Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Rekha Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
শ্ৰীকণকলতা ঘােষ
প্রকাশক
গােপালদাস মজুমদার
ডি, এম, লাইব্রেরী
৬১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ
১৩৩৬
মূল্যসাধারণ •
রাজসংস্করণ
প্রবাসী প্রেস
১১, আপার সাকুলার রােড, কলি
সজনীকান্ত দাস কর্তৃক মুদ্রি
উৎসর্গ তষ•••••
No text on this page.
সূচী পত্র ০ ০ ০ ০ ০ ০ অনন্ত জীবন অনন্তের যাত্রী . . . অধিকার অভিমান আত্ম-নিবেদন ৮০০ ৮. । আনন্দের সন্ধান . ০০ ০ ঈশ্বর উৎসর্গ পত্র উদ্বোধন কি আছে আমার ০ ০ ৪ ০ ০ ০ ৪ ০ জীবন তরী বসন্তোৎসব ৮২ বর্তমান ২৪ বর্ষা-বন্দনা ৮৪ বন্ধুর পত্র বাণী-বন্দনা ৭ ৮৬ বাসনা নির্বাণ ৮৯ বিরহ বিদায়-বেলা ২ ৭১ বিশ্ব-প্রীতি bob ১৪ বৃন্দাবন ৭৮ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রতি ৪১ মহাত্মাজী ম ৩২ ৪৩ মানস-সঙ্গিনী মানসী १७ মিনতি ৭২ মিলন ৫৪ ৪ রঙ্গলাল-স্মৃতি ৪৮ শ্ব-স্মৃতি ৪৬ শৈশব মাধুরী ১৭ শিশুর প্রতিজ্ঞা শ্রদ্ধার পূজা ৩৪ ৫৮ শ্রীশ্রীজগন্নাথজী শ্রদ্ধাঞ্জলি ৬৮ স্বপ্ন-লব্ধা ৭৪ ৫৩ সীতাদেবী হৃদি-স্থিত হৃষিকেশ ০০৫ ০ ০ ০ তরুণের জয়যাত্রা দুইদিক দেশবন্ধু স্মৃতিপূজা ••• নারী ও পুরুষ ০ ০ ০ ০০০ নির্ভয় পিতৃহারা ৪৫ পুরুষের উক্তি ০০০ ১ ০ ০ ০ psc প্রথম চুম্বন প্রার্থনা প্রিয়-সশনে প্রেম বর্ষ আবাহন ০ ও ৪
No text on this page.
ঘষণে-
যাঁহাকে শৈশবে জ্ঞান বিকাশের পূর্বে
বিধাতার অমােঘ বিধানে হারাইয়াছি,
সারা জীবনের আকুল অন্বেষণে ও যাহাকে
এ জনমে আর ফিরিয়া পাইবার আশা নাই,
আমার সেই পূণ্যচরিত্র মহাপ্রাণ
পিতার পবিত্র স্মৃতি স্মরণ করিয়া আজ
আমার এই ক্ষুদ্র সাধনা মঙ্গলময়
শ্রীভগবানের চরণে ভক্তি ভরে সমর্পন করিলাম।
১৬ই আশ্বিন
লেখিকা
মহালয়া, ১৩৩৬
No text on this page.
উৎসর্গ পত্র
প্রভু! দূর অতীতে বাল্যকালে
কাব্যলক্ষী হৃদয়তলে
সংগােপনে শুভক্ষণে লভেছিল স্থান,
যখন এ অবােধ বালা
বুঝিত কাব্যকলা,
জানিত না কবিদের করিতে সম্মান,
কেবল পড়ার তরে
কবিতা মুখস্থ করে
ভাবিত কি করে পায় মিলের সন্ধান,
যাহারা কবিতা লেখে
জানি কতই শেখে
যাহাতে লেখায় করে ব্যকুলতা দান।
বুদ্ধি বিকাশের সনে
ভাবিতাম মনে মনে
আমি কি লিখিতে পারি কবির মতন
নিজের মনের কথা
নিজ সুখ দুঃখ ব্যথা
ফুটাইয়া লেখনীতে করিয়া যতন?
বড় বড় কবি যার
বিদ্যাধনে ধনী তারা
আমার তাদের মত কোথা বিদ্যাধন ?
উৎসাহ কমিয়া এল
তবু সাধ নাহি গেল
কবিতা লিখিব লেখে কবিরা যেমন।
বাণীর চরণ স্মরি’
একাগ্র সাধনা করি
দেখি সিদ্ধি লভে কি না মন্ত্রের সাধন
দুর্বল মানব প্রাণ
যার তেজে বীৰ্য্যবান
যার স্নেহে ধন্য হয় মানব জীবন,
তাঁহার করুণা লভি
বাল্যের কল্পিত ছবি
ফুটিল মানসে মম নয়ন-রঞ্জন,
শক্তিহীন সাধ্যমত
বিরচিল অর্ঘ্য যত
তােমার কৃপায় প্রভু, আজি তা এখন
উৎসর্গ পত্র
এনেছে সাজায়ে ডালি
তবপদে দিবে বলি
তুমি যদি স্মিত হাস্যে করহে গ্রহণ,
অক্ষম ভক্তের পূজা
তুমি যদি লহ রাজা,
সার্থক লেখনী তার সফল সাধন।
উদ্বোধন
জগন্মাতার আগমনের
বার্তা জাগায় ঐ বােধন
এই লগনে শুভক্ষণে
শকতির উবােধন।
হাস্যমুখে বঙ্গবাসী
সাজাও আজি বরণ ডালা,
মহামায়ার মাল্যসাথে
আনাে জাতির মিলন মালা।
মায়ের স্নিগ্ধ চরণ-তলে
এইত মহা সন্ধিক্ষণ,
ভারত জুড়ে ঘরে ঘরে
হক শকতির উদ্বোধন।
আয় স্বজাতি, আয় বিজাতি,
কারেও হেলা করব না,
সবাই মিলে হৃদয় খুলে
করব মায়ের বন্দনা।
উদ্বোধন
শক্তি কোথা শক্তি কোথা
একাগ্র আজ ভক্তি কই,
সাধনা কই শক্তি লাভের,
একতা কই সৰ্বজয়ী ?
ঘিরেছে যে দুর্বলতায়
মমাদের সবার দেহ মন,
আজ পরিহার করতে তারে
চাই শকতির উদ্বোধন।
দুর্বলতার সঙ্গী যারা
স্বার্থ এবং হিংসা দ্বেষ
বীৰ্যবলে তাদের দলে
শান্তিভরা করব দেশ,
ছােট গরীব মূখ বলে
কারেও ঘৃণা কব না,
সবাই মানুষ, সবার মাঝে
দেবতা আছেন ভুলব না।
আড্র হবে চিত্ত মমাদের
দেখলে দুঃখীর দুঃখ ক্লেশ,
সবায় ভালবাসব মােরা
কব না আর ব্যঙ্গ শ্লেষ,
আলস্যে আর কাটবেনাক
সময় মােদের অনুক্ষণ,
৬ প্রতিজ্ঞা এই করতে হবে বৃথায় না যায় শুভক্ষণ। কইগাে কোথায় পুরনারী, কল্যাণীরা আয় না সব, আজ শকতির উদ্বোধনে শােনাও পূত শঙ্খ-রব। ঘরে ঘরে জাগগা নারী, উৎসাহেতে ভরও মন, তােমরা সবাই জাগলে হবে মহাশক্তির উদ্বোধন। নবীন যুগের নবীন আলােয় ঘুচুক দেশের সকল দুখ, মমাদের সত্য নিষ্ঠা ত্যাগে আসুক আবার শাস্তি সুখ, ধর্মপথে মতি রেখে কপথে অগ্রসর হ’তেই হবে আজ আমাদের- ছাড়তে হবে মনান্তর। শরতে আজ বঙ্গ জুড়ে বাজছে শােনাে ঐ বােধন এই লগনে শুভক্ষণে হক শকতির উদ্বোধন।
বাণী-বন্দনা
হে দেবী বিদ্যাভরণ,
আজিকে আমার হৃদয়-দেউলে
তােমারি পূজার্চনা।
জান কি জননী তাহারি লাগিয়া
মহা উৎসাহে উঠেছি জাগিয়া
পূৰ্বাৰ্জিত আলস ত্যজিয়া
নবীন উন্মাদনা
লভিয়াছি তাই অন্তরে আজি,
ভকতি-পুষ্পে ভরিয়াছি সাজি,
তােমার বীণা মা, উঠিয়াছে বাজি’
মম অন্তর ভরি,
কি দিয়ে পূজিব নহি গাে মা ধনী,
তবু জানি তুমি সবার জননী,
তাই আনিয়াছি ওগাে বীণাপাণি,
হৃদয় পাত্রে করি-
কে
ৱেধা সারা জীবনের সাধনা আমার, ভক্ত হ’বার সাধনা অপার- আর আনিয়াছি অর্ঘ্য তােমার প্রাণের শ্রদ্ধা মাের, এ পূজা মা, তুমি করিলে গ্রহণ জ্ঞানের আলােক ভরে রবে মন, সভয়ে করিবে দূরে পলায়ন (মম) যত অজ্ঞতা মাের।
শ্রীশ্রীজগন্নাথ জী
পুরীধামের অধিস্বামী জগৎস্বামী জগন্নাথ,
সিন্ধুতীরে শ্ৰীমন্দিরে তােমায় করি প্রণিপাত।
মূর্তি তােমার দুঃখহর হেরেছি দেব, এই নয়নে,
সকল দুঃখ উজাড় করে দেয় যে মানব ওই চরণে।
দেবালয়ের পুষ্পগন্ধ আজো যেন আসছে ভ্রানে,
মধুর সে যে বাদ্যধ্বনি ভাসছে যেন আজো কাণে।
লক্ষ লক্ষ নরনারী যাচ্ছে সারা বরষ ধরে
দরশ পেয়ে ধন্য হয়ে আসছে ফিরে আপন ঘরে,
শ্রীচৈতন্য শঙ্কর দেব তােমার প্রেমে ভেসেছিল,
বিজয়কৃষ্ণ, সাধু হরিদাস, কত লােকের মন মজিল।
তােমার প্রেমে মাতােয়ারা হয় যে মানব এই মহীতে
হেথায় তারে আর তাে কভু হয় না কোনাে ক্লেশ সহিতে
পবিত্র সৌরভে পূর্ণ তােমার মন্দির মাঝে,
অপূর্ব মধুর ভাব মুগ্ধ এ হৃদয়ে রাজে।
সহস্র কণ্ঠে উঠিছে নিনাদি জয় জগবন্ধু বলরাম,
চঞ্চল সলিলা সিন্ধু তােমার গাহে বন্দনা অবিরাম।
বীর হনুমান ও সিংহকেশরী তােমার দ্বারের প্রহরী,
সম্মুখ দ্বারে চণ্ডাল তরে “পতিত-পাবন” মুরারী।
ধন্য ধন্য ধন্য দেব জাগ্রত হে ভগবান,
উজ্জ্বল মুর্তিতে করাে ভক্ত-হৃদে অধিষ্ঠান।
কত সাধু মহাজন স্মৃতি বুকে ধরি’
সমুদ্র-সৈকতে এই সুমধুর পুরী।
* সর্বপ্রথম প্রকাশিত কবিতা। ভারতবর্ষ ১৩৩১ সাল
প্রার্থনা
প্রতি উষায় যেন প্রভু,
তােমার স্মরি,
প্রতি নিশায় কৰ্ম্মশেষে
প্রণাম করি,
সুখে দুঃখে রাখি মনে
তােমার কথা,
তােমার পদে উজাড় করি
সকল ব্যথা।
পাই যা কিছু কারো কাছে
তোমার কৃপায় ,
দিই যা কিছু বুঝি যেন
তােমার দয়ায়,
আমার মাঝে তোমায় যেন
সদাই দেখি,
দান যা তােমার সবই ভালো।
ভাবতে শিখি।
যখন আমি মগ্ন রব
তোমার ধ্যানে,
রেখা
নিন্দাপ্ততি তুচ্ছ যেন
যায় কানে।
নিত্য মাথায় ঝরে তােমার
আশীষ-ধারা
এমনি আমায় ভক্ত করে।
আপন হারা।
দোষ যা কিছু করে থাকি
কোরাে ক্ষমা,
ধৈৰ্যশীল করে মেরে
পৃথী সমা।
দুঃখ ব্যথা যা কিছু মাের
হরেই নিও,
তােমার প্রেমে হৃদি মম
ভ’রেই দিও।
সত্যে যেন আস্থা থাকে
মিথ্যাতে নয় ,
শান্তি যেন সঙ্গী সাথী
সর্বদা রয়।
তােমার পদে রহে যেন
সদাই মতি,
প্রার্থনা মাের পূর্ণ করে
জগৎপতি।
অনন্ত জীবন
অসীমের মাঝে চাই অনন্ত জীবন,
যেথায় আকাশ ভরে
তারকারা খেলা করে
রবি শশী করে যেথা মুখে বিচরণ,
সেই অসীমের মাঝে অনন্ত জীবন।
যেথায় কাহারে কেহ করে নাক হেলা,
যেথা প্রেম প্রীতি স্নেহ
ভরা সবাকার দেহ,
যেখানে দুদিন বাদে ফুরায় না খেলা,
সেই অসীমের মাঝে অনন্তের মেলা।
যেথা রােগ শােক ভরা নহেক আবাস,
মানব যেখানে সুখে
বেড়াইছে হাসিমুখে
সে হাসিতে আছে মাখা শান্তির আভাষ,
যেখানে মানব ফেলে নির্ভয়ে নিশ্বাস।
যেথা রাজ-সিংহাসনে দেব ভগবান
অসীম প্রেমের সিন্ধু
ভক্তের পরম বন্ধু
দুর্বলের বল যেথা আপনি মহান,
সেই অসীমের মাঝে অনন্ত পরান।
হিংসা স্বার্থ ক্রোধ যেথা না করে প্রবেশ,
মাতৃরূপে ভগবতী
শাস্তিময়ী মুর্তিমতি
করুণার মুর্তি যেথা পিতা পরমেশ
হেরিতে বাসনা সেই অন্তরের দেশ।
বর্ষ আবাহন
এস এস নব বর্ষ,
সাথে লয়ে এস জগতের তরে
নব প্রীতি নব হর্ষ।
আনাে নব বাণী নবীন সাধনা
মুছে যাক সব পুরানাে বেদনা,
নব পুরাতনে মিলিয়া ভুবনে
জাগাও নবীন হর্ষ।
তব আগমনে গগনে পবনে
বহে আনন্দ নব,
প্রকৃতির কোলে বসন্ত হিল্লোলে
অনুরাগ অভিনব।
রঞ্জিত ঊষা নবারুণ রাগে
গ্রীষ্মের সাথে কোলাকুলি মাগে
বসন্ত ঋতুরাজ,
বরিয়া লইতে তােমারে প্রকৃতি
পরেছে নবীন সাজ।
মধুময় নব বরষে
নব উৎসাহে হাসুক কর্মী
নব জাগরণ আভাসে-
হউক ধরণী স্নিগ্ধ শীতল
স্তব্ধ হউক হীন কোলাহল,
নব আনন্দে মাতিবে প্রকৃতি
লভিয়া তােমার স্পর্শ,
এস এস নব বর্ষ।
শৈশব মাধুরী
রে শিশু সুন্দর,
ভুবন ভোলানাে তোর রূপ মনােহর,
হাসিতে কুসুম ফুটে
ভাবের লহর ছুটে
নধর অধর পুটে অমিয় নিঝর,
পবিত্র জাহ্নবী সম হৃদয় কন্দর।
তোরা সুকোমল প্রাণে
তত্ত্বকথা নাহি মেনে
সবারে যতন দিতে হ’স তৎপর
না বুঝিয়া হীন নীচ, না মানিয়া পর।
হেরিয়া তােদের রীত
জ্ঞানী হয় চমৎকৃত
হয় তো সে ফিরে চায় শৈশব সুন্দর
যখন না থাকে প্রান ভেদ আত্মপর।
রেখা
১৮
শিশুরূপে আলােকরা
এসেছিল ননীচোরা
কৃষ্ণপ্রেমে মাতােয়ারা গােপিনীর দল
পরেছিল আত্মহারা প্রেমের শৃঙ্খল।".
ওরে শিশু, আজো যে রে
তােরা প্রতি ঘরে ঘরে
পরস সবার প্রাণে মায়ার শিকল
হাসিয়া
মধুর
হাসি অমল সরল।
স্নেহাশীষ করি ওরে
দশদিক আলাে করে
থাক তােরা আত্মভােলা প্রেমিকের দল
কৰ্ম্মক্লান্ত মানবের ছায়া সুশীতল।
বড় হয়ে ধরা মাঝে
বড় হয়ে সব কাজে
বিধির কৃপায় শুভ্র রাখিও অন্তর,
ভুলােনা ভুলােনা শিশু শৈশব সুন্দর।
খােকা
ওরে দুষ্ট খােকা,
কেউ বা তােরে চালক বলে কেউ বা হাঁদা বেকা,
আমি কিন্তু দুষ্টমিতে হার মানি তাের সনে।
দিবা নিশি খুটী নাটী ফন্দী মনে মনে,
চোখ দুটী তাের দুষ্টামীতে সদাই থাকে ভরা
তারি সাথে ঝতে থাকে হাসির ফোয়ারা।
বায়না আর আবদারে তুই ব্যস্ত করিস মােরে
তবু যে রে রইতে নারি চোখের আড়াল করে।
কখন কখন দেখি তোরে চপল অতিশয়,
কখন আবার ডোে কথায় অবাক হতে হয়।
ভালবাসায় বাঁধতে পারিস ছােট বড় সবে,
বন্ধু যে তাের নয় কে আমি পাইনে খুজে ভবে।
প্রার্থনা মাের দুষ্টমী আর হাসি খুসী নিয়ে
ভরে থাকিস ঘরটী মােদের ভ'রে থাকিস্ হিয়ে।
আশীৰ্বাদ
উজলি’ মােদের ক্ষুদ্র ভবন
আসিয়াছ হেথা তােমরা দুটা
মাতৃ-হদয় বিকশিত করি’
কুসুম কোরক উঠিল ফুটী।
ধন্য হউক জীবন তােদের
সফল হউক আশা,
উচ্চ হৃদয় হইয়া লভিও
সবাকার ভালবাসা।
ফুটে ওঠ তােরা পারিজাত সম
আপন গরবে ভাসি,
নন্দনবন-গন্ধ বিহাের, (হারে)
নয়ন ভুলানাে হাসি।
তােদের হেরিয়া বাল্যের স্মৃতি
আবার ফিরিয়া আসে,
মধুর শৈশব দেয় উকি ঝুকি
জীবন-মধ্যাহ্ন মাঝে।
আশীর্বাদ
চেনে নাক শিশু ক্রুর সংসার
থাকে আত্ম পর,
অর্থের মােহ তাহাদের মন
করেনা স্বার্থপর।
আজি যে মধুর এক বন্ধনে
গড়িয়া উঠিছে হৃদয় দুটা
দুদিনের বাদে কলহ বিবাদে
সে বাঁধন যেন না যায় টুটি।
পুণ্যশক্তি তােদের হৃদয়ে
থাক চিরদিন পূর্ণভাবে,
ধরামাঝে তােরা উজলিয়া ওঠ,
জ্ঞানে বিদ্যায় সগৌরবে।
দেবের আশীষ বন্মের মত
থাকুক তােদের ঘিরে,
অর্থ-বাসনা হিংসা কামনা
না আসে ক্ষণেক ভরে।
ত্যাগী পুরুষের মহান্ আদর্শ
জীবনে বরিয়া ল'য়াে
পরহিত-ব্ৰত আপনার প্রাণে
অক্ষয় করে নিয়ে।
বংশোজ্জ্বল সন্তান হয়ে
মায়ের আশীর্বাদ,
অটুট আন্থে দীর্ঘায়ু হও,
(এই) করুন বিশ্বনাথ।
সার্থক হক জীবন তােদের,
পূর্ণ মনস্কাম,
দশের মধ্যে গণ্য হউক
“সলিল” “শিশির নাম।
পুত্র ও দেবর পুত্রের প্রতি লেখিকার আশীর্বাদ।
শিশুর প্রতিজ্ঞা
মা, তুমি কি রাগ করেছ আমার উপরে
রয়েছ কেন চুপটী করে বসে,
অামি যে মা, অবােধ ছেলে অবুঝ বড় যে-
রাগ করে কি আমার কোনাে দোষে ।
এবার থেকে ঠিক বলছি তােমায় আমি মাগাে,
ভালাে ছেলে হবই এবার দেখাে,
বারে বারে রাখতে নারি তােমার যত কথা
রাখব এবার সত্যি জেনে রেখাে।
শান্ত ছেলে হব আমি শুত্ব সবার কথা
দিব মাগাে, লেখাপড়ায় মন,
লক্ষ্মীটী মা, রাগ ভুলে যাও, ডাকে আদর করে,
“আয়রে কোলে সােণার যাদুধন”
অতীত
গিয়াছে সে একদিন
উদ্দাম প্রাণ নাচিত পুলকে
সকল ভাবনা হীন,
শিশুর সরল সুকুমার হিয়া
লঘু আনন্দে বেড়াত-ভাসিয়া
চল চল বায়ু হিল্লোলে
বাজাত প্রাণের বীণ
কভু আমনে কুসুম-কলিকা
ছিন্ন করিয়া গাথিত মালিকা
সংসার-জ্ঞান-বিহিনা বালিকা
রাখিত না কারো ঋণ,
বহিত না কোনাে দুখের বেদনা
ক্রোধের কারণ ছিল নাক জানা,
সংসার ছিল পূর্ণ অজানা
শান্তি ছিল অধীন।
আর না ফিরিয়া আসিবে সে কাল
লয়েছে গুটায়ে নিজ স্নেহ-জাল,
মধুর অতীতে সুখ শৈশবে
গিয়াছে সে একদিন
বৰ্ত্তমান
এখন বর্তমান
কামনা-মদিরা পান করি’ সুখে
গাহে যৌবন-গান,
মহা উৎসাহে করিছে নৃত্য
বাসনায় ভরা তরুণ চিত্ত,
উদ্দাম আজি উজল দৃপ্ত
করিতেছে সন্ধান
কোথায় তাহার ঈঙ্গিত ধন
মিলিবে কোথায় মণি-কাঞ্চন,
কোন্ পথে ধীরে ফেলিয়া চরণ
হইবে সে আগুয়ান।
জীবন-ঊযায় যে ছিল কোমল
আজি সে কঠিন আজি সে প্রবল
সংসারে এসে সহিয়া কেবল
শত বিদ্রুপ বাণ,
তথাপি তরুণ প্রাণ
আশা উৎসাহে ভরিয়া হৃদয়
গাহে যৌবন গান।
তরুণের জয়যাত্রা
জীবন-উষায় জয়ের পথে এগিয়ে চল্ এগিয়ে চল,
বিপ্ন বাধা যা কিছু সব দুপায়ে দল, দুপায়ে দল।
তরুণ প্রাণের নবীন আশা
নবীন সাহস নবীন ভাষা
বক্ষে নবীন ভালবাসা আমরা তরুণদল,
যুঝব চিরন্তনের সাথে বুঝব মনের বল।
পুরাতনের বক্রপথে
চলব না আর কোনােমতে
থাকব সদা ন্যায়ের পথে আমরা তরুণ দল,
চলরে ভাই, জয়ের পথে সবীর দাপে চল,
জীর্ণ যত পন্থা সখা,
ফেলব দূরে নইত একা
পিছন হতে পার্থ-সখা যােগায় বিরাট বল,
সত্য পথে মহৎ পথে সাহস ভরে চল।
२१
তরুণের জন্য।
পুরানাে সেই মিথ্যাবেদী
ভাঙ্গবাে মােরা অত্রভেদি
যাহার তলে নিরবধি চলছে নানা ছল,
সত্য শিবের করব পুজা আমরা তরুণ দল।
যাত্রা পথের আবর্জনা
ফেলব দূরে প্রতিকণা
ধূলিকণা ও হবে মহৎ মহত্ব সম্বল,
সবুজ নিশান উড়িয়ে চলি আমরা তরুণ দল।
ওই যে তরুণ উষার আলো
ঘুচায় ধরার আঁধার কালাে
ওরি মত শুভ্র র’বে মােদের হৃদয়-তল,
জীবন পথের নবীন পথিক আমরা তরুণ দল।
অসহায়ের হব সহায়
চিত্ত ভরা রইবে দয়ায়,
মুছব মাের দীন দুঃখীর তপ্ত নয়ন জল,
ফুল্লণে পথের পানে চলরে তরুণ চল।
সেবক মােরা জগৎ মাতার,
আশীষ লভি বিশ্ব পিতার
এসেছি এই জগত-মাঝে আমরা তরুণ দল।
নাইকো কোনাে শঙ্কা সহায় দেবের চরণ-তল।
নবীন প্রাণের আশা দিয়ে
নব ভাবের অর্ঘ্য নিয়ে
গড়ব মােরা নুতন ধরা স্বর্গ সমতুল
মাথায় ল’য়ে বিশ্বপিতার আশীৰ্বাদি ফুল।
চলরে তরুণ জয়ের পথে মহােৎসাহে চল,
যাত্রা পথের বিপ্ন যত দৃপ্ততেজে দল।
১৩৩৪ সালের তরুণ-কিশাের সন্মিলনীর দ্বিতীয় বার্ষিক কবিতা প্রতি
যােগিতার শ্রেষ্ঠতালাতে রৌপ্যপদক প্রাপ্ত।
মানস-সঙ্গিনী হে কবিতা মানস-সঙ্গিনী নিভৃত অন্তর লােকে নিঝর রূপিণী, অবকাশ যাপনের হে সুন্দর-প্রিয়া, তােমারে বেসেছি ভালাে প্রাণ মন দিয়া। তুমি মিটায়েছ মাের অন্তরের কাব্য-উন্মাদনা, তােমারে লভিয়া আমি শিখিয়াছি বাণীর বন্দনা। তুমি কর নাই কভু কুটী প্রকাশ যখন যেরূপে আমি করিয়াছি আশ- সাজায়েছি তােমা আমার প্রাণের রঙে হে প্রাণ-প্রতিমা, কতু লাল, কভু শ্বেত, সবুজ বরণে তােমারে হেরেছি আমি মানস-কাননে। কখনাে বেদনা ভরা ধরিয়া তুলিকা দিয়েছি ললটে তব মসী কৃষ্ণ রেখা, তুমি তাহে বিন্দুমাত্র হওনি ব্যথিত। যখন যে রঙে আমি করেছি রঞ্জিত তখনি সে রঙে তুমি উঠেছ রজিয়া মানস-কানন সম রূপে উদ্ভাসিয়া। হে মাের কল্পনা রাণী, ফুটায়ে তুলেছ তুমি এ প্রাণের অকথিত বাণী । স্থান দেছ তারে প্রিয়া, অতি সমাদরে সন্তর্পনে আপনার স্নিগ্ধ বক্ষো’পরে। ওগাে সাবধানী, শুধু তার আগে দেখেছিলে জানি বা না জানি করিতে নিজস্ব তােমা, তুলিকায় আছে কিনা প্রাণ, পারে কি না এ শিল্পীর হাতে আপনারে করিতে প্রদান। স্পর্শে মাের সৌন্দর্য্য তােমার বিকশিত হয় কিনা তাহা দেখিবার- মানসে অন্তরে মম লয়েছ আবাস, অব্যক্ত করিতে ব্যক্ত সাধ্যমত করিছ প্রয়াস। আমি বলি নিজরূপে ফুটে ওঠ প্রিয়া, আমার প্রাণের সর্ব অজ্ঞতা নাশিয়া নিশির শিশির সম এ প্রাণের প্রতি বিন্দু মম- গ্রহণ করােগগা তুমি জ্ঞান বিদ্যা ভাব ভাষা যাহা কিছু সার, শুধু পূর্ণরূপে প্রস্ফুটিত হও তুমি সাধনা আমার।
মানসসঙ্গিনী
থাক তুমি অচঞ্চল আমার অন্তরে,
তােমারে ঘেরিয়া আমি এ জীবন ভরে
চয়ন করিব কত কুসুম নবীন
এ হৃদয়-বন্ত হ’তে নিত্য প্রতিদিন।
করলােক হতে
আহরণ করিবার তরে, ভেসে যাব কল্পনার স্রোতে।
সিদ্ধি যবে লভিবে সাধনা
কবিতায় মূর্ত হবে হৃদয়েরসকল কামনা
সকল বেদনা সৰ্ব্ব সুখ অনুভূতি,
তখন জানিব তুমি তুষ্ট মাের প্রতি,
বন্দী তুমি মম অনুরাগে
আমার লেখনী-মুখে অচঞ্চল তব প্রেম জাগে,
তখনি বুঝিব তুমি
আমারে যাবেনা ছাড়ি’ যতদিন বেঁচে রব আমি।
তারপর অনন্ত কালের স্রোতে
লুপ্ত হবে এদেহ আমার নশ্বর এ ধরণী হইতে,
কিন্তু জেনে যাব আমি, তুমি মাের স্মৃতি
আঁকড়িয়া ধরি বুকে জেগে রবে নিতি
নিদ্রাহীন চোখে,
সুষুপ্তির অঙ্কে কবি পড়িবে ঢলিয়া,
সাধনায় সিদ্ধিলাভ সুখে।
মা
মা নাম অমিয় ভরা সুখ-প্রস্রবণ
জনম লভিয়া শিশু করে উচ্চারণ,
বিপদে সম্পদে সদা মাতৃনাম রহে গাঁথা
হৃদয় মাঝার
মাতৃস্নেহে পরিপূর্ণ জগত সংসার।
মা নাম ত্রিতাপ হরা মাতৃস্নেহে পূর্ণ ধরা
কে আছে মায়ের সম স্নেহের আধার,
তােমারে ভুলিলে মাগাে, কি থাকে আমার?
তােমার মুখের হাসি তব সুখ দুঃখ রাশি
মােহময় জীবনের আলােক আমার,
রােগে শােকে সুখে দুখে মাতৃনাম দেয় বুকে
আনন্দ অপার,
মাতৃস্নেহ এ জনমে নহে ভুলিবার।
মাতৃস্তন্য-সুধা পিয়ে পরিপুষ্ট ছেলেমেয়ে
মাতৃশিক্ষা জীবনের পরম বৈভব,
সে শিক্ষায় উদ্ভাসিত সকল গৌরব।
মা
বল পুত্ৰ, বল কন্যা, বল অনিবার
মাতৃস্নেহে পরিপূর্ণ জগত সংসার।
সন্তান যেখানে থাক্ বিপদে তাহার
আপনি কঁদিয়া উঠে হৃদয় মাতার,
নিঃস্বার্থ মায়ের স্নেহ খ্যাত চরাচর
সেই স্নেহ ভূলে কোন্ পাষণ্ড পামর ?
মায়ের হৃদয়-তলে যে স্নেহ-প্রদীপ জ্বলে
জগতে কিছুই নাই সমান তাহার,
উচ্ছসিত কণ্ঠে ডাকি জননী আমার।
পৰ্বতে গহনে বনে মাতৃনাম রাখি’ মনে
অতিক্রমি’ দূরারােহ কণ্টক কান্তার,
জানি, মাতৃস্নেহ পূর্ণ জগত সংসার।
মাতৃস্নেহ-বৰ্ম্মে অঙ্গ করি’ অচ্ছািদন
বাহু বলে কর পুত্র অসাধ্য সাধন।
মাতৃস্নেহাশীষ মাথে করিয়া ধারণ
লভ কন্যা, পরিপূর্ণ আদর্শ জীবন।
কৈশােরে যৌবনে প্রৌঢ়ে স্মরি’ অনিবার
মাতৃস্নেহে পরিপূর্ণ জগত সংসার।
শ্রদ্ধার পূজা
অতীতের কোলে পড়িয়াছে ঢ'লে
সেদিবস বহুদিন,
যে দিবসে মােরা আশ্রয় হারা
বিদেশে বন্ধুহীন।
শঙ্কা ব্যাকুল কয়টি নয়ন
খুজেছিল চারিধারে
এ দুখ-সাগর সাতারিয়া উঠি
কোন্ স্নেহ-পারাবারে ?
চিন্তা করিতে না দিয়া, চকিতে
লয়েছিলে সব ভার,
আনন্দা পূর্ণ নয়নে (আজো)
স্মরি তাহা বার বার।
তােমার স্নেহের নীড়ে শিশুক’টি ধীরে ধীরে
বাড়িয়া উঠিল পরে পর,
অপার্থিব স্নেহ দানে মহৎ শিক্ষার গুণে
তাহাদের হৃদি-পরে রচিলে যে
শ্রদ্ধাৱ পূজা
তাহারি প্রভাবে আজি সাজাইয়া ফুল সাজি
পুলকে ভরাতে যেন পরে চরাচর।
(ও) মহান্ হৃদয় জুড়ে যে প্রেরণা লীলা করে
তাহার আভাযে পূর্ণ (ক) তাদের অন্তর।
এ জীবনে দিতে পাড়ি সম্মুখে রয়েছে পড়ি
দীর্ঘ দুই পথ,
মহৎ শিক্ষার গুণে মন যেন লয় চিনে
কোন্ সত্য পথ।
ও প্রশান্ত হৃদি-তলে যে প্রদীপ্ত শিখা জ্বলে
তাহারি আলােকে খুজি ভবিষ্যৎ পথ,
যে পথে চলিলে সত্য পূর্ণ মনােরথ। *
* দেবপ্রতিম জ্যেষ্ঠতাতের প্রতি স্নেহানুরক্তকন্যার ভক্তি শ্রদ্ধা
নিবেদন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
( মহাত্মা গান্ধীজীর প্রতি)
ভারতের মন্ত্রদ্রষ্ট। হে ঋষি প্রবর,
কবে কোন্ শুভলগ্নে দেখেছিলে তুমি
ভারতের মুক্তিস্বপ্ন, করিয়া নির্ভর
ঐশীবলে, হবে মুক্ত এ ভারত ভূমি।
কল্পনা বা স্বপ্ন সত্যে করি পরিণত
আনিতে চাহিয়াছিলে স্বাধীন স্বরাজ,
সফল করিতে তব জীবনের ব্রত
হে মহান্ নিজে নিলে দরিদ্রের সাজ।
দেখালে ত্যাগের শক্তি আপনার প্রাণে
সত্যাশ্রয়ী সত্য বলে হলে বলীয়ান,
নিয়ােজিলে কর্মশক্তি, শক্তি-উদ্বোধনে
নিদ্রালস গণশক্তি লভিল পরাণ।
শ্রদ্ধানি
ঘােষণা করিলে তুমি সুগম্ভীর স্বরে
কে আছ স্বদেশ-ভক্ত ছুটে এস আজ,
অহিংস অসহযােগ করিবার তরে
শক্তির বিকাশ হের আপনার মাঝ ।
যেখানে যেখানে চলে দুর্বল-পীড়ন
সেখানে দাড়াও বীর নির্ভয় হৃদয়,
রক্তপাত শৃহত্যাগ করিয়া তখন
সত্যাগ্রহ, সত্যাগ্রহে লভিবে বিজয়
“মহাত্মাগান্ধী”র জয় বলি উচ্চৈঃস্বরে
দিকে দিকে জেগে উঠে ভারত সন্তান,
মাতার সুপুত্র কত আসি নত শিরে
লভিল শিষ্যত্ব তব, ধন্য মতিমান।
ঝাঁপায়ে পড়িল সবে কর্মের সাগরে
ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন করিল সকল,
বিস্মিত জগতবাসী তবু শক্তি হেরে
কল্পনা বাস্তবে হতে চলিল সফল।
অহিংস সেনানী লয়ে গঠিলে যখন
বিপুল বাহিনী, শুনি অসীম প্রভাব,
হেরিতে আসিল কত জন অগণন
মুগ্ধ হল গৰ্বহীন হেরিয়া স্বভাব।
সিদ্ধি পথে পেলে বাধা সাময়িক ভাবে
রচিত হইল এক অপূৰ্ব আইন,
কারার দুয়ার খোলা, এস যারা যাবে
বিচার হবে না বদ্ধ রবে বহুদিন।
হাসিমুখে কারাগারে গেল কত লােক
কোনাে দোষ নহে শুধু স্বদেশের বুকে,
হেরিতে চাহিয়াছিল স্বাধীনতা-লােক
পরাধীন গেল তাই করার সম্মুখে।
শিষ্যবৃন্দ সাথে সাথে হে জ্ঞানী মহান্
তােমরা সহাস্য মুখে গেলে কারাগারে,
বুঝালে দৃষ্টান্ত দিয়ে নহে অপমান
রুদ্ধ মুক্তি অভিযান ক্ষণেকের তরে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি
হে যােগী। তপস্যা তব নহে ত নিষ্ফল
একান্ত বিশ্বাস ভরে ডাকি ভগবানে-
বলিয়াছ মুক্তিস্বপ্ন হইবে সফল
আত্মবল দাও যদি সবাকার প্রাণে।
ভস্মচাপা বহ্নি সম এবে পুনৰ্ব্বার
নবতেজে জনগণ তুলিয়াছে শির,
ভারতের হৃদিতন্ত্রে উঠেছে ঝঙ্কার
মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি, তরে জেগে উঠে বীর।
জেগেছে তরুণ শক্তি বিপুল বিক্রমে
দুঃখে অচঞ্চল এরা মরণে না ভরে,
জাগিতেছে গণশক্তি অপূর্ব উদ্যমে
বন্ধনে পীড়নে কভু ভয় নাহি করে।
হে মহাত্মা! মগ্ন এবে পুনঃ কোন্ ধ্যানে
নীরবে নিভৃতে তুমি আপন আশ্রমে ?
অপামর চেয়ে আছে বীর তব পানে
নব মন্ত্র লভেছ কি নিভৃত বিশ্রামে।
ভারতের মুক্তিস্বপ্ন করিতে সফল
এস বীর, সাথে লয়ে আত্মিক বৈভব,
ঐশীবলে বলী তুমি নহ নিঃসম্বল
সবার নমস্ত পূজ্য, ভারত গৌরব।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রতি
যে ফুল তুলিনি যে ফুল দেখিনি
যে ফুলে গাঁথিনি মালা,
তুমি যে সে ফুল তুলিয়া পূর্বে
ভরেছ আপন ডালা !
যে গান ইহার পূর্বে আমার
কখনাে হয়নি গাওয়া
সে গান গাহিতে চমকিয়া পাই
তােমার সুরের ছাওয়া।
যে কথা গােপনে মম অন্তরে
বেঁধেছিল তার বাসা,
সে কথা ভাষায় ফুটাইয়া দেখি
সে ও যে তােমার ভাষা।
যে ছবি আমার নয়নে হে “বি”
লেগেছিল খুব ভালাে,
তাহারে আঁকিয়া দেখিনু এতেও
পড়েছে তোমার আলাে।
যে ছন্দে আমি সজাই কবিতা
সাজাবার পর দেখি
তুমি সে ছন্দ বহুদিন আগে
সাজায়ে ফেলেছ একি ।
আমার মানস-কাননে হে কবি,
ধরেছে যতেক ফল
দেখিনু তাহারা করেছে পরশ
তােমার চরণ বল।
তুমি যাহাদের করেছ আপন
মানস লােভন ইঙ্গিতে,
আমি তাহাদের পারিনা ধরিতে
চারি আঙ্গুলের সঙ্কেতে।
বাগবাদিনীর অঙ্ক জুড়িয়া
তুমি লভিয়াছ স্থান,
বিশ্ব প্রেমের গরীমায় তব
ভরিয়া রয়েছে প্রাণ।
আমার কবিতা ছন্দ আমার
শুন হে বিশ্বকবি,
তােমারি ছায়ায় জীয়াইতে চায়
তােমারি প্রসাদ লভি।
জীবন-তরী
বিজন ছাতের পরে বসি একেলা
কত কথা আসে মনে প্রভাত বেলা
যাহা কিছু করে থাকি যাহা কিছু আছে বাকী,
সে সকলি মনে হয় মায়ার খেলা
বিষাদে উদাস হয় হৃদয় বেলা।
ক্রমে ঢলে পড়ে রবি গগন ভালে
জগত ফেলিল ঘিরি সােনালী জালে
আমি একা বসে হেথা অজানা কি মনটব্যথা,
আমারে ঘিরেছে আজি প্রভাত কালে
কি যেন কি চায় হৃদি অন্তরালে।
আশে পাশে আছ মাের তােমরা কেগো ?
কেন ভাল বাস মােরে বুঝি নে যে গাে।
যতদিন আছি হেথা মাের যত দুঃখ ব্যথা,
তােমরা ঘিরিয়া সদা রয়েছ যে গাে
তথাপি কি চায় মন বুঝিনে রে গাে।
এতদিন যাহা লয়ে ছিনু ধরাতে,
আজ মনে হয় তাহা ভারা মিছাতে।
রূপ যৌবন মিছে সবি পড়ে রয় পিছে,
অর্থ পারেনা মন সুখে ভরাতে,
হৃদয় বসেন আর মিছা খেলাতে।
তুমি কে গাে বসে আছ সুদূর পারে ?
এতদিনে মনে হয় চাই তােমারে।
যত সুখ দুঃখ হাশি যত পাপ পুণ্যরাশি
উজাড় করিয়া দিনু চরণ’পরে,
আমারে কি ল’বে তুমি করুণা করে।
অরূপ তােমার রূপে উঠিছে ভরি’
আমার পরাণ আলি আহা আ মরি,
জীর্ণ এ দেহখানি শতছিন্ন এ পরাণি,
পারিবে কি পারে নিতে হে কাণ্ডারী
পদরেণু পাবে কি এ জীবন-তরী।
শ্ৰদ্ধাস্পদ রবীন্দ্রনাথের ‘সােনার তরী’র ভাবাবলম্বনে
পিতৃহারা
আজ মনে হয়
কোথা সেই স্নেহ-নীড় চির মধুময়,
সংসারের কোলাহলে দেহ মন শান্ত হলে
ছুটে যাই তৃপ্ত হতে কাহার ছায়ায়
কই স্নেহময় পিতা কোথা সে আশ্রয় ?
সে গম্ভীর তােজোদীপ্তি সে পবিত্র দেবমুর্তি
পাবনা পাবনা আর দেখিতে হেথায়,
মােদের ছাড়িয়া পিতা চলে গেছে হায়।
যখন শৈশবে
ফেলে গিয়েছিলে পিতা, বুঝি নাই তবে
কি ছিল কি চলে গেল কি পাবনা ফিরে,
আজীবন খুজিলেও ভাসি’ অনীরে।
কেন চলে গেছ পিতা, কি দোষ কাহার,
পিতৃহারা হৃদে প্রশ্ন জাগে অনিবার ?
শৈশব বিগতে যবে জ্ঞানের সঞ্চার হবে
তখন খুজিবে পুত্র কন্যারা তােমায়,
একথা স্মরণে আনি’ কেন তুমি ওগাে জ্ঞানী,
আর-কিছুদিন রহিলে না এমর ধরায় ?
স্মৃতি
বধূরূপে তব গৃহে
এসেছিনু যবে স্নেহে
লয়েছিল সাদরে আদানি,
তার পর দিনে দিনে
আপনার কন্যা ১
একাসনে বসাইলে প্রভেদ না মানি
কভু দোষে কভু গুণে
অতি প্রিয় জানি
তিরস্কার পুরস্কার করিতে প্রদান,
বিভক্তি সেবা পেয়ে “এটা বড় ভাল
বলিয়া সবার কাছে বাড়াতে সম্মান।
আজ তুমি হেথা নাই দেখা তব নাহি
তথাপি ও স্নেহ-স্মৃতি নহে ভুলিবার,
অজ্ঞানে যে পিতৃহীনা কে বুঝিবে সেই
পিতৃস্থানে শত্রু-স্নেহ কি স্বার্থক তা
দেশবন্ধু স্মৃতি-পূজা
দেশের জন্য করেছিলে তুমি জীবন পণ,
শশধর সম আলাে, করেছিলে সারা ভুবন।
বলেছিলে তুমি বীরের মতন জলদ-মন্দ্র স্বরে-
“নত হইবনা, আনিব স্বরাজ চিরউন্নত শিরে।
ধূলিকণা সম ম্রিয়মান থাকা মানব ধর্ম নয়।”
স্মৃতিটী তােমার মােদের হৃদয়ে আজো উজ্জ্বল রয়।
তিমির তাহারে মলিন করিতে পারেনা কভু।
পুণ্য ত্যাগের ধন্য প্রভাবে দূরে গিয়ে কাছে রয়েছ তবু।
জানি তুমি রবে হে চির অমর, দেশের সকল আশার মাঝে
দিবে উৎসাহ অমর হইতে দেশহিতকর সকল কাজে।
বলে গেছ তুমি যে সকল কথা হে জ্ঞানী মহান, দেশের দু
সে সকল কথা ধ্বনিছে আজিও তব দেশবাসী সবার বুকে
রঙ্গলাল-স্মৃতি
বঙ্গকবি রঙ্গলাল আজি কতদিন
অতল কালের গর্ভে হয়েছে বিলীন
বিনশ্বর দেহ তব কত বর্ষ আগে,
কিন্তু কবি, স্মৃতি তব আজো হেথা জাগে-
তাদের অন্তরে, যারা হেরেনি তোমারে
তুমি গত হলে যারা এল ধরাপরে,
তাহাদের চিত্তে আজো ধ্বনিতেছে হায়
যে কথা লিখেছ তুমি প্রদীপ্ত ভাষায়।
স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে ?”
শুধু এই দুটী কথা মৰ্ম্ম যাতনায়
আমরা স্মরণ করি’ প্রণমি তােমায়।
ভাবি মনে কবি শুধু রসস্রষ্টা নয়,
মন্ত্রদ্রষ্টা কবিগণ ভবিষ্যৎ কয়,
কবে গত হয়ে গেছে পদ্মিনীর যুগ
আলাদ্দীন ফেলে গেছে পৃথিবীর সুখ,
লাল-স্মৃতি
কিন্তু আজো আলাদ্দীন পদ্মিনীর প্রায়
দুরাকাঙ্ক্ষা ধর্ম সাথে বিবাদ বাধায়।
পৃথিবী পাপের ভারে আজিও পীড়িত,
লােভীর উদ্যত হস্ত হরিছে নিয়ত
অন্যের ঈপ্সিত ন্যায্য দুলভ রতন,
ভীমসিংহ সম দুঃখী আজো কত জন।
হে কবি, ভারত আজ তব বেদনায়
মিলায়ে বেদনা নিজ, স্বাধীনতা চায়।
পরের শৃঙ্খলে বদ্ধ হস্ত পদ চয়
তথাপি বন্দীর মৰ্ম্ম বান্দা কারাে নয়।
মােহমুগ্ধ অন্তরের খুলিয়াছে বার
সে শুধু শুনিছে আজি মৰ্ম্মের চীৎকার,
সুবৰ্ণ পিঞ্জরে বদ্ধ বিহঙ্গের প্রায়
পরাধীন দেশবাসী গর্জিতেছে হায়
চাহিনা বিলাস-পণ্য চাহিনা বাহার
খুলে দাও অবরুদ্ধ পিঞ্জরের দ্বার।
বিগত হয়েছে মােহ-ভারত এখন
ফিরে পেতে চায় নিজ স্বাধীনতা ধন।
তুমি বলেছিলে কবি সখেদে যখন
“রে ভীরু, রাখিতে নারে স্বাধীনতা ধন”
তখন আসিনি মােরা জগত-মাঝারে
কিন্তু সেই মৰ্ম্মস্পশী ভাষার ঝঙ্কারে
আজো লাজে অবনত অন্তর মমাদের,
রাজস্থান নহে মাত্র, সারা ভারতের
ব্যাকুল মানব-চিত্ত স্বাধীনতা তরে
আজো তারা শ্রদ্ধাভরে তব বাক্য স্মরে,
স্বাধীনতা হীনতায় চাহিনা:বাঁচিতে
অধীনতা ব্যথা আর পারিনা সহিতে।
কৰ্ম্মদেবী পদ্মিনীর মতই আবার
ভারতের নারী হক বীরত্ব আঁধার।
জাগিয়া ভারত সিংহ বিপুল বিক্রমে
স্বাধীন করুক পুনঃ নিজ বাসভূমে,
হে কবি, উদ্দেশে তব করিয়া প্রণতি
রচিলাম শ্রদ্ধাভরে রঙ্গলাল-স্মৃতি।
* ১৩৩৫ সালের মাঘ মাসে মাইকেল-লাইব্রেরীর কবিতা-
প্রতিযােগিতায় শ্রেষ্ঠত্বলাভে ‘মধুমিলন’ সভায় রৌপ্যপদক প্রাপ্ত।
দুই-দিক
কল্পনা ছুটিয়া চলে পুষ্পরথ সম
গতি তার শ্রান্তিহারা বাধা বন্ধ হীন,
নব নব রূপে আসে মনকুঞ্জে মম
নিমিষে আঘাত লভি না হয় বিলীন।
প্রতিদিন শ্রবণে সে যে বাণী শুনায়
নাহি তাহে নিরাশার নিষ্করুণ ভাষা,
অন্তরে মধুর ভাব সে নিতি জোগায়
নানাভাবে দেয় প্রাণে সুখ স্বপ্ন আশা।
বাস্তব জগতে যবে চলিবারে চাই
শত বাধা বিঘ্ন আসি রােধ করে পথ,
মনে হয় অভিলাষ কেমনে পূরাই
অর্ধপথে গতিহারা কল্পনার রথ।
বিস্ময় স্তম্ভিত প্রাণে ভাবি শুধু তাই
কল্পনা বাস্তবে কেন সাম্যভাব নাই।
বন্ধুর পত্র
বন্ধু, তােমারে ভুলি নাই,
সারাদিন যায় কাজ কাজ করে
সারারাত পড়ে ঘুমাই অঘােরে
তবু জেনাে এই বিরল অবসরে
তুমি আছ মাের প্রাণে ভাই।
বিশ্বাস করাে প্রাণের বন্ধু,
তােমারে কখনাে ভুলি নাই।
ছুটির দিনেও চিঠি একখানি
লিখি নাই বলে রেগেছ তা জানি,
তাই নিরুপায় অপরাধ মানি,
কিন্তু তােমারে ভুলি নাই,
কর্মজগতে দূরে রহিলেও
মনে-জগতে যে বাঁধা ভাই।
প্রেম
সে পবিত্র প্রেম চাই অনিন্দ সুন্দর
হৃদয়ে অঙ্কিত যাহা থাকে চিরতরে,
ভালবাসা চাই প্রভু, চির-মনােহর
মলিন না হয় যাহা কালের তিমিরে।
যে প্রেম স্বার্থের লাগি শুধু আসে যায়
সে প্রেম কামনা ভরা চাহি নাক তায়,
চাহি না প্রেমের ভান ছলনাভিনয়
মরীচিকা মিথ্যা মােহ চাহে না হৃদয়।
যে প্রেম উজল চির আপন প্রভায়
সত্যের আলােকে যাহা নিত্য জ্যোতির্ময়,
যে প্রেমে সংশয় দৈন্য আবিলতা নাই
নিভৃত অন্তর হ’তে সেই প্রেম চাই।
চাই প্রভু, সেই প্রেম অনন্ত নির্ভর
জীবনে মরণে যাহা শাশ্বত সুন্দর।
মিলন
তরুণী উষারে যথা তরুণ তপন
ব্যাকুল হৃদয় ল’য়ে করে আলিঙ্গন,
বিক্ষুব্ধ অন্তরে ধরি তরঙ্গ বিপুল
সিন্ধু গঙ্গোত্রীর সনে মিলিতে ব্যাকুল।
প্রস্ফুটিত কুসুমের সৌন্দর্য্যে যেমন
দূর হ’তে লুব্ধ হয় ভ্রমরের মন,
প্রদীপ্ত দিবস যবে কৰ্ম্মক্লান্ত হয়
সন্ধ্যার প্রশান্ত বক্ষে চাহে সে আশ্রয়।
ভক্ত যথা ভগবানে সঁপি’ মন প্রাণ
তাহারে লভিতে করে আপনারে দান,
তেমনি প্রেমিক প্রাণ চাহে প্রেয়সীরে
রাখিতে আপন করি’ হৃদয়-মন্দিরে।
অপূৰ্ব বিধির বিধি সৃষ্টি চিরন্তন
পুরুষ প্রকৃতি সহ পবিত্র মিলন।
অধিকার আমি ত চাহিনি শুধু করুণা তােমার অনুগ্রহ দয়া তব তাও চাহি নাই, হতে পারে সত্য তুমি কৃপা-অবতার তােমার করুণা-কণা পেয়েছে সবাই তাও হতে পারে সত্য, কিন্তু তবু আমি কখনাে চাহি না কৃপা, ভুল সখা, ভুল- যদি কৃপাপ্রার্থী মােরে ভেবে থাক তুমি। আমি এ জীবনে সখা, কভু কোনােদিন অনুগ্রহপ্রার্থী যেন না হই কাহার, আপন ক্ষমতা বলে হেথা চিরদিন বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী যেন রহি সবাকার। উচু তারে বাঁধা র’বে এ হৃদয়-বীণ সবার অন্তর-প্রীতি করি’ অধিকার।
অভিমান
অভিমান আহত হৃদয় আজিকে
গুমরিয়া উঠে বেদনা ভারে
সহানুভূতি বা সান্ত্বনা কারো
এ নীরব ব্যথা মুছাতে নারে।
দিয়েছিলে ব্যথা, পার গাে মুছাতে
অভিমানে ভরা অশ্রুরাশি,
নিজ ব্যবহারে অনুতাপ লভি’
এস যদি কাছে মধুর হাসি।
যেদিন প্রথম এসেছিলে তুমি
শুভ-বসন্তে মৌন সাঁঝে
লয়েছিনু বরি’ দ্বিধাহীন চিতে
মম যৌবন-কুঞ্জ মাঝে।
সেই যে প্রথম কম্পিত হৃদে
হয়েছিল চারি চোখের দেখা,
আজিও নিভৃতে হৃদয়-করে
রয়েছে স্বর্ণ আখরে লেখা।
অভিমান
জীবন-উষায় সঙ্গিনী করি’
গয়েছিলে যবে সকল ভার,
দেখিনি চাহিয়া কি দিয়েছ তুমি
করিনিক সমালােচনা তার।
আজি যদি তুমি ব্যথা দাও মােরে
লাগে না কি তাহা তােমায় ফিরে,
জ্বলেনি পুণ্য প্রেমের আলাে কি
মােদের দুইটী হৃদয় ঘিরে ?
যে নয়ন মন হেরিয়া আমারে
এনেছিল টানি' তােমার কাছে,
বল বল প্রিয়, সে নয়ন মন
আজো কি তােমার তেমনি আছে ?
প্রথম চুম্বন
প্রথম প্রণয় নীরে
লাজ সরে ধীরে ধীরে
দুইটী হৃদয় ঘিরে
মধুর মিলন,
প্রাণে কত আশা জাগে
কঁাপপ তনু ভাবাবেগে
পবিত্র প্রণয় রাগে
রঞ্জিত জীবন।
চোখে চোখে হাসা হাসি
চোখে ভালবাসা বাসি
চোখে চোখে চলে কত
মান অভিমান,
চোখে চোখে চা’য়া চা’য়ী
চোখে কথা কয়া কয়ী
অনুরাগী হৃদয়ের
নব অভিধান।
প্রথম চুম্বন
মিলন ব্যাকুল বাহু
শণী যেন গ্রাসে রাহু,
দোহারে জড়ায়ে দুহু
সুখ আলিঙ্গন,
সে প্রেম-পরশে বালা
স্থিরা ধীরা অচঞ্চলা,
পরুষ পুরুষ শান্ত
তৃপ্ত তার মন।
মুখের মুখর ভাষা
নয়নে বেঁধেছে বাসা
ভয়ে লাজে মূক-ওষ্ঠে
অধীর কম্পন,
আর কি সরম চলে
অধরে অধর মিলে
পূর্ণ প্রেম অনুরাগে-
প্রথম চুম্বন।
বিরহ
১
আধ জাগরণে নিরখি নয়নে
প্রিয়তম তুমি এসেছ,
ঘুমে অচেতনে হেরেছি স্বপনে
ওগাে প্রিয়, পাশে বসেছ।
আমার বিরহ বিধুর হৃদয়
পরশি শীতল করেছ,
দু’ বাহু বাড়ায়ে প্রেমালিঙ্গনে
আমার এ তনু বেধেছ।
সে পরশ স্মরি চমকিয়া চাই
কোথা তুমি কই তুমি গাে,
নিমেষে টুটিল তার ঘাের
একেলা জাগিয়া রহি গাে।
২
প্রভাতের পাখী জাগেনি তখন,
গাহেনি প্রভাতী গান,
গগনে তখনাে সুখ তারকাটী
জ্বলিছে অপরিস্নান।
৬৯
বিৱহ
ঝরেনি শেফালী ধরণী চুমিয়া
আপনা করিয়া দান,
প্রভাতের মৃদু মলয় পরশে
আকুল করিল প্রাণ।
মনে হ’ল ওগাে প্রিয়তম, তুমি
কানে কানে মােরে কহিছ,
“কখন যামিনী নিয়েছে বিদায়
এখনাে শয়নে রয়েছ।
জেগে দেখাে প্রিয়া, তােমার লাগিয়া
প্রবাস হইতে এসেছি,
গভীর আঁধার হইতে আসিয়া
প্রাণের আলােকে হেরেছি।”
এমনি করিয়া আশা নিরাশায়
কাটাই দীরঘ বেলা,
আপনার মনে কুড়ায়ে শেফালী
গাঁথি বসে কত মালা,
কতদিনে প্রিয়, এ বিরহ ব্যথা
মিলনের মাঝে মিলাবে,
কবে প্রিয়তম, পরবাস ত্যজি
আপন আবাসে আসিবে ?
নারী ও পুরুষ
নারীর উক্তি
পিতৃ মাতৃ ক্রোড়ে জনম লভিয়া এসেছি জগত-নীড়ে
তাহাদের স্নেহ যতনে লভিয়া বাড়িয়া উঠেছি ধীরে,
বরষের পর কাটিল বরষ শৈশব গেল চলি’
কৈশোের সেও হইল বিগত, গােপন চরণ ফেলি’-
আসিয়া সঁাড়াল যৌবন কাল আমার দেহের 'পরে
ফেলিল তাহার চরণ-চিহ্ন বিপুল গর্ব ভরে।
যত পাড়া প্রতিবাসী
করে কানাকানি, বলে কত কথা আমাদের গৃহে আসি।
বিব্রতা মা আমার
পিতৃ সমীপে এসে বলে ধীরে ঘরে “টেকা হল ভার,
মেয়ে ত তোমার আদরে আদরে
কারাে কোনাে কথা কেয়ার না করে
হাসিয়া খেলিয়া লেখা পড়া নিয়া দিব্য আরামে আছে,
বয়েস ওদিকে হ’ল যে পনের চোদ্দ পেরিয়ে গেছে।”
বাবা বলে হেসে “মেয়ের বিয়ের ভাবনা ভেবনা মিছে,
।
নারী ও পুরুষ
যখন ফুটিবে বিবাহের ফুল
তখন কাহার শক্তি অতুল
রুধিয়া রাখিবে তায়,
তবে কেন এত ভাবনা চিন্তা দেখি বুঝে ওঠা দায়।”
এমনি করিয়া কিছুদিন গত একদা সন্ধ্যাবেলা
আসিয়া দাড়াল অজানা পথিক হাতে লয়ে ফুল-মালা
চমকিত বিস্ময়ে
নয়নের সাথে মিলিল নয়ন শুভ বিয়ে হয়ে গেল।
শুনিনু যে সেই অজানা পথিক এসেছে পুষ্পরথে,
নিয়ে যাবে মােরে সঙ্গিনী করি’ তাহার জীবন-পথে।
হাতের সেই সে মালাগাছি দিয়া
বাঁধিয়া লইবে আমার এ হিয়া,
তার পর হ'তে তারি সাথে সাথে ফিরিতে হইবে মােরে
পিতা মাতা আর প্রিয় পরিজন পরিচিত গৃহ ছেড়ে।
কন্যা হইয়া জন্ম লভেছি বঙ্গ-জননী গেহে,
গিয়ে স্বামী সনে তার পরিজনে আপন ভকতি স্নেহে
করিতে হইবে অতি আপনার এই রমণীর কর্ম,
স্বামী সুখে সুখী তার দুঃখে দুঃখী নারীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম।
মানিয়া নিলাম তাই,
বুঝিলাম সার ইহা ভিন্ন আর রমণীর গতি নাই।
আবাল্য প্রিয় সকল ত্যজিয়া
অজানার দেশে চলিনু ভাসিয়া,
স্বভাবের গুণে সেথাকার প্রিয় হইব কি হইব না
কিছু ছিল নাক জানা।
কুমারী জীবনে আছিল আমার যতেক চঞ্চলতা
এখানে আসিয়া নিমেষে সে সব মিলাইয়া গেল কোথা,
আর না পাইমু খুজি
বাল্যের সাথী বিমলানন্দ আশৈশবের পুজি।
বধিল সংসার কর্ম-নিগড়ে
চিত উন্মুখ কৰ্ম্মের তরে,
কত না চিন্তা কতই ভাবনা আসিল হৃদয়’পরে,
আপনার তরে অতি ব্যস্ততা রেখে এমু খেলাঘরে।
যবে স্বামী সনে হ’ল পরিচয়
শুনিনু মােদের প্রাণ বিনিময়,
হয়েছে শুভক্ষণে
সংসারে মােরা সকল কাৰ্য্য সাধিব মিলিত প্রাণে।
নবীন প্রেমের নীরে
ভেসেছিনু ধীরে ধীরে,
(তারপর) জানি না কখন গিয়াছে কাটিয়া নবীন প্রেমের ঘাের
কৰ্ম্ম-সায়রে হ’ল বিলুপ্ত সকল সত্ত্বা মাের।
হইয়াছি আজি ঘরণী গৃহিণী,
পুত্র কন্যার নবীন জননী,
গৃহের সকল কর্মের অধিকারী ;
অধিক কি আর আছে করিবার ক্ষীণ দুর্বল নারী।
নারী ও পুরুষ
কি আছে আমার বিপুল ধরায় করিতে খরদারি।
হৃদয়-যন্ত্রী থাকনা সুপ্ত
পুরুষ যাহাতে না হবে তৃপ্ত
সাধিতে সেরূপ কোন ও কাৰ্য নহি নহি অধিকারী,
কারণ—মাের যে নারী।
পুরুষের উক্তি
মিছা অভিমান রাণী,
আমার জীবনে তােমার প্রভাব
অতি প্রয়ােজন মানি।
আমি সারাদিন খেটে আসি যবে
ক্লান্ত চরণে শ্রান্ত দেহে,
তােমার স্নিগ্ধ প্রেমের ছায়ায়
হৃদয় আমার তৃপ্তি চাহে।
তোমার কোমল পরশ লভিয়া
শুনিয়া তােমার মধুর বাণী,
দুরে চলে যায় দিবসের দুখ
জীবন পরম ধন্য মানি।
মিনতি আমার মিছে অভিমান
ভজ গাে রাণী।
যােগে দুখে আর অভাবে দৈন্যে
তুমি না থাকিলে গৃহের মাঝে
মুছাতে বেদনা আসে না আলােক,
লাগে না ত মন কোন কাজে
নীরস শুষ্ক কৰ্ম প্রবাহে
আমি চিরদিন ভাসিয়া চলি।
পুরুষের উক্তি
তুমি সুকোমল হৃদয় লইয়া
পুণ্য প্রেমের প্রদীপ জ্বালি’-
রহ গাে বসিয়া আমার আশায়
ক্ষুদ্র আমার কুটীর’ পরে,
স্মরিয়া তােমার সে মূরতি মাের
সকল শ্রান্তি ঝরিয়া পড়ে।
তােমার গর্ভে জনম লতেছে
প্রিয় সন্তান মম,
উভয়ের মাঝে ফুটে আছে তার
সেতু বন্ধন সম।
মিলিত প্রাণের ভাব ভাষা লভি’
বড় হবে তার জগত-মাঝে,
জান না কি প্রিয়া, তাদের ঘিরিয়া
কত আনন এ গৃহে রাজে?
সন্তান আর প্রিয় পরিজন
সকলের ভার তোমার করে
দিয়েছি সপিয়া পরমাশ্বাসে
তবু অভিমান কিসের তরে ।
ওগাে প্রিয়া, আজি প্রেম অনুরাগে
পুনঃ আবাহন করি,
তোমরা দেশের দশের শক্তি
হে মহিমময়ী নারী।
প্রিয়-সন্দর্শনে বহুদিন পরে আসিয়াছ প্রিয়, আবার আমার পাশে, পশ্চাৎ হতে বেঁধেছিলে চোখ- বুঝি কিনা—সেই আশে নিমেষে চিনেছি ও কর-পরশ শুনেছি চরণ-ধ্বনি, অন্তর মম মুখর হইয়া বলিয়াছে চিনি চিনি। তােমারে না যদি চিনিতাম তবে মিছা হত ভালবাসা, ব্যর্থ হইত রমণী-হৃদয় বৃথা হত তব আসা। কতদিন প্রিয়, দেখি নাই তােমা গুমরিয়া অভিমানে, ভেবেছিনু আর ফিয়া’ব না আঁখি সেই নিঠুরের পানে। খেলাচ্ছলে যে রমণীর হিয়া অনায়াসে দলি’ যায়,
সে জন যে অতি কপট নিঠুর,
আর ভাবিব না তায়-
এই কথা মনে ভেবে কতদিন
নয়ন মুদেছি যাই,
অমনি সহাস মূরতি তােমার
হৃদয় দেখিতে পাই।
কত রাগ মান জমা ছিল হৃদে
আজি কতদিন হতে
ফিরে দেখিব না ভেবেছিনু যেই
এসেছ নয়ন-পথে-
অমনি অবাধ্য আঁখিতারা মম
তোমার মুখের 'পরে
হয়ে গেল স্থির গত কথা ভুলি’
আর কে ফিরাবে তারে।
হে প্রিয়, তােমার স্পর্শ লভিয়া
সকলি ভুলিয়া গেনু,
রহিল না আর রাগ অভিমান,
তোমারে যে কাছে পেনু।
বুঝি তােমারে না দেখিয়া ছিল
ব্যথিত আমার প্রাণ,
রাগ সে মিথ্যা, অনুরাগ আজো
রয়েছে অপরিমান।
দূরে থাক আর কাছে থাক তুমি
আমার হৃদয়-পুরে-
হে প্রিয়, নেছ যে শ্রেষ্ঠ আসন
তা হ’তে র'বে না দুরে।
যাপিয়াছি কত দিবস রাত্রি
তােমার আসার আশে,
সকল বেদনা ভুলায়ে আজিকে
এসেছ আমার পাশে।
বিদায়-বেলা
হে প্রিয় হে সখা,
বিদায় বেলা কাছে এসে দিও আমায় দেখা।
যখন আমি যাব চলে সেই বিদায়ের রাতে
শেষ মিলনের অর্ঘ্য মধুর দি ও আমার সাথে।
মুরতি তােমার জড়িয়ে আছে আমার হৃদয়-তারে
তবু নয়ন ব্যগ্র তােমায় দেখতে বারে বারে।
যখন তুমি অনুরাগে এস আমার কাছে
হৃদয়বীণা সেই মুহূর্তে নতুন সুরে বাজে।
বিরাগ ভরে চেয়ে যখন দেখে আমার পানে
ভীত হয়ে ভাবি তখন কি হবে মোর প্রাণে।
এমনিতর বাঁধা আমি থাকতে তােমার সনে
এসেছিলাম তােমার গৃহে কোন্ সে শুভক্ষণে।
এল আমার যাবার বেলা বাজছে বিদায়-বাণী,
মুছে ফেল অশ্রু সখা, দাও গাে বিদায়-হাসি।
জীবন-ভরা কৰ্ম্ম আমার দিয়ে তােমার করে
ভাসিয়েছিলাম জীবনতরী প্রেমের পারাবারে।
জানিনেক কোন্ সুদূরের যাত্রী আমি আজ,
হৃদয় ভরা অর্ধ আমার লও গাে হৃদয়-রাজ ॥
মিনতি
করোনা ভৎসনা,
করিনি ত কোনােদিন ও দেহ কামনা।
লালসায় পূর্ণ চিত্ত সে ত আমি নই,
মুগ্ধ চক্ষে তােমা পানে শুধু চেয়ে রই।
ও আঁখি সুন্দর
ছায়া ফেলিয়াছে মাের মরম ভিতর,
আকুল করেছে মােরে রূপজ্যোতি তাের
ও আঁখিতে অাখি রেখে আনন্দে বিভাের
দোষ কিবা তায়
কে আকৃষ্ট নয় বল রূপের প্রভায় ?
বহ্নিতে পতঙ্গ মুগ্ধ, ভ্রমর কুসুমে,
তরুণ অরুণ তৃপ্ত ধরণীরে চুমে।
রূপ-মুগ্ধ নর
খোজে যদি দৃষ্টি তার তরুণী সুন্দর,
নেহারিতে শুধু বল কিবা দোষ তায়
রােষ-দীপ্ত নেত্রে কেন ভৎসিছ আমায়?
মিনতি সুন্দরী,
অতৃপ্ত নয়নে যদি তব রূপ হেরি
তাহে তুমি মম প্রতি হয়ােনা নির্দয়
জেনো উহা রূপ-পূজা আর কিছু নয়।
মানসী
ভালবাসি ভালবাসি
আমি তােমায় ভালবাসি ওগাে মানসী,
তােমার সুনীল নয়ন দুটী স্নিগ্ধ মধুর হাসি,
টানে আমায় বিপুল টানে
কি জানি কি আকর্ষণে
রইতে নারে পরাণ আমার নীরব উদাসী ।
কল্পলােকের প্রিয়া আমার হৃদয়-নিবাসী
আসবে যেদিন মােহন বেশে
আমার পাশে মধুর হেসে
স্বপ্ন সেদিন সত্যরূপে উঠবে বিকশি,
ভালবাসা ধন্য হবে স্বরূপ প্রকাশি।
সেদিন আমি বক্ষে তােমায় রাখবে হরষে
লাগিয়ে চমক তােমার মনে
গভীর সােহাগ-পরশনে
নিবিড় করে বাঁধবাে তােমায় অধর-পরশে
প্রেমের কুঁড়ি উঠবে ফুটি’ তােমার দরশে।
স্বপ্ন-লব্ধ
নিশীথে স্বপন-ঘােরে
আজি লভিয়াছি তারে
যারে নিশিদিন আমি ফিরেছি খুঁ জিয়া,
প্রতিদিন জনস্রোতে যাহারে খুজেছি পথে
এবে সে দিয়াছে দেখা স্বপনে আসিয়া।
শুধু একদিন তারে
হেরেছিনু নদীতীরে
আর কোনােদিন দেখা পাইনি তাহার,
সে মূরতি অনুপম
এ মানস পটে মম
যে রেখা আঁখিয়া দেছে নহে মুছিবার।
মুগ্ধ শিল্পী তা'রে তাই চিত্রে ফুটাইতে চাই
রং তুলিকাদি ল’য়ে করি প্রাণপণ,
এক নিমিষের দেখা
সজীব সে চিত্রলেখা
হয়েছে সমাপ্ত প্রায় করিয়া যতন।
কিন্তু সে নয়ন দুটি
চিত্রে উঠে নাই ফুটি
তার সনে পরিচয় হয়নি সেদিন,
অসমাপ্ত র’ল ছবি
বুঝি ব্যর্থ হ’ল সবি
প্রাণময় দৃষ্টি বিনা চিত্র প্রাণহীন।
বনলক
ক্ষোভে কঁদে শিল্পী-প্রাণ কেন হ’মু আগুয়ান
বারেকের দেখা সেই অঙ্কিতে মূরতি
যেটুকু পেয়েছি দেখা তার প্রতি অঙ্গ রেখা
চিরতরে হৃদি-পটে স্পষ্ট আছে অতি ।
কিন্তু ভাবি নাই মনে
শুধু মাত্র সে নয়নে
দেখে বিফল হবে সাধনা আমার,
দুঃখে ম্রিয়মান তাই
হেথা যাই সেথা যাই
কোথায় তাহার দেখা পাব আর বার।
প্রতিদিন মনক্ষুন
ফিরি ঘরে আশা শূন্য,
অবসন্ন শ্রান্ত দেহে পড়ি বিছানায়,
আজিকে গভীর রাতে নিদ্রালু আঁখির পাতে
পরিপূর্ণ রূপে আমি হেরিলাম তা’য়।
বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে
যেমন দেখিনু চেয়ে
অমনি মিলিয়া গেল নয়নে নয়ন,
নিদ্রা ভঙ্গ হয়ে খুসী তুলিকাদি ল’য়ে বসি,
ধন্য শিল্পী, পূর্ণ চিত্র, সার্থক স্বপন।
নির্ভয়
দেবতা, তুমি ত বক্ষে আমার রয়েছ নিত্যকাল
তবে কেন আমি ঘেটে মরি যত দুনিয়ার জঞ্জাল ?
আপনারে লয়ে কিসের ভাবনা,
অন্তর তলে কি দুঃখ-যাতনা
কি তীব্র ব্যথা নিশিদিন মােরে করিতেছে নিপীড়ন,
অতৃপ্ত কোন সুতীব্র তৃষ্ণা করে মন উচাটন।
সে-সব তোমার নহে ত অজানা
মাের প্রতি কথা আছে তব জানা,
সুগােপন ব্যথা ব্যক্ত যাতনা সকলি ত তুমি জানাে,
মানব-হৃদয় পাষাণ ত নয় তাও নিশ্চয় মাননা।
তথাপি দেবতা এত পরীক্ষা-
নিত্য করিয়া দিতেছ শিক্ষা,
ভেবেছ কি আমি পরাজয় মানি' হব অতি হীন প্রাণ,
তা নয় তা নয় দোষী হই তবু তােমারি ত সন্তান।
লােভ মােহ শত কামনা বাসনা
হৃদয় দুয়ারে দে’ছে মাের হানা,
নিষ্ফল তারা গিয়াছে চলিয়া, ফিরিয়াছে হতমান,
তােমার আশীষ মস্তকে বহি’ আজো দণ্ডায়মান
૧૧
রয়েছি জানিও হইনি খর্ব ;
মনুষ্যত্বের বিপুল গর্ব
গুড়ায়ে ফেলিনি, ভুলি নাই মােরা অমৃতের সন্তান,
তােমার পতাকা বহি’ নতশিরে হইয়াছি গরীয়ান।
তবু যাহা কিছু করিয়াছি দোষ
তুমি ক্ষমা করাে করিও না রােষ,
সকলি হেলায় তুচ্ছ করেছি—কেবল লেগেছে ভালাে
সরলতা ভরা পবিত্র প্রেম—তাহার দীপ্ত আলাে।
ভুলায়ে দিয়েছ সব অশান্তি
হরিয়া লয়েছ সকল ক্লান্তি,
তারে অপমান করিতে আমার শকতি নাই যে প্রভু
তুমি বল দাও দুর্বল মােরে বিপথে না যাই কভু।
শান্ত প্রেমের স্নিগ্ধ সলিলে
অবগাহি আমি শান্তি লভিলে,
তুমি স্থান দিও অভয় চরণে হেরি’ অন্তর মাের
ওগাে অন্তর দেবতা আমার অনন্ত নির্ভর।
বৃন্দাবন
পুণ্যময় তীর্থক্ষেত্র ধন্য বৃন্দাবন,
কৃষ্ণ-পদরেণু মাখা স্নিগ্ধ তপােবন।
শ্রীকৃষ্ণের লীলা ভূমি
সবার আরাধ্য তুমি
ব্রজগোপ গােপিনীর শান্তি নিকেতন
নন্দ যশােমতী প্রিয় ধন্য বৃন্দাবন ।
যেথা যমুনার কূলে
বসি’ কৃষ্ণ-পদমূলে
ভুলেছিল কুলবধূ সকল সরম,
খুজে পেয়েছিল রাধা আরাধ্য রতন
রাধা নামে সাধা বাঁশী
পরায়ে প্রেমের ফঁাসী
নিভৃতে আনিত টানি সাধনার ধন,
রাধাকৃষ্ণ প্রেমপূত ধন্য বৃন্দাবন।
কালাে যমুনার জলে
দাড়াইয়া লীলাচ্ছলে
করিল বালক কৃষ্ণ কালীয় দমন,
সেই যমুনার তীরে স্থিত বৃন্দাবন।
যেথা পুতনা রাক্ষসীরে
অনায়াসে হেলা ভরে
ফেলিল মৃত্তিকা’পরে দৈবকীনন্দন,
সে বীরত্ব গাথা ভরা তুমি বৃন্দাবন।
রাখিতে ভক্তের মান
যেথা কৃষ্ণ মতিমান
নন্দ যশােদার গৃহে আপনি নন্দন,
সে পুণ্য মিলন-ক্ষেত্র তুমি বৃন্দাবন।
পবিত্র তােমার নামে
মনে হয় রাধাশ্যামে
শুন পুণ্যময় ধাম জানিনা কখন
এ জীবনে পাব কিনা তব দরশন।
জীবন-মধ্যাহ্ন বেলা
রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা
পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাভরে করিয়া স্মরণ
ভক্তিপ্লুত হৃদে তােমা’ করিনু তর্পণ।
সীতাদেবী
ধমাঝে ঋষিশ্রেষ্ঠ জনকের ঘরে
আবির্ভুত লক্ষ্মীসীতা বিধাতার বরে,
নিষ্ঠুর নিয়তিসনে যুঝিতে জনম
লভিয়া দেখাল সীতা নারীর ধরম।
লােকে বলে সীতাদেবী জনমদুখিনী
মােরা বলি ধন্যা সীতা স্বামী গরবিণী,
কি ছার সাম্রাজ্যগর্ব ছার রাজ্যসুখ
বনবাসে পতিপাশে সদা হাসিমুখ।
নিজ সহোদর সম দেবর লক্ষ্মণ
সীতারে করিতে সুখী ব্যস্ত অনুক্ষণ,
ধর্মের মাহাত্ম্য হেথা দেখতে সবারে
সাধ্বী সীতা পতিব্রতা রাবণের ঘরে।
সত্যব্রত রামচন্দ্র সীতার কারণে
সবংশে বধিল লঙ্কাপতি দশাননে,
অগ্নির পরীক্ষা নহে রামের কৌশলে
পবিত্র সীতার মূর্তি দেখিল সকলে।
করাইল অগ্নিশুদ্ধি দেখে সজনা,
নতমুখে সতীপদে করিলা বন্দনা।
সীতাদেবী
-
ভাগ্যবিড়ম্বনা হেতু বনেতে বসতি
পতি করে নাই ত্যজ্যা, করিল নিয়তি।
ধর্মের প্রভাবে বনবাস মধুময়
বাল্মিকীর তপােবন স্নেহের আশ্রয়,
লব কুশ দুইপুত্র গুণের আধার
বংশের গৌরব তার গৌরব মাতার।
দূরে রহিলেও তবু স্বামীর অন্তরে,
কি উজ্জ্বল ছিল মূর্তি, স্বর্ণসীতা গড়ে
দেখাইলা রামচন্দ্র সবার সম্মুখে
‘ভুলি নাই—ভােলা নাহি যায় রাজ্যসুখে।
রাজগৃহে তপােবনে দোহার হৃদয়ে
যে প্রেমের মন্দাকিনী ধীরে যায় বয়ে,
সে প্রেমে যে প্রাণ পূর্ণ কি দুঃখ তাহার
তার কাছে রাজ্যসুখ অতীব অসার।
রাজকন্যা রাজবধূ রাজরাণী সীতা
যুগে যুগে দেশে দেশে তুমি মা বন্দিতা
৬
বসন্তোৎসব
বিদায় লয়েছে শীত আজ
এল বসন্ত ঋতুরাজ,
প্রভাত বায়
মােরে জানায়
এল বসন্ত ঋতুরাজ
তার আগমনী গাহ আজ।
সে মধুবায়
দেহ কঁপায়
প্রবেশে ধীরে মনােমঝ,
বলল, পর এবে নব সাজ,
খােললা ধড়া চূড়া
গেছে শীত বুড়া
পুরু আবরণে নাহি কাজ,
পরেছে প্রকৃতি নব সাজ।
নাহি নাহি আর কুহেলি-অাঁধার
শিশির সজ্জা নাহি আজ
এল বসন্ত ঋতুরাজ।
নব তৃণ দল
করে বল মল
তরুণ রৌদ্র লাগি আজ
নামিল ধরায় ঋতুরাজ।
বসন্তোৎসব
বিরহী-হিয়ায়
মিলন তৃষায়
ঘুচে গেছে আজি সব লাজ
নবীনানন্দ হিয়া মাঝ।
গাহে পিক বঁধু
লুটে নাও মধু
হৃদে বাঁধ সখী, হৃদিরাজ।
তুমি কবি, সব ত্যজি কাজ।
গাহ আজি সুখে প্রকৃতির বুকে
যে শােভা এনেছে ঋতুরাজ
লেখনীতে দাও ফুল সাজ,
তারি গুণ গান গাহ কবি-প্রাণ
বসন্তোৎসবে মাতে আজ
এসেছে ধরায় ঋতুরাজ।
বর্ষা-বন্দনা
বাহিরে বাদল ঝরে ঝর ঝর
লাগিল বরষা হিয়ার ভিতর,
ভিতরে বাহিরে প্রলয় রােলে
বিরহ বেদনা জাগায় তােলে।
আয়রে বরষা প্লাবিয়া আয়
বহিছে
মধুর
শীতল বায়,
সারাটা প্রকৃতি দাপটে তাের
মত্ত মাতাল নেশায় ভোর।
কৰ্মী হারাল কাজের মন
খুজিতে লাগিল গৃহের কোণ,
(গৃহে) ব্যাকুল বধূর অধীরে চায়
রয়েছে প্রিয়ের প্রতীক্ষায়।
কড় কড় কড় মেঘের নাদ
ঐবিদ্যুৎ বজ্রপাত,
আয়রে বর্ষা আকুলা আয়
(ভর) শ্রান্ত জগতে শীতল তায়।
বাহিরে ভীষণ শব্দ ঝন্ ঝন
ঘরে বসে গাহি বর্ষার-বন্দনা।
বাসনা নির্বাণ
কর প্রভু, বাসনা নির্বাণ,
কামনা বাসনা আশা
স্বার্থপর ভাল বাসা
ভাঙ্গিয়া দিতেছে হৃদি করি শতখান,
কর প্রভু বাসনা নিৰ্ব্বাণ ।
মরীচিকা পিছে ছুটি
হীরা ভ্রমে কঁাচ লুটি
ভােগের চরণে সপি আপনার প্রাণ,
কর প্রভু বাসনা নিব্বাণ।
কোথা সুখ কোথা শান্তি,
শুধু মায়া শুধু ভ্রান্তি
এ জগত নহে চির শান্তিময় স্থান,
কর প্রভু বাসনা নিৰ্ব্বাণ ।
তোমার চরণ-তলে
অনুভাপ-অশ্রুজলে
নিবেদন করি প্রভু ওগাে দয়াবান,
কর কর বাসনা নির্বাণ।
আত্ম-নিবেদন
আমায় তুমি তােমার সাথে যােগ করে নাও হরি,
অজানা কোন্ আকর্ষণে
টাছে আমায় তােমার পানে
তাই ত তােমার অদর্শনে বিয়ােগ-ব্যথায় মরি,
এবার আমায় তােমার সাথে যােগ করে নাও হরি।
বিপুলা এই বিশ্বে আমার
যা-কিছু সে সবই তােমার,
তােমার মাঝে সত্ত্বা আমার নাও গাে বিলােপ করি,
দেখাও প্রভু, দেখাও তােমার অভয় পদ-তরী।
অহমিকার গর্ব মিছে
বাঁধতে আমায় পারেনি যে,
তােমায় পাওয়ার আশায় আমার উঠছে চিত্ত ভরি,
আমায় তুমি তােমার সাথে যােগ করে নাও হরি।
হৃদয় আমার স্তব্ধ নিঝুম
তােমার রচা এ প্রাণ-কুসুম
কেমন করে তােমার পদে অর্ঘ দিব হরি
সেই ভাবনায় কাটছে আমার দিবস-বিভাবরী।
আত্ম-নিবেদন
হৃদয় আমার চায় তােমারে
এস এস হৃদ-মাঝারে
বহুদিনের আশা আমার পূর্ণ করাে হরি,
যখন আমি সকল কাজই করব তােমায় স্মরি
পরাজয়ের মিথ্যা গ্লানি
হরবে না আর মুখের বাণী
তখন স্বার্থ সাধন আশে চাইব না আর ফিরি
আমার সকল আশার রূপে এস অরূপ হরি।
দেবতা-চরণ তব মানবের শান্তিস্থল
বেদনা মােচন তরে তুমি দেহ অশ্রুজল,
ভােগ সুখখান্মত্ত লােক তব পদ নাহি চায়
অর্থগৃধু, ধনলিপ্স, তােমারে চিনে না হয়।
মায়াময় এ জগতে মােহ যারে রয় ঘিরে
সে কভু তোমার প্রতি বারেক চাহে না ফিরে,
দুঃখ দৈন্য নিরাশায় ভরে যবে মন যার
সে তখন তব প্রতি অনুরাগে বার বার
ফিরে চায় করজোড়ে মাগে তব কৃপাকণা
অক্ষম দিনের প্রভু কেবা আছে তুমি বিনা।
আনন্দের সন্ধান
আনন্দের পেয়েছি সন্ধান
কৰ্ম্ম হ’তে কৰ্ম্মান্তরে
ফিরি কৰ্ম্ম সাঙ্গ করে
লেখনী লইয়া হয় বিশ্রামাবসান,
নীচতা লাগে না ভালো
কলহ নিতান্ত কালো
করিতে চাহে না মন কারে অপমান
আনন্দের পেয়েছি সন্ধান।
একলা থাকিলে প্রাণ
ভয় নহে মুহমান
কাব্য-সহচরী সুখে করে সঙ্গদান,
কল্পনায় গাথি কত
ভাষা-পুস্প মালা শত
ভাবের বন্যায় হৃদি হয় ভাসমান
আনন্দের পেয়েছি সন্ধান।
ধরিতে কপট বেশ
করিতে কাহারে দ্বেষ
সঙ্কোচে ফিরিয়া আসে জ্ঞানান্বেষী প্রাণ,
সারা বিশ্বে মাের ঘর
কেহ নহে নহে পর
সবারে বাসিতে ভাল হই আগুয়ান
আনন্দের পেয়েছি সন্ধান।
কি আছে আমার
তােমার জগতে প্রভু, কি আছে আমার,
যেখানে যা-কিছু দেখি সকলি তােমার,
তুমিময় ধরামাঝে
তােমারি মহিমারাজে
আমি অতি ক্ষুদ্রতম খেলেন তােমার,
তােমার জগতে নহি আমিই আমার।
দুনিয়ার খেলাঘরে
তুমিই এনেছ মােরে
স্নেহ প্রেম প্রীতি প্রাণে দিয়েছ অপার
জানায়েছ তুমি বিনা সকলি অসার।
কৰ্ম্মময় এ জগতে
ভাসায়েছ কৰ্ম্ম-স্রোতে
শিখায়েছ কৰ্ম্মে মাত্র আছে অধিকার
তুমিময় ধরণীতে সকলি তােমার।
ধৰ্ম্ম অধৰ্ম্মের জ্ঞান
তুমিই করেছ দান
রেখা
বুঝয়েছ পাপপুণ্যে ভরা এ সংসার
নিত্য ধ্রুব সত্য মাত্র চরণ তােমার।
নির্মম সংসার পথে
আছ সকলের সাথে
দিয়েছ সবারে গুরু কৰ্ত্তব্যের ভার
তােমার জগতে প্রভু, কি আছে আমার ?
যখনি বিপদে পড়ি
তখনি তােমারে স্মরি
বিপদ বেদনা সহ আমি যে তােমার
তুমি না দেখিলে বল কি গতি আমার ।
মায়া মােহে ভরা ধরা
মায় মুগ্ধ জীব মােরা
অহং জ্ঞানে মত্ত ভাবি সকলি আমার
বিবেক হারায়ে ভুলি অস্তিত্ব তােমার।
তুমি ত করােনা রােষ
ধরনা কোনও দোষ
তােমাময় জ্ঞান পুনঃ দাও আবার
ঘাত-প্রতিঘাতে শুধু হৃদয়-মাঝার।
তুমি প্রিয়জন দাও
তুমি পুনঃ কেড়ে নাও
ভেঙে চুরে হৃদি তুমি কর চুরমার
তুমিই হৃদয়ে দাও সান্ত্বনা আবার।
৯৩
কি আছে আমার
তােমার নিখিল বিশ্বে
সুখ দুঃখ অশ্রু হাস্যে
মিলায়ে মানব করে খেলার সংসার
জানি না বুঝি না সৃষ্টি রহস্য তোমার।
কেবল রয়েছে জানা
তােমার করুণা বিনা
এ জগতে এক দণ্ড চলে না। আমার
সৃষ্টি স্থিতি লয়কারী মহিমা তােমার।
বিশ্ব-প্রীতি
এসগাে তৃষিত এসগাে তাপিত
এসগাে ব্যথিত হইব ব্যথী,
সাগরের মত অতল গভীর
উদার হৃদয় রেখেছি পাতি।
কেহ ফিরিবে না নিরাশ বিমুখ
বিরাট আমার বক্ষ হতে,
সবার হৃদয় হইবে শীতল
আমার প্রাণের স্নিগ্ধ স্রোতে।
কারে কোনােদিন দিব না বেদনা
এই চিরদিন বাসনা মম,
সবার বেদনা মুছায়ে লইব
শান্ত প্রভাত-সমীর সম।
যতদিন রবে এ দেহে পরাণ
ততদিন চাব রহিতে ভালাে,
হৃদয় আমার ঘিরে রবে সদা
সত্য ধর্ম প্রেমের আলো।
বিশ্ব-প্রতি
সকল মানব মিত্র আমার
শত্ৰু করিতে চা’ব না কারে,
সবাই আমার, আমার নিকটে
সেহপ্রীতি রাশি লভিতে পারে।
জগত আমার আমি সবাকার
এইভাবে রহি পরম সুখে,
জগতের আদি পিতা ভগবান
সদা বিরাজিত আমার বুকে।
তাঁর প্রীতিলাভ করিতে আমার
তাঁর জীবে দয়া করিতে হবে
তার ভালবাসা লভিতে আমার
সাধনা করিতে হইবে ভবে।
বিশ্ব আমার বান্ধব হবে
লইব সবারে আপন করে,
দেবতা আমারে শক্তি দানিবে
চলিব জগতে সাহস ভরে।
স্নেহপ্রীতি-ডােরে বাঁধিব সবারে
সেবা সান্ত্বনা করিব দান,
মহা মানবের মহা মহিমায়
ভরে রাখ দেব আমার প্রাণ।
অনন্তের যাত্রী
বন্ধু, আজি বিদায়ের লহ নমস্কার
নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু হয়েছে আমার,
পিছনে ডেকোনা বন্ধু,
দেখাযােনা প্রলােভন আর
সত্ত্বময় জ্ঞানতৃষ্ণা জাগিয়াছে
অন্তরে আমার।
সংসারে পেয়েছি বন্ধু, অনেক জিনিষই
স্নেহ প্রাণ পরিজন রূপ যশ মান ধন
অভাব ত নাহিক কিছুরই,
তথাপি ব্যাকুল প্রাণ, কেন জান কি ?
সংসার চিনেছি বন্ধু ! পেয়ে বড় ব্যথা,
অন্তর আজিকে চায় পরিপূর্ণ বেদনায়
ছিন্ন করি সকল শৃঙ্খল
স্থির চিত্তে লভিবারে সত্যপূর্ণ সংযমের বল।
অনন্তেঘাতী
নিভৃত অন্তর মম উদ্ভাসিত আজি বন্ধু,
যে প্রেম প্রভায়
তাহার পরশ লভি কামনা লালসা সবি
পেরেছি ভাবিতে তুচ্ছ লভিয়াছি জয়।
আজ আর নাহি প্রয়ােজন
আপনারে নিষ্পেষিয়া করিতে গােপন,
যত কিছু সুখ দুঃখ ব্যথা আপনার
মুক্ত এবে হৃদয়ের দ্বার।
সংসারের সমাজের নিঠুর পীড়নে
নাহি নাহি আর নাহি ভয়,
ওই দূরে পরপার হ’তে মৃত্যু মােরে
দানিছে অভয়।
কোথাকার মম্মতলে অপমান ব্যথা জ্বলে
কে কোথায় অভিমানে গুমরিয়া মরে
কে তাহা দেখিতে চায় বিরাট সংসারে,
কে কোথায় উৎপীড়িত অশ্রুজলে অবিরত
কে ভাসিছে ? কে যুঝিছে বিবেকের সনে,
কে কিসে আঘাত পায় মর্যাদা সম্মানে,
মনুষ্যত্ব কোথা হীন নিয়ত পীড়নে,
বৃহৎ সংসারে বন্ধু, এ সংবাদ কত লােকে জানে?
মুগ্ধ তােক বাহ আড়ম্বরে
বাহ লয়ে আস্ফালন, অন্তরের খোঁজ নাহি করে।
ম
ভােগ লিন্দা লয়ে মত্ত গর্বিত নির্ভীক
দর্প ভরে তুচ্ছ করে দুর্বল যে দিক,
পুরুষ পরুষভরে সমাজের বক্ষোপরে
সসম্মানে ব'সে
নারী হয়ে খেলা করে, তাহাদের মাপ সর্বদোষে।
কিন্তু নারী অসহায় দুর্বল কোথায়
মুহূর্তের ভুলে
কিংবা প্রলােভনে হায়,
হয়তাে বা উৎপীড়নে কার
কোথায় করিল ত্রুটী, রক্ষা নাহি আর
অমনি তাহার প্রতি ভীষণ কুটীপূর্ণ
রক্তচক্ষু মেলি ধেয়ে এল সমাজের ভীষণ শাসন
অর্পিল কঠোর দণ্ড জানিবারে না চাহি কারণ,
প্রতিকার করিল না, করিল না দুর্বলের দুঃখ নিবারণ
জান বন্ধু! এরি নাম সমাজ-শাসন।
বলো দেখি চারিদিকে চেয়ে একবার
সমাজের ব্যবস্থা কি নহে চমৎকার ?
না বলিও না, শুধু অনুভব করে নিজ মনে
সংগােপনে বসিয়া নির্জনে।
যে কথা অন্তরে জাগে নিত্য প্রতিদিন
মুখে তা বলিলে না কি হয় লােক হীন,
অত্যাচার অপমান নীরবে না স’য়ে
প্রতিকার করে যদি
অনন্তের যাত্রী
হয়তাে তাহে, স্পর্ধা তব পাইবে প্রকাশ
প্রবলের বজ্রমুষ্টি রবে নিরবধি
উদ্যত মস্তকে তব, কাজ কিবা তায়
এমনি নীরবে চলাে কোনাে কথা নাহি বলে
তবে সব লােকে ভাল বলিবে তােমায়।
অতি দুঃখে কেন হাসি বুঝিতে না পারি
সমাজে গৃহে ও রাজ্যে এমনি ব্যবস্থা চলে
যাই বলিহারী।
মাের বন্ধু, লাগেনাতাে ভালাে
স্বার্থ দ্বেষ রেষারেশী, আমি চাই আলাে-
অপার্থিব সত্য জ্যোতিঃ ভরা
অন্তরের অন্ধকার হর।
সকলি অসার
এই তুমি এই আমি এই যে সংসার,
সকলি নিয়মে চলে,
একমাত্র ধ্রুবসত্য সেই বিধাতার।
কে-না জানে এই কথা, তবু তবু কেন হিংসা
কেন বৃথা আমার আমার।
জানাে বন্ধু, এ সংসারই হয় মধুময়
যদি সবে হয় জ্ঞানী, যদি কেহ কোনাে লােকে
ব্যথা নাহি দেয়।
বেদনার মধ্য দিয়া আমি এ সংসারে বন্ধু,
১০০
যাহা কিছু অভিজ্ঞতা করেছি সঞ্চয়,
জ্ঞানের তােরণ আর সুখের বেদনারূপে
সেই মােরে ঘিরে রবে-
আমরণ অক্ষয় অব্যয়।
বিদায় বিদায় বন্ধু, আর দেরী নয়
ডাকে ওই মহাসিন্ধু
অনন্তের যাত্রী এস হয়েছে সময়।”
হৃদি-স্থিত হৃষিকেশ
হৃদি-স্থিত হৃষিকেশ,
যা তুমি করাও তাই আমি করি
সব কাজে আমি তােমারেই অরি
নত মস্তকে রহি সৰ্ব্বদা
পালিতে তব আদেশ,
তুমিই আমারে প্রেরণা দিয়েছ
কবিতা লিখিতে তুমি শিখায়েছ
তােমারি বেণুর ঝঙ্কারে হৃদে-
লভেছি সুরের রেশ।
সে সুর-লহরী ভাসিয়া ভাসিয়া
আমার শ্রবণে পশিয়া পশিয়া
মুগ্ধ হৃদয়ে বিপুল পুলকে
আনিয়াছে মােহাবেশ,
১০২
সে মােহ তুমিই লাগায়েছ কাজে
উৎসাহ দিয়া অন্তর মাঝে
জাগায়েছ মােরে ঘুম ঘাের হতে
হে আমার হৃষিকেশ !
তব করুণায় যেটুকু শিখেছি
তারি সাহায্যে যা কিছু লিখেছি
তাই আজি মাের পরম বিত্ত
নাহি সন্দেহ লেশ,
কল্পলােকের খুলিয়াছে দ্বার
যা আছে সেথায় সীমা নাহি তার,
তুমি যদি দাও অভয় আবার
করিতে সেথা প্রবেশ
তবে রহিবে না আর কোনাে ভয়
প্রবেশিয়া সেথা পুনঃ নির্ভয়
তােমারি জ্ঞানের আলােকে হেরিব
তােমারেই হৃষিকেশ।
অজ্ঞানতার অন্ধ কায়ায়
বন্দী রহিতে হবে না আমায়
মুক্ত প্রাণের দীপ্ত প্রভায়
রবে না দুঃখ ক্লেশ,
যেথা আমি যাই যাহা কিছু করি
সদা মনে মনে অনুভব করি-
হৃদিছি হৃষিকে
আমার দেবতা রক্ষিছে মােরে
চাহিয়া নিৰ্ণিমেষ,
হে চির আপন হৃদয়নিবাসী
হে আমার হৃষিকেশ।
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.