Makardah Saraswat Library, Howrah
Moner Mil
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
&ত্রৈর
মির্শ
SAILESH;
PAULY
সৌরীন্দ্রমোহন মুখোসাধ্যায়
দেব-সাহিত্য-কুটীর
:২৫বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা হইতে
শ্রীসুবােধচন্দ্র মজুমদার কর্তৃক
প্রকাশিত
।
১৫১
দুই টাকা
২৪, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা হইতে
এস, সি, মজুমদার কর্তৃক
মুদ্রিত
No text on this page.
No text on this page.
॥ ফলে অলর সন্তা, }}} প্রথম পরিচ্ছেদ ফুলছড়ি , % কলিকাতার দক্ষিণে গঙ্গার তীরে ছােটগ্রাম•••ফুলছড়ি। গ্রামখানি ছােট হইলে কি হয়, গ্রামের মধ্যে দলাদলি, দ্বেষ-হিংসার মাত্র। এমন প্রবল যে, অনেক বড়-বড় বদ্ধিষ্ণু গ্রামও এ ব্যাপারে তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না! পাড়ায়-পাড়ায় স্বতন্ত্র দল। দলপতির প্রখর দৃষ্টি সক্ষণ উদ্যত,—কোথায় SAILESH মনের মিল কি ত্রুটি ঘটিল, কার পাণ হইতে কতটুকু চূণ খশিল, সেই দিকে। বাঁধা আইন-কানুন, বাঁধা গণ্ডী এমন টানা যে, তার বাহিরে কাহারাে পা পড়িলে সর্বনাশ! লাঞ্ছনা- তিরস্কারের অন্ত থাকে না। গ্রামে মুখ-দেখান ভার হইয়া ওঠে এবং দলপতির দলপতির নির্দেশ-মত প্রায়শ্চিত্ত করিলে তবেই সে-যাত্ৰা রক্ষা। অর্থাৎ সর্বক্ষণ পাড়ায় একটা-না-একটা বিষয়ের ঘোট চলিয়াছে। ও-পাড়ার শশী চক্রবর্তীর বিধবা ভাজ গঙ্গাস্নান করিতে গিয়া মুখের ঘোমটা খুলিয়া চরণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে নাকি কথা কহিয়াছে। গ্রামের বৌ হইয়া এতখানি তার নির্লজ্জ আচরণ! অমনি শশী চক্রবর্তীর নামে দলপতির পরােয়ানা জাহির হইল,—করাও বারােটি ব্রাহ্মণ-ভােজন ! নহিলে একঘরে হইতে হইবে ! চরণ ভট্টাচাৰ্য্যকে এ-সম্বন্ধে কোনাে উচ্চবাচ্য করিতে শুনা গেল না। শশী এই সেদিন ভাইয়ের অসুখে ডাক্তারের জন্য নগদ একশােটি টাকা ধার করিয়াও ভাইকে ধরিয়া ইহলােকে আটকাইয়া রাখিতে পারে নাই। পাড়ার সবার ঘরে ভিটার দলিল লইয়া গিয়াও তার জোরে টাকা ধার পায় নাই। বিধু মুখুয্যে টাকার আণ্ডিল। এতবড় নির্লজ্জ সুদখোর যে তার আর জোড়া নাই সে বলিয়া বসিল, দলিল লেখাপড়া এবং রেজিষ্ট্রী না হইলে সে টাকা দিতে পারিবে না। তা ছাড়া সুদের যে-হার শশী বলিয়াছে, তা একেবারে অচল, দুঃসাধ্য ব্যাপার! বিধু মুখুয্যে সুদের যে- মনের মিল হার বলিল, শশীর পক্ষে সে-সুদে টাকা ধার লইলে ভিটা বাঁচানাে কোনােকালে সম্ভব হইবে না। গৃহে ভাইয়ের প্রাণ তখন দেহ-পিঞ্জরের মধ্যে ছটফট করিতেছে—তাহার পাশ ছাড়িয়া নড়া চলে না। সুদ না হয় খুব চড় দিলাম, ভিটা না হয় গেল, ভাইয়ের প্রাণের চেয়ে ভিটার দাম বেশী নয় ! কিন্তু রেজিষ্ট্রী-অফিসে ছােটা তাে সহজ ব্যাপার নয় ! সেখানে দলিল রেজিষ্ট্রী হইলে টাকা মিলিবে—তবে সেই টাকায় ঔষধ-পথ্য ! দাদা অনেকের দায়ে মাথা দিয়াছে ! পয়সার অভাবে সেই দাদা বিনা-চিকিৎসায় প্রাণ দিবে? বিধু মুখুয্যের দিকে কটমট করিয়া চাহিয়া, দলিল লইয়া শশী বেচারা শেষে এক পেশোয়ার-বাসী কাবুলীর দ্বারস্থ হইয়া টাকা ধার করিয়া, ডাক্তারের পায়ে ধরিয়া দক্ষিণা দেয় । সে টাকা শোধ দেওয়া দূরের কথা, কাবুলীর পাগড়ি আর ঢিলা আলখাল্লা ঘুমে-জাগরণে তার আশে-পাশে ছায়ার মতো কি বিভীষিকার মূর্তি ধরিয়া যে সারাক্ষণ ঘুরিয়া ফিরিতেছে- আজও সে-ছায়া সরে নাই। এরা বলে কি না, বারােটি ব্রাহ্মণ-ভােজন করাও ! তাও বিনা দোষে ! শশী খি চাইয়া উঠিল, বলিল—কভি নেহি! দামড়া গরুকে হাম্ জাব, নেহি খিলায়েঙ্গা। বিধবা ভ্রাতৃজায়া বিন্দু স্বামী-বিয়ােগের সদ্য বেদনার উপর লজ্জার বােঝা মাথায় বহিয়া বলিল-ওঁদের মিছে কথা! চরণ ভটচায এমন ইতর রসিকতা করেছিল তার জবাবে ধমকে মনের মিল আমি বলেছিলুম-বুডাের ঐ মুখ ঝাঁটার ঘায়ে থেত করে দিতে পারতুম তাে ঠিক হতাে!•••ব্যাপার ভাই, এই। শশী বলিল—চরণ ব্যাটা হলাে আবার সদু বড়য্যের ইয়ার। ব্যাটা ভটচায্যি, না, চামার! দু-ব্যাটার ভেতরের কথা জানি তাে! মগের মুল্লুক পেয়েচে ! ইঃ, না? ইংরেজের রাজত্ব, এখানে চোখ রাঙাস্ কি সাহসে? কখনাে বামুন খাওয়াবাে না আমি। কেন, কিসের জন্য ? তাও ঐ সব চামার বামুন! বি কহিল—কিন্তু ঠাকুরপাে, ইংরেজের রাজত্ব হলেও এরাই এ মুল্লুকের বিধাতা । শশী কহিল,“তুমি ভেবাে না বৌঠাকরুণ, কোনাে দায়ে কোনাে ব্যাটা কখনো মাথা দিতে আসে না-শুধু ঘরে বসে হুমকি ছাড়বে! কে রাখে ওদের তােয়াক্কা ? বিন্দু কহিল--ওরা একঘরে করবে, বলেচে ! শশী কহিল—বেঁচে যাবে। কোনাে ব্যাটাকে বাড়ীতে ডাকতে হবে না! কোনাে ব্যাটা ছেলের বিয়েয়, ভাতে, পৈতেয়, দু’খানা কাচা ময়দার লুচি দেখিয়ে দু’টাকা চার টাকা লৌকিকতা আদায় করতে পারবে না আর। ভ্রাতৃজায়া কহিল, তােমার দায়ে-অদায়ে... শশী কহিল—কোনাে ব্যাটা কোনােদিন দেখেচে ? দেখবে, তাও আমি চাইনে! তবে আমিও ছাড়ছি না। আমার মায়ের মনের মিল মত বড় ভাজ তুমি...তােমার নামে এত-বড় মিথ্যা অপবাদ তুলেচে যে ব্যাটা, তাকে আমি একবার দেখে নেবো। বিন্দু কহিল-তার মানে ? শশী কহিল,—মানে এখনও খতিয়ে দেখিনি বৌঠাকরুণ... তবে সে-মানে যত ঘােরালােই হােক, আমি ছেড়ে দেবো না। বিন্দু গম্ভীর স্বরে ডাকিল,—ঠাকুরপাে•• সে-ডাকে আসন্ন বিপদের আশঙ্কা, এবং তার পিছনে কতখানি স্নেহের মাধুৰ্য যে মিশানো! শশী কহিল,—তােমার কোনো ভয় নেই, বৌঠাকরুণ। গাঁয়ে একটা মজা দেখচি বেশ, যার পয়সার জোর আছে, সে যা-খুশি তাই করে যাচ্ছে—দুৰ্বল গরীবের উপরই শুধু যত জুলুম ! বিন্দুর চোখে নিরুপায়তার ছায়া আরো গাঢ় হইল। বিন্দু কহিল,-তবে? তােমার তাে পয়সার জোর নেই, লােক-বলও নেই। কাজেই... শশী কহিল,-কাজেই, ওদের হুঙ্কার মেনে চলতে হবে ? বারােটা মর্কটকে পাত পেতে খাওয়াবো ? বিন্দু শান্ত স্বরে কহিল,তা নয় ভাই ঠাকুরপাে•••আমাকে নিয়েই তো কথা উঠেছে। আমি যদি এ ভিটে ত্যাগ করে’ যাই? —বৌঠাকরুণ... শশীর কথায় বাধা দিয়া ভ্রাতৃজায়া কহিল—জানি ভাই, এ ঘর ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে কত শক্ত। এ ঘর আমার মনের মিল বেদনার-বাষ্পে ভ্রাতৃজায়ার কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল। শশীর বুকে এইটুকুই অনেকখানি আঘাতের বেদনা জাগাইয়া তুলিল। শশী কহিল,—এমনি অকথ্য অপবাদ মাথায় বয়ে তুমি চলে যবে ?•••ত হবে না বোঠাকরুণ...আমি মরদ-বাচ্ছা। ঐ ভটচায্যি বামুনকে আমি একবার তার টিকি আর নামাবলীর খােলােস ছাড়িয়ে সকলের চোখের সামনে ধরে’ দেবব,—এই আমার পণ !•••তােমার কোথাও যাওয়া হবে না। ওদেরাে কথা শুনবো না! ওরা কি করবে? কত শক্তি? ••ওদের সঙ্গে মিশে পাঁচ-ঘরের ঘর আমি করতে চাই না। ডােম-চঁড়ালের দোরে দাড়াবে দরকার হলে’—তবু ও ইল্লদের ঘেষ কখনো সইবো না। আলােচনায় দেবরের জিদ আরাে বাড়িবে...কি করিতে শেষে কি করিবে,—এই ভাবিয়া বিন্দু চুপ করিল। শশী তখন ঘরের মধ্যে ঢুকিল এবং কঁাধে একখানা উড়ানি ফেলিয়া একটা ছাতা লইয়া ঘরের বাহিরে আসিতে বিন্দু কহিল,কোথায় বেরুনো হচ্ছে, শুনি? বেলা এই বেড়ে উঠলাে, আর এখন তােমার বেরুবার সময়। তারপর কোন্ অবেলায় ফিরে কড়কড়ে ভাতগুলাে খেতে ববে। তার চেয়ে বাবু, স্নান করে’ খাও। আমি এখনি ভাত ধরে দিচ্ছি। বেরুতে হয়, খেয়ে বেরিয়ে।। হাসিয়া শশী কহিল,-তুমিও যেমন ! বেশী দূর নয়, আমি যাচ্ছি ও-পাড়ায় নিতাইয়ের কাছে। এখনি ফিরবাে।
মনের মিল বিন্দু কহিল,-তােমার ফেরা তো! বেরুলে কি আর তােমার ঘরের কথা মনে থাকে, ভাই ? বিন্দু থামিল, পরে হাসিয়া কহিল,—ঐ জন্যই তো বলি, একটি বৌ এনে দি, নাহলে’ ঘরে মন বসবে কেন? শশী ফিরিয়া বিন্দুর পানে চাহিল, কহিল,—ও-কথা পুরােনাে হয়ে গেছে, বৌঠাকরুণ। তােমার ভয় নেই, আমি এখনি ফিরবে আর ফিরে শীগগির করেই নেয়ে-খেয়ে নেবো। কেন না, আমাদের মস্ত একটা কাজ আছে। তার কিনারা কতদূর হলাে জানতে চলেছি। বিন্দু কহিল,-কাজটা কি, শুনি? শশী কহিল,—মাছ ধরা গাে, মাছ ধরা। বিন্দু আর কোনাে কথা কহিল না; শশীও ছাতা খুলিয়া বাড়ীর বাহির হইয়া গেল। নিতাইয়ের বাড়ী ও-পাড়ায়। সেখানে যাইতে হইলে সদু বড়য্যের বাড়ী পার হইতে হয়। শশী আসিয়া সদু বাঁড়ুয্যের বাড়ীর সামনে পৌছিলে দেখিল, চরণ ভট্টাচাৰ্য মহা উৎসাহে হাত নাড়িতে-নাড়িতে সদুর বাড়ী হইতে বাহিরে আসিতেছে। আছে আরাে টাকমাথা তিন-চারিটা সমাজ-রক্ষী। চরণকে দেখিবামাত্র শশীর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল। শশীকে দেখিয়া চরণ কহিল-এই যে শশী । তারপর, ব্রাহ্মণ-ভােজনটা সঙ্গে কবে হচ্ছে হে? ৭ মনের মিল চরণকে শশী কহিল,-যেদিনই হোক্, তােমার তো কোনাে আশা দেখচিনে... চরণ কহিল-তার মানে ? শশী কহিল—তােমার মতো বিটলেকে তাে ব্রাহ্মণের দলে ডাকতে পারি না। অন্ততঃ আমার বাড়ীতে। পাড়ার বাগদীদের যদি কখনাে নেমন্তন্ন করি, তাহলে সেদিন তােমায় ডাকবাে। রাগে বাক্য-হারা হইয়া চরণ তীক্ষ দৃষ্টিতে শশীর পানে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। শশী কহিল—তােমাকে খাওয়ানাের চেয়ে দুটো ভেড়া-গরু খাওয়ালে অনেক বেশী পুণ্যি হবে। এ-কথায় চরণ দাউদাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। চোখে আগুন, জালিয়া চরণ কহিল,—ভারী তেজ দেখচি যে। চেনাে না? চরণ যদি মনে ও-তেজ কোথায় থাকে, একবার দেখি। শশী কহিল,-যেখানেই থাকুক, অন্ততঃ দুলে-পাড়ায় কি বাগদীপাড়ায় তাকে পাবে না চরণাদ ভটচাজ ! কথাটা বলিয়া চরণের উত্তরের প্রতীক্ষামাত্র না করিয়া শশী চলিয়া গেল। কথাটার মধ্যে অনেকখানি ব্যঙ্গ প্রচ্ছন্ন ছিল। দুলে-পাড়ার সঙ্গে না হোক, বাগদীপাড়ার সঙ্গে চরণের একটু সম্পর্ক আছে। প্রায়ই তাহাকে সে পাড়ায় দেখা যায়। কাহাকেও দেখিলে চরণ বলে—এই সদুবাবুর পাওনা আদায় করতে আমার আসা। করে মনের মিল অর্থাৎ বাগদী-পাড়ায় সদুর কয়েক ঘর প্রজা আছে। তাদের কাছ হইতে খাজনা আদায়ের অন্য লোক থাকিলেও এ-কাজটায় চরণ অগ্রসর হইয়া আসে। এজন্য গোপন অন্তরালে কেহ- কেহ বাদী-পাড়ায় কোনো একটি বিশেষ পরিবারের সহিত চরণের ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত করে। তবে সমাজে সদু বঁড়য্যের প্রতিপত্তি বিলক্ষণ এবং চরণ তাঁর বিশেষ অনুগৃহীত—এই দুই কারণে ব্যাপারটা লইয়া প্রকাশ্যে ইহার বেশী আলােচনা করিতে কাহারাে সাহসে কুলায় না ! কে জানে, এখানে ছােট একটি, ইট ছুড়িলে কত-বড় পাটকেল কোন্ দিক্ হইতে আসিয়া মাথায় পড়িবে । আজ শশীর এ প্রকাশ্য ইঙ্গিতে চরণ একটু চমকাইয়া উঠিল ; পরক্ষণেই নিজেকে সম্বরণ করিয়া কহিল—টাকা আদায় করতেই যাই বাদী-পাড়ায়! তাতে হয়েছে কি ? গঙ্গা- স্নান না করে জল গ্রহণ করি না আমি। সন্ধ্যা-আহ্নিক, এমন নিষ্ঠা•••গ্রামে আর কার আছে, দেখিয়ে দিক্ না ! ফড় ছোকরা, আমার সঙ্গে মস্করা করে ! আমার উপর ঠেশ দিয়ে গ্রামে বাস করবে ঐ বিধবা কঁাচা-বয়েসী ভাজ নিয়ে! ঘাখো মজা, কি হাল করি তােমার••• কিন্তু নিস্ফল আক্রোশ ! যাহার উদ্দেশে এ আক্রোশ, সে তখন বহু দূরে চলিয়া গিয়াছে। চরণ একবার পথের দিকে চাহিয়া থমকিয়া দাড়াইল, তারপর গভীর একটা অভিসন্ধি মনে-মনে আঁচিয়া লইয়া আবার সদ বড়য্যের গৃহে মনের মিল প্রবেশ করিল। বাকী সমাজ-রক্ষীর দল স্নানাদির বেলা হইতেছে বলিয়া বিদায় লইল। বিদায় লইবার সময় দেবু বলিয়া গেল, যা হয় একটা ঠিক করে ফ্যালো। এসব সামাজিক ব্যাপারে গয়ংগচ্ছ করতে নেই হে চরণ। চরণ কহিল,-না, আজই হেস্তনেস্ত না করে’ নড় চি না!••• দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ নিতাই নিতাইয়ের গৃহে নিতাই ক'টা হাঁসের পালক হইতে ফাজ্ঞা কাটিয়া ছিপে বাঁধিতেছে, এমন সময় বাহির হইতে শশী ডাকিল,—নিতাই আছো ? -কে ? শশীদা••এসো! নিতাইয়ের গৃহে সে ছাড়া দ্বিতীয় প্রাণী নাই, কাজেই তার দ্বার সৰ্ব্বক্ষণ অবারিত! নিতাইয়ের গৃহে গিয়া শশী কহিল,—বেরুবার আয়ােজন পাকা তো? নিতাই কহিল,—নিশ্চয়। তবে যাবার সময় একবার বাঙ্গীপাড়া ঘুরে যেতে হবে, দাদা। বাদীপাড়া? নিতাই কহিল,-হ্যা। উমেশের এক ভাইপাে আপিসে ছুটি নিয়ে এসেছে। তার শরীর খারাপ, এখনাে সারতে পারে নি। বজবজের একটা পাটকলে সে কাজ করে। তার ছুটি বাড়ানাের দরখাস্ত একখানা লিখে দিয়ে যেতে হবে। নাহলে চাকরি খােয়াতে পারে, কিম্বা জরিমানা হতে পারে! বেচারা!
মনের মিল শশী কহিল,আমাদের কতদূর যেতে হবে, শুনি? নিতাই কহিল,-নতুনপাড়ায়। ঐ পাদ্রী-সাহেবদের নতুন ইস্কুল হয়েছে না? তার ঠিক পিছনে আবদুলের পুকুর-মস্ত পুকুর দাদা, আর মাছ তাতে দেদার। ধরে’ সুখ পাবে ! শশী কহিল,-বান্দীপাড়া ঘুরে যেতে এক দূর পড়বে না ? নিতাই কহিল,কতটুকু বা! তেমনি আষাঢ়ের বেলা ! অন্ধকার হতে যার নাম তােমার সাতটা। কত মাছ ধরবে, ধরাে। এই আধ ঘন্টা আগে দলু এসেছিল, বেচারী মিনতি জানিয়ে গেছে। তখনি লিখে দিতুম—কাজ চুকে যেতাে। কিন্তু সে ওদের সাহেবের আর আপিসের নাম-লেখা কাগজটা বাড়ীতে ফেলে এসেচে। বললুম, সেই তাে বেরুচ্ছি খানিক পরে, যাবার সময় লিখে দিয়ে যাবাে।—তা তােমার ভয় নেই, দাদা। তােমাকে তাদের বাড়ী ঢুকতে হবে না, পাশে দাড়িয়ে থেকো! তােমায় জানি তাে, বামুন মানুষ, তায় ভটচায্যি বামুন•••বাঙ্গীর ছায়া মাড়ালে জাত যাবে। শশী কহিল,আমি তাহলে নাওয়া-খাওয়া সেরেই তােমার এখানে আসবে। কি বলো? তােমার কত দেরী এদিকে ? নিতাই কহিল,রান্না হয়ে গেছে।••• শশী কহিল,—দেখি, ছিপ কেমন হলো। নিতাই কহিল,—তােমারটা হয়ে গেছে, আছে। আনাই। আমার এতে হুইলটা লাগিয়ে নিলেই ব্যস্। এ কথা বলিয়া নিতাই ডাকিল,-কাশি... ঘরে মনের মিল নেই। সে আহ্বানে দশ বছরের একটি ছেলে আসিয়া দাঁড়াইল। নিতাই কহিল—আমার ঘরের কোণে যে-ছিপটা তৈরী করে রেখেচি, নিয়ে আয় তাে ভাই... কাশি ছিপ আনিতে গেলে শশী কহিল,-এ ছেলেটিকে কৈ আগে দেখিনি তো ! নিতাই কহিল,-না। ও এই দিনকতক হলাে এসেচে। এইখানেই আছে আমার কাছে। দুনিয়ায় ওর কেউ কোথাও ওর আসল নাম হলো কাশিম—জাতে মুসলমান। মুসলমান ! শশীর আজন্মের সংস্কার একবার মাথা ঝাড়া দিয়া উঠিয়া পরক্ষণেই এতটুকু হইয়া গেল ! নিতাইয়ের কেহ কোথাও নাই, সে গোয়ার-গােবিন্দ ! কিন্তু শশীর ? তার গৃহে ভাজ আছে, বিগ্রহ আছেন। তাছাড়া সমাজ:••যে-সমাজকে এই মাত্র প্রবল হুঙ্কারে-গর্জনে সে তুচ্ছ করিয়া আসিয়াছে। যত তুচ্ছ করুক, তবু সমাজ নামটার সঙ্গে কতখানি বিভীষিকা জড়ানাে আছে ! সমাজকে চক্ষে না দেখিলেও সে-বিভীষিকাটুকুকে প্রাণের কোণ হইতে একেবারে নির্বাসিত করিয়া দিতে পারে নাই ! চট করিয়া সে কোনাে জবাব দিতে পারিল না। নিতাই কহিল,—আমাদের বােটের মাঝি ছিল হানিফ, সেই হানিফের ছেলে। হানিফের বৌ তো অনেক দিন আগে মারা গেছে ! হানিফও একবছর ধরে কালা-জ্বরে ভুগে-ভুগে সেদিন মারা গেল। রােগে পড়ে অবধি এই ছেলের জন্য ভেবে সে সারা হয়ে থাকতো। জাত-কুটুম কেউ এগোয়ে নেই। মারা মনের মিল যাবার সময় কাশিমকে আমার হাতে দিয়ে যায়। যাবার সময় বলে, দাদাবাবু, এটাকে মানুষ করে দিয়ে। নিতাই একটা নিশ্বাস ফেলিল, তারপর হাসিয়া কহিল, মানুষ কাকে বলে, জানি না! নিজেও মানুষ হলুম না কোনাে দিন ••আমি একে কি করে মানুষ করি, বলো তো দাদা? যাক্, খেতে পরতে দিতে পারবে। তারপর ওর নিজের হাত, মানুষ হওয়া। কাশি ওরফে কাশিম ছিপ লইয়া আসিলে নিতাই কহিল, এই তােমার ছিপ। ছিপ তো আসিয়াছে ! কিন্তু ঐ মুসলমানের হাত হইতে সে ছিপ লওয়া ! কেমন এক অশুচিতায় শশীর মনটা রী-রী করিয়া উঠিল। এমন অনাচার ! নিতাই বুঝিল, বুঝিয়া কহিল, ছুঁতে পারছো না! গঙ্গাজল চাই না কি ? বলো•••এনে দি । নিতাই উঠিয়া ঘর হইতে গঙ্গাজল আনিয়া ছিপ লইয়া সেটাতে গঙ্গাজল ছিটাইল, পরে কহিল,-এবার হয়েছে ? খাশা চীজ বানিয়ে রেখেচো দাদা এই গঙ্গাজল! একটু ছুলেই শুদ্ধি ! খুন-খারাপী ছাড়া আর যা-কিছু করাে। খুন-খারাপীটাও চলতো, কিন্তু আইন-পুলিশের রাজ্য কি না! তাই ভাবি, গঙ্গাজল না থাকলে সংসারের অর্ধেক আনন্দ তাে গয়াস্যাৎ করতে হতাে। হাসি পায় মােদ্দা এই ভেবে দাদা যে, সব মানুষকে এক বিধাতাই সৃষ্টি করেছেন। তিনি যদি প্রতি-হাতে গঙ্গা-জল ব্যবহার করতেন, তাহলে ভগীরথের কি সাধ্য থাকতো, মা-গঙ্গাকে ১৪ মনের মিল পৃথিবীতে আনেন !•••মাঝে থেকে আমরাই শুধু কেউ মজিদ বানিয়ে, কেউ গঙ্গা-জল তৈরী করে পৃথক হচ্ছি! কাশিমকে তৈরী করতে ভগবান কি অশুদ্ধ হয়ে গেছেন ? কথাটা খুব সহজ। ইহাতে শাস্ত্রের হুঙ্কার নাই,-এবং শশীর মন সেটাকে গ্রহণ করিবার জন্য নিমেষে উন্মুখ হইয়া উঠিল। কিন্তু, সংস্কার ! ঘরের বিগ্রহের কথা মনে পড়িয়া গেল। তার মুখে বিরক্তির ঝাঁজ।•••শশী কোনাে জবাব না দিয়া ছিপটা পরীক্ষা করিল, তারপর নিতাইকে কহিল—তাহলে আমি চান, পূজো-আর্চা, খাওয়া সব সেরে এখনি আসছি। মােদ্দা, তুমিও তৈরী হয়ে নাও! ছিপটা এইখানেই থাকুক। কেন আর মিছে বয়ে নিয়ে যাই ? এই পথ দিয়েই তাে যাবো। শশী চলিয়া গেল। নিতাই ছিপের কাজ সারিয়া উঠিল— এবং মাথায় তেল লেপিয়া কাশিকে তেল মাখিতে বলিল। কাশির তেল মাখা হইলে তাকে লইয়া সে গেল নদীতে স্নান করিতে। সারা পথ কাশির কথা ভাবিতে-ভাবিতে শশী গৃহে ফিরিল। বেচারা অনাথ । মুসলমানের ঘরে জন্মিয়াছে বলিয়া তার কি এমন অপরাধ হইয়াছে যে সে ভাসিয়া যাইবে ? তার যদি পীড়া হয়, ক্ষুধায় কাতর হইয়া সে যদি পথে পড়িয়া থাকে তো তাকে বুকে তুলিয়া ঘরে আনিয়া সেবায়-যত্নে আরাম করা•••এটা বড়, , জাত বাঁচাইয়া তার কাছ হইতে সরিয়া পড়াতেই মনুষ্যত্ব প্রকাশ পায়। কিন্তু, মুসলমান। গৃহে বিগ্রহ-পূজা করিতে হইবে।•••মস্ত এক সমস্যা শশীর দ্বিধা-হীন নিশ্চিন্ত মনের মধ্যে মনের মিল জাগিয়া এক বিশ্রী জোট পাকাইয়া তুলিল! নিতাই কেমন অবলীলায় ঐ মুসলমানের ছেলেকে গৃহে আনিয়া ঠাই দিয়াছে। এ সমস্যার মীমাংসাই-বা কে করে? কাহাকে প্রশ্ন করিলেই-বা সমাধান মিলিবে ? গৃহে ফিরিতে বিন্দু কহিল, কি ভাগ্যি! এর মধ্যে ফিরেচো ! শশী কহিল,-ফিরলুম। আমি স্নান করে আসি। এসেই পূজা সেরে নেব। তুমি দুটি ভাতের ব্যবস্থা করে রাখে, বৌঠাকরুণ। বিন্দু কহিল,তুমি আগে এসাে তো। ভাত না পাও, তখন বলো। শশী আর কালক্ষেপ না করিয়া স্নানে বাহির হইল। স্নানান্তে পূজা সারিয়া আহারে বসিলে বিন্দু কহিল,কোথায় যেতে হবে, শুনি? শশী কহিল,—মাছ ধরতে•••বলেচি তাে ! বিন্দু কহিল,-ধন্যি সখ যা হােক। মাছ ধরে’ নিজে তো খাবে কত! কতকগুলো মাছ ধরে একে-তাকে বিলিয়ে কি-মুখ পাও, জানি না ভাই । হাসিয়া শশী কহিল-বিলুনােতে আসল সুখ নয় বৌ-ঠাকরুণ, আসল সুখ, মাছ ধরায়। ফাৎনার পানে চেয়ে যে বসে থাকি, লােকে হাসে-কি রাজ্য-জয়ের ফন্দী আঁচছি। তারপর যখন একটি টানে পাঁচসের মাছটাকে ডাঙ্গায় তুলি, তখনকার মনের মিল আনন্দ-••ও, রাজা রাজ্য জয় করে এসেও বুঝি এমন আনন্দ পায় না। বিন্দু হাসিল, হাসিয়া কহিল,—তা অনর্থক এ প্রাণিহত্যায় আনন্দ পাওয়া কি ভালো, ঠাকুরপাে ? জলের মাছ, জলেই থাক্ না, বাপু শশী কহিল,—ক্ষেপেচো বৌঠাকরুণ, জলের মাছ জলে থাকবে যদি তাে ছিপটার সৃষ্টি হয়েছে কেন? হাসিয়া বিন্দু কহিল,—শােনাে কথা! ছিপের জন্য মাছ, না, মাছের জন্য ছিপের সৃষ্টি। শশী কহিল,-মন্দ বলে নি বৌঠাকরুণ। এমনি একটা কথাই এই কিছুক্ষণ থেকে আমার মনে জাগচে। সে-কথা হলাে এই যে, সমাজের জন্য মানুষ, না, মানুষের জন্য সমাজ। বিন্দু কহিল,ইস্, তুমি যে একেবারে আধ্যাত্মিক হয়ে উঠলে ! শশী কহিল,—আমাদের ও-পাড়ার নিতাইকে জানাে তাে? বিন্দু কহিল,-শ্রীধর চাটুয্যের ছেলে? শশী কহিল,-হঁ্যা। তা সে তাে একা মানুষ। আজ তার ওখানে গিয়ে দেখি, দশ-এগারাে বছরের একটি মুসলমান ছেলেকে সে ঘরে এনে ঠাঁই দেছে। গােয়ালের ধারে পড়ে থাকবার মতাে ঠাই নয়, একেবারে নিজের ঘরের মধ্যে ঠাই। ছেলেটার মা-বাপ ভাই-বন্ধু কেউ কোথাও নেই যে তাকে মানুষ করে। বিন্দু কহিল,-মুসলমানের ছেলে ?
মনের মিল শশী কহিল,-হ্যা গাে ! তাকে দেখে আমি তো চমকে উঠেছিলুম! ছেলেটির নাম, কাশিম। নিতাই তার নাম দেছে, কাশী। অর্থাৎ মুসলমানের ‘ম’ অক্ষরটা হেঁটে দেছে। তাই ভাবছিলুম, আমাদের এই সদু, বড়য্যের দল যদি টের পায়, তাহলে খাপ্পা হয়ে উঠবে। বিন্দু শিহরিয়া উঠিল, কহিল,সত্যি ভাই! এরা জানলে মারধাের করতেও পারে বােধ হয় ! নিতাই শুনেচি ভারী একরােখা ছেলে। নিজে যা ভালো বােঝে, তা করতে করে চোখ-রাঙানির তােয়াক্কা রাখে না। শশী কহিল,—ওই জন্যই তো ওকে আমি সবার চেয়ে ভালােবাসি।•••ভাবছিলুম, আমাদের কথাটা ওকে নাহয় বলি... এ-কথার মধ্যে নিজের প্রতি কতখানি ইতর গ্লানির ইঙ্গিত আছে, সেটুকু মনে করিয়া বিন্দু সসঙ্কোচে কহিল,—ঘরের কথা তার কাছে আর নাই-বা বললে ঠাকুরপাে। শশী কহিল, না, না, তুমি বােঝো না বৌঠাকরুণ...আমি একা আর তুমি মেয়েমানুষ—একজনকে পাশে সহায় পেলে আমার পক্ষে লড়া কত সহজ হয় ভাববা দিকিন। নিতাই কারাে তােয়াক্কা রাখে না! ওকে ওকে বলি ••তারপর দুজনে মিলে ঐ চরণ ভটচায্যিটাকে একবার দেখে নি। ভারী পটপটানি। ভেবেচে কী ? একটা ছুচোর মােসাহেবি করে বেঁচে আছে... ওর তম্বি অসহ্য লাগে। এই কথা বলিয়া, নিতাইয়ের গৃহের পথে কিছু পূর্বে সদুর ১৮ মনের মিল বাড়ীর সম্মুখে চরণের সঙ্গে যে ব্যাপার ঘটিয়াছিল, সেটুকুও শশী বিন্দুর কাছে, বিবৃত করিল, করিয়া কহিল,-ব্যাটা চামার। ওর বান্দীপাড়ার খাতাঞ্জিখানা আবিষ্কার করতে হবে। এ-প্রসঙ্গে শশী আরও উত্তেজিত হইবে এবং সে উত্তেজনা যে তাকে কেন্দ্র করিয়াই বাড়িয়া উঠিবে, বিন্দুর তা নিঃসংশয়ে জানা ছিল। এ উত্তেজনা-প্রকাশে কোনো ফল নাই! মাঝে হইতে পাড়ায় বাস করার ব্যাপারে ক্রমে অশান্তি, আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তা জাগিতে পারে, ইহা ভাবিয়া ও-প্রসঙ্গে বাধা দিয়া বিন্দু কহিল, তা, ও-ছেলেটিকে নিতাই পেলে কোথায় ? শশী কহিল,--বললে, তাদের এক বােটের মাঝি ছিল হানিফ —সেই হানিফের ছেলে। ছেলেটিকে দেখলে চট করে’ মুসলমান বলে ধরা যায় না। হাসিয়া বিন্দু কহিল,-মুসলমান হলেই কি মানুষের চেহারা উল্টো রকমের হবে? এমন পাগলের কথাও তাে শুনিনি। শশী কহিল,-আচ্ছা বৌঠাকরুণ, ঐ মুসলমানকে যদি আমি চুই ? বিন্দু কহিল,-তার মানে ? শশী কহিল,তার গায়ে পড়ে’ ছুতে যাচ্ছি না, অবশ্য। ধরাে, দৈবাতের কথা। দৈবাৎ যদি ছুঁয়ে ফেলি ? এই অবধি বলিয়া শশী একবার থামিয়া বিন্দুর পানে চাহিল। বিন্দু কোনো জবাব না দিয়া সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে শশীর পানে চাহিয়া মনের মিল আছে দেখিয়া শশী আবার কহিল,-তাহলে আমায় গোবর-জলে ধুইয়ে সাফ করে তবে বােধ হয় বাড়ীতে ঢুকতে দেবে তো? বিস্ময়ভরা স্বরে বিন্দু কহিল,-কেন? শশী কহিল,-নয়? সে যে মুসলমান। তােমাদের শাস্ত্রে মুসলমানকে একদম তফাতে রাখতে বলে বিন্দু কহিল—আমি তাে ভাই শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত নই, মুখ মেয়েমানুষ। অত আচার-বিচারের মানেও আমি বুঝি না। মুসলমানকে যে-বিধাতা গড়েচেন, আমাকেও তাে তিনিই গড়েচেন। না, বিধাতারও স্বধৰ্ম্ম-বিধৰ্ম্ম আছে। প্রচুর উৎসাহে শশী কহিল,-লাখ কথার এক কথা। ঠিক বলেচো বৌঠাকরুণ। নিতাইও তাই বলছিল। অর্থাৎ আমার ছিপগাছটা সেই ছােকরা ধরে ছিল, সেটা ছুতে আমার কেমন বাধছিল। তাই নিতাই হেসে তাতে গঙ্গাজল ছিটিয়ে আমার হাতে দিলে, দিয়ে ঐ কথা বললে।••• আমার কিন্তু এমন সংস্কার যে, এই সামান্য ব্যাপারে দ্বিধা বোধ করছিলুম। ভাব- ছিলুম, মুসলমানকে ছুঁয়ে বিগ্রহ পূজা করতে পারা যাবে না। বিন্দু কহিল, কেন ভাই, তােমার দাদার কথা মনে পড়ে ? সেবার মুসলমান-পাড়ায় আগুন লেগে যখন সব পুড়ে ছাই হচ্ছিল, গায়ের অত-সব মাতব্বর লােক দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল শুধু তােমার দাদা থাকতে না পেরে ছুটে গিয়ে তাদের চালে উঠে চাল কেটে দেন? কতকগুলো চাল। তাতে বাঁচে। তারপর মােড়লরা তাকে কত টিটকিরী দেয়! শুনে মনের মিল তিনি বলেন, টিকি রক্ষা করে মানুষ মরচে দেখলে টিকির জাত যায় না? বটে! আর জাত যায় মানুষকে মরণের দোর থেকে হাত ধরে টেনে বাঁচাতে গেলে, না? সেই অবধি সবাই তাকে তামাসা করতো, মৌলবী-ভটচায্যি বলে। শশী কহিল, তােমার কথা শুনে বঁচিলুম বৌঠাকরুণ । ঐ বিশ্রী সংস্কারটা আমার মনের সহজ ইচ্ছার উপর এমন চেপে বসেছিল যে, স্নান করতে গিয়েও তাকে সরাতে পারিনি। স্নান করতে-করতে কেবলি ভেবেছি, এই গঙ্গার অন্য-ঘাটে মুসলমান স্নান করছে হয়তো, তাতে কৈ গঙ্গার জাত যাচ্ছে না তাে, আর সেই গঙ্গার জল এনে ঠাকুরের পূজাও তত করচি। বিন্দু বহিল,-ঠাকুর সকলের মধ্যেই আছেন ভাই। হিন্দু মুসলমান খ্রীষ্টান, এসব ভেদ তাে মানুষের মনগড়া। ছােট ছেলেটি যখন জন্ম নেয়, তখন সে টিকি নিয়ে আসে না, কলমা পড়েও আসে না। তার হাসি-খেলায় সব-ধৰ্ম্মের সব মানুষের প্রাণ গলে! শশী কহিল,—মানুষ, মানুষ—এ ছাড়া তার অন্য পরিচয় নেই—এই কথাই খাঁটি। তার পর স্বভাবের গুণে কেউ হয় বড়, কেউ ছােট। ঐ যে চরণ ভটচায্যি•••তার চেয়ে এই মুসলমান কাশিমের দিকেই মন আমার বুকচে বৌঠাকরুণ ।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ মিশন স্কুল মস্ত পুকুর। দুই বন্ধুতে ছিপ ফেলিয়া ফাত্তার দিকে চাহিয়া তন্ময় হইয়া বসিয়া আছে। তিন ঘণ্টা ধরিয়া পণ্ডশ্রম সার হইয়াছে। নিতাইয়ের নির্দেশ-মত কাশিম মাঝে-মাঝে জলে চার ফেলিয়া মৎস্য-গােষ্ঠীকে সবিশেষ প্রলুব্ধ করিবার প্রয়াস পাইতেছে। সে-বেচারীও বড় আশা করিয়া আসিয়াছে, কত- বড় মাছ উঠিবে। মাছ এ-পর্যন্ত উঠিল না দেখিয়া নিতাই বা শশীর চিত্ত অস্থির না হইলেও, ছেলেমানুষ কাশিম নৈরাশ্যে শ্রান্ত হইয়া পড়িল। মাছ ধরার ব্যাপারে তার উৎসাহ ক্রমে শিথিল হইয়া আসিল। এক ফঁাকে সরিয়া আসিয়া সে পাদ্রীদের স্কুল-বাড়ীর সামনে দাড়াইল। মাঝারি সাইজের একতলা বাড়ী। ফ্লোরের উপর দুদিকে কাঠের রেলিঙ-আঁটা টানা বারান্দা, ঘরগুলি মাঝখানে। এই ঘরগুলিতে ছেলেরা পড়াশুনা করে। এই বাড়ীর পাশেই বাংলো- প্যাটার্ণের ছােট একটি বাড়ী-আশে-পাশে সম্মুখে-পিছনে অনেকখানি খোলা জায়গা। এই ভােলা জায়গার একপ্রান্তে २२ মনের মিল বছর। ফ্লোরের উপর কতকগুলা ঘর। বাের্ডিং, ডিসপেন্সারী, রান্নাবাড়ী এগুলো সেইদিকে। এই স্কুল-গৃহের সামনে একধারে পারালেল-বার, রিং, দোলনা প্রভৃতিতে সজ্জিত ক্রীড়াভূমি। আর এই স্কুল-গৃহ, বাংলো প্রভৃতি সমস্তটা একই কম্পাউণ্ডে তারের বেড়ায় ঘেরা। খেলার মাঠে দশ-বারো জন ছেলে ছুটিয়া মহা-কলরবে খেলাধূলা করিতেছে। ছেলেদের বয়স সাত হইতে বারাে কেহ দোল খাইতেছে, কেহ পারালেল-বারে উঠিবার চেষ্টা করিতেছে,-এবং কয়েকটি ছােট ছেলে একটা ফুটবল লইয়া ছুটাছুটি করিতেছে। ইহাদের খেলাধূলার তদারক করিতেছে সুন্দরী এক কিশােরী বাঙালী। তার পরনে কালা পাড় শাড়ী, কঁাধে ব্ৰুচ আঁটা, গায়ে সাদা ব্লাউশ, পায়ে জুতা। কিশােরী পরম-স্নেহে ছেলেদের খেলায় যােগ দিয়া তাদের খেলার আনন্দ অনেকখানি বাড়াইয়া তুলিয়াছে। বেড়ার ওধারে দাড়াইয়া কাশিম খেলা দেখিয়া বিমুগ্ধ হইল। সে যদি উহাদের সঙ্গে দলে মিশিতে পারিত! উহাদের ঐ হাসি-কলরবে নিজের কণ্ঠ মিশাইবার একটু সুযোগ পাইত !••• এমনি দেখা আর ভাবার মধ্যে তার কিশাের চিত্ত একেবারে তন্ময়! ছেলেরা হঠাৎ তার দিকে ছুটিয়া আসিতেছে দেখিয়া তার চমক ভাঙ্গিল। ছেলেরা কি বলিতেছে ? ছেলেরা তাকেই ডাকিতেছিল--ওরে•• এই...
মনের মিল চারিধারে সে একবার চাহিয়া দেখিল, না, কাছাকাছি আর তো কেহ নাই! এর। তবে তাকেই... ছেলেরা আগাইয়া আসিয়া কহিল,—আমাদের বলটা কুড়িয়ে দাও তাে••• কাশিম তখন ব্যাপার বুঝিল, বুঝিয়া পাশে চাহিয়া দ্যাখে, ফুটবলটা তার কাছ হইতে খানিক দূরে পড়িয়া আছে । তাড়াতাড়ি সেটা কুড়াইয়া সে ছেলেদের দিকে ছুড়িয়া দিল। ছেলেরা বল পাইয়া মহানন্দে তাহাতে কি মারিতে ছুটিল। আর, কাশিম? ঐ বলটা যে সে স্পর্শ করিতে পাইয়াছে, ইহা ভাবিয়াই কৃতার্থ ! স্কুলের ঘন্টা বাজিল। কিশােরী তখন সকলকে আহ্বান করিল। ছেলের দল তার সে-আহ্বানে একমুহূর্তে খেলা বন্ধ করিয়া স্কুল-গৃহের দিকে ছুটিল। কিশােরী ডাকিল-মহাবীর সাদা চাপকান-পরা এক বালকভৃত্য ছুটিয়া আসিল। বলটি তাহাকে কুড়াইতে বলিয়া কিশােরী স্কুল-গৃহে চলিয়া গেল। চাহিয়া কাশিম তেমনি দাড়াইয়া আছে। মাথার উপর রৌদ্র কখন মেঘে ঢাকিয়া গিয়াছে, সেদিকে তার হুশ ছিল না। ঐ•••পড়ার বই ধরিয়া সুর করিয়া ওরা ও-কোন্ কল্পলােকের কি-বার্তা সংগ্রহ করিতেছে •••কাশিমকে কে তাহা বলিয়া দিবে? ও-লােকেও এই আকাশ, এই বাতাস, এই গাছ-পালার দীঘল শ্যামল ছায়া, স্কুল-গৃহের দিকে ২৪ মনের মিল ০ পুকুরের এই কালাে জল,–এই সবই আছে ? না, কেবল পরীর স্বপ্নে, দৈত্যের ভয়ে ও-কল্পলােক পরিপূর্ণ ? কাশিমের সার চিত্ত ঐ কল্পলােকের একটু পরিচয় পাইবার জন্য অসহ আকুলতায় গুমরিয়া উঠিতে লাগিল। হঠাৎ ঝমঝম্ করিয়া বর্ষার বারিধারা বিপুল বেগে ঝরিয়া পড়িতে কাশিম চমকিয়া স্কুল-গৃহের ফটক পার হইয়া একেবারে টানা-বারান্দায় গিয়া উঠিল। ভিতরে উঠিল। ভিতরে ছেলের দল তাকে দেখিয়া চোখ ফিরাইল। কি মজাই না ওই ছেলেটির—এমন বর্ষায় বারিধারায় মাতন তুলিবার কি অবাধ অধিকার! কারো নিষেধ নাই। কোনো বাধা নাই! আর তারা? কাশিম ভাবিতেছিল, এই নিবিড় মেঘের অন্ধকারে ঢাকা দুনিয়ার মাঝে যেটুকু আলাে, তা ঐ ঘরের মধ্যে ছেলেদের হাতের বইগুলার পাতাতেই বুঝি গিয়া সব জড়ো হইয়াছে। বৃষ্টির বিরাম নাই! নিবিড় কালো মেঘ আরো নিবিড়, আরো কালো হইয়া আসিল। বর্ষার ধারা আরাে বেগে নামিল। সে আঁধারে ঘরের মধ্যে বইয়ের পাতায় ছাপা হরফ- গুলা অস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। সামনের ক্লাশে সেই কিশােরী পড়াইতেছে। কাশিমকে লক্ষ্য করিয়া ক্লাশের একটি ছেলে বলিয়া উঠিল,-একটা ছেলে বারান্দায় ভিজচে••• কাশিমকে কিশােরী লক্ষ্য করিয়াছে। কিশােরী বাহিরে আসিল, কাশিমকে দেখিয়া কহিল, কোথা থেকে তুমি আসছো?
মনের মিল কাশিমের বিস্ময়ের মাত্রা এমন বাড়িয়া উঠিয়াছিল যে, সে কোনাে জবাব দিতে পারিল না। কিশোরী তার পিঠে হাত রাখিয়া সস্নেহ-কণ্ঠে কহিল,-তুমি তো আমাদের স্কুলে পড়ে না। কাশিম এ-কথায় থতমত খাইয়া গেল। হঠাৎ স্কুল-বাড়ীতে আসিয়া উঠিয়াছে--হয়তো মস্ত অপরাধ করিয়াছে। ' কুষ্টিত স্বরে সে বলিল,-না। কিশােরী কহিল,-কোথায় তুমি থাকো? কাশিম কহিল,—দূরে..গায়ে.••বামুনপাড়ায়। কিশোরী কহিল,—তােমার নাম ? কাশিম নিজের নাম বলিল। শুনিয়া কিশােরী বলিল, -কিন্তু তুমি তো মুসলমান। বামুনপাড়ায় থাকে। যে ? কাশিম যেমন বুঝিত, তেমনি ভাবেই জবাব দিল,আমার বাবা মরে গেছে। কেউ নেই। তাই মনিব আমাকে তার বাড়ীতে নিয়ে রেখেছেন। কিশােরী কহিল,-তুমি লেখাপড়া করো না ? -না। কিশােরী কহিল,-এই বৃষ্টিতে এখানে ভিজছিলে যে? কাশিম বলিল, কাছের পুকুরে তার মনিব মাছ ধরিতে আসিয়াছেন, সেও আসিয়াছে সঙ্গে। ভালাে লাগে? নাই, তাই ঘুরিতে-ঘুরিতে এখানে আসিয়া ছেলেদের খেলা দেখিতেছিল, তারপর এই বৃষ্টি... কিশোরী কহিল,-বডড ভিজে গেছ যে! ভিজে কাপড়ে ২৬ মনের মিল থাকলে অসুখ হবে। এসাে, কাপড় ছোটে ফলো। কাশিম কহিল, ছেলেবেলা হইতেই তার এ-রকম ভে অভ্যাস আছে। কিশোরী কহিল,--না, না, তা হয় না। ভিজে কাপড় ছেড়ে ফ্যালো •••কিছু খাবে ? কাশিম কহিল,—খবাে। তার বেশ ক্ষুধা পাইয়াছে। কিন্তু অপরিচিত ব্যক্তির সামনে ক্ষুধার কথা বলিতে চিরদিন সে কুষ্ঠিত থাকে। কিশোরীর কাছে এখনো আহারের ইচ্ছ। প্রকাশ করিতে পারিত না। কিন্তু বহুক্ষণ ধরিয়া আবহাওয়া কিশােরীর এই দরদ-মমতা তার প্রাণে এমন আকর্ষণের সৃষ্টি করিয়াছে যে, ইহাদের সঙ্গে মিশিতে, আলাপ করিতে, কথা কহিতে তার ঔৎসুক্যের আর সীমা-পরিসীমা ছিল না। অদূরে এক ভৃত্য বসিয়াছিল। কিশােরী তাকে ডাকিল, বয়••• বয় আসিল। কিশােরী কহিল,-বিস্কিট, ঔর লজেঞ্জেস্ লাও। ভৃত্য আদেশ-পালনে ছুটিল। কিশােরী কাশিমকে প্রশ্ন করিল,—তোমার মনিবের নাম কি? কাশিম বলিল,-নিতাইবাবু। হিন্দু ? না, ব্রাহ্ম ? 2 মনের মিল ব্রাহ্ম-কথার অর্থ কাশিম বুঝিল, ব্রাহ্মণ। সে জবাব দিল ,, বামুন। কিশােরী অবাক হইয়া গেল। হিন্দু ব্রাহ্মণ হইয়া ফুলছড়ির মতো পল্লীগ্রামে মুসলমান ছেলেকে আশ্রয় দেওয়া--এ যে আশ্চর্য ব্যাপার ! সে কহিল তােমার মনিব কি করেন ? কাশিম জবাব দিল,—তেনার পাঁচখানা গাদাবােট আছে। পাটের কলে খাটে। -বাড়ীতে তার কে-কে আছেন ? কাশিম কহিল,—আর কেউ নেই। বাড়ীতে শুধু তিনি আছেন, আর এই আমি থাকি। আর একজন চাকর আছে, গোবরা। কিশােরীর শ্রদ্ধা হইল এই নিতাই বাবুটির উপর। আবালা পাদ্রীদের হাতে সে মানুষ হইয়াছে। ছেলেবেলার কথা যতদূর মনে পড়ে, সেই জোস্ বাবা,-মস্ত দাড়ি, প্রশস্ত ললাট, দীপ্ত চক্ষু, অরি স্নেহভরা বুক ! বড় হইলে বাইবেলে যীশুর কথা পড়িবার সময় তার মূর্তিই যীশুখ্রষ্ট-রূপে বালিকার চোখের সামনে উদয় হইয়াছে এবং আজও যীশুর কথা মনে হইলে সেই একান্ত দরদ আর স্নেহভরা মুখচ্ছবি চোখের সামনে জাগিয়া ওঠে । অতি-দরিদ্র অসহায় আতুরকে বুক পাতিয়া গ্রহণ করা শুধু তঁাহারি পক্ষে সম্ভব ছিল। তারপর খ্ৰীষ্টানদের সঙ্গে মিশিয়া এই কথাই সে শিখিয়াছে, হিন্দুরা বিধৰ্ম্মীকে শুধু বিধর্মীকে কেন, ছােটলােকদের মধ্যে বহু জাতিকে হীন পশুর মতাে == ২৮ মনের মিল অস্পৃশ্য-জ্ঞানে দূরে সরাইয়া রাখিয়াছে•••তাদের ছায়া মাড়াইলে ঘৃণায় রী-রী করিয়া গঙ্গার জলে স্নান করিয়া তবে অশুচিত। মােচন করে। মানুষের উপর মানুষের এই ঘৃণা তার বুকে বাজিয়াছে চিরদিন, এবং তাই এ-ঘৃণা যতখানি পারে, কাটাইয়া ইতর-ভদ্রনিবিশেষে সকলের প্রতি দরদী হইবার প্রয়াস পাইয়া আসিতেছে। এইজন্যই সে লেখাপড়া শিখিয়া সংসার- জীবনের সংকল্প ত্যাগ করিয়া ছেলে পড়াইবার ব্রত গ্রহণ করিয়াছে। বেত লইয়া পড়া গিলাইবে, এ-উদ্দেশ্য তার মােটই নাই। স্নেহ-মায়ায় ছাত্রদের মন যাহাতে ভরিয়া তুলিতে পারে, ইহাই তার লক্ষ্য। সম্প্রতি তাদের মিশন হইতে ফুলছড়ির এ-পাড়ার জমি লইয়া সে জমির উপর স্কুল খােলা হইয়াছে। কিন্তু গ্রামের সাবধানী ভদ্র-সম্প্রদায় সে-স্কুলে ছেলে পাঠাইতে নারাজ। ছেলেরা বাপ- পিতামহের ধৰ্ম্ম ছাড়িয়া শেষে খ্রীষ্টান বনিবে ? কাছাকাছি আর কোনাে স্কুল নাই, বহু দূরে, সে বজবজে না কোথায় একটি আছে। ছেলেরা রৌদ্র-ঝড়ে মাঠ ভাঙ্গিয়া, ট্রেন ধরিয়া সেখানে যায় লেখাপড়া শিখিতে। ফুলছড়ির স্কুল কাজেই খালি পড়িয়া আছে। মিশনের কর্তৃপক্ষ তখন অন্য জায়গা হইতে অনাথ ছেলেদের জড়াে করিয়া এখানে পাঠাইয়া দিল। তারা বাের্ডিংএ থাকে এবং এই স্কুলে লেখাপড়া করে। এখানকার স্কুলের কী হইয়া আসিল ?
মনের মিল ছিল। মেয়েরাই শুধু এই কিশোরী। কিশােরীর নাম—সুমিত্র। পাদ্রী জোন্স তার একটা বিলাতী নামও দিয়াছে--দিসিল। সুমিত্রা নাম তার মায়ের দেওয়া। ছেলেবেলায় সিসিল-সুমিত্রা নামটাই চলিত বড় হইয়া সে যখন সব বুঝিতে শিখিল, তখন বিলাতী সিসিলটুকু বাদ দিয়া সুমিত্রা-নামই বজায় রাখিয়াছে। মিশনের সঙ্গে অনেক তর্ক অনেক তর্ক করিয়া সুমিত্রা বুঝাইয়া দিয়াছে, ছেলেদের লেখাপড়া এবং দেখাশুনার ভার পুরুষের হাতে দিলে ঠিক হইবে না। ছােটদের দেখাশুনার ভার দেওয়া উচিত মেয়েদের হাতে। দরদে-স্নেহে চরিত্রকে গড়। যেমন সহজ ছেলেদের আব্দারও তেমনি সহিতে পারে। তাদের সুখ-দুঃখের খুঁটি-নাটি খবরও মেয়েরা রাখিতে জানে, এবং কাজেই সে-খবর রাখিয়া চারিদিক বুঝিয়া তাদের মনগুলিকে বঁাকাইয়া নােয়াইয়া অনায়াসে অগ্রসর করিয়া দিতে পারে। এ-কথার মুল্য বুঝিয়া মিশন এ-স্কুলের ভার তার হাতেই অৰ্পণ করিয়াছে। তার সঙ্গে আর একটি মহিলা শিক্ষয়িত্ৰী আসিয়াছে, মেরি জ্যোৎস্না এবং একজন শিক্ষক—নীলকণ্ঠ স্মিথ। স্মিথ। স্কুলের সংলগ্ন যে তিনকামরা-ওয়ালা বাংলো আছে, তারি দুটি কামর সুমিত্রার ; অপরটি জ্যোৎস্নার। স্কুলের বাহিরে ছােট একখানি বাংলো—সেই বাংলােয় নীলকণ্ঠ স্মিথ বাস করে। সুমিত্রা এখানে আসিয়া ভদ্র-পল্লীতে লােক পাঠাইয়া বহু সাধ্য-সাধনাতেও যখন স্কুলে ছেলে পাঠানােয় তাদের রাজী ;
মনের মিল ') করাইতে পারিল না, তখন তার মনে বেদনা জাগিল। বেদনায় ধৈৰ্য্য না হারাইয়া ইতর-পল্লীর ঘরে-ঘরে গিয়া পল্লী- বাসীদের প্রথমে মিষ্ট ব্যবহারে ও মিষ্ট বচনে সে বিমুগ্ধ করিল ; পরে ভালাে করিয়া বুঝাইয়া বিনাবেতনে তাদের ছেলে-মেয়েদের আনিয়া স্কুলে ভর্তি করিয়া লইল। বেচারা অনাদৃত ইতর-সম্প্রদায় —দেশের লােকজনের কাছ হইতে দরদের কাছ হইতে দরদের এতটুকু ক্ষীণ রেখাও কোনাে দিন লাভ করে নাই—তারা সুমিত্রার কথায় ও ব্যবহারে গলিয়া গেল এবং বিনা-খরচে ছেলেদের লেখা-পড়া শিখাইলে, ভবিষ্যতে তাদের চাকরি মিলিবে.••চাকরির এমন সুযােগ যখন আয়ত্তে, তখন সে-সুযােগটুকু হেলায় হারাইয়া তাদের ভবিষ্যৎ গড়িয়া তুলিতে তারা একনিমেষ ইতস্তত করিল না। বয় লজেঞ্জেস ও বিস্কুট আনিয়া দিলে, সুমিত্রা কাশিমের হাতে সেগুলাে দিল, দিয়া কহিল,—খাও। কাশিম বিস্কুট মুখে দিল। সুমিত্রা বলিল,-তুমি স্কুলে পড়বে ? তোমার মনিবকে বলো, এখানে পড়লে পয়সা লাগবে । বুঝলে ? কাশিম ঘাড় নাড়িয়া জানাইল ; এ-কথা মনিবকে বলিবে। সুমিত্রা কহিল,তােমার মনিবের বাড়ী তােমাকে কোনাে কাজ-কর্ম করতে হয় ? কাশিম কহিল,-না। সুমিত্রা ভাবিল, মনিব বেশ ভালো লােক তাে ! পরের মনের মিল ছেলেকে ঘরে রাখিয়া খাইতে দেয়, অথচ তাকে পিষিয়া কাজ আদায় করে না ! এমন স্বার্থজ্ঞান-হীন লােক অনেক এ- গ্রামে আছে ! খাওয়া চুকিলে কাশিমের মনে হইল, অনেকক্ষণ সে পুকুর ছাড়িয়া এখানে আসিয়া রহিয়াছে। সেখানে যদি কোনো প্রয়ােজন থাকে ? ব্যস্ত হইয়া সে কহিল,-আমি এখন যাই । সুমিত্রা কহিল,—ভিজে কাপড় ছেড়ে তবে যাবে। কাশিম কহিল,—তাতে কি! আমাকে আমাকে হামেশা জলে ভিজতে হয়•••ভেজার অভ্যাস আছে। সুমিত্রা কহিল,-না, তা হবে না। এই জলে ভিজলে সন্তু অসুখ করবে। বিশেষ, ভিজে-কাপড়ে কতক্ষণ তােমাকে থাকতে হবে তার ঠিক কি ! তার পর ঐ কাপড়েই তাে বাড়ী ফিরবে। একটা ছাতাও আনিয়ে দি। ছাতা নিয়ে যাও। কাশিম আকাশের দিকে চাহিল, চাহিয়া কহিল,-বৃষ্টি ধরে গেলে দিয়ে যাবাে’খন। আচ্ছা, ছাতা দিন। ওখানে ওঁরাও তো ভিজচেন। সুমিত্র। কহিল,—তােমার মনিব মাছ ধরতে এসেছেন বললে না ? তা, এ-বৃষ্টিতে মাছ পাবেন ? কাশিম বলিল,——মাছ জলে-বৃষ্টিতেই আমি কত দেখেছি। তুমি এক কাজ করে। ছাতা নিয়ে যাও। তারা যদি পথে দাড়িয়ে ভেজেন, তাহলে এখানে আসতে বলে। তার পর বৃষ্টি ধরলে সকলে বাড়ী যাবেন।
মনের মিল ছাতা আসিল। কাশিম ছাতা মাথায় দিয়া বাহির হইয়া গেল। পুকুর-ধারে গিয়া দেখে, মস্ত একটা কচু-পাতায় মাথা ঢাকিয়া নিতাই ছিপ লইয়া তেমনি বসিয়া আছে, আর শশী এক গাছতলায় বসিয়—শশীর পায়ের সামনে ক’টা মাছ। মাছ দেখিয়া কাশিম আনন্দে লাফাইয়া উঠিল, উৎফুল্ল কই কহিল-কখন ধরলেন ? যেই আমি গেছি..না? শশী কাহল,-আমি একটা ধরেচি, বাকীগুলো ধরেচে নিতাই। কাশিম কহিল,আপনি আর ভিজবেন না। ছাতা এনেচি। নেবেন ? কাশিন ছাতা আগাইয়া ধরিল। মুসলমানের হাতের স্পর্শ ! সংস্কার আবার মাথা তুলিল। শশীর ছাতার কোনাে প্রয়ােজন ছিল না। তবু ঐ সংস্কারকে চাপিয়া হত্যা করিবার জন্যই সে হাত বাড়াইয়া ছাতা লইল ; তার পর কাশিমের পানে চাহিয়া কহিল,-আমি গাছতলায় আছি, তত জল পাচ্ছি না। ছাতাটা বরং নিতাইকে দাও। কচুপাতা ছেড়ে ছাতার তলায় মাথাটা ওর রক্ষা পাবে। কাশিম ছাতা লইয়া নিতাইয়ের কাছে গেল। এত বৃষ্টি- নিতাইয়ের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই! সেই প্রচণ্ড বর্ষা মাথায় করিয়া ফাৎনাতে সমস্ত মন সপিয়া বসিয়া আছে! কাশিম অগত্যা ছাতা খুলিয়া নিতাইয়ের পিছনে দাড়াইয়া রহিল। আর আকাশ ছাপাইয়া বর্যার অবিরাম ধারা ঝমঝম্ শব্দে মাতিয়া মহাসাগর-সৃষ্টির উল্লাস-কল্পনায় অঝােরে ঝরিতে লাগিল। • চতুর্থ পরিচ্ছেদ সুমিত্রা সন্ধ্যার কিছু পূৰ্ব্বে বৃষ্টি থামিল। পথ একেবারে নদী-নালায় রূপান্তরিত হইয়াছে। মাছ ধরার পর্ব শেষ করিয়া নিতাই কাশিমকে প্রশ্ন করিল, এ ছাতা তুই কোথায় পেলি ? কাশিম ছাতার বৃত্তান্ত খুলিয়া বলিল। তাকে যে দরদ করিয়া স্কুলের মেম-মা খাবার খাইতে দিয়াছে, সে কথাও গােপন রাখিল না। শুনিয়া নিতাইয়ের মন স্কুলের মেম-মার প্রতি প্রসন্নতায় ভরিয়া উঠিল তবে যে সে শুনিয়াছিল, বিবি-মা লজেঞ্জেসের জাল পাতিয়া এ দেশের ছেলেগুলার জাত মারিয়া তাদের খৃষ্টধর্মে আসক্ত করিয়া তুলিবার সঙ্কল্পে স্কুল খুলিয়াছে এবং সেজন্য পল্লীর যত ইতরের ঘরে ঘুরিয়া মােহিনী মায়ায় মা-বাপদের মুগ্ধ করিয়া ছেলেগুলাকে বিনাবেতনে স্কুলে ঢুকাইয়াছে—এ সব কথা অলীক রটনামাত্র! নহিলে বাহিরের ছেলে কাশিমকে ডাকিয়া সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে খাইতে দিবে কেন ? আর এই জলে ভিজিয়া পাছে তার ঘরে ৩৪ মনের মিল অসুখ করে, ইহা ভাবিয়া এতখানি বিশ্বাস করিয়া তার হাতে ছাতাই বা ছাড়িয়া দিবে কেন ? নিতাই বলিল,-গােট। সাতেক মাছ আছে। তা•••তােমার কটা চাই, শশীদা ? শশী কহিল,-একটা হলেই হবে। আমার বাড়ীতে খাবার লােক বলতে তাে আমি একমেবাদ্বিতীয়ং ! নিতাই' কহিল, পাড়ার কাউকে দেবে না ? শশী কহিল—ঐ হতভাগাগুলােকে ? রাম বলল। নিতাই কহিল,-বেশ, আমিও একটা নেববা আর একটা দেবব গফুরকে,•••তারই পুকুর কি না। বাকী থাকে তাহলে চারটে ! এ চারটে কাশিমের ঐ মেম-মাকে দিয়ে যাই।... এতগুলি ছেলে স্কুলে পড়ে—তারা খেয়ে খুশী হবে। কি বলে। শশীদা? শশী কহিল-এত ভিজে এত মেহনৎ করে ধরা মাছ:••তা খাবে ঐ খ্ৰীষ্টানগুলো? নিতাই কহিল,-কাকে দিতে চাও, বলো? তােমার কোন্ পরম-হিন্দু বন্ধু আছে, বলল, যাকে দিলে তুমি খুশী হবে? শশী কহিল,—ত বটে! যত ব্যাটা স্বার্থপর বদমায়েস। খাবার নােলা সব এতখানি ! তাদের দেওয়ার চেয়ে••• শশীর মুখের কথা লুফিয়া নিতাই কহিল,—এই নিবিরােধী খৃষ্টানদের মুখে দিলে তৃপ্তি.••কেমন? আমিও তাই ? বলছিলুম। ভাবাে তো শশীদা, ঘরে বসে পরচর্চা করলে কি আরামেই এদের মনের মিল এতে দিন কাটতাে! তা না করে গাঁটের পয়সা ব্যয় করে যাদের মুখের পানে চাইতে কেউ নেই, সেই সব বেচারীদের খাওয়াচ্ছে, পরাচ্ছে, বিদ্যা দান করচে ! তাও এ দান খৃষ্টানকে নয়•••বিধর্মীকে। এত বড় বেকুব!.••এ মাছ ঐ বেকুবদেরই খাওয়ানাে যাক্। এরা খেয়ে আর কিছু না করুক, অন্ততঃ এ কথা বলবে না যে, হতভাগাগুলাে খেটে মাছ ধরলে, আর তাদের ঠকিয়ে সে-মাছে আমরা রসনার কি পরিতৃপ্তিই না সাধন করছি । এ শ্লেষের অর্থ পুরাপুরি উপলব্ধি করিয়া শশী হাসিয়া উঠিল, কহিল,—ঠিক কথা বলেচে নিতাই! তাই চলো.। কাশিমের তরফ থেকে ধন্যবাদও ভালাে রকমে জানানাে হবে। নিতাই কহিল,—অন্ততঃ হিন্দু ছাতার ঋণ স্বীকার করে, এ কথাটা খৃষ্টানদের বােঝানাে যাবে তো! শশী এ-কথার অর্থ ঠিক বুঝিল না, শুধু বলিল—চলে তাহলে। গাছে অনেকগুলো লতা ঝুলিতেছিল। একটা লতা ছিড়িয়া সেই লতায় বাঁধিয়া কাশিম মাছগুলি হাতে লইল। নিতাই কহিল,তুই একা পারবিনে, কাশি,কতকগুলো আমাকে দে। ছাতাটা বরং তুই নে। আর ছিপ, দুটো তুমি নাও শশীদা। তারপর তিনজনে অগ্রসর হইল। স্কুলের ছুটী হইয়া গিয়াছে। কাছাকাছি যে-সব বাড়ী হইতে ছেলেরা স্কুলে বােজ পড়িতে আসে, তারা সকলে চলিয়া গিয়াছে। স্কুলের খেলার মাঠে ছেলেরা সেই বল লইয়া মাতামাতি করিতেছে; এবং দালানের মনের মিল বারান্দায় রেলিঙে ভর দিয়া একটা ভৃত্য জামা গায়ে দাঁড়াইয়া আছে। তিনজনে আসিয়া স্কুলের সুমুখে দাড়াইল এবং নিতাই সেই ভূত্যকে হাতছানি দিয়া ডাকিল,—এই ছােকরা... ভৃত্য কাছে আসিল। নিতাইয়ের দিকে চাহিয়া শশী কহিল,-এর হাতে সমর্পণ করা ঠিক হবে না। কোথা থেকে মাছ এলো. কেন এলো, কেউ বুঝবে না। তাছাড়া ছাতাটা যদি উড়িয়ে দ্যায় কি বলে? নিতাই হাসিল, হাসিয়া কহিল,—দেশের লােক, স্বধর্মী হয়তাে, কিন্তু তাকে আমরা কতখানি অবিশ্বাস করি, বলো তে। শশীদা! শশী একটু অপ্রভিত হইল, কহিল,—কি জানি ভাই, আমার মন হয়তো খুব ছোট.. নিতাই কহিল,-তােমার মন ছােট নয়। আমরা এমনিতেই ছােট হয়ে গেছি। তাছাড়া অবিশ্বাস এমনি জাগে না, শশীদা। বহু-পরীক্ষায় মন এই অবিশ্বাসকেই মেনে নেছে ! এ অবিশ্বাস আমাদের অভিজ্ঞতায় এখন মাথা তুলে শক্ত হয়ে গজিয়েছে। এ কতখানি দুর্ভাগ্য, বলো তো ! এইটুকু বলিয়া কাশিমের পানে চাহিয়া নিতাই প্রশ্ন করিল, —মেম-মা বললি না? কাশিম ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, হ।। নিতাই তখন ভৃত্যকে কহিল,-মেম-মা কোথায় রে ?
মনের মিল ; ভৃত্য পদ-মর্যাদা বুঝাইতে ঠোট একটু বাঁকাইল ; তারপর অবিচল কণ্ঠ উত্তর দিল,বাসায়। নিতাই কহিল,—বাসা কোথায় ? বাংলাের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া ভৃত্য কহিল,—দুইযে। নিতাই কহিল,—একবার সেলাম জানিয়ে বল যে, তিনটি লােক এসেছে তার সঙ্গে দেখা করতে। দরকার আছে। ভৃত্য কহিল—এখন তিনি চান করছেন। তার পর চা-ট খাবেন। এখন দেখা হবে না। নিতাই বিরক্ত হইলা, কহিল,-আরে মর, রাশভারি করচে খুব। তারপর বেশ চড়া গলায় কহিল-চা খাচ্ছেন, কি কি করছেন, তোর অত বক্তৃতার দরকার কি? বলচি, দরকার আছে•••তুই খপর দে! চো কোথাকার! নিতাইয়ের ঝাঁজালো কথায় ভৃত্য একটু বিচলিত হইল। সাহেব-মনিবের কাছে সে কাজ করিতেছে, এমন ঝাঁজ দেশী লােকের কাছ হইতে কখনাে প্রত্যাশা করিতে পারে না। কিন্তু নিতাইয়ের বলিষ্ঠ দেহ আর সুদৃঢ় কণ্ঠস্বরে তর্ক বাড়াইবার সাহস হইল না তার। সে কহিলকা আছে ? কাট! নিতাই একটু অবাক হইয়া ভাবিল। পরক্ষণে হো- হাে করিয়া হাসিয়া কহিল,—ও, কার্ড ! ব্যাটার সব দিকে কেতা দুরস্ত দেখচি!.••কাট নেই, তবে মাছ আছে। আর এই ছাতা- তাের মেম-মার ছাতা। যা, গিয়ে বলবি, ছাতা ফিরিয়ে দিতে এসেছি। ৩৮ মনের মিল ভৃত্য কহিল,-তা আমাকে দাও না । নিতাই কহিল—তাের হাতে দেবে না। তারপর ভৎসনার স্বরে কহিল—তুই খপর দিবি কি না, বল ? নাহলে আমার যা করবার, করি ভৃত্য এবার বিরক্তির সুরে কহিল—আচ্ছা, দাড়াও, আমি অপর দি। বলিয়া সে চলিয়া গেল বাংলাের দিকে। নিতাই কহিল,—দেখলে শশীদা, এই পুচকে চাকর ছোঁড়াটার আস্পর্ধা! তোর মনিবের সঙ্গে দেখা করতে এসেচে ভদ্র লােক, আর তুই গ্রাহ্য করবি না ! আমাদের দাড় করিয়ে হাজার কথা তুলবে। সমাজের দোষ সব ব্যাপারে যে দাও—এখানে তাে তােমার সমাজ নেই। শশী কোনাে জবাব দিল ন•••চাহিয়া রহিল নিতাইয়ের পানে•••নির্বাক ভঙ্গী। নিতাই বলিল,-তবু এ ব্যাটার এ রকম প্রবৃত্তি কেন, বলে। তাে? • স্রেফ কুশিক্ষা আর কুসংস্কার। তাতে এর মন এমন আচ্ছন্ন যে একটুখানি সাহেব-মনিবের ঘেষ পেয়ে নিজেকে প্রবল প্রতাপান্বিত ঠাউরে নিয়েছে। কলকাতায় অনেক সাহেব-সুবাের সঙ্গে আমায় দেখাশুনা করতে হয় তাে, সেখানেও দেখেছি, সাহেবরা আমাদের অগ্রাহ্য করে না ! অগ্রাহ্য করে তাদের চাকর- নফর-কেরাণী-চাপরাশির দল। তারা আমাদের দেশের লােক দেশের লােককে দেশের লােক যেমন হীন চক্ষে দেখে, বিদেশী-লােক তেমন দেখে না ! ডােম-চঁড়ালকে বামুন-কায়েতরা কি না!
মনের মিল যে-চোখে দেখে, এই সব ডোেম-চঁাড়ল চাকর-বাকর সাহেবের তবে দু-দশ টাকার চাকরি পেয়ে বামুন-কায়েতকেও ঠিক সেই রকম তাচ্ছিল্যের চক্ষে দেখে ! এ রহস্য আবিষ্কারের চেষ্টা করে দেখাে,-এ সবের মূলে সেই এক কারণক্ষমতার দম্ভ ! তা সে-ক্ষমতা শাস্ত্র থেকেই আসুক আর বাতাসে বয়েই আক্ । শশী চুপ করিয়া দাড়াইয়া শুনিল, কোনো জবাব দিল না। কথা শেষ করিয়া নিতাই ক্ষণেক চুপ করিয়া রহিল ; তারপর মাঠে ছেলেরা ফুটবল লইয়া খেলা করিতেছিল, তাদের একজনকে ডাকিল । সে কাছে আসিলে নিতাই প্রশ্ন করিল—তোমরা এই স্কুলেই থাকো? সে বলিল,-।। -তােমাদের মা-বাপ যে ছেড়ে দেছে ? --মা-বাপ নেই। -কে আছে ? সে-ছেলেটি কহিল, তার এক মামা আছেন—তিনিই কোনাে সূত্রে খপর পাইয়া এখানে তাকে রাখিয়া গিয়াছেন। আর একটি ছেলে আসিয়াছিল ; তাকে প্রশ্ন করিতে সে কহিল, তার বড় ভাই শ্বশুরবাড়ীতে থাকে ; সেখানে তার থাকা দুঃসহ ঠেকিতে এখানে পাঠাইয়াছে। নিতাই কহিল,—হু! তােমাদের খরচ-পত্ৰ তঁারা দেন ? দুজনেই কহিল, না, খরচ লাগে না। এখানে বিনা-খরচায় থাকিবে আর লেখাপড়া শিখিবে বলিয়া তাদের পাঠাইয়াছে। ৪০ মনের মিল নিতাই কহিল—দ্যাখাে শশীদা দেশের লােককে, • নিজের ভাই, মামা যাদের পুষতে চায় না, কোন্ মুল্লুক থেকে বিধর্মী এসে তাদের বুকে তুলে নিয়ে লালন-পালন করচে ! সত্যি, এদের কথা শুনে এদের উপর আমার এমন শ্রদ্ধা হচ্ছে যে আমি ভাবচি, সারাদেশের লােক যদি হুড়মুড় করে আজ জর্ডানের জল মাথায় দিয়ে খৃষ্টান হয় তাে আমি হরির লুট দি! দূর, দূর, যত ব্যাটা সমাজপতি...খালি নিজের পকেট, নিজের স্বার্থ, আর পরকে একঘরে করার মতলব নিয়ে পড়ে আছে । এ-জাত আবার মানুষ ! এ জাতের আবার সমাজ! অসংবদ্ধ অনেক কথাই নিতাই বলিতে লাগিল। এমন কথা নিতাইয়ের মুখে শশী নিত্য শোনে, এবং শুনিয়া শুনিয়া সমাজকে হীনতার পঙ্কে মজ্জিত দেখিয়া দেশের মানুষের বিরুদ্ধে শশীর মনও থাকিয়া থাকিয়া ফু শিয়া ওঠে। কিন্তু এমন করিয়া এত খুটীনাটী তার চোখে পড়ে না এবং সে খুটীনাটীর সম্যক আলােচনাও তার দ্বারা সকল সময়ে সম্ভব হয় না। নিতাইয়ের কথায় তার চোখের সামনে সমাজের শত-ক্ষত- জীর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমন বীভৎসতায় ভরিয়া উদয় হইল যে, শশী শিহরিয়া উঠিল। তার মনে হইল, যদি তেমন শক্তি থাকিত তো প্রবল চপেটাঘাতে সমাজের দৃষ্টিকে এদিকে ফিরাইয়া ধরিয়া সে বলিত, এগুলা সরাইয়া তােল, নহিলে দু’দিন পরে তাের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। কিন্তু কাকেই বা সে এ-কথা বলিবে ? তাই চুপ করিয়া নিতাইয়ের পানে চাহিয়া রহিল। ৪১ মনের মিল ভৃত্য ফিরিয়া আসিয়া জানাইল, মেম-মা এখনি আসিবেন এবং বাবুরা ইচ্ছা করিলে ঘরে আসিয়া বসিতে পারেন। নিতাই কহিল,-থাক্, ভিজে কাপড়ে আর ঘরে ঢোকে না। তাের মেম-মা যতক্ষণ না আসেন, এইখানেই দাড়াই। তারপর শশীর দিকে চাহিয়া নিতাই কহিল;—এখানে এই স্কুলটুকু খুলতে এদের কম বেগ পেতে হয়নি, শশীদা। তুমি তো সব জানাে ! এই গ্রামে এত ভদ্রলােকের বাস, অথচ একটা স্কুল নেই। বাবা নিজে থেকে কিছু টাকা দিতে স্বীকার হয়ে ঐ সদু বড়য্যের দলকে সেধেছিলেন, সকলে মিলে কিছু কিছু টাকা দিয়ে ছােটখাট একটা স্কুল নিদেন খেলে। বাবা বলেছিলেন, কোঠা-বাড়ী নয়—আটচালাতেই ছেলেরা পড়বে। একটা স্কুলের আবহাওয়ায় লােকের লেখা- পড়ায় প্রবৃত্তি জাগে কতখানি । তা সদু বড়য্যের দল সে-কথা কাণে তুললাে না। তারপর এরা যখন আমাদের পাড়াতে জমি নিতে আসে, তখন গ্রামের লােক এককাট্টা হয়ে বললে, খৃষ্টান এসে বুকের উপর বসবে! উহুহু ! আরে বাপু, ওরা তো তােদের তলােয়ার দেখিয়ে বলচে না যে, সকলে খৃষ্টান হ’। যদিও এটা ঠিক, তলােয়ার দূরের কথা, একগাছা চাবুক দেখিয়ে এরা যদি বলে, যে খৃষ্টান হবে না, তার পিঠে এই চাবুক পড়বে, তাহলে ঐ চরণ ভচায্যি, সদু বড়য্যে•••দেখবে, ওরাই সবার আগে ছুটবে পাজিপুথি ফেলে বাইবেল নিতে !•••এরা এলো তােদের ছেলেদের লেখাপড়া শেখাতে। তাও বিনা-পয়সায় ৪২ মনের মিল লেখাপড়া শেখাবে। তাছাড়া খেলাধূলা। না, হিন্দুধৰ্ম্মের যত ব্যাটা বকাসুর তিলা-জমি দিয়ে এদের সাহায্য করলে না?••• তখন এরা এলাে এই মুসলমান-পাড়ায়,–এসে জমি নিলে, স্কুল খুললে ! তাও না হয় ছেলেদের স্কুলে পড়তে পাঠা, তাতেওবাদ ! হু', 'এতে ক্ষতি কার ? নিতাইয়ের কথা শেষ হইল না, তার পূর্বেই সুমিত্রা আসিয়া বারান্দায় দঁাড়াইয়া ভৃত্যকে কহিল,—বাবুদের ভিতরে নিয়ে আয়। তার আবির্ভাবে নিতাই এবং শশীর বিস্ময়ের সীমা রহিল না। কাশিম কহিল,-ঐ যে মেম-মা... ইনিই মেম-মা ! যেন সাক্ষাৎ দেবী-বীণাপাণি তঁার কমল-আসন ছাড়িয়া ইট- কাঠে গড়া বাড়ীর বারান্দায় আসিয়া দাড়াইলেন ! চোখে জ্যোতি আর আশা একেবারে জ্বলজ্বল করিতেছে ! ভাজ্জিন মেরির ছবি নিতাই দু’চারিখানা বইয়ের পৃষ্ঠায় দেখিয়াছে•••মনে হইল, যেন ভার্জিন মেরি স্বয়ং••• শ্রদ্ধায় তার মাথা আপনি আনত হইল। সে সুমিত্রার পানে চাহিল। মৃদু হাস্যে সুমিত্রা কহিল-আপনার ভিতরে আসুন। নিতাই বারান্দার ঠিক সামনে আসিল। কহিল,—ভিজে কাপড়। সুমিত্রা, কহিল,—তাতে কি! আপনারা আসুন। এই যে সে ছেলেটি। এসাে ! তারপর ভৃত্যকে কহিল,—তিনখান। চেয়ার নিয়ে আয় বারান্দায়।
মনের মিল ভৃত্য আদেশ পালন পালন করিলে সুমিত্রা বলিল,—বসুন আপনারা। নিতাই কহিল,আপনি আগে বসুন। সুমিত্রা আসন গ্রহণ করিলে নিতাই চেয়ার টানিয়া বসিল এবং শশীকে বসিতে বলিল । শশী বসিল । কাশিমকে দেখাইয়া নিতাই কহিল,-এই ছেলেটির মুখে আপনার করুণার কথা শুনে অত্যন্ত শ্রদ্ধা হলাে। তাই কৃতজ্ঞতা জানাবার জন্য সামান্য ভেট এনেছি। এই মাছগুলি • যে- ছেলেদের স্নেহে আর মায়ায় আপনি এই বনবাস শিরােধার্য করেচেন, তাদের তৃপ্তির জন্য তুচ্ছ ভেট! তারা যদি এ-মাছ খায়, আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে। এ-কথায় সুমিত্রার মুখ সম্মিত হইয়া উঠিল। সে বলিল,-- আপনার কথায় বুঝচি, আপনি ঐ অনাথ মুসলমান ছেলেটিকে আশ্রয় দেছেন। আপনার নাম নিতাইবাবু ? নিতাই কাহল,—আমার নাম নিতাই। সামাজিক ভাবে নিতাইচরণ চট্টোপাধ্যায়। ব্রাহ্মণ-সন্তান। গলাযু যজ্ঞােপবীত... সুমিত্রা কহিল—আপনার মহত্ত্বের পরিচয় কিছু পেয়েছি একটু আগে আপনার ঐ কাশিমের কাছে। নিতাই লজ্জায় মাথা নত করিল; পরক্ষণে কহিল - আমি মহত্ত্ব-টহত্ত্ব বুঝি না। একটা অনাথ ছেলে, একটা অনাথ ছেলে, কেউ কোথাও নেই, অথচ নিজের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানের শক্তি হয় নি! রােগে ৪৪ মনের মিল দেখবে এমন জনের অভাব, তাই তাকে কাছে রেখে তার কষ্ট যতখানি হালকা করা যায়—এই মাত্র ! দু-চোখে সস্মিত দৃষ্টি...সুমিত্রা কহিল-ক'জন তা করে ? নিতাই কহিল—সকলের প্রবৃত্তি সমান প্রবৃত্তি সমান নয়, জানি । তাছাড়া তাদের সংসার আছে, স্ত্রী-পুত্র আছে। আমার এমন কেউ নেই যাকে দেখতে হয়। আমার বােটের কারবার। কতকগুলো মাছি-মাল্লা আছে—তাদের আছে—তাদের কাছ থেকে হিসেব নেওয়া ব্যস্ ! আমাকে তারা ভালোও বাসে। জুয়াচুরি-তঞ্চকত। করে না। অর্থাৎ লোকের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পাওয়া মােটেই শক্ত নয়। শুধু একটু মিষ্টি কথা আর তাদের উপর একটু দরদ•••বাস্! এ লােকটির দুটো কথাতেই সুমিত্রা বুঝিল, কতখানি মহৎ প্রাণ ঐ শক্ত পেশীর নীচে বুকের মধ্যে ঢলঢল করিতেছে ! সে কহিল,—সে কথা ঠিক। নিতাই তৎক্ষণাৎ কহিল,—এই আপনাদের দেখচি...যে শিক্ষা পেয়েছেন এবং যে-ভাবে বড় হয়েছেন, তাতে অন্ততঃ ঘরে বসে আরামে আয়েস করে আপনি সময় কাটাতে পারতেন। তা না করে এই সব ইতর লোক—ভদ্র-দল যাদের অস্পৃশ্য বলে ঘৃণায় দূরে ঠেলে রেখেচে মানুষ বলে মনে করে না, শেয়াল-কুকুরের সামিল ভাবে-এ-ভাবে তাদের সঙ্গ দিয়ে, স্নেহ দিয়ে, তাদের নিয়ে এই যে সংসার গড়ে বাস করছেন, এতে কতখানি মহত্ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে, বলুন তাে! আপনারা খৃষ্টান ৪৫ মনের মিল পরােক্ষে আপনাদের পাদ্রী-সাহেবদের মনে যে গভীর অভিসন্ধিই থাকুক, প্রত্যক্ষভাবে সাধারণের মধ্যে জ্ঞান বিতরণ করে, মনুষ্যত্ব আর মর্যাদাবােধ শিখিয়ে তাদের কি উপকার যে করচেন! পাদ্রীরা কি বােঝে না যে, একশােজন হিন্দু- মুসলমানকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করবার চেষ্টা হয়তাে একেবারে নিস্ফল হবে! তবু এই দান আর স্নেহ-মমতা--এতে তো কখনাে কৃপণতা করছে না ! দেশে দেশে এই যে সব 'ইনষ্টিটিউশন তারা খুলচে, তার গূঢ় উদ্দেশ্য যাই হােক, কতখানি লােক- সেবা হচ্ছে তাতে। আমাদের জাতের ঐ সব ছােট লােক... আমাদের আরাম দেবার জন্যই যাদের জন্ম হয়েচে•••ভাবি, তাদের পোটাঝ রা নােংরা ছেলেগুলােকে চোখে চোখে দেখলেই আমরা ঘৃণায় শিউরে সরে যাই...আর আপনারা তাদের নাকের পেঁাটা মুছিয়ে কোলে তুলে নিচ্ছেন !...ধৰ্ম্ম ? আমাদের সমাজেও অনেক ধর্মধ্বজ আছেন, কপালে ফোটা, গলায় মালা মুখে নামজপ-ভগবানকেই সৰ্বস্ব জানেন। কিন্তু তারা যেখানে হাঁকচেন-তফাৎ যাও, দুনিয়া অশুচি•••আপনারা সেখানে বলছেন, কাছে এসো, কাছে এসাে, ভাই, মিতা, বন্ধু তােমরা ! ••তাই ভাবি, এতখানি মমতায় সারা দুনিয়া আজও কেন খৃষ্টান হয়ে যায় নি। সুমিত্রা বহিল—আপনি ভাবছেন, আমি খৃষ্টান ? তা নই। আমার খুব ছােট বয়সে মা-বাপ মারা যান, খৃষ্টান পাদ্রীর হাতে আমি মানুষ হই। তিনি আমায় আদর করে সিসিল ৪১ মনের মিল বলে ডাকতেন,-এই যা! কখনাে তিনি খৃষ্টান হতে বলেন নি। মাথায় জল ছিটিয়ে খৃষ্টধর্মে দীক্ষা দিতেও চানি কোনােদিন ! অথচ তা করবার সুযােগ ছিল কতখানি! করলে অপরাধও হতো না! এতখানি স্নেহ, এমন আশ্রয় যে পেয়েছে, কৃতজ্ঞতার জন্যও হয়তো সে খৃষ্টান হতে পারতো। বিশেষ, আমি খৃষ্টান হলে কোনাে দিক থেকে যখন কোনো নিষেধ উঠতাে না! এবং খৃষ্টান-হিন্দু মুসলমান•••সকলে যখন আমার কাছে সমান ! বাইবেল যেমন পড়েছি, তেমনি রামায়ণ- মহাভারতও চাইবামাত্র পড়তে পেয়েছি। আমাকে একদিনের জন্য প্রশ্ন করেন নি, আমি খৃষ্টান হবে কি না? নিতাই বেশ বিস্মিত হইল, কহিল,আপনি তাহলে খৃষ্টান নন ! আমার ধারণা ছিল, খৃষ্টান ছাড়া এখানকার কর্তৃত্ব অখৃষ্টানের হাতে পড়তে পারে না! আশ্চৰ্য্য কথা অথচ সুমিত্রা কহিল,-যাক্, শুধু বাজে কথাই হচ্ছে, আপনারা ভিজে কাপড়ে অপেক্ষা করছেন। নিতাই কহিল, আজ আমরা আসি। আপনার বেয়ারাকে বলুন, মাছগুলাে নিয়ে যেতে। আর এই ছাতটা। আর দরকার হবে না। বৃষ্টি থেমে গেছে। সুমিত্রা কহিল—একদিন দুপুরবেলা এসে স্কুল দেখে যাবেন...কি রকম কাজ হচ্ছে। হাজার হােক, মূখ স্ত্রীলােক তাে আমি । ৪৭ মনের মিল হাসিয়া নিতাই কহিল,আমাকে বুঝি আপনি মস্ত পণ্ডিত ঠাউরেচেন! যদি বলেন আমার এই শশীদ। আছে • ••ওর দাদা কলকাতার কলেজে পণ্ডিত ছিলেন। তার মন ভারী উঁচু ছিল..মারা গেছেন। আর শশীদ। অামার মাছ ধরে বেড়ালে কি হবে, এর পড়াশুনা আছে। ওকে বরং এই স্কুলে ভর্তি করে নিন, ছেলে পড়াবার জন্য। দুপুর বেলাটা তাহলে পুকুরের মাছগুলো অন্ততঃ আরামে বাঁচতে পারবে । শশীকে নমস্কার জানাইয়া সুমিত্রা কহিল, -আপনিও দয়া করে এর সঙ্গে আসবেন স্কুল দেখতে। শশী কহিল,–আসবাে। তার পর বিদায় লইয়া নিতাই, শশী এবং কাশিম প্রস্থান করিল। ৪৮ পঞ্চম পরিচ্ছেদ সন্ধ্যার পর সদু বড়য্যের বাড়ীর সম্মুখ দিয়া সেই পথ। সদুর রােয়াকে মজলিস জমিয়ছে। তামাকের সঙ্গে অনেকের অদৃষ্ট পােড়ানাে •••এবং নাকে নস্য গেঁাজার সঙ্গে নস্যাৎ করার নানা প্ল্যান চলিয়াছে। হঠাৎ শশীকে এ-পথে মাছ হাতে আসিতে দেখিয়া কয়েকজন উদর-পরায়ণের নজর টাটাইল। শিবু কহিল, তাইতো হে শশী, মাছ কোথায় পেলে ? শশী হাসিয়া কহিল,-ও-পাড়ার তাল গাছে। --তাল গাছে মাছ! ও আবার কি কথা? শশী কহিল,-এ মজলিসের যােগ্য কথা নয় কি ? মাছ মেলে:••তা তাে বােঝেন। তবে জিজ্ঞাসা করচেন কেন? শিবু কহিল,—জিজ্ঞাসা করার মানে, কার পুকুরে ধরলে ? মাছটি দেখছি, বেশ, নেহাৎ ছােট-খাট নয়। শশী কহিল,—তাই বলুন। কারাে দয়া-দত্ত দান নিয়েও যাচ্ছি এও বুঝচেন নিশ্চয় !•••ওই খৃষ্টানী-স্কুলের কাছে মস্ত পুকুর আছে, সেই পুকুরের মাছ। পুকুরে মাছ ৪১ ৪ মনের মিল জ্ঞানশঙ্কর কহিল,—মুসলমান-পাড়া ? শশী কহিল,-হ্যা। শুধু পাড়ার মুসলমানের পুকুরের মাছ ! নাকে গন্ধ গেছে, চোখেও এ-মাছ দেখলেন, জাত গেল না তো? না, আমি ধরেচি বলে দ্বাদশটি ব্রাহ্মণ-ভােজন করালে দোষ কাটবে ? এই.পৰ্য্যন্ত বলিয়া শশী হাসিল, হাসিয়া বলিল- একটু গণনা করে বলে দেবেন, মাছটা কি জাতের ? মুসলমান ? খৃষ্টান ? আমার মনে হচ্ছে, মাছটা মুসলমান নয়, খৃষ্টান নয়, পরম হিন্দু ! নাহলে এত বড় টিকি ! বলিয়া সে মাছ-বাঁধা লতাটুকু দেখাইল। মজলিসে চরণ ভট্টাচাৰ্যও বিরাজ করিতেছিল। সে এবারে কথা কহিল। চরণ কহিল,-সব কথায় ডেপােমি করা । নিষ্কর্মার লক্ষণই তাই। শশী কহিল,—কি করি বলুন, মােসাহেবি বিদ্যাটুকু আয়ত্ত করতে পারিনি, আর বান্দীপাড়াতেও ঘুরতে শিখিনি। চরণ কহিল,-বাঙ্গীপাড়ায় ঘুরবে কি দুঃখে, বাপু? বাড়ী আছে তো•••বাড়ীতে বৃন্দাবন দ্যাখাে এবারে কি হাল করি!... বুঝলেন সদুবাবু, এবার একটা বিহিত করুন। শশী কহিল, বল তাের সদুবাবুকে—আমি তার তাবেদার নই, আর তার মােসাহেবি করেও আমাকে অন্ন সংগ্রহ করতে হয় না। কি ধার ধারি সদু বাঁড়ুয্যের যে, কথায়-কথায় সই বাঁড়ুয্যের নাম করিস্ !..কথাটা বলিয়া শশী রাগে গরু- গর করিতে-করিতে চলিয়া গেল।
মনের মিল মজলিস তখন শশীর দম্ভের সমুচিত দণ্ডদানের জন্য বিবিধ উপায় আলােচনা শুরু করিল। যত তর্ক, যত আলােচনাই হােক, এটা স্থির যে, চাল কাটিলে বা ক্ষেতের ফশল নষ্ট করিলে ফলটা ত্যন্ত সুনিশ্চিত এবং প্রত্যক্ষ হয়—কিন্তু ফশ করিয়া আদালতে যদি ও নালিশ করিয়া বসে ? ইংরেজের রাজত্ব—সমাজের সে প্রতিহত শক্তি এই কারণেই মুষড়াইয়া আছে! একঘরে করা? তাহাতেই-বা এমন কি বাজিবে । বিবাহ দিবে, এমন একটা ভগ্নী বা কন্যা নাই। এক ভাজ—বিধবা ! তার নামটাতে কালি মাখাইয়া ধূলায় লুটাইয়া জবরদস্ত শােধ লওয়া যায়, কিন্তু সেটা যদি গায়ে না মাখে! শশীর নিজের পুষ্করিণী আছে, প্রজা আছে, বাগান আছে, আর স্নান করিবার জন্য আছে গঙ্গার ঘাট। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়িয়া দিলেও শশী এবং তার ভাজ যে কোনো তােয়াক্কা রাখিবে, এমন মনে হয় না। চরণ সে পরিচয় ভালো করিয়াই পাইয়াছে। ঘােমটা দিয়া থাকিলে কি হয়, ঐ ভাজের যেমন ঝাঁজ, তেমনি তেজ! শশীকে জব্দ করিবার খুব সঙ্গিন-রকমের কোনাে উপায় খুঁজিয়া না পাইয়া সদু বাঁড়ুয্যের দল নিস্ফল আক্রোশে গুমরাইতে লাগিল। গৃহে ফিরিয়া মাছটা উঠানে ফেলিয়া শশী ডাকিল বৌঠারুণ••• বিন্দু ছিল রান্নাঘরে—উনুনে আগুন দিতেছিল। শশীর আহ্বানে বাহির হইয়া আসিয়া কহিল,—এই যে এসেচো । যে মস্ত মাছ! একা খাবে কি করে?
মনের মিল শশী কহিল—দেখাে তখন, কি করে খাই। ভাজা করো, চচ্চড়ি রাধে, ঝােল রাখধা•••আমি সব মাছ খাবো ! ব্যাটারা একঘরে করবে বলে' শাসিয়েচে। করুক একঘরে••খাশা হবে। স্ফুর্তিতে খেয়ে বাঁচবাে ! কাকেও মাছের একটা আঁশ দিতে হবে না। হাসিয়া বিন্দু কহিল,—এই যে, দার্শনিক তত্ত্বও বেশ শিখেচে, দেখচি। শশী হাসিল, হাসিয়া কহিল,-নয় বৌঠাকরুণ ? বঁচা যায় তাহলে ! কঁঠাল এলাে, দে ওকে। মাছ আনলুম, দে তাকে ভাগ। কেন রে বাপু, এসেছে, নিজে তৃপ্তি করে খাই। ঘরের মজা কত, ওরা বুঝুক, আমরাও বুঝি। এবারে রােজ একটা করে মাছ ধরে আনবে, আর পাঁচজনকে দেখিয়ে খাবো। বুঝলে বৌঠাকরণ, মাছ আনছিলুম.. দেখে শিবু গোঁসাইয়ের নােলায় জল ঝরছিল। বিন্দু কহিল,—থামে, থামাে, আর পরের কথা নিয়ে ঘোট করে না। মুখ-হাত ধোও, ধুয়ে কাপড় ছাড়ো। এই বৃষ্টি মাথার ওপর দিয়ে গেছে—এখন অসুখ না হলে হয় ! তুমি যাও, আমি বঁটি এনে মাছ কুটি। কুটে রান্না চাপিয়ে দি... শশী মাছ রাখিয়া মুখ-হাত ধুইয়া ভিজা কাপড় বাইল ; বিন্দু তখন মাছ কোটায় ব্যস্ত ! শশী কহিল,-একবার ঘুরে আসি বোঠাকরুণ... বিন্দু কহিল,কোথায় যাওয়া হবে, শুনি••• • মনের মিল শশী কহিল,—নিতাইয়ের কাছে। অাজ এক মজা হয়েছে বৌঠাকরুণ...পাদ্রীরা একটা স্কুল খুলেচেনা সেই মুসলমান-পাড়ার ওদিকে ? বিন্দু কহিল, সেবার ওলাবিবির-তলায় যেতে দেখচি বাট ! শশী কহিল,—আজ সেই স্কুল দেখে এলুম। একটি বাঙালী- মেয়ে সেই স্কুলের কর্তা নয়, কত্রী। অর্থাৎ স্কুল দেখাশুনার ভার তার উপর। মেয়েটি খৃষ্টান নয় দেখে এমন আনন্দ হলাে! আমাদের বাঙালীর মেয়ে...খালি রান্নাবান্না, বাটনা-বাটায় মত্ত না থেকে এত বড় কাজ করছে, যে-কাজে অনেক পুরুষ এগুতে ভয় পায় ! বাঙালীর মেয়ের এ-মূর্তি...সত্যি বলচি বৌঠাকরুণ, আমাদের শাস্ত্রে বিদ্যার দেবতাকে যে মেয়ে-মানুষ বলা হয়েছে, সে খুব ঠিক । অত দরদ করে মমতা করে কে বিদ্যা শেখাতে পারে ? মেয়েটিকে দেখে শাস্ত্রকারের তৈরী দেবী-বীণাপাণির স্তবটুকু মনে পড়ছিল...যা শুভ্র-বস্ত্রাবৃতা, যা বীণা-বরদণ্ডমণ্ডিত ভুজা, যা শ্বেত-পদ্মাসীনা ! তাকে দেখে আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, তিনি বসেন নি চেয়ারে—মেয়েটি যেন শ্বেত-পদ্মে বিরাজ করচেন । বিন্দু কহিল,-সত্যি? শশী কহিল,-সত্যি বৌঠাকরুণ! দ্যাখো, ছােট ছেলেকে মা যখন হাতে-খড়ি দিয়ে ক-খ শেখান, তখন ছেলে কত সহজে শেখে ! কিন্তু তারপর যেই পণ্ডিতের হাতে পড়ার ভার পড়ে, মনের মিল সে যে কি অমনি সেই ছেলে ফঁাকির ফন্দী আবিষ্কারে মাথা খাটাতে লেগে যায় । আমার মনে হয়, স্কুলে ছােট ছেলেদের পড়ানাের ভার যদি মেয়েদের হাতে দেওয়া হয়, ঐ গুলাে মাষ্টার-পণ্ডিতদের তাড়িয়ে, তাহলে ঢের ভালাে হয়। পুরুষ মাষ্টার শুধু শাসন করতে জানে। ছেলেদের আব্দার মেনে দরদে-স্নেহে তাকে পড়া শেখাতে পারে শুধু মেয়েমানুষ! এক তাে ধৈৰ্য্য না থাকলে সম্ভব নয়-পুরুষ চিরদিন ধৈৰ্য্য-হারা! ধৈৰ্য্য যা, তা আছে শুধু মেয়ে-মানুষের !••• বিন্দু মৃদু হাসিলতার মনে হইল, তার নিজের কথা ! যে, সংসারে কি তার কাজ ! রান্নাবান্না আর ঘর-সংসার দেখা। কতটুকু সময় বা ! তারপর দিনের দীর্ঘ অবসর । করিয়া কাটে। এ সময়টায় দুই-চারিজন ছেলে-মেয়েকে লইয়া যদি তাহাদের পড়াইতে পারি, তাহাদের হাসি-খেলা-ধুলায় সঙ্গ দিয়া মানুষ করিয়া তুলিবার কাজ পাইত। শশী কহিল,-তুমি ভাবচো, মেয়েটি খৃষ্টান ? মােটেই নয়। আমরাও তাই ভাবলুম। কিন্তু তিনি বললেন, তিনি খৃষ্টান নন। অনাথা,-ছেলেবেলায় বাপ-মা হারিয়ে পাদ্রীদের ঘরে মানুষ হয়েচেন, লেখাপড়া শিখেছেন। তাঁর সঙ্গে আলাপ হলাে কি না -তাই শুনলুম। একদিন তার স্কুল দেখতে যেতে বলেচেন... বিন্দু কহিল,-যেয়ো। আর ফিরে এসে আমাকে তঁার কথা বলাে। শশী কহিল,—নিশ্চয় বলবাে।•••তাহলে ঘুরে আসি... ৫৪ মনের মিল বিন্দু কহিল,শীগগির ফিরে ভাই। একলাটি থাকি... শশী কহিল,-এখনি ফিরবাে। শশী চলিয়া গেল এবং বিন্দু মাছ কুটিয়া রান্না চড়াইয়া দাওয়ায় আসিয়া বসিল। দাওয়ায় একটা আলো জলিতেছিল। আলাের সামনে সে একখানা বই খুলিয়া বসিল। কতক্ষণ বই পড়িতেছে..হঠাৎ একটা শব্দে চমকিয়া চাহিয়া বিন্দু দ্যাখে, উঠানে একটা ছায়া পড়িয়াছে। মানুষের ছায়া। বিন্দু সভয়ে প্রশ্ন করিল, কে ? ছায়া নড়িল না। বিন্দু উঠিল। দাওয়ার এককোণে একটা লাঠি ছিল। লাঠিটি তার স্বামীর। সেই লাঠি হাতে লইয়া বিন্দু উঠানে নামিল,—গা একবার ছ-ছম্ করিয়া উঠিল। ভয়ে ! সে ভয় দাবিয়া বিন্দু কহিল,—কে? জবাব দাও। তবু কোনাে সাড়া নাই,—ছায়া নিশ্চল। বিন্দু তখন আর- একটু অগ্রসর হইল, কহিল,—জবাব না দিলে আমি এখনি চঁাচাবে। বলো, কে ? ছায়া এবার নড়িল। বিন্দু লক্ষ্য করিয়া দ্যাখে, উঠানে বড় চাপা গাছের আড়ালে একজন মানুষ। সে চমকিয়া উঠিল, তারপর কহিল,-কে তুমি ? কথার সঙ্গে-সঙ্গে হাতের লাঠি উদ্যত করিয়া ধরিল এবং মনুষ্য-মূৰ্ত্তি লক্ষ্য করিয়া সজোরে লাঠি চালাইল। সঙ্গে-সঙ্গে একটা আর্তনাদ তুলিয়া মূর্তি ভুলুণ্ঠিত হইল। আকাশে ক্ষীণ চন্দ্রালােক—সে-আলােয় ভালো কিছু লক্ষ্য হয় মনের মিল . না। তাড়াতাড়ি আলল আনিয়া বিন্দু দ্যাখে, লােকটা পড়িয়া আছে! ভয়ে তার আপাদ-মস্তক কঁপিয়া উঠিল। ঘটিতে জল লইয়া সে তার মুখে-চোখে : দিল। লােকটা চোখ মেলিয়া চাহিল । চোখে বক্র কটাক্ষ। সৰ্ব্বনাশ—কে এ? কাহাকেই-বা সে এখন ডাকে? পাড়ার কাহাকেও ডাকিলে কেহ আসিবে না মাঝে হইতে... কি করা যায় ? শশীর উপর রাগ হইল। এত রাত্রি হইতে চলিল, তবু তার গল্প আর শেষ হয় না ! বাহির হইলে ঘরের কথা এমনি ভুলিয়া থাকিতে হয় !••• তবু উপায় যখন নাই, তখন ভয়ে নিশ্চল থাকিলেও তো চলিবে না! ভগবানকে স্মরণ করিয়া লােকটার পানে চাহিয়া সুদৃঢ়-কণ্ঠে সে কহিল,—চোর । এখনাে পড়ে আছো! চলে যাও এখনি... লোকটা কাতর ভাব দেখাইয়া ক্ষীণ-কণ্ঠে কহিল,আমার পায়ে চোট লেগেচে। উঠতে পারছি না। বিন্দু কহিল,—যেমন কোরে পায়রা, যাও। না হলে এখনি লােক ডাকবে। শেষে থানায় যেতে হবে ! লােকটা কহিল,আমায় ধরে’ যদি একটু তুলে দাও, তাহলে চলে যাই। পুলিশে দিয়াে না-দোহাই ! এ-কথায় বিন্দুর মমতা জাগিল। সে তার হাত ধরিয়া টানিয়া তাকে উঠাইল। লােকটা উঠিয়া গায়ের কাদা মনের মিল ঝাড়িতেছে, এমন সময় বাহির হইতে কে হাঁকিল,-শশী আছো? চরণ ভট্টাচার্যের গলা। বিন্দুর সর্বাঙ্গ কপিয়া উঠিল। এক অপদ না যাইতে... চকিতে চরণ আসিয়া উঠানে দাড়াইল, তার পিছনে সদু বড়য্যে, শিবু গোঁসাই প্রভৃতি। বিন্দু সসঙ্কোচে দূরে সরিয়া গেল। চরণ কহিল,--কে তুমি, বাপু? লােকটা কহিল,আজ্ঞে, আমি এদের আপনার লােক••• এইটুকু বলিয়াই সে কোনােমতে একটু অন্তরাল সংগ্রহ করিয়া সবিয়া পড়িল। বিন্দু অবাক এইমাত্র যে উঠিতে পারিতেছিল না, সে এমন ফশ করিয়া ছুটিয়া পলাইল—আর ও কি কথা বলিয়া ! কি... এ যে কি, তাহাও তার সম্পূর্ণ উপলব্ধি হইল চরণের পরের কথায় ! চরণ কহিল,দেখলেন সকলে! আমি স্বচক্ষে দেখেচি, শশী চলে গেল, আর তার পরেই ঐ লােকটা ফশ ক'রে বাড়ীতে ঢুকলো ! তাই আপনাদের খপর দিলুম। হু! আমি চরণ ভটচাজ,—দু’বেলা সন্ধ্যাহ্নিক না করে জল গ্রহণ করি না আমায় অপমান! আমায় মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা ! সতু বড়য্যের দল সমস্বরে কহিল,—এ তো ভালাে মনের মিল নয়. ক্ষেত্তর আমাদের কি মানুষ ছিল। আর তার বিধবার এই রীত•••গায়ের বুকে বসে’! আস্পর্ধা কম নয়। কথায় কথা বাড়িয়া উঠিতেছিল! এবং চরণের ইতর ইঙ্গিত- ভরা টিপ্পনীর সঙ্গে সে-সব কথা এমন জটিল ও দুঃসহ হইয়া উঠিল যে, বিন্দু সে-কথার আঘাত সহ্য করিতে পারিল না। চোখের সামনে হইতে লণ্ঠনের আলাে, আকাশের ঐ ক্ষীণ জ্যোৎস্না দপ করিয়া নিবিয়া সমস্ত পৃথিবীকে কখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন করিয়া দিল । সে কম্পিত দেহে বােয়াকের পাশে মূচ্ছিত হইয়া পড়িল । ঠিক এমনি সময়ে শশী আসিয়া গৃহে ঢুকিল। উঠানে ভিড় দেখিয়া সে হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইল। পরে যখন দেখিল, সে-ভিড় জমাইয়াছে চরণ ভট্টাচাৰ্য্য ও সদু বড়য্যের দল, তখন রাগে জ্বলিয়া সে চীৎকার তুলিল,-আমার বাড়ী ঢুকেচো কোন্ সাহসে? বেরােও, এখনি বেরােও,নাহলে সব খুন করবো। নিজের দেহকে একেবারে সঙ্কুচিত করিয়া চরণ চাপাগাছের অন্তরালে সড়িয়া পড়িল। সদু কহিল,-কি মিছে চঁাচামেচি করচো, পাগলের মতাে ! তােমার ভাজের ব্যবহার ক্রমশঃ যে অসহ্য হয়ে উঠলো,—সে খপর রাখাে? শশী কহিল,আমার ভাজ...তার খপর আমি রাখবাে। তােমাদের সে অপরের জন্য মাথা-ব্যথা কিসের? শিবু কহিল,-তুমি বাড়ী নেই, সে-সময় অপর অচেনা পুরুষ এসে তোমার ভাজের সঙ্গে আলাপ করবে, এই-বা গ্রামে থেকে আমরা সহ্য করবে কেন ?
মনের মিল শশী হুঙ্কার তুলিল,-কি ! এত বড় কথা ! জ্ঞান কহিল,—কিসের চোখ রাঙাও! লােক-জন ডেকে আলাপ করার সখ যদি তঁার হয় তো গ্রামের বাইরে চলে যান। এখানে আমরা এ-সব বরদাস্ত করবো ন। এতে থানা-পুলিশ করতে হয়, স্বীকার ! বাড়ী-চড়া হইয়া এভাবে অপমান! শশী কহিল,আমার আপনার লােক যা-খুশী করবে, তােদের কি ? বেরাে সব বলচি—নাহলে মাথা ফাটিয়ে দেবো...বলিয়া সে পাগলের মতো লাঠি-গাছটা কুড়াইয়া রণরঙ্গে নাচিয়া উঠিল ! তার সে রুদ্র-মূত্তি দেখিয়া সদুর দল ভয় পাইল এবং বিনা বাক্য-ব্যয়ে দ্রুত অপসৃত হইল। তারা চলিয়া গেলে শশী রােয়াকের দিকে ফিরিয়া দ্যাখে, বিন্দু মূচ্ছিতার মতো পড়িয়া আছে। এর কি কোনাে অত্যাচার করিয়া গিয়াছে ? উঠানে দাদার লাঠি, ওধারে জলের ঘটী পড়িয়া•••ব্যাপার কি? শশী তাড়াতাড়ি বিন্দুর কাছে আসিয়া ডাকিল,—বৌঠাকরুণ... বিন্দু চোখ মেলিয়া চাহিল, অতি ক্ষীণ স্বরে কহিল, ঠাকুরপাে ! বিন্দুকে ধরিয়া শশী ধীরে-ধীরে তুলিল। বিন্দু বসিল। কিন্তু এ কি চেহারা বিন্দুর ! যেন কতকাল আহার নাই, কত দীর্ঘ দিন যেন মস্ত রােগে ভুগিয়াছে ! চোখে-মুখে তেমনি কালির রেখা। শশী কহিল,—কি হয়েছিল বৌঠাকরুণ ?
মনের মিল ।। তারপর লজ্জায় ঘৃণায় দুঃখে বিন্দুর যেন চেতনা ছিল না ! অতি-কষ্টে শশীর পানে চাহিয়া ভগ্ন হতাশ কণ্ঠস্বরে সে কহিল,—বলচি... আমায় নিয়ে চলো ঠাকুরপাে । বিন্দুকে ধরিয়া শশী রােয়াকে আনিয়া বসাইল। উদ্বেগের উত্তেজনায় ঘুরিয়া বেড়াইল। বহুক্ষণ পরে বিন্দু ডাকিল—ঠাকুরপাে•• শশী কাছে আসিলে বিন্দু ধীরে-ধীরে সব কথা খুলিয়া বলিল । শুনিয়া শশী রাগে ফুলিয়া উঠিল,-এবার শশী বামুনকে ওরা দেখবে,—পড়ে-পড়ে থাৎলানি খাবে, খেয়ে পালাবাে বা দমবো, এমন শৰ্ম্মা আমি নই ! ঐ যত ব্যাটা গোড়াকে পা দিয়ে চেপে একবার ভালো করে জানাবো, শশী বামুনের শক্তি কতখানি ! ঐ চরণে ব্যাটা...সি-কাঠে ঝুলি যদি, সেও আচ্ছা, ওকে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবাে--ওর বামনাগিরির শ্রাদ্ধ করবে। তবে ছাড়বাে ! বিন্দু কহিল,—শােনো ঠাকুরপাে, ও-সব পাগলামি ছাড়ে। ভাই। তুমি একা, ওরা অত লােক! কি তুমি করবে? শেষে তােমার প্রাণ নিয়ে টানাটানি ঘটে যদি ? ওদের অসাধ্য কাজ নেই। এক অজানা আতঙ্কে বিন্দুর সৰ্ব্ব-শরীর শিহরিয়া উঠিল। শশী কহিল,—তুমি কোনাে ভয় করে না। বাড়ীতে আমি ছিলুম না বলেই ওদের ছাতি অতখানি ফুলেছিল ! আমি বাড়ী ঢুকতেই ছুঁচোর মত সরে গেল ! ওদের বড়াই শুধু দুর্বল মনের মিল মেয়ে-মানুষের সামনে !•••আচ্ছা, যে-লােকট। প্রথমে টোকে, তাকে তুমি চিনতে পারো ? বিন্দু কহিল,-না। শশী প্রশ্ন করিল,দেখতে কেমন? বিন্দু কহিল,-তা কি দেখেচি লক্ষ্য করে ? চোর ভেবে ভয়েই আমি সারা ! তবু সাহস করে লাঠি নিয়ে এগিয়েছিলুম, ভেবেছিলুম, তােমার দাদার লাঠি ! তাই কেমন বল পেয়েছিলুম। নাহলে আমার সাহস তো জানাে, চোরের নামে ভয়ে অজ্ঞান হই। শশী ড্র কুঞ্চিত করিয়া কহিল,-লাঠি তার গায়ে লেগেছিল ? বিন্দু কহিল,—পায়ে লেগেছিল। শশী কহিল,তার চেহারা একেবারে লক্ষ্য করােনি? বিন্দু কহিল,—মাথায় কোকড়ানাে চুল, চোখের নীচে কালি, খোঁচা দাড়ি, আর গালে সুপুরির মত একটা কালো জড়ল। শশী কি ভাবিল, পরে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল,—হু। ওদের দলের কেউ। আমি সন্ধান নিচ্ছি। দেখি, তার বুকের পাটা কত বড়!
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ বিজলী { সুমিত্র। গঙ্গার ধারে বেড়াইতে বাহির হইয়াছিল। স্কুল হইতে সােজা পথ গিয়াছে গঙ্গার ধারে । গঙ্গার ধারে কয়েকটা ইট-খেলা। ইট-খােলার পাশ দিয়া সে আসিয়া জেটিতে উঠিল। মিল। ফুলছড়িতে একটা কটন মিলও আছে-মিডল্যাণ্ড কটন এ জেটিটি সেই মিলের সংলগ্ন। নদীর লাল ঘােলা জল বৃষ্টির পর শান্ত স্রোতে বহিয়া চলিয়াছে। নদীর বুকে ক’খানা নৌকা। ভূতের মতে ক’জন লােক সে সে নৌকায় বসিয়া ইলিশ-মাছ ধরিতেছে। সুমিত্রা জেটিতে আসিয়া জলের ধারে পা ঝুলাইয়া বসিল। জলের অগাধ প্রসার•••মন তার কোন্ অজানা অসীমে ছুটিল। সামনে ভবিষ্যৎ•••তাররা এমনি প্রসার। জীবনে তার চাহিবার কি আছে ? এই ছেলেদের লইয়া খেলাধূলা করা, যতটুকু সাধ্য জ্ঞানের বাতি ধরিয়া এইসব অবহেলিত বালক-বালিকার চিত্তে আলো জ্বলিয়া তাদের জীবনে যতটুকু পারে অস্পষ্টতার মনের মিল মাঝে আলো ধরিয়া দেওয়া••এ যে কত বড় কাজ। এরা যখন লেখা-পড়া শিখিয়া মানুষ হইবে, ইতর অবােল। মতো পরের সর্বপ্রকার দাসত্ব শিরােধার্য্য করিয়া শুধু দু’মুঠ। অন্নের সংস্থান হইলেই কৃতার্থ হইবে না! জীবনের অর্থ বুঝিয়া বিরাট কর্মশালায় আপনাদের শক্তি নিয়ােজিত করিবে সে শুভ উজ্বল সুন্দর ভবিষ্যৎকে কল্পনার চোখে দেখিয়া সুমিত্রা কি তৃপ্তি যে অনুভব করিল ! কল্পনায় সে রঙীন ছবি দেখিয়া তার মুখ-চোখ সম্বিত হইয়া উঠিল! হঠাৎ পিছন হইতে কে ডাকিল,-সুমি... চমকিয়া ফিরিয়া সুমিত্রা দ্যাখে, পিছনে বিজলী আসিয়া দাড়াইয়াছে। সুমিত্রা উঠিয়া দাড়াইল, হাসিয়া কহিল—তুমি... বিজলী হাসিয়া জবাব দিল,—হা। তুমি ভাবনায় এমন তন্ময় যে, আমি এসে দাড়িয়েচি, জানতেও পারে নি !•••কি ভাবছিলে? সুমিত্রা কহিল,—কত কি বিজলী অগ্রসর হইয়া সস্নেহে সুমিত্রার হাতখানি নিজের হাতে ধরিয়া কহিল,—কি ভাবছিলে, সুমি? সুমিত্রা কহিল,আমার স্কুলের কথা। ভাবছিলুম, এই যে ছেলেরা লেখাপড়া করছে, এরা যদি সত্যকার মানুষ হয়ে ওঠে কোনাে দিন.. জীবনের মর্ম বা লক্ষ্য পুরুষানুক্রমে যারা বােঝেনি ...কি চমৎকার সে হবে !
মনের মিল বিজলী কহিল,-তােমার এ পরিশ্রম কখনাে নিস্ফল হবে , সুমি। তােমার হাতে সেই রূপকথার সােনার কাঠি আছে । তুমি জানো না, সে সােনার কাঠির ছোঁয়া যে পাবে, মানুষ তাকে হতেই হবে। সুমিত্রা বলিল—ও-সব কথা যা। তুমি আজ এই সন্ধ্যার সময় এখানে হঠাৎ ? বিজলী কহিল,-নেহাৎ হঠাৎ নয় ! রাটার সাহেব দেখ। করতে বলেছিল তাই এসেচি । সুমিত্রা কহিল,-রাটার সাহেব ? বিজলী কহিল,-পারে যে পাটের কল আছে, তার বড় সাহেব রাটার। সে আজ আমাকে আসতে বলেছিল... এই অবধি বলিয়া বিজলী একবার থামিল, থামিয়া পরক্ষণে কহিল,—ওই মিলে আমি চাকরির চেষ্টা করছিলুম। গাওয়ার সাহেব চিঠি দিয়েছিল... সুমিত্রা কহিল,তুমি তাহলে ইস্কুলের কাজ ছেড়ে দিচ্ছ ? বিজলী কহিল,-হ্যা। তাতে ভবিষ্যত উন্নতির কি সম্ভাবনা আছে ? স্কুল-মাষ্টারী করে’ কাটাবার জন্যই কি দুলভ নর-জন্ম গ্রহণ করেচি, সুমি? তার চেয়ে ঐ পাটের কলে ঢুকতে পেলে একদিন লক্ষপতি হবার সম্ভাবনা ! সুমিত্রা কহিল,—এ কি ভালো হলাে? বিজলী কহিল,—খুব ভালাে। এই যে জীবনকে উপভােগ্য করবার জন্য চারিদিকে বিচিত্র আয়ােজন পড়ে রয়েছে, পয়সা ৬৪ মনের মিল থাকলে তার কোনােটাকে আয়ত্ত করা যাবে না। খাওয়া- পরা নিয়ে মত্ত থাকলেই তাে চলবে না। সে খাওয়া-পরার মধ্যে বৈচিত্র্য চাই। তাছাড়া ভালো বাড়ী, মােটর, দাস-দাসী ••এ-সবের কল্পনা করার শক্তিও ক্রমে লােপ পেয়ে যাবে সুমি, স্কুলে মাষ্টারি করতে-করতে। জীবনকে আমি উপভােগ করতে চাই—শুধু বােঝার মতাে বয়ে বেড়ানো নয়। এ-কথায় সুমিত্রার আজন্মের সংস্কারে বেশ আঘাত লাগিল। সে স্তব্ধ হইয়া বিজলীর পানে চাহিয়া দাড়াইয়া রহিল। সেই বিজলী ! অনাথ অসহায় দেখিয়া পাদ্রী সাহেব যাকে বুকে তুলিয়া নিজের গৃহে আনিয়া আশ্রয় দিয়াছিলেন। সে- আশ্রয় না পাইলে কোথায় কি-দশায় যে সে থাকিত, তার কোনাে ঠিকানা নাই ! পাদ্রী সাহেব কতদিন বলিয়াছেন,-তােমরা দু’জনে শিক্ষা-দানকেই জীবনের ব্রত করিয়াে। ভারতবর্ষে শিক্ষার বড় অভাব। এই শিক্ষার অভাবে দারিদ্র্য আর মৃত্যু এত-বড় জাতিটাকে নষ্ট করিয়া দিতেছে, জীর্ণ কঙ্কালে পরিণত করিতেছে। সুমিত্রা কোনো কথা না বলিয়া বিজলীর পানে চাহিয়া রহিল। কহিল,—কি দেখছো? সুমিত্রা কহিল,-এর মধ্যে তুমি এতখানি বৈষয়িক হয়ে উঠেচো...তাই দেখছি। বিজলী কহিল,-বৈষয়িক কথাটা ঠিক খাটে কি ? তা নয়। যখন মানুষ হয়ে জন্মেচি, তখন মানুষের মতো বাস করতে চাই।
মনের মিল ; সুমিত্রা কহিল,—বিলাসিতা না হলে কি মানুষের মতাে বাস করা যায় না? মানুষ আর বড়-মানুষ•••দুটো এক বস্তু নয়। বিজলী হাসিল ; হাসিয়া কহিল,-তােমার কথার মানে ঠিক বুঝতে পারলুম না। সুমিত্রা কহিল,-ফাদারের কাছে যে-প্রতিশ্রুতি... বিজলী কহিল,-প্রতিশ্রুতি আবার দিলুম কবে ? সুমিত্রা কহিল,—কথায় না দিই, তাঁর ইচ্ছা ছিল... বাধা দিয়া বিজলী কহিল,-জানি। কিন্তু শক্তি থাকতে দারিদ্র্য বরণ করবে কেন? এখন একলা আছি। যদি বিবাহ করি...যদি কেন ? বিবাহ তো করবে। একদিন। একটা সংসার গড়ে তুলবাে। সে-সংসারের সব ভার, সব দায়িত্ব বহন করবার যােগ্যতা থাকা চাই। সে যােগ্যতা অর্জন না করে বাহিরের কটি প্রাণীকে এনে সংসার গড়বার চেষ্টায় তাদের উপর অবিচারই প্রকাশ পাবে সুমি।•••সংসারে একা থাকার সাধ আর যার থাকে, থাক্, আমি নিঃসঙ্গ জীবনের পক্ষপাতী নই। কাজেই আর্থিক অবস্থা ভালো করা চাই। আর্থিক অবস্থা ভালো হলে শুধু নিজের নয়•••আরাে পাঁচজনের অনেক উপকার ! বিজলী সুমিত্রার পানে দীপ্ত নেত্রে চাহিল। সুমিত্রা বিজলীর পানেই চাহিয়া ছিল। দু’জনের দৃষ্টি মিলিতে বিজলী হাসিল ; হাসিয়া কহিল,—জানাে তে সুমি, এ মনে কি আশা বয়ে আসচি.. জীবনের পথে পা দেওয়া ইস্তক...
মনের মিল • সুমিত্রার দৃষ্টিতে প্রশ্ন জাগিল। বিজলী তাহা লক্ষ্য করিল ; করিয়া কহিল,—তােমায় নিয়ে যে সংসার পাতবাে, সে সংসার বইবার যােগ্যতা থাকা চাই...তােমার স্বাচ্ছন্দ্যে না বাধে কোথাও ! সুমিত্রার মুখের উপর কে যেন অতর্কিতে আঘাত করিল। লজ্জায় সে মুখ নামাইল। তার কর্ণ-মূল অবধি লজ্জায় রাঙা, তপ্ত হইয়া উঠিল। বিজলী কহিল,আমার এ আশা কি দুরাশা, সুমি ? কথাটা বলিয়া সে সুমিত্রার হাত ধরিবার জন্য অগ্রসর হইল। সুমিত্রা দু’পা সরিয়া গিয়া কহিল,—তা ভেবে দেখিনি কখনাে।•••ও কথা থাকুক। এই অবধি বলিয়া সে অন্য কথা পাড়িল, কহিল,—এই স্কুলের কাজ আমার এত ভালাে লাগছে যে, এ-কাজ ফেলে আর কোনাে দিকে আমি মন দিতে কখনাে পারবে কি না, জানি না।••• কথাটা বলিয়া সুমিত্রা শূন্য আকাশের পানে চাহিয়া রহিল। বুঝি, তার চোখের সম্মুখে ভবিষ্যতের সে অপরূপ ছবি ফুটিয়া উঠিতেছিল ! বিজলী কহিল,—কিন্তু তাতেই জীবনের সার্থকতা নয়, সুমি । একটা গৃহ, সংসার পেতে বসা•••তাতে প্রচুর আনন্দ। এ কাজ হয়তাে কালে নীরস প্রাণহীন হবে একদিন—কিন্তু যে-কাজে স্নেহের স্পর্শ, সে-কাজ কখনাে বিরস হবার নয়।
মনের মিল সুমিত্রা কহিল,—এর মধ্যে স্নেহের অভাব দেখলে কোথায় ? এই সব ছেলেমেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে বাস করে স্নেহের অভাব কোনাে দিন বােধ করবাে না। বিজলী কহিল,—যাক্, ও নিয়ে এখন তর্ক তুলতে চাই না। যদি কোনাে দিন যােগ্যতা অর্জন করতে পারি, সেদিন আমার প্রার্থনা নিয়ে তােমার দোরে এসে দাড়াবাে। আমাদের জীবন এক সঙ্গে বেড়ে উঠেচে•••এর মধ্যে ভগবানের কি কোনো ইঙ্গিত নেই, ভাববা? সুমিত্রা কহিল,—ও কথা থাক্। এখন তােমার কাজের কথা বলো। রাটার সাহেবের কাছে গিয়েছিলে ? বিজলী কহিল, গিয়েছিলুম। সাহেব নিতে রাজী। কেনই-বা নেবে না? একে মিশনারীদের কাছে মানুষ হয়েচি, তার উপর গাওয়ার সাহেবের সুপারিশ। সাহেব আমায় এ্যাসিষ্ট্যান্ট ম্যানেজার করবে। আপাততঃ দুশো টাকা মাহিনা। মাহিনা। যাই হােক্—অন্য পাঁচ রকমে রােজগার আছে বিলক্ষণ। সাহেব নিজেও সে-কথা বললে। কথাটা বলিয়া বিজলী হাসিল। সুমিত্রা বিস্ময়পূর্ণ দৃষ্টিতে বিজলীর পানে চাহিয়া রহিল। বিজলী কহিল,—কি ভাবছো ? সুমিত্রা কহিল,-আরাে পাঁচ রকমের মানে ? ঘুষ ? বে- আইনী রোজগার ? বিজলী কহিল-বাইবেল মানলে সেই অর্থ দাঁড়ায়। কিন্তু মনের মিল ব্যবহারে এটা ন্যায়সঙ্গত দাড়িয়েছে। মনিব মিলওয়ালা তা জানে। আর তা জানে বলেই মাহিনার হার দু’শাের ঊর্ধ্বে ওঠে না। সাহেব স্পষ্ট বললে, দুশাে টাকা মাহিনা হলে কি হয়, বুদ্ধি থাকলে মাসে হাজার দেড়-হাজার টাকা রােজগার করতে পারবে। তবে হুশিয়ার, কোম্পানিকে বাঁচিয়ে চলা চাই। তাহলে নিজেও বাঁচতে পারবে। ধিক্কারে,সুমিত্রার মন ভরিয়া উঠিল। সুমিত্রা কহিল,—ছি । লেখাপড়া শিখে এ-কথা এমন অনায়াসে বলচো কি করে ? বিজলী কহিল তােমার পুথি-গত জীবনেই তুমি চিরদিন বদ্ধ রইলে সুমিত্রা ! সংসারকে সংসারকে লােকে কর্মক্ষেত্র বলে, কেন ? কর্মক্ষেত্রে নানলে পুথির বুদ্ধিকে বহু কাট-ছুঁাট করতে হয়- নাহলে জীবন হয় গডডলিকা-প্রবাহে ভেসে চলে, নয়তো জীবন- স্রোতে পঙ্গুতা আসে। মানুষ জড় পুতুল হয়ে দাড়ায়। সুমিত্রা কহিল,-তােমার এ ফিলজফি আমি গ্রহণ করতে পারবো না, বিজলী । বিজলী কহিল—ইস্কুলে ফিরবে ? সুচিত্রা কহিল,-একটু পরে ফিরবে। বিজলী কহিল,—আচ্ছা, আমি আসি। আমার একটু কাজ আছে। চাকরিতে বাহাল হই, তারপর একদিন এসে দেখা করবো। বিজলী চলিয়া গেল। সুমিত্রা কাঠ হইয়া দাড়াইয়া রহিল- দৃষ্টি তার শূন্যে নিবদ্ধ। ? ৬১ সপ্তম পরিচ্ছেদ পিঞ্জর-পৰ্ব্ব গৃহের সম্মুখে উঠানে একটা কাঠের টুলে নিতাই চুপ করিয়া বসিয়া আছে। প্রভাত-সূৰ্য পেয়ারা গাছের পান্তরাল-পথে অজস্র কিরণ বর্ষণ করিতেছে। নিতাইয়ের পায়ের কাছে পরিষ্কার ছা কতকগুলা বাখারি । কাশিম আসিয়া কহিল—কঞ্চি এনেছি। নিতাই কহিল,রেখে দে। কাশিম কহিল,-ময়নাটা কোথায় রাখবো ? খাচা যে এখনি চাই। কাল ঝড়ের মুখে একটা ময়না পাখী কোথা হইতে উড়িয়া আসিয়া দাওয়ার উপর পড়িয়াছিল—একেবারে মূচ্ছিত দেহে ! বহু যত্নে সেবায় পরিচৰ্য্যায় কাশিম তাকে বাঁচাইয়া তুলিয়াছে। ভােরে উঠিয়া নিতাই আর কাশিম দুজনে বাখারি চঁচিয়াছে, ময়নার খাঁচা তৈয়ার করিবে বলিয়া। কাশিম গিয়াছিল নিতাইয়ের কথায় কঞ্চি-সংগ্রহে। ইতিমধ্যে নিতাইয়ের এই ভাবান্তর। হঠাৎ নিতাইয়ের ঔদাস্য দেখিয়া কাশিম বিস্মিত হইল। সে কহিল-খাচা হবে না?
মনের মিল নিতাই কহিল,—হবে’খন। হঠাৎ একটা কথা মাথায় এলাে রে কাশি। ১৫ • —কি কথা? নিতাই কহিল,—কাল ঐ ইস্কুল দেখলি তো? কাশিম কহিল,দেখেচি । নিতাই কহিল,—বেশ ইস্কুল। পণ্ডিতের জলবিছুটি নেই, বেত নেই। কি আদরে, কি যত্নে লেখাপড়া শেখাচ্ছে ঐ গরীব ছেলেদের কাশিম হঁ করিয়া নিতাইয়ের পানে চাহিয়া রহিল। নিতাই কহিল,--আমাদের ধর্মে লেখাপড়ার যিনি মালিক —যার দয়ায় মানুষ লেখাপড়া শেখে, তিনিও মেয়ে-মানুষ। তাঁর নাম জানিস ? কাশিম কহিলনা। নিতাই কহিল,-তুই একেবারে গাধা। দেখিসনে সেই শীতকালে ওপাড়ার মাঠে বারােয়ারি করে পূজো হলাে সরস্বতী- পূজো? সেই যে রে, রাশরাশ গাঁদা ফুলের মালা কাশিমের মনে পড়িল সেই আনন্দ-দীপ্ত উৎসব! সে কহিল,—হঁা••• নিতাই কহিল,—সেই সরস্বতী ঠাকুর হলেন লেখাপড়ার দেবতা। ঐ ইস্কুলে সেই দেবতাকেই কাল দেখে এসেচি। কথার মর্ম কাশিম ঠিক বুঝিতে পারিল না। নিতাই কহিল,মেয়েদের কাছে লেখাপড়া শিখলে ভালো ৭১ মনের মিল করে’ শেখা যায়। তারা বিদ্যেতে ভয় ধরিয়ে দেয় না। তাই ভাবছিলুম, তাের দিনগুলো হেইয়ো-হেইয়াে করেই কাটছে। এ তাে ঠিক নয়। তুই লেখাপড়া শেখ, পরে ভালাে হবে। কাশিম নিরুত্তর 'রহিল। নিতাই কহিল,—ওই ইস্কুলে তােকে পড়তে পাঠাবাে ভাবছি। জাত যাবে বলে’ ভয়ে কেউ শিউরে উঠবে না, তােকে কেউ দূর- ছাইও করবে না ওখানে। পড়বি ভালো। পড়াশুনা করে’ এর পর মানুষ হতে পারবি—নিজের হাতে বােট ঠেলে দিন কাটাতে হবে না। কথাটা কাশিমের মন্দ লাগিল না। বেশ একটি বড় দল ••"কত খেলা-ধূলার ব্যবস্থা আছে। ঐ যে মাঠের দু'ধারে কাঠ পোতা••ছেলেরা বল খেলে। তার উপর বাঙালী মেমের আদর করিয়া কত-কি খাওয়ানো! তিনিও তো স্কুলে পড়ার কথা বলিলেন । সস্মিত মুখে কাশিম কহিল,আমি পড়বো। নিতাই কহিল,—পড়বি তো নিশ্চয়। তবে ভাবচি, ওখানেই থাকবি, না, বাড়ী থেকে রােজ ইস্কুলে যাবি। এ দুটার মধ্যে কোটা ভালাে, কাশিমের বুঝিবার শক্তি নাই। কাজেই নিতাইয়ের পানে নিরুত্তরে সে চাহিয়া রহিল। নিতাইও সেই কথা ভাবিতেছিল। এমন সময় দ্বারে শশীর গলা শুনা গেল। শশী কহিল, নিতাই আছে ? = १२ মনের মিল নিতাই যেন স্বপ্ন দেখিতেছিল:••এ-আহ্বানে সহসা জাগিয়া সে দ্বারপ্রান্তে চাহিল। শশী ততক্ষণে চৌকাঠ ছাড়াইয়া উঠানে পা দিয়াছে। নিতাই কহিল—এসসা শশীদ।। কি খপর ? শশী কহিল,-খপর গুরুতর,—তাই এসেছি। তােমাকে এর বিহিত করতে হবে ভাই। আমি একা...আমার দোসর চাই এ- ব্যাপারে। শশীর স্বরে উত্তেজনা। নিতাই বেশ একটু বিস্ময় বােধ করিল। নিতাই কহিল,-কি ব্যাপার, বলো তাে? কাশিমকে সে আদেশ করিল,আর একটা টুল এনে দে রে, কাশি... কাশিম ছুটিল টুল আনিতে। নিতাই কহিল-তােমার মুখ-চোখ দেখে মনে হচ্ছে••• কথা শেষ হইল না। শশী কহিল-গুরুতর ব্যাপার, বললুম কাশিম টুল আনিয়া দিলে শশী বসিল। বসিয়া কালিকার ঘটনা নিতাইকে খুলিয়া বলিল। শুনিয়া নিতাই একেবারে লাফাইয়া উঠিল, কহিল বলো কি! এত বড় আস্পর্ধা! শশী কহিল-থানায় যেতে পারতুম—কিন্তু ওদের পয়সার জোর আছে, তাছাড়া দলে ভারী। নিতাই কহিল—থানা কিসের! আমরা ও ছুচোগুলােকে শিক্ষা দিতে পারি না-নিজেরা ? এ-কথায় শশীর উৎসাহ বাড়িয়া গেল। সে কহিল,—তাইতাে তােমার কাছে এসেছি।
মনের মিল •• একটু পূৰ্বে নিতাই বাণীর কমল-বনের স্বপ্ন দেখিতেছিল ; শশীর কথায় সে স্বপ্ন ফঁশিয়া গেল,—বাণীর কমল-বনে যেন বিদ্যুতের চমক বহিল ! দুজনে বহুক্ষণ স্তব্ধ বসিয়া... সে-স্তব্ধতা ভঙ্গ ' করিয়া সহসা নিতাই ডাকিল,-ওরে কাশি... কাশিম সেই বঁখারির কাঠিগুলা লইয়া অদূরে নাড়াচাড়া করিতেছিল, নিতাইয়ের আহ্বানে মুখ তুলিয়া তার পানে চাহিল। নিতাই কহিল—তুই সেই চরণ ভটচায্যিকে জানিস্ ? কাশিম বিমূঢ়ের মতাে কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া কহিলনা। প্রদীপ্ত স্বরে নিতাই কহিল,-জানিস্ বৈ কি! সেই ফেরি ঘাটে সেদিন তােকে মারতে উঠেছিল,—তুই গঙ্গায় নেমে জল ছুড়ছিলি...আর সেই নৌকো থেকে নামতে যার গায়ে সে-জল লাগে রে। কাশিম উৎফুল্ল-কণ্ঠে কহিল—ও, , হ্যা, হা•••তিনি ? তেনাকে চিনি বৈকি। নিতাই কহিল,-তবেই আর-কি! আচ্ছা, তােকে একটা কাজ করতে হবে: শশী কহিল,—মার-ধর করবে ? নিতাই কহিল,—যদি করি ? নিতাই গম্ভীর দৃষ্টিতে শশীর পানে চাহিয়া রহিল। শশী কহিল,—ওরা মজা পাবে। না, না, মারধর নয় ! ফ্যাসাদ বাধে যদি... শেষে ৭৪ মনের মিল নিতাই হাসিল, হাসিয়া কহিল-দাঙ্গা তাহলে চাও না ? বেশ,-দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে না। তবে শিক্ষা দিতে হবে— এমন শিক্ষা দেওয়া চাই যাতে বাছাধনরা বােঝে, দলে ভারী না হলেও ফন্দীফিকিরে ওস্তাদ আমরা। শশী কহিল,-হা, হঁা—তাই। সেই হলেই ভালো হয়। তবে এক ঢিলে যদি সবকটাকে মারা যায়: নিতাইকহিল,—তাহলে একটু ভাবতে দাও। আমি ঐ খাচাটা তৈরী করতে-করতে একটা উপায় চিন্তা করি। খাচা না হলে’ কাশির ময়নাপাখী নিরাশ্রয় থাকবে কি না! নিতাই উঠিল, উঠিয়া কহিল,—ওরে কাশি, আয়...তাের খুঁচাটা আগে বানিয়ে দি... কাশিম মহা-উৎসাহে নিতাইয়ের হাতে বাখারিগুলা তুলিয়া নিতাই খাচা তৈয়ারীর কাজে মনঃসংযােগ করিল। গাছের ডালে বসিয়া একটা ঘুঘু ডাকিতেছে—তার কেমন সে সুরে শশীর মন এই সমাজপতিদের দৌরাত্ম্যের চিন্তা ছাড়িয়া ধীরে-ধীরে স্কুল-গৃহের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিল। সেই বাণীরূপিণী তরুণী • বিশ্বের আলােয় শতদল ফুটাইয়া তাহারি পাপড়ির উপর পা রাখিয়া দাড়াইয়া আছেন ! অপূর্ব সে দৃশ্য ! নিতাই ডাকিল,—শশীদা••• শশী চমকিয়া নিতাইয়ের পানে চাহিল। নিতাই কহিল, সেই বান্দীপাড়ায় যদি আমাদের ছাউনি ফেলি ? দিল। উদাস সুর! ক ?
মনের মিল শশী কহিল,—সে কথা তাে সবাই জানে। ওতে আর প্রতিকারের উপায় কি হবে ? নিতাই কহিল,—ওরি মধ্যে একটু রকমফের করে তােলা যায়: সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে শশী কহিল—কি রকমটা হবে, বুঝতে পারচি না। নিতাই কহিল,-একটা ফন্দী মাথায় এসেচে! এমন জাল পাতবো, ভাবচি, যাতে সে-জালে ওদের রুই-কাতলাগুলােকেও গঁথতে পারি !•••সদু বড়য্যেও সেখানে যায় না, ভাবব? শশী কহিল,—হয়তাে যায়...কিন্তু আমি ঠিক বুঝচি না নিতাই, ওদিক দিয়ে কিছু করা যাবে কি না শশীর মুখের পানে নিতাই ক্ষণেক চাহিয়া রহিল, তারপর কহিল,—সে লােকটাকে চেনে? যে ছুঁচোটা বাড়ীতে সেধিয়েছিল ? শশী কহিল, না,তার নাম-ধাম জানি না, তবে দেখলে চিনতে পারবে বৈকি। চোট লেগেছে, তার উপর গালে নাকি আব আছে। নিতাই কহিল,—তবে চলো, এ-কাজটা সেরে সেরে একবার আমেরিকা-আবিষ্কারে বেরুই। সে লােকটার পাত্তা যদি মেলে, তাহলে আমাদের প্রতিকারের উপায়ও ঠিক হয়ে যাবে । শশী কহিল,-বেশ। তুমি তাহলে কাজ সেরে নাও। ক্ষিপ্র কৌশলে নিতাই তখনি খাঁচা গড়িয়া ফেলিল। খাঁচা ৭৬ মনের মিল ? তৈয়ার হইলে কাশিমকে কহিল,-এই নে তোর খাচা । পাখীটাকে খাঁচায় রাখ...কিন্তু শুধু রাখলেই চলবে না। খাওয়াবার কি ব্যবস্থা করলি কাশিম কহিল,-কেন? ছাতু। সক্কালেই আমি ছিরুর দোকান থেকে ছাতু কিনে এনেচি। খেতেও দিয়েছি নিতাই কহিল,এক -এক কাজ করুকলা খুজেপেতে * ত্যালাকুচো আন্ দিকি...ওরা খেতে ভারী ভালােবাসে রে•••বুঝলি ? খাচা হাতে তুলিয়া ঘাড় নাড়িয়া কাশিম কহিল,-ত্যালাকুচো •••এখনি আনচি। কাশিম চলিয়া গেল। সে চলিয়া গেলে নিতাই কহিল, দাড়াও দাদা•••আমি একটা জামা গায়ে দিয়ে নি। ভদ্র-পাড়ায় যাচ্ছি, ভদ্র-বেশে যাওয়া উচিত।•••কি বলো? হাসিয়া শশী কহিল,নিশ্চয়। ৭৭ অষ্টম পরিচ্ছেদ টগরের প্রতাপ অনিন্দ আলাের নীচেই অন্ধকার.••এই সত্য প্রমাণ করিবার জন্যই যেন ফুলছড়িতে আর-একখানি নাটকের অভিনয় জমিবার সূচনা ঘটিল। সদু বাড়ুয্যের কিশাের বয়স্ক পুত্র আনন্দ কলিকাতায় থাকিয়া আই-এ পড়িতেছে। একটু বেশী বয়সেই সে ম্যাটিক পাশ করিয়াছে এবং পাশ করিয়া পড়ার নাম করিয়া সহরে থাকিবার ঝোঁকটা হইল বেশী। সদু বাঁড়ুয্যে ভাবিলেন, বংশে এই প্রথম একটা পাশ করিয়াছে•••দৈত্যকুলে প্রহলাদ জন্মিয়াছে। তাই একটির পর আর-একটি পাশের লােভ সদু বাড়ুয্যের মনকেও পাইয়া বসিল। । কাজেই আনন্দর সহরে যাওয়ায় প্রতিবন্ধক ঘটিল না। সদু বাড়ুয্যের বাড়ীর পাশেই * বাঙলা স্কুল। পাড়ার মাতব্বরদের চঁাদায় এ স্কুলের সৃষ্টি হয় দশ বছর পূর্বে। সদু বাঁড়ুয্যে সেক্রেটারি এবং যে-বাড়ীতে স্কুল, সে-বাড়ীর মালিকও সদু বাঁড়ুয্যে। স্কুলকে বাড়ী দিয়া মাসে-মাসে দশটা করিয়া টাকা ভাড়া লয় সদু। স্কুলের পিছন দিকে থাকে স্কুলের মাষ্টার কেশব চক্রবর্তী। কেশবের সংসারে আছে তার আটটি ছেলেমেয়ে আর তৃতীয় পক্ষের কিশােরী পত্নী টগর। ৭৮ মনের মিল টগর এই গ্রামেরই মেয়ে। শশীর বাড়ীর পাশে টগরের বাপ অবিনাশ রায়ের বাস। অবিনাশ কলিকাতার কোন্ অফিসে কেরাণীগিরি চাকরি করে••ফুলছড়ি হইতে ডেলি- প্যাসেঞ্জারি করিয়া চাকরি রাখা কঠিন ' এবং দুঃসাধ্য ; তাই সে কলিকাতায় পাতিয়াছে আস্তানা। শনিবার-শনিবার বাড়ী আসে, আবার সােমবার ভােরের ট্রেনে বাহির হইয়া যায়। চাকরির উপর কলিকাতায় এক ভদ্রলােকের বাড়ীতে তার দুটি ছেলেকে পড়ায় এবং পড়ানাের বদলে বড়লােকটি অবিনাশকে তার গৃহে থাকিতে এবং দুবেলা দুমুঠো খাইতে দিয়া কৃতার্থ করিয়াছেন। অবিনাশ মাহিনা পায় চল্লিশ টাকা, ঘাড়ে চার- চারটি মেয়ে...টগর সবার বড়•••যােল বছর বয়সেও তাকে পাত্রস্থ করিতে পারে না! দুশ্চিন্তায় অবিনাশ কাতর•••এমন সময় কেশবের সংসার শূন্য করিয়া তার দ্বিতীয়-পক্ষ লইল ইহলােক হইতে বিদায়। স্ত্রীর সঙ্গে বাস করা কেশবের এমন অভ্যাস হইয়া গিয়াছে যে, স্ত্রীবিহীন জীবন তার পক্ষে দুঃসহ হইয়া উঠিল এবং সদু বাড়ুয্যের মধ্যস্থতায় অবিনাশের মেয়ে টগরকে সে তৃতীয় পক্ষে বরণ করিয়া জীবনকে আবার খাড়া করিল। সদু বড়য্যের বাড়ীতে টগরের যাতায়াত ছিল। সদু বড়য্যের গৃহিণীর ফাই-ফরমাস খাটিত। তার মাথার পাক চুল তােলা, বড়ির ডাল বড়ির ডাল বাটিয়া বড়ি দেওয়া, গা-হাত টেপা•••এ-সব কাজে টগরের কখনাে ত্রুটি ছিল না। বাড়ীতে ভালো কিছু খাবার করিলে টগরকে তার অংশ দিতে মনের মিল সদুবাবুর গৃহিণীর কখনাে ভুল হইত না। এমনি সেবা- পরিচৰ্য্যায় এ-বাড়ীর সঙ্গে টগরের সংযােগ বেশ বেশ নিবিড় হইয়াই উঠিয়াছিল। টগরের উপর ‘আনন্দর প্রথম যখন দরদ মমতা জাগিল, তখন আনন্দর বয়স আঠারো বছর, টগরের বয়স বারো। স্বাস্থ্য ভালো-গড়ন ভালো•••লেখাপড়ায় মন আছে-টগরের পানে ও-বয়সের ছেলে ফিরিয়া চাহিবে—ইহাতে আশ্চৰ্য্য হইবার কিছু নাই! বিশেষ এ-বাড়ীতেই যখন টগরের অনেকখানি সময় কাটে••• এবং••• আনন্দ নাটক-নভেল পড়ে। নাটক-নভেল পড়িয়া মনে- মনে সে বাসনা করে, সে যেন ঐ উপন্যাসের নায়ক আর টগর নায়িকা। টগরকে ডাকিয়া ছাদে উঠিয়া বলে- আমার ঘুড়ির ধরাই দিয়া যাও ! মার কাছে টগর বসিয়া আছে, আনন্দ আসিয়া বলে,-টগর, আমার জামার দুটো বােম ছিড়ে গেছে, সেলাই করে দেবে ? মা বলেন টগরকে--যারে টগর, তাের আনন্দদারজামার বােতাম••• নিবিষ্ট মনে টগর বােতাম সেলাই করে আর আনন্দ তার পানে চাহিয়া থাকে বিমুগ্ধ বিহ্বল নেত্রে। নাটক-উপন্যাসের বাছাবাছা-পরিচ্ছেদগুলা মনে জাগে। অনেক ভাবে, ফশ, করিয়া বলিবে কি-টগর তােমায় আমি ভালােবাসি। কিন্তু বলিতে পারে না•••সে কথায় টগর যদি ফেঁাশ করিয়া ওঠে...যদি কাহাকেও বলিয়া দেয়।
মনের মিল অনেক সাধ জাগে, কিন্তু সে-সব শুধু কল্পনাতেই থাকে—অলীক কল্পনা লইয়াই আনন্দর দিন কাটে। তারপর পাশ করিয়া কলিকাতায় আসিবে, হঠাৎ এমন সময় কেশব বিবাহ করিয়া বসিল টগরকে••বাপ সদু বঁড়িয্যে দাড়াইয়া থাকিয়া এ-বিবাহ দিলেন। আনন্দর বুকে লক্ষ্মণের শক্তিশেল পড়িল! বিবাহের দিন কতবার সে ভাবিয়াছে, টগরকে একান্তে ডাকিয়া বলিবে—ঠিক সেই উপন্যাসে যেমন লেখা থাকে, চলো, আমরা গায়ে ছাই মাখিয়া, হাতে কমণ্ডলু লইয়া সন্ন্যাসী সন্ন্যাসিনী সাজিয়া হিমালয়ে যাই। কিন্তু এতটুকু ফাক পায় নাই। বিবাহ সে চোখে দেখে নাই, এবং লুচী-তরকারিও সেই উপন্যাসের নায়কের মতো স্পর্শ করে নাই। তারপর সহর কলিকাতা। সেখানকার আবহাওয়া এবং সে আবহাওয়ায় অভিজ্ঞতা বাড়িলে সে ঠিক করিয়া লইল যে, বুড়া কেশবকে টগরের কখনােই মনে ধরে নাই—ধরিতে পারে না। তাই সে মনে-মনে কল্পনা করিত, একদিন সে যদি টগরকে... কলিকাতায় থাকিবার সময় বসিয়া-বসিয়া আনন্দ ভাবে, এবারে দেশে গিয়া টগরকে মনের কথা বলিবে, কিন্তু দেশে আসিয়া টগরকে নিরালায় পায় না। কেশবের আটটা ছেলে- মেয়ে যেভাবে বাড়ীতে অষ্টবজের বাঁধন আঁটিয়া আছে, সেখানে মাথা গলানো দায়।
মনের মিল রাত্রি প্রায় আটটা। ছেলে-মেয়েদের লইয়া কেশব পারে তার দ্বিতীয়পক্ষের শ্বশুরবাড়ীতে গিয়াছে, কি নাকি পাকা দেখার নিমন্ত্রণ। বাড়ীতে টগর একা। রূপসী যােড়শী স্ত্রীকে লইয়া হটর-হটর করিয়া ঘুরিতে কেশবের সাহস হয় না! ওপারে চটকলের সাহেব-সুবাে আছে,—হাতখানা যদি ধরিয়া ফ্যালে ? তার উপর পথে-ঘাটে খােট্টার আর কাবলীর যে-রকম আমদানী হইয়াছে...পাচটা ছেলে-ছােকরাও আছে: বাঁকা সিথি কাটিয়া চোরা-চোখে বেপরােয়া ভাবে টপ্পা গান গাহিয়া বেড়ায় টগর একে এই গ্রামেরই মেয়ে—ছেলে-বয়স হইতে ঐ-সব ছেলে-ছােকরার মধ্যে কাহারও-কাহারও সঙ্গে হয়তো খেলা-ধূলাও করিয়াছে—এখন তাহার প্রদীপ্ত শিখার মতো রূপ...আর টগরের যে-রকম মিশুক স্বভাব•••সকলকেই বিশ্বাস করে•••তাকে যদি ছেলে-ছােকরারা ফুলঝুরি বা হাউই করিয়া... কেশবের গৃহে উঠানে একরাশ জ্যোৎস্না আসিয়া পড়িয়াছে। কোণে টগরের হাতে-পোঁত বেলফুলের গাছে অজস্র ফুল সেগুলার পাশে হাহানার ঝড়..দাওয়ায় মাদুর পাতিয়া, হারিকেনের সামনে উপুড় হইয়া শুইয়া টগর নভেল পড়িতেছে— বঙ্কিমের চন্দ্রশেখর। এ-বই আনিয়াছে দীনু মুখুয্যের বউএর কাছ হইতে...বউ সহরের মেয়ে.••বাংলা নাটক-নভেল কেনে। টগর তার কাছ হইতে বই আনে, আনিয়া পড়ে, পড়িয়া ফেরত দেয়, ফেরত দিয়া আবার নূতন বই আনে। १२ মনের মিল টগর পড়িতেছিল সেইখানটা—সেই ভীম। পুষ্করিণী হইতে ফিরিয়া শৈবলিনী চন্দ্রশেখরের কথামতো তাঁর অন্নব্যঞ্জন সজাইরা ঢাকা দিয়া রাখিয়া ঘরে গিয়া শুইয়াছে.আর চন্দ্রশেখর শৈবলিনীর রূপরাশি দেখিয়া ভাবিতেছেন, শাস্ত্রানুশীলনে ব্যস্ত ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের ঘরে এ-রত্ন তিনি কেন আনিলেন? পড়িতে-পড়িতে টগরের বুকের মধ্যে কেমন হু-হু করিয়া উঠিল ! বইয়ের পাতা হইতে মুখ তুলিয়া টগর চাহিল আকাশের পানে। জ্যোৎস্নায় ফিনিক্ ফুটিয়াছে-দূরে কোন গাছে একটা পাখী ডাকিতেছে। বুকে একরাশ নিশ্বাস মনে হইল, নভেলের এ শৈবলিনী যেন টগরই! টগর একদিন কত স্বপ্ন দেখিত•••হাসি গান আলাের স্বপ্ন ! ভাবিত, বিবাহ হইলে স্বামীর আদরে সােহাগে.. বিবাহ হইয়াছে। স্বামীর যে-ছবি মনে আঁকিত, অর সঙ্গে কেশবের কোথাও মেলে না ! ভালােবাসার কি জানে কেশব ? কেশবের গৃহে রান্নাবান্না—তার ঐ আটটা ছেলে-মেয়ের তম্বি সহা—ছেলেমেয়েরা তাকে মানেও না•••বড়-মেজ তাকে টগর বলিয়া ডাকে, কথায়-কথায় তাকে শাসায়, চোখ রাঙায় ! কি করিয়া যে টগরের দিন কাটে! সখ হয়, পরিপাটি করিয়া চুল বাঁধে, কপালে ছােট খয়েরের টিপ আঁকে, রং-করা শাড়ী পরে—কিন্তু মিথ্যা! সে সাজ কেশব কোনদিন চোখ তুলিয়া দেখিবে না ! লােকে বলে, টগর রূপসী। কিন্তু, কেশব ? তার সম্পর্ক টগরের দেহখানা লইয়া••• ৮৩ মনের মিল টগরের যে মন আছে, সে মনের খোঁজ কেশব কোনােদিন লইল না। হঠাৎ নিঃশব্দে কে আসিয়া চাপা-গলায় ডাকিল, টগর... চমকাইয়া ধড়মড় করিয়া টগর উঠিয়া বসিল—চাহিয়া দ্যাখে, আনন্দ। কহিল,—তুমি হঠাৎ? আনন্দ বলিল,-হ্যা। কলেজের ছুটি হলো। আমি এই সন্ধ্যার একটু আগে বাড়ী এসেছি। টগর শুধু বলিল, ও। আনন্দ বলিল,-তোমার ছেলে-মেয়েদের দেখছি না যে? --না। তারা নেমন্তন্ন গেছে ওপারে—সিধুর মামার বাড়ীতে -পাকা দেখা। —কেশবঠাকুর ? সঙ্গে গেছে। আনন্দর মনে হইল, তার পৃথিবীতে আজ বসন্তোদয় ? হৃদয়কে মেলিয়া ধরিবার চমৎকার সুযোগ। কিন্তু কি বলিয়া শুরু করে ? টগরের পানে চাহিল। টগরের সারা গায়ে জ্যোৎস্না পড়িয়াছে•••কি অপরূপ তার শ্রী ফুটিয়াছে !•••টগর চাহিয়া আছে আকাশের পানে•••উদাস দৃষ্টি। বইখানার উপর নজর পড়িল, টানিয়া দেখিল, চন্দ্রশেখর। বুকে এক-ঝলক বসন্তের বাতাস••আনন্দ কহিল,—চন্দ্রশেখর পড়ছো? ৮৪ মনের মিল টগর বলিল,-হু••• তার কণ্ঠ স্বপ্নাচ্ছন্নের মতাে। বইয়ের যে-পাতা পড়িতেছিল, তার কোণটা ছিল মােড়া— সে-পাতার কটা লাইনে আনন্দ চোখ বুলাইয়া লইল। দু’একখানা পাতাও উল্টাইলফষ্টরের লাইনটা চোখে পড়িল, নাউ অর নেভার! আনন্দ ভাবিল, ফষ্টর যেন তাকেই ইঙ্গিত করিতেছে । কি বলিতে যাইতেছিল—বাস্পোচ্ছ্বাসে কণ্ঠ রুদ্ধ•••কাসিয়া গলা সাফ করিয়া আনন্দ ডাকিল, টগর... টগর তার পানে চাহিল, বলিল,-কি ? -নভেল যে পড়াে, এর সব কথা বুঝতে পারো? টগর অবাক ! অবাক ! প্রশ্নের মর্ম বুঝিল না। প্রশ্ন করিল, -তার মানে ? -না•••মানে, জিজ্ঞাসা করছি, অনেকে নভেল পড়ে, শুধু ঐ গল্পই বােঝে, কিন্তু নভেলে যেসব লােকের কথা থাকে, তাদের দুঃখ কোথায়, সুখ কিসে, কি তারা চায়, বােঝেনা••• আনন্দর কথাগুলা খুব স্পষ্ট নয়•••কেমন বাধিয়া-বাধিয়া যাইতেছে। টগর কোনাে জবাব দিল না। আনন্দ বুঝিল, তার কথার মর্ম টগর উপলব্ধি করে নাই! তাই সে কাসিয়া আবার গলা সাফ করিল। গলা সাফ করিয়া আনন্দ বলিল, চন্দ্রশেখর পড়ে আমার কিন্তু তােমার কথা মনে হয়। ৮৫ মনের মিল টগর আশ্চর্য হইয়া আনন্দর পানে চাহিল। আনন্দ বলিল,--আমার মনে হয় তুমি যেন শৈৱলিনী...আর কেশবঠাকুর তােমার চন্দ্রশেখর..নয় ? শৈবলিনী সুন্দরী, শৈবলিনীর বয়স কম•••তােমার সঙ্গে মেলে। আর, চন্দ্রশেখরও কেশবঠাকুরের মতাে বুড়ো মানুষ। চন্দ্রশেখর পুঁথি পড়ে, কেশব- ঠাকুর ছেলে পড়ায়। টগরের ভারি মজা লাগিল। হো-হো করিয়া হাসিয়া টগর বলিল,-আর, আমার প্রতাপ ? আনন্দর মাথায় খানিকটা ঘুর্ণি-হাওয়া...তার মাথা ঘুরিয়া গেল ! কোনােমতে আনন্দ বলিল,-নেই কি ? —কোথায়? এ্যা? হাসিয়া টগর যেন লুটাইয়া পড়িবে । আনন্দর বুকে যেন হাতুড়ি পিটিতেছে ! কিন্তু... আনন্দ ভাবিল, না, একটু সাহস.••বাড়ীতে কেহ নাই.. টগর একা•••বাছিয়া-বাছিয়া যখন চন্দ্রশেখর পড়িতেছে এবং হাসিয়া কথা কহিতেছে•••আনন্দ বলিল, যদি বলি, আমি তােমার প্রতাপ ? —তুমি! টগর এবার হাসিয়া লুটাইয়া পড়িল...অনেক- ক্ষণ হাসিল, তারপর বলিল,—কি করে? কবে আমি তােমার সঙ্গে নদীর ঘাটে বসে নৌকো গুণেছি ? আকাশের তারা গুণেছি ? জলে সাঁতার কেটেছি ?? এ-কথার সহজ সারল্যে আনন্দ বিহ্বল, বিভাের •••বলিল, নৌকো গােণা, তারা গােণ-ও-সব নভেলেই চলে। আসলে, ৮৬ মনের মিল এই দ্যাখাে, কলকাতায় বসে-বসে’ কেবল তোমার কথাই, সেইসব কথা নিয়ে তােমার নামে পদ্য লিখেছি। বলিয়া পকেট হইতে ঝকঝকে বাঁধানো একখানি ছােট খাতা বাহির করিয়া টগরের হাতে দিল। খাতাখানা দেখিয়া টগর বলিল,—এই এত পছ•••এসব তুমি লিখেচো? য় । চোখে বিজয়ী-বীরের দৃষ্টি...আনন্দ বলিল,-হ্যা। আর এ- সব পদ্য তােমার নামে লেখা । টগর বলিল—কলকাতায় তাহলে তুমি লেখাপড়া করােনা, শুধু আমার নামে পছই লেখাে ? আনন্দ একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল,-তুমি কি বুঝবে, তােমার জন্য আমার•• কথাটা শেষ হইল না। টগর অবাক! আনন্দর পানে ক্ষণেক চাহিয়া থাকিয়া টগর বলিল,—পড়বে এ পদ্য ? পড়বে কি। তােমাকে পড়াবার জন্যই তাে আমার লেখা•••এ আমার মনের কথা:••এই দ্যাখাে, এ-খাতার নাম দিয়েছি:•• খাতার প্রথম পাতা আনন্দ দেখাইল। বড়-বড় অক্ষরে লেখা ‘মনের কথা...তারপর নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আমি পড়ি, তুমি শােননা। ৮৭ মনের মিল খাতার একখানা পাতা খুলিয়া আনন্দ সুরু করিল : তােমার কথাই ভাবছি আমি রাত্রি-দিবা আমার আঁধার-মনে তুমি উজল বিভা! আমি হেথায় মগ্ন আছি তােমার ধ্যানে- তুমি যাকে নিয়ে আছে—সে কি তােমার মূল্য জানে ? পাতা উল্টাইয়া আর-একটা কবিতা পড়িল : তোমার আসন আমার হৃদয়-মন্দিরে, এমন আসন তােমারে কে দিতে পারে ? আপন বলিয়া পাশে পাইয়াছ যারে- সে মূঢ় বৃদ্ধ হৃদয় ফেলিবে চিরে। টগর অবাক! কি এ-সব•••পাগলের প্রলাপ যেন... হঠাৎ বাহিরে ও-বাড়ীর বিন্দুর গলা! বাহির হইতে বিন্দু ডাকিল, টগর আছিস্? আনন্দ কঁপিয়া উঠিল...ঝ। করিয়া খাতাখানা পকেটে পুরিয়া আনন্দ একলাফে সামনের ঘরে গিয়া ঢুকিল। বিন্দু উঠানে আসিল... টগর বলিল,-বৌদি ? তুমি হঠাৎ? -হ্যা। বাড়ীতে সত্যনারাণ ছিল, তাই শিনি এনেছি তুই ভালোবাসিস...একটা পাত্র আন্। টগর পাত্র আনিল...আনিয়া শিনি বাতাসা সন্দেশ লইল। মাদুরের সামনে একজোড়া জুতা•••বিন্দু দেখিল, বলিল, কার জুতাে রে? d ৮৮ মনের মিল আন্দদার। —সদুবাবুর ছেলে আনন্দ ? -হু। এসেছে। ঐ ঘরে কি একখানা বই খুজছে । ঘরে বসিয়া আনন্দ তারিফ করিল টগরের বুদ্ধির । টগর হাকিল,-বই পেলে আন্দদা? ভিতর হইতে আনন্দ জবাব দিল,—না। হাসিয়া টগর বলিল,-অন্ধকারে অন্ধকারে কোথায় হাতড়াবে ? হারিকেনটা দেবো? ভিতর হইতে আনন্দ বলিল,-দাও। বিন্দু বলিল, এরা কোথায় গেছে—ছেলেরা ? টগর বলিল,-নেমন্তন্ন গেছে, ওপারে। -ও! বলিয়া বিন্দু চলিয়া গেল। বিন্দু বাহির হইয়া গেলে টগর বলিল, আনন্দকে উদ্দেশ করিয়া,বেরিয়ে এসো, চোরের মতাে আর অন্ধকার-কোণে ফাকতে হবে না। আনন্দ আসিল বাহিরের দাওয়ায়। টগর বলিল, বাড়ী যাও। এ-রকম করে আর এসো না। আমি আর-একজনের বউ-লােকে দেখলে নিন্দা করবে। —কিন্তু•••আনন্দ মরিয়া হইয়া উঠিল, বলিল,--আমি তোমায় ভালােবাসি টগর•••নতুন ভালােবাসা নয়—অনেক দিন থেকে। হাসিয়া টগর বলিল,-সত্যি? কিরকম ভালােবাসস ৮ মনের মিল আন্দদা—এই সব নভেলে যেমন লেখা থাকে ? •••কথার শেষে টগর আবার হাসিল। আনন্দ হতভম্ব। বলিল,-হাসলে যে? —তুমি হাসাচ্ছে। আর আমি হাসবে না? বাড়ী যাও আন্দদা। ভালো যদি বেসে থাকো, উপায় তাে নেই । আনন্দ ফেঁাশ করিয়া উঠিল। -কেন নেই উপায় ! —আমি আর-একজনের স্ত্রী। -তাতে কি ? -মাথা খারাপ করো না। যাও, বাড়ী যাও। যে-কথ বললে, আর বলো না...বলতে নেই। -না,••••••না--তােমাকে আমি বুঝিয়ে দেবাে টগর•• —কিন্তু এ-সব বােঝবার মতো বুদ্ধি আমার নেই আন্দদ। ••সত্যি, কি বিপদে আজ ফেলেছিলে আমায় বলো তাে? বিন্দু-বৌ এসে দেখে গেল•••কিছু মনে করে যদি... -কি মনে করবে ! হু ! ওঁর কথা শােনাে নি ? ওই উজবুক চরণ ভটচায্যি•••তার ওপরে ওঁর••• —ছি ছি ছি, এ-সব কথা মুখে উচ্চারণ করাে না, মুখে ঘা হবে। তার চেয়ে বলে। যদি, আমি গিয়ে জ্যাঠাইমাকে বলবো তোমার বিয়ে দিতে। জ্যাঠাইমা অর্থে আনন্দর মা! সদু বাঁড়ুয্যের গৃহিণী । নিশ্বাস ফেলিয়া আনন্দ বলিল, বিয়ে আমি করছি কি না। টগর বলিল, বিয়ে না করে, বেশ, করাে না। তাবলে ১০ মনের মিল আর-একজনের বৌকে ভালােবাসা জানাতে এসে না। আমি বারণ করছি। আমি তােমার এ-কথা শুনবাে না। তুমি বাড়ী যাও। টগরের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ এবং কথাগুলা বৈশ স্পষ্ট। পর••• বেত-খাওয়া কুকুরের মতো আনন্দ চলিয়া গেল। ৯১ নবম পরিচ্ছেদ সুমিত্রার স্বপ্ন ; স্কুলের বারান্দায় বসিয়া সুমিত্রা একখানা চিঠি পড়িতেছিল। চিঠি ইংরাজীতে, টাইপ করা•••মিশ-হোেম হইতে আসিয়াছে। সেক্রেটারী লিখিয়াছেন,—ফুলছড়ির স্কুলে বাের্ডিংয়ের জন্য পাকা ঘর তৈয়ারীর প্রস্তাব সােসাইটি মঞ্জুর করিয়াছে ; এবং মিশন-হোম তার ব্যয়নিৰ্ব্বাহের জন্য টাকা শীঘ্র পাঠাইবে। তাছাড়া, চঁাদার যে-প্রতিশ্রুতি মিলিয়াছে, হিসাবে দেখা যাইতেছে, তাহাতেও প্রায় সাত-আটশাে টাকা সংগ্রহ হইবে। এ টাকাগুলা সুমিত্রার কাছে পাঠানাে হইতেছে। কাজ শুরু করিয়া দেওয়া হাে•••কনট্রাক্টার শীঘ্র আসিবে । এবং সুমিত্রাকেই সকল ব্যাপারের তত্ত্বাবধান করিতে হইবে। সুমিত্রা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিল। ছেলেমেয়েদের সংখ্যা যে- ভাবে বাড়িতেছে, তাহাতে এ-ঘরে কুলাননা পরে সম্ভব হইবে না। তাছাড়া পাতার ঘর—বেশী জোরে জল-ঝড় হইলে ঘর রক্ষা করা দায়! এবং মেয়েদের আর ছেলেদের জন্য আলাদা ঘর চাই। মঞ্জুর কয়েক মাস ধরিয়া লেখালেখির ফলে মিশ-হােম তার প্রস্তাব যে করিয়াছে, ইহাতে সুমিত্রার আনন্দের সীমা নাই । একটা বেয়ারা আসিয়া সংবাদ দিল, দুয়ারা গ্রামের যে-ছেলেটি মনের মিল জ্বর-গায়ে বাড়ী গিয়াছিল, তার সে-জ্বর খুব বাড়িয়া উঠিয়াছে । তার বাপ, না খুড়া, কে আসিয়াছে দেখা করিতে। ছেলেটির চিকিৎসার ব্যবস্থা না করিলে নয়। সুমিত্রা তখনি উঠিল। স্কুলের প্রান্তসীমায় ক্যাম্বেলের-পাশ ডাক্তার সুহাস দত্তর আস্তানা। সুমিত্রা তার কাছে ছুটিল । ডাক্তার তখন ছােট্ট ডিপেনসারিতে দাড়াইয়া একটা শিশি ধুইতেছেন। সুমিত্রা কহিল,-আপনাকে এখনি একবার যেতে হবে আমার সঙ্গে...দুয়ারায়। স্কুলের একটি ছেলের খুব জ্বর... সুহাস ডাক্তার কহিলেন—আমি দশ মিনিটে তৈরী হচ্ছি । তাদের ওখান থেকে লােক এসেচে ? সুমিত্রা কহিল-এসেছে। আমিও সঙ্গে যাবো। —আপনি। ডাক্তার সবিস্ময়ে সুমিত্রার পানে চাহিলেন। সুমিত্রা কহিল,-বেড়াতে-বেড়াতে যাবােখন। সুমিত্রা আসিয়া লােকটির সঙ্গে দেখা করিল, তাকে আশ্বাস দিয়া সংবাদ লইল, দুয়ার’ কত দূরে ! লােকটি কহিল,-ফুলছড়ির পরেই দুয়ারা। সুমিত্রা নিজেকে সজ্জিত করিয়া লইল। তারপর ডাক্তার আসিলেন বাইসিক্ল লইয়া। বাইসিক্লে আর চড়া হইল না। তিন- জনে দুয়ারার দিকে চলিল। ফুলছড়ির বাদী-পাড়া ছাড়াইয়া দুয়ারা। মাঠের প্রান্তে কয়েকখানা পাতার কুঁড়ে—দারিদ্র্যের জীর্ণতা রী-রী করিতেছে। নােংরা পল্লী।
মনের মিল সুমিত্রা কহিল,-এ নোংরায় অসুখ করবে না? সুহাস ডাক্তার কহিলেন,–এরা বেঁচে থাকে কি করে’ সেইটেই ভাৰবার কথা ! সুমিত্রা বলিল,--এসব দেখে বুক কেঁপে ওঠে—কি করে’ বাঙালী জাত আমরা আত্মঘাতী হচ্ছি। জমিদার আছেন কি করতে? সুহাস ডাক্তার কহিল,-গ্রামের জমিদার শুধু খানা আদায় করে। এরা কিসে ভালো থাকবে, সেদিকে এতটুকু লক্ষ্য নেই। সুমিত্রা বলিল,-কিন্তু, এদের কাছ থেকে টাকা আদায় করবেন, এদের ভালাে-মন্দ দেখবেন না? জমিদার মানে তো, রাজা ! সুহাস হাসিলেন, হাসিয়া কহিলেন—তার কি দায় পড়েছে অত দেখতে। তার সম্পর্ক ঐ টাকার সঙ্গে... সুমিত্রা -- কহিল—আমাদের স্কুল এ-জায়গায় খুলে বড় ভালাে কাজই করা হয়েছে। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হলে যদি তাদের দুর্গতি ঘােচে••• রােগীর গৃহও তেমনি•••যেন ছােট একটা গহ্বর। আলো- বাতাসের নাম নাই। ঘরে কে আছে, তাও লক্ষ্য হয় না। আলাে চাওয়া হইল—একটা কেরােসিনের ডিবা আসিল। দেখিয়া সুমিত্রা শিহরিয়া উঠিল ; কহিল—নিয়ে যাও, নিয়ে যাও ও আলাে। কেরােসিনের ধোঁয়ায় রােগীর বিপদ ঘটবে। ; ১৪ মনের মিল তবে খুব রােগী দেখা হইল—কেশ, নিউমোনিয়া। সাংঘাতিক হয় নাই। কিন্তু এ-রােগের পরিচৰ্যা এখানে কি করিয়া হয়? সুমিত্রা বুঝাইয়া বলিল, স্কুলে ছেলেটিকে লইয়া চলে-- সেখানে হাসপাতাল আছে। ছেলের মা-বাপ সঙ্গে থাকিবে, চিকিৎসার সুবিধা হইবে । বহু আলোচনায় তাদের রাজী করা গেল। সুমিত্রার মূর্তি, সুমিত্রার মুখের কথা ••তারা গলিয়া গেল। তাছাড়া তারা তো পরিচয় পাইয়াছে—গরীব-দুঃখী বলিয়া কেহ সংবাদ লয় না; আর ইনি আর ইনি কত সাধিয়া ছেলের লেখা-পড়ার ভার লইয়াছেন! এমন দরদ-ভরা কথা.গরীব-দুঃখী ইহাতে আর ভুলিবে না? এমন কথা তারা কোনাে পুরুষে কখনাে শােনে নাই । পরের কাছ হইতে পায় শুধু আদেশের হুমকি, তাড়া আর লাঞ্ছনা, তিরস্কারের তীব্র হুঙ্কার । সুমিত্রা কহিল,—ডুলি পাওয়া যাবে? ছেলেটির বাপ কহিল—আমি কোলে করে নিয়ে যাবাে। সুমিত্রা কহিল-বেশ, ঢাকা দিয়ে নিয়ে চলো। ডাক্তার বাবু বাইসিক্লে যাচ্ছেন, আমি তােমাদের সঙ্গে যাবে: কথাবার্তা পাকা হইলে আয়ােজনে বিলম্ব ঘটিল না। ছেলেটিকে বুকে তুলিয়া তার বাপ সলীম তখনি পথে বাহির হইল। সুমিত্রা এবং ডাক্তার সঙ্গে চলিল।
মনের মিল • সুমিত্রা কহিল–আপনি আবার হাঁটবেন কেন ডাক্তারবাবু ? আপনি বাইসিক্লে চড়ে এগিয়ে যা। সুহাস কহিলেন—একসঙ্গে যাচ্ছি, মন্দ কি। সুমিত্রা কহিল—আপনি আগেই যা। এর বিছানার ব্যবস্থা করিয়ে ফেলুন। আমরা আস্তে-আস্তে যাচ্ছি.. সুহাস রাজী হইলেন না। সুমিত্রার অনুরােধের অন্ত নাই। অগত্যা সুহাসকে বাইসিক্লে চড়িয়া অগ্রসর হইতে হইল। সুমিত্রা তখন সলীমের সঙ্গে তার ঘরকর্ণার কথা পাড়িল । বেচারী সলীম ! একটু ক্ষেত-খামার আছে। সংসারে নিজে আর বড় ছেলে—দু’জনে ক্ষেতে কাজ করে। কতকগুলা গরু আছে, হঁাস আছে। গরুর দুধ গ্রামের কেহ লয় না—জাতে সে মুসলমান•••তাই। ভিন্ন গ্রামের এক গােয়ালার কাছে গিয়া প্রত্যহ দুধ বেচিয়া আসে। গরজ সলীমের, কাজেই দামে তার পােষায় না! হাঁসে ডিম দেয়—ডিম বেচিয়া দু’ পয়সা আসে,তবে, জুলুমও আছে। ফুলছড়ির বাবুরা যা-খুশী দাম দেয়। জমিদার বাড়ুয্যের মেজাজ ভারী কড়া। খাজনার পয়সা ঠিক দিনে দেওয়া চাই। না দিলে অকথা, কুকথার অন্ত থাকে ...কথার উপর তার লােকের হাতে কাণ-মলা প্রভৃতি গরু-বাছুর অবধি টানিয়া লইয়া যাইতে ত্রুটি রাখে না। সুমিত্রা কহিল—গরু-বাছুর নিয়ে যায় ? আদালতের হুকুমে ? সলীম্ কহিল-না। এঁরাই আদালত, মা•• ঘটিয়া যায় ।
মনের মিল সুমিত্রা কহিল-বটে! কিন্তু তা তো নিয়ে যেতে পারে না। আইন নয় ! নিশ্বাস ফেলিয়া সলীম্ কহিল—ওঁরাই আইন, ওরাই আদালত। গরীবের আর আইন-আদালত কোথায় ? সুমিত্রা কহিল-ই। এমনি কথায়-কথায় সকালে যখন স্কুল-গৃহে আসিয়া পেীছিল, খেলা তখন সাড়ে-নটা বাজিয়া গিয়াছে। সুহাস ডাক্তার ব্যবস্থাদি করিয়া রাখিয়াছেন। সুতরাং কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটিল না। সলীমের ছেলের ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করিয়া সলীমের স্থান-নিৰ্দেশান্তে সুমিত্রা স্কুলে ফিরিয়া দ্যাখে, বিজলী আসিয়া বসিয়া আছে। সুমিত্রাকে দেখিয়া হাসিয়া বিজলী কহিল—Good morning Miss Florence Nightingal.... সুমিত্রা কহিল,-তঁার পায়ের ধূলাে হবার যােগ্যতা যেন অর্জন করতে পারি, সেই প্রার্থনা করাে বিজলী:.. বিজলী কোনাে কথা কহিল না•••স্থির দৃষ্টিতে সুমিত্রার পানে চাহিয়া রহিল। সুমিত্রা কহিল--কি খপর? চাকরি হলাে? হাসি-মুখে বিজলী কহিল—নিশ্চয়। সুমিত্রা কহিল—ভালাে।•••তা, চাকরিতে না গিয়ে এখানে এ-সময় ?
মনের মিল বিজলী কহিল-একটু কাজ ছিল••• সুমিত্রা কহিল—কি ? বিজলী কহিল—যে পুণ্য-ব্রতই তুমি নাও সুমিত্রা, একটা কথা শুধু মনে রেখাে... সুমিত্রা কহিল—কি কথা? বলাে বিজলী কহিল,আমার ভবিষ্যৎ-রচনার এই যে আয়ােজন, এ-আয়ােজনটুকু তােমারি সম্বর্ধনার জন্য... কথার অর্থ ঠিক বুঝিতে না পারিয়া সুমিত্রা বিজলীর পানে চাহিল। বিজলী তার সে দৃষ্টি লক্ষ্য করিল। সে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল-মানে, ছেলেবেলায় দু’দিক থেকে এসে দুজনে একসঙ্গে মিশেছি। আমাদের হাসি-গল্প একসঙ্গে...অনেক স্বপ্ন গড়েচি, তাও একসঙ্গে...আমাদের জীবনটুকু এমনি একসঙ্গে মিশে বয়ে যেন চলে চিরদিন••• এই আশ্বাসটুকু যদি পাই.•• সুমিত্রা দিগন্তের পানে চাহিয়া রহিল। তার দৃষ্টি উদাস। সে যেন কালের যবনিকার অন্তরালে বহু দূর ভবিষ্যৎ দেখিবার চেষ্টা করিতেছে। বিজলী সুমিত্রার কাছে অগ্রসর হইয়া আসিল—সুমিত্রার একখানা হাত নিজের হাতে লইয়া ডাকিল—সুমিত্রা•• সুমিত্রা কেমন চমকাইয়া উঠিল-ধীরে-ধীরে হাত মুক্ত করিয়া লইল। বিজলী কহিল-বলাে••• ১৮ মনের মিল সুমিত্রা কহিল-এ-সব কথা কখনাে ভেবে দেখিনি বিজলী: কি বলবো? বিজলী কহিল—কিছু নেই বলবার ? ফাদার তো এমন ভাসও সুমিত্রা কহিল—আমার নিজের ভবিষ্যতের কথা কখনাে ভাবিনি তেমন করে’••• বিজলী কহিল—যাই ভাবো, নিজেকে একেবারে ভাসিয়ে নিয়াে না।•••তােমার নিজের জীবনের দাম অল্প নয় । পৃথিবীতে ও-জীবনের দাম বােঝে, এমন লােকও আছে•• জেনাের সুমিত্রা কহিল-বলবাে, দেখব ভেবে বিজলী কহিল--হ্যা, দেখাে।
দশম পরিচ্ছেদ তারিণী সে লােকটির পাত্তা পাইতে বিলম্ব ঘটিল না। নাম -তারিণী । চরণের দূর-সম্পর্কের সম্বন্ধী। 'আর কোথাও আস্তানা না পাইয়া চরণের স্ত্রীর কাছে আসিয়া জুটিয়াছে--- চরণের লাথি-জুতা হাসিয়া অম্ল ন বদনে সহিতে চায়। নিরুপায় দেখিয়া চরণ অগত্যা চুপ করিয়া গিয়াছে। পত্নী তার পক্ষ লইয়াছে—কাজেই চুপ করা ছাড়া গত্যন্তর নাই। এখন এই লােকটাকেই চরণ ধরিয়াছে--তার বদমায়েস। অভিসন্ধিতে ঘুরাইবার জন্য । কথায় বলে, যাকে রাখাে, সেই রাখে•••এ-কথা কতখানি খাটি, চরণ খাটি, চরণ আজ তা হাড়ে বুঝিয়াছে। তারিণীও যােগ সারে। চরণ এক-পা আগাইতে বলিলে, সে আগাইয়া যায় চার পা। সুতরাং তার পশার হইল—শুধু চরণের কাছে নয়, চরণের অভিভাবক শ্ৰীযুক্ত সদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও। নিতাই আর শশী বাগদীপাড়ায় ঘুরিতেছিল...সেই পাড়ার এক কুটীর হইতে অকস্মাৎ তারিণী বাহির হইল। তাকে দেখিয়া শশী কহিল—এই লােক...
মনের মিল নিতাই কহিল—ঠিক বলছো? শশী কহিল—উহু, ভুল হতে পারে না। ঐ যে গালে আব । ব্যস্। নিতাই অমনি গিয়া খপ করিয়া তার হাত ধরিল, কহিল-দাড়া••• তারিণী ভড়কাইয়া গেল। হঠাৎ এমন... মুখখানা কঁচুমাচু করিয়া তারিণী কহিল—দুটো তরকারির চেষ্টায় এসেছিলুম... তরকারি ! তাহা হইলে ইহার মধ্যে অনেকখানি গূঢ় রহস্য আছে ! নিতাই কহিল—হাত তো খালি দেখচি। তরকারি কৈ ? সপ্রতিভ ভঙ্গীতে তারিণী কহিল-ওবেলায় নিয়ে যাবে। তাই বলতে এসেছিলুম••• কার কাছে বলতে এসেছিলে ? চলো, মােকাবেলা করে নিতাইয়ের স্বর কড়া—তাহাতে আদেশের সুর! তারিণী অ:বার ভড়কাইল।•• কণ দৃষ্টিতে সে নিতাইয়ের পানে 5াহিল। নিতাই ছাড়িবার লােক নয়, বিশেষ ইহার অন্তরালে রহস্যের আভাস পাওয়া গিয়াছে যখন... তারিণীর পা আর চলিতে চায় না•••অথচ চলিতে হইবে! নিতাই ক্রমাগত ধাক্কা দিতেছে...নিতাইয়ের গায়ে বেশ জোর। আর এই নিমেষের দর্শনে ঘর্ষণে তারিণী বেশ বুঝিয়াছে, নিতাই লােকটি মােটেই ভালো মানুষ নয় ! ১০১ মনের মিল যে-দ্বার মাড়াইয়া এইমাত্র আসিয়াছে, সেই দ্বারে গিয়া আবার দাড়াইতে হইল। নিতাই কহিল-কে তােমার লােক, বলাে ? তারিণীর চোখে আবার সেই করুণ দৃষ্টি! নিতাই তাহাতে ভুলিবার পাত্র নয়। তার মনে একটা কথা••• তারিণী কহিল—আছে, মেয়ে-লােক। নিতাই হুঙ্কার দিল, কহিল-মেয়ে-লােকই হোক ফেলােকই হােক, ডাকো। আমি মােকাবেলা করতে চাই । তােমার রকম দেখে মনে হচ্ছে, তােমার মতলব ভালে নয়। এ-কথায় তারিণী একেবারে অবাক হইয়া গেল ! নিতাই তাকে ধাক্কা দিয়া কহিল-ডাকো... তার চীৎকার গৃহমধ্যেও বিস্ময় জাগাইয়া তুলিয়াছিল । এক প্রৌঢ়া রমণী আসিয়া দ্বারপ্রান্তে উকি দিল, কহিল—কি হয়েছে গা? নিতাই কহিল-এ লােকটি এখানে তােমাদের বাড়ী কেন এসেছিল ? দেখচি, জাতে বামুন••• রমণী কহিল-ও এসেছিল, ওর খুশী। তার জবাবদিহি দেবাে কিসের জন্য বলাে তো, ঠাকুর? নিতাই পাড়ার ছেলে:••সকলেই তাকে চেনে। নিতাই কহিল,-আমি জবাবদিহি চাই..নাহলে এখনি একে টেনে সদুবাবুর কাছে নিয়ে যাবো। ১০২ মনের মিল রমণী কহিল—আমাদের ভচায্যিমশাইয়ের একটু কাজ ছিল...তাই খাজনার তাগাদায় এ-পাড়ায় এসেছিল। বটে। তারিণীর পানে চাহিয়া নিতাই কহিল--কি গাে, এ কি বলে ? তারিণী নিরুত্তরে নিরুপায় দৃষ্টিতে নিতাইয়ের পানে চাহিল । নিতাই সেদিকে লক্ষ্য না করিয়া রমণীকে কহিল—কত খাজনা দিয়েছো? রমণী কহিল,—আজ দিইনি! আর-একদিন আসতে বলেছি। নিতাই কহিল--হু, চেক-মুড়ি কৈ ? বলিয়া তারিণীর পানে চাহিল। রমণী কহিল—সকালবেলা কি ঝামেলা করচে। ঠাকুর আমার দোরে ? আর কোনাে কাজ নেই তােমার ? নিতাই দেখিল, রমণীর রসনা বেশ খর-ধার। স্ত্রীলােকের সঙ্গে কি তর্ক করিবে! তারিণীকে ধরিয়া সে হঁাকা দিল, দিয়া কহিল—চললো, তােমাকে ছাড়চি না। একেবারে সদু- বাবুর কাছে নিয়ে যাবো। চেক-মুড়ি নেই, কিছু না,-এদের কাছে খাজনা চাইতে আসো, এ-কথা তাকে জানানো দরকার। তারিণী প্রমাদ গণিল। সে এখানে আসে অতিনিঃশব্দে এবং গােপনে। তারিণীর এখাসে আসা চরণ পছন্দ করে ...নিষেধ করিয়াছে, বলিয়াছে—ওরা ছােটলােক...ও-পাড়ায় যাস্ নে, একঘরে হতে হবে।•••কিন্তু সে-কথার পরেও••• চরণের যাতায়াতে কৌতুহলী হইয়া তারিণী আসিতেছিল।
মনের মিল { আসিয়া ঐ ক্ষেত্ৰমণি ওরফে ক্ষেতুর যত্নসেবা, তার সাজা তােমাকের প্রসাদ:••সে যেন রাজার আদর ! তাছাড়া চরণের বয়স হইয়াছে...তারিণীর জোয়ান বয়স••দায়ে পড়িয়া চরণের সেবা করিলেও ক্ষেতু চায় তারিণীকে...ক্ষেতুর অনুগ্রহ পাইয়া তারিণী বৰ্তাইয়া গিয়াছে•••চরণের বাড়ীতে পড়িয়া থাকে ন্যাংলা কুকুরের মতো এখানে সে ক্ষেতুর হৃদয়বিহারী ক্ষেতু তাকে স্পষ্ট বলিয়া দিয়াছে, কোনো ভয় নেই, তুমি এসো ঠাকুর। আমি তােমারি। এখন এ গােপন-লীলার কথা প্রকাশ হইয়া গেল.••চরণের গৃহে কি ঠাই থাকিত ? তারিণীকে টানিয়া নিতাই পথে বাহির করিল। ক্ষেতু দ্বার- প্রান্তে দাড়াইয়া কি কতকগুলা বকিতে লাগিল। নিতাই তা কাণেও তুলিল না.••শশী শুধু ক্ষেতুর নাসিকার প্রকাণ্ড দোদুল নথটার পানে বার-বার চাহিয়া দেখিতেছিল। ঐ মুখ •••নাক আছে কি না, বুঝা যায় না—শুধু ঐ নথের প্রসাদে সে ভাবিতেছিল, পুরাণে কথিত সেই সুদর্শন-চক্র! স্থান-কাল ভুলিয়া বাই-চান্স এ-পুতনার নাকে আসিয়া আটকাইয়া গেল ? মােড় বঁকিতে ক্ষেতুর ঘর অদৃশ্য হইল। তারিণী তখন নিতাইয়ের পায়ে পড়িল, কঁাদিয়া কহিল—আমার আশ্রয়টুকু কেড়ে নেবেন না। আশ্রয় ! আশ্রয় কাড়িয়া লইবে ! বিস্ময়-ভরা দৃষ্টিতে নিতাই তারিণীর পানে চাহিল ! কি করিয়া ?" ১০৪ মনের মিল দয়ে পড়িয়া তারিণীকে তখন সত্য কথা প্রকাশ করিতে হইল। সে চরণের সম্বন্ধী কোনাে কূলে তার কেহ নাই.. অন্ন নাই, আশ্রয় জোটে না—জুটাইবার সামর্থ্য নাই। তাই লি-প্রহার-লাথি•••সব সহিয়া এখানে চরণের গৃহে পড়িয়া হ'ছে ! ' আহার যা জোটে, বলিবার নয়। আর সর্বপ্রকার বদমায়েশীতে...কি করিবে সে? একান্ত অসহায়, নিরুপায় । এখানে চরণের ফরমাশ খাটিতে আসিয়াছিল এবং তার উপর ক্ষেত্ৰমণির কেমন নজর পড়ে। ক্ষেতু ভারী যত্ন করে, আদর করে, কাপড় কিনিয়া দিয়াছে, একজোড়া জুতা, এই ছাতা••• কেতু ভারী ভালো। চরণের মনে সন্দেহ হয়, তারিণীকে চরণ নিষেধ করিয়া দিয়াছে-এখানে যেন তারিণী না আসে। কিন্তু ক্ষেতুর অত যত্ন••তাছাড়া তাকে একটু যত্ন করে, এমন লােক জগতে তার কেহ নাই। নিতাইয়ের চিত্তে শয়তান বিজয়-গর্বে নাচিয়া উঠিল । চমৎকার হইয়াছে। শশীকে নির্দেশ করিয়া নিতাই কহিল-এঁর বাড়ীতে সন্ধ্যাবেলায় উৎপাত করতে গিয়েছিলে কেন ? তারিণী সব কবুল করিল, সবিনয়ে জানাইল, শুধু চরণের 'দেশে ! নিতাই কহিল--হু..তারপর কি চিন্তা করিল ; করিয়া কহিল—আমি তােমাকে আশ্রয় দেবাে, টাকাও দেবাে, আমার একটি কাজ করতে হবে কিন্তু।
মনের মিল -কি কাজ? তারিণীর বুক দুলিয়া উঠিল। নিতাই কহিল-চরণকে আমি জব্দ করতে চাই। তারিণী সােৎসাহে কহিল—আমি তাতেও খুব রাজী। আমাকে যে পীড়ন করে আজ্ঞে, দায়ে পড়ে আমি সব সয়ে থাকি ! নিতাই কহিল-তোমার ভয় নেই। আমি তােমাকে দেখবো। কিন্তু যদি বেইমানী করাে--তাহলে একখানি হাড়, আর আস্ত রাখবাে না। আমি থানা-পুলিশের ভয় করি না। আমার নাম নিতাই, কি রকম দুর্দান্ত..পঁচি-জনকে জিজ্ঞাসা করে দেখো। নিতাই-নামটি তারিণীর অশ্রুত নয় ! সদুবাবুর আসরে এ- নাম সে বহুবার শুনিয়াছে... নিতাইয়ের পানে চাহিয়া তারিণী কহিল-বেশ, আমি করবো, আমাকে যা বলবেন আপনি। নিতাই কহিল,-পৈতে ছুয়ে বলো••• তারিণী তখনি হাতে পৈতা জড়াইল, কহিল—আপনি য বলবেন, শুনবাে•• নিতাই কহিল--বলো, কখনো বেইমানী করবে না। মন্ত্র পড়িবার ভঙ্গিতে তারিণী কহিল—আজ্ঞে, কখনাে বেইমানী করবাে না । নিতাই কহিল—আচ্ছা, এসো তাহলে এখন আমার বাড়ী... সেখানে গিয়ে সব কথা হবে।••• ১০৬ মনের মিল ব্যস, অমনি ঘণ্টাখানেক বসিয়া পরামর্শাদি করিয়া নিতাই তারিণীকে বিদায় দিল, বলিল, আমার লােক তােমাকে ডাকতে যাবে সে শুধু বলবে, প্রভু ডাকচে। আমার নাম করবে না। তুমি চলে আসবে। অন্যথা না হয়• • • কৃতজ্ঞ চিত্তে তারিণী কহিল—আজ্ঞে, কখনাে হবে না। তারিণী বিদায় লইল। শশী কহিল—আমিও আসি। মতলব যা ফেঁদেচো: হাসিয়া নিতাই কহিল–দাড়াও না, এই এক-জালে সব ব্যাটাকে ঘায়েল করবো। -তারপর? নিতাই কহিল-তারপর যা,•••তা ভাবতে দাও। অতদূর ভাবতে গেলে কাজ করা চলে না। ক্রমে-ক্রমে ভেবে স্থির করা যাবে। শশী কহিল—আমি তাহলে আসি। নিতাই কহিল-এসো। শশী চলিয়া গেলে নিতাই ডাকিল-কাশি... কাশিম কহিল--কেন? নিতাই কহিল-চপ খাওয়া-দাওয়া সেরে নিতে হবে রে। ওবেলায় স্কুলে যাবাে তােকে ভর্তি করতে•• কাশিম কহিল—আজই ? নিতাই কহিলা...শুভ কাজে দেরী করা ঠিক নয়। ১০৭ মনের মিল স্নানাহার সারিয়া কিন্তু ওবেলার প্রতীক্ষায় থাকা গেল না। নিতাই কহিল-কি কাজ আছে রে ঘরে ? কিছু নেই তো•••চ এখনি যাই। স্কুলটি আমার ভারী ভালো লেগেচে। কাশিমের মনও তাই চাহিতেছিল । সেই কলরব, সেই আনন্দ! সেই বারান্দা...সুমিত্রা বসিয়া কি সেলাই করিতেছে, পাশে দুটি মেয়ে। তারাও একরাশ সূতার বাণ্ডিল পকাইতেছে। নিতাই আসিয়া কহিল-নমস্কার । সুমিত্রা চাহিয়া দেখিল। তার মুখ সস্মিত হইয়া উঠিল। সুমিত্রা কহিল,-আসুন••• সুমিত্রা চেয়ার দেখাইয়া দিল, নিতাই বসিল। সুমিত্রা কহিল --হঠাৎ••• নিতাই কহিল,—হ্যা একট কাজে এলুম। সুমিত্রা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে নিতাইয়ের পানে চাহিল। নিতাইও চাহিয়াছিল...ঐ কালো দুটি চোখের তারা•••ও যেন এই আঁধার- ভরা দুনিয়ার মাঝখানে আনন্দের দুটি, দীপ•••কি আশায়-রঙীন আলাের দীপ্তি ও দুই চোখে ! এ-দৃষ্টির সামনে সারা দুনিয়ার বরঙ যেন বদলাইয়া যায়। নিতাই কহিল—এই ছেলেটি.••এর লেখাপড়া কিছু হচ্ছে না। —শুধু আমার ফরমাশ খেটে দিন কাটায়। আমি ওর সর্বনাশ করচি-এ তো ভালো কথা নয়। সুমিত্রার দুই চোখ প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। নিতাই কহিল, ১০৮ মনের মিল একে আজই আপনার স্কুলে ভর্তি করে নিন। বাড়ী থেকেই রােজ আসৰে-যাবে। মাহিনা দেবে...অমনি পড়বে না। মাহিনা দেবে না। আমি যখন দিতে পারি • এমনিতেই তে আপনাদের কত খরচ—আমি কঁকি দিতে চাই না। খুশী-মনে সুমিত্রা কহিল-বেশ•••বলিয়া একটি ছেলেকে কহিল,-~~-মতিবাবুকে ডেকে আনে তো বিপিন... মতিবাবু স্কুলের কেরাণী। ছেলেটি মতিবাবুকে ডাকিয়া নিলে, সুমিত্রা তাহাকে বলিয়া দিল—এ-ছেলেটি ভর্তি হবে••• এর নাম-ধাম সব লিখে নিন। ফ্রী নয়। এর মাইনে দেবেন••• কাশিমকে সঙ্গে লইয়া মতিবাবু চলিয়া গেল। নিতাই উঠিতেছিল, সুমিত্রা কহিল,-আপনি বসুন••• নিতাই কহিল-এর পরিচয়-টরিচয়গুলো... সুমিত্রা কহিল-খাতা-পত্র নিয়ে মতিবাবু এইখানেই আসবেন। তাহাই হইল। দু'একটি কথার পর নিতাই কহিল,--আমি যদি আপনাদের ফণ্ডে মাসে-মাসে কিছু দিতে চাই, নেবেন? সুমিত্রা কহিল,-“দরকার নেই। তার চেয়ে আপনি এদের খেলা-ধূলার আয়ােজন করুন। আপনি নিশ্চয় স্পাের্টস্-ম্যান্•• হাসিয়া নিতাই কহিল-চেহারা দেখে তাই মনে হয়? এককালে চর্চা করেছি বটে...যখন কলকাতায় থাকতুম । তারপর চারিধার থেকে আত্মীয়-স্বজনরা খশে সরে পড়লো••• এমন অকস্মাৎ•••মন বিগড়ে গেল। লেখাপড়া, খেলাধুলা .
মনের মিল সব ছেড়ে গায়ে এসে বসলুম ! এসে দেখি, এখানে চারিদিক জঞ্জালে ভরা ! সে-জঞ্জাল সরাতে গেলুম•••পারলুম না ! লােকগুলাে ঐ জঞ্জাল আঁকড়েই থাকতে চায়। জঞ্জাল সরাতে গেলে বিভ্রাট বাধে। ধুত্তোর বলে’ ঘরে এসে বসলুম। যা মনে আসে, তাই করি: স্রেফ, indolent life ! প্রাণ-খােলা কথা। এ-কথায় সুমিত্রা চমৎকৃত হইল! সে কি বলিতে যাইতেছিল, তার পূর্বেই নিতাই কহিল, দৈবাৎ এধারে মাছ ধরতে এসে আপনার স্কুল দেখলুম ! আপনাকে দেখলুম•••যেন শ্বেত কমলদল-বাসিনী বাণী দেবী! মন সেই-ইস্তক কাজ চাইছে। জীবন যেন নূতন মূর্তি নিয়ে জেগে উঠেচে! কুড়ের মতো পড়ে থাকার জন্য জীবন নয়! যা-তা করে কাটিয়ে দেবারও নয়। মানুষের অনেক কাজ করবার আছে।••বিশেষ, আপনার এই কাজে যদি যােগ দিতে পারি- আপনাদের কাজে মনের যােগ স্থাপন করবার সুযােগ যদি পাই, তাহলে আমি বেঁচে যাই যেন। সুমিত্রা কহিল-শুনে ভারী ‘আনন্দ হলো। লােক দরকার। আমি একা...আরাে দু'এক জায়গায় চেষ্টা করেচি•••কিন্তু কেবলই বিদ্রুপ পেয়েচি।•••শুধু বিদ্রুপ নয়:•• সুমিত্রা থামিল, পরে গম্ভীর স্বরে কহিল-ইতর টীকা- টিপ্পনীরও অভাব ঘটেনি। সকলে বলে, মেয়ে-মদ্দ! নিতাই গর্জিয়া উঠিল—হতভাগা দেশ । পুরুষগুলাে এ-গ্রামে মেয়েদের চেয়ে অধম হয়ে আছে। নিজেদের ভালো কাজের মনের মিল নিজেরা করবে না কখনাে। অপরে ভালো করতে এলে, তাতেও সৰ্বৱকমে বাধা দেবে। বেয়ারা আসিয়া সংবাদ দিল, সেই সলীমের ছেলের স্বর একটু কমিয়াছে। সে একটু ভালাে আছে ! সুমিত্রা কহিল-চলুন, আপনাকে সব দেখাই। একটি ছেলে বাড়ীতে অসুখে ভুগছিল—তাকে এখানে এনে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে ! নিতাইয়ের মনে আনন্দের বান ডাকিল। প্রাণের আবেগে সে কি বলিতে যাইতেছিল, সহস নিজেকে সম্বরণ করিয়া লইল। সুমিত্রা ডাকিল আসবেন ? নিশ্চয়... দুজনে চলিল। প্রকাণ্ড কম্পাউণ্ড। ডাক্তারখানায় সলীমের ছেলেকে দেখিয়া ফিরিবার সময় সুমিত্রা সহসা থমকিয়া দাড়াইল, কহিল,—ও কে ? একটা বড় গাছের দিকে সে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল। নিতাই চাহিয়া দ্যাখে, একজন লােক। ভদ্র বেশ। গাছের আড়ালে আত্মগােপন করিতেছে। কে? মনে কেমন সন্দেহ আসিল। কেহ কোনাে মন্দ অভিপ্রায়ে... নিতাই গুঢ়ভাবে গাছের দিকে চলিল। লােকটা... নিতাই ছুটিয়া গিয়া তার হাত ধরিল, সবিস্ময়ে ডাকিল শশী...
মনের মিল - । তাই। শশী। নিতাই কহিল-লুকোচ্ছে। যে ? লুকোবাে কেন ? ••এমনি এসেছিলুম... —লুকোবার কিছু নেই, সত্যি। এসে যা দেখডি, চমৎকার ! কাশিকে আজ স্কুলে ভর্তি করে দিলুম।••• কথার সঙ্গে-সঙ্গে শশীর হাত সরিয়া নিতাই তাকে একেবারে টানিয়া লইয়া চলিল। সুমিত্রা স্তম্ভিতের মতে দাড়াইয়া। নিতাই কহিল-শত্রুপক্ষ নয়...মিত্র। সেই বন্ধু, শশী।
একাদশ পরিচ্ছেদ শয়তান আরাে সাত-আট দিন পরের কথা... বেলা বারােটা বাজিয়া গিয়াছে । সুমিত্রা নিস্পন্দ বসিয়া আছে। তার সামনে দাড়াইয়া বিজলী। বিজলীর মুখে-চোখে উদ্বেগ। চারিদিক স্তব্ধ:: শুধু সুদূর আকাশচারী দু'একটা চিলের চীৎকার মাঝে-মাঝে সেই স্তব্ধতার গায়ে ভাসিয়া উঠিতেছে। বিজলী কহিল,না হলে আমার সমস্ত ভবিষ্যৎ চুরমার হয়ে যাবে। মাসখানেকের জন্য শুধু আমাকে রক্ষা করো, সুমিত্রা। বিজলী একেবারে সুমিত্রার পায়ের উপরে লুটাইয়া পড়িল। সুমিত্রা কহিল,—কি করো, বিজলী! ওঠো। বিজলী তবু ওঠে না। সুমিত্রা বলিল,-আঃ-পা ছাড়ো। বিজলী কহিল,—ঐ স্কুল-ফণ্ডের প্রায় আড়াই হাজার টাকা তোমার কাছে আছে, পরশু ডাকে এসেছে, আমি জানি। তা থেকে শুধু এক হাজার-••এক মাসের জন্য••• আমাকে দাও•••ধার। তােমাদের এখনো তিন মাস দেরী বাড়ী তােলবার। এক মাসের মধ্যেই আমি এ-টাকা শােধ করে দেবে।
মনের মিল ? সুমিত্রা কহিল-কিন্তু ও-টাকায় আমার কি অধিকার। পরের টাকা•••ও-থেকে কি করে তােমায় ধার দি? এ যে কত- বড় অন্যায়••• বিজলী কহিল,-তুমি এ-টাকা চুরি করচো না, খরচ করচো না...তােমার বাক্সে এ ক'মাস অকেজো পড়ে থাকবে কোনাে দরকারে লাগবে না। আর এই একমান...ও-টাকা যদি আমার কাছে থাকে, তােমার লােকসান নেই,'—অথচ আমার সমস্ত ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে তাতে...উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ! একমাসের মধ্যেই আমি এ-টাকা শােধ দেবে। তার নড়চড় হবে না। সুমিত্রা কোনাে কথা কহিল না। বিজলীর কাকুতির অন্ত নাই। সুমিত্রা তবু অবিচল। শেষে বিজলী এক কাজ করিল। দেওয়ালের গায়ে একখানা বড় খুপী টাঙানাে ছিল, দেওয়ালের শােভার জন্য এবং বিপদে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেও বটে,বিজলী চট করিয়া সেটা হাতে লইয়া থিয়েটারী- ভঙ্গীতে কহিল,—এটুকু দয়া যদি না করাে, তাহলে আমি বাঁচবো না: এই খুপী বুকে বসিয়ে সব শেষ করে দেবো। যদি জীবনের এমন সুযােগ হারাই, তাহলে কি কাজ এ-জীবনে••• কথাটা বলিয়া বিজলী বুকের উপর খুপী ধরিল। সুমিত্রা দেখিল। দেখিয়া শিহরিয়া উঠিল, কহিল,কি করাে? আঃ । বিজলী তেমনি অভিনয়ের ভঙ্গীতে কহিল,এছাড়া আর কোনাে উপায় নেই, সুমিত্রা ••• ১১৪ মনের মিল সুমিত্রা খুপী কাড়িয়া লইল। বিজলী কহিল,-এ জীবন শেষ করতে আরো হাজার পথ খােলা আছে। সে পথ তো তুমি বন্ধ করতে পারবে না। বিজলী থামিল, পরে স্বরে আরো চমক লাগাইয়া কহিল,—যার ভবিষ্যৎ নেই, তার জীবনে কোনো প্রয়ােজন থাকতে পারে না!••এ জেনেও তুমি অটল...কিন্তু এর জন্য তুমিই হবে দায়ী সুমিত্রা। বিজলীর দুই চোখে জল দেখা দিল। সে গমনােদ্যত হইল। সুমিত্রার বুকের মধ্যে যা হইতেছিল সে ডাকিল,- বিজলী... বিজলী ফিরিল। সুমিত্রা কহিল—এ পরের টাকা... বিজলী বলিল—আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না? শুধু একমাস ...এ-টাকা জমা দিলে আমি কেশিয়ারী চাকরিটা হাতে পাই। পঁ চশাে টাকা মাহিনা।•••কাজে বাহাল হলে এক- মাসে পঁচিশাে টাকা মাহিনা আগাম চাওয়া শক্ত হবে না। আর.••চাইলে তা পাবােই। লক্ষ্মীটি, দয়া করে, সুমিত্রা••• আমায় রক্ষা করাে••• সঙ্গে-সঙ্গে সুমিত্রার পায়ে আবার সে লুটাইয়া পড়িল। সুমিত্রার পায়ের তলা হইতে বিশ্ব-ভুবন কোথায় সরিয়া যাইতেছিল। সেই বিজলী••• সুমিত্রা চাহিয়া দেখে, বিজলীর চোখে জল ! সুমিত্রার মনের মিল মন দুলিল। সে কহিল—ঠিক এক মাসে দেবে? কিন্তু পরের টাকা...আমার বুক কাঁপচে ! বিজলী কহিল—আমি পাকা লেখাপড়া করে দিচ্ছি। নারীর মন। সহস্র কর্তব্যের মধ্যেও মমতা সে ছাড়িতে পারে না। চোখের জলে তার মনের মাটি ভিজিয়া যায় । যন্ত্র-চালিতের মতো ঘরে গিয়া সুমিত্রা সিন্দুক খুলিল••• একতাড়া নােট... তার মাথা ঘুরিতেছে, চোখে সে অন্ধকার দেখিতেছে !.. সেই অন্ধকারের আবছায়ার মধ্যেই বিজলী কাগজ লইয়া তাহাতে কি-সব লিখিল। লিখিয়া সুমিত্রার চোখের সামনে ধরিল-বিজলীর মুখে কৃতজ্ঞতার গদগদ বচনভগবানের নাম । সে যেন বিদ্যুতের ঝলক বহিয়া গেল।••• তারপর যখন সচেতন সুমিত্রার চোখের সামনে বিশ্বভুবন আবার তার স্বরূপে দেখা দিল, তখন বিজলী চলিয়া গিয়াছে, এক-হাজার টাকার বদলে পড়িয়া আছে একখানা হাণ্ডনােট.. টিকিটের উপর বিজলীর নাম সহি। সহিতে সেই অপূর্ব কায়দা। সে যেন বিদ্রুপের হাসি। সেটা সুমিত্রার হাতে•••তার চোখের সামনে আলো। আবার নিবিয়া গেল মাথা ঘুরিল। কাছে একখানা চেয়ারে অবসন্নের মত সুমিত্রা বসিয়া পড়িল। বসিয়া চক্ষু মুদিল।••• নিতাইয়ের আহ্বানে সুমিত্রা চোখ মেলিয়া চাহিল। চাহিয়া চমকিয়া উঠিল। একটা বড় নিশ্বাস কিছুতেই সে রােধ করিতে মনের মিল পারিল না। এতক্ষণ সে যেন স্বপ্ন দেখিতেছিল ! স্বপ্ন মিলায় নাই ! আলােয়-আলো ঘর•••সে আলােয় কালো-কালো কি উড়িতেছে ! নিতাই কহিল-এ-লােকটা কেন এসেছিল? ঐ সুট-পর বাঙালী সাহেব ? সুমিত্রা কহিল-~-বিজলী। নিজের স্বয়ে নিজেই সে চমকিয়া উঠিল। এ যেন কোন্ পাতালের অতল তল হইতে আর-কে কথা কহিল । নিতাই কহিল—যে-ই হােক, ও ভয়ানক রেশ-বাজ: রেশ-বাজ। সুমিত্রার চোখে বিস্ময় ও আতঙ্ক সীমাহীন পাথরের মতো ! নিতাই কহিল-ও আর ঐ মিলের অচিন্ত্য-দু’জনে ভারী কলকাতার মাঠে ঘােড়দৌড়ের ঘােড়ার স্বপ্ন দেখে ওরা দিবা-রাত্র। চাকরি খুইয়েচে-ক্যাশ ভেঙ্গেছিল বলে। তারা ছাড়বে কেন? কান ধরে আদায় করে নিয়েচে•••পুলিশে খবর অবধি দিয়েছিল । তাই! তাই! সুমিত্রার পায়ের তলা হইতে দুনিয়া সরিয়া যাইতেছিল.•• সে যেন কোন্ অন্ধকার রসাতলে নামিয়া চলিয়াছে। পায়ের নীচে আশ্রয়ের চিহ্ন নাই। সুমিত্রা কহিল,—কত টাকা দিতে হয়েছে জানেন? নিতাই কহিল-শুনেচি হাজার-বারােশো টাকা!...কিন্তু ও ভাব। ১১৭ মনের মিল কি•••আপনার মুখ যে সাদা হয়ে গেল !•••এর মানে ? আপনার আত্মীয়। নিশ্বাস চাপিয়া সুমিত্রা কহিল,একরকম আত্মীয়ই ? কিন্তু এমন উৎসন্ন 'গেছে ! এ আমার স্বপ্নের অগোচর••• সুমিত্রার মাথা ঘুরিতেছিল! সে আবার চক্ষু মুদিল ।••• পনেরাে দিন পরের কথা। এ পনেরো দিন সুমিত্রার কি ভাবে কাটিয়াছে, তা শুধু তার অন্তর্যামীই জানেন। নিতাই নিত্য আসে। তার সঙ্গে সুমিত্রার অনেক কথা হয়। এসব কথার অন্তরালে বেদনার কাটায় খেচ। সুমিত্রার রক্তাক্ত মনের পরিচয় নিতাইয়ের অজ্ঞাত রহিল না। তবে কিসের বেদনা, এটুকুই জানা গেল না। সে প্রশ্ন নিতাই কোনাে দিন করিতে পারিল না...কেমন এক দ্বিধায় কণ্ঠ তার রুদ্ধ হইয়া আসে! অথচ জানিবার কী আগ্রহ। সেদিনও কথা-বার্তা হইতেছে•••এমন সময় ডাক আসিল । টাইপ-করা বড় একটা খাম। হাতে লইতে সুমিত্রা কঁপিয়া উঠিল। চিঠি খুলিয়া পড়িল..সর্বনাশ! সে অস্ফুট আৰ্ত্ত রব তুলিল! নিতাই তার পানে চাহিল। সুমিত্রা কহিল,—কি হবে? এ্যা••• কথা শেষ হইল না। নিতাই তার পানে চাহিল। সুমিত্রার মুখ বিবর্ণ—যেন সে ভূত দেখিয়াছে, এমনি আতঙ্কে পরিপূর্ণ ! চিঠিখানা সুমিত্রা তার হাতে আগাইয়া দিল। ১১৮ মনের মিল নিতাই চিঠি পড়িল। মিশন্ হাে হইতে চিঠি আসিয়াছে । সাহেব লিখিয়াছেন, এঞ্জিনিয়ার প্রভৃতিকে লইয়া কালই তিনি ফুলছড়িতে আসিতেছেন।... সুমিত্রার দু চোখে জল। সুমিত্রা কহিল,—উপায় ? তিই কহিল,আমাকে সব কথা বলতে পারেন। আমি আঁচে যেন কিছু বুঝচি! কিন্তু... সুমিত্রা সব কথা খুলিয়া বলিল,"বিজলীর সঙ্গে তার কি সম্পর্ক, তাও গােপন রাখিল না! শুনিয়া নিতাই কহিল,-বটে! আমি উপায় দেখচি।... কিন্তু ওদিকে বিপদ বাধিল! তারিণীর সাহায্যে যে জাল পাতিয়াছে,•••সে জাল আজ গুটানাে চাই। নহিলে সে-কাজ কঁশিয়া যাইবে। অথচ বিজলীকেও চাই, আজই...দুটোই সমান শয়তান! দুটোকেই আয়ত্ত করা চাই। সুমিত্রার দু'চোখে জলের বিরাম নাই। নিতাই কহিল,—ভয় নেই। আমার শক্তিতে বিশ্বাস হচ্ছে ?...বেশ, প্রমাণ পাবেন। আমি তাহলে বসবে না। এখনি চলি তার সন্ধানে। নিতাই উঠিল। উঠিয়া গৃহে ফিরিয়া সে দেখে, তারিণী আসিয়া বসিয়া আছে। তারিণী কহিল,চরণকে ক্ষেতু রাজী করিয়েছে, ক্ষেতুর সেই বােঝী এসেছে। তার এক ছেলে..সেই ছেলের অন্নপ্রাশন ১১৯ মনের মিল চরণ আজ। ক্ষেতুর বাড়ীতেই হবে। খরচ-পত্র চরণ দিচ্ছে। সব ঠিক। এ থেকে কায়দা করা সম্ভব হবে না ? নিতাই কি ভাবিল, ভাবিয়া মুখে হাসি ফুটাইয়া কহিল,—ঠিক হয়েছে। এক কাজ করে তারিণী... তারিণী নিতাইয়ের পানে চাহিল। নিতাই কহিল,চরণ ওখানে দেখা-শুনা করতে থাকবে নিশ্চয় ? তারিণী কহিল,—নিশ্চয় ! আমিই বাজার করে দিয়েছি। ক্ষেতু বললে, আজই খাওয়া-দাওয়া। চরণকে সে বলেচে। রাজী না হয়ে করে কি ! ক্ষেতু যে কাণ্ড বাধিয়েছিল ••ও, কলকাতার থিয়েটার দেখেছেন? একেবারে যেন সেই থিয়েটারের সেরা এ্যাকট্রেশের ভঙ্গী। সােৎসাহে তারিণীর পিঠ চাপড়াইয়া নিতাই কহিল,—ঠিক হয়েছে। এক কাজ করে তারিণী...ক্ষেতুকে ঠিক রাখে, আব্দার ধরে থাকে যেন। এই আনন্দের কাজে চরণকে ওখানে পােলাও খাওয়াতে হবে। তারপর••• তারিণী কহিল,—বেশ, আমি তাহলে এখন যাই। ভোজ। নিতাই কহিল,-হা, তুমি যাও। ক্ষেতুকে দিয়ে এই কাজটি করাতেই হবে—যেমন করে’ পারে। একাজ যদি পারাে, তাহলে কেল্লা মার দিয়া।•••তুমি শুধু এসে আমাকে খপরটুকু দিয়ে যাবে —তারপর যা করবার, আমি করবাে। তারিণী খুশী-মনে চলিয়া গেল। রাত্রে ১২০ মনের মিল নিতাই ডাকিল,—শশী •• শশী অদূরে বসিয়া নভেল পড়িতেছিল, কহিল, কি ? শশীকে নিতাই সব কথা খুলিয়া বলিল। শুনিয়া শশী তার পানে চাহিল। নিতাই কহিল,—সদুবাবুকে খপরটুকু দিতে হবে। তারপর যত চঁাই-মশাইকে ও-বাড়ীতে নিয়ে যেতে পারলে, চরণের মরণ সুনিশ্চিত। যেমন ব্যাটা ছুচো পাজী... শশী কহিল,—তা বলে’ বামুনের জাত মারবে ? হাসিয়া নিতাই কহিল,জাতের কি আছে ওর। ক্ষেত্র হাতের অন্ন মুখে দিলেই বুঝি জাত যায় ? অথচ ওর ঘরেই চরণের বাস! জাতবিচারের চমৎকার আইডিয়া তােমার। শশী কহিল,-তা বটে। সদু লােকটির সহস্র দোষের মধ্যে একটি গুণ আছে—জাতের ব্যাপারে ভণ্ডামি করে না। দয়ামায়াজ্জিত দুর্দান্ত হইলেও জাতের সংস্কার বাঁচাইয়া চলে। চরণের সম্বন্ধে যে-কুৎসা রটিয়াছে, অতিরঞ্জিত ভাবিয়া সদু তাকে ক্ষমার চক্ষে দেখে। নিতাই কহিল,আমি একবার বেরুচ্ছি। তারিণী ফিরলে তাকে বসিয়ে রেখাে। আমার সঙ্গে দেখা না করে সে যেন চলে না যায়। কাজটি সুসম্পন্ন করা চাই। আজ রাত্রে। এমন সুযােগ আর মিলবে না। হাসিয়া শশী কহিল,—কাজ সুসম্পন্ন হবে।
মনের মিল -বেশ। বলিয়া কঁাধে উড়ানি ফেলিয়া নিতাই বাহির হইবার উদ্যোগ করিল ! শশী কহিল-কোথায় চললে ? নিতাই কহিল, আর-এক শয়তানের সন্ধানে। এটাও ভদ্রবেশী শয়তান। এর চাল আর-এক কাঠি উপরে••• কথার অর্থ না বুঝিয়া শশী নিতাইয়ের পানে চাহিয়া রহিল। নিতাই কহিল,-কৌতূহল একটু সম্বরণ করাে-পরে সব জানতে পারবে। २२ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ বিদ্যাদিগগজ সারাদিন পাতি-পাতি খুঁজিয়ও বিজলীর সন্ধান মিলিল না। যে-নিলে সে চাকরির কথা বলিয়াছিল, সেখানে সন্ধান লইতে সংবাদ মিলিল, বিজলীর চাকরি এখানে হয় নাই। সাহেব তাকে দুদিন পরখ করিয়াই জবাব দিয়াছে। সন্ধ্যার পর নিতাই স্কুলে ফিরিল। সুমিত্রা? ঘরে বিছানায় দেহ-ভার লুটাইয়া সুমিত্রা পড়িয়া আছে। নিতাই দেখিল, তাকে ডাকিল না;...নিঃশব্দে বারান্দায় আসিয়া বসিল। স্তিমিত আলােয় ছেলে-মেয়েরা ছায়া-মূর্তির মতো খাওয়া- দাওয়া সারিয়া পড়িতে বসিল। নিতাই তেমনি কাঠ হইয়া বসিয়া আছে। প্রহরের পর প্রহর বহিয়া চলিয়াছে।••• রাত্রি সাড়ে ন'টা-জ্যোৎস্নায় চারিধার ভরিয়া গিয়াছে। সুমিত্রা উঠিয়া বারান্দায় আসিল, আসিয়া নিতাইকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। নিতাই কহিল—সে আগাগােড়া মিথ্যা কথা বলেছে। মিলে তার চাকরি নেই। সুমিত্রা কহিল,আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। -তার পর?
মনের মিল উঠিল, —হু। সে বলেছে, জেল বাঁচাতে সে-টাকা খরচ হয়েছে। তার হাতে কিছু নেই। টাকা এখন সে দিতে পারবে না। এমনি সাফইয়ের কথাই নিতাই ভাবিয়াছিল। সুমিত্রা কহিলা—তার উপর সে উঁকিয়ে দেছে। বলে,এক মাসের কড়ারে টাকা নিয়েছে পনেরাে দিনের কড়ারে নয়! এক মাস পরে টাকা না পাও, নালিশ করে।। বিষম রােষে জ্বলিয়া নিতাই একেবারে লাফাইয়া কহিল—কোথায় সে শয়তান ? সুমিত্রা কহিল,-ষ্টেশনের কাছে তার এক বন্ধুর বাড়ী-- সেইখানে সে আছে। বন্ধুর নাম, অক্ষয়বাবু। কাল সকালে কলকাতায় যাবে। পালাবে ? ওকে পালাতে দিচ্ছে কে? বলিয়াই নিতাই উঠিল। সুমিত্রা কহিল,—কোথায় যাচ্ছেন ? —সেই অক্ষয়ের বাড়ী। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশা••• এখনাে ক’ঘণ্টা সময় আছে, এ-সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করি। কিন্তু তার আগে শশীর একটা বরাত আছে। সুমিত্রা নিষেধ তুলিতেছিল, সে-নিষেধ তােলার পূর্বেই নিতাই বীরদর্পে দীর্ঘ দেহ লইয়া সরিয়া পড়িল। তাই তাে, ক্ষেতুর গৃহে আর-এক শয়তানের খােলস ছি ছিবার আয়ােজন বেশ পাকা করিয়া তােলা হইয়াছে। সে-কাজের এমন সুযােগ আর মিলিবে না! তারিণী, শশী প্রভৃতি সেখানে তার প্রতীক্ষায় পথ চাহিয়া আছে। বিজলীকে ধরিবার পূর্বে সেখানে যাওয়া ১২।
মনের মিল ক প্রয়ােজন। বিজলী তো কাল সকালে কলিকাতায় পলাইবে-- তাকে ধরিবার সময় এখনো নিঃশেষ হয় নাই ! অথচ ক্ষেতুর গৃহে অন্ন-উৎসব..রাত প্রায় দশটা বাজিতে চলিল...এই তো মাহেন্দ্রক্ষণ!••• গতির বেগ দ্রুত করিয়া নিতাই বাগীপাড়ার পথে চলিল। মাথার উপর আকাশ-ভরা জ্যোৎস্না-বাতাসের দোলায় গাছের পাতায় মৃদু মৰ্ম্মর ! দূর হইতে অস্পষ্ট কলরব শােনা গেল। ঐ ক্ষেতুর গৃহ। ••• নিতাই আসিয়া দেখে, বাহিরে এক গাছতলায় শশী ও তারিণী দাড়াইয়া আছে। নিতাইকে দেখিয়া তারিণী কহিল—আমি ভিতরে যাবো না। তবে ক্ষেতুকে সাফ বলেছি, এ-কাজ যদি না পারো তো এ গা থেকে আমায় বাস তুলে যেতে হবে। ক্ষে? দিব্যি গেলেচে, চরণকে তার অন্ন সে খাওয়াবেই। নিতাই কহিল,-সদু বাড়ুয্যেদের খপর দিয়েছো শশী ? শশী কহিল,-উড়ো-চিঠি দিয়েছি। তাছাড়া সদুর এক মাসতুতাে ভাই আছে না••রমানাথ ? তাকে লোভ দেখিয়েছি, দিনের বেলায় ঐ পাদ্রীদের ইস্কুল দেখতে যাবাে। দেখতে যাবাে। সে ভাব করতে চায় সুমিত্রার সঙ্গে... নিতাই কহিল,—তার মানে ? শশী কহিল,-বেচারীর চাকরি নেই। বি-এ ফেল করে সে এসে সদুকে ধরে, কিছু টাকা ধার দাও•••ব্যবসা করবাে। তা, সদু বলেছে, ধার দিতে রাজী আছে, রমানাথের একটু জমি আছে মনের মিল কলকাতায়, সেই জমি যদি সহুর কাছে রমানাথ বন্ধক রাখে। ঐ জমির উপর সদুর ভীষণ লােভ। বেচারী বলছিল, এ-চকরি যদি পায়, তাহলে আর সদুর বিষয়-বুদ্ধির মধ্যে তাকে সে ধুতে হবে না। অর্থাৎ ঐ জমির লােভে রমানাথকে সদু একটু যত্ন-আত্তিও করচে দুদিন। নিতাই কহিল,—কি করে সে জানলে, আমরা স্কুলে যাই । = শশী কহিল,—সেখানে সে একদিন আমাদের দেখেছিল।••• নিতাই কহিল,-ত, রমানাথ কি করবে ? শশী কহিল,—সদুর দলকে গিয়ে সে বলেচে,—চরণ ভটচাষি সকলের নাম ডুবুলো-ক্ষেতুর ঘরে অজ নেমন্তন্ন খাচ্ছে। সদু বলেচে,—স্বচক্ষে সে দেখতে চায়। রমানাথ এতক্ষণ এখানে ছিল,—দশ-বারো মিনিট হলো, সদুদের ডাকতে গেছে। —বেশ। বলিয়া নিতাই তারিণীর পানে চাহিল, কহিল, এযজ্ঞ আমরা দেখি কি করে ? তারিণী কহিল,-চুপি-চুপি আসুন: আমি ব্যবস্থা করেছি। ক্ষেতুর ঘরের পাশে টেকিশালে একটা কাপড় টাঙিয়ে রাখা হয়েচে -পর্দার মতাে। ওদিকে ছােট জানলার গরাদ ভাঙ্গা- সেদিক দিয়ে টেকিশালে ঢুকে আমাদের বসে থাকতে হবে।••• আসুন আমার সঙ্গে নিতাই কহিল,তারপর সদুবা এলে••• তারিণী কহিল,--আমি বাইরে থাকবো-খপর দেবাে। ;
মনের মিল ক্ষেতুকে ইসারা করলেই চরণের সামনে সে ভাতের থালা এগিয়ে দেবে। নিতাই ও শশীকে লইয়া তারিণী টে কিশালে ঢুকিল!•••উঠানে কুটমের দল আহারে বসিয়াছে। চরণ চুপ করিয়া ক্ষেতুর ঘরে তক্তপোষে বসিয়া তামাক টানিতেছে।•••তারিণী দ্বারে করাঘাত করিল। শুনিয়া ক্ষেতু সন্তর্পণে বাহিরে আসিল। তারিণী মৃদুস্বরে কহিল,শুভ কাজে আর বিলম্ব কেন, ক্ষেতুরাণী ? হাত নাড়িয়া ক্ষেতু কহিল,-তােমার কথায় বামুনের জাত মারচি! এর পরে তুমি যেন আমায় পায়ে ঠেলে না•••দেখো। তারিণী ঘড় নাড়িয়া কহিল-না..না..না...তিন সত্যি করছি। তারিণী নিঃশব্দে সরিয়া পড়িল। ক্ষেতু ঘরে গিয়া চরণকে কহিল—তােমার ভাত আনি। চরণ চমকিয়া উঠিল। চারিদিকে চাহিয়া কহিল,—ভাতটা ত আমার তৃপ্তি, খাইয়ে তােমার তৃপ্তি—দু'নম্বর তৃপ্তি হয়ে যাবে। ক্ষেতু কহিল,-ও-সব ভিটকেলমি আমি শুনছি না। একটা আমােদের কাজ • এতে যদি বাগড়া তােলো, তাহলে সত্যি বলচি, আমি তোমার মুখ দর্শন করবো না। চরণ হতাশ দৃষ্টিতে ক্ষেতুর পানে চাহিল ! ক্ষেতু কহিল,—আমার কাছে বান্নাই ফলিয়ো না ঠাকুর। আমি তামাক সেজে দিচ্ছি, হুকোয় জল আছে—সে জল আমার ১২৭ মনের মিল ছোওয়া। আগুন আর জল...দুই আছে তার। সঙ্গে তামাক আর টিকে, কেমন তো? পােলাতেও ঐ আগুন আর জল--- শুধু তামাক-টিকের বদলে চাল আর মশলা—এই না!•••তবে ? চরণ কহিল,—এটা কাষ্ঠ-সংযােগে কি না•••কথায় বলে, বৃহৎ কাষ্ঠে জাত যায় না।... হাসিয়া ক্ষেতু কহিল,—আচ্ছা বাবু, পিড়িতে বসে খেয়াে••• কাঠের যােগ থাকবে তাহলে। না খেলে আমি মাথা খুড়ে মরবাে••সত্যি? কে আর জানবে? শুধু তুমি আর আমি... চরণ কহিল,আমায় আজ বঙ্কিমবাবুর সেই বিদ্যাদিগগজ না সাজিয়ে আর ছাড়বে না, দেখচি! যাক্, মহাজনের পথ। তার ছিল আশমানি, আমার আছো তুমি ! সে আবার কি? চরণ কহিল,—সে এক মজার গল্প...বলবাে’খন। এখন নাও•••ছাড়বে না তাে•••তােমার সন্তোষের জন্য কি না করতে পারি!—মােদ্দা চুপি-চুপি..বুঝলে ক্ষেতু•••আর পাঁচ বেটা-বেটি জানতে পারলে --ভয় নেই গো ঠাকুরমশাই, সে জ্ঞান আমার আছে। বামুনের জাত মারচি জানলে এ-গয়ে কি আর আমাকে কেউ আস্ত রাখবে ? সে-ভয় আমার নেই ? ক্ষেতু চলিয়া গেল। চরণ বসিয়া চালের বাতা গণিতে লাগিল। নিতাই ও শশী কথাগুলা শুনিল। শশীর গায়ে ঠ্যালা দিয়া নিতাই কহিল,—সমাজপতির কাণ্ড দেখছো? ১২৮ মনের মিল শশী কহিল-চুপ ! ক্ষেতু থালায় অন্ন বাড়িয়া আনিল-মাটীর ভাড়ে ঝোল, থালায় নানা তরকারী ব্যঞ্জন। ক্ষেতু কহিল,-খাইয়ে দি, হাতটা নাই বা এটো করলে! তাছাড়া হাতে গন্ধ থাকবে ! শুধু মুখ দিয়ে খাওয়া বৈ তা নয়। আঁচিয়ে পাণ আর তামাক খেলেই চুকে যাবে। চরণ কহিল-খুব বুদ্ধি বার করেছে। কিন্তু দোরে খিল দাও ক্ষেতু, কেউ যদি এসে পড়ে ? ক্ষেতু কহিল,—কেউ আসবে না ভয় নেই। তাছাড়া কেউ আসে যদি, ভাববে, আমি খাচ্ছি। আমার হাত এটো-- তােমার হাত খালি দেখবে তাে ! তুমি ঐ তক্তপােষে বসে থাকো—আমি গেরাস তুলে তুলে তােমার মুখে দি। তাহাই হইল। নিতাইয়ের অস্বস্তির সীমা নাই। সে ওদিকে প্রহর গণিতেছে সদুবাবুরা কখন্ আসিবে। চরণ আরামে গ্রাস লইতেছে। ক্ষেতু কহিল-কেমন রান্না হয়েছে ? চরণ কহিল—চমৎকার। এমন কখনাে খাইনি, ক্ষেতু—সত্যি বলচি। কে বঁধলে ? ক্ষেতু কহিল—আমার বােনঝী-জামাই। সে হুগলিতে এক সাহেবের বাবুর্চিরান্না-বান্না জানে। চরণ কহিল,—বিলিতি খানা! ও•••তাই বলাে। এমন খানা মনের মিল খায় বলেই না এরা রাজত্ব করছে! আর আমরা যেমন বেগুন কাঁচকলা খাই, তেমনি দাসত্ব করে মরচি। ভােজ্যের স্বাদে চরণ জাতের কথা ভুলিয়া গেল। মাংস খাইতে খাইতে চরণ কহিল,দাতের সে জোর নেই ক্ষেতু•• নাহলে...আচ্ছা, তােমার এই বােঝী-জামাইটি কিছু দিন আছে তাে এখনে? ক্ষেতু কহিল,--না। ছুটী মেলে কৈ? কাল বিকেলে ও চলে যাবে। একখানা হাড় চিবাইবার লােভ চরণ ছাড়িতে পারিল না। ...কাজেই তক্তাপােষ হইতে নামিয়া হাত দিয়া সেটাকে বাগাইয়া ধরিল, ধরিয়া তাহাতে দিল কামড়। বেচারী ! সহসা দ্বারপ্রান্তে স্বর ফুটিল,ইস... ••এ যে রীতিমত মহােৎসব লাগিয়েচো হে চরণ। এ কণ্ঠ ?•••চরণ চমকিয়া উঠিল। কম্পিত হাত হইতে ছাগলের হাড় পড়িয়া গেল। চাহিয়া চরণ দেখে, সর্বনাশ । দ্বারে দাড়াইয়া সদু বঁড়য্য, রমানাথ এবং•••কে যে নাই। ক্ষেতু কি ইহাদেরও নিমন্ত্রণ করিয়াছে ? সদু কহিল,-খুব বামুন তুমি! বাঃ। নিতাই এবং শশী টেকিশাল হইতে বাহিরে আসিল। নিতাই কহিল,আমরা সাক্ষী, বড়য্যে মশাই। এই চরণকে দিয়ে দেশ-শুদ্ধ সকলের জাত মারচেন আপনি। সামাজিক বিহিত যদি না হয়, আমরা কাছারিতে এর ১৩০ মনের মিল নালিশ করবো। জাত-মারার অপরাধে শুনেচি জেলও হয় নাকি। সদু কহিল,-আমিও ছাড়বাে না হে। এর বিহিত আমি করবােই।•••চরণ••• আর চরণ ! চরণ একেবারে মাটীতে মিশিয়া গিয়াছে। মাথায় ঘোমটা টানিয়া সলজ্জ ভঙ্গীতে ক্ষেতু পাশ কাটাইয়া ঘর হইতে ইতিমধ্যে কখন সরিয়া পড়িয়াছে... নিতাই কহিল,-এর বিহিত যদি না করেন, তাহলে আমরা উপায় দেখবাে। ঐ পাদ্রীদের ধরবাে•••জাত যদি যায়, তাহলে আমরা খৃষ্টান হবে। সদু কহিল,-এইখানেই তুমি থেকে যাও চরণ। গায়ে আর ও হাড়-চোষা মুখ দেখিয়াে না। দেখালে তােমাকে রক্ষা করবার সাধ্য থাকবে না আমার। নিতাই কহিল,—ওঁকে সৎপরামর্শই দিয়েছেন। তা উনি রাজী। উনি নিজেই বলছিলেন, উনি নাকি বিদ্যাদিগজ আর ক্ষেতু হলাে ওঁর আশমানি।
এয়ােদশ পরিচ্ছেদ ভাগ্যচক্র ! রাত্রেও নিতাইয়ের আর দেখা নাই !•••রাত্রিটা সুমিত্রার যে-বিভীষিকার মধ্যে কাটিল... বুঝি নরক-যন্ত্রণা বলিয়া যে কথা আছে, সে নরক-যন্ত্রণাও ইহার কাছে অতি তুচ্ছ। সকালে সেই রৌদ্র, সেই বাতাস ! তবু দুনিয়ার মুখের কলি আর ঘোচে না!•••সাহেবের আসিবার কথা ন’টায়।•••নাই, উপায় নাই, কোনাে উপায় নাই ! মুখে এই কালি মাখিয়াই তাদের সামনে দাড়াইতে হইবে । তাই হাে! নিজের মুখে সে কবুল করিবে, করিয়া বিচার চাহিবে —যত বড় কঠিন শাস্তি দিন, বুক পাতিয়া সে গ্রহণ করিবে! চা-সমেত চায়ের পেয়ালা টেবিলে পড়িয়া আছে। ছেলেরা আসিল। তাদের পড়াশুনা.•• সুমিত্রা কহিল—আমার শরীর বড় খারাপ, আজ ক্লাশ নিতে পরিবাে না। তােমরা পড়ে নিজে নিজে ছেলেরা সুমিত্রার মুখের পানে চাহিল। ও-মুখ তারা এমন মলিন পূর্বে কখনও দেখে নাই! তারা বিদায় লইল। খবর পাইয়া সুহাস ছুটিয়া আসিলেন। তাঁর মুখে-চোখে উদ্বেগের ছায়া। সুহাস কহিলেন—কি হলাে? মৃদু কণ্ঠে সুমিত্রা কহিল,- কহিল,—এমন কিছু নয়। রাত্রে ভালো- ঘুম হয় নি, তাই কেমন...
মনের মিল সুহাস কহিলেন,–তাই বলুন। সময়টা খারাপ কি না-ভয় হয়েছিল। মৃদু হাসিয়া সুমিত্রা কহিল—ভয়ের কারণ নেই। আপনি যান। ; সুহাস চলিয়া গেলেন। সুমিত্রা পথের পানে চাহিল ; পরে ঘড়ির পানে। ঘড়ির ছােট কঁাটাটা আটটার ঘর পার হইয়াছে, ন'টার ঘর বুঝি এখনি ধরে ! সুমিত্রা মুখ-হাত ধুইতে গেল। সাফ হইয়া সে আসিয়া বারান্দায় দাড়াইল। পথের পানে চাহিয়া রহিল। বড় বড় গাছগুলা ছায়া মেলিয়া দাড়াইয়া আছে, বাতাসে পত্র-পল্লব মৃদু দুলিতেছে! চারিদিকে জীবনের স্পন্দন। দীপ্ত শ্রী !•••তার মনেই শুধু এই সকালে ভয়ের ছছমানি ! ঐ না...ঐ...কতকগুলা শুভ্র মূর্তিতাই সুমিত্রা চক্ষু মুদিল.••একান্ত আগ্রহে ভগবানকে ডাকিল–0 Father That art in Heaven. সাহেব আসলেন:সঙ্গে এঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি। সুমিত্র তাহাদের অভ্যর্থনা করিল চারিদিক দেখিয়া সাহেব প্ল্যান খুলিলেন, বলিলেন,—ইনি শীঘ্রই কাজ শুরু করবেন ! তুমি ওঁর হাতে টাকা দিয়ে যাও, সুমিত্রা। তিন মাসে উনি কাজ শেষ করে দেবেন। সাহেবের মুখ সস্মিত। এঞ্জিনিয়ার বাঙালী। হাসিয়া তিনি কহিলেন—আপনার কি সুখ্যাতিই যে সাহেব করছিলেন•••বলছিলেন, she is an angel. ১৩৩ মনের মিল গাঢ় কণ্ঠে সুমিত্রা কহিল—টাকা আনি। সে ঘরে ঢুকিলসিন্দুক খুলিল। Miracle••• তেমন miracle ঘটে না?...মহাভারতে সে পড়িয়াছে, দ্রৌপদী নারায়ণকে ডাকিয়াছিলেন, তার লজ্জা রক্ষার জন্য! নারায়ণ সে ডাক শুনিয়াছিলেন । তারও আজ দ্রৌপদীর দশা! বুঝি, দ্রৌপদীর চেয়েও বড় বিপদ! চোরের কাজ করিয়াছে সে। কত বড় কলঙ্ক ! তাই সে ভাবিতেছিল, ভগবান কি তার ডাক শুনিবেন না? Miracleএর সৃষ্টি করিবেন না? বুকখানা নিমেষের জন্য স্পন্দিত হইল। কিন্তু কিছু ঘটিল না ! কোথায় miracle ? টাকা গণিয়া যতবার দেখে, ততবারই কম হয়—সেই এক হাজার কম। তার নিজের সঞ্চয় ? গণিয়া দেখে, তিনশাে বত্রিশ টাকা! বাকী ছ'শাে আটষটি টাকা চাই!•••কোনাে উপায় নাই ? ভগবান•••ভগবান, তােমার অসাধ্য কিছু নাই। তুমি মনে করিলে ••মান রাখো, মান রাখো, দুৰ্ব্বলচিত্তা নারীর মান-ইজ্জৎ রক্ষা করাে প্রভু। কে শুনিবে? মানুষের শয়তামীর পর শয়তানী দেখিয়া ভগবান আজ চোখ বুজিয়াছেন। তার বিরক্তি ধরিয়াছে, ঘৃণা ধরিয়াছে, মানুষের ডাক তিনি তাই আর কাণে তােলেন না। উপায় ? দুনিয়া দুলিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে ঐ গাছপালা মাঠ-বাট... মাথার উপর ঐ রৌদ্র-আলােকিত নীল নিৰ্ম্মল আকাশও••• ১৩৪ মনের মিল উপায় আছে। একটিমাত্র উপায় । তাহাতে লজ্জা রক্ষা পাইবে—মার কিছু না হােক্ !•••সেই উপায়••• টেবিলের উপর টাকার থলি এবং বিজলীর হ্যাণ্ডনােট রাখিয়া সুমিত্রা পিছনের দ্বার-পথে বাহির হইয়া গেল..বুঝি। নিতাইয়ের সন্ধানে। তার গতি চোরের মত সতর্ক কম্পিত। দীর্ঘ পথ। খােলা মাঠ, বন, জঙ্গল, ঝােপ-ঝাপ, পুকুর, ডােবা খানা, নালা...কদৰ্যতার সঙ্গে চারুতার বিচিত্র মিলন।•••সুচিত্রার মনে হইল, শয়তানীর সঙ্গে করুণার মিলনের মত যেন! কিন্তু নিতাইয়ের কাছে কেন সে চলিয়াছে? নিতাই কি করিবে? কেন করিবে ?...কি বলিয়া সে-ই বা করুণা ভিক্ষ করিবে? বুকে তার তীব্র বহ্নি-দাহ ! সে দাহে তীক্ষ্ণ সামনে পুকুর। বুকে কালো জল। ঢেউ তুলিয়া তাকে যেন ডাকিতেছে, তােমার ও-জ্বালা আমি জুড়াইয়া দিব। এসো, আমার বুকে এসাে। নিমেষের ইঙ্গিত! কাণের কাছে মনও কহিল-তাই চলাে। সব কুৎসা, সব গ্লানি জুড়াইবে, চলো। সুমিত্রা পুকুরে নামিল।•••আঃ, কি শীতল জল। কি আশার উল্লাসে ভরা। কি স্নিগ্ধ আরাম এ জলে... বিদ্যুতের চমক দিয়া দুনিয়ার আলাে পরক্ষণেই দপ করিয়া নিবিয়া গেল। সব অন্ধকার•••দিকে দিকে কেবলি ঘন কালাে অন্ধকার••• যখন সুমিত্রা চোখ মেলিল, ঘরে এক-ঘর লােক। সাহেব, এঞ্জিনিয়ার, সুহাস ডাক্তার আর নিতাই। নিতাইয়ের চোখে তীব্র আগ্রহ। সাহেব কহিলেন-জলে ডুবলো কি করে ? এদিকে গেল কখন ? নিতাই কহিল,—টাক। এখানে রাখা নিরাপদ নয় বলে আমার কাছে রেখেছিলেন। তারপর আমার কাছে যাচ্ছিলেন। পিছল পথ•••পা হড়কে জলে পড়ে যান। ভাগ্যে আমি ঐ পথে আসছিলুম••• 71737 786070Thank God: Ard lle nieans harm to the good. নিতাই কহিল—তাই। সুমিত্রার লুপ্ত চেতনা ফিরাইতে বিলম্ব ঘটিল না। নিতাই খুব সময়ে এ পথে আসিয়াছিল।–সুমিত্রা জলে হাবুডুবু খাইতেছে—পথের ধারেই পুকুর। জল খুব বেশী নয়। শুশ্রুষায়-সেবায় কলরবে সারাদিন কাটিয়া গেল। বৈকালে সাহেব সদলে বিদায় লইলেন। তাঁদের বিদায় দিয়া নিতাই বারান্দায় আসিয়া বসিল। nerer ১৩৬ মনের মিল সুমিত্রা দাড়াইয়াছিল। আকাশে একটা পাখী উড়িতেছে, সুমিত্রা তার পানে চাহিয়া আছে। সহসা একটা নিশ্বাস ফেলিয়া সুমিত্রা কহিল—এত টাক আপনি কেন দিলেন ? নিতাই কহিল —এ-কথা মুখে আনবেন না। টাকা এমনি পড়েছিল বৈ নয়। তবে বিজলীকে শিক্ষা যা দিয়েছি, তা তার হাড়ে হাড়ে গাঁথা থাকবে।•••সকাল অবধি যখন কিছু আদায় হলো না, তখন বাড়ী ফিরে এসে টাকার জোগাড় করে ফেললুম। সুমিত্রা কহিল—কিন্তু এ ঋণ••• নিতাই সুমিত্রার পানে চাহিল, চাহিয়া কহিল,—দেবেন এর পর শুধে ! তার জন্য চিন্তা কিসের?
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ হাতী-ঘোড়ার পরে আনন্দর দুঃখের সীমা নাই। কলিকাতায় থাকিবার সময় টগরকে লইয়া মনে রােমান্সের কত ছবি আঁকিত। কলেজে পড়ে • টেনিশনের এন আর্ডেন•••শক্ত প্যাশেজওলা বুঝিতে না পারিলেও গল্পের প্রেমটুকু ভালাে করিয়া বুঝিয়াছে। সাহস করিয়া ভালােবাসার কথাটুকু শুধু বলিয়া ফেলা। বিশেষ নায়িকা যেখানে টগর! কেশব আজ বছর খানেকই হয় টগরকে বিবাহ করিয়াছে•••টগরকে কেশব জানে এই এক বছর! কিন্তু আনন্দ ? ••••• ছােট বেলায় টগরকে কত কি দিয়াছে...এবং যখনি তাকে ডাকিয়াছে, সে-6াকে টগর সাড়া দিয়াছে। টগর চন্দ্রশেখর পড়িতেছিল। এন আর্ডেন পড়িয়া, বাঙলা নাটক নভেল পড়িয়া আনন্দ যদি নিজের মনের পরিচয় পাইয়া থাকে, তাহা হইলে টগরও কি তার মনের দারুণ দৈন্যের খবর ঐ সব নাটক-নভেল পড়িয়া পায় নাই। নিশ্চয় পাইয়াছে। নহিলে ঘর-কর্ণার কাজের মধ্যে একটু অবসর পাইলেই টগর নাটক-নভেল পড়িবে কেন? পাড়ায় টগরের বয়সী আর পাঁচটা মেয়ের সঙ্গে এপাড়া ওপাড়া ১৩ মনের মিল এবাড়ী-ওবাড়ী ঘুরিয়া গল্প করিয়া তাস খেলিয়া বেড়াইতে পারিত। তা সে করে না এবং বাছিয়া বাছিয়া পড়িতেছে চন্দ্রশেখর । শৈবলিনী আর প্রতাপকে লইয়া আনন্দ যে ইঙ্গিত করিয়াছে...তারপর ঐ নিজের লেখা পদ্য পড়ানো•••রাগ হইল •• অমন নিরাল। অবসর...পদ্যটা পড়িয়া সদ্য শেষ করিয়াছে••• ঐ পদ্য ধরিয়া মনের কথা পাড়িবে...আর ঠিক সেই সময়ে শশীদার বৌঠকরুণ আসিয়া হাজির.•• তারপর হইতে প্রত্যহ সুযোগ খুঁজিতেছে আর একবার অমনি একটু নিরাল...কিন্তু খটিতেছে না। কেশববে সে করে না...কেশব বাড়ীতে থাকিতে আনন্দ গিয়া টগরের সঙ্গে দেখা করিতে পারে। কেশব যদি বলে, কি খবর? আনন্দ বলিবে—টগরের কাছে একট দরকার। সন্দেহ করে যদি ? করুক•••সদুবাবুর ছেলে আনন্দ আর সদুবাবু কেশবের অন্নদাতা। কাজেই মনে সন্দেহ জাগিলেও সে-সন্দেহ মনে রাখিবে.••প্রকাশ করিবার সাহস হইবে না। তা ছাড়া কেশব টগরের দাম বোঝে না—সে বিবাহ করিয়াছে সংসার- টাকে চালাইয়া কেশবকে নিশ্চিন্ত রাখিবে টগর-ব্যস। আনন্দও এখান হইতে টগরকে ছিনাইয়া লইয়া যাইতে চায় না তার বিপদ ঐ ছেলেমেয়েগুলাের জন্য...বাড়ীতে ধরেনা এত ছেলে মেয়ে•••কিলবিল করিতেছে পােকা মাকড়ের মতে! নিরালায় টগরকে ডাকিয়া পদ্য শুনাইয়া মনের কথা জানাইবে, সে ফাক মিলিবে না? আনন্দ ভাবে আর মনের মিল ভাবে। এবং যখন পদ্য লিখিতে শিখিয়াছে তখন কল্পনার রথে তুলিয়া মনকে চৌদ্দভুবন ঘুরাইতে চায়••• ভাবিয়া ভাবিয়া পাছে সে একখানা চিঠি লিখিল টগরের নামে। ছন্দে গাথিয়া একথা জানাইল যে চন্দ্রশেখরের মতাে কেশবও তােমার যােগ্য নয়। জ্যোৎস্না-নিশীথে তােমাকে পাশে বসাইয়া কখনো প্রাণের কথা শুনাইয়াছে? প্রাণ কি তার আছে যে প্রাণের কথা শুনাইবে ? ভাত-ডাল তো আছেই কিন্তু ভাত-ডালের প্রয়ােজন মানুষের কতটুকু ? পেটটা ভরানো শুধু! এমনি নানা কথা লিখিতে লিখিতে পদ্যের শেষের দিকে লিখিয়াছে আমি তােমার মনের খবর রাখি- মনের দৈস্য দিই ভালোবাসায় ঢকি। জ্যোৎস্না রাতে কানে তােমার গাইবো গান, এসাে তুমি প্রাণের প্রিয়-বাচাও প্রাণ! তুচ্ছ প্রতাপ ভালোবাসার জানতে কি? তোমার পরে আমার এ প্রেম ঢের বেশী । তুচ্ছ করি পৃথিীকে হতে পায়ি নবতাগী তুমি যদি হওগো টগর আমার হৃদয় মন-ভাগী। ক্যারারা হােয়ায়েট কাগজে বেশ পরিষ্কার করিয়া পদ্যটি লিখিয়া খামে মুড়িয়া খামে লিখিল-শ্ৰীমতী টগর প্রিয়তমাসু লেফাফার মাথায় লিখিল গােপনীয় । এবং এক ফাকে টগরের সঙ্গে দেখাও হইয়া গেল। টগর গিয়াছিল সন্ধ্যার আগে ১৪ মনের মিল শশীর গৃহে•••বিন্দু সেখানে মালপো তৈয়ার করিয়াছে••• টগর ভালােবাসে•••টগরকে বলিয়া পাঠাইয়াছিল...তাই... সেখান হইতে ফিরিতে একটু রাত হইল। টগর বাড়ী ফিরিতেছে...গ্রামের মেয়ে নিশ্চিন্ত মনে আসিতেছে...হঠাৎ আহ্বান টগর... চেনা গলা। টগর ফিরিল, বলিল,-আনন্দ! -হু... আনন্দ আগাইয়া আসিল, বলিল,-একটা নতুন পদ্য••• পড়াবাে ভেবেছিলুম...কিন্তু তার সুযােগ মেলেনা। পড়বে? -কেন পড়বে না ? পড়ে। পড়ে কেমন লাগে লিখে আমায় একটু যদি জানাও.•• —বেশ। কিন্তু কি করে পড়বে? —এই নাও.•• খামে আঁটা পদ্যর চিঠিখন আনন্দ দিল টগরের হাতে • দিবার সময় টগরের হাতখানা আবেগভরে টিপিয়া ধরিল। —আঃ! বলিয়া টগর হাত ছাড়াইয়া লইল। একরাশ নিশ্বাস জমিল আনন্দর বুকে•••তবু আনন্দ ডাকিল ----টগর... -বলাে.•• আনন্দ বলিল,-কাল সন্ধ্যার পর আসতে পারবে আমাদের খিড়কী পুকুরের ঘাটে। ১৪১ মনের মিল -কেন? টগর করিল প্রশ্ন...সহজ স্বর। আনন্দ বলিল,-খুব ভালাে চামেলি গাছ পুঁতেছি••• কলকাতার নার্সারি থেকে এনেছি•••গােটা চারেক। তােমার যদি পছন্দ হয় দুটো নিয়ে আসবে। ফুলগাছের উপর টগরের ভারী মায়া ! টগর বলিল,-সত্যি? -সত্যি... বেশ' যাবাে। টগর চলিয়া যাইতেছিল.••আনন্দ ডাকিল-টগর -কেন? আনন্দ চারিদিকে চাহিল••তার পর চাপা গলায় কণ্ঠে মিনতি ঢালিয়া বলিল,-~-একটা••• —ধেৎ! বলিয়া টগর চলিয়া গেল...গতিতে বেশ খানিকটা বেগ। পদ্য ! বাড়ী ফিরিয়া টগর পড়িল লেফাফা ছিড়িয়া আনন্দর লেখা। পড়িয়া শিহরিয়া উঠিল•••বুঝিল, ভূতে পাইয়াছে আনন্দকে। ছি ছি•••এ-সব কী কথা। কিন্তু সদুবাবুর দয়ায় তাদের সংসার চলিতেছে•••কিছু বলিবার জো নাই। তবু গঁয়ে যে সব লােকের বাসসদুর প্রসাদ বজায় রাখিবার জন্য ইহরা না করিতে পারে, এমন কাজ নাই। তার উপর টগর শুনিয়াছে, শশীর বাড়ীতে বিন্দু বৌদিকে লইয়া চরণ ভট্টাচাৰ্য কী মিথ্যা ঘোট পাকাইয়া তুলিয়াছে । ১ঃ২ মনের মিল কে জানে, ঐ আনন্দ••ও তাে সদু বাড়ুয্যের ছেলে:••তাই বুকের জোর আছে•••এখনই ব্যবস্থা না করিলে প্রশ্রয় পাইয়া যদি একদিন পথের উপর কি পুকুর-ঘাটে হাতখানা ধরিয়া বসে? টগর পুকুর সরিতে যায় সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা সব সময়ে••• কোনােদিন রাত নটাও বাজেনা, মজা বা তামাসার কথা নয় এ। সত্যকার কিন্তু কি করা যায়? কেশবকে বলিবে ? কেশব কি মানুষ ! মাষ্টারী চাকরি বজায় রাখিবার জন্যই সংসারে পড়িয়া আছে ! নিজের ছেলে-মেয়েগুলা যেন দুরন্ত ষাঁড় তৈরী হইতেছে.••তাদেরই দাবিয়া রাখিতে পারে না। মমতা হইল। স্বামী বলিয়া মনে ধরে নাই সত্য—কিন্তু বিবাহ যখন হইয়াছে, তখন এ জন্মের মতো এ বন্ধন হইতে মুক্তি নাই তাে। এ-বন্ধন দেহে-মনে আঁটিয়া এ-জন্ম শােধ করিতে হইবে। নভেলে যে-সব কথা লেখে, ও-সব নভেলেই চলে , সংসারে তা না কি হয়? দশজনে ছি-ছি করিবে, তা ছাড়া ঐ নভেলেই পড়িয়াছে, পুরুষের এ-রকম ভালােবাসা শুধু চোখের নেশা! পরের স্ত্রীকে ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছে কত নভেলের কত মানুষ...কিন্তু দুদিন মাত্র মাথায় তুলিয়া নৃত্য করিয়াছে... তারপর ছেড়া জুতার মতাে ফেলিয়া দিয়াছে । কৃষ্ণকান্তের উইলের রােহিণী...বিবাহের চেয়ে বড় নভেলের নায়িকা মালতী:..সারা রাত টগরের চিন্তায় কাটিল। রাত্রে কেশব দু-তিনবার করিয়া ওঠে•••বয়সের ব্যাধি... ১৪৩ মনের মিল রাত তিনটা:: কেশব দেখে • জানলার ধারে গুম হইয়া বসিয়া টগর••• কেশব বলিল—শােওনি ? টগর বলিল, না। --অসুখ করেছে? -না। ঘুম হচ্ছে না। কেশব ক্ষণেক দাড়াইল...টগর বলিল,—ঘুমোও গিয়ে... সকালেই তাে ছেলে পড়ানো কেশবের চোখ ঘুমে আচ্ছন্ন হইয়া আছে কেশব গিয়া বিছানায় শুইল। টগর নিশ্বাস ফেলিল! নাটক-নভেলে পড়া অনেকগুলা গল্প মনে ভালিয়া উঠিল...প্রায় সব গল্পেই পড়িয়াছে, এমন ঘটিলে স্ত্রীকে স্বামী কী আদর করে কত সােহাগে জাগ্ৰত স্ত্রীর চোখে ঘুম আনিয়া দেয়। কিন্তু কেশব ? ভাবিল, হায়রে, শুনাে গাছে ফুলের প্রত্যাশা•••বাতাসে প্রাসাদ-রচনা••• পরের দিন সকালে উঠিয়া টগর ছুটিল বিন্দুর কাছে। বিন্দু তখন শশীর জন্য মােহনভােগ তৈয়ার করিতেছে•••শশী বলিয়াছে তার তাড়া আছে কোথায় কত কাজের আয়ােজন করিতে হইবে। টগরকে দেখিয়া বিন্দু বলিল—কিরে টগর। টগর বলিল—তােমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে বৌদি কাউকে বলবে না বল। -কি কথা রে? বিন্দুর বুকখানা ছাৎ করিয়া উঠিল। ১৪৪ মনের মিল টগর দেখাইল পদ্যে লেখা অনিন্দর চিঠি। বিন্দু পলিপড়া শেষ হইলে বিন্দুর দু'চোখ হইল এত বড়••বিন্দু বলিল—টাকার জোর আছে বলে’ আস্পর্ধারও সীমা নেই। এ•••এর বিহিত •• টগরের ভয় হইল, বলিল—কিন্তু বােঝো তাে বৌদি.••ওর বাবার স্কুল...আর সেই স্কুলে ••• —তা বলে:.. -ভয় করে বৌদি। তছাড়া একটা বদনাম দিতে কতক্ষণ! বিন্দু বলিল—ঠাকুরপে কে বলি । শশীদাকে...টগর চমকাইয়া উঠিল। তাের ভয় নেই। আমার উপর কী পীড়ন চলেছিল জানিস তে। এ-সব সয়ে থাকলেই বিপদ। এ-রোগে সদ্য-সদ্য চাবুক দিতে হয়। তাের কোনাে ভয় নেই... শশীকে এ-কথা বলিলে, শশী চিঠি লইয়া নিতাইকে দেখাইল এবং সব কথা খুলিয়া বলিল। নিতাই বলিল—হু.. লেখাপড়া শিখবে কি ও•••দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ-প্রাণে বেজায় রস হয়েছে দেখছি... শশী বলিল—কি করবে। হাসিয়া নিতাই বলিল—আরে, এ তো একটা মশা•• এক চপেটাঘাতেই...হু... ১৪৫ মনের মিল তবু শশী করিল প্রশ্ন। নিতাই বলিল—ব্যস্ত হয়ো না...এখনি কিহিত করছি.. এসো আমার সঙ্গে •• ভাগ্য প্রসন্ন•••আনন্দ বেশভূষায় সাজিয়া বাহির হইয়াছে... চলিয়াছে কেশবের স্কুলের দিকে... নিতাই ডাকিল-আনন্দবাবু যেনমস্কার । কথার ভঙ্গীতে আনন্দ ভড়কাইয়া গেল। কোনাে জবাব না দিয়া নিতাইয়ের পানে তাকাইল••• নিতাই বলিল-পদ্য লিখে ভালােবাসা জানাচ্ছে। অপরের বিয়ে-করা স্ত্রীকে! এ•••এই সে পদ্য তােমার বাবাকে দেখাবো...তারপর কোর্ট আছে•••দুটো পয়সা আছে, তার জোরে বাঁচবে। গায়ে কত কী করচো...কেউ কিছু বলে না... ভেবেছো, গা হলো ভারত-সাম্রাজ্য আর সে সাম্রাজ্যে তােমরা সম্রাট আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট !•••••• আনন্দর মুখ শুকাইয়া এতটুকুন...নিতাইয়ের গা জ্বলিয়া উঠিল। হাতও সেইসঙ্গে নিশপিশ...আনন্দর কাণ ধরিয়া নিতাই সবেগে দিল টান•••মাথা হেলিয়া পড়িল•••তারপর কাণ ছাড়িয়া তার গালে বেশ জোরে বসাইল চড় কহিল,—ফের যদি ভদ্রলােকের বৌয়ের সঙ্গে প্রেম করতে যাও, শুনি...তাহলে পাজাকোলা করে নিয়ে গিয়ে নদীর জলে চোৰাবাে••• আনন্দর বুক কঁপিতেছে•••কেহ যদি আসিয়া পড়ে..যদি প্রশ্ন করে, ব্যাপার কি ? বাবা তাহা হইলে দূর করিয়া দিবে... ১৪৬ মনের মিল মুখে কথা নাই...মাথা নীচু করিয়া আছে আনন্দ••• নিতাই কহিল,—কী•••এ প্রেম চলবে? না, এর সমাপ্তি ••• বলো, যাবে থানায় ? আনন্দ বলিল-না। -কার্ণ মলো নিজের হাতে..বলো, কেশব কেশব ঠাকুরের বাড়ীর দিক্ মাড়াবে না, টগরকে কোনােরকম জ্বালাতন করবে না। চারিদিকে চাহিয়া আনন্দ নিজের কান মলিল—বলিল, না, -আর কখনাে না। —ই, মনে থাকে যেন ! পদ্য লিখতে চাও, তােমার ঐ আকাশ আছে, বাতাস আছে ফুল আছে, ফল আছে... গরু বাছুর চাল ডল:••এত জিনিষ রয়েছে, সেইসব নিয়ে লেখো ! তা নয়, পরের বৌয়ের উপর নজর ! কথা শেষ করিয়া আনন্দর গালে আবার একটা চড় মারিয়া নিতাই বলিল, পদ্য আমার কাছে রইলো ! ফের যদি শুনি...টগরকে দি করেছে, তাহলে ছাড়বো না। টগরকে আদালতে নিয়ে গিয়ে, দেবব তাকে দিয়ে নালিশ ঠুকে হুশিয়ার আনন্দ রায়... ১৪৭ পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ মনে মনে আনন্দকে ঢিট করিয়া নিতাই বলিল—চলো, স্কুলে যাই... ওদের সভা বসবে বেলা দশটায়। আমরা নেহাৎ নিমন্ত্রিতের মতো যাবো..ভালো দেখাবে না শশীদা••• -হু...মানে, ভয় পেয়ে টগর এসেছিল বৌদির কাছে সকালেই...বৌদি আমাকে চিঠি দেখলো, আমি ভাবলুম-- এর বিহিতের জন্য দেরী করা নয়, তাই... —বেশ। এখন তুমি তৈরী হয়ে এসাে...আমিও তৈরী হয়ে নি। বেলা এখন আটটা... দেখাে স্কুলে আজ ভিত্তি-স্থাপনের উৎসব। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আসিবে এবং ম্যাজিষ্ট্রেটের নামে এদিককার মাতব্বর বহু লােক আসিবে। সদু বড়য্যেকেও কার্ড পাঠানো হইয়াছে••• নিতাই বলিল,-মজা শশীদা...ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব আসচেন, কাজেই এরা স্কুলে দিব্যি আসবে’খন•••এখানকার ধর্মধ্বজগুলোে••• ন’টার আগেই নিতাই আর শশী আসিয়া স্কুলে হাজির সুমিত্রা যেন দশভূজা হইয়া সব দিকে সব কাজে নিজেকে ১৪৮ মনের মিল সপিয়া দিয়াছে। পরিচ্ছন্ন পরিপাটী বেশ•••সাদাসিধা • তাহাতে বাহার নাই.. অথচ সম্রম সরমের পরিপাটী আবরণ। সকলের কাজে সস্নেহে সহযােগিতা কপালে স্বেদবিন্দু... নিতাইয়ের চোখে অপরূপ লাগিল। নিতাই আর শশীকে দেখিয়া সুমিত্রা ছুটিয়া কাছে আসিল। সস্মিত হাস্যে বলিল- বলিল—আপনাদের কাজ করতে হবে••• হাসিয়া নিতাই কহিল--কাজ করতেই তো এসেছি, নেমন্তন্ন খেতে আসিনি আমরা। আপনি আপনি আমাদের কী ইস্পায়ার করেছেন মন্ত্র জানেন। হানিয়া সুমিত্রা বলিল—এসব কথা রেখে এখন যান ষ্টোরে, রমানাথবাবু আছেন। প্লেটে করে খাবার সাজাচ্ছেন ও-ঘরে এখানকার কাকেও ঢুকতে দিইনি। জানি তো, জাত যাবার ভয়ে অনেকে কাটা হয়ে থাকেন । হাসিয়া নিতাই বলিল—জাতকে যারা এত ঠুনকো ভাবে, পাশে বসলে জাত যাবে•••বিস্কুট খেলে জাত যাবে-জাতের মৰ্ম্ম তারা বোঝেনা। তাছাড়া এখানে দেখবেন, ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব থাকবেন, তাঁর সামনে জাতের বাঁধন অনেকের আলগা হবে। তবু••যাক, যখন জাত বাঁচিয়ে খাওয়াবার ব্যবস্থা করেছেন•••ভালােই করেছেন। সুমিত্রা বলিল—ওঁদের সামনে আপনারাই দয়া করে খাবার পরিবেষণ করবেন কেমন ? | ০ ০ ১৪ মনের মিল ন উৎসব চুকিতে বেলা বারােটা বাজিয়া গেল মাতব্বরের দল সকলেই আসিয়াছিল—এখানকার সদু বাড়ুয্যেরও •• টেবিলে মাটির প্লেটে করিয়া খাবার। শশী, নিতাই, রমানাথ, তারিণী • • এরা খাবারের প্লেট আনিয়া দিল••সদুর দল নিতাইকে ডাকিয়া একান্তে কহিল--ওরা ছোয়নি তাে বাবা ? নিতাই বলিল---না, না। আপনারা যেখানে•• রমানাথ আর তারিণী•••এরা ছিল খাবারের চার্জে:•• নিশ্বাস ফেলিয়া ভঁরা চুপ করিয়া গেলেন এবং খাওয়ার কোনাে বিঘ্ন ঘটিল না! বেলা একটায় লােকজন বিদায় হইল...দোয়া খাটানাে লনে শুধু নিতাই, শশী আর সুমিত্রা... সুমিত্রা বলিল—একটা সুসংবাদ আছে নিতাই বলিল-কি? —রমানাথবাবুর চিঠি এসেছে...মাসে এখন তিরিশ টাকা করে’ পাবেন•••বাড়ী থেকেই আসা-যাওয়া করবেন। শুনিয়া নিতাই খুশী হইল•••বলিল—রমানাথবাবু পড়াতে যাবেন••• তারপর ইস্কুল সম্বন্ধে নানা কথা...বেলা দুটো বাজিল। শশী বলিল—উঠি এবার •• নিতাই বলিল-তুমি এসাে। আমার একটু দেরী হবে.•• শশী বলিল—বৌদিকে নিয়ে ওবেলা আসবে। সুমিত্রা বলিল -নিশ্চয়। কথা দেছেন::: * * * মনের মিল শশী চলিয়া গেলে নিতাই বলিল—আমার একটু কথা আছে। সুমিত্রা বলিল-বলুন••• নিতাই বলিল—শ'খানেক টাকা এনেছি। আপনাদের স্কুল- ফতে দিতে চাই... সুমিত্রা বলিল—আপনার অনুগ্রহের আর সীমা নেই... কিন্তু এরা থাকতে এ টাকা দিলেন না কেন ? -না, দামামা বাজিয়ে দিতে আমার লজ্জা করে সে রুচিও নেই। একশাে টাকার একখানা নােট নিতাই দিল সুমিত্রার । এ সুমিত্রা বলিল--এখনি এর রসিদ অফিস-ঘরে আসবেন ? -রসিদের কি দরকার, —ডিউটি। রসিদ ফেলে দিতে চান, দেবেন, কিন্তু রসিদ দরকার তো। -বেশ। চলুন: দুজনে আসিল অফিস-ঘরে । সেখানে রসিদ লেখা প্রভৃতি। সুমিত্রা বলিল—আপনার সে টাকাটা...আমায় কী ঋণে ঋণী করে রেখেছেন ! ও টাকা শােধ না দেওয়া অবধি আমি স্বস্তি পাবো না:••সত্যি••• একটা নিশ্বাস সুমিত্রা রােধ করিতে পারিল না।
মনের মিল সুমিত্রার পানে নিতাইয়ের একাগ্র দৃষ্টি..হাসিয়া নিতাই বলিল—এ ঋণের জন্য এত ভাবনা। কিন্তু শােধ করবার খুব সহজ উপায় তো রয়েছে। সুমিত্রা চাহিল নিতাইয়ের পানে—কহিল—কি উপায়? নিতাইয়ের বুকের কোথায় ছিল একখানা পাথর চাপা সে দৃষ্টিতে বুকের সে পাথর সরিয়া গেল... দ্বিধাহীন কণ্ঠে নিতাই বলিল—আমি একটা ভ্যাগাবণ্ড কাজকৰ্ম্ম করি না...শুয়ে-বসে’ দিন কাটাই। আপনার কাজ আর, আপনার মত•••আমাকে কী-রকম যে ইস্পায়ার করেছে:::যদি অনুমতি দেন••• আপনার এ-কাজে নামবার অধিকার... সুমিত্রার দু'চোখে গভীর আবেশ...সুমিত্রা বলিল--আপনি কি বলছেন নিতাইবাবু••আপনাকে পাশে পেলে আমি কতখানি শক্তি পাবে: বলিতে-বলিতে নিতাইয়ের চোখে সুমিত্রা যে আবেশ লক্ষ্য করিনিতাই তার পানে চাহিয়া •••সুমিত্রা কথা শেষ করিতে পারিল না•••মাথা নীচু করিল। নিতাই বলিল—তাই চাই.••বলিয়া সুমিত্রার হাত নিজের হাতে ধরিল•••সুমিত্রার দেহে বিদ্যুতের তরঙ্গ বহিয়া গেল মুখে গােলাপের অভা•••নিতাই বিমুগ্ধ হইল। চুপ করিয়া নিতাই চাহিয়া রহিল অনেকক্ষণ•••সুমিত্রার মুখে নিবদ্ধ একাগ্র অবিচল দৃষ্টি... তারপর নিশ্বাস ফেলিয়া নিতাই বলিল—শয়তান মনের মিল একটা কথা ঠিক বলেছিল.••জীবনের পথে সাথী চাই, মনকে উদ্দীপ্ত রাখতে পারবে এমন সাথী। সুমিত্রার মুখ ফুটিল। সে কহিল,—কিন্তু সে যােগ্যতা কি আমার আছে ? নিতাই চমকিয়া উঠিল। সে কহিল,--যােগ্যতা! আপনার যােগ্যতা! আমিই অযােগ্য.. তাই মনের স্পর্ধা:•• সুমিত্রা কহিল,---ও কথা বলবেন না। আমি আপনার পায়ে চিরদিন বিকিয়ে রইলুম। কে আমি ! অথচ কি দিয়ে আমার মান, আমার ইজ্জৎ আপনি রক্ষা করলেন। কিন্তু•••আমার দেবার মতো কি আছে ? তার উপর••• নিতাই সুমিত্রার হাত ধরিল, কহিল,তার উপর কি? সুমিত্রা কহিল,--আমি অনাথা। খৃষ্টানের ঘরে খৃষ্টানের অম্নে প্রতিপালিত... নিতাই কহিল,—হিন্দু-খৃষ্টান•••এ ভেদ মানুষের তৈরী। আমরা মানুষ••একই বিধাতার হাতে গড়া মানুষ। শুধু সঙ্কীর্ণ মন নিয়ে এই হিন্দু-মুসলমান-খৃষ্টানের ভেদ রচে’ মস্ত ব্যবধান গড়ে তুলছি পরস্পরের মধ্যে। এ ভেদ আমরা মানবাে না। মানুষে-মানুষে মনের-মিল চাই। সে মিল ঘটাতে পারলে পৃথিবী সৃষ্টির সার্থকতায় ভরে উঠবে। সেই সার্থকতা যাতে লাভ করতে পারি, আসুন, সেই উদ্দেশ্যে আমাদের জীবন মিশিয়ে এক-লক্ষ্যে বইয়ে দি... সুমিত্রা কহিল,-তাই হােক ।
মনের মিল তার স্বর মৃদু, কে নিল। সে স্বরে রাজ্যের নারী আর আরাম! আর তার চোখের ক্ষতি ? আনন্দের আবেশে জ্বলজ্বল করিতেছে! শেষ ১৫৪ আমাদের পরবর্তী পরম-উপভােগ্য উপন্যাস সাহিত্য-সব্যসাচী শ্রীসৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়ের জীবন-সঙ্গিনী কুশলী হাতের প্লট, • যেমন বিচিত্র•••বিবিধ চরিত্রের সঙ্গত- স্বাভাবিক বিকাশ-বিভবে তেমনি উপভােগ্য। হাসি-অশ্রু-শ্লেষ-ব্যঙ্গ-সৰ্ব্বরসের সমন্বয়ে অভিনব । সিনেমার ছবির ট্রেলারে বিচিত্র চিত্রাভাসে খণ্ড-দৃশ্যলীলায় যেমন পরবর্তী ছবির পরিচয় দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি ভাবেই আমাদের পরবর্তী নূতন উপন্যাস সৌরীন্দ্রমােহনের ‘জীবন- সঙ্গিনী’র নানা পৃষ্ঠা হইতে ছত্রাবলী উদ্ধৃত করিয়া তার পরিচয় দিতেছি পাঠক-পাঠিকাকে। এ-প্রয়াস বাঙলায় এই প্রথম।
No text on this page.
l০ L এসৌমেন মুখােপায় (!? - C Fটীৰ ২২/৫ বি,ঝামাপুকুর লেন জীবন-সঙ্গিনী কলকাতা সহর। বহুকালের বেনেদী ঘূর। টাকা-কড়ি অনেকখানি অক্ষয় আছে। পূর্বপুরুষে কে বুঝি কোন নবাবের দাওয়ান ছিলেন, তার দেতে বাংলা দেশে জমিদারী এবং মোহর-টোহর বিস্তর সংগ্রহ হয়েছে।••• পাজিতেহিদুর যতগুলাে পূজো-পার্বণ নির্ঘণ্ট রে' লেখা আছে, এ-বাড়ীতে তার কোনােটা বাদ যায় না। দোল- দুর্গোৎসব, জগদ্ধাত্রী পূজো—এ-সবে শুধু জ্ঞাতি-কুটু-সমাগম আর ভেজের পম নয় ; নাচ-গান যাত্রা—এ-সব চলে আসছে সেই সেকাল থেকে।••• কর্তর আসনে এখন বিদ্যুৎ চৌধুরী:••তাকে নিয়েই এম-এ পাশ করে ইস্তক তার ঝোঁক বিলেত গিয়ে ব্যারিদার হয়ে আসবে। ওটাতে তখন কশরৎ ছিল কম- তবির অনেকখানি। সে তমিরের সামর্থ্য বিদ্যুৎ চৌধুরীর বিলক্ষণ। কিন্তু বাড়ীতে বিধবা মা••সনাতন আচার-বিচারে এমন তার ভক্তি যে, ছেলের কথায় তিনি শিউরে ওঠেন। বলেন- ক ভয় করে বাবা! আচার-না-মানার দরুণ এ-বংশে দু-দুবার যে অনর্থ ঘটে গেছে•••বাড়ীতে ঠাকুর-দেবতা রয়েছেন•••জাগ্রত বিগ্রহ। তার উপর মা মঙ্গলচণ্ডী বিরাজ করছেন ঘটে... এ-বাড়ীতে এতটুকু অনাচার-তারা সহ্য করবেন না। সেই মা মারা যাবার পর তিনমাস ত্বর সইলো না। বিদ্যুৎ চৌধুরী চললে বিলেত-পূৰ্বপুরুষের বাধা বিধি-নিষেধ ঠেলে স্ত্রী উমার মুখ মলিন। উম! বলে—আমার জন্যে না হােক, খােকনের জন্যে তােমার মন কেমন করবে না ? বিদ্যুৎ হাসলে ! হেসে বিদ্যুৎ বললে—মন-কেমন-কর। নিয়ে কুয়াের মধ্যে বসে থাকলে মনের একদিন অপমৃত্যু ঘটবে, উমা। পৃথিবী আজ সব আড়াল সরিয়ে আমাদের বুকের উপর এসেছে। তাকে ঠেলে যদি সরিয়ে দিতে চাই, গ্রহণ না করি, তাহলে বুক যাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে । পৃথিবীর কোন খবর উমা রাখে না। সে-খবরে তার দরকার নেই। তার পৃথিবী একটুখানি—স্বামী আর খােকনকে নিয়ে। আর এ-বাড়ীর ঠাকুর-দেবতা • পূজো-পাৰ্বণ লােকজন নিয়ম-কানুন এবং আচার-সংস্কার হলো তার এ-পৃথিবীর প্রাচীর । এই প্রাচীরের গণ্ডীর মধ্যে উমার পৃথিবী আবদ্ধ। গণ্ডী ছোট বলে’ উমার মনে কষ্ট হয় না। এ-গণ্ডীর মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে তার কোনাে অস্বাচ্ছন্দ্য নেই.••বাহিরের পৃথিবী রইলো কি গেল, তাতেও উমার কিছু এসে যায় না।••• উম বাড়ীর নিত্যপূজার উদ্যোগ-আয়ােজন নিয়ে ব্যস্ত। বিদ্যুৎ রাগ করে। বলে--এত বলি, এ-সব কাজ আর কারাে হাতে দাও। বামুনের মেয়ে না হলে’ যদি না হয়, বলচি তো, দেখে-শুনে পরম-নিষ্ঠাবতী একজন গরীব মেয়েছেলে রাখা চলে । বিশ-পঁচিশ টাকা মাহিনা দেবে...খাওয়া-পরা-থাকা—যে শুধু পূজোর কাজ করবে। ব্যস। কুণ্ঠাভাবে উমা বলে—কিন্তু জানো তাে, তােমাদের বাড়ী পূজোর কাজকর্ম, নিয়ম-নিষ্ঠা... মরবার সময় শ্বাশুড়ী উমার হাত ধরে বার-বার সাবধান করে গেছেন~-এ-বাড়ীতে লক্ষ্মী অচল হয়ে আছেন শুধু গৃহিণীর নিষ্ঠায়।•••যে-সব আচার-বিচার আমি মেনে আসছি, তুমি সে- সব দেখেছো তাে—সে-সবে যেন এতটুকু ত্রুটি না ঘটে ! বিদ্যুৎ যদি না মানে, খাওয়া-দাওয়ায় অনাচার করে, বারমহলে করুক। ঠাকুরদের মহলে যেন তার বাতাস না লাগে, মা! জানাে তো, আচার না মেনে এ-বংশে কত-বড় দুটো অনর্থ ঘটে গেছে একদিন। একদিকে ঠাকুর-দেবতা, আচার-নিষ্ঠা, আর-একদিকে স্বামী বিদ্যুৎ ! এমনি দোটানার মধ্যে উমা নিরালা অবসরে বসে ভাবে কোনাে কূলই কি আমার থাকবে না ঠাকুর? বসে’- বসে ভাবেভাবে আর নিশ্বাস ফ্যালে।•••স্বামী বিদ্যুৎ দিনে- দিনে তার পাশ থেকে সরে-সরে যাচ্ছে যেন! . চার বছর পরের কথা: বিদ্যুৎ দেশে ফিরলো নতুন চোখ এবং সে-চোখে নতুন দৃষ্টি নিয়ে.•• সুজন পিসতুতো ভাই। বয়সে ছােট। পায়ের ধুলো নিতে {০ হাত বাড়ালাে—দেশের যেমন প্রথা। বিদ্যুৎ পা নিলে সরিয়ে ; বললে-হােয়াই মেক এ ফুল অফ ইয়ােরশেলফ !•••তাছাড়া, পা পাবে কোথায় ? পা নেই ! পায়ে জুতাে। জুতাের ধূলো নেবার প্রথা তােমাদের শাস্ত্রের কোনো পাতায় লেখা নেই। সুজন বলে—চোখ দুটো সােনার জলে ধুয়ে নাও বিদা••• ওখানকার চুরুটের ধোঁয়ায় আর ফগ্-এ তােমার চোখ আচ্ছন্ন রয়েছে•••সােনার জলে সে ধোয়া-ফ« ধুয়ে-মুছে দেশকে দ্যাখো। ভালাে লাগবে, খুশী হবে:•• বসে সিগার ধরিয়ে বিদ্যুৎ বলে--বাঙালী-পাড়াটা একবার দেখে এলুম, সুজন । মেয়েরা চলেছে দল-বেঁধে...হাউ ক্লামশী। এখনাে এ-যুগে ঘােমটা !...মাথার উপর আকাশে এরোপ্লেনে চড়ে যেন ড জুয়ানের দল ঘুরছে—ওঁদের মুখ দেখতে পেলে চিলের মত ছোঁ মেরে লুঠে নিয়ে যাবে ! ঐ ? কি সব ভাবে ? বিদ্যুৎ আরাে বলে—এই ড্রিঙ্ক...মদ বলে’ তােমরা ঘৃণা করাে। ড্রিঙ্ক যে করে, তাকে মাতাল বলে’ নাক সে টকাও ! অথচ এই ড্রিঙ্ক:••বিলেতে এ নিয়ে কারও কপাল কেঁচকায় না। সুজন বলে-যস্মিন দেশে যদাচার•••এদেশের মানুষ এর ব্যবহার জানে। আমরা আমরা একটু খেয়ে খুশী হই না, বােতল- বােতল পার করি। তার ফলে ব্যারাম, চীৎকার, লিভার-এ্যাবসেশ ..কাজ নষ্ট•••সম্পত্তি ছারখার বেপরােয়া দুশ্চরিত্রতা...কী হচ্ছে, বলো তাে? আমাদের দেশের বােনেদী পরিবারগুলাের বেশীর ভাগ তাে ডুবে তলিয়ে গেল শুধু এই মদের বােতলে ••• সুজন বলে--বাড়ীখানার হাল করেছে। যেন হরগৌরী । !
I/ হেসে বিদ্যুৎ দেয় জবাব--তা নয়, বলে বরং, বার-বাড়ীটা ওয়েষ্টার্ণ হেমিসূফীয়ার পরিষ্কার ছিমছাম•••আর অন্দর ইষ্টার্ণ হেমিসূফীয়ার...এটো পাতা, মাছের আঁশ, হৈ-হৈ ! যেন পাণ্ডেমােনিয়াম ! জানাে তো, ইষ্ট এ্যাণ্ড ওয়েষ্ট...দে নেভার মীট। ফোন বাজে। জিতু ফোন করছে। জিতু বললে—তুমি বিলেত থেকে ফিরেছো...তােমার এ্যাট হােম আমাদের ক্লাবে আসতে চাও তুমি। ফ্যাশনে গ্যাদারিং। বিদ্যুৎ বলে—নিশ্চয় যাবে। সুজন বললে-ওদের ক্লাব আছে•••দী আছে•••দী বোহেমিয়ান্স... বিলেতে না গিয়ে বিলিতি আদব-কায়দা এমন রপ্ত করছে যে, দেখে, বিলিতি-মানুষও লজ্জা পায় ! ৪% জিতুর বাগান। লনে মস্ত আসর। ভাড়-করা বেন্ট-উড চেয়ারে আর ছােট-ছোট গােল টেবিলে আসরে ফাক নেই। উদ্দিপরা খানশামাদের ছুটোছুটি...প্লেটে-ডিশে-গ্লাসে-কাঁটায়- চামচে উঠছে ঝিনঝিনি-কিকিনি রব। এক-এক টেবিলে এক- এক গ্ৰ প, পান-ভােজ, হাসি হল্লা:.. বিগ-গ্রুপ বসেছে, মলি সেনকে ঘিরে। সে গুপে মলি সেনের পাশে বিদ্যুৎ চৌধুরী আর আছে স্মার্ট ছােকরা, বিজলী ব্যানার্জী, জিতু•••এবং আরাে দু’জন। বিজলী স্মার্ট ক্লেভার। বামুনের ছেলে জুতাের দোকান খুলেছে। শুনে বিদ্যুৎ মহাখুশী। তারিফ করে বললে—এই তাে চাই ! বিজনেশ ইজ বিজনেশ। গলায় পৈতে দিলেই রুটি-বিস্কুট বেচতে হবে ? কটা পয়সা loo তাতে মিলবে ? তার চেয়ে বহুৎ-বহুৎ লাভ জুতাের ব্যবসাতে !••• মলি সেনের সঙ্গে কথা হচ্ছে বিদ্যুতের। বিদ্যুৎ বললে— সেখানকার সােসাইটিতে আপনি চমৎকার ফিট করবেন! সিয়াের। সলজ্জ মৃদুহাস্যে মলি বললে--আমার ইচ্ছা আছে•••এ- বছরে সুবিধা হবে না, নেক্সট ইয়ারে মে-জুন নাগাদ••• জিতু বললে—টু মেক এ কনকেষ্ট ? তােমার নাচের ডিসপ্লে দেখিয়ে মলি বললে-নাচ••••••নাচ আমার প্রাণ! নাচ নিয়ে আমি মেতে আছি। কিন্তু টু মেক ট্রেড অন্ ডান্স • আই হেট ইট বিদ্যুৎ বললে--কেন ? আনা পাবলােভার মতো আর্টিষ্ট যদি... বাধা দিয়ে মলি বললে,—আমি যত গরীরই হই না, আর্ট নিয়ে ব্যবসা, নেভার: নে••• ? রাত্রি। ঘড়িতে ঢং ঢং করে’ দশটা বাজলো। উমা চমকে উঠলো। বিদ্যুৎ এখনাে ফেরেনি। কতক্ষণ খেয়াল নেই..বসে আছে উমা। উমার মন বার-মহলে ঘােরাফেরা করছে। তার ওদিকে কি, উমা জানে না। হঠাৎ নীচে গাড়ী-বারান্দায় মােটরের হর্ণ... সিড়িতে জুতাের শব্দ...উমা এলো সিড়ির সামনে ল্যাণ্ডিংয়ে। সেখানে দু’জনে দেখা। উমা বললে—খেয়ে এসেছে। বুঝি ? -হ্যা। পার্টি ছিল। বিদ্যুৎ বললে-তােমার এখনাে খাওয়া হয়নি, নিশ্চয় ?
1/০ উমা বললে—তােমার খাবার আগে কখনাে আমি খাই ? বিদ্যুৎ বললে-হু। সতী-সাবিত্রীও শুনেছি তাই করতেন •••না? তবু তুমি আমার সঙ্গে খাওন ! আমি খাই বাইরে টেবিলে! তুমি খাও ভিতরে•••মেঝেয় আসনে বসে থালা পেতে। • কবে তুমি মানুষ হবে, উমা? এমনিভাবেই সম্ভাষণ। বিদ্যুৎ রাগ করে বলে,আমি কী চাই, তুমি তা কখনো বুঝবে না ? ছেলে ভানু•••ছ-সাত বছর বয়স। রাত্রে বিছানায় শােবে•••মা উমা তার তার জামা-কাপড় ছাড়াচ্ছে। ভানু বললে—“বাবা বলেছে, আমাকে বিলেতে পাঠিয়ে দেবে, জানো মা? উমা বললে-আমাকে ছেড়ে সেখানে থাকতে পারবে? ছেলে বললে—বা রে, আমি তো এখন বিলেত যাবাে না। বড় হলে’•••যখন বাবার মতন বড় হবে। বড় হলে মাকে আর দরকার হবে না তো, তখন যাবাে। মা বললে-বড় হলে মাকে দরকার হবে না কেন? --তখন নিজে-নিজে জামা-কাপড় পরবাে...নিজে বিছানায় শােবাে, কাছে কেউ না থাকলে ভয় করবে না। যখনি খিদে পাবে, খাবাে। উমা বললে-বটে, তাই মাকে বিলেত নিয়ে যাবে না ? ছেলের বুঝি মমতা হলাে! ছেলে বললে-না, তা নয়••• তুমিও আমার সঙ্গে বিলেত যাবে। -মায়েরা বিলেত যায় না, ভানু।
ছেলের ভারী আশ্চর্য লাগলো। ভানু বললে,—কেন ? বিলেতের লোকদের মা নেই বুঝি ? হেসে উমা বললে—তা নয় ! বিলেত হলো, সাহেবদের দেশ। সেখানকার সাহেবদের মা হলাে, মেমসাহেব। ভন্ন কোনো জবাব দিলে না। কাপড় বদলানাে হলো, উমা বললে~~তুমি তাহলে বিলেত যাবে ভানু ? তোমার খুব ইচ্ছে, না ? ভানু বললে-~-তা কেন? বাবা যে বলে। বাবা বলে, বিলেত গেলে কত কি দেখবো, কত কি শিখবাে। বিলেত গেলে মানুষের মত মানুষ হবাে। উমা বললে—এদেশে থেকেও মানুষের মত মানুষ হওয়া যায় ভানু। মনুষ হবার জন্যে এদেশের মানুষকে বিলেত যেতে হয় না। -তাই না কি ? তাহলে আমি বিলেত যাবে না, মা। তুমি আমার সঙ্গে যাবে না: তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না, যেতে চাই না মা, আমার খুব মন কেমন করবে। কোর্টের পর বাড়ীতে কি আরাম ? বিদ্যুৎ উঠলো গিয়ে মলির ফ্লাটে। একটি কথা:••একটু হাসি•••কার কাছে পাবে? মলিকে মনে পড়লো। হাউ স্মার্ট..হাউ সােশাল ! মলি বললে—একটা কথা জিজ্ঞাসা করবে। মিষ্টার চৌধুরী ? —স্বচ্ছন্দে। মলি বললে-মিসেস্ চৌধুরীকে নিয়ে আপনি তো কখনো বাইরে বেরােন না। সব সময়ে দেখি একা-একা। কেন? কাফে —পার্টি—সিনেমা••• বিদ্যুৎ বললে,—মানে, মিস্ সেন, আমাদের ফ্যামিলি হলো বহুকালের পুরােনাে•••যাকে বলে, বােনেদী। বাড়ীতে আগা- গােড়া সেকেলে বােনেদী ভাব। প্রায় সেই পৌরাণিক-যুগের মত ! আমার স্ত্রীর শিক্ষা-দীক্ষা মায়ের কাছে, সেইজন্যে তিনি সেকেলে রয়ে গেছেন। পুরুষ-মানুষ দেখলে জড়োসড়ো হন। মুখে ঘােমটা টানেন। —স্ত্রীকে বুঝিয়ে আপনি •• —ঢের চেষ্টা করেছি মিস্ সেন•••এবং করছিও। কিন্তু হােপলেশ, টাস্ক ! ফরুণ-কণ্ঠে মলি বললে,—ও, হাউ আই ফীল ফর ইউ। সব থেকেও আপনার কিছু নেই তাহলে ! বিদ্যুৎ বিমুগ্ধ ! তার উপর মলির এত দরদ ! মলি বললে—আপনি এত ভালো, বাট সস লােলি! আপনার স্ত্রী আপনাকে চিলো না ! কি করে’ এ ব্যথা আপনি সহ্য করচেন ? আমার কেবলই মনে হচ্ছে, আমি যদি পারতুম•• কথাগুলো ছাড়াছাড়া•••যেন হেঁয়ালি ! তবু আভাসে যেটুকু অর্থ পাওয়া যায় দুর্বার লােভ !•••একটা নিশ্বাস বিদ্যুৎ রােধ করতে পারলো না। মলি এলো বিদ্যুতের কাছে—একেবারে পায়ের কাছে বসে পড়লো•••বললে,—নিশ্বাস ফেললেন যে ? বিদ্যুৎ বললে—আমার দুঃখ তুমি বােঝাে? নিশ্বাস ফেলে উদাস-কণ্ঠে মলি বললে—বুঝি। —যদি সত্যি বােঝে আমার দুঃখ দুঃসই, পারাে আমার এ দুঃখ দূর করতে? • .
॥ —কি করে ? মলির দু-চোখের দৃষ্টিতে আগ্রহ•••আবেশ ! বিদ্যুৎ বললে,- বলবাে, রাগ করবে না ? —না। বিদ্যুৎ বললে,তুমি আমার হও। পারাে না? হােয়াই লেটু মস ম্যারি । এe ম মলির পানে চেয়ে উমার চোখে পলক পড়ে না। মলির মজা লাগলাে। মলি বললে,—কি দেখছেন ? উমার মুখে কথা নেই। সে যেন কোন্ ধ্যানলােকে ! মলি বললে—আমি কে জানেন ? মৃদু হেসে মাথা নেড়ে উমা বললেজানি। -কে বলুন তো? শান্ত-কণ্ঠে উমা বললে—বােন। মলি হাে-হাে করে হেসে উঠলো। বললে,-হাউ ফানি । আমাকে দেখে রাগ হচ্ছে না? জেলশি ? ছােট একটা নিশ্বাস ফেলে উমা বললেন। তোমাকে উনি দেখে পছন্দ করে এনেছেন। আমি ওঁকে সুখী করতে পারলুম না, তুমি করাে। মলি বললে—কিন্তু, আপনার নিজের সুখ ? উমা বললে,—দুদিন স্বামী-সুখে সুখী হও, তখন বুঝবে, মেয়েদের সুখ কিসে! বিদ্যুৎ বললে,—এসো মলি, উনাকে আটকে রেখাে না। ওঁর বােধহয় পূজোটুজোর কাজ বাকী।
০ মলি বললে,-কাকে ফোন করছিস? রেবা বললে—বাবু জয়রাম বক্সী। —সে আবার ফোন্ নিলে কবে ? -তাকে দিয়ে ফোন নিইয়েছি। বলছি, ফোন নেই, কখন কি কথা মনে হয়, আপনাকে বলতে চাই, আপনাকে বলবো ••• ফোন্ না থাকলে কি করে কথা হবে ? হেসে মলি বললে-কেন রেবা, বুড়ো পেটো-কারবারীর মাথা খাচ্ছিস? রেবা বললে--খাবো কী মলিদি ? এর কি মাথা আছে- , খাবার মতাে মাথা ? একেবারে গােবর-পাের! নাহলে এমন করে’ নাচে! লােকে যেমন বাঁদর-নাচ দেখে, দেখি । বিন্দু-ঝির সহ্য হয় না। উমাকে বললে,—কিছু বলি না, তুমি বকবে বলে’ তাই বলিনি। নাহলে দেখেছি তো, ওদিকে গেলে ছেলেটাকে হা-হা করে তেড়ে আসে, যেন তাড়কা রাক্ষসী ! কেন রে•••ার সব, সে যাবে ভেসে ? তাের তাে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিস ? - চুপ ক বিন্দু। বিদ্যুৎ জিজ্ঞাসা করলে--ব্যাপার কি ব্যানার্জী ? মলি বললে—কিছু নয়। বিন্দুর সঙ্গে কি বুঝি বকাবকি, মানে, মিস-আণ্ডারষ্টাণ্ডিং? তা নিয়ে তুমি আর মাথা ঘামিয়ে । এসাে, আমাদের রিহার্শাল দেখবে। বিদ্যুৎ বললেন, না-মিষ্টার ব্যানার্জী চুপ করে আছেন। বিজলী বললে--আজ্ঞে না, কিছু না।
বিদ্যুৎ বললে—আমায় বলল, কি নিয়ে এখনি দু’জনে.. মলি বললে—বিন্দু ওকে চোখ রাঙিয়ে কুকথা বলেছে। -হু । বিদ্যুৎ বললে...আচ্ছা, আমি এখনি আসছি। স গম্ভীর-কণ্ঠে বিদ্যুৎ বললে—হয় বিন্দু...না হয় আমি।... একজনকে এ বাড়ী থেকে চলে যেতে হবে। উমা বলে,—বিন্দুর খুব অন্যায়, আমি তাকে খুব বকেছি। বিদ্যুৎ বললে--মানুষ বাড়ীতে শান্তিতে থাকবে, তার উপায় নেই ? উমা বললে-তুমি যাতে শান্তি পাও, সে ব্যবস্থা আমি করবে। বিন্দুর মুখে কথা বাধে না। বিন্দু বললে,-রাজলক্ষ্মী হয়ে নিজেকে তুমি এমনি বিসর্জন দেবে? মলিন হাস্যে উমা বললে,-আমার বিসর্জন অনেক দিন আগে হয়ে গেছে বিন্দু। মলি বললে --খবর পেলে ? নিশ্বাস ফেলে বিদ্যুৎ বললে—না। বিছানায় এই চিঠিখানা মলির হাতে বিদ্যুৎ দিলে চিঠি। মলি চিঠি পড়লো। মলি বললে—তাহলে ভাবচো কেন? ওর মায়ের কাছে গেছে। মায়ের বাড়ী কোথায় ? -কাশীতে থাকেন উমার মা—আমার শাশুড়ী।
৬০ বেশ কঠিন-কণ্ঠে বিদ্যুৎ বললে-তােমাকে আমি ভদ্রলোক বলে জানতুম বিজলী। বিজলী কোনাে জবাব দিলে না। মলি তাকালো উগ্রনয়নে বিদ্যুতের পানে। বিদ্যুৎ বললে-মিসেস চৌধুরী আমার স্ত্রী।•••ার রূপে মুগ্ধ হয়ে নেশার ঘােরে এইসব কথা বলছো তঁাকে! তােমাকে.. তােমাকে তােমাকে আমি... বলতে-বলতে হাত নিশপিশ করে উঠলো। বিজলীর ঘাড়খানা জোরে চেপে ধরলাে বিদ্যুৎ ••ধরে তাকে ঠেলা দিয়ে বিদ্যুৎ বললে—এখনি বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও আমার বাড়ী থেকে...নেভার টু এনটার মাই গেটস এগেন ! বিদ্যুৎ বললে—তুমি জানাে, বিজলী একটা লোফার র্যাঙ্কাল •••তার সঙ্গে তুমি সিনেমায় যাবে না ! মলি বললে—আমি যাবাে। তুমি রুখবে ? দেখি কেমন রুখতে পারাে! আমি তােমার উমা নই যে, তােমাকে দেবতা ভেবে তােমার সব কথা মেনে চলবে? আমি মলি, এ-কথা ভুলে যেয়াে না। ভানুকে ভালো করে পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু নিশ্বাস ফেললেন। তার মুখ গম্ভীর। দেখে রাখাল বললে—অসুখটা শক্ত ? তিনি বললেন—হু। —কি অসুখ ?
৭y লাঙসে প্যাচ। আপনি ডাক্তার বললেন—নিউমােনিয়া। কাগজ-কলম নিয়ে বাহিরে আসুন। ৪৫ মার্কেট.••একরাশ জিনিষ কিনে মলি মােটরে উঠবে...সামনে বিজলী বিজলী বললে—মিষ্টার চৌধুরীর খুব অসুখ নাকি ? রঙপুরের কী সেশন্স-কেস্ করতে গিয়েছিলেন•••কোর্টে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান! কাগজে খবর পড়লুম। মলি বললো। —এখন কেমন আছেন ? -খুব জ্বর •••বেহুশপানা। কিছু বলা যায় না। বিজলী বললে—আর তুমি শপিং করতে বেরিয়েছ ? মলি বললে—আমাকেও রােগী হয়ে পড়ে থাকতে হবে তার সঙ্গে ? দু-দুজন ইউরােপীয়ান নার্শ আছে ! পাঁচজন ডাক্তার আসছেন। চিকিৎসা হচ্ছে, সেবা হচ্ছে।•••একলা কেমন ভালো লাগলাে না, তাই বেরিয়েছি। বিজলী বললে—এখন বাড়ী ফিরচো? তাছাড়া আর জায়গা কোথায় ? বিজলী কি ভাবলো। বললে—সিনেমায় চলে না: ইভনিং শাে•••ভালো ছবি আছে। —চলে। -তার মানে, কোনো হােটেলে খাওয়াবে তাে? —হু।
৭/০ বিছানায় পড়ে বিদ্যুৎ••• সুজন বললে—বৌদিকে একখানা চিঠি লিখব বিদা, কাশীতে ? —কেন ? —উমা কেন চলে গেল সুজন? উমাকে আমি কোনো দিন বলিনি, যাও ! সুজন বললে—হয়তো তারপর এখানে তাঁর থাকা কোনাে কারণে সম্ভব হলো না। তা যাক, তােমার অসুখ শুনলে তিনি মনে অভিমান রাখবেন না•••তখনি ছুটে আসবেন। -হু! বিদ্যুৎ কি ভাবলাে। তারপর বললে--ছােটবেলায় বঙ্কিমবাবুর বিষবৃক্ষ পড়েছিলুম, সুজন। বিষবৃক্ষের সূৰ্যমুখী চলে গিয়েছিল। --কিন্তু সে সূর্যমুখী আবার ফিরে এসেছিল দ্।ি। —হু! একটা নিশ্বাস। বিদ্যুৎ বললে-নভেলের সূর্যমুখী •••তাই ফিরে এসেছিল। সত্যিকারের সূৰ্যমু । চলে গেলে আর ফিরে আসে না:•• ঘটনার পর এইরকম বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলি একসঙ্গে গেঁথে-গেঁথে লেখক যে মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন সম্পূর্ণ বইখানিতে-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তা একনিশ্বাসে পড়ে যেতে হবে পাঠক-পাঠিকাকে
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.