Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Rangin Suto Ed.2

Sanyal, Probodh Kumar · 2010/04/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ৰঙীন সুতে
প্রবােধকুমার সান্ন্যাল
হিন্দুস্থান বুক ডিপাে
১২নং বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ত্রীট
কলিকাতা

ঙন সুতাে
দ্বিতীয় সংস্করণ
মার্চ ১৯৪৬
প্রচ্ছদপটশিল্পী-কমল চট্টোপাধ্যায়
মুল্য দুই টাকা
হিৰ বুক ডিপাে, ১২নং বঙ্কিম চ্যাটার্জি দ্রুট, কলিকাতা হইতে সন্তোষ সেন গুপ্ত
কর্তৃক প্রকাশিত ও ব্যবসা ও বাণিজ্য প্রেস হইতে সুরেন্দ্রনাথ যােব
কর্তৃক মুজিত।

এপাবে ছোট সহব, মাঝে নদী, নদীর ওপাবে নির্জন বালুচড়া। সকাল-সন্ধ্যা খেয়া নৌকা পারাপার করে। ওপারের একটি আঁকাবাঁকা পথবে প্রান্তবের উপর দিয়ে বহুদুর পয্যন্ত ষ্টেশনের দিকে চলে গেছে, শ্রাব কিছুদূর গেলেই ত্রিবেণীব ঘাট পাওয়া যায়। নদীর পবপাবে বালুচড়ায় আমরা পরস্পবের দেখা পেতাম। 'আজো পাই , আমার জীবনেব বঙ্গমঞ্চে চন্দ্রার প্রবেশ ও প্রস্থান আজো চচে। গ্রহ-তা বকাব চক্রান্ত। পাই। চন্দ্রাব স্বামীও নেই, সন্তানও নেই। সে শস্যশ্যামলা নয়, একখণ্ড মরুভূমি। সে-চন্দ্রার উপর দিয়ে মেঘের মত ভেসে চলে যাই, সে মামার বর্ষণকে টেনে নেয় না। সে বিস্তৃত, অগাধ, কিন্তু রুক্ষ। মধ্যে কাব্য নেই, আছে ইতিহাস। কি বল চন্দ্রা, তাই নয় ? বর্ষার এই দিগন্তজোড। ক্লান্ত সন্ধ্যার দিকে তাকালেই, বুঝলে ১া, 'আমার শনেব মবো বেলাদিদির পদশব্দ শুতে বেলাদিদির সঙ্গে তােমার কোথায় যেন একটি চরিত্রগত ঐক্য রয়েছে। বেলাদিদি শ্রদ্ধা কবেন পুরুষত্বকে, ববিত্বকে। অত্যাচারীর প্রতি আমাৰ কৰুণা, তঁাব কিন্তু আক্রোশ। যারা সাঁতার কেটে সাগর পাব হয়, যা উডো জাহাজ থেকে পাহাড়ের চূড়ায় লাফিয়ে পড়ে, যুদ্ধে যারা প্রাণ দেয়, যারা লাঠালাঠি কবে, ট্রেণ থেকে ঝাপ দেয়, ফুটবল খেলে পা ভাঙে, যারা বিপ্লবী, তাদের কথায় বেলাদিদির অহেতুক আনন্দ। বেলাদিদি বড় ঘবেব মেয়ে, মােটরে ছাড়া তিনি চলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়েব শেষ উপাধিটি আঁর কণ্ঠলগ্ন বঙীন সুতাে হয়ে ধন্য হয়েছে। সম্রান্ত সমাজের, তার ভক্তেব সংখ্যা অনেক। এত শিক্ষা এত জ্ঞান তবু বেলাদিদি কেমন ধীরে ধীবে নেমে এলেন। রূপবতী মেয়েকে বুঝি, কিন্তু রূপ সম্বন্ধে যে-মেয়ে বিশেষ সচেতন, তাকেও কি সহজে বােঝা যায় চন্দ্রা ? বেলাদিদিবও আগুন ছিল। বেলাদিদি একজনকে ভালবাসেন, কিন্তু সে ভালবাসা নয়। ভালবাসা যে নয় জানলাম এই সেদিন। বেলাদিদি আজ সব ভুলে গেছেন, কেবল ভুলতে পারেননি আগেকার ঐশ্বর্য্য- বিলাস। সেদিন দেখি একটি গলির মধ্যে একটা গ্যাসের আলাে নীচে ফিটফাট পবিচ্ছদে গা ঢেকে দাড়িয়ে বেলাদিদি সিগাবে টানছেন। চমকে উঠা না চা, জীবনেব গতি সব সময় সােজা দিবে নয়। এ ভ' সন্ধ্যাব বাদল, কিন্তু তােবেব বর্ষণের দিকে তাকালেই যাব কথা আমার প্রথম মনে পড়ে সে বেলদিদি নয়, আব এক জুন সেও বর্ষা, আমার ক্ষেতে ফলিয়েচে সে অনেক ফসল। তার কথা বলতে গেলে আমার প্রত্যেকটি বােমকূপ পয্যন্ত মুখরিত হয়ে ওঠে। চন্দ্রা, তাকে নিয়ে কোনদিন গল্প লিখতে বসবাে না এই আমার আনন্দ। সে আমার প্রকাশ নয়, বিকাশ। মূলধন নয়, গুপ্তধন । তার কথা ভাবলেই আমি রূপবান হয়ে উঠি। সে বোধ হয় প্রদীপ শিখা, আমার মনের কাছাকাছি এলেই আমি আলােকিত হয়ে উঠি। সে আমার আত্মার ঘুম ভাঙিয়েছে।

=
গল্প লেখা চলে না ।
আমা1 জীনে কয়েক বার জ্বলে উঠেছিল
নই। আমি বেশ জানি, স্বামী তাব
বর্তমান ১
সান্নিধ্যকে এড়িয়ে চলে।
তবু মনি স্বামীকে পাৰ্ব্বতী ভালবাসত এখনকার যে-কোনাে সভা-
• এর মত। কারণ পাৰ্বতী দুব্বল নয়, ভব নয়—আমার সঙ্গে
তার যে সম্পর্ক ছিল তা স্বামী-স্ত্রীব চেয়েও গভীরতব। আমি ঝঞ্চ”
দেখচি, দাবানল দেখেচি, ইবাবতী নদী দেখেচি, তাই পার্বতীকে
আমি সহজেই চিনতে পাবি।
পার্বতীকে দেখে পার্বতীকে আঁকা যায় না। সে হয় চিত্র—চরিত্র
নযু। হুবহু চরিত্র নকল করাটা শুধু প্রকাশের কৃতীত্ব, তাতে গল্পে

ده وو । একটি একটি কবে’ কলের প্রদীপ নিয়েই ত আমার দাপ- ৬ৎসবের দিনে আমি তাকে কেমন কবে শুনবো, প্রাণ-মন্দিবে যেন সন্ধ্যাদীপ দিয়ে গেছে। সন্ধ্যাদীপের শতই সে ভীরু, ক্ষণিক, দুৰ্বল দেখতে দেখতে সে নিলিয়ে যায়, সে কল্পনা নয়, মনােবিলাস নয়, সে সত্য কিন্তু স্বল্পায়ু। ভেবেছিলাম তাকে নিয়েই গল্প লিখব। গল্পেব উপাদান ভাব মধ্যে প্রেমের গল্প নয়, তার ব্যর্থ জীবনের ইতিবৃত্ত। যুগে যুগে যে নারীব দলের অশ্রু ও দীর্ঘশ্বাস আমাদের সমাজে জীর্ণতা এনেছে সেও তাদের একটি। অপমানিত হয়েছে সে অকাবণে, অবহেলা ও তাচ্ছিল সে স কবেচে ভাব সকল দিকের যােগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, প্রচুর।

রঙীন সুতো
নিয়তির লাঞ্ছনা সে মাথায় পেতে নিয়েছে নিরপরাধেই-জীবন যে
তার ব্যর্থ হয়ে গেল তার জন্যে সে বিধাতার বিরুদ্ধে কোনােদিন
প্রতিবাদ জানায়নি।
সে মেয়েটির জীবন সুদুব-বিস্তৃত, তাকে নিয়ে গল্প লিখতে পারি,
কিন্তু কলমের এত কারুণ্য কোথায় পাব? নিপীড়িত জীবনের দিকে
তাকিয়ে যুগে যুগে যারা গল্প ও কবিতা সৃষ্টি করে গেছে, ৰূপে রসে
মমতায় রূপকে যারা অপরূপ করে গেছে, তাদের
হৃদয়ের উদার
কারুণ্য আমি কোথায় পাবাে ? আমি চিন্ময়ীকে নিয়ে গল্প লিখতে
পারি, কিন্তু সে সাহিত্য হবে না, সে হবে ইতিহাস। ঘটনাকে ও
চরিত্রকে যারা গল্পের প্রথম ভূমিকা থেকেই কারুণ্যের আবরণে ঢাকবার
চেষ্টা করে, তারা এখনো সাহিত্য লিখতে শেখেনি।
চিন্ময়ীকে নিয়ে
লেখা তাই আমার
পক্ষে কঠিন।
বুঝলে চল ?
আমি লিখতে পারি তার প্রমাণের অভাব নেই, কিন্তু ভাল
লিখি এমন প্রমাণ
ভালো লেখা মানে ভাল করে’
লেখা নয়। মেয়ে সুন্দরী, প্রসাধনও তার নিপুণ, সৰ্বাঙ্গ যৌবনের
গর্ধ্বে গর্বিত, ষ্টাইলও ভাল,কিন্তু তাতে কী এসে গেল? সাহিত্যে
হৃদয়হীনা সুন্দরীর স্থান নেই। যদি বা থাকে, মহাকালের বিচারে
তার হবে চির নির্বাসন দণ্ড। বিশুদ্ধ হৃদয়াবেগের ঐশ্বৰ্য্য যে রচনায়
নেই, দেবী ভাবতী তার উপর দৃষ্টি করেন না। তিনি চান ফুল, সে
ফুল গন্ধহীন হােক, কিন্তু কাগজের তৈরী না হয়।
অতি অল্প।
৫

বঙীন সুলতা কাগজের তৈরী না হয়, এই কথাই আমি চাকে সেদিন বলতে চেয়েছিলাম। ওপারেব বালির চড়ায় বসে চন্দ্রকে আমার সেদিনেব ‘মােহ, মায়া ও মতিভ্রমের কয়েকটা কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই মনে হলাে, মেয়ে-বন্ধুর কাছে হালকা প্রেমের গল্প বলাব মত বিড়ম্বনা সংসারে আর কিছু নেই । প্রেমের গল্প বলেচি এইজন্যে যে, চন্দ্রা আমার বন্ধু, আর কিছু নয়। চন্দ্রা যে আমার আর কিছু নয় তা সেও জানে। জানে বলেই চাব কাছে আমার কোনো কলা গােপন নেই। কলঙ্ককে কাপড় চোপড় পরিয়ে ভদ্র-সমাজে পবিচিত কবে দিনেই তার নাম হল প্রেম। প্রেমকে নিয়ে তাই সংসারে যত চোখের জল, যত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। শোনো চা: একটি মেয়ে, ঘুবিয়ে কাপড় পরা বেশ একটি আধুনিক মেয়ে, বিয়ের বয়স হয়ে গেছে কিন্তু মাথায় সিদুব নেই,—বােধ হয় দেশ খৃশ্চা, অর্থাৎ পাত্র জোটেনি। হঠাৎ হ’ল আলাপ হাওড়া স্টেশনে। মেয়েটি নিজেই আলাপ কবল, তাত’ করবেই। যে-পুরুষের চোখে আর ভঙ্গীতে আসবি ছায়া অল্প, তার সঙ্গে যেচে আলাপ করা কোনাে কোনো মেয়ের পক্ষে সহজ। আলাপ করেই জানালা, সে তার ছোট মাসিমাকে পুরীব গাড়ীতে তুলে দিতে এসেছিল। মেয়েটি হাসপাতালের নাস', নাম, একটা মিথ্যে নামই বলি-ইন্দুমতী। শােনাে চা: আলাপ হল। তারপব? বাজ্যের বাজে কথা, মিথ্যা মৌখিক

বঙীন সুত
'।
ভদ্রতা, অকারণ বিনয়, অসহ্য ন্যাকামি। কি আশ্চয্যি, অপনাকে
যেন কোথায় দেখেচি, আপনি খুব ঘুবে বেড়ান্ ত ? এত রাতে
আপনি একা মেয়েছেলে হয়ে, চলুন পৌঁছে দিয়ে আসি আপনাকে।
কোন দিকে যাবেন ?
“না না, একাই যেতে পারব, এই ত’ শিয়ালদা’ব কাছে আমাদের
বাড়ী। মিষ্টাব দত্তকে চেনে?
এই ভােকেট আমার
।
বাৱিব অন্ধকার। অবশ্য ঘন অন্ধকার নয়, অত আলাে জলচ
চারিদিকে। তবু বাত্রির অন্ধকাব বললে বুঝবে, অপরিচিত দুটি
নবনাবী রাত্রির আলােয় রাস্তায় একসঙ্গে যেতে যেতে কী ভাবে।
উঠলাম গাড়ীতে, চলো ছুটে। ছুটলো ভবানীপুরের দিকে। মােটরে
কবে' এক হােটেলে এসে দু’জনে নামলাম। প্রেম নয়, প্রেমের
ভূমিকা। খেলাম দু’ পেয়ালা চা। তাকে নিয়ে সময় কাটানােই তখন
আমার কাজ।
ইন্দুমতী এক সময় আকুঞ্চন কবে বল, ‘আপনি কি নেশা
করেচেন ? দেখুন, আমার কিন্তু অনেক বাত হয়ে যাচ্ছে, বরং আর
একদিন না হয়--
হাত ধবে তাকে আবার গাড়ীতে তুলে নিয়ে বললাম ‘ভয় কি ?
শােনাে চা:
মােটব ছুটে চল। মেয়েটির ভয় ছিলনা, ছিল একটা জড়িত
সঙ্কোচ। আরো ছিল অসহায়তা, মানে বিপদে পড়ে অসহায় নয়,
৭

রঙীন সুতো নিজেকে দুর্বল জেনে সে অসহায়-অর্থাৎ এই সাধারণ মেয়ের মতই আর কি। এমন বললাম না যে আমি তাকে ভালবাসি, সেও যে তা শুতে চায় এমন মনে হল না। তবু রাত্তির অন্ধকারে এক-পথ থেকে আর এক-পথে কেন আমাদের এই ঘােরাঘুরি, সে প্রশ্ন বিধাতা করবেন আমাদের ভিতর দিয়ে। যাক সে কথা। লেরােড হয়ে ঘুবে এসে গডের মাঠের কাছে নেমে গাড়ী ছেড়ে দিলাম। তারপর ? যাই কোথা ? মনে হলো আমরা দুজনেই নির্জন, একান্ত,-আমরা কি পথ হারালাম ? মাঠের মধ্যে চলতে চলতে গভীর অন্ধকারের মধ্যে এক সময় ইন্দুমতীর হাত ধরলাম। চলা, তুমি জান আমার সত্য পরিচয় কী। জনসাধাৰণেব চক্ষুর অন্তবালে এসে ইন্দুমতী একটু মিঞ্চ হাসি হাসল। ইন্দুমতীর চরিত্র পরিপূর্ণরূপে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে, লােকচক্ষু যখন তাকে আর দেখতে পায় না। মেয়েদের অনেকটা অভাবই এই। দয়িতের জন্য তাদের অশ্রুজল পড়ে নিভৃতে, পাপে কলাকৌশল তার সন্ধান করে একান্ত নির্জনে, সত্যকারের নারীত্ব তাদের উদ্বোধিত হয়ে ওঠে গোপন তপস্যায় । ইন্দুমতী হাসল কিন্তু সে-হাসি পুরুষ-সান্নিধ্যজনিত আসক্তির নয়, মাঠের মাঝখানে তার সে-হাসি দেখে চোখে আমার ঘুম জঙিয়ে এল। চন্দ্রা, তুমি হয়ত হাসবে আমার কথা শুনে, সংস্কৃত শ্লোক আউডে তুমি হয়ত আমায় লজ্জাই দেবে। কিন্তু তুমি জানাে না,

রঙীন সুতো
চন্দ্র,
মেয়েদের আমি ম্মান না দিয়ে পারিনে। তারা দুর্বল তাই
তাদের আমি ভালােবাসি। মেয়েদের সম্বন্ধে আমি আইন-অমান্ত
করি কিন্তু টেররিজম্ করিনে।
হাত ধরে ইন্দুমতীকে বললাম, তারপর ? এবার কি করবে ?
থতিয়ে গিয়ে বল, কি করব বলুন ?
শশানো চন্দ্রা : আমি তার একটি হাত চুম্বন করলাম।
সব মেয়েই জানে আমার কাছে তাব। কী নিরাপদ। সব মেয়েই
জানে আমি তাদের ভালবাসায় হয়ত ঠকিয়েচি, কিন্তু ভালে'
ব্যবহারে ঠকাইনি। চন্দ্রা, তুমি আমার সব জানো।
আমি যদি কল্পনা করতাম তা হলে হয়ত ভাল গল্পই তৈী হ'ত,
কিন্তু তা হবার নয় এও জানি, সত্য ঘটনা কুশলী শিল্পীর হাতে
বিকৃত হয়ে একটি সাহিত্যের রূপ পায় । কিন্তু ইন্দুমতী আমার
জীবনের একটি সামান্য আকস্মিক ঘটনা। এমনিই আকস্মিক যে,
আমি ভেবেই পেলামনা, সে বাত্রে তাকে নিয়ে আমি কি কবি
এবং কোথায় যাই। আমার সত্য পরিচয় হচ্ছে যে, আমি ভদ্র।
বন্ধুত্ব করবার সময় আমার কেবলই মনে হয়, এ বন্ধুত্ব আমি রক্ষা করব
কেমন করে'।
মাঠেব অন্ধকারে ইন্দুমতীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আমার কেমন
যেন মায়া হলো তার ওপর। আমি একবার আকাশের তারাব দিকে
তাকিয়ে জীবনের গভীরতম ভাষাকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করলাম।
আমাৰ উত্তেজনা ছিল না, ছিল ব্যাকুলতা। আমি যে চিরদিনের
১

বঙীন সুতাে
ব, আপনি
পথভ্রান্ত তা আমি ভুলে গেলাম। নিজের সম্বন্ধে সকলের চেয়ে বড়
প্রশ্নটাই সর্বপ্রথম আমার মনে হলো, ইন্দুমতী কি সেই নারীর দলের
একজন, যাদের ভিতর দিয়ে
জন্ম-জন্মান্তর ধরে আমি নিজেকে
আবিষ্কার করবার চেষ্টা কবেচি ?
স্নিগ্ধ কণ্ঠে ইন্দুমতী
ইন্দুমতী ব,
‘আপনি এমনি
কবে
কল্কাতার পথে ঘুরে বেড়ান্? কেন ? এ অবস্থায় আপনি বাড়ী
বিবেন কেমন করে ?
চন্দ্রা, সত্যি বলছি ইন্দুতী আমাব কেউ নন, আজো তার সঙ্গে
আমার কোনাে সম্বন্ধ গড়ে ওঠেনি, তবু সে-বাত্রে আমার চোখে জল
এসেছিল। তুমি বলবে, নেশা কবনেই আমার চোখে জল আসে।
হ্যা, তা সত্যি, নেশা করে নিজের চেহারা দেখে আমার কান্না পায়।
কিন্তু ইন্দুমতীর আয়নায় নিজেকে দেখাম যে। সে-মেয়েটি আমার
একটি বাত্রির বন্ধু ।
শােনাে চন্দ্রা : আমার ঠিকানা ইন্দুমতী টুকে নিয়ে গেছে। বলে
গেচে, আমার ঋণ সে জীবনে ভুলবে না, আমিই নাকি তার প্রথম
পবমাত্মীয়।
তার একটি হাত ধরে আমি খেলা করেচি, এই তার আনন্দ।
সে-বাত্রে তাকে শিয়ালদা ষ্টেশনের কাছে পৌছে দেবার সময় সে বল্ল,
‘অমুক দিন আসছি আপনার কাছে, সেদিন হাসপাতালে আমার ছুটি।
এসেছিল বৈকি। সে গল্প যেমন অপূৰ্ব তেমনি আজগুবী চন্দ্রা,
তুমি শুনবে সে গল্প ?,

রঙীন সুতো গল্পটা যতক্ষণ মনে মনে থাকে ততক্ষণ সে পাকা সােণা। কিন্তু গাহিত্যের ব্যবহাবে সে পাক সােণা চলে না। সে সােণায় খাদ নিশিয়ে বাইরে আতে হবে। সাহিত্যে সেই গিণি সােনার দাম বেশী। ঔজ্জ্বল্য, মনােহারীত্ব, চাকচিক্য-এই হচ্ছে গিনি সােণাব রূপ, এবং তাই হচ্ছে সাহিত্য। সত্যি নয় চন্দ্রা ? সাহিত্যে আমবা যে, জীবনেব আস্বাদ পাই, তব মূলগত অনুপ্রেরণা হচ্ছে আমাদের ব্যবহাবিক জীবন। এমন লেখকের অভাব আমাদের দেশে নেই, যার ব্যবহারিক জীবনের সংবাদ-সমষ্টি সাহিত্য- বা অধিকার কবে’ সৌন্দৰ্যময় সাহিত্য-জীবনকে ম্লান কবতে উদ্যত হয়েচে। ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা যদি লক্ষ জীবনের তারে তারে প্রকাশের কৃতীত্বে অনুবণিত না হয়ে ওঠ, তাহলে বুঝতে হবে সাহিত্য- বিচাবে তাব কানা কড়িও মূল্য নেই। সাহিত্যের এই গােলাকার কথাটা আমার মনে হচ্ছিল যখন আমি আবাব তরুবালব দেখা পেলাম। অপবাহের ক্লান্ত আলােয় চলন্ত ট্রেণেব মধ্যে সহযাত্ৰিনী হিসাবে তাকে যখন হঠাৎ চিনলাম, তখন প্রথমেই আমার মনে হল, একে আমি দীর্ঘ আট বছর ধরে ভুলেছিলাম কেমন করে? চন্দ্রা, এ আমার গল্প বলার ভূমিকাও নয়, প্রেমের গল্পের উপক্রমণিকাও নয়। তরুবালার সঙ্গে আমার প্রেমও নেই তাকে নিয়ে আমার গল্পও হবে না। তরুবালা হচ্ছে আমার স্পষ্ট অভিজ্ঞতা, তার কথা নিয়ে কল্পনা করে সাহিত্য সৃষ্টি কৰাৰ দৈন্য আমার নেই। তরুবালাকে চিনলাম তার হাসির শব্দ শুন । তার মুখ দেখে নয়, রঙনি সুতো তার হাসির শব্দে। সামান্য কারণ ঘটলেই হাসতে হাসতে চুরমার হয়ে ভেঙে সে কাৎ হয়ে পড়ে। হাসতে হাসতে সে নিজেই যন্ত্রণা পায়, হাসির পরিশ্রমে ও কষ্টে তার চোখে জল গড়িয়ে আসে। বাঙলা দেশে একটিমাত্র মেয়ে হাসতে জানে, সে তরুবালা। অস্তমান সূর্যের আভায় আর একটা চিহ্ন, দেখে তাকে চিনলাম । তার চোখ কালাে নয়,-কালো যে নয় এইটুকুই আমার মনে আছে। কিশাের কালে আমরা দু'জন গলা ধরাধরি করে যখন উচ্চ সুরে ডি- এল-রায়ের গান গাইতাম, তখন এক এবার কি মনে করে তার চোখের দিকে অবাক হয়ে চাইতাম,তখন থেকেই আবার মনে আছে রুবালার চোখ কালো নয়। ওামি শরৎকাশের নীলোজ্জল আকাশকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ কবেচি, শেষ-বসন্তের বনশ্রেণীর মধ্যে তাকিয়ে তাকিয়ে চলে গেচি, তাই দেখে আমার মনে হয়েছে তরুবালার চোখ কাণো নয়। পরস্ত্রীর দিকে তাকাবাব যে অস্বাভাবিক কুণ্ঠা তা আমি আজে। হাবাইনি। হারানােই যে ভালো এ আমি বিশ্বাস কবি। যে-কোনাে নাবীর দিকে সরল দৃষ্টিতে তাকানাে সুস্থেরই লক্ষণ। পরের সম্পত্তি বলে’ পব স্ত্রীর প্রতি যারা তাকায় না, তারা নারীকে অপমান করে। নারীর প্রতি গােপন প্রলোভন যার আজো মবেনি, পরস্ত্রীর দিকে তাকানো তাদেরই কাছে দু'ত। রুবালার দিকে তাকালে দেখতে পেতাম, সমস্ত গাভীর যাত্রীর ভার অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যের অত্যাচারে কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে।

বঙীন সুতো
চঞ্চল হবার মত তার দেহ বটে।
শক্ত বেতের চাবুক যেমন সপাসপ
কবে আস্ফালন কবে, তরুবাব দেহটি তেমনি। পাতলা ইস্পাতের
মত তার দেহ। সুন্দর ও মনােহব একটি সাপের মত তার দেহখানি
একে বেঁকে হি হি কবচে । সে দেহ রক্ত-মাংসের না হয়ে যদি
মাটির তৈরী হত তাহলে বলতাম, সে সরস্বতী। তরুবালা নয়,
সবস্বতী।
ট্রেণ থেমেচে। চা খেতে নামলাম। মুখ বাড়িয়ে সবস্বতী বল্ল,
5া' অলাকে একবাব ডেকে দেবেন—এই যে ওদিকে
এক পাও নডসাম না, কেবল তার মুখের দিকে তাকালাম।
আরে। তুমি ?
হাসলাম না। শুধু বললাম, চিনে ?
এতদিন পরে নাটকীয় ঘটনাব মত দেখা পেয়ে তরুবালা বােধ হয়
উচ্চকণ্ঠে হবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে অবাক হয়ে চুপ কবে রইল ।
হঠাৎ সন্দেহ হল সে যেন ফুবিয়ে গেছে।
স্বামী ছিলেন সঙ্গেই, তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে বাধিত হলাম।
তরুবালার পাশে রয়েছে তারই একটি মেয়ে—বছর পাঁচেক বয়স।
সবতীর মেয়ে।
এর পর আব গল্প নেই। আট বছবের ব্যবধান, সে ব্যবধান
জোড়া লাগে না। তা ছাড়া জোড়া লাগবেই বা কেন ? আমার
জীবনের সঙ্গে যতদিন তরুবালা জড়িয়ে ছিল, তার সঙ্গে আমার
আলাপের অস্তিত্বও ছিল ততদিন । এমনিই ত’

বঙীন সুতো
জীবনকে বদ্ধ জলার মত করে বেলে লাভ নেই। যে-নদীতে নেই
স্রোত যার নেই জোয়ার-ভাটা, সে-নদী মবেচে, তার অস্তিত্ব অস্বাস্থ্যকর।
তরুবালা আমারই স্রোতে ভেসে ভেসে গিয়ে বিস্মণের মহাসমুদ্রে
মিলেচে, আট বছবের ব্যবধান পার হয়ে গিয়ে তাকে নিয়ে প্রেমের গল্প
লেখার মত ধৈয্য ও রুচি আমার নেই।
—আচ্ছা, কি দৌরাত্মিটাই আমরা করতাম’ নয় ?
একবার মনে হলে হেসে তব এ কথাটার জবাব দিই, কিন্তু
তবলার মুখ থেকে এই সুলভ মৌনিক আলাপ শুনে আমার গা
ঘুলিয়ে উঠল। দুজনেই আমরা দু’জনের মুখের দিকে তাকাবো,
কিন্তু কী দেখব? দেখব আমরা নিজেই নিজেদের চিতে
পাবচিনে, দুজনের মুখেই পরিবর্তন ঘটেছে। এই আট বছবে।
জীবনের বিচিত্র ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের মুখে ছাপ ফেলে
ফেলে পাব হয়ে গেচে। আমাদেব সে মন গচে হাবিয়ে, সে-হৃদয়
গেচে তলিয়ে, সে-বিচ গেচে অতীতের অন্ধকাবে নিশ্চিহ্ন হয়।
আজ তরুবালা যে পরস্ত্রী তাতে আর সন্দেহ নেই।
উচ্ছাসের দিকে দ্রুত ছুটে চলেছি তা ভুলিনি। আমার সব চেয়ে
বড় উচ্চাশা, আমার সাহিত্যে উচ্ছ্বাস স্থান পাবে না। আমি যদি
ঘুরিয়ে ঘুবিয়ে বলতে চাই রুবালাকে একদিন সত্যই ভালে
বেসেছিলাম, তা হলে তার চেয়ে বড় কলঙ্ক আর আমার কিছুই
যে-ভালােবাসার মধ্যে শুধু হৃদয়াবেগ, মস্তিষ্ক-বিচার নেই
সে-প্রেম অন্ধ,—সে প্রেম নিয়ে উন্মাদ হওয়া যায়, কিন্তু সহজ হওয়া
নেই।
১৪

বঙীন সুতো যায় না। তরুবালাব সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতম পরিচয় হয়ত ছিল, কিন্তু ভালােবাসা ছিল না। তুমি এত বড় হয়ে গেচ ?-তরুবালা বলল, তখন খুব ছােট ছিলে, এনি বােগা আমাকে চিনতে পেবে ডাকোনি কেন ? তোমাৰ দিদি কোথায় ? এখন কোথায় থাকে ? এই প্রশ্ন গুলির মধ্যে অনাত্মীয়তার যে কী গভীব ইঙ্গিত তা আমি জানি। তরুবালা কথা বলছে, দূর থেকে মাঝখানে আট বছবের পথ সে পার হয়ে আসবাব চেষ্টা করছে, তার কণ্ঠস্বব তাই আমি আর শুনতে পাই না। জীবনের সব চেয়ে বড় কলঙ্ক বালা-প্রেম। তার কারণ প্রেম নয়। তরুবালাব দেখা পেয়ে মনে হলো, আমার মিথ্যাবাদী মন তাকে নিয়ে অন্ধের মত শুধু ইন্দ্রজাল রচনা করেছিল, ভালবাসেনি। বাল্যকালের বন্ধুত্বকে ‘বান-প্রেম' নাম দিয়ে সাহিত্য লেখা খুব সহজ, ভাব কারণ তার মধ্যে কল্পনার অবকাশ আছে—কিন্তু জীবনের ক্ষেত্রে সে বাল্যপ্রেমের কোন মূল্য নেই। বড আর্টিষ্ট বা বড় বড় মিথ্যাবাদী। ভুগতে কবি ও গল্প লেখকেরা মানুষকে আজ পর্যন্ত যত ভুল পথে চালনা করেচে এমন আর কেউ নয়। তরুবালাকে নিয়ে যদি আমি মিথ্যাভাষণ কবতে সুরু করি তা হলে আমার গল্প সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য বলে গণ্য হতে পারে, কিন্তু তা আমি পারবাে না—পরনাৰী অথবা ভদ্রমহিলা সম্বন্ধে মিথ্যা রটনা করে বাংলা দেশে যে-শ্রেণীর সৎসাহিত্য গড়ে উঠেছে, সেখানে আমার ঠাই নেই।

বঙীন সুলতা শােনা তারপব,-আগে ইন্দ্রানীর কথাটা বলে নিই তার সাজ- সজ্জাটাব বর্ণনা কিছু শোনালে যেন বিরক্ত হয়ে উঠো না— ইন্দ্রাণীর কানের ঝুমকো দুটোয় মুক্তো বসানাে। হাতে কয়েকগাছি চুড়ি—সােনার সঙ্গে কয়েকগাছি লাল-সবুজ মিহি বেলােয়াবি, হাত দুখানা নাডনে ওস্তাদ সেতারির যন্ত্রে ওঠে যেন মৃদু ঝংকার । ইন্দ্রাণীর পবনে আজকে ছিল বেশমী নীলাম্ববী, তাতে চওড়া শাদ। জৰিব পাড়। কঁাধকাটা জামা, অনাবৃত বাহু দুখানা শাখের মতাে স্বাস্থ্যের জৌলস এখনো বয়েছে। আমি তার পিছনে এসে দাড়িয়েছিলুম। আমার দিকে একবাবটি মুখ ফিরিয়ে সে বসলাে। তারপর সম্মুখে লাইফ-সাইজ আয়নায় প্রতিফলিত আমার মুখের দিকে চেয়ে বললে মনে পড়লাে? ভাবলুম চারিদিকে যে রকম মডক, তুমিও বুঝি তলিয়ে গেছ। দুভিক্ষের চাদা আদায় করতে এলে নাকি ? মাথাব এলােখোপায় আইভরি কাট। গুজে ইন্দ্রাণী তার বিগত যৌবন মুখেব বেখাকুঞ্চনের ওপর পাউন্ডারের পাক বুলােতে লাগলাে। বললাম, বিশ্বাস কবো, নিস্বার্থভাবেই এসেছি। সবিস্ময়ে উচ্চকণ্ঠে ইন্দ্রাণী বিদ্রুপের হাসি হেসে উঠলো। বললে পুরুষ মানুষ সত্যবাদী হলে ভয় করে। ডান হাতে সুইচ টিপে আলোটা সে জ্বাললো। বললাম, বুড়াে বয়সে এত সাজসজ্জা কেন ? কোথাও যাচ্ছ নাকি ?

বঙীন সুতাে শরতের সন্ধ্যা আমার ঘরের মধ্যে ধীরে ধীরে জমে উঠেছে। আলো নেই, হাওয়া নেই—চাপ নিশ্বাসরােধী অন্ধকার। এই অন্ধকারের মধ্যে তরুবালার ছায়ার দিকে তাকিয়ে এতক্ষণ তার কথা ভাবছিলাম। সেদিন ট্রেণের মধ্যে তৰুবালা যদি সানেত্রে পুরাতন প্রেম নৃতন কবে’ নিবেদন করত তা হলে বিরক্ত হতাম কিনা সেই কথাই ভাবচি। তবু জানি তরুবাল। একদিন ছিল আমার সর্বনাশিনী অগ্নিশিখা। সে-শিখা আমাকে আলােকিত কবেনি, বার বার পুড়িয়ে মেরেছে। আমি ছিলাম অসহায়, দুব্বল, ভীরু-অঙ্গুলি হেলনে তরুবালা তখন আমাকে দিয়ে সংসারের যে কোনাে অন্যায় এবং যে কোনাে পুণ্যকাৰ্য করিয়ে নিতে পাব। আম ছিম সমবয়সী। তরুবালা ছিল অামার চেয়ে সবল ও সুস্থ। সে স্ত্রীলােক, এই সুবিধা নিয়ে সে আমার পরে যত অত্যাচাব কবেচে, এমন আমার নিয়তিও নয়। লােহাব চিটে পুড়িয়ে আমার গায়ে সে হেসে হেসে কতবার ছে । দিয়েছে তা আমি আজো মনে ককতে পাবি, গায়ের ওপব চুচ বিঁধে রেখে কতবাব সে ছুটে পালিয়েছে , ঘব ঢুকলে শিকল তুলে দিয়ে পালিয়ে যাওয়া ছিল তার রীতি তরুবালাকে আমি ভ8 করতাম। তরুবালাকে নিয়ে মুখের গল্প হয় কিন্তু সাহিত্যের গল্প য় না। তরুবালাব কল্পনায় ঔজ্জ্বল্য মনোহাবীত্ব এসব কিছু সে নিতান্ত সুন্দরী, অত্যন্ত চলনসই সুন্দরী। শুরুবালাকে

রঙীন সুতাে
মনের মধ্যে লুকিয়ে বেধে আমি অনেকগুলো গল্প লিখেছি, কিন্তু তাকে
প্রকাশ করতে গেলে আমার কলম চলে না।
একটি মাত্র মেয়েকে আমি ভালবাসি, কিন্তু সে তরুবালা নয়।
আমার কালো দীঘিব তীবে তীরে যারা ছায়া ফেলে সরে গেছে
রুবালা মাত্র তাদেবই একজন। আমার আকাশ থেকে তরুবালা
কক্ষচ্যুত হয়ে গেছে।
ট্রেন থেকে নামবাব সময় চুপি চুপি সে বলে গেছে, অনেকদিন
পবে দেখা হয়ে গেল, দুপুর বেলা একদিন যেও আমাদেব এখানে
ববিবার ছাড়া যে কোনাে দিন
আজও ভাবচি চন্দ্রা, তার কাছে একবার যাবো কি না।
চা, শােন বলি ভবপর
কাশীতে গণেশ-মহল্লাব গলি জানো ত’? নিশ্চয়ই জানাে।
সেই গলির গােলকধাঁধায় অনেক ঘােরাঘুরির পর আমার প্রিয় দুশ্চরিত্র
বন্ধু শ্ৰমান্ যতীন্দ্রমােহন এক দরজার কাছে এসে অন্ধকারে অত্যন্ত
মৃদু হাতে কড়া নাড়লেন। ইঙ্গিতটুকুই যথেষ্ট, ধীরে ধীরে কপাট
খুলে গেল।
এই যে ইনি, এব কথাই তােমাকে বলছিলাম শবাে, আমার
প্রিয় বন্ধু। আচ্ছা আমি এখন যাই।'
সামান্য পরিচয় করিয়ে দিয়েই বন্ধু বিদায় নিলেন। চা, এ গল্প
শুধু তােমার জন্যে, সাহিত্যের জন্যে নয়। ব্যক্তিগত জীবনের কলঙ্কের
১৮

বঙনি সুতে কথা যারা সুললিত ভাষায় সাহিত্যে প্রচার করে তাদের দলে আমি নই। জীবনের ক্ষেত্রে যে-তৃষ্ণা আমার মেটেনি, যে-আশা আমার সুদূরপরাহত, যে-গােপন কামনা আমার প্রকাশের পথ পায়নি সাহিত্যের ভিতর দিয়ে তাদেব সে-দাবী মিটোতে আমি ঘৃণা করি। মানুষের চবিত্র আঁকতে গিয়ে অন্তদৃষ্টির চেয়ে কল্পনাব খেলা যারা দেখায় তারা শক্তিশালী লেখক হতে পারে কিন্তু শিল্পী নয়। অধ্যয়নের পাণ্ডিত্য নিয়ে যারা গল্প লিখতে আসে তারা যশ পায় সন্দেহ নেই, কিন্তু তা অপযশ । পবিচয় যার সঙ্গে হলো, সে নারী। হেসে অভ্যর্থনা করে’ ঘবের ভিতরে তুলে নিল। যেন কত দিনের আলাপ। দরজাট। আবার সে বন্ধ করে দিল। চন্দ্রা, আমার কি মনে হলো জানাে? সে যেন আমায় কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বন্দী করল। আমার পালাবার আর পথ নেই। যে-কোনাে মেয়ের সঙ্গে আমি অনর্গল কথা বলে যেতে পারি, যদি সকল দরজা খােলা থাকে। দরজা বন্ধ করলেই আমার মনের চেহারা বদলে যায়। বাইবের হাওয়া বন্ধ হলেই আমার মধ্যে একটা নতুন ঝড় ওঠে। তার জন্য আমি লজ্জিত। তার জন্য আমি লজ্জিত। তুমি জানাে চা, আমার সে ঝডের চেহারা কেমন। দূর আকাশের পার হয়ে ওঠে রাঙা, সমুদ্রের জল ওঠে ফুলে, গাছ পালা শত হাতে মাথার চুল ছিডে ছটফট

রঙীন সুতে
করতে থাকে, প্রলয়ের বগা খুলে দিয়ে বিদ্যুতের চাবুক আকাশকে
জর্জরিত করে তােলে।
শােনো চা, মেয়েটির নাম সরোজ। এই ধবে। আঠাবে
উনিশের কোঠায়। চেহারা সু নয়। বয়সের একটা রূপ আছে
সেই রূপটাই সরােজের পাথেয়। দশ বছর পবে তাকে নির্ভয়ে কুৎসিং
বলা চলবে। মেয়েদের সব চেয়ে বড় বিপদ যখন কেউ তাদের
কুৎসিৎ বলে। মেয়েদের বিশ্বাস, রূপ ছাড়া পৃথিবীতে বাঁচবাব আর
তাদের দ্বিতীয় সম্বল নেই।
সরােজ আমার একটি হাত ধরে মেঝের উপব ছড়ানাে বিছানার
বসালো, তারপর হাতপাখাখানি নিয়ে ধীরে ধীরে আমার
গায়ের উপর বাতাস করতে শুরু করল। যে কোনাে জাতের মেয়েই
হোক, পুরুষকে দেখলেই সে তাকে অকুণ্ঠ সেবার দ্বারা অকারণে খুস”
করবার চেষ্টা করে।
ঘবের ভিতরে একবার তাকালাম।
মাটিৰ
প্রদীপ জ্বলচে। একপাশে রাতের খাবার ঢাকা। একটি ছোট তেরঙ্গ ।
কয়েকটি ৰাসন। এক জায়গা পান সাজবার সরঞ্জাম। একটি জলেব
কলসী। কড়িকাঠ থেকে একটা দডিতে বাধা রঙচঙে একটা তিঞ্জ,
হাড়ি ঝুলচে। দেয়ালে কয়েকখানি ঠাকুর-দেবতার ছবি টাঙানে’ ,
স্বামী বিবেকানন্দেৰ ছপা ছবিখানি প্রথমেই নজরে পড়ছে।
বললাম, এই তোমার ঘর ?

বঙীন সুতো
সবােজ হেসে আমার একটি হাত তার হাতের মধ্যে টেনে নিল।
বল, কোন বকমে এইখানেই থাকি ।
চন্দ্রা, আমি তােমাকে পতিতা নারীব গল্প বলতে বসিনি।
হত নাবীকে নিয়ে যারা সাহিত্য সৃষ্টিব চেষ্টা করে তারা হয় বাতু,
পত পতিতালয়ের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করবার জন্য তারা লালায়িত।
যাব লালিত্যে পতিত নাবীব চবিত্র অঙ্কন করতে আমি ঘৃণা কবি।
তাব কাবণ, পতিতার চবিত্র বলে কোনাে পদার্থ ই নেই।
নিস্তব্ধ রাত। দূবে কোন্ মন্দিবে আরতি ঘণ্টা স্তিমিত হয়ে
এল। চন্দ্রা, ভয়ে ও অসহায়তায় আমার সর্বণবীব
জমাট হয়ে
আসছিল। কম্পিত द বললাম, তােমাদের দেশ
fথর ?
বােজ বল্ল, যেখানে থাকি ।
এমনি কবে তােমার দিন চলে ?
না, এ কাজ ত আমি করিন্।ে আমি আগে মােজা বুতাম।
তনি আব মা।
মা তোমার কোথায় ?
ধানবাদে, মামাদের ওখানে। আমি ছিলাম সেখানে, ভগ্নিপতির
সঙ্গে এখানে এসেছি।
কোথায় তিনি? ভগ্নিও আছেন এখানে ?
দিদি মারা গেছেন অনেক দিন ।

রঙীন সুতো ও, আর ভগ্নিপতি ? এই কাশীতেই আছেন বোধ হয়। আমাকে এখানে রেখে তাকে আর খুঁজে পাচ্ছিনে। তারপর মীঘাটে আপনার বন্ধু আমায় দেখতে পান তারপর এই ত’ আপনি এলেন। চমৎকার গল্প চা। ভাল গল্প লেখার ভূমিক! এর চেয়ে আর কী ভালাে হতে পারে। সরােজের জীবনের কারুণ্যটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারলেই চমৎকার উপন্যাস হলো। খানিকটা মহত্ব, খানিকট। সংষম, কিছু পরিমাণে তেজস্বিতা ও প্রেমালাপের ছলা-কৌশল, বাস, সরােজিনী দেবী গল্পের নায়িকা হয়ে গেলেন। আমার মত যুবক তাকে নিশ্চয়ই উদ্ধার করবে, বিবাহ করতে সাহস করবে না, কারণ সে কাপুরুষ, দিনের পর দিন ধরে প্রেমের অভিনয় করবে, —ভারপর গল্প-লেখকটি যদি পুরুষ হয় তাহলে পর্যন্ত ‘গােগাবিন্দলাল সেজে ‘রােহিণী’-রােজিনীকে গুলী করে মারবে, আর যদি মহিলা-গল্পলেখক হয় তাহলে অনন্যোপায় হয়ে সরােজিনীকে রুগ্ন করে মৃত্যু এনে দিয়ে চিতায় তুলে দেবে। নায়কের হবে আবার বিবাহ। শুধু সরােজিনীর স্মৃতি মাঝে মাঝে তাকে অন্যমনস্ক করবে। বাংলা সাহিত্যের ক্রমােন্নতি বলতে শুধু এইটুকু বােঝায়। লালসার তাড়নায় যে-নারী পথে নেমে এসেছে চা, তার পরে আমার কোনো মমতা নেই। মমতা নেই বলেই তাদের নিয়ে গল্প লিখতে আমি ঘৃণা করি। সহানুভূতি ও মমতার রসে মধুর ২২

রঙীন সুলতা
মনােহর করে যারা পতিতা নারীকে নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস করে
তারা যে জাতির শক্ত তাতে আর সন্দেহ নেই। চরিত্রহীন নারী
ও পুরুষকে নিয়ে গল্প লেখার ফ্যাসান, আমার কাছে কটু ও বিসদৃশ।
তারপর শােনাে, চন্দ্রা।
সরােজ আমার গায়ে হেলান দিয়ে কাং কাং হয়ে বল। অর্থাৎ
তার সঙ্গে আমার পরিচয় যে নিগূঢ় তা সে ধরেই নিল। আমাকে
সে যেন চিনে নিয়েছে। মেয়েরা কথায় নিজেদের মনােভাব প্রকাশ
করে না, প্রকাশ করে ভঙ্গীতে, কটাক্ষে, হাসিতে, সর্বাদের নানা
ইঙ্গিতে। তবু আমি জানি, সরোজ পতিতা নয়, দেহপণ্য করা তার
পেশা নয়-অঙ্গ প্রসাধনে নিতান্তই সে অপটু। অত্যন্ত সাদাসিদে
মেয়ে সে।
সে আমার কাছে বল আমার স্ত্রীব মত, প্রণয়িনীর
মত-পতিতার কোন অশােভন অভদ্র বিহ্বলতায় আমার গায়ের
ওপব সে হেলান দিয়ে বসেনি। তাকে আমি ভালো না বাসতে
পারি কিন্তু ঘৃণা করবার পথ সে রাখল না। কানের কাছে মুখ
বেখে সে আমাকে সবিনয়ে জানালাে, কাজ তাকে কিছুদিন
করতেই হবে, এতে নাকি অর্থ পাওয়া যায়, যদি পাওয়া যায় তাহলে
কিছু জমিয়ে নিয়ে সে মায়ের কাছে চলে যাবে । মায়ের
এখ, একটিমাত্র মেয়ে।
মায়ের একটি মাত্র মেয়ে—এই কথা বলতে গিয়ে তার চোখে
জল এল, চা। আমার কাঁধের ওপর মাথা রেখে জানালে তার

বঙীন সুতে বিপদের কথা। সে বললে, তুমি আমাকে বাঁচাও। লেমার বন্ধুটিব হাত থেকে আমাকে বাঁচাও। চন্দ্রা, এই পর্যন্ত আমার গল্প । আমার উদাতা দেখাবব এমন সুবিধা আমি আর জীবনে পাইনি। একটি নাবী সৰ্বান্তঃকরণে আমার কাছে মহত্বর জীবন ভিক্ষা কবছে, এত বড গৌরবকে আমি অবহেলায় ত্যাগ কবর কেমন কবে ? আণা নিবে গেল। ঘর অন্ধকার। একেবারে বুকচাপা অন্ধকার। চোখ বুজে আমার মনে হল, বােজ আমাকে উধাও য়ে উড়ে চলেছে। বি ত পরিব্যাপ্ত আকাশ, নীল দিগন্তবিলীন মহাসাগব, শূন্য মহাব্যোমপথে উড়ে যেতে যেতে সে আমায় বনচে, চল, চল আমাৰ গয়ে •তােমার বন্ধুটির হাত থেকে আমাকে বাঁচাও। চন্দ্রা, তুমি জানাে আমার কত ৰড পৰীক্ষা। সাপের মত সবো যখন আমার সর্বাঙ্গ আলিঙ্গন করল, তখন মেয়েদেব সম্বন্ধে যা আমার মনে হলো, সে কথা এখন থাক-নদীর ধাবে এই বালির চড়ায় বসে তােমার কাছে আব সে কথা উচ্চারণ করিতে চাইনে। গল্পের শেষকে রসমধুর কবে তােলবার গােপন লােলুপতা আনাব নেই। আমার অভিরুচি এবং বিচাবেব অপেক্ষা গল্পের মধ্যে থাকবে না, যদি থাকে ত সে গল্প কৃত্তিম। গল্প তারাই লেখে মানব চরিত্রের সঙ্গে যাদের পরিচয় অতি ঘনিষ্ঠ । সববাজেব এই আলিঙ্গনের যাবা কদৰ্থ করবে, তাদের সঙ্গে আমার কারবার নয়, ব্রণর পাশে ২৪ বঙীন সুতে ছিল) মক্ষিকাব মত তারা ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। সে আলিঙ্গনের মধ্যে গভীর আত্মীয়তাকে আমি কেমন করে অস্বীকার করা, চন্দ্রা? সে যে আনাবই অপেক্ষ। কবে ছিল ছিল বলেইত আমাকে চঞ্চল কবেনি, উত্তেজিত কর্বেমি, মাতাল করেনি। তাব মধ্যে আমি আমাৰ ৪ােব স্পশ গভীব ভাবে উপলব্ধি করেছিলাম। চন্দ্রা, তুমি জানো আমার প্রিয় কে। কাকে আমি জীবন উৎসর্গ বাবছি। কে আমার নিভৃত রাবি সঙ্গীহীন তারকা। একটি মুহুর্ত শুধু সবােজ আমাকে স্মৰণ করিয়ে দিয়েছিল আমার সৌন্দর্য্য- ম্রাজ্ঞীকে। সববাজের কাছে আমি চিবকৃতজ্ঞ। হাত ছাড়িয়ে দিয়ে পথে নেমে এসে বললাম, আ' এক দিন হতে পাবি। অন্ধকারে সবােজ বােধ হয় তখন মাথা হেঁট করে বসেছিল। শুলজ্জায় ও অপমানে। মেয়েরা কখন লজ্জিত ও অপমানিত হয় তুমি নিশ্চয়ই জানাে চন্দ্রা। জীবনের গভীরতম ভাষার সঙ্গে সাহিত্যে গােপন বসপ্রেরণার মিলন যেখানে ঘটল না সেখানে গল্পটা হচ্ছে শুধু সংবাদ-সংগ্রহ। সেখানে শুধু কথাই আছে, সাহিত্য সেই বুঝলে চা? কথাই আছে, সাহিত্য নেই-এমনি একটি নাটক সেদিন চলন্ত ট্রেণেব মধ্যে অভিনীত হল। নাটক—কিন্তু গল্পও বটে। অথচ গল্পের আরম্ভ যাই হোক না কেন, শেষ নেই। গল্পের নায়ক আছে, - রঙীন সুতাে নায়িকা আছে, দুটি পার্শ্ব চরিত্রও আছে। আর আছে, একজন ভ্ৰষ্টা—সে আমি। তুমি গল্প শুনলে হয়ত হাসবে চা। হাওড়া থেকেই ট্রেণে চড়েছিলাম তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রী। জাতিবর্ণ- নিৰ্বিশেষে স্ত্রী-পুরুষ সবাই একেবারে ঠাসাঠাসি করেচে। যতগুলি লােক জায়গা পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি লােক পায়নি। বিডির ধোয়ায়, কলহে, কোলাহলে, ঘােট ঘাটেব চাপে—একেবারে নিশ্বাস রাধ হবার উপক্রম। এমনি দুর্যোগের মধ্যে এল বর্ধমান। গাড়ী থামতেই একটি সুত্র যুবক ভিড় ঠেলে, ধাক্কা দিয়ে নিতান্ত গায়ের জোবে গাড়ীতে চড়াও হয়ে উঠল। জিনিসপত্র তার সঙ্গে ছিল সামান্য। জামার আন্তিন গুটানো। ইনিই নায়ক। নায়ককে অতি কষ্টে জায়গা দিলেন একটি বাঙালী বৃদ্ধ। বৃদ্ধের পাশে ছিল একটি ছােট্ট মেয়ে। মেয়ের পাশে মেয়ের মা। সম্ভবতঃ তিনি বৃদ্ধের কন্যা এবং এই মহিলাটিই আমাদের নায়িকা। পরণে একখানি সৰু কালাপেডে ধুতি, গায়ে একখানি চাদব। মাথায় কতকগুলি চুল ঘােমটার পাশ দিয়ে বেবিয়ে এসেচে। মুখখানি করুণ, কুষ্ঠিত ও সুন্দর। নায়কটির সঙ্গে বৃদ্ধের অতি সহজেই আলাপ হল। যুদ্ধের সঙ্গে আলাপ হল, তার মানে এ নয় যে নাকটি নায়িকার সঙ্গে আলাপ করতে ব্য-অত দেখে তা মনে হল না। দেখে শুধু এই কথাই মনে হ’ল ছেলেটি কোন নারীর সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন। চোখে তার রঙীন সুতাে দূর পথের আভাস, মুখে তার পথ ভ্রমনের আনন্দ। অস্থির এবং চঞ্চল তার অঙ্গভঙ্গী। সে বসল বটে কিন্তু সে থেমে নেই, সে ছুটচে, রাত্রিব ট্রেনের সাথে সাথে সেও পার হয়ে চলেছে পথ-প্রান্তর। থামলে তার চলবে না। এমন অশান্ত, তবু বৃদ্ধ তার সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন। ট্রেণের কথা, দেশ বিদেশের কথা, চাকরী-বাকরীর কথা। শেষের কথা হল ব্যক্তিগত। পাশের তরুণীটির ঘােমটা নামিয়ে জালার দিকে তাকিয়ে সব ছিল। হয়ত শুনছিলই না, দেহখানি ছেডে মনটি হয়ত তার গাড়ী ছেড়ে বাইরে প্রান্তরের অন্ধকারে উধাও হয়ে গিয়াছিল । ‘আপনি কতদূর যাবেন ? বৃদ্ধ বললেন, 'কাশী, আমার স্ত্রী আছেন সেখানে। ‘উনি আপনার মেয়ে বুঝি? এটি নাৎনি ? নিশ্বাস ফেলে বৃদ্ধ বললেন, হ্যা, এটি নাৎনি, এর নাম দুলালী, ওইটি আমার মেয়ে, জামাইটি হঠাৎ মারা গেল, ইঞ্জিনীয়ার ছিল— যাই হােক, বলি চল কাশী নিয়ে যাই। অবস্থা ত ভাল নয়, একাত্তরটি লকা পেন্সন পাই বাবা। এমনি সময় দুলালী উঠে এসে দু’জনের মাঝখানে দাড়াল। কচি দু’টি চোখ, ছােট্ট একখানি সুন্দর মুখ। বল ওকে দাদামশাই ? “ও মামা। দুলালী। কিয়ৎক্ষণ অবাক হয়ে আবার দুজনের আলাপ শুনতে ২৭ বঙীন সুতে। লাগল। কিন্তু সে অল্পক্ষণই, তাবপর ধীরে ধীরে অলক্ষ্যে তার ছোট একটি হাত বাড়িয়ে যুবকটির হাতের আঙ্গুল গুলি স্পর্শ করল! স্পর্শ কবেই সে বুঝলে, এই নিতান্ত নিস্পৃহ ব্যক্তিটি সই তাব আত্মীয় কি না। নায়ক তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে গভীব স্নেহে তাকে কোলে তুলে নিল। এমন নয় যে এ গল্প ঘন হয়ে আসছে। বৃদ্ধ পিতা, হয়ত অবিবাহিত বক, তরুণী বিধবা এবং উভয়ের প্রণয়েব সেতুর মত এই বালিকাটি— এই অতি সাধাৰণ অতি-ব্যবহৃত দেশ-কাল-পাত্র নিয়ে গল্প বলাব দৈন্য আমাব নেই । ট্রেণের মধ্যে প্রণয়-অভিনয়ে একটি দুব্বল দেহ-লালসার ইঙ্গিত আমি পাই । প্রথম দৃষ্টিতে প্রেম, এবং প্রথম আলাপেই হৃদয়ােচ্ছাস-এর চেয়ে মিথ্যা, ভঙ্গুরতা সংসারে আর কিছু নেই । কি বল ? আসানসােল-এ এসে গাড়ী খাল। চারিদিকেব গােলমালে কাপ পাতা যায় না। বিনা টিকিটের যাত্রী যাব। তাদের অভ্যর্থনার জন্য গাড়ীতে উঠল টিকিট-চেকাব। মানুষব টিকিটও লাগে, পোটলা-পুটলিবও লাগে। একজন দেশী সাহেব বৃদ্ধের কাছে এসে টিকিট দেখতে চাইল। টিকিট দেখানাে হ’ল কিন্তু সে লােকটা দুলালীর টিকিটও দাবী করে বল। ১৮

বঙান সুতাে
এইবার গল্পের নায়কের জেগে ওঠবার পালা। যুবকটি উঠে দাড়িয়ে
উত্তপ্ত হয়ে বল, এইটুকু মেয়ে, ওর আবার টিকিট কি ?
‘হাফ টিকিট চাই, সাত বছরের মেয়ে।
‘কে বলে সাত বছরের মেয়ে ? ওর বয়েস পাঁচ বছর।
বাকযুদ্ধ শুরু হল, তারপর হল কলহ, তাপর যুবকটি তাকে ঠেলে
দিয়ে চীৎকাব কবে’ বল, বেরিয়ে যাও গাড়ী থেকে।
টিকিট চেকাব আস্ফালন কবে’ বলল, তােমাকে পুলিশে দেবে।
যুবকটি আর সহ্য করতে পারল না, গলা ধাক্কা দিয়ে তাকে গার্ড
থেকে ছিটকে বাইরে ফেলে দিল।
এইবাব নাটকের অভিনয়। সদল বলে একটু পবে শত্রুপক্ষ একে
হাজিব। কোন্ বাবু ট্রেণেব শান্তি ভঙ্গ করেছে ?
যুবকটি কাছে এগিয়ে এল। একটি বয়স্ক প্রবীণ ইস্পেক্টর বললেন,
‘কই দেখি কত বড় মেযে?'—তিনি বৃদ্ধের কাছে এসে দাড়ালেন।
ভয়ত্ৰন্ত তরুণীটি হতচকিত হয়ে সকলের দিকে তাকাতে লাগল ।
ইনস্পেক্টর বললেন, ‘ক’ বছরের মেয়ে বলছেন?
নায়ক বল, পাঁচ বছরের, একটু বাড়ন্ত গড়ন, তা-
ইম্পেক্টব হাসলেন, হেসে বলেন, 'আপনি ওর বাবা হয়ে যখন
বললেন পাঁচ বছর বয়েস তখন,—যাক গে, ওর টিকিট আর লাগবে না,
চল হে সদলবলে তিনি গাড়ী থেকে আবার নেমে গেলেন।
এক মুহূর্তে সবাই যেন পাথর হয়ে গেল । যুবকটি নিশ্চল হয়ে

বঙীন সুতো
ডাল, বৃদ্ধ নির্বাক, দুলালী চারিদিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্চে,
তরুণীটির মুখ বিবর্ণ-অতি কষ্টে শুধু সে মাথার ঘােমটা আর একটু
টেনে দিল।
গাভী আবার চলতে লাগল। রাত্রি এল গভীর হয়ে। গাভীব
কালাহল গেল থেমে। যাত্রীদের চোখে এসেচে মন্থর নিত্রার আবেশ।
সে যে পিতা নয়, এ প্রতিবাদ কেউ কল না। নায়কটি অঙ্গ এক
যাত্রীব পুটলির ওপর বসে পড়ল। তাব আর চাঞ্চল্য নেই, অস্থিরতা
নেই, অতিরিক্ত লজ্জায় সমগ্র পৃথিবীর কাছে মুখ লুকিয়ে সে যে হঠাৎ
কি করবে তার আর ঠিক রইল না। তরুণীটি লজ্জার মুখে মাটির
নীচে মিশিয়ে যেতে লাগল। বৃদ্ধ দুই হাটুর মধ্যে মাথা গুজে নিস্পৃহ
হয়ে বসে রইলেন।
দুলালী আবাব কাছে সরে এল। কিন্তু কি জানি কেন,
তাকে কোলে নেবাব সাহস নায়কটিব হল না। একটু আগে যাকে
সে আপন কবে' নিতে পেরেছিল, এবার হয়ত সে ভাবল, মাঝখানে
সুদীর্ঘ ব্যবধান।
দুলালী
বলল, কই গল্প বললে না ত ?
নায়ক তার দিকে তাকিয়ে আবার মাথা হেঁট করল । দুলালী
কিন্তু ছাড়ল না, জোর করে নায়কের কোলে চড়ে বসে তার গলা
জড়িয়ে ধরল।

বঙীন সুতো নায়ক একবার ওদিকে তাকিয়ে বল, তােমার মা ডাকচেন বােধ হয়, যাও ঘুমােওগে। যাও ত লক্ষ্মীটি। ‘না, যাবাে না। আমি থাকব তােমার কাছে। নায়ক গল্প সুরু করল-এক ছিল রাজা। তারপর ? ‘তাবপর সে ট্রেণে চড়ল- ‘রাজা বুঝি ট্রেণে চডে? মিথ্যেবাদী। নায়ক বল, হ্যা চডে, তুমি জানাে না? ট্রেণে চডে’ যেতে যেতে সে রাণীর দেখা পায়। রাণী কোথায় ছিল এতদিন? ‘বনে ছিল যে, রাজা তাকে বনে পাঠিয়েছিল। ‘তারপর?'—বলে’ দুলালী তার কোলের মধ্যে শুয়ে পড়ল। সেই বনে ছিল রাজকন্যে—' ‘রাজকন্যে কোত্থেকে এল? বাঃ। ‘রাজকন্যে বাণীব মেয়ে, তা জানো না বুঝি ? 'আচ্ছা বল। নায়ক বলতে লাগল গল্প, তার আদি নেই, অন্তও নেই। গল্প সাহিত্যও নয়, রূপকও নয়। তাতে স্বপ্নের রঙও নেই , জীবনের রসও নেই। ট্রেণের গল্প খেই হারানাের গল্প, খেই না পাওয়ার গল্প। অনেক্ষণ পরে দেখা গেল নায়ক ছাড়া আর কেউ জেগে নেই।

বঙন সুতো দুলালী গভীর নিদ্রায় অভিভূত, বৃদ্ধের নাসিকাধ্বনি শােনা যাচ্ছে। তরুণীটি জানলার ধারে মাথা রেখে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। ডিষ্ট্যান্ট সিগনানের আলো দেখা যেতেই নায়ক একটু ব্যস্ত হয়ে উঠল। ঘুম-কাতর দুলালীকে বুকের মধ্যে পক্ষী-শাবকের মত নিয়ে সে উঠে দাড়াল। তারপর একটু এগিয়ে গিয়ে মৃদুকণ্ঠে বলল, আপনার ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। তরুণীটি অপক্ষে একবার তার নিদ্রিত বৃদ্ধ পিতার দিকে তাকাল। তারপর চুপি চুপি বলল, ‘শােয়াবার জায়গা ত’ এখানে নেই। নায়ক বল, একে কোলে নিয়েই আমি গাড়ীতে রাত কাটাতে পারতাম, কিন্তু এই মােকামায় আমাকে নামতে হবে। নায়িকা বলল, 'নেমে যাবেন ? এই মােকামায়?' বলে সে জান্t: মাথা গলিয়ে একবার দূর ষ্টেশনের দিকে তাকান। কিছুক্ষণ তাকি হাত বাড়িয়ে বল্ল, দি আমার কোলেই দি ওকে। মেয়েটিকে নামিয়ে দিয়ে নায়ক সরে' এন। একটু শুধু হাত কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলল না। বলবার আব ছিলই বা কি। তুমি হলেও কিছু বলতে পারতে না চন্দ্রা । নিভৃত রাত্রির অন্ধকার নিস্তব্ধতার মধ্যে ষ্টেশনে গাড়ী এসে দাড়াল। জিনিস-পত্র সমেত যুবকটি কাউকে কিছু না বলে নেমে পড়ল। নেমে পড়ল বটে, কিন্তু পর মুহূর্তেই অত্যন্ত সন্তপণে, অতিরিক্ত লজ্জা ও কুণ্ঠার সঙ্গে নায়িকা তাকে একবার ডাল। নায়ক

বঙীন সুতো
কাছে আসতেই সে অস্পষ্ট কণ্ঠে শুধু বল্‌, 'আপনি চলে যাচ্ছেন,
এবাৰ দুবালীব টিকিট চাইলে কি বলব? পাঁচ বছর বয়েস বললে যদি
• বা বিশ্বাস না কবে ?
এইখানে এ গল্পের শেষ হলো। নায়ক-নায়িকার বিদায় দৃশ্য এতটুকু
'বেণ-উচ্ছ্বান নয়
শেবে শেষ কথাণিব ম'ব্য আর কিছু হিল কিনা কে জানে,
'কন্তু নায়কটিব কোথায় যেন কি মনােবিকাব দেখা নি। কযেক শা
গিয়ে সে আবাব ফিবে দাড়ান, আবার কিছু দূর গিয়ে থমকে সে ফিরে
[ S", আবার কিছুদূর গি থক সে ফিরে তাকা। মনে হলাে
ব সমস্ত বিখত জীবন
আ থেকে একটি
সন্দেহেব দোলায়
ব, সে ও ঐ পাব না, পদে পদে তার সুস্পষ্ট
ধারণা চুরমার
'য় যাব, দু । ত{ব নিপাত হবে অষ্ট,-নাবী চরিত্রের
অর্থ ও জতে খুঁজতে ব্যর্থ হয় নিজেকেও সে হয়ত একদিন দুর্বোধ্য
কবে তুলবে। কি বর চন্দ্রা ?
বি স ম
(নন দু ব 1্য করে তোলে
। । ও
শােনাে বা :
বাগানের পাবে মাঝে মাঝে তব দেখা পেতাম।
পবণে তব গেয়', এবং জীবনের যে-বয়সটায় মানুষ প্রকৃতির
ঐশ্বষ্যে পরিপূর্ণ—সেই যৌবনকাল সে গেরুয়ায় আচ্ছন্ন করে অতিক্রম
।

ৰঙন তো করে এসেছে। দূর থেকেও অনেক লােকের জটলা কাটিয়ে जन কাপড়খানি আমার চেখে পড়ত। আস্তে আস্ত এগিয়ে যেতাম। হয়ত নলিন-রৌ অপবাহ। বাগানের পশ্চিম প্রান্তের গাছ- লিতে ক্লান্ত পাখীৰ ন আপন আপন অধিকার নিয়ে কলব শুরু কবেচে। বাজপথ এই সময় গমন অনাস্রাতে মুখরিত। বসো। । কোমরের কসিতে গোজা অব একটি বস্তুনিশ্চিত মৃধাধার সঙ্গে সঙ্গেই থাকত। কী ' ছিল তার মধ্যে। বিভি, চূণ, চবস, পয়স', ছুচ-সুতাে, চিঠি—এমন আরো কত কী। এলিটি খুলে একটি বিtি ধবিয়ে সে আপন মনে টানতে লাগল । ‘একা আমি থাকতে পারিনে, বুঝলে । ভিড়ের মধ্যেই একা থাকা আমার অভ্যেস। আবার সে বিডি টানতে লাগল। তার মুখে চোখে ছিল একটি সহজ ঔদাসিন্য, নিলির জীবনে প্রশান্তি , মানুষ যেন কোথায় তার কাছে ছোট হয়ে গেছে। বললে, 'আব তা ছাড়া কি নো, এদের দিকে চেয়ে থাকতে আমার ভাবি ভাল লাগে।' বললাম, 'ওই ছেলেদের থেলার দিকে? হ্যা, ওই শিশুরা,-দেব খেলা, ওদের আলাপ, ওদের আনন্দ। চুপ করে রইলাম । এ ?' অত্যন্ত স্বাভাবিক, সন্ন্যাসী গ্রেড ৩৪

বুঙন সুতো
জীবনের বাৎসল্য ! তবু পরমযুব অপরায়ে এসে দাড়িয়ে গৃহ-বৈরাগীর
চেহারাটা যে কেমন হয় একে দেখবার আগে আমি এমন করে আয়
বুঝিনি। এমনি করেই এই মানুষটিকে বার বার দেখে এসেছি।
ছােট ছোট ছলেমেয়েরা যেখানে থেণা কবে, ঘুটোছুটি কবে' বেড়ায়,
গল শাবি কৰে' গান ধওে সেই পথেই এব আনাগােনা।
সরকা'র প্রাথমিক বিদ্যালৰে বজাৰ কে কতদিন দাড়িয়ে থাকতে
দেখে'১।
হস্য (৮নেমেদে মুখে দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তার
চোব পৰ্শক • বি প৮ে । ।
t
। বিশ্বাস বান)-' থেমে খেণে সে বলতে লাগল, অথচ
আ , জন মা' • ৫। ক’ মামাব পরিচয় তুমি ভাবতে পারো,
আমি একদিন উচ্ছ ৭ ৮লাম । , আমার গেয়ার নীচে ছিল একট।
মাতা মাছি );
থাকতেই প{’র।'-বললাম।
‘স কথা তুমি ভাবতে পাবাে ।
*) মানুষের জীবনে ধরে'
‘, তুম ভাবতে পারো না।' দৃঢ়কণ্ঠে কথা কয়টি বলে সে
আবার অন্যমনস্ক : বুল।
বলাম, সে মুসের কথা তোমার মনে পড়ে ?
‘পছে বৈ কি।' সে বলতে লাগল, এই ৩ মাত্র বছর কুড়ি

বঙীন সুতো
হলাে সব থেমে গেচে। ', ঝড় থেমে গেচে, যৌবনটা ঝই ঝডেব
মতনই সে
আকাশের দিক সে দৃষ্টি প্রসারিত করে দিন। অনেকক্ষণ
তাকিয়ে তাকিয়ে
সে বলল,
বলল, 'এ ন মনে কবো না আমার
কোথাও বেদনা আছে , একটুও না । বে;• •া (বনা দে
তার এঙ্গে শ ব পরিচয় নেই , 1, ” । ব 1ব। পচ,
দ্বিবাহ-পথে পথে পদে
* কোনদিন
দুঃখের শেশ পাইনি।'
অাবাব ব, মানুষের तादावसान को জানে ?
প্রতীক্ষা। জীবনবাবণের যে-উৎসব যে- য়েন যে শুধু এক নেব
ন
দেখা পাবো সেই তালায়।'
বললাম, 'সবাইয়েবই কি তাই?
‘সবাইবেই, হ্যা, নইলে এর কোনাে মানে হয় না। কিন্তু
আমার সে প্রতীক্ষাও শেষ হয়ে গেছে, আশা কৰবাব আব কিছু নেই।
আশা মিটে গেছে।
ক্ষোভ নেই, দাহ নেই, উত্তেজনা নেই—কথাগুলিব সবল সারল্যে
একটি নিস্পৃহ মনের স্পর্শ পেতাম।
অথচ এই প্রা-বৃদ্ধ মানুষটিই একদিন দৈবের হাত এড়াতে
পারল না। একদিন সে গাড়ী পা পৃভল । হয়ত অত্যন্ত নগণ।

রঙীন সুতাে
ভাব জীবন, অতি তুচ্ছ, তবু তাকে অকালে ছিনিয়ে নিয়ে যাবাব
প্রয়ােজন ছিল বিধাতার। কাব শােচনীয় পৰিণামের ভিতর দিয়ে
সৃষ্টির ছন্দ বজায় রাখতে হবে।
হাসপাতালে গেলাম, তখন প্রাং সব তার শেষ হয়ে এসেচে।
জীবনের কোনাে আশা নেই। সর্বাঙ্গে অসংখ্য ক্ষত, পা দুটি ভাঙা-
ষে পা দিয়ে সে সকল শীর্থ পমি কবেচে, সক« দেবালয়।
(চাখ দুটি খুলে নে একটু হাসল। মুঃ কণ্ঠে বলল, 'সব গল্পটা
আব তােমাকে - হতে। না -এখন অব সময় নেই।
পাশের বিছানায় একটি বছর দশেকেব ছোট ছেলে কি এক
দুবাবেগ। বোগে নিজীব হয়ে শুয়েছিল, সেই দিকে তাকিয়ে সে
বলল, ‘খব---খব শুধু, সঞ্চয় নেই, কিন্তু দুঃখ কি জানো?
কথার পাবশ্রমে মুখ বিকৃত কবে’ সে হাপাতে লাগল। তখনাে
তাৰ সৰ্বদেহের ক্ষতগুলি দিয়ে একটু আধটু রক্ত গডিয়ে আসছিল।
বীভৎস তার চেহারা,-অস্বাভাবিক মৃত্যুর অকরুণ দৃশ্য সমস্ত
হাসপাতালটিকে অভিভূত কবে' রেখেছে , অগণ্য মৃত্যুব দল কতকগুলি
নিরপরাধ জীবনকে যেন বন্দী কবেচে এখানে।
লুঠ করে শুধু নিষেই গেম, রেখে গেলাম না কিছু।
চোখ দিয়ে তার জলের বারা গড়িয়ে এলো। বলল, ভাবতে
পারে, আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার যা কিছু সবকিছুই রইল না।

বঙীন সুতো বললাম, তার জন্যে দুঃখ কিসেব ? ‘দুঃখ কিসের?'— একটুখানি সে উত্তেজিত হয়ে উঠল, “তুমি বুঝবে না, তােমার এখনাে চুন পাকেনি-তাহলে বুঝতে নিশ্চিই হয়ে মুছে যাওয়াটা কি যন্ত্রণার। ভাবলাম, ববি, তুমি ত সন্ন্যাসী, জীবনকে অস্বীকার করাই ত তােমাৰ বৰ্ম্ম, তােমার তপস্যা। কিন্তু প কবেই হলাম। করেছিলাম, প্রশান্ত ও নিলিপ্ত হৃদয় নিয়ে সে মৃত্যুকে বরণ ঈবে, কিন্তু তা আর হলো না,চোখে এল তার ক্ষুধা, মুখেব পরে একটি আরক্ত উত্তেজনা,লােভাতুর উৎসুক দৃষ্টিতে সে পাশের বিছানাটাব দিকে চেয়ে বলল, ‘অমনি একটি সন্তান, হােক চিরুগ্ন, বিকলা, হােক সে অকণ্য ••ত- আবার তার চোখে জল গভয়ে এল। শোন । তার্থের পথে আর একটা অল্পবয়সী সন্ন্যাসীর সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। পরণে একখানি ময়লা গেরুয়া, কাধে পাচ সিকে দামে। একটী তুলার কম্বল। ছেলেটী অনেক জায়গায় ঘুরেচে , বে’পা অবশ্য কবেনি। অন্তত তার কথায় বিশ্বাস করা উচিৎ। চোখ দুটা অর্থমুদ্রিত করে নিজের ভ্ৰমণ-কাহিনী একবার শুরু করলে থামানাে মুস্কিল। জাতে সে কৈবর্ত। বাপ হচ্ছে মত কড ৩ রঙীন সুলতা কারবারী। আত্মীয়-স্বজন সবাই আছে। প্রথম ছেলেটাকে আবিষ্কার করাম বোম্বাইয়েব এক ধণালয়। কোনাে মানুষকে দেখলেই সে কেমন যেন আকষণ করবার চেষ্টা করে তার ওই গল্প নিয়ে। কোথায় নেপালের পশুপতিনাথ থেকে অবস্ত করে সেতুবন্ধ রামেশ্বর পর্যন্ত সমস্ত গল্প তার বসে বসে শুনতেই হবে। বলে-বুঝলেন ? দেশ যদি স্বাধীন না হয় ত’ কিছুই যায় আসে না, তীর্থ স্থানগুলাে যতদিন আছে ততদিন আমরা কারােকে পরােয়া করিনে। বস্ম সম্বন্ধে আলােচনা কবতে তাকে একবারও অনুরােধ করিনি, কারণ যেখানে তাকে দেখলাম, সেটা ধর্মালোচনার উপযুক্ত আবহাওয়া একটী ব্রাহ্মণের ছেলে তার সঙ্গী। নাম—চাটুয্যে দেশ ভ্রমণে বেবিয়েচেন , বাড়ী বুঝি ভাট পাড়ায়। দুটী স্ত্রীলােককে নিয়ে চাটুৰ্য্যে দেশ •ণে বেরিয়েছেন। পথে অজীর্ণ বােগাক্রান্ত এই সন্ন্যাসীটী তব সঙ্গ নেয়। বলে,—টাকাকডি সঙ্গে রয়েচে চাটুয্যে মশাই •••••• দেহে তেমন শক্তি-সামর্থ্য নেই, আমি আপনার সঙ্গেই ঘুরবে। তা সত্যিই বলেছিল। দেহখানি যেন একটা পাকানো বেত । অম্ন আব অজীর্ণ বােগে সমস্ত বস একেবাবে শুষে নিয়েছে। মোক দাডির সম্বন্ধে বিধাতার অতিরিক্ত কার্পণ্য প্রথমেই নজবে পড়ে। ছােট ছােট চোখ দুটার মাদকতা দেখে একেধাবে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

বঙন সুতাে ঠাকুর দেবতার নাম কবলেই সে একেবারে গদগদ হয়ে ওঠে। প্রথমে এক আধটা কথা তার সঙ্গে কইলেই মনে হয় ভাব বােগাক্রান্ত দেহের আজন্ম দুর্বলতাই তাব চবিত্ত এবং পুরুষত্বকে নষ্ট কবে দিয়েচে। কথা সে বলে রুগ্ন। নাৰীব মত—সে কথা এমনই নিস্তেজ। রান্নাবান্না ওই মেয়ে দুটাই কবে। পতিতা মেয়ের হাতে খেতে অবশ্য তার বাধা নেই। এ সম্বন্ধে উল্লেখ কবতেই সে কাপড় জড়ানো ছোট একটা পুটলি খুলে ‘ভুবনেশ্বব’ বডি আব মকরধ্বজ বাব কবলে করতে বলল--এসব কিছুই নয়, বুছলেন না? পাপ করচি মনে থাকলে পাপ যেতে বেশীক্ষণ লাগে না। এমনি অসংলগ্ন কথা সে প্রায় সকল সময়েই বলতে পারে। কথা বলবার ধরণ দেখলে মনে হবে লেখাপড়া সে কিছু কিছু জানে। পূজো করতে একবার সে বসলে তাকে ওঠানােই মূক হতাে। খাবার দেওয়া হয়েচে না বললে তার চুপি চুপি মন্ত্র পড়া আর থামতেই চাইত না। আহাদি সম্বন্ধে চাটুয্যে যখন পাশে বসে ঘন ঘন সব কতো, সে তখন আমার ঘরের দিকে চেয়ে লজ্জায় বিবর্ণ হয় বলতো- শুনতে পাবে যে একটু গলা খাটো করে বল না চাটুষ্যে মশাই। = উত্তরে মেয়ে দুটি ককণ্ঠে হেসে উঠে কি একটা মন্তব্য করে বলতে। ৪e

বঙীন সুতাে
পরে
এমনি এক আধটা দুর্বলতার সন্ধান সে নিজেই দিয়ে ফেলে।
হয়ত ঘরে বসে আছি, এক সময় এসে বলবামুন ঠাকুবের
কি রুচি। ওকে খাইয়ে দিচ্ছে-ছি।
চুপ করেই বহলাম। সে বলল-ভালবাসলে কি জাতের বিচাও
থাকে না ? } ছাড়া বিযে কবা বৌ যখন নয় তখন
এমন এক আধটা মন্তব্য সেও না করে থাকতে পাবতো না।
অবশ্য নিজের অসুবিধাকে সে অনেক পরিমাণে মানিয়ে নিয়েছিল।
বাধ্য-বাধকতায় গেলে নিজের দাবী কি আব সব সময়
থাটানা চলে * বিশেষ করে চাটুষ্যে যখন মেয়ে দুটোর সঙ্গে
হাসি-তামাশয় ঘবখানা মুখৰ ক'রে তুলতে—তাকে তখন একটু
বিপদে পড়তে হতো, নিরিবিলি জায়গার অভাবে দু’দণ্ড চোখ
বুজে সে বসতেই পারতো না। অর্থাৎ স্ত্রীলোকের হাসির আওয়াজে
তব মনের সমস্ত বৰ্মভাবটুকু এক মুহুর্তেই উবে যেত। মন্দিরে গিয়ে
সে ঠাকুব শন কববার সময় পেত না, মেলায় ঘুরে ঘুরে ততক্ষণে
মেয়েদের সৌখীনজিনিষ কিনতে হতো। একদিন নাকি
তাড়াতাডি গাড়ী বরবার আগে সে েেয়দের খাবার পরিবেশন
কবছিল। নিজের প্রতি নিজেই সে সহানুভূতি প্রকাশ কবে বলল
এসব কিছুই নয়। বুঝলেন ? আমি যদি ঠিক থাকি ত! হলে সব
কাটিয়ে চলে যাবো। আগুনের ওপর কি আর জল বাড়াতে
পারে?

বঙীন সুলতা
তার মধ্যে ভগবং প্রেরণা ছিল কিন্তু শান্তি ছিল না। পরে পীড়া
তাকে কোথাও অারামে থাকতে দেয়নি।
অত্যন্ত অসময়ে এবং
বাতেভিতে-অকস্মাৎ তাকে অদৃশ্য হতে দেখে দুঃগই হতো।
সন্নাসী
হযে সে যে কেন এই তামসিক ভোগবাদের পিছু নিয়ে রাস্তায়
নেমেছে তা স্পষ্ট অর্থ বুঝতে পারতাম না। যন তাকে ঘরছাড়।
কবেচে কিন্তু দেহের কারণে সে বেচারি পরাধীন। ‘আহার মঞ্চে
সে যথেষ্ট বাদ বিচার কবে চলে। অবসর সময়ে এটুকু সেটুকু সঞ্চয়
করে না আলে তার মন বড খুংখুং কবে। চাটুয্যে এ নিয়ে
হাসাহাসি করলেই সে একটুখানি উত্তোজত হয়ে
হয়ে বলতো-পেটুক
আমি নই, বুঝলে চাটুষ্যে মশাই? যা কিছু থাই সবই ওষুধের সামিল,
া বলে পেটুক নই।
মেয়ে দুটির তরফ থেকে তাকে অপ্রস্তুত এবং বিদ্রুপ করবা
একটি বিশেষ চেষ্টা প্রায়ই লক্ষ্য করতাম।
করতাম। বেচারি কোন জটিল
কথার উত্তর দিতে পারতো না। মনে হতাে এদিক দিয়ে সে অত্যন্ত
অভিমানী , এতটুকু আঘাত কোথাও পেলে মনে শনে সেটিকে
নাড়াচাড়া করে ফুলিয়ে ফঁাপিয়ে তােলে।
বড় মেয়েটি বয়সে প্রায় চাটুষ্যের সমান, দেখলে একটু গম্ভীর
বলে মনে হতে পারে। ছোট একটু উচ্ছল, বলতো-পান এনে
দবো ? পান খেলে অম্বলের ব্যামো ভাল থাকে।
৪২

রঙীন মুখে
সন্ন্যাসী জবাব দিত—তা দেবে জাও, পান অনেক দিন খাইনি।
পান হাতে নিয়ে বলতো, চুণ
অমনি একটুখানি।
ছােটটি আঙলে অঙলে ঠেকিয়ে চুণটুকু দিয়ে যেতে বলে।
বিছানা কবে দেব?
বিছানা ? তা যদি পাবে। তা হলে,—আচ্ছা ঐ কবখানা
পেতে দিয়ে যাও। তােমাদের মতন অমন নরম করে বিছানা আমি
বতে পাৰিনে, কেন বল ?
আমাদের যে মে'র 'ত।
ও ল'ই বটে।
মনে হতো গৃহীব গােপন ক্ষুধ। তার মধ্যে কোথায় যেন ডিয়ে
আছে ।
মেদের সঙ্গে এর বেশী কথা সে আর কী বলতে পারে । কেন
জানি না, তাকে দেখলেই মনে হতো লােকটি উপবাসী। সে ষে
ঠিক মিথ্যাচারী তা বলনে, কিন্তু একটি অস্বাভাবিক সাৰিকতার
আবরণে আপনাকে ফাকি দেবার কেমন একটি চেষ্টা তার সমস্ত
চহারা থেকে ফুটে উঠতো। তাকে দেখে এঙ্কার চেয়ে মনে মনে
বেদনারই উদ্রেক হতো । দেহের শীর্ণতার মধ্যে তার কোনো
তেজ ছিল না। হাত পা গুলি রক্তহীন, চোখের কোণে কালি,
সব্বাতে গ্লানির একটা ছায়া—সর্বদাই যেন চি চি কবচে ।
৪৩

বঙীন সুতাে
রাত্রে সবাই একটু বিপদে পডে। একখানি মাত্র ঘবে ওদেব
চাকজনেব সঙ্কুলান হও; ভাবি কঠিন। পথে আসতে আসতে
এতদিন সব জাগতেই একটি মাত্র ঘবে সন্ন্যাসীকে এই পতিতা
মেয়েটি সঙ্গে যাত্রবাস ব২তে হয়েচে। চাটুযো অত
গ্রাহ
করে না—বেনা বশেই বাত কতে ছাড না। বনে-
আগুনের ওপবাল দাডার ব ব ঠাকু?
ঠাকুর ব
•েএকি সত্যি নয়?
অবে স'ও কথাই ৩ বাচ ।
তবে এ কথাও ত
সত্যি যে
পাথরও আগুনে পােড়ে?
তাব মানে ?
আত্মার ক্ষুধাকে সে ৫ অস্বীকার করে চলেচে-এবথ। চাটুধে
যেন কেন কৰে বােঝে ' কিন্তু ঠ'কুরের আর কোনাে উপায় ছিন না।
একা ভাব পক্ষ সন্ন্যাস জীবন যাপন করা কিছুতেই চলে না।
তবুও কোন কোন দিন বাত্রে ঠাকুব একসঙ্গে শুতে পারতো না।
মনে হতো সে যেন কোথায় একটা অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। লাব
কাছে বসে তার ভাবভঙ্গী দেখতাম।
এদের এই অদ্ভুত অস্বাভাবিক জীবনযাত্রার কোনো অর্থ খুজে
লতাম
না। ব-দরজা বাইবে
দালানে শুয়ে তপসি
৪৪

বুঙীন সুতো
আর সন্ন্যাসীটি যখন অন্ধু তবে একটু একটু গল্প করতো তখনও কি
কোনাে অর্থ আবিষ্কার কবতাম ?
সকাল বেলা উঠে দেখতাম মাঝে খানিকটা ফাক বেথে দুজনে
গভীর নিদ্রায় অভিভূত।
এক একদিন মাবাব তপসির বদলে নানামুখি এসে বাইবে শুতে,
সেদিন আব গল্প অনে না—সন্ন্যাসীর প্রতি সোনামুখি। মৃদু মৃদু
তবস্কাবেব ভাষা শুন্ত পেতা।। তিনটি নবনাবীব এই পঙ্কিল
জীবনব জঘন্য । কি •ন্নাসীর মনে কোনাে ছাপ ফেলতা না?
কিছুই বুঝতাম না , এব তলায় তলায় মানবজীবনেব কি কোন নিগুঢ়
কথা আত্মগােপন কবে ছিল?
এখান থেকে চলে যাবার দিন হয়ে এসেছিল। বিদায় নিজে
বিেরয়ে যাবার সময় মাসীর দিকে চেয়ে মনে হলো, কে সে দুর্বল,
হোক কাপুরুষ-সংসাব যদি তাকে অক্ষম বলে' বাতিল করে দিয়ে
থাকে ত দিক-অপমানিত, ব্যর্থ বেদনাময় জীবনের গভীর রহস্যের
ইহি • • • • ; 'কছু জানে। যাবার সময় মৃদু হেসে আমাকে
বিদায় দিয়েছিল।
নিজের কাছেই মানুষ কী দুর্বোধ্য তা আমি কিছু কিছু জানি।
এক জনের সঙ্গে শেষের দিন কী কথা হয়েছিল তাই তােমাকে বলি,
শোনাে চন্দ্রা :
৪৫

রঙীন সুতো বাড়িয়ে ডিরে কথা বতে অবিধা হচ্ছিল। বল্লাম -একটুখানি বসবে? নদীর উপর অন্ধকার থম থম করচে , বিস্তীর্ণ বালিব চাটা আর দেখা যাচ্ছে না। বশবার সময় সেইদিকেই চেয়েছিলাম। তবুও বুঝতে পাচ্ছিলাম, অশকার পা টচে । কি একটা সুতীক্ষ্ণ মনোভাব অনেকক্ষণ থেকে তাকে উদ্বেল করে তুলেছিল। কাঠের এক টুকরো তক্তাব ওপর বসে পড়বার আগে সে বলল- ৰােগ শৰীয়, দাডাতে আর পাবিনে। কিছু দিন থেকে শরীরটা যে কেন এমন আহে আৰু ভেঙে পচে বুঝতেই পাচ্ছি না। কোনো ওষুধ তুমি জানো যাতে আবে। কিছুদিন আমাকে সোজা । করে' বাখকে পারে ? একটুখানি হাসলাম। অলকা বলল-না ন', তা বলিনি, আমাকে ভুল বুঝ না, দেহের গাধূনিটাকে বেঁধে রাখতে চাইন, প্রাণটাকে শুধু ধরে রাখবার কথা বলচি। সহজে মরতে কে চায় বলতে পারে? অলকার মুখে একটু একটু মদের গন্ধ পাচ্ছিলাম। অকারে চোখে তার কালের আভাস দেখে বললাম-হঠাৎ নেশা করতে গেলে কেন? স্ত্রীলোক হয়ে সে বলল—দিব্যি করে বলছি, তােমার কাছে মিথ্যে বলবো না। ৪৬

বঙীন সুতে
# ওই দেগীনবাবু, ও আমার কিছুতেই ছাড়লাে না। মন্দিরে পূজো
দতে বেরিয়েছিলাম, পথে দেখে তারপর বেড়িয়ে আসতে গিয়ে
এই শান্তি।
বাম--দেখলাম বটে তােমার যােগনবাবুকে, ধনবান বলেই
ঘন মনে হলো। কিন্তু ও-লােকটি আবাব জুটলো কবে থেকে?
অলকা একটু দুঃখের হাসি হাসলো। বল—আর বলাে না,
একটা নেমে হস্কুলে পড়তাম, ও হাচ্চ সেখানকার সেক্রেটারী ।
লোকটি যেমন গম্ভব তেমনি সচ্চবিত্র। একদিন একটু বাজিয়ে
দেখবার ইচ্ছে হল। হেসে কি যেন একটা বলেছিলাম, লােকটি
তার পরদিন আড়ালে পেয়ে আমাকে বল, চুলোয় যাক আমার স্ত্রী,
তােমার মতন আর কাউকে এত ভালবাসিনি। ব্যাস, তারপর
দুজনে বেরিয়ে পড়লাম আর কি।
উদাত কৌতুহল চেপে রেখে বল্ল-এই যে নবদ্বীপ না কোথায়
এর আগে ছিলে ?
হা, সে বোধ হয় তুমি জানতে। গোঁসাইজির সঙ্গে ত তােমার
আলাপ ছিল।
সেখান থেকে চলে এনে কেন ?
নেশাই করুক আর বিভ্রাম্ভই হােক=বেশ বুঝলাম, লজায়
অনকার মাথা হেঁট হয়ে গেছে। খানিক্ষণ পরে মাথা তুলে বিজড়িত

রঙীন সুতাে
মৃদুক, সে বললে—নেই যাও, একটি ছেলে হয়েছিল,—মরা,
গোসাইজিব ওখানে তাই আর থাকা চললাে না, নবদ্বীপে যে তাঁর
অনেক খ্যাতি।
অলকা পুনরায় বল্ল-ছেলে থাকলে আমায় কি কেউ জায়গা
দিত মনে কব ?
দুজনে মিলে তখন খেতাম কি ? আমার দেহটা
গম যদি বা কিছু থাকে, সন্তানের দাম কি কেউ দেবে ?
চুপ কবে বইলাম। একটু পবে বলাম—যতদূর মনে পড়ে বিয়ে
হবার পবেই তুমি সেই ডাক্তাবের সঙ্গে চলে গিয়েছিলে। তারপর
একবার শুধু তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
অলকা এবার একটু অধীর হয়ে উঠলাে ব-একটা মেয়ে
অমুকের সঙ্গে চলে গিয়েচে তােমরা শুধু এইটুকুই জেনে রাখো, এই
খবরটাই সংসারে সত্যি হয়ে ওঠে, কিন্তু কত বড় দুঃখ বুকে নিয়ে যে
তার পথে নামে, কতখানি আঘাত পেলে •••যদি তােমরা জানতে
তা হলে
ঠাৎ থেমে সে নিজেই বা-থাকগে, অনেক বক্তৃতা দিয়েছি।
বললাম-না, আমি অন্য কথা ভাবছিলাম। বলছিলাম যে,
পুরুষ পরীক্ষা করে বেড়ানােটা-
অলকা বেশ স্পষ্ট করেই বস্তার মানে, প্রকারান্তরে তুমি
আমাকে চরিত্রহীন বলতে চাও-এই না?-অন্ধকারে একটুখানি
৪

রঙীন সুতাে
হেসে সে আর বল-আর তা ছাড়াই বা আমি কী বল?
মেয়েমানুষ হয়ে পুরুষ মানুষকে বিচার করে তার সঙ্গে ঘর করতে
গেলেই আমার মতন সমস্ত জীবন ধরে দুঃখ পেতে হয়। মানুষের
মিতন মানুষ কি আর মেয়েরা কোনদিন পাবে তুমি মনে কর?
মানুষকে যে দেবতা হতে হবে।
আবার অলকা বল—আর তা ছাড়া কি জানো, স্বামীর ঘর
ছাড়লে পৃথিবীতে আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া
স্ত্রীলোকের পক্ষে ভারি কঠিন। যে-গাছের গােডা নেই তার আগায়
কি আর ফুল ফোটে ?
বেশ বুঝতে পাচ্ছিলাম অলকার কথাবার্তা ক্রমেই অসংলগ্ন হয়ে
আসচে , শরীরটাও তার বসে বসে গল্প করবার উপযুক্ত নয়। বললাম
রাত হলো, যােগীনবাবু বােধ হয় ব্যস্ত হয়ে উঠবেন এর পরে।
রাম বল। ব্যস্ত।—গিয়ে দেখবে। হয়ত আহিকে বসেছে।
মাতাল হলে বুঝতাম কিন্তু তার চেয়েও খারাপ, লােকটা ভণ্ড। মনের
ঢেকুর তুলে মহাদেবের মন্ত্র পড়ে। ব্যস্ত সে আমার জন্যে এতটুকু নয়।
নিতা আজ আমাকে ধরেচে তাই, নৈলে-
এবার অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম। ঘাটে দু একটি নালােবা
তাও নিবে গেচে। খেয়ানৌকার টিটমে এক একটি
.

রঙীন সুতাে
আলাের রেখা কেবল নজরে পড়ছিল। মাথার উপর শুধু এক আকাশ
তারা বলল করচে।
জলের দিকে চোখ ফিরিয়ে এক সময় অলকা বলল—একটি কথা
বললে তুমি হয়ত এখুনি হেসে উঠবে। কিন্তু একথা তুমি ছাড়া
হয়ত আর কেউ বিশ্বাস করতো না।
বললাম-বলই না কী কথা?
একটু থেমে অলকা বলল—তােমাকে কাছে পেয়ে আমার কেবলই
কাদতে ইচ্ছে করছে। আর খানিকটা নেশা। কবলে এতক্ষণ বােধ হয়
কেঁদেই ফেলতাম-নয় ?
(कन वन ?
অলকা বলল—যে আমার সব জানে তার কাছে আমি আর
নিজেকে লুকোতে পারিনে।
বললাম—মানুষের সবটা কি জানা যায় ?
তা যায় না, যায় না বলেই ত এতকাল এই চোখ দুটে। নি, পথে-
বিপথে ঘুরে বেড়ালাম! আচ্ছা, তুমিই বল না, একি আমার অন্যায় ?
দুষ্টলােককে—তা সে যেই হােক—আমি সহ্য করতে পারিনে, সেটা
কি আমার এত বড় পাপ।
বললাম—এত পাপ-পুণ্যের কথা নয়, এ তােমারই কথা।
হ্যা, আমিও তাই বলচি, বুঝলে? আমার সত্যি কথা হচ্চে যে

রঙীন সুতো
কখন কারো আশ্রয়ে না থাকলে আমি বাচতেই পারিনে। আমি যে
লোক। অথচ মনের মত মানুষটিকে খুজে বেড়াচ্চি পৃথিবীময়
ঘুরে ঘুরে-অলকা একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নদীর দিকে তাকাল।
দুজনেই এক সময়।উঠে দাড়ালাম। বললাম—এই শরীরে একলা
বাসায় ফিরতে পারবে?
খুব। নেশা ত আজ নতুন নয় বলে অলকা বেশ সহজেই
আস্তে আস্তে চলত লাগল।
পথে একটা গলির মধ্যে চলে যাবার আগে ঠিকানাটা দিয়ে সে
ব—সামনের বুধবারে উনি যাবেন গয়ায় পিণ্ড দিতেদিন দুয়েকের
জন্যে। এই সময় তুমি এক বার এসো আমার কাছে, অনেক কথা
আছে ।
মাথার দিব্যি রইল ।
সাপের মত একে বেঁকে গলিটার মধ্যে সে চলে গেল , তার
গতি ভঙ্গী যদি কেউ দেখতে তা হলে বলত, তার অনুতপ্ত জীবন
এতটুকু তাকে ক্লান্ত করতে পারেনি। জানি মানুষের কাছে অলকা
ঘৃণাই পাবে শ্রদ্ধা পাবে না। তার সতীত্ব নিয়ে কথা উঠবে, অথচ
আমি জানি কী যায় সে এই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
মলিনার মত মেয়েকেও সহজে কেন বােঝা যায় না সে কথাটাও
তােমাকে বলি চন্দ্রা শােনো

রঙীন সুতো তিন ক্রোশ পথ হেঁটে গেলে তবে শে। ছােট ছোট খাল- বিলগুলি বর্ষার ঘােল জলে পরিপূর্ণ হয়ে পথ আগলে রয়েছে। প্রাণের শেষ বর্ষণের পর উপরের আকাশ পরিচ্ছন, নির্মল নীল, সাদা কতকগুলি মেঘের টুকরাে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল। দিগন্ত বিত করে উজ্জল রৌদ্রকিরণ শিশির-সিক্ত প্রান্তরের উপর ঝিকমিক করচে। নিন মাঠের উপর দিয়ে আমরা দুজনে যাচ্ছিলাম। স্বাটুকেশটা আমার হাতে, মলিনার কাছে জলের ক্লাঙ্ক, জুতোটা তাকে হাতে করে নিতে হয়েছে, হাটুর কাছে কাপড় তুলে জল পার হতে গিয়ে সুন্দর পা দুখানি তার কর্দমাক্ত ; সে আসছিল পিছনে পিছনে। পায়ে হাঁটা একখানি গ্রামের ধার দিয়ে চলে গেছে। তারই দিকে মুখ ফিরিয়ে হাত দিয়ে চোখে সূর্যের কিরণ বাঁচিয়ে মলিনা বল, এ গ্রামের কি নাম বলত ? বললাম, তােমার এদিকে শ্বশুরবাড়ী, তুমি জানাে না? আর কোনাে কথা হলো না, নিঃশব্দে চলতে লাগলাম। এখনাে অনেক বাকী, বহুদূরে ষ্টেশনের পাশে অল-সংরক্ষণের বড় ট্যাটা এখান থেকেও দেখা যাচ্ছিল, সেইটিই ছিল আমাদের পথ- নিল। মাঝে মাঝে আমরা ছােট ছোট জলাশয়ের উপর দিয়ে নয়াপায় হয়ে হেঁটেই পার হচ্ছিলাম, ঘণ্টাখানেক এমনি করে এলে রঙী। মশিন। এক সময় বলল, ‘সাৰখান, সাপের ঘাড়ে যেন পা দিও না, আল- ঢোড়ার ভ্যাঙায় উঠে রােদ পোহাড়ে। বাবা, বড় ভয় করে। আচ্ছা, ওই না সােনামুখীর জলক, মাছমারে না ওখানে? যাই ব, নােনাভাঙড় আমার কি খেতে ভাল লাগে না। এমনি করেই খাপছাড়া কথা কইতে কইতে এতটা পথ সে এসেছে, কখনাে উত্তর দিয়েচি, কখনাে দিইনি। কিছুদূর এসে আবার সে হেসে বলল, কাপড় তুলে হাটুচি, অথচ পেছন দিকে পেটিকোটের খানিকটা ভিজলো কেমন করে বুঝলাম না, কাদাও লেগেছে, লােকে দেখলে মনে করবে কি? গাঙচিল চেচাতে চেঁচাতে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, ছোট ছােট বক চরচে জলের ধারে ধারে—সুমুখে পতিত জমি, সেখানে চাষ হয় না অথচ ঘাসে ফুল ফোটে। সেই অনামা ফুলগুলির বৌ রুক্ষ গ নাকে আসটে। গ্রামের প্রান্তসীমায় কতকগুলি সাদা কাশফুল মাথা দোলাচ্ছিল। মাঠের মাঝখানে একটা প্রাচীন বটগাছের ধার দিয়ে পার হচ্ছিলাম, তারই ছায়ায় এসে মলিনা বলল, একটু বসে যাই বাপু, এক নিখেসে এত হাঁটতে পারিনে, আর কতখানি পথ আছে ? বলে সে বটগাছের ধাঁধানো বেদীর উপর জুতো মোড়াটা রাখলাে। এই ত এসে গেচি, আর কোশ খানেক।

রঙীন সুতাে
কোমরের কাপড় দু’হাতে টেনে সে কমি গুলো, বলল, সেই
সকাল থেকে হাঁটছি,-ওমা, এখানে সিদুর মাখানাে ঠাকুর রয়েছে, এর
ওপর জুতাে রাখলাম?' বলে সে সচকিত হয়ে এদিক ওদিক তাকালাে,
তারপর হেসে আবার বলল, 'ভাগ্যি কেউ নেই এদিকে।
এড়িয়ে
বইলে কেন, একটু বসে?
আঁচল দিয়ে সে তার পথঙ্গা ঘর্মাক্ত রাঙা মুখখানি মুছে ফেললে,
তারপর বেদীর উপর উঠে বসে বলল, তেষ্টা পেয়েচে, জল খাবে ?
খাবে না? তবে আমিই একটু••••••জল না খেয়ে আমি বাপু থাকতে
পারিনে।'
ক্লাঙ্কো ছিপি খুলে সে এমন করেই জল খেল যে অধর থেকে
গলায়, এবং গলা থেকে বুকের আঁচল পর্যন্ত ভিজে গেল।
তারপর সে স্থির হয়ে বসল। বলল, তােমাকে কড়া কথা শুনিয়ে
দিলে ওরা, তার জন্যে কিছু মনে করাে না। আমার মুখ চেয়ে••উনি
থাকলে হয়ত এত গণ্ডগােল হতাে না।
একটু হেসে চুপ করে রইলাম। গায়ে গা ঠেকিয়ে মলিনা বসেছিল,
এবার কাৎ হয়ে আমার পায়ের ওপর মাথা রেখে ভয়ে পড়ল। বলল,
বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে, আঃ। কাল রাতে এক মিনিটও চোখ
বুজিনি। আচ্ছা, আমি যে অত ঝগড়া করতে পারি, মুখ খারাপ করে
৫৪

রঙীন সুতে গাল দিতে পারি, তােমার একটু আশ্চৰ্য্য ঠেলে না? ছোট বেলা থেকে তুমি কোনােদিন আমার মুখে—?' বলে সে মুখ লুকিয়ে হাসতে লাগল। মাথার উপর বটগাছের পাতায় পাতায় বাতাসের শব্দ হচ্ছিল, তারই কোন্ নিভৃতে কয়েকটা শালিক কলরব করছে। মাকে মাফ একটা কাঠবিড়ালী এসে চকিতে ঘুরে যাচ্ছিল। -একদিন দেখে এই পথটা দিয়ে আমি একাই যাতায়াত করব, এই পথটার জন্যেই বাড়া আমার এত ভাল লাগে। হাট বুঝি? তা খামাকে কোন মেয়েই বা ছেড়ে থাকতে পারে বল ত? স্বামী যদি মনের মত হয় তবে একটু থেমে মলিনা বলল, তােমাকে বলতে আমার কিছু না নেই, আর এখানে কেই-বা আছে - বললাম, “ঘূমে যে তোমার চোখ জড়িয়ে আসছে, এখনাে এতটা পথ। মদিনা সে-কথা কানে নিল না, নিদ্রাজড়িত চকে বলতে লাগল, একটি দিনের কথা আমার মনে পড়ছে, আমার সব চেয়ে স্মরণীয় দিন- তোমাকে ছাড়তে হবে একথা যেদিন আমি সেদিনের কথা -বলচিনে একটু থেমে সে বলল, 'যেদিন ৰােগানকে দেখলাম। সে যে কী আনন্দ, তোমায় বলতে পারব না, নিষ্কলঙ্ক আনন্দ! বড় একটা

রঙীন তো
যায় চোখের সামনে যখন এসে দাড়ায় তখন নিখেকে কত
মনে হয়, কত তুচ্ছ। ভাবতে পারাে একটা লােক জীবনে কোন দিন
অন্যায় করেনি, অধৰ্ম করেনি,সত্যিকারের বড় চরিত্র কাকে বলে
=
বলো?
আমিও জানতাম না। মলিনা বলতে লাগল,-বড় লােককেই
নি, বড় মানুষকে জানিনে। চোখে তার স্বপ্ন, বুকে বলিষ্ঠতা,
চরিত্রের অপূর্ব ওল,-এক হাতে আশা অন্য হাতে আশীৰ্বাদ,
মানুষের পরে নিঃস্বার্থ সহানুভূতি, মাথা আমার হেঁট হয়ে এল।
আর সে বল না, চোখ বুজে পড়ে রইল, নিখাস দ্রুততর বইতে
D
মনে হ’ল পায়ের উপর মাথা রেখে বুঝি বা ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু
হঠাৎ এক সময় জেগে উঠে বলল, 'সেদিন আমি খা করতে শিখতাম,
সত্যি বলছি তোমাকে, আমার প্রায় কোনাে ফাকি ছিল না, কোনো
।
তরকারীর বােঝা মাথার করে একটা লােক এইদিকে তাকিয়ে
গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছিল। বটগাছের সুন্থি ছায়ার উপর দিয়ে দুধ
একটু একটু সরে যাচ্ছে, দূরে দিগন্তবিলীন মাঠের পরে উনার নীল
আকাশ নেমে গেছে, তাই কোল ঘেষে এল পাখী সার বেঁধে
এইদিকে উড়ে আসছিল। বেলা অনেক হয়েছে।
৫৬

রঙীন সুতাে
“দিদিমার বলবার আগেই মন্দিরের সিড়িতে সাষ্টাঙ্গে গলায় আঁচল
দিয়ে মােগান পায়ের ধূলাে নিলাম, তিনি স্নিগ্ধ হেসে আশীর্বাদ
করলেন। মনে হল আমার পরমায়ু যেন বেড়ে গেল।
মিনিট দুই পরে সে হঠাৎ ঝঙ্কার দিয়ে হেসে উঠল, সে-হাসি মুখে
জলের বাধটার উপর দিয়ে ওপারে মাঠের বহুদূর পর্যন্ত ছুটে গেল,
‘পূজো করলাম, এদ্ধা করলাম, কি-দানো সে গল্পটা বলেছি
তােমাকে ?' চোখ খুলে সে মুখের দিকে তাকাল।
‘বলনি ত ?
বলিনি ৰটে। বলিনি যে যােগানৰ সন্ন্যাসী নয়। সত্যি, যােগা-
নন্দ সন্ত্রাসী হলে পৃথিবীর চেহারা অন্যরকম হতো।
আমি বুঝলাম সে
। তোমাদের কখন চেনা যায় জানাে?—যখন আমাদের কাছাকাছি
আসসা-যােনর প্রতি শ্রদ্ধা এখন আমার চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে।
কি রকম?
সে পর্গলােকেও নয়, দেবতাও নয়। সে আমার । ভক্তিকে
নষ্ট করে দিয়েছে। হা, জানি, তুমি বলবে মেয়েদের মন এমনি তরল,
এমনি ভক্ষু—কিন্তু কী করব বল!
ঘা গেল কেন ?
ভালবাসতাম যে! সে যে এখন আমার স্বামী, আমাদের ভিতরে

রঙীন সুতাে এখন সেই ও শ্রদ্ধার অস্বাভাবিক সম্পর্ক নেই। 'कोबारक पवन তােমার মুণ্ডু। চল যাই।' বলে মদিনা স্বচ্ছ আনন্দে আর একবার হেসে উঠে পড়ল। শুনলে ত চন্দ্রা ? মলিনা ঠিক কেমনটি তাই নিয়ে ভাবছিলাম একটি গল্প রচনা করব। সকাল বেলাতেই লিখতে বসলাম। আবহাওয়াটি বেশ লিখবার মত। প্রাতঃকাল থেকে অতি মন্থর এবং নিঃশব্দ বৃষ্টিপাত হচ্ছিল, মাঝে মাঝে জলের হাওয়া উঠে পরজা জানলা কাপিয়ে হু হু করে বয়ে যাচ্ছে। দু’দিন ধরে এত বর্ষণ হল তবু দিবারাত্র আকাশে ঘন মেঘের আয়োজন ক্ষান্ত হল না। ভাবছিলাম, বুঝলে চন্দ্রা, মলিনাকে নিয়ে একটি করুণ ও মধুর ভালবাসার গল্প আজকের এই সজল তার মধ্যে শেষ করব, একটি অতি মােলায়েম ছড়, টেনে পাঠকের মনে সেই চির- দিবসের বিচ্ছেদের সুর ধ্বনিত করে তুলবে। যে ঘরটিতে বসে আমি লিখবার চেষ্টা করছি, তার চারিদিকে আমার প্রতিবেশীর ঘরে প্রতিক্ষণেই একটা কিছু করব এবং জটলা লেগেই থাকে, আর এই বর্ষণ-মূখর প্রভাতেও তার ব্যতিক্রম নেই। মনে মনে খলিশার সঙ্গে একটি নায়কের চরিত্র করে কী নাম রঙীন সুতো দেবো ভাবছি এমন সময় পাশের বাড়ীর নীচের কলতলায় ভটচাষি গিন্নি হাঁক পাড়লেন, একটিমুহুর্তেই আমার সাজানো বাগান তৎক্ষণাৎ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ভটুচাধ্যি গিন্নীর ক্যাবলী বশ করলেই তার চেহারা ও চরিত্র তােমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে চা, এই আমার বিশ্বাস। তার গলার আওয়াজ শুনলেই আমার মনে হয় তার হাতে শাখা, পরণে কস্তাপেড়ে শাড়ী, চুলওঠা মাথায় এতখানি ভাবছেৰে সিঁদুর, দু'পা হাজা ঘা। বীণানিন্দিত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘তুলে দাও, ভাঙা পাচিলট। তােমরা তুলে দাও বাপু, নৈলে আমি আর এ-ৰাজীতে টেকতে পাৰিনে, একটা বিলি-ব্যবস্থা তােমরা কর। কি হল' গা বৌমা ? কিছুই হয়নি, হবে আবার কি মা? ছোটপিসিমা কথা তুললেন কিনা তাই ঠাকুরপােকে বলছিলাম, তােমরা পাচিল তুলে দাও। আমরা গরীব বলে কি আমাদের আবরু নেই ? এ পাড়ায় এই পাঁচিলটির আলোচনা শােনেনি, এমন লােক খুঁজে পাওয়া কঠিন। হেসে চুপ করে রইলাম। ভাবলাম এবার গটো ধীরে ধীরে আরম্ভ করা যাক, ওরা পাচিলে ততক্ষণ মাথা ঠুকে মরুক। অটুচাষি-গিন্নীর কণ্ঠস্বরে আবার আমার কলম কেঁপে উঠল রঙীন সুলে তিনি পঞ্চমে উঠে হাঁকলেন, 'তােমাদের আর কি বল, তিন কাল গেছে এক কাজ বাকি আমার হয়েছে যত জাল।। ‘তা মা তুমি সােমত্ত মেয়ে না হয় একটু রােগা ‘রােগাই হই আর হাড় ক'খানাই সার হােক, ছোট-পিমািদের হে যেমন অসাড় হয়ে গেছে, আমার তা এখনাে হয়নি মা । কোন পরপুরুষ তাকালে এখনো আমার গা সির সিয় করে।-আমি মরুতে মা লক্ষবার আনাগােনা করি, সব সময় কি ঠিক থাকি, হয়ত গামছাখানা পরেই দু'ঘণ্টা রইলাম—নিজের বাড়ীতে আমি যা খুসী তাই করব। শ্রোতা ও দর্শকগণের কৌতুহল পরিতৃপ্ত করে তিনি বলেন, 'ওমা, যখনই চোখ পড়ে দেখি ও-বাড়ীর বড় ছেলেটা ঘুলঘুলি থেকে সরে গেল, ওই যে গো ওদের শৈলেন ••ওকি বাব গা? পরের বাে’য়েব দিকে হা করে তাকানাে? কী দেখিস? আমিও মানুষ তুইও মানুষ, আমাকে এমন করে দেখবার কী আছে শুনি? * কানের ভেতর দিয়ে তাহার সঙ্গীত আমার মরমে পশতে লাগল। কলমটি রেখে সেইদিকে কান পেতে রইলাম। তিনি বলতে লাগলেন, আর কেউ দ্যাখে না, আর কি ছাই আমারই ওদিকে চোখ পড়ে গা? যত ভাবি দেখুকগে, যা খুশী তাই করুক গোজি কৰ না, তৰু ছোড়া আমার নজরে পড়ে যায়, চোখ আমায় রঙীন সুতে অবাধ্য—আমি বাবা কম মেয়ে নই, আমিও সব খবর রাখি। জানলার ধরে বসে’ গাড়ি কামানাে হয়, আয়না নিয়ে চুল আঁচড়ানাে-যেন কতই গম্ভীর। কার চোখে তুমি ধূলাে নাও শুনি। আমার চোখে ? আমি বাবা তােমায় নাড়ী-নক্ষত্র আনি। বউটার কাছে আবার সাধু সেজে থাকা হয়, এবার বউটাকে বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দিয়ে একেবারে আউট হয়ে বসেছেন। এখনকার ছেলেদের এতটুকু বিশ্বাস করাে না মা, তারা সব পারে। সব জ্ঞান তাদের আছে, শুধু ধৰ্ম্মজ্ঞান নেই। তাই নাকি? তুমি কি বল চদ্ৰা ? ‘তােমরা বুঝি দ্যাখােনি ছোডাকে? দিব্যি রইল, একবার দেখাে। দেখে ওর মুখে চোখে কি অহঙ্কার। ‘কেন, অার কেন বৌদি? ‘কেন ? সুপুরুষ বলে ?” আমার চোখ ভাই বড় ধারালো, ওর মনের কথা পর্যন্ত বলে দিতে পারি। সেদিন কইলায় আমায় দেখে ঝপাং করে জানলাটা বন্ধ করে দিল, যেন কতই সাধু। তােমরা জানো না মা, ছোড়া বদমাইসের ধাড়ি, বৌটাকে নিয়ে কি আদিখ্যেতাই করে। বলি দেখিত একদিন ছোড়ার কাণ্ড-কারখানা। দেখেছো , আমার ঘরের সামনে ওর ঘর?-মানটা বই থাকতো, সেদিন রাঘিরে ঘরের আলাে নিবিয়ে খুললাম মা জানলাটা-উনি গিয়েছিলেন রঙীন সুলতা বমান বাড়ী-ওমা কি হয়ে গে, বৌকে ভালবাসা জানাবার কী ঢঙ ? এ যে বেশেবাড়ীর হদ্দ। আমরাও ত ঘরের বৌ মা, কই ওরা ত এমন ব্যাভার করেন না,-একটা চক্ষুলজ্জাও নেই গা ? কে যেন কি একটা প্রতিবাদ করতে গেল, তিনি বলে উঠলেন, থামে ঠাকুরপাে, আমার মুখের ওপর ওকালতি করতে এসে না, তােমাকে আমি চিনি, শৈলেনকেও চিনি। পাড়ায় ত আর মাথা নেই যে এই বেলেল্লাপণাকে ঢিট করবে, আমাকেই সব সইতে হচ্ছে। —সেদিন দেখি, বুঝলে পিসিমা, হেসে হেসে একখানা চিঠি পড়া হচ্ছে, পেম পওর যেন আর কেউ পড়ে না, ইচ্ছে করল নিই একঠা গালে চড বসিয়ে—বেহায়া। কই কেউ বনু দেখি ওর কথা? একটু উনিশ বিশ কেউ দেখেচে কখনো? এদিকে যেমন গম্ভীর, তেমনি পূজো- পার্বণ নিয়ে দিনরাত থাকেন। আমার মুখের দিকে চেয়ে কখনো হাসতে দেখিনি, এমন সচ্চরিত্র মানুষ, মানুষ ত নয়, দেবতা। ওর কাছে ও? এখনকার ছেলের মা হালকা, ছটফট, একটু রাশভাবি নয়, মেয়েমানুষের কথায় ওঠে-বসে, ভালবাসা ছাড়া দুনিয়ায় তাদের আর কোন কাজ নেই। আ মরণ। সেদিন দেখি মা, পাঞ্জাবী উড়িয়ে গলায় চাদর দিয়ে ছড়ি ঘুরিয়ে ফুলবাবু শফরে বেরুচ্ছেন। ইচ্ছে হল পেছন থেকে গিয়ে গলার চারখানা পাকিয়ে ছডির বাড়ি অনি সপসপ কি ৬২

রঙীন সুলতা:
বলব যে আমি ঘরের বৌ।
সকলের মুখ দিয়ে একটা হাসিব শব্দ শােনা গেল, খুব সম্ভবত
তার অভী দেখে। কিন্তু আমি হাসলাম অন্য কারণে। তুমি জানো
চা বে কারণটা কী?
বলছিলেন, যদি ভাই বৌছুড়ী দেখতে রূপবতী হতে।।
রাম বল, ওর নাম রূপ ? আমাদের মা যতই অভাবের ঘর হোক, এই
আর না খাই, কাঠামােটা দেখলে শত্রুরও চোখ ফেরাতে পারে না—বড
মুখ করে বলতে পারি আমার চেহারার সঙ্গে ওর বৌয়ের-অবিহ্যি
বলাটা ভাল দেখায় না তা জানি, ঘেন্নাও করে—
একজন বর্ষীয়সী বলেন, তাত বটেই বৌমা, সব কথা বলাও যায়
না, অথচ মনেও হয়। তোমার এখনে। যা চেহারা আছে, যত্ন-আত্তিতে
থাকলে-তোমার রূপ ত ছাই চাপা আগুন।
কলতলায় কাপড় আছড়াতে আছড়াতে ভটচাষি-গিন্নি বলন,
সেই কথাই ত বলচি পিসিমা, ও-ছোড়াও সে কথা বােঝে। উনি
আমার শিবতুল্য সােয়ামী, তবু বলি, আমি যদি ওই শৈলেনেব
হাতে পড়তাম তবে দেখতে তোমার, কী জব্দ করতাম। আমার
কাছে বাবা ওসব চালাকি চলত না। হোক পরপুরুষ, তবু বলি,
আমি চোখ বুঙ্গিয়ে ও-ছোড়াকে বুঝতে পারি, ও কি কম শয়তান ?
কত দিন রাতে শুয়ে শুয়ে ভেবেচি, ছোড়াকে কি করে বাগে ফেলা যায়,

রঙীন যতাে
কোনাে উপায় পাইনি, ইচ্ছে হয় ওর বৌকে বলে দিয়ে এ করি।
তা’পর বলি, না, একটা কিছু কেলেঙ্কারী হবে। এমন ইচ্ছে করে
পিসিমা, যে, যাই লুকিয়ে ওর ঘরে
ওর ঘরে আগুন আলিয়ে দিয়ে আসি,
আমার এক একবার অসহ্ন হয়ে ওঠে। ওর কথা ভাবলে রাতে আমার
ঘুম হয় না। ভগবান আমাকে শাস্তি দিয়েছেন, নৈলে অমন নচ্ছার
লেকের পাশে আমাকে দিন কাটাতে হয় কেন? ঠাকুরপাে, তােমরা
এর একটা বিহিত করে, কিছু একটা করো, নয়ত ছাত পর্যন্ত উচু
একটা পাচিল তুলে দাও, কিছু না পারো, চল বাড়ী বিক্রি করে' এদিক
থেকে চলে যাই। আমি আর পারিনে, এ আর আমার সয় না, এর
পর গলায় ড়ি দিয়ে আমি সব জালা জুড়ােবো।
‘বেশ ত বৌদি, আমরা ও বাড়ীর লােকদের ডেকে বলিগে ?
“না, না—বলতে গেলে বা ৰলৰে, তােমাদের ঘরের বউকে
সাবধান কগে, তখন তােমাদের মুখ থাকবে কোথায় ? লুকিয়ে
লুকিয়ে দ্যাখে, তার ত আর প্রমাণ নেই, অথচ তার সব জালা আমার
সব অশান্তি আমার। তোমরা कि
জানবে ধামর হয়েছে
কাটাবন দিয়ে টানাটানি
শই বুঝলাম কান্নায় ভটচাষি-গিণীয় গলা বুজে এল ।
সেদিন সকালের কলরব ইনেই শেষ হল কি আমার গল্প
লেখা আর হল না, চা। গেমের
প্রেমের গল্প বিনিয়ে বিনিয়ে লেখাই
* ৬৪

রঙীন সুতাে
সাহিত্যের একমাত্র বিষয়বস্তু নয়। ভট্‌চাৰ্যি-গিন্নীর মত হতভাগিণী
মেয়ের আবরুর কথা শুনতে গিয়ে যদি একটি সকাল প্রেমের গল্প না
লিখে নষ্ট করতে হয়, তাতে
সাহিত্যের বিশেষ কোনাে ক্ষতি নেই,
তুমি কি বল ?
মনের মানুষ যেবার খুঁজতে বেবিয়েছিলাম, চা, তখনকার একটা
অভিজ্ঞতার কথা বলি, শােনো
চিঠি লিখেচি, টাকা এলেই চলে যাবো। রুগ্ন হলে বোধ হয়
কাছাকাছি শহরের
হাসপাতালে আশ্রয় পেতাম কিন্তু শরীরটা সুস্থ
থাকার দরুণ ছােট কাফিখানাটি ছাড়া আর কোথাও থাকবার জায়গা
পাওয়া গেল না।
ছােট্ট কাফিখানাটি একেবারে সমুদ্রেব চডর উপর। নারিকেলের
খুটি, বালদো, আর করােগেট দিয়ে ঘরখানি তৈরী, তারই অসংখ্য
ছিদ্র দিয়ে অবিশ্রান্ত সমুদ্রের ঝড়ো হাওয়া বইছে, হাসফাস করে নিরন্তর
একটি দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হচ্ছে। আগুন লাগবার ভয় এখানে বড়বে,
তামাক খেতে গেলে অনেক আইন কানুন মেনে চলতে হয় ; উনুনের
আঁাচটাকে সামলে রাখা একটা মস্তবড় কাজ।
‘ম্যলেক’কে অনেক প্রলোভন দেখাতে হয়েছে, কবুল করেছি তার '
পানার চেয়ে অনেক বেশি। লােকটি মন্দ নয়।
।

বঙীন সুতে সমূহের চড়ায় চিৎ হয়ে শুয়ে ঢেউয়ের অবিচ্ছিন্ন গর্জন শুনতে শুনতে দিন কাটে। একাকীত্বকে ঘিরে ছােটখাটো একটি জগৎ গড়ে উঠেছে কি আর করি, অদূরে ছোট পাহাড়ের গায়ে যেখানে ঢেউগুলো এসে ভাঙে তারই কোলে গােপন গুহার মধ্যে নিজেব কল্পনাকে ছেড়ে দিই, দুতিনটি তারার সঙ্গে বেশ চেনা শােনা হয়ে গেছে, সূত্তের কতক্ষণ পরে তাদের প্রথম দেখা পাওয়া যায় তা বেশ জনি, আকাশ আর সমুদ্রের বুঙ, কখন বদলায় তার একটা মােটামুটি হদিস বেশ যন করেচি। মাঝে মাঝে চলার পথ ধরে বহুদূর পর্যন্ত চলে যেতাম, বালির পথ সবাইকে প্রলুব্ধ করে দূরে নিয়ে যাবার জন্য । একটুখানি তামাসা করবার লোভে কাফিখানার সঙ্গে মনটাকে বেশ করে বেধে নিজেকে আলগা করে দিয়ে হাঁটতে শুরু করতাম। হাঁটতে ইটিতে বহুদূর গিয়ে হঠাৎ ফিরে দাড়িয়ে পথটাকে ফাকি দিয়ে হেসে ছুটে পালিয়ে আসতাম। বালির পথ, চলতে ভারি অসুবিধা হতো—তা হােক, পিছন দিকে আসন্ন সন্ধ্যার একাকিনী নিরুদ্দেশ অন্ধকারের মিনতিকে এড়াতে পারলে বাচতাম। সে যেন পথ ভােলাতো। কাছেই চোট বন্দর। নাম ওখা। সপ্তাহে চারদিন করে জাহাজ বাতায়াত করে। কোশখানেক দূরে ত্রিশূলীর একটা মন্দিরকে কেন্দ্র করে ছােট একটি শহর। সেখানেই হাট-বাজার-লােকালয়। ৬৬

রঙীন সুতো
জাহাজ জেঠিতে এসে ভিড়লেই কাফিখানায় শ্রমিকদের জটলা হয়।
খালাসীর সংখ্যাই বেশি। তা ছাড়া কেউ বা টিকিট-চেকার। জন
দুই পুলিশের লােক, তার মধ্যে একজন আবার গােয়েন্দা
জাহাজে যারা কাজ করে তারা নিজ নিজ জীবনের স্মৃতিকথা -
আওড়াতে পারলে আর কিছু চায় না। এই বােধ হয় নিয়ম। কারণ,
প্রায়ই দেখেচি জলের উপর যারা ভ্রমণ করে তারা জাহাজ যেদিকে
চমচে তার উলটো দিকে তাকিয়ে থেকেই সময় কাটায়। যাই হােক,
অনর্গল উচ্ছল আত্মকাহিনী শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে
যেত। নিতান্ত করুণাপ্রার্থীর মত এক পাশে বসে বসে তাদের দিকে
চেয়ে থাকা ভিন্ন আর কোন কাজ ছিল না।
বারণ করতে গেলে হয়ত
বা মাবতেই উঠবে—তাদের বিরাট দেহগুলির দিকে তাকালে এই
কথাই মনে হয়।
আত্মকাহিনীর প্রতিযােগীতায় বাই উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
-সাত বরিষ, জাহাজ সে তৈরনেকে। হুম্ হমারে নহি থি।
সমূঝে ?
নানক সিং মাথার পাগ ডট। একবার ঠিক করে নিল, তার
পর ভাটার মত চোখদুটো একবার ঘুরিয়ে নিয়ে বলল--সাত বছর?
কিছু না। আঠারাে থেকে উনত্রিশ বছর পর্যন্ত আমার হাতের শেকল
৬৭

রঙীন সুতাে খােলা হয় নি। ছোট একটা লোকাকে ছাদের ওপর থেকে তলাও’য়ের মধ্যে ছুড়ে ফেলেছিলাম। কেঁ । ভাই হাজারিলাল, খেয়াল হৈ ? হাজারিলাল গাজার কেট। আর একজনের হাতে দিয়ে বলল- রাজকোটের ডাকাতিটা বাদ দিচ্ছ কেন? মাঘ গয়ে থে তুমারে সাথ, আঁ জি? —জি হা। বলে নানক সিং একটু হাসলাে অর্থাৎ সেই অদ্ভুত ডাকাতির গল্প শােনবার উপযুক্ত লোক এখানে কেউ নেই। মােহনদাস এতক্ষণ বসে বসে গোঁফ আর দাডির জঙ্গলে হাত বুলােচ্ছিল, এবার হঠাৎ নিজের পায়ের উপর সজোরে একটা চাপ মেরে বল-আরে লুঠতরাজ ত ছোট কথা। পৈরাগকুমারীকে কেটে দুখানা করে এলাম তবু আমার ফঁানী হল না। জান ত সে কথা ? সবাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ••• ছাংলা গল্পির' পাহাড়ে পল্টনের দপ্তর ছিল তােমবা জান না। ‘সাহাব লেগ’-এর একটা কবরের জমি ছিল অনেক নীচে। আমি সেই কবরের মাটি খোঁড়ার কাজ করতাম। ই, সেখানেই পৈরাগকুমারীকে দেখলাম। চমৎকার মেয়ে , কাট কেটে নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করত। ভাব হল, ভারি আরামে রইলাম ৬৮

রঙীন সুতাে
দুজনে অনেক দিন পর্যন্ত, তার পর জানত মানুষের কপাল ? একটা
‘সাহাব’ জুটে গেল, মেয়েটাকে আর তার মাকে অনেক টাকা ঘুস
খাওয়ালো। আমি গরীব লােক, টাকা অত পাবাে কোথায়। সেখান
কার জল হাওয়ার গুণে লোকে কয় মরত, মাইনেও অল্প, বকশিশও
পেতাম না। ভরি রাগ হ। একদিন চাদের আলোয় দুজনকে
অঙ্গলের মধ্যে দেখেউঃ গায়ের রক্ত অমনি পি পি করে উঠল।
নিজকে আর কি তখন সালাতে পারি? হাতে ছিল কোদালি,
আড়াল থেকে ছুটে বেরিয়ে মেয়েটার গলার ওপর বসিয়ে দিলাম।
বাস দু মিনিটের মধ্যেই খতম্।
মােহন দাস হাসতে লাগল। সবাই বলল-তারপর?
তারপর ?
-তাবপর কত কাণ্ড হয়ে গেল। আসল ঘটনা হচ্ছে ওইটে !
তবে বাজাব দয়াতে দ্বীপান্তব থেকে অনেক দিন পর খালাস পেয়ে
এলাম।
আপন আপন অপরাধের ইতিহাস অকপটে বলতে তাদের কাছে
লজ্জা ছিল না, শান্তি তাদের হয়ে গেছে। চুপ কবেই শুনতাম, কিন্তু
আবহাওয়াটা কেমন যেন ভয়াবহ হয়ে উঠত।
সকাল আর সন্ধ্যায় লােকের অতিরিক্ত ভিড়। পিতলের ছোট
গামলা আর গেলাসে ঢালাশি কবে সকলের কাফি পান করা চলত।
রাত্রে আবার সবাই জাহাজে ফিরে যায়।

রঙীন সুলতা ঠাকুরজিকা কেয়া হালচাল দেওয়ান চন্দ? সবাই মুখ ফিরিয়ে তাকায়। কলঙ্ক-কাহিনীর বিবৃতির মাঝখানে ঠাকুবজীর কথায় দু একজন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে । দেওয়ান চাদ সদ্ধভাবে বলল—এই একটি মানুষ, সারা দুনিয়ামে এ্যায়সা চাঙগা আমি কভি দেখা নেই যায়েগা। এমন আশ্চর্য ‘সন্নিয়াসী কখনও দেখিনি। কাছে গেলে আপনা হতে পায়ে মাথা লুটিয়ে পড়ে,-সাচ, বতি ম্যায় । -কোথায় তিনি?—সবাই ব্যগ্র হয়ে ওঠে। -মন্দিরে তঁাব রামায়ণ-গান হচ্ছে, কাল শুনতে গিয়েছিলাম। বলতে বলতে সবল ভক্তি ভরে ঠাকুরজীর উদ্দেশ্যে দুহাত কপালে ঠেকিয়ে দেওয়ান চাদ একটি নমস্কার জানায়। অবাক হয়ে খানিকক্ষণ সবাই তার দিকেতাকায়। হঠাৎ মনে হতে পারে অন্ধকার পাথার-পুরীর ক্লেদাক্ত আবহাওয়ার মধ্যে দেওয়ান চাদ যেন আলোকের একটি স্নিগ্ধ উজ্জল রেখা বহন করে এনেচে। যে মানুষের পায়ে মাথা লুটিয়ে পড়ে সে মানুষ কেমন, কী আছে তার চোখে যে নানক সিং একটু নড়ে চড়ে বল-একবার দেখা পাইনে তঁার ? হাজারিলাল পর্যন্ত একটি নিশ্বাস ফেলে দেওয়ান চাঁদের দিকে অকাল।

বঙন সুতাে পােত্ত ম এতক্ষণ এক পাশেই বসেছিল, হঠাৎ একটা ঝাকানি দিয়ে বলল-আরে থামাে থামাে, কোথাকার কে তার ঠিক নেই। ওরকম সন্যাসী অনেক দেখেচি। তবে শোনাে বলি গোড়া থেকে। গলা ঝাড়া দিয়ে ঠিক হয়ে বসে পুবমােত্তম বলতে লাগল-তেবে বছর বয়সে আমি প্রথম পুলিশে ধবা পাড, হষ্টিশানে একটা বাবুব পকেট থেকে একটা আধুলি তুলে নিতে গিয়ে দু’স শ্বশুরবাড়ী ঘুরে এলাম। দু’স পবে ফিরে এসে একদিন পথ দিয়ে হাঁচি, পুলিশের দুটো লােক এসে আমার ট্যাকের ভেতর থেকে এক জোড়া সােণার বালা বার কবল ' আবার ছ মাস। ত। ভাগবান! তা। বলা ভঙ্গী দেখে এই হেসে উঠল। -শােনা বা শােনে, হসসা নাদুটো মেয়েমানুষ নিয়ে একবার পালাচ্ছিাম, তাদের সােজা পণ দেখানাের লােভ দেখিয়ে,—হ, তারা ‘তীবথ কব’ত বেরিয়েছিল,বানাস নদী পার হয়ে দেই-ষে আবু পাহাড়ের নীচে জঙ্গল, সেই জনের মধ্যে আছে হৃষিকেশের মন্দির। •••দিনের বেলাও সেখানে অঙ্ক কার, মেঘুমানুষ দুটোর কাছে অনেক টাকা ছিন, এক জন ছিল ভারি সুন্দরী। রূপলাল ব্যাকুল ব্যগ্রতায় বল্ল-তারপর ? তাড়াতাড়ি বল। পুরুষােত্তম একবার মাথা হেঁট করল, কিয়ৎক্ষণ পরে মুখ তুলে বল। -হা বলবই সেই সন্যাসীর ওপর অনা। রাগ অহে। • • রাতে ৭১ বঙীন সুতাে বেলা সেই সুন্দরী মেয়েটার কাছে বসে কি জানি কেন আমি হাউ হাউ করে কাদলাম, আর কেউ ছিল না সেখানে। একেবারে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদলাম । -কেন ? কালি কেন? তা জানি না ভাই, মেয়েটাকে আমার ভাবি ভাল লেগেছিল, সে যদি আমার সঙ্গে আসত আম চুরি করা ছেড়ে দিতাম, তাকে নিয়ে ঘর করতাম,"ই, তারপর ভুলে যাচ্ছি, মেয়ে দুটো গােলমাল করে উঠল, এক বেটা সন্ন্যাসী ছুটে এসে সব শুনে বলল, আমি নাকি সুবিধে পেয়ে লুকিয়ে মেয়েটাকে অপমান করতে গিছলাম। করতে গিছলাম। রাগ হয়ে গেল ৩০০০০.আমি কাদতে পারি, ভালবাসার কথা বলতে পারি, তাই বলে কি কাপুরুষের মতন মেয়েমানুষকে একলা পেয়ে......মাবলাম একটা পাথর ছুডে সন্ন্যাসীর মাথায়, মাথাটা ফেটে গেল। তারপর নিজেই আমি পুলিশে ধরা দিলাম, মেয়ে দুটো গিয়ে কাছারীতে আমার নামে ৰা ত বলল।-হাসতে হাসতে পুরুষােত্তম বলল-আবার দশ বছর ধরে পাথর ভাঙতে গেলাম। বুঝলে, কেন ‘সন্নিয়াসীর ওপর আমার মাগ ? ৫০০ পাশ কাটিয়ে ধীরে ধীবে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ঝড়ো হাওয়া বইছে। বালির পথ ভেঙে একটা লােক মােট মাথায় নিয়ে শহরের

বঙীন সুতাে
lদিকে চলেছে।
ঢেউ যেখানে এসে আছড়ে পড়ে মাথা ভাঙাভাঙি
Fরচে তারই কাছে এগিয়ে গেলাম। কোনো একটা কাজ করবার
ন্য হাত-পা নিসপিস করচে। দিনের পর দিন কোনো কাজ নেই...
এর চেয়ে বড় শান্তি আর কি আছে ? খামখেয়ালির মত বালির
তার উপর দিয়ে কয়েক পা ছুটে গেলাম, পরক্ষণে বড় বড় তরঙ্গ
সে পায়ের
দাগগুলি মুছে
নিয়ে গেল।
কতক্ষণে অন্ধকার
য়ে আসবে, কতক্ষণ সেই তারা দুটি আকাশে দেখা দেবে তারই
Fথা ভাবছি।
আবার উঠে খানিক দূর এগিয়ে গেলাম।
জলের উপর পশ্চিমে
দুৰ্য্যটা ঝুঁকে পড়েছে। বেশি দূরে নয়, এই কাছেই। মাথা কাং
রে জলের উপর দিয়ে দেখলে হাত দশেক দূরেই মনে হবে
সূর্যাস্তের এত কাছে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।
জলের উপর
দয়ে রশ্মিটা ভেসে এসে আমার ঠোটের কাছে লাগচে। হাতের
অঞ্জলির মধ্যে রশ্মিটুকু নিয়ে চুম্বন করলাম। ভারি মিষ্টি আলো।
একাকী সাগরের তীরে পায়চারি করতে কেমন যেন একটি
যন্ত্রণাদায়ক তৃপ্তি বোধ করছিলাম । পূৰ্ব-দিগন্তে ধাবমান অন্ধকারের
দিকে তাৰিয়ে একবার চারিদিক দেখলাম। সমুদ্রেব দীর্ঘ বেলাভূমি।
নীলাম্বরীর আগায় জরির পাড়ের মত দেখাচ্ছিল।
৩৩

রঙীন সুতাে
উঠ চ।
হা, খেয়াল ছিল না এতক্ষণ, আকাশে আকাশে দীপালী জলে
আমার সে প্রিয় দুটি নক্ষত্রকে খুঁজে বার করে একবার
অভিনন্দিত করলাম। ভয়-ভীষণ সাগরের দিকে তাকিয়ে মনে হল
আজ বুঝি অমাবস্যার কোটাস।
বিশ্বপ্রকৃতি অন্ধকারের মধ্যে ডুব
দিয়েছে। অনেক দুরে এসে
পড়েচি। পিছন দিকে একবার তাকাতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
হঠাৎ প্রবল শক্তিতে উদ্ধশ্বাসে দৌড়তে লাগলাম কাকিথানাটা
লক্ষ্য করে।
আবাে দুটি দিন পার হয়ে গেল।
মালেকের কাছে মুখ দেখাতে লজ্জা হচ্ছে। মানুষের অনুগ্রহের
উপর আর কতদিন সুবিধা নেওয়া চলে? তাকে সন্তুষ্ট রাখবার জন্য
কাফিপানাম বিন মাহিনাতেই ঝাড়ুদারের কাজটা নিলাম। চন্দ্রা,
তুমি বিস্মিত হয়াে না।
কাজটা মন্দ নয়, বেশ ফঁাকি দেওয়া চলে। দুবেল মার দুঘণ্টা
এর উপর যদি ভিড়ের মধ্যে সবাইকে কাকির গে খাস হাতে হাতে
এগিয়ে দেবার কাজটা করি তাহলে এ সময়টা বেশ আনন্দেই কাটবে।
জাহাজ আবার এসে জেঠিতে ভিড়েছে। পশ্চিম দিকে সূর্য
হতে না হেলতেই কাকিখানায় লােক জমায়েং হচ্ছে।
৭৪

রঙ নি তাে
মধ্যে আবার অনাদৃত জীবনের ছােট ছােট কাহিনী শুরু হয়ে
গিয়েছিল।
এদের আলােচনাগুলি বেশ লাগচে। পাপের কলঙ্ক
এবা ঢেকে রাখে না, সংককেও এরা অতি-বিনয়ের মধ্যে আবদ্ধ
কবে না।
কাফি সরববাহ কচ্ছিলাম। তুড়ি দিয়ে
কচ্ছিলাম। তুড়ি দিয়ে গুর্জর সিং কাছে
ডাকলাে। নিকটে যেতেই আমার মাথাটা ধরে ঝাকানি দিয়ে
একটু আদর কল। সামান্য একটু স্নেহের আভাস পেলাম। বলল--
ঠাকুবুজিব গান হবে এখুনি।
শুনবে ত ?
ঠাকুরজি কই ? সেই সন্ন্যাসী ?
সবার চক্ষু যে মানুষটির উপর গিয়ে পড়ল, তিনি এতক্ষণ একান্তে
বসেছিলেন। কপালে তার শ্বেত চন্দন, মাথায় সাদা পাগডি, পরণে
খদ্দন, হাতের কজিতে রুদ্রাক্ষ বঁধ,—মুখে একটি সুন্ধিগ্ধ হাসি লেগে
রয়েছে। উদাস আনন্দে দুটি গভীর চক্ষু তুলে বললেন-বাচ্ছা, জীত
*
মহো।
কাকি পানের পর সবাই পয়সা চুকিয়ে দিল। এবাৰ গান আরম্ভ
হবে। উঠে দাড়িয়ে তিনি একবার সবার দিকে তাকিয়ে সগেই হাসি
হেসে এই কথাই বুঝিয়ে বললেন, মানুষ নিজের কাজের জন্য দায়ি হতে
।
পারে না!
৭৫

রঙীন সুতাে
সামান্য এই একটি কথায় সবাই ব্ধ হয়ে গেল। এ কথা তাে তারা
কোনদিন শােনেনি। মনে হ’ল এ-মানুষটি যেন কতকগুলি ব্যর্থ
উপেক্ষিত জীবনের মাঝখানে একটি নতুন বার্তা এনেছেন।
নানক সিং
নির্বাক নিস্পন্দ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। হাজারিলালের হাতে
গাজার ককেটা পুড়ে যেতে লাগল। পুবমােত্তমের কুঞ্চিত ললাট
সৃণ হয়ে এল।
এ মানুষটি কি জীবনের গভীরতম সুব
সুৰ বা জাতে
পারে ?
ভিতরে যেন সকলের নিশ্বাস রােধ হয়ে এসেছিল।
ঠাকুবজী তার স্বাভাবিক উদাত্ত কণ্ঠ বললেন—আমার নিজের
একটি ঘটনা শুনলে তােমরা বুঝবে যে আমাদের কোন হাত নেই
নিজেদের ওপর।
সবাই আগ্রহে আকুল হয়ে উঠল।
বয়স তখন অল্প, ছটা বিপুকে তখনও আয়ত্ব করতে পারিনি,
এমন একদিন একটি মেয়েকে ভালবেসেছিলাম,সেও আমাকে,কিন্তু
যাক সে কথা। সে সময় বড় দরিদ্র ছিলাম, মেয়েটার মুখে খাবাব
দিতে পারতাম না।
নিরুপায় হয়ে কতদিন চোখের জল ফেলেছি।
একদিন করলাম কি
—কি ? কি করলেন ?
-কি করলাম ?-ঠাকুরজি হেসে বললেন—মানুষ অবস্থার দান
৭৬

রঙীন সুতাে
মেয়েটাকে বাঁচাবার জন্য অন্ধ হয়ে গেলাম, তখন কি মনে হয়েছিল যে
বাঁচাবার কর্তা আমি নই ?
—কি করলেন ?
-না বলে এক বন্ধুর বাক্স থেকে টাকা তুলে আলাম ।
—চুরি ? চুরি করে তুমি ?
গুর্জর সিং আর হাজাবিলাল ঝড়ের মত হা হা করে হেসে উঠল।
শুনলে ভাই শুনলে? ঠাকুরজি ও আমাদের চেয়েকম যায় না।
একটি মুহূর্তে যেন প্রকাণ্ড একটা ভােজবাজী হয়ে গেল। দাতের উপর
দাত দিয়ে নানক সিং বলল—চার হয়ে তুমি এখানে সাধুগিরি ফলাতে
এসেচ ?
ঘৃণিতকণ্ঠে একজন বলল—তবে আমাদের সঙ্গে তােমার তফাৎটা
কোথায় বইল হে ঠাকুর?
করঘােড় ঠাকুবজি বললেন—বেটা, আমি নিজেকে সাধু বলচি
না, ধাম্মিক বলে আমার অহঙ্কার নেই, আমি তােমাদেরই মতন,
তােমাদেরই ভাই আমি। আমি কেবল বােঝাচ্ছিলাম যে
তখন কে কার কথা শােনে। সমস্ত দোকান ঘিরে একটা হল।
উঠল। বাইরের কতকগুলি লােক এসেছিল, তাদের নানাজাতীয়
বিদ্রুপ ও ব্যঙ্গোক্তিতে ভিতরটা বোঝাই হয়ে উঠল।
৭৭

রঙীন সুতো
ঠাকুরজীর প্রতি সকলের এত শ্রদ্ধা, এত হৃদয়াবেগ এক মুহুর্তে
খাের মত মিলিয়ে গেল। বহুকাল পূর্বের সামান্য কোন নিরুপায়
অন্যায়ের জন্য একটি পরিণত তপঃসিদ্ধ জীবনকে তারা বিদ্রুপ কবে’
মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিল ।
ঠাকুরজী হাত জোড় করে বাড়িয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করছিলেন কিন্তু
তাদের কঠিন মন টল না। —চোট্টা, ডাকু কঁাকো।
একজন বলল—মন্দিরে তোমার ভণ্ডামীর জায়গা ছিল, তা বলে
এখানেও আমাদের কাছে চালাকী করতে এসেচ ?
মনে হচ্ছিল, হিংস্র দাত দিয়ে সবাই বুঝি এখুনি ঠাকুরজীকে ছিড়ে
খাবে।
দিশেহারা হয়ে গেলাম । ঠাকুরজীর দিকে একবার তাকিয়ে টলত
টতে বাইরে এসে লক্ষ্যহীন হয়ে একদিকে ছুটে চললাম ।
ছুটে চললাম—ছুটে ছুটে-রুদ্ধ নিশ্বাসে তীরবেগে চললাম
নীল পাখী উড়ে চলে গেল অনন্ত বেলাভূমির উপর দিয়ে। নির্জন
সাগর-তীরে এলাম। দীর্ঘ জিহ্বা মেলে দিয়ে অজগর সাপটা তৃষ্ণায়
শিউরে শিউরে উঠচে। টিক টিক করচে চনচনে রােদ। তরঙ্গের
এ ব্যাকুলতা কেন? থানাও তােমার কান্না। অবিভ্রান্ত মৰ্মান্ত
আর্তনাদ আর সহ হয় না।
৭৮

রঙীন সুতো
হাঁপাতে হাঁপাতে ভাবলাম কী করি। কিছু একটা করতেই হবে।
অস্থির আবেগে হাত পা কাপচে। মাথা ঠুকে ঠুকে
মাথা ঠুকে ঠুকে নিজেকে রক্তাক্ত
করলেও বাঁচতাম, রক্ত দেখে শান্তি পেতাম।
-বাচ্ছ',
উঠো।
মানুষের আওয়াজ পেয়ে চমকে চট করে উঠে বসলাম। চোখের
জলের সঙ্গে সমন্ত মুখে আমার বালি মাখামাখি হয়ে গেছে। হাপাতে
হাঁপাতে বললাম-ঠাকুরজি?
স্নেহের স্নিগ্ধ নির্মল হাসি তার মুখে ডানো। পাগড়ি আর
মাথায় নেই। বড় বড় মাথার চুল ঘাডের কাছে নেমে এসেচে। চোখ
দুটি উজ্জ্বল।
ঠাকুরজি, তােমার গায়ে অত কালশিরার দাগ কেন ?
ঠাকুরজী আবার হাসলেন। কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন-বেটা,
তােমার কোন দুঃখ আছে?
দুঃখ? কই না, কিছুই না।
এখানে তবে কি হচ্ছিল বেটা?
-খুজছিলাম ঠাকুরজি, একটা জিনিষ আমার হারিয়েচে-আচ্ছা
খুজে পাচ্ছি না কেন বলতে পারাে? সামান্য জিনিষ তবু সেটা আমার
চাই যে।

রঙীন সুতাে T আমায় জর্জরিত ক্লিষ্ট শ্রান্ত দেহের প্রতি তাকিয়ে প্রথমে তিনি কথা বললেন না। পবে যাবার আগে প্রণাম করতেই হাত বাড়িয়ে আশীর্বাদ করে বলে গেলেন, মন দিয়ে খোঁজ বাচ্ছা । চন্দ্রা, সেই খোঁজাখুজি আমার আজো শেষ হয়নি। শােন চন্দ্রা, এবার এমন একটি মানুষের কথা তােমাকে বলব ঘকে তুমি অনুভব করবে কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে তাকে বুঝতে পারবে । যাদের আমি আজো বুঝতে পারিনি, কেন জানিনে, তাদের কথাই তােমাকে বলতে আমার ভাল লাগে। কদাচিৎ পথেই দুজনের দেখা হতো। শীতের রাতে জনহীন পথের প্রান্তে অমনি বেয়াকুবের মত একাকী তাকে বাড়িয়ে থাকতে দেখে হঠাৎ একটু বিস্মিত হয়ে যেতাম। অনেক কালের চেনানো, কিন্তু বছরে মাত্র তিন চার বার কোনাে কোনাে বিচিত্র স্থানে এবং নিতান্ত অসময়েই তার দেখা পাওয়া যেত। তার সম্বন্ধে মনে করবার অনেক কিছুই ছিল। হাটের কোলাহলের মধ্যে তার ঠাই ছিল না, জীবন-প্রবাহের অবিশ্রান্ত ধারার সঙ্গে সে ভেসে যেত না—সে ছিল অসময়ের মানুষ। তালের সঙ্গে তাল মিশিয়ে চলবার লােক সে নয়, সময়ানুবর্তিতা তার জীবনে কোনদিন ঘটেনি। যে-কোন গৃহস্থ লােকের সে ছিল দু চোখের বিষ। ভারপর ? কেমন আছ হে ?

রঙীন সুত প্রশ্নের জবাব সে সহজে দিত না। দুনিয়ার যে-কোনো লোকের যে-কোনাে সাগ্রহ এই তার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। উত্যক্ত হয়ে কতদিন চলে গেচি, নে একবার ফিরেও ডাকেনি। প্রকৃতিগত তার একটি অবহেলা সহ করে দাড়িয়ে থাকলে, আপাদমস্তক একবার নিরীক্ষণ করে, আকাশের দিকে একবার চেয়ে, নিঃশব্দে একটুখানি হেসে, মাথার চাবিটা একবার চুলকে নিয়ে সংক্ষেপে তাচ্ছিল্য কঠে জবাব দিত-বাঃ । অথচ পাগল নয়। শৰ্ণ একখানি তালপাতার মত দেই; শতর রক্তহীন চির-উপবাসী একখানি মুখ , কোটর প্রবিষ্ট দুটি বড় বড় সহ দৃষ্টি, খাডার মত নাক, দাড়ি-গোঁফের নিতান্তই অনুর্বরতা বড় দাতগুলি বুজে সলজ্জভাবে আর একবার হেসে বস্ত-বেশ তুমি লোক যাহোক। কথার মধ্যে তার মাথামুণ্ড থাক আর নাই থাক কিন্তু বেশ বুঝতাম রাস্তা-ঘাটের প্রত্যেকটি তুচ্ছতম বস্তুর প্রতি তার একটি সজাগ দৃষ্টি সকল সময়েই খােলা রয়েছে। বহুকাল আগে থেকে তাকে নানা ভাবেই দেখে আসছি, ঠিক কথাটি বলবার আগে বহুদূর পথের দিকে সে এবার তাকিয়ে নেয়—একটি সাগ্রহ প্রতীক্ষা তার মে-বৃষ্টিতে ফুটে উঠতাে, অথচ এটি তার অভ্যাস ছাড়া যে আর কিছু তা মনেই হত না। কি একট। ঔষধের দোকানে পচিশ টাকা বেতন নিয়ে সে বা রঙীন সুতাে, লিখত। এখনও লেখে। কাজও বাড়েনি, মাইনেও বাড়েনি। কাজের লোক সে নয়, কিন্তু কাজের লােক তার বড় প্রিয়। কারোকে তাভ- তাড়ি রাস্তা দিয়ে ছুটে চলতে দেখলে সে ভারি খুশি হয়ে উঠত। বললাম-উজবুকের মত এখানে দাড়িয়ে থাকার চেয়ে ঘরে গেলেই ত হয়। এই শীতে ঠাণ্ডায় •• বলল-ঘুম পাবে কখন তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি, তখন দেখবে পা দুটো ঠিক টেনে নিয়ে যাবে ঘরের দিকে। অভাব, অনটন, দারিদ্র্য,তার উপর কয়েকটি অপােগণ্ড ভাই- বোনের ভার তাকে বইতে হতো। ভার যে সে বইচে এ চেতনা তার ছিল না। আজ পর্যন্ত যতবার তাকে দেখেচি ঠিক একই ছাট- কাটের এবং একই বছর জামা-কাপড় তার গায়ে ঝােলানো । রঙ ছাড়া দুনিয়ার আর কোনাে রঙই তার পছন্দ নয়। ব্যক্তিগত চর্চা এবং বাস্তব জীবনের প্রয়ােজনীয় আলােচনা তব সইতো না। সব চেয়ে বিস্মিত হতাম, নিজ অবস্থার প্রতি তার একটি সহজ ঔদাসীন্য দেখে। পথ চলতে চলতে ক্রমশঃ সে কথা বলতে শুরু করে দিত ভাল হয়নি, মানুষকে এমন করে অপমান করবার চেষ্টা ভাল নয়। দেখলে ঐটাস্কর ইংলণ্ডে আসার সম্বন্ধে বার্কেহেড আর উইন্টারটনের মতামত কি বিশ্রী ? ২

রঙীন তাে।
হঠাৎ একটি উৎফুল্ল হাসি হেসে আবার বলল—কিন্তু বার্ণার্ড শ
জবাবটি দিলেন চমংকার। আমি হলে ঠিক ওই কথাই বলতাম।
নিঃশব্দেই তার কথা শুনে যেতাম। একটা থেকে
আর একটা
টপকে টপকে গিয়ে সে যে কোথায় দাড়াবে তার আর ঠিক-ঠিকানা
নেই।
-আফগানিস্থানের চেহারা কি রকম বলে গেল দেখ ত ।
আগে কিন্তু নাদির খাকে এ বকম লােক বলে ? আমার মনে হয়নি
আমাল্লার জন্য সত্যই আমার মন কেমন করে।
তারপর সমাজ, শিক্ষা, সভ্যতা, যন্ত্র-জগৎ প্রভৃতি বড় বড় তত্বের
উপব তার আলােচনা সমান্য একটু ছুয়ে ছুয়ে যেতে থাকে।
স্মৃতিশক্তি তার একটু ধারালোই বলতে হবে। ভারত সরকার
এবং প্রাদেশিক সরকারি চাকরীতে কে কত বেতন পায়, কার কত দূর
উন্নতি-অবনতি ঘটেছে, কে কতদিন পেন্সন পাচ্ছে, কে-কে ছুটিতে
রয়েছে—ইত্যাদি সমস্ত তথ্যই ভাব মুক্ত থাকতো।
পুস্তকাগারে গিয়ে সে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে দ্বিধা করতো না।
একা থাকাই হচ্ছে তার জীবনে সব চেয়ে বড় কথা। এ যে ভায়
শুধুই সঙ্গীহীনতা তা নয় তার অন্তর-জগতে মানুষ ত মানুষ-পাখ,
পক্ষীর স্থান পর্যন্ত সেখানে কোপাও ছিল না। দোকানে কোন
লােকের সঙ্গে তার খাপ খেতে না কারণ অই কারােক মানিয়ে
তত্বের
•- { ন' দ
এr

বঙন সুতাে
নিতে গেলে যে নিজেকেও কিছু ছাড়তে হয় একথা সে জান্তই না।
দাকৃানে যেখানে কাজ করে সেই টুলের পাশে গিয়ে দাড়ালাম।
তা সুমুখে রেখে এক মনে সে কাজ করতে কিম্বা একান্তমনে সে
কছু চিন্তা করতো তা বোঝাই যেত না।
স্বাগত সম্ভাষণ জানাইবাব মত হৃদয়েব বালাই তার নেই। মুখ
চুলে বলত—কিছুই হচ্ছে না। বেণী দশটায় আসি বাত দশটায়
লে যাই—কেবল ফাকি দিয়ে। কাজের সময় এদের আবে। কিছু
iড়িয়ে দেওর, উচিত-আব শুনেচ, কাশ্মীরে ববফে ব নদী কত
সাসিয়ে নিয়ে গেল?
সব চেয়ে খুসী হতাম যখন সে নিশ্ৰয়েব মত বাস্তব ধারে বসে
স্ত্রীর উপদেশ দিত।
•এ বকম ভাল নয়-বুঝলে ? ভবিষ্যত জীবনে আমাদের
• বাইকেই উন্নতি করতে হবে। ভাল দেখে একটা চাকুরি কোথাও
ধকে বাগিয়ে নাও দেখি ?-না না, বিদেশে কোথাও নয়, এই
লাতাষ।
আর হঁ্যা, সায়েবে আফিসে কাজ নিও, ও বেটাদের
তই গাল দিই কিন্তু কাজের বেলায় ওরা——ইংরিজি কথা বলতে
নি ত? গিয়েই অমনি কপালে হাত ঠুকে গুমড় নিঙ বলে দাড়াবে,
রপর একটু হেসে
পরম তৃপ্তিতে চক্ষু ঢুলু ঢুলু করে নিজেই সে আবার বল
.
৮৪

রঙীন সুতা
সায়েবের সঙ্গে কথা ৰচি একথা ভাবতেও আমার ভাল লাগে ।
এ সকল কথা শােনার সম্বন্ধে শ্রোতার ঔৎসুকের অভাব সে
গ্রাহ্যই করতো না। মানুষের মনের কথা জান্বার ব্যাকুলতা তার
কোনোদিনই নেই ।
দৈহিক দুর্বলতা, নিরুৎসাহ, উপায়হীনতা, বাহিরের প্রতিকুলতা
এ গুলিকে সে যথাসম্ভব বাদ দিয়ে চলতে চায়। ইচ্ছা থাকলেই যে
উপায়
কথা তার চেয়ে বেশি বােধ হয় আর কেউ
বুঝত না।
—তবে চুপ করে আছ কেন, এত যদি জানে। তবে ভাল করে
কাজে নামলেই ত হয়।
বললেই সে ছােট্ট একটি নিশ্বাস ফেলত। কাজে সে কেন নামে ন
কাজের প্রেরণা তার কেন জাগে না, জীবনের এতগুলি উচ্চাশাকে সে
কেন মুক্তি দেবার চেষ্টা করে না তা তার অন্তর্যামীই জানেন।
এক একটি দিন তার ব্যর্থ হয়ে চলে যায় সে তাই গুণে গুণে হিসা
করে।
দেহে যে তার একটি যৌবন আছে সেদিকে তার এতটুকু লক্ষ
ছিল না। দৈহিক যৌবনের প্রতি না-ছিল তার কোনাে অনুরাগ না
ছিল তার সঙ্গে কোনাে পরিচয়। অতটা তলিয়ে বােঝবার মত জf
তার দেখা যেত না।

রঙীন সুতাে
-বিয়ে কববার বয়স যে এসে আবার চলে যাচ্ছে, কতদূব কি
করলে?
ওবলে মুখ তুলে একবার সে চেয়ে দেখত। বত-মনে আছে,
ভুলিনি, বিয়ে করবার কথা ভুলিনি কোনােদিন।
বেশ ত, কবে হচ্ছে বিয়েটা।
ত। একদিন হবে বৈ কি -বলে সে আবার মাথাটা কাৎ কবে চোপ
বুজে নিঃশব্দে কি ভাবতে কে জানে।
চোখ বুজে নিজেকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে বাবার একটি অভ্যাস
তার বাববই ছিল । লোকজন কমে গেলে কোনো একটা
সাধারন বাগানে ঢুকে জলের কাছাকাছি গিয়ে বসে হাঁটুর উপর
মাথা হেলিয়ে সে চোখের পাতা বন্ধ করে থাকত। ঘন ঘন
জায়গা বদল করার প্রকৃতি তার নয়, একটি বিশেষ স্থানই ছিল তার
সব চেয়ে প্রিয়। বৈচিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা তার কোনদিনই দেখা যায়নি।
এমন জীবনের অর্থ কিছু বােঝা যায়, চা?
নরনারীর প্রেম সম্বন্ধে একদিন অকস্মাৎ কি একটা কথা উঠেছিল,
এনধিকার চর্চা হিসেবে সে প্রথমে চুপ করেই ছিল।
এক সময় বলল—আচ্ছা প্রেম মানে ভালবাসা, কি বল ?
তা এক রকম বলতে হবে বৈ কি, কেন বলত?
তাই বলছি। তাই যদি হয় তা হলে ভালবাসা মানে প্রেম
৮৬

রঙান সুতাে ছাড়া আর কি হতে পারে? বাস—এই পয্যন্তই। ভালবাসা মানে প্রেম না হলেও তার কিছু যায় আসে না। একটা হাই তুলে একটুখানি হেসে সে বলে-মেয়ে মানুষের কোনো কথা আমার ভাল লাগে না। ভাল তার কিছুই লাগে না। সমাজ, সংসার, জীবনযাত্রা, আনন্দ, বেদনা—কিছুই তাকে চঞ্চল করে তােলে না। তার হৃদয়ের কঠোরতা দেখা যায়নি, কোমলতার সন্ধানও কোনােদিন মেলেনি, অসচ্চরিত্র সে নয়, কিন্তু চরিত্রের লেকতাও তার কিছু ছিল না। সংসারকে সে যেন একটি পবম অহঙ্কারে নিজের কাছে বাতিল করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে চারিদিকে চেয়ে নিতান্ত অবজ্ঞাভরে তাই বলে কিছু হচ্ছে না -বুঝলে? এই যা দেখচ এসব কিছু হচ্ছে না। পৃথিবীর বড় বড় লােকেরা তার পরামর্শ নিয়ে যদি কাজকর্ম কবতাে, তাহলে হয়ত কিছু হতে পারতো—এমনি একটা মনােভাব হার মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতাম। লােক-সমাজে মুখ বুজে বাস করে সে যেন সবাইকে অনুগৃহীত করেছে। নিজেকে বােধ করি এইদিক দিয়ে ভয়ানক শ্রদ্ধা করতে গিয়ে অন্য সবাই তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। শান্ত লােক বলতে কিন্তু তাকেই ঠিক বোঝাত। কোথাও আগুন লেগেছে শুনে সে একটা সিগারেট ধরিয়ে উদাসীনের মত বসে থাকতে। ৮৭

রঙীন সুতো
কেউ আত্মহত্যা কয়েচে শুনলে সে একটুখানি হেসে বলত—ছেলে-
মানুষ। বিজয়া দশমীর সন্ধ্যাবেলায় সে একান্তে কোথাও শুয়ে
নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেত।
একদিন শুধু তাকে চঞ্চল হতে দেখেছিলাম। হাঁ, চঞ্চল হতে
দেখেছিলাম তাকে ঠিক একটি দিনের জন্যই। চিরঞ্জিনের নিবীহ,
নিরুদ্বেগ, নিতান্ত সাধারণ একটি মানুষ কেমন করে না জানি একটি
মুহূর্তের মধ্যেই বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিল।
দুপুর বেলা রাজপথের এক প্রান্তে অমন করে বসে থাকতে
এর আগে তাকে আর কোনদিন দেখিনি। দূর থেকে আমাকে দেখে
মুখ লুকিয়ে উঠে চলে যাবার চেষ্টা করেছিল বটে। চোখাচোখি না হলে
হয়ত সত্যই চলে যেত।
কাছে এসে দাড়ালাম। কথা কইল না। মলিনহোর
দিকে চেয়ে বললাম—নাওয়া খাওয়া হয়নি—বসে আছ যে? কাজে
যেয়ােওনি বুঝি ?
মনেই ছিল না, সহানুভূতি মাঝে মাঝে কি ভয়ানক পীড়াদায়ক হয়ে
উঠে। তার সেই রক্তহীন ফ্যাকাসে মুখখন ধীরে ধীরে লাল হয়ে
উঠল।
বলল—না বেরােইনি, তুমি যাও যেদিকে যাচ্ছিলে।
তবুও দাড়িয়ে রইলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে মুখ তুলে সে উত্তেজিত
bb

রভীন সুলতা
হয়ে বলল-বন্ধুত্ব ? বন্ধুত্ব কাকে বলে জানো? আমার কথা মনে করে
কোনােদিন? আমি কি চাই একথা কোনদিন আমায় বলে ?
নিঃশব্দে তার দিকে চেয়েছিলাম। বেচাবি যে কোন আঘাত
পেয়েছে তা মনে হল না। নিতান্ত সঙ্গোপনে সকল কথার আড়ালে
এ আগুন যেন তার মধ্যে জমে উঠেছিল। অবাক হয়ে দেখলাম তার
সেই কঠিন ও মূক দুটি বড় বড় চোখে এর মধ্যে কথন জল ভরে
এসেচে। ছেলে মানুষের মত কেঁদে ফেলে সে ব–তোমরা সবাই
মিলে আমায় সরিয়ে দিচ্ছ , নিজের কথা শুধু নিজে ভাবতে আর আমি
পারি নে ?
সকলের মাঝখানে আমি থাকতে চাই।
একটু থেমে আবার বলল—তােমার জন্যে আমি ভাববে, আমার
জন্যে তুমি-নৈলে, নৈলে আমার দিন চলবে কেমন করে বলতে
পাবো ?
মনে হলো, পৃথিবীর সবার সঙ্গে একটি আত্মীয়তার বন্ধনের মধ্যে
বাঁধা পড়ে নিজেকে মুক্তি দেবার জন্যে তার অন্তরাত্মা যেন ব্যাকুল
হয়ে উঠেছে।
উঠে দাড়িয়ে আমার হাত ধরে একান্ত মিনতির সুরে বলল—যদি
এসেচ তবে যা হোক একবার উপায় বলে দিয়ে যাও ভাই।
একটুখানি হাসলাম। চন্দ্রা, আমার সেই নিজের হাসি আজো
স্মরণ করতে পারি।

রঙীন সুতাে
এমনি করেই দেখে গেচি জীবনের চেহারা পথে ঘাটে। সেদিন
চলন্ত ট্রেনের ভিতরে শুয়ে কেমন করে আমার ঘুম ভাঙল, শােনো
চন্দ্রা :
• আমার কী আছে ? একলা কোন দিকে যাবে বলতে পারাে?
দিব্যি করে বলল আগে আমায় ছেড়ে তুমি কোথাও যাবে না?
তােমার আর কি, একটাব বদলে আর একটা, আমার তাে আর ।
নয়। তখন কি উপায় হবে আমাব? বলি শুতে পাচ্ছ ? আমার
কথা শুনতে গেলেই বুঝি তােমার ঘুম আসে ?
আরে না না, বলে যাওনা তুমি, ঠিক শুচি। একটু তাড়াতাডি
করে বল। হু, একটাব বদলে আর একটা’—তারপর ?
-কথনো বাইরে বেরােইনি, কোন কাজ জানিনে, আপনার বন্দুতে
কেউ নেই। কি করে তখন আমি নিজেকে বাঁচাবো ?
কান্নায় যে তােমার গলা বুজে এল। হরি হরি, ছেড়ে-ছুড়ে
পালাবে কিনা সেই ভাবনাতেই যে গেলে।
তােমাকে আমি জানি তাই একথা বলছি।
কি আশ্চয্যি, জানাে অথচ সঙ্গে আসতেও ছাড়লে না? দেখো
একটা কথা বলি শােন, ভালবাসার মধ্যে ঈর্ষা থাকতে পারে কিন্তু
সন্দেহের খান তার মধ্যে নেই।
এইবার বুঝি তোমার বক্তৃতা আরম্ভ হল । আমার নিজের

সুতো
থাটা ভুলিয়ে দিতে পারলে তুমি আর কিছু চাও না—কেমন ?
• আরে তাই ত বলচি, প্রেম চিরকালই আত্মভােলা। স্বার্থ ছাড়া
বি এক পা চলে না, তাদের আবার ভালবাসা কি ? দু নৌকো
মি পা দিয়ে থেকো না, বুঝলে ,
কিন্তু তুমি যদি ছেড়ে যাও, তখন দাড়াবার জায়গা কোথায় পাবাে ?
সে কি কথা? তােমার এত রূপ থাকতে,হা ভগবান, তােমার
হেব জেল্লারও কি একটা দাম নেই ?
আছে বৈকি,-ঈষৎ উষ্ণকণ্ঠে -তাব জন্যে যে নিন্দে কবে
নলজ্জ। তুমি সে এত কুকীত্তি কবে’ বেড়াও তাতে দোষ নেই?
ঘুম ভেঙ্গে গেল।
উঠে বসলাম।
রাত কত কে জানে, বােধ
র একটা হবে । শীতকালের মাঝামাঝি। ঠাণ্ডায় সবাই জড়সড়
য়ে কুঁকড়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে আপাদক ঢাকা দিয়ে শুয়ে আছে কি
সে রয়েছে হঠাৎ এক নজবে কিছুতেই বােঝাবার উপায় নেই। ট্রেন
লােহায় লােহায় প্রচণ্ড সংঘর্ষের বিচিত্র আওয়াজ ছাড়া আর
কছুই শােনা যাচ্ছিল না। এই কিছুক্ষণ আগে গয়া পার হয়ে এসেচে।
যাত্রী সব ৩ জন দশেক। সবাই আপাদমস্তক অবগুণ্ঠন। স্ত্রী
মার পুরুষে কোন প্রভেদ বােঝা যাচ্ছে না। তৃতীয় শ্রেণীর গাভী
একটা মাত্র আলাে তাও আবার বিশেষ উজল নয়। মানুষের চেহারা
পষ্ট করে দেখতে গেলে ঐ কুঞ্চন করতে হয়।
লচে।

বঙীন সুতাে কি আশ্চষ্যি, লােকে চাকরী করে পেট চালায়, তুমি না হয় - এই কথা। তা ছাড়া,—কি মশাই, আপনি যে উঠে বসলেন ? কি দেখচেন ? দেখতে ইচ্ছে হয় ত সুমুখই আসুন না। এই অপ্রত্যাশিত উক্তিতে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম। —গৌরীবালা, ওর দিকে একবার মুখ ফেরাও ত,-নিন, দেখুন মশাই, ভাণ করে দেখে নি। বাঙালীর ছেলে মনে হচ্ছে, বিয়ে করেন নি তা ত দেখতেই পাচ্ছি। আজ্ঞে হ্যা!-বোকার মত বগলাম। ভক্ষণআবার যোগ করে দিলাম-কেন বলুন ত ? তাই বলচি , কঁচা বাঁশ সহজেই মুইবে—এবার গৌরীবালার সঙ্গে যা হোক একটা পাতিয়ে নিন্-দিদি, বৌদি, কি গঙ্গাজল—যা হােক একটা কিছু-নইলে যে সুবিধে হচ্ছে না। বললাম—কিসেব সুবিধে ? দেখুন, বােকা সাজবেন না, সমস্তই আপনি বুঝতে পাচ্ছেন আপনার মত দুটো পাজি চোখ আমি আর কোথাও দেখিনি। লোকটির কলহেব প্রবৃত্তি অতিমাত্রায় প্রবল। শুধু বললাম- আপনি কি অপরিচিত লোকের কাছে এই ভাবে কথা বলেন ? মােটেই না--লােকটি হেসে বলল—এ ভাষা শুধু আপনার জন্যই ব্যবহার কবচি। ভাল করে আপনাকে বােঝাতে হবে ত । ১২ রঙীন সুতাে একটা চাপা হাসির শব্দ শােনা গেল। কি মশাই, রাগ কল্লেন নাকি ? বাগ? কৈ না রাত অনেক হল-এবার একটু ঘুমােনাে যাক্। মােটেই ঘুমােননি এতক্ষণ? এই আধ ঘণ্টাখানেক কেবল কাং হয়ে বাস বাস, এতেই হবে—যথেষ্ট। তাকাল শােনা যাচ্ছে তেরো- মি নট ঘুমােলেই আবার সহজ মানুষ। আসুন, আসুন, ওই দিক দিয়ে ঘুরে সামনে এসে বসুন। ১ অনুবােধটা ঠিক হুকুমের মত শোনালো, তবুও এড়াতে পারলাম না। উঠে ওপাশ দিয়ে গিয়ে তাদের ঠিক মুখ বেঞ্চিতেই বসলাম। -কিছু মনে করবেন না, ছেলেমানুষ বলেই কড়া কথাগুলো তখন বনলাম। রাস্তা ঘাটে এমন হয়েই থাকে, আবার মিটে যায়। -হ’ল এক তরফা, আমার দিক দিয়ে বােধ হয় কোনাে অন্যায় ছিল না। মেয়েটি এতক্ষণ চুপ করেই ছিল, এবার একটু খুসখুস করে উঠল। গুছিয়ে ভাল করে বসে মুখের কাপড়টা সরিয়ে বেশ সহজ গলায় বলল- আপনি কি বাইরের মেয়েদের দিকে তাকান না? একবার তার দিকে তাকিয়ে লােকটিকে বললাম-এ কথার কোনাে | মানেই হয় না।

বঙীন তাে লােকটি যদি-বা হাসল, মেয়েটি তীক্ষ্ণ গলায় বলল-নিশ্চয়ই মনে বরং আপনার এ সাধুগরিরই কোনো মানে হয় না । সাধুগিরি নয়, আমি বচি ভদ্রতার কথা, নীতির কথা। লোকটির বােধ হয় তন্দ্রা আসছি, আচমকা চোখ চেয়ে বল্ল- নীতির কথা ? আজ্ঞে হ্যা। একটুখানি হেসে সরে লােকটি গেল, গায়ে মাথায় আবার মুড়ি দিল, তারপর বেশ কবে গুছিয়ে আরাম করে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজন। মেয়েটি হাসতে লাগল। বল-ওই দেখুন, আপনার নীতি ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিল বােধ হয় ওঠবার চেষ্টা কচ্ছিলাম। মেয়েটি বলল—কত দূর যাবেন ? এই বর্ধমান পর্যন্ত। ও, আমরা আসছি কাশী থেকে, কলকাতা যাবে। কাশী থেকে আসছেন ? লােকটা চোখ বুজেই এবার কথা বল্ল-হা, কাশীর মেয়েকে চিতে আপনাব এত বেশী দেরি লাগে ? আর কি, এবার দেখুন ? রূপ দেখুন, কেমন কাপড় চোপড় পরা আছে দেখুন তারপর দেখুন সধবা কি বিধবা আঃ, তুমি লোককে অপ্রস্তুত করবার একটি।

রঙীন সুতো
লােকটি কোন উত্তর দিল না, আগেকার মত চোখ বুজেই ঠোট
উলটে একবার হাসির ভঙ্গী করে পড়ে রইল।
মেয়েটি আবার নিঃসঙ্কোচ সহজ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল—বিয়ে হয়েছে
অাপনার?
ঘাড় নেড়ে বললাম-না, এখনও
লােকটি মুদিত দৃষ্টিতেই
বল-করেন নি?
আশ্চয্যি ত।
আমার এই বয়সে অন্তত বিশ পচিশবার••••••এই দেখুন না, ষােল
বছর বয়স থেকে পথে ঘাটে যেখানে যত দেখেচি, মনে মনে সবাইকেই
-বুঝলেন না? নীতিতে আমার এতটুকু বাধেনি। কোনাে মেয়ের
ৰূপের প্রশংসা করা মানে মনে মনে তার সঙ্গে ••••ওকি গৌরিবালা,
এবার একেবারে ঘটা কবে মাথায় কাপড় টেনে দিলে যে? আরে
বন মশাই, ঠাণ্ডা হয়ে বসুন। দু একটা নীতির কথা বলে যান,
আমাদের দুরবস্থা দেখছেন তাে ?
মুখ তুললাম।
এই দেখুন না মশাই, আমাদের জীবন একেবারে দুর্বহ হয়ে
উঠল!
কেন ?
• আর কেন। স্বাধীন প্রেম করার মত পাপ আর দুনিয়ায় নেই।
ঢের ভাল মশাই, বাল্যবিবাহ ঢের ভালাে। আমাদের গোঁড়া হিন্দুর

বঙান সুতাে মেয়ে জেঠিমা ঠিক কথাই বলেন। আমাদের মতন ছেলে-মেয়েকে মুন গিলিয়ে মারাই উচিত। এরা কে, কোন্ জাতের লোক, দুজনের মধ্যে সম্বন্ধটা কী, কিছুই সহজে বােঝবার উপায় ছিল না। বললাম-আপনার বাড়ী কোথায় ? লােকটা বল্ল-পৰিচয় নিতে চান ? দেবো না মশাই, আপনি যে বিনিয়ে বিনিয়ে মেয়েলি কথায় আমার কুলুজি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবেন, তা হবে না। পরিচয় চাইতে গেলে আপনাকে এখান থেকে উঠিয়ে দেবো। মেয়েটি বলল—পরিচয় চেপে রাখাে কেন সেটাও ওঁকে বলে দাও। উনি কি আর এতক্ষণে তা বােঝেননি ? আমায় দেখে কি খুব সাধু পুরুষ মনে হয়? তবে শুনুন মশাই, সেই দশ বছর বয়সে প্রথম আমি একটি মেয়েকে নিয়ে আসি- থাক—গৌরীবালা তাকে থামিয়ে দিয়ে বল্ল-তুমি ঠাট্টা-তামাস। কর বুঝতে পারি কিন্তু তুমি গল্প ফেঁদে না। গল্প তোমার মুখে মানায় না। লােকটা এবার অপ্রস্তুত হয়ে কৃত্রিম কোণে চীৎকার করে উঠল— তবে তােমার গল্পই ওকে নিয়ে দেবো নাকি? মশাই বুঝলেন—এই যে মেয়েটিকে দেখচেন, ইনি স্বর্গে উর্বশর মত ••• • বলব—আরাে

অঙন সুতো
-আগে বলব ? তােমার আত্মকাহিনীগুলো ফাস করে দেবে ?
উঠে পড়িয়ে বললাম-দোহাই আপনার মুখের আগল আর
খুলবেন না। এই আমি তবে এখান থেকে
আহা হা, বাগ করেন কেন মশাই? বন, বন-তাই কি আর
বলতে পারি ? গৌরীবালা অনেক বিশ্বাস করে আমাকে ওর গল্প
বলেচে। আপনি বাইবের লােক, তাই কি আর বলতে পারি ?
গৌরীবালার কোন সঙ্কোচ নেই, কোনাে দ্বিধা নেই, নারীর সব
চেয়ে যে বড় দুর্বলতা তার সম্বন্ধে কোনাে চেতনা নেই।
—কি বাকি বাধলে বলতে? কোনাে মেয়ের জীবনের কথা
নিয়ে নাড়াচাড়া কবাব মত পাপ সংসারে আর কিছু নেই তা জানাে?
আৰ সে-পাপ শুধু তুমিই করতে পাবে।
লােকটা সানন্দে বলে উঠল—দেখে নিন্ মশাই, কি রকম লেখা-
পড়া জানা মার্জিত মেয়ে-ছেলেকে নিয়ে আমি পথ চলি। এ রকম
পালিশ করা মেয়ে দেখেছেন এর আগে ,
বললাম—আপনাদের মধ্যে বােঝাপড়াটা এখনাে কি বুঝতে
পারলাম না।
লােকটা বলল-খবরদার, ও আপনার নীতিতে বাধবে। তা ছাড়া
আমি মেয়েদের একটু সম্মান রেখে চলি মশাই। আমার চরিত-কথা
আপনাকে বলতে পারি—কিন্তু রাম বল, গৌরীবালার কাহিনীগুলি

রঙনি তে
আপনার কাছে প্রকাশ করতে পারবাে না। তবে বােঝাপড়াটা কী
নেন? আমাদের মধ্যে কোনাে আটক নেই, কোনো বাধন নেই,
লুকোনো কিছু নেই। দু’জনেই দুজনকে জানি কি না—ওকি, অমন
হা করে বােকার মত চেয়ে রইলেন কেন মশাই ? বুতে পারলেন
? বন্ধু-বন্ধু মশাই আমরা। কে যে মেয়ে আর কে যে পুরুষ এ
আমাদের অনেক কষ্ট করে তুলতে হয়েছে।
গৌরীবালা বল—এবারেও আপনার নীতিতে বাধলো নাকি?
ম—গ্রী পুরুষের শুধু বন্ধুত্ব কে বিশ্বাস করবে বলুন।
নাই বা কল। আপনি ওটার দিকে অত ঝোক দিচ্ছেন কেন?
—গৌরীবালা কণ্ঠে বলে উঠল।
মুখের একটা শব্দ করে লােকটা এবার বলৰালক, দেখুচ না ?
আপনার সঙ্গে কথা বলাটা আমাদের গর্বের পক্ষে হানিকর। সকল
কথা এড়িয়ে ভাগাডের দিকেই আপনার নজর এত বেশী কেন ?
আপনি দেখ চি নিতান্তই••••
বড় একটা ষ্টেশনে এসে গাড়ী দাড়াল। রাত প্রায় শেষ হয়ে
এসেচে। দুয়ত শীতের কুয়াশা, জালা দরজা চারিদিকে বং-এ সমস্ত
পার হয়ে ফেরিওয়ালার চীৎকার আর কারাে কানেই শৌছচ্ছিল না।
গৌরীবালার কথার আবরু ছিল না, সঙ্কোচের বালাই ছিল না কিন্তু
কথার মাধুৰ্য ছিল। তার নীতিজ্ঞানহীনতা বিকৃত নয়, সরল বিশ্বাসের

রঙীন সুতো
উপর তার প্রতিষ্ঠা। তার কুচি তাকে সৌন্দৰ্যশালিনী করে তুলেছে।
এত যে আঘাত, এত যে তিরস্কার পেলাম সমস্তই কেমন করে না জানি
সহ হয়ে গেল।
লােকটির চোখে আবার ঘুম জড়িয়ে এসেছিল।
একটু সহানুভূতি কঠে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম-শীতে
আপনার কষ্ট হচ্ছে, আমার কলটা নেবেন ?
লােকটা আবার সজাগ হয়ে উঠল। ল—না থাক, নিষ্ঠত।
পাকিয়ে তেলবার আর দরকার নেই, উনি বেশ ভালই আছেন।
অকস্মাৎ এই অপমানে মুখখানা আমার কালি হয়ে গেল।
•• এইগুলো আপনাদের বুঝতে পারিনে, এই ন্যাকামিগুলো।
মেযেদেব কষ্টের জন্য আপনাদের মাথা ব্যথা এত বেশি বেড়ে গেছে ?
পৃথিবীতে আর টেকবার উপায় নেই। একটি মাত্র মেয়ের দেহকে খুশী
করবার জন্য পৃথিবীর চারিদিকে আজ এত অশান্তি।
দিকে এই যে এত কাণ্ড ঘটুচে এর গােয় নারী দেহের প্রতি একটি
প্রচণ্ড বেভ ছাড়া আর কি আছে বলুন দেখি -আরে মশাই, বসুন
বসুন, চটে যাচ্ছেন কেন?
বাম-মাথা ধরে গেছে।
মাথা ধরে গেচে ? গৌরীবাল, মাথায় ওঁর একটু হাত বুলিয়ে
দাও ।
।
জগতে দিক

রঙীন সুতাে তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম—আপনার মুখে কি কিছুই বাধে না? বােঝেন না মশাই, বােঝেন না। মেয়েরা হচ্ছে শক্তি। একটু ছোঁয়া লাগলেই দেখবেন গায়ে দশ হীব বল ।তৎক্ষণাৎ কথা ঘুরিয়ে সে বলতে লাগল—জগতে যারা বড় বড় কাজ করে গেছে তাদের জীবন তন্ন তন্ন কবে’ খুজুন গেদেখবেন তাদেরও আপনার মতাে মাথা ধত আর মেয়েরা দিত হাত বুলিয়ে। ওবা হচ্ছে সােনার কাঠি, দুলে আর দেখতে নেই তবে এই যে একটু আগে বলছিলেন যে গৌরীবালা এবার সত্যিই হেসে উঠল। বল—আপনি বুঝি ওঁর কথার সামঞ্জস্য খুজ ছিলেন এতক্ষণ? এখনাে বুঝি ওঁকে বুঝতে পারেন নি ? রাগ হয়ে গিয়েছিল। বললাম-বুঝে আব কাজ নেই। যাত লামিরও একটা সীমা আছে। উঠতেই যাচ্ছিলাম, লােকটা আবার হাত ধরে বসিয়ে দিল। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে একটুখানি হাসতেই গৌরীবালা বলল—রাগ করবেন না, আপনি কিন্তু সত্যিই ছেলেমানুষ। আপনি এখনো কথার মানে খোঁজেন, ধ্যান-ধারণার দাম যাচাই কবেন, মতে না মিললে তর্ক করতে যান, এ সবগুলাে ত আর- লােকটা এবার বলল--তাই বটে। দুনিয়ার ছন্দের দিকে নজবটা ত। ১ৈ ব্ৰঙীন সুতে। আপনার ভারি কড়া দেখচি। এ-ঘাের কাটিয়ে উঠুন, বুঝলেন, নৈলে ভাবি কষ্ট পাবেন। কিছুরই কিছু মূল্য নেই, মুখের কথাগুলাে ফাকা কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। বলাম—আর ওই যে তখন আপনি বিয়ে আর সতীত্ব নিয়ে যা বলছিলেন, ওগুলাে? লোকটা বলছেলেমানুষ হলেও আপনি একেবারে কচি নন। বিয়ে অার সতীত্ব দুটোর মানে কি আপনি আজও বুঝেছেন? তাব মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। পরে বললাম- আচ্ছা না-হয় ও-দুটো বুঝিনে, কিন্তু এই নরনারীর স্বাধীনতাটা? মেয়েটি হাসতে হাসতে উত্তর দিল—সে আবার কি? খাই-দাই, হাসি-খেলি, স্বামী নিয়ে কিম্বা স্ত্রী নিয়ে আমােদ-আহলাদ করি স্বাধীনতা আবার কি? আপনি এত বাজে বকেন কেন ? বােকার মত গৌরীবালার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাবির রইলাম। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে লােকটা বলল-পাগল নাকি আপনি? মাখ খারাপ? এৰায় আর সহ্ন হল না। উত্তেজিত হয়ে বললাম—দু'জনে মিলে আপনারা আমাকে অন্তত করবার চেষ্টা করছেন।

রঙনি তাে
লােকটা বলল—গৌরীবালা, এবার এ-ছেলেটা সত্যিই চটে গেছে
দেখছি।
চটে গেচি। মিথ্যে কথা!
আপনাদের কথায় চটে যাওয়া
বােকামি।
গৌরীবালা বল—রাগ করাে না ভাই, তুমি যে একটু বােকা তা
আগেই বুঝতে পেরেছি।
ফঠের মাধুৰ্য দিয়ে মেয়েটি ভাব তিরস্কারকে সুন্দর করে তুলল।
কোন কথাই আর মুখে এল না।
Sধু বললাম আমিই না হয় বােকা, কিন্তু আপনাদের কথাবার্তারও
একটা কিছু লক্ষ্য থাকা উচিত ত ?
মাটি রেচে।লােকটা বলে উঠল-এর উপর আবার লক্ষ্য?
দোহাই, আর আপনি চালাবেন না, মাথায় আপনার গােবর ভরা।
ভালয় ভালয় এবার আপনি নেমে যা। কোথায় নামবেন বলুন ত ?
ধৈৰ্য রাখা এবার সত্যিই কঠিন হ’ল। বললাম—তা হলে বােধ
হয় প্রেমও মানেন না ?
লোকটা চীৎকার করে উঠল—এই রে। যা ভয় কচ্ছিলাম এতক্ষণ,
ঠিক তাই। এ বেচারাকে দেখচি বর্ধমানে নামিয়ে বাড়ী পৌছে গিয়ে
আসতে হবে।ওকি গৌরীবালা, তুমি আবার পটুলি থেকে কি বাৰ

রঙীন সুতো গৌরীবালা তাড়াতাড়ি দুটি মেঠাই মুখে এনে ধরে বলল- -कानेब মিষ্টি, খান—না, না, খেতেই হবে, ধরুন। তা নৈলে জোর করে আমি মুখে গুজে দেবাে বলে দিচ্ছি। উত্তেজনায় নিজের হাত-পা কঁপছিল, তবুও মেঠাই নিয়ে মুখে দিতে হল। তারপর স্কুলতে ফুলতে আবার নিজের জায়গায় এসে বসলাম। গায়ে যেন জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। বােনা হয়েই রইলাম। পথ আর বাকি ছিল না, সকাল হবার আগেই বর্ধমান এল। পাশের জালাটা খুলে দিলাম,-ভােরের হাওয়া চলাচল করছে। প্লাটফরমে গাড়ী এসে থামতেই উঠে দাড়ালাম। লােকটা হাসিমুখে এবার ঘাড় ফিরিয়ে বলল—কি মশাই, বলি ও সুনীতিবাবু, নেমে “চলেন, একটা নমস্কারও করে গেলেন না? না-হয় স্ত্রীলােকের সম্মানটাই রেখে যান। সতী-সাবিত্রীর প্রতি এত্ত ত আপনার আদি এবং অকৃত্রিম! মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গেল-উনি কি আপনার স্ত্রী? খ্রী নয়, আপাতত ধর্থপত্নী। গৌরীবালা বলে উঠল—কথায়-বার্তায় বুঝতে পারেন নি এতক্ষণ? লােকটা তাড়াতাড়ি উঠে এসে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। -ঘাড় মশাই, ছেড়ে দিন আপনাদের ন্যাকামি আর ভাল লা চে না! ১৩

রঙনি মৃত
-গৌরীবালা, সত্যি তােমার দিৰিা—আর দু ফোটা ওষুধ দিয়ে
দাও। বেচারা শুকনাে মুখেই ফিরে যাবে ?
গৌরীবালা উঠে জড়িয়ে বলল—আঃ তুমি ভারি দুষ্ট লােক, ওকে
নিয়ে কেন অমন টানা-হেঁচড়া কচ্ছ?—কাছে সরে এসে আমার দুটো
হাত ধরে সে পুনরায় বলল-রাগ করলে ভাই আমার ওপর ?
রাগ ?—তার মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে গেলাম। গত রাত্রি
থেকে এখন পর্যন্ত সবার সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি সমস্তই ভুলে গেলাম।
ভূলতে আমার এক মুহূর্তও লাগল না।
গৌরীবালার দৃষ্টি ভোরের
আকাশের মত স্নিগ্ধ এবং সকরুণ ।
না, আপনার ওপর রাগ হয় না বলে কলটা নিয়ে ধীরে
ধীরে গাড়ী থেকে নেমে চলে গেলাম।
কিছুদূর গিয়ে হাসির আওয়াজে ফিরে তাকালাম। বিস্ময়ের আর
অবধি রইল না। জানলায় মুখ বাড়িয়ে নরনারী দুটির হাসি আর থামে
না। হাসতে হাসতে বুঝি-বা তাদের দমই বন্ধ হয়ে আসে।
চোখ বুজেই তোমার সঙ্গে আলাপ করে যাই চন্দ্রা, কিন্তু এ ছাড়াও
ও আছে বিতর জীবনের কথা। অভাব-অভিযােগে, দৈ-দারিদ্রে
মানুষের কণ্ঠ যেখানে অবরুদ্ধ হয়ে এসেছে। আমি ত পথে পথে দেখে
গেছি তার কোনো প্রতিকার নেই, প্রতিবিধান নেই।
একটি গাড়ির কথা বলি, শােনাে চা : ৫
।
১৪

রঙন সুতে চাদর মুড়ি দিয়ে শীতের ঠাণ্ডা আটকায় না, পা গুটিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ষ্টেশনের বেঞ্চিতে ওয়েছিলাম। নিতান্তই গ্রাম্য ষ্টেশন। অত রাতে লােকজন কেউ নেই, গাড়ী আসবার তখনাে দেরি রয়েছে; চারিদিক খা খা করচে, ঘুমােনার একটা চেষ্টা ছিল, কিন্তু অতিরিক্ত শীতের হাওয়ায় ঘুম আসছিল না। এমনি সময় কখন দুটো লােক এসে পায়ের দিকে খালি বেঞ্চিটুকু অধিকার করে বসেচে টের পাইনি, তাদের গায়ে পা লাগতেই বুঝলাম ত এসেছিল। পা সরিয়ে নিয়ে আবার আগেকার মত পড়ে রইলাম। লােক দুটি মাঝে মাঝে কথা বলছিল, শােনবার মত কৌতুহল আমার ছিল না। ও গলার আওয়াজ শুনে অনুভব করলাম, একটি লােক বসেচে বেঞ্চির উপর আর একজন তারই সুমুখে যাতায়াতের পথের উপর উবু হয়ে বসে কথাবার্তা কইচে। --গাঁয়ের ইতিহাস তুমিও ত কিছু কিছু জানাে সাম, তুমিও ত কম দুঃখ পাওনি-কি, ইকো নেই ধু কলকে? আচ্ছা তা হােক কলকেই সাজো একছিলিম খেয়ে বাঁচি, যে ঠাণ্ডা। তামাক কি আর গায়ে কেউ খায় সামন্ত, এক পয়সায় দু'খানি পাতা, ক’জন কিনতে পারে বল বলে বেঞ্চির উপরের লােকটা খৰু করে কাশতে কাশতে অস্থির হয়ে বললে, এ আর তুমি কতটুকু দেখচ সাম, এ-কাশি যা, হয়েছিল তার তুলনায় এখন আর নিরানব্বইয়ের ওপর ওঠে না।

রঙন সুতে
সাম বললে, এবার একটু বিশ্রাম নিন ডাক্তারবাবু, খেটে খেটে
-শরীর ত আপনার... এবার দিনকতক
-ভাঙতে বসেছে কি ভাঙেনি সামন্ত, ভাঙলেই বাঁচি। বড়
ছেলেটা গিয়ে পৰ্যৰ বুকটা একেবারে খালি হয়ে গেছে।
কলকেতা থেকে তাল ডাক্তার সময় মত আনলে ছোটা তার
কপালের লেখা, হয়ত কিছুতেই বাচত না, লাতে হতে রােগের খরচে
পৈতৃক চালাটুকু আমার
কলকেয় ফু দিতে দিতে সামন্ত বললে, এ নামই সংসার,-আসুন,
তামাক ধরেছে।
তামাক টানতে টানতে ডাক্তারবাবু বিরক্তিকর কাশি কাশতে
লাগলেন। এক সময় বললেন, তিনু টুচাষির গরুট। কি ছাড়িয়ে
নিয়ে গেছে সামন্ত ?
আছে না, ছ আনা পয়সা নৈলে গরু আটকাবার সময়ই আমি
জানি ভট্টচাষি তিন দিনে পয়সা যােগাড করতে পারবে না। ছ যান।
পয়সা এখনকার দিনে, আমিই বা কি করব বলুন, থানার নেই মােজ
‘গার, দারােগাবাবু ধমক সয়ে সয়ে চাকুরি বজায় রাখা...তি
শুটুচাষির শান্ত গৰু, কারুর খামারে ঢোকে না।
তবে কেন আটকালে?
সে আর বলবেন না তাতারবাবু। মাগ-ছেলে নিয়ে যাকে সংসা

রঙীন যুগে করতে হয় অভাবের ঘরছাই পাই না করলে তার -তা সত্যি সামন্ত। ধর, তামাক খাও।, তা বটে। তােমার ত রােগার ওই সাতটি টাকা, যুদ্ধর বাজারে এক জোড়া কাপড়ের দাম, তােমার এতে কীই বা হয় বল। -কি না, কাটা-মুলােটা••• আগে পালা-পার্বণে এক আধটা জামাকাপড় গায়ের লােক দিই, সে ত আপনি জানেন ডাক্তারবাবু, তারপর সেই মেয়ে-চুরির মামলায় সাক্ষী দিতে গিয়ে • সেই আমার কাল হল।-বলে সময় একটি গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করে পুনরায় বললে, না সেদিন আর নেই। কোথায় বা সেই চৌধুরী-গিরি, লমীরূপা মা আমার, আৰ কোথায় বা আমাদের আচাষিদের ঘর। -হা স একদিন ছিল সামন্ত, কত খেয়েচি, কত- -শুধু খেয়েচি ? লুট করেচি, হুট করেচি,-গায়ের শুকনিরা ছিড়ে ছিড পেয়ে তাদের আব কি রাখল? শেষে তারা পালিয়ে বাঁচল। –উপায় কি সামশু, এ যে শান। তুমিই বল না আজ আমার অৰা কি এমন হতো? ওষুধের ব্যাগ হাতে নিয়ে মাঠে-ঘাটে ঘুবি, লোকে ভাকবেই বা কেন? হ্যা যদি পাশ করা ভাঙ্গার হতাম তাহলে হয় কথা ছিল। সেদিন পাঁচটি পয়সার তাগাদায় গিছলাম, বামুনের ছেলেকে কৈবৰ্তরা কী অপমানটা কষ্টে দেখলে ? দোষ দেবাে vাকে। আমার ওষুধে রােগ সারেনা কেন সে ত আমি জানি। দুখু রঙীন সুতো নেই সামশু, রাগও নেই। গেল পুজোর সময় ছােট ছেলে শাঁচটা টাকা পাঠিয়েছিল, আট আনা তার থেকে তুলে রেখেছিলাম বিচেলি কিব বলে, ঘরের চালে ফুটো, সে পয়সাও গেল খরচ হয়ে। রাজুর কাছে একখানা পােষ্টকার্ড চেয়েচি ছেলেকে আবাব লিখব। আজ তিন দিন হাঁটাহাঁটি করচি বাজুর কাছে, তিন পয়সা আজকাল পােষ্ট- কার্ডের দাম, না সামন্ত ? সামন্ত বলে, হা সেদিন বটে দারােগা বাবু বলছিলেন। —লিখব একখানা চিঠি, বুঝলে? রাজু যদি না দেয়, আমিই খরচ করব তিনটে পয়সা। দিন আর আমার চলে না সামন্ত। —তা কেমন করে চলবে বলুন, অতগুলি পুষ্যি যার ডাক্তারবাবু বলেন, আমিই একমাত্র ডাক্তার, যার নাম আছে অথচ ডাক নেই। প্রশংসা শুনি আর উপবাস করি। সামন্ত বললে, কিন্তু আগে ত আপনার যথেষ্টই সে আগে, কিন্তু এখন? আমার অবস্থা এক সময় স্বচ্ছল ছিল সেটা গল্প-কথা। স্রোত এসেছিল, ভেসেছিলাম; স্রোত চলে গেল, চড়ায় আমার নৌকো হল বানচাল । ওরা বলে আজকাল আপনার ওষুধে অার- রোগ সারে না, এই তু? দে দোষ কার সাম? তোমরা দু’পম্বসার বেশি একশিশি ওষুধের দাম দেবে না, আমি রােগ সারাবাে – ১•

রঙীন সুতাে
কী দিয়ে বলতে পার? ওষুধের শিশিতে ওষুধ নেই, শুধু জল, তাতে
কি রােগ সাবে ?
সমস্ত বললে, জল দেন ওষুধের বদলে ?
চুপ, কেউ যেন শুনতে না পায় সামন্ত, দিলেই বা শুধু জল, ও যে
ওষুধের শিশি। দেবার সময় জলে মন্তব দিয়ে দিই।
সামন্ত জোরে জোরে কলকেটা টানতে লাগল।
গলা নামিয়ে ধীরে ধীরে ডাক্তার বললে, আজ আমার কোথাও
ঠাঁই নেই সামন্ত, যে ছিল সকলের মাঝখানে, তুমি সবই জানাে, সে
পড়ল সবার আড়ালে, আজ ভাব দাম কানাকড়িও নয়। সংসারে
এমনিই হয়, এই নিয়ম। তার জন্যে দোষ দেবাে কাকে বল ত ?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডাক্তার পুনরায় বললে, তা বলে তুমি যা
ভাবচ আমার হিংসে হয়েচে দেবেন সা’র ওপর ? মমাটেই না। পঞ্চায়
বছর বয়স হল হিংসে করিনি কাবে ওপর। ও 'আমি জানিই নে।
আমি ত জানি দেবেন সা বড় ডাক্তার, কলকাতার পাশ করা, পয়সা
নিয়ে ওষুধই দেয়, জল দেয় না, রুগী ভাল হয় তার ওষুধ খেয়ে, তারা
আমারই গায়ের লােক, আমারই ছেলেমেয়ে হিংসে আমি করিন
সামন্ত, নিজের দারিদ্রের রাগ অন্যের ওপর তুলিনে।
সামন্ত বােধ করি ডাক্তাবের সাধু ভাষা বুঝতে না পেরে চুপ করে
রইল।

বঙীন সুতো * হু করে কনকনে বাতাস বইছিল। এই দুটি মানুষের কথাবার্তা ছাড়া আর কোথাও জনসমাগম নেই। বাত্ৰি স স করচে। চাদরের ভিতবে নিঃশব্দে শুয়ে পা দুটি আবো কুকডে শরীবকে গরম করবার চেষ্টা করছিলাম। এখানে কোথায় এসেছিলেন ডাক্তাবাৰু ? এই এসেছিলাম সামন্ত, এখানেই। ভূপতিব আসবার কথা, আমার ভাগ্নে গো, আগের গাভীতে আসেন, যদি এ গাড়ীতে আসে। ভূত এসে যদি কিছু দেয়, বুঝলে না? -, সাম বললে, আমি এসেছিলাম মাষ্টার মহাশয়ের কাছে। গাড়ী চাল না গেলে 'ঠার সঙ্গে আকে। আছে আমার হাতে, মাঠের পথ••• এক সঙ্গেই যাবে। ডাক্তাবাৰু-গলা নীচু কাব পুনরায় সে চুপি চুপ বললে, পাবি মাঠের ধার দিয়ে একলা নাই বা গেলেন, চোর- ডাকাতের কথা বলচিনে এই জোড়া তালগাছের ধারে,—আছে ডাক্তারবাবু, আছে। তােমায় হ আবাব বাতে ভিতে বেরুতে হয় সামন্ত। কি করব বলুন, চৌকীদারি কবচি এই তেইশ বছর, মুখ খুলে বলিনি কোনোদিন। শবীর ত দেখছেন, হাড় কখানি সার হাপানিটাও বেড়েছে ক'দিন। গা পাহারা দিয়ে জীবনটা কাটল ডাক্তারবাবু। বাতের বেলা চোখ বুজে হাক্ পেডে চলে যাই, নিজের

রভীন সুতাে
পায়ের শব শুনলে ভম্ব করে, পায়ের কাছ ব্যাঙ ছটকালে আঁক করে
উঠি ••একেই অনুতাসে মানুষ আমি।একটু থেমে সামন্ত আবার
বললে, আমার চাকরি ত জানেন ডাক্তারবাবুকে বল আসে, কি
একটু সাহস বাড়ে এমন ওষুধ আপনি একটু দিতে পারেন?
আছে বৈ কি সামন্ত, সঙ্গেই আছে, কত লােক এই ওষুধ খেয়ে
সলেই আছে? দিন্ তবে একটুখানি-
ডাক্তার ব্যাগ, খুললে। খুঁজে পেতে ওষুধ বার করে বললে, এতে
জল মেশানো নেই সামন্ত, এ একেবারে টাটকা, ভাজা,বুঝলে?
আকোৱা।
ও, বেশ বেশ—দিন গালে চেলে, হাঁ করচি।
ঔষধ খেতে খেতে ষ্টেশনে ঘণ্টা বেজে উঠল, গাড়ী আসছে। গাড়ী
এসে দাডাবার আগেই সামন্ত বললে, পায়ের ধূলাে দিন যেন উপগার
হষ•••কাল আপনাকে দামটা পৌছে দিয়ে আসব ডাক্তারবাবু।
কাল ? আজ নয় ?ভাজার ব্যাকুল হয়ে বললে, তােমার
সরকারি চাকরি, তুমিও ধারে খাবে সামন্ত ?
ততক্ষণে গাড়ী এসে পৌছেছে। সলকণ্ঠে সাম কি উত্তর দিল
তা শােনবার আগেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আমি গাভীর দিকে এগিয়ে
গেলাম, চা। গাড়ী একমিনিট কি দু'মিনিট দাড়াবে।
কৃষ্ণকায়। নির্দয় নিশীত-রাত। জানলা ও দরজা বন্ধ করে যাত্রীরা
১১১

রঙীন সুতা
ভিতরে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমােচ্ছে।
দেখতে দেখতে গাড়ী ছেড়ে দিল
জ্বালার বাইরে একজনের উদ্ধেগ-আকুল কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম-এল
না, ভূপতি এ গাডীতেও এলনা, বুঝলে সাম•••ভূপতি অ ভূপতি,
এলি বাবা?
কোথায় ভূপতি? ডাক্তাবের ব্যাকুল চীৎকার পিছনে অস্পষ্ট হয়ে
আসতে লাগল। নির্জন অন্ধকার বিদীর্ণ করে বন্য জন্তুর মত তখন
আমাদের গাড়ী ছুটচে, চন্দ্রা।
তোমার সঙ্গে আলাপ হবার ঠিক আগেই যার কাছে বিদায় নিয়ে
এসেচি তার কথা না বলে নারী চরিত্র সম্বন্ধে কোথায় যেন একটা
ভুল থেকে যায়, চন্দ্র। তার সঙ্গে আমার শেষের দিনের গল্পটা বলে
আপাতত শেষ করি। মন দিয়ে তুমি শুনবে ত?
বারান্দা পার হয়ে আস্তে আস্তে ঘরের ভিতর এসে দাড়ালাম।
মেঝের উপর একখানা বড় আয়নার সুমুখে বসে হিরণয়ী তখন চুল
বখছিল। আয়নার ভিতর দিয়েই সে বোধ করি আমাকে লক্ষ্য করে
থাকবে, চুল আঁচড়াতে আচড়াতে বললে, “দেখা নেই যে একদিন,
গিয়েছিলে নাকি কোথাও?”
না, যাবে আর কোথায় তার অয়েলথ পাতা বিছানাটার
উপর উঠে বসলাম।
সে বললে, আজ যে হঠাৎ দেবতার আবির্ভাব ?
১১২

রঙীন শতো হিণী হাসল। এমনি এলাম ঘুরতে ঘুরতে•••অনেকদিন দেখিনি। এমন করেই সে হাসে,নিত ৰিপের একটি বাঁকা হাসি। যেদিন এক দূর তীর্থপথে তার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল সেদিন তার এমনি হাসির চেহারা দেখেছিলাম। বললাম, 'কিছু ভাল লাগ৮ে ন হির, যদি কিছু টাকা দাও ত চলে যাই কোথাও। হিরমী মুখ ফিরিয়ে একবার তাকান। তার মূখে চোখে কোথায় যেন একটি স্নেহের ইঙ্গিত ফুটে থাকত, একটি দুর্লভ সারল্য। খাবার সে মুখ ফিরিয়ে চুল বাঁধতে লাগল। সেদিনটা ছিল প্রথম বসন্তকালে সন্ধ্যা। সূৰ্য ডুবে অকার হবার আগেই পূণিমার জ্যোদায় চারিদিক শাল হয়ে উঠেছে দিকের জানলার নীচেই একটা ভাঙা চোরা মাঠ, সেখানে খানকে গরুর গাড়ী ল্যাজ তুলে মাটিতে মাথা নুইয়ে জড়াজড়ি করে পড়িয়ে আছে, আর তাদেরই একান্তে চাদের আলােয় সে জনকয়েক গাড়োয়ান মাদল বাজিয়ে এরই মধ্যে গান জুড়ে দিয়েছে। মাঠে কোলে রাজ- পথের উপর দিয়ে লোকজন গাড়ী ঘােড়। উচ্চবৰে আনাগােনা ছিল। সেইদিকে চুপ করে চেয়েছিলাম, হিরন্নী এক সময় বললে, 'আহ, সেই এক কম কালো হাড় আছে, বােধ হয় না যে, জানো রঙীন সুতো জল বদলে কোথায় সে হাড় পাওয়া যায়। তােমার ত কত সাধু-সন্নাসীর সঙ্ক আলাস, নিজেও ত তুমি একজন বেমাৰী,-বলতে পারে? কী হবে বল ত? কাকে বশ করবে? দরকার আছে গ', বড় দরকার। আচ্ছ। কোথায় কিনতে পাওয়া যায় জা না?—সত্যি বড় দরকার।' সে আর কিছু 'জুসে করবে না, চুল বাধা শেষ করে একটা পান পালে দিয়ে গড়গ টা বার করে মাক স জতে বস। তামাকের উপ টিকে সার্ভিয়ে অগ্নি সংযোগ করে ফু দিয়ে বললে, 'তুৰি আসে না, গগটার আর নেই, এবা ত সিগারেট ছাড়া আর কিছু খায় না! বলাম,'ইনি কোথায়? তােমার এই অবিনাশবাৰ হিী হেসে বললে, 'তালুক যাওয়া হয়েচে টাকা আনতে, এ-বাড়ী ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না•••মৌমাছির মত-হা, আমিই একরকম ঠেলে পাঠালাম। বাড়ীতে প্রী, সন্তান, সংসার- বাকিটুকু সে সেই শেষ করে নিন। ‘সে হয়ত তুমি বিশ্বাস করবেন বলে বিছানায় বসে আমার একখানা হাত নিয়ে হিরাষী বলতে লাগল, এগায়ে বছর বয়স তখন আমার বিয়ে হল, স্বামী ছিল খেলার সাথী। বাস্তবিক, হেমােনা তুমি, তাকে আমি আশ্চর্য রকম ভাল বাসায়। হ, আঞ্জো ভাব ১১৪ রঙীন সুতো মন কাউকে আমি এত খালবাসিনি। মেয়েমানুষ ভালবাসে এক- জনকেই, আর বাকি—শােনো বলি, তারপর তেরো বছর বয়সে একদিন শেষ রাতে বাড়ীর দরজা থেকে উঠলাম এক ঘােড়র গাছীতে, সঙ্গে কি, আম'কে সে বায়স্কোপ জেতে-কী আনন্দ। কিন্তু গাভী এস এক জায়গায় থামতেই কে যেন আমার নাকের ওপর একখানা কাপড় চেপে ধরল, তার সামান্য গন্ধেই আমি জ্ঞান হারাম। তারপর? ‘ারপর শ বছরের ইতিহাস আর শুনতে চেও না। অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি, অনেক খানি হিশী একবার থ ম পবে বললে, ভালো কীর্তন গাইতে পারি বসে আমার পাতি হয়েছিল খুব, চেহারাটাও ত চলনসই, তাই আমার সামান্য শক্তিটুকু ফু-েফেঁপে অসামান্য হয়ে ভ-সমাজের চোখে পড়লো, পসার মন্দ সানা। কলকাতা থেকে বেশি দূরে নয়, এক জায়গায় মরো করতে গেলাম। বড় বাগানবাড়ী বড় আসর। বাড়ীর কওঁ। মারা গেছেন তাঁর প্রান্ত, গান শুনতে বহু লোকের ভিড় হয়েছে। আমি গিয়ে গড়াতেই সবাই যে নিয়ে মেয়ে-মহলে নিয়ে গেল। * আগ্রহ তবে আমাকে কাছে বসিয়ে দেখবার। তাদের চোখে আমি দেবী * নবী ঠিক বুঝলম ন, শুধু দেখলুম তাদের কৌতুহল। কেউ গান ১১ রঙীন মুতে টলে, কেউ করে আদর, কেউ করে বসে উদ্ভট অভদ্র বনিকতা, কউ বা খাবার এনে খাওয়ায়। আমার জীবনের প্রতি তাদের অদ্ভুত, আকর্ষণ। তারপর ? তারপর, কর্তার বড় ছেলে, যিন আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রীর ঙ্গে দেখা। বাড়ীর তিনিই গিন্নি, তার শাড়ী নেই। প্রথমে দেখেই তনি অামার দিকে কটাক্ষ করে বললেন, এই যে, বেশ পছন্দ করেই মনা হয়েচে খেচি। তার বিষাক্ত বাণ খেয়ে একটু দমে গেলাম। লিলাম, নুন, আমি যোগ্য নই আপনাদের সামনে এসে যায়। —তিনি গ্রাই করলেন না, বরং আমার বিন-নম্রতাকে ধমক দিয়ে ।লে উঠলেন, কদিন আমার স্বামীর সঙ্গে তােমার আলাপ হয়েছে ? Fথাটার কুৎসিত ভঙ্গীতে সকলের সুমুখে অত্যন্ত অপমানিত বােধ Fরম, বিরক্ত হয়। কিন্তু কী কাৰ, তাঁদে ত আর অসম্মান রিতে পারিনে, তাঁরা তারের মেয়ে। শান্ত ভাবেই বলুষ, তার সে ত তেমন আলাপ আমার নেই, ওই যা আয়নার সশস্ত্র দেখা। তিনি শিলেন, বিশোবাদী, আমি চিনিনে আমার স্বামীকে?-আহা বেচারা। -হিনী হাসতে লাল।

বঙীন শতাে বুঝলে, স্ত্রী চেনে স্বামীকে। বিদ্রুপাত্মক কাঠ হিরী পুনরায় বললে, যেমন সকল স্বীই চেনে সকল স্বামীকে। দু’জনেই খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাম। ‘হা, বলেই ফেলি তােমাকে, তুমিই বুঝবে। হিরন্ময়ী সােঙ্গা হষে উঠে বসল,-বাইবে আসচি, বউটা ছুটে এসে আমার মুখে-চোখে কি যেন মাখিবে দিনে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে••চাবিদিক মামার অন্ধকার হয়ে গেল। একটা চোখ ফুলে উঠল, তা , কানা ও হইনি, তবুও সেদিন শত গােলমাবে মধ্যে মানি গান ।গয়ে এলাম, এক জনের সামান্য ঈর্ষায় কেন ? অত বড় আসব মুন হবে, তুমি বল না? আসবার সময় টাকা নিইনি, শুধু সেই আসবে দাড়িয়ে হেসে বউটার স্বামীর হাত ধ’ ব ব শ এলাম, দা কবে আমার বাসায় টাকাটা পৌছে দিয়ে ও দিতে পারবেন? আপনিই যাবেন। হিবায়ী এবার উজ্জল কবে হেসে উঠতেই তার কানের দুল দুটো চিক্ চিক্ করে উঠলাই তুমি বশ, আমার সে-হাসি আর অনুরােধ ব্যর্থ হয়নি, বাবুট এনে একদিন। উঃ কী কুংসিত, লম্বা বােকা মুখ, ছোট ছোট কান, হাসলে জীবের ডগা আর মাড়ি বেরিয়ে পড়ে। প্রতি আমার লােভ? হা, ভগবান। তবু সে হলাে আমার প্রতি, তায় ১১৭

বঙীৰ মুতে
শােধের খেলা, আমার ইত-রােমােয় অল্প • বাগ করােনা তুমি, আমি যে
যেয়েমানুষ!
বললাম, ভালবাসলে নাকি ?
ঝডের মত হিরন্ময়ী হেসে উঠল,-“ঠিক যা বলে, ভাশবালুম
বলেই ত এই পাঁচ বছরে লােকটা সর্বান্ত হল,সী, পুত্র, সংসার,
সমাজ, কী না ছাছল আমার জন্ধে। ভুলেই গেলাম সে আমার স্বামী
নয়, প্রি না, প্রিয়তম নয়, ভুলে গেলাম আমি কী। দশ বছরে
আমার মুখে যে-ছাপ পড়েছিল, সে-ছাপ একটু একটু করে মুতে গেল।
বোধ হয় এমনিই চমু, কি বল ?
বললাম, ‘পূনর্জ আর কি।
হিনী বললে, “আজ শাঁচ বছর পরে অবিনাশৰ জী আমার
এখানে এসেছিলেন।
উঠে বসলাম।
বলাম, এখানে? মানে, এই বাড়ীতে ?
‘া গাে , এই ঘরে। কী কাকা আমার পায়ে হাত দিয়ে।
'এ-বাড়ীতে এল, লােকনিন্দার ভয় নেই?
উদ্দীপ্ত ক হিরন্ময় বলে, লােকনি ? তুমি কী জানো
লোকনিলার ভয় মেয়েমানুষের মন থেকে কখন চলে যায়। তাকে
কানতে দেখে আজ বুঝলাম, কী অন্যায় আমি করেছি এই পাঁচ
বছর ধরে।
১১৮

key. {{ ভাগ , উদয- পুর, **** बौन ऋण *অন্যায় ও করনি, প্রতিশােধ নিয়ে। সে কথা বলে না, ভাজা দুটি আত চোখ জানলার বাইরে জ্যোৎস্না রাত্রির দিকে প্রসারিত করে নিয়ে বসে রইল। বাপথের *বৰ শান্ত হয়ে আসছিল, মালের বাজনা থামিয়ে এই মধ্যে এভােয়ানের দল কখন উঠে চলে গেছে। আশপাশের বাড়ীfল থেকে হাসি-তামাসা, গান-বাজনা ও কলকৰ শব্দ ভেসে ভেসে আসছিল। ক্ষমা চাইতে এসেছিল, কেমন ? ‘ক্ষমা নয় ভিক্ষ। হিন্নী মুখ ফিরিয়ে বলনে, 'এসেছিল তার ১ স্বামীকে ভিক্ষে করে নিয়ে যেতে। থেও একটা শ করতেই সে আবার বললে, “ বিপ করো না, বুঝল। জীবনকে সব সময় ১টা করাটা দেখতে দেখতেই হিরন্ময়ীর গলার আওয়াজ ভারি হয়ে উঠল, তার চেহারাটা পর্যন্ত যেন বদলে গেল। বললে তুমি বুঝবে না মেয়েমানুষের কী হয়। তাদের ভালবাসার মানে তােমাদের এই প্রেম নয়, সমস্ত শরুমা। সেই থেকে হৃদপিণ্ডটা টেনে ছিডে নিলে কী যন্ত্রণা হ আলে? বেঁচে থেকেও মরণ কাকে বলে বুঝতে শিচে ? হিরন্ময়ী বিছানাটা ছেড়ে নীচে নেমে গেল, একবার বাইরে গিয়ে বারান্দায় ঘুরে এল, তারপর বললে, অথচ আমার কোনো হাত নেই,

বয়ন'রামপুর হও ।
রঙনি সুতাে
আমার প্রেমালাপ সে শুনবে, দিনের পর দিন ধরে মিথ্যে কথা শুনবে,
কিন্তু আমার হিতোপদেশ শুনতে চাইবে না।'
আয়নার মুখে দাড়িয়ে নিজেকে লক্ষ্য করে সে হাসতে “গল,
দুটো হাত তুলে মাথার খোটা একবার ঠিক করে নিন এবং এরপর
পুনরায় বললে, একরকম গাছের শেকড আছে জানো, এন ‘তে
পারাে জোগাড় করে ? কি সেই বনমানুষের হাড় ?
আস্তে আস্তে উঠলাম। সে বললে, ‘উঠচ নাকি ?
টাকার কথা বলছিলে না? বলে ক্যাশবাক্সটা পেডে অচিবে খুট
থেকে চাবি নিয়ে খুলতে খুলতে আবার বললে, ‘কত টাকা চায় ?
শােনাে, যদি কোনাে তীখে যাও, তবে আমার জন্যে একটু প্রসাদ
এন।
, তুমি চেয়ে রয়েচ কেন শমন কবে ? আর কী শুনতে চাও?
কোথাও সামান্য বেদনা, কোথাও-বা ক্ষনিকের আনন্দ, জীবনের চোবা
এমনিই। এমনিই তার বিলা, অসামঞ্জস্য-তবু তাকে গ্রহণ করতে
হবে পবিপর্ণ গ্রীতির সঙ্গে।
তরুণ অংক
শক্তি,সেবা,মাহিয়া বিভাগ)

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rangin Suto Ed.2

Author
Sanyal, Probodh Kumar
Title
Rangin Suto Ed.2
File name
Rangin Suto Ed.2
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2010/04/22
Publisher
Hindustan Book Dipo, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
136
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Novel
Keywords
Sanyal, Probodh Kumar
DLI number
515187
Barcode
4990010016819.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
AWQNl9iysxU
Download PDF

Rangin Suto Ed.2