Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Sekoa
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শৈকেয়া
।
আশ্রাফ আলী খান
.
এম্পায়ার বুক হাউস
৫, কলেজ স্কোয়ার,
কলিকাতা
প্রকাশক :
মাহফুজার রহমান খান
এম্পায়ার বুক হাউস,
১৫, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা
প্রথম ছাপা
কার্তিক, ১৩৪ ০
দাম এক গকা
নিউ সরস্বতী প্রেসে
ঐমিহিরচন্দ্র ঘােষ কর্তৃক মুদ্রিত
২৫।এ মেছুয়াবাজার থ্রট
কলিকাতা
মহাকবি স্যার মােহাম্মদ ইকবালের নাম বিশ্ব-বিদিত; তার শ্রেষ্ঠ কাব্যগুলি ও বিশ্ব-বিদিত। এরই ভেতরে তার একাধিক কাব্য পাশ্চাত্য দেশের নানা ভাষায় অনুদিত ও সমাদৃত হয়েছে। অথচ বাঙলার খ্যাতনামা কবিদের ভেতরে কেউ এদিক মাড়ানাে প্রয়ােজনীয় মনে করেন নি। আমাদেরই ঘরের জিনিষ পাশ্চাত্যের মাপকাঠিতে যাচাই কোরে না নিলে তাতে আমাদের মন ভরে না-এটাই পরাধীন জাতির ধর্ম। সাদী, হাফেজ, ওমর খৈয়াম প্রভৃতির বেলায় যা দেখেছি, স্যার ইকবালের বেলায়ই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেন ? তবু সৌভাগ্যের কথ; যে, এতদিনে প্রিয়বন্ধু আশরাফ আলী খানের ন্যায় একজন প্রতিভাবান নব্য কবির দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হােয়েছে। ‘শেকোয়া’র ভাব সম্পূর্ণ অভিনব। তা মাত্র স্যার মোহাম্মদ ইকবালের ভেতরেই আমরা দেখতে পাই। সে ভাব অল্প পরিসরে মিন্টনের “Paradise Lost” এর ভাবকেও অতিক্রম কোরেছে। “Paradise Lost”এ স্রষ্টার বিপক্ষে সােজ! বিদ্রোহ ঘােষণা করা হােয়েছে; কিন্তু ‘শেকোয়া’র কবি স্রষ্টার প্রতি মােল আনা ভক্তি বজায় রেখে সদ-যুক্তির . ব্রহ্মাস্ত্র দিয়েই যেন তাকে অচল কোরে ফেলেছেন। এ যেন পীযুষ-বাহিনী স্রোতস্বিনী,একই স্রোতের আঘাতে যুগপৎ ভাঙা ও গড়ার কাজ শেষ কোরে চলেছে ; এ যেন বিদ্রোহের প্রলয়-বিষাণের পাশাপাশি ফুল-ফুটানাে ভ্রমর-গুঞ্জন। বাংলা ‘শেকোয়া’য় কবি আশরাফ আলী বিশ্ব-কবির গড়া এ অসামান্য রূপকে অবিকৃত রাখ তে যথাসম্ভব চেষ্টা কোরেছেন। তাই শব্দের পরিবর্তে ভাবের দিকেই তিনি মনােযােগ দিয়েছেন বেশী। শব্দ-পূজার গোড়ামীকে তিনি কোনও দিনই প্রশ্রয় দেন না,-এ-স্থলেও দেন নি। মাহফুজার রহমান খান
No text on this page.
‘বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দরাজ-দন্তে পঞ্চ-নদের কল-রাগিণী আজকে আমার মন-বেতারে নিলুম ধরে–ছড়িয়ে দিতে বাঙলা মায়ের শ্যামল দ্বারে। খোদা-দ্রোহের ভাগীরথী নামূল কবির স্বর্গ হতে, শাস্ত্র-বহা বাঙ্গালী জা৩, যায়-বা ডুবে তাহার স্রোতে ! ‘শােক-হানা খেয়ালী বিধির ভয়-না-জানা দুষ্টু ছেলে ; আর কতকাল ছুটবে পথে বিদ্রোহেরই মশাল জেলে ? জাহ্নবীর এ ভাষণ প্লাবন না-জানি কী প্রায় ঘটায়। গরল-পায়ী শিব গো, তুমি ধবে কি তা প্রাণের জটায় ? গুণ-মুগ্ধ- আশরাফ,
No text on this page.
No text on this page.
শেকান্না মহাকবি ডক্টর স্যার মােহাম্মদ ইকবাল কা। । কবি-জীবনী জন্ম ডক্টর মােহাম্মদ ইকবাল খ্রীষ্টীয় ১৮৭৭ অব্দে পাঞ্জাবের অন্তর্গত শিয়ালকোট নগরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাহার পূৰ্ব্ব-পুরুষগণ হিন্দু ছিলেন। প্রায় দুইশত বৎসর পূর্বে তাহারা পবিত্র ইলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। শুনিতে পাওয়া যায়,—বিখ্যাত মডারেট নেতা স্যার তেজ-বাহাদুর সপরু ও স্যার মােহাম্মদ ইকবালের পূর্ব-পুরুষগণ একই পরিবার-ভুক্ত ছিলেন। শিক্ষা মােহাম্মদ ইকবাল যে কালে সমগ্র প্রাচ্য ভূ-খণ্ডের গৌরব হইয়া দাড়াইবেন, একথা তাঁহার পিতা-মাতার স্বপ্নেরও অগােচর ছিল। শৈশবে তাঁহারা পুত্রকে শিক্ষার্থ মক্তবে প্রেরণ করেন। অতঃপর যখন তিনি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীতে উন্নীত হন, তখন একটা মাসিক বৃত্তি পান। এইরূপে তিনি মিডল স্কুল হইতে বৃত্তি লাভ করিয়া প্রবেশিকা স্কুলে ভর্তি হন। প্রবেশিকা-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া তিনি শিয়ালকোটের স্কচ-মিশন-কলেজে প্রবেশ লাভ করেন। কলেজে অধ্যয়ন কালে তিনি এমন একটা সুযােগ লাভ করেন, যাহার সহিত তাহার পরবর্তী জীবনের উন্নতির বেশ যােগসূত্র সংস্থাপিত আছে। এই সময়েই তৎকালীন আরবী সাহিত্যে বিশেষভাবে বুৎপন্ন মওলানা সৈয়দ মীর হাসানের সঙ্গে তাঁহার পরিচয় হয়। মওলানা সৈয়দ মীর হাসানের জীবন-আদর্শ শকেয়া শিক্ষা তাহার জীবনে অনেকখানি প্রতিফলিত হইয়াছিল। তিনি তাঁহার মনকে ইস্নামীয় কৃষ্টি ও সাহিত্যের দিকে আকৃষ্ট করিতে সমর্থ হন। যথাসময়ে স্যার মােহাম্মদ ইকবা শিয়ালকোট কলেজ হইতে কৃতকাৰ্য্য হইয়া লাহাের গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। অধ্যবসায়' বলে। তিনি বি-এ পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করিয়া একটী স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন। লাহাের গভর্ণমেন্ট কলেজে অধ্যয়ন কালে স্যার মােহাম্মদ ইকবাল আর একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির বন্ধুত্ব লাভ করেন। তিনি আলীগড় কলেজের ভূতপূৰ্ব অধ্যাপক মিঃ আরনল্ড। স্যার মোহাম্মদ ইকবা যে সময়ে লাহাের গভর্ণমেন্ট কলেজের এম-এ ক্লাসের ছাত্র, তখন মিঃ আরনল্ড উক্ত কলেজে অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। মিঃ আরনল্ড বুঝি সুক্ষ্মদৃষ্টি-প্রভাবে ছাত্র ইকবালের প্রতিভাসম্পন্ন গৌরবময় ভবিষ্যৎ জীবনকে পাঠ করিয়া লইয়াছিলেন,--তাই তিনি ছাত্র ইকবালের সহিত বন্ধু রূপে মিশিবার লােভ সম্বরণ করিতে পারিলেন না। তিনি তাঁহাকে বন্ধুরূপে অনেক কিছু উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলেন। অতঃপর স্যার মােহাম্মদ ইকবাল এম-এ পরীক্ষায় সম্মানের সহিত প্রথম স্থান অধিকার করিয়া তাহার গৌরবের উপযুক্ত পুরস্কার স্বরূপ পুনরায় একটা পদক প্রাপ্ত হন। অধ্যাপনা লাহাের গভর্নমেন্ট কলেজ হইতে এম.এ উপাধি লাভ করিবার পর স্যর মােহাম্মদ ইকবাল লাহাের ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস এবং দর্শন-বিভাগের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। তাহারই কিছুকাল পরে তিনি লাহাের গভর্নমেন্ট কলেজে ইংরাজী এবং দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত হন। তঁাহার জ্ঞানগর্ভ শিক্ষায় এবং চরিত্র-মাধুর্যে ছাত্রগণ অতিমাত্রায় মুগ্ধ হইয়া পড়ে। এমন কি কলেজ-কর্তৃপক্ষগণও তাহার কাৰ্য্যের উচ্চ প্রশংসা করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। কিন্তু পৃথিবীতে যে সকল প্রতিভা-সম্পন্ন ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন, তাহারা এতটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকিতে পারেন না। তাই, স্যার মােহাম্মদ ইকবা তাঁহার সুদূরপ্রসারী উন্নত দৃষ্টিকে } 1 শয়ে এতটুকু সীমাবদ্ধ প্রশংসার গণ্ডীতেই নিবদ্ধ রাখিতে পারিলেন না। তিনি কলেজের কৰ্ম্মের পর যে অবসরটুকু পাইতেন, সেটুকু কৃপণের ধনের মতাে আঁকড়াইয়া ধরিয়া তাহার গবেষণামূলক কাৰ্য চালাইতেন। হলঞ্জে স্যার মােহাম্মদ ইকবালের এবম্বিধ জ্ঞান-পিপাসা দেখিয়া তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তাহাকে আরও উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলাতে প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি তিন বৎসর কাল কেজি বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন-বিষয়ক গবেষণা করেন এবং স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগণ কর্তৃক উচ্চ উপাধিতে ভূষিত হন। অতঃপর তিনি জাৰ্মাণীর ‘মিউনিক’ ইউনিভার্সিটীতে ফার্সী ও দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপনা করেন। তথাকার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগণ তাহাকে পি-এইচ-ডি উপাধি প্রদান করেন। জাৰ্মাণ হইতে তিনি পুনরায় ইংলণ্ডে প্রত্যাবর্তন করেন এবং তথায় আইন অধ্যয়নে মনােনিবেশ করেন। এতদসঙ্গে তিনি রাজনীতি . ও অর্থনীতি অধ্যয়নকল্পে লণ্ডনের School of Economics and Political Scienceএ যােগদান করেন। এই সময়ে স্যার মােহাম্মদ ইকবাল পাশ্চাত্য জন-সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত হন। তিনি অস্থায়ীভাবে London Universityতে আরবী ভাষার প্রধান অধ্যাপক নিযুক্ত হইয়াছিলেন । স্যার মােহাম্মদ ইকবালের লাহোরের কর্ম-জীবন তাহার জ্ঞানানুশীলনের পক্ষে ততটা সুবিধাজনক ছিল না। পরবর্তী জীবনে যিনি একজন যুগ-প্ৰবৰ্ত্তক কবি হইবেন, তাহার কি আর অতটুকু সুবিধাই যথেষ্ট বলিয়া মনে হইতে পারে ? তাই, ভারতের জড় পারিপার্শ্বিকতার ভিতরে অবস্থান কালীন তাঁহার সেই সৰ্ব্বততমুখী প্রতিভার উন্মেষ সম্ভবপর হয় নাই। ইংলণ্ডের অনুকূল পারিপার্শ্বিকতা, অসংখ্য গ্রন্থাগার, অগণিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং তদুপরি সুধী সমাজের সহানুভূতির অন্তরালে তাহার প্রতিভার কোমল গােলাব কুঁড়িটা ধীরে ধীরে পাপড়ি ছড়াইয়া শৈকেয়া চুটিয়া উঠিল। তিনি কবি এবং বাগ্মী উভয়রূপেই প্রসিদ্ধি লাভ করিলেন। বক্তা ইকবাল তাহার প্রথম বক্তৃতা ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে প্রদান করেন এবং সেই হইতেই তিনি লণ্ডনের শিক্ষিত সমাজে সুবক্তারূপে খ্যাতি লাভ করেন। স্যার মােহাম্মদ ইকবা যখন তাহার অধ্যয়ন সমাপন করিয়া ভারত-প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাহার বয়স মাত্র ৩২ বৎসর। ইউরােপ-প্রবাসকালীন তিনি ডক্টর নিকোলসএর সহিত বেশ ঘনিষ্ট ভাবেই পরিচিত হন এবং পরবর্তী কালে ইনিই স্যার মােহাম্মদ ইকবালের বিখ্যাত ফার্সী কাব্যগ্রন্থ ‘আসরার-ই-খুদী’ সর্বপ্রথম ইংরাজীতে অনুদিত করেন। অভিনন্দন খ্রষ্টীয় ১৯০৮ শতাব্দীর জুলাই মাসে স্যার মােহাম্মদ ইকবাল তঁাহার ভারতীয় হিতৈষী বন্ধু-বান্ধব, ভক্ত-অনুরক্তদিগের পক্ষ হইতে যে গৌরবজনক অভিনন্দন প্রাপ্ত হন, তাহা আজ অতীত হইলেও স্মরণীয় ! তাহার সেই কৰ্তব্য-জনিত দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদের পর পুনরায় মিলন সকলকে হর্ষোৎফুল্ল করিয়া তুলিয়াছিল। কত শিক্ষিত ভারতবাসী যে সেদিন এই নবীন কবির প্রতিভাদীপ্ত মুখের দু’টী কথা শুনিবার জন্য ছুটিয়া আসিয়াছিলেন,তাহা আজও ভুলিবার নহে। স্যার মােহাম্মদ ইকবাল যেমন উচ্চশিক্ষিত তেমনি বিখ্যাত কবি। তাঁহার হৃদয়ে যে জ্ঞান-পিপাসা জাগিয়া উঠিয়াছিল, তাহা মাত্ৰ লাহাের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা দ্বারাই নিবৃত্ত হয় নাই। তাই, তিনি স্বীয় আত্মীয়বর্গের বিচ্ছেদজনিত ক্লেশ এবং সমুদ্রযাত্রার নানা অসুবিধা ভােগ করিয়াও সুদূর ইউরােপে যাইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ইউরােপ-পৰ্যটন তাহার প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল। স্যার মােহাম্মদ ইকবাল সম্বন্ধে ইংলণ্ডের বিখ্যাত লেখক মিঃ কার্লাইল বলিয়াছেন—“তিনি একজন বীর সৈনিক। পৃথিবীর প্রয়ােজন পূর্ণ করিতেই তাহার আগমন !” স্যার মােহাম্মদ ইকবাল যে প্রকৃতপক্ষেই একজন বীর, তাহা তাহার উত্তেজনামূলক কবিতাগুলি পড়িলেই বেশ অনুধাবন করিতে পারা যায়। তিনি তাহার কাব্যে এক জায়গায় শৈকেয়া কবি-শ্রেষ্ঠ Shakespeareকে উদ্দেশ করিয়া বলিয়াছেন—“মানব-হৃদয় সৌন্দর্যের বিকাশ-স্থল এবং এবং সৌন্দর্য সত্যেরই সুমহান সত্যেরই সুমহান বিকাশ। কিন্তু তােমার ভাষা মানব-হৃদয়ের জীবন্ত আলেখ্য।” স্যার মোহাম্মদ ইকবালের লিখিত বিষয়ের আলোচনা করিবার পূর্বে একবার ভারতীয় মােসলমানদের তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলােচনা করা আবশ্যক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বুকে এক নূতন সভ্যতার ঢেউ জাগিয়া উঠিল। ভারতীয় মােসলমানদের হৃদয়ে যেন পাশ্চাত্যের মুক্ত ভাবধারার স্পষ্ট ছাপ লাগিয়া গেল। তাহাদের জীবনের প্রত্যেক স্তরে একটা স্বাধীন চিন্তার আলোেক-রেখা ফুটিয়া উঠিল,আর সেই আলােকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গোঁড়া মােল্লাদের অন্ধকার-যুগের পরিসমাপ্তি হইল। তাহারা পাশ্চাত্য সাহিত্যের দিকে মনােসংযােগ করিবার সুযােগ পাইলেন। তখন সেই মামুলী যুগ-সুলভ “ইশ” ও “শারাব”এর গজল আর নব্য যুবকদের চিত্ত আকর্ষণ করিতে পারিল না। “ইশা” “দার্দ” অথবা “গালিব” এর গ্রন্থ নিচয়ের স্থলে “সেক্সপিয়র” “বাইর” ও “টেনিসন”এর কাব্যই তাহাদের হৃদয়ের উপর প্রভাব বিস্তার করিল বেশী। তখন ভারতীয় মােসলমানগণ শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরাজী পড়া হারাম’-এ-কথা আর মানিয়া লইতে পারিলেন না। তাহাদের চিন্তাধারা পরিবর্তিত হইয়া উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে লাগিল । পাশ্চাত্য ভাবধারার গঙ্গা-স্রোত আনিবার জন্য যে মহাপ্রাণ মানব প্রথম চেষ্টা করেন—তিনি বহু পরিচিত স্যার সৈয়দ আহমদ খান। আলীগড় কলেজ স্থাপনের কাৰ্য্যে সহযগিতার জন্য তিনি ভারতীয় মােসলমানদিগকে আহ্বান করেন। নৃতন আলােকের সন্ধানে যাহারা দলে দলে দলে ছুটিয়া আসিলেন,তন্মধ্যে মহাকবি হালী, নজির আহমদ, মােহ সিন্-উল-মু এবং জাকা-উল্লাহ, প্রভৃতি বিশিষ্ট সহকর্মীদের নাম উল্লেখযােগ্য। স্যার সৈয়দ আহমদ খান্ সাহেবের অক্লান্ত চেষ্টা ও তাঁহার সহকম্মিগণের আপ্রাণ পরিশ্রম বাস্তবিকই ধন্যবাদাহ। তাহারা যে অমৃত পান করিয়া অমর হইয়াছিলেন,-তাহারি এক বিন্দু তাহার ভারতীয় মােসলমান যুবকদের মুখে তুলিয়া দিবার জন্য কত আয়াসই না শৈকেয় - স্বীকার করিয়াছিলেন ?—মহা-কবি হালীর চিন্তা, ভাব ও ভাষার ভিতর দিয়াও তখন বেশ একটা নূতনত্ব ফুটিয়া উঠিয়াছিল ; তিনি অনেকটা কু-সংস্কারমুক্ত এবং স্বাধীন চিন্তাশীল ছিলেন। তাই পাশ্চাত্যের মুক্ত আবহাওয়া তাঁহার মস্তিষ্কে অনেকখানি ক্রিয়া করিয়াছিল। তঁাহার লেখার ভিতর “সাকী” আর “শুলের আড়ম্বর মাত্রই ছিল না। তঁাহার কবিতা ছিল পৌরুষব্যঞ্জক। তাহার লিখিত ‘মােসাদ্দাস-ই-হালী’-ই তাহার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। কবি আর মহাকবি হালীর সম-সময়ে আর একজন শক্তিশালী কবির অভ্যুদয় হয় ; তাহার নাম আকবর। কবি আকবরের লেখার ভিতরও বেশ সূক্ষ্মদৃষ্টি এবং প্রাণের সাড়া পাওয়া যায়। মহাকবি হালী ও আকবর মােসলমান সমাজের সেই অধঃ- পতনের যুগে যেন আলােকবৰ্দার হইয়া আসিয়াছিলেন। তখনকার সেই চরম দুর্দিনের কথা স্মরণ করিয়া আজ সত্যই দুর্দিনের বন্ধু মহাকবি হালী এবং আকবরের প্রতি সমাজের মন কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হইয়া ওঠে!—লুপ্ত-গৌরব পরাধীন মোসলমান তখন উখানের কল্পনাও করিতে পারে নাই। তাহার। সাম্রাজ্য-হারা, পরাধীন জীবন লইয়া মরণ-সিন্ধুর অতল অন্ধকারে নিমজ্জমান হইতেছিল, ঠিক সেই সময়েই মহাকবি হালী এবং আকবর আসিলেন—তাহাদের হাত ধরিয়া টানিয়া তুলিবার জন্য। আজ যে তাহাদের সে-চেষ্টা অনেকাংশে সফলতার পথে চলিয়াছে,-তাহাতে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। শিক্ষা-দীক্ষা এবং দেশ-বিদেশ ভ্রমণে স্যার মােহাম্মদ ইকবাল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় মহাদেশেই সমভাবে পরিচিত। স্যার মােহাম্মদ ইকবালের প্রতিভা তাহার কবিতার ভিতর বেশ পরিষ্কাররূপে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। তিনি নিজের লিখিত গ্রন্থ দ্বারা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য উভয় দেশের ভাবধারা ও সভ্যতার সংযােগ স্থাপন করিতে সমর্থ হইয়াছেন। মহাকবি হালী এবং আকবরের পরই মৌলানা শিবলীর স্থান ছিল, কিন্তু } শয়ে এই নূতন দার্শনিক কবির আবির্ভাবে মওলানা সাহেবের দীপ্তি চন্দ্রালােকে নক্ষত্রের মততই নিষ্প্রভ হইয়া গেল। প্রতিভা স্বভাব-দত্ত, মানুষ সেটা হাতে গড়িয়া লইতে পারে না। এই প্রবচনটী স্যার মােহাম্মদ ইকবালের জীবনে বেশ সুন্দরভাবে খাটিয়া যায়। শিয়ালকোট কলেজে তাহার ছাত্র-জীবনের আরবী শিক্ষক মওলানা সৈয়দ মীর হাসান সাহেবের নিকট অধ্যয়ন কালেই তাহার ভবিষ্যত গৌরবময় জীবনের ঈঙ্গিত পাওয়া গিয়াছিল এবং সেই প্রতিভার ক্ষীণ জ্যোতিঃ দর্শনেই মওলান। আরবী সাহিত্যের দিকে তাহার মনঃসংযােগ করাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। কবি মির্জা দাগ তৎকালে হায়দ্রাবাদের বর্তমান নিজাম বাহাদুরের গৃহ-শিক্ষক ছিলেন। স্যার মােহাম্মদ ইকবাল ছাত্র-জীবনে তাহার লিখিত কবিতাগুলি উক্ত কবির কাছে সংশােধনের জন্য প্রেরণ করিতেন। কবি দাগ ছাত্র ইকবালের কবি- প্রতিভা দর্শনে চমৎকৃত হন এবং এই তীক্ষ্ণধী যুবককে পুনঃ পুনঃ উৎসাহিত করেন। কিছুকালের মধ্যেই তিনি কবি-মণ্ডলীর মধ্যে একটা উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক রূপে আত্মপ্রকাশ করিলেন । স্যার মােহাম্মদ ইকবালের সম্বন্ধে স্যার জুলফিকার আলী খান লিখিয়াছেন যে, “আমি কোন এক ‘মুশায়েরায় (কবি-সভায় ) স্যার মােহাম্মদ ইকবালকে তাহার স্ব-রচিত কবিতা মধুর স্বরে আবৃত্তি করিতে শুনিয়াছিলাম। সেদিন সমাগত সভ্যগণের নিকট হইতে তিনি যে বিপুল প্রেরণা পাইয়াছিলেন, তাহা আমি আজো ভুলিতে পারি নাই। কাব্যজীবন স্যার মােহাম্মদ ইকবালের কাব্য-জীবনকে সাধারণতঃ তিনটী বিভিন্ন পৰ্য্যায়ে বিভক্ত করা যাইতে পারে। খৃষ্টীয় ১৯০১ হইতে ১৯০৫ অব্দ পর্যন্ত প্রথম পৰ্যায়, ১৯০৬ হইতে ১৯০৮ পর্যন্ত দ্বিতীয় পৰ্য্যায় এবং ১৯০৯ হইতে বর্তমান কাল পর্যন্ত তৃতীয় পৰ্যায়। ০ শয়ে ইহার পরে তিনি পৃথিবীর বুকে আবার কোন্ রঙ-এর ফুল ফুটাইয়া তুলিৰে, তাহা দেখিবার নিমিত্ত জগদ্বাসী ঔৎসুক্যের সহিত অপেক্ষা করিয়া রহিয়াছে। স্যার মােহাম্মদ ইকবালের লিখিত কবিতাগুলি গভীর ভাব-ব্যঞ্জক অথচ সহজ- বােধ্য। যে-কোন পাঠক একটা লাইন দুইবার পড়িবার আগেই ভাবটী সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইবেন। স্যার মােহাম্মদ ইকবাল দার্শনিক কবি হইলেও, তাহার লেখা তথাকথিত শুষ্ক কঠোর দর্শন নয়। এ-সম্বন্ধে তিনি নিজেই বলিয়াছেন ‘দর্শন শাস্তুকে আমি ভয় করি। কেননা, দর্শনের ওই নীরস নীতি আমার কাছে অপ্রীতিকর বলিয়া মনে হয়। মানবীয় সিদ্ধান্ত যখনই ধৰ্ম্ম-বিধানের পরিপন্থী হইয়া দাঁড়ায়, তখনই আমি উহাকে অগ্রাহ্ করিতে বাধ্য হই। যে-ভাবের কথা দার্শনিকগণ পছন্দ করেন, সে-ভাবের অনেক কথা আমি বলিয়া থাকি বটে; তবে ওই সকল বিষয় আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতে প্রাপ্ত—দার্শনিক কল্পনার দ্বারা নহে।” স্যার মােহাম্মদ ইকবালের “হিমালা” কবিতা সৰ্ব্ব-প্রথম (১৯০১) “মাখজান” পত্রে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাবলী তঁাহার কাব্য-জীবনের প্রথম ভাগে যে সকল কবিতা লিখিত হয়, তন্মধ্যে “হিমালা” (হিমালয় পর্বত ), “গুল-ই-রঙ্গীন” ( রঙ্গীন ফুল ), “পরিন্দে-কি-ফরিয়াদ” ( বিহগ-কাকলী) “শামা-ও-পওয়ানা” (প্রদীপ ও পতঙ্গ), “এক আরজু” (একটা কামনা), “তারা-ই-হিন্দ” (ভারতীয় সঙ্গীত) “চা” (চন্দ্র), “কেনার-ই-রাবী” (রাবী-তটে) প্রভৃতি কবিতাসমূহ সবিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। ইহাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যরূপে নিৰ্বাচিত। দ্বিতীয় ভাগে যে-সকল কবিতা লিখিত হয়, তন্মধ্যে “মহব্বত” (প্রেম), “হকিকত-ই-হু” (রূপ-মাহাত্ম), “পায়াম” (বাণী ), “ভিসাল” (একক্ষের শৈকেয়া মহিমা), “কোশেশে-না-তামাম” (অসম্পূর্ণ চেষ্টা ), “পায়াম-ই-ইশকৃ” (প্রেমের বাণী) ও “গজলিয়াৎ” (সুর-তত্ব) প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযােগ্য। তৃতীয় ভাগে তিনি যে-সকল কবিতা লিখিয়াছেন, তন্মধ্যে “কুফর-ও-ইলা” (ইসলাম ও কোফরী) “মুসলিম্ আওর তালিমি-জাদী” (মুসলমান ও আধুনিক শিক্ষা), “মজহাব” (ধৰ্ম্ম-সম্প্রদায়), “খিজার-ই-রাহ” (পথ-প্রদর্শক), “তুলু-ই- ইসলাম” (ইস্লামের উত্থান ), “সেক্সপিয়র”, “শেকোয়া” (অভিযােগ ), “জওয়াবে- শেকোয়া” (অভিযােগের উত্তর), “জওয়ানানে-ইসলা” (মােসূলেম-যুবশক্তি), “আসিরী” (দাসত্ব) প্রভৃতিই শ্রেষ্ঠ। তন্মধ্যে “আ-ই-খুদী” এবং “শেকোয়া” এই দুইখানি কাব্যগ্রন্থ বিশ্ব-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ রূপে পরিগণিত হইয়াছে। “শেকোয়া” কাব্যে কবি মােসলমানদিগের বর্তমান অধঃপতিত অবস্থার কথা উল্লেখ করিয়া স্রষ্টার বিরুদ্ধে কতকগুলি গুরুতর অভিযোেগ আনয়ন করিয়াছেন। কারণ, তাহার মতে স্রষ্টার একত্ব-প্রচারের সৈন্যগণের (মােসলমানদিগের) এই দুর্দশা স্রষ্টার অবিচার ভিন্ন আর কিছুই নহে। “শেকোয়া” কাব্যের প্রারম্ভেই বিদ্রোহী কবি স্রষ্টাকে প্রকাশ্য তর্ক-যুদ্ধে আহ্বান করিয়া বলিয়াছেন— “ধূ খুলে ব্যথার আগুন, হৃদয় আমার অগ্নি-গিরি, মাফ করিও-তারি খানিক উঠবে আজি পাষাণ চিরি। জীবন ভরি’ যারা তােমার প্রশংসাই পড়লে নামাজ, তাদের মুখের কুৎসা কিছু নাও না শুনে রাজাধিরাজ। “শেকোয়া” যখন সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়, তখন পাঞ্জাবের ধর্মভীরু জন- সাধারণের মধ্যে ভীষণ উত্তেজনার সৃষ্টি হইয়াছিল। ওই সময় তাহাকে ‘খােদা-দ্রোহী ধৰ্ম্ম-দ্রোহী’, নাস্তিক’ প্রভৃতি আখ্যায় আখ্যায়িত করা হইয়াছিল। এমন কি গোঁড়া মনােভাব-সম্পন্ন লােকদের প্ররােচনায় তাহার জীবননাশের ষড়যন্ত্ৰ পৰ্য্যন্ত হইয়াছিল শয়ে বলিয়া শােনা যায়। তাহারই ফলে কবির অন্যমত শ্রেষ্ঠ কাব্য “জওয়াবে- শেকোয়া’র উদ্ভব। খােদাতালার “মনােনীত ধর্ম ইসলামের পথে থাকিয়া যদি মানুষের দুর্দশাই উত্তরােত্তর বাড়িয়া চলে, তবে সে পথকে সত্য বলিয়া আঁকড়িয়া থাকা যায় কি প্রকারে ?—এই যুক্তিতেই কবি শেকোয়ার প্রারম্ভে বলিয়াছেন— সর্বহারা চিত্ত আমার এই কথাটি বলতে চাহে, লােনেরই সওদা করি’ চ'ছি খােদ। তােমার রাহে । বর্তমানের ক্ষেত্র আমার শস্য-বিহীন, শুধুই ফাকি, দূর অতীতের শবদেহকে সামনে রেখেই তুষ্ট থাকি । এই সকল উক্তির জন্যই ধর্মভীরু মােসলমানগণ উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিলেন । কিন্তু “শেকোয়া” কাব্যেরই পরবর্তী অংশের স্থানে স্থানে পাঠ করিলে স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, ইহা ধৰ্ম্ম-দ্রোহ নহে—বরং স্রষ্টার উপর কবির তীব্র অভিমান। “শেকোয়ার” এক স্থানে উক্ত হইয়াছে “তীব্র কথার খোঁচায় আমি বিশ্ব-ভুবন কাপিয়ে তুলি , দুঃখ শুধু, তােমার কাছেই কণ্ঠ আমার হারায় বুলি। ৪ “যুগ-জামানা তােমার আয়ু-জানাে, তুমি সবই জানে, সবক দেওয়া তােমায়-সে-যে প্রদীপ দিয়ে দিন দেখানাে। ও “ক’রতে পারে সবই তুমি,তুমি অসীম শক্তিমান, উষর মরুর বুক ভাসায়ে আনতে পার ঘাের তুফান।” স্রষ্টার প্রতি তাহার বিশ্বাস যে কতদুর দৃঢ়, উল্লিখিত পংক্তিগুলিই তাহার প্রমাণ। মােটের উপর “শেকোয়া” কবির অতুলনীয় কাব্য। সর্বশক্তিমান সৰ্ব্বজ্ঞ বিশ্ব- স্রষ্টার সহিত একটা “বােঝা-পড়া করিতে হইলে যে কতখানি মাল-মশলা আয়ত্তে থাকা দরকার, তাহা তিনি ভালরূপেই জানেন। তাই—তাহার স্বজাতীয়গণের শ্রেষ্ঠত্ব কোথায় এবং স্রষ্টার কাৰ্যে তঁাহারা কখন কি ত্যাগ-স্বীকার অথবা বিপদ বরণ করিয়াছেন, তাহার একটা মােটামুটী হিসাবও তিনি খুলিয়া বসিয়াছেন।
শৈকেয়া । “বিশ্ব ছিল পাগলাগারদ, পারতো না। কেউ কারাে ধার, কেউ পূজিত পাথর -মুড়ি, কেউ বা ইতর জানােয়ার, বলগা-ছেড়া ঘােড়ার মতাে ছড়িয়ে ছিল বিশ্ব-তল,- মােরাই তাদের তাড়িয়ে নিয়ে ভয় তােমার আস্তাবল । “তলােয়ার ত’ তুচ্ছ কথা, সে আমাদের শিশুর খেল, তােপের মুখে প্রাণ বিলাতে আমরা ছিনু হাতেম-দেল। “তুমিই বল, হেলায় কারা কল হাজার জজ জয়, অহঙ্কারীর শির করিল পথের ধুলার সঙ্গে লয়। . “ইব্রাহিমের সাধের কা'বা, তাও ছিল যে বেত খানা- মােদের বলেই আজ সে কা'বা বিশ্বাসীদের আস্তানা। “মমাদের তরে মুক্ত ছিল হর-জাহানের সব দুয়ার, অতল-সাগর টপকে যেত মােদের যত ঘােড়-সওয়ার। এসব কাজে বল মােদের দেখলে কোথায় ব্যর্থতা। যেথায় গেছি জয় করেছি,এইত জানি সার কথা।” মহাকবি ইকবালের “শেকোয়া” কাব্যকে যদি স্রষ্টার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলিয়াও ধরিয়া লওয়া হয়, তথাপি বলিতে হইবে, ইহা কবির সার্থক-বিদ্রোহ, এ বিদ্রোহে তিনি জয়ী হইয়াছেন। স্রষ্টাই তাহাকে নিজের মনের মত করিয়া যে সর্বজয়ী প্রতিভার অধিকারী করিয়াছেন, তাহাতে পরাজয়ের অভিযান তিনি করিবেন কেন ? কবি ইকবাল একাধারে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কবি। নিজের জীবিত সময়ে মাত্র ৫০ বৎসর বয়ঃক্রম কালের মধ্যেই তাহার প্রতিভার আলােক সুদূর ইউরােপ, আমেরিকায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইতিমধ্যেই লণ্ডন নগরীতে ‘ইকবাল লিটারারি ক্লাব’ স্থাপিত হইয়াছে। এমন দিন হয়ত’ সুদূর নহে, যখন বিশ্বকবি ইকবালের রচিত মধু-চক্র হইতে মধু পান করিয়া সমগ্র বিশ্বের সাহিত্য-রস- পিপাসু চিত্তসমূহ পরিতৃপ্ত ও ধন্য হইবে।
একটী ভাষার নওতাে কবি-জাহান-জোড়া তােমার শে’র,
আকাশ-চারী গানের পাখী, সকল যুগের সব দেশের ;
আরব তােমার, ভারত তােমার, মিসর তােমার, তােমার চীন,
নিখিল মনের ব্যথার সুরে বাজে তােমার হৃদয়-বীণ।
বিশ্বে আছে অনেক কবি--য় তাদেরাে প্রাণ-বাণী ;
তাদের সে-সব ভাবের ধারা স্বর্গ হােতে আমদানী।
চিত্ত সে যে কেল্লা তােমার-জ্যান্ত ভাবের কারখানা,
সেখান হােতে ভাবের কেজি স্বর্গে গিয়ে দেয় হানা ।
আমরা করি নিজের ভাষায় অন্য দেশের ভাব ছুরি,
আস্তাকুঁড়ের ছাই কুয়ে উড়াই ক্ষণিক ফুল-ঝুরি ;
তুমি কবি-কাব্যে তােমার নেইকো সে-সব গণ্ডগোল,
পরের দেশে পরের ভাষে নিজ-গরিমার বাজাও ঢোল ।
পাঞ্জাবী আর উর্দ, ভাষায়, ইংরেজী আর ফারসীতে
ছড়াও গীতি,—বিশ্ব হেরি তােমার গানের আর্সীতে ।
No text on this page.
No text on this page.
সর্বহারা চিত্ত আমার এই কথাটী বােলতে চাহে,- লােক্সানেরি সওদা করি’ চলছি খােদা তােমার রাহে ; বর্তমানের ক্ষেত্র আমার শস্যবিহীন, শুধুই ফাঁকি, দূর অতীতের শব-দেহকে সামনে রেখেই তুষ্ট থাকি। গােলা-কুঁড়ি নই আমি যে, রইব পড়ি কাটার ঝড়ে, টবে নাক’ পাষাণ-হিয়া বুলবুলিদের হাহাকারে। তীব্র কথার খোঁচায় আমি বিশ্ব-ভুবন কাপিয়ে তুলি, দুঃখ শুধু, তােমার কাছেই কণ্ঠ আমার হারায় বুলি। ১৭:
শৈকেয়া ‘ভালাে-মন্দ হােনা যাহা, প্রভুর আদেশ মান্ব মােরা এই নীতিতেই বােবার মতাে লক্ষ আঘাত সইছে ওরা, ধৰ্ম্ম ধৰ্ম্ম কোরে কেবল কারে মরে মূখ সব, দেখছে না কি পাশেই চলে ধর্মহীনের মহােৎসব । ধু-ধু জ্বলে ব্যথার আগুন-হৃদয় আমার অগ্নি-গিরি, মাফ করিও, তারি খানিক উঠবে আজি পাষাণ চিরি; জীবন ভরি’ যারা তােমার প্রশংসারই পড়ল নামাজ, তাদের মুখের কুৎসা খানিক নাওনা শুনে রাজাধিরাজ। ১৮ শৈকেয়া যুগ-জামানা তােমার আয়ু, জানাে তুমি সবই জানাে, সবক দেওয়া তােমায়, সে যে প্রদীপ দিয়ে দিন দেখানাে। জানাে তুমি, ছিল যেদিন ফুল-বাগানে ফুলের মেলা, বুলবুলি সে গাইত সুখে, সুখের স্রোতে ভাসিয়ে ভেলা; ফুলের শােকে আজ সে কাতর,শুতে হবে নালিশ তাহার, হাকিম তুমি, দোষীও তুমি—বিচার হবে শাহান-শাহার। বিশ্বে তােমার নামের কদর সে না-হােলে কে বাড়া’ত? বাতাস বিনা ফুলের সুবাস দেশ-বিদেশে কে ছড়া’ত?
- শঙ্কোয় আজকে নালিশ তােমার নামে, এই কি তােমার খােদায়ী কাম ? পাপীরা হয় জান্নাতী আর পুণ্যবানের জাহান্নাম ? বিশ্ব ছিল পাগলাগারদ, ধাত না কেউ কারাে ধার, কেউ পূজিত পাথর-মুড়ি কেউ-বা ইতর জানােয়ার, বগা-ঘেঁড়া ঘােড়ার মত ছড়িয়ে ছিল বিশ্বতল, মােরাই তাদের তাড়িয়ে নিয়ে ভরনু তােমার আস্তাবল। চক্ষে আপন দেখার আগে তােমায় খােদা মাত কে ? মােদের হুনাের কৎ বিনা তােমায় বলল চিত কে ?
শৈক্টোয় । বিশ্বে ছিল কতই জাতি বারী আর ফেরেববাজ, তারাই তখন জগৎ-জোড়া, বিন্দু মাের সিন্ধু মাঝ হিন্দু ছিল ভারত-ভূমে, কাফরী ছিল আফরিকায়, নিবিড় বনেও মানুষ ছিল হিংস্র ভয়াল পশুর প্রায় ; সেলজুকী আর তুরাণবাসী, এহুদ-চীনা আর ঈসাই, সবই জাননা, আল্লা’-মিঞা, বলে কি আর সারূবে ছাই ? তােমার নামে জীবন-পণে ধরুত কেবা হাথিয়ার ? কেই-বা এমন ভোল ফিরাল পঙ্গু তােমার সৃষ্টিটার ? ২১ শকেয়া আরাম ছিল হারাম মােদের-যুদ্ধভূমি খেলার মাঠ, জলে-স্থলে ফিনু করি’ শয়তানেরে লুঠ-লােপাট। ইউরােপের ঐ গির্জা-শিরে উঠত তােমার পা আজান, তীরে যার শাহারাতে সাইমুমেরও কত জান্ ; শক্তি-পাগল বাদশা’ যারা ফেরাউনের খাস, মুরীদ, অহঙ্কারে পায়ের তলায় ভাঙতে চাহে ধরার ভিৎ ; মােদের দয়ার পাত্র তারা, মুষিক হােতেও শক্তিহীন, তেগের তলে কমা সাথে বাজত মােদের হৃদয়-বীণ। ২২:
শৈকেয়া একটী লড়াই জয় কোরেছি আর লড়া’য়ে ঝাপ দিতে, তােমার নামেই মৃত্যু-জহর পান কোরেছি শান্তিতে ; ধন অথবা তখত, লাগি নয়ক’ মােদের যুদ্ধ জয়, কেউ-কি ধনের বিনিময়ে ছাড়তে পারে মরণ-ভয় ? লক্ষ-হাজার স্বর্ণহীরার প্রস্তাবে যে দেয়নি কাণ, পাষাণ হােয়ে কল গুড়া পাষাণ-গড়া মূর্তিখান ;- তাদেরও কি থাকতে পারে স্বার্থ-সেবার ক্ষুদ্র ? বােললে কেহ, বােব মােরা, তার চেয়ে নেই ঝু কথা।
শৈকেয়া যেই বিপদে পিঠ, ফিরা’ত শত্ৰুদলের শ্রেষ্ঠবীর, ঝড়ের মুখে পাহাড় সম ছিলাম মােরা উচ্চ-শির ; তলােয়ার ত’ তুচ্ছ কথা! সে আমাদের শিশুর খেল, ততাপের মুখে প্রাণ বিলাতে আমরা ছিনু হাতেম-দে। তােমার নামের বেইজ্জতী কত কভু যে এক তিল, ক্ষমার কথা ? হারাম সে যে, হােতম তাহার আজরাইল! তারাই আজি মরণ-পথিক্-বাঁচাই সেরেফ, যাদের হক্, জীবণ-পণে যারা তােমার তৌহিদেরই জাম্-বাহক। ২৪ - শৈকে তুমিই বল হেলায় কারা কোল হাজার জজ জয় ? অহঙ্কারীর শির করিল পথের ধূলার সঙ্গে লয় ? অগ্নি-পূজার নি আগুন, তােমার নামে ছায় ইরাণ ; ফুলের সাজে সাজল সে দেশ, কোরল কাফের যা’য় বিরাণ ; তীরে কার মাটীর পুতুল জিন্দা হােত-খুত প্রাণ ? দগ্ধ মরুর বালুকায়ও ডাকত মহা প্রেমের বান। স্থবির ধরায় কোরূল কারা নও-জওয়ানির উদ্বোধন ? কোল কেবা রাজ্যে তােমার লক্ষ ভুলের সংশােধন ?
শৈকেয় রণ-ভূমি সে সৃষ্টিনাশা প্রলয়-নদীর ভাঙন-কূল, সেথাও মােদের পড়তে নামাজ বারেক তরে হয়নি ভূল ; ভৃত্য-মনিব ছােট ও বড় কেউ বা গরীব, কেউ প্রধান, চরণ-ঘাতে চুর করিমু আমরা সে সব ব্যবধান ; তােমার রাহে যখন মােরা মনের ঘােড়ায় হই সওয়ার, জালিম-হৃদয় শঙ্কা-দোদুল ভীরুর বুকে বয় জোয়ার ; এক জামা’তে সবাই যখন হাজির তােমার দরবারে, ভেদ কিছু কি পাও দেখিতে কম-জোরে আর জোরুবারে ?
শৈকেয়া এই দুনিয়ার মফিল মাঝে ফিরনু কত সাঁসকাল, বেঈমানীর সিন্ধু জুড়ি’ পানু তােমার নামের জাল তােমার বাণী কোতে প্রচার ফিনু মরু-পর্বতে, ভঃ সকল প্রাণ-পেয়ালা তৌহিদেরই শরবতে ; মােদের তরে মুক্ত ছিল হ জাহানের সব দুয়ার, অতল সাগর টপকে যেত মােদের যত ঘােড়-সােয়ার ; এসব কাজে বল মােদের দেখলে কোথায় ব্যর্থতা ? যেথায় গেছি, জয় কোরেছি, এইত জানি সার-কথা । ২৭ শৈকোয়া জড়বাদ আর নাস্তিকতার কোনু মােরা মূলােচ্ছেদ, হীন গােলামীর শিকল-পরা মানুষ-ভা’য়ের ঘুচল খে; ইব্রাহিমের সাধের ‘কা’বা’—তাও ছিল যে বােত খানা, মােদের বলেই আজ সে ‘কা’বা বিশ্বাসীদের আস্তানা। তােমার বাণীর কোরতে আদর কেই-বা ঘামায় নিজ মাথা ; মােদের হাফেজবুকে তাহার প্রতি হরফ রয় গাঁথা; তবুও যদি ৰােত্বে মােদের কৃতঘ্ন আর স-নীচু, ( তবে, ব্লু, জেলার ঋদয় বাে’লে নেই কিছু। ২ শঙ্কোয়া আজকে রাতে বােত খানাতে ধূম লেগেছে উৎসবের, নানা ভাবে শতেকরূপে হােচ্ছে পূজা ভূত সবের ; কাফের যারা বােছে ডেকে আজকে সবাই ফুল্ল-প্রাণ, “প্রতিমাদের ধ্বংসকারী ধ্বংস আজি মুসলমান। ধ্বংস তারা, আর তাহাদের গ্রন্থ কোরাণ—তাও বিলীন, এই দুনিয়ার পান্থশালায় নেই তাদের কোনই চিন্। আজ তৌহিদের চৌদিকেতে ডাকছে ভীরু ব-শিয়াল, নামটী তােমার যাচ্ছে ডবে, তা কি তােমার নেই খেয়াল ? ৯ শকেয়া মূখ-নাদান হইল প্রধান, রত্ন-মাণিক ঢের তাদের, এদিক মােরা সর্বহারা,-কাদায় পড়ে রইল শের ; কাফের-তরে গড়লে তুমি এই জগতেই স্বর্গপূর, শােনাও মােদের ভূয়াে কথা মরণ পরে আসবে হুর ; তােমার মাঝে মােদের মাঝে দেওয়া-পাওয়ার সেই সেতু, কেমন কোরে ভাঙল হঠাৎ বুঝতে নারি তার হেতু ; ঠুনকো প্রণয় তােমারও কি এক আঘাতে যায় টুটে ? নরের মত চোখের নেশা ভাের না হােতেই যায় ছুটে ?
শৈকেয়া কোরতে পারে সবই তুমি--তুমি অসীম শক্তিমান, ঊষর মরুর বুক ভাসা’য়ে আনতে পারাে ঘাের তুফান ; পন্থ-ভুলানাে আলেয়ারে করিয়া পথ-প্রদর্শক, পথ-হারানাে পথিকেরে আনতে পারাে পথের রােখ। সেই শকতি আজ কি তােমার বদ্ধ সীমার গণ্ডীতে ? মােদের বেলা’ই ঘাটতি পড়ে বিশাল তােমার হুণ্ডীতে ? বে-দীন হােতে পাচ্ছি মােরা. টিটকারী আর অপমান, তােমার নামে সব দিয়েছি—এ-ই কি তাহার প্রতিদান?
শকেয়া বিশ্বে মােদের জীবন-ধারণ গাইতে কেবল তােমার জয়, নীচতারে কোতে মহান, অসুন্দরের কে তে লয় ; আজ দুনিয়া চায় না মােদের, কাফেরদেরই বাশাহী, মােদের বাঁধা ঘরখানিতে মােদেরই আজ ঠাঁই নাহি বিদায় কালে আজকে মােদের পরাণ কাঁদে সেই ব্যথায়, পারবে না ফের দুষতে মােদের, ও-নাম যদি ডুবে যায়। আমরডবে মরুলে পরে ভুববে জানি তােমার নাম, মলে সাকী, রয় কি ৰাকী সাকীর হাতের শরাব-জাম ?
শকেয়া তােমার সভা ভাল আজি—দী-ঈমানের ঘনায় সাঁঝ, তােমার নামের পাগল যারা; নিচ্ছে বিদায় তারাও আজ দিন-রজনী তােমার তরে ফেলুত যারা চোখের জল, হৃদয় সঁপি তােমার করে পেল তাহার যােগ্য ফল ; এই দুনিয়ার শান্তি লাগি খাল যারা নিরন্তর, শান্তি হােল হারাম তাদের, কোলে তাদের দেশান্তর ; প্রেমিক যারা যাচ্ছে চোলে সামনে তাদের ঘাের আঁধার, সূত্রের আলােয় খুঁজবে কি ফে কোলে যাদের অবিচার?
শৈকেয়া । আদম-হাওয়ার দণ্ড তুমি কোলে মােদের চিরন্তন, কঁদছে কায়েস-লায়লী আজো জুড়ে নিখিল হৃদয়-মন ; কারেও দেছ কোতে পীড়ন, কেউ নীরবে সইছে তা, কেউ জগতে চির-সুখী, সার কোরেছে কেউ ব্যথা ; হরিণ-পিছে আজও আছে বাঘ-শিকারীর অন্বেষণ, প্রেমিক-হৃদয়—সেথাও জ্বলে প্রেমের শিখা অনুক্ষণ; অত্যাচার ও অবিচারের গড়লে তুমি হাজার রূপ, সব-সওয়া সে সৃষ্টি-পরে কোন ছলে ফেহও বিরূপ ।
শৈকেয়া নাস্তিকতার এই দিনেও ছেড়েছি কি তােমার পথ ? বােলতে পারে—কোছি হেলা শেষ রসুলের ধৰ্ম্ম-মত নিত্য যেথা পুতুল-পূজা, মন্দিরেতে ঘণ্টারব, সেথাও মােরা কোনু জোরে পুতুল-ভাঙা মহােস ; করূনী-আবেস, সা গুণী যে-পথ ধরি’ ছিলেন স্থির, আজও মােরা মনে-প্রাণে সেই পথেরি মােসাফির ; বেলাল-রাহী আজও মােরা,-দীপ্ত শিখা তকবীরের আজও মােদের হৃদয় মাঝে শক্তি যােগায় লাস্থ বীরের। ৩৫ শৈকেয়া হয়তাে প্রাণে আগের মত খেলে না আর প্রেমের ঢেউ, তেমন খাটী হৃদয় নিয়ে করি না আর সেজদা কেউ ; হয়তাে হিয়া প্রেম-আবেগে ধায় না তেমন কেবলা-মুখ, দিদার তােমার লাভ করিতে নইকো তেমন সমুৎসুক ; হয়তাে মােরা আজকে নহি আগের মতো ভক্তিমান, তােমারও নেই আগের মতাে ক্ষমায়-দয়ায় পূর্ণ প্রাণ ; আমরা না-হয় ক্ষুদ্র মানুষ, কিন্তু ওহে কৃপাময়, দান কোরে যে ফিরিয়ে নিলে, তাতেই কি যুক্তি হয় ?
শৈকেয়া দীন-ঈমানের উৎস খুলে তুমিই দিলে ‘ফারান’ ময়, ইসারাতে কোলে তুমি সংখ্যাহীনের হৃদয় জয় ; সেই হৃদয়ে আজকে বলল কেমন কোরে লাগল ঘুণ ; ধু-ধু কোরে জ্বলতে যাহে শুধুই তােমার প্রেম-আগুণ? দূরের আলােয় উদ্ভাসিত ছিল মােদের যেই হিয়া, কেমন কোনে রয় তা আজি তিমির-ঘেরা ঘাের সিয়া ? হৃদয় মােদের জোলে পুড়ে হােয়েই থাকে যদি ছাই, কাহার সে দোষ ? কার হুকুমে ভাঙা-গড়া বিশ্বটাই ? ==৩:
শৈকোয়া নজদী উপত্যকায় আজি নাই সে হাসি-কোলাহল, আজকে সুধার পাত্র মাঝে শুধুই রাজে হলাহল ; যেথায় ছিল ফুলের সুবাস, সেই হাওয়াতে ‘হায়’ মাত, নাই সে মােরা, হৃদয় মরা, সব গরিমার আজ খতম্। আর নাহি সে কায়েস পাগল, নাই পিয়ারা, নাই পিরাণ, আজ এ সভায় নাই তাে শােভা, সােণার পুরী আজ বিরাণ; গৌরব-উজল হে শুভদিন! কোথায় তােমার অন্তরীণ ? বাজবে কি আর শিরীন্ রবে মােসলেমের এ ভগ্ন-বীণ, ?
শৈকোয়া হােথায় রহে ফুলের মেলা, উৎস-বারি সুনির্মল, হেথায় কঁদে ফুল-হারা দিল, পিপাসিতের মৰ্ম্ম-তল ; হােথায় চলে ঘূৰ্ত্তি বেদম্ ভােগ-বিলাসের মহােৎসব, হেথায় রহে জ্যামেরা তােমার নামের মাতাল সব ; শূন্য তাদের পান-পেয়ালা,—পূর্ণ তাদের গ্রহের ভােগ, উল্টা চলে জীবন ’দের—দুঃখ-সুখের যােগ-বিয়ােগ। প্রদীপ-শিখায় প্রাণ হারাতে পতঙ্গ আজ হয় উধাও, শক্তি-মালিক, তাদের পাখায় বিদ্যুতেরই শক্তি দাও।
শৈকোয়া পথ-হারাদের দৃষ্টি আবার কা’বার মুখে ফিরলাে যে, পক্ষ-হারা বুলবুলিরা দূর বিমানের পথ খোঁজে ; প্রণয় আজি গুমরে মরে বক্ষ-পুটে ফুলকলির, ছিন্ন তারের বুক চিরে সুর বাইরে যেতে হয় অধীর ; পাহাড়ে জাগলে আবার নূর-আগুণে জ্বলার সাধ ; নিজ্জীবও আজ জীবন মাগে, মুকেয় বুকে ফরিয়াদ। শুকনাে চােয় বান ডেকে যায় তােমার নিদেশ যদি পায়, নিখিল জুড়ি ব্যথার কঁাদন, সাড়া তােমার নাই যে হায় । ৪০ শৈকেয়া মুমুষুদের অঙ্গে তুমি সােণার কাঠি ছুইয়ে দাও, পুচ্ছ-শূননা ময়ুর পুনঃ শূন্য পানে হাে উধাও; প্রেম-শরাবে পূর্ণ কর প্রেম-হারাদের এই হৃদয়, ইচ্ছা তােমার মােদের মাঝে পূর্ণ হউক ইচ্ছাময় । পথের মানুষ উঠলাে রথে, আমরা আজি পথচারী, দূর হোতে তাই পূর্ব-স্মৃতি দিচ্ছে মােদের টিটকারী। ক্ষীণকে যারা কোরুল বলী, উৎপীড়কের তুললাে দাদু, জখমী হিয়া তাদেরই আজ কোরছে ব্যথায় আর্তনাদ। -৪১- শৈকেয়া হাওয়ার সাথে যুক্তি কোরে গুপ্তচর ঐ ফু-সুবাস ফুল-কাননের গুপ্ত-কথা বাইরে করে সপ্রকাশ; তেমনি মােরা ঘরের কথা ছড়াই নিতি সবখানে, ভা’য়ের যত গুপ্ত-কথা ভাই-মুখে দুষ-মন জানে। শেষ হােল আজ ফুলের ফসল, ফুলবনে আর নেই বিলাস; নেই কুসুমে শাখায় পাতায় স্বভাব-রাণীর অট্টহাস ; স্তব্ধ হােল সব কাকলী, নেই পাখীরা হেথায় কেউ, শূন্য বনে এ আমার বক্ষে ওঠে গানের ঢেউ।
শৈয়ে সুখ যা কিছু সব মােরেছে,--হৃদয়-ব্যথার নেই ময়ণ, শাখীর শাখায় নেইক আজি সবুজ পাতার আস্তরণ ; মরা-বাঁচার অর্থ একই, কিছুতে আজ শান্তি নাই.. কাজ বলিতে সার কোরেছি নিজের লােহু পান করা-ই; নিভার আগে প্রদীপ যথা মরণ-ভয়ে কম্পমান, তেমনি এ ক্ষীণ প্রাণের মাঝে কাঁপছে আমার ক্ষীণ ঈমান। বেঁচে থাকার সার্থকতা আগেই গেছে সব ঘুচে, বাদ ছিল ষে চিহ্নটুকু যায় বুঝি,আজ তাও মুছে।
শৈকেয়া al ফুলের শােকে তাের ও-বুকে কান্না কেন রে বুবুল ? প্লাণ যদি রয় গানের সুরে, উঠবে ফুটে হাজার ফুল ; কাটবে আবার দুখের নিশি, ভােরের হাওয়ার ক্ষীণ পরশ লাগলে পরে বিষাদ-মেঘে, হইবে মরুর বুক সরস। ক্ষিনের ত্যক্ত গেলা ফেল তুলে নে-ঢাল সুর, বােৎসাহে উঠুক বেজে ভগ্ন হিয়ার তানপুরা। হিণী গোদের গানের ভাষা হাে তাহাতে নেই হানি, সবাই জানে, সুরটাহার হেজাজাতে আমদানী। ৫
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.