Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sadhu-charit Ed. 8th

Bhattacharyya, Bhubanmohan · 2010/02/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

by the Central Text-Book Committee and authorised
the Director of Public Instruction, Bengal.
সাধু-চরিত
শ্রীভুবনমােহন ভট্টাচার্য্য
প্রণতি।
অষ্টম স বণ।
t atti :
১ C. Aা'1)1) & Co., 130KSL FRS 4: I} { }}{১}{R১
5 ~ ? ।{} }}}\({{}v 37
.
11
ল। ১াবি আঃ ।

No text on this page.

সেন্ট্রাল টেষ্ট-বুক কমিটীর অনুমােদিত। বঙ্গদেশীয় বিদ্যালয়সমূহের ডাইরেক্ট- মহােদয় কর্তৃক পাঠ্যতালিকাভুক্ত। সাধু-চরিত প্রথম ভাগ। ভুবনমােহনভট্টাচাৰ্য-প্রণীত অষ্টম সংস্করণ Calcutta: S. C. AUDDY & CO., BOOKSELLERS AND PUBLISHERS, 58 & 12, WELLINGTON STREET. 1911.

PRINTED AND PUBLISHED IY L. K. DASS FOR ). C. AUNDI & CO
AT THE "WELLINGTON PRINTING WOKKS,"
TO, HALADHAR URDHIN LANE, CALCUTTA,

উৎসর্গ ।
যাহার নামের দোহাই দিয়া
তামার পুরুষ-পরম্পরা দ্বিশতাধিক বর্ষ
সসম্মানে জীবিকা নির্বাহ করিয়াছেন, সেই
দেবােপম প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ
রমানাথ বিশারদ---
মহাশয়ের পবিত্র নামে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ
পবিত্র করিলাম।
গ্রন্থকার।

No text on this page.

বিজ্ঞাপন। বালকদিগকে গল্পচ্ছলে নীতি শিক্ষা দিবার উদ্দেশ্যে ‘সাধু-চরিত” প্রচারিত হইল। ঘরের কথা ছাড়িয়া, পরের কথায় এই ক্ষুদ্র পুস্তকের কলেবর পরিপুষ্ট করি নাই। পুস্তক- খানি বালকদিগের পাঠোপযােগী হইয়াছে কি না, তাহা দয়াশীল কর্তৃপক্ষের বিবেচ্য। কলিকাতা, আশ্বিন, সংবৎ ১৯৫৫। শ্রীভুবনমােহন দেবশর্মা। চতুর্থ সংস্করণের বিজ্ঞাপন ছয় মাসের মধ্যে সাধু-চরিতের ৩য় সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়াছে। গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের পক্ষে ইহা গৌরব ও সৌভাগ্যের কথা। যাঁহারা ঋষি ও ঋষিকল্প পূর্বপুরুষগণের চরিত্রের প্রতি ঈদৃশ সম্মান প্রদর্শন করিতেছেন, সেই সকল মহানুভবের নিকট সানুনয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতেছি। আসামের বর্তমান প্রধান কমিসনর, বিজ্ঞ, বহুজ্ঞ, সমদর্শী, ন্যায়নিষ্ট, দয়ালু ও পরােপকারী মাননীয় শ্রীযুক্ত সি, এস্, কটন মহােদয় সাধু-চরিত ১ম ও ২য় ভাগ পাঠ করিয়া বিশিষ্টরূপ প্রীত হইয়াছেন। কলিকাতা, শ্রীভুবনমােহন দেবশর্মা। সংবৎ১৯৫৮।

No text on this page.

সূচীপত্র।
বিষয় ।
পৃষ্ঠা।
সাধুসঙ্গ
রত্নাকর
গুরুভক্তি
১০
উপমনু।
আরুণি
অধ্যবসায়-দানকৃতজ্ঞতা
• • •
১৮
২৪
মাতাপিতা
ধম্মব্যাধ
মাতাপিতার প্রতি অবজ্ঞার ফল
সৰ্ব্বশ
সত্যপ্রতিজ্ঞতা -পিতৃভক্তি—রাজভক্তি
ভীষ্মদেব
অধ্যবসায়
বিশ্বামিত্র
'৩৪
৪ ০

q
বিষয়।
পৃষ্ঠাঙ্ক।
শরণাগতরক্ষণ
বিশ্বামিত্ব
আশ্রিতরক্ষণ
•••
৪৩
মহারাজ শিবি
•••
S'৬
অন্নদান
মহর্ষি মুদগল
•••
ন্যায়পরতা
• • •
৫৩
বিবােচন ও সুধা
পরস্বগ্রহণ
• • •
৫০
শঙ্খ ও লিখিত
দান—প্রতিশ্রুতিরক্ষণ
৬০
হরিশ্চন্দ্র

সাধু-চরিত।
সাধুসঙ্গ।
বাল্মীকি (রত্নাকর )।
[ কৃত্তিবাস অবলম্বনে। ]
Imran
রত্নাকর বিখ্যাত দস্ত। দস্যুবৃত্তিই তাহার
জীবিকা ছিল। সে প্রকাণ্ড মুদগর হস্তে
লইয়া, বনের মধ্যে, পথের পার্শ্বে বসিয়া
থাকিত এবং পথিকগণের প্রাণসংহার
করিয়া, তাহাদের সঙ্গে যাহা কিছু
থাকিত, কাড়িয়া লইত। ক্রমে রত্নাকরের অত্যাচারে
লােকের পথ চলা ভার হইয়া উঠিল।
একদা ব্রহ্মা ও নারদ, সন্ন্যাসীর বেশ ধরিয়া, যে
বনে রত্নাকর বসিয়া থাকিত, তথায় উপস্থিত হইলেন।
ব্রহ্মা ও নারদ রত্নাকরের পাপকার্যের কথা অবগত
ছিলেন। তথাপি, তাহারা দয়াপরবশ হইয়া, দস্যর
উদ্ধার করিতে তাহার সম্মুখীন

२
সাধুসঙ্গ।
=
অকস্মাৎ সম্মুখে দুই জন সন্ন্যাসীকে আসিতে
দেখিয়া, রত্নাকরের হৃদয় আহ্লাদে নাচিয়া উঠিল।
মুদগর ঘুরাইতে ঘুরাইতে তাঁহাদের সম্মুখীন হইয়া
বলিল, আজ আর রক্ষা নাই। শমন তােমাদিগকে
স্মরণ করিয়াছেন। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।”
ব্ৰহ্মা বলিলেন,-“বাপু! তুমি কে ?
রত্নাকর কঠোরস্বরে উত্তর করিল,আমি দস্য।
তােমাদিগকে বধ করিয়া তােমাদের বস্ত্রগুলি গ্রহণ
করিব।
ব্রহ্মা উত্তর করিলেন,—আমরা নিরীহ পথিক ;
আমাদিগকে হত্যা করিলে যে পাপ হইবে তাহার
তুলনায়, বস্ত্রের মূল্য কিছুই নয়। প্রাণিহিংসা গুরুতর
পাপকাৰ্য। এই মহাপাপে তােমাকে নিশ্চয়ই ঘাের
নরকে পড়িতে হইবে ।
দ্য বলিল,-বুঝিয়াছি। তােমরা আমাকে ফাঁকি
দিবার চেষ্টা করিতেছ। এই হস্তে তােমাদের মত
কত সন্ন্যাসীকে যমালয়ে পাঠাইয়াছি। রত্নাকর তােমা-
দের পাপপুণ্যের ফাঁকা কথায় ভুলিবে না। শীঘ্র
মরিতে প্রস্তুত হও।
ব্রহ্মা কহিলেন,“বাপু! আমরা মরিতে কাতর
নহি। যদি একান্তই আমাদিগকে বিনষ্ট করিতে হয়,

বাল্মীকি।
তাহা হইলে, আমাদের কয়েকটা কথার উত্তর দিয়া
আমাদিগের প্রাণনাশ কর।
দ। কি বলিবে, শীঘ্র বল।
ব্ৰহ্মা। আচ্ছা জিজ্ঞাসা করি, তুমি কিজন্য এরূপ
গুরুতর পাপকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান কর ?
দ্য। আমি এই উপায়ে মাতা, পিতা, স্ত্রী, পুত্র
সকলেরই ভরণপােষণ করি।
ব্ৰহ্মা। ভাল, তাহারা তােমার উপার্জিত ধনের
যেমন অংশ গ্রহণ করিয়া থাকেন, তােমার সঞ্চিত
পাপের অংশও তেমনি লইতে প্রস্তুত আছেন কি ?
দ।
অবশ্য থাকিবেন ।
ব্ৰহ্মা। কখনই নহে। তুমি যত পাপ করিতেছ,
তাহা তােমারই। তােমার পাপের ফল তুমিই ভােগ
করিবে। অন্যের তাহাতে কোন সংস্রব নাই। তুমি
একটীবার তাহাদিগকে কথাটা জিজ্ঞাসা করিয়া আইস।
যদি তাহারা তােমার পাপের অংশ গ্রহণ করিতে
সম্মত হন, তাহা হইলে, ফিরিয়া আসিয়া আমাদিগকে
নিহত করিও।
রত্নাকর হাসিয়া উঠিল এবং বলিল,-পালাবে
বুঝি ?
ব্ৰহ্মা কহিলেন,—সত্য বলিতেছি, আমরা পলায়ন

৪
সাধুসঙ্গ।
!
করিব না। তুমি মাতাপিতা প্রভৃতি আত্মীয়গণকে
জিজ্ঞাসা করিয়া আইস।
রত্নাকর গৃহাভিমুখে অগ্রসর হইল। কিন্তু, পাছে
সন্ন্যাসীগণ পলায়ন করেন, এই আশঙ্কায়, বার বার
পশ্চাতের দিকে ফিরিয়া ফিরিয়া দেখিতে লাগিল ।
রত্নাকর গৃহে গিয়া প্রথমে পিতার নিকটে উপস্থিত
হইয়া কহিল,—পিতঃ ! আমি নরহত্যা করিয়া ধনসংগ্রহ
করি। আপনি আমার পাপভারের অংশ গ্রহণ করি-
বেন কি ?
পুত্রের কথা শুনিয়া পিতা বড় কূপিত হইলেন।
তিনি কহিলেন,—“পুত্র পাপকাৰ্য্য করিয়া পিতার
ভরণপােষণ করিলে পিতাকে সেই পাপের অংশভাগী
হইতে হইবে, এমন কথা কে বলিল ? কোন্ শাস্ত্রে
ইহার বিধান আছে ? তুমি যখন বালক ছিলে, তৎকালে
তােমার যাহা যাহা আবশ্যক ছিল, সমস্ত দিয়া, আমি
তােমাকে প্রতিপালন করিয়াছিলাম । এক্ষণে আমি
বৃদ্ধ হইয়াছি; তুমি অবশ্যই আমাকে আবশ্যক দ্রব্য
দিয়া প্রতিপালন করিবে। আমি যত পাপ করিয়াছি,
তােমাকে তাহার অংশভাগী হইতে হইবে না।
তােমাকে নরহত্যা করিতে কে বলিল ? আমি কেন
তােমার পাপভাগী হইব?”

বাল্মীকি। এই কথা শুনিয়া, রত্নাকরের মুখ শুকাইল । সে জননীর নিকটে গিয়া কঁদিতে কঁদিতে কহিল,—“ মা ! অনেক পাপকাৰ্য্য করিয়া তােমাদের অন্নবস্ত্র সংগ্রহ করি ; বল, তুমি আমার পাপের অংশ গ্রহণ করিবে কি না ? ” মাতা কহিলেন,—“দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করিয়া কত কষ্ট পাইয়া, তােমাকে মানুষ করিয়াছি। সন্তানের জন্য মাতা যতদূর ক্লেশ স্বীকার করেন, তাহার এক দিনের ধারও কেহ পরিশােধ করিতে পারে না। কোথায় তুমি আমার উপকার করিবে, তাহা না করিয়া আমার মাথায় বিষম পাপের বােঝা চাপাইয়া দিতে ইচ্ছা করিয়াছ। আমি তােমার পাপের অংশ গ্রহণ করিতে পারি না।” রত্নাকর নিরাশ হইয়া পত্নীর নিকটে উপস্থিত হইল এবং কাতরস্বরে কহিল,-“আমি তােমার অন্নবস্ত্র, সংগ্রহ করিতে অনেক পাপ করিয়াছি। সত্য বল, তুমি আমার পাপের অংশ গ্রহণ করিবে কি না?” রমণী উত্তর করিলেন,—“প্রভাে! স্বামী স্ত্রীর ভরণ- পােষণ করেন বলিয়া তিনি ভর্তা। স্ত্রীর অন্নবস্ত্র দিতে স্বামী যদি পাপ করেন, তাহা হইলে, পত্নীকে তাহার অংশভাগিনী হইতে হয় না। তােমাকে পাপ করিতে সাধুসঙ্গ। কে বলিল ? আমি তােমার পাপের অংশ গ্রহণ করিতে পারি না। এতক্ষণের পর রত্নাকর বিলক্ষণ বুঝিতে পারিল, স্ত্রী বল, পুত্র বল, পাপের অংশী কেহই হয় না। রত্নাকর আজ চারিদিকে অন্ধকার দেখিতে লাগিল। তাহার হৃদয়ে অনুতাপের প্রবল আগুণ জ্বলিয়া উঠিল। পাপের ভয়ে সে চোক বুজিল। কিন্তু আজ তাহার শান্তি কোথায় ? সে নয়ন মুদিয়া মানসনেত্রে দেখিতে লাগিল, শত শত নরককুণ্ড তাহার জন্য উন্মুক্ত রহিয়াছে। যম- দূতগণ বিকটবেশে যেন তাহারই জন্য অপেক্ষা করি- তেছে। রত্নাকর কাদিল। চক্ষুজলে তাহার পরিধেয় বসন ভিজিয়া গেল । সে ভাবিতে লাগিল,আমার কি গতি হইবে ? হায়! এই হস্তে কত নিরীহের বিনাশ করিয়াছি। কত শিশুকে কঁদাইয়াছি। কত রমণীকে অনাথা করিয়াছি। হায় ! কোথায় যাই ? কোথায় গেলে আমার এই বিষম পাপভার লঘু হইবে ? রত্নাকর ভাবিতে ভাবিতে, উদ্ধশ্বাসে ছুটিয়া, যেখানে ব্রহ্মা ও নারদ অবস্থান করিতেছিলেন, সেখানে উপস্থিত হইল। ব্রহ্মা দেখিলেন রত্নাকর আর সে রত্নাকর নাই। দস্যু রত্নাকর অনুতাপের আগুনে পুড়িয়া গিয়াছে। তাহার বদলে এক নূতন ব্যক্তি উপস্থিত।

বাল্মীকি। ব্রহ্মা বলিলেন,—“কেমন, কেহ কি তােমার পাপের অংশ গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছেন ?” রত্নাকর এই কথার কোন উত্তর না দিয়া, ব্রহ্মার চরণ জড়াইয়া ধরিল এবং নিতান্ত কাতরস্বরে বার বার বলিতে লাগিল,“প্রভাে! এই অধমের উদ্ধার করুন। আমি পাপসাগরে ডুবিয়াছি।” ব্রহ্মা রত্নাকরকে ভরসা দিয়া বলিলেন,-“ভয় নাই, কুঁদিও না। না জানিয়া যে মহাপাপ সঞ্চয় করিয়াছ, তাহার প্রায়শ্চিত্ত কর। আমি যে পৰ্যন্ত পুনরায় এখানে ফিরিয়া না আসি তদবধি, নিজের পাপ- কাৰ্য্য স্মরণ করিয়া পরমেশ্বরের আরাধনা কর।” ব্রহ্মা এই বলিয়া চলিয়া গেলেন। রত্নাকর সেই বিজনবনে বসিয়া কঠোর ধ্যানে নিমগ্ন হইল। কত গ্রীষ্ম এই ভাবে গেল। ব্রহ্মা ফিরিলেন না। রত্নাকরের সেই বিশাল শরীর ক্রমে ক্রমে শুকাইয়া গেল। সেই শরীরের উপর দিয়া কত বাত, কত বৃষ্টি, কত ঝড় বহিয়া গেল। তথাপি ব্রহ্মা ফিরিলেন না; মহাপাপের মহাপ্রায়- শ্চিত্ত। ক্রমে রত্নাকরের বাহ্যজ্ঞান লােপ পাইল। বল্মীকপিণ্ডে তাহার দেহ ঢাকিয়া গেল। রত্নাকরের চেতনা নাই। সে সেই উইয়ের ঢিবির ভিতরে কত শীত কাটিল ।

৮ সাধুসঙ্গ। বসিয়া, একমনে পরমেশ্বরের অনুগ্রহ প্রার্থনা করিতে লাগিল। অবশেষে, ব্রহ্মা যখন বুঝিলেন, রত্নাকরের পাপের উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত হইয়াছে, তখন সেই বনদেশে উপ- স্থিত হইয়া, তাহার উদ্ধার করিলেন। রত্নাকর নয়ন মেলিয়া সম্মুখে দেখিল, ব্ৰহ্মা। সে তৎক্ষণাৎ তাঁহার চরণে পড়িয়া কাদিতে কঁদিতে কহিল,—“ বল প্রভাে ! আমার কি উপায় হইবে ?” ব্রহ্মা বলিলেন,—“ভয় নাই। তােমার পাপ কাটিয়াছে। অতঃপর রত্নাকর বাল্মীকি বলিয়া প্রসিদ্ধ হইলেন। সাধুসঙ্গের মাহাত্ম্য অসীম। সাধুসঙ্গের গুণে দস্যু ঋষি- পদবী প্রাপ্ত হইল। একদা বাল্মীকি দেখিলেন, এক বকদম্পতি বৃক্ষ শাখায় বসিয়া রহিয়াছে, এমন কালে, এক ব্যাধ, নিশিত শরে তাহাদের একটীর বিনাশ করিল। এই ঘটনা অবলােকন করিয়া, তিনি হৃদয়ে বড় বেদনা পাইলেন। যে ব্যক্তি স্বহস্তে শত শত নরহত্যা করিতে সঙ্কুচিত হয় নাই, সাধুসঙ্গের গুণে, তাহার হৃদয়ে এতই পরি- বৰ্ত্তন ঘটিয়াছিল যে, একটী বককে নিহত দেখিয়া সেই- কঠোর হৃদয় কাঁদিয়া উঠিল। বাল্মীকি শােকে অধীর

বাল্মীকি।
হইয়া বলিয়া উঠিলেন,—“রে নিষাদ ! তুই কখনই
প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারিবি না।”
বাল্মীকি রামায়ণ প্রণয়ন করিয়া জগতে অমর হইয়া
গিয়াছেন

গুরুভক্তি।
(১)
উপমনু।
[ মহাভারত অবলম্বনে।]
কালে আয়দধৌম্য নামে একজন
ঋষি ছিলেন ; উপমন্যু তাঁহার শিষ্য ।
সেকালের ছাত্রদিগকে গুরুর গৃহে বাস
করিয়া অধ্যয়ন করিতে হইত। ভৃত্যের
ন্যায় গুরুর আজ্ঞা পালন করিতে হইত।
ক্রীতদাসের ন্যায় তাঁহার মন যােগাইতে হইত। গাে-
চারণ, পুষ্পচয়ন, যজ্ঞকাষ্ঠ প্রভৃতির আহরণ—এমন কি
গুরু যখন যেরূপ আদেশ করিতেন, শিষ্যকে তাহাই
পালন করিতে হইত।
গুরু উপমন্যুকে গোচারণের ভার দিয়াছিলেন ।
এই নীচ কাৰ্য্য করিতে উপমন্যু কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হন
নাই। সে কালের শিষ্যেরা গুরুকে সামান্য মানুষ

উপমন্যু।
ঘরে
;
বলিয়া মনে ভাবিতেন না। তাঁহারা বলিতেন, গুরুদেব
সাক্ষাৎ শিবস্বরূপ ; তাহার আদেশই বেদ, শুশ্রুষাই
তপস্যা ; গুরুর প্রীতিকর কাৰ্যের অনুষ্ঠানই পরম
যজ্ঞ। যতকাল গুরু শিষ্যের সেবায় পরিতুষ্ট হইয়া,
তাহাকে আপনার গৃহে ফিরিয়া যাইতে অনুমতি প্রদান
করিতেন, শিষ্যকে ততকাল পর্যন্ত গুরুর
থাকিয়া তাঁহার সেবা করিতে হইত। এমনভাবে কত
শিষ্যের চুল পাকিয়া যাইত, দন্তমূল শিথিল হইয়া
পড়িত; তথাপি, তাহাদের হৃদয়ে গুরুর প্রতি অভক্তির
উদয় হইত না।
গুরুর আজ্ঞানুসারে উপমন্য সমস্ত দিন গরু
চরাইতেন এবং সন্ধ্যাকালে, গুরুর গৃহে ফিরিয়া আসিয়া
তাহার পাদবন্দনা করিতেন ।
একদিন আমােদধৌম্য উপমন্যুকে ডাকিয়া কহি-
লেন, “বাছা! তুমি ক্রমেই হৃষ্টপুষ্ট হইতেছ দেখি-
তেছি। তুমি কি আহা করিয়া এরূপ মােটাসােটা
হইতেছ ?”
উপমন্যু উত্তর করিলেন,-“ প্রভাে! ভিক্ষা করিয়া
যাহা প্রাপ্ত হই, তাহাই আহার করি।”
গুরু কহিলেন,—“ আমাকে না বলিয়া ভিক্ষার দ্রব্য
আহার করাতে তােমার দোষ হইতেছে
2)

গুরুভক্তি।
উপমন্যু পরদিন ভিক্ষা করিয়া যাহা পাইলেন,
সমস্ত গুরুর নিকট রাখিলেন। গুরু সকলই গ্রহণ
করিলেন। উপমন্যুকে কিছুই ফিরাইয়া দিলেন না।
তিনি সে দিন উপবাসে কাটাইলেন ; পরদিন, উপবাসী
হইয়াও, যথাকালে গরু চরাইতে গেলেন। এই ভাবে
কিছু দিন কাটিল।
আর এক দিন উপাধ্যায় বলিলেন,—“ উপমন্যা !
আমি ত প্রত্যহ তােমার সমস্ত ভিক্ষা গ্রহণ করি,
তথাপি তােমার শরীর এরূপ হৃষ্টপুষ্ট দেখিতেছি
কেন? তুমি আজকাল কি খাও?”
উপমন্যু বলিলেন,—“ প্রভাে! গােচারণে গিয়া
গাভী দোহন করিয়া দুগ্ধ পান করি, তাহাতেই আমার
ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর হয়।
| গুরুদেব বলিলেন, আমি তোমাকে দুগ্ধ পান
করিতে অনুমতি প্রদান করি নাই ; সুতরাং, ইহাতে
তােমার বড়ই দোষ হইতেছে। অতঃপর তুমি গাে-
দোহন করিও না।”
উপমন্যু অতঃপর গাভী দোহন করিতেন না।
বৎসগণ দুগ্ধ পান করিলে, উহাদের মুখে যে ফেন
লাগিয়া থাকিত, তিনি তাহাই সংগ্রহ করিয়া পান
করিতেন। কয়েকদিন পরে, গুরু জানিতে পারিয়া,

উপমন্যু। • ইহাতেও নিষেধ করিলেন। জীবন ধারণের জন্য উপ- মন্যুর আর কোনই উপায়হিল না। ধন্য উপমন্যু! ধন্য তাঁহার গুরুভক্তি ! এত অত্যাচারেও গুরুর প্রতি তাহার শ্রদ্ধার কিছুমাত্র হ্রাস হইল না। তিনি দিন দিন কৃশ হইতে লাগিলেন, কিন্তু তথাপি, পূর্বের মত প্রত্যহ গরু চরাইতেন। একদা গােচারণে গিয়া উপমন্যু ক্ষুধার জ্বালায় অধর হইয়া উঠিলেন ; কিন্তু উপায় কি ? গুরু তাহার আহার রাখেন নাই। প্রাণ যায়, তাহাও স্বীকার, তথাপি উপমন্ত গুরুবাক্য লঙ্ঘন করিতে পারেন না। তিনি আহারের আর কিছু না পাইয়া, অগত্যা অর্কপত্র ভক্ষণ করিলেন। তাহাতে চক্ষুর পীড়া উপস্থিত হইল। রােগ ক্রমে বৃদ্ধি পাইল। উপমন্যু অন্ধ হইলেন এবং একদিন সেই বনের মধ্যে, একটা কূপে পড়িয়া গেলেন ; অনেক চেষ্টা করিলেন, উঠিতে পারিলেন না। ক্রমে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইল। উপমন্যু গৃহে ফিরিলেন । গুরুর আসন টলিল। তিনি রাত্রিকালে শিষ্যের অনুসন্ধানে বাহির হইলেন। উপমন্যু যে বনে গরু চরাইতেন, গুরু সেখানে উপস্থিত হইয়া “উপমন্যা, উপমনন্যা !” বলিয়া ডাকিতে লাগিলেন। উপমন্যু কূপের মধ্যে থাকিয়া উত্তর করিলেন,—* আমি ক্ষুধার

১১৪
গুরুভক্তি।
জ্বালায় অস্থির হইয়া অর্কপত্র ভক্ষণ করিয়াছিলাম,
তাহাতে অন্ধ হইয়া কূপে পড়িয়াছি ; উঠিতে পারি-
তেছি না।”
উপমনুর অদ্ভুত
গুরুভক্তি দেখিয়া দেবতারা
তাঁহাকে কৃপা করিলেন। তিনি শীঘ্রই সেই কূপ
হইতে উদ্ধার পাইয়া রােগমুক্ত হইলেন। গুরুভক্তির
বলে ও দেবতার অনুগ্রহে, তিনি অচিরে সকল শাস্ত্রে
অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। ঈশ্বর যাহার প্রতি
সদয়, তাহার পক্ষে কিছুই বিচিত্র নহে।

গুরুভক্তি (২) উদ্দালক। [ মহাভারত অবলম্বনে। আযােদধৌম্যের আরুণি নামে আর এক- জন শিষ্য ছিলেন। তিনিও নিরতিশয় গুরুভক্ত। গুরুদেব যখন যাহা আদেশ করিতেন, আরুণি তৎক্ষণাৎ তাহাই করিতেন। গুরুর শস্যক্ষেত্র ছিল। একদিন তিনি আরুণিকে ক্ষেতের আলি বাঁধিতে আজ্ঞা করিলেন। আরুণি তৎক্ষণাৎ শস্যক্ষেত্রে চলিলেন। তিনি সেখানে গিয়া, আলি বাঁধিলেন, কিন্তু জলের স্রোতে উহা ভাঙ্গিয়া গেল। আবার বাঁধিলেন, আবার ভাঙ্গিল। পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করিয়াও আরুণি জলস্রোত বন্ধ করিতে পারি- লেন না। অবশেষে আর কোন উপায় না দেখিয়া, আরুণি। ক্ষেতের যে অংশটুকু ভাঙ্গিয়া, জলস্রোত প্রবাহিত হইতেছিল সেখানে, স্বয়ং পড়িয়া রহিলেন। জলের গতি বন্ধ হইল। এদিকে ঋষি বহুক্ষণ আরুণিকে ফিরিয়া আসিতে দেখিয়া, অন্যান্য শিষ্যগণকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আরুণি কোথায় ? সকলেই কহিলেন,—আপনি তাহাকে ক্ষেতের আলি বাঁধিতে পাঠাইয়াছেন। বলিলেন,—তাহার বহুক্ষণ বিলম্ব হইতেছে ; চল, আম- রাও সেখানে যাই। এই বলিয়া, শিষদিগকে সঙ্গে লইয়া, তিনি ক্ষেত্রের দিকে চলিলেন। ক্ষেত্রের নিকটে উপস্থিত হইয়া তিনি এদিক ওদিক খুজি- লেন, কিন্তু কোথাও আরুণিকে দেখিতে পাইলেন না। ইহাতে শঙ্কিত হইয়া, গুরু “আরুণি, আরুনি !” বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিলেন। গুরুদেব আহ্বান করিতেছেন শুনিয়া, আরুণি তৎক্ষণাৎ গাত্রে- থান করিলেন এবং তাহার নিকটে গিয়া প্রণাম করিয়া কহিলেন, প্রভাে! ক্ষেত্রের জল বাহির হইয়া যাইতেছিল, আমি বহুতর প্রয়াস পাইয়াছিলাম, কিন্তু তথাপি, জলের গতি বন্ধ করিতে পারি নাই। অগত্যা, সেই জলবেগ রােধ করিবার জন্য, সেখানে শয়ন করিয়াছিলাম।”

উদ্দালক।
১৭
গুরু মহাসন্তুষ্ট হইলেন এবং কহিলেন,—“বৎস!
তুমি কেদারখণ্ড হইতে উত্থিত হইয়াছ, অতএব আজ
অবধি তােমার নাম উদ্দালক হইল । আমার আশী-
ৰ্বাদে তুমি সকলশাস্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইবে।”
বাস্তবিকই ভগবানের অনুগ্রহে উদ্দালক মহাপণ্ডিত
হইয়াছিলেন।
२

SUOMINGO
ONYO
অধ্যবসায় -দানকৃতজ্ঞতা।
কর্ণ।
[ মহাভারত অবলম্বনে।]
৬৫০
ঙ্গদেশের রাজা মহাবীর কর্ণ দাতা,
পরােপকারী এবং কৃতজ্ঞ বলিয়া বিখ্যাত।
তদীয় শৈশবাবস্থায় অধিরথ নামে এক
সূত ভঁহাকে পুত্রের মত লালনপালন
করিয়াছিল। অধিরথের পত্নীর নাম
রাধা। রাধার স্তনদুগ্ধ পান করিয়া পরিপুষ্ট হইয়া-
ছিলেন বলিয়া, অনেকে কর্ণকে রাধেয় বলিত।
নীচ লােকের গৃহে কর্ণ প্রতিপালিত হইয়াছিলেন।
এই হেতু, বাল্যকালে সকলে তাহাকে অবজ্ঞা করিত।
কর্ণ একটু বড় হইয়া, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন,
লােকের অবজ্ঞাভাজন হইয়া জীবনধারণ করা বিড়ম্বনা-
মাত্র, অতএব যেরূপে পারি বিদ্যা, জ্ঞান এবং যশ
উপাৰ্জন করিয়া আমি জনসমাজে আদরণীয় হইব, তখন
লােকে আমাকে আর নীচকুলােব বলিয়া অবজ্ঞা করি-
-

কর্ণ। = বার অবসর পাইবে না, বরং আমাকে সমধিক গুণসম্পন্ন বলিয়া সমাদর করিবে । লেখাপড়া বল, আর যাহাই কেন বল না, গুরুভক্তি ও অধ্যবসায় না থাকিলে কিছুই ভালরূপে শিখিতে পারা যায় না। কর্ণের অধ্যবসায় ও গুরুভক্তির তুলনা নাই। কিশােরবয়সে তিনি ছদ্মবেশে পরশুরামের নিকট যুদ্ধবিদ্যা শিখিতে গিয়াছিলেন। একদিন পরশুরাম কর্ণের উরুতে মাথা রাখিয়া নিদ্রা যাইতেছিলেন। একটা কীট সহসা মৃত্তিকা ভেদ করিয়া উঠিল এবং কর্ণের উরুর মাংস কাটিয়া লইতে লাগিল। কর্ণের বড় কষ্ট হইল। কিন্তু পাছে গুরুর ঘুম ভাঙ্গিয়া যায় এই ভাবিয়া, তিনি একটুও নড়িলেন না। রক্তে ভঁহার পরিধেয় বসন ভিজিয়া গেল। পরশুরাম জাগিয়া কর্ণের ঈদৃশ ধৈৰ্য্য ও গুরুভক্তি দেখিয়া বড়ই বিস্মিত হইলেন। পূৰ্বেই বলা হইয়াছে, কর্ণ ছদ্মবেশে পরশুরামের নিকটে গিয়াছিলেন। তিনি পরশুরামের নিকট আপ- নাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিচয় দিয়াছিলেন। বাস্তবিক তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না। মিথ্যার মত পাপ আর নাই। এই মহাপাপে পরশুরাম কর্ণের উপর যার পর নাই অসন্তুষ্ট হইলেন এবং কর্ণের অসাধারণ গুরুভক্তি ও সহিষ্ণুতা থাকিলেও, ‘যুদ্ধকালে ব্রহ্মাস্ত্র বিস্মৃত অধ্যবসায়-দানকৃতজ্ঞতা। হইবে তাহাকে এই দারুণ অভিশাপ প্রদান করিলেন। মিথ্যাবাদীর যতই কেন গুণ থাকুক না, এক মিথ্যার দোষে কেহ তাহাকে ভালবাসে না। দ্রোণাচাৰ্য নামে এক জন মুনিপুত্র মহাধনুর্দ্ধর ছিলেন। তিনি কুরুবংশের রাজপুত্রদিগকে অস্ত্রবিদ্যা শিখাইতেন। যুধিষ্ঠির, অর্জুন, দুর্যোধন প্রভৃতি সক- লেই তাহার শিষ্য । এক দিন দ্রোণ ছাত্রগণের পরীক্ষা লইতে ইচ্ছা করিলেন । পরীক্ষার দিন স্থির হইল। নগরের যত বড় বড় লােক বালকগণের পরীক্ষাদর্শনার্থ উপস্থিত হইলেন। বালকেরা একে একে আপন আপন বিদ্যাবুদ্ধির প্রমাণ দেখাইলেন। অৰ্জ্জুন সকলের প্রধান বলিয়া অবধারিত হইলেন। সকলে ধন্য ধন্য বলিয়া অর্জুনের প্রশংসা করিলেন। কর্ণের প্রাণে ইহা সহিল । কর্ণ নির্ভয়ে রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করিয়া অৰ্জ্জুনকে ডাকিয়া কহিলেন,—“অৰ্জ্জুন! তুমি যে সকল কৌশল দেখাইয়া সভাজনকে বিস্মিত করিয়াছ, আমিও সে সমস্ত দেখাইতে পারি।” কর্ণের এই অহঙ্কারের কথা। শুনিয়া সভার সমস্ত লোেক তাঁহার মুখপানে চাহিয়া রহিল। অবশেষে, অর্জুন যাহা যাহা দেখাইয়াছিলেন, কর্ণও একে একে তৎসমুদায় দেখাইলেন। সভ্যগণ এক- বাক্যে কর্ণের প্রশংসা করিলেন। অর্জুনের জ্যেষ্ঠভ্রাতা কর্ণ । ৪n যুধিষ্ঠির পর্যন্ত মনে করিলেন, জগতে কর্ণের মত বীর আর নাই। কর্ণের হৃদয়ের লক্ষ্য বড় উচ্চ ছিল। তিনি শিক্ষা- ক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, অর্জুন অদ্বিতীয় ধনুৰ্ধর ; কর্ণ প্রতিজ্ঞা করিলেন, আমি অৰ্জ্জন অপেক্ষাও প্রধান হইব। অসাধারণ অধ্যবসায়প্রভাবে বাস্তবিকই তিনি অর্জনের প্রায় সমকক্ষতা লাভ করিয়াছিলেন। যাহার জীবনের লক্ষ্য মহৎ, তিনি নিশ্চয়ই মহাপুরুষ হইয়া থাকেন। দুৰ্য্যোধন বরাবর পাণ্ডবদিগের দ্বেষ করিতেন। কর্ণকে অর্জনের তুল্য গুণসম্পন্ন দেখিয়া এবং তাহার অদ্ভুত অবদান প্রত্যক্ষ করিয়া, তিনি কর্ণের সহিত মিত্ৰতা করিলেন, এবং তাঁহাকে অঙ্গদেশের রাজা করিয়া দিলেন। গুণের পুরস্কার অবশ্যই হয়। অধ্যবসায় প্রায় নিস্ফল হয় না। কর্ণ গরীবের ঘরের ছেলে। দারিদ্রের যে কি কষ্ট, তাহা তিনি বুঝিতেন। তিনি এক্ষণে রাজা। হীন অবস্থা হইতে হঠাৎ বড়লােক হইলে, অনেকে নিজের দুর- বস্থার কথা ভুলিয়া যায়, একবার ভ্রমেও গরীব দুঃখী- দের কথা মনে করে না। কর্ণের প্রকৃতি ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তিনি, রাজা হইয়া, দীনদুঃখীদের কষ্ট

२२
অধ্যবসায়-দানকৃতজ্ঞতা।
দূর করিতে কল্পতরু হইয়া বসিলেন। কর্ণের নিকট
যাচক কখনই নিরাশ হইত না। যে যাহা চাহিত, কর্ণ
তাহাকে তাহাই দিতেন। তাহার দানের যশে পৃথিবী
পূর্ণ হইল। সূতপুত্র নাম ঘুচিয়া গেল। অতঃপর
তিনি দাতাকর্ণ বলিয়া বিখ্যাত হইলেন।
দেবতার অনুগ্রহে কর্ণ অক্ষয় কবচকুণ্ডল প্রাপ্ত
হইয়াছিলেন। এই কবচকুণ্ডলের এক অসাধারণ গুণ
ছিল। কর্ণ এই কবচকুগুলের বলে সমরে অজেয়
ছিলেন।
এক দিন দেবতাদিগের রাজা ইন্দ্র, ব্রাহ্মণের
বেশে কর্ণের নিকটে উপস্থিত হইয়া সেই দুর্ভেদ্য কবচ
ও কুণ্ডল চাহিয়া বসিলেন। কর্ণ জানিতেন, কবচকুণ্ডল
ছাড়িয়া দিলে তাহার নিজের জীবন বিপন্ন হইবে ।
তথাপি তিনি ভিক্ষুককে বিমুখ করিলেন না। নিজের
জীবনের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া, তিনি যাচকের মান
রাখিলেন। সাধুগণ পরের উপকার করিবার জন্যই
জীবনধারণ করেন।
দুরবস্থার সময়ে কর্ণ দুর্যোধনের নিকট উপকার
পাইয়াছিলেন। তিনি আজীবন একথা বিস্মৃত হন
নাই। যাহাতে দুর্যোধনের উপকার হয়, কর্ণ প্রাণ
দিয়াও তাহা করিতে প্রস্তুত ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের
মহাসমরে কর্ণ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দুর্যোধনের

কর্ণ।
পক্ষে থাকিয়া যুদ্ধ করিয়াছিলেন। এই মহারথীকে
পাণ্ডবপক্ষ করিবার জন্য অনেকে বিস্তর চেষ্টা করিয়া
ছিলেন, কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হইতে পারেন
নাই। যত বার কর্ণের নিকট এই পাপপ্রসঙ্গ উত্থাপিত
হইয়াছিল, তিনি ততবারই ঘৃণার সহিত উহার প্রত্যা-
খ্যান করিয়াছিলেন। সাধুগণ বরং মরিতেও প্রস্তুত হন,
তথাপি, কৃতঘ্নতারূপ মহাপাপ করেন না।
কর্ণের চরিত্রের গুরুতর দোষ, তিনি পাণ্ডবগণের
প্রতি দ্বেষ করিতেন। অকারণে পরের হৃদয়ে বেদনা
দিয়া কেহ কখনও সুখী হয় না। কর্ণ যাহাদের প্রতি
অকারণে দ্বেষ করিতেন, তাহাদেরই একতম অর্জ,
হাতে মরিয়াছিলেন। পাপ কাহাকেও ছাড়ে না। তুমি
বীর হও, দাতা হও, আর যাহাই কেন হও না, যদি
তােমার হৃদয়ে পাপ থাকে তাহার ফল ফলিবেই
ফলিবে। কর্ণের মত দাতা ও কৃতজ্ঞপুরুষ পৃথিবীতে
দুর্লভ। এ হেন
এ হেন কর্ণকেও পাপের ফলে অকালে
মরিতে হইয়াছিল । : *
জুনের

মাতাপিতা।
ধৰ্ম্মব্যাধ (তুলাধার )।
[ ধম্মপুরাণ অবলম্বনে।
( তপােদেব নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন।
তাঁহার একমাত্র পুত্র কৃতবােধ। ধর্মের
প্রতি কৃতবােধের একান্ত অনুরাগ ছিল,
কিন্তু মাতাপিতার প্রতি তেমন ভক্তি
ছিল না। তিনি অল্পবয়সে গৃহত্যাগ
করিয়া তপস্যা করিতে চলিয়া গেলেন। পিতা নিষেধ
করিলেন, অনেক বুঝাইলেন; কিন্তু কৃতবােধ ঘরে রহি-
লেন না। পিতার কথা অবহেলা করিয়া, তিনি তপস্যা
করিতে গেলেন।
সমুদ্রের তীরে গিয়া কৃতবােধ ঘাের তপস্যা করিতে
লাগিলেন। আহার নিদ্রা একাসনে বসিয়া,
বহুকাল কাটাইলেন।
'য়র ঢিবিতে
তাঁহার শরীর ঢাকা পড়িল
ম জলে সেই

ধৰ্ম্মব্যাখ।
উইয়ের ঢিবি গলিয়া পড়িল। তখন পাখীরা কৃতবােধের
চুলের ভিতর বাসা বাঁধিল। ধ্যান ভাঙ্গিলে, এই সকল
ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া কৃতবােধের মনে বড় অহঙ্কার
উপস্থিত হইল। তিনি ভাবিলেন,—কি ঘােতর
তপস্যাই করিয়াছি। ভাবিতে ভাবিতে তিনি জলধিতে
স্নান করিতে গেলেন ; ফিরিয়া আসিবার কালে, একটা
বক তাহার শরীরের উপর মল পরিত্যাগ করিয়ে
কৃতবােধ বড়ই চটিলেন। তিনি ক্রোধভরে বকের
দিকে যেই চাহিলেন, অমনি সেটা ভস্ম হইয়া গেল।
কৃতবােধ ভাবিলেন, আমার তপস্যার সিদ্ধি হইয়াছে।
অহঙ্কারে বুক ফুলাইয়া তিনি ইতস্ততঃ বেড়াইতে
লাগিলেন
একদিন মধ্যাহ্নকালে, ক্ষুধাতুর হইয়া, কৃতবােধ এক
ব্রাহ্মণের গৃহে অতিথি হইলেন। ব্রাহ্মণ তখন ঘুমা-
ইতে ছিলেন। তাঁহার পুত্র পিতার পদসেবা করিতে
ছিলেন। কৃতবােধকে দেখিয়া ব্রাহ্মণবালক অভ্যর্থনা
করিলেন না। ইহাতে তাহার ক্রোধের উদয় হইল।
তিনি বলিলেন,—“ওহে ব্রাহ্মণকুমার ! আমি অতিথি,
আমাকে গৃহে উপস্থিত দেখিয়াও তুমি কোন কথা
কহিতেছ না কেন? গৃহস্থের গৃহ হইতে যে অতিথি
ফিরিয়া যায়, সে, নিজের পাপের ভার গৃহস্থকে দিয়া,

মাতাপিতা তাহার সমস্ত পুণ্যটুকু লইয়া যায়। তােমার অন্যায় ব্যবহারের প্রতিফল দিতেছি। তুমি আমার তপস্যার বল দেখ। ব্রাহ্মণবালক একটু হাসিয়া উত্তর করিলেন,—“মহা- শয়, অত রাগ করিবেন না। আপনি আমার পিতার অতিথি, তিনি জাগিয়া আপনার উপযুক্ত সম্মান করিবেন। মি পিতৃসেবা করিতেছি। সন্তানের পক্ষে মাতাপিতার দিবার ন্যায় তপস্যা আর নাই। আপনি একটা বক ভস্ম করিয়া গর্বিত হইয়াছেন। কিন্তু আমি ত বক নহি যে, আপনি আমাকে ভস্ম করিবেন ? অতএব শান্ত হউন। পিতা এখনি আপনার সেবা করিবেন।” বালকের কথায় কৃতবােধ বড়ই বিস্মিত হইলেন। তিনি কহিলেন, “ব্রাহ্মণকুমার! আমি এতকাল জপ- তপস্যা করিয়া যে জ্ঞান লাভ করিতে পারি নাই, তুমি কি করিয়া তাহা পাইলে? শমি বক ভস্ম করিয়াছি, এ কথা ত কেহই জানে না। তুমি বালক হইলেও তােমাকে গুরু স্বীকার করিলাম। বল, কি করিলে আমি তােমার মত ত্রিকালজ্ঞ হইতে পারি।” ব্রাহ্মণশিশু বলিলেন,—“বারাণসীতে এক ব্যাধ বাস করেন। তাহার নাম তুলাধার। তিনি পরম ধাৰ্ম্মিক। আপনি তাঁহার নিকট গমন করুন। কিন্তু অদ্য আপনি

ধৰ্ম্মব্যাধ।
২৭
অদ্য
২য়ছেন।
আমার পিতার অতিথি। আপনাকে এখানে
থাকিতে হইবে।” কৃতবোধ ‘তাহাই হইবে বলিয়া সে
দিন সেখানে রহিলেন। পরদিন বারাণসীর অভিমুখে
প্রস্থান করিলেন ।
কৃতবােধ তুলাধারের নিকটে উপস্থিত হইলে, ব্যাধ
কহিল,—“মহাশয় ! আমি আপনার আগমনের কারণ
পূৰ্বেই জানিতে পারিয়াছি। আপনি তপােষুদে
ব্রাহ্মণশিশুকে অবজ্ঞা করিয়াছিলেন। তিনি
দর্পচূর্ণ করিয়া আপনাকে আমার নিক
ভাল আমার গৃহে আসুন।
এই বলি লাধার চলি-
ব্রাহ্মণ কোন কথা না
তাঁহার অনুসরণ
করিলেন।
ব্যাধ ঘরে গিযুহার মাতাপিতাকে
ভক্তিপূৰ্ব্বক প্রণাম করিল রং যােড়হাতে, তাঁহাদের
সম্মুখে দাঁড়াইয়া রহিল গতি আজ্ঞা করিলেন,
বাছা! অতিথির সৎকার র। পিতা আদেশ করিলে,
তুলাধার যথাবিধানে অর্থের সেবা করিলেন।
} ব্যাধের সেবায় কৃতবােধের পথশ্রম দূর হইলে,
তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,—যে কারণে আমি আসিয়াছি,
আপনার তাহা অবিদিত নাই। এক্ষণে বলুন, কিসে
আমি আপনার মত ত্রিকালজ্ঞ হইতে পারি ? তুলাধার
কহিলেন,-মহাশয় ! আমি একদিন একটা বনে পাখী,
লেন।

২৮ মাতাপিতা। সন। শিকার করিতে গিয়াছিলাম। জাল পাতিয়া বসিয়া আছি, অকস্মাৎ একটা বৃদ্ধ পক্ষী আমার জালে পড়িয়া ছট ফট করিতে লাগিল। অদূরে আর একটা পক্ষীশাবক ছিল। বৃদ্ধ পক্ষীকে এইরূপ বিপন্ন দেখিয়া, সে চঞ্চপুটে খানিকটা জল লইয়া, উহার মুখে দিল। কিন্তু জল দিতে গিয়া, অসাবধানতাবশতঃ, সে নিজে জালে পড়িয়া ণ হারাইল। পক্ষিশাবক মরিয়া দেবতার শরীর বং দেবতারা উহাকে দিব্য রথে চড়াইয়া স্বর্গে এই ঘটনা অবলােকন করিয়া আমি বড় চম হইলাম। নিকটে একজন ব্রাহ্মণ- কুমার দাড়াইয় লন। আমি তাহাকে সবিনয়ে ইহার কারণ জিজ্ঞা, করিলাম। তিনি বলিলেন,- জল দিতে গিয়া যে খিটা মারা পড়িল, উহা এই বৃদ্ধ-পক্ষীর শাবক। তাকে বিপন্ন দেখিয়া, নিজের প্রাণের মায়া ছাড়ি ইহার মুখে জল দিয়াছে, এই পুণ্যফলে, দিব্য-দেহ ইয়া স্বর্গে গিয়াছে। জগতে মাতাপিতার ন্যায় প্রত্যক্ষ দেবতা আর নাই। যাঁহারা মাতাপিতার সেবা করেন, তাঁহারা ঘরে বসিয়া সকল তপস্যার ফল লাভ করেন। হে ব্যাধ ! যদি তুমি পক্ষিশাবকের মত দেবলােক লাভ করিতে ইচ্ছা কর, তাহা হইলে, ঘরে গিয়া মাতাপিতার সেবা কর।

ধৰ্ম্মব্যাধ।
“ব্রাহ্মণকুমারের উপদেশ পাইয়া আমি গৃহে ফিরিয়া
আসিলাম এবং তদবধি কায়মনে মাতাপিতার আজ্ঞা
পালন করিতেছি। আমার যাহা কিছু জ্ঞান জন্মিয়াছে,
তাহা একমাত্র মাতাপিতার অনুগ্রহে।
মহাশয় ! আপনি মাতাপিতার মনে কষ্ট দিয়া
তপস্যা করিতে গিয়াছিলেন ; পিতা নিষেধ করিলেও
তাহার কথা শুনেন নাই। এই মহাপাপে, আপনার
সকল তপস্যা বিফল হইয়াছে। যদি মঙ্গল লাভ
করিতে বাসনা থাকে, তাহা হইলে, অবিলম্বে ঘরে
জনক জননীর সেবা করুন। তাহা হইতোপনি ঘরে
বসিয়া সকল তপস্যার ফল পাইবেন।
ব্যাধের কথায় কৃতবােধের এর উদয় হইল।
তিনি গৃহে গিয়া একমনে মাতা তার সেবা করিতে
লাগিলেন --

মাতাপিতার প্রতি অবজ্ঞার ফল। সৰ্ব্বশ। [ পদ্মপুরাণ অবলম্বনে।] পূর্বকালে মনােভদ্র নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি পরম ধার্মিক। তাঁহার পুত্র ছিল। রাজা বৃদ্ধবয়সে, পুত্র- গণে হস্তে রাজ্যভার দিতে ইচ্ছা করিলে অভিষেকের দিন সকলে রাজসভায় বসিয়া আছেন, এমন সময়ে, এক গৃধ নির্ভয়ে সভাগৃহে প্রবেশ করিল। ধিকে রাজসভায় প্রবেশ করিতে দেখিয়া, সকলেই পর নাই চমৎকৃত হই- লেন : সভাস্থলে উপস্থিত হইয়া গৃধ্র মানুষের কথায় রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিল,-“মহারাজ! তােমার পুত্রগণের সমৃদ্ধি দেখিয়া বড় সন্তোষ লাভ করিয়াছি। ইহারা নিজের পাপের ফলে দুস্তর নরকে পড়িয়াছিল ; সম্প্রতি পাপমুক্ত হইয়া অতুল বিভব প্রাপ্ত হইয়াছে।

সর্বশ। সেজন্য আহ্লাদিত হইয়া ইহাদিগকে দেখিতে আসি- য়াছি।” রাজা বলিলেন,—“গৃধ্র ! তুমি কে, কিরূপে তুমি আমার পুত্রগণের পূর্ববৃত্তান্ত অবগত হইলে, তাহা প্রকাশ কর। উহা শুনিতে আমার বড় কৌতুহল উপস্থিত হইয়াছে।” এ গৃধ্র বলিতে লাগিল,—“মহারাজ! আমি পূর্বজন্মে সৰ্ব্বশ নামে ব্রাহ্মণ ছিলাম। অতি উচ্চ বংশে আমার জন্ম হইয়াছিল এবং পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দ্বারা বেদাদি সকল শাস্ত্রে পণ্ডিত হইয়াছিলাম। মহারাজ! বলিতে কি, তৎকালে আমার রূপ, যৌবন, বিদ্যা, ধন প্রভৃতি কিছুরই অভাব ছিল না। এই সম্পদই আমার সর্ব- নাশের কারণ হইল। আমি রূপ, যৌবন ও জ্ঞানমদে যার পর নাই অহঙ্কত হইয়া উঠিলাম। তৎকালে, আমার মাতাপিতা বিদ্যমান ছিলেন। আমি সেই প্রত্যক্ষ দেবতা মাতাপিতাকে না বুঝিয়া অবজ্ঞা করি- মনে ভাবিতাম,—আমি জ্ঞানবান, রূপবান, ধনবান্ ; আমি ধাৰ্মিক, কিন্তু আমার মাতাপিতা পাপ- পরায়ণ ও দুৰ্ম্ম খ; ইহাদের জ্ঞান বা দয়ার লেশমাত্র কেবল ইহাদেরই জন্য আমার বিদ্যা, বুদ্ধি, ধন প্রভৃতি সকল সম্পদ বিফল হইল। আমি বার বার তাম। নাই।

মাতাপিতার প্রতি অবজ্ঞার ফল।
এইরূপ ভাবিয়া, মাতাপিতার সেবা পরিত্যাগ করি-
লাম এবং তাঁহাদের প্রতি দুর্ব্যবহার করিতে আরম্ভ
করিলাম।
“কালে আমার মৃত্যু হইল। যমদূতগণ, ধৰ্ম্মরাজের
আদেশে, আমাকে বন্ধন করিয়া দারুণ নরকে নিক্ষেপ
করিল। সেই নরকে তােমার পুত্রগণের সহিত আমার
সাক্ষাৎ হইয়াছিল। অনুসন্ধানে জানিতে পারিলাম
ইহারা পূর্বজন্মে ধনী ছিল, কিন্তু ভিক্ষুক দরিদ্রদিগকে
একটী কপর্দকও দান করে নাই। সেই পাপের ফলে,
অনেক পুণ্যকাৰ্য্য করিয়াও, নরকে পতিত হইয়াছে।
ভগবানের অপার কৃপায় ইহারা এক্ষণে পাপমুক্ত
হইয়া অতুল সম্পদ লাভ করিয়াছে। তাই আজ আমি
ইহাদিগকে দেখিতে আসিয়াছি।
এইরূপ বলিয়া গৃধ্র আবার বলিতে লাগিল,-
মহারাজ! আমি বড় দুর্ভাগ্য। মাতাপিতার প্রতি
অবজ্ঞা করিলে, পরিণামে কিরূপ দুর্গতি ভােগ করিতে
হয়, আমিই তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। আমি সহস্র সহস্র
বৎসর অবিরত নরকযাতনা ভােগ করিয়া, অবশেষে গৃধ্রু
হইয়াছি এবং মৃতমাংস ভক্ষণ করিয়া প্রাণধারণ করি-
তেছি। আমাকে ধিক্ ! যে হতভাগ্য মাতাপিতার প্রতি
ভক্তিযুক্ত না হয়, তাহার ইহকালপরকালে দুর্গতির

সৰ্ব্বশ।
অবধি থাকে না। ফলতঃ মাতাপিতা প্রত্যক্ষ দেবতা-
স্বরূপ। যাহারা তাহাদের সেবা করেন, তাহারা মহা-
শয়। যে মনুষ্য মাতাপিতার প্রতি অবজ্ঞা করে, সে
ঘাের নরকে বাস করিয়া থাকে। মাতাপিতার প্রতি
অনাদর করাতেই আমার ঈদৃশ দুর্গতি হইয়াছে। জানি
, কত দিনে দয়াময় পরমেশ্বর আমার দুঃখ দুর
করিবেন।

553
ত
সত্যপ্রতিজ্ঞতা-পিতৃভক্তি-রাজভক্তি।
ভীষ্মদেব ।
[ মহাভারত অবলম্বনে।
*** **
ষ্মের পিতা শান্তনু, মাতা গঙ্গাদেবী।
শান্তনু হস্তিনাপুরের রাজা ছিলেন।
রাজপুত্র হইয়াও ভীষ্ম যে প্রকার
নির্লোভ, নিরহঙ্কার ও জিতেন্দ্রিয়
ছিলেন, পৃথিবী খুজিলে তাঁহার তুলনা
মিলে না।
সত্যের প্রতি ভীষ্মের একান্ত অনুরাগ ছিল। এই
মহাপুরুষ মৃত্যুকালপৰ্যন্ত কোন দিন ভ্রমেও সত্যের
অপলাপ করেন নাই। তিনি কথায় যাহা বলিতেন,
কাজেও তাহাই করিতেন। সত্যের জন্য তিনি রাজ্য,
ঐশ্বৰ্য্য সমস্ত পরিত্যাগ করিয়াছিলেন ; জীবনের সকল

ভীষ্মদেব। সুখ ছাড়িয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিজ্ঞা এতই অটল ছিল যে, আজ পর্যন্ত কাহাকেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখিলে, লােকে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার সহিত তাহার উপমা দিয়া থাকে। ভীষ্মের পিতৃভক্তিও অসাধারণ। পিতার সন্তোষের জন্য তিনি প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন –বিবাহ করিব না। ভীষ্ম আজীবন ব্রহ্মচারিভাবে অবস্থান করিয়াছিলেন, তথাপি, একদিনের জন্যও, আপনার প্রতিজ্ঞার কথা বিস্মৃত হন নাই। শিক্ষায় ভীষ্মের একান্ত অনুরাগ ছিল। তিনি অল্প বয়সেই একজন অদ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর হইয়া উঠেন। তাহার অলৌকিক শক্তি দেখিয়া, লােকে বলিত, তিনি দেবতা ; শাপভ্রষ্ট হইয়া মানুষ হইয়াছেন। ফলতঃ তাঁহাকে দেবতা ভিন্ন আর কিছুই বলা যায় না। ভীষ্মদেব মহাবীর ছিলেন। তাঁহার সহিত সম্মুখ- সমরে স্থির থাকিতে পারেন, তৎকালে, এমন বীর কেহই ছিলেন না। কুরুক্ষেত্রের মহাসমরে তিনি একাকী প্রতিদিন অযুত-যােদ্ধার প্রাণসংহার করিতেন। দশ দিন এইরূপ ভয়াবহ যুদ্ধ করিবার পর অন্যায়সমরে পাণ্ডবপক্ষ এই মহারথীকে পরাভূত করেন। ভীষ্মের জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই...

সত্যপ্রতিজ্ঞতা-পিতৃভক্তি—রাজভক্তি। অল্প বয়সে ভীষ্মের মাতৃবিচ্ছেদ হয়। শান্তনু সত্য- বতীকে বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিলেন। সত্যবতীর পিতা নীচজাতীয় ছিলেন। কিন্তু হইলে কি হয়, তিনিও বৃদ্ধ শান্তনুকে সহজে কন্যাদানে সম্মত হইলেন না। অবশেষে বলিলেন,—আমার দৌহিত্রকে সিংহা- সন প্রদান করিবেন, এই অঙ্গীকার করিলে, আপনাকে কন্যাদান করিতে আমার কোনও আপত্তি নাই। শান্তনু সম্মত হইলেন না। তিনি মনের কষ্টে কালযাপন করিতে লাগিলেন। ভীষ্ম মন্ত্রীমুখে পিতার মনঃকষ্টের কারণ অবগত হইয়া, সত্যবতীর পিতার নিকট গমন করিলেন এবং তাহাকে কহিলেন,—“আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি কখনও সিংহাসন গ্রহণ করিব না। আপনি স্বচ্ছন্দে পিতাকে কন্যাদান করুন।” সত্যবতীর পিতা উত্তর করিলেন,—“আপনি সিংহাসন লইবেন না তাহা ত বুঝিলাম, কিন্তু আপনার ছেলেরা কেন রাজ্যের আশা পরিত্যাগ করিবে ? আপনার মাতৃকুল, পিতৃকুল উভয়ই উচ্চ; বিশেষতঃ, আপনি জ্যেষ্ঠপুত্র বলিয়া রাজ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী। সুতরাং, প্রজাগণ সকলেই আপনার সহায় হইবে। আপনি রাজ্য- গ্রহণ না করিলেও, তাহারা আপনার পুত্রের অনুগত হইবে।”

ভীষ্মদেব। ভীষ্ম কহিলেন,—“মহাশয়, আপনি অমূলক সন্দেহ করিবেন না। পিতার প্রীতির জন্য রাজ্য কেন, যদি প্রাণ দিতে বলেন, আমি তাহাতেও প্রস্তুত আছি। আমি ধৰ্ম্ম সাক্ষী করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি, এ জীবনে বিবাহ করিব না। আমি বিবাহ না করিলে ত আপনার দৌহিত্র- গণের রাজ্য পাইবার কোন ব্যাঘাত হইবে না? ভীষ্মের উন্নত চরিত্রের কথা দেশময় প্রচারিত হইয়াছিল। সুতরাং, সত্যবতীর পিতা আর কোনও সন্দেহ করিলেন না । বৃদ্ধ শান্তনুর সহিত সত্যবতীর বিবাহ হইয়া গেল। ভীষ্মদেব বিমাতাকে জননীর ন্যায় সম্মান করিতেন। যে বিমাতার জন্য তিনি রাজ্য, ধন প্রভৃতি সকল সুখের বস্তু হারাইয়াছিলেন, সেই বিমাতার প্রতিও, তাঁহার মনে বিরাগের সঞ্চার হয় নাই। ধন্য ভীষ্ম ! ধন্য তাহার পিতৃভক্তি! ধন্য তাহার ন্যায়নিষ্ঠা । সত্যবতীর গর্ভে শান্তনুর বিচিত্রবীৰ্য ও চিত্রাঙ্গদ নামে দুইটী পুত্র জন্মে । তাহাদের অতি শৈশবাবস্থায় শান্তনু ইহলােক পরিত্যাগ করেন। ভীষ্ম পরমযত্নে বৈমাত্রেয় ভ্রাতৃযুগলের লালনপালনাদির ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। চিত্রাঙ্গদ অল্পবয়সেই কালগ্রাসে পতিত হন। বিচিত্রবীৰ্য বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে, ভীষ্ম তাঁহাকে রাজ- সত্য প্রতিজ্ঞতা—পিতৃভক্তি—রাজভক্তি। পদে অভিষিক্ত করিয়া স্বয়ং তদীয় অভিভাবক অথচ আজ্ঞাবহ হইয়া, রাজকার্য পরিদর্শন করিতেন। কাল- সহকারে বিচিত্রবীৰ্য্য পরলােক গমন করিলে, ভীষ্ম তদীয় পুত্রদ্বয়কে পুত্রনির্বিশেষে প্রতিপালন করিয়া- ছিলেন। জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ ছিলেন বলিয়া, কনিষ্ঠ পাণ্ডুকেই তিনি রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া স্বয়ং সর্ব- বিষয়ে দৃষ্টি রাখিয়া চলিতেন; কিন্তু কদাপি প্রভুত্ব প্রদর্শন করিতেন না। ধৃতরাষ্ট্রের দুৰ্য্যোধনাদি শত পুত্র এবং পাণ্ডুর যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চ পুত্র ভীষ্মেরই স্নেহে পরিপুষ্ট হইয়াছিলেন। ভীষ্মই তাঁহাদের শিক্ষা এবং সমৃদ্ধির বিধাতা যিনি যখন সিংহাসনে বসিতেন, ভীষ্ম তাঁহারই অনুগত হইতেন। তিনি সত্যবতীর পিতার নিকট যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তাহা কখনও বিস্মৃত হন নাই। এক সময়ে সত্যবতীও ভীষ্মকে বিবাহ করিতে এবং রাজা হইতে অনুরােধ করিয়াছিলেন, কিন্তু ঐ মহাপুরুষ কিছুতেই সত্য লক্ষ্মন করিয়া, বিমাতার অনু- রােধ রক্ষা করে নাই। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভীষ্ম দুর্যোধনের পক্ষ অবলম্বন করিয়াছিলেন। ভীষ্ম জানিতেন, দুর্যোধন পাপী, পাণ্ড- বেরা নিস্পাপ ; দুৰ্য্যোধন লােভী, অত্যাচারী, পাণ্ডবেরা

ভীষ্মদেব।
নির্লোভ, ধার্মিক। এজন্য তিনি মনে প্রাণে পাণ্ডবগণের
মঙ্গলকামনা করিতেন। যাহাতে যুদ্ধ উপস্থিত না হয়
সেজন্য তিনি দুৰ্য্যোধনকে অনেক বুঝাইয়াছিলেন।
দুৰ্য্যোধন কাহারও কথা শুনেন নাই।
নীতিশাস্ত্রে ভীষ্মের মত পণ্ডিত বােধ হয় সেকালে
কেহই ছিলেন না। তিনি মৃত্যুর পূর্বে যুধিষ্ঠির
প্রভৃতিকে যে সকল উপদেশ দিয়াছিলেন, তাহার
প্রত্যেক কথায়, তাহার অসীম-নীতিজ্ঞানের পরিচয়
পাওয়া যায়। ভীষ্মকে লােকে যে শাপভ্রষ্ট দেবতা
বলিয়া ভক্তি করে, ফলতঃ তাহার চরিত্রও দেবতার মত
ছিল। ভীষ্মের ন্যায় মহাপুরুষ পৃথিবীতে দুর্লভ।
2ae

- ML
অধ্যবসায়।
বিশ্বামিত্র।
[ বৈদিক ও পৌরাণিক উপাখ্যান অবলম্বনে।]
কান্যকুজদেশে গাধি নামে একজন বিখ্যাত
রাজা ছিলেন। বিশ্বামিত্র তাঁহার পুত্র।
বিশ্বামিত্র বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া পিতার
সিংহাসনে আরােহণ করিয়াছিলেন ।
একদা রাজা বিশ্বামিত্র বহুসংখ্যক সৈন্যসামন্ত
লইয়া দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইয়াছিলেন। নানা দেশ ও
জনপদ পরিভ্রমণ করিতে করিতে বিশ্বামিত্র সসৈন্য
মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে উপস্থিত হইলেন।
অতিথিসৎকার পরম ধৰ্ম্ম। অতিথি গৃহে উপস্থিত
হইলে, যে ব্যক্তি যথাশক্তি তাঁহার সেবা না করে, সে
যার পর নাই হতভাগ্য। বশিষ্ঠ পরম ধার্মিক ছিলেন।
তিনি অতি আদরসহকারে বিশ্বামিত্রকে লােকজনের

বিশ্বামিত্র।
৪১
সহিত প্রচুররূপে ভােজন করাইলেন। পথপৰ্যটনে
তাহাদের যে পরিশ্রম হইয়াছিল, ঋষির আতিথেয়তায়
তাহা সম্পূর্ণরূপে দূরীকৃত হইল।
বশিষ্ঠের একটী ধেনু ছিল। উহার নাম শবলা ।
এই কামদুঘ। অলৌকিক শক্তি ধারণ করিত। বিশ্বা-
মিত্র, মুনির নিকট ধেনুটী চাহিয়া বসিলেন। মুনি
বলিলেন,-ইনি আমার সৰ্ব্বস্ব ; ইহাকে কিছুতেই দান
করিতে পারি না। রাজ। অনেক অনুনয় করিলেন,
অনেক মূল্য দিতে চাহিলেন ; ধেনু ইচ্ছাময়ী ছিল,
সুতরাং, বশিষ্ঠ রাজার কথায় সম্মত হইতে পারিলেন
না। তখন বিশ্বামিত্র বলপূর্বক ধেনু কাড়িয়া লইতে
উদ্যত হইলেন। কিন্তু কামধেনুর তামানুষী ক্ষমতায়
রাজা হারিয়া গেলেন।
এই ঘটনায়, রাজার মনে নিৰ্বেদ উপস্থিত হইল।
তিনি ভাবিলেন,—শরীরের বলে ধিক্ ! জ্ঞানবলের
ন্যায় বল নাই। আমি এত বড় একজন রাজা হইয়াও
একজন বনবাসী ঋষির নিকট পরাস্ত হইলাম। আমার,
রাজ্য ও ঐশ্বর্য্যে ধিক্।
অতঃপর বিশ্বামিত্র রাজ্য, ধন প্রভৃতি সমস্ত পরি-
ত্যাগ করিলেন। তিনি মনে ভাবিলেন, যেমন করিয়া
হউক, আমি ব্রাহ্মণ হইব। এই প্রতিজ্ঞা করিয়া, তিনি
{

82
অধ্যবসায়।
নিবিড় বনে প্রবেশ করিয়া, একমনে সেই সনাতন
পরমেশ্বরের আরাধনা করিতে লাগিলেন।
কখন ফলাহারে কখন বা অনাহারে, বিশ্বামিত্র উগ্র
তপস্যা করিতে লাগিলেন। তাহাব দৃঢ়সংঙ্কল্প, তিনি
ব্ৰহ্মতেজ লাভ করিবেন। শীত, আতপ, বাত, বৃষ্টি
কিছুতেই তাহার দৃকপাত নাই।
কোনরূপ ক্লেশ
তাঁহাকে কর্তব্যভ্রষ্ট করিতে পারিল না। জগতের
কোনরূপ লােভ তাহার মনের গতি ফিরাইতে পারিল
এইরূপ অসীম অধ্যবসায়ী পুরুষ না করিতে
পারেন কি ? অধ্যবসায়ের জয় হইল। বিশ্বামিত্র ব্রহ্মর্ষি
হইলেন। ফলতঃ, অধ্যবসায়ে অসম্ভব সম্ভব হয়, অসাধ্য
সাধ্য হয়,--বিশ্বামিত্র এ কথার জাজ্বল্যমান প্রমাণ।

শরণাগতরক্ষণ। বিশ্বামিত্র । = annnnn রণাগতের রক্ষার জন্য বিশ্বামিত্র চির- বিখ্যাত। কেহ তাহার শরণ লইলে তাহার রক্ষার জন্য, তিনি বিধাতার বিপক্ষে দাঁড়াইতেও সঙ্কুচিত হইতেন . ত্রিশঙ্কু নামে সূৰ্য্যবংশের একজন রাজা গুরুর অবমাননা করিয়াছিলেন। এই গুরুতর অপ- রাধে সমস্ত ব্রাহ্মণ ত্রিশঙ্কুকে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। নিরুপায় হইয়া, ত্রিশঙ্কু অবশেষে বিশ্বামিত্রের শরণ লইলেন। বিশ্বামিত্র রাজাকে ভরসা দিয়া কহিলেন, মহারাজ! ভয় নাই। তুমি আমার শরণ লইয়াছ, আমি যেমন করিয়া হউক, তােমার উপকার করিব।” বিশ্বামিত্র প্রকৃতই সেই শরণাগত রাজার উপকার করিয়াছিলেন। একমাত্র বিশ্বামিত্রের অনুগ্রহেই রাজা ত্রিশঙ্কু ব্রাহ্মণের কোপানল হইতে রক্ষা পাইয়াছিলেন।

৪৪ শরণাগতরক্ষণ। হরিশ্চন্দ্র নামে একজন রাজা ছিলেন। তাঁহার সন্তান জন্মে নাই। রাজা বরুণদেবের নিকট এই বর প্রার্থনা করিয়াছিলেন যে যদি দেবতার অনুগ্রহে তাঁহার সন্তান জন্মে, তাহা হইলে, তিনি প্রথম সন্তানটী বরুণের প্রীতির উদ্দেশ্যে, বলি দিবেন। ঈশ্বরের লীলা বড় বিচিত্র। হরিশ্চন্দ্রের পুত্র জন্মিল। তিনি ক্রমে ক্রমে পুত্রের মায়ায় জড়িত হইলেন। কিরূপে অঙ্গীকার রক্ষা করিবেন, রাজা এই ভাবিয়া আকুল হইলেন। অবশেষে অজীগৰ্ত্তনামক একজন দরিদ্রকে প্রচুর ধন দিয়া, তাহার পুত্র শুনঃশেফকে কিনিয়া আনিলেন। । * রামায়ণে ইনি অম্বরীষ নামে আখ্যাত হইয়াছেন। | রামায়ণে ঋচীক নামে আখ্যাত। : শুনঃশেফ।-ঋ' ধ্বদের ১ম অষ্টকের ১ম মণ্ডলন্তৰ্গতঃ চতুর্বিংশতিসংখ্যক সূক্ত হইতে পরবর্তি কয়েকটী সূক্ত শুন:শেফ-ঋষিদৃষ্ট বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই সকল বেদমন্ত্র হইতেই পৌরাণিক উপাখ্যানের সৃষ্টি হইয়াছে। শুনঃশেফ-ঋষি বড় বিপদে পড়িয়া বলিয়াছিলেন,-“কোন্ দেবতার নাম উচ্চারণ করিব; কে আমাকে দারুণ মৃত্যুভয় হইতে পরিত্রাণ করিবেন? কোন দেবতা আমার প্রাণরক্ষা করিয়া আমাকে মাতা পিতার শ্রীচরণ দর্শন করাইবেন ?- “কোনো মহা অদিতয়ে পুনদাৎ পিতং চ দৃশেয়ং মাতরং চ।” ঋগ্বেদ।-কে দেবাে মাং মুমুয়ুং পুনরপি মহৈ মহত্যৈ অদিতয়ে পৃথিবব্য দাৎ দদ্যাৎ। তেন দানেন অহং অমৃতঃ সন্ পিতরং মাতরং চ দৃশেয়। পশ্যেয়ম্। ( সায়ণভাষ্য)। দেবতা শুনঃশেফের কাতর-বিলাপে কর্ণপাত করিয়াছিলেন। কথিত আছে, বরুণদেব স্বয়ং যজ্ঞক্ষেত্রে আবিভূত হইয়া শুনঃশেফের বন্ধনমােচন করিতে হরিশ্চন্দ্রকে আদেশ করিয়াছিলেন। বিশ্বামিত্রের উপদেশেই শুনঃশেফ বেদমন্ত্র উচ্চারণ করেন।

বিশ্বামিত্র।
৪৫
হরিশ্চন্দ্র পুত্রের পরিবর্তে এই শিশুকে বরুণের নিকট
বলি দিবার উদ্যোগ করিলেন। শিশুকালে একমাত্র
মাতাপিতাই সন্তানের রক্ষক। পিতা অর্থের লােভে
শুনঃশেফকে বিক্রয় করিয়াছিলেন ; লােকে অন্যায়রূপে
উৎপীড়িত হইলে, রাজার কাছে বিচারপ্রার্থী হয়, রাজা
নিজেই শুনঃশেফের প্রাণবিনাশে উদ্যত হইয়াছিলেন।
সুতরাং, এ জগতে এই অসহায় শিশুর দাড়াইবার স্থান
ছিল না। শিশুর অবস্থা দেখিয়া বিশ্বামিত্রের হৃদয়
গলিল। ঋষি আপনার অসীম তপস্যার বলে শুনঃশেফের
প্রাণ রক্ষা করিলেন। যাঁহার হৃদয় পরের দুঃখ দেখিয়া
এরূপ কাতর হয়, যিনি নিরাশ্রয়ের উদ্ধার করিতে এরূপ
বদ্ধপরিকর হইয়া থাকেন, তিনি যে ক্ষত্রিয়কুলে জন্ম
লইয়াও ব্রহ্মর্ষি হইবেন, তাহাতে বৈচিত্র্য কি ?

আশ্রিতরক্ষণ।
=
মহারাজ শিবি।
[ মহাভারত অবলম্বনে।
৫০০০০০০
ৰ্ব্বকালে শিবিনামে একজন পরম ধার্মিক
রাজা ছিলেন।
একদা দেবতাদিগের রাজা ইন্দ্র
এবং হুতাশন, শিবিরাজের ধার্মিকতার
পরীক্ষাকল্পনা করিলেন। অগ্নি কপাে-
তের রূপ ধরিয়া পলায়মান হইলেন; ইন্দ্র কপােতের
প্রাণসংহার করিবার জন্য শ্যেনরূপে উহার অনুসরণ
করিলেন। কপােত অবশেষে প্রাণের ভয়ে, রাজার
কোলে লুকাইল।
কপােত এইরূপে রাজার আশ্রয় লইলে, শ্যেন
কহিল, মহারাজ! শুনিয়াছি, আপনি ধার্মিক।
কপােত আমার ভক্ষ্য। বিধাতা উহাকে আমার

মহারাজ শিবি।
৪৭
উপায়।
ভক্ষ্যরূপে সৃষ্টি করিয়াছেন। অতএব আপনি কপােত,
পরিত্যাগ করুন।
রাজা উত্তর করিলেন,—“ বিহগরাজ ! এই কপােত
প্রাণের ভয়ে আমার শরণ লইয়াছে। যে ব্যক্তি শরণা-
গতকে পরিত্যাগ করে, তাহার পাপের অবধি থাকে
। আমি কিছুতেই কপােত পরিত্যাগ করিব না।
তখন শ্যেন কহিল,—“রাজন্ ! আহারই প্রাণি-
গণের জীবনধারণের একমাত্র
আহারের
অভাবে কেহই বাঁচিতে পারে না। আহাৰ্য্য প্রাপ্ত না
হইলে, আমি কেমন করিয়া জীবনধারণ করিব ? আপনি
কপােতকে পরিত্যাগ না করিলে, আমাকে অনশনে
প্রাণত্যাগ করিতে হইবে। একজনকে রক্ষা করিতে
গিয়া অপরের প্রাণনাশ করিলে পুণ্যলাভ হয় না।
অতএব আমার আহাৰ্য্য আমাকে প্রদান করুন।
রাজা কহিলেন, “যে ব্যক্তি শরণাগতকে শত্রুর
হস্তে প্রদান করে, তাহার জীবনধারণ বৃথা। সহস্র
পুণ্যকাৰ্য্য করিয়াও সে স্বর্গ লাভ করিতে পারে না।
তুমি এই কপােতের আশা পরিত্যাগ কর।
অন্য যে
কোনও মাংস আহার করিতে প্রবৃত্তি হয়, বল, আমি
তােমার জন্য তাহাই আনিয়া দিতেছি।”
শ্যেন বলিল,-“মহারাজ! অন্য কোনও মাংসে

৪৮
আশ্রিতরক্ষণ।
আমার রুচি নাই। বিধাতা আজ এই কপােতকে
আমার খাদ্যরূপে প্রেরণ করিয়াছেন, আপনি দয়া
করিয়া উহাকে পরিত্যাগ করুন।
শিবি কহিলেন,—“বরং প্রাণ দিতে পারি, তথাপি
এই শরণাগত কপােত পরিত্যাগ করিতে পারি না।
তুমি কপােতের আশা পরিত্যাগ করিয়া অন্য যাহা ইচ্ছা
প্রার্থনা কর।
শ্যেন বলিল, মহারাজ! যদি একান্তই আপনি
কপােতকে রক্ষা করিতে ইচ্ছুক হইয়া থাকেন, তাহা
হইলে, আপনার নিজের শরীর কাটিয়া আমাকে কপাে-
তের তুল্যপরিমাণ মাংস প্রদান করুন।
রাজা তৎক্ষণাৎ হাসিতে হাসিতে শ্যেনের কথা
স্বীকার করিলেন। তুলাদণ্ড আনিত হইল। রাজা
আপনার উরুর মাংস কাটিয়া কপােতের সহিত ওজন
করিলেন। কপােত ভারী হইল। তিনি আরও মাংস
কাটিলেন, এবারেও কপােতের ভার অধিক হইল।
অসাধারণ সহিষ্ণু রাজা ইহাতেও কাত হইলেন না।
তিনি আবার আপনার মাংস কাটিলেন ; কিন্তু অবশেষে
যখন দেখিলেন, এবারেও কপােত ভারী হইল, তখন
নিজেই তুলাদণ্ডে আরােহণ করিলেন ।
এই অদ্ভুত ব্যাপার অবলােকন করিয়া ইন্দ্র ও অগ্নি

মহারাজ শিবি।
৪১
যার পর নাই বিস্মিত হইয়া কহিলেন,—“মহারাজ !
আমরা ইন্দ্র ও অগ্নি ; আপনার ধার্মিকতার পরীক্ষা
করিবার জন্য, ছদ্মবেশে আপনার নিকট উপস্থিত
হইয়াছিলাম। ধন্য আপনার মহত্ত্ব, ধন্য আপনার
আশ্রিতরক্ষণ, ধন্য আপনার পরােপকার! আপনার
পুণ্যের ফল সহস্ৰমুখে বলিয়া শেষ করা যায় না।”
দেবতার অনুগ্রহে ধৰ্মাত্মা শিবি তৎক্ষণাৎ সুস্থ ও
পূর্ণদেহ হইলেন এবং অচিরে বৈকুণ্ঠলােকে গমন
করিলেন ।
০

অন্নদান।
মহর্ষি মুগল।
[ মহাভারত অবলম্বনে।
কু
রুক্ষেত্রে মুগলনামে এক ঋষি বাস
করিতেন। তিনি বড় দরিদ্র ছিলেন।
উঞ্ছবৃত্তি দ্বারা কোনরূপে জীবিকা-
নিৰ্বাহ করিতেন। ঋষি দরিদ্র ছিলেন
বটে, তথাপি, যথাসাধ্য ক্ষুধার্তকে
অন্নদান করিতেন। তাঁহার গৃহে অতিথি উপস্থিত
হইলে, তিনি নিজে উপবাসী থাকিলেও, অতিথিকে
আহার করাইতেন। ক্রমে ঋষির এই যশের কথা
চারিদিকে বিস্তৃত হইল। সকলেই বলিতে লাগিল,-
মুগল একজন মহাশয় লােক।
মহর্ষি দুর্বাসা, মুগলের এই যশের কথা শুনিয়া,
বড় বিস্মিত হইলেন। তিনি মনে ভাবিলেন, যে লোেক
আপনি খাইতে পায় না, কি করিয়া সে অপরকে

মহর্ষি মুগল। ৫১ খাইতে দেয় ! আমাকে একবার মুদগলের ধার্মিকতার পরীক্ষা করিতে হইবে। একদিন দুর্বাসা অতিথিবেশে মুগলের গৃহে উপ- স্থিত হইয়া কহিলেন,—“ আমি বড় ক্ষুধার্ত হইয়াছি। আমাকে শীঘ্র খাইতে দাও।” মুগল সন্তুষ্টচিত্তে ঋষিকে পা ধুইবার জল এবং বসিতে আসন প্রদান করিলেন। দুর্বাসা সুখে উপবিষ্ট হইলে, মুদগল তাঁহাকে অন্ন ও পানীয় প্রদান করিলেন। দুর্বাসা সমস্ত অন্ন অবিলম্বে উদরসাৎ করিলেন। মুগল তাড়াতাড়ি আবার অন্ন আনিলেন ; দুর্বাসা এবারেও সমস্ত নিঃশেষে খাইয়া ফেলিলেন। অতিথি মুদগলের গৃহস্থিত সমুদয় অন্ন ভােজন করিয়া আসন পরিত্যাগপূৰ্ব্বক আচমন করিলেন। মুগল সপরিবারে সে দিন উপবাসে কাটাইলেন। পরদিন মুদগল বহুকষ্টে আহারের যােগাড় করি- লেন, কিন্তু ভােজনকালে সেই ঋষি উপস্থিত হইয়া সমস্তই খাইয়া গেলেন। এইরূপে দুর্বাসার আগমনে, ক্রমাগত ছয় দিন মুদগলের আহার ঘটিল না। উপযু- পরি উপবাসী থাকিয়া, তাহার শরীর শীর্ণ হইয়া পড়িল, কিন্তু তথাপি, তাঁহার হৃদয়ে কোনরূপ অসন্তোষের সঞ্চার হইল না ; তথাপি মুগল, অতিথির পরিচৰ্য্যায় বিমুখ হইলেন না।

অন্নদান।
অবশেষে, দুর্বাসা সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন,
“মহাত্মন্ ! ইহলােকে আপনার মত দাতা আর দেখা
যায় না। আপনি এই মহাপুণ্যের বলে সকল লােক
জয় করিয়াছেন। স্বর্গবাসী দেবতারাও আপনার দানের
প্রশংসা করিতেছেন। আপনি অচিরে বৈকুণ্ঠে গমন
করিবেন। আমি আপনার সমাগম লাভ করিয়া পরম
আপ্যায়িত হইয়াছি।” দুর্বাসা এইরূপে মুগলের
বহুবিধ প্রশংসা করিয়া যথাস্থানে প্রস্থান করিলেন।

৩০933 ন্যায়পরতা। বিরােচন ও সুধন্বা। [ মহাভারত অবলম্বনে। ৪৬০ বিবােচন দৈত্যপতি প্রহলাদের পুত্র। সুধা ঋষিকুমার। একদিন কথায় কথায়, উভ- য়ের মধ্যে কে প্রধান, এই কথা লইয়া তুমুল কলহ উপস্থিত হইল। বিরােচন কহিলেন,—“হে দরিদ্র ঋষিকুমার ! তুমি কিছুতেই আমার সমকক্ষ নহ। তুমি কি জান , এই বিশাল পৃথিবী আমার পিতার অধিকৃত ? সুধা কহিলেন,—“ রাজকুমার ! বৃথা কেন অহঙ্কার করিতেছ? সত্য বটে, তােমার অসীম ধনবল আছে ; তোমার পিতার অধিকারও অব্যাহত, কিন্তু তাহা হইলেও, জ্ঞানবলে বলবান্ ঋষিগণের তুলনায় তুমি ক্ষুদ্রতম।”

৫৪ স্যায়পরতা। এইরূপে কথায় কথায় উভয়ের কলহ বৃদ্ধি পাইল। অবশেষে উভয়েই স্থির করিলেন, কোন উপযুক্ত মধ্য- স্থের নিকট গিয়া এ বিষয়ের মীমাংসা করিবেন। আরও স্থির হইল, যিনি বিচারে পরাস্ত হইবেন, অপরে তাহার প্রাণদণ্ড করিবেন। এইরূপ বিষম প্রতিজ্ঞা করিয়া বিবােচন কহিলেন,-“কাহাকে মধ্যস্থ মানিবে, চল, তাঁহার নিকটে যাই।” ঋষিকুমার বলিলেন,-“তােমার পিতাকেই এ বিষয়ে মধ্যস্থ করা হউক। তিনি বিচার করিয়া যাহা কহিবেন, আমি তাহাতেই স্বীকৃত হইব। বিয়ােচন মনে মনে বড় সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি ভাবিলেন,—পিতা কখনই আমার জীবনের মায়া পরি- ত্যাগ করিয়া সুধম্বার পক্ষ অবলম্বন করিবেন না। এই ভাবিয়া, তিনি তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিলেন। উভয়ে প্রহলাদের নিকট উপস্থিত হইলে, বিরােচন বলিলেন,—“পিতঃ ! আমরা প্রাণ পণ রাখিয়া, এক বিষয়ের বিচারপ্রার্থী হইয়া আপনার নিকটে উপস্থিত হইয়াছি। আমাদের দুই জনের মধ্যে কে প্রধান, আপনাকে তাহার মীমাংসা করিতে হইবে। আমাদের মধ্যে যিনি হীন বলিয়া অবধারিত হইবেন, অন্যে তাঁহার প্রাণসংহার করিবেন। দৈত্যপতি প্রহ্লাদ পুত্রকে সম্বােধন করিয়া কহি-

বিরােচন ও সুধন্য।
!
?
যে ব্যক্তি
লেন,—“ বিরােচন! আমি তোেমাকে খুব ভালবাসি
সন্দেহ নাই, কিন্তু কি করিব ? স্ত্রী বল, পুত্র বল, ধর্মের
ন্যায় বন্ধু নাই। আমি পুত্রের জীবনের অনুরােধে
অতুল ধৰ্ম্মধন পরিত্যাগ করিতে পারিব না।
বিচারকালে স্বার্থের অনুরােধে অন্যায় পক্ষের সমর্থন
করে, তাহার সকল ধৰ্ম্ম নষ্ট হইয়া যায়। আমার বিবে-
চনায়, তুমি কিছুতেই ঋষিকুমারের সমান হইতে পার
। তুমি নিশ্চয় জানিও, ধন অপেক্ষা জ্ঞান প্রধান, বিদ্যা
অপেক্ষা সৎকাৰ্য্য গুরুতর, আর ধর্ম সকলের শ্রেষ্ঠ।
সত্য বটে, তুমি রাজকুমার, কিন্তু ধৰ্ম্মবলে বলবান্ ঋষি-
পুত্র তােমার অপেক্ষা সহস্রগুণে প্রধান। তুমি বাদে
পরাস্ত হইয়াছ। ”
প্রলাদের এই ন্যায়পরতা দর্শন করিয়া সুধন্বা যার
পর নাই সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি কহিলেন,—“মহারাজ!
আমি আপনার ন্যায্য কথায় পরম সন্তুষ্ট হইয়াছি।
ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। বিবােচনের জীবন নাশ
করিয়া, আপনার হৃদয়ে বেদনা দিলে, আমার বড়ই পাপ
হইবে।
আপনার পুত্র আপনি গ্রহণ করুন। আমি
তাহার কেশাগ্রও স্পর্শ করিব না।” এই বলিয়া,
সুধন্বা চলিয়া গেলেন।
।

ag
পরস্বগ্রহণ।
শঙ্খ ও লিখিত।
{ মহাভারত অবলম্বনে।]
০০০০০০০০০
ঙ্খ ও লিখিত দুই সহােদর ছিলেন।
বাহুদা নদীর তীরে পৃথক পৃথক্‌ আশ্রমে
থাকিয়া, উভয়ে তপস্যা করিতেন।
এক দিন লিখিত জ্যেষ্ঠের সহিত
সাক্ষাৎ করিবার ইচ্ছা করিয়া, তাঁহার
আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। শঙ্খ তখন আশ্রমে ছিলেন
। পথ হাঁটিয়া লিখিতের বড় ক্ষুধা উপস্থিত
হইয়াছিল। তিনি কাতর হইয়া ইতস্ততঃ আহার
অন্বেষণ করিতে লাগিলেন।
আশ্রমে অনেক ফলের গাছ ছিল। ঐ সকল বৃক্ষে
বারমাস নানা জাতীয় ফল থাকিত। ফল দেখিয়া,
লিখিতের বড় আনন্দ হইল। তিনি একটা গাছ হইতে
অবিলম্বে কতকগুলি ফল পাড়িলেন। লিখিত আহার

শঙ্খ ও লিখিত।
করিতে বসিলে, শঙ্খ আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে ফলভােজন করিতে দেখিয়া, শঙ্খ
জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ভ্রাতঃ ! তুমি এই সকল ফল
কোথায় পাইলে ?” লিখিত হাসিতে হাসিতে উত্তর
করিলেন,—“মহাশয়! আমি ক্ষুধায় বড় পীড়িত হইয়া-
ছিলাম; সেই জন্য, আপনার আশ্রমস্থ বৃক্ষ হইতে এই
সকল ফল আহরণ করিয়া ভােজন করিতেছি।”
শঙ্খ কহিলেন,—“ভ্রাতঃ, তুমি অতি গর্হিত কাৰ্য্য
করিয়াছ।
না বলিয়া পরস্ব গ্রহণ করিলে, চুরি করা
হয়। আমাকে না বলিয়া ফলভােজন করাতে, তুমি
চোর হইয়াছ। চুরি করা মহাপাপ। যদি এই
মহাপাপ হইতে উদ্ধার পাইতে চাও তাহা হইলে,
সত্বর রাজার নিকটে যাও; সেখানে সরলভাবে আপনার
অপরাধ প্রকাশ করিয়া, দণ্ড প্রার্থনা কর।
অগ্রজের কথা শুনিয়া, লিখিত অবিলম্বে রাজার
নিকটে উপস্থিত হইলেন। রাজার নাম সুম। ঋষির
আগমনের কথা শুনিয়া, তিনি অবিলম্বে দ্বারদেশে
উপস্থিত হইয়া কহিলেন,—“ভগবন্! কি নিমিত্ত
আপনার আগমন হইয়াছে ? আজ্ঞা করুণ, আমাকে কি
করিতে হইবে ?” লিখিত উত্তর করিলেন,—“মহারাজ।
আমি চোর ! না কহিয়া জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আশ্রম

পরস্বগ্রহণ।
হইতে ফল লইয়া ভােজন করিয়াছি। আপনি আমাকে
যথােচিত শাস্তি প্রদান করুন ”
সুন্ন কহিলেন,—“মহাশয় ! রাজা ইচ্ছা করিলে
অপরাধীর দোষ ক্ষমা করিতে পারেন। আপনি
ব্ৰতপরায়ণ ঋষি ; না জানিয়া একটা অপরাধ করিয়া
ফেলিয়াছেন, আমি আপনাকে ক্ষমা করিলাম।
আপনার আর যাহা ইচ্ছা, প্রকাশ করুন।
লিখিত কহিলেন,—“মহারাজ ! আমি আর কিছুই
প্রার্থনা করি না। প্রায়শ্চিত্ত না করিলে পাপের ক্ষয়
হয় না। মূঢ়েরাই পাপ করিয়া ঢাকিয়া রাখে। আমার
বিশেষ অনুরােধ, আপনি আমাকে যথাশাস্ত্র শাসন
করুন।”
এইরূপ একান্তনিৰ্বন্ধে পড়িয়া, রাজা লিখিতের
দুই হাত কাটিয়া দিলেন। তিনি ছিন্নহস্তে ভ্রাতার
নিকটে উপস্থিত হইয়া সকল কথা খুলিয়া বলিলেন।
শঙ্খ কহিলেন,—* ভ্রাতঃ! উত্তম হইয়াছে, তােমার
পাপক্ষয় হইয়াছে ; এক্ষণে নদীতে গিয়া তর্পণ কর।”
অগ্রজের আজ্ঞানুসারে লিখিত নদীর তীরে
উপস্থিত হইয়া জলে অবতীর্ণ হইলেন ; অনন্তর, যেমন
জল লইয়া তৰ্পণ করিতে ইচ্ছা করিলেন, অমনি ঈশ্বরের
অপার অনুগ্রহে, তাহার ছিন্নহস্ত পুনর্বার প্রাপ্ত হইলেন।

শঙ্খ ও লিখিত।
লিখিত বড় বিস্মিত হইলেন এবং শঙ্খের নিকটে
গিয়া তাঁহাকে হাত দুইটী দেখাইলে শঙ্খ কহিলেন,-
“ভ্রাতঃ ! ইহাতে অন্য কোনও আশঙ্কা করিও না।
আপনার তপস্যার বলে ও তােমার সরল ব্যবহার দর্শনে,
ঈশ্বর তােমাকে অনুগ্রহ করিয়াছেন। প্রায়শ্চিত্ত না
করিলে পাপের ক্ষয় হয় না।
রাজা দণ্ডের কর্তা, সেই
জন্য তােমাকে রাজার কাছে পাঠাইয়াছিলাম। তিনি
শাস্তি দেওয়াতে, তােমার সকল পাপ দূর হইয়াছে।”
পরের দ্রব্য দূরে থাকুক, না বলিয়া জ্যেষ্ঠ সহােদরের
দ্রব্য গ্রহণ করিয়া, লিখিতের মত মহর্ষিকেও, চোর
হইতে হইয়াছিল।
2ass

দান—প্রতিশ্রুতিরক্ষণ।
হরিশ্চন্দ্র।
[ মার্কণ্ডেয় পুরাণ অবলম্বনে।]
তাযুগে হরিশ্চন্দ্ৰনামে একজন রাজা
ছিলেন। হরিশ্চন্দ্রের শাসনসময়ে প্রজা-
গণের সুখের অবধি ছিল না। দুর্ভিক্ষ,
ব্যাধি প্রভৃতির উপদ্রপ ছিল না। প্রজা-
গণের হৃদয়ে পাপের লেশমাত্র ছিল না।
রাজা ধার্মিক হইলে, প্রজাগণ পরমসুখে কালযাপন
iphronhinn
একদিন হরিশ্চন্দ্র বনে মৃগয়া করিতে গিয়াছিলেন।
তিনি মৃগের অনুসন্ধানে ইতস্ততঃ বেড়াইতেছেন,
অকস্মাৎ শুনিতে পাইলেন, কয়েকটী স্ত্রীলােক রক্ষা
কর, » « রক্ষা কর” বলিয়া আর্তস্বরে চীৎকার করিতেছে।
বিপন্নের কাতরকণ্ঠ শুনিয়া রাজার হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক
হইল। তিনি ডাকিয়া কহিলেন,—“ভয় নাই। আমার

দান-প্রতিশ্রুতিরক্ষণ। অধিকারের মধ্যে কোন্ দুষ্টলােক এরূপ অন্যায় কাৰ্য্য করিতেছে ? আমার শরে কাহার মরিতে সাধ হই- য়াছে ?”—এই বলিয়া, রাজা অগ্রসর হইলেন। বিশ্বামিত্র মুনি তখন অসিদ্ধবিদ্যা সাধন করিতে- ছিলেন। বাস্তবিকই কোন রমণী তৎকালে চীৎকার করেন নাই। ঐ সকল বিদ্যাই বিশ্বামিত্রের উগ্র তপ- স্যার প্রভাবে কাদিয়াছিল। হরিশ্চন্দ্রের কথা শুনিয়া, বিশ্বামিত্র রুষ্ট হইয়া- ছিলেন। তিনি ক্রুদ্ধ হইবামাত্র, বিদ্যাসকল অদৃশ্য হইয়া গেল। ইহাতে তাহার আরও ক্রোধ উপস্থিত হইল। এই সময়ে, রাজা হরিশ্চন্দ্র বিশ্বামিত্রের সম্মুখে উপ- স্থিত হইলেন। মুনিকে দেখিয়া তাহার ভয় হইল। তিনি ভাবিলেন,--আমি ঋষির প্রতি এরূপ কঠোর কথা বলিয়া অতি অন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছি। ভয়ে হরিশ্চন্দ্রের শরীর কঁপিতে লাগিল। বিশ্বামিত্র তাহাকে দেখিয়াই ক্রোধভরে কহিলেন,—“দুরাত্মন্! দাড়া, তাের অহঙ্কার ভাঙ্গিতেছি। হরিশ্চন্দ্র মুনিকে প্রণাম করিয়া সবিনয়ে কহি- লেন,—* প্রভাে ! আমার উপর অকারণে ক্ৰোধ করি- বেন না। দান, রক্ষা এবং ধর্মশাস্ত্রমতে যুদ্ধ করা রাজা-

হরিশ্চন্দ্র।
স
দিগের কর্তব্য। আমি বিপন্ন-ব্যক্তিকে রক্ষা করিতে
অগ্রসর হইয়াছি ; সুতরাং, আপনি আমাকে ক্ষমা
করুন।
বিশ্বামিত্র কহিলেন, মহারাজ! যদি তােমার
অধর্মের প্রতি ভয় থাকে, তাহা হইলে শীঘ্র বল,
কাহাকে দান করা উচিত ? কাহাকে রক্ষা করিতে
হইবে এবং কাহার সহিত যুদ্ধ করা কর্তব্য ?
রাজা উত্তর করিলেন,—দরিদ্রদিগকে দান করিবে,
ভয়ার্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করিবে এবং রাজদ্রোহিগণের
সহিত যুদ্ধ করা কর্তব্য।
বিশ্বামিত্র কহিলেন,“মহারাজ! আমি যাচক ব্রাহ্মণ;
যজ্ঞ করিব, আমাকে যজ্ঞের দক্ষিণা প্রদান কর।
রাজা এই কথা শুনিয়া বড় সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি
কহিলেন,-ভগবন্! বলুন, আপনাকে কি দিতে হইবে ?
স্বর্ণ, রত্ন, স্ত্রী, পুত্র, আমার নিজের দেহ,—আপনি
যাহা চাহিবেন, তাহাই দিব।
বিশ্বামিত্র কহিলেন,-মহারাজ! তুমি যাহা দিবে,
আমি তাহাই গ্রহণ করিব ; অগ্রে আমাকে যজ্ঞের
দক্ষিণা দাও।
রাজা কহিলেন,—তাহা ত দিবই। তদ্ব্যতীত
আপনার আর কি চাই, বলুন।

দান—প্রতিশ্রুতিরক্ষণ।
বিশ্বামিত্র বলিলেন, তােমার স্ত্রী, পুত্র, শরীর এবং
ধৰ্ম্ম ছাড়া আর যাহা কিছু আছে, সমস্ত আমাকে প্রদান
কর।'
রাজা হৃষ্টমনে তৎক্ষণাৎ তাহাই হইবে বলিয়া
সম্মত হইলেন। তখন বিশ্বামিত্র বলিলেন, তুমি ত
আমাকে তােমার সমস্ত দিয়াছ ; এক্ষণে বল দেখি, কে
প্রভু হইল ?
রাজা কহিলেন,“যখন আপনি সমস্ত রাজ্যের অধি-
কারী হইয়াছেন, তখন, আপনিই প্রভু।
বিশ্বামিত্র কহিলেন, তবে সমস্ত বসনভূষণ পরি-
ত্যাগ করিয়া সত্বর স্ত্রী পুত্র লইয়া আমার অধিকার
হইতে দূর হও।
রাজা, স্ত্রী এবং একমাত্র শিশুপুত্র লইয়া রাজ্য
ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলেন। এই অবসরে,
বিশ্বামিত্র তাঁহার পথ অবরােধ করিয়া কহিলেন,—তুমি
আমাকে যজ্ঞ-দক্ষিণা না দিয়া কোথায় যাইতেছ ? হরি-
শ্চন্দ্র কহিলেন,“ভগবন্! আমার যাহা কিছু ছিল,
সমস্ত আপনাকে দিয়াছি। এক্ষণে স্ত্রী, পুত্র এবং আমার
শরীরমাত্র অবশিষ্ট আছে।
বিশ্বামিত্র কহিলেন—আমি ওকথা শুনিতে চাই

৬৪ হরিশ্চন্দ্র। না। তুমি অবিলম্বে যজ্ঞ-দক্ষিণ দাও। দান, রক্ষণ এবং যুদ্ধ রাজাদিগের কর্তব্য বলিয়া তুমিই বলিয়াছ । রাজা কহিলেন,“ভগবন্! সম্প্রতি আমার কিছুই নাই। অতএব দয়া করিয়া আমাকে কিছু সময় প্রদান করুন। বিশ্বামিত্র কহিলেন,—আমাকে কতকাল প্রতীক্ষা করিতে হইবে, শীঘ্র বল। অন্যথা আমার শাপানলে দগ্ধ হইবে। রাজা কহিলেন,আপনি আমাকে একমাস সময় প্রদান করুন। মাসান্তে যেরূপে পারি, আপনার দক্ষিণা দিব। মুনি বলিলেন—ভাল, তাহাই হইবে। যাও, পথে তােমার মঙ্গল হউক। তােমার শত্রুগণ বিনষ্ট হউক। রাজা স্ত্রী পুত্র লইয়া নগরের বাহির হইলেন। রাজ- ভােগে যাঁহারা দিনযাপন করিতেন, আজ তাঁহারা পথের ভিখারী। প্রজাগণ রাজার অবস্থা দেখিয়া হাহাকার করিতে লাগিল। তাহারা একবাক্যে বলিতে লাগিল,- * মহারাজ! আপনি আমাদিগকে সঙ্গে লইয়া চলুন। হা নাথ! হা প্রভু! আপনি কোন অপরাধে আমা- দিগকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতেছেন ?”—প্রজাগণ এইরূপে বিবিধ বিলাপ করিতে লাগিল। তাহাদের

দান-প্রতিশ্রুতিরক্ষণ।
কাতরকণ্ঠ শুনিয়া রাজার করুণহৃদয় আর্দ্র হইল। তিনি
ক্ষণকাল দাড়াইলেন। অমনি বিশ্বামিত্র কঠোরস্বরে
কহিলেন,-“দুরাচার ! তােমাকে ধিক্‌! তুমি আমাকে
রাজ্য দান করিয়া পুনরায় উহা গ্রহণ করিতে ইচ্ছা
করিতেছ ?” রাজা বিশ্বামিত্রের ভয়ে কঁপিতে কঁপিতে
কহিলেন,—“যাইতেছি।” এই বলিয়া, তিনি রাণীর
হস্তধারণপূর্বক অগ্রসর হইলেন। সুকুমারী রাজমহিষী
পথশ্রমে বড় কাতর হইয়াছিলেন। ইহাতেও হরিশ্চন্দ্রের
হৃদয় বিচলিত হইল না।
?
রাজা হরিশ্চন্দ্র, শিশুপুত্র ও রাণীর সহিত বারা-
ণসীতে উপস্থিত হইলেন। এদিকে একমাসকাল পূর্ণ
হইয়া আসিল। তিনি বারাণসীতে উপস্থিত হইয়া
দেখিলেন, বিশ্বামিত্র অগ্রেই সেখানে উপস্থিত হইয়া-
ছেন। রাজা একান্ত বিনীতভাবে বিশ্বামিত্রের অভ্যর্থনা
করিলেন। বিশ্বামিত্র কহিলেন,—“মহারাজ! মাস পূর্ণ
হইয়াছে।
এক্ষণ আমাকে প্রতিশ্রুত দক্ষিণা প্রদান
কর।
হরিশ্চন্দ্ৰ কহিলেন,—“ভগবন্! অদ্যই মাস পূর্ণ
হইবে।
অতএব দিবসের অবশিষ্ট সময়টুকু অপেক্ষা
করুন। আমি দক্ষিণা সংগ্রহ করিতেছি।”

হরিশ্চন্দ্র।
লেন,—কিরূপে
বিশ্বামিত্র কহিলেন,--‘ভাল, তাহাই হইবে। আম
পুনরায় আসিব। কিন্তু যদি অদ্য দক্ষিণা প্রদান না কর,
তাহা হইলে, তােমাকে অভিশাপ দিব।”
বিশ্বামিত্র চলিয়া গেলে, রাজা চিন্তা করিতে লাগি-
আমি প্রতিশ্রুত দক্ষিণা প্রদান
করিব ? আমার যে কিছুমাত্র সম্বল নাই! যদি
অঙ্গীকার প্রতিপালন না করিয়া প্রাণত্যাগ করি,
তাহাতেও আমার নিষ্কৃতি নাই। যাহারা প্রতিশ্রুত
প্রদান না করে, নিশ্চয়ই তাহাদের অধােগতি হয়।
আমি দাসত্ব করিব, আপনাকে বিক্রয় করিয়া ঋষির ঋণ
পরিশােধ করিব।
রাজা নিতান্ত কাতর হইয়া অধােমুখে এইরূপ
ভাবনা করিতেছেন দেখিয়া, রাজমহিষী কহিলেন,
“মহারাজ! চিন্তা পরিহার করিয়া সত্য পালন করুন।
সত্যহীন ব্যক্তি শ্মশানের মত পরিত্যাজ্য। সত্য রক্ষা
অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম আর নাই। মিথ্যাবাদীর দান,
অধ্যায়ন প্রভৃতি সকলই বৃথা।” এই বলিয়া রাজমহিষী
কঁদিতে কঁদিতে কহিলেন,-“ মহারাজ ! আমাকে
বিক্রয় করিয়া যে ধন পাইবেন, তদ্বারা ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা
প্রদান করুন।
রাজা এই কথা শুনিয়া মর্মাহত হইলেন। এই
-
3)

দান-প্রতিশ্রুতিরক্ষণ।
সময়ে হরিশ্চন্দ্রের শিশুপুত্র ক্ষুধায় কাতর হইয়া
বলিতে লাগিল,—“বাবা! আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে।
কিছু খাইতে দাও।”
এমন সময়ে বিশ্বামিত্র আসিয়া সেখানে উপস্থিত
হইয়া বলিলেন,-“ রাজন্ ! আমাকে যজ্ঞ-দক্ষিণা দাও।
সত্যের ন্যায় ধৰ্ম আর নাই। অতএব তুমি তােমার
সত্য পালন কর। যদি সূর্যাস্তের পূর্বে আমাকে প্রতি-
শ্রুত যজ্ঞ: দক্ষিণা প্রদান না কর, তাহা হইলে, নিশ্চয়ই
আমি তােমাকে অভিশাপ প্রদান করিব।”—বিশ্বামিত্র
এই বলিয়া প্রস্থান করিলেন।
বিশ্বামিত্র চলিয়া গেলে, রাজা একান্ত অধীর হইয়া
পড়িলেন। তিনি কি করিবেন, কিছুই স্থির করিতে
পারিলেন না। রাণী কহিলেন,-“মহারাজ! আমি
যাহা বলিতেছি, তাহা করুন। আমাকে বিক্রয় করিয়া
ঋষির ঋণ পরিশােধ করুন।
মহিষীর একান্ত অনুরোধ এড়াইতে না পরিয়া
রাজা কহিলেন,—“ ভদ্রে, আমি তােমাকে বিক্রয়
করিব । অতি নিষ্ঠরেরাও যাহা পারে না, আমি তাহা
করিব।” এই বলিয়া তিনি বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে বলিতে লাগি-
লেন, হে নগরবাসিগণ! আমি আমার প্রাণাধিকা
প্রেয়সীকে বিক্রয় করিতে আসিয়াছি। যদি তােমাদের
2)

হরিশ্চন্দ্র। কাহারও দাসী ক্রয় করিবার প্রয়ােজন থাকে, তাহা হইলে শীঘ্র বল। এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আসিয়া বলিলেন, “ আমার দাসীর প্রয়ােজন আছে। আমার ব্রাহ্মণী সুকুমারী, গৃহকর্ম করিতে পারেন না। আমার ধনের অভাব নাই। উপযুক্ত মূল্য দিতেছি, লইয়া আমাকে দাসী প্রদান ) ব্রাহ্মণ এই বলিয়া, রাজার পরিহিত বল্কলের প্রান্ত- ভাগে, দৃঢ়রূপে ধন বাঁধিয়া দিল এবং রাণীর কেশে ধরিয়া টানিয়া লইয়া চলিল। মাতাকে এইরূপে লইয়া যাইতে দেখিয়া রাজকুমার তদীয় বসনপ্রান্ত ধরিয়া আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন রাজমহিষী সেই ব্রাহ্মণকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন,—“ আৰ্য্য ! একটু অপেক্ষা করুন। এই শিশুকে আর দেখিতে পাইব না, ইহাকে একবার দেখিয়া লই।” তৎপরে তিনি পুত্রকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন,—“ বাছা! আমি এখন দাসী হইয়াছি। আমাকে স্পর্শ করিতে নাই।” শিশু মাতার কথা শুনিল না। সে, মামা বলিয়া, কাদিতে দিতে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল। কঠোরহৃদয় ব্রাহ্মণ বালককে অগ্রসর হইতে দেখিয়া, তাহাকে পদাঘাত করিলেন। তথাপি বালক জননীকে ছাড়িল না।

দান—প্রতিশ্রুতিরক্ষণ।
2
তৎপরে রাণীর একান্ত অনুনয়ে, ব্রাহ্মণ, বালককেও
ক্রয় করিয়া লইয়া গেলেন। স্ত্রীপুত্রকে এই ভাবে লইয়া
যাইতে দেখিয়া, রাজা আপনাকে ধিক্কার দিয়া হাহাকার
করিতে লাগিলেন।
সেই সময়ে বিশ্বামিত্র রাজার নিকটে উপস্থিত
হইয়া দক্ষিণা চাহিলেন। স্ত্রীপুত্র বিক্রয় করিয়া রাজা
যাহা কিছু পাইয়াছিলেন, সমস্তই বিশ্বামিত্রকে দিলেন।
কিন্তু তাহা ঋষির মনঃপূত হইল না। তিনি ক্রোধভরে
কহিলেন, “রে অধম ! এই সামান্য ধনই কি আমার
উপযুক্ত যজ্ঞ-দক্ষিণা? যদি তাহাই মনে করিয়া থাকিস্
তাহা হইলে, আমার তপস্যার বল দেখ।
রাজা কহিলেন,—“ভগবন্! আমি অবশিষ্ট দক্ষিণাও
প্রদান করিব। কিন্তু সম্প্রতি আমার যে কিছুই
নাই। আমি স্ত্রী ও শিশু-পুত্রকে বিক্রয় করিয়াছি!
বিশ্বামিত্র বলিলেন,- দিবসের আর অল্পমাত্র সময়
অবশিষ্ট আছে। এই কালের মধ্যে যেরূপে হউক,
আমায় দক্ষিণ প্রদান করিতে হইবে।”—এই বলিয়া
তিনি প্রস্থান করিলেন।
রাজা শশাকে দুঃখে একান্ত কাতর হইয়া, উচ্চৈস্বরে
কহিতে লাগিলেন,—“ধন দিয়া দাস ক্রয় করিতে যদি
কাহারও অভিলাষ থাকে, তিনি সূর্য অস্ত যাইবার পূর্বে

হরিশ্চন্দ্র।
কহিল,
আমাকে ক্রয় করুন।” এই কথা শুনিয়া, এক বিকৃত--
দর্শন চণ্ডাল আসিয়া কহিল, ---“আমার দাসের প্রয়ােজন
আছে ! বল, কত মূল্য দিতে হইবে ?” সেই
চণ্ডালের আকৃতি দেখিয়া ও কথা শুনিয়া, রাজার মনে
বড়ই ঘৃণা উপস্থিত হইল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,
তুমি কে ?”
চণ্ডাল
আমার নাম প্রবীর। আমি
জতিতে চণ্ডাল ;
শ্মশান হইতে মৃতব্যক্তিগণের
কম্বলপ্রভৃতি সংগ্রহ করি।”
বিশ্বামিত্র তৎকালে সেখানে উপস্থিত হইয়া
কহিলেন,—“এই চণ্ডাল তােমাকে অধিক ধন দিয়া
ক্রয় করিতে
উদ্যত হইয়াছে ;
হইয়াছে ; অতএব তুমি
আপনাকে বিক্রয় করিয়া আমার যজ্ঞ-দক্ষিণা
প্রদান কর।”
রাজা কহিলেন,—“ভগবন!
ভগব! পবিত্র সূৰ্য্যবংশে
আমার জন্ম হইয়াছে। সামান্য ধনের লালসায় কিরূপে
চণ্ডালের দাসত্ব স্বীকার করিব ?” রাজা ঋষির পায়ে
ধরিয়া অনেক কাদিলেন, অনেক অনুনয় করিলেন এবং
কহিলেন,—“ভগবন! আমি আপনারই দাস হইব ।
আমার প্রতি প্রসন্ন হউন। আমি প্রাণ গেলেও
চণ্ডালের দাসত্ব করিতে পারিব না।”

দান-প্রতিশ্রুতিরক্ষণ। ৭১ বিশ্বামিত্র কহিলেন,—“ভাল, তুমি আমারই দাস হইলে। আমি তােমাকে ধন লইয়া চণ্ডালের নিকট বিক্রয় করিলাম।” এইরূপ বলিতেই চণ্ডাল মুনিকে ধন দিয়া হরিশ্চন্দ্রকে বাঁধিয়া লইয়া চলিল এবং তাহাকে দণ্ডদ্বারা প্রহার করিতে লাগিল। সেই চণ্ডালের গৃহে থাকিয়া রাজা হরিশ্চন্দ্র দুঃখে, লজ্জায়, স্ত্রীপুত্রের বিরহে কত কঁদিতেন, কত ভাবিতেন। তিনি এক এক বার মনে করিতেন,হয় ত আমার স্ত্রী, আমার শিশুপুত্রের মলিন মুখখানি দেখিয়া মনে করেন, আমি ধন দিয়া শীঘ্রই তাহাদিগের উদ্ধার করিব। হায় ! তিনি জানেন না যে, আমার কি দশা উপস্থিত হইয়াছে। আমি আজ চণ্ডালের দাসত্ব করিতেছি। কিছু দিন পরে সেই চণ্ডাল, রাজাকে মৃতলােকের বস্ত্র সংগ্রহ করিতে শ্মশানে নিযুক্ত করিল। এদিকে সর্পদংশনে হরিশ্চন্দ্রের লেই একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হইল। রাণী মৃতপুত্রকে ক্রোড়ে লইয়া শ্মশানে উপস্থিত হইলেন। চণ্ডালবেশধারী হরিশ্চন্দ্রও বস্ত্রাদি গ্রহণ করিবার আশয়ে, সেখানে উপস্থিত হই- লেন। দুঃখে দুঃখে ইহাদের আকৃতির এতই পরিবর্তন হইয়াছিল যে, প্রথমে কেহই কাহাকে চিনিতে পারি- १२ হরিশ্চন্দ্র। লেন না। শেষে, উভয়েই উভয়কে চিনিতে পারিলেন। দুইজনেই পুত্রশােকে অধীর হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। শীঘ্রই চিতা প্রস্তুত হইল। মৃতপুত্রকে চিতার উপর স্থাপন করিয়া রাজা ও রাণী, একবার প্রাণ ভরিয়া, সেই সনাতন পরমেশ্বরের নাম লইলেন। এই সময়ে, স্বয়ং ধৰ্ম্ম ও অন্যান্য সকল দেবতা আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। ধৰ্ম্ম কহিলেন,—“মহারাজ ! ক্ষান্ত হও; মরিও না! আমি স্বয়ং ধৰ্ম্ম তােমার নিকটে আসি- আছি। তুমি সহিষ্ণুতা, জিতেন্দ্রিয়তা ও সত্যপালন- প্রভৃতি গুণে আমাকে বড়ই সন্তুষ্ট করিয়াছ। তুমি স্ত্রীপুত্রের সহিত পরম সম্মতি প্রাপ্ত হইবে। ” অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র আকাশ হইতে অমৃত বর্ষণ করিলেন। মহাত্মা হরিশ্চন্দ্রের সেই মৃতপুত্র সুন্দর ও সুস্থ শরীরে পুনরায় বাঁচিয়া উঠিল। রাজা ও রাণী আনন্দে অধীর হইয়া পুত্রকে আলিঙ্গন করিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র হরিশ্চন্দ্রকে স্বর্গে যাইতে অনুরােধ করিলেন। হরিশ্চন্দ্র কহিলেন,—“প্রজাগণ আমার বিচ্ছেদে কাতর হইয়াছে। তাহারা আমার ভক্ত। আমি কিরূপে আশ্রিতজনকে পরিত্যাগ করিয়া অদ্য স্বর্গে গমন করিব ? যদি আমার ঐ সকল ভক্ত ও ?

দান--প্রতিশ্রুতিরক্ষণ।
?
অনুরক্ত প্রজাগণকে আমার সহিত যাইতে অনুমতি
প্রদান করেন, তাহা হইলে, আমি স্বর্গে যাইব। তাহা-
দিগকে লইয়া আমি নরকে বাস করিতে প্রস্তুত আছি,
তথাপি অনুগত আশ্রিতজনকে পরিত্যাগ করিব না।”
ইন্দ্র কহিলেন,-“মহারাজ ! তাহাদের পৃথক পৃথক্‌
বহুবিধ পাপপুণ্য আছে। তাহারা কিরূপে আপনার
সঙ্গে যাইবে ?” রাজা কহিলেন,-“দেবরাজ ! আমি
যে কিছু পুণ্যকাৰ্য্য করিয়াছি, আমার ঐ সকল আত্মীয়-
গণও তাহার ফলভাগী হউন। আমি তাঁহাদিগকে
আমার সমস্ত পুণ্যফল ভাগ করিয়া দিলাম।” সকলে
তাহাতেই সম্মত হইলেন।
পুত্রকে অযধ্যার সিংহাসনে স্থাপন করিয়া, রাজা
হরিশ্চন্দ্র, আপনার ভক্তগণের সহিত স্বর্গারােহণ
করিলেন।
ভগবান্ শুক্রাচার্য্য বলিয়া গিয়াছেন,—“হরিশ্চন্দ্রের
সমান রাজা কখন হয় নাই, হইবেও না। সহিষ্ণুতার
কি মাহাত্ম্য ! দানের কি মহাফল! দেখ, রাজা
হরিশ্চন্দ্র দান ও সহিষ্ণুতার বলে অতুল ইন্দ্রলোক
প্রাপ্ত হইলেন।
s
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sadhu-charit Ed. 8th

Author
Bhattacharyya, Bhubanmohan
Title
Sadhu-charit Ed. 8th
File name
Sadhu-charit Ed. 8th
Text
OCR done
Citation
1911
Published
2010/02/16
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
92
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Lyrics
Keywords
Gurubhakti
DLI number
511340
Barcode
4990010018497.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
9SWo3Z6NLkK
Download PDF

Sadhu-charit Ed. 8th