Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Ma
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মা।
ধৰ্মমূলক নাটক।
এমার থিয়েটারে অভিনয়
শ্ৰীযুক্ত বাবু অতুলকৃষ্ণ মিত্র প্রণীত ।
১৩৩ সাল
নিমাইচরণ বসুর প্রকাশিত,
২ নং ফড়িয়া পুকুর ষ্ট্রীট
PRINTED BY B. L. DASS. "AT TOE NEW CALCUTTA PRESS". NO? HORIMOHUN BASU'S LANE.- CALCUTTA, নাট্যোঙিখিতৰ্যক্তিগণ ! ৪ । ৪০০ কালকেতু সােমাই ওঝা ঐ পুরােহিত। মুরারী পােদ্দার বণিক। ভডি, দত্ত কালকেতুর দেওয়ান বুলান মণ্ডল সাধনার পিতা। বোস্তম যবন। শিবা ভাঁড়র গােদা ভাই। ধূমকেতু ভড়ির শ্যালক। সিদ্ধিনাথ ব্যাধগণ, সভাসগণ, পাইকগণ, কলিঙ্গ কোটাল, পুরােহিত, সৈন্যগণ ইত্যাদি সিংহ, হস্তী, ব্যাঘ্র, ভল্লুক, বানর ইত্যাদি পশুগণ। . ০ ৬ ০ ৫০০ ০ ০ ০ } ফুল্লরা • ০ p স্ত্রী চরিত্র। কালকেতুর স্ত্রী। বিমলার মা ঐ সই। মােড়শী রমণী ... চণ্ডীর ছদ্মবেশ। দুৰ্ম্মখা ভাড়, প্রথমাস্ত্রী। ঐ দ্বিতীয় স্ত্রী। সাধনা ••• বুলানের পালিতা কন্যা। অষ্টকুমারীগণ সাধনার সঙ্গিনীগণ। মুরারী পত্নী, ব্যাধিনীগণ, ইত্যাদি ০ ০ ০ ০৪ ০ দুঃশীলা * * * ৫০ ০
No text on this page.
মা।
প্রথম অক।
প্রথম দৃশ্য।
( গভীর বন মধ্যভাগ—চন্দন তরুতল।)
রাজাসনে সিংহরাজ—একপার্শ্বে ছত্রকরে হস্তী,
অপর পার্শ্বে মন্ত্রীবেশে ভল্লক, সেনাপতি
বেশে ব্যাঘ্রদূতবেশে বানর ও
অন্যান্য পশুগণ উপস্থিত।
সিংহ। তড়াক করে মারব লাফ,
পােটাপথ করব’ সাফ,
বন্ থেকে গ্রাম গ্রাম থেকে বন্ ছাড়াব'।
বাড়লে পরে খিদের বাড়,
হালুম করে ভাঙব ঘাড়,
মানুষ পশু যায় পাব তায় মেটাব’ ।
ব্যাঘ্র। এদিক ওদিক চাইব’ যাব, ,
আগে থেকে গন্ধ নেব,
মা। [ প্রথম অঙ্ক। ওত, বুঝে ঠিক-আঁচ কোরে ঠাই মাড়াব। খিদের জ্বালা থাক বা না থাক্, শীকার পেলে দেব’না ফঁা বুকে হেঁটে পাছু থেকে ঝুপ-লাফাব’ । বানর। সিঙ্গি মশাই বেশ বলেছ-বাঘ মামাও ভাল। হাতী হুজুর এইবারে একগাদা নেদে ফেল ॥ হস্তী। মাংসাশী নই, মাংসাশী নই, গাছ পালাটা চাই। নদর গদর চলতে ছুটি চপ চপ খাই । বানর। ভালুক খুড়াে ! তােমার কি রা নাই ? ভল্লুক। আছে আছে আছে, কচকচি কি ক’চ্চ সবাই, কেলাে রয়েছে পাছে। সিংহ। ( সচকিতে পিছনে চাহিয়া ) কৈ ? কোথারে ? এলাে নাকি ব্যাঘ্র। মারব’ নাকি লাফ । হস্তী। বাপরে বাপরে কি হলো বাপ। বানর। এস না! ছুট মারি না সাফ । "ভল্লুক। থামাে থামাে থামাে-- নাম শুনে সব ডরিয়ে গিয়ে কোকিয়ে উঠ কেন ? চণ্ডী যখন রাজি দিলেন, না নিলেই তাে হােত। আত্মশাসন রাজনীতি পথ নাই বা পশু পেত। ( নিজের) ওজন বুঝে নাওনি, এখন খাচ্চ হাবুডুবু । রাজ্যগিরি কি ঝারি,—দেখি সকল বাবুই কার। এই পশুবাবুদের সকল বাবুই কাবু । সিংহ। লােড়েছি ত’ সাতটা লড়াই ? ?
2
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
ব্যাঘ্র।
আমিও বা কি কম ?
ভল্লুক! ওকে বলে মুখের বড়াই (কাজে) কোরেছে বেদম ?
হস্তী। ও বাবা সে ব্যাধের পাে,-
একা কেলাে সে একটি শো,
(তার) তীরের চোটে পাহাড় নৃড়ে;
পালাই খেচে উভরড়ে।
ভল্লুক। শােন-শােন শােন -
(সব) পালিও পিছে যে যার আঁচে
( জানি খুব) দৌড় দিতে জান’
বাক্যে দড়, দম্ভে বড়, কার্যকালে ভ্যাক।।
মেগের কাছে পেগের বড়াই, পরের কাছে ন্যাকা।
এক হােলে সব, রাজ্যি নিলে, চণ্ডীর কাছে মেগে ।
কেউ রাজা কেউ পাত্তর হােলে কেউ বা মছ রেগে
পেতেন। পেতে, দলে দলে দল, ঢং ধরেছ ঠি।
আত্মশাসন সং সেজে, রং ক’ত্তেছ ছি—ধি ॥
ব্যাধের বাণে ম’রতেছ তাই একলা একলা হ'য়ে।
বাঁচবে যদি, এক দলে হও, রাজ্যি যাবে রয়ে ।
তােমাদের রাজ্যি যাবে রয়ে ।
বানর। খুড়াে বলেছ ঠি।
এক এক দলের এক এক ছলা (অথচ) সব দলই বেল্লিক
সিংহ। দল বুঝি না—ছল বুঝি না, রাজ্য দেছেন চণ্ডী।
বনের ভেতর ব্যাধ না আসে, মেরে দিয়ে যান গণ্ডী ।
৪
মা।
[ প্রথম অঙ্ক
পশুগণের গীত।
।
ব্যাঘ্র ইত্যাদি পশুগণ।—ওমা এইটি কর তারা।
আমরা যেন মারুতে পারি যাইনে যেন মারা।
সিংহ। নড়তে চড়তে হয় না যেন মা-
এমনি কর ধারা।
বােবাে শােব খাব দাব বাকি ঝাড়ব খারা।
ব্যাঘ্র ইত্যাদি।-ওমা এইটি কর তারা।
আমরা যেন মারতে পারি যাইনে যেন মারা।
সিংহ। দলে দলে ঘোঁট পাকাব মা-
হ’ব না হেরেও হারা।
আপন গণ্ডা বুঝব’ নেব’—পর কেঁদে হ’ক সারা
ব্যাঘ্র ইত্যাদি। ওমা এইটি কর তারা।
আমরা যেন মারতে পারি যাইনে যেন মারা।
সাম্য স্বাধীনতার কথা মা-
প্রাণকে আঁখি ঠারা ।
যে যার আপন ভাংব চুরব’ গড় ব’ আপনাপারা
ব্যাঘ্র ইত্যাদি। ওমা এইটি কর তারা।
আমরা যেন মারুতে পারি যাইনে যেন মারা ॥
সিংহ।
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
৫
বানর। পালারে পালারে—পালা, ঐঐঐ এলাে কেলে।
[ পলায়ন।
ভা। ভাল, ভাল, ল্যাজ গুটিয়ে লম্বা দি সব চল ।
[ পশুগণের পলায়ন।
(বনপার্শ্ব হইতে কালকেতুর প্রবেশ।)
}
কাল। (স্বগত) মাগাে ! কি কলি মা! জীব দিলি যদি ত’
পােড়। পেট দিলি কেন ? পেটই যদি দিলি ত’ তার
খিদে দিলি কেন মা? আবার থিদেই যদি দিলি ত’
তা মেটাবার মত আহার দিলিনি কেন মা? তুই কি
আমায় জব্দ কচ্চিস? না এই পােড়া পেটের খিদে
কমাচ্ছিস? তা কমাতে পারিস তো কমা ;কিন্তু
তাের কৃপায় আমারই বেন কলাে—আমার কুঁড়ে ঘরে
যে দুঃখিনী আলাে করে বসে আছে,—যাকে আমার
প্রাণের সঙ্গে গেঁথে দিয়েছিস, খিদের জ্বালায় যার প্রাণ
কদূলে যে আমার সুমুখে কখনও চক্ষের জল ফেলেনি,
তার কি হবে মা? তাকে কি করে বাঁচাব’? এমন
করে আর ক’দিন যাবে মা? বনে পশু নেই খাব কি?
দুঃখিনীকে খেতে দেবকি ? ফুল্লরা আমার প্রত্যাশে
দাড়িয়ে আছে—আমি শুধু হাতে কি ব’লেগে তার
কাছে দাড়াব ? আমার যেমন তােতে নির্ভর-সে
বেচারি তেমি যে আমার উপর নির্ভর করে আছে। কি
হবে মা কি হবে?
৬
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
কালকেতুর গীত।
ওমা আমি যে তাের ভিখারী ছেলে।
কেন নিলিনা কোলে, দিলি চরণে ঠেলে,
ভব ভাবিনী ভাবালি ভব পাথারে ফেলে ।
চিতে চেতনা দিয়ে,
দিলি নিলি চিনিয়ে,
এবে চাহিতে চাহিলে দুটী নয়ন মেলে।
কেন আলােকে লুকাস কালী আঁধার ঢেলে ।
(গীত শেষে একান্তে সুবর্ণ গােধিকার ধীরে ধীরে প্রবেশ।)
কালকেতু। এ কি অলক্ষণ ! মাগাে! আজ অনশনই কি
আমার অদৃষ্ট লিখন? ভাল তাই হােল্ক। সমস্ত দিন
গেছে—পশুপাখীর চিহ্নমাত্র পাইনি-যাত্রাকালে এই
অলক্ষুণে গোধাই তার মূল, একে আজ জীয়ন্ত পােড়াব।
[ গােধিকা ধনুহুলে বন্ধন করিয়া প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কালকেতু ব্যাধের কুটীর প্রাঙ্গণ।
( কুটীর হইতে ফুল্লরা ও পার্শ্ব হইতে বিমলার মার প্রবেশ।
বি-মা। ও সই আমি এসেছি।
ফুল। এসেছ সই! বেস্ করেছ। ব’স! আমি কি হলে
রয়েছি একবার ভাল করে দেখ।
দ্বিতীয় দৃশ্য। মা। ৭ * না ওখিয়ে যাব বি-মা। তাই’ত! একি ? দেখি (কুটীরের দিকে চাহিয়া) ওমা ! আজ কি সই তাের হাঁড়ি চড়েনি ? ফুল। আজ, শুধু কি সই! আজ তিন দিন চড়েনি। বি-মা। সেকি! কেন সই। ফুল্ল। কেন আর কি বলব সই! আমি যে গরিবের ঘরণী, আমার সােয়ামি যে দীনের দীন ভিখারীরও ভিখারী, ভিখারী তার ভিক্ষা রােজ পায়, আমার ভিখারী যে তাও পায় না! যে দিন পায় হাসি মুখে খায়, যে দিন না পায় সে দিন এসে আমার গলা ধরে হাপুস নস দ! সই। ঠিক্ ছেলে মানুষের মত কাঁদে ! নিজেওয়াও বাস গ্রাহ করে না। আমি অভাগী যে না খেতে এই ভাবনায় তার বুকের ভিতর যেন জ্বলে জ্বলে উঠে। আমিই কি সেই শুরু মুখ দেখে থাকতে পারি ? তখন প্রাণ ভরে কঁাদি আর ভাবি-হে মা ভগবতী! আমার এমন সােণার স্বামীকে কাঙ্গাল কল্লে কেন ? বি-মা। আহা! এত দুঃখ সই! তা আমরা কি তাের পর। একবার আমাদেরও তো খবর দিতে হয়, দুকাটা চাল হয় ধার দিতুম, আর বেলা এসে কিছু আনাজ কোনাজ দিয়ে যেত। জরা আহা সই! তা কই ? তাও কি আমার করবার যাে আছে! ধার ক’ত্তে দিতে কিছুতেই চায় না। যদ্দিন ঘরে জিনিসটে পত্তরটা ছিল, তদ্দিন একে একে গােল- হাটে সে সব বিক্রি করে খাওয়া পরাটা চলেছে, শেষে তরসু দিন বাকি ছিল মেটেপাথর খানা, সেখানা বেচে
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
এক ব্যালা চলেছে, তারপর এই তিন দিন কিছু ধার
কোরে আনি বােলে কত সেধেছি কত বলেছি কত পায়ে
ধরেছি কিছুতেই নয়। বলতে গেলেই টানাটানা দুই
চক্ষু জবা ফুল হােয়ে ওঠে! আর দ দ কোরে জল
পােড়তে থাকে।
বি-মা। তা হঁ্যা সই। সয়ারি আমার এমন দশা হলাে কেন ?
আগেত' খুব বােজগার পাতি হতাে?
ফুল্ল। বনের পশু মেরে আর কদ্দিন চলে সই ? তাও একরকম
ক আষ্টে চ'ততা, কিন্তু গণক ঠাকুরের কথা শুনে ওর
গীত শেষে থেকে পণ, তিনবার তিনটি তীর ছুড়বেন,
তা। এ হলে শুধু হাতে ফিরে আবেন। তা তাতেই
বেস, তো! এখন বলেন অবলা জানয়ারদের বিনা
দোষে মাত্তে যেন প্রাণ ফেটে যায়।
বি-মা। ঐ যে তােমার বীর আচে ! সই আমি এগুই, আং
আর যেন উপােলি থাকিস নি, আসি-মাথা খা।
।
[ প্রস্থান।
ফুল্ল। তাই তাে! অজিও যে শুধু হাতে! হা। কপাল !
( কপালে করাঘাত।
(সুবর্ণ গােধিকাকে বন্ধন
অবস্থায় ধস্থলে লইয়া কালকেতুর প্রবেশ।)
ফুল। আজও কিছু পাও নি।
কাল। কিছু না-
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
ফুল্ল। তবে কি হবে। আজও না খেয়ে থাতে পাবে কি?
কাল। মরেও যদি পাত্তে হয় তাে পা'ব, কিন্তু তুমি যে
আমার এখনি শুফ লতার মত লতিয়ে পড়বে, এ কথা
ভাবতেও সাহস হচ্ছে না! আজ আমি আমার বাচন
মরণের ভিখারী নই! কাঙ্গালের বাঁচনেও সুখ নাই
মরণেও দুঃখ নাই, কিন্তু তােমার কি হবে ?
ফুল। আমার কি হবে? আমি তােমার মুখ দেখে আরও
একদিন থাকতে পারব, কিন্তু এমন করে আর কতদিন
যাবে ?
কাল। মার মনে যা আছে তাই হবে। খাওয়াও তিনি, না
খাওয়াও তিনি। খাওয়াতেও তিনি, না খাওয়াতেও
তিনি। তাঁর জীব, না খেয়ে যদি বেঁচে থাকতে পারি,
তারই জয় জয়কার, কাঙ্গালদের একটা গতি হয়, তারা
আর কাঙ্গালী থাকে না, মার কোলে শুয়ে সুখে নিদ্রা
যায় ; পেটের দায়ে পরমার্থ ফেলে পশুর মত ঘুরে
বেড়াতে হয় না। আহা! ফুল্লরা, মা কি আমার সে
দিন দেবেন্ ? ওহহা মা গাে! (মস্তকে হাত দিয়া ভূমিতে
উপবেশন )
ফুল্ল। তাই’ত! কি করি গা? এ বুকভাঙ্গা যাতনা আমি
কেমন করে চক্ষে দেখি ? দেখ তােমার পায়ে পড়ি, তুমি
ততক্ষণ ঐ বেতবনের পুকুর ঘাট থেকে হাত পা ধুয়ে
এসসা। আমার সইয়ের কাছে আমি পেতুম—সেই দু
কাটা চাল সে আজ দেবে বলেগেছে, আমি নিয়ে আসি,
তােমার গা ছুয়ে বছি আমি ধার কত্তে যাচ্ছি না।
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
কাল। পেতে ? আবে? যাও ! শক্তি তুমি! শক্তিহারাকে
শক্তি দাও!
[ উভয়ের উভয় দিক দিয়া প্রস্থান।
(অকস্মাৎ স্বর্ণ গোধিকার ঘােড়শী
রমণী বেশে পরিবর্তিত হওন ও কুটীর দ্বারে উপবিষ্ট হইয়া গীত।
এ যে আমায় বেঁধে এনেছে।
গুণে বেঁধেছে।
কত কেঁদেছে মা বলে আমি আসিনি,
ভাল বাসাতে চেয়েছে ভাল বাসিনি,
শেষে ভক্তি গঙ্গাজলে, দাস্য পুষ্পদলে,
প্রাণ ঢেলে পুজা করেছে।
আহা! সাধনা সঙ্গীতে সাধু ডেকেছে।
(চাউল হস্তে ফুল্লরার প্রবেশ।)
•
ফুল্ল। একি! দেবকন্যা নাকি ? (অগ্রসর হইয়া) তুমি কে মা
আমার ভাঙ্গা কুড়ের দোর আলাে করে বসে আছ !
বো। আমি বাণের মেয়ে, পাহাড়ে মেয়ে আমার ডাকনাম ।
ফুল্ল। তােমার বাপের বাড়ী কোথা!
যাে। গিরিপুর ।
ফুল্ল। শ্বশুর বাড়ি ?
দ্বিতীয় দৃশ্য,।]
মা।
১১
যাে। শ্বশুর বাড়ি জান না? যেথায় বাঘে গরুতে এক ঝরনায়
জল খায়, মলয় বায়ু দিবা রাত্তির বয়, ফুলের গাছে
ফুল ফুটে যেথায় দেবতার মাথায় আপনি ঝরে পড়ে,
যেখানের ভাণ্ডারের ধন অফুরন্ত, দশহাতে বিলিয়ে
আমি ফুরুতে পারিনি—যে যায়গায় রােগী ভােগী যােগী
সবারই সমাদর। যে ঠায়ে কষ্টে প্রলয়অগ্নি জ্বলে, বিরাট
মেঘে বিদ্যুত খেলে, বাজের উপর বাজ পড়ে, অথচ
তুষ্টে—আশুবিল্বদলে। যেথায় মােহ টুটে, প্রাণ ছুটে
আশার অধিক ফল ফলে। যেথা ক্ষুধা নাই, তৃষ্ণা নাই,
আশা নাই, নিরাশা নাই, দীন দরিদ্র গৃহস্থ ধনীর সমান
মান, যেথায় হা হুতাশের সাড়া নাই, ভালবাসায় বিচ্ছেদ
নাই, বিচ্ছেদের বুক ভাসান’ কান্না নাই, সেই পাহাড়ের
গায়ে আমার শ্বশুর বাড়ি।
ফুল্ল। তােমার পােয়ামী আছেন ?
যযা। খুব আছেন, এ কাল সে কাল তিনকাল ধরে আছেন।
অজর অমর দেহের বড়ায়ে আপনাকে দেবতার দেবতা
বলে বলান। আমায় গালাগাল দেবার সময় তার
পাঁচমুখ বেরয়,
তার সে গালাগাল ত নয় যেন গানের
ছড়া। একবার একটি কালকোল বাণের ছেলেকে সেই
ছড়া শুনিয়ে, মাটী করা ছেড়ে জল করে দিয়েছিলেন।
স্বামী আমার যেমন গালাগালি দিতে মজবুত, তেমনি
গাল খেতেও মজবুত। ভাঙ্গড় বল, নেসাখাের বল,
শ্মশানের মুফরাস বল, কিছুতেই দ্বিধা নাই। একদিন
নন্দী বলে একটা ছোঁড়া কতকগুলাে ছাই মাখিয়ে দিলে,
-
১২ মা। [ প্রথম অঙ্ক কানে দুই ধুতরার ফুল গুজেদিলে, মাথার চুলে জটা বানালে, মটকায় ছিল গােখরাে সাপ-ঝুকরে সেই জটায় পড়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে রইলাে, কতকগুলো ভূতপ্রেতকে সঙ্গে দিয়ে, একটা সঁড়ে চড়িয়ে, তাড়িয়ে দিলে, তাতেও মিন্সে রাগলেনা। রাগ নেই ত নেই, রাগলে আর রক্ষা নেই। ফুল্ল। তিনি দেখতে কেমন ? যাে। নেংটা নাগার মত, অথচ তার রূপ ধরেনা। ফুল্ল। তবে বেশ! তা জিজ্ঞেস করি, এমন বড় ঘরের মেয়ে এমন বড় ঘরের বউ হয়ে, একলা এ বনের ভিতর কেন এসেছ? যাে। এসেছি কি সাধে! আমার সকল ভাল অথচ কিছুই ভাল নয়, আমার সকল আছে অথচ কিছুই নাই। আমি কুলিনের মেয়ে পড়েছি মহা কুলিনের হাতে, কুলিনের মেয়ের জ্বালা জান ত’? বে—হয়েছে ভাল, কিন্তু সতীনের জ্বালায় বরাবর জুলছি। সতীন আবার যে সে সতীন নয়, তার তরঙ্গ কত ? হেলে দুলে যা, রূপের গরবে স্বর্গ থেকে ধরাতল—ধরাতল থেকে তলা পর্যন্ত ছুটে বেড়ান। কম বয়সী হয়ে থােয়ামীকে মুটোর ভিতর করেছে-ঝাপটা মেরে মাথার উপর উঠে বসে ! ঠাকুর- টীও আমার মাথা থেকে নামাতে চা-হতভাগী তার ধ্যান জ্ঞান জীবন স্বরূপিণী হয়েছে। আমার বেলা গালাগাল, আর তার বেলায় আদর একি মেয়ে মানুষ হয়ে কেউ সইতে পারে ? তাই সতীনের সঙ্গে ঝগড়া
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
করে সরে এসেছি—এখন দুই চক্ষু ছেড়ে তিন চক্ষু
বা’র করে যে দিকে মন চায়, সেই দিকে চলে যাব।
এ সােণার রং কালি করে, এই বনবাসে থেকেও আমি
অনেক সুখী হ'ব।
ফুল্ল। আহা সতীনের জ্বালায় চলে এসেছ ? এম্নি হয়ই বটে।
কিন্তু মা সতীনই যেন তােমার পর-স্বামীত পর নয়।
অবলা আমরা-আমাদের যে স্বামীই সৰ্বস্ব। স্বামীই
গতি ; স্বামীই সতীর বিধাতা সুখ মােক্ষ দাতা! স্বামী
বই আর আমাদের কে আছে ? তা হামা! এতােটা
কি ক’ত্তে আছে। আমরা ছােটো জাত, স্বামীর উপর
রাগ ক'রে কুলের বাইরে যেতে আমরাই ভয় পাই,
তুমি মা ভাল জেতের মেয়ে-তােমার অঙ্গে রূপ ধরে
—তােমার গা সােণায় মােড়া, তােমার কি এ কাজ
ভাল হয়েছে ?, দশে যে অপযশ ঘুষবে না।
যাে। দেখ, আমি কুলের মেয়ে কুলের বউ, আমার ভাল
মন্দ আমি ভাল জানি। অপশের ভয় রেখে কি কেউ
বাড়ির বার হয় ?
কুল্ল। তা হবে না, আজ রাগ হয়েছে, কাল রাগ পড়ে যাবে,
তখন যে মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে হবে ? তা হবেনা মা
তা হবেনা—তুমি বাড়ি যাও, ঘরের লক্ষ্মী ঘর আলো
করে থাকগে।
ষো। ও কথাটি বলাে না, সে বাড়ীতে আর সেঁধােব না-
বিশেষ এখানে এই বনের ভেতর আমি আমার মনের
মত ধন পেয়েছি ! একলা বসে কঁদছিলেম, তােমার
२
১৪
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
বীর স্বামী আমায় নিজগুণে বেঁধে এনেছে ? তুমি
যতই বলনা কেন, আমি বীরকে ছেড়ে আর কোথাও
নােড়ব না। তার দুঃখ দেখে আমার বড় মায়া হয়েছে।
আমার ধন তাকে দেব, এই কুঁড়েঘরে সােণার অট্টা-
লিকা তুলব, এই বন কেটে নগর বসাব, তােমার স্বামীকে
রাজা কব’, আর তুমি তার পাশে রাণী হবে।
ফুল্ল। আর তুমি, তুমি কি কবে ?
যাে। আমি তােমার স্বামীর আশেপাশে থাকব, বুকের
ভেতর বাসা নেব’—প্রাণের দুটি চোক ফোটাব—আর
তােমায় ফেলে দিবা রাত্তির আমায় যাতে নিয়ে থাকে
তারি চেষ্টা ক’ব !
ফুল। সব্বনাশ! ও মা! তােমার পেটে পেটে এতত?
আপনার ছেড়ে পরের নিয়ে টানাটানি? আবার বলছে
তিনি ডেকে এনেছেন, আচ্ছা দেখি দিকিন, তিনি কেমন
করে তােমায় নিয়ে ঘর করেন। পেটের জ্বালায় মরি
তার উপর আবার সতীন গেঁথে দেবেন! গলায় দড়ি
দিয়ে না ম’ব।
. বেগে প্রস্থান।
৫
যাে। (স্বগতঃ ) সংসারী যােগী হয়ে যােগেশ্বরের ধ্যান করে।
সেই যােগেশ্বরের যােগের যােগিণীর পূজা কি হবে না।
স্বর্গ আমার চেয়ে ছিল—স্বর্গ আমায় পেয়েছিল, মৰ্ত্ত
চায়-মৰ্ত্ত কি আমায় পাবে না ? কে এমন পাষাণী মা
আছে যে সন্তানের কান্নায় টলে না? সন্তানের শুষ
দ্বিতীয় দৃশ্য।] মা । মুখপানে ফিরে চায় না? শিশুর প্রথম কথা মা, প্রবীণের শেষ কথাও মা, মায়া মমতায় মা নামের জন্ম, প্রাণ ভ’রে যদি আমায় এ মধুর মা বলে কেউ ডাকে, আমিত কৈ থাকতে পারি না। আমি যে এই ছুটে আসি। ছেলে কোলে করে তার মুখ চুম্বন করায় যে কি সুখ তা যার আছে সেই জানে, যাকে দশে মা বলে সেই বােঝে। মা ডাকে পাতকী তরে যায়, যমদূত ছুটে পালায়, শিব- দূত কাণ পেতে শশানে—আর প্রাণ ভরে হাসে, বিষ্ণুদূত বৈকুণ্ঠে নিয়ে যায়। আজ পৃথিবীকে সেই মধুমাখা মা নাম ডাক্তে শেখাব। মায়ের কোল পেয়ে জগতের জীর্ণ জ্বরা আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাবে। (একান্তে ফুল্লরা ও কালকেতুর প্রবেশ) ফুল্ল। ঐ দেখ, দেখছো ত, এখনও বল-না। কাল। তাই তাে! ইনি কে। ফুল্ল। আহা! যেন কিছুই জানেন না! আকাশ থেকে পড়- লেন আর কি! লজ্জা করে না? ভয় নেই ? পরের মেয়ে পরের বউ ঘরে এনেছ’—মাথার উপর কলিঙ্গের রাজা আছে জ্ঞান নাই? নিজেও মজলে আমাকেও মজালে। কাল। আহা আমি কি মিথ্যা বছি! এই দেখ (অগ্রসর হইয়া) তুমি কে মা? আমি সামান্য ব্যাধ, আমার ভাঙ্গা কুঁড়ের চারিদিকে পশুর হাড়-পশুর নাড়ি-পশু মাংসের ছড়া- ছড়ি—এ শ্মশানের মতন জায়গায় কে তুমি ঠাকরুণ।
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
যাে। আমায় তুমি এনেছ তাই এয়েছি'
ফুল্প। (কালকেতুকে) আর ঢাকৃচ’ কি, ধরাত পড়লে ?
কাল। আহা শােন না। হাগা ঠাণ! মিছে কথা কয়ে
কেন আমায় রাগাচ্চ ! না বুঝে যদি ঘরের বার হয়ে
এসে থাক, ভেঙ্গে বল, সন্ধ্যে না হতে হতে তােমায়
ঘরে রেখে আসি। ফুল্লরা তােমার সঙ্গে চলুক, আমি
পিছনে ধনুৰ্ব্বাণ নিয়ে যাই। এ অবস্থায় কেউ দেখলে
নানা কথা শুনতে হবে। পুরান কাপড় আর অবলার
জাত অনেক যত্নে রক্ষা পায়, ব্রাহ্মণ কন্যা তুমি এ কথাত
তােমার জানতে বাকি নেই।
যােআমায় হাজার বল হাজার ভােলাও আমি তােমায় ছেড়ে
কিছুতেই যাচ্চি না ! তােমার বুকে আসন পেতে তবে
আমার সােয়াস্তি হবে।
কাল । পাপিণি! সুর্পণখার মত এখনি তাের নাকান কেটে
দেব! শিগগির এখান থেকে পালা।
যাে। কিছুতেই যাব না।
কাল। তবে আর নিস্তার নাই (বাণ ত্যাগের উদ্যোগ ও স্তম্ভিত
হওন।)
ফুল্ল। আ-হা-হা কর কি ? স্ত্রীহত্যা করােনা! (ধনু ধারণ)
বে। সাধ্য কি আমার অঙ্গস্পর্শ করে, ঐ দেখ তােমার হাতের
ধনু হাতেই রইল। বাণত্যাগের ক্ষমতা নাই।
কাল। তাই তাে ! একি! বালকের চেয়েও যে এ বাহু দুর্বল
হলো, ফুল্লরারে আমার সে অমানুষী শক্তি কোথায়
গেল ?
* .
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
যাে। আদ্যাশক্তি আমি বীর ! তাের ডাকে কাতর হয়ে তােকে
বর দিতে এসেছি। ধনুঃশর ত্যাগ কর। আর তুই দরিদ্র
ন’ আজ হ’তে তুই রাজরাজেশ্বরের চেয়েও বড় হলি।
ধরু—অঞ্জলি পেতে বর নে! এই মাণিকের আংটী সাত
রাজার ধন, এই ভাঙ্গিয়ে এই গুজরাট বন কাটা, নগর
বসা’, প্রজা স্থাপনা কর, আর প্রতি মঙ্গল বারে আমার
পূজা করি। এই ধর! ( অঙ্গুরী প্রদান )
ফুল্ল। না-না-না-নিওনা, ওকথা শুনােনা! ওতে জাতও যাবে
পেটও ভরবে না!
ভাল না হয় আর সাত ঘড়া ধন দেবো, আমার সঙ্গে
চল!
কাল। মা, আমি অতি নীচ জাত, বুদ্ধিশুদ্ধিহীন, আমার এ
কুড়ে ঘরে কি মা চণ্ডীকা আতে পারেন? আমার
বিশ্বাস কত্তেও যে ভরসা হচ্ছে না।
ফুল। আমিও মনে কচ্ছিলেম ঐ কথা বলি।
যাে। ভাল, কি হলে তােমাদের বিশ্বাস হয় ? ভক্তের বিশ্বা-
সের আসনেই আমার অধিষ্ঠান! বরে ভক্ত দম্পতি।
কিসে তােদের বিশ্বাস হয়।
কা। মা! যদি তুমি সেই বিশ্বজননী আদ্যাশক্তি হও, তা
হ'লে মা! শারদে! শরতে তােমার যে রূপের পূজা
হয়, এক বার সেইরূপ ধর! আমাদের জীবন সার্থক
হ'।
যাে। ভক্ত প্রাণে আমার রূপ! ভক্তরে। প্রাণ ভরে যেরূপ
এঁকেছি, সেই রূপই দেখ।
মা।
[ প্রথম অঙ্ক |
(অকস্মাৎ যােড়ীর দশভূজা রূপে পরিবর্তন হওন।)
(ফুল্লরা ও কালকেতুর অবনত জানু হইয়া জোড়করে স্তব গীত।)
উমা এলি মা আয় মা দেখি মা।
ওমা আলাে কোরে এলি-
তােরে ভাল কোরে দেখি মা।
দেখি আঁখি খুলে পুনঃ আঁখি মুদে দেখি মা।
ভিতরে বাহিরে তােরে চারি ধারে দেখি মা।
তৃতীয় দৃশ্য ।
(বন মধ্যস্থ পথ )
(মােমাই ওঝা ও বিমলার মার কথা কহিতে কহিতে প্রবেশ।
বি-মা। ওগো হ্যাগো পুটঠাকুর! আমি কি মিছে বচি?
তুমি কদিন ছিলে কোথা ?
সােমাই। গেছলেম একটু নিজের কাজে মা! তা তােমার
গে-তারপর কি হলাে?
বি-মা। তারপর বাবু দেবতা ছুড়িটে আবার মাষের মতন
হয়ে এগিয়ে এগিয়ে চল্লো, কালকেতু ঠাকুরপাে ধনুর্বাণ
হাতে করে তার পেছনে পেছনে চল্লো, আমিও লুকিয়ে
লুকিয়ে পাছু নিলুম; ঐ যে বেতবনের ভেতর এঁদো
তৃতীয় দৃশ্য। ]
মা।
ভােবা আছে, জানত পুট ঠাকুর! সেই তার ওপারে
সেই যে ডালিম গাছ আছে, সেই যে গাে, যার তলায়
বেম্মদত্তি আছে ব’লত, সেইখানে না গিয়ে, জান গা
পুট ঠাকুর! সেইখানে সেই দেবতা ছুড়ি না গিয়ে,
ঠাকুর পােকে বাবু কি বল্লে ! বাবারে! গা যেন শিউরে
উঠলাে ! জান গা পুট ঠাকুর! তারপর বাবু ঠাকুর পাে
সেই খাটা না খুঁড়ে, সাত ঘড়া ধন পেলে! ভারে
ভারে করে বাড়িতে রেখে গেল, একটা ঘড়া ভারে
আঁটলাে না বলে, জান গা পুট ঠাকুর! দেবতা ছুড়ি
কাকে করে বােয়ে দিলে।
সাে। বটে, তার পর? তােমার গে তারপর ?
বি মা। তার পর বাবু কি সব কথা হলাে, দেবতা ছুড়ি ঠাকুর
পাের কানে কানে কি বলতে লাগলাে, সই হাসি মুখে
ছুড়ির পায়ে ধন্তে গেল, অমি কোথাও কিছু নেই,
জান গা পুট ঠাকুর ! অমি হুস্ করে ছুড়ি যেন উপে
গেল আমার গাটা কাটা দিয়ে উঠল। আমি ছুট্টে বাড়ি
পালিয়ে গেলুম ! তারপর, এ কদিন ধরে কত কি
হচ্ছে যাও না, দেখ না। তুমি পুট ঠাকুর ! তােমর কাছে
কি আর কিছু লুকুবে ?
[ প্রস্থান।
(অপর পার্শ্ব হইতে মুরারী পােদারের কেঁচা ধরিয়া তৎপত্নীর প্রবেশ।
মু-পত্নী। দে হতভাগা দে, আমার পাওনা গণ্ডা হিসেব করে
দে, নইলে এখনি এক টান দিয়ে তােকে পাঁচ জনের
সাম্নে এ করে ফেলবাে !
০
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
মুরা। আহা হা হা হা! খুলে যাবে, খুলে যাবে, দিচ্চি দিচ্চি।
মু-প। কৈ! দে?
মুরা। দেব অখন ঘরে গিয়ে
মু-প। ফের এ কচ্চিস? এখনি দেবি পােড়ার মুখখা! এক
হ্যাকায় এ করে ফেলব?
মুরা। আহা হা হা হা-দিচ্চি দিচ্চি।
মু-প। কৈ দে! ভালমুখে দে !
মুরা। এই চ’না আমি আসছি। এসে—হাত পা ধুয়ে-দুদণ্ড
ব'সে—হিসেব পত্তর করে—খাতায় তুলে তার পর আজ
দিলেও যা কাল দিলেও তা, আমিও দিলুম তুইও পেলি !
কেমন পেলিত? আমি একটি পয়সা কারু ঠকাইনে,
তেমন বাপে আমায় জন্ম দেয়নি।
মুপ। তাের ও হেঁদো কথা রাথু তো! এই খানে আমায়
দিবি, তবে তাের কেঁচা ছাড়ব'! দে বছি দে, নইলে
সত্তি বছি এবারে এ করে ফেলব !
মুরা। আহা হা হা হা, দিচ্চি, দিচ্চি, ছাড়।
মুন। এই ছাড়লুম, কৈ দে।
মুরা। দেবাে? তােকে আমি দেবো ? নাকের জলে চোকের
জলে কোরে যদি দিই! দেবই না ত’! দি যদি, তা তোর
বাপের ভাগ্যি।
মূ-ন। বটে ! দেখবি! আবার কেঁচা ধরব ?
মুরা। ধর, দিকিন? এবার ধরতে এলে, চুলের মুটী ধরে, ঘাড়
ফিরিয়ে, গদ্দানার উপর বিরেসি সিল্কের ওজনে না গদাম্
গদাম্ কোরে দুই কীল ঝবে।
"
তৃতীয় দৃশ্য।] মা। সাে। ওহে মুরারী! কর কি! মুখে হ’লনা-তােমার গে মুখে হ’ল না—স্ত্রীলােকের গায় হাত তুলতে পৰ্য্যন্ত যে এগুচ্চ মুরা। আজ্ঞে সাইমশাই। আমার এই ইস্ত্রীটিকে ইস্ত্রিনােকের তালিকা থেকে কেটে দিন্ ! ও আজ বড় গ’রমেছে ! আচ্ছা রকম দুঘা না ঝতে পাল্লে আর থাচে না। আরে মাঝে মাঝে যে এটা ক’ত্তে হয় মশাই। না হলে কি এই সিঙ্গিনীর বাচ্ছা পাঁড় বাঘিনীকে পােষ মানিয়ে রাখা যায় ? ম্প। ও হতভাগা ! মাবি ত মারনা! সাইমশাই ঠাকুর। তুমি এর বিচের কর। আমার পাওনা গণ্ডা আমায় দেবে , তার উপর আবার মারবে ? ওর হাতে যে কুড়ি- কিষ্টি হবে, ওর হাত যে পােচে যাবে, গ'লে যাবে, খ’সে যাবে, ধ’সে যাবে। মুরা। খসে যাবে যাবে আমার যাবে, ধসে যাবে যাবে আমার যাবে! তা বলে তাের কথায় আমি বুকের রক্ত টাকা, মিছিমিছি তার ভাগ তােকে দিয়ে বসে থাকবাে ? মু-প। মিছিমিছি ? হারে চোখেগাে! মিছেমিছি ? হা সাঁই মশাই ঠাকুর! তুমিই এর বিচের কর। সাে। কি ? হয়েছে কি ? তােমার গে কিসের পাওনা ? মু.প। পাওনা কিসের জানগা সইমশাই ঠাকুর মুরা। আহা হা আমি বচি-শােন না সঁইমশাই মু-প। তুই তাে তাের দিকে টেনে ববিরে হতভাগা! আমি বলি। দ্যাখােগ। সাইমশাই ঠাকুর! ঐ যে ধৰ্ম্ম- কেতুর পুত্তর কালকেতু, আজ কদিন হলো এক
২২
মা ।
[ প্রথম অঙ্ক।
বুঝি তাই
চাইতে এয়েছে,
দিন একটা মাণিকের আংটী ভাঙাতে আসে। সে
হরিণ মাসের দরুন্ মিন্সের কাছে দু পােণ কড়ি পেতে,
মিন্সে মনে কোলে
অমি তার সাড়া না পেয়ে দেছুট, খিড়কী দোরের
পাশে গিয়ে লুকুলাে ! আমি বাইরে যেতেই কালকেতু
আমায় আংটীটী দিলে। তার পর আমি সেই আংটী
নিয়েগে, ওকে দেখাতে, তবে এসে, অনেক কসে মেজে
কেঁদে কোকিয়ে, এক গাড়ী টাকা দিয়ে সেইটে
কিলে! তা হাগা সাইমশায় ঠাকুর, আমারই ইস্ত্রী-
ধনের টাকা থেকে কি আমি কিনতে পান্তুম না?
সো। বেস্ততা, তা কি হয়েছে ? তােমার গে কি হয়েছেই
বল না ?
মুরা। হয়েছে আর কি সাইমশাই! সেই আংটীটে আমি
দু-পাঁচ টাকা লাভে সহরে বেচে এয়েছি! ওকে তারি
অর্ধেক ভাগ দাও। আপনিই
আপনিই বলুন-এ, কি কেউ
কাউকে দিয়ে থাকে ?
মুপ। ও হতভাগা মিছ কতুরি গলায় ছুরি,-সে তােমার দু-
পাঁচ টাকা? সাইমশাই ঠাকুর ! বলব কি, এক গাড়ী
টাকা লাভ হয়েছে ! দুটো গাড়ী করে এনেছে জানে না।
(নেপথ্যে অশ, হস্তী, গে, শকট ও বহুলোকজনের
কোলাহল করিতে করিতে গমন।)
সাে। এ আবার কি ? তােমারগে এ সব আবার কি ?
মুরা। ও বুঝি জান না সঁইমশাই! ও ওই ধম্মকেতুর-ছেলে
কালকেতু। চণ্ডীর বর পুর হয়েছে, বন কাটাচ্চে,
চতুর্থ দৃশ্য। মা। রাজি কোরবে। তাই সহর থেকে রাজি করবার সাজসরঞ্জম কিনে নিয়ে যাচ্ছে! ঐ যে মস্ত হাতীটের উপর ঐ যে তােমার কালকেতু চেপে চলেছে! বুঝি তোমায় দেখতে পেলে,—ঐ যে দণ্ডবৎ কচ্চে। ঐ হাতছানি দিয়ে ডাকছে! যাও ঠাকুর যাও, তােমারও কপাল ফিলল। [ সােমাই ওঝার প্রস্থান। মুরা। আমিও যাই! এ সব লােক লস্কর জিনিস পত্তর হাতী ঘোড়া সব কোথায় রাখে একবার দেখে আসি। [ প্রস্থানের উদ্যোগ। মু-প। আমার এটা, এ না কোরে কেমন এ দেখতে যাবে যাও দেখি ? এখনি এটা ধােরে না এ করে ফেলবাে। [পলায়নপর-মুরারীর কাছ ধরিতে ধরিতে প্রস্থান। চতুর্থ দৃশ্য। ( বৃক্ষ-শূন্য বিস্তীর্ণ প্রান্তর পার্শ্বস্থ একটীমাত্র বৃক্ষতল।) (ফুলালঙ্কারে সুসজ্জিত ব্যাধ ও ব্যাধিনীগণের নৃত্য ও গীত) (আমরা) ভালবাসি ফুল-বাস, ফুলহাস, ফুলনিশ্বাসে বিলাস। ফুল-কলিটি ধরিলে ফিরে চাই-তাই- আধ’ ফোটা মুখখানি আঁতত ফেরাই,
২৪
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
পাছে ব্যথা পায় কলি,
পাছে ঝেরে যায় কলি,
তাই ছুঁতে পাইগগা তরাস ।
ক্রমে কলি ফুটে ওঠে,
ফুলরাণি বাস ছােটে,
তুলে এনে তােড়া কেউ, মালা গেঁথে পরি কেউ,
নাচি গাই মিটাই পিয়াস।
(সোমাই ওঝা, কালকেতু, ফুল্লরা ও বিমলার মার প্রবেশ )
•
কাল। না—পুরুত, জ্যাটা! তুমি স্বপ্নে আরও কি দেখেছ বল।
সে। আরে পাগল ছেলে-তােকে কি আর আমি মিছে
কথা বােল্লেম ? তােমার গে মিছে কথা কি আমি কই ?
তুই যজমান রাখবি মান, আমি পুরােহিত তাের থাক্’ব
সুহৃৎ, দেখব' হিত, এই তত বুঝি বাবা!
কাল। তা তাে সত্যি, তা জ্যাটা, মা.কি বল্লেন ?
বি-মা। ( জনান্তিকে সােমায়ের প্রতি) বল না সেই কথা !
ফুল। (জনান্তিকে ঐ) বলুন না—কথা’ত মিথ্যে নয়।
সােমাই। হ্যা বাবা! তাই বলচি, বেটী যেন তােমার গে
মাথার শিওরে এসে দাঁড়াল। তেমন রূপ ত বাবা
কখনও দেখিনি। শুনেছি কোন রূপ দেখলে তােমারগে
ভালবাতে হয়, কোনাে রূপ দেখলে তােমার গে
আদর ক’ত্তে হয়, কোনাে রূপ দেখলে তােমার গে
শুনেছি চোক দুটো তাতে ডুবে যায়, রূপের তেষ্টা
চতুর্থ দৃশ্য।]
মা।
পায়,
তাতে তােমার গে মজে থাকতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু
বাবা এ রূপ সে রূপ নয়,এ দেখে চোক্ ঝলসে যায়,
প্রাণে একটা ভক্তি ভয়ের উদয় হয় ! প্রাণের ভিতর
থেকে তােমার গে মা বলে ডাবার জন্য যেন আপনা
আপনি একটা ইচ্ছা উঠে, মুখ দে বেরিয়ে পড়ে।
এরূপ সেই রূপ! এ মূৰ্ত্তি সেই মাতৃ-মুর্তি! ভাবতে
প্রাণ শিউরে উঠে বাবা ।
কাল। হ্যা জ্যাটা ! মার আমার ঐ মূৰ্ত্তিই বটে! ঐ আনন্দো-
জ্জল মূর্তিতে আমাকেও দেখা দিয়েছিলেন। তার পর
কি বল্লেন ?
বি-সা। (জনান্তিকে) বল না গাে বল না।
সাে। তার পর বল্লেন,তােমার গে খুব ভালই বল্লেন !
বল্লেন-তােরা ওদের বরাবর পুরুত, কালকেতুকে
আমি দীক্ষা দিয়েছি, সে পবিত্র হয়েছে, তুমিও আজ
পবিত্র হলে, তােমার গে বুঝলে বাবা! আমায় বল্লেন,
তুমি আর বেদের বামুন রইলে না, তুমি বামুনেরও
বামুন হলে, বেস্ করে আমার পূজাআম্রা কবে,
আর—আর—তােমার গে আর বল্লেন (জনান্তিকে)
তবে বলি মা ?
ফুল্লরা।• (জনান্তিকে) হু হু বলুন বলুন!
সােমাই। আর বল্লেন, কালকেতু যেন খুব বুঝে সুঝে রাজ্যি
পাট চালায়, যেন দিবারাত্তির আমার পূজায় মত্ত থেকে
তােমার গে সাংসারিক কাজটাজ না ভােলে ?
বিমা। তা বেস্ ত ! মা ত, বেস্ তুলছেন
মা।
[ প্রথম অঙ্ক।
কাল। বেস্ বলেছেন, আমার মাথা আর মুণ্ডু। আমি
অমূল্য নিধি পেয়ে হারাব? দিবারাত্তির তার চরণতলে
বসে থাকতে পাব না? ছাই রাজ্যিপাট নিয়ে উন্মত্ত
হ’ব? পােড় সংসারের ভিতর ঘাের সংসারী হয়ে হয়
ত তাকে ভুলতে আরম্ভ কব? এ সব ত আমার
মনের মত নয়। আমি চাই, আমার আমি ভুলে গিয়ে
সৰ্বস্ব তার চরণে সঁপে, তাঁর আমি হ'য়ে, তার জন্যেই
এ জীবন যাত্রায় সিদ্ধিলাভ করব! জ্যাঠা মহাশয়।
এমন পাগল কি কেউ আছে, যে সুপথ পেয়ে বিপথে
চলে যায়। আলােক পেয়েও অন্ধকারে ফিরে যায়।
ফুল্লরা। হঁাগা! তােমার যদি মনে মনে এই সব ছিল, তবে
মাণিকের আংটীই বা নিলে কেন? সাত ঘড় খনই
বা নিলে কেন?
কাল। ফুল্লরা! সে কেবল তােমার দুঃখ মােচনের জন্য ।
তােমার বিরস মুখে সরস হাসি দেখব বলে, ও ছাই
অর্থের লালসা করেছিলেম। তা না হলে ফাঁকে দেখতে
পেলে রাজরাজেশ্বর রাজ্য ছেড়ে পেছনে পেছনে
ছুটে যায়, তাঁর কাছে কি আমি তুচ্ছ অর্থ যাচিঞা
ক’ত্তেম ? কেবল তােমার মুখ পানে চেয়ে তা করেছি।
তুমি রাজ্যিপাট কর, সােণার সংসার নিয়ে থাক,
আমায় আর ও জঞ্জালের ভেতর রেখাে না !
ফুল্লরা। রাজ্যিপাট হবে কি করে ? কত কেঁদে কোকিয়ে
বন বাদাড় কাটালুম, তােমার কত হাতে পায়ে ধরে
রাজি করবার যাজ ফরঞ্জাম কিনে আনালুম, কিন্তু সুধু
চতুর্থ দৃশ্য।
মা।
২৭।
;
তাতে তত হবে না! রাজ্যি বসাতে হলে, হাট, বাজার,
ঘর, বাড়ি, দেউল, জাঙ্গাল, এসবত তৈরি হওয়া চাই।
বি-মা। তা—তার ভাবনা কি সই ? কাল ত কালকেতু ঠাকুরপাে
মার কাছে নগর বসাবার বর চেয়ে নিয়েছেন ; মাএতে
দিলেন, আর ঘর বাড়িগুল কোরে দেবেন না কি ?
ফুল্লরা। যদি নাই দেন—তাহলে যেমন করে হ’ক, লােকজন
আনিয়ে বাড়ি ঘর দোর তৈয়ারি করাতে হবে। এ
সেদিকে এর গা কই ? কাল অবধি যখনই ওঁকে
বলেছি, তখনই আমায় হাসতে হাসতে বলেছেন ও সব
আপনা আপনি হবে। কৈ আপনি যােক দেখি ? এই ত
সমস্ত রাত কেটে গেল, কোথায় বা বাড়ি ? কোথায় বা
ঘর ? আর কোথায় বা সহর ? বন কাটা মাঠ ঐ তত
ধু ধু কচ্চে। আমি আরাে, সকাল সকাল এই সব
পাড়াপড়সীদের এখানে এসে আমােদ-আলাদ নাচ-গান
ক’ত্তে বলে দি’ছিলে। সহরটা যেমন হবে আর আমি
ওদের নিয়েগে সেঁধুবাে? তা ত দেখচি সবই হ’লল।
কাল। সেকি ফুরা ! তুমি কি আমার মাকে মিথ্যাবাদিনী
বল ? তিনি যা বলেছেন, আমার ধ্রুব বিশ্বাস এখনি তা
হবে। এই সূৰ্য্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তােমায় বিশ্বকর্মা
নিৰ্মিত সােণার রাজ্য প্রতিষ্ঠা কত্তে এগুতে হবে। মা
দয়াময়ি! ফুল্লরার কামনা পূর্ণ কর মা!
সাে। ওকি! ওকি! দেখ, দেখ, চোখের পলক না পড়তে
পড়তে ঐ শূন্যভূমি যে পূর্ণ হয়ে উঠলাে ? প্রান্তর
লুকাল! আপনা আপনি মনিগরী স্থাপিত হলাে।
২৮ মা। [ প্রথম অঙ্ক (আকাশে সূর্যোদয়।) (পট পরিবর্তনে প্রান্তরে মহানগরীর দৃশ্য প্রকাশ ইওন।) সাে। আর কেন ? সবাই মঙ্গল সঙ্গীতের লহরী তােল। মায়ের নাম করে, চল সবাই মহামায়ার এই সুবর্ণ পুরীতে প্রবেশ করা যাক। (সকলের নৃত্য গীত।) ব্যাধিনীগণ।-(আমরা) ভাল বড় ভাল বাসি ভালর ভাল দেখলে ভাল রই। ব্যাধগণ।- ভালর ভাল আলাের ছটায় মন্দ ভাল বাছাই করে লই। ব্যাধিনীগণ। দেখতে ভাল, শুতে ভাল, বলতে ভাল যে, যার ভালতে, জগৎ ভাল, বাসলে ভাল সে; ব্যাধগণ। দেখি ভাল আর শুনি ভাল আর ভালর ভাল কই। ব্যাধিনীগণ - গাই ভাল তাই নাচি ভাল- ভাল বাসি না ভাল বই। পটক্ষেপণ ।
দ্বিতীয় অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। ? (কলিঙ্গ-ভাঁড়র অন্তঃপুর।) (ভাড়, চিন্তিত ভাবে আষীন।) দুর্মূখার প্রবেশ। দুৰ্ম্ম। ওগাে ? ওগাে ? শুচো ! ওগাে শুনচো? তাইত কানের মাথা যে খেয়েছ দেখছি। ভ। (সচকিতে) অ্যা কি ? দুৰ্ম্ম। এ যে যেন ঘুম ভেঙ্গে উঠলে! তা বেশ হয়েছে, খুব হয়েছে! তুমি যেমন কুকুর তােমার মাথায় তেমনি মুগুর গড়েছে ? এখন ভেবে মর, জালার চোটে ছট- ফটিয়ে ছুটে বেড়াও, উনুনের হাঁড়ি সিকেয় উঠু, দুটি অন্নের জন্যে লােকের দোর দোর ফেরে। যেমন, আমায় মেরেছ এখন তেমনি আপনি মর। ভ। ঠিক বলেছ! বড় গিন্নি! ঠিক ঠাউরেছ। মরাই এখন আবশ্যক। কিন্তু আমার একলা মােলে ত চলবেনা, সহমরণে যাবে কে ? তােমার মত এমন মিষ্টিভাষী মধুমুখী অল্পবয়িসী মেয়ে মানুষকে সঙ্গে কোরে না নিয়ে গেলে যমরাজের সিংদরজা পেরুব কি করে? বুঝেছ !
৩০ মা। [ দ্বিতীয় অঙ্ক। বড় গিন্নি, ভূত পেরেতের মুখে তােমায় এগিয়ে দেব আর আমি আঁচল ধধরে পিছু পিছু যাবে, আমারও মরা হবে তােমারও মারা হবে। দু। তাই তাে! এতে কেন? ম’ত্তে হয় নিজে মরগে, আর তােমার মেয়ের যুগি মালসামুখী ছটকি ছুড়িকে সহ- মরণে নেও। ভ।। ভাল তাই যেন হ'ল । কিন্তু তােমার দশা কি হবে ? রাজ্যেত আর শ্যাল কুকুর নেই কঁদবে কে ? দু। আমার ভাবনা কি? রাজা মনিব, দুহাতে খাব দশহাতে বিলুব! আর মাঝে মাঝে তােমার জন্যে সুর তুলে বিনিয়ে বিনিয়ে তােক দেখানে এক আধবার কাদব। তুমি চুরি কোরে ধরা পােড়ছিলে, আমিত আর ধরা পড়িনি? রাজা মনিব আমায় পুষতে পারবেন। ভ। রাজা মনিব ? খেতে দিলে ত এতক্ষণ? আর দেবে কোথেকে? ও রাজায় আর আছে কি? ওকেত এখন দেউলে বল্লেও হয়—কাঙ্গাল বল্লেও হয়। বড় রাজ্যিখানা বন্যায় ডুবে ছারখার হয়ে গেল, ওরি পাপে’ত? দেশশুদ্ধ লােক কাঙ্গাল হলাে, ওরি পাপে’ত! এমন নিক’ড়ে রাজ্যের রাজাই বা কি আর পারি বা কি! দু। এখন তাড়িয়ে দেছে কিনা, তাই রাজা বড় মন্দ হয়েছে। তা বেশ হয়েছে! দেবেনা ! একেত’ এপর্যন্ত যত পেরেছ চুরি করেছ, ধরা পড়েছ আবার করেছ,তার ওপর এই বুড়াে বয়সে কাজ কৰ্ম্ম ছেড়ে ঐ পাচামুখী ছুরি
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
মাগ নিয়ে দিন রাত উন্মত্ত হলে তার কি আর ভালই
আছে? আমি তখনই বােলেছিলেম এতে তােমার বে
করা হচ্চেনা, ঢেনি রাখা হচ্ছে ! কেমন! আমার
কথা’ত ফল্লো ? আমার সাপ হাড়ে হাড়ে’ত বিধলাে ?
ভাঁ। তা খুব বিধেছে! তুমি আমার পয়মন্ত পরিবার কি না!
সঁপের গুতােয় বন্যে এলাে, বাড়ী ঘর ভেঙ্গে পড়লল,
গােলার মাল ভেসে গেল,খাতক ফেরার হ’ল ! ভরসা ছিল
রাজা, তা তারও দস্তিদশা, পেটের জ্বালায় ঘেঁকি কুকুরের
মত ঘেঁখেকিয়ে আলা ফয়লাদের কামড়াতে শুরু কল্লে।
তাড়াবার আর তর সইল না, দুর্ভিক্ষ-অবতার রাজা
বাহাদুরকে দূরে থেকে দণ্ডবৎ করেই সরতে হ’ল। তা
হয়েছে ভাল, সকল দিকেই সুবিধে, এখন কেবল লক্ষ্মী
পূজোর দিন এই আলক্ষ্মীটি বিদেয় করে, এ দেশ ছেড়ে
পালাতে পাল্লেই বাঁচি।
দু। আলক্ষ্মী বিদেয় দেবেকি ? তােমার এমন সােনার সংসার
ভেঙ্গে চুরে যাবে, বাড়ি ঘর ধু ধু করে জেলবে, তুমি
পাগলের মত ছুটে ছুটে বেড়াবে, তােমার আদরের ভেঁকি
পেটের জ্বালায় পেছু পেছু ঝাটা নিয়ে তাড়া করবে,
আমি না থাকলে দু পা ছড়িয়ে বসে এ সব দেখবে কে ?
ভ।। তা দেখাচ্চি, রাজ্যিটা আগে ছাড়ি।
ছেড়ে যাবে কোথা ?
ভ। কেন? অন্য রাজার দরবারে যাব।
দুৰ্ম্ম।
। অন্য রাজা তােমায় নেবে কেন? এক জনকে ফকির করে
মেরে ফেলে পালাচ্চ সে জান্ত পারবে না ?
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
!
ভ। রাজার পাপে রাজ্যি ধ্বংশ, আমাদের এই কলাটা! আমরা
চাকর, মৌমাছির জাত, তােমার চাকে মধু থাকে—
মৌমাছি ঝাঁকে ঝাঁকে এসে জুটবে, নােড়বে না! কিন্তু ও
ও যতক্ষণ ! ও ও ততক্ষণ ! ফুলে কৈ রাখ দেখি ! মধু
ফুলে কৈ থাকুক্ দেখি? ফুক করে উড়ে যাবে।
দুৰ্ম্ম। তা বলে মৌমাছি ত আর মানুষ নয় ! মানুষও তােমার
মৌমাছি নয়।
ভা। আরে মাগি ! ওটা দিষ্টান্ত! দিষ্টান্ত! রাজা গরিব হলো
ত আর রইলাে কি ? ক্ষীর পচলে কি খাওয়া যায় ?
কাজেই পলায়ন।
দুৰ্ম্ম। পালালে ত আর পেট ভরবে না !
ভ। না হয় আধপেটা খাব। এখন তুমি সরে পড় দিকি।
দুৰ্ম্ম। কেন উথলে উঠলাে নাকি ? ছােটকি বুঝি হালেছে ?
আজকে আমার পালা তা জানাে ?
ভ। পালা ফালা বুঝিনে, বােন্যের ঠ্যালায় সব উটে গেছে।
আজ থেকে বাইরে শয়ন।
দুৰ্ম্ম। (যাইতে যাইতে) তা বুঝেছি! ঝাটা গাছটা গােবরের
গাঙ্গায় বুড়িয়ে রাখিগে! আজ দেখছি শুধুতে
হবে না।
ভ। আমারও বােঝা আছে ! নতুন কটুকে চটি যােড়াটাও এসে
আজ পৌঁচেছে! বউনি হবে এখন।
[ দুমুখার প্রস্থান।
। (স্বগত) ভাল আপােদ! মরবেও না, মরুতে
দেবেও না !
।
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
=
(শিবা ও ধূমকেতুর মারামারি করিতে করিতে প্রবেশ।)
ধূমকে। শালার ব্যাটা শাল গােদা আমি আগে
শিবা। ওরে শালা ল্যাংড়া আমি আগে--
ধূম। তাের গােদ কামড়ে ছিড়ে ফেলবাে!
কৈ
ব দেখি—
শি। তাের খোঁড়া হাত পা পেটের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে
কীচক বধ করে ফেলবাে! কৈ তুই আগে বল দেখি!
ভা। আহা হাহা ! তােরা করিস্ কি? ভাল কাজে পাঠিয়ে-
ছিলুম! যে হয় বল্ না, দাঙ্গা কোরে মরি কেন ?
শি। তাই তাে বাে’লচি আমি আগে বব।
ধূম। তা হবে না আমি আগে ।
ভা। ভাল তাই হােক! ওরে শিবা! ওকেই বাবু বােতে
দে না।
শি। বেশ দাদা! এই বুঝি তােমার বিচার হলাে! আমি
মায়ের পেটের ভাই—আমি বেটা আগে বলতে পাবাে
না, আর ও মেগের ভাই সম্বন্ধী ঐ শালার জেদই বজায়
রইলো ?
ভা। আরে তাইতাে ! ও যে বড় কুটুম ! গুছিয়ে বলতে
পারে বলুক না।
শি। তা বলুক-বুঝেছি! তােমায় বােন না দিলেতাে তুমি কথা
শুবে না! শালা বাবু! আর কেন? পালা সুরু কর।
আগে শালা পিছে ভাই।
বােনাই বাবা বলে তাই।
ভা। তুই বড় তঁাদোড়!
তুমি বল ত ভাই।
ধূম। তা বলব না! ও আমায় ছাড়া বােলে গাল দিলে কেন ?
৩৪ মা। [ দ্বিতীয় অঙ্ক। আমায় উতর শিখিয়ে দাও, ওকে বলে তবে বলব। হলে বলবােও না—কইবােও না—কাঁদতে কাঁদতে দিদির কাছে গিয়ে নালিশ ক’বসে আমার মার পেটের বােন্ জানত? তােমায় কলা দেখিয়ে তাকে বার করে নিয়ে যাব। শি। শালা বাবু তাই কর—তাই কর। তা হলেই আমার উতাের দেওয়া হবে। ভ। তুই থামৃত পাজি। তুমি কিছু কর না-ও কথা শুনাে না-বল। ধূম। কক্ষনও বলবাে না! ও আবার আমায় গাল দিলে। উতাের শিখিয়ে দাও তত দাও। তা নইলে এখনি মজা দেখাব। এক্ষুণি দিদিকে গিয়ে বেগড়াব। ভ। ভাল জালায় ত পড়লেম। এখন ছড়া পাই কোথা ! শি। দাদা! আমি না হয় একটা র’চে দিচ্ছি। শালা বাবু বল- শালা বলি বেস্ কলি বদ্যিনাথের এঁড়ে। কখনও শালা কখনও বােনাই সকল ভেড়ের ভেড়ে । চোরার মত দাত খামাটী মেরে ন্যাংচাতে ন্যাংচাতে খুব চেচিয়ে চেঁচিয়ে বল, ল হলেই আমায় খুব গালাগাল দেওয়া হবে। আমার গায়ে-বড় বড় ফোস্কা হবে এখন দেখাে ! ধূম। বােনাই বাবু! বলি? ঐ কথা বলি ? ভ। আর বলে কি হবে ? ও যখন তােমার হয়ে আপনা আপনি ভেড়ের ভেড়ে বলে গালাগাল খেলে, তখনি প্রথম দৃশ্য।] মা। তােমার উতাের দেওয়া হলাে। এখন ছড়া কাটাকাটি ছেড়ে, যেখানে গিছলে সেখানের কি হলাে বল। ধূম। তাই’ত বলছি! বােনাই বাবু! মস্ত রাজি গােমস্ত রাজ্যি-তৈলােক্ষে এমন কেউ কখনও দেখেনি—দেখবে ! মস্ত বড়! যেন কত বড় কি একটা বিরদ ব্যাপার। বড়র চেয়েও বড় তার চেয়েও বড়—আবার তার চেয়েও বড় বল্যে তবু কুলােয় না-এত বড়! শি। বস্বলাত হােয়েছে! না আরাে কিছু বাকি আছে ? ধূম। বাকি থাকবে কেন ? এক কথায় সব’ত ব’লুম! হ্যা বােনাইবাবু! সব, বন্ধুমনা। ভ।। হ্যা বলেছ! বুঝেছি, এখন যাও; তােমার দিদিকে খৰর দাওগে! সেপথ চেয়ে বােসেআছে! ধূম। এই যাই! দিদির কাছে নাহলে আমার মুখ ফোটেনা ! ন্যাংচাব বলব! বৰ ন্যাংচাব! ন্যাংচাৰ বল্ববা, ববাে ন্যাংচাব- [ বলিতে বলিতে প্রস্থান। ভ। শালা গর্দভ আরকি! যেমন বুঝেছে তেমনি বােঝালে এখন কি ব্যাপার তুমি বল ত ভাই ? এবার তােমার বে দেবই দেব। কুলিন না হলােত বয়েগেল কি? মোলিকের ঘরে ও নিদেন দেবাে-বলত ভাই কিহলাে। শি। হলে ভাল, যা শুনেছ সবই ঠিক। বন কেটে রাজ্য বসিয়েছে বটে! সে ব্যাধের ছেলেও বটে! সাতঘড় ধনও পেয়েছে বটে। তারপ্রতি চণ্ডির কৃপাও হয়েছেবটে। ভ। ভ্যালা মাের ভাইরে। তারপর ? !
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
শি। তারপর—খুবসহর বানিয়েছে ! হাট বসিয়েছে, বাজার
কোরেছে, দেউলতুলেছে, জাঙ্গাল দিয়েছে, রাস্তা, ঘাট,
বাগান, বাগিচা, ঘর বাড়ি, দোতালা তেতালা চৌতালা
খাপরেল খােড়ােয় ছয়লাপ। কিন্তু লােক নেই,
সব খ
খা কচ্চে।
ভ। বটে! বটে! বেস্, বেস্! এক এক জন এক এক
খানা বাড়িনিয়ে বস্বাে, চাকর বাকরদেরও এক এক
খানা দিয়ে দেব ! তারপর?
শি। তারপর-রাজা হয়েছেন ভেড়া, তারপার হয়েছেন ম্যাড়া,
কালু ব্যাধের ডানহাত হয়েছেন মেয়েন্যাড়া সােমাই
ওঝা! রাজ্যিবসাবার লােখুঁজছে! কড়ি পাতিদেবে, ঘর
দোর দেবে, যায়গা জমিদেবে, যাও—মেপেনেও-চেপে
বােসােবা।
ভ। তবে ত বেস্ হয়েছে! এ দাও ছাড়া হবে না ! কালই
চল, দুভেয়ে গিয়ে পড়া যাক্। হবচন্দ্র রাজা আর
তার গবচন্দ্র মন্ত্রীকে পেটে পুরতে কতক্ষণ? কিন্তু
দেখাে খুব চুপি চুপি যেতে হবে, কেউ না যাতে,
পারে।
শি। এতে শিগগির কে যাতে পারবে। আর কেউ জান্
লেই বা কোরবে কি ?
ভ। জালেই ভাগ বসাবে, একা খেতে দেবে না !
শি। তুমিও যেমন দাদা কে জানবে ?
ভ। জানবার ঢের লােক আছে। রাজ্যি শুদ্ধ কাঙ্গাল, টের
পেলে কি আর রক্ষা থাকবে ? বিশেষ সকরি ঐ
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
৩৭
মােড়ল ব্যাটাকে। ব্যাটা বরাবর আলিয়ে এসেছে, টের
পেলে এখানেও কামড়াতে কি ছাড়বে ?
শি। টের পাবে কি করে ! সবার আগে যাব, মুখ রাজার
কাছে সবার আগে পৌছােবাে, আগ মণ্ডাটি আমরা
তুলে খাব! শেষে যে ব্যাটারাই যাক না কেন নৈবিদের
কলাটা মুলােটা বই আর তাদের কপালে কিছু ঘটবে না।
ভ। তা হলেই ত বাঁচি। আচ্ছা রাজাটা কেমন! দেখে
এয়েচিস ত।
শি। উহু-উহু-দাদা ঐটে পারিনি।
ভ। কেন পারিসনি!
শি। পারিনি-পারিনি—এই পায়া ভারি বােলে, এই গােদা-
পায়ের লজ্জা ত তুমি দাদা ঢাকলে না।
ভা। ও! তা বটে! ভাল চ—তাে দেখাযা! যদি কাজ
হাসিল হয়, তা হলে সদ্য সঙ্ক তাের ঐ গােদ কেঁচে দেওয়াব,
হয় সােনাদে মুড়িয়ে বেঁজী কটাতে জহরত বসিয়ে
দেবে! কেমন ?
শি। অমি সেই সঙ্গে বে-টাও দাদা ভুলে না যাও।
( উভয়ের প্রস্থান।
৩৮
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয়
দৃশ্য।
(ভাড়ুর অন্তঃপুর—দুঃশীলার কক্ষ।)
(ধূমকেতু ও দুঃশীলা।)
দুঃশী। তা তাের উপর ওর এত রাগ, কেন?
ধূ। রাগ, দিদি? রাগ শালার সেই হাের বের দিন থেকে
সেই যে আগে তাের সঙ্গে ওর বের সম্বন্ধ হয়ে ছেলে কি
! তার পর বােনাই বাবু সেই তােকে দেতে গেল।
দেখে শুনে বােনাই বাবুর বড় পছন্দ হ'ল। আমরা বােলে-
ছিলেম এগার, কিন্তু তাের বয়েস তখন চোদ্দ বছর হয়ে
ছিল কি না? বােনাই বাবু লােভ সালাতে পাল্লে না,
ভাইকে ভাড়িয়ে নিজেই তােকে বে কোরে ফেল্লে ! এই
আর গােদা শালা কোথায় আছে। রেগে কঁাই হয়ে
উঠলাে ! ভেইয়ের কিছু কত্তে না পেরে যত রাগ শালা
আমার ওপরে ঝাড়তে লাগলাে! মনে করে ওটা আমিই
ঘটিয়ে দিয়েছি।
দুঃশী। ওঃ তাই বটে? তা তুই যাবার সময় ওকে সঙ্গে কোরে
নিয়ে গেলি কেন?
ধূ! ও শালা যে বাঘ ভাল্লুকের ভয় দেখালে! চোর ডাকা
তের ভয় দেখালে! ভূত পেরেতের ভয় দেখালে!
দুঃ। তা তােক যে কোথাও পাঠাচ্চি সে কথা বল্লি কেন ?
বা সে বুঝি আমি—আমি বুঝি শালার গলা ধােরে
বতে গেছলুম ? ৩
দ্বিতীয় দৃশ্য। ] মা। ৩৯ দুঃ। তবে তাকে কে বােল্লে ? ধূ। যেই বলুক না! শুধু বােল্লে বুঝি ? আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়ে তবে ছাড়লে। দুঃ। কে ? কত্তা ? না- ধূ। বােনাই বাবুর বাবার সাধ্যি ছিল কি পাঠাতে ? সে ততা তাের হুকুমে ওঠে বসে। পাঠিয়েছিল তাের সতীন! গুটীর দেওরের সঙ্গে যে ভারি পিরীত ; বেটীর বুড়াে বুড়ো চার ছেলে, হস্তিনীর মত আটটা মেয়ে, ষণ্ডামার্ক ছ' জামাই, দেখিসনি তবুও বেটী ভাতারের জন্যে তাের সঙ্গে ঝগড়া লড়াই করে মরে ! দুঃ। তা, ওর কথায় তুই সঙ্গে করে নিয়ে গেলি কেন? ধু। আবার বলে সঙ্গে করে নিয়ে গেলি কেন? ওকি খােকা, মে ওকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে না নিয়ে গেলে যেতে পারবে না? বােনাই বাবুর সঙ্গে আমি কথা কচ্চি, তুই যা শিখিয়ে দিয়েছিলি—সেই বেদিনী যা বলে গেছল—সেই সব বচি, এমন সময়ে কোখেকে অমনি রায়বাঘিনীর মত ওটী ছুটে এলো ! গােদা শালাকে আমার সঙ্গে দেওয়ার কথা নিয়ে বােনাই বাবুতে আর তাতে অগ্নি ঝটাপটি লেগে গেল। বেটী ভাদ্র মাসের তালের মত গদাম গদাম করে কীল মাত্তে লাগলাে, বােনাই বাবুও চটাচ চড় হারাতে লাগলাে !শেষ- কালে কীলেরি জিত হলাে! গােদা শালা আমি আমার সঙ্গ নিলে। t
৪০
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
দুঃ। তা নি, আমি যখন প্রথম খবর দিয়েছি, তখন যাবার
সময় ওদের ভাসিয়ে দিয়ে না যায় তাে, ও বুড়ােরি
একদিন, কি আমারি একদিন। এতদিন গায়ে হাত
তুলিনি, এইবার হাত ছেড়ে পা পর্যন্ত
(ভাড় দত্তের প্রবেশ ।)
।
পা পর্যন্ত বেশ লাথিটে পৰ্য্যন্ত মারবে ?
দুঃ। গোদা পায়ের লাথি তুলে রেখেছি, এখনও ফেলিনি।
এবার আমি যা ব’বাে যদি না শােন, আমার কথা মত
যদি না চলে, তা হলে পা ফেলা ছেড়ে তােমায়
থেঁতলে রেখে—ভাইটীর হাত ধরে—দোর দোর ভিক্ষে
করে খেয়ে বেড়াব ! আর বাবু-ভেয়েদের কাছে
গিয়ে তােমার ঐ কালামুখে ভাল ক'রে চুণকালি
মাখাবাে।
ভা। দেখ, ও কথাটি বােলন, তােমার কথামত না চলচি কই ?
তােমার কথায় দেওয়ানখানার চাকরি ছেড়েছি, এত
বড় সংসারটাকে এ ক’মাস এক রকম না খাইয়ে, না
পরিয়ে রেখেছি। যা বলছে তাই কচ্চি।
দুঃ। চাকুরি কি আর আমার কথায় ছেড়েছ? প্যায়দায়
ছাড়িয়েছে! রাজার আর কিছু নেই, নিজেই সরাত, না
হয় সেরে পড়েছ! কিন্তু আদৎ কথার কি করেছ ?
চারিটি যেতেই আমি বল্লম-আমাকে, আমার মাকে,
আর ধূমমাকে ছাড়া আর সক্কলকে দুর করে দাও, তা
দিলে কই ?
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
৪১
?
আপনার, তত কি আর আমি ওদের ভাবি! ও মাগ
বল, মেয়ে বল, ছেলে বল, ভাই বল, নাতি নাতনি বল,
সবাই খাবার কুটুম ! ও দলকে দল তাড়িয়ে দিলুম
আবার যে যার এসে জেঁকে জুকে বসলাে, এখন তার
করি কি বল দেখি?
দুঃ। তারও ত উপায় তােমায় বলে ছিলুম, তা শুনলে কৈ ?
ভ। কবে ? কি উপায়?
দুঃ। সেই যে—যে দিন বন্যের জল কমে গেল, আট দিনের
পর প্রথম রান্না হলাে! সেই যে—আমার ধূমাের পাতে
বােড়কি মাগী এক থাবা উনুনের পাস ফেলে দিছলাে?
সেই আমি রাগ করে ঘরে দোরদে শুয়ে রইলুম্ ? তুমি
এসে কত কাদাকাটি কোত্তে, তবে দোর খুলে দিলুম, তুমি
তাড়াতাড়ি বিছানার উপর উঠতে এলে—আমি অমি
গলা ধাক্কা দিয়ে নাবিয়ে দিলুম। তারপর সেই যে—মনে
নেই ? তিন সত্যি কোরে যা কোত্তে চাইলে ?
ভ। কৈ কি বল দিকি। আমার তাে মনে নেই।
ধূ। বােনাই বাবু। তােমার মনে নেই, কিন্তু আমার মনে
আছে। আমি সেই যে কোনাচ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে
• আড়িপেতে সব শুলুম। দিদি বল্লে, হয় ওদের
বাড়ি থেকে বার কোরে দাও। না হয় দলকে দল বিষ
খাইয়ে মেরে ফেল।
ভ। । হা মনে পড়েছে ! তা তেমন বিষ পেলুম কৈ ?
তা হলেত সেই রাগের মাথায় যা হয় একটা হয়ে যেত।
দুঃ। আহা! কি আমার রাগি পুরুষ গা ! বিষ পাওয়া
৪২
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
গেল না! তুমি কি আমায় কচিখুকী পেয়েছ তাই ঐ
বােলে বােচ্ছ ? এত বড় সহরে বিষের আবার ভাবনা!
ধু। বােনাই বাবু! আমায় একবার হুকুম দাওনা, বাজার
ঝেটিয়ে তােমার ঘরে বিষের কড়ি এনে বােঝাই কচ্চি ।
ভ। তা বলি—তা বলি! বিষ ছাড়া কি অপর উপায় নেই ?
দুঃ। উপায় নেই কেন? তুমি রাজি হও ত এক্ষণি উপায়
ভ। কি বল !
দুঃ। ঐ যে নতুন রাজার রাজ্য হােয়েছে, সেইখানেত চাকরি
কোত্তে যাবে ? কাউকে কিছু না বলে কয়ে—মাতে,
আমাতে, ধূমমাতে, আর তােমাতে, চল সেইখানে লুকিয়ে
গিয়ে পড়া যাক্। ওরা এখানে মরুক আর বাঁচুক, সে
খবর না রাখলেই হবে।
আর দিদি, ব্যাটাবেটীরে যদি গন্ধে গন্ধে গিয়ে ধরে
ফেলে?
দুঃ। ধােরবে কি ? একত যেতেই পারবে না। যদি যায়,
তখন ওর কেউ নয় বােলে তাড়িয়ে দিলেই চোবে।
নতুন রাজা, সে কিছু আর অত খুটিয়ে খবর নেবে না।
ভ।। হ্যা এ কথাটা পাকা বটে! কানে ঠিক্ লাগল। এই
মতলবই ঠিক। তাই চল আর দেরি কোরে কাজ নেই,
আজ রাত্তিরেই সরে পড়া যাক।
দুৰ্ম্ম। তাই চলল, মার ঘরে গিয়ে বেস কোরে পরামর্শ
এঁটে ঠিক্ ঠাকু করা যাকগে—ধূমােও আয়।
[ একদিকে সকলের প্রান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
মা।
(অন্য দিক হইতে শিবা ও দুম্বুখার প্রবেশ।)
শি। পাজি বেটীর পরামােশ দেওয়ার ঘটাটা গুলি বউ।
দুৰ্ম্ম। হতভাগা মিন্সেরও পরামােশ নােয়ার রকমটা দেখলি
ঠাকুরপাে।
শি। দাদা তত বয়ে গেছে বউ। ও ঘর ভাঙ্গানি ছােটো
ললাকের মেয়ে দাদাকে কি আর আস্ত রেখেছে ? কোরে
গিলে বসে আছে। শাউড়ি বেটী ডাইনী, বসে বসে
মন্তর ঝাড়ছে, ন্যাংড়া ছেলেটাকে পাছ লাগিয়ে রেখে
দিয়েছে, মেয়ে ওয়ােটা এদিকে আমার ম্যাড়াকান্ত
দাদার নাকে দড়ি দিয়ে যেদিকে ইচ্ছে সেই দিকে
ফেরাচ্ছে।
দুৰ্ম্ম। তাতে ফেরাচ্ছে, এখন আজ রাত্তিরে যে ফেলে পালাবে
তার কি ? এত বড় সংসার নিয়ে যে আমি আথান্তরে
পােড়ে যাব।
শি। সে কি বউ, তবে তােমার শিবে ঠাকুরপাে রয়েছে কি
ক’ত্তে? উনি মাগ নিয়ে সােরবেন কোথা ? যেথায়
যাবেন আমি যে সেথাকার হাড়হ সব জেনে এয়েছি।
উনিও পালাবেন—আমরাও পাছু নেবব! দলবল নিয়ে
গিয়ে ঠিক হাজির থাকব! বলি শােন-হাউমাউ
কোরে গােল কোরাে না। ভেতরে ভেতরে সবাইকে
তােয়ের হয়ে থাকতে বল। উনিও সদরের চৌকাটে
পা দেবেন, আমরাও দলবল নিয়ে খিড়কি দিয়ে লম্বা
হবাে ! ৰয়েলের গাড়ি ডুলিটুলি সব যােগাড় আমি এখনি
কোরে রাখিগে—কেমন ?
৪৪
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
দুৰ্ম্ম। তার পর ঐযে বােল্লে-সেখানে গিয়ে যদি বলে ওরা
আমার কেউ নয় ?
শি। কেউ নয়ত একবার বল্লে হয়! তা হলে উনিই সেখানে
ফাতুস হয়ে যাবেন ! ভাড়দত্ত আমার ভাই, এ কথা
আমি তাদের সােমাই পণ্ডিতকে বােলে এয়েছি। আর
সেই হলাে সেথাকার হর্তাকর্তা বিধাতা। একবার
কেউ নয় বল্লেত হয় ? তা হলে উনিই জাল ভাঁড়দন্ত
হয়ে যাবেন। আর আমি তখন রাজার দাওয়ান খানা
থেকে, ওঁর মত আর একটা মাতব্বর লােককে ভাই
সাজিয়ে নিয়েগে, সেথায় দাওয়ানী কাজে লাগিয়ে দেব।
গোঁপে চাড়া দেবো, গােদে হাত বুলুবব, আর ঘরে বসে
তার কাছ থেকে মাসহারা খাব। কিন্তু বউ তােমার
জন্যে এতাে করব, এর বদলে তােমার কাছে কিছু না
নিয়ে ছাড়চিনি! ধন দৌলত নয়, পােষাক আষাক নয়,
খাওয়া দাওয়া নয়, তুমি যা দিতে পার, আর যা দিতে
তুমি লুকিয়েও পার—জানিয়েও পার—যা দিলে তােমার
বদনাম হবে না—এমন কিছু তােমার ঠেঙে নেব।
দুৰ্ম্ম। কি বল্ ! কি দিতে হবে ।
শি। আগে তিন সত্যি কর দেবে।
দুৰ্ম্ম। ওরে দেবরে দেব-তােকে দেব না? তুই কি আমার
পর? এখন বল দেখি কি দিতে হবে ।
শি। আমার একটি বে দিয়ে দিতে হবে। দাদা ত দিলে
—বরাবর ফাঁকি দিলে—এখন তুমি ভরসা, তুমি না
দিয়ে দিলে এবার আমি গলায় দড়ি দিয়ে মাের।
তৃতীয় দৃশ্য।] মা। ৪৫ দুৰ্ম্ম। এই কথা! তা তার জন্যে ভাবনা কি? আমার নাইয়ের মেয়ের সইয়ের জায়ের ভাইয়ের ভায়রা ভেয়ের বেস্ একটি টুকটুকে মেয়ে আছে। এ গােল মিটুক, সদ্য সদ্য তােমার বে দিয়ে দেবাে-কেমন ? [ প্রস্থান। শি। (স্বগতঃ) আঃ তা হলে ত বেঁচে যাই! টুকটুকে ছেড়ে একটা কেলেটেলে পেলেই--বাস- [ প্রস্থান। তৃতীয় দৃশ্য। (কলিঙ্গ—দেবালয় সম্মুখ।) (বন্যা-প্লাবিত-গৃহ ও কুটীর সকলের ভগ্নাবশেষ পরিদৃশ্যমান।) (বুলান মণ্ডল ও সাধনা উপস্থিত) ( সাধনার গীত) আমার মা কেন গো কথা শােনে না। শুনতে পায় না—কি চায় না, কি পেয়ে কথা কানে তােলে না । • কত চুপে চুপে প্রাণে প্রাণে ক’হেছি, কত মা মা বলে হেঁকে ক’হে ডেকেছি, কত আশা বলী দিছি, তৃষা ভুলে গিছি, লালসার ফাঁসি খুলেছি,
৪৬
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
বুক ভরা প্রতি ঢেলে দিছি পায়,
সেধেছি—কেঁদেছি—ফিরে চাহে না।
কত নির্জনে কেঁদেছি কথা কহে না।
বুলা। সাধনা! সত্যি সত্যি কালি যে মা ?
সাধনা। কঁদব না? এমন করে কথা না শুলে-কদিন
আর না কেঁদে থাকতে পারি? মায়ের মেয়ে সমস্ত
দিন মায়ের পায়ের পানে চেয়ে পড়ে থাকি, প্রাণ
ভােরে ঐ গালভরা নাম ডাকি—পাষাণী ফিরেও
দেখে না। তাই মনে হয়—বুঝি এ জন্মে মা আমায়
দেখা দেবে না--কথা কবে না—এ জীবনের সাধনায়
বুঝি সুখ ! খুখি গরণের পর দেখা দেবেন।
আমার সে মরণ কবে হবে তাই ভাবি আর কঁদি।
কান্না বইতে তুমি বাবা আর আমায় সাধনার কিছু
শেখাও নি। লােকে বাঁচবার জন্যে কঁাদে—আমি
মরণের জন্যে কাঁচি—এতেও কি মার মন পাব না?
বু। সাধনা! মরণের পথ দিয়ে তো সকলেই যেতে পারে-
যাচ্চেও অনেকে। কিন্তু আস্বার সময় যখন তার
কাছে বিদায় নিয়ে মাতৃগর্ভে প্রবেশ করেছিলে,
ঘাের অন্ধকারে বােসে যখন জোড় করে তারই ধ্যা
মত্ত ছিলে, তার পর ভূমিষ্ঠ হয়ে সেই মহামায়ার কোলে
শুয়ে কেঁদে ছিলে, তখন ত মরে পাবার আশা করনি ?
!
।
তৃতীয় দৃশ্য।]
মা।
৪৭
জীয়ন্তে পাবে বােলে তােমায় ত মা সংসার-চাকায়
ঘুরতে দিই নি। তুমি যদি জ্যাক্তে না পাবে, এই নির্মল
বালিকা বয়সে তােমার আধ আধ মধুর বােলে যদি
তিনি দেখা না দেবেন, তা হলে আমাদের মত সংসার
কীটের কি হবে ? সাধনা! দয়াময়ী উনি তাের চোখের
এক এক ফোটা জল, ওঁর বুকে শেলের মত হােয়ে
ফুটচে।
সা। তা আর ফুটতে হয় না, ফুটলে পরে মাতাে বাবা এক
বারও নিদেন শিউরে উঠতে! সান্ত্বনা করা চুলােয়
যাক,চাহনিটা নিদেন একবার আমার দিকে’ত
ফেরাতত? তা কই ? এতে কঁচি-কিন্তু ঐ দেখ
বাবা! পাষাণীর পাষাণ দেহ যেমন তেমনি বােয়েছে।
চক্ষে পলক নেই—ঠোটের হাসি ঠোটেই মেশানাে
রায়েছে—মুখের ভাব একটুও ফেরে নি! দশ হাতের
অস্ত্রশস্ত্র দশ হাতেই বােয়েছে—নড়েনি! মস্তকে মহা-
কাল যৈমন নীরব নিশ্চল মহাযােগে স্থির-মাও আমার
তেমনি অচল অটল। এমন কোরে মরা কোলে কোরে
আর কত কাল কাটাবাে।
বু। ক্ষুদ্র বালিকা তুই মা—অগাধ সমুদ্রের মত তাের সুমুখে
এখনও অনন্তকাল পড়ে যােয়েছে—পর পার বহুদূর।
পারে পৌছবার তাের অনেক সময় বাকি। এখনি
এতে উতলা কেন মা?
সা। উতলা হতে যে তুমিই শিখিয়েছ! দেহের পিপাসা
যত পরিমাণে নিবৃত্তি হােগেছে, প্রাণের পিপাসা তত
৪৮
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
পরিমাণে যে বেড়েছে বাবা! এ কথা তােত তােমারি-
আমার নয়-জলপাত্র মুখে নােয়েছে অথচ সে পিপাসা
মেটাতে পাচ্ছি না-এ আলার চেয়ে জ্বালা কি আর
ভূভারতে আছে ?
বু। তা নেই বটে! কিন্তু মা সকল কাজের সবুর আছে।
এ পৃথিবীতে যে কাজটা এক দিনে এক জনের দ্বারা
হয় না—সে কাজটা পাঁচ দিনে পাঁচ জনের দ্বারা সহজে
হােয়ে যায়। কাজ হয়—কোন কাজই পড়ে থাকে না।
তবে অসময়ে না হােয়ে সময়েতেই হয়। সেই সময়টা
পৰ্য্যন্ত অপেক্ষা কর।
সা। সময় আর কবে হবে বাবা! হাটতে শিখে পৰ্য্যন্ত
তােমার হাত ধােরে সহরের সর্বত্র ঘূরেছি। যেখানে
যত ঠাকুর আছে সব দেখে বেড়িয়েছি। কালী, কৃষ্ণ,
শিব, রাম যেখানে যার অধিষ্ঠান—এই ক্ষুদ্র প্রাণটুকু
নিয়ে সেখানে তার পায়ে ধরে দিতে গেছি, এ
পােড়া মন কোথাও ওঠেনিকাকেও দেওয়া ঘটে
নি। জাগ্রত দেবতা সব যেন আমায় দেখে ঘুমিয়ে
পােড়তেন। হাসি মুখে যেতেম, কঁদতে কাঁদতে
ফিরে আসতেন।
শেষে আমার মাকে এইখানে
দেখলেস্-এই খানে পেলেন। আহা বাবা! এ রূপ
ততা কোথাও দেখিনি। মাতৃহীন সন্তান—ছুটে গিয়ে
ঐ রাঙ্গা চরণে লুটিয়ে পােড়লেম! আমার জিনিস
আমি চিনে নিলেম—কিন্তু মা তে আমায় কৈ চিনলে
? আমায় জাগলে--নিজে তাে জাগলে না।
তৃতীয় দৃশ্য।
৪৯
বু। চেনা দাও মা! আরও ভাল করে চেনা দাও! আরও ভাল
হিসাবে জাগাও! মা মেয়ে কি কেউ কারুর পর হয় ?
সা। পর কি আপনার আজ একবার ভাল করে পরীক্ষা
কব। আজ গাছ ভােরে ফুটেছে দেখেছি—আঁচল
পেতে এক রাশ সেই রাঙ্গা জবা তুলে এনে ঐ রাঙ্গা
পায়ে সাজিয়ে দিয়ে দেখ ব-মাকে মজাতে পারি কিনা।
( সাধনার পত।)
রাঙ্গা চরণ দুটী চাইব মায়ের সাজাব জবায়।
রাঙ্গা টুকটুকে জবায়,
রাঙ্গা টুকটুকে দু-পায়,
সাজাব আর দেখব ফিরে চায় কি না চায় মায়।
নয়ন কোণে চায় কি না চায় মায় ।
[ গাইতে গাইতে প্রস্থান।
বু। আহা! সাধনা আমার মাতৃমায়ার ভিখারিণী । ভিখা-
রিণীর দারুণ পিপাসা ! শান্তিময়ী—এ দারুণ পিপাসার
শান্তি করবে। সংসারের কোলাহল ছেড়ে কবে ওকে,
কোলে করে শাস্তিপথের পথিক হব? ওতাে আমার
মেয়ে নয়, ও যে সব জ্ঞানের কথা বলে আমার
গর্ভধারিণী। ওর হাতে আমার মােক্ষ। দেখি—তা
লাভ ক’ত্তে আর কত দিন কাটাতে হয়। মা জগদম্বে ।
সংসারে সুখ দিলি কই ? বিপদের পর বিপদ-তার
ওপর বিপদ—এই সইতে সইতেই তাে এগিয়ে যাচ্ছি।
আরও কি বিপদ আছে—এনে দে মা! সইতে শিখেছি
মা। [ দ্বিতীয় অঙ্ক। সইব ! যতবার সইব ততবার শিব-অথচ সম্পদে হয় তত পছু ফিরে চাইব না—এই ভয় হয়। (রােমের শে।) রাে। মড়ল মশায় ! এ দিহি সব ঠিক হৈয়েছে। সাত গ্যারামের পেজা জড় হৈয়েছে। গাংয়েছিপেতে, লাতে, ছড়েতে, একলােখানা বােঝাই হৈয়েছে! চড়ার সব ভর্তি হ’তি লেগেছে। আহনে ক্যাবল আপনি আর আমার সাধনা মা ঠারুণ আলি পর-লা খুলি রওয়ানা হতি পারি। গণ হৈয়েছে। বু। আমি তাে খাড়া রহেচি বাবা! আমার ঐ সাধনার ভাব- নাই ভাবনা! ও এদেশ ছেড়ে, এই ঠাকুর ছেড়ে, কিছু তেই যেতে চায় না। অথচ না গেলেও নয়। সাত, গেরামের মােড়ল হ'য়ে, সাত ছেলের বাপ হয়ে, অন্না- ভাবে মরিই বা কি করে ? আর যারা আমার মুখপানে চেয়ে আছে তাদের মারিই বা কি করে ? (জবাফুল অঞ্চলে সাধনা ও পশ্চাতে সিদ্ধিনাথের প্রবেশ।) সিদ্ধি। জয় দুর্গে ! জয় দুর্গে! জয় সর্বস্বরূপে! জয় জয় চণ্ডী! মাতঃ চণ্ডি! করুণা কুরুমে! (প্রণাম) আহা মরি! এ মূৰ্ত্তি যে দেখেছি। কাল কালকেতুর দেব- মন্দিরে-মা তাে ঠিক্ এই মূৰ্ত্তি যে দেখেছি। বুল। সাধু পুরুষ ! কোথায় দেখেছেন? কালকেতুর নূতন নগরে ? সিদ্ধি। হাঁ। হাগা! সে মন্দিরে কি ঠিক এই রকমের মা দেখেছ ? সিদ্ধি। ঠিক এই মূর্তি! তবে ইনি কিছু প্রভাহীন মলিন-
তৃতীয় দৃশ্য।
মা।
তার প্রভায় মন্দির আলােকিত। আহা! তৃপ্তিময়ী
তেজস্বিনী মূর্তি!!!
সাধ। তবে বাবা ! আর আমার সেখানে যেতে কোন বাধা
নেই। আমি যে ভেবেছিলেম, আমি যে বলেছিলেম—মা
আমার এখানে নেই কোথাও গেছে—সে কথা ঠিক্মা
আমার এখানে নেই। এস এ জবায় আর এ প্রতিমার
পা পূজব না! প্রাণভরে পূজব বলে তুলেছি। আমার
মানস-প্রতিমা যেথায় গেছে সেথায় গিয়ে এই শত জবার
অঞ্জলি দিয়ে পূজা করিগে চল। ইনি সাধু পুরুষ,-এর
দৃষ্টি ভ্রমের নয়। আমার প্রাণ ব’লচে-মা আমার সেথায়
গেছেন, প্রাণে প্রাণে আমায় ডাকছেন! আমি আর
থাকতে পারি না যে! বাবা! আমায় নিয়ে চল।
বু চল মা চল'! এ জন্মের মত এ দেশ ছেড়ে চ'লে যাই
চল। রাজা পিতা, বন্যার পর প্রজা বােলে তিনি যখন
কোন সংবাদ নিলেন না, তখন হে মা কলিঙ্গ অধিষ্ঠাত্রী
দেবি! আমার কোন অপরাধ নিও না ! (প্রণাম)
সাধু! আপনি এখানে থাকবে না যাবেন ?
স। আমার থাকা যাওয়া আমার নয়! যার আমি, সেই
নিয়ে যায়! যেথা ইচ্ছা নিয়ে যায়! মন হ'লেই হ’ল,
দুই চক্ষু অনি পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।
সা। তা উনি কেন আমাদের সঙ্গে আসুন না। আমরা
তাে কালকেতুর রাজ্যেই যাচ্ছি। সেখানে বেস মা
দেবেন—আমরা মা দে! মা দেখতে মনকে তত
দৌড়তে আছে ?
০
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
বু। সাধু! তাই আসুন ।
সি। চলুন।
[ সকলের প্রহ।
চতুর্থ দৃশ্য।
(গুল্ট রাজসভা।)
( সিংহাসনে রাজষেশে কালকেতু-চতুর্দিকে সমদ,বেশে )
অন্যায় ব্যাধগণ উপস্থিত।
( সকলের গীত)
সংসারে এ সং সাজা,
কাল ভিখারী আজ রাজা,
ঢং ধরা চাই, রং করা চাই, নাই ছুটি।
( যখন যেমন তখন তেমন।
চং ধরা চাই, রং করা চাই, নাই ছুটি।
কেউ ট্যানা কেউ পােষাক পরা সং,
কান্না হাসি দুঃখ সুখের রং,
এই ললাটে পায় চোক পালটে এই লুটি।
মুখ বুজে সই-ওল্টালে ফের মুখ ফুটি।
বি-মা। (পার্শ্ব কক্ষদ্বারের যবনিকা ঠেলিয়া আসিয়া) 'ওগো ।
তােমরা যে গলা ছেড়ে গান লাগিয়ে দিয়েছ ? একি
বন? এযে রাজসভা! সইরাণী বল্যে।
কা। তােমার সইরাণীকে বলগে-রাজসভা এখনও বসেনি।
[ বিমলার মার প্রস্থান।
!
চতুর্থ দৃশ্য।]
মা।
খেছি ভাল ওঠন পড়ন খেল,
খাচ্চি ঠেলা-মাচ্চি ফিরে ঠেল ;
স’চ্চি কত-ক’চ্চি কত ভিরকুটি।
দিচ্চি কারেও-খাচ্চি কারুর কানটি ।
সােমাই। ( প্রবেশ করিতে করিতে) আরে কর কি ? থাম”
থাম’! একেবারে যে তােমারগে যাঁড়ের চীৎকার
সুরু করে দিয়েছ ?
কা। জগঠামশাই! এই থামলুম্ ! কিন্তু বাবা-তােমার
এ রাজসভা সাঙ্গ হতে আর কত দেরি ? এই ছাই
ভস্ম গুলাে গায়ে দিয়ে, এ জবড়জঙ্গ হয়ে যে আর
থাকতে পারি না। কি বল হে সভাসদগণ ?
স-গণ। (সমস্বরে) হাঁহ-গাে মহারাজ! থাকতে পারিনা
গাে মহারাজ!
সাে-মা। ওরে বাবা একটু ক্ষেমা দে, সহর থেকে সব প্রজা লােক
আচে, তােমারগে তাদের জন্যে খানিকক্ষণ সভ্য ভব্য
হয়ে চেপে চুপে থাকলেই বা? এ রাজ্যটাকে বসিয়ে
দিতে দেন! বেস রাজারাজড়ার মত ব’সহ অনি
করে! আহা হা! পা দুটো অমন ফাঁক করে রেখ
না! হঁাবেস ঐ রকম বুকের ছাতি তুলে–ঘাড় সােজ।
করে—তােমারগে দুই উরুতে দুই হাত দিয়ে-জমাট
হয়ে বােস! তােমরা কি ? ওরকম যে যার মতলব মত
হয়ে বসলে চলবে না। এ বন বাদাড় নয় ! ঠিক হয়ে
পায়ের ওপর পা দিয়ে মানুষের মত ব’স’।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক।
স-গণ। হা-হা-গােসই পণ্ডিসাই! মানুষের মত বসি।
সােমা। এ ব্যাটাদের এ আবার কি ঢং ?
কা। ওরা যে সভাসদ ! ওদের ঐ রকম করে কথা কইতে
হয়। পােন্দার খুড়াে শিখিয়ে দিয়েছে।
সােমা। আর কথা কয় না ! সব ঠিক হয়ে ব’স। ঐ মােড়ল
আচে ! সাতশাে আটশাে ঘর প্রজা ওঁর তাবে। দেখ,
ওঁকে যা ব’লতে কইতে হয় সব আমি কই’ব, ‘তুমি মাঝে
মাঝে কেবল এক একবার হু দিয়ে যেও! আর কিছু
বলবার দরকার হয়ত আমি শিখিয়ে দিলে ব’ল।
কা। খুব বােল্ব ? বলে পালাতে পাল্যে বাঁচি ।
(মুরারী পােদ্দারের প্রবেশ।)
মু। মােড়ল এয়েছে। হাজার দুহাজার প্রজা এনেছে ! ঢাক
ঢােল বাজাতে বাজাতে আচে। ঐ যা-ই মশাই।
তুমি মন্ত্রীর টুপিটা পরনি?
সােমা। অ! তাইভাে? তােমারগে বড় ভুল হয়ে গেছে।
( বুলান মণ্ডলের প্রবেশ।)
বুলা। ( সিংহাসনতলে কিছু নজর রাথিয়া) নবীন মহারাজের
জয় হােক ! অধীনের নাম বুলান মণ্ডল, নিবাস কলিঙ্গ,
হুজুরের দরবারে আশ্রয় প্রার্থী।
কা। (ঘাড় নাড়িয়া) হু! হু ।
সোমা। (জনান্তিকে কালকেতুর প্রতি গােড়ায় শুধু হু হু
বল্লে চলবে না। তাঁর আসাতে বেস সন্তুষ্ট হয়েছ এই
কথা বল।
কা। বেস সন্তুষ্ট হয়েছি! (সােমাইর প্রতি) আর কিছু
আছে না পালাব’ ?”
চতুর্থ দৃশ্য।]
মা।
৫৫
সােমা। (জমান্তিকে) আহা-হা । একটু থাম না। আচ্ছা
মণ্ডলমশায় আপনার অভিপ্রায় কি বলুন ?
বুলা। অভিপ্রায় মহারাজের রাজ্যে বাস করা! চণ্ডীর কৃপায়
উনি নবরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, চণ্ডীর দরিদ্র তনয়
আমরা, ওঁর অধীনে বাস করে সেই ব্ৰহ্মময়ী মার নামের
জয়পতাকা ওড়াব এই বাসনা।
কা। হু ! !
সােমা। মণ্ডলমশাই বেস বলেছেন।
মুরা। বেস বলেছেন।
কা। (সােমাইর ইঙ্গিতে) বেস বলেছেন। কি বল হে সভা-
সঙ্গণ? (সভাসদগণকে ইঙ্গিত।)
সগণ। ঘঁা-হা-গাে-বেশ বলেছেন।
সােমা। ভাল, মণ্ডলমশাই! তােমরা তা হ'লে এসে বাস কর।
শুনেছি বন্যায় তােমার গে তােমাদের সর্বস্ব ভেসে গেছে।
এই নগরে বাড়ি ঘর আছে বাস কর। এখনকার মত
কিছু কিছু সম্বল স্বরূপ অর্থ নাও !
মুরা। (জনান্তিকে) আহা-হা! অর্থের কথাটা আগে কেন ?
সােমা। (জনান্তিকে) বলে ফেলেছি আর কি হবে !
মুরা। । (জনান্তিকে) হবে আর কি, আর এক কী ধন
ভাঙ্গাতে হবে।
সােমা। তা হােক! (বুলানের প্রতি) দেখ, এক এক জন
তােমারগে যত ইচ্ছা ভূমি চাষ কর, তিন সন বই রাজাকে
কর দিও ! র’য়ে বসে দিও! দেশে ডিহিদার থাকবে
! সেলামী—কি বাঁশগাড়ি—কি কোন বাবেবরাতে
৫৬ মা। [ দ্বিতীয় অঙ্ক। টাকা কড়ি নেওয়া হবে না। ব্রাহ্মণ সজ্জন নিষ্কর বাস করবে। (জনান্তিকে কালকেতুর প্রতি) এইবার বল আমি সকলের সম্মান নেব-সকলকে সম্মান দেব। কা। (জনান্তিকে) না, জ্যাঠা। সম্মান নিয়ে কাজ নেই দেওয়াই ভাল। সােমা। ভাল, তাই বল। সম্মান দেব-সম্মান দেব! (সভাসগণের প্রতি) কি বল হে সভাসদগণ ? স-গণ। হা-হা-গােমশাই, সম্মান দেবগাে মশাই। সােমা। ভাল আলা, এরা করে কি ? তা—তার পর মণ্ডল মশাই ! এতে তুমি যদি সম্মত হও, তা হলে তুমিই প্রধান মণ্ডল স্থির হবে। তােমার দুই কাণে তােমার গে রাজদত্ত দুই সােণার কুণ্ডল পরান হবে। আর যেখানে যে কমে যত প্রজা বসাতে হবে, সে সমন্তের তদবির তােমাকেই করতে হবে। বুলা। যে আজ্ঞা, আমি এতে স্বীকৃত। চণ্ডীর কৃপায় আর আপনাদের আশীর্বাদে, আমার সাতটী পুত্র সন্তান, সাত- দিনে সতেরখানা গ্রাম তারা বসাতে পারে। সকল জাতের সঙ্গে তাদের সদ্ভাব। কা। বাস্ জ্যাঠা ! এইবার ভাগি। কি বল হে সভাসৰ্গণ ? সগণ। হা-হা-গাে-আমরাও ভাগি। সােমা। আহাহা! আর একটু থামনা। কা। এদিকে যে সর্দিগৰ্ম্মি হল। আমরা ব্যাধ মানুষ, আমা- দের কি অভ্যাস আছে ? কি বল হে সভাসদগণ ?
চতুর্থ দৃশ্য।
মা।
৫৭
স-পণ। হা-হুঁাগাে! কি অভ্যাস আছে ?
(কঁচকলার ঋদি হন্তে ধুমকেতু ও পশ্চাতে দেওয়ানজী বেশে
(ভাড় দত্তের প্রবেশ।)
ভ। (সিংহাসন তলে কাঁদি রাখিয়া) মহারাজ! (দেখিয়া )
একি? কালু খুড়াে না? ও খুড়াে ! তুমি, রাজা হয়েছ
বাবা? অামায় চিনতে পার কি? সেই যে আমি তােমার
ঠেঙে গণ্ডারের কোশাকুশী, বাঘের নখ, ভাল্লুকের
রোয়া, সিঙ্গির সেই—সেই যে—আরবছরে ষষ্টিবাটার
দিন জামাই ব্যাটাদের জন্যে আদখানা হরিণ-এই যে
পােদ্দার পিসেও যে? তবে তত সব আপনা আপনি
দেখতে পাচ্চি। ইনি? একে কি চিনি না ?
মু। চিনবেন না! ইনি এর পুরােহিত-মন্ত্রী—যাই বলো।
ভাঁ। ব্রাহ্মণ ? উনি তাে পিতার ততুল্য! প্রাতঃপ্রণাম মহা-
শয়! দাসকে কিঞ্চিৎ পদধূলি দি—পদধূলি মন্তকে
ও বক্ষে দিয়া) আঃ! আঃ! পবিত্র হলেম! কি
জানে’ ধর্মাবতার—আমরা জাত কাটচাষাভুষাে
নই—ব্রাহ্মণকে প্রণাম করে—উটি না নিয়ে ছাড়া-
আমাদের কুলকুষ্ঠিতে লেখে না।
সাে। সাধু! সাধু! আপনি কায়স্থ বুঝি?
ভ। শুধু কায়স্থ ? কায়স্থের রাজা ঠাকুর! নিজে খাজা
মৌলিক, আমলহাড়ার দত্ত। ঘােষ বােসের দুই মেয়ে
ক'রেছি বিয়ে—নিজের মেয়ে দিয়েছি মিত্তিরকে।
গঙ্গার দুধারি যে যেথা কায়স্থ আছে আমার ঘরে
সকলকেই পাত পাড়তে হয়। সেরা মুখিরও স্বহস্তে
(দ্বিতীয় অঙ্ক। পাক হবার যাে নেই। বহু পরিবার নিয়ে ঘর করি ঠাকুর! এই দেখ না ( অঙ্গুলিতে গণনা) দুটা পরিবার, তিনটী শালা, বড় পক্ষের দুটী, আর ছােট পক্ষের একটী, এক পক্ষের একটী শাশুড়ী,তা ছাড়া দেখুন গে, বড় ভগিনীটি আছেন—চার রকমের ছেলে চারটি আছেন- আটটী মেয়ে আছেন--তার ছটা পার করেছি, সুতরাং ছটী জামাইও আছেন,তাদের কারুর কারুর নেী- গেণ্ডীও আছেন, তার পর দুটী গাই আছেন, দুটি বলদ আছেন, দুটী বদে আছেন-ছােট গিন্নি গাে-দুধ খান না, তাই দুটী পাটীও পালা আছেন। তা ছাড়া আউতি যাউতি, কুটুম কুটুম্বিতে তো আছেই—এই বহু গুদ নিয়ে তােমার কাছে এসে পড়েছি খুড়াে! কাল। হু হু। সােমা। বহু গুষ্ঠী বই কি? মুরা। বাবা! বহু গুষ্ঠী নয়? যেন রাক্ষুসে রাবণের পুরী! এতাে গুষ্ঠী পুষতে হলে আমি তাে বাবা গলায় দড়ি দিয়ে মরি। ভ। তা খুড়াে! তুমি রাজরাজেশ্বর হও বাবা! আমার ভার তােমাকে নিতে হবে। বয়ে সর্বস্ব গেছে, বাড়িঘর থেকে-টেকিকুলাে থেকে-কাপড় চোপড় গয়না গাটি টাকা কড়ি পর্যন্ত সমস্ত তােমায় নতুন কোরে দিতে হবে। কাল। হু হু। সো। এতে আমরা আপনাকে তােমারগে দেবই। ভ। আর তা ছাড়া দেওয়ানীটি মুড়লীটি, এদুটী আমার চাই। হাজায় ঘর কায়স্থ আহ্মণ নিয়ে সহর ভেঙ্গে আমি আববা!
চতুর্থ দৃশ্য।
মা।
৫৯
মু। তুমি আবে কি বাবা? এই মণ্ডল মশাই হাজার ঘর প্রজা
এনে হাজির করেছে। মুড়লিটী আপনি আর কিছু
আগে ওঁকেই দেওয়া হয়েছে, বিশেষ উনি একজন
ও সহরের পুরােণ মােড়ল!
ভ। কে? কে? কলিঙ্গের পুরােণাে মােড়ল তত এখানে
কাওকে দেখিনা!
বু। সেকি ভাড়দত্ত মশাই! বুলান্ বেচারাকি নজরে পােড়,
চেনা? ও রাজার কাছে মুড়লীর লড়াইটে নিজেও গায়ের
জোরে ভুলেছ, আমায়ও ভুলতে বল নাকি ? ছমাস
যে মুখ দেখান ভার হয়েছেল মনে নেই বুঝি ?
ভ। যাও! যাও ! তােমার সঙ্গে কথা ক’চ্চিনা! ও হুজুর! এই
তােমাদের পুরােণ’ মােড়ল? ওতে চাষাভূষাের মােড়ল
পাড়াগেঁয়ে মােড়ল, কায়স্থ ব্রাহ্মণ নিয়ে সহুরে মুড়লী
সে বড় শক্ত ছাতির কথা।
বু। দত্তজা! গরিব সাতপুরুষে মােড়ল, গাঁয়ে মানে জান
তাে? সহরই বল, গাঁ বল, সেথা মানে না—হেথা অথচ
আপনি মােড়ল হ'তে আসিনি।
কাল। জ্যাটা! আর পারি না বাবা পালাই! কি বলহে সভা-
সগণ ? (উখানােযােগ)
স-গণ। হা হা গাে মহারাজ! আমারাও তাই! (উথানােযােগ)
সাে। (বসাইয়া) উঠো না! উঠো না! আর একটু থাক।
এই হুকুমটো দিয়ে যাও! বল মুড়লী এর দেওয়ানী ওঁর।
মু। আর আমারটা অমনি।
সাে। তােমার তাে পােদ্দারি আছেই। (কালকেতুর প্রতি) বল!
৬০
মা।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
।
কাল। তাই তাই তাই! এখন ছেড়ে দাও পালাই। এমে
বাড়ছেই বালাই।
সগণ। হা হা গো মশাই সঁই-আমারাও ভেগে যাই।
(বিমলার মাতার যবনিকাভ্যন্তর হইতে খেগে প্রবেশ
বি-মা। ওগগা। এখন যেন সভা ভাঙ্গে না! সইরাণী বােল্যে
পুরের ছেলে মেয়েরা একটা মঙ্গল গান গেয়ে তবে সভা
ভাঙ্গবে।
কাল। ওরে বাপরে বাপ! আবার গান? আমি কিছুতে
আর থাক্বাে না (উখান)
স-গণ। হা হঁা গাে রাজা! আমরাও না(উত্থান ও গােযােগ)
সাে। আহাহা,আর একটু থাকলে ভাল হত। সব মিটে যেত!
বি-মা। ওগগা থাক না! একটু থাক না! সইরাণী যে বছে গাে!
ভ। আজ্ঞা হ আমারও বিষয়টা বিবেচনা করে দিন। শুধু
দেওয়ানীতে পােষায় না।
তা বই কি শুধু পােদারিতে আমারও মন উঠচে না।
সাে। আহাহা ! থামােথামােথামাে–একটু থাক ।
কাল। আর থাকি? পাখী পিঁজরে খােলা ফুড় ক করে উড়ে যাই।
সগণ। হা হা গো ! ফুড়ক করে উড়ে যাই।
সােমা। আহাহা থাম থাম থাম একটু থাক।
(কালকেতু ও সভাসদগণের লায়ন।
বি-মা। ওগগা থাক না! একটু থাক না! সইরাণী যে বলচে
গােয় গান হবে যে গােন
(পটক্ষেপণ )
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
গুজরাট চণ্ডীর মন্দির পশ্চাৎ ভাগ উপবন।
-
সাধনা ও অষ্ট কুমারীর নৃত্য ও গীত।
আমরা শুধু ভাল বাতে এসেছি।
নেব বােলে আসিনি প্রাণ দিতে এনেছি।
ভালবাসা ফুটেওঠা-ফুল,
বাসে করে গাে আকুল,
ঢেলেদেয় মধুবাস শুধু নেয়নাতত মূল
প্রেমে বেচা-কেনা লেনা-দেনা তাই ভূলেছি।
শুধু ভালবাসা ভাল বলে ভাল বেসেছি।
সাধ। এমনি করে মন্দিরের সুমুখে, পিছনে, চারিদিকেই
ভাল বেসে বেসে বেড়াব। ভালবাসা সেধে সেধে
বেড়াব, ভালবাসা ভিক্ষে করে বেড়াব। কেমন লো
তাের সব পারবি?
১ম-কু। হ্যা ভাই! খুব পরিবাের এযে ঠাকুরের ভালবাসা,
আমাদের মা, বাবা, মেয়েরা সব্বাই এ ভাল বাসা বাতে
মা ।
[ তৃতীয় অঙ্ক।
আসতে দেয়। হ্যা ভাই! এ ভালবাসা পূজো করা ?
না ?
সাধ। চোক্ বুজে বিড় বিড় করে শাক ঘটা নেড়ে এ পূজো
নয় করতে হয় কলুম, তারপর ভুলে গেলুম। আমাদের
ছােট্ট খাট্ট প্রাণ ব’লে যে জিনিষটুকু আছে, এ পূজোয়
তারি একটু দরকার। ভাল বাতে হ'লেই—যে ভাল
বাসা সত্যি ভালবাসা-বাবা বলেন যে ভালবাসা মায়ে
পােয়ে, বাপে বেটায়, ভেয়ে ব’নে, সােয়মী স্ত্রীতে সুক্ষ্ম
ডাের বেঁধে রাখে, সেই ভালবাসা বাতে হ'লে—প্রাণের
তেষ্টা বাড়ান চাই। আমার মাকে যে সত্যি ভাল বাসলে
সব ভুলে আর কাউকে না ভাল বেসে-মায়া, মমতা,
ভক্তি, ভালবাসার মালা গেঁথে, আমার মার গলায় যে
পরাতে পালে, সেত ত’রে গেল। ভালবাসা ফিরিয়ে না
নিতে চেয়ে ভাল বাতে চাইলে, পথের পথিক ফিরে
চায়, মাকি চুপ করে থাকতে পাবেন ? তােদের বলছি
শােন্ঐ মরা মাকে জিয়ন্ত ক’বাে, ঐ পাষাণীর মুখে
মানবী মায়ের মুখ ভরা হাসি দেবাে।
সাধনার গীত।
আমি আপন ভেবে ভালবাসি মায় ।
মহামায়ায়-মমতায়,
দেখে না থাক্তে পারি
( দুটা চক্ষু খুঁজে চায়।
প্রথম দৃশ্য। ]
মা।
মুখ দেখে মার মনে পড়ে মা,
মুখে ফোটে নাকো রা,
চোখের বাধন ঠেলে জলে বুক ভাসায়ে যায়।
শেষে কান্নায় জানাই মাগো কোলে নে আমায় ॥
(ধুমকেতুর গলা ধরিয়া সিদ্ধিনাথের প্রবেশ।)
সিদ্ধি। এই সন্ধ্যা বেলা পাঁচিল টোপকে পােড়ে পাঁচ বেটাতে
কি কুমতলবে এসেছিলি বল্ ?
ধূম। আজ্ঞে সন্ন্যাসী ঠাকুর! আমি তাে আসিনি ? আমি খোঁড়া
মানুষ, মুলাে মানুষ—আমি কি পাঁচিল টপকাতে পারি ?
সিদ্ধি। তবে এলি কি কোরে ?
ধুম। আমি তাে আসিনি--মাইরি আসিনি—আমায় যে তারা
ধরাধরি করে পাঁচিলের ওপর দে নাবিয়ে দে গেল ।
সিদ্ধি। ফের মিছে কথা? এখনি ঐ নদীর জলে তােকে ছুড়ে
ফেলে দেবাে জানিস ?
ধুম। আজ্ঞে না সন্ন্যাসী মােশায়! আমি সাঁতার জানি না
মায়ের এক ছেলে-টুপ, কোরে ডুবে যাব আর উঠতে
পাব না !
সিদ্ধি। হয় বলনা হয় এই দিলুম ফেলে ।
সাধ। ওকে অমন কোচ্চো কেন? ওও তত মার ছেলে।
ওকে অমন কোলে মা যে মনে ব্যথা পাবে ভাই!
সিদ্ধি। তবে ও বলুক ও কে ? অমন লুকিয়ে চোরের মত কেন
এসেছিল ?
৬৪ মা। [ তৃতীয় অঙ্ক। ধুম। তা বােছি, তা বােলছি। আমি দত্তজার-না, না, দত্তজা আমার- (কালকেতুর প্রবেশ) সিদ্ধিনাথ কর্তৃক ধুমকেতুর হন্ত মােচন ও সাধনার ইঙ্গিতে ধূমকেতুর পান। কাল। ও বাবাজী! তুমি এই যে হেথা? মার আরতির সময় হয়েছে শিগগির এস! তােমরাও সিদ্ধি। চলুন, আমি যাচ্ছি। (কালকেতুর প্রান।) সিদ্ধি। ঐ যাখোঁড়া ছোঁড়াটা পালিয়েছে ? সাধন। হঁা' আমি তাকে পালাতে বন্ধুম। আহা সে বলে তার মা আছে। যার মা আছে, যা ভাই সিদ্ধিনাথ, তাকে কি কেউ মাত্তে পারে? মার মায়া অক্ষয় কবজ হােয়ে তাকে রক্ষা করে ? সিদ্ধি। সাধনা! এ পৃথিবীতে সুই শিখে এয়েছ! কু-তত শেখনি মার ছেলে মেয়ে সবাই ভাল, এ ভ্রম হােমার আছে, আমার তাে নাই! কাল-সাদা, ভাল-মন্দ, মিষ্টি-ট এই নিয়েই জগৎসংসার ! পৃথিবীর সর্বত্র ঘুরেছি, যেখানে গেছি, সেইখানেই এই দুয়ের অস্তিত্ব! মন্দের জ্বালায়মন্দ দেখতে পারি না,-মন্দ সইতে পারিনা বােলে পৃথিবী ত্যাগ কর্তে চেয়েছিলেম ! শেষে শুলেম আমার মায়ের নূতন রাজা নূতন রাজ্য হয়েছে ! ছুটে এলেম্! এসে দেখলেম ব্ৰহ্মময়ী মা আমার বিরাজিত ; ভাবলেম্ মায়ের এ নূতন রাজ্যে পুণ্য থাকবে,শাপ যাবে, ধৰ্ম্ম রবে, অধৰ্ম্ম পালাবে। !
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
পরম ভক্তের হাতে মহামায়া আমার রাজ্য সঁপেছে, তার
রাজ্যে আমি এতােটুকু মন্দ থাকতে দেব না ! কাল্-
ভৈরব আমার সহায়, পাপের গন্ধ যার গায়ে থাকবে,
তাকে ঐ বড় নদীর পরপারে পাঠিয়ে দিয়ে তবে নিশ্চিন্ত
হব!
সাধ। তুমি বড় রাগী ভাই! পেটের ছেলে পাপী তাপী হয়ে
মার পায়ে ধরে কাঁদলে তিনি তাে স্থান দেন।
সিদ্ধি। আহা সাধনা! সে অনুতাপের কান্না এ পৃথিবী ভুলে
গেছে। জ্ঞানপাপী প্রেতের প্রতিমূর্তি, পাপ কোত্তে
তাদের দেহের একটী শিরাও কম্পিত হয় না। পাপ
কোরে এক বারের তরেও তাদের প্রাণ কাঁদে না।
পবিত্রোজ্জ্বল জীবাত্মাকে তারা নিৰ্ব্বাণােন্মুখ কোরে
রাখে। অথচ বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে হাসে খেলে ! হাতে
হাতে খেতে খেতে আপনার জনকে পর ভেবে,
সেই পরের সৰ্ব্বনাশ কোরে বসে। সাধনা, তুমি
জাননা—তাদের জন্য এ জগৎ সৃষ্ট হয় নি। মহাশক্তি
মা জননী সেই সব দুর্জন-দলনীরূপে এ জীব-জগতে
আবিভূত হােয়েছেন। জ্ঞানপাপী কুষ্ঠরােগ—তাকে
স্পর্শ কোলেও পাপ আছে।
নেপথ্যে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি।
সাধ। ঐ চল আরতি আরম্ভ হ’ল ! আয় ভাই তােরাও সকে
আয়।
বাকলের গান করিতে করিতে প্রস্থান
মা
[ তৃতীয় অঙ্ক।
গীত।
মায়ের কোলে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপন দেখি সব।
স্বপ্নে জনম স্বপ্নে মরণ শুনি স্বপ্নে মাভৈঃ রব ॥
( সকলের প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
গুজরাট-ভাড়র
বাটী
দুঃশীলা ও ভাড়ির প্রবেশ ।
দু। তা হবে না। মাসে মাসে লক্ষি টাকা জমান না হােলে
আমার মন উঠবে না! মন না উঠলে জানো তাে ? তাই
ক’ববা! কক’রে লক্ষি টাকা করে আমার হাতে
এনে দেবে, আমি ঋনাত্ করে অনি মায়ের পায়ের
কাছে ঢেলে দেবে ; মা অম্নি গণ্ডা গণ্ডা করে ভাগ
করে তুলে রেখে দেবে। মা আগে গুণতে জান্তাে না,
এখন্ কেমন টাকা গুনূতে শিখেছে দেখেছো তাে?
৪।। তা হবে! তা হবে! নানা রকমে টাকা ঘরে আছে ঠিক।
গুনে গেঁথে রাখতে পালেই হবে। বেদের ছেলের রাজ্যি
করা আর খোড় ভাঙ্গভাের পাহাড় ডিঙ্গানন দুই
সমান, এও পারে না ও'ও পারে না! নিয়েচি। সব শালার
গালে চড় মেরে সব ক্ষমতা হাতে করে নিয়েচি। জানে
তাে রাজ্য এখন আমার হুকুমেই চছে! আমি মারি
দ্বিতীয় দৃশ্য।] মা। ধরি, কাটি, লােকের উড়িয়ে পুড়িয়ে দিই, ঘর জ্বালিয়ে দিই আর যা ইচ্ছে তাই সর্বনাশ করি, কারাে সাধ্যি- নেই যে এককথা বলে। কেবল ডরাই ঐ মােড়ল ব্যাটাকে! ব্যাটা বাগে পেলেই বড় কুট কুট ক'রে কামড় দিয়ে বিধিয়ে বিধিয়ে বলে আর আমার পাকা মতলব সব ফাঁকা করে দেয়। ঐ বুড়াে ভুড়াে বেটাকে দেশ ছাড়া কত্তে পাল্লে তবে আমার বােয়াস্তি হয়। গায়ে ফু দিয়ে বসে বসে ভাণ্ডার লুটী, কোন ব্যাটাকে চোকে কানে দেখতে দিইনা। দুঃ। তা তােমার এত ক্ষমতা তুমি কেন ওকে তাড়িয়ে দাওনা ? ভা। তাড়াতে পাত্তম কিনা দেতুম—কি বােল্বব-গোদা ভাই শালাই আমার মাথা খেয়েছে। ওই গিয়ে সেই আ- বার দিন চাষা বেটাকে খবর দিয়ে আমার আগে এনে পৌছে দেছলাে! তা না হলে ওর মােড়লী পাওয়া ঘােরাতুম্। আর ভাড়াতে পান্তুম কি না দেখ তুম। দুঃ। ওই গােদাই তাে যত নষ্টের মূল, বাড়ী থেকে দূর করে ছাে, যে যার সব আলাদা হয়ে আছে, ওর কি দরকার যে বােড় কীকে সঙ্গে করে এনে আমার বাড়ীতে ঢােকে ? বােকেছি গাল দিইছি ঝেটা দেখিয়েছি কিছুতে কিছু না? মাগী অনি ঘেঁকী কুকুরের মত ঘেঁক ঘেঁক করে আসে আর গোদা পোড়ার মুখখার গালে হাসি ধরে না। ভা। আরে ওটা বেহায়া-বেহায়া ! ওতত আমার ভাই নয়, ও আমার শালা
[ তৃতীয় অঙ্ক।
( শিবার সহিত দুৰ্ম্মধার প্রবেশ ।)
শিবা। কি দাদা! ভাই শালা? তা বেশ! এখন এ মাগ শালীর
কি করবে বল দেখি ? ওকি এর দোর তার দোর করে
বেড়াবে, আর তুমি ছুরী মাগ নিয়ে দেওয়ানী করবে ?
দুঃ। আবার আমায় নিয়ে টানাটানি? উনি বলুন আর না
বলুন, আমি তবে বলি-বুড়াে বয়সে ভাতার নিলেনা,
যাদের দরদ বেশী তাদের ঘাড়ে গিয়ে পড়ক না; যাদের
বিয়িয়েছে তারা নিয়ে গিয়ে খাওয়াক না?
দুৰ্ম্ম। শিবু ঠাকুর পাে? তুই হেথা কোন কথা কইতে বারণ
করেছিলি, কিন্তু আমি তো আর থাকতে পাচ্ছিনে!
ওরে বেটী বুড়াে সােহাগী! ও বুড়ােকে তুই পেটেনা
তাের মা পেটে-
শিবা। বউ ! একটু থামােনা ! তােমার থােরাকী আমি গলায়
আঙ্গুল দিয়ে বার করে নেব! উনি যাবেন কোথা?
সহজে না হয়, এ গােদা শিবা ওপােরওলাদেরও চেনে,
যেখান দে টাকা বেরােয়, সেখানেও গতায়াত আছে।
ভা। আমি যদি এক পয়সা না দিই তুই কি করবি?
শিবা। কি আর ক’বাে? তােমার প্রতি পায়ে হেঁাঁচোট
খাওয়াব। সােজা পথে তাে চলােনা, তুমি যে বাঁকা
পথ ধােবে সেই বাঁকা পথ গিয়ে আগ্লাবাে, তােমায়
উঠতে বসতে খেতে শুতে দােয়াস্তী পেতে দেবনা।
দুৰ্ম্ম। শুধু তাই, হতভাগা মিনসের রাজার কাছে যাব, রাণীর
কাছে যাব, মন্ত্রীর কাছে যাব, সেনাপতির কাছে যাব
সবারই কাছে যাবাে, গিয়ে ওকে চোর ঘঁচোড়,
•
দ্বিতীয় দৃশ্য। মা। জোচ্চোর—দাগাবাজ-জালিয়াত বলে পােরুচে পাড়বে, আর বােল্বাে দেওয়ান হয়ে পৰ্যন্ত মাগ ছেলেকে খেতে দেয় না, বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, আর, একটা দুলের মেয়েকে বার করে এনে তাকে সপরিবারে পুষছে, কেমন ? কেমন রে অনামুখাে, হতচ্ছাড়া মিসে? এই হলে তাের মুখের মত হবে? আসল মাগকে অন্ন দিবি, নকল মাগের ভেড়া হওয়া এড়াবি? কেমন ? ভা। রাজবাড়ীতে গেলে দবােয়ানে দূর করে দেবে। দুঃ। আমরাও এই বাড়ীতে কাল অবধি দরােয়ান বসাবাে। শিবা। কেন? লেংড়া ভেয়ে অটেনা, এবারে কি দরােয়ান পাহারা চাই ? (ধূমকেতুর প্রবেশ।) ধুম। বােনাই বাবু! রাজবাড়ী থেকে সাই পণ্ডিত এয়েছেন। ভা। আঁা, কেন? এত রাত্রে ? কৈ চ দিকি দেখি। [ ধুমকেতুর সহিত ভাড় র প্রস্থান। দুঃ, ওগাে ! এরা এখানে থাকবে নাকি ? দুৰ্ম্ম। থাকূব না তাে কি বা ছুড়ী ডাইনি, থাক্বাে না? শুধু থাকবে? ছেলে মেয়ে ডেরিডাবরি সব নিয়ে এসে জেঁকে ব’স্বাে, তােকে আর তাের মাকে আর তাের একঠেঙ্গে ভাইকে কোণঠাসা ক’রবাে, তবে ছাড়বে। হাততােল দুটী দুটী খেতে দেবে, ছেলে মেয়ের অক- ল্যাণ করবােনা, কিন্তু তাও ধানে ভাতে।
৭০
[ তত্বীয় অঙ্ক।
5ঃ। তাইতাে ? বুড়ো প্রাণে আম্বা কত ? এই দিচ্চি ঝিকে
ডেকে, ঘরের জঞ্জাল ঝেটিয়ে, নাচদোর পার করে
দেবে অখন।
[ বেগে প্রস্থান।
শিবা। বউ, বড় বেগতিক ; ওকে না তাড়িয়ে বড় তাল ফাতে
পাচ্ছে না।
দুৰ্ম্ম। কেন? খুব গলা ছেড়ে কেঁদে, সাতবাড়ীর লােক এক
বাড়ীতে জড় করে, পােড়। মিসের গলায় কাপড় দে
টালে হবেনা ?
শিবা। উ হু বউ! তাতে কোন কাজ হবে না।
দুৰ্ম্ম। তবে এই সময় ঐ সই পণ্ডিত এয়েছে, ওর সমুখে
মড়াকে খুব সট্টে পট্টে ধরিগে?
শিবা। যাবে যাও! কিন্তু হাউ হাউ করে যেন কতকগুলো
বােকোনা! ঐ বকাই তােমার কু-
।
[ দুৰ্ম্ম,খার প্রস্থান।
ধুমাে শালা এলাে আর গেল নাকি? শালাকে লােভে
ফেলে আসল কাজটা করাতে পাল্লে যে বাচি। এই যে
ভেড়াে যায়নি।
(ধূমকেতুর প্রবেশ।)
পৃম। ছি বাবা ছি ! এমন সময়ও বলে দিয়েছিলে, গিয়ে মারের
চোটে হাড় ভেঙ্গে আসতে হ’ল, পাঁকে বড়বড়িয়ে
পাও বােসে গেল, পদ্মফুলও তােলা হলাে না।
তৃতীয় দৃশ্য। }
শিবা। তুই যে ভাই নিজের কাজ আগে বাজাতে গেলি,
কাজেই ঠ’কে এলি! আমি বল্লেম মুরারী এতে করে
ধরেছে, তার এটা করে দে, আমিও তাের ওটা ক'রে
দিই। সাধনাকে পাইয়ে দিই।
ধূম। সে তত করাই আছে হে! এই আজ সকালে-- দিদি
আপনাআপনি বােছিলাে-মুরারী যদি একলাক টাকা
দেয়, তা হলে
শিবা। সে তাই দেবে! তা হলে ঠিক কর, তােরও আমি
ঠিক করে দিচ্চি।
দুৰ্ম্ম। ( নেপথ্যে।) ওরে, হতভাগা মিসে আমায় লাথি
মেরে চোলে গেল রে, ওরে আমায় ফেলে দিয়ে গেল
রে, ওরে আমায় মেরে ফেলে গেল রে!
শিবা। অই! চ’—’ দেখি চ’-
[ উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
রাজবাটী-ফুল্লরার উপকক্ষ।
(পত্নীর কেশাকৰ্ষণ করিয়া মুরারী পােদ্দারের প্রবেশ।)
মু-প। ওরে ছাড়, ছাড় ! ছাড়, মিসে ছাড়।
মুরা। বল্ ভাগ দিবি কি না ? আপনার বেলা আঁটিসুটি,
পরের বেলা দাঁতকপাটি। আমার রােজকারের ভাগ
१२ মা । [ তৃতীয় অঙ্ক । নেবার জন্যে হাঁ করে বসে থাবি, আর তাের রােজ- কারের বেলা বুঝি আমায় কলা দেখাবি ঠাউরেছি ? বল্ ভাগ দিবি, তবে তাের চুল ছাড়বে। মু-প। তুই গােছ গােছ ক'রে চুল ছিড়ে আমায় নেড়া করে ফেল্লেও দেব না। মুরা। তবে তােকেও আমি ব’তে দেবনা ! আমার কাছে খবর নিয়ে তবে তাে তুই বলতে এয়েছিস্? আমার খবর দেবার দাম না দিলে কিছুতেই ব’তে দেবনা, এই চুলের ঝুটি ধরে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। তার পর আমি এসে, বউ রাণীমাকে বলে, তাের পাওনা গণ্ডা নিয়ে নেব, তখন ফ্যা ফ্যা করে মরবি। মুপ। (হঠাৎ হাত হইতে চুল ছাড়াইয়া) ওগাে রাণী বৌমা গাে, রক্ষা করগাে। [ বলিতে বলিতে প্রস্থান। . মুরা। (স্বগতঃ ) এহেহে, বড্ড ফস্কে গেছে, শালীর গায়ে জোরই কি কম। যাক, আমিও বাবা ওৎ করে রই- লেম, টাকা নিয়ে ফিরেছে কি ধরেছি চুলের গােছ। ঐ বই আর কিছুতেই শালীকে কাবু কতে পারি না, এবার আচ্ছা করে বাগিয়ে ধরব, যাতে পিছলে না পালাতে পারে। ধ'রে–কেড়ে নিয়ে-দে দৌড়। ঐ যে বৌরাণীমাকে সঙ্গে করে এদিকে আসছে। কি বলছে না ? ঐ যে শালী হাত পেতে কি নিলে, ঐ যে তাড়াতাড়ি পেটকেঁচড়ে বেঁধে রাখলে।
তৃতীয় দৃশ্য।]
মা।
৭৩
ফুল্লরা ও মুরারী পত্নীর প্রবেশ ।
মু-প। এই মিসেকে জিজ্ঞেস কর বৌমা! এই মিনূসেকে
জিজ্ঞেস কর।
মু। হঁা মা বৌরাণী! আমার মাগী যা ব’চে সব ঠিক্ !
আমিই তে গিয়ে খবর আলু-মেয়েটা হচ্চে মােড়-
লের, তা কেউ বলে পেটের মেয়েকেউ বলে পালিত
মেয়ে। আর ঐ যে আর আটটা ছুড়ি জুটেছে ও কটাই
বামুণের মেয়ে।
কে জানে খুড়াে মশাই! কি যে হচ্ছে আমিতাে কিছু
বুঝতে পাচ্ছি না! আমি এতে সাধ করে সােণার
সংসার সাজালুম, আমার সকল যে বৃথা হয় ! যার জন্যে
এতত, সেই যদি এ সব ফিরে চেয়ে না দেলে, তবে আর
কি নিয়ে, কাকে নিয়ে, রাজ্যিপাট করি।
মু-প। তা বৈ কি মা! শুধু পাটরাণী হয়ে পাটের শাড়ী
প’রে বেড়ালেই তাে রাণীগিরি হ’ল না? রাজার রাণী
রাজা বিনে যে কাঙ্গালিনীর চেয়েও অধম।
মুপ। তা হঁ্যা বৌ রাণী মা! রাজা তে মাঝে মাঝে ঠাকুর
বাড়ী ছেড়ে আসেন, তখন তুমি দুকথা বেস গুছিয়ে
ব’তে পার না?
। আসেন বটে খুড়িমা! কিন্তু সে কেবল নে রক্ষে করা।
একে তাে হপ্তার ভেতর যে দিন খুসি সেই দিন আসে-
তাও সঙ্গে নিয়ে আসেন একদল নাগা সন্ন্যাসী! দণ্ড
খানে গিয়ে সিংহাসনে বসে কাচারি করেন। তারপর
আমার সঙ্গে দেখা যােক ভাল, না হােক ভাল, হেঁড়ে
৭৪
মা ।
[ তৃতীয় অঙ্ক।
গলায় চীৎকার করে মার নাম ক’ত্তে ক’ত্তে আবার সেই
ঠাকুর বাড়ীতে ফিরে যা! তাই বলি, যদি মা'কে নিয়েই
তুমি চব্বিশ ঘণ্টা থাকবে, তবে এ সব কেন? আমাকে
এ জব্দ করবার দরকার কি? আর এমন করে দগ্ধে
মারাই বা কেন ?
মুপ। সেকি বৌমা ! যে দিন আসে—সে দিন রেতে
থাকেন না ?
রেতে থাকা মা সেই কুড়ে থেকেই ঘুচেছে! সে কথা
আর বল কেন? আমি যাই মেয়ে—তাই মুখ বুজে
স’য়ে থাকি ! অন্য হলে ঐ দুঃখে দড়ী কন্সী নিয়ে
নদীতে ঝাপ দিয়ে ম’ত্তো।
মুপ। আহা! তাইতাে গা! তা তাের সব কাছে থাক
কিছু বলতে পার না?
ফু। আরে মাগী কাছে থাকি কতক্ষণ? থাকতে পাই কত
ক্ষণ ? হপ্তার মধ্যে দণ্ড খানেক বইতে নয়! তা তাও
কি তাকে একা পাই? পাঁচ জনের পাঁচ কথাতেই
কাবার। হুপ করে আসেন, হুপ করে জান্!
মুপ। তা বৌমা ! এর এখন উপায় কি ?
আম্রা মেয়ে মানুষ—আমরা আর উপায় ক’রুবাে কি মা?
আমরা দুঃখ হলে কঁাতে জানি,সুখ হ'লে হতে জানি।
কিন্তু কি করে যে কি হয়, তাতে কিছু বুঝতে পারি না।
সেই জন্যেই বিধাতা মেয়ে মানুষের পুরুষ বই আর গতি
রাখেন নি! তা আমার পুরুষ তাে আর আপনার
হ’লনা-কাজেই আমাকে কেঁদে বেড়াতে হচ্ছে।
তৃতীয় দৃশ্য।]
মা।
৭৫
=
মুপ। তা-মা! শুধু কেঁদে কেটে আর কদ্দিন্ কাটবে? যে
রকমে হােক ওঁকে সংসারী করাই এখন তােমার কাজ।
লােকে পূজাআশ্রাও করে সংসার ধর্মও দেখে ! উনিও
যাতে তাই করে-তারি একটা পরামর্শ কর মা তারি
এটা পরামর্শ কর ।
ফু। হামা! সেই জন্যেই জ্যাটামশায়কে দিয়ে দেওয়ানজিকে
ডাকতে পাঠিয়েছি। খুড়ােমশায়ও এখানে আছেন,
কজনে পরামর্শ করে—আমায় এ দায় থেকে উদ্ধার
কোত্তে পারেন ভালই, নইলে এই রাজ্যিপাট সােণাদানা
সব ফেলে আমিও বিবাগী হয়ে চলে যাব।
(সােমাই ও ভাড়র প্রবেশ।)
ভ। খুড়িমা! সাইমশাইর কাছে তাে সকলই শুনলে এর
ভেতরের আদৎ কথাটা কেউ বুঝেছেন? আমরা সেই
ছেলেবেলা থেকে সহুরে রাজসভায় ঘুরে ঘুরে পায়ের
গােড়ালী খােইয়ে ফেলেছি! কোন একটা কাৰ্য্য হতে
লাগলে তার একটা কারণ বার করা বরাবরই আমাদের
অভ্যেস,-এর ভেতরেও একটু সূক্ষ্ম কারণ আছে মা
জননী।
গো। আমারও যেন তাই বােধ হয়। তা না হলে-তােমারগে
এতােটা হবে কেন ?
ফু। আমার পােড়া কপালে কারণের অভাব নেই। এই
শােনােনা খুড়ির তেঁয়ে।
সাে। কি গা? বলতাে?
মুপ। ওকি জান সাইমশাই
ঠাকুর!
ও সেই ঠাকুর বাড়ীর
৭৬
মা।
[ তৃতীয় অঙ্ক।
কথা ! সেথায় সেই যে চোক ডেডেবে বুনাে মেয়েটা
তারির কথা।
ভা। ওগাে খুড়ি মা ! আমিতাে সেই কথাই ব’লচি! ওটা
এই বুলান্ মােড়লের কুড়নাে মেয়ে ! এ সপ্ চা ঐ
চাষা বেটার! কোন গতিকে মেয়েটাকে দিয়ে খুডাের
আমার মুণ্ডুপাত ক’ত্তে পাল্যেই রাজ্যিপাট বলধন
দৌলত বল—হুকুম হাকাম বল-সকলই ওর হাতে
এসে পড়লাে তখন তুমিই বা কে? আমিই বা কে ?
আর এই সাইমশায়ই বা কে? সকলকেই নাকের
জলে চোকের জলে হ'য়ে এ দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে
হবে!
মু। তা কি হতে পারে ? মােড়ল কি এতো নেমকহারামী
ক’ত্তে পারে ?
ভ। পারে কি না পারে তা তুমি কি বুঝবে বাপু ! পরের
ধনে পােদ্দারি করে বেড়াও বইতাে নয়। একটা রাজ্যি
চালাতে হ'লে—তার চারদিকে নজর চাই। বিশেষ ও
চাষা বেটার চাচো আমি গােড়া থেকেই দেচি
খারাপ। ঐ যে মিষ্টিমুখ ও বড় সহজ নয়! ওর পেটে
পেটে হীরের ছুরি। এই গােড়া থেকে ওকে দমন ক’ত্তে
না পাল্যে এর পর ওকি কিছু রাখবে ? সমস্ত' চিবিয়ে
খেয়ে পেটে পুরে হজম করে ফেলবে! তখন আবার ঐ
চাষার বিক্রম দেখবে। আমি কায়েৎ বাচ্ছা, আমি ও
বেটাকে চিনি না ?
কু। তবেই তাে! কি হবে বাবা? তুমি আমার পেটের ছেলে
তৃতীয় দৃশ্য।
মা।
৭৭
এর যা হয় একটা উপায় করে—আমায় এ দায় থেকে
বাঁচাও!
ভা। উপায়? উপায় খুড়ি? উপায় এই ভাঁড়, দত্তর মুটোর
ভেতর ! ওকে একেবারে দেশছাড়া কত্তে পারি, তা
হ'লেই সব দিক্ রক্ষা হয়।
সাে। তাই বা কি করে হয় ? ওর তবে হাজার দুহাজার
ঘর প্রজা রয়েছে।
ভা। আহাহা! আপনি বুঝলে না। তাড়ানাে কৌশলে
চাই! কারুর গায়ে আঁচও লাগবে না, অথচ ও ব্যাটা
পালাতে পথ পাবে না ।
তা কি হবে?
ভ। খুব হবে খুড়িমা! ঐ যে মেয়েটা, ওটার জন্যে বুড় মরে
ওটাকে কোন গতিকে সরাতে পাল্যেই বুড়োও স’বে-
রাজাও ভাল হবে।
তা তাই বাবা! যা-ভাল হয় কর। তােমার ওপরই
আমার সর্বস্ব ভার!
ভ। ভারতে? সে ভাল ! চলুন্ তবে-কিসে কি হয়, কেমন
করে কি করা যাবে, তার একটা বিশেষ পরামর্শ করা
যাগে !
( সকলের প্রস্থান।
৭৮ মা। [ দ্বিতীয় অঙ্ক। চতুর্থ দৃশ্য। বুলানের বাটীর সম্মুখে বটবৃক্ষতল-পার্শ্বে ভগ্ন শিবমন্দির। বৃক্ষতলে বুলান ও রােস্তম উপস্থিত। রােস্ত। কত কত্তা, ওর বাড়ী উঠুয়ে নদীর মােহানায় ভাসায়ে দিতে পারি, ওরে খাকা ধরে আনে ওর বুকি বাশ ড’লে ছাড় তি পারি। চোকিৰ পালটে ওর গােণ- গুষ্টিরি জাহান্নমে পেটিয়ে থুড়িলাপ খাতি পারি। হাজার জোয়ান মাের পাছে, তােমার লেগে হরদম্ মজুত, তুমি গরিবির বাপ দা কত্তা! তােমার কি উর ? বুলা। ড করতে হয় বই কি বাবা রােস্তম! কুমীরের সঙ্গে বাদ করে জলে বাস করা বিড়ম্বনা বই আর কি বলতে পারি। হয় ওকে জল ছাড়তে হবে, না হয় আমাকে ডেঙ্গাতে পালাতে হবে। সব গাঁ হতেই অত্যাচারের খবরাখবর পাচ্চি, নতুন নতুন নায়ের পাঠাচ্ছে, এক এক বেটা যেন মূর্তিমান্ যমদূত, প্রজার রক্ত শােষণের ঠিক ব্যবস্থা করছে। এ রাজধানীতেও যথেষ্ট উপদ্রব 'ছে যত সব অকৰ্ম্মার দল, কলিঙ্গ থেকে এসে জুটেছে রাজা সদাশিব সংসারের কোন খবর রাখেন না,তারা যা কোচ্চে তাই হােচ্চে। আর ভাড়দত্ত হয়েছে তাদের সদ্দার, দাওয়ানীতে সদ্দারিটা চোছে খুব। টাকাটা সঁকের করাতে ফেলে আসতে যেতে কাটছে। রোস্তম। অত্যিচার তাে ক’তিছে কত্তা টাকাওতাে লুটতিছে চতুর্থ দৃশ্য।] মা। ৭৯ এদিকে তুমিও সইতেছ দেখছি। কিছু কও না, কত্তি দেবাও না; এ সমিস্তিডে মুই সজাতি নারলাম। বুলান। ওরে বাবা! এর পর বুঝতে পারবি, আমার মত বয়েস পা, আমার মত সংসারসাগরের ঝড়ঝাটি সইতে শেখ, দুঃখ দারিদ্র ভােগ করতে জান, শােক তাপ সয়ে স’য়ে পাষাণ হয়ে যা, তবে আমার মত সকল দিক্ বুঝে সাবধানে কাৰ্য্য করতে শিবি। রােস্তম। তবে কি বােঝব কত্তা, ঐ পাগলা এড়েটার রশি তুমি আরও ঢিল দিয়ে দ্যাখবা? অত্যিচারটা আরও পেকিয়ে তুলতি দেবা? ও গাই বাছুর ধােরে আগে টান দেবে, লাঙ্গল ব্যাচপে, গরু ব্যাচুপে, গােলার ধান লুটিয়ে দেবে, তারপর লাঠির চোটে মরদগার মাথা ফেটিয়ে চোখির সামনে জরু ছাওয়ালরে বেইজ্যত করবে, এই গুলাে না ঘটলেই আর তােমার চ্যাতন হচ্ছে না, কেমন কত্তা, এই তত বুঝি লা কি ? বুলান। তা নয়রে বাবা! তা নয়, এতাে বড় পুণ্যবান্ রাজা, দেখছি ওঁর পুণ্যের তেজে পাতকীকে আপনাআপনি পালাতে হয় কি না? ভাণ্ডার লুটছে, মাথার ওপর ধর্ম, রাজ্যের বুকে চণ্ডীর আসন, গুটীপােকা একদিন আপ- নার জালে আপনি বাঁধা পােড়বেন। রােস্তম! আমি শুধু সেই দিনের প্রতীক্ষায় চুপ করে বসে আছি। রােস্তম। ক্যাবল তা না কত্তা! মুই এর একটা হদিস্ বার করেছি, তুমি আর এহনে সােজায় হ্যাঙ্গামা কোত্তি চাও , দুক থা জোরে কতি গেলে তােমার রা হয়ে যায়,
মা।
[ তৃতীয় অঙ্ক
নিজির জেদ বজায় কোত্তি এগােনের মত মামলা কোত্তি
কি দরবারে লড়াই কোত্তি তােমার আর মন সরে না।
এর অণ্ডেরা পেয়েছি কর্তা, গােসা হােও না, তােমার
ঐ দিবেরাত্তির ধম্ম ধম্ম করে ছুটে বেড়ানাে টা।
ধুলান। নােস্তম! তুই ঠিক বলছিস্ বাবা! আর এই সংসা-
রের মিছে কাজের জন্যে মিছে হ্যাঙ্গামা কত্তে প্রবৃত্তি
হয় না। এখন আর এক পথের পথিক হ’তে সাধ
হয়েছে, সে পথ দিয়ে যেতে হলে—পৃথিবীর যত কিছু
কাজ, সমাজের যত কিছু বিধি, কঁাটা খোঁচার মত পায়ে
বিধে, পাশ কাটিয়ে যেতে পারাই সমদারের কাজ।
সাতসাটী উপযুক্ত ছেলে আমার, আমাকে তাে তারা
এ কাৰ্য্য থেকে এই জগতের ঘানিগাছ থেকে ঘাড়ের
জ্যোত্ খুলে নে এক রকম অবসর দিয়েছে, তবে যতদিন
বাঁচবে। সংসারে থাকবে, দুঃখীর অশ্রুজল, পীড়িতের
কাতরতা, আতুরের যাতনা, পাপীর অনুতাপ, অভাগার
হাহুতাশ, এ সব দেখে নিশ্চিন্ত থাকব না! ভগবান
যত দিন এ দুৰ্বল দেহে বিন্দুমাত্রও শশাণিত রাখবেন,
ততদিন সেই শেষ বিন্দু দিয়েও যতটুকু উপকার কত্তে
পিরবাে করবাে। অত্যাচার প্রবল হলে, আমি কি
রােস্তম নিশ্চিন্ত থাক্ব ?
(শিবার প্রবেশ ।)
শিবা। মােড়ল দাদা! তােমার সাধনা এখনও ঠাকুরবাড়ী
যাইনি তাে?
বুলান। না, কেন ভাই শিবু ?
ব
চতুর্থ দৃশ্য।
মা।
শিবা। কারণ আছে দাদা। কারণ আছে, চল বাড়ীর ভেতর
উঠে চল বলি। কথাটা দাদা তােমার গােপনীয় ।
[ সকলের বাড়ীর ভিতরে প্রস্থান।
(ধুমকেতুর সহিত দুঃশীলার প্রবেশ।)
ধুম। (প্রবেশ করিতে করিতে।) হঁ্যা দিদি ! তার হাতে
লােয়র সিন্দুকের চাবি, সে যাকে দেবে সেই পাবে।
বােনাই বাবুকে শুদ্ধ তার হাত দিয়ে টাকা নিতে হয়,
অমনি নয়! পােদার মশায়ের মা কত?
দুঃশী। লাক্ টাকা আবে তাে?
ধুম। আবে বৈ কি দিদি। আবে না? না হলে এদিকেও
যে না,জানে না? ঐ, ঐ মন্দিরের ভেতর গিয়ে তুই
একটু ব’স, এল বলে।
[ দুঃশীলার মন্দির মধ্যে গমন।
(বাড়ীর মধ্য হইতে শিবার প্রবেশ।)
শিবা। এয়েছিস্? এনেছিস্?
ধুম। আনিনি? ঐ ভাঙ্গা মন্দিরে এনে মাল মজুত করেছি ।
মর কি বাত, হাতি কি দাঁত, আমি বাবা আমার কথা
রাখলু, এখন তােমার কথা রাখ।
শিবা। দাঁড়া! আগে মুরারী এসে ওকে নিয়ে যাক্, তারপর
দাদার মতলব তত শুনেছিস্? সেটার নিষ্পত্তি হ’
তারপর তাের জিনিষ তােরই আছে।
ধুম। হঁ্যা দাদা! বােনাই বাবু শালাকে না ঠকাতে পাল্লে
তার গ্রা থেকে আজ পাওয়া দুষ্কর। শুনেছি সব
৮২ মা। { তৃতীয় অঙ্ক। লােকজন চাপাশে লুকিয়ে রেখে সেজে গুজে আসবে, ঠাকুরবাড়ী যেতে পা বাড়ালেই সাধনাকে লুফে নিয়ে চলে যাবে। শিবা। দাদাকে তুই সে কথা বলেছিস্তত? ধুম। তা বলিনি ? বলিচি, রাজী হয়েছে, আমার সঙ্গে এসে এই মন্দিরে লুকিয়ে থাকবে, আমি বাইরে থাকা ; সাধনা বেরুলেই আমি ওকে বলে লােকজনকে নিয়ে খবর দোব, তার ধােররনে যাবে, উনি শেষে গিয়ে মজা মারবেন, এই মতলব আঁটা হয়েছে। শিবা। তা বেড়ে হয়েছে, শেকল টেনে দিয়ে তােতে আমাতে যেমন কথা আছে তুই শেষ নিয়ে সরে পড়বি। এখন যা, আমি মুরারীকে দিয়ে এদিক্ কাবার করি, তুই দাদাকে এগিয়ে আতে যা। [ ধূমকেতুর প্রস্থান । শিবা। (স্বগতঃ ) যা শালা যা! আমি আজ এক ইটে দুই পাখী মারবাে। মুরারী পোদ্দারের প্রবেশ।) মুরা। কৈ হে ইয়ার! ব’লে এলে তাে, এখন লুকুই কোথা? আমি কি বাবা এ সব কাজ ক’ত্তে পারি ? গেরস্তর মেয়েটাকে লেটেল দিয়ে ধরে আনা ? ভাড়দত্তর মত- লবেই তাে এইটে ঘটল, শেষ দেখি সঙ্গে না এলে বৌরাণী মা রাগ করেন, কাজেই আসতে হ’ল, এখন কর ভাই, আমায় পরিত্রাণ কর, কোথাও লুকিয়ে চুরিয়ে রাখ, ওদের কাজ হয়ে গেলে, শেষে দলে গিয়ে মিসব।
চতুর্থ দৃশ্য।
মা।
শিবা। তােমার জন্যে ইয়ার জায়গা তাে ঠিক করে রেখেছি,
ঐ ভাঙ্গা মন্দির দেখচ, ওরির ভেতর সেঁধিয়ে থাক,
জনপ্রাণীতেও সাড়া পাবে না।
মুরা। আঃ, বাচালি ইয়ার! বেশ যায়গা !
শিবা। শিগ্যির যাও, শিগ্যির যাও! লােক জননে দাদা এসে
পােড় লাে।
[ মুরারীর মন্দির মধ্যে গমন।
রােস্তম মিয়া।
(বাটীর মধ্য হইতে রােস্তমের প্রবেশ।)
এই ডান দিকের বােনে একদল, আর বাঁদিকের বােনে
একদল। তুমি পাঁচ সাত জন নিয়ে তাড়া দিলে সব
বেটা ভােজপুরে ছুটে পালাবে। তুমি যাও, আর দেরি
ক'রাে না, মােড়ল দাদার মান বাঁচাও।
রােস্তম। তা হবে এহনে কত্তা! কও তো মুই এদের সাথে করে
অমনি অমনি গাঁয়ে চলে যাব। মাের স্যালাডা দিও
[ বােস্তমের প্রস্থান :
শিবা। এই যে শালা ছুটে আছে।
• (ধূমকেতুর বেগে প্রবেশ।)
ধুম। দিদি আর পােদার চোলে গেছে তত ?
শিব। হা হা! এই মাত্তর এই দিক দিয়ে
ধুম। বােনাই বাবু আসছে। আমি তবে নিয়ে আসি-
শিবা। (স্বগত) এইবারে রং বাধূল, আমি একটু গাছের
আড়ালে গাঢাকা হই।
[ বেগে পুনঃ প্রস্থান ।
.
৪
মা।
[ তৃতীয় অঙ্ক।
(বৃক্ষান্তরালে অবস্থান ও ধূমকেতুর সহিত ভাড়দত্তের প্রবেশ।)
ধুম। এই যে, এই মন্দিরে তুমি ঢােকনা বােনাই বাবু! আমি
দোরের পাশে দাড়িয়ে চৌকী দিই। যেমন বেরুবে,
অমনি ছুট্টে গিয়ে খবর দেব।
ভাড়। দেখি। যেমন তাল ফঁক দিনি!
(ভাড়র মন্দির মধ্যে প্রবেশ।
শিবা। (বৃক্ষান্তরাল হইতে
হইতে বাহির হইয়া।) দে শালা দে,
শিলি এঁটে দে!
ধুম। তা আর ব'তে। (মন্দিরের দ্বারের শিলি বাহির
হইতে আঁটিয়া দেওন।)
শিবা। এইবার আসুন, আমি ততক্ষণ লেংড়া বেটাকে ধরি।
( ধূমােকে ধারণ ।)
এ কেন দাদা ?
শিব। চোপ্ শালা।
ধুম।
(বুলানের দ্বার হইতে প্রবেশ।)
(নেপথ্যে লােকজনের পরিত্রাহি চীৎকার ও দাঙ্গা হেঙ্গামার কলরব।)
বুলান। ওকি শব্দ ভাই ?
শিবা। রােস্তম মিয়া একধার থেকে সব ব্যাটাকে দোরস্ত করে।
খেদাচ্চে তারির শব্দ, ওদিকে তুমি কাণ দিও না দাদা।
এদিকে তােমার সিংভাঙ্গা বঁড়কে দেখােবা (ধূমাের
প্রতি।) খােল শালা, শিকল খােল।
ধুম। একি ভাই শিবা।
চতুর্থ দৃশ্য।]
মা।
৫
শিবা। চোদ্ শালা। ফেন্ ?
(ধূমাে কর্তৃক শিকল খুলন ও দুঃশীলার প্রবেশ ও প্রস্থানােযােগ, ।)
যাও কোথা ? দাঁড়াও ঐ খানে, ইনি দাদা আমার
ভাড়, দাদার দ্বিতীয় পক্ষের পুণ্যি! লা টাকার লােভে
পপাদ্দারকে জাত দিচ্ছিলেন। এই শালা ভাই এর ঘটক,
পােদ্দার বেচারি এর কিছু জানে না, আমার কথাতে
এসেছে, ওহে ইয়ার! বেরিয়ে এসনা।
(মুরারীর প্রবেশ।)
মুরা। হা হে ইয়ার! এক হঁাপা থেকে বাঁচাতে গিয়ে আর
এক হাপাতে ফেলে দিচ্ছেলে, এটা কি উচিত? ঘঁাগাে
মােড়ল মশায় ?
শিবা। তা হােক। একটু পাপে তত ছিলে? তা সে কথায়
আর কাজ কি? এখন তােমার গায়ে তাে আঁচও
লাগলাে না, অথচ ইয়ারের একটু কাজ হ’ল। এখন
যাও, শেরে পড়, দাদাকে একবার টেনে বার করি।
মুরা। আচ্ছা ইয়ার! একবার দেখা করি, সমিস্যেটা বড়
বােঝা গেল না।
[ প্রস্থান।
শিবা। ডাক্ শালা তাের বােনাই বাবাকে ডাক। গলায়
কাপড় দে টেনে নিয়ে আয়। মেয়ে বার কত্তে এয়েছে
জানে না ? লুকিয়ে থাকলে কি যমে ছাড়বে?
ধুম। বােনাই বাবু বেরিয়ে এসো, না হলে গলায় কাপড় দে
টেনে আতে বলছে।
মা।
[ তৃতীয় অঙ্ক।
দাদা !
(অবনত মস্তকে ভাড়ির প্রবেশ।)
শিবা। দাদা বুঝলে? পরের কুলে দাগা দিতে এয়েছিলে,
এখন নিজের সালাতে পালে কি ? নষ্ট মেগের ভাতার
ভিখারী হলেও যা আর দেওয়ান হলেও তা। বিশেষ
বুড়াে বয়সের মাগ। আহা! দাড়িয়ে আছেন দেখে,
যেন ভাজা মাছটা উলটে খেতেও জানেন না। মােড়ল
ঘরে যার এই, সে যে মহা অনাচারী হবে
তার আর অসম্ভব কি ?
বুলান। দত্তজা, ছিঃ ! তােমায় আর ব’বাে কি ? ছিঃ ! যে জন্যে
এয়েছিলে, তাতে আর তােমায় ব’লবাে কি ? ছিঃ !
শিবা। তবে আর কি ? এখন যাও ! ঐ কুলের ধ্বজা কাঁদে
করে ঘরে ফেরে। আর এই কুকুরের কুকুর তস্য কুকুর
বহিনকা ভাই শালাকে পুষ্যিপুত্র নিয়ে ঘরকন্না করগে !
সত্যি মাগ ছেলে আর ভাইভগগররা ভেসে যাক্।
যাও-যাও না! আর লজ্জা কেন ? এগােও! আমায়
আবার পেছনে পেছনে ঢাক বাজাতে বাজাতে যেতে
হবে তো ?
[ দুঃশীলা, ভাঁড় ও ধূমকেতুর প্রস্থান ।
বুলান। শিবু ভাই! তুই আজ আমায় কিনে রাখনি, তাের
ঋণ এ জন্মে পরিশােধ ক’ত্তে পারব না।
শিবা। এ জন্মেই পাবে দাদা? দেখে শুনে এই আইবুড়ো
শিবার একটা বে দিয়ে দিলেই পারবে! আমি যারই
উপকার করি না কেন, তােমায় দাদা সত্যি বলতে কি
চতুর্থ দৃশ্য।
মা।
৮৭
বিয়ের লােভেই করি। এখন আসি-সহরময় না রাষ্ট্র
কল্লে তাে আমার ঘুম হবে না।
[ প্রস্থান।
( বাটীর ভিতর হইতে গাইতে গাইতে সাধনার প্রবেশ ।)
গীত।
হেথা সবাই কেন কাদায় মা আমায়।
অপরাধী নহিত কখনও কারু পায় ।
ব্যথা কভু দিইনি কারেও,
কভু কারাে যাইনি ধারেও,
আছি সরে—আপনি লুকায়ে আপনায়,
কেউ কাদালে কাদিত—তারও শুভ কামনায়।
বু। আর কাঁদিনি মা!—আর কঁদিনি! আমার প্রাণ
থাতে পাপের নিঃশ্বাস তাের গায়ে লাগতে দেব না।
আমার মাথা এখনও খাড়া আছে-আমি এখনও দাড়িয়ে
রয়েছি—আমার ডানার নীচে তুমি-তােমার ভয়
কি মা?
সা। ভয় নয় তাে বাবা! আমি ভয়েতে ত কঁদছিনে! ওরা
মানুষ - আমার মায়ের সব ছেলেপুলে—ওরা ভাল হ'লে
আমার সুখ হয়,-আমি যেমন ভালবাসি আমায়
তেমনি ভালবালে আহলাদ হয়। তা না, মার বাছা
আমি-আমাকে ভয় দেখাচ্চে। মা হয়ত ওদের ওপর
রাগ করবেন-ওদের হয়ত"কত হানি হবে। বাবা।
سانا মা। [ তৃতীয় অঙ্ক। সেই দুঃখেই আমার কান্না পাচ্ছে। আমি কঁচি আর মনে মনে বলচি—মা! পাতকী তরাও! মা! পাতকী তরাও! চোরার মত পাপের বুকে কেঁচা মেরে এ পৃথিবী থেকে পাপ উঠিয়ে দেও। সােপার পৃথিবী সােণার হক, তােমার মত সােণার প্রতিমা বুকে রাখবার যােগ্য হক, অমৃত-ধারায় ধুইয়ে দিয়ে—সােণার সত্যযুগ এনে দেও! বু মা! তুই মানবী ন’--তুই দেবী। তুই বালিকা—কিন্তু কুদ্ধ কেশরী তাের কাছে অবনত। আজকের এ ঘটনায় আমার উন্মত্ততা এসেছিল-সংসার রঙ্গক্ষেত্রে আর এক অঙ্ক অভিনয়ের বাসনা জন্মেছিল! অত্যাচার দমন ক'ৰ্ত্তে রক্তপাতের কল্পনা পর্যন্ত এসে সুমুখে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু তুই মা—আমার এ বৃদ্ধবয়সে মােক্ষপথ যাত্রীর সাথী। প্রতিপদে পদস্থলনে মােহান্ধ পিতার তুই যে মা যষ্ঠিস্বরূপা, তােতে ভর করে আবার প্রকৃতিস্থ হলেম, সংসার কোলা- হল সন্তানেরা করুক, তাদের বাহুবলে অত্যাচারী অনা- চারীর দমন হক। পাপীর পতনে পাতকের শাস্তি সা। কিন্তু বাবা! পাপীর পতনে পাপের শান্তি হলে, আম- দের এক মায়ের ছেলে, আপনার ভাই বহিন পাপী বেচা- রীরা যে ভেসে যায়। তারা কেন ভাল হক না। আমি ত মায়ের কাছে কোন কামনা করিনি—যদি তাদের ভাল হয়, তারা বলুক—আর নাই বলুক, আমি রােজ দিবা রাত্তির মার কাছে ধন্না দিতে পারি—কেঁদে গড়াগড়ি
চতুর্থ দৃশ্য। ]
৮৯
দিতে পারি, আমার এই ক্ষুদ্র প্রাণটুকু দিলে যদি হয়
আপন ইচ্ছায় তাও দিতে পারি।
( সিদ্ধিনাথের প্রবেশ।)
আজ বাবা! আপনার কিছু বিলম্ব হয়েছে—আমি রিপুর
পুরীতে বাস করি-সাধনা আমার সম্বল—রিপুর লক্ষ্য
আমার ঐটির উপর! উটিকে যেন না হারাই—এইটিই
ক’র বাবা! তােমার হাতে দিয়ে তােমার সাথে
পাঠিয়ে—মায়ের মেয়ে-মার চরণে সঁপে বােজ নিশ্চিন্ত
থাকি, যতদিন বাঁচি—ততদিন তাই যেন থাকতে পাই।
সি। আপনার সুপবিত্র সাধনা, এমন পুণ্যময়ী ধর্মেগঠিত কন্যা-
রত্নের উজ্জ্বল প্রভায় রিপুর পাপদেহ কতক্ষণ থাকতে
পারে ? মুহূর্তের মধ্যে ভস্মীভূত হয়ে যায়। পাপের
চিহ্ন মাত্র থাকে না। পাপীদমন আমার কাৰ্য্য-অন্ধকার
রাত্রে আমার ত্রিশূল -অগ্নিময় হয়ে পাপ দগ্ধ করে
সূৰ্য্যালােকে—প্রকাশ্য দিবায়—পাপীর চক্ষে মুকুরের ন্যায়
হ'য়ে পাপের প্রতিবিম্ব দেখায় ! চণ্ডীর রাজ্যপাপের
নয় ! চণ্ডীর সাধনা-পাপীর নয়! সাধনা স্বর্গের
সােপান! আপনার ভয় কি? আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
সা। আমি যাই বাবা! মার কাছে খুব কেঁদে আসি।
বু। চল মা! আমিও যাই! আজ জাতের দিন,-মা আজ
দিবারাত জাগ্রত ! রাজদর্শনও হবে, মার কাছে কেঁদে
আসাও হবে।
[ সকলের প্রস্থান।
মা। (তৃতীয় অঙ্ক। পঞ্চম দৃশ্য। ( আলােকমালায় সজ্জিত চণ্ডীমন্দিরের পুরােভাগ।) ( মন্দিরােপরি সােমাই ওঝা ও কালকেতু আমীন) । पर নিম্নে ভাড়দত্ত, ধুমকেতু, মুরারী ও অষ্টকুমারী উপস্থিত। ভ।। তা আপনি যে রকম আদেশ করবেন তাই হবে। কাল। আঃ! বাঁচাও দেওয়াজী!-বাঁচাও! সই ফই যা ক’ত্তে হয় তুমি ক’র। সস। তা তােমারগে—তা তােমারগে সবই হলে চলবে কেন ? মু। তা বৈ কি? পাকা পাকা সই সাবুদ—চাকরে চলে কি ? ভ। কেন চলবে না? কলিঙ্গের পােনেরাে আনা সই আম- রাই কত্তম, ওঁকে সব সময় ব্যস্ত কলে চলবে কেন? উনি রাজা মানুষ-পূজাআশা করবেন, না দিবারাত্তির এরির পেছনে লেগে থাকবেন? তা ও’ত হ'ল! এখন হুজুরকে আমার আর একটা আবেদন শুনতে হবে। এই যে আপনি এখানে বসে থাকেন, যার ইচ্ছে সে এসে সকল সময় আপনাকে বিরক্ত করে, সেটা দেখতে পারি । বিশেষ রাজারাজড়াদের সে রকম চাল নয়। কার কোন কথা থাকে-কাজ থাকে-কর্মচারিদের কাছে যকি, এইটী আপনি হুকুম করে দিন, তা হলে আর
পঞ্চম দৃশ্য।
মা।
কোন গােল থাকবে না, আপনাকেও আর বিরক্ত হতে
হবে না।
কা। বেস্ বলেছ তুমি। চাকর বাকরদের হুকুম দিয়ে
দাও, আমার কাছে কেউ না আসে।
ভ। ওরে শুনছিস্ তাে সব ? রাজার হুকুম তামিল না হলে
আমি এক এক ব্যাটাকে ধ’রবাে-আর শূলে দোব!
মু। কর্মচারীরাও কেউ আসতে পাবে না ?
ভা। তা অবিশ্যি কালে ভদ্রে আসতে পাবে। কিন্তু তাও ছােট
কাউকে আসতে হলে তার বড়কে জানান দিয়ে আসতে
হবে! কেমন হুজুর? ঠাকুর দেখতে কেউ আস?
নাটমন্দিরের ওধার থেকে দর্শন করে চলে যাও !
সাে। তা বলে তােমারগে হপ্তায় হপ্তায় এই জাতের দিন
অত ক'টকিনে ক'ল্যে কি ভাল দেখায় ?
কা। তুমি জ্যাঠামশায় থামােত! ও ব্যক্তি আমার হিত
কচ্চে, মা পূজোয় যাতে মগ্ন হয়ে থাকতে পারি-
তারির উপায় কচ্চে ! তুমি পুরােহিত, তােমার এতে
বাধা দেওয়া কি ভাল? আমার এ সব জঞ্জাল যত
পরিস্কার হয়, ততই আমি এগুতে পারি!
ভাঁ। আজ্ঞে তা বই কি হুজুর! বিশেষ এই যে এক মাসের
কথা বলছিলেন—এ মাসটাতে যাতে আপনাকে কেউ
বিরক্ত ক’ত্তে না পারে—আমি তারও উপায় ক’চ্চি।
কা। এক মাস তো আমার চাইই—জনপ্রাণী আসতে পাবে
। আমি একাসনে মায়ের পা দুখানি কোলে করে
বসে থাকবে!
মা। [ তৃতীয় অঙ্ক। ভ। অবিশ্যি থাকবে—আমি তার ঠিক ব্যবস্থা করে দেব। আরও একটি কথা হুজুরকে বলে যাই। এই সব কারণে অনেকে আমার শত্রুতা করবে-সুযােগ পেলেই আপ- নার কাছে কোন গতিকে আমায় অত্যাচারী, অনাচারী বলে কাটাবে-সে গুলােতে আপনি বড় একটা কাণ দেবেন না ! কাল। কাণ দোব? তাদের লাঠী ঠেঙ্গা নিয়ে তাড়া করবাে। ভ। যে-আজ্ঞে হুজুর ! তবে আসি? এস মুরারি! কাগজের তােড়াটা ঐ আমার ধূমকেতুর হাতে দাও! [ ভাড়, মুরারী ও ধূমকেতুর প্রস্থান। কাল। এ একমাস আমি এখান থেকে কিছুতেই নড়বো না—তা তােমার রাজ্য উড়েই যা—আর পুড়েই যা! ৫ (সিদ্ধিনাথের সঙ্গে ধুলানের প্রবেশ।) কালু। কেও ? সিদ্ধিনাথ! তুমি আম্তে আসতে আসনা ? ব্যাপার কি ? সঙ্গে কে ? সি। একটু আস্তে আস্তে এসেছি বটে, কিন্তু এসেছি থাকতে পারিনি তাে? সঙ্গে আপনার রাজ্যের মণ্ডল রাজদর্শনে এসেছেন। কা। ভাল, দেখাতে হয়েছে ? কিছু বলবার থাকে তাে আমার দেওয়ানের কাছে-গে বলুন! মহারাজ আমায় যে পদে রেখেছেন—এ পদে দেওয়ানের কাছে আমি জবাবদিহী নই, আমি আপনার প্রজার প্রতি-শত সহস্র সন্তানের প্রতিনিধি। আপনি পঞ্চম দৃশ্য।] মা। পিতা—তাদের জ্বালা যন্ত্রণা তাদের সুখ দুঃখ তাদের হর্ষ বিষাদ নিজের করে নিয়ে আপনাকে জানানােই আমার কাজ। আমার কথা আপনাকে শুতে হবে, আমার কান্না আপনাকে মুছাতে হবে-আমার জ্বালা আপনাকে জুড়তে হবে। কা। ওগগা বাবু! আমার সময় নেই। আমার মাকে ছেড়ে যতক্ষণ থাকি—ততক্ষণই আমার বৃথায় যায়! আমার মার কথা ভিন্ন যে কথা শুনি-সে কথা আমার কাণে পৌছায় না। আমার মা নিয়ে আমি থাকি, তােমরা বাবু ভাগাভাগি করে পাঁচ জনে রাজ্য করগে ! আমাকে আর জড়াতে এসাে না। সাে। তবু মােড়ল মশাই কি বলতে এয়েছে, মানিমানুষটো তােমারগে—কিব’লতে এয়েছে শােনই না! কা। জ্যাঠামশায়। তােমার পায়ে পড়ি—আমার কাজে আর বাধা দিও না। শিগ্যির শিগ্যির আমায় পরিত্রাণ কর!' আমার মাকে ডাকা ব'য়ে যাচ্ছে। বু। মহারাজ ! ডাকুন! আমরাও প্রাণ ভরে ডেকে যাই- উনিই আমাদের নিস্তার করবেন ! [ প্রতিমা প্রণাম ও প্রস্থান। সাে। গুলমশাই তােমারগে একটু দুঃখিত হয়ে গেলেন! যেন কিছু কথা ছিল তােমারগে ব’তে পেলেন না। কাল। তুমি জ্যাঠা থামতে—আমার মার কাজে আর বাধা দিও না। সাে। ওরে বাবা–বাধাই যদি দেব-তাহলে আর এত দিন
৯৪
মা ।
তৃতীয় অঙ্ক।
ধরে তােকে তন্ত্র মন্ত্র অষ্টাঙ্গযােগাদি শিক্ষা দিয়ে
তােমারগে বৈরাগ্য উপদেশ দেব কেন? ওটা কি জান
বাবা-সংসারি লােকে বােঝে না বলে--তােমারগে
তাদের কাছে তাদের মতন কইতে হয়—তা না হলে
তুমি যে পথে চলেছ-তােমারগে এই পথই ঠিক—এ
তুমিও জান—আমিও জানি, আর তােমারগে ওই মা
বেটিত জানেই।
(বিমলার মাতার প্রবেশ।)
বি। ওগগা ওগাে ! সইরাণী আপনাআপনি পাকী ক'রে
এয়েছেন!
কা। সেকি । এই রাত্তিরে এখানে পর্যন্ত তাড়া করে
আসা কেন? ঘঁাগাে জ্যাঠা ! একি ? মিছি মিছি সময়টা
যাবে দেখচি ।
( ফুল্লরার প্রবেশ।)
ফু। আমি এয়েছি।
কা। তাতে দেখতে পাচ্চি। না এলেও হত।
এলেও হ’লত? এই কি তােমার কথা হ'ল ? আমি
তােমার এই কথা শাের জন্যে কি এতদূর এলেম ?
এত দিন এত জালা স’য়ে তােমার কাছে এক দণ্ডের
তরে জুড়তে এলে, তুমি এই তাচ্ছল্যের কথা ক’য়ে কি
তার প্রতিফল দিলে ? ঘৃণার হাসি হেসে-বিদ্রুপের
চাউনি চেয়ে—আমায় এই সমাদর ক’লল? ছিঃ ছিঃ--
ছিঃ! অভাগিনী আমি, এমন কপাল নিয়েও ভারতে
এয়েছিলেম, একদিসের তরেও সােয়াস্তি পেলেম না ।
পঞ্চম দৃশ্য । ]
মা।
প্রথম জীবনে অল্পের জন্যে লালায়িত, একদিন পেয়েছিত’
তিনদিন পাইনি। তারপর এখন সহস্রের অন্ন সংস্থান
আমার হাতে, আজ আমি পতির সােহাগের জন্যে যে
কাঙ্গালিনী সেই কাঙ্গালিনী। দেখ, স্ত্রীলােকের সকলে
পর হতে পারে, মা বল, ভাই বােন্ বল, শ্বশুর শ্বাশুড়ী
বল, সকলেই একদিন না একদিন পর হতে পারে, কিন্তু
যে স্বামী জীবন মরণের সাথী, ইহকাল পরকালের
অবলম্বন, পাপ পুণ্যের সমভাগী, আজ সেই স্বামী তুমি
আমার পরের চেয়েও পর হলে? এ দুঃখ কি আমার
রাবার জায়গা আছে ? এ জ্বালা কি আমার মেটাবার
স্থান আছে, এ যন্ত্রণা কি আমার জুড়াবার উপায় আছে ?
কা। বলি, স্বামী ত’ তােমার মরেনি ? আজ না হয় কাল,
কাল্ না হয় পরশু পাবেত’ ? আছে ত’ ?
ফু। কৈ আছে ? এ থাকা যে না থাকার সমান। আমি কত
আশা করেছিলেম, মনে মনে কত কল্পনা করেছিলেম,
তা হ’ল কই, কত্তে দিলে কই? অর্থ পেলে, রাজ্য নিলে,
লক্ষ প্রাণীর আশা ভরসা স্থল হ'লে! মনে ছিল জীবনে
বড় যাতনা পেয়েছি, বড় কষ্ট পেয়েছি, যাতনা কারুর
আর রাবােনা, কষ্ট কারুর আর দেখব না, দুজনে
গিয়ে যেখানে যার দুঃখ দেখব তার দুঃখ ঘােচাব’
যাতনার দায়ে যার চক্ষে শতধারা বইবে তার সে
চোক্ষের জল মােছাব, তা তুমি আমায় কত্তে দিলে কই ?
সকলই উলটে দিলে ! সিংহাসন পেয়ে সকল ভুলে গেলে,
নিজেকে নিজে ভুলে! শেষ চিরসঙ্গিনী সুখের সুখিনী
৯৬
মা।
[ তৃতীয় অঙ্ক।
দুঃখের দুঃখিনী আমি, আমাকে শুদ্ধ ভুলে গেলে? পায়ের
তলে পােড়ে প্রাণের দায় আমি এসে কাদছি একবার
আমার দিকে চেয়েও দেখুচ’না !
কা। এ! কঁদুনী যে ক্রমে বাড়তেই লাগল।
হা পােড়া কপাল! এ কান্না টুকুও তােমার সইল না?
আর কাঁদবনা! এ জালার কথা আর তােমার কাছে
বলতে আসব না! বুকের ব্যাথা বুকে রেখে নির্জনে
গিয়ে কাদিগে ! তুমি সুখে থাক, সুখে থাক, সুখে থাক।
{ বিমলার মার সহিত ফুল্লরার প্রস্থান।
কা। আঃ বাঁছলুম। সুখেত’ থাব’ই বটে, মার নাম করি
আর সুখে থাকি। কেমন সিদ্ধিনাথ।
(কালকেতুর গীত।)
কালকেতু। (ওরে) মা-বৈ-যে আর আমরা কারু নই।
মা-বৈভবে-কেউ না কয় মা-ভৈঃ ।
সাধনা ও কুমারীগণ। মায়ের পায়ে দোষ করি যত,
মায়ের মায়া-দেখতে পাই তত,
( মায়ের) মুখভরা রাগ বুকভরা প্রেম ওই ।
কালকেতু। মা-যে- মিষ্ট মুখে, শিষ্টে ভাষে,
দুষ্টে তােষে ইষ্ট কথা কই। (কহি)
পটক্ষেপণ ।
চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
গুজরাট রাজ-অন্তঃপুর।
(বিমলার মাতা ও ফুল্লরার প্রবেশ।)
ফু। যদি না আসেন?
বি-মা। আবে না কি ? আমরা এতো করে ম’চ্চি দিন
গুণে গুণে-এক দিন নয়, দু দিন নয়, পুরােপুরি একটা
মাস কাটালুম্-তার পর মন্দির থেকে বেরুবার পর দিন
অত হাতে পায়ে ধরে এলুম—এতেও যদি না আসেন,
তা হলে তােমায় আর জলে ডুবতেও ধরে রাখব না,
গলায় দড়ি দিতেও বারণ করব না।
সই। এত সাধনাতেও যদি না আসেন, এবারও যদি
আশা ভঙ্গ হয়, তা হলে তাে মরেও সুখ পাৰ না। এ
প্রাণের পিপাসা না মিটলে পরলােকে গিয়েও তো
ত্ৰাণ পাব না? এ নরকের চেয়ে সে নরকের জ্বালা
যে ঢের বেশী, সেখানে যে আরও ছটফট ক’ত্তে হবে।
বি-মা। বালাই ! নরকে যাবে কেন সই ? তুমি অত ভয় পাচ্ছ
কেন? সে ছুড়ি কি এই এক মাসের ভেতর পরের
ধন একেবারে ভুলিয়ে নেবে? থাকুক্ না একমাস—এক
?
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
ফু
সঙ্গে—এক মন্দিরের ভেতর ! সেখানে তো আর এলা
ছিল না? আর একটা বাঘছাল পরা ছোঁড়াত ছিল।
আর বিশেষ এত তন্তর মােন্তর—বশ করার জন্যে
এতে ছিটে ফোঁটা—সবই কি আমাদের মিছে হবে ?
তাতে আবার আজ বতো উজোচ্চ, নিজে হাতে রেধে
স্বােয়ামীকে খাইয়ে তার পাতে পোদ পাবে, এটাও
তাে তাকে বিবেচনা ক’তে হবে ?
তা যেন কল্লেন, এলেনও,-তারপর চলে গিয়েই
যদি পর হ, তা হলে কি হবে ?
বি-মা। তা আর হতে হয় না। এমন ক'রে নেয়েধুয়ে, এই
কাচা সােণার রং কঁচা সােণায় মুড়ে, এই মেঘের মত
কালাে ঢেউ খেলানাে চুলের রাশ, এলিয়ে, এই হরি-
ণের মত টানা টানা ভাসা ভাসা চক্ষু দুটীতে চেয়ে,
বড় বড় গজমুক্তোর মত দুচার ফোঁটা জল ফেলে,
কত মুনিঋষির মাথা ঘুরে যায়, কত পর এসে পায়ে
ধরে আপনার হয় ;-আর তিনি যােয়মী, মাথার মণি,
আপনার চেয়েও আপনার, তিনি কি না মজে থাক্তে
পাবে ?
( সােমাই ওঝার প্রবেশ।)
স। তা মা! তােমার গে সব ঠিক হয়েছে, ইনি আচে
ফু। আচে? আঃ!বুক থেকে যেন একখানা পাষাণ
সরে গেল!
সাে। আসচে-
-কিন্তু
তােমারগে একা আসচে না, সঙ্গে
প্রথম দৃশ্য।
মা।
সেই সিদ্ধি ছোঁড়া আর তােমারগে সেই সাধনা
ছুড়িও আছে !
ফু। তবেই তাে সই! কি হবে ?
বি-মা। হবে আর কি? তারা শুদ্ধ, বশ হয়ে যাবে। এই যে-
?
(সাধনা সিদ্ধির সঙ্গে কালকেতুর প্রবেশ।)
কাল। এ কি রূপ! এ কি মুর্তি! এ যে আমার জগজ্জননী
মাতৃপ্রতিমা! আহা হা! এ প্রতিমার পায় দেবতার
মাথাও যে লুটিয়ে পড়ে! (সাষ্টাঙ্গে প্রণাম)।
বি-মা। ওমা! একি গাে ?
সাে। তাই তাে ! তােমারগে—তাই তাে !
ফু। (হস্ত ধরিয়া তুলিয়া) এ কি সব্বনাশ! প্রভু! একি
ক'ল্লে? আমি যে তােমার প্রসাদভিখারিণী পরি-
ণীতা পত্নী ! কার কুহকে ভুল্লে ? এ ভুল কল্লে ? একে-
বারে ভুলে গেলে ?
কা। শক্তি তুমি,-ভােলানাথের তােমায় ভুল হয় না, আমি
কে ছা! তুমি প্রাণেশ্বরী! এই প্রাণের সিংহাসনে
ব'সে আছ! তুমি মহাপ্রকৃতি! এই জড় দেহের শিরায়
শিরায়—শােণিতে শােণিতে-অস্থিমজ্জাতে তুমি বিরাজ
কচি ! তুমি সহস্র দল-বাসিনী! এই সহস্রারে বাস করে
অচেতনকে চেতন করাচ্চ, নিদ্রিতকে জাগাচ্চি, মনাে-
রাজ্যের মােহন্ধকারে আলােকের সহস্র রেখা পাত
ক’চ্চ। তােমায় ভােলা কি সহজ কথা ? তােমায়
ভুলিনি! আগে ভুল চক্ষে দেখেছিলেম্, এখন সে ভুল
!
১০০
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
শুধরেছে। আগে ঠিক চিন্তে পারিনি, এখন আর
লুকুবে কোথা? চিন্ময়ীরূপিণী! এখন আর লুকুবে
কোথা ? তােমায় চিন্তে পেরেছি।
বি-মা। তা হঁ্যা সয়া! সইকে আমার চিন্তে পেরে, অমন ক'রে
গড়ইবা কল্লে কেন? আর ঐ ছাই কথাটা বলেই বা
ডালে কেন?
কা। ও কথা যে মধুমাখা কথা! এ জগতে যত কথা শিখেছি,
সব কথার মূলেই যে ঐ কথা ! আমি যে জগৎময়
ঐ রূপই দেখি! রমণীর মাতৃভাব কি সুন্দর ! কি মধুর!
কি মনােহর ! আহা! প্রাণ উথলে উঠছে, প্রাণ
ভােরে একবার ডাকতে ইচ্ছে হচ্চে, জয় মা জগদীশ্বরি।
সা, সিদ্ধি। জয় মা জগদীশ্বরি।
কা। একবার করুণা কটাক্ষে চাও! কোলে নাও! মাতৃ-
নামের জয় জয় কার হােল্ক !
ফুল্ল। জ্যাঠামশায়! একি? আমার এ সৰ্ব্বনাশ কে ক'লে ?
সােণার স্বামী আমার এ কি হল ? আমার পায়ে কুশা-
স্কুর বিঁধলে যিনি বুক পেতে দিতে চাইতেন, এ
কঠোর কথা ব’তে আজ তাকে কে শিখালে? আমার
সে স্বামীকে কে এমন করে দিলে ? আমি তত জ্যাঠা
মশায় জ্ঞানে কখনও কারও অনিষ্ট করিনি, কারুকে ব্যথা
দিতে চাইনি-কারুর আপনার নিধি পর করিনি। তবে
আমার অদৃষ্টে এ মহাপাতকীর সাজা কেন? (রােদন)।
সস। তাই তাে মা ! তােমারগে আমি তাে এর কিছু সােঝে
উঠতে পাচ্ছি না।
প্রথম দৃশ্য।
মা।
বি-মা। আমরা মেয়েমানুষ-তােমরাই বল দশ হাত কাপড়ে
নেংটো! আমরা পাচ্চি, আর তুমি এটা সতে
পাল্লে না পুটুঠাকুর ? পেরেছে ! তাই বল যে কিছু
ব’তে কইতে পাচ্চ না! কোথাকার এক হতভাগী
সব্বনাশী এসে, আমার সইয়ের সর্বস্বধন কেড়ে নিচ্চে,
এমন রাজরাণীকে পথের ভিখারী কচ্চে, এটা তো
তােমরা কেউ দেখেও দেখুচ না—শুনেও শুষ্ক না!
এর পর যে এটা খুননাখুনি হবে তার কি ?
সাে। তা কেন? তােমারগে তা কেন হবে?
বি-মা। তা কেন হবে, তােরা পুরুষ মানুষ, তােরা কি
বুঝবে ? মেয়েমানুষ হ'তে-তে মেয়েমানুষের জ্বালা
জাতে! আমরা সকল সইতে পারি, কিন্তু ঐটীতে
যেন আমাদের গায়ে বিষ ছড়িয়ে দেয়, আমরা পাগল
হয়ে যাই, প্রাণের জালায় ছুটে বেড়াই, বাঘিনীর
মূৰ্ত্তি ধরে যে সব্বনাশী জালা দেয়, তার বুক চিরে
রক্ত খেয়ে ফেলি—তাতে না হলে শেষে বুকে ছুরি
মেরে স্বােয়ামীর পায়ের কাছে পড়ে প্রাণ দিই! জান
পুটুঠাকুর। সইকে কি আমি তা না করিয়ে ছাড়বাে
নাকি? দেখি না সয়া সইকে আমার আরও কত
তাচ্ছিল্য কত্তে পারে—ঘেন্না ক’ত্তে পারে—অপমান
কতে পারে।
কা। দুউয়ো ! এরা খেতে দিতে পাল্লে না! চ ভাই! আমরা
এ মা ছেড়ে সে মার কাছে দৌড়ে পালাই।
[ কালকেতু ও সঙ্গে সঙ্গে সাধনা সিদ্ধির প্রস্থান।
১০২
মা।
* চতুর্থ অঙ্ক।
ফুল। উঃ
বি-মা। হ’ল! বন্তো উজোনাে হ'ল! আহা সই! এমন
পােড়া কপালও করে এয়েছিলে তুমি ?
! মাগাে! কি হ’ল মা ! আর যে সইছে না! বুক
যে ভেঙ্গে যায় মা!. উঃ! সােণার স্বামী আমার
মাথার মণি আমার প্রাণের নিধি আমার—জীবনের
সৰ্ব্বস্থ আমার—উঃ ! মাগাে
[ মুচ্ছিত হইয়া পতন ও ফুল্লরাকে ধারণ।
বি-মা। একি হল! একি হল! ওগাে ! তােরা দেখনা
সই আমার এমন হয়ে পড়ল কেন?
সােমা। তাইতাে আহাহা ! তাইতাে! তােমারগে এ রকম
হল কেন?
বি-মা। ওগাে ! দাতি লেগে গেছে যে গো ! ওগাে ! দেখ না
নাকে যে নিশেস পড়ছে না! ওগাে দেখ না-কি ক’ত্তে
হবে কর না।
সােমা। তাইতাে মা ! তােমারগে কি করি মা! আমারতে
দেখে শুনে পেটের ভেতর তোমারগে হাত পা সেঁধিয়ে
গেছে !
বি-মা। ওগো! ধর না! হাতাহাতি করে সইকে ধরে শােবার
ঘরে নিয়ে যাই চল না ! না হয় দাসিদের ডেকে দাও না!
সােমা। তাই দিচ্চি -এইযে-
দাসিগণের প্রবেশ ও ফুল্লরাকে বহন করিয়া লইয়া প্রস্থান পশ্চাতে লােমাই
ও বিমলার মার প্রস্থান।
( অন্য দিক্ হইতে বুলানের প্রবেশ।)
বু। ওগো! কে-গা?' ওদিকে কে গা ? আমার রাণী মা
।
প্রথম দৃশ্য। মা। ঠাণকে একবার খবর দিতে পার? তাইত ! ওরা কেউ তাে কথা কাণেও তুল্লে না! আমার এমনি দুর- দৃষ্টই বটে! আর একটু এগিয়ে না হয় দেখি—ওঁকে বলে—এমন দুরূহ কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করায়ও পাপ আছে- (সােমাই ওঝার পুনঃ প্রবেশ1) বু। এই যে পণ্ডিতমশায়। রাণীমার সঙ্গে যে আমার এক- বার সাক্ষাতের প্রয়ােজন। সােমা। কেন? বু। কেন, তা তারির কাছে নিবেদন ক’ব। সােমা। কি শুনিই না! তােমারগে কথাটাই কি ? বু। শুনে তো কিছু ক’ত্তে পাবেন না! আমার শােনাতে কি? ব্যাপার বড় গুরুতর দাড়িয়েছে! দত্তজার উপ- দ্রবে প্রজালােকের আর তিষ্ঠান ভার। তাদের রােদনে রাজা বধির, আপনি বধির-এখন কেবল একবার রাণী- মাকে জানাতে বাকি, তিনি কোন প্রতিবিধান করেন ভাল,নতুবা তারা নিজেনিজেই এ দারুণ অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পাবার চেষ্টা ক’বৃবে! আজই কবে? (বিমলার মার দ্রুত প্রবেশ।) বি-মা। ওগো! এস’না গো! আমি যে মহা আথান্তরে পড়েছি। সােমা। চল চল। [ বিমলার মার সহিত সােমাইর প্রস্থানােদ্যোগ। বু। আমায়ও নিয়ে চলুন -রাণীমাকে জানা না দিয়ে আমি যে সে কাজে হাত দিতে পাচ্ছি না।
১০৪
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
বি-মা। তুমি এখন কোথা যাবে গাে? আমাদের এই সর্বনাশ,
এখন কি তােমার কথা কয়বার সময় ?
কথা না কইতে পেলে, আজই যে—এখনি যে—মহা
সর্বনাশ ঘটে যাবে।
বিমা। হ’গে 'বাবু তােমাদের সর্বনাশ,-রাণীমার সঙ্গে এখন
কিছুতেই দেখা ক’ত্তে পাবে না। পাবে না—পাৰে না-
পাবে না! সরে যাও! আর এক দিন এসে তখন দেখা
কর!
ওগাে ঠাকরুণ । তা হবে না এখনি দেখা করা
==
বু।
চাই!
বি-মা। ওগাে বাবু তা হবে না—এখন তিনি কিছুতেই দেখা
করবেন না, তুমি চলে যাও !
[ সােমাই ও বিমলার মার প্রস্থান।
;
বু। আমার এম্নি দুঃসময়ই বটে! সহজে যাতে মিটে যায়
তার জন্যে বহু চেষ্টা ক'ল্যে, কিছুতেই কিছু হ’ল না
শেষ চেষ্টা তাও নিস্ফল হ’ল ! যাদের হাতে অসংখ্য
প্রজার জীবন,-তারা কেউ ফিরেও চেয়ে দেখুলে না
সুতরাং অত্যাচারে যারা জৰ্জর, অনাচারে যাদের প্রাণ
কাতর, আর তাদের কি ব'লে নিরস্ত করব ? মা
জগদীশ্বরী জানে—শান্তির বহু চেষ্টা ক’লল্যম,—কিছুতে
হ'ল না! বিগ্রহের নরকদ্বার কাজে কাজেই উন্মােচিত
হক, বিদ্রোহের জ্বলন্ত শিখা কাজেকাজেই অত্যাচারী
অনাচারী নারকীকে জীবন্ত ভস্মীভূত ক’ত্তে অগ্রসর
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
১০৫
হ’!
বিক্রমপ্রকাশে বিরক্ত প্রজাপুঞ্জের কাজে
কাজেই মানসম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হক।
[ প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
গুজরাট—চণ্ডী-মন্দিরের পুরােভাগ।
(সিদ্ধিনাথ ও সাধনা উপস্থিত।)
( সাধনার গীত।)
এরা পাপের ভরা মাথায় কেন বয়।
কেন আপনি হেনে বাণ গাে-
আপন বুক পেতে দে সয় ।
কেন নিজের নিজে পর হয়, যায় আপনারে ভুলে,
গরল খায় নিজে তুলে,
কেন বিমল প্রাণে মাখায় মলা, যায় না গাে ধুলে ;
কেন আগুন জ্বেলে আপন হাতে আপনি ভস্ম হয়।
সি। দেখ সাধনা ! যারা পাপ করে, তাদের পাপ করাটা
রােগ, ও রােগ একবার ধল্লে আর ছাড়ে না, ও রােগী
মাত্রেই পশু হয়ে যায়। পশুর মধ্যেও আবার হিংস্রক
পশু ! ওদের ধ্বংস সাধনই প্রশস্ত ! আমি তাে এই বুঝি ।
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
সা। আমি ও রকম কখনও বুঝি না—বুঝতে পারি না—জান
ভাই সিদ্ধিনাথ-আমি বুঝতে জানি না! ওদের সব
কত জ্বালা, কত যাতনা, আমি ওসব সইতে পারি না।
কেঁদে মরি আর মনে করি, ওরা সব আমার পাছু
পাছু আসুক, আমার সঙ্গে মায়ের এই মুক্তিমণ্ডপে গড়া-
গড়ি দিক্, ওদের সব পাপ ভাল হয়ে যাবে ! ওরাও
আমাদের মতন মা বই জাবে না—মা বই চিবে না-
মা বই ব’বে না ! মার দোহাই দিয়ে গড় গড় করে
স্বর্গে চলে যাবে।
সি। পাপীরা প্রায় মায়ের সেই সু ছেলে মেয়ে কি না?
মার নামে তাই ছুটে এসে পাপের হাত থেকে নিস্তার
পাবে ! তারা কি আসে না? আসে—দলে দলে আসে
-তীর্থে এসে মনে করে, এক বােঝা পাপ নেবে গেল ।
আবার ফিরে গিয়ে একটু আধটু করে বােক বাঁধতে
সুরু করে ! পাপীর কি সে জ্ঞান আছে সাধনা? পাপীর
কি সে চৈতন্য মরণের আগে হয় ? তাই--বুঝি—তাদের
নির্মূল ক’ত্তে পালে যারা এখনও পবিত্র আছে,
যাদের গায়ে এখনও পাপের গন্ধ বেরােয়নি এমন
সব সােণার পুতলী-সােহাগের ছেলেমেয়েরা—সােণার
সত্যযুগ এনে ফেলবে । মায়ে পােয়, মায়ে ঝিয়ে দেখা-
দেখি চ’বে ! জগন্মাতার এ জগতের খেলাঘরে সরল
বালক বালিকার ভালবাসাবাসি খেলা চলবে! কথায়
বার্তায়, আমােদে প্রমােদে, হাসিতে খুসিতে, আচারে
ব্যাভারে, অপবিত্রতার কাল ছায়া পড়তে পাবে না !
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
প্রাণ, মন, দেহ, আত্মা সব পরিষ্কার ঝকঝকে আয়নার
মত হবে! যে যার প্রতিবিম্ব দেখতে পাবে, দেখাতে
পাবে! পাপের নাম উঠে যাবে। এর পর যে সব সন্তান
জন্মাবে তাদের পুণ্য বলে কিছু বেছে নিতে হবে
। তারা যা ক’রূবে তাই পুণ্য, পুণ্য বই আর
কিছুরই সত্ত্বা থাকবে না।
সা। পাপীকে মেরে নিৰ্ম্মল করে তবে তােত অমন হবে?
মা ছেলে মেয়েদের মেরে অমন ক'ভে নাই যে
ভাই সিদ্ধিনাথ । তাদের মাল্পে যে তােমার পাপ
হবে ?
সি। পাপ হয় আমার হবে। খেদো সােণা গালিয়ে খাঁটী
করে নিতে অনেক আগুণের তাপ সইতে হয়। আমি
তা সইব তবু ছাড়ব না!
সা। তােমার কেমন ঐ জোরের কথা! তাই তােমার সঙ্গে
এক একবার বনে না! তুমি পাপীদের- হয় বল মারবে
না, না হয় বল আমাদের ভালবাসাবাসি ভাসিয়ে দিয়ে
পাগল হয়ে আমি কেঁদে বেড়াই! তুমি যত পার
পাপী মেরাে, আমার বুকের এক একখানি কোরে হাড়
খসিয়ে নিও!
সি। • সাধনা! তাকি হয় ? আমাদের এ ভালবাসাবাসি কি
ভাসানো যায়? তুমি আমি মায়ে এক্, এ একের একটা
খােলে আর একটি কি থাকতে পারে? তুমি চাও
পাপের নাশ, আমি চাই পাপীর নাশ, মা কি চান্ চল
শুনিগে।
১০
བ
[ চতুর্থ অঙ্ক।
( উভয়ের মন্দির মধ্যে প্রবেশ)
(একপার্শ্ব হইতে মুরারী পােদ্দারের গলায় দড়ি দিয়া টানিতে টানিতে
মুরারী-পত্নীর প্রবেশ।)
ম-প। বল্ পােড়ারমুখাে ব! এই ঠাকুরের সানে তাবা তুলসী
হাতে নিয়ে সত্যি কথা বলসে ভাঙ্গা মন্দিরে কেন
গেছলিরে ড্যা বলতাে ?
মূ। আহাহা ! লাগে যে! হ্যাচকাস কেন? বলচি ! তুই
যা মনে করেছি তা নয়, এই দেবতার সুমুখে
ধম্মত বলচি! যত নষ্টের মূল আমার শিবু ইয়ার।
সেই জানিস্ তত? সেই জন্যে ;-ব’ল্যে তােমায় মন্দিরে
লুকিয়ে রাখবাে, ঢুকিয়ে দিলে ! ঢুকে দেখি ঐ তাড়কা
রাক্ষসীর মূর্তি, হাসতে হাসতে কাছে এল ! এমন সময়
দোর ঠেলে তার ভাতার শালা হাজির। ভাতার আর
কে? ঐ দত্ত বেটা কি না?
মূপ। তা হবে না ! এইখানে হাটুগেড়ে বসে গড় ক’ত্তে ক’ত্তে
বল, আমি কিছু জানিনি! আমি কিছু জানিনি! আমি
কিছু জানিনি! আমিও নাহয় তাের সঙ্গে গড়, ক’চ্চি।
মু। আচ্ছা, তাই ক’চ্চি। দড়ি খুলেনে! ভাঁড়ুদত্ত বেটা
মাগৃভাতারে পড়ে মিছিমিছি আমার এই খােয়ারা
ক’ল্যে! ( উভয়ের গড় করিতে করিতে) আমি কিছু
জানিনি! আমি কিছু জানিনি! আমি কিছু জানিনি !
(ভাড়, দত্ত, ধূমকেতু, ও দুঃশীলার একান্তে প্রবেশ)
ভা। এই তাের পায়ে ধরি ছােট! তুই একবার এই তাবা
তুলসী হাতে করে এইখানে দাড়িয়ে বলসে দিন সেই
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
১০৯
ভাঙ্গা শিবের মন্দিরে ঠাকুর দেখতে গিছলি—তাের ধর্ম
নষ্ট হয়নি। তা হলেই আমার মন ঠাণ্ডা হবে ! বিশ্বাস
হবে যে তুই আমার যে সতীলক্ষ্মী, সেই সতীলক্ষ্মীই
আছি! গােদা ভাই শালা আমার মিথ্যে কথা রটিয়েছে।
(বীরবেশী বােস্তমকে সঙ্গে লইয়া শিবার প্রবেশ।)
শিবা। এই যে দাদা! দাদা! তােমায় রােস্তম্ মিঞা খুঁজচে !
একেবারে গরু-খোজা ক'রেছে! তুমি যে এ সময়
এখানে এসে ভাঙ্গা মাগকে জোড়া লাগাচ্চ মিঞা তাে তা
জানে না! আমি ঠিক খবর রেখেছিলুম কি না? সঙ্গে
করে নিয়ে
এলুম!
ভ। তা এখানে কেন? এখানে কেন ? বাড়ীতে গিয়ে
সাে। কি কৈসরে বজ্জাত। নেমকহারাম! সে বাড়ীতে
তাের কি আর ঢােকবার যাে রাখেছি ? সেথা পাশ শাে
পাঠান জোয়ান খাড়া-বাড়ীর বনিয়াদ উটুয়ে বড় গায়ের
জলে ফ্যালায়ে দেবে। হাজার মােগলাই জোয়ান পাচ
হাতিয়ার কাঁধে রাজার কৌটার চার ধার ঘেরােয়া
করিছি। আর দুহাজার শড়কিওয়ালা হিন্দু জোয়ান
সাথে নিয়ে এই চণ্ডিমার দেউল ঘেরােয়া করলাম ।
তাের সয়তানি আর চলবে না। তাের গদ্দান্ ধরে রাজার
কাছে নিয়ে হাজির করুবাে। তােরে এই দ্যা ছাড়া
করবার হুকুমনামা বার কৈরা তবে ছাড়বাে ; রাজা যদি
সহজে হুকুম না দেয়, মােরা জবরদস্তি হুকুম নবব।
(ভাড়র গলা ধরিয়া মন্দিরের সুমুখে অগ্রসর হওন)
১০
১১০
না।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
ভ। ওরে মেরে ফেলেরে ! গুণ্ডে। বেটা মেরে ফেলেরে
গোঁয়ার বেটা মেরে ফেল্লেরে।
(পরিত্রাহি চীৎকার)
(মন্দির মধ্য হইতে কালকেতু, সিদ্ধিনাথ, গাধনার প্রবেশ)
ন
কাল। কি হয়েছে! কি হয়েছে ?
রাে। হুজুর! বন্দা আপনার রাইয়ত, পাচ সাত হাজার ইয়ত
বন্দার সাথে আসে হুজুরে হাজির আছে! হুজুর ! এই
ভাড়, দত্ত মােরা সবাই জানি-কলিঙ্গিরাজার দেওয়ানে
ভাড়ামি করে খাতো। এহানে হুজুরির কাছে আইসে
ফাকি দিয়ে দ্যাওয়ান হয়ে হুজুরির কাঙ্গাল রাইয়তের
ভিটে মাটি চাটি কর্তিছে ! আপনার দৌলতত দশ হাতে
লুটতি লেগেছে, কেন পােদ্দার মশাই কওনা? এহােন
যে মুয়ে গুয়াে দিয়ে রয়েছে ?
মু। হাঁ-তা-লুটছে বটে! মিছে সব বায়নাক্কা তুলে শাকের
করাতের মত দত্তজা আমার যেতে আসতে কাটছে।
রাে। তা ছাড়া গেরামকে গেরাম জ্বালিয়ে দেচ্ছে, যারে ইচ্ছে
নেটেলা পেটিয়ে ধরি আনতিছে, হক না, হক বেইজ্যাত
কৰ্ত্তিছে । সব কেছেরিতে পাচপাে বহরের সাগর
জুতা টাঙ্গানাে আছে, তারির বাড়ী মার তাে মার
বেদম মার-দলে দলে একেবারে মাইরে মাইরে
মাইরে ফেলাচ্চে। বড় ছােট সবাকার মান সন্ত্রম
একেবারে জাহান্নমে পেটিয়ে দেচ্ছে। প্যাটে খাতিতে
পাচ্ছেই না, তার ওপাের এই হারাম খাের বেটা,
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
১১১
আর এর সাথির চাইর পাশশশ বেটা নােটো, গেরামে
গেরামে দলে দলে গেয়ােস্তগার জাত কুল খাইয়ে
বেড়াচ্ছে! গাঁকে গাঁ কান্নার ধূয়াে ধরেচে! হাট বাজারে
হাটুরে মহাজন ব্যাপারি খরিদদার সবাই হাহুতাশ কত্তি
লেগেছে! দানাপানি আর ধম্ম—এ আর কেউ রাতি
পাচ্চে না! হুজুর মালিক—এর বিচারের ভার খােদাতালা,
আর ঐ চণ্ডি মা আপনার হাতে দেছে, যা কত্তি হয়
করুন। এক উওরে রাহেন তাে মােরা দলে দলে দ্যাশ
ছেড়ে যাই। নয়তাে কন ওরে চ্যাবাইয়া খাইয়ে ফেলাই
পিরথিমিডে জুড়ােক।
কা। কি-বল সিদ্ধিনাথ ?
সি। মার রাজ্যে অতবড় অত্যাচারীর জীয়ন্ত বলিদানই শ্রেয়।
সা। আহাহা! নরবলি বল কেন ভাই সিদ্ধিনাথ ! না-ভাই
রাজা! তুমি আমার কথা শােননা, ওকে বরঞ্চ নির্বাসন
কর! অনুতাপ করে কেঁদে এলে আবার তখন নিও।
কা। ভাল তাই করগে ! মার রাজ্যে আমার পােকাটী
মাকড়টী পৰ্যন্ত খারাপ না থাকে (কাল কেতু, সিদ্ধিনাথ,
ও সাধনার মন্দির মধ্যে গমন)
ভ। ধর্মাবতার ! একতরফা শুনে
বরা চুপদে হারামজাদা! এহনি যে ভাবে আচিস-এই এক
কাপড় পরনে-সহরের মধ্য দিয়ে না-আশ পাশদে
ভাগাড় দে-কাটা খােচার বনদে-চুপি চুপি মুখ খান
ঢেহে বড় নদীর পারে চলে যা। এই ছাড়ান দেলাম,
ভাল মানসির মত দে পিটান।
১১২ মা। [ চতুর্থ অঙ্ক। ভা। একবার সবার সঙ্গে দেখা না করে- রাে। সবারে আর দেখপা কি ? সঞ্চুগােলার এই হাল! তােমর দলের কাররি ছাড়াননি, দেখা কৰ্ত্তি গেলি-কেন আর বল্লামের খােচা খাইয়ে মরবা? তােমারে চড্ডা চাপড়ার উপর দিয়ি গেল, সাধনা মার হুকুম না হলি সকল সুমুদির মত তােমারেও খােচাইয়া মারতাম। যাও পেলিয়ে বাচ। ভা। তবে কাযেই যেতে হ’ল ! ছােট! আয় ভাই! তাের হাত ধরে এয়েছিলেম, তাের হাতে ধরেই যাই- দুঃশী। আমি কোথায় তাের সঙ্গে গােভাগাড়ে মােত্তে খাবাে? আয় না ভাই? এ অসময় অমন করি কেন? (হস্তধারণ) ধুমম। আহা ও যাবেনা ব’চে তবু কেন টানছো? আয় দিদি। তুই আমার সঙ্গে আয়, আমার এয়ারের বাড়ি থাকবি, মা থাকবে, এক এক খান গয়না দিবি, বেচে আ, খাবাে দাবা, মজা লুটবাে ! (অন্য হস্তধারণ ) ভ। আয় আমার সঙ্গে আয়! (টানন) দুঃশী। উহুহ! হাত ভেঙ্গে গেল। 'ধুমম। আয় আমার সঙ্গে আয় (টানন) দুঃশী। চনা-টেনে নিয়ে চনা ? ভা। রােস্তমিয়া। তােমার পায়ে পড়ি, একে আমার সঙ্গে যাইয়ে দাওনা ! ছাড়, শালা খোঁড়া। ধুমম। ছাড়, শালা-বােনাই । [ বুমাের দুঃশীলাকে টানিয়া লইয়া প্রস্থান। ভা। ঐ যাঃ! নিয়ে গেলযৈ—টেনে নিয়ে গেলযে—
দ্বিতীয় দৃশ্য।]
মা।
মু।
শি। টাবে কেন? আপনি গেল দেখলে না? এখন চল—
সুখের সময় তাে কাছে রাখনি, দুঃখের সময় চল তােমার
সঙ্গ নিই।
রাে। তাই নিয়ে যাও সাথে এরে গােদা মক্কেল মিয়া! আর
বিলম্ কর্তি পাবা না ।
ভা। রােস্তম মিয়া আর একটু সবুর
রাে। এ-খেদায়ে না দিলি, দেখচি যাবানা (গলাধাক্কা দিতে
দিতে) চন্চল্ বেটা পাজী! ফের এদিকে তাকাস ?
চল্ চল্ বেটা গােলাম্ ।
[ বােস্তমের ভড়কে ঠেলিয়া লইয়া প্রস্থান ও
পশ্চাতে শিবার প্রস্থান।
হল ভাল, সঁড়ের শত্তর বাঘে মাল্যে! যমদূতের মত
এসে ব্যাটার ধরেছিল। রাজা না তাড়ালে কি ওরা
ছাড় তাে ? একটা মহারক্তারক্তি ব্যাপার ঘােটে যেতো।
ওদের পেছনে মােড়লের সাত সাতটা ছেলে রয়েছে।
এখন রেশ হয়েছে, চ শিগ্যির শিগ্যির চ। সই মশাইয়ের
কাছ থেকে দেওয়ানীটে নিয়ে নিইগে চ ।
মু-প। তা চ! দাওয়ানের মা হয়ে আমি কিন্তু আর মাটিতে
• পা দেবনা- তা এখন থেকে বলে রাখচি।
সে
কি ? কঁাধে চড়বি নাকি ?
ম-প। তাইতাে চড় ব ! চড়ে -দুই কাণ পাকিয়ে ধরে—উগাব
টগাব ঘোঁড়া হাঁকিয়ে বেড়াবাে-বড়মাসের মেগেরা
বুড় ভাতার নিয়ে না করে কি ?
মু। তাই করিস্ বাবু! এখন চ! •
[ উভয়ের প্রস্থান।
১১৭
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
তৃতীয় দৃশ্য।
( বুলানের বাটীর সম্মুখস্থ বটবৃক্ষতল।)
(বুলান ও সােমাই ওঝার প্রবেশ
তার প ? তার পর?
সো। তার পর তােমাৱগে ভড়কে তাড়াবার তিন দিন পরে,
এই তােমারগে কান্ আর কি-খবর এলাে-কলিঙ্গ
রাজার ফৌজ, এসে সহরের চাদিক্ ঘিরেছে, অবসর
খুজছে ;-কাজেই আজ, মন্দিরে ছুটে গেলেম।
সেখানে তােমারগে কেবা কার কথা শােনে! কালকেতুকে
যত বলি কলিঙ্গের কোটাল এসে সহর ঘিরেছে, সে
ততই তােমার গে আমার মুখ পানে ফ্যাল ফ্যাল করে
চেয়ে থাকে! কথাটা যেন তােমারগে বুঝতেই পারে না।
ভাগ্যে ছিল সেই সিদ্ধিব’লে সন্ন্যাসী ছোঁড়াটা-কাণে
কাণে কি বল্যে! অমনি তােমারগে ছেলের যেন ঘুম
ভাঙ্গলো! দুই চক্ষু জবাফুল ক'রে “জয় মা জগদীশ্বরী”
বলে হুঙ্কার ক’ত্তে ক’ত্তে দাঁড়িয়ে উঠলাে ! ঐ শরীর যেন
তােমারগে ক্রদ্ধ কেশরীর মত ফুলে উঠলো। ধনুর্বাণ কৈ
ধনুৰ্ব্বাণ কৈ বলে হুঁক পাড়তে লাগলাে। সিদ্ধিনাথ সঙ্গে
করে নিয়েগে কেল্লার ভেতর অস্ত্রাগারে প্রবেশ ক’লল্য,
আমি তোমারগে সৈন্য সামন্ত গুলােকে সাজগােজ করে
বেরুবার জন্যে হুকুম দিতে গেলেম্ ! ফিরে এসে দেখি
তৃতীয় দৃশ্য।
মা।
১১৫
রাজাও নাই, সে সিদ্ধিনাথও নাই! ছুট্টে তােমারগে
তােমার কাছে এলে।
বু। ঠাকুর মশাই! আমিও কি নিশ্চিন্ত ছিলেম্ ? কাল সংবাদ
পেয়েই আমার সাত ছেলেকে খবর দে আনিয়ে রােস্তমকে
ডাকিয়ে নিজ হাতে পাঁচ হাতিয়ার বেঁধে দিলে! দু হাজার
তীরন্দাজ আর দু হাজার সড়কীওয়ালা সঙ্গে দিয়ে কেল্লার
দিকে পাঠিয়ে দিলে, তারা রাজাকে নিয়ে রণােন্মত্ত
অসুরদের মত জয় জয় শব্দে হুহুঙ্কার কৰ্ত্তে ক'ৰ্তে রণে
অগ্রসর হয়েছে !
বু।
(শিবার প্রবেশ।)
শি। এই যে মােড়ল দাদা ! ছি ছি ছি ! এম জানলে আমি
কি এখান থেকে এক পাও নােড়,তুম্ ? এখনি গদ্দানাটা
গেছলো আর কি।
কেন ভাই শিবু! কি হয়েছে ? কোথা গেছলে ?
শি। সে কথা দাদা কেন আর জিজ্ঞাসা কর? আমার মরণ তাই
অমন কুচক্রী ভেয়ের সঙ্গ নিয়ে ছিলুম্। এখান থেকে দূর
হয়ে গেল, দেখলুম্ কেউ সঙ্গে যায় না, কি করি—এক
মায়ের প্লেটে জন্মতত? কাজেই থাকতে পাম্ না। সঙ্গে
সঙ্গে গেলুম্ সেই কলিঙ্গ রাজার রাজ্যে। মনে কলুম্
দাদা আমার চিন্টু হয়েছে, সেখানে কোন চাকরি বারি
নিয়ে থাকবে ! ও হরি! তা কোথায় ? রাজার সুমুখে গিয়ে
ধে মূৰ্ত্তি সেই মূর্তি! রাজাকে মিছি মিছি কতক গুণে
লাগিয়ে ভাঙ্গিয়ে একেবারে আগুণ করে তুলে ! রাজা
সহর কোটালকে ডেকে এই রাজ্য জয় ক’ত্তে হুকুম দিলে।
১১৬
মা ।
{ চতুর্থ অঙ্ক।
দাদাকেও সেই সঙ্গে পাঠালে ! আমি বেটা মাঝে থেকে
মারা যাই আর কি ? দাদার ওপর ভারি ঘেন্না হল,
নেম হারাম বলে ঝগড়া করে চলে আসতে চাইলুম্ ।
তা কি ছাড়ে? দু বেটা কালান্ত যমের মত ফৌজের
হাতে আমায় সঁপে দিলে! সে ব্যাটার কি কিছুতে
ছাড়ে? শে আজ খানিক আগে, যখন খুব মারম
লড়াই চলতে লাগলাে সেই সময় দু-বেটার চোখে
না দু মুটো ধূলো দিয়ে দে-দৌড়! দৌড়তে দৌড়।
একেবারে ভোঁ দৌড়। দুই গােদা পা নিয়ে থপ থপ্ করে
আসতে আতে, পড়বি তাে পড় একেবারে এখানকার
পাঠান ফৌজুদের মুখে, তারা তখন তরােয়াল ভাজতে
ভাজতে এগুচ্চে, কেটে ফেলেছিল আর কি? ভাগ্যিস
সেখানে ছিল রােস্তম মিয়া, তাই ছাড়ান পেয়ে উঠিতে।
পড়ি-পড়িতে উঠি, গড় পেরিয়ে এই ধার বাগে সটান
দিলুম্ ! কি ব’বাে মােড়লদা ! এখনাে এই দেখনা
মাথার চুলের আগা থেকে পায়ের তেলাের শেষ পর্যন্ত
সৰ্ব্বশরীর থর থর করে কাপছে !
( সাধনা ও সিদ্ধিনাথের প্রবেশ ।)
স। ভাই সিদ্ধিনাথ! তুমি বড় নিষ্ঠুর! দেখ বাবা! সিদ্ধি-
নাথ আজ আমার বড় কাদিয়েছে।
কেন মা? সিদ্ধিনাথ তো তােমায় কাদায় না! তােমার
চক্ষের জল মুছাতে সিদ্ধিনাথ আমার সর্বদাই তাে
প্রস্তুত।
তৃতীয় দৃশ্য ।]
মা।
১১৭
সি। দেখুন, ব্ৰহ্মময়ী মায়ের রাজ্যে আজ মহাসমারােহ ! বিরাট
মহা যজ্ঞের ঘটা! গড়ের বাইরে—চারিদিকের যজ্ঞকুণ্ডে
মহান্ সমরাগ্নি প্রজ্বলিত ! ধৰ্ম্ম বলে বলিয়ান মহা মহা
বীরগণ “হােতা”—কুৎসিৎ কদাচারী পাপভারে ক্লিষ্ট
মহাপাতকীগণ মায়ের এ মহা যজ্ঞের “আহতি” এই
প্রকাণ্ড ব্যাপার চ’চে“আমি এতে না হেসে-আনন্দে
নেচে-কেমন করে থাকি বলু?
সাে। তা হ্যা বাবা সন্ন্যাসী ঠাকুর ! তােমরাতে তােমারগে
গড়ের উপর থেকে লড়াই দেখছিলে, কি রকমটা হচ্ছে
তােমারগে শুনিই না
ও বাবা! লড়াই এমন নিষ্ঠুরের কাজ—নির্দয়ের কাজ
মহাপাতকীর কাজ জালে কি আমি দেখতে যেতুম ?
আহা মরি—বিনি অপরাধে পরের তরে ভাই ভাইকে
মার্চে-বাপ্ ছেলেকে মাচ্চে-ছেলে বাপকে মাচ্চে-
কেউ কারুকে চিচেনা! রক্তে মাখামাখি হয়ে—আহা
হায়রে—কত দুখিনী বিধবায় অশ্রুময়ী করে—জন্মের মত
ফেলে-এ জন্মের মত কালের কোলে শুয়ে পােড়ছে-
আমি কি তা দেখে থাকতে পারি ? আমার প্রাণ কি
এমনি পাষাণ, যে ঐ মহা শ্মশানে বসে হাসতে পারি
সামান্য একটী পিঁপড়েকে মাড়িয়ে ফেলে আমি কত কান্না
কঁদি, তা তত তুমি জান সিদ্ধিনাথ !
সি। সাধনা! তুমি আমি মহিষমর্দিনী মায়ের ছেলে মেয়ে,
তা কি তুমি ভুলে যাচ্চ ? কান্নায় যদি পাপের শান্তি হত
তা হলে মা আমাদের দশ প্রহরণ ধারিণী-সিংহবাহিনী
১১
শা।
(চতুর্থ অঙ্ক।
রূপে অবতীর্ণ কেন? পাপীর বিনাশ সাধন ব্যতীত
এ জগতে কোন অবতারই পাপের বিনাশ সাধনে সমর্থ
হয় নি। দেবীযুগে দৈত্যের সমরই বল, সত্যের সুরাসুর
রণই বল, ত্রেতায় লঙ্কাভিযাই বল,-দ্বাপরে কুরুক্ষেত্র
প্রভাসই, বল—সকলই পাপীর শােণিতপাত ব্যাপারে
পর্যবসিত হয়েছে। পাপীর শােণিতপাতে বসুন্ধরার
ভার লাঘব হয়, অনুৰ্ব্বর ভূমি উর্বর হয় ;এ রণক্ষেত্রে তাই
হচ্চে। মায়ের এ রাজ্যে আর পাপের চিহ্ন মাত্র থাক্বে
। সাধনা-সিদ্ধিলােমাতে আমাতে মিলে যাবাে।
মিশে যাবাে। মায়ের মহাপ্রাণে মহাপ্রাণীদের আসন
করে রাখতে আর কোন বাধা বিপত্তি থাকবে না।
;
[ নেপথ্যে রণবাদ্য।
( রক্তাক্ত কলেবরে কালকেতু, পশ্চাতে সৈন্যসহ রােস্তমের প্রবেশ।)
।
কি বলুন!
সাে। মহারাজের জয় হ’!
বু। মহারাজের জয় হ’! শত্রুকুল নিৰ্ম্মল তো ?
কা। নিৰ্ম্মল বটে! কিন্তু নিজের প্রাণরক্ষার্থে তােমার
সর্বনাশ করেছি।
বু।
রাে। উনি আর কইবেন্ কি? কত্তা গাে! তােমার ছােট
ছাওয়াল বাবুডি, মরদের মত কাম দেখায়ে, রাজার লেগে
জান দিয়ে, বর্যার খােচাটা নিজের বুকি ধ’রে লিয়ে, পাচ
হুরির বুকে মাথা রাহে স্বগ্যে বাতি লেগেছে ! আর
কমবক্ত আমাদের কেমন করে রাজার জান সামলাতে,
তৃতীয় দৃশ্য। মা । ১১৯ নিজের জান দিয়ে, জীদের লড়ায়ে, হাতে হাতে এ মাটীর বানানাে কায়া ছেড়ে পেলিয়ে যেতে হয়, তাই শিখিয়ে দিচ্ছে। বু। উঃ ! মাগাে ! ( দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ)। কা। স্বার্থপর আমি আমি। তােমার বড় সর্বনাশ করেছি। তােমার বুকের পাঁজর খসিয়ে নিছি! আমায় ক্ষমা কর । বু। ও কথা ব’বেন না ! আপনি প্রভু আমি ভৃত্য মাত্র । আপনি পিতা, আমরা আপনার পুত্র মাত্র! প্রভুর কাৰ্য—পিতার কাৰ্য্য আপনি করেছেন; পুত্র আমার ভূতত্যর কর্তব্য পালন করে বীরধামে গমন করেছে। আপনার রক্ষাৰ্থ একটী কি ? একে একে যদি ঐ সাতটী সন্তানের সাতটী শির আবশ্যক হতো, তাও ওরা অব- হেলে দিত। রাজভক্তি যাদের শরীরের শিরায় শিরায় শােণিতে শােণিতে প্রবাহিত, রাজভক্তি ভিন্ন যারা অন্য পুণ্য কাৰ্য জানে না, রাজভক্তি যাদের ধর্মসংহিতার সমাজসংহিতার পত্রে পত্রে, ছত্রে পত্রে পত্রে, ছত্রে ছত্রে বিরাজিত, রাজকার্যে তাদের প্রাণ দান মহা সন্তোষের হেতু, বিষাদের তাে নয়! মাতৃভূমির মুখােজ্জল ক'রে, দেবতা- তুল্য রাজার জীবন রক্ষা করে, পুত্ৰতত আমার অমর হ'য়ে, অমরের সঙ্গে, অমরাবতীতে বিরাজ কচ্চে। চক্ষের জলে তাকে বিদায় দিলেম্ ! কিন্তু প্রভু ! প্রাণে তাে আনন্দ ধরে না ! অমন গুণবান্ পুত্রের পিতৃ পদবীতে স্থান পেয়ে আজ আমার জীবন সার্থক হ’ল !
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
কা। ধন্য তুমি! ধন্য তােমর রাজভক্তি! ধন্য তােমার
স্বদেশ-হিতৈষীতা !
ও ভাই রাজা। আজ তােমাদের তাে মহা আনন্দের
দিন! মাকে ছেড়ে আর কতক্ষণ থাকবে ? চলনা
সবাই গিয়ে—প্রাণে প্রাণে এক হ'য়ে—আমােদ আহলাদ
করিগে।
কা। সাধনা ! মায়ের কাছে ছিলে, বেস ছিলে সংসার সমুদ্রে
ডােবা ওঠা ভুলে গেছলে, মার বুঝি তা সইলাে না,
ঠেলে ফের সংসার সমুদ্রে ফেলে দিলেন। এখন দিন
কতক ফের ডুবি উঠি, হাত ধরে তুলে নিয়ে যান
আবার যাবাে।
সাে। বটে? আবার সংসার কোৰ্বে ? তবে তােমারগে চল
সুভালাভালি ফিরে এলেতে চল! বৌরাণী মা মালা
চন্দন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, বরণ করে ঘরে তুলবে।
কা। চলু-এ ভগ্নতরী ভেসে যাক্।
( সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
রাজ-অন্তঃপুরস্থ ধ্যান-ঘরের পুরােভাগ।
(ফুল্লরা উপস্থিত।
ফুল। (স্বগতঃ ) না জানি কি সব্বনাশই ক’ত্তে বসেছি।
বাকে পাবার জন্যে এতাে ক’চ্চি, যদি তাঁর কোন
চতুর্থ দৃশ্য। মা। ১২১ বিপন্ ঘটে ? আমা হতে যদি তিনি কোন বিপদে পড়েন? তা হলে আর দাড়াবাে কোথা? সইয়ের কথা শুনে এত দূর এগিয়েছি, এখন ফিরিই বা কি করে? ফিরে যাই বা কোথা ? তারি কথায় এ রাজ্যি- পাটের আশা ত্যাগ করেছি, এ ধনদৌলতের মার। ভুলে গেছি । তারি কথায় আমার দেবতার মত স্বামীর সঙ্গে, দিবারাত্তির একত্রে থাকতে পাব বলে, বনবাস-বাসের ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু যে উপায়ে তা ক’ত্তে বসেছি, সে কথা মনে ক’ত্তেও যে বুক কেঁপে উঠছে। কলিঙ্গের ফৌজ কাল হেরে পালিয়ে আজ আবার এসেছে, সইয়ের পরামমশে আমি তাঁকে এ কথা জাতেও দিলু না! সাতহারা ঘরের ভেতর ধ্যানঘর-মেঘের ডাক পৰ্য্যন্ত সেথা সেঁদোয় না, সেই খানে তাকে বসিয়ে রেখেছি। এদিকে সহরের যেখানে বত সন্যিসামন্ত, এ বাড়ীর যেখানে যত চৌকি পাহারা, সইয়ের কথায় সকলকে রাজার হুকুম বলে বিদায় দিয়ে সহরের বার করে দিয়েছি। কলিঙ্গের রাজা এসে রাজ্যিপাট সব দখল করে নিকৃ—স্বামীর হাত ধরে আমি যে বনবাসিনী সেই বনবাসিনী হইগে! রাজার রাণী হওয়ার চেয়ে আমি ভিখারিণী হয়ে সুখে থাকব। সেখানে আমার সােণার স্বামীকে কেউ পর ক’ত্তে পার- বেনা! ঐ যে কলিঙ্গ ফৌজের রণব্যাদি আবার বেজে উঠল, তাইত কি হবে, মা, কি হবে ? (নেপথ্যে রণবাদ্য) বি-মা। ঐ ঐ রণবাদ্যি থামল’! এইবার বুঝি ওর আসছে।
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
(বিমলার মার প্রবেশ।
এ সাতমহলের ভেতর ত’ পুরুষ মানুষের গন্ধও নাই ;
গড়গড়িয়ে আবে এখন। ও সই ! এ দিকের আমি সব
ঠিক করে রেখেছি। এক ঘড়া ধন নিয়ে খিড়কীর অব
বাগানে রেখে এয়েছি, বীরের তিনটে তীর আর ধনুক
খানা ব্যানা ঝােপের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি। এখন
কেবল ওরা এসে দখল করে বসুক, আমরাও চল
তােমার বীরের হাত ধরে নাচদোর দে সেই বন পানে
পালাই।
ওরা এসে যদি কোন অত্যাচার করে ?
বি-মা। অত্যাচার করবে কি? এত বড় রাজ্যিপাট, ধনদৌলত
অমনি ছেড়ে দিয়ে গেলুম, আবার কি? আর, অত্যাচার
করবে কার উপর ? আমরা চলে গেলে, কে আর তাদের
অত্যাচার সইতে থাকবে ?
ফু। আচ্ছা সই। উনি যদি পালাতে না চান ? তা হলে কি
হবে ?
বি-মা। পালাতেই হবে। না পালিয়ে করবেন কি ? কৈ, চল
দিকিনি তােমার বীরকে একবার দেঃে আসি ! কেমন
তিনি না যেতে চান ?
( উভয়ের ধ্যান-ঘরে প্রবেশ।)
( অন্যদিক দিয়া ভাড়, দত্ত পান, কুল, চন্দন, লইয়া
জনৈক ব্রাহ্মণের প্রবেশ।)
ব্রাহ্মণ। এ নির্ঘাৎ ভূতে বাড়ী, আমিত বাবা আর এগুচ্চি না।
চতুর্থ দৃশ্য। ] মা। ভ। আরে কও কি ঠাকুর? সাতটা গড় পেরিয়ে এখন সাতটা মহল পেরুতে পিছু'চ্চ? ব্রা। এটা আটা মনিষ্যির দেখা পেলে, বাবা,এমন সাতমহল কি, বিশমহলেও ভরাতেম না! কেবল গড়ই পেরুচ্চি, কেবল গড়ই পেচ্চি ! কেবল মহলই পৈরুচ্চি, কেবল মহলই পেচ্চি। আর সব যেমন থাকবার তেমনই আছে,কিন্তু একবেটাও মনিষ্যির চেহারা নজরে ঠেল না! মনিষ্যিহীন এই প্রকাণ্ড হাতী-শালা, ঘােড়াশাল ওলা, দপ্তরখানা-দেওয়ানখানাও আর রান্নামহল থেকে রংমহল পর্যন্ত সাতমহল ও বাড়ী যদি না ভুতে। বাড়ী হবে তবে কি ভূত মশাইরা “রাম রাম” নাম ক’ললাম ? ( নাক কাণ মলন) ঐ সেই মশাইরা তবে কি বাসরঘরে, বে-বাড়িতে, শ্রাদ্ধবাড়িতে, পূজোবাড়িতে, যেখানে অনেক লােকের আমদানী হয় সেইখানে গে বাসা নেবে? এ বাড়ী যদি ভূতত বাড়ী না হয়, আমি কলিঙ্গ-কোটালের পুরুতপদ থেকে, বেরাহ্মণের তালিকা থেকে খারিজ। ভ।। আর যদি এই মহলেই মানুষ দেখতে পাও, ঠাকুর? তা তা হলেত এগুতে চাইবে ? ব্রা। এই সাতমহলের গুহিদ্বারে যদি এসে বাবা কোন মনিষি দেখা দেয়, তা হলে তিনি হয় ভূত নয় পেতনী। “রাম রাম” নাম কলম? ( নাক কাণ মলন) এ ওঁদেরই রাজ্য ; ভাড়! কেন বাবা বেহ্মহত্যা করবি ? আমায় ছাড়ান দে পাছুবাগে চাইতে নেই—চাইবাে না ; উদ্ধ- শ্বাসে ছুটে গড়ের বাইরে গিয়ে দম ফেলে বাঁচি। • ১২৪ মা। [ চতুর্থ অঙ্ক। ভ। ঠাকুর এত ডরাও কেন ? লােজন নেই দেখেও যখন এতটা আসা গেছে তখন আর একটুর জন্যে কেন বল আমাদের সব আঁটা মতলব ফস্কে দেবে? কোটালকে জানতো? তােমার যজমানটীকে চেন তত? হেরে পালাতে হচ্ছেলাে, আমার মতলব শুনে পথ থেকে ফিরে, তােমায় রাজপুরুত সাজিয়ে, আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দেছে, জানতাে? ফাঁকতালে কাজ হাসিল করে নিতে চায় বােঝতো? না ক’ত্তে পাল্যে তােমার তর- মুজের বােটার মত টিকিটি-শুদ্ধ, নেড়ামাথাটা কাটা যাবে ; আমাকেও শূলে চড়ে সিঙ্গে ফুকতে হবে, বুঝলে? বিশেষ ভজকটো ক’র না—যা বলি তা শােন! ইশারায় বুঝে নাও, তুমি আমি ছাড়া আপাশ দে আমাদের আরও অনেকে এগিয়ে আসছে। তুমি এই খানে থাক, পালিও না। আমি ঐ দোরের কাছে গিয়ে ডাক পাড়ি! থাকে তাে-পালিয়ে গিয়ে না থাকে তত এইখানেই আছে। ও খুড়ি! খুড়ি মাগাে ! (কাণ পাতিয়া শুনিয়া) ঐ যে ভিতরে যেন ফুসফুস করে কথার আওয়াজ হচ্ছে না? হ'চ্চে বৈ কি। এইখানেই আছে! ( উচ্চৈঃস্বরে) ও খুড়ি! খুড়িমা গাে! সু-খবর নিয়ে তাের ক্যাঙ্গল। ছেলেটা এয়েছে যে মা ! ( বিমলার মার সহিত ফুল্লরার কক্ষঘর হইতে প্রবেশ।) বি-মা। কে গা? দত্ত ছেলে বুঝি ? ভা। হ্যা গাে মা ! হুঁ! আমি নয় তাে আবার কে ?
চতুর্থ দৃশ্য । ]
।
মা।
১২৫
ছেলে না হলে আর এত জোর কার? এই খুড়ি
মা, আমার গর্ভধারিণী মা ! বলে—“কুপুত্র যদ্যপি হয়
কুমাতা কদাপি নয়”। এই বিপদ—এ সময় কি আমি
মায়ের কাছে না এসে থাকতে পারি ? তা খুড়িমা,
ধম্ম যেখানে জয় সেখানে! কলিঙ্গের রাজাকে কি
কম বুঝিয়েছি ? কত হাতে পায়ে ধরে বুঝিয়ে সুঝিয়ে
তবে এ যুদ্ধ, রদ করিয়েছি, জান গা খুড়িমা! বড়
হলেই তাঁর পাঁচ বেটা শত্তর হয়! কলিঙ্গ রাজার
কাছে সেই রকম পাঁচ বেটাতে লাগিয়ে ভাঙ্গিয়ে এটা
করিয়েছিল কি না! আমি তাে কিছু লাগানাে ভাঙ্গানাে
করিনি। কাজেই সে সব উলটে দিয়ে দিনরাত
পড়ে থেকে কেঁদেকোকিয়ে খুড়াের ওপর তার মন
ফিরিয়েছি ! এই দ্যাখ তিনি পুরুত, পাঠিয়ে দিয়ে-
ছেন। ওঁর হাতে প্রেসাদি পান আর রাজটীকার ফুল
চন্নন আছে! খুড়ােকে ডাকু, তিনি এসে হাত পেতে
নিন্-বাস্, সব জঞ্জাল মিটে যাক্। রাজায় রাজায়
ভাব না থাকলে কি খুড়ি কাজ চলে?
বি-মা। তবেই তত? তা হাগা! তােমাদের কলিঙ্গের রাজা
মশাই কেন একেবারেই রাজ্যিথানা দখল করে নি
না! আমি, আমার, সই, আর সয়া তিনজনে পাশের
মধুবনের ভেতর কুঁড়ে বেঁধে থাকিগে ! আমাদের
সৈন্যিসামন্ত তো কেউ গড়ের ভেতর নেই, তােমরা
একটু জোরজার দেখালেই আমরা সয়াকে নিয়ে
পালিয়ে যাই।
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
কি ?
ও সই! তা কেন ? কলিঙ্গের রাজা যখন প্রেসাদি
পান পাঠিয়েছেন—তখন আর ও দারুণ কথায় কাজ,
যে জন্যে রাজ্যত্যাগ করে বনবাসে যেতে
চাচ্ছিলেম, কলিঙ্গরাজ সম্রাট বাপের বড়,আর ইনি
আমার পেটের সন্তানেরও বাড়া-এরাই তার উপায়
ক’রূবে! রাজা হ'য়ে রাজকার্য ছেড়ে-সংসারধর্ম
ছেড়ে- উদাসীনের মত হয়ে থাকতে, রাজার রাজা
সম্রাট যিনি, তিনি যদি না দ্যা তা হলেই তাে
আমার কামনা পূর্ণ হয়। রাজাস্বামীকে আমার রাজা-
স্বামীরূপেই পাই।
বিমা। তা বেস্! তবে তাই হােক্ ! ওঁদের কিন্তু বােলে
দিয়ে যেতে হবে, সয়া আমার ঘরে থাকবে—রাজ্যি-
পাট করবে আর জাতের দিন ছাড়া অন্য কোন দিন
ঐ মন্দিরের ত্রিসীমানায় যেতে পাবে না !
ভা। এই কথা? আমি সব ঠিক করে দোব! এখন বলতো
খুড়ি ! খুড়ো আমার কোন্ মহলে আছেন ? এই
মহলে বুঝি ? এই মহলে না? এই দিক্কার এই ঘর
গুণাের ভেতর সেই মাঝখানকার পাথুরে ঘরে বুঝি ?
বল না ? আমি পেটের ছেলে-আমায় ব’তে কি ?
। হঁ্যা, সেই ঘরেই আছেন। তা আমি না হয় ডেকে
আচি।
।
( উভয়ের কক্ষমধ্যে প্রবেশ।)
। ঠিক থেকো ঠাকুর। কঁপছো কেন ?
চতুর্থ দৃশ্য।] মা। ১২৭ ব্রা। কঁপছি কেন? সব শুদ্ধ, পপাত ধরণীতলে হইনি যে এই ঢের! বাবা ভাঁড়! তােমায় ব্যাগত্তা করি- তােমায় জোড়হাত করি—আমায় ছাড়ান দেও, আমি সরে পড়ি। তুমি বাবা ভূতের রােজা—তা আমি বুঝতে পেরেছি! রাজার রাণী শাকচুন্নী- শাকচুন্নী—আর তার সই ঐ মাগী পেত্নী! ডাতে গেল রাজাবেটাকে সে বেটা মােরে ভূত হয়ে আছে ! “রাম রাম”- আবার নাম কম? ( নাক কাণ মলন)। (বেগে বিমলার প্রবেশ।) বি-মা। দত্ত ছেলে! সব্বনাশ হয়েছে। ভ। কি ? কি ? খুড়াে ওখানে নেই নাকি ? বি-মা।ওগাে তা নয় গাে, তা নয়! ধ্যানঘরের ভেতর বসে- ছিলেন,—সই গিয়ে খবর দিলে, তােমর কথা বলে, অমনি, খাড়া হয়ে দাড়িয়ে উঠলেন্। এমন সময়, জানগা দত্ত ছেলে, জানলার ভেতর দিয়ে যেন বিল্ল- তার মত একটা ঘােরালাে আলাে এসে সয়ার মাথার চার দিকে ঝক ঝক করে জ্বলে আবার জাঙ্গা দিয়ে বেরিয়ে মিলিয়ে গেল! অমনি, জানাে দত্ত ছেলে, সয়া আমার চৌচাপটে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল, আমি তাই ব’তে এলুম। ভা। তাই তাে! এটা কি রকম হল ? ব্র। ও বাবা ভাঁড় ! তােমার খুড়াে দেখচি তবে তা নয়। বেহ্মদত্তি ? তুমি বাবা মজালে দেচি! এখনি
১২৮
মা।
( চতুর্থ অঙ্ক।
খড়ম পায়ে দিয়ে খট্ খট, ক'রে এসে বেলগাছে
তুলে, খুলিটী খুলে, মাথার ঘিটুকু চুমুক দিয়ে খেয়ে,
ঠেলে ফেলে দে
(ফুল্লরার সঙ্গে কালকেতুর প্রবেশ।)
কাল। বাহুর বল গেল, দেহের সামর্থ্য গেল, মা জগদীশ্বরী
কি কলি ! সন্তানের শক্তিসামর্থ্য তেজ-বল একেবারে
হরণ ক’লি ?
ভ। ও খুড়াে! তােমার তেজ কি যেতে পারে বাবা ?
কলিঙ্গরাজ তােমার তেজ শুনেই তাে সন্তুষ্ট হয়েছে-
তােমার সঙ্গে সন্ধি করে পাঠিয়েছে। এই পুরুতের
হাতে প্রেসাদি পান, আর রাজটীকার জন্যে ফুল
চন্নন দিয়ে দিয়েছে। মজা করে নিজের রাজ্য নিজে
ভােগ কর, পাঁচজনকে প্রতিপালন কর। এই ধর—
হাঁটু গেড়ে বােসে, মাথা পেতে, সম্রাটের প্রেসাদি
পান নেও।
(কালকেতুর হাটু গাড়িয়া উপবেশন।)
বি-মা। ওগো দত্ত ছেলে। সেই কথাটা অমনি বলে দাও।
ভা। হঁ্যা বলচি ! আগে কাজ হাসিল করি। (সঙ্কেতসূচক
বংশীধ্বনি করণ)।
(কলিঙ্গ কোটাল ও সৈন্যগণের দ্রুত প্রবেশ এবং কালকেতুকে
শৃঙ্খলাবদ্ধ করণ।)
ফু
,
বি-মা। ওমা! একি গাে ! ওমা একি গাে ! একি কর গাে!
ওঁকে বাঁধ কেন ?
চতুর্থ দৃশ্য। মা। কাল। কৈ ? বন্ধন কৈ ? ফুল্লরা ! তােমরা যে বন্ধনের চেষ্টা কচ্চিলে—তার কাছে এ বন্ধন তাে অতি তুচ্ছ ! মমতার ডােরে প্রাণের বন্ধন-মায়ার তে সংসারের বন্ধন- আর সামান্য লৌহের শিকলে দেহের বন্ধন-এতে যে স্বৰ্গম প্রভেদ! এ বন্ধন একদিন সহজে ছিড়তে পারবে। কিন্তু ও বন্ধন যে মরণ পৰ্য্যন্ত সঙ্গের সাথী হবে! ও বন্ধনের চেয়ে এ বন্ধন ভাল! ভ। ও কোটাল মশায়! শেকলের বন্ধন ছিড়তে চায় যে ! বেস করে বাঁধ—আচ্ছা করে বেঁধে ফেল! দুই হাটুতে কনুয়েতে এক সঙ্গে করে, কোমরের সঙ্গে হাতির শিকল দিয়ে, মােড়ম্বা করে বেঁধে ফেল! খুব এটে বাঁধ,গলায় আচ্ছা করে জিঞ্জির লাগাও। লাগিয়ে, কোমরের শেকলে এটে দিয়ে, দুই হাতে হাতকড়ি পরিয়ে, দোস্ত করে নিয়ে চল! , ঐ ঠি-ও রকম না হলে কি এই বুনােবয়ারকে বাগিয়ে নেওয়া যায় ? কেমন হে রাবু কালকেতু! যা বলে গেছলে—তা হ'ল তাে? তা ঘােটলাে তাে? আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হ'য়েছেল-চোকে কাণে যে দেখতে পাওনি। এখন? এখন আর কে রাখে ? বলে গেছলুম—যদি হরি দত্তের বেটা হই—জয় দত্তের নাতি হই, তা হলে তােমার ঐ হাতীঘােড়া হাটে বেচাৰে, গুজরাট দখল করবে, আর ঐ তােমার ফুল্লরাকে হাটে হাটে পসরা দিয়ে মাংস বেচাবাে, তবে ছাড়বাে। তা হ’ল তাে ?
মা।
[ চতুর্থ অঙ্ক।
কাল। মা জগদম্বার ইচ্ছা পূর্ণ হবে, তুমি কে ? ভিখারী না
হ'লে মার প্রসাদ তত পাব না! মা ভিখারী কোচ্চেন,
তুমি কে ? ভাল মন্দের বিচার তিনি কোচ্চেন, এ বন্ধন
রি, তুমি কে?
ক-কোটাল। উনিই এ সমস্তের মূল, তুমি যে এতো ব’চো,
আমার রাজাকে না জানিয়ে রাজ্যিপাট ফেদে বসেছে,
তুমি বাপু কে ?
কাল। ভাই কোটাল ! আমি কে? আমি কেউই না। এ
ধনসম্পদ মা চণ্ডী আমায় দিয়েছেন, তঁারি আদেশে এ
বন কাটিয়েছি,তারি ধন ব্যয় করে আমি প্রজা বসিয়েছি,
আমি কিছু জানিনা! সামান্য ব্যাধের ছেলে আমি, এর
ভালমন্দ আমার মা-ই জানেন তার চরণতলে পড়ে
আছি, সৰ্বস্ব তঁাকে অর্পণ করেছি! এর ভালমন্দ
তিনিই জানেন, আমি তাকে বইতাে আর কাকেও
ভালবাসিনা, আর কাকেও ভক্তি করিনা, আর কাকে ও
ডরাই না!
ক কোটাল। ডরো কি না উর, এক বার রাজার সমুখে
তােমায় নিয়ে গেলে বুঝতে পারবাে ! হাতীর পায়ের
তলে, কি বাঘের মুখে, কি শূলের আগায়, কি জল্লাদের
টাঙ্গির ঘায় যখন পড়বে, তখন বুঝতে পারবে তােমার
কত সাহস ?
ভা। তাই চলনা কোটাল মশায়! নিয়ে চলনা, আর দেরি কেন?
ফুল। ওগো, রক্ষা কর, ওঁকে নিয়ে যেওনা! ওঁর কোন
অপরাধ নাই। ওগাে ! তােমাদের হাতে ধরি, সব্বস্ব
চতুর্থ দৃশ্য।
মা।
-
নেও! এ হাতীঘােড়া, লােকলস্কর, ধনদৌলত, রাজ্যিপাট
সব্বস্ব নিয়ে ওকে ছেড়ে দাও! আমি কাঙ্গালিনী ছিলেম,
কাঙ্গালিনীই থাকি। আমার কাঙ্গাল স্বামী কাঙ্গাল
হােক, আবার বনে গিয়ে বাস করূবো। ওগাে!
তােমাদের পায়ে ধরি, অভাগিনীকে অকথিনী করনা
ওঁকে ছেড়ে দাও! এ জন্মে আর কখনও ওঁকে এ জায়-
গার ছায়া মাড়াতে দেবনা! ওগো, তােমাদের কাছে
গলায় কাপড় দে মিনতি করে বছি, আমায় স্বামীভিক্ষা
দাও ! ওগাে! সর্বস্ব নিয়ে আমায় স্বামী ভিক্ষা দাও।
কোটা। আমি, মা, রাজ-আজ্ঞাবাহী ভৃত্যমাত্র। আর বিলম্ব
ক’ত্তে পারি না! ওহে! বন্দীকে নিয়ে চল ।
[ বন্দীকে লইয়া সকলের প্রস্থান ।
ফুল, বি-মা। ওগাে সত্তি সত্তি নিয়ে গেল যে ! রক্ষা কর গাে!
হায় হায়, কেউ নেই যে রক্ষা করে ? হায় হায়, কি
ক'ৰ্তে কি কলোম্, কি হ’তে কি হ’ল ? বুক থেকে যে
ছিড়ে নিয়ে গেল গাে ! ওগো! কি সর্বনাশ হ’ল গো
( উভয়ের উভয়দিকে মুর্ভূিত হইয়া পতন।)
পটক্ষেপণ।
পঞ্চম অক। প্রথম দৃশ্য। গুজরাটু চণ্ডীমন্দিরের সম্মুখ। (সাধনা ও সিদ্ধিনাথ।) সিদ্ধি। প্রেত। প্রেত ! প্রেত। সাধনা। এই অমানিশার ঘােরন্ধিকারে প্রেতের নৃত্য হচ্চে ! অত্যাচারিতের হাহাকারে তাড়নার হুহুঙ্কারে মিশে প্রলয় সঙ্গীতের সংহারতান,উঠছে! অত্যাচার আর বাধা মানে না, রাজ্যে নিরাশ্রয় অনাচারের উন্মাদিনী স্রোতস্বিনী দু-কুল ভাসিয়ে গজাতে গজাতে ছুটে আসছে ! গ্রামকে গ্রাম, নগরকে নগর সে পৈশাচিক তরঙ্গের মুখে পড়ে কে কোথায় ভেসে যাচ্ছে, তার নির্ণর হচ্চেন! প্লাবন! প্লাবন। সাধনা! সে মহাপ্লাবনে সব ভেসে যাচ্চে। ধৰ্মকৰ্ম্ম, বনমান, আশা, বাসনা, সাধনা, কামনা, ইহকাল, পর- কাল, মাতৃত্ব, পিতৃত্ব, পুত্রত্ব, এমন কি, কুলমহিলার সােণার সতীত্ব পর্যন্ত ভেসে যাচ্চে—কিছুই তিতে পাচেনা-অনাহত স্রোত অবিরাম বইছে সাধ। তাই তাে ভাই সিদ্ধিনাথ ! এমন বিপদ তাে কখনও হয়নি। মায়ের এ সােণার রাজ্যে এমন সৰ্ব্বনাশ যে হবে, এতো স্বপ্নেও ভাবিনি।
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
সিদ্ধি! সাধনা ! যাকে নিয়ে রাজ্য, যাদের নিয়ে সংসার, আর
তারা তােত মায়ের নেই। মাকে ছেড়ে দুষ্ট তৃষায়, কি
রাজা, কি প্রজা, সবাই সংসারের মায়া-মরীচিকায়
মেজেছে! রাজা গেছে, প্রজা যাচ্চে, রাজ্যও যায় !
সম্পদ যারা চেনে না, সম্পদ যারা উপভােগ ক’ত্তে জানে
, সম্পদের মূলে যাদের দৃষ্টি নাই, সে হতভাগাদের
বিপদ বই আর কি সম্ভব হতে পারে ?
সাধ। আচ্ছা ভাই সিদ্ধিনাথ! তারা যেন অভাগা ছেলে-
মহামায়া মা তত আমাদের সবারই মা, জানতাে ভাই,
‘কুপুত্র যদ্যপি হয়, কু-মাতা কদাপি নয়। তাই ভাবি,
তিনি আর হেথায় নেই! মা থাকলে, ছেলেপুলেদের
এমন বিপদ কি ঘটতে পারে ?
সিদ্ধি। সে কি সাধনা! জাননা? ইচ্ছাময়ী মার ইচ্ছাই যে
সম্পদূবিপদের মূল, তার অনাদরে এ সংসারে বিপদ
আসে, আবার তারি আদরে বিপদ ত্রাসে ছুটে পালায়।
বিপদের পর সম্পদ এলে, বিপদবারিণী মায়ের নাম
অমনি চারিধারে বেজে ওঠে! মর্তের মাতুনি সংক্রামক
হয়ে, স্বর্গ পৰ্য্যন্ত ছুয়ে এসে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আমি
ভাবি, মা কোথাও যানি—সেই খেলা করবার জন্য,
সেই রঙ্গ দেখাবার জন্য এই বিপদের অবতারণা।
সাধ। তাতত নয় সিদ্ধিনাথ ! মা তাে আমাদের নিদয়া নন্।
কান্নার রঙ্গ দেখতে তো তাকে কখনও দেখিনি,
কখনও শুনিনি ! আমি ঠিক বুঝতে পাচ্ছি, তিনি
হেথায় নাই! ওই দেখ কান্তিময়ী মা জননীর সে জ্বলন্ত
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
ছটাতত আর নাই। সে দীপ্তিমান শতসূর্যের জ্যোতি
ততা আর নাই ।
সিদ্ধি। নাই? নাই সাধনা ? সত্যিই তাে নাই। তাই তাে,
তবে কি হবে! অধৰ্ম্মের ক্ষয় আর ধর্মের জয় তা হ'লে
কই হােল? সাধনা। এ জন্মের আগেকার কথা মনে
কর, সেই আগেকার কথা। সেই কৈলাসে পদ্মার
পরামর্শে, মা আমাদের ভােলানাথকে ভুলিয়ে অভিশাপ
দিইয়ে, শচীপতির সাধের সন্তান নীলাম্বরকে ব্যাধের
ঘরে জন্ম দিইয়ে,ধৰ্ম্মের সরল সৌন্দর্য্যে গঠিত করে, তার
মুখ দিয়ে জগৎকে মধুমাখা ‘মা’ নাম বলাতে এসেছিলেন।
তা কই হ’ল ?
সাধ। ইচ্ছাময়ী মা আমাদের, তাঁর ইচ্ছ। তিনিই জানেন, তার
কাৰ্য্য তিনি কোল্যেন না! তা, হ্যা ভাই সিদ্ধিনাথ ?
আমাদের এখন কি হবে ? মার নাম যায়, রাজ্য পাপে
ডােবে, এখন তুমি আমি কি করি, ভাই ?
সিদ্ধি। মার খেলা ফুরােয় যদি, তুমি আমি কে? ' সাধনা, মাকে
পাই ভাল,নইলে তুমি আমি এক হােয়ে যাব। এক হয়ে,
জান সাধনা, এক হয়ে তার পর ঐ মন্দির, মহামায়ীর
ঐ পাষাণ প্রতিমা, ওইখানে ওঁরই পাশে
(রােরুদ্যমান ফুল্লরার ৰেগে প্রবেশ ।)
ল্প। ওগাে কে আছ গাে! রক্ষা কর—রক্ষা কর। পাপীষ্ঠর
এখানে পৰ্য্যন্ত তাড়া করে আসছে।
সিদ্ধি। কৈ? কারা ? কোথা ?
ফুল্ল। ওগাে ! ওই যে ! ওই যে বাঘের মত গর্জন কোত্তে
প্রথম দৃশ্য।]
মা।
কোত্তে আসছে ! ওই যে রাজ্যের যত পুরুষকে ধনে
প্রাণে মেরে, কুলমহিলার ধর্ম খেতে খেতে, জলন্ত মশাল
হাতে রক্তমুখী হয়ে ছুটে আসছে! ওগাে! ওরা যে
বড় অধৰ্মী, ওরা এ দেবতার দেউল মানূবে না! ওদের
পাষণ্ড দলপতি ভাড়দত্ত চাতুরী কোরে আমার স্বামীকে
হরণ করে নে গেছে, রাজ্য ছারখারে দিচ্ছে, শেষে
অনাথিনী আমি, আমার উপর অত্যাচার কোত্তে বাড়ি
থেকে পথ, পথ থেকে বন, বন থেকে মাঠ, মাঠ থেকে
এ পর্যন্ত তাড়া কোরে আসচে! ওগাে ! কোনও
উপায় কর, এলাে যে! ওগাে, মার কাছে এসেও কি
এ অভাগিনীর পরিত্রাণ নাই ?
সিদ্ধি। কি? এখানেও পরিত্রাণ নাই? এ মায়ের কোলে
সন্তানের পরিত্রাণ নাই, কে বলে ? জগন্মাতা মাগাে।
এ বুকভাঙ্গা নৈরাশ্যের কথা কাণ পেতে শুছিস্ কি ?
তাের আশ্রয়ে এসে তাের ছেলেমেয়ে পরিত্রাণ পাবে
? এ কলঙ্কের কথা কাণ পেতে শুচিস্ কি ? বল,
বল্ মা অসুরনাশিনী! বল্ মা! এ কলঙ্কের কথা
তাের কেন শুনি? কেন শুনি? কেন শুনি? শুতে
পারি না যে মা, সৰ্ব্বশরীরে যে বিদ্যুৎ ছুটে যায়।
(নেপথ্যে কোলাহল।)
কুল। ওই,—ওই বুঝি ওরা এলাে?
সাধ। তাইতাে! এসে পােড়ল যে! ভাই সিদ্ধিনাথ ! আমি
দৌড়ে সিংদরজাটা বন্দ কোত্তে বলে আসি।
[ বেগে প্রস্থান।
১৩৬ মা। [ পঞ্চম অঙ্ক। (নেপথ্যে পুনঃকোলাহল।) সিদ্ধি। ওই—ওই মহাশক্তি মাগাে, এলাে যে! অসুরের দল এলাে যে! অসুরনাশিনী! জাগ, মা, জেগে আমায় খ দে! তাের হাতের খঙ্গ তাের সন্তানের হাতে, দে! অসুরের রক্তে তাের পা ধুইয়ে দি! ( সিদ্ধিনাথের মন্দিরে প্রবেশ ও সাধনার পুনঃপ্রবেশ।) নেপথ্যে। (একজন) ওই যাঃ-দরজা বন্দ কল্যে যে। নেপ-ভ। দরজা ভেঙ্গে ফেল, চুলের ঝুটী ধােরে বের করে নিয়ে আয়! তার পর এইখানে দশের সুমুখে বেইজ্জত কোরে, ওলয়ারের আগায় টুকরাে টুকরাে কোরে, গাদায় মিশিয়ে দে! প্রতিহিংসার এতটুকু বাকি রাখবাে না। ভাঙ্গ, ভাঙ্গ, দরজা ভেঙ্গে ফেল! (মহাকলরব ও আঘাতের শব্দ।) (খড়হস্তে মন্দির হইতে সিদ্ধিনাথের প্রবেশ।) সিদ্ধি। খঙ্গ পেয়েছি ! শতসহস্র অসুরাবতার-পাতের মহা খড়গ এই আমার হাতে! এই জীয়ন্ত খঙ্গে অসংখ্য বলি এনে মায়ের পায়ের তলে ফেলে দেব। (নেপথ্যে কোলাহল ও দ্বারভঙ্গের শব্দ) সিদ্ধি। ঐ যে! ঐ যে বলি এলো! আপনি এলাে, জয় মা ! (নেপথ্যে গমন ও ছিন্ন শির হস্তে পুনঃপ্রবেশ) জগ- দীশ্বরী! এই নে, আবার আনি! ( নেপথ্যে গমন ও ছিন্ন শির হস্তে পুনঃপ্রবেশ) অনাশিনী! এই নে, !
প্রথম দৃশ্য।
মা।
আনি!
আবার আনি! জয় মা ! (নেপথ্যে গমন ও ছিন্ন শির
হস্তে পুনঃপ্রবেশ) দনুজদলনী! এই নে, আবার
জয় মা ! (নেপথ্যে গমন ও ছিন্ন শির হস্তে
পুনঃপ্রবেশ) জগদম্বে! এই নে, আবার আনি।
জয় মা ! (নেপথ্যে গমন ও ছিন্ন শির হস্তে পুনঃপ্রবেশ)
মহিষমর্দিনী। এই নে, আবার আনি।
(মদির হইতে জ্যোতির্ময়ী চণ্ডী-মূৰ্ত্তির প্রবেশ।)
০
চণ্ডী। ওরে বাবা ! থাম্, পাতকীর শােণিত-পাতে পাতকী
কমে, নিঃশেষ হয় না। অনুতাপের অস্ত্রে পাতকী তরে,
পাতক বলি দিয়ে, কই, কেউত তরাচ্চে না! আমার
সােণার সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমার পুণ্যের রাজত্বে
পাপ ঢুকছে! আমার ধর্মভীরু ছেলেপুলের অধর্মের
স্রোতে ভেসে যাচ্চে। ওরে, তাদের ত কেউ ফেরাচ্চে
! এ ঘাের অন্ধকারে আলােকের পথ কেউ দেখাচ্ছে
। তারা সবাই ভুল বুঝচে ! সুপথ ভেবে কুপথের
দিকে ছুটে যাচ্ছে ! আপন আপন ছুরি আপন আপন
বুকে মেরে, আত্মহত্যা-মহাপাতকে লিপ্ত হােচ্চে।
পরকে আপনার কচ্চে, আপনাকে পর কোচ্চে।
এ মহাম তাদের কেউ বুঝিয়ে দিচ্ছে না। এ মহা
ভুল তাদের নিজের নিজের সত্ত্বা পৰ্যন্ত ভুলিয়ে দিচ্ছে।
কেউ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে না! কেউ রক্ষা কোচ্চে না।
এমন আলা, আমি মা হয়ে, কেমন কোরে সইতে পারি,
বাবা ?
১৩৮
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
সিদ্ধি। মা ! একি মা! এ রহস্য কেন মা! জগদীশ্বরী ।
তােমার জগৎ, তােমার জীব, তুমি সবার অন্তরে থেকে
এ অন্তরের কথা কেন কইচ মা? মহামায়া ! এ তােমার
কোন মায়া মা? এ অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের ওপর নীচে,
ভেতরে বাইরে, যেখানে যা আছে, তােমার অগােচর তত
কিছু নয় মা! তুমি জগতের স্থাবরজঙ্গম, তুমিই জীব
দেহে প্রাণ ; আত্মময়ী! তােমাতে সব, তুমিও সবাতে।
তবে এ ছলনা কেন? সন্তানকে সুপথ তুমি না দেখালে
আমরা কে ?
চণ্ডী। ওরে বাবা! সন্তান কি আর আমার আছে ? তারা
যে আমায় পর ভেবে পরের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
এ ভবসমুদ্রের তটে একলা আমি তাদের নিয়ে খেলা-
চ্ছিলেম, চেয়ে দেখি এক একটি তরঙ্গ এসে একে একে
তাদের গ্রাস করে নিয়ে যাচ্ছে। তারা যাচ্চে আর
ফিরছে না। আমি শূন্য কোলে সােণার ছেলেমেয়েদের
ভাসিয়ে দিয়ে আত্মহারা অভাগিনীর মত কেঁদে কেঁদে
বেড়াচ্চি। হ্যা বাবা! শুনেছি, পুত্রহীন কাঙ্গালিনীর
কান্নায় পাষাণ গলে ; পরে এসে চক্ষের জল মুছায়।
আপনার যারা, তারাত কই আর ফেরে না। তাই
বাবা, তাই আমি কেঁদে সারা হই। কান্নার ডােরে
যদি বাছাদের ফিরিয়ে এনে আবার বাঁধতে পারি, তাই
কাদি বাবা!
সিদ্ধি । কঁদবে কঁাদ, কিন্তু মা ! তােমার কান্নাতে তােমার
নয়! তােনার হালিকানা যে জগতের হাসিকান্না।
প্রথম দৃশ্য।
মা।
তুমি যাদের জন্য কাচ, তারাও তাে তােমার জন্যে
কঁচে।
চণ্ডী। কই কাঁদে বাবা। তারা কাঁদে কই? আমার বাছার
কঁদে কই? আহা, তারা যে আমার বড় সুবােধ ছেলে ;
মা বই যে তারা আমার আর কাউকে জান্ত না, মার
কোল বই তারা যে আমার আর কারও কোল চিন্তা
, মা নাম বই তারা যে আমার আর কারু নাম
মুখে আত না। এমন সব ছেলে আমার কোথায়
গেল বাবা? বাবা ! বরে, তারা যে বড় সাধের বাছা
আমার ; বরে, তারা যে বড় দরদের নিধি আমার ;
বরে, আমি তাদের কোলে পেয়ে যে সকল দুঃখ ভুলে
ছিলেম ; বরে, আমার মায়ার পুতুল সব কনে
পালাল, বল্ ?
সিদ্ধি। তাদের যে মা সম্পদ দিয়ে ভুলিয়ে ছিলে ! বিপদের
ধাক্কা সইতে, বিপদের কান্না কাঁদতে তাে শেখাওনি।
তুমি বিপন্নের মা–সম্পন্নের তত কেউ নও। লােক
বিপদে তােমায় ডাকে, সম্পদের সময় ভুলে যায় !
বিপদে জগতের লােক জগতের লােককে ফেলে পালায়,
একলা তারা, তাই তােমায় চায়-অন্য কাউকে পায় না,
তাই তােমায় চায়! সম্পদের সময় শত্রু এসে মিত্র হয়,
অনাহ্বানে পর এসে আপনার হয়ে বসে, আর তােমায়
ভুলিয়ে দেয়। তারা তাই তােমায় ভুলে, মাথা পেতে
বজ্র নিয়ে, মহাপাতকের হ্রদে গিয়ে ডুব দিয়েছে ।
চণ্ডী। বটে! বটে বাবা! বাছাদের আমার ভুলিয়ে নেগেছে ?
১৪০ মা। [ পঞ্চম অঙ্ক। সিংহিনী আমি, আমার বাছাদেরও ভােলালে? সদ্য- প্রসূত সিংহিনী আমি-আমার শাবকদের শিকারীতে হরণ করে নে গেল? এখনি ফেউন্মাদিনীর মত পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে যাব, যেখানে পাব, পাপ শিকারীর বুকের রক্ত শুষে খেয়ে নিজের শাবকদের কোলে নিয়ে, আসতে পারি ফিরে আসবে, আর যদি না পাইতে, সাধনা ! সিদ্ধিনাথ! সন্তানদের যদি না পাই, তা হলে, আমার এই যাওয়াই শেষ যাওয়া! এ পাপ রাজ্য ছারখার হয়ে যাবে, আর আস্বাে না! [ বেগে প্রস্থান। সাধ। সিদ্ধিনাথ ! মা যে চলে গেল ভাই! আর আসবে না বলে গেল যে! তুমি আমি তবে আর কেন থাকি ? কার জন্যে থাকি ? সিদ্ধি। তাই তো? কোথা থাকি? কার মুখ পানে চেয়ে মা আমাদের পায়ে ঠেলে চলে গেলেন, আমাদের আর দাড়াবার স্থান কই, সাধনা ? সাধনা। এ শূন্য মণ্ডপপানে যে চাইতে পারি না! ওহহ! মাতৃপীঠে মা নাই, আমরা। তবে কে? মা নাই, ভক্ত তবে কে ? ভক্ত নাই, সাধনা, তুমি কে? সাধনা রবে , আমি সিদ্ধি কে ? সবশূন্যসবশূন্য-জগন্ময়ীর জগৎ শূন্য শূন্য পুরীতে কোথায় রব ? এ শূন্য শ্মশানে মা-মা বােলে আর কারে ডাবো? কে উত্তর দেবে ? আমরা প্রাণ ভরে ডাক্বাে ‘মা’ শূন্য শ্মশান প্রতিধ্বনি থাকি ?
প্রথম দৃশ্য।] মা। ১৪১ '? দেবে ‘না’; তাই শুনতে এ ছাই ঠায়ে কি আর থাকতে পারি ? সাধনা! অনন্ত মহাশূন্যের এক বিন্দু শূন্য নিয়ে এয়েছি, পঞ্চভূতের জাল ছিড়ে, চল দুজনায় এক হয়ে, সেই অনন্ত মহাশূন্যের স্তরে স্তরে মহামায়ীর মহা কায়ে মিলিয়ে যাই। সাধ। “চল তাই যাই ভাই। এ জড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। (বিমলার মার দ্রুত প্রবেশ।) বি-মা। ওগাে ! এই যে তােমরা হেথা? তােমরা কিছু দেখনি? হ্যা সই! তুমিই না হয় বলনা, আমি কি সত্যি দেখুলুম, না, স্বপ্ন দেখচি। ফুল্ল। কি সই! কি দেখলে ? বি-মা। ওমা তােমরা কিছু দেখনি? এই মাত্তর এই দিক- থেকেই তােত সব গেল গাে ! এমন আশ্চয্যি জন্মে কখনও দেখিনি? সিদ্ধি।কি ? কি দেখেছ, বাছা ? বি-মা। ওমা, তবে দেখ চি তােমরা কিছু জাননা ! তবে হয়ত আমি স্বপন দেখিছি, এখনও হয়ত স্বপন দেখছি! স্বপন না হলে কি অমন আশ্চয্যি কেউ কখনও সত্যি সত্যি দেখতে পায় ? সাধ। কি মা? কি দেখেছ বলনা! স্বপন কি আর কেউ জেগে দেখে ? বলনা? বি-মা। আচ্ছা বছি। এই দ্যাখ, আমাকে আর আমার
১৪২
মা।
পঞ্চম অঙ্ক।
এই সইকে তাড়া দিতে সই পালিয়ে এলাে, আমি
ছুট্টে গিয়ে, মােড়লদের বাড়ির পাশে, রাস্তার ধারে সেই
যে বটগাছটা আছে, তারির পাশে লুকুলুম; লুকিয়ে
আছি, এমন সময়, জান মা, এই মন্দিরের দিকটা যেন
আলাে হয়ে উঠলাে ! চেয়ে দেখি
চেয়ে দেখি সেই ভাঁড় দত্ত
পােড়ারমুখাে আর তার সঙ্গে একদল লােক ছুটে
আছে ; আর তাদের পেছনে পেছনে, ব’বাে কি মা,
ব’তে গা শিউরে উঠছে, একটা পেরকাণ্ড সিঙ্গীতে
চ'ড়ে জ্বলন্ত আগুণের মত রং, সেই সেই যে সই, সেই
যে দেবতাহুঁড়ি তােমাদের সাত ঘড়া ধন দিয়েছিল,
সেই দেখিনা ছুটে আছে ; তার পেছনে আশে পাশে
আবার দেখি, বাঘ ভালুক বরা আরও কত-কি জন্তু
জানােয়ার লক্লকে জিব বের করে হা-হা কর্তে
ক'ৰ্ত্তে ছুটে আছে ! আর পথের দুধারি কলিঙ্গের
সয়তান গুণাের, কাউকে থাবা মেরে, কারুর বুক চিরে,
কারুর ঘাড় ভেঙ্গে, রক্ত শুষতে শুতে এগুচ্চৈ ! দেখুঁতে
দেখতে মা চোকের বার হ'য়ে গেল
সিদ্ধি। বটে! এমন হয়েছে ? মা আমার অসুর দমন ক’ত্তে
ক’ত্তে চোলে গেছেন, চল দেখি দেখি ! জয় মা জগদী-
শরী! জয় মা জগদীশ্বরী ।
[ সকলের বেগে প্রস্থান।
দ্বিতীয়
দৃশ্য।]
মা।
১৪৩
দ্বিতীয় দৃশ্য।
(কলিঙ্গ কারাগার।)
( কারাগাৱস্থ গহ্বর হইতে ধীরে ধীরে কালকেতুর প্রবেশ ।)
( কালকেতুর গীত।)
আমি জাগিয়ে ঘুমাই।
চাই স্বপনে ডাকিতে মায়ে
মা-মামা-মা বলে
নারি,-আঁখি-নীরে ভাসি তাই।
আমি এ কারায় কঁদি তাই।
আগে জাগিয়ে দিয়ে কত ডেকেছিনু মায়,
তায় জেগে মা জননী কোলে নেছিল আমায়,
ভাল বেসেছি যত,
ভাল বেসেছিল তত,
মায়ামমতা-বঁধনে বেঁধেছিল মহামাই।
ডাের ছিড়েছে মা দয়াময়ী,
সে দয়াত নাই।
কই ডাকিলে শুনেনা মা তাে সাধিলে আসেনা,
প্রাণ শূন্য হয়ে আছে মা তাে আসিয়ে বসেন,
১৪৪
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
আমি মা-হারা সন্তান,
আমি পাতকী-প্রধান,
পেয়ে নারিনু রাশিতে নিধি একি এ বালাই।
গেল, মা কোথা, মা কই, মাগাে মায়াময়ী মাই।
{ গান করিতে করিতে জ্যোতির্ময়ী চণ্ডীরমুর্বির আবির্ভাব ।)
(চণ্ডীর গীত।)
আমায় কে ডাকে মা বলে রে।
(ওরে) মা বলে ডাকিত যারা
তারা গেছে চলে রে।
গেছে একে একে ছেড়ে তারা সব,
মাের বাছারা নীরব,
কেউ মা বলে ডাকেনা, ভাকিলে শশানেনা,
কোল পেতে কবি, কোলে তােল আসেনা,
এলাে গেল চ'লে ছলেরে।
(ওরে) বুক ভেঙ্গে গেল, সকলি ফুরাল,
ছাই হয়ে যাই জ্বলেরে ।
(কালকেতুর গীত।)
আমি মা ভুলে মা মজেছি।
(ভবে) এ ছার কারায়, তারা,
মায়া বেড়ি পােরেছি।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
মা।
১৪৫
দিছি রিপু-করে সঁপে দেহপ্রাণ,
বুকে নিয়েছি পাষাণ ;-
রিপু সাধিলে শােনেনা, মিনতি মানেনা,
ছাড়িতে চাহিলে ছাড়িতে চাহেনা ;-
দিবারাতি সারা হতেছি।
(হ'য়ে) হুতাশে আকুল, হেরিনে মা কুল,
অকুল পাথারে পড়েছি।
(চণ্ডীর গীত।)
আহা মরি মরি হারে ওরে বাপ,
(কেন) লইলি এ তাপ ;
(কেন) চিনে চিনিলি না, মা বলে এলিনা,
সন্তানের ডাকে কবে করি ঘৃণা ;
এসে থাকিতে পেরেছি ?
(ওরে) পাপী তাপী সবে, আমি যে এ ভবে,
মা নাম শিখাতে এসেছি।
(কালকেতুর ঈত)
ওমা, মােহে ম’জে মরেছি।
( ভুলে) আপনি মা আপনায় হারাইয়ে বসেছি ।
১৪৬
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
(চীর গীত।)
তুই যে রে বাপ নাড়িছেড়া ধন,
মাের লুকান রতন ;-
(কোলে.) ছিলি ভাল ছিলি, আপনা ভুলিলি,
মায় ভুলে তায় যত দাগা দিলি ;-
(তাের) মুখ দেখে সব ভুলেছি।
(কালকেতুর গীত।)
(আমি) ছি ছি কি পাতকী, অধম নারকী,
হেন মায় দাগা দিয়েছি।
(চীর গীত।)
ব্যথা পেয়ে বুকে চুপে চুপে সই,
হেঁকে কঁদিনি ত কই ;-
পাছে) ঝুরে আঁখিবারি, বাছারি আমারি,
অকল্যাণ ঘটে তাইরে নিবারি ;
ছাড়া পেয়ে ছেড়ে চলেছি।
(কালকেতুর গীত।)
ওমা, আর না ছাড়িব, পাছু পাছু যাব,
অনেক যাতনা সহেছি ।
{ সকলের প্রস্থান ।
তৃতীয় দৃশ্য। মা। ১৪৭ তৃতীয় দৃশ্য। চণ্ডি-মন্দিরের পুরােভাগ। (বিমলার মা ও ফুল্লরা উপস্থিত।) ফুল্ল। সই! সকলই যে ফুরাল! আশায় বেঁচে থাক্বার আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না যে! আশা করে নিরাশার শেল বুকে সওয়া, আমি সেই বালিকা বয়েস থেকে অভ্যেস করেছি—সে অভ্যেসে তত সই আর কোন ফল হােচ্চে ! আগেকার শেল যখনই যখনই বুকে বেজেছে, তার মুখ চেয়ে আমি তখনই তখনই তা সয়েছি। আজ আর তাে সইতে পাচ্ছি না সই অভাগিনী আমি, সে মুখ যে জন্মের মত হারিয়ে বসে আছি। আজ যে এ বুক সত্যি সত্যি ফেটে যেতে চাচ্ছে। প্রাণের ভেতর ঘাের অন্ধকার—কোন আশার ছবি আর যে ফুটে উঠছে না। সে শূন্য শ্মশানে কেবল মাঝে মাঝে ধূ ধূ শব্দে আশা ভরসার চিতা-বহি জলে জলে উঠছে! সই ? এই প্রাণের ভষ্মরাশি নিয়ে আর এক দণ্ডও যে বেঁচে থাকতে পাচ্ছি না! আমায় এতদিন বেঁচে থাক- বার এত উপায় বলেছিলি-আজ সই! তাের হাতে ধরি—আমায় ম'বার একটি উপায় বলে দে! বেঁচে জুড়তে পাইনি-ম’রে জুড়ই। বি-মা। ও সই! ও কি বলিস? মরণের পথে কি তোকে আমার একা যেতে দেব মনে করেছিস ? এক দিনে
১৪৮
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
এক কুঁড়ের ভেতর জন্মে—এক সঙ্গে খেলাধুলাে করে
দুঃখেসুখে তােতে আমাতে কাটিয়ে এসেছি। আজ
তুই বুকের রক্তপাত করে-সর্বস্ব হারিয়ে-নারীজন্ম
বৃথায় কাটিয়ে, এ সংসারের সংহারপীঠে আত্মবলিদান
দিতে যাচ্ছি—আমি কি রমণী হয়ে তােক একা যেতে
দিতে পারি ? এতে যে কোমলপ্ৰাণা রমণী-নামে কলঙ্ক
হবে সই। এতে যে রমণীর জীবনমরণের ভালবাসা আর
কেউ বলবে না সই! আমি তােরে নিয়েই সংসারী।
তাের সংসার ভেঙ্গেছে-আর আমি কে? তাের
সংসার ভেঙ্গেছি—আর আমি কি? চ’ সই! চ'।
মরণের পথে তাের সঙ্গে আমিও যাই চ'! দুই দুঃখিনীর
অশ্রুজল দু-জনে মুছিয়ে—দু-জনে দু-জনের গলা ধরাধরি
করে—দেবতা স্বামীর চরণ চিন্তা কত্তে কত্তেজ্বলন্ত
চিতার বুকে, আসন পাতিগে—চ’!
কুল্ল। আহা! সই! আমি অভাগিনী, আমারই সইবে, তুমি
কেন তােমার এ সােণার অঙ্গ আগুণে দেবে? আমি
মহাপাতকিনী-নিজে কেঁদে, পরকে কাদাতে-নিজে
জ্বলে, পরকে জ্বলাতে-এ ভারতে এসে জন্মেছি !
আমার মরণে সবাই জুড়বে, আর তুমি—তুমি যে, সই,
বিধবা ব্রহ্মচারিণী, লক্ষ গৃহস্থের আদরের নিধি, ভক্তির
প্রতিমা, মমতার সামগ্রী—তুমি ম'লে যে চারিদিকে
কান্নার বােল উঠবে-হা-হুতাশের ঝড় বইবে! তুমি
বেঁচে থাক, দশের উপকার কর, আমায় যেতে দাও!
আমার সকলই ফুরিয়েছে, আমা হ'তে আর কিছু হ’ল
তৃতীয় দৃশ্য।
মা।
১৪৯
না! আমার খেলাঘরের সংসার পাতা হল, ভেঙ্গে
গেল, খেলাধূলা যেন স্বপ্ন হয়ে রইল। আমায় একা
যেতে দাও। আমার সঙ্গে যেতে চেয়ে আর আমায়,
সই, বাধা দিও না !
বি-মা। ই-তাইতাে! আমি তাই যেতে দিলেম এতক্ষণ !
একলা যেতে দেব ব'লে প্রায় কি না দুজনে এতদিন
এক হয়ে রইলেম ? সুখের সময় পাশে থেকে, এ
দুঃখের সময়, তােমায় একলা না ছেড়ে দিলে মানাবে
কেন? তােমায় মরণের কোলে তুলে দিয়ে, আমি বেটী
জীয়ন্তে ম'রে থাকি আর কি ?
(বুলান ও সােমাই ওঝার প্রবেশ)
সােমাই। এই যে! এঁরা হেথায় রয়েছেন ।
বুলান। ঠাকুর। এর রয়েছেন বটে! কিন্তু ওদিকে দেছ
কি ? মাতৃপীঠ শূন্য যে! ওহাে! মা-হারা মাতৃভূমির
তাই আজ এ দুর্দশা-মা-হারা সন্তানদের তাই আজ এ
দারুণ অধঃপতন। মা আমাদের সাধ করে এ সােণার
সংসার সাজিয়েছিলেন, ধর্মরাজ্য স্থাপন করে দেবতার
মত দণ্ডধরের হাতে রাজদণ্ড দিয়ে, প্রজারূপী ধর্মভীরু
ছেলেপিলেদের কোলে নিয়ে, এই সােণার সংসার
সাজিয়েছিলেন! তা রইল কই ? কোথা থেকে পাপ
প্রেত এসে, মায়ের এমন সােণার সংসার ছারখার কল্লে,
ভেঙ্গে চুরে দিলে ! পাপের দুর্গন্ধে মা জননী আমাদের
ঘৃণায় ফেলে চলে গেলেন। ঠাকুর! মা গেছেন,
রাজা গেছেন, তাই আজ রাজ্যের এ দুর্দশা। দেশ
১৫০
মা ।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
পুরুষত্বহীন, একটা মাত্র পুরুষও আর জীবিত নাই,
পাপীর অস্ত্রে সবাই প্রাণ দেছে। রাজ্য বিধবায় পূর্ণ,
বিধবার বােদন ঐ শােন, ঐ শােন, মর্মভেদী নােল তুলে,
তারা দলে দলে রণস্থলে চিরচনা করে, মৃত স্বামীদের
সঙ্গে সহমরণে যাবার ব্যবস্থা কচ্চে। চোরের মত
লুকিয়ে লুকিয়ে এ দেখতে আর এ মহাশ্মশানে কি করে
থাকি? ঠাকুর! চল, সুমুখে নদী, দু-জনেই বৃদ্ধ,
মরণের পথে এগিয়ে বসে আছি—চল, ঐ নদীগর্ভেই
এ দুখানা ভগ্নতরী ভাসিয়ে দিয়ে যাই।
সো। তা চল, কিন্তু এ অভাগিনীদের কি হবে ?
বি-মা। আমাদের কি হবে, তা আর পুটঠাকুর, তােমাদের
ভাবতে হবে না ! আমরা হিন্দু বিধবা, স্বােয়ামীর
প্রাণের সঙ্গে প্রাণ দিয়ে তাে বসে আছি। তার পর,
এই শূন্য দেহখানাকে পুড়িয়ে ফেলতে আমরা কখনও
ডরাতে শিখিনি, জানিনা, তাতে জান পুটঠাকুর।
বিধবার মরা তাে বেঁচে যাওয়া গাে! অামাতে, আমার
সইতে এখনি চিতায় বসে নিজে হাতে আগুণ দিয়ে
হাসতে হাসতে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে অখন, দেখাে ;
আমাদের জন্যে তােমাদের কোন ভাবনা নেই।
সো। সেকি! আহাহা! তা কেন করবে, তােমারগেতা
কেন করবে
ফুল । জেঠা মশায় ! হতভাগিনী আমি, আমি আর কি
কবে? আমি তাে আর তাকে ফিরে পাব না! ফিরে
পাবার যে আর একটুও আশাকে মনে ঠাই দিতে পাচ্চি
তৃতীয় দৃশ্য। মা। ১৫১ ! মহাপাপিনী আমি, নিজ হাতে বিষ তুলে তাঁর মুখে দিয়েছি, ইচ্ছা করে নিজে তাকে সিংহের গহ্বরে ফেলে দিয়েছি। একেবারে হারিয়েছি, আর তাে ফিরে পাবনা! ফিরে পেলে, জেঠা মশায়, এবার কত সাধ করেছিলেম—কত আশা পুষেছিলেম! এবার ফিরে পেলে, মনে ছিল, তার পায়ে কাঁটা ফুটুলে দাঁত দিয়ে তুবব, তিনি যা ভাবেন তাই ভাববাে, যা করবেন তাই কব, যে পথে যাবেন সেই পথে যাবাে, নিজের নিজত্ব কিছু আর রাখবাে না। সব তাতে মিশিয়ে দেব, তার প্রাণে আর কখনও কোন ব্যথা দেব না; এ ছাই সংসা- রের মায়ায় মুগ্ধ করে রাখতে আর কখনও এগুবাে না! তিনি মাকে চিনেছেন, মার কোল নিয়েছেন। আমিও মার কোল চিনেছি, মার কোল নেব। ধনের দুঃখমাখা সুখ ফেলে, সম্পদের যাতনা-জড়িত থােয়াস্তি ফেলে, মনের নির্মল সুখ আর প্রাণের শান্তিময় স্বােয়াস্তি উপ- ভােগ করবাের পতিপত্নীতে নির্মল প্রাণে মার পূজায় দেহপাত করব! তা, তা আর হ’ল কই ? সে সাধ আমার মিটল কই? আমি যে, জেঠা মশায়, সৰ্বস্ব হারা হয়ে আজ নিজেকে পর্যন্ত হারিয়ে বসেছি! এখন কাল বই আর কে আমায় কোল দেবে। (মুরারী ও মুরারী-পত্নীর প্রবেশ।) মু-প। বল্ পােড়ারমুখাে বন্! আমার সঙ্গে সহমরণে যাবি কিনা ব! নইলে এখনি সেই ভড়, দত্তর দোরে যে কেঁদো
১৫২
[ পঞ্চম অঙ্ক।
দেব,
১;
বাঘটা পাহারা দিচ্ছে, তার মুখে তােকে ঠেলে ফেলে
বন্!
ওরে থা! কাউকে আর কারুর সঙ্গে সহমরণে যেতে
হবে না; থাম্, এরা এখানে রয়েছেন, এদের বলি ।
ওগো! রাজা ফিরেছে। আমাদের চণ্ডীমার স্বপনে নাকি
ভয় পেয়ে, কারাগারে এসে, আপন হাতে রাজা
সাজিয়ে, ঢাক ঢােল সঙ্গে দিয়ে, ভুয়ে রাজাদের দিয়ে
ছাতা ধরিয়ে, চামর দুলিয়ে কলিঙ্গের রাজা সহরের
সীমানায় আমাদের রাজা মশায়কে পৌঁছে দিয়ে
গেছে!
মু।
সো। কে বলে ?
বুলা। কই ?
বি-মা। কোথা গাে ?
। আঁ! আমার এমন দিন কি হবে ?
ওগো হ্যাগাে হা ! আমি স্বচক্ষে এই দেখে আছি ।
সাে! তুমি তােমারগে সহরের বাইরে কেমন করে গেলে?
তুমি তাে তােমারগে ভেঁড়াের ভয়ে সস্ত্রীক অন্দরমহলের
চোর কুটুরিতে লুকিয়ে ছিলে।
মু-প। শুধু তাই, সাঁই মশাই ঠাকুর ! আঁচল ঢেকে রাখি, তবে
কত্তার কাপুনি থামে।
মু। তাই তাে ঠিক ! জান সাইমশাই! কাপছি আর
জোরে জোরে নিখেস ফেছি, এমন সময় দেখি না
আমার শিবু ইয়ার এসে ইসারা করে ডাকলে! ডেকে
বল্লে –“ইয়ার! ভয় কি ? ভাড়, দাদা বেটার দলের
।
তৃতীয় দৃশ্য ।]
মা।
১৫৩
সক্লকার বাড়ির সদর দোরে চণ্ডিমা আমাদের বাধ,
ভালুক, সিঙ্গী, বরার দল সব ছেড়ে দিয়ে গেছেন, তারা
থাবা মেরে বােসে, দোর আটকে আছে ; কোন
ব্যাটাকে বাড়ি থেকে বেরুতে দিচ্ছে না ; অথচ রাহি
মানুষকে কিছু বলছে না। তাই দেখতে দেখতেই তাে
সহরের বার পর্যন্ত গেলুম! গিয়ে দেখি রাজা মশাই
হাজির! জান সাঁই মশাই! শুধু হাজির নয়! আরও
কত কি আশ্চর্য্য কাণ্ড হ’ল! মরা ফিরল।
সাে। সে কি রকম? তােমারগে, সে কি রকম?
মু। রকম ভাল, সঁই মশাই শােন না! এই লড়ায়ে যে সব
নদ মরেছিল, আর বাকি যাদের ভেঁড়াে দত্তের দল জবাই
করেছিল, দেশ শুদ্ধ, তাদের বাড়ীগুণে সব এক হয়ে
সারি সারি আগুণের কুণ্ডু কেটে সেই সময়ে সহমরণে
যাচ্ছিল। রাজা না তাই দেখে চক্ষের জলে ভেসে গিয়ে
“জয় মা জগদীশ্বরী” বলে ডাকতে লাগলেন—দেখতে
দেখতে এক পসলা বিষ্টি হয়ে গেল। সবাই বতে
লাগলাে “মা অমৃতকুণ্ডুর জল ছড়িয়ে দিলেন” অমনি যে
যেখানে ম'রে পড়ে ছিল, সব গা ঝাড়া দিয়ে দাড়িয়ে
উঠলাে ! একটা মহা কলরব পড়ে গেল, তার পর
বাজনাবাদ্যি কত্তে কত্তে রাজা এসে সহরে ঢুকে
ভেড়াের বাড়ির সানে দাঁড়ালেন দেখে, ছুটে এসে
মাগীকে দেখাতে নিয়ে যাচ্ছিলেম আর কি! ঠকনাড়ে
ভেঁড়ো ব্যাটার নাকালটা—বুঝলে—হয়ত এতক্ষণ হয়ে
গেল ! ঐ যে বাজনাবাদ্যি শােনা যাচ্চে। ঐ বুঝি
১৫৪
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
সব আচে ! হা করে আমার মুখপানে চেয়ে দেখছেন
কি ? কান পেতে শুনুন্ না!
( নেপথ্যে দূরে বাদধ্বনি।)
সােম। তাই তাে?
বুলান। সত্যিই তো!
বি-মা। ও সই। সত্যিই তাে ঐ বাজতেছে ।
ফুল্ল। সই! অভাগীর কপাল ! বিশ্বাসের সাহস কুলােয় না !
মা কি আমায় এমন দিন দেবেন? এ দিন পেলে যে
আমি তার কেনা দাসী হ’ব !
বুলা। ওগাে ঐ যে ! ব্রহ্মময়ী মা আমাদের ঐ যে ! ঐ যে
জননীর জাগ্রত মূর্তি জেগে উঠলাে! (মাতৃপীঠে মাতৃ
মূৰ্ত্তির আবির্ভাব।)
(নেপথ্যে নিকটে বাদ্যধ্বনির মধ্যে প্রজাগণ লইয়া সাধনা ও
সিদ্ভুিনাথের সহিত কালকেতুর প্রবেশ।) :
সাধনা, সিদ্ধি, কালকেতু। জয় মা জগদীশ্বরী।
সকলে। জয় মা জগদীশ্বরী
(গর্ধভ-বেশী ধূমকেতুর পৃষ্ঠে উল্টামুখে চাপিয়া জুতার মালা গলে,
মুণ্ডিতমস্তক ভাড় দত্ত ও উভয় পার্শ্বে শতমুখী হস্তে দূঘুখা ও
দুঃশীলার প্রবেশ। সম্মুখে ধূমকেতুর গলজ্জ, ধারণ করিয়া
রােস্তম ও পশ্চাতে শিবার প্রবেশ।) .
।
'। .
রােস্ত। আয় বেটা হারামখাের, চ'লে চলে আয় ! এ সহর
ছেড়িয়ে গায়ে গায়ে যাতি হবে তো? ( দড়ি আকর্ষণ)
শিবা। হাটু শালার গরু হাটু—থুড়ি-গাধা হাট! শালার
তৃতীয় দৃশ্য।
মা।
১৫৫
গাধা খাতি পার আর যাতি পার না? হাটু! (ছিপটি
মায়ণ )
দুঃশী। ওরে বুড়াে মড়া—তুই তাে চল্পি, আমার দশা কল্পি কি ?
ব—নইলে ঝেটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিয়ে, এখনি যেথা ইচ্ছা,
যার কাছে ইচ্ছা চলে যাব ।
দুমু। ওরে হতভাগা এক চকো! এই উলটো গাধায় চোড়ে
এখনও ওর দিকে ঢলে পড়ছি যে বড় ? ওতাে তােক
ছেড়ে দিচ্চে রে বেহায়া ! হিন্দুর মেয়ে, গেরস্তর মেয়ে
আমরা, স্বােয়ামীর বিপদে তাে আমরা কোমর বেঁধে
উঠি! তাই বলি, আমায় এ
বলি, আমায় এ সময় পাশে থেকে তাের
সেবা কর্তে দিবি কিনা বল ! নইলে ঝেটিয়ে বিষ ঝেড়ে
দিয়ে, এখনি আমার দলবল নিয়ে তাের পাছু পাছু ধাওয়া
ক'ৰ্বো। অন্য দেশে তােকে ভিক্ষে মেগে এনে খাওয়াব।
ভাড়। ওরে তােরা থা! খুড়ো! রক্ষা কর বাবা! এ পর্যন্ত
অনেক দোষ করিছি বটে কিন্তু বাবা জেনে করিনি।
অনেক পাপ করিছি বটে কিন্তু বাবা জ্ঞানে করিনি।
আপন অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে না পেরে ভড় থেকে
একেবারে দেওয়ানী নিয়ে ভুলের পর ভুল, ভুল শােধরাতে
গিয়ে আবার ভুল, একেবারে ভুলের রাজ্যে গিয়ে পােড়ে
ছিলেম বাবা! এ পাপের মাপ আছে। আমি ঐ জ্যান্ত
মায়ের পায়ে হাত দিয়ে মনে মনে বছি, পাপের
পায়ে দণ্ডবৎ! ও পথ দে আর যাব না! আমি যেমন
দপদোপে জ্বলন্ত আগুণ নিয়ে খেলা কর্তে গেলে, পুড়ে
কুড়ে ছাই হয়ে তার ঠিক সাজাই হয়েছে। মাগো।
মা
[ পঞ্চম অঙ্ক
",
খুড়াের ঘাড়ে ভর কোরে, এ যাত্রা মাপ করিয়ে, এ বুড়াে
হাবড় বেটাকে দিন কয়েকের জন্যে নিদেন আঁকড়ে
রেখে দে!
কাল। মার আইনে অনুতাপই পাপের প্রায়শ্চিত্ত! যাও,
ছাড়ান পেলে।
ভাঁ। আঃ বাঁচালে খুড়! ( উত্থানের চেষ্টা )
ধূ। ( ভড়কে ধরিয়া) বােনাই বাবু! নিজে বাঁচুলে এখন
আমায় বাঁচাও! উপুড় কোরে চোড়ে শিরভাড়াটি
ভেঙ্গেছো, এখন জুড়ে দাও! ( উভয়ের উত্থান)
রো। হুজুর, মুই তবে আসি গাে, সালাম ! এ দূগ্যি মায়ের
দেউলে, মুই মােসলমান, মাের থাহাড়া ভাল দেখায় না।
কাল। ভাই রােস্তম ! মুসলমান তাে হিন্দুর পর নয়, হিন্দুও
মুসলমানের পর নয় ; হিন্দুমুসলমান দুই ভাই ; হিন্দুর
ভালবাসা মুসলমানের আদরের, মুসলমানের ভালবাসা
হিন্দুর আদরের, এ ভালবাসা দেওয়া-পাওয়া যে উভয়েরই
চাই ভাই! তুমি হেথা না থাকলে আমি বড় বেদনা
পাব ! আর শােন, তােমাদের বলি, আমার মায়ের এই
ধৰ্ম্মরাজ্যে সবাই ঠিক খাটি হয়ে থেক, কারুর খাদ না
বেরােয়। খাদ বেরুলে আবার পুড়ে শুদ্ধ হতে হবে,
এটা যেন মনে থাকে—আমি পর্যন্ত ছাড়ান পাইনি,
এটা যেন মনে থাকে—আমায়ও পুড়ে শুদ্ধ হতে হয়েছে,
এটী যেন মনে থাকে।
ফুল্ল। প্রভু! আমি যে মহাপাতকিনী, আমার কি হবে ?
দেবতা তুমি, আমি যে তােমায় এতদিন চিনতে পারিনি
তৃতীয় দৃশ্য।]
মা।
১৫৭
প্রভু! বরাবর তােমার পায়ে অপরাধ ক'রে এসেছি ।
আমার কি হবে ?
কাল। ফুল্লরা! তুমি যে আমার আমিত্বের অর্ধেক, তুমি আমায়
চিনেছ, আমার অন্ধ পূর্ণ করেছ ! এখন মার কোলে
তুমি আমার সঙ্গে থাক! আমি কায়া, তুমি ছায়া—এক
হয়ে মায়ের কাজে এ রাজ্যের যেখানে যে আছে,সকলকে
এক করে, এক মনে, একসুরে, মহামায়ীর মহানাম
কীৰ্ত্তন কৰ্ত্তে কৰ্তে মহাপুজায় মত্ত হয়ে থাকি এস ! বল
সবাই “জয় মা জগদীশ্বরী ! সিদ্ধি দে!”
সক। জয় মা জগদীশ্বরি! সিদ্ধি দে ।
নেপ। (মন্দির হইতে) তথাস্তু !!!
সিদ্ধি। সাধকের সাধনা পূর্ণ-সাধনা তােমার জয় !
সাধ। সাধকের সিদ্ধিলাভ-সিদ্ধিনাথ-তােমার জয় ।
মন্দির হইতে দৈববাণী।
{সহমগিরি
সাধনা, সিদ্ধি, আয়রে !!
সিদ্ধ। ওই মায়েরই সাধনা ! মায়েরই জয়! জয় মা জগদী
শরি! যাই—( প্রস্তরে পরিবর্তিত হওন )
মন্দির হইতে পুনঃ দৈববাণী।
{সাইনআরে,
সাধনা, সিদ্ধি, আয়রে !!
সাধ। ঐ মায়েরই সিদ্ধি! মায়েরই ‘জয় ! জয় মা জগদীশ্বরী
যাই ( প্রস্তরে পরিবর্তিত হওন)
১৪
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক।
বুলা। একি হল ? মাগাে, এ কি কল্লি-সিদ্ধি দেখিয়ে তাের
এই প্রাচীন সাধকের সাধনাকে টেনে নিলি ? নে মা নে,
ইচ্ছাময়ী তুই, তাের ইচ্ছাই পূর্ণ হােক!
কাল। আহা মরি একি? আমার সাধের সাধনা-সিদ্ধি দুজনে
দুপাশে পাষাণ হ'য়ে গেল যে! আহা মরি ! কি মূর্তি!
পাষাণে যেন দুটী দেবদেবীর জ্বলন্ত মূৰ্ত্তি ফুটে উঠলাে।
থাক মা সাধনা! থাক ! আমার এই জাগ্রত দেবী-
পীঠে চিরদিনের তরে জাগ্রত থেকে সংসারকে মধুমাখা
মা নাম ডাতে শেখাও ! আর সিদ্ধিনাথ! দেব!
তােমার ওই শান্তগম্ভীর মূর্তিখানি চিরদিন সাধকের
প্রাণে শেষের সে শান্তিময় আশার উৎসাহ জাগ্রত রাখুক।
আর ওই জগজ্জননী মা আমাদের প্রাণ নি, পূজা নিন্,
সৰ্ব্বস্ব নিন্! সর্বস্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ঐ পায়ে মায়ের
থাকি! ওই মা নামই ডাকি-পাগল হয়ে ডাকি-সংসার
এসে পাগল হােক—সবার সঙ্গে ডাকি-“জয় মা
জগদীশ্বরি !”
সকলে। জয় মা জগদীশ্বরি !!
(কালকেতুর গীত।)
( শঙ্করাচাৰ্য্যকৃতদুর্গাষ্টকম্।)
নমস্তে শরণ্যে শিবে সানুকম্প
নমস্তে জগদ্ব্যাপিকে বিশ্বরূপে।
নমস্তে জগদ্বন্দ্যপদারবিন্দে
সকলে-নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে। ১।
তৃতীয় দৃশ্য।
মা।
১৫১
নমস্তে জগচ্চিন্ত্যমানস্বরূপে
নমস্তে মহাযােগিনি জ্ঞানরূপে।
নমস্তে সদানন্দনন্দস্বরূপে
সকলে—নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে । ২।
অনাথস্য দীনস্ত তৃষ্ণাতুরস্ক
ভয়ার্ত ভীতস্য বৃদ্ধস্য জ্বন্তোঃ।
ত্বমেকা গতিৰ্দেবি নিস্তারদাত্রি
সকলে নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে । ৩।
অরণ্যে রণে দারুণে শক্ৰমধ্যেই
নলে সাগরে প্রান্তরে রাজগেছে।
ত্বমেকা গতিৰ্দেবি নিস্তারহেতু
সকলে-নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।৪।
অপারে মহাদুস্তরেত্যন্ত ঘােরে
বিপৎসাগরে মজ্জতাং দেহভাজা
ত্বমেকা গতিৰ্দেবি নিস্তারনৌকা
সকলে-নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে। ৫।
নমণ্ডিকে দণ্ডদোর্দণ্ডলীলা-
সসৎখণ্ডিকাধগুনাশেষভীতে।
ত্বমেকা গতির্বিঘসন্দেহহন্ত্রী
সকলে-নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে। ৬।
মা।
[ পঞ্চম অঙ্ক
ত্বমেকা জিতারাধিতা সত্যবাদি-
নমেয়াজিতা ক্রোধনা ক্রোধ-নিষ্ঠা।
ইড়া পিঙ্গলা ত্বং সুষুম্না চ নাড়া
সকলে-নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে। ৭।
নমাে দেবি দুর্গে শিবে ভীমনাদে
সরস্বত্যরুন্ধত্যমােঘস্বরূপে
বিভূতিঃ সতী কালরাত্রিঃ শচী তৃং
সকলে-নমস্তে জগত্তারিনি ত্রাহি দুর্গে ॥ ৮ |”
যবনিকা পতন।
No text on this page.
No text on this page.