Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Premabatar Jishu Khrista

Nandi, Prafulla Nalini · 2009/08/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পেনালতার
®িখৃষ্ট
PROI
সরলা নন্দী, বি.এ. বি.টি.
(St. Ursula Girls' High School, Nagpur )
প্রফুল্ল নলিনী নন্দী, বি.এ., বি.টি,
(C. E. Z. Mission Girls' School, Bhagalpur )
দাম এক টাকা
দব-সাহিত্য-কুজীৱ * ২২৫বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা

প্রকাশফ-সুবােধচন্দ্র মজুমদার
দেব-সাহিত্য-কুটীর
২২বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
.
শুভ ১লা বৈশাখ—১৩৫২
প্রিন্টার-এশশধয় চক্রবর্তী
কালিকা প্রেস লিঃ
২০ নং ডি. এল. রায় জীট, কলিকাতা

অতি আদরের
সুনু ও অমুকে
পিসিমা ও মা..

সূচীপত্র • ৪৩ --- ৪৪ s ৪৭ ০০০ ৪৮ • ০ ০ ০ বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় , পৃষ্ঠা খৃষ্টের জন্ম ১| সমুদ্র-শাসন সুসংবাদ প্রচার অন্ধের দৃষ্টিলাভ পূৰ্বদেশের পণ্ডিতগণ পক্ষাঘাতগ্রসের উয়ার বালক খৃষ্ট ১১ | বিশ্রামদিন পালন সাধু যােহনের কাছে ? শিক্ষাদান খৃষ্টের দীক্ষা ১৪ | পাচ হাজার লােককে খাওয়ান ৫৩ সাধু যােহনের দেহাবসান ১৬ | শিষ্যদের পা ধােওয়ান••• খৃষ্ট ও তার শিষ্যগণ ১৭ খৃষ্টের দুঃখভােগ খৃষ্টের প্রথম অলৌকিক কাৰ্য, ১৯ পিত খৃষ্টের শিক্ষাদান ২১। পাপীয়সীর পরিবর্তন ২৪] মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা••• প্রেমময় পিতা ২৬ | বিচার-প্রথম পর্ব ૧૨ খৃষ্টের অলৌকিক চিকিৎসা ২৯] বিচার—দ্বিতীয় পর্ব বিধবার সন্তান ৩১ | বিচার—তৃতীয় পর্ব্ব যায়ীয়ের কন্যা ৩৩। বিচার শেষ পর্ব ৮০ ৩৬ খৃষ্টের মৃত্যু কুষ্ঠীর আরােগ্যলাভ ••• ৩৮ ) মৃত্যুঞ্জয়ী খৃষ্ট ধীবরের ভাগ্য ৪১) পুনরুত্থান ও অর্গারােহণ ** ০০০ দয়ালু, শমরীয় ৭৫ । • ৭৮ শিশুদের বন্ধু ৮৪ ৫০০ ৮৬ ৯০

No text on this page.

গােশালায় ঘাসের পাত্রে শায়িত শিশু যীশুখৃষ্ট [ পৃষ্ঠা-৫ প্ৰেমাৰভাৱ যীশুখৃষ্ট খৃষ্টের জন্ম 1 ভূমধ্যসাগরের পূৰ্ব্বতীরে যে , দেশ, তার নাম প্যালেষ্টাই। ইহুদীরা সে দেশের অধিবাসী। পুরাকালে এই দেশটি তিন ভাগে বিভক্ত ছিল ? উত্তর অংশের নাম গ্যালিলি, দক্ষিণ অংশের নাম যিহুদা, আর মধ্যাংশের নাম শমরিয়া । গ্যালিলি প্রদেশের ছােট একটি গ্রামের নাম ন্যাজারথ। প্রায় দু’ হাজার বৎসর আগে, সেইখানে এক দরিদ্র দম্পতী বাস করতেন, তাদের নাম যােসেফ ও মরিয়ম্। খুব উচু বংশের হলেও তখন আর তাঁদের গৌরব করবার কিছুই ছিল না। কারণ, যােসেফ, ছুতাের- মিস্ত্রীর কাজ করে, অতি কষ্টে সংসার প্রতিপালন করতেন। দারিদ্র্য যাঁর অঙ্গের ভূষণ, তাঁর কি আর কোন গৌরব করা চলে ?

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট সারা ইউরােপ, এমন কি এশিয়া মাইনর পর্যন্ত তখন রােম-সম্রাটের প্রবল প্রতাপে থরহরি কম্পমান ছিল। প্যালেষ্টাইনও তা’ হতে মুক্ত ছিল না—প্যালেষ্টাইনও তখন বােম-সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। নােম-সম্রাট সীজার অগাষ্টাস্ নিয়ম করেছিলেন, তার বিশাল সাম্রাজ্যের প্রত্যেকটি প্রজার নাম-ধাম ও জাতি রাজ-সরকারের খাতায় লিখিয়ে নিতে হবে। নইলে, সেজন্য শাস্তির বিধান ছিল যথেষ্ট। ন্যাজারথের অধিবাসীদের নাম লিখিয়ে নেবার জন্য নির্দিষ্ট যে স্থান ছিল, তার নাম বেৎলেহহম্। সম্রাটের আদেশ পালন করবার জন্য যােসেফ, ও মরিয়ম্ একদিন বেৎলেহেম সহরে এসে উপস্থিত হলেন। বেৎলেহেম, সহর হলেও অতি ছােট সহর। নাম লেখাবার হিড়িকে তখন তা অসংখ্য লােকজনে পরিপূর্ণ হয়ে গমৃগম্ করছে! এতটুকু ছােট সহরে ঘর- বাড়ী আর কত! তাতে এত লােকের জায়গা হবে কেমন করে ? কাজেই কেউ পড়ে রইল গাছতলায়, কেউ রইল রাজপথে, কেউ বা মাঠে-ঘাটে, আর আনাচে-কানাচেই বা কত ! যােসেফ, ও মরিয়মূকেও বড় বেশী কষ্টে পড়তে হ’ল ;

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তার আর কোথাও জায়গা পেলেন না, অগত্যা সহরের
বাইরে এক গােয়ালঘরে—কোনরকমে মাথা গুজবার
একটু জায়গা করে নিলেন।
কিন্তু ঠিক তেম্‌নি সময়ে হ’ল এক অভাবনীয় কাণ্ড!
যােসেফ, ও মরিয়ম্, নিজেরাই যখন মাথা গুজবার ঠই
পাচ্ছেন না, তেম্‌নি সময়ে তাঁদের এক পুত্র-সন্তান ভূমিষ্ঠ
হ’ল !
কি আর করা যায় ! নবজাত পুত্রটিকে ভঁরা
তাড়াতাড়ি, সেই গােয়াল-ঘরেই এক ঘাসের পাত্রে
ঢেকেঢুকে রেখে দিলেন। এই বৈ—অতি দীনতম গৃহে,
হীনতম শয্যায় সেদিন যে শিশুর আবির্ভাব হয়েছিল,
তারই জশে আজও সারা পৃথিবী উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
তিনিই জগদ্বিখ্যাত মহামানব—ধর্মগুরু যীশুখৃষ্ট।
যােসেফ, ও মরিয়ম্ সেদিন বিদেশ-বিভূই এক অখ্যাত
গৃহে এই নবজাত শিশু-পুত্রটিকে নিয়ে যে কি মহা-বিপদেই
পড়েছিলেন, ভুক্তভােগী না হলেও তা ধারণা করা
একেবারেই অসাধ্য নয়।
সুসংবাদ প্রচার
প্যালেস্টাইনের যিহুদা নামীয় প্রদেশটি পাহাড়-পর্বতে
ভরপুর। এখানকার সব জায়গায় ঘাস জন্মায় না। পুরাকালে

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট তাই মেষপালকেরা তাদের মেষপাল নিয়ে এক স্থান হতে আর-এক স্থানে ঘাসের সন্ধানে ঘুরে বেড়াত; তারপর রাত হলে কোন উন্মুক্ত প্রান্তরে আগুন জ্বালিয়ে, নেকড়ে বাঘ ও ভালুকের হাত থেকে মেষপাল রক্ষা করত। একদিন এই রকম একদল মেষপালক শীতের রাতে তাদের মেষপাল রক্ষা করছিল। হঠাৎ আকাশে দেখা গেল এক উজ্জ্বল আলোেক! আর তারই মাঝে তারা দেখতে পেল কয়েকজন দেবদূত ! মেষপালকেরা দেখলে, দেবদূতরা তাদেরই দিকে নীচে নেমে আসছেন। এই আশ্চর্য ঘট দেখে মেষপালকেরা ভয় পেয়ে গেল। দেবদূতরা তাদের মাথার ওপর এগিয়ে এসে বলেন, “তােমরা, ভয় কর না, আমরা তােমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ বয়ে এনেছি। তােমাদের সকলের ত্রাণ- কর্তা যীশুখৃষ্ট আজ বেৎলেহেম নগরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তােমরা গিয়ে তাঁকে দর্শন করে এস। তিনি সকলকে পাপ হতে রক্ষা করবেন। তােমরা যেয়ে দেখতে পাবে, শিশুখৃষ্ট সেইখানে এক গােয়াল-ঘরে ঘাসের পাত্রে শুয়ে আছেন।” খুব কাছে না হলেও মেষপালকেরা দেবদূতদের কথায় তখনই সেই গােশালার উদ্দেশে রওনা হ’ল। সেখানে

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
গিয়ে দেবদূতদের কথামত শিশুটিকে ঘাসের পাত্রে শায়িত
অবস্থায় দেখতে পেল। তার পিতামাতা—যােসেফ, ও
মরিয়ম্ তখন তার পাশেই বসে ছিলেন।
মেষপালকেরা যে দেবদূতদের কাছে খবর পেয়ে
ত্রাণকর্তা খৃষ্টকে দেখতে ছুটে এসেছে, সেকথা যােসেফ
ও মরিয়মকে তারা বলে ; তারপর সেই সুন্দর শিশুটিকে
দর্শন করে নিজ-নিজ স্থানে তারা ফিরে চলে গেল।
চলে গেল বটে, কিন্তু এমন একটা আনন্দের খবর
তারা চেপে রাখতে পারলে না একেবারেই। পথে
যেতে-যেতে যার সঙ্গে দেখা হ’লতাকেই তারা সব
কিছু বল্ল। যারা এই সব ঘটনা শুনল, তারাও এই
মহান্ শিশুর দর্শন-আশায় উৎসুক হয়ে উঠল।
এমনই একটা ব্যাপার যে ঘটবে, ইহুদীদের ধৰ্ম্ম-পুস্তকে
সে-রকম কথা অনেক দিন হ'তেই লিখিত ছিল। তাই
প’ড়ে ইহুদীরা আশা করছিল যে, কোন একদিন স্বর্গ হতে
তাদের উদ্ধারের জন্য একজন ‘মেসায়া’ (Messiah)
বা ত্রাণকর্তা তাদের মাঝে এসে দেখা দিবেন। তারা
এখন মনে করলে, এতদিনে বুঝি সেই ‘মেসায়া জন্মগ্রহণ
করেছেন!
মহা আনন্দে দলে-দলে লােকে খৃষ্টের দর্শন-আশায়

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
বেৎলেহেমে উপস্থিত হ’ল। তারা সুন্দর শিশুটিকে দেখে
খুব আনন্দিত হ’ল বটে, কিন্তু নিরাশ হ’ল বড় বেশী।
কারণ, তারা সকলেই আশা করেছিল যে, খৃষ্ট নিশ্চয়ই
কোন রাজার ছেলে হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন। কাজেই
শিশুটিকে গােয়ালঘরে ঘাসের পাত্রে দেখতে পেয়ে মনে-
মনে একটু ক্ষুন্নই হ’ল।
মরিয়ম্ কিন্তু তাঁর পুত্র সম্বন্ধে সব কিছুই জানতেন।
কারণ, শিশুর জন্ম হ’বার আগেই এক দেবদূত এসে বলে
গিয়েছিলেন, “তােমার উদরে যিনি জন্মগ্রহণ করবেন,
তিনি জগতের পাপীদিগকে পাপ হতে মুক্ত করবেন।
আর তুমি সেই নবজাত শিশুর নাম রেখাে যীশুখৃষ্ট।”
সেই কথানুসারে যােসেফ ও মরিয়ম্ নবজাত শিশুর
নামকরণ করলেন ;—শিশুর নাম হল “যীশুখৃষ্ট।
পূৰ্ব্বদেশের পণ্ডিতগণ
সমগ্র প্যালেস্টাইনে যিরুশালেমের স্বর্ণমন্দির ইহুদীদের
কাছে সবচেয়ে বেশী পবিত্র। তার সৌন্দৰ্য্যও ছিল
অতুলন! তার থামগুলি পাথরের, আর দরজা ছিল
পিতলের। তার উপর এমন সুন্দর কারুকার্য যে,
দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় !

প্রেমাতার যীশুখৃষ্ট
মন্দিরের যিনি প্রধান পুরােহিত, তাঁর নাম সাইমন।
সে যুগে তাঁর মত ধর্মভীরু ও ন্যায়পরায়ণ লােক অতি
অল্পই ছিল। খৃষ্টের বয়স যখন মাত্র চল্লিশ দিন, যােসেফ,
ও মরিয়ম্ সেই সময় তাঁকে নিয়ে সেই স্বর্ণমন্দিরে উপস্থিত
হলেন। সাইমন তাকে ঈশ্বরের নামে আশীর্বাদ করবেন,
এই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
সাইমকে তার আগেই একদিন দেবদূত এসে বলে
গিয়েছিলেন যে, খৃষ্টকে না দেখে তাঁর কখনন, মৃত্যু
হবে না। সাইমন্ সেই থেকে আশায়-আশায় দিন
গুণছিলেন, কবে সেই খৃষ্ট এসে তাকে দর্শন দিয়ে যাবেন।
এখন শিশু খৃষ্টকে দেখেই তিনি বুঝলেন, এই সেই
‘মেসায়া বা ত্রাণকর্তা! আনন্দে তিনি তাঁকে কোলে
তুলে নিলেন, আর তাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করে
তাঁর মায়ের হাতে ফিরিয়ে দিলেন। যখন তারা ফিরে
যাচ্ছিলেন তখন খৃষ্টকে দেখে অনেকেই আনন্দ প্রকাশ
করতে লাগল। তারপর নবজাত শিশুকে নিয়ে তাঁর
মাতাপিতা যিরুশালেম হতে বেৎলেহেমে ফিরে গেলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পরে কয়েকজন পূৰ্ব্বদেশীয়
পণ্ডিত খৃষ্টের দর্শন-আশায় উটে চড়ে একদিন সেই
যিরুশালেমে এসে উপস্থিত হলেন।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট তারা বলেন, “পূব আকাশে অতি উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের উদয় দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছি, ত্রাণকর্তা ইহুদীরাজ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন। কোথায় তিনি ? আমরা তাঁকে পূজো করতে এসেছি।” গ্যালিলির রাজা হেরােদ এই কথা শুনে বড় ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, ‘সর্বনাশ ! এমন ক্ষমতাশালী ইহুদীরাজ যদি কেউ জন্মে থাকেন, তবে তাে আর প্রভাব- প্রতিপত্তি কিছুই থাকবে না। তিনি তখনই রাজ্যের যত প্রাচীন ও ধার্মিক পুরােহিত আর পণ্ডিতদের ডেকে পাঠালেন। তঁারা এলে তিনি বলেন, “কোথায় সেই ত্রাণকর্তার জন্মস্থান, আপনারা তা হিসেব করে বলুন।” রাজা হেরােদের মত রাজ্যের পণ্ডিতগুলােও খ্রষ্টের জন্য ভয়েভয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। কারণ, খৃষ্টের জন্ম হলে, কেউ যে আর তাদের বিধি-নিষেধকে সম্মানের চোখে দেখবে না, তাঁদের প্রভাব-প্রতিপত্তিও কমে যাবে। তাই মহা আগ্রহে তাঁরাও পুথি-পত্তর ঘেঁটে খ্রষ্টের জন্ম- স্থানের হিসেব করতে বসে গেলেন। কিছুক্ষণ হিসেব করে তাঁরা বলেন,“যিহুদা প্রদেশের বেৎলেহে হচ্ছে সেই মেসায়ার জন্মস্থান।”

প্রেমাবতার যীশু,-
রাজা তখন সেই পূৰ্বদেশীয় পণ্ডিতদের বলেন,
“আপনারা বেৎলেহে সহরে গিয়ে তাঁর অনুসন্ধান
করুন। তারপর তার খোঁজ পেলে আমাকেও জানিয়ে
যাবেন, কোথায় গেলে আমিও তার দেখা পেতে পারি?
আমিও তাকে পূজো করতে চাই।”
মুখে একথা বলেন বটে, কিন্তু তার মনের ভাব ছিল
অন্যরূপ। যাহােক পণ্ডিতেরা তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে
অবশেষে বেৎলেহহম সহরে খৃষ্টের সম্মুখে উপস্থিত হলেন।
তারা বলেন, “আমরা ইহুদীরাজকে দেখতে
এসেছি। হেরােদ রাজার রাজবাটীতে আমরা গিয়েছিলাম
কিন্তু রাজা সেখানে জন্মান নি। তারপর খুজে-খুজে আমরা
এইখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। আকাশের তারা আমাদের
পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে।” এই বলে তখন তারা বহুমূল্য
উপহার বালকের পায়ের তলায় রেখে প্রণাম করলেন।
কিন্তু সেই রাতেই স্বপ্নে তারা জানতে পারলেন যে,
হেয়ােদ রাজা খৃষ্টের প্রাণবধ করতে চান, তাই তিনি খৃষ্টের
জন্মের সংবাদ তাকে দিতে বলেছিলেন। পণ্ডিতরা কাজেই
আর হেরােদ রাজার কাছে না গিয়ে অন্যপথে নিজেদের
গন্তব্যস্থানে চলে গেলেন।
রাজা হেরােদ খৃষ্টকে মারতে চান, পণ্ডিতদের কাছে

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তাদের এই স্বপ্নের কথা শুনে যােসেফ, ও মরিয়ম ভয়
পেলেন। রাতে তাঁরাও স্বপ্ন দেখলেন। এক দেবদূত এসে
তাঁদের বছেন, “তােমরা এই স্থান পরিত্যাগ করে চলে
যাও। কারণ, হেরােদ রাজা খৃষ্টের প্রাণনাশ করতে
চান।”
যােসেফ, সেই রাতেই শিশু খৃষ্ট ও তাঁর মাতাকে
গর্দভে চড়িয়ে বেৎলেহে হ'তে পলায়ন করলেন।
আকাশের তারাগুলি তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললাে।
এইভাবে সারারাত চ’লে ভাের হবার আগেই তারা
অনেক পথ ছাড়িয়ে গেলেন।
অবিরত এক সপ্তাহ চলার পর তারা মিশরের
সীমানায় এসে পড়লেন। তারপর একটি ছােট নদী পার
হ’য়ে হেরােদের রাজ্য পেরিয়ে মিশর দেশে পেছিলেন।
সেখানে রাজা হেরােদের আর কোন অধিকার থাকবে না
এই ভেবে, তারা নিরাপদে এক বৎসর সেখানেই বাস
করলেন।
যে নীলনদের জন্য মিশর দেশ তখন পৃথিবীর
সবচেয়ে উর্বর দেশ বলে বিখ্যাত ছিল, সেই নীলনদ
তাদের পথে পড়লাে। তারা তা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
সেখানকার লােকদের সুন্দর পােষাক-পরিচ্ছদ আর নানা

প্রেমাবতার যীশুধুই
রঙের তৈরী কাঠের ঘরগুলি দেখে তাদের আর আনন্দের
সীমা রইল না।
এদিকে হেরােদ রাজা যখন অপেক্ষা করেও
পণ্ডিতদের দেখা পেলেন না, তিনি তখন খুবই ক্রুদ্ধ
হলেন। তিনি তখন নিজেই বেৎলেহহ সহরে খৃষ্টের
খোঁজ সুরু করে দিলেন। কিন্তু কোন খোঁজখবর না
পেয়ে, তিনি সেখানে একদল সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন।
তাদের হুকুম দিয়ে দিলেন, সেখানে দু’বছর বয়সের মধ্যে
যত শিশুকে পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে যেন তরবারির
মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
তার ধারণা হয়েছিল, এত শিশুর মধ্যে কেউ না
কেউ নিশ্চয়ই সেই খৃষ্ট! কাজেই শত-শত নিরীহ শিশুর
প্রাণনাশ করে তিনি পরম তৃপ্তিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস
ফেললেন
বালক খৃষ্ট
সেযুগে যিরুশালেমে প্রতিবৎসর উদ্ধায়-পৰ্ব্ব নামে এক
মহােৎসব সম্পন্ন হ’ত। পুরাকালে ইহুদীরা মিশর দেশে
দাসত্ব-শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। ঈশ্বরের অনুগ্রহে তারা সেই
দাসত্ব-শৃঙ্খল হতে মুক্ত হয়েছিল। এই বিশেষ ঘটনাকে

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
স্মরণীয় করবার জন্য তদবধি প্রতি বৎসর তারা জাকজমকের
সঙ্গে এই উৎসব যিরুশালেমে সম্পন্ন করে এসেছে। সারা
দেশে যেখানে যত ইহুদী, তারা সবাই এই উৎসবে মহা
আনন্দে যােগদান করত।
বালক খৃষ্টের ক্রমে বার বৎসর বয়স হ’ল। তাঁর
পিতা-মাতা মনে করলেন এবার তাকেও যিরুশালেমে
নিয়ে যাবেন।
ন্যাজারথ সহর হ’তে যিরুশালেম দু’দিনের পথ।
যােসেফ, মরিয়ম্ ও খৃষ্ট ধূলি-ধূসরিত পথ অতিক্রম করে
লােকারণ্য যিরুশালেম সহরে উপস্থিত হলেন। সেখানে
স্বর্ণমন্দিরের চূড়া দেখে তারা অতিশয় আনন্দ অনুভব
এক সপ্তাহ ধরে এই সহরে আনন্দ-উৎসব
চল্ল। সমস্ত সহর এই আনন্দের কোলাহলে মুখরিত হয়ে
উঠল। খৃষ্ট মহা আনন্দে এই উৎসব উপভােগ করলেন।
উৎসব শেষ হলে যােসেফ, ও মরিয়ম্ ঘরে ফিরে
যাওয়ার উদ্যোগ করলেন। কিন্তু খৃষ্টকে দেখতে না পেয়ে
তারা ভাবলেন, খৃষ্ট হয়তাে ন্যাজারথের অন্য যাত্রীদের
সঙ্গে চলে গেছেন। কিন্তু পূরাে একদিনের পথ পেরিয়ে
গিয়েও যখন তারা খৃষ্টের দেখা পেলেন না, তখন তারা
বড়ই উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। চারদিকে খোঁজ-খোঁজ
করলেন।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
পড়ে গেল কিন্তু কোন লাভ হ’ল না। অবশেষে মরিয়ম্
ও যােসেফ, ব্যাকুলচিতে পুনরায় যিরুশালেমে ফিরে
গেলেন। সেখানে স্বর্ণমন্দিরে উপস্থিত হতেই তারা তাে
অবাকৃ! মন্দিরে তখন এক অভিনব দৃশ্য !
দেখলেন, বালক খৃষ্ট সেখানে পণ্ডিতমণ্ডলীর সঙ্গে
শাস্ত্র সম্বন্ধে আলােচনা করছেন আর বৃদ্ধ পণ্ডিতদের দল
সেই অল্পবয়স্ক বালকের তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও অসাধারণ ক্ষমতা
দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেছেন।
মরিয়ম্ অতি সন্তর্পণে তার পাশে গিয়ে বলেন,
“বাবা, আমি ও তােমার পিতা যে তােমার জন্য ব্যাকুল
হয়ে চারদিকে অন্বেষণ করছি।”
বালক খৃষ্ট বলেন, “মা, আপনি কি জানেন না যে,
আমি আমার পিতার ঘরেই থাকব?”
দেবতার আরাধনার স্থান, ধৰ্ম্ম-মন্দির যে খৃষ্টের
পিতার ঘর, মরিয়ম সেদিন তা কিছুই বুঝতে পারেননি।
কাজেই বালকের সেই কথা সেদিন মরিয়মের কাছে বুঝি
হেঁয়ালীর মতন মনে হয়েছিল, তিনি তার কোন অর্থই
বুঝতে পারলেন না। কিন্তু এটুকু তিনি বেশ ভাল
করেই বুঝতে পারলেন যে, তার গৃহে এক অসামান্য
পুত্রের উদয় হয়েছে।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
যাহােক, খৃষ্ট তখন পিতামাতার সঙ্গে ন্যাজারথে ফিরে
গেলেন ও সেখানকার সেই সামান্য অবস্থার মধ্যেই বয়সে
ও বুদ্ধিতে বৃদ্ধি পেতে লাগলেন।
সাধু যােহনের কাছে খৃষ্টের দীক্ষা
প্যালেস্টাইনের পূর্ব সীমানা দিয়ে যদ্দন নদী ধীরে
ধীরে বয়ে যায়। এই ছােট নদী প্রত্যেক ইহুদীর কাছে
অতি মূল্যবান্ নদী। খৃষ্টের দূর-সম্পর্কীয় এক ভাই
যােহন এই যৰ্দন নদীর ধারে বসে ঈশ্বরের নাম প্রচার
তাঁর পিতামাতা তাঁকে জন্মের পর হতে ঈশ্বরের
নামেই উৎসর্গ করেছিলেন। তাই তিনি বড় হতেই
অতি কঠোর সাধু-জীবন যাপন করতে লাগলেন। গৃহের
সকল সুখ ও আনন্দ ত্যাগ করে প্রান্তরে গিয়ে ঈশ্বরের
নাম প্রচার করাই হ’ল তার একমাত্র কাজ। তিনি উটের
চর্ম পরিধান করতেন আর বনের মধু খেয়ে জীবনধারণ
করতেন। যে কেউ তাঁর সংস্পর্শে আসতেন, তিনিই
তাঁর মনকে সংযত করে যৰ্দনের জলে স্নান করে নুতন
জীবন যাপন করতে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠতেন।
তাঁর সাধুজীবন ও ধর্মোপদেশে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই
১৪

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
মনে করত, তিনিই বুঝি সেই ‘মেসায়া বা ত্রাণকর্তা
পৃথিবীতে উদয় হয়েছেন। কিন্তু যােহন তা লক্ষ্য করে
বতেন, “না, তােমরা ভুল ধারণা করেছ। আমি
সেই ‘মেসায়া’ নই। কিন্তু শীঘ্রই সেই ‘মেসায়া’র
উদয় হচ্ছে, তােমরা সেই ‘মেসায়ার জন্য তৈরী হয়ে
থাকো।”
খৃষ্টের বয়স তখন ত্রিশ বৎসর। তিনি এতদিন গৃহে
পিতার কাছে সামান্য সূত্রধরের কাজ শিক্ষা করছিলেন।
যে মহান্ কাজের জন্য তাঁর জগতে আগমন, সে কাজ
তখনাে তাঁর আরম্ভ হয়নি। এই সময় একদিন তিনি তাঁর
স্নেহের নীড় পরিত্যাগ করে যােহনের কাছে গেলেন ও
যৰ্দন নদীর পবিত্র জলে স্নান করে আপনার নির্দিষ্ট
কাজ করতে প্রস্তুত হলেন।
প্রত্যেক নরনারীকে ভগবানের পথে আনবেন এই
ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। যদ্দন নদীর জলে স্নান করে,
সাধু যােহনের কাছে দীক্ষা দিয়ে আজ হ’তে তিনি সেই
কাজ আরম্ভ করলেন।
আজও সেই রীতি রয়ে গেছে। খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত
হবার জন্য জর্দন নদীর জল আজও তাই পরম পবিত্র বলে
বিবেচিত হয়।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
।
সাধু যােহনের দেহাবসান
সাধু যােহন ন্যায় ও সত্যের জন্য সবকিছু করতেই
প্রস্তুত ছিলেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কখনাে তিনি
কোন ভয় পেতেন না, রাজার সম্পর্কেও নয়। রাজা
হেরােদ ছিলেন অন্যায়ের প্রতিমূর্তি। তিনি তার ভ্রাতার
বর্তমানেই ভ্রাতৃবধূকে বিবাহ করেছিলেন। যােহন সেই
জন্য রাজা হেরােদ ও তাঁর নূতন স্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায়
মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন।
রাজা হেরােদ এতে মনে-মনে খুব অসন্তুষ্ট হলেও
যােহনের কোন অনিষ্ট করতে সাহসী হন নাই। কারণ,
দেশের সকলে যােহনকে এত ভক্তি ও শ্রদ্ধা করত যে,
কোনরূপ প্রতিশােধ লওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
রাজার জন্মদিন উপলক্ষে রাজবাড়ীতে একদিন এক
বিরাট ভােজের আয়ােজন হ’ল। সেই ভােজে নূতন রাণীর
পূৰ্বস্বামীর কন্যা তার নাচের বাহাদুরী দেখাল। তার
নৃত্যে মুগ্ধ হয়ে হেরােদ তাঁর কন্যাকে বলেন, “বল, কি
পুরস্কার তুমি চাও ? যা চাইবে, তাই আমি দিব।”
কন্যাটি ছিল মায়ের অনুগত। সে তার মাতার
প্ররােচনায় যােহনের ছিন্ন মস্তক পুরস্কার চেয়ে বসল।
'.

No text on this page.

সাধু যােহনের দেহাবসান এ পৃষ্ঠা-১৭

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
রাজা হেয়ােদ সকলের সামনে কথা দিয়েছেন। তিনি
তা’ নড়চড় করবেন কেমন করে? বিশেষতঃ যােহন যে
তাঁরও বিষ-নজরে পড়েছিল অনেকদিন আগেই। সুতরাং
তিনি তখনই নিজের কথা রাখবার জন্য সেই সাধু ব্যক্তিকে
হত্যা করিয়ে তার মস্তক কন্যাকে উপহার দিলেন।
এইরূপে সেই মহৎ জীবনের অবসান হ’ল, সঙ্গে-সঙ্গে রাজা
ও রাণীর মনস্কামনা পূর্ণ হ’ল।
সাধু যােহন ইহলােক ছেড়ে চলে গেলেন বটে, কিন্তু
তার শিক্ষা ব্যর্থ হয়নি। তিনি খৃষ্টের আগমনের জন্য,
সকল লােককে প্রস্তুত করেছিলেন, তারা খৃষ্টের আগমুনের
অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর খৃষ্ট আপন
কর্মজীবন পূর্ণভাবে আরম্ভ করে দিলেন।
খৃষ্ট ও তার শিষ্যগণ
যােহনের মৃত্যুর পর খৃষ্ট তার পবিত্র কাজ তুলে নিলেন।
তিনি সকলকে বলতে লাগলেন, “তােমরা সকলে মন
পরিবর্তন কর, নূতন ভাবে জীবন যাপন কর, মন্দের পথ
চিরদিনের জন্য পরিত্যাগ কর।”
তাঁর এই আহ্বান অনেকে উপেক্ষা না করে তার
কাছে এসে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর আদর্শে নুতন
১৭

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট জীবন যাপন করতে লাগলেন। কয়েকজন তাঁদের যা- কিছু ছিল, সব পরিত্যাগ করে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। যাকোব ও যােহন দুই ভাই তাদের মাছের ব্যবসা ত্যাগ করে তার আজ্ঞা পালনের জন্য তাঁর অনুগমন করলেন। দেশভক্ত পিতর, মথি প্রভৃতিও তাদের নিজ-নিজ কাৰ্য্য পরিত্যাগ করে তাঁর শিষ্য হলেন। খৃষ্ট তাঁদের বারজনকে প্রধান শিষ্য বলে মনােনীত করে নিলেন। তাঁর শিষ্যদের প্রত্যেকেই সামান্য পরিবার হতে এসেছিলেন বটে, কিন্তু প্রভুর সাহচর্যে এসে তাঁরা প্রত্যেকে তারই ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর আরব্ধ কাৰ্য্য সম্পন্ন করেছিলেন। প্রত্যেক শিষ্যই শিক্ষা-দীক্ষায় সামান্য ব্যক্তি ছিলেন; কিন্তু খৃষ্টের প্রেরণায় দেশ-বিদেশে গিয়ে নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে সকলের কাছে তাঁরা তাঁর শিক্ষা প্রচার করেছিলেন। আগেই বলেছি, তখনকার দিনে রােম-সম্রাট অতিশয় ক্ষমতাশালী ছিলেন। নােমীয় শাসকদের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে কারও কোন কথা বলবার সাহস ছিল না। কিন্তু খৃষ্টের শিষ্যেরা সেই প্রতাপশালী রাজ্যের শাসন- কর্তাদের সম্মুখেও আপন-আপন জীবনের কথা ও খৃষ্টের, বাণী প্রচার করতে কুণ্ঠাবােধ করেন নি। এমন কি, যে ১

এক নিষ্ঠুর প্রজাপীড়ক সম্রাট তখন রাম-সাম্রাজ্যের
অধিপতি ছিলেন, খৃষ্টের শিষ্যেরা তাঁকেও কিছুমাত্র
করে পিতরের প্রেরণায় সেখানে গিয়েও খৃষ্টের
নাম প্রচার করতে কিছুমাত্র ইতস্ততঃ করেন নি। তার
ফলে, সম্রাটের আদেশে তাদের অনেককে পুড়িয়ে মারা
হয়েছিল, কেউ বা জীবন্ত হিংস্র পশুর মুখে নিজেদের
প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তথাপি প্রভুর নাম করতে
তারা বিরত হননি, তাঁর মৃত্যুকে হাসিমুখেই বরণ করে
নিয়েছিলেন।
খৃষ্টের প্রথম অলৌকিক কাৰ্য্য
নাসরতের নিকট কামানগর অবস্থিত। সেখানে খৃষ্ট
একদিন এক বিবাহ-ভােজে নিমন্ত্রিত হলেন। সে দেশের
নিয়ম অনুসারে নিমন্ত্রিত সকলকে পান করতে দেওয়া হত
আঙুরের রস। কিন্তু লােকের সংখ্যা আশাতীত বেশী হওয়ায়
বাড়ীর কৰ্ত্তা বিষম বিপদে পড়ে গেলেন, কারণ র
সঞ্চিত রস প্রচুর পরিমাণে ছিল না। কর্মকর্তা সকলের
সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত হবার উপক্রম, এমন সময়
খৃষ্টের কল্যাণময়ী জননী তাঁর এই বিপদের কথা বুঝতে
পেরে, তার অদ্ভুত ক্ষমতাশালী পুত্রের কাছে ছুটে গেলেন।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তিনি জানতেন, এই বিপদের কথা শুনতে পেলে তাঁর
পুত্র খৃষ্ট কখনাে সাহায্য করতে পরাঘুখ হবেন না। হ’লও
তাই। পুত্র মাকে ভরসা দিলেন। তারপর বিপদ যখন
ঘনিয়ে এল, খৃষ্ট তখন কয়েকজন ভৃত্যকে বলেন,
“তােমরা যাও, বড়-বড় জালাগুলি জলে পরিপূর্ণ কর ও
পরে সেই জল কর্মকর্তাকে আস্বাদন করতে দাও।”
তাঁর কথানুসারে ভৃত্যরা বড়-বড় জালাগুলি জলে
পরিপূর্ণ করলে ও শেষে তারই কিছু জল গৃহের অধ্যক্ষের
নিকটে নিয়ে গেল। তিনি সেই জল আস্বাদন করে
দেখলেন, জল তাে নয়, সে যে অতি সুন্দর আঙুরের রস।
তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে সেবকদের বলেন, “এত রস থাকতে
তােমরা এতক্ষণ এদের দাও নি কেন?”
পরে যখন তিনি সমস্ত ঘটনাটি আনুপূৰ্ব্বিক শুনলেন
তখন খুবই আশ্চর্যান্বিত হলেন। খৃষ্টের প্রতি কৃতজ্ঞতায়
তার হৃদয় ভরপুর হয়ে গেল ; কারণ, সেবার তিনি খৃষ্টের
দয়ায়ই অপমান ও লজ্জার হাত হতে রক্ষা পেলেন।
তার এই অলৌকিক ঘটনার বিষয় চতুর্দিকে ব্যাপ্ত
হয়ে গেল। তাঁর শিষ্যরা ও অন্য সকলে তাঁকে ঈশ্বরের
অবতার ব’লে বিশ্বাস করলেন।
সূর্যের তাপে পাহাড়-চুড়ায় বরফ গলতে আরম্ভ হলেই

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
ধরা পড়ে যায় কোথায় কোন গিরি-নদী আর ঝরণা
মানুষের দৃষ্টির বাইরে আত্মগােপন করে আছে। করুণার
তরল ধারায় খৃষ্টের রূপও আজ তেমনি এক ভিন্ন আকারে
মূর্ত হয়ে উঠল, অবতার ব’লে আজ তিনি লােকের কাছে
ধরা পড়ে গেলেন!
খ্রষ্টের শিক্ষাদান
সাধারণ লােকেরা খৃষ্টকে অত্যন্ত ভালবাসত। তাঁর
হৃদয়গ্রাহী শিক্ষা, সৌম্য মূর্তি ও সরল জীবন সকলকেই
তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করত। সে সময়ে ইহুদীদের মধ্যে
‘ফরিশী’ নামে পরিচিত একদল জ্ঞানী লােক ছিল।
তারা তাঁকে খুবই ঈর্ষার চোখে দেখতে লাগল, কারণ
খৃষ্টের আবির্ভাবে তাদের প্রতিপত্তি সাধারণ লােকের
কাছে কমে যেতে সুরু হয়েছিল।
একদিন বহু লােক তাঁর উপদেশ শােনবার জন্য
এক পাহাড়ের কাছে সমবেত হ’ল । খৃষ্ট এই বৃহৎ সমবেত
জনতাকে উপদেশ দেবার জন্য পাহাড়ের উপরে উঠলেন।
তারপর তাঁর স্বভাবসুলভ আবেগময়ী ভাষায় সকলকে
সম্বােধন করে উপদেশ দিতে লাগলেন। তাঁর বক্তৃতায়
সকলেই আত্মহারা হয়ে গেল।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
বিরাট জনতাকে লক্ষ্য করে খৃষ্ট বলেন :
“ঈশ্বর প্রেমময় পিতা, তিনি সকলের মঙ্গলের
জন্য ব্যাকুল।
যারা এখন কষ্ট পাচ্ছে, ঈশ্বর তাদের সান্ত্বনা
দেবেন।
যারা নম্র, জগতে তারাই হবে মহান।
যারা ধর্মের জন্য ব্যাকুল, ঈশ্বর তাদের হৃদয়ে
বাস করেন।
যারা অন্যের প্রতি দয়ালু, তারা ভগবানের দয়া
হ’তে কখনও বঞ্চিত হবে না।
যারা শান্তি-স্থাপক, তারাই ঈশ্বরের প্রকৃত
সন্তান।
যারা ঈশ্বরের নামের জন্য সকল অত্যাচার নীরবে
সহ্য করে, তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন।
তােমার দক্ষিণ গালে কেউ যদি চড় মারে, তবে
তাকে বাম গাল ফিরিয়ে দিও, প্রতিশোেধ
নিও না।
পুরাকালে ধৰ্ম্ম-উপদেশকরা বলেছেন, শত্রুকে
ঘৃণা করবে কিন্তু বন্ধুকে ভালবাসূবে’; কিন্তু
আমি তােমাদের বছি শত্রুকে ভালবাসূবে,

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট কেউ অভিশাপ দিলেও তাকে আশীৰ্বাদ করবে, কেউ ঘৃণা করলেও তার উপকার করবে। যারা তােমার প্রতি অত্যাচার করে, তাদের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবে, তবেই তােমরা ঈশ্বরের প্রকৃত সন্তান বলে বিখ্যাত হবে। ঈশ্বরকে তােমার সমস্ত মনঃপ্রাণ দিয়ে ভাল- বাসবে। তােমার প্রতিবেশীকেও নিজের মত ভালবাসবে। এই শ্রেষ্ঠ নিয়মটির উপরেই সমস্ত শিক্ষা নির্ভর করে।” এই সকল সরল ও হৃদয়গ্রাহী উপদেশে সমবেত নরনারী খুবই আনন্দিত হ’ল। তারা বুঝতে পারলে যে, নগণ্য সূত্রধরের পুত্র খৃষ্ট সত্যই ঈশ্বরের অবতার, নতুবা এরূপ শিক্ষা তারা তাদের শিক্ষাগুরু ফরিশীদের কাছেও কখনাে পায়নি। যুগে-যুগে যারা মহাপুরুষ বা অবতাররূপে জন্মগ্রহণ করে জগৎকে শিক্ষাদান করে গেছেন, কোনপ্রকার বিদ্যালয়ের শিক্ষা না পেয়েও তারা সর্বশ্রেষ্ঠ পাণ্ডিত্য ও মনস্বিতার পরিচয় দিয়েছেন প্রতি পদে, প্রতিটি কথায়। আর এই হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

এমন
প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
দয়ালু শমরীয়
পূৰ্বে বলা হয়েছে গালিল ও যিহুদা প্রদেশের মধ্য
ভাগকে শমরিয়া বলে। গালিলীয় ও ইহুদীগণ এই প্রদেশের
লােকদের অস্পৃশ্য মনে করত ও স্বণা করত।
কি, তাদের দেশের মধ্য দিয়ে যাতায়াত পৰ্য্যন্ত করতে
কুণ্ঠিত হত।
একদিন খৃষ্টকে একজন শিক্ষিত লােক জিজ্ঞাসা করল,
“প্রভু, স্বর্গে যাবার জন্য আমাকে কি করতে হবে ?”
খৃষ্ট বলেন, “শাস্ত্রে কি লেখা রয়েছে, বলতে
পার?”
সেই ব্যক্তি বল্ল, “শাস্ত্রে লেখা আছে, “তুমি তােমার
সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে ঈশ্বরকে ভালবাসবে ও তােমার
প্রতিবেশীকে নিজের মত ভালবাসবে।”
খৃষ্ট বলেন, “তুমিও তাই-ই কর।”
তদুত্তরে সে বল্ল, “কিন্তু প্রভু, আমার প্রতিবেশী
খৃষ্ট বলেন, “শােনাে তবে, আমি একটা গল্প বলছি।”
এই বলে তিনি ধীরে-ধীরে এক গল্প বলতে আরম্ভ
করলেন ।
“একদিন এক ইহুদী যিরূশালেম হতে যেরিকো

প্রেমাতার যীশুখৃষ্ট
দেশে যাচ্ছিল। পথে দস্যরা তাকে আক্রমণ করে।
দস্যুরা তার সর্বস্ব লুণ্ঠন করে নিয়ে, তাকে অর্ধমৃত
অবস্থায় পরিত্যাগ করে চলে গেল ।
সেই সময় যিরুশালেমের স্বর্ণ-মন্দিরের এক পুরােহিত
ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ঐ আহত লােকটিকে
দেখে অন্য পাশ দিয়ে আপনার পথে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ পরে মন্দিরের একজন গায়ক ঐ পথে এলেন।
তিনিও আহত ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন কিন্তু দেখেও
তাকে কোন সাহায্য করলেন না—পুরােহিতের ন্যায়
অন্যপাশ দিয়ে তিনিও নিজের গন্তব্য স্থানে চলে গেলেন।
এরপর সে পথে এলাে গর্দভে চড়ে একজন অস্পৃশ্য
শমরীয়। সে ঐ আহত ইহুদী লােকটিকে দেখতে পেয়ে
তার কাছে এগিয়ে গেল, তারপর নিজের হাতে তার
আহত স্থানগুলি বেঁধে দিল। লােকটি কিছু সুস্থ হলে
সে তাকে নিজের গর্দভে চড়িয়ে নিকটস্থ এক সরাইখানায়
নিয়ে গেল এবং ঐ স্থানের অধ্যক্ষকে তার উপযুক্ত সেবা
ও শুশ্রুষার জন্য অর্থ দিয়ে বল্ল, ‘আপনি এই লােকটির
যথাসম্ভব যত্ন নেবেন, আমি ফিরবার পথে আপনার বাকী
সকল খরচ পরিশােধ করে যাব।
সরাইখানার অধ্যক্ষ এই ঘৃণিত অস্পৃশ্য শরীয়ের

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
আচরণ দেখে বিস্মিত ও কৃতার্থ হয়ে গেলেন। তিনি তার
কথামত সেই আহত ইহুদীকে সরাইখানায় রেখে তার
উপযুক্ত সেবা-যত্ন করলেন।”
গল্প শেষ হলে খৃষ্ট সেই যুবককে জিজ্ঞাসা করলেন,
“আচ্ছা বল দেখি, এই তিনজনের মধ্যে কে ঐ আহত
ব্যক্তির প্রতিবেশী ?”
সেই যুবক উত্তর করল, “ঐ দয়ালু শমরীয়।”
খৃষ্ট বলেন, “যাও, তুমিও সেই রকম কাজ কর,
সকলের প্রতিবেশী হও।”
পৃথিবীর আর কয়জন লােক অপরের মৰ্ম্ম-বেদনা এমন
ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন ?
প্রেমময় পিতা
খৃষ্টের একদিন ইচ্ছা হ’লঈশ্বর যে সবাইকে কত
ভালবাসেন, সে কথা তিনি গল্পচ্ছলে ইহুদীদের বুঝিয়ে
দেবেন।
তিনি বলেন, “ঈশ্বর সকলের পিতা। পিতা কি
কখনাে তাঁর সন্তানের প্রতি নিষ্ঠুর হতে পারেন ?”
এই বলে তিনি এক গল্পের অবতারণা করলেন -
এক ধনী ব্যক্তির দু’টি পুত্র ছিল। একদিন তার
২৬

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
কনিষ্ঠ
পুত্র তাঁর কাছে এসে সম্পত্তির অর্ধেক দাবী
করে বসল। পিতা তখনই তাকে তার অংশ দিয়ে
দিলেন।
পুত্র চলে গেল। কিন্তু দূরদেশে গিয়ে দুষ্ট বন্ধু-
বান্ধবদের সংস্পর্শে এসে অল্পদিনের মধ্যেই সে তার সমস্ত
সম্পত্তি নষ্ট করে ফেল্ল।
যখন তার সমস্ত অর্থ নিঃশেষ
হয়ে গেল, তখন তার বন্ধুরাও তাকে পরিত্যাগ করে চলে
গেল। সেই নিঃসঙ্গ অবস্থায় কপর্দকহীন হয়ে সে তখন
অনাহারে কষ্ট পেতে লাগল। অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে
সে এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে সামান্য কিছু কাজ দেবার জন্য
তাকে অনুরােধ করল। কিন্তু কি কাজ, সে করবে ?
কাজ করবার মত কোন গুণই তার ছিল না। কাজেই
তাকে দেওয়া হ’ল শূকর-পালকের কাজ।
ইহুদী জাতির কাছে ‘শূকর সবচেয়ে ঘৃণ্য জীব
পেটের দায়ে সে এখন এই ঘৃণ্য কাজ করতেও রাজী
হ’ল। কিন্তু এ কাজ করে তার এমন আয় হত না,
যাতে সে দু’বেলা যথেষ্ট আহার পেতে পারে। তাই
ক্ষুধার তাড়নায় সে প্রায়ই শূকরের খাবার থেকেও
কিছু-কিছু খেয়ে নিত।
অবশেষে একদিন তার নিজের বাড়ীর কথা তার

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
মনে পড়ল, পিতার স্নেহময় আশ্রয়ের কথা হৃদয়ে জাগল।
সে মনে মনে বল্ল, “আমি এখন পিতার কাছে গিয়ে তাঁর
পায়ে ধরে বলব—বাবা, আমার সকল অপরাধ মার্জনা
করে আমাকে চাকরের মত প্রতিপালন কর
হায়, কেন আমি তাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম ?
আমার ব্যবহারে না জানি কত ব্যথাই তিনি পেয়েছেন।
এই অনুশােচনার পর সে সেই
ঘৃণিত কাজ ছেড়ে
ক্লান্ত পদ-বিক্ষেপে ও কুণ্ঠিত মনে আপনার পিতার
গৃহাভিমুখে যাত্রা করল।
ওদিকে তার প্রেমময় পিতা প্রত্যহই পুত্রের অপেক্ষায়
বসে থাকতেন; কারণ, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—পুত্র তার
একদিন-না-একদিন তার দোষ বুঝতে পেরে নিজের ঘরে
ফিরে আসবে। কাজেই তিনি প্রত্যহই তাঁর গৃহের দরজায়
দাঁড়িয়ে দূরে পুত্রের পথের পানে চেয়ে থাকতেন।
একদিন সত্যই তিনি দূরে নিজ সন্তানকে দেখতে পেলেন।
তিনি আর রইতে পারলে না, তখনই ছুটে গিয়ে
পুত্রকে আলিঙ্গন করে ঘরে নিয়ে এলেন।
পুত্র বল্ল, “বাবা, আপনার কাছে অনেক অপরাধ
করেছি, আমি আপনার ‘পুত্র’-নামের যােগ্য নই, আমার
অপরাধ মার্জনা করুন।”
২৮

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
পিতা তাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ভৃত্যকে
বলেন, “যাও, এখনই আমার পুত্রের জন্য সুন্দর পরিচ্ছদ
নিয়ে এসাে। আর সকলকে বলে দাও যে, আমার গৃহে
আজ আনন্দ-ভােজ হবে। সকল বন্ধু-বান্ধবকে ডেকে
নিয়ে এসাে; কারণ, আজ আমি আমার হারানাে
ছেলেকে ফিরিয়ে পেয়েছি।”
পুত্রের জন্য পিতার ভালবাসা যেমন অনন্ত, মানুষের
জন্য ঈশ্বরের ভালবাসাও তেমৃনি অনন্ত। খৃষ্ট সেই কথাই
আমাদের সবাইকে বুঝিয়ে গেছেন।
খৃষ্টের অলৌকিক চিকিৎসা
এক সময়ে কফরনাহমে এক রাজ-কর্মচারীর ভৃত্য অতিশয়
অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকেরা তার জীবনের
আশা ছেড়ে দিলেন ; রাজ-কর্মচারী ইহাতে অতিশয়
মনঃক্ষুন্ন হয়ে পড়লেন। এমন সময় তিনি খৃষ্টের অদ্ভুত
ক্ষমতার কথা নােক-মুখে শুনতে পেলেন। খৃষ্টও এই
সময়ে কফরনাহমে উপস্থিত ছিলেন। রাজ-কর্মচারী
তখন ঘােড়ায় চড়ে স্বয়ং খৃষ্টের নিকটে রওনা হলেন।
তারপর কামানগরের মধ্য দিয়ে তার কাছে গিয়ে
উপস্থিত হলেন।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
রাজ-কর্মচারী, খৃষ্টের শান্ত-স্নিগ্ধ মূর্তি দেখে ভরসা
পেলেন এবং তাকে অনুরােধ করলেন, “প্রভু, আপনি দয়া
করে আমার গৃহে চলুন; আমার ভৃত্য মরণাপন্ন, আপনার
আগমনে সে সুস্থ হয়ে উঠবে।”
রাজ-কর্মচারীর এই আকুল আগ্রহ দেখে খৃষ্টের হৃদয়
দয়ায় বিগলিত হ’ল। তিনি বলেন, “তুমি ঘরে যাও,
তােমার ভৃত্য ভাল হয়ে গেছে।”
খৃষ্টের প্রতি তার এরূপ অগাধ বিশ্বাস জন্মে ছিল
যে, তিনি আর একটি কথাও না বলে তাকে প্রণাম করে
গৃহে ফিরে গেলেন। পথে তার চাকরদের সঙ্গে দেখা হল।
তাদের মুখে আনন্দের চিহ্ন দেখে তিনি বুঝলেন, তাঁর
ভৃত্য যথার্থই সুস্থ হয়ে গেছে। তখন তিনি খোঁজ করলেন
কখন সেই বালকটি সুস্থ হতে আরম্ভ করেছিল।
ভৃত্যেরা যে সময়ের উল্লেখ করলে তা শুনে তিনি
বুঝলেন যে, ঠিক ঐ সময়েই খৃষ্টের সঙ্গে তার কথা
হচ্ছিল, আর খৃষ্ট ঠিক সেই সময়েই বলেছিলেন, যাও,
ঘরে যাও, তােমার ভৃত্য ভাল হয়ে গেছে।
তিনি ঘরে ফিরে এই অপূর্ব ঘটনার কথা সকলকে
বলেন আর সেই দিন হ’তে ঐ রাজপুরুষ খৃষ্টের
অনুগত শিষ্য হলেন।
৩০

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
খৃষ্ট মানুষের মাঝে মানুষ হয়ে জন্মালেও, মানুষের
কাতরতায় তিনি চিরদিনই স্বর্গীয় ক্ষমতায় সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল
হয়ে উঠেছেন।
বিধবার সন্তান
খৃষ্ট বেশীদিন কফরনাহমে রইলেন না। তিনি সেখান
থেকে পশ্চিম দিকে পঁচিশ মাইল দূরে নাইম নামক এক
নগরে গেলেন। এই ছােট নগরটি প্রান্তরের মাঝে এক
পাহাড়ের উপর অবস্থিত। এখানে আসতেই তিনি দেখতে
পেলেন, একদল লােক একটি মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে।
শুনলেন, এক বিধবার একমাত্র যুবক পুত্র মারা গেছে,
তারই সেই শব।
পুত্রহারা জননী চোখের জলে বুক ভাসাতে-ভাসাতে
সঙ্গে যাচ্ছিলেন। খৃষ্ট সেই করুণ দৃশ্যে বড়ই বিচলিত
হ’লেন, তিনি কেঁদে ফেললেন ; কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে
সামলে নিয়ে শব-বহনকারী লোেকদের ডাকলেন আর
বিধবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, “আর কেঁদো না।”
খৃষ্টের এই সামান্য বাণীটির মধ্যে সম্ভবতঃ এমন কোন
শক্তি ছিল যার জন্য ঐ বিধবার চোখের জল তৎক্ষণাৎ
থেমে গেল। মুমুর্মু পুত্রের পাশে বসে সে এতদিন নিজেকে

প্রেমাবতার যীশু
কোন সান্ত্বনাই দিতে পারেনি, কিন্তু আজ খৃষ্টের
সামান্য দু’টি কথাই যেন পুত্রহীনা জনমীর বুকে
অমৃত ছড়িয়ে দিলে ! আশায় তার সমস্ত মনঃপ্রাণ
ভরপুর হয়ে গেল, আর সমবেত লােকেরা ত বিস্ময়ে
নিৰ্বা।
খৃষ্ট সেই মৃতদেহের পাশে গিয়ে বলেন, “হে যুবক,
আমি তােমায় বলছি, ওঠ।”
সঙ্গে-সঙ্গে এক অলৌকিক কাণ্ড! যুবকটি তৎক্ষণাৎ
খাটের উপর উঠে বসল, মনে হ’ল সে যেন গভীর নিদ্রা
থেকে উঠেছে। খৃষ্ট তার হাত ধরে তাকে মায়ের কাছে
এগিয়ে দিলেন। আর স্নেহময়ী জননীর কৃতজ্ঞ হৃদয়
তখন আনন্দে আত্মহারা।
সমবেত সকলে এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখে ভয়ে ও
বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল! তারা অভিভূত ভাবে ঈশ্বরের
নাম করতে লাগল। তারা বলাবলি করতে লাগল,
“সত্যই ইনি ঈশ্বরের অবতার ; তা না হলে এ রকম
অদ্ভুত কাজ কেউ কখনাে করতে পারে ?”
ক্রমে এই ঘটনার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
লােকমুখে তার জয়গান ঘােষিত হতে লাগল। এর
ফলে খৃষ্টের পক্ষে কোথাও যাওয়া খুব শক্ত হয়ে পড়ল ;

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
কারণ, যখন যেখানে তিনি যেতেন তখনই সেখানে
লােকের ভীড় এত বেশী হ’তে লাগল যে, তিনি কোন
কাজই করতে পারতেন না, বা কোন উপদেশই কাউকে
দিতে পারতেন না।
যারা করুণাময়, যারা প্রেমময়,—তাঁদের বিগলিত
হৃদয়ের স্রোতে পৃথিবীর দুঃখ-কষ্ট ভেসে যায় বটে, কিন্তু
তাদের ব্যক্তিগত নানা অসুবিধা ক্রমশঃ ঘনীভূত হয়ে বর্ষার
পলিমাটির মত পায়ের তলায় সঞ্চিত হতে থাকে।
যায়ীরের কন্যা
আর একদিন খৃষ্ট কফরনাম সহরে আছেন এমন
সময় একজন বিখ্যাত লােক ভীড় ঠেলে খৃষ্টের কাছে
এসে উপস্থিত। এই ব্যক্তির নাম শায়ীর, তিনি ঐ
সহরের একজন প্রধান ব্যক্তি। সকলেই তাকে রাস্তা
ছেড়ে দিল ; কারণ, তার মুখ দেখে মনে হ’ল তিনি
বড়ই বিপদ্গ্রস্ত।
তিনি খৃষ্টকে দেখে তার সামনে নতজানু হয়ে বলেন,
“প্রভু, আমার কন্যা মরণাপন্ন ; আপনি দয়া করে
আপনার মঙ্গল-হস্ত দিয়ে তাকে স্পর্শ করুন। তাহলে
সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।”

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তিনি তৎক্ষণাৎ যায়ীরের সঙ্গে তাঁর গৃহের দিকে
চলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর শিষ্যেরা ও অন্যান্য অনেকেও
যেতে লাগল।
সেই জনতার ভিতর একজন অসুস্থ স্ত্রীলোেক ছিল।
সুদীর্ঘ বারাে বছর যাবৎ সে অসুখে ভুগছিল।
ডাক্তার-কবিরাজ তার চিকিৎসা করেছিল, কিন্তু কেউ
তাকে আরােগ্য করতে পারে নি।
স্ত্রীলােকটির বিশ্বাস হ’লএকবার যদি সে খৃষ্টের
পােষাকের একটা কোণও স্পর্শ করতে পারে, তাহলে
তার সমস্ত ব্যাধি সেরে যাবে ! সে তাই ভীড় ঠেলে কোন
রকমে তাঁর কাছে এগিয়ে গেল, তারপর হাত বাড়িয়ে
তাঁর জামার প্রান্তভাগ স্পর্শ করল। সেই মুহূর্তে সে
অনুভব করল যে, সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে।
খৃষ্ট তৎক্ষণাৎ পশ্চাদ্দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা
করলেন, “কে আমায় স্পর্শ করল ?”
শিষ্যেরা এই প্রশ্নে বড়ই আশ্চর্যান্বিত হলেন ;
তারা তাে কাউকেই স্পর্শ করতে দেখেন নি। বিশেষতঃ,
তাঁর চারদিকে তখন অসংখ্য লােক। তাদের সঙ্গে ছোয়া-
ছুঁয়ি হতে পারে বটে, কিন্তু অমন ভীড়ে তাকে ইচ্ছে
করে স্পর্শ করবে কে?
৩৪

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
স্ত্রীলােকটি ভয় পেয়ে তার সম্মুখে এগিয়ে এল ;
তারপর অপরাধীর মত ভয়েভয়ে বিনীত ভাবে বল্ল,
“আমি—আমি স্পর্শ করেছি !” বলেই সে ধপাস করে
খৃষ্টের পায়ের উপর পড়ে গেল, তারপর চোখের জলে
ভেসে বলে, “প্রভু! বারাে বছর চিকিৎসা করেও
হাকিম-বৈদ্য যে অসুখের কিছু করতে পারে নি, আপনার
মঙ্গলময় স্পর্শে আজ সেই অসুখই আমার ভাল হয়ে
গেল। আমি এই ভরসায়ই আপনাকে ছুঁয়েছিলাম
প্রভু! আমায় ক্ষমা করুন!”
খৃষ্ট তার এই ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা দেখে খুসী হলেন।
তিনি বলেন, “নারী, তােমাকে ভাল করেছে তােমার
ভক্তি ও বিশ্বাস। যাও, কোন ভয় নেই,তুমি শান্তিতে
গৃহে চলে যাও।”
পরে তিনি যায়ীরের গৃহের দিকে যেতে লাগলেন।
পথিমধ্যে যায়ীরের চাকর এসে বল্ল, “প্রভু, কন্যাটি
মারা গেছে।”
এই দুঃসংবাদে যায়ীরের মুখ বেদনায় কালাে হয়ে
গেল। খৃষ্ট তার বেদনা নিজের হৃদয়ে অনুভব করে
তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “ভয় করাে না, ঈশ্বরে
বিশ্বাস রাখখা, কোন বিপদই হবে না।”

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
যায়ীরের গৃহে উপস্থিত হয়ে খৃষ্ট দেখলেন, চতুর্দিকে
নরনারী কঁদছে, কন্যার মা তাে শশাকে একেবারে আকুল!
ধীরে-ধীরে তিনি মৃত কন্যার কাছে এগিয়ে গেলেন,
সকলকে বলেন, “তােমরা কঁদছ কেন ? মেয়েটি ঘুমিয়ে
আছে, এখনই তার ঘুম ভেঙে যাবে,—সে জেগে উঠবে।”
এই বলে তিনি তার কয়েকজন শিষ্য ও কন্যার
পিতামাতাকে নিয়ে কন্যাটির বিছানার পাশে গেলেন।
তারপর তিনি ধীরে ধীরে সেই কন্যার হাত ধরে বললেন,
“ওঠ, ওঠ। আমি বলছি কুমারি, উঠে বস!”
তৎক্ষণাৎ এক অদ্ভুত কাণ্ড। প্রাণহীন কুমারীর
দেহে যেন এক বিদ্যুৎ-তরঙ্গ খেলে গেল! সে চোখ খুলে
চারদিকে তাকাল। তারপর সদ্য ঘুম-ভাঙা মেয়েটির
মত, সে হাই তুলে বিছানায় উঠে বসল! সঙ্গে-সঙ্গে
মহা আনন্দে সকলে কলরব করে উঠল।
জগতের প্রেমময় বন্ধুর আবার এক অলৌকিক মহিমা
প্যালেষ্টাইনের ঘরে-ঘরে প্রচারিত হয়ে পড়ল !
শিশুদের বন্ধু
খৃষ্ট শিশুদের খুব ভালবাসতেন। তিনি যেখানেই যেতেন,
সেখানেই শিশুরা তাঁর নিকটে আসত আর তিনি সকলকে

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট,
কোলে নিয়ে আদর করতেন। একদিন অনেক স্ত্রীলোেক
তাদের শিশুগুলিকে নিয়ে তার কাছে এল ও তাঁকে
অনুরােধ : করল যেন তিনি শিশুদের আশীর্বাদ
করেন।
খৃষ্ট অনেককে আশীৰ্বাদ করা সত্ত্বেও ভীড় কমল না,
ক্রমে আরও অনেক শিশু এসে সমবেত হ’ল। তখন
শিষ্যেরা বিরক্ত হয়ে তাদের মায়েদের বারণ করতে
লাগলেন। খৃষ্ট তাদের এই কথা শুনে ভৎসনা করলেন
এবং শিশুদের সকলকে আশীৰ্বাদ করা হলে পর, তাদের
একজনকে সকলের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে বলেন,
“দেখ, তােমরা যদি এই শিশুর মত নম্র হতে না পার,
তা হলে ভগবানের কাছে যেতে পারবে না।”
খৃষ্টের শিষ্যরা একদিন নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক
করছিলেন যে তাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ ! খৃষ্ট তাই আজ
শিশুদের দেখিয়ে বলেন, “এদের তােমরা অবজ্ঞা কর
; কারণ, যে কেউ শিশুদের ভালবাসে, সে আমাকেই
ভালবাসে। আরু যে শ্রেষ্ঠ হতে চায়, তাকে এই শিশুর
মত নম্র হতে হবে।”
শিশুরাও তাকে তাদের নিজেদের লােক বলেই মনে
করত। তাঁকে দেখলেই সকলে তার কাছে ছুটে যেত।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তিনি তার সকল কাজ ছেড়ে দিয়ে তাদের কোলে তুলে
নিতেন ও আশীৰ্বাদ করতেন।
কুষ্ঠীর আরােগ্যলাভ
খৃষ্টের জীবন ছিল সেবার জীবন। তিনি যেখানে যেতেন
সেখানেই যত অসুস্থ লােক তার কাছে আসত আর তিনি
তাদের কাউকেই নিরাশ করতেন না। তাঁর করুণায়
সকলেই রােগমুক্ত হয়ে সুস্থ শরীরে ফিরে যেত।
তিনি একদিন গালিল প্রদেশের কোন এক গ্রামে
উপস্থিত হলেন। তিনি এসেছেন জানতে পেরে এক
কুষ্ঠী তার কাছে আসবার জন্য অধীর হয়ে উঠল। কিন্তু
কেমন করে সে তার কাছে যাবে ? কেউ যে তাকে খৃষ্টের
কাছে ঘেঁসতেই দেবে না। কারণ, ইহুদীরা কুষ্ঠব্যাধিকে
পাপের ফল বলে মনে করত। আর সেই জন্য অনেক
অত্যাচার কুষ্ঠীদের সহ করতে হত। রাস্তা দিয়ে যেতে
গেলেও দূর থেকে সকলে “অশুচি, অশুচি” বলে চীৎকার
করে অন্য সবাইকে সাবধান করে দিত। কুষ্ঠীকে তখন
অতি কষ্টে রাস্তার এক পাশ দিয়ে চলে যেতে হত।
সহরের বড় রাস্তা দিয়ে তাদের চলার অধিকার ছিল না।
এই সব লােকদের গ্রাম ছেড়ে দূরে গিয়ে
হত ;
৩৮

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
;
কারণ, আত্মীয়-স্বজন কেউ তাদের দিকে ফিরেও
তাকাত না।
এই কুষ্ঠী লােকটি খৃষ্টের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা
লােক-মুখে শুনেছিল, আর তাই ভরসা করে তার কাছে
আসবার জন্য ব্যাকুল হয়েছিল। তার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল,
একবার যদি সে কোন রকমে খৃষ্টের কাছে পৌঁছুতে
পারে, তা হলেই সে রােগমুক্ত হবে।
হঠাৎ এই কুষ্ঠীকে দেখতে পেয়ে রাস্তার লােকজন।
সকলেই ভয় পেয়ে দূরে সরে গেল। কুষ্ঠীর এতে সুবিধাই
হ’ল ; সে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে এসে খৃষ্টের কাছে নতজানু
হয়ে বল্ল, “প্রভু, আপনি ত’ ইচ্ছা করলেই আমাকে
ভাল করতে পারেন।”
ভাবের আবেগে সে এর বেশী আর কোন কথা বলতে
পারল না।
খৃষ্ট তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার অগাধ বিশ্বাস
দেখে আকৃষ্ট হলেন। তিনি তাঁর হাতখানি বাড়িয়ে দিয়ে
সেই কুষ্ঠীর ক্ষতযুক্ত হাতখানি টেনে তুলে নিলেন, তারপর
ধীরে-ধীরে বলেন, “আমি ইচ্ছা করি তুমি এই মুহূর্তে
ভাল হয়ে ওঠ।”
তৎক্ষণাৎ আবার এক অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য কাণ্ড!
৩৯

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
রক্তপূয-সমম্বিত অসংখ্য ক্ষতযুক্ত সেই ঘৃণ্য কুষ্ঠী যেন
কোন্ যাদুমন্ত্রে নিরাময় হয়ে গেল! চক্ষুর নিমেষে কুষ্ঠীর
কৃতজ্ঞ মস্তক খৃষ্টের পদতলে লুটিয়ে পড়ল, তার চোখ দিয়ে
অজস্র জলধারা বয়ে চল!
খৃষ্ট বলেন, “একথা আর কাউকে বলল না। কিন্তু
এখনি তােমার ধৰ্ম্ম-মন্দিরে ছুটে যাও। সেখানে যেয়ে
ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে পূজো দাও, আর পুরােহিতকে তােমার এই
দেহ দেখিয়ে দেবতার আশীর্বাদের জন্য তাঁর দয়া ভিক্ষা কর।”
কুষ্ঠী তাঁকে প্রণাম করে তখনই ছুটল ; কিন্তু যে
এত বড় রােগ থেকে মুক্ত হয়েছে, সে কিছুতেই নিজেকে
দমন করতে পারলে না ! সে সকলের কাছে খৃষ্টের এই
অদ্ভুত কাজের কথা বলতে-বলতে ছুটে চল্ল। কারণ, তার
হৃদয় তখন কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ; এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না
করে সে কি থাকতে পারে ? তাই খৃষ্টের নিষেধ তাকে
বাধা দিতে পারলে না।
ঈশ্বর পতিতপাবন। পাপী-তাপীর প্রতি তাঁর অসীম
দয়া। তাঁর কৃপালাভ করলে সকল যন্ত্রণার হস্ত থেকে
রক্ষা পাওয়া যায়।

অননীর অনুরােধে খৃষ্ট জালায় জল আঙুরের রসে পরিণত করলেন (পৃষ্ঠা-২

No text on this page.

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
ধীবরের ভাগ্য
গালিল প্রদেশের এক প্রকাণ্ড হ্রদ তার বিশাল
আয়তনের জন্য ‘গালিল-সমুদ্র’ নামে পরিচিত ছিল।
খৃষ্ট একদিন তার তটভূমিতে ব’সে নানা বিষয়ে শিষ্যদের
উপদেশ দিতে লাগলেন।
তার উপদেশ শুনবার জন্য দলে-দলে লােক সেখানে
সমবেত হতে লাগল। ক্রমশঃ এমন হ’ল যে তটভূমি
প্রায় ভরপুর হয়ে গেল, তার নিজেরই আর বসবার স্থান
হয় না!
তিনি দেখলেন তীরের কাছে দু'খানা জেলে ডিঙি
বাঁধা। তিনি তাদের একখানিতে উঠে তার ধীবর-মাঝিকে
বলেন, “আমি এতে ব’সে এদের কিছু ধৰ্ম্মকথা শােনাচ্ছি,
তুমি নৌকোখানি একটু দূরে সরিয়ে রাখাে।”
মাঝি তার কথামত নৌকোখানি তীর থেকে কিছু
দূরে নিয়ে গেল, খৃষ্ট তাইতে ব’সে তার ভক্তদের নানা
উপদেশ দিতে লাগলেন।
বক্তৃতা যখন শেষ হয়ে গেল, খৃষ্ট তখন সেই মাঝিকে
বলেন, “এইবার তােমার নৌকোটি আরাে কিছু দূরে
নিয়ে চলল। তারপর সেখানে একবার জাল ফেলাে দেখি।”
।
৪১

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
ডিঙির জেলে-মাঝি বলে, “প্রভু! ওতে কিছুই
লাভ হবে না। আমরা সারা দিনরাত পরিশ্রম করে একটা
মাছও ধরতে পারিনি। আজ আমাদের বরাত মন্দ,
জাল ফেলে আর কি হবে ?”
খৃষ্ট বলেন, “তবু যা বলছি তাই করাে, তােমার
পরিশ্রমের দাম পেয়ে যাবে।”
তার কথা এড়াতে না পেরে জেলে তার ডিঙি
ভাসিয়ে দূরে নিয়ে গেল, তারপর হতাশ ভাবেই জাল
ফেলে।
কিছুক্ষণ পরে সে জাল টানতে আরম্ভ করল-জাল
এবার বিষম ভারী ! সাহায্যের জন্য সে অন্য সঙ্গীদেরও
ডেকে নিলে। তারপর সকলের চেষ্টায় অবশেষে ধীরে-
ধীরে জাল ভােলা হ’ল। জাল দেখেই ত’ তাদের
চক্ষুঃস্থির ! এত মাছ একসঙ্গে তারা আর কোনদিন দেখে
নাই! একবারেই এত মাছ উঠেছে যে, তাদের আশঙ্কা
হ’ল, নৌকো বুঝি তলিয়ে যায় !
ডিঙির মাঝি এবার ভক্তিতে গদ্গদ হয়ে হাত যােড়
করে খৃষ্টকে বলে, “প্রভু! কে তুমি জানি না। কিন্তু
আমি বড় পাপী, আমার কাছে থেকো না প্রভু, তুমি
এখান হতে চলে যাও।”
!
৪২

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
খৃষ্ট তাকে অভয় দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। মাঝিরা
সেই দিন হতে আর তাকে ছেড়ে থাকতে চাইল না।
তারা তাদের নৌকো ও জিনিষপত্র সবকিছু ফেলে দিয়ে
তখনই তার সাথে-সাথে চল্ল।
পরশমণির ছোয়া পেলে কত লােহাও তখন সােনা
হয়ে যায় !
সমুদ্র-শাসন
খৃষ্ট একদিন তাঁর শিষ্যদের নিয়ে সমুদ্রে বেড়াতে
বেরােলেন। বেরােবার কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎ আরম্ভ
হ’ল প্রচণ্ড ঝড় ! সেই তাণ্ডব ঝড়ে ছােট নৌকোখানি
সামান্য তৃণখণ্ডের মত সমুদ্রের বুকে লাফাতে লাগল।
সকলেরই ভয় হ’ল, নৌকো বুঝি আর বাঁচে না !
খৃষ্টের শিষ্যেরা উন্মাদের মত আর্তনাদ করতে আরম্ভ
করলেন, কিন্তু খৃষ্ট তখনাে নিদ্রামগ্ন! এমন তুমুল
ঝড়েও তাঁর ঘুম ভাঙেনি, তিনি কিছুই এর জানতে
পারলেন না।
উত্তাল সাগরে ঝড়ের বেগ ক্রমেই বেড়ে চন্দ্র, শিষ্যেরা
অগত্যা খৃষ্টকে জাগিয়ে বলেন, “প্রভু, আমরা যে মরতে
যাচ্ছি,—আমাদের রক্ষা করুন।”
৪৩

প্রেমাবতার যীশু
খৃষ্ট উঠে দাঁড়ালেন আর বিরক্ত হয়ে শিষ্যদের
বলেন, “জগৎপিতার প্রতি যদি তােমাদের অচলা ভক্তি
থাকত, তা হলে কখনাে এমন কথা মুখে আনতে না!”
তারপর সমুদ্রের দিকে হাত বাড়িয়ে, আদেশ করবার
সুরে তিনি বলেন, “থামােথামােশান্ত হও।”
আশ্চৰ্য কাণ্ড ! তৎক্ষণাৎ ঝড়ের বেগ থেমে গেল,
সমুদ্র নিস্তরঙ্গ নিথর হয়ে শান্ত ছেলেটির মত ঘুমিয়ে
পড়ল !
শিষ্যেরা তাে অবাক্ ! ভক্তি ও বিস্ময়ে আত্মহারা
হয়ে তারা খৃষ্টের সৌম্য বদনের দিকে একদৃষ্টিতে
তাকিয়ে রইল।
ঈশ্বরে যারা বিশ্বাস করেন, জীবনের কোন ঝড়-ঝঞ্চাই
তাঁদের বিপন্ন করতে পারে না! সমস্ত বিপদই তারা
শান্ত ভাবে অতিক্রম করে যান।
অন্ধের দৃষ্টিলাভ
খৃষ্ট একদিন শমরিয়ার এক নগরের মধ্য দিয়ে যিরু-
শালেমের দিকে যাচ্ছিলেন। শিষ্যগণও তার সঙ্গে
ছিলেন। এই নগরের এক বড় রাস্তায় বসে এক জন্মান্ধ
ভিক্ষা করত।
৪৪

প্রেমাতার যীশুখৃষ্ট
সে কতদিন খৃষ্টের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা শুনেছে।
সে শুনেছে—কত খোঁড়া, কত অন্ধ, কত অসুস্থ তার
হাতের স্পর্শে ভাল হয়ে গেছে। তার বড় আশা ছিল,
কোনদিন এই মহাজনের আশীর্বাদে সেও ভাল হয়ে যাবে।
আজ সে শুনতে পেল, খৃষ্ট এই রাস্তা দিয়েই যাবেন।
তার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। তাহলে সত্যই কি
সে দৃষ্টিশক্তি লাভ করবে ? সত্যই কি ভগবানের দেওয়া
ফল-ফুল, গাছপালা, জগতের সব-কিছু সুন্দর জিনিষ
দেখবার সৌভাগ্য আজ তার হবে ? খৃষ্টের করুণায়
তা কি কখনাে সম্ভব হতে পারে না ?
হঠাৎ চারধারে কলরব হতে লাগল। অন্ধ বুঝতে
পারল খৃষ্ট ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছেন। সে লাফিয়ে উঠে
গােলমাল, লক্ষ্য করে তার দিকে দৌড়ে গেল। আর
চীৎকার করে বলতে লাগল, “প্রভু, আমার প্রতি দয়া
করুন, আমার প্রতি দয়া করুন।”
এত ভীড়ের মধ্যেও তার এই কাতর স্বর খৃষ্ট শুনতে
পেলেন। তিনি সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন, এক অন্ধ
পাগলের মত ছুটে আসছে ।
তিনি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি চাও?
আমি তােমার জন্য কি করতে পারি ?
.৪৫ ;

প্রেমাতার যীশুখৃষ্ট
এই ভরসা পাওয়ামাত্র সে বলে উঠল, “আমি যেন
চোখে দেখতে পাই প্রভু!”
খৃষ্ট এক মুহূর্ত নীরব থেকে বলে উঠলেন, “আচ্ছা,
তাই হবে। তােমার বিশ্বাস তােমাকে সুস্থ করুক।”
খৃষ্টের কথার সঙ্গে-সঙ্গেই চক্ষু তার খুলে গেল !
সে দেখলে, তার চারপাশে এক অপূর্ব জগৎ! গাছপালা,
ফল-ফুল, কত পাখী, কত জিনিষ,—কত বিচিত্র ঐশ্বর্য্যের
সমারােহ।
ভিখারী বুঝতে পারলে, আজ সে কত ভাগ্যবান, আজ
সে দৃষ্টিশক্তির অধিকারী ! জীবনে যে আনন্দ সে কখনন
পায়নি, আজ তাই সে পেয়েছে। যাদের মুখ সে কখনাে
দেখেনি, আজ তাদের সে দেখল, আর সেই সঙ্গে দেখল
তার চক্ষুদাতার করুণ মুখখানি! সমস্ত জগৎ আজ তার
কাছে এক নূতন ভাবে দেখা দিয়েছে। জন্মান্ধের জীবন
যেন আজ এক নূতন রঙে রঙিন হয়ে উঠল।
প্রায় দু’ হাজার বছর আগে, খৃষ্ট সেদিন যে জন্মান্ধ
ভিখারীকে দৃষ্টিশক্তির ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ করেছিলেন, আজও
তাঁর সেই কাজ শেষ হয়নি। আজও তার বাণী, তার আদর্শ,
জগতের কোটি-কোটি লােককে যথার্থই দৃষ্টিশক্তির ঐশ্বর্য্যে
সমৃদ্ধ করে তুলছে—ক্রমশঃই তাদের চোখ খুলে যাচ্ছে।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
পক্ষাঘাতগ্রস্তর উদ্ধার
কিছুদিন পরে খৃষ্ট আবার একদিন কফরহমে গেলেন।
তার আগমনে সারা সহরে বিপুল আনন্দের সাড়া পড়ে,
গেল—তাঁকে দেখবার জন্য উৎসুক জনগণ দলে-দলে
এসে ভীড় করতে লাগল। সেখানকার যত জ্ঞানী ও
সাধারণ লােক সকলেই তাঁর কাছে এল তার সুন্দর
উপদেশ শােনবার জন্য।
একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত লােক অনেক দিন অসুখে
ভুগছিল। তার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবগণ খৃষ্ট এসেছেন
জানতে পেরে, তাকে একটি
খাটে শুইয়ে তার কাছে।
নিয়ে এল। কিন্তু ভীড় সেখানে এত যে, সেখানে প্রবেশ
করে কার সাধ্য! এম্‌নি অবস্থায় তারা কি যে করবে,
কিছুক্ষণ তা বুঝতেই পারলে না। অবশেষে কোন উপায়
দেখে, যে ঘরে খৃষ্ট ছিলেন, তারা সেই ঘরের ছাদের
উপর উঠল, আর সেখানকার ছাদের খােলা সরিয়ে কিছু
অংশ ফাক করে ফেল্ল। তারপর দড়ি দিয়ে খাটশুদ্ধ
সেই রােগীকে খৃষ্টের সামনে নীচে নামিয়ে দিল।
খৃষ্ট তাদের আগ্রহ ও বিশ্বাস দেখে আশ্চর্যান্বিত
হলেন। সমবেত লােকেরাও বড়ই বিস্মিত হল।
৫

}
প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তখন খৃষ্ট সেই রােগীকে বললেন, “হে সন্তান, তুমি
আশ্বস্ত হও, তােমার কোন ভয় নেই।”
রােগী বুঝতে পারল খৃষ্ট তার প্রতি করুণাবিষ্ট
হয়েছেন। তার হৃদয় আনন্দে ভরপূর হয়ে গেল।
তারপর খৃষ্ট বলেন, “ওঠ, তুমি তােমার খাট নিয়ে
ঘরে চলে যাও!”
বিপন্নের ত্রাণকর্তা খৃষ্টের আকাঙ্ক্ষা কি বৃথা হতে
পারে ? তখনই এক অসম্ভব ব্যাপার চোখের সম্মুখে
সম্ভব হয়ে গেল! সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত জড় ব্যক্তি সকলের
সামনে উঠে দাড়াল, তারপর সম্পূর্ণ সুস্থ সবল যুবকের
মত তার খাটখানি নিজের কাঁধে তুলে নিল।
আনন্দে তার মুখ-চোখ উজ্জ্বল, কণ্ঠে শুধু খৃষ্টের
জয়-গান! সে তার খাটখানি কঁাধে তুলে, অনায়াসে
বয়ে নিয়ে বাড়ী চলে গেল ।
এই আশ্চর্য ঘটনা দেখে উপস্থিত সকলে বিস্মিত হ’ল
আর ভগবানের গৌরব গান করতে লাগল।
বিশ্রামদিন পালন
ইহুদীরা শনিবার দিনটিকে বিশ্রাম-দিন ব’লে মান্ত।
তার আগের দিন থেকেই সে সম্বন্ধে সকলকে সাবধান
৪৮

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
করে দেওয়া হত। যিরুশালেমের মন্দিরে ঘণ্টা বাজতে
সুরু করত, লােকজন তাতে জানতে পারত বিশ্রাম-দিন
আরম্ভ হয়েছে।
সেদিন আর কেউ কোন কাজে হাত দিবে না, পথে
হাঁটবে না, কেবল ধর্মচিন্তায় দিন কাটাবে; এমন কি,
সেদিন রান্না পর্যন্ত বন্ধ থাকত। কাজেই খাওয়ার
বন্দোবস্ত করে রাখা হত তার আগের দিন। সেদিন কোন
বিপদ-আপদ হলেও কেউ চিকিৎসকের সাহায্য নিতে
পারত না, ঘরে আগুন লাগলেও নিভিয়ে দেবার চেষ্টা হত
,—এমনই ছিল তখন কুসংস্কার। অথচ এই কুসংস্কারের
বিরুদ্ধে কারও একটা কথা বলবারও সাহস ছিল না।
যিরুশালেমের নিকটবর্তী বৈৎসদা গ্রামে একটি প্রস্রবণ
ছিল। সেখানে মাঝে-মাঝে এমন জল বার হত যে,
তাতে স্নান করলে লােকে ব্যাধিমুক্ত হত। এই প্রস্রবণের
পাশে একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত লােক আটত্রিশ বৎসর ধরে
পড়ে ছিল। অথচ তার এমন কেউ ছিল না যে তাকে
এই জলে স্নান করাবার জন্য এগিয়ে নিয়ে যায়।
সেদিন বিশ্রাম-বার, খৃষ্ট ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
সেই হতভাগ্যকে দেখে করুণায় তার হৃদয় বিগলিত হয়ে
গেল; তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি ভালহ’তে চাও?
০১

প্রেমাতার যীশু এই প্রশ্নে তার চোখ জলে ভরে এল। সে বল, “মহাশয়, আমাকে তুলে এগিয়ে দেবার লােক ত’ কেউ নেই! তাই আজ আটত্রিশ বছর এমনি ভাবে আমি নিরাশ হয়ে পড়ে আছি।” খৃষ্ট সস্নেহে বলেন, “আচ্ছা, নিরাশ হয়াে না, ওঠো; আর তুমি তােমার বিছানা নিয়ে ঘরে চলে যাও।” কার সঙ্গে-সঙ্গে সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত লােকটির সমস্ত ব্যাধি দূর হয়ে গেল, দেহে তার অপূৰ্ব শক্তি ফিরে এল। সে নূতন এক জীবনের স্বাদ প্রথম আস্বাদন করলে। এ কথা চারদিকে ব্যাপ্ত হয়ে গেল। ইহুদীদের অনেকে বলতে লাগল, “বিশ্রাম-দিনে লােককে ভাল করা, হয়েছে—অতএব খ্ৰীষ্ট যথেষ্ট অন্যায় করেছেন।” তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলতে লাগল, কেমন করে তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া যায়। তারা অনেক মিথ্যা অপবাদও দিতে লাগল। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও লােকেরা—বিশেষতঃ দীন-দুঃখী পাপী-তাপী -তার পশ্চাৎ-পশ্চাৎ যেতে লাগল। শিক্ষাদান পূৰ্বেই আমরা জেনেছি ইহুদীরা শনিবার দিনকে বিশ্রাম- দিন ব’লে মানত। একদিন এক শনিবারে খৃষ্টের শিষ্যেরা

• প্রেমাবতার যীশু
গমের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে যেতে-যেতে কিছু শিষ নিয়ে হাতে
মেড়ে খেয়েছিলেন। এই অপরাধে ইহুদী-সমাজের বড়-বড়
নেতারা ভয়ানক ক্রুদ্ধ হ’ল।
তারা বলে, “বিশ্রাম-দিনে শস্যছেড়া মহা অপরাধ ।
আর খৃষ্ট এই অন্যায়ের সাহায্য করছেন।” এই বলে
নেতারা সকল লােককে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে
লাগল। তা ছাড়া, আর-একটি ব্যাপারে দোষ-ধরার
কাজে তাদের সুবিধা হ’ল খুব বেশী।
একটি লােকের হাত একেবারে শুকিয়ে অস্থির
হয়ে গিয়েছিল। কতবারই সে খৃষ্টের কাছে এসেছিল
ভাল হ’তে ! কিন্তু ভীড়ের জন্য সে তার কাছে এগুতেই
পারেনি। আজ বিশ্রাম-দিন, তাই সুবিধা পেয়ে সে খৃষ্টের
সামনে এসে দাঁড়াল। চারধারে বিপক্ষবাদীরা অপেক্ষা
করতে লাগল তিনি কি করেন তাই দেখবার জন্য।
খৃষ্ট তাদের মনের ভাব বুঝতে পারলেন। কিন্তু
কিছুমাত্র হৃক্ষেপ না করে তিনি লােকটিকে বললেন,
“হাত বাড়াও।”
খৃষ্টের আদেশের সঙ্গে সঙ্গে তার পীড়িত দুর্বল হাতে
যেন কোথা হতে শক্তির সঞ্চার হ’ল। সে তৎক্ষণাৎ
খৃষ্টের সম্মুখে তার হাত বাড়িয়ে দিলে।

খেমাবতার যীশুখৃষ্ট
এই দেখে তার শত্রুরা রাগে অন্ধ হয়ে চলে গেল।
কিন্তু অন্য লােকেরা তার সুন্দর উপদেশ শুনবার জন্য
অপেক্ষা করতে লাগল। তারা তাদের সব কাজ ছেড়ে
তার সঙ্গে-সঙ্গে যেত শুধু তার অমূল্য উপদেশ শুনবার
জন্য। তাঁর প্রত্যেকটি কথা তাদের মনে যেন অফুরন্ত
শান্তি ঢেলে দিত।
খৃষ্ট এক জায়গায় গিয়ে ভাল হয়ে বসলেন। বসতেই
মুহূৰ্তমধ্যে এক বিপুল জনতা তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হল।
তিনি বলেন, “দান করা ভাল, একথা তােমরা
শুনেছ। কিন্তু লােককে দেখাবার জন্য কখনাে দান করাে
; তােমার বাঁ-হাত যেন জানতে না পারে যে তােমার
ডান-হাত কি দান করছে। তারপর আর একটা কথা।
লােকের কাছে শুধু বাহবা পাবার জন্য কখনাে উপবাস
করাে না। উপবাস করলে গােপনে করাে, যেন কেবল
ভগবানই তােমার উপবাসের কথা জানতে পারেন।
ভগবানের উপর সম্পূর্ণ ভরসা রেখাে। ভবিষ্যতের
কথা ভেবে ব্যাকুল হয় না। প্রার্থনা করতে কখনন
ঢাক পিটিয়ে প্রার্থনা করাে না, নির্জনে করাে। লােকে
যেন তােমার প্রার্থনার কথা জানতে না পারে। আর
তােমাদের প্রার্থনা যেন এই ধরণের হয় ?

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
হে আমাদের স্বর্গস্থ পিতা! আপনার নাম পবিত্র
ব’লে মান্য হােক। আপনার প্রেমের রাজ্য জগতে আসুক।
স্বর্গের ন্যায় পৃথিবীতে আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হােক।
আমাদের আজ আহার দিন। আমরা যেমন অন্যদের
অপরাধ ক্ষমা করি, আপনিও তেম্‌নি আমাদের অপরাধ
ক্ষমা করুন। আর যা কিছু প্রলােভন ও পাপ, তাই থেকে
আমাদের রক্ষা করুন। আপনার রাজ্য ও মহিমা যুগে-
যুগে ধন্য হােক।”
পাঁচ হাজার লােককে খাওয়ান
খৃষ্ট জনতা থেকে দূরে
গিয়ে নির্জনে থাকবার জন্য
একদিন বৈৎসদার কাছে এক মরু-প্রান্তরে চলে গেলেন।
কিন্তু জনতা সেখানেও তাকে পরিত্যাগ করল না।
সকলেই তার উপদেশ শুনতে চায় ; আর যারা পীড়িত ও
অথৰ্ব্ব, তারাও তার অনুগ্রহে ভাল হতে চায়। এই দেখে
তাঁর মনে দয়া হ’ল। তিনি তখন সেই মরু-প্রান্তরেই
তাদের শিক্ষা দিতে লাগলেন, আর যারা অসুস্থ, তাদের
ভাল করতে লাগলেন।
এদিকে বেলা শেষ হয়ে গেল, সূর্য অস্ত যায়-যায় !
তবুও লােকদের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তখন তার
শিষ্য পিতরু এসে খৃষ্টকে বলেন, “প্রভু, রাত হয়ে এল,

প্রেমাবতার যীশু
অথচ এখান থেকে কেউ যে যাচ্ছে না। এই প্রান্তরে এরা
খাবে কি? এখানে কিছুই পাওয়া যায় না। আপনি
এখন এদের সকলকে ঘরে ফিরে যেতে বলুন। সকাল
থেকে এরা কিছুই খায় নি।”
প্রভু বলেন, “তােমরা এদের খেতে দাও।”
সে কথা শুনে তাে শিষ্যরা অবাক! এত লােককে,
খাওয়ানাে, আর এই প্রান্তরে যেখানে কিছুই পাওয়া যায়
! সে যে অসম্ভব ! কিন্তু তখনকার জন্য শিষ্যরা
ভুলে গিয়েছিলেন যে, প্রভুর পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়।
তাঁর শিষ্য ফিলিপ বলেন, “প্রভু, এ কি সম্ভব ?”
তখন খৃষ্ট তাদের বলেন, “কেন সম্ভব নয় ? যাও,
খোঁজ কর—কার কাছে কি খাবার আছে।”
বহুক্ষণ খোঁজ করার পর দেখা গেল, একটি ছেলের
কাছে পাঁচখানা মাত্র রুটি ও দু’টি মাছ আছে।
শিষ্যেরা নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন। এত লােকের
মধ্যে পাঁচখানা রুটি ও দু’টি মাছ দিয়ে কি হবে ?
প্রভু তাদের কাছে ডাকলেন আর বলেন, “ঐ রুটি
আর মাছই নিয়ে এসাে।”
শিষ্যেরা তাই-ই নিয়ে এলেন। খৃষ্ট ঐ রুটি আর
মাছ হাতে নিয়ে ভগবানের কাছে কিছুক্ষণ কি প্রার্থনা
৪

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
করলেন। তারপর বললেন, “যাও, সকলকেই একটু
একটু করে ভেঙে খেতে দাও।”
ওদিকে জনতার ললাকেদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, খৃষ্ট
কোন-না-কোন উপায়ে তাদের খাওয়াবেনই। তারা তাই
আগে হ’তেই সারি-সারি ব’সে গিয়েছিল।
খৃষ্টের আদেশে শিষ্যরা সেই সামান্য রুটি ক’খানি ও
মাছ দু’টি ভেঙে তাদের দিতে লাগলেন, কিন্তু আশ্চৰ্য্য,
সে খাবার আর ফুরােয় না। সকলে খেয়ে-দেয়ে পরিতৃপ্ত
হ’ল, তবু অনেক রুটি ও মাছ উদ্বৃত্ত রয়ে গেল।
এই অদ্ভুত ঘটনা দেখে সবাই তার নামের গৌরব
করতে লাগল। তারা বুঝতে পারল, ইনি তাদের সাধারণ
গুরু নন।
কিন্তু সম্ভবতঃ এ কথাটা তখনও কেউ বুঝতে
পারেনি যে, ভবিষ্যতে যার আদর্শ ও উপদেশ সারা
পৃথিবীর নৈতিক পরিপুষ্টি সাধন করবে, আজ তার পক্ষে
দৈহিক পরিপুষ্টির জন্য খাদ্য সরবরাহ করা একেবারেই
অসাধ্য নয়।
শিষ্যদের পা ধােওয়ান
খৃষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর কাজের দিন
ক্রমশই শেষ হয়ে আসছে। কারণ, কতকগুলাে ইহুদী
'?

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তাকে মশীহ বা ত্রাণকর্তা বলে মনে করলেও,
অধিকাংশ ইহুদী ছিল তাঁর বিরােধী। তারা তাঁকে
‘মশীহ’ বলে মনে করতে পারে নি।
ইহুদীরা ব্যস্ত থাকত তাদের নিজেদের জাতিগত
ধর্ম ও দেবতা নিয়ে। কিন্তু খৃষ্ট তত তা করেন নি।
তিনি সমস্ত মানুষের যিনি উপাস্য, তাকেই সকলের পিতা
বলে প্রচার করছিলেন।
তারপর আর একটা বিষয়ে ছিল তার সঙ্গে অনৈক্য।
ইহুদীরা ছিল তাদের পুরােহিতদের অধীন। ইহুদীদের
ধৰ্মগত বিধান ও বাধা-নিষেধগুলি যাতে মেনে চলা হয়,
তাদের পুরােহিতরা দিন-রাত তাই নিয়েই ব্যস্ত থাকত।
কেউ যদি তাদের বিধি ও নিষেধগুলি না মানত,
তা হলে পুরােহিতরা তার বিচার করত। কিন্তু খৃষ্ট
এ সবের ধার ধারতেন না। পুরােহিতদের বিধি-নিষেধ
মানবার চেষ্টা তিনি কোনদিনই করেন নাই।
বিশ্রাম-দিনে কেউ কোন কাজ করবে না, এই ছিল
তাদের অনুশাসন। কিন্তু খৃষ্ট সেদিনও কত কাজ করে
গেছেন, কতজনকে উপদেশ দিয়েছেন, কত পীড়িত
ব্যক্তিকে ভাল করেছেন।
শরীয়দিগকে সবাই অস্পৃশ্য মনে করত। কিন্তু

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
খৃষ্টের কাছে সবাই ছিল সমান। বরং শরীয়দিগের
মধ্যেও যে মহৎ দয়াগুণ দেখতে পাওয়া যায়, তিনি তার
উদাহরণ দিয়ে গেছেন। কাজেই তিনি নিশ্চিত বুঝে
নিয়েছিলেন যে, ইহুদী-সমাজ—তথা তাদের পুরােহিত
ও পাণ্ডিত্য-গী ফরিশী-সম্প্রদায় কিছুতেই বেশীদিন
এসব সহ্য করবে না। তিনি তাই খুব তাড়াতাড়ি
তাঁর শিক্ষাদানের কাজ শেষ করে যেতে চাইছিলেন।
সেইজন্য তিনি তাঁর শিষ্যদের কয়েকজনকে ধৰ্ম্ম-প্রচারের
জন্য দেশ-বিদেশেও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝে-মাঝে
তাঁর মনে বড় একটা কষ্ট হত যে, শিষ্যরা এখনও তার
ভাবে অনুপ্রাণিত হতে পারলেন না ! এখনও তারা
সম্মানের জন্য লালায়িত, নম্রতা, তাঁদের মনঃপূত নয়!
ধর্মের জন্যও কষ্ট স্বীকার করতে তাঁরা প্রস্তুত নন্ ।
খৃষ্ট একদিন একটি ছােট শিশুকে তাঁদের সামনে
বসিয়ে নম্রতা শিক্ষা দিয়েছিলেন। তখনকার জন্য তাঁদের
মন নম্র হয়েছিল বটে, কিন্তু পরে আবার তারা তর্ক-বিতর্ক
সুরু করে দিলেন এই নিয়ে যে, খৃষ্টের মৃত্যু হলে,
তাঁদের মধ্যে কে তখন খৃষ্টের সর্বশ্রেষ্ঠ শিষ্যরূপে সকলকে
পরিচালিত করবেন? তারা ঠিক বুঝতে পারেন নি যে,
খৃষ্টের আদর্শ অনুযায়ী এক ধৰ্ম্ম-রাজ্য সংস্থাপন করবার

খেমাবতার যীশুখৃষ্ট
পূর্বে তাদের সকলকেও অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে
হবে, সম্মানের বদলে অসম্মানের বােঝা মাথায় তুলে
নিতে হবে।
খৃষ্ট এ সব দেখে খুবই দুঃখ পেলেন, তাই তিনি তাদের
সামনে নিজের জীবন দিয়ে এক আদর্শ রাখতে চাইলেন।
সে আদর্শ এমন আদর্শ যে, তা দেখে জগতের সামনে তাঁরা
সকল দুঃখ, সকল কষ্ট বরণ করে নেবেন আর তাই হবে
খৃষ্টের শিষ্যের সব চেয়ে বড় পুরস্কার।
একদিন তার শিষ্যেরা এক জায়গায় সমবেত হয়েছেন
এমন সময় খৃষ্ট এক গামলা জল নিয়ে ও কোমরে গামছা
বেঁধে প্রত্যেক শিষ্যের কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে তাঁর
পা ধুইয়ে ও মুছিয়ে দিতে আরম্ভ করলেন।
পিতর এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলেন না। তিনি
বলেন, “প্রভু, এ কখনাে হতে পারে না। আপনি আমার
গুরু, আমি আপনাকে আমার পা ধােয়াতে দেব না।”
খৃষ্ট বললেন, “তা হলে তােমার সাথে আমার কোন
সম্পর্ক থাকবে না।”
তখন পিতর কুণ্ঠিত হয়ে তাঁকে পা ধুইয়ে দিতে
দিলেন। কিন্তু তার এই আচরণে প্রত্যেক শিষ্যই হতবুদ্ধি
হয়ে গেলেন। তাঁদের প্রভু আজ তাদের সামনে নতজানু

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
হয়ে তাদের জুতাে খুলে, ধূলােমাখা পা ধুইয়ে দিচ্ছেন।
তাঁদের সকল গৰ্ব চুরমার হয়ে গেল।
খৃষ্ট তখন বলেন, “তােমরা আমাকে ‘প্রভু বলে
সম্বােধন কর। আমি তােমাদের প্রভু হয়ে যদি তােমাদের
পা ধুইয়ে দিতে পারি, তবে তােমরা কি পরস্পরের প্রতি
সহানুভূতি দেখাতে পার না, পরস্পরকে সেবা করতে
পারবে না ?”
সেদিন শিষ্যেরা তাদের ক্রুটী খুব বেশী করে বুঝতে
পেরেছিলেন। এর পর নম্রতার শিক্ষা খৃষ্টকে আর কখনন
দিতে হয়নি।
খৃষ্টের দুঃখভােগ
ঋষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর মৃত্যু সন্নিকট; সেজন্য তিনি
তাঁর শিষ্যদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছিলেন, যেন তার
অবর্তমানে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে না পড়েন।
ফরিশীরা ও ইহুদী-সমাজের নেতারা খৃষ্টের অদ্ভুত
ক্ষমতা দেখে হিংসা করতে লাগল। সাধারণ লােকেরা
আর তাদের কথা শুনতে চায় না, খৃষ্টের কথা শুনবার
জন্য ব্যাকুল হয় ; এ দেখে তারা বড় ভয় পেল। সকলে
মিলে খৃষ্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে লাগল, কি করে

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তাকে বিপদে ফেলে তার জীবন শেষ করে দিতে পারে।
এই বিষয় নিয়ে তারা অনেক পরামর্শ করতে লাগল। তাদের
এক সুবিধাও এসে পড়ল। খৃষ্টের বারজন শিষ্যের মধ্যে
যিহুদা নামে একজন শিষ্য বড় দুৰ্বলমনা ছিলেন। ফরিশীরা
তার দুর্বলতার কথা জানতে পেরে তাকে টাকার লােভ
দেখিয়ে খৃষ্টকে ধরিয়ে দেবার কথা বল। যিহুদার টাকার
লােভ ছিল খুব বেশী, সে এই সুযােগ পেয়ে রাজী হল।
খৃষ্ট বৃহস্পতিবার রাতে শিষ্যদের নিয়ে জৈতুন
পর্বতের উপর গেৎশিমানি নামে এক জায়গায় উপস্থিত
হলেন। সেখানে এক বাগান ছিল, তিনি তাতে প্রবেশ
করলেন।
তার ইচ্ছা ছিল সারারাত তিনি প্রার্থনায় কাটাবেন।
কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর মৃত্যু আসন্নপ্রায়।
তিনি শিষ্যদের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে নিজে একাকী
বাগানের ভিতরে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ প্রার্থনা
করবার পরে ফিরে এসে দেখলেন, শিষ্যেরা সবাই ঘুমিয়ে
পড়েছেন।
তিনি বলেন, “তােমরা কি এটুকু সময়ও আমার সঙ্গে
জেগে থাকতে পার না? তােমরা সর্বদা প্রস্তুত থাকবে,
এই আমার একান্ত অনুরােধ ?”

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তারপর খৃষ্ট তাদের নিয়ে যেই বাগান থেকে বেরিয়ে
আসছেন এমন সময় দূরে দেখলেন, একদল সৈন্য হাতে
বর্শা ও মশাল নিয়ে তাদের দিকেই আসছে। আর তাদের
সকলের আগে যিহুদা। তিনিই তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে
আসছিলেন।
যিহুদা আগেই সৈন্যদের বলে রেখেছিলেন, তিনি
যাকে প্রণাম করে চুমাে খাবেন, তাঁকেই যেন তারা
বন্দী করে,—তিনিই খৃষ্ট।
যিহুদা সেই অনুসারে খৃষ্টের কাছে এসে তাঁকে
প্রণাম করে চুমাে খেতেই সৈন্যরা তাঁর সঙ্কেত বুঝে
নিলে। খৃষ্টও তার দৈব ক্ষমতাবলে আগেই সব জানতে
পেরেছিলেন। তিনি যিহুদাকে বলেন, “যিহুদা, শেষ
কালে চুমাে খেয়ে তুমি তােমার গুরুকে ধরিয়ে
দিলে ?”
যাহােক, তিনি সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেয়ে বললেন,
“তােমরা কাকে চাও ?”
সৈন্যরা বলে, “আমরা খৃষ্টকে চাই।”
তিনি বলেন, “আমিই সেই খৃষ্ট।”
তৎক্ষণাৎ সৈন্যরা তাকে বন্দী করে ফেল।
খৃষ্ট বললেন, “তােমরা বর্শা ও তরবারি নিয়ে কেন

প্রেমাতার যীশু
এসেছ? আমি কি তােমাদের মধ্যে সর্বদা ঘুরে বেড়াই
? তবে এত সব আয়ােজন কেন?”
খৃষ্টকে গ্রেপ্তার করায়, তাঁর শিষ্যরা বড়ই ক্রুদ্ধ
হলেন। পিত একটি সৈনিকের কান তরবারি দিয়ে
কেটে ফেলেন।
খৃষ্ট অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বললেন, “ছিঃ! একাজ
করলে কেন পিতর ? তুমি কি মনে কর যে, আমার
পিতা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলে তিনি আমাকে
এদের হাত থেকে রক্ষা করতেন না ?
আমি তাে সে সবই পারতাম পিতরু। কিন্তু আমি
যদি নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করি, তাহলে যে আমার
আদর্শ পরিপূর্ণ হয় না—ধর্মশাস্ত্র মিথ্যা হয়ে যায়।”
এই বলে তিনি সেই কানকাটা সৈনিকের ক্ষতস্থানে
নিজের পদ্মহস্ত বুলিয়ে দিলেন। আর তখনই তার কানটি
সম্পূর্ণ ভাল হয়ে গেল।
তারপর সৈন্যরা খৃষ্টকে ধরে নিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে
পাপীর কাছে ধর্মের এক বিচারের প্রহসন ঘনিয়ে এল।
১ পিতর
খৃষ্টের বারজন শিষ্যের মধ্যে পিতই ছিলেন সব
বিষয়ে অগ্রণী। খৃষ্টকে যখন ধরে নিয়ে গেল তখন

বেমাতার যীশু
অধিকাংশ শিঘই পালিয়ে গেল, কিন্তু পিতরু ও যােহন
একেবারে পালিয়ে গেলেন না, দূর থেকে সবকিছু দেখতে
লাগলেন।
সৈন্যরা খৃষ্টকে ধরে ইহুদীদের প্রধান যাজকের কাছে
নিয়ে গেল। যােহনের সঙ্গে প্রধান যাজকের জানালােনা
থাকায় তাঁর পক্ষে ঘরের মধ্যে যাওয়ার কিছুমাত্র অসুবিধা
হ’ল না। কিন্তু পিতর বাইরের উঠানেই দাঁড়িয়ে
রইলেন।
উঠানে তখন আগুন জ্বলছিল আর তার চারপাশে
অনেক লােক জমা হয়েছিল। সেখানে একজন স্ত্রীলােক
পিতরুকে দেখে বললে, “তুমিও কি খৃষ্টের শিষ্যদের
একজন নও?”
পিতর একজন শ্রেষ্ঠ শিষ্য হয়েও ভয়ে মুষড়ে
পড়লেন। তিনি বলেন, “না নারী, আমি ত তাঁকে
চিনি না।”
কিছু পরে আবার একজন লােক পিতকে বল,
“তুমিও তাদেরই একজন।”
পিতরু বলেন, “না, তুমি ভুল বছ—আমি নই।”
এর প্রায় এক ঘণ্টা পরে আর একজন লোেক পিতরুকে
দেখিয়ে বলল, “এ লােকটিও খৃষ্টের লােক।”

**
প্রেমাতার যীশু
পিতরু এবার কিছুই জানেন না এমন জণ করে
বলেন, “তুমি কি বলছ, আমি তা বুঝতে পারছি না।”
ঠিক এই সময় তিনি দেখলেন, খৃষ্ট উপরের বারান্দা
থেকে তারই দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
এ দৃশ্য দেখে তার মাথা হেঁট হয়ে গেল। অনুতাপে
তাঁর হৃদয় ভরে গেল। এর পর থেকে পিতৰু নিজ,
জীবনের ধারা বদলে ফেলেন এবং খৃষ্টের প্রকৃত সেবক
হয়ে উঠলেন।
রােমের সম্রাট নীরাের সময় যখন খৃষ্টের শিষ্যদের
উপর অকথ্য অত্যাচার হচ্ছিল, তিনিই তখন তাঁদের
আশা ও ভরসা জুগিয়েছেন। তারপর তাঁকেও অব্যাহতি
দেওয়া হয় নি। সম্রাট আঁকে ক্রুশে বিদ্ধ করবার আদেশ
দেন।
তাঁকে যখন ক্রুশে দিতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তিনি
তাদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন, “তােমরা আমাকে
আমার প্রভুর মত ক্রুশে দিও না; কারণ, তাঁর ও আমার
সঙ্গে অনেক তফাৎ। আমি তঁার যােগ্য নই। আমার
মাথা নীচের দিকে ও পা উপর দিকে করে দিও।”
তিনি হাসিমুখে নিজের প্রভুর জন্য জীবন উৎসর্গ
করে জগতের সামনে এক উল আদর্শ রেখে গেছেন।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট পাপীয়সীর পরিবর্তন খৃষ্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এই সংবাদে সমগ্র ইহুদী- সমাজে মহা সাড়া পড়ে গেল। যাজকগণ, ফরিশী-সম্প্রদায় ও অধিকাংশ সাধারণ ইহুদী—প্রায় সকলেই তার বিরােধী; সকলেই তাঁকে যেন এক অস্বাভাবিক বিষ-দৃষ্টিতে দেখেছিল। খৃষ্ট তাদের কাছে কোন অপরাধ না করেছেন? একদিন এক দুষ্টা স্ত্রীলােককে তাদের দেশীয় শাসন- বিধি অনুসারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। মহা- আড়ম্বরে সেই হতভাগিনীকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হ’ল। প্রান্তরের মাঝখানে তাকে শক্ত করে এক কাষ্ঠ- খণ্ডের সঙ্গে বন্ধন করা হ’ল, আর তার চতুর্দিকে ঘিরে দাড়াল অসংখ্য নর-নারী। তাদের প্রত্যেকের হাতেই একটি করে প্রস্তরখণ্ড। প্রস্তর নিয়ে উদ্যত হস্তে সকলেই প্রস্তুত-কেবল আদেশের প্রতীক্ষা। আদেশ পাওয়ামাত্র শত-শত প্রস্তর খণ্ড হতভাগিনীর মস্তকে বর্ষিত হবে, আর সঙ্গে সঙ্গে তার মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে ও তার রক্তাক্ত প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়বে ভূমিতলে।

প্রেমাবতার যীশু খৃষ্ট ইহুদী-সমাজে দুষ্টা নারীর এই ছিল শাস্তির বিধান। রােরুদ্যমানা হতভাগিনী তখনাে সা-নয়নে কাতর কণ্ঠে সকলের করুণা ভিক্ষা করছিল,—আর পুনঃপুনঃ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল যে, সে আর কখনাে অসৎ পথে গমন করবে না। কিন্তু কে শােনে তার সেই কাতর আবেদন ? দুষ্ট যে, পাপী যে,-সমাজ তাকে কখনই ক্ষমা করতে পারে শাস্তি তাকে পেতেই হবে। কাজেই তাকে শাস্তি দিবার জন্য সকলেই প্রস্তুত। এমনি সময়ে সমবেত জনসঙ্গে হঠাৎ এক চঞ্চলতা! সকলেই চেঁচিয়ে উঠল, “খৃষ্ট। খৃষ্ট!” করুণার প্রতিমূর্তি খৃষ্ট হতভাগিনীর কাতর ক্রন্দনে বিচলিত হয়ে সহসা যেন জীবন্ত দেবতার মত সেই বধ্য- ভূমিতে আবির্ভূত হলেন। তিনি এসেই জিজ্ঞাসা করলেন, “এই হতভাগিনী নারী, কোন অপরাধে অপরাধিনী ?” পদস্থ এক ব্যক্তি সম্মুখে এগিয়ে এসে বললেন, “ অতি অসচ্চরিত্র স্ত্রীলােক। কাজেই শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী একে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। আর সেই মৃত্যুর বিধান হচ্ছে, প্রস্তরাঘাতে মৃত্যু।”

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট “বটে! প্রস্তরাঘাতে মৃত্যু।” সৌম্য প্রশান্ত বদনে খৃষ্ট পুনরায় বলেন, “বেশ,। কিন্তু একটা কথা মনে রেখাে। পাপীকে সাজা দিচ্ছ তার পাপের জন্য। কাজেই শাস্তিদাতা হবে এমন লােক, যে জীবনে কোনদিন কখনাে কোন পাপ করে নি। তােমাদের মধ্যে যে নিস্পাপ, সে এগিয়ে এসে সামনে। এই দুষ্টা নারীকে প্রথম আঘাত করবার অধিকারী একমাত্র সেই নিস্পাপ ব্যক্তি। কাজেই কে আছ নিস্পাপ, . সে এগিয়ে এসাে; আর পাপী যারা, তারা পিছিয়ে যাও।” বিপুল জনসঙ্ েতখনই আবার এক চাঞ্চল্য! শত-শত উদ্যত হস্ত তখনই যেন কোন্ মন্ত্রবলে মুহূর্ত-মধ্যে শুয়ে গেল, আর তাদের প্রস্তরখণ্ডগুলি ঝরে পড়ল সশব্দে ভূমিতলে। তারপর সেই অসংখ্য নর-নারী—অপরাধীর মত নত- শিরে ধীরে-ধীরে কোথায় বিলীন হয়ে গেল। সুবিস্তৃত বধ্যভূমিতে পড়ে রইল শুধু সেই হতভাগিনী নারী, আর রইলেন মুৰ্ত্ত দেবতা—খৃষ্ট। তিনি তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “নারী। কে . তােমার শাস্তিদাতা?”

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত হতে অব্যাহতি লাভ করে রমণী
তখন আনন্দে উদ্বেলচোখে তার আনন্দের অশ্রু-হৃদয়ে
ভাবের আতিশয্য। সে অভিভূত ভাবে বলে, “কই,
কাউকেই ত’ দেখতে পাচ্ছি না।”
খৃষ্টের বদনে এবার সার্থক করুণার হাসি ফুটে উঠল।
তিনি বলেন, “যাও তবে নারী, তুমি এখন মুক্ত
স্বাধীন। কিন্তু ভবিষ্যতে আর কখনাে পাপের পথে পা
বাড়িয়াে না।”
খৃষ্টের করুণায় হতভাগিনীর জীবন রক্ষা হয়ে গেল।
সেও প্রতিজ্ঞা করলে, সে আর কখনাে কোন অপরাধ
করবে না—পবিত্র ভাবে জীবন কাটাবে।
খৃষ্টের করুণায় ও সুকৌশলে একটা জীবন বেঁচে গেল
এবং তা চিরদিনের জন্য পরিবর্তিত হয়ে গেল বটে, কিন্তু
সমগ্র ইহুদী-সমাজ, তথা ফরিশী-সম্প্রদায় ও যাজকগণ,
তঁাকে সেজন্য প্রীতি ও ক্ষমার চোখে দেখতে পারে নাই।
অপরাধিনী নারীর কাছে তাদের দস্তু, তাদের বিধান ও
কর্তৃত্ব যে অক্ষুন্ন রইল না, এই হ’ল তাদের সবচেয়ে বড়
ব্যথা ও প্রকাও অপমান। কাজেই খৃষ্টের গ্রেপ্তারে
তারা যে আনন্দ ও স্বস্তি অনুভব করবে, এতে আর
বিচিত্র কি ?

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা
দেব-মন্দিরের ব্যাপারেও খৃষ্টকে একবার হস্তক্ষেপ করতে
হয়েছিল।
ইহুদী জাতির দেব-মন্দির—সে যেন পুরােহিত ও
যাজক-সম্প্রদায়ের এক অতি-নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু
যীশুখৃষ্ট তা কোনদিনই স্বীকার করেন নি। নিজেকে
তিনি ঈশ্বরের নিকটতম আত্মীয়-পুত্র বলে ঘােষণা করে
গেছেন ; কাজেই ঈশ্বরের মন্দির, তাঁর পিতার গৃহ বলেই
তিনি অনুভব করেছেন।
খৃষ্ট তার তিরােধানের অল্প কিছুদিন পূর্বে একদিন
যিরুশালেমের স্বর্ণমন্দির পরিদর্শনে উপস্থিত হলেন।
তিনি লক্ষ্য করে দেখলেন,ঈশ্বরের পূজা-আরাধনায় যত না
ভীড়, তার চেয়ে বেশী ভীড় হচ্ছে প্রাঙ্গণের দোকানগুলিতে।
তিনি বিস্মিত হলেন এই ভেবে যে, “কি আশ্চৰ্য্য।
ঈশ্বরের পবিত্র গৃহ—যেখানে হবে শুধু তাঁর পূজা-
আরাধনা, তাঁর নাম-কীৰ্ত্তন-সেখানে কেমন করে
বাজার গড়ে উঠেছে। লােকজন এখানে এসে আর
ঈশ্বরের কথা—আমার পিতার কথা কেউ ভাবছে না
ভাবছে কেবল এই সব দোকানদারীর কথা, টাকা-পয়সা ও

খেমাতার যীশুখৃষ্ট লাভ-লােকসানের কথা। আর সবচেয়ে লজ্জার কথা হচ্ছে এই যে, বড়-বড় যাজকেরাও এই সব দোকানদারীতে জড়িত।” বিরক্তি ও ঘৃণায় তার সারা অন্তঃকরণ ভরপুর হয়ে গেল, এশঃ তার হৃদয়ে হ’ল দারুণ ক্রোধের সঞ্চার। মনে-মনে তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, “না, দেব- মন্দির—দেব-মন্দিরের মতই পবিত্র থাকবে। তার আশে- পাশে কোন লােভ—কোন পাপ—কোন টাকাকড়ির হাট-বাজার গড়ে উঠতে পারবে না। আমি তা কিছুতেই হ’তে দেব না।” তিনি তখনই প্রাঙ্গণে ছুটে গেলেন। তারপর মুহূর্ত মধ্যে যে প্রলয়-কাণ্ড সঙ্টিত হ’ল, তা যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনই দুঃসাহসিক। তিনি তৎক্ষণাৎ ক্রেতা ও বিক্রেতা—সকলকেই সমভাবে ধাক্কা দিয়ে মন্দির-প্রাঙ্গণ হ’তে বার করে দিতে লাগলেন। টাকা ভাঙ্গার পােদারদের টেবিল ও চেয়ার সশব্দে দূরে নিক্ষেপ করলেন; বলির নিমিত্ত যারা পশু ও পাখী বিক্রয় করতে ব্যস্ত ছিল, তিনি তাদের সমস্ত পশু- পাখী ছেড়ে দিলেন এবং প্রহার করে তাদের সকলকেই মন্দির প্রাঙ্গণ হতে বার করে দিলেন।

প্রেমাতার যীশু মন্দিরের যাজকগণ ছুটে এল খৃষ্টকে বাধা দিতে ; কিন্তু খৃষ্ট তখন ধৰ্ম্মবলে বলীয়ান, দেহে তার অসীম শক্তি। সাধ্য কি কেউ তখন তাকে বাধা দেয় ? তিনি প্রহার করতে-করতে সকল বাধা-বিঘ্ন এড়িয়ে, মন্দির-প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করে ফেলেন। তারপর সদর্পে বলেন, “শাস্ত্রে কি একথা লেখা নেই যে, ঈশ্বর বলেছেন, ‘আমার মন্দির সৰ্ব্বজাতির আরাধনার স্থান ?'—কিন্তু তােমরা তাকে চোর-ডাকাতের লীলাক্ষেত্র করে তুলেছ!” খৃষ্টের এই কটুক্তি, এই তীব্র কটাক্ষ কেউ সইতে পারলে না—কেউ তার সম্মুখে দাড়াতেও সাহস করলে । কাজেই দেখতে-দেখতে ঈশ্বরের মন্দির হতে সমস্ত আবর্জনা মুহূর্ত-মধ্যে দূর হয়ে গেল মন্দিরের কর্তৃপক্ষ আর প্রতিবাদ করতে সাহসী হ’ল না। সেদিন তারা সাহসী হয় নাই বটে, কিন্তু জীবনে কখনাে তারা সে অপমান ভুলতে পারেনি। লােভী যাজক- সম্প্রদায় সেদিন ধৰ্ম্মের এই শাসন নতমস্তকে মেনে নিলেও, তারা কোনদিনই তার বশ্যতা স্বীকার করে নাই। বরং তারা অপমানের তুষানলে দিনরাত পুড়ে মরছিল, আর গােপনে কেবলই সুযােগ খুজছিল,কবে ও কেমন করে তারা যীশুখৃষ্টের ধ্বংসসাধন করবে।

খেমাবতার যীশুখৃষ্ট
কাজেই খৃষ্ট গ্রেপ্তার হয়েছেন, একথা পােনামাত্র
তাদের হৃদয়ে যেন এক আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। তারা,
স্থির করলে, “এইবার—এইবারই তাঁর শেষ। এবার
আর খৃষ্টকে বাঁচতে দেওয়া হবে না।”
?
বিচার—প্রথম পর্ব
সৈন্যরা খৃষ্টকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে নিয়ে গেল আম্নস্
নামে এক পুরােহিতের কাছে। এক সময়ে তিনিই ছিলেন
প্রধান পুরােহিত বা মহাযাজক। কিন্তু তখন মহাযাজক
ছিলেন হাননের জামাতা কায়ফা।
হানন আগে হ’তেই খৃষ্টকে বিষ-নয়নে দেখেছিলেন।
তিনি একদিন জামাতাকে বলেছিলেন, “এই একটা মাত্র
লােকের জন্য ইহুদীদের অনিষ্ট হচ্ছে। যেমন করে থােক,
একে দূর করতেই হবে।”
সেই হানন এবার খৃষ্টকে হাতের মুঠোয় পেয়েছেন।
রাগে ও ঘৃণায় তার চক্ষু লাল হয়ে উঠল।
তিনি খৃষ্টকে কতকগুলি প্রশ্ন করলেন। খৃষ্ট তাঁর
পাম্ভীৰ্য্য ও শান্তভাব বজায় রেখে তার জবাব দিয়ে
গেলেন। কিন্তু হানন তাতে কিছুমাত্র খুশী হলেন না,
=

মােৰতায় শীত
তিনি খৃষ্টকে হাতে-পায়ে বেঁধে জামাতা কায়ফার কাছে
পুরােহিতদের বিচারসভায় পাঠিয়ে দিলেন।
পুরােহিতদের এই সভার নাম ছিল সেহেদ্রি।
সেহেদ্রিনের সকলেরই ইচ্ছা খৃষ্টকে অভিযুক্ত করা
হয় আর তার প্রাণদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু
বিচার ছাড়া কেমন করে তা সম্ভবপর হয় ? কাজেই
তখন শুরু হ’ল এক বিচারের প্রহসন।
বিচারের জন্য মিথ্যা সাক্ষীর অভাব হ’ল না। তাদের
কেউ বলে, খৃষ্ট বলেছেন যে, তিনি ইহুদীদের সমস্ত
ধৰ্ম্মমন্দির চুর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলবেন, তারপর তিন দিনের
মধ্যে তা নতুন করে গড়িয়ে দেবেন।
কিন্তু খৃষ্টের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে উঠে,
সাক্ষীরা নিজেদের মধ্যেই অনেক কিছু গুলিয়ে ফেলে,
তারা পরস্পরােধী অনেক কথা বলতে আরম্ভ করলে।
মহাযাজক য়ফা বড়ই বিপদে পড়লেন। তিনি
দেখলেন যে, এমন ধরণের সাক্ষী দিয়ে তাে সুবিধা কিছুই
হ’ল না। তিনি তখন খৃষ্টের নিজ মুখ থেকে তাদের
ধর্মভাব-বিরােধী কোন কথা বার করতে পারেন কিনা,
সেই চেষ্টায় তাকে প্রশ্ন করলেন, “তুমি নাকি নিজেকে
‘ঈশ্বরের সন্তান বলে দাবী করে থাকো?

খেমাবতার যীশুখৃষ্ট খৃষ্ট বলেন, “সে তাে দু’দিন পরেই প্রমাণিত হবে। স্বর্গের মেঘের উপর ঈশ্বর আর পাশে তার সন্তান- অচিরেই এ দৃশ্য সবাই দেখতে পাবে।” “বটে।” প্রধান যাজক কায়ফা রাগে আগুন হয়ে উঠলেন। ক্রোধে তিনি তার গায়ের পােষাক টানতে- টানতে চীৎকার করে উঠলেন, “বটে। তাহলে তাে আর কোন সাক্ষী-প্রমাণের কিছুমাত্র দরকার নেই। আপনারা সবাই শুনেছেন আসামী কি বলছে! নিজেকে ঈশ্বরের সন্তান বলে দাবী করতে কিছুমাত্র ইতস্ততঃ করছে না। ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসে আঘাত করবার পক্ষে এইটুকুই যথেষ্ট। আপনারা বলুন, কি এর উপযুক্ত শাস্তি ?” সমবেত কণ্ঠে সবাই চীৎকার করে জানিয়ে দিলে, “মৃত্যু,—প্রাণদণ্ডই এর একমাত্র শাস্তি। কায়ফার ইচ্ছা হচ্ছিল, তিনি খৃষ্টের প্রাণদণ্ড ঘােষণা করেন। কিন্তু তখনই মনে হ’ল নিজেদের অসহায় অবস্থার কথা। প্রাণদণ্ডের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কই ? রােমের শাসনাধীন ইহুদীস্থানে, প্যালেস্টাইনে—প্রাণদণ্ড দিবার একমাত্র অধিকারী নােম-সম্রাটের প্রতিনিধি পন্টিয়া পাইলেটু। তাঁর আদেশ ছাড়া সেখানে কারও

প্রেমাবতার শীখৃষ্ট
প্রাণদণ্ড হওয়া অসম্ভব। এত-বড় ইহুদী-মণ্ডলী
‘সেহেদ্রিন, কিন্তু রােম-সম্রাটের শাসন অমান্য করে,
তার এমন ক্ষমতা কই ?
মহাযাজক কায়ফা চিন্তিত হলেন, তিনি বড়ই বিপন্ন
বােধ করলেন।
যাহােক্, তখনই স্থির হ’লখৃষ্টকে পন্টিয়া
পাইলেটের দরবারেই হাজির করা হবে—তারপর যেমন
করেই হােক, তাঁর প্রাণদণ্ড মঞ্জুর করাতে হবেই ।
এইভাবে ধর্মধ্বজী ষড়যন্ত্রকারিগণ সারা জগতের
উদ্ধারকর্তা খৃষ্টকে পৃথিবী থেকে জন্মের মত বিদায় করবার
জন্য যে মহা ষড়যন্ত্রের উদ্যোগ-আয়ােজন করলেন, আজ
তা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কলঙ্ক ও নির্মম পাশবিকতা
বলে পরিচিত হয়ে আছে।
বিচার-দ্বিতীয় পর্ব
পন্টিয়া পাইলে তাঁর সিংহাসনে বসে আছেন, তাঁর
সম্মুখে বন্দীবেশে খৃষ্ট, আর গৰ্বস্ফীত যাজকগণ।
পাইলেই জিজ্ঞেস করলেন, “এর বিরুদ্ধে কি তােমাদের
অভিযােগ ?”
যাজকগণ এবার আগে হ’তেই সঙ্কল্প করে এসেছিল

*
প্রেমাতার যীশুখৃষ্ট
যে, খৃষ্টের বিরুদ্ধে এমন অভিযােগ আনতে হবে, যাতে
বিদেশী শাসক তাকে সাজা দিতে স্বতঃই উদ্বুদ্ধ হয়ে
ওঠেন! কেবল ধৰ্ম্মের কথা বললে তাে কিছু হবে না।
কারণ, খৃষ্ট ইহুদীদের ধৰ্ম্ম-বিরুদ্ধ কোন মত পােষণ
করেন, কি করেন না, তাই নিয়ে বিদেশী শাসক তাঁর
মাথা ঘামাবার কোন প্রয়ােজন বােধ করবেন না। তাই
তারা বলে, “ধর্মাবতার! এই আসামী আমাদের জাতটার
মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা-সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সে বলে যে,
সে নাকি ইহুদীদের রাজা; এই বলে সে রাম-সম্রাটের
প্রাপ্য কর-প্রদানে সবাইকে নিষেধ করে দিচ্ছে।”
পাইলেট্ খৃষ্টকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি নাকি
নিজকে রাজা বলে ঘােষণা করছ ?”
খৃষ্ট ধীরভাবে উত্তর দিলেন, “আমার রাজ্য এই
পৃথিবীর কিছু নয়, এখানে আমার কোন রাজ্য নাই।”
পাইলে তখন ইহুদী যাজকদিগকে সম্বােধন করে
বলেন, “কই, আমি তাে এর বিরুদ্ধে কোন অভিযোেগ
দেখতে পাচ্ছি না।”
যাজকের দল সমস্বরে চীৎকার করে বলে,
“ধর্মাবতার। এই বন্দী সবাইকে রাজদ্রোহে উত্তেজিত
করে তুলছে। সে গালিল হ’তে এই যিরূশালেম

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
পৰ্য্যন্ত—সব জায়গায় জনসাধারণকে ক্ষেপিয়ে তুলতে
চেষ্টা করছে।”
গালিলের নাম শুনে পাইলেটের একটা কথা মনে
হ’ল। তার মনে হ’ল গালিলের রাজা, হেরােদ তখন
যিরুশালেমেই অবস্থান করছেন। কাজেই তিনি নিজে
এর বিচার না করে, সমস্ত দায়িত্ব এর রাজার হাতে ছেড়ে
দিতে চাইলেন। তিনি তখন খৃষ্টকে রাজা হেরােদের
কাছে পাঠিয়ে দিলেন। মনেমনে ভাবলেন, “রাজা
হেয়ােদই এর বিচার করুন। ইচ্ছা হয় শাস্তি দিন,
নয় তাে ছেড়ে দিন। এ ব্যাপারে আমার হাত না
দেওয়াই ভালাে।”
খৃষ্ট সম্পর্কে অনেক অলৌকিক কথাই রাজা হেরােদ
শুনেছিলেন। সুতরাং এখন তাঁকে হাতে পেয়ে, তিনি
বিদ্রুপ ও রসিকতার ছলে অনেক কিছুই তাঁকে জিজ্ঞেস
করলেন। কিন্তু খৃষ্ট তার বিদ্রুপের স্পৃহা লক্ষ্য করে
তার প্রশ্নের কোন জবাবই দিলেন নানীরবে সব কিছু
সহ করলেন।
রাজা হেরােদ বড়ই অপমানিত বােধ করলেন।
খৃষ্টের উপেক্ষায় তিনি যারপরনাই ক্রুদ্ধও হলেন। তিনি
তখন খৃষ্টকে আরও বেশী ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, তাঁকে যেন

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
বােকা বানিয়ে তুললেন। তারপর তাকে একটা সাদা
পােষাকে সাজিয়ে, পুনরায় রাজপ্রতিনিধি পাইলেটের
কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
তিনি যে বিচারের ভান করে খৃষ্টকে কোন কঠিন
দণ্ডে দণ্ডিত করবেন, সেরূপ সাহসও তার হ’ল না।
ন্যায়ের সম্মুখে অন্যায় এমনই ভাবে নত হয়ে মাটিতে
লুটিয়ে পড়ে, জগতের এই এক চিরন্তন রীতি।
বিচার তৃতীয় পর্ব
খৃষ্টকে পুনরায় পাইলেটের দরবারে উপস্থিত করা হল।
পাইলেটের বুঝতে বাকি রইল না যে, ইহুদী যাজকেরা
কেবল হিংসার বশবর্তী হয়ে এর মৃত্যুদণ্ড কামনা করছে।
তিনি তাদের পরীক্ষা করবার জন্য বলেন,
“তােমাদের প্রচলিত রীতি অনুসারে আমি বন্দীদের যে
কোন একজনকে মুক্তি দিতে পারি। বন্দীদের একজন
এই খৃষ্ট, আর একজনের নাম বারাব্বা। সে একজন
খুনে আসামী। তােমরা বল, এদের মধ্যে আমি কাকে
মুক্ত করতে পারি, আর কার সাজা তােমরা চাও ?”
যাজকদল তখন হিংসায় উন্মত্ত, ঘৃণা-লজ্জা পৰ্য্যন্ত
তারা বিসর্জন দিয়ে বসেছে। তারা বলে, “বারাকাসূকে
প

প্রেমাতার যীশুখৃষ্ট
ছেড়ে দিন ; কিন্তু খৃষ্টকে ছাড়া হবে না, তাকে চরমদণ্ডে
দণ্ডিত করুন।”
এতক্ষণ তবু যেটুকু সন্দেহ ছিল, এইবার যাজকদের
এই কথায় তা পরিষ্কার হয়ে গেল। তিনি বুঝলেন,
যাজকের দল সত্যই খৃষ্টের মৃত্যু প্রার্থনা করছে। কিন্তু
খৃষ্টকে মৃত্যুদণ্ডের মত এতবড় একটা চরম দণ্ডে দণ্ডিত
করতে তবু তার ইচ্ছা হ’ল না।
তিনি বলেন, “আমি এর বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত
অভিযােগই শুনেছি। তবু মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করবার মত
কোন অপরাধ আমি এর খুঁজে পাচ্ছি না। কাজেই, আমি
একে বেশ কয়েক ঘা প্রহার দিয়ে বিদেয় করে দিচ্ছি।”
এই বলে তিনি সৈন্যদের ডেকে তাঁকে প্রহারের
আদেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ একদল সৈন্য এসে খৃষ্টকে
নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গেল। তারপর তাঁর উম্মুক্ত পৃষ্ঠে
নির্মম ভাবে প্রহার করতে লাগল।
সৈন্যরা তাঁর মাথায় কাঁটার মুকুট পরিয়ে দিল,
একজন এসে তার হাতে একটা শরগাছ গুজে দিয়ে বিদ্রুপ
করে বলে, “কিগাে, তুমি নাকি ‘ইহুদীদের রাজা
হয়েছ ? এইবার তার উপযুক্ত পােষাক পেলে। বাঃ,
বেশ দেখাচ্ছে তােমায়। মাথায় রাজমুকুট, হাতে ৰাজদণ্ড।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
এখন তবে প্রণাম করি রাজা-বাহাদুর।” এই বলে
বিদ্রুপের ভঙ্গীতে এগিয়ে এসে, আঁকে কুর্ণিশের ধরণে
অভিবাদন করলে। কোন কোন সৈন্য তাঁর চোখে-মুখে
থুথু দিয়ে চূড়ান্ত অপমানের দৃষ্টান্ত দেখাতেও ব্রুটী
করলে না।
খৃষ্ট নীরবে সমস্তই সহ করে গেলেন—যন্ত্রণার একটু
কাতর শব্দও তার মুখ থেকে বেরুল না ।
এইভাবে কিছুক্ষণ অকথ্য নির্মম অত্যাচারের পর
খৃষ্টের দেহের অবস্থা এমন হ’ল যে, তা দেখলে অতি-বড়
পাষণ্ডও বুঝি করুণায় গলে যায় !
পাইলেটু ভাবলেন, এইবার যদি আসামীকে ঐ
যাজকদের কাছে উপস্থিত করা যায়, তা হলে নিশ্চয়ই
কেউ আর এর মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করবে না। এই ভেবে
তিনি আদেশ দিলেন, “আসামীকে দরবার-ঘরের সামনে,
সিড়ির ওপর নিয়ে এসাে।”
বিচার শেষ পর্ব
রাজ-প্রতিনিধি পন্টিয়া পাইলেটের অনুমান খুব অসঙ্গত
না হলেও, তা যে প্রকাণ্ড ভুল, সেকথা একটু পরেই
প্রমাণ হয়ে গেল।

বেতার যীশুখৃষ্ট—শেষ নিঃশ [পূ৮

No text on this page.

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
খৃষ্টের সর্বশরীরে তখনও অজস্র রক্তধারা, সৰ্বাঙ্গ
ক্ষত-বিক্ষত। মাথায় তার কণ্টকের রাজমুকুট।
অত্যাচারের পেষণে সেই মুকুটের প্রত্যেকটি কাঁটা তাঁর
মাথার চামড়া ভেদ করে ভিতরে ব’সে গিয়েছিল। হাতে
তাঁর বিদ্রুপের রাজদণ্ড—সুদীর্ঘ শর! তখন তার পবিত্র
চোখে-মুখে অত্যাচারীর নিষ্ঠীবন-চিহ্ন ফুটে রয়েছে।
শত অত্যাচার ও লাঞ্ছনায় তাঁর ক্ষীণ দেহ এলিয়ে পড়েছে,
যেন চির-বিশ্রামের কামনায় তা’ উন্মুখ!
সৈন্যগণ তাঁকে নিয়ে এল দরবার-গৃহের সম্মুখে
বারান্দায়! পাইলেই তাকে দেখিয়ে সেই উত্তেজিত
জন-সমুদ্রকে সম্বােধন করে বলেন, “তােমরা দেখ,
কি এর অবস্থা হয়েছে, তা দেখ। আমি এর প্রাণদণ্ডের
কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।”
ধর্মান্ধ যাজক ও ইহুদীগণ তখনাে প্রতিহিংসায়
আত্মহারা ! খৃষ্টের সেই অবস্থাও তাদের মনে কিছুমাত্র
করুণার সঞ্চার করলে না। যাজকগণ চীৎকার করে
বলে, “না, না,-এর মুক্তি নেই। এ কখনাে মুক্তি পেতে
পারে না। একে হত্যা করুন, ক্রুশে বিধিয়ে হত্যা
করন। এ ধৰ্ম্মদ্রোহী—এ রাজদ্রোহী।
আপনি রাজ-প্রতিনিধি ; রােম-সম্রাটের শাসন অক্ষুন্ন
ক

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
থাকতেও এ লােকটা নিজেকে ‘ইহুদীদের রাজা বলে
ঘােষণা করে বেড়ায়। এর এই রাজদ্রোহিতার যদি
বিচার না করা হয়, তা হলে আপনার পক্ষেও সম্রাট
সিজারের প্রতি কর্তব্য-পালন করা হবে না। কাজেই
একে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করুন—একে ক্রুশে বিদ্ধ করুন।”
পাইলে এবার চিন্তিত হলেন। শুধু ধৰ্ম্ম-লঙ্গনের
অভিযােগ হ'লে, তিনি তা উপেক্ষা করতে পারতেন।
কিন্তু এ যে রাজদ্রোহের অভিযােগ। তিনি খৃষ্টকে তাঁর
স্বপক্ষে কিছু বলবার জন্য কত অনুরােধ করলেন। কিন্তু
খৃষ্ট তখন নিৰ্বা! তিনি যেন ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর মত
আত্ম-সমাহিত! একটি কথাও তিনি বলেন না।
ধৰ্ম্মান্ধ যাজকগণ আবার চীৎকার করে উঠল,
“আসামী রাজদ্রোহী। সম্রাট সিজারের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি
হিসাবে আপনি একে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করতে বাধ্য।
এ কখনাে মুক্তি পেতে পারে না, আপনি ক্রুশে বিদ্ধ
করবার হুকুম দিন।”
পাইলে পুনরায় চিন্তিত হলেন। তিনি স্পষ্টই
বুঝতে পেরেছিলেন যে, খৃষ্টকে এরা মারতেই চায়। তাই
এরা এর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযােগ চাপিয়ে দিচ্ছে।
এই অভিযােগ সত্ত্বেও পাইলে যদি আসামীকে মুক্তি দেন,

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট তাহলে হয়তাে রােমের রাজ-দরবার পর্যন্ত এদের আবেদন- নিবেদন চলবে। তার ফলে, সম্রাট হয়তত পণ্টিয়া পাইলেট্‌কে সন্দেহ করতে পারেন ; আর ভাল করে কিছু বুঝবার চেষ্টা না করেই তাকে সাজা দিয়ে বসবেন। কাজেই তিনি আর নিজের কাঁধে বিপদের ঝুঁকি রাখতে চাইলেন না—খৃষ্টকে দণ্ড দিতেই মনস্থ করলেন। কিন্তু তবু এমন একজন নির্দোষ লােককে নিজে সাজা দিতে ইতস্ততঃ করলেন। যাজকদের সম্বােধন করে তিনি বলেন, “বেশ, তবে তাই হােক। কিন্তু ধৰ্ম্ম সাক্ষী—এর রক্তপাতের দায়িত্ব আমার নিজের নয়, সে দায়িত্ব তােমাদের।” সমবেত জনসঙ্ চীৎকার করে উঠল, “হাঁ, হাঁ, সেজন্য আমরা দায়ী, আমাদের বংশধররা পৰ্য্যন্ত দায়ী।” পন্টিয়া পাইলে তখন খুনে আসামী বারাব্বাকে মুক্ত করে খৃষ্টকে সেই উন্মত্ত যাজকমণ্ডলীর হাতে ছেড়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ ক্ষুধার্ত হিংস্র নেকড়ের মত ধৰ্ম্মান্ধ ইহুদীরা, উৎপীড়িত ও ক্ষীণদেহ খৃষ্টের উপর একসঙ্গে লাফিয়ে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে অধর্মের কাছে ধর্মের আত্ম-বিসৰ্জন জগতে সূচিত হয়ে উঠল।

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট খৃষ্টের মৃত্যু সে সময় যারা নরহত্যা করত ভয়ানক মন্দ কাজ করত, তাদের ক্রুশে পেরেক দিয়ে হাত-পা গেঁথে টাঙিয়ে দেওয়া হত। খৃষ্টকে তারা সেই ভাবে দণ্ডিত করলে। তখনকার নিয়মে যাকে ক্রুশে দেওয়া হত, তাকেই ঐ ভারী কাঠের ক্রুশ কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যেতে হত। খৃষ্টকেও নিজের ক্রুশ বয়ে নিয়ে যেতে হ’ল। তাঁর পেছনে তাঁর শত্রুরা নানারকমের টিকারী দিতে দিতে চলল। নগরের উত্তর দিকে কার্লভেরী পাহাড়। সেই পাহাড়ে পোঁছে রােমীয় সৈনিকরা তাঁর হাত-পা পেরেক দিয়ে ক্রুশে গেঁথে তাঁকে টাঙ্গিয়ে দিলে। তাঁর রক্তাক্ত দেহ স্বর্গ ও মর্ত্যের সন্ধিস্থলে শূন্যপথে ক্রুশের উপর অবস্থান করতে লাগল। নির্মম অত্যাচারীর দল সেদিন তাঁকে সাধারণ সম্মান- টুকু পর্যন্ত দেয় নাই। দু’টি ঘৃণিত অপরাধী—চোরের সঙ্গে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে সেদিন তারা চরম অপমানের দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেছিল। তাদের একজনকে রাখা হ’ল তার বাঁ-দিকে, আর একজন ডান-দিকে। খৃষ্টকে তাদের মাঝখানের ক্রুশে -

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
বিদ্ধ করে জগতের কাছে তারা সেদিন তাঁকে ঘৃণা ও
উপহাসের পাত্র প্রমাণ করতে প্রয়াসী হয়েছিল।
খৃষ্ট অকথ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে-করতে প্রশান্ত বদনে
ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে বললেন, “হে পিতঃ ! যারা আজ
আমাকে ক্রুশে দিয়েছে, তাদের ক্ষমা করাে। কারণ, কি
যে এরা করছে তা এরা বুঝতে পারছে না।”
এই করুণ দৃশ্য দেখে অনেক সােক চোখের জল
রাখতে পারল না। স্ত্রীলোেকরা আর্তস্বরে চীৎকার করে
কাঁদতে লাগল।
খৃষ্টের জননীও সেখানে দাড়িয়ে ছিলেন। খৃষ্ট তাঁর
শিষ্য যােহনকে সেখানে দেখতে পেয়ে মাকে দেখিয়ে
বলেন, “ঐ দেখ তােমার মা।” আর শিষ্য যােহনকে
দেখিয়ে জননীকে সম্বােধন করে বলেন, “ঐ দেখ
তােমার পুত্র।”
এর কিছুক্ষণ পরে দস্যুদের একজন খৃষ্টকে ঠাট্টা
করে বলল, “তুমি ত’ অনেক আশ্চৰ্য কাজ করতে। এখন
নিজেকে ও আমাদের বাঁচাও না কেন!” এই বলে সে
তাকে নানারকম ঠাট্টা করতে লাগল।
কিন্তু অন্য দুটি তাকে ধমক দিয়ে বলল,“কেন তুমি
এই সাধু পুরুষকে এমন সব অনর্থক কথা বলছ? আমরা

প্রেমাবতার যীশু
ত’ নিজের দোষের জন্যই কষ্ট পাচ্ছি; কিন্তু ইনি ত’
কিছুই করেন নি, তবু এই শাস্তি পাচ্ছেন। তারপর সে
খৃষ্টকে বলল, “প্রভু, আপনি যখন স্বর্গে যাবেন, আমাকে
স্মরণ করবেন।”
খৃষ্ট বললেন, “তুমি আজই আমার সঙ্গে ঈশ্বরের
কাছে যাবে।” তখন তিনি ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে বললেন,
“হে পিতঃ, তােমার হাতেই আমাকে সমর্পণ করছি।”
তারপর সবই নীরব। কিন্তু সে কেবল কিছুক্ষণের
জন্য! সেই মুহূর্তে ভয়ানক ভূমিকম্প হ’ল, আকাশ
অন্ধকার হয়ে গেল, পৃথিবী এক অদ্ভুত ভাব ধারণ করল।
সকলে এই সব অদ্ভুত ঘটনা দেখে ভীত হ’ল, তাদের
কেউ-বা বল, “সত্যিই ইনি ঈশ্বরের অবতার ছিলেন।
তা’ নইলে কি এমন একটা ঘটনা হয় ?
উৎপীড়িত ধর্ম তার নিজের বুকে অধৰ্ম্মের লাঞ্ছনা সহ
করে গেলেও, জগতের যিনি পিতা, তিনি তা সহ্য করেন
না কোনদিন। তাঁর ক্রোধ ও বিরক্তি সর্বত্রই ফুটে ওঠে।
মৃত্যুঞ্জয়ী খৃষ্ট
শুক্রবার দিন খৃষ্টের মৃত্যু হয়। মৃত্যু হবার পর তাঁর
কয়েকজন ভক্ত নােমীয় শাসনকর্তা পাইলেটের অনুমতি

প্রেমাতার যীশুখৃষ্ট
নিয়ে ক্রুশ থেকে খৃষ্টের মৃতদেহ নামিয়ে নিলেন, আর
কাছেই এক বাগানে সমাহিত করলেন। তখনকার দিনে
পাহাড়ের গর্তে মৃতদেহ রাখা হ’ত ও তার ওপর একটি
পাথর ঢাকা দেওয়া হত।
ইহুদী নেতারা এই মহাপুরুষকে অন্যায় ভাবে হত্যা
করেও ভয়ের হাত হতে নিস্তার পায়নি। তারা রােমীয়
শাসকের কাছে গিয়ে বল্ল, “এ লােকটি যখন জীবিত
ছিল তখন বলেছিল, সে তৃতীয় দিনে সমাধি থেকে উঠবে।
অতএব আপনি প্রহরী দিয়ে এই সমাধি রক্ষা করুন যাতে
তার শিষ্যরা সমাধি থেকে মৃতদেহ চুরি করে নিয়ে যেতে
পারে, বা মিথ্যা কথা রটনা করে দিতে না পারে
যে, মৃত্যুর পরেও খৃষ্ট পুনরুত্থান করেছেন।”
তাদের ইচ্ছামত প্রহরীর বন্দোবস্ত তখনই মঞ্জুর
হয়ে গেল।
তৃতীয় দিন ভােরবেলা সহসা এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প।
সেই ভূমিকম্পে সমস্ত ঘরবাড়ী থরথর করে কেঁপে উঠল ।
আর সেই মুহূর্তে সমাধিস্থলে হ’ল এক অপূর্ব কাণ্ড।
খৃষ্টের কবরের ওপরে যে পাথরখানা ছিল, তা সরে
গেল,—আর ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন খৃষ্ট। কিন্তু
এখন আর তাঁর সেই আগেকার চেহারা নাই। তার
1

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট উৎপীড়িত অবসন্ন মুখমণ্ডল এক অপূর্ব দীপ্তিতে উদ্ভাসিত, তঁার সারাদেহে তখন যেন আলােকের বিচ্ছুরণ ! তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে-সঙ্গে আকাশ থেকে নেমে এল এক দেবদূত! মনে হল, সে-ও যেন এক আলাে-কণা । মাত্র দু'দিন আগে যাঁকে কবর-মধ্যে সমাহিত করা হয়েছে, তাঁর এই আবির্ভাবে সমাধি-রক্ষক নােমীয় সৈন্যগুলাে ত’ ভয়ে ও বিস্ময়ে স্তব্ধ। তারা একবার, দু’বার তার দিকে তাকাতে চেষ্টা করেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। যা হােক জ্ঞান যখন হ’লতখন তারা দেখে সেই দৃশ্য। তারা দেখলে খৃষ্ট শান্ত নির্বিকার ভাবে কবরের পাথরখানার ওপর বসে আছেন। প্রহরী সৈন্যরা আর মুহূৰ্ত্তমাত্র দেরী করল না, তারা তৎক্ষণাৎ সহরের দিকে ছুটে গেল, তারপর এক নিঃশ্বাসে এই অদ্ভুত খবর সবাইকে বলে বেড়াতে লাগল। খৃষ্ট যে সেদিন পুনরুত্থান করবেন, একথা তাঁর শিষ্যেরা প্রায় সকলেই ভুলে গিয়েছিল; কিন্তু মরিয়ম নামে র এক শিষ্যা তা মনে রেখেছিলেন। কাজেই তিনিও ঠিক সেই তৃতীয় দিন, অর্থাৎ রবিবার ভাের- বেলা খৃষ্টের সমাধিস্থলের উদ্দেশে বাড়ী থেকে বেরিয়ে-

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
ছিলেন। কিন্তু খৃষ্টের সমাধির কাছে উপস্থিত হয়ে
দেখলেন, সমাধির মুখের পাথর কে সরিয়ে ফেলেছে—আর
তা একেবারেই খালি।
তিনি তখনই ছুটে গিয়ে অন্য সকল শিষ্যকে খবর
দিলেন যে, কেউ প্রভুর মৃতদেহ সরিয়ে ফেলেছে! কারণ,
তার ধারণা হয়েছিল যে, প্রভুর শত্রুরাই একাজ করেছে।
মরিয়মের এ কথা শুনে পিতর ও যােহন দৌড়ে
সমাধির কাছে এলেন। তারা দেখলেন, সমাধি একেবারে
শূন্য, তার ভিতর শুধু কাপড়-চোপড় পড়ে আছে। তাঁরা
নিরাশ হয়ে বাড়ী ফিরে এলেন। মরিয়ম্ কিন্তু সমাধির
পাশে বসেই কঁদতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ
তিনি দেখতে পেলেন দু’জন স্বর্গদূত তার সামনে।
তারা বলেন, “তুমি কাঁদছ কেন?”
তিনি বললেন, “লােকেরা আমার প্রভুকে এখান
থেকে নিয়ে গেছে, কোথায় রেখেছে জানি না।
এই সময়ে পিছনের দিকে তাকিয়েই মরিয়ম খৃষ্টকে
দেখতে পেলেন, কিন্তু তাকে চিনতে পারলেন না।
খৃষ্ট জিজ্ঞাসা করলেন, “নারী, তুমি কার খোঁজ
করছ ?”
মরিয়মূ তাকে সেই বাগানের মালী ভেবে বললেন,

বেমাবতার যীশুখৃষ্ট
“তুমি কি আমার প্রভুকে দেখেছ ? তুমি কি তাঁকে
লুকিয়ে রেখেছ ?”
খৃষ্ট উত্তরে শুধু গম্ভীর ভাবে তাকে ডাকলেন,
বললেন, “মরিয়ম্।”
শুধু এই একটি কথাতেই তিনি তার প্রভুকে চিনতে
পারলেন আর তার পায়ের কাছে আত্মহারা হয়ে মাটিতে
লুটিয়ে পড়লেন।
তারপর জ্ঞান হ'লে মরিয়ম্ ছুটে যেয়ে এই আনন্দের
খবর সকল শিষ্যদের জানিয়ে দিলেন।
পুনরুথান ও স্বারােহণ
খৃষ্ট মৃতদের মধ্য হ'তে উঠেছেন, এ বার্তায় প্রত্যেক
শিষ্যের মনে অভূতপূৰ্ব আনন্দের সঞ্চার হ’ল। খৃষ্টকে
হারিয়ে তারা সকলেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
এখন এই অভূতপূর্ব ঘটনায় তাদের মনে আবার আশা
ও উৎসাহের সঞ্চার হ’ল।
একদিন শিষ্যেরা এক ঘরের মধ্যে একত্র হয়েছেন
এমন সময়ে হঠাৎ খৃষ্ট তাদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে বললেন,
“তােমাদের মধ্যে শান্তি থােক।”
সকল শিষ্য তাঁর দর্শনে আনন্দে আত্মহারা হলেন,

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
তাদের যেন নূতন জীবন লাভ হ’ল। এইভাবে খৃষ্ট তার
মৃত্যুর পর চল্লিশ দিন যাবৎ এ জগতেই ছিলেন ও মাঝে-
মাঝে শিষ্যদের দেখা দিয়েছেন। এইবার তারা সকলেই
বুঝতে পারলেন, খৃষ্ট মৃত্যুকে জয় করে উঠেছেন।
যিরুশালেমের কাছে ছিল জৈতুন পাহাড়। তিনি
একদিন সকল শিষ্যকে সেখানে একত্র হতে বলেন।
কারণ, তাঁর বারজন শিষ্য ছাড়া আরাে অনেক শিষ্য
ছিলেন যারা কোনদিন তাঁর দর্শন পাননি।
এখানে প্রায় পাঁচশত লােক একত্র হয়েছিল।
সকলকে তিনি তাঁর মধুর বচনের দ্বারা আশ্বাস দিলেন
আর বলেন, “আমার অবর্তমানে তােমরা নিরুৎসাহ
হয়াে না; আমার আদেশগুলাে পালন করাে, আমি
যুগের শেষ পর্যন্ত তােমাদের সকলের সঙ্গে-সঙ্গেই
থা।”
দিলেন।
শেষবার তিনি তার সমস্ত শিষ্যকে বৈথনিয়াতে দেখা
এখানে আবার তিনি তার সকল শিষ্যকে
প্রেমের বাণী শােনালেন ও তদনুসারে কাজ করতে আদেশ
করলেন। এর পর তিনি হাত তুলে সকলকে আশীৰ্বাদ
করতে-করতে স্বর্গে চলে গেলেন।
শিষ্যগণ সকলে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন, আর ঠিক

প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট
সেই সময় একখণ্ড মেঘ এসে তাঁকে আড়াল করে যে,
আর তাঁকে দেখা গেল না।
শিষ্যরা ব্যাকুল হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে রয়েছেন,
এমন সময় স্বর্গদূত তাদের সামনে দেখা দিয়ে বললেন,
“আর কেন ? তােমরা আর কেন স্বর্গের দিকে তাকিয়ে
আছ? তােমরা নিরুৎসাহ হয় না, এখন হ’তে পৃথিবীতে
থেকে তাঁর আদেশমত কাজ করে যাও।”
একথা শুনে তারা আশ্বস্ত হয়ে নিজ-নিজ স্থানে ফিরে
গেলেন।
খৃষ্ট তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনাকে
পরের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছেন। অমানুষিক অত্যাচারের
মধ্যেও তিনি অটল ধৈৰ্য্য দেখিয়ে গেছেন। জীবনে যা’
কিছু মহৎ শিক্ষা, তাই তিনি নিজের জীবনে ও কার্যে
প্রকাশ করে গেছেন। এইভাবে পৃথিবীর কাজ শেষ করে
অবশেষে পাপীদের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ
করেছেন।
তার অপূর্ব আশ্বাস-বাণী -প্রায় দু’হাজার বছর পরে
আজও প্রত্যেক নর-নারীর হৃদয়ে সান্ত্বনার অমৃতধারা
ঢেলে দিচ্ছে।
শেষ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Premabatar Jishu Khrista

Author
Nandi, Prafulla Nalini
Title
Premabatar Jishu Khrista
File name
Premabatar Jishu Khrista
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/08/28
Publisher
Deb Sahitya Kutir, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
112
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Biography
Keywords
Jesus Christ
DLI number
511284
Barcode
4990010018446.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
AbGOZ2RHEVa
Download PDF

Premabatar Jishu Khrista