কিছু নয়,
শুনলি ত সবি ভাই,
পারিস যদি বা খোঁজ দিস তবে,
যেমনটি আমি চাই।
ড়ের রাতে
।
ক্ত রবির সন্ধ্যালােকে
ধূসর ধূলায় বাত্যা জাগে,
সত্য আমার চিত্তে কেন
কাল বােশেখীর দোলন লাগে ?
[লি কমলের কপােল তলে
বিদায় ব্যথা উঠছে ফুটি,
বলার বুকে ব্যথার ফেনা
অধীর হয়ে পড়ছে লুটি।
তপ্ত সবুজ ফুলের শাখে
ঝড় খেয়ালীর ঝাপট লাগে;
নিত্য কেন চিত্ত মাঝে
কাল বােশেখীর দাপট জাগে ?
প্রিয়ারে মাের বিদায় দিছি,
চোখের জলে ঝড়ের রাতে
সেই গাথা মাের শ্মশান-বুকে
রুদ্র সুরে গুমরে কাঁদে।
তার বিরহের তপ্ত শ্বাসে
আমার বুকে শ্রাবণ ডাকে,
১২
অভিযান
বুকের তলায় সুপ্ত-স্মৃতি
উথলে উঠে বেদন-রাগে।
নিত্য ওগাে চিত্ত তলে
কাল বােশখী দোলন তােলে,
ক্লান্ত আমার উদাস হিয়া,
বিরাম মাগে ধরার কোলে।
আমার প্রিয়া
সদ্য ফোটা ফুলের মতাে
আমার প্রিয়ার মুখের হাসি-
বেলার বুকে নীরের মতাে
উছলে তার রূপের রাশি।
স্নিগ্ধ মধুর নবীন বধুর
বুকের তলায় ওঠে তুফান,
কান্ত কিরণ পরশ পেয়ে
প্রেম-নদীতে বইল উজান।
হেম-লতিকার মতাে প্রিয়া
লুটিয়ে পড়ে মৃদুল বায়ে,
সইতে নারে একটু ব্যথা
মূচ্ছ। সে যায় ফুলের ঘায়ে ।
নিত্য পূজার পুষ্প সম
পবিত্র মাের প্রিয়ার যে মন,
প্রিয়ার সুধা-কণ্ঠ গানে
তৃপ্ত ধরা, নীল গগন।
স্নেহ দয়া মায়ার রসে
পূর্ণ আমার প্রিয়ার হিয়া,
লজ্জা-মধুর সরলতায়
প্রিয়া আমার সবার প্রিয়া ।
৪৪
প্রাণের টান
রূপ-শরতের দিনের শেষে
নীল সায়রের কোল ঘেঁসে,
উঠল নভে খিল খিলিয়ে
হুর-পরীদের দল হেসে।
ধূপছায়া রং ওড়না গায়ের,
উঠলাে বায়ে চঞ্চলি,
ছড়িয়ে দিল আঁধার আবীর
ভরে গাে দুই অঞ্জলি।
ঘরে ঘরে জ্বাললাে ত্বরায়
দীপ্ত তারার দীপশিখা-
নিপুণ হাতে আঁকলো ভালে
অস্তরাগের টীপ-লিখা।
t
সুম। চোখে ফুলেল ঠোটে
রঙীন সুরা করলে পান,
অঙ্গ-রাগে আতর গুলে
উঠলাে মেতে পরীস্থান।
দিল-দরিয়া উঠলাে টলে
লাগলাে সাড়ী ‘ফরকাতে
৪৫
অভিযান
একে একে বলে সবে,
নীল সায়রের ঝরকাতে।
হাসনুহানা হাসলে ধরায়
বাস ছড়ালে দিল খুলে
ফোটার ঘায়ে পুলক ভরে
উঠলাে যুঁই'য়ের বুক দুলে।
দুধ-চামেলী ঘােমটা খুলি
চাইল হেসে মুখ তুলে,
সন্ধ্যা-মণি মেললল আঁখি
গেল আলাের দুখ ভুলে।
হালকা চুলে আতর ঢেলে
গােলাপ বেলী জাগছে গাে,
রাত ফুরালে কোন আলােতে
বুলবুলে হায় আসবে গাে।
শরত-নভের সাদা মেঘের
হালকা ভেলার বুক চিরে,
অসীমতার প্রান্ত শেষে
পশ্চিমের ওই নীল তীরে।
অধর তুলে চাইল হেসে
একাদশীর চন্দ্রিকা,
৪১৬
पण्यिान
এক নিমিষে টুটলে ধরার
গুল-বাগিচার তন্দ্রিক।
দীঘির জলে সাপলা ফুলে
জ্যোৎস্না কিরণ চুম্বনে,
ছড়িয়ে হাসি উঠলাে ফুটি,
পুলক শিহর কম্পনে
উঠলো হেসে ফুল-বালারা,
লুটলাে বায়ে বাস কেশের
চঁদের কিরণ পরশ লেগে
বইল জোয়ার রূপ-দেহের।
নদীর বুকে জ্যোৎস্না কিরণ
রজত রেখায় ঝলমলে,
উল্লাসে জল স্রোতের মুখে
গান গেয়ে যায় কল্লোলে।
ওইদিকে ওই বালুর চরে,
রূপালী ওই জলের গায়
চকোরীরে ঠুকরে ঠোটে,
প্রেমিক চকোর প্রেম বিলায়।
মরাল পাশে মরালী আজ
দীঘির জলে সন্তরে,
৪৭
অভিযান
আলােয় থােয়া আলাের হাটে
প্রেম জেগেছে অন্তরে
কোথাও বা কোন নব বধূর
কণ্ঠে ভাষা ফুটছে না,
হর্ষে লাজে প্রাণের মধু
উছল ধারায় টুটছে না।
তরুণ যুবার তর সহে কি
ভাঙতে লাজের ঘুমটা গাে ?
মিটলাে বুকের তৃষ্ণা খানিক
ওষ্ঠে দিয়ে চুমটা গাে।
এমন সাঁঝে গাইলাে পাখী
‘বউ কথা কও নীল গাঙে,
সলাজ বধূ উঠলে দুলে-
লজ্জাতে তার প্রাণ রাঙে।
এমন দিনের এমন সাঁঝে
উদাসী কে দীন বেশে,
চলছে পথিক পথের টানে,
অজানা কোন দূর দেশে ।
মাথার মণি হারিয়েছে সে,
আনমনা মন দিল ফুটা—
৪
অভিধান
দিক-বিদিকের মনহরা রূপ
তার কাছে আজ সব ফুটা।
পথের পাশে দীঘির জলে
হাজার যুগের নিদ্ চোখে,
ঢুলছে কমল কা’র বিরহে
উঠছে কেঁপে দিল শশাকে।
পাপিয়া হায় করুণ গানে
ডাকলাে নভে পিউ-কাহা।
ফুল্ল সজাগ বন বাগিচার
কণ্ঠে ফোটে—আহা আহা।
পাপিয়ার ওই করুণ গানে
দীন পথিকের প্রাণ তলে
এক লহমায় উঠলাে কেন
লক্ষ চিতার আগ জ্বলে।
পথ ছেড়ে ওই পথিক চলে,
ঝাউয়ের যেথা বন দোলে
বালুর চড়া লুটিয়ে যেথায়
পড়ছে গিয়ে জল-কোলে।
লুকিয়ে যে হায় নীরবতায়
তটিনীর ওই করে,
৪১
অভিযান মন-উদাসীর মনের ব্যথা কে তারে বল জানতে রে ? ধীর চরণে আসলাে নেমে, বলল নীরব ঝাউ বনে— কাটিয়ে দিল সুন্দরী রাত, চোখ বুজে হায় আনমনে! স্পর্শে ঊষার মেললাে পথিক ব্যথায় ভরা আঁখির পাত- তখন নভে হুর-পরীরা জাগতে ছিল বাসক-রাত।
আমি কবি তাহাদের আমি কবি বেদনার আমার কবিতা বিশ্বের ক্রন্দর তলে ফব্ধ হয়ে লুপ্ত ছিল এতদিন, মূৰ্ত আজি হইল সহসা বেদনার মূর্তি নিয়া। অন্তর অরণ্যে পরদুঃখ-অনুভূতি জ্ঞান-রশ্মি যেথা আমিত্বের তমিস্রারে ভেদ করি বর্ষ বর্ষ ধরি করিতে পারেনি কভু ক্ষীণ রেখা পাত, মুহূর্তের মাঝে আজি উঠিল প্রােজ্জ্বলি উচ্চকিত সেই মৰ্ম্ম-বন- বেদনার দাবানল ছুটিল গর্জিয়া, যৌবনের প্রতি রন্ধ্রে, নয়ন-অম্বরে উঠিল ভাসিয়া জল-ভরা ব্যথা কাদম্বরী। অভিশাপ তলে চাহিনু গ্রাসিতে বিলাসীর বিলাস ব্যসন-- ঐশ্বৰ্য প্ৰাচুৰ্য্য আর সৌধ হৰ্ম্ম রাজি
অভিযান
গড়িয়া উঠেছে যাহা
সর্ব-সহা দরিদ্রের বক্ষ কঙ্কালেতে :
প্রাণহীন দীপ্তিহীন শুধু জ্বালাময়
বারিশৃশ্য নয়নের তিল তিল রক্তকণা দিয়া।
চাহিমু গ্রাসিতে
ঐশ্বর্যের গর্বে অন্ধ দিক-ভ্রান্ত মানবের
মূঢ় মানবতায়
আমি কবি তাহাদের
মুষ্টি অন্ন যাহাদের দিনান্তের জীবন-সম্বল,
অনুভূতি গিয়াছে মরিয়া,
বেদনা বধির হয়ে লুকায়েছে মুখ
মৃত্যুরে আঁকড়িয়া আছে যারা।
সমগ্র জীবন ভরি নিত্য অহরহ
শীর্ণকায় দুটি হস্তে কুড়ায়ে চলিছে যার
জগতের কুটিল ভ্রুকুটি আর
ঘৃণা-অপযশ।
সম্মুখে যাদের
সংসার ঠেকিছে নিত্য বিড়ম্বনাময় ।
পুত্র-কন্যা, আত্ম-পরিবার,
বুভুক্ষার তীব্ৰানলে হ’তেছে দহন ;
করিতেছে অতর্কিতে মৃত্যু-আলিঙ্গন ;
দেখিছে অসাড় চিত্তে
প্রতিরােধ করিবার নাই কিছু নাই,
তথাপি আপ্রাণে যারা পর-অন্ন করিছে সঞ্চয় ;
৫২
অভিযান
করিতেছে বাস
দীর্ণ জীর্ণ পর্ণ-কুটীরেতে
ততােধিক দীন চিত্তে যারা
আপনারে করি সর্বহারা
নিজের নিজত্ব দেছে পরত্বে বিলায়ে,
যাহাদের চক্ষে নাহি কণামাত্র বারি
বক্ষে নাহি স্নেহ-দয়া-মায়া-
ওষ্ঠ প্রান্তে হাসি
নিঃশেষে গিয়াছে মরি ;
বিত্ত-সুখে ভােগ-লােভী মানবের দানবত্ব
আমি কবি তাহাদের
R
মাের জ্যোছনা লাগে না ভাল
নদ নদী গিরি বন কান্তার আজি
জ্যোছনায় গেল ঢাকি,
সুনীল সায়রে লুটায়ে পড়িল
মম চঞ্চল মন-পাখী
সাগরের কোলে জ্যোছনা ঝলকে,
চলে জোয়ার-ভাটার খেলা
নিমিষে নিমিষে ভাসিছে ডুবিছে
শত শ্বেত-উর্মির ভেলা।
দুর বেলাতটে উদাসী পথিক,
কেহ বেদনার গীতি গায়-
মরমেতে মাের তারি ক্ষীণ সুর
বয়ে আনিছে পথিক বায় ।
-
চকিতে আমার তিক্ত স্মৃতির
গেল বাতায়ন দু’টি খুলি
হু হু করে পশি বিষাদ-বাতাস,
দিল মরমেতে ঝড় তুলি
অভিযান কালের আঘাতে হৃদি-পট হতে প্রায় গেছিল যে দাগ ক্ষয়ে, আজি বহ্নি-আঁখরে অঙ্কিত হয়ে, পুন উঠিল উজল হ'য়ে। জীবন ভরিয়া প্রেম-গুঞ্জনে আমি যারে ভাল বেসেছিনু, জগত-মাতানাে এমনি নিশীথে তারে লভিয়া হারাই প্রিয়ার বিদায়-মুখ ওঠে ভেসে, মাের তাইত লাগে না ভাল- সুনীল নভের চঁাদিমা বাতির ওই করুণ জ্যোছনা-আলাে। । -~- ৫৫
বের ভাষা
টরে টক্ টরে টক্
টরে টরে টাকা।
বাঙালীর বুকে গিয়ে
জোরে মারি ধাক্কা
ঘরে ঘরে দিয়ে আসি
বেদনা ও দুঃখ,
সজীবতা কেড়ে নেই,
করে তুলি রুক্ষ।
টরে টক্ টরে টক
টরে টরে টক্কা
দূর দেশে পরবাসে,
ছেলে পায় অকা।
কালানল জ্বলে ওঠে
জননীর বক্ষে
ঝর ঝর নিঝর
জল ভাসে চক্ষে।
স্বামী কাজে পরদেশে,
প্রিয়া রচে স্বপ্ন--
মায়াজাল কেটে দিয়ে
হানি শুল তীক্ষ।
অভিযান
সধবার সুখ-হারা
কঁদে বসে তৰী,
জ্বলে বুকে ধ্বক ধ্বক
বিরহের বহ্নি।
টরে টক টরে টক
টরে টরে টকা ।
বুড়াে বাপ বাঁচে না রে,
পায় নারে রক্ষা।
ছেলে তারে ছুটে আসে,
ছুটে আসে কন্যা
জাগে বুকে শঙ্কা
ও চিন্তার বন্যা।
টরে টরে টক টক
টরে টক টক্কা-
কেহ হয় লাখ-পতি,
কারাে মূলে ফক্কা।
কেহ হাসে লাভে আর
কেহ ভাসে মন্দে-
টরে টক টরে টক...
এইটুকু ছন্দে।
দুনিয়ার রীতি
বিশ্বজনে বলতে গেলাম
অন্নাভাবের যন্ত্রণা ;
কেউ বা হেসে মুখ ফিরালাে,
কেউ বা দিল গঞ্জনা।
সুখের কালে যারা ছিল
অন্ত-ডােরের বন্ধনে,
যারা ছিল সু-সময়ে,
মধু-লােটার সন্ধানে ;
যারা ছিল সদাই মােরে
চাটু কথায় তুষ্টিতে,
ছিল যারা আমার অন্নে
তাদের দেহ পুষ্টিতে ;
এখন তারা নেই কেহ নেই,
ছায়ার মতো পশ্চাতে
এক মুঠো চাল দেয় না খেতে,
কয় না কথা সাক্ষাতে ।
৫৮
অভিযান
এ দুনিয়া স্বার্থে চলে,
হেথায় কেহ আপন নয়,
পয়সা ফেল অমি পাবে
গণ্ডা-দশেক স-হৃদয়।
বড় লােকের বড় ঘরে
বইছে বােঝা দাসত্বের,
গরীব দেখে ওরাই আবার
চক্ষু রাঙায় প্রভুত্বের
অর্থ যেথায় সু-হৃদ সেথায়,
বন্ধু সখা সচিব গাে,
এ দুনিয়ার এইত লীলা—
কোন সুখে আর বাঁচবাে গাে।
আমার কবিতা আমার কবিতা আমি ভালবাসি, আর ভালবাসে প্রিয়া ; আমি বসে লিখি, প্রিয়া ব’সে দেখে, অনিমেষ আঁখি দিয়া পাতায় পাতায় ছন্দ মিলাই, বক্ষের তালে তালে-- প্রিয়া রাখে তারে জড়ায়ে জড়ায়ে সুরভিত সুর-জালে। প্রিয়া গাহে গান, আমি বসে শুনি, আমারি রচিত গান- ধন্য প্রিয়ার কোমল কণ্ঠে সুললিত সুর-তান। আমারি গাঁথা সে কবিতার হার প্রিয়ার বুকের ধন, কোথা হতে যদি পায় অনাদর, প্রিয়া কঁাদে অনুখন। আমি রচি কথা ব্যথিতের ব্যথা উছলিয়া ওঠে তায়, ৬০
অভিযা
প্রিয়া আঁখি-লােরে কেঁদে কেঁদে মরে
বুকফাটা বেদনায়।
প্রিয়া-অাঁখিজল করে টলমল
সেই জল মসি-দিয়া,
লিখেছি যা-কিছু প্রেমের কবিতা
উজাড় করেছি হিয়া।
আজিকে আমার উদাস অখিতে
কী যে ভাষা ওঠে ফুটে
কি আশাতে আজ মধুহীন ফুলে
মধুপ পড়িছে লুটে।
কে বুঝিবে মাের ভাষাহীন ভাষা,
আজ কাছে নাই প্রিয়া-
শূন্য উদাস হাহাকার মাখা
বিরহ-মথিত হিয়া।
৬১
আসবে জানি প্রিয়তম
তুমি-আমি এক হব গো এই কথাটি যখন জাননা,
তবে কেন দূরের থেকে আমার বুকে বেদন হানাে ?
জগত-নাটের নাট্যশালায় আমারে আজ নটী করে,
অভিনয়ের মিথ্যা সুখে কেন আমায় রাখছ’ ধরে ?
চাও কি তুমি, তােমার স্মৃতি মন হ’তে মাের মুছে নিতে ?
মনােহরণ মাদক সুরে মনটিরে মাের বেঁধে দিতে ?
বৃথাই কেন বেদন হাননা, পারবে নাকো এ ঠিক জেনাে-
তােমার পরশ হতে দূরে তবে মােরে রাখছ কেন ?
আমার প্রাণের করুণ ডাকে মনটি তােমার টলবে নাকি ?
এসে কি তুমি প্রিয়, দিতে আমায় পারবে কি ?
আমি যখন ডাকি তােমায়, জানি তুমি সে ডাক শােনো,
অভিমানের পালা শেষে, আসবে জানি প্রিয়তম।
৬২
মাের ব্যথা আজ বিশ্বের ব্যথা আমার বুকের স্তব্ধ ব্যথার গােপন কথাটি নিয়া— জগত আজিকে বরষার সাথে মাতিয়া উঠেছে প্রিয়া। মত্ত-প্রবাহে বেদনায় ভরা চিত্তের শতদল- মুক্তি লভিয়া উঠিল কঁপিয়া ঝরিল অশ্রু-জল। ধরার বুকের নিঃশ্বাস সি ফাটিয়া পড়িল দিকে, নীল গগনের বুকখানা চিরে আগুনের লেখা লিখে। বিধাতা দেখালাে দেখালাে আমারে, তাহারাে বুকেতে জ্বলে- বিরহ-প্রেমের দীপ্ত শিখাটি নিদারুণ কোলাহলে। কালাে পাষাণের বক্ষ চিরিয়া মূর্তি গড়িয়া যার, ধ্যান-তন্দ্রায় মগন আছি রুধিয়া চিত্ত দ্বার ;
অভিযান
আজিকার এই কাল ঝড়ে মাের
সব হ’ল একাকার,
ধ্যান-আরাধনা পাষাণ-প্রতিমা
ভেঙে হ’ল চুরমার
মাের সীমা হতে পাষাণী দেবীরে
ছিনে ল’য়ে আজি সাঁঝে,
বিধাতা তাহারে ভাঙিয়া বিলালাে
সকল চিত্ত মাঝে
মাের ব্যথা আজ বিশ্বের ব্যথা
দেবতার ব্যথা আজ,
একই বেদনায় কঁদিছে সবাই
পরিয়া মলিন সাজ।
U
৩৪
চিরন্তনের যাত্রী
চিরন্তনের যাত্রী কে গাে থমকে দাড়ালে ?
আনমনে হয় আমার দ্বারে চরণ বাড়ালে।
গানের কঁাটা বি ধলো কি পায়,
সেই বেদনার কঠিন ঘায়,
চরণ তব নীরব হল,
সাঁঝের আঁড়ালে।
দুলাে নভে মেঘ-বলাকা,
উঠলো কেঁপে নিশার পাখা,
উঠলাে কেঁপে সীতার ব্যথা
রুদ্ধ পাতালে।
ছড়িয়ে সুরে অতীত স্মৃতি,
কে গেয়ে যায় ব্যথার গীতি,
গানের টানে নয়ন তুলে
পিছন তাকালে।
নয়ন জলে নিশায় চুমি,
আনমনে হায় আবার তুমি,
প্রাণের টানে আমার দ্বারে
চরণ বাড়ালে ।
অভিযান প্রদীপ হাতে নাবিয়া এনু, নয়ন তুলে যেমনি চেনু, কপিল হাত, কপিল শিখা, নিভিয়া গেল বাতি। যাহার তরে নয়নে ভাসি, দুয়ারে মাের সেই উদাসী, চরণ ধুলি অধরে চুমি করিনু শ্রেয় রাতি। মর্মরিল কানন-বীথি, সাঁঝের তারা ঢালিল প্রীতি, চিত্ত সাকী গাহিল গীতি জীবন সফলতা। দোহার মাঝে আঁধার কালাে, কঁপিল ঘন লাগিল ভাল, লাগিল ভাল মুগ্ধ প্রাণে স্তব্ধ নীরবতা। চকিতে মােহ টুটিল মাের, ঝরিল চোখে তাপিত পাের, বরিয়া তারে তুলিনু ঘরে— বসিনু পাদমূলে দেবতা মাের সমুখে আজ- তাহারে হেরি করিব লাজ ? ৬৬
অভিযান
সরম-ভাের দলিয়া পায়
চাহি আঁখি তুলে।
উদাস তার করুণ আঁখি,
নিমিষে গেল কি যেন আঁকি,
আমার দুটি চটুল চোখে
বুঝাতে পারি না যে।
কনক-দীপ তরুণ শিখা,
আঁধারে লিখি অরূপ লিখা,
কপােল চুমি চরণতলে
ঠিকরি পড়ে লাজে।
পুছিনু মাের মরম চোরে,
সবিতা যেথা পশিতে ডরে,
কেমনে তুমি অকুতভয়ে
পশিলে আসি সেথা।
কহিলা হাসি পরাণ-স্বামী,
গাহিয়া গান দিবস যামি,
প্রাণের তব ব্যাকুল ব্যথা
এনেছে মােরে হেথা।
সহসা ঘুম ভাঙিলে সে কি
ভয়াল আঁখি মেলিয়া দেখি,
৬৭
অভিযান
কোথা গাে মাের সেই উদাসী,
খুঁজিছি কাহারে ?
যেমন ছিনু তেমনি আছি,
প্রদীপ-শিখা মরিছে নাচি,
স্বপন শুধু নাচায়ে গেছে,
বেঘাের হিয়ারে।
নিঠুর তুমি হে প্রিয়তম,
কি ব্যথা বিধি পরাণে মম,
স্বপনে ভরি হরষে হিয়া
জাগায়ে কঁদালে।
দীপ্ত শিখার স্বপন সম,
নিভায়ে ফুয়ে প্রদীপ মম
আঁধার ঘন গহন তলে,
আমারে ডুবালে।
বুকেতে বিধি বিরহ-হুল,
এ পতিতার ভাঙিলে ভুল,
ভাঙিলে কি গাে মােহের বাঁধ
চকিতে লুকালে।
অরুণ তবে নামায়ে মুখ,
চুমি উষার নগন বুক
কিরণ-হাতে উদয়-লিপি
ভুবনে পাঠালে।
ফাগুন জোছনা কাঁদে
যমুনার জলে তাজ-'আঙিনায়,
বৃন্দাবনের বন-বীথিকায়,
কুঞ্জে কুঞ্জে মাল হাওয়ায়
বিরহীর আঁখি পাতে
ফাগুন জোছনা কঁাদে।
কোথা গােপ-বাল ফাগের বাহার,
চরণ-নূপর বাজে নাকো আর,
কুঞ্জ-বিতানে শুধু হাহাকার,
কালের করাল ঘাতে-
ফাগুন জোছনা কঁাদে।
মন-হরা মােহ কালিয়ার বাঁশী,
যমুনার তটে ওঠে নাকো ভাসি,
বৃন্দাবনের মাধুরীর রাশি,
নিভেছে কালার সাথে,
ফাগুন জোছনা কাঁদে।
অভিযান
দিল্লীর দিল ও রংমহাল,
চাদনী চকের রূপের মশাল,
চটুল চোখের লালসার জাল
স্তব্ধ ঝড়ের বাতে
রূপসী জোছনা কাঁদে।
র
চঁাদের কিরণে পাপিয়ায় আহা,
কঁদিছে ফিরিয়া পিউ কঁহা কঁহা,
পিউ কঁহা মেরি, পিউ কঁহা ওগাে,
খেয়ালী বিধির বাদে
করুণ জোছনা কাঁদে।
কিরণ রেখার সঘন চুমায়—
বিরহিনী প্রিয়া ক্ষণে শিহরায়,
চিত্ত কোথায় অসীমে হারায়
নিশুতি নীরব রাতে—
ফাগুন জোছনা কাঁদে।
৭০
প্রেম আর প্রাণ আর ব্যথা
কুণ্ঠাহীন চিতে এসাে নেমে,
ধরণীর তনিমার তীরে
সায়হ্নের তরল আঁধারে,
বেহাগের বেদনার নীড়ে।
দিবসের কর্ম-রাগ হায়
নিদারুণ কোলাহল সুরে,
মুলাজ শঙ্কিতা ভীতা রাগিনী সাথীরে
দূরে দূরান্তরে,
দিয়েছে বিদায়।
চিত্ত মাের বারংবার তােরে শুধু চায়,
একান্তে একার মাঝে-
নিশীথ নীরব মূচ্ছনায়।
আয় সখি, নেমে আয় ধীরে,
নিশীথের ঘন শিহরণে।
রুদ্ধ ভাষা পরাণের প্রেম-অনুভূতি,
সশব্দ চুম্বনে
করি দেহে অনুভব
শর্বরীর স্বপ্নমায়া তলে।
দিবসের রুদ্ধ রােষ, আর তপ্তশ্বাস,
শ্বসুক ভূতলে।
আমি আর তুমি শুধু রব গাে জাগিয়া
শ্যামল শয্যায়-
বিবশা রজনী রবে আমাদের শিয়র সীমায়।
৭১
আয়েষা
বালিকা বয়সে বসি বেদী পরে একাকিনী,
ওলাে নবাব-নন্দিনী,
যবে সােহাগে কুসুম তুলি
যতনে গাঁথিতে মালা-
মনে কি গাে উদেছিল কারে তুমি
সােহাগে পরাবে বালা ?
কা’রে তুমি কুসুম হারে,
বাঁধিবে হৃদয়-দ্বারে,
কে তােমারে করিবে গাে জীবন-সঙ্গিনী ।
সৌন্দর্য্যের রাণী ওলে নবাব-নন্দিনী।
বুঝিতে কি পেরেছিলে কভু,
মালা গাঁথা নিরর্থক হবে চিরদিন
অভিশপ্ত কুসুমের হার লুটাবে ধুলিতে
হবে সে মলিন।
প্রথম যৌবনে,
নিকুঞ্জ কাননে,
বসেছিলে তরুমূলে বসন্ত মল্লিকা
সান্ধ্য সমীরণে ঢেলে অপরূপ স্নিগ্ধ রূপ-শিখা।
৭২
অভিযান বাতাসের কোলে ক্রীড়ারত ছিল তব উত্তরীয়াঞ্চল— বসন্ত-পরশে অগােচরে হ’ল তব যৌবন চঞ্চল, কাহারে করিতে ছিলে অন্তরে কামনা, ছিলে আনমনা ? e } সত্য কি গাে নহে বল আয়েষা রূপসী, প্রেম তব অন্তরের অন্তরালে আপনি বিকশি উঠেছিল যােগ্য জনে দিতে উপহার, খুলে দিয়ে সৌন্দর্যের অনন্ত ভাণ্ডার। * - বিধাতার কাল চক্রে পেলে তুমি সাধনার ধন, পূত প্রেম সঙ্গোপনে তুমি তারে করিলে অর্পণ ; সেবারূপে হ’ল তা প্রকাশ বক্ষ জুড়ে বাহিরিল বুকফাটা শ্বাস, তবু তুমি যাচ নাই প্রেম-প্রতিদান, জেনেছিলে মিলনের চির-ব্যবধান। প্রেম দিলে প্রাণ দিলে যারে ; যার তরে জ্বালি র’লে সােহগের দীপ, দীর্ঘ দিবানিশি সেবি যারে তুমি করিলে সজীব, নিজেরে দলিত করি তারে তুমি করিলে মহান নিজ হাতে সাঁপি তারে তঁার কাম্য ধন, পূর্ণ তার করিলে পরাণ । চির-বিষাদিনী, পাষাণে বাঁধিলে বুক, অফুরন্ত ভাষা যত হয়ে এলাে মূক- . ৭
অভিযান
অন্তরের দ্বারে দ্বারে লাগিল শ্বসিতে,
হৃদয়ের অব্যক্ত বেদনা ;
আঁখি তব হ’ল ছলছল, ভরে এলাে জল,
সহিতে লাগিল প্রাণ দহন-যাতনা।
যৌবনেরে বেঁধে ফেলে অচ্ছেদ্য বন্ধনে
রচিলে জ্বালার শয্যা প্রেম-নিকেতনে।
।
ধরণীর কুসুম কলিকা বৃন্ত হ’তে স্খলিতা মঞ্জরী,
চির অভিশপ্তা ওলাে আয়েষা সুন্দরী,
দগ্ধ তব হৃদয়ের গুরু ব্যথা ভার
জননী ধরণী কিলো পারে কভু চাপিয়া রাখিতে ?
তাই কঁাদে আজো কাঁদে
গভীর নিশীথ রাত্রে শ্রাবণের সাথে ।
৭৪
কে তুমি চপল মেয়ে
কে তুমি চপল মেয়ে,
পাশের ছাতের আলিসার ধারে রূপের উজান বেয়ে,
নিতি প্রাতে দিয়ে দেখা
নয়ন তুলিতে আঁকিয়া তুলিছ অন্তরে প্রেম-রেখা।
কতবার আস কত না গােপন ছলে,
নীরবে দাড়াও নয়ন রাখিয়া মাের বাতায়ন-তলে ;
কভু আস তুমি নুয়ে পড়া ওই মাধবী লতার
শিশু লতিকারে করে দিতে ছাদে সােজা-
কভু বা আসিছ ল’য়ে এক রাশি ভিজে কাপড়ের বােঝা ;
প্রতিটি কাপড় মেলিতে দেখি যে কাটে গো তােমার
কম হলে তাও পাঁচটি মিনিট সকাল বেলার ।
সবে মেলা শাড়ী তুলিয়া নিতেছ, আবার মেলিছ তারে,
তারি ফঁাকে ফঁাকে কয়ে যাও কথা,
আঁখি দিয়ে বারে বারে !
গােপন বারতা—শুধু তা প্রকাশ তােমার-আমার কাছে।
ভয় হয় তাই ভাষা দিতে নারি জানিল বা কেহ পাছে।
আষাঢ়ের একদিন,
গাঁথিতে বসেছি ছন্দের মালা, চিত্ত বাঁধন-হীন,
মনে পড়ে বারবার---
সে দিন নয়ন তােমারে প্রথম করিল আবিষ্কার।
.
অভিযান গত দিবসের সারাটি রজনী বাদল ঝরেছে, রৌদ্র জেগেছে প্রাতে তুমি লঘু পায়ে কাপড় মেলিতে আসিলে মুক্ত ছাদে। নয়নে নয়ন পড়িল যেমনি, বহিল প্রভাত হাওয়া উপরে ও নীচে চারিটি আঁখিতে নিমিষে হইল চাওয়া। মুখ লুকাইলে হেসে, আবার তখনি নয়ন তুলিয়া দাড়ালে সমুখে এসে। লজ্জা ও প্রেম রক্তিম হয়ে দেখা দিল তব গণ্ডে, চিত্তের মাঝে লাগিল পুলক, অনুরাগে নব রঙ্গে। বাদল হাওয়ায় ভেসে আসা তব গােলাপী গায়ের গন্ধে, মাতন জাগিল পরাণে আমার, ভুল হয়ে গেল ছন্দে। কল্পনা হ’ল চূর্ণ- তােমারি স্বপ্ন অন্তর তলে অধিকার নিল পূর্ণ। কবিতা গেল যে ভেসে, মানসী সে দিন মূর্ত হ’ল কি বাস্তব প্রিয়াবেশে ? সে দিনের সেই বুটিদার লাল শাড়ী, তনু নগ্নতা চাপা দিতে গিয়ে, রূপের আগুন দিয়েছিল বিস্তারি। সেই শাড়ী তুমি বােজ প্রাতে মেল মাের আঁখি সম্মুখে, নয়ন মেলিতে তব রূপ-শিখা পড়ে যেন মাের চোখে। তারি পাশে তব ‘ভি-গলা ব্লাউজ, রং তার লাল চন্দন, জানায় আমায় তােমার বুকের বিষাদের স্পন্দন। ৭৬
অভিযান
৩
তৃপ্তি মেটে না মাের,
ফিকে হয়ে কেন আসে নয়নেতে রূপ-মদিরার ঘাের ?
দেখি কতবার তবু বার বার—উন্মুখ হয়ে থাকি,
নয়নের পথে চঞ্চল পদে তব যাওয়া আসা মাগি ।
তাই গবাক্ষে তব প্রতীক্ষে আগমন ক্ষণ গণি,
অন্তর মম চিনিয়া ফেলেছে তব চরণের ধ্বনি।
চিত্ত নাচিয়া ওঠে---
যখনি ও রাঙা চরণের ধ্বনি ছাদের সিড়িতে ফোটে।
নিত্যই দেখা পাই,
মেঘলা প্রভাতে নীরব দুপুরে বেল যবে যায় যায়।
প্রথম হইতে আজও প্রতিদিন তেমনি করিয়া ঠিক,
মাের পানে তুমি চেয়ে রও তুলি নয়ন নিৰ্ণিমিখ।
নয়ন-লিপিতে লিখিয়া জানাও
তুমি ভালবাস মােরে—
আমিও তােমারে ভালবাসি—প্রিয়া
ভালবাসি প্রাণ ভরে।
তবে সে নয়নে আজি হাসি সনে রয় যে উদাস ব্যথা,
যৌবন তব যাচে কি গােপনে গভীর পরশসদা ?
নাই তার পথ নাই---
তোমার আমার লাগিয়া সৃষ্ট দুটি বিচ্ছেদ ঠাই।
৭৭
শেষ কথাটি . জীবন আমার বিষিয়ে গেছে, মরণ আমার শিয়র তলে ; শয্যা আমার স্বস্তি তরে, ধরা মায়ের চিতার কোলে। তাইতে প্রিয়ে যাচ্ছি বলে, সােহাগ ভরে শেষ কথাটি ; আমার স্মৃতি বক্ষে করে, কাটিও গাে দিন একলাটি। মরণ পরে চিতার পরে ছড়িয়ােগাে ফুল যতন করে, ঢেলে কুসুম দু’হাত ভরে, সিক্ত করে আঁখির ললারে। ধীর চরণে দীনের চিতায় . নিতুই সাঁঝে এসাে প্রিয়া, গেও গাে গান-যাও ভগবান, মৃতের হিয়া জুড়াইয়া। জামি প্রিয়ে মরণ পরে, ধরা গাইবে কু-নাম- কণ্ঠে তােমার ফুটবে শুধু, সু-যশ আমার, আমার সুনাম। ৭৮
No text on this page.
No text on this page.