Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Dharmapath

Chattopadhyay, Satishchandra · 2009/09/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

স্বর্গপৎ
“মন এব মনুষাণাং কারণং বন্ধ মােয়ােঃ।”
শ্রীসতীশচন্দ্র চটাপাধ্যায়

No text on this page.

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ।
ভরসা।
Av
ক
ধর্মপথ
(করুণরসাত্মক ধর্মভাবপূর্ণ নাটিকা )
“মন এব মনুষ্যাণাং কারণং বন্ধ মােয়ােঃ।”
রত্নমালা ; জাহানারা ; শ্রীরাধা ; অন্নপূর্ণা ; চণ্ডীরাম
অবাক কাণ্ড; নূতনবাবু ; প্রভৃতি প্রণেতা
প্রণীত।
কলিকাতা
“ভারত সঙ্গীত সমাজ” নাট্যমন্দিরে
অভিনীত।
বৈশাখ,
সন ১৩২১ সাল, ইং ১৯১৪।
মূল্য চারি আনা মাত্র।

No text on this page.

উৎসর্গ ।
}
মাননীয় অটল বাবু মহাশয় !
অতুল ঐশ্বর্যের উচ্চশিখরে উপবেশন করিয়াও,
আপনি যেরূপ নিরহঙ্কারী, সহৃদয়, সরল, ও
সমদশী তাহা দেখিলে অপার আনন্দ অনুভব
করিতে হয়। অহিংসা, আস্তিক্য, দয়া, ক্ষমা,
ধৃতি প্রভৃতি পবিত্রভাবে আপনার হৃদয়সৰ্ব্বদাই
পরিপূর্ণ। আপনার নিরপেক্ষ গুণগ্রাহিতা ও
স্বর্গীয় সত্ত্বভাবদর্শনে পুলকিত হইয়া, আপনার
পবিত্র করকমলে এই পবিত্র গ্রন্থ “ধৰ্ম্মপথ”
অৰ্পণ করিয়া, পরিতৃপ্ত হইলাম। আশা করি,
আপনিও এই দীন গ্রন্থকারের অকিঞ্চিৎকর
অর্ঘ্য “ধৰ্ম্মপথ” গ্রহণে আনন্দিত হইবেন।
কিমধিকমিতি-
বিনীত গ্রন্থকার
শ্রীসতীশচন্দ্র

No text on this page.

শ্ৰীঅটল কুমার সেন

No text on this page.

নিবেদন। “ধৰ্ম্মপথ” একটি ক্ষুদ্র গল্প অবলম্বনে লিখিত হইয়াছে। ইহাতে অত্যাশ্চৰ্য্য, অমানুষিক ঘটনার কোনরূপ সমাবেশ করা হয় নাই। ধৰ্ম্মের পবিত্রগাথা শ্রবণে যাহারা আনন্দ অনুভব করেন, পুণ্যময়, পবিত্ৰকাৰ্য্যের বিচিত্র মহিমা দর্শনে—যাহাদিগের হৃদয়ে “ভগবদ্ভক্তির” মন্দাকিনী-ধারা প্রবাহিত হয় ; দয়া, মায়া, স্নেহ, মমতায় যাহাদিগের হৃদয় সৰ্ব্বদাই পরিপূর্ণ ;—সেই সকল সত্ত্বগুণ প্রধান, সহৃদয় মহাত্মাগণের করুণ কটাক্ষের প্রতি লক্ষ্য করিয়াই, “ধৰ্ম্মপথ” নাটকাকারে লিখিত হই- আছে। নিতান্ত নিঃস্বহায় অবস্থায় নিপতিত হইয়াও, মানুষ যদ্যপি ধৰ্ম্মা- শ্রয় পরিত্যাগ না করে, তাহা হইলে, ধৰ্ম্ম—মানুষকে যে, কি প্রকারে দুরপনেয় দুর্দশার হস্ত হইতে উদ্ধার করেন, তাহাই এই ক্ষুদ্র “নাট্যগ্রন্থে” দেখাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে। দর্শকগণের চিত্তবিনােদনের জন্য, এই গ্রন্থে “ধৰ্ম্মবালা” ও “কল্পনাসঙ্গিনীগণের দৃশ্য পরিকল্পিত হইয়াছে। এই ক্ষুদ্র নাটকাভিনয় দর্শনে—যদ্যপি কোন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির হৃদয়ে বিন্দুমাত্র পবিত্রভাবের উদয় হয়, তাহা হইলেই এই “ধৰ্ম্মপথ” প্রণয়ন স্বার্থক হইবে এবং গ্রন্থকারও আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিবে। ইচ্ছাময়ের ইচ্ছায় নির- পেক্ষ গুণগ্রাহী সদাশয়—মহাত্মার—পবিত্র দৃষ্টি নিপতিত হইয়াছিল বলিয়া “ধর্মপথ” এত শীঘ্র প্রকাশিত হইবার সুযােগপ্রাপ্ত হইল। উন্নত-হৃদয় —পরশ্রীকাতরতাহীন—নিরপেক্ষ গুণগ্রাহী ব্যতীত—কেহ কখনই— পরের গুণের আদর করিতে সক্ষম হন না! এই “ধৰ্ম্মপথ” আজ কোথায়

*** Wr
।
পড়িয়া থাকিত, যদ্যপি ঠাকুরের কৃপায় এ শুভ-সংযােগ সংঘটিত না
হইত। আশা করি ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি মাত্রেই, এ শুভ সংবাদে আনন্দিত
হইবেন। শুভদিনে, শুভক্ষণে, কলিকাতা “ভারত-সঙ্গীত সমাজের”
গণ্য, মান্য; বরেণ্য, সম্রান্ত-সুধী সভ্যবৃন্দের-সম্মুখে—অভিনীত হইয়া
“ধৰ্ম্মপথ” এসংসারে চিরস্মরণীয় হইয়া রহিল। ইতি
বৈশাখ, সন ১৩২১ সাল।
কলিকাতা ;
বিনীত গ্রস্থকার
শ্রীসতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
“গ্রন্থকারের অন্যান্য গ্রন্থ—যাহা প্রকাশিত হইয়াছে, এবং যে সকল
নূতন রচিত গ্রন্থ শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে, তাহার সংক্ষিপ্ত পরিচয়, এই
গ্রন্থের শেষাংশে সন্নিবেশিত হইল।
প্রাপ্তিস্থান।
শ্ৰীযুক্ত বাবু গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের দোকান। ২০১ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট,
দাস, গুপ্ত এণ্ড কোংর দোকান।
৫৪৩ নং কলেজ স্ট্রীট।
কলিকাতা।

No text on this page.

No text on this page.

৫
আ*
ব
ধর্মপথ৯৩
** মুকং করােতি বাচালং
পং লায়তে গিরিম।
যং কৃপা তম্ হমম্ বন্দে
পরমানন্দ মাধবম্ ।
চরণাশ্রিত
সতীশ
Cover -- Mobila Press, Calcutta.

No text on this page.

নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ ।
পুরুষ।
অজিতকুমার।
কর্ণাটের রাজা।
বিজয়কুমার।
ঐ পুত্র (বালক রাজকুমার )।
হেমাঙ্গমােহন।
রাজার সখা ও আত্মীয়।
দয়ানন্দস্বামী।
( ছদ্মবেশী ভিখারী) রাজার গুরু।
শিবশৰ্ম্মা।
রাজার মন্ত্রী।
শশীশেখর।
ঐ অমাত্য।
ত্রিলােচন ঠাকুর।
জনৈক দরিদ্র ব্রাহ্মণ।
অনাথকুমার।
ঐ বালক পুত্র।
সহর কোতয়াল, জমাদার, চোদারগণ, ব্রাহ্মণদ্বয়
ও গ্রাম্যলােকগণ।
স্ত্রী।
মায়াময়ী।
নিৰ্মলা।
উষারাণী।
সবি।
কর্ণাটের রাজরাণী (অজিতের স্ত্রী)।
(হেমাঙ্গের স্ত্রী) রাণীর সঙ্গিনী ও আত্মীয়া।
(বালিকা) রাজকুমারী।
ত্রিশােচনের সহধর্মিণী।
কল্পনাসঙ্গিনীগণ ; ধৰ্ম্মবালাগণ ;

No text on this page.

প্রোগ্রাম । প্রথম অঙ্ক। দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য। ( ত্রিলােচনের কুটীর ) সবিতা, অনাথকুমার, ত্ৰিলােচন, ভিখারী ও ধৰ্ম্মবালাগণ। প্রথম দৃশ্য। ( মায়াময়ীর কক্ষ ) মায়াময়ী, নিৰ্ম্মল, বিজয়কুমার, উষারাণী ও অনাথকুমার। দ্বিতীয় দৃশ্য। ( ত্রিলােচনের কুটীর সম্মুখস্থ গ্রাম্যপথ ) অজিতকুমার, হেমাঙ্গ ও ত্রিলােচন দ্বিতীয় দৃশ্য। (ত্রিলােচনের কুটীর সংলগ্ন স্থান) সবিতা, ত্রিলােচন ও অনাথকুমার। তৃতীয় দৃশ্য। ( রাজপথ), অনাথকুমার, গ্রাম্য-লােকগণ, বিজয়কুমার, উষারাণী ও চোপদারগণ। তৃতীয় দৃশ্য। (রাজবাটীর তােরণ ) চোপদারগণ, জনৈক গ্রাম্যলােক, জমাদার, হেমাঙ্গ, সহর কোতয়াল, শীশেখর ও অনাথকুমার। চতুর্থ দৃশ্য। ( ত্রিলােচনের কুটীরাভ্যন্তর) সবিতা, ত্রিলােচন ও ধৰ্ম্মবালাগণ চতুর্থ দৃশ্য। ( রাজঅন্তঃপুরস্থ কক্ষ। অজিতকুমার, মায়াময়ী, নির্মলা, হেমাঙ্গ, অনাথকুমার ও কল্পনাসঙ্গিনীগণ। পটক্ষেপণ পটক্ষেপণ।

তৃগর অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
শেষ দৃশ্য।
(ত্রিলােচনের কুটীর )
( ত্রিলােচনের কুটীর সম্মুখস্থ স্থান)
ত্রিলেচেনসবতী ও ধৰ্ম্মবালাগণ।
অজিতকুমার, বিজয়কুমার, হেমাঙ্গ,
দ্বিতীয় দৃশ্য।
মন্ত্রী, ত্রিলােচন, অনাথকুমার,
( ত্রিলােচনের কুটীর পার্শ্বস্থ পথ )
মায়াময়ী, ঊষারাণী, নির্মলা, সবিতা,
প্রতিবাসী ব্রাহ্মণদ্বয়, মন্ত্রী, শশীশেখর,
চোপদারগণ, হেমাঙ্গ, ত্রিলােচন,
চোপদারগণ, দয়ানন্দ স্বামী
অজিতকুমার, মায়াময়ী, বিজয়কুমার,
ও ধৰ্ম্মবালাগণ।
উষারাণী, নিৰ্ম্মল, অনাথকুমার
ও দয়ানন্দ, স্বামী।
যবনিকা পতন।
.

ধর্মপথ
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
ব্রিলােচনের কুটীর )
“উনুনের উপরে হাঁড়িতে জল ফুটিতেছে। ক্ষুধায় কাতর হইয়া,
অনাথকুমার—আগুনে ফুৎকার প্রদান করিতেছে।
এক পার্শ্বে চিন্তামগ্না সবিতা—উপবিষ্টা
!
সবিতা। বাবা, আর কেন মিছে উনুনে ফু পাড়ছিস ? চোখ দুটো যে
রাঙ্গা হয়ে উঠলাে ! আয় সরে আয় ! শুধু জল ফুটিয়ে আর কি
হবে বল ? ( নিকটে যাইয়া চোখ, মুছাইয়া দিলেন )
অনাথ। না, মা,জলটা আমি খুব গরম করে রেখে দিচ্ছি! বাবা যেমন
চাল নিয়ে আসবেন, আর অনি সেই চালগুলাে আমি এই

ধৰ্ম্মপথ ।
[ ১ম অঙ্ক ;
!
হাঁড়িতে ফেলে দোব। দেখতে দেখতে ভাত হয়ে যাবে এখন।
আর অমনি আমরা খেতে বসবাে। উঃ ! যা খিদে পেয়েছে।
, না, তত খিদে পায়নি! আমি ভুলে-বলে ফেলেছি মা।
তবে—কি জানি—এই পেটটা কেন এত জ্বালা করছে। মা !
একটা কাজ করনা মা! আমাকে—এই হাড়ী থেকে একটু
গরম জল তুলে দাও না মা! একটু খাই, দেখি, যদি এই পেটের
জ্বালাটা একটু কমে !
সবিতা। হা ভগবান! এও আমাকে বসে বসে চখে দেখতে হচ্ছে।
আহা! বাছা আমার কাল থেকে খিদেতে ছটফট্‌ করছে ।
এখন পর্যন্ত কিছুই খেতে দিতে পারলুম না ! কি হবে ! কেমন
করে বাছার আমার প্রাণ বাঁচবে ? এ সংসারে কি আমাদের
এ দুঃখু দেখবার লােক কেউ নেই ! (চোখে অঞ্চল দিয়া
ক্রন্দন )
অনাথ। মা, দাও না মা? একটু গরম জল তুলে–দাও না মা !
সবিতা। বাবা, আর একটু খানি দাড়াও ! এখনি তিনি এলেন বলে।
তােমার জন্যে, কিছু না কিছু নিয়ে আসবেনই এখন।
অনাথ। না মা, না! আমার জন্যে আর কিছুই আতে হবে না ! আমায়
তুমি খালি এখন একটু এই গরম জল তুলে দাও! আমার
খিদে পায়নি! আমার বড় তেষ্টা পেয়েছে ! তুমি না দিতে পার
আমি আপনিই তুলে নিচ্ছি। (মালা করিয়া হাড়ী হইতে গরম
জল তুলিয়া লইয়া ফুৎকার প্রদান করিতে করিতে পান করণ)
আঃ! বেশ জলটী গরম হয়েছে ! আঃ ! পেটটা ঠাণ্ডা হলাে!
মা, তুমিও একটু গরম জল খাও না মা ! তােমার পেটটাও
ঠাণ্ডা হবে এখন। বাবা যদি এখন কিছু আর না আনেন, নেই,

১ম দৃশ্য।]
!
নেই, আর আমার এখন কিছুই খিদে নেই ! (চক্ষে বস্ত্র
দিয়া সবিতার ক্রন্দন ! অনাথ নিকটে যাইয়া) কেন মা, তুমি
কাদছ ? আমার ত আর খিদে নেই। গরম জলও ত মা,
একরকম খাবার ! এই দেখনা, আমি যেমন গরম জল খেলুম,
অমনি আমার পেটা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো!
( ত্রিলােচনের প্রবেশ।)
ত্রিলােচন। সবিতা ! আজ একেবারে শূন্য হাত ! আজ আর কিছুই
পাওয়া গেল না ! এ কি ! তুমি কাঁদছ কেন?
অনাথ। বাবা! মার—বােধ হয়—আজ পেটুটা বড় জ্বালা করছে ! আমি
এত করে মাকে বলছি, তা, মা কিছুতেই একটু গরম জল
খাচ্ছে না! আমার পেটটাও জ্বালা করছিলাে, কিন্তু আমি যেমন
ঐ হড়ী থেকে—একটু গরম জল—তুলে খেলুম, আর অমনি
আমার পেটটা ঠাণ্ডা হয়ে গেলাে ! মা যদি একটু গরম জল
খেত, মারও পেটটা ঠাণ্ডা হয়ে যেত। তা—মা, কেন খাচ্ছে না
বাবা? তুমি মাকে একটু গরম জল—খেতে বল না বাবা?
ত্রিলােচন। বাবারে! ঐ অগ্নিময় জলে যদি—জঠরানল নিৰ্বাণ হত, তা
হলে আর মানুষের এত দুঃখ এ সংসারে থাকতাে না! সবিতা,
চুপ কর ! কেঁদনা ।
সবিতা। মনে করি ত কঁদব না। কিন্তু কান্না যে থামাতে পারিনা!
এ কান্নার বেগ যে, নদীর বেগের চেয়েও প্রবলবেগে আমার
চোখ ফেটে বেরিয়ে পড়ে! ওঃ! আর জন্মে না জানি কত মহা-
পাপই করেছিলুম! তাই এই সব চ’খে দেখতে হচ্ছে ! আহা!
দুধের বাছা আমার–কাল থেকে কিছু খেতে পায়নি, খিদের
জ্বালায় সমস্ত রাত্রি ছটফট করেছে! মনে করেছিলুম সালে

ধর্মপথ।
[ ১ম অ
যে, আর
আমার বাছাকে—কিছুনা কিছু খেতে দিতে পারব! তা এত
বেলায় তুমি কি না—শুধু হাতে ফিরে এলে ! আমি যে,
আমার বাছার শুনাে মুখ দেখতে পাচ্ছিনি! আমাদের
কি হবে ? আমরা কেমন করে, এখন এই ছেলেটার প্রাণ
বাঁচাব ?
( ক্রন্দন)
ত্রিলাে। (সকাতরে ) না এ প্রাণ আর রাখবাে না! এ দারিদ্র রাক্ষসের
ভীষণ অত্যাচার আর সহ্য করতে পারবাে না। এ নির্মম
আর চক্ষে দেখতে পারবাে না। আমি আত্মহত্যা করব। আমি
আত্মহত্যা করব ! (প্রস্থানােত )
সবিতা। কি কর ? কি কর ? কোথায় যাও ? ছিঃ! অমন করে কি
অধীর হতে আছে। অদৃষ্টে যা আছে তা হবেই! কৰ্ম্মফল
নিশ্চয়ই ভােগ করতে হবে ! দেখ, ভগবান—আমাদের অদৃষ্টে
আর কত কষ্ট লিখেছেন দেখ !
অনাথ। মা, আর তুমি কখন কেঁদনা ! আর আমি—কখন তােমার
কাছে আমার খিদের কথা বলবাে না! বাবা, তােমার পায়ে
পড়ি বাবা ! তুমি অমন করে--আর রাগ করে চলে যেও না!
আমার কিচ্ছু খিদে পায়নি বাবা, আমার কিচ্ছু খিদে
পায়নি!
নেপথ্যে ভিখারীর
গীত।
কোথা বিপদ বারণ ! অনাথ স্মরণ !
অধম তারণ ওহে দয়াময় ।
আমি ভবার্ণবে ডুবে মরি হরি, দীননাথ, দীনে হও হে সদয় !
অনাথ। ঐ একজন ভিখারী এসেছে, যাই আমি গান শুনিগে।
[দৌড়িয়া গমন।

১ম দৃশ্য।] ধৰ্ম্মপথ। ত্রিলাে। হা ভগবান! ভিখারীর বাড়ীতে আবার ভিখারী! এ তােমার আশ্চৰ্য্যলীলা ! সবিতা, অনাথকে বারণ করাে ! বৃথা কেন ঐ গরীবের সময় নষ্ট করবে। এখানেত আর ও ব্যাচারীর এক মুষ্টি চালেরও প্রত্যাশা নাই। সবিতা। অনাথ ! এদিকে এস বাবা! মিছিমিছি, লােককে কষ্ট দিও না। ( ভিখারীর হস্ত ধরিয়া অনাথের প্রবেশ।) অনাথ। তুমি এইখানে একটা গান গাও! আমার মার মনে বড় হয়েছে ! তােমার গান শুনলে, আমাদের আর কারুর কষ্ট থাকবে না! তুমি একটা গান গাও ! সবিতা। ছি বাবা ! অমন করে কি লােককে মিছিমিছি গান গাওয়াতে আছে ? ওকে তুমি কি ভিক্ষা দেবে ? ত্রিলাে। আপনি বােধ হয় ব্রাহ্মণ ? আজ্ঞে হা, নমস্কার । ত্রিলাে। নমস্কার ঠাকুর! আপনি ও ছেলের কথা শুনবেন না ! বাবা ! ছেলেরকথা যদি না শুনবাে, তবে এ জগতে আর কার কথা শুনবাে বাবা ? “ছেলে নারায়ণ”! বালকের হৃদয় ভগ- বানের বড়ই প্রিয়স্থান! তিনি সৰ্ব্বদাই বালকভাবে আবিভূত হয়ে, এই সংসার মরুভূমির তাপদগ্ধ মানবের প্রাণে শান্তিধারা বর্ষণ করেন। বাবা! আপনারা বড় ভাগ্যবান। তাই এই বালকরূপী ভগবানকে কোলে পেয়েছেন। এ সংসারে যারা ছেলেকে যত্ন করে না, তারা কি আর মানুষ। তারা নিশ্চয়ই মনুষ্যরূপী রাক্ষস। সবিতা। বাবা ! আমাদের যে, ভিক্ষা দেবার কিছুই নেই। তুমি কি গান গেয়ে অমনি চলে যাবে ? ভিখা। ভিখা।

ধৰ্ম্মপথ ।
[ ১ম অঙ্ক ;
ভিখা।
মা ! তাতে আর হয়েছে কি! বালক আবদার ধরেছে, না হয়
অমনিই একটা ভগবানের নাম গাইলুম। সব বাড়ীতে কি আর
ভিক্ষে পাওয়া যায় মা ! সবাই কি এখন আর এই কলিকালে
মুষ্টি ভিক্ষার মর্ম বুঝতে পারে মা! ভিখারীকে একমুষ্টি চাল
দিলে যে, তাদের ধর্মের খাতায় লক্ষমুষ্টি চাল জমা হয়, তা কি
আর এখনকার লােক—সকলে—একথা বুঝতে পারে মা?
অনেকে ত এখন ভিখারীকে অমনিই বিদেয় করে দেয়।
সবিতা। বাবা, আমরা ঐ একটি ছেলে নিয়ে ঘর করি। পাছে কারুর
মনখুন্নি হয়, এই আমাদের সদাই ভয় ! আমাদের আর মুখ,
চাইবার যে, কিছুই নেই বাবা।
ভিখা। কিছু ভয় নেই মা! কিছু ভয় নেই ! আমার মনখুন্নি হওয়া দূরে
যাক, আমি বরং কায়মনে আপনাদের মঙ্গলের জন্য ভগবানের
কাছে প্রার্থনা করব ! আপনাদের যেন তার চরণেই মতি গতি
থাকে। আমি এখন একটা নাম গান করি, আপনারা শুনুন্।
(অনাথের প্রতি) এস বাবা কাছে এল ! গান শোেন !
ত্রিলাে।
ঠাকুর ক্ষমা করুন। আমাদের মনে এখন আদপেই সুখ
গান ভাল লাগবে না।
ভিখা। কেন সুখ নেই বাবা ? কি হয়েছে ?
ত্রিলাে। হবে আর ছাই কি! আমিও আপনার মতনই একজন ভিক্ষুক!
কিন্তু বড়ই দুর্ভাগা !
ব্রাহ্মণমাত্রেই ভিখারী। তাতে আর আমাদের দুঃখ করবার
কি আছে বাবা ?
ত্রিলাে। হাঁ, তা সত্য। কিন্তু আমার ভাগ্যে যে ভিক্ষাও যােটে না,
আমি এমনিই হতভাগ্য ।
নেই !
ভিখা।

১ম দৃশ্য। ]
ধৰ্ম্মপথ
?
ভিখা। ভিক্ষা কি আর বােজ, জোটে বাবা! , তার জন্য আর ভাবনা
কি ? আজ না জুটে থাকে, কাল জুটবে! সেই দীননাথ,
পতিত-পাবনকে স্মরণ করুন ! তার নাম--দীনবন্ধু ! তিনি
অবশ্যই দীনকে দয়া করবেন।
ত্রিলাে। ঠাকুর! দীনবন্ধু যদি এ জগতে কেউ থাকতেন, তা হলে আর
আমার ন্যায় দীনের হাঁড়ীতে, ঐ শুধু জল ফুটতাে না! নিশ্চয়ই
দুটী চালের যােগাড় হ’তত ! দুধের ছেলে আমার তাহলে,
খিদেয় কাতর হয়ে, তােমার গান শুনে ভুলে থাকবার চেষ্টা
করতাে না !
ভিক্ষা। সে কি কথা ! আপনার ঐ হাঁড়ীতে শুধু জল ফুটছে ? চাল
নেই এই নিন্! এই নিন্ ! আমার ভিক্ষালব্ধ এই চালগুলি
নিয়ে, শীঘ্র ঐ হাঁড়ীতে ফেলে দিন !
সবিতা। বাবা তুমি কি বলছো? এ জন্মে ত এই দুর্দশা ভােগ করছি।
একমুষ্টি অন্নের জন্য, হা-হা করতে হচ্ছে ! তুমি কি শেষ
আমাদের আর নরকে ডােবাবে ? তুমি আমাদের দ্বারস্থ হয়েছ,
তােমাকেই আমরা ভিক্ষে দোব। তা নয়, আবার তােমার কাছ
থেকে, তােমার ঐ ভিক্ষের চালগুলি পর্যন্ত কেড়ে নােব ?
ভিক্ষা। মা, যদিও আমি ভিখারী সত্য। কিন্তু এটা জানবেন মা, আমি
প্রাণহীন নই। আপনাদের এই দুধের ছেলে শুখিয়ে থাকবে
জেনেও,আমি আমার এই নিজের শূকর-উদর পূর্ণ করবার
জন্য—আমার চালগুলাে সব বেঁধে নিয়ে যাব ? না, না, তা
আমি কখনই পারব না ! এ চাল, আপনাদের নিতেই হবে।
আপনারা যদি এখনি আমার এই চালের অন্ন রন্ধন করে, এই
ক্ষুধাতুর বালকের ক্ষুন্নিবৃত্তি না করেন, তাহলে আমি আপনাদের

১৪ ধৰ্ম্মপথ । [ ১ম অঙ্ক ; ? নিকট এখনি আত্মঘাতী হব! আঁ! এই বালক অভুক্ত? দেখুন! আমি ভিখারী হলেও সৎকুলােব ব্রাহ্মণ ! আমি স্বয়ং আপনাদের হাঁড়ীতে এই চাল প্রদান করব, দেখি কেমন করে আপনারা আমায় নিষেধ করেন। ( হাঁড়ীতে চাউল ঢালিয়া দেওন) ত্রিলাে। ঠাকুর, করেন কি ? করেন কি আপনার সব চালগুলাে ‘ড়ীতে ঢেলে দিলেন? ভিখা। যা করলুম,—আপনি বুঝতে পারবেন না। আপনার উপরে যিনি আছেন, তিনি বুঝতে পারবেন যে, আমি কি করলুম ! (অনা- থের প্রতি ) বাবা ! আর একটুখানি কষ্ট সহ্য কর! এখনি অন্ন পাক হয়ে যাবে এখন। আমি তােমায় না খাইয়ে, এখান থেকে কিছুতেই যাব না। ততক্ষণ এস তােমায় ভগবানের নাম গান শােনাই। ত্রিলাে। সবিতা, একি! ইনি কে? আমি কিছুই বুঝতে পাচ্ছিনি। আমাদের ওপর এর এত দয়া কেন ? সবিতা। তুমি বুঝতে না পেরে থাক, আমি বুঝতে পেরেছি ! ইনি নিশ্চয়ই কোন দেবতা। ভিখারীর বেশে আমাদের দয়া করতে এসেছেন। (ভিখারীর প্রতি) বাবা! আমাদের সকল অপ- রাধ মার্জনা করুন। আমরা আপনাকে চিন্তে পারিনি ( প্রণাম করণ ) ভিথা। একি মা! আপনি আমায় প্রণাম করছেন কেন? আমি আপনাকে মা বলেছি, আমিই আপনার পদধুলি মাথায় করে নােব। আপনি সাধ্বী—সতী, পতিব্রতা, আপনার দর্শনেও আমার পুণ্য আছে। মা, আমি দেবতা নই, মা! !

১ম খ।] ধৰ্ম্মপথ। আমি দো নই। আমি আপনাদের মতনই একজন মানুষ। তবে আমার কায়, মন, প্রাণ, সব আমি এখন আমার সেই প্রাণবল্লভ শ্রীহরির শ্রীপাদপদ্মে অর্পণ করেছি। এখন আমি পবােপকার ব্রতকেই জীবনের সার বিবেচনা করেছি। মা । আমিও আপনাদের মতন অনেক দুঃখ কষ্ট পেয়েছি। মনটা যখন আমার সন্দেহ দোলায় দুততা, এ জগৎ কাণ্ডের যখন আমি কিছুই বুঝতে পারতুম না, তখন আমিও অনেক রকম দুঃখ, যন্ত্রণা পেয়েছি। তারপর যখন স্থির বুদ্ধি দ্বারা বুঝতে পারলুম যে, এ জগতের কোন কার্যের উপরই মানুষের কোন হাত নাই, মানুষ জগৎকৰ্ত্তার হাতের একটি ক্রীড়া-পুতুল মাত্র! তখন—যেন অন্তরে অন্তরে কি একটা মহাশান্তির অনুভব হলাে। প্রাণ যেন এই অনিত্য সংসারের, তুচ্ছ ভােগসুখের আশা পরি- ত্যাগ করে, কোথায়, কোন শান্তিময় স্থানে ছুটে যেতে লাগলাে। তখন বুঝলুম যে, পঞ্চভূতের মােহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, একই আত্মা, সৰ্ব্বদেহে বিরাজিত। তখন কে যেন, আমার কানে কানে বলে দিলে, যে আত্মপর “ভেদাভেদজ্ঞান” কেবল জীবের মােহবন্ধন মাত্র। কার ছেলেকে এ সংসারে কে খাওয়ায় মা ? যার ভানা, তিনিই ভাবছেন। কেবল তাকে বিস্মৃত হয়েই, আপনারা এত কৰ্ম্মফল ভােগ করছেন। মা, এই ভিখারীর একটা কথা স্মরণ রাখবেন! শয়নে, স্বপনে, ভােজনে, উপ- বেশনে, সদাসর্বদাই—সেই বিপদহারী,—মধুসুদনকে স্মরণ কর- বেন। সত্যপথে থেকে,পরের উপকারের জন্য, কৃতসংস্কল্প হবেন। দেখবেন, এ জগতে আর আপনাদের কোন দৈন্য, কোম দুর্দশাই থাকবে না।

ধৰ্ম্মপথ । [ ১ম অঙ্ক ; সবিতা। বাবা! আপনি আমাদের পায়ে রাখুন ! আপনি আমাদের উদ্ধার করুন! ভিখা। মা ! আমি আপনাদের এই প্রাণ পুত্তলিকে, আজ-ভগ- বানের নামমন্ত্র প্রদান করবাে, এই বালক, আজ থেকে যেখানে ভগবানের নাম গান করবে, সেইখান থেকেই প্রচুর ভিক্ষা প্রাপ্ত হবে। এই বালকের ঐ মধুর মুখে, মধুর হরিনাম গান শুনলে, নিৰ্ম্মলআত্মা, পবিত্র পুণ্যবান ব্যক্তি মাত্রেই, স্নেহ মমতায় বিগলিত হবে। তাদের পবিত্ৰহৃদয়ে ভগবদ্ভক্তির উদয় হবে। এই সন্তান হতেই আপনাদের সৰ্ব্বসন্তাপ বিদূরিত হবে। আর কোন দুঃখই থাকবে না। এস বাবা! ভগবানের নাম গান-শিখবে এস ! এই নাম গান, তােমাকে আবার এমনি করে, লােকের বাড়ী বাড়ী গিয়ে গাইতে হবে। অনাথ। যদি আমি হরিনাম গাইলে, আমার মা, বাবার দুঃখু দূর হয়, তাহলে আমি খুব নাম গান গাইতে পারব। ভিখা। তুমি যে পারবে,তা আমি জানি। তােমার পিতামাতার দারুণদুর্দশা দূর করবার জন্যই যে, তােমার জন্ম হয়েছে, তাও আমি বুঝতে পেরেছি। এখন এস! আমার সঙ্গে নাম গান শিক্ষাকরবে এস। ( ভিখারী ও অনাথকুমারের গীত।) (কীৰ্ত্তন) । কোথা বিপদবারণ। অনাথ স্মরণ । অধম তারণ ওহে দয়াময় । আমি ভবার্ণবে ডুবে মরি, হরি দীননাথ, দীনে হওহে সদয় ।

১ম দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
১৭
আমি জেনেছি, জেনেছি, জেনেছি এখন,
তুমি অগতির গতি পতিত পাবন !
তুমি নারায়ণ ! জগত তারণ !
দিয়ে শ্রীচরণ, প্রদান অভয় !
(সহসা ধৰ্ম্মবালাগণের আবির্ভাব ও সমবেত সঙ্গীত।)
ধৰ্ম্মবালাগণ।
ওহে মঙ্গলময় নাথ, কর হে মঙ্গল !
দেখা দাও দীনে, দীনের সম্বল।
ভিখারী ও অনাথ।
হের আঁখি জল, ঝরে অবিরল ।
ঘুচাও আমার করমের ফল!
নিভাও আমার, অনুতাপানল !
এই তাপিত হৃদয়ে-হও হে উদয় ।
ধৰ্ম্মবালাগণ।
কর শান্তিদান ! ওহে মহাপ্রাণ ।
কর, কর, প্রভু! কর পরিত্রাণ ।
ওহে তাপিত তারণ! শ্রীমধুসূদন !
দাও, দাও, প্রভু! দাও শ্রীচরণ !
সকলে—লইনু স্মরণ! ঘুচাও বন্ধন!
ঘুচাও আমার এ ভব ভয়।
[ পট-পরিবর্তন ]

দ্বিতীয়
দৃশ্য।
ত্রিলােচন ঠাকুরের কুটীর সম্মুখস্থ গ্রাম্যপথ।
( ছড়িহস্তে অজিতকুমারের প্রবেশ ।)
অজিত। জানিনা কেন আমার প্রাণ এত নির্জন স্থান ভালবাসে! সংসা-
রের অসার, অর্থহীন, কোলাহল থেকে, কেন প্রাণ দূরে থাকতে
চায় ! আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বিষয়, বিভব, কিছুই যেন
আর ভাল লাগে না ! জানিনা এ অতৃপ্ত প্রাণ কিসের জন্য
লালায়িত হয়েছে। কি জানি কিসের জন্য মনে এমন উদাস
ভাবের উদয় হয় ! কোথায় কোন অনির্দিষ্ট স্থানে, মন আপনি
যেন ভেসে চলে যায় ! কি যেন এক--মােহনসুরের অজ্ঞাত
মধুর তানে—প্রাণ আপনি আকুল হয়ে ওঠে! কি যে করি!
কোথায় যে ঘাই ! কিছুই স্থির করতে পারি না! এ অনিত্য
জীবনের অসার কল্পনাসুখ, আর যেন আমাকে তৃপ্তি প্রদানে
সক্ষম হয় না! গুরুদেব যা দেখালেন, যা বােঝালেন, তা অতি
জ্ঞানগর্ভ উপদেশ ! এ মনুষ্য জীবনটা কি—শুধু মােহের বন্ধন ?
স্বপ্ন কল্পনা? কিছুই বুঝতে পারছি না !
'(হেমাঙ্গমােহনের প্রবেশ।)
হেমাঙ্গ। (স্বগত) এই যে, হুজুর আমার এখানে নির্জনে দাড়িয়ে কি
বিড়, বিড় করে বছেন।(প্রকাশ্যে ) বলি প্রভু! ব্যাপারখানা
কি ? এই বয়সে এত একা থাকার সাধ কেন? যান,
বাহন, লােকজন, সমস্ত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মায় শরীর

২য় দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
!
রক্ষীটী পৰ্য্যন্তও কাছে নাই, বলি, ব্যাপারখানা কি? এখানে
কি, কিছু আঁতের টানের জিনিষ আছে না কি ?
অজিত। হেমাঙ্গ ! আঁতের টানের জিনিষ, এ সংসারের সর্বত্রই আছে,
কিন্তু আমরা এমনি মায়ামােহে অন্ধ-যে, কিছুই দেখতে পাইনি।
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে হ্যা ! কথাটা সত্য বটে! কিন্তু আবার এক এক সময়
এমন দেখতে পাই—যে, তখন আর দিকবিদিক জ্ঞান থাকে না।
তা সে কথা চুলােয় যাক্, এখন জিজ্ঞাসা করি, বলি—এখানটায়
এত পায়চারী করা হচ্ছে কেন ? কেউ, উকি, ঝুকি মেরেছে
কি ?
অজিত। হেমাঙ্গ ! এই নিরানন্দময় সংসারে, এত আনন্দ তুমি কোথায়
পাও? সদাই সদানন্দ মূর্তি! আমি দেখছি, এ সংসারে তুমিই
সুখী।
হেমাঙ্গ। তা সুখী না হয়ে, আর করি কি বলুন প্রভু ? আমার দুঃখের
কথা আর, এ সংসারে কে শুনবে বলুন? এই যে, আপনাকে
আতি, পাতি, করে, খুজে খুঁজে আমার হাঁফ ধরবার যােগাড়
হয়েছে! তা,—সে কথা—কে আর আমায় জিজ্ঞাসা করছেন
বলুন দেখি ?
অজিত। তা, কে তােমাকে এত পরিশ্রম করতে পরামর্শ দিলে ? আমিত
আর বালক নই, যে পথ বিস্মৃত হব।
হেমাঙ্গ। দয়াময়! আপনি বালক না হলেও যে, খুব বেশী বুদ্ধিমান, তাত
আমার বােধ হয় না। কারণ, আপনার জীবনের মূল্যটা.
যে, কিরূপ তা বােধ হয়, আপনার অনুধাবন করবার শক্তি
একেবারেই নেই!
অজিত। জীবনের মূল্য? জীবনের আবার মূল্য কি ? জীবন,কি
!
।

২০ ধৰ্ম্মপথ। [ ১ম অঙ্ক ; মানুষের হাতধরা? জীবন এ সংসারে আপনি আসে, আবার আপনিই চলে যায়। তবে যে কদিন আপন-ইচ্ছায়, এই মাংস- পিণ্ডটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে, সেই কদিনই—মানুষ মনে করে যে, আমি জীবিত আছি। হেমাঙ্গ। ও বাবা! এ যে দেখছি একেবারে—বেদান্ত দর্শন! এ সব লক্ষণ ত বড় ভাল নয় ! এ যে দেখছি সব “বনং ব্রজেতের” লক্ষণ। না আর আপনাকে এমন করে—নির্জনে ছেড়ে দেওয়া দেখছি যুক্তি সঙ্গত নয়। শেষে কি আবার একটা কাণ্ড করে বসবেন। এখন চলুন দেবতা ! এখন চলুন ! আর বাক- বিতণ্ডায় প্রয়ােজন নাই, এখন যেখানকার নিধি—সেইখানে পোঁছে দি চলুন ! অজিত। কেন, আর বাক-বিতণ্ডায় প্রয়ােজন নেই কেন? আমি কি কিছু—অন্যায় কথা বলেছি ? হেমাঙ্গ। না প্রভু! না, কিছু না, কিছু না, কিন্তু আমি আপনার নিকট আর এ সব আধ্যাত্মিক কথা শুনতে সম্মত নই। বাবা ! শেষে কি আবার, আমার মাথাটা শুদ্ধ, গুলিয়ে যাবে ! এখন সােমত্ত পরিবার ঘরে জ্যান্ত রয়েছে। না না, আর কথায় কাজ নেই, এখন চলুন ! চলুন ! আহা! রাণী মা আমাদের যা বলেন, তা মিথ্যে কথা নয়। এ যে দেখছি, একেবারে পরিবর্তন। ও বাবা ! প্রভু যে, ভিতরে, ভিতরে, এতদুর এগিয়েছেন—তা আমি জানতুম্ না । ( এই সময় অজিতকুমার, অন্যমনস্ক হইয়া, ভুমিতে ছড়ি ঠুকিতে লাগিলেন, এমন সময় অজ্ঞাতসারে হস্ত হইতে হীরকারী পতিত হইল।) হেমাঙ্গ। প্রভু! আর লাঠি ঠুকতে হবে না ! এখন গৃহে চলুন! এখনত

২য় দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ ।
২১
বয়স আছে দয়াময়, এখনত বয়স আছে। এর মধ্যে অত তত্ত্ব
চিন্তা কেন ? চলুন। চলুন! এখন ঘরের ছেলে—ঘরে চলুন !
বিষয় কৰ্ম্মগুলো-সব, একবার দেখবেন চলুন !
অজিত। চলাে যাচ্ছি। কিন্তু কার বিষয় কে দেখবে, তা তুমি কিছুই
জান না ! আচ্ছা চলো !
“মায়া যবনিকাছন্ন মজ্ঞাধােক্ষ জম ব্যয়ং।
ন লক্ষ্যসে মূঢ় দৃশা নট নাট্যধররা যথা ॥”
[ প্রস্থান।
হেমাঙ্গ। না, এ লক্ষণ বড় ভাল নয়! এ দেখছি সব ভূতে পাওয়ার
লক্ষণ ! কিন্তু এত, যে, সে ভূত নয় বাবা! এ যে পঞ্চভুতের
বাবা-ভূতনাথ কৃপা করেছেন! এ ভূত যে, সংসারীকে
সন্ন্যাসী করে। দেখি, আবার—প্রভু আমার, কোন্ দিকে
গেলেন দেখি ।
[ প্রস্থান।
(ত্রিলােচন ঠাকুরের প্রবেশ।)
ত্রিলাে।
এত বেলা হলাে, অনাথ আমার এখন ফিরে এল না কেন?
কোথায় গেলে ? ভিক্ষা কতে, করতে কি, কোন দূরগ্রামে
গিয়ে পড়েছে ? ছেলেটার জন্যে যে, প্রাণটা বড়ই অধীর
হয়ে উঠলাে ! বাবা-আমার, একলা—কোথায় ঘুরে ঘুরে,
বেড়াচ্ছে! সবিতাও যে, তার জন্যে-বড়ই অধীর হয়ে
পড়েছে ! এখন কি করি ? কোথায় তাকে অনুসন্ধান করি ?
(সম্মুখে ভূপতিত হীরকারী দেখিয়া ) একি! এ কার আংটী

২২
ধৰ্ম্মপথ ।
[ ১ম অঙ্ক ;
এখানে পড়ে রয়েছে ? এ কিসের আংটী ? এ কি হীরে ?
হীরে কি এত বড় হয় ? এ যদি সত্যি হীরে হয়, তাহলে,
তাহলে—এর মূল্য কত হবে ? ভগবান কি আমাদের দারুণ
দুর্দশ—দূর করবার জন্যই, এই মহামূল্য বস্তু—আমার এই
কুটীর দ্বারে এনে ফেলে দিয়েছেন ? যাই। যাই।
সবিতাকে—দেখাইগে! এইবার বােধ হয়, আমাদের সকল
দুঃখের অবসান হবে! ভগবান, ধন্য তােমার দয়া ।
[ প্রস্থান।

তৃতীয় দৃশ্য।
রাজপথ।
( অনাথ কুমার ও গ্রাম্য লােকগণ।)
গীত।
অনাথকুমারের
কোথা প্রেমসিন্ধু ।
আমায় কৃপা-বিন্দু কর দান !
আমি বড় দীন, ওহে দীনবন্ধু ।
আমার নাহি কিছু দিতে প্রতিদান ।
আমি বুঝেছি, বুঝেছি, বুঝেছি এখন ।
তুমি অগতির গতি, পতিত-পাবন !
নিত্য নিরঞ্জন ! ভুবন পালন !
তুমিই অপার করুণা নিদান ।
[ এই গান গাহিবার সময় গ্রাম্যলােকগণ অনাথকুমারের চতুর্দিকে
আসিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। এবং গান সমাপ্ত
হইবার পর, সকলে বলিতে লাগিলেন ]
সকলে। বাঃ! বাঃ! চমৎকার গান! চমৎকার গান !
১ম লােক। ছােরার গলাও যেমন মিঠে, কথাগুলিও তেমনি মিষ্টি।
বলিহারী বাবা ! বলিহারী! বেঁচে থাক, বেঁচে থাক।
২য় লােক। ছােকরা, তুমি এ বয়সে এমন গান শিখলে কি করে ?
আহা ! প্রাণটা যেন জুড়িয়ে দিলে ! বাঃ বাঃ কি সুন্দর গান ।
দীর্ঘজীবী হও বাবা! দীর্ঘজীবী হও !

২৪ ধৰ্ম্মপথ। [১ম অঙ্ক ; ৩য় লােক। ওহে ছােরা, গাও! গাও! আর দু চার খান গাও! এত ভদ্রলােক সব, তােমার গান্ শাের জন্যে দাড়িয়ে গেছে । চুপ করে আছ কেন? গাওনা ! গাওনা! আর দু একটা গাও না! অনাথ। আপনারা আমায় দয়া করে, কিছু ভিক্ষা দিন। আমি আবার গাইব এখন! সকলে। ও বাবা! বলে কি ? পয়সা চায় যে হে ? ৩য় লােক। তাইত, এখানে দাঁড়ান আর সুবিধা নয়, বেটা দেখছি জাত ভিখিরীর ছেলে। একটা গান গাইতে না গাইতেই বলে পয়সা দাও! আরে অমন গান্ ঢের শােনা গেছে। এস হে, যদু দাদা, চলে এসাে । ২য় লােক। চলাে ! চলল ! ব্যাটা মনে করেছে, আমরা যেন আর কখন গান্ শুনিনি, পয়সা অমনি পড়ে আছে আর কি ? [ ২য় ও তৃতীয় লােকের প্রস্থান। ১ম লােক। (টাকে হাত দিয়া ) তাইত বাবা! কাছেত এখন একটাও পয়সা নেই দেখছি, তা দেখ, আবার যখন এদিকে আসবে, আমার সঙ্গে দেখা কোর ! তােমার পয়সাটা আমার কাছে পাওনা রইল। দেখা কোর! ভুলনা । [ প্রস্থান। সকলে। চল হে, চল ! বেলা হয়ে গেছে! আর এখন গান শশানে না, চলাে ! চলাে! বেটা আবার পয়সা চায়! পয়সা অমনি খােলাম- কুচি আর কি। [ সকলের প্রস্থান। অনাথ। কৈ! এখানে কিছুই ভিক্ষা পেলুম না ! তবে কি হবে ? মা "

৩য় দৃশ্য।]
ধর্মপথ।
২৫
আমার আশাপথ চেয়ে বসে আছেন, আমি ভিক্ষে করে না নিয়ে
গেলে, আমার মা বাবার আজ খাওয়া হবে না! কৈ ? এরাত
আমার গান শুনে কেউ ভিক্ষে দিলে না। তবে কি হবে ?
ভিখারী ঠাকুর বল্লেন যে, আমার গান শুনলেই লােকে ভিক্ষে
দেবে! তা কৈ দিলে ? এরা সকলেই ত অম্‌নি চলে গেল,
আচ্ছা,আর একবার গান গেয়ে দেখি, ভিক্ষা পাই কি না।
অনাথকুমারের গীত।
অকুলে আকুল হয়ে, লয়েছি স্মরণ !
কোথা হরি দেখা দাও--বিপদ বারণ।
হর, ভয় হর! হরি ভয় বিনাশন।
মায়ার বন্ধনে--হয়ে আত্মহারা
[আমি] ভাবিতেছি—শুধুপুত্র কন্যা দারা ;
কিন্তু নাহি ভাবি কভু-কেহ নয় তাহারা,
কেবল মায়ার সংসারে মােহেরি বন্ধন।
আমি, শেষের সে দিন, ভাবি মনে মনে।
আমার কম্পিত হৃদয় হয় ক্ষণে ক্ষণে !
দেখাে প্রভু দেখাে ! আমায়—নিজগুণে রেখাে ।
অন্তিমে এ দীনে দিও শ্রীচরণ ॥
( বিজয়কুমার, উষারাণী, ও চোপদারগণের প্রবেশ।)
বিজয়।
এ কাদের ছেলে, এখানে দাড়িয়ে গান গাইছে ?
উপরের গীতের দ্বিতীয় লাইনের পর
“সংসারে জড়িত-ভয়-ভীত চিত”
এই লাইনটী বসিবে।

ধৰ্ম্মপথ।
[ ১ম অঙ্ক
;
বিজয়। না, আমি গান শুনবাে ! তােমরা একটু দাঁড়াও !
২য় চোপ। রাস্তামে এ কেয়া বখেড়া লাগায় দিয়া ? আরে ছােরা
হট যাও! হিয়াসে হট যাও!
উষা। না, ও হট যাবে না! ও গান করুক! আমরা শুবাে।
১ম চোপ। আরে, ইয়েত বড়া মুস্কিল লগায় দিয়া। আভি কেয়া করে ?
কুমার বাহাদুরকো, আভি কেয়সে হিয়াসে লে যাই ?
২য় চোপ। কুমার বাহাদুর! উষামায়ী! চলল, ঘমে চললা ! দেখাে
কেতনা বেলা হাে গিয়া, আভি বদমে ধুপ, লাগেগা ! রাণী
মায়িকি গোঁস হােয়েঙ্গি।
উষা। তবে আমরা ওকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে যাব। দাদামণি ।
তুমি ওকে আমাদের বাড়ীতে ডেকে নিয়ে চলো না !
বিজয়। তুমি আমাদের বাড়ীতে যাবে ? আমরা তােমার গান শুন্বাে !
অনাথ। যাব ! কিন্তু এরা যে আমায় ববে !
(চোপদারকে দেখাইয়া দেওন )
বিজয়। না, ওরা কিছু বলবে না। তুমি আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলাে !
অনাথ। তােমরা আমায় ভিক্ষে দেবে ?
ঊষা। আমার মার কাছে—যদি তুমি গান করূতে পার, তাহলে তুমি
অনেক ভিক্ষে পাবে। মা আমার খুব ভিক্ষে দেন।
অনাথ। তবে আমি তােমার মার কাছেই গান গাইব। আমার বড়
ভিক্ষের দরকার। আমরা বড় গরীব লােক! ভিক্ষে না ককূলে
আমরা খেতে পাই না।
উষা।. দাদা, ও কি বলছে ? ওরা কেন খেতে পায় না দাদা ? ওদের
বাড়ীতে কি লুচি ভাজা হয় না? সন্দেশ তৈরি করে না?
বিজয়।
তােমার মা কি—তােমায় খেতে দেন না ?

৩য় দৃশ্য।] ধৰ্ম্মপথ। ২৭ অনাথ। আমার মা-বাবার পেলেই আমায় খেতে দে। কিন্তু সব দিন ত আর খাবার পানি না। বিজয়। আচ্ছা চলো, আমাদের বাড়ীতে চলল ! আমার মা তােমায় অনেক খাবার দেবেন এখন। ১ম চোপ। আরে, এ কেয়া মুস্কিল হাে গিয়া ! আরে ছােরা, তােম্ কেয়া বখেড়া লাগায় দিয়া? ভাগাে, হিঁয়াসে ভাগে ! উষা। তাে ােেপ রাও ! উসকো কুছ, মত, বােলল ! দাদামণি ! চলাে না, ওকে আমাদের বাড়ী নিয়ে যাই। বিজয়। চলােনা ভাই! আমাদের সঙ্গে—আমাদের বাড়ীতে চলাে না! [ হস্তধারণ ] ঊষা। আমরা দুজনেই তােমার হাত ধরে নিয়ে যাব। আমার মার কাছে তােমায় গান গাইতে হবে। (অপর হস্ত ধারণ ) ১ম চোপ। আরে, এ ভিখারীকা লেড় কাকো লেকে, এ লােক্, কেয়া হাঙ্গামা লাগার দিয়া? ছােড় দিজিয়ে- হুজুর ! উকো হাত ছােড়-দিজিয়ে এই-সাহি উসকো আনে দিজিয়ে। বিজয়। না, আমি ওর হাত ছাড়বাে না। আমি ওর হাত ধরেই নিয়ে যাব। ঊষা। আমিও তাহলে এ হাত, ছাড়বাে না। আমিও হাত ধরে নিয়ে যাব। উভয়ে। (দুইজনে অনাথ কুমারের দুই হস্ত ধরিয়া যাইতে যাইতে ) আমরা একদিকে ভাই, একদিকে বােন্ ধরে নিয়ে যাই। তুমি চলে এস ! চলে এস ! চলে এস ভাই। [ প্রস্থান। চোপদারগণ। এ কেয়া বখেড়াহহা গিয়া ভাই। এ কেয়া বখেড়া— হাে গিয়া। সকলের প্রস্থান।

চতুর্থ দৃশ্য। (ত্রিলােচনের কুটীরাভ্যন্তর) ( চিন্তামগ্না সবিতা আসীনা, ত্রিলােচনের প্রবেশ) ত্রিলাে। সবিতা, এইবার বুঝি আমাদের দুঃখের অবসান হলাে ! দেখ! দেখ !--ভগবান আমায় কি দিয়েছেন দেখ ! (সবিতার হস্তে অঙ্গুরী প্রদান ) সবিতা। একি! এ যে মাণিকের আংটী ! এ তুমি কোথায় পেলে ? ত্রিলাে। ভগবান দিয়েছেন সবিতা, ভগবান দিয়েছেন। এইবার বােধ হয়—আমাদের আর কোন দুঃখুই থাকবে না ! সবিতা। এ নিয়ে তুমি কি করবে ? ত্রিলাে। কেন? বিক্রি করবাে! সবিতা। অমন কাজও কর না ! তুমি নিশ্চয় যেন, এ আংটী বড় সামান্য লােকের আংটী নয় । এ আংটী বেচতে গেলেই তুমি অপ- হরণের অপরাধে ধরা পড়বে। এ আংটী তুমি কাছে রেখ ! রাজবাড়ীতে গিয়ে জমা দিয়ে এস, আমার কথা শােন। এ আংটী বেচে—দুঃখু দূর করবার চেষ্টা করলে, আমাদের দুঃখু আরও বাড়বে বই কমবে না ! তুমি নিশ্চয় যেন যে, এ আংটী নিশ্চয়ই কোন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির আংটী। সৌভাগ্যবান ব্যক্তি—এরূপ আংটীর অধিকারী, তিনি বড় সামান্য ব্যক্তি নন্। আমরা পথের ভিখারী, আমাদের হাতে এরূপ মহা মূল্যবান দ্রব্য থাকলে, আমরা রাজদ্বারে দণ্ডনীয়

৪র্থ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
হব। আমার কথা শােন! তুমি এখনি এই আংটী—রাজ
বাড়ীতে জমা দিয়ে এস! রাজা এ আংটীর যথার্থ অধিকারীকে,
অনুসন্ধান করে, আংটী প্রদান করবেন এখন।
ত্রিলাে। সবিতা, তুমি কি বলছ ? দরিদ্রতা দোষে, তােমার কি জ্ঞান
বুদ্ধি সব বিলুপ্ত হয়েছে ? আমি কি কারুর গৃহ থেকে এ
আংটী চুরি করে এনেছি যে আমার রাজদ্বারে দণ্ড হবে ?
এ আমায় ভগবান দিয়েছেন। আমার
কুটীর দ্বারে,
আমি
পথের ধুলায় এই অমূল্য বস্তু কুড়িয়ে পেয়েছি। ভগবান দত্ত
জিনিষ, আমি উপেক্ষায় পরিত্যাগ করব? না, তা আমি
কখনই পারব না।
সবিতা। নানা ! ভগবান তােমায়—কখনই এ দ্রব্য—দেনি ! তুমি
লােভের বশীভূত হয়ে, বৃথা ভগবানের নাম করে, আত্মমত
পােষণ করছ। দেখ, আমি তােমার সহধর্মিণী ! আমার কথা
শােন! সেই দেবপ্রকৃতি ভিখারীর কথা স্মরণ কর। তিনি
বার, বার, বলেগেছেন—“সত্য পথ কখন পরিত্যাগ করােনা!”
ও গাে, আমার মনে খুব—আশা হচ্ছে ! অনাথকুমার, আজ
আমার প্রচুর ভিক্ষা আবে ! বাছার আমার সেই মধুর মুখে,
মধুর হরি নাম শুলে, অনেকের প্রাণ গলে যাবে। আমি
তােমায় বলছি, তুমি লােভ ত্যাগ কর ! লােভে পাপ।
পাপে মৃত্যু! সেই ভিখারীর কথার উপর বিশ্বাস কর! তুমি
দেখাে, আমি নিশ্চয় বলছি, আমাদের আর কোন দুঃখ
থাকবে না! ঐ ছেলে হতেই আমাদের সব দুঃখু—দূর হবে।
ধৰ্ম্মপথে থাক, এত কষ্ট পেয়েছ! কিন্তু কৈ, কখনত তুমি
অধর্মের কথা মুখে আননি! আজ তােমার একি বুদ্ধি হলাে ?
--

ধৰ্ম্মপথ।
[ ১ম অঙ্ক ;
•
আমার কথা শোেন ! এ আংটী তুমি রাজসরকারে—জমা দিয়ে
এস! আমি বলছি, তাহলে আমাদের ভাল বই মন্দ হবে না।
ত্রিলাে। সবিতা, আমি তােনার সব কথা শুনতে পারব, কিন্তু তােমার
এ অনুরােধ আমি রাখতে পারব না। এ ভগবানের দান
আমি স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করতে পারব না। আমি বড় কষ্ট
পেয়েছি ; দারিদ্রের দারুণ দুর্দশায়—আমার অস্থি, চৰ্ম্ম, সব
নিষ্পেষিত হয়ে গেছে। আমি আর সেই নিদারুণ দুর্দশার
যন্ত্রণা সহ্য করতে পারব না। আর আমি, এই মায়া মমতাহীন
রাক্ষসের সংসারে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার্থী হয়ে ঘুরে বেড়াতে
পারব না! আমি এই রত্ন বিক্রয় করে—যে, প্রচুর অর্থ প্রাপ্ত
হব, তাতে বােধ হয়, আমার পুরুষানুক্রমে—ঐশ্বৰ্য্য সুখ
সম্ভোগ করবে। আমি কিছুতেই এ লােভ পরিত্যাগ করতে
পারব না ! আমায় তুমি ক্ষমা কর ! এখন আমি কিছুদিন
এ আংটী অতি গােপনীয় স্থানে রেখে দেব। তারপর—সময় ও
সুযােগ বিবেচনা করে, এই আংটী বিক্রয় করব। তারপর ?
তারপর যা হবে, তুমি নিশ্চই তা দেখতে পাবে! দাও! এখন
আংটী দাও! (আংটী গ্রহণ করিয়া) আমি এখন একে,
অতি সন্তর্পণে—একটা গােপনীয় স্থানে রেখে আসি।
( প্রস্থান)
সবিতা। হা ভগবান! একি করূলে প্রভু! এ দরিদ্রের ঘরে বিপদের
রাশী এনে—কেন ঢেলে দিলে! হায়! হায়! কি হবে! কেমন
করে ওকে এ লােভের হাত থেকে উদ্ধার করব ! দেখি, দেখি,
কোথায়—আংটী লুকিয়ে রাখে একবার দেখি ! ভগবানের
কৃপায় কি, ধৰ্ম্মরক্ষার কোন উপায় করতে পারব না? অবশ্য
*

৪র্থ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ
পারব! আমি কিছুতেই এই আংটী গ্রহণ করতে দেব না !
ভগবান রক্ষা কর প্রভু! রক্ষা কর! লােভরাক্ষসের হাত
থেকে আমার স্বামীকে রক্ষা কর।
[ প্রস্থান।
( ধৰ্ম্মবালাগণের আবির্ভাব ও গীত।)
যদি মতি, গতি, ওগগা সতী,
থাকে তার পায়
তবে বিপদে, সম্পদে, বিপদ বারণ,
করিবেন উপায়।
মায়া, মােহে, নর আপনা হারায়,
সুখ-আশে সদা বিপথেতে ধায়,
সুখ নাহি পায়, করে হায়! হায় !
শেষে অনুতাপানলে—হৃদি জ্বলে যায় ।
মরণের দিন নিকটে দেখিয়া,
নিরাশ হৃদয়ে করে হায়! হায় !!
ধরমের আলাে–ধিকি, ধিকি, জ্বলে,
ধরমের সুখ -ধীরে, ধীরে, ফলে
বলী যদি হও,-ধরমের বলে !
তবে কেন—হবে—নিরুপায় !
হের, ভবের কাণ্ডারী—নিয়ে ধৰ্ম্ম-তরী,
ঐ কর্ণধার হয়ে, ডাকিছেন তােমায়।
[ পটক্ষেপন।]
;

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
মায়াময়ীর বিলাসকক্ষ।
মায়াময়ী ও নির্মলা।
নির্মলা। একি সত্য বছ সখি ? আমার ত ভাই বিশ্বাস হয় না,
অমন প্রেমিক পুরুষ কি কখন অপ্রেমিক হতে পারেন?
মায়া। নিৰ্মলা, তােমার কাছে আমার আর কি গােপনীয় আছে বল ?
আমি তােমায় সত্য কথা বলছি, তিনি এখন আর আমায়
তেমন--ভালবাসেন না ! সে সােহাগ, সে ভালবাসা, সে পলকে
প্রলয়, এখন আর সে সব কিছুই নেই! সেই হাসিভরা প্রফুল্ল
মুখ এখন যেন গাম্ভীর্য্যের আঁধারে আবৃত! সৰ্ব্বদাই একমনে
কি যে চিন্তা করেন, তাত আমি কিছুই বুঝতে পারি নি।
নিৰ্মলা। সখি, তুমি যদি তাঁর ভাব বুঝতে না পেরে থাক, তা হলে
এ জগতে যে, আর কেউ বুঝতে পারবে তাত আমার বিশ্বাস
হয় না। আমার বােধ হয়, তােমার প্রণয়-দুগ্ধটা একেবারে
নবনীতে পরিণত হয়েছে, তাই তিনি আর অধিক পরিমাণে
পান করতে পারেন না। ভাল জিনিষ—-অধিক পরিমাণে
খাবারও ত উপায় নেই! পােড়া বিধির বিধান! এমন
অবিচারও দেখিনি।
মায়া। নির্মলা! তােমার কি—খালি ঐ রহস্য! আমি কোথায়,
তােমায় আপনার ভেবে—দুটো মনের কথা বলুম, তাই, এই
কি রজবাব হলাে ?

১ম দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
নিৰ্মলা। কি জান সখি, একটা চতি কথায় আছে, “যার ছেলে যত খায়
তার ছেলে তত নালায় !” যার ঘরে--যে জিনিষটী থাকে, তার
তাতে মন ওঠে না! যে ফলটা হাত বাড়িয়ে পাওয়া যায়, লােকে
সেটীর দিকে না চেয়ে, সেই মডালের ফলটীর দিকেই হাঁ ক'রে
চেয়ে থাকে। তোমার ঘরে ভালবাসার ছড়াছড়ি, সােহাগের
হুড়ােহুড়ি, তাই আমােদেরও গড়াগড়ি ! একটা গানে আছে
শুনেছিলুম, কি—ছাই মনেও আছে না! হা! হা! মনে
হয়েছে ! শুনবে? শুবে ? তবে শােন!
নিৰ্মলার গীত।
বিরহে প্রাণ হয় যে ব্যাকুল,-
কেবল অনুরাগ তায় বােঝা যায় ।
অদর্শনে যে যাতনা,
দর্শনে থাকেনা হায় !
যেখানে যার যত মান,
সেখানে তার তত টান!
অভিমানে-আত্মহারা,
কাদে গো প্রাণ-যাতনায় ;
এ যে, কি যাতনা বুঝতে নারি,
ওগাে, যাতনায় সুখ একি দায়।
মায়া। তােমার মুখে আগুন! এত রঙ্গও জান! যেমন দেবা, তেমনি
দেবী, রঙ্গ রসে যেন ডুবে আছেন।

৩৪
ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক।
;
নিৰ্মলা। কি করি রাণিজি! তা ছাড়া আর কাজ কি আছে বলুন দেখি ?
নিশ্চিন্ত মনে, রাজবাড়ীতে এরূপভাবে অনুধ্বংশ করূলে,-
কার না শরীরে রসের উদ্ভব হয় ? আমার শরীরত এখন রসে
ডগম করছে ! রস—উথলে পড়ছে ! কিন্তু কি পরিতাপ ! যে
এমন সুধারস পান্ কবার, উপযুক্ত রসিক—আর এ ভাগ্যে
কেউ জুটলাে না!
মায়া। কেন? তােমার আবার রসিকের অভাব হলাে কেন ?
নিৰ্ম্মলা। কি আর বলবাে বল সখি ! ও দুঃখু সকলেরই সমান, কথার
বলে,- “তুমি খাও ঘাটে জল আমি খাই মাঠে।
আর তােমার দুঃখু দেখে সখী, আমার বুক ফাটে !”
তুমি রাজরাণী হয়েও যখন সম্পূর্ণভাবে সন্তোষলাভ করতে পার
, তখন আর আমাদের কথা—কি বলব বল দেখি? ব্যথার
ব্যথি—পাওয়া এ সংসারে—বড় শক্ত কথা ! জগতের মজাই এই
যে, সবাই সবাইকে সুখী দ্যাখে! অথচ সবাই ভাবে যে,
অমার মতন দুঃখী—বুঝি আর এ জগতে কেউ নেই।
জগতের কাণ্ড, কি করে, কে বুঝবে বল দেখি ?
( বিজয়কুমার, উষারাণী, ও অনাথকুমারের প্রবেশ।)
বিজয়। মা ! এই ছেলেটী কেমন গান গাইতে পারে ;-
ঊষা। মা ! আমরা ওকে সঙ্গে করে এনেছি, তুমি ও’র গান শােন
নামা ।
মায়া। বেশ ছেলেটী। আহা—কাদের ছেলে ?
উষা। ও মা, গরীবদের ছেলে। ওরা খেতে পায় না।
ওদের বাড়ী
লুচি সন্দেশ কিছুই হয় না।

১ম দৃশ্য। ]
ধৰ্ম্মপথ।
নির্মলা। রাজরাণি ! এই চাদের হাট যার ঘরে, তার আবার এ জগতে
কিসের দুঃখু ? আহা, বাছাদের কথা শুনলে প্রাণ শীতল হয় !
এ জগতের এখন কিছুই জানে না !
ঊষা। ওগাে! তুমি ওকে গান গাইতে বল না !
নিৰ্মলা। বছি মা, বছি! আগে তােমার মার কথা শেষ হতে দাও।
মায়া। তুমি কাদের ছেলে ?
অনাথ। আমি বামুনদের ছেলে। আমরা বড় গরীব মানুষ।
মায়া। তোমার কে আছেন ?
অনাথ। আমার মা আছেন, আর বাবা আছেন, আর কেউ নেই।
মায়া। তারা কি করেন ?
অনাথ। মা আমার বাড়ীতেই থাকেন, বাবা আগে ভিক্ষে করতেন, কিন্তু
বাবাকে আর কেউ ভিক্ষে দেয় না বলে, আমি ভিক্ষে করুত
বেরিয়েছি। আপনি যদি আমায় ভিক্ষে দেন, তাহলে আমি
গান গাইতে পারি।
বিজয়। হা!—মা তােমায় খুব—ভিক্ষে দেবেন, তুমি গান গাও ?
উ। মা, তুমি ওকে খুব বেশী করে ভিক্ষে দিও ! তা নইলে ওরা
খেতে পাবে না।
মায়। (স্বগত) তােমরা যখন—ওর হাত ধরে ডেকে এনেছ, তখন
আমি ওদের খাবার দুঃখ আর রাখবাে না! ( প্রকাশ্যে )
হা মা, দোব বৈকি, আচ্ছা তুমি একটা গান গাও।
( সকলের উপবেশন )
অনাথকুমারের
ওগাে, চেয়ে দেখ ফিরে !
–কে ডাকে তােমারে,
গীত।

ধর্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক ;
বাজাইয়া বাঁশী মােহন রবে !
কেন ভুলে যাও ! নিজ গৃহ পানে চাও !
চিরদিন—ভবে থাকিতে না হবে ।
বাঁশী বড়ই কাতরে,
বলিছে তােমারে,
আপনার পানে চেয়ে দেখ ফিরে,
ঐ ভবসিন্ধু তীরে,
চেয়ে দেখ ফিরে।
ঐ দাড়ায়ে রয়েছে ভুবন মােহন।
কেন ভুলে যাও ! চাও ফিরে চাও !
ঐ ডাকিছে তােমারে-পতিত পাবন !
ওগাে, ফিরে কি যাবে না ?
খেলা, সাঙ্গ কি হবে না ?
(বল) পরবাসে আর কত দিন রবে !!
( মায়াময়ী ও নির্মলা চক্ষে অঞ্চল দিয়া ক্রন্দন )
বিজয়। মা! মা! তুমি কাঁদছ কেন ?
মায়া। . বাবা! আজ যা শুলুম, তা জীবনে কখন শুনিনি! নিৰ্মলা!
তােমার চক্ষেও জল বেরিয়েছে ?
নিৰ্মলা। এ গান শুনে কে চুপ করে থাকতে পারে বল ? এমন গান
আমি আমার জীবনে কখন শুনিনি। প্রাণের ভেতর যেন তরঙ্গ
উথলে উঠলাে ! বাবা! তুমি কি এমন গান আর জান ?
অনাথ। হাঁ, অনেক জানি। কিন্তু এখন আর গাইতে পারব না। আমার

১ম দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
৩৭
মা বাবা আমার জন্য আশা-পথ চেয়ে বসে আছেন। আমি
ভিক্ষে নিয়ে গেলে, তবে তারা খেতে পাবেন।
নায়। নির্মুলা ! এই বালকের দু-হাত ভরে ভিক্ষা দাও! বাবা,
আবার তুমি এস। আমি–আবার তােমার গান শুনবাে !
ভুলনা ! এস ! ( দাড়ি ধরিয়া চুম্বন ) আহা! কি সুন্দর
বালক! কি সুন্দর গান !
নিৰ্মলা। আমার ত ছাড়তে ইচ্ছা করছে না! আহা কি মধুর গানই
শােনালি বাবা!
বিজয়। মা! ওকে আবার আসতে বলুন না ! আমি আবার গান
শুনবাে। বাবাকে একবার গান শােনাব।
ঊষা। (হাত তালি দিয়া) হ্যা, হঁা, বেশ হবে ! বেশ হবে ! তােমার
গান—আমার বাবামণি শুবেন! তুমি আবার খুব ভিক্ষে পাবে।
অনাথ। (রাণীর প্রতি) আচ্ছা মা, আমি আবার আস্বাে ! আমি ভিক্ষে
পেলে রােজ এইখানে অসবাে । কিন্তু আজ আর আমি
এখন থাক্‌তে পারবাে না। আমার মা হয়ত আমার জন্য কত
ভাবছেন !
মায়া। না, এখন আর তােমায় থাকতে হবে না ! তুমি এখন ভিক্ষে
নিয়ে-তােমার মার কাছে যাও ! আবার কাল এসাে।
নিৰ্মলা দাও-যা বলুন তাই দাও!
নিৰ্মলা। এস—বাবা এস। ভিক্ষে নেবে এস!
বিজয় ও উষা। (হাত তালি দিয়া) হাে! হহ! বেশ হয়েছে ! মা খুব
গান শুনেছেন !
বিজয়। চলল, চলল, তােমায় আমি বার মহলে দিয়ে আসি চলল।
[ সকলের প্রস্থান ।

দ্বিতীয় দৃশ্য। ত্রিলাে। ত্রিলােচনের কুটীরসংলগ্ন স্থান। ( সবিতা ও ত্রিলােচনের প্রবেশ ) ত্রিলাে। সবিতা! তুমি আর কথা কইছ না কেন? তােমার কি হয়েছে ? অনাথের জন্য চিন্তা করছ ? কিছু চিন্তা নেই! সে এখনি আসবে এখন। সবিতা। দেখ, আমার মনে আর সুখ নেই। তুমি যে পাপ ঘরের ভিতর রেখেছ, ও পাপ যতক্ষণ না আমার ঘর থেকে বার হবে, ততক্ষণ কিছুতেই আমার শান্তি নাই। ফের ঐ কথা। আমি তােমায় করযােড়ে অনুরােধ করছি। তুমি আর ও কথা মুখে এনাে না ! কে কোথা থেকে শুনে ফেলবে। শেষে কি---তুমি আমার সর্বনাশ করবে ? সবিতা। দেখ, যে জিনিষ নিয়ে—প্রাণের ভেতর—সদা সৰ্ব্বদা অশান্তি ভােগ করতে হয়, সে জিনিষে মানুষের কখনই সুখ হতে পারে ! অদৃষ্ট ছাড়া মানুষের পথ নেই। আমরা যেমন কর্ম করে এসেছি, তেমনিতফলভােগ করব! তা—তার জন্য আর দুঃখু কিসের ? কিন্তু এটা আমি ঠিক বুঝেছি-ধর্ম- পথের চেয়ে মানুষের সুখের পথ আর কিছুই নেই। আমাদের যে দুবেলা হাঁড়ি চড়ে না। একটিমাত্র ছেলেও যে—খিদের সময় খেতে পায় না-তা আমি জানি। কিন্তু এত দুঃখের ভেতরও যখন আমার মনে হয় যে, আমরাত কখন কোনও অধৰ্ম্ম করিনি। তখন আমার বুকটা যেন দশহাত হয়ে ওঠে। তখন আমি মনে

২য় দৃশ্য।
ধৰ্ম্মপথ ।
করি, আমরা ভিখারী হলেও, আমরা ধৰ্ম্মধনে ধনবান! আমা-
দের—ঘরে—চাল নেই, ডাল নেই, কিছুই নেই, কিন্তু আমাদের
ঘরে ধৰ্ম্মের ভাণ্ডার আছে। আমাদের এত দুঃখেও যে এত
সুখ—কেন—তা জান ? কেবল আমরা—-ধৰ্ম্মপথে আছি বলে।
কিন্তু জানিনা—আজ কি মােহমুগ্ধ হয়ে, তুমি আমার সেই ধৰ্ম্মের
সংসারে আগুন দিতে বসেছ! পর দ্রব্য অপহরণ করে কি, এ
জগতে কেউ কখন সুখী হতে পারে ? কখনই পারে না।
তুমিও কখন পারবে না ! এখন আমার কথা শােন! যার
আংটী তার অনুসন্ধান করাে ! নচেৎ রাজবাড়ীতে গিয়ে—ঐ
আংটী জমা দিয়ে এস।
ত্রিলাে। সবি! তােমায় মিনতি করি ! যােড়হাত করি। ও কথা তুমি
আর তুলাে না! আমায় ক্ষমা কর। আমি তােমার স্বামী,
আমার একটা অনুবােধ তুমি রক্ষা কর ! ঐ বুঝি অনাথ
আসছে! চুপ কর ! সবিতা চুপ কর !
( অনাথের প্রবেশ
অনাথ। মা ! মা! আজ অনেক ভিক্ষা পেয়েছি। মা, সেই ভিখারী
ঠাকুর যা বলে গেছেন, তা মিথ্যে হবার নয় মা, তা মিথ্যে
হবার নয় ! দেখ—মা দেখ! কত টাকা পেয়েছি একবার দেখ।
(বস্ত্রাঞ্চলের টাকা প্রদর্শন )
সবিতা। ওগাে, দেখ ! দেখ! একবার চেয়ে দেখ ! বাছা আমার কত
টাকা এনেছে একবার চেয়ে দেখ ! আমিত তােমায় তখনি বলে
ছিলুম যে, ও ভিখারী সামান্য ভিখারী নয় ! ও নিশ্চয়ই কোন
দেবতা—ছদ্মবেশে এসেছিলেন! দেখ, যা বলে গেছেন, তাই
D

৪০ ধৰ্ম্মপথ। [ ২য় অঙ্ক ; ঠিক হয়েছে। তিনি বলে গেছেন যে, এই ছেলে হতেই আমাদের সকল দুঃখ দূর হবে! তুমি এখনও আমার কথা শােন ! ত্রিলাে। আবার ঐ কথা! আবার ঐ কথা! তুমি চুপ কর !–সবিতা চুপ কর ! অনাথ! বাবা—তােমায় এত ভিক্ষে কে দিলে বাবা ? অনাথ। কে দিলে—তা জানি না বাবা! আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান করছিলুম্—এমন সময় একটী সুন্দর ছেলে, আর একটী সুন্দর মেয়ে এসে, আমাকে তাদের বাড়ী ধরে নিয়ে গেল। তাদের খুব মস্ত বাড়ী! তাঁদের মা, আমার গান শুনে, আমায় এই—এত টাকা দিলেন ! বাবা ! আর তুমি দেরি করনা, শিগ্‌গীর করে সব জিনিষ কিনে আন! আজ আমরা খুব পেট ভরে খাব এখন! কেমন বাবা ? আজ আমরা খুব পেট ভরে খেতে পাব না ? সবিতা। বাবা ! আর আমাদের খাবার ভাবনা কি? তুমি যখন টাকা আতে শিখেছ, তখন আর আমাদের দুঃখ কিসের ? ত্রিলাে। তা হলে এখন এ থেকে আমায় কিছু দাও! আমি সব আব- শ্যকীয় জিনিষ পত্র কিনে আনি। অনাথ। এই নাও বাবা! এই নাও ! তুমি শিগগীর করে সব কিনে আনগে! (টাকা প্রদান ) মা, তুমি এধারকার সব যােগাড় কর । ত্রিলাে। সবিতা, আমি তবে এখুনি সব কিনে আছি! তুমি উনুনে আগুন দাও। সবিতা। তােমার কি এখনও চোখ ফুটল না? তুমি কি এখন লােভের হাত থেকে আপনাকে উদ্ধার করূতে পারলে না? এখনও কি তুমি বুঝতে পারছনা যে, ভগবান আমাদের উপর মুখ তুলে চেয়েছেন। আমাদের দুঃখের দিন অবসান প্রায় হয়েছে। এই .

২য় দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
দুধের ছেলে—এক আঁচ লা টাকা নিয়ে ঘরে এল ! এ দেখেও
কি তােমার—জ্ঞান চক্ষু ফুটলাে না?
ত্রিলাে। ফের ঐ কথা! ফের ঐ কথা ! না—না আমি আর এখানে
থাকবনা ! আমি চলুম! আমার—একটা অনুরােধ—তুমি রক্ষা
কতে পারলে না ? ছি! ছি ।
[ প্রস্থান।
সবিতা। ভগবান! দীননাথ ! পতিতপাবন ! প্রভু!
পতিতপাবন ! প্রভু! অভাগিনীর
স্বামীকে রক্ষা কর! হে সুবুদ্ধিদাতা ! আমার স্বামীকে সুবুদ্ধি
দাও প্রভু! আমার স্বামীকে সুবুদ্ধি দাও ! তার ধর্ম রক্ষা কর
প্রভু! তার ধৰ্ম্ম রক্ষা কর! (করযােড়ে প্রার্থনা ও ক্রন্দন )
অনাথ। কি হয়েছে মা? তুমি অমন করে কঁদছ কেন মা? বাবা কি
তােমায় কিছু বকেছেন ?
সবিতা। বাবারে! আর বুঝি আমাদের কিছু থাকে না! এইবার
বুঝি আমাদের সব যায় ! ( ক্রন্দন )
অনাথ। কেন মা? কি হয়েছে মা? আমায় বলনা মা ! আমার তুমি
যা বলবে আমি তাই করব ।
সবিতা। বাবা ! তুই কি আমায় এ বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবি
বাবা ?
অনাথ। কেন পারব না মা! তুমি আমায় যা করতে বলবে, আমি তাই
করব!
সবিতা। বাবা, আমি তােমায় একটা আংটী দেববা, তুমি সেই আংটী
নিয়ে, যেখান থেকে তুমি এই ভিক্ষা এনেছ, তাঁদের কাছে দিয়ে
আসতে পাবে ?
অনাথ। কেন পারব না মা ! এখুনি পারব ! তুমি আমায় দাও ! আমি

82
ধৰ্ম্মপথ ।
[ ২য় অঙ্ক ;
একদৌড়ে গিয়ে—এখুনি তাদের হাতে আংটী দিয়ে আসব
এখন ।
সবিতা। আচ্ছা দাড়াও বাবা! আমি আংটী এনে দিচ্ছি। (প্রস্থান ও
ক্ষণপরে প্রবেশ) এই নাও বাবা—এই নাও! খুব সাবধানে
নিয়ে যেও ! রাস্তায় যেন খুলনা ! ( অঞ্চলে বাঁধিয়া দিলেন )
অনাথ। না--মা! আমি কখন রাস্তায় খুলবাে না।
সবিতা। যাও—বাবা যাও! তুমিই তােমার পিতাকে এ বিপদ থেকে
উদ্ধার কর। তাদের বােল যে, এই আংটীটা আমরা কুড়িয়ে
পেয়েছি। যথার্থ যার আংটী—তারা যেন তাঁর অনুসন্ধান
করে, তাকেই এই আংটীটি প্রদান করেন।
অনাথ। আচ্ছা মা, আমি ঠিক ঐ কথা বলব এখন! তবে মা আমি
যাই ?
সবি।
এস বাবা এস! ভগবান তােমায় রক্ষা করুন !
[ মার পদধুলি লইয়া অনাথের বেগে প্রস্থান।
দীননাথ ! দয়াময়! লজ্জানিবারণ! আজ আমার মুখ রক্ষা
কর—ঠাকুর ! মুখ রক্ষা কর! বিপদভঞ্জন! 'আমাদের এ
বিপদ থেকে উদ্ধার কর ! (প্রস্থান)
স্কঃ

তৃতীয় দৃশ্য।
তােরণ।
রাজবাটীর
লাঠি ঘুরাইতে ঘুরাইতে চোপদারগণের প্রবেশ ।
সকলে। আরে ইয়ে আঙ্গুঠি যায়েগা কঁহা ? 'হামলােক—আঙ্গুঠিকে
নিকালকে—তব ছােড়েগা। (আস্ফালন করিতে লাগিল।
১মচো। দেখাে ভাই, খুব হুসিয়ার ! কৈ শালা নেহি ভাগ যায় ।
সকলে। খুব হুসিয়ার ভাই ! খুব হুসিয়ার !
জনৈক গ্রাম্য লােকের প্রবেশ।
সকলে। এই, এই, এই শালা আঙ্গুঠি লিয়া! এই শালা আঙ্গুঠি লিয়া।
এই শালা আঙ্গুঠি লিয়া! ( ধারণ) চোর-পাড়া গিয়া ! চোর
পাড়া গিয়া
লােক। একি বাবা! খামকা আমাকে চোর বলছ কেন ?
১মচো। তােম্ আলবং চোর হায় !
লােক। কেন বাবা, কিসে চোর হায়! হাম-কেয়া চুরি করা হয় ?
১মচো। তােম্ মহারাজকা, আঙ্গুঠি চোরি কিয়া হায় !
লােক। আঙ্গটী ? মহারাজকা ? এ তােম্ লােক কেয়া বা হায় ?
হাম্ ত কুছ সম্ঝাতে পাতা নেহি হায় !
১মচো। আরে যব, ডাণ্ডা পড়েগা, তব সম্ঝনে সাকোগে !
লেক। একি জুলুম হয় বাবা ? আমি কিছুই জান্তা নেহি হায় !
আর অনি শুধু শুধু ডাণ্ডা খায়েগা ?
সকলে। আলবৎ খায়েগা! শালা তােম্ আলবৎ ডাণ্ডা খায়েগা।

৪৪
ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক ;
লোক। আমি কিছু জানি না বাবা! তবু আমি ডাণ্ডা. খাব কেন বাবা!
ওরে বাবারে! আমার একি হল রে !
জমাদারের প্রবেশ।
জমা। আরে কেয়া সব গােলমাল লাগায় দিয়া ? কেয়া হুয়া ? কেয়া
হুয়া ?
সকলে। ইয়েহি আঙ্গুঠি চোর হ্যায়! ইয়েহি আঙ্গুঠি চোর হ্যায় !
লােক। দোহাই বাবা! দোহাই বাবা ! আমার কোন পুরুষে আংটী
চোর নয় বাবা ! আমি কিছুই জানি না বাবা! আমি কিছুই
জানিনা ! আমি আঙ্গুটিও জানিনা। মহারাজও জানিনা।
আমি কিছুই জানিনা। ( ক্রন্দন )
জমা। আরে—কেয়া সব—বুটিমুটবখেড়া লাগায় দিয়া ? ছােড়
দিজিয়ে ইয়ে গরীব কিষান আমি হায় ! বেফয়দা ইকো উপর
কেয়া জুলুম করূতে হে? ছােড় দেও! এ আমি কো ছােড়
দেও! যাও ! যাও! তােম হিয়াসে চল যাও।
লােক। রামজী তােমার ভালা করুক বাবা ! ‘রানজী তােমার ভাল
করুক! ভাগ্‌গি তুমি এলে, তাই ছাড়ান পেলুম ! তা নইলে
এতক্ষণে ডাঙার চোটে—আমাকে অঙ্গুঠি চোর বানিয়ে তবে
ছাড়তে !
[ সেলাম করিতে করিতে প্রস্থান।
জমা। একেয়া হে গিয়া! এ কেয়া হে গিয়া ! মহারাজকা
মানিকা আঙ্গুঠি—কঁহা খাে গিয়া ! কেয়া গজব, হুয়া! কেয়া
গজব, হুয়া !
২য়চো। জমাদারজি ! ইস্ আঙ্গুঠি কি—কিম্মৎ কেনা হােগি ?
জমা। আরে ভাই, ইসকি কিম্মৎ কোন কহে শাখতা হ্যায়! হামনে

৩য় দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ ।
৪৫
শুনা হ্যায়! ইয়ে মাণিক কি আঙ্গুঠি, মহারাজকা দাদা-মাহারাজ
যো—থে, উষ্কা—দাদা-মহারাজকা, দাদা-মহারাজকো-কৈ
দেওতাসে—মিলিথি। কেয়া কহেঙ্গে ভাই! এত বড় মাণিক
আউর কভি-হামনে দেখা নেহি! আগকা মাফিক্‌ অস্তা
হ্যায়!
১মচো। আরে বাপ !
আরে বাপ! তব কেয়া হােয়েগা ?
জমা। হােয়েগা কেয়া ? যিস্ তরেসে হাে—ইয়ে আঙ্গুঠি–নিকালনা
পড়েগা! ভাই, সব আভি খুব হুসিয়ারি সে, চারাে তরফ নজর
করকে, দেখাে। ( সকলের আঙ্গুঠি অন্বেষণে নিযুক্ত হইল )
২য়চে। (দেউড়ির উপর দিকে চাহিয়া আংটী খুজিতে লাগিল)
!
হেমাঙ্গের প্রবেশ।
হেমাঙ্গ। বলি কি হচ্ছে কি-জমাদার সাহেব ? সব যে একেবারে উঠে
পড়ে লেগে গেছ ? বলি—কিছু কি—সন্ধান হলাে ? এই যে,
এই চোপদার সাহেব—বােধ হয় কিছু সন্ধান পেয়েছে ! ভেলা
মাের বাপ, রে! জিতা রহহ! জিতা রহহ! হাঁ! ঠিক্ ঐ
কারনিসের কোনেতেই আঙ্গুঠি আছে ! ঐ যে, চিক্ চিক্
করছে ! ঐ—উচু কানিসের কোণে—ঠিক দেখা যাচ্চে ।
দেখ বাবা! দেখ! খুব ভাল করে, ঐ কানিসের দিকে চেয়ে
দেখ! ঐখানে নিশ্চই—আঙ্গুঠি আছে—
জমা। আরে কম্ বখ—হুয়া কেয়া দেখ তা হ্যায় ?
২য়চো। কেয়া জানে, কৈ সুরৎসেযব আঙ্গুঠি-হুয়া গিয়া হােই ?
হেমাঙ্গ। ঠিক বলেছ বাবা ! ঠিক বলেছ! মহারাজের হাত থেকে,
আঙ্গুঠিটাত ছিটকে গিয়েও, ঐ কারনিসের ওপর পড়তে পারে

৪৬
ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় ওঙ্ক ;
তা—এত-বুদ্ধি-নিয়ে—তুমি চোপদারি করতে এসেছ কেন
বাবা ? হাকিম হতে পারনি ?
( মন্ত্রী, সহরকোতয়াল ও শশীশেখরের প্রবেশ। জমাদার ও
চোপদারগণ সেলাম করিয়া একপার্শ্বে দণ্ডায়মান হইল।)
!
মন্ত্রী। তাইত। এ আংটী না পাওয়া গেলে—কি আর রক্ষে আছে ?
এই আংটীটিই হলাে, আমাদের রাজবাড়ীর লক্ষ্মী ! এ কি
আজকের আংটী? কত পুরুষানুক্রমে এই মাণিকের আংটী
রাজভাণ্ডার আলাে করে রেখেছে! মহামূল্যবান্ বস্তু ।
মহামূল্যবান্ বস্তু! ওহে হেমাঙ্গমােহন! মহারাজ বােধ হয়, এই
আংটীর শশাকে—এতক্ষণ অধীর হয়ে পড়েছেন। একবার দেখ,
দেখ! অন্দরে গিয়ে, মহারাজের অবস্থাটা একবার দেখে এস।
হায়! হায়! কি সর্বনাশই হলাে! এমন জিনিষও হারায়।
শশী। তাইত মন্ত্রী মশাই! এত কম দুঃখের কথা নয়। আমরা সব
এতগুলাে লােক থাকতে কি না, মহারাজের একটা হারাণ
আংটীর অনুসন্ধান হবে না ? তা হলে লােকে বলবে কি ?
স-কো। দেখুন মন্ত্রী মশাই! এ আংটী যখন মহারাজের হাত থেকে
হারিয়েছে, তখন এ আংটীর অনুসন্ধান করা যে, বড় কঠিন
ব্যাপার, তা নয়। তবে আমার ওপর—এখন মহারাজের একটা
হুকুমনামা, আপনাদের বার করে দিতে হবে।
হেমাঙ্গ। তাত নিশ্চয়! তাত নিশ্চয় । তা নইলে কি--কখন আংটী খোজা
অমনি হতে পারে ? আর তা নইলে কি—কখন অমনি---আংটী
বেরুতে পারে ? হুকুমনামা চাই বইকি! হুকুমনামা চাই
!
বইকি!

ধৰ্ম্মপথ ।
৪৭
মন্ত্রী।
তা আপনার যা—আবশ্যক, তাত নিশ্চয়ই দিতে হবে। কিন্তু এ
আংটীর সন্ধান আপনাকে করতেই হবে। তা নইলে আমাদের
আর মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না! হায়! হায়! কি
সৰ্ব্বনাশই হলাে।
শশী। সৰ্ব্বনাশ বলে সর্বনাশ! একেবারে রাজ-সংসারের লক্ষ্মীটিই
হারিয়ে গেল !
স-কো। দেখুন মন্ত্রী মহাশয় ! আর বিলম্ব ককূলে হবে না ! আমাকে
টাটকা-টাটকা সব অনুসন্ধান করূতে হবে ! আপনি শী
করে—'আমাকে ক্ষমতাপত্র প্রদান করুন । আমি এখনি
মহারাজের আংটী এনে দিচ্ছি।
হেমাঙ্গ। আপনার তা হলে এখন কিরূপ হুকুমনামার আবশ্যক বলুন ত ?
আমি এখনি এনে দিচ্ছি।
স-কো। যে সমস্ত রাস্তা দিয়া, আজ মহারাজ প্রাতঃসমীরণ সেবনের জন্য
গমনাগমন করেছিলেন, সেই সমস্ত পথের উভয় পার্শ্বে যে সকল
মানুষের গৃহ আছে, আমি সেই সকল গৃহ অবাধে অনুসন্ধান
করিব। আর ঐ সকল গৃহের—আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাদের নিকট
থেকে, যে উপায়ে হােক—মহারাজের—আংটীর-অনুসন্ধান
করিব।
এতে কেহ কোন প্রকার বাধা প্রদান করিতে
পারিবেনা।
হেমাঙ্গ। ভেলা মাের বাপরে! ভেলা মাের বাপ! এমন নইলে কি কেউ
কখন-নেমকের চাকর হতে পারে ? এ উপায়—তাবলম্বল
করলে ও আংটীততা—আংটী, আংটীর-চৌদ্দপুরুষ পৰ্য্যন্ত বেরিয়ে
পড়বে এখন। কোতয়াল সাহেব! ধন্য ! ধন্য ! ধন্য আপনার
বুদ্ধি! একেই বলে—রাজসরকারের -জবরদস্ত কোতয়াল! মন্ত্রি

৪৮
ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক।
মশাই, আর বিলম্বে প্রয়ােজন নাই! বিলম্বে প্রয়ােজন নাই।
কাৰ্য্য অনেকটা এগিয়ে এসেছে। এখন আপনি হুকুমনামাটার
একটা মুসবিদে করে ফেলুন! ও আংটী একরকম পাওয়া
গেছেই ধরুন।
মন্ত্রী। যুক্তি মন্দ নয় ! যুক্তি মন্দ নয়। তবে মহারাজের বিনা হুকুমে
এরূপ হুকুমনামার মুসাবিদা করা--কৰ্তব্য কি না—তাই আমি
চিন্তা কছি !
হেমাঙ্গ। তার আর চিন্তা কি! তার আর চিন্তা কি ! আমি এখনি
মহারাজের অনুমতি এনে দিচ্ছি।
মন্ত্রী। হেমাঙ্গমােহন, তাই যা হয় তুমি এর একটা উপায় বিধান কর
ভাই! আমরাত এই আংটী হারাণর সংবাদ শ্রবণ পৰ্য্যন্ত,
সব দুশ্চিন্তায় দগ্ধ হচ্চি! কি যে করি—কিছুই স্থির করতে
পারছি না।
হেমাঙ্গ। কিছু চিন্তা নেই—মন্ত্রী মশাই ! কিছু চিন্তা নেই। আমি এখনি
মহারাজের নিকট এ সংবাদ নিয়ে যাচ্চি। মহারাজ এ সংবাদ
শ্রবণে আনন্দে অধৈর্য হবেন এখন! যা হক্‌ এতক্ষণে তবু
আংটী আবিষ্কারের একটা উপায় নির্ণয় হলাে ।
স-কো। মশাই! সহর কোতয়াল কি অমনি হলেই হল? অনেক
বুদ্ধি চাই! অনেক বুদ্ধি চাই ! এই রাজ্য চালাবার চাবি কাটি
কে জানেন ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞেতা আর জানিনা! তা আর জানি না! খুব জানি।
খুব জানি ! এই যে চাবি কাটিটি স্বশরীরে আমার সম্মুখেই
দণ্ডায়মান রয়েছেন।
মন্ত্রী। হেমাঙ্গমােহন! যাও ভাই যাও! এরূপ হুকুমনামা প্রদানে—

ধৰ্ম্মপথ ।
৪৯
মহারাজের কোন প্রকার আপত্য আছে কি না—একবার
জেনে এস।
হেমাঙ্গ। আজ্ঞেতবে আমি চলুম ! আপনি মুসােবিদেটা করে রাখুননা !
মহারাজের এতে কোন আপত্য হবে না। কোন অমত হবে না।
এ হুকুম নামার মধ্যে এমন আর অন্যায় কথাটা-কি আছে, বলুন
দেখি ? সবই ন্যায়সঙ্গত-যুক্তিপূর্ণ,
—যুক্তিপূর্ণ, সুবিচারের কথা ! এমন
ধারা না করূলে, আংটীর সন্ধান হবে কেন? আমি তবে চলুম !
[ প্রস্থান।
মন্ত্রী। আসুন মশাই! আপনারা আসুন! আরও একটু এ বিষয়ের
জন্য গভীর গবেষণা করা যাক্ আসুন!
স-কো। চলুন মশাই চলুন! আমি চোপদারদের সব ঠিক করে রেখে যাই
মন্ত্রী। এস ! শশীশেখর এস ! কি দুশ্চিন্তা ! কি দুশ্চিন্তা।
শশী। দুশ্চিন্তা-বলে—দুশ্চিন্তা! একেবারে আহার-নিদ্রা ত্যাগ হয়ে
গেছে!
[ উভয়ের প্রস্থান।
স-কো। জমাদার !
জমা। হজুর ! তাঁবেদার—গােলাম—হাজির হ্যায়! (সকলের সেলাম)
স-কো। দেখাে, সব খুব হুসিয়ারিসে রহ! আভি সবকৈকো আঙ্গুঠি
কা ওয়াস্তে বহুৎ জবর কামে যানে হােয়েগা।
জমা। হুজুর—মায়ত সব সমঝ, লিয়া! আভি আপকো হুকুমকো ওয়াস্তে
হামলােক খাড়া হ্যায় ।
স-কো। আচ্ছা—সব হাম সাথ আও! হাম সব বন্দবস্ত কর্ দেঙ্গে।
জমা। (উচ্চৈঃস্বরে) এ-হেই! (চোপদারগণ সারিবন্দি হইয়া
দণ্ডায়মান হইল) ঢিলা-কদম্-ঢিলা কদম্— সকলের ধীরে
ধীরে গমন ) খাড়া হাে যাও! (সকলের দণ্ডায়মান হওন )
৪

ধৰ্ম্মপথ । [ ২য় অঙ্ক ; স-কো। হা—সব ঠিক হ্যায় ! তােমকো জরুর বক্‌সিস্—মিলেগা। জমা। হুজুরকা মেহেরবাণি ! হুজুরকা মেহেরবাণি! হামত’ আপই : কা তাবেদার হ্যায়! ( অগ্রে সহর কোতয়াল, পরে জমাদার, ও একে একে চোপদারগণের যাইতে যাইতে ;-) জমা। হুসিয়ার । টিলা কদম্ ! ঢিলা কদম্ ! [ প্রথম চোপদার ব্যতীত সকলের প্রস্থান। (অনাথকুমারের প্রবেশ।) অনাথ। এইত সেই রাস্তা ! এইত সেই বাড়ীর ফটক ! এই বাড়ীতেই আমি এসেছিলুম! মা আমার আঁচলে আংটী বেঁধে দিয়েছেন। আমি সে আংটী খুলিনি। ঠিক এনেছি। যাই এইবার সেই যিনি আমাকে অনেক ভিক্ষে দিয়েছেন—তার হাতে এই আংটীটী দিয়ে আসি। ১ম-চো। এই, তােম্ কোন্ হ্যায় ? অনাথ। আমি এই বাড়ীতে যাব ! আমায় চিন্তে পাছনা দরওয়ান ? আমি সেই গান গেয়েছিলাম। আমি আবার এইখানে গান গাইতে এসেছি। ১ম-চো। হাঁ হাঁ, আভি পছন লিয়া! তােকো—কুমার বাহাদুর, আউর উষামায়ী-বড়া পশন কর্তা হ্যায়! চলাে—লেড়কে চলল। হাম তুমকো অরকা রাস্তা বাতায় দেগা-চলাে ! অনাথ। চলল, আমি ভাবছিলুম যে-কেমন করে কোন রাস্তা দিয়ে ভেতরে যাব ? ১ম-চো। কুছ, ডর নেই! চলল ! তােম্ হামরা সাথ চলল ! তােকো রাজকুমার—আউর রাজকুমারী—বড়া পশন কর্তা হ্যায়! তােম্ হামরা সাথ আও! হাম তুমকো রাস্তা বাতায় দেগা ! [ উভয়ের প্রস্থান। ।

চতুর্থ দৃশ্য
রাজঅন্তঃপুরস্থ সুসজ্জিত কক্ষ।
( অজিতকুমার, মায়াময়ী ও নির্মলা আসীন।
নির্মলা। এ বড় আশ্চৰ্য্য কথা ! অমন আংটীটা অমনি হারিয়ে গেল
বল্লেই গেল ?
অজিত। নির্মলা, এ সংসারে কিছুই আশ্চৰ্য্য নয় ! হারাবার সময় হলে,
এ সংসারে—কেউ কখন কাউকে—ধরে রাখতে পারে না।
তুমি ঐ সামান্য আংটীর কথা কি বলছ ? মানুষই যখন মানুষের
সানে থেকেও হারিয়ে যায় তখন একটা আংটী হারিয়ে যাবে,
এ কি আর বেশী কথা! (রাণীর প্রতি ) রাণি দেখ ! আংটীর
জন্য নির্মলার একবার চিন্তা দেখ ।
মায়া। মহারাজ, আপনি কি জানেন না ? নিৰ্ম্মল যে আমাদের
আপনার চেয়েও—আপনার ‘ভাবে । তাই আমাদের আংটীর
জন্য ওর এত চিন্তা ।
অজিত। কিন্তু আমাদের চেয়েও যে, ওর আর একজন পরম আত্মীয়
আছে,তাকি ও জানে না ? আমাদের এ ক্ষণিক সম্বন্ধে,
এতদুর আত্মহারা হওয়া কর্তব্য নয়। এক একবার ভাবতে হয়
যে, আমরা কেউ চিরদিনের জন্য এ সংসারে আগমন করিনি।
আমাদের যথার্থ আপনার লােক একজন আছেন। তাঁর কাছে
আমাদের সকলকেই একদিন যেতে হবে।
নিৰ্মলা। ক্ষমা করুন প্রভু, ক্ষমা করুন। আমার এখন অত তত্ত্বজ্ঞানের

ধৰ্ম্মপথ। [ ২য় অঙ্ক ; প্রয়ােজন হয়নি। তা যদি হত, তাহলে এই রাজবাড়ী ছেড়ে এতক্ষণ সেই ভটুচাজ্জিদের টোলে গিয়ে বসে থাকতুম ! আর দেখুন মশাই! সকল কথাতেই আপনি যদি কেবল ঐ তত্ত্ব- জ্ঞানের কথা বলেন, তাহলে ত দেখছি—আপনার সঙ্গে—আর আমাদের কথা কওয়াই হয় না । অজিত। নির্মলা! তত্ত্বজ্ঞানের কথা ছাড়া আর এ সংসারে সার কথা কি আছে বল দেখি? তত্ত্বজ্ঞানহীন বলেই এ সংসারে আমাদের এত দুঃখ ! নিৰ্মলা। না সখি, আমি পারব না ! আমার সাধ্য নাই যে, আমি মহারাজের ঐ সকল কথার জবাব দি! বাবা! রাজারাজড়ারা কখন যে কি মেজাজে থাকেন, তা বােঝে কার সাধ্য ? অজিত। কেন নিৰ্ম্মলে! তুমি কি এতদিনেও আমাকে বুঝতে পারলে না? নিৰ্মলা। আজ্ঞে ! আগে মনে করতুম বুঝেছি! কিন্তু এখন দেখছি। কিছুই বুঝিনি! আপনি যে কখন কি ভাবে থাকেন, তা বােঝে কার সাধ্যি ? কখন প্রেমিক! কখন ধাৰ্ম্মিক! কখন রসিক। কখন নৈতিক! কখন ভৌতিক! কখনও চিক্ চিক্ ! আবার কখন কখন ফি ফিক্‌ হাসিটুকুও আছে! এ সব ভাব বােঝবার সাধ্য কি—এই ছােটখাট অবলা সরলা-মেয়েমানুষের আছে মহারাজ ? অজিত। নিৰ্মলা—তুমি যে আপনার মনে কি কতকগুলাে বলে গেলে, তাত আমি কিছুই বুঝতে পারলুম না ! এ সব কথার অর্থ কি ? নিৰ্মলা। তা, আপনার কথা যখন আমি বুঝতে পারিনি—তখন আপনিই বা আমার কথা বুঝতে পারবেন কেন? অভিধান আনুন! টীকাকারকে ডাকুন! তবে আমার কথার মীমাংসা করুতে !

৪র্থ দৃশ্য।] ধৰ্ম্মপথ । ৫৩ পারবেন। আমিও যে বড় বড় তত্ত্বকথা জানিনা—তা মনে করবেন না মহারাজ ! তবে কইনা—কেবল মনের দুঃখে ! অজিত। তােমার আবার মনের দুঃখ কিসের? তুমি হলে বাকৃবিদ্যা বিশারিণী ! হেমাঙ্গ-হৃদি-মােহিনী! জন-মন-ততষিনী। রস- রঙ্গিণী ! সুভাষিণী ! সুহাসিনী ! কল-কণ্ঠ-নিনাদিনী ! তােমার আবার দুঃখ ? এ কথা আমি বিশ্বাস করি নি নিৰ্মলা। আবাঁচলুম্ ! এতক্ষণে ধড়ে প্রাণ এলাে! নিরাশ প্রাণে আশার সঞ্চার হ’ল ! এখন তবু বুঝলুম যে, আমার সখীর গেরুয়া পরবার বিলম্ব আছে! ভয় নেই—সখি ভয় নেই ! তুমি যতটা ভেবেছিলে, ততটা এখনও হয় নি ! মহারাজের উদ্বেলিত প্রণয়সিন্ধু—এখন দেখছি—ফলগু নদীর মত অন্তঃশীলে হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপরে কেবল—কতকগুলাে তত্ত্বকথারূপ বালি ঢাকা পড়েছে। মহারাজের ঐ গুরুগম্ভীর-নীরস বদনে আবার যখন রসের কথা বেরিয়েছে, তখন আর উনি যাবেন কোথায়! তুমি কেন বৃথা হা হুতাশ করছ সখি! তুমি নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রা যাও! আমি বলছি—তুমি দেখে নিও! যে, মহারাজ আবার—তােমার প্রেমে হাবুডুবু খাবেন নিৰ্মলা- গীত। ওগাে, আবার শ্যাম কদমতলায় বাঁকা হয়ে দাড়াবে। আবার, বামে হেলে, রাধা বলে, তেমনি বাঁশী বাজাবে। প্রাণ উদাসী, মােহন বাঁশী, বাজবে রাধা বলে । আবার হরি রাধার নামে, ভাসবে নয়ন জলে । প্রেম সাগরে—উঠবে তুফান ! বইবে উজান ।

৫৪
ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক ;
আবার—আকুল হবে শ্যামের প্রাণ--
আবার—রাধার প্রেমে বাঁধা হরি, আপনা হারাবে।
আবার—জয় রাধে রাধে বলে, কঁদিয়ে লুটাবে ।
“দেহি পদ পল্লব” বলি—কঁদিয়ে লুটাবে ।
“আবার, যুগল রূপের” প্রেম তরঙ্গে-
ধরা ভেসে যাবে ।
অজিত। নির্মলে! ধন্যা তুমি! ধন্য তােমার সঙ্গীত মহিমা ! তােমার
প্রাণস্পর্শী
সুমধুর
সুরলহরীতে হৃদয় পরিতৃপ্ত হয় ! এমন
সুমধুর সঙ্গীত--তুমি কেমন করে শিক্ষা করূলে ?
নিৰ্মলা। (রাণীকে দেখাইয়া) এই—প্রেমময়ীর—প্রেমের দায়ে পড়ে,
আমায় যে—সবই শিখে রাখতে হয় মহারাজ!
মায়া। পােড়ারমুখীর—কথায় কথায় গান—আর রঙ্গরস ! জ্বালাতন
করেছে আরকি।
অজিত। রাণি । অমন কথা বল না । নিৰ্মলা আর হেমাঙ্গ না থাকলে,
আমাদের এ জীবনে কোন সুখই থাকত না। এই স্বার্থ-তাড়িত
কুটীল সংসারে, এমন সদানন্দময়—সরলমূৰ্ত্তি, আর আছে কিনা
জানি না। আমার বােধ হয়—হেমাঙ্গ আর নির্মলা, শাপভ্রষ্ট
হয়ে, আমাদের জন্যই যেন এ সংসারে এসে জন্মগ্রহণ করেছে।
কপটতা নেই। হিংসা নেই । পরশ্রীকাতরতা নেই। সদাই
সদানন্দ ভাব!. সৰ্ব্বদাই পরােপকারের জন্য কৃতসঙ্কল্প ! বহু
সৌভাগ্যের ফলে, আমরা এমন প্রিয় সঙ্গ লাভ করেছি।
নিৰ্মলা। ক্ষমা করুন মহারাজ! ক্ষমা করুন। আর অত প্রশংসাবাক্যে
প্রয়ােজন নাই! আপনি আমার—সখীর সঙ্গে নির্জনে দুটো

৪র্থ দৃশ্য। ধর্মপথ। মনের কথা কইবেন, সেই কথা বল্লেই ত—সব চুকে যায় ! আমি তা হলে, আপনিই এখান থেকে চলে যাই। অজিত। নির্মলে! তােমার কাছে আর আমাদের কি গােপনীয় আছে বল ? তােমার সামনে কি আর আমি তােমার সখীর সঙ্গে কথা কইতে পারি না ? নিৰ্মলা। তা, কৈ পারেন দয়াময় । এইত সেই অবধি—ক্রমাগত আমার সঙ্গেই কথা কইছেন! কৈ, আমার সখীর সঙ্গে কোন কথাই কইছেন না ! আপনি দেখছি এইবার একটা কাণ্ড না করে আর ছাড়বেন না । এতদিন পরে শেষ দেখছি আমাকে এই—রাজরাণীর বিষ নয়নে নিপতিত হয়ে, রাজবাড়ী থেকে বিদেয় হতে হবে । অজিত। (সহাস্যে) নির্মলা, তুমি কি উন্মাদের ন্যায় কথা বলছ ? মায়া। তােমার মুখ দগ্ধ হ’ক ! তুমি শীঘ্র যমালয়ে যাও! নিৰ্মলা । তােমার-মুখে ফুলচন্দন পড়ক! সখি—তােমার--মুখে ফুল- চন্দন পড়ুক ! তােমার কথা ভগবান—স্থানে থেকে—কাণে শুনুন ! আমি যেন সত্য সত্যই, তােমাদের এই সুখের বাসর সাজান দেখে, যমালয়ে একটু এগিয়ে যেতে পারি! সখি! এমন ভাগ্য কি আমার হবে ? তােমার কথা কি সত্য হবে ? অজিত। নির্মলা, তুমি যমালয়ে এগিয়ে গেলে, তােমার সখী কি আর একদিনও--এ পৃথিবীতে থাকতে পারবেন? তুমি কি জাননা যে, তােমার সখী—তােমায় কত ভালবাসেন ? নিৰ্মলা। মহারাজ! আমি এ পৃথিবীর আর কিছু জানি আর নাই জানি। কিন্তু আমি এটা খুব জানি যে, সখী আমায়, তার পবিত্র—প্রাণের—ভালবাসার—অগাধ-সাগরে ডুবিয়ে রেখে

ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক ;
দিয়েছেন। এত ভালবাসা এ জগতে আর কেউ কখন—কারর
সখীর কাছে পেয়েছে কি না—তা আমি জানি না !
নিৰ্মলার
গীত।
আমি জানি আমার মনে মনে, আমায় সখী কত ভালবাসে !
সে যে, আপন সাধে, যত্নে বেঁধে রেখেছে প্রাণ প্রাণের পাশে ॥
আমার হাসি দেখলে সে যে, হেসে গলে যায় !
আমার নয়ন কোণে—দেখলে বারি, কাঁদিয়ে ভাষায় ।
এমন প্রাণ জুড়ান ভালবাসাকে কোথায় পায় ।
আমি ভালবাসার সুধার সাগর, পেয়েছি ধরায় ।
তাই, সেই সােহগে—অনুরাগে-অমি বাঁধা আছি প্রেম কঁাসে ।
নিৰ্মলা। মহারাজ ! আমার জীবনের সকল সাধ এখন পূর্ণ হয়েছে। সেই
জন্যই আমি এখন—আমার এই—লক্ষ্মীনারায়ণের যুগলমূৰ্ত্তি সম্মুখে
রেখে—দেখতে দেখতে এ পৃথিবী থেকে চলে যেতে চাই !
শশঙ্কিত হৃদয়ে আর আমি এক মূহুর্তও এ পৃথিবীতে থাকতে
ইচ্ছা করি না। মানুষ কখন আছে, কখন নেই ! কি জানি মহা-
রাজ! কে—কখন কাকে ফাঁকি দিয়ে—কার মাথায় বজ্রাঘাত
করে—পালিয়ে যাবে। তাই আমার সদাই ভয় হয় ! মহারাজ ।
আমায় আশীৰ্বাদ করুন। আমি যেন আপনাদের সকলকে
বজায় রেখে,এই আনন্দ-কানন—সাজান দেখে--সত্যি সত্যিই--
একটু এগিয়ে যেতে পারি! (সজল নয়নে অবস্থান )
অজিত। রাণি ! দেখ! এইবার কে তত্ত্বজ্ঞানের কথা কইছে—একবার
দেখ ! নিৰ্মলার মুখেরদিকে একবার চেয়ে দেখ ! আ মরি-মরি।

৪র্থ দৃশ্য। ধৰ্ম্মপথ। কি পবিত্র প্রশান্ত ভাবের পুণ্যময় প্রতিভা প্রতিফলিত হয়েছে ! নিৰ্ম্মলহৃদয়া নিৰ্মলার —নিৰ্ম্মলবদন—যেন —–আজ গঙ্গাজল- বিধৌত শ্বেতশতদলের শােভা ধারণ করেছে! রাণি ! ধন্যা যে এমন মহিমাময়ী—সরলা রমণীকে সঙ্গিনীরূপে প্রাপ্ত তুমি ! হয়েছ! নিৰ্মলা। মহারাজ! অবলার প্রগল্‌ভতা মার্জনা করুন! আমি যে কি বলিছি, তা কিছুই জানি না। হেমাঙ্গ। (নেপথ্যে) বলি—হুজুর কি ঘরে আছেন ? অধীন—কি, অভ্যন্তরে—আগমনের জন্য হুকুম প্রাপ্ত হতে পারে ? মায়া। এই যে—হেমাঙ্গ এসেছে ! বেশ হয়েছে। এইবার আমি নিৰ্মলার গুণের কথা—সব বলে দিচ্চি। বড়—তােমার মরবার সাধ হয়েছেনা? আচ্ছা দাঁড়াও! অজিত। আতে—আজ্ঞা হয় মশাই! নিরাপত্তিতে—আতে আজ্ঞা হয়। ( হেমাঙ্গমােহনেরপ্রবেশ।) হেমাঙ্গ। এই যে—বেশ সব বসে, বসে, নিশ্চিন্ত মনে—খােষ গল্প হচ্চে আর এদিকে রাজ্যময়—একেবারে হুলস্থুল পড়ে গেছে! একেই বলে “যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই।” এমন হলে আর লােকে-রাজারাজড়ার কাণ্ড বলবে কেন ? বাঃ বাঃ! চমৎকার ! চমৎকার ! আবার-চমৎকারের উপর আর’ চমৎকার ! যে নিৰ্মলাদেবী—স্বয়ংই এখানে উপস্থিত রয়েছেন। তা নীরবে অবস্থান করছেন কেন? কলকণ্ঠনিনাদে রাজপ্রাসাদ মুখরিত করুন! রাজ-কর্ণে-কৰ্মনাশার—অমৃত- ধারা সিঞ্চন করুন !

ধর্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক ;
?
অজিত। বলি কি! ব্যাপারখানা কি ? অকস্মাৎ একেবারে এত উচ্চ
বক্তৃতার কারণ কি ? এই এতক্ষণ ত আমরা নিৰ্মলার বক্তৃতা
শুনে সব মােহিত হয়েছিলুম! তার উপর আবার তুমি এসে
যােগ দিলে ? তা, ভাল ! ভাল । দুজনে এইবার এক-যােগে
বক্তৃতা কর! আমরা শুনি।
হেমাঙ্গ। ও যােগ-যাগ যা দিতে হয়, সে সব মহারাজ, আপনি দিন।
আমি এখন যে—ব্যবকলনের ধাক্কায় পড়েছি—তার তাল
সামলাতেই বুঝি আমার প্রাণ যায় !
অজিত। কেন ? কি হয়েছে কি ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে না, এমন কিছু হয় নি। তবে এই নিৰ্মলা আজ, আহার
করেছে কি না—তাই একবার আপনার কাছে জান্তে এলুম!
নির্মুলা। আহা! রঙ্গ দেখে আর বাঁচিনি ! অত হেঁয়ালীর দরকার কি ?
কি হয়েছে—সােজা করে বলে ফেল না ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে ! সেটা এতক্ষণ আপনার হুকুম হয়নি বলে, বলতে
পারিনি।
মায়া। হেমাঙ্গ! কি হয়েছে, আমায় বল!
হেমাঙ্গ। মহারাণি ! আপনিও কি আজকাল বধিরতা প্রাপ্ত হয়েছেন?
মায়া। কেন হেমাঙ্গ! এ কথা তুমি আমায় বলছ কেন?
হেমাঙ্গ। কেন বলছি, তা আর এ পাপমুখে কেমন করে ব্যক্ত করব
বলুন ? রাজবাড়ীতে একেবারে হুলস্থুল পড়ে গেছে! আমলা,
অমাত্য, সেপাই-সান্ত্রী, সৈন্য-সামন্ত, সব একেবারে, হৈ, হৈ,
রৈ, রৈ, করছে! চারিদিকে সাজ-সাজ রব পড়ে গেছে। আর
এদিকে মহারাজ কি না, নিশ্চিন্ত মনে--এখানে বসে বসে
নিৰ্মলা দেবীর সঙ্গে থােষ গল্প কছেন !

৪র্থ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ
নিৰ্মলা। হা—খােষগল্প করছেন। তাতে তােমার হয়েছে কি ?
হেমাঙ্গ। না, আমার আবার হবে কি বল ? কৰ্ম্মনাশা রূপিণী তুমি যখন
স্বয়ং স্বশরীরে এখানে বিরাজমানা রয়েছ, তখন আর এখানে
অন্য সংবাদ কে কি রাখবে বল ?
নিৰ্মলা। তুমি যে বাক্-চাতুৰ্য্যে খুব পটু—তা আমি বেশ জানি! তা এখন
বাক্যচ্ছটা পরিত্যাগ করে আসল কথাটা যে কি-না হয় একটু
দয়া করে বলেই ফেলনা ।
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে আপনাকে তাহলে—এখন একটু চুপ করতে আজ্ঞা হয়।
আপনার কাছে আমি—এ সব কথা বলতেই সম্মত নই।
নিৰ্মলা। কেন? বলবে না কেন? বলতেই হবে !
হেমাঙ্গ। কেন ? না বলে কি, আপনি—বল—বল-বলে-গান ধরবেন
নাকি ?
নিৰ্মলা। হা গান ধরব! গান না ধরলে, তুমিত জব্দ হবে না !
হেমাঙ্গ। দোহাই নির্মলে! দোহাই তােমার । আমি তােমার কাছে
করযােড়ে মিনতি করছি! তুমি এ সময়ে—আর কৃপা করে গান
ধরনা!
কি হয়েছে।
শীঘ্র বল ?
নিৰ্ম্মল। বেশ !! তা হলে,
হেমাঙ্গ। কেন বল দেখি? তােমার এত—জোর তলব কেন বল দেখি?
নিৰ্মলা। কেন ? জোর তলব হবেনা কেন? তুমি জান ! আমি
তােমার কে ?
হেমাঙ্গ। তা আর জানিনি! তুমি আমার সাক্ষাৎ স্বর্গরূপিণী । চতুৰ্বর্গ
ফল দায়িনী! দুস্তর ভবার্ণবের–সােণার তরণী ! তুমি আমার
কে—তা আর জানিনি।
নির্মলা। তবে সাবধানে আমার সঙ্গে কথা কইবে

৬০ ধৰ্ম্মপথ। [ ২য় অঙ্ক ; ! কি হল ? (হমাঙ্গ। তা নইলে কি আবার আমায় সেই ভয় দেখাবে নাকি? দোহাই নির্মলে। দোহাই তােমার ! দোহাই মহারাজের ! দোহাই মহারাণীর! নিৰ্মলা দেবী যেন—এখন গান—না ধরে—এই আমার কাতর ও বিনীত প্রার্থনা। অজিত। আচ্ছা হেমাঙ্গ ! তােমরা কি দুজনে একত্র হলেই খালি ঝগড়া করবে ? হেমাঙ্গ। এ ঝগড়া নয় মহারাজ! এ ঝগড়া নয় ! ঐ কৰ্ম্মনাশী নির্মল দেবীর গানকে আমি বড় ভয় করি ! দিন নেই—রাত নেই, সময় নেই—অসময় নেই, যখন-তখন—অমনি গান গাইলেই ওতে যে অনেকের সর্বনাশ হয় ! মাথামুণ্ডু সব যে একেবারে গুলিয়ে যায় । নিৰ্মলা। (সুর সহ) “আমি সাধে কিগাে-শ্যামা নাম এত ভালবাসি হেমাঙ্গ। দোহাই রাণীমার ! দোহাই মহারাজের! তবে আর আমি এখানে থাকব না ! আমি তবে চলুম! ও বাবা! কি সৰ্ব্বনাশ! বলতে না বলতে যে—একেবারে তান ধরে ফেলেছে ! (কর্ণে হস্ত প্রদান ) এমন ডাকা বুকে মেয়ে মানুষও ত কখন দেখিনি। স্বামী বলে কি একটু সমিহ পৰ্য্যন্ত করা নেই! মহারাজ! ঐ দেখুন ! ঐ দেখুন ! ঐ আবার ঠোট ফোলচ্চে ! ঐ আবার বুঝি তান ধরে! তবে আমি চড়ুম! (প্রস্থানােত ) অজিত। যাবে কোথায়? এইখানে দাড়াও ! নিৰ্মলা যখন প্রথম পদটী গেয়েছে, তখন দ্বিতীয় পদটী পূরণ করে দিক। হেমাঙ্গ। ক্ষমা করুন মহারাজ! ক্ষমা করুন! নিৰ্মলা যদি আবার দ্বিতীয় পদটী পূরণ করে—তা হলে আমায় চতুষ্পদ হয়ে এখান থকে উেদ্ধশ্বাসে পলায়ন করতে হবে। ! ।

৪র্থ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
নিৰ্মলা। তা বেশ! তা হলে আমি না হয় তােমার কথাই শুলুম !
তােমাকে না হয়,—চতুষ্পদ করূতে বিরত হ’লুম! তুমি
তা হলে আমার কথা শােন! কি হয়েছে শীঘ্র করে বল ?
হেমাঙ্গ। হে কলকণ্ঠ-নিনাদিনি চারুশীলে ! মুঞ্চময়ি ! তােমার এ
রাজনীতির কথা শ্রবণ কর জন্য—এত আগ্রহান্বিতা হবার
প্রয়ােজন কি ?
নিৰ্মলা। হে আৰ্য্যপুত্র! গুণধাম ! দাসীর প্রতি আপনিই বা এত বাম
হচ্চেন কেন? আমার যে আপনার ওপর মােল আনা অধিকার
আছে, তা কি আপনি বিস্মৃত হয়েছেন ?
হেমাঙ্গ। হে আপদ উদ্ধারকারিণি ! সৰ্ব্ববি-বিনাশিনি! ক্ষণকালের
জন্য—আপনি তাহলে একটু প্রসন্না হউন ! মহারাজকে দুটো
আবশ্যকীয়-কথা বলবার অবসর প্রদান করুন !
অজিত। হেমাঙ্গ, ও সব বাজে তর্ক এখন ছাড়! কি হয়েছে সত্য
করে বল ?
হেমাঙ্গ। বা! বা! চমৎকার! অতি চমৎকার ! এ যে সেই “সাতকাণ্ড
রামায়ণ—আর সীতে কার পিতে” সেই গােছ হল দেখছি।
অজিত। হেমাঙ্গ! রহস্য রাখ, কি হয়েছে শী বল ?
হেমাঙ্গ। তা বটেই ত ! আমার কথা আপনার ভাল লাগবে কেন?
আমিত—আর নির্মলা দেবী নই ! তা যা হক প্রভু! এ
অধীনকে নাহয় অতটা বঞ্চনা নাই করলেন,আমিত আপনার
দাসানুদাস-অনুরক্ত—ভক্ত বইত নয় ।
অজিত। আচ্ছা হেমাঙ্গ! তােমরা কি দুজনেই সমান! কখন কি আসল
কথাটা সােজা করে—সহজে বলতে জান না ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে ! তা জানব কেমন করে হুজুর ! এই অষ্টাবক্র, মুনির

ধৰ্ম্মপথ।
( ২য় অঙ্ক
সঙ্গগুণে—আমরাও যেতেড়ে বেঁকে-নববক্র হয়ে গিয়েছি
প্রভু !
অজিত। আচ্ছা বেশ! তাহলে এখন আর তােমায় কোন কথাই বলতে
হবে না! তুমি এইখানে
হেমাঙ্গ। উপবেশন করহ ! আজ্ঞে হুজুর—এইত আপনার হুকুম ? কিন্তু
এখন আর তার উপায় নেই। উপস্থিত কার্যের একটা নিষ্পত্তি
হলে, আমিত এখন আর কিছুতেই—নিশ্চিন্ত হয়ে
উপবেশন করতে পাচ্চিনি।
মায়া। কেন হেমাঙ্গ! কেন তুমি এত উতলা হয়েছ ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে—মা জননী । আমি আমাদের এই বিরূপক্ষের ব্যাপার
দেখে, একেবারে অবাক হয়ে গেছি। অমন মহামূল্যবান্
পৈত্রিক সম্পত্তিটা হারিয়ে গেল! তা একবার একটু ভ্রুক্ষেপ
পৰ্যন্ত নেই। আশ্চৰ্য্য বটে। আর এদিকে, রাজ্যময় একটা
হুলস্থুল পড়ে গেছে! আহার নিদ্রাত্যাগ করে—হাজার হাজার
লােক সব—সেই আংটী অনুসন্ধানের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছে।
আর আমাদের প্রভু এখানে কিনা, নিশ্চিন্ত মনে বসে, ঐ
নিৰ্মলাদেবীর—সঙ্গে খােষগল্প করছেন!
অজিত। ওঃ তাই বল! সেই আংটীর কথা বলছ ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে ! হাঁ হুজুর ! এই রকম অনুমান হয় ।
অজিত। তা-তার জন্য কি আর করতে হবে ? একটা জিনিষ ছিল,
হারিয়ে গেল । তা—তার জন্য আর এত কাণ্ড কেন ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে ! আপনি ত তার জন্য কিছুই করবেন না! তা জানি।
কিন্তু আপনার—পােষ পুত্তররা তা শুনবে কেন? তারা যে
• সব—সেপাই-সান্ত্রি-তােজদান-বন্দুক নিয়ে, সেই আংটীরূপ

৪র্থ দৃশ্য।
ধৰ্ম্মপথ ।
সীতার উদ্ধারের জন্য সাগর লঙ্ঘনের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাড়িয়ে
আছেন! এখন কেবল আপনার হুকুমের যা অপেক্ষা--
অজিত। এ সামান্য বিষয়ের জন্য এত গােলমালের প্রয়ােজন কি ?
হেমাঙ্গ। আপনি হলেন রাজা ! আপনার পক্ষে অতি গুরুতর বিষয়ও
সামান্য বলে ধারণা হতে পারে। কিন্তু যারা আপনার
রাজ সরকারের অন্নভক্ষণ করে পরিপুষ্ট হয়েছেন, তাঁরা ত
আর কেউ “লবণ শূকর হতে পারেন না! রাজ সরকারের
বিশুদ্ধ লবণ যে—এখন তাদের গা ফুটে বেরিয়ে পড়েছে। তারা
এখন সব প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বলছেন যে, হয় সেই আংটীর উদ্ধার
করবেন, নচেৎ “জয় রাম”—বলে জীবন বিসর্জন দেবেন ।
অজিত। হেমাঙ্গ, কি উন্মাদের মতন প্রলাপ বক্ছ ? যাও সকলকে
নিরস্ত হতে বলগে !
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে, সে এখন আর হবার উপায় নেই দয়াময় । আমার
বােধ হয়—ও “বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনীও” এখন কেউ দিতে
পারবে না। আংটীর অনুসন্ধান না করে তারা কিছুতেই
ক্ষান্ত হবেন না ! রাজমন্ত্রী, সহরকোতয়াল, অমাত্যপারিষদবর্গ
সব একেবারে আংটীর শােকে অধীর হয়ে পড়েছেন। এখন
মহারাজ-এর একটা বিহিত না করলে, আমার বােধ হয়,
তারা কেউ আর জীবন ধারণ করতেই সক্ষম হবেন না !
অজিত। এমন উন্মাদ যদি আর কোথাও দেখে থাকি। আমার আংটী
আমার হস্তচ্যুত হয়ে হারিয়ে গেছে, তার জন্য আমার
বিনানুমতিতে-এত আন্দোলনের প্রয়ােজন কি ?
হেমাঙ্গ। তা বলে কি হয় হুজুর! তবে আর রাজসরকার বলেছে কেন ?
মশা মারতে—যদি কামানেরই না প্রনােজন কে—তবে আর

७४
ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক ;
লােকে—রাজারাজড়ার কাণ্ড বলবে কেন ? তা সে যা হােক,
এখন আপনার “হুকুমনামার জন্য সকলে উগ্রীব হয়ে অপেক্ষা
কছেন ! আপনি এখন একটা “হুকুম নামা” প্রদান করে—
রাজকর্মচারীদের কর্তব্যকৰ্ম্ম প্রতিপালনের জন্য উৎসাহ প্রদানে
আপনার—রাজধৰ্ম্ম প্রতিপালন করুন।
অজিত। রাজকর্মচারীদের কর্তব্যকৰ্ম্ম যে কি, তা আমি জানি। আর
রাজধৰ্ম্ম প্রতিপালনের জন্য যা কিছু করা প্রয়ােজন, তা আমি
স্বয়ং করব। সে জন্য তােমাদের এত চিন্তা কতে হবে না !
হেমাঙ্গ। চিন্তা না করূলে চলবে কেন মহারাজ! রাজবাড়ীর সকলেই
যখন আংটীর জন্য চিন্তিত হয়েছেন, তখন আমিই বা কেমন করে
নিশ্চিন্ত থাকি বলুন?
তা সে যা হ—এখন আংটীটার
অনুসন্ধান করবার জন্য, একখানি “হুকুম নামা” প্রদান করে
আমাকে নিশ্চিন্ত করুন !
অজিত।
এর জন্য আবার “হুকুমনামা” কি দোব? তুমি কি—উন্মাদের
মত কথা বলছ ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে ! অধিক কিছু আপনাকে এখন আর লিখে দিতে হবে
! হুকুমনামার মুসােবিদে একরকম প্রায় নিষ্পত্তই হয়ে গেছে।
এখন কেবল মহারাজের অনুমােদনের জন্যই যা অপেক্ষা করা
হচ্চে।
অজিত। কিরূপ হুকুমনামার প্রয়ােজন? অভিপ্রায়টা তাহলে একবার
ব্যক্ত করেই বলুন! আমি শ্রবণ করি ।
হেমাঙ্গ। হুকুমনামার—অভিপ্রায় বিশেষ কিছু এমন গুরুতর নয়। তবে
মহারাজের নামাঙ্কিত “ক্ষমতাপত্র প্রাপ্ত না হলে, লােকে কি
প্রকারে—আপনার আংটীর অনুসন্ধান করবেন বলুন?

৪র্থ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
অজিত। আজ্ঞে । সেত সবই হৃদয়ঙ্গম করলুম ! কিন্তু তাহলে এক্ষণে
কিরূপ ক্ষমতাপত্রে আমায় স্বাক্ষর করতে হবে, সেই বিষয়টা
আপনি একটু প্রকাশ করেই বলে ফেলুন, যথেষ্ট পরিমাণে ত
ভূমিকা বর্ণনা করা হয়েছে ! আর কেন? এখন আসল কথাটা
কি—বলেই ফেলুন না !
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে—হুজুর আজ প্রাতঃ সমীরণ সেবনের জন্য—যে সকল পথ
দিয়া গমনাগমন করেছেন, সেই সকল পথের উভয় পার্শ্বে
যে সকল সজীব জীবের বাসস্থান আছে, তাহার অভ্যন্তরে
প্রবেশপূৰ্ব্বক—তন্ন তন্ন করিয়া রাজসরকারের হারাণ আংটীর
অনুসন্ধান করিবা। এবং যে কোন উপায়ে হউক, উক্ত
আংটীর উদ্ধার সাধন করিয়া, রাজভাণ্ডারকে পুনরায় ঐ মহা-
মূল্য রত্নের দ্বারা সুশােভিত করিবে। আমি নিজ রাজশক্তি
বলে—স্বইচ্ছায়—সুস্থ শরীরে—এই ক্ষমতাপত্রে স্বাক্ষর করিয়া
দিলাম। ইতি-
অজিত। বাঃ-অতি চমৎকার ব্যবস্থা! কিন্তু এরূপ ব্যবস্থার অনুমােদন
করা—আমার সাধ্যাতীত। অতএব আপনি এখন নিরস্ত
হেমাঙ্গ। কেন মহারাজ! এতে আর আমাকে নিরস্ত হতে বলছেন
কেন? এত আপনার—হারাণ আংটী-পুনঃ প্রাপ্ত হবার অতি
সুবিবেচনার—সুব্যবস্থাই করা হয়েছে। আপনার ক্ষমতাপত্র
প্রাপ্ত হলেই—দলে, দলে, সব রাজকর্মচারীরা, সেপাই-শাস্ত্রী
নিয়ে, রাজ্য তােলপাড় করে ফেলবে এখন। তারপর গৃহস্থের
গৃহে প্রবেশ করে, তাদের সব উদবাস্তু করে তুলবে এখন।
তারপর-ঘােড়ার ল্যাজে বাধা, বুকে বাশ দিয়ে ডলা, প্রভৃতি
৫

ধর্মপথ।
মােলায়েম রকমের-রকমারি সৎব্যবহার হলেই—একেবারে
গাদাগাদা আংটী চোর সব বেরিয়ে পড়বে এখন। কাছারী
বাড়ীতে একেবারে আংটী চোরের গাদী লেগে যাবে এখন।
মহারাজ ! আপনার ত একটীমাত্র পৈতৃক আংটী হারিয়েছে,
কিন্তু আপনার এই একটী আংটী অনুসন্ধানের ফলে, আমার
বােধ হয়, এ রাজ্যে আর কারুর ঘরে—তাদের পৈতৃক কুটো
গাছটী পৰ্যন্ত থাকবে না! সব ঐ আপনার পুষিপুতুরদের
ঘরে, অতি অজ্ঞাতসারে প্রবেশ লাভ করবে এখন।
নিৰ্মলা। আ মরি ! মরি ! মহারাজের কাছ থেকে, কি হুকুমই
নিতে এসেছেন! যাও যাও আর তােমাকে আংটী অনু-
সন্ধানের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে না! তুমি খুব বুদ্ধিমান
তা বুঝতে পেরেছি! আংটী খোজবার ছুত করে—যত সব
নির্দোষী লােকের উপর অত্যাচার কাবার মৎলব আর কি ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে—মাপ করতে হয়েছে। আমি আপনাকে প্রেম নীতির
তর্কপঞ্চানন, বা ন্যায়সিদ্ধান্ত বলে সম্মান করূতে পারি।
কিন্তু রাজনীতি সম্বন্ধে আমি আপনার সিদ্ধান্তকে কিছুতেই
সম্মান করতে পারি না। অতএব হে বাকবাদিনি! আপনি
এ ক্ষেত্রে একটু নিরস্ত হউন !
অজিত। দেখ হেমাঙ্গ, নির্মলা যা বলেছে, অতি সত্য কথা। একটা
আংটীর জন্য যে, কতকগুলি নির্দোষী লােক—প্রপীড়িত হবে,
এ আমার একেবারেই ইচ্ছা নয়। একটা, আংটী একজন
লােকেই প্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু সেই অপরাধের জন্য—আমি
কি—আমার সমস্ত নির্দোষী প্রজাকে প্রপীড়িত করবার জন্য
অনুমতি প্রদান করব ? যাও তুমি মন্ত্রীকে গিয়ে বলগে,
!

৪র্থ দৃশ্য।
ধৰ্ম্মপথ।
'৬৭
আমার অংটী অনুসন্ধানের জন্য আপাততঃ কোন প্রকার
উদ্যােগ, আয়োজনের প্রয়ােজন নেই। আমি স্বয়ং গােপনে
এ বিষয়ের ব্যবস্থা করব। আজ থেকে আমার আংটী সম্বন্ধে
কোন কথা—আর যেন কেউ কোন প্রকারে--না আলােচনা
করে।
নির্মলা। (হেমাঙ্গের নিকটে যাইয়া) বলি, রাজনীতি-বিদ্যাবিশারদ
মশাই! এইবার আপনার রাজনীতির বুদ্ধিটা কোথায় রইল ?
কেমন—খুসী হয়েছেন ত? এখন যান--মানে, মানে, এখান
থেকে বিদেয় হন্ ! বিদেয় হয়ে সকলকে—গিয়ে, এই রাজ
আজ্ঞা শুনিয়ে দিগে ! বান্যান্ আর এখানে—হাঁ করে
পঁড়িয়ে থাকতে হবে না! চলে যান ! চলে যা!
হেমাঙ্গ। দেখুন ! মহারাজ দেখুন ! একবার মেয়ে মানুষের—স্পর্ধা
দেখুন! আমায় কি রকম করে—একবার অপমান করছে
দেখুন! আপনি এর বিচার করুন ! তা নইলে কিন্তু ;-
নির্মলা। তা নইলে কিন্তু কি ? কি তুমি করবে কি ? এখন আমি
ভাল কথায় বলছি শীঘ্র এখান থেকে গিয়ে—সকলকে রাজ
আজ্ঞা শুনিয়ে দাওগে। তা নইলে এখনি কিন্তু মজা টের
পাবে।
হেমঙ্গ। ইস! তাইত ! খুব যে তর্জন গর্জন হচ্চে দেখতে পাচ্ছি।
মহারাজের কাছে থেকে, একেবারে যে সেপাই হয়ে
দাড়িয়েছ দেখছি।
নিৰ্মলা। হাঁ! হইছি ! হবনাত কি ? এইবার যদি আমার কথা না
শােন,তা হলে কিন্তু তােমায় আমি সঙ্গীনের খোঁচা-দোব তা
জান ? আমি রাজরাণীর সেপাই মনে থাকে যেন।

ধৰ্ম্মপথ। ২য় অঙ্ক হেমাঙ্গ। মহারাজ—দেখুন! একবার স্থান মহাত্মের-মহিমাটা দেখুন। সাধে কি আর কবি বলেছেন- “জানামি রে সর্প তব প্রভাবং, কণ্ঠস্থিত গর্জসি শঙ্কর। স্থানং প্রধানং ন বলং প্রধানং- স্থানস্থিতে কাপুরুষােহপি সিংহঃ । তা নির্মলে? তােমার যত বাহাদুরী সব—এই মহারাজের সম্মুখেই শােভা পায় ! মহাদেবের কণ্ঠস্থিত, সর্প—যেমন গরুড়কে দেখেতৰ্জন, গর্জন করে, তেমুনি তুমিও আজ— মহারাজের নিকটে থেকে, আমাকেও খুব এক চোট তর্জন, গর্জন করে নিলে ! মহারাজের কাছে যদি বিচার থাকত, তাহলে কি আর তোমার মতন একটা সামান্য স্ত্রীলােক— আমায় অপমান করূতে পাতাে? অজিত। “অপমানং পুরস্কৃত্য মানং কৃত্বাচ পৃষ্ঠকে। স্বকাৰ্য্য মুৰ্দ্ধরেৎ প্রাজ্ঞঃ কাৰ্য্য ধ্বংসে চ মূখ।” একটা মেয়ে মানুষের একটু কোমল অপমান সহ্য করূলে—যদি স্বকাৰ্য্য সাধিত হয়, তা এতে কি আর কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি আপনাকে অপমানিত বিবেচনা করে ? তা করে না। বিশেষতঃ অৰ্ধাঙ্গিনীর—তৰ্জন, গর্জন, এসংসারের সকলকেই একটু আধটু সহ্য করতে হয়। হেমাঙ্গ। জানি ! মহারাজ জানি! আপনি যে—নিৰ্মলার পক্ষ অবলম্বন করে কথা কইবেন, তা আমি বেশ জানি। অজিত। হেমাঙ্গ, আমিও যে তােমায় জানি না—তা মনে করাে না। পাছে কোন নিরপরাধী ব্যক্তি, বিনা কারণে প্রপীড়িত হয়,

৪র্থ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ ।
এই আশঙ্কায় তুমি নানা ছলনায়—আমার মন পরীক্ষা করছ।
কিন্তু হেমাঙ্গ। এতদিনেও কি তুমি তােমার এই বাল্য
সঙ্গীর—অন্তর বুঝতে পারনি ? তা যদি না পেরে থাক ?
তা হলে—এ জগতে আর আমায় কে বুঝতে পারবে বল ?
হেমাঙ্গ। মহারাজ ! সখা ! দয়ার অবতার! নিজগুণে আমার ধৃষ্টতা
মার্জনা করুন! ( করযােড়ে অবস্থান)
অজিত। (হেমাঙ্গের হস্ত ধরিয়া) ছি হেমাঙ্গ! ও কি কথা বলছ ?
তুমি কি জান না যে আমি তােমাকে কত আপনার বলে
জানি ?
হেমাঙ্গ। না মহারাজ ! তবে আমারি হার! আমারি হার ! নিৰ্মলার
জিত! নিৰ্মলার জিত ! কেমন নির্মলে! এইবার ত খুনী
হয়েছ ? আমি তবে যাই ! রাজআজ্ঞা প্রচার করে—তােমার
হুকুম তামিল করিগে! তুমি এটা ঠিক জেন যে, আমি তােমার
নিতান্ত অবাধ্য স্বামী নই। মহারাজ অজিতকুমার—মহারাণী
মায়াময়ীর-দোহাই দিয়ে আমি তাহলে—একবার জোর
গলায় তবে—রাজ আজ্ঞা প্রচার করিগে !
মায়া। হেমাঙ্গ, এ ধৰ্ম্মের রাজ্যে যেন-বিন্দুমাত্র অধৰ্ম্ম না হয় !
অমন শত শত হীরকারীর জন্যও যেন—অামার একটী
নির্দোষী প্রজাও প্রপীড়িত না হয় ! আমিও তােমায় এই
হুকুম দিচ্চি—তুমি নির্ভয়ে গিয়ে এই আজ্ঞা প্রচার করগে !
হেমাঙ্গ। (রাণীর প্রতি ) রাজরাজেশ্বরি! রাজকুললক্ষ্মি ! মা! এইবার
বুঝলুম যে, তুমি শুধু আমার মা নও! তুমি এই জগতের
মা । আমি তবে চলুম ! নির্মলে অধীনকে স্মরণ রেখাে।
}

৭.০ ধৰ্ম্মপথ। [ ২য় অঙ্ক : অজিত। রাণি ! এমন অদ্ভুত চরিত্রের লোেক কি, তুমি আর কখন দেখেছ? মায়া। দেখব না কেন? এই যে, আর একটী সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অজিত। তা ঠিক বলেছ। নিৰ্মলা যেমন আমার নির্মল গঙ্গাজল ! হেমাঙ্গও—তেমনি আমার হেমের পর্বত ! আমাদের ধন্য ভাগ্য যে, এই স্বার্থময় কুটীল সংসারেও এমন স্বর্গের দেব- দেবীকে—সুহৃৎভাবে—প্রাপ্ত হয়েছি। নিৰ্মলা। ( করযােড়ে) ও কি কথা মহারাজ! আমরা আপনার আশ্রিত। ও অনুগত। আমাদের প্রতি এরূপ বাক্য প্রয়ােগ করবেন না ! অজিত। নির্মলা! আমার আংটীর জন্য তুমি বিন্দুমাত্র চিন্তা করােনা। আমি তােমায় নিশ্চয় বলছি, যদি সেই আংটী—আমার সত্য হয়-হলে—আমি নিশ্চই সে আংটী পুনঃ প্রাপ্ত হব । । (নেপথ্যে ) অনাথকুমারের গীত। বড় ক্লান্ত হয়েছি আমি, এই সংসারে এসে। কেন—হা হা করি! কেন ঘুরে মরি। বুঝিতে না পারি । কি সুখ আশে । অজিত। আহা ! একি—মধুর গান! এ-গান এখানে কে গাইছে ? এ যে, সংসার বদ্ধ জীবের-মুক্তি-মার্গের—অনুতাপভরা- কাতর ক্রন্দন ! এ যে, “পঞ্চভূতাবদ্ধ আত্মার আত্মজ্ঞানের দেবগাথা! এ গান এখানে কে গায় ?

ধৰ্ম্মপথ
৭১
মায়া। নির্মলে! আবার সেই বালক এসেছে ! ওকে তুমি এইখানে
[ নির্মলার গমন।
নিয়ে এস !
(নিলৰ্মার সহিত অনাধকুমারের গীত গাহিতে গাহিতে প্রবেশ )
হাসিলেই যদি—কাঁদিবারে হয় ।
মিলনেতে—সদা বিচ্ছেদের ভয় !
সদাই শঙ্কিত—কি হয় ! কি হয় !
জীবনে--অথবা মরণের শেষে !
কেহ নাহি জানে। কিবা প্রয়ােজনে ।
আসে জীব—এই মরণের দেশে।
অজিত। আহা! কি সুন্দর গান ! বালক! এ গান তােমায় কে
শিখিয়েছেন ?
অনাথ। ভিখারী ঠাকুর আমায় এ গান শিখিয়েছেন। আমি এই
রকম গান গেয়ে গেয়ে ভিক্ষা করি। কিন্তু এবার আমি
ভিক্ষা করতে আসিনি। আমার বড় দরকার আছে—তাই
আবার এসেছি।
মায়া। বাবা! তােমার কি দরকার বল ?
অনাথ। কি দরকার বলববা! এই—আমরা—একটা অংটা—কুড়িয়ে
পেয়েছি। আমার মা সেই অংটাটী—আপনার হাতে আমায়
দিতে বলেছেন।
মায়া। আংটী কুড়িয়ে পেয়েছ ? কৈ দেখি কি আংটী
অনাথ । এই যে, মা আমার কাপড়ের খুঁটে বেঁধে দিয়েছেন! ( কাপড়
হইতে আংটী খুলিয়া) এই নি! (আংটা প্রদান )।
৯.

१२ ধৰ্ম্মপথ । [ ২৪ অঙ্ক ; মায়া। আঁ! একি! এযে, মহারাজেরই আংটী ! এ আংটী এ বালক কোথায় পেলে ? নির্মলা। আঁ! বলকি সখি ! দেখি ! দেখি ! ওমা—সত্যিইত ! এযে— মহারাজেরই সেই—আংটী দেখতে পাচ্চি ! কি আশ্চর্য ! অজিত। নির্মলে! আমি তােমায় বলেছিলুম্ যে, এ সংসারে কিছুই আশ্চৰ্য নেই। এই দেখ, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ! একবার ভাল করে, ভেবে দেখ দেখি ! এ সংসারে কার কাৰ্য কে করে । যার কাৰ্য তিনিই এ সংসারের সমস্তই নিৰ্বাহ করেন। মানুষ কেবল উপলক্ষ মাত্র ! মানুষ অহঙ্কারে আত্মহারা হয়ে মনে করে যে, মানুষই এ সংসারের কর্তা। কিন্তু মানুষের সেটা সম্পূর্ণ ভ্রম কল্পনা মাত্র। এক মুহূর্ত আগে আমি যা বলেছি, অন্তর্যামী ভগবান—আমার সেই অন্তরের কথা প্রত্যক্ষ প্রমাণ করবার জন্য—যেন—এই বালক বেশে এসে আমায় দেখা দিলেন ! লীলাময় ! ধন্য তােমার লীলা নিৰ্মলা। মহারাজ! আমি জ্ঞান বুদ্ধিহীনা—সামান্যা রমণী ! আমায় আপনি নিজগুণে মার্জনা করুন। অজিত। রাণি ! ধৰ্ম্মের পবিত্র প্রভাব একবার নিরীক্ষণ কর! অবি- চলিতভাবে ধর্মের প্রতি লক্ষ্য রাখলে—এ সংসারে মানবের আর কোন দুঃখই থাকেনা! (আংটী দেখাইয়া) আমার পিতৃ-প্রদত্ত মহামূল্যবান এই স্মৃতিচিহ্ন, যখন আমার অজ্ঞাত- সারে হস্তচ্যুত হয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিল, তখন ক্ষণিকের জন্য আমার হৃদয়ে একটু চিন্তার ছায়া নিপতিত হয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই ধৰ্ম্মের নির্মুলজ্যোতিঃ--আমার হৃদয়ে বিকশিত হয়ে, আমাকে জানালােক প্রদান করেছিল। আমি তখন -

৪র্থ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ ।
৭৩
!
স্থিরবুদ্ধি দ্বারা বিবেচনা করলুম যে—এ সংসারের কোন দ্রব্যের
উপরই—মানুষের কোন অধিকার নাই! পৃথিবীর সমস্ত দ্রব্যই
এই
পৃথিবীর বক্ষে—আবহমানকাল—সমভাবে—বর্তমান
আছে ! কেবল—মানুষই এ সংসারে চিরস্থায়ী নয় ! আজ যে
আছে, কাল সে নেই ! আজ এই যে মুক্তামালা আমার কণ্ঠ
সুশােভিত করে রেখেছে! কাল হয়ত এই মুক্তামালাই মেদিনী
বক্ষে—ধুলি-বিলুষ্ঠিত হয়ে নিপতিত থাকবে ! কোন দ্রব্যের
জন্যেই কোন মানবের আত্মহারা হওয়া কর্তব্য নয় ! ধর্মের
প্রভাব মানব হৃদয়কে কত উচ্চস্থান প্রদানে সক্ষমতার
প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই ভিখারী সন্তান! এই বালকের পিতা-
মাতা ভিক্ষাজীবী হলেও—কিন্তু কি উন্নত হৃদয়! কি
সত্যনিষ্ঠাপূর্ণ প্রত্যাহার ! এই মহামূল্যবান অঙ্গুরীয় অনা-
য়াসালব্ধ জেনেও-নগন্য দ্রব্যের ন্যায়—পরিত্যাগ করেছেন।
এখন পর্যন্ত এমন মহাত্মার পদরজ যে ভূমি বক্ষে ধারণ
করে আছে, সে ভূমিকে আমি স্বর্গাদপিগরিয়সী বিবেচনা
করি ! এমন পবিত্র-পদ-স্পর্শিত জন্মভূমির গরীমায়, আমিও
গৌরবান্বিত। রাণি ! এখন এই ব্রাহ্মণ বালকের উপযুক্ত
পুরস্কার কি ?
অনাথ। (রাজার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে অবলােকন)
মায়া।
মহারাজ! আমি চিরদিনই আপনার অজ্ঞানুবর্তিনী! আপনি
যা মনস্থ করবেন, তারউপর দ্বিরুক্তি কবুবার অধিকার আমার
নাই! দেখুন মহারাজ! দেখুন ! বালক—কিরূপ সরল নয়নে
আমাদের দিকে চেয়ে আছে দেখুন!
নির্মলা। (অনাথের প্রতি) তােমার কোন চিন্তা নাই বাবা! ইনি

৭৪
ধৰ্ম্মপথ
[ ২য় অঙ্ক ;
এই দেশের রাজা। ইনি আজ তােমাকে--স্বয়ং ভিক্ষা প্রদান
করবেন।
অনাথ। ইনি রাজা? (করযােড়ে নতজানু হইয়া) আমি ত জানিনা।
আমাকে ক্ষমা করুন! ( নমস্কার করন)
অজিত। (হস্তধারণ) বালক! তােমার কোন চিন্তা নাই! তুমি
নির্ভয়ে অবস্থান কর! আমি তােমাকে যে এখন কি পুরস্কার
প্রদান করব, তাই চিন্তা করছি।
অনাথ। আমি আর এখন কিছুই চাইনা! আমার রাণীমা আমায়
অনেক ভিক্ষা দিয়েছেন। আমার মা বলেছেন, তাতে এখন
আমাদের অনেকদিন চলবে! আমি এখন কেবল এই
আংটীটী—রাণীমাকে দিতে এসেছি। মা বলে দিয়েছেন,
যার-আংটী—আপনারা তাকে এই আংটীটী ফিরিয়ে দেবেন।
অজিত। তুমি তােমার মাকে গিয়ে বােলাে«যে, যার আংটী, তিনি
স্বয়ং সেই আংটী গ্রহণ করেছেন । আরাে বােলাে-আমি
তােমার সেই সত্যধর্মের আদর্শ রূপিণী-জননীকে একবার
দর্শন করবার জন্য তােমাদের গৃহে গমন করব !
অনাথ। আপনি রাজা! আপনি আমাদের বাড়ীতে যাবেন ? সেত
এমন ভাল বাড়ী নয় ! সে-যে আমাদের মাটীর ঘর! খড়ের
চাল! সেখানে গেলে—আমি আপনাকে -বসূতেদেবােকিসে?
নিৰ্মলা। সে জন্য তােমার কোন ভাবনা নেই! ওঁর বসবার স্থান উনি
আপনিই করে নেবেন এখন।
অজিত। রাণি ! এই আংটীর জন্য তুমি এই বালকে—সন্তোষচিত্তে
আপাততঃ কিছু পুরস্কার প্রদান কর! বােধহয় অবগত আছ
যে—এই আংটীর সূর্যের পরিমাণ কত ?

৪র্থ দৃশ্য। ] ধৰ্ম্মপথ। মায়া। নির্মলা, বিজয়কুমারের—শিশুকালের সেই মােহরমালাট। নিয়ে এস। আজ থেকে—বিজয়কুমার -আর এই ব্রাহ্মণ-- কুমার-আমার সমান স্নেহের অধিকারী হবে। ( নির্মলার গমন এবং মােহরের মালা হন্তে করিয়া পুনঃ প্রবেশ) মায়া। (সস্নেহে অনাথের গলায় মােহরের মালা পরাইয়া দিলেন ) অজিত। রাণি ! এই দরিদ্র সন্তানের প্রতি তােমার আন্তরিক মমতা দর্শনে—আমি বড়ই আনন্দলাভ করলুম ! আমি এখন এই বালকের সেই পূণ্যময় পিতামাতাকে একবার দর্শন করতে ইচ্ছা করি ! রাণি ! চলল আমরা সকলে আজ এই ব্রাহ্মণ- বালকের গৃহে—আতিথ্য গ্রহণ করিগে চলল! নিৰ্মলা, তােমাকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হবে! নিৰ্মলা। প্রভু! আপনি দরিদ্রের বন্ধু ! বিপন্নের সহায়! দয়ার অব- তার! সরলতার প্রতিমূর্তি ! আপনার তুলনা এ জগতে, আর কোথাও আছে কি না জানিনা ! আপনার পদধুলি নিপতিত হলে,এই দরিদ্র ব্রাহ্মণের—পর্ণকুটীর যে—স্বর্ণকুটীর হবে—তা আমি জানি ! সেই ইচ্ছাতেই যে, 'আপনার এ আতিথ্য গ্রহণের অভিলাষ—তাও আমি বুঝতে পেরেছি। অজিত। রাণি ! একে ব্রাহ্মণ বাড়ী-তাতে আবার তােমার এই ধর্ম- পুত্রের বাড়ীতে গমন করতে হবে, প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি নিতে যেন বিস্মৃত হয়ােনা! বিজয়কুমার, আর উষারাণীকেও সঙ্গে নাও! ( রাণীর প্রস্থান) নিৰ্মলা, হেমাঙ্গকে সংবাদ দাও, যেন অবিলম্বে আমার এই ব্রাহ্মণগৃহে—গমনের জন্য—উপ আয়ােজন করে ! নিৰ্মলা। আর বলতে হবে কেন মহারাজ! আমি আপনার

ধৰ্ম্মপথ।
[ ২য় অঙ্ক ;
অভিপ্রায় ইঙ্গিত মাত্রেই—সমস্ত বুঝতে পেরেছি। আমি
এখনি সংবাদ প্রেরণ করছি।
[ প্রস্থান।
অজিত। লীলাময়! এ সবই তােমার লীলা! মানুষকে যে তুমি কি
উপাদানে সৃষ্টি করেছ--তা তুমিই জান! মানুষ এ সংসারে
কখন যে কিভাবে—কি কাৰ্য্য করে,তা কেউ বুঝতে পারেনা!
দেখিলে সে মুখ,
যায় দুঃখ,
( চতুর্দিক হইতে গান গাহিতে গাহিতে কল্পনা সঙ্গিনীগণের প্রবেশ।)
এই মানবের মাঝে-সবই দেখা যায় ?
নরকের কথা-স্বরগের গাথা,
যাহা কিছু আছে ধ্যান ধারণায় !
কখন মানব-দেবতার বেশে,
শান্তি সুধা দিতে—পৃথিবীতে আসে ।
দূরে
পৃথিবী তখন সুখে ভেসে যায় ।
কখন মানব-দানবের সাজে,
সৃজিতে নরক--আসে ধরা মাঝে,
মানবের প্রাণ-মানবে ছিড়িয়া,
রুধীর খাইয়া—পিপাসা মিটায় ।
সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ—ত্রিগুণের মায়া,
ত্রিগুণের খেলা, ত্রিগুণের ছায়া !
তমােগুণে নাশ, রজেতে বিকাশ,
সত্ত্ব-গুণে শুদ্ধ “ব্ৰহ্মনাম” গায় !!
[ পটক্ষেপন।]

তৃতীয় অঙ্ক ।
প্রথম দৃশ্য।
ত্রিলােচন ঠাকুরের কুটীর।
(ত্রিলােচন ও সবিতার প্রবেশ।)
ত্রিলাে। সবিতা! তুমি করেছ কি ? এমন সৰ্ব্বনাশ তুমি কেন করলে ?
হাতের লক্ষ্মী তুমি কেন পা দিয়ে বার করে দিলে ? তুমি
কোন সাহসে সেই মহামূল্যবান রত্ন ঐ একটা শিশুর হাতে
প্রদান করলে ? হায়! হায়! কি সর্বনাশই করেছ ! আমার
এত আশা! এত সাধ-সব নির্মূল করে দিলে ? না আমি
এ প্রাণ আর রাখবাে না! আমি আত্মঘাতী হব! আমি
আত্মঘাতী হব! তােমাকে আমি ব্ৰহ্মহত্যা! স্বামীহত্যা
পাপে লিপ্ত করব । ওঃ! কি সর্বনাশ হলাে। মা লক্ষ্মী
স্বেচ্ছায় আমার ঘরে এসেছিলেন,আর তুমি কিনা তাকে জোর
করে আমার ঘর থেকে বিদেয় করে দিলে ? হা ভগবান !
আমার কি হবে। আমি আর কতদিন এ নিদারুণ যন্ত্রণা
সহ্য করব ! আর যে পারিনি! আর যে পারিনি।
সবিতা। কেন এত অধৈৰ্য্য হচ্ছ ? কেন আত্মহারা হয়ে উন্মত্তের ন্যায়
এত অধীরতা প্রকাশ করচ ? তােমার এত চিত্তচাঞ্চল্য কেন
হলাে ? তােমার সেই ধর্মের তেজ! সেই সত্যনিষ্ঠা। সেই
হৃদয়ের বল ! সব কোথায় গেলাে ? এত কষ্টে এতদিন

৮
ধৰ্ম্মপথ।
[ ৩য় অঙ্ক
ধৰ্ম্মাশ্রয়ে থেকে, শেষ কি না তুমি একটা পরদ্রব্যের ললাভে
ধৰ্ম্মত্যাগ করতে বসেছ ?
ত্রিলাে! না না। আমি আর ধর্ম মানি না। আমি আর ধৰ্ম্ম মানি না।
আমার ধর্মের উপর আর কোন আস্থা নেই। আমি আজীবন
ধৰ্ম্মের সেবা করেছি। ধৰ্ম্মরক্ষার জন্য অকাতরে অনেক কষ্ট
সহ্য করেছি। কিন্তু
তবু
আমি দুবেলা দুটি ক্ষুধার অন্ন প্রাপ্ত
হইনি! ধৰ্ম্ম নেই। সবিতা—ধর্ম নেই ! আমি তােমায়
নিশ্চয় বছি ! এ সংসারে ধৰ্ম্ম নেই! ধৰ্ম্ম যদি থাকতাে, তা
হলে তােমার মতন সাধ্বী সতীকে দুটী অন্নের জন্য কখনই
এত কষ্ট পেতে হত না!
পবিতা। কষ্ট! কিসের কষ্ট ? আমার এ সংসারে কিছুই কষ্ট নেই !
তবে সময়ে সময়ে মায়ার তাড়নায়—আমাকে অভিভূত হতে
দেখে, তুমি কি মনে কর যে, আমি বড় কষ্টে আছি ? তুমি
নিশ্চয় জেন, আমার এই সহস্র কষ্টের মধ্যেও আমার যা সুখ
আছে তা বােধ হয় অনেক রাজার ঘরণীরও নেই ! আমার
এই ক্ষুদ্র হৃদয়ে কত শান্তি ! কত সুখ! কত ধৈৰ্য্য! তাকি
তুমি জাননা? আমার চখে জল দেখে কি তুমি মনে কর
যে, আমি তােমার--দুরবস্থার জন্য ক্রন্দন করি ? না প্রভু না!
সেজন্য আমি আমার জীবনে কখন কঁদিনি! আমি কঁদি
কেন তা জান ? যখন আমার একমাত্র সন্তান-ক্ষুধায় কাতর
হয়ে’—আমার মুখের পানে চেয়ে দেখে! তখন আমি কি মনে
করি তা জান ? আমি তখন মনে করি—আমি হয়ত পূর্বজন্মে
কত মহাপাপ করেছি ! এই রকম কত ক্ষুধাতুর দরিদ্র শিশুর
সম্মুখে—হয়ত আমি কেবল—আমার নিজ সন্তানকেই উদরপূর্ণ

১ম দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ ।
৭৯
করে—আহার করতে দিয়েছি ! কখনােকারুর ছেলের মুখের
দিকে—একবার ভুলেও চেয়ে দেখিনি। তাই এ জন্মে আমার
সেই মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে। আমার বাছারও মুখের
দিকে—আজ এ জগতের কেউ একবার ফিরে চেয়ে দেখছেনা।
আমি নিশ্চয় বলছি ! তুমি নিশ্চয় জেনাে! ধৰ্ম্ম নিশ্চয়ই
আছেন ! ধৰ্ম্ম আছেন বলেই—আজ আমরা আমাদের সেই
দারুণ দুষ্কৃতির-হাত থেকে—ধৰ্ম্মের কৃপাতেই—ধীরে ধীরে
উদ্ধারের পথে অগ্রসর হচ্ছি। আমি জানি ! তুমি তােমার
পূর্বজন্মার্জিত কৃতকর্মের ফলে—অনেক কষ্ট পেয়েছ! অনেক
যন্ত্রণা সহ্য করেছ ! কিন্তু তুমি কখনত ধৰ্ম্মত্যাগ করনি! তবে
আজ আবার ঐ সামান্য—তুচ্ছ হীরকারীর লােভে কেন
আত্মহারা হচ্চ ? কেন তোমার সেই—আজন্মঅর্জিত--
মহামূল্য ধৰ্ম্মরত্নকে—ঐ সামান্য ধূলিকণার জন্য—বিসর্জন দিতে
কৃতসঙ্কল্প হয়েছ ? ঐ দেখ ! ঐ তােমার পর্ণকুটীরবাসী ধৰ্ম্ম
আজ-তােমার এই ঘৃণিত কাৰ্য্যদর্শনে—কিরূপ মলিনভাব
ধারণ করেছেন—একবার চেয়ে দেখ !
(কুটীরের দিকে অঙ্গুলী প্রদর্শন )
(সহসা ধৰ্ম্মবালাগণের আবির্ভাৰ)
গীত।
ওগগাবুঝিতে না পেরে, মায়া মােহ ঘােরে,
লােকে মনে করে কিছুই নাই ।
ধৰ্মকৰ্ম্ম যাহা, কিছু নহে তাহা,
পাপ-পুণ্য কিছু এ জগতে নাই !

৮০
ধৰ্ম্মপথ।
[ ৩য় অঙ্ক ;
এত কান্না-হাসি ! এত দুঃখরাশি ।
এত কৰ্ম্মফল-কোথা হতে আসে।
এক শক্তি হতে---
আসি এ জগতে,
কেহ সুখে-কেহ-কেন দুঃখে ভাসে !
কৰ্ম্মফলে—জীব ঘটায় বন্ধন!
কৰ্ম্মে মুক্ত হয়—কৰ্ম্মেতে পতন ।
দেখরে বুঝিয়া--করিয়া যতন !
কৰ্ম্মফল বিনা—আর কিছু নাই !!
( প্রস্থান।
ত্রিলাে। সবিতা ! এ সব আমি কি দেখছি ! এ সব আমি কি শুনছি।
আমি এ কোথায় এসেছি। আমার অনাথকুমার কোথায় ?
আমার অনাথকুমার কোথায় ? ঐ যে, ঐ যে, বাবা আমার
রাশি রাশি ভিক্ষা নিয়ে—এই দিকে আছে ! চলল ! চলাে
সবি ! চলাে! অনাথকুমারকে—কোলে নেবে চলাে! আর
আমাদের কোন দুঃখ নেই! আর আমাদের কোন দুঃখ
নেই। বাবা! বাবা! আমাদের উদ্ধার কর বাবা ! আমাদের
উদ্ধার কর ! দারিদ্র রাক্ষসের—নির্মম হাত থেকে-
আমাদের উদ্ধার কর।
[ বেগে প্রস্থান—পশ্চাৎ পশ্চাৎ সবিতার প্রস্থান।

দ্বিতীয় দৃশ্য।
ত্রিলােচন ঠাকুরের কুটীরপার্শ্বস্থ পথ।
( প্রতিবাসী ব্রাহ্মণদ্বয়ের প্রবেশ )
১ম ব্রা। বলি ভায়া ! এ ব্যাপারখানা কি ? এত সব দ্রব্যসম্ভার লয়ে,
এরা সব কারা এদিকে আগমন করছেন?
২য় ব্রা। আমি ত কিছুই অনুধাবন করতে পারছিনা ! দাড়াও।
দাঁড়াও! ব্যাপারখানা কি—একবার দেখা যাক।
(ফর্দহন্তে শশীশেখর, মন্ত্রী, ও চোপদারগণের প্রবেশ)
শশী। মশাই, বলতে পারেন, এখানে ত্রিলোচন ঠাকুরের ঘর কোথায়
বলতে পারেন ?
উভয়ে। আজ্ঞে ! কেন ? কেন ? কি প্রয়ােজন ? কি প্রয়েজন ?
শশী। প্রয়ােজন আছে, আপনারা কি তাঁকে জানেন ?
১ম ব্রা। আজ্ঞে ! দাড়ান! দাড়ান! একটু গবেষণা করে দেখি ।
২য় ব্রা। এর আর গবেষণা করা করি কি আছে ? ত্রি—লাে-
চন! অর্থাৎ যার তিটী চক্ষু !
চক্ষু ! তা—কৈ মশাই, এ
পাড়ায় ত—তিন চোখে ব্রাহ্মণ—কৈ, কাউকেই দেখতে
পাইনা! তবে—একচোখে ব্রাহ্মণ—দু-একটা আছে বটে
জানি। .
মন্ত্রী। আপনারা বােধহয় তাহলে—তার কোন সন্ধান অবগত নন্ ?
১ম ব্রা। আজ্ঞে, দাড়ান! দাড়ান! একটু যেন ঐ নামের ছায়া
১

ধৰ্ম্মপথ।
[ ৩য় অঙ্ক ;
আমার স্মৃতিপথে নিপতিত হচ্ছে! আচ্ছা, আপনারা কি
বলতে পারেন যে, “ত্রিলােচন” নামটী তাঁর ডাক নাম ?
না রাশ নাম ?
সে বিষয় আমরা সঠিক অবগত নই। আপনারা তাহলে
ত্রিলােচন—ঠাকুরের কোন সন্ধানই জানেন না ?
১ম ব্রা। ঠিক যে জানি না, তাই বা বলি কেমন করে ?
২য় ব্রা । ( জনান্তিকে ) দেখছ না—বামন বাড়ীতে বিদেয় দিতে
এসেছে ! হাতছাড়া কোরনা! হাতছাড়া কোরনা ! কোন
রকমে বাগিয়ে নাও! মস্ত দাও।
১ম ব্রা। দেখুন, অনেক গবেষণার পর আমি নির্ণয় করলুম যে, বর্তমান
সঠিক ত্রিলােচন নামক—কোন ব্রাহ্মণই এ পল্লীতে বসবাস
করেন না।
২য় ব্রা। হাঁ ! তা ঠিক কথা! তা ঠিক কথা! কৈ আমরাও ত
বড় একটা কাকেও—ত্রিলােচন বলে, জানিনা।
১ম ব্রা। তবে, এর মধ্যে একটা কথা আছে—আমার বর্তমান নাম
যদিও পঞ্চানন্ শৰ্ম্মা, কিন্তু আমার মাতুলানী—আমাকে
সৰ্ব্বদাই আদর করে, ঐ নামে, অর্থাৎ ত্রিলােচন নামেই
সম্বােধন করতেন।
২য় ব্রা! ভায়া ! আগে—একথা বলতে হয় ! এতক্ষণ তবে চুপ করে
রয়েছ কেন ? ও মামীর আদর কখনই মিথ্যা হওয়া সম্ভব
নয় ! তুমি নিশ্চয়ই তাহলে ত্রিলােচন! ত্রিলােচন না হয়ে
তুমি—যেতেই পারনা! আর কেন বৃথা ছলনা করছ দাদা!
স্পষ্ট করেই বলে ফেল না! ভদ্রলােকদের—আর কেন মিছে
কষ্ট দিচ্চ?

২য় দৃশ্য।]
ধর্মপথ।
মন্ত্রী। কোথায় পঞ্চানন ! আর কোথায় ত্রিলােচন! এযে—একে-
বারেই কোন সৌসাদৃশ নেই !
২য় ব্রা। সৌসাদৃশ কি আর সব সময় থাকে মশাই! একটু চেষ্টা
চরিত্র করে সৌসাদৃশ করে নিতে হয়।
মন্ত্রী।
এ যে, একেবারে অসম্ভব ! এ কি প্রকারে সম্ভব হতে
পারে ? কোথায় পঞ্চানন্! আর কোথায় ত্রিলােচন ?
২য় ব্রা। কেন মশায়! ঐ শেষের দিকটায় ত অনেকটা মিল আছে।
এদিকে পঞ্চাননের-ন—আর ওদিকে ত্রিলােচনের—চন্
এত প্রায় একই রকমের—দেখা যায়। তবে আর—অসম্ভব
ভাবছেন কেন ?
( হেমাঙ্গমােহনের প্রবেশ )
হেমাঙ্গ। কি হলাে মন্ত্রি মশাই! কিছু কি সন্ধান করতে পারলেন ?
আমিত ত্রিলােচন ছেড়ে,একটি এক লােচনেরও সন্ধান করতে
পারলুম না! ও পাড়া এ পাড়া সব খুজে এলুম ! কিন্তু
ত্রিলােচনের কেউত কোন সন্ধানই দিতে পারলেনা। ইদিকে
ত—প্রভুর আমাদের–আসবারও-সময় হয়ে এলাে !
মন্ত্রী। এই, এরা—কি বলছেন, একবার শােন দেখি?
শশী। (পঞ্চাননকে দেখাইয়া) ইনি বলছেন, ওর আসল নাম হলাে
পঞ্চানন শর্মা। তবে ছেলেবেলায়—ওঁর মামী ঠাকরুণ নাকি
-ওকে আদর করে, ত্রিলােচন বলে ডাকতেন।
হেমাঙ্গ। তা হলেত—উনি নিশ্চয়ই—ত্রিলােচন! ত্রিলােচন না হয়ে
আর উনি যান কোথায় ? কিন্তু ঠাকুরমশাই! এর ভেতর কিন্তু
একটা কথা আছে। আচ্ছা, আপনার আসল নামত—হলাে

৮৪
ধৰ্ম্মপথ।
[ ৩য় অঙ্ক ;
পঞ্চানন ? তা থেকে—আদর করে না হয়, জোর আপনাকে
পেঁচো পচা বা পঞ্চা পৰ্যন্ত বলতে পারে। কিন্তু কি হিসাবে—
আপনার মামী ঠাকরুণ, আপনাকে একেবারে ত্রিলােচন করে
ফেললেন ? ত্রিলােচন আর—পঞ্চাননের মিলের মধ্যে
দেখছি, কেবল ঐ শেষের দন্ত ‘ন। কিন্তু ত্রিলােচন শব্দের
আগেকার ব্যঞ্জনবর্ণগুলিব্যাকরণের কোন্ সূত্রে—একেবারে
পরিবর্তন হয়ে গেল, তা আমায় বলতে পারেন ?
১ম ব্রা। আজ্ঞে । কি প্রয়ােজনে আপনারাও ব্রিলােচনের এত অনু-
সন্ধান করছেন, তা আমিও সম্পূর্ণরূপে অবগত না হলে, আর
কোন কথাই ব্যক্ত করতে প্রস্তুত নহি।
হেমা। আজ্ঞে ! আছে ! একটু বিশেষ প্রয়ােজন আছে! আপনি
একটু কৃপাপরবশ হয়ে, ত্রিলােচন ঠাকুরের সত্য সন্ধানটা
বলে দিন্ না ?
১ম ব্রা। আজ্ঞে—আপনারাই না হয়, আপনাদের সত্য প্রয়ােজনটা
ব্যক্ত করে, আমার কৌতুহল নিবারণ করুন না ?
হেমা।
প্রয়ােজন শুনবেন? প্রয়ােজন কিছু গুরুতর রকমের।
২য় ব্রা কি ? কি ? কিছু কি বিদেয়-আদায় দেবেন না কি ?
হেমা। আজ্ঞে—বিদেয়—আদায়—ত দেওয়া হবেই—কিন্তু আপা-
ততঃ, তাঁর নামে একখানি যে, পরওয়ানা আছে—সেখানি
তাহলে কে নেবেন বলুন দেখি ?
১ম ব্রা। পরওয়ানা ? কিসের পরওয়ানা ?
হেম। আজ্ঞে, রাজবাড়ীর পর ওয়ানা! বড় সাংঘাতিক! রাজার
অংটী চুরির কথা বােধ হয় শুনেছেন ?
১ম ব্ৰ।। ও বাবা! আপনারা বুঝি, সেই আংটী চোরকে সব ধরুতে

২য় দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ
৮৫
এসেছেন? তাই বুঝি এত লােকজন এসেছে ? ও বাবা ।
কি সর্বনাশ ! আমি ত্রিলােচন নই বাবা! আমি ত্রিলােচন
নই! আমি পঞ্চানন ! আমি পঞ্চানন ! আমি কেবল এই
লােকটার পরামর্শে, মিথ্যা কথা বলছিলুম ! ত্রিলােচন
বলে একটা—-বদমাই —চোর-জোচ্চোর---হাড় দরিদ্র
লােক-ঐ কুটীরে থাকে মশাই—ঐ কুটীরে থাকে। (ত্রি-
লােচনের কুটীর প্রদর্শন) যান ! যান ! ঐখানে গিয়ে তাকে
ডাকুন ! ও বাবা! আংটী চুরির পরওয়ানা! ভায়া ! তােমার
মতলবে—এখুনি আমি মারা গেছলুম আর কি ! আংটী চুরির
পরওয়ানা নিয়ে—সব চোর ধরূতে এসেছে। আর তুমি আমায়
বলছ কিনা বিদেয় দিতে এসেছে ? তা—নাও এখন নগদ
বিদেয় নিয়ে—খুসি হয়ে ঘরে যাও ! আমি তবে—অমনি
অমনিই সরে পড়ি।
[ প্রস্থান।
২য় ব্রা। 'ও বাবা! এ আবার কি রকম করে—চোর ধরূতে আসা
বাবা ? এত জিনিষ পত্র নিয়ে আবার, কে কোথায় চোর ,
ধরতে আসে ? বলি মশাই! চোরের সঙ্গে কি, আপনার
কন্যার বিবাহ দেবেন না কি ? তাই এত জিনিষপত্র এনে-
ছেন ? চালাকি করবার বুঝি আর যায়গা পাননি? [ প্রস্থান।
হেমাঙ্গ। ও ঠাকুর মশাই! ও ঠাকুর মশাই! দাড়ান! দাড়ান! যদি
নিতান্তই তাই হয়,তাহলে আপনাকে কন্যাত্রীর নিমন্ত্রণ করা
হবে। মন্ত্রি মশাই, এইবার বােধ হয় সন্ধান পাওয়া গেছে।
তাহলে একবার আসুন,এইখানেই একবার ডেকে দেখা যাক।
মন্ত্রী। হেমাঙ্গমােহন! ধন্য তােমার বুদ্ধি ! তুমি না এলে আমরা
বােধ হয়, কিছুতেই এ সন্ধান কতে পারতুম না।
!

ধৰ্ম্মপথ।
{ ৩য় অস্ক :
হেমাঙ্গ। সেত, যা হবার হয়ে গেছে। এখন একবার আসুন ! ত্রিলােচন
ঠাকুরকে দর্শন করা যাক ! জানবেন যে, এ ব্রাহ্মণ বড় সামান্য
ভাগ্যবান নয়। স্বয়ং মহারাজ যাকে দর্শন করতে আসছেন—
তিনি কি সামান্য ব্যক্তি। (কুটীরের নিকটে যাইয়া উচ্চৈস্বরে)
বলি, এ বাড়ীতে কে আছেন মশাই
ত্রিলাে। (নেপথ্যে) আজ্ঞে কে মশাই
হেমাঙ্গ। একবার অনুগ্রহ করে—এদিকে আসবেন ! একটু প্রয়ােজন
আছে।
( ত্রিলােচন ঠাকুরের প্রবেশ )
ত্রিলাে। আপনারা, কাকে অন্বেষণ করছেন ?
হেমাঙ্গ। আজ্ঞে, আপনার নাম কি ত্রিলােচন শৰ্ম্মা ?
ত্রিলাে। আজ্ঞে, এই দীনের নামই ত্রিলােচন শৰ্ম্মা। কেন ? কিছু
প্রয়ােজন আছে কি ?
হেমাঙ্গ। প্রয়ােজন বলে প্রয়ােজন ! বিশেষ প্রয়ােজন।
ত্রিলাে। কি আজ্ঞা করুন!
হেমাঙ্গ। বলি, আপনি কি একটা হীরের আংটী কুড়িয়ে পেয়েছেন?
ত্রিলাে। (বিস্মিত ভাবে) আজ্ঞে হ—পেয়েছিলুম্ বটে! কিন্তু কিন্তু
সে—ত আমার ছেলে নিয়ে গেছে।
হেমাঙ্গ। সে সব কথায়, আমাদের বিশেষ প্রয়ােজন নেই। তবে সেই
আংটীর জন্য—মহারাজ স্বয়ং--আপনার এখানে আগমন
করছেন !
ত্রিলাে। আজ্ঞে ! আমি নিতান্ত দীন-দরিদ্র ব্রাহ্মণ ! আমার সঙ্গে
এরূপভাবে—পরিহাস করা—আপনার ন্যায় মহৎ ব্যক্তির
শশাভা পায় না।

২য় দৃশ্য।] ধর্মপথ। ৮৭ মন্ত্রী। হেমাঙ্গ। আজ্ঞে, সম্মুখে স্বয়ং রাজমন্ত্রী উপস্থিত রয়েছেন। জিজ্ঞাসা করতে পারেন? ত্রিলাে। আঁ! বলে কি ? ইনি রাজ-মন্ত্রী ! মহাশয় ! আমি কি অপরাধ করেছি বলুন! আমি অতি সামান্য দীন-হীন ব্যক্তি আমি কেমন করে আপনাদের সম্মান রক্ষা করব ? আমাদের সম্মান রক্ষার জন্য, আপনার কোন চিন্তার প্রয়ােজন নেই। আপনি এখন মহারাজের সম্মান রক্ষার জন্য চিন্তা করুন ! ত্রিলাে। মন্ত্রি মহাশয় ! এই দরিদ্র ব্রাহ্মণের সঙ্গে—কেন এরূপভাবে পরিহাস কচ্চেন ? আপনারাই আমার নিকট মহারাজা। শশী। পরিহাস নয় মহাশয় ! পরিহাস নয় ! এই দেখুন—ফর্দ দেখুন! এই সমস্ত দ্রব্য সামগ্রী-মহারাজ-আপনার ব্যবহারের জন্য প্রেরণ করেছেন। এখন এ সমস্ত দ্রব্য কোথায় রাখবেন, তার একটা ব্যবস্থা করুন ! ঐ দেখুন ! ঐ অদূরেই এই সমস্ত দ্রব্য রক্ষিত হয়েছে। ত্রিলো। একি স্বপ্ন ! না সত্য। মহাশয় ! এ সব আপনারা কি বল- ছেন? আমি পর্ণকুটীরবাসী ভিখারী ব্রাহ্মণ ! আমি এ রাজ- ঐশ্বৰ্য্য কি প্রকারে গ্রহণ করব ? মহাশয় ! আর আমার সহিত পরিহাস করবেন না ! আমি করযােড়ে মিনতি করছি। আপনারা আমায় ক্ষমা করুন । আপনারা আমায় ক্ষমা করুন ! হেমাঙ্গ। ঐ মহারাজ এসেছেন! ঐ মহারাজ এসেছেন। (নেপথ্যে চোপদারগণ গােলমাল করিয়া উচ্চৈস্বরে ) মহারাজাধিরাজ—অজিতকুমার বাহাদুর কি জয়! জয়-রাণী মাইকি জয়! রাজকুমার-রাজকুমারী কি জয়।

৮৮
ধর্মপথ ।
[ ৩য় অঙ্ক ;
ত্রিলাে। এ কি! এ কি ব্যাপার। আমিত কিছুই বুঝতে
পাচ্চিনি
এ যে দেখছি—সত্য সত্যই মহারাজ স্বয়ং এসে উপস্থিত
হলেন! সবিতা! সবিতা! দেখ! এদিকে এসে একবার
দেখ ! ( দ্বার অভ্যন্তরে সবিতার আগমন ও লােকজন দেখিয়া
প্রস্থান) আমি কিছুই বুঝতে পাচ্চিনি। আমি কিছুই বুঝতে
পাচ্চিনি! ( কম্পিত হওন )
( অজিত কুমার, বিজয় কুমার, মায়াময়ী, নির্মলা, উষাৰাণী,
এবং সুসজ্জিতবেশে অনাথ কুমার ও
চোপদারগণের প্রবেশ।)
সকলে। জয় ! মহারাজাধিরাজ-অজিত কুমারের জয়! জয় মহারাণী
মাতাজীর জয়!
অনাথ। বাবা! বাবা! এই দেখ ! আমার—রাণীম। আমাদের
বাড়ীতে এসেছেন! রাজা মশাই এসেছেন! রাজকুমার
এসেছেন! উষারাণী এসেছেন ! আর কতলােক এসেছেন
একবার দেখ !
ত্রিলাে। (হতভম্ব ভাবে দর্শন ও কম্পিত হওন!)
অজিত। আপনি এই বালকের পিতা ? আমার প্রণাম গ্রহণ করুন !
( সকলের প্রণামকরণ) আপনার ন্যায় সত্যনিষ্ঠ ব্রাহ্মণের
চরণ দর্শনেও আজ আমরা ধন্য হলুম ! এ রাজ্যের মহারাণী
আজ স্বয়ং আপনার দ্বারে উপস্থিত। আজ আমরা সকলেই
আপনার অতিথী।
ত্রিলাে। আঁ! স্বয়ং মহারাণী ! মা জননী—আমার গৃহে এসেছেন?
( বসিয়া পড়ন)
হেমাঙ্গ। (হম্ভধারণে উঠাইয়া) ঠাকুর ! অমন করছেন কেন ? আজ ত

২য় দৃশ্য।] ধৰ্ম্মপথ। ৮৯ আপনার মহানন্দের দিন! চলুন! চলুন ! মহারাজকে-- রাণীমাকে-রাজকুমার -রাজকুমারীকে—অভ্যর্থনা করে আপনার কুটীরাভ্যন্তরে নিয়ে চলুন। ত্রিলাে। ( সানন্দে উচ্চৈস্বরে) সবিতা ! সবিতা! শীঘ্র এস ! শীঘ্র এস! স্বয়ং রাজলক্ষ্মী আমার ঘরে এসেছেন। স্বয়ং রাজলক্ষ্মী আমার ঘরে এসেছেন ! জলের ধারা দাও ! শঙ্খধ্বনি কর । শঙ্খধ্বনি কর! পুজার আয়ােজন কর ! পূজার আয়ােজন কর । ( বেগে অভ্যন্তরে প্রবেশ। নেপধ্যে শঙ্খধ্বনি।) হেমাঙ্গ। আহা! ব্রাহ্মণ—আনন্দে আত্মহারা হয়েছে ! কি যে করবে, কিছুই স্থির করতে পারছে না! একেই বলে বামনের চাদ হাতে পাওয়া! এত আনন্দ সহ করা কি সহজ কথা! স্বয়ং রাজ-রাজেশ্বর—আজ কিনা মহারাণীর সঙ্গে এই দরিদ্রের পর্ণ-কুটীরে—এসে উপস্থিত হয়েছেন। অজিত। হেমাঙ্গ! আমি সমস্তই বুঝতে পেরেছি ! তােমরা সব একে, একে, ব্রাহ্মণের নিকটে গমন কর ! শশীশেখর ! তুমি আপাততঃ এই কুটীরের সন্নিকটস্থ কোন স্থানে—শিবির সংস্থাপন করে, দ্রব্য সম্ভার সমস্ত রক্ষা করবার ব্যবস্থা কর । ( মন্ত্রী ব্যতীত সকলের একে একে কুটীর অভ্যন্তরে গমন) রাজআজ্ঞা শিরােধার্য্য [ প্রস্থান। অজিত। মন্ত্রি মশাই! চলুন! সরল ব্রাহ্মণের—পবিত্র পদস্পর্শিত- পর্ণকুটীরের—ধুলিকণা স্পর্শ করে, আমরা একটু সরলতা শিক্ষা করিগে চলুন ! শশী।

৯০ ধৰ্ম্মপথ। [ ৩য় অঙ্ক ; মন্ত্রী। মহারাজ ! আপনার দয়ার কি তুলনা আছে ! আপনি দয়ার অবতার । আমি আর আপনার কি প্রশংসা করব বলুন? আপনার এই দয়া দর্শনে, দেবতারাও স্বর্গে দুন্দুভি নিনাদ করছেন। [ সকলের প্রস্থান। ( দয়ানন্দ স্বামীর প্রবেশ ) { দয়ানন্দ। লীলাময়! ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র মানব আমি, তােমার লীলা কেমন করে হৃদয়ঙ্গম করব প্রভু! অনাথনাথ ! পতিতপাবন ! দারিদ্র- ভঞ্জন তুমি ! আজ দরিদ্র ব্রাহ্মণের দরিদ্রতা দূর করবার জন্য, মহারাজ অজিত কুমারের—পবিত্র হৃদয়ে আবির্ভূত হয়েছ। মহারাজ অজিত কুমার—আজ তােমার পুণ্যপ্রতিভাময়—স্বর্গীয় জ্যোতি হৃদয়ে ধারণ করে—দেবমূর্তি ধারণ করেছেন। তােমার মহান্ মহিমা—যে হৃদয়ে একবার প্রতিফলিত হয়। সে হৃদয় কি আর কখন—এই তুচ্ছ সংসারের মায়ামমাহে আচ্ছন্ন হতে পারে ? না প্রভু না! তা কখনই হতে পারে না! গীত। দেখিলে যারে-কিছু দেখিতে থাকে না, ভাবিলে যারে—ভব ক্ষুধা দূরে যায় ! বারেক হৃদয়ে নেহার হারে, সে বিনে আপন—আর কে আছে ধর যাহার কৃপার কণিকা লইয়ে, এই বিশ্ব ভাসিতেছে সৌন্দর্য্যে মাতিয়ে, এ-বিশ্ব-মাঝারে, তঁারে না হেরিয়ে,

২য় দৃশ্য।
ধৰ্ম্মপথ।
৯১
কি দেখিছ হায়,
ভুলিয়ে মায়ায়।
সংসার সাগরে—মায়াতে ডুবিয়ে,
তুচ্ছ সুখে কেন—আছরে ভুলিয়ে !
খুলিয়ে নয়ন—দেখরে চাহিয়ে,
কত মাধুরীমাতার মহিমায় ॥
কত শান্তিসুধার রূপে ক্ষরে,
কত প্রেমামৃত—তাঁর নামে ঝরে,
হেরিলে যাহারে-সুরাসুর নরে,
ত্রিতাপের জ্বালা সকলি জুড়ায় !!
[ প্রস্থান।

কর । শেষ দৃশ্য। কুটীর সম্মুখস্থ স্থান। অজিতকুমার, বিজয়কুমার, হেমাঙ্গমােহন, শিবশর্মা, ত্রিলােচন ঠাকুর, অনাথকুমার, মায়াময়ী, উষারাণী, নির্মলা, সবিতা ও চোপদারগণ আসীন। ত্রিলাে। সবিতা! সবিতা ! পূজার আয়ােজন কর ! পূজার আয়ােজন স্বয়ং রাজলক্ষ্মী আমার ঘরে এসেছেন। স্বয়ং রাজলক্ষ্মী আমার ঘরে এসেছেন ! মা! তােমার এত দয়া না ? এই দীন দরিদ্রের পর্ণ-কুটীরে, তুমি স্বয়ং এসে, উপস্থিত হয়েছ ? মা ! আমি কেমন করে—তােমার পূজা করব মা? আমি যে দীনের দান! হীনের—হীন! অজিত ! ঠাকুর ! আপনার সত্যনিষ্ঠা ও ধর্মপরায়ণতা দর্শনে, আমরা সকলেই পরম প্রীতিলাভ করেছি। ত্রিলো। আমার কিছু ধৰ্ম্ম নেই মহারাজ! আমার কিছু ধৰ্ম্ম নেই ! আনি মহাপাপী! আমি মহা নারকী! আমি আপনার আংটীর লােভ সম্বরণ করতে পারিনি—মহারাজ! আমি আপনার আংটার লােভ সম্বরণ করতে পারিনি। আমার এই সহ- ধর্মিনীই আমায় রক্ষা করেছেন! তা’নইলে আজ আমার যে, কি সর্বনাশ হত-তা জানিনি! সবিতা! তুমি আমায় ক্ষমা কর! ক্ষমা কর। আমি তােমাকে এতদিনেও চিন্তে পারিনি। আমায় ক্ষমা কর । সবিতা। আমি তােমার চরণ সেবার দাসী মাত্র। আমাকে ওরকম শেষ দৃশ্য।] ধৰ্ম্মপথ । কথা ব’লনা! ধৰ্ম্মই যে মানুষের একমাত্র উদ্ধারকর্তা—এ কথা আমি, তােমার মুখেই শুনেছিলুম! তাই আমি তােমাকে কেবল ধর্ম রক্ষা করতেই বলেছিলুম ! হেমাঙ্গ। মা ঠাকরুন ! ও পাগল ঠাকুরের কথা এখন ছেড়ে দিন। আপনাদের ধর্মের উপর মতি গতি না থাকলে কি আর, এই লক্ষ্মীনারায়ণ—স্বয়ং এসে, আপনাদের এই পর্ণ কুটীরে উপস্থিত হন ? চন্দ্র, সূৰ্য্য যার মুখ দেখতে পায়না! সেই রাজকুল- লক্ষ্মীপুত্র-কন্যা সঙ্গে নিয়ে, স্বয়ং যার গৃহে উপস্থিত হয়েছেন, তিনি কি বড় সামান্য ভাগ্যবান। ত্রিলাে। এ আমার ভাগ্য নয় ! এ আমার ভাগ্য নয় ! এ আমার সবি- তার ভাগ্য! আমার ঐ সতীলক্ষ্মী সহধর্মিনীর ভাগ্যে এ সব হয়েছে ! আমার ঐ অনাথকুমারের ভাগ্যে—আজ মা অন্নপূর্ণ। স্বয়ং আমার গৃহে এসেছেন। ( দয়ানন্দ স্বামীর প্রবেশ ) দয়ানন্দ। বাবা ! ধৰ্ম্মপথে থাকলে – সকলের ভাগ্যেই এই রকম হয়। ধৰ্ম্মের কাছে ছােট বড় সবই সমান। ধৰ্ম্মের বিচার অতি ত্রিলো। এ কি ! ভিখারী ঠাকুর ! আপনি এসেছেন? বাবা! আপনি কে – আমায় বলুন ? আপনি কে—আমায় বলুন? সবিতা। ( চরণ প্রান্তে প্রণত হইয়া) বাবা! বাবা ! এ সবই আপনার কৃপা ! এ সবই আপনার কৃপা ! অনাথ। ( নিকটে যাইয়া স্বালিঙ্গনে) ভিখারী ঠাকুর ! এই দেখ ! আমি তােমার সেই নাম গান করে—কত ভিক্ষা পেয়েছি ! (মােহরের মালা প্রদর্শন ) ৯৪ ধৰ্ম্মপথ । [ ৩য় অঙ্ক ; না ! দয়ানন্দ। ধন্য! ধন্য তুমি বালক! তােমাকে নাম মন্ত্রদানে—আমিও ধন্য হয়েছি ! ( ত্রিলােচনের প্রতি) কেমন বাবা! ধৰ্ম্মের মহিমা কি এইবার কিছু বুঝতে পেরেছে ? ত্রিলাে। (দয়ানন্দের পদ ধারণে) ঠাকুর ! আমার রক্ষা করুন ! আমার রক্ষা করুন! আমি আপনাকে চিন্তে পারিনি। আমি ধৰ্ম্ম- ভ্রষ্ট হয়েছি। আমি ধর্মভ্রষ্ট হয়েছি। দয়ানন্দ। তুমি কখনই ধর্মভ্রষ্ট হতে পারবে না ! তােমার এই সত্যধৰ্ম্ম- রূপিনী । সাধ্বীসতী সহধর্মিনী--যতক্ষণ তােমার সহায় থাক- বেন—ততক্ষণ কিছুতেই ধৰ্ম্ম তােমায় পরিত্যাগ করতে পারবেন সহধর্মিনীই—স্বামীর একমাত্ৰ ধৰ্ম্মরক্ষাকারিণী! (ছদ্ম- বেশ উন্মােচন করিয়া রাজার প্রতি) মহারাজ! আশীৰ্বাদ গ্রহণ করুন! (হস্তোত্তলন) অজিত। একি! আমি এতক্ষণ বৃথা সন্দেহ করছিলুম ! গুরুদেব । গুরুদেব ! আপনি? আমার অপরাধ মার্জনা করুন। আমি যে কিছুই হৃদয়ঙ্গম করতে পাচ্ছিনি! (প্রণত হওন এবং সকলের ঐ সঙ্গে প্রণাম করণ ) প্রভু! ঘটনা স্রোতের তৃণ আমি-আমি কিছুই জানিনি! “য়া হৃষীকেশ হৃদিস্থিতেন যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করােমি।” দয়ানন্দ। মহারাজ! এই নির্ভরশীলতার গুণেই—আজ আপনি নরাকারে দেবতা হয়েছেন। এই দরিদ্রের পর্ণকুটীরে রাজদর্শন করে, আজ আমি ধন্য হলুম! ভুপতি যে-জগৎপতির প্রতিনিধি, তা একমাত্র মহারাজ অজিৎ কুমারকে দেখেই বিশ্বাস হয় ! এমন— উদারতা যদি সমস্ত রাজাগণের হৃদয়ে—উদয় হয় ! তা হলে

শেষ দৃশ্য।]
ধৰ্ম্মপথ।
এই পৃথিবী—স্বর্গে পরিণত হতে পারে! ধন্য ! ধন্য রাজা
অজিৎকুমার ! ধন্য রাজ মহিমা !
সকলে। জয় ! গুরুদেব দয়ানন্দ স্বামীকি জয়! জয়। মহারাজাধিরাজ
অজিতকুমারের জয়!
হেমাঙ্গ। আর জয় ঐ নিৰ্মলা দেবী, আর এই হেমাঙ্গ দেবের জয়! বাবা ।
তাইত বলি যে, এতটা ঘটনা ঘটাবার মূল্ কে ? এই যে,
এইবারে মূল সন্ন্যাসী বেরিয়ে পড়েছেন! তা নইলে কি, অমনি
ভানুমতীর খেলার মতন—এতটা ব্যাপার অমনি—ফুমন্ত্রে কখন
হতে পারে ? স্বয়ং সিদ্ধপুরুষ—গুরুর কৃপা—আগে লাভ করা
হয়েছে ! আরে বাবা, কান্ টানলেই—মাথাকে যে আপনিই
আতে হবে। গুরুর মতন গুরু পেলে কি আর, এ সংসারে
কারুর কোন ভাবনা থাকে ? এই জন্যই ত তুলসীদাস প্রভু
বলে গেছেন, “সদ্গুরু পাওয়ে ভেদ, বাওয়ে জ্ঞান করে
উপদেশ, তব কয়লা কি ময়লা ছুটে, যব, আগ করে পরবেশ ॥”
তা এই দরিদ্র ব্রাহ্মণের কৰ্ম্মফলরূপ-কয়লাকে যে, এই মহা-
পুরুষের কৃপারূপ অগ্নিতে একেবারে ভস্ম করে ফেলেছে ! আর
কি এখানে দরিদ্রতা থাকতে পারে ? মহাপুরুষের কৃপায়—আর
ভগবানের কৃপায়—কি, কিছু প্রভেদ আছে ? মহাপুরুষের কৃপা-
লাভ করতে পারলে--মানুষ যে শত শত জন্মের কর্মফল থেকে
উদ্ধার হতে পারে ! তা-এ ব্রাহ্মণের দরিদ্রতা দূর হবে, এ আর
কি বেশী কথা ? (করযােড়ে) দয়াময় । বৰ্তমান আমার বড়
কিছু একটা প্রার্থনা নেই। কিন্তু ঠাকুর! সেই, সেদিন—যেদিন
—এ সংসারে আমার মুখ চাহিবার আর কেউ থাকবে না! চক্ষু
দৃষ্টিহীন হবে! জিহবা বাক্যহীন হবে! গলা—ঘড় ঘড় কবে ?

৯৬
ধৰ্ম্মপথ।
[ ৩য় অঙ্ক :
এই সােণার নির্মুলা—আমার পাশে বসে রােদন করবে ! সেই
শেষের সেই দিনে—যেন এ দাকে বঞ্চন-করবেন না !--সেই
সময় একবার এসে—এই পা দুখানা আমার মাথায় চাপিয়ে
দেবেন ! বাস্-তাহলে আর আমি—কিছুই চাইনি! (পদধূলি
লইয়া) নিৰ্ম্মল ! আয় ! এ দিকে আয় ! একটু পায়ের ধুলাে
তাের মাথায় দিয়ে দি—আয় ! (পদধূলি লইয়া নিৰ্মলার মস্তকে
প্রদান) আমি একলা উদ্ধার হলে—আমার মরেও তৃপ্তি হবে
নারে ! আমার মরেও তৃপ্তি হবে না! ভােকেও উদ্ধার
করতে হবে! ( নিৰ্ম্মল দয়ানন্দের পদধূলী গ্রহণপূর্বক হেমাঙ্গের
পদধূলী গ্রহণ) ওরে আমার পায়ের ধুলাে নিতে হবেনারে !
আমার পায়ের ধুলাে নিতে হবে না! আমি ত তাের ঘােরর
ঠাকুর! আমি অমনই তাের প্রতি প্রসন্ন থাকব ! এখন,-তুই
এই সাধনার ধন-শ্রীগুরুদেবের—পদধুলি নিয়ে মাথায় দেরে !
এই পায়ের ধুলাে, নিয়ে মাথায় দে।
[ নিজ হস্তে দয়ানন্দের পদধুলি লইয়া, নির্মলার মস্তকে প্রদান }
অজিত। স ! ধন্য তােমার গুরুভক্তি! ধন্য তুমি !
দয়ানন্দ। হেমাঙ্গমােহন! তােমার মতন উদার অন্তকরণ—নীরহঙ্কারী,
ভক্তিমান ব্যক্তি—এ সংসারে খুব অল্পই দেখতে পাওয়া যায় ।
তােমার সদানন্দময়-সরল মূৰ্ত্তি দর্শন করলে—মন পবিত্র হয় ?
জীবন ধন্য হয় !
হেমাঙ্গ। দোহাই দয়াময়! দোহাই আপনার ! আর আমার ঘাড়ে
ঐ তাহঙ্কারের বােঝাটা চাপিয়ে দেবেন না ! আমি তা হলে
বােধ হয় আর মাটিতে পা দিয়ে চলতে পারব না! ঐ দেখুন !
দেখুন! আমার গুণের কথা শুনে আমার অর্ধাঙ্গিনীর

শেষ দৃশ্য। ]
ধৰ্ম্মপথ
শ্রীচরণ দুখানা, বােধ হয় মাটী ছেড়ে আধ হাত, উচুতে উঠে
পড়েছে। দোহাই আপনার প্রভু ! দোহাই আপনার !
(করযােড়ে মিনতি প্রদর্শন) আমাদের রক্ষা করুন। আমাদের
রক্ষা করুন !
অজিত। প্রভু! বহুদিন এ দাস শ্রীচরণ দর্শনে বঞ্চিত হয়ে আছে ।
জানি না, কোন অপরাধে অপরাধী হয়েছি। তাই দাসকে
দর্শনদানে-বঞ্চিত করে রেখেছেন।
দয়ানন্দ। মহারাজ ! আমি আপনার মঙ্গলের জন্য, আপনার স্ত্রী পুত্রের
মঙ্গলের জন্য, আপনার রাজ্যের মঙ্গলের জন্য, আপনার
প্রজাবর্গের মঙ্গলের জন্য, দিবারাত্র রাজ্যময়—ভিখারীর বেশে
বিচরণ করে থাকি ! ক্ষুধাতুরকে অনুদান! রােগীকে ঔষধ
দান! অনুতপ্তকে শান্তিদান ! শােকাতুরকে শান্তনাদান !
প্রভৃতি—নানাপ্রকার কর্তব্য প্রতিপালনের জন্য—আমি
সৰ্ব্বদাই নিযুক্ত থাকি! সৰ্ব্বদা আপনার সম্মুখবর্তী হওয়াপেক্ষা
—অন্তরালে অবস্থানপূৰ্ব্বক—শিষ্যের মঙ্গল কামনা করাই
গুরুর প্রধান ধৰ্ম্ম । অতএব আপনি নিশ্চিন্ত মনে—আপনার
রাজধৰ্ম্ম প্রতিপালনে-পরকালের পথ প্রশস্ত করুন!
অজিত। গুরুদেব । আপনার শ্রীপাদপদ্মই আমার একমাত্র ভবার্ণবের
তরণী। আমার কায়, মন, প্রাণ-আমি সমস্তই আপনার
শ্রীপাদপদ্মে অর্পণ করেছি। আমার মঙ্গলামঙ্গল আমি আর
কিছুই জানি না ! শ্রীগুরুর শ্রীপাদপদ্মই আমার—এখন
একমাত্র ভরসা ! (পদধুলি গ্রহণ )
দয়ানন্দ। “অহােবত বিচিত্ৰানি চরিত্ৰানি মহাত্মনাম!
লক্ষীং তৃনায় মন্যন্তে তদ্ভারেন নমন্তি চ।”
৭

৯৮ ধৰ্ম্মপথ। { ৩য় অঙ্ক মহারাজ! অতুল ঐশ্বৰ্য্যাধিপতির—এরূপ নম্র ভাব দর্শনে, প্রাণ পরিতৃপ্ত হয়। মহারাজ ! আপনি নররূপী দেবতা! ভগবান আপনার মঙ্গল বিধান করুন। অজিত! গুরুদেব! আপনি যে এই দীন ভিখারীর বেশে--আমার রাজ্যের মঙ্গলের জন্য বিচরণ করেন। কিন্তু রাজভাণ্ডারের দ্বার কি, পরােপকারের জন্য রুদ্ধ ? আপনার কোন অনুমতি কখন সে স্থানে উপস্থিত হয় না কেন? দয়ানন্দ। মহারাজ! দুঃখী না হলে, দুঃখের মৰ্ম্ম-কেউ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না ! ভিখারী না হলে—ভিখারীর মর্মব্যথা—কখন বুঝতে পারা যায় না! পরােপকারের জন্য, ভিক্ষালব্ধ ধনই আমার নিকট কুবেরের ভাণ্ডারের কাৰ্য্য করে। তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখুন ! আমি যখন এই নিরন্ন ব্রাহ্মণের—একমাত্র বালককে উষ্ণ জলপানে—ক্ষুধার যন্ত্রণা নিবারণ করতে দেখলুম! তখন আমার প্রাণ বড়ই কাতর হয়ে উঠলো। আমি তখন—আমার ভিক্ষালব্ধ চালগুলি—এই ব্রাহ্মণের সেই শূন্যপাত্রে ঢেলে দিয়ে কাতর প্রাণে-মা অন্নপূর্ণাকে ডেকে বল্লুম- “অনাথ-দীনস্ত—ক্ষুধাতুরস্ক-- ভয়ার্ল্ড-ভীত-বদ্ধস্যজন্তোঃ। ত্বমেকাগতিৰ্দেবি নিস্তারদাত্রি, নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি শিবে শুভঙ্করী।” মা! জগৎপালিনি! দীনদুঃখহারিণি ! অন্নচিন্তা নিবারিণি। সৰ্ব্ব ভয় বিনাশিনি! মা! এই নিরন্ন ব্রাহ্মণের অন্নচিন্তা-নিবারণ কর মা! আমার সেই কাতর প্রার্থনা—নিশ্চয়ই আমার মার কর্ণগােচর হয়েছিল। মা কি আমার সেই কাতর প্রার্থনা শেষ দৃশ্য।] ধৰ্ম্মপথ । শুনেস্থির থাকতে পারলেন? পারলেন না! তাই দেখুন মহারাজ ! আজ স্বয়ং রাজকুললক্ষ্মী--মা অন্নপূর্ণার মূর্তিতে—এই পর্ণকুটীরে—বিরাজমানা! ( ত্রিলােচনের প্রতি ) ব্রাহ্মণ-ধন্য তুমি! ধন্য তােমার ভাগ্য! ত্রিলাে। ঠাকুর! সবই আপনার কৃপা ! সবই আপনার কৃপা ! সবিতা ! তুমি ঠিক বলেছ ! তুমি ঠিক বলেছ ! ঠাকুর ভিখারীর বেশে এসে—ভিখারীকে দয়া করেছেন ! ঠাকুর ! আমায় পায়ে রাখুন। আমায় পায়ে রাখুন ! (পদধারণ ) দয়ানন্দ। (ত্রিলােচনের হস্ত ধারণ করিয়া ) ব্রাহ্মণ ! খুব সাবধান ! ধৰ্ম্মের পরীক্ষা বড়ই কঠিন! ধৰ্ম্মপুত্র-ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকেও—স্বর্গ- দ্বারে উপস্থিত হয়ে—পরীক্ষা প্রদান করতে হয়েছিল! সুখে ! দুঃখে ! বিপদে ! সম্পদে ! আনন্দে। নিরানন্দে! কখন যেন ধৰ্ম্মপথ পরিত্যাগ কর না ! মানুষের ইহকাল-পরকালের একমাত্র—এমন প্রাণের বন্ধু আর কোথাও পাবে না! এটা নিশ্চয় জেনাে ! বাবা অনাথকুমার ! এইসুখের দিনে—ঐ মধুর কণ্ঠে-একবার মধুর নাম গান করে, আমার প্রাণ পরিতৃপ্ত কর! অনাথ। আপনি যা বলবেন আমি তাই শুনবাে ! ( দয়ানন্দের পদধূলি লইয়া ) গীত। = ওগাে, অসার ভাবনা আর ভেব না ! শুধু হরিনাম- মুখে বলনা : ভজন, সাধন, কিছুই নাই—এই কলিতে ঐ নাম বিনা ।

ধৰ্ম্মপথ। [ ৩য় অঙ্ক ; গনা দিন, কেন ভুলে যাও ! থাকতে দিনশেষের সে দিন-বুঝে কিনে নাও! ( নেপথ্যে ধৰ্ম্মবালাগণের গীত ) ধৰ্ম্ম পানে চাও ! সবাই ধৰ্ম্মপানে চাও। জে’ন ধৰ্ম্ম বিনে-শেষের দিনে,-কেউত সঙ্গে যাবে না । অনাথ- ওগাে, কেউত সঙ্গে যাবে না । কেউত সঙ্গে যাবে না । ( সহসা ধৰ্ম্মবালাগণের আবির্ভাব ও করযােড়ে ) তাই করযােড়ে সবায় বলি— ধৰ্ম্মপথ—কেউ ছেড় না ! ধৰ্ম্মপথ—কেউ ছেড় না !! (ওগাে) ধৰ্ম্মপথ কেউ ছেড় না !!! যবনিকা পতন।

স্মৃতিকথা !

No text on this page.

স্মৃতিকথা। অতীতের স্মৃতি! বিস্মৃতির গর্ভে নিমগ্ন প্রায় দেখিয়া, সংক্ষেপে দুই একটী ‘স্মৃতিকথা” লিখিয়া রাখিতে প্রবৃত্ত হইলাম। ইংরাজী সন ১৮৯৮ সালে “ভারত সঙ্গীত সমাজ” ভারতের রাজা, মহারাজা, প্রভৃতি উচ্চ পদ গৌরবে গৌরবান্বিত, সম্মাননীয়, সম্রান্ত, ধনকুবের ও সুধী মণ্ডলীর আন্তরিক পৃষ্ঠপােষকতায় স্বর্গীয় মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ মহাশয়ের, ১৪৮ নং বারানসী ঘােষের স্ট্রীটস্থ সুবিখ্যাত ভবনে, বিপুল আয়ােজনে সংস্থাপিত হইয়া কলিকাতা নগরীর মুখােজ্জল করিয়াছিল। বহু গণ্যমান্য, বরেণ্য, সঙ্গীতানুরাগী সভ্যবৃন্দের দ্বারা সুশশাভিত হইয়া, যে সময় “ভারত সঙ্গীত সমাজের” গৌরবপতাকা উডডীয়মান হইয়াছিল, সেই সময়ে সঙ্গীতানু- শীলনের সহিত, নাটকাভিনয়ের উৎকর্ষ সাধনের জন্য “সঙ্গীত সমাজের নাট্যানুরাগী সভ্যগণের দ্বারা উক্ত সমাজ মন্দিরেই একটী “নাট্য সম্প্রদায়” বিগঠিত হয়। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীর সুবিখ্যাত নাট্যকার ও সঙ্গীতা- চাৰ্যসম্মাননীয় শ্রীল শ্ৰীযুক্ত বাবু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের সহানু- ভূতি ও যত্নে পরিচালিত হইয়া,উক্ত “নাট্যসম্প্রদায়” যখন ধীরেধীরে উন্নতির পথে অগ্রসর হইতেছিল, সুবিখ্যাত নাট্যকলাবিশারদ, অদ্বিতীয় নাট্যশিক্ষক স্বর্গীয় অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফী মহাশয় যখন উক্ত “নাট্যসম্প্রদায়ের” নাট্য- শিক্ষকরূপে শিক্ষা প্রদান করিতেছিলেন, সেই সময়ে সহৃদয় সভ্যবৃন্দের আন্তরিক আগ্রহে আমি—উক্ত “নাট্য সম্প্রদায়ের অবৈতনিক অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত হইয়াছিলাম। এই সময়ে আমি জ্যোতিরিন্দ্র বাবুর নির্দেশমত সুবিখ্যাত নাট্যকারদিগের নাটক সকল অভিনয়ের জন্য বিশেষরূপে চেষ্টা ২ স্মৃতিকথা। করিয়াছিলাম। “অশ্ৰমতী”, “বিসর্জন”, “বাল্মিকী প্রতিভা, পূর্ণচন্দ্র”, “বিষাদ”, “হিতেবিপরীত,” “সধবার একাদশী” প্রভৃতি নাটক সকল অভি- নয়ের জন্য নির্বাচিত হইয়াছিল। এই সময়ে সঙ্গীত সমাজের অন্যতম সভ্য আমাদিগের “নাট্য সম্প্রদায়ের বিশেষ উৎসাহদাতা মাননীয় শ্রীল শ্ৰীযুক্ত বাবু অটলকুমার সেন মহাশয় “নাট্য সম্প্রদায়ের উন্নতিসাধনকল্পে সৰ্ব্বদাই আমাদিগকে সুযুক্তিপূর্ণ সদোপদেশ প্রদান করিতেন। অটল বাবুর স্থির, ধীর, শান্ত মূর্তি দর্শনে এবং তাহার সুমিষ্ট সরল ব্যবহারে “নাট্য সম্প্রদায়ের” সভ্যমাত্রেই আন্তরিক প্রীতিলাভ করিতেন। অটল বাবু নাট্যাভিনয়ের একজন বিশেষ উন্নতিকামী ছিলেন। আমি তাঁহার সরল ভাব দর্শনে অত্যন্ত আনন্দ অনুভব করিতাম। অভিনয়ােপযােগী নাটক নির্বাচন ও নাট্যাভিনয়ের উন্নতি সাধন উদ্দেশে তিনি যে মূল্যবান মন্তব্য প্রকাশ করিতেন, আমরা সকলেই আন্তরিক শ্রদ্ধার সহিত তাহার অনু- মােদন করিতাম। “পূর্ণচন্দ্র”, “পুনর্বসন্ত”, “অশ্রুমতী” প্রভৃতি নাটকের অভিনয় দ্বারা, এই সময়ে “নাট্য সম্প্রদায় অভিনয়ােৎকর্ষের চরমসীমা প্রদর্শন করিয়াছিল। “সঙ্গীত সমাজের পূর্ণ প্রতিভায় এই সময়ে দিগন্ত উদ্ভাসিত হইয়াছিল। মাননীয় মহারাজা স্যার প্রদ্যোৎকুমার ঠাকুর বাহাদুর এবং খ্যাতনামা গ্রন্থকার মাননীয় শ্রীল শ্রীযুক্ত বাবু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেক্রেটারির পদে অধিষ্ঠিত হইয়া. (ইং ১৮৯৮ সালের ২৭শে জানুয়ারী) “ভারত সঙ্গীত সমাজের শুভ প্রতিষ্ঠা কাৰ্য্য সম্পন্ন করেন। তাহার পর সুবিখ্যাত মল্লিক বংশের সম্মাননীয় স্বর্গীয় বাৰু হেমচন্দ্র মল্লিক মহাশয় মহারাজার অবসর গ্রহণের পর, উক্ত সেক্রেটারীর পদে নিযুক্ত হইয়া- ছিলেন। এই সময়েই “নাট্য সম্প্রদায়” সম্বন্ধীয় কোন বিশেষ কারণ লইয়া সভ্যগণমধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হয়। ইহার অব্যবহিত পরেই “রক্ত সঙ্কীত সমাজ” হইতে “ভা সঙ্গীত সমিতির উৎপত্তি হস্তু। এই সময়েই স্মৃতিকথা। “ভারত সঙ্গীত সমাজ” নবভাবে নবােদ্যমে কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটে আসিয়া নূতন ভবনে সংস্থাপিত হইয়া অদ্যাবধি উক্ত কর্ণওয়ালিস ষ্ট্ৰীটেই অবস্থিত রহিয়াছে। “ভারত সঙ্গীত সমিতি” উক্ত বারানসীঘােষের স্ট্রীটস্থ ভবনেই অবস্থিত হইয়াছিল। সাম্প্রদায়িক সুনাম প্রতিষ্ঠার আশায় উভয় সম্প্রদায়ই এই সময়ে পূর্ণ উদ্যমে কাৰ্য্য করিয়াছিলেন। অজস্র অর্থব্যয়ে “স্থায়ী নাট্য- মঞ্চ” নির্মাণ দ্বারা, নাট্যাভিনয়ের উৎকর্ষ সাধনাভিপ্রায়ে উভয় সম্প্রদায়ই বিশেষরূপে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। এই সময়ে “ভারতসঙ্গীত সমাজের” নব নাট্যমঞ্চে “পুনর্বসন্ত”, “বিসর্জন”, “অশ্রুমতী” প্রভৃতি নাটকের অভিনয় হইয়াছিল। এদিকে সঙ্গীত সমিতির পক্ষে মহারাজা স্যার প্রদ্যোৎকুমার ঠাকুর বাহাদুর প্রমুখ বহু রাজা মহারাজা এবং মাননীয় শ্রীল শ্ৰীযুক্ত বাবু বিজয়চন্দ্র সিংহ, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমূল্যপ্রসাদ ঘােষ, গােপালচন্দ্র মুখখাপাধ্যায়, আই, সি, বসু, স্বর্গীয় প্রসাদদাস বড়াল প্রভৃতি বহু সম্মাননীয় সম্রান্ত সুধীমণ্ডলী, এই সময়ে পৃষ্ঠপােষক হইয়া “সঙ্গীত সমিতির” বিজয় পতাকা উড্ডীয়মান করিয়াছিলেন। আমার চির-শুভাকাঙ্ক্ষী, “সঙ্গীত সমিতির প্রধান পৃষ্ঠপােষক, উন্নত-হৃদয় অমূল্য বাবুর অনুরােধ উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সাধ্যাতীত জানিয়া, আমি সৰ্বজন সন্মতিক্রমে পুনরায় সঙ্গীত সমিতির” নাট্য সম্প্রদায়ের “অবৈতনিক অধ্যক্ষের” পদে নিযুক্ত হইয়াছিলাম। এই সময় “ভারত সঙ্গীত সমাজ” ও “ভারত সঙ্গীত সমিতির সভ্যগণ মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রখর স্রোত প্রবাহিত হইতেছিল। কিন্তু এরূপ সম্প্রদায়গত বিবােধ ভাবের মধ্যেও অটলবাবু নিরপেক্ষভাবে, উভয় সম্প্রদায়ের সভ্যশ্রেণী ভুক্ত হইয়া এবং উভয় স্থলেই বিশেষরূপে সংশ্লিষ্ট থাকিয়া যেরূপ উদার ও উন্নত হৃদয়ের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন তাহাতে তিনি সকলের নিকটেই শ্রদ্ধাভাজন হইয়াছিলেন। উন্নত নাট্যা- ভিনয়ের দর্শনকাঙ্ক্ষায় এই সময় সঙ্গীত সমিতির” নাট্যানুরাগী সভ্যমাত্রেই ৪ স্মৃতিকথা। বিশেষরূপে আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন। সরলহৃদয়-স্বর্গীয় মহাত্মা বিপিন বিহারী দত্ত মহাশয় এই সময় “সঙ্গীত সমিতির” “নাট্য সম্প্রদায়ের প্রধান উদ্যোগী হইয়া আমায় অশেষ প্রকারে সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়াছিলেন। তাহার আন্তরিক অনুরােধ উপেক্ষা করিতে না পারিয়া, আমি এই সময়েই প্রথম নাটক রচনায় প্রবৃত্ত হইয়া “রাজপুত কাহিনী” হইতে “জয়মল্ল” ও “পুত্ত্বের” অমানুষিক বীরত্বগাথা অবলম্বন করিয়া “কমলা” নামক এক- খানি ক্ষুদ্র “ঐতিহাসিক নাটিকা” রচনা করি। ঐ ক্ষুদ্র ‘নাটিকা’ অভিনয় করিয়া, “ভারত সঙ্গীত সমিতির” “নাট্য সম্প্রদায়ের” সভ্যগণ বিশেষরূপে প্রশংসিত হইয়াছিলেন। তারপর সুপ্রসিদ্ধ নাট্যকারদিগের কয়েকখানি সুবিখ্যাত নাটক উচ্চ প্রশংসার সহিত অভিনীত হইয়াছিল। এই শুভ সময়েই উক্ত “নাট্য সম্প্রদায়” ভুক্ত সভ্য শ্ৰীযুক্ত বাবু ভুপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যয়ের আন্তরিক চেষ্টায়—অমর কবি বস্কিমচন্দ্রের “চন্দ্রশেখর” সৰ্বজন প্রশংসিত হইয়া “কৰ্জন রঙ্গমঞ্চে” অভিনীত হইয়াছিল। ইহার পর “সঙ্গীত সমিতির” সুধী সভ্যমণ্ডলীর আন্তরিক অনুরােধে উৎসাহিত হইয়া, আমি “চণ্ডীরাম” নামক একখানি ধৰ্ম্মমূলক পঞ্চাঙ্ক নাটক রচনা করি। এই সময় আমি মধ্যে মধ্যে অটল বাবুর নিকট গমনাগমন করিয়া নাটক ও নাট্যাভিনয় সম্বন্ধে নানা বিষয়ে তাহার মতামত গ্রহণ করিতাম। “সঙ্গীত সমিতির সভ্যগণ মধ্যে নাট্যরসজ্ঞ, নাট্যামােদী, নিরপেক্ষ সমা- লােচক ও গুণগ্রাহী মাননীয় স্বর্গীয় কুমার দক্ষিনেশ্বর মালিয়া বাহাদুর, শ্রীল শ্রীযুক্ত বাবু ললিতচন্দ্র মিত্র, শ্রীযুক্ত বাবু অটলকুমার সেন, শ্রীযুক্ত বাবু বিজয়চন্দ্র সিংহ, এবং শ্ৰীযুক্ত বাবু অমূল্যপ্রসাদ ঘােষ প্রমুখ সভ্য মহােদয়গণ সৰ্ব্বদাই আমাকে “নাটকরচনা” বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করিয়া সহানুভূতি প্রদর্শন করিতেন। স্বনামখ্যাত অমর কবি স্বর্গীয় দীনবন্ধু মিত্র মহাশয়ের কৃতী পুত্র ললিত বাবুর আন্তরিক সহানুভূতিপূর্ণ উৎসাহবাক্যগুলি আমি স্মৃতিকথা। আমার জীবনে কখন বিস্মৃত হইতে পারিব না। স্বর্গীয় মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ মহােদয়ের সুশিক্ষিত সুযােগ্য পুত্র শ্রীযুক্ত বাবু বিজয়চন্দ্র সিংহ মহাশয় আমার প্রথম প্রণীত পঞ্চনাটক “চণ্ডীরাম” পাঠ করিয়া আনন্দিত হৃদয়ে নিজব্যয়ে “চণ্ডীরাম” নাটক প্রকাশ করিয়া দিয়াছিলেন। “সঙ্গীত সমিতির” সম্মাননীয় সভ্য স্বর্গীয় সিহাড়শােলাধিপতি কুমার দক্ষিণেশ্বর মালিয়া বাহাদুর আমার “চণ্ডীরাম” নাটক পাঠে আন্তরিক প্রীতিলাভ করিয়া দুইশত সংখ্যা ‘চণ্ডীরাম নাটক’ স্বেচ্ছায় ক্রয় করিয়া আমার প্রতি বিশেষ সহানুভূতি প্রকাশ করিয়াছিলেন। সুবিখ্যাত স্বর্গীয় সারদাপ্রসাদ ঘােষ মহাশয়ের বংশধর শ্রীযুক্ত বাবু অমূল্যপ্রসাদ ঘােষ মহাশয়ের কথা এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে বর্ণনা করা অসম্ভব—কারণ অমূল্য বাবুর ঋণ আমি জীবনে কখন পরিশােধ করিতে পারিব না। এই সকল মহামনা মনিষীদিগের আন্তরীক চেষ্টায় “ভারত সঙ্গীত সমিতির” নাট্য সম্প্রদায়ের সভ্যগণ দ্বারা অভিনয়ােপযােগী হইয়া, “চণ্ডীরাম নাটকের” যখন “ফুল রিহার্সাল” প্রদর্শিত হইল, তখন নাট্যামােদী সদাশয় সুধী সভ্যমাত্রেই “চণ্ডীরামের” “শিক্ষাভ- নয়” দর্শনে আন্তরিক প্রীতিলাভ করিলেন। এবং সঙ্গীত সমিতির গৃহে স্থানা- ভাব হইবার সম্ভাবনায় সর্বজনসম্মতিক্রমে সেই সময়ের সুবিখ্যাত “ক্লাসিক রঙ্গমঞ্চে” “চণ্ডীরাম” অভিনয়ের স্থান নির্দিষ্ট হইল। ইংরাজী ১৯০১ সালের ৯ই জুলাই তারিখে, “ক্লাসিক রঙ্গমঞ্চের” সত্ত্বাধিকারী এবং সুপ্রসিদ্ধ অভি- নেতা শ্ৰীযুক্তবাবু অমরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয়ের সহানুভূতিতে নাট্য-সম্প্রদায়ের সভ্যগণ দ্বারা আশাতীত উচ্চ প্রশংসার সহিত “চণ্ডীরাম নাটক” “ক্লাসিক রঙ্গমঞ্চেই” প্রথম অভিনীত হয়। এই “চণ্ডীরাম” নাটক সম্বন্ধে সুবিখ্যাত সংবাদপত্রসমূহ, এবং অমরবাবু স্বয়ং বিশেষ অনুকূল মন্তব্য প্রকাশ করিয়া- ছিলেন। সঙ্গীতাচাৰ্য্য শ্ৰীযুক্তবাবু চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় “চণ্ডীরাম চরিত্র” অভিনয় করিয়া, চণ্ডীরাম নাটককে চিরস্মরনীয় করিয়া রাখিয়াছেন। ।

স্মৃতিকথা। “চণ্ডীরাম” অভিনয়ের অব্যবহিত পরেই আমি “রত্নমালা” নামক বিচিত্রঘটনাপূর্ণ পঞ্চাঙ্ক নাটক রচনা করি। এই “রত্নমালা” নাটক লইয়াই কলুটোলার সুপ্রসিদ্ধ ধনকুবের স্বর্গীয় কানাইলাল শীলের দৌহিত্র শ্রীযুক্ত বাবু গিরিমােহন মল্লিক, আমার উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্বভার অর্পণে আমাকে ম্যানেজারের পদে নিযুক্ত করিয়া ভুতপূৰ্ব “রয়েল বেঙ্গল রঙ্গমঞ্চে” ইংরাজী ১৯০৩ সালের ৬ই জুন তারিখে “রত্নমালা” নাটকের প্রথম অভিনয় করিয়া “ইউনিক থিয়েটারের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। বৎসরাধিক এই ‘রত্নমালার’ উপর্যুপরি অভিনয়ে “ইউনিক থিয়েটার” কিরূপ সুযশ অর্জন করিয়াছিল তাহা বােধ হয় এখন পর্যন্ত অনেক নিরপেক্ষ গুণগ্রাহী দর্শকের উন্নত হৃদয়ে, সুখ-স্মৃতিস্বরূপ অঙ্কিত হইয়া আছে। “রত্নমালা” অভিনয়ের পর “জাহানারা”, “শ্রীরাধা”, “অন্নপূর্ণা”, “নতুন বাবু”, “অবাককাণ্ড” প্রভৃতি গ্রন্থ যাহা আমি রচনা করিয়াছিলাম তাহা ক্রমান্বয়ে “ইউনিক” ও “ন্যাশা- ন্যাল” রঙ্গমঞ্চে, উচ্চ প্রশংসার সহিত অভিনীত হইয়াছিল। এই সকল অভিনয় সম্বন্ধে সুবিখ্যাত সংবাদপত্র সমূহে যে সকল নিরপেক্ষ সমা- লােচনা প্রকাশিত হইয়াছিল তাহা বােধ হয় নাট্যামােদী সুধীমাত্রেই অবগত আছেন। “ইউনিক থিয়েটার” হস্তান্তরিত হইয়া “ন্যাশান্যাল থিয়েটারে পরিণত হইবার পর যদিও আমি উক্ত “ন্যাশান্যাল থিয়েটারের” কর্তৃত্ব ভার প্রাপ্ত হইয়াছিলাম কিন্তু বিশেষ কোন কাৰ্য্যসূত্রে আবদ্ধ হইয়া এই সময় আমাকে কলিকাতা পরিত্যাগ করিয়া বােম্বাই প্রদেশে গমন করিতে হয়। সেখানে অবস্থিতি করিবার সময় শুভাকাঙ্ক্ষী, সরল-চিত্ত সুহৃদ শ্রীযুক্ত বাবু বরেন্দ্রকৃষ্ণ ঘােষ মহাশয়ের উৎসাহবাক্যে উৎসাহিত হইয়া, পুনরায় নাটক রচনায় প্রবৃত্ত হই। “সের আফগান” নামক ঐতিহাসিক পঞ্চাঙ্ক নাটকখানি সম্পূর্ণ করিয়া প্রায় দুই বৎসরকাল পরে আমি কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করি। কলিকাতায় প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিকথা। পর আরও দুই একখানি নাটকের পরিশিষ্ট অংশ সম্পূর্ণ করা হয়। তাহাদের মধ্যে এই “ধৰ্ম্মপথ” নাটিকাখানিও গননীয়। আমি এ- বৎকাল আমার নব-রচিত নাটকাভিনয়ের জন্য কখন কাহার নিকট কোন প্রকার ইচ্ছা প্রকাশ করি নাই। কিন্তু কাৰ্যস্রোতের অনিবার্য প্রভাবে দুই চারিজন যথার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী গুণগ্রাহী, সহৃদয় সুহৃদের একান্ত অনুবােধ উপেক্ষা করিতে না পারিয়া আন্তরিক ইচ্ছা না থাকিলেও আমি আমার উক্ত “ঐতিহাসিক নাটকখানি” অভিনয়ােপযােগী হইয়াছে কি না জানিবার জন্য আমার পরম শ্রদ্ধাপদ স্বর্গীয় নাট্যসম্রাট গিরিশ্চন্দ্র ঘোেষ মহাশয়ের নিকট গমন করি। গিরিশ বাবু তখন “কহিনূর থিয়েটারের” অধ্যক্ষ ছিলেন। আমার “ঐতিহাসিক নাটকের ভূমিকা শ্রবণ করিয়া তিনি সন্তোষচিত্তে তাহার লেখক, পরম প্রিয়পাত্ৰ শ্ৰীযুক্ত বাবু অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে আমার ঐ নাটকখানি আদ্যোপান্ত পাঠ করিতে বলেন। অবিনাশবাবু নাটকখানি পাঠ করিয়া, যেরূপ নিরপেক্ষভাবে উদার অভি- মত প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহাতে উন্নতপ্রাণ গুণগ্রাহী গিরিশ বাবু নাটকখানি “কহিনূর রঙ্গমঞ্চে” অভিনয় করিবার জন্য আন্তরিক অভিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু ইহার অব্যবহিত পরেই নানাপ্রকার দৈবদুর্বিপাকে “কোহিনুর রঙ্গমঞ্চের” অবস্থা নিতান্ত শশাচনীয় হওয়ায় গিরিশ বাবু বাধ্য হইয়া কোহিনূরের সংস্রব পরিত্যাগ করেন। তাহার পর গ্রাম্য যােগীর ভিক্ষা প্রাপ্তি দুষ্কর জানিয়া” এতাবৎকাল আমি আর কাহারও নিকট আমার নাটক অভিনয়ের জন্য কোন প্রকার আগ্রহ প্রকাশ করি নাই। সাধারণ রঙ্গমঞ্চের সংস্রব পরিত্যাগ করিয়া একপ্রকার নিশ্চিন্ত মনেই অব- স্থান করিতেছিলাম। কিন্তু অনিবাৰ্য কাৰ্যস্রোতের প্রবল প্রবাহ আবার আমার উপর আসিয়া নিপতিত হইল। বন্ধুসম্মিলনীতে আবার আমার গ্রন্থ সম্বন্ধে আলােচনা হইল। দুই চারিজন নাট্যানুরাগী-হৃদয়বান-সুহৃদ আমার স্মৃতিকথা। নবরচিত নাটক শ্রবণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। অবশেষে তাহা- দের আন্তরিক সহানুভূতিপূর্ণ উপরােধে উৎসাহিত হইয়া, বর্তমান সাধারণ রঙ্গমঞ্চের বিধাতাপুরুষদিগের সন্নিকটে যাইবার জন্য উৎযােগী হইলাম। পরে কোন মহাত্মার নিকট গমন করিয়া সমস্ত কথা খুলিয়া বলিলাম। তিনি আমার নাটক সম্বন্ধীয় সমস্ত কথা শ্রবণ করিয়া বিশেষ সহানুভূতি প্রদর্শনে, উক্ত নাটকখানি অভিনয় করিবার জন্য প্রতিশ্রুত হইলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যেও তিনি উক্ত নাটকখানি শ্রবণ করিবার জন্য একদিনও সুযােগ প্রাপ্ত হইলেন না। ইহা দেখিয়া আমি ধৈর্য্যের সীমা অতিক্রম পূৰ্ব্বক স্বেচ্ছায় সকল আশা পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইলাম। পরে পুনরায় উক্ত শুভানুধ্যায়ী সুহৃদ্বর্গের আগ্রহ যত্ন ও অনুরােধে আবদ্ধ হইয়া, পুনরায় অন্য একটা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের ভাগ্যবিধাতার দ্বারস্থ হইলাম। সহানুভূতিপূর্ণ, সুমিষ্ট মৌখিক ব্যবহারে আপ্যায়িত হইলাম। আমার নবরচিত ঐতিহাসিক নাটক সম্বন্ধে একটু আলােচনাও হইল। পর ছিদ্রান্বেষী, কূট তর্কবাগীশ, পাণ্ডিত্যাভিমানী কোন এক নাট্যরথি নানা প্রকার কূট তর্কের অব- তারণা করিয়া আমার নাটক খানিকে উপেক্ষা প্রদর্শন করিতে লাগি- কিন্তু উক্ত নাট্যমঞ্চের ভাগ্য বিধাতা মহাশয়, নিতান্ত সদয় হইয়া আমাকে দুই জন সুশিক্ষিত-নাট্যরসজ্ঞ সম্রান্ত সুধীর নিকট হইতে আমার উক্ত নাটকখানি অভিনয়ােপযােগী হইয়াছে কি না এই সম্বন্ধে মতামত সংগ্রহ করিবার জন্য উপদেশ প্রদান করিলেন। মাননীয় শ্ৰীল শ্রীযুক্ত বাবু ললিতচন্দ্র মিত্র, ও মাননীয় শ্রীল শ্ৰীযুক্ত বাবু অটলকুমার সেন মহােদয়দ্বয়কে তিনি নিরপেক্ষ সমালােচক, গুণগ্রাহী ও নাট্যরসজ্ঞ জ্ঞানে ইহাদিগের মধ্যে কাহারও নিকট হইতে উক্ত “নাটক সম্বন্ধে মতামত সংগ্রহের জন্য অনুরােধ করিলেন। এবং ইহাদিগের মধ্যে স্মৃতিকথা। ৯ যে কেহ হউক উক্ত নাটক “সাধারণ রঙ্গমঞ্চের” অভিনয়ােপযােগী বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিলেই তিনি বিনা আপত্তিতে উক্ত নাটকখানি অভিনয় করিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন। আমি যেন তখন একটু আশার আলােক দেখিতে পাইলাম ! এবং ললিত বাবুর সময়াভাব জানিয়া “ভারত সঙ্গীত সমাজের” বর্তমান সেক্রেটারী চৌদ্দ পনর বৎসর পূর্বের পরিচিত অটল বাবুর নিকটেই গমন করিবার জন্য বাসনা করিলাম। এবং একদিন সন্ধ্যার সময় আমার নব রচিত “সের আফগান” নামক ঐতিহাসিক নাটকের পাণ্ডুলিপি হস্তে করিয়া, সিমুলিয়ার সেই ১০নং রাজেন্দ্রনাথ সেনের লেনস্থ “রাজেন্দ্র সদনে” যাইয়া উপস্থিত হইলাম। কি সূত্রে, কাহার দ্বারা আদিষ্ট হইয়া, কি কার্যের জন্য, আজ প্রায় চৌদ্দ পনর বৎসর পরে পুনরায় শারিপাড়ার সেই সুবিখ্যাত সেন বংশের “রাজেন্দ্র সদনে” আসিয়া উপস্থিত হইলাম, তাহা অজ্ঞানান্ধ মানব আমি সম্পূর্ণ কিছুই অবগত হইলাম না। নিরপেক্ষ গুণগ্রাহী এবং নাট্যরসজ্ঞ জ্ঞানে আমার ‘নাটক’ সম্বন্ধে নিরুপেক্ষ অভিমত সংগ্রহের জন্যই আজ আমি চৌদ্দ পনর বৎসর পরে, অটল বাবুর নিকট আগমন করিয়াছি কেবল মাত্র এই ধারণাই হৃদয়ে লইয়া, সেই পুরাতন পবিত্র “রাজেন্দ্র সদনে প্রবেশ করিলাম। এবং সমভাবে অবস্থিত সেই পুরাতন সােপানাবলী অবলম্বনে অটল বাবুর উপরের বৈঠকখানায় যাইয়া উপস্থিত হইলাম। অটল বাবু সে সময় বহিৰ্বাটীতে উপস্থিত ছিলেন না। আমি অটল বাবুর অতুল ঐশ্বর্যের কথা স্মরণ করিয়া মনে করিলাম যে, এই বিংশ শতাব্দির পরিবর্তনশীল- যুগে—আজিকার এই প্রখর সৌখীনত্ত্বের দিনে চৌদ্দ পনর বৎসরের মধ্যে—অটল বাবুর বৈঠকখানার কি কিছুমাত্র পরিবর্তন হয় নাই। অপরিবর্তনীয় “পীঠস্থানের ন্যায়” সেই সকল পুরাতন পশম-বিনিৰ্ম্মিত-পবিত্র স্মৃতিকথা । দেব-দেবীর চিত্রে শুশশাভিত হইয়া “সেন বংশের” সেই পুরাতন গৃহখানি এখন পর্যন্ত সমভাবেই অবস্থান করিতেছে। পরিবর্তনের মধ্যে দেখিলাম কেবল কয়েকটী বৈদ্যুতিক আলােক, ও কয়েকখানি পাখা, তাহাও নিতান্ত সাদাসিধা রকমের। সেই বনিয়াদী ঢালা বিছানা, সেই পুরাতন লিখিবার ডেক্স, সেই সমস্ত পুরাতন দ্রব্য সমভাবেই অবস্থিত রহিয়াছে। সেই অটল বাবুর স্বর্গীয় পিতৃদেব, মাতাঠাকুরাণী ও জ্যেষ্ঠ সহােদরের পবিত্র প্রতিমূর্তি সমভাবে সেই স্থানেই সংস্থাপিত থাকিয়া, সত্ত্বগুণপূর্ণ, নিরহঙ্কারী, অটল বাবুর উন্নত হৃদয়ের মােহীনতার প্রত্যক্ষ পরিচয় প্রদান করিতেছে। ১৩০৫ সালের শ্রাবণের “সাহিত্য মাসিক পত্রিকায়” চন্দননগরের সেই পর্ণকুটীর নিবাসী অসাধারণ উদ্যমশীল, মেধাবী মহাত্মা “কিঙ্কর সেনের” অদ্ভুত জীবন কাহিনী প্রকাশিত হইয়াছিল। পর্ণ-কুটীরবাসী হইয়াও “কিঙ্কর সেন” অসাধারণ বুদ্ধিবলে দিল্লীর বাদসাহের পাঞ্জার উপর কলম চালাইয়া বেগর তক্ত আওর জাফরান” বাক্য লিখিয়া অসীম সাহস প্রদর্শনে, প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় প্রদান করেন এবং এইরূপে বাদসাহের অনুগ্ৰহলাভে সক্ষম হইয়া, কিঙ্কর সেন “হুগলীর ফৌজদার” হইয়াছিলেন। সেই স্বনামধন্য স্বর্গীয় মহাপুরুষের পুণ্যপ্রতিপূর্ণ পবিত্র সেনবংশের বর্তমান কুল প্রদীপের আজ এ কি নিরহঙ্কারিতার পরিচয় ! অতুল ঐশ্বৰ্য্য সত্ত্বেও এত উদারতা, এত বিনীত ভাব, এত মাৎসর্য্যহীনতার পরিচয়, কয়জন ধনবানের গৃহে দেখিতে পাওয়া সম্ভব! ঐশ্বৰ্য গর্বে গৰ্বান্বিত হইয়া, অধিকাংশ ধনবানকেইত অহঙ্কারে আত্মহারা ও মদগৰ্ব্বে অন্ধ হইয়া থাকিতে দেখা যায়। আমি এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে কিছুক্ষণ অটল বাবুর বৈঠকখানায় একাকী উপবেশন করিয়া চতুর্দিক নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলাম যে, চৌদ্দ পনর বৎসর পূর্বে যাহা দেখিয়াছিলাম, তাহার মধ্যে কেবল দুই চারিখানি পশমনিৰ্মিত কৃষ্ণলীলার সুন্দর চিত্র এবং স্মৃতিকথা। ১১ দুই চারিখানি ফটোচিত্র নূতন সংরক্ষিত হইয়াছে। অটল বাবুর একখানি প্রতিমূর্তি দেখিয়া আমার তৈলচিত্র বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল, কিন্তু পরে জানিতে পারিলাম যে, বয়নশিল্প-বিদ্যা-বিশালিনী, অটল বাবুর গুণময়ী গৃহিণীর হস্তে উক্ত প্রতিমূর্তিখানি পশমের দ্বারা বিনির্মিত হইয়াছে। উক্ত চিত্রখানি যে, বয়নশিল্পবিদ্যার বিশেষ পারদর্শিতার পরিচয় প্রদান করিতেছে তাহার আর কোন সন্দেহ নাই। কিছুক্ষণ পরে অন্তঃপুর হইতে অটল বাবু, বহিৰ্বাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বহুদিন পরে অটল বাবুর সেই শান্ত সত্ত্বভাবপূর্ণ প্রশান্ত মূৰ্ত্তি দেখিয়া, আমি আনন্দিত হইলাম। যথারীতি প্রণাম করিয়া, অটল বাবু সহাস্য বদনে অতি মিষ্টভাষে, আমার এতদিন পরে আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি যে কারণে তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইয়াছিলাম, তাহা সমস্তই খুলিয়া বলিলাম। অর্থাৎ আমার নব-রচিত ঐতিহাসিক পঞ্চাঙ্ক নাটক “সের আফগান” আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া তিনি যদি নিরপেক্ষ ভাবে অভিমত প্রকাশ করেন, তাহা হইলে আমার নাটকখানি কোন সাধারণ রঙ্গ মঞ্চের” বিধাতা পুরুষের নিকট অভিনয় যােগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। অটল বাবুর চির উন্নত হৃদয়, পরােপকারের জন্য চিরদিনই উন্মুক্ত। তিনি আমার কথা শুনিবামাত্র অকুষ্ঠিত চিত্তে, সহাস্য বদনে, সম্মতি জ্ঞাপন করিয়া বলিলেন, “আমার পাঠ করা অপেক্ষা আপনি যদি সন্ধ্যার পর আসিয়া আমাকে পুস্তকখানি পাঠ করিয়া শ্রবণ করান, তাহা হইলে বাের হয়, মতামত প্রদানের পক্ষে উপযুক্ত ব্যবস্থা হইতে পারে।” যিনি শিয়ালদহ এবং প্রেসিডেন্সি কোর্টের অবৈতনিক বিচারকের পদে প্রতিষ্ঠিত, যিনি হাইকোর্টের স্পেশাল জুরার, যিনি অসংখ্য সভা সমিতির ব্যবস্থাপক, অতুল বিভবের যিনি একমাত্র অধীশ্বর, তিনি যে এক কথায় কোন প্রকার কুটীল পন্থা অবলম্বনে আপত্তি না স্মৃতিকথা। করিয়া, আমার ন্যায় একজন ক্ষুদ্র নাট্যকারের একখানি সুবৃহৎ “পঞ্চাঙ্ক নাটক” শুনিবার জন্য অম্লানবদনে সম্মত হইলেন, এবং কোনপ্রকার চাতুরী অবলম্বন করিলেন না, ইহা দেখিয়াই আমি আপনাকে ভাগ্যবান বলিয়া বিবেচনা করিলাম। কারণ কোন এক ভদ্রবংশীয় নামজাদা ব্যক্তির কথামত তাঁহারই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করিবার অভিপ্রায়ে, প্রায় ছয়মাসকাল তাঁহার নিকট গমন করিয়াও আমি তাহাকে এই নাটকের একটী ছত্রও পাঠ করিয়া শ্রবণ করাইবার অবসর প্রাপ্ত হই নাই! অথচ তিনি বাজে কথায় সর্বদাই সময় অতিবাহিত করিতেন। এই জন্যই লােকে বলে যে, এই মনুষ্যের মধ্যেই * সবই বৰ্তমান আছে। কাহাকেও বিন্দুমাত্র মনবেদনা প্রদান করিতেও মৰ্ম্মবেদনা অনুভব করেন। আবার কেহ কেহ মানব হৃদয়কে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া আত্মতৃপ্তিলাভ করিয়া থাকেন। অটল বাবুর শতসহস্র কার্যের মধ্যেও যে, প্রত্যহ সন্ধ্যার পর আমার গ্রন্থ শ্রবণের জন্য তিনি দুই ঘণ্টা করিয়া সময় নির্দিষ্ট করিলেন, ইহাতেই তাহার উন্নত হৃদয়ের বিশেষ পরিচয় প্রাপ্ত হইলাম। প্রায় পনর দিন ধরিয়া, ক্রমান্বয়ে আমার “নাটকখানি” মনননিবেশ- পূৰ্ব্বক আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া দুই একস্থানে সামান্য কিছু পরিবর্তন ও সংযােজনার জন্য অভিমত প্রকাশপূৰ্ব্বক, তিনি উক্ত “ঐতিহাসিক পঞ্চাঙ্ক নাটক” সম্বন্ধে নিরপেক্ষভাবে যে, মূল্যবান উদার মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা গুণগ্রাহী, নাট্টামােদী সুধীবৃন্দের অবগতির জন্য শীঘ্রই মুদ্রিত করিবার বাসনা রহিল। অটল বাবুর ন্যায় একজন সম্রান্ত সুযােগ্য সুশিক্ষিত নাট্যানুরাগী, নিরপেক্ষ ব্যক্তির উদার অভিমতের মূল্য নির্ধারণে যাহারা সক্ষম নহেন, সেরূপ ব্যক্তির সম্বন্ধে কোন প্রকার মন্তব্য প্রকাশ না করাই যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করিলাম। এবং “সের আফগান রচনার জন্য, আর আমি কোন ক্ষোভই রাখিলাম না। কারণ উক্ত নাটক সম্বন্ধে, স্মৃতিকথা। অটলবাবুর নিকট হইতে আমি যে মূল্যবান মন্তব্য প্রাপ্ত হইয়াছি, তাহাতেই আমার নাটক রচনার সকল শ্রম সার্থক হইয়াছে। “সের আফগান নাটক” সের আফগানের উন্নত দেব চরিত্রের আদর্শ অবলম্বনে লিখিত হইয়াছে। আমি আন্তরিক প্রীতির সহিত এই অদ্ভুত ঘটনাপূর্ণ বিচিত্র বিয়ােগান্তক নাটক “সের আফগান” অটলবাবুর পবিত্র নামে উৎসর্গ” করিবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলে, অটল বাবু সরলভাবে বলিলেন যে, “বিয়ােগান্তক নাটকের উৎসর্গ তাহার নামে না হইলেই ভাল হয়”। “বিয়ােগান্তক নাটক” আধুনিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মতে উন্নত স্থান অধিকার করিলেও তিনি “বিয়ােগান্তক” অপেক্ষা “মিলনান্তক” নাটকই অধিক পছন্দ করিয়া থাকেন। এই সময়ে আমি আমার “ধর্মপথ নাটিকার” কথা উল্লেখ করিয়া তাহার নামে “উৎসর্গ” করিবার আন্ত- রিক অভিপ্রায় জানাইলাম। তাহাতে তিনি কোন প্রকার আপত্তি উত্থাপন না করাতে, আমি তাঁহাকে আমার নবরচিত করুণ রসা- ত্মক মিলনান্তক “ধৰ্ম্মপথ নাটিকাখানি পাঠ করিবার জন্য অনু- রােধ করিলাম। অটলবাবু তাহাতে সম্মতি জ্ঞাপন করিয়া, “ধৰ্ম্মপথ” নাটিকা খানি শ্রবণ করিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। আমি যথাযথ রূপে “ধৰ্ম্মপথ” সম্বন্ধীয় সমস্ত বিষয় অটল বাবুকে শ্রবণ করাইলাম। করুণরস পূর্ণ, ধৰ্ম্ম-ভাবময় ক্ষুদ্র নাটিকা খানির ভূমিকা শ্রবণ করিয়াই অটল বাবু তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ গুণগ্রাহিতার গুণে, “ধৰ্ম্মপথের” উন্নতভাব হৃদয়ঙ্গম করিয়া, উহা প্রকাশ করিবার জন্য আমায় অনুরােধ করিলেন, এবং “ধৰ্ম্মপথ” “ভারত সঙ্গীত সমাজে” অভিনয় করিবার জন্য, আমাকে ব্যবস্থা করিতে বলিলেন। আমি অটল বাবুর এইরূপ অকপট সদাশয়তা দর্শনে আন্তরিক আনন্দ অনুভব করিলাম। যাহার নিরপেক্ষতার ফলে আজ আমার এই “ধৰ্ম্মপথ” প্রকাশিত হইয়া ভারত সঙ্গীত সমাজের ১৪ স্মৃতিকথা। সম্মাননীয় সুধী সভ্যবৃন্দের সম্মুখে অভিনীত হইবার সুযােগপ্রাপ্ত হইয়াছে, তাহার পবিত্র করে এই পবিত্র গ্রন্থ “ধৰ্ম্মপথ” উৎসর্গ করিয়া এবং তাঁহার পবিত্র প্রতিমূৰ্ত্তি এই গ্রন্থের সহিত গ্রথিত করিয়া আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিলাম। যিনি নিরপেক্ষ গুণগ্রাহী, তাঁহার নিকট সকলের গুণই সমান ভাবে সমাদৃত হইয়া থাকে। অটল বাবুর নিরপেক্ষ,উদার উন্নত সরল ব্যব- হারে, সকলেই সমানভাবে সন্তোষলাভ করিয়া থাকেন। কোন এক বিশিষ্ট সম্প্রদায় বিশেষের সভ্য সম্মিলনীর ফটো চিত্রে অটল বাবুর উচ্চ সম্মানলাভ দেখিয়া, বিশেষ আনন্দিত হইলাম। একপার্শ্বে তৎসাময়িক বঙ্গেশ্বর স্বয়ং “স্যার এণ্ড ফ্রেজার” ও একপার্শ্বে মহামান্য “মহারাজাধি- রাজ-বর্ধমানাধিপতি উপবেশন করিয়া “অটল বাবুর” উচ্চ সম্মানকে যেন চিরদিনের জন্য গৌরবময় করিয়া দিয়াছেন। অটলবাবু সকল সমাজে, সকল প্রকৃতির লােকের সহিত সমানভাবে সংমিশ্রিত হইয়াও নিজ উন্নত আদর্শ চরিত্রকে চির পবিত্র করিয়া রাখিয়াছেন। বংশমর্যাদাকে আমাদের দেশের লােকে যে কেন এত মূল্যবান বিবেচনা করেন তাহা অনেক সংশের সুসন্তানদিগকে দেখিলেই বুঝিতে পারা যায়। উচ্চবংশের উচ্চ গৌরব অক্ষুন্ন রাখিতে যাহারা সক্ষম, তাঁহারাই বংশমর্যাদার পরিচয় প্রদানের যােগ্যপাত্র। নচেৎ অতি ঘৃণিত, জঘন্যকাৰ্য্য দ্বারা চরিত্র কলুষিত করিয়া, যাহারা কেবল অসার অহঙ্কার- পূর্ণ গর্বিত বাক্যে বংশ মর্যাদার পরিচয় প্রদান করিয়া, সংসারে বৃথা সম্মানলাভের জন্য ব্যতিবন্ত হন, তাহারা কেবল লােক সমাজে ঘৃণিত ও নিন্দনীয়ই হইয়া থাকেন। অটল বাবুর নির্মল চরিত্র, উদার উন্নত সরল ব্যবহার, নিরপেক্ষভাবে সকল অবস্থার ব্যক্তির সহিত সমানভাবে সদালাপ, নিরহঙ্কারী হইয়া বিধিপূর্বক সামাজিক কাৰ্যের অনুষ্ঠান প্রভৃতি বংশগত গুণ গরিমার পরিচয় প্রদানে সক্ষম হইয়া, যাহারা অটল ৰাৰুর র স্মৃতিকথা। বংশ-মৰ্য্যাদার গােরব প্রকাশ করেন, তাহাদের সে বংশ গৌরব শুনিবার ও শুনাইবার উপযুক্ত। অটল বাবুর পিতৃকুলের পরিচয় বােধ হয় “সাহিত্য পত্রিকার পাঠকমাত্রেই অবগত আছেন। সন ১৩০৫ সালের শ্রাবণের “সাহিত্য মাসিক পত্রিকায়” স্বনামধন্য “কিঙ্কর সেনের অদ্ভুত জীবন- কাহিনী শ্ৰীযুক্ত বাবু যােগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় মহাশয়দ্বারা বিশেষরূপে বিবৃত হইয়া লিখিত হইয়াছে। সেই “সেন বংশের আদি পুরুষ ও প্রতিষ্ঠাতা “হুগলীর ফৌজদার” “ভায়া কিঙ্কর সেনের” বংশগৌরব আজ পৰ্য্যন্ত সেন বংশধর অটল বাবুর দ্বারা অক্ষুন্নভাবে অবস্থিত রহিয়াছে। অটল বাবুর বৃদ্ধ প্রপিতামহ মহাশয় চন্দননগর হইতে প্রথম কলিকাতার সিমুলিয়ায় (বর্তমান কাসারি পাড়ায়) আসিয়া বাস করেন। প্রপিতামহ রাধামমাহন সেন মহাশয় সাময়িক কবিত্বশক্তিসম্পন্ন বলিয়া খ্যাতনামা হইয়া ‘সঙ্গীত তরঙ্গ” নামক পুস্তক রচনা করিয়া অসাধারণ কবিত্বশক্তি ও সঙ্গীতবিদ্যার পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন। অদ্যাবধি অনেক সুরজ্ঞ ব্যক্তি উক্ত “সঙ্গীত তরঙ্গ” নামক গ্রন্থকে বিশেষ সম্মান করিয়া থাকেন। পিতামহ ভােলানাথ সেন গভর্ণমেন্টের নিমক মহলের ডেপুটী দাওয়ান ছিলেন। এই সময় মহাত্মা দ্বারকানাথ ঠাকুর নিমক মহলের দেওয়ানের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পিতা রাজেন্দ্রনাথ সেন বানহাউসের সম্মাননীয় “বেনিয়ানের” পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া অশেষবিধ সম্মানলাভ করিয়াছিলেন। পরে অটলবাবুর জ্যেষ্ঠ সহােদর আদর্শ-চরিত্র স্বর্গীয় মহাত্মা সনৎকুমার সেন মহাশয় প্রায় একুশবৎসরকাল ঐ কার্যে নিযুক্ত থাকিয়া অশেষ প্রকারে যশস্বী হইয়া কাৰ্যদক্ষতার পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন। বর্তমান অটলবাবু স্বয়ং ঐ পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া আছেন। অটলবাবুর পিতৃকুলের পরিচয় যেমন গৌরবমণ্ডিত, মাতামহকুলও তদ্রুপ মহা-যশগৌরবে বিভূষিত। শ্যামবাজারের সুবিখ্যাত কৃষ্ণরাম বসুর বংশধর বাঙ্গলাদেশে সর্বপ্রথম স্মৃতিকথা। যিনি নাটকাভিনয়ের সৃষ্টি করিয়াছিলেন, সেই সুবিখ্যাত মহামহিমান্বিত মহাত্মা নবীনচন্দ্র বসু অটল বাবুর মাতামহ। যিনি মাতৃকুল ও পিতৃকুর গুণ গৌরকে ধন্সৰ্ব্বদাই গৌরবান্বিত সেই সদাশয় মহাত্মা অটল বাবুর অর্থব্যয়, আগ্রহ, যত্ন ও নিরপেক্ষ গুণগ্রাহিতার ফলে আজ আমার এই ক্ষুদ্র নাটিকা “ধৰ্ম্মপথ প্রকাশিত হইয়া কলিকাতার প্রধান সম্মাননীয় প্রমােদর ভারত সঙ্গীত সমাজের নাট্যমন্দিরে অভিনীত হইয়া “নাটক” ও “ট্যকারকে” চির গৌরবান্বিত করিয়া রাখিল। ভগবান অটলবাবুর ন্যায় নির্মলচরিত্র, নিরহঙ্কারী, সদাশয় মহাত্মাকে এবং তাহার শান্ত-স্বভাব, প্রিয়দর্শন একমাত্র বংশধর স্নেহাস্পদ শ্রীমান অচলকুমার সেনকে সুস্থদেহে দীর্ঘজীবি করিয়া—সেনবংশের পবিত্র সংসারে শান্তিধারা বর্ষণ করুন! ইহাই এই গ্রন্থকারের আন্তরিক প্রার্থনা ! ইতি— সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বিনীত গ্রন্থকার।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dharmapath

Author
Chattopadhyay, Satishchandra
Title
Dharmapath
File name
Dharmapath
Text
OCR done
Citation
1914
Published
2009/09/20
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
139
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Shibsharma
DLI number
512593
Barcode
4990010019653.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
AVLKEkC6hQw
Download PDF

Dharmapath