Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rikta

Mukhopadhyay,dhirendranath · 2009/09/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রিক্তা
এধীরেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
প্রণীত
মূল্য আট আনা মাত্র

প্রকাশক
শ্রীসতীশচন্দ্র নাগ
টাউন ক্লব--খুলনা ।
মানসী প্রেস
১৪ এ, রামতনু বার লেন, কলিকাতা
ঐশীতলচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত

উৎসর্গ
যে দেবােপম মহাপুরুষের চরিত্র, আমার আদর্শ ;
যে মহানুভব গুরুজনের শিক্ষা, আমার গৌরব ;
যে বিগলিত-হৃদয় হিতার্থীর স্নেহ, আমার গর্ব ;
যে প্রেমপ্রবণ বন্ধুবরের উৎসাহ, আমার প্রাণ ;
সেই পরমারাধ্য পিতৃব্য
শ্ৰীযুক্ত হরকুমার মুখোপাধ্যায়
মহাশয়ের শ্রীপাদপদ্মে
তাহার চির-শিশু পূজারীর
রিক্তা
রচনা’—সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বেদনায়
উৎসৃষ্ট হইল।

No text on this page.

সংগ্রাহকের নিবেদন সে আজ প্রায় সাত বৎসরের কথা, যে দিন তের বৎসর বয়সের একটা সুন্দর বালক, বিনয়-নম্র লজ্জাজড়িত ফুল্লমুখে, আশাদীপ্ত উদ্বেগের দৃষ্টি লইয়া আমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। তার হাতে একখানা কবিতার খাতা। সেই খাতার পাতায় পাতায় তরুণ বালকের কালি-দিয়ে-আঁকা যে হৃদয়ের পরিচয় পাইয়াছিলাম, আজ সেই হৃদয়ের পরিপূর্ণতার উচ্ছাসের বিশদ অভিব্যক্তির সংবাদটা নিবেদন করিতে আমাকেই মুখ তুলিয়া দাড়াইতে হইয়াছে ! কারণ, আমিই তার সাক্ষী ;-আমিই তার কবিতাগুলির সঙ্গে ওতপ্রােতভাবে জড়িত ও নিগূঢ় সম্বন্ধে কবির পক্ষ হইতে তার অমূল্য কবিতাগুলির পরিচয় দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নহে, সে ভার পাঠকবর্গের উপরই নির্ভর করে। প্রিয়জন চিরকালই বিচার-বিতর্কে, দোষগুণ আলােচনায় অন্ধ ; তাহা যদি সত্য হয়, তবে ‘রিক্তার ভিতর দিয়া পূর্ণতার অনুভব করা, আমার পক্ষে একটুও দোষের নয়। পাঠকবর্গের কাছে এ আশা কতদূর সফল হইবে—জানি না; তাহারা হয় ত ইহার মধ্যে অনেক রিক্ততা খুঁজিয়া পাইবেন! যুবকের তরুণ-তরল আশা-আকাঙ্ক্ষাময় হৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রৗঢ়-কবি-সৌন্দর্যের প্রগাঢ় রসমাধুৰ্য অবশ্যই অনেক সময় দুষ্প্রাপ্য। আধ্যাত্মিক রাজ্যের ভিতরে কামকলার বিকাশবিক্ষেপ অনেক সময়ই রসসৌন্দর্যের হানিকর সন্দেহ নাই, কিন্তু জড়জগতের মধ্যে কোনটাই ত উপেক্ষার নহে ! তাই এ হিসাবে, আমাদের রিক্তা’ যথার্থনাম্নী হইলেও, ‘ভারতবর্ষের সম্পাদকের নিকট হইতে সে নিজের পরিচয়, যােগাড় করিয়া লইয়াছে। সাহিত্যক্ষেত্রে কবিতাকুঞ্জ গহন কণ্টকে আবৃত, এই কণ্টক- রাশি অতিক্রম করিয়া কুঞ্জের ভিতর নিরিবিলি বসিয়া বেণুবীণার সঙ্গীত উপভােগ করা বর্তমানকালে বড় কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। এ কষ্ট যাহারা স্বীকার করিতে না চাহিবেন, তাহাদের হৃদয়মধ্যে আমাদের রিক্তা’ নিশ্চয়ই অমঙ্গল উৎপাদন করিবে ! রিক্তাকে দেখিয়া পিছাইলে চলিবে না—তাহাকে বরণ করিয়া লইতে হইবে অমঙ্গলভয়ে অন্ততঃ শুভ্র সিত-তণ্ডুল উৎসর্গ করিয়া সংসারক্ষেত্রে তাহার দোষটাকে ঢাকিয়া লইতে হইবে! দিনক্ষণ দেখা তাঁহাদেরই সাজে—যাহারা ভাল করিয়া মঙ্গলকে বরণ করিয়া লইয়া আসিবেন । সংসারে ‘রিক্তা’র আদর কম নহে। না, ভদ্রা, জয়াকে সঙ্গে লইয়া উপরে থাকুন,-আমরা তাহাদের দিকে কেবল চাহিয়াই থাকিব। শ্রীপঞ্চানন ভট্টাচার্য্য। কাব্য-স্মৃতিতীর্থ } শিব-চতুর্দশী, ১৩২২।

সূচী। • ০ ১ ।। ৫ ০ ০ ০ ৭ ১২ ১২ ১s ৮০০ ০ ০ ০ ১৯ ২১ রিক্তা প্রতীক্ষায় লক্ষ্মী সুর পথে অপেক্ষী মানসী কথা বঞ্চিত অসময়ে ( কাদম্বরী অবলম্বনে লিখিত ) উদ্দেশে স্মরণে সন্ধান অনন্যতা মেহময় শিরী-ফরহাদ ( অভিনয় দর্শনে লিখিত) বাঁশরী তুমি মুক্তি ঐকান্তিক খেয়া সাধনা বাতি ইতিহাস (কপালকুণ্ডলার ইতিহাস ) ••• • • • ০ ০ ০ ৫ । । । । ৩১ ৫০। ••• ৩৭ •• ••• 30 ••• ৪৩, ৫ ০ ০ ৪৫ . . ৪৮ + + + ••• ৪৮ ০ ০ ০ ••• স্বপ্নছবি (একটি স্বপ্নদর্শনে)••• মানসসুন্দর লাভ আকুলতা আশা (গােল্ডস্মিথের অনুবাদ) সেই ও এই আলাপে (ক্ষণিকের উন্মাদনা—নিয়তি, অবসাদ !) স্মৃতি (সেলি হইতে অনুদিত) নিমমষিকা হাহাকার সিন্ধুলীলা রাগিণী কবি মানবজীবন যাত্রী প্রার্থনা আকর্ষণ ( মূর হইতে অনূদিত) দয়াময় ••• ৫৮ :: ••• • • • ৬২ ••• ••• ••• ৭ ০ ৭৪ প্রেমবদ্ধ নাম-গান (কোরস গান ) হিন্দু-ললনা (কোরস গান) বেদনায় সমাপ্তি ৭৮ ... ৭৯ -----

“অহৃতস্য বিলােভনান্তর
মম সৰ্ব্বে বিষয়াদাশ্রয়াঃ
অহমেকরসস্তথাপি তে
ব্যবসায় প্রতিপত্তিঃ নিষ্ঠরঃ।

No text on this page.

ক্তি
‘আমার’ বলিয়া ভাবিতে আমার, জগতে যা কিছু আছে,
সকলি দেখি ও চরণের তলে আশ্রয় লভিয়াছে।
জীবন, পূজার অঞ্জলি মত
ও রাঙা-চরণে চির অবনত ;
আঁখি চাহি, যেন প্রিয় অনুগত, অপলক তােমা পানে;
বসনা অবশ, শ্রবণ বিভল, তব আরতির গানে।
ওগাে ও প্রেমাভিমানি।
ভিতর বাহির নিঃশেষ কৰি তােমারে সকল দানি
রিক্তা আজিকে চিন্তা আমার, এইটুকু শুধু জানি।

রিক্তা যত ছবি আমি প্রেম-ভাবাবেশে আঁকি’ লই মনোমাঝে- সার্থক করি সকল প্রয়াস তােমার মূরতি রাজে! প্রাণের আমার যত আয়ােজন তন্ময় তব প্রেমে নিমগন, মহাসাধকের মন্ত্রমতন অপূৰ্ব্ব গরিমায়- প্রকাশে নিত্য নির্বিকল্প দেবতার প্রতিভায় ওগাে ও পুরুষ-রাজ ! বিরাট তােমার মূর্তি আঁকিতে মুগ্ধ-মম-মাঝ, রিক্তা সকল কল্পনা মাের, এই শুধু জানি আজ । = যত কিছু বলি, সুখে বা দুঃখে-বেদনায়, অনুরাগে, সব কথা মাের তব নাম-গাথা বুকে লয়ে সদা জাগে ! আবেগে-বাচাল কথাগুলি মম বুদবুদ হয়ে ফুটে অনুপম বিমানে মহান্ প্রণবের সম লভি এক মহাপ্রাণ- এক সুরে-লয়ে—একটি শব্দে, পায় সবে নির্বাণ। ওগাে ও প্রাণাভিরাম । সেই সুরে লয়ে গাহি’ প্রাণ ভরে’ মধুমাখা হরিনাম, রিক্তা আজিকে কবিতা আমার–পূর্ণ মনস্কাম।

প্রতীক্ষায়
কত যুগ ধরি অনিমিখ আঁখি
প্রতীক্ষায় আছি বসে ।
অনন্তু কালের প্রবাহের সনে
কত স্মৃতি আসে ভেসে।
যত উদ্বেগ-অবশ প্রাণের,
জলে-ভাসা দুটি চকিত চোখের
যত চেয়ে থাকা, বৃথাই সকলি—
বৃথা সে মন্ত্র-শেখা-
প্রতীক্ষা করি’ বসে আছি যার
তার তত মিলে না দেখা।

রিক্ত
স্তরে স্তরে চিতে যে চিত্র মধুর
অরবে জাগিতেছিল—
অতি অনুরাগে, প্রাণ যার আগে
শরণ মাগিতেছিল ;
স্বপনের মত জাগিয়া জাগিয়া,
তামস আলােকে যা ছিল নিভিয়া;
মােহ-চঞ্চল জীবন আমার
পড়েছিল পদে লুটিয়া-
সে কম-ছবির পূর্ণ বিকাশ
উঠিবে রে কবে ফুটিয়া।
অতীতের শত জ্বালা অবসানে
প্রসন্ন সুখধারা,
ব্যথিত নিশার পূর্ণাবসাদে
মঙ্গল শুকতারা,
আশা-চিহ্নিত তৃষিত প্রাণ
রাগ-বিজড়িত শান্ত তান,
আবেগে-অবাক হৃদয়ে আমার
আসিবে গাে কবে ছুটিয়া-
বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর শােভা
উঠিবে রে কবে ফুটিয়া !

উচ্ছাসে মাতি’ লুব্ধ যেদিন দেবতা-দানবে মিলিয়া,
মুগ্ধ হৃদয় জলধি মথিল কত না বিপুল যত্নে ;--
ফেনিল-চূর্ণ-তুফান-ভঙ্গে অজস্রধারে ঢালিয়া,
পীড়িত সিন্ধু উপহার দিল কত মণি, কত রঙ্গে !
তৃপ্তি-বিহীন ব্যাকুল ভারতে, অযুত আশীষ করিয়া,
স্নিগ্ধ মধুর পেলব পরশ বুলাইয়া মহানন্দে
আনি’ দিল তার জীবনের তারা, সব দুখ জাল হরিয়া,
পূর্ণা লক্ষ্মী-গাহিল বিশ্ব সঙ্গীত মধু ছলে।

রিক্তা
কিরণ-জড়িতা, ফুল্ল-আনন, চকিত-হরিণী-দরশা,
কাত্যায়নীর স্নেহ-মণ্ডিতা, ধান্য-শশাভিত হত।
লাজরক্তিম বিকচ কমল মানি’ গুরুতর ভরসা,
শত-শতদল-শােভি-পদমূলে হৃদয় করিল ন্যস্ত।
কত মন্মথ-মথিত-চিত্ত মদিরা-ভরিত আবেশে,
ঘূরিত-হৃদয় প্রসারিল বাহু ধরিতে তাহারে অঙ্কে,
ব্যস্ত-ব্যাকুল ছুটিয়া পাল জ্যোতি-ভাতি-ভীত তরাসে-
মরালী কি কভু খেলিবারে যায় শৈবালময় পৰুে!
ওই কোন্ জন মুগ্ধ নয়ন যার সে আনন-উপরে,
স্তম্ভিত যথা বারি-ভরা মেঘ ধরণী নিরখে বলে,-
স্থির, আঁখি যারে নেহারি’ শব্দ পশে না কর্ণকুহরে,-
প্রেম-সম্ভার অর্পণ করি’ মিলিল কাহার সঙ্গে?
বাতি-হরি-বিশাল-বক্ষে রভসে মিশিলা হাসিয়া
কামনার যেথা—সাধনার যেথা—সকলের যেথা পূৰ্ত্তি ।
আমিও লক্ষ্মি ! পাইনি কি তােমা’ ব্যর্থ রয়েছি বসিয়া
হরিতে যে আমি লক্ষ্মী পেয়েছি-দুয়ে-এক-হওয়া মুক্তি।

সুর
কোন্ মায়াবলে বাধিয়াছিলে এ ছিন্ন বীণার তার,
সুর-সপ্তক বাজায়ে মধুরে হে চিরপ্রিয় আমার ।
বেদনার সুর—বিষাদের গান,
ক্রন্দন-রােল-পূর্ণিত প্রাণ,
শান্ত করিলে তুলি’ কি মধুর অভিনব ঝঙ্কার!
কোন্ মায়াবলে বাঁধিয়াছিলে এ ছিন্ন বীণার তার ?
বীণার আমার ছিলনতাে কিছু ছিল না তালের ছন্দ;
বন্ধু, যেগুলি, জালজঞ্জালে সকলি আছিল বন্ধ!
গৈরিক-ভরা গিরি-গুহা মত
উচ্ছাসভরে ফাটিতে চাহিত,
সে বেসুর বাঁশী বাজায়েছিলে কি প্রাণ করি’ সঞ্চার।
কোন্ মায়াবলে বাঁধিয়াছিলে এ ছিন্ন বীণার তার !
সেই সমসুরে বাঁধা আছে মাের বীণার সকল তন্ত্রী
ওগাে সুন্দর! অমােঘ-মন্ত্র-মােহিত-মানস-যন্ত্রি
সেই সুরে ধীর ললিত আবেশে
উদারা-মুদারা-তারা গেছে মিশে
সেই সুর বুঝি অসীমে মিলেছে, হয়ে মহা ওঙ্কার !
কোন্ মায়াবলে বাধিয়াছিলে এ ছিন্ন বীণার তার ।
৭

পথে দিন গেল—কতকাল গেল- অসাড় মানস জাগিল না, আলাে যাহা ছিল নিভে গেল তােমার পথটি চিনিল না ? চারিদিক ভরা অন্ধকার ক্ষীণ তারালােকও নাহিরে,- কেমনে দেখিব গৃহ তােমার, পথহারা কাঁদি বাহিরে। ৮ রিক্তা ফিরিতে আমারে দিলে না তাে প্রাণপণে তাই ছুটে যাই- সুন্দর, তুমি কোথা আছ- চলিবার মাের ক্ষমতা নাই। --- তােমার যে পথ দেবতা গো সেই পথে প্রভু, চালায়ে নাও হাতে হাতে মােরে ধরে রাখো, দুর্বল মােরে শকতি দাও। দীপ্তি তব দূর করে দিক আঁধারের যত আবরণ- প্রেম তব কাছে টেনে নি দলিত, অভাগা, পতিত জন । বুঝয়ে দাও, শিখায়ে দাও ধারণা-ধ্যান-সাধনা-পূজা, আসন তােমার পাতিয়া নাও অনন্ত জুড়ে প্রাণের রাজা। ৯

অপেক্ষী
;
আমি জাগিয়া রয়েছি সারা নিশি ; এবে
হয় বুঝি অবসান!
“তুমি দেখা দাও—দেখা দাও ওগাে
প্রাণের প্রাণের প্রাণ!”
আমি হৃদয় চাপিয়া ধরি’
আকুল আশায় বিপুল আবেগে
যাপি সারা বিভাবরী।
অপেক্ষী মাের ব্যাকুল দু’আঁখি,
তােমারে দেখিতে অনিমেষ রাখি ;
প্রতি মুহূর্তে বাজে মাের কানে,
তােমার চরণ-ধ্বনি
এই বুঝি তুমি আসিছ ভাবিয়া,
কম্পন বুকে গণি।
আমি তপ্ত পিয়াসে আঁখিনীরে ভাসি
বিষম ব্যথিতমন,
তুমি কথা কও-কথা কও এসে
ওগাে ও আপন জন।

রিক্ত ভাবি, কি-যেন-কি মাের নাই- শিশির--সিক্ত বাতাসের মুখে কাহার বারতা পাই। কত আশ্বাসে মরম পূরিয়া, দ্বারপানে শুধু রহিগাে চাহিয়া জমাট বাঁধিয়া হতাশা সেথায় আঁধারে মাখিয়া কায়, ভীতির চমকে উপহাসে মােরে শতেক ভঙ্গিমায় । কতকাল স’ব এ অশেষ ব্যথা, দূরে দূরে থাকি’ সরি, তুমি দয়া কর—দয়া কর সখা ! সকল দূরত। হরি’! ওগাে সেদিন আসিবে কবে, তুমি-আমি ছাড়া জগতের মাঝে আর কিছু নাহি রবে, অনুভূতি সব হবে বিদূরিত, দেহ মন প্রাণ হবে বিলুলিত ; কল্পনা-ছবি অন্তরে আনি’ চেয়ে র’ব চুপে চুপে ;- রবে গাে রবে, গেহে মাের কবে অচল অটল রূপে।

মানসী মাের জীবনের ঝঙ্কাবহুল নিবিড় গগন-কোলে, হইয়াে তুমি ইন্দ্রধনু, অশেষ রূপের ছবি, বিয়ােগ-মাখা-বিষাদ-মাখা মলিন প্রদোষকালে, হইয়াে তুমি রঙিন-কিরণ-হাস্য-ভরা রবি। ভক্তি যখন আসবে প্রাণে, মুগ্ধ করি মন- হইয়াে তুমি পূজার আমার পূর্ণ নারায়ণ ! কথা আজি আসিয়াছি অফুরন্ত বেদনার ভার নিয়ে, তােমার গৃহের দ্বারে ; আর কি পাব কোথায় আমি! মগ্ন কোলাহলে পশে নাই কর্ণে মাের আয় আয় বলে কত যে ডেকেছ তুমি, পাগল হিয়ায় ছুটেছি স্বার্থের তরে, প্রবৃত্তি-বন্যায় সুবৃত্তি ভাসায়ে দি’ছি,—সব চলে গেছে ! শূন্য জড়পিণ্ড এক শুধু পড়ে আছে !

রিক্ত তুমি কি মহা! বিভিন্নতা–অনাদর- সেদিকে ঐক্ষেপ নাই-করুণা-কাতর আবার ডাকিলে মােরে ;-ধীরে, অতি ধীরে আঘাতিলে মৰ্ম্মে মাের সে প্রশান্ত স্বরে- খুলিল প্রাণের দ্বার ; আলােকে তােমার দূরে গেল অবসাদ ; মলিন আঁধার মানস উঠিল ভাতি; শিরায় শিরায় উদ্বেল আবেগধারা উথলিয়া যায় । হে আত্মীয়, প্রাণারাম! হৃদয়ের ধন । স্বরূপে-রূপে তােমা চিনিব এখন। সঞ্চিত বাসনা দিব তােমাতে ঢালিয়া, বঞ্চিত প্রণয়ে লব তােমাকে বরিয়া, যত মলিনতা মাের সুদূরে পলাবে- অনন্ত মিলনে দুয়ে-এক হয়ে যাবে ।

বঞ্চিত
এই তাে তখন আদরে শুনালে
মােহন মিলন তান,
এই তত তখন আসি আসি বলে,
মাতাইয়া দিলে প্রাণ।
স্বপ্ন-ছাওয়া কত কল্পনা ছবি
উতলা পরাণে জাগিল না জানি ।
অধীর আবেগ্নে মাতিল পরাণী
মধুর তােমার স্নেহে
রােমাঞ্চ রাশি গড়া’য়ে ছড়া’য়ে
পড়িল সারাটি দেহে !
১

রিক্তা
•ন
বিলুপ্ত হ’ল অনুভূতি মাের
আবেশে পূরিল হিয়ে
পাগল অধীর রহিনু তােমার
আশাপথ পানে চেয়ে ;
পাখীটি নড়িলে, পাতাটি কপিলে
আসিছ ভাবিয়া সচকিতচিতে,
বিচলিত আঁখি, চাহি চারি ভিতে
ব্যাকুল মরম-টানে,-
কি আবেগে-ভরা কাতর পরাণ
সে কথা কেহ না জানে!
ন এসে কতজন গেল
গণিলাম ধীরে ধীরে
কাদিলাম,—“বল, কোথা সে আমার”
কেহ না চাহিল ফিরে।
বড় গুরু ব্যথা বাজিছে পরাণে,----
সকল প্রবােধ পরাভব মানে,---
কতকাল রব এ গভীর ধ্যানে
বক্ষ চাপিয়া ধরি’,-
কতদিনে ল’বে পাষাণ দেবতা,
আমারে তােমার করি।
১৫

অসময়ে
সেদিন প্রভাতকালে
পত্র-পুষ্প-অন্তরালে
ঝিল্লি-তানপূরা-তালে
গাহিছিল ঘুম-ভাঙ্গা পাখী ;
বিচ্ছেদ-ব্যথিত মনে
দিগন্ত-বিতত বনে
পড়েছিনু এক কোণে
শিলাখণ্ডে দেহভার রাখি।

রিক্তা
অনন্ত মাধুর্য নিয়া,
ঘন বন কিরণিয়া,
পড়িছিল উছলিয়া
দ্রবীভূত কষিত কাঞ্চন।
শাখী শত পত্ৰাধারে
পারে নি রাখিতে তারে,
তাই সে সরসী-নীরে
পড়ি গর্ধ্বে নাচিল কেমন!
উল্লসিত প্রেমভরে
কুসুম ঝরিয়া পড়ে ;
সারাটি
ধরা তারে পারে না আঁটিতে ;-
বুকেও ধরে’
ফুলও আর মধু-ভারে
পারে না রাখিতে ধরে’
কানায় কানায় ভরে
উপচিয়া পড়িছে মাটিতে।
তব ছবি বুকে করে’
আমিও যে আপনারে
পারি নি রাখিতে ধরে
ব্যর্থ-দেহ-গণ্ডীর মাঝারে ;-
১৭

রিক্তা
প্রেমখেলা অবিরত,
হে প্রিয়, চিররাঞ্ছিত,
আমার পাগল চিত
পারে নাই অত সহিবারে ।
সময়ে এলে না সখি,
কত যে সােহাগ মাখি’
রেখেছিনু ছবি আঁকি
দেখিলে না বারেক ফিরিয়া-
অপার সৌন্দৰ্য্য রাশি
ঢেলে দেওয়া দিশি দিশি ;
তা’সাথে সে সব মিশি
কখন, যে পড়েছে সরিয়া ।
তখন যদি আসিতে
নাই-বা ভালােবাসিতে,
দেখিতে, এ মরমেতে
কত প্রেম আছিল গােপন,
গীত-শেষে রঙ্গাবাসে
কি ফল বল না এসে,
বিশ্বে প্রাণ গেছে মিশে,
দেহ হিম-অসাড় এখন।

উদ্দেশে অন্ধ মানস অক্ষম প্রভু, তােমার স্বরূপ চিনিতে ;-- দেখে নি কখনাে ; মহিমা তােমার, পারে নি কখনাে বুঝিতে ! শুনে, তুমি নাকি চির-আপনার, প্রীতি-আধার, ভক্তি-আগার, অন্তর-মাঝে আসন পাতিয়া, অচল হৃদয়-রাজ- একের মাঝারে রহিয়াছে তব বিশ্বরূপের সাজ !

রিক্তা
ধৈর্য-শিলায় হৃদয়ের স্রোত
আছাড়ে মুক্তি-লাগিয়া
বাসনার ফেনপুঞ্জ তাহাতে
খেলায় ডুবিয়া—জাগিয়া।
আশার লহরী তুলিয়া তুলিয়া,
ছুটে যেতে চায় আপনা ভুলিয়া,
কোথায় বিশাল সাগর রয়েছে,
সন্ধান-আশে তাহারি
অচেনা সাগরে মিলনের তরে,
অচেনা প্রদেশে বিহারি’!
মংল-মন-কুঞ্জে কি যেন
কাকলি উঠিছে আকুলি ;
মুগ্ধ-মানস-বিমােহিনী স্মৃতি
কেমনে রাখিব আগুলি ।
কোথায় হে তুমি বিকার-বিহীন।
জাগ মাের প্রাণে চির নিশিদিন,
শান্ত প্রেমের অঞ্চল দিয়ে
চঞ্চল হৃদি আবরি।
তােমার নয়নে নয়ন রাখিয়া
সৰ দুখ-জ্বালা পাসরি।

স্মরণে
কবে প্রথম তােমারে দেখিয়াছি—
কোন্ স্মৃতিভরা স্বপনে ;
কবে তােমারে যে ভালােবাসিয়াছি-
এখনাে আছে তা স্মরণে ।
ললিত কুসুম-কুঞ্জ-মাঝে,
গেয়েছিলে গান সােণালি সাঁঝে,
আমার হৃদয়-সেতারে বেজে,
মিশে গেছে তাহা গগনে
সেই আবেশ-মধুর লগনে !
সেই দিন হতে আছি আশা নিয়ে--
কুসুম-কানন করিব এ হিয়ে,
তার মাঝে প্রিয়, তােমারে আনিয়ে,
সফল করিব জীবনে--
আমি ধন্য হইব ভুবনে !
১

সন্ধান
সেই কোন্ শুভ সুপ্রভাতে,
জ্যোতির্ময় অঙ্গের ছটায়,
উজলিয়া আঁধার মানস,
দীপ্তবিশ্বে জাগালে আমার !
উন্মিলিয়া তালস আঁখি
জ্যোতি তব করিনু দর্শন
সৌন্দর্যের তাড়িত পরশে
ঝলসিল দুৰ্বল নয়ন।

রিক্তা
চকিতে চমকি’ দুই হাতে
আঁখি পরে দিনু আবরণ—
সেই ক্ষুদ্র মুহুর্ত ভিতরে
কত কি আঁকিল ছবি, মন ।
প্রতিভরে চাহিনু আবার
কোথা হয় সে মধুর হাসি !
এযে দেখি, ভুবন ভরিয়া
ঘেরিয়াছে গাঢ় তমােরাশি।
ভ্রান্ত মম ক্ষুব্ধ শ্রান্ত হিয়া,
বঞ্চিত যে অলস,
উদাস---
বিজড়িত হতাশা-বাঁধনে-
নাহি প্রাণে সবল বিশ্বাস !
কোথা যাব হে প্রিয় সুন্দর,
তােমা তরে আকুল পরাণ,-
মরমের অন্তস্তল যথা
সেথায় কি করিব সন্ধান।

অনন্যত
কত কত নিশি-~-কত শত দিন
পলকবিহীন নয়নে,
পথ চেয়ে আছি তােমার আশায়,
আবেগে-সজাগ শয়নে !
বিলাপে ব্যাকুল বেহাগ কত যে
কাদিয়া মিশেছে আকাশে-
হৃদয়-ভাঙ্গা সে ক্রন্দন মাের,
যায় নি কি তব সকাশে ?
শুধু কি নিয়েছি স্বপ্ন-ছবিরে
হৃদয়-আবেগে বরিয়া ?
কিছুনা-মাখানাে সকল দিয়া কি
রেখেছি পরাণ ভরিয়া ?
ওগাে, বিশ্বাস মাের দিয়াে না ঘুচায়ে,
আমারে মজায়ে রাখগাে-
কিছু হও বা না হও, পরাণে আমার,
সৰ হয়ে তুমি থাক গাে।

স্নেহময়
-
চিন্তাভরা সজাগ-রাখা দীর্ঘ নিঝুম রাতে
ক্লান্ত আমি যখন পড়ি ঘুমি’-
অঙ্গে আমার শান্তি-মধুর হাত বুলায়ে দিয়ে
অযুত স্নেহ ঢালে কপােল চুমি’ !
শিহরি উঠে অঙ্গ আমার, শীতল তােমার করে,
ব্যস্ত হয়ে তাকাই নয়ন তুলি’
স্নিগ্ধ তােমার দৃষ্টি দেখি আমার মুখের পরে-
ললাট-পরে কনক-আঙুলগুলি ।
কি করুণা, সিক্ত আঁখির কোমল পলব দুটি
মন্দ কঁপে—অশ্রু বুঝি ঝরে !
প্রেম-লুলিত হৃদয় তােমার এতই ব্যাকুল কেন
কাতর কেন এই অভাগার তরে ।
আমার বুকের সুখের দুখের গুরু কম্পনগুলি
তােমার বুকেও তেমনি কিগাে বাজে
প্রগাঢ় তােমার আত্মীয়তা আমার তরেও কি গাে,
মুক্ত সদাই—সকল কাজের মাঝে ।
তবে গাে বঁধু, অন্ধ চোখে সঞ্চারি’ দাও জ্যোতি,
বধির শ্রবণ ভরিয়া তােমার রবে-
আপন বলে’ সকল হ’তে লইলে তােমার কোলে,
অপূর্ণ মাের সকল পূর্ণ হবে !

শিরী-ফরহাদ
তুমি কোন্ দেশে আছ ধেয়ানে আপনা-হারা,
আমি আছি কোন্ দেশে উদাস-হিয়ায়,
তবু যেন দুটি প্রাণে কি-যে-কি অজানা সুর,
দিবা নিশি বেজে উঠে শত মূচ্ছনায়।
জানি না কি মােহমন্ত্রে এ গভীর আকর্ষণ
তােমা লাগি এ ব্যগ্রতা অচেনা-প্রেমিক,
বুঝি না এ মাের প্রাণ কি চাহে—কি ভালােবাসে ;
কেন দেখে শুষ্ক চোখে শূন্য চারিদিক।
রাজার বিভব-সুখ, বুকভরা অনুরাগ,
ঘৃণায় সে তুচ্ছ ভাবে রিক্তমুষ্টি সম--
সে যেন কি দেখিয়াছে—সে যেন কি লভিয়াছে
ধন মন সুখ হ’তে রম্য মনােরম !
স্বার্থের দুর্গন্ধভরা এযে বিষময় কারা-
আত্মসুখ-লিপ্স, নর, রক্ষক ইহার ;
ফিরেও দেখে না কেহ প্রাণের গভীরতায়,
ভাণ-করা প্রেমখেলা তৃপ্তি যে সবার।

রিক্তা
সহসা আসিলে তুমি—একি বিধাতার খেলা
তােমাকে দেখিয়া আমি বুঝি কি চাই!
তুমি তাে আছিলে সুখী, মানসী প্রতিমা নিয়ে ।
নিস্পন্দ রহিলে চাহি’, কি আমাতে পাই’!
একি সুখ—কি উদ্বেগ—কি আনন্দ ব্যথা-মাখা ।
আমি তাে দেখি নি তােমা তুমিও দেখ নি,
একেছ এমন যদি স্বরূপের প্রতিরূপ,
আমার পরাণ কেন তাহাতে রাখ নি।
নয়নে সমস্ত প্রাণ পুঞ্জীভূত করি রাখি
কি পুণ্য সময়ে হ’ল দৃষ্টি-বিনিময় ?
“সুন্দর!”—আমার কথা, তুমিই উঠিলে বলি—
ফুটিল আমার মুখে নিৰ্বাক-নিচয় ।
তােমার ভ্রমরকৃষ্ণ নয়নের তারা দুটি,
নিমেষে জানা’ল কত অর্থভরা বাণী ।
ছিলে কোন্ ছায়াপথে স্বপ্নমগ্ন শুকতারা,
জীবন-প্রভাতে আজি আলােকিলে প্রাণী ।
বল প্রিয়, কোন্ শাপে রৌদ্রঢাকা জ্যোতি তব,
আততায়ী করে আজি শেষ তব খেলা ;-
অভাগীর দীর্ণ হিয়,-সমাহিত সাধ, আশা-
আকাঙ্ক্ষিত বক্ষে শান্তি লভি এই বেলা ।

বাঁশরী
-
আকাশ বাতাস সুতানে পূরিয়া,
ওই শুন বাজে বাঁশরী
বেঁধে নাও এবে হৃদয়ের তার
সব দুখ-জ্বালা পাসরি’!
নির্ভয় হও—নির্ভর কর,
মুছ গাে অশ্রু-ধারা দরদর ।
বিমুঢ়-মোন থেক না বসিয়া,
মিলাও কণ্ঠ এ তানে ;
মানস হরিয়া গােপন-বিহারী
কখন যে যাবে কে জানে।
সময় থাকিতে পথ করে লও
অযুত শক্তি প্রসরি’ ।
ওই শুন বাজে বাঁশরী ।
আর কেন ব্যথা, আর কি ভাবনা,
ওই শুন উঠে তান--
কেন আনাগােনা ?—ওই যায় শােনা
ব্যাকুল আহ্বান !
নানা সুর আর মরমের তারে,
ভুলেও বারেক যেন বাজে না রে
৮

রিক্তা ইন্দ্রিয় হ’তে অন্তর--সব, একই সুরে রাখ বঁধিয়া একটিতে দিলে ঝঙ্কার, যেন সবগুলি উঠে বাজিয়া। বিশ্বের সুরে মিলাইয়া সুর, তারপর ধর গান- ওই শুন উঠে তান। যা’ছিল আগল, সকল টুটিয়া ওই দেখ মাতে প্রাণ- গম্ভীর-ৰেদী রহিবে কি তুমি, বেদনায় পরিমান । আবেগের ভরে শাখী থর থরে উন্মাদ যেন গায় মর্মরে পূর্ণতা দেছে বিশ্বেরে ছেয়ে ! অসীম দীনতা ভুলিয়া, এ শুভ আসরে সুর বেঁধে, দাও শত ঝঙ্কার তুলিয়া ! সারাটি জগৎ উঠুক চমকি’ স্রোত বই উজান ওই দেখ মাতে প্রাণ! !

তুমি
---
তু
তুমি অপরূপ চারু চিত্রলেখা,
প্রশান্ত শশাঙ্ক-রেখা প্রায় ;
পূর্ণতার অপূৰ্ব্ব মুরতি
প্রতি অঙ্গে ছটা উছলায় !
সৌন্দর্য্যের সূক্ষ্ম পরিণতি,
তিলােত্তমা শােভার আধার,
সুবিস্তীর্ণ মুক্ত ব্যোম বিনা,
চন্দ্রমার শােভা কোথা আর ।
তুমি
প্রাণস্পর্শী বিশ্ব-বিমােহন,
প্রকৃতির রূপের ভাণ্ডার ;
উজ্জলে-মধুরে-ভরা তুমি
পুঞ্জীকৃত জ্যোতির আগার !
তুমি
সবারি একান্ত আপনার,
স্বপ্রকাশ সূর্যালােক যথা,
হে দেবতা, প্রেমিক মহান্,
প্রেম যথা—ব্যক্ত তুমি তথা !
তুমি চির পরিচিত পুরাতন--
পলে পলে তবুও নূতন,
সুমহান্ সদানন্দ ছবি-
বিশ্বরূপে মানস মােহন।
৩০

মুক্তি সেই দিন—সেই তীব্র কঠোরতাময় বিচ্ছেদের ব্যথিত রােদন- কমনয়ীতার সেই রুক্ষ পরিণতি, খুলে দিল প্রাণের বাঁধন ! ; নিহত সাধের ব্যগ্র শঙ্কিত বেদনা, মরমের মাতল তিয়াসা, অপূর্ণ সে আকাঙ্ক্ষার জ্বলন্ত মরু, বিনাশিল পরাণের আশা । • নির্বাপিত নিখিলের উজ্জ্বল আলােক- মান বিশ্ব, নিতান্ত মলিন ভীরু, বিদলিত মাের একক জীন- প্রবঞ্চিত দগ্ধ উদাসীন।

রিক্তা
সেই দিন খুলে গেল সংরুদ্ধ প্রবাহ,
উচ্ছলিত তরঙ্গ-প্রহারে ;
পরিপূর্ণ বাসনার উদ্বেল আবেগে,
কি ব্যথিত করিল আমারে !
সেই দিন—সে গভীর ব্যাথার ভিতর,
খুলিল যে স্বপ্ন-চিত্র-পট ;
তারই আরাধনে প্রিয়, আজ তুমি মাের,
আরও কাছে—আরও নিকট
এবে দেখি হে সুন্দর, সে বিচ্ছিন্ন ভাব,
সুমঙ্গল মিলনের দ্বার
বিচ্ছেদ ঘটিয়াছিল, তাই আজ বুঝি,
ধ্রুব তুমি অন্তরে আমার !
সেই দিন জীবনের পবিত্র বােধন,
আজি পূর্ণ বিসর্জন তার
সেই দিন দুঃখে, ক্লেশে পূজার উন্মেষ
আজি মুক্তি সেই সাধনার !
সেই দিন যে দেউলে আনিতে তােমায়,
হয়েছিনু চপল অধীর
আজি দেখ, যাতনার ক্রন্দনের ফলে,
তােমাময় সে শূন্য মন্দির ।

ঐকান্তিক
ঢাকুক এ মহাবিশ্ব কুহেলি আঁধার,
গ্রহতারা মুছে যাক,
সব পুড়ে হােক খা,
মহী মরুভূমি হােক—কিম্বা পারাবার
যা হবার হয়ে যাক্ তুমি তাে আমার ।

রিক্তা
তুমি তাে আমার দুই নয়নের মণি,
তােমা-পানে চেয়ে থাকি,
বিশ্বেরে ফলিত দেখি ;
নিখিলে রয়েছে ব্যাপ্ত আনন্দের খনি—
বক্ষে মাের, আনন্দের স্পন্দন যে গণি।
সমুন্নত মহীধর বৃক্ষ সুশােভন,
তার বুকে বল দেখি
আশ্রয় লভিছে নাকি,
উচ্ছল মেঘের দল, প্রেমপূর্ণ মন ;-
আমি কি পারি না হ’তে জলদ তেমন !
আমি কিন্তু জানি তুমি প্রেম-অবতার ।
ব্ৰহ্মাণ্ড ধরিয়া তান,
গায় তব প্রেম-গান ;
প্রকৃতি তত প্রতিবিম্ব তােমার শােভার,
প্রেমময় পুণ্যময় তুমি তাে আমার ।

খেয়া
ঘাটে বাঁধা ছিল তরীখানি ;-
প্রভাতের রবি তরল আলােক তখনাে দেয় নি ঢালি
বিভােলা বিলােলা কুমুদী উপপখি’ ভ্রমরার গালাগালি,
তখনাে ঘােটা টানি
জুড়ে নি গােপনে বাতাসের সাথে অবিরল কানাকানি।
অলস-নয়ন মাঝী একজন বসিয়া তরণী-পরে,
দেখিল, সােণালি বালুকাবেলায় বিপুল আবেগ-ভরে
ঢেউগুলি ছুটে যায়
সহিয়া ঘৃণার পদাঘাত, ফিরে অনাদরে-হতাশায়।

রিক্তা
বাজিল বুঝি সে বেদনা মাঝির সরল উদার বুকে,
সহানুভূতির হৃদয় তাহার, কাদিল তাদের দুখে
ছুটিল ওপার পানে
বুঝবে বেলারে কি ব্যথা ভীষণ ভালােবাসা-অপমানে !
ঝিকিমিকি-করা হাজার বালির চোখে ভরা উপহাস,
নিয়খি’ ভাবিল দয়ালের দেশে একি নিঠুরের বাস !
ডাকিল, “আয় রে আয়
ওপারে কে যাবি”—উঠিল তখনি কারা যেন নৌকায়।
বাহিল তরণী—দেখে আসি কূলে আবেশ মরণ-মাখা,
লক্ষ-জনমে-মাথা-ভেঙ্গে-মরা লহরীর বুকে আঁকা।
ডাকে মাঝি—“ওরে আয়,
বিফল আশার মদিরা পাগল ছুটি না নিরুপায়।”
স্বপন-বেদনা-বিধুর জানে না জোয়ার ভাটার নাম,
এপারে ওপারে ব্যস্ত করে সে, যাওয়া-আসা অবিরাম।
সন্ধ্যায় ভাবে দেখি-
কিরণ-রঙিন লহরীর মুখে তৃপ্তির হাসি,—“একি।”

সাধনা অনন্তের মহামন্ত্রে পৃথিবী চালিত, মানব-হৃদয়ে তার সুপ্ত অধিষ্ঠান, উত্তেজনা, প্রকৃতির মহা সমাধান ! কৰ্ম্ম নিরলিপ্ত তারে করে কেন্দ্রীভূত ! জগতের প্রতি অঙ্গে শক্তির বিকাশ ; কৰ্ম্মে অনুভূত তাহা লক্ষ্যে দৃঢ়ত- স্বরূপে বিশ্বাস স্থির তা হ’তে প্রসূত ?- জ্ঞান করে হৃদয়ের মালিন্য বিনাশ। বিশালের অংশ আমি বিশ্বকৰ্ম্মে রত, জ্ঞানে বিনিহিত ভাব বিবেকের মূলে ; ধৈৰ্য্য তিতিক্ষারে তাহা জাগাইয়া তুলে-- ভক্তি দেয় দেখাইয়া সাধনার পথ। জগতের সুখ যাহা, সুখ আপনার, স্বতন্ত্র চিত্তের বৃত্তি মহা শুভঙ্করী ; জ্ঞান, কৰ্ম্ম, ভক্তি সদা একই পথ ধরি সাফল্যে ভূষিত করে পন্থা সাধনার !

বাঞ্ছিত
দূর জগতের এক মনােরম দেশে,
স্বপনের ঘােরে, স্নিগ্ধ বাঁশরী-নিম্বনে
বাজে যেই প্রাণস্পর্শী তান,
তাহারি—তাহারি এক অজানা ঝঙ্কারে,
আকুল ব্যাকুল এই প্রাণ
একি নহে বাঞ্ছিতের গান ।
=
নীল গগনের ওই সুবিশাল দেহ,
প্রসারি দিগন্ত বাহু সুগভীর প্রেমে
আলিঙ্গিছে অনন্তে উদার,
ঢালিতেছে বিশ্ব’পরে নীহারের ছলে,
প্রেমানন্দশংসী অশ্রুধার
একি নহে বাঞ্ছিত আমার ।
ওই যে নয়ন দুটি স্থির নির্নিমেষ
শশাঙ্ক-সবিতা-রূপে হেরিতেছে সদা
কামনীয় মূৰ্ত্তি জগতের,
অতৃপ্ত পিয়াসা তাই আরক্তনয়নে
মুখ চেয়ে আছে প্রেমিকের
একি নহে নেত্র বাঞ্ছিতের ?
৩৮

রিক্তা = কুসুমিত কাননের সুবাস-পূরিত প্রীতির সুরভিশ্বাস—সমীরণ যবে বয়ে যায় পাগল করিয়া ; তখনি উথলি উঠে আবেগ-লহরে আলােড়িত হৃদয়-দরিয়া- মুগ্ধ হই বাঞ্ছিতে স্মরিয়া! কামনা-তমসাময় হৃদয়ে আমার, অপূৰ্ব ত্যাগের রম্য সমুজ্জ্বল ভাতি বিবেকের দীপ্ত অভিজ্ঞান- শ্যামচ্ছায়া-কুঞ্জগৃহে মাধবী নিশীথে আত্মহারা পাপিয়ার তান- আমারই বাঞ্ছিত পরাণ ! যা’ দেখি, যা’ শুনি তাহে বাঞ্ছিত কেবল, ভাবনায় সুখ সেই সুধীর মূরতি-- হিয়া-মাঝে পূর্ণ, আত্মহারা,- জীবন-উদ্যানে মাের গরিমা-প্রসূন নিদাঘের স্নিগ্ধ বারিধারা- স্বপ্নসৃষ্টি,—আনন্দ-ফোয়ারা। ৩৯

ইতিহাস
বিজন গহন বনে
কতই উদ্ভান্ত মনে
প্রভাতের সমীরণে
পথহারা নবপান্থজন,
সম্মুখে নদীর জল
কি উদাম ফেলােচ্ছল,
কি আকুল কি প্রবল,
করিছিলে স্থির নিরীক্ষণ।
3o

রিক্তা উন্মাদিনী আত্মহারা অনন্ত-যৌবন ধারা ছুটিছে পাগল পারা কোন্ মন্ত্র করিতে সাধন, স্রোততবেগ কি প্রখর ! ভেসে যায় নিরন্তর অভিমান, অনাদর- তুচ্ছ যত বালির বাঁধন ! - সহসা নয়নে তব পড়িল নয়ন মম, কি যে অনুরাগ নব নিমিষের মৌন আলাপন, আনিল হৃদয় ছাপি’ উভয়ে উঠিমু কঁপি’ কয়টি মুহূৰ্ত্ত ব্যাপি পুঞ্জীভূত সমগ্র জীবন । উছলে হৃদয়ে সারা কি আনন্দ পূত ধারা, কিবা মধুরিমা-ভরা কম্পিত সে লজ্জিত মিলন,

রিক্তা
শুধু চোখাে-চোখি-তরে-
শুধু দেখা-দেখি-তরে,
কত ছল বারে বারে,
পলে পলে হত প্রয়ােজন।
আর আজি রুক্ষ এত,
প্রলয় কালাগ্নি মত
জ্বলে নেত্র অবিরত,
কি ভীষণ—কিবা ভয়ঙ্কর!
রূপের প্রবল টানে
প্রাণে মাদকতা আনে,-
শিথিল ইন্দ্রিয়-বাণে
কোথা থাকে মত্ততা তাহার ?
সেই প্রেম-পূর্ণ প্রাণ
এই তার প্রতিদান,
সেই মান-অভিমান
আজি এই জ্বলন্ত হুতাশ !-
কত ভালােবাসি প্রভু,
পারি নি বলিতে কভু
পরাণ অতৃপ্ত তবু
শেষ মম ক্ষুদ্র ইতিহাস।

স্বপ্নছবি
আজি কি খেলা খেলিয়া গেছে সে আমার
ব্যথিত পরাণ নাচা’য়ে,
আজি কি মধু আবেশ ঢেলেছে সে মাের
পিত মানস বাঁচা’য়ে ;
যত
আমি ছিলাম বক্ষ চাপিয়া,
অশেষ যতনে বিলাপ-কাতর
আধঘুমে নিশি যাপিয়া ;-
জমাট-বধানন মলিন বেদনা,
তৃপ্তি-হারাণাে ব্যর্থ বাসনা,
নিমেষে তাহার সােহাগ-পরশে
কোথা যেন গেছে মিলায়ে
সে গেছে আমার পরাণটি নিয়ে
এই এক খেলা খেলায়ে।
সুদুর জীবনে, মধুর লগনে,
মনে পড়ে তারে দেখেছি-
গভীর বিজনে নিভৃত পরাণে
ছবিখানি একে নিয়েছি ;
;
কোন
কোন্

রিক্তা আমি । মাের সকল পরাণ খুলিয়া, যা’কিছু পেয়েছি কুড়ায়ে আনিয়া সপেছি আপনা ভুলিয়া ! রিক্ত হৃদয় নত দুঃখ-ভারে খুজিয়া কোথাও পায় নাই তারে— স্বপ্ন-আলােকে অঙ্গ আবরি’ কি খেলা খেলিল আসিয়া প্রগাঢ়-যতন-রুদ্ধ-হৃদয় চঞ্চল করি হাসিয়া । আজি মাের যদি যদি শুনি’ এ মাের পরাণে আসিয়াছে সে গাে ! বহুদিন হ’ল গােপনে, এই দেখাশােনা এই আনাগােনা সকলি লুকালাে স্বপনে ; তবু পাতি মাের বুকে কান, ধীরে বেজে ওঠে হৃদয়-সেতারে সেই স্বপনের গান ; তাহার মধুর সে মুরতিখানি, চির পরিচিত আপনার জানি, হৃদয়-বাহির আছে সে জুড়িয়া ; • স্থির অচপল স্মরণে চিরকাল থাকে এ ছবি আমার জড়ানাে জীবনে-মরণে? যেন 33

মানসসুন্দর
দীর্ঘ কত বর্ষ গেছে হেলায় কাটিয়া,
পূর্ণ করি’ জীবনের ক্ষণ ; তােমা নিয়া,
রচিয়াছি কত কল্পনার স্বর্গ-ভূমি,
সেই দূর শৈশব হইতে ! আজো তুমি
তেমনি আশার ধন, বস্তু কামনার--
আজো তুমি সেইমত অন্তরে আমার
প্রহেলিকা, মায়াজাল,—কি-যেন-কেমন,
বাস্তবের পরে অবাস্তব আবরণ !
মনে পড়ে সেই দিন,—যেদিন তােমার
সােহাগ-কুসুম-মালা করিল বাহার
তনুটি আমার, জাগায়ে কল্পনা শত
মন্ত্রমুগ্ধ মানস-মাঝারে, সুখহত
চিত্তবৃত্তিগুলি, আবেশে অবশ মানি’
বুঝে নিল শুধু মানসী-প্রতিমাখানি-
৪৫

রিক্তা প্রতিভায় সমুজ্জ্বল, গৌরবে মহৎ, লাবণ্যে মধুর, প্রফুল্লসুষমাবৎ স্নিগ্ধতা ও উন্মাদনা, পূর্ণ সমাবেশ! জগৎ হইয়া গেল স্বপনের দেশ! ডাকিল পাপিয়া, ফুকারিল পিকবর, কচিৎ উঠিল ধ্বনি দোয়েলের স্বর, গাইল শতেক পাখী কণ্ঠ চাপি’ চাপি’ সরসীর কালাে জলে পদ্মপত্ৰ কঁপি’ উৰ্মিরে নাচায়ে দিল, মলয় পবন কুসুম-কপােল প্রেমে চুমিল যখন, সুন্দরী প্রসূনবালা সুখহাসি ঢাকি শুয়ে পল লতিকার বুকে মাথা রাখি। প্রশান্ত নয়ন মেলি’ চাহিলে তখন আমার নয়ন-পানে,উথলিত মন স্পষ্ট রেখা ক’টি নিয়ে ফুটিল যেমন বিভল সে নেত্রে মাের,-করিলে দর্শন- হেলায় পশিলে মম মৰ্ম্মতলদেশে তখনাে বিভাের আমি আবেশ-বিলাসে ! তারপর কতদিন গেছে উতরিয়া- দিনে দিনে-ক্রমে ক্রমে গিয়াছ সরিয়া, তপ্ত দেহ হতে মাের ; বিঘুঝাবাত, বিক্ষুব্ধ তরীতে মাের করিয়া আঘাত - ৪৬

রিক্তা
নিয়ে গেছে কত দূরে তারে, নাহি যায়
সেথা কাহারাে আহ্বান,বালুকাবেলায়
ফুটেনাকো পদচিহু কারাে! চক্ৰবালে,
সেই দূর দূরান্তরে বিশ্বেরে চিনালে !
আর আজি বহুকাল, বহুবর্ষ পরে,
প্রণয়ের একটানা তরঙ্গের ভরে
এসেছি আবার তােমার সে তরীপাশে,
আমার তরণী বেয়ে ; যে পােষিত আশে
এতকাল ধরে’ শ্রান্তিরে হারায়ে দিছি--
শত বিপদের বজ্র মাথা পেতে নিছি,
বঞ্চিত করে না তাতে ; হে প্রাণের রাজা,
প্রশান্ত নয়নে চাও; দিয়ােনাকো সাজ।
অপাঙ্গ-বিভ্রম তব ভ্রুকুটি বিলাসে !
তােমারে চিনায়ে মাের অজ্ঞান মানসে
ভাঙ্গিয়া চূরিয়া দিয়াে ! তােমারি প্রভাবে
সৃজিয়াে মহৎ করি’ মােরে, ঘুচে যাবে
সঙ্কীর্ণতা, তব সৃষ্ট নবীন পরাণে
বিশাল হইয়া চা’ব জগতের পানে !
তখন তােমার ওই পূর্ণ বপু লয়ে,
নিখিল ব্যাপিয়া থেকে সময় হয়ে ।
৪৭

লাভ
দীর্ঘ বরষ কেটে গেছে কত--একে একে শত লাখ,-
এত যে কেঁদেছি, চাহ নাই ফিরে, বারেক শােন নি ডাক ;
বাসনার শিখা নিভে গেছে এবে, পূর্ণ হয়েছে প্রাণ,
প্রণয়ের নদী নিথর গভীর, নাই সে জোয়ার-টান
কে বলে তােমায় আসিতে এখন ?—নাই মাের পরিতাপ—
-পেয়েও আমি পেয়েছি তােমারে,-ত্যাগে লাভই বড় লাভ?
আকুলতা
অন্তরে মাের কম্পন আজি,
উঠিছে কিসের লাগিয়া
কি যে রে শান্তি, কি যে মত্ততা,
যুগপৎ উঠে জাগিয়া ।
মৰ্ম্ম যেন কি তাড়িৎ পেয়েছে,
স্পন্দন প্রাণে ছড়ায়ে গিয়েছে
চঞ্চল আমি-বিহ্বল আমি,
উদ্বেল গিছি গলিয়া-
বক্ষে যেন রে গন্ধের ধার
উচ্ছলে কলকলিয়া।
3s

রিক্তা
চেতনা আমার অবশ যেন রে
কাহার সরস পরশে,
চক্ষু আমার সিক্ত যেন রে
উদ্দাম কিযে হরষে ;-
অঙ্গে আমার রঙ্গ করিয়া
জ্যোছনার ধারা পড়িছে ঝরিয়া,
স্তব্ধ ধরণী শব্দ-বিহীন,
চাহিয়া মুগ্ধ দরশে !
বিস্মিত আমি বিমুগ্ধ পড়ি’
কাহার সরস পরশে।
=
কে যেন আমার অতীব নিকট--
মনে করি তারে ধরিব ;
বৃথাই সে আশা, শিথিল দু’বাহু
কেমনে প্রসার করিব ।
কে আছ বন্ধু, এস ফিরে চাও
তার কাছে মােরে যাও নিয়ে যাও,
সে যাদুকরের প্রেম-সায়রের
অতলে প্রবেশ করিব।
অবশ অঙ্গে সংজ্ঞা হারায়ে,
সে অতলে ডুবে মরিব ।
৪

আশা
অভাগা, আহত, যেবা মহাঘাত-প্রতিঘাতে
আশার কুহক ছলে সেও ভুলে রয় ;-
“যে ব্যথা সহ বায়-দীর্ণ করে মানববরে,
তাহাও দেখা’য়ে দেয় আশার উদয় ?
আশা আলােকের ওই দীপ্তরশ্মি রেখাসম
চলিতে আঁধার পথে দৃঢ়তা শিখায়-
নিশার তিমির ছায়া যতই বাড়িতে থাকে,
ততই উজ্জলতর কিরণ বিকায়।

সেই ও এই
;
সে যে ছিল চক্রবাল-দূর অতি দুর,
কল্পনার শান্তি-সুখ, নিরালা মধুর !
এ যে পার্শগত ছায়া, একান্ত নিকট
বৃহৎ বঞ্চনা শুধু, অসত্য,
অসত্য, কপট
সে যে ছিল যমুনার তরল কাকলি
স্বভাবের সাধা সুর ধ্বনিত আকুলি’
এ যে বাঁশরীর রব,—বাজালে বাজিবে-
নতুবা মুরলী-ধ্বনি মূক হয়ে রবে ?
সে যে ছিল চন্দ্রালােক স্নিগ্ধ সমুজ্জ্বল,
সৌন্দর্যের পরিণতি-মাধুৰ্য কেবল !
এ যে প্রদীপের আলাে—কি যে তীব্রতায়
ধাঁধায় নয়ন শুধু, যত দেখা যায় !
সে যে ছিল বালকের শশাঙ্ক-কামনা
ব্যাকুলতা-উল্লাসের পুণ্য উত্তেজনা
এ যে কুসুম-শমুনে অন্ধ মাদকতা
লক্ষ্যহীন উৎসাহের শ্রান্ত বিহ্বলতা ।
সে যে ছিল কামনার লেশমাত্রহীন
অতল-পরশ, প্রেম, প্রশান্ত স্বাধীন,
এ যে মিছে তৃপ্তি, শুধু দান-প্রতিদান,
লুকোচুরি খেলা, শুধু মান-অভিমান।
=

আলাপে
শত জনমের আয়ােজন মাের সার্থক করি’ আজ,
কি শুভ লগনে দেখা দিলে তুমি ব্যথিত এ হিয়া-মাঝ !
আসিবে না বুঝি ভেবেছিনু মনে,
সাধ আশা যত এ মাের পরাণে,
ক্ষুব্ধ বেদনে অতীব গােপনে মিলাইবে চুপে চুপে,
বিশেষত্বহীন জগতের মাঝে পড়ে র’ব কোনরূপে !

রিক্তা এতদিনে মাের আকুল আহ্বান, কানে বুঝি পশিয়াছে, এতদিনে তব রাগিণীতে বুঝি গীতি মাের মিশিয়াছে। কি-যেন-কি-এক-কি-রকম-দিয়ে মুগ্ধ পাগল করেছ এ হিয়ে আবেশ আমারে ফেলিছে ঘিরিয়ে, কোনই শকতি নাই- এত কাছে তুমি সাধনার ধন, তাও না দেখিতে পাই। , - আসিয়াছ যদি সখা হে আমার, হৃদয়ে দেহগগা বল, সকল ভুলিয়া নয়ন ভরিয়া দেখি তােমা অবিরল, যে দিকেই আমি নয়ন ফিরাই তােমারেই যেন দেখিবারে পাই বিশ্বমাঝারে কোথা কিছু নাই, সুন্দর! তােমা ছাড়া রাখ এ মিনতি, আসিয়াছ যদি-যদি দেছ ডাকে সাড়া ! মঙ্গল--বাহু-বন্ধনে তব, আমারে বাঁধিয়া নাও- আরও—আরও—আরও গাঢ়রূপে, প্রাণে মাের মিশে যাও। স্বাতন্ত্র মাের কিছুই রেখ না- দূর আমাহ’তে তুমিও থেক না, সমান আকুতি, সমান প্রকৃতি, এক হৃদি-পরমাই— সম্যক্ দুয়ে মিলিয়ে-মিশিয়ে নূতন হইয়া যাই।

স্মৃতি
গীতের করুণ সুর হয় অবসান,
লয়টুকু বাজে তবু মরম-মাঝার ;
কুসুম দু’দিন পরে হয়ে যায় স্নান,
সুবাস, পাগল প্রাণে করে হাহাকার !
গােলাপ শুকায়ে যায় পাতাকটি তার
প্রিয়ের শয়ন-তরে স্তুপাকারে রয়
তুমিত চলিয়া গেছ-স্মৃতিতে তােমার
প্রেম, সে আপন মনে গভীরে ঘুমায় ।
০৪

"
নিমেষিকা
আঁখির ছলনা বুঝিতে পারিনি আগে
দুদিকের ঘন আবরণ-আড়ে রাখিয়াছে কোন্
অবিরল অনুরাগে ;
পলক পাতের ফাঁকে,
ঠিকারিয়া যদি বাহিরিতে চায়,-চাপ দিয়া ঢেকে রাখে।
প্রতিপদে বাধা পাই’ অবিরত
ব্যাঘাত-ব্যাহত সিন্ধুর মত
হয় সে দুর্নিবার !
যতই নিমেষ, যতই পলক, তত প্রবলতা
দ্বিগুণিত হয় তার ;-
শুভ অবসরে করে অপসার আঁখির অত্যাচার।

রিক্তা
আজিকার গাঢ় নীলিমার তলে আঁখি,
অলস বিলাসে মরমের সনে পিরীত করিয়া
নিতেছিল ছবি আঁকি
;
যেখানে যা ভালাে সাজে,
তেমনি করিয়া সাজা’য়ে ভাবিল, ডুবিবে সে রূপ-মাঝে!
আহা! দেখে তার ছবির মাঝার,
হয় নাই রূপে প্রাণ-সঞ্চার
সফল পূর্ণতায় !
নিপুণগঠন পাষাণ প্রতিমা অন্তরদেব
সজাগ নাহিক’ তায়-
মরম ভাবের পসার ছাড়িয়া রূপ শুধু নাহি চায়।
আঁখির বাঁধিল মহা গােলােযােগ আজ !
মরমের সাথে রসের-ভাবের বােঝাপড়া নিয়ে
ভুলিল সে আন-কাজ?
নিমেষ-অলস চাহি,
ভাবিতেছিল সে, রূপের সহিত ভাবের সুবাদ নাহি ?
এই অবসরে অনুরাগ হাসি’
বিপুল পুলকে বাহিরিয়া আসি’
রূপে দিল মহাপ্রাণ!
বিভল বিবশ আঁখি ও মরম করিল আবেগে
ছবিরে সকল দান ;
ভাব, সে দেখাল, প্রিয়া নিমেষিকা বিশ্বে প্রকাশমান।

হাহাকার
ব্যর্থ যত বাসনার বিফল স্বপন মােহ
হৃদয়ের ছিন্ন তার করিয়া মিলিত,
কি গভীর শােকাচ্ছাসে মরমের তলদেশ
কোমল-করুণ-রাগে করে মুখরিত !
রম্য কোন্ জীবনের অস্ফুট আলােক টুকু
ক্ষীণ—ক্ষীণতর হয়ে স্মৃতির আঁধারে,
বেদনার অশ্রুপরে হয় সদা বিভাষিত,
জাগায় অব্যক্ত ব্যথা পরাণ-মাঝারে ।
সে সাধের আনন্দাশ্রু গিয়াছে মুছিয়া এবে,
বেদনার দরধারা রয়েছে ভরিয়া
কি যেন অকথ্য আলা নিয়তই জাগে প্রাণে
কি যে স্বপ্নসুখছবি গিয়াছে সরিয়া ।
কি যে মৌন বিভীষিকা ভাসিছে সুমুখে সদা-
কি যে আকুলতা প্রাণে আবেগ জাগায় ;
কি যেন ইন্ধনে আল হতাশার তীব্র শিখা
ছাই ভস্ম করে হৃদি বিষম প্রভায়।
মঙুল মুকুল দাম, পড়েছে ঝরিয়া ওগাে ।
উচ্ছাসের পূত কণ্ঠ হয়েছে নীরব ;
মাধুৰ্য জীবন্ত স্রোত, হায়রে ! শুকায়ে গেছে
কি যেন কি হয়ে গেছে অতুল বিভব!
;

সিন্ধুলীলা
রসময়, ভাবময় শুভ্রফেণচুড়
আকুল তটিনী ললাটে সাগর বেলায়,
শীতল অতল হৃদে তরঙ্গ প্রচুর,
প্রাণের প্রণয়-গীতি বাতাসে মিলায় !
সিন্ধু ছােটে মত্তগতি আপনার মনে,
ঝঙ্কারিয়া কবীণ সম্মােহি চৌদি ;
শুনায় উদাত্ত স্বরে বিশ্ববাসী জনে
আলাপি’ ভৈরব রাগে সাম-যজু-ঋক্ !
তটিনী মহত্ত্বে মূঢ়া, ত্যক্ত-আশা-সুখ,
ধীরে শ্রমক্লান্ত বাহু প্রসারি’ অবশ,
নীরব, পড়িল ঢলি’ ম্লান-শুষ্ক-মুখ,
লভিয়া অনন্ত-প্রেম-সমাধি-পরশ।
প্রেম ধ্যান সিদ্ধ সিন্ধু হেরি’ এতক্ষণে,
তুষিল তৃষিত হিয়া আকুল চুম্বনে !

•
রাগিনী
সহসা এমন বাজিয়া উঠিল
আমার হৃদয় সেতারে,
যাদু করি’ যেন সকল আমার--
এ কিএ নবীন গাথা রে !
মরম আমার সব পূরে গেল,
আনন্দ মাের উথলি উঠিল
বাহিরের জ্ঞান সকলি নাশিল
ধ্যানলােকে আনি’ রে-
এমন করিয়া বিমােহিত করে
একি এ রাগিনী রে।
জগতের সব অণু রেণু কণা
দেখি এ রাগিনী গাহিছে,
সকলের সুর এক হয়ে দেখি,
প্রণবে মিশিতে চাহিছে।
এই মহাসুর মাতাইয়া কবে
উদ্বেল হয়ে মিলাইয়া যাবে
এক তানে যাবে-এক ভাবে যাবে,
গৌরব মানি’ রে-
ক্ষীণকণ্ঠনিস্তা মাের
ক্ষীণা রাগিনী রে !

কবি নিৰ্ম্মল মেঘমুক্ত গগন ভরা যবে সুষমায়, কৌমুদী-ধারা-ধৌত ধরণী গৌরবে শােভাপায়, লতায় পাতায় অনুভূতি কত, কত উচ্ছল হাস্য, মৃদুল-উৰ্ম্মি-ক্ষোভিত সলিলে কত রঞ্জিত লাস্য, নেহারি এ শােভ কারাে মনে জাগে চিন্তন কত সূক্ষ্ম,- আপন কৰ্ম্মে বিঘ্ন ভাবিয়া কেহ পায় মনে দুঃখ ! ঝিরি ঝিরি যবে বহে সমীরণ, মাখিয়া কুসুম গন্ধ, প্রকৃতির সারা অঙ্গে বিকাশে পুলকশিহর মন্দ ; কুসুমিতা লতা কল্পনা-চোখে আঁকিয়া অযুত স্বৰ্গ, সুখ-হিন্দোলে আন্দোলি বুক ঢেলে দেয় ফুল-অর্থ ! এ শীত মলয়া পরশে কাহারাে জাগে মনে প্রিয়-সঙ্গ, ব্যাধি উপজিবে ভয় করি কেহ বসনে আবরে অঙ্গ। প্রকৃতির শােভা সকলের তরে বিধির মুক্ত দান- জোছােনা-মলয়া কবি করে না তাে, কবি গড়ে তুলে, প্রাণ !!

মানব জীবন
সুখস্বপ্নমােহমত, তন্ময়তা মানবের
ভেঙ্গে যায় সংসারের তীব্র-ফণি-গর্জনে
দূরে যায় হৃদয়ের নিরাবিল বিহ্বলতা—
ব্যর্থ তৃপ্তি আশে ছুটে, ভ্রান্ত স্বার্থ-অর্জনে।
মধু রাগিনীর ন্যায়, সুখ-আশা দুরে যায়
দুঃখপূর্ণ জীবনের রৌদ্র-ভেরী-বাদনে,
দাবাগ্নি-জ্বলিত বনে অর্ধদগ্ধ তরু মত,
পড়ে থাকে শুষ্ক স্মৃতি জন্ম দিতে বেদনে।
ভ্রান্ত কুরঙ্গের প্রায়, কৰ্ম্ম লক্ষ্য ভুলে যায়
মরু দগ্ধ জীবনের মরীচিকা-বিভ্রমে ;
শ্রান্ত মন আত্মহারা ছুটে যায় প্রাণপণে
শীতল অমৃত ভরা শান্তি তপঃ আশ্রমে।
সমুদ্র-কল্লোল যথা, স্পর্শিতে চরণ খানি,
বেগে ছুটে মুগ্ধ নর, পরিপূর্ণ অন্তরে ;
গগন দিগন্তে নামি’ কোলে তারে নিলে টানি
কৃতাৰ্থ পরাণ গায় প্রীতিপূর্ণ মন্তরে।

যাত্রী
আমি একা, আনমনা যেতাম বাহিয়া
লক্ষ্যহীন এ জীবন-তরী ; তুমি কেন
একই স্রোতে পা’লভরে আসিলে ভাসিয়া,
সাথী হলে সে নিরালা পথে ; তুমি কেন
নীরব সাধনা ভাঙ্গি, তন্ময়তা নাশি
বিক্ষিপ্ত করিলে মন, তরী পাশে আসি !
ধ্যান গেল, চাহি ফিরিয়া, কি সুন্দর!
দরিয়ার যাত্রী তুমি, এত মনােহর !

রিক্তা
অতৃপ্ত নয়ন মম সর্ব শক্তি দিয়া
তােমার ও মুখপানে চাহিয়া চাহিয়া,
শান্তি নাইপল নাই—দেখিয়া দেখিয়া,
বিভল হইয়া গেল ; পশ্চিম রাঙিয়া
যত রক্তবর্ণ মেঘ, ধীরে—অতি ধীরে,
স্মৃতিনিয়ে ছুটি’ছিল কোন্ স্বর্গ পুরে!
হিল্লোলিত, উচ্ছলিত যাইছে তটিনী
কোন্ সে অজানা দেশে, মােদের তরণী
শুধু ফেণপুঞ্জ তারে দিতেছে ঢালিয়া!
কতদূর চলে এমু দুজনে মিলিয়া,
গেয়ে কত সুখে-দুখের গান ; নিয়া
শুধু বুকভরা ভালােবাসা, তৃপ্ত হিয়া,
প্রাণের পাগল-করা টান ; কত আশা,
কতই আশ্বাস ! এই যে এ স্রোতে-ভাসা,
ভাবিলাম দেব-দয়া
সহসা গগন
ভরিল নিবিড় মেঘে ; প্রবল পবন
উন্মত্ত কম্পিত হয়ে তাণ্ডব হেলায়,
মূর্ত বিভীষিকা যেন আনিল ধরায় !
ছুটিল মােদের তরী ; কোথা কিছু নাই,
শুধু ঝঞ্চা, শুধু বাত্যা, যেদিকে তাকাই ;

রিক্তা
=
সহ শীকরকণা ঘন অন্ধকারে
বিশ্বেরে ঘেরিয়া আছে! আতঙ্কে তখন
খুজি তােমারে ব্যস্ত, শঙ্কিত নয়ন ;
একি দেখি! প্রিয় মাের! নাহি তুমি কাছে,
দূর দিগন্তের গাঢ় অন্ধকার মাঝে,
অপরূপ জ্যোতির্ময় মূৰ্ত্তি তব রাজে!
দেখিনু, যেতেছ তুমি তেমনি বাহিয়া—
ক্লান্তি হারা, চিন্তাহীন,
চিন্তাহীন, পূর্ণ হিয়া নিয়া !
বিপদ সম্ভমে যেন আসে নাই কাছে !
যা’ছিল তােমার, যেন তাই সব আছে !
আশায় মাতিল প্রাণ, প্রতিধ্বনি তুলি
‘কোথা তুমি প্রাণাধিক!’ ডাকিনু আকুলি
পশিল না সে আহ্বান, শ্রবণে তােমার,
তুমি অলস উদাস প্রাণে, দরিয়ার
কূল পানে, হির লক্ষ্য যেতেছ চলিয়া।
আমি বল, কি করি এখন! সব দিয়া
ফেলেছি তােমারে, ওগগা ও প্রাণের রাজা !
কোন্ অপরাধে বল, আমার এ সাজা ।
যাহা মাের প্রাণের পিয়াস, তুমি তাই
সাধনা আমার যাহা, তােমাতে তা পাই ।
তাই তােমা বাসিয়াছি ভালাে ! এই ভ্রম!
;

রিক্তা
এই দোষে সব নিয়া—যাহা ছিল মম,
অকূল জলধি মাঝে ফেলিয়া একেলা,
নিজপথে চলি গেলে বিপদের বেলা!
চমকে তরাসে কঁাদে ভীত প্রাণ মম ;
সুদূর গগনস্পশী পৰ্ব্বতের সম
উত্তুঙ্গ তরঙ্গরাশি আসে ভীমাকার,
ডুবাতে অভাগা মােরে অতলে অপার !
আর কেন—এস সখা, এস একবার
অঙ্গুলি-সঙ্কেতে, সব বিপদে আমার,
বিত্রস্ত করিয়া দাও! এস প্রিয়তম,
উজ্জ্বল জ্যোতিতে তব, তৃণ খণ্ড সম
ভস্ম করি ফেল সবে ; তেমনি আবার
করে লও রিক্ত মােরে চিত্র পূর্ণতার ।
ধায় বেগে শত ভীতি করিতে আঘাত
ক্ষুব্ধ মন, স্তব্ধ দেহ, আসে অবসাদ !

প্রার্থনা
দেখিতে দাও হে ভুবন-মােহন,
তােমারে নয়ন ভরিয়া ;
কৃপা করি লও হে মনােহরণ,
আমার সকল হরিয়া।
তােমার মােহিণী-রাগিণী-আলাপে
শ্রুতিযুগ দাও পূরিয়া ;
যা ধ্বনি সব নিথর নীরব
সে প্রণব রাগে মরিয়া !
পরশমাণিক-চরণ-পরশে
সােনা কর জ্যোতি ক্ষরিয়া,
চরণ-সরােজ-গন্ধে রাখিয়াে
নাসিকা পূর্ণ করিয়া !
রসনায় দাও শকতি, রহিতে
আরতির গানে মাতিয়া
প্রেম-গৌরব-মুগ্ধ-মানসে
আসন লহগাে পাতিয়া।

আকর্ষণ
ধীরে, অতি ধীরে, সােণার-স্বপন-ভরা তীরভূমি ছাড়ি
সিন্ধুর ঢেউ-বন্ধুর পথে অর্ণবযান
দিতে যায় যবে পাড়ি ;
প্রতিকূল-বায়ু-পরশে পতাকা তার,
শিহরিয়া চায়, পারাবার হতে পার,
ফিরে চেয়ে দেখে, নিস্ফল-ব্যথা, নিগূঢ়-আবেগে কঁপি ;
তেমনি, প্রতুল প্রিয়জন অবহেলি’
প্রণয়ের দৃঢ় বন্ধন ছিড়ে ফেলি’
করিতে গমন অশান্ত মন করে যেন দাপাদাপি,
ব্যথায় বক্ষ চাপি।

রিক্তা
কর্ম-বিপাকে ঘুরিফিরি যবে নব নব দেশে যাই,
যাদু-করে-লওয়া মাধুরিমা-শােভা নয়নের আগে
কত দেখি, সীমা নাই।
প্রকৃতির ফুল-মাধুৰ্য্য-পরাভবি’
সহজ-সরল সুন্দর যথা সবই,
দেখি আর দেখি, বিস্ময় একি! প্রাণ খুজে নাহি পাই।
ভাবি, এই শােভা-মাঝারে প্রভু আমার,
দাও প্রিয়জন, বুকে রাখি’ দেহভার,
শেষ আরামের নিঃশ্বাস ফেলি’ মরিয়া বাচিয়া যাই।
আর কিছু নাহি চাই।
পথিক যেমন চলিতে চলিতে নিরখি’ পূবাকাশে,
তিমির-তুলিকা-অঙ্কিত কালি গাঢ় হতে যেন
গাঢ়তর হয়ে আসে !
উন্মনা শুধু পিছনে ফিরিয়া চায়,
পশ্চিমাকাশে যদি সে দেখিতে পায়,
ক্ষীণায়মান এক রশ্মি তখনাে মৃদুজ্যোতি পরকাশে !
তেমনি, সুখের দিনগুলি অবসানে,
আঁধারের ছায়া ঘনাইয়া আসে প্রাণে,
ব্যাকুল নয়নে ফিরে চাই মােরা, যা-গেছে-তা পা’-আশে,
বিফল বিশ্বাসে।

দয়াময়
ওগাে। শত প্রলােভনে দিশেহারা মাের
জাগে নি কখনাে মনে,
আপনার হয়ে রয়েছ যে তুমি,
মৰ্ম্মের মাঝখানে,
নিভৃতে নীরবে জুড়িয়া বসেছ
ক্ষুদ্র হৃদয় খানি,
পরাণের খোঁজ লই নি কখনাে
তাই কিছু নাহি জানি !
বাহির জগতে, স্বার্থ-সাধনে
যখন হইনু সারা-
ব্যথার জালায় ডাকিলে তােমারে
অন্তরে দিলে সাড়া ।
ওগাে প্রত্যয় দিয়ে, চেতনারে মাের
বেশ করে ঢেকে দাও--
মরমের মাঝে যাহা কিছু আছে,
তােমাতে মিশায়ে নাও।
ওগাে ! বিশ্বের সনে বেঁধে লও মােরে
জড়ায়ে প্রীতির ভাের ;
বিশ্বরূপের প্রেমময় ছবি
চিত্তে জাগুক মাের।

কামনা
;
সুখময় শব্দময় কোলাহল কোলে,
ক্ষীণ কণ্ঠে চাহি শুধু আত্মবলিদান ;
আকুলতা-দীর্ঘশ্বাস মিশাতে অনিলে,
চাহি শুধু ভুলিবারে তীব্র ভেদ জ্ঞান !
সুখের উন্মার্গগামী তীব্রতা ছাড়িয়া,
চাহি দুঃখে নির্ভরতা-পরিপূর্ণ মন,
ধন মান আভিজাত্য-সব তেয়াগিয়া,
যাচি শুধু ভিখারীর পবিত্র জীবন ।
জ্ঞানের দাম্ভিক স্বার্থ সুদুরে ফেলিয়া,
চাহি আমি প্রেমময় সরল অন্তর ;
বিলাসের মিথ্যা তৃপ্তি দূরে নিক্ষেপিয়া,
চাহি আমি করমের কঠিন নিগড় ।
চাহি শুধু বিপদের কঠোর আহবান,
আর চাহি, প্রাণ মাঝে মুক্ত আত্মজ্ঞান।

প্রেমবদ্ধ
অয়ি ব্যর্থ-আকাঙ্ক্ষিতা, অয়ি মাের রাণি ?
কি মহা রহস্য নিয়ে আসিলে না জানি ।
জীবনের নিরুদ্বেগ নিৰ্ম্মল প্রভাত ;
তখনাে কর নি ভাব, রশ্মিরেখাপাত
প্রাণের তারল্যে মাের ; ইন্দ্রধনুরাগে
জাগে নি সৌন্দৰ্য কারাে, মুগ্ম-আঁখি-আগে ।

-
–
রিক্তা
সেই সে অবুঝ কালে, কে তুমি মােহিনী,
অস্ফুট প্রেমের দীর্ঘ শঙ্কিত কাহিনী,
কহিতে আমার কানে,-কোন্ স্বপ্নদেশে
রূপ-প্রেম-সমাহিত অভিনব বেশে,
মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করি’ নামিলে ধরায়,
বাজিল মঙ্গল শঙ্খ, বরিতে ত্বরায় !
দেখিলাম তােমা,—কি সে, কহিতে না পারি,
শিশুর আঁখির ভাষা ।-কে কবে বিচারি’
আছে কি না আছে তাহে গুপ্ত ভালােবাসা,
নির্ভরতা, নিবেদন, আকুল পিয়াসা !
জানি না ! তবুও কোন্ অপার্থিব বাণী,
গুনাল আমার কানে,-“এই সেই প্রাণী
যাহা বুঝি চাও তুমি,-যে চাহে তােমায়,
লহ গাে বরিয়া এবে, প্রেম-গরিমায়।”
তাই কি! প্রেমিকা মাের! কে কবে আমারে!
অচেনায় আকর্ষণ জন্মিতে কি পারে।
কে কবে আমারে,—জীব জনম অবধি,
চাহে কি না অন্যপ্রাণ মুগ্ধ নিরবধি।
দার্শনিক নহি,-নাহি জানি গবেষণা--
এই জানি, তুমি সিদ্ধিপ্রণয় সাধনা !
এই জানি, তুমি মহা রহস্য-বিজ্ঞান
জীবনের-পরপারে-প্রেমবদ্ধ প্রাণ ।
-

রিক্তা
বুঝি না বিধির লীলা।—নিয়তি আমার,
পুঞ্জীভূত করি’ কোন্ মহা হাহাকার,
করেছে সৃজন মােরে ;-সেই শুধু জানে,
শিশিরাক্ত পদ্মসম, যাহার বিধানে
প্রেম হয় বিকশিত পূর্ণ নিরমল
পরিষিক্ত করে যবে স্বচ্ছ আঁখিজল ।
–
আজ তুমি বহুদূরে ;
রাজেন্দ্র-ভবনে
অচঞ্চল লক্ষ্মীসম, বসন্ত পবনে
চিরফুলগন্ধ সম,-কোন্ অজানায়,
বদ্ধ করি রাখিয়াছে কে যেন তােমায় ।
দূর দূরান্তর পারে, বিষন্নতা পাছে,
একমূখী প্রেম সেই এখনও কি আছে ?
এখনও কি বাসনার সমাধির পরে
বিন্দু বিন্দু অবিরল অশ্রুকণা ঝরে !
এখনও কি সংসারের লুব্ধ প্ররােচনা,
ব্যর্থ করে নাই তব সকল সাধনা !
এখনও কি সাধি যদি-“ভুলে যাও”—বলে
চূর্ণ হয়ে যাবে তব হৃদয় তা হলে ।
থাক তবে মহাধ্যানে, সাধিব না বাদ ;--
ভক্ত হৃদি নাহি জানে ক্ষুদ্র অবসাদ ।

নাম-গান নন্দিত করি’ নন্দ-যশােনা, বিমােহি’ বৃন্দাবন শােয়, নন্দনবন গড়িল মাধব, কালিন্দি-কূলে—তমাল-ছায় ! আজি সেই কেলিকদম্ব-মূলে ত্রিভঙ্গছবি শােভে না আর, ব্রজের কুঞ্জে ব্ৰজগােপালের মুরলী গাহে না নাম রাধার হরি বল আজি হরি বল সবে, নামগান সনে মিশায়ে প্রাণ । আবার বাজিবে মােহন বাঁশরী, আবার যমুনা ব’বে উজান । কে প্রেমে মলায়ে ভক্তহৃদয় করিবে ধরণী সে রাসময়, কে গােবর্ধন করিয়া ধারণ, ভয়ভীতজনে দিবে অভয় ! ক্ষীর ননী নিয়া কাঁদিলে বসিয়া অধীর-আভীর-জননী-প্রাণ- দুলায়ে মােহন চুড়া কে ছুটিবে, জাগায়ে রাখাল-সাথীর মান। কে শুনাৰে গীতা, ভাগবত গাথা; মধুর তত্ত্ব-অমৃতাসার কে তুলি’ আনিবে মন্থিত করি’ বেদ-বেদাঙ্গ-সাগর অপার। ভক্তির সনে জ্ঞান ও কর্ম সাধনা শিক্ষা কে দিবে আর- বিপুলে বিরাট পুরুষ নেহারি গলিবে ভক্ত-নয়নে ধার । বৃকভাসুতা মাধবীর মূলে অপেক্ষা করি নাহিক আর, মননামাঝে গুরু ঝঙ্কার তুলি’ বাশরীর ধ্বনি বাজে না তার ; করে না দারুণ অভিমান, চাপি’ মুখে হাসি, চোখে অযুত ঠাম । ‘পদপল্লবমুদারং দেহি’-বলিয়া দিতে আসে না শ্যাম। ৭৪

হিন্দু-ললনা
উষার মতন লাবণ্যভরা উজল আননে সহজ ভান,
সারি সারি কাটি ‘পুণ্যিপুকুর’, ব্রত-পবিত্র বালিক-প্রাণ,
সারা হৃদয়ের স্নেহ নিরমল,
আদর, যত্ন,—যা-কিছু, সকল
কবিতাময়ী সে, পুতুলে সপেছে, বিশ্ব তাহাতে ফলিত তার ।
ধন্য ধন্য হিন্দুললনা পূর্ণ মূরতি মধুরতার,
অঙ্গে যাহার লক্ষ্মীর ছটা, কণ্ঠে বসতি ভারতী মার।
৭৫

রিক্তা
কিশােরী মােহিনী, মেঘাল দিনের স্থলকমলিনী-রূপের সার,
সরলতা পরে সরমের আভা, সঙ্কোচে-রাঙা কপােল তার !
কবির প্রাণের কবিতার মত,
সকলি তাহার অনুভব-গত,
অযুত প্রশ্ন উত্তরে-বাণী, অফুট চকিত মৃদু সেতার !
ধন্য ধন্য হিন্দুললনা, পূর্ণ মূরতি মধুরতার,
অঙ্গে যাহার লক্ষ্মীর ছটা, কণ্ঠে বসতি ভারতী মার।
যুবতীর প্রাণে সীতা-সাবিত্রী আদর্শ সদা বিরাজমান,
তেত্রিশ-কোটি দেবপূজা তার, স্বামীর রাতুল চরণ ধ্যান!
প্রণয়ে পত্নী, আদরে ভগিনী,
স্নেহে বিলুলিতা জননীরূপিনী
সেবা, মাতৃত্ব, প্রেম ও পুণ্য, একের মাঝারে বিকাশ তার
ধন্য ধন্য হিন্দুললনা, পূর্ণ মূরতি মধুরতার,
অঙ্গে যাহার লক্ষ্মীর ছটা, কণ্ঠে বসতি ভারতী মার।
প্রবীণার প্রেমে কত গভীরতা, জগতে তৃপ্তি যেন না পায়,
অনন্ত ধরা ছাড়িয়া কিযে রে অনন্ত আছে, সে দিকে ধায় ;
সে যেন ধরার, ধরা যেন তার,
নয়নে উথলে কি স্নেহ উদার,
বুকের ছায়ায় ঢাকিবে সে যেন, জগতের যত বিষাদ-ভার।
ধন্য ধন্য হিন্দুললনা পূর্ণ মূরতি মধুর তার,
অঙ্গে যাহার লক্ষ্মীর ছটা, কঠে বসতি ভারতী মার।
৭৬

রিক্তা
সধবা, তাহার সিথির সিন্দুর, দেবতার পূতবিভূতি-দান
হাতের সুগােল শাখায় নিহিত পুণ্য বিমল সরল প্রাণ,
লাল-পাড়-দেওয়া-সাড়ী-অঞ্চলে
শান্তির হাওয়া উথলিয়া চলে,
বিভ্রমহীন আনত আঁখিতে পুঞ্জিত করা সুষমাধার ।
ধন্য ধন্য হিন্দুললনা, পূর্ণ মূরতি মধুরতার,
অঙ্গে যাহার লক্ষ্মীর ছটা, কণ্ঠে বসতি ভারতী মার।
জননী মধুর পীযূষের সাথে তনয়েরে করে শকতি দান,
আশায়, গরবে, শিখায় তাহারে, দেশের গরিমা, জাতির মান,
শিখায়, জগতে যত কিছু আছে,
সকলি
তুচ্ছ
জননীর কাছে,
স্বধৰ্ম্ম-তরে বীরব্রত সাধি জীবন-নিধন ত্রিদিব তার।
ধন্য ধন্য হিন্দুললনা পূর্ণ মূরতি মধুরতার,
অঙ্গে যাহার লক্ষ্মীর ছটা, কণ্ঠে বসতি.ভারতি মার।
বিধবা, স্নিগ্ধ সংযমে-ভরা শান্ত প্রতিমা কঠোরতার
সংসারে থাকি’ সংসার ছাড়া, বিপুলে-বিছানাে হৃদয় তার ;
সিন্ধুর মত মুক্ত প্রবাহে,
প্রেম সেবা দিয়ে ভাসাইতে চাহে ;
কাব্যের মত, পুণ্যের গানে জীবন্ত করে প্রাণের তার ।
ধন্য ধন্য হিন্দুললনা পূর্ণ মূরতি মধুরতার
অঙ্গে যাহার লক্ষ্মীর ছটা, কণ্ঠে বসতি ভারতী মার।
৭৭

বেদনায় ছিড়ে গেছে জগতের মরম-বাঁধন, সুরে নাই সে মধুঝঙ্কার । প্রাণহীন বীণা আজি নীরব-নিথর, সুর বাঁধা ঘুচেছে তাহার । উদ্বেলিত হৃদয়ের পরতে পরতে শ্মশানের ছবি আঁকা সার, লক্ষ্যহীন, আশাহীন, অন্ধকার-মাঝে জ্বলে শুধু চিতার অঙ্গার ! ভীম যাতনার তরে একটু করুণা সেথা নাই,--প্রশান্ত তরল সমবেদনার অাখি-চিরে-ঝরে-পড়া এক ফোঁটা নাই অশ্রুজল । শেষ জাগে প্রভাতের ভীষণ স্বপন, শেষ আজ মরম-উচ্ছাস, সব শেষ-সুখ, শান্তি, প্রেম, ভালােবাসা চিতাভম্মে সবার প্রকাশ। সেই সে শেষের মাঝে দীপ্ত জাগে শুধু গুটিকত অক্ষরের রেখা- “কালাে এই জগতের একমাত্র দান- আলাে নহে বিধাতার লেখা ?” ৭৮ সমাপ্তি - নই- - = কল্পনার রম্য মােহে গুপ্ত বৃত্তিচয়, উচ্ছসি’ অশান্ত মােরে, যবে করি’ লয়, রচি যত তৃপ্তি-মরীচিকা, শান্ত করি হৃদয়ের ; মুগ্ধ প্রাণে ক্ষণেক পাসরি বাহিরের সমুদয় ! এ বিশ্বসংসার সত্বরজতম,-ব্যোম, বেলা, পারাবার,- আপনার মাঝে, একে একে দেখে লই, চিনে লই সব ; ভাবি, আমি তুচ্ছ আছে প্রাণ, আছে কৰ্ম্ম, আছে স্বাধীনতা, আছে সুবিস্তীর্ণ ক্ষেত্ৰ-নগ্ন মধুরতা ; আছে সে মহান্‌, আছে সেই মহীয়ান্ ; আছে পূর্ণ একত্বের চিত্র গরীয়ান্। সুখ, স্তুপাকার সুখ ; মধুর এমন, কাটে চুপি মােহময় জীবন-স্বপন। মনে করি, থাক্‌ বিশ্ব অনিমিখ চাহি’- তৃপ্ত আমি, প্রিয় সনে, যাই চলি বাহি’ তরণী আমার ; নিয়া শুধু ভালােবাসা, ফুটা’য়ে মানব-মনে শত শুভ্র আশা। সংসার বিষাক্ত হয়ে দুপাশে দাড়াক- জীবন আপন তেজে পথ করে যাক। সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rikta

Author
Mukhopadhyay,dhirendranath
Title
Rikta
File name
Rikta
Text
OCR done
Citation
1915
Published
2009/09/6
Publisher
Satish Chandra Nag,khulna
Language
Sanskrit
Pages
99
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Manasi
DLI number
513160
Barcode
4990010020163.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
AIpYr3usRH5
Download PDF

Rikta