Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Nowroj

Hossen,akram · 2010/01/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নওরােজ আকরম হােসেন,

প্রকাশক
কাজী আকাম উদ্দিন
৮১, শ্যামাচরণ দে খ্রীট (কলেজ স্কয়ার) কলিকাতা।
[ পাঁচ সিকা ]
প্রিন্টার—এপরমানন্দ সিংহ রায়
এস, কে, প্রেস
৬৭, সীতারাম ঘােষ স্ট্রীট, কলিকাতা

ভূমিকা সুদীর্ঘ পঁয়ষট্টি বৎসর পূর্বে আমরা চারিজন সাহিত্যিক # মুসলিম বঙ্গভাষার অতি শৈশব সময়ে সাহিত্যের যে ভিত্তিস্থাপন করিয়া তদুপরি উদ্যান প্রস্তুত করিতে সচেষ্ট হইয়াছিলাম, সুখের বিষয় আজ সেই ভিত্তির উপরে--সেই উদ্যানে অসংখ্য মুসলিম তরুণ কবি বহুবিধ পুষ্প ও ফলের বৃক্ষ সৃষ্টি করিয়াছেন। আজ আবার সেই ভিত্তির উপরে, সেই উদ্যানে ফুলকুলশােভিত নূতন একটি মঞ্জু কুঞ্জকানন সৃষ্টির সুসংবাদ প্রিয় পাঠকগণকে উপহার প্রদান করিয়া আমি গৌরব ও আত্মপ্রসাদ অনুভব করিতেছি। দুঃখের বিষয় আমার সেই সঙ্গীয় তিনজন এখন ইহজগতে নাই। তাহারা এখন জীবনের পরপারে। সুবিখ্যাত “ইসলামের ইতিহাস” প্রণেতা কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজের সুযােগ্য প্রফেসর মৌলবী কাজী আকরম হােসেন এম-এ সাহেবের নওয়ােজ” কাব্যখানাই সেই মঞ্জু কুঞ্জকানন। আমি ইহাতে পরিভ্রমণ করিয়া বাস্তবিকই মুগ্ধ ও পুলকিত হইয়াছি। ইহার কবিতা- গুলি বর্তমান যুগের দুর্বোধ্য হেঁয়ালি নহে। হেঁয়ালির দুর্গ হইতে ভাব ও মৰ্ম্ম উদ্ঘাটন করিতে রীতিমত যুদ্ধ করিয়া শব্দরূপ ইট পাটিকেলগুলি চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া ফেলিতে হয়; কিন্তু এ কাব্যখানি সেরূপ নহে। ইহার ভাষা খুব মনােরম, কোথাও কমটি নাই, কষ্টকল্পনা নাই, নদীর জলের ন্যায় ক ক ছল্ ছল্ করিয়া বহিয়া ; শান্তিপুরের কবি মােজাম্মেল হক, কুষ্টিয়া লাহিনীপাড়ার মীর মােশাররফ হােসেন, ময়মনসিংহ চারাণের পণ্ডিত রোেষ উদ্দীন ও এই দরিদ্র লেখক, বঙ্গভাষার সেই অতীত যুগে এই চারিজন সাহিত্যিক ব্যতীত অন্য কোন মুসলমান লেখকই ছিলেন না।

y0 যাইতেছে। কবিতার প্রসাদগুণই হইতেছে যে, উহা পাঠ করা মাত্র উহার মনােরম ভাব-তরঙ্গগুলি হৃদয়ের মাঝে বসন্তের মলয়ানিলের ন্যায় ঝুর ঝুর করিয়া বহিয়া যায় ও কানের ভিতর দিয়া মরমে ও প্রাণের নিভৃত কোণে প্রবেশ করে ; এ কাব্যে সে গুণ যথেষ্ট আছে। “নওয়ােজ” ফুলবাগানের কবিতাগুলি যেন সদ্য প্রস্ফুটিত এক একটি সুরভি কুসুম। আমি আশীর্বাদ করি এই শক্তিশালী কবি দীর্ঘজীবন লাভ করিয়া উত্তরােত্তর তাহার সুগভীর ভাবপূর্ণ কবিতা- কুসুমের মালা গাঁথিয়া মুসলিম বঙ্গ সাহিত্য সমৃদ্ধিশালী করুন। বঙ্গীয় মুসলিম সমাজে এই মনােরম কাব্যখানা খুব সমাদৃত হইবে বলিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ইতি আগলা—পূর্বপাড়া কবাে ঢাকা ১৯৩৮ সন, ১৪ই জুন উদ্বোধন হাবশী ; [ যে কয়জন লােক সর্ব প্রথম হজরতের নবুয়তে ইমান আনিয়াছিলেন হজরত বেলাল (রাঃ) তাঁহাদের মধ্যে একজন। বেলাল জাতিতে প্রথমে তিনি কোরেশ বংশীয় জনৈক ধনী লােকের ক্রীতদাস ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন শুনিয়া তাঁহার মুনিব তাহার উপর অকথ্য অত্যাচার করেন। ধর্মত্যাগ করাইবার জন্য তাহাকে প্রত্যহ নির্দয় ভাবে প্রহার করা হইত, তারপর মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকার উপর বুকে বিশাল পাথর চাপা দিয়া প্রখর রৌদ্রে ফেলিয়া রাখা হইত। বেলালের প্রতি এই নির্মম অত্যাচারের কাহিনী ক্রমে ক্রমে সর্বত্র প্রচারিত হইয়া পড়ে। হজরত আবুবকর (রাঃ) ইহা শুনিয়া অর্থ প্রদান পূর্বক বেলালকে দাসত্ব শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করেন। হিজরতের পর মদিনা শরীফে যখন প্রথম মসজিদ নির্মিত হয় তখন হজরত বেলাল উহার মােয়াজ্জেন নিযুক্ত হন।]

আয় বেলাল
ইস্লামের এ
দুর্দিনে ;
দে আজান
খােশ লাহান
ডাক্ রে যত
মু'মিনে
বে-ওজর
ঘুমায় যত
শেরে নর।
ভাঙরে ফের
ঘুম তাদের
আওয়াজে তাের
পুর ফখ
নও হেলাল—দ্বিতীয়ার চাদ। খােশ লাহান-মিষ্ট স্বর। শেরে নর-পুরুষ
সিংহ। পুর ফখর—গৌরবদৃপ্ত।

নওরােজ
ইমান যায়
আমান যায়
যায় রে সামান
আবতের ;
ডাক্ রে ডাক
দে-রে হাঁক
ভাঙরে তাদের
নেশার জের।
দে আজান
ভর জাহান
মুশদ। ভরা
তাের স্যদায় ;
হইবে ফের
খােদ হাজের
রহমত আবার
এই ধরায়।
ডুবছে যে
লুটছে যে
হাতটি ধরি
তােল তারে ;
আমান-শান্তি। সামান—পুজি। আক্বতের-পরকালের। মুশদা-
সুসংবাদ। স্যদায়-স্বরে। রহমত-কল্যাণ।
==

নওরােজ
জোশের বান
দিবে জান
শিথিল হাতের
পাঞ্জারে।
বুকে সঙ্গ
পিঠে যঙ্গ,
আবার হােল
মুসলিমের ;
নিজ মেসাল
দে বেলাল
মুছে দে গম্
গমগিনের।
যঙ্গ-দাগ । মেসাল-দৃষ্টান্ত।
জোশের—উৎসাহের। সঙ্গ,—পাথর।
গমগিনের-বেদনা-ক্লিষ্টের ।

No text on this page.

SEAL সালাম আলায়কুম ! নিকটে যাহারা আছ এস আজি করি গলাগলি, দূরেতে যাহারা আছ মনে মনে তাহাদেরও বলি, দুনিয়ার যে কোণেতে যেথা যে বাঁধিয়াছ বাসা, স্ত্রীপুরুষ শিশু যুবা ছােট বড় ভদ্র কিবা চাষা; ভাল হও তারে কহি, মন্দ যেবা তারে দি না বাদ ; মিত্র হও দিব কোল, শত্রু হও তারও নাহি বাধ ; জগতের যেথা যারা লভিয়াছ ইমানের দান- সবে কহি, ‘লভ শান্তি, স্নিগ্ধ হােক তৃপ্ত হােক প্রাণ ‘সালাম’ সবারে কহি আজি এই মধুর প্রভাতে, সব ব্যথা গেল চলি সুধাময় আলােক সম্পাতে ; দেখ চেয়ে আজ ভােরে সুসময়ে ভাঙ্গিয়াছে ঘুম, কহি তাই সালাম সবারে সালাম আলায়কুম। = =

নওরােজ
৩
‘লভ শান্তি, এই বলি করি মােরা প্রীতি সম্ভাষণ,
ইসলাম চাহিছে শান্তি, শান্তি তার অন্তরের ধন ;
শান্তি তার বীজমন্ত্র ; শান্তি আনি ব্যথিত ধরায়
গড়িল নূতন করি, চেয়ে দেখ ওই দেখা যায়।
ওই দেখ মরুচর বেদুইন আরবের দল,
অবিচার অনাচার ব্যভিচার চলিছে কেবল।
মন্দিরের চারিপাশে নরন্তরী উলঙ্গ শরীর,
পাপের দুৰ্ব্বার স্রোতে প্লবমান অঙ্গ ধরণীর !
কুৎসিত প্রমােদ যত নিরর্থক হীন আয়ােজন,
তরু-লতা-মূর্তি পূজা, শিশু হত্যা চলে অগণন ।
ভা’য়ে ভা’য়ে বিসম্বাদ, গৃহে গৃহে রক্তঋণ শােধ,
নিষ্ঠুর আচার যত হরিয়াছে কাণ্ডজ্ঞান বােধ।
আঁধার ছাইয়া আছে দুঃখভরা জগতের বুকে,
করুণ কাতর চোখে কেঁদে কেঁদে চাহে উর্ধমুখে ।
ওই দেখ যবনিকা ধীরে ধীরে হােয়ে যায় দূর,
ক্ষীণরেখা চন্দ্রলেখা আনিয়াছে আলােকের সুর।
দিনে দিনে বর্ধমান শশীকলা আকাশে উদয়
আলােকের জয়গানে আন্ধকার হইল বিলয়।
মরতের বুকে হাসি ঝিলিমিলি ফুটিয়া উঠিল,
শান্তিপ্রীতি আনন্দের স্বরগের মহিমা ঘােষিল ।
এলেন আরব-নবী সহি দুঃখ অপার যাতনা,
হিংসা ভরা পৃথিবীতে প্রেমরাজ্য করেন স্থাপনা।
২

নওরােজ
ওই দেখ জালেমের হস্ত হােতে দণ্ড পড়ে খসি,
এতিম ল’ভেছে পিতা হাসি হাসি কোলে তার বসি।
শিশু এসে হাত ধরে নিজ গৃহে ল'য়ে যায় টানি,
ভালবাসা মমতায় আপনার সমকক্ষ জানি।
ভৃত্য যদি সেবে তারে, সেবা তিনি দেন পুন তারে ;
আসন ছাড়িয়া উঠি মান দেন আপন কন্যারে।
জগতের ধনরত্ন হেলা ভরে ধরি মুষ্টিমাঝে,
পেটেতে পাথর বাঁধি অনাহারে ব্যস্ত নানা কাজে।
চির অরি ইহুদীরে কত যত্নে করান আহার,
নিজ হস্তে পরিষ্কার করিছেন পুরীষ তাহার !
নিষ্ঠুর আঘাত হানি ধরাশায়ী করিয়াছে যারা,
কহিছেন, ক্ষমা কর, ওগাে প্রভু, মূখ অতি তারা।
বিশ্বাসী আমীন বলি খ্যাত সদা নিজ জন্মস্থানে,
আশৈশব মিথ্যা কভু কহে নাই জ্ঞানে বা অজ্ঞানে,
এসেছেন সেই নবী মুখে তার আল্লার কালাম,
সালাম তােমারে করি এয়া নবি হাজার সালাম।
তােমারে স্মরণ করি মুসলিমের গৃহে গৃহে ধুম,
কহি তাই সালাম তােমারেসালাম আলায়কুম।
আরব জাগিছে ধীরে চেয়ে দেখ নব মহিমায়,
দূর করি দলাদলি অভিমান দ্বেষ ও ঘৃণায়।

যত কিছু দ্বন্দ্ব হিংসা পুরাতন যত রক্তঋণ,
চূর্ণ হােয়ে নবিজীর পদতলে হইল বিলীন।
কদাচার অবিচার কন্যাবলি হইয়াছে রােধ,
ব্যভিচার নাহি আর জাগিয়াছে ভাল মন্দ বােধ।
নারী আর নহে শুধু বিলাসের অন্ধ কামকূপ,
ইন্দ্রিয়ের সেবা তরে নিবেদিত নহে তার রূপ।
ধনী আর নিধনেরে তুচ্ছ জানি করে না আঘাত,
নিধন ধনীরে নাহি হেঁট শিরে করে প্রণিপাত ।
দাসদাসী অন্ন বস্ত্রে প্রভুসম তুল্য অধিকারী,
ব্যবধান নাহি আর সবই এক আল্লার পূজারী।
ছাড়িয়াছে মূর্তিপূজা বৃক্ষপূজা জানিয়াছে ভুল,
বহু দেবতার মাঝে নাহি আর বিরােধের মূল।
ধন্য হে আরব ভূমি দূর করি মিথ্যা ও জুলুম,
কহি তাই সালাম তােমারে-সালাম আলায়কুম!
এল শান্তি; কিন্তু সে আসে নাই কুসুমিত পথে,
আসিয়াছে নিদারুণ নিষ্করুণ সংগ্রামের রথে !
প্রিয় জন্মভূমি হােতে শুল্কমুখে নিয়েছে বিদায়,
সাগর ভূধর লঙ্ঘি গেছে দূর আবিসিনিয়ায় ;
নিপীড়িত বিদলিত মুষ্টিমেয় মুসলিমের দল
বিতাড়িত মরুমাঝে বিত্তহীন দুঃস্থ দুরবল ;

গৃহ ছাড়ি পরগৃহে দূর গ্রামে করেছে বসতি,
তথাপি আপন জ্ঞাতি হিংসা পােষে তাহাদের প্রতি।
আল্লারে জেনেছে বড় করিয়াছে সত্যের প্রচার,
এই হােল বড় দোষ অতি বড় অন্যায় সবার।
আত্মীয় হােয়েছে পর, নিকট যে সে হােয়েছে দূর,
তথাপি সত্যেরে বরি হৃদয়েতে আনন্দ প্রচুর।
সুদীর্ঘ যুদ্ধের পরে অবশেষে হইয়াছে জয় ,
নাশিয়াছে মােহভ্রান্তি চিরশান্তি হইয়া উদয় ।
মন্ত্রমুগ্ধ নরনারী সবে এসে করেছে সালাম,
হাতে ধ'রে সবাকারে শিখায়েছে হালাম হারাম।
যুগ যুগ পুঞ্জীভূত অন্ধকার হােয়েছে মা'দুম,
হে আৰী, সালাম তােমারে-সালাম আলায়কুম!
বিশ্বনবী বিশ্ববাণী নহে শুধু আরবের তরে ,
সত্যবার্তা বহি দূত ছুটিতেছে দেশ দেশান্তরে।
সুদূর চীনের কূলে দেখ তারা বাধা নাহি মানি
মানব কল্যাণ তরে বিলাইছে শান্তিময়ী বাণী।
শাপগ্রস্ত ধরামাঝে হে মানব কে আছ কোথায় ?
পুণ্যের নহর বহে করি স্নান ধন্য হও তায়।
আরব বখিল নহেলভিয়াছে তৃপ্তি সে আপনি,
এবে চাহে করিবারে পরিতৃপ্ত সমগ্ৰ অবনী।

না
•
দেশে দেশে দেখ ওই চলিয়াছে পাপের উৎসব,
অজ্ঞানতা অবিচার নিপীড়নে মথিত মানব।
ইরাণ মিসর রুম কোথাও যে নাহি আছে আলাে
পাপেরই চলেছে রাজ্য, তল হােয়ে গেছে সব ভালাে।
বিলাসিতা পাপাচার নারীপূজা শক্তিপূজা আর,
মানুষে করেছে পশু নিৰ্ম্মম কুৎসিত কদাকার।
আকুল উদার স্বরে শুনাইল সত্যের মহিমা,
শুনাইল ভক্তগণ হজরতের চরিত্র গরিমা।
শুনিল না কেহ তাহা, পুনরায় হইল সংগ্রাম।
অন্তরেতে পূর্ণশান্তি বাহিরেতে যুদ্ধ অবিরাম
শান্তি সে নামিয়া আসে অশান্তির মরুপথ ব’য়ে,
প্রেমের পূর্ণতা হয় বিরহের তীব্র জ্বালা স’য়ে ;
আপনি কোরবান হয়ে আপনারে করি শান্তিদান,
আপনার মান রাখি বলি দিয়ে সর্ব অভিমান।
চেয়ে দেখ মুষ্টিমেয় অশিক্ষিত আরবীয় দল
যুঝিতেছে শত্রুসনে হেলাভরে করি হতবল
অজেয় বলিয়া খ্যাত পরাক্রান্ত রােমক বাহিনী ;
বিস্ময়-বিমুগ্ধ ধরা শুনি সেই অপূর্ব কাহিনী।
ওই দেখ খালেদের দেরারের প্রচণ্ড প্রতাপে
টলে ওঠে সিংহাসন, রােম-রাজ থর থর কাঁপে।

নওরোজ
দিকে দিকে মন্দ্রস্বরে আরবের জয়গান ওঠে,
পঙ্কিল ধরার মাঝে স্বরগের ছবি এসে ফোটে।
শত সম্রাটের সম মহিমায় যে আরব নবি,
হের তারে বিনয়ের প্রতিমূর্তি দারিদ্র্যের ছবি।
লজ্জা ও শরম ভরা দৃষ্টি তার মাটি রয় ছুয়ে,
যুবতী কুমারী সম মাথা ওই পড়িতেছে নুয়ে ।
আল্লার হবিব তিনি তথাপিও ভয়েতে অধীর,
করিছেন এবাদত মগফেরাত চাহিয়া পাপীর।
কভু বা আহার জোটে কভুও বা চলে ফাকাকশী,
বস্ত্রেতে কত না গলি যথা তথা পড়ে বুঝি খসি।
তুলনা না পাই এর মনে যেন হয় না প্রত্যয়,
রাজার শকতি ধরি দারিদ্র্যের একি অভিনয় !
ক্ষুদ্ৰ চৰ্ম্ম শয্যা পরে দণ্ড কাল করেন শয়ন,
বন্দেগী ও মােনাজাতে সারারাত বিনিদ্র নয়ন।
প্রাণের পুত্তলি কন্যা আলােকের পুলকের ছবি,
দারিদ্রের নিপীড়নে সেও যেন রাহুগ্রস্ত রবি।
পানির মশক বহি কক্ষে তার বসিয়াছে দাগ,
হাতেতে পড়েছে কড়া, যা পিষি গত রক্তরাগ।
কম্বলের পীরাণেতে শীত তার করে নিবারণ,
চাম দিয়ে তালি দেয় বহুছিদ্র বিদীর্ণ বসন।
তবু খুশী সদা তুষি পিতা পতি স্নেহের নন্দনে,
দেখেছ এ হেন ছবি জাগরণ অথবা স্বপনে ?
১৪

নওরােজ
মদিনার কামিনীরা টিটকারি দিয়ে কথা কয়,
অশ্রু আসে চক্ষু ভ’রে সব তবু হেঁটমুখে সয়।
পিতা তারে একদণ্ডে সাজাইতে পারে রাজরাণী,
কোমল রেশম সাজ ইচ্ছামাত্র দিতে পারে আনি।
কিন্তু তারা জানে মনে নাহি আছে সেই অধিকার,
পরেরই সেবায় তরে যত কিছু রাজার ভাণ্ডার।
দরিদ্রের সেবা তরে নিবেদিত সব কিছু ধন,
তাহাদের সুখী করি পরিতুষ্ট হইল জীবন।
যে রাজ্যে এহেন রাজা গরীবের সেথা রাজভােগ,
যথার্থ হােয়েছে তাহা, কল্পনার নাহি এতে যােগ।
মানুষের তরে শুধু কাঁদে নাই তাদের পরাণ,
অশ্ব মেষ উটেরেও পালিয়াছে সন্তান সমান।
জীব জন্তু মানবের কারও যেথা নাহি আছে হেলা,
তেমন রাজত্ব হােতে বেহেশত, কি দূর রহে মেলা ?
প্রিয় নবি, প্রিয় মাতঃ নবির নন্দিনী, হে মাসুম,
করি আমি সালাম তােদের সালাম আলায়কুম!
দেখ চেয়ে প্রথম খলিফা আবু বকর সুধীর
সর্বস্ব বিলায়ে দিয়ে সাজিয়াছে পথের ফকির।
রাজা হােয়ে কহিলেন সবে ডাকি, “হে মুসলিমগণ,
নবিজির প্রতিনিধি বলি মােরে রাখিও স্মরণ।

নওরােজ
তাঁহারই পদাঙ্ক ধরি চাহি সদা পথ চলিবারে,
ত্রুটি যদি দেখ তাতে কেহ যেন মেনন না আমারে।”
অশ্বপৃষ্ঠে সেনাপতি চলিছেন সমর প্রাঙ্গণে,
পাশেতে খলিফা তার পদব্রজে প্রসন্ন বদনে।
কন তিনি, “যাও বাছা, ভাবিও না মান অপমান,
তােমারে তাজিম করি আমারই যে বাড়িয়ে সম্মান ;
কিন্তু বাছা যুদ্ধকালে মনে রেখাে আমার আদেশ,
শিশু নারী তরু-লতা কভু যেন নাহি পায় ক্লেশ।”
বসেছেন আহারেতে বয়ােবৃদ্ধ খলিফা প্রবর,
মনে হােল অশ্ব তাঁর অভুক্ত যে কয়েক প্রহর ;
কন তিনি, “কি বলিয়া খানা আমি খাব মন সুখে,
আমার অধীন জীব ভােগে যদি অনাহার দুখে ?”
মিনতি করিয়া তারে কন্যা তার কয়, “বাবা, খাও,
অশ্বের খানার ভার আজ হােতে আমারেই দাও।
খলিফা তনয়া তাই লইলেন সহিষের কাজ,
দানা পানি আনি দেন মনে কিছু নাহি মানি লাজ।
এসেছে বিদেশী বীর সম্মানিত বন্দী মদিনায়,
খলিফা ওমর কোথা খুঁজে খুঁজে পাতা’ নাহি পায়
মসজিদের চত্বরেতে দীনবেশে করিয়া শয়ন,.
ওমর তাহারি নাম জেনাে বন্ধু এ নহে স্বপন।
F

রােজ
বেহেশতের রাজ্য এযে লীলাক্ষেত্র নহে বিলাসীর,
প্রজাবর্গ ধনী হেথা, রাজা দেখ কাঙ্গাল ফকীর।
প্রজার আহার লাগি রাজা হেথা অনাহারে রয়,
গভীর নিশীথে ফিরে দেখে কার কি হাল হয়।
ওই না কাতর চক্ষে বুদু, এক শিবির দুয়ারে ?
কি ভাই, কি হােল তাের খুলে সব বল্ না আমারে।
বুদ্দ, কয়, ‘পত্নী মাের খিমা মাঝে আসন্ন প্রসবা,
বিপন্ন পথিক আমি, পার যদি খলিফারে ক’বা! .
আগন্তুক কহে, “ভাই, কিছু ভয় নাহি আছে তাের,
এখনই আনিব দাই, ভাল দাই চেনা আছে মাের।
দাই এসে করে সেবা, আগন্তুক বসিয়া বাহিরে
পথিকের পথশ্রান্ত পা-দুখানি সেবে ধীরে ধীরে।
‘সুসংবাদ, হে খলিফা, কহে দাই, হে স্বামী আমার,
বন্ধু তব লভিল তনয়, মােরে দেহ পুরস্কার।
বুদ্দর মস্তকে যেন অকস্মাৎ হােল বজ্রাঘাত,
কাতরে কাঁদিয়া কয়, “ক্ষম মােরে ওগাে নেকজাত;
ওমর তাহারে কন, করি আমি কৰ্তব্য আমার
বিচারের দিনে তুমি দয়া করে সাক্ষ্য দিও তার।
মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ভৃত্য সহ চলেন ওমর,
এক সাথে আছে কার তরে জান সে খবর ?
কভু ভৃত্য কভু তিনি চলিছেন উষ্ট্র আরােহিয়া,
ভৃত্য যদি দুঃখ পায় তাতে ভঁর কেঁদে ওঠে হিয়া ।
৩

নরো
বৃদ্ধা এসে কয় তারে,“হে ওমর, আমি আছি দুখে ,
খবর না রাখ কিছু, রাজ্য তুমি কর কোন্ মুখে ?
অমনই তাহারে কন, মাগাে, মাের হয়েছে কসুর ;
কিবা দুঃখ বল মােরে প্রাণপণে করিব তা দূর ।
আরব ইরাণ শাম মিসরের যিনি মহারাজ,
দিগ্বিজয়ী খালেদের শির হ'তে খসে পড়ে তাজ
অঙ্গুলি হেলনে যাঁর, দেখ তারে এমন বিনয়ী,
বিলাস বাসনা মুক্ত সেবাব্রত দীন মিতব্যয়ী।
ওমরের নাম শুনি অত্যাচারী জরাগ্রস্ত হয়,
দীন দুখী ডরে দেখ সে ওমর কম্পিত হৃদয়।
পুরুষ কেশরী যিনি প্রভাবেতে সূর্যের সমান,
কোমল কুসুম সম দেখ তার প্রেমসিক্ত প্রাণ।
ওই দেখ সা'আদের সুবিশাল তােরণ দুয়ার
খলিফার আদেশেতে অগ্নিযােগে হয় ছার খার।
কহেন ওমর, “দেখ, প্রজা যেন অনায়াসে পায়
জালেমের অত্যাচার কুণ্ঠাহীন শুনাতে তােমায় ;
হও যদি রুদ্ধদ্বার দ্বারবান্ রাখ যদি দ্বারে,
মজলুম কেমনে তবে নির্বিবাদে পঁহুছিবে ধারে ?
ইরাণ-বিজেতা বীর হেঁটমুখে দেখে দাঁড়াইয়া
মদিনার দূত আসি দ্বার তার দেয় জ্বালাইয়া ।
কোমলে কঠোর তুমি হে খলিফা, কঠোরে কোমল ;
বিশ্বাসীর আশা তুমি মুমিনের অন্তরের বল।
১.

নওরােজ
কারে কই, হায় হায় ! ওমর যে নাহি আছে আর ;
আলােক নিভিল হায়, ওই দেখ ঘিরিছে আঁধার।
আমীরুল মু'মিনীন, বেলাশেষে যাও নিজ ধাম,
সবে মােরা সাক্ষ্য দেই ঠিক ঠিক করিয়াছ কাম।
আমাদের এই নিশা আর বুঝি হবে না প্রভাত,
চির সহচর বুঝি হয়ে রবে এই দুঃখ রাত ।
ওই দেখ চারি দিকে বিদ্রোহের অগ্নিশিখা জ্বলে,
ওসমান হইল খাক সে জ্বলন্ত অঙ্ক দাবানলে ;
মােৰ্ত্তজা জীবন দিয়া পারিল না নিভাইতে তায়,
সহিল বিষের জ্বালা হাসান সে অনলেতে হায় ;
হােসেনের তাজা খুন অকাতরে ঢেলে তারে দিল,
তবে সেই রাক্ষসের সর্বনাশা উদর পূরিল ;
কারবালার তপ্তবালু আজো রাঙা সেই রক্তরাগে,
ফোরাত ফুপিয়া কাঁদে, বাতাসেতে দীর্ঘশ্বাস জাগে;
হে খােলাফা, হে শােহদা, নয়নের মণি হে মজলুম,
করি আমি সালাম তােদের-সালাম আলায়কুম!
ডুবেছে দিনের রবি তাহে বন্ধু কোরােনা মাতম,-
করিওনা আহাজারি, আঁখি মুছি ভােল এবে গম
সুখ নহে চিরদিন; ফুল সেও ধূলি হয়ে যায়,
জোছনা ছানিত মুখ সেও হায় কবরে লুটায়।

সরোজ
;
রবি যায় শশী আসে, রবে না এ নিদারুণ কালাে
কোটি কোটি তারা ফুটি জ্বালাইবে ছােট ছােট আলাে।
চেয় দেখ চারিদিকে খেলাফত ধ্বংস বটে আজ
‘প্রতিনিধি কে কাহার ? জালেমের আরম্ভিল ‘রাজ।
শক্তিদর্প অহঙ্কার বিলাস ব্যসন কদাচার
সুরাস্রোতে ভেসে গেল খেলাফত দীন মদিনার।
দামেশকের মধুভরা কুসুমিত নিকুঞ্জ ভবনে
রাজা এবে মত্ত সদা বিধুমুখী নর্তকীর সনে।
তবু ভাই জেনাে মনে রাজা বটে হইয়াছে মূঢ়,
মানুষ মরেনি সব, বুকে বুকে সত্য আছে গূঢ়।
কোরাণের মধ্বনি গৃহে গৃহে ওই শােনা যায়,
প্রতি কণ্ঠে বাণী তার উল্লাসেতে পরাণ নাচায় ।
হয় নাই কমী বেশী এক নােক্তা কিম্বা এক পােশ,
আখেরী নবির মুখে এল সে যে আখেরী আদেশ।
যাও সবে দেশে দেশে সে আদেশ করহ প্রচার,
রাজা যদি মন্দ হয় পরােয়া কোরােনা কিছু তার।
রাজত্বের ভাঙ্গাগড়া চিরদিন আছে দেশে দেশে,
ধৰ্ম্মরাজ্য তার সাথে দেখাে যেন ধূলায় না মেশে।
পৃথিবীর প্রান্ত হােতে প্রান্তে ছুটি বােজগান সবে
সুখস্বর্গ সৃষ্টি কর দুঃখ জ্বালা পরিপূর্ণ ভবে।
আলেম ফাজেল যারা দেখাে যেন মুছে নাহি যায়
মদিনার জ্ঞানধারা কোন দিন এই দুনিয়ায়।

নওরােজ
মাের্তজার পুণ্যকথা আয়েশার জ্ঞানগর্ভ বাণী
সতত রাখিও মনে কভু কোনাে ত্রুটি নাহি জানি।
নারীর বক্তৃতাধারা সুরসাল করিয়াছে মরু,
বহাও সে ধারা যেথা মরে গেছে সব জ্ঞান-তরু।
বলে দাও যে দেশেতে নারী আছে অন্ধ খঞ্জ মূক,
আনাে আশা, তাহাদের অন্তরের কালিমা ঘুচুক।
‘প্রতিনিধি মরিয়াছে, ইসলাম মরে নি সে সাথে,
প্রমাণ করিও তাহা যে ভাবে যে রহ যেখানেতে।
হাসিয়া উঠিছে বিশ্ব কিবা স্নিগ্ধ আলােক সম্পাতে,
তাপদগ্ধ নরনারী ওই দেখ নাহিছে তাহাতে।
বান্দাদের নবারুণ কর্ডোভার জ্বল জ্বল আলাে
ওই দেখ মুছে নিল অন্তরের যত কিছু কালাে।
জ্ঞান ধর্ম সভ্যতার ওই দেখ চলেছে উৎসব,
জয় জয় ইস্লামের ওই শােন উঠিতেছে রব।
জ্ঞানমন্ত্রে দীক্ষা লভি ইয়ুবােপ ছুটিছে হােথায়,
আফ্রিকার দূর কোণে তার মৃদু সুর শােনা যায়
ভারতের ভেদছিন্ন জরাজীর্ণ মথিত হিয়ায়
জাগরণ মহামন্ত্র ওই শােন কেবা ফু কে যায়।
‘ভুলে যাও ভেদ সব ছেড়ে দাও জাতির বিচার,
একমেবাদ্বিতীয় শেখাে দেখি আর একবার।

নওরােজ
কোথাও আঁধার ঘেরে কোথাও বা ফুটে ওঠে আলাে,
কোথাও পূর্ণিমা শশী কোথাও বা ঘন ঘাের কালাে ;
কোথাও সালাহুদ্দীন সােলেমান মহা মহীয়ান,
কোথাও বা মীর জাফর বােয়ালি ঘাতক সমান ;
অত্যাচারী কোনাে রাজা নিরমম পিশাচের মত,
কেহ বা কোমল প্রাণ সেবা-ব্ৰত সদা ধৰ্ম্মে রত।
কোথাও মুসলিম তার নিজ গৃহে সদা নিপীড়িত ;
কোথাও সিংহের মত, শত্রুগণ রহে ভয়-ভীত।
কোথাও বা ঘিরে রহে অর্থহীন সংস্কার সব,
কোথাও বা জ্ঞানদৃপ্ত, জয় জয় উঠিতেছে রব।
কোথাও দরবেশ অলী অমৃতের বইছে ধারা,
কোথাও বা ভণ্ডপীর সুধা নামে বিলাইছে পারা।
কোথাও আলেমগণ সত্যকার নায়েবে রসুল,
কোথাও বিষ্ঠার ভাণ্ড, আগাগােড়া ভরা শুধু ভুল।
এইরূপে বহু যুগ চলিয়াছে ইসলামের দিন,
কোথাও উজল আভা কোথাও বা তমসা মলিন।
আজি বুঝি হেরি পুন নবারুণ উঠিছে আকাশে,
সুখের বারতা যেন ব’য়ে আসে বাতাসে বাতাসে।
বিশ্বব্যাপী জাগরণ প্রাণে ওই দোলা দিয়ে যায়,
অসাড়ে স্পন্দিত করে ক্লীব পঙ্গু বল ফিরে পায় ।
আরব মিসর তুর্ক হিন্দুস্থান কাবুল ইরাণ
সবাই জেগেছে আজি—শুনিয়াছে মুসলিম জাহান।
---

নওরােজ
;
জামালের * মহাবাণী ; শুনিয়াছে আব্দুহু জগলুল,
ভারতের বীরসিংহ । সে বাণীরে করে নাই ভুল,
সে বাণী প্রচার তরে বিদেশেতে পরাণ সঁপেছে,
মিসরে আরবে শােকে কারবালার মাতম উঠেছে।
সে বাণী গুঞ্জিছে সদা সউদের সুবিশাল বুকে,
সে বাণী ফুটিয়া ওঠে কামালের দীপ্তিভরা মুখে,
সে বাণী বহিয়া যায় আমানের নয়নের জলে,
সে বাণী ফুটিয়া ওঠে পাহলবীর চিত্ত শতদলে,
সে বাণী গরজি ওঠে মরক্কোর পর্বতে কান্তারে,
সে বাণী ঝঙ্কার তােলে গঙ্গা সিন্ধু শতদ্রুর পারে ।
ইসলাম কেতাবে শুধু? পার যদি দেখ আঁখি মেলে,
ইসলামের জয়স্রোত আসে আজ সব বাধা ঠেলে ।
ইসলাম মুসলিমে শুধু ? তাও নয়, ভুল তাহা ভুল,
অমুসলিম বক্ষে আজ ইস্লাম যে গাড়িয়াছে মূল ।
ওই দেখ ভেঙ্গে পড়ে অস্পৃশ্যতা প্রাচীর প্রাচীন,
ইসলামের মন্ত্র উঠি ‘নর হােতে নর নহে ভিন্।
সুরাপান ধৰ্ম্ম যেথা রুদ্ধ সেথা শরাবের ধারা,
জয় জয় ইসলামের বিশ্ব আজি গাহে আত্মহারা ।
সুশীতল ছায়াতলে আসি আজ ‘দীন’ ইস্লামের,
ধনী ও নিধন ওগগা, ক্ষান্ত কর দ্বন্দ্ব তােমাদের।
* সৈয়দ জামালুদ্দীন আফগানী।
। মওলানা মােহম্মদ আলী।

এ কুৎসিত সংগ্রামেতে দিকে দিকে বিষবাষ্প ওঠে,
সভ্যতার দপদ গুড়া হয়ে ধরাতলে লােটে।
ধনিক পিষিয়া যায় পায়ে তার নিঃস্ব ও নিধনে,
সুদ আর মূলধনে মহাবল অস্ত্র বলি গণে।
নিধন মরিয়া হােয়ে হেঁড়ে তারে টুটি চেপে ধরি,
করিবে শােণিত পান কামান ও গােলারে না ডরি।
কেহ বলে রহিবে না ধনী, সব হবে দরিদ্রের,
কেহ বলে কমী বেশী নাহি রবে, নারী ও নরের
ব্যবধান দূর হয়ে কেহ আর রহিবে না ন্যূন,
সব হবে একাকার ভাল মন্দ সগুণ নিগুণ।
মিথ্যাকথা ! আড়ম্বর! বক্তৃতার ভণ্ড ভােজবাজি,
শিখিছে রুশিয়া তাহা দীর্ঘকাল পরীক্ষায় আজি ।
ত্যজিয়া সংগ্রাম এস হাত ধরে লও পরস্পরে,
নারীর কোমল স্পর্শে নর তুমি যুগ যুগান্তরে
আপনারে ধন্য জান; নারী রহ মধুর সরস,
লাবণ্য নবনী মাখা, কভু যেন না হয় মানস
পুরুষের রুক্ষপেশী কঠিন কঠোর দেহরেখা,
ক’রাে লজ্জা পরস্পরে নাহি ভুলি কোরানের লেখা।
চাহি স্বাস্থ্য চাহি বিদ্যা লজ্জা নাহি দিয়া বিসর্জন,
লজ্জাহীন নরনারী সত্য বটে পশুর মতন।
ধনিক আসিয়া কাছে ধরি তােল অভাগা নিধনে,
জাকাত খয়রাত আনি হাতে তার দাও সযতনে।
২৪

নওরােজ
কুসীদ হারাম জান; খণ্ড খণ্ড হােক মূলধন,
প্রতি জন্ম মৃত্যুসনে। এস এস এস হে নিধন,
ধনিকেরে দেহ আলিঙ্গন ; দিয়াছে সে প্রেম,
জেনাে মনে তার চেয়ে বড় নহে মণি মুক্তা হেম।
বেঁধে লও পরস্পরে মমতার স্বর্ণসূত্ৰ দিয়া;
দূর করি অভিশাপ দিবে নব মাধুরী আনিয়া
ইসলামের এই নীতি। ভূতগ্রস্ত য়ুরােপীয় দেশ
আবার প্রশান্ত হবে ; সুনিশ্চিত কল্যাণ অশেষ
দ্বেষ দম্ভ ক্ষমতার বিষ তীব্র জ্বালা ঘুচাইয়া
দিবে তার মৃত্যু জ্বালা দহনের ব্যথা মুছাইয়া।
হে য়ুরোেপ, এ দুর্দিনে স্মর তুমি সেই নবিবরে,
অনাহারে রহি যেই বিলায়েছে ধন অকাতরে ।
বল হােতে ধন হােত আত্মা বড় জেনাে মানুষের,
ধ্বংসের দুয়ারে এসে এই দীক্ষা লহ তুমি ফের।
জ্ঞানমন্ত্ৰ লভেছিলে ইলামের বিশ্ববিদ্যালয়ে,
দানমন্ত্র সেবামন্ত্র ধর এবে দম্ভিত হৃদয়ে ।
হে ভারত, জেনাে মনে জাতি হােতে প্রীতি উচ্চতর,
দীনহীন অস্পৃশ্যেরে কভু যেন ভাবিও না পর।
বিধবার আঁখি মােছ, নারী রাখে প্রবৃত্তি নারীর,
দেবতা সাজায়ে তারে গাঁথিও না ভিত্তি ভণ্ডামীর ।
তিল তিল করে মারা,এই যদি ধৰ্ম্ম তব হয়,
সতীপ্রথা মন্দ কিসে? সেও ধৰ্ম্ম, সেই বেশী সয়।
৪

নওরােজ
হে মুসলিম, জাগিয়াছ ? দেখ তবে আঁখি তব মেলি,
নবজীবনের মন্ত্রে যাত্রাপথে হয় ঠেলাঠেলি।
মুসলিম দরিদ্র বটে, কিন্তু তার বুকে আছে বল,
খণ্ড খণ্ড করি কাটো তবু কভু নাহি জানে ছল।
আল্লা ছাড়া কারাে কাছে মাথা তার নাহি করে নত,
কুটিলতা নাহি জানে, সত্য তার জীবনের ব্রত।
ওই শােন লণ্ডনের বার্লিনের মিনারে মিনারে,
উঠিছে আজান ধ্বনি জাগাইয়া সপ্ত পারাবারে।
দেখ চেয়ে আজ ভােরে সুসময়ে ভাঙ্গিয়াছে ঘুম,
করি তাই সালাম সবারে সালাম আলায়কুম। *
দক্ষিণ কলিকাতা মুসলিম যুবসমিতির ঈদ সম্মিলনীতে পঠিত।

মজলিস

No text on this page.

সুন্দর
(১)
কে বেশী সুন্দর
ফুটন্ত কলির মত শিশু মনােহর,
স্বরগ মাধুরী ভরা বিমল অন্তর।
গালেতে গােলাৰ জল কভু শােভা পায়,
হাসির হিল্লোল কভু ভুবন ভুলায়।
লুটায় ধরণী তলে ঝরা ফুল হেন,
আদর চুম্বন দিতে দেরী হােল কেন ?
চাঁদ মামা নিয়ে খেলা আয় আয় বলে,
ধন্য হয় কত ধনি ধরে তায় কোলে।
আধাে আধাে কথা কয় আদুরে দুলাল,
মধু হােতে মিষ্ট বেশী শরাব হালাল।
ফুটন্ত কলির মত শিশু মনােহর,
তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?
---

নওরােজ
(২)
কে বেশী সুন্দর ?
কিশাের কিশােরী মিলি আলাে করে ঘর,
হাসি খেলা নাচ গান চলে নিরন্তর ।
উতল আনন্দ ধারা কথার হিল্লোল,
কলহ বিবাদ কালে মহা গণ্ডগােল।
পলায় বাবার ভয়ে করিলে হুঙ্কার,
মায়েরে পাগল করে শােধ নেয় তার।
পড়শীর ঘুম নেই সঙ্গীতের চোটে,
ডাকাত পড়িয়া যেন বাড়ী ঘর লােটে।
কুড়ায় ঝড়ের আম ডালা ভরে ভরে,
পাতেন আঁচল কেউ শেফালীর গােড়ে।
কিশাের কিশােরী মিলি আলাে করে ঘর,
তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?

নওরােজ
(৩)
কে বেশী সুন্দর ?
যৌবন পরশি গেল কিশােরী অন্তর,
হাসি খেলা লীলা স্রোত হইল মন্থর।
হরিণীর মত সদা চকিত নয়ন,
ধীরে ধীরে পূরে আসে কমল বদন।
লজ্জার উদয় হােল মূর্তি ধরি বুকে,
পলাইয়া যায় ছুটে যদি চাও মুখে।
আপন অঙ্গের প্রতি ঘন ঘন চায়,
বসনে হৃদয় যেন ঢাকা নাহি যায়।
আপনার শােভা হেরি আপনি মােহিত,
গলার ঝঙ্কার শুনি হয় চমকিত।
যৌবন পরশি গেল কিশােরী অন্তর,
তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?

নওরােজ
( ৪ )
কে বেশী সুন্দর ?
যুবতী লাবণ্য ভরা যেন শশধর,
পূর্ণিমা নিশীথে করি শােভা মনােহর।
পরিপূর্ণ অঙ্গশােভা বদন কমল
ছড়ায় আলােক রাশি অমিয় তরল।
হাসিতে তড়িত খেলে আঁখি হানে শর,
সুধার আধার তবু তৃষিত অন্তর।
কখনও কথার ধারা বহে কল কল,
কখনও নীরব রয় আঁখি ছল ছল।
চলিতে চলিতে পথে অঙ্গ থর থর,
সহসা অবশ হােল বিভােল অন্তর।
নিরমল ভাবময় কোমল উদার,
গরব মণ্ডিত হের বদন তাহার।
যুবতী লাবণ্য ভরা যেন শশধর,
তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?

নওরােজ
(৫)
কে বেশী সুন্দর ?
স্বামীর গৃহেতে বধূ কৰ্ম্ম ততপর,
সেবায় নিরত সদা সানন্দ অন্তর।
শ্বশুর শ্বাশুড়ী তরে খাটে ফুল্ল মনে,
তুষিতে সদাই ব্যস্ত দীন দুখী জনে।
নিরন্তর হাসি খুশী ঘর করে আলাে,
বধূ না থাকিলে গৃহ হয় যেন কালাে ।
শ্বাশুড়ী আদর করি বেঁধে দেন চুল,
স্বামীর হৃদয় হয় সৌরভে আকুল।
ছুটাছুটি ঘাটে চলে চঞ্চল অধীর,
কখনও বা কাজ সারে নীরব গম্ভীর।
স্বামীর গৃহেতে বধূ কৰ্ম্ম ততপর,
তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?
R
৫

নওরােজ (৬) কে বেশী সুন্দর ? স্নেহময়ী মাতৃমূৰ্তি হসিত অধর, কোলে শিশু নিয়ে ওই করেন আদর- ‘আয় আয় আয় চাঁদ আয় আয় আরে, মণির কপালে মাের টিপ দিয়ে যাবে। নাচান শিশুরে কোলে নিজে নাচি তালে, বলি, ‘আয়, আয় চাদ চাঁদের কপালে। মাথায় রহে না বাস সাজেন পাগল, শিশুর প্রেমেতে মার ভাঙিল আগল। পুত্রের স্নেহেতে মাতা নীরব বিহবল, হাসিমুখে পিয়ে নেয় তিক্ত হলাহল। স্বর্গের সুষমা ভরা মায়ের বদন, পঙ্কিল ধরার মাঝে নিখুঁত নন্দন। মেহময়ী মাতৃমূর্তি হসিত অধর, তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?

নওরােজ
(৭)
কে বেশী সুন্দর ?
জ্ঞান পুণ্য বিভাসিত জ্যোতির্ময় নর,
স্বার্থ হিংসা পঙ্ক হীন সরল অন্তর।
জীবনের
যুদ্ধে
যিনি নিষ্কলঙ্ক বীর,
তপস্যার বলে হােয়ে সত্যিকার পীর।
অঙ্গার যাঁহার স্পর্শে হয় গাে হীরক,
পাষাণ কোমল হয় বিগলে পীড়ক।
আয়ু যার কেটে যায় পরার্থ চিন্তায়,
রসুলের প্রতিনিধি সত্যই ধরায়।
পর্ক কেশ শ্বেত শ্মশ্রু শুভ্র পরিধান,
মস্তকের পরে শােতে বর শিরস্ত্রাণ।
জ্ঞান পুণ্য বিভাসিত জ্যোতির্ময় নর,
তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?

( ৮ )
কি বেশী সুন্দর?
কৌমুদী প্লাবিত ধরা মুগ্ধ চরাচর,
দামিনী মূৰ্ছিতা যেন ধরণীর পর।
নীরব নিথর বহে সীমাহীন জল,
হাসিয়া তটিনী ছােটে কল কল কল।
উন্মুক্ত বিশাল ক্ষেত্র মাঝে মাঝে ঘর,
পূর্ণেন্দু পরা’ল তারে রূপালি অম্বর।
মুনিগণ বনে বসি করিছেন ধ্যান,
শব্দ নাই শঙ্কা নাই নাহি বাহজ্ঞান।
দূরেতে ধ্যানস্থ হােল পৰ্বত ভূধর,
লতা পাতা তরু রাজি নগর শহর।
পরিস্নাত শুভ্রশান্ত মৌনী বসুন্ধরা,
স্বরগ আশিস সম মধুরিমা ভরা।
কৌমুদী প্লাবিত ধরা তব্ধ চরাচর,
তার চেয়ে বেশী কিছু আছে কি সুন্দর ?

চিন্তা
প্রথম তরঙ্গ
নানান ফুলে দেছে ভরে নানান রকম গন্ধ,
একের সুবাস অপরেতে মেলে না নিঃসন্দ।
আমের কাজটি আমেই করে কুলের কাজটি কুল,
তারার হাসি তারাই ফুটায় ফুলের হাসি ফুল।
কেউ বা চলে নেচে কুদে কেউ বা চলে উড়ে,
কেউ বা আসে মায়ের কোলে কেউ বা পাতাল ফুড়ে
যার যা স্বভাব তাই সে করে নাইক তাহে ভুল,
শক্তি যেমন কর্ম তেমন তফাত নয় গাে চুল।
কেউ বা সাধু মস্ত বড় কেউ বা নরঘাতী,
কারও পিঠে উটের বােঝ কেউ বা চড়ে হাতী।
যার যা পুজি তাই ত জাহির করেন সবে ভবে,
আসলেতে সবাই সমান হিসাব কর যবে ।
যেমন পুজি তেমন রুজি পুজির মালিক জানে,
সাধু পাপী কবি চাষী সমান বলেই মানে।
ভাল মন্দ পাপ ও পুণ্যের অর্থ নাইকো মােটে,
যার যা খেলা তাই সে খেলে যাহার যেমন জোটে।

নওরােজ
স্বর্গ নরক দিয়ে খােদর কিবা প্রয়ােজন,
নাচি মােরা তারই তালে যেমন তাহার মন।
স্বাধীন-ইচ্ছা পুরুষকার সেও ত তারই দেওয়া,
তদবিরেরও কতটুকু তকদির হােতে নেওয়া।
খােদার কাছে নইকো দায়ী হিসাব হােতে মুক্ত,
যেমন শক্তি তেমন কৰ্ম্ম সবাই উপযুক্ত।
মােদের খাতা হােল কিন্তু অন্য রকম লেখা,
মােদের চোখে বহুত বিভেদ বহুত রঙের রেখা।
কড়া মােদের দণ্ড শাসন কড়া মােদের বিধি,
কারাগার ও দ্বীপান্তরেও তুষ্ট না হয় হৃদি।
পরকালটি দিছি এঁটে তাহার সাথে সাথে,
নরককুণ্ড করছে খা খা পড়বে যেয়ে তাতে।
তুমি যাবে জাহান্নামে আমি ভেশতে বসি,
করব মজা কত মত রঙমহলায় পশি।
আমি বলি দাড়ি ভাল, তুমি বল গোঁফ ;
কেহ কহে ‘হরি হরি’, অন্যে হাঁকে ‘চোপ!
ন্যাড়া মাথা কারও ভাল কারও বাবরী চুল,
আতর গােলাব কারও ভাল কারও তাজা ফুল।
কারও মতে রাজা ভাল কারও মতে চাষী,
কারও মতে যুদ্ধ ভাল কারও সর্বনাশী।
৩,

নওরোজ
নানান মত ও নানান ধৰ্ম্ম গজায় মহানন্দে,
নানান ধুয়া নানান মুখে নানান রকম ছন্দে।
এই দুনিয়ার ইহাই ধরণ ইহাই পরম সত্য,
হিসাব করি পরস্পরে যাহার যেমন তত্ত্ব।
দশজনে যায় যে পথেতে সেই পথটাই খাঁটি,
অন্য পথে গেলে কেহ মাথায় পড়ে লাঠি।
দশে যাহার কথা শশানে তিনিই পরম গুরু,
তাহার মুখে ঐশী বাণী অন্ত এবং শুরু।
দশে দশে জোড় দিয়ে হয় দল সমাজের সৃষ্টি,
আদব কায়দা রীতি নীতি শিক্ষা এবং কৃষ্টি।
আইন কানুন শাসন বাধন ক্রমে হােয়ে পুষ্ট,
সভ্যতা ও গরিমাতে পরম পরিতুষ্ট।
আসল সত্য পড়ে চাপা খণ্ড সত্যের কাছে,
মােদের সৃষ্টি মানি আগে খােদার সৃষ্টি পাছে।
গভীর বিষাদে মন হয় জর জর,
ধর্মের নামেতে যবে পাপ করে নর।
-আরব কবি আল মায়ারী।

চিন্তা
দ্বিতীয় তরঙ্গ
শুধুই যদি থাকত ভাল মন্দ নাহি থাত,
শুধুই যদি সুখের স্রোতে পরাণ সদা ভাত,
রূপের গাঙে ভরা জোয়ার ভাটা নাহি জান্ত,
ধরা হােত কেমন ধারা বল্ দেখি মন বত!
থাকত না আর কান্নাকাটি থাত না’ক ক্ষুধা,
পেটটি সদা রইত পােরা খেয়ে অনেক সুধা।
সবার মুখে সদাই হাসি সবার চোখে আলাে,
সবার বুকে ভালবাসা সবায় বেসে ভাল।
ইচ্ছামত লােক লস্কর হাতী ঘােড়া আত,
মণি-মুক্তা আস্বাব আদি সদাই হাজির থাকত।
ধিন ধিন নেচে গেয়ে যেত চলে দিন রে,
বেহেশততা আর পৃথিবী যে রইত নাক ভিন্ রে ;
একটুখানি কিন্তু তবু লাগায় যেন খট্‌কা,
পেটটি ভরা রইলে পরে কিসের মণ্ডা মা।
মটকা-কমা, এক প্রকার মিঠাই।
E
৪০।

নওরােজ
কদার শেষেই হাসি ভাল নইলে হাসি বাসি,
জ্যৈষ্ঠমাসে বৃষ্টি এলে তবেই খুশী চাষী।
বিচ্ছেদেতে মিলন হােলে বড়ই লাগে ভাল,
অন্ধকারের বন্ধ ঘরে হেসে ওঠে আলাে।
সবাই যদি সমান চোখে অন্ধ কিসে মন্দ ?
থানা একটু বেশী কমী একটুখানি দ্বন্দ্ব !
ফাঁকে ফাঁকে চলুক মিলন যেমন মােদের আছে,
কেউ বা ভাল কেউ বা মন্দ একটু আগে পাছে ।
জোয়ার ভাটার টানেতে ভাই চলুক জীবন তরী,
দুঃখ সুখের সওদা দিয়ে বােঝাই তারে করি।
রইব নাকো ঘাটে বসে ঘাট আমাদের নাই,
মরাই শুধু ঘাটের লােভী চিরস্থির সে তাই।
চলা মােদের চরম লক্ষ্য চরম ধৰ্ম্ম মানি,
ভাল মন্দ সত্য মিথ্যায় পথের চিহ্ন জানি।
এ পৃথিবী মন্দ কিসে অলস স্বর্গ থেকে ?
শান্তি নাই ত ফৰ্ত্তি আছে ধূলা কাদা মেখে ।
মরা যেন শান্তি চাহে আমরা চাই কৰ্ম্ম,
বজ্র আঘাত দিব নিব শক্তি মােদের বর্ম।
৪১..

রমণি, তােমারই কি সব টুক ?
রমণি, তােমারই কি সব টুক ?
এত যে কথা এত যে গান,
এত যে মধু এত যে তান,
এত সঙ্গীত এত মূচ্ছনা,
এত যে ছন্দে করি বন্দনা,
এত রস, রঙ, রূপ,
তােমারই কি সব টুক ?
কালিদাস রবি শেলী শেক্সপার,
হাফেজ ও জামী সাদী ও হােমার,
কত দীন কবি নাম নাই যার,
আনে ভারে ভারে কত উপহার,-
তাতেই তােমার রূপ,
জান নাকি এই টুক ?
---
সাজাই তােমারে গােলাব চন্দনে,
বাড়াই গরব আকুতি ক্রন্দনে,
চাই বাঁধিবারে নিবিড় বন্ধনে,
আপন স্বপ্ন-সুরভি নন্দনে
জমাই তােমার রূপ,
জান না কি এই টুক ?
F
= ৪২=
---

বায়েজীদ
চলেছেন বায়েজীদ পথমাঝে ধীর নম্র চালে,
হেনকালে আসি এক লােষ্ট্র তার লাগিল কপালে।
দর দর বহে ধারা রুধিরেতে রাঙা হােল পাল,
হেসে কন, ‘ভাল হােল, আজি আমি মেখে এই লাল
যাব মাের প্রিয় পাশে। শিষ্যগণ দেখে চেয়ে কাছে,
একপাল ছেলে জুটি ঢিল ছুড়ে মারে কুল গাছে ;
তারই এক খণ্ড আসি ভাঙিয়াছে তাপসের মাথা,
ধরে বলে একজনে, ‘দিব শাস্তি, হইয়াছে খাতা।
কহিলেন বায়েজীদ, ছেড়ে দাও বালকেরে আহা!
একটি আঘাত শুধু—সহিতে কি পারিব না তাহা ?
চেয়ে দেখ কুল গাছে, দিনে দিনে কত না পাথর
হানিতেছে ব্যথা তারে, তিলে তিলে ভাঙিছে পাঁজর ;
তবু নাহি আহা বলি বিতরিছে মিষ্ট মিষ্ট ফল,
একটি আঘাতে আমি হব কি গাে নিঠুর বিহবল ?
?
1. ৪৩=

সতী ও অতিথি
সংযত অতি মন্থর গতি চলিছে রমণী সতী,
ওড়না আড়ালে বিজুলি আবরি নয়নে মাখিয়া নতি।
কুঙ্কুম রাগে রঞ্জিত নহে চরণ অধর গাল,
শিঞ্জিত নহে গুঞ্জর ধ্বনি কণ্ঠে দোলে না মাল।
আতর গােলাব কস্তুরী বাস রহে না ঘিরিয়া তারে,
গন্ধ বহে না মন্দ অনিল লুব্ধ কেশের ভারে।
আপনার মনে চলিছে আপনি না চাহি কাহারও পানে,
শরম ভরমে মণ্ডিত দেহ ছলনা কিছু না জানে।
আপন গরবে আসিল রমণী আপন দুয়ার পাশে,
হেনকালে এক যুবক আসিয়া কহিল কাতর ভাষে,
‘ওগাে বিজয়িনী গরবিনী রাণী কর দয়া মােরে আজ,
বন্দী আমি যে তােমার চরণে বন্দি হৃদয় মাঝ ।
দারুণ পিয়াসা এ বুকে সজনি দাওগাে ফটিক জল,
নহেত তিয়াষে মরিব আজিকে কোরােনা ললনা ছল।
কহিল রমণী, ‘নাহি করি ছল তবে জেনাে ইহা ভাই,
এ দেহ আমার নহে আপনার ফিরে যাও বলি তাই।
কোরােনা লালসা কলুষিত এই মাটির পিণ্ডটিরে,
আধিব্যাধি জুরা বিষকীটে ভরা দগ্ধ নিয়ত ধীরে।
৪৪ =
---

নওরােজ
কহিল যুবক, ‘শুনায়ােনা মােরে ধৰ্ম্মের উপদেশ,
ওই আঁখি দুটি তুষিবে আমারে এই ভিক মাগি শেষ।
যুবতী কহিল, ‘মেহমান তুমি এসেছ আমার ঘরে,
কি বলে তােমারে করিব বিদায় অপমান হতাদরে।
এই যদি মতি হে মাের অতিথি রই হেথা ক্ষণকাল,
তুষিবে তােমারে আঁখি দুটি মাের ঘুচায়ে দুঃখজাল।
এত বলি সতী আপনা মহলে ঢলিল ক্ষিপ্রগতি,
হরষে মাতিল প্রণয়ী যুবক পরম ফুল্লমতি।
যথাকালে আসি মহলের দাসী নিয়ে গেল তারে ডেকে,
নিভৃত কক্ষে বসাল যতনে কণ্ঠে করুণা মেখে ।
মেযের উপরে রেশমী রুমালে আবৃত খাঞ্চা খানি,
‘প্রিয়ার হাতের প্রথম স’গাত'—মনে মনে ইহা জানি
বিপুল পুলকে তুলিয়া রুমাল দেখিল খাঞ্চা পরে,
সেই আঁখি দুটি উপাড়ি আপনি ভেজেছে অতিথি তরে।
:৪৫

শিলঙে
ও পিসিব
কুবলাই কুবলাই! উবলাই তােমায় রাখুক ভালো,
উম্ খুলুনি হয় নি এখন ? ঢালাে ঢালে
জদি ক'রে দুধটা চায়ে, মিলাও চিনি,
চিরদিনই তােমার কাছে থাকব ঋণী।
শুয়ে শুয়েই আস্তে ধীরে দেই চুমুক,
হাসছ তুমি? কুচ, না বুঝাে আহাম্মুক!
ওয়াই, আর,•••বাজল যেন অনেকটা,
নাইক আরাম, বিশ্রী কি যে ঠাণ্ডাটা।
চৈত্রমাসে শীতের চোটেই যাবে জান,
ভালাে করে দাওনা চেপে কলী খান।
দজা খােলা ? মেঘ ঢুকেছে, হায় রে হায়,
এবার বুঝি কী সমেত গা ভিজায়
দিনের বেলাও ঘরে ঢোকে এম্নি চোর,
এ দেশের এই মেঘ-শিশুরা, ভিড়াও দোর।
ভালের চাম কি রাখ গায়ে ? পাওনা টের,
যাবই ফিরে কলকাতাতে কইনু ফের।
৩
উবলাই-খােদ; উম্ খুলুনি-গরম পানি ;
কুবলাই-সালাম ;
ওয়াই, আর-এক, দুই।

নওরােজ
গরম হােতে রেহাই পাব এ পাহাড়ে,
হায় রে কপাল ! ঠাণ্ডা ঢাকে হাড়ে হাড়ে।
কুবলাই, কুবলাই ! ও পিসিব তবে আসি,
পড়বে মনে গরম দেশেও তােমার হাসি।
আঁটা সাঁটা দেইখানি ঠোটটি পুরু,
ওয়াই, আর,•••সবক তুমি দিলে গুরু।
চড়াই উত্রাই ডর না’ক, হেসে খেলে,
চল পথে দু’মণ বােঝা পিঠে ফেলে ।
শাবাশ বলি তাকত এবং হিম্মতেরে,
পাহাড় ভেঙে শহর বসাও হেরে ফেরে!
পাথর খুড়ে শস্য ফলাও তােমরা মেয়ে,
(ভতাে ভীরু বাঙ্গালীরা দেখে চেয়ে !
:৪৭ ==

শােণ নদীর বাঁধ
পাষাণ গাঁথিয়া বাঁধিয়াছে নদী
আছাড়ি পড়িছে তায়,
দুর্বার স্রোত হুঙ্কার করি
উদ্দাম বেগে ধায়।
হেথা কুলুকুলু বাঁশরীতে সাধা
নহে তটিনীর জল,
বজ গরজে চণ্ড আহবে
মেতেছে
সৈন্যদল ।
নিশীথ শয়নে কেঁপে উঠি শুনি
ক্রুদ্ধ ভীষণ নাদ,
এইবার বুঝি গুড়া হােয়ে যায়
পাহাড়ের মত বাঁধ।
টুটিতে না পারি পাষাণ প্রাচীর
লঙ্ঘিয়া তারে যায় ;
অযুত নাগিনী বিস্তারি ফণা
সরােষে গরজি ধায়।
=
৪৮ =

নওরােজ
এত ক্ষুধা আছে তটিনীর বুকে,
এত মায়া আছে প্রাণে ;
নিঠুর মানুষ এমনি নিদয়,
আঘাত তাহারে হানে !
সাগরে চলিছে তটিনীর জল,
তাহাতে এতই বাধা ;
তাহার মাঝারে কাঁদে যেন কোন্
চির বিরহিনী রাধা।
৪৯

;
ধূ ধূ করা বালুচর শুধু
এদেশের এই নদী
মরুর নিশ্বাস স্বসিয়া শ্বসিয়া
বয়ে যায় নিরবধি।
অগভীর জল ক্ষীণ হােয়ে হােয়ে
কোথাও বা যায় মুছি ;
পিপাসায় বারি নাহি এক ফোটা
বৃথাই সবারে পুছি।
হায় হায় হায় নদীর বুকেতে
তৃষিতের প্রাণ যায় ;
বাংলার নদী একথা শুনিলে
শরমে মরিবে ঠায় ।
শি

নওরােজ
বুক ভরা তার উছলে অমিয়
ক ক ক স্বরে ;
হাজার তরণী তর ত তহ্
চলিছে পালের ভরে
বাংলার মেয়ে সেও মধু ভরা,
নাহি জানে রুঠো কথা ;
মমতা জড়ান চোখে মুখে তার
ব্যথিতের তরে ব্যথা।
নাহি আফসােস তবু এই দেশে
খােদ যদি বালুচরে ;
ঝির ঝির ঝির ভেসে উঠি নীর
তৃষিতের তৃষ হরে।
এ দেশের মেয়ে পাষাণেতে গড়া,
মিছে এই অপবাদ ;
পাষাণের মাঝে বহে ক্ষীরধারা
কুলু কুলু কুলু নাদ।

নওরােজ
হিমালয় হােতে নামে ভাগীরথী,
সরসি কত না দেশ;
এ পাষাণ হােতে তেমনই নামিবে,
করুণা মােহন-বেশ।

ফুলঝৱি

No text on this page.

( ১ )
কু কু কুল
চুল বুল চুল
কি মশগুল,
মুখের বুলি ;
থিড় থিড় থিড়
দাড়ান ফির
শিরীণ ক্ষীর
চুমােগুলি।
তুল তুল তুল
বাই গুল্
দোদুল দুল
দোলেন তিনি ।
কিন্ কি কি
কঁদেন ক্ষীণ
সুর মিহীন
আয়রে নিনি ।

নওরােজ
(২)
কাজল মেয়ে সাঁওলী তারে বলতে হবে বটে,
উঠতি বয়েস ফুলের কলি ফোটে কি না ফোটে।
ডাগর ডাগর আঁখি দুটি তাকিয়ে রহে পানে,
শরম নাহি জানি তারা সুমুখে তীর হানে।
লীলা ভরে দুলিয়ে বেণী দুলিয়ে বেণীর ফিতা,
নূপুর পায়ে বাজিয়ে চলে নয় সে লাজে ভী।
কভু বা ফুল খোঁপায় গোঁজে কভুও গাঁথি মালা,
জড়ায় শিরের মেঘলা নীড়ে আঁধার করি আলা।
কভু বা হার কণ্ঠে দোলে পেয়ে কোমল ছোঁয়া,
শিউরে ওঠে অঙ্গ তাহার যায় কি পরাণ খােয়া !
কখনও তার নাচের খেয়াল সঙ্গিনীদের সাথে,
ছড়ায়ে চুল উড়ায়ে ধূল ময়ুর পাখা হাতে।
কখনও ফের গানের নেশায় পা দুটি তার মেলি,
কণ্ঠে বােনে সুরের যাদু নানান ছাদে খেলি।
খিল্ খিল্ খিল্ হাসি কভু ঝিলিক পানা নাচি,
চমক লাগায় বুকের তলায় মরি কিংবা বাঁচি।

নওরােজ
(৩)
লহরী লীলায় খেলে সে রঙ্গে
সখীজন সনে বিবিধ ভঙ্গে-
আনন্দ উছাস মধুর গীতি,
হাসি কোলাহল স্নেহ ও প্রীতি ;
বসন আড়ালে লুকায়ে আঁখি,
মধুর অধরে বিজুলী ঢাকি,
নাচিয়া নাচিয়া চলে সে ধনি
মেঝেতে বাজায়ে ঝন ঝনি।
কেমনে বাখানি প্রিয়ারে আমি
মজাল রসেতে দিবস যামী।
সৌন্দৰ্য আনন্দ বুঝি এই সত্যটুক,
প্রমাণ করিছে ভবে রমণীর মুখ ।
---

নওরােজ
( ৪ )
উজল কোমল পূর্ণ বদন মণ্ডল,
শীতল সরল শুভ্র আলাে ঝলমল।
উদার মধুর স্নিগ্ধ নীরব চাহনি,
গভীর পিরীতি মুগ্ধ প্রেয়সী সজনি।
গরবে ভাস্কর দীপ্ত, লাজে আনমিতা,
আবেশে কলিকা নম্র সুখ পুলকিত।
মহিমা জড়িত অঙ্গ রাজ রাজেশ্বরী,
সুষমা শশাভিত শান্ত স্বরগ অপ্সরী।
চমকে পশ্চাতে কৃষ্ণ আকুল কুন্তল,
আপাদ লম্বিত হৃষ্ট সমীর-চঞ্চল
সুধীর তরঙ্গ ভঙ্গ গভীর পাথারে,
চুমিছে দেহের জোছনা মুছিতে আঁধারে।
কভু সে মজায় চিত্ত ডুবায়ে চেতনা,
কভু বা জাগায় হর্ষ নাশিয়া বেদনা
অকুল রসেতে ঠ করিছে জীবন,
হরিয়া সকল দৈন্য ভুলায়ে মরণ।
•

নওরোজ
(৫)
কোমল লতিকা লসিত তনু,
কপােল লােহিত পুলক লাজে,
লাবণী তরল চপলা ভাতি,
দোলেরে চিকুর অতুল সাজে।
ললিত লীলাতে কমল আঁখি
কহিছে বারতা কথার আগে,
অলস আবেশে বসিল পাশে,
নাচেরে ধমনী তুফান জাগে।
( ৬ )
জ্বালায়ে রূপের ধূপ করি আবাহন,
বাঁধিয়াছে প্রেমসূত্রে গুণমুগ্ধ মন ;
রূপের ভিতর দিয়ে বটে পরিচয়,
রূপের অতীত এবে মােদের প্রণয়।

নওরােজ
( ৭ )
রয়েছে শয়নে
এলায়িত তনুর মায়াকুঞ্জবনে।
দামিনী মূরছি যেন আকাশের গায়,
স্পন্দহীন দেহলতা পূরিত বিভায় ।
অপলক আঁখি দুটি—জ্বলে না সে তারা,
স্বপন আঁখির মাঝে হােল আত্মহারা।
নিদ্রাদেবী
নিজে বিনিদ্র নয়নে,
চুমিছেন চন্দ্রানন হসিত বদনে।
দেহের পরশে শয্য"আনন্দ বিভল,
মরে যেন ক্ষণে ক্ষণে সুখেতে কেবল।
মুগ্ধ

নওরােজ
(৮)
কথা তার কথা নয় সুধা প্রস্রবণ,
বয়ে যায় কল কল তর তর বেগে ;
নামে যেন হিমালয় হােতে
মধুভরা স্নিগ্ধ বারিধারা।
শিশুর কুসুম হাসি,
পূর্ণিমা জোছনা রাশি,
কিশােরীর
ঘুমন্ত নয়ন,
যুবতীর প্রণয় চুম্বন,
প্রেমিকের মৃদু ভাষা,
রমণীর ভালবাসা,
তটিনীর কুলু কুলু,
কোকিলের কুহু কুহু,
মিলনের মধু গাথা,
বিরহীর মনােব্যথা,
ও কণ্ঠে মাখান।
সুরের সে তীর্থক্ষেত্র,
সঙ্গীতের মিলন মন্দির ;
আনন্দের মূরতিস,
চঞ্চলতা তার মাঝে স্থির।

নওরােজ
(৯)
আমার এ আমি
আমার সে নয়,
আমারে ফেলেছি
হারায়ে
আমি নাহি আছি,
প্রতি
তুমি আছ শুধু
ছড়ায়ে
অনু মাঝে
তােনারি বাসনা
বুকেতে আমার,
তােমারি কামনা
নয়নে ;
ওঠে পড়ে শ্বাস,
প্রতি শিরা মাের
তব নাম জপে
গােপনে
=৬২
s

নওরােজ
আমার এ দেহ
আমার এ মন
আমার জীবন
সকলি ;
মিশেছে তােমাতে,
তােমা-ময় সব,
‘আমি’ মিছে কথা
কেবলি
-

No text on this page.

নিমক মহল ৯

No text on this page.

(১)
চাদ ! তােমারে সকলে কয় আদর করি,
চাদের ছবি আছে তােমার বদন ভরি।
পূর্ণ চাঁদের মতন শােভা আলােয় উজল,
মাঝে আছে সুৰ্ম্মালেখা নয়ন কাজল।
চঁাদের দেশে শুনি নাকি পাহাড় ওঠে,
ও নাসা আর ললাটে তার প্রমাণ বটে।
চাদের আছে যােল কলা কমা বাড়া,
তােমার আছে মেজাজেতে নরম কড়া।
চাদের পিছে অমাবস্যা বিশ্বগ্রাসী,
তােমার পিছে মেঘের বরণ কেশের রাশি।
= ৬৭

নওরােজ
(২)
বােলল না আর মনটা যে ভাই ভাল নেইকো মােটে,
বেহদ্দ হার হােল ঘরে কি জানি হয় কোর্টে।
কোলাম তাঁরে, আজ কাল ত আর পসার তেমন নাই,
খরচ পত্র এখন কিছু সমঝে করা চাই।
এসেন্স সাবান আতর টাতর কম কিলেও হয়,
নতুন নতুন ফ্যান্সী শাড়ী নইলে কি আর নয় ?
রােজ সন্ধ্যায় হাওয়া খাওয়া ওটা এখন ছাড়,
হিসেব কিতেব করে চল যতটা যা পার।
কোলেন তিনি খানিক ভেবে, ‘এতই যদি দায়,
ছেড়েই দেব ফাজিল খরচ যেমন অভিপ্রায় ;
তােমার কিন্তু তেন্নি তরাে করার করতে হবে,
সিনেমা ও টকী হােতে সদাই দূরে রবে।
;
-

নজ
(৩)
সজল তাহার কাজল আঁখি চেয়েছিল আমার পানে,
যাবার যখন সময় হােল দীর্ঘ দিনের অবসানে।
আসবে এদিন তাহার আমার দুইয়ের মনেই ছিল জানা,
তবু যে ছার আঁসুর ধারা জানে নাকো কোনও মানা।
‘গিয়েই পরে চিঠি লিখাে’-এইটি শেষের অনুবােধ,
পৌছুতেই ফেলি চিঠি হিতাহিত যে নাহি বােধ।
চিঠি দিলেই চিঠি আসে—চিঠির আশে চেয়ে রই,
চিঠি দিল পিয়ন এনে বুকের মাঝে ফোটে খই।
হায়রে কপাল! এ যে চিঠি আমারই নিজ হাতের লেখা,
উল্টে দেখি নাইকো তাতে শিরােনামার একটি রেখা।
ডি-এল-ওতে ছাপটি মেরে আক্কেলে মাের দিয়ে সালাম,
পাঠিয়ে দেছে আমার কাছে অতি ব্যস্তের এ পরিণাম।

নওরােজ
(৪)
অনেক ভেবে কোলাম তারে, দেখ বিবিজান,
ত্যাগ যদিকে কর কিছু তবেই বুঝি টান।
মিষ্টি হেসে কোলেন তিনি, কোরবান হব আমি,
তােমার একটু খুশীর লাগি জেনাে ওগাে স্বামী।
কোলাম তারে, আচ্ছা, ধর তােমার এই যে চুল,
নিত্য যাতে মাখাও তুমি গােলাব ও বকুল
বলি যদি দাও ত কেটে দরকার আছে কিছু ?
‘সেই মুহূর্তেই দিব কেটে ফিরব নাকো পিছু।
‘যদি বলি দাও ত দেখি গয়নাগুলাে বেচে,
ভাল একটা পার্টি দেব হেসে গেয়ে নেচে ?
‘দিও পার্টি এম্নি যদি হােয়ে ওঠে মন,
তােমারি সখ মিটবে বলে রাখি এ জীবন।
কোলাম তারে, দেখ লক্ষী, মনটা কেমন করে,
ও পাড়ার ওই মুনশী বাড়ীর বড় মেয়ের তরে।
ওরে বাবা, কড়া তেলে পড়ল বুঝি নুন,
সাপের মত ফুসে ওঠে মুখটা করি চুণ ।
= ৭০

নওরােজ
(৫)
অসুখ হােল আমার জুরি নিয়ে বার্লি নিয়ে দুধ,
বারে বারে আসা যাওয়া আপন হাতে দাও ওষুধ।
শিথিল হােল কড়াকড়ি ভেঙে গেল লাজের বাঁধ,
নিউমােনিয়ায় ভুগি আমি মেটে তবু কতই সাধ ।
বাঁচাও ভাল মরাও ভাল হেরি যদি মুখখানি,
বাঁচার চেয়ে মরাই ভাল পলাও যদি বাজ হানি।
বাঁচব আমি বাঁচতে যদি সত্যি করে বল ঠিক,
নয়ত এম্নি মরাই ভাল জীবনেরে শত ধিক।
থার্মোমিটার হাতে ধরি চেপে ধর আমার হাত,
সেই সুযােগে মরতে পারা সেত পাওয়া খাস নাজাত।
(৬)
অমন,
ন
দূরে দূরে সরে যাওয়া ভাল নয়,
প্রাণে যদি প্রীতি জাগে শরম করা ভাল নয়।
বুকে যদি থাকে ব্যথা চেপে রাখা ভাল নয়,
মুখে যদি আসে কথা বেঁধে রাখা ভাল নয়।
চোখে যদি রহে তৃষা ছেপে রাখা ভাল নয়,
আখি দিয়ে আঁখি ছলে ফাঁকি দেওয়া ভাল নয়।
৭১।

পরােজ
(৭)
নানা দেশে নানা ছলে নানা রকম মতে
দেখা হােল পথে।
বাের্কা আড়ে পূর্ণ শশী চোখে নেশা ভরে
হঠাৎ নেকাব তুলে ফেলা আমার বরাত জোরে ;
হাসি তবে মকসেদ হােল আমান হােল ফতে,
দেখা হােল পথে।
গাে-যান চলে কঁাচর ক্যাচর তুমি তাহার মাঝে,
বাপশকট মােটর গাড়ী এক্কা ও জাহাজে ;
তােমার চাকায় বাঁধা আমি হরেক রকম রথে,
দেখা হােল পথে।
ধূলায় ফেলি পা দু'খানি চল পরিপাটি,
তােমার কোমল ছোঁয়া লেগে শিউরে ওঠে মাটি ;
আমার জীবন নদীর কূলে তােমার জীবন তটে,
দেখা হােল পথে।
=৭২:

দেবরের আদর
সদ্য হারায়ে পতি
আহাজারি করে সতী,
কপােলে ঝরিছে মতি,
বিনায়ে বিনায়ে কাঁদে ;
‘বল বল বল স্বামী,
কেমনে কাটাব আমি
দীর্ঘ দিবস যামী
পাসরি সকল সাধে।
দেবর দাড়ায়ে ছিল,
সময় বুঝিয়া নিল,
প্রবােধ মুখেতে দিল,
‘ভেবােনা, ভেবােনা ভাবী।
যাহা চাও তাই দিব,
সব সাধ মিটাইব,
কোন দুখ না রাখব,
এনে দাও দেখি চাবি।
E

নওয়াজ
সতী কহে, এই বাড়ী
বাক্স পেটারা শাড়ী
ধানের চালের কাড়ি,
কি হবে, কি হবে স্বামী।
দেবর কহিল, ভাবী,
মিছে মর তুমি ভাবি,
দাও না আমারে চাবি,
সকলই দেখিব আমি।
সতী কহে, এই জামা
কত ফ্যান্সী বিনামা
কোট প্যান্ট পায়জামা,
কি হবে, কি হবে হায়।
দেবর কহিল, বাস,
সকলই করিবে পাস
আভি সে হামামে পাস,
কেন গাে ভাবিছ তায়।
৭৪।

নওরোজ
সতী কহে, এই খাট
যেন বা রাণীর পাট,
কেমনে কাটাব রাত
এখন তাহার পরে ?
দেবর কহিল, ‘ছি, ছি।
বক কেন মিছেমিছি
জীবন সঁপিয়া দিছি,
তােমার ভালাের তরে
সতী কহে, “দু' হাজার
রেখে গেছ ওগাে ধার,
কেমনে কি হবে তার
বল বল বল স্বামী!
দেবর কহিল, “সে কি ?
আসল তােমার মেকি।
সকলই পারি কি দেখি,
তফাত রহিব আমি।
e
৭৫

হেকায়েত ছহি যবানে
শােন সবে মন দিয়া মােনহে কহানি,
আপনা দেলের বিচে সেচি তার মানি।
কেনান শহরে এক আলেম আছিল,
মেছের নগরে গিয়া হাজির হইল।
কয় দিন কেটে গেল খুশী খােশালীতে,
এলেম জাহির তার হােল চারিভিতে।
বাদশার বাগিচাতে করিতে সায়ের,
একদা খাহেশ তার হইল আখের।
চলিলেন সেই দিকে কদম কদম,
সাথী কেহ নাহি ছিল তাই কিছু ‘গম।
হাকিম সাহেব এক রাহেতে আসিয়া,
মিলিলেন তার সাথে খােশদেল হইয়া।
বড়ই তাজিম করি নিলেন সাথেতে,
আসমানের দ যেন পাইলেন হাতে।
এক ছিল দুই হােল খােদার রহম,
কমেরে বেণী করে বেশীরে করে কম।
এইরূপে কিছুদূর গেলেন যখন,
কামেল দরবেশ এক দিল দরশন।
তিন জনে মিলি তবে চলিল সায়েরে,
নানামত বাত করি খােশাল খাতেরে।
অবশেষে বেনে এক ব্যাসিয়া জুটিল,
চারিজন মিলি মিশি বাগেতে ঢুকিল।

নাজ
নাগেস রায়হান লালা কত মত ফুল,
হাজার কলেতে ভরা বেহেশতের তুল।
খুলী মত ফল তুড়ি মুখেতে পুরিল,
ফুল হাতে অবশেষে বাহিরে চলিল।
হেন কালে মালী আসি করিল সালাম,
কেবা বট আপনারা কিবা নাম ধাম ?
পরিচয় শুনি কহে আলেম হুজুরে,
চান যদি আরও কিছু ফল দেই তুড়ে।
হাকিমেরে মিঠে হাসি করিল 'তাজীম,
মশহুর আপনি বটে বােজৰ্গ হাকিম।
হুকুম করিলে পরে দিই তুলে ফুল ।
গােলাব রায়হান কেওড়া অথবা সুম্বুল--
কামেল ফকীর তরে হেঁট করি সের,
কহিল কসুর হােল এই গরীবের ।
আপনি লইয়া ফল হাজির হইতাম,
দীন দুনিয়া দোন হাসিল করিম।
বেনেরে ডাকিয়া জোরে কয় কড়া সুরে,
কার হুকুমেতে তুমি এসেছ এ পুরে ?
তার পর হাত পাও জিঞ্জিরে বাঁধিয়া,
রাখিল শােয়ায়ে তারে মাটিতে ফেলিয়া।
আলেমে আবার লৈ সালাম তাজিমে,
মিঠে বাত দিয়ে খুশী করিল হাকিমে।

নওরােজ
তার পর দরবেশেরে ডাকিয়া কহিল,
আপনারও খাতা কিছু এখানে হইল।
বলিয়া মেওয়া খাওয়া এই কিগাে পীরী?
বাদশার কাছে নিব ভাঙিব ফকিরী।
এত বলি তাহারেও রাখিল বাঁধিয়া,
আলেমে কহিল তবে হাসিয়া হাসিয়া।
আপনি বিদেশী ভাই যব খুশী হয়,
এখানে আসিয়া খান যাহা মনে লয় ।
তার পর হাকিমেরে ধরিয়া জোরেতে,
জিঞ্জির বাঁধিয়া দিল হাতেতে পায়েতে।
আখেরেতে আলেমের ধরি দুই হাত,
হাত কড়ি দিয়ে দিল কহি এই বাত,
আমি ত একেলা আর তােমরা চার জন,
বিদ্যের জাহাজ হােয়েও বেকুফ অধম।
তােমরা সকলে যদি একাট্টা রহিতে,
সাথীর বিপদ দেখি সাথ যদি দিতে।
কি করিতে পারিতাম আমি একা একা,
এখন বুঝিতে পাবে কার কিবা ঠেকা।
বাদশার বিচারেতে হােয়ে গেল শূল,
মনে মনে ভেবে দেখ কিবা হােল ভুল।
কহানি আমার এবে হইল খতম,
গােনা খাতা হয় যদি করিও রহম।
৭৮

কবিকুঞ্জ

No text on this page.

( ১ )
দেহ শক্তি দয়াময় তব পূর্ণ স্থান,
পারে যেন খুঁজে নিতে এ মানব প্রাণ।
পারি যেন গড়ে নিতে মাের বিশ্বখানি,
তােমার আলাের সুরে ছন্দ তব আনি।
পূত
করি
সে আলােক পাতে,
সৃষ্টি মাের আলােকিয়া তার সাথে সাথে
সৃষ্টি তব

নওরােজ
(২)
জাগাই মােরা গানের ধারা,
স্বপন মােরা দেখি থাকি থাকি ;
সাগর তীরে ভ্রমি একা,
নদীর চরে চিহ্ন রাখি আঁকি।
সৰ্বত্যাগী সৰ্বহারা,
চঁদের আলাে শিরে মােরা মাখি ;
নাচাই মােরা, কঁপাই মােরা,
দুনিয়াটারে মােরাই সােজা রাখি।
অবাক করা ছন্দে মােরা
নতুন নতুন নগর শহর গড়ি,
ফঁকা কথার যাদু বুনি
দিগ্বিজয়ের স্বপন মােরা ভরি।
একটি বুকে একটি স্বপন
রাজার মাথায় হানে বজ্রাঘাত,
কয়টি পরাণ একটি গানে
সাম্রাজ্যেরে করে ধূলিসাৎ।
পৃথিবীর সে প্রাচীন দিনে
কাল সাগরে নিলীন যাহা আজ,
নিনেভা যে গড় মােরা,
বুকে চাপি দুঃখ ব্যথা লাজ।
৮২=

নওরােজ
বাবেল শহর উঠল গ'ড়ে,
তেমনি করে নিয়ে মােদের হাসি ।
রঙীন স্বপন দেখনু তখন,
বেদন যত গেল কোথায় ভাসি।
ভবিষ্যতের বাণী দিয়ে
আবার তাদের করি চূর্ণচার,
গাইনু মােরা বিজয়-গাথা
অনাগত নতুন দিনের আর।
যুগের পরে যুগ যে আসে
অর্থ জানি আর কিছু নয় তার,
স্বপন শেষে স্বপন আসে,
স্বপনেরি চির অভিসার। #
অনুবাদ : O'Shaughnessyর Ode.

নওয়াজ
(৩)
মনে পড়ে আজ হেসেছিলে তুমি,
লিখেছিনু যবে নামটি তােমার
সিন্ধু-সিকতা পরে।
কয়েছিলে মােরে, কি অবােধ শিশু!
বালুকা উপরে রহে কি গাে লেখা
একটি দিনের তরে ?
তার পর হােতে লিখিয়াছি নাম,
সাগরের বারি মুছিবে না তায়,
রবে লেখা চিরকাল।
কত দেশে দেশে যাইবে সে নাম,
কত কোটি মুখে ধ্বনিবে সে গান,
কত যুগ কত সাল। *
* অনুবাদ : Landor হইতে

নওয়াজ
(৪)
তুচ্ছ আমি, তুচ্ছ আমার ব্যথা নয় ;
ক্ষুদ্র তুমি, ক্ষুদ্ৰ তােমার কথা নয়।
আমার ব্যথা তােমার কথা দুয়ে মিলি,
বুনিয়া যায় রেশমী সূতার ঝিলিমিলি ।
ডাগর হােলেও আঁখি তােমার কতই বড়,
তার অতলে তলিয়ে গেলাম কেমন তরে ।
আঁসুর ফোটা এত্তটুকু তারি বাণে
ভরা ডুবি হােল কি মাের পরাণ জানে!
তােমার মুখের হাসি সে আর কতই মিঠে,
ছুরির মত বিধল তবু বুকে পিঠে।
ক্ষুদ্র হােলেও আজকে তুমি রাণীর রাণী,
লায়লী এবং শিরী হােতে বড়ই মানি।
তুচ্ছ হােলেও মাথায় আমার কবির সাজ,
হাফেজ রুমীর ভূষণ যে এই কাটার তাজ
সাদী জামীর দরজা পেলাম তােমায় বরি,
তা কেয়ামত বাজবে আমার বিজয় ভেরী।

নওরােজ
(৫)
কবির যে ভালবাসা
নহে তা একার তরে ;
বিশ্ববাসী পিবে সুখ
তার সুখ সরােবরে।
নরনারী লভে তৃপ্তি
পিয়ে মাের প্রাণ মধু;
এস তবে এস প্রাণে,
ওগাে কবি প্রাণ বঁধু।

নওরােজ
(৬)
সুন্দরের তৃষা যার
অসুন্দর পরশে না তায় ;
বরষে একটি বার
হেরি যদি মুখ তার,
যত মলা যেথাকার,
মুহূর্তেকে সব লয় পায়।
হৃদয়ে স্বরগ আঁকা,
প্রেমের পরশ মাখা,
লালসা কলুষ লেখা
আপনি মুছিয়া যায়।
(৭)
সৌন্দৰ্য সৌন্দর্য্যে নহে, নহে গাে নয়নে ;
সৌন্দৰ্য্য প্রিয়াতে নহে প্রেমিকের মনে।
কালগুণে প্রাণ করে প্রেমসুধা বৃষ্টি,
কে জানে কাহার তরে কার হয় সৃষ্টি ?
s
১৭

নওরােজ
(৮)
প্রবৃত্তিরে বাঁধিয়া শৃঙ্খলে
ছেড়ে দাও প্রমুক্ত আত্মারে ;
কামনারে দৃঢ়বদ্ধ করে
হও মগ্ন রস-পারাবারে।
প্রেমাম্বতে সিঞ্চি দেহ মন,
সুন্দরের কর আরাধনা ;
মঙ্গলেরে করিয়া স্মরণ
আনন্দের করহ সাধনা।
পুণ্যসূত্রে বাঁধি কথাগুলি
উচ্চ কণ্ঠে কর তবে গান ;
রুদ্ধ করি হিংসার দুয়ার
উর্দ্ধে তােল মুক্তির নিশান।

নওরােজ
(৯)
তুমি
আমি
তুমি
আমি
তুমি
আমি
তুমি
আমি
দিয়েছিলে হাসি,
বাজাইমু বাঁশী ;
কোরেছিলে মান,
গেয়েছিনু গান ;
এনেছিলে গন্ধ,
গেঁথেছিনু ছন্দ ;
সাজাইলে ডালা,
পরাই মালা।
১২

নওরোজ
(১০)
পথমাঝে চেনা শোেনা,
পথমাঝে ভালবাসা,
পথেতেই প্রাণ বিনিময় ;
কত সুখ কত আশা
পমাঝে জাগি পুন
পথেতেই হােয়ে যায় লয়

নওরােজ
(১১)
শত ঝক্ষা মাঝে
নেমে আসে শান্তি কোথা হােতে,
ভুলে যাই সব যেন মুহূর্তের তরে,
ভুলে যাই ভাবনা বেদনা ;
মনে হয় আসিয়াছি স্বাধীন স্ববশ,
প্রকৃতির কোনও এক রম্য নিকেতনে,
শ্যামল শীতল শান্ত বনচ্ছায়া ঘেরা
ফুল্ল ফুল মধু হাসে,
অদূরে রজত রেখা ক্ষীণ স্রোতস্বিনী,
ত ত ব’য়ে যায় ;
লতাকুঞ্জ সাজান বিবিধ ছাদে
তারি এক কুঞ্জ মাঝে
মনে হয় আছি চেয়ে
একখানি প্রিয় মুখপানে উজল সুন্দর,
শরত চঁাদের মত পূর্ণ নিরমল ;
;

নওরােজ
=
নয়নেতে প্রেম আছে আঁকা,
উথলিয়া ওঠে বুক,
মেলি দুই বাহু চাই ধরিবারে,
প্রস্ফুট জোছনা খানি।
-সহসা ফুরায় স্বপ্ন,
মিলাইয়া মরীচিকা
শুকায় শ্মশান সম দগ্ধ মরু মাঝে।
সহস্র বৃশ্চিক আসি এক সাথে করি আক্রমণ
বহায় শশাণিত ধারা,
ফিরে আসে নিষ্পেষিত দারুণ জীবন।

নওরােজ
(১২)
একদা তােমার আঁখি দুটি ভরি
জেগেছিল কি যে ভাষা,
শরম জড়িত ব্যাকুল আবেগে
কোয়েছিল ভালবাসা।
সে মধু চাহনি তড়িত কঁপনি,
মিলায়ে গিয়াছে স্বপনেরি মত,
মিশে গেছে সুখ আশা।
ঝরা ফুল রাশি কুড়ায়ে কুড়ায়ে,
ভরিনু আমার সাজি,
তাই দিয়ে গাঁথা মালাটি তােমারে
পরাতে এনেছি আজি ।
মলয়া বহিয়া গিয়াছে চলিয়া,
পরশ মধুর পুলক স্মৃতিটি
শুধু আজ নিয়ে আসা।
১

নওরােজ
(১৩)
বিংশতি বৎসর পরে যেত বা মুছিয়া
তােমার সুষমারাশি হৃদি পট হাে’তে ;
ধন্য এ কবিত্ব, বাঁধি যার ছন্দোমাঝে,
রাখিনু তােমারে আজো ফুল্ল পুষ্পদামে।
হারায়েছে রূপ তব হারালে যৌবন,
স্মৃতি তারাে আজ হায় ভােলা ভােলা প্রায় ;
আমার ভারতী মাঝে আছ তবু তুমি
অধিষ্ঠিতা গরবিনী সম্রাজ্ঞীর রূপে,
অনন্ত মাধুরীময়ী অনন্তযৌবনা।
অর্ধ শতাব্দীর পরে হেরি এই লেখা,
ডাকিবে উচ্ছ্বাস বাণ সে শুষ্ক হৃদয়ে ;
অর্ধ শতাব্দীর পরে ? কে জানে তখন
কোথায় রহিবে তুমি কোথায় বা আমি,
কোন্ সাগরের জলে যাইবে ভাসিয়া
জীর্ণ ছিন্ন শুষ্ক এই কবিতার মালা।
=১৪

বেলাশেষে।

No text on this page.

(১)
টলটল শিশিরের মত
পূরেছিল তােমার যৌবন,
বিশ্বের সুষমা লুটি
প্রতি অঙ্গ ফুটে উঠি
বিবশ করিয়া দিল মন।
সুষমা গিয়াছে ঝরি,
দেহ শুধু তােল পড়ি,
আলসে এলায়ে এবে হায় ;
ভরা শুধু অবসাদ,
জীবনে নাহিক সাধ,
শ্লথ তনু'বহিছ হেলায় ।
বিসর্পিত বেণী নাই,
দোলে না সে তালে তালে
কালাে ছায়া দিল দেখা
আঙরের মত গালে।

নওরােজ
(২)
দিন চলে যায়-
উন্মত্ত এ অগ্নিশিখা চাপি বক্ষে হায় ;
সুন্দরের অভিলাষী হৃদয়ের তৃষা
মিটিল না এ জীবনে, হারাইয়া দিশা
ফিরি শুধু দিকে দিকে শ্রান্ত ক্লান্ত দেহ,
ক্ষুধা মিটাইবে হেন নাহি হায় কেহ।
স্বপনে যে শােভা হেরি মুগ্ধ আঁখিদ্বয়,
স্বপন ফুরায়ে গেলে মিথ্যা সবই হয়।
জাগ্রতে স্বপনে যদি এত ব্যবধান,
জাগরণ নাহি চাহি, চির স্বপ্নখান
দাও টানি আঁখি পরে, জ্ঞানের শলাকা
আর সেথা পশিবে না তীব্র দীপ্তিমাখা ।
শীতল মরণ আসি ঘুম পাড়াইয়া,
চিরতরে দিক সব ব্যথা মুছাইয়া।
যে আলােকে আলােকিয়া একদিন আমি
হেরেছিনু মন্ত্রমুগ্ধ ওগাে অন্তর্যামী
১৮

নওরােজ
'তব বিশ্ব-পরিবার, ছিল নাকো যথা
কোন দুঃখ কোন দৈন্য কোন মলিনতা—
সে আলােক নিভে গেল একটি ফুৎকারে,
প্রপীড়িয়া শান্তিপ্রীতি অন্তহীন ভারে।
হারায়ে তাহারে হায় জীবনের মাঝে,
আঁধার ঘিরিয়া আসে সর্ব চেষ্টা কাজে
(৩)
কল্লোল ফুরায়ে গেল, কালের কবলে
যৌবন জোয়ার তব হারাইল ধারা।
একদা সহসা আসি যেই বারিরাশি
জাগাইল রূপরসে যৌবন তােমার
অতর্কিত কৈশাের সন্ধ্যায় ; মজাইয়া
দুইকূল উদ্দাম প্লাবনে, কঁপাইয়া
নাচাইয়া মাইয়া হিয়াখানি মাের ;
জীবন মধ্যাহ্ন-ক্ষণে যেই স্রোতেধারা
নিথর পাথার প্রায় দাঁড়াল নীরবে,
আজি হয় শুকাইল তাহা ; ক্ষীণকায়া
স্রোতস্বিনী বহে কিনা বহে, বালুরাশি,
সিকতায় ধূ-ধূ-ধূধু করে, নিরাশার
স্বপ্ন যেন পড়ি আছে মরু-বক্ষ মাঝে।
-১৯-

নওরােজ
তীরেতে দাঁড়াইয়া আছি আমি বৃদ্ধ বট,
শুষ্ক মূল রুক্ষ জটা শীর্ণ শাখারাশি,
চির মৌন মুনি সম চির পুরাতন।
কোথা রস কোথা স্নেহ কোথা সুধা হায়,
কোথায় তৃষ্ণার বারি মৃত সঞ্জীবন!
(৪)
আকাশ পানে চাহিয়া রই,
চিনি না মাের কোন্ তারাটি ।
আমার যে ফুল ঝল ধরায়,
হােথায় গিয়ে ফুটল না কি।
যে তারাটি বেশী উজল,
সে বুঝি মাের নাই বা হবে ;
যে তারাটি হাসি হাসি,
আমার তারে কেবা কবে।
আমার তারা মলিন মুখে,
করছে কোথায় মিটি মিটি ;
আর তারারা ভিড় করে তায়
ঘিরেই থাকে নিতি নিতি।

নওরােজ
আমি তাহায় চিনি নাকো,
সে আমারে চিছে ঠিক ;
আমার পানে তাহার আঁখি
চেয়েই আছে নির্নিমিখ।
ঘাের নিশীথে আমার আঁসু
বহে যখন বাঁধন হারা,
তার নয়নে আলাের ফোটা
টপকে যেন কঁাদন পারা।
তাহার তরে রচি যবে
কণ্ঠভরা বেদন সুর,
অসহ সেই রােদন-ঘাতে
নেমেই আসে খানিক দূর।
ভুলটি তখন পড়ি মনে,
যায় সে ফিরে আকাশ পথে ;
আমায় ডাকি তাহার পাশে
খবর পাঠায় আলাের রথে ।
৭

নওরােজ
(৫)
এত ভালবাসা কোথা হােতে আসে ভেবে কিছু নাহি পাই,
চোখে এত জল কেবা দিল বল সাগর সেথা ত নাই।
এত যে দরদ ছিল মাের বুকে তাহার মুখের লাগি,
কি ফল লভিনু নাম ধরি ডাকি এত নিশি নিশি জাগি,
হাড়গুলি তার খাক হােয়ে গেল আঁধার গােরের মাঝে,
এ ছার আঁসু যে তবু না শুকাল কেন এত ব্যথা বাজে?
স্বরগ হইতে আসিল কি প্রেম তুরিবে আমারে ব'লে,
নরক অনল নিয়ে ফেলিবে আঁখি মাের গলে গলে ?
বিচারের দিনে হিসাব নিকাশ পুছিবেন যবে স্বামী,
শুধু দুটি কথা কব নত মুখে, ‘ভালবাসিয়াছি আমি।'
=১০২=

নওরােজ
(৬)
সে যে ছিল মাের কুসুম লতিকা,
বিজলি জ্বলিত অঙ্গে তার।
রূপের লহরী খেলিয়া সতত
গতিতে মিশাত সুষমা সার।
অণুতে অণুতে ফুটিত লাবণী,
দুলিত আকুল কেশের ভার।
কোমল আঁখিতে মদিরা মাখান
জাগাত পিয়াসা বুকের হার।
ছলিয়া ক্ষণিকে পলাত ক্ষণিকে,
সে বিনা জীবন ছিল অসার।
চ'লে গেছে সেই আমি রনু প'ড়ে,
ঘেরে চারি দিকে শুধু আঁধার ।
১০

নওরােজ
(৭)
ফিরে এস, ফিরে এস! গৃহে মাের সারারাত জ্বলিতেছে আলাে,
তারই মত সারারাত অপলক আঁখি দুটি জাগে আর জ্বলে ;
সারারাত তারই মত ঝুরি ঝুরি হই আমি মসী মাখা কালাে,
প্রভাত আসিয়া কহে ফিরিবে না কভু আর যে গিয়াছে চলে ;
ডাকি আমি বার বার ফিরে এস, ফিরে এস বলে।
••
তারই মত ক্রমে ক্ষীণ হই ওগাে সীমাহীন দুখ ও ব্যথায়,
তারই মত জ্বলে জ্বলে সারা হই, ক্রমাগত সারা হই জ্বলে
তারই মত জ্বালাইয়া আনন্দের যত তেল ছিল এ ধরায়,
জ্বালাইয়া রাখি বাতি পথে তব এস বঁধু, এস বঁধু চলে ;
ডাকি আমি বার বার ফিরে এস, ফিরে এস বলে।
আকাশেতে পূবে হাওয়া ডাকে যবে তারই মত তারই মত আমি
চমকি কাপিয়া উঠি, এ পরাণ তারই মত ভয়ে ভয়ে দোলে ;
আশার পতঙ্গ সব উড়াইয়া ডানাগুলি আসে হায় নামি,
আঁধার রাতিতে উড়ি পড়ে মরে, পুড়ে মরে সে অনলে জ্বলে
যে আলাে জ্বালায়ে রাখি পথে তবএস বঁধু, এস বঁধু চলে ;
বার বার ডাকি আমি ফিরে এস, ফিরে এস বলে।
.
১০৪

নওরােজ
তারই মত যে আগুনে গলে গলে ক্রমে আমি সারা হােয়ে যাই
পােড়ায়ে আমারে করে আলােকের শিখাসম, দেহ যবে গলে
আত্মা মাের হয় যেন শুদ্ধ পূত আলােকের শিখাসম, তাই,
বর্ধমান সে আলােকে দেখি আমি যেন কোন্ দূর দূরাঞ্চলে,
তারকার মত যেন প্রেম মাের ছাড়ি মােরে জ্বলিছে সদাই,
জ্বালাইয়া রাখি বাতি আঁধার সাগর পথে এস বঁধু চলে ;
ডাকি আমি বার বার ফিরে এস, ফিরে এস বলে।
ফিরে এস, ফিরে এস। সারারাত দেখি তারে কেবলই যে জ্বলে,
সারারাত মােনাজাত করে যেন উঠাইয়া দুইখানি হাত;
মােনাজাত করে যেন ফিরে আসে বঁধু মাের সব বাধা দলে।
দিন এসে তারকারে কারামাঝে বন্ধ যেন করে অকস্মাৎ,
আলােক নিষ্প্রভ হয় তবু সে যে সারাদিন ধিকি ধিকি জ্বলে,
সারাদিন আশা রাখি বুকে তার ফিরে তুমি আসিবেই বলে।
দিবসের তাপে সে যে ক্ষীণ হােতে ক্ষীণতর হয় প্রতিভাত,
অটুট ধৈর্যের সাথে শিখা তার তবু যে গাে মৃদু মৃদু জ্বলে ;
ডাকি বঁধু বার বার ফিরে এস, ফিরে এস বলে
ফিরে এস, ফিরে এস। কি জানি কি ঘটে প্রিয় হয়ত বা তুমি
চাবে যবে ছুইবারে, এ প্রদীপ একেবারে নিভে যাবে জ্বলে ;
১০৫

নওয়ােজ • দূর হতে চেয়ে চেয়ে দেখ যবে গবাক্ষেতে শিখা তার ঝলে, হয় ত বা গৃহমাঝে আসি যবে চা'বে তুমি নিতে তারে চুমি, দেখিবে যে নিভে গেছে আঁখি দুটি, বক্ষে মােরে ধরিয়াছে ভূমি ; নাহি কেহ ম্লানমুখে তােমারে যে ডেকে নেবে এস এস বলে । একটুকু ছায়া শুধু, বাতাসেতে দুলি দুলি একটুকু ধূমই, আছে শুধু তােমা তরে, শিখাহীন ভস্ম শুধু ; যন্ত্ৰীহীন কলে, উত্তাপ বুঝি বা আছে—আগুন নিভিয়া গেছে ধিকি ধিকি জ্বলে। জ্বলিল সে ধিকি ধিকি প্রিয় তুমি আসিলে না, আসিলে না ব'লে, আলােকের শেষ কণা দিল সে যে তুমি প্রিয় আসিলে না বলে, শেষ কণা আলাে তার তােমারই যে পথ চাহি ধিকি ধিকি জ্বলে, ডাকি বঁধু বার বার ফিরে এস, ফিরে এস বলে। * * অনুবাদ : Dobellএর Return. =১০৬

নওরােজ
(৮)
‘আজো তুমি তেম্নি আছ’, কোয়েছিলে মধুর ভাষে,
খােশ নসিবের জোরে আবার পেলাম যখন তােমায় পাশে।
‘কোরবান তােমার পায়ের তলায় আজো আছি তেম্নি আমি,
আর কিছু যে নাই তেমনই বিষের জ্বালায় দিবস যামী ;-
শুনে কথা মুচকে হাসি আপন হাতে সাজিয়া পান,
দিলে আমার নজরানা চুমে নিলাম স্নেহেরি দান।
কোলাম আমি, কেমন থাকি তা তুমি কি নাহি জানাে ?
মজনু কেমন লায়লী জানে একথা কি নাহি মানাে ?
আঁধার মেঘে ছাইল বদন, আমার বুকের সুরাখ হায়
মিলনের এই মধুর ক্ষণে করল বুঝি ঘায়েল তায়।
দোহার চোখে আঁসুর ধারা ক'রল শীতল বিষের বিষ,
মুখে মুখে চেয়ে চেয়ে কথা কওয়া অহর্নিশ।
মনের কোণে কার কি আশা কার কি ব্যথা লুকিয়ে রয়,
জাহির হােল একে একে কিছু যে আর গােপন নয়।
জমানার কি ফেরেব-বাজি এমনই সে ঘাের জাহেল,
এত করেও মন পেলাম না হােল সে যে ফের কাতেল।
এ জুদায়ীর দাওয়া যে নাই জমানা হায় বেদেরগ
হানুল আবার মােদের শিরে জহর ভরা কহরী তেগ ।
১০৭

নওরােজ
(৯)
সুনসান বাড়ী খা খা করে ইট পাথরের রাশে,
-হঠাৎ যদি আসে !
একলা.বসি চলছি লিখি গাঁথি ফুলের মালা,
তাজা কুসুম কোথায় পাব ? সাজাই আমার ডাল।
বিশ বছরের বাসি ফুলে, এমন সময় পাশে
হঠাৎ যদি আসে!
কহিবে সে মুচকি হেসে মিশায়ে আঁসুর ফেঁটা,
‘বিদ্যে জাহির ক'রেছ খুব ; একটি খাতা গােটা
ভ’রেছ যে আমার কথায়, কাজ নাইকো কিছু ?
‘একটা নহে আরও আছে, মাথা করি নীচু
কইব তারে। শুনি তখন আমার মুখের কথা
টেনে নিয়ে বুকে তাহার, ‘বড়ই দেখি ব্যথা
বাজিয়াছে তােমার বুকে!
কইবে কোমল ভাষে,
হঠাৎ যদি আসে !
লেখার বােঝ দূরে
ঠেলে কলমটি
লুকিয়ে মুখ তাহার বুকে যাব বুঝি ম'রে ।
পথের পানে চেয়ে চেয়ে থাকি ত সেই আশে,
হঠাৎ যদি আসে!
দূর করে,
=১০

(১০)
‘হাতটি ধ'রে তুলতে হবে’, কয়েছিলে আমায় হেসে,
ভিড়ল যবে আমার তরী তােমার নদীর তীরে এসে।
আজো আমার হাতে আছে তােমার হাতের কোমল ছোঁয়া,
মরুর মাঝে কুসুম ফোটে সাথে ওঠে ব্যথার ধোঁয়া,
প্রিয় গাে মাের ! শুকায় নদী কোথায় তরী বাইব হায়,
বালুই কেবল চতুর্দিকে জলের রেখা নাইকো তায়।
জানি ওগাে এই নদীতে আসবে নাকো বন্যা আর,
ভাঙছে তরী বালুর চরে মিছেই শুধু হাহাকার।
চছে যে লু হু-হু-হু-হু আগুন ঢালি আগে পাছে,
জানিনা আর কতই দহন সহ্য করার কত আছে।

নওরােজ
(১১)
চঞ্চল এই বায়ু-কম্পন,
চঞ্চল যত বন উপবন,
তার মাঝে আজ ভেসে আসে মনে
চঞ্চল কার মুখ ছবি খানি।
বজ্ৰ বিষাণ বিদ্যুত হস,
অন্ধ তিমির ঘাের ঘন রাশ,
তার মাঝে আজ শুনি যেন কানে
গুন্ গুন্ কার কণ্ঠের বাণী।
ঝর ঝ ঝরে বরিষার জল,
দুর্গম পথ ভাসে ধরাতল,
তার মাঝে আজ ছুটি কার পানে,
দূর কত পথ সেও নাহি জানি।
১১০

নওরােজ
(১২)
ওগাে পথ, কতদূর নিয়ে যাবে টেনে
ভুলায়ে আমারে আর মিছে ছলনায় ?
নাহি ঘর, নাহি ছায়া, নাহি সাথী কেহ,
ঘনাইয়া আসিতেছে নিশার আঁধার,
ক্ষান্ত কর এবে তব আশার কুহক।
জানি আমি ফিরে কভু পাব না তাহারে,
তবু খুঁজি লুব্ধ চিতে মুগ্ধ মত্ততায়
অনন্ত অনন্ত কাল। যাই ফিরে ঘরে,
সেই লােকালয়ে যেথা প্রতি রন্ধ্র মাঝে,
ক্ষণে ক্ষণে ঝঙ্কারিছে নূপুর শিঞ্জন।
জানি ওগাে ঋষি, তুমিও পেয়েছ দুখ—
বক্ষোমাঝে ধরি তার পদ কোকনদ
পরক্ষণে হারায়েছ। তাই শুষ্কমুখে
প্রস্তর কঙ্কর কঁাটা সহি পলে পলে,
দগ্ধ তপ্ত বালুকায় দেহ এলাইয়া
চলিয়াছ খুঁজি, ব্যর্থ ব্যর্থ দুরাশায়।
=১১১=

নওরােজ
বন্ধু, দেহ মােরে ছাড়ি বন্ধ অন্ধ গৃহে,
যাও তুমি ছুটি অনন্ত অসীম পানে
খোঁজ যদি কোনও দিন কেহ তার পাই
মিলিব আবার মােরা, প্রস্ফুট কুসুম
বিছায়ে আঁচিলে যেথা আছে স্মিত মুখে
আমাদের তরে মালা গাঁথিবার ছলে।
১১২

সম্ভাষণ কবিতার বর্ণনাগুলির সহিত মুসলমানের অতীত ইতিহাসের অতি নিবিড় সম্বন্ধ। এ সম্পর্কে নওয়ােজ লেখকের নিম্নের তিনখানি ইতিহাস পুস্তক উল্লেখযােগ্য। পাঠক পাঠিকাগণ সুযােগ ও সুবিধা অনুসারে ইহাদের যে কোনও একখানি দেখিতে পারেন। বলা বাহুল্য, ঘটনাগুলির সহিত পরিচিত হইলে কবিতাটি অধিকতর উপভােগ্য হইবে । ইসলামের ইতিহাস—ইহাতে আছে হজরত মহম্মদের সময় হইতে আরম্ভ করিয়া বর্তমান কাল পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম জাহানের ইতিহাসের চমকপ্রদ কাহিনী এবং বিভিন্ন দেশের কীর্তিকলাপ ও জ্ঞানবিজ্ঞান সাধনার আলােচনা। পুস্তকখানি বঙ্গসাহিত্যের একখানি অমূল্য সম্পদ। মূল্য আড়াই টাকা। ইসলামের ইতিকথা—এই পুস্তক ইস্লামের ইতিহাসে সহজ ও সুলভ সংস্করণ। আকারে ইলামের ইতিহাস অপেক্ষা ছােট হইলেও ইহাতে প্রয়ােজনীয় কোন ঘটনা বাদ দেওয়া হয় নাই। মূল্য পাঁচ সিকা। ইস্লাম কাহিনী—এই পুস্তক ইসলামের ইতিহাসের আরও সরল ও সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ; ছােট বড় সকলের উপযােগী। মূল্য আট আনা।

দেখিয়াছেন কি? সদ্য প্রকাশিত পুস্তক ঃ- মৌলবী আবুল হাশেম প্রণীত কখিকা-ঐতিহাসিক ও সামাজিক জীবনের কতকগুলি চিত্তহারী ঘটনা লইয়া বিরচিত কবিতামালা। রবীন্দ্রনাথের কথা ও কাহিনী হিন্দুদের নিকট যেরূপ উপভােগ্য হইয়াছে, প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে কথিকাও সেইরূপ উপভােগ্য। কবি কায়কোবাদ লিখিয়াছেন, “কথিকা.কাব্যের কবিতাগুলি পাঠ করিলে হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার হয়। কবি যে রসটুকু আমাদিগকে উপভােগ করিতে দিয়াছেন তাহা তাহার পক্ষে গৌরবের বিষয় সন্দেহ নাই।” টাকা প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ প্রণীত লক্ষ্মীছাড়া—বাংলার চাষীজীবন ও পল্লীজীবনের কয়েকটি গল্প । ইহাতে পাইবেন বাংলার চাষীদের মৰ্ম্মের কথা, জমিদার মহাজনের সহিত চাষীদের সম্বন্ধের করুণ চিত্র, বাংলার চাষী বাংলা ছাড়িয়া কেন আসামের জঙ্গলে যায় তাহার উত্তর, বহুবিধ সামাজিক গলদের পরিচয় ও তাহার প্রতিকারের উপায়, এবং অন্নসমস্যার সমাধান ও অর্থনৈতিক আত্ম-প্রতিষ্ঠার পন্থা নির্দেশ। ওস্তাদ শিল্পীর নিপুণ তুলিকায় সবগুলি চিত্ৰই জীবন্ত হইয়া উঠিয়াছে। —এক টাকা। আরও কয়েকখানি ভাল বইঃ- প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ প্রণীত হীরক হার—আরবী ফারসী প্রভৃতি গ্রন্থ হইতে সংগৃহীত গল্পের বই। বাঙ্গালী মুসলমানের জন্য হীরক হার বেহেশতের সওগাত। বাংলায় হীরক- হারের তুলনা নাই। আট আনা। শেখ হবিবর রহমান সাহিত্যরত্ন প্রণীত ছােটদের গল্প—ছোট ছােট ছেলে-মেয়েদের উপযােগী প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা উপদেশের গল্প ও হাসির গল্পের একত্র সমাবেশ। -ছয় আনা। মৌলবী আব্দুল কাদের বিএ, বি-সি-এস প্রণীত হায়দার আলি-দশ আনা। টিপু সােলতান—দশ আনা। ছােটদের সালাহুদ্দীন-দশ আনা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nowroj

Author
Hossen,akram
Title
Nowroj
File name
Nowroj
Text
OCR done
Citation
1938
Published
2010/01/12
Publisher
Kaji Akam Uddin,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Hossen,Akram
DLI number
511239
Barcode
4990010018406.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
9q0WT1hKY2n
Download PDF

Nowroj