Bally Sadharan Granthagar

Madhumati Ed. 2nd

Chattopadhyay, Sri Purnachandra · 2009/08/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মধুমতী।
উপন্যাস।
( বঙ্গদর্শনােত)
শ্রীপূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত।
[ দ্বিতীয় সংস্করণ। ]
কলিকাতা ;
২০১নং কর্ণওয়াসিস্ ষ্ট্রীট, “বেঙ্গল মেডিকেলাইব্রেরী” হইতে
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
১৩০৮, কার্তিক।

Calcutta:
PRINTED BY K. B. Dass, AT THE “VICTORIA PRESS:
2, GOABAGAN STREET.

মধুমতী।
উপন্যাস
প্রথম পরিচ্ছেদ।
কয় বৎসর পূর্বে তটপথে ঢাকা হইতে কলিকাতায়
যাতায়াত করিতে, মহম্মদপুর নামক ক্ষুদ্র গ্রামের নীচে,
মধুমতীনাম্নী তরঙ্গময়ী নদী পার হইতে হইত। তাহার
নামান্তর “এলেন খালি।”
একদা নিদাঘের প্রচণ্ড ঝটিকাবসানে রাত্রিশেষে
মধুমতীর উপকূলে সেই গ্রামে একখানি শিবিকা
থামিল। ডাকের বেহারারা প্রথামত, শিবিকা রাখিয়া,
বশিষ লইয়া প্রস্থান করিল। ভিতর হইতে অতি
সুন্দর পঞ্চবিংশতিবর্ষীয় এক যুবা পুরুষ নির্গত হইয়া,
ইতস্ততঃ অন্য বাহকদিগের অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন।

মধুমতী। কিন্তু কাহাকেও দেখিতে না পাইয়া কিঞ্চিৎ দূরে, গেলেন, এবং নিকটস্থ একখানি ভগ্ন কুটীরের দ্বারে আঘাত করিলেন। কুটীরবাসী জিজ্ঞাসা করিল, “কে দ্বার ঠেলে ?” যুবক উত্তর করিলেন, “আমি পথিক, এই গ্রামে একদল ডাকের বেহারা থাকিবার কথা ছিল, তাহারা কোথায় বলিতে পার ?” কুটীরবাসী কহিল, “তাহারা রাত দশটা পর্যন্ত এই খানে ছিল, কিন্তু ঝড় আসাতে চলিয়া গিয়াছে।” যুবক নিরাশ হইয়া প্রত্যাবর্তন করিলেন। রজনী দ্বিতীয় প্রহর, অনন্ত নীলাকাশে পূর্ণচন্দ্র হাসিতেছে; এবং বিশাল তরঙ্গিণী মধুমতীর হৃদয়ে ঝিকমিক করিয়া তৎপ্রতিবিম্ব নাচিতেছে। সুশীতল নৈদাঘ বায়ু মন্দ মন্দ বহিতেছিল । পৃথিবী স্থির, সুশীতল ; পশু পক্ষী, গ্রামবাসী, সক- লেই নীরব ; কেবল কোথাও মনুষ্যপদশব্দে উত্তেজিত কুকুরের রব, আর কখন কখন অতিদূরনিঃসৃত গ্রাম্য প্রহরীদিগের চীৎকারধ্বনি শুনা যাইতেছিল। যুবক স্বভাবের সৌন্দর্য্য অবলােকনে অন্যমনা হইয়া মধু- মতীর তটে পদচারণ করতেছিলেন ;হঠাৎ চমৎ- কৃত হইয়া দাড়াইলেন। দেখিলেন, তাঁহার সম্মুখে জলের অনতিদূরে একটি শ্বেত পদার্থ। পদার্থটি মৃত মনুষ্যদেহ। তাহার অনতিদূরে দুই একখানি ভগ্নকাষ্ঠ ও একখানি নৌকার হাল। বুঝিলেন যে, নিশারম্ভে যে

প্রবল
ঝটিকা
বয়ঃক্রম
মধুমতী।
কা হইয়াছিল, তদ্বারা কোন নৌকা জলমগ্ন
হইয়ছিল এবং এই হতভাগ্য ব্যক্তি তাহার একজন
আরােহী।
যুবক, রাজধানী-সন্নিকটবর্তী—লা গ্রামের একজন
সৌষ্ঠবান্বিত ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী কায়স্থের পুত্র ; তাহার
নাম করালীপ্রসন্ন। তিনি বিংশতি বৎসর
পৰ্যন্ত ইংরাজি বিদ্যাভ্যাস করিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাধি প্রাপ্ত হইয়া, মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা-
বিদ্যা শিক্ষায় প্রবৃত্ত হন।
এবং তথায় যথারীতি
অধ্যয়ন করিয়া, গৌরবের সহিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হইয়া, পূর্ব বাঙ্গালায় এক প্রধান চিকিৎসকের পদে
অভিষিক্ত হন।
অদ্য ডাকযােগে কৰ্ম্মস্থানে যাইতে-
ছিলেন। পথিমধ্যে এই আড্ডায় বাহক না পাওয়াতে
এই অবস্থায় পতিত হইয়াছিলেন।
করালীপ্রসন্ন ভাবিলেন, যদি এই ব্যক্তি এরাত্রের
ঝড়ে জলমগ্ন হইয়া থাকে, তবে এখনও চেষ্টা
করিলে, ইহাকে পুনর্জীবিত করা যাইতে পারে।
করালীপ্রসন্ন মৃতদেহের নিকট যাইয়া বিশেষ করিয়া
নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। এবং দেখিলেন যে,
দ্বাবিংশতিবৎসরবয়স্ক
পরমা সুন্দরীর দেহ। দেহ
যেন পৃথিবীর রিপুবর্জিত হইয়া,
স্বগীয় কান্তি ধারণ
করিয়াছে। এবং চন্দ্রালােকে বােধ হইল, যেন মৃত

মধুমতী।
রমণীর ওষ্ঠে অপূর্ব হাসি শশাভা পাইতেছে। করালী-
প্রসন্ন অনেকক্ষণ অবধি অনন্যমনে শব নিরীক্ষণ করিতে
লাগিলেন। করালী অনেক সুন্দরী দেখিয়াছিলেন,
কিন্তু তাহার বােধ হইল যেন, এমত সুন্দরী কখন
তাহার নয়নগােচর হয় নাই। করালী নিঃসঙ্কোচে
মৃত রমণীর দেহস্পর্শ করিলেন; এবং তাহার হত
পদাদি চালনা ও অন্যান্য কৌশল দ্বারা দেহ হইতে
জল নির্গত করাইলেন, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত এক
ফোটা জল পড়িল, ততক্ষণ চেষ্টার ত্রুটি করিলে
তৎপরে মৃত দেহ ভূমিতে রাখিয়া শিবিক
হইতে কোনও দ্ৰব পদার্থ ও একখানি ফ্লালেন বস্তু
লইয়া গেলেন। এবং ঐ বস্ত্র দ্বারা অনেকক্ষণ পর্যন্ত
মৃত রমণীর হস্তপদাদি ঘর্ষণ করিতে লাগিলেন
তৎপরে দ্রবপদার্থ তাহার ওষ্ঠভেদ করিয়া ঢালিলেন
কিন্তু পদার্থ তৎক্ষণাৎ দুই কশ দিয়া পড়িয়া গেল, গলাধঃ
কৃত হইল না। ইত্যবসরে, করালী মৃতদেহ কৰ্দ
হইতে পরিষ্কার করিয়া, ঘাসের উপর রাখিলেন।
করালী দুই তিন ঘণ্টা পর্যন্ত চেষ্টা করিলেন,
কিন্তু কোন মতেই কামিনীকে পুনর্জীবিত করিতে
পারিলেন না। শেষে হতাশ্বাস হইয়া, শিবিকায় প্রত্যা-
গমন করিলেন, এবং দ্বার রুদ্ধ করিয়া নিদ্রা যাইবার
চেষ্টা করিলেন; কিন্তু নিদ্ৰা আসিল না। সেই নদী
;

মধুমতী সৈকতখায়িনী অপূর্ব মহিমান্বিতা মৃত রমণীর মুখমণ্ডল মনে পড়িতে লাগিল। করালী অন্যদিকে মন ফিরাইতে যত্ন করিলেন, কিন্তু সফল হইলেন না। তিনি শিবিকার দ্বারােদ্ঘাটন করিলেন; এবং সহসা তাহার বােধ হইল, যেন নিদাদের যন্ত্রণায় নৈশ সমীরণ সেবনার্থ, কোনও ব্যক্তি চন্দ্রালােকে মধুমতীতীরে শয়ন করিয়া আছে। সেই হতভাগিনী সুন্দরী ! যাহাকে প্রাসাদোপরি সুকুমার পুশয্যায় আদরে শয়ন করাইয়া, যত্নে ব্যজন করিয়া, মধুর সঙ্গীতে নিদ্রিত করিয়া, সৌন্দৰ্যমুগ্ধ স্বামীর আকাঙ্ক্ষা --পরিতপ্ত হইত না, এখন সে নদীসৈকতে, কর্দম- শয্যায় পড়িয়া আছে ! করালী অল্পবয়স্ক, মৃত সুন্দ- রীর জন্য তাঁহার চক্ষে এক ফোটা জল পড়িল। করালী অন্যমনস্ক হইবার জন্য শিবিকার ভিতরে আলাে জ্বালিয়া, একখান পুস্তক পড়িতে চেষ্টা করিলেন, অবশেষে নিদ্রার আবির্ভাব হইল। আলাে নির্বাণ করিয়া শয়ন করিলেন, কিন্তু নিদ্রা কষ্ট- জনক হইল। করালী নিদ্রায় স্বপ্ন দেখিলেন, যেন সেই মৃত কামিনী শ্মশানশয্যা ত্যাগ করিয়া, শিবিকার দ্বারােদ্ঘাটন পূর্বক, তাহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে এবং প্রেমপরিপূরিত লােচনে তাহার প্রতি চাহিয়া কি বলিতেছে। করালী চমকিয়া উঠিলেন, এবং শিবিকার দ্বার

আর নদী
মধুমতী।
খােলা দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন, কিন্তু কিছুই কুদখিতে
পাইলেন না। মধুমতীর তটে যে স্থলে মৃতদেহ রাখিয়া-
ছিলেন, সেইদিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন। কিন্তু আশ্চর্য্য!
সে স্থলে শব নাই। চকিতের ন্যায় চতুর্দিকে দৃষ্টি
নিক্ষেপ করিলেন, কোথাও কিছু দেখিতে পাইলেন না।
যামিনী প্রায় অবসন্না হইয়াছে। চন্দ্র অস্তগতথায়।
পুর্বদিক ঈযৎ পরিস্কার হইয়াছে। বিহঙ্গমকুল কল
কল রব করিয়া দিদিগন্তে যাইতেছে ।
সূতী উষার খরতর সমীরণে চঞ্চল হইয়া কল
কল রব করিতেছে। করালী ইতস্ততঃ দেখিতে দেখিতে
মধুমতীর কূলের দিকে চলিলেন ; কিন্তু কিছুই
দেখিতে পাইলেন না। করালী একবার মনে ভাবি-
লেন, শৃগাল কুকুরে আহারের নিমিত্ত কোনও বনে শর
লইয়া গিয়াছে। এই স্থির করিয়া শিবিকায় প্রত্যা-
বন করিলেন। শিবিকার নিকট আসিয়া তাহার
তার পা উঠিল না, শরীর রােমাঞ্চিত হইল, বুদ্ধি লােপ
পাইল। মৃত-রমণীদেহ নদীকূলশয্যা ত্যাগ করিয়া, করা-
লীর শিবিকা-পার্শ্বে শয়ন করিয়া আছে ।
করালী প্রসন্ন অনেকক্ষণ প্রস্তরবৎ দাড়াইয়া রহি-
একি ! কেহ শব তুলিয়া এখানে ফেলিয়া
গেল ? না পৈশাচ ধৰ্ম প্রমাণীকৃত করিয়া শব এখানে
আপনি আসিয়াছে ?
;
৪
লন।

. । মধুমতী । স্থির বুদ্ধির নিকট কোনও ভ্রম থাকে না। করালী শবের প্রকোষ্ঠে অঙ্গুলি অর্পণ করিয়া দেখিলেন, জীবনস্রোতঃ বহিতেছে। নিশ্বাসাদি পরীক্ষা করিলেন, দেখিলেন, এ শব নহে; সুন্দরী জীবিত। কিন্তু নিদ্রিত। অথবা মৃচ্ছিতা। করালী এখন বুঝিলেন যে, যুবতী তাহার চিকিৎসা-প্রভাবে পুনর্জীবিত হইয়া শিবিকা পর্যন্ত হাসিয়াছিলেন । এবং তাহারই দ্বারা শিকার দ্বারোদঘাটন হইয়াছিল । পরে তিনি ক্লান্ত হইয়! নৃসিহত হইয়া থাকিবেন। করালী ধরে ধরে যুবতীকে শিবিকার ভিতর ৮ রান। গ্রামবাসী জনৈক ব্যক্তিকে পুরস্কার হকার করিয়া, ততি স্বরায় সৈয়দপুরে যাইবার একখানি পানসী ভাড়া করিলেন; বাহক আনাইয়া, পালকী সহিত যুবতীকে নৌকায় তুলিতেন, এবং একটি কাম- রায় আপনি স্বয়ং শয্যরচনা করিয়া অতিযত্নে রম- ণীকে উহাতে স্থগিত করিয়া, অনেক কৌশলে মূচ্ছ- ভঙ্গ করিলেন। দিনমণির উদয় পৃথিবী জ্যোতিৰ্ম্ময়ী হইল, সঙ্গে সঙ্গে করালীপ্রসন্নের হৃদয় জ্যোতির্ময় হইল। যে রমণীর মৃতদেহ দেখিয়া অশ্রু- পাত করিয়াছিলেন, এক্ষণে সেই রমণী তাহারই যত্নে পুনর্জীবিত হইয়া, চক্ষুরুন্মীলন করিল। করালীর বােধ ছিল যে, যুবতী অপরিচিত স্থানে অপরিচিত হইল, ; মধুমতী। ব্যক্তি দেখিয়া ভয় পাইবেন, কিন্তু তাহার কিছু চিহ্ন দেখিলেন না। যুবতী চৈতন্য পাইয়া কিছু খাইতে চাহিলেন। করালী তাহার পাথেয় খাদ্য দ্রব্য হইতে কিছু খাইতে দিলেন। রমণী আহার করিয়া নিদ্রাভিভূত হইলেন; ইত্যবসরে করালী ইতিকৰ্তব্যতা বিবেচনা করিতে লাগিলেন। যুবতী যে সধবা নহে, তাহা তিনি। তাহার অলঙ্কারবিহীন হস্ত দেখিয়া স্থির করিয়াছিলেন। যুবতী কে, কাহার কন্যা, কোথায় নিবাস, কেমন করিয়াই বা তঁাহাকে বাটী পাঠাইবেন, আর কি প্রকারে পরিচয় জিজ্ঞাসা করিবেন এই সকল ভাবিতে- ছিলেন, এশত সময়ে রমণীর নিদ্রাভঙ্গ , হইল। করালী জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখন কেমন আছ ?” যুবতী কোনও উত্তর না দিয়া উঠিয়া বসিল এবং আপনার তাঞ্চল লইয়া ক্রীড়া করিতে লাগিল । ক্রমে অস্ফুট স্বরে গীতােদ্যম করিতে প্রবৃত্ত হইল। অব্যক্তনাদী কলবিহঙ্গমবৎ কণ্ঠ ধ্বনিত হইল, কিন্তু অর্থযুক্ত কোনও বাক্য নির্গত হইল না—যেন গীত মনে পড়িল না। করালী দেখিলেন, মুখের ভাব অজ্ঞান বালিকার ন্যায়। দৃষ্টির স্থিরতা নাই। স্খলিত বসন সাবধান করিবার ইচ্ছা নাই। সর্বনাশ! এ কি পাগল? করালী পুনরপি জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কাহার কন্যা ?” রমণী বিনা বাক্যে তাহার । অঙ্গ- মধুমতী। প্রতি চাহিয়া রহিল। “তােমার নাম কি ?” তথাপি কোনও উত্তর পাইলেন না। তৎপরে কিছু খাদ্য সামগ্রী লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “খাবে ?” রমণী বালি- কার ন্যায় হাস্য করিয়া খাদ্য লইয়া আহার করিল। করালী মাথায় হাত দিয়া বসিলেন, একটি উন্মাদিনী তাঁহার স্কন্ধে পড়িল। রমণীর পূৰ্ব্বস্মৃতি লোপ পাইয়াছে, সুতরাং তাহার আত্মীয় স্বজনের অনুসন্ধানের সম্ভাবনা নাই। কিন্তু তিনি কি প্রকারে অপরিচিতা, বুদ্ধিহীনা রমণীকে সমভিব্যাহারে লইয়া বেড়ান। এই সকল চিন্তায় তিনিও ক্ষিপ্তের ন্যায় হইলেন। করালী বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল, এবং স্থিরপ্রতিজ্ঞ। সহসা কোনও বিষয়ের মীমাংসা করিতে ক্ষমবান্ ছিলেন। তিনি এক্ষণে স্থির করিলেন যে, যুবতী বুদ্ধিহীনা হউক বা বুদ্ধিমতী হউক, যখন তাহার আত্মীয় স্বজনের অনুসন্ধান পাওয়া যাই- তেছে না, তখন তাহাকে আশ্রয় দেওয়ায় কোনও দোষ নাই, বরং কর্তব্য কাৰ্য্য। অতএব যুবতীকে সমভি- ব্যাহারে লইয়া যাইবার মানসে, নিকটস্থ গ্রাম হইতে একটি দাসী আনাইয়া তাহার পরিচৰ্যার্থ নিযুক্ত করি- লেন। করালী পুনর্জীবিতা রমণীর নামকরণ করি- লেন। মধুমতী-নদীতীরে তাহাকে কুড়াইয়া পাইয়াছেন, অতএব তাহার নাম দিলেন “মধুমতী।”

মধুমতী। করালীপ্রসন্ন মধুমতীকে সমভিব্যাহারে লইয়, কৰ্ম্ম- স্থানে গেলেন, এবং অতি যত্নে লালন পালন করতে লাগিলেন। মধুমতীও, বালিকা যেমন মাতার অনুরক্ত। হয়, সেইরূপ করালীর অনুরক্ত হইলেন। যতক্ষণ তিনি বাসায় থাকিতেন, ততক্ষণ মধুমতী তাহার সঙ্গ ছাড়িতেন না। হয় তাহার কেতাব পত্র লইয়া, নতুবা অন্য কোনও দ্রব্য লইয়া, তাহার সম্মুখে বসিয়া ক্রীড়া করিতেন। এই প্রকারে তিন মাস গেল। ক্রমে মধুমতীর মুখের ভাবান্তর হইতে লাগিল। যখন করালীকে দেখিতে পাইতেন, তখন বালিকা-মূৰ্ত্তি পরিবর্তিত হইয়া মুখমণ্ডলে যৌবনােপযােগী ভাবের সঞ্চার হইতে থাকিত। এইরূপে তাহার বুদ্ধিস্ফুৰ্ত্তি হইতে লাগিল। যেমন বালিকাদিগের দিনে দিনে, মাসে মাসে, বর্ষে বর্ষে, ফুর্তি হইয়া থাকে, সেপ্রকারে নহে। যেমন শুষ্ক পল্লব- রাশিমধ্যে অগ্নি রাখিয়া ফুৎকার দিলে অগ্নি একবারে প্রজ্বলিত হয়, এ সেই প্রকার। অন্যান্য স্ত্রীলােক- দিগের বুদ্ধির ন্যায় বুদ্ধি মধুমতী পুনঃপ্রাপ্তা হইলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ পূর্বস্মৃতি ফিরিয়া পাইলেন না। তিনি জলমগ্ন হইবার পূর্বে কে ছিলেন, তাহা আর মনে পড়িল না।

মধুমতী।
১১
কলী একদিন পাঠাভ্যাস করাইতে করাইতে
তাঁহাকে জলমজ্জনবৃত্তান্ত সমুদয় অবগত করাইলেন এবং
তৎপূর্বাবস্থা স্মরণ করিতে অনুরােধ করিলেন। কিন্তু
মধুমতীর কিছুই স্মরণ হইল না, বরং ঈশ্বরের নিকট
প্রার্থনা করিলেন, যেন কিছুই স্মরণ না হয়। যেন কিছুই
স্মরণ না হয়। আর কেহ কি উন্মাদিনীর মত জগদীশ্বরের
নিকট পূর্বস্মৃতি-লােপের প্রার্থনা করে ? শত সহস্র
লোক। যাহাদের পূর্বকৃতাপরাধ ব্যাঙ্কোর বংশাবলীর
ন্যায় শোণিতাক্ত কুণ্ডলদাম দোলাইয়া সর্বদাই স্মৃতিপথে
বিচরণ করে, তাহারাই স্মৃতিলােপের কামনা করে ।
কিন্তু মধুমতী লুপ্তস্মৃতির চিরললাপের কামনা করে কেন ?
করালী অনুসন্ধান করিলেন।' দেখিলেন, মধুমতী এখন
সুখিনী—পাছে পূর্বস্মৃতি আসিয়া এ আনন্দের বিঘ্ন
করে, এই আশঙ্কা। যেমন দপণে দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিয়া লােকে আপন মুখ দেখে, তেমনি করালী,
মধুমতীর হৃদয়ে আপন হৃদয়ের প্রতিবিম্ব দেখিলেন।
দেখিলেন, উভয়েই প্রেমবিমুগ্ধ।
পুত্তলিকার প্রতি বালিকার প্রেমের ন্যায়, মধুমতীর
প্রেম।
এক দণ্ডের জন্য করালীকে না দেখিতে পাইলে,
মধুমতী পাগলের ন্যায় হইতেন। করালীপ্রসন্ন চিকিৎসার
অনুরােধে দুই এক ঘণ্টা অনুপস্থিত থাকিতেন।

মধুমতী।
কিন্তু মধুমতী এ সময়টুকু অসীম যন্ত্রণায় অতিবাহিত
করিতেন। মধুমতী, পা ছড়াইয়া বসিয়া, 'অবােধ
বালিকার ন্যায় রােদন করিতেন, এবং মধ্যে মধ্যে
চমকিয়া উঠিতেন ; যেন করালীপ্রসন্নের জুতার শব্দ,
অথবা দরওয়াজায় গাড়ী থামার শব্দ পাইতেন ; অমনি
চীৎকার করিয়া পরিচারিকাকে জিজ্ঞাসা করিতেন,
“বামা। বাবু এলেন বুঝি ?” কিন্তু যখন বামার উত্তরে
বুঝিতেন, সে তাহার ভ্রম মাত্র, তখন আবার পা
ছড়াইয়া কঁদিতে বসিতেন।
করালীপ্রসন্ন পঞ্চবিংশতিবর্ষীয় যুবা পুরুষ, মধুমতীর
ন্যায় ভুবনমােহিনী রূপসীর সহবাসে যে মন হারাইবেন,
তাহা বিচিত্র কি ? অষ্টেপৃষ্ঠে মধুমতীর প্রণয়পাশে
জড়িত হইয়া অকূল সাগরে ঝাঁপ দিলেন। মধুমতী
স্ত্রীর, কেমন করিয়া অধিকার করিবেন, অনুদিন
তাহাই চিন্তা করিতেন। মধুমতী বিবাহিতা কি
অবিবাহিতা, সে বিষয় সর্বদাই অন্দোলন করিতেন।
মধুমতী বিধবা হইলে, তাহার বিবাহের কোনও আপত্তি
ছিল না, কেননা তিনি ব্রাহ্ম; কিন্তু মধুমতী যে সধব।
নন, সে বিষয়ে তাঁহার একপ্রকার সংশয় দূর হইয়াছিল ;
কেননা যখন মধুমতীকে মৃতাবস্থায় দেখিতে পান, তখন
হস্তে একখানিও গহনা ছিল না। হইতে পারে, দস্য
কর্তৃক তাহা অপহৃত হইয়া থাকিবে। কিন্তু মধুমতীর
;

মধুমতী। প্রণয়াকাঙক্ষায় তাহার মন এতই চঞ্চল হইয়াছিল যে, সে সংশয় মনে আসিল না। করালীপ্রসন্ন মধুমতীকে বিবাহ করাই স্থির করিলেন। একদিন করালীপ্রসন্ন মধুমতীকে পাঠাভ্যাস করা- ইতে করাইতে কহিলেন, “মধুমতি”। মধুমতী তাহার প্রতি চাহিয়া রহিলেন। মুখে কথা ফুটিল না। কোনও কোনও সময়ে করালীর সম্মুখে মধুমতীর কথা ফুটিত। যখন করালীপ্রসন্ন প্রদীপ অথবা দ্বারের দিকে পশ্চাৎ করিয়া মধুমতীর মধুমতীর সম্মুখে বসিতেন, তখন কথা ফুটিত। মধুমতী অমনি ব্যস্ত হইয়া বলিতেন “এই, দিকে বস।” কেন না করালীর মুখ, অন্ধকার হও- য়াতে, তিনি ভাল করিয়া দেখিতে পাইতেন না। এইদিকে বসিলে অন্ধকার ঘুচিয়া মুখ আলােকময় ‘হইবে এবং মধুমতী তৃপ্তিপূর্বক তাহাকে দেখিতে পাইবেন। এক দিন করালীপ্রসন্ন জিজ্ঞাসা করিলেন, “মধুমতি ! তুমি সধবা না বিধবা, তাহা কিছু তােমার মনে পড়ে ?” এবার মধুমতী কথা কহিলেন। বলিলেন, “বিয়ের কথা প্রকছু মনে পড়ে না। বােধ হয় বিধবা।” আমার তাই বােধ হয়, কেননা তােমায় যখন নদীর তীরে পাইয়াছিলাম, তখন তোমার অঙ্গে কোনও অলঙ্কার ছিল না। -:- খ

১৪
মধুমতী।
ম। তবে আমি বিধবা।
করালীর মুখ প্রফুল্ল হইল।
পুনরপি বলিলেন, “বিধবার বিবাহ হয় জান?”
ম। তােমারই মুখে শুনিয়াছি।
ক। তুমি আবার বিবাহ করিবে?
ম। করিব না কেন?
কাকে বিয়ে করবে?
ম। তুমি যাকে বল।
ক। আমাকে ?
মধুমতী তখন লজ্জায় মুখ নত করিয়া, মৃদু মৃদু
স্বরে কহিলেন, “করিব।” করালী আর কখনও
মধুমতীকে লজ্জিত দেখেন নাই। করালী উঠিয়া
গেলেন। মধুমতী ক্ষিপ্তার ন্যায় হাসিতে ও কঁদিতে
আরম্ভ করিলেন, সে কেবল আনন্দে।
বিবাহের দিন স্থির হইল। শুভক্ষণে, অশুভক্ষণে,
তাঁহাদের বিবাহ হইল। করালী বিদায় লইয়া, মধুমতীর
সহিত স্বদেশে যাত্রা করিলেন।
“আর কত দিনে আমরা সেই স্থানে পৌছিব ?”
মধুমতী একদিন নৌকাতে করালীপ্রসন্নকে জিজ্ঞাসা
করিলেন। করালী কহিলেন “কোন স্থানে? যে স্থানে
তােমায় কুড়াইয়া পাইয়াছি ? সে ঐ স্থান।” মধুমত।
একবার সেই স্থান নিকটস্থ হইয়া দেখিতে চাহিলেন।

।
,
মধুমতী।
প্রভুর আজ্ঞায় মাঝিরা নৌকা অমনি কূলের দিকে
ফিরাইল মধুমতী খড়খড়ি খুলিয়া দেখিতে লাগি-
লেন এবং ইচ্ছা করিলেন, সে রাত্রে সেখানে থাকেন।
সুতরাং নৌকাও তীরলগ্ন হইল। রজনী দ্বিতীয়
প্রহর। মধুমতী সুখে করালীপ্রসন্নের ক্রোড়ে নিদ্রা
যাইতেছিলেন, আর করালীপ্রসন্নের
হাস্যময় মুখ
নিদ্রায় স্বপ্নে দেখিতেছিলেন। কিন্তু সে সুখের
স্বপ্ন ভাঙ্গিল। মধুমতীর নিদ্রাভঙ্গ হইল। করালীও
জাগিলেন। দেখিলেন যে, ভীষণ তরঙ্গাভিঘাতে নৌকা
দুলিতেছে। করালী খড়খড়ি খুলিয়া বাহিরে দৃষ্টি
নিক্ষেপ করিলেন, কিন্তু শিহরিয়া উঠিয়া অতি ব্যস্ত
হইয়া মধুমতীকে হৃদয়ে টানিয়া লইলেন। মধুমতী
করালীর ভয়ের কারণ কিছুই বুঝিতে পারিলেন না।
কিন্তু তিনি যে, স্বামীর হৃদয়ে মাথা রাখিতে পাইলেন,
সেই অসীম সুখে কাঁদিতে লাগিলেন। করালী
র বাহিরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দেখিলেন যে, অতিভীষণ
অন্ধকারে দিম্মল আচ্ছন্ন হইয়াছে ; প্রলয়-কালের
ন্যায় বৃষ্টি, মুহুর্মুহুঃ অশনি-নিপাত এবং অতি প্রচণ্ড
ঝড়, সকলে একত্র হইয়া পৃথিবী রসাতলে দিতেছে।
কিন্তু করালীপ্রসন্ন বিদ্যুদালােকে দেখিলেন যে, এই
ভীষণ সময়ে উন্মথিতা নদীর বিজন উপকূলে ঝড়
বৃষ্টি উপেক্ষা করিয়া এক দীর্ঘাকার পুরুষ পঁাড়াইয়া

ক।
মধুমতী।
আছে। করালী কৌতূহলী হইয়া জনৈক সুচতুর মাঝিকে
জিজ্ঞাসা করিলেন—“ও কে দাড়াইয়া—জান ?”..
মাঝি কিছুই দেখিতে পাইল না। পুনরায় বিদ্যুৎ
হানিলে দেখিতে পাইল এবং চমকিয়া উঠিল।
করালী জিজ্ঞাসা করিলেন, “ওকে চেন ?”
মাঝি। ওকে আবার চিনি না—এ অঞ্চলে মাঝি
মাল্লা যে এখানে ঝড় বৃষ্টিতে ‘নৌকা লাগাইয়াছে, সেই
চিনিয়াছে।
ও কে ?
মাঝি। কে তা কেউ জানে না, ও ভূত কি চোর, তা
কেউ জানে না, কিন্তু আজ মাস দুইতিন হইল রাত্রে ঝড়
বৃষ্টির সময়ে এই নদীতীরে সকলেই দেখিতে পায়—
ক। তুমি কখনও দেখিয়াছিলে ?
মা। মাঝি মাল্লার মধ্যে কে দেখেছে ? আমরা
কলিকাতা হইতে আসিবার সময় একদিন ঝড় বৃষ্টির
রাত্রে এইখানে নৌকা রাখিয়াছিলাম। আর ওকে ঐ
স্থানে দেখিয়াছিলাম।
করালী অতিশয় কুতূহলী হইয়া কূলের
দিকে দৃষ্টিপাত
করিলেন, কিছুই দেখিতে পাইলেন না। বিদ্যুৎ হানিলে
দেখিলেন যে, দীর্ঘাকার পুরুষ অদৃশ্য হইয়াছে। পরে
মাঝিকে বিদায় দিয়া নীরব হইয়া রহিলেন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। রহিল না । করালীপ্রসন্ন মধুমতীর সহিত স্বদেশে পৌছিলেন। পিতা মাতা মঙ্গলাচরণ করিয়া পুত্র পুত্রবধূ ঘরে লই- লেন এবং মধুমতীর সৌন্দর্য্য দেখিয়া পরম প্রীতিলাভ করিলেন। মধুমতী এবং করালীপ্রসন্নের সুখের সীমা একদণ্ডের জন্য বিচ্ছেদ নাই; করালী দিবারাত্র ঘরে থাকিতেন, এবং মধুমতী অনিমিষ লােচনে তাহার প্রতি চাহিয়া থাকিতেন। কখনও যদি এক দণ্ডের জন্য বিচ্ছেদ হইত, তবে মধুমতী বালিকার ন্যায় কাদি- তেন। মধুমতীর এই প্রকার ব্যবহারে পুরবাসী ও প্রতি- বেশিগণ সকলেই বিরক্ত হইতেন । অকস্মাৎ এই অনন্ত সুখের সাগর শুদ্ধ হইল। দিনে বিধাতার লিখনানুসারে এক অশনিতে দুই জনের হৃদয় ভগ্ন হইবে, সেই দিন প্রভাত হইতে চলিল। সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা আমরা কি প্রকারে বর্ণন করিব ? তাহার অনুপূর্বিক বর্ণন সম্ভব নহে। করালীপ্রসন্ন বিশেষ কাৰ্যোপলক্ষে দুই চারি দিবসের জন্য কলিকাতায় '১৮ গেলেন। মধুমতী। নির্বোধ মধুমতী অশান্তের ন্যায় ব্যবহার করিতে লাগিলেন। তাঁহার সমবয়স্কা ননদিনী' শ্যামা- সুন্দরী অনেক বুঝাইলেন। মধুমতী শ্যামার কিছু অনু- রক্তা ছিলেন। করালীর গমনের পর রাত্রে শ্যামা- সুন্দরী তাহার সান্ত্বনার নিমিত্ত একত্রে শয়ন করিলেন। মধুমতী ও শ্যামাসুন্দরী উভয়েরই নিদ্রা আসিল না। শ্যামাসুন্দরীর গ্রীষ্মযন্ত্রণায়, মধুমতীর বিচ্ছেদযন্ত্রণায়। শ্যামাসুন্দরীর প্রস্তাবানুসারে উভয়ে শয়নগৃহ ত্যাগ করিয়া পশ্চিমের এক বারাণ্ডায় বসিলেন। বারাণ্ডা অতি নিম্ন, এমন কি বালকেরাও ভূমি হইতে সহজে তদুপরি উঠিতে পারে। সম্মুখে ভাগীরথী, পশ্চাতে অতি বিস্তীর্ণ এক প্রান্তর। রজনী দ্বিতীয় প্রহর। পূর্ণিমার রাত্রি ; চন্দ্রমা নিঃশব্দে আকাশে ভাসিতেছে, নৈশ সমীরণ অতি মন্দ মন্দ হিল্লোলে জাহ্নবীহৃদয় চঞ্চল করিতেছে। মধুমতী ও তাহার ননদিনী দুরন্ত গ্রীষ্মযন্ত্রণায় বাবা- ণ্ডায় বসিলেন। শ্যামাসুন্দরী মধুমতীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বউ ! তাের কি আগেকার কথা কিছু মনে পড়ে না?” মধুমতী উত্তর করিলেন, “কিছুই না।” পরে উভয়ের নানাবিধ কথােপকথন হইতে লাগিল। অকস্মাৎ মধুমতী সশঙ্ক চিত্তে উঠিয়া বসিলেন। চন্দ্রিকা- বিধৌত জাহ্নবীর উপকূল হইতে সুকণ্ঠনিঃসৃত সঙ্গীত-

মধুমতী।
ধ্বনি হইল। সঙ্গীত নৈশ সমীরণে আরােহণ করিয়া
জাহ্নবীর হৃদয়ে বিচরণ করিতে লাগিল। শ্যামাসুন্দরী
জিজ্ঞাসা করিলেন, “হঠাৎ অমন করিয়া বসিলি যে?”
মধুমতী উত্তর করিলেন, “ঠাকুরঝি ! পূর্বকার কথা আমার
কিছু মনে পড়ে না, কিন্তু এই গান শুনিয়া আমার
একটি কথা মনে পড়িতেছে। আমি যেন একটি গান
জানিতাম।”
শ্যামা। গান ত সকলেই জানে-সে আর মনে
পড়িবার কথা কি ?
গায়ক অতি পরিস্ফুট স্বরে আকাশ বিদীর্ণ করিয়া
গায়িতে লাগিল। মধুমতী বড় চঞ্চল হইলেন-বলি-
লেন “শুধু একটি গান জানিতাম তাহা নহে—একটি গান
বড় ভাল বাসিতাম, সর্বদাই শুনিতাম মনে হইতেছে।
বুঝি সে এই সুর। এ সুরে আমাকে পাগল করিয়া
তুলিতেছে। দেখ দেখি কথা বুঝা যায় কি না ?”
উভয়ে মনােনিবেশপূর্বক শুনিতে লাগিলেন। গীতের
একটি পদ স্পষ্ট বুঝা গেল
“আদর তরঙ্গ বহে, রূপের সাগরে
বিদ্যুদগ্নিবৎ এই কথা মধুমতীর হৃদয়মধ্যে প্রবেশ
করিল। সেই পূর্বত গীতই বটে। যেমন সভা-
মণ্ডপে পরিচারক একটি প্রদীপ লইয়া সহস্র দীপ
জালিত করে, এই গীতে মধুমতীর সেইরূপ হইবার

মধুমতী। তন্মধ্যে উপক্রম হইল। “আদর তরঙ্গ”—আদর-আদরিণী নামটি মনে পড়িল। কাহার নাম আদরিণী ?'তাহাও মনে পড়িল। মধুমতী মনশ্চক্ষে দেখিতে লাগিলেন এক ক্ষুদ্র স্বচ্ছ পুষ্করিণী—চারিপাশে কদলী, দাড়িম্ব, আম্রাদি বৃক্ষ-তন্মধ্যে অনতিবৃহৎ বাসগৃহ । আদরিণী-আদরিণী ও আর একজন—এক দাড়িম্ব তলায় উভয়ে পরস্পর স্কন্ধে হস্তাপণ করিয়া। মধুমতী তখন দুই হস্তে মুখাবরণ করিয়া নীরবে রহিলেন। শ্যামা দেখিলেন, তঁাহার কলেবর দোক্ত ও কম্প- যুক্ত, এবং মুচ্ছার পূর্বলক্ষণবিশিষ্ট। মধুমতী চক্ষু মুদিয়া তাহার ননদিনী শ্যামাসুন্দরীর হস্ত দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিলেন। শ্যামাসুন্দরী মধুমতীকে পীড়িত বুঝিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হয়েছে বউ ?” নাই, মধুমতী মূচ্ছ যান নাই, চীৎকার করেন নাই, অথবা কাঁদেন নাই, কেবল মাত্র স্তম্ভিত হইয়া চক্ষু মুদিয়া শ্যামাসুন্দরীর হস্তধারণ করিয়া রহিলেন। মুচ্ছার লক্ষণ বুঝিয়া তাহার ননন্দা তাহার হস্ত- ধারণ করিয়া শয়নগৃহে যাইয়া তাহাকে পৰ্যঙ্কে শয়ন করাইলেন। মধুমতী কলের পুত্তলীর ন্যায় শুইলেন। শ্যামাসুন্দরী ও মধুমতী এক শয্যায় শয়ন করিলেন। যামিনী প্রভাতা হইল। গবাক্ষ-নিকটস্থ বৃক্ষস্থিত একটি পাপিয়ার ধ্বনিতে শ্যামার নিদ্রা ভাঙ্গিল,

মধুমতী।
নিদ্রাভমাত্র মধুমতীর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন,
কিন্তু শিহরিয়া উঠিলেন। গত রাত্রে শ্যামা মধুমতীকে
স্বর্ণপ্রতিমার ন্যায় দেখিয়াছিলেন, কিন্তু আজ প্রাতে
মধুমতীকে অঙ্গারখণ্ডের ন্যায় দেখিলেন।
মধ্যে কি ভীষণ পরিবর্তন হইয়াছে । এ পরিবর্তন
কি শারীরিক পীড়ায় অথবা কোনও মানসিক পীড়ায় ?
সরল। শ্যামাসুন্দরী শারীরিক পীড়া অনুভব করিলেন।
এবং তদনুসারে কাৰ্য্য করিয়া মধুমতীকে আরও পীড়িত
করিতে লাগিলেন।
ছয় ঘণ্টার
ue

সুতীয় পরিচ্ছেদ نمی করালীপ্রসন্নের বৃহৎ পুরী নিঃশব্দ, জন মানব দেখা যায় না। কেবল মাত্র বড় দালানে চড়াই পীর শব্দ শুনা যাইতেছে, আর অন্তঃপুরমধ্যে এক কক্ষে শয্যাশায়ী একটি শীর্ণদেহ স্ত্রীলােকের ঘন ঘন দীর্ঘ- নিশ্বাস শ্রুতিগােচর হইতেছে। মধুমতী শয্যাশায়িনী; কি পীড়ায় শয্যাশায়িনী, তাহা কোনও চিকিৎসক নির্ণয় করিতে পারেন নাই। করালীপ্রসন্ন অদ্যাপি বাটী প্রত্যা- গমন করেন নাই, তজ্জন্য মধুমতীর পূর্বের ন্যায় ব্যাকুলতা নাই। মধুমতী বাহ ও মানসিক ক্ষমতারহিত হইয়া মৃতবৎ শয্যায় মিশিয়া আছেন। সন্ধ্যা হইল, পশ্চিম গগনে ঘাের মেঘাড়ম্বর হইল, রাত্রি এক প্রহর, অতি নিবিড় অন্ধকারে পৃথিবী আবৃত। হইল। ক্রমে বৃষ্টির সহিত প্রচণ্ড ঝড় উঠিল মধুমতী সেই জনহীন বৃহৎ অট্টালিকার এক কক্ষে মধুমতী। শয়ন করিয়া আছেন। শয্যাপার্শ্বে একটি আলােক জ্বলিতেছিল। নিঃশব্দ, কেবল বাহিরে ঝড় বৃষ্টির হু হু শব্দ, ও তজ্জন্য কপাট জানেলার ঝঋনা শব্দ হইতে- ছিল। আলো কিছু মিটমিট করিতেছিল। এমত সময়ে অকস্মাৎ, চিত্রপটে চিত্রমূৰ্ত্তিবৎ, মধুমতী মুক্ত দ্বারপথে এক মনুষ্যমূর্তি দেখিতে পাইলেন। দেখিয়া, সেই বহু- কালবিস্মৃত মূৰ্ত্তি চিনিয়া মধুমতী উঠিয়া বসিলেন। মনুষ্য আসিয়া তাঁহার নিকটে বসিল। উভয়ে বহুক্ষণ নীরবে পরস্পরের মুখ নিরীক্ষণ করিয়া, দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। পুরুষের চক্ষে অশ্রু বহিল। তিনি বলিলেন- “তুমি এখানে কেন, আদরিণি ?” মধুমতী অথবা আদরিণী কহিলেন, “নহিলে কোথায় যাইব? মধুমতীর তীরে যখন মরিয়া পড়িয়াছিলাম, তখন আমাকে কে বাঁচাইয়াছিল ? যিনি বাঁচাইয়াছিলেন, তিনিই আশ্রয় দিয়াছেন।” লুপ্তস্মৃতির পুনঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মধুমতী বুদ্ধিও পুনঃপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। আগত ব্যক্তি কহিলেন, “ভালই করিয়াছেন—আমি তঁাহার, ঋণী হইয়াছি। কিন্তু তুমি এতদিন দেশে আসিয়াছ, একবার আমার সন্ধান কর নাই কেন? তুমি কি প্রকারে আমাকে ভুলিয়াছিলে ?” মধুমতী কহিলেন, “কিপ্রকারে ভুলিয়াছিলাম, তাহা ২৪। মধুমতী। শুনিলে তুমি বিশ্বাস করিবে না; তবে বলিয়া কি হইবে ?” উত্তরে তিনি বলিলেন, “তুমি যাহা বলিবে, আমি তাহাই বিশ্বাস করিব-অথবা তাহা শুনিতেও চাহি । আমি যে তােমাকে আবার দেখিতে পাইয়াছি, ইহাতেই আমি সুখী। এখন আমার সঙ্গে গৃহে চল।” যিনি বলিতেছিলেন, আহলাদে তাহার শরীর তর তর করিতেছিল—কণ্ঠ গদগদ। তখন মধুমতী, মুখ নত করিয়া কম্পিত কলেবরে, অস্ফুটস্বরে কহিলেন, “গৃহে যাইব? আমার আর গৃহ নাই। তােমার সঙ্গে আর আমার সম্বন্ধ নাই। এ জীবন আর আমার নহে। যিনি ইহা রক্ষা করিয়াছেন, এক্ষণে ইহা তাহারই। তােমার আমার ইহাতে কোনও অধিকার নাই।” শুনিয়া আগন্তুকের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হইল। প্রথমে তিনি কিছুই বুঝিতে পারিলেন না—পরে মধুমতীর বিস্ময়জনক কথার মর্মানুধাবন করিয়া, দোক্ত- কলেবরে, মস্তকধারণ করিয়া বসিলেন। বলিলেন, “আদ- রিণি, আমি যে তোমার স্বামী !” আদরিণী কহিলেন, “ছিলে; কিন্তু তােমার স্ত্রী মধু- মতী জলে ডুবিয়া মরিয়াছে।” তখন মধুমতীর পূর্বস্বামী, কিয়ৎক্ষণ বিস্ময়বিস্ফা- রিত চক্ষে, মধুমতীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া, রােদন মধুমতী। করিতে লাগিলেন,-বলিলেন, “আমি কখনই এ কথা বিশ্বাস করি না—আমার আদরিণী যে আমাকে এরূপ কথা বলিবে, ইহা বিশ্বাস করি না-তুমি আমাকে ব্যঙ্গ করিতেছ। আমার এত যত্নের কি এই ফল ? যে দিন তুমি জলমগ্না হইয়াছিলে, সেই দিন হইতে আমি শ্মশানবাসী। সেই দিন হইতে, নদীর তীরে তীরে, শ্মশানে শ্মশানে, কাদায় কাদায়, উন্মত্তের ন্যায় চীৎ- কার করিয়া বেড়াইতেছি। উন্মছের ন্যায় কি ? আমি পাগলই হইয়াছিলাম-ঘাটে ঘাটে মাঝি মাল্লারা “গােপাল-পাগল” বলিয়া অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া আমাকে দেখাইত। আমার শরীর দেখ আদরিণি,-তুমি আমাকে চিনিতে পারিয়াছ, ইহাই আশ্চৰ্যএমন দীন দরিদ্র কে আছে,-কার শরীর এমন অস্থিচর্মাবশিষ্ট, শুষ্ক, মলিন-কার বস্ত্র এমন শতধা ছিন্নকার কেশ মন রুক্ষ- তিনি আর বলিতে পারিলেন না-রােদন করিতে লাগিলেন। কেহ আসিতেছে, কেহ আসিতেছে, পায়ের শব্দ হইল। গােপাল বলিলেন, “কে আসিতেছে-এ বাড়ীতে আমি চোর—সুতরাং আমি এখন চলিলাম-কালি আসিব।” মধুমতী কহিলেন, “আসিও-কিন্তু কালি না। এ গৃহের স্বামী গৃহে আসিলে আসিও। আর এখানে গ মধুমতী। আসিও না। সন্ধ্যার পর, ঐ গঙ্গাতীরে অসিও। সেই খানে আমার সাক্ষাৎ পাইবে।” গােপাল চলিয়া গেল। যেটি ভয়ঙ্কর কথা—আদ- রিণী যে তাঁহাকে বিসর্জন দিয়া অন্যকে বিবাহ করি- য়াছেন—সে কথা গােপাল এখনও শুনে নাই। যাহা শুনিয়াছিল, তাহাতেই তাহার হৃদয় ভগ্ন হইয়াছিল। পরদিন সন্ধ্যার সময় করালীপ্রসন্ন কলিকাতা হইতে বাটী প্রত্যাগমন করিলেন। মধুমতী তাহাকে দেখিয়া পূর্বের ন্যায় হাস্যমুখে নিকটে ছুটিয়া গেলেন না। কেবল মাত্র ঈষৎ চঞ্চল হইলেন ; যেমন চন্দ্রোদয়ে সাগর চঞ্চল হয়, সেইরূপ চঞ্চল হইলেন। করালীপ্রসন্ন মধুমতীকে শীর্ণ দেখিয়া অতি ব্যস্তে জিজ্ঞাসা করিলেন “কি হইয়াছে ? কেন এত শীর্ণ হই- আছ ?” মধুমতী উত্তর করিলেন না। করালী পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করাতে কহিলেন, “কিছু হয় নাই।” করালী তথা কহিলেন, “কেন অমন হইয়াছ, আমাকে বলিবে না?” মধুমতী নীরব হইয়া রহিলেন, করালী অতি কাতর স্বরে কহিলেন, “যাহাকে এক মুহূর্তের জন্য না দেখিলে কঁদিতে, তাহার নিকট পীড়া গােপন করি- তেছ ?” মধুমতী কোনও উত্তর দিলেন না। করালী ব্যথিত হইয়া বসিয়া পড়িলেন। মধুমতী করালীর মুখ- প্রতি চাহিলেন, এবং দেখিলেন যে, তাঁহার মুখমণ্ডল

মধুমতী।
রক্তবর্ণ হইয়াছে, এবং চক্ষু ছল ছল করিতেছে।
মধুমতী তথাপি কিছু বলিলেন না। করালী অনেক
কণ অবধি সেইখানে বসিয়া মধুমতীর প্রতি চাহিয়া
রহিলেন এবং অনেক অনুনয় বিনয় দ্বারা তাহার
প্রতি ভাবান্তরের কারণ জানিতে চেষ্টা করিতে লাগি-
লেন। কিন্তু মধুমতী ক্ষেপও করিলেন না। করালী
ব্যথিত ও দুঃখিত হইয়া আপন শয্যাগৃহে যাইয়া
উপাধানে মুখ লুকাইয়া রহিলেন। বােধ হয় কঁদিতে
লাগিলেন।
রাত্রি প্রায় দুই প্রহর একটা হইয়াছে, আকাশ
মেঘাচ্ছন্ন হওয়াতে অতি গাঢ় অন্ধকার হইয়াছিল।
পৃথিবী নিঃশব্দ, করালীপ্রসন্নের বৃহৎ অট্টালিকাও
নিঃশব্দ ; কিন্তু এত গভীর-রাত্রে কালীপ্রসন্ন দূর
হইতে মনুষ্যপদধ্বনি শুনিতে পাইলেন। করালী, কিছু
বিস্মিত হইলেন, পদশব্দ ক্রমে নিকটবর্তী হইল।
করালী একবার ভাবিলেন, চোর আসিয়াছে; আবার
ভাবিলেন যে, তাহার ভম মাত্র ; কিন্তু পদশব্দ এত
স্পষ্ট শুনা যাইতে লাগিল যে, করালী ভঁহার ভ্রম
মনে করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিলেন নারায়
দ্বারােদঘাটনপূর্বক বাহিরে চতুর্দিক অন্বেষণ করিলেন।
কিন্তু কিছু দেখিতে পাইলেন না, নিশ্চেষ্ট হইয়া গৃহে
প্রত্যাগমন করিলেন। কিন্তু দ্বার রুদ্ধ করিবামাত্র

२७
মধুমতী।
আবার পদশব্দ শুনিতে পাইলেন। স্থির হইয়া
গৃহের
মধ্যদেশে দাঁড়াইয়া শুনিতে লাগিলেন, হঠাৎ, শব্দ
থামিল, এবং তৎপরক্ষণেই গবাক্ষপথে শ্মশুবিশিষ্ট
এক বৃহৎ মনুষ্যমুণ্ড দেখিতে পাইলেন।
অতি দ্রুত
দ্বারােদঘাটনপূর্বক বাহিরে গেলেন। কিন্তু কিছুই
দেখিতে পাইলেন না। করালীপ্রসন্নের দুই মহল
অন্তঃপুর ; উভয় মহল আলাে লইয়া তন্ন তন্ন করিয়া
অনুসন্ধান করিয়া শয়নকক্ষে ফিরিয়া আসিতেছিলেন,
পথি মধ্যে, অন্ধকারে, বােধ হইল, এক জন স্ত্রীলােক
দাড়াইয়া আছে। জিজ্ঞাসা করিলেন “কে ও ?
স্ত্রীলােক কহিল “আমি।” করালী স্বরে চিনিলেন,
মধুমতী। পুনরপি জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখানে কেন ?”
মধুমতী কহিলেন, “কাহাকে খুঁজিতেছ ?” করালী
কহিলেন, “জানালায় এক বিকৃতাকার মনুষ্য দেখি-
য়াছি—তাহাকেই।” মধুমতী কহিলেন, “আমি তাহাকে
চিনি-ঘরে চল, বলিতেছি।”
মধুমতী, করালীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ, তাহার শয্যাগৃহে
আসিলেন। তথায় করালী পালঙ্কের উপর চরণ লম্বিত
করিয়া বসিলেন। মধুমতী তাহার চরণতলে বসিয়া,
তাঁহার চরণ গ্রহণ করিয়া, নীরব হইয়া রহিলেন।
করালী বিস্মিত হইলেন-বলিলেন, “কে সে ?” দেখি-
লেন, মধুমতী কঁদিতেছে।

মধুমতী। মধুমতী বলিলেন, “তুমি আমার জীবন দান করি- গাছ-আমি তােমার নিকট যে ঋণে ঋণী, মনুষ্যে তাহা শোধ করিতে পারে না। তাহার শােধ দূরে থাক, আমি তাহার পরিবর্তে গুরুতর অপরাধ করিয়াছি- তাহার প্রায়শ্চিত্ত নাই। তােমার কাছে আমার এই ভিক্ষা—যে জীবন তুমি রক্ষা করিয়াছিলে—তাহা আবার নষ্ট কর—চিকিৎসাশাস্ত্রে কি তাহার উপায় নাই ?” করালী অবাক্ হইলেন,-বলিলেন, “এসকল কথা কেন ? কে সে ব্যক্তি ?” মধুমতী শুস্ক কণ্ঠে, বােদনােম্মুখবৎ নিশ্বাসে, পূর্ব- স্মৃতি-পুনরুদয়ের কথা বলিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে পটু করালী সে বৃত্তান্ত বুঝিলেন এবং বিশ্বাস করিলেন। তার পর মধুমতী বলিতে লাগিলেন, “তখন আমার সকল স্মরণ হইল। তখন মনে পড়িল যে, আমি তােমার নিকট বলিয়াছিলাম—আমি বিধবা, সে মিথ্যা কথা। আমি সধবা। অামি লালগােপাল দত্তের স্ত্রী। তিনি আজিও জীবিত আছেন। এখন যাহাকে দেখিয়া- ছিলে, তিনিই আমার সেই পূর্ব স্বামী। এই বলিয়া মধুমতী কিয়ৎকাল স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন। করালীও নীরব হইয়া রহিলেন। মধুমতী “নরপি বলিতে লাগিলেন, “যে গীত শুনিয়া আমার

০
মধুমতী।
সব মনে পড়িল, তাহা তিনি অহরহঃ গাইতেন। আমি
তাহা অহরহঃ। শুনিতে ভাল বাসিতাম- সে গীত
আমার হাড়ে হাড়ে অঙ্কিত ছিল। পরদিন তিনি আসিয়া
সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন।”
এই বলিয়া মধুমতী নিরস্ত হইলেন। করালী
কিছু বলিলেন না। অনেকক্ষণ নীরবে বসিয়া, উঠিয়া
গেলেন। পৃথক শয়নগৃহে মিয়া দ্বার রুদ্ধ করিলেন।
করালীও দ্বার রুদ্ধ করিয়া শয়ন করিলেন।
পরদিন উভয়ে উভয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন
। ইচ্ছাপূর্বকই সাক্ষাৎ করিলেন না। বিশেষ
করালী অত্যন্ত ধর্মভীত; তিনি বুঝিয়াছিলেন যে,
অন্য স্বামী বর্তমানে তাহার সহিত আদরিণীর বিবাহ
ধৰ্ম্মতঃ বিবাহ নহে। সুতরাং আদরিণী তাহার ধৰ্ম্মপত্নী
নহেন। এরূপ স্থলে তাহার সহিত সহবাস ঘাের পাপা-
চার। কিন্তু মধুমতীর সহবাস পরিত্যাগ অপেক্ষা প্রাণ
পরিত্যাগ করা সহজ। তিনি কর্তব্যবিমূঢ় হইয়া সমস্ত
দিন দ্বার রুদ্ধ করিয়া কঁদিতে লাগিলেন।
এদিকে সন্ধ্যা অতীত হইয়া চারি পাঁচ দণ্ড
রাত্রি হইল। প্রথম রাত্রে জ্যোৎসা। গােপাল
অবধারিত সময়ে গঙ্গাতীরে আসিয়া দাঁড়াইল। কূলে
কাহাকেও দেখিতে পাইল না—কিন্তু দেখিল যে, বক্ষঃ-
পরিমিত জলে দাঁড়াইয়া একজন স্ত্রীলােক গাত্র ধৌত

মধুমতী।
৩,
করিতেছে। গােপাল চিনিল।সেই আদরিণী। বলিল,
“আমি, আসিয়াছি।”
আদরিণী বলিল, “আর একটু দাড়াও—আমার
এখনও বিলম্ব
বিলম্ব আছে। দাড়াইয়াই বা কি করিবে,
আমার নিকটে এই জলে আইস, সেবার আমরা
অগাধ জলেও ডুবি নাই, এই একবুক জলে ভয় কি ?
আমার যাহা বলিবার, তাহা এই গঙ্গাজলে দাঁড়াইয়া
তােমাকে বলিব।”
গােপাল জলে নামিয়া আদরিণীর নিকটে গিয়া
দাড়াইল। আদরিণী বলিল, “আমি যাহা বলিব, বােধ,
হয় তুমি তাহা বিশ্বাস করিবে না। তুমি বিশ্বাস কর
বা না কর, আমি সত্য কথা বলিব।”
এই বলিয়া মধুমতী পূর্ব ঘটনা সকল, সেই
জ্যোৎস্নাপ্রফুল্লিত গঙ্গাতরঙ্গমধ্যে দাঁড়াইয়া, সেই বিজন
নিস্তব্ধ প্রদেশে, মৃদু গম্ভীর স্বরে, অদ্যোপান্ত বিবৃত
করিলেন। করালীর সহিত বিবাহের কথা বলিলেন।
গােপাল মুমূযুবৎ সকল শুনিল ।
আদরিণীর কথা
সমাপ্ত হইলে, গােপাল দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া
বলিতে লাগিলেন।
“আমার যাহা কপাল ছিল, তাহা ঘটিয়াছে।
তুমি এক শত বিবাহ করিলেও আমার অত্যাজ্য।
তুমি আমার গৃহে চল। আমরা এ
চল। আমরা এ দেশ ত্যাগ

কেহ '
মধুমতী।
করিয়া, দেশান্তরে গিয়া এ কলঙ্ক লুকাইব ।
জানিবে না—আমরা আবার সুখে দিনযাপন করি।
গােপালের অবিচলিত স্নেহ দেখিয়া, এবং আপনার
পূর্ব প্রণয় স্মরণ করিয়া আদরিণী গঙ্গাস্রোতের উপর
দরবিগলিত অশ্রুধারা বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন,
আর দুই পদ অগ্রসর হইয়া, গলদেশ-পরিমিত জলে
দাঁড়াইয়া, মধুমতী অতি কাতর স্বরে বলিতে লাগিলেন,
“আমি এখন তােমাকে প্রতারণা করিব না—আমি
তােমার গৃহে যাইব কি প্রকারে ? আমি পরের। আমার
প্রাণ পৰ্যন্ত পরের। আমি মহাপাপিষ্ঠা। আমি তােমার
স্নেহ ভুলিয়া গিয়াছি। আমার সকল ভালবাসা নূতন
স্বামীর প্রতি। আমি তােমার গৃহে যাইব না ”
এই বলিয়া আদরিণী আর একপদ জলে অগ্রসর
হইলেন। জল চিবুক পৰ্যন্ত হইল। তখন মূর্খ
গােপাল, আদরিণীর দুরভিসন্ধি সহসা বুঝিতে পারিয়া,
ক্ষিপ্তের মত চীৎকার করিয়া নদীর তট প্রতিধ্বনিত
করিতে লাগিল; ডাকিল, “আদরিণি—প্রাণাধিকে !
ও কি-রক্ষা কর, এ সর্বনাশ করিও না।” এই বলিয়া
আদরিণীর উভয় হস্ত ধারণ করিয়া আকর্ষণ করিতে
লাগিল।
আদরিণী, অতি ধীরে, অতি মৃদুস্বরে, অধরপ্রান্তে
বিশ্ববিমােহন হাসি হাসিয়া, বলিলেন, “আমি ফিরিব না।

একবার আলিঙ্গন
মধুমতী।
কিন্তু তােমার কাছে এক ভিন্ন।
কর; বুঝিব যে, আমার সকল অপরাধ মার্জনা করিলে।
যদি আমায় একদিনও ভাল বাসিয়া থাক, তবে এই
খানে জন্মের শােধ আলিঙ্গন কর।” করালী তখন
‘আদরিণীর মন হইতে অন্তর্হিত হইয়াছিল।
তখন গােপাল গদগদ কণ্ঠে, অতি কষ্টে, বলিতে
লাগিল, “তােমায় আলিঙ্গন করিব আদরিণি! আমা-
রই আদরিণী-কত আদরের আদরিণী ? তােমার সাধ
মিটাইয়া, জন্মের শােধ আলিঙ্গন করিব। তুমি একা
যাইও না। তুমি যদি ফিরিলে না, আমি তােমার
সঙ্গে যাইব।”
এই বলিয়া গােপাল চিবুক-পরিমিত জলে দাঁড়াইয়া,
চিরপ্রেমভাগিনী আদরিণীকে গাঢ় আলিঙ্গন করিল।
তাহার পর উভয়কে, পৃথিবীতে আর কেহ, কখনও
দেখিল না।
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Madhumati Ed. 2nd

Author
Chattopadhyay, Sri Purnachandra
Title
Madhumati Ed. 2nd
File name
Madhumati Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1901
Published
2009/08/6
Publisher
Gurudas Chattopadhaya And Sons, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
42
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
512872
Barcode
4990010019904.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
AJonFfldys5
Download PDF

Madhumati Ed. 2nd