Maju Public Library,howrah

Chinibash-charitamrita Ed.6

2010/03/4

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

চিনিবাস-চরিতামৃত।
শ্রীশ্রীরাজলক্ষী, মডেলভগিনী, কালাই, বাঙ্গালী-
চরিত, নেড়া হরিদাস, কৌতুককণা প্রভৃতি
গ্রন্থ প্রণেতা কর্তৃক বিরচিত।
যষ্ঠ সংস্করণ।
কলিকাতা,
৮২ জবানীচরণ দত্তের ৮ট, বগলী-ম-মেসি-প্রেসে
অরুণোদয় রায় দ্বারা
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
১৩০১ সাল।
মূল্য ১৭ এক টাকা।
ঢাকমাশুল • আনা, ভি পিঃ না।

No text on this page.

মুখবন্ধ। কেবল হাসির জন্য যদি কেহ চিনিবাস চরিতামৃত পাঠ করিতে চাহেন, তবে তাহাকে আমি গ্রন্থপাঠে নিষেধ করি। গােড়া হইতে শেষ পর্যন্ত গ্রন্থে ছত্রে ছত্রে চোখের জল আছে। শ্মশানময় দেশের বর্ণনায় হাসি কি ? সেই শ্মশান- ছবিতে রঙ দিবার সময় কেবল্প “এক-পোছ” হাসির বাণিস মাখান হইয়াছে। তাই বলি, যিনি কেবল হাসির জন্য গ্রন্থ পড়িবেন, তিনিই ঠকিবেন। এদেশে বিদ্ধপাত্ম কাব্য লিখিকার এখনও উপযুক্ত সময় আসে নাই। শাদাকে ঈষৎ গােলাপী আমেজ করাই বিদ্রুপ। কিন্তু যাহা স্বভাবতই ঘাের গােলাপী, তাহার উপর আবার গােলাপী রঙ, চড়াইয়া, গােলাপিতম করা বিড়ম্বনামাত্র। একটা মােটামানুষকে ঠাট্টা করিতে হইলে, লােকে বলে, ঠিক “এটা যেন হাতী।” হাতী, অতিরঞ্জিত হইয়া, পৰ্ব্বতের সহিত তুলনীয় হয়। করিগণ, পৰ্ব্বতকে মেঘের সহিত তুলনা করেন। বল দেখি ভাই! সেই আকাশ-ভরা, ঘাের-গভীর ঘন-ঘটাকে কাহার সহিত তুলনা করিবে ? তখন নিধু বাবুর সহিত বুলিতে হয়, তােমারই তুলনা প্রাণ তুমি এ মহীমগুলে!”

wa
গ্লাহ চরম, তাহাতে বিদ্রুপ বা অতিরঞ্জন খাটে না।
বঙ্গভূমির এখন অবস্থা চরম, সুতরাং চিনিবাসে বিদ্রুপ বা
অতিরঞ্জন স্থান পাইতে পারে না। চিনিবাস, স্বভাব-উক্তি
অলঙ্কারে পূর্ণ ।
“স্বভাবােক্তিরলঙ্কানরা যথাবধস্তুবর্ণ নম্ ।
লােকে যেন নয়ন-জলে ভাসিতে ভাসিতে চিনিবাস
চরিতামৃত পাঠ করেন, ইহাই গ্রন্থকারের আশা।”
১২:১২ সাল।
কলিকা।

চিৰিাস-চরিতামৃত।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
রাজনীতি নদী অতি তরঙ্গ তুফান।
ভাঙ্গা তরী ভাসে তায় মাঝি জাম্বুবান।
চিনিবাসের প্রেম অমৃত সমান।
যেই শুনে সেই লভে,পূর দিব্যজ্ঞান।
গ্রামে আজ মহাপ্রলয় । লােক সব, ছুটাছুটি দেড়দৌড়
করিয়া বেড়াইতেছে, কোথাও আগুন লেগেছে নাকি?
পাড়ার চৌকিদার, এক প্রকাও লাঠ ঘাড়ে করিয়া, বিকট
রবে চেঁচাইতে চেচাইতে চলিয়াছে,-“সকলে বাডুযে, মহা-
শয়ের বাড়ী শী যাও,আর বিলম্ব নাই।" কারু গঙ্গাযাত্রা
হবে নাকি ? মহেশমণ্ডল, চটীজুতা পায়ে দিয়া, মুড়িশেলাই
চাদর কঁাধে ফেলিয়া, হনহন আসিতেছে। চৌকিদার
তাহাকে দেখিয়া বলিল,-“আরে বড়-মােড়ল! আপনাও এত
দেরী কেন? ওদিকে যে স ফুরিয়ে গেল। বাবু ভারি ব্যস্ত
হয়েছেন।" মণ্ডল বলেন, “এই আমি মাঝের পাড়ায়

চিনিবাস চরিতাম।
খবর দিয়ে, তিপাড়া যাচ্চি-আড়াই প্রহরের এ দিকেত
আর কৰ্ম্ম হবে না, আমি কি আর নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছি,
—আমি তাহিপাড়ার নিমন্ত্রণটা সেরে শীঘ্র বাবুর বাড়ী যাচ্চি
—তুই দক্ষিণপাড়া ডেকে আয়।” কি এ, বাবুর বাড়ী পিতৃ-
শ্রাদ্ধ নয় ত ?
দশ মিনিটের মধ্যে রাস্তা দিয়া, দলে দলে লােক দৌড়িতে
লাগিল। তঁাতি, জোলা, কলু, বাদী, কামার, কুমার, জেলে,
অগুরি, কৈবর্ত, সােপ—সকলেই বেলে বাবুর বাড়ীর দিকে
ধাবমান। বেলা তখন প্রায় দুটা। পৌষ মাস। কেহ ধান
কাটিতে কাটিতে উঠিয়া আসিয়াছে, কাস্তেখনি কাহারও
কোমরে গোজা অাছে। কাহারও বা হাতে আট
আঁটি ধান
আছে। কোন জেলের জল-ঘাড়ে; কেহ বা নূতন জাল বুনিতে
বুনিতে পথ চলিতেছে। হরিহর কৈবর্ত, হাটে আলু-পটল
বেচিয়া ঘরে আসিতেছিল,--মাথায় তালি বাজরা ; তাকে
আর ঘরে ঢুকিতে হইল না; সে সেই বাজরা মাথায় করিয়াই
চলিল।
গ্রাম্যপথে এক অপুৰ্ব্ব দৃশ্য দেখা দিল।
দেখিতে দেখিতে বাবুর বাড়ী লােকারণ্য হইল। বাড়ী-
খানি অতি চমৎকার। বাহিরে একটী ভজন-কুঠারি-ছিটে-
বেড়ার দেওয়াল। মেজে মাটীর। তথাচ সেই ক্ষুদ্র জরাজী,
মৃত্তিকা-বাঁশ-খড়-কঞ্চিসমন্বিত গৃহমধ্যে একটা টেবিল এবং
একখানি চেয়ার বর্তমান। টেবিলের উপর দোয়াত-কলম ও
কাগজ প্রায় চারিশ লােক একত্র ; তাহারা কোথায়

প্রখম পাচ্ছে।
;
দাঁড়ায়, কোথায় বসে, তাহার কিছুই ঠিক হইল না, তথাচ
বর, গ্রামের সমস্ত লোেক এখনও আসিয়া পেীছিল না ধলিয়া,
মহা ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন।
বাবুর গড়ন পাকসিটে ; লম্বা টং ; রংটা খাড়ি মসুরির
ডেলের মত ; চুলগুলা কোকড়া-কোকড়া, চোখে চসমা।
নাসিকার নিম্ন দিয়া গোঁফের রেখা ঈষৎ সমুদিত। দেহখানি
বনাতের কোটে আবৃত। পায়ে ডবল-এষ্টাকিন, হাতে রুমাল।
শীতকালে অবশ্যই ঘম নাই, তবু রুমাল লইয়া বাবু অনবরত
মুখ মুছিতেছেন, চোখের কোল ঘসিতেছেন।
এতক্ষণে বুঝিলাম, ঘরে আগুন ও নয়, গঙ্গাযাত্রাও নয়,
শ্রাদ্ধ ও নয় ;—কেবল ছিটেবেড়া, বাবু এবং লােকপাল। এই
ত্রৈরাশিতে কি ফল উৎপন্ন হইবে, জানি না।
বাবু একলা-ঘরের যাদুমণি। বাপ নাই, দাদা নাই, খুড়া
জ্যেঠা কেহই নাই। -অাছে কেবল এক বুড়ী-মা--তা, সে হত
ভাগীর বেটা না থাকারই মধ্যে। ফোকলা দাতে তার কথা
ভাল বেরােয় না, চালেধরা চোখে সে ভাল দেখতে পায় না,
পায়ে বাত ধরায় সে ভাল চলতে পারে না। এমত স্থলে
মাতার কর্তৃত্ব পুত্রের উপর একেবারে নাই বলিলে অত্যুক্তি
হয় না। সুতরাং বলা বাহুল্য, বাৰু সৰ্ব্বতভাবে স্বাধীন ;-
পারিবারিক প্রথার
প্রথার কঠোর শাসনে প্রপীড়িত নহেন।
পিতা মাতা, খুড়া জ্যেঠা • প্রভৃতি অকর্মণ্য জীবগণকে
সামাজিক বৃথা সম্মান দেখাইয়া, তাহাকে আর অনর্থক
র

চিনিবাস-চরিত। করেন। সময় নষ্ট করিতে হয় না। ইহাই সংসারের খাঁটি মুখ, অক্ষত শান্তি ! বাবুর বাপের কৃষ্ণনগরে কাপড়ের দোকান ছিল। এই দোকানে বিলক্ষণ দশ টাকা লাভ থাকায়, তিনি কিছু সঙ্গতি প্রায় ষাট বিঘা নাখরাজ জমী খরিদ করেন এবং মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে নিজ গ্রামখানি পত্তনি লয়েন। তিনি নিতান্ত মিতব্যয়ী ছিলেন ;-লােকে বলে, এখনও রাবুর মায়ের হাতে নগদ দশ হাজার টাকা আছে। বুড়ী মা, কিন্তু কাট- কৰুল, বলে-“হাতে আমার এক কড়া কড়িও নাই।' বাপ, বাড়ী ঘর কিছুই করিয়া যান নাই—সেই সাবেক সেকেলে বড়াে বাড়ী। বাৰু বহুকাল হইতে কৃষ্ণনগর কলেজে পড়িতেছেন। এবার এনট্রেন্স পাস দিবার নিশ্চয় কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ কেন পাস না দিয়াই বাবু বাটী আসিলেন, এ কথা অনেকে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। বাবু একটু মুচকি হাসিয়া, সকলকে এইরূপ উত্তর দানে প্রবৃত্ত হইলেন, “তােমরা এনট্রেন্স লাসের মৰ্ম্ম কি বুঝিবে ? বৃষ্ণনগর সহর শুদ্ধ সকল লােকেই এবার একবাক্যে বলিয়াছিলেন, আমি এনট্রেন্স পরীক্ষা দিলে সর্বপ্রথম হইব ; কিন্তু বয়সের কাল্পতা নিবন্ধন কলেজের অধ্যক্ষ আমাকে পরীক্ষায় উপস্থিত হইতে দিলেন না। তােমরা বােধ হয় কেহই জান না, ঘােল বৎসরের কম বয়স হইলে এনট্রে দিতে নাই। আমি কি করি—কাজেই বাটী আসিলাম।

প্রথম পরিচ্ছে।
==
এই গ্রামে এ পর্যন্ত ইংরেজী পড়া প্রবেশ করে নাই ;
বাবুই এ বিদ্যায় প্রথম ব্ৰতী। এত অল্প বয়সে, এত অধিক
বিদ্যা উপার্জনের কথা শুনিয়া লেকে চমকিত হইল।
এই কথা শুনিয়া, দু একটা দুষ্ট লােকে কাণাকাণ করিতে
লাগিল,ওর বয়স বােলর কম কিসে? উনি ত অনেক দিনের
ছােকরা—আজও কি যােল পূর্ণ হইল না ?
বাবুর এই বয়সের গােলযােগ লইয়া কষ্ণনগরে একবার
দাঙ্গা হইয়াছিল। বাবু যে বাসায় থাকে, সে বাসায় আরও
পাচটী ছেলে থাকে। শাহারাদির পর রাত্রে তর্ক উঠিল,-
“কার কত বয়স?” বাবু বলিলেন,—“আমার বয়স ১৪। এই
কথা শুনিয়া সকলে হাে হাে রবে হাসিয়া উঠিল। একটী
বালক বলিল,—“আমার বয়স ৫। আমি এখনও কাপড় পরি
মা।” আর একজন বলিল,-“সে কিহে, তােমার এত অধিক
বয়স ? আমার যে এখনও অন্নপ্রাশন হয় নাই। এই একটা
ভাল দিন দেখে শীঘ্রই সকলকে আমার ভাতের নিমন্ত্রণ
করবে।” বাবু তখন ক্রোধে কম্পিতকলেবর হইয়া সেই
বালকের গালে, সেই পাকসিটে হাতের চড় বসাইয়া
দিলেন। ক্রমে মহাগােযােগ উঠিল—বিলক্ষণ মারামারি
আরম্ভ হইল, লােক জড় হইল, পুলিশ আসিল। এই বিট
দাঙ্গার পর অদ বাবুর কোষ্ঠা দেখিয়া বয়স বলিতে গ্রন্থকার
সাহসী হইলেন না।
এই বাবুই আমাদের নায়ক—চিনিবাস বন্দ্যোপাধ্যা।

চিনি-চরিতামৃত। অ মি ৫০০ হঠাৎ চিনিবাস বাবুর ছিটেবেড়ার গৃহাভ্যন্তর হইতে, টং টং টং টং পেটা-ঘড়ি বাজিয়া উঠিল। সেই সঙ্গে সঙ্গে “চুপু চুপ চুপ।” এইরূপ একটা সাড়া পড়িয়া গেল। সকলে নিস্তব্ধ চিনিবাস দাঁড়াইয়া বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন, “তােমাদের জন্যই অদ্য আমার এ শ্রমস্বীকার। অামি গ্রাম, পথের দুর্দশা দর্শনে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া পড়িয়াছি ; রাত্রে চোকের জলে বুক ভাসিয়া যায়। গবর্ণমেট নিতান্ত নিষ্ঠুর, এ পর্যন্ত একটা পয়সাও দেন নাই। অথচ প্রতি বৎসর আমরা সকলে গবর্ণ- মেটকে পথয় দিয়া আসিতেছি। তোমরা নিতান্ত কাপুরুষ, তাই আজও এ টাকা আদায় করতে পার নাই। টাকার জন্য রােডণেশ-কমিটীতে ইংরেজীতে এই দরখাস্ত লিখিতেছি । আপনারা ইহাতে সহিকরিলেই টাকা পাইবেন। “আর এক কথা। আপাতত এই পাঁচশত টাকা আদায়ের জন্য কৃষ্ণনগর যাইয়া আমাকে তদ্বির করিতে হইবে—এবং ফলিকাতার প্রধান প্রধান সংবাদপত্রে এ বিষয়ে সুদীর্ঘ প্রবন্ধ দেখাইতে হইবে, অতএব প্রথম তদ্বির জন্য অন্তত ১০০ টাকা আবশ্যক। তােমরা অদ্য চাদা করিয়া এই টাকাটী তুলিয়া দিলেই কল্য আমি কৃষ্ণনগর বাত্ৰা করিব। এ টাকা দিলে ততাদের লাভ ভিন্ন লােকসান নাই; ৫০০ টাকা আদায় হইলে, কশ সুদহুব্ধ তােমাদের টাকা ফেরত দিব। বাকি ৩৭৫ টাকার গ্রামে সুন্দর রাস্তা ঘাট হইবে। আর ঐ একশত টাকা হলে, আমি দেশে এরূপ রাজনৈতিক আগুন জ্বালিব, প্রথম পরিচ্ছে। যাহা কখনই নিবিবে না। কল্য প্রাতেই আমাকে যাত্রা করিতে হইবে—অতএব আজ নাগাইদ সন্ধ্যা টাকা চাই। “শেষ, তােমরা শ্রবণ কর ইংরেজী দরখাস্ত।” এই বলিয়া ইংরেজীভাষা-অনভিজ্ঞ, গ্রামবাসীর নিকট চিনিবাস বাবু সেই দরখাস্ত উচ্চৈঃস্বরে পড়িলেন। মহেশমণ্ডল বলিল,—অতি উত্তম লেখা হইয়াছে; ক্রমে সভাস্থ সকলেই বলাবলি করিল, বাবু যেরূপ তেজ কলমে লিখিয়াছেন, তাহাতে অচিরেই শুভফল ফলিবে। তারপর সেই দরখাস্তে নাম সহি করিবার ধুম পড়িয়া গেল। মহেশমণ্ডল প্রভৃতি দুই একটা লােক ছাড়া পর আনা উনিশ গণ্ডা লােক ঢেরা সই করিল । বেল। চারিটার সময় সভা ভঙ্গ হইল। বাবুর পাড়ার ব্রাহ্মণবংশীয়। কুল-ললনাগণ এমন সময় কলসী-কাখে নদীতে চলিল। মালতী, মােদা, মােহিনী, বৃন্দ, বিমলা, বগলা প্রভৃতি যুবতীগণ ধীরে ধীর তালে তালে পা ফেলিয়া, গজেন্দ্রগমনকে লজ্জা দিয়া, পরস্পর মধুরালাপে বৈকালিক বায়ুকে আন্দোলিত করিয়া, নদী সৈকতে উপনীত- প্রায় হইলেন। মালতী বলিলেন, “আহা, বেশ ছেলেটী ! সে দিনকার চিনিবাস, আজ ইংরেজীতে কথা কয়ে, লিখে, গ্রামের পথ ষাট সব বাধিয়ে দিচ্ছে,-এমনি ছেলে হলেই মায়ের সুখ। বৃন্দা। তা বৈ কি দিদি-চিনিবাসের মা ত রত্নগর্ভা ; ওবাড়ীর পরেশ চিনিবাসের বয়সী—সে যদি আজ লেখাপড়া শিখুত-তাহলে আর ভাবনা কি ?

টিবিল-চরিতামৃত। . মােহিনী। আহা, হােকােক,-বুড়ীর আর কেউ নাই- ঐ শিবরাত্রির সলতেটুকু ভরসা, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে, এক-শ বছরের হয়ে চিনিবাস বেঁচে থাকুক বিমলা'। হ্যা গা, সে দিন একটা কি কথা শুনলেম। কোম্পানী নাকি চিনিবাসকে কয়েদ দেব বলেছে-সে কি কথা গা ? মালতী। অঃ পাগল, আর তুই জানিসনে? চিনি- বাস কেষ্টনগরে, কোম্পানীর মুলুক উলটে দিতে চেয়েছিলাে- দারােগাকে, মেজেষ্টার সাহেবকে ইংরেজীতে কথা কয়ে মাত্তে গিয়েছিলাে। চিনিবাস বলেছিলাে,আমি কোম্পানীর মুলুক মানি না মােদা। চিনিবাস, দৈত্যকুৱে পেলাদ- বগল। চিনিবাসের সবই ভাল, তবে মেয়ে-ছেলে, বউঝীর উপর একটু পর নজর আছে— মালতী। না, না, না, সে কথা বলােনা, দুধের ছেলে, সে দিন হতে দেখলুম ওর যে সব কোন দোষ নাই— বলা। হ্যা বয়েস কচি বটে;তবে কি না জান, ওরা সহরের ছেলে, পাচটা দেখেচে, শুনেছে, বিমলা। ঠিক বলেছ, বুন! এখন কি আর দিন কাল সে রকম আছে ? ইংরেজী পড়লে ছেলে পিলের চোখ মুখ শিগ্‌গির ঝোটে-চিনিবাসের মাথায় চেরা-সিথি দেখ নাই ? বগল। তােমরা কিভাই কিছুই শােন নাই ? তাদের

প্রথম পরিচ্ছে।
রামমণির জন্য এবার সে সােণার চিক গড়িয়ে এনেছে
সাবান, তাস, পমেটম,—সব দিয়েছে-
মালতী। রামমণি আধবয়সী মাগী, কালপেঁচী—সেদিন
বিধবা হলাে,—তাকে কি ও-সব দেওয়া সম্ভব ?
বগলা। তা জানিনে ভাই!—আমিত ওসব কথা, কৰ্তাৰ
মুখে কাল শুনেছি
এই কথা কহিতে কহিতে রমণীগণ নদীজলে অবতরণ
করিলেন।
রামমণি গ্রামের রাজনৈতিক এবং সমাজনৈতিক রমণী কি
, জানি না; তবে এটা ঠিক, চিনিবাস প্রত্যহ সন্ধ্যার পর
রামমণির বাটীর দিকে চাহিয়া ব্ৰহ্ম-সঙ্গীত আলাপ করিতেন ।
এবার একখানি ব্ৰহ্মসঙ্গীত পুস্তকও তিনি লইয়া আসিয়াছেন।
সেই দিন বৈকালে ওদিকে
১০০
টাকা চাঁদা আদায়রূপ
রাজনৈতিক কাণ্ড চলিতে লাগিল,—এদিকে ঠিক সন্ধ্যার পরই
চিনিবাস, ভাবমগ্ন মহাযােগীর ন্যায়, সামাজিক-মহাসাগরে ডুব
দিলেন। সেই ভজন-কুঠারির দ্বারে খিল দিয়া, জানালার কাছে
চেয়ারে বসিয়া, ঠিক রামমণির বাটীর দিকে চাহিয়া, বাবু
আড়খেমটায় ব্রহ্ম-সঙ্গীত আরম্ভ করিলেন,
রাগিণী পিলু খাম্বাজ-তাল আড়খেমটা।
সযতনে বিছায়েছি হৃদয় অসন ;
বড় আশা তুমি এসে বসবে আজি প্রাণধন।

চিনিব চরিতামৃত।
*
প্রীতির কুসুম গুলি রেখেছি যতনে তুলি,
বড় সাধ প্রাণ তুমি এসে কর হে এহণ।
তব রূপ অতুলন,
দেখা ও হে হৃদয়-মন,
হেরি রূপ মনসাধে ভরি দুনয়ন।
তৃষিত চাতক সম, হয়ে আছে, প্রাণ মম,
মিটাও পিয়াস করি কৃপাবারি বরিষণ ;
সংসারের যাতনার মন প্রাণ দগ্ধ প্রায়,
( এসে } ঢাল জাল প্ৰেম-সুধা জুড়াক আজি প্ৰাণ মন।
এস তবে প্রাণ-সখা, প্রাণ অকুল পেতে দেখা,
সুখ-তরঙ্গ তােল প্রাণ দিয়া দরশন ;
সুখের তরঙ্গে সেই, প্রাণেরে ভাসিয়ে দেই,
ভুলে যাই দুঃখ শােক, এই মনে আকিঞ্চন ।
এই গানটা শেষ হইলে, বাবু আর একটী ব্ৰহ্ম গান আড়-
খেমটীয় ধরলেন,
কবে হায় সে দিন হবে ?
তব প্রেম-পাকা তুলে কুতুহলে,
{ যত নরে । কুতূহলে মিলবে সবে-
এমন সময় গৃহদ্বারে দূপদাপ ধক পড়িতে লাগিল ;-
“খােল ব্যাটা
বামুন দোয়ার, তাের মাথাটা আমি আজ
লেঠিয়ে ভেঙ্গে ফেলবে? আজ তাের রামনাই কেমন
থাকে দবে ?
চিনিবাস। ডাকাত পড়েছে, ঘরে ডাকাত পড়েছে। হে

প্রথম পরিচ্ছেদ।
রামধন, শীগগীর এসাে ( ধাক্কা দাতার প্রতি ) কে হে তুমি, কি
চাও ?
ধাক্ককারী। আরে মশাই রেখে দিন বিটলেমী-ভব্দর
লােক স্থ’য়ে, গেরস্তর মেয়েছেলের উপর জুলুম ; আজ সন্ধ্যা-
বেলা থেকে ঘরে বসে, আমার বাড়ীর দিকে চেয়ে, কেবল
কাচা খেউড় হচ্ছে—
চিনিবাস। কেহে, তুমি নিতাই তাতি-ওসব ভাই কিছু
মনে করাে না, আমি কেবল ঈশ্বরের নাম ক,
পুনরায় দ্বারে আঘাত সজোরে।
চিনিবাস তখন ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন,—“দেখ নিতাই, আমি
ভীরু, কাপুরুষ নহি—আমি তোমার লাঠিতে ভয় করি না।
আজ যদি আমার দ্বারে ইংরেজের লক্ষ রাজনৈতিক লাঠি
একত্রিত হইত, তাহা হইলে আমি এখনি দ্বার খুলিয়া অকাতরে
মাথা পাতিয়া দিতাম। কিন্তু তােমার ঐ সমাজনৈতিক
একটী লাঠিতেই আমি সঙ্কুচিত হই। কারণ শ্রাতার সহিত
ভ্রাতা বিবাদ করে না”
দেখিতে দেখিতে বহু লােক জড় হইল। গ্রাম মহা
আন্দোলনে আন্দোলিত হইল।
-

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। সম্মিলন, পর দিন অতি প্রত্যুষে, কাক ডাকিবার পুর্বে, অরুণে- জয়ের ‘ৰ্ব্বে, বােধ হয় শুকতারা উঠিবার পূর্বেই, গ্রাম- নিবাসিগণ চিনিবাসের কথা লইয়া গৰম্পর আলাপ আরম্ভ করিল। প্রভাতে ঠাকুরদেবতার কথা গেল, বৈষয়িক চিন্তা গেল—লােকের কেবল একমাত্র ভাবনা, চিনিবাস আর রাম- মণি। লােকের দোষ কি? চিনিবাস ত সহজ জীব নহেন। রাজনীতি এবং সমাজনীতি একাধানে মিলিত হইয়া চিনিবাস- দেহ গঠিত হইয়াছে ;—যেন গঙ্গাযমুনা-সঙ্গম, যেন হরগৌরী- যেন মণিকাঞ্চনের মহাযােগ। এক ৰাজনীতির আন্দোলনেই লােক অস্থির হয়—তাহাতে আবার সমাজ- নীতির যােগ ; আর কি রক্ষা আছে ? প্রবলবায়ুর সাহায্যে প্রলয় আগুন ধু ধু জ্বলিয়া উঠিয়াছে। মেয়ে, ছেলে, বুড়াে, বুড়ী, বৌ, বাৰু সকলেই যেন মেতে উঠিয়াছে। দক্ষিণপাড়ায় কেহ বলিতেছে, চিনিবাসের দোষ ; কেহ বলিতেহেঁ, রামমণির দোষ ; কেহ বলিতেছে নিতাই গতির দোষ। কাহার মতে, কাল রাত্রে চিনিবাস খুব মার খেয়েছিল ; কেহ প্রতিবাদ করি- লেন, চিনিবাসের কেশাগ্রভাগও কেহ স্পর্শ করতে পারে নাই। কেহ বা ঐ কথা অনুমােন করিয়া বলিলেন—“'ত ঠিক ; চিনিবাসের গায়ে আঁচড়টা লাগে নাই কিন্তু নিতাই গতিই আচ্ছা মার খেয়েছে।” যখন নিতাই তাভিরই মাৰ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
}
খাওযা সাব্যস্ত হইল, তখন একজন বলি, “নিতাই পিঠে,
ঘাড়ে, চুণ-হলুদ দিয়ে শুয়ে আছে।”
কিন্তু পূর্বপাড়ার কথা অন্যবিধ। মােড়লবাড়ী সৎগােপদের
মহামজলিস বসিয়াছে। একজন বলিল, “যদি ব-মােড়ল
দৌড়ে যেয়ে নিতাইকে না ধরিত, তাহলে নিতাই দরজা
ভেঙ্গে চিনিবাসের মাথাটা ফাটাইয়া ফেলিত।”
দ্বিতীয় ব্যক্তি। আঃ তুমি কিছু জাননা নাকি? ঘরের
দরজাটা গুড়ানাড়া করে, নিতাই চিনিবাসের মাথায় এক লাঠি
বসিয়ে দিয়েছিল। লাঠির আঘাতে চিনিবাস ধড়াস কবে,
পড়ে গেল।
তৃতীয় ব্যক্তি। তা, নয় ; তুমিও ঠিক জান না ; চুলের
sষ্ট ধরে চিনিবাসের ঘাড়ে নিতাই দুই কীল মেরেছিল।
চতুর্থ ব্যক্তি। বড় মােড়ল চাদা সেধে ফিরে না এলে,
এর ঠিক খবর পাওয়া যাবে না—আমি শুনেছি, চিনিবাস মার
খায় নাই।
পঞ্চম ব্যক্তি। চিনিবাস নিশ্চয় মার খেয়েছে-যন্ত্রণায়
সমস্ত রাত্রি ছটফট করেছে-সকাল বেলা, তার মা ডাক্তার
আন্তে লােক পাঠিয়ে দিলে ;-নিতাই তার গাঁটে গাঁটে
লাঠি মেরেছিলাে,-সৰ্বাদে চূণে-হলুদ মেখে চিনিবাস
বসে আছে।
ব্রাহ্মণপাড়ায় গভীর বিচার আরম্ভ হয়েছে।
হধর স্মৃতি
ভুষণ বলিলেন,-“আমি কি সাধ করে ইংরেজী পড়িতে নিষেধ

চিনিবাস চরিতামৃত। ? করি ? ছেলেপিলে, সহরে যেয়ে ইংরেজী পড়লেই খারাপ হয়ে যায়। চিনিবাস দিব্য ছেলেটা ছিল, আর দুমাস যদি আমার কাছে মুগ্ধবােধ পড়িত, তা হলে ব্যাকরণ একেবারে কস্থ হতে। ছােড়ার বুদ্ধি খুব তীক্ষ—যা একবার বলিতাম, ত আর কখন ভুলিত না-হঁ ! অজি কি না একটা তাতির মেয়ের সঙ্গে তার অপবাদ হলাে ? নীলাম্বর তর্করত্ন বলিলেন,—ঘটনা কি যথার্থ ? চিনিবাসকে অতি সুবোধ শান্ত ছেলে বলেই ত আমি জানি ; এই ছেলে- বসে তার পেটে এত কুবুদ্ধি ঢুকবে কি ? আমার বােধ হয় ইহা রটানে কথা।” এই কথা শুনিয়া সভাস্থ অপরাপর ব্যক্তিগণ ঈষৎ বিষন্ন হইলেন। যে কাণ্ড লইয়া তাহারা অন্য প্রভাত হইতে এত আমোদ করিতেছিলেন,—তাহা যদি মিছে হয়, তাহা হ'লে ত তঁাহারা একেবারে দাড়িযে মাটী! কি নিয়ে তারা দিন কাটান এবং কো সুখেই বা তারা ঘরে ফিরে যান ? রামমণি যদি সতী হয়, আর চিনিবাস যদি সৎ হয়, তাহা হইলে প্রত্যেক গ্রামবাসীর দুর্ভাবনায় অদ্য অন্ন রােচে কি না সন্দেহ! তর্করত্ন মহাশর গ্রামবাসীর সুখে কটক এবং অন্নে হন্তারক হইলেন বলিয়া সভাস্থ সকলেই তাহার উপর চটিয়া উঠিলেন। জন ক্রোঞ্চে কাপিতে কাপিতে, চোখ দুটা কপালে তুলে, তর্ক- রত্নকে রুক্ষ সম্বােধনে বলিল, ‘চাটুয্যে মােশাই! তােমার একি খারাপ স্বভাব ? না জেনে, না শুনে, দুম করে একটা কথা ফি পরিচ্ছেদ। --- 1 কওয়া ভালাে কি ? চিনিবাসের সঙ্গে রামমণির ঘটনা কার জানা আছে ?—ছি।” দ্বিতীয় ব্যক্তি। ঠিক কথাইত ! যা রটে, তা বটে তৃতীয় ব্যক্তি। পূবের চঁাদ যদি পশ্চিমে উদয় হয়, তা হলে ও চিনিবাসের ঘটনা অবিশ্বাস করিবার যে নাই- চতুর্থ ব্যক্তি ঈষৎ মুচকি হাসিয়া বলিলেন,-"চিনিবাস, চাটুয্যেকে এবার শীতকালে কৃষ্ণনগর থেকে একখানি রাঙ বনাত এনে দিবে বলেছে- নীলাম্বর তর্করত্ন বলিলেন,—“আপনারা হঠাৎ রাগ করে কেন ? কোন বিষয় বলিতে হলে, তার আগে পিছে ভেবে বলিতে হয়, হঠাৎ লােকের অপবাদ দে ওরা ভাল কি?-- এই কথা তাহার মুখােচ্চারিত হইতে না হইতেই, সভায় একটা গােল উঠল,-“তুমি কোথাকার পাগল? কোথাকার পাগল ?” এমন সময় বিধুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অসিয়! তথায় উপনীত হইলেন। তিনি চিনিবাসের প্রাণের বন্ধু । বয়স ত্রিশের কম নহে; গ্রামময়, চিনিবাস কাণ্ডের প্রতিবাদ করিয়া বেড়ানই তাহার অধ্যকার কাৰ্য। তিনি গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞা- সিলেন, “কিসের গােল ?—এত রাগের লক্ষণ কেন?” তর্করত্ন বলিলেন, “এই দেখ, বাঁড়ুয্যে, সকলেই অামার উপর মারমুখী—আমি বলচি, বিচার করে, চিনিবাসকে ফাসি দেও— বিধু। ঠিক কথা!—চিনিবাসের দোষ কি? গ্রামে অর

চিনিবাস মিম।
;
একটা এমন ছােরা জন্মালে গ্রামে আজ মিউনিসিপালিটী
হতো !–র অতি সাধু অন্তঃকরণ, অতি নিস্পাপ শরীর ;
যারা চিনিবাসের চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক আরােপ করিতেছেন,
তাহাদিগকেই আমি জিজ্ঞাসা করি, তারা কি স্বচক্ষে কিছু
দেখেছেন? (সম্মুখস্থ ব্যক্তিৰ গায়ে হাত দিয়া) আচ্ছা দাদা,
তুমি ঠিক বলল, উপরে চন্দ্রসূৰ্য্য, নীচে অগ্নি, নিজের চোখে
তুমি কিছু দেখেছো কি না?” সম্মুখস্থ ব্যক্তি একটু আমৃতা
আমতা করিয়া বলিলেন, “হ্যা ঠিক নিজের চোখে দেখি নাই
বটে, কিন্তু যা শুনেছি, তাতে ঠিক বলেই বােধ হয়—
বিধু। শােনা-কথা বিশ্বাসযােগ্য হতে পারে না, আদালতে
প্রমাণ বলিয়া গণ্য হয় না। বিশেষ, একটী ভদ্রলােকের ছেলের
নামে এমন কলক্ষ কি শােনা-কথায় রটাতে আছে ? চোখে
দেখ,-ধর, তার পর চিশ পয়জার মার, ঘাড় পেতে লইব।”
বলা বাহুল্য, সভাস্থ সকলেই শােনা কথার উপর নির্ভর
করিয়াই এত খানি আন্দোলন উপস্থিত করিয়াছিলেন। বিধু
বাবুর সতেজ, স-সার কথা শুনিয়া সকলেই একটু নীরব
হইলেন। সভাস্থ সকলের হার হয়-হয় দেখিয়া, একজন
বলিলেন,-“বাঁড়ুয্যে , যা বলুক,-আমরা যা শুনেছি, তা
দেখার চেয়ে বাড়া;-রামমণি ‘অমন ১৭ টাকা যােড়া
শান্তিপুখে সাড়ী পেলে কোথা? পেটেরই বাহার কি?”
বিধু বাৰু ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন,-“আপনি বড় মূখ দেখি-
তেছি। কেন মিছ। আপনারা পরের ছেলের উপর দোষ

দ্বিতীয় পরিচ্ছে। দেন ? আপনি কি দোকানদারের খাতা দেখে এসেছেন, শান্তিপুরে কাপড় খানির দাম ঠিক ১৬ টাকা। আর যদি ১৬ টাকাই হয়, তা হলে কি রামমণি চিনিবাসের ঘটনা অবশ্য সম্ভব ? আপনি কি মামমণির হস্তে চিনিবাসকে ঐ কাপড় অর্পণ করিতে দেখিয়াছেন ? যদিই দেখিয়া থাকেন, তা হই- লেই কি সুপ্রমাণ হইল, উভয়ের মধ্যে কোন অসৎ সম্বন্ধ আছে ? তর্কের খাতিরে মনে করুন, আপনি স্বচক্ষে, সুস্থ অবস্থায় দেখিয়াছেন, চিনিবাস, রামমণির কোমল করপ ধরিয়া ঐ বস্ত্ৰ অৰ্পণ করিয়াছেন। তাহা হইলেই কি বুঝিতে হইবে, চিনিবাসের অভিসন্ধি মন্দ ? আপনি ত এমনও মনে করিতে পারেন, অনাথ বিধবা ভগিনীর দুঃখে দুঃখিত হইয়া দরিদ্রের দারিদ্র্যদুঃখ লাঘবের জন্য, উদারহৃদয় দানশোও শ্ৰীযুক্ত চিনিবাস বাৰু বহুমূল্যের শান্তিপুরে বস্ত্র রামমণিকে অৰ্পণ করিয়াছেন ?”—কলে হােহাে হাসিয়া বলিয়া উঠিলেন, —“তাতির মেয়ে বামুনের ভগিনী কিহে ?” সভা হইতে হঠাৎ শব্দ উত্থিত হইল,—“দূরদূর-বেনে, বেরােধর বাঁড়ুয্যেকে -ভূয্যে জাতি।”—বাঁড়ুয্যে একদিক দিয়া পলাইয়া গেল। গােলমালে সভাভঙ্গ হইল। এদিকে চিনিবাস, ধীর, গভীর নিশ্চিন্ত, সুস্থির, কিছুতেই দৃকপাত নাই,বুদ্ধিমানের ন্যায় কেবল আপনার কার্যোদ্ধারের জন্যই ব্যস্ত। যেন কল্য রাত্রে কিছু টে নাই,“ঘেন মেঘ ডাকে নাই, ঝড় বহে নাই, বিদ্যুৎ চমকে জিনস-স। নাই। চিনিবাস আপন মনে কেবল চাদা আদায় কার্যে বিব্রত রহিয়াছেন । মহেশমণ্ডল এবং চৌকীদারের তাড়নায় যারা বাবুর কাছে পথরের চাঁদা দিতে আসিতেছে, তাহাদিগকে বাবু অদ্য সমাদরপূৰ্ব্বক কাছে বসাইয়া বলিতে- ছেন, “এ গ্রামে মাতালের বড়ই প্রাদুর্ভাব হইয়াছে, মদে মদে দেশ উৎস গেল ; কাল রাত্রে নিতাই তাঁতি মদখেয়ে এসে এখানে মাতলামি করেছিল। এ বিষয়ে অামি খােদ মাজির সাহেবকে চিঠী লিখব। দেশেম এরূপ দুর্গতি দেখিয়া কে, না কান্দিয়া থাকিতে পারে ? স্বদেশ- হিতৈষীদের উচিত, রাজনৈতিক আন্দোলন করিয়া মাদক- দ্রব্যের টেক্স বৃদ্ধি করানে।” এমন সময় ভিখারী খঞ্জনী বাজাইয়া গান করিতে আসিল। সে গান ধরিল ;- ললিত-তিগুট। ও কাররমণী সমরে নাচিছে। দিগম্বরী দিগন্নবােপরি শােভিছে। নানা ধারা-ধৰু, রুধির-ধারা নিকর, কালিন্দীর জলে কিংশুক ভাসিছে। বন বিমল শশী কত সুধাক্ষরে হাসি, কালরূপে তম রাশি রাশি রাশিছে। ফহে করি রামপ্রসাদে, কালিকা কমল-পদে, মুপি, হেতু গ্রেী কদ ভাবিছে।

ঙিীয় পরিচ্ছে। = { গান শুনিয়া বাৰু, ভিখারীকে জিজ্ঞাসিলেন,-“ভিখারী তােমার নাম কি ?” ভিধাৰী বাবুর মধুর সম্ভাষণে গলিয়া গিয়া বলিল,-“আঃ আমার নাম গৌরদাস। আপনার বাপ- পিতেমাের খেয়ে আমরা মানুষ। এখন বয়স হযেছে, সব দিন বেরিয়ে মায়ের নাম কর্তে পাই না—আপনি বার মাস কেষ্ট- নগরে থাকেন, কাজেই আপনার সাক্ষাৎ পাই না ; তা মা- ঠাকরুণ আমায় ছেলের মত ভাল বাসেন—” চিনিবাস। বেশ, বেশ, তোমার শছে আমার একটু আবশ্যক আছে- গৌৱদাস। যা আজ্ঞে করবেন, তাই কবুবাে,আপনাদের খেয়ে আমরা মানুষ। চিনিবাস। দেখ, এ বড় শক্ত রাজনৈতিক কথা,-অতি গােপন কথা-এ কথা কাহাকেও ব্যক্ত করিও না। গৌরদাস, বাবুর কথা কিছুই ভাল বুঝিতে না পাবিয়া, ফ্যাল ফ্যাল চাহিয়া রহিল। চিনিবাস পুনরায় আরম্ভ কবি- লেন,-“আমার প্রথম কথা এই তুমি ঐ কুরুচিপূর্ণ গান ত্যাগ কর—গানে রমণী, দিগম্বরী, এলােকেশী, এ সব কি ? তুমি প্রত্যহ প্রভাতে গৃহস্থের দ্বারে ঐ সকল নারীবিষয়িণী গান কর,ইহাতে স্ত্রীলােকের মন খারাপ হইতে পারে। বিশেষতঃ রমণীহৃদয়ে কুরুচিবি একবার প্রবেশ করিলে, তাহা সহজে বাহির হয় না। অতএব ওরূপ গান সর্বতােভাবে দূষণীয়। বােধ হয়, এ জ্ঞান তোমার অবশ্যই আছে যে, রাখা

চিনিৰাস-গি।
ঘাটে অশ্লীল গান গাহিয়া বেড়াইলে, তােমাকে পুলিশে ধরিতে
পারে।” গৌরদাস ভয়ে শিহরিয়া উঠিয়া বলিল—“আজ্ঞে-
আজ্ঞে,-আমি ত কিছু করি নাই”
চিনিৰাস! না, এখন তােমার কিছু ভয় নাই। একে
তােমার কাছে আমার একটা বিশেষ কাৰ্য্য আছে।
সাহায্য ব্যতীত, আমি সে দায় হইতে উদ্ধার পাইব না।
গৌরদাস। আজ্ঞে, আমা হতে যা হবে, তাই তখনি
করবাে।
চিনিবাস। তােমার মত বার জন ভিখারী আমার
আবশ্যক । সেই ভিখারীদের বেশ সতেজ সুমিষ্ট সুর হইবে।
গোর। ভিখারীর অব কি ? দেশময়ই ভিখারী-১২
জন কেন, আপনি হুকুম করিলে, আমি কালই ৫০ জন ভিখারী
এনে দিতে পারি।
চিনিবাস। তা নয় ; ১২ জন বাছাই করে, উপযুক্ত
ভিখারী এনে দিতে হবে-
গোর। ভিখারীর আবার উপযুক্ত নুপযুক্ত কি ? যায়।
খুব খােড়া কণা বুড়াে, তাদিগে চাই কি ?
চিনিবাস। না, না, না, তুমি আমার উদ্দেশ্য বুঝিতে
পরিতে নামার খুব ভাল গান করিতে পারে এবং যারা
পুৰ সহিষ্ণু এবং বলিষ্ঠ এমন ভিখারী আমার আবশ্যক।
গাৱ। খাসিয়া } আজ্ঞে, ও কম লােক, ভিক্ষে কবে

দ্বিতীয় পরি। চিনিবাস। তুমি আমার উদ্দেশ্য বুঝিতেছ না; খোজ, খোজ, খুঁজলেই মিলিবে- গৌর। আজ্ঞে, তাদিগে কি করতে হবে ? চিনিবাস। সে খড় বিষম কথা। এস, আমার খুব কাছে এসে বােস। কাণে কাণে বলিব । গৌরদাস অগত্যা, সভয়ে চিনিবাসের কাছে গেল। চিনি- বাস বলিতে আরম্ভ করিলেন - “আমার উদ্দেশ্য ভারত-উদ্ধার ;-রাজনৈতিক শিক্ষাদানে ভারতকে মাতোয়ারা করা । ভারত মাতাইতে ভিখারী যেমন উপযুক্ত হইবে, তেমন আর কেহই নহে। এখন তােমরা অশ্লীল গান গাহিয়া, মেয়ে ছেলে ভুলাইয়া, পয়সা রােজগার কর। তখন আর তাহা করিতে হইবে না। আমি প্রত্যেক ভিখারীকে ১০ টাকা হিসাবে মাহিনা দিব। তাহনি সহরে গিয়া প্রত্যই এতে লােকের দ্বারে দ্বারে রাজনৈতিক গান করিয়া বেড়াইবে। সেই রাজনৈতিক গানের তেজে পুলিশ শঙ্কিত হইবে, মাজিষ্টর ভয়ে কাঁপবে, গবর্নমেন্ট বিপদে শ্রীমধুসূদন ডাক ছাড়িবে।” গৌরদাস। আজ্ঞে, আমি আপনার কথা ভাল বুতে পারতেছি না। ভিখারীরা মােশাই! কি গান করে বেড়াবে ? চিনিবাস। মুখ । বুঝিতেছ না, দেশের হিতার্থে আত্ম- প্রাণ বলি দিব। দেশের ঘুমন্ত লােককে জাগাইয়া তুলিব। গৌরদাস। আজ্ঞে, কারা ঘুমাচ্ছে, মােশাই ? {

চিনিবাস চরিতামৃত।
চিনিবাস। এমন পাগলকে লইয়া আমি কি করিব পা ?
এই শােন, ভারতবাসীকে উত্তেজিত করিতে হইবে—হৃদয়ে
রাজনৈতিক বলপ্রয়ােগ কারিত্বে হইবে ; বুঝিতে ত ?
গৌরদাস বড়ই বিপদে পড়িল। ক্ষীণষরে মাথা চুলকাইতে
চুলকাইতে বলিল, আজ্ঞে হা,–আপনি বলুন কি গান গাইতে
চিনিবাস। প্রত্যেক ভিখারীকে এইরূপ রাজনৈতিক গান
করিতে হইবে;
“বাজ রে পিঙ্গে বাজ এই রবে,
সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে,
সবাই জাগ্রৎ মানের গৌরবে,
ভারত শুধুই ঘুমায়ে রয়।
আরব্য মিশর পারস্য তুরকী,
তাহার তিত অন্য কবক
চীন প্রহ্মদেশ অসভ্য জাপান,
তারাও স্বাধীন, তারাও প্রধান,
দাসত্ব করিতে করে হেয়জ্ঞান,
ভারত শুধুই ঘুমায়ে রয়।”
প্রকৃতই গৌরদাস পানের বিন্দুবিসর্গও বুলি না,জিজ্ঞা-
সিঙ্গ, “শুধুই ভারত ঘুমাচ্চে-কথাটা কি কার সঙ্গে
বাঙ্গায় কথাটাই বা কি? আমি মােশই এ-গাৰ কৰুতে পারব
মা। মায়ের নামের চেয়ে আর কিছু গান আছে কি?

ত্ব পরিচ্ছেদ।
দেখ, তুমি বড় অশিক্ষিত; তুমি যদি
আমার কথা না শুন, তা হলে, অশ্লীল গান কর বলিয়া
তােমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিব—তােমার ছয় মাস মেয়াদ
হবে। তােমাকে কল্য আমার সঙ্গে অবশ্যই পচিশ জন
ভিখারী লইয়া কৃষ্ণনগরে যেতেই হবে।
হবে। সেখানে গিয়ে
তােমাকে “বাজরে শিঙ্গে গান গাহিয়া ঘরে ঘরে ভিক্ষা
করিতে হইবে।
পৌরদাস। (যােড় হাতে আমায় ক্ষমা করুন, হুজুর, এ
বয়সে আমি কারাে মন্দ করি নাই,—আমি মােশাই ঐ শিঙ্গে
বাজিয়ে গান করতে পারব না—আপনার পায়ে পড়ছি আপনি
ক্ষমা করুন।
চিনিবাস। দেখ, তুমি বড়ই বাড়াবাড়ি করিতেছ—তুমি
যদি কাল আনার সঙ্গে না যাও, পুলিশ এসে তােমাকে ধরে
নিয়ে যাবে-
গৌরদাস কাপিতে কপিতে যােড়হাতে বলিল,-“হ
ঈশ্বর ! হে মা শুভণ্ডি!--আমি ত কারো দু’পণ ধান চুরি
করে খাই নাই,আজ আমার এ দণ্ড কেন ?—বাবু আমাকে
এ যাত্রা রক্ষা করুন,—আমি ছেলে পিলে কেলে কেষ্টনগরে
যেতে পাবাে না--
ক্ৰমে গৌরদাসের ঐন্দনের বােল উচ্চে উঠিতে লাগিল।
এমন সময় দূর হইতে দেখা গেল, রামমণি চেঁচাইতে চেঁচাইতে
দৌড়িয়া আসিতেছে ;-“হেঁগা, ভাল-মানুষের ছেলে, এই কি

২৪
চিনি ৰিহামৃত।
তােমাদের কাজ?-তুমি কাল অবধি আমার নামে দোষ দিয়ে
বেড়া।”
স্বামমণির সঙ্গে একটা পুরুষ এবং দুইটা বৃদ্ধা স্ত্রীলােকও
আপিতেছে। চিনিবাস ব্যাপার দেখি, অতি উৎকণ্ঠিতচিতে
যেন ভয়ব্যাকুল হইয়া, ভিখারীকে বলিল,-“তুমি এখন শী
যাও, যাও,-কাল এসে দেখা করাে।” ভিখারী এই
কথা শুনিয়া তাড়াতাড়িতে ভিক্ষার ঝুলি ভুলিয়া ফেলিয়া বেগে
পলাইল। চিনিবাস ঘরে গিয়া, লেপ মুড়ি দিয়া, শুইয়ং নাক
ডাকাইতে লাগিলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
বসন্তু কাল। ফান মাস। কৃষ্ণনগরীয় কোকিলকুল
কলল অশ্লীল গান করিতেছে। ঐ কুরুচিময় কুহুধ্বনিতে
শিক্ষিত শব্দ্য নর-নারীর অঙ্গ শিহরিয়া উঠিতেছে। সুযােপ্য
পুলিশ নাই কি, যে কোকিলগুলাকে এ সময় হাত দেয়।
মিউনিসিপালিটাই বা কোথায়?-গােলন্দাজ আনাইয়া
কোকিলগুলাকে গুলি করিয়া ফেলিলেই হয়। ও দিকে
ভ্রমরমী ঠিক যেন গােপালে উড়ের টপ্পা আৰম্ভ করি-
ক্লায়ে; সরোবরে কল লি ফুটিয়া উঠিয়া মুখে হাসি-
কাশি পড়াইতেছে—উদ্যানে আকুল, ফুটন্তু কুল, সুগন্ধে
মন মাতাইয়া খুলিছে-তার উপর আবার মলয় অনিল

তৃতীয় পরিচ্ছেগ। বুধষ্ণুর, বহিতেছে-এ-হলে বি? আর যে বাঁচি না। দেশ যে রসাতলে গেল। লাট সাহেব কোথায় ? চিনিবাস এ ঘাের দুর্দিনে, কৃষ্ণনগরে আসিয়া কেবল শান্তিবারি ছড়াইতে আরম্ভ করিলেন। চিনিবাস আর বালক নাই ; প্রকৃত সংসার, বিষয়ী। ছাত্রদের সহিত একবাস ছাড়িয়া, নিজে এক বড় বাড়ী ভাড়া করিয়াছেন। দ্বিতল গৃহ। উপরে একটা বড় হল, আর চারিটা কুঠারি। হলে বসিয়া রাজনীতি হয় ; কুঠারতে সমাজনীতি হয়। একটা কুঠারির দ্বারে লেখা আছে,—“গােপনীয়-গৃহ প্রবেশ নিষেধ। বাড়ী- ভাড়া ৭৫ টাকা ! ভাড়া শুনিয়াই সকলে অবাক। চিরকাল যার ৪৫ টাকা ভাড়া ছিল, হঠাৎ ৭৫ টাকা হইল কেন ? পাড়ার লােক আশ্চর্য্য হইল। ঐ বাটীর ঠিক পাশে একঘর হাল-আইনমত উন্নতিশীল “গৃহস্থের” বাটী। ঐ দুটা বাড়ী পরস্পর মাখামাখি। একটু শ্ৰম স্বীকার করিলেই ছাদে ছাদে পরস্পরের বাড়ী বেশ আসা-যাওয়া যায়। সভ্যতার নিয়মমত, পাশের বাড়ীর রমণীগণ প্রভাতে, দ্বিপ্রহরে, বৈকালে, নিশীথে', ছাদে উঠিয়া স্বাধীনভাবে বিচরণ করেন। ঘােমটারূপ জেল- থানায় মহিলাগণের মুখমণ্ডল কখন আবন্ধ থাকে না। . কোন নবীনার নব-নীল-নীরদ তুল্য আলুলায়িত কেশপাশ বসন্ত- বাসে ঝরু বর উড়িতেছে ; কাহারও কুণ্ডলীকৃত কুন্তলােপরি সুবর্ণগােলাপ ঝক ঝক ঝুঁকিতেছে ; কাহারও অধবপ্রান্তের মধুর-হাসি মলয়ানিলেন সঙ্গে মিশিয়া প্রতিবেশী যুবকের চিনিনি তিস্তৃত। অঙ্গে মিলাইতেছে; কাহারও বা কুরঙ্গ-নয়নের কুটিল-কটাক্ষে কোটি কোটি কাম বিমােহিত হইতেছে। সুতরাং চিনিবাসের বাটার যে ভাড়া হঠাৎ বৃন্ধি হইবে, তৎপক্ষে জার সন্দেহ কি ? বাটীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিনিৰাস নিজ পােষাফেরও পরিবর্তন করিলেন। ধুতি চাদর ছাড়িয। চোগা, চাপকান, চসমা, ধরিলেন। শীঘ্র দাড়ীতে চুল উঠিবার জন্য প্রত্যহ প্রাতে দাড়ী কামাইতে লাগিলেন। কিন্তু খােসা-মুখে পােড় দাড়ী উঠিতে চায় না। কেবল ধুতিতে কয়েকগাছি চুল খোঁচখোঁচ ভাবে “যথাপূৰ্ব্বং তৰাপৰং” হইয়া রহিল। রামমণিৰ পৰ্বাধ্যায় কিরূপে শেষ হইল, তাহা লােক- সাধারণ মধ্যে তাদৃশ প্রকাশ পাইল না। দুষ্ট লােকে কাণাকাণি করিতে লাগিল, চিনি, নিতাই জাতিকে নগদ ১০০ টাকা দিয়া বিবাদ আপােষে নিস্পত্তি করিয়াছেন। কেহ বলি, “তা নয়, চিনিবাস রামমণিক মাসিক ১০ টাকা করিয়া দিতে স্বীকৃত হওয়ায়, রামমণি বিবাদে ক্ষান্ত দিয়াছে।” তৃতীয় ব্যক্তি বলিল,-“তােমাদের কোন কথাই ঠিক নহে, নিতাই কাতি রামমণিকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে ; রামমণি চিৰিবাসের সঙ্গে কৃষ্ণনগৱে এসে আছে।” ফল কথা, গ্রামের লােৰু, রামমণিকে ঘরের বাহির হইতে আর দেখিল না । ইহাতেই কেহ বলি, “মাণ দেশে নাই কেহ বলিল, মাকে আর নিতাই জাতি বাড়ীর বাৱ হইতে দেয় না।” বলা বাহুল, নিতাই রূমণির জাদা।

তৃতীয় পখিলে।
আচ্ছা, চিনিবাসের চলে কিসে? এত বাবুগিরি-৭৫
টাকার ভাড়াটে বাড়ী, নিয়তই ঘণ্টা হিসাবে সেকেন-ক্লাস
গাড়ী, ২৪ ঘণ্টা মুকের পকেটে সােণার চেন-ঘড়ী, বাসায়
চাকর-চাকরাণীর ছড়াছড়ি-চিনিবাসের খরচপত্র সঙ্কুলান হয়
কিসে ? আবার তিনি আজকাল বােল ধরিয়াছেন “নিজে,
একখানা জুড়ী না করিলে, আর চলে না ; ভাড়াটে গাড়ীতে
বড়ই সময় নষ্ট হয়—সময় অতি মুল্যবান—আমার সময়ের
মূল্য, এক এক মিনিটে এক এক গিনি।” যিনিবাসের পৈতৃক
বিষয়ের হমু বার্ষিক আয় ৫০০ টাকার অধিক নহে।
আজকাল তাহাঁরও বে-বন্দোবস্ত, ভাল আদায় পত্র হয় না ।
সেই বিষয়ের আয়ের উপর একটী পৈতৃক অতিথিশালা আছে।
অতিথিশালাটা আজ শ্রীহীন,চিনিবাসের চক্ষুশূল, লােক
আসিয়া আর বড় আদর অভ্যর্থনা যত্ন পায় না। চিনি
যখন বাড়ী আসেন, তখনই মাকে বলেন, “অতিথিশালা মিছে
রাখিবার আবশ্যক কি ? আমি কালই উঠিয়ে দিব।” মা
কাঁদে, পাড়াপড়শীরা বুঝায়—কাজেহঠাৎ চিনিবাস অতিথি-
শালা উঠাইতে পারেন না। তাই লােকে ভাবে, এরূপ বস্তু
মানুষী করিবার চিনিবাস টাকা পায় কোথায় ?
আঃ পাগল!—এটা আর বুঝনা,—যার দেহ-রাজনীতি
সমাজনীতি, তাঁর আর অকিঞ্চিৎকর, পার্থিব অর্থের ভাবনা
কি ? বিধবাবিবাহ, স্ত্রীস্বাধীনতা, স্ত্রীশিক্ষা, পতিপরিত্যাগ,
শ্রীব্যায়াম, মাদক-নিবারণ, প্রজা, সিবিল-কার্ভি, খােলটী,

টিকা মিিষ্ট।
পৎফর, ফৌজদারী-বিচার, পুলিশ-অত্যাচায়, ভারত-ভাণ্ডার
এতগুলি মহামহা বিষয় যাঁহার করতলগত, রৌপ্যমুদ্রা, তার
কি কখন এক তিলের জন্য ভাবনার কাম হইতে পায় ?
ইহা ব্যতীত মায়ের কাছথেকে বার্ষিক অনেক টাকা উপরি
রােজগার করাও আছে। চিনিবাসের বিশ্বাস,-মায়ের কাছে
যদি কিছু না থাকে, তবু অন্তত দশ হাজার টাকা আছে। তিনি
সময়ে সময়ে মাতাকে ভয় দেখান, “মা রাজনীতির আন্দোলন
অন্য আমি শীঘ্রইবিলাই যাইব, আপনি অনুমতি দিন।” হাবা
কালা বুড়ী মা-মাগী, একথা শুনে কেঁদেই আকুল হয়—“না
বাছা, তােমার বিলাত যেয়ে কাজ নেই, তুমি আমার একশ
বছরের হয়ে ঘরে বসে ক-তােমার অভাব কিসের ?”
পুত্র। জননি।
ননি! আপনি আমার বাক্যের অনুসরণ
করিতে পারিতেছেন না ; আমি বিলাত গমন করিয়া ভারতের
রাজনৈতিক উদ্ধার সাধন করিব।
মা। (কান্দিতে কাঁদিতে) বাহা, বিলাত যেয়ে তাের রাজা
হয়ে কাজ নাই,
পুত্র। ছি ছি! রাজা হইবার কথা আমি বলি নাই
--নয়। সাধারণতন্ত্র-প্রয়াসী স্বাধীনতাভিখারী। সেই
ঋনতার খনি বিলাত যাইবার জন্য সকলেই আমাকে
অনুৰােৰ তেনে। আপনি অনুমতি দিলেই হয়।
, এই কথা শুনিয়া চোখের জলে বুক ভাসাইয়া ফেলিতে
লাগলো। বাপ। তাের বিলাত যেয়ে কাজ নাই—মাকে

তৃতীয় পরিচে। আর মারিস না! তুই বল তাের কিসের অভাব- তাের কত টাকা চাই ?-তুই বার মাস ঘরে বসে পায়ের উপর পা দিয়ে থাক,আমি তোকে রাজার হালে রাখবে। পুত্র। এই আজ আমার ৫০০ টাকা চাই—আপনি কোথা পাবেন ? মা। তা, আমি যেখানে পাই তোকে টাকা দিব ; তাের বিলাত যেয়ে কাজ নাই। এইরূপ নানা উপায়ে, নানা কৌশলে শ্মীচিনিবাস, বৃক্কা মায়ের নিকট হইতে টাকা আদায় করিয়া থাকেন। এবার বাটী হইতে বৃষ্ণনগর আসিবার সময় চিনিবাসের হাতে প্রায় হাজার টাকা মজুত ছিল। মাতার নিকট হইতে ৫২৫; পথরের টাকা আদাযের তদ্বির জন্য দাসংগ্রহ ৮৫; একজন দোকানদার চিনিবাসের নিকট গচ্ছিত রাখে ২৫০; একজন বৃদ্ধা 'হ্মণী বৃষ্ণনগর হইতে শাখা কিনিয়া পাঠাইবার জন্য দেয় ১৬; দীনু হালদার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর জন্য গোঁফহার গড়াইতে লুকাইয়া দেয় ১০০ টাকা। এই টাকাগুলি পাইয়া, প্রফুল্লমনে চিনিবাস ষ্ণনগরে অবতীর্ণ হইলেন। অচিরে তিনি মাদকনিবারিণী সতার সম্পাদকীয় পদ পাইলেন। নিজ বাসার নিতলে স্ত্রী বিদ্যালয় বসিল। দ্বিতলের হলে সিবিলসার্ভিস পরীক্ষার বয়স বাড়াইবার জন্য এক স্বাজনৈতিক সভা খুলিলেন। দ্বিতলের সেই গােপনীয় গৃহ" বিধবা-বিবাহের মঙ্গল শােভা করিল। ফান মাস--

তিনিয়িত।
কত মিটে কড়া বিলক্ষণ অাছে-তথাচ সমন্ত ঘরে টানাপাখা
চলিতেছে! বরফ লেমােনের অভাব নাই।
চিনিবাস কৃষ্ণনগরে আসিয়াই প্রায় ৬০ খানি রেজিষ্টরি
পত্র এক সপ্তাহ মধ্যে পাঠাইয়া দিলেন। মহারাণী স্বর্ণময়ী,
শৱসুন্দরী, শ্যামমােহিনী, ধনপৎ, ছমিশৎ, বিদ্যাসাগর,
যতীন্দ্রমােহন, ইন্দ্রচন্দ্র, শ্যামশঙ্কর, রামতনু লাহিড়ী ইত্যাদি
মহােদয়গণের নামীয় সেই পত্ননিচয় যথাসময়ে পেীছিল ।
মহারাণী স্বর্ণময়ীর পত্রে এইরূপভাবে লেখা ছিল ;-
“আপনার মত দানশীলা রমণী এ পৃথিবীতে আর নাই ।
বঙ্গদেশে এমন সদনুষ্ঠান নাই, যাহাতে আপনার দান নাই।
আমরা বঙ্গীয় ভগিনীগণের উন্নতির জন্য যে মহাব্ৰত ধারণ
রিয়াছি, তাহা অনুষ্ঠানপত্রে দ্রষ্টব্য। দরিদ্র রমণীকুলকে
আপনি সাহায্য না করিলে আর কে করিবে স্ত্রী-বিদ্যালয়
গৃহটা শীঘ্ৰ নিৰ্মাণ হইবে। আপনার নিকট আমরা পাঁচ শত
টাকার ভিখারী। কৃতাঞ্জলিপুটে প্রার্থনা-৫০০ টাকা দিয়া,
বঙ্গীয় মহিলামণ্ডলীর উন্নতি বিধান করুন। এ সম্বন্ধে স্থানীয়
ডেপুটী বাবুর ও অধ্যাপকের পত্র এই সঙ্গে পাঠাইলাম। ইতি
চিনিবাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পাদক।”
কিন্তু সর্বাপেক্ষা কিনিবাসের অধিক চিন্তার বিষয় হইল—
র রাস্তা-ঘাট। ১৫ দিন মধ্যে রােডশে কমিটীতে
তিনখানি দরখাস্ত কৰূিলেন,কিন্তু মাছ চাকা পাইলেন না।
উলেস কমিটীর গহৰ পন্তির গহে টাভাড়া গাড়ি
ন

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
করিয়া প্রত্যহ যাতায়াত আরম্ভ করিলেন। সহ-সভাপতি
বলিলেন, “ফ®ে, এবৎসর টাকা নাই। আমি কোথা হইতে
দিব ? বিশেষ, আপনি অসময়ে দরখাস্ত করিয়াছেন।”
চিনিবাস। সে কি কথা? আপনি জানেন, অাশ আমরা
পঁচ বৎসর কাল ক্রমান্বয়ে পথকর দিয়া আসিতেছি, এক
কপর্দকও পাই নাই। আপনি অবিচারে আমাদিগকে বঞ্চিত
করিবেন না।
সহঃসভাপতি। আপনার, সময়ে খাস্ত করা উচিত
ছিল। যাহােক, আমি চেষ্টা করিয়া একবার এক শত টাকা
দেওয়াইব।
চিনিবাস। ৫০০ টাকার পাই-পয়সা কম আমি ছাড়িব
না। ও-টাকা ত আপনার ঘরের ধন নয় যে, আপনি দিতে
কুষ্ঠিত হবেন ?
সহঃ-সভাপতি। আপনি কি মনে করেন যে, আমি বােড়
শেসের টাকা লইয়া স্ত্রীর গহনা গড়াই ? আচ্ছা, আমি কিছু
জানি না,-সভাপতি, মাজিষ্টরের কাছে আপনি দরখাস্ত
করিয়াছেন, তিনি যা হুকুম দিবেন, তাই হবে,
চিনিবাস। দেখুন, আমরা সুনীতির ও সুরুচির পক্ষপাতী।
দেখিতেছি, আপনার নীতিজ্ঞান কম। আর আপনাকে ক্ষমা
করিতে পারি না। আমি এজন্য কল্য হইতে কৃষ্ণনগরে এরূপ
কাজনৈতিক আউন জ্বালাইব, যাহা সমুদায় খড়িয়া নদীর জলে
নির্বাপিত হইবে না।”

ििनवान-विमा এই বলিয়া, চকু রক্তবর্ণ করিয়া চিনিবাস, দ্রুতপদে তথা ইকে প্রস্থান করিলেন। বাসায় আসিয়াই কালী, কলম, কাগজ সংগ্রহ করিয়া মনঃসংযােগপূৰ্ব্বক সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখিতে আরম্ভ করিলেন। তখন তাহার হৃদয় যেন দীপক রাগে জ্বলিয়া উঠিল। শাৰ্দল-বিক্ৰীড়িতচ্ছন্দে চিনিবাস প্রবন্ধ ধরিলেন ;- “আর নিশ্চিন্ত থাকিতে পারি না। কতকাল এ কাল- নিদ্রায় অভিভূত থাকিব ? রাজনৈতিকগগন যেরূপ গুয়ঙ্করী ঘনঘটায় সমাচ্ছন্ন হইয়াছে, তাহা ভাবিলে কাহার না অন্তরাত্মা বিশুদ্ধ হইয়া যায় ? ঐ দেখুন, ঘেরা, বিকটদশনা, লহল-বসনা, রাজনৈতিকী অমানিশা, যেন ভারতমাতাকে গ্রাস করিতে আসিতেছে ; যেরূপ মুহুর্মুহু ক্ষণপ্রভার আলােক বিকশিত হইতেছে, প্রলয়-পবনের প্রবল বায়ু বোঁ বোঁ শব্দে বহিতেছে, ঝাতের ঝন ঝন শব্দেক বধির করিতেছে, তাহাতে আমার হৃদয়ে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হইয়াছে যে, ভাৰজননীর গগনের রাজনৈতিক দুর্দিন সহজে নিবৃত্ত হইবে । যে দিকে দেখি, সেই দিকেই আঁধার, আঁধার, আঁধার- আরও আঁধার-ধু ধু ধূ-ফু ফু ফু! : এ বিপদের কাণ্ডারী কে ? মাটখিনি কে ? খি কম দুঃখের কথা-এ কি বলিবার ক-এ কি লিখিবার কথা~-এ কি গুনিবার কথা যে, প্রতি বৎসর যথা- নিয়মে-শীত নাই, বা নাই—গ্রীষ্ম নাইকড়ায় গণ্ডায় তৃতীয় পরিচ্ছ। সুদ-শুদ্ধ পথ দিয়া আসিলেও, আজ আমরা গ্রাম্য-থ্যা সংস্কারের জন্য উপযুক্ত, পরিমিত, ন্যায়ানুগত, রজতমুদ্রা পাইলাম না। গবর্ণমেন্টের যে কিরূপ নিষ্ঠুরতা, অবিমৃষ্য- কারিতা, নির্বুদ্ধিতা, তার এক মুখে বর্ণনা করা যায় না। সেই জঙ্গলময় পাহাড়ময়, নদীময় রখ্যাসমুহের ঐকাস্তিকী দুর্দশা দর্শনে কোন পাষাণপ্রাণ পুরুষের হৃদয় গলিয়া দ্রব হইয়া না যায় ? পথিপাৰ্থে এরূপ সুবৃহৎ অরণ্যানী প্রস্তুত হইয়াছে যে, তথায় হজে হস্তী, গণ্ডার, উ, ব্যাঘ্র, সিংহ প্রভৃতি হিংসু- জন্ধুগণ স্বচ্ছন্দে লুক্কায়িত থাকিতে পারে। বড় বড় অজগর সরীসৃপ কাল-ভৈরব কেউটে সর্প, মহাচক্রধারী গােখরা সর্প— সেই গ্রাম্য পথে নিয়ত পরিভ্রমণ কবিতেছে। এই শোচনীয় অবস্থা কেহ দেখে না, কেহ শুনে না, কেহ ভাবে না, কেহ মনােযােগ দেয় না ! রাহুর করাল-কবলে কবলিত হইতে পূর্ণ- চন্দ্রকে দেখিয়াছি, ভীমণিরি কাঞ্চন-গঙ্গাঙ্গ বজ্রপাতে বিচূর্ণিত হইতে দেখিয়াছি, উত্তালতরঙ্গমালা-বিভূষিত আটলান্টিক মহাসাগরে অবপােত নিমজ্জিত হইতে দেখিয়াছি,কিন্তু গ্রাম্যপথের এরূপ দুর্দশা কোথাও দেখি নাই। রামচন্দ্র এক বাণে সপ্ততাল ভেদ করিয়াছিলেন, অর্জুন একবাণে লক্ষ্যভেদ করিয়াছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ এক চপেটাঘাতে চাপূর (ধ করিয়া- ছিলেন, কিন্তু আমাদের কি এখন বল নাই যে, এক বক্তৃতায় গ্রামাপথের জীর্ন সংস্কার করি। বিশেষতঃ জমি নিজ গ্রামে স্ত্রী-স্বাধীনতা দিবার দৃঢ়ন্সল্প করিয়াছি; এমন কি ইতিমধ্যে চিনিৰাশ-ফরি। এক আধল গ্রাম্যমী, স্বাধীনতা পাইবার উপক্রম করতে ছেন। সেই উচ্চ-নীচ বন্ধুর পথে রমণীগণ যখন স্বাধীনভাবে পদচালন করিয়া বেড়াইবেন, তখন তাহাদের কোমল পদযুগলে যে মৰ্ম্ম-ব্যথা জন্মাইবে,—তাহার ড্যামেজ দিবে কে? যখন সেই পথি পার্শ্ববর্তী জঙ্গলের খোঁচা লাগিয়া, রমণী-অঙ্গ ক্ষত- বিক্ষত হইবে, যখন বন হইতে মত্ত-মাতঙ্গ বহির্গত হইয়া, রমণীদের সম্মুখে বৃহিত ধ্বনি করিবে,যখন নাগরাজ তক্ষক কুলাপান কালচক্র ধরিয়া মণীদের পুরভােগে ফোস ফেঁস শব্দ করিবে, তখন রমণীকুলকে রক্ষা আবার যখন দুরন্ত দুর্দিনে, পথ সকল পিচ্ছিল হইবে, কুটিল কর্দমে কমনীয় কামিনীর কমলপত্রবৎ কোমল পদাঙ্গুলী ডুবিয়া যাইবে, তখন তাঁহাদের বিপদের কাণ্ডারী কে? কৃষ্ণনগরের ভাইসূচেয়ারম্যান নিতান্ত স্বার্থপর, কৃতঘ্ন, অকৃতবিদ্য,তাহারই অকৃতার্যের দরুণ গ্ৰাম্য-রথ্যার এরূপ দুর্দশা ! আজই তাঁহাকে পদচ্যুত করা উচিত। তিনি পাষণ্ড, ভণ্ড, ষণ্ড, ৰকাণ্ড, গবাপ। তিনিই কৃষ্ণনগরের অমঙ্গল ধুমকেতুস্বরূপ উদিত হইয়া, নগর ছারখার করিতে ছেন।-হা সর্বজনহিতেরত ফসেট! হা, ভারতময় জীবন ব্রাইট ! আজ তুমি কোথায় ? হা পরােপকারব্ৰতধারিণী কুমারী মাইটিঙ্গেল! তুমিই বা হেথায় ? আর সেই ভুবনয়- নাশিন্ত্রী, ভারতেশ্বরী ভিক্টোরিয়াই বা কোথায় ? এ অসময়ে প্রাম-পথ বাঁধাইবার, স্পন পালেমেন্টে বক্তৃতা করিয়া

তৃতীয় পরিচ্ছন।
আন্দোলন উপস্থাপিত করিবে কে? হায়! আমরা গেলাম,
রসাতলে চলিলাম। হা বিধাতঃ! ভারতের ভাগ্যে কি
এই ছিল ?”
সংবাদপত্রের জন্য এইরূপ প্রবন্ধ লিখিয়া চিনিবাস নিম্নে
নিজ নাম স্বাক্ষর করিয়া, কলিকাতায় পাঠাইয়া দিলেন।
এমন সময় বন্ধু-মনােমােহন আসিয়া উপস্থিত । চিনিবাস
বলিলেন,—“আজ বড় শক্ত পরিশ্রম করিয়াছি ; লিখিয়া
আঙ্গুলে ব্যথা হইয়াছে,—চক্ষু জ্বলিতেছে, এক-কপ চা না
খাইয়া তােমার সঙ্গে কথা কহিতে সমর্থ হইব না।”
মনােমােহন। সে কি হে ? চা খাবে কি ?—চায়ে যে
মাদকদ্রব্য আছে। উহা খাইলে নেসা হয় ।
চিনিবাস। আমার বড় সর্দি করিয়াছে—ঠিক যেন জ্বর
হইয়াছে—আর এই হাড়ভাঙ্গা মেহনতের পর, নাড়ী বড়ই
দুৰ্বল হইয়া পড়িয়াছে ' 'এ অবস্থায় ডাক্তারি মতে , শুধু চা
কেন, আমি ব্রাণ্ডি পৰ্যন্ত খাইতে পারি। ইহাতে কোন
দোষ নাই। তুমি কি মাদকনিবারিণী সভার নিয়মাবলী
পড় নাই ?
মনােমােহন। ইহা ত বড়ই নিয়ম। আমারও বড়
মাথা ধরেছে। তবে আমার জন্যও একটু চা তৈয়ারি
করিতে বল।
চিনিবাস। খুব বেশী মাথা ধরেছি কি ?কীয়
ধমনীতে প্রবলবেগে কি রক্ত প্রধাবিত হইতেছে?

চিনি-চরিভাত।
মমােমাহন।
বড় বিষম মাথা ধরেছে।~-জায়
চিনিবাস। তা হলে তােমার জন্য দুই আউন্স ব্রাণ্ডি
বন্দোবস্ত কৱিতে পারি-
মনােমােহন বাবু মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে আঁ ও
করিয়া বলিলেন, “এতে কোন দোষ হবে না ত? সভার নিয়ম
ভঙ্গ হবে না ত ?”
চিনিবাস। আরে পাগল!~-তুমি কি স্বাস্থ্যহত্ত্ব পড়
নাই! অসুস্থ শরীরে ঔষধ না পড়িলে যে, ব্যারাম বৃদ্ধি
হইবে; শেষে তােমার প্রাণনাশ হইতে পারে ?
মনোমােহন। আচ্ছা, তবে ব্রাণ্ডি খাবো, সভার নিয়ম
মন না হইলেই হই। ব্রাণ্ডি খাওয়া পাপ বলে ত আমার
কুসংস্কার নাই!
তখন চিনিবাস বাবুর ইঙ্গিতমই ভূত চা এবং ব্রাণ্ডি
আনিয়া উপস্থিত করিল! মনােমােহন বাবু বলিলেন, “ভাই
চিনিবাস ! তুমিও একটু ব্ৰণ্ডি ভক্ষণ কর”-
চিনিবাস। না, আমি এখনও অধিক বিষম রোগগ্রস্ত
হই নাই, শরীর মন তত অবসন্ন হয় নাই।
মনোেমাহন। তাত আমার সে বিশ্বাস নহে; আপনার
বৰ নিশ্বাস পড়িতে, মুখ দিয় হাই উঠিতেছে, চোখ
দুটা ল ল করিতেছে। আমি অপেক্ষাও আপনার অধিক
গোম দেখিতেছি। আমার ৮ বিষম জুর বােধ হইতেছে।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
চিনিবাস। আচ্ছা, তবে বগলে থামিটার দিয়ে দেখি,
জর হয়েছে কি না?
মনােমােহন। না, না, বগলে দেওয়া হবে না—মুখের
ভিতর দাও।
তৎক্ষণাৎ তাপমানযন্ত্র আনাইয়া মুখাভ্যন্তরে রক্ষিত হইল।
উভয়ে পাঁচ মিনিটকাল ঠায় নিস্তব্ধ। পাঁচ মিনিট পরে চিনি-
বাস বাবু মুখ হইতে তাপমানযন্ত্র খুলিবার উপক্ৰম করিলেন ।
মনােমােহন বাবু বলিলেন, তা হবে না—আরও পাঁচ মিনিট
রাখা চাই। এইরূপ দশ মিনিটকাল মুখ বুজিয়া, নীরব
আকিয়া, কসরত করিয়া চিনিবাস মুখ হইতে যন্ত্র খুলিলেন।
উভয়ে তখন অনির্মিষ-লােচনে সেই থারমিটরের প্রতি নিরীক্ষণ
করিতে লাগিলেন। দেখা গেল,-৯৯৯ ডিগ্রি পারদ
উঠিয়াছে। তখন নিশ্চয় জ্বর হইয়াছে বুঝিয়া, হাসি হাসি
মুখে, আনন্দের সহিত, শুষ্ঠ রােগ বিনাশের জন্য, উভয়ে ব্রাণ্ডি-
সুধা পান করিতে লাগিলেন। ঐমে গৃহে আনন্দের লহরী-
লীলা বহিতে লাগিল।
মনােমােহন। ভাই। সেই অনাথিনী স্ত্রী-য়ে বিধবা
বিবাহের কি হইল?
চিনিবাস। সেই অবলা, সরলা, বিধবা বঙ্গীয়া বালার
কথা ভাবিলে, আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয় ;সেই ঐশ্রমতী
রামমণি দেবীর পবিত্র, নিৰ্ম্মল, সুচারুচরিত্র, আদর্শস্থানীয় ।
কিন্তু সেই রমণীকুল-উলকারিণীয় উপযুক্ত পতি কৈ?

किनिवाग-रिया কোন ভাগ্যবান পুরুষ তাহার কোমল করকমলে নিজ কর অৰ্পৰ্শ করিতে সাহস করিবে ? উত্তমরূপ ইংরেজী ও বাঙ্গাল শিখাইবার জন্য তাহার শিক্ষয়িত্রীর বন্দোবস্ত করিয়াছি। আঁহার কঠে যেন সরস্বতী বসিয়াছে। তিনি একমাস মধ্যে প্রথমভাগ শেষ করিয়া বােপােদয় ধরিয়াছেন। তাহার অনি- র্বচনীয় মেধাশক্তি, সেই কলকরে মনােমােহিনীর মধুর ভাষা দেখিয়া, শুনিয়া, আমি মোহিত হইয়াছি। মনে হয়, ধরাধামে যেন স্বয়ং তিলোত্তমা স্বর্গ হইতে অবতীর্ণ হইয়াছেন। ভাই! সৰ্বগুণসমন্বিত সস্তাপহারিণী দেবীর সাক্ষাৎ লাভ করিয়া স্বর্গসুখ লাভ করি। চিনিবাসের কথা শেষ হইলে উভয়ে ঢুলু ঢুলুনেত্রে হেলিয়া দুলিয়া গাড়ী করিয়া, শ্রীশ্রী রামমণি মহাদেবীর নিকট গমন করিলেন। চতুর্থ পরিচ্ছেদ। জাগিলে আর ভারত-কামিনী। পােহার না আর এ দু'মিনী। বেলা ১১টা। বৈশাখ মাসের রােদ ঝা ঝা করিতেছে। বে। বাঁ শব্দে বায়ু বহিয়া পথের ধুলা উড়িয়া, পথিকে চোখ, বুখ, নাক, চুল ভূষিত হইতেছে। এমন সময় একজন বীণ- বয়স্ক ব্রাহ্মণ, মাথায় গামছা ফেলিয়া, খালি পায়ে, কৃষ্ণনগরের চত্ব দিয়া হ হ শলিতেছেন। দুই বা ;ৰে গীয়

চতুর্থ পৰিচ্ছে।
;
ভাব; কথা নাই; চারিদিকে চাহিয়া দেখা নাই ; ক্রোধে
অগ্নিশৰ্ম্মা হইয়া, দুর্বাসা ঋষির মত, বেগে চলিয়াছেন। এ
বােদ ব্রাহ্মণ যায় কোথা ? খড়িয়াতে স্নানে যাইতেছেন
নাকি ? নিমেষ মধ্যে তিনি পুলিশ থানার নিকট পৌছিলেন।
একজন উকীল কাহারি যাইতেছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসিলেন,
“ঘােষাল মাশয়, যাচ্ছেন কোথায় ? ঘােষাল সে কথা শুনিতে
পাইলেন না ; আপন মনে দ্রুতপদে যাইতেই লাগিলেন।
উকীল
পুনরায় একটু উচ্চরবে বলিলেন,-“ও ঘােষাল
মােশাই, ধুপায়ে, এ রােদে কোথায় যাচ্চেন ?”
ঘােষাল ফিরিয়া চাহিয়া দেখিলেন,-নবীন বাবু ; গাড়ী
থামাইয়া তাঁহাকে ডাকিতেছেন। তিনি তখন নবীন বাবুর
কাছে গিয়া গাড়ী ধরিয়া দাড়াইয়া
দাড়াইয়া বলিলেন,-“আরে
মােশাই! মাথামুণ্ড কি আর বলবাে,ছেলেটা কাল থেকে
কোথা বেরিয়েছে, আজ ও ঘরে আসে নাই, রাত্রে কোথা রৈল,
কোথা খেলে, কিছুই জানি না; শুনিলাম চিনিবাসের ঘরে
ছােড় রয়েছে
নবীন। হ্যা, হ্যা, চিনিবাস কে বলুন দেখি ? তার নাম
ত অনেকের মুখে শুনছি। কাল একটা ছােরা হাটু কোট
পরে আমার বাসায় এসে চাদার খাতায় সই করাইয়া লইল।
শুনলাম-ইনিই চিনিবাস।
খােল। সেই ছোড়াই দেশ মালে, আপনারাও
fাকা দিতে আরম্ভ করেন--তবে আর বলি কাকে ?
}}

ফিলিসিঙ্কিামুক্ত। নবীন। (হাসিয়া) কি করি বলুন, পাঁচ সাতজন লােকে এসে ধরে, যােত করে বলে,কাজেই ৫ টাকা দিতে হল- ঘােষাল। সই করেছেন বৈ নয়—টাকা ত আর দেন নাই—আমার দিব্য, খবরদার টাকা দিবেন না-হেঁড়াটা দেশ মজালে-আমার ছেলেকে কাল থেকে ধরে রেখেছে, ছেড়ে দেয় নাই; একবার দেখা পেলে হয়,-দেখা পেলে কানায়ের কাণ ছিড়ে নি-দেওয়ালে নাক ঘসুড়ে দিব। রামকানাইঘােষাল, ঐ ব্রাহ্মণের পুত্র। তিনি কৃষ্ণনগর কলেজের সেকেণ্ড ক্লাসে পড়েন। নবীন। চিনিবাস বড় বদলােক দেখছি-ঐটুকু ছেলে চোখ টিপে টিপে কথা কয়।-- ঘােষাল। আর শুনেছেন চিনিবাস কাল চাষাপাড়ায় চাঁদা আদায় কতে যেয়ে, বিধবাবিবাহের বক্তৃতা করেছিল। তখন একজন মেছোনীর মেয়ে দেখে চিনিবাস বলেছিলাে, তােমার আমি বিধবা-বিয়ে দিবাে। সে মাগী চারিছেলের মা - ৫০ বশর স্বয়স। তার বড় ছেলে, একথা শুনে চিনিবাসকে মায়ে আর কি। তার পর বাবুরা এসে ছাড়িয়ে দিলে। নবীন। ঘোড় কে গা ?~-এবার চাটা হচ্ছে কিসের ? খােল। তাই যদি না জানেন, হবে চাদা খাতায় সই কয়েন কি করে ? নবীন, খাৰু আবার হাসিতো-* ভিক হয়ে বাড়ী ভিক্ষা করতে আসিয়ায় কি বলে কেৱাই ?”

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
৪।
ঘােল। চিনেটাকে জব্দ করিবার উপায় কি ?
নবীন। কাছারি থেকে এসে আমি সে উপায় বলবাে।
নবীন বাবু এই কথা বলিয়া ওকালতী করিতে কাছারি
গেলেন ; ঘােষাল চিন্যিাসের গৃহাভিমুখে দৌড়িলেন।
খড়িয়া নদীর ধারে চিনিবাসের বাসা। দ্বারে দ্বারবান।
ঘােষাল যেমন বাড়ীর ভিতর ঢুকিবেন, অমনি দ্বারবান যাইতে
নিষেধ করিয়া বলিল-আপকাে নাম কেয়া।” ঘােষাল
মহাশয় তাহার কথা গ্রহি না করিয়া বলিলেন, “দূর ব্যাটা,
থা, আমি কে, তুই জানবি কি?”—এই বলিয়া তিনি গট গট
দ্বিতলে উঠিয়া গেলেন। তথায় যাহা দেখিলেন, তাহা অপূর্ব
অননুভুত। সেই প্রকাণ্ড হলে পাঁচটা যুবতী মেয়ে যেন রণসাজে
সজ্জিত হইয়া বসিয়া আছেন ; তাহাদের মধ্যস্থলে চিনিবাস
এবং রামকানাই ; ইহা ব্যতীত আরও দশ বার জন পুরুষ
পার্শ্বদেশে উপবিষ্ট ; গরিদিকে প্রজা পতাকা উড়িতেছে ;
একদল বাদক মধ্যে মধ্যে ফুলুট বাজাইতেছে; একজন খান
সামা অনবরত বরফ এবং লেমনের যােগাইতেছে। টানাপাখা
হু হু চলিতেছে।
ঘােষাল মহাশয়ের হলে প্রবেশমা, রামকানাই আস্তে
ব্যস্ত, যেন ঈষৎ ভীত হইয়া চারিদিকে চাহিয়া সেই “গােপনীয়
গৃহে গিয়া বিল দিলেন। পিতা দূরু দূর শব্দে ঘরের দ্বার
ঠেলিতে লাগিলেন।
এদিকে চিনিবাস মহাকোপাম্বিত হইয়া রূঢ়ভাবে বলিলেন,

চিনিবারিত। “কে তুমি? অতি অসত্য, ব-পবৎ এত উৎপাত করিতেছ ; তুমি কি রমণীর সম্মান জান না? দেখিতেছ না, পাঁচটী রমণী অদ্য অশ্বারােহণে ব্যায়াম বিদ্যার পরিচয় দিয়া, ভারত উদ্ধ- রের বীজ অঙ্কুরিত করিবেন ? দূর হও। ঘােষালও অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন,—“তােমর মদ- বেশ্যা নিয়ে আপন ঘরে বসে যা ইচ্ছা তাই কর, তাতে আপত্তি করি না,-গরীবের ছেলেটাকে ছেড়ে দাও।” চিনিবাস। তু.িযুখ সামলে কথা কবে, নচেৎ এক মুষ্ট্যা, ঘাতে তােমার নাসিকা ভগ্ন করিব- ঘােষাল মহাশয় তখন চিনিবাসের কাণ ধরিয়া গালে এক- চড় মারিলেন। চিনিবাস পরে ! মারে! গেলাম, মােলাম” বলিয়া চীকার করিয়া উঠিলেন। রমণীগণ ভয়বিহ্বলচিত্তে চেঁচাইয়া উঠিয়া পলায়নের উপক্রম করিলেন। পুরুষ বারজন দ্রুতবেগে আসিয়া অতি বিনয়নম্রভাবে ঘােষাল মহাশয়ের হাত ধরিয়া বলিলেন, ‘মহাশয় মাপ করুন! রামকানাইকে আমরা এখনি ছেড়ে দিচ্ছি।” সকলের কথাক্রমে রামকানাই খিল-খুলিবামাত্র পিতা তাহার হাত ধরিয়া, পিঠে বৎ চানিল চড় মারিয়া, কাশিতে মলিতে ধরে লইয়া গেলেন। শুনুন চিনিবাস প্রকৃতিস্থ হইয়া সকলকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, আমাদের এই দেশহিতৈষী কার্নে অনেক আছে। অনেক বিপ. অনেক অত্যাচার আমাদের উপর পড়িবে। সৈকুল নিয়ই দেবতাদিগকে চতুর্থ পরিচ্ছে। থাকে। অতএব ভাই সকল এবং ভগিনীসমুহ! আপনারা এ বিপদে ভ্রুক্ষেপ করিবেন না। বুক পাতিয়া, মুখ পাতিয়া, ছাড় পাতিয়া, বীরের ন্যায় আমরা সমস্ত উপদ্রবই সহ করিব। আর বিলম্ব করিও না,-১২টা, বাজিয়াছে; এ আমরা কোম্পানীর বাগানে গিয়া ঘােড়-দৌড়ের বন্দোবস্ত করিগে।” তখন ভারতের উন্নতি কামনায়, ব্যাঙ বাজাইতে বাজাইতে সেকেণ্ড-ক্লাস গাড়ী করিয়া রম এবং পুরুষগণ কৃষ্ণনগরের কোম্পানীর বাগানে আসিয়া উপনীত হইলেন। অদ্য রামমণি প্রধান নায়িকা। ভারি বিব্রত। তিনি বড় ঘােড়ায় চড়িবেন। চিনিবাস বলিতেছেন, শ্ৰীমতী রামমণি দেবী নিশ্চয়ই ঘােড়- দৌড়ে প্রথম প্রাইজ পাইবেন। বড় বড় পাঁচটী ঘােলা আসিল। ৪টা বাজিয়া গেল। তখন চিনিবাস বাবু বলিলেন, “ঘােড়- দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার বক্তৃতা হইবে।” এ দিকে ঘােড়- দৌড় আরম্ভ হইল, ওদিকে চিনিবাসের বক্তৃতাও চলিল। “আহা! ভারতের আজ চরম উন্নতি! ঐ দেখুন, ধীর-রমণীচয় কেমন সুন্দর শিক্ষা পাইয়া বেগে অশ্বচালনা করিতেছেন। ঐ দেখুন, শ্রীল শ্রীধু রামমণি কেমন রঙ্গ ভঙ্গে আলুলায়িত- কেশে, উন্নতহৃদয়ে, অশ্বের লাগাম ধারয়া, সভার শােভা বৃদ্ধি করিতেছেন। যখন তিনি কোন বীরপুরুষে, জায়া হইয়া, বীরসন্তান প্রত্ব করিবেন, তখন বুঝিব, ভারতমাতার উদ্ধার শয়ায়। আজ চাদা আদায় সার্থক হইল। কিন্তু দুঃখ এই, এই রমণীকুলকে কলিকা লইয়া যাইয়া গড়ের মাঠে চিবাল-খামু। শােভা দেখাইতে পারলাম না। রামমণি ! রামমণি ! তুমি সাবা বঙ্গরমণী। তােমার ঘােড়া নাই! রামায়ণে সীতা, মহা- ভারতে দ্রোপদী এবং কৃষ্ণনগরে রামমণি-এ তিন একই জিনিষ। শক্তিরূপিণী রামমণিকে সঙ্গে পাইলে, পৃষ্ট- পােষক রূপে সহায় পাইলে, এই তরবানি হতে আজই আমি ভারত-উদ্ধার করতে পারি; অথবা তিনি যদি আমার সম্মুখে হাসি হাসি মুখে, পপলালোচনে ভঙ্গি করিতে করিতে অসিয়া পাড়ান, তাহা হইলে এই গােলাপফুল হন্তে আজই আমি হিন্দুসমা উদ্ধার করিতে পারি। রামমণি আদর্শ- মারিকা ;-ভঁহাকে লইয়া হিন্দুসমাজ এবং রাজনীতি, পিতৃকুল এবং আকুল ইখলােক এবং পরলােক—এই তিন দিকেই উস্কার পাওয়া যায়। অতএব রামমণিকে বােড়দৌড়ের প্রথম পুরস্কার স্বরূপ ৫০০ টাকা মুল্যের একহুঁড়া মতির মাল। গড়াইয়া দেওয়া উচিত। “কিন্তু অহে! কি দুর্দৈব । কি দুর্দৈব! রামমণি জগৎ- আমায়ণী স্বামমণি, ঘােড়া হইতে পড়িয়া গেলেন-পড়ুন --ক্ষতি সৰি, কিন্তু ৫০০ টাকার মতির মালা হাই শাও শথিৱ নে ম গোলাগ উঠল। গেলযাগ উঠিল। লােক সমস্ত খি চিনিৰাশৰ ৰস্কৃতও এক্ষিণ । D, 1902

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
চিনিবাসের ঐশ্বর্যের সীমা রহিল না। তাহার ধন, মাম,
বল, শুক্লপক্ষের শশিকলার ন্যায় দিন দিন বাড়িতে লাগিল।
ক্রমশঃ তিনি উত্তপ্ত তপনের ন্যায় বৃষ্ণনগর-গগনে ঝর ঝক
ঝকিতে লাগিলেন।
পঞ্চরমণীর ঘােড়দৌড় বৃত্তান্ত সেই দিনই রাত্রিতে তার
যােগে কলিকাতা ইংলিশম্যান টেসম্যান এবং ভেলিনিউসে
পাঠান হইল। হিপেটি যুট, মিরর এবং অমৃতবাজারে
বিবরণযুক্ত এক একখান পত্র লিখিয়া ডাকে পাঠান হইল।
কলিকাতার লবঙ্গলতা নাম্নী একখানি বাঙ্গালা কাগজে,
কৃষ্ণনগরস্থ বিশেষ সংবাদদাতা এইরূপ পত্র প্রকাশিত
হইল
কৃষ্ণনগরে আজ যে অপূর্ব দৃশ্য দেখিলাম, তাহা কখন
ভুলিব না।, রূপবতী, গুণবতী, বীৰ্যবতী শ্ৰীশ্ৰীমতী রামমণি
দেবী যেরূপ অশ্বচালনায় শক্তি দেখাইয়াছেন, তাহা জগতে
মতুল। ভুমির দোষে অশ্ববর পা পিছলাইয়া পড়িয়া যাওয়ায়
রামমণি দেবী লাগাম ছাড়িয়া দিয়া, নিম্নমুখী এবং উপদ।
হইয়া ভুলে অবতরণ কুরিতে বাধ্য হইয়াছিলে সত্য; কিন্তু
এ কাৰ্যে উহার প্রাতিষ্ঠা এবং প্রত্যুৎপন্নমতিৰেই অতীৰ
প্রশংসা করিতে হয়। বীর মস্তকে, মেরুদণ্ড এবং কটা-
প্রদেশে বিষম আঘাত লাগায়, তিনি ডাক্তার কর্তৃক চিকিৎসিত
-
৮।।

চিনিবাচয়িতা। হইতেছেন। সাদি-সম্মতিক্রমে রামমৰি অশ্বচালনায় প্রথম হইয়াছেন। “এখানে আর একটা কথা না বলিয়া, থাকিতে পারিলাম । স্বদেশহিতৈষী, স্বদেশ-সংস্কারক, রাজনীতিজ্ঞ পণ্ডিত শ্ৰী শ্ৰীযুক্ত বাবু চিনিবাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের যত্নে, পরিশ্রমে এবং উৎসাহে এ কাৰ্য সুসম্পন্ন হইয়াছে। কৃষ্ণনগরের জন- সাধারণ তাঁহাকে মুক্তকণ্ঠে দিবারাত্র ধন্য ধন্য করিতেছে। কিন্তু চিনিবাস মহাশয় এমনি উদারচেত যে, তিনি বলিতে- ছেন, আমাকে ধন্য ধন্য করা কেন ?—আমি ত কেবল কর্তব্য- কৰ্ম্ম করিয়াছি মাত্র। যে পাঁচটী রমণী অশ্বচালনা করিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে ১ম রামমণি, ২য় বিমল, ৩য় বিনোদিনী, ৪র্থ বামাসুন্দরী, ৫ম কমলা। কৃষ্ণনগরে জনসাধারণ আজ কাল, শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, ভােজনে, পানে, গানে, তানে, মানে, অনুক্ষণ কে এই নামমাহাত্ম কীৰ্তন করিতেছেন, বিমলা কমল বিন্দী বামী বামমণীস্তথা। পঞ্চকন্যা অৱেন্নিত্যং ভারত-দুঃখনাশনং। শ্রীহঃ এই পরপাঠে কলিকাতার, সান্তটা উন্নতিশীল ব্যক্তি { ও জনসাধারণ , এই পঞ্চকন্যাকে দেখিয়া মন, প্রাণ, দেহ সুশীতল করিবার জন্য বড়ই উৎকণ্ঠিত হইলেন। লবঙ্গ তা পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে এক প্রবন্ধ প্রকাশিত হইল ? ক পঞ্চম পরিচ্ছেদ। এ “কলিকাতাবাসিগণ পঞ্চকন্যার মহিমাংকীৰ্ত্তন জন টাউন । হলে, শীঘ্রই এক মহাসভা আহ্বান করিবেন। সেই প্রজ্ঞায় শ্ৰীশ্ৰীমতী রামমণি দেবী উপস্থিত থাকিলে, জনসাধারণ বড়ই সৌভাগ্য বলিয়া মানিবে । অতএব দেবী যদি অনুগ্রহপূর্বক কলিকাতায় শুভপাৰ্পণ কবি কলিকাতাবাসীর প্রার্থনা পূরণ করেন, তাহা হইলে সমগ্র কলিকাতার লােক আনন্দ- মহােৎসবে মাতি উঠিযা কেবল প্রেমা বর্ষণ করিবে। আর একটী শুভ সংবাদ দিয়া প্রবন্ধের উপসংহার করিবে। জনসাধারণ চদি করিযা, টাকা তুলি। দেবীকে এক ছড। হীরক হার উপঢৌকন ।দবার জন্য স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইযাছেন। হামিলটন কোম্পানীর বড় সাহেবকে ইষ্টিমিটের জন্য পত্র ও লেখা হইয়াছে। আর একটা কথা বলিব। ‘আমাদের এ জাতীয় উপানে সংবাদ বিলাতের টাইমস পত্রিকায় তাবযােগে পাঠাইলে হয় না ? হদ্দ ৫০০ টাক। খবচ বৈত নয়? ভারত-উদ্ধার-ফও হইতে এ সামান্য টাকা দেওয়া যাইতে পারে না কি ? জন সাধারণ অবশ্যই ভারতের হিতকর এরূপ প্রস্তাবের অনুমােন করিবে। শেষ কথা, “আমরা একান্ত মনে প্রার্থনা করি, সাধু - হৃদয়, সৰলচিত্ত, উন্নতননা, সম্নীতিপরায়ণ, পরােপকারময জীবন, শ্রীযুক্ত চিনিবাস বাবুর প্রতিমূর্তি টাউনহলে রক্ষিত হট।”

চিলিচারা। পৱ সপ্তাহের লবলতা পত্রিকায় চিনিব বাবুর স্বাক্ষরিত এইরুপ এখনি পত্র প্রকাশিত হইল। “মনুষ্য অতি ক্ষুদ্র জীব। বানর হইতে মনুয়াের উৎ- পতি। আমি সেই ক্ষুদ্র জীবের তম প্রাণী। সুতরাং আমার মুর্তি রাখিয়া ফল কি? আমি নিতান্তই দুঃখিত হইব, যদি আমার প্রতিমূর্তি টাউনহলে রক্ষিত হয়। আমি আজকাল নিষ্কাম-ধৰ্ম্মের আলােচনা করিতেছি। পরােপকাৰ ধৰ্ম্মের বা আমার দ্বিতল গ্রহের ছাদে দিন-রাত পতপত শব্দে উড়িতেছে। ধন-কড়ি-সম্পত্তি, সম্মান গৌরবে আমার কিছু মাত্র স্পৃহা নাই। টাকাকে মাটির চিলবৎ মনে করি। সম্মানকে পদ্মপত্রের জলবৎ জ্ঞান করি। উচ্চ রাজপদকে কমিকীট অপেক্ষাও ঘৃণা করি। আমার বাসনা, আমার বাসনা,জটাবল পরিধান করিয়া, অঙ্গে ভস্ম লেপন করিয়াে, হস্তে চিমটা লইয়া রামায়ণ-উপন্যাসের রামচন্দ্রের রূম "তুর্দশ বৎসর ভারত- অরণ্যে ভ্রমণ করি। রামের সহিত ভগিনী সীতা বনে যান। আমার সঙ্গে ভগিনী রামমণি যাইতে পারেন। সুতরাং এ অবস্থায় আমার প্রতিমূর্তি গড়িলে আমার মনে বড়ই কষ্ট হইবে। বিশেষত দেশের অসভ্য চালােক আমার মুর্তি দেখিয়া, মায়া চন্দন দিয়া, কুমরাশি একত্র করিয়া দেবতা পুজা করিতে পারে,ইহাতে পৌত্তলিকতার প্রশ্রয় দেওয়া হয়। অতএব প্রতিমুর্তি গঠনে আমার বিয়ে আপত্তি আৰে। যা জনসাধারণের প্রার্ভি পড়িবার বাসনা এতই মনৰ ই পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪১ হইয়া থাকে, তাহা হইলে সেই সুখহাসিনী' খঞ্জন-গঞ্জননয়নী, ভুবন-ভুলানী—সেই রণরঙ্গিণী, বীররমণী, আৰ্য্যশশাণিত- প্রবাহিত ধমনী-সেই বিশ্বপ্রেমময়ী, প্রসন্নময়ী রামমণি ধনীর মুর্তিখানি গড়িলেই ত হয়। কোন পাষণ্ড, কোন মীচমনা ব্যক্তি এ প্রস্তাবের অনুমােদন না করিবে। তবে লােকের মনে কষ্ট দেওয়া আমার ধর্ম নহে। আপনারা যদি নিতান্তই ক্ষুব্ধ ও মৰ্ম্মাহত হন, তাহা হইলে রামমণি-পার্শ্বে আমার ক্ষুদ্র মুর্তিটুকুও রাখিতে পারেন। কিন্তু ইহাতেও আমি রাজী নহি, কেবল আপনাদের কষ্ট হইবে বলিযা মত দিতে বাধ্য হইলাম । “আপনারা জানেন, নিষ্কাম ধৰ্ম্মের ব্রত বড় গুৰুতব। একটু পদস্থলন হইলেই মহাপাপ-পঙ্কে নিমগ্ন হইতে হইবে। আমার কত স্বার্থত্যাগ দেখুন ! নিষ্কাম-ধৰ্ম্মের প্রসার বৃদ্ধির জন্য আমাকে হােমিওপ, চিকিৎসাবিদ্যা শিখিতে হইয়াছে। তারপর নিজ অর্থে হােমিওপ্যাথি ঔষধ কিনিয়া, তাহা আমাকে প্রায়ই বিনামুল্যে বিতরণ করিতে হইতেছে। অর্থব্যয়, অথবা চিকিৎসা বিদ্যালাভের জন্য পরিশ্রম ব্যয় ধরি না, কিন্তু ইহাতে যে আমার মূল্যবানীয় সময় নষ্ট হয়, ইহার জন্যই আমি কাতর। সাধারণতঃ রমণীকুলকে আমি বিনামূল্যে চিকিৎসা করিয়া থাকি; বিশেষতঃ সেই অনাথা সেই যৌবনজ্বালায় বিব্রতা, বিধবা রমণী পাইলে, নিজপকেট হইতে তাহার পথ্যের খরচও দিয়া থাকি। বেদানার রস, ইক্ষুর, নেবুর প্রভৃতি ৪ চিনিস-চরিতামৃত। w ; বসনিচয় স্বহস্তে তৈয়ারি করিয়া, তাঁহাদের মুখ-কমলে তুলিয়া দি। অধিক গরম হইয়াছে বুঝিলে শ্রীমতীদের কপালে শ্ৰীকঠে, গ্রীবায় উত্তমাঙ্গে স্বহস্তে বরফ লেপন করি। কেবল নিষ্কাম-ৰ্ম্মের খাতিরে আমি এত যন্ত্রণা সহ্ করিয়া থাকি। দিন নাই, রাত্রি নাই—বিধবার পীড়ার ংবাদ পাইলেই আমি ছুটিয়া যাই। মনে করুন, দিবসের এবং প্রথম রাত্রির কৰ্ম্ম- অবসানে, আমি নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া ঘুমাইতেছি ; গভীর নিশীথকাল উপস্থিত,নিশাসতী ৩টা বাজাইয়াছেন; শুনি- লাম, কর্ণপটহে শব্দ আসিল, বিধবালা পীড়ায় ‘আইঢাই’ করিতেছেন। আমার আর বিশ্রাম নাই ; শয্যা হইতে উঠিয়া একছুটে, দ্রুতপদে একাকী চুপে চুপে চলিয়া গেলাম। পরিশ্রমে, শরীর আর ক দিন টিকিবে ? তবে স্ত্রীলােক নিতান্ত শিশু অথবা বৃদ্ধ হইলে, অৰ্দ্ধমূল্যের ব্যবস্থা করিয়াছি ; কারণ সর্বস্ত্রীলােককে সমভাবে দেখিবান আর সময় কৈ ? কিন্তু উহাদিগকে দেখিয়া যে টাকা পাই, তাহা বিধবাদের জন্যই ব্যয় করি। আর, আমার আবাসভবনের নিতলে যে বালিকা- বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহার ছাত্রীগণের চিকিৎসাতেই অামার দিবসে প্রায় ৪ ঘন্টা অতিবাহিত হয়। শ্রীমতী বিনাে- দিনী, অশ্বনীক্ষায় তৃতীয় স্থান লাভ করিয়াছেন; তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রধান বালিকা ; প্রায় প্রত্যহ দিবা দ্বিপ্রহরে তাঁহার ফিট হয়-হঠাৎ কেমন যে তিনি মুচ্ছা যান, তাহা আর কিছু তেই আরাম হয় না। সুতরাং তাহাকে দ্বিতলে এই গোপনীয়

পম পরিচ্ছেদ।
,
গছে অানাইয়া প্রত্যহ এক ঘ টাকাল চিকিৎসা করিতে হয়।
তাহার আরােগ্য সমাধান না হইতে হইতেই কুসুমের মূ।
হয় ; খানিক চিকিৎসায় কুসুম সংজ্ঞালাভ করিলে বামাসুন্দরী
রােগাক্রান্ত হয়েন! তাঁহাকেও মহৌষধ প্রদান করিতে হয় ।
সময়ে সময়ে বিপদ ও ঘটে। একেবারে তিন চারিটী রমণী
রােগাক্রান্তা হইলে, আমি একাকী বিব্রত হইয়া পড়ি। সেই
জন্য রামকানাই, বিধুভূষণ প্রভৃতি শিক্ষানবীশগণের সাহা।
লইতে হয়। এখন বুঝুন; অমির পরিশ্রম কত, অধ্যবসায়
কত এবং ত্যাগ স্বীকারই বা কত! নিষ্কামধৰ্ম্ম এমনি মহিমা-
ময়! অবশেষে সন্ধ্যার পর, রামমণিদেবীর প্রাত্যহিক পাঠের
পরীক্ষা লইতে
যাইতে হয়।
দেবীকে পূর্ণমাত্রায় শিক্ষিত
করিবার জন্য ৫
৫৭।
টাকা বেতনে একজন বিবি শিক্ষয়িত্রী
রাখিয়াছি। বিবি দিবসে কিরূপ পাঠ পড়াইয়া গেলে,
পুখানুপুঙ্খরূপে তা<; f$বার জন্য, দেবীগৃহে বাত্রি প্রায়
দশটা অবধি থাকিতে হয়। সাধে বলি, আমার সময় কৈ ?
আমার মুর্তি গড়িবায় পূৰ্ব্বে, কারিকরকে অবশ্যই আমার
চেহারা একদিন দেখিয়া যাইতে হইবে। কিন্তু তাহার
সহিত সাক্ষাৎ করিবার আমার অবসর কৈ ? তবে নিশ্চা
ধৰ্ম্মের জন্য সমস্তই সম্ভবে। আপনার কানি রকে শীঘই
কৃষ্ণনগর পাঠাইবেন,-সাধারণের উপকার জন্য এক
মিনিটের জন্য সামার এবং রামমণির মূর্তি তাহাকে
দেখাইতে পারি।

বিবাদ-চয়িতা।
জনসাধারণের কৌতুহল নিবৃতি জন্য আপাতত স্বভাব
সুন্দরী, আৰ্য-কুলাবতংসিী রামমণি দেবীর একখানি ফটো
পাঠাই; দেখিবেন এবং দেখাইবেন।”
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
কলিকাতার ঐ সাতজন ব্যক্তি—অর্থাৎ জনসাধারণ, চিনি,
বাস-মহােৎসবে মালিয়া উঠিলেন। টাউনহলে বিরাটসভার
আয়ােজন হইতে লাগিল। নানা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকা-
শিত হইল। চাদার খাতা লইয়া “দুইজন-জনসাধারণ” দ্বারে
আরেফিরিতে লাগিলেন। চিনিবাস এবং রামমণিমুৰ্ত্তি গড়িবার
জন্য উপযুক্ত কারিকর-অম্বেষণ-কাৰ্য্য চলিল। কলিকাতার
কুল-ললনাগণ অর্থাৎ পাঁচটী ‘উন্নতিশীল স্ত্রীমূৰ্তি কুসুম গুচ্ছ
লইয়া কারুকার্যে ব্যাপৃত রহিলেন। নিবাস এবং রামমণি,
শেয়ালহের ষ্টেশনে নামিলেই, কালনাগণ রামমণির হস্তে
ফুলের তােড়া উপহার দিয়া, চিনিৰাসের গলায় মালা দিবেন,
ইহাই অযুক্তি হইতে লাগিল। সব কমিটীতে পৱামর্শ হইল,
চিনিবাস এবং রামমণি-প্রকৃতি এবং পুরুষ-ঘােড়গাড়ীতে
চাপিলে শেয়াদিহ হইতে তাহ! বালকগণ দ্বাৱা টানান
উঠিত। “একন-কনসাধারণ” ১১টা গ্রাজুয়েট ভাড়া করিতে
বাহির বলে তাহাৱা স্বাধীকার ঋজ ধরিয়া,
গল্পীর সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন-সঙ্গীত গাইতে গাহিতে চলিবেন।

বউ পরিচ্ছে। - এদিকে চিনিকাশের প্রাৰ কৃষ্ণনগর প্রকম্পিত হইল। সেই মহারাজ কৃষ্ণচক্রের প্রিয়জধানী, আজ চিনিবাসের লীলাভূমি। নবদ্বীপের পণ্ডিতমণ্ডলী আজ হীনপ্রভ, চিনিবাস দ্বাদশসূৰ্য্যের ন্যায় দেদীপ্যমান। ক্রমে কৃষ্ণনগরে চাকরাণী মেলা ভার হইল। ঘরে ঝী চীকে না। অনেক ঝী, বই হাতে করিয়া, চিনিবাসের স্কুলে পড়িতে যাইতে আরম্ভ করিল। ২৪ বৎসরের কমবয়ষ্ণা ঝী দেখিলেই চিনিবাস সিংহবিক্রমে তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলেন,—“তোমার আবু ভয় নাই; আমি তােমাকে উদ্ধার করিব, অন্নবস্ত্র প্রভৃতি দানে, তােমার শারীরিক দুঃখ দূর করিব। এস আমার সঙ্গে; খরচ দিয়া তােমাকে স্কুলে পাইব।” রামকানাই হবার হারাইয়া গেল। ৫ দিন তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। ঘােষাল মহাশয় আবার পুত্র- অন্বেষণে বহির্গত। কিন্তু এবার চিনিবাসের গৃহে তিনি টুকিতে পাইলেন না। চিনিবাস শান্তিরক্ষার দরখাস্ত করিয়া, দুইজন কনষ্টেবল, দ্বারে বসাইয়াছেন। ইহা ব্যতীত, চারিজন পাঠান দ্বারবান দ্বারদেশ আওলিতেছে। হঠাৎ শুনা গেল, ধনঞ্জয় বাচম্পতির পুত্র দুইদিন নিরুদ্দেশ হইয়াছে। বৃদ্ধ। বিধু ব্রাহ্ম- নর পৌত্র কনগর কলেজের এলে ক্লাসে পড়ে ; বুড়ি বহু- কষ্টে তাহাকে মানুষ করিয়াছিল। গতরে সে, বুড়ীর সিন্দুক জাগিয়া, কয়েকটী মােহর লইয়া হাথায় চলিয়া গিয়াছে। । ।।

চিনিবল-চরিতামৃত।
;
আবার একি দেখি ? উকীল নবীন দাস বাবু হঁপাইতে
হাপাইতে, সঙ্গে লােকজন লইয়া, কোথায় ছুটিয়াছেন ? নবীন
বাবুর চক্ষু দিয়া ঝর ঝর জল পড়িতেছে।
ঘােষাল। একি, একি!
নবীন বাবুর চক্ষু দিয়া প্রবলবেগে জলধারা বহিতে
লাগিল; তিনি বলিলেন,-“মাথা মুণ্ড কি আর বলবাে ?
আমার মেয়েটাকে পরখ রাত্রি থেকে আর দেখতে পাচ্চি
না,-তার মা আজ এদিন কিছু খায় নাই, কেবল শুয়ে শুয়ে
কঁদিচে-
ঘােষাল। বলেন কি মােশাই? এ সর্বনাশ কে কন্নে ?
আমার রামকানাইকে পাঁচ দিন দেখিতে পাই নাই।
ঘোষালের ফ্রন্দন।
নবীনদাসের কন্যার নাম কল্যাণী। কল্যাণী বিধবা, বয়স
বিধু ব্রাহ্মণী অতি দরিদ্রা। তার পুত্রের অল্প বয়সেই
সর্পাতে মৃত্যু হয়। ব্রাহ্মণী তুলা পিজিয়া, কানা কাটিয়া
নাতিটীকে মানুষ করে। কৃষ্ণনগরে একজন বিষয়াপন্ন ব্যক্তি
ঐ নাতিটীর মাহিনা দিয়া স্কুলে পড়ান। বহু বৎসরে এনট্রেন্স
পাস হইয়া, নাতি জমে ফার্চ আরম্ভ করিলেন। ব্রাহ্মণী
জীবনের একমাত্র অবলম্বন নাজিকে না দোলা, ঠিক পান,
লিমী হইল, পথে পথে ফিরিতেছেন। ঝকড়-মাকড় চুল,
কালো কাপড়, আধখানা গা বােলা-কাহ্মী যেন উন্মাদ হইয়া

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
নবীন বাবুকে জিজ্ঞাসিলেন, “অ বাছা ! আমার রামধনকে
দেখেছো ? নবীন বাবু উত্তর দিতে না দিতেই ব্রাহ্মণী আপন
মন চেঁচাইতে লাগিল, “রামধন! ওরে রামধন! কোথা
গেলিরে তুই ? বাছা: তাের কাল অবধি ভাত বা আছে,
একবার এসে খেয়ে যা।” একজন ঘােড়ার ঘেসেড়াকে দেখি।
ব্রাহ্মণী বলিলেন, “তুই আমার রামধন কোথা, বলে দে-''
নবীন বাবু স্থির করিলেন, স্ত্রীলােকটা পাগল। এমন সময়
ধনঞ্জয় বাচস্পতি ক্রোধে থর থর কাপিয়ে কঁপিতে আসি।
নবীন বাবুকে বলিলেন, “মহাশয় আপনারা ত উকীল ; এব
একটা বিচার করুন ; ব্রাহ্মণপণ্ডিতের ছেলেকে চিনিবাস,
পেঁয়াজ রুশুণ খাওয়াবে,আর নাম উচ্চারণ করিব না ;—এই
সস্ত খাওয়াইয়া যে, জাতকুল সব নষ্ট করবে,—এ আর সহিতে
পারিব না। এইমাত্র দেওয়ানজীকে বলে এলাম, এর যদি
আপনারা সুবিচার । নন, তা হলে আমি ব্ৰহ্মহত্যা হবে।
শুনিলাম, দুৰ্বত্ত ছেলেটা আজ দুদিন মদ খেয়ে চিনিবাসের
ঘারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ; কান তাকে ডাকতে গেলাম,
চিনেটা মুসলমান দিয়ে আমার অপমান কল্পে ; চারিটে নেড়ে
আমার মুখময় থুথু দিয়ে আমার পিঠে কিল লাথি, জুতা বর্ষণ
কয়ে। এই দেখুন,আমার পিঠ ফুলে আছে-আপনার
পতে আমাদের এই অপমান!”
ব্রাহ্মণের করুদ্ধ হইল। চোখ দিয়া দু এক ফোটা জল
পতিতে লাগিল।

চিৰিৰ-চরিত।
অদূরে অশ্বৰধ্বনি শােনা গেল। পথের ধুলা উড়িল।
রাজপথ লােক-কোলাহলে পূর্ণ হইল। নিমেষ মধ্যে দেখা
গেল, রক্তমুখ পুলিশ-সাহেব, অশ্বারােহণে আসিতেছেন;
তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ পুলিশ ইনস্পেক্টর, চিনিবাস এবং
রমণী বিনােদিনী,ইহারা প্রত্যেকই সন্থে চড়িয়া তালে
তালে চলিয়াছেন। আর ১৬ জন কনষ্টেবল প্রাণপণে দৌড়িয়া
এই চারি মুক্তির অনুসরণ করিতেছে। তখন চিনিবাস, ধনঞ্জয়
বাচস্পতিকে সম্মুখে দেখিয়া বলিলেন, “ঐ পলায়, ঐ পায়-
কাল ঐ ব্যক্তিই আমার গৃহে অনধিকার প্রবেশপূৰ্ব্বক ডাকাতি
করিয়া, আমার সর্বস্ব হরণ করিয়াছে-সাহেব ধরুন, ধরুন,
ঐ পলায়।
ক্ষুধিত ব্যাঘ্ৰ দুৰ্বল মেশাবককে ধরিল। ভয়ে ধনঞ্জয়ের
কথা কহিবার শক্তি হিত ;—একেবারে দুই হাত, দুই পা
দৃঢ়রূপে বাঁধা হইল। চারিজন ---বল তাঁহাকে ধরিয়া
লইয়া চলিল। ধনঞ্জয় সংজ্ঞাহীন। নবীন বাবু হতভম্ব ;
--তিনি পুলিশ-সাহেবকে একবার ইংরাজীতে বলিয়াছিলেন,
-নিৰ্দোৰ ব্ৰাহ্মণকে শুধু শুধু হঠাৎ পরেন কেন? তৎক্ষণাৎ
ঘােড়ার চাৰুক জােরে নবীন বানুর পৃষ্ঠে পতিত হইল।
যায় স্বী ইত্যবসরে সাহেবকেও বলিল,-“হেগ
সাহেব, আমার স্বামধনকে এনে কও নাকাল অবধি বামার
রামধৰু কিছু খায় নাই।”
সব সে কথা গুনিল না, বুথিল না ; দপন মনে

সপ্তম পরি।
বিনােদিনীর সঙ্গে কথা কহিতে কহিতে ধীর-কদমে ঘােড়
ফুটাইল। কিন্তু সে কথা চিনিবাসের কাণে গেল। তিনি
ব্রাহ্মণীকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “রে দুষ্টচরিত্রে ! অঙ্গ
আবরণ-বিহীনে!--সুতরাং রাজপথ কুরুচিকরিণি-রমণি ।
তুই অস্বাভাবিকরূপে আমাদের গতির প্রতিরােধ করিতে-
ছিস। অতএব এই চাবুকই তাের উপযুক্ত দণ্ড—”
এই বলিয়া উদারহৃদয় চিনিবাস বাবু, বৃদ্ধ। ব্রাহ্মণীর পৃষ্ঠে,
মুখে, বুকে সজৈারে তিন চাবুক বসাইয়া, এদিক ওদিক চাহিয়া,
দ্রুত-অশ্বারােহণে তৎক্ষণাৎ পুলিশ-সাহেবের নিকট পৌছিয়া,
সদালাপ আরম্ভ করিলেন।
সেই দারুণ কশাঘাতে, ক্ষীণা, দীনা ছিন্নভিন্নবসনা, বৃদ্ধা
ব্রাহ্মণকন্যা ভুতলে পড়িয়া সুচ্ছিত হইলেন। তাঁহার পিঠ
ফাটিয়া রক্ত পড়িতে লাগিল।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
প্রভাত কাল। কৃষ্ণনগরে হাহাকার ; কিন্তু চিনিবাসের
আবাসভূমি নীরব, স্থির, গম্ভীর। কেবল শ্রীদামমুটি একটা
ঢোল বাড়ে করিয়া, উঠানের এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান। শ্রীদামের
বয়স চল্লিশ বৎসরের অধিক নহে। কিন্তু ম্যালেরিয়া এবং
দুর্ভিক্ষ এ উভয় বসে তাহার মনপ্রাণ মুশতল হওয়ায়,
গ্রামের বয়ঃক্রমটা ৫৫ হইতে ৬০টের মধ্যস্থল হইয়া

চিমিশালগরিঙাম্বত।
;
পঁপড়াইয়াছে। সংসারে এমনও লােক আছেন, যাঁহারা চুলে
ঔষধ দিয়া চুল পাকাইয়া প্রবীণ সাজিতে চাহেন; এ পণ্ডশ্রম
বৃথা । তাদের উচিত, শ্রীদামের কাছে গিয়া প্রবীণত্বের স্বয়ধ
চাহিয়া লওয়া। তারা যদি ছয় মাস কাল শ্রীদামের
শিষ্যগিরি স্বীকার করেন, তাহা হইলে, সে একবারে বুড়াে
করে ছেড়ে দিতে পারে।
ক্রমে বােদ উঠিল। সাতটা বাজিয়া গেল। শ্রীদাম
ভাবিতে লাগিল, বাবু ভােরে আসিতে বলেছিলেন, কিন্তু এখনও
বাবুর দেখা পাইলাম না কেন? ভগবান কি আমার অদৃষ্টে
আজ এক মুঠা অন্ন মাপান নাই ? ছেলেপিলে খাবে কি ?
এমন সময় একজন নবীন নধর খানসামা চোখ কচলাইতে
কচলাইতে, হাই তুলিতে তুলিতে, বাম হস্তের দ্বারা নিশাভগ্ন
চেরাসিথি কাটিতে কাটিতে, উপরতল হইতে নীচে নামিল।
খানসামার রংটী মেটে মেটে ; পামবান মিহি কালাপেড়ে ধুতি,
পায়ে রঙ্গীন ফতুয়া, পায়ে চটিজুতা। সে আসিয়াই একটা
ফুটন্ত গােলাপ ছিড়িয়া নিজ বুকপকেটে রাখিল। শ্রীদাম
ইহাকে দেখিয়া খানসামা, কি বাৰু কিছুই স্থির করিতে পারিল
না; ভাবিল, বাবুর ছােট ভাই হইবেন। তখন সে ঘােড়হাতে
খানসামাকে বলিল, “হুজুর! বড় বাৰু, কখৰ উঠবেন ? কাল
সন্ধ্যার পর দুবার আমাকে তিনি ছেকেছিলেন ; ছৈাট বাবু।
আপনাদের জোয়ার থেকে মুঠা না নিয়ে গেলে, আমাদের

সপ্তম পরিদ।
-
?
বাস্তবিক মাণিক খানসামা এ কথায় বড়ই প্রীত হইল ;
তাহার চেহারা প্রকৃতই বাবুবৎ ভাবিয়া আপনাকে ধন্য বলিয়া
মালি। মাণিক বলিল, “একটু থাম, বাবু কাল অনেক রাত্রে
শুয়েছিলেন, তাই উঠিতে বলা হয়েছে।”
শ্রীদাম। কাজকর্মের বাড়ী, শুতে রাত্রি হবে বৈ কি ?
লক্ষীর ছিরি থাকলেই দশজনের পাত পড়ে। আমার ছেলে-
পিলে শুনতে পেলে, রাত্রে এসে পত কুড়িয়ে নিয়ে যেতো।
মাকি। ভােজ নয় হে বাপুকাল রাত্রি দুটা পৰ্যস্ত
সভার বক্তৃতা হয়েছিল
শ্রীদাম। (ঘােড়হাতে) আজ্ঞে, তা হ'বে বৈ কি? কাজের
বাড়ীতে বকাবকি হবে বৈ কি ? তা, আমার ছেলেরা এসে
একপাশে দাঁড়িয়ে থাকবে! যেমন ব্রাহ্মণভােজন শেষ হবে,
অমনি পাতকুড়িয়ে নিয়ে জায়গা পরিষ্কার করে দেবে ; তারা
কোন গােলমাল বকাবকি করবে না--
এমন সময়ে স্বয়ং বাবু দ্রুতপদে নীচে নামিলেন। তাহার
পরণে ঢিলে ইজার, অঙ্গে কামিজ, পায়ে এষ্টাকিন । বাবুর
জুতার শব্দ কাণে প্রবেশমাত্র খানসামা দৌড়িল। মাণিকের ভয়
হইল, পাছে আমি বাবুর সাক্ষাতে মুচির নিকট ধরা পড়ি।
খানসামার হঠাৎ শবেগদৌড়ম দেখিয়া মুচি খানিক ফ্যাল
ফ্যাল চাহিয়া কহিল ; প্রথমটা নিল যায় ভাবিয়া শেষে সে
টেচাইতে আরম্ভ করিল,—“ছোট বাবু প্রণাম হই, ছােট বাবু,
প্রণাম হল”,

চিনিবাস-চরিতামৃত। মাণিক এই বাক্যে মহা বিরক্ত হইয়া, বড়ই কাতর হইযা, , মনে মনে বলিল,-শালার মুচিকে আর বাড়ী চুকতে দিব না -“এবারে এলেই লেঠিয়ে তার পা ভেঙ্গে ফেলবাে-” এত চেচাচেঁচিতেও খানসামা মুখ ফিরাইয়া প্রণাম গ্রহণ করিল না দৈখিয়া, শ্রীদাম আবার বিকট ধ্বনিতে বলিল,-- “ছোট বাবু মেশাই। অ—হােট বার মােশাই! প্রণাম খানসামা, “কি-মুস্কিল, কি বিপদ” ভাবিতে ভাবিতে একেবারে তেতােলার ছাদে গিয়া লুকাইয়া বসিয়া রহিল। সুচির সেই চাচাছোলা যােটা বাজখেয়ে চায় অনেকের কর্ণে বনিত হইল। দ্বিতলের সেই গােপনীয়গহের গবাক হইতে মুখ বাহির করিয়া একটা বিধিভুষায় ভূষিত রমণী, মুচিকে তখন অনির্মিষ লােচনে হৈরিতে লাগিলেন। যেন বিদ্যাসুন্দ- রের ভাবে চিনিবাসের আবাসভূমি বিহ্বল হইয়া উঠিল ;- অনিমিষে বিনােদিনী দেখিছে বিনােদ। বিনােদর বিনােদিনী দেখিয়া প্রােদ। বিপরীত বিপরীত উপমা কি দিব। উর্বে কুদিনী হেটে কুবান্ধব। ইত্যবসরে চিনিবাস ৰাৰু, মুচি নিকটে পৌছিলেম তিনি গভীরু স্বরে সাধুভাবায়, দামকে বসিলেন-“খুটির। অয়ন সভায় উপযােগ, চতুর্কি-প্রবাহিত-অমিললষ্ঠার অনু- , এন সাশৰ কৰনি তুমি পাইলে কোথায় ? তুমি সপ্তম পরিচ্ছে। ঐ কমনীয় কণ্ঠনালীনিত জলিত-ভৈরব আলাপ দ্বারা এই- মা কি অনির্বচনীয় অব্যক্ত নিনাদ করিতেছিলে ? হে মুচি- কুলতিলক! আমায় বুঝাইয়া বল, কোন উদ্দেশ্যে তােমার ঐ কোমল-ক-কূজন ব্যয়িত হইয়াছিল ?” শ্রীদাম, খােদ বাবুকে দেখিয়া, কোন কথার উত্তর না দিয়া, কয়েকবার “আজ্ঞে হেঁ, আজ্ঞে হেঁ” করিয়া শেষে সাষ্টাঙ্গে ভুমিতে প্রণিপাত করিল। চিনিবাস, প্রণাম দেখিয়া ঈষৎ নাসিকা কুঞ্চন কমিলেন । মনে মনে বলিলেন,-ই, দেখিতেছি, লােকটা জাতিভেদ মানে-বড়ই কুসংস্কারাচ্ছন্ন।” প্রকাশ্যে বলিলেন,—“উঠ উঠ, মুচিবর! তুমি কি জান না, ঈশ্বরের চক্ষে সকল জন্তুই সমান ?—সকলেই ভ্রাতা—আমি তুমি কোন ভেদ নাই?” শ্রীদাম। আজ্ঞে, তা বৈ কি? (ড়েহাতে) আমাদের কি জানলেন হুজুর গা পেটভরে খেতে দিয়ে, সমস্ত দিন কাজ করিয়ে নিন; ছেলে দুটী মানুষ হওয়া আপনারই ভার! তা, ছােট বাবুর বিয়েতে রাঙ্গা শিরােপা ছাড়বে না বিবাহের নাম শুনিয়া চিনিবাস চক্ষু রক্তবর্ণ করিলেন ; দন্তে দন্তে সংঘাষত ইল; বাহুদ্বয় বিসম দুলিতে লাগিল ; বামপদ ক্ষিতিলে দুপ দাপ শৰু করিল; কাজেই সুখ আর চুপ করিয়া রহিল না—“রে বাদক। রে ঋন্ধে ঢোবাহী। রে চৰ্ম্মব্যবসায়ী! তুমি কি আজ সমাজ-বিজ্ঞান অধ্যয়ন কর নাই? যে পুরুষ যৌবনে বিবাহ-বন্ধনে নিবন্ধ, সে পুরুষ দ্বারা ?

চিনিবাস-চরিতামৃত।
;
বিশ্বসংসারের কোন উপকারেরই আশা নাই,-হস্ত-পদ-দেহ
থাকিলেও সে জড়বৎ। ইউরােপের অনেক মহাত্ম। এবং
মহাত্মনী বিবাহ করেন নাই বলিয়াই, অধিক পরিমাণে
পরােপকার করিয়া যাইতে পারিয়াছেন। বাজে লােক বিবাহ
করে করুক, কিন্তু আমাদের মত মনুষ্যগণের বিবাহ করা যে
নিষিদ্ধ, তাহা মিল এবং স্পেনসার স্পষ্টাক্ষরে বলিয়া গিয়াছেন ।
চৈতন্য বিবাহ করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু শেষে আপনার ভ্রম
বুঝিয়া স্ত্রী ত্যাগ করেন। আর বৌদ্ধদেবের চরিত্র তুমি
একবার মনে মনে আলােচনা করিয়া দেখ,—হে মুচিবর !
তখন তুমি বুঝিতে পারিবে, বিবাহ করা পাপ কেন? বিশেষত
আমার গৃহে রমণীবিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছে ; এস্থলে বিবাহ
শব্দ, ঐ কুরুচি-প্রধানা মহাকথা, ঐ অন্তঃসারপূর্ণ। অশ্লীলধ্বনি
উচ্চারণ করায় তুমি পিনাল-কোড অনুসারে দাৰ্হ হইয়াছ।”
াম। আজ্ঞে, তা বৈ ।। <পুর! ছােট বাবুর বিয়েতে
আমরা তিন বাপ-বেটায় পেটভরে খেয়ে সাত দিন ঢোল
বাজাবাে ;--তা আমার ছোট ছেলেটী কঁশি বাজাতে
শিখেছে-
( মাণিক খানসামা, তৃেতােলার ছাদে উঠিয়া, শােপনভাবে
উকিঝুকি মেরে দেখিতেছি,-মুচিটে কি করে, অথবা কি
বিভাট ঘটায়। দুইবার “ছােট বাবুর নাম মুচিযুখে উচ্চারিত
হইতে শুনিল, আর তাহার অন্তরাত্মা শুকাইজ; শেষে মুখ
বিকৃত করিয়া রাখে ছাদে উর দুটা কীল মারিয়া ফেলিল।)

সপ্তম পরিচ্ছো।
চিনিবাস।
(স্বগত) (লােকটার বড়ই মােটাবুদ্ধি !)
পাগল নয় ত!) রে মুছে! তুমি ঐ আদি-অক্ষরে ‘বয়ে
হ্রস্বই’কার দেওয়া কথাটা ছাড়িয়া দাও-এক্ষণে আমার
প্রত্যাব একমনে শ্রবণ কর,
“তুমি ঐ ঢােল—শর্থাৎ বাদ্যযন্ত্রবিশেষ স্কন্ধদেশে স্থাপন
করিয়া নগরময় পরিভ্রমণপূর্বক এক সুমহতী ধােষণা প্রচার
করিতে সক্ষম হইবে কি?” শ্রীদাম এতক্ষণ ভালমন্দ কিছুই
বুঝে নাই ! এবার সে ঢােলের নাম শুনিয়া মাথা চুল্কাইতে
চুল্কাইতে আঁা-ও-আঁ-ও করিয়া বলিল, “ত ঢেলে আমাকে
যা বাজাতে বলবেন, তাই বাজাবে—আপনাদের অনুগৃগোরে
থাকলে, এ গােলাম সব পারে।”
চিনিবাস মহা বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “রে মুখ ! তুমি
আমার কথার পশ্চাদ্ধাবন করিতে পারিতেছ না—আবাৰ
বলি, অভিনিবেশপূৰ্ব্ব ও মমাতি-চিত্তে শ্রবণ কর, সুগোল
সুলম্বা উপাধানবৎ, অথবা লৌহমুদগর সাহায্যে পিট্টায়মান
গােলাকার ভূমণ্ডলবৎ, ঐ যে বাদ্যযন্ত্রী, চৰ্ম্মরঙ্কু সাহায্যে
ঝুলিতেছে, ঐটীকে কাষ্ঠলগুড় দ্বারা ধ্বনধ্বয়িত করিতে
হইবে, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে এই ঘােষণাটা তােমার
জিহ্বার সাহায্যে আবৃত্তি করিতে হইবে;—যথা, “কা,
নগরীয় কুল-ললনাগণের নিকট নিবেদন এই যে, স্ত্রী-স্বাধীনতা
এবং ডাইভাের্ম সম্বন্ধে যিনি সর্বোৎকৃষ্ট প্রবন্ধ লিখিবেন,
তিনি দুই শত রজত মুদ্রা উপঢৌকন প্রাপ্ত হইবেন। প্রবন্ধ

চিলি-গয়িতা। বিচারের ভার, শ্রী শ্রীমতী আৰ্য-কুলগেরিবী রামমণি দেবীর কোমল করকমলে অতি হইয়াছে।” যুটে। এক হৃদয়- ক্ষম করিতে সমর্থ হইলে কি ? বল, বল, শীঘ্র কথার উত্তর শ্রীদাম। আজ্ঞে, তা বৈকি? হুজুর যা বলছেন, তা কবে বৈকি? আমার জীউ যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ হুজুরের কাজ করবে চিনিবাস। তাল ভাল, তবে ঝটিতি গিয়া এ শুভকাৰ্য সম্পাদন করিয়া প্রত্যাগত হও--তৎক্ষণাৎ তােমার পারিশ্রমিক প্রদত্ত হইবে। দাড়াইয়া কেন ? শীঘ্র যাও- শ্রীদাম। (যােড়হাতে কোথা যাবাে হজুর ?- চিনিবাস। (স্বগত) অহহ! কি বুদ্ধিশূন্যতা! আমি কি প্রকৃতই তবে বুঝতে অক্ষম হইলাম ? তবে একবার সহচর রামকানাইকে ভাকি। (৩) দ্বারবান! দরােজা আজ্ঞাক্রমে দরদ ফটক বন্ধ করিল। দাম দেখিয়া শুনিয়া ভয়বিল হইল-মাবে নাকি ?-ঢােল কেড়ে নেবে নাকি? দোয়ার বন্ধ করে কেন ? তখন সে কদাদ হইয়া বলিল,-“হুজুর আমাকে ছেড়ে দিন, আমি এমন কাজ ফন রুবে না।” টিনিন, তখন আপন আত্মা এবং মনে বহুশ প্রশংসা করিলেন-“মুচি আমার আকৃতির নখ পরিয়ে। ? গুরু-গম্ভীর-জ্যোতিঃ দেখিয়া ত্রাসযুক্ত হইয়া থাকিবে ; একদিন বৌদ্ধদেবের আকৃতির আলোেক দেখিয়াই অনেক ইতর ব্যক্তি চৈতন্য লাভ করে ; আজ কি আমার সেই জ্যোতি হইল ? নচেৎ শ্রীদামের চক্তে জল আসিবে কেন ?” শ্রীদাম। হুজুর, দোয়ার খুলে দিন, আমি ঘরে যেযে একটু জল খাবাে- রামকানাই এখন কুসংস্কারাবচ্ছিন্ন পিতৃগৃহ পরিত্যাগ করিয়া, চিনিবাসের সাছে গােপনে সমাজনীতিশাস্ত্রে আখড় দিতেছেন। পাছে রামকানাইকে লােকে দেখে, এই জন্য ফটকের খিল বন্দ হইল। অবাধ মুচি এ তত্ত্ব বুঝে নাই। রামকানাই কার্যক্ষেত্রে উপনীত হইয়া, পরামর্শ মতে মুচিকে বলিল, “ওরে বেটা শােন- মুচির তখন দুই চক্ষে দশধারা বহিতেছে। কানাই। যদি দরি এই এক ঘুষিতে তাের নাক ভেঙ্গে ফেলবো- মুচি “বাপরে, মেরে ফেপ্লেরে” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। চিনিবাস ক্রোধপরবশ হইয়া বলিলেন, “জলুদি, চাবুক লেয়াও; চাক লাগায়কে হাম ওকে। সিধা করেঙ্গে”- চাবুকের নাম শুনিয়া সেই জরাজীর্ণ মুচি ভয়ে কাপিতে লাগিল,-“দোহাই হুজুর, মাপ করুন, এমন কাজ আর কখনন কবে না- ৫

চিনিগৰিাম্বত।
=
কানাই।
ফের বল, করবাে না-
লাম । (কঁদিতে কাদিতে) কৰাে না-
কানাই। এই শােন—পাড়ায় পাড়ায় ঢেট দিতে
পাবি-
শ্রীদাম। (চোখের জল মুছিয়া) আজ্ঞে হেঁ, তা খুব
পারি,—চিরকাল ঐ কাজ করে আসূচি, তা পিরবাে-
কানাই। কি বলিয়া টেট্রা দিতে হবে জানি,
শ্রীদাম। ন'। হুজুর না বল্লে কি করে জানবাে-
চিনিবাস। রে অন্বতভাষী! এইমাত্র আমি তােমাকে সে
কথা বলিলাম ;--মিথ্যা কথা দাপি কহিও না—অদ্য
গৃহে গিয়া এজন পরমপিতার নিকট তােমার প্রার্থনা করা
উচিত।
কানাই। আচ্ছা, তবে এই কথা টেট্রায় বলবি–“কাষ্ণ,
নগরীয় কুলললনাগণের নিকট” এই কথা বল, এই বেলা
শিগগিরি মুখস্থ করে ফেল
শ্ৰীম। (যােহাতে) হুজুর আবার বলুন, ভাল বুঝিতে
পারি নাই।
কানাই। আঃ বড় জ্বালাতন কলি যে ; ফের শােন
“কাফনগরীয়
দাম। শা,, কি বলে-
চৰিল ৰ একগাছ চাৰুক হাতে লইয়া, জীমকে
কেন করিয়া রিক্ত লাগলেন।

গণ পরিচ্ছ। কানাই। বার বার এই বার শেষবার,-এবার না বলতে পারে, তাের পিঠের চামড়া থাকবে না, বল, কাষ্ণনগরীয় কুল- ললনাগণের নিকট নিবেদন'—বল-বল- শ্রীদাম। (সভয়ে মাথা চুল্কাইতে চুল্কাইতে) কুরুষ্টেগুরে ফুলুলুলুলু—আজ্ঞে, আজ্ঞে,তারপর বলুচি-এই যে ! চিনিবাস। বদমাইস ! নিশাচর! পাষণ্ড! বাদক-কুল- কলঙ্ক ! দেখিতেছি, তাের হৃদয়পদ্মে একটী ফোটাও বুদ্ধি-মধু নাই-এই পদাঘাতই তোর পক্ষে উপযুক্ত। এই বলিয়া বীরশ্রেষ্ঠ চিনিবাস বার ক্ষীণাঙ্গ মুচির বক্ষে সজোরে পদাঘাত করিলেন। নিদারুণ পদাঘাতে শ্রীদাম পড়িয়া মূচ্ছিত হইল। তখন মাণিক-খানসামা নীচে নামিয়া, মুচির মাথায় আগ্ন এক লাথি মারিয়া বলিল, “স্ফালা, যেমন কর্ম তেমনি ফল,—খবরদার। আর এ বাড়ীতে আসিস না।” মহাকুরুক্ষেত্র যােগ দেখিয়া উপরিতল সেই রমণীটী নীচে নামিলেন। তার অঙ্গে আঙ্গরাখা তদুপরি ওডুনা, মাথায় পালক, পায়ে সিলীপার চটী, পরিধান পাছাপেড়ে সাটী । তাঁর নাম কুমারী কুঞ্জমালা। তিনি ক্ষীণ নাকিসুরে চিনিবাসকে জিজ্ঞাসিলেন “এ সংগ্রাম কিসের ? যে ব্যক্তি যুদ্ধে পরাভূত হইয়া রণভূমে ভুতলশায়ী হইল, ঐ ব্যক্তি বা কে ? আমি উহার সেবা-শুশ্রুষা করিবার অধিকারিণী হইতে পারি না কি ? রমণীকুলের নিয়ম, যুদ্ধে আহত ব্যক্তিগণের সেবা করা

শি-য়িতা।
;
ফ্রাঙ্কোরি অথবা রুবতুরস্কের যুদ্ধ কি আপনার শরণ হয়
না ? আজ হােমিওপ্যাথি শিক্ষাটা সফল করি।”
চিনিবাস বলিলেন, “তথাস্তু। কুমারী কুশালা তখন এঝ
শিশি ঔষধ একটী জল, একটী কাচের বাটী লইয়া রােগীর
শিয়রদেশে বসিলেন। বিউগরে এক ফোটা ঔষধ এবং চোখে
মুখে খানিক জল পড়াতে রােগীর চেতুন হল ; চারিদিকে
সে চাহিয়া দেখিল, কেহই নাই, কেবল একটী টুকটুকে-মুখখা
ছুকরী মেয়েমানুষ মাথার কাছে বসিয়া আছে। শ্রীদাম ভাবিল,
আমাকে পেত্নী পেলে নাকি ?
এমন সময় স্বয়ং মাজিষ্টর, নবীন বাবু, ঘাষাল মহাশয়
এবং প্রায় কুড়ি জনদ্রলােক চিনিবাসের গৃহে প্রবেশ করি-
লেন। বৃষ উৎসর্গ ব্যাপার ! মহাসমাৰােহ কাণ্ড! প্রতিবেশী-
মণ্ডলী চমকিল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
স্বয়ৎ আজিষ্টর সেদিন প্রাতে চিনিবাসগৃহের অবস্থান
অন্বেষণ করিলেন। উ, নীচে, ছাদ, পাইখানা তুম্ন তন্ন
করিয়া দেখিলেন, তথা নবীন বাবু কন্যা কল্যাণীকে পাইলেন
। নবী বাবুর মুখে আর কথা নাই, চারিদিক্‌ অন্ধকার
দেখিতে লাগিলেন। আজিষ্টর একটু বিরক্ত হইয়া নবীন
সবুকে বলিলেন,-“খুন, আপনি উকীল, আপনার কাজে

অষ্টম পরিচ্ছে। বিশ্বাস করিয়াই, আমি ভদ্রলােকের ঘরে প্রবেশ করিলাম, কিন্তু আপনার কন্যা ত নাই।” নবীন। কাল রাত ৮টা পর্যন্ত আমার মেয়ে এখানে ছিলো, এ কথা আমি ঠিক জানি, বােধ হয় হঠাৎ কোথায় সরিয়ে ফেলেছে, মাজিষ্টর। সেই বৃদ্ধ। স্ত্রীলোকটীর নাতি রামধনই বা কোথায় ? নবীন। সকলেই কাল রাতে এখানে ছিল,-বােধ হয়, কোন রকম সন্ধান পেয়ে তারা এ বাড়ী থেকে পলাইয়াছে। মাজিষ্টর আরও বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “এ সব সংবাদ তােমার পূর্বে রাখা উচিত ছিল, সুধু শুধু আমাকে কষ্ট দেওয়া উচিত হয় নাই—আমার পরিশ্রমের মূল্য কত জান ? চিনি- বাস বাৰু নির্দোষ হইতে পারেন।” এই কথা বলিয়া মাজিষ্টর সদলে চলিয়া গেলেন। ঘােষাল মহাশয়ের খবর নবীন বাবু জানিতেন না, কিন্তু ঘােষাল অদ্য সুযােগ পাইয়া গােলমালে চিনিবাসের ঘরে চুকিয়া পিড়য়াছিলেন। মাজিষ্টর বহুলােক সমভিব্যাহারে চিনিবাসের ধরে প্রথম পা দিবমাত্র রামকানাই বাপকে সর্বপশ্চাতে দেখিয়া, অদূর- বর্তী নিচুতলায় গিয়া ধীরে ধীরে সুকাইল। মাজষ্টর কনষ্টেবলগণকে বাড়ী ঘেরিতে আজ্ঞা দিয়া স্বয়ং তপক্ষে উপরিতলায় উঠিয়া গেলেন। চিনিবাও তাহার অনুসরণ

৭০
চিল-শয়া।
করিলেন। ক্রমে প্রায় সকলেই উপরে উঠিলেন। নিয়ে
কেবল কুমারী কুঞ্জমালা, শ্রীদাম মুচি, রামকানাই এবং
খােলমহাশয় রহিলেন। নারীধর্শে এবং চিকিৎসাধর্শে
কলঙ্ক-পতনের ভয়ে কুঞ্জমালা রােগীর সেবাতেই বিশেষ মন
দিলেন। শ্রীদাম মুচি উঠিতে চায়, কুঞ্জমাল বলেন, “এখন
নয়, এই অবস্থায় তােমাকে ঠিক ৪ ঘণ্টা থাকিতে হইবে।”
শ্রীদাম মনে মনে লিল, “সত্য সত্যই তবে আমাকে ডাকিনী
নিয়ে যাবে না কি?” প্রকাষ্ঠে কহিল,-“তুমি মা যে হও,
আমি তােমার দুটী পায়ে পড়ি, আমাকে ছেড়ে দাও”
কুঞ্জমালা। আমরা মা নই,আমরা ভগিনী।
এ দিকে বােষালমহাশয়, নিচুতলাপানে উকি ঝুকি
মারিতে লাগিলেন। তিনি কানাইয়ের মুখটা দেখিতে পান
নাই! কেবল পা-দুটা দেখি। উহার সন্দেহ হইল।
পিতার চোখে কতক্ষণ ধুলা দিয়া রাখা যায় ? তখন ঘােষাল
পা পা করিয়া, সেই দিকে চলিলেন। কানাই ভাবিল, বড়ই
বিপদ! যেমন সে নিচু-তলা হইতে মুখ বাহির করিয়া
বাপকে দেখিৰে, অমনি থােষালমহাশয়, “তবে রে পালি,
ডাকাত, বদমাই”—এই কথা বলতে বলতে দৌড়িয়া গিয়া,
একবারে বজ্রমুষ্টিতে পুত্রের হাত ধরিলেন। ক্রমে কমে
অধীর হইয়া, তিনি বেদু শালাগালি দিতে লাগলেন।
কানাই। তােমার অশ্লীল গালাগালি দিবার অধিকার
নাই।

অষ্টম পরিচ্ছেদ। ৭১ ঘােষাল, ক্রোধে আরও অধীর হইয়া কাপিতে কাঁপিতে বলিলেন, “লিচুগাছে তাের নাক ঘসূড়ে এখনি এক সের রক্ত বার করে ফেলবাে জানি।--ব্যাটা আমার, সেখাে ভাষায় কথা কইতে শিখেছে,—অশ্লীল কি রে ব্যাটা?”—এই কথার অবসানে, পুত্রের পৃষ্ঠে ৮২ সিকার ওজনে, এক চড় ; এবং পুনরায় বেছুট গালাগালি । এ দিকে কুমারী কুঞ্জমালা ঘােষালের দিকে চাহিয়া মিহি লুম-ঝিঝিট সুরে ডাকিতে আরম্ভ করিলেন, “ভদ্র মহাশয় ! আপনি আশ্রমের শান্তি- ভঙ্গ করেন কেন ? যা বধ্যে থাকে, আমাকে বলুন!” ও কথা কেই বা শুনে? ঘােষাল, আপন মনে সেইরূপ বেছুট বকিতে বকিতে, পুত্রের হাত ধরিয়া, হড় হড় করিয়া সেই দিপানেই টানিয়া আনিতে লাগিলেন। ঘােষালের সেই “কুরুচিপূর্ণ” কথা শুনিয়া এবং কুরুচিটা সেই দিকেই, আসিতেছে দেখিয়া, কুঞ্জমালা যেন ঈষৎ চমকাইয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন। মুচিটা তখনও সেইরূপ চৌদ্দপােয়া হইয়া শুইয়া চেতন লাভ করিলেও তার উঠিবার যাে নাই- যেন নাগপাশে বন্ধ। . কুঞ্জমালা তাহার শিৱদেশ হইতে ঠিবামা, মুচি আস্তে আস্তে পিট পিট, চোখ চাহিয়া, ব্যাপারটা দেখিতে লাগিল। কুঞ্জমালা তখন ঘােষালকে উদ্দেশ করিয়া নাকিসুৰে যেন ঈষৎ ঈদ ঈদ ভাবে বলিলেন, “হা গা পুকু! আপনি এত কুচি বলিতেছেন কেন ? আমি যে ও-কথা শুনে এখনি যুচ্ছ। যা !” আছে।

চিনি-চরিতামৃত। === বোয়াল ক্রোধে দল কিটিমিটি করিয়া বলিলেন,—“শুধু মুচ্ছ। কেন, একেবারে ক্ষয়ে যাওনা যে, আপদ যায়?” কানাই। পিতঃ! যাহা গালি দিতে হয়, তাহা আমাকে দিউন। রমণীকে কটু কথা বলিবার তােষর অধিকার নাই- থােষাল, পুত্রের আচ্ছা করিয়া কাণ মলিয়া দিয়া বলিলেন, ‘রণী কি রে ব্যাটা ? ও তাের কে হয়—মা, না মাসী?” কুঞ্জমাল। ( উষ্ণ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়) অহহ! আমি ভগিনী---বে এ-ই আমি মু-চ্ছি-ত হইলাম। (কুঞ্জমালার পতন ও মুচ্ছা) শ্রীদাম মুচি এতক্ষণ নীরব ছিল। ঘােষালমহাশয়কে দেখিতে পাইয়া তাহার একটু সাহস হইল। কুঞ্জমালা তাহার গা ঘেসিয়া ধড়াল করিয়া পতিত হইমাত্র, মুচি বিকট চিৎ- কারে “বাপ রে” বলিয়া বেগে উঠিয়া পড়িল। যােল। একি এ ? দাম এখানে যে ? শ্রীদাম ( যােহাতে) “হুজুর! আপনি এখানে না এলে আমি মারা গেলুম আর কি ? ঐ যে স্কুলে মেয়েটী, আমার দফা রফা করেছিল আর কি ? উটি কি .মােলাই ? উটি কি মেয়ে মানুষ, মা আর কিছু ?” পরে আনুপূর্বিক সমন্ধ টা বলিল। * খােল। তুমি কেন পাল, তেমৰি জার ক্ষম হয়েছে। থেকে বের হলে বা সা? তােকে কেক বলে লেখ ?

নবম পরিচ্ছেদ।
কেবল
ঘােষালের উৎসাহপুর্ণ কথায় শ্রীদাম শরীরে বল পাইয়া
দৌড়িল। ঘােষাল, পুত্রের হাত ধরিয়া, মহাদন্তে চলিলেন।
কারও তখন নিষেধ করিবার শক্তি ছিল না।
মুচ্ছিতা কুমারী কুঞ্জমালা শুয়ে শুয়েই ঝিম্ আওয়াজে বলি-
লেন, “ভাই কানাই ! তুমিও কি চলিলে ? আমাৰ মূচ্ছ।
ভাঙ্গাইবে কে ?”
মাজিষ্টরের খামাতল্লাসির পর, চিনিবাস সহসা আর দ্বিতল
হইতে নীচে নামিলেন না ! কাজেই কুঞ্জমালা এবার আপন।
আপনিই মূচ্ছ। ভাঙ্গাইয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া গায়ের ধূলা
ঝড়িলেন। অবশেষে তিনি অদূরে মাণিক-খানসামাকে দেখি
তাহাকে ডাকিলেন ; মাণিকের বুকপকেটস্থ সেই গােলাপফুলটী
লইয়া মাথার খোঁপায় “জিয়া হেলিয়া দুলিয়া উপরে উঠিযা
গেলেন।
;
নবম পরিচ্ছেদ।
বন্ধু-মনােমােহনকে তুলিলে চলিবে না! তিনি দু-পুরুষে
উন্নতিশীল। তাহার ঝা-টা পর্যন্ত লিবারেল ; খানসামাটী
ক্যাভিক্যাল ; আর স্বয়ং বার ক’ত উন্মাদ। কেবল
অশুর গাভীটা কোন জাতীয়-লবারেল, কি কনসার
বেটিব, তাহা আজও ভাল ঠিক হইল না। মনােমােহনের

চিনিনি।
;
বড় দুঃখ যে, অশিকি গাইটা আজও ফাউলকারিয় মৰ্ম্ম
বুঝিল না।
মনােমােহনের সংশিক্ষায় স্ত্রীটা আজও একটুও সভ্য হইয়া
উঠেন নাই ;-ইহাই তাহার চরম দুঃখ। স্ত্রীর নাম গিরিবালা।
গিরিবালা বুন্ধিমতী, চতুৱা, গৃহকাৰ্যতৎপরা এবং স্বামিসেবা-
নিরতামনোেমােহন কেবল স্ত্রীর নিকটই জব্দ। স্পষ্টবাদিনী
স্ত্রীর কাছে বাবুর টু’শব্দ করিবার ঘষা নাই। রাত্রি ৮ টার
সময় এক পা মিয়া, দিবসের কাৰ্য শেষ করিয়া, মনােমােহন
ঘরে আসিলেন। গায়ের উপরি উপরি তিনটা পিরিহান ;
পায়ে ডবল কিন; পকেটে রুমাল।
গিরিবালা। জ্যৈষ্ঠমাসের এ গুট গরমে গায়ে এত
গুলো আমা কেন ? সুধু চাদর গায়ে দিয়ে বেড়াতে গেলেই
এই বলিয়া স্ত্রী সর্বাগ্রে পায়ের একিন খুলিয়া দিলেন।
অনােমাহন। ঐ এটাকিনটা খুলে ফেল্পে বটে!
গিলি। এখনি যে সগিরমিহিয়েছিলাে, জামাগুলাে
খোল বলছি;
শ। খুচি খুলটি,উপরের টা খুলছি,একটা জামা
শিল্পি।, কেন,একটা মা গায়ে মেকে কি হবে বল
১৯ এ গম সহ প্রা. জান্নাই ক-r
মন বাশাকে রশি করে নাই।

মন পৰিচ্ছে।
৭৫
গিরি। না, গরমি কি আর কচ্চে? কেবল ঘেমে নেয়ে
উঠে বৈত নয়! শীঘ্র জামা খুলে ফেল—
বাৰু কি কয়েন, গুগত্যা জামা খুলিয়া ফেলিলেন। স্ত্রী
তখন একটা পাখা লইস, বাতাস করিতে আরম্ভ করিলেন।
একটু সুস্থ হইলে, স্ত্রী ধীরে ধীরে, অতর্কিতভাবে স্বামীর নাক
হইতে টুক করে, চসমাটি তুলিয়া লইলেন।
মন। কি কর, কি কর,শীঘ্র চসমা দাও, আমি যে
সব অন্ধকার দেচি-
গিরি। (হাসিয়া) তবে তুমি আমাকেও দেখতে পাচ্ছি না।
মন। তা কি আমি বলচি ?তবে এখন আমার ?
কোন সূক্ষম বস্তু দেখা অসম্ভব।
গিরি। এখানে ত আর কোন সূক্ষম বস্তু নাই,
বাহিরে বেড়াবে, তখ: মৃক্ষ বস্তু দেখাে, রাত্রে-চক
আমার কাছে থাকূ !
শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র, অর্জুনের গাণ্ডীব, ইন্দ্রের ব.
মহাদেবের ত্রিশূল, বরুণের পাশ, যমের দণ্ড-শিক্ষিত বাবু
চমা এ সব একই জিনিষ। নিজ নিজ অঞ্জ অভাবে সক
লেই নতশির। সুতরাং মনােমােহ চসমা অভাবে দুর্বল
হইয়া পড়িলেন। এষ্টার্কিন গেল, জামা গেল, অসময়ের ধন
চলমাটুকু ছিল, শেৰে তাহাও গেল। দুঃখের অবধি নাই।
গিরিবালার এমনি মন্ত্র-ঔষধ গুণ যে, এত যন্ত্রণা পাইলেন,
তথা মনােমােহন গিরিবালার কোন কাৰ্য প্রতিবাদ করিতে

চিনিমকি। গম হইলেন না। প্রায় ১৫ মিনিট কাল নীরবে থাকিয়া বাৰু গম্ভীর এবং সকরুণ স্বরে বলিলেন- “প্রাণেশ্বরি । প্রিয়তমে। আমার একটি প্রস্তাব আছে, তুমি আমার প্রস্তাব রক্ষা করিবে কি ?”, গিরিবালা। ভাল করে বল না, কি কত্তে হবে ? অমন সংস্কৃত ভাষায় কথা কেন ? মন। প্রাণ-প্রতিমে! তবে শ্রবণ কর- গিরি। অমন ‘প্রাণ-পিদিম প্রাণ-পিদিম করে আমি কোন কথাই শুনবাে না-সােজ ফরে বল, কি হয়েছে, পায়ে মন। আমার ইচ্ছা যে, তুমি স্ত্রী-স্বাধীনতা এবং ডাই- গি সম্বন্ধে প্রবন্ধ লেখ। চিনিবাস বাৰু এজন্য আমাকে গুলো ধরিয়াছেন। ইহাতে দুইশত টাকা পুরস্কারও আছে— ত হয়।গরি। পােড় কপাল ভার কি? আরবারে তােমার এই শুনে স্ত্রী-শিক্ষার প্রবন্ধ লিখিলাম, আমার নম্বর সবচেয়ে প্রাইজ পেলে কি না, তােমাদের সেই রামমণি ! এই বামুণশুকনী, কালপেচী! এবার তিনিই আবার পরীক্ষা করিবেন।-হায় হায় । আমি হয়ে মরি নেই কেন ? যম। ? মেণি অতি পশুিভ। তিনি আজকাল পাতঞ্জল শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন, যে শিখুনে। এখানে উপযুক্ত পঙ্কিত মিলিতেছে না এলিয়া, জিন শীঘ্রই কলিকাতা হয় ঋী খাবেন। সেখানে হার বেষ্ট পৰিও ফানা দী হলাে, ।

সমম পরিচ্ছেদ। গিরি। তা কাশী যেতে হবে বৈকি ? সেই সঙ্গীসাবিত্রী স্বামমণি কাশী যেয়ে বেদ শিখুন, তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু আমাকে তুমি এ যাত্রা মাপ করাে। রামমণি যে আমার পরীক্ষা নেবে, এ আমি সহ কত্বে পাবাে না ! হেঁগা কাল, পেঁচীটা যে, কিছুই লেখাপড়া জানে না। মন। দেবীকে আর তুমি কালপেঁচী বললাে না, -চিনি- বাস বাবু শুনলে রাগ করবেন গিরি। তবেই ত আমি ভয়ে মরে গেলুম ! তােমার যদি ভয় হয়, তা হলে, কালপেঁচীর কথা আমার সাক্ষাতে আর তুলাে না। তােমরা ওটাকে তােমরা ওটাকে বামুণের মেয়ে বলে, কিন্তু আমার মনে হয় ঠিক, যেন হাড়ীর মেয়ে। মন। ঈঃ! ঈঃ! কবরী কি ? করে কি ? ( জিহ্বা কৰ্ত্তন)। গিরি। (হাসিয়া) কেন বল দেখি, রামমণিকে কুচ্ছি বল্পে তােমাদের অত রাগ হয় ? মন। (গম্ভীর ভাবে) তুমি • কি আমাকে অবিশ্বাসী ভাবলে ? গিরি। ( ঈষৎ হাসিয়া ) রাগ কম্নে না কি । মন। রাগ করি নই, দুঃখ করিতেছি। তুমি ত আর আমার একটা কথাও শােন । গিরিবালা এইবার সুযােগ পাইয়া, গন্তীর অথচ বিনম্র- ভাবে বুলিলেন, বামি ত তােমার সব কথাই শুনি, কিন্তু

৮
তিনি।
{
মন।
তুমি আমার একটাও কথা শুন কি ? একদিনও কি আমাখ
গা রেখেছ?”
মন। (যেন ঈষৎ চমকাইয়া) প্রিয়ে। তুমি বলাে কি ?
তুমি কি জান না, আমি তােমার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারি।
গিরিবালার অপর প্রান্তে একটু হাসি ফুটিল। তিনি বলি-
লেন,—“একেবারে প্রাণটা দিয়ে কাজ নাই, সামলাতে পাবাে
; সামান্য মুড়ি-মুড়কি পেলেই আমরা সন্তুষ্ট।”
এ সংসারে তােমার, এমন কি কথা আছে, যাহা
জামি শুনিব না?
গিরি। বল তবে, আমার কথা শুনবে ?
মন। শুনবাে।
গিরি। ফের দুবার বল “শুনব।”
মন। শুনবাে শুনবাে।
গিরি। এই তিন শওর হলে। আচ্ছা, এইবার
আমার মাথায় হাত দিয়ে বল “শুনবাে।”-
মনােমােহন গিরিবালার মাথায় হাত দিয়া বলিলেন,
“শুনবাে।”
তখন মনােমমাহন জিজ্ঞাসিলেন,-“তুমি স্ত্রী-স্বাধীনতা
এবং ভাইভাের্স সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখবে তু?
পিরি। (হাসি) লিখিব।
শৰ । তােমার কি কখা, শী বলল না--
পূরি। ধনঞ্জয় ৰাতিকে তুমি চেন কি ?

মম পরিচ্ছে। মন। চিনি বৈ কি? তবে চেহারা দেখি নাই কখননা, সে’ত ডাকাত ; আজ এক মাস তার হাজত হয়েছে- সে দিন চিনিবাস বাবুর ঘরে সে ডাকাতি করে, অনেক জিনিষ পত্র লুট করেছিলাে গিরি। তিনি ব্রাহ্মণপণ্ডিত, বৃদ্ধ, শাস্ত্রব্যবসায়ী। তার কি ডাকাতি করা সম্ভব হয় ? আর তােমার চিনিবাসের বাড়ী পাঁচ সাতজন দরােয়ান, -বুড়াে বামুণ কি একলা যেয়ে ডাকাতি করে এলাে ? আমি সব শুনেছি-তার পুত্র রাম- ধনকে চিনিবাস কোথায় লুকিয়েছে,-বৃদ্ধ, ছেলে খুঁজিতে যান; চিনিবাস তাকে মেরে, শেষে ডাকাত বলে ধরিয়ে দিলে- মনােমােহন শুনিয়া স্তম্ভিত হইলেন। তাহার আর মুখ হ’তে কথা সরিল না। একদৃষ্টে ফ্যালফ্যাল ভাবে গিরি- বালার পানে চাহিয়া রহিলেন। গিরি। পণ্ডিতমহাশয়ের স্ত্রী আজ সমস্ত দিন আমাদের বাড়ীতে ছিলেন; সারাদিন তিনি চোখের জল ফেলেছেন ; আজ একমাস তিনি আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করেছেন, কেবল দুধ আর গঙ্গাজল খেয়ে আছেন। তাঁর চেহারা দেখলে পাষাণ গলে যায়। আমি তাকে কত সাধলুম, “আমাদের বাড়ী আজ চুটী ভাত খাও।” তা, আমাদের এমন পুণ্য কি আছে যে, তিনি আমাদের বাড়ী ভাত খাবেন ? কিনি বলেন, “মা তুমি আমার মেয়ের ত; মাের গড়ীতে। - - চিনিগৰিন্থত। - ভাত খেতে দোষ কি ? কিন্তু মা আমি ভাত খেতে পারবে। না ; অামার বাছা আর একমাস বুঝি ভাত খেতে পায় নাই।” এই বলিয়া বৃন্ধা কাদিতে লাগিলেন- এই কথা বলিতে বলিতে গিরিবালারও চোখ দিয়া দু এক ফোটা জল পড়িল। মনােমােহন তখনও নীরব, গীর, চিন্তা- ময়, মুখ বিশুদ্ধপ্রায়। তিনি তখন একবার মাত্র মুখ ফুটিয়া গিরিবালাকে বলিলেন, “আজ আমার বড় ঘুম পেয়েছে ; মাথাটাও ধরেছে। আমি এখন ঘুমাব কি ? কাল তােমার সব কথা শুনবাে।” গিরি। আজই কি আর কালই কি কোন দিনই আমার কথা তােমার শুনে কাজ নাই। তুমি আমার কথা কবে জনেছ ? মন। ( আমতা আমতা সূরে) না না,তা, বলছি কি ? তা, বলি নাই —তুমি বলিয়া যাও, আমি সব শুনছাে গিরি। আজ আমার মহাপাপ হয়েছে—সেই বৃদ্ধা ব্ৰহ্মণী কেঁদে আমার পা দুটা জড়িয়ে ধরেছিলেন ; আমি ভয়ে আর বাঁচি না। আমি তার পায়ে ধরে, হাতে ধরে, অনেক সান্ত্বনা করিলাম,কিন্তু তার কান্না কি থামে? তুমি আমার পতি, আমার সাক্ষাৎ ভগবান, তােমার চরণে যােড়হাতে এই মিনতি কচ্চি, কাল তুমি এ মােকদ্দমায় চিনিবাসের হয়ে সাক্ষী দিতে যেও না। ===

নবম পরিচ্ছেদ।
;
;
মনােমােহন কোন কথা না ,কহিয়া, কেবল মুখটা
লুকাইলেন।
গিরি। শুনিলাম, “তুমিই ঐ মােকদ্দমার প্রধান সাক্ষী।
তুমি যদি সাক্ষী না দেও, তাহলে ব্রাহ্মণ খালাস পাবে।বিশেষ
তুমি ডাকাতি হতে দেখও নাই, বাচস্পতিকেও চেন না; তবে
তুমি কি করে বলবে, ডাকাতি সত্য ? তােমরা বল যে, আমরা
মিথ্যা কথা কই না।”
স্বয়ং চিনিবাস বাবু আমাকে বলেছেন ; ডাকাতি
সত্য। তার কথা ত আর মিথ্যা হইবার নয়।
গিরি। আচ্ছা যখন মােকৈ আদালতে জিজ্ঞাসা করবে,
তুমি স্বচক্ষে বাচস্পতিমহাশয়কে ডাকাতি কত্তে দেখেছ কি না?
তখন তুমি কি উত্তর দিবে ?
মন । তা, আমি বলব—“স্বচক্ষেই দেখেছি।” এরূপ
বলায় মিথ্যা কথা হয় না। কারণ, চিনিবাস এবং আমি এক ;
চিনিবাসের চক্ষু এবং আমার চক্ষু এক ; সুতরাং ডাকাতিটা
চিনিবাসের দেখাও যা, তামার দেখাও নই।
স্ত্রী এবার একটু ভীত হইলেন। ক্ষুব্ধ হইয়া স্বামীকে
বলিলেন, “তুমি বলাে কি? তােমাদের ধৰ্ম্মশাস্ত্রে কি ঐ কথা
লিখেছে ? সে যা হােক, তােমার কাল সাক্ষী দিতে যাওয়া
হবে না।”
মমােমােহন নীরব।
গিরি। দেখ, বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর কান্না দেখে, তাঁর অনাহারের

--
চিলি-চরিতামৃত।
কথা শুনে, আজ আমি এখনও জল পৰ্যন্ত খাই নাই। তােমার
কাছ থেকে সু-খবর নিয়ে পাঠিয়ে দিলে, তবে ব্রাহ্মণী দুধ
গঙ্গাজল খাবেন। তার খাওয়া শুনলে, আমি তবে খাবাে।
তুমি আমাকে স্পর্শ করিয়া বল যে, মােকমায় সাক্ষী দিব
,আর চুপ করিয়া থেকো না-বুঢ়ী যে ওদিকে না খেয়ে
ভেবে ভেবে মরে গেল।
মনােমােহন আবার সেইরূপ হেঁটমুখে নীবর হইয়া রহি-
লেন। নড়ন চান নাই, চক্ষের পলকও বুঝি পড়ে নাই,
যেন কাঠের পুতুলবৎ, তিনি অবস্থিত।
গিরি। এখনও যে চুপ করে রইলে? আমি যােড়হাতে
বলচি তুমি বল, “আমি সাক্ষী দিব না।”
মনোেমােহন অনেকক্ষণ ভাবিয়া চিন্তিয়া, ভাঙ্গা ভাঙ্গা সুরে
বলিলেন, “আমার নামে যে শমনজারি হয়েছে, আমি না গেলে
যে, আদালতকে অবমাননা করা হবে-
গিরি। তুমি আমাকে প্রাণ পর্যন্ত দিতে পার বলছিলে ।
না হয়, আমার জন্য, আমার কথায়, আজ আদালতকে একটু
অপমানই কল্পে বা
মন। (আমতা আমতা সুরে) , বলচি কি ? আদা-
লতে হাজির না হলে আমাকে ওয়ারেন্ট দ্বারা গ্রেফতার
করিয়া নিয়ে যাবে-
গিন্নি। যদি ওয়ারেন্টই হয়, তবে না হয়, তখনই হাজির
হয়ে বলবে,বাচস্পতি জাকাতি করে নাই,

নবম পরিচ্ছেদ। সত্যের অপলাপ করা কি সুনীতি-সঙ্গত হয় ? তুমি কি আমাকে ন্যায়ের মস্তকে পদঘাত করিতে বলিবে ? গিরি। আ-হা-হা! কি সত্য কথা কহিতেই শিখেছ ? সে যা হােক, তােমার সাক্ষী দিতে নিশ্চয় যাওয়া হবে না -.. তুমি আমার মাথায় হাত দিয়েছ, 'তিন শত্তর করেছ সে, তুমি আমার কথা শুনবে ; তবে তাই এখন স্পষ্ট বল, আমার কথা তুমি শুনবে না- স্ত্রী হেঁটমুখে দিতে লাগিলেন। হিন্দুরমণী আর কত সহিবে ? মনােমােহন তখন ব্যস্ত হইয়া রুমাল লইয়া, স্ত্রীর মুখ মুছাইতে গেলেন। গিরিবাল বলিলেন, “যে জল চো দিয়া চিরদিনই পড়িবে, তাহা আর একবার মুছাইয়া কি হইবে ? যাও যাও, আমার চোখের জলে শরীর ভিজিয়া যাউক।” এমন সময় ঝি আসিয়া সংবাদ দিল, “মা । আবার সেই বুড়ি-বামণী এসেছে।” রাত্রি এখন দশটা। গিরিবালা শা হাকে আনিতে গেলেন। ওদিকে একটা চিনি-চিনি পরিচিত- গলা, মননামােহনকে ডাকিতেলাগিল,-“বন্ধু, বন্ধু, ও বন্ধু । একবার শুনহে বন্ধু !” গিরিবালা মধ্যপথ হইতে দৌড়িয়া আসিয়া স্বামীকে বলিলেন, “খবরদার ; তুমি সাড়া দিও না,সেই পােড়ারমুখে। চিনিবাস এসেছে—খবরার বলুচি, তুমি উঠ না, শক্তিরূপিণী স্ত্রীর তেজোময়ী কথায় স্বামী নীরব, নিশ্চল, অড়, অনড়,, জড় পদার্থবৎ হইলেন। তখন ১াবার স্ত্রী

চিনিৰল ।
নক্ষত্ৰবেগে সেই ব্রাহ্মণীকে আনিতে চলিলেন—তাহার নিকটে
গিয়া দেখিলেন, ব্রাহ্মণী ডুপতি। তিনি মূচ্ছিতা, কি সুতা,
কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। গিরিবালা গভীর আর্তনাদ
করিয়া উঠিলেন।
দশম পরিচ্ছেদ।
গিরিবালা সেই বৃদ্ধা, জীর্ণ, অনশনা ব্রাহ্মণীর নিকট গিয়া
দেখিলেন, ব্রাহ্মণী পতিতা, স্থির-কলেবরা। তাহাৰ বাম বগ
দিয়া অবিরাম বক্তধারা বহিতেছে। মুখে কথা নাই, শরীর
৫। গিরিবালা তাহার শিবরাদেশে বসিয়া মুখে চোখে জল
দিতে লাগিলেন। কিন্তু ক্রমশ আরও চাপ চাপ রক্ত পড়িতে
লাগিল। গিরিবালা এদিক ওদিক চাহিয়া দূরে একটী
রক্তমাখা ঢিল দেখিতে পাই, "ন। ঢিটী কুড়াইয়া আনিয়া
দেখিলেন,ইটের নয়, পাথরের। ভাবিলেন, বৃদ্ধাকে কেহ
ঢিল মারিয়াছে না কি ? আবার তিনি বৃদ্ধার গায়ে হাত
দিলেন, —গা বরফবৎ হিম ;-চক্ষের পলক নাই। তখন
তিনি আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন। স্বামী মনােমােহন নিকটে
আসিলেন। গিরিবালা বলিলেন, “সর্বনাশ হইয়াছে, তুমি
শিগগীর ডাক্তার ডাক।”
তখন মনােমােহন আবার সেইরূপ বেশ-ভূষা করিয়া,
যেন অত প্রকুচিতে ডাক্তার জাকিতে বাহির

দশৰ পৰিচ্ছে। ~ । - খাইবার সময় গিরিবালা, স্বামীর সম্মুখে গিয়া, হাই ধরিয়া, আবার বলিলেন, “শিগ্‌গীর ফিরাে।” স্বামী গৃহের দ্বার পার হইবামাত্র, বাটীর বাহিরে অনুবে একটা হাসির বিকট রব উঠিল। গিরিবালা সে শব্দ ক ৭ খাড়া করিয়া শুনিলেন,—চিনিবাসের গলার আওয়াজ পাই- লেন। ঝিকে তিনি বলিলেন,—“ঝি ! দেখ ত, এ রাত্রে কাৱা অমন কচ্চে?” কি, দেখিয়া শুনিয়া ফিরিয়া আসিয়া বলিল,- “বাইরে কেউ নেই, একখানি গাড়ী গড়গড়িয়ে চলে গেলো। তখন গিরিবালার মনে ঘােরতর সন্দেহ জন্মিল। তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল; তিনি ভাবিলেন, “চিনি- বাসই কি বৃদ্ধার ব্লগে পাথর মারিয়াছে ? স্বামীকে কি চিনিবাস গাড়ীতে তুলিয়া লইয়া পলাইল ?” ব্রাহ্মণীর যে, প্রণবাযু বাহির হইয়াছে, গিরিবালা তখন ও বুঝেন নাই। তিনি মধ্যে মধ্যে দুধ আর গঞ্জাজল, অল্প অল্প বৃদ্ধার মুখে ঢালিতেছেন; কিন্তু তাহা উদরস্থ না হই চোয়াল বহিয়া বাহিরে পড়িতেছে। ডাক্তার লইয়া স্বামীর আসিতে যত বিলম্ব হইতে লাগিল, স্ত্রীর প্রাণ ততই আকুল হইয়া উঠিতে লাগিল। ক্রমে এক ঘণ্টা অতীত হইল,-- তথাচ মনােমােহন ফিরিল না। জেলখানার পেটা ঘড়ীতে একা বাজিল। জ্যোৎস্না ফাইল, ঈদ ভুবিল। পৃথিবী অন্ধকার হইল। গিরিবালা উঠানে, মৃতদেহ-পা এক- কিনী বসিয়া রহিলেন। রাত্রি দুইটা; তথা স্বামীর দেখা চিনি-চরিতামৃত। নাই। স্ত্রীর মনােমধ্যে তখন এই দুর্ভাবনা উদয় হইল,- এ অন্ধকার রাত্রে পথে স্বামীর কোন বিপদ ঘটে নাই ত ?” তখন তিনি চাকরকে সেই রাত্রে স্বামীর অনুসন্ধানে পাঠাই- লেন। টং টং টং শব্দে তিনটা বাজিয়া গেল, চাকরও ফিরিল না। নিরাশায়, ভয়ে গিরিবালার বুক ভাঙ্গিয়া গেল। একাদশ পরিচ্ছেদ। সেই কাল-রাত্রে তৃতীয় প্রহরে কৃষ্ণনগরবাসী নিদ্রিত। কেবল দুইটী ঘরে, বিশেষ কার্য্যানুরােধে, আজ জাগরণের পালা। গিরিবালা একাকিনী, মৃতদেহের কাছে বসিয়া ভাবিতেছেন, কঁদিতেছেন, উকি মারিয়া দেখিতেছেন, স্বামীর পথপানে চাহিয়া আছেন। ওেিক চিনিবাসের গৃহে আজ আনময়ের আনন্দ-মহােৎসব চলিতেছে। দ্বিতলের হলে খােল বাজাইয়া সঙ্কীৰ্ত্তন হইতেছে। আজ স্বয়ং রামমূণি যােগদান করিয়াছেন। বিমলা, কমলা, কুঞ্জমালা-সকলেই উপস্থিত। রামকানাইও পিতৃগৃহ হইতে তৃতীয়বার পলাইয়া আসিয়া আজ হাজির। ঐ যে বাধন, মনোেমাহন, সকল কেই দেখিতেছেন! ক্রমে সকালে নাচিয়া নাচিয়া কীর্তন আরম্ভ করিলেন। মধলে রামমণি এবং চিনিবাস পরস্পর হাত ধরাধরি করিয়া গানে উন্মত্ত। সঙ্গীতরসে বিল হইয়া

একাদশ পরিচ্ছে।
৮৭
কুমারী কুঞ্জমালা রামকানায়ের হাত ধরিলেন; রামধন, বিনাে-
দিনীকে লইলেন; বামাসুন্দরী মনােমােহনের নিকট আসি-
লেন। তেজে খােল বাজিতে লাগিল। নৃত্যের লক্ষ, ঝ,
কম্প, সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাইল। সঙ্গীতসুধায় হৃদয়দেহ উৎফুল্ল
হইয়া উঠিল ;-
তােমার তরে ভূষিত প্রাণ।
কর হে প্রেমবারি দান
দয়াঘন তুমি, • ভূষিত চাতক আমি,
করি বারি দান, বাঁচাও প্রাণ,
ওহে প্রাণের প্রাণ।
( বারি পিয়াও দেখি মম-চাতকে )
তুমি হে প্রেমশী,
আমি চকোর এবা-পিয়াসী,
মিটাইয়ে সাধ, ওহে প্রেমাদ,
কারব সুধাপান।
(সুধা পিয়াও দেখি মন-চকোরে)
তুমি হে প্রেমসিন্ধু, দাও প্রেম একবিন্দু,
করিব পান, জুড়াব প্রাণ,
গলিবে মন-পাষাণ!
তােমার একবিন্দু প্রেমে )
মাতি ভক্তি-রস-রঙ্গে, ভাস প্রেম-তরঙ্গে,

চিনিৰাৰ-চরি। তােনার নাম, খুলিয়ে প্রাণ, আজি করিব গান। (দুঃখ দূরে যাবে-নাম গানে। শেষে ভাবে গদগদ হইয়া হঠাৎ কুঞ্জমালা মুর্দিত হই- লেন। চিনিবাস বলিলেন, “ভ্রাতা কানাই! তুমি কুমারীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া, পার্শ্ববর্তী গৃহে মুচ্ছা অপনােদনের চেষ্টা কর।” কানাই। তথাস্তু । তৎক্ষণাৎ কুমারী কুঞ্জমালাকে গৃহান্তরে প্রবিষ্ট করান হইল। এই সঙ্গে সঙ্গীতও থামিল। চিনিবাস, বন্ধু-মনাে- মােহনকে সম্বােধন করি বলিলেন,—“বন্ধু ! এই কানাই বালকট রত্ন-বিশেষ। ইনি অতীব পবিত্ৰচেতা, সংসারতত্ত্ব- অভিজ্ঞ, কৰ্ম্মঠ, সাহসী এং প্রতিজ্ঞপ্রিম। দেখ বন্ধু, সেই অসভ্য পিতা, কহিনুরজাতীয় হরকখণ্ডবৎ পুত্র রামকানাইকে কতবার নিদারুণ শক্তিশেল-রূপ অস্ত্র দ্বারা প্রহার করিয়া- ছেন-এ স্থান হইতে রামনাই কতবার পিতা কর্তৃক ধৃত হইয়াছে, কিন্তু ভাই-কানাই কিছুতেই দৃকপাত করেন নাই। ধর্মের মহিমা উলরূপে কীৰ্ত্তন করিবার জন্য তিনি মম গৃহে ভুতীয়বার পদার্পণ করিয়াছেন। ধৰ্ম্মের কি অপূর্ব দেবভাব । কি গরীসী মা! কি অনির্বচনীয় গোবে।” নয়। ইহা অতি সুন্দরী কথা! কোকিলকুজিত কোমল কমনী-কলকলাতিফ-করি- একটু ইতস্তত ভাব) চিনিবাস। বেশ, বেশ-বলিয়া যাও,অতি উত্তম কায়দা। 'মন। কালের করাল কোদণ্ড কটকটাযিত কুটীর-কুট্টিমে কুলকামিনীর কেশকশ ( ভাই চিনিবাস ! আর যে পাবি ।) চিনিবাস। আচ্ছা, আচ্ছা, তােমার দোষ নাই, উহা বাঙ্গালীর ভাষার দোয়। সেই জন্য শ্ৰীশ্ৰীমতী রামমণি দেবী আজকাৰ সংস্কৃতে কেবল কথা কহেন রামমণি নিকটবর্তিনী হইয়া, ঈষৎ হাসিয়া সংস্কৃত বলিলেন, যােথােবাণি পরিত্যজ্য অপােরাণি নিষেবতে। পােবাণি তস্য নষ্যতি অপােব নষ্টমেবহিং । মন। (ঘাড় দুলাইয়া) ঠিক, কি ! আহা! সংস্কৃতের কিবা মধুময় ভাব- ব—দেই জুড়াহল !- রামমণি। “একশ্চং তমহন্তিঃ নচ তারা গণৈপিং “ঈশ্বরাসিদ্ধেং” “যােগং চিত্তবিত্রিনিবােধং” জননীং জন্মভুমীং চ স্বাদশীৎ গরীয়সীৎ,” “কম্মিশ্চিৎ বনেং ভাসুরকং নাম: সিংহং প্রতিবসতিং,” “মন্দং কবিযশং গমিষ্যাং"-(উ উ উ)-ফলে যথাং।” মন। আহ! অন্য কি স্বয়ং সরস্বতীর বীর্ণধ্বনি শুনিতেছি ? চিনিবাস। দেবী শীঘ্রই আকাশী মে গমন করিয়া বেদ

তিনিবাস-চরিতামৃত।
মম।
অধ্যয়ন করিবেন,এ দেশে বেদ পড়া ভাল হয় না।
সাক্ষী দেওয়ার পর, আমি, তুমি, দেবী এবং অন্যান্য সহচর
ও সহচরীগণ সকলেই কলিকাতা যাত্ৰা করিব, করিবে বং
করিবেন। তথা হইতে কাশী গমন।
মন। সাক্ষীটা পরশ্ব দিলে কি চলিবে না? ১২ পৃষ্ঠা
কাগজ আমি এত অল্প সময়ে মুখস্থ করিতে পারিব কি ?
চিনিবাস। রামকানাই ত দিব্য মুখস্থ করিয়াছে ? তুমি
অক্ষম হইবে কেন ?
সময় কৈ ? প্রভাত হইয়া আসিল। দশটার
সময় আদালতক্ষেত্রে উপনীত হইতে হইবে—ইহার মধ্যে
একবার বাড়ী যাইতে হইবে! বৃদ্ধ। ব্রাহ্মণীর কি দশা ঘটিল,
তাহা একবার দেখা উচিত নয় কি ? ভাই! তােমার হস্তের
ঢিল ব্যর্থ যাইবে কি ?
চিনিবাস। ভাই! তুমি বড়ই ভ্রমপথের পথিক। আমি
চিল মারি নাই। নিরাকার ঈশ্বরই 'ঢিলটী মারিয়াছেন,
সকলি ঈশ্বরের আদেশ। তিনিই আমার হাত হইতে ঢিলটী
লইয়া বৃদ্ধাকে আঘাত করিয়াছেন—আমি উপলক্ষ মাত্র।
রামমণি। সত্যং সত্যং-ত্বয়ি হৃষিকোং যথা নিয়ােস্মিং
তথা রামিং
চিনিবাস। সাথীং।
সাবীং !!
কম।' বটেং বটং-
সা মে সংস্কৃত হইয়া উঠিল। চিনিবাস ভঙ্গ বন্ধু
–

একাদশ পরিচ্ছে। মনেমােহনের হাতে ধরিয়া বলিলেন, “ভাই! আমি তােমাকে প্রাণ অপেক্ষা প্রিয়তম ভাবি। তুমি আমার কথা রক্ষা কর । অদ্য মহচ্চিতের একটু লক্ষণ দেখাও। ধৰ্ম্মের জন্য গৌরাঙ্গ একদিনে সন্ন্যাসী হইয়া স্ত্রীকে ত্যাগ করেন। আর আজ তুমি ধৰ্ম্মের জন্য গৃহে গমন না করিয়া থাকিতে পারিবেন না কি ? স্ত্রী পুত্র মাতা পিতা লইয়া যাহারা সংসারজালে জড়িত তাহাদের দ্বারা সমাজের উন্নতি হয় না। তুমি ! মােহমায়া পরিত্যাগ কর। কল্য দশটার সময় আদালতে গিয়া রাচস্পতি ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাও-সামাজিক কুসংস্কার দূরীভূত হউক। মন। ভাই! তােমার আজ্ঞা কখন লজ্জন করি না তবে কি না, ঘরে স্ত্রী- চিনিবাস। স্ত্রী কি ? যে স্ত্রী, পরি স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যাঘাত দেয়, সে স্ত্রীনামের উপযুক্তই নয়-তুমি এখনই তাহাকে ভাইভাের্স করিতে পার— মন। 'না, না,তা, নহে। আমি কল্যই সাক্ষ্য দিব। ঐ ১২ পৃষ্ঠা হাতের লেখা মুখস্থ করিতে অদ্য বড়ই কষ্ট হইবে। চিনিবাস। ভগিনী বিনােদিনী মুখস্থ-বিষয়ে অদ্য রাত্রে আপনার সহায় হইতে পারেন- মন। পণ্ডিত। বিনােদিনী এবং নিরাকার ঈশ্বর-এই দুই ব্যক্তি সহায় হইলেই কাৰ্যসিদ্ধি হইবে। তখন বিনােদিনী গাড়াইয়া উঠিয়া বলিলেন, “শেষরাত্রে }

২
চিনি-চরিতা।
জাগিয়া শিক্ষা দিতে হইলে, প্রথমত, আমার সেই, লালব।
জলীয় ঔষধ সেবন আবশ্যক-*
চিনিবাস। তাতে আপত্তি নাই—মাত্রা বেশী না হইলেই
হইল,—ইহাতে শুদ্ধি-সাধিনী সভার নিয়ম ভঙ্গ করা হয় না।
তখন লাল মহৌষধে কলেবর প্রফুল্লিত করিয়া মনাে-
হনকে সঙ্গে লইয়া বিনােদিনী পাঠগৃহে চলিলেন। রামমণি
দেবীও চিনিবাসের হাত ধরিয়া সংস্কৃতে কথা কহিতে কহিতে
কক্ষান্তরে গমন করিলেন ।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
কলিকালে ইংরেজরাজত্বে ধৰ্ম্মের সূক্ষমা গতি। সুতরাং
দায়রার বিচারে ধনঞ্জয় চম্পতির তিন বৎসর মেয়াদ হইল।
মনােমােহন, রামকানাই, কুঞ্জমালা, চারিজন দ্বারবান এবং
স্বয়ং চিনিবাস-ইরা সকলেই একবাক্যে বলিলেন, “হ
আমরা ধনঞ্জয়কে ডাকাতি করিতে দেখিয়াছি।” পুত্র ননী-
গােপাল ও পিতা ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল । সে বলিল,
“পিতা মৈ লাগাইয়া প্রাচীরে উঠেন ;, তথা হইতে তরবালের
খাপ খুলিয়া লঞ্চ দিয়া ভূতলে’পড়িলেন এবং কাট কাট্‌ শব্দে
তে-রে-রেরে কন্ধিয়া ধাৰিত হইলেন। আমি তখন ভয়ে ঘরে
থি দিলাম।” ৰঞ্জয় এতক্ষণ নীরব ছিলেন; কেবল
আপন মনে ইটমন্ত্র পতেছিলেন।
পুত্রকে সাক্ষী কাটরায়

খাদশ পরিচ্ছে।
৭)
দেখিয়া তাহার চমক ভাঙ্গিল। শেষে পুত্রের জবানবন্দী
শুনিয়া তিনি উচ্চরবে জজকে বলিলে,-“আমি ভাকাতই
বটি, -তবে এই এক অনুবােধ, কারাবাস দণ্ড না দিয়া একে-
বারে ফঁসি দিন। তার আমার সাফাইয়ের সাক্ষী দিবার
আবশ্যক নাই”
আসামীর উচ্চরবে কথা শুনিয়া, কনেষ্টবল এবং চাপরাশি-
বৃন্দ চুপ চুপ চুপ করিয়া উঠিল। ধনঞ্জয় বাচস্পতি আরও
তীব্রন্সরে বলিয়া উঠিলেন, “আমি ডাকাত, আমি ডাকাত
আমায় ফাসি দাও--
জজ সাহেব, গবর্নমেন্ট উকীলকে জিজ্ঞাসিলেন, “গতিক কি
ব্যাপার কি ?”
উকীল। বােধ হয়, আসামী পাগলের ভাণ করিতেছে।
পাগলকে পাগলাগারদে পাঠান উচিত।
ধনঞ্জয়। আমি পাশল মহি ম ডাকাত।
শেষে সূক্ষ বিচারে কি হইল, আসামী পাগল নয়, কেবল
সে নিজদোষ একরার করিতেছে। জুরীগণ একবাক্যে বলি-
লেন, “আসামী দোষী। জজ রায় দিলেন, “আসামী বৃদ্ধ এবং
অক্ষম; এবং ইহা তাহার প্রথম অপরাধ বলিয়া বােধ হই,
তেছে; সুতরাং তাহার তিন বৎসর সপরিশ্রম কারাবাস-দণ্ড
সাদা হইল।
সেই দিন রাত্রে চিনিবাসের গৃহ আন-নিকেতন হইল।
গৃহদ্বারে লাল কাপড়ে লেখা হইল,-“সত্যমেব জয়ছে।"

১৪ পিসি চরিতামৃত। ছাদে বলা উড়িল, “ধর্মের জয়।” কীৰ্ত্তন আরম্ভ হইল; গেল রে দুঃখ-রজনী সমুদিত দিনমণি সত্যধৰ্ম্ম হইল প্রকাশ। পাপনিদ্রা পরিহরি এস সব নরনাৰী ছিন্ন কবি এস মােহ-পাশ। ( হায় হায় । সত্যধৰ্ম্ম হইল প্রকাশ। কলিকাতা সেই লবঙ্গল পত্রিকায় প্রবন্ধ বাহিৰ ২ইল,-“ধৰ্ম্মেব কি অনির্বচনীয় প্রভাব। ধৰ্ম্মেব জন্য পরশুরাম মাতাকে বধ করেন, ধৰ্ম্মেরজন্য মহাবীর কর্ণ নিজ অঙ্গ কাটিয়া অক্ষয় কবচ প্রদান করেন, দুর্যোধনেব রাজসভায় দ্রৌপদী বিবস্ত্রা হইলেও, ধৰ্ম্মের জন্য পঞ্চ- পাণ্ডব নীরব রহেন, ধৰ্ম্মের জন্য রাজা দশরথ রামচন্দ্রকে বনে পাঠান,আর ত্য ধর্মের জন্য ননীগােপাল পিতাব বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়া পিতার তিন বৎসর কারাবাস দণ্ডাজ্ঞা ঘটাইয়াছেন। অহহ! ধৰ্ম্মের কিবা আশ্চর্য্য বিকাশ। কিবা গােলাপিপ্রস্ফুটন! এ অধঃপতিত ভারতে পুনরায় কি সত্যের বিজয় ভেরী বাজিয়া উঠিবে ? আর কি সেই নিৰ্ম্মল সলিল বহিবে সদা, তটশালিনী সুন্দর যমুনেও ? “নীগােপাল বঙ্গের একটী উজ্জল বহুস্বরূপ হইয়া উঠিয়া- ছে। কুসংস্কার অন্ধকার ভেজ করিয়া তিনি আজকাল কেবল বাদশ পরিচ্ছে। । লেন না। মধ্যাহ্নপনের ন্যায় দপ দপ দপিতেছেন। তিনি যেমন ন্যায়- পরায়ণ, তেমনি কতকৰ্ম্মা। তাহারই ওণে কৃষ্ণনগরের ডাকাত- দল কতকটা ম্লানমুখ হইয়াছে। উপস্থিত ডাকাত-ধরা কাণ্ডে সুযােগ্য পুলিশ সাহেকে প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারি- লাম না।” রমণীনাথ মিত্র। ধনঞ্জয় বাচস্পতির জেলখানায় একমাস মধ্যে মৃত্যু ঘটিল । কারাগারে মেচ্ছাচার দেখিয়া তিনি তথাকার অন্ন গ্রহণ করি- অনেক রকম সাধ্যসাধনা এবং বলপ্রয়ােগ করা হইল,তথাচ তিনি ভাত পাইলেন না। তিনি দিনের দিন, দুধ আর গঙ্গাজল পান করিলেন। শেষ উদরাময় হওয়ায় তিনি জেল-হাসপাতালে আনীত হইলেন। তথাকার সুচি কিৎসায়, একমাস মধ্যেই তাহার প্রাণবায়ু বাহির হইয়া গেল। পিতার মৃত্যুর পর, উপম পুত্র ননীগােপাল একটা আনন্দভােজ দিলেন। কলিকাতার উইলসন হােটেল হইতে ৫০° টাকার আহারীয় দ্রব্য কৃষ্ণনগরে গেল। বাচস্পতি ইহ-জীবনে যা কিছু অর্থ সঞ্চয় করিয়াছিলেন, বােধ হয়, তাহার সমস্তই পুত্রবর্তৃক পিতৃশ্রাদ্ধে ব্যয়িত হইয়াছিল। কৃষ্ণনগ-বিজয় সমাপ্ত হইল। চিনিবাস, রামধন, রাম- কানাই, ননীগােপাল, মনােমােহন, বিধুভূষণ, রামমণি, কল্যাণী, কুঞ্জমালা, বিনােদিনী, বামাসুন্দরী, বিমলা-সকলেই দিয়িজয়- মানসে কলিকাতা যাত্রা করিলেন। ভবানীপুরে বাসা ভাড়া চিলিসন্ধিা। কল ওয়া হইল। শেয়ালদহ স্টেশনে অবতরণমাত্ৰ কলিকাতার জনসাধারণ, অর্থাৎ ৭টা পুরুষ এবং ৫টী স্ত্রী—তাহাদিগকে মহাসমাদরে অত্যর্থনা করিয়া, ব্যাণ্ড বাজাইতে বাজাইতে ধ্বঙ্গা-গতকা উড়াইয়া বাসায় লইরা গেলেন। লবঙ্গল- পত্রে গ্রেট অক্ষরে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হইল, “১৫ই ভাদ্র শনিবার মহামহােপাধ্যায় পরম পণ্ডিত, তত্ত্বদর্শী, বিবেকী ঈশ্বরের প্রতিকৃতিস্বরূপ শ্ৰীযুক্ত চিনিবাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কলিকাতার টাউন হলে ‘সমাজসংস্করণ সম্বন্ধে বক্তৃতা করিবেন। জনসাধারণের আগমন প্রার্থনীয়।” ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। • ভাদ্রপদ মাসে বড় দুরন্ত বাদল। নদ নদী একাৰ আটদিকে জল। কহিতে দুঃখের কথা চঙ্গে বহে জল। বড় বড় গৃহস্থের টুটিল সম্বল। আজ হয় দিন অতিবৃষ্টি আরম্ভ হইয়াছে। পুকুর, ভােবা, পৃথ, ঘাট, মাঠ, উঠান সমস্ত জলে একা হইয়া তর্ক শুরু করি- তেছে। আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন। পৃথিবী ঈষৎ অন্ধকারময় ! ধী, গঙ্গী ঋনে বাৰু বহিতেছে। আমগাছের ভাল ভগ্ন ; মাটির প্রচার পতিত ; খড়ের পুরান পচা চাল মিডিয়া, জল পড়িয়া, ঘরের মেপে স্ব করিতেছে, শানে খাৰে কাও অশে পরিণ। ছেন। হইয়াছে। গ্রামে দুইখানি বই মুদির দোকান ছিল না। প্রলয় জলের প্রভাবে দোকানদ্বয় আজ দুই দিন বন্ধ আছে। যার বড় দরকার, সে মুদি-গিন্নির সুপারিষ করিয়া দ্বিগুণ দরে চাল, ভাল, নুন, তেল কিনিয়া লইয়া যাইতেছে। গ্রামের মধ্যে যারা একটু সঙ্গতিপন্ন, তাহারাই দু চারিজন একত্র হইয়া, কেবল পাশা তাস শতরঞ্চ এবং আমাকে মনােনিবেশ করিয়া- গরম গরম চালকলাই ভাজা, রতি পরিমাণে লঙ্কা সংযােগে, কখন বা আদার বুকনি দিয়া বড়ই মিঠা লাগিতেছে। যাহার সংস্থান আছে, তিনি মুসুরির ডাল, মিহি চাল এবং গাওয়া স্বত--এই তিন মহাব্যকে জল এবং অগ্নি দ্বারা রাসায়নিক ভাবে মিশ্রণ করিয়া, নিজ রসনার পরিতৃপ্তি সাধন করিতেছেন। যাঁহার নাই, তিনি যনঘটাপূর্ণ আকাশ পানে চাহিয়া, বৃষ্টির জলের সহিত চোখের জল মিশাইয়া কেবল ধরাতল অভিষিক্ত করিতেছেন। ঐ যে সম্মুখে একখানি কুঁড়ে ঘরছিটেবেড়ার দেওয়াল, কেশের ছাউনি, তালপাতার আগড়, মার খুটী—ঐ ঘরটী কার? ঘরের ভিতরে কাদা বলিলে অত্যুক্তি হয় না ; বৃষ্টির জল উপর দিয়া পড়ে, পাশ দিয়াও আসে, আর সম্ভবত নিতল হইতেও জল উঠিতেছে। ঘরে আসবাব, সাজ- সরঞ্জাম কিছুই নাই; কয়েকটী পুরাণ ফাটা হাড়ি এক কোণে আছে, ঘরের উত্তরাংশে বাঁশের সাঙার পর এখনি শখ হিয়, মলিন, কাপড় শুকাইতেৰে তাহার ৭ চিনিবাস-মি মেয়ে- অদূরে গামছাবৎ একটু ঝাড়ায় কি যেন একটা জিনিষ বাঁধা রহিয়াছে। সেই সাঙার নীচে, ছিটেবেড়ার দেওয়ালের পাশেই একটা উনান জলে গলিয়া যেন প্রব হইবার উপম হইতেছে। সেই ঘরের একমাত্র অধিকারিণী—একটী স্ত্রীলােক। কেবল স্ত্রীলােক হইলে কি হইবে ?-তার যে নানা দোষ। রমণীর একটাও দাত নাই; সুতরাং গাল দুটী সুগােল সবস নহে, জলহীন ভিীর উদরের মত বসা এবং বিশুরু। মানুষটীর গলার আওয়াজ সুমধুর নহে- কনিটা বসন্ত বাহার রাগিণীর ঠিক বিপরীত,-কি এক রকম যে, ফফ করে কথা কয়, তার কিছুই বুঝা যায় না। চুলগুলা ত শােণের নুড়ী, তাও খাট খাট, সম্মুখভাগটাত একেবারেই নেড়া; অন্তত যদি সেই নবনীলনীৰ্বদতুল্য আলুলায়িত কেশকলাপ তাহার পৃষ্ঠদেশে বিলম্বিত থাকিত, অথবা যদি কুণ্ডলীকৃত কুন্তল খোঁপায় পরিণত হইয়া, সুবর্ণ-গােলাপের সাহায্যে কক- মক্ক ঋকিত, তাহা হইলেও বা একদিন ঐ স্ত্রীলােকটির নারী- সমাজে পরিচয় দিতে পারিতাম। আৱে ছি!-আবার -কি?-অঙ্গ উলঙ্গ যে! কালী কলৰ কৈ ? বাধা পান্থপড়ে মিহি কাপড়ই বা কৈ। খরিক্ত চারিগাছা গলও যে শয়ে নাই। আর মিটমিটে চোখটান্ত কোটগত। কেবিদোন্সলােচনী বিলানির মত সৰিল কুকিটাক্ষ, শ, জলকীর সেই মুহুলমধুর হিল্লোলই বা

আয়োদশ পরিচ্ছেদ।
কৈ? সর্বনাশ! সর্বনাশ। মা বুড়ী !-রাম, রাম --
শিবাে, শিবব ।
সেই বৃদ্ধা খ্রীলােকটী, কুটীর মধ্যে একখানি কাঠের উপর
বসিয়া তুলা পিজিতেছেন। তুলাগুলি যে কোথায় রাখেন,
এমন স্থান একটুও নাই-ঘরের মেজে ত কাদা। পেঁঙ্গা
তুলা কতক আঁচলে রাখিয়াছেন, কতক একটা ভাঙ্গা হাঁড়িতে
আছে। আঁচলে বড় বড় ছিদ্র ; কতক তুলা সেই ছিদ
দিয়া গলিয়া পড়িয়া গেল। বৃদ্ধা সেই গুলি আবার খুঁটে খুঁটে
তুলিতে লাগিলেন; হঠাৎ একটু জোরে বাযু বহা কিছু
তুলা আঁচিল হইতে উড়িয়া গেল। বৃদ্ধা বড় বিব্রত হইলেন,
উঠিয়া ঈড়াইলেন ; দৌড়িয়া তুলা ধরিতে গেলেন । কিন্তু
উড়ন্ত তুলা কি সহজে ধরা যায় ? বৃদ্ধার পা পিছলিয়া গেল ;
ছিটেবেড়ার দেওয়ালে মাথা ঠুকিয়া বৃদ্ধ। গৃহমধ্যে পতিত
হইলেন। আঁচলের তুলা খরময় ছড়াইয়া গেল। পবনদের
সুবিধা বুঝিয়া এইবার অনেক তুলা বড়গাছের উপর তুলি-
লেন; কতক গৃহস্থের চালে রাখিলেন। কিছু তুলা বা কোন
কামিনীর খোপায় পরাইয়া দিলেন।
চাকাই-মলমলবৎ মিহি ছাচে-গড়া নবীনা কামিনীমুর্তির
মুচ্ছিত হইবার জন্য, আজকাল বুঝি ফুলের আঘাতও দরকার
হয় না; কিন্তু সেকেলে পাকা বুড়া-হাড়ে সব সয় ।
কুলুঙ্গি, শুখা মুচ্ছিতা হইলেন না। কেবল তিনি ণ,
ভাঙ্গা ভাঙ্গা কশিতস্মরে বলিলেন, “বি, চিনিবাস, তেরি
;

১০০ চিনিসরিতামৃত। মা আর বেশী দিন বাঁচবে না-তাের একবার মুখটা দেখে মবে”-এই কথা বলিতে বলিতে মায়ের চক্ষে এল আসিল। একটা প্রতিবেশিনী বালিকা দৌড়িয়া আসিয়া,-“অ-বুড়ী, বুড়ী-তাের যে তুলল সব উড়ে গেল। এই নে, এত গুলাে তুলল"আমাদের ঘরে যেয়ে পড়েছিলাে।” এই কথা বলিয়া বালিকা কতকগুলা পেঁজা তুলা চিনিবাস- জননীর হাতে দিল। বালিকার বয়স তের ; দুই বৎসর বিবাহ হইয়াছে ; তাহাঁর স্বামী কলিকাতায় একটু মােটা মাহিনার চাকুরী করেন। বুড়ীর কুঁড়ের দশ হাত দূরে বালিকার পিতৃগৃহ। মাতাকৌশল্যা অতি করুণস্বরে বলিলেন, “না, না, আমার তুলায় আর কাজ নাই, তােমরা জন্ম-এমিস্ত্রি হয়ে বেঁচে থাক, হাতের ন য় যাক; আমার মরণ হইলেই এখন ভাল। তবে বাহাকে একবার দেখে মরবাে এই বড় সাধ । বাছার মুখটা আজ এক বছর দেখি নাই।” কৌশল্যার চোখ দিয়া টল ট ল পড়িতে লাগিল। বালিক। “দেখ পাগলী বুড়ী, তুই যদি কবি তা হলে তোকে এখনি মারবাে” এই বলিয়া বালিকা নিজ অঞ্চল দিয়া কৌশল্যার মুখ, চোখ মুছাইয়া দিল। বালিকা পুনরায় জিজ্ঞাসিলেন,একি বুড়ি তাের গায়ে এ ফালা কেন? আর এফ তুলা গুড়াৰ কেন? আ কি ভূই তিনি স্কুল দেচিল ৰাই? বুড়ী, তুই আজ

অােশ পরিচ্ছে।
কি খেয়েছিস বল?-মুখ তাের শুকনাে, উনন ভাঙ্গা কেন ?
আজ বুঝি এখনও কিছু খাস নাই।”
কৌশল্যা নীরব, কোন কথার উত্তর দিলেন না,কেবল
ভাহার গহল দিয়া বারিধারা বাহিতে লাগিল।
বালিকা উত্তর না পাইয়া বুঝিল, বৃন্ধার প্রকৃতই আহার
হয় নাই। বলিল, “দেখ, বুড়ী! আজ তােকে আমাদের
বাড়ী কাধে করে নিয়ে যেয়ে এখনি ভাত খাওয়াবাে।”
কৌশল্যা সয়েহে বালিকার গায়ে হাত বুলাইয়া বৱি-
লেন,-“দিদিমণি! তুমি ত জান, আমি কারু ভাত খাই না।”
বালিকা। আমি আজ তার কথা শুনবাে না-ভাত
আজ খাওয়াইব-তুই মরে গেলে সন্ধ্যাবেলা আমাদের
শােলক বলবে কে ?
কৌশল্যা। দিদিমণিটে পাগল ! তােমাদের ঘরে একটু
গুড় থাকে ত নিয়ে এস-তেষ্টা পেয়েছে, একটু জল খাবাে-
সেই ক্রয়ােদশবর্ষীয় বালিকা বৃন্ধার পরিতৃপ্তির নিমিত্ত
আপন গৃহাভিমুখে ধাবিত হইল।
চিনি-ননীর দুঃখের সীমা নাই। আর তিন দিন
তাহার অঙ্গার হয় নাই; স্ত্রীলােকের বড় কঠিন প্রাণ, তাই
তিনি আজও বাঁচিয়া আছেন। কাল তিনি চাল ভিজাইয়া-
ছিলেন, কিন্তু লি চাৰি বার মুখে দিয়া, আর যান নাই।
গত পর, শাৰু ও ভাত এক বন্ধনের চেষ্টা করেন, কিন্তু
উনান কিছুতেই জল ধরিল না। আখ ট হওয়ার পর,
;

১০ গিৰিহাখা। একটা বেশী দশকে বৃষ্টি আপিল-এবং y চাল দিয়া জল পড়িয়া, একেবারে উলান নিবিয়া গেল। বা অন্তত একগ্লাস মুখে দিলেন, আর ভাতে হাত দিলেন না। অদ্য তৃতীয় দিনে কিছুই সংস্থান নাই—একটু ন্যাকড়াতে কেব*এক পােয়া আন্দাজ খেসারির ডাল বাঁধা ছিল। তাই তিনি ভােরে উঠিয়া চরকায় সুতা কাটাতেছিলেন। তুলা ফুরাইয়া গেল, অথচ এক পয়সার বৈ মৃত হইল না। সুতরাং আবার তুলা পিজিতে আরম্ভ করেন। বৃদ্ধার ইচ্ছা ছিল,-তিন পয়সার আন্দাজ সূতা কাটিয়া, পাড়ার তিদিগে বেচিয়া, মুদীর দোকান হইতে নুন কিনিবেন। কিন্তু দুর্দান্ত পবন, তাহার এ সাধেও বাদ সাধিল। পিতার মৃত্যুর পর, চিনিবাস যে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তর- ধিকারী হইয়াছিলেন, তাহার কাজ কিছুই নাই। অসায় সংসারে বিষয় বিভবকে অধিকতরপ্রসার বােখে তিনি তালুক, লাখ অমী, বাড়িঘর, পুকুর, খাল, বা কিছু ছিল, সমস্তই বিক্রয় করিয়া যেকােন গ্রামে একধর জাতি বড়মানুষ আছে, বল্পী ফাহাগাই খরিদ করে। চিনিবাসের মা কৌশল্যাকে তাহিরুখ খর হতে যাৰ ফার দেয়। -শ-কন্যার কানেশিয়া, ব্রাহ্মীকে ভাজি ই ছিটেবো গোয়াল- ঘয়া এই ৱে কৌশল ঐ যেই গুখে সুখ কলি চিনলো মল-কানার স্থান করিতে

অনো পৰিছে।
১০৪
ইয়া চুরাইয়া দিন কাটাইতেছিলেন। হঠাৎ একদিন বিধু-
ভুষণ বঙুষ্যে গ্রামে আসিয়া কৌশল্যাকে বলিলেন,-“চিনি-
বাস বড় বিপদে পড়িয়াছেন; অন্তত নগদ হাজার টাকা না
দিলে উদ্ধার নাই; ধনঞ্জয় বাচস্পতি তাহার বাটীতে ডাকাতি
করায় তিনি সর্বস্বান্ত হইয়াছেন; ডাকাতির মােকদ্দমা
উত্তমরূপ প্রমাণ না হলে, চিনিবাসকে জেলে যেতে হবে,
এখন হাজার টাকা না দিলে চিনিবাস বাঁচে না,-এই তার
পত্র দেখ।”
এ কথা শুনিয়া কৌশল্যা কত দিলেন, কাটিলেন ।
বলিলেন, “হাজার টাকা আন্টি কোথা পাব ?”
বিধু বাবু বলিলেন “তবে চিনিবাস জেলে যাক।”
পুত্রের অশুভ সংবাদ পাইলে মায়ের মনের বেগ কি কখন
থামে ? বৃদ্ধার যা কিঞ্চিৎ সংস্থান ছিল, সমস্তই বিধুর হাতে
দিলেন—মােট হইল ১২০ টাকা মাত্র। এক ছাড়া দু-নর
সােণাৱ মালা সাড়ে ছয় ভরির ছিল,তাহাই ১০০ টাকায়
বিক্রীত হইল। নগদ, ১৪ টাকা বৈ ছিল না; একখানি
তাপােষ, একট, বড়, দুখানি থাল এবং একটা সেকেলে
ৰা বেচিয়া ৯০ হইল-সুং একুনে ১২৩/০ লইয়া
বিধু বাৰু চিনিবাসের নিকট যাত্রা করেন।
হায় লাৰু পরিবর্তে ১২৩/০ টাকা পাইয়া চিনিবাস
একেবারে তেলে-লেৰে কালিয়া উঠিলেন। জোশিত
ছিনি কিন্তু বাকে বলিলেন, “ঙ্গে সায়াতি

ििनधन-विजया ব্যক্তি ও সামি ইহজীবনে কখন দেখি নাই ? তুমি ঐ অকিঞ্চিৎকর অর্থ গ্রহণ করিলে কেন? ঐ টাকা সেই বৃদ্ধা লােকের গায়ে ছড়াইয়া দিয়া, “আমি তােমাকেই ইহা গান করিলা” বলিয়া আসিলে না কেন? তাহা হইলেও, আমার সম্মান, গৌরব কতকটা বজায় থাকিত। সেই মায়াবিনী, বুয়া পাকা-ডাইনীর হন্তে যদি কিছুই না থাকে, তাহা হইলে আজও হাতে অন্তত আট হাজার টাকা আছে। সেই পাপী মুসার একটা বিপাপুত্র আছে; মরণ কালে বৃদ্ধা তাহাকেই ঐ টাকাটা দিয়া যাইবে ইহা আয়ি কোন প্রাণে সহ করিব ? বুড়ীর নামে প্রবঞ্চনার অভিযোেগ মানিয়া ফৌজদারীতে মালিশ করিলে হয় না কি?” ক্রমে চিনিবাস ৰাৰু সংহারমূর্তি ধাৰণ করিলেন। প্রলয- কালীন রুমুর্তিবৎ তাহার অঙ্গ দিয়া মহাগ্নি বহির্গত হইতে লাগিল; কখৰ চিনিৰাস-মহাদেৱে, উ ছুটে চেসিভিঘটা আর পর। উছুলিয়া বাম-জল ঝরে ঝর ঝ। গৱ গৰু গৰাক আহি ল ল। কোটা মূ অঙ্গে অগ্নি কৰুে কু কু ॥ হ হল সে ফ ফল হল। ট ইট সেল ফল। বিল কলম ধৰিয়। কাক, মগ কৈ কৰিছে হাঁকা। ;

আশ পরিখে।
দায়াত দে, দোয়াত দে, দেখিব কেমন।
ডাইনী লুকায়ে রাখে জনকের ধন।
প্রলয়-কালের সেই ভীষণমুর্ত দেখিয়া চিনিবাসের নিকট
আর কেহই স্থির হইয়া ধাড়াইতে পারিলেন না। রামকানাই,
রামধন, ননীগােপাল ভয়ে চকু মুদিলেন। তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড
লােপ হয়-হয় দেখিয়া, সেই শক্তিরূপিণী, পবিত্র প্রণয়ের মহা-
খনি, মহাদেবী রামমণি ধনী ধীরে ধীরে কাছে আসিয়া, চিনি
বাসের মাথায় হাত দিয়া সংস্কৃতে বলিলেন-“শাং শান্ত,
শান্তংক্রোধং, সংহরং এভােং।” অমনি পৃথিবী ঠাণ্ডা হইল।
সমস্তই জলবৎ তরলং হইয়া গেল। তখন ঈশ্বর উপাসনার
পর, রামমণির সুপরামর্শে মহাত্মা চিনিবাস কৌশল্যা-
ডাইনীকে এইরূপ পত্র লিখিয়া ডাকে পাঠাইলেন ;-“অয়ি ।
মায়াবিনি। দুষ্টচরিত্রে! কুলকলঙ্ক কারিণি! কুলাবিনা-
পিনি! তার মুখ দেখিলে পাপ হয়! তােকে জননী সমাে-
ধন করিতেও আমার ঘা বােধ হয়। আমি এক হাজার টাকা
মাত্ৰ দাবী করিয়াছিলাম, কিন্তু কি জন্য সে টাকার আট
ভাগের এক ভাগও দিলি না ? অদ্যই ইহার সমুচিত প্রতিফল
দিতাম, কিন্তু কোৰ গৰীয়সী মহিলার অনুৰােধে তাহা ঘটিল
। তােৰ বই অদৃই যে। অদ্য হইতে আমার প্রতিজ্ঞা
তাের মূখ মেধিৰ ৰা, আর তুই যে গ্রামে থাকবি, যে গ্রামে ও
পাপণ করব না।
তােমার একান্ত অনুগত
চিনিবাস।

•
তিনি।
এই পত্র যথাসময়ে গ্রামে আসিয়া পোঁহি। বৃত্তার যদি
কখন কালে ভদ্রে চিঠি আসিত, তাহা হইলে, সেই বালিকা
পত্র পড়াইয়া শুনাইত। বালিকা চিনিবাসকে চিৰিত ; সুতরাং
ঐ পত্রের কথা গােপন রাখিয়া বালিকা বলিল, “ও বুড়ী।
তাের ছেলে আছে ভাল ; শীঘ্ন বাড়ী আসবে লিখেছে ;
এইবাৰ তােকে কলিকাতায় নিয়ে যেয়ে, প্রত্যই গঙ্গাস্নান
করবে বলেছে।
কৌশল্যা। হায়! অামার অদৃষ্টে কি সে সুখ আছে ?
আমার চিনিবাস বেঁচে থাক; তাকে রেখে মরিতে পারিলেই
আমার মুখ।
বালিকা। দূর বুড়ী! তবে তুই কি বৌ নিয়ে ঘর কবি
? ছেলের বিয়ে দিয়ে, বৌ এনে ঘর করে, নাতির মুখ দেখে
আমাদিগে শােলক বলতে বলতে তবে তুই মরবি-
কৌশল্যা। দিদিমণি!
তোন অষ্টে আমি
অলিনি। বার চোখে জল আসিল।
এইরূপে চোখে পলে আষাঢ় গেল, শ্রাবণ গেল, ভাড়
আসিল; ফিনিশ তথা বাদী আগমন করিলেন না।
কোলা বল বালিকাকে বিসে-“চিনিল আমার
করে থরে আসবে, দিবি?” বালিকা উত্তর দেয়, “দূৰ মুখ,
তুই টি কেন? এলে এলাে বলো?”
দিকে দিলিলের | কে ১২ টাকা পাঠানর
পর, একম, সয় হইলেন। জাত খাবার একটা

uরাগণ পৰিলে। গােরা ছিল, ক্রমে সেটাও তিনি বাঁধা দিলেন । শেষ সম্বল মহিল—একটী প্রিতলের ঘটী, এত দুঃখেও, বৃদ্ধা কাহারও প্রদত্ত অন্ন খান নাই। বালিকার মায়ের নাম জগৎতারিী। তিনি কতদিন বৃদ্ধাকে আহারের জন্য কত সাধ্যসাধনা করিয়াছিলেন, তথাচ তিনি একদিনও তাহার গৃহে খাইতে স্বীকৃত হন নাই। তবে বালিকা মধ্যে মধ্যে মায়ের নিকট হইতে সাময়িক ফল মূল লইয়া আসিলে, বৃদ্ধা তাহা গ্রহণ করিতেন। শ্রাবণ মাসে বড় কষ্ট হইল। দিন আর যায় না। বৃদ্ধা সেই পিতলের ঘটিটী বাঁধা দিলেন। তুলা কিনিলেন। তুলা কাটিয়া গ্রামের তাতিবাড়ী বেচিয়া প্রত্যহ যে, দু তিনটী পয়সা পাইতেন, তাহাতেই কোন রকমে তাঁহার দিনপাত হইত। কিন্তু ভাদ্র মাসের সপ্তাহ- কালব্যাপী অতিবৃষ্টিতে চিনিবাস-জননী ত্রিভুবন আঁধার দেখি- লেন। এই ত ব্যাপার। পূর্ব ঘটনা ঐরূপ। দেখিতে দেখিতে বালিকা এবং জগত্তারিণ, বৃকার জন্য জলখাবার বহিয়া লইয়া উপস্থিত হইলেন। অগত্তারিণীর দক্ষিণ হতে বৃহৎ থালা, তদুপরি গুড়, সন্দেশ, মুগের ডাল ভিজান, দোকলা-গাছের দুইটি পাকা আম, পাকান রহিয়াছে। বালিকার হাতে এক ঘটি জল। কুটীর মধ্যে থালা যে কোথায় নামাইয়া রাখেন, তারিখ তাহার স্থান খুঁজিয়া পাইলেন । কৌশল্যা, তাহাকে দেখিয়া “এস এ এস” বলিয়া সলষণ করিয়া বলিলেম, মা আমার এত থাৎ এমেচ কেন?”

চিনি। বালিকা। বুড়ী, তােকে জাল সব খেতে হবে। একটু যদি ফেলি, তাহলে পিঠে এই গুম করে, কীল মাৰবাে-- জগত্তারিণী। এমন ত কিছু বেশী জিনিস নেই—আন্ত আস্তে বসে বসে খাও, খেতে পারবে এখন! বু, উহারই মধ্যে একটু পরিষ্কার স্থানে খালা খানি রাখিয়া দিলেন। বালিকা। বুড়ী, বাবা কলকাতা থেকে ভাল আম পাঠিয়ে দিয়েছেন, খেয়ে দেখ দেখিন, কেমন মিষ্টি জগৎ। আগে আম খেয়ে, তার পর সন্দেশ খেও- কৌশল্যা। না, মা,-আম কি আমি মুখে দিতে পারি মা! আমার চিনিবাস ঘরে নেই ;-বাহা আমার এ বছর বলি আম খেতে পেয়েছে কি না জানিনা। চিনিবাস যদি ঘরে থাকতো, তাকে এই সব আম খাইয়ে, তবে আমি তার একটু চেয়ে খেতাম। আম তুই নিয়ে যেয়ে ঘরে রেখে দে মা! বাছঅামার শীগগির ঘরে আসবে-তখন আমি দুটা চেয়ে আমােক এখ। তুমি মা, ছেলে ছেলে করেই পাগল হলে। ছেলে এদিকে, ভুলেও একখানি চিঠি লেখে না, বুড়ী মলে কি রইলো, একবার চেয়ে দেখে না। बागा बरी ফ্যাল ফ্যাল নেরে চাবিয়া গৎ- তাকিকে জিজ্ঞাসিলেন, “বে কি, মা, চিনিল আমায় বলে ববে যা ?

বালিকা। বুড়া, তুই খা খা; তাের ছেলে এই মাসেই
ঘরে আসবে-
বৃদ্ধা তখন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া, অন্তরে চিনিবাসকে
ভাকিয়া, ছল ছল চোখে খাইতে বসিলেন। গুড় আর মুগের
ভাল ভিজান খাইলেন, অন্য কিছু গ্রহণ করিলেন না,ঝলিক।
সন্দেসট খাইবার জন্য অনেক জেদ করিল; বৃদ্ধা উত্তর
দিলেন, “সন্দেস কি আমরা খেতে পারি ? চিনিবাস ঘরে
আসুক, তাকে সন্দেস দিব, তােকে আঁচল ভরে সন্দেস দিব
—তাহলেই আমাদের খাওয়া হলো।”
বালিকা। বুড়ীকে যমে ধরবে কবে গা ?
কৌশল্যা। মরণ কি আমাদের অদৃষ্টে আছে, তা হলে
অনেক দিন আগে মৰ্ত্তাম। তুমি আয় একখানি চিনিবাসকে
চিঠি লিখে দাও না ? যাছাকে না দেখে আমার প্রাণের
ভিতর কেমন হু হু কষ্টে;
ক্ৰমে বৃদ্ধা, সমগ্র পৃথিবী যে, চিনিবাসময় দেখিতে লাগি
লেন। একটু বেগে বাতাস বহিল, বন্ধ ভাবিলেন বুঝি আমার
চিনিবাস আসিতেছে। তালপাতার আগড় বড়ু খছু করিতে
লাগিল, বৃদ্ধা ধির করিলেন, চিনিবাস বুঝি কাড়াইয়া আগড়ে
থাকা মারিতেছে। আকাশ হইতে বৃষ্টির জল টপ টপ পড়িল ;
বার ধারণা, রতিসঙ্গে আকাশপথ হইতে চিনিবাস নীচে
নামি। কাক, কা কা জাকে; বু ভাবেন, সে বুঝি চিনি-
বাসের সংবাদ আৰিয়াছে। বৃকার বুলি হইল, “চিনিবাস,
চিনিবাস, বিনিবাস।”

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
এদিকে কলিকাতায় কুরুক্ষেত্র কাণ্ড। পথে পথে বিবিধ
রঙের মূরপুচ্ছবৎ প্লাকার্ড। তাহাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা
আছে।
টাউনহলে
মহাসভা-বিরাট বক্তৃতা।
নিষ্কাম ধৰ্ম্ম
ঐচিনিবাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
শনিবার সন্ধ্যার পর অতি
সুললিত স্বরে সুমধুর
বক্তৃতা করিবেন।
অনুত দৃশ্য ! অদ্ভুত দৃশ্য !। অদ্ভুত দৃশ্য !!!
এ মুবিধা কখন হাড়িবেন না।
আসুন, আসুন, আসুন।
শিক্ষিত মহিলাগণের সঙ্গীত।
সুবিধা কখন ছাড়িধেন না।
আৰ, আসুন আসুন।
}

দুশি পরিচ্ছেদ।
লবঙ্গল পত্রিকায় ঐ ভাবেরই একটা “বিশেষ দ্রষ্টব্য
প্রকাশিত হইল। তবেই ইহাতে বেশীর ভাগ এই লেখাছিল,
“চারিটার মধ্যেই নরনারী সমাগমে টাউন হল পূর্ণ হইয়া
যাইবে; যাঁহারা বিলমনোরথ না হইতে চান, তাহারা যেন
চারিটার পূর্বেই আসিয়া স্থান অধিকার করিয়া লয়ন।”
কতকগুলি বালক ইস্তিরি করা সাদা ধপধপে পিরাণ গায়ে
দিয়া, পায়ে ইষ্টাকিন আঁটিয়া, একটা লাল ফিতে বুকে বাঁধিয়া,
পথে পথে মােড়ে মােড়ে, গলিতে গলিতে, আফিসে আফিসে,
স্কুলে স্কুলে, গির্জায় গির্জায়, নৌকায় নৌকায়, রেলে রেলে—
লাল কাগজ বটন করিতে লাগিল। তাহাতেও ঐ কথা লেখা।
তখন কেশবচন্দ্র সেন জীবিত ছিলেন। চিনিবাসের
দল কয়েকটী বিজ্ঞ লােক তাহার নিকট গিয়া ধরিয়া বসি-
লেন,—“অদ্যকার মহাসভায় আপনাকে উপস্থিত থাকিতেই
হইবে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া গমন না করিলে, সমস্তই
বৃথা” কেশব বাবু গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “সামাজিক কার্যের
সহিত আমার সম্পূর্ণ সহানুভুতি আছে, কিন্তু আমার শরীর
অসু; সুতরাং যাইতে অক্ষম।”
বিলােকগণ তখন বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ধরিলেন।
তিনি বলিলো “বাপু! এ বয়সে আর আমাকে টানাটানি
কর কেন? আমি ওসব কাজ অনেক দিন ছাড়িয়া দিয়াছি।
আমাকে মাপ কর-দেশে অনেক বড় বড় লোেক আছেন,
তাঁহাদিগকে লইয়া খাও।”

চিনি-ছবি। অমণঃ ঠাহারা শ্রীযুক্ত রামতনু লাহিড়ীর ঘাড়ে গিয়া পড়িলেন। সেই সুধীর সৎপ্রকৃতি রামতনু বাবু তাহাদের প্রস্তাব শুনিয়া বিব্রত হইলেন। বাস্তবিক, ডাক্তারগণ কোন বিষয়ে কিঞ্চিত্র পরিশ্রম করিতে তাঁহাকে তখন নিষেধ করিয়াছেন। তিনি অতি কুণ্ঠিত হইয়া বলিলেন, “আমার ত কোথাও যাবার যাে নাই ; ডাক্তার পরিশ্রম করিতে নিষেধ করিয়াছেন।” সেই দল প্রধান বিজ্ঞ ব্যক্তি উত্তর করিলেন, জাপনার কোনও কষ্ট হইবে না। পাকা করে ধীরে ধীরে আপনাকে নিয়ে যাব ; বেশ একটা নিরিলি জায়গায় বসিয়ে আখৰৰ-একটুও পরিশ্রম হবে না।” রামসু বাৰু। আপনাদের কথায় আমার যাবার বড় ইচ্ছা হচ্ছে। আমি গেয়ে যদি আপনাদের অভিলাষ পূর্ণ হয়, তাহা হইলে আমি অবশ্যই যাইতে রাজী আছি। কিন্তু এ কথা আমি একবার ডাক্তার বাকে জ্ঞাসা করিব, তিনি যদি বলেন, তবে নিশ্চয়ই যা।” এখানে অর্থ-আশ পাইয়া, আঁহারা কৃষ্ণদাস পালের নিকট গেলেন। তাঁহার নিকট নিম্নলিখিত প্রভাৰ হইল ; নীতিতে আপনার সহিত মতভেদ থাকিলেও এ উনবিংশ শতাব্দীতে ষানীতি ব্যাপারে আমরা সকলেই এক প্লাট- ফরমে গড়াইয়া আছি। যুক্ত চিনিবাস বন্দ্যোপাধ্যায় মায়েৰু স্বপেনার যােগাৰ কৰা একান্ত ক? কৃষ্ণ পল মাশয় বললেন-“আপনাদের চতুর্দশ খবিচ্ছে। সত্তার বিষয় আমি কিছুই অবগত নহি , কি কি বিষযে আন্দোলন হইবে, তাহাও জানি না-সুতরাং, এমত স্থলে আমার যােগদান করা সম্ভব। বিশেষতঃ, শনিবার দিন ঠিক ঐ সময়েই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ানসভার কাৰ্য্য হইবে। অতএব তখন আমার অন্যত্র যাওয়া ঘটিবে না। আচ্ছা, তবে আপনার। সামাজিক আন্দোলন উপস্থিত করুন,আমি সম্যকরূপে বুঝিতে পারিলে অবশ্যই যােগ দিব। সৎকার্যে কে না সহানু- ভুতি দেখাইবে ?” তখন চিনিবাসের দল, নিরাশা-নীরে নিমগ্ন হইয়া চিনি- বাস-সমীপে উপনীত হইয়া বলিলেন,-“প্রলে। নির্দিষ্ট ব্যক্তিগণের মধ্যে কেহই সভায় যাইতে স্বীকৃত হইলেন না, আমরা চেষ্টার ত্রুটী করি নাই।” তখন চিনিবাস চক্ষু একবর্ণ করিয়া অমিত্রাক্ষরে উত্ত- রিলেন, অতি বৃদ্ধ, অতি বিজ্ঞ, সেকেলে প্রবীণ, বালাভােলা বাহাত্তরে, বিগত-যৌবন,- বসা-চোখকে চায়, হেন নরে আজ? কুলে কালী কৃষ্ণদাস, সামাজিক কথা, কি বুঝিবে ? সভাস্থলে ভ্যা ভ্যা গঙ্গারাম। বিদ্যার সাখৰু ৰটে সেটা নামে কামে কিন্তু চটী জুতা না, ছি শিরে কি ! পাকা চুল কাটা প্রেমাদ হয়।

কেশব কেবল কথা, কালে কাজী নয়;
বহুদিন আশাল শুক’য়ে ওর।
লাহিড়ীর তরে সভা নহে লালায়িত,
পােণ-ফুলবনময় চুল বার গিয়ে।
আষাঢ়ের মেধূ মত গভীর গর্জনে,
উক ডাকি আমি বলি শতবার,
কাহারে না ভরি আমি; ভমরুর রবে
ভীত নয় কাল ফণী,দীপ্ত দিনমণী
এবে ; সভ্যতা-আলােকে, আলােকিত মহী।
বেঁচে থাক ছাত্রবৃন্দ চিরজীবী হয়ে।
সভার গোঁৱব তারা ; ব্রহ্মাণ্ড উজ্জল ;
লিনী-ভূল; এস-কোকিল
বৈশাখের পাকা আন্ধু নিদাঘের জল ;
বক্তৃতা-অমৃত-পানে অব্যয়, অক্ষয় ;
বেঁচে থাকু হায় চিলাৰী হয়ে।
মখীন নধর কি বালক গঠন।
শাট কটি মুখে কিবা বাসি খানি কথা!
তার তালে তালে বি হাত ভাজি।
“শুনেন নি পান্না
•

চকুৰ পৰিবে।
?
কার শক্তি বােখে মাের গতি ? বেগবতী
শ্রোতস্বতী ভীমগিরি ভাঙ্গি পাড়ি যৰে
ভাবে বেলে যায় ; পারে কি রে তৃণগুচ্ছ
-তুচ্ছ অতি যাহা-নিবারিতে সে বিক্ৰম ?
সিংহাসনে বাদ কভু করে কি শশকে।
জোনাকি চায় কি কভু দেরে ঢাকিতে ?
তরবারি সহ কবে যুঝেছে পাকাটি
বেঁচে থাক ছাত্রবৃন্দ চিরজীবী হয়ে।
জীবন-ভরসা তােৱা-কাঙ্গালের ধন।
সেনাপতির উৎসাহ-বাক্যে উৎসাহিত হইয়া সকলে কোমর
ধিলেন। পঞ্চকন্যা যথাবিধি অস্ত্রশস্ত্রে ভূষিত হইয়া কলপ ও
বং বল বল করিতে লাগিলেন
জীর, তারা,
মত চিনিবাস বেগে, সদল, টাউনহলে আসিয়া পেছিযাই,
আগমন-বার্তা ঘােষর জন্য স্বয়ং ভেপু বাজাইয়া দিলেন।
দূরস্থিত বালকবৃন্দের কর্ণে তাহা যেন সুধাবৎ লাগিল।
বালকের মন-পাখী উধাও হইয়া উডিল। ঐরুষ্ণের মােহন
বংশগবর্নিতে যেন গােপিনীকুলের মন মজিল। কোন বালক
স্কুলের ছাত্র পর, এক ক্রোশ পথ হাটিয়া আসিয়া, জলযােগ
কৰিতে বসিয়া সবেমাত মেঠায়েৰ টক দানা জাতি-
খায়-অমৰি সেই সুধাময় সুললিত সুর হার কাল
পল। আর নেই। এই কি জানি ফুটিলেন।
আর একটি কালক সহ আরেই কুহেলি? প্রথম বালকের
উল্কা, বাযুব

চিনিন চরিত।
?
G
দৌড়াদৌড়িতে তাহার ঘুম ভাঙ্গিল। সে যাইয়া তাহায় হাত
ধরিয়া বলিল, “ভাই! এত বিরত হইয়া তুমি কোথা
যাইছে? আমায় শীঘ্র বল। এত ব্যাকুল কেন ? প্রথম
বালক গদগদ-স্বরে বলিল,-
ভাই! ভেপুব কিবা শুনিলাম ।
কাণের ভিতর দিয়া, মরমে পশিল গাে,
আকুল করিল মাের প্রাণ।
জানি কতেক মধু,
ভেপুরবে আছে গো,
পরাণ হাড়িতে নাহি পারে।
কোন বালক, গৃহ-শিক্ষকের নিকট পাঠ লইতেছিল ;
ঙে পুৰ শুনিবামাত্র, সেটেকামড়ানির ভাণ করিয়া, বাহিরে
গেল ;-ক্ষার ফিরিল না। কাল বালক উটা পিরিহাণ
গায়ে দিয়াই বেগে ধাইল। দুই পা জুতা পায়ে দিতে
বিলম্ব হইবে বলিয়া কেহ বা একপাটী জুতা অর্ধ-মাত্রায় পায়ে
দিয়াই দুটিল। কোন বালকের গায়ে পিরিহাণ নাই,
ঋধে চায় নাই, এক ছুটেই চলিয়াছে। কোন বালকের
শিক্ষা, ছেলেটিকে ধরিয়া রাখিয়াছে; বালক শিকার বাহু-
স্বয়ে যেতে হইয়া, পিঙ্ক, রাশির নয় কেবল
টটু রুতি আৰু মুখে
মায়, মুৰ বুলিয়ে
মা কি,
আমারে ছেড়ে

চতুর্দশ পৰিছে। বালকের পিছু পিছু ছুটিয়াছে। তন্মধ্যে একটি বৃদ্ধ-বালক উলঙ্গের উদ্দেশ্যে বলিল, “ওরে ছেলেগুলাে, তােরা ঘরে ফিরে খা—আমাদের সঙ্গে কোথা যাবি ?” তাহারা কাঁদ-কাদ সুরে বলিল, “না, না, মা,—আমরা যাবাে।” এইরূপে নানা রঙের, নানা ঢঙের বালক, একে একে, দুয়ে-দু'য়ে, দশে দশে, দলে দলে দেখা দিল। সহরের সমগ্র বালক সভাস্থলে উপস্থিত। যে সকল বালক বােগ, গুরুজন-ভয়, অথবা উথান- শক্তি-রহিত-হেতু, সভাস্থলে শরীর-ধারণ পূর্বক আসিতে অক্ষম হইল, তাহারা ঘরে থাকিয়াও সভায় মন, প্রাণ, আত্মা পাঠাইয়া দিল। ব্যাপার অদ্ভুত হইয়া দাড়াইল। একজন তত্ত্বজ্ঞ পুরুষ তাহার বন্ধুকে জিজ্ঞাসিলেন, “এ সময় যদি (টাউনহলটা ভাঙ্গিয়া পড়ে তাহলে কলিকাতার সমস্ত লােকই কি নির্বংশ হয় ?” তিনি বলিলেন, “ভাঙ্গিয়া পড়িলে দুই চাঞ্জিটা ছেলে বাঁচিতে পারে; কিন্তু সমভাবে সভায় থাকিলে, নিশ্চয়ই পিণ্ডলােপ; ভিটায় কাহারও সন্ধ্যা পাইবে না- পিতৃপুরুষের পিলােপ ত হইবেই।” ষোলকলা পূর্ণ হইল। চিনিবাস অঙ্গঝাড় দিয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন। খুখিতা বাঘিনী যেন সম্মুখে শীলর পাইয়া, লােভ-লােলুপৰেত্রে চারিদিকে দেখিয়া, জন্তু বিকাশ পূর্বক বন্যাদান করি অথবা কালনাগিনী যে, ল্যাজে লগু হারিত হয়। সে কেঁল করিয়া উঠিল। “চনিবাস টাকা-গালিতে অক্সিলেন ;-“অমহিলাগণ।

তিনিবাস মৃত। মহােদৱগণ! ভারতে নাই কি?-ঐ দেখ, উত্তরপ্রান্তে সু- উচ্চে, সদুষ্ট, অত্যুচ্চ হিমালয়-নামী মহতী গিরি মাথা খাড়া করিয়া দণ্ডায়মান,—এমন পৰ্বত কোথায়ও দেখিয়াহ কি ? ইউরোেপ খুঁজিয়া আইস, আমেরিকা, আফরিকা, তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান কর—অষ্ট্রেলিয়ায় যাও,—এমন উচ্চ পর্বত কোথাও দেখিবে না! তাই বলি, ভারতে নাই কি? আবার নদীর দিকে দৃষ্টিপাত কর,-গঙ্গা, গােদাবরী, গােমতীর সহিত পৃথিবীর কোন নদী তুলনীয়া ? ভারতীয় শ্রোতস্বিনী যেরূপ সুল , সুন্দরী, সেরূপ আর কোথায় ? (করলি) মহা- সাগরের কথা কাহারও মনে পড়ে কি ? বঙ্গোপসাগরের মত এমন তরঙ্গমালাসঙ্কুল, সুপ্রশস্ত মহাসাগর আর কোথায় আছে কি? আর ওদিকে, ' উচ্চ গগনগর্ভে চন্দ্রের প্রখর উজ্জ্বল জ্যোতি তাকাইয়া দেখ।—বুঝিবে, এমন সুধাময়ী ঠা ভারত ব্যতীত আর কোথাও নাই। তাই বলি ভারতে নাই কি? “দি সবই আছে, তবে এত ঘন ঘন কুর্ভিক্ষ কেন ? (শােন, শােন) উদরায়ের জন্য আমরা পরের দ্বারস্থ কেন? ইহার একমাত্র মুখ্যতম কারণ—নারীজাতির অবনতি। (থন করতালি)। আবার বলি, নারীর অবনতি | করতালি চির- কুসংস্কারে যীভূত হইয়া আমরা মারা যাইতেছি। স্ত্রী-স্বাধী- না, কিল, এ-ব্যায়াম এবং কিববিহু, অসবর্ণবিবাহ, এ সব স্কুপ্রথা পাদের দেশে আছে কি। ইউকােপে ইহু চতুর্দশ পরিচ্ছে। ; আছে বলিয়া ইউরােপ রাজা; ভারতে নাই বলিয়াই ভারত প্রজা। ঘন করতালি)। আজই এ সুপ্রথা ভারতে সুপ্রচলিত হউক,-কালই দেখিবে, যাদুমন্ত্র-বলে ভারত সজীব হইয়া উঠিয়াছে। একটা বিষয় আপনারা প্রণিধান করিয়া ভাবুন,-স্বাধীনতা ব্যতীত, স্বাধীনভাবে যথাতথা বিচরণ ব্যতীত, রমণীকুলের স্বাস্থ্যরক্ষা হয় না। একজন প্রসিদ্ধ মার্কিণ ডাক্তারের ইহাই মত। একটা দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝাইয়া দি। একটী পিঞ্জরাবদ্ধ হিন্দুমহিলার পেটের অসুখ ছিল, কিছুতেই আরাম হয় না। এমন সময় একজন বিজ্ঞ ফরাসি- ডাক্তার এ দেশে আসিলেন; তিনি ব্যবস্থা দিলেন, রমণীকে স্বাধীনভাবে রাজপথে বিচরণ করিতে দাও, রােগ আরাম হইবে। স্বাধীনতা পাইয়া এক সপ্তাহ মধ্যে রমণী নীরােগ হইলেন, শেষে চায়েন হইয়া উঠিয়া বংশের নাম উজ্জ্বল করিলেন। (ঘন ঘন করতালি)। ঘন ঘন করতালি)। অসুস্থ রমণীর ছেলেও অসুস্থ হইবে, সুতরাং ভারতের আর আশা কোথায় ? আর দেখুন,ভারতের অনেক জমি এখনও পতিত আছে, গর- আবাদী নিবন্ধন শস্য কম হয় বলিয়াই ভারতবাসীর অনুকষ্ট। বিধবাবিবাহের প্রথা প্রচলিত হইলে, অনেক অতিরিক্ত সন্তান অবশ্যই জমিতে পারে। তাহাৱা তখন জঙ্গল-ভূমি আবাদ কয়াি ভারতের দুঃখবিমােচন করিবে। (করঙালি) কোন কোন অল্পবুদ্ধি, অদূরদর্শী মানব বলিয়া থাকেন, “ভারতে পুরুষের সংখ্যা কম, স্ত্রীলােকের সংখা অধিক; বিধৰাৰ ১২০ চিনি-চরিতামৃত। বিবাহ হইলে, অনেক স্ত্রীলােককে পুরুষ অভাবে চির-কুমারী থাকিতে হইবে।” এ সম্বন্ধে আমার প্রথম বক্তব্য, ভারতে স্ত্রী পুরুষের সংখ্যা সমান, বরং চক্ষু মুদ্রিত করিয়া ভাবিয়া দেখিলে, পুরুষের সংখ্যাই অধিক বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে। চীন পরিব্রাজক হােয়েন্থশাং এ বিষয় বিশেষ প্রমাণ করিয়া গিয়াছেন। আর ভট্ট মােলর, মিল, মেকলে, আর ও- বাড়ীর সেজ বাবু—এ সম্বন্ধে সকলেই একমত, সুতরাং প্রমাণ অকাট্য শিরােধার্ঘ্য। আর যদি মনে করেন, পুরুষের সংখ্যা কম-অতএব বিধবাবিবাহ প্রচলিত হইলে, অবিবাহিতা বালি- কারা চির-কুমারীই থাকিবে,—তাহা হইলেও এক্ষণে আপাতত বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত। যখন পুরুষ অভাবে কতকগুলি স্ত্রীলােক নিশ্চয়ই অবিবাহিত থাকিবে,-তর্কের খাতিরে ইহা ধরিয়া লওয়া হইল,—তখন কেবল বিধবারা ইহার ফলভােগ হইবে কেন ? সাম্য ও ন্যায়ের বিচারে কুমারীগণও ফলভােগ করিতে বাধ্য। নচেৎ পক্ষপাত-দোষ- দুষ্ট হইতে হয়। পালা প্রথার সৃষ্টি হউক। একশত বৎসর বিধবার বিবাহ হউক। আর তৎপর একশত বৎসর কেবল কুমারীদের বিবাহ হউক। এই সৎসামঞ্জস্যে অধিক সুফল প্রসব করিবে। ( করতালি) জাতিভেদই যত অনর্থের মূল। আমি ব্রাহ্মণ বটি, কিন্তু অামায় মন' এমনই ভাৰে গঠিত হইয়াছে যে, আমি চণ্ডাল বা তাঁতিৰ উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করিতে ঘৃণা করি না। সমাদরে

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
সসম্মানে, তাহাদের সহিত কোলাকুলি করি। ইহা সংশিক্ষার
একমাত্র ফল। তাতিজাতিকে অস্পৃশ্য বিবেচনায়, আমি যদি
তাহাঁর ছায়া না মাড়াই, তাহার সঙ্গে হাতধরাধরি করিয়া
বেড়াই, তাহা হইলেকি উভয়ের মধ্যে কখন ভাতৃভাব
জন্মে? আর ভ্রাতৃভাব ব্যতীত উদ্ধারের কখনও আশা নাই ।
দুর্যোধনের সহিত যুধিষ্ঠিরের যদি ভ্ৰাতৃভাব থাকিত, তাহা
হইলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ অটিত না। রাম যদি রাবণকে বাহুবেইন
করিয়া ভ্ৰাতৃভাবে আলিঙ্গন করিতেন, তাহা হইলে সীতা
লইয়া আর এত গােলযােগ ঘটিত না। আবার এ দিকে
দেখ, পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে খুব নিগুঢ় ভ্ৰাতৃভাব ছিল বলিয়াই
এক-স্ত্রী দ্রৌপদীতেই পাঁচজনেই উপগত হয়েন। অর্থাৎ
ভ্রতৃভাব থাকিলেই কিছুতেই আটক হয় না, কিছুতেই দ্বিধা
বােধ হয় না। (ঘ, ঘন করতালি )। ভারতে সেই ভ্রাতৃ-
ভাবের অভাব—সেই ভাব—সেই মহাভাব, ভারতীয় 'নরনারী-
মধ্যে এখনি প্রচলিত হউক-এখনি প্রচলিত হউক--আর
বিলম্ব সহে না—সহে না--সহে না। '(ঘন ঘন করতালি )
অথবা বােধ হয়, পাশ্চাত্য শিক্ষিত, সভ্য যুবক এবং যুবতী
নির্বিকারচিত্তে এ প্রথা অবলম্বন করিয়া থাকিবেন। ( সভ।
হইতে হাঁ, ই, করিয়াছি) (ঘন ঘন করতালি ।।
স্য আমি মুক্তকঠে, উচ্চরবে, হুহুঙ্কার করিয়া ঘোষণা
করিতেছি, নির্বিকার ভাতৃ-ভাবের এই মহাপ্রথা যেন, আগামী
কল্য হইতে ঘরে ঘরে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় ;-চেৎ রক্ষা নাই,

চিৰ-চরিতামৃত।
রক্ষা নাই, রক্ষা নাই—দেশ গেল, দেশ গেল, দেশ গেল।
( ঘন ঘন করতালি)
ভারতীয় নরনারীর দুর্দশা দেখিয়া সতত আমার প্রাণ
কঁদে বলিয়াই এরূপ গলা চিরাইয়া, মুখে রক্ত উঠাইয়া, অতি
চীৎকারে এ কথা ঘােষণা করিলাম। ইহাতে যদি কাহারও
কাণে তালা ধরিয়া থাকে, তবে তাহার নিকট আমি ক্ষমা
প্রার্থনা করিতেছি। সেই ছিন্নভিন্নকেশা, মলিনবেশা, অনা-
থিবী, রমণীর দুর্দশা দেখিলে কাহার না চোখ ফাটিয়া জল
পড়ে? (করতালি) এ প্রশস্ত ভারতবর্ষ মধ্যে এমন কি কোন
সামাজিক বীর নাই, যিনি ভারতীয় রমণীকুলের দুর্দশা দূরী-
করণার্থ, হিমালয়-গিরি খণ্ড খণ্ড করিয়া সাগরজলে ভাসাইতে
পারেন, ঐরাবতী উপাড়িয়া সাহারায় ফেলিতে পারেন,
গােদাবরী গলায় গাঁথিয়া গভীর গরিগুহায় ঢুকাইতে পারেন,
অথবা গ্রহ-নক্ষত্র ধরিয়া গিলিতে পারেন? এমন মহানুভব
ব্যক্তি-হিমালয় হইতে কুমারিকা পৰ্যন্ত, সুদূর গান্ধার
হইতে ব্ৰহ্মপুত্ৰ পৰ্যন্ত এই বিস্তীর্ন ভূখণ্ডেকেই কি নাই ?
কেহ কি নাই? (ঘন ঘন করতালি। ( সভাস্থল হইতে
আছে, আছে)।”-
চিনিবাসের তিনটী চর টাউনহলের উপর নীচে চারিদিক
ঘূরিয়া নানা বিষয় পৰ্যবেক্ষণ করিতেছিল। তাহাদের
একন আসিয়া কি একটা কথা চিনিবাসের কাণে কাণে
বলিল। বক্তার মুখ অমনি বিষম বিষয় হইল। গলার সুর
-

চতুর্দশ পরিচ্ছে। ১২৩ ; ভাঙ্গিয়া গেল। বুক ধড়াস ধড়াস করিতে লাগিল; সেই চরকে তিনি ধীরে ধীরে বলিলেন, “সেই বৃদ্ধা পাপীয়সী যেন কদাচিং উঠিতে না পায়, তাহার বন্দোবস্ত কর—এবং সেই দুৰ্ম্মের সহায়কারী অঘাের বাবুকে চোর অপরাধে পুলিশের হাতে গ্রেফতার করাইয়া দিতে পারিলে ভাল হয়।” চর ‘তথাস্তু' বলিয়া চলিয়া গেল। চিনিবাস তখন ঝিম আওয়াজে বক্তৃতার উপসংহার অারম্ভ করিলেন ;-“শ্রোতৃবৃন্দ ! তলভঙ্গ-হেতু অদ্য আমায় ক্ষমা করিবেন। মনের আবেগ, শ্বাস প্রশ্বাসের প্রতিরােধ- বশত, উচ্চকণ্ঠে চীৎকার-হেতু, বক্তৃতার তেজে আমার হঠাৎ দম আটকাইয়া গিয়াছিল, তাহাতেই বিলম্ব ঘটিল। আপনা- দের যদি বিশ্বাস না হয়, তবে ডাক্তার ডাকিয়া আমার কণ্ঠনালী পরীক্ষা করিতে পারেন। (করতালি)। বিশেষত, রাজনৈতিক বক্তৃতাই আমার কেল্লা। হঠাৎ সামাজিক ব্যাপারে হাত দিয়া, শরীরের কল বিকল হইয়া গিয়াছে। { করতালি)। তাই, আরও অনেক কথা বলিবার ইচ্ছা থাকিলেও, শিরঃপীড়াবশত অদ্য উপবেশন করিতে বাধ্য হইলাম। (ঘন ঘন করতালি)।”

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।
অনেক কথা বলা হইল না। যে গ্রামে চিনিবাসের বাস,
সে গ্রামের নাম বলিব না; সেই বালিকার নাম বলিব না,
আর বলিব না,—সেই কলিকাতা-প্রবাসী বালিকার স্বামী
অঘাের বাবু কোন স্থানে কি চাকুরি করেন। এ সব কথা,
অনেকের জিজ্ঞাস্য হইলেও নিগুঢ় কারণবশত তাহা প্রকাশ
করিতে পারিলাম না।
চিনিবাস, অঘাের বাবুর চক্ষে ধুলা দিয়া, ভিড়ের মধ্যে
মিশিয়া টাউনহল হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। অঘােরনাথ,
অনেকক্ষণ চিনিবাসের অপেক্ষা করিয়া, শেষে কাহাকেও না
দেখিতে পাইয়া, বৃদ্ধাকে লয়া ভগ্নমনে ঘরে ফিরিলেন ।
বৃন্ধ। কেবল কাঁদিলেন। “বাবা! মিনিবাস, তুই কোথায়
গেলি, বলিয়া শেষে তিনি আর্তনাদ আরম্ভ করিলেন।
সেই এয়ােদশবর্ষীয়া বালিকা ধীরে ধীরে, চুপে চুপে মরাল
গমনে আসিয়া, বৃদ্ধার চোখ টিপিয়া ধরিল। বৃদ্ধা দিতে
কাদিতে বলিলেন,-দিদিমণি! কলকাতা এনেও তুমি
বাছাকে আমার দেখাতে পারিলে না-তােমার দোষ কি ?
এ সবই আমার অদৃষ্টের লিখন।”
বালিকা একখানা গামছা আনিয়া বলিল, “এইবার বুড়ীর
মু বঁধিব। অমন করে কাঁদলে হাত পা বেঁধে গঙ্গার জলে
ফেলে দিব।”~~

পঞ্চদশ পরিচ্ছে।
১২৫
.
;
বৃদ্ধার মুখে ঈষৎ হাসি দেখা দিল। অতি দুঃখে মানুষ
হাসে। তখন চিনিবাস-জননী কৌশল্যা উত্তর দিলেন,
'গঙ্গায় এখন হাড় পড়িলে ত আমি বাঁচি। এ পােড়া কপালে
কি সে সুখ আছে ? দিদিমণি ! রাত হলে ; তুমি খাওযা
দাওয়া করে শােও গে ; বুড়া মরবে না।”
এইরূপে রাত্রি গেল, দিন আসিল। বালিকা অতি প্ৰাষে
উঠিয়া বৃদ্ধার ঘরে দ্রুতপদে হাজির হইল। দেখিল, বৃদ্ধ
জাগিয়াছেন, তথাচ শুইয়া আছেন ; আর বালিসের দিকে মুখ
করিয়া কেবল চোখের জল ফেলিতেছেন। কৌশল, বালি
কার সাড়া পাইয়া আস্তেব্যন্তে উঠিয়া বলিলেন, “তুমি দিদি
এত ভােরে উঠেছ কেন ? শেষ রাত্রে পালিয়ে এলে, নাত,
জামাই ভালবাসবে কেন ?”
বালিকা। আমার হাত "সুড় সুড় কচ্চে, তোকে ভুট।
কিল মারব বলে এসেছি, ;-অর আজ কাঁদলেই নাক কেটে
দিব ।
কৌশল্যা। না,—দিদিমণি, আমি কঁদি নাই; এখনও
কাক ডাকে নাই, তুমি ঘরে যেয়ে শােও গে-
বালিকা। গঙ্গায়, নাইবি না ?
কৌশল্যা। তুমি পােলাও গে,—আমি পি-কে সঙ্গে নিয়ে
গঙ্গায় যাবাে এখন।
বালিকা তখন বৃদ্ধার হাত ধরিয়া বলিল, “দূর ! বুড়ী
পাগলি!-দোয়ারগােড়ায় গাড়ী দাড়িয়ে,-আমি যাব, ঝি

টিৰিবাস-মিতা। যাবে, তুই যাবি, আর রামা চাকর যাবে,শীগগির, আয়, শীগগির আয়।” গঙ্গাস্নান হইল। একটী ভাবের মুখ কাটিয়া বালিক। বলিল, “বুড়ী তুই শীগগির এই ভাবটা খা-এতে বিষ আছে, খেলেই মরবি ?-তুই যে বলি, আমার মরণ নেই,-একবার ভাবটা খেয়ে দেখ, এখনি কেমন না মরিস ? আর তুই যদি ডাবটা না খাস, তা হলে আমি এখনি ভাবটা খেয়ে মবুবাে।” বৃদ্ধা একটু হাসিয়া অগত্যা ডাবজল পান করিলেন । বালিকা বলিল, “বুড়ী! তুই একটা ভাল শােলক মনে কবু, আমি ওঘর থেকে এসে শুনবাে।” ও-ঘর অর্থে শ্ৰীযুক্ত অঘােরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের শয়ন-ঘর । অঘাের বাবু সাদাসিদে লােক। ঘরে আসবাব অনেক, কিন্তু জান নাই। গৃহিণীটীত বালিকা,“আজ সাত দিনমাত্ৰ কলি- কাতায় স্বামিগ্রহে আসিয়াছেন। থার পুস্তক অনেক। কতক- গুলা বই কেদারার উপর, কতকগুলা বিছানার উপর, কতক- গুলা টেবিলের উপর। বালিকা প্রথম আসিয়াই দেখিল স্বামী নাই; তখন আপন মনে পুস্তকগুলি গুছাইয়া টেবিলের উপর রাখিতে লাগল। টেবিলের এক অংশে বাঙ্গলা বই অন্যাংশে ইংরেজী বই, সাজান হইল। দোয়ত, কলম, ডাকের কাগজ মধ্যস্থলে রাখিয়া নিজ অঞ্চল দিয়া বালিকা টেবিল ঝাড়িল । শেষে কপাট ঠেশাইয়া, দলে আপন মুখটী যেন ভয়ে ভয়ে একবার দেখিয়া লইয়া, ভাড়াঃ গর্পণ রাখিয়া

পঞ্চদশ পরিচ্ছে।
;
দিল। এত কাজ সমাপ্ত হইল, তথাচ বৈঠকখানা হইতে
আঘাের বাৰু অন্দরে আসিলেন না। লজ্জাশীলা বালিকার
আজও এমন সাহস জমে নাই যে, স্বামীকে বাহির হইতে
ভাকিয়া পাঠান ; স্বামীর কাছে আজও রালিকা ঈষৎ ঘােমটা
দেয় ; চারি চক্ষু চাওয়াচায়ি করিয়া নয়নবাণ হানাহানি করিয়া
আজও সে কথা কহিতে শিখে নাই। বালিকা তখন মাথাটা
হেঁট করিয়া বিনম্রভাবে; ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে স্বামীর সহি •
কথা কহিত। সেই স্ত্রী কেমন করিয়া স্বামীকে ডকিতে
হুকুম করিবে ? বালিকা কেদেরায় বসিয়া মনে মনে রামায়ণ
পড়িতে আরম্ভ করিল। বেলা ৯টা বাজে, তথাচ অঘাের বার
ঘরে আসিলেন না। দেখিতে দেখিতে ১০টা বাজিল,
সানাহার হইল না—স্বামী কোথায় গেলেন ?—এই চিন্তা
বালিকার মনোমধ্যে উদয় হইল।-বালিকা তখন গৃহ হইতে
বাহির হইয়া কৌশলার নিকট আসিল। বৃদ্ধার নয়-
আকাশে সর্বদাই শ্রাবণের বারিধারা-মেঘপূর্ণ, বাগ্নিপূর্ণ,
জলতরঙ্গপূর্ণ ! বালিকা বৃদ্ধার হবিষ্যান্নের উদ্যােগ করি।
বৃদ্ধার চুল ধরিয়া টানিয়া বলিল,-“বুড়ী! আজ
“বুড়ী! আজ তােকে
আমারও ভাত রাঁধতে হবে, আমার বিষ্যের ভাত খেতে সাপ
হয়েছে।
কৌশল্যা। বালাই ! যেঠের বাছা, যঈর দাসী,
তােমাকে কি হবিষ্যি কত্তে আছে?
এমন সময়ে অঘাের বাবুর পাদবিক্ষেপ-ত হইল।

চিনিৰাম-চরিতামৃত।
;
বালিকা তৎক্ষণাৎ অমনি শয়নগৃহে ধাবিত হইল। অঘাের
বাবু ঘরে পেীছিলে, সলিকা ধীরভাবে জিজ্ঞাসিল,-“এত
দেরী কেন?”
অঘাের। এই, তােমার জন্যই ঘুরে ঘুরে এত বেল।
হলাে। তােমার শ্রীমান চিনিবাস, ভবানীপুরের বাসা উঠা-
ইয়া কলিকাতায় এসে বাসা ভাড়া নিয়েছেন। খুঁজে খুঁজে
বৌবাজারে তার বাসার সন্ধান পেয়েছি।
বালিকা। তার সঙ্গে দেখা হয়েছি কি ?
অঘের । দেখা করি নাই ; আজ তার বাড়ীতে ভারি
ধুম। বাবু না কি মিউনিসিপাল কমিশনার হয়েছেন , রাজ।
হবেন, তাই আজ মহা উৎসব চলিয়াছে।
বালিকা। বড়-ঠাকুরমাকে তবে কখন সঙ্গে করে নিয়ে
তার কাছে যাবে ?
অঘাের। তার কাছে সহজে যাওযা যাইবে না,-সিপা-
হীর পাহারা,আমার একটী বন্ধুর মুখে শুনিলাম, সে শীঘ্রই
রাজা-বাহাদুর উপাধি পাইবে।
ছেটলাটের সঙ্গে সে প্রতি
সপ্তাহে একবার দেখা করিতেছে। তােমার চিনিবাস খুড়াে
জানিয়াছেন যে, তাহার মা আমারই ঘরে আছে। খুড়াে
আমাকে জব্দ করিবে বলিয়াছেন।
বলিকা নীরব।
অঘাের বার বালিকার পৃষ্ঠদেশে হাত দিয়া বলিলেন,
তােমার ভয় নাই ; একটা কাৰ্যদক্ষ লােকের সহিত আমি

পদশ পরিচ্ছে।
চিনিবাসের
মাতাকে
লইয়া আগামী রবিবার দিন
যাইব।”
বালিকা বলিলেন, “তবে তাহাই হইবে , তােমার কোন
বিভ্রাট ঘটিবে না ত?”
অঘাের বাবু স্ত্রীকে কোন ভয় নাই" বলিযা না লে
ওদিকে চিনিবাসের বাসায় প্রকৃতই মহা ধূম। ক্5ে,
১াকর-বাকর, দ্বারবান, পাই,যেন লোৰে । { ৮ ন.
যাছে! চারিদিকে রব উঠছে, চিনিবাস 11 জ হই,
ল'সলতা-পত্রিকায় প্রবন্ধ বাহির হইল, “নি* - * ••
চিনিবাস বন্দ্যোপাধ্যাযের রাজা উপাধি লইব ( 18
না। তবে গবর্নমে ট উপযুক্ত পাত্র দেখি, 'স। ড1)}।
নিবাসেই ন্যস্ত করিতে দৃঢ়সঙ্কল্প কবিধানে ৩{1, :
বিষয়ে জনসাধারণেরও বিশেষ অনুরোধ আছে । বা ভাল।
আলাদের সহিত প্রকাশ, করিতেছি, চিনিবাস বা
ভাবে রাজা উপাধি গ্রহণ কৰি স্বীকাৰ ।ছেন ।
কলিকাতার সমগ্র অধিবাসী তাহাকে মিউনিসিশিব
হইতে অনুরােধ করায়, তাহাকে এ গুরুভাবও এই কবি
হইতেছে।”
প্রতিবেশী দুই একজন সন্দেহ করিল, চিনি' • ৬ ট{}
পাব কোথা ? যাঁহারা নিগুঢ়তত্ব জানিতেন, তাহারা বলি-
লেন, রাজনীতির সহিত সমাজনীতির যােগ হইলে টাকা,
ভাবনা কি ?

যােড়শ পরিচ্ছেদ। অঘাের বাৰু ইতিমধ্যে তাহার কোন বিশ্বস্ত বন্ধুর দ্বারা চিনিবাসকে বলিয়া পাঠান যে, কলিকাতায় তাহার মা আসিয়া ছেন। চিনিবাস এই দুঃসংবাদ পাইয়া চকিত হইয়া বলেন, “আমার আবার মা-কে ? কুসংস্কারচ্ছন্ন হিন্দুদের যখন সহ- মরণ-প্রথা প্রচলিত ছিল, তখনই আমার মা, পিতার সহিত সহমৃতা হইয়াছিলেন।” বন্ধুর নাম গােপালদাস মিত্র। তিনি উত্তর দেন, “সে কি ? তােমার মাকে দুবেলা দেছি ; প্রত্যহ গঙ্গাস্নান করেন, আর কাঁদেন—” চিনিবাস। ওঃ হেঃ-বুঝিয়াছি। গবর্ণমেন্ট আমাকে শীঘ্রই (আমার অনিচ্ছাসত্ত্বেও ) বলপূর্বক রাজা উপাধিতে ভূষিত করিবেন,আজ বাদে কাল আমি রাজা হইব, তাই বুঝি কোন বৃদ্ধা রমণীর আমার মা হইতে রাজ-জননী হইতে সাধ গিয়াছে! (হাসিয়া) সেই বঙ্গমহিলা যদি অর্যের ভিখা- রিণী হয়, তাহা হইলে যত্ন, অধ্যবসায় এবং শ্রম স্বীকার-পূৰ্ব্বক পুয়াের-ফ”ে তাহার নাম লেখাইয়া দিতে পারি। আমার চেষ্টায়ু কিনা সম্ভবে ? গােপাল। বলেন কি মহাশয়। আপনার মা, “চিনিবাস চিমিস করিয়া অজ্ঞান !আপনি এক বৎসর তাকে দেখা দেন নাই,—আপনাকে দেখিবার জন্য তার প্রাণ ব্যাকুল হয়ে বেড়শ পরিচ্ছে। উঠেছে; কেঁদে কেঁদে চোখে আর তিনি ভাল দেখিতে পান । আপনার মায়ের দুঃখ দেখে পড়ার সমস্ত লােকই কাতর । চিনিবাস। উঃ-ঘােরতর ষড়যন্ত্র ! আমি দেখিতেছি, আপনি মহামায়ায় মুগ্ধ হইয়াছেন। রঞ্জুকে সর্পভ্রম করিয়া ছেন ; কৃমিকীটকে পনিরকীট ভাবিয়াছেন; বিড়কে বা ঠিক করিয়াছেন। আমার জননী থাকিলে কি, এতদিন তাহাকে অন্তঃপুরবাসিনী থাকিতে দিতাম? তাহাকে অবশ্যই এতদিন ইংরেজী পড়াইয়া, শিক্ষিত করিয়া, স্ত্রী-স্বাধীনতার ধ্বজ। ধরাইয়া, ভারতীয় ললনাকুলের অগ্রগামিনী করিতাম । কথা শুনিয়া, গােপাল বাবু ত অবাক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া, কেবল চিনিবাসের মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। চিনিবাস বক্তৃতার সুরে বলিলেন,--আপনি কি জানেন না, দেশমধ্যে আমার অনেক শত্রু আছে আমি উন্নতিরূপ হিমালয় পর্বতের ধবলগিরিরূপ উন্নততম শৃঙ্গে উঠিয়া ভারতকে অত্যুন্নত-মার্গে উঠাইতেছি ;-কিন্তু দুরাচার দৈত্য- কুল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া, মধুম, মাতঙ্গের ন্যায়, আমার এই গুরুগম্ভীর গতির প্রতিবােধা সতত ফিরিতেছে ! কাষ্ট- নগরীয় দানববৃন্দ একবার একটা কাষ্ঠকুড়ানী কুড়াইয়া, অামার স্কন্ধদেশে এইরূপ একটা ‘মা’ ফেলিয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছিল। আমি তখন স্বর্গীয়ভাবে উদ্দীপিত হইলাম । মুখমগুল, ঘদিশসূর্যের ন্যায় জ্বলিতে লাগিল। , এক ভৈরব হুঙ্কার ছাড়িলাম,আর ফুৎকারে সমস্ত উড়িয়া গেল ।

চিনিবাস চবিতা।
ষড়যন্ত্রকাস্থিগণ প্রবল ঝড়ে উডীয়মান তুলার ন্যায় দিগদিগন্তে
সরিয়া পড়িল। অতএব সাবধান! আপনি যদি অভিনিবিষ্ট
চিত্তে ভাবিয়া দেখেন, তাহা হইলে, নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিবেন,
-অামার ইহজীবনে,এই লােকহিতার্থ উন্নততম প্রাণে, আর
অন্য মাতা,-পার্থিব মাতা সম্ভবে না ;—এখন ভারতমাতাই
আমার মা—আমি তাহারই প্রেমে মগ্ন!”
গােপাল বাবু কোন কথাই উত্তর দিতে পারিলেন না,
অনিমিষলোচনে কেবল চিনিবাসের নােগ্র হইতে কেশা
পর্যন্ত হেরিতে লাগিলেন।
চিনিবাস পুনরায আরম্ভ করিলেন,—“দেখিতেছি আপনি
বিশিষ্ট ভদ্র ব্যক্তি,-অাপনার সহিত একটু সদালাপ করা
যাউক। অাপনি বােধ হয় অবশ্যই অবগত আছেন, রাজনীতি
তর স তুফানে দেশ আজ কাল প্লাবিত। ইহার আমিই বীজ ।
আমি বক্তৃতায় প্রমাণ করিয়াছি, ইংরেজরাজ ৫৮ খ্রীষ্টাব্দের
ঘােষণা অনুসারে সিবিল-সার্ভিসের পরীক্ষার বয়স বত্রিশ
বৎসর ধার্য করিতে বাধ্য। আমারই আন্দোলনে গবর্নমেট
ভীত, এ, কম্পিত-কলেবর হইয়াছেন। আর কি চাই ?
স্থানে স্থানে, সভাসমিতি, ঘােষণা, আন্দোলন, বক্তৃতা-আর
চাই কি?-ঘরে ঘরে আবৈদন, অনুমােদন, প্রবন্ধ, প্রস্তাব,
পদ্য, গদ্য, আর চাই কি ?”
গােপাল বাবু ধীরে ধীরে বলিলেন, “আপনার মাতার
আকস্তি শরণ আছে কি?”

ষােড়শ পরিচ্ছ।
চিনিবাস। ছি ছি ছি!-ও সব অসার পাপ কথা
ছাড়িয়া দাও—আমি সময় নষ্ট করিতে সক্ষম নহি।
আমেরিকা হইতে আমার যে টাইটেল আসিয়াছে, তাহা
আপনি দেখিতে চান কি ?—দেখিলে আপনার দিব্যজ্ঞান
জমিবে।
তৎক্ষণাৎ বাক্স খুলিয়া কাগজ বাহির করিয়া চিনিবসেব
টাইটেল পাঠ,—“z. 0. T. / S, S. ০. ) C. k. 1
Y, Y. &c. c.'
,
গােপাল মহাশয় ও সব আমার কিছুই আবশ্যক নাই।
আপনার মাতা একরকম মৃত্যুশয্যায় শায়িত—এ অন্তিমকালে,
তিনি দিনরাত কেবল আপনার নাম উচ্চারণ করিতেছেন ।
আচ্ছা, আপনার মায়ের নামটী কি বলুন দেখি?
চিনিবাস ক্রোধকষায়িত-লােচনে উত্তর দিলেন-“আমি
আপনার নিকট চৌদ্দপুরুষের হিসাব দিতে প্রস্তুত নহি,
আইনমতে বাধ্য ও নহি। আপনি আমাকে আর বিরক্ত করি-
বেন না,মুল্যবানীয় সময় বৃথা অপব্যয়িত হইতে দেখিলে
আমার প্রাণ কেবল কঁাদে।”
গােপাল। আমি নিজের জন্য আসি নাই, আপনার মায়েব
কষ্ট দেখিয়া আসিয়াহি+আপনি সন্তান হইয়া মাতাকে
বিসর্জন দিতেছেন,-হাঁ চৰ্য্য! তােমরা কি আর উদঘ
হইবে ?
চিনিবাস। (ক্রোধভরে ) আপনি দুৰ্বত্ত, এখনি চলিয়া

১৩
চিনিবাস-চরিতামৃত।
যান,আপনি তিলার্ধ এখানে থাকিলে, আপনার নামে
অনধিকার-প্রবেশের দাবী দিয়া নালিশ করিব।
গােপাল বাবু “ঈশ্বর তােমার একমাত্র শাসনকর্তা,”
বলিয়া উঠিয়া আসিলেন।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।
অনাের বাবুর বৈঠকখানা সুদীর্ঘ এবং সুপ্রশস্ত। উত্তম
ঢালা বিছানা। কয়েকটী উকীল, একটী ডাক্তার এবং
আরও তিন চারিজন লােক--সৰ্বশুদ্ধ প্রায় আট দশ জন
ব্যক্তি, একত্র বসিয়া গল্প করিতেছেন; তামাক-পান চলি-
তেছে। হাসির শব্দ হহ হহ উঠিতেছে। ডাক্তার বাবুর
হাসির রবটা কিছু উচ্চ অঙ্গের,—পূর্ণমাত্রায় উন্নত। অঘোর
বাবু, ডাক্তার বাবুকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন, “তুমি হাসির
সুরটা একটু নরম করিয়া বাঁধ। তােমার একলার জন্য আমা-
দের সকলের মাতাল অপবাদ হইবে কেন?”
ডাক্তার। সে কি কথা? মাতাল কি ?
অঘোর। এই যে প্রত্যহ এখানে আমরা হাসি, অতএব
মদ খাই,--সুতরাং রমণীকুলের উপর অত্যাচার করি,
উকীল বাবু বলিলেন, “ওরে শীঘ্র তামাক দে, গল্প ভারি
মিয়াছে।”
ডাক্তার। (মনে মনে হাসিয়া) আমার এক অনুরােধ

সপ্তদশ পৰিছে।
আছে ; যদি না রাখ, তা হলে, তােমার সঙ্গে এই পৰ্যন্ত
বিচ্ছেদ! দুটা মদের বােতল জল ভ'রে এই বিছানায় রাখতে
হবে, আমি মাঝে মাঝে দুটা বােতল দুহাতে করিয়া হাসিব।
উকীল। (ঈষৎ আসিয়া ) ব্যাপার কি ?
ডাক্তার। ব্যাপার আমার মাথা আর মুণ্ড
( উচ্চ হাসি)
অঘাের। (হাসিয়া ).রাস্তার ওপারে ককটা শিক্ষিত
ভ্রাতা এবং শিক্ষিতা ভগিনী ঘর ভাড়া লইয়াছেন। ভ্রাতারা
লােকের কাছে বলে বেড়ান, “অঘাের বাবুর গৃহে প্রত্যহ
রাত্রে জটলা হয়, মদের স্রোত বহে। মদ ব্যতীত এরূপ উচ্চ
হাসির রব উঠিতে পারে না। সেই বিকট হাসির ধ্বনি
শুনিয়া লজ্জাশীলা ভগিনীগণ অতিঙ্কে, অন্ধকারে আমাদের
কাছে আসিয়া লুকাইতে চায়। আমরা কি করি, শরণাগতা,
অনাথা, বিহ্বলা রমণীকে যথাসাধ্য আশ্রয় দান করি।”
ডাক্তার। (হাসিয়া) ও পােড়ামুখে কি মদ ব্যতীত
আর হাসি আসে না ? যে হাসে, সেই অবশ্য মদ খায়-
এ যুক্তি অতি উত্তম! আজ থেকে হেসে হেসে আমি দেশ
ফাটাবে।
অঙ্কের। তুমি কি জান না, হাসিটা একটা কুরুচি?
হালি, রঙ-তামাসা, রসিকতা,—এ সমস্তই কুরুচিভাব-প্রণাে-
দিত? গভীর গোঁজমােহন গােবদামুখে বসিয়া না থাকিলে
সুরুচি হয় না। এ সব নিচুগু তত্ত্ব তােমা বুঝা উচিত।
---

চিনিবাস-চরিতামৃত। ডাক্তার। কেবল ছাচি বেত !-পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পৰ্য্যন্ত এক সপাৎ, সপাৎ বসাও, তবে সােজা হয়। ( সকলের হাস্য ) এমন সময় চিনিবাসের বাসা হইতে গোপাল বাবু আসিয়া উপস্থিত। তিনিও ডাক্তার। গােপাল বাবু আসিবামাত্র, অঘােরনাথ অতি ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, “সংবাদ কি?” গােপাল বাবু কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিলেন, “সংবাদ বড়ই বিষম । আমি কিছুই ঠিক করিতে পারিলাম না । আমার মনে বড়ই সন্দেহ জন্মিয়াছে- অঘাের। গতিক কি ? ব্যাপার কি ? গােপাল। আমি নিবিষ্টচিত্তে প্রায় আধ ঘন্টা কাল তাহার চেহারা দেখিলাম।' চোখের চাহনির কেমন স্থিরতা নাই। অন্তরটা যেন তার সদাই গুর গুব করচে। সদাই ভয়ে ভয়ে , এদিক ওদিক চায়—যৈন কে তাহাকে ধরিতে আসিয়াছে। আর মাঝে মাঝে কি যে আবল-তাবল বকে, তার বিন্দুবিসর্গ আমি অর্থ করিতে পারি না। অঘাের। এ যে উন্মাদের লক্ষণ দেখিতেছি। গোপাল। আমিও তাই ভাবচিতার মতিস্থির নাই- ডাক্তার। তােমরাও ত "পাগল নও,-চিনেটাকে আমি ছেলেবেলা থেকে জানি। বদমাইসের চূড়ান্ত ! সে আবার পাগল কোথা ?—ভারি বদমাইস! সেই সেয়ান- খেপাটাকে তােমরা আজও চিনিতে পারিলে না ?

সপ্তদশ পরিচ্ছে।
অঘাের। না না,টাউনহলে এক দিন বক্তৃতার ঝোক
সে যেরূপ রঙ্গ ভঙ্গ বিকট চীৎকার করিল, তাহাতে তাকে
বদ্ধ পাগল বলেই মনে হইল ।
ডাক্তার। তাকে পাগলাগারদ দিতে হয় দাও, তাতে
আপত্তি নাই। ফল কথা, সে পাগল নয়—ঐ একরকম ধরণ ।
অঘোর। ডাক্তার স্মিথ কে লইয়া তার কাছে গেলে
হয় না ?
ডাক্তার। স্মিথকে নিয়ে যাবার দরকার নাই, পাগলা-
গারদে রাখিবার জন্য আমিই সাৰ্টফিকেট দিতে পারি ।
অঘাের। মহামুস্কিলের কথা হইল। তার মা কেঁদে কেঁদে
সার হলাে—এখন উপায় কি ? গােপাল বাবু! তার মায়ের
কথা বলাতে সে কি উত্তর দিল ?
গোপাল। সে কথা আর শুনিয়া কাজ নাই! অতি
পাপিষ্ঠ নরাধম ।
অথবা উন্মাদ।
অঘাের। চিনিবাস মায়ের কথা কি বলিল,-বল, বল ।
গােপাল। পাপিষ্ঠ বলিল, আমার মা নাই,-মা, বহুকাল
সহমৃতা হইয়াছে। তার পর সে, বক্তার হইয়া, সাপের মন্ত্রবৎ
কি যে বক বক বলি, আমি তাহার কিছুই বুঝিলাম না।
প্রবল ভূমিকম্পে দেশ বসিয়া যায়, প্রবল ঝড়ে বড় বড়
গাছ উড়িয়া যায়, প্রবল তরঙ্গে জাহাজ হাবুডুবু খায়, আর
প্রবল পাপপূর্ণ বীভৎসকথায় হৃদয় দ্রব হয়, চক্ষু স্থির হয়,
চৈতন্য লােপ হয়। বাজ পড়িলে
বাজ পড়িলে বিদ্যুতাগ্নির তেজে মানুষ

চিনিবাস করিত।
যেমন হঠাৎ একেবারে অবশাঙ্গ নিশ্চল নিষ্পন্দ হয়,-গোপাল
বাবুর কথা শুনিয়া, সমবেত ভদ্রমণ্ডলীর ঠিক সেইরূপ দশা
ঘটিল। বৃদ্ধা-জননী জীবিত,-চিনিবাস বলেন, জননী মৃত !
উঃ! প্রায় পাঁচ মিনিটকাল সভাস্থ কেহই আর ঘাড় তুলিয়া
বাক্য নিঃসরণ করিতে সমর্থ হইলেন না।
অবশেষে অঘাের বাবু ধীরে ধীরে বলিলেন, “এ কথা
লইয়া এখন আর অধিক আন্দোলন করিয়া কাজ নাই;
চিনিবাসের মা যদি এ কথা শশানে, তাহা হইলে বুড়ী আজই
মবে—অনেক যত্নে আমি তাকে বাঁচিয়ে রেখেছি।
ডাক্তার। গােপাল বাবু! আপনি আমার একটা প্রশ্নের
উত্তর দিন। আপনি কি খালি পায়ে চিনিবাসের বাড়ী
গেছলেন ?
গোপাল। এ কথা কেন ?
ডাক্তার। জুতা কাছে থাকিলে কি আপনি চিনের
মাথায় পঁচিশ পয়জায় মারিতেন না? তােমরা না পার,
এস আমার সঙ্গে-বাহিরে থেকে জুতার শব্দ শুনিবে ;-
“আসুন গােপাল বাবু!”—এই বলিয়া ডাক্তার বাবু গােপাল
বাবুর হাত ধরিয়া উঠিলেন।
অঘাের বাবু বলিলেন, “থাক থাক—এ সময় আর যেয়ে
কাজ নাই,বাণেশ্বর পণ্ডিতের সঙ্গে পরামর্শ করে যা হয়
ঠিক করা যাবে। তিনি প্রবীণ ব্যক্তি, এ সকল ব্যাপারে তার
মত লইয়াই কাৰ্য করা ভাল।”

সপ্ত পৰিছে।
১
কথান্তে অঘাের বাবু, ডাক্তার বাবুর হাত ধরিয়া
বুসাইলেন।
পরদিন প্রাতে তাহারা সকলে বাণেশ্বর পণ্ডিতের বাটীতে
গেলেন। বাণেশ্বর সহুরে মােড়ল। তার ধন আছে, দান
আছে, পাণ্ডিত্য আছে, প্রতিপত্তি আছে এবং বহুদর্শিতাও
এখন বৃদ্ধ হইয়াছেন; লােককে কেবল সলা, পরামর্শ
উপদেশ দেন। তিনি বলিয়েন, “চিনিবাসের মাত দিয়া
চিনিবাসের নামে একটী নালিস রুজু কুরাইতে হইবে। আমি
শুনিয়াছি, খিড়কীর পুকুর আমবাগান এবং ১২ বিঘা লাখরাজ
জমী চিনিবাসের পিতা, স্ত্রীর নামে কেনেন। চিনিবাসের
বাপ অতি সৎলােক ছিলেন ;-আমার, স্মরণ হইতেছে,
দলিলটা তিনি কৃষ্ণনগরে একবার আমাকে দেখান। যাহােক,
ঐ তিনটা সম্পত্তি স্ত্রীধন। চিনিবাস সমস্তই বিক্রয় করে
ফেলেছে,—শুনিলাম, সিকি দামে ওগুলাে বেচিয়াছে ;-
স্ত্রীধন উদ্ধারের জন্য উহার মানালিস করিতে সম্পূর্ণ সক্ষম।”
অঘাের। চিনিবাসের মা নালিশ করিতে কোনমতেই
স্বীকার হইবেন না। বিশেষ, তিনি এ সব কথা হলে আর
বাঁচবেন না। আমি বড় বিষম সঙ্কটে পড়েছি-
বাণেশ্বর। যে কোন উপায়ে হােক, নালিসটা একবার
দায়ের করিতে পারিলেই নিশ্চিন্ত
আঘাের। নালিশ করিতে ত দেরী আছে। অভাবপক্ষে
একমাস সময়ের কম কিছু এ কাজ সমাধা হবে না। দেখিতে

১৪
চিনিবাস-চরিতামৃত।
দেখিতে পূজার ছুটী আসিয়া পড়িল। নালিসই যদি
করিতে হয়, তাহলে, যেরূপ গতিক, পূজার পর না হলে,
আর দায়ের হবে না। কিন্তু বৃদ্ধাকে যে, আমি আর রাখিতে
পারিব না,আজ নয়, কাল নয়, পশু নয়, চিনিবাসে
বাড়ী নিয়ে যাব,—এই বলিয়া বুড়ীকে প্রত্যহ সান্ত্বনা করি-
তেছি। বৃদ্ধার মনে যেন একটা সন্দেহ জন্মেছে, “আমাৰ
ছেলের- বুঝি কোন অমঙ্গল ঘটেছে, তাই বুঝি আমাকে
জড়াচ্চে।” মহামুফিল কাণ্ড! এক্ষণে বৃদ্ধার কাছে প্রতি-
শ্রুত আছি যে, আগামী রবিবার দিন নিশ্চয়ই আপনাকে
চিনিবাসের বাড়ী লইয়া যাইব। বৃদ্ধা কেবল দিন গণিতেছে,
বার গণিতেছে,-করে রবিবার আইসে।”
বাণেশ্বর পণ্ডিত অনেকক্ষণ নীরব রহিলেন।
ভাবিয়া চিন্তিয়া বলিলেন, “কোন ভয় নাই। রবিবার দিন আমি
নিজে চিনিবাসের মাকে লইয়া চিনিবাসের বাসায় যাইব ।
অাের বাবু, কেবল আমার সঙ্গে যাইবেন।
“চিনিবাস ইতিপূর্বে আমার সহিত দুই তিন দিন সাক্ষাৎ
করিতে এয়েছিল, কেবল ভ্যান ভ্যান করে বাজে কথা বকে
বলিয়া আমি তার সঙ্গে দেখা করি নাই; একটা কাজ করিতে
হইবে। রবিবার প্রাতে আপনি তাহার সহিত দেখা করিয়া,
এ-কথা এ-কথা কহিয়া, তামাস-চ্ছলে বলিবেন, বাণেশ্বর
পণ্ডিত সেদিন আপনার খুব প্রশংসা করিতেছিলেন। বৈকালে
আমি যাই।”
অনেক

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ।
এইরূপ পরামর্শ স্থির করিয়া অঘের বাবু প্রভৃতি স্ব স্ব
গৃহে প্রস্থান করিলেন।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ।
যথানিয়মে, রবিবার প্রাতঃকালে অঘোর বাবু স্বয়ং চিনি-
বাসের বৌবাজারস্থ বাসায় গেলেন। দেখিলেন, দ্বারে দ্বার
বান। প্রশ্নোত্তরে বুঝিলেন, চিনিবাসবাবু রাজনৈতিক আন্দো,
লনায় মফঃস্বল গিয়াছেন। তিন চারি দিন আসিবেন না ।
অদের বাবুর মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। তাহার চক্ষে
পৃথিবী যেন শূন্য বােধ হইল। বিশেষ সংবাদ জানিবার জন্য
তিনি এদিক ওদিক চাহিতে লাগিলেন। গৃহের অভ্যন্তর
প্রদেশে একবার উকি মারিলেন। ছারবান্টা গাঁজা টিপিতে
ছিল। সে, অঘোঁর বাবুর দ্বারদেশে বৃথা অবস্থিতি দেখিয়া
একটু বিরক্ত হইল। সে বলিল, “বাবু ! আপনি কাল আসি-
বেন—ঠিক খবর বলিব—কাল প্রাতে বড়বাবুর ডাকের চিঠি
পাইব। আজ ঘরে কেহই নাই।”
দ্বারবান্ বলে, ঘরে কেহ নাই ; কিন্তু অঘাের বাবু শুনি-
লেন,-ছাদে, উঠানে, দ্বিতলে দুপদাপ, হুটহাট শব্দ। চৌ-
বাচ্ছায় কৈ, মাগুর, খলসে মাছ জীওয়াইয়া রাখিলে, যেমন
মধ্যে মধ্যে হুটুস হুটুস শব্দ হয়,—ইহা সেই রকম শব্দ ।

চিনি-চরিতা। - কেহ সিঁড়ি দিয়া তরতর বেগে নামিতেছে, কেহ ইবহর শব্দে উপরে উঠিতেছে, কেহ ছাদে ঝম ঝম রবে ছুটাছুটি করি- তেছে, কেহ বা মধুর-ধ্বনিতে হার্শ্বোনিয়ম বাজাইতেছে। দ্বারবানের কথাই সত্য। বাস্তবিক ঘরে পুরুষ কেহই ছিল না; চিনিবাস-প্রতিপালিত কয়েকটা মহিলা আজ গৃহের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। মহিলাগুলি এখন প্রাতঃকালিক উৎসবে মনােযােগ দিয়াছেন। তাই ঐ শব্দ। দ্বারবানের সহিত অঘাের বাবুর “এক আধটী কথা চলি তেছে, এমন সময় একটা রমণী মুখের সিকিখানি উকি মারিয়া অঘাের বাবুকে দেখিল। দেখিয়াই সেই সিকিখানি মুখ, সেই টুকরাে চাদখানি লুকাইল। আবার তৎক্ষণাৎ দশমীর চন্দ্রের দশ আনা মুখ দেখা গেল। আবার সেইটুকুও লুকা- আবার বর্ধিতায়তনে দেখা দিল। দেখিতে দেখিতে ষোলকলা পূর্ণ হইল। তখন কি দৈখিলাম ?—দেখিলাম, সেই কোকিলকণ্ঠী কুমারী কুঞ্জমালার টুকটুকে মুখখানি, সেই কুরঙ্গনয়নীর অপাঙ্গদৃষ্টখানি; সেই মরালগামিনীর মৃদু- মন্দ গমনখানি—ধীরে ধীরে তালে তালে, কাছে আসিতেছে। যেন অপূর্ব সুন্দরী উর্বশী ইন্দ্রালয়ে অর্জুন-সম্ভাষণে চলিয়া- ছেন। কুঞ্জমালা নিকটবর্তিনী হইয়া অঘাের বাকে বীণা- নিন্দিত স্বরে জিজ্ঞাসিলেন, “মহাশয়। প্রভাে! কিমর্থৎ আপ- নার এখানে আগমন ? আমাকে বলিলে যদি কার্যোদ্ধার হয়, তবে তাহাতে আমি প্রস্তুত আছি। অদ্য এই গৃহ পুরুষ-শূন্য অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ। নির্ফামধৰ্ম্ম চিনিবাস বাবু, বন্ধুগণ সমভিব্যাহারে, রাজনীতির নিমিত্ত, দূরদেশে গমন করিয়াছেন।” অঘাের বাবু একটু বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “আমি চিনিবাস বাবুর সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছি। কল্য আসিব। দ্বর- বান বলিতেছে, কাল তার সংবাদ পাওয়া যাইবে।” কুঞ্জমালা। হাঁ, ঠিক কথা। কল্য বৈকালেই আপনি আসিবেন, আমরা আপনার জন্য জলখাবার বন্দোবস্ত করিয়া রাখিব। আপাতত আমরা গৃহে থাকিয়া সমাজনীতিতে : প্রাণ সপিয়াছি। কল্য অতি অবশ্য বৈকালে আসিয়া অামা- দের সমাজনীতিতে যােগদান করিলে, পরম উপবত হইব। নিষ্কামধৰ্ম্ম চিনিবাস বাবু সম্ভবতঃ এখন একসপ্তাহকাল আসি- বেন না।” অঘাের বাবু “তবে আমি চলিলাম” বলিয়া গমনােদর হইলেন। কুঞ্জমালা হাসিয়া বলিলেন, “আমি কি এতই অপরাধিনী যে, আপনার নামটা পৰ্য্যন্ত শুনিতে পাইব না । একবার গৃহে প্রবেশ করিয়া মহাদেবী রামমণির সহিত শাস্ত্র- লাপ করুন না কেন ?” অঘাের বাবু কোন কথার উত্তর না দিয়া লেগে প্রস্থান করিলেন। পরদিন প্রভাতে ইংরেজী দৈনিক সংবাদপত্রে চিনিবাসের রাজনৈতিক আন্দোলনের সংবাদ- ঘােধিত হইল। তারের সংবাদ এইরূপ ;-“বিরাট সভা। ৪৯ হাজার ৯৯৯ জন চাষ উপস্থিত। নদীয়া জেলার অন্তর্গত ধুলুগ্রামের চিনি-চরিতামৃত। ; ময়দানে সভার কার্য হয়। দ্বাদশটী প্রস্তাব অনুমােদিত এবং সমর্থিত হইয়াছিল। মহা উৎসাহ, মহা আন্দোলন, মহা- বা। চিনিবাস বাবুর বক্তৃতায় সভাস্থ সকলেই কাদিয়া- ছিল।” পরদিন প্রাতঃকালের সংবাদপত্রে আবার এইরূপ তারের সংবাদ ঘােষিত হইল ;-“২৪ পরগণার অন্তর্গত মুলু- গ্রামে মহতী সভা। সভার মাঠে স্থান সঙ্কুলান না হওয়াতে, অনেক কৃষক চক্ষের জল ফেলিতে ফেলিতে গৃহে ফিরিয়া গিয়াছিল। লােকসংখ্যা ৬২ হাজার ৩১৭। চিনিবাস বাবুর উদ্দীপনাপূর্ণ বক্তৃতা শুনিয়া লােক সকল উৎসাহে নাচিয়াছিল। দুই দিন পরে দংবাদপত্রে আবার তারের সংবাদ ; ‘হুগলী জেলার অন্তর্গত কুলুগ্রামে ভয়ঙ্কর সভায় মেদিনী বিক- শিত হইয়াছিল। লােক-পদ-উৎক্ষিপ্ত ধুলিপটলে সমগ্র বঙ্গ- ভুমি ধূসরিত হইয়াছিল। একলক্ষ একশত এগার জন লােকের সমাগম। সিবিলসার্ভিস পরীক্ষার বয়স বত্রিশ বৎসর অনু- মােদিত হইয়াছে।” এদিকে রাষ্ট হইল, চিনিবাস শীঘ্রই লাট-সভার সভ্য হই- কেহ বলিল, “বঙ্গীয়-মহিলাকুলের প্রতিনিধিস্বরূপ হইয়া চিনিবাস লাট-সভায় বসিবেন।”, কেহ বলিল, “তিনি কৃষক এবং তিকুলের প্রতিনিধি হইবেন।”. দেশে দেশে ৰাজনীতির জয়ঙ্কা পিটিয়া, কোথাও বা সমাজনীতির ফুলুট বাজাইয়া, কোথাও বা প্রেম-নীতির সিম দিয়া,চিনিবাস তিন সপ্তাহের পর কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিলেন। বেন।

উনবিংশ খরিকে। দুর্গোৎসব নিকটপ্রায় হইল। মহাদেবী স্কুলগলি রে পাঠা কাশীগমনেরও সময় নিতান্ত নিকটবর্তী হইল। যে দিন চিনিবাস বহুবাজারের বাসায় আসিলেন, তার পরদিন রাত্রে ডাকগাড়ীতে, তিনি রামমণিকে লইয়া, সংস্কৃত জ্ঞানেব জন্য, কাশীধাম-অভিমুখে যাত্র করিলেন্স। যাত্রাকালে কুমাব। কুঞ্জমালা, চিনিবাসের চরণতলে কাঁদিয়া পড়িয়া বলিল, বেদপাঠেব সময় উপস্থিত না হউক, আমার দর্শন-পাঠের কাল নিতান্ত নিকটে আসিয়াছে। আমাকে যদি একান্ত কাশীতে লইযা না যান, তবে বৈদ্যনাথে বাখিযা • যাইন'- সেখানে পাতঞ্জলি পাঠটা সমাপ্ত হইতে পাবে।” চিনিবাস বলিলেন, “তাহাই হইবে।' কুও মালাব অভি ভাবকস্বরূপ বামকানাই ও সঙ্গে চলিল। হাবভাব ৪েসনে ৬াক- গাড়ী শিক্ষিত নবনাবীব প্রায় দীপ্তি পাইতে লাগিল । উনবিংশ পরিচ্ছেদ। আশা পুর্ণ হইল না। কৌশল্যাব সহিত চিনিবাসের সাক্ষাৎ ঘটিল না। দিন যায়, রাত আসে, আবার সূর্য উঠ, বালিকা প্রত্যহ স্বামীকে বলেন, “চিনিবাস আসিয়াছে কি না, আজ সংবাদ সইও।” স্বামী প্রতিদিন অনুসন্ধানে জানেন, চিনি- বাস এখনও ফেরেন নাই। তখন বালিকার মুখমল শুকাইতে লাগিল। অঘের বাবুরও মুখ ম্লান হইয়া আসিল। আর, ১ঃ চিনি-চরিতামৃত। বৃদ্ধা কৌশল্যার আহার একরকম বন্ধ হইল। প্রথম কলি- কাতা আসিয়া বৃদ্ধার মনে একটু স্ফুর্তি হইয়াছিল, কিন্তু সে সুখ, নিৰ্ব্বাণােম্মুখ দীপের ন্যায় একবার দপ্ করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়া, শীঘ্রই নিবিয়া গেল। শেষে অঘাের বাবু সংবাদ পাইলেন, চিনিবাস বঙ্গীয় রাজনৈতিক আন্দোলন শেষ করিয়া যেদিন কলিকাতায় প্রত্যাগত হন, তার পরদিনই ভারত- ভ্রমণের জন্য, তিনি উত্তরপশ্চিম, পঞ্জাব, বােম্বাই অঞ্চল উদ্দেশে বাত্ৰা করিয়াছেন। তিন মাস কাল তিনি ফিরি- বেন না । এখন সব আশাই ফুরাইন্স! কৌশল্যা চারিদিক অন্ধকার দেখিলেন, কুলকিনারা কোথাও পাইলেন না। সূৰ্য অন্ধকার, চন্দ্র অন্ধকার, নক্ষত্র অন্ধকার--আর, কালাে মেঘও অন্ধকার। সব সমান হইল ! কুপজল, গঙ্গজল সমান! বালিকা এক দিন কৌতুক করিয়া বৃদ্ধাকে পাছাপেড়ে কাপড় পরিতে দিয়াছিলেন ; বৃদ্ধা তাহাই পরিয়া রহিলেন। বালিকা একদিন স্বামীকে বলিলেন, “রাত্রে বৃদ্ধ ঘুমাইয়া কাহার সহিত যেন কথা কন,—কেন, হাসেন, রাগেন, কাঁদেন, আপনিই উত্তর-প্রত্যুত্তর দেন, একদিন রাত্রিকালে প্রায় সাড়ে তিনটার সময়, অঘাের বাবু এবং বালিকা উভয়েই বৃদ্ধার গৃহপার্শ্বে অলক্ষ্যে নিঃশব্দে ঈঙইয়া রহিলেন। দেখিলেন,--বৃদ্ধা ঘােরনিদ্রায় অভিভুতা, অথচ ক কহিতেছেন। মিস্ত্রি কৌশল্যা বলিতেছেন,

উনবিশ পরিচ্ছে।
“বাবা চিনিবাস ! এ বৎসর দোলে আমি ঐক্ষেত্র যাবে?
অামাকে একশত টাকা দিতে হবে।”
কৌশল্যা নিজেই চিনিবাস সাজিয়া উত্তর দিছেন,
'না, মা,—এখন অত টাকা কোথা পাব ?--তা বগের সম
তুমি ঐক্ষেত্রে যেয়ােমা ।”
মা। না, বাছা,দেলেই যেতে হবে। আমি মানসিক
করেছিলাম, তোর ছেলে হলে, বাবা জগন্নাথেব সােণাৰ দেশ
গড়িয়ে দিব।-বাছা, বোকা এক বছরের হা, অব {
অামার ঐক্ষেত্র না যাওয। ভাল দেখায় ।
পুভ্র। “আচ্ছা, মা, তাই হবে--
তবে লোকে এই মাই বাপের বাড়ী হতে,
আয,-আজ একমাস খােকার মুখ দেখি নাই
মা, তুমি জুগদ্ধা পূজা কবরে না ?-সে-ি-
তুমি বল্পে, তাই আমি পুরুঠাকুরকে চিঠি লিখে পাঠালাম –
বাছ। এ বছর আর কববাে না—তুমি এক
বারে এত টাকা কােথায় পাবে ?–বাছা, বোকে একখানি
ভলি বারাণসী কাপড় দিবার জন্য তােমাকে সেদিন এই সব
বল্লাম-তবু তুমি তাকে কাপড় কিনে দিলে না ।
কথা শুনতে একেবারেই নাই, এমত ত কিছু শাস্ত্রের লে?
পুত্র ।
নাই।
চিনিবাস হাসিলেন। অর্থাৎ কৌশল্যা স্বয়ং চিনিবার
হইয়া হাদিলেন।

চিমিশােত।
অঘাের বাবু দেখিলেন, বালিকা তাহার বাহুমূলে
দিয়া দিতেছেন। স্বামী স্ত্রীর পৃষ্ঠে হাত দিয়া, সান্ত্বনা-
বাক্যে কহিলেন,—“তুমি কাঁদ কেন ?”
বালিকা (কঁাদ কাধ স্বরে)। বুড়ী আর বাঁচবে না-
এই সময, এক দিনের জন্যও যদি ও ছেলের সঙ্গে দেখা
হতাে-
এই বলিয়া বালিকা উচ্চরবে বােদন করিয়া উঠিলেন
স্বামী, “চুপর, চুপ কর”—বলিয়া অঞ্চলে'ব দ্বারা বালিকার
চোখের জল মুছাইলেন। বালিকা বহুকষ্টে বােদন সম্ববণ
করিলেন, অঘাের বাবু বলিলেন; “চিনিবাসকে পাইবার এখন
ত কোনও উপায় দেখি না—পূজার পর নিশ্চয়ই কাৰ্য্য উদ্ধার
কবিৰ।” এই বলিযা অদেবনাথ স্ত্রীর হাত ধরিযা ধীরে ধীবে
নিজ কক্ষে গমন করিলেন। কৌশল্যা কখন নীরব রহিলেন,
কখন কথা কহিলেন। দিবসে কখন ব্রা চিনিবাসের জন্য
কাদেন, কখন হাসেন, কখন বা কোন খাবার জিনিষ চিনি-
বাসের জন্য আঁচলে বাঁধিয়া রাখেন। 'একদিন একরাশ খৈ
বৃদ্ধা আঁচলে বাঁধিয়াছেন। খৈ-বাশির জন্য বৃদ্ধার কষ্ট হইতেছে
দেখিয়া, বালিকাতা আঁচল হইতে খুলিতে গেলেন। অমনি
কৌশল্যা কাঁদিয়া আকুল—“আমার ছেলের উপর এত অযত্ন
করিলে, আমি আর এ ঘরে থাকিব না।” বালিকা তখন
চলের খৈ আবার আঁচলেই রাখিয়া দিলেন।

বিংশ পরিচ্ছেদ। } আশ্বিন মাস। দুর্গোৎসব। পূঞ্জার অবকাশে অবাের- নাথ সপরিবারে ঘরে গেলেন। কৌশল্যা সঙ্গে রহিলেন। অঘাের বাবুর বাটা, হুগলী জেলার অন্তর্গত ক্ষুদ্র পল্লী- গ্রামে। এক বৎসর পরে অধাের বাবু বাটীতে আসিয়া দেখিলেন, গ্রাম জঙ্গলপূর্ণ। পথ গতায়াত-বিহীন। গুরুতর বর্ষব প্রভাবে চারিদিকে ঝুপিবনের রাজত্ব হইয়া উঠিয়াছে বসুন্ধরা সমভাবে তৃণলতায় আচ্ছন্ন। স্পষ্টরূপে পথ চিনিয়। লওয়া দুষ্কর। যেন ব্রাহ্মণগণের অনভ্যাস হেতু শ্রুতি-পথ সকল লুপ্ত হইয়া আসিয়াছে চারিদিকে স্নেচ্ছের রাজত্ব । বর্ষাকালে কাহারও মাটির প্রাচীর খানিক ভাঙ্গিয়া পড়ি- য়াছে। মাঠে একহাঁটু জল খালে বিলে স্রোত বহিতেছে । দেখিতে দেখিতে শরৎ ঋতুর সমাগমে আকাশ নিৰ্ম্মল হইল। মেঘ আর দেখা গেল না। চন্দ্র, কমনীয় কান্তিতে উগসিত হইয়া, বিমল সুধা বিতরণে প্রবৃত্ত হইল। বায়ু ঔদ্ধত্য পরি- ত্যাগ করিল। পলি জল নিৰ্ম্মল হইতে আরম্ভ হইল। স্বল্প জলবিহারী সদাক্রীড়নশীল মৎস্যসকল, শরৎসূর্ঘ্যের তাপে জল যে মরিয়া আসিতেছে, তাহা বুঝিতে পারিল না ;-মুঢ় সংসারী ব্যক্তি, পরমায়ু যে প্রত্যহ ক্ষয় পাইতেছে, তাহা কবে বুঝিয়া থাকে? ক্রমশঃ শরৎ ঋতু, র্য-রিয়ে উত্তাপ হরণ করিল, চিনিবাস-চরিতামৃত। -দিব্যজ্ঞানের অভ্যুদয়ে, সততই দেহাভিমানের তাপ বিনষ্ট হয়। রাজার শুভসমাগমে এক দস্যু ব্যতীত, যাবতীয় লােক উৎফুল্লিত হয়,-মিঠেকড়া সূৰ্যসমাগমে, কুমুদ্রতী ভিন্ন, যাবতীয় জলসুপ প্রফুল্লিত হইল। উসব আনন্দের দিন উপস্থিত-আনন্দময়ী ঘরে আসিবেন। ঘরে ঘরে, নূতন বস্ত্র, নুতন অলঙ্কার, নূতন আহারীয় সামগ্রী, পুত্র মায়ের নিকট নব-কলন-ভূষণে ভূষিত হইয়া, পথে পথে, ঠাকুর- বাড়ীতে খেলাইয়া বেড়াইতেছে। বৃদ্ধা বালিকাকে বলি- লেন, “আমার চিনিবাসের কাপড় কৈ ?” বালিকা একখানি ভাল কালা পেড়ে ধুতি আনিয়া দিলেন। ধুতি পাইয়া বৃদ্ধ। বলিলেন, “আমার ছেলের জামা কৈ, জুতা কৈ ?” বালিকা অমনি স্বামীর নূতন জুতা, মূতন জামা আনিয়া হাজির করি- লেন! তখন বৃদ্ধা ধুতিখানি খুলিয়া সম্মুঙ্গে পুত্ৰবােধে, তাহা পরাইতে গেলেন। শেষে পুত্রকে খুঁজিয়া না পাইয়া, “আমার ছেলে কৈ ?” বলিয়া গভীর আর্তনাদে বালিকা গলা জড়াইয়া ধরিলেন। কৌশল্যা মুচ্ছিত হইয়া ভুতলে পড়িয়া গেলেন। বহুক্ষণ পরে আবার তিনি চেতন লাভ করিলেন। পূজার বাজনা বাজে, বৃদ্ধা বালিকাকে বলেন, “দেখ দিদিমণি । চিনিবাস আমার বিয়ে করে, বো নিয়ে বাজনা বাজায়ে ঘরে আসূচে-পূমি দিদি ? বৌকে কোলে করবে, আমি ছেলেকে কোলে কোর আবাে?” বালিক! তা অনবে বৈকি ?

fংশ পরিচ্ছেদ।
?
বৃদ্ধা। কাল, ঐ বড় ঘরে ফুলশ্লষ্যা হবে। তুমি এখন
থেকে ফুলশয্যার যােগাড় কর।
আরতির শাক বাজিল, কৌশল্যা বলিল, “ঐ বর
এসেছে।”
এইরূপে আশ্বিন গেল, কার্তিক অসিল। বৃদ্ধার দেহ
ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইতে লাগিল। কোন দিন ভাত খান,
কোন দিন খান না, কোন দিন বা বালিকা খাওয়াইয়া দেন।
কোন দিন ভাত খাইতে বসিয়া বৃদ্ধ বলেন, “আমি এতগুলে।
ভাত খেলে আমার চিনিবাস খাবে কি ? আমি দুমুঠোর বেশী
ভাত খাব না-”গ্রাস দুই মুখে দিয়া সেদিন সময় ভাত
ফেলিয়া রাখেন।
কাকিমাসের শেষে অঘোর বাবু অাবার সপরিবারে
কলিকাতা আসিলো, তাহার কাজকৰ্ম্ম দূরে গেল, কেবল
চিনিবাসের অনুসন্ধানই তাহার একমাত্র ব্রত হইল । কার্তিক
অতীত হইল, অগ্রহায়ণ আসিল,—কিন্তু চিনিবাস আসিলেন
না। অবশেষে পৌষমাসের প্রথমে, চিনিবাস, রামমণি সমভি-
ব্যাহারে কলিকাতায় শুভপদার্পণ করিলেন। বন্ধুবান্ধবকে
বলিলেন, “এবার উত্তরপশ্চিম, পাঞ্জাব সম্পূর্ণরূপ দিগ্বিজয়
করিয়া আসিয়াছি, কাশী, এলাহাবাদ, কাণপুর, লক্ষ্ণৌ, দিল্পী,
লাহোরে বক্তৃতা অগ্নি ধু ধু জ্বালাইয়া আসিয়াছি, ভারত •
উদ্ধারের জন্য বহুসহস্র টাকা চাদা আদায় হইয়াছে।”
বন্ধুবান্ধবগণ চিনিবাসকে সাধু, সাধু, কহিতে লাগিল।

চিনিবাস চরিত।
০
লবসল পত্রিকায় এই দিগ্বিজয়বার্তা সুবর্ণ অক্ষরে প্রকাশিত
হইল। জনসাধারণ' বলিল, “চিনিবাস ক্ষণজন্মা পুরুষ।”
ধুধুধুধু নৌবত বাজে রে।
বরপুত্ৰ সভ্যতার,
-চিনিবাস অবতার,
রাজা হৈল কলিকাতা মাঝে রে।
ভে। ভে। ভােরঙ্গ বাজে, ধাঁ ধাঁ ধামসা গাজে,
ঝা ঝা ঝম ঝম্ ঝুঁজে রে ।
ঘড়ি বাজে ঠন ঠন, ঘণ্টা বাজে রণ, রণ
গন গন গজটা গাজে রে ।
সিপাহী সহায় হঁাকে, নকীব সেলাম ডাকে,
দেওয়ান বলি কাজে রে ।
নবগুণে নবরসে,
ভুবন ভরিল যশে,
চাদের কলঙ্ক হইল লালে রে।
নগরে আনন্দলহরী। নিষ্কামধৰ্ম্ম চিনিবাস রাজা হইবেন।
পাছে ভারতেশ্বরী ভিক্টোরিয়া মৰ্ম্মে বাধা পান, বড়লাট দুঃখিত
হন, ঘােটলাট কাঁদেন ;--এই ভয়ে শ্রীযুক্ত চিনিবাস বন্দ্যো-
পাধ্যায় মহাশয়, ( নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও.) জনক ঋষির ন্যায়,
নিষ্কামভাবে রাজা-উপাধি গ্রহণ করিবেন বলিয়াছেন।
আজ ঘােষণার দিন। চিনিবাস যে রাজা হইবে, অদ্য
তাহাই কলিকাতাবাসীর নিকট তিনি নিষ্কামভারে ঘােষণা করি-
বেন। তাই তঁার শ্বাহে জাজ মহা মহােৎসব। পতপত শব্দে
পাকা উড়িতেছে,-তাহাতে লেখা আছে; “শিক্ষামধৰ্ম্ম চিনি-

বিংশ পরিঙ্গৈ। বাস রাজা।” অত্যুচ্চ তােরণে নহব বাজিতেছে ; কোথাও বা রােসন-চৌকির মধুর আলাপে মন মাতাইয়া তুলিয়াছে ; কোথাও বা গড়ের বাদ্যে বিজয় ঘােষণা করিতেছে। গৃহদ্বারে কদলী বৃক্ষ, মঙ্গলঘট, বান হইয়াছে ; আমের শাখা টাঙ্গান হইয়াছে ; দ্বারদেশ হইতে গৃহাভ্যন্তর পর্যন্ত চলন-পথটা লাল কার্পেটে মােড়া হইয়াছে। গৃহমধ্যে প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণে এক বিচিত্র চন্দ্রাতপ খটান হই- আছে ! সাদা, লাল, নীল রঙের ঝাড়-লণ্ঠন ঝুলিড়েছে। সৈই চাপে এই কয়টী কথা খুব বড় বড় অক্ষরে লিখিত আছে। “যতাে ধৰ্মস্থতাে জয়ঃ।” “ব্ৰহ্মকৃপাহি কেবলম।” “কন্যাপ্যেবং পালনীয় শিক্ষণীয়াতিযত্নতঃ।” “অহিংসা পরমাে ধৰ্ম্ম।” উঠান টা প্রথমত তাল কার্পেট মােড়া, তার উপর কোথাও চেয়ার টেবিল, কোথাও সােকা, খাট ;-কোথাও বা যাজিম- পাতা চালা বিছানা । উঠানের এক কোণে কতকগুলি বিলাতী বাদ্যযন্ত্র -পিয়াননা, হারমােনিয়ম, ফুলুট, জয়ঢাক ইত্যাদি। অজি হবে কি ? চিনিবাসজার গৃহে আজ কলিকাতার জনসাধারণ নিমন্ত্রিত। তদুপলক্ষে সৎসঙ্গীত, সচ, সৎ- অামােদ-প্রমােণ হইবে। দেশীয়দের সম্মান বজায় শখিবার ১৪ চিনি-চরিতামৃত। ; জন্য চিনিবাসরাজ, অদ্য কতকটা দেশীয় ভাব বজায় রাখিয়া- ছেন। কতকগুলি বিলাতীয় বন্ধুও নিমন্ত্রিত হইয়াছেন তাহাদের জন্য সমস্তই বিলাতীভাবে প্রস্তুত আছে। ফল কথা, বোবাজারের শ্রীযুক্ত ভীম বাবু বং উইল-সেন্ সাহেব, আজ একই গৃহে অবস্থিত। কিরূপ আমােদ হইবে, তাহা লইযা ভারি বাদানুবাদ হয় । বাইনাচ, খেমটানাচ-কুরুচি। থিয়েটার কুরুচিকারণ তাহাতেও বেশ্যা-স্ত্রীলােক থাকে। যাত্রার দল--অসভ্যতা পূর্ণ, -এবং উহাতে মিথ্যা কথার প্রশ্রয় দেওয়া হয়, কারণ তথায় পুরুষ স্ত্রীবৎ পােষাক পরিয়া আপনাকে স্ত্রীলােক বলিয়া পরিচয় দেয় ;--জালকরা, পিনালকোর্ড অনুসারে দণ্ডনীয়। শেষে ঠিক হইল, কে এল শিক্ষিতা-মহিলাগণের পবিত্র সঙ্গীত হইবে। একজন এ প্রস্তাবটি অন্ধ প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, “সঙ্গীত হউক ক্ষতি নাই, কিন্তু ইহাতে আর নূতনত্ব নাই।” একজন বিলাত প্রত্যাগত সুস যুবক এইরূপ প্রস্তাব করিলেন ;-“এরূপ সমারােহ কাণ্ডে বিলাহে রাজগণ “বল” দিয়া থাকেন। অতি পবিত্র নৃত্য। শিক্ষিত সভ্য যুবতী কুল- বধুগণ শিক্ষিত সভ্য কুলতিলকগণের হত ধরিয়া স্কন্ধ ধরিয়া পায়ে পা দিয়া, অতীব পবিত্র মনে নৃত্য করিতে থাকেন। অদ্য এই মহােৎসবে বল নাচই হউক।” একজন দেশীশিক্ষিত বলিলেন, “ইহাতে কুরুচির ঈষৎ-আমেক্স আসিতেছে নয়?” সেই বিলত প্রত্যা- সভা, হে হ হাসিয়া উঠিলেন এবং ;

বিংশ পরিচ্ছেদ। । সেই হাসিতে অনেকেই যােগ দিলেন। বিলাত প্রত্যাগত ব্যক্তি বলিলেন, “যাহা সভ্যদেশ-সম্মানিত, তাহা সৰ্ব্বথা পুজ- নীয়। উহাতে কোনরূপ দোষের আশঙ্কা থাকিলে কখনই ১৯টা সভ্যদেশে উহা প্রচলিত হইত না। কেবল মনটিকে পবিত্র করিয়া ঐ কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হও, কোন দোষ নাই। আমাদের মধ্যে কোন নরনারীর মন অপবিত্র ?-কাহারাে নহে। কোন্ নরনারীর মনে দ্বিভাব আছে ? কাহারো নহে। কোনর- নারীর হৃদয়ে বিশ্বজননীর প্রেম অঙ্কিত হয় নাই ?”—“সক- লেরই।” সভাস্থ সকলেই বলিলেন,—“সকলেরই।” যিনি প্রতিবাদ করিয়াছিলেন, তিনিও বলিলেন, “সকলেরই।' বিলাতে যখন “বলনাচ” অাছে, তখন আমার ও ইহাতে মত অাছে। সভ্যদেশের দৃষ্টান্ত অনুকরণীয়। কোন শুভদিনে বঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় এই নাচ আরম্ভ হইবে, আমি এখন কেবল তাহাই ভাবিতেছি।” প্রস্তাব অনুমােদিত হইলে, রাজভবনে বল নারেই আয়ো- জন হইতে লাগিল। নরনারীকুল নাচের পােষাক পরিতে আরম্ভ করিলেন। তবকে তবকে ফুলের রাশি চারিদিকে পড়িতে লাগিল, গােলাপজল, লাভেণ্ডার, অডিকলােম প্রভৃতি জলীয় পদার্থের বর্ষণ শুরু হইল। মহােব-উ মা মহিলা- কুলের মধুমুখের মধুমাখা কথায়, আসর মাৎ হইয়া উঠিল ; পরেশপাথর পুরুষকুল ও প্রকৃতির সেবার কার্যাপৱতা দেখা, ইতে গেলেন। কোন কামিনী কৌতুক করিয়া কোন পুরুষের ;

চিনিবাস-চরিতামৃত।
পাত্রে গােলাপফুল ছুড়িয়া মারিলেন। পুরুষপ্রবর সেই
কোমলকামিনী-হস্তপ্রক্ষিপ্ত নিজ-অঙ্গ-ঘর্ষিত, ভুপতি,
গােলাপপুস্পটিকে কুড়াইয়া লইয়া একবার চুম্বন করিয়া,
আপন বক্ষে তাহা ধারণ করিলেন। কোন মধুরহাসিনী,
ঈষৎ-কর্ণাভরণ দুলাইয়া, আড়খেমটায় তালে তালে পা ফেলিয়া
নীরবে প্রচ্ছন্নভাবে, কোন পুরুষের পশ্চাৎ প্রদেশে উপস্থিত
হইয়া অলক্ষ্যে তাহার গলদেশে বেলফুলের মালা পরাইয়া
দিলেন। পুরুষ-প্রাণ চমকিল। তিনি ফিরিয়া দেখিলেন,
যেন ফুলময়ী বাসীলতা গৌরবে স্ফীত হইয়া, মলয়ানিলের
মন্দ মন্দ হিল্লোলে, মৃদুমৃদু দুলিতেছে। তখন পুরুষ, ননদ্বয়
অর্ধ-মুদ্রিত করিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে স্তব আরম্ভ করিলেন,
“হে দিবি! হে সুরসুন্দরি। 'হে বিলােল-লােচনি! তুমি
কে, আমায় পরিচয় দাও। ভাগীরথা দেবীকে ভাদ্রমাসে
ভরা দেখিয়াছি, নন্দনকাননে অমৃতময়ী অপ্সরার মনােমমাহিনী
মুক্তি দেখিয়াছি; কিন্তু এরূপ অন্ত রূপের মহাসাগর কখন
নিরীক্ষণ করি নাই। রূপসাগরের তরঙ্গ যেন, বেলাভূমি
অতিক্রম করিয়া, আমাকে গ্রাঙ্গ করিতে আসিতেছে! দেবি !
দয়া করিয়া বল, আমাকে কোন কাৰ্য্য সাধন করিতে হইবে ?
বিশালাক্ষি। আর নীরব থাকিও না ; শীঘ্র বল, তােমার
কোন প্রিয়কৰ্ম্ম আৰম্ভ কবি? যদি কোন অবধ্য ব্যক্তিকে
বধ করিতে হয়, অথবা যদি কোন বধ্য ব্যক্তিকে মুক্ত করিতে
হয়, তাহাও তােমার সন্তোষের নিমিত্ত করিতে প্রস্তুত আছি।
!

বিংশ পরিচ্ছেদ। ; সুন্দরি ! আমার যাহা কিছু ধন সম্পত্তি আছে, তুমি তৎ- সমুদয়েরই অধীশ্বরী—আমি ও আমার অনুচরবর্গ সকলেই গেমার বশবর্তী। অবনীমণ্ডলের মধ্যে যত উত্তম উত্তম রত্ন আছে, তন্মধ্যে তুমি যাহা প্রার্থনা কর, বল ; তাহাই প্রদান করিতেছি। দেবি । একটীমাত্র কথায় মনের ভাব প্রকাশ কর। বরং জলবর্ষণ না হইলেও সংসারযাত্রা নির্ধাহ হইতে পারে, দিবাকর উদিত না হইলেও বরং ব্যবসা বাণিজ্য নিৰ্বাহ হইতে পারে, জগৎপ্রাণ অনিল ব্যতীত বরং লেকপাল জীবিত থাকিতে পারে ; পরন্তু তােমার অধর-পদ্ম-প্র’ প্রস্ফুটিত সুধামাখা একটা কথা ব্যতীত কোন ব্যক্তিই জীবিত থাকিবে ।” কিন্তু রমণী কোন কথাই কহিলেন না-কেবল একটা ফুলের তােড়া লুফিতে লুফিতে অন্য দিকে চলিয়া গেলেন। পুরুষ নিকটস্থ সােফায় পড়িয়া গিয়া, বােধ হয় চৈতন্য হারাই- লেন। আবার ওদিকে দেখ, কোন তৃষাতুরা কামিনীর জন্য, কোন পুরুষ গােলাপী সরবত লইয়া ধাৰিত হইয়াছেন; কোন হিমাঙ্গিনীর চা তুলিয়া খাইতে সাধ হওয়ায়, পুরু গরম গরম চা, চামচে করিয়া, কামিনীর অধরে ঢালিয়া দিবার সুখানুভব করিতেছেন। কোন কোন পদ্মিনী সভামধ্যে বিষম সর্দি- রােগে আক্রান্ত হওয়ায়,-সুচিকিৎসক লালবর্ণ দ্রবময় মহা- মধুর ব্যবস্থা করিয়া দিলেন বিজয় ব্যাণ্ড বাজিয়া উঠিল। নরনারীর নাচ আরম্ভ দুইল। দিক সুপ্রসন্ন হইল। আকাশের কালাে মেঘ চিনিন চরিতামৃত। কাটিয়া গেল। চন্দ্র হাসিল। জয় জয় রবে ভূবন ভরিল। এ সময় বাজা চিনিবাস কোথায় ? গুরুতর কর্তব্য অনুরােধে তিনি আজ নাচে যােগ দিতে পারেন নাই। অদ্য তিনি স্বয়ং গৃহদ্বারে দাড়াইয়া নিমন্ত্রিত, অগিন্তুক, অতিথিগণকে সম্রমে অস্বনি করিতেছেন। পাছে কাহারও অমর্যাদা হয়, এই ভয়ে তিনি নিজে দ্বারে থাকিয়া সম্ভাষণ-কার্যের ভার লইয়াছেন। নিষ্কাম-ধৰ্ম্মের কি অনির্বচনীয় প্রভাব। বাজাহে আজ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় ;কিন্তু স্বয়ং চিনিবাস- -রজি আজ নিষ্কাম,-আট আনা মূল্যের ঠে টিথান ধূতি পরিয়াছেন,-হাঁটুর উপর সে কাপড় উঠিছে,—পায়ে তাল- তলার চটী,বঁধে মূড়িশেলাই চাদর, হাতে একগাছি কঞ্চির ছড়ি। চিনিবাস-রাজের পার্শ্বদেশে কয়েকটী অনুচর ছিল, তাহারা সকলে উজ্জ্বল বসন-ষণে বিভূষিত। সমগ্র রাজ- পুতানা উজাড় করিয়া সে পােষাকে সুষ্ট হইয়াছে। কাহার ও পােষাকে সুব। হীরক ঝকিতেছে। কাহারও পাগড়ীতে সােণার প্রজাপতি বসান আছে। সাল, কিংখাপ, সাটীনের শ্রাদ্ধ হইয়াছে। তাহাদিগকে দেখিলে মনে হয় যেন, পােষাক পরিবার জন্যই তাঁহারা ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়াছেন। তাহা- দের মধ্যে কেহ নবভুপতির উদ্দেশ্যে বলিতেছেন, “মহারাজ। অব্য আপনার এ সামান্য বস্ত্র পরিধান করা উচিত নহে। আপনি একবার রাজবেশ পরুন, আমরা একবার নয়ন সার্থক ।

रि • বিচেছদ। বিভু শতি ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “আমি নিষ্কামধম্মী পুরুষ,-আমি কামনাশূন্য হইয়া সমস্ত কাজই করিযা থাকি । সুতরাং আমার আড় ধরময় পােষাকে কাজ কি ? আমার পক্ষে সব সমান।” সকলে সমস্বরে বলি উঠিলেন, “ধন্য, ধন্য ! এ মাযামস মহীতলে একমাত্র আপনিই ধন্য !-কিন্তু আমাদের ক্ষু ম• বুঝে না, তাই বলিতেছি, একবার, দশ মিনিটের জন্য সেই বিলা ও কারি কব-নিৰ্ম্মি রাজবেশী পরিপাশ কৰি প্র কৃতি সুর অন দ1 ক.ন! মহারাজ! সুর্যে। যে কমলের ন্যায় আমাদের হৃদয-কলকে প্ৰ বুটিত করুন।” মহারাজ আবার হালিয়া বলিলেন, “হে অনুচরব f! লোক- অনিন্দবন্ধনের নিমিত্তই আমার রাজ-ব্রত গ্রহণ-অমাব নিজের কিছুতেই স্পৃহা নাই। কিন্তু শ৷ শ্ৰীমতী সংস্কৃত ভাসি। মহাদেবী ভগিনী রমমূণির এ বিষয়ে অনুমতি নাই।” অনুচরবর্গ যােড় হাতে আবার বলিলেন,-“মহারাজ! এ দাসগণের এক শেষ-অনুরােধ অাছে। অাপনি রাজ-চি- সরূপ সেই মুকুটটী মাথায় পরুন ;-আমাদের কষ্টের বহু পরিমাণে লাঘব হইতে পারে। চিনিবাস-রাজ বলিলেন, “তােমাদের মনে আমি আর কষ্ট দিতে চাহি না--তাহাই হউক।” এখন অনুচরবর্গ অনিন্দমনে বহুথুল্য রাজমুকুট আনিয়া সেই চটীজু-ঠে টিন-মুড়িশেলাই-চাদর-বিশিষ্ট চিনিবাস-

১৬।
চিনিৰাস-চরিতামৃত।
।
রাজের মস্তকে তাহা পরাইয়া দিল । একখানি পাতি মোর
মাথায় দিয়া আসিয়া, বেলিভ্রাতা-ভবনের থানধুতি-পরিধান
নিরাভরণা ভগিনী রামমণি চিনিবাস-রাজের বামে আসিয়া
দাড়াইলেন। অনুচরবর্গ ও ‘নিষ্কামধৰ্ম্ম অঙ্কিত একখানি লাল
কাপড় ধরিয়া রহিল।
এদিকে অঘাের বাৰু কেবল সুবিধা সুযােগ খুঁজিতেছিলেন।
অদ্য চিনিবাসের রাজ-উৎসব বুঝিতে পারিয়া, স্থির করিলেন
-সাক্ষাতের অদ্যই শুভ দিন। কৌশল্যাকে গিয়া বলিলেন,
“অজি তােমার ছেলের সঙ্গে দেখা হবে—আমার সঙ্গে-
চল।” বৃদ্ধা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন। মুখ
দিয়া কথা সরিল না-ভাগ্নিতে কথা, দ্রব হইয়া জল-স্থলে
চোখ দিয়া বাহির হইল।
অঘাের বাবু নিজগৃহ হইতে কলকাতায় আসিয়া পেছিলে
পর নিয়মিত গঙ্গাস্নান এবং সুনিয়মে আহারাদি করিয়া একটু
যেন সুস্থ হইয়া উঠিলে বৃদ্ধা তত আর প্রলাপ বকিতেন না।
শুভসংবাদ পাইয়া আনন্দাশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে
বৃদ্ধা পুত্ৰদৰ্শনে গমনােদ্যত হইয়া সজ্জা করিতে লাগিলেন।
ছেলের জন্য সেই পূজার, সময়ের কালাপে েকাপড় জামা এবং
জু-একখানি রুমালে অইস্তে বাঁধিতে লাগিলেন। বাঁধা
ভাল হইতেছে না দেখিয়া, বালিকা তাহা বাঁধিয়া দিতে
গেলেন। বৃদ্ধা বালিকাকে ঈষৎ ঠেলিয়া দিয়া হাসিকালামিশ্রিত
সুরে বলিলেন, “দিদিমণি! আজ আমি ছেলের জিনিস

বিংশ পরিচ্ছেদ।
কাহাকেও বাঁধিতে দিব না।” চিনিবাস বাল্যকালে খৈচুর
ভালবাসিত। কৌশল্যা এক হাঁড়ি খৈচুর লইলেন। বাছা
এ বছর ভাল আম্ খাইতে পায় নাই বলিয়া বৃদ্ধা মিষ্ট আমের
চারখানি আমসত্ত্ব সংগ্রহ করিলেন। একটা ক্ষুদ্র পাতলা
কাসার বাটী ছিল ; ছেলেবেলায় সে বাটীতে চিনিবাস দুধ
খাইতে ভালবাসিত ;—অন্য বাটীতে দুধ দিলে চিনিবাস বাগ
করিত। সেই বাটীটীও বৃচ্ছা সঙ্গে লইলেন।
ঘােড়গাড়ী আসিয়া দ্বারে লাগিল। অrঘার বাবু
কৌশল্যাকে বলিলেন, “শীঘ্র এস, গাড়ী আসিয়াছে।" খৈচুবের
হড়ী, কাপড়ের বস্তা প্রভৃতি সমস্তই গাড়ীতে তােলা হইল।
তখন বৃদ্ধা বালিকার বদন চুম্বন করিয়া বলিলেন, “দিদিমণি।
তুমি জন্ম এয়েস্ত্রী হও,-এক বছরের মধ্যে একটী ছেলে হোক,
পাঁচ সাত দিন অন্তর তুমি আমার খবর নিও-তােমাকে না
দেখুলে আমি বাঁচবাে না।”
বালিকা কাঁদিতে দিতে বৃদ্ধাকে প্রণাম করিলেন। –
বৃদ্ধা আশীর্বাদ করিলেন,-“তােমার স্বামী চিরজীবী হউন ,
তুমি সৎসন্তানের মা হও। দিদিমণি ছেলে না হওয়াব এক
দোষ-লােকে বাজা বলে। কিন্তু কু-সন্তান হলে প্রত্যাহ
সহস্র-বিছার দংশন-জ্বালা ভােগ করতে হয়।--সে যাহােক,
আমার চিনিবাসের বিয়ের সময়, একমাস পুর্বে যেয়ে তােমাকে
কাজকর্ম করিতে হইবে।”
যাের বাৰু পুনরায় শ্ম আসিবার জন্য ত্বর দিলেন।
১১

১৬ চিনিবাস-চরিতামৃত। কৌশল্যা বাটীর দ্বার পর্যন্ত বালিকার হাত ধরিয়া লইয়া গেলেন। শেষে কাঁদিতে কাদিতে, বালিকার হাত ধরিয়া গাড়ীতে উঠিলেন। অন্য সময়ে, কৌশল্যাকে ধরিয়া গাড়ীতে তুলিতে হইত ; অদ্য তিনি স্বয়ং সজার গাড়ীতে উঠিয়া পড়ি- লেন। অঘাের বাবু এবং ডাক্তার বাবু উভয়েই তখন গাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলেন। কোচম্যান গাড়ী হাঁকাইল। অর্ধঘণ্টার মধ্যে চিনিবাসের রাজভবনের সম্মুখে গাড়ী উপস্থিত হইল। চিনিবা-রাজ সেইরূপই ঠে টি-থান কাপড় পরিয়া, মাথায় নিষ্কামভাবে মুকুট আঁটিয়া লােসন্তাষণার্থ, দ্বারদেশে দণ্ডায়মান। কৌশল্যা, বহুদিন পরে দূর হইতে সন্তানের মুখাবলােকন করিয়া দ্রুতপদে গাড়ী হইতে নামির নক্ষত্ৰবেগে চিনিবাস- অভিমুখে ছুটিলেন। চক্ষুর পলক ফেলিতে না ফেলিতে বৃদ্ধা “বাবা চিনিবাস” বলিয়া মহা আর্তনাদে পুত্রের গলা জড়াইয়া ধরিলেন। চিনিবাস ভীত, চমকিত, শশব্যস্ত, বিব্রত। মুখ দিয়া আর ভাল কথ। বাহির হয় না; তিনি “কে তুমি, কে তুমি” বলিয়া কৌশল্যাকে ঝাড়িয়া ফেলিবার উপক্রম করিলেন। অঘাের বাবু, বলিলেন, “চিনিরাস বাবু, আপনার মা এসেছেন, কৌশল্যা চিনিবাসের গলা ধরিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘বাবা চিনিবাস ! এত দিন কি মাকে ভুলে থাকতে হয় বাছা ?” ==

বিংশ পরিচ্ছেন।
পার্শ্ববর্তী অনুচরগণ বিস্ময়াম্বিত হইল। তখন মহাদেবী
রামমণি ক্রোধে দন্ত কিটিমিটি করিয়া, রক্তচক্ষু ধুরাইযা চিনি-
বাসকে বলিলেন, “রাজ! কিং করিতেছং-ইয়াং বৃদ্ধা
দুষ্টাং পাপিনিং ভিখারিণীং পদাঘাতং কৃত্বং,-দূরং বুরু,
দূরং কুরু-”
চন্দ্র, সূর্য, বৈশ্বানর, গ্রহ, নক্ষত্র-সকলে সাক্ষী হও।
কলিকালে, কলিকাতায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্লেষভাগে এক
অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটিল। মহাগুরু প্রধানা ভগিনী রামমণির
কথা শুনিয়া চিনিবাস, কৌশলে কৌশল্যার হস্ত নিজ গলদেশ
হইতে ছাড়াইয়া বলিলেন, “দ্বারােয়াজী, এই পাগলীকে
হিয়াসে জলদি নিকালো—
কৌশল্যা কিছুই বুঝেন নাই “বলিলেন বাছা চিনিবাস ।
হাের মুখ এত শুকননা 'নে?”
চিনিবাস তখন রামমণির হাত ধরিয়া দ্বারদেশ ছাড়িয়া
অন্দরাভিমুখে পলায়ন-পরায়ণ হইলেন। বৃদ্ধা আর্তনাদ
করিতে লাগিলেন, “বাবা চিনিবাস ! তুই বুড়ীকে ফেলিয়া
আবার কোথা যাস?”—এমন সময় দ্বাবােন আসিয়া বৃক্ষর
গলা সজোরে বিষম টিপিয়া ধরিয়া বলিল, “ভাগাে-
হিয়াসে।”
জরাজীর্ণ, ক্ষীণ, দীনা বৃদ্ধা গলায় দারুণ আঘাত পাইয়া,
মুচ্ছিত-হুইয়া ভুতলশায়িনী হইলেন। মুখ দিয়া ফেন উদগত
হুইতে লাগিল। চক্ষু কপালে উঠিল। অঙ্গ স্থির হইল। এক
–

টিল । TAJU PUBLIS LIBRARY. চিনি সি-চরিতা। মিনিটের মধ্যে প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত-এই সমস্ত ঘটনা অঘাের বাবু এবং ডাক্তার বাবু ধরাধরি করিয়া সেই পুত্র- ময়প্রাণ কৌশল্যাকে নিমতলার ঘাষ্টে লইয়া গেলেন। তথায় স্তুপীকৃত চন্দনকাষ্ঠের মধ্যে বৃদ্ধার জ্বালাময় দেহ ভস্মীভূত হইল। সেই বালিকা ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিলেন, “আমার যেন কখন পুত্র সন্তান না হয়। চিনিবাসের রাজত্ব ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। সত্য- ধৰ্ম্মের ফুল ফুটিল। সমগ্র ভারতবাসীর প্রেমে চিনিবাসের মন আদিলীলা সমাপ্ত ৭ মজিল । ESTD. 1902 a J, HawaA বিজয়া বটিকা। বিজয়া বটিকা এবং কুইনাইন। কুইনাইন সেবনে যে জ্বর যায় না, বিজয়া বটিকায় সহজেই তাহা আরাম হয়। দশ পনর দিন অন্তর পুনঃপুনঃ জ্বর- রোগে যিনি কষ্ট পাইতেছেন, বিজয়া বটিকা তাহার জ্বরবরাগে ব্ৰহ্মাস্ত্র-সরূপ। বিজয়া বটিকার অলৌকিকত্ব। রােগীর নাড়ীতে ২৪ ঘণ্টাই জ্বর আছে, প্লীহার কামড়ানি এবং যকৃতের টাটানিতে রোগী অস্থির হইয়াছে, রোগীর হাত মুখ পা পর্যন্ত ফুলিয়াছে, চক্ষু হরিদ্রাবর্ণ হইয়াছে ;-এমন বিবিধ ব্যাধিগ্রস্ত রােগী ও বিজয়। বটিকা সেনে আরোগ্য হইতেছেন ;-অথচ এদিকে আপনার জ্বরজ্বালা কিছুই নাই, প্লীহা যৎ নাই ;-সহজ, শরীরে আপনি বিজয়া বটিকা সেবন করুন, আপনার ক্ষুধা বৃদ্ধি হইলে, পুরুষত্ব বৃদি হইবে এবং, লাবণ্য বৃদ্ধি হইবে। সুতরাং বিজ্য। বটিকাকে অভূত- পূৰ্ব অলৌকিক শক্তিধর ঔষধ কে না বলিবে ?

বিজয়া বটিকা—বি, বসু এণ্ড কোম্পানী। এলােপ্যাথি, হােমিওপ্যাথি ও হাকিমি বিফল। বােহিলখণ্ডের অন্তর্গত রামপুর ষ্টেটের হাইস্কুলের প্রিসি- পাল, বি, সিংহ কি লিখিয়াছেন দেখুন, “যথাক্রমে এলােপ্যাথি, হােমিওপ্যাথি, এবং হাকিমি মতে দীর্ঘকাল ধরিয়া চিকিৎসা করিয়াও যে সকল রােগীর আদৌ কোন ফল হয় নাই, ইতিপূর্বে আপনার নিকট হইতে যে এক কৌটা বিজয়া বটিক। অনাইয়াছিলাম, তাহা তাহা- দিলের পক্ষে যেন মন্ত্র-শক্তির ন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছে।” পঞ্জাব প্রদেশস্থ উকীলের পত্র। পঞ্জাব প্রদেশস্থ লাহােরের প্রধান বিচারালয়ের সুপ্রসিদ্ধ উকীল শ্ৰীযুক্ত বাবু অমৃতলাল রায়, বি, এ, বি, এল মহােদয় ইংরাজীতে যে পত্র লিখিয়াছেন, তাহার ভাবার্থ এইরূপ, “আপনার সুপ্রসিদ্ধ ‘বিজয়া বটিকা দ্বারা আমি যে অসামান্য উপকার লাভ করিয়াছি, তজ্জন্য আপনাকে আনন্দ- সহকারে ধন্যবাদ প্রদান করিতেছি। প্লীহা ও যকৃৎ সংযুক্ত বহু দিনের পুরাতন জ্বর এবং বাতজ্বর, অন্যান্য অনেক রকম ঔষধে যাহা আবােগ্য করিতে সমর্থ হয় নাই, আপনার বিজয় বটিকা দ্বারা তাহা আরােগ্য হইয়াছে। অনুগ্রহ করিয়া সত্বর নং বিজয়া বটিকার এক কৌটা ভিঃ পিঃতে পাঠাইয়া দিবেন।” ৮ বিজয়াবটিকা-৭৯নং হারিসন রােড, কলিকাতা। ডেপুট-মাজিষ্টয়ের পত্র। গভীর শােথযুক্ত ফোড়া হওয়ায়, আমি বিষম জ্বরে ভুগিতেছিলাম। ডাক্তারী চিকিৎসায় কোন ফল পাই নাই ; অবশেষে আপনার বিজয়ী বটিকা সেবন করিয়া, সম্পূর্ণরূপে আবােগ্য হইয়াছিলাম। সেই অবধি বিজয়া বটিকার উপর আমার প্রগাঢ় ভক্তি। ইহা উৎকৃষ্ট টনিক। ইহা সেবন করিলে, স্বচ্ছন্দে কোষ্ঠ খােলদা হয়,জ্বর এবং সর্দি শরীরে আসিতে দেয় না। শ্ৰীশ্ৰীনাথ গুপ্ত, ডেপুটী মাজিষ্ট্রেট, খুলনা, বঙ্গদেশ। | • ১নং কোটা ২নং কোটা ৩নং কোটা বিজয়া বটিকার মূল্যাদি। বটিকার সংখ্যা: মূল্য ডাঃমঃ প্যাকিং ভিঃপিঃ ॥ lo ৩৬ ০ ৫৪ ১y /o বিশেষ বৃহৎ-গার্হস্থ কোটা অর্থাৎ | | ৪নং কোটা ১৪৪ ৪। ০ বি, বসু এণ্ড কোং ৭৯ নং হারিসন রােড, কলিকাতা।

বি, বসু এণ্ড কোম্পানীর
সালস।
সালার প্রশংসাপত্র।
১ম পত্র ।
মধ্যভারত গােয়ালিয়া রাজ্যের লস্কর হাসপাতালের এসি-
ষ্ট্যান্ট সার্জন শ্ৰীযুক্ত বিহারীলাল ঘােষ মহাশয় আমাদেব
হাতীমা সালসা সম্বন্ধে ইংরাজীতে যে পত্র লিখিয়াছেন,
তাহার ভাবার্থ এইরূপ,-“মহাশয় ! বাজাবে যত প্রকার
সালসা পাওয়া যায়, তন্মধ্যে, বি, বসু এণ্ড কোম্পানীর সালসা
সর্বোৎকৃষ্ট। ইহা আমি স্বয়ং উত্তমরূপে ব্যবহার করিযা
জানিয়াছি। আমার ধারণা পাকস্থলী সবল করিতে ইহা
অদ্বিতীয় মহৌষধ। আমি দীর্ঘকাল ধরিয়া অগ্নিমান্দ্য ও বহু-
মুত্র রােগে কষ্ট পাইয়া আসিতেছি; কিন্তু আপনার সালস।
ব্যবহার করা অবধি অনেক পরিমাণে ভাল আছি।
আমি
মুক্তকণ্ঠে বলিতেছি, আপনার সালা আশ্চর্য ক্ষমতাশালী।
২য় পত্র ।
আমি আপনাদের (বি, বস্তু এ কোংর) হাতীমার্কা
সালসা সেবন করিয়া বাতরােগে বিশেষ উপকার পাইয়াছি।
ইতিপূর্বে অনেক রকম চিকিৎসা করিয়াও, এই বাতরােগ
হইভে মুক্তিলাভ করিতে পারি নাই। আর কিঞ্চিমাত্ৰ বাবে
কর, আছে। এই লােক মাং ৩নং দুই শিশি সালস।

হাতিমার্কা সালসা-৭৯নং হারিসন রােড, কলিকাতা।
পাঠাইবেন। আমার একটী ছেলে খােস-পাচড়ায় অনেকদিন
হইতে কষ্ট পাইতেছিল, আপনার সুস্বাদু সালসা তাহাকেও
খাওয়াইতেছি। তাহারও অনেক উপকার হইয়াছে।
শ্রীদেবেন্দ্রবিজয় বসু।
মুন্সেফ, উলুবেড়িয়া, হুগলী।
৩য় পত্র ।
আপনাদের সালসা সেবনে বিশেষ উপকার পাইযাছি ।
ইহা যে ক্ষুধাবৃদ্ধি, ধাতুপুষ্টি ও রক্ত পরিষ্কার করিতে পারে,
তাহাতে সন্দেহ নাই। বাস্তবিক আপনার সালসা অতি উপা
দেয় জিনিষই হইয়াছে, তজ্জন্য আপনাদিগকে ধন্যবাদ দিই ।
যাহারা রক্তপরিষ্কার, ক্ষুধাবৃদ্ধি ও ধাতুপুষ্টির বাসনা কবেন,
তাদিগকে একবার বি, বসু এন্ড কোম্পানীর সালস সেবন
কবিতে অনুরােধ করি।
শ্ৰীযতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত জমিদার, পােঃ চৌদ্দগ্রাম, ত্রিপুরা।
হাতীমার্কা সালমার মূল্যাদি।
মূল্য
ভঃমাঃ প্যাঃ ভি
১নং আধপােয়া শিশি ॥yo
২নং একপায়া শিশি ১%
lo
৩নং দেড়পােয়া শিশি ১০
বি, বসু এণ্ড কোং
৭৯নং হারিসন রােড, কলিকাতা।

বি, বসু এণ্ড কোম্পানীর ফুলেলা। মহাসৌরভময় উপকারক তৈল। ফুলেলার প্রশংসাপত্র। ১ম পত্র। কলিকাতা হাইকোর্টের সূক্ষদর্শী প্রসিদ্ধ উকীল এটর্ণী শ্ৰীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত এম, এ, বি, এল, মহােদয় ফুলেল সম্বন্ধে কি লিখিয়াছেন, দেখুন, “আপনাদের ‘ফুলেলা’ দুই শিশি ব্যবহার করিয়াই চুল- উঠা সম্বন্ধে অনেক উপকার পাইয়াছি। ফুলেলা’র গন্ধ অতি মনােহর,স্নানের পরও অনেকক্ষণ গন্ধ থাকে।” ২য় পত্র। - যিনি অবকাশঞ্জিনী, পলাশীর যুদ্ধ, রৈবতক, কুরুক্ষেত্র প্রভৃতি গ্রন্থ লিথিয়া বঙ্গের কবিকুলচূড়ামণি হইয়াছেন, এক্ষণে যিনি চট্টগ্রামের কমিশনরের পার্শনাল আসিষ্টান্টের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত, সেই মহাকবি শ্রীযুক্ত নবীনচন্দ্র সেন-- ‘ফুলেল' ব্যবহারে প্রীত হইয়া কি লির্থিয়াছেন, দেখুন,—“কি স্নিগ্ধতায়, কি সৌরভ, কি বর্ণের গৌরবে,-“ফুলেলা’ ব্যবহ্রার করিলে মুগ্ধ হইতে হয়।”

ফুলেলা—৭৯নং হারিসন রােড, কলিকাতা। ৩য় পত্র। মশশয়। আপনার প্রেরিত এক শিশি ‘ফুলেলা ব্যব- হরে অত্যন্ত আরাম বােধ করিতেছি ; অনুগ্রহপূর্বক আর এক শিশি ‘ফুলেলা ভিঃপিঃ ডাকে পাঠাইয়া বাধিত করি- বেন। আপনার ‘ফুলেল। অতি চমৎকার হইয়াছে। প্রবােধচন্দ্র দত্ত মুন্সেফ, ল মমীপুর, জেলা নোয়াখালী। ৪র্থ পত্র। কলিকাতা হাইকোর্টের জজ শ্রীযুক্ত সারদা চরণ মিত্র, এম, এ, বি, এল, মহােদয় লিখিতেছেন,- “আমি ফুলেলা ব্যবহার করিয়াছি। মস্তিষ্ক শীতল রাখার পক্ষে ইহ। উৎকৃষ্ট তৈল। ইহার সৌরভও অতি মনােহর। প্রতি শিশি ফুলেলার মুল্য ১৭ এক টাকা; ডাক মাশু- লাদি ও অনা। একত্র ১২ শিশি ফুলেলা লইলে ১৬ দশ টাকাতেই পাইবেন। একত্র ১২ শিশি ফুলেল লইলে, ডাক মাশুলাদি যা আড়াই টাকা মাত্র। একত্র ৬ ছয় শিশি ফুলেল। হইলে পাঁচ টাকাতেই পাইবেন। ইহার ভাকমাশুলাদি ১ly০ এক টাকা ছয় আনা মাত্র। ছয় ছয় শিশির কম লইলে কেহই কমিশন পাইবেন না। বিবসু এণ্ড কোং ৭৯নং হারিসন রােড, কলিকাতা।

বি, বসু এণ্ড কোম্পানীর দাতের মাজন। প্রত্যেক কোটার মূল /০ পচি আনা, ডাঃ মাঃ চারি’ আনা। প্যাকিং / এক আনা। অর্থাৎ ভিঃ পিঃ ডাকে লইলে প্রত্যেক কোটার জন্য ॥ এগার আনা দিতে হয়। কিন্তু একত্র চারি কোটা লইলে, ঐ । চারি আনা ডাক- মাশুলেই যায় । একত্র চারি কোটার প্যাকিং • দুই অনা, ভিঃপিঃ • এক অনা। অর্থাৎ ১৩০ এক টাকা এগার আনাতেই চারি কোটা ডাকে পাওয়া যায়। এক ডজন ( ১২ কৌটা) লইলে, কমিশন ৫০ বার আনা । ভাকমাশুল ০ বার আনা। প্যাকিং । চারি অনা। ভিঃপিঃ • এক আনা অংfৎ ১২ কৌটা দাতের মাজন একত্র ডাকে লইলে ৪/ চারি টাকা। এক আনাতেই পাইবেন। প্রশংসাপত্র। মজঃফরপুরের অন্তর্গত সীতামুরীর সব-ডেপুটী মাজিষ্টর শ্ৰীযুক্ত বাবু প্রভাতচন্দ্র মুখােপাধ্যায় মহাশয় লিখিয়াছেন, “বি, বস্তু এও কোম্পানীর সঁতের মাজন অতি উত্তম। ভিঃপিঃ পােষ্টে পুনরায় আমাকে আর চারি কৌটা দাঁতের মাজন পাঠাইবেন।” বি, বসু এণ্ড কোং ৭৯নং হারিসন রােড, কলিকাতা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Chinibash-charitamrita Ed.6

Author
Not Available
Title
Chinibash-charitamrita Ed.6
File name
Chinibash-charitamrita Ed.6
Text
OCR done
Citation
1902
Published
2010/03/4
Publisher
Arunadoy Ray,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
188
Library
Maju Public Library,howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Chinibash-Charitamrita
DLI number
510997
Barcode
4990010018186.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
A0XoE6gHawu
Download PDF

Chinibash-charitamrita Ed.6