Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Paradhiner Mukti Ed. 2nd

Ganguly, Nishikanta · 2010/02/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শঙ্করমঠ গ্রন্থাবলী
পল্লবীনের মুক্তি
শ্রীনিশিকান্ত গাঙ্গুলী
( পবিবর্ধিত ২য স ণ )
সৰস্বতী লাইব্রেবী
৯ বমনাথ মজুমদালেব স্ট্রীট
কলিকাতা।
মৃল্য ১ টাকা

প্রকাশক
শাঅরুণচন্দ্র গুহ
শঙ্করমঠ, বরিশাল।
৫-৩৫-~~১ ০ ০ ০
প্রিন্টার--মহেন্দ্রনাথ দত্ত
শ্রীসরস্বতী প্রেস
১ নং রমানাথ মজুমদার ষ্ট্রীট, কলিকাতা

নিবেদন
অন্যান্য পরাধীন দেশের মুক্তির প্রচেষ্টা আলোচনা
করিলে বুঝিতে পারা যাইবে পরাধীন ভারতকে মুক্ত
করিতে দেশবাসীকে কতখানি অত্যাচার ও উৎপীড়ন
মাথা পাতিয়া লইতে হইবে, কতখানি ধৈৰ্য্য ধারণ
করিয়া অবিচলিত ভাবে অগ্রসর হইতে হইবে; এই
উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হইয়া কয়েকটী পরাধীন জাতির
মুক্তি-কাহিনী এই ক্ষুদ্র পুস্তকে লিপিবদ্ধ করা হইল।
শ্ৰীশঙ্করমঠ,
বরিশাল।
নিশিকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

সূচিপত্র
বিষয়
পৃষ্ঠা
কোরিয়া
হাঙ্গারী
৬৩-১০৮
কিউবাদ্বীপ
বেজিয়
ভারতে মুক্তির অভিযান
১৩৬—১৪৭
১৪৮-১৫৭

পল্লবীনের মুক্তি
কোরিয়া
পরিচয়
প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে কোরিয়া অবস্থিত।
পুরাকাল হইতে ব্যবসায় বাণিজ্যের সর্ববিধ সুবিধা
বিদ্যমান থাকায় কোরিয়া বেশ সমৃদ্ধিসম্পন্ন হইয়া
উঠিল এবং সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী স্বাধীন জাতিসমূহের
সলােভ দৃষ্টি কোরিয়ার উপর পতিত হইল। চীন সম্রাট
অনেক দিন হইতে কোরিয়া-সাম্রাজ্যের রক্ষক বলিয়া
আপনাকে মনে করিতেন এবং কোরিয়ার সৌভাগ্য
লক্ষ্মীর কৃপাও বেশ লাভ করিয়া আসিতেছিলেন।

২
।
খুঃ
পরাধীনের মুক্তি।
প্রশান্ত মহাসাগরের বক্ষস্থিত জাপান-সাম্রাজ্য দিন
দিন বিধাতার কৃপায় সৌভাগ্য সােপানে আরােহণ
করিতেছিল। স্বীয় উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে
সঙ্গে পার্শ্ববর্তী
অপেক্ষাকৃত দুৰ্বল দেশের ধনৈশ্বৰ্য্য দেখিয়া লুব্ধ হইয়া
উঠিল এবং কোরিয়ার রাজলক্ষ্মীকে আপন অঙ্কশায়ী
করিতে ব্যাকুল হইল।
জাপান কোরিয়ায় অবাধগতিতে ব্যবসায় বাণিজ্য
চালাইতে লাগিল।
১৮৫২
জাপান-সরকার
কূটনীতিজ্ঞ হিডেযােশীকে ( Hidejoshi ) কোরিয়ায়
প্রেরণ করেন। হিডেযােশী নানা প্রকারে জাপানী
প্রতিপত্তি কোরিয়াতে বিস্তার করিতে চেষ্টিত হইলেন।
জাপানের উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিয়া কোরিয়াবাসী চীনের
শরণাপন্ন হইল, ফলে কোরিয়া হইতে জাপানিগণ
বিতাড়িত হইল এবং ভবিষ্যতে তাহাদের কোরিয়া
প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা হইল।
এইরূপে কতিপয় বৎসর অতীত হইবার পর বণিক
স্বভাব জাপান কোরিয়ায় পণ্য প্রেরণ ও তথায় ব্যবসায়
করিবার জন্য পুনঃ লালায়িত হইল এবং ১৮৭৬ খৃঃ
কয়েকজন জাপানী বণিক কোরিয়ায় প্রবেশ করিতে
চেষ্টা করিতে, কয়েকজন কোরিয়ান তাহাদিগকে হত্যা

কোরিয়া করিয়া ফেলিল। জাপান কোরিয়ার বিরুদ্ধে সমর অভিযান করিবার উদ্যোগ করিল। কোরিয়া-সম্রাট ভীত হইয়া সন্ধি প্রার্থনা করিলেন। এই সন্ধিসূত্রে কোরিয়া-সম্রাট জাপানকে একটী বন্দরে অবাধে ব্যবসায় করিবার অধিকার প্রদান করিলেন। কূটনীতিজ্ঞ জাপানও কোরিয়া-সম্রাটকে পূর্ণ স্বাধীন বলিয়া ঘােষণা করিল। চীন-সম্রাটের প্রভাব হইতে কোরিয়াকে মুক্ত করিবার জন্যই এই ঘােষণার অবতারণা। চীন-সম্রাট এই ঘােষণা আদৌ গ্রাহ্য করিলেন না। কোরিয়ায় জাপানের বাণিজ্য প্রসার দেখিয়া ইংলিশ ও মার্কিন জাতি কোরিয়া রাজ্যে বাণিজ্যকেন্দ্র খুলিবার জন্য ব্যস্ত হইল। যুক্তরাজ্যের সহিত কোরিয়া-সম্রাট ১৮৮২ খৃঃ সন্ধি করিলেন; এই সন্ধিসূত্রে আমেরিকা- বাসীরা কোরিয়ায় বাণিজ্যাধিকার পাইল, প্রতিদানে যুক্তরাজ্য এই প্রতিশ্রুতি দিল যে, বিদেশী কোন জাতি কোরিয়ায় কোন প্রকার অন্যায় অত্যাচার করিলে, যুক্ত- রাজ্য তৎপ্রতিরােধে কোরিয়া-সম্রাটের বিশেষ সহায়তা করিবে। কোরিয়া সাম্রাজ্যে বাণিজ্যাধিকার প্রদান করিয়া ১৮৮৩ খৃঃ ইংলণ্ডের সহিত কোরিয়া এক সন্ধি- সূত্রে আবদ্ধ হইল। ;

৪ পরাধীনের মুক্তি। বিদেশিগণকে অবাধে বাণিজ্যাধিকার প্রদান করায়, কোরিয়ার জনসাধারণ ক্ষুব্ধ হইল। তাহারা বুঝিল, এই বিদেশিগণ কোরিয়ার ভবিষ্যৎ দুঃখময় করিয়া তুলিবে। ১৮৮১ খৃঃ কোরিয়ায় দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হইলে, কোরিয়ার জনসাধারণ মনে করিল- সম্রাটের আচরণে দেবতা অপ্রসন্ন হইয়াছেন, তাই এই দুর্ভিক্ষ প্রেরিত হইয়াছে। কোরিয়াবাসী উত্তেজিত হইল এবং জাপানী অধিবাসিগণকে আক্রমণ করিল ; ফলে কয়েকজন জাপানী নিহত হইল এবং জাপান প্রতিনিধি অতিকষ্টে পলায়ন করিয়া প্রাণ বাঁচাইলেন। জাপান যুদ্ধ ঘােষণা করিতে উদ্যত হইল। কোরিয়া-সম্রাট ভীত হইয়া ক্ষতিপূরণ স্বরূপ বহু সহস্র মুদ্রা জাপান-সম্রাটকে প্রদান করিলেন এবং ব্যবসায়ের সুবিধাও অনেক করিয়া দিলেন। কোরিয়ার দুর্বলতার সুযােগ লইতে চীন-সরকারও পশ্চাৎপদ হইল না এবং কোরিয়ার রাজধানী সিউল্ ( Seoul ) নগরে দশ সহস্র সৈন্য প্রেরণ করিয়া বিদেশীর বিরুদ্ধে কোরিয়াগণকে উত্তজিত করিবার নেতাদিগকে নির্বাসিত করিল। ;

কোরিয়া আভ্যন্তরীণ অবস্থা বহুকাল হইতে কোরিয়ার আভ্যন্তরীণ বিবাদ বিসংবাদ এবং নানা দলের বিদ্রোহ কোরিয়ার জীবনী- শক্তি ক্ষয় করিয়া আসিতেছিল। কোরিয়ায় বিবাদমান নানা দল থাকিলেও প্রধান ছিল দুইটী—একটী রক্ষণ- শীল, অপরটী পরিবর্তনশীল। রক্ষণশীল দলে ছিল শাসক এবং অভিজাত-সম্প্রদায় ( Yangbans)। এই অভিজাত সম্প্রদায়ই কোরিয়ার সর্বনাশের মূল ছিল ; তাহারা সর্বপ্রকারে কৰ্ম্ম-বিমুখ ছিল, তাহাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সাধারণ কোরিয়াবাসীর উপর বহুকাল যাবৎ উৎপীড়ন চলিয়া আসিতেছিল, ইহাদের ভৃত্যগণ পর্যন্ত সাধারণকে গালাগালি করিত এবং প্রভুদের আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি, মূল্য না দিয়াই লইয়া আসিত এবং এজন্য তাহাদিগকে কেহই কিছু বলিতে পারিত না। কোরিয়ার শাসক সম্প্রদায়ও নিজেদের স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা প্রণােদিত হইয়াই তাহাদের কর্তব্য সমাধান করিত। কি প্রকারে জনসাধারণের ধনদৌলত আত্মসাৎ করিবে, তাহাদের শাসনের ইহাই ছিল মূল নীতি। প্রজাদের কোন প্রকার অত্যাচার বা অবিচারের বিষয় সম্রাটের নিকট যাহাতে পৌঁছিতে না পারে, সে জন্য পরাধীনের মুক্তি। ইহারা সর্বপ্রকার পন্থা অবলম্বন করিত। সম্রাট যাহাতে । ইহার কিছুই দেখিতে বা শুনিতে না পান, তাহার ব্যবস্থা ইহারা করিত। কোরিয়ার সর্বপ্রকার উন্নতির ইহারাই ছিল প্রধানতম অন্তরায়। ইহাদের অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারিতা বাধা পাইবার কোন বালাই ছিল না এবং পাছে নিজেদের ক্ষমতা খর্ব হয়, এই আশঙ্কায় সকল সংস্কারেই ইহারা বাধা জন্মাইত। অপর দিকে পরিবর্তন-প্ৰয়াসীদল কোরিয়ার সংস্কারের পক্ষপাতী ছিল। শাসক সম্প্রদায়ের দুর্নীতির অবসান করিয়া, দেশের উন্নতি সাধনে সদাই যত্নশীল ছিল এবং রক্ষণশীল শাসক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আবশ্যক বােধ করিলেই ইহারা জাপানের সাহায্য গ্রহণ করিত। অপর দিকে রক্ষণশীল সম্প্রদায় ইহাদের বিরুদ্ধে চীনের সাহায্য লইত। কোরিয়ার আভ্যন্তরীণ এই অবস্থা দেখিয়া মনে হয়—যতদিন পর্যন্ত কোরিয়া আপনার শাসন প্রণালীর সংস্কার করিয়া সাধারণের সুখ- স্বাচ্ছন্দের প্রতি মনােযােগী না হয় এবং যতদিনে কোরিয়ায় অন্তর-বিদ্রোহ নিবারিত না হয়, ততদিন পৰ্যন্ত কোরিয়ায় চীন, রুষ বা জাপানের আধিপত্য ও প্রাধান্য বিদ্যমান থাকা অবশ্যম্ভাবী।

কোরিয়া
৭
•
স্বার্থ দ্বন্দে জাপান ও চীন
এদিকে জাপান কোরিয়াকে গ্রাস করিবার জন্য
উঠিয়া পড়িয়া লাগিল ; কোরিয়া হইতে চীনের
ক্ষমতা তিরােহিত করিতে না পারিলে, স্বীয় অভিলাষ
চরিতার্থ করিতে সক্ষম হইবে না, জাপান ইহা বেশ
বুঝিল ; সুতরাং কোরিয়া হইতে চীনের ক্ষমতা
অপসারিত করিবার জন্য সে নানা প্রকার ষড়যন্ত্র করিতে
লাগিল। কোরিয়া-সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদল সৃষ্টি
করিতে পারিলে, এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে, এরূপ মনে করিয়া
জাপান লােকচক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া, সম্রাটের বিরুদ্ধে
উখিত হইবার জন্য কোরিয়ান যুবকবৃন্দকে উৎসাহিত ও
উত্তেজিত করিতে লাগিল। এমন কি, কোরিয়ার
অনেক যুবককে জাপানে রাখিয়া সামরিক শিক্ষা দীক্ষায়
সুশিক্ষিত করিতে লাগিল; কিন্তু এ ষড়যন্ত্র প্রকাশ
হইয়া পড়িল। জাপানী প্রতিনিধি পুনঃ আক্রান্ত
হইলেন এবং প্রাণ রক্ষাৰ্থ পুনঃ তাহাকে পলায়ন করিতে
হইল। জাপানের জনসাধারণ যুদ্ধ ঘােষণা করিতে
চাহিল, কিন্তু জাপান স্পষ্টই বুঝিল, এই যুদ্ধ শুধু
কোরিয়ার সহিত নহে, এযুদ্ধ শেষে চীন-যুদ্ধে
পর্যবসিত হইবে। চীনের সহিত শক্তি পরীক্ষা
;

be
পরাধীনের মুক্তি
করিতে দেশ এখনও অনেক পিছনে, তাই জাপান
সম্রাট এই উত্তেজনার উপশম করিলেন এবং স্বীয় শক্তি
বৃদ্ধি করিতে সচেষ্ট থাকিয়া সুসময়ের জন্য দিন গণিতে
লাগিলেন।
কোরিয়া গ্রাসের অভিলাষ জাপানের প্রবল হইয়া
উঠিল এবং ১৮৮৪ খৃঃ জাপান আপনাকে সম্পূর্ণ
উপযুক্ত মনে করিল এবং সন্ধি সূত্রের ভাণ করিয়া
কোরিয়া আক্রমণে অগ্রসর হইল ।
ইতিমধ্যে চীনের সঙ্গে জাপানের এই মর্মে একটী
সন্ধি হইল যে, উভয় দেশের সৈন্যনিচয় কোরিয়া হইতে
উঠাইয়া লওয়া হইবে এবং উত্তরকালে একজন অপর
জনকে না জানাইয়া, কোরিয়া প্রদেশে সৈন্য প্রেরণ
করিতে পারিবে না। চীন জাপানের
অভিসন্ধি বুঝিতে পারিল না এবং কোরিয়া হইতে
আপন সৈন্য উঠাইয়া লইয়া সন্ধির মর্যাদা রক্ষা করিল।
জাপানও আপন সৈন্য কিছুকালের জন্য উঠাইয়া
লইল।
জাপান সুযােগ বুঝিয়া কোরিয়া-সম্রাটের বিরুদ্ধা-
চরণের জন্য পুনঃ একটী ‘দল সংগঠন করিল এবং
সম্রাটের বিরুদ্ধে উখিত হইবার জন্য উৎসাহিত করিতে

কোরিয়া লাগিল। এই বিদ্রোহের বিষয় জানিতে পারিয়া, চীন- সরকার জাপান সরকারকে জানাইল যে, কোরিয়া- সম্রাটের সাহায্যার্থ বিদ্রোহ দমন করিবার জন্য চীন সৈন্য পাঠাইবার প্রয়ােজন হইয়াছে। জাপান তৎক্ষণাৎ দশসহস্র সৈন্য কোরিয়া-রাজ- ধানী সিউল নগরে প্রেরণ করিল এবং সঙ্গে সঙ্গে জাপানী মন্ত্রী কোরিয়া-সম্রাটকে চীন-সম্রাটের আধিপত্য হইতে বিচ্ছিন্ন করিবার দাবী করিলেন। তিনি সম্রাটের নিকট আরও দাবী করিলেন যে, রেল চালাইবার ও কোরিয়া সাম্রাজ্যে স্বর্ণ খনির একচেটিয়া অধিকার জাপানকে প্রদান করিতে হইবে এবং তিন দিবস মধ্যে চীনা সৈন্য কোরিয়া সাম্রাজ্য হইতে অপসারিত করিবার জন্য চীন সরকারকে বাধ্য করিতে হইবে। ইহার ফলে চীনের সহিত জাপানের যুদ্ধ আরম্ভ হইল। জাপানী সৈন্য কোরিয়ার রাজধানী সিউল নগর অধিকার করিল । কোরিয়া-সম্রাট নিরুপায় হইয়া পড়ি- লেন। জাপান ইহা বুঝিতে পারিয়া কোরিয়া-সম্রাটকে এক সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করিতে বাধ্য করিল; ইহার ফলে সম্রাট কোরিয়াকে চীনের রক্ষণাবেক্ষণ হইতে সম্পূর্ণ পরাধীনের মুক্তি স্বাধীন বলিয়া ঘােষণা করিতে এবং চীনা সৈন্য কোরিয়া হইতে অপসারিত করিবার প্রস্তাব করিতে বাধ্য হইলেন। জাপান অন্যূন ৫০ জন জাপানীকে কোরিয়া সম্রাটের উপদেশাথ প্রেরণ করিল ; কোরিয়ার শাসন সংরক্ষণের ভার জাপানের হাতে গেল এবং চীন সৈন্য অপসারিত হইবার পর, জাপান কোরিয়ায় সর্ব- প্রকার একচেটিয়া বাণিজ্যের দাবী করিল। কোরিয়া-সম্রাট রাজ্ঞীর অনুরােধে জাপানী দাবী অগ্রাহ্য করিলেন, ফলে জাপানী চক্রে কোরিয়ায় পুনঃ বিদ্রোহী দলের সৃষ্টি হইল। বিদ্রোহীদল রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করিয়া, সম্রাকে স্বীয় প্রাসাদে বন্দী করিল এবং সম্রাজ্ঞীকে হত্যা করিল। জাপানীভাবাপন্ন এক- জন কোরিয়ানকে প্রধান মন্ত্রীর পদ প্রদান করা হয় ; এই প্রকারে কোরিয়ায় জাপানী প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্টিত হইল। কোরিয়া হইতে চীন প্রাধান্য বিদূরিত দেখিয়া, রুষিয়া জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী হইল। কোরিয়া-সম্রাট রাজ- প্রসাদ হইতে রুষ প্রতিনিধির নিকট পলায়ন করিলেন। দেশের শােচনীয় অবস্থা দর্শন করিয়া কোরিয়াবাসীর জাপানীবিদ্বেষ মূর্ত হইয়া উঠিল। রুষিয়াও কোরিয়ার

কোরিয়া
১১
বিপদে সমবেদনা-পরবশ হইল। এদিকে জাপান
রুষিয়ার শক্তির সহিত স্বীয় শক্তির পরীক্ষা করিতে
সাহসী হইল না ; সুতরাং কোরিয়ার অপহৃত ক্ষমতা
প্রত্যর্পণ করিতে বাধ্য হইল।
১৮৯৬ খৃঃ কোরিয়ার সহিত জাপান ও রুষিয়া
একটী চুক্তিবদ্ধ হইল ; ইহার ফলে কোরিয়া-সম্রাট স্বীয়
প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করিলেন, জাপান সরকার কোরি-
য়াস্থ জাপানীদের আচরণ নিয়ন্ত্রিত করিবার দায়িত্ব
গ্রহণ করিল। সৈন্য এবং পুলিশ সংরক্ষণের অধিকারও
কোরিয়া পুনঃ প্রাপ্ত হইল।
কোরিয়ার শাসক সম্প্রদায় এই সুযােগ গ্রহণ করিতে
পারিল না। স্বাধীনভাবে দেশ শাসন সংরক্ষণের
সামর্থ্য তাহারা হারাইয়া ফেলিয়াছে। সর্বত্রই
ব্যভিচার পরিলক্ষিত হইল। ফিলিপ জেসন (Philip
Jaisohn) ১৮৮৪ কোরিয়ান ছাত্রগণকে
উৎসাহিত করিয়া, সম্রাটের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র করিয়া-
ছিলেন; কিন্তু উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হইয়া, তিনি মার্কিণ
দেশে পলায়ন করিয়াছিলেন। তিনি স্বদেশে পুনরা-
গমন করিয়া সরকারে কাৰ্য্য গ্রহণ করেন; কিন্তু
নানা প্রকার ব্যভিচার দেখিয়া তিনি স্পষ্ট হৃদয়ঙ্গম
;

১২ পরাধীনের মুক্তি করিলেন যে, সরকারী কার্যে নিযুক্ত থাকিয়া তিনি দেশের কোনও মঙ্গল সাধন করিতে পারিবেন না ; সুতরাং তিনি কাৰ্য্য পরিত্যাগ করিলেন এবং প্রকৃত জাতীয়তাবোেধ উদ্দীপ্ত করিয়া, স্বাধীন শাসন পদ্ধতি প্রণয়ন করিবার মানসে, জাতীয় আদর্শে শিক্ষা বিস্তার করিতে প্রয়াসী হইলেন। স্বাধীন ক্লাব ফিলিপ জেসন দুইটী স্বাধীন বার্তাবহী পত্রিকা প্রচার করিলেন এবং “স্বাধীন ক্লাব” (Indopendence Club) নামে একটী প্রসিদ্ধ ক্লাব স্থাপন করিলেন। সরকারের যাবতীয় অত্যাচার ও ব্যভিচার পত্রিকায় বিশেষভাবে প্রকাশিত হইতে লাগিল। তিন মাস যাইতে না যাইতে, প্রায় দশ সহস্র সভ্য “স্বাধীন ক্লাবের” তালিকাভুক্ত হইল। জেসন নানা প্রকার বাদ প্রতিবাদ দ্বারা জন সাধারণকে রাজনীতি বিষয়ে শিক্ষিত করিতে লাগিলেন। তৎ- প্রবর্তিত সংবাদ পত্র এবং ক্লাব সরকারপক্ষের চক্ষুশূল হইয়া উঠিল। রুষিয়া ও জাপান তীব্র কটাক্ষ করিল— কোরিয়া কোরিয়া স্বায়ত্বশাসনে সুশিক্ষিত ও সুদক্ষ হইয়া উঠে, ইহা কাহারও রুচিপ্রদ হইল না ! কোরিয়া-সম্রাট রুসিয়ার হস্তে জাতীয় সৈন্যের সামরিক শিক্ষার ভার প্রদান করিতে মনস্থ করিলেন। “স্বাধীন ক্লাব” এসংবাদে সন্ত্রস্ত হইল এবং ক্লাবের সহস্র সভ্য রাজ প্রাসাদের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সম্রাটকে তঁাহার সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিবার জন্য বারংবার অনুরােধ করিতে লাগিলেন। সম্রাট কোন প্রকার আপত্তি করিলে, সভ্যগণ তাহাতে সন্তুষ্ট হইল না। তাহারা সম্রাটকে স্পষ্ট করিয়া জানাইল যে, সম্রাট তঁাহার সামরিক শিক্ষার অভিমত পরিত্যাগ না করিলে,তাহারা তথা হইতে প্রস্থান করিবে না। উপায়া- স্তর না দেখিয়া সম্রাট সভ্যগণের দাবী গ্রাহ্য করিলেন এবং রুষিয়ার সামরিক কর্মচারিগণকে স্বদেশে প্রত্য- বৰ্তন করিতে আদেশ প্রদান করিলেন ; ক্লাবের জয় হইল । ১৮৯৮ খৃঃ জেসন মার্কিণদেশে চলিয়া গেলেন, কিন্তু তৎপ্রণীত সমুদয় কাৰ্য্য সিঞ্জম্যান রী (Syngman Rhee) সুদক্ষতার সহিত পরিচালনা করিতে লাগিলেন। এই সিঞ্জম্যান রীকেই উত্তরকালে

১৪
পরাধীনের মুক্তি
কোরিয়াবাসী “স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের সভাপতি নির্বাচন
করিয়াছিলেন। মিঃ রী স্বাধীনতা প্রয়াসী কোরিয়া-
বাসিগণকে পরিচালনা করিতে লাগিলেন। তিনি
সম্রাটের নিকট দাবী করিলেন, সরকারী কাৰ্য
পরিচালনে বিদেশী ক্ষমতার উচ্ছেদ, বিদেশিগণকে
অত্যধিক সুবিধা প্রদানের
সঙ্কোচ, রাজনৈতিক
অপরাধিগণের প্রকাশ্য বিচার, সরকারী আয় ব্যয় বিভাগে
সততা সংস্থাপন এবং একটী প্রতিনিধি সভা স্থাপন
করিতে হইবে।
কোরিয়ার সর্বত্র জনসাধারণের সভা-সমিতির
অধিবেশন হইতে লাগিল; দেশময় স্বাধীনতার বাতাস
প্রবাহিত হইল। রমণীসম্প্রদায়ও চিরাগত গৃহাবগুণ্ঠন
অপসারিত করিয়া, স্বাধীনতার আন্দোলনে যােগদান
করিল
কোরিয়া-সম্রাট সন্ত্রস্ত হইলেন এবং স্বাধীন ক্লাব
উচ্ছেদ করিবার আজ্ঞা প্রদান করিলেন। ক্লাবের
স্বাধীনতাবৎসল সভ্যবৃন্দ উত্তেজিত হইয়া উঠিল ;
তাহার। একসঙ্গে সরাসর থানায় উপস্থিত হইয়া,
তাহাদিগকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য বলিতে লাগিল।
সকলকে গ্রেপ্তার করা অসম্ভব, তাই বাছা বাছা সতের
* =

কোরিয়া
জনকে গ্রেপ্তার করা হইল। ফলে সমগ্র দেশময়
ভীষণ উত্তেজনার ঝড় উঠে। সর্বত্রই সরকারী
কার্যের তীব্র প্রতিবাদ হইতে লাগিল। ইহাতে
সরকার পক্ষ অত্যন্ত ভীত হইয়া পাঁচ দিন পর
নায়কগণকে মুক্তি দিল। সম্রাট শাসন পদ্ধতি
সংশােধন করিবার প্রতিশ্রুতি প্রদান করিয়া উত্তেজনা
প্রশমন করিলেন। জনসাধারণ শান্তভাব ধারণ করিয়া
স্ব স্ব গৃহে প্রত্যাবর্তন করিল; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শাসন
পদ্ধতি সংশােধনের প্রতিশ্রুতি বিস্মৃতির জলে ডুবিয়া
গেল !
জাতীয় স্বাধীনতা প্রয়াসী কোরিয়ানগণ অচিরেই
বেশ বুঝিতে পারিলেন যে, সরকার তাহাদিগকে বৃথা
আশা দেখাইয়া প্রতারণা করিয়াছে ; সুতরাং সরকারের
আচরণের প্রতিবাদ কল্পে নব উদ্যমে সভাসমিতি
আহুত হইতে লাগিল; সরকারের প্রতি বিদ্বেষ-বহ্নি
পুনঃ প্রজ্জ্বলিত হইল। অপর দিকে সরকারের মস্তিষ্কও
উষ্ণ হইয়া উঠিল । সরকারের কাৰ্যের প্রতিবাদ কল্পে
জনসাধারণ একত্রিত হইলে, উন্মুক্ত অসি দ্বারা ঐ
জনতা ভঙ্গ করিবার জন্য সরকার পুলিশের উপর হুকুম
জারি করিল। কিন্তু পুলিশ সরকারের আজ্ঞা প্রতি

১৬ পরাধীনের মুক্তি পালন করিতে রাজী হইল না। দেশপ্রাণ পুলিশ- কর্মচারিগণ তাহাদিগের চাপরাসি সরকারের নিকট ফিরাইয়া দিয়া বলিল--সাধারণের ও তাহাদিগের মঙ্গল অভিন্ন। উপায়ান্তর না দেখিয়া, সরকার সামরিক সৈন্যের সাহায্য গ্রহণ করিল এবং সাধারণের প্রতিবাদ সভা ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইল। কিন্তু সরকারী কার্যের প্রতিবাদ কল্পে সহস্র সহস্র কোরিয়া-বাসী রাজপ্রাসাদের সম্মুখে বসিয়া রহিল, কিছুতেই তাহারা সে স্থান পরি- ত্যাগ করিল না। চৌদ্দ দিন চৌদ্দ রাত্র একই ভাবে সেখানে বসিয়া থাকিয়া, সমগ্র কোরিয়া-বাসীর দৃঢ় সঙ্কল্প সম্রাটকে জানাইল। সম্রাট বিচলিত হইলেন এবং বুঝিলেন কোরিয়া-বাসীর সহিত একটা ‘রফা’ না করিলে চলিবে না। ইহার এক পক্ষ পর, সম্রাট জাতীয় দলের প্রধান প্রধান নায়কগণকে আহ্বান করিলেন। সম্রাট সমীপে উপস্থিত হইয়া জাতীয় দলের নেতৃবর্গ দাবী করিলেন— জাতীয় বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং শাসন পদ্ধতির প্রকৃত সংস্কার অচিরে কার্যে পরিণত করা। সম্রাট এই দাবী কার্যে পরিণত করিবার জন্য প্রতিশ্রুতি প্রদান করিলেন।

কোরিয়া
১৭
;
জাতীয়দলে মতভেদ
সম্রাট ‘জিদ’ ছাড়িয়াছেন এবং আত্মপক্ষের জয়
হইয়াছে দেখিয়া জনসাধারণ আনন্দিত হইল। জাতীয়
দলের কোন কোন অধিনায়ক সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর
এবং তীব্র ভাষা প্রয়ােগ করিতে লাগিল। ইহাতে
অন্যান্য নায়কগণ বিরক্ত হইয়া উঠে; ফলে জাতীয় দলের
একতা বিনষ্ট হইয়া, ভিন্ন ভিন্ন দলে পরিণত হয়।
সম্রাট সুযােগ পাইয়া পুনঃ বাঁকিয়া দাড়াইলেন এবং
যে সকল দেশনায়ক—এখন দলনায়ক-সীমা উল্লম্বন
করিয়া, তীব্র ভাষায় সরকারী কার্যের প্রতিবাদ করিয়া-
ছিলেন, তাহাদিগকে গ্রেপ্তার করিতে আদেশ দিলেন
এবং সঙ্গিনের সহায়তায় সভাসমিতি ভাঙ্গিয়া দিতে
বলিলেন। যাহাদিগকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছিল,
তাহাদিগের মধ্যে সিঞ্জম্যান্ রী অন্যতম। কারাগারের
অন্ধকার প্রকোষ্ঠে হস্তপদ শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় তাহাকে
সাত মাস কাল অসহ্য নিগ্রহ সহ করিতে হইয়াছিল।
এক রাত্রে তিনি প্রাণদণ্ডের আদেশ শ্রবণে সমস্ত
পীড়নের অবসান হইবে মনে করিয়া, অত্যন্ত উৎফুল্ল
হইলেন; কিন্তু ভুলক্রমে রীর পার্শ্ববর্তী এক জনকে রী
মনে করিয়া ফঁাসী দেওয়া হইল। রী এই প্রকারে
;
২

১৮
পরাধীনের মুক্তি
প্রাণদণ্ডের হস্ত হইতে রক্ষা পাইলেন।
ছয় বৎসর পর
১৯০৪ খৃঃ অব্দে তিনি মুক্তিলাভ করিয়া, মার্কিন প্রদেশে
গমন করেন এবং তথায় দর্শনশাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি
লাভ করেন।
স্বার্থ দন্দে রুষ ও জাপান
এদিকে রুষিয়া ও জাপান প্রত্যেকেই কোরিয়া
স্ববশে রাখিবার জন্য সর্বপ্রকার কূটনীতি অনুসরণ
করিয়া আসিতেছিল। রুষিয়া যখন চীনের নিকট হইতে
লিয়াট (Iliatong) লইয়াছিল, তখন জাপানের
সহিত একটী সৰ্ত্তে আবদ্ধ হইয়াছিল। এই সর্তানুসারে
রুষিয়া কোরিয়ার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়াছিল এবং
কোরিয়ায় জাপানের যে বিশেষ আর্থিক স্বার্থ আছে
তাহাও স্বীকার করিয়াছিল। সেই সৰ্তানুসারে রুষিয়।
কোরিয়ার রাজধানী সিউল নগর হইতে অর্থনৈতিক
উপদেষ্টা এবং অন্যান্য কর্মচারিগণকে উঠাইয়া
ইয়াছিল।
এইরূপে কিছুকাল অতীত হইবার পর, রুষিয়া স্বীয়
প্রভাব কোরিয়ায় পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য লালায়িত

কোরিয়া
হইল এবং এইজন্য রেভলফ, (Revloff ) নামক
একজন কূটনীতিজ্ঞ মন্ত্রীকে কোরিয়ার রাজধানী সিউল
নগরে প্রেরণ করে। কোরিয়ার প্রধান মন্ত্রী রুষিয়ার
দিকে ঝােক’ দিলেন।
জাপান অনেক দিন হইতেই রুযিয়ার সহিত
স্বকীয় শক্তির পরীক্ষা করিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিল।
জাপান এখন প্রস্তুত ; তাই স্বীয় উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিবার
জন্য সুযােগ খুজিতেছিল। এবার জাপান কোরিয়া
আক্রমণের সূত্র পাইল।
পূৰ্ব সৰ্ত্ত ভঙ্গের অভিযােগে রুষিয়ার বিরুদ্ধে
জাপান যুদ্ধ ঘােষণা করিল। এই যুদ্ধ ঘােষিত হইবার
সঙ্গে সঙ্গেই কোরিয়ার উপকূলস্থ রুযিয়ার সমগ্র
তার্ণপােতগুলি ত্বরিত গতিতে ডুবাইয়া দিল, কোরিয়ার
রাজ প্রাসাদ অধিকার করিল এবং সমস্ত কোরিয়া
সাম্রাজ্য বশীভূত করিল। এসময় হইতেই নামে না
হইলেও প্রকৃত প্রস্তাবে কোরিয়া জাপানের অধীনে
গেল এবং কোরিয়ার স্বাধীনতা নামে মাত্র অবশিষ্ট
রহিল এবং কোরিয়ার জাতীয় বৈশিষ্ট্য নামেই
পর্যবসিত হইল, জাপানের বহুদিনের অভিসন্ধি পূর্ণ
হইল !

পরাধীনের মুক্তি
এই সময় হইতে কোরিয়া-সম্রাট জাপানের
পরামর্শানুসারে সকল কার্য পরিচালনা করিতে বাধ্য
হইলেন এবং রুযিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার সময়
জাপানকে সর্ববিধ সুবিধা প্রদান করিতে বাধ্য
রহিলেন। স্বীয় শক্তি সুদৃঢ় না হওয়া পর্যন্ত
জাপান কোরিয়ায় একটু নরম ভাবেই কাৰ্য্য করিয়া
যাইতে লাগিল ; ক্রমে রুবিয়ার সহিত জাপানের যুদ্ধ
বাধিয়া গেল। জাপান প্রবল পরাক্রান্ত কষিয়ার
অধিকার হইতে পাের্ট আর্থার ( Port Arthur)
কাড়িয়া লইল ; পরিশেষে রুষিয়া সম্পূর্ণরূপে পরাজয়
স্বীকার করিয়া, জাপানের সঙ্গে সন্ধি করিল। রুষ
বিজয়ে সমগ্র ইউরােপ জাপানী বিক্রমের পরিচয়
পাইল এবং ইউরােপের স্বাধীন জাতি সমূহের মধ্যে
জাপানের আসন স্থাপিত হইল।
রুষ জয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাপানের প্রাধান্য কোরিয়ায়
যতই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, ততই জাপান স্বেচ্ছাচারী
হইয়া উঠিল এবং কোরিয়াবাসীর ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতি
একেবারে উদাসীন হইতে লাগিল ।
••

কোরিয়া ২১ যে জাপানী জুম জাপান কোরিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতা অবাধ গতিতে চালাইল। বিদেশী বিষয় পরিচালনের জন্য কোরিয়া- বাসীর স্থলে জাপানী উপদেষ্টা নিযুক্ত হইল। পােষ্ট- আফিস ও টেলিগ্রাম বিভাগ জাপান স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আনিল, বিনা অনুমতিতে কোন কোরিয়াবাসীকে রাজনৈতিক সদ্য গঠন করিতে বারণ করিয়া দিল এবং সমুদয় রাজনৈতিক বিষয়ক কাগজ পত্র জাপানী সেন্সরের নিকট প্রদান করিতে আদেশ দিল । সকল কোরিয়াবাসী জাপানের স্বেচ্ছা- চারিতার সমালােচনা এবং প্রতিবাদ করিয়াছিল, তাহাদের অধিকাংশকেই কারারুদ্ধ করা হইল, অবশিষ্ট সকলকে কোরিয়া হইতে নির্বাসিত করা হইল। জাপান কোরিয়ার সর্বত্র জাপানী কুলী আমদানী করিল এবং কুলী সম্প্রদায়কে কোরিয়ার শাসন সংরক্ষণ আইনের বহিভূত করিয়া দিল। ইহার ফলে জাপানী কুলিগণ অবাধ গতিতে চুরি, মারপিট, হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি করিতে থাকিলেও তাহাদিগকে শাসন করিবার কোনই উপায় রহিল না। সহরগুলির কোরিয়া নাম পর্যন্ত জাপানের সহ্য হইল না, তাই সহর সমূহের জাপানী পরাধীনের মুক্তি নামাকরণ হইল। সর্বত্র সামরিক আইন জারী করা হইল এবং সামরিক কার্যের ভাণ করিয়া রেল লাইনের পার্শ্ববর্তী যাবতীয় স্থান প্রকৃত মূল্যের এক- বিংশাংশ মাত্র প্রদান করিয়া, গ্রহণ করা হইল। জাপান এই প্রকারে গৃহীত সমুদয় জমী জাপানীদের নিকট বিক্রয় করিল। জাপানিগণ তথায় গৃহ নির্মাণ, বড় বড় কারখানা এবং উপনিবেশ স্থাপন করিল। এই প্রকারে জাপান সরকার যখন সমুদয় কোরিয়ার দুই তৃতীয়াংশ জাপানীদের লইবার চেষ্টা করিল, তখন দেশের সর্বত্র জাপানী বিদ্বেষ মূর্ত হইয়া উঠিল। ইহার ফলে জাপান ক্ষণকালের জন্য স্বীয় অভিসন্ধি স্থগিত রাখিল। জাপান ১৯০৫ খৃঃ মারকুই ইটোকে ( Marquis Ito)কোরিয়া-সম্রাটের নিকট প্রেরণ করিয়া,দাবী করিল যে, বিদেশীয় সমুদয় বিষয় নিয়ন্ত্রিত করিবার অধিকার জাপান সরকারের হস্তে ন্যস্ত করিতে হইবে এবং কোরিয়ার শাসন সংরক্ষণ পদ্ধতি পরিচালন করিবার অধিকার কোরিয়াস্থ জাপানী মন্ত্রী এবং কালের হস্তে অৰ্পণ করিতে হইবে। কোরিয়া-সম্রাট এ প্রস্তাব গ্রহণকরা অপেক্ষা মৃত্যু বরণীয় মনে করিয়া, প্রথমত কোরিয়া ; এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিলেন; কিন্তু বিশেষ ভয় প্রদর্শিত হইলে, তিনি সম্মতি প্রদান করেন। জাপানের হস্তে এই ক্ষমতা প্রদানের সংবাদ শ্রবণে সমগ্র কোরিয়াবাসী হাড়ে হাড়ে জ্বলিয়া উঠিল। অধিকাংশ ক্ষমতাশালী কোরিয়া এবং ভূতপূৰ্ব প্রধান মন্ত্রিগণকে সঙ্গে লইয়া, ভূতপূর্ব যুদ্ধ-মন্ত্রী সম্রাটের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং জাপানের সহিত নূতন সন্ধি প্রত্যাহার করিবার জন্য বিশেষ পিড়াপিড়ি করিলেন। সম্রাট প্রকাশ করিলেন যে, তিনি সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন নাই, কিন্তু কোন নূতন সর্তে তিনি যে আবদ্ধ হন নাই, এইরূপ খােলামেলা ভাবে বলিতে সাহসী হইলেন না। সম্রাট যে এই সন্ধি-জালে আবদ্ধ হইয়াছেন, তাহারা ইহা বুঝিল। ইহা বুঝিল। নিজ বাস ভূমে পরবাসী হইয়া থাকা অপেক্ষা মৃত্যু বরণীয়, তাই স্ব স্ব গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া, এই ক্ষমতাশালী কোরিয়ান- গণের অনেকেই আত্মহত্যায় প্রাণত্যাগ করিল । কোরিয়া-সম্রাট এই দুর্দিনে মার্কিন সভাপতি রুজভেল্টের (President Roosevelt) নিকট একজন বিশেষ প্রতিনিধি প্রেরণ করিলেন। কোরিয়ার দুরবস্থায় মার্কিন সভাপতির সহানুভুতি আকর্ষণই

২৪
পরাধীনের মুক্তি
ইহার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। ১৮৮২ খৃষ্টাব্দের সন্ধি সূত্রে
মার্কিন কোরিয়ার স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য
সহায়তা করিতে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল; কিন্তু কোরিয়া-
সম্রাটের প্রতিনিধি মার্কিনে পৌছিলে সভাপতি
রুজভেল্ট তাহার সঙ্গে দেখা করিতে অস্বীকার করিলেন
এবং তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়া পাঠাইলেন—“যে জাতি
আপনার মৰ্য্যাদা আপনি রক্ষা করিতে অক্ষম, সে
জাতির জন্য অন্য জাতির সহানুভূতি আকর্ষণ করিবার
প্রচেষ্টা বাতুলতা মাত্র।”
“কোরিয়ান্ দৈনিক সংবাদপত্রের”
সংবাদপত্রের” লেখক মিঃ
বেথেল (Mr. Bethel ) তাহার সংবাদপত্রে জাপানী
স্বেচ্ছাচারিতার তীব্র প্রতিবাদ করেন
এবং এই
অপরাধে তিনি কারারুদ্ধ হইলেন; পরে মুক্তির
অব্যবহিত পরেই তাহার মৃত্যু হয়। কোরিয়াবাসী
মিঃ বেথলের নাম কৃতজ্ঞতার সহিত স্মরণ করিতেছে।
১৯০৫ খৃঃ মারকুই ইটোর প্রস্তাবিত নূতন
সন্ধিপত্রে কোরিয়া-সম্রাট স্বাক্ষর করেন নাই। সম্রাটের
দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, অন্যান্য প্রধান স্বাধীন জাতি
তাহার অনুকূলে হস্তক্ষেপ করিবেন এবং এই আশায়
অনুপ্রাণিত হইয়া, ১৯০৭ খৃঃ হে আন্তর্জাতিক সভায়
;

কোরিয়া ২৫ (Hague Conference) তিনি রাজদূত প্রেরণ করেন, কিন্তু এই সভায় তাহার দূতের প্রবেশাধিকার দেওয়া হইল না। জাপানের অনুমতি না লইয়া ইউরােপীয় সভায় দূত পাঠাইবার জন্য সম্রাটের উপর জাপান খঙ্গ- হস্ত হইল এবং ইহার প্রতিশোেধ স্বরূপ সম্রাটকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া,তদীয় হীনবীৰ্য পুত্রকে সিংহাসনে বসাইল এবং তাহাকে নূতন সৰ্ত্ত গ্রহণে বাধ্য করিল। এই সৰ্তানুসারে কোরিয়াস্থ জাপান মন্ত্রী আইন প্রভৃতি প্রণয়ন বিষয়ে সর্বেসর্বা হইলেন এবং সমুদয় সরকারী কর্মচারী নির্বাচনের ক্ষমতাও তাহার হস্তে প্রদত্ত হইল এবং কোন বিদেশীকে সরকারী কাৰ্য্যে নিযুক্ত না করিতে সম্রাটকে বাধ্য করা হইল। যুক্তরাজ্যের সভাপতি রুজভেল্টের ব্যক্তিগত পুস্তকালয়ে তঁাহার স্বাক্ষরিত একখানা গুপ্ত চুক্তিপত্র আবিস্কৃত হয়। এই চুক্তিপত্রে মিঃ রুজভেল্ট জাপানকে এরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন যে, কোরিয়া জাপান- সাম্রাজ্য ভুক্ত করিবার জন্য জাপানী দাবী তিনি সমর্থন করিবেন। এই রুজভেল্টই শান্তি বৈঠকের সভাপতি ছিলেন। এই চুক্তিপত্র প্রকাশিত হইবার পর,

পরাধীনের মুক্তি
যুক্তরাজ্যের প্রতি কোরিয়ানদের শ্রদ্ধা অনেক পরিমাণে
কমিয়া গেল। এই সময়ে কোরিয়াবাসীর অবস্থা
অতীব শশাচনীয় অবস্থায় পৌছিল।
কোরিয়ায় কোরিয়াবাসীর বাসকরা দুর্বিসহ হইয়া
উঠিল। অমানুষিক অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া প্রতি
বৎসর সহস্র সহস্র কোরিয়ান পৈতৃক ভিটায় বাসকরা
অপেক্ষা অজানিত, অপরিচিত মাঞ্চুরিয়ায় ( Mon:
churia) নিৰ্বাসন অথবা পথে অনশন ও মৃত্যুকে বরণ
করা অধিকতর সুখপ্রদ বলিয়া মনে করিল। দুৰ্ব্বলের
উপর সবলের উৎপীড়ন কি ভীষণ ভয়াবহ ! মাঞ্চুরিয়ার
পথে কত পুরুষ,কত স্ত্রী, কত বালক, কত বালিকা, হিমে,
অনশনে, পথক্লান্তিতে যে প্রাণত্যাগ করিল, তাহার
ইয়ত্তা কে করিবে ? অর্ধনগ্ন দেহে মাতা শিশুসন্তানকে
বুকে করিয়া, কেহ বা ঝুড়িতে পুরিয়া পিঠে করিয়া, পথ
বহিয়া চলিল, শীতের ককনে হাওয়ায় শিশুসন্তানগণের
কচি হাত পা জমাট হইয়া গেল—শিশুর অবশাঙ্গ
মাতৃক্রোড়ে অত্যাচারীর হাত হইতে চিরশান্তি লাভ
করিল। কত বৃদ্ধের, কত বৃদ্ধার, কত যুবার, কত
যুবতীর হাত পা জমাট বাঁধিয়া অচল ও অবশ হইয়া যে
সৃষ্টিকর্তার শান্তিরাজ্যে চলিয়া গেল, তাহার সংখ্যা

কোরিয়া ২৭ অপরিমেয়। কত গভীর মর্মবেদনায়, কত প্রাণের অসহ্য জ্বালায় যে এই কোরিয়ানগণ আপনাদের জন্ম- ভূমি, পিতৃ-পিতামহের লীলাভূমি পরিত্যাগ করিয়াছিল, তাহা কোরিয়াবাসী ভিন্ন অপরে কি বুঝিবে ? স্বেচ্ছাচাৰিতা ও নির্যাতন অনেক তেজস্বী কোরিয়ান অস্ত্রের সহায়তায় জাপানের অত্যাচারের স্রোত অবরুদ্ধ করিবার জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প করিয়া পার্বত্য প্রদেশে “ন্যায় সৈন্য” (Righteous Ariny) নামে একদল সৈন্য গঠন করিল। এই “ন্যায় সৈন্য” পৰ্ব্বতপৃষ্ঠে সশস্ত্র লুক্কায়িত থাকিত এবং সুযােগ বুঝিয়া জাপানীদিগকে দ্রুতগতিতে আক্রমণ করিত এবং তাহাদিগকে বিদ্ধস্ত করিয়া পুনঃ শৈলশিখরে প্রস্থান করিত। এই প্রকারে ইহারা ‘গরিলা যুদ্ধ করিতে লাগিল। অনেক চেষ্টা করিয়াও জাপানী সৈন্য ইহাদিগকে ধরিতে বা সংযত করিতে পারিল না; ফলে জাপান ভীষণ প্রতিশোেধ’ লইবার মানসে কোরিয়ার গ্রামের পর গ্রামে ‘লঙ্কাকাণ্ড’ করিতে লাগিল—কত ঘর বাড়ী যে ভস্মে পরিণত করিল, কত কোরিয়ানকে যে গুলি করিয়া শমন ভবনে প্রেরণ করিল, কত ২৮ পরাধীনের মুক্তি কোরিয়ান রমণীর প্রতি পৈশাচিক অত্যাচার করিল, তাহার সংখ্যা করা দুঃসাধ্য। একদল জাপানী সৈন্য একদিন একটী গ্রাম্য গির্জায় তত্রস্থ সমুদয় খৃষ্টান পুরুষ- দিগকে একত্র করিয়া, ঐ গির্জায় অগ্নি সংযোগ করিল এবং প্রাণ বাঁচাইতে কেহ বাহিরে ছুটিয়া আসিলে, অমনি তাহাকে গুলি করিয়া হত্যা করিল। এইরূপ নানাপ্রকার অত্যাচার কোরিয়ার উপর দিনের পর দিন চলিতে লাগিল। এদিকে কোরিয়ার খৃষ্টান সম্প্রদায় প্রথম হইতেই জাপানীদের চক্ষুশূল হইয়াছিল ; সুতরাং জাপানের অত্যাচার দূর করিবার জন্য তাহাদের অধিকাংশ কোরিয়াবাসীর জাতীয় আন্দোলনে যােগদান করিয়া- ছিল। সেনাপতি টেরচি ( Terauchi) ১৯১১ খৃঃ খৃষ্টানগণকে নিষ্পেষিত করিবার আয়ােজন করিলেন। প্রথমতঃ তিনি সমগ্র খৃষ্টান প্রচারক ও শিক্ষকগণকে গ্রেপ্তার করিলেন এবং ১ শত ৪৯ জনকে বন্দী অবস্থায় সিউল নগরে বিচারের জন্য পাঠাইয়া দিলেন। ইহাদের তিন জন নির্জন কারাগারে প্রাণ ত্যাগ করে। যাহারা অবশিষ্ট রহিল তাহাদের মধ্যে ২৩ জনকে নির্বাসিত করা হইল এবং ১ শত জনকে গভর্ণর জেনারেলকে

কোরিয়া
হত্যা করার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করা হইল। ইহাদের
মধ্যে তরুণ খৃষ্ট সঘের সহকারী সম্পাদক ব্যারণ য়ুন
চিহাের ( Baron yun Chi-ho) নাম বিশেষ
উল্লেখযােগ্য।
বন্দিগণকে উৎকট পীড়ন করিয়া, যে স্বীকার উক্তি
বাহির করা হইয়াছিল, সেই উক্তির বলেই ধরপাকড়
হইয়াছিল; কিন্তু যাহাদিগকে পীড়ন করিয়া এই
স্বীকার উক্তি বাহির করা হইয়াছিল, তাহারা সকলেই
বিচারকালে, পীড়ন ভয়ে ঐরূপ বলিয়াছে বলিয়া প্রকাশ
করিল। কিন্তু ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী’-১ শত
২৩ জনের বিচার প্রহসন শেষ হইল এবং এই বিচারে
ব্যারণ চিহহ ও অপর পাঁচজনের দশ বৎসর, ১৮ জনের
সাত বৎসর, ৪০ জনের ছয় বৎসর এবং ৪২ জনের পাঁচ
বৎসরের কারাবাসের আদেশ হইল। মাত্র ১৭ জন
অব্যাহতি পাইল। বন্দিগণের প্রতি যে অত্যাচার ও
উৎপীড়ন হইয়াছে, তাহা প্রকাশ করিবার কোন
সুবিধাই বন্দিগণকে দেওয়া হয় নাই। এই বিচার
প্রহসন ও তাহার ফলাফল প্রচারিত হইলে, আমেরিকার
যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য ইউরােপীয় দেশ জাপানী
অত্যাচারের এমন তীব্র প্রতিবাদ করে যে, জাপান

০
পরাধীনের মুক্তি
আপিল আদালতে পূৰ্ব বিচার সম্পূর্ণ পরিবর্তন
করিতে বাধ্য হয়।
পুনর্বিচারে বন্দিগণকে স্বাধীন ভাবে স্বীয় কাহিনী
প্রকাশ করিবার অনুমতি প্রদান করা হইল। একজন
বন্দী আত্ম-কারা-কাহিনী বলিতে গিয়া বলিল যে,
পুলিশ তাহাকে উলঙ্গ করিয়া পিছনদিকে তাহার হাত
বাঁধিয়া দরজায় ঝুলাইয়া রাখে ; পরে তাহার চেতনা
লােপ হইলে, বন্ধন খুলিয়া চোখে মুখে জল দেওয়া
হয় এবং পুনঃ সচেতন হই বামাত্র পীড়ন চলিতে থাকে।
একদিন সন্ধ্যাবেলা তাহাকে বলা হইল যে, যদি সে
অপরাধ স্বীকার না করে, তবে অত্যাচার করিয়া তাহাকে
মারিয়া ফেলা হইবে। অপর দুইজন বন্দীর স্বীকার
উক্তি স্বাক্ষরিত একখানা কাগজও তাহাকে দেখান
হইল, তথাপি সে মিথ্যা কথা বলিতে প্রস্তুত হইল না।
এইরূপে ক্রমাগত দুইমাস অমানুষিক অত্যাচার ও
পীড়নের পর—“তােমরা যাহা বলিতে বল, তাহাই
বলিব”—একথা বলিতে বাধ্য হয়। এই একজনের
কাহিনী হইতেই অপরাপর বন্দিগণের প্রতি যে কিরূপ
অত্যাচার করা হইয়াছিল, তাহা বেশ স্পষ্টই অনুমান
করা যাইতে পারিবে।

কোরিয়া পুনর্বিচারে ৫১ দিন অতিবাহিত হইল। ৯৯ জন বন্দীর নিরপরাধ প্রতিপন্ন হইল, য়ুন চিহহ ইহার মধ্যে একজন, অপর ছয় জনের দুই বৎসরের কারাদণ্ড হইল; যদিও রাজদ্রোহসূচক ষড়যন্ত্রের কোনও প্রমাণ •• ছিল না। কোরিয়ার অধিকাংশ আধুনিক বিদ্যালয় খৃষ্টান সম্প্রদায় কর্তৃক পরিচালিত। ১৯১৫ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসে জাপান কর্তৃপক্ষ এক হুকুম জারি করিল যে, বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষগণ ঐ সকল বিদ্যালয়ে কোন প্রকার ধৰ্ম্ম শিক্ষা দিতে পারিবে না। সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষাই জাপানী ভাবাপন্ন হইবে এবং বিদ্যালয়ের সমুদয় পাঠ্য- পুস্তকই জাপান কর্তৃপক্ষকর্তৃক নির্ধারিত হইবে । এদিকে ইউরােপের মহাসমরের অবসানে আমেরিকার যুক্তরাজ্যের সভাপতি উইলসন ( Wilson) সম্মিলিত জাতি-সত্ব ( League of nations) গঠন করিয়া ঘােষণা করিলেন যে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহের স্বাধীনতার অধিকার স্বীকার করা হইবে। কোরিয়া- বাসী এই আশার বাণী শ্রবণ করিয়া উৎফুল্ল হইয়া উঠিল এবং প্যারিস্ কনফারেন্স বসিলে তথায় প্রতিনিধি পাঠাইবার সঙ্কল্প করিল এবং এজন্য আমেরিকাস্থ

;
পরাধীনের মুক্তি
তিনজন কোরিয়ানকে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হইল,
কিন্তু তাহাদিগকে প্যারিস্ যাইবার অনুমতিপত্র
( Passport) দেওয়া হইল না। কিউসি কিন্
( Kiusic kin) নামক একজন নির্বাচিত কোরিয়ান
প্রতিনিধি কোন প্রকারে প্যারিস নগরে উপস্থিত
হইলেন; কিন্তু সম্মিলিত মিত্র-রাজনীতিবিশারদগণের
সঙ্গে দেখা করিতে তাহাকে অনুমতি দেওয়া হইল
।
বিদেশী জাতির সাহায্য পাইতে নিরাশ হইয়া, সমগ্র
কোরিয়াবাসী অস্ত্র ধারণ করতঃ তাহাদের দুর্গতির
অবসান করিতে উদ্যত হইল, কিন্তু জাতীয় নেতাগণ
ইহা নিবারণকল্লে নিম্ন উপদেশাবলী মুদ্রিত করিয়া
দেশময় বিতরণ করিলেন :-
“তােমরা অন্য যাহাকিছু কর না কেন, জাপানীর
অবমাননা করিবে না ।
“জাপানীদিগের উপর লােষ্ট্র নিক্ষেপ করিবে না।”
“কোন জাপানীকে গুলি করিবে না, কারণ এ সকল
অসভ্যতার পরিচায়ক।”
নেতাগণের প্রচেষ্টার ফলে কোরিয়ানদের উত্তেজনা
সংযত হইল; কিন্তু নায়কগণ কোন কাপুরুষতার প্রশ্রয়
;

কোরিয়া
দিলেন না। অত্যাচারের ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিকার ও
প্রতিবাদ করিতেই হইবে—পাশবিক শক্তিদ্বারা নহে,
নীরব অসহযােগ পন্থা দ্বারা।
সম্রাটের মৃভু ও প্রজাতন্ত্র ঘােষণা
প্যারিস্ কনফারেন্সে কোরিয়া-প্রতিনিধির প্রবেশা-
ধিকার না পাওয়ার সংবাদ প্রচারিত হইবার অব্যবহিত
পরেই বৃদ্ধ সম্রাটের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হইল। এরূপ
জনরব উঠিল যে, যুবরাজের সহিত জাপান-রাজকুমারীর
বিবাহ যাহাতে সংঘটিত হইতে না পারে, তন্নিমিত্ত
সম্রাট আত্মহত্যা করিয়াছেন। কোরিয়ার প্রচলিত
নিয়ম অনুসারে পিতামাতার মৃত্যুর পর তিন বৎসর
পৰ্যন্ত পুত্রের বিবাহ নিষিদ্ধ। মৃত সম্রাটকে জাতীয়
ভাবে সমাহিত করিবার জন্য দেশব্যাপী সাড়া পড়িয়া
গেল এবং কোরিয়াবাসীর চিত্ত আলােড়িত করিয়া প্রশ্ন
উঠিল—স্যায়ত তাহারা এখন কাহাকে রাজা বলিয়া
গ্রহণ করিবে। জাতীয় নায়কগণ সাহসে ভর করিয়া,
‘স্বাধীন প্রজাতন্ত্র’ ঘােষণা করিয়া, এই প্রশ্ন মীমাংসা
করিবার সঙ্কল্প করিলেন।
নেতৃবর্গ স্বাধীনতার ঘােষণাপত্র প্রস্তুত করিলেন

৩৪ পরাধীনের মুক্তি এবং তাহার নকল প্রত্যেক সহরে, প্রত্যেক গ্রামে, বিশ্বস্ত লােক মারফতে প্রেরণ করিলেন। সম্রাটের সমাধির দিনে যাহাতে দেশব্যাপী বড় বড় সভা সমিতি আহুত হয় এবং সকল দেশবাসী যাহাতে সভায় যােগ দান করে, সে বিষয়ে উপদেশ প্রদান করা হইল এবং ঐ দিবসই স্বাধীনতা ঘােষণা করিবার দিন বলিয়া ধাৰ্য্য হইল। স্বাধীনতা-ঘােষণা-পত্ৰ বহু সহস্র মুদ্রণ করা হইল এবং বিদ্যালয়ের বালক বালিকাগণকে এমন- ভাবে প্রস্তুত করিয়া রাখা হইল, যেন মৃত সম্রাটকে সমাধিস্থ করিবার দিন আহুত সভাসমিতি ভঙ্গ হইবার সঙ্গে সঙ্গেই ঐ ঘােষণাপত্র সকলের নিকট বিতরণ সকল বিষয়ের অনুষ্ঠান পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে করা হইল। এদিকে জাপান কর্তৃপক্ষ মৃত সম্রাটের সমাধির দিন কোনও সভাসমিতি করিবার নিষেধ আজ্ঞা প্রচার করিল; কিন্তু দেশব্যাপী যে ‘নূতন একটা কিছুর সূচনা হইয়াছে, কর্তৃপক্ষের মনে এরূপ সন্দেহ হইতেছিল বটে, কিন্তু এই ‘নূতন:সূচনা’ যে কি, তাহা নির্ধারণ করিতে পারিল না। দেশ-নায়কগণ জাপান কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি এড়াইয়া, সম্রাটের সমাধির জন্য পূর্ব কোরিয়া নির্দিষ্ট ‘সােমবার’ পরিবর্তন করিয়া তৎপূৰ্ব দিবস নির্ধারণ করিলেন এবং যাহাতে দেশব্যাপী সভা সমিতির অধিবেশন হয়, তৎসম্বন্ধে উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। কর্তৃপক্ষ এই নূতন সমাধি-দিন সম্বন্ধে কিছুই জানিতে পারিল না। কোরিয়াবাসী কি প্রকারে স্বাধীনতা ঘােষণা করিয়াছিল, তাহা শ্রবণ করিলে বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইতে হয়। ৩৩ জন প্রসিদ্ধ দেশ-নায়ক ‘স্বাধীনতা ঘােষণা পত্র স্বাক্ষর করিলেন এবং এই নায়কগণ প্রধান প্রধান জাপানী কর্মচারিগণকে একটি প্রীতি-ভােজে আহ্বান করিলেন। আহারাদি শেষ হইলে জাপানী কৰ্ম্ম- চারিগণ মনে করিলেন যে, তখন তাহাদের কিছু গুণকীৰ্ত্তন হইবে; কিন্তু হইল “হরিষে বিষাদ”। একজন দেশনায়ক “স্বাধীনতা-ঘােষণা-পত্র” বাহির করিয়া জাপানীগণের বিস্ময়ের একশেষ জন্মাইয়া, আদ্যোপান্ত ধীর গম্ভীর ভাবে পাঠ করিয়া শুনাইলেন এবং পরক্ষণেই পুলিশকেন্দ্রে টেলিফোন্ করিয়া, পুলিশ সুপারিটেডেন্টকে তাহাদের সমুদয় কাৰ্য্য জানাইলেন, তৎপর ধৃত হইবার জন্য অবিচলিতভাবে ‘বন্দী-গাড়ীর প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। পেস্টকিল (Pestor

পরাধীনের মুক্তি
Kil) নামক একজন দেশনায়ক নিমন্ত্রণে’ কিঞ্চিৎ
বিলম্বে আসিয়াছিলেন। তাহার আসিবার অল্প পূর্বেই
অন্যান্য দেশনায়কগণকে গ্রেপ্তার করিয়া কোতাে-
যালীতে লইয়া গিয়াছে জানিয়া, তিনিও তাঁহাদের সঙ্গী
হইবার জন্য কোতােয়ালীতে গিয়া হাজির হইলেন।
যখন দেশনায়কগণের বন্দী-গাড়ী কোতয়ালী
অভিমুখে যাইতেছিল, তখন পথের উভয় পার্শ্বস্থ
কোরিয়ানগণ দেশের জয়ধ্বনিতে চতুর্দিক বিকম্পিত
করিয়া তুলিল। জাপান কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী যে
ব্যক্তি কোরিয়ার স্বাধীনতার পতাকা রাখিবে, তাহার
প্রাণদণ্ড হইত; কিন্তু ঐ আইন কোরিয়াবাসী সে দিন
বিস্মৃত হইল, প্রত্যেক গৃহে এবং প্রত্যেকের হাতে
কোরিয়ার স্বাধীনতার পতাকা শােভা পাইতে লাগিল।
মানব ইতিহাসে এই অভিনব ঘটনা চিরস্মরণীয় হইবে
সন্দেহ নাই।
স্বাধীনভা-ঘােষণা-পত্রিকা
স্বাধীনতার ঘােষণাপত্র মহত্ত্বের ও উদারতার
পরিচায়ক ; স্বাধীনতার ভাবে উদ্বুদ্ধ তেজস্বী
কোরিয়াগণের নির্মল ও উচ্চ আদর্শের ইহা

কোরিয়া ৩৭ পরিচায়ক। ঘােষণার সারমর্ম নিয়ে প্রদত্ত হইল - “এতদ্বারা আমরা কোরিয়া দেশের এবং কোরিয়া- বাসীর স্বাধীনতা ঘােষণা করিতেছি। জগতে সকল জাতির তুল্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হউক এবং আমরাও আমাদের জন্মগত স্বাধীনতার অধিকার অক্ষুন্ন রাখিয়া, পরবর্তী বংশধরগণকে ইহার উত্তরাধিকারী করিতেছি। “ভগবানের শুভ ইচ্ছা আমাদের সহায় হউক। এই নূতন যুগে আমাদের পাঁচ সহস্র বৎসরের স্বাধীন ইতিবৃত্ত এবং একই ভাবে অনুপ্রাণিত দুইকোটী দেশ- বাসী আমাদের এই স্বাধীনতার ঘােষণা সমর্থন করিতেছে। স্বাধীনতা মানবজাতির ন্যায্য অধিকার। এই স্বাভাবিক অধিকার মুছিয়া ফেলিবার জিনিষ নহে; ন্যায়ত কেহ এই অধিকার ধ্বংস বা অপহরণ করিতে পারে না। “যখন সমগ্র মানব-জাতি নূতন মনুষ্যত্বের যুগে অগ্রসর হইতেছে, তখন শত শত বৎসর স্বাধীন জীবন যাপনের পর ভাগ্যবিপর্যয়ে আমরা সেই পুরাতন যুগেই পড়িয়া রহিলাম। বিগত দশ বৎসর ধরিয়া বিদেশী শাসনের দুর্বিসহ যন্ত্রণা আমরা হাড়ে হাড়ে পরাধীনের মুক্তি উপলব্ধি করিয়াছি। জীবনে সুখসুবিধা লাভের পন্থা হইতে আমরা বঞ্চিত হইয়াছি। কোরিয়া বিদেশীর কবলে পতিত হওয়ায় আমাদের সকল প্রকার স্বাধীন চিন্তা সঙ্কুচিত হইয়াছে, জাতীয় জীবনের সকল মৰ্যাদা হীনপ্রভ হইয়াছে এবং আধুনিক যুগের জ্ঞানবিজ্ঞান- বিকাশের সকল পথ এবং সকল সুবিধা আমাদের অবরুদ্ধ হইয়াছে। “বাস্তবিকই যদি অতীত যুগের দোষগুলি সংশােধন করিতে হয়, যদি বৰ্ত্তমান সময়ের দুর্বিসহ যন্ত্রণার অবসান করিতে হয়, যদি ভবিষ্যতে এই অত্যাচারের পুনঃ অবতারণা অসম্ভবে পরিণত করিতে হয়, যদি স্বাধীন চিন্তার পথ উন্মুক্ত করিতে হয় এবং স্বাধীনভাবে কাৰ্য্য করিবার অধিকার পুনঃ স্থাপন করিতে হয়, যদি পৃথিবীর অন্যান্য জাতির সহিত উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে হয়, যদি আমাদের ভাবী বংশধর- গণকে দুঃখপূর্ণ ঘৃণিত পরাধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিতে হয় এবং যদি তাহাদিগকে অবিচ্ছিন্ন সুখসৌভাগ্যের উত্তরাধিকারী করিতে হয়, তবে সৰ্ব্বাগ্রে কোরিয়াবাসীর পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করিতেই হইবে! যদি আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে দৃঢ় কোরিয়া అ সঙ্কল্প থাকে, তবে সত্যের জন্য, ন্যায়ের জন্য এক- সূত্রে গ্রথিত এই দুই কোটী কোরিয়াবাসী কি না করিতে পারে ? পৃথিবীতে এমন কোন্ শক্তিশালী জাতি আছে যে আমাদের উদ্দেশ্য সাধনে বাধা প্রদান করিতে পারে? এমন কোন্ কাৰ্য আছে যাহা আমাদের সাধ্যাতীত? “আমাদের প্রতি জাপানবাসীর অন্যায় ব্যবহার, আমাদের সভ্যতার প্রতি তাহাদের ঘৃণা প্রদর্শন অথবা তাহাদের স্বেচ্ছাচারিতা লইয়া আলােচনা করিবার আমাদের প্রবৃত্তি নাই। আমাদের দুরবস্থার জন্য আমরাই দায়ী। এখন কি অন্যের দোষানুসন্ধান করিয়া, আমাদের এই মূল্যবান সময় বিনষ্ট করা উচিত ? আমাদের বৃথা গতানুশশাচনায় ফল নাই। আমরা এখন ভবিষ্যতের সৌভাগ্যসৌধ নির্মাণে লাগিয়া যাইব ; আজ আমরা নিজেদের গৃহ সংস্কারে সকল শক্তি, সকল সামর্থ্য নিয়ােজিত করিব। কে আমাদের গৃহ ধ্বংস করিয়াছে, কি কারণে আমাদের এই শশাচনীয় অবস্থা হইয়াছে, সে বিষয় আলােচনা করিবার অবকাশ আমাদের নাই। সরল বিশ্বাসে ভবিষ্যতের আবর্জনা বিদূরিত করাই বর্তমানে ৪০ পরাধীনের মুক্তি আমাদের একমাত্র কর্তব্য। আমরা যেন অতীত দুঃখকাহিনী স্মরণ করিয়া, বিদ্বেষ ভাবাপন্ন অথবা হিংসাপরবশ না হই। “পাশব শক্তিতে অনুপ্রাণিত, ন্যায় এবং সত্য বিবর্জিত জাপান কর্তৃপক্ষকে আমাদের আচরণ এবং প্রভাব দ্বারা যেন ন্যায় এবং সত্যের পথে আনয়ন করিতে পারি। “কোরিয়াকে জাপান-সাম্রাজ্য ভুক্ত করিয়া, উভয় দেশের গুরুতর অনিষ্টই করা হইয়াছে এবং জাপান দ্রুতগতিতে অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচারিতার পথে অগ্রসর হইতেছে। এখন সৎসাহস, সরলতা, প্রকৃত সহানুভূতি এবং বন্ধুত্বের পবিত্র বারিধারা প্রবাহিত করিয়া, অতীত দুর্নীতি সমূহের উচ্ছেদ সাধন করতঃ জাপান ও কোরিয়াকে সমভাবে সুখশান্তির অধিকারী করাই প্রার্থনীয়। কোরিয়ার স্বাধীনতা কোরিয়াবাসীকে সুখ সম্পদ প্রদান করিবে সন্দেহ নাই, কিন্তু জাপান কর্তৃ- পক্ষকেও কূটনীতি এবং অসাধু পথ হইতে সরল মতি দান করিয়া, সুপথে আনয়ন করিবে। জাপান গৌরব- মণ্ডিত স্থলে অভিষিক্ত হইয়া, ‘পৃথিবীর পূর্বভাগের প্রকৃত রক্ষকরূপে বিরাজ করুক ; চীন-সাম্রাজ্য হইতেও *

কোরিয়া
৪১
জাপানী-ভীতি তিরােহিত হউক। আমরা নীচ ক্রোধ
পরবশ হইয়া কিছুই বলিতেছি না, সমগ্র মানব জাতির
সৰ্ব্ববিধ কল্যাণ সাধনই আমাদের আন্তরিক অভিলাষ।
“আমরা দিব্যচক্ষে এক নূতন যুগের আগমন
দেখিতেছি ; পাশব শক্তি তিরােহিত হইতেছে, ন্যায় এবং
সত্যের যুগ সমাগত। অতীত উৎপীড়ন ও স্বেচ্ছা-
চারিতার মধ্য হইতেই এই নূতন যুগ উৎপন্ন হইয়াছে,
আজ স্থানভ্রষ্ট সমুদয় পদার্থই আবার স্বস্থানস্থ হইবে,
আজ এই নব প্লাবনে আমরা স্বাধীনতার তরী ভাসাইব,
আর কালবিলম্ব করিব না, ভয়ও করিব না; এক মন
এক প্রাণ হইয়া, আজ সমগ্র কোরিয়াবাসী আমরা
তমসাচ্ছন্ন অতীত জীবন হইতে সত্যের আলােকময় এই
নূতন জীবন বরণ করিতেছি। শীতকালে প্রকৃতি
তসৌন্দৰ্য্য হইয়া, যেমন বসন্তের শুভাগমে, মলয় পবন
স্পর্শে আবার শ্যামলাঙ্গী হয়, সেইরূপ আমরাও এই .
জাতীয় জীবনের নব-বসন্তের জীবন সঞ্চারক স্পর্শে
অতীত জড়তা ত্যাগ করিয়া, গৌরবময় জীবন বরণ
করিব। পিতৃপিতামহের পুণ্য স্মৃতি আমাদের ভিতর
হইতে এবং জগতের সাধুশক্তিনিচয় বাহির হইতে
আমাদের উদ্দেশ্য সাধনে সহায় হইবে, এই আশায়

৪২
পরাধীনের মুক্তি
অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ হইয়া, আমরা সম্মুখে অগ্রসর
হইলাম।”
ঘঘাষণা পত্রিকার সর্বনিম্নে এই তিনটী কথার
উল্লেখ আছে :
১। “সমগ্র কোরিয়াবাসী স্বাধীনতা লাভ করিবার
জন্য ব্যাকুল এবং তাহাদের অনুরােধে ন্যায়, সত্য এবং
মনুষ্যোচিত জীবনধারণের জন্য, আমরা এই ঘােষণা পত্র
প্রকাশ করিলাম । কোন প্রকারে শান্তিভঙ্গ যেন
হয়।
২। “যাহারা আমাদের অনুবর্তী হইবেন তাহাদের
প্রত্যেকেই যেন সন্তুষ্ট চিত্তে সর্বদা সকল স্থানে ঐ কথা
স্মরণ রাখেন।
৩। “সকল কাৰ্যই যেন বিশিষ্ট শিষ্টাচারের সহিত
করা হয়, যেন শেষ পর্যন্ত আমাদের আচরণ ন্যায়সঙ্গত
বলিয়া সর্বত্র বিবেচিত হয়।”
কোরিয়ার প্রত্যেক সহরে এবং প্রত্যেক গ্রামে
সভাসমিতি করিয়া, একই সময়ে জনসাধারণের নিকট
স্বাধীনতার বার্তা ঘােষণা করা হইল। নূতন যুগ
আসিয়াছে বলিয়া, সর্বত্রই আনন্দোৎসব হইল।
কোরিয়ার নারীসম্প্রদায় দলে দলে উৎসবে যোগদান

কোরিয়া ৪৩ করিল। কোরিয়ান পুলিশগণ তাহাদের ‘চাপরাশ’ জাপান-সরকারকে ফিরাইয়া দিল। দেশকে লক্ষ্য করিয়া আজ সকল সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ মিলন হইল। এই জাতীয় আন্দোলনে বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করিবার বিষয় এই ছিল যে, সকলেই সৰ্ব্বতােভাবে 'সংযম রক্ষা করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল, কোন প্রকার শান্তিভঙ্গ হইল না। দেশ-নায়কগণ সর্বত্রই শান্তি রক্ষার জন্য তীক্ষ্ণ নজর রাখিলেন। একজন দেশ নায়ক কারারুদ্ধ হইলে, আর একজন তাহার স্থান সানন্দে পূরণ করিতেন, এইরূপে সকলেই শান্তি রক্ষা করিয়া চলিত। পাছে কোন প্রকারে শান্তি ভঙ্গ হয়, এই আশঙ্কায় দেশ-নায়কগণ ঘােষণা করিলেন—যে শান্তিভঙ্গ করিবে সে স্বাধীনতা, লাভ সুদূর পরাহত করিবে এবং তাহাকে দেশের ঘাের শত্রু বলিয়া বিবেচনা করা হইবে। কোরিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার পর কিছুকাল সভা- সমিতি বন্ধ রহিল। সভাসমিতি স্থগিত দেখিয়া, জাপান- কর্তৃপক্ষ স্বাধীনতার আন্দোলন উচ্ছেদ করিবার গুপ্ত আয়ােজন করিল, ভবিষ্যতে কোন সভাসমিতি যাহাতে আর না হইতে পারে এবং কোন সভা হইলে তাহা যাহাতে ভাঙ্গিয়া দেওয়া হয়, সে জন্য ৪৪ পরাধীনের মুক্তি হইল ; আদেশ আন্দোলনে যােগদান করিলেই তাহাকে গ্রেপ্তার করিবার হুকুম পুলিশকে দেওয়া হইল। জনতা বিতাড়িত করিবার জন্য জাপানী পুলিশগণকে লাঠি ও তরবারি দেওয়া হইল। নগরে জাপানী পুলিশ এই নূতন ক্ষমতায় শক্তিমান হইয়া, অচিরেই ইহা প্রয়ােগ করিল। সিউল একজন নিরস্ত্র কোরিয়াকে জাপানী পুলিশ রাস্তার পার্শ্বের ড্রেনে ফেলিয়া দিল এবং কয়েকজন কোরিয়ান জড় হইলে তাহাদিগকে বিতাড়িত করিয়া, ঐ হতভাগ্য কোরিয়ানের কান এবং আঙ্গুল কাটিয়া ফেলিল এবং শরীরের অন্যান্য স্থানে অস্ত্রাঘাত করিয়া, রাস্তায় ফেলিয়া রাখিয়া চলিয়া গেল। কয়েকজন কোরিয়া তাহাকে বহন করিয়া লইয়া গেল। ইহার কয়েকঘণ্টা পরই হত- ভাগার মৃত্যু হয় এবং সকল যন্ত্রণার হস্ত হইতে সে অব্যাহতি পাইল। ম্যাকেঞ্জি (Mackenzi) সাহেব একদিন এই ব্যক্তির ফটো যুক্তরাজ্যে তাহার তিন জন বন্ধুকে দেখাইয়াছিলেন। তৎপর দিন বন্ধুগণ তাহাকে বলিয়াছিল যে, পূৰ্ব্ব রাত্রে ঐ দৃশ্যের স্মৃতি তাহাদিগকে একটু সময়ের জন্যও নিদ্রা যাইতে দেয় নাই।

কোরিয়া ৪৫ কোরিয়ার সর্বত্রই সামরিক আইন জারি করা হইল এবং জাপানী পুলিশের অত্যাচারও বেশ চলিল, ইহার ফলে সকল বিদ্যালয় বন্ধ হইয়া গেল এবং দোকানী দোকান বন্ধ করিল। জাপান- কর্তৃপক্ষ ভীষণ আতঙ্ক-বহ্নি প্রজ্বলিত করিলেও কোরিয়াবাসী পশ্চাৎপদ হইল না। আন্দোলন পূর্ণবেগে চলিতে লাগিল। জাপান কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক ভাবে কাজকর্ম প্রচলনের আদেশ প্রদান করিল। অত্যাচারের ভয়ে বিদ্যালয় সমূহ খােলা হইল বটে, কিন্তু কোন ছাত্রই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইল না। দোকানদারগণকে দোকান খুলিবার হুকুম দেওয়া হইল, কিন্তু তাহারা দোকান খুলিল না। পুলিশের সাহায্যে দোকান খােলা হইল বটে, কিন্তু পুলিশ চক্ষুর আড়াল হইলেই দোকান বন্ধ করা হইত। পরে দোকান খােলা রাখিবার জন্য দোকানের সম্মুখে পুলিশ মােতায়ন রাখা হইল ; দোকানদার দোকান খােলা রাখিল বটে, কিন্তু ক্রয় বিক্রয় বন্ধ রহিল, কেননা কেহ জিনিষ ক্রয় করিতে আসিলে, দোকানী বলিত “দোকানে নাই।” কতিপয় সপ্তাহ পর্যন্ত এরূপ চলিল। ;

৪৬ পরাধীনের মুক্তি জাতীয় আন্দোলন বালক ও বালিকা বিদ্যালয় সমূহ খােলা হইলেও ছাত্রগণ বিদ্যালয়ে যোগদান করিল না। জাপান-সরকার ঘােষণা করিল যে, যে সকল ছাত্র বিদ্যালয়ে প্রত্যাবর্তন না করিবে, তাহাদিগকে উপাধি-পত্র প্রদান করা হইবে না। রাজ- ধানী সিউল নগরে উপাধি-বিতরণী সভায় ছাত্রগণকে উপস্থিত দেখিয়া মনে হইল যেন, তাহাদিগকে ঔষধে ধরিয়াছে ; কয়েকজন খ্যাতনামা জাপানী কৰ্মচারীও ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন। যথারীতি কাৰ্য চলিল এবং উপাধিপত্র বিতরণ করার পর, একটী শিষ্টাচারী ছাত্র বক্তৃতা দিতে অগ্রসর হইল ; ইহাতে জাপানী কর্মচারিগণ বড়ই আনন্দিত হইলেন। ছাত্ৰটী বক্ততার উপসংহার করিবার সময় পকেট হইতে কোরিয়ার স্বাধীনতার পতাকা বাহির করিয়া, ইতস্ততঃ সঞ্চালন করিল এবং উপস্থিত জাপানী কর্মচারিগণের বিস্ময় জন্মাইয়া বলিল—এই আমার শেষ বক্তব্য। জাপানী আইনে কোরিয়ার স্বাধীনতার পতাকা বহনকারীর প্রাণদণ্ডের কথা ছাত্রীর অজ্ঞাত ছিল না, কিন্তু ভয় আজ তাহার কাছেও আসিতে পারিল না। ছাত্রটির পতাকা সঞ্চালনের সঙ্গে সঙ্গে সমুদয় ছাত্রগণ কোরিয়া ৪৭ একসঙ্গে দণ্ডায়মান হইল এবং প্রত্যেকেই স্ব স্ব পকেট হইতে স্বাধীনতার পতাকা বাহির করিয়া, ইতস্ততঃ সঞ্চালন করিয়া, সমকণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল— ‘আমাদের দেশ ফিরাইয়া দাও, কোরিয়াবাসী দীর্ঘজীবী হউক। স্বাধীনতা, স্বাধীনতা ধ্বনিতে চতুর্দিক মুখরিত হইয়া উঠিল, সঙ্গে সঙ্গে উপাধি পত্রগুলি ছাত্রগণ ছিড়িয়া, একসঙ্গে সভামণ্ডপ হইতে চলিয়া গেল। রাজধানী সিউল নগরের বালক বালিকাগণ একসঙ্গে স্বাধীনতার আন্দোলনে যােগদান করিল। তাহারা একটী বিরাট সভা আহ্বান করিলে নিষ্কোষিত অসি হস্তে পুলিশ তাহাদিগকে আক্রমণ করিল এবং বালক বালিকা নির্বিশেষে দারুণ প্রহার করিয়া, তিন শত বালক এবং এক শত বালিকাকে গ্রেপ্তার করিল। পাদ্রি হাসপাতাল হইতে ১৫ জন ধাত্রী আহত বালক বালিকাগণের শুশ্রুষার জন্য আসিলে, তাহাদিগকেও গ্রেপ্তার করিল। এই পাদ্রিগণও আন্দোলনে যােগদান করিয়াছে, এই মর্মে স্বীকার উক্তি বাহির করিবার জন্য নানা প্রকারে জেরা করিয়া ধাত্রীগণকে ছাড়িয়া দিল। সর্বত্রই বালিকাগণ পূর্ণ উদ্যমে জাতীয় স্বাধীন- তার আন্দোলনে যােগদান করিল। পাদ্রি বালিকা ৪৮ পরাধীনের মুক্তি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী ভঁহার বিদ্যালয়ের বালিকাগণকে আন্দোলন হইতে প্রতিনিবৃত্ত করিবার জন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আদিষ্ট হইলেন; কিন্তু শিক্ষয়িত্রী পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করিয়া, একটী বালিকাকেও ফিরাইতে কৃতকার্য হইলেন না। বালিকাগণ স্বাধীনতার ব্যাজ পরিধান করিয়া এবং জাতীয় পতাকা উডডীন করিয়া, সহরময় ঘুরিতে লাগিল। তাহারা পুলিশকে গ্রেপ্তার করিতে বলিল এবং স্বাধীনতার ধ্বনিতে চতুর্দিক বিকম্পিত করিয়া তুলিল। অবশেষে সন্তুষ্ট হইয়া, সহর হইতে প্রত্যাবর্তন করিল। তাহাদিগের নায়ক বলিলেন,—“আমরা আমাদের কাৰ্য শেষ করিয়াছি ; আমাদের পুরুষগণ মেষের ন্যায় ছিল কাৰ্যারম্ভ বালিকা গণ করিল, এখন পুরুষগণ ঠিক্ ঠিক্ চলিবে।” ব্যক্তিগত সুখশান্তি জলাঞ্জলি দিয়া, কোরিয়ার সৰ্ব্বত্রই কর্মকুশল নির্ভীক নারী-সম্প্রদায় স্বাধীনতার আন্দোলনে যােগদান করিল, জাপান কর্তৃপক্ষের আদেশে যে সকল রমণী স্বাধীনতার আন্দোলনে যােগ- দান করিল, তাহাদিগকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করিয়া বেত্রাঘাত করা হইল এবং যত বেশী সম্ভব তাহাদিগকে কোরিয়া- বাসীর নিকট উলঙ্গ অবস্থায় রাখা হইত। ;

কোরিয়া
৪৯
নিরুপায় দেখিয়া , সহজে খেলা
খোলা না যায় এরূপ
নূতন ধরণের পােষাক রমণীগণ পরিধান করিলেন,
কিন্তু পশু শক্তির নিকট তাহাদের এ
এ চেষ্টা
ব্যর্থ হইল। অনেক রমণীর অদৃষ্টেই যে কি ভীষণ
নিৰ্যাতন ঘটিল, তাহা বলা দুঃসাধ্য। অত্যাচার ও
উৎপীড়ন অবাধ গতিতে চলিতে লাগিল। স্বীকার
উক্তি বাহির করিবার জন্য অনেক বালিকাকে ভীষণ
ভাবে প্রহার ও উৎপীড়ন করা হইল। যে সকল
বালিকাকে গ্রেপ্তার করিয়া বন্দিশালায় পাঠান হইত,
সেখানে তাহাদিগকে কারাগারের নিয়ম অনুসারে ঘণ্টার
পর ঘণ্টা হাটু গাড়িয়া থাকিতে হইত! বন্দী রমণী-
গণের উপর এমন পৈশাচিক অত্যাচার করা হইত যে,
বল প্রকাশে অত্যাচারের প্রতিকার করার মানসে টংচু-
নগরের ( Tonchu) অনেক কোরিয়া থানায়
জড় হইল।
একজন খৃষ্টান নায়ক অনেক কষ্টে
তাহাদিগকে শান্তি ভঙ্গ করিতে নিরস্ত করিলেন এবং
প্রধান পুলিশ কর্মচারীর নিকট প্রতিনিধি পাঠাইয়া,
প্রতিকারের চেষ্টা করিলেন; কিন্তু প্রতিনিধিগণকে
প্রধান পুলিশ কর্মচারী জানাইলেন যে, রমণীগণকে
উলঙ্গ করা জাপানী আইনে অনুমােদিত।
;
৪

পরাধীনের মুক্তি প্রতিনিধিগণ যখন পুলিশের প্রধান কর্মচারীর সহিত ভিতরে বসিয়া বন্দী-রমণীগণের বিষয় আলােচনা করিতেছিলেন, তখন বাহিরের জনতা এত উত্তেজিত হইল যে, অনেকেই চীৎকার করিয়া বলিল- “আমাদিগকেও বন্দী কর, নতুবা মহিলাগণকে মুক্ত কর।” জনতার মধ্যে এতাদৃশ উত্তেজনা দেখিয়া, প্রধান পুলিশ কর্মচারী চারিজন ভিন্ন সকল রমণীগণকে ছাড়িয়া দিতে স্বীকৃত হইলেন। এই রমণীগণের মধ্যে একজন যুবতী রমণীর উপর পুলিশ এমন জোরে পদাঘাত করিয়াছিল যে, যুবতীর চলিবার শক্তি ছিল না। ধরাধরি করিয়া তাহাকে লইয়া যাওয়া হইল। একজন খৃষ্টান শিক্ষকের পত্নীর উপরও দারুণ প্রহার করা হইল,তাহারও অন্যের সাহায্য ভিন্ন চলিবার শক্তি ছিল না। একজন প্রত্যক্ষদ্রষ্টা বলিয়াছেন—চলনশক্তিহীন অবস্থায় যখন এই রমণী- গণকে লইয়া যাওয়া হইতেছিল, তখন সমাগত জন- মণ্ডলীর সকলেই সকরুণ বিলাপ করিয়া উঠিয়াছিল এবং তাহাদের মধ্য হইতে কেহ কেহ চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিয়াছিল—এই অসভ্য বর্বরদের অধীনে থাকা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়।' তৎপর উত্তেজিত হইয়া অনেকেই

কোরিয়া
বলিল—“চল আমরা প্রধান পুলিশ কর্মচারীকে
আক্রমণ করি এবং উলঙ্গ করিয়া তাহাকে প্রহার করিতে
করিতে মারিয়া ফেলি। কিন্তু খুষ্টান প্রবীণ নায়কগণ
তাহাদিগকে শান্তিরক্ষা করিতে বাধ্য করিলেন।
পুলিশের অত্যাচার হইতে কোরিয়ার কেহই
বাদ গেল না ; ধনী, দরিদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ভদ্র,
ইতর, ইহাদের কেহই লাঞ্ছনা ও নিগ্রহের হাত এড়াইতে
পারিল না। বিশ জন উচ্চশিক্ষিত এবং পদস্থ কোরিয়া
প্রধান শাসনকর্তার নিকট পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রিত
করিবার জন্য আবেদন করিলেন, কিন্তু তাহাদিগকে
উক্ত আবেদন সহ থানায় উপস্থিত হইতে বলা হইল।
থানায় উপস্থিত হইবা মাত্র তাহাদিগকে গ্রেপ্তার করা
হইল। ভাইকাউন্ট কিম্ এবং
কিম্ এবং ভাইকাউন্ট, লী
( Viscount Kim and Viscount Li) 9999
প্রসিদ্ধ সম্রান্ত ভদ্রলােক। কিম্ ৮৫ বৎসরের বৃদ্ধ, দুর্বল
এবং উত্থানশক্তি রহিত ছিলেন। তিনি সর্বদাই
জাপানীগণের প্রতি সৌম্যভাব পােষণ করিতেন।
১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে তিনি সম্রাটকে কোরিয়ায় জাপানীগণের
প্রবেশের নিষেধ আজ্ঞা প্রত্যাহার করিতে অনুরােধ
করিয়াছিলেন। লী একজন বিশেষ সম্মানিত শান্ত

পরাধীনের মুক্তি ভাবাপন্ন বিশিষ্ট ভদ্রলােক ছিলেন। কিম্ এবং লী উভয়কেই গ্রেপ্তার করা হইল। ৮৫ বৎসরের চলন- শক্তিহীন বৃদ্ধ কিম্ দুই বৎসরের কারাদণ্ডের আজ্ঞা পাইলেন, লী পাইলেন ১৮ মাসের ! কোরিয়ার সর্বত্রই নির্মম ভাবে নির্যাতন এবং ধরপাকর চলিতে লাগিল ; এক সঙ্গ চু (Song chou) সহরেই ত্রিশ জন কোরিয়াকে হত্যা এবং দুই শত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেক স্থলেই গির্জাসকল ভস্মীভূত হইল এবং পাদ্রিগণকে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করা হইল। স্বাধীনতা ঘােষণা করিবার এক পক্ষ মধ্যে শুধু সিউল নগরে সহস্রাধিক কোরিয়াকে গ্রেপ্তার করা হইল। সরকারী হিসাবে প্রকাশ যে, ১৯১৯ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসের প্রথম তারিখ হইতে জুন মাসের উনিশ তারিখের মধ্যে এক লক্ষ ৬৬ হাজার ৮৩ জন কোরিয়াকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছিল এবং ইহাদের মধ্যে ৮ হাজার ৩ শত ৫১ জনকে দণ্ডিত করা হইয়াছিল। কারাগারে বন্দীদিগকে যে উৎকট নিগ্রহ সহ করিতে হইত, কারাগার হইতে প্রত্যাগত বন্দীদিগের শরীরের কাল চিহ্নই তাহার নিদর্শন।

কোরিয়া উচ্চপদস্থ একজন মার্কিনবাসী কোরিয়ায় থাকিয়া, তৎকালীন অত্যাচার কাহিনী প্রসঙ্গে বলিয়াছেন—“আমার বাসস্থানের সন্নিকটেই দিনের পর দিন কোরিয়াগণকে প্রহার করা হইত। কাষ্ঠফলকে হতভাগ্যগণকে বাঁধা হইত, পরে উলঙ্গ করিয়া প্রহার করা হইত। দারুণ প্রহারে সংজ্ঞাহীন হইলে, চোখে মুখে শীতল জল প্রদান করা হইত এবং সজ্ঞান হইলে পুনঃ প্রহার চলিত। কোন কোন সময়ে এইরূপ অনেকবার চলিত। আমি বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হইয়াছি যে,অনেকের হাত পা ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইয়াছে, অনেক স্ত্রী, পুরুষ, বালক, বালিকাগণকে গুলি করিয়া হত্যা করা হইয়াছে এবং সঙ্গিন-বিদ্ধ করা হইয়াছে। এইরূপে সাত সপ্তাহের মধ্যে অস্ত্রবিহীন সহায়বিহীন প্রায় দুই সহস্র স্ত্রী, পুরুষ, বালক ও বালিকাকে হত্যা করা হইয়াছে; কিন্তু এই ভীষণ অত্যাচারের মধ্যে কোরিয়াবাসীর উদ্যম, সহনশীলতা, সংযম এবং বীরত্ব আমাকে স্তম্ভিত করিয়াছে।” “স্বাধীন সংবাদ” নামে একখানা সংবাদ পত্র গুপ্ত- ভাবে মুদ্রিত হইয়া, কোরিয়ার সর্বত্র বিতরিত হইতে লাগিল। কর্তৃপক্ষ শত চেষ্টা করিয়াও কোথায় ইহা

৫৪
পরাধীনের মুক্তি
মুদ্রিত হইত, তাহার সন্ধান করিতে পারিল না।
কর্তৃপক্ষ পুনঃ পুনঃ প্রচার করিল যে,এই স্বাধীন সংবাদ
প্রকাশকগণকে ধৃত করা হইয়াছে। কিন্তু এ সংবাদ
প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন সংবাদ’ আর এক খণ্ড
বাহির হইত।
কোরিয়ার অবস্থা এত গুরুতর হইয়া উঠিল যে,
জাপানসম্রাট কোরিয়াস্থ প্রধান শাসনকর্তাকে রাজধানী
টোকিওতে ( Tokyo ) ডাকিয়া পাঠাইলেন। কোরিয়া
সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা করা যাইতে পারে তাহার আলােচনা
হইল। জাপান সাম্রাজ্যে স্বায়ত্ত শাসন অসম্ভব দেখাইয়া
গভর্ণর অধিক জাপানী সৈন্য প্রেরণ এবং কঠোর নীতি
অবলম্বন করিবার পরামর্শ প্রদান করিলেন। পরামর্শ
গৃহীত লইল এবং কোরিয়ায় এই মর্মে আদেশ
প্রচার করা হইল যে, যে ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিবর্তন
আনয়নের জন্য চেষ্টা করিবে, তাহাকে দশ বৎসর
কারাদণ্ড ভােগ করিতে হইবে। এই নূতন নিয়ম
অনুসারে যাহাদিগকে অনেক পূৰ্বে গ্রেপ্তার করা
হইয়াছিল, তাহাদিগকেও দণ্ড প্রদান করা হইল।

কোরিয়া
শাসন-পদ্ধতি প্রণয়ন ও প্রচার
,
অমানুষিক নির্যাতনে নিপীড়িত হইয়াও কোরিয়া-
বাসী অদম্য উৎসাহের পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া, ১৯১৯
খৃষ্টাব্দের ২৩শে এপ্রিল শাসনপদ্ধতি প্রণয়ন করিল।
১৩টি প্রদেশ হইতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হইয়া একত্রিত
হইলেন এবং তাহারা শাসন-পদ্ধতি প্রণয়ন করিলেন।
সিঞ্জম্যান্ রী স্বাধীনতার ব্ৰত বহু পূৰ্ব্ব হইতে গ্রহণ
করিয়া, দেশসেবায় নিযুক্ত ছিলেন এবং তিনি যুক্তরাজ্যে
কোরিয়ার জন্য প্রচারকার্য করিয়া আসিতেছিলেন ;
প্রতিনিধিগণ তাহাকে
তাহাকে প্রথম সভাপতিত্বে বরণ
করিলেন। প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য প্রথমতঃ
তাহারা অস্থায়ীভাবে শাসন-পদ্ধতি প্রণয়ন করিলেন।
ইহা দ্বারা শিক্ষা, শিল্প এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্ত্রী,
পুরুষ সকলেই সমান অধিকার পাইবে ; সকলেই স্বাধীন
ভাবে ধর্মানুসরণ করিতে পারিবে ; কথা বলিবার,
লিখিবার ও তাহা প্রকাশিত করিবার পূর্ণ স্বাধীনতা
সকলের থাকিবে, সাধারণ সভা-সমিতি করিবার
ও সঙ্ঘ সংগঠন করিবার অধিকার সকলেরই বিদ্যমান
থাকিবে। আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ (League of Nations)

পরাধীনের মুক্তি কর্তৃক উপেক্ষিত হইলেও ঐ সঙ্ঘের সভ্যশ্রেণী ভুক্ত হইবার অভিলাষও ইহা দ্বারা ঘােষণা করা হইল। ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিরুদ্ধে সৈন্যশ্রেণী ভুক্ত করিবার ক্ষমতা ইহা দ্বারা স্বীকৃত হইল। স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘােষণাবলীর কিয়দংশ নিম্নে উদ্ধত করা হইল :- “কোরিয়াবাসী আমরা প্রায় চারি হাজার দুইশত বৎসরের অধিককাল হইতে পৃথক দেশ হিসাবে স্বাধীনতার সুখসম্ভোগ করিয়া আসিতেছি, আমাদের সভ্যতাও উন্নতশীল এবং আমরা শান্তিপ্রিয় জাতি। জগতের জ্ঞানালােকের অংশিদার হইবার এবং মানব- জাতির সর্ববিধ কল্যাণ সাধনের অধিকার আমরা দাবী করিতেছি। আমাদের সভ্যতাও সমুজ্জ্বল এবং পুরাতন ; জাতীর স্বাভাবিক তেজস্বিতা প্রযুক্ত, আমরা অমানুষিক ও অস্বাভাবিক ভাবে পীড়িত ও অত্যাচারিত হইলেও পরাধীনতা স্বীকার করিব না। আমরা জাতীয় বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট করিয়া, অন্য জাতির সহিত সংমিশ্ৰিতও হইব না। আসুরিক ও জড় ভাবাপন্ন জাপানবাসীর অধীনতা কোন প্রকারেই আমরা স্বীকার করিব না, জাপানের সভ্যতা আমাদের সভ্যতা হইতে দুই সহস্র বৎসরের আধুনিক ।

কোরিয়া
“জগৎবাসী জানে যে, জাপান প্রতিশ্রুতি প্রদান
করিয়া, অতীত সন্ধি ভঙ্গ করিয়াছে এবং আমাদিগকে
বাঁচিয়া থাকিবার অধিকারটুকু হইতেও বঞ্চিত
করিয়াছে। সে যাহা হউক, আমাদিগের উপর জাপা-
নের অত্যাচার, অথবা তাহাদের পুঞ্জীভূত পাপের বিষয়
আমরা অালােচনা করিব না। যাহাতে আমরা বাঁচিয়া
থাকিতে পারি, স্বাধীনতা ও সাম্য প্রচার করিতে পারি,
ভবিষ্যতে সত্য ও মনুষ্যত্বের দাবী নিরাপদ করিতে পারি
এবং সমগ্র পৃথিবীর কল্যাণ সংবর্ধন করিতে পারি,
সেই জন্যই আমরা কোরিয়াবাসীর স্বাধীনতা ঘােষণা
করিতেছি।
“আমরা সভ্যতার দাবী ও অধিকার রক্ষার
আমাদের উপর জাপান বর্বর পশুশক্তি
প্রয়ােগ করিয়া, নির্যাতনে জর্জরিত করিতেছে ;
মানবজাতি কি প্রকারে তাহা নীরবে চাহিয়া দেখিবে ?
দুই কোটী কোরিয়াবাসীর অচল দেশ-ভক্তি নিষ্ঠুর
অত্যাচারে বিলুপ্ত হইবার নহে। যদি জাপান অনুতপ্ত
এবং সংশােধিত না হয়, তবে ভবিষ্যতে কোরিয়াবাসী
নীরবে যাতনা সহ্য করিবে না। কোরিয়াবাসীর এক
জনও জীবিত থাকা পর্যন্ত জীবনের শেষ রক্তটুকু
জন্য
;
;

৫৮ পরাধীনের মুক্তি দিয়া কোরিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা করিবে। হৃদয়ের ভক্তি, সংকল্পের একাগ্রতা, কর্মের নিষ্ঠা দ্বারা দেশ- সেবায় ব্ৰতী আমরা জগতের সম্মুখে আমাদের স্বাধীনতা এবং জাতীয় বৈশিষ্ট্য মুক্তকণ্ঠে ঘােষণা করিতেছি।” উপসংহার বহুদিন পর্যন্ত কোরিয়া স্বাধীনতা লাভ করিবার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করিয়াও স্বাধীনতা লাভ করিতে পারে নাই এবং জাপানের স্বেচ্ছাচারিতায় উৎপীড়িত হইলেও হইলেও তাহাদের স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্খ নিৰ্বাপিত হয় নাই। তাহারা দেশকে মুক্ত করিবার আশা পােষণ করিয়া আসিতেছে। কোরি- য়ার যুবক এবং যুবতীগণ দেহ এবং মনের শক্তি বৃদ্ধি করিবার জন্য অধ্যাবসায় সহকারে কঠোর সংযম অবলম্বন করিয়াছে। তাহাদের উদ্দেশ্য-বিদ্রোহ করিয়া কোরিয়া মুক্ত করিবার জন্য সর্বোতােভাবে প্রস্তুত হওয়া। যে সকল কোরিয়ান্ যুবক বিদেশে অধ্যয়ন করিতেছে, তাহারা প্রায় সকলেই স্বাধীনতার জন্য বদ্ধপরিকর। কোরিয়ায় এরূপ যুবক ও যুবতীর সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ হইবে।

কোরিয়া
ভারসেলিসের ( Versailles ) সন্ধিতে
কোরিয়ার ভাগ্যে কিছুই মিলিল না, তখন কোরিয়া-
বাসী স্পষ্টই বুঝিল যে, তাহাদের দেশের উদ্ধার
তাহাদের নিজেদেরই হাতে এবং এইভাবে অনুপ্রাণিত
হইয়াই তাহারা ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে জাপানের বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ করিয়াছিল, যদিও এই বিদ্রোহে তাহারা
সিদ্ধকাম হইতে পারে নাই, তথাপি ইহাতে স্পষ্ট
প্রতীয়মান হয় কোরিয়াবাসীর স্বাধীনতার
আকাঙ্খ মন্দিভূত না হইয়া, বরং ক্রমশঃই প্রবল
হইতেছে। জাপান ইহা লক্ষ্য করিয়াই কোরিয়া শান্ত
করিবার জন্য কোরিয়াবাসীকে পত্রিকাদি প্রকাশ
এবং সভঘ করিবার অধিকার প্রদান করিয়াছে।
কোরিয়ার বর্তমান স্বাধীনতার আন্দোলনকে
প্রধানতঃ তিন ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে :-
১। জাতীয় দল (Nationalist Party)—জাপান
এই দলকে বে-আইনী সঙ্ঘ বলিয়া ঘােষণা করিয়াছে।
ইহারা ১৯১৯ খৃঃ অব্দে সাংঘাইতে ( Shanghai )
অস্থায়ীভাবে শাসন প্রণালী প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে এবং
চায়নার দক্ষিণ গবর্ণমেন্টের অনুমােন পাইয়াছে।
সাংঘাইতে এই দলের পত্রিকা প্রকাশিত হইতেছে।

পরাধীনের মুক্তি
;
২। সমাজতন্ত্রবাদী দল ( Socialist Party)
ইহারা অধিক প্রকাশ্য ভাবে কাজ করিতে পারে,
এই দল জাপানে দোষী বলিয়া স্থির হয় নাই।
৩। কমিউনিষ্ট দল (Coininunist Party )
ইহাদের প্রধান আচ্ছা ব্লাডিভকটে; এখানেই
তাহাদের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা রুযিয়ার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত
হইতেছে। ইহাদের কর্মক্ষেত্র সীমাবদ্ধ।
বর্তমানে কোরিয়ার বিদ্রোহ করিবার পক্ষে প্রধান
অন্তরায় মাঞ্চুরিয়াস্থ ( Manchuria) জাপানী
প্রতিপত্তি। মাঞ্চুরিয়ার শাসনকর্তা চ্যাং-সাে-লিন্
(Chang Tso-Lin) জাপানের একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ।
সুতরাং তিনি কোরিয়াবাসীর উপর অমানুষিক অত্যা-
চার ও উৎপীড়ন করিয়া আসিতেছেন, কোরিয়াবাসী
বর্তমান চায়নার বিদ্রোহে চ্যাং-সাে-লিনের পতন একান্ত
মনে কামনা করিতেছে। কারণ চ্যাংএর পতন হইলে,
মাঞ্চুরিয়া কোরিয়ার বিদ্রোহের কেন্দ্র হইতে পারিবে
এবং সেখান হইতে ভালমত প্রচারকার্য করিবার
বিশেষ সুবিধা হইবে।
কোরিয়ার অন্তর-চিত্র মনে রাখিয়া বিচার করিতে
গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী চীন এবং রুধিয়ার ক্ষমতা উচ্ছেদের

কোরিয়া প্রয়াস জাপানের পক্ষে স্বাভাবিক। কোরিয়ার শাসক এবং অভিজাত সম্প্রদায় এত দুর্নীতিপরায়ণ এবং হীন চরিত্রের ছিল যে, কোরিয়ায় জাপানের কঠোর শাসন চালাইতে কোন অসুবিধাই হয় নাই। কোরিয়ায় জাপান যথেষ্ট অত্যাচার করিয়াছে বটে, কিন্তু জাপান- সাম্রাজ্যভুক্ত হইয়াই যে, কোরিয়ার জনসাধারণ অনেকটা স্বস্তি লাভ করিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। অবশ্য সুশাসন কখনই স্বায়ত্তশাসনের তুল্য হইতে oftascal -Good Government is no substitute for self-governinent. প্রকৃত পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাধীন না হইলে কোন জাতিই জ্ঞানে, বিজ্ঞানে,স্বাস্থ্যে, নীতিতে, শিল্পে,বাণিজ্যে উৎকর্ষ লাভ করিতে পারে না। সমগ্ৰ প্ৰাচ্যখণ্ডে একমাত্র জাপানই ইউরােপীয় জাতি সমূহের সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রাচ্যের দুর্বল জাতি সমূহের ভরসাস্থল। যুক্তরাজ্য অনেক ক্ষুদ্র দুর্বল জাতির স্বাধীনতা লাভ করিতে সহায়তা করিয়া, সর্বত্র মহিমান্বিত হইয়াছে। আমরাও আশা করি যুক্তরাজ্যের উদারতা জাপানকে বেশীদিন পশ্চাতে ফেলিয়া রাখিতে পারিবেনা। এশিয়ার জাতি সমূহের স্বাধীনতা লাভে

পরাধীনের মুক্তি
কাৰ্যতঃ সহায়তা করিয়া, জাপান এসিয়ায় জাতি-
সদ্য গড়িয়া তুলিতে বদ্ধপরিকর হইলে, জাপান যে
একদিন সকলেরই প্রাতঃস্মরণীয় হইবে তাহাতে বিন্দু
মাত্রও সন্দেহ নাই। কোরিয়া জাপানের উদারতা
প্রদর্শনের ক্ষেত্র হউক-কোরিয়ার স্বাধীনতা ফিরাইয়া
দিয়া, জাপান কোরিয়াবাসীর অন্তর জয় করিয়া লউক।
এসিয়ার জাতিসমূহ সঙ্ঘবদ্ধ হইয়া, যাহাতে মহাশক্তির
কেন্দ্ররূপে পরিণত হইতে পারে, জাপান তাহার সহায়তা
করিয়া, সমগ্র এসিয়াখণ্ডের মহতী কল্যাণ সাধনে
অগ্রসর হউক।
ফুট

হাঙ্গারী
অষ্টিয়ার সহিত মিলন
বহুপূর্ব হইতে হাঙ্গারী সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবন যাপন
করিয়া আসিতেছিল, কিন্তু মুসলমান আক্রমণের ভয়ে
ভীত হইয়া, ১৫২৬ খৃঃ অব্দে অষ্ট্রিয়ার হাসবার্গ বংশের
রাজগণের সাহায্য লইতে বাধ্য হয় ; তদবধি হাঙ্গারী
অষ্ট্রিয়ার সহিত মিলিত লইল, কিন্তু এই মিলনের
বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে,-উভয় দেশই স্ব স্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষা
করিয়া পরস্পর স্বাধীন ও তুল্য জাতিরূপে বিদ্যমান
থাকিবে। এইরূপে সংবদ্ধ হইয়া, অষ্ট্রিয়া ও হাঙ্গারী
বিদেশী শত্রুর আক্রমণ হইতে দেশ রক্ষা করিত এবং
উভয় দেশের মঙ্গল সাধন করিয়া চলিতে লাগিল।

৬৪
পরাধীনের মুক্তি
উভয় দেশের প্রতিনিধি লইয়া অষ্ট্রিয়ার রাজধানী
ভিয়েনাতে (Vienna) একটি মন্ত্রণাসমিতি গঠিত
হইয়াছিল। এই সমিতির পরামর্শ অনুসারে অষ্ট্ৰীয়
সম্রাট সমুদয় রাজকীয় কার্য পরিচালনা করিতেন।
ক্রমে হাঙ্গারীর অভিজাত প্রতিনিধিগণ বিলাসপ্রিয়
হইয়া উঠেন এবং নিজ দেশের স্বাধীনতার প্রতি
উদাসীন হইলেন। সুখশান্তির স্রোতে গা ঢালিয়া
দিয়া তাহারা আত্মমর্যাদা বিস্মৃত হইতে লাগিলেন।
বিলাসপ্রিয় এই প্রতিনিধিগণ তখন জানিতেন না যে,
তাহাদের ঔদাসীন্য, হাঙ্গারীর মঙ্গল সাধনে তাহাদের
শৈথিল্য, হাঙ্গারীর ভবিষ্যৎকে কি নিদারুণ বিষাদের
তুলিতে আকিতেছে ।
আভ্যন্তলীন অবস্থা
বহুশতাব্দী পূৰ্ব্ব হইতে হাঙ্গেরীতে বিভিন্ন জাতি
বসবাস করিয়া আসিতেছিল। এই বিভিন্ন জাতির
মধ্যে অভিজাত “মাগীয়া” (Magyars) সম্প্রদায়
সকল প্রকার রাজনৈতিক সুখ সুবিধা একচেটিয়া
করিয়া লইয়াছিল। হাঙ্গেরীর শ্লাভ, ক্ৰট প্রভৃতি
অন্যান্য জাতিকে অত্যন্ত হীন ও অবজ্ঞার চক্ষে ইহারা

হাঙ্গারী দেখিত; অভিজাত সম্প্রদায় সকল সুবিধা ভােগ করিয়াও কখন কোন কর প্রদান করিত না এবং আপনাদের এই সুবিধার উপর কোন প্রকার হস্তক্ষেপই ইহারা সহ্য করিতে পারিত না ; পক্ষান্তরে এই অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্ষমতার সঙ্কোচ সাধন করিতে না পারিলে, হাঙ্গারীর অপরাপর জাতির উত্থান সম্ভবপর নহে। সুতরাং হাঙ্গারীকে সংবদ্ধ ও শক্তিশালী করিয়া তুলিতে হইলে, পরিবর্তন-বিরােধী অভিজাতগণের ক্ষমতার সঙ্কোচ করিতেই হইবে এবং এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনমত সৃজন করা বিশেষ আবশ্যক। সাধারণকে বুঝিতে দিতে হইবে যে, তাহারাও রাজনৈতিক সুখ সুবিধা ভােগের অধিকারী। এদিকে অষ্ট্ৰীয় সম্রাটগণ হাঙ্গারীর প্রতিনিধিগণের দেশাত্মবােধের অভাব লক্ষ্য করিয়া ক্রমে তাহাদের মতামত উপেক্ষা করিয়া চলিতে লাগিলেন। এইরূপে কিছুকাল অতীত হইলে, অষ্ট্রীয় সম্রাট তাহাদের আত্ম- মৰ্যাদা-বােধহীনতার পূর্ণ সুবিধা গ্রহণে সচেষ্ট হইলেন এবং ক্রমে হাঙ্গারীকে পরাধীন দেশ বলিয়া মনে করিতে ও তদনুরূপ ব্যবহার করিতেও কুণ্ঠিত হইলেন না। এইরূপে সময় চলিয়া যাইতে লাগিল।

পরাধীনের মুক্তি
অবশেষে অষ্ট্রিয়া হাঙ্গারীকে প্রকাশ ভাবে অধীনতা
শৃঙ্খলে বিজড়িত করিবার জন্য ছিদ্র খুঁজিতে লাগিল।
সুযােগও সহজেই মিলিল–অষ্ট্রিয়ার স্বেচ্ছাচারিতার
উচ্ছেদকল্পে হাঙ্গারীর এক সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্র ধরা
পড়িল। অষ্ট্রিয়া উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গেল। ষড়-
যন্ত্রকারী নেতাগণ ধৃত হইলেন এবং বিচারে তাহাদের
প্রাণদণ্ডের আদেশ হইল! হাঙ্গারীর জাতীয় সমিতি
বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল এবং সঙ্গে সঙ্গে হাঙ্গারীকে
প্রকাশ্যভাবে অষ্ট্রিয়ার অধীন বলিয়া ঘােষণা করা হইল।
জাগ==
হাঙ্গারী নিজের জাতীয়-সমিতি পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিয়া,
উহা রক্ষা করিতে যত্নশীল হইল ; অষ্ট্রিয়া কিন্তু ঐ
সমিতির অস্তিত্ব আদৌ গ্রাহ্য করিল না। অষ্ট্ৰীয়
সম্রাট হাঙ্গারী প্রদেশ হইতে সৈন্য সংগ্রহ করিতে চেষ্টা
করিলেন; কিন্তু হাঙ্গারীর জাতীয় সমিতি সৈন্য সংগ্রহে
বাধা প্রদান করিয়া বলিল,—‘একমাত্র হাঙ্গারীর প্রতি
নিধি সভাই হাঙ্গারীতে সৈন্য সংগ্রহ করিতে সক্ষম,
অন্যের এইরূপ সৈন্য সংগ্রহ করিবার কোন ক্ষমতা
নাই। এই সভা অষ্ট্ৰীয় সম্রাটকে হাঙ্গারীর রাজা
বলিয়া গ্রহণ করিতে আদৌ রাজি হইল না।
•

হাঙ্গারী ৬৭ ; অষ্ট্ৰীয় সম্রাট পাঁচ বৎসর পৰ্যন্ত নিজের ‘জি’ চালাইলেন, কিন্তু আত্মসম্মান বােধে উদ্বুদ্ধ জাতির সম্মুখে ‘জি’ আর টিকিল না, সুতরাং হাঙ্গারীর প্রতিনিধি সভা আহ্বান করা হইল। এই সভায় ‘মন্থরপন্থী দল’ ( Moderates ) সংখ্যায় অধিক ছিল। তাহাদের অনেকেই অষ্ট্ৰীয় আবহাওয়ায় আত্মসম্মান- বােধ হারাইয়াছিল ; হাঙ্গারীর ভাষাও তাহাদের নিকট হীন বলিয়া প্রতীত হইত, তাই জাতীয় সমিতিতে অষ্ট্ৰীয় ভাষায় কাৰ্যাদি আলােচনা করিতে তাহারা অধিক গৌরব বােধ করিত। একজন হাঙ্গারীর যুবক এই সভায় স্বীয় মাতৃভাষায় সকলকে সম্ভাষণ করিলে, অনেক বৃদ্ধ সভ্য বিরক্তি প্রকাশ করিল, কিন্তু মাতৃ- ভাষায় দেশ-প্রীতি-ভাবােদ্বীপক বক্তৃতা শ্রবণ করিয়া, উপস্থিত যুবকবৃন্দ তাহার ভূয়সী প্রশংসা করিলেন এবং স্বাধীনতার ভাবে উদ্বুদ্ধ হইলেন। পুনঃ পুনঃ অনুরুদ্ধ হইলেও ঐ যুবক কোন নেতৃত্বের পদ গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হইলেন না ; কিন্তু তিনি স্বকীয় শক্তি ও চিন্তা দ্বারা হাঙ্গারীতে সুশিক্ষা বিস্তার, কৃষিকাৰ্য ও শিল্পের সর্ববিধ উন্নতি সাধন করিতে প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তস্থাপিত ‘জাতীয় বিজ্ঞান পরাধীনের মুক্তি মন্দির’ অদ্যাবধি হাঙ্গারীতে শিক্ষাকেন্দ্ররূপে গৌরব- ন্বিত। এই যুগের হাঙ্গারীর নেতৃবর্গের মধ্যে ফ্রান্সিস্ ডি ( Francis Deak) এবং লুই কছুথ, (Louis Kassouth) সৰ্ব্ব প্রধান ছিলেন। এই নেতৃদ্বয়ের ত্যাগ, একনিষ্ঠা ও স্বদেশানুরাগ ভঁহাদিগকে প্রাতঃ- স্মরণীয় করিয়া রাখিয়াছে। শক্তিমান অস্ত্রীয় সম্রাটের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইবার বিষয় মন্থরপন্থীদের সহিত ফ্রান্সিস্ ডিকের কথােপ- কথন হইতে তাহার তেজস্বিতারবিশেষ পরিচয় পাওয়া যাইবে - মন্থরপন্থী—তামরা কি করিতে পারি ? অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে আমরা কোন ক্রমেই পারি না। কাজেই অষ্ট্ৰীয় সম্রাট অনুগ্রহ করিয়া শাসন-সংরক্ষণ হিসাবে যে সুবিধাটুকুই দেন না কেন, তাহাই গ্রহণ করিয়া সন্তুষ্টচিত্তে উহার সদ্ব্যবহার করা সমীচীন নয় কি ? ডি—আপনাদের পিতৃপিতামহের নিয়ম কানুন অষ্ট্ৰীয় সম্রাট ধ্বংস করিয়াছে। তবু আপনারা একেবারে চুপ ? হায়, হায়, যে দেশের লােক ন্যায়ের মন্তকে

হাঙ্গারী
পদাঘাত হইলেও মাথা তুলিতে সাহসী নহে, সে
দেশের কি ভীষণ দুরবস্থা ! তাহারা চুপ থাকিয়া,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ না করিয়া, নিজেদের
দাসত্ব-শৃঙ্খল দৃঢ় করে মাত্র। যে জাতি মাথা পাতিয়া
অন্যায় ও অত্যাচার গ্রহণ করে সে জাতির ধ্বংস
অবশ্যম্ভাবী।
জাতীয় শিক্ষা প্রতিরোধ ও তাহার পরিণতি
১৮৩৬ খৃষ্টাব্দে হাঙ্গারীর মহা-সমিতি (Diet )
জাতীয় শিক্ষা বিস্তারের সুবন্দোবস্ত করিতে চাহিলে,
অষ্ট্ৰীয় সম্রাট তাহাতে বাধা প্রদান করিলেন।
জাতীয় শিক্ষা বিস্তারের প্রস্তাব অষ্ট্ৰীয় সরকার কর্তৃক
প্রতিরুদ্ধ হইলেও জাতীয় দলের বিশেষ কোন অসুবিধা
হইল না।
পক্ষান্তরে এই উপলক্ষে দেশে
আন্দোলন আরম্ভ হয়, তাহাতেই জাতীয় ভাব
উদ্ভবের সূত্রপাত হইল। অষ্ট্ৰীয় সরকার কর্তৃক জাতীয়
শিক্ষা বিস্তার প্রতিরােধের সংবাদ এবং এই শিক্ষা
সম্বন্ধে সরকারের ব্যঙ্গোক্তি কছুথ, কাগজে লিথো
করিয়া দেশময় প্রচার করিলেন, ইহাতে দেশব্যাপী

৭০
পরাধীনের মুক্তি
উত্তেজনার স্রোত প্রবাহিত হইল ; ফলে সম্রাট ভীত
ও চঞ্চল হইয়া উঠিলেন।
জনপ্রিয় উদীয়মান কছুথকে সরকার স্বপক্ষে
আনিবার জন্য একটি উচ্চপদ প্রদান করিবার প্রস্তাব
করিল, কছুথ, বিরক্তির সহিত উহা প্রত্যাখ্যান
করিলেন।
জাতীয় নেতৃগণকে প্রলােভনের জালে ধৃত করিতে
ব্যর্থ মনােরথ হইয়া অষ্ট্ৰীয় সরকার দণ্ডনীতির অবতারণা
করিল এবং হাঙ্গারীর নায়কগণকে গ্রেপ্তার করিল,
কছুথ ও বাদ গেলেন না। অবশেষে বিচারের একটা
প্রহসন করিয়া, অধিকাংশেরই সশ্রম কারাবাসের
ব্যবস্থা করা হইল এবং সঙ্গে সঙ্গে হাঙ্গারীর জাতীয়
মহাসমিতি ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইল। কছুথ, কারাগারে
থাকিয়া হাঙ্গারীর ভবিষ্যৎ কল্যাণ ভাবিতে লাগিলেন।
তিনি ইংরাজি ভাষা শিক্ষার বিশেষ প্রয়ােজন মনে
করিয়া উহা শিক্ষা করিতে আত্মনিয়ােগ করিলেন
এবং অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ইংরাজি ভাষায় বিশেষ
ব্যুৎপত্তি লাভ করিলেন; পরে দেখা গেল ইংরাজি
ভাষায় তাহার ওজস্বিনী বক্তৃতা হাঙ্গারীতে নূতন
শক্তি ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করিতে সমর্থ হইয়াছিল।
;

হাঙ্গারী
৭১
অত্যাচার ও নিপীড়নে দুই বৎসর কাটিয়া গেল,
তৎপর জাতীয় সমিতি পুনঃ আহ্বান করা হইল।
এই সমিতি সর্বাগ্রে কছুথ, প্রমুখ নেতৃবর্গের মুক্তি
দাবী করিল। সরকারের পক্ষ হইতে তৎক্ষণাৎ উত্তর
হইল—তােমরা ধীর স্থির গতিতে চলিলে নিশ্চয়ই
তােমাদের নেতাগণ মুক্ত হইবে।
ডিক্‌ গম্ভীরস্বরে বলিলেন-“তা কখনই হইবে
। বন্ধুগণের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন অপেক্ষা দেশের
প্রতি আমাদের কর্তব্য পবিত্রতর। দেশের প্রতি
কর্তব্য অবহেলা করিয়া, বন্ধুগণের মুক্তি কখনও কাম্য
হইতে পারে না; পক্ষান্তরে এইরূপ মুক্তি কামনা
আমাদের কারারুদ্ধ স্বদেশ বৎসল বন্ধুগণের পীড়াদায়ক
ও মনঃকষ্টেরই বিষয় হইবে।”
সম্রাট ডিকের দৃঢ়তা দেখিয়া জি পরিত্যাগ
করিলেন এবং ১৮৪০ খৃষ্টাব্দে কছুথ, প্রমুখ নেতৃবর্গকে
মুক্তি প্রদান করিলেন।
কারামুক্ত হইয়া কছুথ, পূর্ণ উদ্যমে দেশ সেবায়
স্বীয় শক্তি ও লেখনী নিয়ােজিত করিলেন। “পেস্থ
গেজেট” (Pesth Gazette) নামক একখানা
হাঙ্গারীর জাতীয় পত্রিকা তিনি প্রকাশ করিলেন।
;

৭২
পরাধীনের মুক্তি
জনসাধারণকে রাজনৈতিক বিষয়ে শিক্ষিত করিয়া
জনমত সৃজন করাই কছুথের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।
তাহার এই পত্রিকা হাঙ্গারীর অশেষ কল্যাণ সাধন
করিল ; দেশের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত
স্বদেশী বার্তা জনসাধারণের নিকট প্রচারিত হইতে
লাগিল। ইহার ফলে কছুথ, এমন লােকপ্রিয় হইয়া
উঠিলেন যে, কাহারও কোন সন্দেহ বা দ্বিধা উপস্থিত
হইলে তাহা মীমাংসার জন্য কছুথের পরামর্শ গ্রহণ
করা হইত।
প্রচারের ফলে জাতীয় দলের দুইটি দাবী মূৰ্ত্ত হইয়া
উঠিল—–অষ্ট্রিয়ার সহিত সমভাবে ট্যাক্স ( tas) প্রদান
এবং হাঙ্গারীয় ভাষার সর্ববিষয়ে প্রচলন স্বীকার।
অষ্ট্ৰীয় সরকার
ভাষার দাবী স্বীকার করিল,
কিন্তু ট্যাক্স বিষয়ক প্রস্তাব গ্রাহ্য করিল না।
কছুথ, সরকারের ট্যাক্স বিষয়ক প্রস্তাবের প্রতিবাদ
কল্পে “হাঙ্গারীয় শিল্প ও বাণিজ্য সমিতি” স্থাপন
করিলেন। অষ্ট্ৰীয় পণ্য-দ্রব্যাদি যাহাতে হাঙ্গারীর
বাজারে স্থান না পায় এবং দেশজাত দ্রব্যাদি দ্বারা
যাহাতে ঐ স্থান পূরণ করা হয়, ইহার জন্যই এই
সমিতি গঠিত হইয়াছিল। অষ্ট্রিয়ার শিল্পিগণ চঞ্চল

হাঙ্গারী ৭৩ হইল এবং সম্রাট ইহার প্রতিকারের জন্য পুনঃ দণ্ড- নীতির আশ্রয় লইলেন। হাঙ্গারীর শিল্প ও বাণিজ্য সমিতি’র উচ্ছেদ সাধনে অষ্ট্ৰীয় সম্রাট কৃতসঙ্কল্প হইলেন এবং তিনি ঐ সমিতি বে-আইনী বলিয়া ঘােযণ। করিলেন। বহু পূৰ্ব্ব হইতে হাঙ্গারীর গ্রামসমূহে পঞ্চায়তী সমিতির প্রচলন ছিল ; গ্রামের সর্ববিধ উন্নতি সাধনই এই সকল গ্রাম্য সমিতির বিশেষ লক্ষ্য ছিল। लि গ্রাম্য সমিতি “শিল্প ও বাণিজ্য সমিতি” রক্ষণের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইল। সরকারের উদ্দেশ্য সাধনে প্রতিকূল দেখিয়া, এই গ্রাম্য সমিতি সমূহের সভাপতি গণকে পদচ্যুত করিয়া তাহাদের স্থান ষ্ট্রীয় কর্মচারী দ্বারা পূরণ করিয়া লইল। কছুথ, ইহাতে বড়ই প্রীত হইলেন— তিনি বুঝিতেন পরাধীন দেশ জাগাইতে হইলে এইরূপ কশাঘাত বিশেষ আবশ্যক। হাঙ্গারীর অভিজাত সম্প্রদায় জাতীয় জাগরণে এখন পর্যন্ত সাড়া দেয় নাই। তাহারা অষ্ট্ৰীয় চাল- চলন অনুকরণ করিয়া, মনুষ্যত্ব ও আত্মমর্যাদা-বােধ হারাইয়া ফেলিয়াছেন। তাই এখনও পিছনে, অনেক পিছনে পড়িয়া রহিলেন।

৭৪
পরাধীনের মুক্তি
সুখের বিষয় এই অভিজাত সম্প্রদায় কছুথের
স্থাপিত “শিল্প ও বাণিজ্য সমিতি”র রক্ষণে সহানুভূতি
প্রকাশ করিলেন এবং ইহাদের অনেকেই গ্রাম্য
সমিতির অধিনায়ক থাকিয়া জাতীয় শিল্প ও কৃষি
কাৰ্য্যের বিশেষ সহায়তা করিতে লাগিলেন। ইহাতে
অষ্ট্ৰীয় সম্রাট ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন এবং যে সকল ব্যক্তি
তাহাদের বিশিষ্টপদের সুযোেগ দেশসেবায় নিয়ােজিত
করিয়াছিলেন, তাহাদিগকে পদচ্যুত করিলেন।
কছুথ, হাঙ্গারীর অভিজাত সম্প্রদায়কে এই সুযােগে
অাহ্বান করিয়া বলিলেন,—“যদি আপনারা যথার্থ
মানুষ হন তবে মনুষ্যোচিত ব্যবহার করুন, সম্রাটের
পদলেহন পরিত্যাগ করুন।” কছুথের বাক্যে অনেকের
প্রাণে আঘাত লাগিল এবং তাহাদের অনেকেই জাতীয়-
দলে যােগদান করিয়া উহা পুষ্ট করিল। একদিকে
অষ্ট্রিয়ার অত্যাচার এবং অপর দিকে জাতীয় নেতৃ-
বর্গের ত্যাগ, নিষ্ঠা, ও দেশসেবায় সর্ববিধ লাঞ্ছনার
পশরা দেখিয়া, স্বল্পাধিক পরিমাণে সমগ্র হাঙ্গারীবাসীর
প্রাণে স্বাধীনতার ভাব জাগিয়া উঠিল ; অনেকের
হাঙ্গারীর প্রতি গাঢ় অনুরাগ প্রকাশিত হইল, অনেকে
ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ভুলিয়া হাঙ্গারীর সেবায়

হাঙ্গারী
৭৫
আত্মনিয়ােগ করিল, আর যাহারা দেশসেবায় ব্রতী
হইতে পারিল না, তাহারাও অন্তরে অন্তরে হাঙ্গারীর
জন্য এক অব্যক্ত অনুরাগ অনুভব করিতে লাগিল।
এদিকে হাঙ্গারীর রাজধানী পেস্থ (Pesth) নগরের
উপর অষ্ট্ৰীয় সম্রাট বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন,কেননা পেস্থ বড়ই
রাজভক্তির স্থান ছিল, কিন্তু এই স্থানেও প্রাদেশিক
সমিতির সভ্য নির্বাচনের সময় জাতীয় দলের অধি-
কাংশ লােকই নিৰ্বাচিত হইলেন। ইহাতে সম্রাটের
চিত্তে আশঙ্কার উদয় হইল, তিনি তখন বুঝিলেন যে,
হাঙ্গারীর একটি স্থানেও ‘সাচ্চা’ রাজভক্তি আর মিলিবে
মোৰ নিকের পতন
Gadafaz (Metternich ) অষ্ট্ৰীয় সম্রাট
ফার্ডিনাণ্ডের ( Ferdinand ) প্রধান মন্ত্রী ছিলেন।
স্বেচ্ছাচারতন্ত্রের তিনি মূর্তিমান বিগ্রহ ছিলেন। প্রজা-
পুঞ্জের আশা আকাক্ষা স্বেচ্ছাচারের লৌহবৰ্ম্মে
আচ্ছাদিত মেটারনিকের কঠিন হৃদয়ে প্রতিহত হইয়া
বিদ্ধস্ত হইত। কোন প্রকারেই তিনি শাসনের

৭৬
পরাধীনের মুক্তি
কঠিন বন্ধন শিথিল করিতে সম্মতি প্রদান করিতেন
।
১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে ৩রা মার্চ হাঙ্গারীর মহাসভায়
অষ্ট্ৰীয় শাসনের তীব্র নিন্দা করিয়া, কছুথ, ওজস্বিনী
ভাষায় একটী বক্তৃতা করেন, তাহার এই বক্তৃতা
শ্রবণে উপস্থিত সকলেই অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে উত্তেজিত
হইল। কছুথের এই বক্ততা জর্মন্ ভাষায় অনূদিত
হইয়া, ভিয়ানায় প্রকাশিত হইলে হাঙ্গেরীতে ত
কথাই নাই, ভিয়ানাতেও অষ্ট্ৰীয় শাসনের বিরুদ্ধে
ছাত্রগণ বিদ্রোহী হইয়া উঠে এবং এই বিদ্রোহ দমন
করিতে অষ্ট্ৰীয় সৈন্য গুলি চালাইতে বাধ্য হইল।
একদল বিদ্রোহী অষ্ট্ৰীয় মহাসভায় প্রবেশ করিয়া,
‘মেটানিক্ ধ্বংস হউক” বলিয়া চীৎকার করিয়া
সাধারণের মনােভাব জানাইয়া দিল।
অবস্থার গুরুত্ব বুঝিতে মেটানিকের আর বিলম্ব
হইল না। চারিদিকের বিদ্রোহে সম্রাট ফার্ডিনাও
বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিলেন ; সুতরাং মেটানিক্ বাধ্য
হইয়া মন্ত্রীত্ব পরিত্যাগ করিয়া ছদ্মবেশে ইংলণ্ডে পলায়ন
করেন এবং তথায় বসিয়া দেখিতে লাগিলেন—কি
প্রকারে তাহারই সংরক্ষিত কত আদরের স্বেচ্ছাচারতন্ত্র

হাঙ্গারী
৭৭
গণতন্ত্রের প্রচণ্ড আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হইতেছে। এই
মেটানিকের পতনের সঙ্গে সঙ্গে অষ্ট্ৰীয় স্বেচ্ছাচারতন্ত্রের
মৃত্যুভেরী বাজিয়া উঠিল।
ফরাসী বিপ্লবের প্রভাব
এদিকে ফরাসী বিপ্লবের প্রবল
স্রোতে ফরাসী
নৃপতি লুই ফিলিপ, ( Louis Philippe) ভাসিয়া
গেলেন। ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে ফিলিপের পতন সংবাদ
ইউরােপের সর্বত্র উৎপীড়িত ও নির্যাতিত প্ৰজাগণের
মধ্যে স্বেচ্ছাচার রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে উখিত হইবার
নূতন প্রেরণা প্রদান করিল। ফরাসী বিপ্লবের
সংবাদে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত
শতাব্দী ব্যাপি নিপীড়িত বােহেমিয়া এবং ইটালি
অষ্ট্ৰীয় শাসন-শৃঙ্খল বিছিন্ন করিবার জন্য বিদ্রোহী
হইয়া,
হইল ।
ফার্ডিনাণ্ড, মহাবিপদে পড়িলেন। অষ্ট্ৰীয় সম্রাটের
এই বিপদের সুযােগ লইতে হাঙ্গারী আর কাল বিলম্ব
করিল না।
বিদ্রোহ দমনে সম্রাট হাঙ্গারীর কোন
সাহায্য পাইলেন না। তিনি হাঙ্গারীর দাবী স্বীকার

৭৮
পরাধীনের মুক্তি
করিয়া বােহেমিয়া ও ইটালির বিদ্রোহ দমন করিতে
প্রয়াসী হইলেন।
মলি
এদিকে কছুথের অগ্নীময়ী বক্তৃতায় হাঙ্গারীবাসী
উত্তেজিত হইয়া উঠিল এবং ১৫ই মার্চ হাঙ্গারীর
মহাসভায় প্রসিদ্ধ “মার্চ ল” (March Law) গৃহীত
হইল। কছুথ, পরিচালিত হাঙ্গারীর জাতীয় দলের
দাবী ইহাতে আকার পরিগ্রহ করিল। ইহাতে
অভিজাত সম্প্রদায়ের শাসন পরিবর্তিত করিয়া
আধুনিক গণতন্ত্র শাসন পদ্ধতির প্রণয়ন করা হইল।
ইহা দ্বারা প্রেসের এবং সকল ধর্মমতের স্বাধীনতা
সংরক্ষণ, জুরীর সাহায্যে বিচার প্রভৃতির বিষয় প্রবর্তিত
হইল।
অবস্থার বিপর্যয়ে পড়িয়া অষ্ট্ৰীয় সম্রাট ফার্ডিনাণ্ড,
অনন্যোপায় হইয়া স্বয়ং হাঙ্গারীতে গমন করেন এবং
৩১শে মার্চ জাতীয় দলের প্রসিদ্ধ ‘মার্চ ল’ মঞ্জুর
করিলেন। ডিক্‌ বিচার বিভাগের এবং কছুথ, আয়
ব্যয় বিভাগের মন্ত্রী হইলেন। জাতীয় দলের জয়
হইল। তাহাদের নির্ধারিত শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত

হাঙ্গারী হইল। নেতৃবর্গের সাধনা এবং হাঙ্গারীর অভিষ্ট সিদ্ধ হইয়াছে দেখিয়া, হাঙ্গারীতে আনন্দ-স্রোত প্রবাহিত হইল। অষ্ট্ৰীয় সম্রাট বিদ্রোহের প্রবল ধাক্কা কাটাইয়া উঠিতে লাগিলেন। তাঁহার সৈন্যগণের সমর নিপুণতা এবং বিদ্রোহী দেশে নানা জাতির হিংসা, দ্বেষ বিদ্রোহ দমনে তঁাহার বিশেষ সহায় হইয়াছিল। তিনি ইটালি ও বােহেমিয়ার বিদ্রোহ দমন করিয়া হাঙ্গারীকে প্রদত্ত ক্ষমতা কাড়িয়া লইবার জন্য সুযােগ খুজিতে লাগিলেন এবং এই সুবিধা তিনি শীঘ্রই পাইলেন। এই সময়ে হাঙ্গারীতে বিভিন্ন জাতির এবং নানা দলের হিংসা, দ্বেষ চরমে উঠিল। অষ্ট্ৰীয় সম্রাট এই সুযোগ গ্রহণ করিয়া বিভিন্ন দলের ঈর্ষা দ্বেষে ইন্ধন দিতে লাগিলেন। ফান্সিস ও “মা… ল” এই সময়ে অষ্ট্রিয়ায় পরিবর্তনের বিরােধিদল অত্য- ধিক ক্ষমতাশালী হইয়া উঠে। বােহেমিয়া এবং ইটা- লিতে জয়লাভ করিয়া তাহারা অষ্ট্ৰীয় শাসন পরিচালনে তাহাদের প্রভুত্ব বৃদ্ধি করিবার জন্য লালায়িত হইল bro পরাধীনের মুক্তি । এবং এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাহারা সম্রাট ফাড়ি- নাকে সিংহাসন পরিত্যাগ করিতে বাধ্য করিল। তৎপর ১৮৪৮ খৃঃ অব্দের ২রা ডিসেম্বর ১৮ বৎসর বয়স্ক ফ্রান্সিস্ জোসেফ, (Francis Joseph I) সিংহাসনে আরােহণ করেন। ফার্ণিনাকে সিংহাসন পরিত্যাগ করিতে বাধ্য করিবার অন্যতম কারণ এই ছিল যে, হাঙ্গারীর প্রসিদ্ধ “মার্চ ল” ফার্ডিনাই স্বীকার করিয়া- ছিলেন ; সুতরাং তিনি সিংহাসনচ্যুত হইলে তাহার স্বীকৃত কাৰ্য্য নূতন সম্রাট মানিয়া লইতে বাধ্য হইবেন জোসেফ, সম্রাট হইয়া হাঙ্গারীর “মার্চ ল” স্বীকার করিলেন না। ভিয়ানার (Vienna) মন্ত্রণা সভা স্থির করিল যে, হাঙ্গারীকে কিছুতেই স্বাধীনতা দেওয়া হইবে না। সুতরাং হাঙ্গারীর মার্চ ল’ বাতিল করিতেই হইবে। অথচ প্রকাশ্যভাবে কোন প্রতিকারের উপায় না দেখিয়া নীচ কূটনীতি অনুসরণ করা হইল। গােপনে লােক চক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া, হাঙ্গারীর পার্শ্ববর্তী ওয়ালেচিয়া (Walla-chians) stafaria (Serbia ns) 99: COTG- দিগকে (Crots) হাঙ্গারী আক্রমণ করিতে অষ্ট্রিয়া উৎসাহিত করিল। সম্রাটের বিশ্বাস ছিল যে, হাঙ্গারী

হাঙ্গারী
৮১
এইরূপ আকস্মিক ভাবে আক্রান্ত হইলে, তাঁহার
শরণাপন্ন হইবে, কিন্তু আকস্মিক ভাবে আক্রান্ত
হইলেও নবীন ভাবে উদ্বুদ্ধ হাঙ্গারীবাসীর বীরত্বের
নিকট আক্রমণকারিগণ পরাজিত ও বিতাড়িত
হইল।
খল একভাবে তার পাপ অভিলাষ চরিতার্থ করিতে
না পারিলে অন্য উপায়ে তাহা চরিতার্থ করিতে
সৰ্ব্বদাই চেষ্টিত হয়। ভিয়ানার মন্ত্রণা-সমিতির
মতানুসারে অষ্ট্ৰীয় সম্রাট লেমবার্গ (Lemberg) নামক
এক ব্যক্তিকে রাজপ্রতিনিধিরূপে হাঙ্গারীতে প্রেরণ
করেন এবং তাহাকে হাঙ্গারীর শাসন পদ্ধতি প্রত্যাহার ।
করিবার জন্য উপদেশ প্রদান করিলেন।
লেমবার্গের নির্বাচন সংবাদ শ্রবণ করিয়া, হাঙ্গারীয়
প্রতিনিধি-সভা ঘােষণা করিল যে, লেমবার্গ
হাঙ্গারীর নির্বাচিত লােক নহেন, সুতরাং তাহারা
তাহাকে কখনও মান্য বা তাহার ক্ষমতা স্বীকার
করিবে না এবং যিনি তাহাকে কোন প্রকার সাহায্য
করিবেন বা তার সুখশান্তির কোন ব্যবস্থা করিয়া
দিবেন, অথবা তাহাকে পরামর্শ প্রদান করিবেন তিনি
দেশের শক্ত বলিয়া বিবেচিত হইবেন।

৮২
পরাধীনের মুক্তি
লেবার্গ হাঙ্গারীবাসীদের বিরাগভাজন হইয়া,
বুদাপেস্থ ( Budapesth) সহরে পদার্পণ করিলে,
গুপ্ত ঘাতকের হস্তে নিহত হইলেন।
অষ্ট্রীয় সম্রাট ক্রুদ্ধ হইয়া জেলাচি (Jellachich)
নামক ক্রোশীয় সেনাপতিকে প্রধান শাসন কর্তার পদে
নিযুক্ত করিয়া, হাঙ্গারীতে প্রেরণ করিলেন। এই
জেলাচিচই কিছুদিন পূর্বে অষ্ট্ৰীয় সরকারের প্ররােচনায়
হাঙ্গারী আক্রমণ করিয়াছিলেন। সম্রাট জেলাচিচের
পিছনে একদল অষ্ট্ৰীয় সৈন্য তাহার সাহায্যার্থ
প্রেরণ করিলেন; কিন্তু হাঙ্গারীর জাতীয় সমিতি
ইহাতে কিছু মাত্র বিচলিত হইল না।
জাভীমঙ্গলের প্রথম যুদ্ধ
কছুথ, পরিচালিত হাঙ্গারীবাসী উত্তেজিত হইয়া
ঘােষণা করিল যে, হাঙ্গারীতে অষ্ট্রীয় সম্রাটের শাসন
অবসান হইয়াছে, সুতরাং হাঙ্গারী স্বাধীন জাতিরূপে
পরিণত হইয়াছে। কছুথ, প্রেসিডেন্টের পদে নিযুক্ত
হইলেন ১৮৪৯ খৃঃ অব্দে অষ্ট্রিয়ার সহিত
হাঙ্গারীর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। অদম্য উৎসাহে হাঙ্গারীর
সেনাপতি আস্থা জর্জি ( Aruthr Georgei )
এবং

হাজারী
৮৩
তিনি সম্মুখ
যুদ্ধ পরিচালনা করিতে লাগিলেন ।
সমরে অষ্ট্ৰীয় সৈন্যগণকে পিছু হটাইয়া দিলেন। কিন্তু
এই সময় যােসেফ, রুষ সম্রাট নিকোলাসের (Czar
Nicholas I) নিকট হাঙ্গারী দমনে সাহায্য প্রার্থনা
করিলেন। নিকোলাস্ স্বভাবতই প্রজাতন্ত্রের বিরােধী
ছিলেন এবং হাঙ্গারীতে জনমত প্রতিষ্ঠিত হইলে পােলা-
ণ্ডেও গােলযােগ হইবার আশঙ্কা মনে করিয়া তিনি
যােসেফের সাহায্যার্থ প্রায় ২ লক্ষ সৈন্য হাঙ্গারীতে
প্রেরণ করেন।
কছুথের উত্তেজনাময়ী বক্তৃতায় অনুপ্রাণিত হইয়া
হাঙ্গারী যুদ্ধ করিতে লাগিল, এবং তুর্কির সাহায্য
প্রার্থনা করিল, কিন্তু কোন সাহায্যই আসিল না।
অগণিত শত্রু সৈন্যের গতিরােধ করা অসম্ভব হইয়া
দাড়াইল। কছুথ, প্রেসিডেন্টের পদ ত্যাগ করিয়া প্রধান
সেনাপতি জর্জিকে তাহার স্থলে নিযুক্ত করিলেন।
১৮৪৯ খৃঃ ১৩ই আগষ্ট জর্জি আত্ম সমর্পণ করিতে
বাধ্য লইলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাঙ্গারীর স্বাধীনতা যুদ্ধের
যবনিকা তখনকার মত পতিত হইল ! কছুথ, তুরস্কে
পলায়ন করিলেন। নিকোলাস্ বিদ্ধস্ত হাঙ্গারী যােসে
ফের হস্তে গর্বভরে প্রত্যর্পণ করিলেন।

৮৪ পরাধীনের মুক্তি হাঙ্গারী আবার অষ্ট্রিয়ার অধীন হইল। অষ্ট্ৰীয় সম্রা- টের আদেশে হাঙ্গারী নির্মম অত্যাচারেজর্জরিত হইল ; বিদ্রোহী দলের বহু নায়ককে হত্যা করা হইল, অব- শিষ্ট সকলকে নির্বাসিত করা হইল। অষ্ট্ৰীয় সৈন্য সর্বত্র বিদ্যমান থাকিয়া হাঙ্গারীর শাসন শৃঙ্খল দৃঢ় করিতে লাগিল ; হাঙ্গারীর শাসন পদ্ধতি বিনষ্ট করা হইল, জাতীয় অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হইল, হাঙ্গারীর ভাষা পরিত্যজ্য হইল, গ্রাম্য সমিতি উচ্ছন্ন করা হইল এবং হাঙ্গারীকে শতধা বিভক্ত করিয়া, অষ্ট্ৰীয় সামরিক কর্মচারিগণের হস্তে প্রদান করা হইল। এইরূপে ইউরােপের মানচিত্র হইতে হাঙ্গারীর স্বাধীন নাম মুছিয়া গেল ! হাঙ্গারীবাসীর ঘাড়ে অষ্ট্রিয়ার দাসত্ব-জোয়াল চাপিল। কিছুকাল যাবৎ বেশ মনে হইতে লাগিল যেন হাঙ্গারীর জাতীয় জীবনের উৎস বিশুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু স্বাধীনতার যুদ্ধ একবার আরম্ভ হইলে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা লাভ না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতার বাসনা নির্বাপিত হইতে পারে না। ফ্রান্দিস ডিক্ স্বাধীনতা যজ্ঞে হবিঃ প্ৰদান করিয়া, অগ্নি প্রজ্জলিত রাখিলেন। দাউ দাউ করিয়া না

হাজারী
৮৫
জ্বলিলেও অগ্নি নির্বাপিত হয় নাই, হইতে পারেও
ডি নিজগৃহ পেস্থ, সহরে বাস করিতে লাগিলেন
এবং স্বাধীনতা যজ্ঞের ইন্ধন সংগ্রহের জন্য দিবারাত্রি
চিন্তামগ্ন রহিলেন। তাহার বন্ধুবৰ্গ নিয়তই তাহার সঙ্গে
হাঙ্গারী প্রসঙ্গে আলাপন করিতে লাগিলেন।
হাঙ্গারীতে দেশ-প্রীতি বিলুপ্ত হয় নাই, উহা এখন
বাহির হইতে লোকের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে ;
তাই কখন কোন ধারা বাহিয়া আবার প্রবল বান
ডাকিয়া হাঙ্গারী প্লাবিত করিবে, এই চিন্তায় অষ্ট্ৰীয়
সম্রাট জর্জরিত হইলেন। অবশেষে তিনি মনে
করিলেন যে, ডিকে কোন মতে স্ববশে আনিতে
পারিলে সকল আপদ চুকিয়া যাইবে। ডিক্ সন্তুষ্ট
হইলে, ডি-অনুগত হাঙ্গারীবাসীও চুপ করিবে-
সাপও মরিবে লাঠিও ভাঙ্গিবে না। এই ভাবে
অনুপ্রাণিত হইয়া, অস্ত্রীয় সম্রাট ডিকে এক অত্যুচ্চ
পদ প্রদান করিতে ইচ্ছাপ্রকাশ করিলেন, কিন্তু মহামতি
ডিকৃ গর্বের সহিত উত্তর করিলেন—“আমার দেশ
স্বাধীনতা লাভ করিবার পর আপনার প্রস্তাব বিবেচনা
করিব।

পরাধীনের মুক্তি স্বীয় অভিসন্ধি সিদ্ধ হইল না দেখিয়া, পুনরায় অষ্ট্ৰীয় সম্রাট ডিকের নিকট প্রস্তাব করিলেন যে, হাঙ্গারীর কয়েক জন বিশিষ্ট প্রতিনিধি ভিয়ানায় গমন করিয়া, হাজারীর শাসন পদ্ধতি সম্বন্ধে তাহার সহিত আলােচনা করিলে একটী চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারা যাইবে । তেজস্বী ডি ইহার উত্তরে বলিয়া পাঠাইলেন—“যে সম্রাট অন্যায়ভাবে হাঙ্গারীর স্বাধীনতা ধ্বংস করিয়াছেন, হাঙ্গারীবাসী তাহার সঙ্গে কোন আলােচনায় প্রবৃত্ত হইতে পারিবে । অষ্ট্ৰীয় ষড়যন্ত্র সকল প্রস্তাবেই বিফল মনােরথ হইয়া, অষ্ট্ৰীয় সম্রাট স্থির করিলেন যে, হাঙ্গারীর জাতীয়তা চিরকালের জন্য বিধ্বস্ত করিবেন এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি হাঙ্গারীকে জম সাম্রাজ্যভুক্ত করিবার জন্য ষড়যন্ত্র করিলেন। একবার হাঙ্গারীকে একবার হাঙ্গারীকে জম সাম্রাজ্য- ভুক্ত করিতে পারিলে হাঙ্গারীর পরাধীন শৃঙ্খল এমন সুদৃঢ় হইবে যে, উত্তরকালে ঐ শৃঙ্খল ছিন্ন করিবার প্রয়াস করিলেই শ্রুসিয়া (Prussia ) হাঙ্গারী ৮৭ বেভেরিয়া (Bavaria) প্রভৃতি হাঙ্গারীকে খণ্ড বিখণ্ড করিয়া ফেলিবে। ফ্রান্স (France) এই ষড়যন্ত্র জানিতে পারিল এবং তাহাকে হাঙ্গারীর পক্ষাবলম্বন করিতে ইচ্ছুক দেখিয়া, অষ্ট্ৰীয় সম্রাট তাহার এই অসাধু উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। এদিকে ডি শিক্ষাপ্রচার ও শিল্পোন্নতি করিতে শক্তি নিয়ােগ করিলেন। কছুথ, এবং অন্যান্য নেতৃবর্গ অষ্ট্ৰীয় সরকার কর্তৃক পূর্বেই বিদেশে নির্বাসিত হইয়া- ছিলেন। তাহারা বিদেশে হাঙ্গারীর পণ্য দ্রব্যের প্রচলনের ব্যবস্থা করিতেছিলেন এবং হাঙ্গারীর প্রতি বিদেশীর সহানুভূতি আকর্ষণ করিতে চেষ্টিত ছিলেন। হাজারীতে পুনঃ অষ্ট্ৰীয় বিদ্বেষ মূর্ত হইয়া উঠিতে দেখিয়া সম্রাট বিচলিত হইলেন এবং মন্ত্রির পরামর্শ অনুসারে পেস্থ, নগরে গমন করত হাঙ্গারীকে সন্তুষ্ট করিতে মনন করিলেন। পেস্থ নগরের সংবাদ পত্রের পরিচালকগণকে সম্রাট আদেশ করিলেন যে, তাহারা যেন স্ব স্ব পত্রিকায় প্রকাশ করেন যে, সম্রাট হাঙ্গারীর জন্য ‘নূতন যুগ আনয়ন কল্পে পেস্থে পদার্পণ করিতেছেন এবং রাজ-

bril
পরাধীনের মুক্তি
নৈতিক অপরাধে যাহাদের বিষয় সম্পতি সরকার
কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হইয়াছে, সম্রাট তৎসমুদায় প্রত্যর্পণ
করিবেন।
সাধারণের শ্রদ্ধা ও প্রীতি সংবর্ধনের জন্য সম্রাট
সকল প্রকার নীতিই অবলম্বন করিলেন, কিন্তু তিনি
সফলকাম হইতে পারিলেন না। ডিক্ প্রস্তরবৎ
অবিচলিত ও ধীর রহিলেন এবং তিনি ঘােষণা করিলেন
যে, হাঙ্গারীর রাজাই হাঙ্গারীবাসীর প্রীতি ও ভক্তির
পাত্র, অষ্ট্রীয় সম্রাট কদাচ নহে।
সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী পেস্থ, নগরে ১৮৫৭ খৃঃ
অব্দের মে মাসে আগমন করেন। সরকারপক্ষ
সকল প্রকার উপায় অবলম্বন করিয়া হাঙ্গারীর
প্রীতি ও উৎসাহ বন্ধনের জন্য সমধিক চেষ্টা
করিল। বড় বড় জাঁকাল মিছিল, নাচ, গান
সর্বত্রই চলিতে লাগিল এবং ভােজ আয়ােজনও কম
হইল না। সম্রাজ্ঞী হাঙ্গারীয় টুপি পরিধান করিয়া
জাতীয়-বিদ্যালয়-সমূহ পরিদর্শন করিলেন, সম্রাজ্ঞীর
চিত্ত-বিনােদের জন্য হাঙ্গারীয় ধরণের নাচ মনােনীত
হইল; সম্রাট-দম্পতি হাঙ্গারীয় ভাষার ভূয়সী প্রসংশা
করিলেন। বলা বাহুল্য যে, হাঙ্গারী ভাষা পূৰ্ব্বে
•

হাজারী সরকার অতি হীনচক্ষে দেখিত। মন্থর-পন্থিগণ সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর ব্যবহারে উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন এবং সম্রাট-দম্পতিকে অভিনন্দন-পত্র দিতে লালায়িত হইলেন। ডিক্‌ কিন্তু অটল রহিলেন, সরকার যে, “বিষকুম্ভ পয়ােমুখ” ইহা তিনি স্পষ্টই বুঝিয়াছিলেন। মন্থর-পন্থীদিগকে লক্ষ্য করিয়া ডি জলদগম্ভীর-স্বরে বলিলেন,—“যে সম্রাট হাঙ্গারীর স্বাধীনতা ধ্বংস করিয়াছেন, তাঁহাকে আবার অভিনন্দন। মন্থর-পন্থিগণ কিন্তু অভিনন্দন-পত্র দ্বারা রাজ- দম্পতিকে আপ্যায়িত না করিয়া ছাড়িলেন না। রাজ-দম্পতি অভিনন্দন প্রদানকারীদিগকে অতি সমাদরে আলিঙ্গন করিলেন। কিন্তু হাঙ্গারীর শাসন- সংরক্ষণ পদ্ধতির কোন পরিবর্তন করিলেন না। সম্রাট দম্পতির আগমনে হাঙ্গারীর জাতীয় দলের মনােভাব কিছু মাত্রও পরিবর্তিত হইল না। সুতরাং ইহাতে কোন স্থায়ী ফল হইল না। অপরদিকে ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্স, যুদ্ধাভিযান করিল। হাঙ্গারী সম্রাটকে উপযুক্ত সাহায্য করিল না। ফলে অষ্ট্ৰীয় সম্রাট পরাজিত হইয়া, অত্যন্ত বিষগ্নমনে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন

পরাধীনের মুক্তি
করিলেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুত করিয়া
যােশিকা (Josika) নামক একজন হাঙ্গারীয়াকে
প্রধান মন্ত্রীর পদ গ্রহণ করিতে অনুরোেধ করিলেন ;
কিন্তু যােশিকা সম্রাটের নিকট নিবেদন করিলেন
‘মহারাজ, আমি হাঙ্গারীবাসী, আমি হাঙ্গারী-ভাষা
ভিন্ন অষ্ট্ৰীয়-ভাষায় অভিজ্ঞ নহি, আপনি যদি অষ্ট্ৰীয়-
বাসীকে হাঙ্গারীবাসীর শাসনকার্যে নিযুক্ত করেন,
তবে তিনি ন্যায়ানুসারে শাসন করিতে সক্ষম হইবেন
, কারণ তিনি বিদেশী। আমি হাঙ্গারীবাসী সুতরাং
বিদেশী, অষ্ট্রিয়াবাসীর উপর আমার শাসন শােভন
ও রুচিপ্রদ হইতে পারে না। যােশিকা এইরূপে
মন্ত্রিপদ প্রত্যাখ্যান করিলেন।
সম্রাট হাঙ্গারীর ঔদাসীন্য ভঙ্গ করিতে প্রয়াসী
হইলেন এবং এই জন্য তিনি ছয় জনহাঙ্গারীবাসীকে
সরকারী পরামর্শ-সমিতির সভ্যরূপে নির্বাচন করিলেন।
তাহারা ডিকের পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিলে ডি বলিলেন
—“আবশ্যক হইলে সম্রাট পেস্থে আসিয়া হাঙ্গারীয়-
প্রতিনিধি-সভার সাহায্যে পরামর্শ করিতে পারেন।”
সম্রাটের মনােনীত প্রতিনিধির মধ্যে অধিকাংশই উক্ত
মন্ত্রণা-সভায় যােগদান করিলেন না।

হাজারী সম্রাট, উপায়ান্তর না দেখিয়া হাঙ্গারীকে সন্তুষ্ট করিবার উপায় উদ্ভাবন করিতে সচেষ্ট হইলেন এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি গ্রাম্য সমিতিসকল পুনঃ স্থাপন করিতে ইচ্ছুক হইয়া হাঙ্গারীবাসীর মতামত জানিবার জন্য হাঙ্গারীতে একটী সরকারী ‘বৈঠক’ বসাইলেন। হাঙ্গারীবাসী মনে করিলেন, ডি গ্রাম্য- সমিতির পুনঃ স্থাপনে রাজানুগ্রহ স্বীকার করিবেন, কিন্তু ডিকের মত একটুও পরিবর্তিত হইল না। তিনি গুরু-গম্ভীরভাবে বলিলেন,—“অষ্ট্ৰীয়-সম্রাটের হাঙ্গা- বীতে এইরূপ, ‘বৈঠক’ বসাইবার কোন অধিকার নাই।” ১৮৬১ খৃষ্টাব্দে অনন্যোপায় হইয়া সম্রাট পুনঃ মনস্থ করিলেন যে, হাঙ্গারীর গ্রাম্য-সমিতিসমূহ প্রতিষ্ঠা করিয়া হাঙ্গারীর জাতীয় সমিতি আহ্বান করিবেন। কিন্তু গ্রাম্য সমিতি পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইলেই সরকার- নিৰ্বাচিত অষ্ট্ৰীয়গণকে সভাপতির পদ হইতে বিতাড়িত করা হইল এবং সমুদয় গ্রাম্য সমিতি হইতে এই প্রস্তাব হইল যে, অষ্ট্ৰীয় সৈন্যের সংরক্ষণের জন্য তাহারা কোন চাঁদা দিবে না এবং কোন চঁাদা সংগ্রহ করিয়া সরকারের হস্তে অৰ্পণ করিবে না।

পরাধীনের মুক্তি সম্রাট যােসেফ, ডিকের নিকট এই প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, হাঙ্গারীর অনুকূলে তিনি যাবতীয় বিষয় মীমাংসা করিবেন এবং হাঙ্গারী মাত্র নিখিল-সাম্রাজ্য- সমিতির অধীন থাকিবে, আভ্যন্তরীণ সমুদয় রক্ষণা- বেক্ষণ-পদ্ধতি এবং অন্যান্য যাবতীয় বিষয়ে হাঙ্গারী পূর্ণ স্বাধীনতা প্রাপ্ত হইবে। হাঙ্গারী ঘৃণার সহিত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিল এবং সম্রাটকে জানাইয়া দিল যে, পূর্ণ স্বাধীনতা ভিন্ন হাঙ্গারী অন্য কোন প্রস্তাবই গ্রাহ্য করিবে না। হাঙ্গীর জাতীয় সমিতি হাঙ্গারীর জাতীয় সমিতিতে মােট তিন শত সভ্য ছিল, ইহাদের মধ্যে ২৭০ জন ডিকের মতাবলম্বী ছিলেন। সরকার এই জাতীয় সমিতি বুদাতে (Buda) সরকারী দুর্গে বসিবার প্রস্তাব করিল, কিন্তু ডি প্রকাশ করিলেন যে, ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে হাঙ্গারীর স্বাধীনতার বিধান অনুসারে এই জাতীয় সমিতি পেস্থ, নগরেই বসিবে, অন্যত্র বসিতে পারে না। অষ্ট্ৰীয়-সরকার উপায়ান্তর না দেখিয়া, এই জাতীয়- সমিতি পেস্থ, নগরেই আহ্বান করিলেন। ইহাতে হাঙ্গারী জাতীয় দলের মত অক্ষুন্ন রহিল, সরকারের ‘জি’ ৩ টিকিল না। মহাসমারােহের সহিত জাতীয়-সমিতির অধিবেশন পেন্থে বসিল। সর্বত্রই উত্তেজনার ঢেউ বহিয়া যাইতে লাগিল। হাঙ্গারীয় পােষাক পরিহিত সভ্যগণ অভিনব শােভা ধারণ করিল। আমার জন্মভূমি’ শব্দে সভা মণ্ডপ পুনঃ পুনঃ মুখরিত হইতে লাগিল। সম্রাট হাঙ্গারীর জাতীয়-মহাসমিতির স্বাতন্ত্র স্বীকার এবং আভ্যন্তরীণ অনেক বিষয়ে স্বাধীনতার অধিকার প্রদান করিবার প্রতিশ্রুতি প্রদান করিলেন, কিন্তু শাসন-সংরক্ষণ-পদ্ধতির ভূমিকা করিয়া বলিলেন যে, নিখিল-সাম্রাজ্য-সমিতির সকল বিষয় নিয়ন্ত্রিত করিবার ক্ষমতা থাকিবে। ডি ইহার প্রত্যুত্তর দিতে বিলম্ব করিলেন না, তিনি তারস্বরে বলিলেন;—“দেখ, বিদেশিগণ তাহাদের নিজ দেশে বসিয়া আমাদের জন্য ও আমাদের সন্তান- সন্ততির জন্য নিয়ম-কানুন পরিচালন ও প্রণয়ন করিবে, বিদেশী বিদেশে বসিয়া আমাদের ভাগ্যচক্র নিয়ন্ত্রিত করিবে, কে এ প্রস্তাব সমর্থন করিবে ?” সমস্বরে উত্তর হইল—“কেহই নহে, কেহই নহে।”

৯৪
পরাধীনের মুক্তি
হাঙ্গারীর জাতীয়-সমিতি সম্রাটকে স্পষ্টরূপে
জানাইল যে, যদি তিনি হাঙ্গারীর সম্রাট হইতে অভি-
লাষী হন তবে তাহাকে হাঙ্গারীর শাসন পদ্ধতি
স্বীকার করিতেই হইবে এবং বুদা নগরে তাহাকে
রাজপদে অভিষিক্ত হইতে হইবে। এই সমিতি সম্রাটকে
আরও জানাইল যে, সম্ভবতঃ হাঙ্গারীকে আবার অগ্নি
পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে, কিন্তু সেই জন্য
হাঙ্গারীবাসী তাহাদের দেশের প্রতি কর্তব্য পরিত্যাগ
করিতে পারিবে না। হাঙ্গারীর স্বাধীনতা তাহাদের
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নহে যে, উহা সহজেই পরিত্যজ্য
হইবে, হাঙ্গারীবাসী বিশ্বাস করিয়া, এই জাতীয়
সমিতির হস্তে তাহাদের স্বাধীনতা ন্যস্ত রাখিয়াছে,
সুতরাং উহা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই জাতীয় সমিতি
দেশবাসীর নিকট অবশ্যই দায়ী। আবশ্যক হইলে
হাঙ্গারীর স্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য এবং ভবিষ্যৎ
বংশধরগণকে ইহার উত্তরাধিকারী করিবার জন্য,
দেশবাসী পীড়ন সহ্য করিয়াও উদ্যমহীন হইবে না।
পাশব-বল যাহা অপহরণ করিতে পারে, সময়ে তাহা
পুনঃপ্রাপ্ত হওয়া যাইতে পারে, কিন্তু দেশবাসী স্বেচ্ছায়
নিজের স্বাধীনতা অপরের হস্তে সমৰ্পণ করিলে,

হাঙ্গারী
তাহার উদ্ধার অতি দুষ্কর ও অনিশ্চিত। হাঙ্গারীবাসী
তাহাদের ন্যায্য দাবী স্থাপনের জন্য এবং ভবিষ্যতের
সুখ সৌভাগ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া, নিৰ্যাতন ও
উৎপীড়ন অম্লানবদনে সহ্য করিবে ।
অস্ট্রীয় অত্যাচার
অষ্ট্ৰীয় সম্রাট হাঙ্গারীর এতাদৃশ দৃঢ়তা দর্শনে
ক্রদ্ধ হইলেন এবং হাঙ্গারীয় জাতীয় সমিতি বন্ধ
করিবার আদেশ প্রদান করিলেন। জাতীয়-সমিতি-
গৃহ অষ্ট্ৰীয় সৈন্য কর্তৃক পরিক্ষিত হইল। সৈন্যগণ
সঙ্গীন হস্তে সভামণ্ডপ পাহারা দিতে লাগিল ; ফলে
সভ্যগণ সমিতি-মণ্ডপে প্রবেশ করিতে পারিলেন না।
ডি প্রকাশ করিলেন যে, অষ্ট্রিয়া যুদ্ধ ঘােষণা
করিয়াছে। প্রত্যেক গ্রাম্য সমিতি বন্ধ করিবার জন্য
সম্রাট আজ্ঞা প্রদান করিলেন। কিন্তু গ্রাম্য সমিতিসকল
ঐ আজ্ঞা গ্রাহ্য করিল না। অবশেষে অষ্ট্ৰীয়-সৈন্য কর্তৃক
সভ্যগণ বিতাড়িত হইলেও হাঙ্গারীবাসী সম্রাটের
মতানুসারে কাৰ্য করিতে স্বীকৃত হইল না। ফলে সর্বত্র
সামরিক আইন প্রয়ােগ করা হইল।

পরাধীনের মুক্তি
ডিক্ দেশবাসীকে বিশেষ সাবধান করিয়া বলিয়া
দিলেন যে, তাহারা যেন কোন প্রকার শান্তিভঙ্গ না
করে; কিন্তু ন্যায্য দাবী যেন
ন্যায্য দাবী যেন তাহারা কখনও
প্রত্যাহার না করে। আত্ম-মৰ্যাদা অক্ষুন্ন রাখিয়া
হাঙ্গারীবাসী যেন পীড়ন মাথা পাতিয়৷ গ্রহণ
ডিকের উপদেশ সানন্দে শিরােধার্য্য করিয়া
হাঙ্গারীবাসী অষ্ট্রিয়ার আসুরিক শক্তির সম্মুখীন হইল।
পূর্ণ উদ্যমে অসহযােগ-নীতি চলিল, কোথায়ও ‘দাঙ্গা-
হাঙ্গামা” হইল না। অষ্ট্ৰীয় ট্যাক্স সংগ্রহকারী হাঙ্গারীতে
ট্যাক্স আদায় করিতে আসিলে তাহার প্রতি কেহই
কোন অত্যাচার এমন কি কোন বিদ্রুপ উক্তি পর্যন্ত
করিল না। হাঙ্গারীবাসী মাত্র কর দিতে অসম্মতি
প্রকাশ করিল।
অষ্ট্ৰীয়-পুলিশ কর আদায় করিবার জন্য হাঙ্গারী-
বাসীর দ্রব্যাদি জোর করিয়া নিলামে বিক্রয়
করিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু কি আশ্চর্য্য, হাঙ্গারীর
কোন লােকই এই নিলামের কোন জিনিষ ক্রয় করিল
না! নিলামী জিনিষ বিক্রয় করিবার জন্য অষ্ট্রিয়া হইতে
লােক আমদানী করিতে হইল। সম্রাট অবিলম্বে

হাঙ্গারী বুঝিতে পারিলেন যে, ইহাতে ভঁহার লাভ অপেক্ষা লােকসান অনেক বেশী। সম্রাট তখন হাঙ্গারীর প্রতি গ্রামে সৈন্যদ্বারা অত্যা- চার করিতে আরম্ভ করিলেন, হাঙ্গারীবাসী ইহার কোন প্রতিশােধ লইল না; কিন্তু অল্পদিন মধ্যেই সম্রাট বেশ বুঝিতে পারিলেন যে, হাঙ্গারীকে নির্যাতনে বশ করা সম্ভব নহে। পরে যখন ভিয়ানাতে নিখিল-সাম্রাজ্য-সমিতি আহুত হইল, তখন দেখা গেল যে, এই সাম্রাজ্য- সমিতিতে হাঙ্গারীর একজন প্রতিনিধিও উপস্থিত নাই; ফলে এই সমিতি সর্বত্রই হাস্যাস্পদ হইল। অষ্ট্ৰীয় চণ্ডনীতির প্রতিবাদকল্পে হাঙ্গারীবাসী পূৰ্বেই অষ্ট্ৰীয় পণ্যদ্রব্য বর্জন করিয়াছিল। অষ্ট্ৰীয় সম্রাট ঘােষণা করিলেন যে, এই বর্জন আইন বিরুদ্ধ। হাঙ্গারীবাসী সম্রাটের এই আদেশে কর্ণপাত করিল না; ফলে সৰ্ব্বত্র ‘পড় পাকড় আরম্ভ হইল। হাঙ্গারী- বাসী স্মিতমুখে বন্দীশালায় গমন করিয়া কারাগৃহ সকল পূর্ণ করিল। সম্রাট ফ্রান্সিস্ যােসসফের মনােরথ সিদ্ধ হইল । তিনি পুনঃ হাঙ্গারীকে সন্তুষ্ট করিতে প্রয়াসী ৭ পরাধীনের মুক্তি হইলেন এবং হাঙ্গারীর রাজনৈতিক অপরাধি- গণকে মুক্তি দিলেন ও হাঙ্গারীর জাতীয় বিদ্যালয় সমূহে প্রচুর পরিমাণে অর্থ সাহায্য করিলেন। সম্রাট ইতঃপূৰ্বেই হাঙ্গারীর জাতীয় মহাসমিতি বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু দেশবৎসল হাঙ্গারীবাসী “কৃষি-সঙ্’ প্রভৃতি সংস্থাপন করিয়া জাতীয় আদর্শ অক্ষুন্ন রাখিলেন। ঘটনাচক্রে এই সময় পুষিয়া অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিতে উদ্যত হইল। অষ্ট্ৰীয় সম্রাট প্রমাদ গণি- লেন। তিনি তখন হাঙ্গারীর বন্ধুত্বের জন্য লালায়িত হইলেন ; সুতরাং তিনি ডিকের নিকট হাঙ্গারীর বন্ধুত্বের মূল্য জানিতে চাহিলেন। ডিক্‌ উত্তরে জানাইলেন--- ‘ হাঙ্গারীর স্বাধীনতার পুনঃ প্রতিষ্ঠা। হাঙ্গারীতে সর্বত্র জনরব রটিল, সম্রাট পুনঃ পেস্থে আগমন করিবেন এবং পুনরায় এক নূতন যুগের অব- তারণা করিবেন। জনরব সত্যে পরিণত হইল। খৃষ্টাব্দে সম্রাট পেস্থে আগমন করিলেন। হাঙ্গারীবাসী পতাকা হস্তে সম্রাটকে অভ্যর্থনা করিতে অগ্রসর হইল। দূর হইতে সম্রাট দোদুল্যমান পতাকা- বিদ্যাস দেখিয়া মনে মনে বড়ই প্রীত হইলেন এবং ১৮৬৫

হাঙ্গারী
ভাবিলেন যে, এবার বুঝি তঁাহার পেন্থে আগমন সার্থক
হইল। কিন্তু হায়! সন্নিকট হইলেই দেখিলেন ঐ
পতাকাসকল হাঙ্গারীর স্বাধীনতা ঘােষণা করিতেছে
মাত্র।
সম্রাট ক্ষুন্ন হইলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে নূতন যুগও
অশ্বডিম্বে পরিণত হইল। অদূর ভবিষ্যতে হাঙ্গারীর
জাতীয় মহাসমিতি আহুত হইবে, এইরূপ আভাসমাত্র
দেওয়া হইল।
হাঙ্গারী সন্তুষ্ট হইল না ও সম্রাট ষিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করিতে সাহসী হইলেন না; সুতরাং প্রুশিয়ার সম্পূর্ণ
দাবী পূরণ করিয়া তিনি যুদ্ধ হইতে অব্যাহতি পাইলেন।
এই ঘটনা হইতে সম্রাট এই অভিজ্ঞতা লাভ করিলেন
যে, দেশের আভ্যন্তরীণ বিপদের অবসান না করিলে
বিদেশী শত্রুর আক্রমণের হস্ত হইতে অব্যাহতি লাভ
করা সম্ভব নহে; সুতরাং তিনি স্থির করিলেন যে,
হাঙ্গারীর আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করিয়া, প্রীতি সংস্থাপন
করিবেন। এই ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দে
তিনি এক সনদ বাহির করিলেন। উহাতে তিনি
হাঙ্গারীর জাতীয় মহাসমিতির স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার
করিলেন এবং সাম্রাজ্যের অধীন থাকিয়া আভ্যন্তরীণ

১০ ০
পরাধীনের মুক্তি
যাবতীয় বিষয় পরিচালনে হাঙ্গারীর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা
স্বীকার করিলেন। হাঙ্গারী কিন্তু ইহাতে সন্তুষ্ট হইল না।
ডিক্ প্রমুখ হাঙ্গারীর নেতৃবর্গ কোন প্রকার ‘গােজা
মিলে’ রাজি হইবার লােক নহেন। তাঁহারা সম্পূর্ণ
স্বাধীনতা প্রয়াসী ; সুতরাং তাঁহারা ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দের
শাসন-সংরক্ষণ পদ্ধতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবী করিলেন।
সম্রাট হাঙ্গারীর জাতীয় সমিতি আহ্বান করিলেন।
হাঙ্গারীয় বেশ ভূষায় সজ্জিত হইয়া তিনি সভা-মণ্ডপে
উপস্থিত হইলেন এবং হাঙ্গারীয় ভাষায় কথা
কহিলেন। অনেক সদস্য সম্রাটের এতাদৃশ আচরণে মুগ্ধ
হইলেন এবং তাহার জয়ধ্বনি করিলেন। ডিক্‌ কিন্তু
নির্বাক, নিশ্চল হইয়া বসিয়া রহিলেন, কোন প্রকার
গররাজির প্রস্তাব তিনি আমলেই আনিলেন না।
সম্রাটের অভিভাষণের ভাব-ভঙ্গীতে মনে হইল
যেন হাঙ্গারী তাহার ষোল আনা পাওনা পাইল ;
প্রকৃত ক্ষমতার কিন্তু কিছুই মিলিল না। একজন
সদস্য বলিয়া উঠিলেন—“এই নূতন যুগে আমরা
পাইলাম সীমাবদ্ধ জাতীয় সমিতি। নিখিল-সাম্রাজ্য
সমিতি ভিয়ানাতে বসিয়া অনেক বিষয়েই সমিতির
কাৰ্য নিয়ন্ত্রিত করিবে ; গ্রাম্য সমিতির কোন উৎকর্ষ

হাঙ্গারী।
সাধনই হইল না—জাতীয় স্বাধীনতা আমাদের
মিলিল না।”
সম্রাট আংশিক ক্ষমতা প্রদান করিতে রাজি হইলেন
বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ ক্ষমতা প্রদানের বিষয় তিনি
ভাবিতেও পারিলেন না। হাঙ্গারীর জাতীয় সমিতি
সম্রাটকে স্পষ্ট ভাষায় জানাইল যে, যদি তিনি
হাঙ্গারীর পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকার না করেন, তবে তিনি
হাঙ্গারীবাসীর শত্রু বলিয়া বিবেচিত হইবেন। সম্রাট
বিষন্ন মনে ভিয়ানায় প্রত্যাবর্তন করিলেন।
অষ্টিস্নার বিপদে হাঙ্গীর সুযােগ
হাঙ্গারীর জাতীয় মহাসমিতি স্বাধীন ভাবেই কাৰ্য্য
পরিচালনা করিতে লাগিল। এই জাতীয় সমিতির
খ-ক্ষমতার বিষয় তাহারা একেবারে বিস্মৃত হইল।
এদিকে ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে ষিয়। অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে পুনরায়
যুদ্ধ ঘােষণা করিতে উদ্যত হইল।
অষ্ট্ৰীয় সম্রাট
চারিদিক তমসাচ্ছন্ন দেখিলেন। হাঙ্গারীকে আবার
তিনি সন্তুষ্ট করিতে ব্যাকুল হইলেন ।
ডিকে তিনি ভিয়ানায় সাদরে আহবান করিলেন ।
নিশীথ সময় ডি সম্রাটের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন।

১০২
পরাধীনের মুক্তি
সম্রাট কাতর-করুণ-স্বরে বলিলেন—ডিক্, এখন
উপায় কি ?
ডিক্‌শান্তি স্থাপন করুন এবং হাঙ্গারীকে তাহার
ন্যায্য স্বাধীনতা ফিরাইয়া দিন।
সম্রাট-হাঙ্গারীর স্বাধীনতা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইলে
এই
যুদ্ধে হাঙ্গারীবাসী আমাকে সাহায্য করিবে কি ?
ডি—কখনই নহে, চুক্তি করিয়া আমি হাঙ্গারীর
স্বাধীনতা পাইতে আদৌ রাজি নহি।
সম্রাট বিষন্ন বদনে কক্ষান্তরে চলিয়া গেলেন এবং
তেজস্বী ডিক্ স্বস্থানে ফিরিয়া আসিলেন।
এ অবস্থায় যাহা হইবার তাহাই হইল। হাঙ্গারীর
সাহায্য সম্রাট পাইলেন না। তিনি প্রষিয়া কর্তৃক
যুদ্ধে পরাজিত হইতে লাগিলেন। সম্রাট মন্ত্রীর পরামর্শ
জিজ্ঞাসা করিলেন,—মন্ত্রী উত্তর করিলেন “স্বেচ্ছাচারী
রাজার ন্যায় আচরণ করুন” । কিন্তু হাঙ্গারীর সম্বন্ধে
সম্রাটের বেশ অভিজ্ঞতা লাভ হইয়াছে, তিনি মন্ত্রীর
কথায় দৃপাত করিলেন না, অধিকন্তু তিনি মন্ত্রীকে
পদচ্যুত করিলেন। সম্রাট প্রাণে প্রাণে অনুভব
করিলেন যে, হাঙ্গারীর সহিত মিত্রতা স্থাপন
অত্যাবশ্যক। এই ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া ১৮৬৬

হাঙ্গারী
খৃষ্টাব্দে সম্রাট হাঙ্গারীর সঙ্গে একটা মীমাংসা করিতে
প্রয়াসী হইলেন। কিন্তু তিনি হাঙ্গারীয় জাতীয়
মহাসমিতির নিকট মীমাংসার প্রস্তাব করিয়া যে পত্র
পাঠাইলেন,
তাহা
হাঙ্গারীবাসী সন্দেহের চক্ষে
দেখিলেন। সম্রাট ভঁহার প্রধান মন্ত্রীকে ডিকের
সহিত পরামর্শ করিবার জন্য পেস্থে প্রেরণ করিলেন।
মন্ত্রী ডিকের নিকট এরূপ প্রতিশ্রুতি প্রদান করিলেন
যে, তিনি হাঙ্গারীর স্বাধীনতার পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিয়া
দিতে পারিবেন। প্রতিদানে ডিও এই প্রতিশ্রুতি
দিলেন যে, ষিয়ার সহিত যুদ্ধের সুযােগ লইয়া
যাহাতে হাঙ্গারীবাসী কোন বিপ্লব উপস্থিত না করে,
তদ্বিষয় তিনি কড়া নজর রাখিবেন।
ডি অতঃপর সম্রাটের নিকট লিখিয়া পাঠাইলেন
—“হাঙ্গারীর স্বাধীনতা পুনঃ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত
হাঙ্গারীর জাতীয় মহাসমিতি সম্রাটের কোন প্রস্তাবই
বিবেচনার যােগ্য বলিয়া গ্রহণ করিবে না।” এই
দারুণ কঠোর উক্তি শ্রবণ করিয়া সম্রাট অত্যন্ত ক্রুদ্ধ
হইলেন এবং হাঙ্গারী হইতে জোর করিয়া সৈন্য সংগ্রহ
করিবার আদেশ প্রদান করিলেন।
হাঙ্গারীর এক প্রান্ত হইতে তাপর প্রান্ত পর্যন্ত

১০৪
পরাধীনের মুক্তি
তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠিল হাঙ্গারীবাসী ক্রোধে
উন্মত্তপ্রায় হইল। ডিক্‌ কি প্রকারে বিপ্লবের পথ রুদ্ধ
করিবেন তাহা ভাবিয়া আকুল হইলেন। তিনি
বলিলেন-“আর একবার শেষ চেষ্টা করিয়া দেখা
যাউক। সম্রাটকে পুনঃ একীভূত হাঙ্গারীর দৃঢ় সঙ্কল্প
জানান হউক ; দেখা যাউক সম্রাট তাহার আদেশ
প্রত্যাহার করেন কি না। হাঙ্গারীবাসী ডিকের
প্রস্তাবে সম্মত হইল এবং সম্রাটকে হাঙ্গারীবাসীর
“শেষ-প্রস্তাব” জানান হইল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, হাঙ্গারীর অবস্থা
উপলব্ধি করিয়া সম্রাট ইতঃপূৰ্বেই সৈন্য-সংগ্রহের
আদেশ প্রত্যাহার করিয়াছিলেন এবং ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে
ডিক্‌কে ভিয়ানাতে আহ্বান করিয়া পাঠাইলেন। তিনি
ডিকের নিকট এই প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, হাঙ্গারীর
সমুদয় দাবী তিনি মঞ্জুর করিবেন। ডিকের আহ্বানের
চারিদিন পর সম্রাট জুলিয়াস্ এণ্ডে সিকে (Julius
Andrassy) ডাকিয়া পাঠাইলেন। এই জুলিয়াস
এণ্ডে সি ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে সম্রাটের বিরুদ্ধে হাঙ্গারীর
স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করিয়াছিলেন এবং সম্রাট তাহাকে
ধৃত করিবার জন্য বহুশত মুদ্রা পারিতােষিক ঘােষণা

হাঙ্গারী ১০৫ করিয়াছিলেন। সম্রাট কিছুই করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না, তাই এণ্ডে সির শরণাপন্ন ! অদৃষ্টের কি বিপর্যয়! এণ্ডে, সি ভিয়ানায় উপস্থিত হইলেন। সম্রাট তাহাকে সম্ভ্রমের সহিত গ্রহণ করিলেন এবং জাতীয় মন্ত্রণা-সমিতি গঠন করিতে তানুরােধ করিলেন। •• হাঙ্গালী স্বাধীনতা স্বীকার ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে হাঙ্গারীর জাতীয় মহাসমিতির অধিবেশন হইল। সম্রাট “শেষ প্রস্তাবের” কি উত্তর প্রদান করিয়াছেন তাহা জানিবার জন্য হাঙ্গারীবাসী উৎকণ্ঠিত হইয়াছিল। জাতীয় মহাসমিতিতে তখন ঘােষণা করা হইল যে, সম্রাট জোর করিয়া সৈন্য-সংগ্রহ- আইন (Conscription ) প্রত্যাহার করিয়াছেন ; হাঙ্গারীবাসী স্বেচ্ছায় যে সৈন্য প্রেরণ করিবেন তাহাই সাদরে তিনি গ্রহণ করিবেন এবং সম্রাট জাতীয় মহাসমিতির সমগ্ৰ দাবী গ্রাহ্য করিবেন। ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দের ৮ই জুন সম্রাট স্বয়ং পেস্থ, নগরে গমন করিলেন এবং হাঙ্গারীর সহিত চূড়ান্ত মীমাংসা করিলেন। এই মীমাংসা অনুসারে-তখন হইতে সামাজ্যের নাম হইবে ‘অষ্ট্রিয়া হাঙ্গারী সাম্রাজ্য। অষ্ট্রিয়া হাঙ্গারী ১০৬ পরাধীনের মুক্তি দুইটী স্বাধীন এবং তুল্য রাষ্ট্ররূপে থাকিবে এবং প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র রাজধানী থাকিবে, অষ্ট্রিয়ার ভিয়ানা এবং হাঙ্গারীর বুড়াপেস্থ, (Budapest) রাজধানী হইবে। উভয় দেশেরই একজন মাত্র রাজা থাকিবেন, এবং তিনি অষ্ট্ৰীয়াতে সম্রাট এবং হাঙ্গারীতে রাজ। নামে অভিহিত হইবেন। প্রত্যেক দেশে পালামেন্ট, মন্ত্রী এবং শাসন প্রণালী স্বতন্ত্র থাকিবে, আভ্যন্তরীণ সমুদয় কাৰ্য্য স্বাধীন ভাবে উভয় দেশেই পরিচালনা করিবে, একে অন্যের কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতে পারিবে না। বৈদেশিক ব্যাপার, যুদ্ধ, এবং অর্থ সমস্যা বিষয়ে মীমাংসার জন্য প্রত্যেক দেশের পার্লামেন্ট, হইতে ৬০ জন করিয়া নিৰ্বাচিত সভ্য লইয়া একটী মন্ত্রণা পরিষদ্ হইবে। এই সভা পৰ্য্যায়ক্রমে ভিয়ানা এবং বুডাপেস্থে বসিবে এবং অধিকাংশের মতানুযায়ী যে সিদ্ধান্ত স্থির হইবে উভয় দেশে তাহাই গৃহীত হইবে। বহু বৎসরের সাধনা হাঙ্গারীর সিদ্ধ হইল-হাঙ্গারী সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করিল। হাঙ্গারীতে গগন-ভেদী জয়ধ্বনি উত্থিত হইল। হাঙ্গারীবাসীগণ আমােদ- আহ্লাদে গা ঢালিয়া দিলেন, সর্বত্রই “নীয়তাং দীয়ং হাঙ্গারী ১০৭ পীয়তাং”-এর সাড়া পড়িল। দশদিক্‌ আবার সুখে হাসিল, হাঙ্গারীবাসী মুক্ত-বিহঙ্গের মত সৌভাগ্য- সােপানে আরােহণ করিতে লাগিল। ডিক্ জীবনে যে স্বাধীনতার ব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন, নিদারুণ উৎপীড়ন সহ্য করিয়াও তিনি সে ব্ৰত ভুলেন নাই। স্বাধীনতা-যজ্ঞের অগ্নি নির্বাণােন্মুখ হইলে, যজ্ঞের হবি ও ইন্ধন যােগাইয়া যজ্ঞাগ্নি প্রজ্জ্বলিত রাখিয়াছিলেন। সেই দেশপ্রাণ মহামতি ডি দেশব্যাপী এ আনন্দ উল্লাসে যােগদান করিলেন না। তিনি সম্পূর্ণ আত্মস্থ রহিলেন। কৃতজ্ঞ হাঙ্গারীবাসী দেশভক্ত ডিক্‌কে সর্বোচ্চ পদ প্রদান করিতে অভিলাষ করিলেন, কিন্তু ডিক্ তাহা গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হইলেন না। সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী ডিকে নানা প্রকার সম্মানে ভূষিত করিতে ব্যাকুল হইলেন, কিন্তু ডিক্ তাহা প্রত্যাখ্যান করিলেন। দেশ- বাসী তাহাকে জাতীয় মহাসমিতির সভাপতিত্বে বরণ করিতে চাহিলে তাহাও ডিক্‌ উপেক্ষা করিলেন। দেশের স্বাধীনতাই যাহাদের কাম্য তাহাদের ব্যক্তিগত মান সম্মান ঐশ্বর্যের কোন বাসনা থাকে না। দেশসেবার আত্মতৃপ্তিই তাহাদের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

১০৮ পরাধীনের মুক্তি ডি উচ্চ—অতি উচ্চস্তরের দেশভক্ত, তাই তিনি দেশের . মঙ্গল সাধনের জন্য নিজ কর্মের পুরস্কার গ্রহণে উদাসীন। দেশবাসীর : আপ্রাণ তানুয়ােধে ডিক্‌ কেবল জাতীয় মহাসমিতিতে একজন সাধারণ সভ্য থাকিলেন। ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে ডি মানবলীলা সম্বরণ করিয়া স্বর্গ- বাসী হইলেন। হাঙ্গারীর আকাশ হইতে একটী ধ্রুব নক্ষত্র খসিয়া পড়িল। হাঙ্গারীর আবালবৃদ্ধবনিতা তাহার বিরহে শােক-সাগরে নিমগ্ন হইলেন। হাঙ্গারীর মহারাণী অশ্রুজলে ডিকের সমাধি স্থান সিক্ত করিলেন। হাঙ্গারীবাসী কৃতজ্ঞ হৃদয়ে অদ্যাবধি ডিকের স্মৃতি তর্পণ করিয়া আসিতেছে। ডি মরিয়া অমর হইলেন— কীৰ্তির্যস্য স জীবতি।

কিউবা দ্বীপ
পরিচয়
আমেরিকার যুক্তরাজ্যের দক্ষিণে মেক্সিকো
( Mexico) উপসাগরের বক্ষে কিউবা দ্বীপ অবস্থিত।
কিউবার অতীত ইতিহাস বিস্মৃতির আবরণে ঢাকা
রহিয়াছে। প্রশান্ত-ক্রোড়ে লালিত-পালিত হইয়া
কিউবা স্বাভাবিক শশাভায় লাবণ্যময়ী হইয়াছিল।
কিউবার শ্যামল-বৃক্ষশ্রেণী, কোমল তৃণদল দর্শকের
মন-প্রাণ মুগ্ধ করিত।
আমেরিকা আবিষ্কারের সময় কিউবার কথা
কলম্বসের নিকট আমরা প্রথম শুনিতে পাই।
খৃষ্টাব্দে কলম্বসের দৃষ্টি কিউব দ্বীপের উপর পতিত
হইল—কিউবার চিত্ত-বিনােদন-দৃশ্যরাজি দেখিয়া,
১৪৯২

১১০
পরাধীনের মুক্তি
নাবিক-প্রবর অতিশয় মুগ্ধ হইলেন এবং ঐ দ্বীপে
অবতরণ করিয়া অতৃপ্ত-নয়নে প্রকৃতির নিভৃত-কুঞ্জে
লুক্কায়িত এই দ্বীপটীর সৌন্দৰ্যরাশি নয়নের সাধ
মিটাইয়া দেখিয়া লইলেন। ১৫ ০২ খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয়বার
কলম্বাস আমেরিকার পথে কিউবা দ্বীপে পদার্পণ করেন।
এই সময় তদীয় পুত্র ডিয়াগাে ভেলাজ কোয়েজ
(Diago Velaz Quez) তাহার সঙ্গে এই দ্বীপে আসিয়া
ছিলেন। ডিয়াগাের কিউবাতে আগমনই কিউবার
ভবিষ্যৎ সর্বনাশের প্রথম সূচনা করিল। ডিয়াগো
এই দ্বীপে স্পেনের উপনিবেশ স্থাপন করিতে মনস্থ
করিলেন এবং ক্রমে ক্রমে এই দ্বীপটীকে স্পেনের
সর্বতােভাবে অধীনে আনিবার তাহার প্রবল ইচ্ছা
হইল। এই উদ্দেশ্যে বারাকোয়া (Baracoa) নামক
স্থানে সর্বপ্রথম উপনিবেশ স্থাপন করা হইল,
এবং ১৫১৪ খৃষ্টাব্দে ত্রিনিদাদে (Trinidad ) দ্বিতীয়
উপনিবেশ পত্তন করা আরম্ভ হইল। এদিকে ডিয়াগাের
নাম চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল এবং কিউবায় মণি-
মাণিক্যের অভাব নাই শুনিয়া অনেক বিদেশী
প্রলুব্ধ হইয়া বসবাসের জন্য কিউবায় উপস্থিত
হয়।

কিউবা ১১১ বিদেশীর কবলে ১৫১৫ খৃষ্টাব্দে কিউবার বর্তমান রাজধানী হাভানা নগর স্থাপিত হয়। তদবধি হাভানা দিন দিন সৌভাগ্য-সােপানে আরােহণ করিতে লাগিল। বৈদেশিক জাতিসমূহ হাভানার শ্রীবৃদ্ধি দর্শনে লুব্ধ হইয়া উঠিল। প্রথমতঃ ফরাসির লুব্ধ কটাক্ষ হতভাগ্য হাভানার উপর পতিত হয়। ১৫২৮ খৃষ্টাব্দে ফরাসি দস্যগণ হাভানা আক্রমণ করে এবং ভস্মরাশি পশ্চাতে রাখিয়া চলিয়া যায়। ডি সােটো ( De Soto ) ইহা পুনঃ নির্মাণ করেন এবং চারিদিকে বেষ্টনী দিয়া দেন। খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয়বার ফরাসি কর্তৃক হাভানা আক্রান্ত হইয়া হত হয়। ভবিষ্যতে বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণ হইতে হাভানাকে রক্ষা করিবার জন্য স্পেন সম্রাটের নির্দেশমতে ১৬৬৫ খৃষ্টাব্দে হাভানার চতুর্দিকে প্রাচীর নির্মিত হয়। তৎপর অনেক বৎসর পর্যন্ত কিউবা অন্য জাতির উৎপাত- উপদ্রব হইতে নিস্তার পাইল এবং শান্তির বিমল ছায়ায় কিউবার ধনৈশ্বৰ্য্য দিন দিন বৰ্ধিত হইতে লাগিল। নিরবচ্ছিন্ন শান্তি কোন দেশের ভাগ্যেই ঘটে না। কিউবার সুখশান্তিময় জীবনও ধীরে ধীরে অবসান ১৫৫৪

১১২
পরাধীনের মুক্তি
হইয়া আসিল। ১৭৬২ খৃষ্টাব্দে জর্জ পােক ( George
Pock) এবং লর্ড এবিমার্লের (Lord Albemarle)
অধীনে একদল ইংরাজ সৈন্য হাভানা আক্রমণ করিয়া
অনেক সৈন্য বলিদান দিয়া উহা দখল করিল এবং ৬ই
জুন হইতে ১৪ই আগষ্ট পর্যন্ত হতভাগ্য হাভানায় লুণ্ঠন,
নরহত্যা প্রভৃতি অত্যাচার অবাধগতিতে চালাইল ;
ইহার ফলে নূন্যাধিক ৭ লক্ষ ৩৬ হাজার ১ শত ৮৫
পাউণ্ড মূল্যের দ্রব্যাদি লুণ্ঠিত হইল। প্রায় দশ মাস
কাল হাভানা ইংরাজের অধিকারে ছিল ; পরে ১৭৬৩
খৃষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারী মাসে প্যারিস সন্ধি-সৰ্তে ফ্লোরিডা
দ্বীপের ( Florida) বিনিময়ে হাভানা স্পেনের হস্তে
অর্পিত হইল। তদবধি স্পেনের বিজয় পতাকা কিউবার
বক্ষে উড্ডীন হয়।
স্পেন হইতে নিযুক্ত জনৈক শাসনকর্তা সসৈন্য
কিউবায় থাকিয়া শাসন-সংরক্ষণ করিতেন।
খৃষ্টাব্দে লাস্কাসাস্ ( Lus Casas) নামক একব্যক্তি
কিউবার শাসনকর্তারূপে নিযুক্ত হইয়া কিউবাতে
গমন করেন। এই সময় কিউবাতে ক্রীতদাস ব্যবসায়
বহুল পরিমাণে প্রচলন ছিল। আফ্রিকার অধিবাসি-
গণকে ধরিয়া আনিয়া ক্রীতদাসরূপে কিউবা এবং
১৭৯০

কিউবা
১১৩
•
অন্যান্য স্থানে বিক্রয় করা হইত। পরে দাস ব্যবসায়
নিবারণের অন্য ব্রিটন এবং স্পেনের মধ্যে এরূপ স্থির
হয় যে ১৮২০ খৃষ্টাব্দের পর এই প্রথা বন্ধ হইবে, কিন্তু
গােপনে গােপনে ঐ ব্যবসায় চলিতে থাকে।
১৮০২ খৃষ্টাব্দে হাভানার অন্তর্গত জেনুমারিয়া পল্লী
দৈবাৎ ভস্মসাৎ হয়। প্রায় ১১ হাজার ৪ শত লােক
গৃহশূন্য হয়। কিউবাবাসী মনে করিল ইহা ভগবানের
অভিসম্পাতের ফল—কিউবার বক্ষে বিদেশী শাসন
ভগবানের ঈপ্সিত নহে; সুতরাং এই অশুভ-ঘটনা
হইতেই জাতীয়মঙ্গলের প্রথম সূত্রপাত আরম্ভ হইল।
কিউবার নানাস্থানে অশান্তি দেখা দিল এবং অল্পদিন
মধ্যে প্রায় সর্বত্র ভীষণ বিদ্রোহানল প্রজ্জ্বলিত
হইল।
এই সময় ইউরােপের সকল জাতির হৃৎকম্প
উপস্থিত করিয়া, নেপােলিয়ন বােনাপার্ট ফ্রান্সে এক
নবযুগের প্রতিষ্ঠা করিতেছিলেন। ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে
নেপােলিয়ন অতি কৌশলে স্পেন নৃপতি চালকে
( Charles IV ) সিংহাসনচ্যুত করিয়া আপন ভাতা
যােসেফকে ( Joseph) স্পেনের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত
করেন। স্পেনের জনসাধারণ নেপােলিয়নের আচরণে

১১৪
পরাধীনের মুক্তি
অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইল এবং পূর্ব রাজবংশ পুনঃ প্রতিষ্ঠিত
করিবার জন্য ফরাসীর বিরুদ্ধে জীবন-মরণ-পণ করিয়া
যুদ্ধ করিতে লাগিল। স্পেনে জলের মত অর্থ ব্যয়
হইতে লাগিল। যুদ্ধের এই অর্থ সংগ্রহ করিবার জন্য
নানা প্রকারে পীড়ন করিয়া কিউবাবাসীর নিকট
হইতে অর্থ সংগৃহীত হইতে লাগিল। এই সময়
হইতে কিউবার সকল ক্ষমতা সামরিক সেনাপতির
উপর প্রদত্ত হইল। অবৈধ অত্যাচারের অবশ্যম্ভাবী
ফল হইল কিউবাবাসীর ষড়যন্ত্র।
স্পেনের বিরুদ্ধে ষড়ষন্ত্র
প্রকাশ্য ভাবে কিউবাবাসী স্পেন সরকারের
অত্যাচার নিবারণ করিতে অসমর্থ হইয়া গুপ্ত সমিতি
প্রতিষ্ঠা করিয়া উৎপীড়ন নিবারণে কৃতসঙ্কল্প হইল।
১৮২৯ খৃষ্টাব্দে ‘ব্লা ঈগল’ ষড়যন্ত্র, ১৮৪৪ খৃষ্টাব্দে কৃষ্ণ
জাতির বিদ্রোহ, ১৮৪৯, ১৮৫৩, ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে
নারসিসসা লােপেজ ( Narciso Lopez) কর্তৃক ষড়যন্ত্র
এবং ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দের ষড়যন্ত্র—এই সকলই বৈদেশিক
শাসনে অতিষ্ঠ দেশবাসীর পরাধীনতা বিদূরিত
করিবার অভিব্যক্তি।

কিউবা
১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে স্পেন হইতে একটী সামরিক কমিশন
কিউবায় প্রেরিত হয় ; এই কমিশনের অমানুষিক
অত্যাচার কিউবাকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিয়াছিল।
স্পেনের বিরুদ্ধে কোন গুপ্ত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিবার
সন্দেহে ৩ হাজারের অধিক কিউবাবাসী ধৃত হয় এবং
তাহাদের উপর ভীষণ অত্যাচার করিবার পর অনেককে
কারাগারে পাঠান হইল, কতককে ফাঁসী দেওয়া হইল
এবং অবশিষ্ট সকলকে কিউবা হইতে নির্বাসিত করা
হইল।
১৮৫২ খৃষ্টাব্দে লােপেজ যুক্তরাজ্য হইতে প্রায়
৩ শত সৈন্য লইয়া কিউবা আক্রমণ করিলেন, কিন্তু
তিনি পরাজিত হইলেন এবং যাহারা আত্মসমর্পণ
করিল তাহাদিগকে গুলি করিয়া হত্যা করা হইল।
উপর্যুপরি অশান্তির প্রবল ঝড় বহিয়া যাওয়ায়
দেশবাসী অবসন্ন হইয়া পড়িল। স্পেনের অত্যাচারে
কিউবাবাসীর দুরবস্থা সন্দর্শনে যুক্তরাজ্যের উদারচেতা
প্রেসিডেন্ট মিঃ পােত্ (Pock) ১৮৪৮ অব্দে ১০ কোটা
ডলার মূল্যে কিউবা ক্রয় করিবার জন্য স্পেনের নিকট
প্রস্তাব করেন। স্পেন এ প্রস্তাবে সম্মত হইল না
এবং কিউবায় পীড়ন-স্রোত রুদ্ধ করিয়া শান্তি স্থাপনও

১১৬
পরাধীনের মুক্তি
করা হইল না। ফলে ১৮৬৮ হইতে ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত
১০ বৎসর ব্যাপী যুদ্ধ হয়। এই দশ বৎসর ব্যাপী
যুদ্ধের সময় স্পেনের লক্ষ্য ছিল—কিউবাকে মরুভূমিতে
পরিণত করা। বিদ্রোহীদিগকে দমন করিবার জন্য
স্পেন ২ লক্ষ ৫৭ হাজার সৈন্য কিউবায় প্রেরণ
করিল। সরকারী বিবরণ হইতে জানা যায় যে, এই
সৈন্যের ২ লক্ষ ৮ হাজার মারা যায় ; অপরদিকে
কিউবার স্ত্রী, পুরুষ, বালক বালিকা সমেত ৪০ হাজার
লােক হত হয় ; এবং যুদ্ধের খরচ ও ধ্বংস সম্পত্তির
মূল্য সহ ৩০ কোটী ডলারের অধিক খরচ হইয়াছিল।
এই সময়ে একদিকের অত্যাচার এবং অপর
দিকের বিদ্রোহানলে, দেশব্যাপী হাহাকার ধ্বনি
উঠিল। অবশেযে কিউবায় শান্তি স্থাপনের জন্য
স্পেন সরকার মার্টিনেজ ক্যাম্পজকে (Martinez
Caunpos} কিউবায় প্রেরণ করেন। ক্যাম্পজ,
কিউবায় পৌছিয়া বিদ্রোহীদলের নায়ককে এক
বৈঠকে আহ্বান করেন এবং জঞ্জন ( Zanjon) নামক
স্থানে তিনি এক সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এই
সন্ধির সৰ্ত্তে স্থির হইল যে—(ক) বিদ্রোহিগণকে ক্ষমা
করা হইবে, (খ) বিদ্রোহীদলের ক্রীতদাসগণকে মুক্তি
।

কিউবা ১১৭ দেওয়া এবং দাসপ্রথা রহিত করা হইবে, (গ) স্পেন- বাসীর সহিত কিউবাবাসীর সমান অধিকার প্রদান করা হইবে । অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা প্রদান করা হইলেও বল, চুল ও চাতুরী দ্বারা স্পেনের আধিপত্য অটুট রহিল এং এই সৰ্তানুসারে কোন কাজই করা হইল । ৩. কিন্তু কিউবার উপর সর্বপ্রকার অত্যাচার ও উৎপী , চলিতে লাগিল এবং এই যুদ্ধের যাবতীয় খরচ কিউ. কে বহন করিতে বাধ্য করা হইল; অথচ অন্যান্য দেশের সঙ্গে ব্যবসায় বাণিজ্য করিয়া কিউবার অর্থাগমের পথ নানা প্রকারে রুদ্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। দেশে অশান্তি ; জ্ঞানে, বংশে, ও গৌরবে শ্রেষ্ঠ হইলেও সরকারের নিকট কিউবাবাসীর কোনও আদর ছিল না; শিক্ষিত দেশবাসীকে উপেক্ষা করিয়া, অশিক্ষিত, দাম্ভিক স্পেনীয়গণকে উচ্চ উচ্চ পদ প্রদান করা হইত। অবশ্য তোমােদকারীর मन উচ্চপদ পাইত ; কিন্তু কি আপদ, এদের অত্যাচারের মাত্রা তীব্র ! ; ১১৮ পরাধীনের মুক্তি বিদেশী স্পেনীয়দের হইতেও অনেক বেশী—অনেক ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দে কয়েকজন স্কুলের বালক জনৈক স্পেনীয় কর্মচারীর কবরের প্রস্তরের উপর কয়েক ছত্র অসম্মানসূচক কবিতা লিখিয়াছিল ; ইহার ফলে, কেবল সন্দেহের উপর নির্ভর করিয়া, তিনজন বালকের প্রাণ- দণ্ডের আজ্ঞা দেওয়া হয় এবং গুলি করিয়া তিনটী বালককেই হত্যা করা হইল। এই সামান্য অপরাধে কঠোর দণ্ডের বিধান দেখিয়া কিউবাবাসী রাজকর্মচারি- গণের উপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইল এবং তাহাদের বিদেশী বিদ্বেষ দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। কিউবাবাসী চিনির ব্যবসায় করিয়া বিস্তর অর্থ উপার্জন করিত, কিন্তু ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে এই চিনির ব্যবসায় হঠাৎ বিনষ্ট হইল, সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের অর্থাগমের প্রধান পথ রুদ্ধ হইল ; ফলে সমগ্র কিউবা ব্যাপী হাহাকার রব উঠিল ! কিউবাবাসী এই বিষম দুর্দিনে স্পেনের কোন সাহায্য ত পাইলই না, অধিকন্তু গুরু করভারে জর্জরিত হইল। ফরাসীর সহিত যুদ্ধে স্পেন ভীষণভাবে ঋণগ্রস্ত হইয়াছিল। এখন এই ঋণ পরিশােধের জন্য স্পেন কিউবাতে ৫২ লক্ষ ৪০ হাজার পাউণ্ড রাজস্ব আদায় ;

কিউবা ১১৯ ; করিতে বদ্ধপরিকর হইল ; বলা বাহুল্য যে, এই ঋণ-লব্ধ অর্থদ্বারা কিউবার তিলমাত্রও উপকার হইল না। কিউবাবাসীকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য স্পেন-সরকার শাসন- প্রণালী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি প্রদান করিল বটে, কিন্তু মুখে যাহা বলা হইল, কাৰ্য্যে হইল—তাহার ঠিক বিপরীত। বিদ্রোহ নানাপ্রকার অত্যাচারে প্রপীড়িত হইয়া কিউবাবাসী অতিষ্ঠ ইইয়া উঠিল। এমন সময় দেশ-ভক্ত যােশী মার্টির (Jose Marti) ওজস্বিনী বক্তৃতায় কিউবাবাসী উন্মত্ত হইয়া উঠিল। যােশী মার্টির বক্তৃতা শ্রবণে কিউবাবাসীর প্রাণে গাঢ় দেশানুরাগ জাগিয়া উঠিল, বিদেশী শাসক ও শাসনের প্রতি তাহাদের তীব্র ঘৃণা জন্মিল ; সঙ্গে সঙ্গে বিদেশীর শাসন-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইবার জন্য তাহারা বদ্ধপরিকর হইল। স্পেনের শাসন বিদূরিত করিবার জন্য যােশী মার্টি কিউবায় এক বিদ্রোহীদল গঠন করিতেছিলেন; কিন্তু বিদ্রোহ ঘােষণা করার পূর্বেই তাহাকে গুলি করিয়া হত্যা করা হইল এবং সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহের উদ্যোগ আয়ােজন ব্যর্থ হইয়া গেল। ;

পরাধীনের মুক্তি
১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে জেসাস্ রাবির অধিনায়কত্বে ও শত
লােক, দারা নামক স্থানে স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ
করিল,—এই হইল বিদ্রোহের প্রথম সূচনা। এই
বিদ্রোহীদলের মধ্যে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ ছিল বলিয়া
সরকার ইহা শ্বেত-কৃষ্ণের স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব বলিয়া
উপেক্ষা করিল। পরে ব্যাপার গুরুতর হইয়া
উঠিল। স্পেন তখন উদাসীন থাকার ভুল সংশােধনের
জন্য মার্টিনেজ, ক্যাম্পেসের অধীনে
সৈন্য প্রেরণ করিল। শাসন-পদ্ধতি পরিবর্তন করিয়া
কিউবাবাসীকে সন্তুষ্ট করিলে সহজে শান্তি স্থাপনের
আশা করা যাইত, কিন্তু ক্যাম্পেসূকে শাসন-পদ্ধতি
পরিবর্তনের কোনও ক্ষমতা প্রদান করা হয় নাই,
সুতরাং গােলাগুলি দ্বারা বিদ্রোহ দমন করিতে
ক্যাম্পেস্ চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
কিউবার এই বিদ্রোহ সাধারণতঃ তিন ভাগে
বিভক্ত করা যাইতে পারে—প্রথম বিদ্রোহ দমনে
মার্টিনেজ, ক্যাম্পে, দ্বিতীয় বিদ্রোহ দমনে অত্যাচারী
ওয়াইলার ( Weylar) এবং তৃতীয় শান্তি স্থাপনে
রাঙ্কো।

কিউবা
১২১
বিদ্রোহ দমনে মার্তিনে ক্যাম্পে
ক্যাম্পে অতিশয় ভদ্রলােক ছিলেন, তিনি কোন
অবৈধ পন্থা বা ছলনা অবলম্বন করিয়া যুদ্ধ করিলেন না।
অপর দিকে মাসিমাে গোমেজ, (Maximo Gomoz)
এবং এন্টোনিও মেসিও (Antonio Maceo) বিদ্রোহী
দলের সুচতুর সেনাপতি ছিলেন। তাহারা গরীলা
যুদ্ধ
করিতে লাগিলেন ; তাহারা জানিতেন, কখন শত্রু-সৈন্য
আক্রমণ করিতে হইবে এবং কখনই বা পাশ কাটিয়া
দাড়াইতে হইবে। অধিকন্তু তাহার। কিউবার প্রত্যেক
কৃষকের সহানুভূতি পাইয়াছিলেন বলিয়া অধিক শক্তি-
শালী হইয়াছিলেন। শত্রু-সৈন্যের গতিবিধির সংবাদ
এই কৃষকগণ তাহাদিগকে দিত এবং গােপনে রসদ
সরবরাহ করিত। এন্টোনিও আপনার জীবনের প্রতি
কিছুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করিতেন না এবং যখন তখন
বিপদের সম্মুখীন হইতে ইতস্ততঃ করিতেন না; ফলে
তিনি আহত হইয়া প্রাণত্যাগ করিলেন।
গোমেজ পূর্বে স্পেন সৈন্যভুক্ত থাকিয়া যুদ্ধবিদ্যায়
পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন ; এন্টোনিওর পর
তিনিই বিদ্রোহীদলের নায়ক হইলেন। কিন্তু সমগ্র

লক্ষ। ১২২ পরাধীনের মুক্তি কিউবাব্যাপী উত্তেজনার স্রোত প্রবাহিত হইলেও গােমেজের অধীনে বিদ্রোহীদের সংখ্যা মাত্র ১০ হাজার ছিল। অপরদিকে স্পেনীয় সৈন্যের সংখ্যা ছিল ১ ১ লক্ষের সহিত মাত্র ১০ হাজার সৈন্যের যুদ্ধ করা অসম্ভব হইলেও কিউবাতে তাহা সম্ভব হইয়াছিল। কারণ স্পেনীয় নূতন সৈন্যদলের পথঘাট জানা ছিল না এবং তাহাদের খাদ্যাদিরও বিশেষ অনটন ছিল ; সর্বোপরি সংক্রামক ব্যাধিতে সৈন্যগণ অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল। গােমেজের কিন্তু এরূপ কোনও অসুবিধা ছিল না। নিউইয়র্কস্থ কিউবাবাসিগণ “জুন্টা” নামক একটা সমিতি স্থাপন করিয়া কিউবার জন্য অর্থ এবং অস্ত্রাদি সংগ্রহ করিয়া কিউবাতে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিতে লাগিল। ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দে বিদ্রোহী সৈন্য হাভানার নিকটবর্তী স্থান আক্রমণ করিল। ক্যাম্পে বাধা প্রদান করিয়া তাহাদের গতিরােধ করিতে পারিলেন না। সুতরাং তাহাকে বিদ্রোহ দমন করিতে অসমর্থ দেখিয়া স্পেন- সম্রাট তাহাকে ডাকাইয়া পাঠাইলেন।

কিউবা
১২৩
বিদ্রোহ দমনে অত্যাচারী ওয়াইলা
১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে ক্যাম্পেসের স্থলে বিদ্রোহ দমন
করিবার পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করিয়া জেনারেল
ওয়াইলারকে স্পেন-সম্রাট কিউবায় প্রেরণ করেন।
ওয়াইলারের অধীনে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার সৈন্য
ছিল।
কিউবায় পদার্পণ করিয়াই ওয়াইলার জানিতে
পারিলেন যে, কিউবার কৃষকগণ বিদ্রোহিগণকে খাদ্য
সরবরাহ করিতেছে, স্পেনিস সৈন্যের গতিবিধির সংবাদ
লইয়া বলিয়া দিতেছে এবং বাহির হইতে কিনিয়া বা
চুরি করিয়া অস্ত্র শস্ত্র, গােলা বারুদ বিদ্রোহিগণকে
সংগ্রহ করিয়া দিতেছে।
ওয়াইলার বুঝিলেন যে,
বিদ্রোহ দমন করিতে হইলে এই পথ প্রথমেই
রুদ্ধ করিতে হইবে । সুতরাং তিনি প্রথমেই একটী পল্লীর
কিয়দংশ বেষ্টন করিয়া ফেলিলেন এবং বিভিন্ন গ্রাম
হইতে নির্দোষ নিরীহ স্ত্রীলােক এবং বালক বালিকা-
গণকে জোর করিয়া ধরিয়া আনিয়া ঐ বেষ্টনীর ভিতর
আবদ্ধ করিয়া রাখিলেন। প্রায় ৩ লক্ষ স্ত্রীলােক ও
বালকবালিকাকে এইরূপভাবে তিনি আটক করিয়া

১২৪ পরাধীনের মুক্তি রাখিলেন। কোন বিদ্রোহী যাহাতে গ্রামবাসীর নিকট হইতে কোন প্রকার সাহায্য না পায় তাহা নিবারণের জন্য তিনি এই ব্যবস্থা করিলেন। পরিবারবর্গের এতাদৃশ দুরবস্থার কথা শুনিয়া বিদ্রোহিগণ আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হইল। এই পরিবেষ্টিত স্থানে যে কি ভীষণ অত্যাচার, কি সর্বনাশ হইয়াছিল, তাহা বর্ণনার অতীত! কত যে সতীর সতীত্ব নষ্ট হইল, কত যে মানীর মান বিনষ্ট হইল, কত স্ত্রীলােক যে চিরদিনের জন্য অনাথা হইল, কত লােক যে মহামারীতে জীবন বিসর্জন দিল, কত লােক যে অনাহারে প্রাণ হারাইল, তাহার ইয়ত্তা নাই। এই ভীষণ অত্যাচার-কাহিনী স্মরণ করিলে পাষাণও বিদীর্ণ হয়। কন্সলেসিয়ম্ ডেসার নামক এইরূপ একটী অবরুদ্ধ পল্লীতে এরূপ ভীষণ অত্যাচারে ১০ হাজারের অধিক নিরীহ নর-নারী নিহত হইয়াছিল। ওয়াইলারের ইহাতেও মন উঠিল না; তিনি সৈন্যগণকে আদেশ করিলেন—“তােমরা যে পথ দিয়া যাইবে, সেই পথের উভয় পার্শ্বস্থ যাবতীয় ঘরবাড়ী ভস্মসাৎ করিবে, শস্য- ক্ষেত্র ধ্বংস করিবে এবং কিউবাবাসী দেখিলেই গুলি করিয়া মারিয়া ফেলিবে।” কি ভীষণ আদেশ ! এই ;

কিউবা নিষ্ঠুর আদেশ কার্যে পরিণত হইতে বিলম্ব হইল না। কিউবার গগন বিদীর্ণ করিয়া দিবারাত্র কেবল হাহাকার ধ্বনি উঠিতে লাগিল। সমুজ্জ্বল উনবিংশ শতাব্দীতে কিউবার বুকের উপর ওয়াইলারের এই হৃদয়বিদারক অত্যাচার- কাহিনী ইতিহাসের পাতায় পাতায় যে কলঙ্কের কালী ঢালিয়া দিল, যুগ যুগান্তের চেষ্টাতেও সে কালীর দাগ আর মুছিবে না। ওয়াইলার ও মুক্তপ্রাজ্য জুন মাসে যুক্তরাজ্য হইতে ‘কমপিটিটর’ নামক একখানা জাহাজ ভেরিওর উত্তর বন্দরে উপনীত হয়। ওয়াইলারের আদেশে এই জাহাজ ধৃত হয় এবং আরােহিগণের প্রতি প্রাণদণ্ডের আদেশ দেওয়া হইল। অভিযােগ এই ছিল যে, ঐ জাহাজে বিদ্রোহিগণের জন্য অস্ত্রশস্ত্র আসিতেছিল। যুক্তরাজ্যের অধিবাসিগণ এই সংবাদে অত্যন্ত বিরক্ত হইল এবং ইহার আশু প্রতিকার দাবী করিল। ইহাতে ওয়াইলার সন্ত্রস্ত হইয়া আরােহিগণকে কয়েকদিন বন্দী রাখিয়াই মুক্ত করিয়া দিলেন।

১২৬ পরাধীনের মুক্তি যুক্তরাজ্যের সহিত স্পেনের এক সৰ্ত্ত ছিল যে, কিউবার কোন অধিবাসী কিছুকাল যুক্তরাজ্যে বসবাস করিলে, সে যুক্তরাজ্যের অধিবাসী বলিয়া গণ্য হইবে। রিউয়স্ নামক এক ব্যক্তিকে স্পেনীয়গণ আবদ্ধ করিল। স্পেন ও যুক্তরাজ্যের সর্তানুসারে রিউয়স আমেরিকা- বাসীর অধিকারে অধিকারী। আবদ্ধ অবস্থায়ই রিউয়সের মৃত্যু হয়। ইহার ফলে স্পেনের সহিত যুক্ত- রাজ্যের মনােমালিন্য আরও ঘনীভূত হয়। ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে ৮ই আগষ্ট স্পেনের প্রধান মন্ত্রী ক্যাটিলােকে (Castillo) হত্যা করা হইলে কিউবায় ওয়াইলারের অবস্থান আর সম্ভব হইল না। তিনি স্পেনে ফিরিয়া যাইতে বাধ্য হইলেন। জেনারেল রাঙ্কে। তাহার স্থান পূরণ করিলেন। শান্তিস্থাপনে ব্লাঙ্কো ব্লাঙ্কো কিউবায় পদার্পণ করিয়াই অবরুদ্ধ নর- নারীগণকে মুক্ত করিয়া দিলেন। বন্দী নরনারী মুক্ত হইল বটে, কিন্তু তাহারা এখন যাইবে কোথায় ? তাহাদের ঘরবাড়ী যে আর নাই, ওয়াইলার সব ধ্বংস করিয়া ফেলিয়াছে।

কিউবা ১২৭ ব্লাঙ্কো যুদ্ধ স্থগিত রাখিয়া ঘােষণা করিয়া দিলেন যে, যাহারা আত্মসমর্পণ করিবে তাহাদের আর কাহারও কোন শাস্তি ভােগ করিতে হইবে না। ওয়াইলারের যথেচ্ছভাবে কিউবাবাসীকে হত্যা করিবার আদেশও তিনি প্রত্যাহার করিলেন। অবশেষে ১৮৮৮ খৃষ্টাব্দে ১লা জানুয়ারী স্পেনের ক্যাডিকে নেতৃপদ প্রদান করিয়া, কিউবায় ঔপনিবেশিক স্বায়ত্ত- শাসন ঘােষণা করা হইল। কিন্তু ইহাতে কোনও সুফল ফলিল না ; উপযুপরি প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে স্পেন সরকারের কথায় কিউবাবাসী আর বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারিল না। ব্লাঙ্কোর কথায় কাহারও আর প্রত্যয় জন্মিল না। কিউবাবাসী মনে করিল ব্লাঙ্কো কেবল প্রতারণার জাল বিন্যাস করিতেছেন মাত্র। যুক্তরাজ্যের উদারচেতা ব্যক্তিগণ দুস্থ কিউবাবাসীর জন্য তাহাদের কিউবাস্থ প্রতিনিধির মারফতে যাহাতে সাহায্য প্রেরণ করেন, এরূপ প্রস্তাব করিতে বলিয়া ব্লাঙ্কো কিউবার নেতাগণের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন। কিউবাবাসীর দুরবস্থার জন্য স্পেনই একমাত্র দায়ী। কিন্তু তাহারা এখন ইহার প্রতিকারের জন্য ভিন্ন দেশীয়দের করুণা ভিক্ষা করিবে ? কিউবাবাসী

দিল।
১২৮
পরাধীনের মুক্তি
ইহাতে ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিল এবং ব্লাঙ্কোর প্রেরিত
দূতকে একজন বিদ্রোহী সেনাপতি হত্যা করিয়া
ফেলিলেন এবং যখন জানা গেল যে, কিউবার
সাহায্যার্থ যুক্তরাজ্যে আবেদন করা হইয়াছে, তখন
ইহার প্রতিবাদকল্পে হাভানায় ভীষণ দাঙ্গা ঘটিল ;
ইহার ফলে আমেরিকা তাহার স্বার্থরক্ষার জন্য ১৮৯৮
খৃষ্টাব্দে ২৫শে জানুয়ারী ‘মেইন’ ( Maine) নামক
একখানা যুদ্ধ-জাহাজ হাভানার উপকূলে পাঠাইয়া
১৫ই ফেব্রুয়ারী হঠাৎ এই জাহাজখানা
জলমগ্ন হওয়ায় ২৫৭ জন লােক প্রাণত্যাগ করে।
যুক্তরাজ্যে প্রকাশ যে-স্পেনীয়গণ জাহাজখানা
ডুবাইয়া দিয়াছে। বলা বাহুল্য এই ঘটনায় যুক্তরাজ্যের
সহিত স্পেনের বিবাদ আরও ঘনীভূত হইয়া আসিল।
এদিকে ব্লাঙ্কো আবার যুদ্ধ আরম্ভ করিয়া দিলেন।
এই সময় মহামতি ম্যাকিলে ( Me Kinley)
যুক্তরাজ্যের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিউবাকে মুক্ত
করিয়া স্পেনের স্বেচ্ছাচারিতার অবসান করিতে তাহার
প্রবল আগ্রহ জন্মিল। ১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে তিনি যুক্তরাজ্যের
কংগ্রেস আহ্বান করেন। এই কংগ্রেসে ধার্য হইল
যে, (ক) কিউবাবাসী সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকিবে, (খ) স্পেন

১২৯ ; কিউবা কিউবা হইতে সৈন্য উঠাইয়া লইবে এবং স্পেনের শাসনের অবসান হইবে; (গ) এ প্রস্তাব কার্যে পরিণত করিতে কিউবাকে সৈন্য ও অর্থ সাহায্য করিতে হইবে। প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সম্বলিত একখানা কাগজে এই প্রস্তাবগুলি লিপিবদ্ধ করিয়া স্পেন-সরকারের নিকট প্রেরণ করা হইল। কিন্তু স্পেন-সরকার সন্তোষ- জনক কোনও প্রত্যুত্তর প্রদান করিল না। আপােষে কাৰ্য্য হইবে না দেখিয়া যুক্তরাজ্যের প্রেসিডেন্ট স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কিউবায় সৈন্য প্রেরণ করিলেন। জলে, স্থলে সর্বত্র সমর ভেরী বাজিয়া উঠিল। এই সময় স্পেনের রাজা ত্রয়ােদশ আলফেসাে (Alfonso XIII) অল্পবয়স্ক বালক ছিলেন। রাজ-মাতা মেরিয়া ক্রিশ্চিনা ( Maria Christina) তত্ত্বাবধায়ক- রূপে রাজকার্য পরিচালনা করিতেছিলেন। আসন্ন বিপদের প্রতিকার করিবার জন্য রাজমাতা ইংলণ্ডের মহারাণী ভিক্টোরিয়ার শরণাপন্ন হইয়া যুদ্ধ মিটমাট করিয়া দিবার জন্য এক কাকুতি-মিনতি-পূৰ্ণ পত্র লিখিলেন। কিন্তু ইহাতে কোন ফল হইল না। যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ১লা জুলাই হইতে ক্রমাগত তিন দিবস

পরাধীনের মুক্তি
ব্যাপী যুদ্ধ হইল। স্পেন-সৈন্য সর্বত্রই বিধ্বস্ত হইতে
লাগিল। স্পেনীয় অধিকাংশ যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস
হইল এবং এই তিন দিন যুদ্ধের ফলে স্পেনের ৬ শত
সৈন্য নিহত ও ২ হাজার বন্দী হইল এবং সান্টিয়াগাে
যুক্তরাজ্যের অধিকৃত হইল। এই সান্টিয়াগাে পতনের
সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের পতনও নিকটবর্তী হইয়া আসিল।
২৬শে জুলাইর পর যুদ্ধ স্থগিত রাখা হইল এবং
ফরাসী রাজদূত শান্তির প্রস্তাব উপস্থিত করিলেন।
১৮৯৮ খৃঃ ১০ই ডিসেম্বর প্যারিস সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়
এবং উহাতে স্থির হইল যে, (ক) কিউবায় স্পেনের
আধিপত্যের অবসান হইবে; (খ) স্পেনীয়গণ কর্তৃক
অধিকৃত পাের্টরিকো এবং অন্যান্য দ্বীপ যুক্তরাজ্যের
হস্তে অৰ্পণ করিতে হইবে এবং (গ) এই সর্তানুসারে
কাৰ্য্য না হওয়া পর্যন্ত কিউবায় যুক্তরাজ্যের সৈন্য
থাকিবে। মেইন ধ্বংসের ব্যাপার অনুসন্ধানের জন্য
একটী কমিটি গঠিত হইল এবং স্থির হইল যে, এই
কমিটির সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষ মানিয়া লইবে ।
প্রকৃত প্রস্তাবে ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারী
হইতে কিউবা যুক্তরাজ্যের অধিকারে আসে এবং সঙ্গে
সঙ্গে কিউবা শ্ৰীসম্পন্ন হইয়া উঠিতে থাকে।

কিউবা
যুক্তরাজ্যের সহায়তায় কিউবা পুনঃ গৌরবমণ্ডিত
হইল সত্য, কিন্তু ওয়াইলারের সময় জাতীয় দলও
কম বীরত্ব প্রদর্শন করে নাই। সেনাপতি আন্টোনিও
মিসিও নিহত হইলেও কিউবার সৈন্যগণ কিছুমাত্র
দমিয়া যায় নাই বা নিরুসাহও হয় নাই। বিদ্রোহিগণ
ওয়াইলার ও ব্লাঙ্কোকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছিল।
এদিকে কিন্তু যুক্তরাজ্যের জয় লাভের সঙ্গে সঙ্গে
কিউবার নেতৃবর্গের মধ্যে এক জটিল শঙ্কট উপস্থিত
হইল। তাহাদের এ সন্দেহ হইল যে, বুঝিবা
যুক্তরাজ্য কিউবা ফিরাইয়া না দেয়।
এই সন্দেহজাল
ছিন্ন করিবার জন্য জেনারেল গার্সিয়াকে কিউবা-
বাসী প্রতিনিধি নির্বাচন করিয়া যুক্তরাজ্যের রাজধানী
ওয়াশিংটনে প্রেরণ করিল। তাহার চেষ্টায় যুক্তরাজ্যের
সহিত কিউবার এক সৰ্ত্ত সাব্যস্ত হইল। কিন্তু
কিউবাতে ফিরিয়া আসিবার পূর্বেই গার্সিয়ার মৃত্যু
হয়। কিউবাবাসী এই সংবাদে মর্মাহত হইল। এক
খানা যুদ্ধ জাহাজ গার্সিয়ার মৃত দেহ লইয়া কিউবায়
ফিরিয়া আসিল।
মিঃ রুজভেল্ট (Roosevelt) এই সময় যুক্তরাজ্যের
প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি কিউবাকে পূর্ণ স্বাধীনতা

১৩২ পরাধীনের মুক্তি প্রদান করিলেন। প্রেসিডেন্ট ম্যাকিলে কিউবাকে স্পেনের অত্যাচার হইতে অব্যাহতি প্রদান করিয়া- ছিলেন, রুজভেল্ট কিউবাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন। ১৯০২ খৃঃ অব্দের ২০শে মে পূর্বাহ্ন ১২ ঘটিকার সময় আমেরিকা কিউবা প্রত্যর্পণ করিল এবং ঐ সময়ই কিউবায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইল। সামরিক শাসন- কর্তার অভ্যর্থনা গৃহ কিউবা হস্তান্তরের জন্য সুসজ্জিত হইল। সভাগৃহ যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি, সেনাপতিগণ এবং কিউবার বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের সমাবেশে পূর্ণ হইল। সভাগৃহের বহির্ভাগ অগণিত কিউবাবাসী এবং আমেরিকার সৈন্যের মিলনে অভিনব শােভা ধারণ করিল। যথা সময় সভার কাৰ্য্য আরম্ভ হইল। যখন কিউবা হস্তান্তরের বিবরণী যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি পাঠ করিতেছিলেন এবং সভাপতি পার ইহার প্রত্যুত্তর প্রদান করিতেছিলেন, তখন দুর্গ হইতে ২৫টী তােপ- ধ্বনি হইল। সভা গৃহের সম্মুখে আমেরিকার অশ্বারােহী সৈন্যগণ কিউবার সৈন্যগণকে অস্ত্রশস্ত্র উপহার প্রদান করিল। ব্যান্ডওয়ালারা আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত বাজাইতে বাজাইতে যুক্তরাজ্যের জাতীয় পতাকা নামাইয়া লইল এবং তৎপরেই কিউবার জাতীয় পতাকা

কিউবা
উড়ান হইল। ২১টী তােপধ্বনি দ্বারা এই জাতীয়
পতাকার সম্বৰ্ধনা করা হইল ; তৎপর আমেরিকার
সৈন্য কিউবার জাতীয় পতাকা নমস্কার করিয়াই
জাহাজে উঠিয়া রওনা হইল।
উপকূল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এবং বহিঃ শত্রুর
আক্রমণ হইতে কিউবা আত্মরক্ষা করিতে প্রস্তুত না
হওয়া পর্যন্ত পেষ্টিয়াগো, কিনফিগস্ এবং হাভানায়
যুক্তরাজ্যের কতক সৈন্য রহিয়া গেল।
কিউবার সহিত যুক্তরাজ্যের যে সৰ্ত্ত সাব্যস্ত হইয়া-
ছিল, তাহার কতকটা উল্লেখ করা হইতেছে—(ক)
কিউবার স্বাধীনতা যাহাতে ধ্বংস বা সঙ্কুচিত হইতে
পারে, কোন বৈদেশিক জাতির সহিত কিউবা এমন
কোন সন্ধি-সূত্রে আবদ্ধ হইতে পারিবে না; (খ) কিউবা
পরিশােধ করিবার সাধ্যাতীত কোন ঋণ গ্রহণ করিতে
পারিবে না; (গ) কিউবার স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিবার
জন্য এবং শাসন কাৰ্য সুচারুরূপে পরিচালনের জন্য
যুক্তরাজ্য কিউবায় হস্তক্ষেপ করিতে পারিবে।
টমাস্ এসট্রাডা পালমা ( Thomas Estrada
Palna) কিউবার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইলেন।
১৮৬০-৭৮ খৃষ্টাব্দের বিদ্রোহের সময় তিনি বন্দী হইয়া
;

১৩৪ পরাধীনের মুক্তি স্পেনে প্রেরিত হইয়াছিলেন এবং তাহার সমুদয় বিষয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হইয়াছিল। পিলমারের বিরুদ্ধে অভিযােগ এই ছিল যে, বিদ্রোহের সময় তিনি শপথ করিয়া মুচলেখায় আবদ্ধ হইতে স্বীকৃত হন নাই। এই অপরাধে রাজপুরুষগণ তাহাকে সুদূর স্পেনে নির্বাসিত করিয়াছিল। স্পেনের কারাগারে, সামান্য অপরাধীর ন্যায় তাঁহাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া কি দারুণ যন্ত্রণাই না ভােগ করিতে হইয়াছিল । স্বাধীনতা লাভ করিয়া কিউবা দিন দিন শ্ৰীসম্পন্ন হইতে লাগিল। স্পেন সরকার কিউবার শিক্ষা বিষয়ে একেবারে উদাসীন ছিলেন ; এখন কিউবায় শিক্ষিত লােকের অভাব নাই। সাধারণের সুবিধার জন্য রেল- পথ ও ডাকের বিশেষ ভাবে সুবন্দোবস্ত হইয়াছে, দেশের লােক আবার সবল ও সুস্থ হইয়া দেশের ও বিশ্বের মঙ্গল সাধনে সুযােগ ও সুবিধা পাইয়াছে, স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে কিউবাবাসীর মনুষ্যত্বের দ্বার উন্মুক্ত হইয়াছে। পরাধীন জাতির প্রাণের বেদনা কত গভীর, বৈদেশিক শাসকের শাসন কত যন্ত্রণাদায়ক, আমেরিকা- বাসী মাত্রই তাহা হাড়ে হাড়ে অনুভব করিয়াছিলেন ; ;

কিউবা
১৩৫
ভুক্তভােগী না হইলে অপরের বেদনা সম্যক উপলব্ধি
করিতে পারা যায় না, তাই ত কবি গাহিয়াছেন,
“চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে ?
কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে
কভু আসিবিষে দংশেনি যারে ?”
আমেরিকাবাসী ব্রিটেনের অধীনে থাকিয়া বিষের
জ্বালা বেশ অনুভব করিয়াছিল। তাই কিউবাবাসী যখন
স্পেনের অত্যাচারে ও স্বেচ্ছাচারিতায় ছটফট করিতে-
ছিল, তখন আমেরিকাবাসীর প্রাণ সমবেদনায় কঁদিয়া
উঠিল, অমনি কিউবাকে মুক্ত করিতে --কিউবার প্রাণের
জ্বলা ঘুচাইতে অগ্রসর হইলেন; কিউবার জন্য সৈন্য
প্রেরণ অর্থব্যয় করিতে তাহারা কাতর হইলেন না।
ধন্য তােমরা আমেরিকাবাসি! পরার্থে আত্মােৎসর্গের
মহিমায় বিমণ্ডিত তােমরা! যতদিন ভূ-পৃষ্ঠে সূৰ্য্য চন্দ্র
চক্রের মত ঘুরিয়া বেড়াইবে, ততদিন তােমাদের
নাম বিশ্বব্যাপী ঘােষিত হইবে। তােমরাই ত
ক্রীতদাসগণকে মুক্তি প্রদান করিয়া লাইবেরিয়া
রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিয়াছ।
দেশই
স্বাধীনতার প্রকৃত লীলা নিকেতন।
তোমাদের

বেলজিয়
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া দলিত, লাঞ্ছিত এবং
নিগৃহীত জাতিও যে, আবার মাথা তুলিয়া দাড়াইতে
পারে, মনুষ্যত্বের পরিচয় দিতে পারে, লুপ্ত গরিমার
পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিতে পারে, সকলকে তাহা স্পষ্ট
দেখাইবার জন্য বেলজিয়মের স্বাধীনতা লাভের কাহিনী
প্রকটিত হইল।
বেলজিয়মের পুরাবৃত্ত পরাধীনতার ইতিহাসেই
পর্যবসিত। বেলজিয়ম্ যেন পরাধীনতার শৃঙ্খল
পরিয়াই ভূমিষ্ঠ হইয়াছে, পরের গৃহে বন্দী ভাবেই
লালিত পালিত হইয়াছে। প্রাচীন কাল হইতে উনবিংশ
শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত এদেশের স্বাধীনতার কথা

বেলজিয় শুনা যায় নাই। বােমরাজ্যের প্রবল বিক্রমের সময় বেলজিয়ম্ ‘গলের’ অধীন ছিল। তৎপর ক্রমে ফ্রান্স অষ্ট্রিয়া, স্পেন এবং কখন হলাণ্ডের অধীনে ছিল— জীবনটা অধীনতায়ই অতিবাহিত হইয়াছে। ১৫৯৬ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৬৩৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত স্পেনিস নেদারল্যাণ্ড (Spanish Netherland) অষ্ট্রিয়া সাম্রাজ্য- ভুক্ত থাকে। ১৫১৮ খৃঃ অব্দে সম্রাট ২য় ফিলিফের ( Philip II) কন্যা ইসাবেলার ( Isabella ) সহিত অষ্ট্ৰীয় রাজপুত্র আবার্টের ( Archduke Albert ) বিবাহ হয় এবং আলবার্ট যৌতুক স্বরূপ বেলজিয়ম্ প্রাপ্ত হইলেন ও তদবধি স্বাধীন ভাবে তিনি বেলজিয়মে রাজ- কাৰ্য্য পরিচালন করিতে লাগিলেন। পরে আবার্টের মৃত্যু হইলে ১৬২২ খৃষ্টাব্দে বেলজিয়ম্ পুনঃ স্পেনের রাজ্যভুক্ত হয়। তৎপরে ১৭১৪ খৃষ্টাব্দে ইউট্রেটের (Restraight) সন্ধিসৰ্তে বেলজিয়ম অষ্ট্রিয়ার অধীনতা স্বীকার করে। ১৭৯০ খৃঃ ফরাসী বিদ্রোহের সময় ফরাসী সৈন্য নেদারল্যাণ্ড অধিকার করে এবং নেপােলিয়নের রাজত্বকালে, তাহার ভ্রাতা লুই ( Louis) নেদার- ল্যাণ্ডের রাজা হন। ১৮১৪ খৃষ্টাব্দে প্যারিসের সন্ধি- সর্তে বেলজিয়ম আবার অষ্ট্রিয়ার অধীনতাপাশে আবদ্ধ

১৩৮
পরাধীনের মুক্তি
হয়। পরিশেষে ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে হলাণ্ডের যুবরাজ
প্রিন্স, উইলিয়ম্ ফ্রেডরিক্ নেদারল্যাণ্ডের রাজপদে
প্রতিষ্ঠিত হইয়া বেলজিয়মকে নিজ রাজ্যান্তভুক্ত
করিয়া লইলে ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে ভিয়ানার কংগ্রেসের
অধিবেশনে মিলিত শক্তিপুঞ্জ বেলজিয়মে হলাণ্ডের
অধিকার স্বীকার করেন। তদবধি হলাণ্ডের শাসন-শৃঙ্খল
বেলজিয়মকে দৃঢ়রূপে আবদ্ধ করিল। চির পদদলিত
এই বেলজিয়মবাসীর প্রাণে যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা
উদয় হইতে পারে, কল্পনাতেও কেহ তখন তাহা ভাবিতে
পারে নাই।
বেলজিয়ম্ হলাণ্ডের অধীনতার প্রথম আস্বাদন
করিল রীতি, নীতি ও ধর্মমত লইয়া। উভয় দেশবাসী
খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী হইলেও উভয়ের মধ্যে বৈষম্য
নিতান্ত কম ছিল না। বেলজিয়ম্ ছিল ক্যাথলিক
ধর্মাবলম্বী আর হলাও ছিল প্রােটেষ্টান্ট।
ইউরােপের প্রায় সর্বত্রই এই উভয় সম্প্রদায়ের
মধ্যে মনােমালিন্যের ভাব ভীষণ আকার ধারণ
করিয়াছিল। বেলজিয়মের ধর্মযাজকগণ প্রােটেষ্টান্ট,
রাজার অধীনতা স্বীকার করিতে ইতস্ততঃ করিল।
এদিকে হলাণ্ডের রাজা স্বীয় মতানুযায়ী বেলজিয়মের

১৩৯
বেলজিয়
ধৰ্ম্মযাজকগণকে নিয়ন্ত্রিত করিতে প্রয়াসী হইলেন ;
ফলে বেলজিয়মে অত্যাচার আরম্ভ হইল।
এদিকে ইউরােপের অন্যান্য দেশের ক্যাথলিক
সম্প্রদায় অত্যাচারিত বেলজিয়মবাসীর জন্য সমবেদনা
জানাইতে লাগিল, সংবাদপত্রে হলণ্ড রাজার আচরণের
তীব্র প্রতিবাদ হইতে লাগিল। ইহার ফলে সমগ্র
বেলজিয়মে একটা উত্তেজনার স্রোত প্রবাহিত হইল।
বেলজিয়মের সঙ্গে হলাণ্ডবাসীদের মনােমালিন্যের
ছায়া আরও ঘনীভূত হইল—সুবিধা ও সুযােগের বৈষম্য
লইয়া। বেলজিয়মবাসী কৃষিজীবি, হলাণ্ডের ওলন্দাজের।
বাণিজ্য ব্যবসায়ী। ওলন্দাজেরা রাজবংশীয় বলিয়া
ব্যবসায় বাণিজ্যে বেলজিয়নদের তাপেক্ষ। অধিকতর
সুবিধা সুযােগ ভােগ করিতেছিল। ইহাতে বেলজি-
য়নদের মনক্ষোভের কারণ হওয়া স্বাভাবিক। অধিকন্তু
ওলন্দাজগণ নদীর মােহনা বন্ধ করিয়া দিল ; ইহার ফলে
বেলজিয়মবাসীর ব্যবসায় বাণিজ্যের যারপর নাই
অসুবিধা হইতে লাগিল।
ফরাসী ভাষাই বেলজিয়মবাসীর মাতৃভাষার মত
ছিল এবং এই ফরাসী ভাষার প্রতিই তাহারা বিশেষ
তনুরক্ত ছিল। হলারাজ স্বকীয় দেশের ‘ড’ ভাষা
;

১৪০
পরাধীনের মুক্তি
রাজভাষারূপে বেলজিয়মে প্রচলন করিতে প্রয়াসী
হইলেন। বেলজিয়মবাসী ইহাতে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ
হইল।
বেলজিয়মবাসীর মর্মবেদনার আর এক কারণ,
রাজার জাতির সহিত প্রজার জাতির অধিকার লইয়া।
বুদ্ধি বিদ্যায় সম পারদর্শী হইলেও রাজার জাতি প্রজার
জাতিকে অবজ্ঞা ও অবহেলার চক্ষেই দেখিয়া থাকে।
যাবতীয় উচ্চ উচ্চ পদগুলি রাজার জাতিই পূরণ করিয়া
লয়, তারপর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তবে তাহাই
প্রজার জাতির ভাগ্যে ঘটে। এই সনাতন রীতির
বেলজিয়মে অন্যথা হইল না। কাজেই জ্ঞানে ও
পারদর্শিতায় বেলজিয়মবাসী হইতে নিকৃষ্ট হইলেও
ওলন্দাজগণের ভাগ্যেই বাছা বাছা পদগুলি জুটিত ;
এইজন্য বেলজিয়মবাসী মনে প্রাণে যে জ্বালা অনুভব
করিয়াছিল তাহা বলাই বাহুল্য।
১৮৩০ খৃষ্টাব্দে কোন বিভাগে কত জন ওলন্দাজ
ও কত জন বেলজিয়ন আছে, তাহার যে তালিকা
প্রকাশিত হইয়াছিল তাহাতে দেখা যায়, আভ্যন্তরীণ
রাজকার্য নির্বাহের জন্য যে সকল প্রধান কর্মচারী ছিল
তাঁহাদের মধ্যে ১১৭ জন ওলন্দাজ, আর ১১ জন মাত্র

বেলজিয়
১৪১
বেলজিয়ন ; সমর বিভাগের উচ্চপদে ১০২
ওলন্দাজ, আর জন মাত্র বেলজিয়ন; সমর
বিভাগের কর্মচারিগণের মধ্যে ৯৯৬৭ জন ওলন্দাজ,
২৮৮ জন মাত্র বেলজিয়। এই সকল বৈষম্যের জন্য
বেলজিয়নদের মধ্যে যে গাত্রদাহ হইতেছিল হলারাজ
তাহার কোন প্রতিকার করিলেন না।
বেলজিয়নগণ নানা কারণেই হলাণ্ডের উপর অন্তরে
অন্তরে দারুণ বিদ্বেষী হইয়াছিল। বাহির হইতে ইন্ধন
পাইলেই যে তাহাদের এই বিদ্বেষ বহিঃ প্রকাশিত হইয়া
বিদ্রোহে পরিণত হইত তাহা সহজেই অনুমান করা
যাইতে পারে। এই সময় ১৮৩০ খৃঃ ফরাসী বিদ্রোহের
কৃতকাৰ্যতার সংবাদ পাইয়া বেলজিয়নগণ হলাণ্ডের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইবার জন্য উৎসাহিত হইয়া উঠিল ;
সমগ্র বেলজিয়মে উত্তেজনার ঢেউ প্রবাহিত হইল।
হলাও উত্তেজনা দমন করিতে ব্যস্ত হইল বেলজিয়নদের
আশা,আকাঙ্ক্ষা পূরণ করিয়া নহে, দলনীতির অনুসরণ
করিয়া। কঠোর শাসন-নীতি প্রণয়ন করা হইল।
সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ করা হইল এবং উত্তেজনাপূর্ণ
প্রবন্ধ লিখার জন্য কয়েকজন সম্পাদককে রাজ-দ্বারে
অভিযুক্ত করা হইল; কয়েকজনকে নির্বাসন-দণ্ডে

১৪২ পরাধীনের মুক্তি দণ্ডিত করা হইল। বেলজিয়মে অশান্তির আগুন প্রবলবেগে জ্বলিয়া উঠিল। ‘লা মিডট এই সময় এক অভিনব ঘটনা ঘটিল। ‘ল মিউটে নামক একখানা নাটক বাহির হইল ; বেলজিয়মের উপর হলাণ্ডের যাবতীয় অত্যাচার বিশিষ্টরূপে এই নাটক খানায় চিত্রিত হইয়াছে। বেলজিয়নগণ এই নাটকের অভিনয় দর্শন করিয়া উত্তেজনায় গর্জিয়া উঠিল ; তাহারা অত্যাচারী রাজা এবং নির্মম রাজকৰ্ম্ম- চারিগণের প্রতি ভয়ানক উত্তেজিত হইয়াছিল। এই উত্তেজনার বশে তাহারা রাজপথে বাহির হইয়া পড়িল। তাহাদের সঙ্গে অনেক বেলজিয়ন মিলিত হইল। এই বিপুল জনসঘ প্রথমে সরকারী কাৰ্যালয় সমূহ আক্রমণ করিয়া ধনাগার লুণ্ঠন করিল, পরে নগর সংরক্ষণের জন্য আপনাদের মধ্য হইতে একদল প্রহরী গঠন করিল ; ইহারা ন্যায্য অধিকার দাবী করিয়া হলাণ্ডে প্রতিনিধি প্রেরণ করিল ও সঙ্গে সঙ্গে রাজ-মন্ত্রিকে পদচ্যুত করিবার জন্য অনুরােধ করিয়া পাঠাইল। এই ঘটনার অল্প পূৰ্ব্বে ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত

;
বেলজিয়
১৪৩
হইয়াছিল ; বেলজিয়নদের মনেও এইরূপ শাসন
প্রণালীর জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিল।
হলারাজ বেলজিয়নদের কথায় আদৌ কর্ণপাত
করিলেন না; এদিকে ওলন্দাজ সেনাপতি তােপ দাগিয়া
নগর উড়াইয়া দিতে প্রস্তুত হইলেন এবং সর্বত্র
ওলন্দাজ সৈন্যের অত্যাচার চলিতে লাগিল। ইউরােপের
দেশে দেশে ওলন্দাজ শাসনের অত্যাচারের কথা রাষ্ট্র
হইয়া পড়িল। অত্যাচার-কাহিনী শুনিয়া অন্যান্য
জাতির প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল, সকলেই বেলজিয়মের
সহায়তা করিতে প্রস্তুত হইল ; ফলে হলাণ্ড কিছুকাল
যুদ্ধ স্থগিত রাখিতে বাধ্য হইল।
ইউরােপের পাঁচটী প্রধান শক্তি লণ্ডনে এক সভায়
মিলিত হইয়া ঠিক করিলেন যে, বেলজিয়ম্ ওলন্দাজ
শাসন হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হইবে।
হলা এ প্রস্তাবে নানা প্রকার বাধা প্রদান করিতে
চেষ্টা করিল, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারিল না।
বিপ্লবের পর, অনেক প্রাণদানের ফলে বেলজিয়
ইউরােপের সমগ্র রাজশক্তি কর্তৃক স্বাধীন জাতি বলিয়া
গণ্য হইল।
প্রথমে সাধারণতন্ত্র শাসনপ্রণালী প্রচলনের কথা
;

১৪৪
উঠিল।
পরাধীনের মুক্তি
পরে ইংলণ্ডের পরামর্শ অনুসারে যুবরাজ
লিওপােন্ডকে (Leopold ) বেলজিয়মের সিংহাসনে
রাজপদে অভিষিক্ত করা হইল। ১৮৩০ খৃষ্টাব্দের ২১শে
জুন
লিওপােল্ড বেলজিয়মের রাজা বলিয়া গণ্য হইলেন
এবং নভেম্বর মাসে লণ্ডনের সন্ধি-সূত্রে ইউরােপের
সমুদয় শক্তি তাহাকে রাজা বলিয়া স্বীকার করিলেন।
বহুশত শতাব্দীর লাঞ্ছিত বেলজিয়ম্ এখন স্বাধীন,
লব্ধপ্রতিষ্ঠ দেশ, চির নিরাশ প্রাণে আশার অঙ্কুর
উন্মােষিত করিবার জন্যই জগতের সন্মুখে বেলজিয়
মস্তক উন্নত করিয়া দাড়াইয়া আছে। জাতীয় জীবন
একেবারে ধ্বংস প্রাপ্ত হয় না—ফল্গু নদীর প্রবাহের
ন্যায় উহার অস্তিত্ব যতই জীর্ণ শীর্ণ হউক না কেন,
থাকিবেই থাকিবে। কালের আবর্তনে, অবস্থার
পরিবর্তনে জাগরণ ও উখান জাতীয় জীবনে আসিবেই
আসিবে। বেলজিয়মের মুক্তি-কাহিনী পাঠ করিলে এ
ধারণা আরও দৃঢ় হইবে ; বেলজিয়ম্ ভূপৃষ্ঠে যতদিন
বিদ্যমান থাকিবে, ততদিনই পরাধীন নিরাশ জাতির
প্রাণে আশার সঞ্চার করিবে:সন্দেহ নাই।
বেলজিয়মের উপর সেদিন কি না অত্যাচার হইয়া
গেল,—পাশব-বলে বলীয়ান জাতির অত্যাচারের একটা
;

১৪৫ বেলজিয় বিকট লীলা অভিনয় বেলজিয়মের বুকের উপর হইয়া গেল। বিগত ফ্রাঙ্কো জমা ( Franco-German) যুদ্ধেইউরােপীয় সেই ভীষণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জমাগণ এই ক্ষুদ্র রাজ্যের ভিতর দিয়া বলপূর্বক সৈন্য প্রেরণ করিতে উদ্যোগ করিয়াছিল। ইউরােপীয় জাতি সমূহের আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে (International Law) Law) কোন জাতি অন্য দেশে সমর অভিযানের জন্য বেলজিয়ামের মধ্য দিয়া কোন সৈন্য প্রেরণ করিতে পারিত না। বেজিয়াম্ ইউরােপের সমস্ত জাতির রক্ষিত দেশ (Protected State) । জাজ আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গ করিলেন, তিনি যেন জগৎকে বুঝাইতে চাহিলেন—জোর যার মুলুক ক্ষুদ্র বেজিয়া আপনার স্বাধীনতা—বড় কষ্টে লব্ধ স্বাধীনতা—অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য জমান সৈন্যের গতিরােধ করিতে বদ্ধপরিকর হইল । সৰ্বস্ব পণ করিয়া, আপনার রাজ্য ও স্বাতন্ত্র্য অটুট রাখিবার জন্য ব্রতী হইল, কিন্তু জমা সৈন্যের গতিরােধ করা বেলজিয়াদের পক্ষে অসাধ্য হইল। জমা সৈন্য প্রবেশ করিয়া সু বেলজিয়ামকে হতশ্রী

১৪৬
যে
পরাধীনের মুক্তি
করিয়া ফেলিল, কত মনােরম অট্টালিকা,
যে সুদৃঢ় দুর্গ তােপের মুখে উড়িয়া গেল,
তাহার ইয়ত্তা নাই। দুর্ভেদ্য এন্টোয়ার্প (Fort
Antwarp) এবং লিজ দুর্গ ( Lieze) ধ্বংসস্তুপে
পরিণত হইল। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কত বেলজিয়া
যে জীবন বিসর্জন দিল, কত লােক যে ঘরবাড়ী
হারাইল, কত রমণী যে অনাথা হইল, তাহা নির্ণয়
করা দুঃসাধ্য।
এই ভীষণ সমরানল ১৯১৪ খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে
প্রজ্জ্বলিত হইয়া ১৯১৮ খৃষ্টাব্দে নিৰ্বাপিত হয়।
জাণি পরাজয় স্বীকার করিল এবং সঙ্গে সঙ্গে
তাহার পাশব বল বিধ্বস্ত হইল।
বেলজিয়াম্ হইতে জমা সৈন্য চলিয়া যাইতে
বাধ্য হইল। হতশ্রী বেলজিয়াকে আবার সম্পন্ন
করিয়া তুলিবার জন্য বেলজিয়াগণ লাগিয়া গেল ;
যুদ্ধের ধ্বংস লীলা হইতে বেলজিয়াম্ আবার সমৃদ্ধি-
শালী হইয়া উঠিতে লাগিল। বেলজিয়াদের তেজো-
বীৰ্য্য এবং আত্মত্যাগের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ
এবং স্তম্ভিত করিল। সেই ছিল একদিন, যে দিন
চির পদদলিত, লাঞ্ছিত বেলজিয়াম্ পরাধীনতার শৃঙ্খল

১৪৭ বেলজিয় কণ্ঠে পরিয়া স্বাধীনতা লাভ করিয়াছিল—আর এই এক দিন, যে দিন ক্ষুদ্র বেলজিয়াম্ স্বীয় স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য নির্ভয়ে বীরদর্পে জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত অকাতরে দিয়া জমা সৈন্যের গতিরােধের চেষ্টা করিয়াছিল। বেলজিয়াদের তেজ বীৰ্য, বেল- জিয়াদের ত্যাগ ও সহিষ্ণুতা ক্ষুদ্র জাতি মাত্রের প্রাণেই আশার সঞ্চার করিবে সন্দেহ নাই।

ভারতে মুক্তির অভিযান
নানা দেশের কথা আলােচনা করিয়া স্পষ্টই প্রতীত
হয় যে, পরাধীন জাতি যখন সঙ্কল্পের দৃঢ় ভিত্তির উপর
অবিচল ভাবে দণ্ডায়মান হইয়া প্রাণে অদম্য উৎসাহ
উদ্যম লইয়া কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয় এবং যখন নব
জাতীয় ধারার পুণ্য প্রবাহে অবগাহন করিয়া সবল ও
সতেজ হইয়া উঠে, তখনই তার দাসত্ব জীবন অবসানের
সময় ঘনাইয়া আসে।
আজ পৃথিবীর অপরাপর পরাধীন জাতির মুক্তি
কাহিনী লিখিতে গিয়া ভারতের বর্তমান মুক্তির প্রচেষ্টা
যে জয়যুক্ত হইবে এই আশায় বুক স্বতঃই ভরিয়া
উঠিতেছে।

১৪৯
ভারতে মুক্তির অভিযান
ধৰ্ম্মপ্রাণ ভারতবাসী স্বাধীন হইবার প্রবল ব্যাকুলতা
হৃদয়ে লইয়া আজ ১৭০ বৎসরের দাসত্ব শৃঙ্খল ছিন্ন
করিতে জীবন-মরণ পণ করিয়া কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ ;
আজ তার অগ্রগতি রােধ করিবার চেষ্টা যে ব্যর্থ হইবে
ইহা কে সন্দেহ করিবে ?
ভারতের এই মুক্তি অভিযানের প্রথম সূচনা সম্বন্ধে
সুদূর অতীতের কথা ছাড়িয়া দিয়া নিকটবর্তী ঘটনাবলীর
উপর আমরা দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিব ।
রাজনীতিজ্ঞ সুচতুর লর্ড কার্জ ১৯০৫ খৃঃ অব্দে
বঙ্গ বিভাগ করিতে উদ্যোগী হইলেন এবং বিলাতে
লিখিয়া বঙ্গ বিভাগের অভিসন্ধি পাকাপাকি করিয়া
লইলেন। এদিকে লক্ষ লক্ষ বঙ্গবাসী সরকারকে বঙ্গ
বিভাগ না করিতে প্রাণের ব্যাকুল বেদনা জানাইলেন,
কিন্তু তাহাদের স্বাক্ষরিত বঙ্গ-বিভাগ রদের আবেদন
সরকার আদৌ গ্রাহ্য করিল না। ইহাতে বঙ্গবাসী
মর্মান্তিক যাতনা পাইলেন। পরাধীনতার তীব্র যন্ত্রণা
তাহারা সেদিন অনুভব করিল। বাঙ্গালার সঙ্গে ভারতের
বিভিন্ন প্রদেশ সমবেদনা পরবশ হইল। বাঙ্গালী তখন
আত্ম-শক্তির অনুসন্ধান করিতে লাগিল। নিজের শক্তি
অনুসন্ধান করিতে যাইয়া দেশবাসী কেমন দুস্থ, কেমন

বৃদ্ধান্তে
পরাধীনের মুক্তি
দীন হইয়া পড়িয়াছে, তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল।
অনেকে ‘আর উপায় নাই, আর বাঁচিবার পথ নাই’
বলিয়া একেবারে হাত পা ছাড়িয়া দিলেন ; কিন্তু এই
নিরাশার ভিতর হইতে আশার আলাে দেখা দিল—
দুৰ্ব্বলের একতাই বল, বঙ্গবাসী সকলে এক সূত্রে গাঁথা
থাকিলে,এক মন এক প্রাণ হইয়া কাৰ্য্য করিলে তাহারও
বলীয়ান হইবে,-তৃণৈগুণৈঃ সমাপন্নে
মত্তদন্তিনঃ।
বাঙ্গালীর তখন জাপানের কথা মনে পড়িল, ক্ষুদ্র
জাপান একতাবদ্ধ হইয়া কি প্রকারে প্রবল পরাক্রান্ত
কষিয়াকে বিধ্বস্ত করিয়া, তাহার গ্রাস হইতে পাের্ট
আর্থার কাড়িয়া লইয়াছে।
বাঙ্গালী তাই আবেদন-নিবেদন ছাড়িয়া নিজের
পায়ে দাড়াইল। বিলাতি পণ্য বয়কট করিল ; ‘বন্দে-
মাতরম্' ধ্বনিতে বাঙ্গালার এক প্রান্ত হইতে অপর
প্রান্ত কঁপাইয়া তুলিল। বিলাতি পণ্য বর্জন পূর্ণ
উদ্যমে চলিতে লাগিল। সরকার ভীত হইল এবং
কয়েক বৎসর পরে রাজপ্রতিনিধি লর্ড হার্ডিঞ্জের
চেষ্টায়, বর্তমান সম্রাটের দিল্লী অভিষেক উৎসবের
সময় বিভক্ত বঙ্গ পুনর্যক্ত হইল। বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের

ভারতে মুক্তির অভিযান আন্দোলন তখন ভারতের আন্দোলনে পরিণত হইয়াছিল। উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইয়াছে, বিভক্ত বঙ্গ পুনঃ যুক্ত হইয়াছে বলিয়া অনেকেই বিলাতি বৰ্জন-ব্রত ত্যাগ করিল; কিন্তু সরকারের ব্যবহারে যাহাদের ঘুম ভাঙ্গিয়াছিল, তাহাদের অনেকেই পুনঃ কুম্ভকর্ণ সাজিলেন । তাহারা দেশের পরাধীনতা দেশের পরাধীনতা বিদূরিত করিতে আত্ম নিয়ােগ করিলেন। সরকার দমন-নীতি অনুসরণ করিয়া, স্বাধীনতার বীজ আঙ্কুরে বিনাশ করিতে সচেষ্ট হইল। ইহার ফলে তেজস্বী যুবকগণ প্রকাশ ভাবে দেশ-মাতার সেবা করা বিপদ সঙ্কুল দেখিয়া, সমগ্র ভারত ব্যাপী গুপ্ত সমিতির প্রতিষ্ঠা করিয়া মুক্তির পথ উন্মুক্ত করিতে প্রয়াসী হইলেন। যে প্রকারেই হউক, বিদেশী শাসন-শৃঙ্খল ছিন্ন করাই এই সমিতি গুলির ঐকান্তিক উদ্দেশ্য ছিল। ক্রমে এই দেশৈক- প্রাণ যুবকবৃন্দের গুপ্তশক্তি বহিঃ প্রকাশ হইতে লাগিল ; ইহাতে সরকার পক্ষ যে ব্যতিব্যস্ত হইয়াছিল, তাহা বলাই বাহুল্য। সরকার দমন-নীতি প্রয়ােগ করিয়া গুপ্ত সমিতিগুলি स्वरम করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

১৫২ পরাধীনের মুক্তি ইতিমধ্যে বিলাতে ১৯১৪ খৃঃ অব্দের জুলাই মাসে মহাসমর আরম্ভ হইল। এই সমরে এক পক্ষে ইংরেজ, ফরাসী, রুষিয়া, এবং পরে ইটালি ও মার্কিন ছিল, অপর পক্ষে ছিল জমাণি, অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গারী এবং তুরস্ক। চারিবৎসর ব্যাপী যুদ্ধ হইল; এই যুদ্ধের সময় বিজয়লক্ষ্মী যে কোন পক্ষের অঙ্কশায়িনী হইবেন তাহা কেহই ঠিক বলিতে বা বুঝিতে পারে নাই। এই জীবনমরণ সঙ্কটে ইংরেজ সরকার ভারতবর্ষে শাসন- পদ্ধতির বিশেষ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি এবং তুরস্ক সুলতানের রাজ্য অটুট রাখিবার অঙ্গীকার প্রদান করিয়া, ভারতবর্ষের জনবল এবং ধনবল অকাতরে নিয়ােগ করিবার সুবিধা পাইয়াছিল। শাসন-পদ্ধতির বিশেষ পরিবর্তন ও সুলতানের রাজ্য অটুট থাকার আশায়, ভারতবর্ষের হিন্দু মুসলমান জলের মত শরীরের রক্তপাত ও অর্থ সাহায্য করিয়া ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ সাহায্য করিয়াছিল। ভারতবর্ষের এরূপ সাহায্য না পাইলে যুদ্ধের পরিণতি যে কি হইত, তাহা সহজেই অনুমেয়। চারিবৎসর যুদ্ধের পর ১৯১৮ খৃঃ অব্দে ইংরেজ পক্ষের জয়লাভ হইল। জয়ােল্লাসে উন্মত্ত ইংরেজ মন্ত্রী ভারতে মুক্তির অভিযান ভারতে তার প্রতিশ্রুতির বিষয় ভুলিয়া গেলেন। সুলতানের রাজ্য টু করিয়া ব্রিটেন এবং তার মিত্র- শক্তি ভাগ করিয়া লইল। ভারতবর্ষের মুসলমানগণের নিকট প্রতিশ্রুতি ইংলণ্ডের প্রধান মন্ত্রী বেমালুম হজম করিয়া ফেলিলেন। তুরষ্ক সুলতানের স্বাধীনতা বিলুপ্ত প্রায় দেখিয়া ভারতবর্ষের মুসলমানগণের মধ্যে তীব্র অনুশােচনা উপস্থিত হইল। ইংরেজ মন্ত্রীর কুহক-জালে পড়িয়া সমধর্মাবলম্বী মুসলমানগণের রুধির-ধারা প্রবাহিত করিয়া, তাহারা যে ধৰ্ম্ম বিরুদ্ধ কাৰ্য্য করিয়াছে, তাহার অনুশােচনার জন্যই ভারত ব্যাপী খেলাফত সমস্যার তীব্র আন্দোলনের উদ্ভব হইল । অপর দিকে, ভারতে শাসন-প্রণালী পরিবর্তনের যে আশ্বাস প্রদান করা হইয়াছিল, তাহা ও লােকের আশানুযায়ী কার্যে পরিণত হইল না। *রিফ বিল’ প্রণয়ন ও পালিয়ামেন্ট হইতে পাশ করাইয়া আইনে পরিণত করা হইয়াছে বটে, কিন্তু তাহাতে শাসনপদ্ধতির দিক দিয়া যা কিছু সুবিধা হইয়াছে, তাহাতে ভারত- বাসী সন্তুষ্ট হন নাই। ইংরেজ মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিণামে ভারত “বর্ষের সমগ্র হিন্দুমুসলমান ইংরেজ কর্তৃপক্ষের কথায় পরাধীনের মুক্তি বিশ্বাস হীন হইল। আর পরমুখাপেক্ষী হইবে না, এরূপ ব্ৰত লইয়া হিন্দু-মুসলমান পায় ভর করিয়া দাড়াইলেন। এদিকে পাঞ্জাবে ডায়ার এবং ওডায়ার প্রভৃতি ইংরেজ ধুরন্ধরগণ জালিয়ানওয়ালাবাগে স্বেচ্ছাচারিতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিল—সাধারণ সভায় সম্মিলিত জনসাধারণের উপর অযথা গুলি বর্ষণ করতঃ ডায়ার সাহেব একটা রক্তগঙ্গা প্রবাহিত করিয়া দ্বিতীয় ভগীরথ সাজিলেন, বালক, যুবক, বৃদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে এই রক্ত-গঙ্গার স্রোতে ভাসিল ! ইহাতেও যেন ডায়াপ্রমুখ ইংরেজ পুঙ্গবগণের বীরত্ব প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হইল না ! তাই তাহারা পাঞ্জাবের স্ত্রীলােকদের উপর পৈশাচিক অত্যাচার ও উৎপীড়ন করিয়া বিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ সভ্যতার পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া, বিশ্ববাসীকে রােমাঞ্চিত করিল। ভারতবর্ষের জনসাধারণ তখনও ইংরেজ বিচারালয়ের ন্যায়-বিচারে একেবারে বিশ্বাসহীন হয় নাই, তাই সমগ্র ভারতবাসী পাঞ্জাৰে অত্যাচারকারীদের ন্যায্য বিচার প্রার্থনা করিলেন। ফলে ডায়া প্রমুখ ইংরাজ পুঙ্গব- গণকে ভারতবর্ষ হইতে পূর্ণ পেনসন দিয়া ইংলণ্ডে

১৫৫
ভারতে মুক্তির অভিযান
পাঠান হইল । বলা বাহুল্য, এই পেনসনের টাকা
ভারতবাসীই বহন করিতেছেন !
সত্যাগ্রহ
মহাত্মা গান্ধী অনেক বৎসর পর্যন্ত ইংরেজের জন্য
দেশ-বিদেশে, সর্বপ্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহে সাহায্য করিয়া-
ছিলেন; এমন কি নিজের জীবন বিপন্ন করিয়াও
ব্রিটনের জন্য অনেক যুদ্ধে কাৰ্য্য করিয়াছেন; কিন্তু এখন
ভারত সরকারের অবৈধ আচরণে, সরকার পক্ষের উপর
তাঁহার পূর্ব ধারণার আমূল পরিবর্তন হইয়া গেল।
অনেক কার্যের মূলেই যে, সরকারের দুরভিসন্ধি
লুক্কায়িত আছে, তাই তিনি স্পষ্টই বুঝিতে পারিলেন।
সুতরাং ভারত-শাসন পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করিয়া
এবং ভারতের জনসাধারণের মতকে প্রতিষ্ঠিত করিয়া,
যাহাতে দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগের অত্যাচার না
ঘটিতে পারে, তাহার প্রতিকার করা মহাত্মাজী জীবনের
ব্ৰত করিলেন। ‘সত্যমেব জয়তে', সত্যের জয় অনি-
বাৰ্য, তাই গান্ধিজী' সত্যাগ্রহ প্রবর্তন করিলেন ;
“নির্ভয়ে সত্য কথা বলিব, যাহা সত্য তাহা হৃদয়ের
সমুদয় শক্তি দিয়া বরণ করিব, সত্য এবং প্রেম দ্বারা

পরাধীনের মুক্তি
অসত্য, অন্যায় ও অত্যাচার সঙ্কুচিত এবং তিরােহিত
করিব” ইহাই হইল প্রত্যেক সত্যাগ্রহীর মুখ্য
উদ্দেশ্য।
ক্রমে ক্রমে মহাত্মাজী হৃদয়ঙ্গম করিলেন যে, ন্যায়-
ধৰ্ম্ম বিবর্জিত, অত্যাচারী বর্তমান ভারত সরকারের
সঙ্গে কোন প্রকার সহযােগিতা করা, আর অন্যায়ের
পৃষ্ঠপােষকতা করা, একই কথা। সুতরাং তিনি এই
বর্তমান অহিংস অ-সহযােগ নীতি প্রবর্তন করিলেন।
দেশবাসীকে সরকারের সহিত সর্ব প্রকার সহযােগিতা
বর্জন করিতে সনির্বন্ধ অনুরােধ করিলেন। দেশবাসী
তাঁহার উপদেশ মত কাৰ্য্য করিলে অতি শীঘ্রই ভারতে
স্বরাজ বা স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠিত হইবে, ইহাই মহাত্মা-
জীর আন্তরিক বিশ্বাস।
পৃথিবীর সকল দেশেই আজ যুবক সম্প্রদায়ের নব
জাগরণের সারা পড়িয়াছে। দেশাত্মবােধে উদ্ব দ্ধ
তাহারা আজ সর্বত্রই দুর্জয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই
যুবক সঙ্ঘ জীর্ণ-শীর্ণ পুরাতনকে পশ্চাতে ফেলিয়া নূতনের
আগমনী সঙ্গীতে সর্বত্র আকাশ বাতাস ধ্বনিত করিয়া
তুলিতেছে। তাহাদের স্পর্শে সর্বত্রই জীবনী শক্তি
ফুটিয়া উঠিতেছে। এই নবযুগের অগ্রদূত যুবকগণ বিজয়
।

ভারতে মুক্তির অভিযান
টীকা পরিয়া অত্যাচাব ও স্বেচ্ছাচারেব যবনিকা টানিয়া
দিয়া আজ বিশ্ব বরেণ্য হইয়া উঠিতেছে।
ভারতের যুবকসম্প্রদায় ভারতের ভাগ্য নূতন করিয়া
গড়িয়া তুলিতে আজ অগ্রণী হইয়াছেন, তাহারা নিৰ্যা-
তন ও নিপীড়নকে অঙ্গভূষণ করিয়া ভারতের মুক্তি
জীবনের
প্রধানতম
লক্ষ্যরূপে বরণ করিতেছেন।
নিখিল ভারতীয় মহাসমিতির পতাকা তলে তাহার।
আজ সমবেত এবং এই
এই সমিতির নির্দেশ মতই
তাহারা কর্মের পথ ধরিয়া অগ্রসর হইতেছেন। অদূর
ভবিষ্যতে ভারতের ভাগ্যলিপি যে অন্যরূপে বদলাইয়া
যাইবে তাহা স্পষ্টই অনুভূত হইতেছে।
ভারতে আজ মায়ের ডাক এসেছে, জীবনের এই
মাহেন্দ্ৰ ক্ষণে হৃদয়ের সমুদয় শক্তি অর্ঘ্যরূপে সাজাইয়া
ভারতবাসী, আজ মায়ের সেবায় নিজকে ধন্য কর ।
সমাপ্ত

No text on this page.

পরাধীনের মুক্তি সম্বন্ধে অভিমত ‘পরাধীনের মুক্তি’ সম্বন্ধে পরলােকগত দেশপূজা অশ্বিনীকুমার দত্ত মহাশয় লিখিয়াছেন : “পরাধীনের মুক্তি” পুস্তকখানিতে যে সকল সুলিখিত দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হইয়াছে তাহা চিত্তাকর্ষক ও বলবর্ধক। বিভিন্ন দেশের মুক্তিকাহিনী শ্রবণে দেশভেদে কালভেদে মুক্তিপন্থা কি তাহা সহজে বােধ- গম্য হয়। এই পুস্তক পাঠে ভারতে অহিংস- অসহযােগের সাফল্য কি,জগন্নাথের রথের গতি কিরূপ অপ্রতিহত, তাহা কিঞ্চিৎ পরিমাণে উপলব্ধি হইবে । বরিশাল, রথদ্বিতীয়া। ১২ই আষাঢ়, সন ১৩২৯।

বরিশাল হিতৈষী" ১৬-৮-২২
" স্থানীয় শঙ্করমঠের ব্রহ্মচারী শ্ৰীযুক্ত নিশিকান্ত
গাঙ্গুলী এম্-এ, কর্তৃক লিখিত “পরাধীনের মুক্তি”
নামক পুস্তক আমরা পাঠ করিয়া পরম তৃপ্তিলাভ
করিয়াছি। দেশহিতকামী অথচ আত্মপ্রত্যয়হীন
ব্যক্তি মাত্রের এই পুস্তক পাঠ করা কর্তব্য। গৃহে গৃহে
মহিলাগণকে এই পুস্তক শ্রবণ করা কর্তব্য। ইহাতে
বর্তমান আন্দোলনের বহু সমস্যা পূরণ হইবে—যাহারা
মহিলাদের কর্মক্ষেত্র নির্দেশ করিতে পারেন না
তাহারা ইহা পাঠে নবীন আলাে পাইবেন।

No text on this page.

No text on this page.

Paradhiner Mukti Ed. 2nd

Author
Ganguly, Nishikanta
Title
Paradhiner Mukti Ed. 2nd
File name
Paradhiner Mukti Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1922
Published
2010/02/14
Publisher
Arunchandra Guha, Barishal
Language
Sanskrit
Pages
169
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
History Of The Modern World
Keywords
Ganguly, Nishikanta
DLI number
511255
Barcode
4990010018421.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
9tNglL8JVQ5
Download PDF

Paradhiner Mukti Ed. 2nd