Makardah Saraswat Library, Howrah
Gharete Bhramar Aelo Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ঘরেতে ভ্রমর এলাে
১৮
বুদ্ধদেব বসু
প্রণীত
এক টাকা
প্রকাশক-প্রীরমেন্দ্রকুমার শীল
১৬০, নিমুগােস্বামীর লেন,
কলিকা
প্রথম সংস্করণ
জুন, ১৯৩৫
প্রিন্টার—একুঞ্জবিহারী শীল
শ্রীকৃষ্ণ আর্ট প্রেস
৩২৯, অপার চিৎপুর রােড, কলিকা
ঘরেতে ভ্রমর এলাে
বুদ্ধদেব বসু
প্রণীত
অন্যান্য উপন্যাস :
••
যেদিন ফুটলে কমল, আমার বন্ধু, ধূসর গােধূলি,
হে বিজয়ী বীর, প্রেমের বিচিত্র গতি, শ্বেত পত্র,
সূৰ্য্যমুখী, পরস্পর, অসামান্য মেয়ে, লাল মেঘ,
রূপালি পাখি, বাড়ি-বদল
ঘরেতে ভ্রমর এলাে
নভে
এসে বললে, 'ওগো, জগুবাবুর বাজারে নাকি গঙ্গার লিস
উঠেছে বড়-বড় ! যাও ন', এক টা নিয়ে এসে। সে ।
কী—ইলিশ নহের দিন তো ফুরিয়ে এলো।
रिक ন নঃ,
উপর এ ঋরে না স্বর্গের
শিশিরের মত। এর সুরে সুরে আশ্বিনের নীল সকাবেলা
বিহবল হয়ে ওঠে ।
মাথা তুলে বললুম, ‘প্রিয়ে, চেয়ে দ্যাখো, তােমার খের
ত আকাশ আজ নীল। সাদা মেঘ গুলো ভেসে চছে-
আমার মনের উপর দিয়ে তােমার স্বপ্নের মত।
যে রোদ উঠলো সােনায় সােনা হয়ে ভাবছি এ কি তােমারই
প্রেম সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো?
এখানেই থাম না-না, আমি নিশ্চয় জানি আরে}
কিছু বলতুম, কিন্তু হঠাৎ ভ্রমরের একখানা হাত আমার
মুখের উপর এসে পড়লো। সেহাতে নানারকম মশলার
একট। মিশেল গন্ধে হঠাৎ রান্নাঘর ভিড় করে এলো আমার
ভালাে
লাগে
না।
মগজের মধ্যে।-আহা-থামাে।
ন্যাকামি।
ভ্রমরের হাতখানা মুখের উপর থেকে সরিয়ে নিজের হাতের
মধ্যে নিয়ে বললুম, প্রিয়ে, একবার তাকাও। জানলা দিয়ে
তােমার ঐ চোখ দুটিকে ভ্রমরের মত একবার বাইরে
পাঠিয়ে দাও। স্বর্গ আজ উন্মােচিত।
উর্বশীর ঝলােমলো
আঁচল দুলছে হাওয়ায়। এমন সকালবেলা কি কাটাতেই
হবে রান্নাঘরে, ইলিশ-মাছ নিয়ে ?
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ভ্রমর একটু মুচকি হাসলো। এ-কথা
মানতেই হবে যে তার প্রকৃতিতে সহিষ্ণুতা আছে। আমার
সম্বন্ধে, অন্তত। আমার এ-সব ন্যাকানি সে সহ্য করে-
হাসিমুখে, যেমন আমরা সহ্য করি শিশুর প্রগলভতা।
আছে একটু করুণা, আছে স্নেহ। প্রতিবাদ করবার দরকার
নেই—কেননা শােনবার দরকার নেই।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ
ভ্রমরের জন্য।
ভ্রমর তার আধ-ময়লা সাড়ির স্মলিত আঁচলটা কোমরে
জড়িয়ে বললে : ‘নাও, ওঠো। ন'টা তাে বাজলো বলে
তাড়াহুড়ো লাগবে একটু পরেই।
‘তাড়াহুড়াে? কিসের?
ভ্রমর আমার দিকে একটা তীব্র কটাক্ষক্ষেপ করে’ ঠোট
কালাে।
‘পাগল ! আজ ইস্কুলে যাবাে নাকি ভেবেছো ?
‘না, তা কি আর যাবে ? রােজই তাে একবার বলাে
ও-কথা । তারপর দশটা যেই বাজতে থাকে-তােয়ালে কই ?
সাবান কই ? ভাত কই ? জুতো কই? পান কই ?
একটু হুলুস্থুল বেধে যায় । সময় থাকতে একটু আস্তে-আস্তে
নেয়ে-খেয়ে নিলে কী হয় ? আমি একা কত কি সামলাতে
শারি! আমাকে জব্দ করতে তোমার খুব লো লাগে,
না?'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করলুম। হায়রে, এক দিন ইস্কুল
কামাই করবার ক্ষমতা যে আমার আছে, তার স্ত্রী পর্যন্ত
তা বিশ্বাস করে না। উচ্ছন্নে যাবার আর দেরি কত?
‘যা ও না একটু বাজারে, এমর বতে লাগলো,
দু'মিনিটেই তো ব্যাপার। ছোট দেখে একটা চ্যাপটা- মত
মাছ এনে-বুঝলে? বরফ-চাপা মাছ খেয়ে-গেয়ে অসুখ
নাকি তােমারই করে। টাটকা মাছ নিজে ‘গয়ে আনবে
তো কী হবে?
তাই তো। কী হবে? কী করে টাটক। গাছ সংগ্রহ
হতে পারে, এ-সমস্যাও জীবনে কিছু কম নয়। উঠে
দাড়ালুম।
আমাকে কলমটা ড্রয়ারে ভরে রাখতে দেখে ভ্রমর
বললে : ‘লিখেছিলে নাকি ?
তাড়াতাtি প্যাডটা চাপা দিয়ে বললুম :) ও কিছু নয়। ‘দেখি না, দেখি না একটু।' (খােকা, একটা লজধূস নেবে?' আমি যে বাজারে যেতে রাজি হয়েছি, তার পুরস্কার হিসেবে দস্তুরমত অামার লেখা সম্বন্ধে একটু উৎসাহী হওয়া যায়।) ভ্রমর তাড়াতাড়ি কাগজটা টেনে নিলে। একই। সনেটের প্রথম চার লাইন লিখেছিলুম- কবে, কতদিনে এব কেমন করে বাকি দশ লাইন লিখবে? সেটা এখন সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের দয়ার উপর নির্ভর করছে । কিন্তু সত্যি আমার লেখার উপর ভ্রমরের যাকে বলে সিম্পথি , আছে। খুব বেশি। লেখাপড়া সে বেশিদূর করেনি, কিন্তু তার সহজ বুদ্ধির গুণে সে বুঝেছে যে মাঝে, মাবে মাসিকপত্রে আমার যে দুটো-একটা কবিতা বেরােয়, তঙ্কররক ভালো। সে আমার টেবিল রোজ দু' বেল। এমন নিখুতভাবে গুছিয়ে রাখে যে আমার ছেলে- বেলাকার কথা মনে পড়ে যায় যখন লেখাপড়া ব্যাপারটা ছিলো টেবিল গুছোবার উপলক্ষ্য। অমি যদি কখনো রাত জেগে লিখি কি পড়ি সে আমার শুতে আসবার জন্য ৩।দার করে না। ঘৰুে আলো জ্বলে বলে তার যে ঘুমে'বার অসুবিধে হয় এমন কথাও তার মুখে শুনিনি কখনো। হয়তাে সত্যি-সত্যি হয় না। করবার এমন " একটা সঙ্গত উপলক্ষ্য পেয়ে ও যে ছেড়ে তবু, নালিশ ৪
দেয়, তাকেই তো মহৎ বলে। আপনারা যারা এখনো
বিয়ে করেন নি, আপনাদের চুপে-চুপে বলছি যে বিয়ে যদি
করতেই হয় তো ভ্রমরের মত মেয়ে ।
ভ্রমর কাগজটা সযত্নে চাপা দিয়ে বলে উঠলো 'বাঃ।
{ 'বাঃ, খোকা, বাঃ। চকোলেট নেবে, চকোলেট ? )
আমি গায়ে একটা পাঞ্জাবি চড়াতে-চড়াতে বললুম,
কোথায়, দাও পয়সা।
ভ্রমর আমার মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বললে,
সত্যি কী চমৎকার পদ্য তুমি লেখো। এত ভালো আর
কোনো পদ্যই আমার লাগে না।
হঠাৎ আমি হো হো করে হেসে উঠলুম।
কী হলো?
না, কিছু নয় । দাও পয়সা। দেরি হয়ে যাচ্ছে। একটা
ছোট এবং চ্যাপ্টা-মত ইলিশ আনতেই হবে।
০
ইস্কুলে যাবে না বলে যে শাসিয়েছিলুম সেটা অবিশি
নেহাৎই ফাকা বুলি। না-গেলে দুটো টাকা লােকসান।
বছরে বারো দিন স-মাইনে ছুটি মেলে, তা খরচ করে’
ফেলেছিলুম জানুয়ারি মাসের মধ্যেই। শীতকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হতো; কান্না পেতে। দশটার সময় স্নান কর- বার কথা ভাবলে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেখিনি। সমস্ত বর্ষাটা ইস্কুল করেছি—ভিজেছি গড়পড়তা সপ্তাহে দু'দিন । ইয়োয় চারদিন পড়ে ছিলুম, ভাগ্যিস তার মধ্যে একটা রবিবার ছিলো, দুটো টাকা বাঁচলো তবু । জীবনটা সর্দি-আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলো, ভ্রমর মাঝে-মাঝে রাত্তিরে } শােবার সময় পায়ে গরম সর্ষের তেল মালিশ করে দিতে বলে' বেঁচে ছিলুম ! জয় হোক্ ভ্রমরের। মাঝে-মরে খানকা তব কামাই করেছি। নেহাৎই গায়ের ঋন ; ঋন ; কাটে। না বাপু-মাইনেই তাে কাটবে। এর বেশি আর কী? যাবে না, কিছুতেই যাবে না; ती করতে পারে ? খাটের উপর ( বিয়ের } চিৎপাত হ'য়ে শুয়ে কৰ্তা: মুণ্ড 'চর্বণ করেছি : সময় কাটাবার পর উপাদেয় উপঃ, নানতেই হবে। কিন্তু গেলে। মাসখানেক পরে রােজ হাজি দিচ্ছি । পূজো মাসে খরচ আছে ! এক টাকা কম মানে এক টাকা কম। আজ , প্রমরের চমৎকার রান্নার ইলিশ মাছ খেয়ে, ভ্রমরের সাজ। চমৎকার পান চিবােতে চিবোতে ছাতাটি (বিয়ে) মাথার উপর খুলে বেরিয়ে পড়লুম। আর কী—আর তে' দু’দিন মােটে পূজোর ছুটি তো এসেই পড়লো। -
এই লেখার ষ্টাইলের সৌন্দর্য ইত্যাদি লক্ষ্য করে
কোনো বুদ্ধিমান পাঠক হয়তাে ভেবে অবাক হচ্ছেন যে
আমি ইলমাষ্টারি করছি। কিন্তু আমি নিজে অবাক
হয়েছিলুম চাকরিটা পেরে। আশা করিনি, সত্যি বলতে।
ম্যাডভান্স, আর অমৃতবাজারে দু’দিন বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিলাে ;
বাঙল। দেশের বিভিন্ন সহর ও মহকুমা, গঞ্জ ও গ্রাম থেকে
সাতাশিটা দরখা পড়েছিলো- সংখ্যাটা ঠিক মনে আছে।
তার মধ্যে আমি কোথায় ? আমার অবশ্যি আছে পয়ল।
নম্বরের ডিগ্রি ; কিন্তু সেটাকে ভালো করে দাঁড় করাতে
পারি এমন সুপারিশের জোর ছিলাে না। অন্য অনেকের
সেটা ছিলো—খুব ভারি ওজনে। তা ছাড়া, এ-পর্যস্ত
আমার যা-কিছু অভিজ্ঞতা সবই জীবনের ব্যাপারে, ছেলে-
পড়ানাের দফাটা ফর্দর মধ্যে ছিলো না। ভরসা করবে।
কী বলে ? তবু যে চাকরিট। আমারই কাছে এলো শেষ
পৰ্যন্ত, তা বলতে হয় নেহাৎই কপালের জোরে—মানে
ভ্রমরের কপালের জোরে, যে তখন পিতৃগৃহে পিয়সের সাবান,
৭
।
ওটিন, গানের ওস্তাদ, শরৎবাবুর নভেল, মাসে দুটো ফিল
ইত্যাদির সাহায্যে আমার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। চাকরি
খুজতে খুজতে মরীয়া হ'য়ে গিয়ে হঠাৎ বিয়ে করে ফেলে-
ছিলুম। বাঙলাদেশে স্ত্রী খুঁজতে হয় না, স্ত্রী হয়। আমার
পিসিমা বলেছিলেন 'আমি নেহাৎ অপয়া, আমার
নিজের কপালে কিছু হবে না, ভাগ্যের মুখ ফেরাবার জন্যই
আমার এখন বিয়ে করা দরকার। অবাক হয়ে গিয়েছিলুম
তার দূরদৃষ্টিতে। যা-ই হােক, ভাবসমুদ্রে ভেসে থাকবার
মত একটা অবলম্বন যে পাওয়া গেছে, এ-জন্যই ঈশ্বরকে
ধন্যবাদ। টাকা ? পৃথিবীতে সকলেরই যে টাকা হ'তে
পারে না, এ-কথা নর ও বোঝে এবং আমাকে বোঝায়।
অার কাজের কথাই যদি বলাে, সংসারে কোন্ কাজটা
করতেই বা আনন্দ হয়। থার্ড ক্লাশে একজন থার্ড ক্লাশ
জীবিত বাঙালি কবির ছুতে-ঘেন্না-করে এমন পদ্য পড়াতে-
পড়াতে-আমি যে মােটের উপর বেশ ভালােই আছি,
এই কথাটা মন্ত্রের মত জপ করতে থাকি। কিন্তু তাতেও
বাধা পড়ে। পাশেই নিচের দিকের একটা ক্লাশ, মাঝখানে
পাৎলা কাঠের একটা পাটিশন মাত্র। আট-দশ বছরের
ছেলের প্রশান্তি ও গাম্ভীর্যের দৃষ্টান্ত নয় -গােলমাল হয়।
আমার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর আমারই কানে ডুবে যায়—তাতে যা-
হােক্ একটু শান্তি পাই মনে।
যে-আমি একদিন কবি হবার স্বপ্ন দেখেছিলুম, বাঙলা- ভাষার নিকৃষ্টতম রচনার কতগুলাে নমুনা পড়িয়ে দিনযাপন করি। ইস্কুলে, শুনতে পাই, আমার নাম হয়েছে। এক- কালে জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা করেছিলুম, আমার হাতের খ্যাতিরেখা সম্বন্ধে কোনাে সন্দেহ ছিলো না। কিন্তু ভাবতে পারিনি, সে-খ্যাতির মানে যে এই। প্রতি মুহূর্তে গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছা করে, ভ্রমর বিধবা হবে ভেবে অতি কষ্টে নিজেকে নিবৃত্ত করি। করি। কলেজে যখন পড়তুম, নিজের ভবিষ্যৎকে দেখেছিলুম দুরাশায়, দুঃসাহসে দিগন্ত থেকে দিগন্তে ঝলােমলো। আজ সে-দিগন্ত ছােট 'তে-হতে এসে ঠেকেছে এই ইস্কুলের দেয়ালে, ভ্রমরের আধময়লা সাড়ির আঁচলের সীমায়। এর নাম জীবন। অনেকদিন ভেবেছি চাকরি ছেড়ে দেবো, আর ভাবতে ভালাে লাগে না। একদিন সয়ে যাবে, একদিন আর গায়ে কিছু লাগবে না। এ-ই আশা। হ্যা, এ-ই আশা--কিন্তু এই তাে দুঃখ, এ-ই তাে সব চেয়ে বড় দুঃখ যে একদিন কিছুই আর গায়ে লাগবেনা।
বছরখানেক কাজ করছি, এরই মধ্যে শিথিল হয়ে
এসেছে স্বভাব। মানুষের মন সহজে মরে না। প্রথমটা
অনেককিছু ভেবেছিলুম—ছেলেদের মনে সাহিত্য রস সঞ্চার
ইত্যাদি। পাগলামি! চিড়িয়াখানার শিম্পাজির ঘরে বসে
রবীন্দ্রনাথ পড়া। মাথায় থাকুন রবীন্দ্রনাথ। মাথায় থাক
সাহিত্য-রস। আমার মাইনে পাওয়া নিয়ে কথা।
কর্তারা তা চান না, তা ছাড়া। তারা চান যে-কোনে।
রকমে আমি কোন্ শেষ করবে। কাজের
বােঝেন তারা। কোন শেষ করে চলি। ঘোড়দৌড়
আবার কী-ই যথেষ্ট। যে-সব জিনিস পড়াতে হয় তা
জন্য আধ মিনিট অতিরিক্ত সময় খরচ করা ও আত্মার
অপমান। এমনও নয় যে আধ মিনিট অতিরিক্ত সময়
পাই। বছরে চারটে পরীক্ষা ; প্রতিবার আড়াইশাের মত
খাতা দেখতে হয় । প্রথম বারই কষ্ট হয়েছিলো।
পরেই শিখে গেলুম। ছেলেটির নাম পড়ি, চেহারা মনে করবা?
চেষ্টা করি (সব নাম কি চেহারা মনে রাখা মানুষের
অসাধ্য ), এখানে-ওখানে পড়ি দু’একটা লাইন, নম্বর বসিয়ে
যাই।
জল।
শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, অনুনান ভুল হয়নি
ক-রকম একটা প্রবৃত্তি জন্মে যায়। অভিজ্ঞতা।
আশ্বিনের মােনালি রােদের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
এ-সব কথা ভাবছিলুম। ভ্রমরের কথা ভাবছিলুম। আমার
চার লাইন-লেখা সনেটের কথা ভাবছিলুম। ভালো হয়নি।
কেনই বা লিখতে যাওয়া? কেন? নিজেকে নিজেরই কাছে
প্রতিষ্ঠা করতে—সংসারের মুখে, ইস্কুলের মুখে, পৃথিবীর
জীবনের মুখে। প্রাণ কি সহজে মরে।
প্রাণ কি সহজে মরে। মাঝে-মাঝে বিদ্রোহ
করে বলে উঠতে চায় , 'এখনো আমি আছি । ।
ছাড়া আর কী?
কিন্তু একদিন আমার লেখা আসতো। একদিন সতি।
আমি কবি ছিলুম। সে কবে—কোন্ জন্মে, কোন্ জগতে,
অতীতের কোন্ অস্পষ্টতায়। সেদিন, বার চোখের দিকে
তাকিরে সুরে-সুরে আমার সমস্ত হৃদয় উচ্ছল হয়ে উঠেছিলো,
তারই দৃষ্টি কি ছড়িয়ে আছে আজকের এই আশ্বিনের
আকাশে ?
খুব আন্তে অাস্তে, অনেকক্ষণ ধরে নাম ডাকলুম! বহু
নাম, বেশ খানিকটা সময় নিলে। তবু, যথেষ্ট সময় যেন
নিলে না। ছেলেদের মনও চঞ্চল হয়ে উঠেছে ছুটির এত কাছাকাছি। তারা উখুস করছে, কথা বলছে ফিফি করে'। দু একজন দু একটা অবান্তর কথা জিজ্ঞেস করছে, সংক্ষেপে উত্তর দিচ্ছি। বুঝতে পারছি তাদের ইচ্ছ। আমি এই ঘণ্টাটা কাটিয়ে দিই গল্প করে। এ-ইচ্ছা এ-ইচ্ছা তাদের মনুষ্যত্বের পরিচয় দেয়। কিন্তু না তাদেরকে মানুষ বলে স্বীকার করলে চলবে না। তারা সুবিধে নিতে আরম্ভ করবে। এরা ছেলেমানুষ, এরা বৰ্ব্বর। এরা ধমক বােঝে, কান-মলা বােঝে; ভদ্রতা বােঝে না, প্রীতি বােঝে না। শিশুকাল থেকে এইভাবেই তাদের বােঝানাে হয়েছে। ফিরে ফিরতি, আমিও ভােল বদলাতে বাধ্য হয়েছি এদের কাছে এসে। দোষ দেবব কার ? বিষাক্ত চক্রের আরম্ভ কোথায় ? প্রথমটায় বেশ একটু কষ্ট হয়েছিলো এদের পােযমানাতে। বয়েস আমার অল্প। দেখতে, গতানুগতিক ইস্কুলমাষ্টার- মূৰ্তিব তুলনার, নেহাৎ কঁাচা। মুখের হাসিখুসি ভাবটা সালাতে পারতুম না কিছুতেই। ছেলেরা বাদামি করতো। টানলুম মুখােস। কী ভয়ানক গম্ভীর, চোখের পলক পড়ে না। যেন সব সময় চটে’ আছি। সামান্য অছিলায় দেখতে-একটু-ছেলেমানুষ গােছের কয়েকটা ছেলে বেছে- বেছে শাস্তি বিতরণ করলুম। ফল পেলুম আশ্চর্য্য। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস পায় না। সেই ১২ মুখােস এখন আর খসাতে পারিনে, ইচ্ছে করলেও পারিনে। ওটা মুখের উপর এসে গেছে। ক্লাশে ঢুকলেই কী-রকম সুড়মুড় করে নেমে আসে, নিজেই টের পাইনে। একদিন হয়তো সেটাই কায়েমি হয়ে পাকা হয়ে বসবে মুখের উপরে। তা তো হবেই—ভেবে কী লাভ? না, গল্প করলে চলবে না। আমাকে পড়াতেই হবে আশুবাবুর ন্যক্কারজনক জীবন-চরিত। ছেলেরা ভাবুক অামার ভিতরটা কোনোখানে এতটুকু কাচা নয়। গলা-খাকারি দিয়ে বই খুললুম। একবার চোখ গেলো বাইরে। সহরের ছাদের ঢেউয়ের উপর দিয়ে খানিকটা আকাশ যেন উত্তাপে আলস্যে দীপ্তিতে মুচ্ছিত। আমি করছি কী? সােনালি-নীল স্বপ্নের মত এই দিন কি আমাকে কাটাতেই হবে আশুবাবুর জীবন- চরিত পছিয়ে ? কিন্তু কোস শেষ না-করণে চণ্যকে কেন ? ডিউটি । চোখ ফিরিয়ে এনে নিবদ্ধ করলুম বইয়ের পৃষ্ঠায় ! আরম্ভ করলুম। সমস্ত ঘরের স্তব্ধতার মধ্যে আর একঘেয়ে, একটানা কণ্ঠস্বর। আশ্চৰ্য্য-ওরা কেউ আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলে না কেন ? আর হঠাৎ, হঠাৎ, ঘরের মধ্যে আর-একটা শব্দ। তাকিয়ে দেখলুম, মস্ত বড় এবং কুচকুচে কালাে একটা ভ্রমর পিছন দিককার জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকেছে। মেলে দিয়েছে
পাখা, অন্ধের মত ছােট-ছােট চক্র একে ছেলেদের মাথার
উপর ঘুরছে।
গুঞ্জনে ভরে গেলো ঘর ভরে গেলাে
আকাশ, সমস্ত বিশ্ব।
সমস্ত বিশ্ব। কোনােখানে আর-কিছু নেই, এই
গুঞ্জনে চিরকাল বাণীময়। আমার চোখের সামনে কাশঘরের
দেয়াল গুলো দূরে সরতে-সরতে দিগন্তে মিলিয়ে গেলো, হারিয়ে -
গেলো ছেলেদের মুখ—তারপর রাত্রি, ঘরে নীলাভ লঘু
অন্ধকার, বাইরে আকাশ ভরে জ্যোছনা । জানলার ধারে
সে বসে'। একট! পেয়ারা গাছের পাতার ভিতর দিয়ে
ছায়ার জালিকাটা জ্যোছনা এসে পড়েছে তার চুলে, তার
ঠোটে, টো হ'য়ে তার বুকের উপর। রক্ত কল্লোলিত
সমুদ্রের জোয়ারের মত ; হৃৎপিণ্ড আছাড় খেয়ে মরছে।
মাংসের দেয়ালে।
'এত দেরি করলে কেন?
কথা বলতে আমার যেন ভয় করছিলাে। তার চুলের
আর ঠোটের আর শিথিল বাহুর দিকে তাকিয়ে চুপ করে
রইলুম !
বিদ্যুৎময় স্তব্ধতা। সে মাথা নিচু করলো, যেন সে-ও
সাহস পাচ্ছে না আমার চোখের দিকে তাকাতে, পাছে
ভয়ঙ্কর রহস্যময় আগুন জ্বলে ওঠে দৃষ্টির সঙ্গে দৃষ্টির ঘর্ষণে ।
তার চুলের ভাগরেখা জ্যোছনায় আভাময় হয়ে উঠলাে,
যেন বহুদূরের দুঃসাহসের কোনাে পথের ইঙ্গিত।
১৪
কোথায় ছিলে এতক্ষণ? হাওয়ায় নিশ্বাসের স্বর ভেসে
এলাে, কোথায় ছিলে? আমার যে কী কষ্ট হয় তা কি
বুঝতে পারো না? কেন—কেন তুমি ভালােবাসলে আমাকে?
তোমাকে ছেড়ে আমি কী করে বাঁচবাে ?
বেজে চললো, নরম, অর্পফুট, রাত্রির হৃদয়ের
কোনো শ্মরের মত। তারপর তা স্ফীত হ'য়ে উঠতে
লাগলো, একটা সংহত ধ্বনি, কথাহীন একটা গুঞ্জন—আমার
কানের কাছে এই ভ্রমরের উচ্চ সান গুঞ্জনের মত। ভ্রমরট।
ক আমার মাথার উপর দিয়ে চঞ্চল পাখা নাড়তে-নাড়তে
উ:টাদিকের জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
—ইম্পর্টন্ট, প্যাসেজ গুলাে একটু দাগ দিয়ে দেবেন, স্যর ?
কেলেঙ্কারি
দু'বন্ধুতে দেখা অনেকদিন পর।
এক কালে, কলকাতায়,
এদের সাহচর্য ছিলো প্রায় নিরবচ্ছিন্ন। মণিলাল তখন
মামার আপিসে নবিশি করে। আপিসে যাবার
অছিলায় সে বাড়ি থেকে বেরুেতা, তারপর প্রশান্তর ওখানে
গিয়ে সারা দুপুর ঘুমোতো। বাড়ি ফিরতো সেই রাত
এগারোটায় । ইতিমধ্যে হ'তে দু'জনে—হাজার কথা--:
বেশিরভাগ যাকে বলে বাজে কথা। কিন্তু সময়টা কউ.
ভালো, হাসিতে গল্পে প্রফুল্লতার স্বাস্থ্য ভালো থাকতে :
অনেক সুখ একসঙ্গে তারা নিয়েছে, কিছু কিছু দুঃখ পেয়ে
একসঙ্গে। খাওয়া আর বেড়ানো, উত্তেজনা আর অবর,
প্রমােদ আর প্রশান্তির লক্ষ ছােট-ছোট সুরের ভিতর দিয়ে
দু'জনের জীবন একসঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু এরকম চিরকাল কাটতে পারে না, তারা জানতো
তারই শঙ্কার ছায়া পড়তো মাঝে-মাঝে কোনাে হােটেলের
উজ্জ্বল আলাের নিচে কি বাস্-এ যেতে-যেতে আলাপের
বিরতির ফাকে। অদৃষ্ট আমাদের মনের ইচ্ছাকে খাতির করে না, তারা জানতো। আর তাই তো হ'লো—প্রশান্তকে চলে যেতে হলে আগ্রার, একটা চাকরি নিয়ে। কাজট দালালি গােছের, ছুটি-ছাটা নেই। ঘুরে বেড়াতে হয় বেশি। ভাগ সময়। এদিকে মণিলাল ও তার মামার আপিস থেকে বেরিয়ে অন্য এক আপিসে ঢুকলো। এখন আর প্রশান্ত নেই, বার বাড়ি গিয়ে দুপুরবেলা ঘুমোনো যায়, আর থাকলে ও স্বাস্থ্যরক্ষার ঐ বিধান মেনে চলা সম্ভব হতো না--মাসের শেষে মাইনেটার বড় দরকার। তিন বছর পর দুজনের দেখা। চিঠি লেখালেখি প্রথম কয়েক মাস চলেছিলো কিন্তু বছরের প্রতিটি দিন যাদের আট- দশ ঘণ্টা করে পরের খাটনি খাত ৩, নিজের চিঠিপত্র তারা কতকাল আর লিখতে পারে । একটা ব্যতিক্রম হয়ে- ছিলো মণিলালের বিয়ের সময়। সে তখন বন্ধুকে বেশ । গোছের একটা চিঠি লিখেছিলো— যদি সে দু’দিনের জন্যেও আসতে পারে। প্রশান্ত করাচি থেকে ফিরে এসে সে-চিঠি যেদিন পেলে, তার আগের দিন বিয়ে হয়ে গেছে। ঠিক সময়ে পেলে হয়তো আসতো—অন্তত চেষ্টা করতে আসতে । তা যখন হলো না, লম্বা চিঠির সঙ্গে ছােট একটা চেক পাঠিয়ে দিলে স্ত্রীকে যা হয় কিছু কিনে দিয়ে, এমন পােড় দেশ, মনের মত কিছু যদি পাওয়া যেতো।
মণিলাল লিখেছিলো উত্তরে : ‘তােমার টাকা আমার কাছে
জমা রইলো, তুমি আবার যখন কলকাতায় আসবে, একসঙ্গে
খরচ করবো।'
এই তাদের মধ্যে শেষ চিঠি । তারপরে বছরখানেক
কেটেছে। নণি লাল, অপিস-ফেরতা, নির্জীব, সিগ্রেটের
ধে রায় ঝাপসা, ইজিচেয়ারে শুয়ে-শুয়ে স্ত্রীর নির্ধাচিত
রেকর্ড শোনে, vogue নামক বলিতি ফ্যাসানের কাগজের
পতি। এট, মাঝে-মাঝে স্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়দের চরিত্রের
বিচিত্র দুর্বলতা নিয়ে আলােচনা করে। আর প্রশান্ত ঘুরে
বেড়ায় কোথায় ইন্দোর, আর কোথায় বোস্থই আর কোথায়
ত্রিচিনপলি, অপিসের কাজ নিয়ে, পরের জিনিস পরের
কাছে বে5ে মাঝখানে মোটা মুনকা কুড়োয়, রেলগাড়িতে
যেতে-যেতে গোয়েন্দ।-নভেল পড়ে, চৌরঙ্গির উপর দিয়ে
লাল দমকল দারুণ বেগে ছুটেছে এই স্বপ্ন দেখতে-দেখতে
চমকে উঠে দেখে গাড়ি বড় একটা জংসনে এসে দাড়িয়েছে।
প্রশান্ত, আগের চাইতে বেশ একটু মােটা, চুলে সায়েবি
ছাঁট, মুখ লালচে, সেদিন সকালবেলায় প্রশান্ত যখন এলাে,
মণিলাল দাড়ি কামাবার উদ্যোগ করছে । পূৰ্ব্বকালে দাড়ি
কামানো সম্বন্ধে সে অত্যন্ত শিথিল স্বভাব ছিলো। তিন
চারদিন নিরুদ্বেগে দাড়ি গজাতে দিয়ে হঠাৎ একদিন নানা
রকমের বাটি ও প্রসাধনের জিনিস সাজিয়ে বসে পুরো আধ
১৮
যায়, শুধু ঘন্টার পরিশ্রমে মুখখানাকে একেবারে আয়নার মত করে তুলতাে। আসল ব্যাপারটা তেমন-কিছু নয়, কিন্তু তার তােড়জোড়ের কথা ভাবলেই তার কান্না পেতো। সত্যি লতে, সেই সময়ে এটা ছিল তার জীবনের সব চেয়ে ও কষ্টকর কাজ। কতবার সে বলেছে যে এটাই হচ্ছে পুরুষের উপর প্রতির প্রতিশােধ, পুরুষকে যে সন্তান বহন করতে হয় না। তার বদলে এই ক্ষৌরকা তার শাস্তি। 51করি ব্যাপারটাতে সব চেয়ে তার যেখানে অন্তি, তা এই প্রাত্যহিক অবশ্যিক ক্ষৌরকর্যে। অন্য সব ধ:- স'য়ে এই ব্যাপারটা এতদিনেও তার ঠিক গা-৩; ৷ে না। যা না-করলেই নয়, তা করতেই হবে। সেদিন সকাল- বেলা (যেমন তার অাজকাল কার জীবনের অন্য সব সকাল বেলায়), যখন সে ১ খেয়েছে এবং খবরের কাগজে সিনে- নার বিজ্ঞাপন ওর উপর চোখ বুলিয়েছে, সে উঠ দাড়ালো, তারপর দাড়ি কমাবার বিভিন্ন বাটি গুলোকে হাতের কাছে সংগ্রহ করতে লাগলাে। এমন সময় চাকর এসে একজন বাবুর আবির্ভাব ঘােষণা করলে। নিশ্চয়ই তার মামাতো ভাই অমরেশ আবার কাউকে বাঙলা বইয়ের জন্যে তার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে (ছেলেটাকে একদিন কড়া কথা না- বললেই চলবে না), এই মনে করে সে বাইরে এলো, এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলাে। ১১
-আরে, তুমি !
'এই তো, এলুম' প্রশান্ত মুচকি হাসতে লাগলো।
‘কব এলে ? কোথায় উঠেছে। ? ক'দিন থাকবে ? আগে
চিঠি লেখােনি কেন? মণিলালের কথা। খেই
খেই প্রায়
হারিয়ে গেলো-‘এসো, এসো, তারপর সব শুনবাে।
উপরে-উঠতে উঠতে প্রশান্ত বললে, “যাক, সেই বাড়িতেই
আছে। তাহ'লে ?
দ্যাখে! ! যদি বাড়ি বদল করা, হয়তো দেখাই হতাে না।
‘তা কী হয় ! খুঁজে বার করে নিতুম ঠিক।
উপরে সামনের ঘাটা, নানারকম ভীতি অংস বাব
খানিক ক্ষণ । চুপ করে
তাকিয়ে রইলো পরস্পরের দিকে, কিছু নে না।
‘অনার কত! ।' প্রশ খানিক পরে বলল ,
উঃ, কী করে ছিলে এতদিন ঐ ঈশ্বরপরিত্যক্ত দেশে?
ছিলুন অর কি !
মণিলাল বন্ধুর সমস্ত শরীরের উপর একবার চেখ বুলিয়ে
বললে, 'বেশ গোলগাল হয়ে উঠেছে। যা হোক্ !'
তােমাকে ও তো কৃশ দেখছি না।
বলে। কেন—হাঁটা-চল। নেই, সারাদিন ঠা
একটা চেয়ারে বসে থাকা। ভুড়ি হলে’ বলে—
তােমাকে কি এখানে-বদলি করলে?
মুখে একটা শত নথি নাড়লো। ‘অমন সেভগ্য কি আমার হবে ! ওদের কাজ নিয়েই এসেছি।' মণিলালের ছায়া পড়লো। কিছুদিন আছো তো?' ‘পরশুই চলে যাচ্ছি।' পরশু!' মণিলালের মুখের ছায়া গভীরতরে। 'ল।-- দুদিনের জন্য নং-এলেও পারতে। 'নন কী? তবু তো দেখা হ'লো। ক খবর সব লাে।' খবর ? মণল অবাক হয়ে গেলো যে তার জীব- নর কোনো খবর নেই। এই তিন বছরে তার জীবনে এমন কিছু ঘটেছে বলে সে মনে করতে পারলে না যা বলা যায়। বেশ ভালােই আছি,' একটু চুপ করে থেকে (স বলে। 'তা তে! দেখতে পাচ্ছি। ক্ষিতীশ এখন কোথায় ? খানিকক্ষণ তারা অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে আলাপ করলে। তাদের কেউ রংপুরে চিনির কারখানায় চাকরি নিয়ে গেছে, কেউ মুন্সেকি করছে মুর্শিদাবাদে, কেউ বা আছে কলকাতাতেই, নােট লিখছে, মাঝে-মাঝে দেখা হয়। বরের চারদিকে একবার তাকিয়ে, দরজায় লতা-আঁকা
পরদা দেয়ালে ছবি (হবেমা-র অ্যাভিনিউ ক্লরেন্সের রাস্তায়
সখীদের নিয়ে হেঁটে চলে’-যাওয়া বিয়াত্রিচের দিকে তাকিয়ে-
থাকা দান্তে টিশিয়ানের ভিনাস ও অ্যাডােনিস ইত্যাদি),
ছােট টেবিলের উপর এক ঝাক ইংরিজি বাঙলা মাসিকপত্র,
দেয়ালের কোণে কালো বানিশ-করা গ্রামােফোন-এ-সমস্ত,
এবং এ-সমস্ত জড়িয়ে যে-মনােভাব জীবনকে গ্রহণ করবার
যে-নির্দিষ্ট ভঙ্গিতা লক্ষ্য করে প্রশান্ত বলে উঠলো
‘বাঃ, দিব্যি ফিটফাট দেখছি।
এবং এই কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে দু'জনের মধ্যে যেন
ফিরে এলাে সেই পুরােনাে স্রোত। নানা কথার মধ্যে
এতক্ষণ সে-সংস্পর্শ তারা খুঁজে পাচ্ছিলাে না তা ফিরে
এলাে এই অত্যন্ত ছােট আপাততুচ্ছ কথায়। মণিলালের
মুখে লাগলো আভা পরিচয়ের—এতক্ষণে সে যেন তার
বন্ধুকে চিনতে পারলে। তার চোখে একটা দুষ্ট রকমের
হাসি ঝলমল করে উঠলাে।
‘ওঃ, লাবণ্যর ভয়ানক গুথুতে রুচি।
‘তােমার স্ত্রী?
‘তা ছাড়া আর কে? শ্বশুরমশাই অনেক যত্নে মেয়েকে
লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন।
‘প্রকৃতিতে একটা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছেই। নিজে
তত একটা মূখ হয়ে কাটালে চিরকাল।
২২
সে কথা এখন আর বােলাে না। কত যে বই পড়েছি যদি জানতে! সেই যে রাসেল না কী, যার বই আজকাল সবাই পড়ে প্রশান্ত হাে-হাে করে হেসে উঠলো। যেন গানের একটা ঝরনা মণিলালের বুকের উপর দিয়ে বয়ে গেলাে। কতদিন এ-রকম হাসি সে শােনেনি। কত- দিন এ-রকম করে' সে হাসেনি। পৃথিবীর এত সমস্ত জিনিস—টাকা, আপিসে যাবার মুখে ট্রামের ভিড়, গ্রামে- ফোনের রেকর্ড, আত্মীয়দের হীনতা, স্ত্রীর পাশে বসে দেখা সিনেমার ছবি, মাঝরাতে পাশের ফ্ল্যাটে শিশুর দুর্দান্ত চীৎকার—এ-সমস্তর মধ্যে এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিলে। এই সরল, এই সহজ, এই উচ্ছ্বসিত, উত্তপ্ত হাসি। স্মৃতির ঝরনা যেন বয়ে গেলো মণিলালের বুকের উপর দিয়ে হঠাৎ একসঙ্গে কত কথা তার মনে পড়লাে। ‘বাঃ, সত্যি-সত্যি রাসেল পড়েছি যে', আবার হাসি শােনবার আশায় মণিলাল বললে। এমন কি, সম্প্রতি বিলেতে ষে দারুণ এক লেখকের আবির্ভাব হয়েছে- হাক্সলি না কী নাম, তার ও প্রশান্ত চেয়ারের পিঠে মাথা হেলিয়ে দিলে । “থাক, এ-সব কথা আর না বললে। শিগগির কোনো বই ছুঁয়েছি বলে মনে হতাে পড়ে না—অবিশ্যি ডিটেকটিভ উপন্যাস ছাড়া প্রকৃতিতে ক্ষতিপূরণের একটা ব্যবস্থা আছেই, মণিলাল -পা গলায় হেসে উঠলো। তার মনে পড়লো প্রশান্ত তাকে কত বই পড়াবার চেষ্টা করেছে, কত উত্তেজিত বক্তৃতা দিয়েছে ; একবার, প্রশান্তের কত সাধাসাধির পরে, কী কষ্টে, কী দীর্ঘ সময় নিয়ে সে আনা কারেনিনা পড়েছিলো। সে- কথা মনে করে সে আবার হেসে উঠলাে, একটু অসংলগ্ন- ভাবে। তারপর বললে, 'এতদিন খুব ঘুরলে যা হােল্ক। ‘বেড়াবার সখ ছিলো খুবই, কিন্তু অদৃষ্ট যে তা ঠিক এইরকম করে' মেটাবে তা অবিশ্যি ভাবতে পারিনি। ‘অদৃষ্টের ব্যবহারই ঐ রকম। আমাদের ইচ্ছাই পূর্ণ করবে, কিন্তু মনে হবে যেন ঠাট্টা। যা দেখছি, তুমিই ভালো আছে। একেবারে সেটড, ডাউন, মায়'—প্রশান্ত কোণের দিকে তাকালো, গ্রামােফোন পৰ্য্যন্ত। ‘হ্যা, একেবারে সেটলড, ডাউন। আর যা-ই বলল, মণিলাল গলার স্বর একটু নিচু করলে, এটা কিছু খারাপ ঘরের t , নয়। ‘আমি তো ভালােই বলছি। ‘নিজের কিছু ভাবতে হয় না, কিছু করতে হয় না। লক্ষ্মী ছেলের মত আপিসে আসা-যাওয়া করলেই খালাস। তা ছাড়া, তার বাইরে যা-কিছু তার জন্যে আছে লাবণ্য। ২৪
কেমন করে ঘর সাজানো হবে, সপ্তাহের কোন্ কোন্ বারে
মাংস খাওয়া হবে, অমুকের বিয়েতে সাড়ি দেওয়া হবে কত
নামের, কবে কোন ছবি দেখতে যাবে—সব লাবণ্য ঠিক
করে দেয়। কী আরাম ভাবতে পারো না।
বিবাহ একেবারে অবিমিশ্র অমঙ্গল নয় এ তো আমি
বরাবর বলে এসেছি,' প্রশান্ত মুচকি হেসে বললে।
কিন্তু মণিলাল গম্ভীর মুখে বলতে লাগলো, ‘না, সত্যি
বিয়ে করে যে এত সুখী হওয়া যায় তা আমার ধারণা
ছিলো না। লাবণ্য লেখাপড়া একটু বেশি করে ফেলেছে--
তা হােক্, ওর সঙ্গে আমার চমৎকার খাপ খায়।
হয়-তো--প্রশান্তর
অন্তত তা-ই মনে হ'লােমণিলাল
পরের মুহূর্তেই বলতো, 'একটু বসো, তাকে ডেকে আনছি,
কিন্তু তার দরকার হলো না, লতা-আঁকা পবুদা সরিয়ে
স্বয়ং লাবণ্য এসে ঢুকলাে। লম্বা, মানানসইরকম
চওড়া, উগ্র সাদ। গায়ের রঙ। পুরু কাচের চশমার ভিতর
দিয়ে চোখ ভালো করে দেখা যায় না। মােটের উপর
ভারি জমকালো চেহারা। ভালো কাপড়-চোপড় পরে রাস্তা
দিয়ে হেঁটে গেলে রাস্তার লােক হা করে তাকিয়ে থাকবে।
বাড়ির আটপৌরে পােষাকেও মনে রীতিমত সমে-উদ্রেক
করে। প্রশান্ত ধাঁ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালাে।
কিন্তু লাবণ্য তাকে লক্ষ্যই করলে না। একবার মাত্র
ঘরে
একবার চশমার পুরু আড়াল থেকে সে তার দিকে তাকালো,
তারপর, ঘরে যেন আর কোনো লােক নেই এমনি সুরে
স্বামীকে বললে ;
‘কী, স্নানের সময় হলো না তোমার ?
মণিলাল লাফিয়ে উঠে দাড়ালো। তাই তো ।
বাজলো?
‘ন'টা বাজলাে বলে । তােমার দাড়ি কামাবার জল
ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।'
‘যাচ্ছি, যাচ্ছি । আর দু'মিনিট। লাবণ্য, এর সঙ্গে
তােমার পরিচয় করিয়ে দিই--- আমার অতি পুরোনো এবং
প্রিয় বন্ধু প্রশান্তকুমার দত্ত।
‘ও, আপনি! লাবণ্যর অত্যন্ত-লাল ঠোটে একটুখানি
হাসি ঝিলিক মেরে গেলো। আপনি এলাহাবাদে থাকতেন
?'
‘আগ্রায়।
‘ও, হ্যা—তাই তো, আগ্রায় । কবে এসেছেন এখানে?'
দুটো চারটে ভদ্র, আলাপ হলাে।
তারপর মণিলাল ম্লানমুখে বললে, আমার তাে আপিসের
প্রায় সময় হয়ে এলো—
‘বাঃ, তার জন্যে কী হয়েছে । আমাকে এমনিও এক্ষুনি
উঠতে হ'তে—অনেক জায়গায় দেখা করতে হবে।
‘কিন্তু, লাবণ্যর সমস্ত মুখে আতিথেয়তার দীপ্তি ছড়িয়ে
পড়লো, ও-বেলা আসবেন কথা দিয়ে যা।
‘আসবে—নিশ্চয়ই।'
‘রাত্তিরে খাবেন এখানে।
প্রশান্ত মাথা নেড়ে সায় দিলে ।
তাই বলে ঠিক খাবার সময়েই আসবেন না—বিকে-
লের দিকেই চলে আসবেন—যদি কোনো অসুবিধে না
‘না, না, অসুবিধে আর কী।' বন্ধুপত্নীর সৌজন্যে।
প্রশান্ত প্রায় অভিভূত হয়ে পড়েছিলো, বেশি কিছু বলতে
পারলে না।
ঠিক সন্ধেবেলায় প্রশান্ত এলো। ইলেকট্রিক আলােয়
বসবার সেই ঘরটি আরাে ঝকঝকে, আরো বেশি নিখুতরকম
পরিপাটি দেখাচ্ছে। ইজিচেয়ারে
আধো শুয়ে মণিলাল
সিগ্রেট খাচ্ছে। পাশে একটা চেয়ারে বসে লাবণ্য কুশি-
কাটা দিয়ে কী যে বুনছে আরো কয়েকদিন না গেলে
ঠিক বােঝা যাবে না। পরনে তার বেগুনি রঙের সাড়ি,
২৭
উঠছে।
আঙুলের নড়া-চড়ার সঙ্গে-সঙ্গে হঠাৎ আংটির হীরে ঝলসে
কপালে ছােট সিদুরের ফোটা—মনে হয়, অমন
কপাল স্পর্শ করতে পেরে সিদুরই ধন্য হয়েছে। প্রশান্ত,
অনেকদিন স্ত্রী-সংশ্রব-বর্জিত, পরের জিনিসের কেনা-বেচা
নিয়ে বড় বেশি ব্যস্ত, এই পরিপূর্ণ দীপ্তিতে লাবণ্যকে দেখে
হঠাৎ একটু থমকে দাড়ালাে।
‘আসুন, লাবণ্য সেলাইট। পাশের ছােট টেবিলে রেখে
দিলে। এত দেরি করলেন যে ?
‘দেরি আর কোথায় ?
প্রশান্তকে বসতে হলে একটা কৌচে, মণিলালের উল্টো
দিকে, মাঝখানে অনেকখানি মেঝে। এইরকম ভদ্র দূরত্ব
বজায় রেখে গল্প করার অভ্যেস তাদের কখনাে ছিলাে না।
মনে-মনে সে খুব আরাম বোধ করলে না, কিন্তু নিজেকে
তার একটু যেন সম্মানিতও মনে হলো। লাবণ্য,
লাবণ্য, এই
মহিলা—সে তার এতই উপরে, পরিবেষে, স্বভাবে, সংস্কারে
এতই দূরে সরানাে যে সে যে তাকে এমন সুচারু সৌজন্যে
আপ্যায়ন করেছে এটাকে সে তার একটা সৌভাগ্য মনে
না করে পারলে না।
মণিলাল জিজ্ঞেস করলে . সারাদিন কী করলে ?
ওঃ, কত লােকের সঙ্গে যে দেখা করতে হলাে। আর
.
বা গরম।
২৮
-
লাবণ্য উঠে পাখার বেগ আর এক ডিগ্রি চড়িয়ে দিলে।
তারপর বললে, আপনার তো আরাে বেশি কষ্ট হবার কথা-
পশ্চিমে তো এ-রকম হিউমিডিটি নেই।
প্রশান্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বললে, ‘বেঁচে থাক’এইৎসেতে
বাঙলাদেশ।
‘আপনার ভালো লাগে এই ক্লাইমেট ?
‘এতদিন পর কী ভালােই যে লাগছে বলবার নয়।
‘তা ছাড়া, মণিলাল বললে, ‘শুধু ক্লাইমেট নিয়ে কি
মানুষ বাঁচে?
কেন, পশ্চিমেই তো তবু দুটো-চারটে ভদ্র-বাঙালি দেখ।
যায়। ছেলেবেলায় লাবণ্য একবার দানাপুর ক্যান্টনমেন্টে
তার আই-এম-এস্ কাকার সঙ্গে কিছুকাল কাটিয়েছিলো',
সেখানে প্রতিবেশী চাকুরেদের বাড়িতে.'মেলামেশা করে
প্রবাসী বাঙালি সম্বন্ধে সে যে-ধারণা করেছিলো আজ পর্যন্ত
বদলাবার কারণ ঘটেনি—কেন না বড় হয়ে সে আর পশ্চিমে
যায়নি।
‘কী যেন, প্রশান্ত তর্ক এড়িয়ে গেলো, আমাকে কাজ
নিয়েই থাকতে হয়—কারো সঙ্গে মেশবার সময় বড় একটা
হয় না।'
লাবণ্য হঠাৎ জিজ্ঞেস্ করলে, ‘তাজমহল সম্বন্ধে আপনার
কী মত?
২৯
অপ্রস্তুত মুহূর্তে প্রশান্ত বলে ফেললাে কেন, বেশ ভালােই
তে।'
-,
‘না—আপনার সত্যি কী মনে হয় ? পুরু চশমার আড়াল
থেকে স্থিরদৃষ্টিতে লাবণ্য প্রশান্তর দিকে তাকালো। 'লােকে
যতটা বলে সত্যি কি তা-ই?
প্রশান্ত ভিতরে-ভিতরে ঘেমে উঠলো। মণিলাল তাড়া-
তাভি বলে উঠলাে, এত লােকের যখন এত ভালাে লেগেছে
তখন কিছু আছে নিশ্চয়ই।'
‘না—আজকাল কিন্তু অনেকে তাজমহলের স্থাপত্যের
অনেক খুঁত ধরছেন। আমি এইটে জানতে চাই যে তাজের
খ্যাতির কারণটা কী—sentimental না fornal।'
প্রশান্ত রুমাল বার করে ঘাড় মুছলাে।
‘আমি বলতে চাই যে তাজ দেখে লােকের এত যে
উচছাস তা যদি হয় প্রধানত শা-জাহানের প্রেমের কথা স্মরণ
করে সেটা অবিশ্যি তার খাটি আর্টিন্টিক মূল্যের কোনো
যাচাই নয়।
‘আমাদের দেশে তাজমহলের খ্যাতি অবিশ্যি রবীন্দ্রনাথের
কবিতার জন্য, প্রশান্ত হঠাৎ বলবার একটা কথা খুঁজে
পেলো।
কথাটা শুনে লাবণ্য এমনভাবে হাসলো যেন
কথাটা তারই, এতক্ষণ এটাই সে মনে-মনে ভাবছিলাে,
এবং তারই জেরে এটা সে জির করে নিয়েছে—
প্রশান্তর মুখে ওটা উদ্ধৃতি-বাক্য মাত্র। ঠিক, সে বলে
উঠলাে, “ঠিক কথা। আমাদের সৌন্দৰ্য্য উপভােগেও যে
কতখানি কভেশন মিশে থাকে ভাবলে অবাক হতে
হয়। কিন্তু জ্যোছনা-রাতে তাজ শুনেছি সত্যি আশ্চর্য্য।
‘আমিও তা-ই শুনেছি।
শুনেছি মানে? আপনি দেখেননি।'
‘গিয়েই একদিন দেখেছিলাম—দিনের আলােয়। তারপর
যাবে-যাবাে করে আর হয়ে ওঠেনি—য। কাজের চাপ।,
প্রশান্তর কণ্ঠস্বর শেষেরদিকে অত্যন্ত ক্ষীণ হ'য়ে এলো। 'আগ্রার
বাইরেই ওর বেশির ভাগ সময় কাটে, মণিলাল বললে।
কিন্তু একদিনও কি সময় হলো না ? লাবণ্যর কথার
সুর এমন—যেন প্রশান্তর এই অবহেলা তার ব্যক্তিগত কোনো
ক্ষতি করেছে। সে ঈষৎ কাধ-ঝাঁকুনি দিলে—যেন জানাতে
চায় এ-প্রসঙ্গ আর চলতে দিতে সে ইচ্ছুক নয়। তবু প্রশান্ত
বললে, অস্ফুটস্বরে, খানিকটা পাপক্ষালন করবার আশায়,
যেখানে থাকি, তাজ সেখান থেকে অনেক দূরে। কিন্তু
এবার গিয়ে নিশ্চয়ই’—কথাটা শেষ করতে না-পেরে সে একটা
সিগ্রেট ধরালাে।
কিন্তু লাবণ্য কথাটাকে লক্ষ্যই করলে না। একটু ফাক
পেয়ে মণিলাল বললে, ‘কতকাল আর ভূতের মত ঘুরে
বেড়াবে-এইবার কলকাতায় এসে বােসো।
‘আপনাকে খুব উর করতে হয় বুঝি ? লাবণ্য জিজ্ঞেস
করলে।
রেলগাড়িতেই জীবনটা কাটলাে, প্রশান্ত হেসে বললে !
‘কোথায়-কোথায় গিয়েছেন?
‘কোথায় যাইনি। এই তো সেদিন গোয়ালিয়র থেকে
এলাম।'
গােয়ালিয়র ! গানের জন্য বিখ্যাত।
প্রশান্ত মৃদু একটু কেশে নড়ে-চড়ে বসলাে।
‘আমাদের হিন্দু-সঙ্গীত নেটিভ-ষ্টেট গুলােই তাে বাঁচিয়ে
রেখেছে,' বলে’ লাবণ্য উৎসুক-দৃষ্টিতে প্রশান্তর মুখে তাকালাে।
একটু লাল হয়ে উঠলো প্রশান্তর মুখ। ভাঙা-ভাঙা
ভাবে বললে, “আমার অবিশ্যি সময় হয় না—কত কাজ থাকে
‘গানে আপনার ইন্টারেস্ট, নেই ?
‘ইন্টারেস্ট খুবই আছে, কিন্তু...'প্রশান্ত ঘাড় উচু করে
ইলেকট্রিক আলাের বালবের দিকে একরাশ ধোঁয়া নির্গত
করলে।
‘এত সব জায়গা ঘুরলেন, কিছুই দেখলেন না, শুনলেন
। It's a pity.' তারপর, মুহূর্তকাল চুপ করে থেকে, যেন
প্রশান্তর এতদিন রস-উপবাস দূর করবার শুভেচ্ছায় প্রণােদিত
হ'য়ে লাবণ্য বললে :
৩২
দু’একটা রেকর্ড শুনবেন?
প্রশান্ত 'তার বন্ধুর দিকে তাকালাে, কিন্তু তার সঙ্গে
চোখােচাখি হলো না। মণিলাল এমনভাবে গা ঝেডে
দিয়ে বসেছে যে তাকে দেখেই মনে হয় যে রােজ এই সময়ে
ইজি-চোয়ারে শুয়ে গােটাকয়েক রেকর্ড শােনে;
‘নিশ্চয়’, প্রশান্ত বললে !
‘বিলিতি গান-বাজনা আপনার কেমন লাগে? চেয়ার
থেকে উঠে গ্রামােফোনের দিকে যেতে-যেতে বণ্য জিজ্ঞেস
করলে।
‘ভালাে লাগে খুব।'
‘শালিপিনের ভগা-বােট সং নিশ্চয়ই শুনেছেন?
তা হােক, তা হাে’, প্রশান্ত তাড়াতাড়ি বলে। আবার
শুনতে দোষ কী?
‘আবার ! লক্ষবার শুনতেও দোষ নেই।”
রেকড চালিয়ে দিয়ে লাবণ্য ফিরে এসে বসলাে। যতক্ষ
রেকড চললাে, দু’বন্ধু পরস্পরের দিকে তাকাতে সাহস
পেলাে না, কেননা পুরু চশমার আড়াল থেকে লাবণ্যর চোখ
থেকে-থেকে দু’জনেরই মুখের উপর এসে পড়ছে। মণিলাল
একদৃষ্টিতে সীলিঙের দিকে তাকিয়ে রইলো, প্রশান্ত রইলো।
চোখ বুজে।
রেকড় থামলো। লাবণ্য উঠে দাড়ালাে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে।
প্রশান্ত শালিয়াপিনের ভগা-বােট সং-এর প্রচুর সুখ্যাতি
করলে।
‘এইবার এট। শুনুন। একটু পরে অর্কেষ্ট্রার পরিপূর্ণ
পর হঠাৎ ঝড়ের মত ভেঙে পড়লাে। লাবণ্য স্বামীর দিকে
তাকিয়ে একাবার ভুরু তুললাে।
মণিলাল চাপা গলায় বললে ; 'Hungarian
Rhapody.'
রাইট ! মাঝে-মাঝে স্বামীকে সে এমনি করে পরীক্ষা
করে।
শোনবার পরও মাঝে মাঝে তার ভুল হয় ।
‘কানই নেই আসলে। কিন্তু চর্চা করতে-করতেই কান
হয়। এতদিনে গান-বাজনা সম্বন্ধে তার দস্তুরমত একটু
বােধ হয়েছে। লাবণ্যর ভাবতেও ভালাে লাগে। যা-ই
বলল না, শুধু টাকা-পয়সা, ঘর-সংসার নিয়ে কি জীবন
কাটে।
•এটা আগে শুনেছিলেন?' রেকর্ডটা তুলে রেখে লাবণ্য
জিজ্ঞেস করলে।
প্রশান্ত মাথা নাড়লে।
আশ্চর্য-না?
না।
‘অবিশ্যি প্রথমবার শুনে খুব ভালো হয়তাে লাগে না,
কিন্তু বারবার শুনতে-শুনতে মনের মধ্যে একটা atmosphere Cofa -it sort of grows on you-' প্রশান্ত তাড়াতাড়ি বললে, “পরে শুনলে আরাে বেশি ভালাে লাগবে সন্দেহ কী ? ‘আর শুনবেন ? এটাই ? ‘না-অন্ত-কোনো রেকড। বলুন না, আপনার কোনো ফেভরিট আছে নাকি? 'না, না, আপনার যেটা ইচ্ছে দিন! ইয়ােরােপীয় সঙ্গীত শােনা হলাে আরো দুটো। লাভলি লাভ লি’, খুব আস্তে-আস্তে মাথা নেড়ে লাবণ্য বলতে লাগলাে, ‘এক্স-কুইজিট ! আমাদের দেশে ইয়ােরােপীয় সঙ্গীতের আদর আরাে বেশি হওয়া উচিত। ‘আস্তে-আস্তে হচ্ছে, প্রশান্ত বললে। হচ্ছে, না? আজকাল অনেক বাড়িতেই দেখি অন্যান্য রেকর্ডের সঙ্গে বিলিতি রেকড থাকে দু’একখানা করে। কিন্তু বাজে ! আজকালকার সব পপুলার ফিলমের গাইয়ে। Taste-এর বড় অভাব। ‘চিরকালই’, প্রশান্ত বললে। ‘আর দিশি গানেরই বা কী অবস্থা। গা ঘিনঘিন করে সব রেকর্ড অনলে। গ্রামােফোন নেই, এমন বাছি আজকাল
খুজে পাওয়াই মুস্কিল : এদিকে খোঁজ নিয়ে দেখুন জোহার
বাইয়ের নামই হয়তো শােনেনি।
প্রশান্ত দাত বার করে হাসলো। সেই হাসি দিয়ে সে
বােঝাতে চাইলো যে ঐ নামের সঙ্গে সে নিজে খুবই
ভালো করে পরিচিত।
জোহার
বাইয়ের রেকর্ড আজ কাল rare হয়ে
অনেক কষ্টে সেদিন ওঁর ফেমাস্ আশাবরীখান।
সংগ্রহ করেছি। শুনুন। Simply Marvellous.'
যেন কোনো পূজার আয়ােজন করছে, অত্যন্ত আস্তে,
সন্তর্পণে লাবণ্য কাগজের মােড়ক থেকে রেকড টি খুললো।
তারপর, যন্ত্রে দম দিতে-দিতে বললে, যদি কিছু মনে না
করেন, আলােটা নিবিয়ে দেবো। এ-গান অন্ধকারে
শােনবার।
একটু পরে অপরূপ এক স্ত্রী-ক যন্ত্রের গহর থেকে
বেজে উঠলে ; সঙ্গে-সঙ্গে লাবণ্য হাত বাড়িয়ে আলােট
নিবিয়ে দিলে ।
গান থেমে গেলো, তার পরেও সবাই চুপচাপ। একটু
অপেক্ষা করে মণিলাল বললে, এখন আলােটা আলা যায়।
লাবণ্য আলো জ্বালিয়ে দিয়ে বললে ; ‘এটা শুনলে
আমার এমন অবস্থা হয় যে খানিকক্ষণ হাত-পা নাড়তে
পারিনে।
প্রশান্ত বললে, চামিং। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ আপনাকেই। জানেন, এ-রেকর্ডটা কাউকে
শােনাতে আমার দস্তুরমত ভয় করে--যদি ভালাে না
লাগে !
'এ-গান ভালাে না-লাগাও কি সম্ভব?'
হঠাৎ মণিলাল আধ-শােয়া অবস্থা থেকে পিঠ খাড়া
করে বসলাে।-“চলো, প্রশান্ত, একটু বেড়িয়ে আসি।
লাবণ্য বললে : এখন কোথায় যাবে? রান্না হয়ে
যাবে একটু পরেই-খাওয়ার পর চলাে সবাই একসঙ্গে
বেরুনাে যাবে। যদি কোথাও কোনাে ভালো ফিল
থাকে-
মণিলাল বললে ; আজ আমার কী হয়েছে, একেবারেই
খিদে পাচ্ছে না।'
'তোমাকে বলি, রোজ দু’চামচে করে টসট
খাবে-
‘না, না, সেজন্যে নয়, এমনি। একটুখানি হেঁটে
এলেই বােধ হয় খিদে হবে,' বলতে-বলতে মণিলাল উঠে
দাড়ালো। চলাে হে।'
‘বেশি দেরি করবে না তো?
'দেরি! এই এক্ষুণি এলাম বলে’ । রান্নার কতদূর?
‘দেরি নেই মােটেও। আমি তো ভাবছিলুম ঠাকুরকে
বলি—একটু বােসসাই না। প্রশান্তবাবু সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছেন—উনি হয়তো ক্লান্ত। ক্লান্ত আর এমন কী, প্রশান্ত লচ্চিতভাবে বললে । ‘একটু হেঁটে আসতে আপত্তি নেই। দু’বন্ধু ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় পাশাপাশি দাড়ালো। ‘দেখাে, দেরি না-হয় যেন, স্বামীর মুখের দিকে একটু পানি তাকিয়ে থেকে লাবণ্য আবার বললে । রাস্তায়, কলকাতার রাস্তায়, কলকাতার অপরূপ গ্রীষ্ম- সন্ধ্যায়, দু’জনে খানিকক্ষণ চুপচাপ হাঁটলে। মুহূর্তে সবই বদলে অতীতের কুয়াশা থেকে উঠে আসা, বর্তমানের এই ভঙ্গুর মুহূর্তে, দু’জন। তাদের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে কলকাতার হাওয়া, স্মৃতির হওয়', পারস্পরিক উষ্ণ-সান্নিধ্যের উষ্ণ হাওয়া। কথা আরম্ভ করলে মণিলাল : ‘লাবণ্য মাঝে-মাকে একটু বাড়াবাড়ি হয়তো করে ফেলে, কিন্তু সত্যি ও গান- বাজনা ভালােবাসে। ৩৮
••
প্রশান্ত তৎক্ষণাৎ জবাব দিলে : ‘বা, এ তুমি
বলছো! চমৎকার তো রেকর্ড শুনলুম কয়েকটা।
এ-প্রসঙ্গ ওখানেই শেষ হ'লাে । উঠলাে অন্য সব কথা,
রাশি-রাশি কথা, হাসি-ছিটানো। দু'জনে বড় রাস্তা ধরে
হাটতে লাগলো। হঠাৎ প্রশান্ত বলে উঠ৫ে. “চলো
বাস-এ করে কোথাও যাই।
‘কোথায় যাবে ? দেরি না হয়ে যায় আবার।'
দেরি হবে কেন?
চৌরঙ্গি পর্যন্ত গিয়েই ফিরে
অসবো। রাত্রের চৌরঙ্গি দেখতে ইচ্ছে করছে।
বাস্ করে’ এপ্লানেডের মােড়ে এসে তারা নামলো।
‘ওহে, তােমার কিছু টাকা রয়ে গেছে আমার কাছে,
মণিলাল বললে।
‘টাকা?
‘সেই যে আমার বিয়ের সময় পাঠিয়েছিলে !”
‘কিছু কিনে দাওনি ওকে?
‘কিনে তো এ-পর্যন্ত কত জিনিসই দিলুম।
‘তা দেবেই তাে।
ময়দানের দিকের ফুটপাথের গাছের সারির তলা দিয়ে
দু’জনে নিরুদ্দেশভাবে বেড়াতে লাগলাে। लाख लिखम
করলে, সে-টাকাটা কি তুমি খরচ কয়রানি ?
‘যদি জানতে চাও তােমার নাম করে কিছু কিনে
দিয়েছি কিনা, তা দিয়েছি। কিন্তু তােমার টাকাটা খরচ
হয়নি।
‘বা, আমাকে কিছু দিতেও দেবে না?
এসব সামাজিক কুপ্রথার প্রশ্রয় দিতে চাইনে।
‘বেশ, তাহলে অন্যভাবে খরচ করতে দাও। কাল
চলো হােটেলে আমার সঙ্গে। একেবারে শ্যাম্পেন-ডিনার,
তার কম কিছু নয়।
দক্ষিণে খানিকদূর গিয়ে তারা আবার ফিরলো।
'ওঃ, ও-সমস্ত ভুলেই গেছি একেবারে।
'কেন, এখন তো দিব্যি মােটা মাইনে পাচ্ছে।
'সে জন্যে নয়। লাবণ্য-বুঝলে না—মানে, ও ঠিক
তােমার-আমার মত-মানে, বুঝলে না-
‘ঠিক বুঝেছি। তাহলে ডিনারটা আর হলো না।
‘কেন, তুমি আর আমি যেতে পারি।
‘লাবণ্যকে বাদ দেওয়া কি—ভালাে দেখাবে?
মণিলাল একটু ভাবলে।
‘ঠিক হয়েছে।-কাল ওকে শাঁখারিটোলায় রেখে আসবো,
ওর বাপের বাড়িতে।
‘কী বলে’ রেখে আসবে?
কেন, স্বীলােক তো মাঝে-মাঝে বাপের বাড়ি গিয়েই
৪০
প্রশান্ত একটু চুপ করে রইলাে।
‘যদি তােমাদের কোনাে অসুবিধে হয়?
'না, না,' মণিলাল বলে উঠলো, অসুবিধে আর কী!
লাবণ্যকে কোনােরকমেই একটু শ্যাম্পেন থেতে রাজি
করানাে যাবে না?
মণিলাল গম্ভীরমুখে বললে, সে-কথা বলে আর লাভ
কী? সকলের তাে আর সব গুণ থাকে না।
আচ্ছা তাহ'লে, তুমি আর আমিই, ঠিক হ'লো।
তারপর হঠাৎ প্রশান্ত বললে, “চলাে না এক গ্লাস বিয়ার
খেয়ে আসি।
এখন?
‘হঠাৎ কী রকম তেষ্টা পাচ্ছে-চলো।'
'না, এখন থাক। দেরি হয়ে যাবে।
কতকক্ষণ আর ! এক চুমুকে এক গ্লাস বিয়ার খেয়েই
চলে আসবে। এসাে। প্রশান্ত বন্ধুকে বাহুর নিচে ধরে’
টানলে। মণিলাল দুৰ্বল একটু আপত্তি করলে, তারপর
দু’জনে চৌরঙ্গি পার হতে লাগলাে।
একটা হােটেলে, যেখানে সেই আগেকার দিনে অনেক
অনেক সন্ধ্যা তারা একসঙ্গে যাপন করেছে, দু’জনে কোণের
একটা টেবিলে দু মাস বিয়ার নিয়ে বসলাে। তারপর
আরম্ভ হ'লে কথা। কত কথা, তার অন্ত নেই।
৪১
হঠাৎ এক সময় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মণিলাল লাফিয়ে
চেয়ার ছেড়ে উঠলো।-ন’টা বেজে গেছে'!
চলে?
শিগগির।
‘বােসাে না আর-একটু।
‘না, চলো। লাবণ্য আবার খাওয়ার সময় সম্বন্ধে
ভয়ানক নিয়ম মেনে চলে।
‘একদিন একটু দেরি হলে কী হয়?
‘না, না, এখন চলল। কাল তো আসবােই আবার!
অগত্যা প্রশান্তকে উঠতে হ'লাে। ফেরবার পথে মণিলাল
ভালো করে কথা বললে না। ঘন-ঘন হাতের ঘড়ির দিকে
তাকাতে লাগলাে।
‘গিয়েই খাওয়াটা সেরে নেবো, বুঝলে?' বাস্ থেকে
নেমে বাড়ির দিকে হাঁটতে-হাঁটতে মণিলাল বললে। তুমি
চটু, করে আবার চলে যেয়ো না-লাবণ্য খাওয়ার পর
বেশি জেগে থাকতে পারে না—তারপর, অনেক কথা আছে
তােমার সঙ্গে।
দু' বন্ধু সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলো। সিড়ির
মাথাতেই লাবণ্য দাড়িয়ে।—এত দেরি হলো যে?
‘এই হ'য়ে গেলাে একটু দেরি। চলাে, বসিগে।
লাবণ্যর পাশ দিয়ে মণিলাল এগিয়ে যাচ্ছিলো, লাবণ্য হঠাৎ
বাতাসটা কয়েকবার শুকলাে।
১২
‘কী-বকম একটা গন্ধ পাচ্ছি।
‘গন্ধ ? গন্ধ কিসের? চলো, বেশ খিদে পেয়েছে
এতক্ষণে।
কিন্তু লাবণ্য তার স্বামীর কাছে এসে দাড়ালো।-“কিছু
খেয়েছে নাকি?
মণিলাল হাসবার চেষ্টা করলে -“কী আবার খাবে?
খেতে চাইছি তা তো দেখতেই পাচ্ছে। প্রশান্ত, তুমি
হাত-মুখ ধবে নাকি?”
দ্যাখাে, মিথ্যে কথা বলছে কেন ? পুরু চশমার
আড়াল থেকে লাবণ্য সােজা তার স্বামীর চোখের দিকে
তাকালাে।
মণিলাল চোখ নামিয়ে নিন।-“কী বলছো তুমি ?
‘কী বলছি তা তুমি ভালো করেই জানে।
মিছিমিছি লুকোবার চেষ্টা করছো?
‘লাবণ্য
‘চুপ করাে, তােমার কোনো কথা শুনতে চাইনে।
লাবণ্য হঠাৎ গলা বাড়িয়ে মণিলালের মুখের খুব কাছে মুখ
এনে জোরে জোরে কয়েকবার নিঃশাস টানলে। তারপর
সমস্ত বাঁধ ভেঙে বলে উঠলো :
‘Awful! Smelling like rabbits. লঞ্জ
না তােমার—এই এত রাত্রে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরতে। আর
আমি এতক্ষণ ভাত নিয়ে বসে আছি। Oh, these
men! Shameless'
লাবণ্য, শােনাে-it was nothing, just a glass
of beer
কিন্তু মণিলালের ক্ষীণ স্বর কোথায় তলিয়ে গেলো :
Smelling like pigs ! আর আমি সেই কথন্ থেকে
বসে’ আছি। Lout ! Scum !
প্রশান্তবাবু নিতান্ত
ভদ্রলােক, কেও জোর করে টেনে নিয়ে গেলাে। মানুষের
একটু চক্ষুলজ্জাও হয়।
প্রশান্ত মাথা নিচু করে’ পাথরের মৃত্তির মত দাড়িয়ে,
মণিলাল কী বলবার চেষ্টা করছে ভালো বােঝা যাচ্ছে না,
আর লাবণ্য অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে তা থেকে অত্যন্ত
স্পষ্ট হয়ে মাঝে-মাঝে শােনা যাচ্ছে :
'Lout ! Lout! Scum!
লােক।
{ ভবানীপুরের এক বাড়ির একতলার রাস্তার উপরে ঘর ।
রাস্তার দিকে দরজ। নীল পরদায় ঢাকা-হাওয়ায় সেটা
মাঝে-মাঝে নড়ে উঠছে। ঘরের মাঝামাঝি একটা মাঝারি
টেবিল-তার উপর বই, কাগজ-পত্র, কাগজ-চাপ, ছাইদান
ইত্যাদি একটু বিশৃঙ্খলভাবে ছড়ানাে। টেবিলের এক
কোণে একটা নীল ঢাকনা-ওয়ালা টেবল-ল্যাম্প, এখন
নেবানাে। সীলিঙ থেকে ঝুলছে উজ্জ্বল ইলেকটিক বাতি।
ঘরের মধ্যে বসে আছে দু’জন। দরজার দিকে পিঠ
দিয়ে টেবিলের কাছে এক যুবক, বয়েস সাতাশের মত।
গায়ে তার পালা একটা সুতাের পাঞ্জাবি, গলার ও তার
নিচের বােতামটা খােলা। এক কনুই সে রেখেছে টেবিলের
উপর, আঙুল গুলাে চালিয়ে দিয়েছে চুলের মধ্যে। তার চোখ
আনত, কী যেন ভাবছে। তার হাতের ঠিক কাছে লেখবার
প্যাড একটা, আর ফাউন্টেন পেন। আর টেবিলের পাশাপাশি
৪৫
একটা ডে-চেয়ারে অর্থ শায়িত একটি মেয়ে—বছর কুড়ি বয়েস। লাল রঙের একটা কুশান তার কোলে, কুশান-টানার ফ্রি গুলো নিয়ে খেলা করছে তার আঙুল। এর দু’জন যে স্বামী-স্ত্রী তা দেখেই বােঝা যায়-পরস্পরের উপস্থিতিতে এরা এত সহজ ; এদের মধ্যে, আপাতত, কথা বলবার প্রয়োজন এত কম ; পরস্পরের মধ্যে এদের এমন সম্পূর্ণ আত্ম-বিশ্বতি। এরা এখন পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছেও । তবু যেন একে অন্যের মধ্যে নিচ্ছে তার পরিপূর্ণ সুখ । স্বাশ্মীর নাম হেমন্ত, আর স্ত্রীর মীরা। গ্রীষ্মের রাত্রির এগারােটা বেজে গেছে। যবনিকা ওঠবার পর একটু সময় চুপচাপ। তারপর : ] মীরা ( ছােট্ট হাই তুলে )। উঃ, ঘুম পাচ্ছে। হেমন্ত (স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে )। যাও, শুয়ে থাকো গে । মীরা। তুমি ? হেমন্ত। আমি আসছি। মীরা ( ক্ষীণ হেসে)। আসছে? তিনটে ? না চারটে ? হেমন্ত (ক্ষীণ হেসে)। পাচটাও হতে পারে-ঈশ্বর যদি দয়া করেন। মীরা ( পিঠ খাড়া করে)। কী যে তুমি করে এক- এক সময়। হেমন্ত। কী করি?
মীরা। রাতের পর রাত এ-রকম করে জাগবার কোনো মানে হয় না। মানে হেমন্ত। কিন্তু বই তো শেষ করতেই হবে। আর- তিনদিনের মধ্যে কাপি দিতেই হবে আমাকে। পাব্লিশর টাকা নিয়ে প্রস্তুত। মীরা। কদর হয়েছে ? হেমন্ত। হয়ে এসেছে। আজ রাত্রে যদি এই চ্যাপ্টারটা শেষ করতে পারি, তারপর আর-একটা। তা হ'লেই শেষ। শেষ—ভাবতেও আমার শরীরটা কেমন শিরশির করে ওঠে। মীরা। উ, বাঁচবে। হেমন্ত। বাচবে কি একটু ! টাকাগুলাে হাতে আসুক না একবার-তারপর কয়েকদিন শুধু ঘুম আর গল্প, গল্প আর ঘুম।-কিন্তু এখন ও-সব কথা ভাবতে নেই। দেখা থেকে তাহলে মন চলে যাবে। মীর (স্বামীর মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে )। কী চেহারাই করেছে এ-ক'দিনে। হেমন্ত ( নিজের গালে একবার হাত বুলিয়ে)। কেন, বেশ ভালােই তাে আছি। বেশ ভালো লাগছে আমার। মীরা ( একটু চুপ করে থেকে)। আজ রাত্রে তে। কফিও খেলে না। হেমন্থ। না, এমনিতেই বেশ গরম অজ। তা ছাড়া ৪।
একটা বই যখন শেষ হয়ে আসতে থাকে অদ্ভুত অবস্থা
হয় মনের আর শরীরের : মনে হয় কখনাে আমার আর
ঘুম পাবে না, কখনাে আমার আর ক্লান্ত লাগবে না।
মনকে খাটাবার একটা সীমা বােব হয় আছে, যা পার হলে
বাইরের কোনাে জিনিসের সাহায্য পৰ্যন্ত দরকার হয় না,
এমনি চলতে থাকে।
মীরা। Nerves.
হেমন্ত। হ্যা, nervesই তো। একটা নেশার মত
যেন। কীরকম যে হয়, সমস্ত শরীর যেন জ্বলতে থাকে,
টন্টন করতে থাকে আঙুলের ডগা গুলো। তুমি বলছে
ঘুমের কথা—তুমি কি মনে করে এখন আমি শুতে গেলে ও
ঘুমুতে পারবাে?
মীরা (শান্ত, বড়-বড় চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ) {
কাৱা তুমি কখন্ শুতে এলে টেরও পেলুম না।
হেমন্ত। তােমাকে আর বিরক্ত করতে চাইনি।
মীরা। একটু জাগালে না কেন ?
হেমন্ত (একটু চুপ করে থেকে)। মীরা, তােমার
যখন মন ভালাে থা: না, রাত্রির অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে
কি তুমি কোনো প্রার্থনা করো না ? কী প্রার্থনা করে
তুমি ?
মীরা ( চুপ করে রইলাে)।
3
হেমন্ত। বলাে না।
মীরা (অস্তে-আস্তে )। আমার প্রার্থনা কী, তা তুমি
বুঝতে পারাে না ?
হেমন্ত (আস্তে হেসে উঠে )। আঃ, স্ত্রী! স্ত্রী।
মীরা। স্ত্রী-ই তো। মেয়ে। মেয়ে হতে লজ্জা করবে।
কেন ?
হেমন্ত (একটু পরে )। আমিও প্রার্থনা করি এক-এক
রাত্রেতা অন্য রকম। কেবল একটি প্রার্থনা আমার
আছে : শক্তি দাও দেবতা, আরো শক্তি দাও আমাকে।
যদি দিলেই, এমন কৃপণের মত দিলে কেন ?
মীরা। দেবতা তােমাকে যথেষ্ট দিয়েছেন। তুমি ভাগ্যবান।
হেমন্ত। না, যথেষ্ট নয়। তুমি যদি জানতে কী সব
আশ্চৰ্য্য জিনিস আমি ভাবি! আমার লেখায় তার কতটুকু
ধরা পড়ে ? কল্পনা অপরিসীম, তার প্রকাশ অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ।
মীরা। তা যদি না হতো, তবে কি
এত আনন্দ
থাকতো কল্পনায় ?
হেমন্ত। কিন্তু অন্যায়, এটা ভয়ানক অন্যায় । এমন
আশ্চৰ্য্য সব ভাবনা—তা প্রকাশ করবার ক্ষমতা যদি আমার
থাকে, তবে তারা আসেই বা কেন? দেবতা যদি
কমই দিলেন, তাহলে কল্পনাশক্তি আরো একটু কমিয়ে
দিলে দোষ ছিলো না। এ কি ঘােরতর অন্যায় মনে হয়
৪১
না তোমার-এমন প্রবল কল্পনার সঙ্গে এতটুকু মাত্র প্রকাশের
ক্ষমতা জুড়ে দেয়া? যত সুন্দর করে একটা জিনিস ভাবি
লেখা কিছুতেই তত সুন্দর হয় না কেন?
মীরা। পৃথিবীর যার শ্রেষ্ঠ লেখক তাদের বেলাতেও
বােধ হয় তা-ই হয়েছে।
হেমন্ত। যদি তা-ই হ'য়েও থাকে, সেটা তাে আমার
কোনো সান্তনা নয়। আরাে শক্তি কি আমার কখনো হবে?
যত সময়ে যত অপরূপ কল্পনা আমার মনে এসেছে, সব
কি প্রকাশ করতে পারবো? তার এতটুকু অংশ কি প্রকাশ
করতে পারবাে?
মীরা। প্রার্থনা করে। আর অপেক্ষা করো।
হেমন্ত ( হঠাৎ নিম্নস্বরে হেসে উঠে)। যা-ই হােক,
তােমার এখন আর অপেক্ষা করে কাজ নেই। তােমার
চোখ লাল হয়ে উঠেছে। ( হাতের কাছে প্যাডটার
পাতা উলটিয়ে পাণ্ডুলিপির শেষ পৃষ্ঠাটা পড়তে লাগলাে )
অ, বেশ। বেশ হয়েছে এই লেখা। (চোখ তুলে স্ত্রীর
দিকে তাকিয়ে) দ্যাখো, প্রতিবার যখন একটা শেষ করি,
মনে-মনে বলি, এইবার আমি একটা masterpiece লিখলুম ।
আর প্রতিবারই, অবিশ্যি, মাসখানেক না-যেতেই আমার
সে-মােহ কেটে যায়।
মীরা। লিখে যে সুখ পাও, সেটাই কি কম ?
হেমন্ত। (প্যাডের পৃষ্ঠাগুলো ওল্টাতে-ওল্টাতে) সুখ ।
সুখ! আনন্দ। যন্ত্রণা। কী আনন্দ, কী যন্ত্রণা, তা আমি
কখনাে কাউকে বলতে পারবে না। ( একটু পরে অন্য
রকম স্বরে) শোনো, দিন তিনেক চলবে তাে?
মীরা। টাকা? ওঃ, খুব। ( একটু হেসে) এমন কি,
চরদিনও চলতে পারে, জোর করে বলা যায় না।
হেমন্ত। তুমি তােমার বাক্সের আনাচে-কানাচে
সব টাকা লুকিয়ে রাখে, সেগুলো এবার বার করে আর কি।
মীরা ( উঠে দাড়িয়ে)। থাক, সে-জন্য তোমায় ভাবতে
হবে না। তুমি লেখাে বসে।
হেমন্তু। আর কিক’দিন পরেই তাে টাকায় গড়াগড়ি
দেবাে।
মীরা। হা-এ-পাশ ফিরলে টাকা,
ফিরলে টাকা, ও-পাশ ফিরলে
টাকা : ঘুম হয় না রাত্তিরে।
হেমন্ত। ঢাকিঙে একবার যেতেই হবে—কী বলে?
না কি বাড়িতেই দেবে একটা ভােজ ?
মীরা। আমি তো ভেবেছিলাম গ্র্যান্ড হোটেলে একটা
পার্টি দেবাে।
হেমন্ত। ঠাট্টা? দাড়াও না-দস্তুরমত একদিন ট্যাক্সিতে
বেড়াবাে-যতক্ষণ তুমি চাও। (একটু থেমে) অবিশ্যি দশ
টাকার বেশি না হয়।
১
[ মীর নিম্নস্বরে একটু হেসে উঠলো। তারপর হাতের
উল্টো পিঠ দিয়ে পিষে মারলো একটা হাই। সামনের
কোণে ভিতরে যাবার দরজা, তার দিকে এগিয়ে এলাে
কয়েক পা। তারপর হঠাৎ থেমে, রাস্তার দিকের দরজার
দিকে তাকিয়ে }
মীরা। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাই।
হেমন্ত। না, না, ওটা খােলাই থাক ।
মীরা। সারাক্ষণ খােলা থাকবে ?
হেমন্ত। থাক না, কী আর হবে। বেশ হাওর'
আসছে। বড় আলােটা নিবিয়ে দাও।
[ হেমন্ত চাবি টিপে টেবল ল্যাম্পটা জ্বালালে। সঙ্গে-
সঙ্গে মীর সুইচ টিপলো। সমস্ত ঘর ছায়ায় ভরে গেলো,
শুধু হেমন্তর সামনে টেবিলের উপর, তার লেখবার কাগজের,
তার একখানা হাতের উপর নরম আলাে। আলাের শেডটা
টেনে দেয়া ; তার পাল, মাংসবিরল মুখেও অস্পষ্ট ছায়া।
সে চেয়ারে ভালো হয়ে বসে কলমটা হাতে তুলে নিলে।।
মীরা ( ছায়া থেকে)। রাত্তিরে যদি চা কি কফি
খেতে হয়, আমাকে ডেকো।
হেমন্ত। (অন্যমনস্কভাবে )। আচ্ছা।
মীরা। (তবু একটু দাড়িয়ে )।
দাড়িয়ে )। আজ দুটোর বেশি
জেগাে না, কেমন ?
হেমন্ত। ( সম্পূর্ণ আত্ম-বিস্মৃত)। হু।
মীরা ( আর-একবার)। দুটো—কি আড়াইটে বড় জোর।
আর আমাকে একটু ডেকো।
হেমন্ত ( কাগজ থেকে চোখ তুলে, ছায়ার ভিতর দিয়ে
মীরার দিকে তাকিয়ে)। লক্ষ্মী, তুমি এখন শুতে যাও।
বলেই সে আবার চোখ নিচু করলাে। মীরা নিঃশব্দে
অদৃশ্য হয়ে গেলাে কোণের দরজা দিয়ে। হেমন্ত চেয়ারের
পিঠে একটু হেলান দিলে, ধরালে একটা সিগ্রেট, ভাবলে
একটু, তারপর বাঁ দিকের ছাইদানে সিগ্রেটটা রেখে কলম
তুলে নিয়ে প্যাডের উপর মাথা নিচু করলো। শেডের
কাক দিয়ে তার ক্ষীণ ম্লান মুখে একটু আলাে এসে পড়লাে।
নেমে এলো যবনিকা।
আবার উঠলো মুহূর্ত পরেই। চার ঘণ্টা কেটে গেছে।
ছাইদান ভরে উঠেছে সিগ্রেটের টুকরোয়। হেমন্ত সেইখানেই
বসে আছে, মাথা ভরে চুল এলােমেলো, মুখ বিবর্ণ, চোখ
একটু আরক্ত। এই মুহূর্তে সে হাত থেকে কলমটা নামিয়ে
চেয়ারে হেলান দিলে। হাতের সঙ্গে হাত ঘষে ডান হাতের
আঙুল গুলাে একবার মটকালাে। মুহূর্তের জন্য চোখ খুলে
তাকালাে প্যাডটার দিকে, একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর
আবার কলম তুলে নিয়ে লিখতে আরম্ভ করলাে।
এমন সময় পিছনের দরজাটার নীল পরদা সরিয়ে
একটা লােক নিঃশব্দে ঢুকলো ঘরের মধ্যে। বেঁটে-মত,
রােগা, মুখ ভরে খেচা-খোচা দাড়ি-গোঁফ। আধ-ময়লা
কাপড় আর নােঙরা হলদে রঙের পাঞ্জাবি পরনে। পায়ে
জুতো নেই। অথচ মাথার চুল চক্চক্,ে পরিপাটি, মাঝখানে
টেড়ি কেটে দু’দিকের চুল বিশ্রী ঢঙে শিঙের মত কপালের
উপর নামিয়ে দেয়া।
লােকটা আস্তে-আস্তে এগিয়ে এসে পিছন থেকে খপ
করে'
কলম-সুদ্ধ ডান হাতটা চেপে ধরলো।
কলমটা কাগজের উপর দীর্ঘ একট। আঁকিব কি রেখা একে
গেলো—ভীষণভাবে চমকে উঠে হেমন্ত মুখ ফেরালো।
তার চোখ বিস্ফারিত, মুখের হা খুলে গেছে, সে চীৎকার
করে উঠতো আর-একটু হলেই।]
লােকটা ( খুব কঠোর স্বর আনবার চেষ্টা করে)।
চাবি দাও।
হেমন্ত ( বাঁ হাতের আঙুল ঠোটের উপর চেপে ধরে)।
স্স্স্ ! চুপ !
লােকটা। চাবি দাও, বলছি।
হেমন্ত ( তীব্র চাপা গলায় )। বলছি চেঁচিয়ো না।
একজন ঘুমুচ্ছে ।
লােকটা। তােমারও তাে এ-সময়ে ঘুমােনো উচিত
ছিলো। কী করছো তুমি বসেবসে?
৫৪
হেমন্ত। অদৃষ্টের বিধান পালন করছি।
লােকটা (ব্যঙ্গের সুরে)। ফু! তােমার অদৃষ্ট ! তুমি-
বুজোয়া , পেতি বুজোয়া!
হেমন্ত। ঐ তাে দ্যাখো, অল্প অলপে মানুষের সম্বন্ধে
মানুষের কী রকম ভুল ধারণা হয়। হাতটা ছাড়ো, বুঝিয়ে
বলছি।
লােকট।। হু-হু–চালাকি !
আগে বা হাত দিয়ে
ড্রয়ার টেনে চাবি বার করাে; তারপর।
হেমন্ত। বা দিকের ড য়ারে শুধু কত গুলো কাগজ
আছে—তা তোমার কোনােই কাজে লাগবে না। চাবি
যার কাছে, সে ঘুমুচ্ছে। তাকে এখন আমি
এখন আমি জাগাতে
পারবে না কিছুতেই।
লােকটা। খােলল না, চাদ, ড য়ারটা।
হেমন্ত ( মুখ ফিরিয়ে লােকটার দিকে তাকিয়ে)। দ্যাখো,
এত রাত্তিরে দু’জন ভদ্রলােক মারামারি করলে ভালো
দেখাবে না। হাত ছাড়ো, তারপর তােমার কী বলবার
আছে বলাে।
লােকটা (হেমন্তর কাধের উপর দিয়ে প্যাডের সদ্য
লিখিত কাগজটার দিকে তাকিয়ে )। কী লিখছিলে ও-সব ?
হেমন্ত। অদৃষ্টের লিপি, বলতে পারো।
লােকট। (গলা বাড়িয়ে কয়েকটা লাইনের উপর চোখ
বুলিয়ে )।
চ্ছো! গল্প !
প্রেমের গল্প। মােটা-মােটা
ডিপ টি-গিন্নিরা দুপুরবেলায় শুয়ে-শুয়ে পড়বে।
হেমন্ত। সেই তো দুঃখ, বন্ধু, সেই তাে দুঃখ।
লােকটা। আর তুমি ! বুজোয়া সেন্টিমেন্টের খােরাক
জুটিয়ে নিজে মােটা হচ্ছে। ফোঃ !
হেমন্ত। হায়, তুমি একটু-আধটু লেখাপড়া শিখে বড়
ভুল করেছে।
লােকটা ( হিংস্রভাবে )। আর তুমি তো চমৎকার
উচ্চশিক্ষিত ভদ্রলােক। তোমার বাপ কোথায় ?
হেমন্ত। স্বর্গে ।
লােকটা। তিনি কত রেখে গিয়েছিলেন ?
হেমন্ত। শুনে কী করবে? তার একটা পয়সাও এখন
নেই।
তা না-ই বা থাকলাে। তুমি তাে আছে।
তুমি, উচ্চশিক্ষিত ভদ্রলােক! ভাগ্য যদি একচুল ভুল
করতো তাহলে আমি আজ হয়তাে একটা প্রােফেসর
হতুম।
হেমন্ত। ভালো করেছে না-হ'য়ে।—কিন্তু হাতটা ছাড়ে।
। এ-রকম করলে কি গল্প জমে ?
লােকটা। কত দেবে বলে আগে।
হেমন্ত। নাঃ! ( চট করে উঠে দাড়িয়ে সে তার বা
হাত লােকটার গলার উপর রাখলো। সঙ্গে-সতে লােকটা
তার হাত ছেড়ে দিয়ে ছেলেমানুষের মত চেঁচিয়ে উঠলো)।
লােকটা। উঃ গেলুম ! গেলুম !
হেমন্ত ( তাড়াতাড়ি লােকটাকে ছেড়ে দিয়ে )। এই,
চেচিয়ে। না! বলিনি তােমাকে একজন ঘুমুচ্ছে !
লােকটা (বা দিকের বুকে হাত রেখে)। বাবা যা
ভয় পেয়েছিলুম।
হেমন্ত ( হাসি সামলাতে না পেরে )। বাঃ, চমৎকার
চোর তুমি !
লােকট। ( কাকতার ছোটলোকের কনি সুরে)। 'আর
বলবেন না মােসাই, উচ্চারণ, মোঙাই ] হার্টটা একেবারে
ঝাঁজরা–একটুকুতেই কামারের হপর হয়ে ওঠে। বাপের
বুড়ো বয়সের ছেলে। জন্ম থেকেই টিকটিকি। ছেলেবেলায়
হাঁপানি ছেল। তার ওপর নেশাট। অশট। বরাবরই চলেছে
কিনা। (গলায় এক বার হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো )
উঃ! যদি দয়া করে এক গেলাশ জল দেন, স্যর।
হেমন্ত (লােকটার এই নতুন ধরণের কথাবার্তা সে
অবাক হয়ে শুনছিলো)। ব্যস্ত হয়ো না। ঠাণ্ডা হও
একটু। সরে গিয়ে ঘরের বড় আলােটা জালিয়ে দিলে,
নিবিয়ে দিলে টেবল-ল্যাম্প,। বােসস না। (ঘরের অন্য
দিকে সরে গিয়ে) এখানে এসে বােসাে।
[ অন্য দিকে, সাদা কাপড়ে ঢাকা গােল একটা টেবিলকে
কয়েকটা চেয়ার বিরে রয়েছে। লােকটা নিতান্ত ভালো
মানুষের মত আস্তে-আস্তে একটায় গিয়ে বসলো—অত্যন্ত
সঙ্কুচিতভাবে, ভয়ে-ভয়ে যেন।]
হেমন্ত। (জানলার তাকে কুঁজো থেকে জল গড়াতে-
গড়াতে)। ভালাে হ'য়ে বােসো।
[ যেন এটা একটা আদেশ যা পালন না করলেই নয়,
লােকটা চমকে উঠে তার শরীরে যতটা সম্ভব চেয়ারের
মধ্যে টেনে নিলে। দু’হাত ছড়িয়ে দিলে হাতলের উপর,
এলিয়ে দিলে মাথা। ]
হেমন্ত (জলের গেলাস নিয়ে এসে )। এই নাও।
লােকট। ( তাড়াতাড়ি গেলাসটা নিয়ে টকটক করে
খানিকটা খেয়ে)। আঃ। ( গেলাসটা টেবিলের উপর রেখে,
হঠাৎ মুখ বিকৃত করে) উঃ !
হেমন্ত। কী হ'লো আবার ?
লােকটা। পেটটা কেমন মােচড় দিয়ে উঠলে! হঠাৎ ।
খালি পেটে জলটা ঠিক সয় না ।
[ একটু সময়, হেমন্ত লােকটার দিকে চুপ করে তাকিয়ে
রইলাে। এতক্ষণে সে তাকে ভালো করে
ভালাে করে দেখলাে।
উজ্জ্বল আলােয় ফুটে উঠেছে তার মুখের কঠিন শীর্ণতা,
তার চোখের ক্ষুধিত রুগ্নভাব। অপরিমিত
তাম্বুল চর্বণে
৮
ঠোট তার কালো। তবু সে ভয়াবহ নয়, ভয়ানক নয়—
সে শুধু ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র, অত্যন্ত তুচ্ছ। শিথিল, অবসন্নভাবে
সেই চেয়ারে বসে তাকে মনে হলো ঠিক যেন দুর্ভাগ্যের
প্রতিমূর্তি।
হেমন্ত। ( আস্তে-আন্তে)। তােমার পেট, তাহলে,
সম্প্রতি খালি যাচ্ছে ?
লােকটা (একটু লজ্জিতভাবে)। ওঃ, এ-রকম আমার
মাঝে-মাঝেই হয়। কিছু এসে যায় না।
কিছু এসে যায় না। কপালে থাকলে
শিগগিরই হয়তো বড় গােছের একটা খাওয়া জুট যাবে,
চাই কি মাইফেল সুদ্ধ ।
হেমন্ত। এখন তো কোনো তৈরি খাবার নেই বাড়িতে।
স্ত্রী আছেন ঘুমিয়ে
লােকটা (করুণস্বরে)। থাক, থাক, কোনাে কষ্ট করবেন
যেন আমার জন্য। সত্যি আমার কোনো অসুবিধে
হচ্ছে না। হঠাৎ কী রকম মােচড় দিয়ে উঠেছিলো এই
জায়গাটা (পেটের বা দিকে হাত রেখে)-ঠাণ্ডা জল ।
তা যা-ই বলুন, আমাদের জীবনটাও মন্দ নয় নেহাৎ। কোনো
বাধ নেই কোনােখানে—ঘুরে-ঘুরে বেড়ানাে, এখান থেকে
'ওখানে, এ-আড্ডায় থেকে ও-আড়ায়, খাওয়ার গন্ধ ওকে..
ওকে। আজ কপালে কী আছে জানিনে। কাল রাত্রে
কোথায় ঘুমুবো জানিনে। স্বাধীন জীবন। আজকাল তো
দেখি।
আমরা সবাই স্বাধীনতা চাই। রােজ দু' বেলা . একই সময়ে
একই জায়গা থেকে আমার খাবার আসছে, এ তো আমার
ভাবতেই বিশ্রী লাগে।
হেমন্ত (এতক্ষণ সে যেন অন্য কী ভাবছিলো )। দাড়াও,
( লেখবার টেবিলের ধারে এসে সে ড য়ার খুলে
বঁটাঘাঁটি করলে খানিকক্ষণ )। আ, তােমার কপাল ভালাে।
( লােকটার কাছে এসে সে একটা টাকা রাখলো টেবিলের
উপর।) এটা কী করে ওখানে ছিলো বুঝতে পারছিনে।
বােধ হয় অনেক আগে মীর একদিন ফেলে রেখেছিলো-
তারপর গিয়েছিলো ভুলে। যাক্, তােমার কপাল ভালাে।
ভালাে করে খেয়ে কাল। (লােকটার পাশে এক টা
চেয়ারে বসলো)।
| মুহূর্তের জন্য লােকটার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলাে,
তার হাত এলো এগিয়ে। কিন্তু পরের মুহুর্তেই সে হাত
সরিয়ে নিলে ]।
হেমন্ত (একটু অপ্রস্তুত হ'য়ে )। একটা টাকা। কিছুই
নয়। কিন্তু এর বেশি আমি আজ পারিনে।
লােকটা (একটু উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে হেমন্তর দিকে তাকিয়ে)।
থানায় একটা নালিশ করবেন তাে?
হেমন্ত। নালিশ? কেন?
লোকটা (ঢোক গিলে )। এই যে আমি-আমি-
জানেন তো, সুবিধে করতে পারলে আমি চুরি করতে ছাড়তুম না। হেমন্ত। পাগল হয়েছে। সেজন্য আমি নালিশ করতে যাই আর কি। যা ঝকমারি পুলিশকোর্টের। লোকটা। কেন, করুন না নালিশ। চোরকে হাতের মুঠোয় পেয়ে কে ছেড়ে দেয় ? হেমন্ত। কখনো জেলে যাওনি তো ? লােকটা। আজ্ঞে এখনাে সে-সৌভাগ্য হয়নি। ভাবছিলুম অনেক দিন তে। কাটলো ছুটোছুটি করে ছটফট করে’ এখন একটু রে নিলে মন্দ হয় না। দিব্যি শান্তিতে কয়েক মাসের চেঞ্জ-বুঝলেন না? করুন না নালিশ-আর-একজনের জন্য একটু কষ্টই না-হয় করলেন। সংসারে একজন আর- একজনকে সাহায্য না করলে চলবে কী করে? হেমন্ত। কিন্তু সত্যি যা ঘটেছে তার জন্য ওরা তােমায় জেলেই দিতে চাইবে না। আমি তাে আর মিথ্যে বলতে পারবাে না তোমার নামে। লােকটা (দীর্ঘশ্বাস ফেলে)। তাহলে আর কী। (হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে সে তার জানার পকেটে রাখলাে)। আপনার স্ত্রী এমনি ভুল করে আরো দু একটা ফেলে রাখেন নি? হেমন্ত। তাহলে তাহলে তােমায় আর বলতে হতো না।
তােমাকে যে এত দিতে পারবে। তা-ও আমি আশা করিনি।
তােমার ব্যবসা খাটাবার পক্ষে আমার বাড়ির নির্বাচন
তােমার ভয়ানক ভুল হয়েছে।
লােকটা (ক্লান্তম্বরে)। তা-ই দেখছি। অন্য কোনো
বাড়ি হ'লে জেলে ঠিক যেতে পারতুম ।
হেমন্ত (লােকটার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে)।
ঘুম পাচ্ছে নাকি তােমার? কিন্তু দেখাে, এখানেই ঘুমিয়ে
পােড়া না কিন্তু। মীরা কী ভাববে সকালবেলায়। একটা
সিগ্রেট খাবে ?
লােকটা ( আবার কনি সুরে)। সিগ্রেট? দিন। শালা
বিড়ি টেনে টেনে সঁতে পােকা পড়ে গেলাে।
[ হেমন্ত উঠে গিয়ে তার লেখবার টেবিল থেকে সিগ্রেট
দেশলাই আর ছাইদান নিয়ে এলো। লােকটাকে সিগ্রেট
দিয়ে নিজে নিলে একটা ]।
লােকটা ( সিগ্রেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে)।
অ, গােল্ড ফ্লেক, গােল্ড ফ্লেক। বড় ভালো জিনিস (s), মােসই।
[ হেমন্ত দেশলাই জ্বালিয়ে লােকটার সামনে ধরলাে।
সিগ্রেট ধরিয়েই সে কেশে উঠলাে শখ করে।]
হেমন্ত। এই—আস্তে আস্তে। (নিজের সিগ্রেট ধরালো।)
লােকটা (কাশি সামলে নিয়ে গভীর নিঃশ্বাসে বুকের মধ্যে
ধোয়া টেনে নিয়ে)। আঃ, বড় ভালো জিনিস, মােসাই,
বড় ভালো জিনিস। একটু ভরা পেটের উপর হলে আরো জমতাে। হেমন্ত। ( একটু পরে) এ-ব্যবসায় তােমার নতুন হাত মনে হচ্ছে ? লােকটা। এ-সব ছােট নজর আমার আগে ছেল না, স্যর। ( ককনি সুরে) হেমন্ত। তুমি তো ইচ্ছে করলেই ভালো করে' কথা বলতে পারে। তাই বলো না কেন? লােকটা (তার কালাে ঠোট একটু হাসিতে বঁকিয়ে)। যা-ই বলুন না, ছােটলােকদের কথার টানটা বেশ। বেশ জোর আছে। আর ভদ্দরলােক হ'য়ে লাভ কী বলুন- 'ভদ্দরলােকের বুড়ো আঙুল চুষে তো আর বাঁচা যায় না। হেমন্ত। ভদ্রলােকের উপর তােমার বেজায় রাগ দেখছি। লােকটা (নােঙরা দাত বার করে হেসে) ভদ্দরলােক। জেন্টলম্যান! ভদ্দরলােক ভদ্দরলােক কি চুরি কি চুরি করে না? লােক ঠকায় না? মিথ্যে কথা বলে না ? নিজের একটু সুবিধের জন্য অন্যের সর্বনাশ করে না? সবই করে। তবে? তাদের কোচার স্কুলে সব ঢেকে যায়। বুয়েছেন মােসই, কেঁাচার ঝুল! ভদ্রলােক কি আর সাধে বলে ! হেমন্ত। সে যা-ই হােক, তােমার যা অবস্থা দেখছি, এ-ব্যবসা তােমার চলবে বলে মনে হয় না। জেলে নাহয়
কোনাে রকম করে একবার গেলেই।
ত। ক'দিন আর
?
তােমাকে রাখবে সেখানে।
লােকটা ( পিঠ খাড়া করে একবার আড়মােড়া ভেঙে )।
না, এ-সব আমার পােষাবে না। শিগগিরই আবার
নীলমণিবাবুর কাছে গিয়ে ধন্না দিতে হবে, দেখছি।
হেমন্ত। কে নীলমণিবাবু?
লােকটা। সে কী! নীলমণিবাবুর নাম শুনেননি? আমাদের
নীলমণি দে—যিনি ঐ বিভীষণ বলে কাগজটা চালান।
হেমন্ত (তার অজ্ঞতা গােপন করবার চেষ্টা করে)। ও।
লােকটা। ঘােরেল লােক মশাই-ঐ তো এক পয়সার
কাগজ, এদিকে দেখুন গে তার তেতলা বাড়ি। মেয়ে
বিয়ে দিয়েছেন টাটকা এক ডিপটির সঙ্গে। মেয়ের নাম
সােনা-দেখতে পােড়াকাঠ। আমি হ'লে তো ওটাকে
আঙুল দিয়ে এম্নি করে'ও ( নস্যির টিপ নেবার ধরণে বা
হাতের দু আঙুল একত্র করে' ) তুম না। কিন্তু সােনা
তাে নামেও—কাজেও। (ঘােড়ার মত বিশ্রী শব্দ করে হেসে
উঠলো।)
হেমন্ত। ঐ কাগজটা খুব চলে বুঝি ?
লােকটা (তার ভাসা-ভাসা জোলো চোখ ঘুরিয়ে)।
বেশ! আপনি আছেন কোথায় ? কাগজ বিক্রির জন্য
বসে থাকতে হ'লেই নীলমণি দের হয়েছিলো আর কি। বড়-
৩১
বড় সব লােক আছে না কলকাতা-দিগগজ, প্রকাণ্ড
হােমরা-চোমরা-মােটরে-মােটরে যারা ঘুরে বেড়ান, বক্তৃতা
দেন লম্বা-লম্বা, একটু-কিছু হ'লেই হাশফাশ করতে-করতে
ছোটেন কোথায় দিল্লি আর কোথায় বােম্বাই আর কোথায়
লণ্ডন সেই সব মস্ত ঘরের মস্ত নামের মস্ত সব লােক আছে।
—তাদের নিয়েই তো দেশের সব ক'টা কাগজের কারবার।
কেবল আমাদের নীলমণিবাবু তাদের কথা কিছু লেখেন না-
নেহাৎ দরকার না হলে। বড়লোকদের মধ্যে এমন বােকাও
কেউ-কেউ আছেন যার। প্রথমটার বয়ে গেলো বর্ণে' উড়িয়ে
দিতে চান। লাভের মধ্যে পরে চচ্চ করে দ্বিগুণ টাক
বেরিয়ে আসে।
হেমন্ত (এতক্ষণে ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে--গম্ভীর
মুখে)। ও। তুমি তাহলে সেই নীলমণি দের একজন চর ?
লােকট। ( উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে হেমন্তর দিকে তাকিয়ে )। রাগ
করলেন? কী করবাে বলুন, পেট তে ভরাতে হবে :
যত ভালো ভালো কথাই বলুন না, পেটের কারনি তো থামবে
তা শুনে। আর মন্দ মজাও নয়—হি-হি ( দুর্বলভাবে
একটু হেসে) দিগগজ, দিগ্বিজয়ী মহাপুরুষদের এই সব কাণ্ড!
হি-হি-বেশ মজাই-কী বলেন? আমার কাজ ছিলাে শুধু
ঘুরে-ঘুরে বেড়ানাে, চোখ খুলে রাখা। কে কোথায় গেলো,
কে কার সঙ্গে বেরুলো, কে কাকে তার মােটরে করে’
অন্য কার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গেলাে। কাজটা সুখেরই,
বলতে পারেন। অ, তােমরা, তােমরা সব মস্ত লােক, মানী
লােক, তোমরা দেশের মাথা, তােমরাও। তাহলে আমাদের
আর দোষ কী—আমরা, রাস্তার কুকুর, নর্দমার পােকা!
আমরা, তােমাদের মােটরের চাকার নিচে পড়ে মরবার
যুগ্যিও আমরা নই ।
হেমন্ত। তাহ'লে নীলমণিবাবুর সঙ্গে বেশ ভালােই ছিলে
বলাে !
লোকটা। তা মন্দ নয় এক রকম।
এক রকম। কিন্তু কী আর
পেতুম ছাই। ঐ নীলমণি—ব্যাটার জন্য আমি কম করেছি।
সেই যে বেলপুকুরের ছােট রাণীর কাণ্ডটা নিয়ে শালা অমন
প্রকাণ্ড ওটা মারলে—ডাইভারকে কত কষ্টে পটিয়ে চিঠি
চুরি করে এনেছিলাে কে? এই আমিই তাে। ঐ একটা
চিঠির জোরেই তো শাল। নীলমণির তিন তলা বাড়ি উঠলো।
আর আমি-আমাকে তাে দেখছেনই। শালা অমন ছােটলােক,
একদিন মুখ ফুটে পাঁচটা টাকা চাইলুম-একটু বিলিতি
খাবার সখ গেছল—তা দিলে না। বললে-বকশিষ কী রে
আবার? জানি, তুই যে-সব কাজ করছি, আমি ইচ্ছে
করলেই তােকে এক্ষুনি পাঁচ বচ্ছর কয়েদ ঠুকে দিতে পারি?
শালা ছোটলােক। চামার!
হেমন্ত (এই-সব অভিনব রহস্য উন্মোচনে স্তম্ভিত।) তারপর?
মশাই ;
অদেষ্ট,
অনেষ্ট !
লােকটা। তারপর আর কী। চলে এলুম ছেড়ে।
বালুম হাঁফ ছেড়ে। বড় নােঙর কাজ, ওস,
'ভদ্দরলােকেরই পােষায়।
হেমন্ত। তা তুমিও ভদ্রলােক হ'য়ে গেলে না কেন?
তেতলা বাড়ি তে উঠতো।
লোকটা।
স্যর,
ভদ্দরলােক হ'তে
পারলে কী আর ভাবনা ছিলো? ভদ্দরলোকের সবই ভালো।
তারা যখন চুরি করে তাকে বলে বুদ্ধির প্যাচ।
তখন লুঠতরাজ করে, তাকে বলে জমিদারি। তারা যখন
লােভের তাড়ায় নিজেদের মধ্যে কামড়া-কামড়ি করে' মারে-
আর মরে, তাকে বলে জীবন-সংগ্রাম। চোর ! চোর! চোর
কে নয়? একহাজার লােকের ভাগেরটা চুরি না-করলে একজন
মস্ত বড়মানুষ কী করে হয় ?
হেমন্ত। ঠিক আমার মনের কথাটা বলেছে। দ্যাখাে •
আমি তােমাকে বলছি, তােমার বুদ্ধি খাটিয়ে খাওয়া উচিত।
লােকটা (বিশ্রীভাবে ঠোট উলটিয়ে )। বুদ্ধি ! বুদ্ধি
তো আর চোখে দেখা যায় না, স্যর। আর জামা-কাপড়
যদি নােঙরা হয়, তাহলে একেবারেই দেখা যায় না।
হেমন্ত। সে-কথা ঠিক।
লােকটা ( হঠাৎ, একটু গর্বের সুরে)। আর ইস্কুলে
আমি ভালাে ছাত্র ছিলুম, অঙ্কে মাথা ছিলো। ম্যাট্রিকুলেশন
।
দিতে পারলে একটা স্কলাশিপ পেয়ে যেতুম হয়-তে। (এই
কথাগুলো সে বললে অত্যন্ত ভদ্রভাবে, বিশুদ্ধ উচ্চারণে ।।
হেমন্ত। কদ্দর পড়েছিলে ?
লােকটা (উগ্রতম কনি সুরে)। থাচ্ছাে কেলাশ
বাপ ছেল কম্পাউণ্ডার, বারো মাস কাশিতে ধুকছে, এই
আছে কি নেই। বড় ভাইবােনেরা কেউ মরেছে—কেউ
এদিক-ওদিক ভেসে গেছে যার-যার কপাল নিয়ে। বুড়ে
বয়েসের ছেলে আমি—বুড়ো বয়েসের পাপের ফল—আদরের
ছড়াছড়ি একেবারে। বাপ একটা ওষুধ কিনতে পারে না
কাশতে-কাশতে চোখ ওঠে কপালে-তবু আমাকে পাঠানে
চাই ইস্কুলে, বুড়াের অনেক আশা ছেল—কী এক মহাপণ্ডিত
বুঝি তিনি ধরাধামে এনেছেন। এদিকে আমি ও ঘােড়ার
মত লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠতে লাগলুম কেলাশ থেকে কেলাশে
থার্ড কেলাশে এসেই থামলো দৌড়-বুড়াে বাপ টেশলে'
বেরিয়ে এলুম ইস্কুল থেকে সটান এক ছাপাখানায়-কম্পো-
জিটারের কাজ শিখতে। পাঁচ টাকা করে দিতে—খাটাতে
ভুতের মত। এদিকে মা-মাগিরও মরণ নেই।
এক ভাই
নাকি ডিব্রুগড়ে মনােহারি দোকান দিয়ে বেশ আছে—
চোখেও দেখিনি তাকে। বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে
গেছল-তারপর ব্যোম ভােলানাথ ! আর খোঁজ নেই ।
দিদিরা মাসে মাসে টাকাটা সিকিটা পাঠাতাে—তা সােয়ামির
লাথি খেয়ে-খেয়ে তারাও অ্যান্ধিনে আধ-মরা। অনেক কষ্টে
দশ টাকা মাইনে হ'লো-সঙ্গে-সঙ্গে মা স্বগগে উঠলেন
হেমন্ত ( নিঃস্পন্দ হয়ে সে শুনছে )। যাক, বাঁচলে।
লােকটা। হ্যা, বাঁচলুম। হঠাৎ দেখা গেলাে সমস্ত
সংসারে আমি একেবারে একা। বাঃ, বেশ মজা তো।
শশালা-ছাপাখানার এই ব্যাগার কে আর খাটতে যায়-
বেরিয়ে পড়লুম রাস্তায়।
হেমন্ত। তারপর ?
লােকটা। তারপর এই তো চলছে। বিশ রকমের
কাজে হাত দিয়েছি। কাগজের হকার, বাস-এর কক্টর,
চায়ের দোকানের বয়, বইয়ের দোকানের কেরানি, থিয়েটারে
ইলেকটিকের
মেকানিক-একবার ছােট একটা পাটেও
নেমেছিলুম, হি-হি।
হেমন্ত। তােমার তো অনেক গুণ দেখছি—কোথাও •
লেগে থাকতে পারলে না?
লােকটা। কোনােখানেই ভালো লাগে না, স্যর। ভালাে
লাগে ভেসে বেড়াতেই। রাস্তার গন্ধ 'কতে না-পারলে
যেন প্রাণ বাঁচে না। কুকুর, রাস্তার কুকুর।
হেমন্ত। শেষ পর্যন্ত মহাবিদ্যার চর্চা না করবার পরামর্শ
তােমাকে কে দিলে?
লােকটা। ওঃ, ও-কথা বলবেন না, স্যর। আমি কোনাে
আখড়ার ভাড়াটে নই। মেছোবাজারের অনেক বড়-বড় আখড়ার সঙ্গে আমার দহরম-মহরম অবিশ্যি। আজকাল সােম- রসের ছিটে-ফোটা যা একটু পেটে পড়ে, তা ওদেরই আডডায় । ছন্ন মিঞা বড় ভালােবাসে অামাকে, মিঞসাহেব বড় দিল- দরিয়া লােক, বড় ভালো লােক। সেদিন আমাকে বলছিলো-- ‘ব্যাটা, তােকে এত খাওয়ালুম, আমার জন্যে তুই কী করলি?' আমি বললুম, ‘ক্যান্ রে, তাের সঙ্গে এত মজার গল্প করি বসে’, সেটা কম? ছন্ন, বললে, “তুই যদি খালি ভাড়ামি না করে একটা কাজে মন দিতিস! তুই আর আমার দলে-বড়-বড় কাজ কববি। তুই লেখা-পড় জানিস, তাের বুদ্ধি আছে। তােকে যদি পাই তবে ছ্যাচড়ামে। ছেড়ে দিয়ে একবার চেকালিতে নামি।' হেমন্ত ( বুঝতে না পেরে )। চেকালি ? লােকটা (একটু হেসে)। ছনুর ও-বুকম নিজের বানানো অনেক কথা আছে। অন্যের নামে লম্বা চেক কাটা আর কি-বুঝলেন না। ছন্ন, বলে, কত লােকের অত লক্ষ টাকা গহিন গাঙের মাছের মত খামক! ব্যাঙ্কে পড়ে আছে- একটু হাতের লেখার ছিপ ফেলে যদি একটা বড় গোছের মাছ এনে ডাঙায় ফেলতে পারি, দোষ কী? যার টাক। সে তাে টেরও পাবে না—তার কত আছে : অথচ আমরা পেট ভরে খেয়ে বাঁচবে। ।
হেমন্ত। ওদিকে চেষ্টা করেছে। নাকি দু একবার ?
লােকটা। অনেক সাধাসাধি করেছ ল, আমি গা করলুম
না। ভালাে লাগে না আর ও-সব ঝঙ্কাটের মধ্যে যেতে।
আর খেটে খেতে ইচ্ছে করে না, স্যর ; ইচ্ছে করে কোনােদিকে
বেরিয়ে যাই, মাঠের মধ্যে শুয়ে থাকি চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে
আকাশের তারা গুণি।
হেমন্ত। আমারও ঠিক তা-ই ইচ্ছা করে। কিন্তু তোমার
তাে জানা উচিত আমাদের জীবনে কত ছােটখাটে ইচ্ছ।
চিরকাল অপূর্ণ
থেকে যায়।
লােকটা। বসে বসে আনি কেন খেতে পারবে না
কয়েকদিন, কয়েকদিন অন্তত। কত মাংসপিণ্ড জমিদার তে
সমস্ত জীবন অমনি করে কাটিয়ে দেয়। আর আমাকেই কি
চিরদিন রাস্তার কুকুরের মত খাওয়া শুকে-কে বেড়াতে ?
হেমন্ত। (লোকটার শীর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে
বুইলো)।
লােকটা (ক্লান্ত, একটানা স্বরে)। আমিও কি বাঁচতে
পারিনে? আর-কিছু নয় ;
আর-কিছু নয় ; একটু জিরােতে
একটু জিরােতে চাই, হাত-পা
ছড়িয়ে বসতে চাই একটু। আজ রাত্রে সেই কধ থেকে
ঘুরছি রাস্তায়-রাস্তায়। কোন রাস্তা দিয়ে কোথায়
পড়লুম, এখন কিছু মনে করতে পারিনে। নিশুতি রাতে
রাস্তাগুলাে বেশ লাগে, একেবারে ফাকা, দু’দিকে অন্ধকার
খুব একচোট
বাড়ি। আপনার বাড়ির সামনা দিয়ে যেতে-যেতে চোখে
পড়লো আলাে। দরজাটাও খােলা।
একটু দাড়ালুম।
হঠাৎ খেয়াল হলাে যাই না কেন ঢুকে।
মার হয়তো খাবো-কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি জেলে যেতে
পারি, 'সে-মার সইবে। কোনােরকম করে যে-কোনােরকম
করে একবার জেলে যদি যেতে পারি। আর ভালো লাগে
পথে-পথে ঘুরে বেড়াতে।
হেমন্ত। তুমি যা চেয়েছিলে তা হলো না—আমি দুঃখিত
সে-জন্য।
লােকটা। হ্যা, জানি, জানি। আপনারা ভদ্রলােক,
আপনাদের মনে কেবল ন্যায়-অন্যায়, ভালাে-মন্দ ; আপনাদের
মনে মানুষের জন্য ভালােবাসা নেই ।
হেমন্ত (চুপ)।
লােকটা (ক্ষীণ, নিম্নম্বরে )। আর তবু-আপনার এখানে
বসে-বসে আমার বেশ লাগছে। আপনাকে—কী বলে?
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এই যে বসেছি, আর উঠতে
ইচ্ছে করছে না। আঃ, বেশ, বেশ। শেষরাত্রের হাওয়াটা
কী-রকম ঠাণ্ডা দেখেছেন ? ঘুম পাচ্ছে, ঘুম পাচ্ছে। বাঁচতে
ভালো লাগে।
বলুক, বাঁচতে বড় ভালাে লাগে ।
( বলতে-বলতে তার চোখ জড়িয়ে এলো ; তার মাথাটা
একবার ধাঁ করে নেমে এলাে নিচের দিকে)।
•
যে যা-ই
এই !
?
হে ম ( চমকে উঠে)। এই, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি ?
ঘুমিয়াে না, ঘুমিয়ে পড়ে না।
লােকট। (একবার অস্পষ্টভাবে চোখ মেলেই আবার
কাধের উপর মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলো)।
হেমন্ত।
কী মুস্কিল।
( চেয়ার থেকে উঠে
লােকটার কাছে দাড়িয়ে তার কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে )
এই! শুনছো!
লােকটা (আরক্ত চোখ মেলে')। ?
হেমন্ত (উচ্চস্বরে)। ঘুমিয়ো না, ঘুমিয়াে না। তুমি
এখানে ঘুমিয়ে পড়লে মীরাকে আমি কী বলবাে?
লােকটা ( কঠিন চেষ্টায় জেগে উঠে )। উ? না, ঘুমুবে।
। ঘুমােবাে না। হেঁ-হেঁ-বড় ঘুম পেয়ে গেছল।
হেমন্ত। তুমি এখন যাও। আমি যদি এখনো শুতে
না যাই তাহলে মীরা হয় তো জেগেই উঠবে।
লােকটা। হ্যা, যেতে হয় এবার।
হেমন্ত। আস্তে-আস্তে বেরিয়ে যাও, বেশি শব্দ কোরো না।
লোকটা ( ঘরের চারদিকে একবার তাকিয়ে)। রাত
তাে প্রায় ফুরিয়ে এলো—দিব্যি মনিং ওয়া হবে।
হেমন্ত ( উদ্বিগ্ন ভাবে )। হ্যা—গরমের রাত, ভাের হ'তে
আর কতক্ষণ। আমাকে একটুখানি শুতে তো হবে। যাও,
?
ওঠো।
লােকটা (একটু চুপ করে থেকে, করুণ স্বরে)। আর
একটুখানি বসতে কি পারিনে ?
হেমন্ত (ব্যাকুলভাবে চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে দিয়ে)।
এখন কী করে বসবে? বােঝো না কেন? এক্ষুনি হয়-
তো মীরা উঠে আসবে—আর তখন কী কাণ্ডট হবে
ভাবে তো ?
লােকটা ( তবু ইতস্তত করতে করতে )। উঃ পা-টা
এমনিতেই ধরে আছে—এখন আবার সেই সাত রাজ্যির
পথ হাঁটা।
হেমন্ত। এক কাজ করে।
বড় রাস্তায় গিয়ে একটু
fাড়াও, একটু পরেই বাস বেরােবে।
লােকটা। বা-এ উঠতে তাে পারি, কিন্তু কোথায় নামবে।
তার যে ঠিক নেই। কোথায় নামবাে? কোথায় নামবো ?
নাঃ-টাই ভালো—হাঁটতে হাঁটতে যেখানে গিয়ে ঠেকি?
হেমন্ত। আর দেরি কোরো না। যাও।
লােকটা। যেতে তো হবেই। ( অত্যন্ত অনিচ্ছায় চেয়ার
থেকে উঠে দাড়ালাে।)
মীরার কন্ঠস্বর। এ কী! তুমি এখনো
[ বলতে-বলতে ভিতরের দরজা দিয়ে মীরা এসে ঢুকলো।
কিন্তু ঘরের মধ্যে পা দিয়েই সে চুপ করে গেলাে।
সঙ্কুচিত, আড়ষ্ট, লােকটা তিন-বাঁকা হয়ে দাড়িয়ে রইলাে।
৭
আর হেমন্ত রইলো সােজা মেঝের দিকে তাকিয়ে। দু’ এক মিনিট নিরেট নীরবতা। হেমন্ত ( হঠাৎ মীরার দিকে তাকিয়ে-অত্যন্ত দ্রুত, অসমান স্বরে)। এই যে, মীর। আমি শুতে যাচ্ছিলুম অনেক আগেই, ইনি হঠাৎ এসে পড়লেন--এই ভদ্রলােক এই অত্যন্ত বেখাপ্পাভাবে নেমে গেলো ) মীরা (বিস্ময়ে বড়-বড় চোখে একজন থেকে আর- একজনের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো ) লােকটা (শরীরের একটা আড়ষ্ট ভঙ্গি করে’-ভাঙা- ভাঙা গলায়)। আচ্ছা, আমি তাহলে এবার—( মীরার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে এক পা এগােলো।) মীর (হেমন্তর দিকে তাকিয়ে )। কী ? কী হয়েছে ? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছিনে। হেমন্ত ( তাড়াতাড়ি)। ইনি যাচ্ছিলেন রাস্তা দিয়ে, ক্লান্ত লাগছিলাে—একটু বসে গেলেন— মীর (লােকটার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে)। রাত্তিরে ! [ একটু চুপচাপ। হেমন্ত তার পাঞ্জাবির একটা বোতাম নিয়ে প্রাণপণে নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবতে লাগলো, কী বলা যায়। লােকটা ঘাড় কাৎ করে শিথিলভাবে দাড়িয়ে—অনেকটা রুগ্ন কোনো পশুর মত দেখতে।
হেমন্ত ( হঠাৎ )। মীরা, এর সঙ্গে আলাপ করাে।
ইনি একজন উঁচুদরের দার্শনিক। (লােকটার প্রতি) বসুন
আপনি।
মীরা ( অবাক হ'য়ে চুপ করে রইলো)।
লােকটা ( এইবার সােজা মীরার চোখের দিকে তাকিয়ে)।
আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন-আমি অসময়ে এসে আপনার
স্বামীর কাজের ও ঘুমের ব্যাঘাত করলুম।
হেমন্ত (সােৎসাহে)। বাঃ, এতক্ষণ কী চমৎকার সব
কথা হ'লো। তুমি যদি শুনতে, মীরা।
লােকটা ( একেবারে অন্য রকম সুরে)। আমি কেন
এসেছিলুম তাও আপনাকে বলি । এসেছিলুম চুরি করতে।
মীরা ( হঠাৎ হেসে ফেলে' )। চুরি করতে ! আমাদের
বাড়িতে।
হেমন্ত ( উৎফুল্লস্বরে) এই
এই তাে। আমিও একে তাই
বলছিলুম। তবে জানো-ডুয়ার খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ একটা
টাকা পেয়ে গেছি। কবে রেখেছিলে মনে আছে ?
মীরা ( মুচকি হেসে)।
তবু ভাগ্যিস
কিছু পাওয়া
গেলাে।
হেমন্ত। অনেক বলে-কয়ে টাকাটা এঁকে নিতে রাজি
করিয়েছি। অবিশ্যি বুঝতে পারছে। ইনি এখন খুব আর্থিক
সচ্ছলতায় নেই।
মীরা। দার্শনিকরা কখনােই থাকেন না। তুমি নিজেও
তো ছােটখাটো একজন দার্শনিক।
হেমন্ত। ওঃ, এর সঙ্গে তুলনা হয় না। এর হচ্ছে একেবারে
জীবন-দর্শন—জীবনকে দেখা।
মীরা। আপনি বসুন না।
লােকটা ( প্রায় রুদ্ধস্বরে)। কেন আপনারা আমাকে
ও-রকম করে’ কষ্ট দিচ্ছেন ?
হেমন্ত (লােকটার মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে)
-হয় বসলেনই একটু। ভয় কী? আমরা সবাই মানুষ ।
লােকটা (দু’হাতে মুখ ঢেকে চুপ করে রইলে)।
[ একটু চুপচাপ ]
হেমন্ত ( একবার আড়মােড়া ভেঙে )। আঃ! বাঁচতে
ভালাে লাগে ।
মীরা।
ভাের হয়ে এলো।
হেমন্ত। এখন চা খেলে কেমন হয় ?
মীরা। যাচ্ছি।
হেমন্ত। আর শােননা—কিছু খাবার দিয়ে সঙ্গে। (দ্রুত
দৃষ্টিতে লােকটার দিকে তাকালো।)
মীরা। নিশ্চয়ই। দেশলাইট। দাও তাে।
[ হেমন্তর হাত থেকে দেশলাই নিয়ে মীর। চলে
গেলাে।]
৭৭
হেমন্ত (লােকটার কাছে গিয়ে দাড়িয়ে, লঘুষরে )। কী
আর হবে। এতক্ষণই যখন বসতে পারলে, আর একটু বসেই
যাও।
লােকটা (হাত সরিয়ে নিয়ে অদ্ভুত, পাংশু এক মুখ
উন্মোচন করে'। কিন্তু এ আমি কখনো ভাবতে পারিনি।
सौ
সাড়ে-আটটা, এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলুম। চায়ের ট্রেটা
নিয়েছি বিছানায় টেনে, লেপ থেকে হাত বার করবার
কুঁড়েমিতে চা ঢালা হচ্ছে না এখনো। ঘুম-ভাঙ্গা চোখে
তাকিয়ে আছি খােলা জানলা দিয়ে, আকাশ রােদে-কুয়াশায়
জড়ানাে। পাশে পড়ে আছে ভাজ-না-খােলা খবরের কাগজ।
এমন সময়ে কিনা আমার বিখ্যাত মকর এসে বললে,
‘কে একজন ডাকছে।
উ?
।
‘একজন বাবু-বাইরে দাড়িয়ে।
রাণু বলে উঠলাে, “কী আপদ! ভাের না হতেই
ডাকাডাকি কেন?
আমি হেসে বললুম, সকলের দিন একরকম কাটে না
এমন আশ্চর্য্য লােকও আছে, যারা সাড়ে আটটার সময়
দাড়ি-কামানাে, স্নান এবং আহার সেরে আপিসে বেরিয়ে
যায়। যাই, দেখে আসি কে এই মূর্তিমান্ রসঙ্গ।
৭১
'বলে দাও না অন্য সময়ে আসতে। চা যে ঠাণ্ডা হয়ে
যাবে এদিকে।
‘এই এক মিনিট, বিছানা থেকে নেমে আমি ড়ে সিং
গাউনটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। মনে হচ্ছে যেন সেই বঙ্গবীর
কাগজ থেকে এসেছে-লেখা চাই।
‘গিয়ে হয়তাে দেখবাে ইন্সিওরেন্সের দালাল।
গিয়ে যা দেখলাম, তাতে তা-ই মনে হলো প্রথমটায় ।
বিলিতি পােষাক পরা -দর্শন ভদ্রলােক, হাতে চামড়ার
পাের্টফলিও। আমাকে দেখে হাত তুলে অভিবাদন করলেন
আধা-বিলিতি কায়দায়। আমি জিজ্ঞাসু চোখ তুলে চাইতেই
বললেন, আমি আপনার পাশের ফ্ল্যাটে থাকি
‘ও। আমার কণ্ঠস্বরে কিছুটা ঠাণ্ডাভাব প্রকাশ পেয়ে
থাকবে নিশ্চয়ই, কেন না সকলেই জানে যে আমার নিজের
পরিবেষের বাইরের বাইরে যে-জগত, সে-সম্বন্ধে স্বভাবতই
আমি উদাসীন। রানু বলছিলে! বটে সেদিন, পাশের ফ্ল্যাটে
কে নতুন ভাড়াটে এলাে বুঝি। কথাটাকে কান দেয়ার
মত মনে করিনি।
ভদ্রলােক বাহুর এমন একটা ভঙ্গি করলেন, যাতে বােঝ।
গেলো যে আমার সঙ্গে বসে দু' দণ্ড বিস্তালাপ করা
তার ইচ্ছা। সুতরাং আমি দরজাটাকে আড়াল করে দাড়িয়ে
ক্ষীণস্বরে বললাম, “তা—
‘আপনার লেখা আমি অনেক পড়েছি,' ভদ্রলােক দ্রুতস্বরে বলতে লাগলেন। আপনি যেসব বিষয় লেখেন- আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আপনি বুঝি ইন্সিওরেন্স- লাইনে ? আসল কথাটা চুকে গেলেই মঙ্গল। ‘বিজনেস-এর লাইনে আছি, ষ্টক এক্সচেঞ্জে ঘােরাঘুরি করি, নানারকম ফাদ পেতে রাখি ভাগ্যের জন্য—একদিন যদি ধরা পড়ে। আগন্তুক কঁপা গলায় হেসে উঠলেন। ‘তা আপনার বই-টই অনেক পড়েছি, খুব ভালাে লাগে, ভারি জোয়ালে লেখা। মরা দেশটাকে ঝাকুনি দিয়ে আমি হাসবার চেষ্টা করে বললুম, 'তা বেশ, আসবেন আর-এক সময় - ভদ্রলােক একটু যেন সঙ্কুচিত হলেন। 'Oh, am I in the way? একটা কথা শুধু আপনার বই গুলাের বিশেষত্বই এই যে ও গুলো পুরােমাত্রায় সাইকলজিকল—তাই কিনা, বলুন? সাইকলজি নিয়ে আমিও নাড়াচাড়া করেছি একটু আধটু-রাঁচির বার্কলি হিল সাহেব আমাকে পিতার মত স্নেহ করেন। ভদ্রলােক একটু থামলেন, শেষের কথাটা যাতে আমার মনে ভালো করে বসতে পারে । আমি রইলাম নিরুত্তর, ঠাণ্ডায়মান চা ও অপেক্ষমান রাণুর কথা মনে পড়ে’ ভিতরটা একবার অস্থির হয়ে উঠলাে। ৮১
‘তা ছাড়া, আমার জীবনে অভিজ্ঞতাও হয়েছে নানারকমের
—নানা ঘাটের জল খেয়েছি, নানারকমের মানুষ ঘেঁটেছি—
ভদ্রলােক চোখটা একটু মিটমিট করলেন, যাতে বােঝা
গেলো কথাটার পিছনে অনেক কিছু আছে। সে-সব কথা
একদিন সময়মত আপনাকে বলবে, হয়তাে তা নিয়ে
একটা নভেল তৈরি করতে পারবেন।
এই ধরণের প্রস্তাব জীবনে এই প্রথম নয় ; বরফ হয়ে
রইলাম। সে অনেক সব মজার মজার কথা বলে ভদ্রলােক
আর-একবার শিথিলভাবে হেসে উঠলেন।
ঘরে ফিরে আসতেই রাণু বলে উঠলো বেশ লােক।
চা কি আর এতক্ষণ আছে।
ফ্ল্যানেলের টুকরাে দিয়ে জড়ানো ট-পট থেকে চা ঢেলে
নিয়ে বললুম, 'কেন, বেশ গরম তো আছে।
“কী ব্যাপার? লেখার offer ?
খবরের কাগজটা খুলতে-খুলতে বললুম, লেখার offerই
বলতে পারো। তবে সম্পাদকের নয়, চরিত্রের।
তার মানে?'
A character in search of an author, ভদ্রলােক জীবনে
অনেক প্রেম করেছেন, আমাকে তার গল্প লিখতে হবে।
রাণু হেসে উঠলাে।-তুমি কী বললে? কে-কে এই
বিবেক-পীড়িত প্রেমিক ?
;
‘আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি।
‘ও, বলিনি সেদিন তােমাকে ? জানলা থেকে দেখলুম,
ট্যাক্সি থেকে নামছে মালপত্র নিয়ে। টকটকে লাল চেহারা।
নতুন বিলেত-ফেরৎ বুঝি ?
‘সে-কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। তবে হাবে-ভাবে
একটু মস্তিষ্কবিকৃত মনে হলো। রাঁচির বার্কলি হিল সাহেব
নাকি ওর বাপের মত। বার্কলি হিল-এর আশ্রমেই একদিন
গিয়ে উঠতে হবে হয়তো ওঁকে।
বলো কী! পাশের ফ্ল্যাটে একটা জ্যান্ত পাগল ! বলতে
গেলে একই তো বাড়ি।
আমি সিগ্রেট ধরিয়ে বললুম, মাভৈঃ! মানুষ দেখলেই
কামড়াবার অবস্থা শিগগির হবে এমন মনে হয় না।
কয়েকদিন পর, দুপুরবেলা খেতে বসেছি—শােনা গেলাে
পাশের ফ্ল্যাট থেকে উচ্চ ক্রুদ্ধ স্বর। ইংরিজি-বাঙলা-হিন্দি
মেশানাে নানারকম গালাগালেয় অকৃপণ বর্ষণ। রাণু ভাতের
গ্রাস মুখে তুলতে গিয়ে থমকে গেলাে শুনছো?
শুনছি তো।
‘এ-রকম রােজই করে। চাকরটা তবু যে টিকে আছে,
তা-ই আশ্চর্য্য।
‘বােধ হয় দু হাতে লেটবার সুযােগ পায়—এগুলােকে
ফাউ পাওনা মনে করে আর কি ! সাইকলজিষ্ট মহােদর
নিঃসঙ্গবাস করছেন সম্ভবত।
“বাড়িতে কোনাে মেয়ে আছে বলে তো মনে হয় না।
‘কাজেই বুঝতে পারছেডডামেটিক এনার্কিতে ভৃত্যেরই
রাণু একটু চুপ করে থেকে বললে, 'যা-ই বলে, আমার
ভালাে লাগে না।
ইতিমধ্যে আমার মন চলে গিয়েছিলো অন্য জায়গায় ,
জিজ্ঞেস করলুম, কী ভালো লাগে না?”
‘ঐ লােকটাকে।'
‘আমার তাে মনে হয় এখন পর্যন্ত তােমার তাকে
ভালাে কি মন্দ কি কোনােকিছু লাগবার কথাই ওঠে না।
‘চুপ করাে, সব সময় ফাজলেমাে ভালো লাগে না।
বাড়িওয়ালারই বা বুদ্ধি কী-ও-রকম একটা পুরুষমানুষকে
কী বলে’ ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিলে।
আমি হেসে উঠলাম।-বাড়ি ভাড়া পাওয়াই যা মুস্কিল
তার উপর যদি সেই সঙ্গে আত্মীয় সংগ্রহ করতে হয়।
৮৪
‘তুমি কিছু বােঝো না, চুপ করে, রানু মাথা-ঝাকুনি
দিয়ে উঠলো। না কি স্ত্রী কেউ না থাকলে কলকাতায়
বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না, জানাে না? সেই যে শচীন-দা
গল্প বলেছিলেন, মনে নেই ?
‘ত। সে-বাড়ি ওয়ালার তাে ছিলো তৃতীয় পক্ষের যুবতী
স্ত্রী।
তা না-থাকলেই বুঝি যেখান-সেখান থেকে আস্ত একটা
পুরুষমানুষ কুড়িয়ে এনে বাড়িতে তুলতে হবে। তােমাদের
এই মিরজা সাহেবের কাণ্ডটা দ্যাখো!
‘নিরজ। সাহেবকে দোষ দিতে পারিনে—একক পুরুষমানুষের
কাছ থেকে ভাড়া পেলে টাকার অঙ্কটা কমে যায়, এমন
কথা ইকনমিক্সের বইয়ে লেখে না। তা ছাড়া, পুরুষমানুষকে ও
তো থাকতে হবে -আস্ত ভগ্নাংশ যা-ই হোক।”
কতগুলো জিনিস তােমরা কিছুতেই বুঝবে না—ঈশ্বর
তোমাদের তেমন করেই গড়েননি।ও কী, উঠছে নাকি?
সময় নেই আর। প্রতিদিন এই সময়টায় ঘড়ির নির
ব্যবহারের কথা মনে পড়ে গেলাে।
‘ই—দই খেলে না তো। একটু বােসস।
ইয়ের ব্যাপারটা যথাসম্ভব অল্প সময়ে শেষ করে দেবার
চেষ্টা করছি, এমন সময় মধ্যবর্তী দেয়ালের ওপার থেকে আবার
তারস্বর শোনা গেলো।
ক্রোধের মাত্রা চড়লে অসংষত রসনা
৮৫
ভৃত্যকে যে-সব সম্বােধন করে তা সকলেরই জানা আছে,
সে-গুলাের পুনরাবৃত্তি না-ই করলাম। পরিশেষে কয়েকট
চড়-চাপড়ের অপেক্ষাকৃত মৃদু আওয়াজও তিগম্য হলো ।
রাণুর মুখ কালাে হয়ে গেলাে।-“দেখলে ! চাকরকে যে
কথায়-কথায় মারতে পারে, সে কখনােই ভালাে লােক
‘সম্পূর্ণ সায় দিচ্ছি তােমার কথায়', শেষ টেক জল খেয়ে
নিলুম। কিন্তু পৃথিবীটা কেবল ভালো লােকের থাকবার
জায়গা এ-ধারণা মন থেকে যত শিগগির তাড়াতে পারে।
ততই মঙ্গল।
আমার সঙ্গে-সঙ্গে রাণুও উঠে পড়লো। বলতে আরম্ভ
করলাে, ‘খাচ্ছো তো কলেজে, পাশে এমন একটা
তাড়াতাড়ি বললুম, ‘ভয় করে তাে দরজা বন্ধ করে
থেকে।
‘এই হৈ-চৈ হল্লাই বা কত ভালাে লাগে।
কিন্তু একপাল মেয়েমানুষ যদি থাকতো তাহলে একবার
ভাবে অবস্থাটা ।
‘চাকরটাও আশ্চৰ্য-একটা কথা বললে না।'
‘নাও-এবার পান দাও তো একটা। ও-এই তো !
চাদরটা আবার কী হলাে? আর সেই যে বইট!-না, পয়সা.
আছে-দাড়াও, দেখছিনা, আর লাগবে না—
উৰ্দ্ধশ্বাসে বেরিয়ে পড়লুম-দিনের পাপক্ষয়
প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে জীবিকার্জনের হীন প্রয়ােজনে
বাদের বাস ধরতে ছুটতে হয়, ঈশ্বর যেন তাদের দয়া করেন।
কলেজ থেকে ফিরে দেখি, আমার ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ ।
ধাক্কা দিলুম, জোরে ধাক্কা দিলুম। হাতে দুটো মােটা-মােটা
বই। তিন ঘণ্টা একটানা চাচানাে। তারপর বাস—এই
ধূলো, ভিড়, ঝাকুনি। তারপর এই সিড়ি বেয়ে তেতলায়
উঠে দাড়িয়ে থাকা !
খুট করে শব্দ হলো, আর-একবার ধাক্কা দিতেই হা হ'য়ে
গেলো দরজা। ঘরে ঢুকে প্রথম কাউকে দেখতে পেলুম না।
তারপর রানুকে দেখলুম কপাটের আড়ালে দাড়ানো।
‘ও, তুমি!' রাণু নিঃশ্বাস ছেড়ে বললে।
‘আমিই তাে। ঘুমুচ্ছিলে নাকি ?
রাণু মাথা নাড়লে।
“তবে? রানুর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার কেমন
অদ্ভুত লাগলাে।
লাগলাে। হয়েছে কী তােমার ? পাগল
নাকি ?
৮৭
রাণু রুদ্ধস্বরে বললে, 'এসেছিলাে।
মেজাজের মার্কারি ক্রমশই চড়ছিলাে, চাপা দেবার চেষ্টা
করে বললুম, কে এসেছিলাে? কেন এসেছিলাে? কথন
এসেছিলো? ভালাে করে কথাই বলাে না।
রাণু কিছু না-বলে' আঙুল তুলে পাশের ফ্ল্যাটের দিকে
দেখালাে ।
‘ও, এই কথা ! ভেবেছিলাম বুঝি একটা ভূত-টুতই এলো।
দিনে-দুপুরে। রাণুর আবার একটু ভৌতিক ঝোঁক আছে।
চাদরটা খসিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। ইজি-চেয়ারে শরীরটা
এলিয়ে দিয়ে বললুম, 'সাইকলজি মহােদয় এসেছিলেন
বুঝি আবার ? তা চা নিয়ে এসাে-শুনছি সব।
‘মকরকে কখ পাঠিয়েছি চিনি আনতে এখনো যদি
ফেরে!
হয়তাে একবার দরজায় টোকা দিয়ে ফিরেও গেছে—
কে জানে! আমি তো ঢুকতে পেরেছি নিতান্ত কপালগুণে।
‘যা চমক লাগিয়েছিলো, জানাে না তাে! এতক্ষণে রাণুর
মুখ-চোখের স্বাভাবিক ভাব ফিরে এলো। হঠাৎ দুপুরবেলা
একেবারে ঘরের মধ্যে এসে উপস্থিত
‘তা বাইরের ঘর তাে লােক আসবারই জয়ে--
‘দুপুরবেলা ওর কী আসবার দরকার শুনি? জানে তত
তুমি বাড়ি থাকে না। এসে বলে, মিটার, মিটার আছেন ?
?
}
৮৮
মকর বললে, নেই। তারপর বলে, মিসেস মিটার ? মকর একটু
ভেবে বললে, তিনি আছেন। খবর দাও তাকে এক্ষুনি,
দরকার আছে। কী চড়া গলার কথা, যদি শুনতে ! আমার
কানে সব কথাই আসছিলাে—মাগাে, সে কী বুকের ধড়-
ফড়ানি, এখনাে ভাবলে দম আটকে আসে। আমি মকরকে
বললুম, হতভাগা, তাের একটু বুদ্ধি নেই, বলে দে মিসেস
মিটার ঘুমুচ্ছেন, এক্ষুনি চলে যেতে বল। তারপর মকরের
সঙ্গে আরো যেন কী সব কথা হলাে। তারপর এই
এতক্ষণ আমার কী ভাবে যে কেটেছে
'একটু অসাধারণ ব্যবহার, সন্দেহ নেই, কিন্তু এমন
বিচলিত হবারই বা কী আছে? হয়তো কোনাে দরকারেই
এসেছিলো—কে জানে। দিনে-দুপুরে তােমাকে তো আর
খেয়ে ফেলতাে না।
দরকার না আরো কিছু ! বদ, লােকটা নিতান্ত • বদ
না-হ'য়েই যায় না।'
'নির্বোধ যে, এটুকু বোঝা গেছে। নাও, দ্যাখাে এখন
মকর এলাে কিনা চিনি নিয়ে।
সন্ধেবেলাটা বন্ধুসমাগমে হাসিতে গল্পে উজ্জ্বল হয়ে
উঠলো। দূরে গেলে। সব ভাবনা, খুসিতে গলে গেলে
রাণুর ভয়, নিকটতম প্রতিবেশী
প্রতিবেশী আমাদের সাইকলজিস্ট,
জীবনের অনু লক্ষ তুচ্ছতার সঙ্গে কোথায় হারিয়ে গেলাে।
কিন্তু কয়েকঘণ্টা পরেই উগ্র রূঢ়তায় সে ফিরে আসবে তা
তখন অবিশ্যি ভাবতে পারিনি।
রাত তখন ঠিক ক’টা হবে বলতে পারবো না, তবে
ট্রাম থেমে গেছে, সমস্ত রাস্তা চুপচাপ, শীতকালের পক্ষে
বেশ গভীর রাতই হবে। হঠাৎ একটা গােলমালে ঘুম
ভেঙে গেলো। পাশের ফ্ল্যাট থেকে আসছে বীভৎস বমির
শব্দ আর সঙ্গে-সঙ্গে উচ্চস্বরে অসংলগ্ন প্রলাপ। পাশে
তাকিয়ে দেখি, রাণুর চোখ খোেলা, অন্ধকারেও বুঝতে
পারলুম, তার সমস্ত মুখ একেবারে ছাই হয়ে গেছে।
জিজ্ঞেস করলুম, ‘কখন্ জেগেছে ?
রানুর মুখ দিয়ে কথা বেরােয় না, থবৃথর করে কাপছে
সে। শক্ত করে আঁকড়ে ধরলাে আমাকে।
একটু অবাক না-হ'য়ে পারলুম না, প্রলাপের মধ্যে
যখন আমার নাম শােনা গেলাে।-ওঃ, ঐ যে নীলকণ্ঠ
মিত্তির—ভারি তো ! অপমান করেছে, নীলকণ্ঠ মিত্তিরের
স্ত্রী আমাকে অপমান করেছে। দেখে নেবাে, দেখে নেবো
–ভারি তাে প্রােফরি করেন, দেবব ভাই চ্যান্সলারকে
বলে চাকরি ছুটিয়ে ! He is my friend, he is my
friend ! আমার বাপ ছেল আশুবাবুর পেয়ারের ছাত্রকে
ay 167! I dined with the Lord Chief Justice last
Tuesday. Good-evening, good-evening, gent-'90
নিদারুণ উগরে কথা চাপা পড়ে গেলো। একটু পরে আবার
শুরু হলাে বিকার ; সব কথা বুঝতে পারলুম না, কিন্তু
থেকে-থেকেই আমার নাম আর ভাইচান্সলারকে বলে
আমার চাকরি ছুটিয়ে দেবার সঙ্কল্প শােনা যেতে লাগলাে।
ব্যাপারটা সব সুদ্ধ কিন্তু পনেরো-কুড়ি মিনিটের বেশি
সময় নেয়নি; আরো দু একবার বমি, তারপর কওঁ এলো
নির্জীব হ'য়ে, তারপর থেমে গেলো, তারপর একেবারে
চুপচাপ।
বললুম, যাক্, সাইকলজি থেকে আরম্ভ করে’ সবই বােঝ।
গেলো।
রাণু ফিসফিস করে বললে, ‘মাতাল! এমন সুরে বলতে
যেন নিম্নতম নরকের গন্ধকবাষ্পময় কোনাে রহস্য উদঘাটন
করছে।
আমাদের আগেই বােঝা উচিত ছিলো ! মুখের ঐ
অ্যালকহল-লালিমাই তো স্বতঃস্ফুর্ত।
রাণু একরকম অদ্ভুত অশরীরী স্বরে বলতে লাগলো,
খাবার ঘরের ওখানটার তাে দেয়ালও নয়, ক্যানভাসের
পাটিশন, ইচ্ছে করলে কেটে ফেলতে কতক্ষণ। আর এই
তো পাশপাশি জানলা, তায় শিক নেই, অনায়াসে মাথা
গলিয়ে দিয়ে চলে আসা যায়। যে মদ খায় সে সব পারে,
সব পারে !
১১
রাণুকে বোঝাবার চেষ্টা করলুম যে মদ যে খায়, সে
সব সময়েই মদ খায় না, এবং প্রকৃতিস্থ
এবং প্রকৃতিস্থ অবস্থায় সে
মােটামুটি অন্যান্য মানুষের মতই। এবং যখন তার উন্মত্ত
অবস্থা তখন দেখতে সে যতই ভয়াবহ হােক্, আসলে সে
মমাটেই ভয়াবহ নয়,
বরং কপার পাত্ৰ-কারণ তখন তার
মত দুৰ্বল, অক্ষম পৃথিবীতে আর কেউ নয়, একটা ধাক্কা
দিলে লুটিয়ে গড়াগড়ি যাবে। কিন্তু আমি যতই বােঝাই,
রাণুর হাত-পা ততই ঠাণ্ডা হয়ে আসে, তার চোখ স্ফীত
হয়, ততই তার শরীর থেকে-থেকে ঝেকে ওঠে। পরিশেষে
সে বললে, 'লােকটাকে যদি এখান থেকে তুলতে পারাে
তো ভালো, নয় তো আমরাই যাবে। অন্য বাড়িতে।
বতে বাধ্য হলুম, 'আচ্ছা, আচ্ছা, তা-ই যাবাে। তুমি
এখন ঘুমােও তো।
কিন্তু রাণু অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘুমোতে পারলো না,
সুতরাং আমিও ঘুমােতে পারলুম না। কোথাও খুট করে
একটু শব্দ হয় কি চমকে ওঠে—উ? জানলার দিকে
তাকাতে পারে না। মশারিতে কিসের ছায়া দেখে। ইত্যাদি,
ইত্যাদি সে অনেকরকম। একটা ভয়ের রাস্তা দিয়ে যত
অশরীরী অন্ধ ছায়া-ভয় ভিড় করে এলাে ওর মনের মধ্যে।
সমস্ত কথা বলবো না, এটুকু জেনে রাখুন সে-রাত্রে
আবার যখন ঘুমােলাম,
টালিগঞ্জের থানায় ঢংঢং করে’
চারটে বাজলাে। ঘুমােবার সময়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, কাল
সকালে উঠে মিরজা সাহেবের সঙ্গে দেখা করা প্রথম কাজ।
ব্যাপারটা ভারি বিশ্রী, সত্যি বলতে।
পরের দিন রবিবার। সকালে উঠে গতরাত্রির প্রতিজ্ঞার
কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, কিন্তু রাণু চায়ের পরেই
মনে করিয়ে দিলে, “কই, যাও একবার বাড়ি ওয়ালা
কাছে।
আমি চোখ তুলে বললুম, 'ও!
‘ও মানে? এক্ষুনি যাও-দেরি করলে কি আর দেখা
পাবে !
রাত্রির স্তব্ধ অন্ধকারে ভয়ে-শুকিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে নিয়ে
যে-ব্যপারটা দুঃস্বপ্নের মত ভীষণ লেগেছিলো, বলা বাহুল্য
সকালবেলার আলােয় তা ঈষৎ বিরক্তিকর এবং খানিকটা
হাস্যকর একটা উপসর্গের বেশি কিছু মনে হলো না।
ছাড়া, আমি মানুষটা যাকে বলে মােটেও প্র্যাকটিকল নই ।
কোনো কাজের কথা নিয়ে কারো সঙ্গে দেখা করবার,
কথা বলবার, বচসা করবার কথা ভাবলেই আমার হৃৎকম্প
উপস্থিত হয়।
তা ছাড়া, ভাবুন, এমন একট। রবিবারের
সকালবেলা ঈশ্বর কি তৈরি করেছিলেন বাড়ি ওয়ালার সঙ্গে
কথা-কাটাকাটি করতে? ভেবে-চিন্তে বললুম, দাড়াও,
চিঠি লিখি।
এই না বলে কলম নিয়ে বসে’ নিদারুণ কড়া ইংরিজিতে
ঝরঝর করে এক চিঠি লিখে ফেললুম। সকলেই জানে,
লেখাটা আমার আসে-আমিও জানি। কেননা সেই
চিঠিতে আহত ভদ্র জ্ঞানের যে-উম্মা, পুরুষােচিত যে-দর্প, যে-
বিক্রমান্বিত সঙ্কল্প, এবং সর্বোপরি নিয়মিত ভাড়া-দিয়ে-যাওয়া
ভাড়াটের যে-তীব্র স্বাধিকার-জ্ঞান অল্প কয়েকটা কথাতে প্রকাশ
করতে পারলুম, মুখোমুখি আলাপে এক ঘণ্টা ধরেও তার
শতাংশ প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলাে না। সব
দিক থেকেই এটা ভালাে হলাে। চিঠিটা মকরের হাতে
পাঠিয়ে দিয়ে জয়ী যােদ্ধার আত্ম-তৃপ্ত প্রশান্তি নিয়ে ইংরিজি
কবিতার নতুন এক চয়নিকার পাতা ওল্টাতে বসলুম।
চিঠির ফল ফললাে ; দুপুরবেলা স্বয়ং মিরজা সাহেব
দরজায় টোকা দিলেন। পাঞ্জাবি মুসলমান, ঠোটের দু’দিকে
ঝুলে-পড়া পুরু গোঁফ, বেলুনের মত ভুড়িটি। শ্লথভাষী,
আয়েসি ভালােমানুষ, ঈশ্বরের দয়ায় কিছুরই অভাব নেই ;
বিস্তর পয়সা, চারটে গোরু মােষ, ছেলেপুলে সম্ভবত বাইশটি,
১৪
অন্যায়। রােজ সকালে দুটো মোটার বােঝাই করে চার কিস্তিতে তার ইস্কুলে যায়। সাহেবের সঙ্গে খানিকক্ষণ খুব তৃপ্তিকর আলাপ হলো। কাটা-কাটা ইংরিজিতে তিনি যা বললেন তার মর্মাংশ এই : নিয়লি ! ও রিয়লি ! তাই তো, কী এর ব্যবস্থা একটা করতেই হবে। এখুনি দেখছি। আসুন একটু আমার সঙ্গে। গেলুম তার সঙ্গে পাশের ফ্ল্যাটের দরজায়, কিন্তু আসন্ন অপ্রিয়-প্রসঙ্গে ভিতরে ভিতরে অস্বস্তি বােধ করতে লাগলুম। মিরজা সাহেব দরজায় টোকা দিলেন, তারপর ধাক্কা দিলেন, কিন্তু দরজা খােলা দূরে থাকু, ভিতর থেকে একফোটা সাড়া এলাে না। ভাবটা এমন বাড়িতে যেন কেউ নেই। আমি তাড়াতাড়ি বললুম, “থাক, থাক তাহলে এখন হয়-তে ঘুমুচ্ছে, হয়তাে বেরিয়ে গেছে মিরজা সাহেব তবু দু একবার ডাকাডাকি করলেন, ফল হলাে না কোনো। অগত্যা তাকে বলতে হলো, “আচ্ছা পরে আমি দেখবো। আবার কোনােরকম গােলমাল করলে জানাবেন- ‘নিশ্চয়ই, “নিশ্চয়ই', মিরজা সাহেবকে আর-কিছু বলতে না-দিয়ে আমি স্বগৃহে ফিরে এলুম-বাঁচলুম হাফ ছেড়ে। রাণু দরজার কাছেই দাড়িয়ে ছিলো, ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলে, কী হলাে? }
‘মিরজা সাহেব বললেন ব্যবস্থা করে দেবেন।'
‘লােকটা কিছু বললে ?
‘লােকটা? ও, সাইকলজিষ্ট ? দেখা পেলুম না।
দেখা পেলে না কী-রকম ?
অনেক ডাকাডাকি ধাক্কাধাক্কিতেও দরজা খুললো না।'
দ্যাখাে, কী পাজি ! নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে-গা-ঢাকা
দিয়ে আছে। তুমি বাড়িওয়ালাকে বললে তো ওকে নােটিশ
দিয়ে তুলে দিতে?
‘ও কিছু বলতে হবে না-ভেবো না কিছু—কই, এখানে
যে-বইটা ছিলাে অলক্ষিত পদক্ষেপে আমার ইজি-চেয়ারের
দিকে এগােতে লাগলুম।
'না, এ-রকম মানুষ নিয়ে কী করে চলে। বলা বাহুল্য,
বলতে-বলতে রাণুর চোখ বিস্ফারিত হলে, ঠোট কুঞ্চিত
হলাে, উত্তেজনায় কণ্ঠস্বর অপরূপ হ'য়ে উঠলাে। আরো
যে সব কথা আমাকে শুনতে হলে, তা আর এখানে না-ই
বললুম। গতরাত্রির ঘটনার পুনরাবৃত্তি আজ যদি হয়
তাহলে কাল সকালে উঠেই অন্য বাড়িতে যেতে হবে-
যেখানেই হােক এবং যেমন করেই হােক—এই শেষ কথা
শুনে আমি ইজি চেয়ারে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লুম।
ঈশ্বর দয়া করলেন, সে-রাতটা ভালােই কাটলাে। পাশের
ফ্ল্যাট থেকে টু শব্দ নেই। পরের দিনটাও কাটলাে অসাধারণ
চুপচাপ, ভিতরে যে কোনাে মানুষ আছে এমন এতটুকু লক্ষণ
দেখানে, শােনা গেলাে না।
রাত্রিতে খেতে বসে' প্রসঙ্গটা উত্থাপন করতে সাহস পেলুম,
‘রাতারাতি কী আশ্চর্য্য পরিবর্তন, দেখলে !
‘যাই বলাে', রাণু বললে, ‘আপদ বিদেয় না-হওয়া পর্যন্ত
শান্তি নেই। তা তােমার মুখ দিয়ে একটা কথা ফোটে না
তাে কী হবে?
এমন সময়ে আমার বিশ্বস্ত মকর-যে কিনা টেবিলের
পাশেই দাড়িয়ে ছিলো, এবং যার এতদিনে এটুকু অধিকার
জন্মেছে যে আমাদের কথার মধ্যে মাঝে-মাঝে দু একটা মন্তব্য
করতে পারে-এমন সময় মকর বললে, 'ও-বাবু তো চলে
গেছেন।
‘চলে গেছেন! রাণু প্রায় চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলো
‘কখন্ গেলেন ?
‘কাল সকালে ট্যাক্সিতে চলে গেলেন—সঙ্গে একট
সুটকেস্।
এত বড় একটা শুভ-সংবাদ চট করে বিশ্বাস করবার সাহা,
পেলুম না। জিজ্ঞেস করলুম, তুমি দেখেছো?”
‘আমি দেখিনি, তেতালার সুবােধবাবুর চাকর দেখেছে।
চলেই গেছেন’, মকর খুব সরলভাবে মন্তব্য করলে, নয় তো
কোনাে গােলমাল কি না হতাে।
কী, একবারে ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন?' রাণু
উৎসাহের ঝেকে খেতেই প্রায় ভুলে গেলো।
‘কী জানি', আকাঙ্ক্ষিত একটা সংবাদ দিতে পেরে মকর
তৃপ্তভাবে একটু হাসলো, দরজা তো ভিতর থেকেই বন্ধ
দেখি সব সময়।
রানুর মুখে আবার ছায়া পড়লাে।-চাকর রেখে গেছে
আর কি-কোন্দিন আবার ফিরে আসে দ্যাখে না!
মকর বললে, ‘কই চাকর ও তাে কাউকে দেখিনে!
আমি বললাম, 'বাড়িওয়ালা কিছু বলেছে বােধ হয়, সম্প্রতি
অন্য কোথাও উঠে গেছে—সুবিধে পেলেই জিনিসপত্র সব
নিয়ে যাবে।
“আহা!' রাণু বলে উঠলাে, তাহলে কি বাইরে থেকে
ভাল থাকতে না দরজায় ? কী বুদ্ধি তােমার।
লজ্জিত হলুম। কোনাে কথা খুজে পেলুম না—মাথা
নিচু করে খেতে লাগলুম।
কে জানে, রাণু বলতে লাগলাে, লুকিয়ে এখানেই হয়তাে
আছে চুপচাপ।
ট্যাক্সি নিয়ে বেরােলেই তাে আর
যাওয়া হলাে না! হয়তাে দিনের বেলা এখানে-ওখানে কাটায়,
রাত্তিরে চুপে চুপে এসে শুয়ে থাকে। কয়েকটা দিন ঠাণ্ডা
আছে, কিন্তু বিশ্বাস কী? মাতাল যে, সে সব পারে।
প্রত্যেকটি কথাই যুক্তিসাপেক্ষ, প্রতিবাদ করা চলে না।
১৮
এক ঢোক জল খেয়ে নিয়ে বললুম, 'তা দ্যাখােই না, যদি চুপচাপ থাকে—একদিন ও-রকম করেছে বলে’ রােজই তো অার- 'তােমার এই ভালােমানুষির অর্থ হয় কোনো ? গায়ে- গা-লাগা ফ্ল্যাট-এক বাড়ি বললেই চলে-মাগো!' নানারকম কাল্পনিক আশঙ্কায় রাণু একবার শিউরে উঠলো। তা একরকম চলেই তাে গেছে-এখন আর ভাবছে। কেন? বেচারাকে অন্য বাড়ি খুঁজে বার করতে ও কয়েকটা দিন সময় দেবে তো। সময় আবার কী? এমন লােক যে, সে রাস্তায় থাকবে। আমি বাড়িওয়ালা হ'লে তো সেই রাত্রেই গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দিতুম। এখানে রাণুকে মনুষ্যধর্মের মূলনীতি সম্বন্ধে কয়েকটা সারবান কথা বলতে পারতুম, কিন্তু এটা-ওটা ভেবে বিরত হলুম। যা-ই হােক, এর পরের দিনগুলাে বেশ চুপচাপ কাটতে লাগলো, এবং এটা লক্ষ্য করে আনন্দ বােধ করলুম যে রাণুর মন আর মুখ থেকে তার এই নতুন ভয়ের ছায়া অপহৃত হয়েছে। ১১ ইতিমধ্যে ক্রিসমাসের ছুটি এসে পড়লো, শীতের সােনালি দিনগুলাে উৎসবের রসে ভরে উঠলাে। ঘুরে বেড়ালুম দু’জনে, এখানে-ওখানে, যেখানে-সেখানে, মকরের আশ্রয়ে ফ্ল্যাটট ফেলে রেখে দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে-বাইরেই থাকতুম কলকাতার ভিতরে থেকেই যে ভ্রমণের সমস্ত উত্তেজনা, আনন ও ক্লান্তি উপভোগ করা যায়, এই একটা নতুন অভিজ্ঞতা হতে লাগলাে। সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের নিমন্ত্রণ ছিলো টাউন হল-এ ব্রজ- মাধুরী সঙ্ঘের কীৰ্ত্তন শুনতে-ফিরতে ফিরতে রাত দশট হলাে। এক প্রকাশকের আসার কথা ছিলো, তার জন্যে বসবার ঘরের টেবিলের উপর একটা চিঠি রেখে গিয়েছিলাম, তার বক্তব্য যেন এই প্যাডের কাগজে লিখে রেখে যান। ফিরে এসে মকবকে প্রথম কথা জিজ্ঞেস করলাম কোনাে ভদ্রলােক এসে- ছিলেন কিনা, এবং মকর কাপতে-কাপতে অনেক গুলো কথা বললে, তার মর্মাংশ এই : সন্ধের পর মকর রান্না করছে, হঠাৎ ঘরে ঢুকলাে—পাঠক
নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন কে-সায়েবি পােষাক পরা, টকটকে
লাল মুখ, পা টলছে। ঢুকেই চীৎকার করে বলতে লাগলাে,
বােলাও--মেমসাবকো বােলা ও-জলদি।' মেমসাব বলেছিলাে,
এটা মকরের স্পষ্ট মনে আছে। বলেই ঢুকলো শােবার ঘরে,
তারপর ফিরে এসেছে। মেরে টেবিলের উপর থেকে রাইটিং
প্যাডটা তুলে নিয়ে এক ছুট। আমার বিখ্যাত মকর এককোণে
দাড়িয়ে থরথর করে কাপতে লাগলাে। বেচারা এন্মেও বােধ
হয় এমন চমক খায়নি; এখনো, বুঝতে পারলুম, সে ঠিক সামলে
উঠতে পারছে না।
রাণুর বােধ হয় কিট হবার জোগাড়, কিন্তু রানুর দিকে মন
দেবার সময় তখন আমার ছিলো না। মুহূর্তে প থেকে মাথা
পর্যন্ত জ্বলে গেলাে, ছুটে এলুম বাইরে। পাশের দরজা পর্যন্ত
যেতে হলো না, আমাদের সাড়া পেয়েই স্বয়ং তিনি বেরিয়ে
এলেন—হাতে ঠিক আমার রাইটিং প্যাডটা।
আমার কাছে এসে দাড়িয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে সেলাম
৩
করলে।
কোনাে মানুষকে দেখে গায়ের উপর বমি করে দিতে
ইচ্ছে করে, এই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হলো। লােকটা
দেখতে সুন্দর, সেই বিশেষ একরকমের সুন্দর, যার বিকৃতরূপ
মনের গৃঢ়তম বিতৃষ্ণা জাগিয়ে তােলে। পরণের স্যুটটা ভালােই,
মাথায় একটা ফেণ্টহাট বাঁকা করে বসানো, বােতামের গর্তে
একটা গােলাপফুল গোজা। সােজা হয়ে দাড়াতে পারছে না, ভকভক করে গন্ধ বেরুচ্ছে মুখ দিয়ে। অনেকটা সার্কাসের ক্লাউনের মত, অত্যন্ত স্থূল হাস্যরসের একটা ছবি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি, একটা ব্যাঙের মত কি টিকটিকির মত --যাকে পায়ের নিচে মাড়াতেও ঘেন্না করে, দূরে থেকে যার গায়ে ঢিল ছুড়ে চোখ বুজে পালিয়ে যেতে হয় । এই বীভৎস জীব আমার মুখােমুখি দাড়িয়ে, জড়িয়ে জড়িয়ে টেনে-টেনে বলতে লাগলো, ‘Scuse me sah, Mah compliments of the season. I ain a pooh man, y'sex. Vehy proh. Give a beggah a upce-' মাথা থেকে টুপিটা খুলে আমার সামনে ধরলাে, ‘Youh most' bedient sahvnt, দু’হাত বাড়িয়ে মাথা নিচু করলো, দেখা গেলো মাথার উপরকার ছােট, গােল টাক। You're the badshah - badshah-badshah-ha-ha! অত্যন্ত শিথিল- ভাবে, দুলভাবে, নৃক্কারজনক মসৃণম্বরে লােকটা হেসে উঠলাে। আমার সমস্ত শরীর একদিকে যেমন ঘৃণায় সঙ্কুচিত হয়ে উঠছিলো, তেমনি কোনাে অদম্য অচেতন শক্তি আমাকে যেন ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলাে সামনের দিকে। আমি লােকটার দিকে একবার তাকালাম, তার ঢিলে, পুরু ঠোট নিচে ঝুলে পড়েছে, ই-করা মুখটা একটা ক্লেদাক্ত গর্তের মত। কী করছি বুঝতে
পারলুম না, ধা করে একটা বসিয়ে দিলুম ওর মুখের উপর।
চীৎকার করে লােকটা গােল হয়ে গড়িয়ে পড়ে গেলাে।
ছুটে নেমে এলেন চারতলা থেকে মিরজা সাহেব, ছুটে
এলো ঢিলে ইজের পর তার পাঁচটা জোয়ান ছেলে, তার
রােয়ান, তার বাবুর্চি, বেরিয়ে এলো উল্টোদিকের দুটো ফ্ল্যাটের
লােক—সবাই ঘিরে দাড়ালো, একসঙ্গে সবাই কথা বলতে
লাগলো। তারপর সবাই একসঙ্গে চুপ করে গেলাে।
‘মরুন, আরে মারুন, মেরে ফেলুন ওকে,' বলতে-বলতে
একটি মেয়ে ছুটে এলো, হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাে মাতালটার
মুখের সামনে।
এই শীতেও তার গায়ে শুধু পালা
একটা সেমিজ, লালচে জট বাঁধা চুল গুলাে পিঠের উপর
ছড়ানো। আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে সে বলতে লাগলাে,
পারেন না আপনারা সবাই মিলে ওকে মেরে ফেলতে
এই যে, নি. মা রুন, আমি কিছু বলবাে না। মেয়েটি বসে’
পড়ে' অচেতন মাথাটা কোলের উপর তুলে নিলে। ও-রকম
মুখ আমি কখনো দেখিনি। দীর্ঘ, অবিশ্রান্ত, অব্যক্ত যন্ত্রণায়,
আর নিদারুণ ধৈর্যের আত্মপীড়নে একেবারে পাথর হয়ে গেছে,
মুখােস হয়ে গেছে। শুধু চোখ দুটো জীবন্ত, উদ্দাম উজ্জ্বল চোখ,
হাজার নিঃসঙ্গ রাত্রির নীরব অশ্রুপাতও সে-উজ্জলতা মলিন
করতে পারেনি। মেয়েটির বয়েস কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে
যে-কোনাে একটা হতে পারে ; দেখে মনে হয় কোনো নির
-
হাত তার সমস্ত যৌবন একসঙ্গে উপড়ে ছিড়ে নিয়ে গেছে-
এখন সে বয়েসের সীমার অতীত, সে যেন কখনো বুড়ো হবে
, কেনন' যৌবন তার কখনো ছিলাে না। আর তার
কথাগুলাে দ্রুত স্রোতে বেরিয়ে আসতে লাগলো,
চোখের উদ্দাম দৃষ্টির সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে—কিন্তু তার কণ্ঠস্বর
অদ্ভুতরকম চাপা, সব সময়ে ফিফিস্ করে কথা বলে'-
বলে’ তা যেন চিরকালের মত লুপ্ত হয়ে গেছে ।
‘জানি, জানি তাে একদিন যে তুই মরবি, এমনি করেই
মরবি-মরবার আগে আমাকে একেবারে শেষ করে যাবি
আর কি। মেয়েটি সেই উৎকট গন্ধময় মুখের কাছে মুখ
নিয়ে বলতে লাগলাে, শুনতে পাচ্ছিস? ছাই! এতক্ষণে
কি আর হুস আছে—স্বর্গে অন্দরীদের হাত ধরে বেড়াচ্ছেন
এতক্ষণে ! আহা-নাক দিয়ে রক্তও গড়াচ্ছে যে, এই তো
আছে আমার আঁচল, মুছিয়ে দিই প্রভুর পুণ্যমুখ। কেমন
লাগে এখন—আমাকে মারবি, আর মারবি আমাকে। আর
মেয়েমানুষের শরীর—সবই সয়, মারো, কাটো—মরে’ না-
গেলেই হ'লে!। মরবাে না রে, তাের মরণ না-দেখে আমি
মরবাে না। একদিন কোন্ ভাগাড়ে মরে পড়ে থাকবি
কেউ দয়া করে’ ধড়টা আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়, তাহলেই
হয়—এতদিন এত সইলুম, এখন ঐ মুখে আগুন না-দিয়েই
কি মরবে'
১০৪
আমার পক্ষে কোনােরকম কোনাে কথা বলাই তখন সম্ভব ছিলাে না, অন্য কে-একজন বললে, ‘চাকরটাকে ডাকুন ওঁকে ঘরের ভিতরে নিয়ে যাক- ‘ও কপাল, আপনারা চাকরের আশায় আছেন বুঝি, চাকর তাে চাকর-বাপ ভাই ছায়া দেখলে পালায়। প্রভুর জনম-মরণের এই এক দাসী দেখছেন, তা ছাড়া-' মেয়েটি হাত উল্টিয়ে চুপ করে গেলো, তার শীর্ণ আঙুলে অনেকদিনের পুরােনো একটি আংটি চিকচিক করে উঠলো। একজন এগিয়ে এসে বললে, “আপদি একটু সরুন, আমরা নিয়ে যাচ্ছি ভিতরে।' ‘আর একদিন আপনাদের দয়া নিয়ে কী হবে—পনেরো বচ্ছর ধরে এই করছি—কামাই নেই ! খুব পারবে—জামা ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে। মেঝের উপর দিয়ে দেখুন না। প্রভুর এখন একেবারে তুরীর অবস্থা, দেখছেন ! দিন, দি, দুটো-চারটে লাথি দিয়ে দিন, যার যা খুসি —আপশােষ রাখবেন না,। মদখোর মানুষ, কিছু মনে রাখবে , কালই আবার হাসিমুখে গিয়ে আলাপ করবে। ফেলে রাখুন এখানে সমস্ত রাত, কিছু আপত্তি নেই, কত রাত ডাসটবিনে নর্দমায় কাটিয়ে এলো—এ তে স্বর্গ। ঐ ডাষ্টবিনই শেষ আশ্রয়—কোনােখানে কি আর থাকতে পারবে। একে নিয়ে কুকুরের মত দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেবে না। আমারও
কথা !
বাপ ছিলাে, শ্বশুর ছিলো—ছিলো, দেখুন, অনেক কিছুই তা
ঠেকতে-ঠেকতে তো এই পর্যন্ত। বাপ কত খুসি হয়েছিলাে
বিদ্বানের হাতে আমাকে দিলেন ! মরেছে, আপদ গেছে। শ্বশুর
বলতেন বৌমা, তুমি যদি পারে! ও-হে-হাে—কী আজাদের
এই তাে পনেরােদিন প্রভুর দেখা নেই-উধাও হয়ে
গেলেন ট্যাক্সি চড়ে'—এদিকে আমি উপােস করে’ই মরি
কি বিষ খেয়েই মরি। আরে মরবে না জানে—মরা কি
এতই সহজ ! মরেই যদি যাই, কার কাছে ও ফিরে
আসবে ! বাপ, মা, ভাই, বােন—এত কি আর কেউ
সইবে ! এই তাে দেখুন—ঠিক ফিরে এসেছে আজ আমার
কাছেই—যত রাজ্যের নােঙরা মেয়েমানুষ ঘেটে, মদে সাঁতার
কেটে-হাতে যা ছিলাে ফুরিয়েছে আর কি! যাই এখন,
সারা রাত বসে’ বরফ চাপা দিই মাথায়--এই তাে আমার
কাজ।
মেয়েটি উঠলো, আমরা কয়েকজন ধরাধরি করে’
লােকটাকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলুম। মেয়েটি আসতে
আসতে বলতে লাগলো অনেক কষ্ট দিলুম আপনাদের
মাতালের উপর রাগ করেই বা কী করবেন, বলুন! এই
যে, এ-ঘরে আসুন। প্রভুর শষ্যা প্রস্তুত করেই রেখেছি,
এ-রকম একটা হবে, জানা কথাই। বেরিয়ে যাবেই সে,
আমার গায়ে কতটুকু জোর, আমি কি ধরে রাখতে পারি,
ক
বলুন! এই যে, শুইয়ে দুিন এখানে, মাথাটা উচু হ'লে।
বুঝি—এখন ধড়াচূড়ােগুলে ফেলতে মাথায়
উঠেই না রে! সৈটি “ক্ষি প্রহা জুতো,
মোজা,
নেকটাই, কলার, কোট খুলে ফেললো, কোমরের বেল্টটা
ঢিল করে’ সাটের বুকের বােতাম দুটো খুলে দিলে ।
নাকের নিচে একটুখানি রক্ত জমে’ কালো হয়ে য়েছিলো,
ভেজা ন্যাড়া দিয়ে ধুইয়ে দিলে । তারপর.কোথেকে মমের
কৌটো ঝ’র করে' ফাট; নাকটায় মালিশ করে দিলে ।
বরফ অন 'লে, মাথায় আইসব্যাগ চাপিয়ে মেয়েটি
হাতে পুখ নিয়ে বসল। শিয়রে। লােকটার চোখ বােজ,
হকরা কুৎসিত মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে জোরে-জোরে ।
‘মণি, চাদের কণ, এবার ঘুমােও আর কি নিশ্চিন্ত
হয়ে, আমি তো আছি সমস্ত রাত বসে । মরতে পারলিনে,
এতদিনেও তুই মরতে পারলিনে, হতভাগা ? মমত্ব
তুই-তাের মুখে-আগুন না-করেই কি আমি মরতে পারি।
আপনারা যা এবার–দাড়িয়ে-দাড়িয়ে মজা দেখছেন নাকি
ওরে চাঁদের কণা, ওরে সােনা, ওরে মণি—ম, মর তুই,
মর
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.