Bally Sadharan Granthagar

Taranga

Bandhopaddhay, Digindra Chandra · 2009/10/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

a
শ্রীদিগিন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
s8
২৯, বাড়বাগান রাে, কলিকাতা

রচনাকাল
শাই ১৯৪৮
দুই চাকা
®ে
पुस्तकालय
লেখক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
২৯, বাদুড় বাগান রো, কলিকাতা থেকে ডি, সি, ব্যানালি কতৃক এশিত
এবং স্ত্রীপতি প্রেস, ১৪, ডি, এল, রায় স্টীট, কলিকাতা থেকে বিভূতিভূষণ বিশাস
কতৃক মুদ্রিত। “পিপলস এজ পত্রিকায় প্রকাশিত চিত্তপ্রসাদের একখানি ছবি
বলম্বনে এলট অঙ্কিত হয়েছে।

নিবেদন পূর্ববঙ্গের পটভূমিতে এই নাটক রচিত বলে ঐ লােরে মুখে পূর্ববঙ্গের ভাষাই দিতে হল। তবে সমগ্ৰ নাটকে,অফিক সংলাপ ব্যবহারে অভিনয়কালে একটু রসভঙ্গ হতে পারে এই ভেবে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মুখে পশ্চিমবঙ্গের চলতি সংলাপ দিলাম। এই মুড়িমুড়কির সংমিশ্রণ খেতে বােধ হয় সুস্বাদুই হবে। সঙ্গতি রক্ষার জন্যে অভিনয়ের সময় বিশুদ্ধ পশ্চিমবঙ্গীয় উচ্চারণ না করে সংলাপে সামান্য পূর্ববঙ্গীয় সুর দিতে পারলে ভাল হবে। পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের মফঃস্বলে অভিনয়কালে কিঞ্চিৎ শ্রম স্বীকার করে পূর্ববঙ্গের সংলাপকে স্থানীয় গ্রাম্য সংলাপে রূপান্তরিত করে নিলে অভিনয় বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। থিয়েটারের বাঁধা স্টেজে অথবা যাত্রার খােলা আসরে দুভাবেই এই নাটকের অভিনয় করা সম্ভব। অঙ্কিত দৃশ্যপটের পরিবর্তে পটভূমিকায় প্রতীক ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। এই নাটক রচনায় বহু সুহৃদের কাছ থেকেই উৎসাহ ও পবামর্শ পেয়েছি। তন্মধ্যে বিশেষভাবে পূর্ববঙ্গের সংলাপ সংশােধনে বন্ধুর অনাদিনাথ পাল, নাটকের মঞ্চ-সম্ভাবনা সম্পর্কে শ্রীযুক্ত সত্য রায়, নাটকের আঙ্গিক বিচারে সহকর্মী মৃগাঙ্ক ঘােষ এবং নাটকের সাহিত্য বিচারে অধ্যাপক ডক্টর সুধাংশুকুমার সেনগুপ্ত পরামর্শ দিয়ে আমাকে যথেষ্ট উপকৃত করেছেন। প্রবাসীর সহ-সম্পাদক শ্ৰীযুক্ত নলিনীকুমার ভদ্র, নবীন নাট্যকার যুক্ত মন্মথকুমার চৌধুরী, তরুণ কথাশিল্পী ধীরেন রায় ও মৃণাল সেন এই নাটক সম্পর্কে আমাকে যেভাবে উৎসাহিত করেছেন তাতে তাদের কথাও স্বতঃই এই প্রসঙ্গে মনে উদিত হয়। অবশেষে আমার সহধর্মিণী সবিতা দেবী দিনের পর দিন ধৈর্যের সহিত প্রতিটি দৃশ্য শুনে এবং প্রয়ােজনক্ষেত্রে চরিত্র সৃষ্টি সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে আমাকে নাট্যরচনায় যেভাবে প্রেরণা যুগিয়েছেন তাতে তার ঋণ স্বীকার না করলে অকৃতজ্ঞ থেকে যাব। এদের সকলের শুভেচ্ছা ও সহযােগিতায় পরিপুষ্ট আমার এই নাট্যপ্রচেষ্টা লােককে আনন্দদানে সক্ষম হ'লে নিজেকে ধন্য মনে করব। ইতি হুকার চরিত্রপরিচয় ০ ০০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০০৫ ০ ০ ০ শশী ঘােষ বৃদ্ধ কংগ্রেসী নেতা অমর শশীবাবুর ছেলে নিখিল ••• অমরের বয় বিপিন ঘােষ তালুকদার, ইউনিয়ন বাের্ডের প্রেসিডেন্ট গােপাল কাঠের মিস্ত্রী নন্দ পােপালের ছেলে ফেলু গােপালের প্রতিবেশী রজ্জব ব্যাপারী মুসলমান জোতদার মাইনুদ্দীন গ্রামের কৃষক শেরালী ঐ মহীউদ্দীন জাতীয়তাবাদী মুসলমান যুবক চেক আলী দফাদার গগন চৌকিদার ইউনিয়ন বাের্ডের কেরাণী নিবেদিতা শশীবাবুর বিধবা বােন বেলা শশীবাবুর পৌত্রী মঞ্জরী গােপালের মেয়ে সার্কেল অফিসার, দারােগা, হিন্দু ও মুসলমান গ্রামবাসিগণ, মহিলাগণ, কনেস্টবল ও সশস্ত্র পুলিশগণ, দেশী ও গােরা সৈন্যগণ প্রভৃতি। ০ ০ ০ ০ ০ ০ বঙ্গ চক্রবর্তী ০ ০ ০

মা, ছােটবেলা গ্রাম্য জীবন নিয়ে নাটক লিখে যখন গ্রামে
অভিনয় করতাম তখন তােমার দু'নয়ন থেকে আনন্দ
ঝরে পড়ত। আমার খেলা-সঙ্গীদের কত আবদার তুমি
সেদিন নীরবে হাসিমুখে সহ্য করতে। তাই আজ ব্যক্তি
ভারাক্রান্ত হয়ে আমার এই রচনা তােমারই চরপােশ
উৎসর্গ করলাম।

No text on this page.

তরল প্রথম প্রথম দৃশ্য [ গােপাল মণ্ডল কাঠের মিত্রী-জাতে না। মােজ হিসেবে কাজ করে জীবিকা অর্জন করে, কায়ক্লেশে সংসার চালায়। বয়েস পাশের কিছু কম। চুল আধাআধি কঁচাপাকা। গায়ে একটা গেঞ্জী, পণে একগালি হােট কাপড়। কাপড়টা প্রায় হাঁটুর ওপর উঠেছে। কর্মঠ চেহারা। উপুড় হয়ে একথানি হােট করাত দিয়ে এক টুকরাে কাঠ চিরছে। যন্ত্রপাতি ভরা একটা কাঠের বাক্স পাশেই পড়ে আছে আর রয়েছে খানকয়েক কাঠের টুকরাে। পেছনে দেখা যাচ্ছে খড়ের ঘরের দাওয়া। অবিবাহিত যুবতী কন্যা মঞ্জরীর প্রবেণ] মঞ্জরী। বাবা, বাবা, ভুঞা বাড়ীর মাইজা ছেইলারে পুলিশে ধইরা নইয়া গেল। গােপাল। [ মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে ] ধইরা নইয়া গেল। কে কইল ত’রে ? মঞ্জরী। আমাগ বাড়ীর পিছনের সড়ক দিয়াই ত নইয়া গেল। আমি ঘাটে বাসন মাজতেছিলাম। ছয় সাতটা পুলিশ আর একজন দারগা। দেইখা ডরে মরি। [ গােপাল আবার করাত চালাতে থাকে) গােপাল। তা ত’র ডর কি? আমরা গরীব নােক খাইটা খাই... নে, এটু, তামুক নাগাছে। [মঞ্জরী কৰুেটা নিয়ে বাড়ীর ভেতর চলে যায়। প্রবেশ করে মুসলমান যুবক মহীউলী। তার বাবা একজন গরীব কৃষক। মহীউদ্দীন খাম্য পাঠশালা থেকে নিয় প্রাথমিক পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিল, কিন্তু বাপ গরীব হওয়ায় হাই স্কুলে ভর্তি হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। চাষ বাসের কাজে বাপকে তার সাহায্য করতে হয়; কিন্তু ইংরেজী শিক্ষার দিকে তার বড় ঝোক। ছােটবেলা তার মনে প্রবল আকাকা ছিল একদিন সে হাকিম হবে। আমের ঘােড়ীয় ছেলেদের সঙ্গে তার খুব ভাৰ-বিশেষ করে অমরের সঙ্গে। অৱকে আয় পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।

মহী। মোরে আর পুলিশ ধইরা লইয়া গেল মিরীকাকা।
গােপাল। শুনলাম, মথ, “আমাৰ থল কইতে পার?
মহী। দোগ ঢেকিরে নাকি সােরা আর কি কতকগুলি
জিনিস পাওয়া গেছে।
গােপাল। [কপালে তুলে]কও কি।
শহী। শুনলাম ত এই রকমই। আমার কিন্তু সৰ অয় এই ব্যাপারে
আর কারাে চালাকি আছে।
গােপাল। চালাকি। চালাকি আবার থাকব কার ?
[উলীল গােপালের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে কি
তা অইতে পারে, তা অইতে পারে। তুমি অয়ত অনুমান ঠিকই
করছ মহী।
মহী। দোস্তর উপর বড় ভুঞার জবর রাগ।
গােপাল। বড় ভুঞার কতা আর কও ক্যান্। সেইদিন গাইটা
আমার দড়ি ছিড়া বড় ভুঞার কালাই ক্ষেতে গেল—চাকর দিয়া
তিনি গাইটারে খােয়াডে পাঠাইলেন। আমি গিয়া কত কাকতি-
মিনতি কল্লাম, তার যদি একটু দয়া অইল। পাচ সিকার পয়সা
দণ্ড দিয়া তবে আমি গাইটারে খালাস কইরা আনি।
মহী। ঐ রকমই। বাজারে ভােলা আদায়ের লেইগা কি বডভুঞা
কম জুলুম কবেন ? গগন চকিদার আর চেরাক আলী দফাদার
ত য্যা দুইটা যমের দূত—চাষীর কাছে ভাল জিনিস দেখলেই
চিলের মতন ছছা মাইরা নেয়।
গােপাল। তা মালিকের ভােলা না দিয়া উপায় কি?
মহী। মালিক আছে খাজনা নিব, কিন্তু তােলার নাম কইরা যে
খাজনার চাইর গুণ আদায় অয়। তা আবার বড় ভুঞা ইউনিয়ন
বাের্ডের প্রেসিডেন্ট, তােল তােলান চকিদার-দফাদাব দিয়া।
গােপাল। তাতেই ত সুবিদা, কারাে কিছু কইবার জো থাকে না।
মহী। সেইদিন বাজারের মধ্যে দোস্তর লগে বড় ভুঞার খুৰু
খেচাখেচি।
গােপাল। কি নইয়া?

( এ প্রথম ফ মহী। মাইনুদ্দীন চাচার একটা বড় তরমুজ তোলা ৰাৰ দফায় নিতে চাইলে সে তাতে আপত্য করে। বড় ভূঞ তখন দুইটা আইসা মাইনুদ্দীন চাচারে ধমকাইতে থাকেন। দোস্ত কি বলতে গেছিল—বড় ভুঞা তাতে রাইগা আগুন। গােপাল। তা ত রাগবই।•••ম, ম! কল্কি নইয়া যে মাইয়া ভিতরে গেল আর আসনের নাম নাই। [ নেপথ্যে বহু করে নি, 'যশোেতর আঙ্গা । আৰুষ, তার মাতা অয়, দেশের তরে মরতে হবে-ফাসী কাষ্ঠে ঝুলতে হবে- ইত্যাদি। গােপাল ও মহীউলীন গলা বাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে, কারা ধ্বনি দিচ্ছে। মহী। ইস্কুলের ছাত্ররা মিছিল কইরা যাইতেছে। তােমার নারেও য্যা দেখতেছি মিস্তরীকাকা। গােপাল। অর কতা আর কইও না—সবখানেই আছে। বাড়ীতে থাকে কতক্ষণ। মিস্তরীর পােলা—তার কি আর কাপড়া অইব। সময় নাই গময় নাই, ক্যাবল নাটুর মত গুইরা বেড়ায়।•••দ্যাখ, মাইয়ার কাণ্ড দ্যাখ! মঞ্জু, মঞ্জু। মঞ্জরী। [ অন্তরীক্ষে ] ক্যান্ বাবা। গােপাল। ক্যান্ বাবা! তরে তামুক নাগাইতে কইলাম না । [ মঞ্জরী সলজ্জভাবে এবং অধোবদনে দাড়াল। গোপালের কাঠ চেরা শেষ হয়ে গেছে। রাতটা মাটিতে রেখে চেরা কাঠ দুটোকে হাতে নিয়ে একবার ঠকঠক করে ঠুকল। তারপর মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বলল ] ও! তামুকের ডিবা বুজি? তা এতক্ষণ কস নাই ক্যান? মহীর কাছে নজ্জামহী, বাবা তামুক ছাড়া ত থাকতে পারি না। গেল আটে দুইটা নাঙ্গল নইয়া গেলাম, একটা জলের দরে বেচতে অইল আর একটা নইয়া ফিরা আইলাম। কাজকয়ে তেমন জুৎ নাই•••••একটু তামুক যে খামু মহী। তামুক পাঠাইয়া দিমুনে।•••আইচ্ছা উঠি। মনটা ভাল লাগতেছে না। গােপাল। দ্যাখ, ছাইড়াও দিতে পারে। প্রবেশ । না কাকা, পুলিশে খয়ে সহজে ছাড়ে। কতায় কয়, ৰাৰে ইলে আঠার ঘা। [মীজীনের এস্থান) গােপাল। ক্যাবল তামুকের ডিবাই থালিনা হাড়িও? মরী। কাইল ত মাত্র তিন পােয়া চাউল আনছিলা। গােপাল। ও, তা অইলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারও পূর্ণ। তা কইতে অয়। [ উইংসের কাছে গিয়ে মহী, মহী, ও মহী।•••[ অন্তরীক্ষে রাগত কণ্ঠস্বর, আমারে ডাকছেন’?] হ, হ। তােমারেই। শুইনা যাও। [ মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে ] বরাত য্যামন করছি। খাটি ত আর কম —তবু য্যান আউগায় না। আইজ বিয়ানে বুজি কিছুই জোটে নাই মা ? য্যামন কপাল নইয়া আইছসনা অইলে এই বয়সে ত’গ’ মা মরব ক্যান! [ মহীউদ্দীনের পুনঃ প্রবেশ ] আইছ ? মা আমার নজ্জায় মুখ ফুইটা কইতে পারে নাই। স্যার দুই চাউলের কাম চালাইয়া দিতে পার ? ব্যাপারী বাড়ীর নৌকা ম্যারামত কল্লাম, তার মজরীটা আইজও পাইলাম না। কি যে টানাটানিতে পড়ছি:•• মহী। আইচ্ছা, তার লেইগা কি আর ঠেইকা থাকব। [ মহীউদ্দীনের স্থান ] গােপাল। মহীর মতন পােলা কমই দেখা যায়। ও যদি মুসলমান অইয়া ইন্দু অইত••• [ গগন চৌকিদারের প্রবেশ। গগনকে দেখে মঞ্জরীর বিদ্যুৎবেগে প্রস্থান। প্রস্থানরত মঞ্জয়ীকে গগনের অপলক দৃষ্টিতে অবতােক, পরে মুখে মৃদু হাসি। গােপাল কর্মরত ] বস, গগন বস। গেছিলা কৈ? গগন। বড়ভুঞা ডাইকা পাঠাইছিলেন গেছিলাম তেনারৈ কাছে। গােপাল। ও!•••আইচ্ছ, ছােট ভুঞা ত সেইদিন জেল থেইকা বাইরইল। ভাশে গােলমালও কিছু নাই। এই সময় আবার অমররে পুলিশে ধল্প ক্যান কও ত? গগন। ক্যান্ ধল্প কি কইরা কমু মণ্ডলধুড়া। এই বাবুগ ধইরা নেয়—আবার এই বাবুগ ছাইড়া দেয়—সরকারের য্যামন মর্জি। গােপাল। সরকারের মর্জিনা আর কারাে কারসাজি ?

২ প্রথম অথম দৃ] গগন। কাজি। গগন বুঝবার ভান করে, গােপালের মুখের দিকে বিলিতভাবে চেয়ে থাকে। গােপাল। অবাক অইও না। আইচ্ছা, সত্য কইরা কও তাে গগন, এর মধ্যে বড় ভুঞা আছেন কিনা ? গগন। বড় ভুঞা ! তুমি কও কি মণ্ডলখুড়া ! গােপাল। তা না অইলে অমর কি পাগল অইছে যে গলকলােরা সে ঢেকিঘরে রাখতে যাইব! দ্যাখ, সরিকানা বিবাদ সব সংসারেই থাকে, তা বইলা শত্রুতা উদ্ধারের জন্য কি ক্যাও ঘরের ছেইলারে পুলিশের আতে সইপা দেয়। গগন। [ মুখে একটু আতঙ্কের ছাপ। অপ্রস্তুত ক]ে তা আমি কি ক মণ্ডলখুড়া। প্যাটের দায়ে চাকরি করি। তােমার মত আতের কাজ জানলে বা একটু খ্যাতখামার থাকলে আর দশ টাকা মায়নায় এই গােলামী কত্তাম না। রাত্রে পাহারা দিতে বাইরই পােলাটারে দীয় মাজির বাড়ী রাইখা, নাইলে তারে জাখে কে? ঘরে মাইয়া ছাইলা না থাকলে যে কি কষ্ট... গােপাল। তােমারে ছাইড়া পােলা থাকতে পারে? গগন। দুঃখের কতা আর কও ক্যান্ মণ্ডলখুড়া। গেল রবিবার থানায় গেলাম আজিরা দিতে—এক রবিবারও ত না গেলে উপায় নাই-পােলাটারে রাইখা গেলাম দীর বউর কাছে। ফিরতে একটু রাইত অইল। মাঠের মধ্যে আইসাই শুনি পােলাটার চিৎকার। পরাণটা ছ্যাৎ কইরা উঠল। দৌড়াইয়া আইসা বুকে নইলাম। বুকে মাতা গুইজা সে কি ফোপাইয়া ফোপাইয়া কালন। গােপাল। দুদের স্বাদ কি গােলে মিটে। গগন। আর কও ক্যান? মা-মরা পােলা, মার নেইগাই তার পরাণ পােড়ে। মার অভাব কি বাপে মিটাইতে পারে মণ্ডলখুড়া••• গােপাল। তা আবার একটা বিয়া কল্লেও ত পার? গগন। আমারে মাইয়া দিব কে? গােপাল। ক্যান?

গগন। গরীবেরে ক্যাও মাইয়া দেয়।•••সেইদিন সােলাই মণ্ডল কইতেছিল তােমার মধুর কতা। সেও ত ভাইর অইল। গােপাল। তা তাে অইছেই; কিন্তু কি করি। বিয়া যে দিয়, টাকাকড়ি কৈ ? গগন। [ সলজ্জভাবে ] টাকার নেইগা কি আর ঠেইকা থাকব। কতই আর নাগব। তিন কুড়ি, না অইলে চাইর কুড়ি? তা কি দেওন যায় না। কিন্তু তুমি ত রাজী অইবা না•••••• গােপাল। আমি অরাজী অমু ক্যান্। গগন। তবে তাে এই মাসেই অইতে পারে। গােপাল। আইচ্ছা ভাইবা দেখি। গগন। এর মধ্যে ভাবাবি কি আছে মণ্ডলখুড়া•••মঙুবে যদি আমার আতে দেই তার কি আর অযত্ন অইব? গােপাল। তা অইব ক্যান্। আইচ্ছা দেখি, মহী কি কয়। গগন। [ একটু রাগতভাবে ] মহী! মহী আবার কইব কি? সে তােমার কুটুম, না গেয়াতি! গােপাল। কুটুমও না, গেয়াতিও না। সময়-অসময়ে সাহায্য করে ভালমন্দ সব কাজেই তার পরামর্শ নই। গগন। হ! সে যদি না করে ? গােপাল। [ মৃদু হেসে] না করব ক্যান! গগন। ধর না, যদি না-ই করে ? গােপাল। ভাইবা দেখুম। গগন। ভাইবা দ্যাখবা?...তােমার মাতা খারাপ অইছে মণ্ডলধুড়া, তােমার মাতা খারাপ অইছে। যা কইলা কইলা আমার কাছেই কইলা, আর কারাে কাছে কইও না। নােকে তােমারে পাগল কই—মুখে গু তুইলা দিবা বল করব। ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! [ বেগে এনােয়ত ও মার বেশ নন। চকিদার দাদা, যাও ক্যান? শােন, শােন একটা কতা। গগন। [ মাগতভাবে }ক কি কবি। নন। চকিদারী তােমার ছাইড়া দিতে অইব। গগন। চকিদারী ছাঙ্গে খায় কি? না। মানুষের বাড়ী কামলা খাইটা খাই।

[ এখন আর
গগন। ই যখন টাকাইত নােক অৰি তখন তার বাড়ী কামলা
খাইটা খামু।
নন্দ। মশকরার কতা না। চাকরি না ছাৰে গেরামের বেবাক
নােক তােমারে একইরা করব। জান, আইজ সভায় কি ঠিক
অইল?
গগন। কা’গ সভায় ?
না। আমাগ ছাত্ৰগ সভায়।
গগন। কি ঠিক অইল ?
নন। বাজারে ভােলা বল করণ নাগব।
গগন। [ শ্লেষের হাসি হেসে ] কবে থেইকা ?
নন্দ। আ’সনের কতা না। দেইখ কি অয়।
গগন কি আর অইব—অইব আ’তির পাচ পাও! অমরবাবু বুজি
ইস্কুলে ত’গ’ এই সবই শিখাইত! বড় ভুঞা ত মিত্যা কয় না•••
গােপাল। পােলাপানের কতা ধর ক্যান!
গগন। পােলাপান! কতগুলি বুজি পােলাপানের মত !•••
আচ্ছা
আসি মণ্ডলখুড়া। পােলারে তুমি ভাল কইরা দ্যাকাপড়া শিখাইও,
কালেদিনে ও দারগা অইব।
[পগনের প্রাণ। কাজ ফেলে রেখে এসে গােপাল নাম পালে
এক চড় বসিয়ে দিল।
গােপাল। তুমি পােলাপান, পােলাপানের মত থাকবা। তােমার
মুখে বড় বড় কতা ক্যান্। দিন দিন জ্যাটা অইয়া উঠতেছে।
[ চড় খেয়ে নল শক্ত হয়ে হিভাবে বাড়িয়ে রইল। গােপালের রাগ
তাতে আগে বেড়ে গেল। মলয় কান ধরে টানতে টানতে]
যা, আমার সামনে থেইকা যা। যা আমি ভালবাসি তাই
হারামজাদা করব। যত বড় মুখ না তার তত বড় কতা ••••••
কামরে টানতে টানতে মন্দকে নিয়ে গােপালের প্রদান। শর্ম

প্রথম অদ্বিতীয় দৃশ্য
ডিস্টি বাের্ডের মায়ার উপর ইউনিয়ন বাের্ডের অফিস সামনে
বানা। তিনে বড় ভূঞা বিপিন ঘােষ ও কেরাণী যা চর্তী বসে
ইউনিয়ন বাের্ড সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখছেন। পাশে মাটিতে বসে আছে
গগন চোদায়। কালো পেটাতে পেটাতে নল বেশ।
নল। আইজ থেইকা এই বাজারে ভােলা বন্দ।
ভােলা দিবা না। বাজারে ভােলা বন্দ-কব-অ••••••[ চীৎকার করে
বলতে থাকবে।
[জ চক্রবর্তী ও গগন চৌকিদার বেরিয়ে এল
ৰ। এই ছোঁড়া চুপ কর।
মল। [ আরো টেচিয়ে] বাজারে ভােলা বন্দ কর।
বঙ্গ। চুপ কর। ভােলা বন্ধ করাবে ধন। ওষুধ আছেন ভেতরেই।
নল। [নার নেতারা পিটিয়ে] ভােলা বল কব-অ। বাজারে-এ-এ
তােলা বন কর••••••
[ভিতর থেকে বিপিন যে বেরিয়ে এসে বারান্দায় ভাল। না
তাকে দেখে তারে চেচিয়ে বলতে লাগলাে ।"
বিপিন। এই উল্লুক, চুপ করলি।
নল। কোনো পিটিয়ে বাজারে ভােলা বন কর।
বিপিন। রসসা, বন্ধ করাচ্ছি।
হাত দিয়ে নয় কান ধরে বিপিনবাবু ডান হাতে তার গালে করে
এক চড় মারল এবং হাত থেকে কানের ও বাবার কাটা
ছুড়ে ফেলে দিল।
কেমন, ভােলা বন্ধ হয়েছে ? বাঁদরামাে করতে এয়েছে এখানে।
বঙ্গ। ওর কি দোষ কত্তা। এসব তত ছােট ভুঞারই কারসাজি।
তা নইলে এই এক রত্তি ছেলে-তেঁতুল তলা দিয়ে গেলে যার মুখে
দই জমেসে আসে কোন সাহসে এখানে ভােলা বন্ধের ঢােল
দিতে—আর কিনা আপনার মুখের উপর ।
“দেখে শুনে থালা লাগে,
বাইশ মণ শােহা বিড়ালে হাগে।”
বিপিন। এই হেড়া, তােকে এই ঢোল দিতে বলেছে কে?

[ প্রথম অংশবিতীয় দৃশ্য। নক্ষ। হােট ভুঞা। বঙ্গ। এই দেখুন ঠিক বলেছি কি না। আরে বল চক্কোতির অজুমান কি কখনাে মিথ্যে হয়। বিপিন। [আগে কাপতে কাপতে ] ছােট ভুঞা ! হােট ভুঞা তােমায় ঘরে আগুন দিতে বললে তাই দেবে। নন্দ। বারে তা ক্যা দিমু! বিপিন। জ্যাঠামি দ্যাখ। মুখে মুখে কথা। [ আয়েক চড় মেয়ে] হাঁ রে গগন, ওর বাপ গােপাল তাে কোন দিনই এমন বেয়াদপ ছিল না। চিরদিন আমাদের সামনে মাটির দিকে চেয়েই কথা বলেছে। এটা এল কোথেকে। বঙ্গ। এটা হয়েছে মুনির ঘরে শনি। বংশের এক একটা কুলাঙ্গার বিপিন। তাইতাে দেখছি। বঙ্গ। কি আর দেখেছেন- বিপিন। [ গগনকে] তুই নিয়ে যা তো ছোঁড়াটাকে ধরে গােপালের কাছে। তাকে বলিস ছেলে সামলাতে। ৰ। আর-বলিস, জলে থেকে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ ভাল নয়। বিপিন তার মানে ? বঙ্গ। মানে আজ্ঞেrঐ গােপালও ছােট ভুঞার একটু বেশি অনুগত কিনা। বিপিন। গােপালও কি এসবের মধ্যে••••••? বঙ্গ। আজ্ঞে না, তা বলছিনে। তবে জানেন তাে—এগুলি আৰ ছোঁয়াচে রােগের মত••• বিপিন। রােগের তত ওষুধও আছে। বঙ্গ। আজ্ঞে, তা আছে বই কি, তা আছে বই কি। বিপিন। গগন, যা না ছোঁড়াটাকে নিয়ে••••• [ গগন এগিয়ে যেতেই নন্দ রেগে উঠল নন্দ। গায় আত দিও না কইলাম চকিদার দাদা। আমিই যাইতেছি। নম্বর দ্রুত বেগে এখান। ৰ। ই! আতুরের গন্ধ যায়নি তার তেজ দ্যাখ।

গালে কিসার, মাটি দেশ ব্যাপার এলে। বিপিন। আসুন, আসুন। ভেবেছিলাম গেল হপ্তায়ই আসবেন। সা-অফিসার। তা না করে এ হথায় এসে আপনাকে অপ্রস্তুত করলাম নাকি? বিপিন। না না, অপ্রস্তুত আর কি। তা এসে ভালই করেছেন। অনেকগুলি বিষয়ে আপনার কাছে পরামর্শ নেওয়া দরকার হয়ে পড়েছে। সা-অফিসার। আমার জন্যেই পথ চেয়ে ছিলেন দেখছি [ মৃদু হাস্য]। বিপিন। অনেকটা তাই বটে। ঘরেই বসবেন? না যেরকম গরুম-বাইরে ? সা-অফিসার। মন্দ কি—বাইরেই বসা যাক না। [ তৌকিদার ও দফাদার ঘর থেকে খান কয়েক চেয়ার, একটা টেবিল একখানি বেঞ্চি বাইরে এনে পাতল। সকলে যথাযােগ্য আসনে বসল ] তারপর বলুন, এদিককার কি খবর? বিপিন। খবর মােটামুটি ভালই। তবে একদল শােক একটা গােলমাল পাকার ফিকিরে আছে। সা-অফিসার। কারা ? বিপিন। এই সব ছােট লােকের দল। মগজ বলে তাে কোন বস্তু নেই ওদের। পরের কথায় নাচে। সা-অফিসার। নাচছে কি নিয়ে? বঙ্গ। সবাই মিলে নাকি বাজারে ভােলা বন্ধ করবে সার। সা-অফিসার। এদের চালাচ্ছে কে? বঙ্গ। তা ঠিক বলতে পাচ্ছিনে, তবে ছােট ভূঞার উস্কানি আছে। সা-অফিসার। শশীকান্তবাবুর ? বঙ্গ। ই সার। সা-অফিসার। তাতে তাে তারও লােকন। বাজারের তিনিও তাে একজন মালিক। বঙ্গ। লােকসানের চাইতে লাভই হৰে বেশি সার; কারণ এই পুরােগাে বাজারটা ভেসে গেলে ঐ পাশের জমিতে তিনি একটা ( প্রথম আবিতীয় মৃ} বাজার বসাতে পারবেন। বাৰে সনিকের বাজার থেকে কতই বা লাভ হয়। বিপিন। সে জছেই শশীকাকা সবার কাছে গেয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর ছেলে অমরকে আমিই পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি। রজ্জব। আমাদের পাড়ায়ও কিন্তু এই রকমই কানাঘুষা। বিপিন। কেবল কানাঘুষা নয় ব্যাপারী সাহেব, লােকে এটাকে সত্য বলেই বিশ্বাস কচ্ছে। গােপাল মিশুরী তাে গগনের মুখের ওপরই স্পষ্ট একথা বলে দিয়েছে। সা-অফিসার। কিরে, তাই নাকি? গগন। হ হুজুর। চেরাক। মাইনুদ্দীন মিঞাও আমারে সেই কই কইল। সা-অফিসার। ই, আগুনটা তা হলে আর তুষানল নয়, দাবানলের মতই ছড়িয়ে পড়েছে। আপনাদের মুসলমান পাড়ায়ও এ নিয়ে খুব জটলা চলেছে, না ব্যাপারী সাহেব ? রজ্জব। আমার বাড়ীতেই কাল একটা জমায়ৎ ডাকা হয়েছে। সা-অফিসার। কাদের জমায়। মুসলমানদের ? রজ্জব। না, হিন্দুরাও আসবে। সা-অফিসার। হঠাৎ আপনার বাড়ীতে। রজ্জব। ভােলা বন্ধ আন্দোলনে গ্রামবাসীরা আমাকেও জড়াতে চায়। সা-অফিসার। জড়িয়ে পড়ুন না। রজ্জব। না পড়েই বা উপায় কি। ভােলা যখন মুছলমানেরাও দেয় তখন এর বিরুদ্ধে যাওয়া•••••• বিপিন। আপনি কেবল স্বজাতির কথাই ভাবছেন ব্যাপারী সাহেব। কিন্তু এই ভােলা বন্ধ আন্দোলনের পরিণতির কথা একবার ভেবে দেখেছেন? সা-অফিসার। ভেবে দেখেছেন বলেই ত উনি এতেযােগ দিতে ইচ্ছুক। রজ্জব। আপনিই বলুন, জাতির বিরুদ্ধে যাওয়া কি ভাল? সা-অফিসার। নিশ্চয়ই নয়, তা যাবেন কেন। বিপিন। বাজারে ভােলা বন্ধ হলে কি ক্ষতি হবে শুধু আমারই ? সা-অফিসার। তা নয় তত কি? বিপিন। কিন্তু আজ যদি এই ভােলাবন্ধ আলোলন সফল হয় তবে কালই গাদাররা ব্যাপারী সাহেবকে বলবে আমরা কর্জার ধান শােধ দিতে পারব না। তখন উনি ঠেকাবেন কি করে? সা-অফিসার। তখন উনি নিশ্চয়ই জাতি বলে নিজের পাওনা ধান তাদের ছেড়ে দেবেন। কি বলেন ব্যাপারী সাহেব। র। বিপিনবাবু হয়তো তাই মনে করেন। সা-অফিসার। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! [ উচ্চহাসি] কেমন বিপিনবাবু, উত্তর পেলেন তােত ? যাক গে, সরকারী অফিসার হিসেবে এসব ব্যাপারে আমার নিরপেক্ষ থাকাই উচিত। তবে কি জানেন বিপিনবাবু, গ্রামে আগুন লাগলে যে সবার ঘরই পুড়তে পারে অন্তত এটুকু বােঝবার মতাে বুদ্ধি ব্যাপারী সাহেবের নিশ্চয়ই আছে। বঙ্গ। হজ একেবারে মােন কথা বলেছেন। সা-অফিসার। ব্যাপারী সাহেব, এসব বিষয়ে আপনি যা ভাল বােঝেন বিপিনবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে করুন। আপনারা থাকতে গ্রামে একটা হজ্জৎ-হাঙ্গামা হয় এটা মােটেই বাংনীয় নয়। আর হ্যা, মুন্সী ? কনেস্টবল। হুজুর। স-অফিসার। তােমার ফাড়িতে কতজন কনেস্টবল আছে ? কনেষ্টবল। তিনজন। লা-অফিসার। আমি আজই থানায় যাব। থানা অফিসারকে বলব যাতে তিনি আরাে দুজন কনেস্টবল তােমার এখানে পাঠান। দেখবে এ অঞ্চলে যেন কোনভাবে শান্তিভঙ্গ না হয়। আচ্ছ, তবে আজ ওঠা যাক। বিপিন। বোর্ডের খাতাপত্র••••••? সা-অফিসার। আমি তাে আসছি দু’দিন বাদেই। তখন দেখা যাবে। (সার্কেল অফিসার ও তার পাতে বিপিনবাবু, রজব আলী, বন্ধ চক্রবর্তী, ফাদার ও কনেস্টবলের স্থান। গগনও এস্থানােত হয়, কিন্তু বিপিনবাৰু অঙ্গুলিসংকেতে তাকে চেয়ার টেবিলগুলো ঘরের মধ্যে নিয়ে যেতে বলেন। গগন মুখ ভার করে চেয়ার টেবিল সরাতে থাকে। কু অবস্থায় বাৰু ও তার সঙ্গে সম্পর প্রবেশ শী। গগন, বিপিন কৈ রে? গগন। আইজ্ঞা, সার্কল বাবুরে আউগাইয়া দিতে গেছেন। শশী। এই ছেলেটাকে বিপিন মেরেছে, দুই দেখেছিল ?

[ প্রথম অদ্বিতীয় দৃ) গগন। আই, আই•••••[মাথা চুলকান] শশী। আই আই নয়, বল দেখেছিল কি না? [ বিপিনবাবু ও ব ষষ্ঠীয় প্রবেশ বিপিন। কি হয়েছে ছােটকাকা । শশী। বিপিন, তুই ছেলেটাকে ধরে মেরেছিল? বিপিন। হ্যা মেরেছি, তাতে হয়েছে কি! শশী। না, গরীবের ছেলেকে মারলে আবার হবে কি! একে তুমি মুনিব, তার ওপর দশ গ্রামের হাকিম হয়ে বসেছ। বিপিন। ছােটকাকা, আপনি আমার আপন কাকা না হলেও কোনােদিন আমি আপনাকে অসম্মান করে কথা বলিনি। কিন্তু••• শশী। কিন্তু আর তুমি আমার সম্মান রক্ষা করতে পাচ্ছ না। সম্মান অসম্মানের কথা ছেড়ে দে বিপিন। আমি বলি তাের এসব বাড়াবাড়ি ভাল নয়। বিপিন। বাড়াবাড়ি আমার, না আপনার ছােটকাকা? ঘােটলােক- গুলােকে আস্কারা দিয়ে কে মাথায় তুলছে ? শশী। তুমি বঝি চাও তাদের জুতাের তলায় ফেলে পিষে মারতে ? বিপিন। জুতাের সুখতলা পায়ের নীচেই থাকে ছােটকাকা। শশী। এও বুঝি তাের জানা নেই বিপিন যে, যে-জুতাে মানুষের পায়ে থাকে সময় সময় সে-জুতাে মানুষের গালেও পড়ে। বঙ্গ। ছােট ভুঞা, রাগের মুখে কি বলতে কি বলছেন। শশী। চুপ করে চক্কোতি, তােমায় কথা বলতে হবে না। বিপিন, এ-মার আজ তুই গােপালের ছেলেকে মারিসনি—মেরেছিস এই গ্রামের সমস্ত গরীব প্রজাদের যারা খাজনা দিয়ে তাের বুকের রক্ত যােগায় —আর—আর আজ মেরেছিস তুই আমাকে। আয় চল••••• [ নর হাত ধরে শশীবাবুর বেগে একাৰ।.বিপিন, জৰতী ও গগন খানিকক্ষ বিয়ে হতবাক হয়ে রইল) গগন। ছােট ভুঞা জবর রাইগা গেছেন। বঙ্গ। বাপরে, এমন রাগ আর তার কখনাে আমি দেখিনি। বিপিন। কুটিল হাসি হেসে ] ছেলেটা সদ্য ফাটকে গেছে, তাই। দু’দিন গেলেই সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।••••••চলুন, ঘরের মধ্যে চলুন। [ তিনশের ঘরে প্রবেশ। আলাে নিভে যাবে।

এম জ-ততীয় দৃশ্য
একটা কি কমু।
[ আলী ব্যাপাখী বাইরে বিকার সবা। ভােলা যন্ত
সম্পর্কে পর্শের জন্য কিন্তু গায়ে মিলিত সভা বসেছে। মহীউলী,
আলী, এম আলী, গােপাল, ল এ গানে গানে ফি
ফুলৰ পৰিক]
নাইদীন। [ গােপালকে] কও মিস্তরী দাদা, তুমিই আগে কও যে
এখন আমাগ কি করণ উচিত।
গােপাল। তােমরা পাচজনে মিলা যা করবা আমি তাতেই আছি।
আমি আবার নতুন
মাইফুদ্দীন। বিনা দোষে মিস্তরী দাদার পােলাটারে মাইরা পাট পাট
কল্প। এর একটা পিরতিকার কত্তেই অয় ব্যাপারী সাব।
রজ্জব। মারাটা উচিত হয় নাই একথা আমিও কইতেছি। কিন্তু
বিপিনাৰু গ্রামের জমিদার। তাঁর বিরুদ্ধে তােমরা কি লইড়া
উঠতে পারবা মিঞা ?
মহীউদ্দীন। জমিদার ত ভারী। ক্যাবল দাপটের উপর আছেন।
শেরালী। বড় ভুঞার কতা আর কইও না। খােদার দোয়ায়
কদু-গাছটার ফলন অইছে ভাল। সেইদিন বাড়ীর ঘাটায় আইসা
ডাক ফালাইলেন—শেরালী, বাড়ী আছ নাকি, গণ্ডা দুই আসের ডিম
দিতে পার ?•••দুই গণ্ডা ছিল না, ছয়টা আণ্ডা আইনা দিলাম।
চুপে চুপে কন-বড় ডিম না থাকে কয়েকটা ছােট ডিমই দেওনা। ••
ছিল ছয়টা মুরগীর আণ্ডা, তাই দিলাম আইস্যা। আমার আতে
একটা দোআনী দিয়া দেখি বড় ভুঞা খালি বার বার কদুগাছটার
দিকেই চান, কন—ত’র গাছে ত বড় সুন্দর লাউ ধরছেরে
শেরালী।•••কি করুম, মনিবের দিষ্টি-দিলাম একটা লাউ ছিড়া ।
দফাদার কান্দে ফালাইয়া লইয়া গেল।
ফেলু। ঐ রকমই। গেল বছর বড় ভুঞা আমারে দিয়া ঝাড়া পাচটা
মাস নাও বাওয়াইল-আর মায়না দিল মাত্র দশটা টাকা। আমি
কইলাম, “কা, মালে যে মাত্র দুই টাকা কইরা মায়না পড়ে।
তাতে কতা বা বাণ ছাড়েন। কইলেননা খাইতে পাইয়া

এখন অয়-তৃতীয় মৃ ১৫ মইরা যাইতেছিলি, তাতে কাম দিয়া খাওয়াইয়া চাইয়াছি। তার উপর যে মায়না পালি এইত বেশী-গরীব মানুষ, টাকা দশটা নিতে অইল। না অইলে কথা শুইনা মনে অইছিল, ব্যাঙের টাকা ছুইড়া মারি। শেৱালী। তমিজখার সিটারে দিয়া গেল মাসে ঘােট আকিমেরে জিয়াফৎ দিল বড় ভূঞতার দাম যদি এক পয়সাও ছােয়াইল। সেইদিন আবার আটে তমিজখীরে বড় ভুঞা কয় কিত’র খাসির মাংস খাইয়া ছােট সায়েব বড় খুশি অইছেন রে তমিজ।•••ইচ্ছা অইল একবার কই, “তমিজের গােস্ত পাইলে আরাে খুশি অইতেন।” তবে চাইপা গেলাম, কইলাম না। মনিবের লগে আটের মধ্যে কাইজা করুম। মহীউদ্দীন। বিশু মাঝির বাড়ীতে সেইদিন যা কাণ্ড অইছে তা আর কওন যায় না। দুই গণ্ডা ছাইলা-মাইয়া-রােজ-কামলা খাইটা অতি কষ্টে সংসার চালায়। তার চকিদারী ট্যাক্স দ্যাড় টাকা। ট্যাক্স দিতে পারে নাই বইলা সেদিন বড় ভুঞার সাক্ষাতেই দফাদার বিশু মাঝির দাওয়া থেইকা লােটাবাটী লইয়া গেল। শেরালী। চকিদারী ট্যাক্স না দিতে পারায় সেদিন সিকিমালীরও বদনাটা লইয়া গেছে। মাইমুদ্দীন। শালার বােড় না ত য্যান একটা শয়তানের কারখানা। ব্যাপারী সাব, আপনেরে কিছু কই না কিন্তু। আপনিই কন, এই লােকের থেইকা ট্যাক্স তুইলা চকিদার-দফাদার পােষণ অইতে আছে এতে গেরামের কোন্ উপুকারটা অয়। শালার চুরি ত গেরামে লাইগাই আছে। এক পাড়ায় চকিদার ডাক ছাড়ে, আর এক পাড়ায় চোরে সিং কাটে। এদিকে ট্যাক্স যােগাইতে আমাগ জান সারা। ফেলু। সােনাপিসী সেইদিন রাত্রে ঝাঁপ খােলা রাইখা বাইরে গেছে, শালার চোর সেই সময় ঘরে ঢুইকা তার পানের বাটাখান নইয়া শেরালী। আরে ভাল কতা মনে কল্লা ফেলু ভাই, তােমার সােনা পিসী নাকি তার বড় কাটাল গাছটা বেচব। বেচলে কও না আমারেই দরদর কইরা দিতে। তক্তা অইব ভাল, কি কও?

ফেলু। আমার পউয়া গাছটাও বেচুম। নিৰা নাকি? শেৱালী। তমিজখা নাও পত্তন দিব। তার কাছে বেচা দেও, দাম পাই। গােপাল। [ একটু বিরক্তিৰ ঘৰে। এই কতাগুলি পরে কইলে অইব না? ভােলা বলের কি করবা কর। যেই জঙ্গ বৈঠকে আইলা তা ঠিক না কইরা বাজে কতা কইয়া নাভ কি? নে নল, এটু, তামুক নাগাছে। [ নন্দ ভাষাক সতে লাগল । মাইনুদ্দীন। ঠিক কতাই কইছে মিস্তরী। ব্যাপারী সাৰ, আপনিই কন না কি করণ উচিত। জব। দ্যাখ, আমার মতে বাজারে ভােলা ভােলাটা এমন কিছু দোষের না ; হ্যা, তবে যদি কারাে উপর জোরজুলুম হয় সেটা অন্যায় বই কি? তােমরা যদি ভােলা বন্ধ কর, বিপিনবাবুও তার বাজার বন্ধ কইরা দিতে পারেন। তাতে তােমাগই ক্ষতি বেশি বাজারে জিনিষ বেইচা তত খাইতে অইব। সকলে। [মহীউদ্দীন ও গােপাল বাদে ] হ, ঠিকই ত। সাচ্চা কতাই ত। তবে আপনি কি পরামর্শ দেন ? রজ্জব। আমি কই কি, এইভাবে জোট না পাকাইয়া যাগ’ উপর জুলুম অইছে তারা গিয়া হাকিমরে জানাও। তিনি তাে পরশুই আসছেন। তিনচারজন। ভাল কতা, ভাল কতা। মাইনুদ্দীন। [ ভয়ার্ত কঠে] কিন্তু বড় ভুঞাও যে সেখানে থাকবেন। রজ্জব। বিপিনবাবু যাতে কাছে না থাকেন তার ব্যবস্থা করা যাইব। সার্কল অফিসারকে না হয় আমার এখানেই আসতে বলুম। কি কও, তবে তােত আর কোন আপত্তি নাই ? মাইনুদ্দীন। মিশুরী দাদা কি কও? গােপাল। [ তামাক টানতে টানতে] আমার একটা গল্প মনে পল্প। ফেলু। গল্প । গােপাল। হ, শােন। একদিন একটা ছাগল পল্প বাঘের মুখে। শেরালী। আর বাঘ অমনি তারে ধইরা টুপ কইরা মুখে দিল। গােপাল। আরে না, দেখা অইল একটা গাধার নগে। গাধারে দেইখাই ছাগলের সে কি কানন। গাধা কইল, আরে কাল ১৭ [ প্রথম অ—তৃতীয় মৃত ] ক্যান্। তুমি সিংগিমামার কাছে যাও না ; দ্যাখ বামে আর তােনারে ছুইতেও সাহস পাই না। ফেলু। ছাগলটা বুজি তখন সিংগিমামার কাছেই গেল? গােপাল। আরে না, কি তামুকই সাজাইছস, এক টান দিতেই সারা•••••• [ শশীবাবুর প্রবেশ। তাঁকে দেখে গােল হকোট হাত থেকে নামিয়ে রাখল। শশীবাবুর আসন কোথায় নেওয়া হবে এই নিয়ে সবাই একটু ব্যস্ত হয়ে পড়ল। । থাক থাক, ব্যস্ত হতে হবে না। আমি এখানেই বসছি। [ সতরঞ্চির একপাশে উপবেশন। সবাই তাঁর গা থেকে একটু দুরে সরে বসে তাকে সমান খােল] তারপর, তােমরা সবাই মিলে কি ঠিক করলে? [ প্রত্যেকেই পরস্পরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। মাইনুদ্দীন। মিস্তরী দাদা, তুমিই কও না কি ঠিক অইল। গােপাল। ক্যা, তুমি কইতে পার না । মাইনুদ্দীন। ছােট ভুঞা, আমরা ঠিক কল্লাম [ ইতস্ততঃকরণ ] শশী। কি ঠিক করলে? মাইনুদ্দীন। আমরা ঠিক কল্লাম•••আরে কও না ফেলু, কি ঠিক কল্লাম ফেলু। আমারে নইয়া আবার টানাটানি ক্যান। শশী। কি আশ্চর্য, তােমরা কি ঠিক করলে বলতে পাচ্ছ না ! মহী। আইজ্ঞা, কইব কি। সবাই মিলা ঠিক কঙ্গ সারকেলবাবুর কাছে দরবার করব। শশী। ও! তাই বল। তা হলে তােলা বন্ধু আর তােমরা করবে না ? মাইনুদ্দীন। আইজ্ঞা, তা করুম না ক্যান। শশী। সার্কেল অফিসারের কাছে বুঝি তােমরা যাবে পরামর্শ করতে কি করে তােলা বন্ধ করা যায় ? শেরালী। আইজ্ঞা, সেই রকমই মতলব। শশী। বুদ্ধিটা তােমাদের বাতলাল কে ? [ একে অন্যের মুখের দিকে চাওয়ি করতে লাগল ] গােপাল। ছােট ভুঞা, ব্যাপারী সাবের বােধ হয় ইচ্ছা না যে আমরা ভােলা বন্দ করি। ।

| ০ ০ ০। ১৮ শণ। কি হে রজ্জব, তাই নাকি? রজব। আজ্ঞে না, আমার তাতে লাভ। শ। কি জানি, কার কোথায় কিসের সঙ্গে লাভ-লােকসান জড়িয়ে থাকে বলা শক্ত। অনেক সময় মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ যে বেশি হয়। রব। না দেখুন, আমি বলছিলাম যে অযথা একটা হাঙ্গামা বাধিয়ে••••• শশী। হাঙ্গামাকে, বড় ভয় পাচ্ছ, না রজ্জব ? চরের জমিটা দখল করবার সময় যে লেঠেল দিয়ে পাঁচ পাঁচটা লােকের মাথা ফাটিয়েছিলে সেটা বুঝি হাঙ্গামা ছিল না। রব। আজ্ঞে, আপনারা পত্তন দিয়েছিলেন তাইত আমি... শ। হ্যা, বিপিন তােমাকে পত্তন দিয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে ঐ সামান্য জমির জঙ্গ খুননাখুনি করতে বারণ করেছিলাম। আমার কাছে তখন একবারও পরামর্শ নেওয়া দরকার বােধ করনি তুমি। [ মজব একটু অপ্রস্তুত হল] হাঙ্গামাকে যে তুমি একটুও ভয় কর না রজ্জব, সেকথা আমি ভালভাবেই জানি। পদ্মবিলের চাষীরা সেবছর ধর্মগােলা করে যে বীজধান রেখেছিল, রাত্রির অন্ধকারে সড়কিওয়ালাদের সাহায্যে তুমি যে সে-ধান সরিয়ে ফেলেছিলে এরই মধ্যে তা ভুলে গেলে চলবে কেন! কেবল ধানই সরাওনি•••••• রজ্জব। [ একটু নিরুপায় ভাবে ] ছােট ভুঞা ! শশী। হা হা, কেবল ধানই সরাওনি। চাষীরা টের পেয়ে যখন তােমার লােজনকে বাধা দিতে এল তখন তােমার পক্ষের দুজন সড়কিওয়ালা একটা লােককেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল। রজ্জব। মিথ্যা কথা ছােট ভুঞা। শশী। মিথ্যা কথা। রাত্রির অন্ধকারে লােকচক্ষুর অন্তরালে পাপ করলেই সেটা মিথ্যা হয় না রজ্জব। অন্তরীক্ষে খােদ থাকেন। তাঁকে কঁকি দেওয়া যায় না।•••লাসটাকে তুমি গুম করে ফেঞ্জে টাকা দিয়ে সাফাই সাক্ষী দাড় করালে। তখন তােমার প্রধান সহায় ঐ বিপিন।•••আমি ছিলাম জেলে, তা না হলে••••• [ প্রথম অক্ষতৃতীয় দৃশ্য। রজ্জব। তা না হলে আপনি আমাকে জেলে পাঠাতেনালিতে বুলাতেন•• শশী। সে ক্ষমতা রয়েছে আদালতের। তবে একবার দেখে নিতাম টাকাই বড়, না পৃথিবীতে সত্য আর মনুষ্যত্ব বলেও কিছু আছে। ••না, থাক উত্তেজনার মুখেই অনেক কথাই বলে ফেলেছি। তারপর, তােমরা কি ঠিক করলে? সার্কেল অফিসারের কাছে ধন্না দেওয়াই ঠিক মাইনুদ্দীন। আপনি যা কইবেন আমরা তাই করুম ছােট ভু। শশী। না না, আমি যা বলব তাই তােমরা করবে কেন! তােমরা দশজনে পরামর্শ করে ঠিক কর কি করবে। কাল নন্দীগ্রামের বৈঠকে সাত গাঁয়ের মােড়লরা একত্র হয়ে ঠিক করেছে বাজারের ভােলা বন্ধ করবে। তােমরাও এখানে চার গাঁয়ের লােক একত্র হয়েছ। তােলা দেওয়া উচিত কি অনুচিত সেকথা তােমরাই বিবেচনা করে তাঁখ। ফেলু। আইজ্ঞা, চরের নােকেরা কি ঠিক কল্প? শশী। বক্তাবলী চরের মিঞারা আর সঁইপার চরের নমঃশূদ্ররা একত্র হয়ে ঠিক করেছে, জীবন গেলেও তারা আর বাজারে ভােলা দেবে না। রজ্জব। ছােট ভুঞা দেখছি নিজের পায়ে নিজেই কুড়ােল মারছেন। শশী। হ্যা মারছি, কিন্তু আঘাতটা বেশি লাগছে তােমাদেরই বুকে, না রজ্জব ?—আর হ্যা, যে কথা বলছিলাম। কৈবর্ত পাড়ার মাঝিরাও ঠিক করেছে, মাছের তােল তারা দেবে না। শেরালী। তবে আমরাই বা ভােলা দিমু ক্যান মাইনুদ্দীন মিঞা। মাইনুদ্দীন। দশ গেরামের লােক যখন ভােলা বন্ধ করব তখন আমরা তােল দিতে গেলে লােকে আমাগ কইব কি। ফেলু। তােলা বল না কঙ্গে আমাগ ইজ্জত থাকব। গােপাল। এতক্ষণে তােমাগ চৈতষ্ঠ অইল দেখছি। দেইখ, কাজের সময় আবার পিছাইয়া যাইও না কিন্তু। মাইনুদ্দীন। মিস্তরী দাদা, তােমার, এমন কতা মনে অইল ক্যান কও ত? আরে ঐ যে তােমার পােলা নারে বড় ভুঞা ধইরা মারছে তাতে কি আমাগ কম লাগছে তুমি কইতে চাও? বলি, * তােমার ছাওয়ালে আর আমার হাওয়ালে কিছু তফাৎ আছে নাকি? ঐ মাইর আমাগ সকলের গতরে পড়ে নাই। কি কও ফেলু ভাই? ফে। তাতে আর সন্দ কি। মাইনুদ্দীন। না মিরী দাদা, তুমি নিশ্চিন্দ থাক। নন্দারে মাইরা বড় ভূঞ যে আগুন জ্বলছে সেই আগুন সহজে নিব না। মহী। তবে তােলা বন্ধ করাই ঠিক? সকলে। [ব বা]ে ভােলা আমরা বন্দ কমই। শশী। যদি অত্যাচার চলে? মাইনুদ্দীন। জান কবুল ছােট ভুঞা। দরকার অয় বুকের খুন দিমু তবু জবানি নড়ব না। [ নাকে কাছে টেনে ] আমার পােলা করিম আর নয় কোন তফাৎ নাই ছােট ভুঞা। এই আমি নারে চুইয়া খােদাতাল্লার নামে হলফ করতেছি, আমি যদি আমার জবানি রাখি তবে য্যান্ জাহামে আমার ঠাই অয়। । রজ্জব, এ সম্বন্ধে তােমার মতামত কি? রজ্জব। আমি কি গাঁয়ের পাঁচজন ছাড়া ছােট ভুঞা ! এরা সবাই মিলে যা স্থির করবে আমি তাতেই আছি। [গােঠে কুল হাসির রেখা। শী। । তােমাদের সিদ্ধান্তে খুশি হলাম।••জানি না, বাইরে বেশিদিন থাকতে পারব কি না••• মাইনুদ্দীন। আবার আপনি জেলে যাইবেন। শশী। অসম্ভব কি। গােপাল। তবে ত বড় মশকিল অইব ছােট ভূঞা। শশী। কিছু মুশকিল হবে না গােপাল। নিজেদের পথ নিজেরাই ঠিক করে নেবে। পরে পথ দেখাৰে কতদিন। (গােপাল গেমেনুতে কে এটা তার দীপ্তি দেখা দিল। তার দিকে মলের দৃতি বিৰল। আচ্ছা, আজ তবে এখানেই বৈঠক শেষ করা যাক। মহী, কাল সকালবেলা দুই একবার আমার সঙ্গে দেখা করিস। তা হলে আমি এখন বাই। ।

প্রথম অ-তৃতীয় বৃ] ২১ মাইনুদ্দীন। চলেন, আমরাও যাই, আপনেরে আউগাইয়া দিয়া আসি। । না না, আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে হবে না। আমি একাই যেতে পারব। তবে রাত হ’ল, তােমরাও বাড়ী যাও। [হারিকেনের আলাে বাড়িয়ে সাত হাতে শশী চলে গেলেন। 'পয়ে একে একে সকলের প্রস্থান। কাজ আলী বাইরের দিকা রজা করে দিয়ে ভেতরে চলে গেল। এর প্রায় অকা আসে। বাইরে থেকে আয়নায় করাঘাত ] গগন। [ অল্পী]ে ব্যাপারী সাব, বাড়ী আছেন নাকি? রজ্জব। [ অন্তরীক্ষে ] কে ? গগন। [ অন্তরীক্ষে ] আমি গগন। দুয়ার খােলেন, বড় ভুঞা আইছেন। [ বুজষের শে। দরজা খুলে দিলে গগন ও বিপিনবার বেশ এত রাত্রে বিপিনবাবু। বিপিন। এমন আর কি রাত হয়েছে, দশটা সাড়ে দশটার বেশি তাে নয়। জানতে এলাম বৈঠকে কি স্থির হল। রজ্জব। তা আপনি কেন কষ্ট করে এলেন। খবর পাঠালে আমিই যেতাম।। বিপিন। না না, এত রাত্রে আপনি আমাদের বাড়ি গেলে শশীকাকার বাড়ির লােকেরা সনােহ করতাে। গগন। আর যেইখানে বাঘের ভয় সেইখানেই রাইত অয়। বড় ভুঞারে খবর দিতে যামু, বাড়ির ঘাটায় ছােট ভুঞার নগে দেখা। অন্দকারে ছােট ভুঞার চক্ষু দুইটা য্যান জুনিপােকার মতন জ্বইলা উঠল। আমি ত ভরে মরি। কিছু কইলেন না।•••ক্যাবল ছােট্ট একটু “হু” কইরা চইলা গেলেন। রজ্জব। তা হবে। জমায়েতে শশীবাবুও এসেছিলেন কিনা। বিপিন। হ, তা না হলে আর যােলকলা পূর্ণ হবে কেন ? জমায়েতে কি ঠিক হল? রজ্জব। সবাই ঠিক করলাে বাজারে তােলা বন্ধ করবে। বিপিন। আপনি কিছু বললেন না? রজ্জব। বলেছিলাম বই কি? কিন্তু শশীবাবু আজ দশজনের মধ্যে আমাকে যেভাবে অপমান করলেন।

বিপিন। কি বলে? রজব। সেই চরদখল আর পদ্মৰিলের মামলার কথা তুলে তিনি আমাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করলেন। বিপিন। ও! সে কথাটা ছােটকাকা কিছুতেই ভুলতে পাচ্ছেন না। আচ্ছা, উৎসাহটা কার কার বেশি? রজ্জব। গােপাল মিস্তরীকে তাে খুবই উৎসাহী বলে মনে হল। তারপর আমাদের গফফর মিঞার ছেলে—ঐ মহীউদ্দীন—সেও বােধ হয় এর পেছনে আছে। গগন। বােধ অয় না ব্যাপারী সাৰ, ঐ ব্যাটাই ত যত নষ্টের গােড়া। গােপাল মিস্তরী খুবই ভাল নােক বড় ভুঞা। ঐ মহীউদ্দীনই তারে কুপরামর্শ দিয়া খারাপ করতেছে। বিপিন। মহী বুঝি গােপালের বাড়ি খুবই যাতায়াত করে ? গগন। আইজ্ঞা, কিবা কমু। যাতায়াত কি—অষ্ট পরের মধ্যে চাইর প’রই ত মহী মিস্তরী বাড়ীতে পইড়া থাকে। বিপিন। বটে! "গােপালের মেয়েটার নাম জানি কি ? গগন। আইজ্ঞা মঞ্জু। বিপিন। হাঁ, মঞ্জু। মেয়েটার তাে বয়েস হয়েছে ? গগন। আইজ্ঞা, তা অইছে বই কি। দেখতে ত গিন্নীবাপ্পীর মতই। বিপিন। তা গােপাল কোন আকেলে তার বাড়ীতে মহীকে অত আনাগােনা করতে দেয়। গগন। আইজ্ঞা, আপনেরা শাসন করেন না বইলাই আঙ্কারা পাইয়া যাইতেছে। বিপিন। শাসন নিশ্চয়ই করব। কালই আমি গােপালকে ডেকে পাঠাব। আর ব্যাপারী সাহেব, আপনিও মহীকে ডেকে বলে দিন, গ্রামের মধ্যে এসব কাণ্ড ভাল নয়। এ নিয়ে একটা মনােমালিন্যের সৃষ্টি হতে পারে। মহী না শশানে, আপনাদের সমাজ থেকে তার ওপর চাপ দিন। আর গগন, গােপালের মেয়ের সঙ্গে না তাের বিয়ের কথা উঠেছিল? গগন। [ন চুলকাতে চুলকাতে সলজ্জভাবে ] আইজ্ঞা হ; কিন্তু মিস্তরী ক্যা জানি আমার উপর একটু কষ্ট অইছে। বিপিন। তাের কাছে বুঝি তার মেয়ে দেবার ইচ্ছা নেই ?

[ প্রথম অ-তৃতীয় দৃ]
গগন। খােলাখুলি না’ও করে না, হও করে না।
বিপিন। “হ” তাকে করতেই হবে। না করে, সমাজে তাকে আটক
দিবি।
গগন। আইজ্ঞা, আপনি সহায় থাকলে•••••••
বিপিন। ব্যাপারী সাহেব, আমি কাল সদরে যাচ্ছি। ছােটকাকা
বােধ হয় বাজারে একটা হাঙ্গামা বাধাতে চান। হাঙ্গামা যদি
তিনি বাধিয়েই তােলেন, আমাকেও শেষ পর্যন্ত লড়তেই হবে।
গগন, তুই তাে কাল থানায় হাজিরা দিতে যাবি। বড় দারােগাকে
আমি একখানা চিঠি দেব। কাল যাবার সময় আমার বাড়ী হয়ে
সেই চিঠিখানা নিয়ে যাবি। আচ্ছা, রাত অনেক হ’ল। আজ
আসা যাক।
[ বিপিনবাবু এস্থানােত ]
গগন আদাব ব্যাপারী সাব।
আদাব।
[ বিপিনবাবু’পা এগিয়ে আবার ফিরলেন
বিপিন। পরশু সার্কেল অফিসার আসছেন, মনে আছে তাে?
রজ্জব। [ মৃদুহাতে ] আছে বিপিনবাবু, আছে।
[ বিপিনবাবু ও গগনের প্রস্থান। যজ্জবের অােষ্ঠে কুটিল হাসি
দৃষ্টিতে একটা বড়যন্ত্রের আভাস-কপালে চিন্তার রেখা। পর্দা

ভিন্ন অঞ্চ-প্রথম দৃশ্য
[ শশীবাবুর বৈঠকখানা। তক্তপােশের উপর ফাস বিছানাে। দু'তিনটি
জাকিয়া বালি পড়ে আছে। শশীবাবু বলে খবরের কাগজ পড়ছেন। তার
হােট যােণ নিবেদিতার এবেশ। নিবেদিতা বালবিধবা, নিঃসন্তান
বিয়ে বাকে। বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি। প্রখর বুদ্ধির জন্যে
শশীবাবু তাকে খুবই ভালবাসেন।
নিবেদিতা। অমর জেল থেকে চিঠি দিয়েছে দাদা।
শণ। ভাল আছে তত ?
নিবেদিতা। হ, শারীরিক ভালই আছে। লিখেছে [ পত্রপাঠ ]
“পিসীমা, তােমাদের ছেড়ে এই বন্দীশালায় দিন আর কাটছে না।
সঙ্গী সাথী অনেকই আছে, তবু কেন জানি সর্বদাই কেমন একটা
এককীত্ব বােধ করি। সব চেয়ে বড় বন্ধু হয়েছে আমার বইগুলি।
বইএর মধ্যে যখন ডুবে যাই তখন আমার মন এই ক্ষুদ্র
কারাপ্রাচীরের বাইরে এক বিরাট বিশ্বজগতে মুক্তি পায়।
সঙ্গে খানকয়েক বইয়ের নাম দিলাম। বাবাকে বলবে, যদি
পারেন আমাকে যেন কিনে পাঠিয়ে দেন।
“ভাল কথা, সেদিন খবরের কাগজে দেখতে পেলাম,
আমাদের আশেপাশের গ্রামের লােকেরা বাজারের ভােলা বন্ধ
করবার জন্য আন্দোলন কচ্ছে
এর পরই কয়েক লাইন কালি দিয়ে কেটে দিয়েছে। এমন
কাটাই কেটেছে যে কিছু বােঝবার উপায় নেই। তারপর
লিখেছে-
“কাল দাদার চিঠি পেয়েছি। তিনি লিখেছেন, বেলা
প্রাইভেট ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয় এই তাঁর ইচ্ছ। বেলাকে
বলবে, ভাল করে লেখাপড়া করতে। বৌদি যেন আমার জন্য
কিছু জেলি তৈরী করে রাখেন। পরের বারে আমার সঙ্গে
দেখা করতে আসার সময় সঙ্গে নিয়ে আসবে।
প্রণাম জানবে। ইতি
তােমাদের
অম

[ দ্বিতীয় অ-প্রথম দৃশ্য ] [পপাঠের পা ভেঙ্গে 'জীৰ গইলেন। বিয়ের ফুল দিয়ে জল গড়াতে লাগলাে। এভাবে পা চললেম ] নিবেদিতা। বড় বউঠান মরেছে না বেঁচেছে। শশী। হঠাৎ একথা বলছিস কেন নিবি!. নিবেদিতা। বলব না তাে কি। জীবনে কী সুখ সে করে গেছে। তােমার জন্য সারা জীবন তাকে চোখের জলই ফেলতে হয়েছে দাদা-সে কি দুশ্চিন্তা, সে কি আতঙ্ক, সে কি উদ্বেগ। এই বুঝি তােমার কঁাসী হয়, এই বুঝি পুলিশের গুলী খেয়ে তুমি প্রাণ হারাও। জীবনে ক’দিনের জন্য সে শান্তিতে ঘর করতে পেরেছে। [ শশীবাবু আবার পত্রিকাপাঠে মন দিলেন ] তবু আমি বলব, সে ভাগ্যবতী ছিল। অমরও আবার তােমারই পথে পা বাড়িয়েছে এ দেখবার আগেই তােমাদের রেখে সে এ. পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পেরেছে। [ শশীবাবুর বড় ছেলের মেয়ে বেলায় প্রবেশ। বয়েস চৌ-পনের ] বেলা। [ একলাহি সুতো দেখিয়ে] বল তাে দাদু, এটা কত কাউন্টের সুতাে হবে ? শশী। [সূতােৰ লাছিটা হাতে নিয়ে ] বাঃ! খুব সরু সুতাে তাে। কার কাটা-তাের, না নিবির ? বেলা। বা রে! দিদার কেন হবে, আমি কেটেছি। বল না দাদু, কত নম্বর হবে? শী। [লাহির দু'একটা সূতাে টেনে দেখে তা প্রায় পঞ্চাশ কাউন্টের সুতাে হবে। নিবেদিতা। আমার পাঁজগুলি সব সেরেছ তাে? শশী। ও! তাই বল। দিদার পাঁজ নিয়ে খুব সরু সুতাে কাটা হয়েছে। বেলা। তা আমি কি ভাল পাজ করতে জানি নাকি। নিবেদিতা। আর যাই কর, আমার চরকাটিতে হাত দিও না বােন। তা হলে আমার সুতাে কাটাই বন্ধ। বেলা। দাদু, আমি সুতাে কেটে তােমায় একখানা ধূতি বানিয়ে দেব।

শণ। আর আমার সুতাে দিয়ে তােক একখানা শাড়ী বানিয়ে দেব বেলা। বাবা! তুমি যে মােটা সুতাে কাট। শশী। আর তুই খুব চিকণ কাটিস, না? বেলা। ধ্যাৎ! আচ্ছা দাদু, কাকামণি আসবে কবে? শশী। ছেড়ে দিলেই আসবে। বেলা। মহাত্মা গান্ধীকে তুমি দেখেছ দাদু ? শশী। ছবিতে দেখেছি। বেলা। ছবির কথা হচ্ছে না, সে তাে আমিও দেখেছি। তুমি স্বচক্ষে দেখেছ কি না? । না। বেলা। গবর্ণমেন্ট মহাত্মা গান্ধীকে খুবই ভয় করে না দাদু? শশ। তাের কি মনে হয়? বেলা। আমার মনে হয় মহাত্মা গান্ধীকে•••••• [ বিপিনবাবুর চাকর একটা খামায় করে তরিতরকারী ও ফলমূল নিয়ে এবেশ করলাে ] শশী। এগুলি কি? চাকর। বাবু কইলেন, আপনাগ এইগুলি দিয়া যাইতে। শশী। কি বাবদ ? চাকর। আইজ্ঞা, আটের তােলা। শশী। [ ক্রোকম্পিত কলেবরে ] হাটের তােলা। বিপিন ভেবেছে আমি এতই হােটলােক! আমাকে এভাবে অপমান করা ! যাঃ, নিয়ে যা শীগগীর এগুলি আমার সামনে থেকে। আম্পর্ধা দেখ ! নিবেদিতা। তুমি এটাকে অপমান বলে মনে কচ্ছ কেন দাদা? এতাে তােমার ন্যায্য পাওনা। শী। আমার ন্যায্য পাওনা ! গরীবের কাছ থেকে যা জুলুম করে আদায় করা হয় সেটা জায্য পাওনা। নিবেদিতা। বাজারের তুমিও তাে একজন মালিক। বিপিন এতদিন তােমার অংশ তােমাকে না দিয়ে নিজে খেয়েছে। আজ যদি সে নিজের অধ্যায় বুঝতেই পেরে থাকে •• শশী। নিজের অন্যায় বুঝে থাকলে সে বাজারে ভােলা আদায় বন্ধ করে দিত। না না নিবি, এ হয় না। আমি উপােস করে মরতে [ বিভীয় প্রথম দৃশ্য ] ২ রাজী, তবু পাপের অল্প আমার মুখে রুচবে না। [ ক]ে যা, দাঁড়িয়ে রইলি কেন, শীগগির এগুলি নিয়ে যা। [মা নিয়ে কােন প্রস্থান। বলিহারি যাই বিপিনের বুদ্ধি দেখে। নিজের যেমন ছােট দৃষ্টি, ভাবে সবারই বুঝি তাই। নিবেদিতা। তাহলে জমিদারীর অংশটাও এবার ছেড়ে দিলেই শশী। ভারী তাে জমিদারী। একমাস চাকরির টাকা না এলে ভিটেয় শুকিয়ে মরতে হবে তার আবার জমিদারীর অত বড়াই। নিবেদিত। তবু তাে পৈতৃক সম্পত্তি। শশী। দ্যাখ নিবি, সম্পত্তির জোরে আমরা জমিদার নয়, ওটা আমাদের একটা বংশগত অহঙ্কার। নিবেদিতা। সেটাই কি একেবারে ফেলে দেবার বিষয় দাদা? ভূঞা বাড়ীর এত নামডাক••• শশী। বংশের গৌরব আর কৌলিগের বড়াই যারা করে করুক নিবি, আমি ওর মধ্যে কোনদিনই নেই। জানিস, যে মহাপুরুষের কাছে আমি শিক্ষা পেয়েছিলাম, ধনীদরিদ্রে, ব্রাহ্মণচণ্ডালে তাঁর কাছে কোনই পার্থক্য ছিল না। না না না, যা আমার জীবনের ধর্ম তা থেকে আমি কিছুতেই বিচ্যুত হতে পারব না নিবি—তােরা এ নিয়ে আমায় বিরক্ত করিসনে। [ আবার পত্রিকাপাঠে মনােনিবেশ ] নিবেদিতা। আমার ওপর খামকাই রাগ কচ্ছ দাদা। শত হলেও বিপিন ঘােষবংশেরই ছেলে। ভেতরে ভেতরে তােমাদের মধ্যে যত মনােমালিঙ্গই থাকনা কেন সেটা যদি বাইরে লােকের কাছে বিরােধ হয়ে প্রকাশ পায়, তাতে ঘােষ বংশের গৌরব বাড়বে না। [ নিবেদিতার প্রস্থান। শশীবাবু তার দিকে একবার তাকিয়ে আবার পত্রিকাপাঠ দিলেন ] বেলা। [ একটু কাছে বেঁধে ] দাদু! শশী। [ গভীয় বরে] বল। বেলা। অত গম্ভীর হলে আমি চলে যাব কিন্তু।

২৬ ০ ০ ০ ০ শশী। [য়ে কাগজ থেকে চােখ তুলে একটু হেসে] তুই কি আমার দ্বিতীয় পক্ষ যে চলে গেলে ছটফট্‌ করব। বেলা। ইস, পাকাচুলে ভারী তত সখ।••••••আচ্ছ, বিপিন জ্যাঠাকে তুমি সব বুঝিয়ে বলতে পার না দাদু? শশী। ওরা বুঝেও বুঝতে চায় নারে দিদি, জেগে থেকে ঘুমােবাৰ ন করে। বেলা। লােকে বলে, কাকামণিকে নাকি বিপিন জ্যাঠাই জেলে পাঠিয়েছেন। শশী। শােনা কথায় বিশ্বাস করতে নেই। বেলা। তুমিও একথা বিশ্বাস কর না? শশী। দেশের হাজার হাজার ছেলেকে গবর্ণমেন্ট আটক করে রেখেছে। তাদের সবাইকে তাে আর তাের বিপিন জ্যাঠা জেলে পাঠায়নি। বেলা। তবে যে লােকে বলে [ বিপিনবাবু প্রবেশ বিপিন। একটা ব্যাপারে বড়ই দুঃখিত হলাম ছােটকাকা। শল। দুঃখ দিতে গেলে দুঃখ পেতেও হয়। বিপিন। ভােলার ভাগের জিনিষ আপনি ফিরিয়ে দিতে গেলেন কেন? বাজারের অংশীদার তাে আপনিও। শশী। তবু ভাল, এতদিনে তুই তা জানতে পেরেছিল। বিপিন। জানতাম চিরদিনই ছােটকাকা। কিন্তু বারাে সরিকের বাজার-লােকে বলে ভাগের মা গঙ্গা পায় না। এও হয়েছে তাই। বাজারের কি হচ্ছে না হচ্ছে কেউ কি তার খোঁজ রাখে? শশী। খোঁজ রাখলেই বিপদ। বিপিন। আপনি ভাবছেন, বাজারের তােলা থেকে আমি খুবই লাভবান হচ্ছি। কিন্তু গেল সন পুলের পাশটা যে ধ্বসে নামল সেটা ভরাট করতে দু’শাে টাকা বেরিয়ে গেল। শী। সেটা তাে ইউনিয়ন বাের্ডের রাস্তা, কাজেই টাকাটা ইনিয়ন- বাের্ড থেকে গেছে বলেই তাে জানি। বিপিন। আপনারা ঐ রকমই জানেন ছােটকাকা। সে যাক গে, বাজারের তােল নিতে আপনার আপত্তি কি?

[ দ্বিতীয় অপ্রথম দৃশ্য ] শণ। আপত্তি কি-কৈফিয়ৎ দিতে হবে ? বিপিন। না না, আপনি কৈফিয়ৎ দিতে যাবেন কেন? না নেন, আপনার জিনিস আপনার দোরগােড়ায় রেখে যাবে। শশী। সেগুলিকে পগাড়ে ফেলে দেব। বিপিন। তা আপনি যা ইচ্ছে করতে পারেন। জানি ছােটকাকা, ওসব তুচ্ছ জিনিসে আপনার লােভ নেই। বেপূর্ণ হাসি ]। শী। বিপিন, আমি তােকে সাবধান করে দিচ্ছি, আমাকে তুই ওভাবে বারবার অপমান করিসনে। বিপিন। আমি আপনাকে চিরদিনই সম্মান করে এসেছি ছছাটকাকা। কিন্তু আপনিই কেন জানি আমার প্রতি বিরূপ। একদিন আপনি আমাকে কত মেহ করতেন, কত বিশ্বাস করতেন••• শশী। করতাম...কিন্তু সে বিশ্বাস তুই রাখিসনি••• বিপিন। আপনি কি আমায় কোনভাভেই ক্ষমা করতে পারেন না ? শশী। ক্ষমা ! কি করে ক্ষমা করব বিপিন। যেদিন তুই পূর্ববঙ্গ ষড়যন্ত্র মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে নিজের মুক্তি কিনে নিলি সেদিনই জানলাম, তাের চলার পথ আর আমার চলার পথ এক নয়। বিপিন। আমি ছােট, আপনি বড়। একদিন যদি ভুল করেই থাকি আপনি তা ভুলে যান। আমি ক্ষমা চাইছি। আত্মবিবােধ করবেন না। আত্মবিরােধে কুরুবংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। শশী। ভুলটা যদি সেখানেই শেষ হত আমি ভুলে যেতে পারতাম বিপিন। কিন্তু তারপর থেকে তাের ভুলের মাত্রা কেবলই বেড়ে চলেছে। বিপিন। তা হলে একটা অশান্তির অনল জ্বলে ওঠে, এই আপনি চান ? শশী। শান্তি। শান্তি কোথায় বিপিন! লােকের অল্প নেই, বস্ত্র নেই—একে বলিস তােরা শান্তি। তােরা যে শান্তির কথা বলিস সে তত মানুষের মৃত্যু। বিপিন। বেশ, তবে তাই হােক। কিন্তু জানবেন, যে আগুন নিয়ে আপনি খেলতে যাচ্ছেন সে আগুনে লঙ্কা দগ্ধ হয়ে যাবে। [বেসে বিপিনের প্রস্থান। শশীবাবু মাগে পায়চাগী করতে লাগলেন।

লাে। দাদু!
| কি?
বেলা। বিপিন জ্যাঠার সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে ফেল।
শী। মিটিয়ে ফেলব।
বেলা। হঁ্যা দাদু, মিটিয়ে ফেল। বিপিন জ্যাঠার কথাবার্তা শুনে
আমার ভয় হলাে তােমাকেও না আবার জেলে পাঠান।
শশী। তাের ঠাকুরমাও ঠিক এমনি জেলের ভয় করতরে দিদি।
ললাকে মিথ্যা বলে না, তােরা সবাই এক ধাতুতে গড়া।
বেলা। তােমায় আবার জেলে নিয়ে গেলে আমরা কিছুতেই
থাকতে পারব না দাদু।
শী। ভয় কি দিদি। এবার জেলে গেলে তােকেও সঙ্গেই নিয়ে
যাব। হাঃ হাঃ হাঃ [হাসি। পর্দা ]।
দ্বিতীয় দ্বিতীয় দৃশ্য
[ গােপাল মিয় বাড়ী। গােপাল মিন্ত্রীকে সমাজে আটক করা হবে
বলে খাবার জন্য নমঃশুপাড়ার কয়েক মােড়ল পােপালেয় বাড়ীতে
এসেছে]
১ম ব্যক্তি। তা তুমি যাই ক্যান 'কও না মিস্তরী, গেরামের মধ্যে
এইরকম একটা অনাচার অইলে আমাগ সমাজেরই ত দুন্নম।
গােপাল। 'অনাচারটা কি অইল ?
১ম ব্যক্তি। তােমারে আবার সেইটা ভাইঙ্গা কইতে অইব নাকি ?
তুমি বুজদার নােক, নিজেই বুজতে পার অনাচার কিনা।
গােপাল। কইতেই যখন তােমরা সব আইছ তখন খোলাখুলিই
কওনা, রাইখা-ঢাইকা কাম কি।
২য় ব্যক্তি। খুইলা কইলে সেইটা কি বেশি ভাল শুনাইব মিস্তরী।
১ম ব্যক্তি। আমি কই, মাইয়া তুমি গগনেরেই দেও। নােকের নিন্দা
কুড়াইয়া নাভ কি?
গােপাল। মাইয়া আমি গগনেরে দিমুনা এমন কতা ত কই নাই।
আমি নিন্দার কামটা কাম কি?

[ দ্বিতীয় অদ্বিতীয় দৃশ্য ]
৩য় ব্যক্তি। তুমি নিন্দার কাম করবা ক্যান মিস্তৱী। কিন্তু তােমার
মাইয়ার চালচলনটা ত তেমন সুবিধার না। বয়স অইছে—এই
বয়সে বিয়া দেওনই ভাল।
গােপাল। তােমার মাইয়ার বয়স ত এর থেইকাও বেশি অইছিল।
৩য় ব্যক্তি। তা অইছিল—তবে মাইয়ারে আমি ঘরের বাইর অইতে,
দিতাম না।
গােপাল। আমি কি মাইয়ারে বাজারে নাম নেকাইয়া দিছি।
৩য় ব্যক্তি। আরে তা কইলাম নাকি। তবে তােমার বাড়ীতে কত
কামে কত রকম নােকই আসাযাওয়া করে।
গােপাল। নােকের কাছেই নােক আসে।
১ম ব্যক্তি। তা ঠিকই কইছ মিস্তরী। তবে সব নােকের মন ত
সমান না।
গােপাল। সব নােকের মনের খবর রাখুম কি কইরা।
২য় ব্যক্তি। একটু রাখতে অয়, একটু রাখতে অয়। ভালমন্দ বিচার
করবা না।
গােপাল। নােকেরে ক্যাবলই যদি সন্দ করি তবে নােকেই বা
আমারে বিশ্বাস করব ক্যান?
১ম ব্যক্তি। বিশ্বাসের সুযােগ নইয়া যদি ক্যাও তােমার সর্বনাশ
করে ?
গােপাল। জানতে পাল্পে ঠেকামু।
১ম ব্যক্তি। জাইনাও যদি বুজতে না পার?
গােপাল। সেইটা আবার ক্যামন কতা অইল।
১ম ব্যক্তি। এই ধর, মহীউদ্দীন ছােকরা যে তােমার বাড়ী ঘনঘন
আসে এইটা ত তুমি জান—কিন্তু ঠিক বুজতে পার না ক্যান
গােপাল। ক্যাবল আমার বাড়ীতেই না, মহী তাে সব বাড়ীতেই
যায়।
১ম ব্যক্তি। তবে তােমার বাড়ীতে একটু বেশি।
গােপাল। তােমরা কি কইতে চাও?
১ম ব্যক্তি। কমু আর কি। কইতে চাই, মাইয়া তােমার ডাঙ্গর

অইছে। একটা মুসলমান ছােরারে যখন তখন তােমার বাড়ীতে আসতে দেওন কি উচিত? গােপাল। মহী ত আমার বাড়ীর মধ্যে কখনও যায় না। ১ম ব্যক্তি। কি কমু মিস্তরী তােমারে, তুমি কি সব সময় বাড়ীতে থাক। [ দ্বিতীয় ব্যক্তিকে কওনা, তুমি সেইদিন কি দেখছিলা। ২য় ব্যক্তি। সেইদিন গেল রবিবার, তােমার বাড়ীর ঘাটা দিয়া আমি আটে যাইতেছিলাম। দেখি বেকি বেড়ার পাশে খাড়ইয়া তােমার মাইয়া আর মহী মশকরা করতেছে। আমারে দেইখা একটু সইরাও যদি গেল! গােপাল। বাজে কতা কইও না। মঞ্জু আমার তেমন মাইয়াই না। ২য় ব্যক্তি। বেইশ, বাজে কতাই। কিন্তু আগুন ঢাইকা রাখবা কতদিন। ভূঞা বাড়ীর নােকের কানেও যে এই কতা গেছে। কও না গগন, সেইদিন বড় ভুঞা তােমারৈ কি কইল । গগন। বড় ভুঞা কইল, “গােপাল মিরীরে তুই সমজাইয়া দিল গগন, গেরামের মধ্যে এইসব কদাচার ভাল না।” গােপাল। বড় ভুঞার কানে কতাটা তুলল কে গগন ? গগন। তাত জানি না। গােপাল। কিছুই জান না, কতাটা এমনিই হাওয়ায় ভাইসা গেছে। গগন। তা বড় মিত্যা কওনাই মণ্ডলখুড়া-কুকতা বাতাসের আগেই যায় কিনা। ১ম ব্যক্তি। চাইর দিকেই যে কতটা ছড়াইয়া পড়ছে। পােপাল। চুপ কর সােনাই মণ্ডল। তােমাগ চিনতে আমার বাকী নাই। পাতের নীচে গু, আবার তােমরাই কর ধু ধু। সকলের কেচ্ছাই আমার জানা আছে। বেশি সাধুগিরি ফলাইও না। ২য় ব্যক্তি। তাতে কি তােমার মাইয়ার দোষ ঢাকব? গােপাল। মাইয়া আমার কোন দোষই করে নাই। ভুইলা যাও ক্যা, তােমার বইন গিয়া শহরে খাতায় নাম নেকাইছে। ২য় ব্যক্তি। তার নগে আমার সম্পর্ক কি গােপাল। না, মার প্যাটের বইন, তার নগে তােমার সম্পর্ক কি? কিন্তু মাসে মাসে টাকা তু ঠিক মতই পাও। ২য় ব্যক্তি। কে কইল তােনারে ?

[ দ্বিতীয় অদ্বিতীয় দৃশ্য ] গােপাল। কই আবার কে। তােমার চৌচালা টিনের ঘর ত এয়েই উঠল। ১ম ব্যক্তি। সে ত সমাজের বাইরে চইলা গেছে। কিন্তু তুমি ত সমাজে থাইকাই মাইয়ারে দিয়া•••• গােপাল। মুখ সামলাইয়া কতা কইও মণ্ডলের পাে। মাইয়ার নামে তুমি যা তা কইও না। তােমার কি নজ্জা বইলা কিছু নাই ? তুমি রটাও আমার মাইয়ার নামে বদনাম। তােমার নিজের দিকে একবার চাইয়া দ্যাখ না। একটা বাজাইরা মাইয়া মানুষকে আইনা তুমি ঘরে ঠাই দিছ—তােমার তিনটা পােলা বেহায়ার মত পেশাকর নইয়া দিনেদুপুরে গেরামে ঢােকে। তুমি আইছ আমার মাইয়ার বিচার কত্তে ! না অয় তােমার টাকার জোর আছে বইলা নােকে মুখের উপর কিছু কয় না কিন্তু তােমার পরিবারের কিত্তির কতা কে না জানে। ১ম ব্যক্তি। শুনছ, শুনছ তােমরা মিস্তরীর ত্যা কত; বড় ত্যাজ অইছে, একটু শিক্ষা দেওন দরকার। গােপাল। আমার বাড়ীতে বইসা আমারেই চোখ রাঙাও । ১ম ব্যক্তি। বাড়ীর গরব বেশি কইর না মিস্তরী। চালে ত ছন নাই, এদিকে দ্বামাক একেবারে রাজাবাদশার মত। গােপাল। তােমারই বা অত চটাং চটাং কতা ক্যা—ঐ যে কয়না চুন্নী মাগীর বড় গলা। ১ম ব্যক্তি। মুখ সামলাইয়া কতা কও মিস্তরী। গােপাল। [ একটু এগিয়ে গিয়ে] মারবা নাকি ? গগন। [ মধ্যস্থতার ভয় দেখিয়ে তােমরা আরম্ভ কল্লা কি। একজন থাম না। ১ম ব্যক্তি। না, থামুম ক্যান্। ও বড় বাড়ন বাড়ছে। তােমরা পিরতিজ্ঞা কইরা যাও, আইজ থেইকা গােপাল মিস্তরী সমাজে আটক, অর থােপানাপিত বন্দ—অরে এক ঘইরা কইরা রাখতে অইব। কি তােমরা স্বীকার ? ২য় ব্যক্তি। তা•••গেরামের মােড়ল তুমি, তােমার কতা শুনতেই অইব। (সকলের মুখে সাতিক “হ হ] ১ম ব্যক্তি। গােপাল মিঙ্করী আইজ আমাগ সকলেরে যে বেইজ্জত কন, সে যদি পায় ধইরা মাপ চায়—আর যদি গগনের আতে তার মাইয়ারে দেয়—তবেই সে সমাজে উঠতে পারব। ২য় ব্যক্তি। আর সত্যনারায়ণের পূজা দিয়া সমাজের সকলেরে খাওয়ান নাগৰ। [ সমযেত কঠে“হ হ’ শব্দ) ১ম ব্যক্তি। ওঠ, ওঠ সব। [গােপাল ও গগন বাদে সকলে খায়মান মিস্তরী, মহীরে যদি আর এইখানে দেখি, নাঠি দিয়া তার ঠ্যাং ভাইজা দিমু। ২য় ব্যক্তি। বাশডলা দিয়া হাড় গুড়া গুড়া কইরা দিলে অয়না। ১ম ব্যক্তি। [ গত কড়মড় করে] যত সব নষ্টামি । [ একে একে সব যেতে লাগল ] গগন। আমার উপর আবার তুমি বাগ কইর না মণ্ডলখুডা, আমাব কোন দোষ নাই। বড় ভুঞাব উকুম, তাই আইছিলাম। আমি তােমার নগেই আছি। [ গােপাল কটমট করে চাইতেই গগন কাচুমাচু ভাবে প্রস্থান করল। গােপাল স্থির দৃষ্টিতে বিমর্ষ ভাবে বসে আছে। কপালে দুশ্চিন্তার রেখা। মঞ্জুর প্রবেশ ] মঞ্জরী। বাবা, এত রাইত অইল, নন্দা ত অখন পয্যন্ত বাড়ী ফিল না ? গােপাল। কি জানি । মরুক গিয়া হারামজাদা পােলা যেইখানে ইচ্ছা। মঞ্জরী। একবার ছােট ভুঞাগ বাড়ী ঘুইরা দেইখা আইলে অয় না। গােপাল। ত’ব গরজ থাকে তুই যা। মঞ্জরী। থাউক, তােমার যাওন নাগব না। রাইত অনেক অইছে, তুমি খাইতে আইস। গােপাল। ঐ হারামজাদা থাকব বাইরে বাইরে, আর আমি খাইতে বসুম কোন আলে! ত’গ নেই আর আমার সােয়াস্তি নাই। অয় ত’রা মর, না অয় আমি মরি। আর সহ অয় না। মারী। বাবা।

[ দ্বিতীয় অদ্বিতীয় দৃশ্য ] [ গোপাল নিত। মা চলে যেতে থাকে। গােপাল। [কোমল ক]ে মধু। •মরী কাছে এল] তুই অয়ত ভিতর থেইকা সবই শুনছস্। মঞ্জরী। তুমি উত্তর দিতে গেলা ক্যান? গােপাল। উত্তর দিমু না। যা তা কইব আর আমি সইয়া যামু। মঞ্জরী। জানই ত মিছা কতা। চুপ কইরা শুইনা গেলেই পারতা। গােপাল। তুই ত জানসই, মিছা কতা শুনলে আমার মাতায় খুন চাইপা যায়। কিন্তু অখন কি করি ক’ ত ? মঞ্জরী। আমি কি কমু বাবা। গােপাল। বুজতে পারছি, সমস্ত চক্রান্তই ঐ গগনের। কিন্তু সারা গেরামের নােক যদি একদিকে যায়, আমি একলা কি কতে পারি। ভাবছি ত’রে কি গগনের আতেই দিমু। মঞ্জরী। বাবা, আমি কি তােমার গলায় কাটা ঠেকছি ? গােপাল। না মা না, তুই কি আমার বেশি। গরীব বাপ বইলা ত’রে আমি এক মুঠা ভাত দিতে পারুম না। কিন্তু কি করি। কু-নােকে যে কু-কতা কয় মা। তুই যদি রাজী অস•• মঞ্জরী। বাবা ! গােপাল। কি ক'। মঞ্জরী। তুমি যা ভাল বােজ কর। গােপাল। কত্তে ত পারি—কিন্তু তুই যদি বেজার অস•• মঞ্জরী। নন্দাটা এমন বে-আল••••••এতখানি রাইত অইল। গােপাল। অয়ত ছােট অয়ত ছােট ভুঞার বাড়ীতেই আছে••দেইখা আসি একবার। [ পােপাল প্রস্থানরত ] মঞ্জরী। বেশি দেরি কইর না কিন্তু। গােপাল। না দেরি করুম কি। যায় আর আমু। [গােপালের প্রস্থান। মঞ্জরী বিছান পাটিটা ওটাতে লাগল। নেপথ্যে মহীউদ্দীনের ডাক শােনা গেল, “মিস্তরী কাকা, বাড়ী আছেন নাকি?”] মারী। না, বাবা বাইরইয়া গেল।

[যতাৰেইলীনের প্রবেশ
নয়। কৈ গেলেন?
নী। না অখনাে বাড়ী ফিরে নাই। বাবা তার তালাসে গেছে।
শহী। ওঃ! আমি একটা জরুরী খবর দিতে আইছিলাম মঞ্জু।
কাকারে তুমি কইও।
নারী। কি ?
মহী। গেরামের কয়েকটা শয়তান বড় কুমতলবে আছে। আইজ
ব্যাপারী বাড়ীতে আমাগ’ সমাজের এক মজলিসে আমারে
ডাকাইয়া লইয়া গেছিল। কি কমু, সরমও লাগে, না কইয়াও
পারি না। তােমারে আমারে লইয়া একটা কুকতা রটাইয়া দিয়া
তারা মিথ্যা মামলা রুজু করাইতে চায়। আমি রাজী অই
নাই। তারা আমারে ভর দেখাইছে। জান গেলেও আমারে
দিয়া এমন কাজ অইব না। দেখলাম, মিস্তরী কাকার উপর তাগ’
বড় রাগ। তাই তারে খবরটা দিতে আইছিলাম। তুমি কাকারে
সব কতা কইও, কইও কিন্তু। আইচ্ছা, আমি ছােট ভুঞার
কাছে চললাম।
[ মহীউদ্দীনের প্রস্থান। হতবাক ও নিশ্চল অবস্থায় মঞ্জরী দাড়িয়ে
থাকে-তার মুখমণ্ডলে বেদনা, উলেগ ও দুশ্চিন্তার ছাপ। পর্দা ]
দ্বিতীয় অঙ্ক-তৃতীয় দৃশ্য
[ইউনিয়ন বাের্ডের অফিস। বিপিন ঘােৰ, রজ্জব ব্যাপারী, বজ চক্রবর্তী
চেয়ারে আসীন। পাশে দফাদার চেয়াক আলী একখানি টুলে বসে আছে ]
বিপিন। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ [ অট্টহাসি ]। কেমন ব্যাপারী সাহেব,
বলেছিলাম না। করুক, বেটারা এবার তােলাবন্ধ আন্দোলন
বঙ্গ। বড় ভুঞার মাথায় এত বুদ্ধিও খেলে! এক ঢিলে দুই পাখী
মেরেছেন। গােপাল মিন্তরীর বড় ডট হয়েছিল-বেটা খুব
জল হয়েছে। আর ঐ মহী ছেড়া—যেমন গিয়েছিল বাঁদরামাে
করতে, তেমনি খেয়েছে খুৰ কয়েক ধা। দুষ্টের দমন না হলে
চলে? কি ফল, ব্যাপারী সাহেব ?

[ বিতীয় অ-তৃতীয় দৃশ্য) ও র। কিন্তু গ্রামের অবস্থা যে সঙ্গীন হয়ে উঠল। বঙ্গ। ব্যাপারী সাহেব একটু ভয় পেয়েছেন বুঝি ? রজ্জব। ভয় না পাওয়ার কি কারণ থাকতে পারে চক্কোতি মশায়। গ্রামে যদি দাঙ্গাহাঙ্গামা বাধে, আপনি আপনার পরিবারটি নিয়ে শশুরবাড়ী চলে যেতে পারবেন; কিন্তু এই জমিজমা ফেলে আমি কোথায় যাব? বিপিনবাবুদের ঘাটের ইজারা আমি আটশাে টাকায় ডেকে নিয়েছি। মাঝিরা যদি আমাকে জব্দ করবার অঙ্গ ঘাটে আসা বন্ধ করে ? যদি নৌকা না বায় ? বিপিন। আমি তাদের নৌকা ঐ নদীর জলে ডুবিয়ে দেব। রজ্জব। তাতে জমা আদায় হবে না—আর তাদের নৌকা জল থেকে তুলে দেবার জন্য পাশের গ্রামের বিনােদ সা তৈরী হয়েই আছে। বিপিন। আমি জানি, সেবার স্টীমার কোম্পানীর সঙ্গে সে ঠিক করেছিল তার ঘাট ইজারা দেবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে স্টীমার কোম্পানীর সঙ্গে আমারই চুক্তি হয় এবং বিনােদ সা ঠকে যায়। সেই থেকে আমার ওপর তার বিষম রাগ। কিন্তু ব্যাপারী সাহেব, আমিও আপনাকে বলছি, বিনােদ সা যত বড় চতুরই হােক বিপিন ঘােষকে এঁটে উঠতে তার ঢের দেরি। বঙ্গ। আরে হুঃ ! কোথায় রাণী ভবানী—আর কোথায় তেলী মুদিনী। সা’র পাে কাপড়ের ব্যবসা ফেঁদেছে বলে জমিদারী চাল চালা বুঝি অতই সােজা। ও বাবা ব’ড়ের চালে কিস্তি মাৎ হয়ে যাবে। কিছু ভয় নেই আপনার ব্যাপারী সাহেব, আপনার আর বড় ভুঞার মধ্যে যদি মিশ খায় তবে এই দশবিশ গ্রামের লােকের সাধ্য আছে কিছু করে। [ সার্কেল অফিসার, দারােগা ও দু’জন কনেস্টবলের প্রবেশ। সকলের পাত্রখান ] এই যে সারেরা এসেছেন। চেরাক, চেয়ার দু'টো টেনে দাও। [ দফাদার চেয়ার দুটো সামান্য টেনে পাশাপাশি এনে দিল। সবাই চেয়ারে বসল। দফাদার কনেস্টবল দু'জনকে বেঞ্চিতে বসবার মধ্যে অনুরােধ করল। কিন্তু কনেস্টবলেরা তাতে বসল না। মুখে একটু অষতার হাসি নিয়ে দাড়িয়ে রইল। দফাদারকেও বাড়িয়ে তে হলাে] জানােগা। আপনার চিঠি পেলাম বিপিনবাবু। সার্কেলবাবুও সেদিন থানায় উপস্থিত ছিলেন। তারপর এদিকে বুঝি খুবই গােযােগ ? বঙ্গ। অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন সার। যে কোন মুহূর্তে••••• বিপিন। হিন্দু মুসলমানে দাঙ্গা বাধবার উপক্রম। দানােগা। কি ব্যাপারী সাহেব—বিপিনবাবুর সঙ্গে আপনার দাঙ্গা বাধবে নাকি? হাঃ হাঃ হাঃ [ হাসি ]। সা-অফিসার। অসম্ভব কি! হয়ত রজ্জব ব্যাপারী বিপিনবাবুর মুখে খানিকটা বদনার পানি ঢেলে দিলেন আর বিপিনবাবু রেগে গিয়ে রজ্জব ব্যাপারীকে অভিসম্পাতে ভস্ম করবার জন্য কমণ্ডলু থেকে এক গস জল ছুড়ে মারলেন। বঙ্গ। সেদিন কি আর আছে সার যে কমণ্ডলু থেকে জল ছিটিয়ে তােক ভন্ম করা যাবে। জাত-বেজাত সব এক হয়ে গেছে। বামুনের ছেলে এখন মুচির কাজ করে সার-বার জাতের পায়ে ধরে জুতো পরায়—আবার বলে, আমি অমুক কোম্পানীর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। নােগা। আপনি তাে অন্য জাতের হাতে জলও খান না। সা-অফিসার। শাদা জল খান না, তবে লাল জল পেলে বােধ হয় আপত্তিও করেন না। ৰল। রাম রাম ! কি যে বলেন সার। [ সহজভাৰ ] দারােগা। যাকগে সে সব কথা। সেই মহীউদ্দীন ছেড়াটা কৈ বিপিনবাবু? যার জন্যে আসা- বিপিন। 'তাকে গগন আনতে গেছে। আর গেছেও তাে এখন নয়। এতক্ষণে ফেরা উচিত ছিল। যা তাে চেরাক, দেখে আয়। গগনটা ফিরতে এত দেরি করছে কেন? [ কে এবানােত ] লারােগা। না থাক, গগনের খোঁজে গিয়ে তাের কাজ নেই। তুই সেই মিস্ত্রী বেটা—কি না নাম? ৰ। গােপাল, সার। নােগা। হা হা, গােপাল। তাকে একবার ডেকে নিয়ে আয় তত। চেরাক। জী। ( সেলাম করে চেয়ে এল।

[ দ্বিতীয় অঙ্ক-তৃতীয় দৃশ্য ) রজ্জব। বলা নেই, কওয়া নেই, ইচ্ছে হলেই একজনকে ধরে মার দেওয়া ! আহ, এ কেমন ধারা বলুন তাে। দাবােগা। মহীউদ্দীনকে যে ধরে মারপিট করা হয়েছে তার কোন সাক্ষীসাবুদ আছে। বঙ্গ। সাক্ষীর অভাব হবে না সার, আপনি কাগণ্ডা সাক্ষী চান ? সা-অফিসার। কিন্তু সবগুলি শেষ পর্যন্ত টিকবে তত ? বঙ্গ। এটা আপনি কি বললেন সার! সাক্ষী দিয়ে যারা চুল পাকাল। আর তাছাড়া তারা সবাই ব্যাপারী সাহেবের হাতের লােক। এই যে মহীকে নিয়ে গগন এসেছে সার। ( মহীউদ্দীন ও গগনের এবেশ। মহী খানিকটা অপরাধীর মত ঈক্কাল ] দারােগা। এই মহী! বাবা! তােমায় নিয়ে গ্রামে এত কাণ্ড! বঙ্গ। ধেনাে লঙ্কায় ঝাল বেশি কিনা সার। দারােগা। সেদিন তাে খুব মার খেলে, না ? কে কে ধরে মারল? মহী। আমারে ক্যাও মারে নাই দারােগা। মারেনি। কি, আপনারা তা হলে কি বলছেন। ওকে তত কেউ মারেনি। বিপিন। তাের কোন ভয় নেই মহী। দাবােগাবাবুর কাছে তুই সব খুলে বল। দাবােগা। ভয় কি! বিনা অপরাধে তােমায় কে কে ধরে মারল আমি একবার সেটাই জানতে চাই। আজ তােমায় ধরে মারবে, কাল আবার তারা আর একজনকে ধরে মারবে। দেশে কি অরাজকতা হয়েছে, না এটা মগের মুল্লুক। মহী। আমি ত কইতেছি, আমারে ক্যাও মারে নাই। দারােগা। Hopeless ! ব্যাপারী সাহেব, আপনার ফরেদী মার খেয়ে ভয়ে চেপে যাচ্ছে। বঙ্গ। চোরের মার কিনা সার। দায়ােগা। মামলা দায়ের করা আর কাকে দিয়ে। দেখুন, আপনি যদি কিছু করতে পারেন ব্যাপারী সাহেব। রজ্জব। মহী, ভয় কি তােমার। সাচ্চা কথা কও না। তােমারে মাইরা আমাগ’ বেবাক মুছলমান সমাজেরই অপমান করছে। এইটা তােমার একলার ব্যাপার না, এর সঙ্গে আমাগ সকলেরই মানইজত জড়ান আছে। সা-অফিসার। বলে ফেল, বলে ফেল, ভয় কি ? মহী। আমারে ক্যাও মারে নাই। [বিপিনবার দাবােগাকে চোখে কি মায়া করলেন। দারােগা। ভাল চাস তাে বল শালা, কে মেরেছে। মহী। ক্যাও মারে নাই। দাবােগা। [মহীর গালে চড় মেয়ে কেউ মারেনি। বদমাশ সব চেপে যাচ্ছে। ভেবেছিল, তুই এই করে গােপালের বাড়ী যাবার পথটা খােলা রাখবি আর তার মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করবি। মহী। আমারে যা কত্তে অয় করেন, কিন্তু দোহাই আপনাগ, একটা গরীবের মাইয়ার নামে আপনারা মিছামিছি দুনাম রটাইবেন না । দাবােগা। [ আবার মহীকে চড় মেরে] চুপ রও শূয়াের। আবার হিতােপদেশ শশানাচ্ছেন। বিপিনবাবু, বিপিনবাবু, এমনি সায়েস্তা হবে না। এক কাজ করুন, এটাকে ১০৭ ধারায় ফেলে দিন গ্রামে আপনিই শান্তি ফিরে আসবে। [ গগনকে যা, আমার সামনে থেকে শয়তানটাকে নিয়ে যা। [ মহীকে নিয়ে মুচকি হেসে গগনের প্রস্থান। জব একটু গম্ভীর হয়ে যায় ] সা-অফিসার। দেখলেন, কি রকম ভাঙ্গে তােত মচকায় না। বঙ্গ। বড় শক্ত চীজ সার। দারােগা। তাই তাে দেখলাম। থাকে, মাঝে মাঝে এরকম দু'একটা থাকে তবে কলের গুতােয় সব ঠিক হয়ে যায়।•••ব্যাপারী সাহেবকে একটু গম্ভীর দেখাচ্ছে যেন। রজ্জব। না, তা কেন, গম্ভীর হব কেন ? দাবােগা। [হেসেকি জানি, আমি ভাবলাম••••••••• [ দফাদার চেনাকের প্রবেশ একা এলি যে! গােপাল কৈ ? চেরাক। সে আইল না। দায়ােগা। বাড়ীতেই পেলি? চেরা। ২।

[ দ্বিতীয় অ-তৃতীয় দৃশ্য ) দারােগা। এলাে না যে? চেরাক। কইল, “আমার অখন কাজে বাইরন লাগব। আমি যা কি কইরা? দারােগা। তুই কি বললি? চেরাক। কইলাম, ‘দাবােগাবাবুর উকুম, তােমার যাওনই লাগব। তার সে জবাব দিল হুজুর, ‘উকুম আমি মাতা পাইতা নিলাম। কিন্তু বােজ কামাই অইলে আমার ত প্যাট চলব না দফাদার। দারােগা। হুকুম না শুনলে কি হতে পারে তুই তাকে বললি না? চেরাক। তাও তারে কইলাম হুজুর, ‘মিস্তরী, তুমি ইচ্ছায় না গেলে তােমারে বাইন্দাও ত নিতে পারে। দারােগা। তাতে সে কি বলল? চেরাক। মিস্তরী একটু হাইসা কইল, তা খুবই পারে। বেশ আমারে বাইদাই নিতে কইও। তবে একটা কতা কি, খুনী আসামীরেও বাইন্দা নিতে অইলে আকিমের সমন জারী কত্তে অয়। দারােগা। বটে! বেটা সব আইন জেনে বসে আছে! আচ্ছা হারাম- জাদা তো! বঙ্গ। গােপাল মিস্তরী বড় শয়তান লােক সার। দারােগা। শয়তানি আমি ভেঙ্গে দেব। আপনাদের এখানকার ছােট- লােকগুলি একেবারে মাথায় উঠেছে দেখছি বিপিনবাবু। বিপিন। ছােটকাকাই এর জন্য দায়ী। গােপাল মিন্ত্রী যে এতগুলাে কথা বলতে সাহসী হয়েছে—কার জোরে, ঐ ছােটকাকার জোরে। (গগমের পুন: প্রবেশ ] দাবােগা। তবে কি তাকেও••••••? বিপিন। তা বুড়াে বয়সে তিনি যদি আবার নিজে ফঁদে পা দেন আমি তার কি করতে পারি। তােলাবন্ধ আন্দোলন ঠেকাতে না পারলে এ গ্রামে বাস করাই কঠিন হবে। সা-অফিসার। সে আন্দোলন যাতে গােড়ায়ই নষ্ট হয়ে যায় তার। ব্যবস্থা তাে আপনারাই করেছেন বিপিনবাবু। একেবারে অমােঘ অস্ত্র। বিপিন। তবু সাবধান হতে ক্ষতি কি?

২
জানােগা। না, ক্ষতি নেই। তবে ভয় পাবার কিছু আছে বলে মনে
হয় না।
গগন। কওন যায় না হুজুর। গেরামের আবার সুর ঘুইরা গেছে।
শুনতেছি, বাজারে নাকি মেলা নােক দল বাইলা ভােলা বল
কত্তে যাইব।
নাৰােগা। ও! আচ্ছা, আপনি ভাববেন না বিপিনবাবু। দরকার হলে
১৪৪ ধারা জারীর ব্যবস্থাও করা যাবে। সত্যি তাে, এ থেকে একটা
কযুনাল রায়ট বাধতেই বা কতক্ষণ। মুন্সী, যাতে কোন হাঙ্গামা না
হয় সেদিকে নজর রাখবে। [ সার্কেল অফিসারকে] চলুন, এবার
ওঠা যাক।
সা-অফিসার। হ্যা, চলুন, আর কেন। [ ঘড়ির দিকে চেয়ে ] ও বাবা !
বেলা তত কম হয়নি। বারােটা বাজতে চলল।
বিপিন। তা এত বেলায় না খেয়ে যাবেন। চলুন না দয়া করে আমার
বাড়ী।
সা-অফিসার। না, আজ আমার আর এক জায়গায় যেতে হবে। তা
হবে অন্য দিন। [ দারােগাকে] আচ্ছা, চলুন।
[ সার্কেল অফিসার ও গায়ােগা এনােয়ত ]
রজ্জব। [ সার্কেল অফিসারের কানের কাছে এসে] সার, আমার বিষয় স্মরণ
রাখবেন কিন্তু।
সা-অফিসার। নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। ভাববেন না আপনি, এবারও যাতে
আপনি নমিনেশন পান তার ব্যবস্থা আমি নিশ্চয়ই করব।
[ আনলে রবের গদগদ ভাব। সার্কেল অফিসার ও দমােগার এখয়ে
ও তাদের পশ্চাতে সকলের জন্য

দ্বিতীয় অঙ্ক-চতুথ দৃশ্য
[ গােপালের বাড়ী। সন্ধ্যাকাল। গােপাল হাট থেকে এসেছে।
তার মাথায় একটা গামা, বগলে সরঞ্জামের বায়। মা কি চান ।
তরকারি রয়েছে। ঢাকতে ডাকতে গোপালের প্রবেশ ]
গােপাল। না, না? আরে সব গেলি কৈ? একজনও বাড়ী নাই?
নন্দা, ও না !
মঞ্জরী। [ ঘর থেকে বেরিয়ে ] না বাড়ী নাই বাবা।
গােপাল। না, তা থাকব ক্যান্। দিন নাই, রাত্র নাই, ক্যাবল চরায়-
বরায়। ধর দেখি মা বােজাটা।
[ শরী প্রথমে গােপালের সরঞ্জামের বাক্স ও পরে মাথার খবরে
নামায়। গােপাল দাওয়ায় বসে ]
পারি না মা, আর আগের মত বােজা বইতে। গতরে যান
জোর পাইনা। রাস্তায় এমন কাদা অইছে যে পাও ফ্যালন
যায় না।
মঞ্জরী! তা আটে যাইবা আগে কও নাই ক্যান্? কইলে নন্দা নগে
যাইতে পাত্ত।
গােপাল। হ, তবেই অইছে -নবাবপুর যাই আমার নগে আটে।
আর বাড়ী থেইকা যখন আমি বাইরই তখন কি আমার কাছে এক
পয়সা আছিল। পাইলাম মিন্দা বাড়ীর পাওনাটা—আইলাম আট
অইয়া গুইরা।
[ নগরী বামার জিনিষ নেড়েচেড়ে দেখে একটা কাগজের ঠোঙ্গা
হাতে তােলে]
মঞ্জরী। এইটার মধ্যে কি আনছ বাবা?
গােপাল। [ একটু হেসে ] খুইলাই দ্যাখ, না।
মঞ্জরী। [ ঠো খুলে] বিশকুট আর নবণচোস!
গােপাল। হ, আনলাম। গেল আটের দিন নন্দা নবণচোসের কতা
কইছিল—সেইদিন আনতে পারি নাই, আইজ দুইটা পয়সা পাইলাম
নইয়া আইলাম। তা পােলার দেখাই নাই। আমারই খালি
পরাণ কালে ; কিন্তু আমার নেইগা কার পরাণ কান্দে না।
তা নন্দা যখন আসে আসৰ—দুই খা না দুইটা।

55 মানী। আমার কি নবণচোল খাওয়ানের বয়স বাবা! গােপাল। না, তুমি মাইয়া আমার একেবারে বুড়ি অইছ—চুল পাকছে, তােমার কি আর নবণচোস খাওয়নের বয়স আছে। পােলাপান অইলাম আমিও আমিই খাই। মঞ্জরী। তা খাইলাই বা, দোষ কি? গােপাল। দ্যাখ মাইয়ার আমার কতা। আইচ্ছা, খামুনে। নে, তুই এইগুলি ঘরের মধ্যে রাইখা আমারে এক ছুলুম তামুক খাওয়া দেখি, একটু গরম অই। -মঞ্জরী বাগাটা ঘরে নিয়ে যায়। ডাকতে ডাকতে গগনের প্রবেশ গগন। মণ্ডলখুড়া বাড়ী আছ নাকি? গােপাল। আছি, আইস। এবেশ করে দাওয়ায় গগনের উপবেশন তারপর, কি মনে কইরা? গগন। আইলাম। মনটা ভাল নাগছিলনাভাবলাম আসি একবার মণ্ডলখুড়ার বাড়ী গুইরা। নােকের ম্যালও ভাল নাগে না— আবার বাড়ীতেও মন টিকে না। গেরামে যে কি অশান্তি। গােপাল। কও কি। গগন। ঠিকই কই মণ্ডলখুড়া। চখের সামনে এইসব মাইরপিট কি ভাল নাগে। কি করুম, সরকারী চাকরি করি, তাই এই সব দেখতে অয়, আর উকুম তামিল না কইরাও পারি না। গােপাল। 'কে কারে মাল্ল ? গগন। আর কও ক্যান; মহীরে ধইরা দারগা নাগাইল খুব চড়চাপড়। তুমি না গিয়া ভালই করছ মণ্ডলখুড়া। আমারে পাঠাইলে আমি গিয়া কইতাম, তুমি বাড়ীতেই নাই। গােপাল। দফাদার গিয়া কি কইল? গগন। কইল গিয়া তােমার নামে বানাইয়া সাচামিছা অনেক কতাই। আমার কিন্তু বিশ্বাস অইল না তুমি এই সব কতা কইছ। চেরাকালী নােকটা ত বড় সুবিদার না। দফাদারী পাইছে বইলা খুবই দেমাক। আরে দফাদারী ত আমারই পাওনের কতা, ক্যাবল রজবাণী ব্যাপারী মাজে পড়নেই ত অর বরাতে দফাদারী জুটল। নােকটা [ দ্বিতীয় অ চতুর্থ দৃশ্য ] 3 নসিব ভাল। বড় ভুঞা ত কইতেছেন দাদারীটা আমারেই বিৰ, দেখি কি অয়। গােপাল। আইচ্ছা, তুমি একটু বস গগন। আমি আতপাটা ধুইয়া আসি। [ গােপালের এখান। গগন বসে ও সুরে গান গাইতে লাগল। মঞ্জরী তামাক মেয়ে কোকি নিয়ে এবেশ করল। মামীকে মেয়ে গগন চঞ্চল হয়ে উঠল। গগনের হাবভাব মেখে গরী অবত হয়ে গেল । গগন। তােমার বাবা ঘাটে আতমুখ ধুইতে গেছে মঞ্জু। দ্যাও, উকাটা আমারে দেও। গগন হাত বাড়ায়। এরী ভয়ে ভয়ে তার হাতে কোটা দেয় । আমারে দেইখা ডরাইলা নাকি মঞ্জু ? ডর কি! আমি সাপও না, বাঘও না। [ গগন তামাক টানতে থাকে। মঞ্জরী ধীরপদে ভেতরের দিকে দু'একপা এগিয়ে যায় । আরে যাও ক্যান্ ?শােন। মঞ্জরী। আমার কাম আছে। গগন। আমি আইলেই বুজি কাম থাকে—আর মহী আইলে ? * উঠে গিয়ে কাছে দাঁড়ায় । মঞ্জরী। বাজে কতা কইও না। সইরা যাও। গগন। রাগ কল্লা ? কতা কও মঞ্জু, আমারে কি তুমি চাও না? চুপ কইরা থাইক না—আমি তােমার মুখে শুনতে চাই, তােমার বাবা যদি তােমারে আমার আতে দেয়•••••• মঞ্জরী। তা দিবনা। গগন। ক্যান্ দিব না ! আমি এমন কি অপরাদ কল্লাম ? মঞ্জরী। অপরাদ তুমি অনেকই করছ চকিদার। গগন। আমি তার পায় ধইরা যদি মাপ চাই। মঞ্জরী। তােমার য্যামন খুশি। গগন। মন্তু, আমারে তােমার পছন্দ হয় না। মঞ্জরী। মরণ আমার, নজ্জাও করে না। গগন। [মীর হাত ধরে] আমি তােমারে ছাড়া বাচুম না মধু।

ময়ী। খুব বাচ চকিদার। আত ছাড়। বাবা আইসা দেখলে
আস্ত রাখব না।
গগন। না রাখল। মারুক, তােমার সামনেই আমারে মাইরা খুন
মঞ্জরী। কুচরিতির নােকগুলাই থাকে এই রকম। ছাইড়া দেও
আমার যাত।
গগন আরাে শক্ত করে মামীর হাত ধরে। হাতের চাপে শরীর
কাচের চুড়ি ভেজে টুকাে টুকরাে হয়ে যায়। তার হাত কেটে গিয়ে
রক্ত বেরােয়:
এইটা কি কল্লা ! এইটা কি কল্লা চকিদার। বাবা আইসা দেখলে
কি কইব।
গগন। [ ব্যস্ত ও ভীত ভাবে ] অপরাদ অইছে ময়ু, অপরাদ অইছে।
আমারে ক্ষমা কইর। [টা থেকে একটা টাকা বের করে ] এই
টাকাটা দিয়া আবার তুমি চুড়ি কিনা পইর।
- টাকাটা মাটিতে ফেলে দিয়ে দ্রুতপদে গগনের প্রস্থান। মঞ্জরী চুড়ির
ভাঙ্গা টুকরােগুলাে কুড়াতে থাকে। গােপাল ও নন্দর একসঙ্গে প্রবেশ
নন্দ। আমার নেইগা তুমি নবণচোস আনছ বাবা ?...কিরে দিদি,
ত’র চুড়ি ভাঙ্গল কি কইরা? আতটাও যে কাইটা গেছে। রক্ত।
গােপাল। কি কইরা চুড়ি ভাঙ্গলরে মঞ্জু ?
মঞ্জরী। [ অপরাধীর মত ] চালের বাতা থেইকা একটা নােয়া পইড়া
গেছিল।
গােপাল । চালের বার্তায় আবার নােয়া রাখছিল কে?
মঞ্জরী চুপ করে থাকে।
ই ! আমার অসাক্ষাতে আর তুমি কারাে কাছে বাইরইও না
মাইয়া।
[ মঞ্জরী অখােদমোট কুড়ায়। খানিকক্ষণ তার মধ্যে কাটে
নন। এইখানে একটা টাকা ক্যান্ দিদি।
গােপাল। টাকা আইল কৈথেইকা ?
মঞ্জরী। না, টাকাটা তুই গিয়া চকিদাররে দিয়া আয় ।
গােপাত। ৩. গগন-বুজি একটা টাকাও রাইখা গেছে। গগনের

৪৭
দ্বিতীয় অ-চতুর্থ দৃশ্য ]
বড় পাখা গজাইছে দেখছি। রাখ, আমিই যাইয়া টাকা দিয়া
আসতেছি।
মঞ্জরী। বাবা, তােমার পায় পড়ি, তুমি যাইও না।
গােপাল। তুই চুপ কর মঞ্জু। গগন আমারে পুইড়া মারনের নেই
চাইরদিকে অনল আলাইছে আবার আমার ঘর ভাঙ্গনের নেইগা
শয়তানী আরম্ভ করছে। অরে আমি এমন শিক্ষা দিমু যে জীবনে
যান্•••
[ কত বেগে গােপালের প্রধান।
মঞ্জরী। না, না, যা খ গিয়া আবার কি কাণ্ড করে ঠিক কি।
গােপালকে নন্দর অনুসরণ। পর্দা 3
দ্বিতীয় অঙ্ক-পঞ্চম দৃশ্য
শীবাবুর বৈঠকখানা। শশীবাবু চেয়ারে বসে আছেন। একপাশে
একখানি টেবিল। পাশের একটা বেঞ্চিতে মহীউদ্দীন ও মাইনুলীন উপবিষ্ট।
মাইনুদ্দীনের ডান হাতের কজিটা স্ফীত; ফীত স্থানে চুণ-হলুদের প্রলেপ -
শশী। হাতটা বুঝি নাড়তে পার না?
মাইনুদ্দীন। তা পারি ছােট ভুঞা, তবে ক্যামন একটু কচকচ করে ।
শশী। দেখি, হাড়ে লেগেছে নাকি।
শশীবাবু মাইনুদ্দীনের হাতটা নেড়ে-চেড়ে বললেন,
লাগে ?
মাইনুদ্দীন। আইজ্ঞা না, তেমন বেশি না।
শশী। হাড়ে লেগেছে বলে মনে হয় না। স্যাকরা গরম করে হাতে
সেঁক দেবে, আর ওষুধ দিচ্ছি, এখন একবার খেয়ে যাও, তারপর
রাত্রে শােবার সময় একবার খাবে।
[ হােমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স খােলন ]
মাইনুদ্দীন। [ সুহাতে] আইজ্ঞা, শ্যাখের আড়ি শক্ত আছে, অযুদ
লাগব না। চুণ-হলুদ দিছি, তাতেই সাইরা যাইৰ। তবে শালার
পুলিশ কামের আতটা খােড়া কইরা দিল এই যা দুখ খু।

: শশী। খােমাদের মত শক্ত হাড্ডিই আজ দরকার মাইনুদ্দীন—তা না হলে ওদের অস্ত্র ভোতা হবে কি করে। আইনের হাতে দুই পুরিয়া ওষুধ দিয়ে এখন এক পুরিয়া খেয়ে ফেল, আর রাত্রে একটা খাবে। মাইনুদ্দীন। [ ওষুধ খেয়ে ] শালার পুলিশরে, জীবনে আমি অমুদ খাই নাই, তুই আমারে অযুদ খাওয়াইয়া ছাল্লি। কি কমু ছােট ভুঞা, মুলী যখন আমার আতে রুলের বাড়ি মাল্ল, মনে অইল শালার ঘাড় মটকাইয়া দেই। ক্যাবল আপনি কইছেন মারামারি কত্তে নাই, তাই আমি সহ কইরা গেলাম। তা না অইলে ও কত বড় পুলিশ একবার দেইখা লইতাম না। শশী। মার খেয়েই ওদের মার ঠেকাতে হবে মাইমুদ্দীন। একার জন্য নয়, এ মার খেতে হবে দশের জন্য। মাইনুদ্দীন। তাই ত আমি চুপ কইরা গেলাম ছােট ভুঞা। না অইলে রক্ত যে-রকম গরম অইয়া উঠছিল। শালা কয় কি, এইটা কি ত’র বাপের আট যে ভােলা বন্দ কত্তে আইছস ? মহী। মুন্সীটার মুখ বড় খারাপ। ল্যাখপড়া ত বেশি জানে না। শশী। পুলিশের লােক লেখাপড়া জানলেও মুখ খারাপ করে মহী ওটা ওদের স্বভাব। [ গােপাল, ফেলু ও শেরালীর প্রবেশ ] গােপাল। মুন্সী ত বড় বাড়াবাড়ি আরম্ভ কল্প ছােট ভুঞা। বাজারে ক্যাও ভােলা বনের কতা কইতে গেলেই তারে ধইরা মাইরপিট করে। ফেলুর পিটে সপাং সপাং কইরা এমন ব্যাত মারছে, দেখেন কি ভাবে ফুইলা উঠছে। [ ফেলুর পিঠ দেখায় ] শেরালী। এক জব্দ করছে জাউলারা ছােট ভুঞা। মাছের বাজারে গেলে মুন্সীরে তারা কইয়া দিছে, “বেশি তেরিমেরি কইর না, বটি দিয়া দুই টুকরা কইরা ফালামু।” শী। তা করলেই তাে মুশকিল। ওরা মারপিট করবার আরাে সুযােগ পেয়ে যাবে। শেরালী। না ছােট ভুঞা, মুন্সী ডরে আর মাছের বাজারের কাছ দিয়াও যায় না। গােপাল। আমাগ অখন কি করণ উচিত কন ত ছােট ভুঞা ? = [ দ্বিতীয় অ-পঞ্চম দৃশ্য ] শশী। উচিত আমাদের সবার একসঙ্গে যাওয়া। কাল আমিও তােমাদের সঙ্গে যাব। ফেলু। ছােট ভুঞা, আপনিও যাইবেন আমাগ নগে। কেবল আমিই নয়, আরাে যাবে। নিবি, নিৰি। [ অস্থায়ী থেকে নিবেদিত-“কি দাদা”] একবার আয় তাে এখানে। -নিবেদিতার এবে; বাজারে পুলিশ এদের ওপর বড় অত্যাচার শুরু করেছে। কেউ তােলা বন্ধের কথা বলতে গেলেই তাকে ধরে মারে। এই দ্যাখ, রুলের গুতােয় মাইনুদ্দীনের হাতটা কি ভাবে ভেঙ্গে গিয়েছে- আর বেতের ঘায়ে ফেলুর পিঠটা ফুলে উঠেছে। এ মার বন্ধ করতেই হবে। কাল আমরা সবাই একসঙ্গে বাজারে যাব। আর হ্যা, তােকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। মহী। আমরা থাকতে পিসীমা যাইব ক্যান্ ছােট ভুঞা ! শশী। হ্যা যাবে, না গেলে এই অত্যাচার বন্ধ হবে না। গােপাল। বইঠারাণ যদি যান, তবে আমাগ মঞ্জুও যাইব। ফেলু। সােনা পিসীরেও কইয়া দেখুমনে যদি যায়। শশী। গোপাল, মহী, ফেলু, শেরালী, মাইনুদ্দীননা থাক, তােমার কাল গিয়ে কাজ নেই-তােমরা গ্রামে ঘুরে ঠিক কর কাল কে কে যাবে। সকাল আটটায় আমরা বটতলায় একত্র হব ; তারপর বাজারের দিকে যাব। [ নমস্কার ও সেলাম জানিয়ে গােপাল, মহীউদ্দীন, ফেলু ও শোলীর প্রস্থান : মাইনুদ্দীন। [ যেতে যেতে ] কাইল আমিও যামু ছােট ভুঞা। শশী। এই ভাঙ্গা হাত নিয়ে? মাইনুদ্দীন। [ হেসে ] এক আত ভাঙ্গছে, আরেক আত ত মাইর ঠেকানের লেইগা আছে। শশী। আচ্ছ, যাবে যাবে। সেলাম নামিয়ে আইলীনের প্রস্থান ] নিবি, চুপ করে রইলি যে?

নিবেদিতা'। দাদা, ভুঞা বাড়ীর মেয়েরা পর্দানশীন বলেই ললাকে আনে। তােমাদের সঙ্গে আমার বাজারে যাওয়া কি ঠিক হবে ? শী। বেশ, না গেলি, আমি একাই যাব। নিবেদিতা। সে কথা হচ্ছে না দাদা। তুমি যেখানে আমিও সেখানে। কিন্তু•• শশী। । এর মধ্যে আর কিন্তু নেই নিবি। কর্তব্যের আহবান আজ ততাদেরও কাছে এসেছে—তােরা যদি সাড়া না দিস, না দিবি। [ বেলার প্রবেশ নিবেদিতা। বেশ, আমি যাব। বেলা। কোথায় যাবে দিদা ? নিবেদিতা। সব কথাই তাের জানতে হবে। * নিবেদিতার প্রধান । বেলা। দিদা কোথায় যাবে দাদু ? শশী। কাল বাজারে পিকেটিং করতে যাবে। বেলা। কিসের পিকেটিং? শশী। ভােলা বন্ধের। বেলা। আমিও যাব দাদু । শশী। যদি পুলিশে ধরে মারে ? বেলা। ইস, মারবে না হাতি। তুমিও যাবে দাদু ? শশী। হ্যা যাব। বেলা। তা হলে তাে আমি যাবই দাদু। শশী। [ সহাস্যে ] তা হলে তাে তুই যাবিই দিদি, না? আচ্ছা যাবি। বেশ এক কাজ কর। খান কয়েক নিশান বানা ত গিয়ে। বেলা। তিন রঙা কংগ্রেসের নিশান ? শশী। হ্যা। আর দ্যাখ, আরেকটা কাজ করতে পারবি ? বেলা। কি ? শশী। তিনচারখানা পিসবাের্ডে বড় বড় করে সুন্দর অক্ষরে লিখিতে পারবি-বাজারে ভােলা বন্ধ কর ? বেলা। কেন পারব না দাদু। আর একখানায় লিখে দেব, স্বাধীন ভারত কী জয়। সেটা আরাে বড় বড় অক্ষরে লিখে দেৰ দাদু, কেমন ?

[ দ্বিতীয় অ—যষ্ঠ দৃশ্য } শ। [ হাসি] বেশ, তাই করগে । বেলা।' কিন্তু আমার নেবে তাে? । নেব, নেব দিদি, নিশ্চয়ই নেব। তােকে ছাড়া কি আমি যেতে পারি। তুই হলি গিয়ে আমার•• বেলা। থ্যেৎ! { বেলায় প্রস্থান। শশীবাবু দাড়িয়ে হাসতে লাগলেন। পর্দা । দ্বিতীয় অঙ্ক-ষষ্ঠ দৃশ্য T L বাজারে প্রবেশের পণ। বিপিনবাবু, দফাদার ও বঙ্গক্রবর্তীর প্রবেশ ও রজব ব্যাপারীর দোকানঘরের বারান্দায় বেঞ্চিতে উপবেশন। বঙ্গ। আমার কিন্তু মনে হয়েছিল বড় ভুঞা যে, এরকম একটা কাণ্ড ঘটতে পারে। বিপিন। গােপালের বড় দুঃসাহস হয়েছে দেখছি। সেদিন দারােগার ডাকে পর্যন্ত, এল না। বঙ্গ। পেছনে ছােট ভুঞা রয়েছেন কিনা। বিপিন। ছােটকাকা ওকে ক’দিন রক্ষা করবেন। তিন বছরের খাজনা বাকী। দুদিন বাদেই বকেয়া খাজনার জন্য নালিশ হবে, তখন যে ওর ভিটেমাটি নীলামে উঠবে। বঙ্গ। দেখবেন এসে আপনার পায়ে ধরে কান্নাকাটি করবে। ওদের কথা আর বলেন কেন। প্রশ্রয় পেলে মাথায় চড়ে, বিপদে পড়লে পায়ে ধরে। ছােটলােকের কাণ্ডই ঐ রকম। [ রজ্জবের প্রবেশ ) : বিপিন। এই যে ব্যাপারী সাহেব। আপনার কথাই ভাবছিলাম। কতদুর কি করলেন ? রজ্জব। না, সবাইকে রাজী করাতে পারলাম না। বঙ্গ। কেউ কেউ তাে রাজী হয়েছে ? রজ্জব। তা হয়েছে, কিন্তু তারাও শেষ পর্যন্ত কি করে বলা যায় না। গাঁয়ের অবস্থা গরম বিপিনবাবু। মুন্সী মারপিট করায় লােক ভয়ানক ক্ষেপে গেছে। প্রথমে তাে আমার কথা কেউ কানেই ২ তুলতে চাইল না। তারপর অনেক করে বুঝিয়ে বলায় জনকয়েক কথা দিল তারা ভােলাব আন্দোলনে যােগ দেবে না। কিন্তু ছােট ভুঞা আর মহী যেভাবে লেগেছে তাতে শেষ পর্যন্ত আমাদের দিকে ক’জন থাকবে বলা শক্ত। বঙ্গ। বেশি লােকের দরকার কি ব্যাপারী সাহেব। সেই লােকটা আপনার হাতে আছে তাে? রব। তা আছে। তবে আর কি। আর পাঁচটা লােকও জুটবে না ? রজ্জব। তা নিশ্চয়ই জুটবে। বঙ্গ। ব্যস, তবেই হলাে। বড় ভুঞা যা ফন্দী এটেছেন। ( একটা গুণ্ড প্রকৃতির লােকের প্রবেশ । রজ্জব। এই আপনার সেই লােক। বঙ্গ। কি করা হয়? গুণ্ডা। হাড়ির ব্যবসা কোরি। বঙ্গ। হাড্ডির ব্যবসা। রজ্জব। হাঁ, গ্রামে গ্রামে ঘুরে হাড় কুড়ায়। তারপর ব্যাপারীদের কাছে তা বিক্রী করে। বঙ্গ। দু। ভাল ব্যবসা। ব্যাপারী সাহেব যা বলেছেন পারবে? গুণ্ডা। [ মৃদু হেসে হিন্দুস্থানী টানে ] আগে থেকে কি কোরে বােৰ পারবে কি না। ব। তােমার কথায় তােত বেশ হিন্দুস্থানী টান রয়েছে। তােমার বাড়ী বুঝি.•••••? গুণ্ডা। হাঁ হাঁ, পশ্চিমে হুজুর। তােবে অনেক দিন ধরে বাঙ্গলা মুলুকে আছি—তাই বাংলায় কথা বলতে পারি। বঙ্গ। বেশ বেশ, তােমায় দিয়ে হবে মনে হচ্ছে। তােমার চেহারা দেখেই বােঝা যাচ্ছে তুমি কাজের লােক। তা, একে কত দিতে হবে ব্যাপারী সাহেব। বিপিন। কাজ আগে করুক, তারপর তাে বখশিশ । গুণ্ডা। এই সব কাজ তত বাকী হােয় না মােহারাজ। বিপিন। টাকা নিয়ে যদি পালাও।

[ দ্বিতীয় অ-ষষ্ঠ দৃশ্য ] গুণ্ডা। গুণ্ডারা আর যাই কোরুক হুজুর, নেমােখারামি কোরে না। টাকা নিলে তারা কাজ কোরবেই। রজ্জব। দিন, পাঁচটা টাকা দিয়ে দিন। ও পালাবার নােক নয়। [ বিপিনবাবু কাছ থেকে পাচটা টাকা নিয়ে বঙ্গবী কে দিল। টাকা নিয়ে সেলাম নিয়ে তার একান। বঙ্গ। [ হেসে ] ব্যাপারী সাহেবের পাকা কাজ। কেমন লােক যােগাড় করেছে দেখুন বড় ভুঞা। ( কারােগা, মুন্সী, দু-তিনজন কনেস্টবল ও গগনের প্রবেশ বিপিন। এই যে এসেছেন। আপনার আসতে দেরি দেখে ভাবলাম গগনটাই বুঝি ঠিক সময়ে গিয়ে আপনাকে খবর দিতে পারেনি। দাবােগা। না, গগন ঠিক সময়েই গিয়েছিল। রাস্তায় একটা তদন্ত ছিল, সেরে এলাম। বিপিন। তা হলে আমরা এবার যাই। আর বেশিক্ষণ আমাদের এখানে না থাকাই উচিত। বিপিনবাবু নােখার কানে ফিস ফিস করে কি বললেন এবং মায়ােগ মৃদু হেসে তাতে ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন। চলুন ব্যাপারী সাহেব, বাের্ডের অফিসে গিয়ে বসা যাক। গগন, তুই বাজারেই থাক। চেরাক আমাদের সঙ্গে আয়। বিপিন, মজব ও চেরাকের প্রস্থান। নেপথ্যে নরনারীর সমবেত কঠে “বাজারে ভােলা বন্ধ কর”; “জোরজুলুম বন্ধ কর”; স্বাধীন ভারত কী জয়”; “বন্দে মাতরম্”; “আল্লাহু আকবর” প্রভৃতি ধ্বনি ] মুন্সী। ঐ আসছে সার। দারােগা। আনুক, তােমরা দাঁড়িয়ে থাক। [ কনেস্টবলেরা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে রইল। হবু পেলেই মারবে তাদের মুখে এই ভাব। অনতার প্রবেশ। সামনে শশীবাবু, তাঁর পাশে জাতীয় পতাকা হতে নন। তারপর নিবেদিতা, যেলা, মরী এবং আরাে দু'একজন মহিলা; তাদের পেছনে পােপাল, ফেলু, মহীউদ্দীন, নাইন, শেৱালী এবং আমের আরাে নানা শ্রেণীর লােক। কয়েকজনের হাতে জাতীয় পতাকা ও ফেস্টন। ধ্বনি করতে করতে সকলের অগ্রগতি। দারােগা শশীবানুর দিকে চেয়ে একটু হাসল। শশীবাবু সেদিকে ক্ষেপও করলেন না। মিছিল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, ;

কি স্টেয়ে মেয়ে। पारदरबन कानमेवा मिहिमा উপর লাঠি চালাতে উদাত হয়। আগে হাত নেড়ে ও চেহারায় লাটি চালাতে বারণ করে। তারা তখন লাঠি নামিয়ে নেয়। মিছিল শেষ হয়ে যায়, ধ্বনি ক্ষণতর হয়ে আসে। দাবােগা। চলাে, ওদিকে এগিয়ে চলাে। [ দু'এক পা এগুতেই যেদিকে মিছিল গিয়েছিল সেদিক থেকে গােলমালেব শব্দ আসে। ছেচাতে চেঁচাতে গুণ্ডার প্রবেশ গুণ্ডা। দাঙ্গা, দাঙ্গা! হিন্দু-মুছলমানে মারামারি। তােমরা সব পালাও, পালাও। দারােগা। দাঙ্গা! গুণ্ডা। হাঁ, হুজুর। ভােয়ানক মারামারি। হিন্দু-মুছলমানে দাঙ্গা। তােমরা সব পালাও, পালাও••• * চেচাতে টেতে প্রস্থান । দাবােগা। চলল মুন্সী, ওদিকে চলল। [ দারােগা ও কনেস্টবলদের প্রস্থান। সওদাপত্র নিয়ে জনকয়েকের হাঁপাতে হাঁপাতে প্রবেশ ও ভীতচিত্তে তাদের পলায়ন। নেপথ্যে কলরব। বিপিনবাবুর ও বিপরীত দিক থেকে গগনের ব্যথভাবে প্রবেশ গগন। ঐদিকে যাইবেন না বড় ভুঞা। খুন। বিপিন। খুন! [ গুওায় প্রবেশ গুণ্ডা। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ [ বিকট হাসি ]। হাঁ, খুন মােহারাজ। একটা খুন কোরেছি। বখশিশ ? [ হাত বাড়াল ] বিপিন। খুন! খুন করে তুমি ! গুণ্ডা। [ মাপ ঝেকে] হাঁ, হাঁ, খুন-খুন কোরেচি মােহারাজ। কেন, বিশ্বাস হােয় না ? [ হাের বের করে ] দিন, বখশিশ দিন। বিপিনবাবু ভয়ে পিছাতে থাকেন এবং গুণ্ডা হাের উদ্যত করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। এভাবে দু'জন নিক্রান্ত। গগন। কি সর্বনাশরে বাবা। কোন্ দিকে যাই। দফাদার, দফাদার। [ গগনের ব্যথভাবে ডাকতে ডাকতে এান। পা] তৃতীয় অ-প্রথম পৃষ্ঠ ময়দান। অমর বন্দীশালা থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে এসেছে। তাকে সাধনা করবার জন্য জনসভা ডাকা হয়েছে। শীকান্ত, অন, নিখিল, মহীউলীন নল, গােপাল, মাইনুদ্দীন, ফেষ্ণু, নিবেদিতা, বেলা, মরী এবং আরও অনেকে উপস্থিত। গােপালের কপালে একটা কাটা চিহ্ন; তাতে এক টুকরো কাক লাগান অয়েছে। ছােট একখালি টেবিল, তার পেছনে একটি চেয়ার। টেবিলের পাশেই কংগ্রেস পতাকা উড়ছে। টেবিলের ওপর একটি মােলিয়াম। সমবেত কণ্ঠে নানারূপ জাতীয় ধ্বনি। নিখিল। আমি প্রস্তাব কচ্ছি, আমাদের আজকে এই সভায় শ্রদ্ধেয়া শ্ৰীযুক্তা নিবেদিতা গুহ সভানেত্রীব আসন গ্রহণ করুন। মহী। আমি এই প্রস্তাব সমর্থন করি। সকলের করতালি। নিবেদিতা উঠে সভাপতির চেয়ারে বসলেন। নিখিল সভার কার্যসূচি লিখে নিবেদিতাকে দিল নিবেদিতা। [ দাড়িয়ে ] এখন গান হবে। [ উপবেশন ] দু'তিনজন ছেলে ও বেলা একসঙ্গে গান ধরল, “দুর্গম গিবি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে।” গান শেষে সকলের ফয়তালি। নন্দ উঠে অমরের গলায় একটা গাদা ফুলের মালা পরিয়ে দিল। আবার সকলের করতালি অমব। [ গােপালকে ] মিস্তরী কাকা, এদিকে আসুন তাে। * গােপাল উঠে অমরের পাশে গিয়ে দাড়াল ] এ মালা আজ আমার প্রাপ্য নয়। সেদিন বাজারে গুণ্ডার ছােরার আঘাতে আমাদের মিস্তরী কাক প্রাণ হারাতে বসেছিলেন, এ মালা তারই প্রাপ্য। আমরা যে আবাব একে ফিরে পেযেছি- মৃত্যুশয্যা থেকে যে এ সেবে উঠেছে—এ আমাদেব সৌভাগ্য বলতে হবে। ( অমর গলা থেকে মালা খুলে গােপালকে পরিয়ে দিল এবং আলিঙ্গন করল। সকলের আনলে করতালি। গােপালের মুখে কৃতজ্ঞতা ও সলঙ্গতার ভাব। অমর ও গোপালের পুনরায় উপষেশন নিবেদিতা। [ দাঁড়িয়ে ] এবার নিখিলবাবু আপনাদের কিছু বলবেন। [ উপবেশন ।

নিখিল। [ গাড়ির মাননীয় সভানেত্রী মহাশয়া, উপস্থিত মহিলা এবং সমবেত বন্ধুগণ, আজ বড়ই গানন্দের কথা যে অমরকে আমরা আবার এত শীগগির আমাদের মধ্যে ফিরে পেয়েছি। তাকে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছিল। তার অপরাধ-দেশপ্রেম ; দেশকে সে ভালােবাসে, পরাধীনতার বন্ধনকে সে ছিন্ন করতে চায়। স্বাধীন দেশে এই দেশপ্রেমই মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণদেশপ্রেম না থাকলে সেখানে দেশক্রোহিতার অপরাধে মানুষের শাস্তি হয়—আর আমরা এমনই হতভাগ্য, আমাদের এমনই দুদশা যে, কারাে মধ্যে সেই দেশপ্রেম থাকলে তারই জন্থে পেতে হয় সাজা। সাধারণ আইনের বিচারে যখন শান্তি খুঁজে পান না তখনই আমাদের কর্তারা বিনা বিচারে আটক করে রাখেন আমাদের কর্মচঞ্চল দেশপ্রেমিক যুবক বৃন্দকে। বিনাবিচারে দণ্ডদান সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্ক- বর্বরতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কিন্তু দণ্ড দিয়ে মানুষকে কতকাল দাবিয়ে রাখা চলে ? দেশের মধ্যে যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জেগেছে, যে মুক্তির প্রেরণা এসেছে-সঙ্গীনের খোঁচায় তাকে কতকাল ঠেকিয়ে রাখা যাবে ? ওরা কেন ভুলে যায়, এদেশেরই ছেলে অম্লানবদনে চরম দণ্ড মাথা পেতে নিয়েছে, হাসতে হাসতে ফঁাসীর মঞ্চে এগিয়ে গিয়েছে। হায়, তবু ওদের রক্তচক্ষু! আমাদেরই কবি গেয়ে গেছেন, “ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, মােদের বাঁধন ততই টুটবে রে, টুটবে।” যারা দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মােচন করতে চায় তারা নিজের পায়ে শৃঙ্খল দেখে ভয় পায় না। দণ্ডকে তারা পুরস্কার বলেই গ্রহণ করে। [ হাততালি ] অমর আমার বাল্যবন্ধু নয়, কলেজে তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। অল্পদিনের মধ্যেই আমাদের পরিচয় নিবিড় হয়ে ওঠে, অমরের কর্মশক্তি ও বুদ্ধির দীপ্তি আমাকে আকৃষ্ট করে। বি এ পাশ করবার পরই আমাকে চাকুরির অন্বেষণ করতে হয়, অমরই তখন আপনাদের এখানে এই ইস্কুলে আমার মাষ্টারির ব্যবস্থা করে আপনাদের সঙ্গে কোন আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যােগ দেবার সৌভাগ্য আমার হয়নি, কারণ চাকুরির খাতিরে নিজেকে আমার দূরে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। আমার মাইনের কটি টাকার ওপর আমার পরিবারের নির্ভর। তবু বারংবার ইচ্ছে হয়েছে তৃতীয় প্রথম দৃশ্য। আপনাদের মধ্যে ছুটে যাই, অমর আপনাদের সামনে যে আদর্শ রেখে গেছে, আপনাদের সঙ্গে গিয়ে সেই আদর্শের পতাকা বহন করি। কিন্তু ভীরু, দুর্বল চিত্ত বার বার কাপুরুষের মত আপন ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে আত্মগােপন করেছে। তবু দুর থেকে দেখে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি, যে-পতাকা অমর আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছিল তার অমর্যাদা আপনারা করেননি—আমার বিশ্বাস আছে কোনাে দিন করবেনও না। অমর আজ আপনাদের মধ্যে আবার ফিরে এসেছে। আপনাদের ঐক্য, আপনাদের কর্মশক্তি, আপনাদের আদর্শনিষ্ঠা, আপনাদের দৃল্প সঙ্কল্প দিয়ে অমরের প্রাণে নতুন প্রেরণা জাগিয়ে তুলুন—তাতেই হবে এই দেশপ্রেমিকের যথােচিত সম্বধনা। সকলের আনলে করতালি। নিখিলের উপবেশন ] = নিবেদিতা। [ দাড়িয়ে ] সভায় আর কেউ কিছু বলবেন? মহী। ছােট ভুঞা, আপনি কিছু কন। শশী। না, না, আমি কি বলব। এসভায় আমার কিছু বলা ভাল দেখায় না। মহী। মিস্তরী কাকা, আপনি কিছু কন। গােপাল। [ লজ্জায় জিভ কেটে ] তুমি কও কি মহী। তােমার মাতা খারাপ অইল নাকি। মহী। না, কিছু কইতেই অইব মিস্তরী কাকা। গােপাল। তুমি কও না। মহী। আমি পরে কমুনে। আপনি আগে কন। গােপালের হাত ধরে টানাটানি । ফেলু। আরে কও না মােড়ল। এত বড় মাইরটা খাইয়া যমের বাড়ী থেইকা বাইচা আইলা—দুইটা কতা কইতে পারবা না! ওঠ, ওঠ, যা পার কও। গােপাল। আমি কিছু কইতে পারুম না। মাইফুদ্দীন। অত সরম কিসের মিস্তরী দাদা, কও না যা পার। নিবেদিতা। বল না গােপাল, যা হয় দু’চার কথা—সবাই যখন বলছে।

[ ইশানা, গােপালকে পড়াতে বললেন। গােপাল কলজেতে উঠে দাড়াল ] এদিকে এল, টেবিলের কাছে এসে দাড়াও। উপবেশন ] গােপাল। [ এগিয়ে এসে ] ভাই সব, আমি মুখখু নােক-আপনাগ কাছে আমি কি কমু। একদিন ভাবতাম, স্বদেশী করণ বাবুভুঞাগই কাম। শুনতাম, ডাকাতি না কল্লে নাকি বড় স্বদেশী অওন যায় না। তারপর জাখলাম, ছােট ভুঞা তারা ইচ্ছা কইরাই আইন ভাইঙ্গা জেলে ' যাইতে নাগলেন। আমরা দেইখা অবাক অইয়া যাইতাম—জেলে আবার ক্যাও ইচ্ছা কইরা যায় । অখন আবার দেখতেছি, আইন ভাঙ্গলেও, দোষ না কল্লেও নােকেরে জেলে নইয়া যায়। অমররে যে ধইরা নিছিল, তার দোষটা ছিল কি? তব’ তারে নিয়া আটকাইয়া রাখছিল। যাউক, অমর আবার ফিরা আইছে, আমাগ মধ্যে ফিরা আইছে। এইটা আমাগ বরাত ভাল কওন নাগে। অমরের মত ভাল পােলা এই মুল্লুকে নাই—হ দশ বিশ গেরামে নাই, এই কতা আমি জোর কইরাই কইতে পারি। অমররে যেইদিন ধইরা নইয়া গেছিল সেইদিন বুজতে পারি নাই তারে ক্যান্ ধরছিল। আইজ বুজি, সে গরীবের কতা কয়। গরীবের কতা কয় কয়জন! তা অমর যা কইল সবৈ শােনলেন আপনারা—ঐ পথেই আমাগ যাওন নাগব—হ যাওন নাগব—ঐ পথেই আমাগ যাওন নাগবনা অইলে গরীবের কি আর বাচন আছে—গরীবের আর বাচন নাই—গরীবের:.... গোপাল কেদে ফেলল। সকলে তাকে ধরে বসাল। খানিকক্ষণ সবাই ] নিবেদিতা। [ দাড়িয়ে ] এবার শ্রীমান অমর কিছু বলবে। উপবেশন । অমর। [ দাড়িয়ে ] সমবেত ভ্রাতা ও ভগিনীগণ, আজ সর্বাগ্রে আপনাদের জানাচ্ছি আমার আন্তরিক অভিনন্দন। আমার সম্বধনার জন্য আপনারা এই সভা ডেকেছেন; কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে আজ আমারই উচিত আপনাদেরকে সম্বর্ধনা জানানাে। ভােলাবন্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আপনারা যে ঐক্য, দৃঢ়তা, ত্যাগস্বীকার ও সহিষ্ণুতা দেখিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। বন্দীশালার বাইরে এসে আজ এই বলে আমি গর্ব অনুভব করছি যে, আমারই গ্রামের তৃতীয় আয় - প্রথম দৃশ্য ] লােক আপনারা, আমারই পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহেয় শােক আপনারা এমনই এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন যা কিছুদিন আগেও অসম্ভব বলে মনে হতাে। সত্য বটে, ভােলাবন্ধ আন্দোলন আপনাদের সম্পূর্ণ সফল কিন্তু এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আপনারা যে-শক্তি অর্জন করেছেন তা অতুলনীয়। আসুন, আমরা আজ সেই শক্তিকে এক বৃহত্তর সংগ্রামে নিয়ােজিত করি। দেশের মুক্তি সংগ্রামে যােগ- দানের জন্য আহ্বান এসেছে—আসুন, আমরা সেই আহ্বানে সাড়া দিই; “মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন” এই সংকল্প নিয়ে আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে অবতীর্ণ হই—দেশের জ© সর্বস্ব পণ করি । [হনি ] হয়নি । কিন্তু চলার পথে বিঘ্ন অনেক। আপনারা দেখেছেন, পদে পদে স্বার্থান্ধের দল কি ভাবে আপনাদের পথে এসে কন্টক হয়ে দাড়ায়। এরা বিদেশ থেকে আসেনি; এরা আপনাদেরই স্বজাতি, আপনাদেরই দেশবাসী। তবু যে এরা শত্রুতা করে তার কারণ আপনাদের স্বার্থ আর এদের স্বার্থ এক নয়। আপনাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে এরা পুষ্ট হয়—আপনাদের অদৃষ্টে কেবল লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, দারিদ্র্য আর নিপীড়ন। এথেকে যদি আপনারা মুক্তি চান, তবেই ওই স্বার্থান্ধরা রক্তচক্ষু হয়ে ওঠে, আপনাদের হত্যা করবার জন্যে অর্থ দিয়ে গুপ্তঘাতক লাগায়; সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তােলে। আসলে ওরা হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়, খ্রীষ্টানও নয়, ওরা সরকারী দালাল। ওদের কোন জাত নেই, বারই এক জাত, ওরা স্বার্থপরের জাত। আপনারা দেখেছেন, গ্রামের যে-কোন আন্দোলনে, যে-কোন সৎকাজে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় ইউনিয়ন বাের্ড। গ্রামে গ্রামে ঐগুলি এক একটি গুপ্তচরের আড়া। আমাদেরই ট্যাক্সে বেঁচে থাকে ওরা ; অথচ আমাদের বিরুদ্ধে ওরা থানায় খবর দেয়, পুলিশকে সাহায্য করে। স্বায়ত্তশাসনের নামে পল্লী অঞ্চলে এই যে পুলিশের চৌকিগুলি বসান হয়েছে এগুলিকে আমাদের ভাঙ্গতে হবে। আসুন, আমরা এই পণ করি, আজ থেকে ইউনিয়ন বাের্ডের এক পয়সা ট্যাক্সও আমরা দেব না। কেবল ভর ট্যাক্স বই নয়, পিকেটিং করে ইউনিয়ন বাের্ডের দোর আমরা বন্ধ করব। [লি ও করতালি] এই বিরাট সংগ্রামে আমাদের সব চাইতে বেশি দরকার ঐক্যের; কিন্তু দুঃখের হলেও বলতে হচ্ছে সেই ঐক্যের পথে আজ বহু বিপ্ন। কিছুদিন আগেও আমাদের এই অঞ্চলের হিন্দু- মুসলমানের মধ্যে যে সম্প্রীতি ছিল, যে সদ্ভাব ছিল, আমি বাইরে এসে লক্ষ্য কচ্ছি তাতে যেন একটু চিড় ধরেছে। শয়তানের ফাদে পড়ে •• [ কয়েকজন সশর পুলিশ ও লাঠিধারী কনেস্টবল নিয়ে স্পেশাল ম্যাজিস্টেটপ সার্কেল অফিসারের সভাস্থলে প্রবেশ। তাকে দেখে অনেকেই উচ্চকিত হয়ে উঠলাে এবং কেউ কেউ ভয়ে উঠি উঠি করতে লাগল । অমর। আপনারা কেউ উঠবেন না। যে যার জায়গায় বসে থাকুন। পুলিশ দেখে ভয় পাবার কিছু নেই। আমরা সভার কাজ চালিয়ে যাব। ০ ০ { অমরের কথা সবাই আবার স্থির হয়ে বসলাে। স্পে-ম্যাজিস্টেট। এই সভার ওপর আমি hundred and fortyfour জারী কচ্ছি। অমর। তা করুন। শত hundred and fortyfour জারী করলেও সভার কাজ বন্ধ হবে না।•••তারপর যেকথা আপনাদের বলছিলাম, স্পে-ম্যাজি। [ বাধা দিয়ে শশীবাবুকে লক্ষ্য করে] আপনি এদের বুঝিয়ে বলুন। Hundred and fortyfour break করলে তার consequence কি দাড়াবে আপনি নিশ্চয়ই তা অনুমান করতে পারেন। [ মৃদু হাসি ] অমর। [অনতার দিকে ] আমি আশা করি পুলিশের ভয়ে আপনারা কেউ এস্থান ত্যাগ করবেন না। স্পে-ম্যাজি। শশিবাবু, আমি চাইনে আজ এখানে একটা কিছু অপ্রীতিকর ব্যাপার ঘটে। কিন্তু কেউ যদি না শােনে, তবে বাধ্য হয়েই আমাকে আমার কর্তব্য পালন করতে হবে।

[ তৃতীয় অ-প্রথম দৃ] অমর। আপনার কর্তব্য আপনি করুন—আমাদের কর্তব্য আমরা করে যাই। শশী। [টেবিলের কাছে এসে দাড়িয়ে তা]ে আপনারা আজ চলে যান। অমর। বাবা ! শশী। কেবল তােমার আমার কথা ভাল চলবে না। দেখছ, কত ছােট ছােট ছেলেপিলে নিয়ে মেয়েরা এখানে উপস্থিত। [এমকে] আপনারা শান্ত ভাবে বাড়ী চলে যান। এতে লজ্জিত হবার কিছু নেই বা একে আমরা পরাজয়ও মনে করব না। আজকের এই অবস্থার জন্ধে আমরা প্রস্তুত হয়ে আসিনি। যেদিন প্রস্তুত হয়ে আসব, পুলিশের ভয়ে এক চুলও নড়ব না। আজ আপনারা যে-যার বাড়ী চলে যান। [ শশিবাবুর কথায় একে একে সবাই উঠে যেতে লাগল। অমর ধ্বনি দিল—“ইনক্লাব”। কিন্তু তার ধ্বনিতে কোন সাড়া মিলল না কারণ এই ধ্বনিতে তখনাে কেউ অত্যন্ত হয়নি। অনেকে তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। শে-ম্যাজি। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! [অট্টহাসি] এর মানে তাে এরা জানে না অমরবাবু। দিন কয়েক রিহার্সাল দিতে হবে। অমর। [ স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের কথা গ্রহ না করে] আপনারা বলবেন— জিন্দাবাদ। বলুন-ইনক্লাব সমবেত কণ্ঠে। জয়। শে-ম্যাজি। বৃথাই চেষ্টা অমরবাবু। [ ] নিখিল। জয়ই বটে। জিন্দাবাদ মানেই জয়। আপনারা বলুন- জিন্দাবাদ। অমর। ইনক্লাব•••••• | সমবেত কণ্ঠে “জয় ও জিন্দাবাদ” ধ্বনি দিতে দিতে সকলের এখান। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের মুখে ভাজিল্যের হাসি। সবার শেষে সদলবলে তার বিপরীত দিকে এৰ। পর্দা == তৃতীয় অঙ্ক-দ্বিতীয় দৃশ্য L ইউনিয়ন যাের্ডের অফিসের সম্মুখ ভাগ। নিবেদিতা, বেলা, মঞ্জরী, এবং আরাে দুতিনজন মহিলা দরজার সামনে বসে আছেন। বেলার হাতে একটি কংগ্রেস পতাকা ১ম মহিলা। দিদি, বাড়ী থেকে দুটো পান বানিয়ে আনতেও ভুলে গেছি। তােমাদের যে তাড়া। নিবেদিতা। তা তাড়াতাড়ি না এলে এদিকে যে এরা আগেই অফিসে ঢুকে পড়ত। তাও তত কেরাণী বুড়াে সেই কোন্ সকালে এসে অফিসে বসে আছে। ১ম মহিলা। বুড়ােকে আজ বেরুতে দেব না দিদি। নিবেদিতা। তা হলে যে সারাদিন না খেয়ে বসে থাকতে হবে। ১ম মহিলা। তাতে আমি কাতর নই। উপােস করার অভ্যেস আমার আছে। ঘােট থােকার কল্যাণে ঠাকুরদেবতার নামে মাসে পাঁচ সাতটা উপােস কোন্ আর না করি। তবে পােড়া ঐ পানের নেশা, পান না খেয়ে দু’দণ্ডও থাকতে পারি না দিদি। মুখে কেবলই জল ওঠে। মঞ্জরী। [ আচল থেকে দু'টো সাজা পান খুলে ] দুইটা পান আনছিলাম চাটুজ্জা খুড়ীমা। খাইবেন? ১ম মহিলা। তা খাবনা কেন। বাঁচালে লক্ষ্মী মেয়ে। একটা তুমি রাখ। মঞ্জরী। [ একটু হেসে ] না, আমার না অইলেও চলব। পান না পাইলে আপনারই কষ্ট অইব বেশি। ১ম মহিলা। তা মিথ্যা বলনি। [ একটি পান মুখে দিয়ে আর একটি আঁচলে বেঁধে ] একটু দোক্তা হ'লে ভাল হত। থাক, তা আর কোথায় পাব•••••• [ কাগজপত্র নিয়ে বঙ্গ চক্রবর্তী ঘরের ভিতর থেকে দরজার কাছে হাজিব বঙ্গ। এ কি । আপনারা এখানে সব মাটিতে বসে! ঘরের ভেতর আসুন-সেখানে টুলচেয়ার পড়ে আছে। " নিবেদিতা ছাড়া অন্য মেয়েরা খিল খিল করে হেসে উঠল।

[ তৃতায় অদ্বিতীয় দৃষ্ণ] নিবেদিত। আঃ । { ধমক খেয়ে বের হয়ে গেল। না, এ ভারী অধ্যায়, ভারী অধ্যায়। বড় ভুঞা এসে আপনাদের এভাবে দেখলে আমাকে বড় গালাগালি করবেন। এটা মোেটই ভাল দেখাচ্ছে না। নিবেদিতা। থাক, আপনার আর ভদ্রতা দেখিয়ে কাজ নেই। আমরা ঠিক জায়গায়ই আছি। আমার ওপর আপনি রাগ কচ্ছেন খামকাই। আমি তাে হুকুমের চাকর মাত্র। নিবেদিতা। আপনি না বললেও সেটা জানি। অযথা বকছেন ন? বঙ্গ। তা হলে আমায় একটু যেতে দিন। নিবেদিতা। যান না আমাদের গায়ের ওপর দিয়ে। বঙ্গ। [ লজ্জায় জিভ কেটে ] ছিঃ ছিঃ। কি যে বলেন আপনি। বেলা। তা হলে আপনাকে দাড়িয়েই থাকতে হবে। বঙ্গ। তুমিও আমায় একটু পথ দেবে না সুন্দরী ? বেলা। [ সক্রোধে ] চুপ করুন আপনি। বঙ্গ। আরে তুমিও রাগ কচ্ছ। তুমি যে সম্পর্কে আমার নাতনী। নিবেদিতা। থামুন, আর ইতরামি করতে হবে না। বঙ্গ। ছিঃ ছিঃ ! আপনি এ কি বলছেন ? নিবেদিতা। মেয়েদেব সামনে একটু ভদ্রভাষায় কথা বলতে হয়। বঙ্গ। গােবিদ বল, গােবিন্দ বল। ভুলে গেছলাম ভদ্রঘরের মেয়েরা এসে এভাবে সদর রাস্তায় বসতে পারে। মুড়িমিছরি এক হয়ে গেল-গগাবিন্দ বল, গােবিন্দ বল। [ ঘরের মধ্যে পুনঃ প্রবেশ ১ম মহিলা। বুডাের কথা শুনলে দিদি। নিবেদিতা। ওর কথা ছেড়ে দাও। ১ম মহিলা। ইচ্ছে হচ্ছিল মুখে ঝাটা মারি। আমি ওরে চিনি নে। ওব জ্বালায় কি আর বউঝিদের পুকুরঘাটে যাবার জো আছে। তিন কাল গেছে এক কাল আছে, তবু স্বভাবদোষ যায়নি। মরণ আর কি। চাইবার ছিরি দেখে গা জ্বলে যাচ্ছিল।

[ বিপিন গগন, চেক, মুলী ও আকাে কনেস্টবলের প্রবেশ
বিপিন। ছােটপিসী, তুমি এখানে। আবার ৰেলাকেও সঙ্গে নিয়ে
এলেছ।
নিবেদিতা। অধ্যায় হয়েছে ?
বিপিন। নিশ্চয়ই অন্যায় হয়েছে। তােমরা কি ভুঞাবাড়ীর নাম
হাসাবে। সমাজে কি আর মুখ দেখাতে দেবে না। ছােটকাকা
কি যে আরম্ভ করেছেন।
[ বড় চক্রবর্তী বরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল ]
নিবেদিতা। তিনি ঠিকই কচ্ছেন বিপিন।
বিপিন। হু। ঠিক কচ্ছেন বই কি। শেষটায় ঐ একরত্তি মেয়েটাকে
পর্যন্ত তিনি এর মধ্যে ঠেলে দিতে কুণ্ঠিত হননি।
নিবেদিতা। তাতেই তাের বােঝা উচিত যে কোন পথে তুই পা-
বাড়িয়েছিল। তাের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্থে ঐ ছােট্ট
মেয়েটাকে পর্যন্ত আজ এখানে আসতে হয়েছে।
বিপিন। তােমার সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। পথ ছাড়বে কি না বল ?
নিবেদিতা। না। যেতে হলে আমাদের মাড়িয়েই তােকে যেতে
হবে।
বঙ্গ। সরকারী কাজে বাধা দেওয়া কি ভাল?
নিবেদিতা। আপনি চুপ করুন চক্কোতি মশায়। ভারী তাে সরকারী
বিপিন। আমরা যে কাজ কচ্ছি সেটা কি দেশের কাজ নয় ছােটপিসী ?
সভায় গিয়ে দুটো গরম বক্তৃতা দেওয়া, মদগাঁজার দোকানে
পিকেটিং করা, ইউনিয়ন বাের্ডের দরজায় পড়ে থাকা, দু'চার ছ'মাস
জেল খাটা—এগুলােই দেশের সব চাইতে বড় কাজ?
জেল তত চোরডাকাতেও খাটে; তা হলে তারাই সবচেয়ে
বড় দেশসেবক।
নিবেদিতা। বিপিন, তাের এই তােতা পাখীটীকে চুপ করতে বল তাে।
বিপিন। তা না হয় করল। কিন্তু তােমরা পথ ছেড়ে দাও।
নিবেদিতা। পথ ছেড়ে দেবার জন্য আসিনি। এটা উচ্ছরে যাবার
পথ বিপিন, এপথ দুই ছেড়ে দে। ছেড়ে দিয়ে একবার দেশের

[ তৃতীয় অৱৰিতীয় দৃশ্য ]
দিকে তাকা—বিবেকের মাথা না খেয়ে একবার ভেবে খ, দেশ
ততাদের কাছে কি চায়।
বিপিন। তােমাদের এই একঘেয়ে বক্তিমে শুনে শুনে কান ঝালা-
পালা হয়ে গেছে ছােটপিসী-ওসব আর আমার শুনতে ভাল লাগে
। তােমরা পথ ছাড়বে কি না বল।
নিবেদিতা। না। তাের যা ইচ্ছে করতে পারিস।
বিপিন। কি আর করব। আমাকে আজ ফিরেই যেতে হবে। কিন্তু
জানবে, এর পরিণাম ভাল হবে না।
[ মুন্সীকে ইশারায় থাকতে বলে বিপিনবাবু ও তাঁর পেছনে কাকের
প্রস্থান ]
গগন। মঞ্জু, তুমি ক্যান এই সবের মধ্যে আইছ। স্বদেশী করণ ভদ্দর
নােকেগই সাজে। বয়স্থা মাইয়া তুমি, আইলা ভাল কর নাই।
স্যাকাপড়া জান না, তুমি স্বরাজের বুজবা কি। বাড়ী যাও, বাড়ী
যাও।
[ গগনের প্রস্থান ]
বঙ্গ। বড় ভুঞা তাে চলে গেলেন। এদিকে আমি যে আটকা পড়ে
রইলাম। মুন্সী, তুমিই একটা বিহিত কর না।
মুন্সী। [ মঞ্জুর হাত ধরে টেনে ] এই মাগী সর, পথ ছেড়ে দে।
নিবেদিতা। [ এগিয়ে এসে মঞ্জুকে আড়াল করে দাড়িয়ে] মেয়েছেলের গায়ে
হাত দিতে তােমার লজ্জা করল না !
মুন্সী। আপনি সরে যান।
নিবেদিতা। না, আমি সরে যাব না।
মুন্সী। আপনি সরে যান বলছি।
নিবেদিতা। চোখ রাঙাবেনা বেশি। তােমার যা ইচ্ছে করতে পার।
মুন্সী। আপনাকে আমি তাহলে arrest কচ্ছি।
নিবেদিতা। ভাল কথা ।
মুন্সী। কেবল আপনাকেই নয়, আপনাদের সবাইকে আমি arrest
কচ্ছি।
নিবেদিতা। আরাে ভাল কথা।

যুণী। মিছির, এদের খাড়িতে নিয়ে যাও। আমি গিয়ে পরে এদের
থানায় চালান দেব।
[বিলুখালী নেস্টল মিছির মেয়েদের নিয়ে চলে গেল। বেলা কৰি
দিল, “বন্দেমাতরম্” “ইক্লাব জিন্দাবাদ” ইত্যাদি ।
বঙ্গ। [বারান্দা থেকে নেমে এসে] রক্ষে পেলাম বাবা। একেবারে যেন
চেরী পরিবেষ্টিত অশােক বনে সীতা। কি উদ্ধার করলে তুমি
আমায় মুলী। তুমি না এলে আজ আমার হাটবাজার, করাই
[ নেপথ্যে সমবেত পুরুষকণ্ঠে ধনি, “চৌকিদারী ট্যাক্স বন্ধ কর ;
ইউনিয়নবাের্ড ধ্বংস কর” ইত্যাদি।
ঐরে বীরাঙ্গনারা গেলেন, আবার বীরপুঙ্গবরা আসছেন।
গলাবাজী করেই এরা স্বরাজ আনবেন। কি উপদ্ৰবই যে আরম্ভ
করেছে। এদের আর সায়েন্তা না করলে চলছে না মুন্সী।
মুলী। দাঁড়িয়ে দেখুন না একটু।
বঙ্গ। না না, আমি যাই। থাকলেই আবার কোন ফ্যাসাদে
পড়ব ঠিক কি।
[ বঙ্গ চক্রবর্তীর প্রস্থান। ধ্বনি দিতে দিতে কংগ্রেস পতাকা হতে
মহীউদী, নল, ফেলু, মাইনুদ্দীন এবং আরাে তিনটার জন হিন্দু
মুসলমানের প্রবেশ। মুন্সী ও অন্য কনেস্টবলটি মারবার অন্য প্রস্তুত
হয়ে দাঁড়াল। মুলীর হাতে যেটন ও কনেস্টবলের হাতে রেগুলেশন
টীক। সত্যাগ্রহীরা উইংসের পাশে এসেই থামল ]
ফুলী। আর এগুবে না বলছি।
[ সত্যাগ্রহীরা নিষেধ না শুনে এগিয়ে এল। তাদের উপর চলল
বেপােেয় লাঠি। লাঠির খা খেয়ে কয়েকজন পড়ে গেল। তাদের মুখে
কানির এল। পদা]
।

তৃতীয় অরু-তৃতীয় দৃশ্য [ শশীষৰু বৈঠকখানায় বসে হােমিওপ্যাথি বই পড়ল। 'পান একখানি সত্যাৰ বুলেটি পড়তে পড়তে বেলা এবেশ করল। বেলা। দাদু, কলকাতায় পুলিশ জোর লাঠি চালিয়েছে। শশী। কে বললে তােকে ? বেলা। এই যে বুলেটিনে লিখেছে। শশী। হু। তা এখানে চালালে আর কলকাতায় চালাতে আপত্তি কি! সেদিন মুন্সী তােদর ছেড়ে দিয়েছে। আর একদিন তাের পিঠেও লাঠি পড়বে। বেলা। পড়ে পড়বে। [আষায় বুলেটিনের পাতা উল্টিয়ে] সর্বনাশ দাদু, মেদিনীপুরে পুলিশ গুলি করেছে। শশী। কোথায় গুলি করেছে ? বেলা। [ পাঠ ] “গত শনিবার পটাশপুর থানার এলাকায় স্বরাজ ময়দানে ১৪৪ ধারা অমান্য করিয়া কংগ্রেসের আহ্বানে এক জনসভা হয়। পুলিশ আসিয়া জনতাকে ছত্রভঙ্গ হইতে বলে, কিন্তু কেহই সভাস্থল ত্যাগ করিতে চাহে না। পুলিশ তখন লাঠি চালায় এবং অবশেষে গুলিবর্ষন করে। লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষনের ফলে চার জন নিহত ও পঞ্চাশ জনের বেশি আহত হয়।”—কি সর্বনাশ দাদু! পুলিশ তা হলে এখানেও গুলি করবে নাকি ? শশী। তা করতে পারে। লাঠিতে না থামলে গুলি তাে করবেই। বেলা। অমন কথা তুমি বলাে না দাদু, তােমার জন্যে আমার বড় ভয় করে। আর কাকামণিকে আমি এত করে বারণ করি- কিছুতেই সে আমার কথা শুনবে না। শশী। বড় ভয় পেয়েছিস দিদি, না? স্বাধীনতা কি মুখের কথা! তার জন্য মূল্য দিতে হবে না ? বেলা। কিন্তু ওদের ঐ গুলির মুখে তােমরা কতদিন দাঁড়াতে পারবে দাদু ? শশী। যতদিন না ওদের শেষ গুলিটি ফুরােবে। সত্যাগ্রহী কোনদিন গুলিকে ভয় করে না রে দিদি—মৃত্যুকে তারা বন্ধুর মতােই কোন পেতে নেয়। ।

। বেলা। তাতে মরাই হবে সারলড়াই আর হবে না। অস্ত্র ছাড়া কথনে লড়াই হয় ? শশী। হয়। অহিংসার কাছে অস্ত্রও হার মানে দিদি। বেলা। কাকামণি কিন্তু এসব বিশ্বাস করে না। শশী। তুই কি কবে জানলি? বেলা। দু। সেদিন নিখিলবাবুর সঙ্গে কাকামণির এ নিয়ে খুব তৰু হচ্ছিল। পড়ার ঘর থেকে আমি সব শুনছিলাম। শশী। অমর কি বলছিল ? বেলা। বলছিল, এই আন্দোলনের মধ্য দিযেই নাকি আমরা শক্তি লাভ করব এবং একদিন অন্ত্রও আমাদেব হাতে আসবে। তারপর কাকামণি ফিস ফিস কবে কি বলল আমি ঠিক শুনতে পেলাম । তুমি বলল তাে•••••• [ বাইরে নিখিল গলার খাকারি দিল। তার সঙ্গে মহীউদ্দীন ] [ বাইরে থেকে—“আমি নিখিল” ] এস, এস। [ বেলাকে] যা, তুই ভেতরে যা। [ বেলার অন্তঃপুরে প্রস্থান ও অপর দিক দিয়ে নিখিল ও মহীর প্রবেশ শশী। এস, বােস নিখিল। মহী, তুইও বােস। [ নিখিল শশীবাবুর বিছানায় এবং মহীউদ্দীন পাশের বেঞ্চিতে বসল ] তারপর কি খবর? নিখিল। স্কুলের চাকরি গেল কাকাবাবু। শশী। কেন? নিখিল। এস-ডি-ও সেক্রেটারীকে চিঠি দিয়েছেন, আমাকে স্কুলে রাখা চলবে না ; আর আমাকে নােটিশ দিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এস্থান আমায় ত্যাগ করতে হবে। শশী। বুঝতে পেরেছি, সেদিনকার বক্তৃতার জের। নিখিল। তা হবে। যাক গে, ভালই হ’ল। চাকরির মায়া কাটাতে পারছিলাম না, অথচ চাকরি করতেও ভাল লাগছিল না। শশী। কিন্তু তােমার পরিবারের••• নিখিল। সেকথা ভেবেই তাে এতদিন অনিচ্ছা সত্বেও চাকরি করেছি। কিন্তু এখন তাে আর এতে আমার কোন হাত নেই।

s তৃতীয় অ-তৃতীয় দৃ শশী। তা হলে তুমি আজই এখান থেকে চলে যাচ্ছ? নিখিল। না। শশী। তবে ? নিখিল। সুযােগ যখন একটা এলই—তখন আর এটাকে হাতছাড়া করি কেন। শশী। তার মানে ? মহী। নিখিলবাবু নােটিশটা অমান্য কইরা জেলে যাইতে চান। শশী। ও! তােমার জেলে যাবার সখ হয়েছে ? নিখিল। সখ কেন কাকাবাবু, এটাকে আমি কর্তব্য বলেই মনে করি। শশী। উত্তম কথা। কিন্তু সাবধান, উত্তেজনার মুখে হঠাৎ কিছু করে বসে শেষে যেন অনুতাপ না করতে হয়। নিখিল। আপনার আশীর্বাদ পেলে আমি উতরে যাব বলেই বিশ্বাস। শশী। আশীর্বাদ তুমি নিশ্চয়ই পাবে। তােমার যখন তাই ইচ্ছে, আমি আর তােমাকে বাধা দেব না। তারপর মহী, তাের ওদিকার খবর কি? মহী। খবর বেশি ভাল না ছােট ভুঞা। ব্যাপারী সাব লােকেরে ক্যাবলই কুবুদ্ধি দিতেছে। বলে, এই আন্দোলন ইন্দুগ, মুছলমানেরা এতে যােগ দিলে গুণা অইব। আমার নামে রটাইতেছে, আমি নাকি ইন্দুগ টাকা খাইয়া দালালি করতেছি। কন্ ত ক্যামন কতা। শশী। কি করবি মহী, কাজ করতে গেলে নিন্দা প্রশংসা দুইই পাবি। দেশের স্বাধীনতাকে যারা ভাগ করে দেখে তাদের সম্বন্ধে শুধু এক কথাই বলা চলে যে তারা নির্বোধ। [ অমনের প্রবেশ ] অমর। বাবা, আপনি নাকি নােটিশ অমান্য করে পুলিশে ধরা দেবেন? শশী। সত্যাগ্রহী হিসেবে তাই তাে করা উচিত। অমর। কিন্তু আপনি এত শীগগির জেলে গেলে লােক যে নিরুৎসাহ হয়ে পড়বে। শী। উল্টো বলিসনে অমর। আমি ধরা দিলে পাের্ক বরঞ্চ জেলে যাবার জন্যে আরাে উৎসাহিতই হয়ে উঠবে। অমর। কিন্তু জেলে যাওয়াটাই তাে সব চাইতে বড় কথা নয়।

শশী। তবে কোটা বড় কথা হল?
অমর। কাজ করাটাই সব চাইতে বড় কথা।
শী। আজকের দিনে আইন অমান্ত করে জেলে যাওয়ার চাইতে আর
কোন বড় কাজ সত্যাগ্রহীর নেই।
অমর। একমত হতে পারলাম না। নিখিল, মহী, তােমরা এস আমার
সঙ্গে। জেলেপাড়ার বৈঠকে যেতে হবে।
শশী। পাড়া। অমিলটা যখন প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে—তখন কথাও
স্পষ্টাস্পষ্টি হয়ে যাওয়াই ভাল। সেদিন সভায় তাের বক্তৃতা শুনেই
আমার কেমন সন্দেহ হয়েছিল। এখন দেখছি, সে অনুমান আমার
মিথ্যা নয়। যদি রক্তারক্তি, ভ্রাতৃহত্যার মধ্যেই দেশের মুক্তি রয়েছে
বলে তাের বিশ্বাস—তবে এই অহিংস আন্দোলন থেকে সরে
দাড়ানই উচিত।
অমর। এসব কথা অবান্তর।
শশী। অবান্তর নয়। খুলে না বললেও তাের আচরণ থেকে আমি
সবই বুঝতে পেরেছি। না না, যে আন্দোলনে বিশ্বাস নেই তার
সুযােগ নিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনের চেষ্টা করা অত্যন্ত অধ্যায়—
বিশ্বাসঘাতকতারই সামিল।
অমর। এ আপনার অনুমান মাত্র।
শশী। আমার অনুমান মিথ্যা প্রতিপন্ন হবে যদি আর আত্মগােপন করে
না থেকে কালই তুই পুলিশে ধরা দিস। গ্রেপ্তারি পরােয়ানা
বেরুবার পরে কোন সত্যাগ্রহীর উচিত নয় একদিনও আত্মগােপন
করে থাকা।
অমর। সে তপােৰনের ধর্ম-রাজনীতি নয় ।
শশী। তােদের রাজনীতির কথা ভেবে শিউরে উঠি। তােরা চাস
শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রেণীকে লেলিয়ে দিতে—তােরা চাস হিংসা দিয়ে
হিংসাকে জয় করতে—অস্ত্র দিয়ে অস্ত্রকে দমন করতে•••••
অমর। আপনিও একদিন তাই চেয়েছিলেন।
শশী। হ্যা, চেয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলাম
সে আশা দুরাশা মাত্র—সে পথ ভ্রান্ত।
অমর। দেশের অগণিত লােককে বাদ দিয়ে জনকয়েক মিলে

[ তৃতীয় অ—তৃতীয় দৃশ]
চেয়েছিলেন স্বাধীনতা আনতে—তাই মাঝপথেই আপনাদের থেমে
যেতে হয়েছিল।
শশী। মিথ্যা নয়। মহাত্মাজীই আমাদের তারপর পথ দেখিয়েছেন।
অমর। আমরাও সেই পথেই এগিয়ে যাবার চেষ্টা কচ্ছি।
শশী। কিন্তু শৃঙ্খলা না মেনে?
অমর। না, তা নয়। কিন্তু শৃলা যদি কখনাে শৃঙ্খল হয়ে ওঠে তাকে
আমরা ভাবই। নিয়মের ব্যতিক্রম আছে বলেই তাে নদীতে
বন্যা হয়—তা বলে নদীকে কেউ দোষ দিতে যায় না।
শশী। সময় থাকতে হানার মুখে বাঁধ দিলে বন্যার জল রােধ করা যায়
অমর।
অমর। কিন্তু সময় সময় সে বাঁধও ভেঙ্গে যায় বাবা ।
শশী। তর্ক করিসনে অমর। অহিংস আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠলে
কখনি আমাদের মঙ্গল হবে না। Don't forget that means
determines the end.
অমর। কিন্তু এও আপনি জানবেন, যে-অস্ত্রে সংগ্রাম শুরু হয় সেই
অস্ত্রেই সংগ্রাম শেষ হয় না।
[ অমরের দ্রুত বেগে প্রস্থান ।
নিখিল। কাকাবাবু••••
শশী। আজ তােমরা যাও নিখিল। আমায় একটু ভাবতে দাও
একটু একা থাকতে দাও আমায়.•••••
[ নিখিল ও মহীউদ্দীনের অবনত মস্তকে প্রস্থান। শশীবাবু ঘরে পায়চারী
করতে লাগলেন—মুখে তার বিড়বিড় শব্দ ।

তৃতীয় অৰু-চতুর্থ দৃশ্য [বিপিন যােরে বৈঠকখানা। সার্কেল অফিসার (এখন শেল ম্যাজিস্টেট) একটি টেবিলের ধারে চেয়ে উপবিষ্ট। তার এক পাশে বিপিনবাবু ও আর এক পাশে রজ্জব আলী চেয়ারে বসে আছে। যত বর্তী খাতাপত্র নিয়ে সামান্য দূরে আর একখানি টেবিলের পাশে উপবিষ্ট। তার একদিকে গগন চেকির দাড়িয়ে আছে। বঙ্গ। আমি কিন্তু জানতাম সর, আপনাকে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট হতেই হবে। শে-ম্যাজি। তাই নাকি! আপনি দেখছি তা হলে সর্বজ্ঞ। বঙ্গ। ( মৃদুহাশ্যে ] লেখাপড়া না হয় বেশি জানাই নেই; কিন্তু বয়সের তাে একটা দাম আছে—অভিজ্ঞতাকে তাে আর হেসে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। স্পে-ম্যাজি। না না, কস্মিনকালেও নয় ; আপনাকে হেসে উড়িয়ে দেব আমি। আপনারা হলেন ত্রিকালজ্ঞ ব্রাহ্মণ•••••• বঙ্গ। আর লজ্জা দেন কেন। ব্রাহ্মণের বংশে জন্ম বটে—কিন্তু ব্রাহ্মণত্বের আমাদের আছে কি? জাতপাত আর কিছুই থাকবে না স্পে-ম্যাজি। কেন? বঙ্গ। কেন আবার কি। অমর ছোঁড়াটা তত জেল থেকে মেলেচ্ছ হরে বেরিয়ে এসেছে। না মানে জাত, না মানে ধর্ম। যার তার হাতে খাওয়া, যেখানে সেখানে শশাওয়া। অনাচারে সব একাকার হয়ে গেল। আমাদের আর এখন কেউ পােছেই না। স্পে-ম্যাজি। আপনারা তাে তাকে ধরিয়ে দিচ্ছেন না। ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে, অথচ পুলিশের চোখে ধুলি দিয়ে অনায়াসে সে গ্রা গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বঙ্গ। দেখা তাে হয় পথেঘাটে মাঝে মাঝে। কিন্তু সে কি এব জায়গায় স্থির হয়ে থাকে কখননা। চড়কীবাজীর মতন ঘুরে বেড়ায়। গ্রামের লােকগুলিকে যেন মন্ত্র দিয়ে বশ করে নিয়েছে এক "পারেনি ঐ ব্যাপারী সাহেবদের পাড়ায় কিছু করতে। বিপিন। তাদেরও গাঁথবার জন্যে নতুন টোপ ফেলেছে। শে-ম্যাজি। কি রকম?

[ তৃতীয় অঙ্ক-চতুর্থ দৃশ্য ] বিপিন। বলছে, কেবল ইউনিয়ন বাের্ডের ট্যাক্স বন্ধই নয়, প্রয়ােজন হলে জমিদারের খাজনাও বন্ধ করতে হবে। এজষ্ট একটা কৃষক সমিতির সৃষ্টি হয়েছে আর তাতে ব্যাপারী সাহেবের স্বজাতিরাও••• স্পে-ম্যাজি। যােগ দিয়েছে ? কি ব্যাপারী সাহেব, সত্যি? রজ্জব। তা একদল যােগ দিয়েছে বটে। বিপিন। আমি অবশ্য বিশ্বাস করিনে; তবে লােকে বলে যে ব্যাপারী সাহেবও নাকি তলে তলে••••• স্পে-ম্যাজি। ওঁর স্বজাতিপ্রীতি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। বিপিন। এহ বাহ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আরাে যে কিছু নেই—কি আছে, কে জানে। রজ্জব। বলতেই যখন চাচ্ছেন তখন আর রেখেঢেকে বলছেন কেন? খুলেই বলুল না । বিপিন। কি আর খুলে বলব। সদর খাজনার জন্যে আমার মহালটা যদি লাটে ওঠে—তবেই তাে লাভ। রজ্জব। আপনি এসব কি বলছেন বিপিনবাবু! আপনার মহালই বা লাটে উঠবে কেন—আর উঠলেই বা তাতে আমার কি লাভ? বিপিন। খাজনা না পেলে খাজনা দেবার মতাে সামর্থ্য যে আমার নেই সেকথা আপনি ভালভাবেই জানেন। রজ্জব। কি আশ্চর্য! আপনি তাে কতবার আমার কাছ থেকে টাকা কর্জ নিয়ে সদর খাজনা দিয়েছেন। বিপিন। কিন্তু আপনার পাইপয়সাও আমি শােধ দিয়েছি। রজ্জব। আমি কি অস্বীকার কচ্ছি। বিপিন। তবে আর সেকথা শােনাচ্ছেন কেন? রজ্জব। থাক বিপিনবাবু, আপনার কথাবার্তাই আজকাল কেমন হয়েছে। বিপিন। আমার হয়নি, হয়েছে আপনার। দু’টো পয়সা হয়েছে বলে ধরাকে সড়া জ্ঞান কচ্ছেন। যত বড়ই হয়ে থাকুন না কেন, জানবেন ভুঞা বংশের মানমর্যাদাকে ধূলােয় লুটাবার মত ঐশ্বর্য হতে আপনার ঢের দেরি। রজ্জব। বামন হয়ে আসমানের চাঁদ ধরতে চাব, এমন দুরাশা আমার নেই। তবে জানবেন, মানইজ্জত সবারই আছে। আচ্ছা, আমি চম পােৰ। আপনার বা ফরমাশ আমায় জানাবেন। আদাব। [ শােল ম্যাজিস্টেটৰুে নাৰ জানিয়ে এ আলীর মাগতভাবে এন] স্পে-ম্যাজি। [ বিপিনকে ] আপনি অত উত্তেজিত হয়ে উঠলেন কেন। বিপিন। আপনি জানেন না সার, লােকটা ভেতরে ভেতরে কি রকম হিন্দু-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। স্পে-ম্যাজি। [ মৃদুহাতে ] যাকুগে সেসব কথা। শশীবাবুর খবর কি? বিপিন। ছােটকাকা আপনাদের নােটিশ অমান্য করে কাল সভায় বক্তৃতা করবেন। স্পেঃ ম্যাজি। ভালই হবে। বৃদ্ধ এবার তাহলে জেলে যাবেনই দেখছি। বিপিন। ভাল হবে কি মন্দ হবে ঠিক বলা যাচ্ছে না। স্পেম্যাজি। কেন? বিপিন। আর যাই হােক, দশ গাঁয়ের লােকে ছােটকাকার কথা শােনে। স্পে-ম্যাজি। তাতেই তাে মুশকিল হচ্ছে। বিপিন। আমি ভাবছি অন্য কথা। স্পে-ম্যাজি। কি ? বিপিন। অমর এ মুল্লুকের লােকগুলােকে যেভাবে ক্ষেপিয়েছে তাতে তাদের শান্ত রাখতে পারে একমাত্র ছােটকাকাই। শে-ম্যাজি। তিনি তােত তা রাখছেন না। বিপিন। নিশ্চয়ই রাখছেন, তা নইলে এতদিনে•••••• স্পে-ম্যাজি। [ শ্লেষের হাসি হেসে ] এতদিনে এ মুল্লুকে বৃটিশ রাজত্বের অবসান হত। বিপিন। আমার কথা যদি হেসেই উড়িয়ে দেন তবে আমি কি করতে পারি। শে-ম্যাজি। না না, হেসে উড়িয়ে দেব কেন। তবে এগুলি আপনার দুর্বলতা। বিপিন। কেমন ?

[ তৃতীয় অ—চতুর্থ দৃশ্য ] শে-ম্যাজি। আপনি বাইরে যতই শক্ত করেন না কেন, শশীবাবুর সম্পর্কে কিন্তু আপনার দুর্বলতা যথেষ্টই। বিপিন। হবে। বেশ আপনার যা ইচ্ছে করুন। স্পে-ম্যাজি। আপনি কিছু ভাববেন না। দেখবেন, রেগুলেশন স্টীকের মুখে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কালকের সভায় শশীবাবুকে গ্রেপ্তার করবার পর লােকগুলােকে কিছু উত্তম মধ্যম দিলে কেমন বিপিন। তাতে কি ভাল হবে ? স্পে-ম্যাজি। নিশ্চয়ই। কত লােককে আপনি জেলে পাঠাবেন। জেল-জরিমানা করে কিছু হবে না; এদের ঠিক করতে হবে লাঠির ঘায়ে। যেমন কুকুর, তেমন•••••• [ নয় হাত দৃঢ়মুষ্টিতে ধরে দফাদারের প্রবেশ। দফাদারের অন্য হাতে একটা লাঠি ও বগলে এক তাড়া কাগজ ] দফাদার। [ কাগজের তাড়াটা স্পেশ্যাল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে রেখে ] দ্যাখেন হুজুর, বাচ্চার কাণ্ড দ্যাখেন। আরে এ যেমন তেমন বাচ্চা নয়, মহীরাবণের বেটা অহিরাবণ। স্পে-ম্যাজি। [ কাগজগুলি খুলে নেড়েচেড়ে ] ও! সত্যাগ্রহ বুলেটিন। এই ছোড়া, এগুলি পেলি কোথায় ? [ নল নিরুত্তর ] পাবে আর কোথায়। ওর গুরুদেব—ঐ অমরই ওকে দিয়েছে। সাকরেদ জুটেছে ভাল। স্পে-ম্যাজি। সাইক্লোস্টাইল মেশিনটার আজও কোন সন্ধান দিতে পারলেন না বিপিনবাবু। আচ্ছা দেখুন তাে, এই হাতের লেখাটা কার ? বিপিন। [ দু'একখানা বুলেটিন হাতে নিয়ে দেখে ] নিখিলের হাতের লেখা বলে মনে হচ্ছে। বঙ্গ। তাই হবে সার। ইস্কুলের মাস্টারি যাওয়ায় এখন ঐ দলে গিয়ে ভিড়েছে। স্পে-ম্যাজি। [ তিলটা কোমর থেকে খুলে টেবিলের উপর রেখে ] এই ছোঁড়া, অমর কোথায় থাকে জানিস ? নন্দ। না।

শে-ম্যাজি। এগুলি তােকে কে দিল? না। ক্যাঙ না। স্পে-ম্যাজি। ক্যাও না তাে হাওয়ায় উড়ে এল ? ছোঁড়া তত বড় ডে পাে দেখছি। বঙ্গ। সার, একেবারে তেঁতুল বিচি। স্পে-ম্যাজি। কয়েক ঘা দিলেই নবম হয়ে যাবে। [ টেবিলের ওপর রিভলবারটা নাড়তে নাড়তে ] এগুলি কোথায় ছাপা হয়, জানিস ? নন। না। স্পে-ম্যাজি। নিষে আয় তাে ওকে সামনে দেখি কেমন জানে কি জানে না। [ দফাদার নন্দকে স্পেশ্যাল ম্যাজিস্ট্রেটের চেয়ারের সামনে ধরে নিয়ে এল। ভাল চাস তাে বল, এগুলাে কোথায় ছাপা হয় এবং কে ছাপে। নল। জানি না। স্পে-ম্যাজি। [ গালে চড় মেয়ে] জানি না ! [ রিভলবার ধরে। দেখেছিস। [নশ অনমনীয় ভাষ] বঙ্গ। আরে বল না যা জানি। মরণেরও ভয় নেই। [ শােল ম্যাজিস্ট্রেট জুতা দিয়ে নন্দর পায়ের উপর জোরে চাপ দিতে লাগল] নল। উঃ। গগন। [একটু বিচলিত হয়ে] ছেইলা মানুষ বড় ব্যথা পাইতেছে হুজুর। স্পেম্যাজি। চুপ কর শুয়াের। ও ব্যথা পাচ্ছে, না তুই ব্যথা পাচ্ছিল? এই, দেখি ঐ বেতটা দে তাে। আর দরজাটা বন্ধ করে দে। { দরজা বন্ধ করে দফাদার বেত এগিয়ে দিল। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট পকেট থেকে একটা পেন্সিল বের করে বেত ও পেন্সিল দিয়ে নন্দর এক হাতের আঙ্গুলগুলি চেপে ধরল ] নল। [ব্যথিত কঠে] উঃ! মাগাে। স্পে-ম্যাজি। চেঁচাবি তত খুন করব। বল, অমর কোথায়?

[ তৃতীয় অঙ্ক-চতুর্থ দৃশ্য বর নল। জানি না। স্পে-ম্যাজি। একই কথা ! [ আরও জােরে চাপ দিল] বল, যা জানিস [ ব্যথা সহ কতে না পেরে মম চীৎকার করে কেঁদে উঠল—“উঃ মারে, বাবারে, মাইরা ফালাইলরে ] [ দফাদায়কে] এই, ওর মুখটা বেঁধে দে তাে। [ দফাদার পাগড়ী দিয়ে নয় মুখ বাখছে এমন সময় বাইরে কড়া নাড়ার শব্দ ও মহিলা কণ্ঠে ডাক “দোরজ খােল” ] বিপিন। এই রে, সেরেছে। যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই। ঘােট পিসী। বঙ্গ। উরে বাবারে! এ যে রায় বাঘিনী। কি হবে বড় ভুঞা ! বিপিন। আমি আর এখানে থাকতে পারব না সার। আমাকে এ অবস্থায় পেলে আমার মুণ্ডপাত করে ছাড়বে। আমি বাড়ীর মধ্যে চলে যাই। [ পাশের দরজা খুলে বিপিনবাবু ও তার পিছু পিছু বঙ্গ চক্রবর্তীর অক্ষয় মহলে প্রবেশ। বাইরের দিককার দরজায় আবার কড়ানাড়ার শব্দ ] নিবেদিতা। [অন্তরীক্ষে] দোর খােল, খােল বলছি। [ আরাে জোরে কড়া নাড়া ] স্পে-ম্যাজি। [ গগনকে ] দোরটা খুলে দে। [ নন্দকে ছেড়ে দেবার জন্য ইশারা করে। গগন দরজা খুলে দেয় এবং নন্দ দফাদারের হাত থেকে ছাড়া পায়। নিবেদিত প্রবেশ করে ] নিবেদিতা। বাঃ! কি বীর পুরুষ আপনারা। একরত্তি এই ছেলেটাকে ধরে এনে খুব পিটছেন। বাহাদুর বটে! গােলামি করতে হয় বলে কি এতটা অমানুষ হয়ে যেতে হয়। স্পে-ম্যাজি। ছেলে মানুষকে দিয়ে যারা এসব কাজ করায় তারা বুঝি খুব মানুষ? নিবেদিতা। তারা মানুষ কি অমানুষ সে কৈফিয়ৎ আপনাকে দেওয়া আমি নিষ্প্রয়ােজন মনে করি। বে-আইনী কাজ করলে আপনারও শাস্তি হতে পারে, আশা করি হাকিম হয়ে সে-কথা ভুলে যাননি। স্পে-ম্যাজি। মেয়েদের কাছ থেকে আইন সম্বন্ধে উপদেশ শােনবার মত আগ্রহ আমার নেই।

নিবেদিতা। দম্ভ আপনার খুবই হয়েছে দেখছি••••• গে, বিপিন
কৈ? পালিয়েছে বুঝি? হারে চেরাক, তােদের দয়ামায়া বলে
কি কিছু নেই—ছেলেটাকে পথ থেকে ধরে এনে তার ওপর ও
ভাবে মারপিট কচ্ছিল। কান্না শুনে বাড়ীতে টিকতে পারলাম না
ছুটে আসতে হ’ল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। আয় নল, আমার সঙ্গে।
Fনর হাত ধরে নিবেদিত এনােত—এখন সময় বাইরে তাৰু
সর্বনাশ! [ শেশাল ম্যাজিস্টেটকে] আপনি পালান।
স্পেশ্যাজি। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! [ অট্টাসি ]
নিবেদিতা। হাসি আপনার থাকবে না—জীবনের মায়া থাকে তাে,
পালান।
স্পেশ্যাজি। কেন?
নিবেদিতা। কেন! শুনতে পাচ্ছেন না? আপনার গুণকীর্তির কথা, +
বােধ হয় গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে—তাই গ্রামের লােক আসছে
এদিকে ছুটে•••••
স্পে-ম্যাজি। প্রতিশােধ নিতে?
নিবেদিতা। না, নন্দকে আপনার কবল থেকে উদ্ধার করতে।
স্পে-ম্যাজি। পারবে না।
নিবেদিতা। তারা জোর করে ছিনিয়ে নেবে।
শে-ম্যাজি। [ রিভলবারটা দেখিয়ে মৃদু হেসে] এটা থাকতে।
নিবেদিতা। এইত আপনার সম্বল! এটা দিয়ে আপনি ক’জনকে
ঠেকাবেন ?
স্পে-ম্যাজি। অন্তত আধ ডজন।
নিবেদিতা। তারপর ?
স্পে-ম্যাজি। তারপর সব শ্যাল-কুকুরের মতাে পালাবে।
নিবেদিতা। এই বুদ্ধি না হলে আর আপনি হাকিম হতে যাবেন
কেন। অত্যাচারে লােক যে মরিয়া হয়ে উঠেছে•••••
স্পে-ম্যাজি। আপনি কি বলতে চান খুলে বলুন তাে।
নিবেদিতা। বলতে চাই, আপনি সসম্মানে পালান।
শে-ম্যাজি। না হলে আমার জীবনসংশয়ও হতে পারে?
নিবেদিতা। অসম্ভব কি।

[ তৃতীয় অ—চতুর্থ সৃ) শে-ম্যাজি। তাই বলুন। আমি জানি, আপনাদের অহিংসাটা একটা ভাণ মাত্র। নিবেদিতা। মােটেই না। সেটা সত্য জানেন বলেই আপনি এখন এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন।••••••কিন্তু আপনার হাতের ঐ হিংস্র অস্ত্রটাই হয়তাে ওদের সহিংস করে তুলতে পারে।••••••গে, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আপনার ভালর জন্যই বলছি—বিপিনের অন্দর দিয়ে আপনি পালিয়ে যান। [ আবার শত কোলাহল। স্পে-ম্যাজি। কিন্তু•••••• নিবেদিতা। কিন্তু শােনব আরেক দিন। দোহাই আপনার, আমার কথা রাখুন—আপনি এক্ষুণি চলে যান। স্পে-ম্যাজি। বেশ, আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু জানবেন, এর বােঝ- পড়া আরেক দিন হবে। নিবেদিতা। [ একটু হেসে ] নিশ্চয়ই হবে। চেরাক, গগন তােরাও যা। আর এক মুহূর্তও এখানে থাকিস নে। [ স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট, চেরাক ও গগনের অন্দর মহলের দিককার দরজা দিয়ে প্রধান। বাইরে জনতার কোলাহল ] নিবেদিতা। আয় নন, শীগগির আয়। আমবা তাড়াতাড়ি গিয়ে না পড়লে ওরা এবাডি চড়াও হবে। [ নম্বর হাত ধরে দ্রুত নিবেদিতার প্রস্থান ] তৃতীয় অঙ্ক-পঞ্চম দৃশ্য গােপালের বাড়ী। ভােৱবো, তখনাে ভাল করে অন্ধকার কাটেনি। গােপালগঞ্জয়ী ও নন্দ বয়ের মধ্যে শুয়ে ঘুমােচ্ছে। গােপালের সরঞ্জামের ৰামটা এখানে পড়ে আছে। পেছনের বেড়ায় দড়ি দিয়ে বুলান একটি কাঠের থাকে লক্ষ্মীর আসন পাতা। লক্ষ্মীর ছবির পাশে আরাে দু'তিনখানা ঠাকুর দেবতার ছবি। তার একটু দূরে সিকের ঝুলান কয়েকটি মাটির ঘট। নন্দর শিয়রের কাছে বেড়ার সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে একটি কংগ্রেস পতাকা। বাইরে কয়েক জোড়া জুতাের মচ মচ শব্দ। গােপাল শুনতে পেয়ে একবার কান খাড়া করে আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। দরজায় করাঘাত ও হাঁক, “দোর খােল”] গােপাল। [ নিদ্রাবিষ্ট অবস্থায় ] সকাল বেলা জ্বালাতন কইর না। কাম থাকে পরে আইস। [ গােপাল পায়ের কাছের কথাখানা টেনে মুড়ি দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। পুনরায় দরজায় করাঘাত ও হক, “দোর খােল শালা।” কি জ্বালাতন রে বাবা! [ উঠে বসে হাত দিয়ে চোখ রগড়াতে রগড়াতে ] কে তুমি ? স্পে-ম্যাজি। [ নেপথ্যে ] শালা তাের যম। লাথি মেরে দরজা ভেঙ্গে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট, ওন কয়েক কনেস্টবল, দফাদার ও চৌকিদারের প্রবেশ। মঞ্জরী ও নন্দ ধচমচিয়ে উঠে বসে ] স্পে-ম্যাজি। বেটা নবাবপুত্তর, উঠে দরজা খুলতে পারেন না। আবার বলেন, “কে তুমি।” এই, দ্যাখ তাে, ঘরে কি আছে। [ কনেস্টবলে তখন খানাতলাসের অছিলায় সমস্ত ঘর লণ্ডভণ্ড করে। লক্ষ্মীর আসন থেকে সব টেনে ফেলে দেয়। দেবদেবীর ছবি গুলিকে মুন্সী বন্দুকের কুঁদো দিয়ে ভাঙ্গে। একজন কনেস্টবল বন্দুকের কুঁদে দিয়ে সিকের হাঁড়িগুলােকে ভেঙ্গে ফেলে—হাঁড়িতে যা সামা মুড়ী-মুড়কি ছিল তা সমস্ত ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। স্পেশাল মাজিস্টেট গােপালের সরঞ্জামের বাক্সটিকে বুটের গুততা মেরে উল্টিয়ে ফেলে দেয়। মুন্সী কংগ্রেস পতাকাটিকে নিয়ে জুতাের তলে মাড়ায়। গােপাল, মঞ্জরী ও নদন্তক হয়ে দাড়িয়ে থাকে] মুন্সী। মিস্তরীচালাক আছে। এক নিশান ছাড়া তাে কিছুই পাওয়া গেল না। স্পে-ম্যাজি। তাই তাে দেখছি। অমর কোথায় মাতব্বর ? ০ [ তৃতীয় অর্থ-পঞ্চম দৃশ্য ] ; গােপাল। জানি না। শে-ম্যাজি। ছাপার যন্ত্রটা ? গােপাল। কি ছাপার যন্ত্র ? শে-ম্যাজি। বদমাইশি রাখ। কি ছাপার যন্ত্র তুমি জান না। এই যে তােমাদের কি—সত্যাগ্রহ বুলেটিন না কি ছাপা হয় ? গােপাল। মুখখু নােক আমি ; আমি তার কি জানি। স্পে-ম্যাজি। [গােপালের গণ্ডদেশে চপেটাঘাত করে। আমি তাের ভনিতা শুনতে চাই নে। জানিস, কি জানিসনে বল। [ গােপাল নিশ্চল অবস্থায় দাড়িয়ে থাকে। ক্ষোভে, অপমানে তার চোখ দিয়ে যেন বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরুতে থাকে । গগন। মঞ্জু এইখান থেইকা চইলা যাউক হুজুর? বয়স্থা মাইয়ার সামনে•••• স্পে-ম্যাজি। তুই চুপ কর। [ গােপালকে] অমর, নিখিল, মহী এরা 'কোথায় থাকে তুই কিছুই জানিসনে ? গােপাল। না । স্পে-ম্যাজি। তাদের সঙ্গে তাের দৈখাও হয় না ? [ গােপাল নিরুত্তর : কি, কথা নেই যে? তবে দেখা হয় ? গােপাল। ক্যাবল আমার নগে ক্যান্, অনেকের নগেই ত তাগ দেখা অয়। তারা ত আর বেলাতে চইলা যায় নাই, এই মুলুকেই আছে। স্পে-ম্যাজি। তা আমি জানি। কিন্তু তাের সঙ্গে দেখা হয় কোথায়, কখন ? গােপাল। তার কি কিছু ঠিক আছে। স্পে-ম্যাজি। তাদের খাওয়াই বা জোটে কোথায় ? গােপাল। তাগ খাওয়ানের নােকের অভাব কি। স্পে-ম্যাজি। অর্থাৎ তােমার বাড়ীও চলে। [ গােপাৰ নিরুত্তর ] কিন্তু জানিস, কংগ্রেসী লােককে খেতে দিলে ছ'মাস জেল হতে পারে ? গােপাল। সায়রেই যার শয়ন, শিশিরে আর তার কত ভয়।

২
স্পে-ম্যাজি। ওঃ! বেটা খুব শােলক শশানাচ্ছে। আচ্ছা, ভয় আছে
কি নেই দেখা যাবে। [ সঙ্গীদের ] চলল। [গােপালকে ] আমি
এখনাে তােমায় সাবধান করে দিয়ে যাচ্ছি, নিজের ভাল চাও
তত এসব ছেড়ে দাও।
[ স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট ও তার সঙ্গে কনেস্টবলদের প্রস্থান ]
গগন। চকিদারী আমি ছাইড়াই দিমু মণ্ডলখুড়া। এই সব আর
আমার ভাল নাগে না।
" মমীর দিকে কটাক্ষ হেনে প্রস্থান। সরস্লামের বাক্স থেকে যন্ত্রগুলি
মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। গােপাল সেইগুলি এক একটা হাতে নিয়ে
কপালে ছুইয়ে আবার ব্যয়ে রেখে দিতে লাগল। মঞ্জরী দেবদেবীর
হবিগুলাে নিঃশব্দে কুড়ােতে লাগল। নন কংগ্রেস নিশানটা মাটি থেকে
কুড়িয়ে নিয়ে ধুলাে ঝাড়তে থাকল। অনেকক্ষণ সবাই নীরব। গােপাল
এক পা দু পা করে মন্থর গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে এল। মঞ্জরী
ছলছল চোখে তার পাশে এসে দাড়াল ।
গােপাল। মঞ্জু।
মঞ্জরী। কি বাবা?
গােপাল। ত’রা একটু সাবধানে থাকিস।
মঞ্জরী। ক্যান্ বাবা, তুমি কোনখানে যাইবা নাকি?
গােপাল। হ, অমরের কাছে একবার যামু।
মঞ্জরী। না বাবা, অখন যাইও না, পরে যাইও।
গােপাল। না না, অখনই আমার যাইতে অইব। যাইয়া অমররে
একবার জিগামু যে, এই ঐত্যাচার আর কতদিন মুখ বুইজা সহ
কতে অইব।
[ পােপালের বেগে প্রস্থান। মঞ্জরী ও ন হতবাক হয়ে দাড়িয়ে
থাকে। পর্দা ]

চতুর্থ অ-প্রথম স্থ
[ ইউনিয়ন বাের্ডের অফিসের সম্মুখভাগ। ঘরের মধ্য থেকে বান্দা
দিয়ে নেমে এলেন বিপিনবাবু, রজ্জব ব্যাপারী
বিপিন। সেদিন না বুঝতে পেরে আপনাকে আমি কয়েকটা অধ্যায়
কথা বলে ফেলেছি। আপনি আমায় মাফ করুন ব্যাপারী
সাহেব।
রজ্জব। কি তাজ্জব ব্যাপার! আপনাকে মাফ করব আমি।
মিছেমিছি আমায় লজ্জা দেবেন না বিপিনবাবু। আপনারা হলেন
সম্মানী লােক।
বিপিন। এটা মান-অভিমানের সময় নয় ব্যাপারী সাহেব। আজ
আমারও বিপদ, আপনারও বিপদ।
রজ্জব। [মৃদু হেসে] অতএব আসুন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সঙ্গে চলি।
বিপিন। সেটাই তাে আজ আমাদের বাঁচবার পথ।
রজ্জব। আপনার পক্ষে তাই বটে, কিন্তু আমার নাও হতে পারে।
বিপিন। আমরা তত সম্পদে আপদে চিরদিনই একসঙ্গে চলেছি
ব্যাপারী সাহেব।
রজ্জব। হাঁ, যতদিন আপনার ছায়ার মত আমি চলতে পেরেছি।
বিপিন। আমাদের সামনে যে আজ দুর্যোগ, অন্ধকার••••••
রজ্জব। এবার এই দুর্যোগে পথের সাথী আপনার স্বজাতির মধ্যেই
খুজে নিন বিপিনবাবু।
বিপিন। আপনি কি আমাকে কোন ভাবেই সাহায্য করবেন না?
রজ্জব। কি করে করব। আপনার আমার পথ যে ভিন্ন।
বিপিন। চারদিকে আজ যে আগুন জ্বলেছে তাতে কি শুধু আমারই
ক্ষতি হবে ?
রজ্জব। হয়তাে আমারও হবে।
বিপিন। তবে।
রজ্জব। তবে—উপায় নেই।
বিপিন। কোন উপায় নেই।
রজ্জব। এ আগুন নেভাবার মত শক্তি অন্তত আমার নেই বিপিনবাবু।
বিপিন। আপনি চেষ্টা করলে আপনার স্বজাতিকে••••

রব। ভুল ধারণা আপনার সম্পূর্ণ ভুল। আপনার অন্ত নয়, আমার নিজেরই বাঁচবার কথা ভাবতে হয়েছে। চেষ্টা করেছি, কোন ফলই হয়নি। বললেও আজ আর কেউ আমার কথা শুনবে না। বিপিন। কিন্তু এতে যে আপনার, আমার অল্প মারা যাবে। রজব। দেখুন চেষ্টা করে, যদি কিছু ফল হয়। [ মৃদু হেসে বুজবের প্রস্থান। বিল্পিত বৃষ্টিতে তার প্রতি পদক্ষেপ বিপিনবাবুর অবলােকন। অপর দিক দিয়ে স্পেশাল ম্যাজিস্টে শীবানু মুন্সী ও দশ-বার জন কনেস্টবলের প্রবেশ। চার-পাঁচ জন পুলিশ বন্দুকধারী স্পেম্যাজি। [ শশীবাবুকে] আপনাকে বাড়ীতে arrest করেই ভাল হ’ল, কি বলেন? সভায় arrest করতে গেলে অযথা একটা গণ্ডগােলের সৃষ্টি হতাে। শশী। আপনাদের মর্জি। অর্ডিনান্স হাতে পেয়েছেন—যা খুশি তাই করতে পারেন। স্পে-ম্যাজি। হাঁ, আমাদের কাজের অনেকটা সুবিধে হয়ে গেছে। এই ধরুন, আপনাকে অন্য চার্জে না ফেলে intimidation চার্জে ফেললুম। শশী। আমি যদি আমার case defend করি । স্পে-ম্যাজি। করলেনই বা, আপনি তাে আর সত্য কথা গােপন করতে যাবেন না। শশী। ও! আমাদের ওপর আপনাদের খুব তত বিশ্বাস। স্পে-ম্যাজি। [সহাতে ] সবার ওপর না থাকলেও ব্যক্তি বিশেষের ওপর আছে বই কি। [ দূরে অনকোলাল। নানারূপ দেশী ও বিপ্লবাত্মক ধ্বনি। শোল ম্যাজিস্টেট একটু চঞ্চল হলেন। ও! মুন্সী, তুমি শশীবাবুকে নিয়ে যাও। [ শশীবাবুকে নৌকায় যাবেন-না মােটর লঞ্চে যাবেন?•••না থাক, লঞ্চে গিয়ে কাজ নেই। আবার এক লঞ্চ লােক হৈ চৈ করবে। তার চেয়ে বরঞ্চ একটা নৌকা ভাড়া করেই যাও মুলী। আচ্ছা আম্মন, নমস্কার। [শবাৰু কিছু না বলে মাখাটা সামান্য নুইয়ে প্রতি নমস্কার জানালেন।

! ( চতুর্থ অথম দৃশ] মুলী ও ফুল সশয় এরী শশষাংকে নিয়ে যেদিক দিয়ে গিয়েছিল সেদিক দিয়ে স্থান ফল । কি ভাবছেন বিপিনবাবু। বিপিন। না, কি আর ভাবব। স্পে-ম্যাজি। উহ! ভাবছেন আপনি নিশ্চয়ই। হয়তাে মনে মনে বলছেন, এই বৃদ্ধকে জেলে না পাঠালে কি ক্ষতি ছিল। বিপিন। আমি তা ভাবতে যাব কেন। শে-ম্যাজি। কোন কারণই নেই? সেদিন না কি বলছিলেন—শশীবাবু আর অমরের মধ্যে মতবিরােধ হয়েছে। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। । উহাসি। [ ব্যস্তভাবে নিবেদিতার প্রবেশ নিবেদিতা। দাদা কোথায় ? স্পে-ম্যাজি। এখানে নেই। নিবেদিতা। কোথায় ? স্পে-ম্যাজি। এস-ডি-ওর কাছে চালান দেওয়া হয়েছে। নিবেদিতা। কিন্তু•••••• স্পে-ম্যাজি। কিন্তু কি ? নিবেদিতা। তাঁকে দেখবার জন্যে যে অনেক লােক এসেছে। স্পে-ম্যাজি। দেখা হবে না। নিবেদিতা। কেন? স্পে-ম্যাজি। যেহেতু তিনি বন্দী। নিবেদিতা। বন্দী নেতাকে দেখবার অধিকার জনসাধারণের আছে। শে-ম্যাজি। জনসাধারণের অধিকার সম্বন্ধে আপনাকে অত্যন্ত সচেতন দেখা যাচ্ছে। নিবেদিতা। তবু ভাল, আপনার মত অচেতন পদার্থেরও তা হলে চোখ আছে ! স্পে-ম্যাজি। নিশ্চয়ই—যাকে বলে চক্ষুষ্মন ব্যক্তি। নিবেদিতা। পরিহাস রাখুন। দাদাকে পাঠিয়েছেন কতক্ষণ? স্পে-ম্যাজি। বেশিক্ষণ নয়, হয়ত এখনাে স্টীমার ঘাটে গিয়ে পৌঁছননি। নিবেদিতা। তা হলে আমি যাই, তাকে গিয়ে খবর দিই স্পেশালি। কাকে ? নিবেদিতা। দাদাকে। শে-ম্যাজি। অসম্ভব। নিবেদিতা। কেন ? স্পে-ম্যাজি। তাঁর কাছে আপনি যেতে পাবেন না। নিবেদিতা। আপনি আটকান। [ নিবেদিতা এগিয়ে যান। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় । আপনি জোর করবেন ? স্পে-ম্যাজিন ইচ্ছে নেই—তবে প্রয়ােজন হ'লে করব। নিবেদিতা। এত অধঃপতন হয়েছে আপনার ! যাক, আমি ফি যাব। স্পে-ম্যাজি। স্বেচ্ছায় যখন ফঁদে পা দিয়েছেন তখন ফিরে যাওয়াটা আপনার ইচ্ছাধীন নয়। নিবেদিতা। তার মানে ? স্পেশ্যাজি। তার মানে আপনি arrested. নিবেদিতা। অপরাধ? স্পে-ম্যাজি। অপরাধ কোর্টে গিয়ে জানতে পারবেন। [ দু'জন কনেস্টবলকে] যাও, ওঁকে ওঁর দাদার কাছে নিয়ে যাও। নিবেদিতা। কিন্তু আমাকে যে ওদের কাছে ফিরে যেতেই হবে। স্পে-ম্যাজি। এইতােখানিকক্ষণ আগেই তো আপনি আপনার দাদার কাছে যেতে চাইছিলেন। নিবেদিতা। আমি গেলে যে ওরা ফিরে যাবে না। স্পে-ম্যাজি। [ হেসে ] তার জন্যে আপনাকে ভাবতে হবে না। ওরা যাতে ফিরে যায় আমিই তার ব্যবস্থা কচ্ছি। নিবেদিতা। আপনাৰ কথাবাত্রা শুনে আমার মােটেই ভাল মনে হচ্ছে না। আপনার ঐ হাসির পেছনে যেন বিষের ছুরি লুকান রয়েছে। স্পে-ম্যাজি। হবে—সমুদ্রমন্থনের হলাহল পান পান কচ্ছি কচ্ছি কিনা। [ কনেস্টবলকে] যাও, ওঁকে ওর দাদার কাছে রেখে এস। দেরি করবে না, শীগগিরই ফিরবে।[ নিবেদিতাকে] যান, এদের সঙ্গে যান।

[ চতুর্থ অ-প্রথম দৃশ্য ] কিনেটল দুনের সনে নিবেদিতা বা যেকি দিয়ে গিয়ে সেদিক দিয়ে চলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বিপিনবাবু এমােয়ত হলেন। আপনি কোথায় যাচ্ছেন? বিপিন। বাজারে একটু কাজ আছে। স্পে-ম্যাজি। ওঃ । আচ্ছা যান। [ যে-দিক দিয়ে নিবেদিতা গিয়েছিলেন সেদিক দিয়েই বিপিনের প্রস্থান ] তােমরা দু’জন এখানে থাক। বাকী সব আমার সঙ্গে এস। [ একজন লাঠিখারী ও একজন বন্দুকধারী পুলিশ রইল। বাকী সব কনেস্টবল স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের অনুসরণ করল। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট যে-দিক দিয়ে এসেছিলেন সেদিক দিয়ে প্রস্থান করলেন। ১ম কনেস্টবল। ব্যাপার কি ভাই? আজ একটা কাণ্ড ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। ২য় কনেস্টবল। আর বলল না। তিন মাস ধরে তাে হয়রাণ হচ্ছি। আজ এখানে, কাল সেখানে। কত আর ভাল লাগে। দুটি পাওনা হয়েছে, তাও তাে এখন পাবার আশা নেই। ১ম কনেস্টবল। এই হাঙ্গামা না থামতে কি আর ছুটি দেবে। [ দুরে অনকোলাহল] একটা গােলমাল হচ্ছে না? ২য় কনেস্টবল। বুড়াে কাকে দেখতে না পেয়ে লােকগুলি বােধ হয় অস্থির হয়ে উঠেছে। ১ম কনেস্টবল। লােকটার কিন্তু ক্ষেমতা আছে। গ্রামবাসীরা দেবতার মত মনে করে। ২য় কনেস্টবল। গুণ আছে বলেই করে। ১ম কনেস্টবল। আমাদের কত্তা তত গেলেন—লােকগুলি আবার কেপে না ওঠে। ২য় কনেস্টবল। অসম্ভব কি। আমাকে যে যেতে হয়নি। ১ম কনেস্টবল। গেলেই বা কি হতাে? ২য় কনেস্টবল। মুশকিলে পড়তাম হয়তাে গুলি চালাবার হুকুম দিতেন। ১ম কনেস্টবল। তুই গুলি কত্তে পারতিস? ৫ কনেস্টবল। না করে উপায় ছিল চাকরি যখন করি।

৫৮ সকলে।, আমি হলে কিন্তু গুলি কতে পারতাম না। ২য় কনেস্টল। সেজঙ্গই তাে তােকে বন্দুক দেয়নি। [ আবার অনকোলাহল ও নানারূপ ধ্বনি। বন্দুকের আওয়া, যেন ই। যা মনে করেছিলাম তাই। শুনছিস ?••••••কে আসছে না ? ১ম কনেস্টবল। [ উকি মেয়ে দেখে ] । ( বিপিন ও গগনে প্রবেশ । গগন। অবস্থা বড় গরম বড় ভূঞা। বিপিন। কি দেখলি? গগন। নৌকাঘাটায় অনেক নােক একত্র অইছে। নােকের মাতা নােকে খায়। ছােট ভুঞারে কি নৌকায় তুলতে পারে। অনেক কইরা নােক সরাইয়া তবে তারে নৌকায় ভােলা অইল। এইর মধ্যে হােটুঠারাণেরে ঐ অবস্থায় দেইখা নােক য্যান ক্ষেইপা আগুন অইয়া গেল। বিপিন। নৌকা ছেড়ে গেছে ? গগন। হ, দুই জনেরে লইয়াই নৌকা ছাইড়া গেছে। কিন্তু এইর পর কি অয় কওন যায় না। [ স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট বে-দিকে গিয়েছিল সেদিকে আবার বন্দুকের আওয়া, গুম”] বিপিন। এ কি! আবার বন্দুকের আওয়াজ! গগন। সেই রকমই তাে শােনা যায়। [ হাঁপাতে হাঁপাতে যা চক্রবর্তীর প্রবেশ ] বা। ওরে বাপরে বাপ! কি সাংঘাতিক কাণ্ড। বিপিন। ব্যাপার কি? বঙ্গ। ব্যাপার আর কি। আসছিলাম এদিকে, দেখি অনেক লােক রাস্তায় দাড়িয়ে। শুনলাম, ছােট ভুঞাকে তারা দেখতে এসেছে। এদিকে একদল কনেস্টবল নিয়ে আমাদের হুজুর গিয়ে সেখানে হাজির। দূরে একটা বাগানে দাড়িয়ে ছিল অমর আর নিখিল। চেরাক এসে খবর দিতেই হুজুর পুলিশ পাঠিয়ে তাদের গ্রেপ্তার | চতুর্থ অ-প্রথম দৃশ্য ] করান। লােকগুলি তখন গিয়ে ঘিরে দাড়ায়, বলে, অমর আর নিখিলকে ছেড়ে দিতে হবে। বিপিন। তাই দিল নাকি ? বঙ্গ। তা কি দেয়। হুজুর বললেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে সরে না গেলে গুলি করব। এমন দুঃসাহস বেটাদের—এক পাও যদি কেউ নড়ল। ব্যস, তারপর গুলি। বিপিন। কেউ মারা গেছে নাকি? বঙ্গ। তা কি আর না গেছে যেরকম এলােপাথারি গুলি। জখম তাে অনেকেই হয়েছে। আমাদের গােপাল মিন্ত্রীকেও তাে আমার সামনে দিয়ে ধরাধরি করে নিয়ে গেল। [ ব্যস্তভাবে সঙ্গলবলে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রবেশ ] স্পে-ম্যাজি। সর্বনাশ হয়েছে, গুলি ফুরিয়ে গেছে। এখন উপায়। বিপিন। আরাে গুলি চালাবেন নাকি? স্পে-ম্যাজি। আপাততঃ দরকার হবে না—লােকগুলি পালিয়েছে— কিন্তু আবার যদি আক্রমণ করতে আসে। এত লােক যে কোখেকে জড় হয়েছিল ! [ যে বন্দুকধারী কনেস্টবলটিকে রেখে যাওয়া হয়েছিল তাকে ] তােমার ক'রাউণ্ড গুলি আছে ? ২য় কনেস্টবল। সাত রাউণ্ড আছে হুজুর। শে-ম্যাজি। আপাততঃ তা দিয়েই আত্মরক্ষা করতে হবে। [দুজন কনেস্টবলকে তােমরা দু’জন আমার ক্যাম্পে যাও-সেখানে যে বিশজন armed force রয়েছে তাদের তাড়াতাড়ি এখানে আসতে । [কনেস্টবল দু’জনের প্রস্থান এবং সেদিক দিয়েই নিবেদিতার সঙ্গে যে দু’জন কনেস্টবল গিয়েছিল তাদের প্রবেশ ] ৩য় কনেস্টবল। নদীর পার ধরে অনেক লােক আসছে হুজুর। শে-ম্যাজি। তারা এদিকেই আসছে নাকি ৩য় কনেস্টবল। হাঁ হুজুর ! শুনলাম, তারা ইউনিয়ন বাের্ড দখল করে আসছে। [ থানা থেকে সাইকেলে করে একজন কনেস্টবলের আগমন। সাইকেল তে তার প্রবেশ । স্পে-ম্যাজি। কি খবর ?

থানার কনেস্টবল। অবস্থা সঙ্গীন। দশ হাজার লােক থানা আক্রমণ কতে আসছে বলে খবর পাওয়া গেছে। স্পে-ম্যাজি। দশ হাজার। থানার কনেস্টবল। তাই হুজুর। বহু দূরদূরান্তের লােক একসঙ্গে জোট পাকিয়েছে। স্পে-ম্যাজি। তাদের কাছে অস্ত্র আছে ? থানার কনেস্টবল। বলা শক্ত। আর না থাকলেই বা কি-থানায় মাত্র পাঁচটা বন্দুক রয়েছে। বড়বাবু বলেছেন, পনের জন—না হলে অন্তত দশজন armed force আপনাকে পাঠাতেই হবে। স্পে-ম্যাজি। তাই তে। তাই তােত। এখন কি করা যায়। [ থানার কনেস্টবলকে ] আচ্ছা, তুমি যাও। আমি এখনি থানায় দশজন armed constable পাঠাবার ব্যবস্থা কচ্ছি। থানার কনেস্টবল। দেখবেন হুজুর, দেরি হয় না যেন। তা হলে বিপদ হবে। স্পে-ম্যাজি। না, দেরি হবে না। তুমি গিয়ে খবর দাও, force আসছে। [ স্যালুট দিয়ে কনেস্টবল সাইকেলে চড়তে যাবে ] দ্যাখ, আরেকটা কাজ করতে হবে। ফৌজ পাঠাবার জন্যে আমি সদরে একটা টেলিগ্রাম লিখে দিচ্ছি। তুমি মােহনপুর পােস্ট অফিস থেকে ••••• থানার কনেস্টবল। টেলিগ্রাম করব কোত্থেকে হুজুর। সমস্ত টেলি- গ্রাফের লাইন কেটে দিয়েছে। স্পে-ম্যাজি। ওঃ! আচ্ছা, তুমি যাও। { থানার কনেস্টবলের সাইকেল নিয়ে প্রস্থান ] চলাে, আমরা এদিকে এগােই। ২য় কনেস্টবল। গুলি যে মাত্র সাত রাউণ্ড আছে হুজুর! স্পে-ম্যাজি। তা থাক না, গুলি না থাকলেও এতগুলাে বন্দুক তাে রয়েছে। চলাে। [ খাটের দিকে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের অগ্রসর হন এবং কনেস্টবল কতৃক তাকে অনুসরণ বিপিন। চলুন, অফিস থেকে কিছু কাগজপত্র সরিয়ে রাখা যাক।

[ চতুর্থ অঙ্ক-দ্বিতীয় দৃ]
বঙ্গ। জীবনই যদি না থাকলে তবে কাগজপত্র দিয়ে কি হবে বড়
ভূঞা।
বিপিন। কিন্তু জীবন থাকলে তাে কাগজপত্রের দরকার হবে। চলুন,
চলুন।
[ দরজা খুলে বিপিনবাবুর ঘরে প্রবেশ ও মাথা চুলকাতে চুলকাতে
ব চক্রবর্তীর তাকে অনুসরণ। পর্দা।
চতুর্থ অঙ্ক—দ্বিতীয় দৃশ্য
[ গ্রামের মধ্যে পায়ে হাঁটা পথ। দু’দিকে ঝোপঝাড় গাছপালা রয়েছে।
মাঝে মাঝে বাড়ী। চেচাতে চেচাতে নলর প্রবেশ
নন। তােমরা সব পলাও, পলাও, গেরাম ছাইড়া পলাও, সৈন্ন
আইতেছে, সৈন্ন।
[ বিপরীত দিক দিয়ে গগনের প্রবেশ
চকিদার দাদা, তুমিও পলাও, সৈন্ন আইতেছে।
গগন। কে কইল ত’রে সৈন্ন আইতেছে?
নন্দ। হ, আমি জানি। বাজারের ঘাটে বহু সৈন্ন আইয়া নামছে।
তারা এই গেরামে ঢুকব।
গগন। ঢুকলই বা—তাতেই বা ডরটা কিসের?
নল। আইচ্ছা ডর না থাকে তুমি থাক। আমি যাই, গেরামে সৈয়
ঢুকলে কি আর কিছু আস্থা রাখব।
[ নন্দ এনােয়ত ]
গগন। এই নন্দা, মঞ্জু কইরে?
নন্দ। বাড়ীতেই আছে।
গগন। খালি বাড়ীতে ?
নন্দ। হ।
গগন। ত’র বাবা কৈ?
নন্দ। বাবার খবর দিয়া তুমি করবা কি ?
গগন। তর দিদিরে যে তুই একলা ফালাইয়া আলি?
নন। কি করুম! দিদিরে আমি কইয়া আইছি, তুই ভাবিস না,
আমি আইলাম বইলা। গেরামের নােকেরে খবর দিয়াই আমি

ফিরা আইতেছি। ফিরা আইয়া তরে নইয়া মামাবাড়ী চইলা যায়। আইচ্ছা, আমি যাই চকির দাদা•••তােমরা সৰ পলাও, পলাও, গেরাম ছাইড়া পলাও, সৈন্ন আইতেছে, সৈন্ন। [ নন্দর স্থান। নল যেদিক দিয়ে প্রবেশ করেছিল সেদিক দিয়ে গগন এনােয়ত হল। মহীউলীনের প্রবেশ মহী। [ চৌকিদারকে বাধা দিয়ে কৈ যাইতেছ চকিদার? পরাণের মায়া থাকে ত ঐ দিকে পা বাড়াইও না। বাজার সৈয়ে ছাইয়া গেছে। গগন। আমার ত সরকারী পােষাক আছে, আমারে কিছু কইব না। মহী। খ্যাপা কুকুর কারেও ছাইড়া দেয় শুনছ ? গগন। তবে উপায়, মঞ্জু যে বাড়ীতে একলা আছে? মহী। গিয়াও তুমি তারে রক্ষা কত্তে পারবানা—মাঝখান থেইকা তােমার জান যাইব। গগন। যায় যাইব•••তব’ আমি... মহী। [বাধা দিয়ে ] পাগলামি কইরনা। ফিরা চল। [ গগনকে নিয়ে মহীউদ্দীনের এন, অমর ও নিখিলের প্রবেশ অমর। তাই তাে নিখিল, মাইনুদ্দীন তাে এখনাে এলনা। সৈন্যরা যে গ্রাম ধর ধর হয়েছে। নিখিল। নৌকা ঘুরিয়ে আনতে গেছে—একটু দেরি হবে বই কি। অমর। মিস্তরীকাকা বড় কাবু হয়ে পড়েছে। গুলিটা লেগেছে খারাপ জায়গায়। জখম দেখে মনে হয়, পুলিশ দমদম বুলেট মেরেছে। নিখিল। তা হবে। তমিজ গুলি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পড়ল—আর ০ ০ ০ ০ উঠল না ! [ বৈঠা হাতে মাইনুদ্দীন ও ফেলুর প্রবেশ ] অমর। এই যে মাইনুদ্দীন, একটু দেরি হয়ে গেল। যাক, তুমি নৌকা রেখেছ কোথায় ? মাইনুদ্দীন। উত্তরের ঘাটে। অমর। বেশ, তুমি তাড়াতাড়ি মিস্তরীকাকাকে নিয়ে ওপারে চলে যাও। ফেলু, চটপট নৌকা বেয়ে যাবে। আর শেরালীকে বলবে, সে যেন ঘাটে নৌকা নিয়ে প্রস্তুত থাকে। ফেলু। শেরালী, সুবল তারা ত গেরাম ছাইড়া যাইতে চায় না।

[ চতুর্থ অবতীয় বৃ) অমর। কি করবে তারা। ফেলু। তারা কয়, মরতে অয় গেরামে থাইকাই মরুম—একবার নড়াই কইরা দেখুন। মাইনুদ্দীন। তা বাড়ী ঘর ছাইড়া না পলাইয়া নড়াই করা মন কি! শালার এত চেষ্টা কল্লাম—পাল্লাম না পুলিশের আত থেইকা একটা বন্দুক ছিনাইয়া আনতে। অমর। বন্দুক নিয়েই যদি দাঁড়াতে হয়, একটা বন্দুকের কাজ নয় মাইনুদ্দীন—এক সঙ্গে বহু বন্দুক নিয়ে দাড়াতে হবে। যাক্, ফেলু, তুমি শেরালী, সুবল তাদের বলবে, এর চেয়ে বড় লড়াই আসবে এবং সে লড়াইএর জন্যে আজ তাদের বেঁচে থাকা প্রয়ােজন। বিপদ উপস্থিত—এ সময় ভুল করলে আমাদের ভবিষ্যৎ-সংগ্রামের আর কোন আশাই থাকবে না। ফেলু। আপনারা এইপারে থাকবেন কতক্ষণ? অমর। যতক্ষণ গ্রামের লােকদের সরাবার অবসর থাকবে। যাও আর দেরি ক’র না। শীগগির যাও। [ মাইনুদ্দীন ও ফেলুর প্রস্থান। অমর তাদের দিকে ব্যথভাবে চেয়ে থাকে] নিখিল। এরা আমায় বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছে অমর। এতকাল কোথায় লুকিয়ে ছিল এদের এই প্রচণ্ড শক্তি। অমর। ইচ্ছে করলে এরা সবই পারে নিখিল। আমরাই এদের ইচ্ছাশক্তিকে ভোঁতা করে রেখেছিলাম। নিখিল। সর্বনাশ। সৈন্যরা গ্রামে ঢুকেছে। নমঃশূদ্র পাড়ার দিকে যাচ্ছে। অমর। তাই তাে। এখন মেয়েছেলেদের কি করে নিয়ে আসা যায় ? নিখিল। অসম্ভব। অমর। তা হলে । নিখিল। তা হ'লে—উপায় নেই। এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না। সৈন্যরা এসে পড়লাে বলে। চলল, নৌকার দিকে চলল। অমর। তাই চলল। [অমর ও নিখিলের প্রস্থান। হাঁপাতে হাঁপাতে বিপিনবাবু ও ব্যাপারীর এ]ে রজব। আমার ধানের গােল শেষ বিপিনবাবু। শুনলাম, সমস্ত ধাশ রাঙ্গায় ছড়িয়ে দিয়েছে। বিপিন। আমার কাপড়ের দোকানটাও নাকি লুট করেছে। রজ্জব। কি আর করব, রক্ষকই যদি ভক্ষক হয়। বিপিন। আমার আরাে ভয় কচ্ছে। বেটাদের তাে বিশ্বাস নেই— বাড়ীতে ঢুকে যদি মেয়েদের বেইজ্জত করে। রজব। অসম্ভব কি। বিপিন। কি ফ্যাসাদেই না পড়া গেল। চলুন, আপনাদের পাড়া হয়েই বাড়ী যেতে হবে। এদিক দিয়ে যাবার পথ তত বন্ধ। রজ্জব। সব পথই বােধ হয় বন্ধ হবে বিবিনবাবু। তা অবস্থা যে-রকম দেখছি••••••চলুন। [ বিপিনবাবু ও রজ্জব ব্যাপারীর প্রস্থান। মঞ্জুকে নিয়ে কয়েকজন ভারতীয় সৈন্যের প্রবেশ। একজন চুলে ধরে মঙুকে টানছে ] ১ম সৈন্য। বল হারামজাদী, মরদগুলাে সব কোথায় পালিয়েছে ? ২য় সৈন্য। ভাল চাস তাে বল। মঞ্জবী। জানি না। ১ম সৈঙ্গ। বজ্জাত মাগী কিছুতেই কিছু বলবে না। ২য় সৈন্য। [ বন্দুকের কুঁদো দিয়ে মঞ্জরীর পিঠে গুতাে মেরে] না বলিস তাে একেবারে খুন করে ফেলব। মঞ্জরী। তাই কর, আমারে খুনই কর তােমরা। উঃ! বাবা গাে, আর যে আমার সহ অয় না। ৩য় সৈঙ্গ। খুন করে কি হবে। মাগীকে নিয়ে চল, কাজে লাগবে। দেখতে খুবসুবং আছে। ২য় সৈঙ্গ। কথাটা মন্দ বলিসনি—হাঃ হাঃ হাঃ। ১ম সৈন্থ। এই—অফিসার আসছে। চল, শীগগির চল। ২য় সৈন্থ। যাঃ মাগী। [ দ্বিতীয় সৈন্য মঞ্জুকে বুটের আঘাত করতেই ম “উঃ মাগাে” বলে মাটিতে পড়ে অচৈতন্য হয়ে গেল। সৈন্যেরা প্রস্থান করল। উৎকণ্ঠিত তাবে ভাকতে ডাকতে গগনের প্রবেশ গগন। মঞ্জু, মঞ্জু, আমি গাছের আড়াল থেইকা দেখছি বৈ; কি করুম, কুত্তাগুলির কাছে আসনের উপায় ছিল না। ওঠ, আমার মঞ্জু। উঃ! [ -বিকাল ] নগে চল। বিশ্বাস কর আমারে, আমি মণ্ডলখুড়ার কাছে যা কইরা অউক তােমারে নইয়া যায়। এই কি। কতা কইতেছে না ক্যান? [ কাছে গিয়ে বলে] মঞ্জু, মঞ্জু, ওঠ। ওঠ ওঠ মঞ্জু। মধু। [ চোখ মেলে ক্ষীণ কণ্ঠে] কে? মহীলা? গগন। এ বিষন্ন ভাবে ? ওঃ! না, না, আ-আমি আমি গগন। [ আবার চােখ বুল। গগন। মঞ্জু, মঞ্জু। এই রে। আবার যে কতা কয় না। কি করি? কোন দিক দিয়া নইয়া যাই? এই দিক দিয়াই যামু-ঘােষাল বাড়ীর পাছদুয়ার দিয়া যদি পলাইয়া যাইতে পারি। [ মঞ্জুকে কাঁধে ফেলে মঞ্চের মাঝপথ দিয়ে গগনের প্রস্থান। ডাকতে ডাকতে মহীউদ্দীনের প্রবেশ মহী। দোস, দোস।•••এই রে—শালারা এই দিকে আসতেছে, গােরা পণ্টন। কোন দিকে যাই। ঐ ঝোঁপে গিয়া পলাই। [ মঞ্চের মাঝপথ দিয়ে প্রস্থান, ছুটতে ছুটতে নন্দর প্রবেশ ] নল। দিদি, দিদি, দিদি বিপরীত দিক থেকে পিস্তলের গুলি। গুলিতে নন্দ পতন। কয়েকজন গােরা সৈন্যের প্রবেশ ১ম গােরা। [ নন্দর মৃতদেহ বুট দিয়ে নেড়ে দেখে ] Killed. ২য় গােরা । A mere chap. ১ম গােরা। Naughty boy. ২য় গােরা। Why? ১ম গােরা। Look. He wears a Gandhi cap. 39 CST I That's a nice thing of course. ১ম গােরা। Bloody. Come on. [ গােরাদের প্রধান। বােস থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে মহীউদ্দীনের প্রবেশ। নন্দর মৃতদেহের কাছে গিয়ে মহীউদ্দীন। [ ব্যাকুলকঠে] নন্দ, নল, এ কি কল্লি ভাই! কি সব্বনাশ কল্পি। মিস্তরীকাকারে আমি গিয়া কি কমু। নন, নল, কতা ক’, চাইয়া দ্যাখ, ত’র মহী ভাই আইছে। কতা ক, ত’র মহী ভাই ত’রে ডাকতেছে। [পর্দা।

চতুর্থতৃতীয় দৃশ্য
[ বানু। শেষ রাত্রি, অকায়। দূরে আর একটা চরের বাড়ীগুলাে
কালাে রেখার মতাে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নদীর ধারে কাশবন। কাশবনের
মধ্য দিয়ে নদী থেকে পারে উঠবার একটা অাঁকাবাঁকা পথ। ছায়ার মতাে
কতকগুলাে লােক বসে। একজনের সামান্য ককানি শােনা যাচ্ছে।
+
অমর। শেরালী নৌকা নিয়ে ওপারে গেল—কৈ এখনাে তাে
এল না ?
নিখিল। না ধরাই পড়লাে ?
অমর। অসম্ভব নয়। তবে ধানক্ষেত পেরিয়ে জলপথে সৈন্যরা কি
অতদুর যাবে ?
নিখিল। টের পেয়ে থাকলে ধাওয়া করতে পারে।
অমর। মুশকিল। এই শূন্য বালুচরে মিস্তরীকাকাকে নিয়ে এভাবে
আর কতক্ষণ থাকব।
গােপাল। অমর।
অমর। কি মিস্তরীকাকা?
গােপাল। আমারে এট্ট, ধইরা বসাও।
[ গােপালকে ধরাধরি করে বসাল। মাইনুদ্দীনের কাছে গােপাল মাখা
রাখল ।
উঃ উঃ উঃ! ককানি ।
অমর। কষ্ট হচ্ছে কাকা?
গােপাল। কষ্ট, কষ্ট না। রাইত আর কতক্ষণ আছে অমর ?
অমর। বেশিক্ষণ নেই। ভাের হ’ল বলে।
গােপাল। বড় অকার••অমর, ঐ দিকটা অমন নাল ক্যান?
সমর। গ্রামে আগুন জ্বলছে।
গােপাল। আগুন! আগুন কে দিল অমর ?
অমর। সৈন্ত।

( চতুর্থ ীয় দৃষ্ট]
গােপাল। সৈৱা আগুন দিল, আল [ একটু উনাই তাৰ ]
অমর। আপনি বেশি উত্তেজিত হলে না মিরীকাকা, তাতে খারাপ
গােপাল। খারাপ অইব। কি আর খারাপ অইব অমর।
অমর। চুপ করুন কাকা। বেশি দুর্বল হয়ে পড়লে ভাজারখানায়
নিয়ে যাওয়াই মুশকিল হবে।
গােপাল। ডাক্তরখানায় গিয়া কি অইব অমর ?
অমর। গুলিটা বার করে ফেললেই ভাল হয়ে উঠবেন।
গােপাল। ভাল অইয়া উম?•••না অমর, এইবার আর ভাল হইয়া
উম না। তােমরা খামাকাই টানাহাচড়া কইর না। [কানি ।
মাইনুদ্দীন। এই সৰ কুকতা কও ক্যান মণ্ডলের পাে। তুমি ভাল
অইয়া উঠবা।
গােপাল। [ ম্লান হাসি হেসে ] ভাল অইয়া উম•••ভাল অইয়া উম
মাইনুদ্দীন ভাই?
মাইফুদ্দীন। হ, জাখবা খােদার দোয়ায় তুমি ভাল অইয়া উঠবা।
গােপাল। কিন্তু এইবার•••এইবার বােধ অয় খােদার মর্জি অন্য রকম
মাইনুদ্দীন ভাই?
ফেলু। চুপ কর মােড়ল। তােমার মুখে এই সব কতা শুনলে আমাগ
কইলজা ফাইটা যায়।
গােপাল। এটু••এটু জল দিতে পার আমারে?
ফে। জল ? [ অমলের মুখের দিকে নিরুপায়ের মত তাকায় ।
অমর। ও! তাইতাে, কিসে করে জল আনবে? আচ্ছা, দেখছি।
ব্যাগ থেকে একটা খালি শিশি বের করে ভাল করে ধুয়ে নদী থেকে
এই শিশিটায় ক'রে জল নিয়ে এস।
( শিশি নিয়ে ফের স্থান :
নিখিল। কারা যেন আসছে না ?
মাইনুদ্দীন। পুলিশ না ত?
নিখিল। দুর, তারা পার হবে কি করে। খেয়াঘাটের সব নৌকাই
যে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মাইনুদ্দীন। জাহাজে পার অইতে পারে না?

গােল্লাল। তাই অইব, তাই এই অমর, অয়ত আমাগই জিত অইছে
আমারে একবার ঐ পারে নইয়া যাইতে পার, ঐ পারে ?
মধু। বাবা ।
গােপাল। [ একটু আবেগের সহিত ] না, না, আপত্য করিস না।•••
মাইনুদ্দীন, আমারে ঐ পারে নইয়া চল। যেইখানে তমিজ, নিতাই,
আমার না পরাণ দিছে আমি সেইখানেই মরতে চাই,
সেইখানেই মরতে চাই আমি। তােমরা আমারে ঐ পারে নইয়া
চল—ঐ পারে••••••
[ স্থিরদৃষ্টিতে গ্রামের দিকে চেয়ে থাকে। পুর্বগগনে ভােরের আলাে
দেখা দেয় :
যবনিকা
()

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Taranga

Author
Bandhopaddhay, Digindra Chandra
Title
Taranga
File name
Taranga
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/10/8
Publisher
D.c.chandra, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
116
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Plays.
Keywords
Taranga
DLI number
513408
Barcode
4990010020388.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
9pFBKGCEJiA
Download PDF

Taranga