Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Pranati
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রণতি
শ্রীহট্ট মুরারিচাদ কলেজের ভূতপূর্ব অধ্যাপক ও অস্থায়ী অধ্যক্ষ,
ধ্যানযােগ, বাসন্তী গীতা, Whispers and Heart-Beats
প্রভৃতি প্রণেতা, শ্রীমদ্ভাগবতগীতার সংস্কৃত টীকাকার
ও ইংরেজী অনুবাদক, তত্ত্বরত্ন-বিদ্যাভূষণােপাধিক
শ্রীশচন্দ্র বেদান্তভূষণ, ভাগবতরত্ন, বি-এ
প্রণীত
কলিকাতা
বঙ্গাব্দ ১৩৪৩, খ্রীষ্টাব্দ ১৯৩৭
মূল্য-কাগজের কভার ॥৩, কাপড়ের বাঁধাই ॥yo।
এই সংস্করণের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ত্রিপুরা হিতসাধিনী সভার
বিল্ডিং ফণ্ডে অর্পিত হইবে।
১।
প্রাপ্তিস্থান :-
গ্রন্থকার, প্রতিভা কুটীর’, ১২নং পেয়ারাবাগান স্ট্রীট,
পােঃ আঃ বিডন ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
অধ্যাপক জগচ্চন্দ্র পাল, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ,
পােঃ আঃ যাদবপুর, জেলা ২৪-পরগণা।
৩। ত্রিপুরা হিতসাধিনী সভার অফি,
১৩৭ নং বহুবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা।
৪। চুন্টা-প্রকাশ অফিস,
১১নং এজরা খ্রীট, কলিকাতা।
কলিকাতা, ২৫ নং ডি, এল, রায় ষ্ট্রীট, কালিকা প্রেম হইতে
শ্রীশশধর চক্রবর্তী কর্তৃক মুদ্রিত
এবং
১নং বৃন্দাবন বােসের লেন হইতে শ্ৰীঅশ্বিনীকুমার চক্রবর্তী এম,এ কর্তৃক
প্রকাশিত।
প্রকাশকের নিবেদন শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত শ্ৰীশচন্দ্র বেদান্তভূষণ মহাশয়ের “প্রণতির মুদ্রণ ও প্রকাশ উপলক্ষবিশেষকে আশ্রয় করিয়া একটা সাড়ম্বর অনুষ্ঠান নয়। সারাজীবন নিভৃতে হৃদয়করে তিনি যে চিরসুন্দর স্বপ্রকাশ রসস্বরূপের আনন্দময় স্পর্শ অনুভব করিয়াছেন,—যাহার মনােমোহন আহ্বানে মােহিত হইয়া তিনি সপ্ৰেম অন্বেষণ ও অভিসারের মধুপান করিয়াছেন—যাহার ক্ষণিক বিরহে ক্ষুব্ধ অভিমানে বলিয়াছেন “আর কি আসিবেনা ?”—মায়াস্বপ্নের অবসানে ‘সফল জাগরণে’ ‘চির প্রহরী প্রেমময়ের দর্শনে আপনাকে সমর্পিত করিয়া-নিবেদিত করিয়া—নিত্য- সঙ্গ ভিক্ষা করিয়াছেন,যাহার প্রেমচক্রের চতুষ্পর্শ্বে তিনি চির- “সােহাগ,” চির-বিলাস করিয়াছেন—অন্তরের অন্তরতম প্রদেশ হইতে যাহার উদ্দেশে তিনি অনবরত ব্যাকুল প্রার্থনা জানাইয়াছেন, “প্রভু তুমি, আমি মিছা, ওগাে তুমি দেখাে”, সেই অনন্তদেবের চরণে প্রবীণের এই জীবনব্যাপী সাধনার মূর্তিস্বরূপ—“বিদুরের ক্ষুদ” স্বরূপ এই “প্রণতি”। ঋষিপ্রতিম পণ্ডিতমহাশয়ের এই সুন্দর সরল সাধনা তাহার এই “তুহু তুই” ভাব আমার চিত্ত স্পর্শ করিয়াছে। যাহাতে আমি নিজে রস পাইয়াছি তাহা অপরকে বিতরণ করার লােভ সংবরণ করিতে পারি নাই। তাই, এই “প্রণতি” সৰ্বসাধারণের সমক্ষে উপস্থিত করিলাম। ইতি কলিকাতা বিনীত ১৭ই মাঘ, ১৩৪৩ শ্ৰীঅশ্বিনীকুমার চক্রবর্তী গ্রন্থকারের অন্যান্য পুস্তক ১। ধ্যানযোেগ ধ্যান-তত্ত্ব ও ধ্যান-সাধন বিষয়ক অভিনব গ্রন্থ। মুল্য ৬০ আনা। 'Vibrant with tremors of living realities. Undoubtedly a fascinating and stimulating volume'.-Patrika. 'So much good matter in such a small compass ! -Indian Messenger. ২। বাসন্তী গীতা শ্ৰীযুক্ত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ ও শ্রীমৎ সত্যানন্দ গােস্বামী লিখিত ভূমিকাসহ। মূল্য ॥, কাপড়ের বাঁধাই ॥/• । ‘কালীপ্রসন্ন ঘােষ বিদ্যাসাগর ছাড়া আর কাহারও হাত হইতে এরূপ রচনা বাহির হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। মানসী। ‘প্রকারে ও পরিমাণে বৃহৎ।’--কালীপ্রসন্ন ঘােষ বিদ্যাসাগর। ‘গদ্যে সঙ্কলিত মধুর-কোমল-কান্তপদাবলী-সমাত বিবিধ ভাব- বিলাস-সমন্বিত অপূর্ব কাব্য।শ্ৰীযুক্ত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ। ‘বঙ্গসাহিত্যে এই পুণ্যগ্রন্থ অনন্যসাধারণ ও বিশেষ সম্ভোগের বস্তু। ইহার তুলনা ইহা নিজেই।-শ্রীমৎ সত্যানন্দ গোস্বামী। ‘বাঙ্গালা ভাষার এক অমূল্য সম্পদ।শ্ৰীযুক্ত মৃণালকান্তি ঘােষ। ‘পুস্তকখানি অমৃতের বিন্দু।—রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত খগেন্দ্রনাথ মিত্র। ‘পড়িয়া মনে হইল যেন একটি পুষ্পেদ্যানে বেড়াইয়া আসিলাম। ইহা একটি মধুচক্র।—ডক্ট শ্ৰীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন। ‘এই রসপরিবেষণ রসসম্বেদিগণের রসাস্বাদের ধন্যধ্বনিতে জয়যুক্ত হউক।—ডক্টর শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত। ৩। উদীয়মানদের প্রতিমূল্য / 81 Whispers and Heart-Beats. (Foreword by Prof. W. Sutherland and by Pt. S. N. Tattvabhu'sban.) Cloth-bound Rs. 2)- ci Srimadbhagavadgita (Devanagar), by S. N. Tattyabhu'shan and S. C. Vedan'tabhu'shan. Cloth-bound Rs. 2/4/- সূচী পৃষ্ঠা • ও ॥ 19 বিষয় পরিচায়িকা ও পরিচিতি গ্রন্থকারের নিবেদন উৎসর্গ বরণ প্রার্থনা llejo :: + + ৪ সুপ্রভাত ৫ ৭০ ৬ মনােরথ কে আজ ডাকিছ মােরে ? স্পর্শমণি ৪৪ ••• ০ ০ ০ ১০ ১১ স্বপ্রকাশ ০ ০ ০ চির সুন্দর ••• সুর-বাঁধা ১৫ স্বপ্নভঙ্গ আসিবে না ? ০ ০ ০ ০০০ * * * २४ অনুশােচনা ভিক্ষা থাকে সাথে দয়াময় জীবন-সন্ধ্যায় নিবেদিতা ••• ২৭ ৩০ E ৩০ ৩৪ ০ পৃষ্ঠা বিষয় শ ০ ০ ০ ৩৮ সফল জাগরণ ৪১ ৪২ সােহাগ ser ৪৯ ••• ১ মায়া-মানুষ দোটান অন্বেষণ ০ ০ ০ ••• ৫৬ প্রেম-চক্র চির-প্রহরী :: ••• ৫৭ নব বর্ষে ৬২ L ০ ০ ••• ০ ০ ০ আহ্বান। নিৰ্বরের প্রার্থনা বিদুরের ক্ষুদ জাগরণ সুসমাচার পূর্ণকাম মােহিত ৬৭ ৮০০ + + • १२ ৪ ০ ০ ০ নব জীবন সমর্পণ অভিসার :: ৮৪ ••• অন্ত্যগান ••• ৮৮ মহাপ্রয়াণ ••• পরিচায়িকা প্রণতি-পুস্তকখানি একজন প্রবীণ ভক্তকবির বিরচিত। ইহার বয়ঃক্রম এখন পঁচাত্তর বৎসর—এই গ্রন্থের কবিতাগুলি লেখকের জীবনের অপরাহু ও গােধূলিকালে রচিত। কবিতাগুলিতে লেখকের শুচিসংযত ভক্তিরসপুত কারুণ্যঘন জীবনের পুণ্যচ্ছায়া প্রতিবিম্বিত হইয়াছে। কবি কোন কবিতায় ব্যবহার-রসে অপচিত জীবনের জন্য আক্ষেপ করিয়াছেন,কোন কবিতায় আপনাকে বিশ্ববিধাতার চরণে সাষ্টাঙ্গে সমৰ্পণ করিয়াছেন, কোন কবিতায় পরপারের আমন্ত্রণকে সাদরে বরণ করিয়াছেন। আবার কোন কবিতায় লেখক অতীত জীবনের কারুণ্যময়ী স্মৃতিকে গীতিতে পরিণত করিয়াছেন। কবির রচনায় মরণের ভীতিও গীতিরূপ ধরিয়াছে। বাৎসল্য ও মধুর রসের কবিতাও এই পুস্তকে আছে। সেগুলিও ভক্তি- রসের সােপানপরম্পরার মত প্রতিভাত হয়। লৌকিক প্রেমের স্মৃতিকে কবি ভাগবতী প্রীতির অমৃতহ্রদে শতদলের মত ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। পুস্তকের প্রণতি নামটি সার্থক। দেবতার প্রসাদ যেমন ভক্তবৃন্দের মধ্যে বিতীর্ণ হয়—হাট বাজারে বিকীর্ণ হয় না—বিক্রয়ের জন্য বিপণি- মণ্ডলে প্রেরিত হয় না; এই কবিতাগুলিও সেইরূপ ভক্তজনের জন্য উদ্দিষ্ট-সাহিত্যের গঞ্জবাজারের জন্য নয়। জীবনের গােধূলিলগ্নে লেখক কোন স্তুতিনিন্দার জন্য লুব্ধ নহেন, কেহ সমাদর না করিলেও লেখক ক্ষুব্ধ হইবেন না। দিন চলিয়া যায়, সূর্য অস্তগগনে ঢলিয়া পড়ে, • সন্ধ্যাত্ৰবিভ্রমচ্ছটা দিগন্তে বিলীন হইয়া যায়,-রাখিয়া যায় কুলায়াভিমুখী পাখীদের কণ্ঠে কলধ্বনি-আর ধরার দূৰ্বাদলে কয়েকটি ॥ শিশিরবিন্দু। সেই করুণকাকলী ও নীহারবিন্দুমালা, মত এই কবিতা- গুলিকে রাখিয়া লেখক চিরবিদায় লইতে চাহেন। । অলমতিবিরেণ। রসচক্র সাহিত্য সংসদ শ্রীকালিদাস রায় ৯, শাহনগর রােড, কালীঘাট পরিচিতি পণ্ডিতবর শ্রীশ্রীশচন্দ্র বেদান্তভূষণের নাম কবি হিসাবে আজ বঙ্গ- সাহিত্যে সুপরিচিত না হইলেও এমন একদিন ছিল, যেদিন তাহার কাব্যসাধনা “নব্য ভারত”, “তত্বকৌমুদী”, “ব্রহ্মবাদী”, “সেবক” প্রভৃতি পত্রিকার কলেবরে প্রকাশিত হইয়া সরল ও শুভ্র সৌন্দর্য্যে ভাবুক ও ভগবৎপ্রেমিকের চিত্ত আকর্ষণ করিত। সেদিন ছিল ভারতীয় সাধনা ও ধর্মসংস্কারের সত্যকার পূজা-আরাধনার দিন। তাই শুভ্র শেফালিকা ও অনাড়ম্বর কুন্দটগরেরই আদর ছিল। গৃহে গৃহে তাহাতেই দেব- সেবার কাজ চলিয়া যাইত। পরবর্ত্তী যুগে যখন সেবার স্থান শােভাসজ্জা আসিয়া অধিকার করিয়া বসিল, তখন হইতেই এই সকল ফুলের আদর কমিল এবং তাহাদের স্থানে গােলাপ গন্ধরাজ আসিয়া দেখা দিল। তাহাতে সেবার সাজি ও পূজার পুষ্পপাত্র অধিকতর শােভাসমৃদ্ধিতে ভরিয়া উঠিল, সন্দেহ নাই, কিন্তু বাণীপূজা যে সার্থকতর হইল সে কথা বলিতে পারিনা। কারণ, যে বিনীত চিহ্রভাব মাতৃপূজার প্রধান উপচার, তাহার সহিত আড়ম্বরের লম্বন্ধ অল্পই ; পবিত্রতা ও সরলতাই তাহার প্রকৃষ্ট উপকরণ।
॥/০ প্রবীণ শ্ৰীশচন্ত্র সেই সরল সাত্ত্বিক পূজার পূজারী। তাহার ছন্দে, বন্ধে বা রচনারীবিতে বৈচিত্র্য সৌষ্টবের নূ্যনতা থাকিলেও তাহার উপাসনামন্ত্রে কৃত্রিমতা বা আবিলতা নাই; তাহার ভগবৎপ্রেমের কবিতাগুলি তাই সরল, স্বচ্ছ ও চিত্তগ্রাহী। রুচির শুচিতায় তাঁহার কবিতাগুলি ফুলেরই মতন ফুটিয়া উঠিয়াছে। আজকালকার তথাকথিত intellectual culture এর যুগে এমন এক শ্রেণীর কাব্যশিল্পীর আমদানি দেখা যাইতেছে, প্রকাশভঙ্গীর নূতনত্বে তাহাদের যতই কেরামতি থাক, রুচি বলিয়া কোন বস্তুর বালাই আছে বলিয়া বােধ হয় না। সৌন্দৰ্যসৃষ্টির আদর্শবাদ স্বীকার করিয়া লইলেও, তাহাদের রচনায় সৌন্দৰ্যসৃষ্টি বা রসানুভূতির পরিচয় সাধারণ চোখে বড় একটা মিলেনা। শ্ৰীশচন্দ্রের রচনায় নূতনত্বের এই সকল উচ্চ দাবী নাই, কিন্তু অনুভূতি, আকুতি ও প্রসাদগুণবিশিষ্ট সহজ সরল প্রকাশভঙ্গী যদি কবিতার প্রকৃত অঙ্গ হয়, তবে “প্রণতির কবি শ্রীশচন্দ্রের যে কাব্যরচনায় অধিকার আছে, একথা বলিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবােধ করিতেছি না। এই পর্যন্ত কবি-পরিচিতি করিয়াই ক্ষুদ্র ভূমিকা শেষ করিলাম। এ পরিচয় যথার্থ কিনা, পাঠকবর্গ তাহার বিচার করিয়া দেখিবেন। 'অলমতিবিস্তরেণ। ইলাবাস, হিন্দুস্থান পা ) শ্ৰীযতীন্দ্রমােহন বাগচী গ্রন্থকারের নিবেদন। আমার কন্যার জন্ম আমার নবজীবনের সূচনা। সেই হইতে ভগবচ্চরণে আমার সত্য প্রণতি এবং সেই উপলক্ষেই আমার কবিতার প্রথম স্ফুরণ। পরে অবস্থাবিশেষে মনের ভাব ও চিন্তা সময় সময় কবিতাতে লিপিবদ্ধ হয়। কোন কোন কবিতা এক সময়ে ‘তত্ব কৌমুদীতে প্রারম্ভিক প্রার্থনারূপে মুদ্রিত হয়। ‘নব্যভারত, ‘ব্রহ্মবাদী’, ‘সেবক’, ‘নিঝর’, ‘সম্মিলনী’প্রভৃতি পত্রিকাতেও অনেকগুলি কবিতা বাহির হইয়াছিল। এখন জীবনের সন্ধ্যাকালে ত্রিপুরা হিত- সাধিনী সভা কর্তৃক অনুষ্ঠিত আমার পঞ্চসপ্ততিতম জন্মােৎসব উপলক্ষে সেই সকল কবিতার অনেকগুলি এই গ্রন্থে নিবদ্ধ করিলাম। আমার পরমশ্ৰদ্ধাস্পদ বন্ধু, বঙ্গীয় গভর্ণমেন্টের সহকারী একাউন্টেন্ট, জেনারেল শ্রীযুক্ত অশ্বিনীকুমার চক্রবর্তী, এম্-এ মহাশয় এই গ্রন্থের প্রকাশক হইয়া আমাকে বিশেষ অনুগৃহীত করিয়াছেন, এইজন্য তাহাকে আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। কবিবর শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্রমােহন বাগচী ও শ্রীযুক্ত কালিদাস রায় কবিশেখর মহাশয়য়ের সৌজন্যের নিকট আমি বিশেষ ভাবে ঋণী। ইহারা উভয়ে প্রতির সহিত এই গ্রন্থের ভূমিকা লিখিয়াছেন এবং কবিশেখর মহাশয় তাহার কৰ্ম্মবাহুল্যের মধ্যেও নিরতিশয় সহৃদয়তার সহিত ইহার প্রুফু আদ্যোপান্ত দেখিয়া দিয়াছেন। আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতার সহিত এই বহুমানাস্পদ সুহৃদ্বয়কে ধন্যবাদ প্রদান করিতেছি। ইতি ‘প্রতিভা কুটীর’, ১২, পেয়ারাবাগান টু, কলিকাতা, ৭ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৭। শ্ৰীশ্ৰীশচন্দ্র বেদান্তভূষণ
উৎসর্গ
প্রাণের কুমারী কল্যাণীয়া প্রতিভার করকমলে
সংসার-পথের মাঝে চলেছিনু নিঃসঙ্গ পথিক
আপনার হাসি অশ্রু লয়ে ; মাের ইহার অধিক
আর ত’ ছিলনা কিছু। মাতৃমূৰ্ত্তি ধরি’ কন্যা মাের
সহসা আসিলে তুমি, পরাইতে মােরে মায়া-ডাের।
এ জীবন ছিল মরু, তুমি মা গাে রচিলে উদ্যান,
পূর্ণতার দিলে স্বাদ, রিক্ততার করিলে সম্মান।
তােমারে করিয়া কেন্দ্র ঘুরে সদা মাের সুখ দুখ,
তােমার আনন্দে হাসি, বেদনায় ঢাকি ম্লানমুখ।
তােমারে ধরিয়া বুকে সত্য সব সাধনা আমার,
নয়নে নয়ন রাখি’ মধুময় হেরি এ সংসার।
তােমারে লভিয়া মাগাে, সত্য মাের অর্চনা, আরতি
তােমারে বেষ্টন করি’ সত্য সব প্রাণের প্রণতি।
;
অস্তগামি-আয়ুসূৰ্য-ক্ষীণ-রশ্মিরেখার ইঙ্গিত
মনে কি জাগায়, মাগাে, দিনান্তের বিদায়-সঙ্গীত ?
এ বৃদ্ধ পিতার সাথে বিচ্ছেদের ভয় কি মা হয় ?
জাননা কি যারে পূজি তিনি সত্য, অমৃত, অক্ষয় ?
দ তার ক্রোড়ে নিত্যবাস। ভূমার সে ধ্রুব ত্য-ভূমি দিব্য নেত্রে দেখ মা গাে,-দেখ সেথা আমি আর তুমি অচ্ছেদ্য প্রেমের যােগে আছি দেহে চির বর্তমান একে অন্যে হয়ে সুখী,—এ সুখের নাহি অবসান। এই ত’ জীবন সত্য,—মরণের নাহি কোন ভয়, ব্ৰহ্ম সত্য, প্রেম সত্য, যােগ সত্য—নাহিক সংশয়। জীবন-সন্ধ্যায় তাই কম্প্রহস্তে করিয়া চয়ন ‘প্রণতি আমার মা গাে, তব করে করিনু অর্পণ। বাবা Paternal Love "Certain it is that there is no kind of affection so purely angelic as that of a father to a daughter. He beholds her both with and without regard to sex. In love to our wives there is desire ; to our sons there is ambition ; but in that to our daughters there is something which there are no words to express.” Addison
প্রণতি
বরণ
আজ মধু যামিনীর
শুভ্র জ্যোছনায়,
শান্ত স্নিগ্ধ মাধুরীর
বন্যা বয়ে যায়।
নীল-চন্দ্রাতপতলে
ইন্দু-তারকার
ছায়া ধরে নীলবক্ষে
সাগর উদার।
বিশাল বারিধি-হৃদি
উদ্দাম অধীর,
উৰ্ম্মিমুখে ঊর্ধে চায়
উচ্ছসিত নীর।
আকুল আবেগে সিন্ধু
উল্লাস-বিহ্বল,
বন্দনা করিছে তব
চরণ-কমল।
প্রণতি শুষ্ক মরুভূমি আমি উপকূলে তার স্তব্ধ আজি, হেরি’ তুমি প্রেম-পারাবার। লভেছি জনম নাের ও সিন্ধু-সলিলে, মােহের মদির মন্ত্রে গিয়াছিনু ভুলে। আজ স্নিগ্ধ কৌমুদীর পুলক-হিল্লোল, উদ্বেল-উদ্ভ্রান্ত-মত্ত- জলধি-কল্লোল, জাগা’ল চেতনা নব মদালস-প্রাণে, স্বপ্নভঙ্গে শিহরিনু তব প্রেমাদ্বানে । তােমারে বরণ করি, যাচি, প্রাণ-তােষ, শঙ্খে যেন বাজে সদা সমুদ্র-নির্ঘোষ । (পুরী, সমুদ্রতীর )
প্রার্থনা
ঘুমের ঘােরে,
প্রভু, আমায় যবে
•আনিলে ভবে,
বাঁধিলে প্রেম-ডােরে,
তুমি কত না ধনে,
কত যতনে,
সাজিয়ে দিলে মােরে।
আমি নয়ন খুলে
নেশায় ভুলে
হইনু অচেতন,
মিছা মায়ার ডােরে
রহিনু অনুখন।
আমি তাদর করে’ নিইনি করে
তােমার যত দান,
ওগাে হৃদয় খুলে
গাইনি ভুলে
প্রাণের যত গান।
তুমি বেদনা দিলে,
ঘুম ভাঙ্গালে,
খুলিলে যবে আঁখি,
আমি চেতনা পেয়ে
দেখিনু চেয়ে,
রয়েছি ধূলা মাখি।
জানি ছিলাম আমি দিবস যামী
রাজদুলাল সম,
এবে আপন দোষে হয়েছি শেষে
ভিখারী দীনতম।
প্রণতি
করেছি ।
তাই সঁপেছি মন,
কণ্ঠবীণা খানি
লয়ে তোমার জানে, তুলিব প্রাণে,
তােমার জয়বাণী ;
আমি মরণ-তীরে,
নয়ন-নীরে,
চরণ তলে তব,
ওগাে
ধরিব তুলি
নিতুই নব নব।
তুমি শােভন করে’ গড়েছ মােরে,
তুলনা তার নাই,
দেখাে,
তােমার গড়া
রূপের ভরা
হয় না যেন ছাই,
ওগাে,
হয় না যেন ছাই।
পূজার ডালি
সুপ্রভাত
১
হৃদয়ের নীপকুঞ্জে, বাঁধি নীড়, পুঞ্জে পুঞ্জে
কুহক ছড়ায়ে ছিল মােহ-ইন্দ্রজাল ;
না চাহিতে আঁখি তুলি’, আশার কোরকগুলি
ঢলিয়া পড়িয়াছিল, বৃন্তের দুলাল !
আজি মম সুপ্রভাত ; -সােহাগ-পরশে, নাথ,
পুলকে সে নীপবীথি জাগিল শিহরি ;
রচিয়া পূজার ডালা, হরষিল ফুল-মেলা,
আকুলিয়া ক্ষীণ কণ্ঠ উঠিল কুহরি।
বেঁধে লও প্রেম-ডােরে, বিশ্বের দেউলে মােরে,
প্রেমের গৈরিকে, নাথ, দাও সাজাইয়া ;
ক্ষুদ্র কমণ্ডলু মম, ভরে দাও, প্রিয়তম,
বাউল হইয়া ফিরি প্রেম বিলাইয়া।
৪
উজলিবে প্রেম-ইন্দু, উথলিবে প্রেম-সিন্ধু,
বহিবে প্রেমের বন্যা, উদ্বেল, উদার।
আশিস্ লইতে শিরে, উৰ্দ্ধমুখে করযােড়ে
দুয়ারে দাড়ায়ে, নাথ, সেবক তােমার।
মনােরথ
•
‘পিতা নােহসি’ এক বাণী, বিশাল, বিপুল,
করিয়াছে মুখরিত বিশ্বের দেউল।
তথাপি অযুত কণ্ঠে উঠিছে ক্রন্দন
কত হিংসা, কত দ্বেষ, কত অমিলন
বিবেকের পুরদ্বারে পড়েছে অল,
নির্বাসিত হয়ে গেছে প্রেম সুনির্মল ;
ঘিরিয়াছে দিব্যালােক মােহের আঁধার।
মেলিছে বিবাদ-বহ্নি সপ্তজিহ্বা তার।
২
অতীত সমাধি 'পরে দাড়াইয়া আজ,
চাহিনু আশি তাই, ওগাে রাজ-রাজ।
পিতা তুমি, মােরা তব স্নেহকণা-ভাগী,
থাকিব তােমারে ধরি’, এই বর মাগি ;
শুনিয়া তােমার বাণী যাইব চলিয়া,
তােমার আলােকে পথ লইব চিনিয়া ;
মিলনের ধৰ্ম্ম যেন লক্ষ্য হয়ে রয়,
ধরায় স্বর্গের ছবি প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রণতি
আশিস্ লইয়া শিরে কায়-মন-প্রাণে,
আশার জীবনখানি সঁপিনু চরণে।
লেখনী-চিন্তার
মূলে তােমার শকতি,
সঞ্চার’ তােমার প্রেম, হে জীবনপতি
ক্ষুদ্র এই তরী, নাথ, ঠিক পথে তার,
বাহিয়া লইয়া যাও হয়ে কর্ণধার।
আশায় বাঁধিয়া বুক, লয়ে তব নাম,
ভাসাইয়া তরী এবে করিনু প্রণাম।
৪
পূর্ণ কর মনােরথ, ওগাে দয়াময়,
বিতরি মঙ্গল যেন সারা বিশ্বময়।
গৃহের মালঞ্চখানি সৌরভে পূরিয়া,
স্বর্গের সুষমা লয়ে উঠুক ফুটিয়া।
পুষ্পবেদী সুপবিত্র হইয়া রচিত,
সিংহাসন তব তাহে হােল্ক প্রতিষ্ঠিত।
মুগ্ধ হাে বিশ্ববাসী পুরুষ রমণী,
হেরিয়া অপূর্ব দৃশ্য প্রেম-সম্মিলনী'।
(সম্মিলনী’র প্রারম্ভিক কবিতা)
কে আজ ডাকিছ মে
মােরে ?
১
ছিনু আমি স্বপনের আলস-আবেশ-ঘােরে,
নির্জন কুটীরে আসি’ কে আজ ডাকিছ মােরে ?
হৃদয়ের অন্তঃপুরে শত বৈতালিক-গীতে,
শ্মশান ভরিয়া গেল কবিতার মধু-তে !
চিতাভস্ম-পে ফুটে উঠিল প্রসূনকুল,
স্বপন গুমরি' মরে, “সকলি যে ছিল ভুল !”
যৌবনের পুষ্প-বনে, উন্মােষিত আঁখি তুলি’,
স্মিতমুখে চেয়েছিল আশার কলিকাগুলি ;
দারুণ আঘাতে দীর্ণ, বুকে লয়ে হাহাকার,
সঙ্গীত-নিশ্বাস ছাড়ি বৈতরণী হ’ল পার ।
প্রতিধ্বনি আজি তার পর-পার হতে গায়,
“আমরা যে অগ্রদূত ! আয় আয় কুঞ্জে আয়।”
পরাণের ঝােপে ঝাপে বিষাদ-শােকের ছায়া,
পল্লব-গুণ্ঠনে ঢাকে বিশীর্ণ মলিন কায়া ;
উত্তপ্ত নিশ্বাস আর নাহি করে উন্মােচন,
চাহিছে তুলিয়া আজি স্নিগ্ধ চারু বিলােচন ;
কুহকের ইন্দ্রজাল ছিড়িয়া হাসিয়া বলে,
“আমরা যে পুষ্পরথ, দলন-যন্ত্রের ছলে !”
প্রণতি
৪
নব-রাগ-সঞ্জীবিত হসিভ কুসুমদামে,
হরষপুলক-দীপ্ত পল্লবিত-ঘনশ্যামে,
হৃদি-ফুলবন আজি উৎসবে কম্পিত-কায়,
বহিতেছে উতরােল উৎসাহ-মলয়-বায় !
অনন্তের তীর্থযাত্রী নীরবে নিরালা ঘরে,
বাসর-শয়নে জাগে বরমাল্য লয়ে’ করে !
নে
সজ্জিত বরণডালা,—ভেটিতে পরশমণি,
মরম মথিয়া উঠে মঙ্গল আরতি-ধ্বনি,
শ্মশানের ফুল-মেলা শিহরিছে ঐকতানে,
পথঘাট ভরে গেল স্বর্গের বাহন যানে !
আরােহিয়া দিব্যরথ নিকুঞ্জে বরিতে ভােরে,
নিভৃত মন্দিরে আসি’ কে আজ ডাকিছ মােরে ?
স্পর্শমণি
•
তােমারি পরশে হেরি রােমাঞ্চ
এ বিশ্ব নিকেতনে,
শােভিত অযুত ফুলে মালঞ্চ
বসন্ত সমীরণে
মধুর গন্ধে হয়ে মাতােয়ারা
ছুটিল উদাসী বায়,
শ্যাম পল্লবে সাজিল এ ধরা
যৌবন-সুষমায় ;
পুলকে জ্যোছনা হাসিল শিহরি’
কাননে ফুটিল ভাতি,
মুগ্ধ বিহগ উঠিল কুহরি’
উল্লাস-মদে মাতি ;
নবীন চেতনা লভি’ চরাচর
নেহারে মােহন চঁাদে,
উৎসব-মােদে ভরে অম্বর
মন্দ মদির নাদে ;
হৃদয়ের বীণা ঝঙ্কারে নব
বাজিল মৃদুল রাগে,
গুঞ্জরি’ গীত উদ্দেশে তব
ধাইল চরণ-আগে ;
প্রণতি
আবেশ-মােহের বাঁধন টুটিল,
ভাঙ্গিল ঘুমের ঘাের,
ভুবন জুড়িয়া ছড়ায়ে পড়িল
মুক্ত পরাণ মাের ;
রুদ্ধ বুকের আকুল বাসনা
চাহিছে তােমারি পানে,
মুগ্ধ এ চিত ভুলিয়ে আপনা
ডুবিল তােমারি ধ্যানে!
স্বপ্রকাশ
যােগমগ্ন ছিল বিশ্ব
নীরব, নিশ্চল,
এলাইয়া ছিল নিশা
আঁধার-কুন্তল,
অনন্তের উপকূলে,
সৃজন-ঊষায়,
প্রকাশিলে, হে আলােক,
দীপ্ত সুষমায় !
প্রণতি
প্রকৃতি বিম্বিল ছায়া
স্বচ্ছ দরপণে,
মিলন-সম্ভাষ হ’লাে
নয়নে নয়নে ;
হরষ-মঙ্গল-শঙ্খ
রণিয়া উঠিল,
ঐকতানে বিশ্ব-বেণু
প্রেমে ঝঙ্কারিল ।
ধ্বনি পেলাে প্রতিধ্বনি—
প্রাণ-বিনিময়,
উদ্ভাসিল তমঃ-পারে
রূপ জ্যোতির্ময় ;
হৃদয়-ভবন হলাে
দেবােত্তর ভূমি,
গােপন-মন্দিরে তার
বিরাজিলে তুমি !
ভুবন-মােহিনী জ্যোতি,
দ্যুলােকে ভূলােকে,
তুমি যে গাে স্বপ্রকাশ
তােমারি আলােকে।
চির সুন্দর ১ বহিছে মৃদুল শীতল সমীর বিহগ কূজিছে ডালে, ফুটিছে তারকা রত্ন-মালিকা সন্ধ্যারাণীর ভালে। আলােক আঁধার স্বপ্ন জাগর, একত্র মিলিছে দু'হু, সুরভি ছড়ায়ে রভসে কঁপিছে মুহু! কুসুম রূপসী আজি এ জীবন- কুঞ্জ-নিলয়ে কার মধু-আলাপন, কুহক-জড়িত মাধবী এ সঁজে করিছে সঞ্চরণ ? নয়ন-ভুলানাে শান্ত সুষমা শােভিছে ভুবন জুড়ি’, প্রেম-সঙ্গীত উঠিছে আকুলি, দিগ্দিগন্ত পূরি’ !
১৪
প্রণতি
==
==
বনানী মাঝারে
পুষ্পলতায়
সুকোমল কিশলয়ে,
স্ফুরিত অধরে,
আঁখি তারকায়,
পুলকিত লােকালয়ে,
রম্য মাধুরী, বিকশিল একি !
ঘুচিল স্বপ্নঘাের।
নিখিল বিশ্ব
পরশ-পুলকে
হরষে হইল তাের ।
৪
দিব্য মধুর
অন্তরে বসি
সুরসে কণ্ঠ ভরে,
জীবন মরণ
দুহু আবরিয়া
কে আজ ডাকিলে মােরে ?
মন্দ্রিয়া বাণী পূরিল সে রসে
মম হৃদি-কন্দর,
সুখ-সন্ধ্যায়
চাহিয়া দেখিনু
তুমি চির সুন্দর,
তুমি চির সুন্দর,
তুমি চির সুন্দর!
সুর-বাঁধা
১
কেন গাে মলয় আজি
অধীর চঞ্চল,
নেশায় বিভাের ভৃঙ্গ
পিয়ে পরিমল ;
প্রকৃতির কাম্যবনে
কৌমুদী-ঘটায়,
মাধবী মাধুরী ফোটে
মােহন ছটায় ?
শােভন সুযােগ একি
করিলে বিধান,
হে নাথ, মােহিতে মম
ক্ষুব্ধ মন প্রাণ ?
নয়নে পড়িল তাই
শান্ত, নিনিমিখ,
নিখিল সৌন্দর্যে ভরা
আঁখি-পুণ্ডরীক !
প্রণতি
উচ্ছসিল বিশ্বময়
স্মিত সম্ভাষণ,
মাের বক্ষে প্রতিধ্বনি
করি’ অন্বেষণ ;
অরুন্তুদ যাতনার
শর-শয্যা 'পরে,
উদ্দাম অহম্-বােধ
স্বেচ্ছামৃত্যু বরে।
৪
জীবনের শ্যামকুঞ্জে
আঁধার নিবিড়
বেঁধেছিল বাসা, এবে
ভাঙিল সে নীড় ;
নিভৃত সে তপােবনে
করে সঞ্চরণ,
অনন্ত মরণ মাঝে
অনন্ত জীবন ।
প্রণতি
১৭
হৃদয়-পাষাণ ভেদি’
গঙ্গোত্রী-নিঝর
প্রেম-বারি উৎসারিয়া
বহে নিরন্তর ;
অস্ফুট, অশ্রান্ত তার
মধুর নিক্কণ
বিশ্বের প্লাবন-গীতে
করিছে স্পন্দন !
উৎক্ষিপ্ত অমিয়রাশি
ত্রিদিব-মন্থনে,
চরাচর মুখরিত
তারি আমন্ত্রণে !
ভিক্ষাপাত্র ল’য়ে করে
ডাকি, হে দয়ালু,
ভরে দাও আজি মাের
ক্ষুদ্র কমণ্ডলু।
১৮
প্রণতি
ওগগা বিশ্ব-পুরােহিত,
প্রেমের যাজ্ঞিক,
আমারে সাজায়ে দাও
যজ্ঞের ঋত্বিক্ ;
প্রাণের সর্বস্বধন ॥
অর্ঘ লয়ে পায়,
আমারে উদাসী কর
মত্ত মলয়ায়।
পূরে দাও ক্ষীণ কণ্ঠে
তব সুধামুর,
হােক্ তাহা চিরদিন
মূচ্ছনা মধুর।
যেন এ জীবন-কুঞ্জে
যুগ যুগান্তর,
গীতে, পুষ্পে বাঁধা হেরি
সুন্দরে সুন্দর।
স্বপ্নভঙ্গ
১
পাখী যবে
কলরবে
কুঞ্জে কুহরিল,
আঁখি মেলি’
ফুলগুলি
চমকি’ চাহিল,
মােহ-ঘােরে প্রীতি ডােরে
বাঁধা পড়ি’ প্রাণ,
গীত-ছন্দে
ফুল-গন্ধে,
যাচিল নির্বাণ ।
২
আচম্বিতে
বাজে চিতে
প্রলয়-নিস্বন,
মােহ-মেলা, মায়া-খেলা,
ভাঙ্গিল স্বপন।
কোথা সাথী
ফুল-বীথি,
কোথা কলরব ?
ঝরে গেল,
থেমে গেল !
ফুরাল উৎসব।
প্রণতি
বুঝি এবে
যেতে হবে
ভবসিন্ধু-পারে,
নাহি সাথী, সমব্যথী
আঁধার পাথারে ;
একা আমি, বেলাভূমি,
করি বিচরণ,
ভাবি শেষে,
তীরে বসে,
জীবন-মরণ।
৪
হেরি ফুটে,
তমস্তটে,
আনােক-সম্ভার,
কি মাধুরী,
দিব্য পুরী,
অসীম-বিস্তার !
চেয়ে দেখি,
এপার ওপার,
দুই পুরী, আলাে করি,
তুমি যে আমার ।
মুদে’ আঁখি,
আসিবে না.?
যায় বেলা চলে যায়,
হৃদয়মালঞ্চ, হায়,
তােমার নিশ্বাস বিনা
ফুটিল না, ফুটিল না !
নয়নে বহিছে লাের,
আকুল পিয়াসা মাের
তােমার আশ্বাস বিনা
মিটিল না, মিটিল না !
জ্বলন্ত চিতার সম
উত্তপ্ত পরাণ মম,
তােমার পরশ বিনা
জুড়াল না, জুড়াল না !
কাতর ক্রন্দন কত
উঠিতেছে অবিরত,
তব দরশন বিনা
ফুরাল না, ফুরাল না !
২২
প্রণতি
আমি যে তােমারি লাগি,
বিরহ-বেদনে জাগি,
তৃষিত পানে কি চেয়ে
হাসিবে না, হাসিবে না ?
হে নাথ অন্তরযামী,
ডাকি হে দিবস-যামী,
দীনের কুটীরে কি গাে
আসিবে না, আসিবে না ?
অনুশােচনা
১
ছুইলে আমারে যদি
হে প্রেম-পরশমণি,
কেন প্রাণ প্রীতি-পাশে
চির বাঁধা পড়িল না ?
(পূরবী, আড়া। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক প্রকাশিত ব্ৰহ্মসঙ্গীত,
একাদশ সংস্করণ, ৫০৫ পৃষ্ঠা)
প্রণতি
সুধার আস্বাদ যদি
দিলে হে অমিয়-খনি,
মানস-চকোর কেন
মত্ত হয়ে রহিল না ?
শুনালে আশার বাণী
হে অতুল, অনুপম,
শ্রবণ-কুহরে কেন
অবিরাম ধ্বনিল না ?
মাধুরী ফুটালে যদি
হে মােহন, মনােরম,
সুরভি-লাবণ্যে কেন
চিত্ত মম মােহিল না ?
২
বুঝিনু হারায়ে দিন
আজি হে অন্তরযামী,
করেছি অবজ্ঞা যত
এই মম দণ্ড তার!
অনেক করেছ ক্ষমা
হে করুণাময় স্বামী,
আবারও ক্ষমহ মােরে,
কি বলিব আমি আর ?
২৪
প্রণতি
নবীন চেতনা দাও
জীবনবল্লভ ধন,
ভুলায়ে মােহন রূপে
পাগল করহ মােরে ;
পরশ-আশ্বাসে নব
হে স্নিগ্ধ, শীত চন্দন,
হৃদয় জুড়ায়ে কর
চির-বন্দী প্রেম-ভােরে
ভিক্ষা
প্রভু গাে, কেন গাে আমি
দূরে চলে যাই,
কেন সদা ভয়ে ভয়ে
জীবন কাটাই ?
তুমি যে আদর করে,
দিয়েছ, দিতেছ মােরে
কত সুখ, কত শান্তি,
অন্ত নাহি পাই ;
প্রণতি
যখন চেয়েছি যা-ই
শূন্য হাতে ফিরি নাই,
পূর্ণ সদাব্ৰত তব
মুক্ত সর্ব ঠাই।
চেয়ে যে কত পাই,
তথাপি সন্তোষ নাই,
এক কথা সদা মুখে-
নাই, নাই, নাই ।
কতই বাসিছ ভালো,
আঁধারে দিতেছ আলাে,
তবু কেন মােহ-ঘােরে
ছুটিয়া পালাই ?
জাগায়ে দিয়েছ আশা,
পরাণে অগস্ত্য-তৃষা,
কেন মায়া-মরীচিকা
খুঁজিয়া বেড়াই ?
কি ভ্রমে পড়েছি বাঁধা,
ঘুচে না আঁখির ধাঁধা,
শিহরি তরাসে, বুঝি
তােমারে হারাই।
২৬
প্রণতি
এ ভুল,—বিষম দায়,
ভেঙেও না ভাঙে হায়,
কায়া ছেড়ে মিছে শুধু
ছায়া পানে ধাই।
দাও শক্তি, দাও জ্ঞান,
সঁপি আজি মনঃ প্রাণ,
জন্মশােধ তব পদে
সর্বস্ব বিকাই
v
আর কোন সাধ নাই,
তােমারে যেন গাে পাই,
এ সাধ পূরিলে, নাথ,
কিছু না ডরাই ;
তােমারে ধরিয়া বুকে,
পার হই মন-সুখে,
জীবন মরণ দুই,
এই ভিক্ষা চাই।
থাকো সাথে দয়াময়
(ইংরাজী স্তোত্র অবলম্বনে রচিত)
১
আলােক নিবিয়া যায়,
আঁধার ঘনায় ধীরে,
বিষাদের কালাে ছায়া
নিরাশ প্রাণের 'পরে ;
সহায় সম্বল হীন,
মনে বড় লাগে ভয়,
অগতির গতি তুমি,
থাকো সাথে দয়াময়।
--
জীবন-নদীর জলে
পড়েছে ভাটার টান,
ভাসিয়া চলেছে বেগে
সংসারের সুখ মান ;
ভাঙ্গাচোরা চারিদিকে,
বিচ্ছেদ, বিনাশ, ক্ষয়,
ধ্রুব, নিত্য, সত্য তুমি,
থাকো সাথে দয়াময়।
প্রণতি
রাজরাজেশ্বর রূপে
বিভীষিকাময় হয়ে,
এসাে না কুটীরে, এসাে
সান্ত্বনা, মমতা লয়ে ;
হইয়া ব্যথার ব্যথী
আর্তনাদে সহৃদয়,
পাতকীর বন্ধু তুমি
থাকো সাথে দয়াময়।
৪
অনুদিন, অনুক্ষণ
তােমাকেই চায় প্রাণ,
তােমার করুণা বিনা
আর কিসে পরিত্রাণ?
আশ্রয় চালক মম
তব সম কেহ নয়,
আঁধারে আলােকে তুমি
থাকো সাথে দয়াময়।
প্রণতি
তােমার প্রসাদে, দেব,
অরি-ভয় নাহি রয়,
বিপদ লঘুতা লভে,
অশ্রুবারি মধুময় ;
মৃত্যুর যাতনা কোথা ?
কোথা শ্মশানের জয় ?
কি আনন্দ, যদি তুমি
থাকো সাথে দয়াময় ।
নয়ন মুদিয়া আসে
দেখা দাও হেসে হেসে,
আঁধার উজলি’, নাথ,
ল’য়ে যাও সেই দেশে ;
স্বরগের উষালােকে
মােহমায়া পায় লয়,
জীবনে মরণে তুমি
থাকো সাথে দয়াময়।
( তত্ত্বকৌমুদী, ১৬ই ভাদ্র, ১৩১৬)
জীবন-সন্ধ্যায় ১ সুনীল-সাগর-কুলে স্তব্ধ নীলিমায়, দেবীর নির্মাল্য এক সৌরভ ছড়ায় ; প্রভাত-শােভন ফুল্ল- নলিনীর দল প্রসূনন প্রণব গাথা- ভরা পরিমল ; কামিনী মুকুল মঞ্জু, মৃদুল, মেদুর, আৰ্ত্ত-হৃদে ঢালে সুধা সান্তনা মধুর । প্রীতির প্রফুল্ল ছবি নক্ষত্ৰ-কিরণ, সােহাগ মিশায়ে রচে স্বপ্ন সম্মােহন
প্রণতি
৩১
অনিলে গুঞ্জরে মৃদু
বীণার ঝঙ্কার,
কলকণ্ঠে উঠে গীত
মাধুরী-সম্ভার,
ললিতে কোমল মিশে,
মধুরে শীতল,
উল্লাসে সাগর-বেলা
করে টলমল ।
একাকী মুদিত কবি
সান্ধ্য নিরালায়
নেহারে মােহন দৃশ্য
জীবন-সন্ধ্যায়।
২
আলােক নিবিল ধীরে,
শান্ত সমীরণ ;
নীরব হইল কণ্ঠ,
বীণার নিস্বন।
নিবিড় জলদজাল
ঘেরিল অম্বর,
ডুবিল তিমির গর্ভে
সৈকত, সাগর।
প্রণতি
বহিল প্রমত্ত বেগে
ক্ষিপ্ত প্রভঞ্জন,
উত্তঙ্গ-তরঙ্গ দল
করে আস্ফালন।
সহসা ভাঙিল স্বপ্ন,
কঁপিল হৃদয়,
আতঙ্কে পূরিল প্রাণ,
গর্জিল প্রলয়।
কোথায় সান্ত্বনা, প্রীতি,
কোথা ফুলবাস ?
সম্মুখে ফেনিলায়িত
ভীম অট্টহাস
উত্তালে করাল মিশে
ক্রুরে ভয়ঙ্কর,
ভরাসে সাগর-বেলা
কঁপে থরথর !
একাকী স্তম্ভিত কবি
নির্জন বেলায়,
নেহারে ভীষণ দৃশ্য
জীবন-সন্ধ্যায়।
প্রণতি ৩ অবশ শিথিল তনু ; স্তব্ধ মনঃপ্রণ; নিমেষে উভয় দৃশ্য লভে তিরােধান। প্রয়াণ করিল মায়া- মােহের ছলনা, কুহক-স্তিমিত আত্মা লভিল চেতনা। চারিভিতে হুঙ্কারিছে প্রলয়ের ধ্বনি, ভেসেছে ভাটার টানে জীবন-তরণী। নয়ন মুদিছে ধীরে ; সম্মুখে পাথার, তরঙ্গ-সঙ্কুল পথ- অনন্ত-বিস্তার। ফুটিল আঁধারে ক্ষীণ আশার আলােক, ভাতিল সুদূর পারে ভূমানন্দ-লােক। ৩ ৩১ প্রণতি আলােকে আনন্দ মিশে, উজ্জ্বলে নির্মল, নেহারে ভবিষ্য দৃশ্য পথিক বিহ্বল। একাকী প্রবুদ্ধ কবি ভাসিল ভেলায়, ত্যজি’ মত্ত মায়াপুরী, জীবন-সন্ধ্যায়। -(পুরী, সমুদ্রতীর) নিবেদিত ১ নব-বসন্ত-মুদিত- মলয়-বীজনে, উল্লাস-ঝস্কৃত- বিহগ-কূজনে, ব্রীড়াবগুষ্ঠিতা, বিনম্রা, কুষ্ঠিতা, কে সতী অতিথি কবির নিকুঞ্জে ?
প্রণতি ২ পুণ্য-সৌরভ-মণ্ডিত বিনােদ-মাধুরী, শিথিলবন্ধন লম্বিত কবরী, নেত্ৰ-নীলােৎপল পূর্ণ-পরিমল শােভনে, মলিনে, কে লাবণ্য-পুঞ্জে ? পূত-প্রীতি-বিলসিত- রুচির-হাসিনী, রাহু-কবলিত পূর্ণেন্দু-ভাসিনী, সন্তাপ-বিধুরা, সংযম-মধুরা, এসাে মা সুরমা, মানস-মােহিনী
৩৬।
প্রণতি
৪
তব সত্তা নিবেদিত
দেব-বিশ্বভৃতে,
শক্তি নিয়ােজিত
পর-সেবা-কৃতে,
সফল জনম,
ধরম, করম,-
ধন্য পুণ্যশীলে,
যৌবনে যােগিনী
এসাে
১
কত সুরভি কুসুম
করিয়ে চয়ন,
এ হৃদয়-নিকুঞ্জে
রচিনু আসন,
আমি আশা-পথ চেয়ে
আকুল নয়ন,
নীরবে, বিরলে
জাগিতেছি নিশি নিশি হে।
প্রণতি
२
.
নব হরষ-লালসে।
অধীর পরাণ,
ভব দরশ-পিয়াসে
আৰ্ত্ত, আগুয়ান,
আজি পরশ-পুলক
করিছে সন্ধান,
উধাও, উন্মত্ত
ছুটিতেছে দিশি দিশি হে।
ওহে এ নব-গুঞ্জিত
অনুরাগ আজি,
কত আকুল সঙ্গীতে
উঠিতেছে বাজি,
সবে প্রতীক্ষা করিছে
ল’য়ে ফুলরাজি,
চরণে সঁপিবে,
নাথ, তুমি নিও, নিও হে।
৩৮
প্রণতি
৪
যত সােহাগ, অচ্চন,
আরতি, হে স্বামী,
মম তর্পণ, বন্দন
ধায় অনুগামী,
মম ক্রন্দন, বেদন
সব দিমু আমি,
এসাে মন্দিরে
মম পতি, মম প্রিয় হে।
সফল জাগরণ
১
থেমেছিল সব কোলাহল
অরুণ গেছিল অস্তাচল ;-
দিগ্ দিগন্তর,
বিরাট অম্বর,
সুপ্ত, স্তব্ধ ছিল পৃথীতল ;
নীরব তটিনী,
মূক বিহগিনী,
স্পন্দহীন সমীর চঞ্চল ;
প্রণতি
নিঝুম, নিবিড়,
গভীর তিমির,
ছেয়েছিল শূন্য, জল, স্থল ;
শশাঙ্ক মলিন,
তারা জ্যোতিহীন,
ছিল ম্লান হৃদি-শতদল।
বাজিল যখন,
তােমার নিস্বন,
আলােড়িয়া ব্যোম, অন্তস্তল,
অখিল মথিয়া,
উঠিল ফুরিয়া,
উন্মাদী বিনােদ গীতদল ;-
নিকুঞ্জ নন্দিল,
পবন স্পন্দিল,
আনন্দে বন্দিল নভস্তল,
প্রাণের আহ্বানে,
প্রেম সম্ভাষণে,
পূর্ণ হ’লাে অবনী মণ্ডল।
৪৫ প্রণতি অন্তর মাঝারে, মিট মিট করে’ জ্বলেছিল দীপ ক্ষীণবল, আঁধার সাগরে, বিশ্ব চরাচরে, ছড়াইল রশ্মি নিরমল ;- বিষাদ মগন, জড় জীবগণ, হেরি সবে হরষ-বিহ্বল, পুলকের ভারে, আলােক-সম্ভারে, বসুন্ধরা করে টলমল । ৪ এই জাগরণ, প্রেম-নিমন্ত্রণ, পরাণজুড়ান সুশীতল,- এই দীপালােক— অনিন্দ্য আলােক- নিরুপম, নিত্য, সমুজ্জ্বল, । ,
প্রণতি
এই গীতরাজি,
ফুরিল যা আজি,
দীনের যা’ পাথেয়, সম্বল,-
চাহিছে ভিখারী,
দু’বাহু পশারি',
যেন, নাথ, হয় না বিফল।
বেসুরাে
অনুরাগ-মুঞ্জরিত
হৃদি-কুঞ্জ মাঝে,
রঞ্জিত অরুণ-রাগে
পত্র-পুষ্প-সাজে,
একই ছন্দে কি মাধুরী
বিশ্বময় রাজে!
একই রাগে বিনােদিয়া
বিশ্ববংশী বাজে!
হে বিশ্বরঞ্জন, আজি
এ জীবন-সাঁঝে,
স্মরিয়া বিরাগ মম
মরে যাই লাজে।
৫।
প্রণতি
সােহাগ
অবশ, উদাস প্রাণ,
শত দুখে ম্রিয়মাণ,
কাতরে মাগিল বর
বিধাতার পদতলে ;
দেবশিশু মহামায়া,
লভিয়া উজল কায়া,
অবতীর্ণ হলি এসে
তাই তাঁর কৃপাফলে
২
মুছাতে নয়ন লাের,
বৃন্ত-ভাঙ্গা মন মাের
বাঁধিতে চরণে তাঁর
অটুট প্রেমের ডােরে ;
শুভাশিস্ শিরে লয়ে
মূর্তিমতী প্রীতি হয়ে,
ভুবন মােহিনী মেয়ে,
ঝাঁপায়ে পড়িলি ক্রোড়ে
প্রণতি
প্রাণের আকুল শ্বাস,
হৃদয়ের হা হুতাশ,
ঘুচা’তে মরম-ব্যথা
নিরমিলা বিধি তােরে ;
আয় আয় খুকুমণি,
আনন্দ-অমৃত-খনি,
মায়ার পুতলী মাের,
আয় দেখি প্রাণ ভরে
৪
সুধাই রে মন-চোর,
চম্পক কলিকা মাের,
কোথায় লুকিয়ে ছিলি,
কোন্ স্বপনের বনে ?
কল্পনার কাব্যতীরে,
নন্দন-নিকুঞ্জে কি রে,
ফুটায়ে কনক-কান্তি
দিব্য-দীপ্তি-আভরণে ?
৪৪
প্রণতি
৫
মন্দার-সুরভি-ভার
দিতে বিশ্বে উপহার,
ফুল্লমুখে দুলেছিলি
কোন্ বসন্তের বায় ?
ললিত লাবণ্য ভরে,
দেহলতা টলে পড়ে,
রূপের মালঞ্চখানি
বুঝি ভেঙ্গে যায় যায় !
ফুলদল বুকে দলি,
সেথা কি গুঞ্জরে অলি,
কুহরে কি পিক-বধূ
কুসুমিত-কুঞ্জ-ছায় ?
মধুর মধুপ-রবে,
বিহরে কি সেথা সবে,
কাননে প্রমােদ ভরে
উদাসী মলয় বায় ?
প্রণতি
৪৫
৭
পুষ্পিতা ব্রততী সেথা,
গায় কি প্রেমের গাথা,
মুখর সেথা কি প্রেম
নিঝরের কলম্বনে ?
মাধুরী-মদিরা পিয়ে,
বিভল, বিবশ হয়ে,
ঘুমায় প্রকৃতি সতী
মৃদু মধু সমীরণে ?
কোমল কুসুম-গায়,
জ্যোছনা কি মূচ্ছা যায়,
শিহরি’ কি সেথা ফুল
কৌমুদী-পরশে হাসে?
শ্যামল-শৈবাল-কোলে,
বিকচ-নলিনী-দলে,
কাপিয়া তরঙ্গে রঙ্গে
শারদ সুষমা ভাসে ?
৬
প্রণতি
সেথা কি রে দেববালা,
গাঁথিয়া ফুলের মালা,
করে নিত্য ফুল-খেলা
ফুল নব বৃন্দাবনে ?
কুসুম-বন্যার জল,
তাই কি রে টলমল,
নীরবে নিথর দেহে
উছলিছে আনমনে
আবেশের ঘুম-ঘােরে,
মায়াময় ফুল-ডােরে,
হৃদয়-নিকুঞ্জে বাঁধা
তুই কি রে কুহুরব ?
নেহারি’ বদন-ইন্দু,
উথলিল সুখ-সিন্ধু,
পুলকে পূরিল হিয়া,
মধুর মধুর সব !
প্রণতি
ရီ
কলকণ্ঠে উলুধ্বনি
করি’ বন-বিহগিনী,
আকাশে উধাও হয়ে
গাইছে মঙ্গল-গান।
তােরে পেয়ে খুকুমণি,
বরষে বিটপি-শ্রেণী,
কুসুম অঞ্জলি ভরি’,
সমীরণে ধরি’ তান!
১২
সােহাগ করিতে তােরে,
তটিনী অফুট স্বরে,
উৰ্ম্মি-বাহু প্রসারিয়া
করে মৃদু সঞ্চরণ।
তােরে খুজি’ চারিপাশ
সমীরণ মৃদুশ্বাস
কেলি’ করে নিশিদিন
মঞ্জ কুঞ্জে
বিচরণ !
৪৮
প্রণতি
তুই কিরে ফুলবাস,
প্রকৃতির প্রেমােচ্ছাস,
ললিত তড়িৎ-লতা
নিবিড় নীরদ কোলে ?
প্রতি অঙ্গে ওতপ্রােত
কোটি-চন্দ্র-করস্রোত,
শিহরে ব্রহ্মাণ্ড-তনু
আনন্দ হিল্লোল-দোলে।
১৪
সুকোমল, সুশীতল,
প্রীতি-ফুল্ল শতদল,
নিৰ্ম্মল জ্যোছনা ঝরে
নলিন-নয়ন-কোণে !
ঢল ঢল রূপরাশি
শরতের রাকা শশী,
আয়রে বাছনি তােরে
রাখি হৃদে সঙ্গোপনে
প্রণতি
মায়া-মানুষ
১
হেথাকার নীপ-কুঞ্জ
চঞ্চল, ভঙ্গুর,
কুসুম-আস্তীর্ণ পথ
মরণ-বন্ধুর !
বেদনা-পীড়িত প্রাণ
ফেলি’ উষ্ণশ্বাস,
আকুলি’ ব্যাকুলি’ সদা
করে হা হুতাশ।
কুহেলী-বেষ্টিত এই
ক্ষণিক বাসরে,
কাহার মাধুরী-লীলা
শােভে চরাচরে ?
কার তাঁখি হ’তে ঝরে
লাবণ্য তরল,
জুড়ায় পরাণ ব্যথা-
বেদন-বিহ্বল।
প্রণতি
কাহার ললিত কণ্ঠে
বীণার নিক্কণ,
পঞ্চমে গুঞ্জরি’ উঠে
বিশ্ব-বিমােহন;
মধুর পরশ দানে
কে করে লেপন
ত্রিতাপ-তাপিত বুকে
শীতল চন্দন ?
সােহাগ, আনন্দ, অশ্রু,
প্রেম-সম্ভাষণ,
কাহার অঞ্চল ঘেরি’
প্রাণের অগস্ত্য-ভূষা
সৈকতে কাহার,
তরঙ্গ শুষিতে গিয়ে
করে হাহাকার ;
জীয়ন-মরণ-কাঠি
ল’য়ে নিত্য কাল
কে বিশ্বের নাট্যশালে
রচে ইন্দ্রজাল ?
প্রণতি
৫১
৪
হে নারি, তুমি না সেই
ভীষণ-সুন্দর,
রচিছ জীবন কুঞ্জে
অমা কোজাগর ?
তােমারি নয়ন-পাতে
শিহরে ভুবন,
প্রলয় গজ্জিয়া উঠে,
ফুটে বৃন্দাবন !
বৃদ্ধা হও, প্রৌঢ়া, কিংবা
যুবতী, বালিকা,
মেয়ে নও, মায়া তুমি!
নারী প্রহেলিকা!
দোটানা
আমি ত থাকিতে চাই
সংসারে ভুলিয়া,
কিন্তু প্রাণ কেন কেঁদে
উঠে আকুলিয়া ?
এপারে টানিছে মােরে
মায়ার বাঁধন,
প্রণতি
ওপারে প্রতীক্ষা করে
প্রেম-নিমন্ত্রণ ;
এদিকে মেলিছে দল
নন্দন-কলিকা,
ওদিকে কাতর দৃষ্টি
হানে শেফালিকা ;
হেথায় করুণ গীত
ফিরিছে গুঞ্জরি’,
হােথায় কোকিল কণ্ঠ
মােহিছে কুহরি’!
ফেলিল বিপাকে একি
দোটানার পথ,
ঠেকিয়া রয়েছি মাঝে
‘হরিশ্চন্দ্র রথ’!
অন্বেষণ
অজ্ঞাত পিপাসা এক
জীবন-উষায়,
শৈশবে, কৈশােরে, পরে
মুকুল-যৌবনে,
প্রণতি
জেগেছিল, হে সুন্দর,
খুঁজিনু তােমায়,
আকুল, পাগল-পারা,
ফিরিনু ভুবনে,
২
;
সম্ভাষিনু ফুলে ফুলে,
কুঞ্জ-লতিকায়,
ভ্ৰমিনু বাউল হয়ে
সংসার মাঝারে
কত না চরণ-তলে
লুটাইনু হায়,
বিকাইনু আপনারে
ফিরি’ দ্বারে দ্বারে
কিন্তু কই, পাইনি তাে
তােমার সন্ধান,
কেহ না মুছিল মাের
গলদশ্রুধার,
৫৪
প্রণতি
সবাই দাড়ালে সরে’
করি’ প্রত্যাখ্যান,
কাদিল হৃদয় মাঝে
ক্ষুব্ধ হাহাকার।
৪
প্রণয়-আহ্বান কত
চারিদিক হতে
করেছিল আমন্ত্রণ,
কি ভীষণ হায়,
হৃদয়-বিবরে সুপ্ত
পরতে পরতে
চাতুরী, মাধুরী শুধু
অাখি তারকায়।
কুসুম-বিছানাে পথ
প্রভাতে সম্মুখে
আছিল বিস্তৃত মম,
আমি ফুল্ল মনে
প্রণতি
বাহিরিনু বিহরণে,
কিন্তু ম্লানমুখে
ফিরিনু কন্টকবিদ্ধ
বিক্ষত চরণে।
মােহিনী মূরতি কত
আলিঙ্গন-আশে
করিনু আবেগ-ভরে
বাহু প্রসারণ,
বন্দী হয়ে পড়িলাম
মােহ-নাগপাশে,
ফণীর দংশন করে
বক্ষ বিদারণ।
৭
মথিনু অমৃত-লােভে
সংসার পাথর,
উদগীর্ণ আমার ভাগ্যে
হলে হলাহল ;
প্রণতি
টি তার আছে লেগে
কণ্ঠেতে আমার,
কর্ণ-মূলে জরা-মৃত্যু
করে কোলাহল ।
সেই হ'তে ‘নীলকণ্ঠ
মুদিল নয়ন,
আর না চাহিল ফিরে
সংসারের পানে ;
অন্তরে হেরিল তব
দীপ্ত সিংহাসন,
বাহিরে বিচিত্র লীলা
বিশ্ব-দরপণে।
প্রেম-চক্র
আমি শূন্য, মম অসীম পরিধি
জুড়িয়া নিখিল ঠাই,
এক সূৰ্য রাজে তাহে স্বপ্রকাশ,
দিবস রজনী নাই ;
প্রণতি
৫৭
পূর্ণ পয়ােনিধি তুমি পুরােভাগে
আছ বক্ষ প্রসারিয়া,
বারি-বিন্দু আমি নিত্য রবিকরে
লই প্রাণে আকষিয়া।
বাষ্পভরে যবে হৃদি মম হয়
কাণায় কাণায় ভরা,
অশ্রুকণা স্বামী, বরষিয়া আমি
সিক্ত করি তপ্ত ধরা।
সে নীর নিঝর-তটিনীর রূপে
বেগে ধায় অনুক্ষণ,
শিশুসম তব অঙ্কে আছাড়িয়া
করে আত্মসমর্পণ।
চির-প্রহরী
তুমি যে গাে দেখ মােরে,
অন্তরে, বাহিরে, ঘরে
নিশিদিন জেগে থাক,
নয়নে নয়নে রাখ,
আঁধারে আলােকে দেখ,
চক্ষে না পলক পড়ে।
৫৮
প্রণতি
তব প্রেম-উৰ্ম্মি-মালা
ঘুচায় সকল জ্বালা,
নাহি করে অবহেলা,
মরম পরশ করে।
কিবা স্বপ্নে জাগরণে,
কিবা শান্তি কিবা রণে,
আছি তব শ্রীচরণে,-
চিন্তা, ভয় যায় দূরে।
আমি দুঃস্থ, কিবা রুগ্ন,
দুঃখে বা দারিদ্র্যে মগ্ন,
তােমারি বক্ষেতে লগ্ন,
পুলকে মন শিহরে।
তুমি সখা, বন্ধু, ব্যথী,
সহায়, সম্বল, সাথী,
ভরণী, কাণ্ডারী, গতি,
দুস্তর ভব-সাগরে।
তাপদগ্ধ দিবাযামী
তােমাপানে ধাই স্বামী,
শঙ্কিত মরণে আমি,
উদ্ধার এ মােহ-ঘােরে
প্রণতি
নব বর্ষে
১
নূতন বরষে, নাথ,
এসেছি চরণে তব,
বহিয়া এনেছি যত
আকুল ক্রন্দন সব ;-
দিন, মাস, বর্ষ কত
একে একে গেল চলে,
কত কাজ পড়ে র’ল
করি, করি, কব বলে।
২
বরষে বরষে আমি
নবীন জীবন লাগি,
কত না কাতর প্রাণে
তােমার আশিস্ মাগি,
তিলে তিলে, পলে পলে,
জীবন ফুরায়ে যায়,
প্রাণের সংকল্পরাশি
পূরিল না হায়, হায়।
প্রণতি
উৎসরের শুভযােগে
বেজেছে তােমার শাখ,
শুনেছে সেবক আজ
তােমার প্রেমের ডাক ;
তোমার মহান্ ধৰ্ম
বাহিরিল দিগ্বিজয়ে,
ছুটিতে চাহিছি নাথ,
তােমার পতাকা ল’য়ে।
৪
এই বর দাও মােরে
হে ধর্মের প্রবর্তক,
তােমার আলোেক নিত্য
হােক পথ-প্রদর্শক ;
জ্ঞান, ভক্তি, প্রেম, পুণ্যে
কর মােরে শক্তিমান,
বিবেকে চালকরূপে
কর সদা অধিষ্ঠান
:
প্রণতি
৬১
৫
বিশ্বাস, বৈরাগ্যে, দেব,
সাজাইয়া দাও মােরে,
করুণা-কপােত কর
অবতীর্ণ শির পরে।
হৃদয় টলে না যেন
দেখাে, নাথ, দেখাে দেখাে,
নিয়ত সেবার পথে
রেখাে দাসে, রেখাে রেখাে।
আহ্বান
১
আজি সুন্দর-চরণ-যুগ-কনক-রেণুকা
মােহন মাধুরী প্রাণে বরষিল গাে,
নব-নিৰ্ম্মল-করুণা-শশি-কিরণ-কণিকা
সুশীত পুলকে চিত পরশিল গাে !
হের মধুর-মদির-মৃদু মলয়-পবনে
রসাল-মুকুলবুল বিকশিল গাে,
ওগাে বিহগ-কৃজিত কিবা বিনােদ-বিপিনে
শ্যামল কুঞ্জে ফুল হরযিল গাে !
৬২
প্রণতি
ওই নভাে-বাতায়নে হের পূরব-তােরণে
তরুণ অরুণ ধরা উদ্ভাসিল গাে,
ওগাে অযুত-মুদিত-মধু-ললিত-স্বননে
উল্লাস-হরষ-রস উচ্ছসিল গাে !
৪
কিবা সুষমা-শােভিত নব বিপুল বিভব
সুরভি-সিক্ত গীত-অনুরাগ গাে,
হের ভুবন ভরিয়া আজি মধুরিমা সব
ডাকিছে সঘনে ‘সবে জাগগা জাগাে গাে*
নিঝরের প্রার্থনা
আশার স্বপন-কোলে, আলস-মন্থর,
বিজন আঁধারে ছিল এ ক্ষুদ্র নিঝর।
আজি তার খুলে গেছে কারার অর্গল,
ছুটেছে সে অভিসারে অধীর, চঞ্চল।
ক্ষীণতনু রােমাঞ্চিত বিপুল পুলকে,
উঠিছে সে আকুলিয়া উচ্ছসিত বুকে।
* কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত আকারে, সাঃ, ব্রা, সমাজ প্রকাশিত ব্ৰহ্মসঙ্গীত, ১১
সংস্করণ, ৬৭৫ পৃষ্ঠা।
প্রণতি
সুদীর্ঘ, বন্ধুর পথ করি উত্তরণ,
চাহিছে তােমারে, সিন্ধো, করিতে বরণ,
প্রাণের গােমুখী-ধারা বহি নিশিদিন,
স পিয়া তােমাতে চায় হইতে বিলীন।
আশীর্বাদ কর, নাথ, গেয়ে তব নাম,
নিঝর যেন গাে লভে তােমাতে বিরাম।
বিদুরের ক্ষুদ
১
দেবি,
তােমারে বরণ করি।
এই মধু-নিশি-শেষে ঘুমের আবেশে,
আকুল পরাণে তােমারি উদ্দেশে,
এসেছি ছুটিয়া দুয়ারে তােমারি।
ওগগা জানিনা কেন যে অতৃপ্তপিয়াসে
আসি’ তব দ্বারে মুষ্টিভিক্ষা-আশে,
ডাকিছে কাঙাল ‘রাজরাজেশ্বরি’!
৬৪
প্রণতি
হের তােমারি লাগিয়া নবীন পুলকে
উঠেছে ফুটিয়া স্নিগ্ধ ঊষালােকে
কত বনফুল, বিচিত্র মাধুরী!
৪
ওগাে ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া বন, উপবন,
কত না কান্তার, পুষ্পিত কানন,
এসেছে অনিল নিকুঞ্জ-বিহারী ;
হের আকুল হইয়া বহিয়া সুবাস
তােমারে খুজিয়া ফেলিছে নিশ্বাস,
তােমারি নিকুঞ্জে ফিরিছে গুঞ্জরি।
কত মত্ত নধুকরী মকরন্দ-আশে,
গুণ, গুণ, করি তােমারি উদ্দেশে,
এসেছে উড়িয়া আপনা পাশরি।
৭
ওগাে মােহের স্বপনে হ’য়ে উন্মাদিনী,
মধুর কূজনে, কত বিহগিনী
গাইছে কাননে বন্দনা তােমারি।
প্রণতি
৮
আমি যে গাে অতিদীন, নাহি ত্রিভুবনে
আপন বলিতে কেহ কোনখানে,
আমি যে একেলা পথের ভিখারী।
ওগাে এনেছি তুলিয়া নব বিকশিত,
সুষমা-শশাভিত, প্রীতি-সুরভিত,
যূথী, শেফালিকা, চম্পক-মঞ্জরী।
মাের ওই শুধু আছে, তাই এ প্রভাতে
বড় সাধে দেবি, এসেছি সঁপিতে
বিদুরের ক্ষুদ চরণে তােমারি।
১১
লহ তুচ্ছ উপহার ;
নলিন-নয়নে
চাহ একবার, চাহ মাের পানে,
দাড়াও সম্মুখে তােমারে নেহারি।
;
ওই দৃষ্টি নিরমল পরাণ জুড়িয়া
ফুটায় কমল ; থাকুক জাগিয়া,
পুণ্য গন্ধ তার দিবস শর্বরী।
দেবি,
তােমারে বরণ করি।
৫
প্রণতি
জাগরণ
তােমারি প্রেমের বন্যা
বহিছে আজি ভুবনে,
তােমারি মােহিনী বাণী
ছুটেছে শান্তি-পবনে !
রজনী হয়েছে ভাের,
ভেঙ্গেছে ঘুমের ঘাের,
জাগিয়া নবীনালােকে
চাহিনু মুগ্ধ নয়নে।
শান্ত, দিব্য জাগরণ,
রম্য, দীপ্ত আভরণ,
নেহারি উজলি’ বিশ্ব
ঝলকে প্রতি আননে।
প্রাণিকুল মুখরিত,
প্রীতি-সুধা সুরভিত,
বিশাল বসুধা-বক্ষ
উথলে গীত-বন্দনে।
রতন-বেদিকা তব,
বিচিত্র বিভূতি সব
দ্যুলােকে, ভূলােকে, দেব,
রাজিছে হৃদি-আসনে।
প্রণতি
আজি এ মহােৎসবে,
তৃষিত মানব সবে,
কাতরে করুণা-তরে
নমি হে তব চরণে।
প্রেমের প্রতিমা মােরা
হয়েছিনু প্রেম-হারা,
বিশ্বরূপে প্রেমরূপ
নিরখি শুভ লগনে।
উৰ্দ্ধমুখে চেয়ে রব,
প্রসাদ মাগিয়া লব,
পূজিয়া, হে রাজ-রাজ,
হৃদয়-ফুল-চন্দনে।
সুসমাচার
১
আসিছ,
হে বিশ্বরাজ,
রটিয়াছে ঘরে ঘরে,
ভক্তদল সঙ্গে লয়ে,
উৎসবে, বরষ পরে।
* কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত আকারে, সাঃ ব্রাঃ সমাজ প্রকাশিত ব্ৰহ্মসঙ্গীত, ১১শ সংস্করণ,
৮৭ পৃষ্ঠা।
৬৮
প্রণতি
আবার শুকনা গাঙে
সহসা ডাকিবে বান,
জোয়ার আসিবে যেথা
পড়েছে ভাটার টান ;
মলিন পল ক্ষুদ্র
পড়িয়া রয়েছে পাশে,
ছুটিবে সুদিন পেয়ে
সাগর-সঙ্গম-আশে ;
বহুকাল যে মালঞ্চে
ফুটেনি একটি ফুল,
হবে সেথা ফুলবীথি
গন্ধে দিক সমাকুল ;
নীরস বিটপী লতা
মঞ্জরিবে নব রাগে,
গুঞ্জরিবে মনােভৃঙ্গ
নবীন পিয়াসে জেগে !
২
শুনিয়া অধীর পান্থ
চাহিছে উদ্দেশে তব,
পরিহরি শর-শয্যা
উঠিছে আগ্রহে নব ;
প্রণতি
•
নিরজন গৃহকোণে
মুছিছে নয়ন-জল,
শোেক-শেল পাশরিছে,
নিবাইছে চিতানল
বাসনা-নিঝর তার
খুজিছে করুণ সুরে,
সাগর-সঙ্গম-তীর্থ
আছে আর কত দূরে ?
এত যার আকুলতা
আশার বার শুনে,
সে কি গাে ফিরিবে ঘরে
শূন্য হাতে ক্ষুন্ন মনে ?
হােক্ না সে শুষ্ক, নাথ,
করুণার সিন্ধু তুমি
চির-সিক্ত করে তার
তপ্ত হিয়া মরুভূমি।
প্রণতি
পূর্ণকাম
১
হৃদয়-সরসী তলে
অঙ্কুরিয়া ধীরে,
আশার কমল-কলি
ভেদিল আঁধার ;
ধীরে ধীরে উত্তরিল
আলােকের তীরে,
উৰ্দ্ধমুখে চাহিল সে
উদ্দেশে তােমার।
২
এক লক্ষ্য, এক ব্ৰত,
এক ধ্যান, জ্ঞান,
দেখে নাই কভু, তবু
ছিলে না অজানা,
অন্তরে সে সঙ্গোপনে
সঁপেছিল প্রাণ,
আজি তার পূর্ণ হ’লল
আকুল বাসনা !
প্রণতি
দূরে যারে ভেবেছিল
সে দিল ফুটায়ে,
খুজিয়া, ছুইয়া তার
সুকোমল দল,
তরুণ সে তনুখানি
হরষে বিছায়ে,
পাতিল পুলকে
কলি
পরশে বিহ্বল।
৪
ছড়াইল চারিভিতে
মাধুরী মেদুর,
সােহাগে মলয় তারে
নন্দিল আসিয়া ;
আবেগে অধীর-পারা
অলি ধরে সুর,
চুমিয়া অমিয় লুটে
আগু বাড়াইয়া।
৭২ ।
প্রণতি
{
নিশ্বসি সুরভি রেণু
মত্ত-অন্বেষণে,
আপনা বিলা’য়ে করে
লীলা সমাপন ;
প্রাণের দেবতা, তুমি
দেখিলে গােপনে,
অশ্রুসিক্ত অর্ঘ্য তার
কর গাে গ্রহণ।
মােহিত
১
সুন্দর ভুবনে ফিরি নিশিদিন আমি
মুগধ-নয়নে
সন্ধান তােমার কবে পেয়েছিনু, নাথ,
কোন্ শুভক্ষণে!
ছিন্ন হল তায় যত সংসারের ঘাের,
ব্যর্থ ইন্দ্রজাল,
স্বপন-কুহক-মােহ কত না টুটিল,
ঘুচিল জঞ্জাল।
প্রণতি
২
বিষাদ-আঁধার রাশি, আর্তনাদ কত
মরিল নিশ্বসি’,
জীবন-আকাশ-পটে উঠিল ফুটিয়া
কোজাগর শশী।
খুলিয়া হৃদয়-দ্বার, পরাণ ভরিয়া,
ডাকিনু প্রাণেশ,
কিবা তাপরূপ-রূপ নেহারিনু তব
সম্মােহন বেশ।
বহিয়া মলয়ানিল আনিল তােমার
স্নিগ্ধ পরিচয়,
মাধুরী তােমার কিবা ফুটালে জ্যোছনা
সারা বিশ্বময়।
নয়নে মাখালে একি মােহন অঞ্জন,
তাই বিশ্ব-পটে
মধুর, মঞ্জুল এক বিনােদ সুষমা
[ঞ্জে পুঞ্জে ফোটে।
৭৪
প্রণতি
৪
করি নিবেদন আজি রেখাে এ নয়ন
স্বচ্ছ নিরমল,
বিম্বিত সতত নাথ, করাে তাহে তব
আঁখি-শতদল।
যেন মন-প্রাণ সব, ওই পানে চেয়ে,
দিয়ে উপহার,
জন্মশােধ আমি প্রভু লুটাইতে পারি
চরণে তোমার।
নব জীবন
১
ঘুরিয়া ফিরিয়া, নাথ,
সংসার প্রান্তরে,
এসেছি দুয়ারে তব
শ্রান্ত কলেবরে।
অনন্তে লইতে পান্থে
আসিছে শমন,
সম্মুখে নিবিড়, ঘন,
আঁধার গহন।
প্রণতি
৭৫
মরণ-বন্ধুর পথে
করিব প্রয়াণ,
মৃত্যুহীন জীবনের
করিতে সন্ধান।
২
মনে পড়ে যৌবনের
পুষ্পিত উষায়,
ছুটেছিনু ইচ্ছাহীন,
লক্ষ্যহীন প্রায় ;
নয়ন আবরি’ ছিল
মােহ-কুজ্জটিকা,
আগুলিয়া ছিল বাট
মৃত্যু বিভীষিকা।
কি মােহন মন্ত্র-বলে
আজি শুভদিন,
অর্গলিত পথ সেই
খুলিলে স্বামি !
সঞ্চারি’ পরশ তব
নিগূঢ়, মধুর,
জাগাইলে হৃদি-তন্ত্রে
সম্মােহন সুর।
প্রণতি
পুলকে রােমাঞ্চ নব
উঠিল কায়ায়,
স্মৃতিময়ী, প্রীতিময়ী
জীবন-সন্ধ্যায়।
চলে গেছে চির তরে
বিলাস-বিভ্রম,
জুড়িয়া বসেছে সেথা
দুশ্চর সংযম।
৪
মরুভূ-সমান এই
তপ্ত, শুষ্ক চিতে,
ঝঙ্কারে মুখর তব
প্রেম চারিভিতে।
বন্ধন টুটিছে, হেরি
সুন্দর ধরায়,
হয়ে গেছি বন্দী আমি
অপূৰ্ব্ব কারায় !
মমতা-জড়িত তব
ন্যায়ের শাসন,
বাসনা, প্রবৃত্তি যত
করেছে দলন।
প্রণতি
অহিরাবণের মত
কামনা নিচয়,
জন্মিয়াই রচেছিল
ভীষণ প্রলয় ;
হস্ত, পদ ভগ্ন এবে
কালনেমি প্রায়
সূতিকাগৃহেই সবে
শ্মশানে লুটায়।
অন্তরে জেগেছে আশা,
দীপ্ত-হুতাশন,
তোমার বক্ষেতে, নাথ,
খুজিছে ইন্ধন।
মরে গেছে অবিশ্বাস,
সংশয়-কুহেলী,
আর কি আঁধারে পড়ি’
কভু পথ ভুলি!
অনন্তের আলাে-কণা
মুক্ত বাতায়নে,
উজলিছে দিশি দিশি
পশিয়া পরাণে।
৭৮
প্রণতি
হৃদয়-মালঞ্চ আজি
গন্ধে ভরপূর,
নন্দন-সুষমা তাহে
ফুটিছে মধুর।
লইতে আশিস্, দেব,
চরণে তােমার,
বহিয়া এনেছি এই
দিব্য উপহার,-
নবীন জীবনখানি
লহ নাথ, লহ,
অনন্ত মিলন দিয়া
ঘুচাও বিরহ।
ভৃত্য আজি তব পদে
এই বর যাচে-
সে যেন তায় থাকে
বিশ্বাস-কবচে।
প্রণতি
সমর্পণ
যেদিন আমি তােমায় প্রভু,
পরাণ ভরি’ ডাকি,
চোখের জলে ভাসা’য়ে বুক
পথটি চেয়ে থাকি,
সেদিন আমি দেখিতে পাই
সকল ব্যথা মাঝে,
আমারই এই বিজন ঘরে
তােমার প্রতি রাজে
২
পরশ তব আপনি আসে
খুঁজিয়া অভিসারে,
বাছিয়া মােরে চিনিয়া লয়,
বিলায় আপনারে,
কত না গীত জাগিয়া ওঠে
পুলকে শিহরিয়া,
কোকিল যত বিহরে বনে
হরষে কুহরিয়া।
৮৫ .
প্রণতি
পরাণ-কাড়া প্রেমের ডাক
ভাসিয়া আসে কানে,
তাপিত হিয়া জুড়া’য়ে যায়,
শকতি জাগে প্রাণে ;
সকল দুঃখ, দীনতা, জ্বালা,
মরম-ব্যথা সব,
পাশরি’ যাই শুনিয়া তব
মধুর প্রেমরব।
আঁধার ঘরে ওগাে আমার
মাণিক তুমি হও,
ভাঙ্গাচোরা জীবনটিরে
তােমার করে লও;
আপন সুরে ভরিয়া তারে
বাজা ও নব রাগ,
ভুলাও মােরে দাড়ায়ে এসে
মলিন আঁখি আগে।
নেহারি’ ঐ বদন-শশী
চিত-চকোর মম,
মজিয়া যাক্,
ডুবিয়া থাক্,
মত্ত অলি সম।
প্রণতি
৮১
লুটাই পদে আমারে, নাথ,
সপিয়া তব কুরে,
তােমার হয়ে থাকিতে পড়ে
চাই যে চির তরে।
আর যা ছিল নিয়েছ সব,
রয়েছি শুধু আমি,
এবার তুমি আমারে লও,
দোহাই তব, স্বামী।
কঁদিব আর দিন-রজনী
কত এমন করে,
তরাও ওগাে পারিনে আর
রইতে একা পড়ে।
অভিসার
ওই শুনি অনাহূত
উদ্দাম নিশ্বাসে,
কালের ভৈরব তূরী
কাণে ভেসে আসে ;
৮২
প্রণতি
ক
চির-নব বসন্তের
ধ্রুব অগ্রদূত
আসিছে ফুটায়ে ফুল
অযুত অযুত !
অদূরে আলােক-সিন্ধু,
ভটকুঞ্জে তার
আজি মম জীবনের
অন্ত্য অভিসার ।
পুলকে উদ্বেল হিয়া,
ভেটিব বাহন,
তার আসন্ন হেরি
শুভ নিষ্ক্রমণ ;
বহিয়া বেদনা-ভার
হাঁধার বিজনে
আশাপথ বাহি যাব
আলাে অন্বেষণে ;
শান্তির শ্যামল কুঞ্জ
করিব সন্ধান,
মর্ত্যের দহন দুঃখ
লভিবে নির্বাণ।
প্রণতি
অন্তরে, নিভৃত পুরে,
করে জাগরণ
আকুল জিজ্ঞাসা এক,
‘কোথা সে মরণ ?
রুগ্ন, ভগ্ন দেহ, মন
উত্তরে তাহার,
আকারে ইঙ্গিতে করে
আভাস প্রচার।
মিলন-বাসনা তাই
পূর্ণ কূলে কূলে,
চেয়ে আছে পথ পানে
ব্যগ্র কুতূহলে।
চলেছি নিয়তি-পথে
বিধির ইচ্ছায়,
লইব আশিস্ ভা’র
নবীন ঊষায় ;
আকাশ-গঙ্গার তীরে
দিগৃবধুগণ
উলুধ্বনি করি’ মােরে
করিবে বরণ।
হৃদয়-বেদিকা হতে
স্বতঃ-উচ্ছসিত
৮৪
প্রণতি
অন্তিম প্রার্থনা এই
হ'তেছে উখিত,
‘হে দরদি,রেখাে মােরে
প্রীতিকুঞ্জে তব,
আশ্বাস, বিরাম, আলাে
দিও নিত্য নব'।
অন্ত্যগান
১
ফুরালাে ভবের খেলা,
উপনীত সন্ধ্যা বেলা,
অপেক্ষা করিছে ভেলা
সাগরের কূলে গাে ;
একাকী কাঙাল বেশে,
যাইব নূতন দেশে,
তবুও আশাব বাণী
বাজে শ্রুতি মূলে গাে
২
জানি সােহাগ ভরে,
সাগরের পরপারে,
রচিয়া রেখেছ গেহ
কোন্ শ্যামকুঞ্জে গাে ;
প্রণতি
ঘুরিয়া ভবের হাটে,
আসিয়াছি খেয়া ঘাটে,
কেন ফুল বাটে বাটে
ফুটে পুঞ্জে পুঞ্জে গো!
যৌবন গিয়াছে মরে,
তবু কেন এল ফিরে’
বসন্তের ভরা বন্যা
হৃদি-ফুলবনে গাে !
মােহন-মাধুরী-মাখা,
আশার কিরণ-লেখা,
বিম্বিত আজিকে কেন
মলিন নয়নে গাে !
৪
কেন শ্রান্ত,
জীর্ণ দেহে
সবেগে তড়িৎ বহে
কেন জাগে নব রাগে
প্রতি রক্তবিন্দু গাে !
কেন সুপ্ত গীতরাজি,
আকুলি উঠিছে আজি,
মুম্ষুর ক্ষীণকণ্ঠে
খুজি’ প্রেমসিন্ধু গাে !
প্রণতি
জানি আমি কোথা হতে
আলােক-বিছান পথে
মধুর শ্বাস-বাণী
ভেসে আসে প্রাণে গাে,
যে দু’দিন এই ভবে,
এখনাে থাকিতে হবে,
চেয়ে রব নিনিমেষ
ওই দিক পানে গাে।
তােমার কৃপার দান,
এই দেহ, মন, প্রাণ,
চরণে সঁপিয়া দিব
তােমারি বিধানে গাে;
অন্তিমে ঘুমায়ে হেথা,
বিসরি’ সকল ব্যথা,
জাগিব আনন্দলােকে
উচ্ছসিত গানে গাে।
প্রণতি
মেখে দিও ফুলরেণু,,
শ্যামল অঞ্চলে তনু
ঢাকিও, কোমল করে
সান্ত্বনা বুলায়ে গাে
শীতল পরশ দিয়া
জুড়া’য়াে তাপিত হিয়া,
বেঁধে রেখে কলকণ্ঠ
গৃহ-কুঞ্জ-ছায়ে গাে।
সাজা’য়ে নবীন সাজে,
ডেকে নিও নিজ কাজে,
জনম সফল যেন
হয় সেই দেশে গাে ;
এখানে রহিল যাহা
অপূর্ণ, যেন গাে তাহা
পূরে সব, মেটে সাধ,
অই পায়ে শেষে গাে।
৮৮
প্রণতি
মহাপ্রয়াণ
১
যে জন কঁদিয়া গেল
এই মৰ্ত্ত বাসে,
আপনার কেহ যা’র
কাঁদিবার নাই,
আজি তার জন্মশােধ
অন্তশয্যা পাশে,
নীরবে দাড়া’য়ে তুমি
কে পথিক ভাই ?
২
শুধাই তােমারে, ভদ্র,
আজি নিরালায়,
সে কি গাে একেলা হেথা
বিজন কান্তারে ?
ভবিষ্য সর্গের এই
পূত ভূমিকায়,
নাই কি গো কেহ কোথা
সম্ভাষিতে তারে ?
প্রণতি
এই পুণ্য জাহ্নবীর
করুণ কল্লোল,
কুসুম-নিশ্বাস-বাহী
আকুল সমীর,
কলকণ্ঠ-বিনিঃসৃত
বিষাদ-হিল্লোল,
যামিনীর জ্যোৎস্না-সিক্ত
শিশিরানীর ;
৪
শ্যামল বিটপি-লম্বী
স্নিগ্ধ পুষ্পহার,
মাধবী-মাধুরী-ভরা
বিপুলা ধরণী
এরা যে করিছে সবে
অন্ত্যেষ্ঠি-সৎকার
মরণ হয়েছে তার
বিশল্যকরণী !
৯০
প্রণতি
৫
এই পূততীরােখিত
যুগান্তের কত
ভপােবন-উচ্ছ সিত
শুভ্র সামগান,
কোটা মুক্ত-আত্ম সহ
হ'য়ে একত্রিত,
করেনি কি আজি এই
শয্যা তীর্থস্থান ?
কত আশা ফেলেছিল
তপ্ত দীর্ঘশ্বাস,
আজিকে জেগেছে সাবে
শীতল বীজনে।
এ নহে কি তবে তার
ফুলশয্যা বাস ?
সে যে গাে সুষুপ্তি-কোলে
রম্য জাগরণে।
প্রণতি
৭
সংসারের প্রেম ছিল
স্বার্থ-বিনিময়,
হৃদয়ে হৃদয়ে ছিল
কত ব্যবধান,
মরণ-সমাধি-গর্ভে
পেয়েছে বিলয়,
সকল দুঃখের আজি
হয়েছে নির্বাণ।
অনাবিল, মুক্ত প্রেম
হ'য়ে আগুয়ান্
সম্ভাষিয়া উথলিছে
আজি চারিভিতে
অনিন্দ্য আনন্দ-লােক
করিছে আহ্বান
মরতের ‘নীলকণ্ঠে’
প্রীতি-সিক্ত গীতে
প্রণতি
R
যাও, ভদ্র, গৃহে ফিরে ;
বলিও সবারে—
‘নিবেদিয়া অঞ-অর্ঘ্য
বিভুর চরণে,
আৰ্ত্ত, শ্রাদ্ধবিবচ্চিত
মৃত্যু-পর-পারে
চলে গেছে দিব্য ধামে
প্রেম-নিমন্ত্রণে
No text on this page.
No text on this page.