Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Ramayan-juger Bharat

Mitra,surendranath · 2010/04/21

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রামায়ণমুগে ভারত।
“ঐতিহাসিক চিত্র” ভূতপূৰ্ব্ব সহকারী সম্পাদক
শ্রীসুরেন্দ্রনাথ মিত্র-প্রণীত।
২২
ASSOCIA
ENSAS
YOUNG
=
মুবক সমিতিবৈদ্য
(হুগ)
বৈদ্যবাটী যুবক সমিতির সম্পাদক
শ্ৰীযুক্ত নির্মল চন্দ্র ঘােষ বি, এল, কর্তৃক
প্রকাশিত।

প্রিন্টার--ঐআশুতােষ বন্দ্যোপাধ্যায়
মেটকাফ প্রিন্টিং ওয়ার্কস্,
৩৪নং মেছুয়াবাজার স্ট্রীট,কলিকাতা।

নিবেদন প্রায় দুই বৎসর পূৰ্ব্বে, রামায়ণ সম্বন্ধে কতিপয় প্রবন্ধ লিখিয়া, নানা মাসিক পত্রিকায় প্রকাশ করি। সেইগুলি স্থানে স্থানে পরিবর্তন করিয়া, পুস্তকাকারে প্রকাশ করিলাম। রামায়ণ সম্বন্ধে ইংরাজ ঐতিহাসিকগণ নানা কথা বলিয়া থাকেন, যাহারা ইতিহাস বিশেষ আলােচনা করেন না এবং যাহারা ইংরাজি সাহিত্যের সহিত বিশেষ পরিচিত নন, যাহাতে তাহারা সেই মতগুলির একত্র সমাবেশ দেখিতে পান, সেই উদ্দেশ্যে এই পুস্তিকা রচিত। ইহাতে কোন নূতন কথা বলিবার চেষ্টা করি নাই, কেননা সে ক্ষমতা আমার নাই। এই গ্রন্থ রচনা করিবার কালে আমি আমার বহু বন্ধুর নিকট যথেষ্ট সাহায্য পাইয়াছি। এই অবসরে আমি তাঁহাদিগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানা- ইতেছি। ইহা মুদ্রিত ও প্রকাশ করিবার পক্ষে আমার কবি বন্ধু শ্ৰীযুক্ত কিশােরী মােহন ঘােষাল বি-এল ও প্রযুক্ত হরিদাস গঙ্গোপাধ্যায় যথেষ্ট উৎসাহ দিয়াছেন, এমন কি—তাহারা পুস্তকের বহু স্থানের প্রুফ দেখিয়া, আমাকে অসীম কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ করিয়াছেন। পরিশেষে যুবক সমিতির সম্পাদক শ্রীযুক্ত নির্মল চন্দ্র ঘােষ বি-এল সভ্যগণের অনুমতিক্রমে সমিতির ব্যয়ে গ্রন্থ মুদ্রিত করায়, গ্রন্থের সমুদায় সত্ত্ব সমিতিকে দান করিলাম। বহু ভাষাবিদ শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক শ্ৰীযুক্ত অমূল্য চরণ ঘােষ বিদ্যাভূষণ গ্রন্থের ভূমিকা লিখিয়া দিয়া গ্রন্থের গৌরব বৃদ্ধি করিয়াছেন। মাদৃশ অকৃতী সাহিত্যিকের প্রতি এবম্বিধ ব্যবহার উদারতার পরিচায়ক। তাঁহার এই ঋণ শােধ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। বৈদ্যবাটী যুবক সমিতি। বিনীত গ্রন্থকার ১লা ফান ১৩১৯।

No text on this page.

রামায়ণযুগের রামায়ণের রচনাকাল। আমরা বাল্যকাল হইতে শুনিয়া আসিতেছিলাম যে, রামায়ণ আমাদের দেশের আদিকাব্য। আদি কবি বাল্মীকি ইহার প্রণেতা। ত্রেতাযুগে নররূপী নারায়ণের সহিত অসভ্য রক্ষগণের যে সংগ্রাম হয়, তাহাই প্রধানতঃ অবলম্বন করিয়া এই মহাকাব্য রচিত। তারপর একদিন ইংরাজ গুরুমহাশয়ের নিকট শুনিলাম যে, রাম নামে কোন নৃপতি যে অযযাধ্যার সিংহাসন অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন, সে বিষয়ের প্রমাণাভাব। রাম-লক্ষ্মণ প্রভৃতি চরিত্রসমূহ কবির কপােল-প্রসূত। আৰ্য্যের সহিত অনাৰ্য্য সংঘর্ষ অবলম্বন করিয়া, আৰ্য-সভ্যতাবিস্তারের কাহিনী ইহাতে গল্পের ছলে বিবৃত হইয়াছে। ইহা ব্যতীত আখ্যানমালার প্রতিপাদ্য বিষয় আর কিছু থাকিতেই পারে না। * ইহা হইতে তৎকালীন সমাজ সম্বন্ধে দুই একটা ঐতিহাসিক প্রশ্নের সমাধান হওয়া সম্ভবপর। এই হিসাবে ইহার যা কিছু মুল্য।১ বগীয় রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয়েরও এই মত। তাহার “Ancient India” নামক গ্রন্থ দ্রষ্টব্য। তিনি স্পষ্টই বলিয়াছেন—The Ramayan, then like the Mahabharata, is utterly valueless as a narrative of historical events and incidents. Às' in the Mahabharata, so in the Ramayan, the heroes are myths, pure and simple.-P. 147-148. ১। Ancient India ইব্য।

२ রামায়ণ-যুগের ভারত। আমরা এই কথা মুখস্থ করিয়া দুস্তর পরীক্ষা-সিন্ধু অবাধে উত্তীর্ণ হইয়াছি। তখন রামায়ণ সম্বন্ধে ইহাই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলিয়া জানিতাম। কিন্তু ঐতিহাসিক পাঠকমাত্রেই অবগত আছেন যে, রামায়ণ সম্বন্ধীয় কোন প্রশ্নেরই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আজও হয় নাই। য়ুরােপীয় বহু কৃতবিদ্য ব্যক্তি এবং বঙ্গ-গৌরব রাজেন্দ্রলাল ও রমেশচন্দ্র স্বীকার করিয়াছেন যে, রামায়ণ-ঘটিত প্রশ্নের মীমাংসা করা সহজ নহে। অন্য পরে কা কথা। নানা ব্যক্তি ইহার নানারূপ অর্থ করিয়া ইহার রচনাকাল নির্ধারণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন ; কাহারও সহিত কাহারও মিল নাই। আমরা সংক্ষেপে কয়েকটী মত উদ্ধত করিতেছি। Mrs. Manning বলেন যে, রামায়ণ আৰ্য-সভ্যতা-বিস্তারের ঐতি হাসিক কাহিনী। দাক্ষিণাত্যে আৰ্য্য-সভ্যতা রামায়ণের কাল হইতেই বদ্ধমূল হয়। অনাৰ্যরাজ রাবণের ভ্রাতা বিভীষণকে ব্রাহ্মণ্যধর্মে দীক্ষিত করিয়া, রামচন্দ্র মালবারের সন্নিহিত ভূখণ্ডে আৰ্য-সভ্যতা স্থাপন করেন। তিনি রাম-চরিত্রকে কাল্পনিক বলিয়া মনে করেন না। কিন্তু তাহার এই মত সৰ্ববাদিসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় নাই। যে সকল য়ুরােপীয় পণ্ডিত রামায়ণকে কাল্পনিক বলিয়া মনে করেন, বৌদ্ধশাস্ত্রবিৎ বিখ্যাত পণ্ডিত রিস্ ডেভিডস তন্মধ্যে অন্যতম। তিনি বলেন,-বেদের দেবতাগণ যেরূপ কল্পিত, সেইরূপ রামায়ণের চরিত্রগুলিও কবির * This story most probably refers to a real expedition through the Peninsula of India and to real victories in the South. * We already observed on the occasion of Agasty's making his way to the South of the Vindya Hills, that Brahmanical colonization then began, and the goodness of Vibhishana, who was brother to the bad Ravan, all may have been one of its results.--Ancient land Mediæval India Vol II. P 25.

রামায়ণের রচনাকাল। ; মনঃকল্পিত-বাস্তব জগতে তাহাদিগের কোন অস্তিত্ব নাই। বেদে যেরূপ কৃষির উন্নতির জন্য নানা দেবতার কল্পনা করা হইয়াছে, রামায়ণে বর্ণিত কাহিনীও সেইরূপ কৃষিবিষয়ক উন্নতির রূপক ব্যাখ্যা মাত্র। * বেব, জেকোবী, হন্টার প্রমুখ বহু পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ এই মতেরই পক্ষপাতী। ইহাদিগেরই মত হণ্টার সাহেব স্বীয় গ্রন্থমধ্যে নিবদ্ধ করিয়াছেন; তাহার ভাবার্থ এই --রামায়ণ গ্রন্থখানি দাক্ষিণাত্যে আৰ্য-সভ্যতা ও কৃষিজ্ঞান বিস্তার বিষয়ক একটী রূপকথা ( allegory) মাত্র। সীতা কোন বাস্তব চরিত্র নয় ; ইহা ভূমিকৰ্ষণােপযােগী লাঙ্গলের ফলাখানা। অনাৰ্য্যগণই রাক্ষসরূপে বর্ণিত হইয়াছে। রাক্ষসগণ কর্তৃক সীতা অপহরণের অর্থ আৰ্য-সভ্যতাদ্বেষী অনাৰ্য্যগণ কর্তৃক আৰ্যসভ্যতা বিষয়ক কৃষিজ্ঞানের উপর নির্যাতন। রাম (বলরাম) ইহাদিগের হস্ত হইতে কৃষি রক্ষা করেন, ইহাই রায়ণের উদ্দেশ্য। We must accept Professor Jacobi's happy suggestion as to the Mithological basis of the latter part of the Ramayan. Voliniki, m trinsplanting the ancient myth of the atmospheric battles from the heaven to the carth, in turning the deities of ancient poetry into human heroes, in raising up to the level of those heroes the local deitics of agriculture, naturally chose as the district he localises -o revolutionary a story, a land, Litni ha with all the charm of mystery.-Budhist India. Footnote P. 3:32 ১। অনায্যগণ সমাজ মানিত না। তাহারা বনে জঙ্গলে বিচরণ করিত ; সমাজ ও সভ্যতার মূল কৃষির উ" অত্যাচার করিয়া, আৰ্যসভ্যতার প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করতে তাহারা কখন সঙ্কুচিত হইত না, এই ঐতিহাসিক তথ্যের উপর নির্ভর করাতে এই মত প্রচারিত হইয়াছে। হল্টার সাহেবের কথা এই -The heroine of the Ramar yan. Sita, literally the field furrow * *. She represented the Aryan husbandry and has to be defended against the raids of the aborigines by the hero, Rama * *. From this abstract point of view, the Rainayan exhibits the progress of the Aryan plough. husbandry. Hunter's History. Indian Antiquary 28 Weber, এবং Pickford ঠিক এই কথাই বলিয়াছেন।

রামায়ণ-যুগের ভারত। আমাদিগের দুরদৃষ্ট যে আমাদিগকে ইহা বিশ্বাস করিতে হয়, এবং ইহার প্রতিকূলে প্রমাণ থাকিতেও পারে, ইহা একবার না ভাবিয়া, আমরা এই মতকেই চূড়ান্ত বলিয়া মানিয়া লই; এবং দেশের ঐতিহাসিকগণ বিজ্ঞাপনের ঢক্কায় এই “সত্য” (?) প্রচার করেন! ১ ইহা কি কম বিড়ম্বনার কথা ? ইহার উপর আবার জাৰ্মাণ পণ্ডিত বেবার প্রমাণ করিতে চান যে, রামায়ণ হােমার কৃত গ্রীক কাব্যের অনুবাদ ! তিনি, অন্যত্র প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, বৌদ্ধদিগের দশরথ জাতকের মূল উপাখ্যান লইয়াই রামায়ণের উপাখ্যানাংশ পরিপুষ্ট হইয়াছে। এই সঙ্গে আর এক ব্যক্তির মত উদ্ধত করিয়া, আমাদিগের বক্তব্য লিপি- বদ্ধ করিব। রেভারেণ্ড কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম অনেকেই নিয়াছেন। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় পাণ্ডিত্যে কোন য়ুরােপীয় পণ্ডিত অপেক্ষা কোন অংশে নূন ছিলেন না। সুতরাং তাহার মত এ স্থলে উদ্ধৃত করা প্রয়ােজন মনে করিতেছি। তাহার মত সংক্ষেপতঃ এই -- রাবণ বাইবেলে বর্ণিত “The Evil One*। পাপ সমুলে দমন করিবার অল্প মৰ্ত্তরাজ্যে ঈশ্বরের আবির্ভাবের যে কথা বাইবেলে দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাকে অবলম্বন করিয়া, ও সেই অবতারের হস্তে পাপের ধ্বংস দেখাইবার জন্য রামায়ণ রচিত হইয়াছে। সুতরাং রামায়ণকে খৃষ্টধৰ্ম্মের অভিব্যক্তিরূপক ব্যাখ্যা বলা যাইতে পারে। ১। শ্রদ্ধেয় রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয়ও এই মত পোষণ করিতেন। তাহার Ancient India গ্রন্থ দ্রষ্টব্য। 1 Weber's Sanskrit Literature * We have now to declare ii concluding this Chapter that to the Mosaic narrative of the fall must be attributed the great idea with which the incarnation of Rama was fraught; it was necess ry for a divine person to be made flesh and to assume human nature in order to encompass the destruction of the Devil and His works,- The Aryan Witness P. 153.

রামায়ণের রচনাকাল। এইবার উপরি উদ্ধত মতগুলির আলােচনা করা যাউক। যাহার রামায়ণের উপাখ্যানভাগকে বৌদ্ধ জাতক হইতে গৃহীত বলিয়া মনে করেন, অগ্রে তাহাদিগের কথাই বলিতেছি। জাৰ্ম্মাণ অধ্যাপক বেবারই এই মত পােষণের পক্ষে অগ্রণী। দশরথ জাতকের সহিত রামায়ণের স্থলবিশেষে সাদৃশ্য লক্ষ্য করিয়াই তিনি এই মত প্রচার করিয়াছেন। ইহার বিরুদ্ধে যে কোন যুক্তি থাকিতে পারে, তাহা তিনি স্বীকারই করেন । ইহার উত্তরে, আমাদের বক্তব্য এই যে, দুইখানি পুস্তকের মধ্যে সাদৃশ্য দেখিয়াই বলা চলে না দশরথ জাতক রামায়ণের পূৰ্ব্ববৰ্ত্তী। কোন অনুমানের উপর নির্ভর করিয়া,এত বড় একটা যুক্তি প্রতিষ্ঠা করিতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। এতদ্ভিন্ন রামায়ণকে বৌদ্ধযুগের পূর্ববর্তী বলিয়া বিশ্বাস করিবার পক্ষে যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে বলিয়াই মনে হয়। রামায়ণ- যুগৈর সভ্যতা, সমাজ ও জনপদসমূহের আলােচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, রামায়ণের রচনাকালে বৌদ্ধযুগ ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত ছিল। নতুবা আমরা রামায়ণের কোন স্থলে না কোন স্থলে বৌদ্ধ জনপদসমূহের উল্লেখ দেখিতে পাইতাম। যে সমুদায় প্রসিদ্ধ জনপদ বৌদ্ধধর্মের আবি- ভাবে সৃষ্ট হইয়াছিল, রামায়ণযুগে তাহাদিগের অস্তিত্ব থাকিলে, মহাকবি জনপদপ্রসঙ্গে নিশ্চয়ই তাহাদিগের উল্লেখ করিতেন। ১ আমরা “রামা মণের সভ্যতা”শীর্ষক অধ্যায়ে স্পষ্টই দেখাইব যে, রামায়ণী সভ্যতা বৌদ্ধ > 1 Pataliputra, the Capital of Magadh was founded about 380 B.C. is not mentioned in the Ramayana although other cities such as Kausambi and Kanyakubja are referred to in it. The name of the Capital of Kosala is invariably given in the Ramayan as Ajodhya which in Budhist time was designated as Saketa, Mithila and Visali are two separate cities while in Budha's lima, they hid colesced into one -Sirdar Mudhao Rao V. Kebb Saheb M.A. (See Modern Review for 1910).

রামায়ণ-যুগের ভারত। 1 সুগ-প্রসূতা সভ্যতা অপেক্ষা প্রাচীনতর ; কেন না বিবাহাদি ব্যাপারে তাহা তখনও অনেক স্থলে আদিম অবস্থাপন্ন ছিল। এতদ্ব্যতীত রামায়ণে বৌদ্ধধর্মের প্রকৃতি ও সভাতগত সাদৃশ্যের একান্তই অভাব, এ কথা যে কোন নিরপেক্ষ ঐতিহাসিককে স্বীকার করিতেই হইবে। * এতদ্ব্যতীত আর একদল লােক বিশ্বাস করেন যে, হিন্দুগণ গ্রীক- দিগের নিকট হইতে হােমারের গ্রন্থের আখ্যানভাগ গ্রহণ করিয়া রামায়ণ রচনা করিয়াছেন। তাঁহাদিগের যুক্তি এই যে, আলেকজান্দারের ভারত আক্রমণের ফলে ভারতের সহিত গ্রীসের সৌহার্দ্য স্থাপিত হয়। ইহার ফলে হিন্দুগগ গ্রীকদিগের নিকট হইতে বহু বিষয় শিক্ষা করিয়া থাকি বেন। এই সময়েই তাঁহারা হােমারের অনুকরণে রামায়ণ রচনা করিয়া- ছেন। হায় দুর্ভাগ্য! যাহারা একদিন জগতে জ্ঞান বিস্তার করিয়াছেন, আজ অভিনব ঐতিহাসিকের হস্তে পড়িয়া প্রতিপন্ন হইতেছে যে, তাঁহারাই একটা উপাখ্যানের জন্য পরের দ্বারে হাত পাতিয়াছিলেন। ইহা কি কম বিড়ম্বনা !! রামায়ণের উপাখ্যানভাগ যে হােমারের কাব্য হইতে গৃহীত, ইহা প্রমাণ করিবার পক্ষে বেবার সাহেব যতগুলি নজীর হাজির করিয়াছেন, তন্মধ্যে উভয় গ্রন্থের সাদৃশ্যকেই তাঁহার মত পরিপােষণের পক্ষে অকাট্য যুক্তি বলিয়া মনে করেন। কিন্তু পণ্ডিতপ্রবর লেসেন তাহার যুক্তির অসারতা দেখাইয়া বলিয়াছেন, উভয় গ্রন্থের সাদৃশ্য দেখিয়া * The worship of Vaidic deities, the preponderance of sacrifice, the free eating of flesh by Brahmins and Kshatriyas, the latter's proficiency in the Vadas and the Vedic deities, all show a state of Society, and a civilization, a religion, uncontaminated by feelings and ideas which had their rise in Budhism.The.Riddles of the Ramayana.

রামায়ণের রচনাকাল। উক্ত গ্রন্থের ইহাই স্থিরীকৃত হয় যে, উভয় কবিই এই সাধারণ ও প্রাচীনতর প্রবাদ হইতে আপনাদিগের গ্রন্থের উপাখ্যানভাগ সংগ্রহ করিয়াছেন। নতুবা বাল্মীকি যে হােমারের নিকট উপাখ্যানাংশের জন্য ঋণী এ কথা বলা চলে না। ১ কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যে, হােমার ভারতের নিকট বহু অংশে ঋণী, এ বিষয়ে প্রমাণের অভাব নাই। The Ancient Classics for English Readers a777 are পাঠ করিলে, এই বিশ্বাস আরও বদ্ধমূল হইয়া পড়ে। ভূমিকায় সম্পাদক মহাশয় স্পষ্টতঃ বলিয়াছেন যে, হােমার তাঁহার কাব্যের উপাখ্যানের জন্য ভারতবাসীর নিকট প্রভূত ঋণী। হােমারের 'ওডেশী (Odyssey) পড়িলে স্পষ্টই মনে হয় যে, তিনি ভারতে পরি- ভ্ৰমণ করিয়াছিলেন। এরূপ ক্ষেত্রে গ্রীক কাব্যের সহিত রামায়ণের সাদৃশ্য দেখিয়া, রামায়ণকে গ্রীক কাব্যের অনুকরণ বলিয়া অঙ্গীকার করিয়া লওয়া কখনই সমীচীন নয়। * বেবার সাহেব রামায়ণে যবন শব্দের উল্লেখ দেখিয়া, অনুমান করেন যে, ইহা খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে রচিত হইয়াছে। রামায়ণের নানা স্থানে যবন শব্দের উল্লেখ আছে। ২ ইহারা কাহারা ? বেবার সাহেব > 1 Prof. Lassen on Waber's Dassertations on the Ramayana, translated by J Muir from the German language in the Indian Antiquary for 1874 P.: 103.04. Vide also Mr. Tilak's Artic Home in the Vedas P. 349. * In the light of these circumstances, is it not worth considering whether any body is justiſed in taking it as a matter of course that Homer's work should be entirely Greek and unborrowed while all works bearing a similarity to his work should be copied from him. -Kasinath Trimbak Telang, ২। রামায়ণের বালকাণ্ডে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠের বিরােধ উপাখ্যানে যবন-সৈঞ্চয় বর্ণনা দৃষ্ট হয় । F রামায়ণ-যুগের ভারত। বলেন ব্যাকটেরিয়ান গ্রীকগণ যবন নামে আখ্যাত হইয়াছে। ইহাতেই তিনি রামায়ণকে খৃষ্ট যুগের পরবর্তী বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। সুতরাং রামায়ণের রচনাকাল নির্ধারণ করিবার পূর্বে যবনশব্দের অর্থ পরিগ্রহ করা প্রয়ােজন। দেখা যাউক যবন বলিতে কি বুঝায়। অধ্যাপক লেসেন সাহেব বলেন যে, ভারতের পশ্চিম দেশবাসী বণিসম্প্রদায় মাত্রেই হিন্দুর নিকট যবন নামে পরিচিত। পণ্ডিত প্রবর মােক্ষমুলারও এই মত অনুমােদন করিয়াছেন। * আবার কেহ কেহ অনুমান করেন যে, যবন শব্দে ব্যাবিলােনিয়ানগণকে লক্ষ্য করা হইয়াছে। ১ কিন্তু ইহা আমাদিগের নিকট যথার্থ বলিয়া মনে হয় না। রামায়ণ ও হিন্দুশাস্ত্র ব্যতীত বাইবেলের নানাস্থানে যবন শব্দের প্রচলন দেখা যায়। ২ সুতরাং যবনশব্দ আধুনিক নয়। শুদ্ধাস্পদ নগেন্দ্র নাথ বসু মহাশয় বিশ্বকোষ নামক বৃহৎ কোষ গ্রন্থে দেখাইয়াছেন যে, এই যৗবনজাতি ইতিহাসবহির্ভূত যুগেও বিদ্যমান ছিল। আনাদিগের বক্তব্য বাড়িয়া যায় বলিয়া, আমরা যবনশব্দের অর্থগত আলােচনা না করিয়া নিম্নে তঁহার মত উদ্ধত করিলাম -৭০৯ খৃষ্ট পূর্বাব্দে সর্গণের রাজ্য কালে কোণাকার অক্ষরে উৎকীর্ণ লিপিতে সাইপ্রস দ্বীপের বর্ণনা ভূয় এবাজঘােরা শকানু যবনমিশ্রিতা তৈরসীৎ সংখৃত ভূমিঃ শকৈববনমিশ্রিত। ইত্যাদি Javan is not the exclusive name of the Greeks or lonians. Prof. Lissen has proved that it had a wider meaning and that it was used even of Semetie nations-Ancient Sanskrit Literature. P, joi. > See Ancient Faiths in Ancient Names Vol ll. I Now there were the generations of the sons of Nooth, Shem Ham and Japheth : and unto them were sons born after the floody the sons of Japheth, Gomer and Magog and Madai and Javan and Jubal and Meshech and Tiras.Genesis * 1-4.

রামায়ণের রচণাকাল। স্থানে যবন শব্দের উল্লেখ আছে। ১ এই স্থানেই আসিরীয়গণ প্রথমে গ্রীকদিগের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইয়াছিলেন। এতদ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, হিব্রুগণ ব্যতীত তৎকালীন অপর জাতিও গ্রীকদিগকে যবন শব্দে অভিহিত করিত। পরে ফিনিকীয়াদিগের দ্বারা উহা পশ্চিম এসিয়া- খণ্ডে প্রচারিত হইয়া থাকিবে।” অতএব দেখা যাইতেছে যে, ব্যাক- টেরিয়ান গ্ৰীকগণের উৎপত্তির বহু-পূৰ্বেই যবন শব্দের প্রচলন ছিল। সুতরাং রামায়ণে যবন শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে দেখিয়াই, তাহার দ্বারা যে ব্যাকটেরিয়ান গ্রীকগণকে লক্ষ্য করা হইয়াছে, এরূপ সিদ্ধান্ত করিবার পূৰ্ব্বে ঐতিহাসিকগণ যে প্রমাণের ন্যায়তঃ দাবী করিতে পারেন, বেবার সাহেব সে প্রমাণ প্রয়ােগ করিতে পারেন নাই। এইবার আমরা রামায়ণের রচনাকাল নির্ধারণ করিতে চেষ্টা করিব। প্রথমতঃ য়ুরােপীয় ও দেশীয় ঐতিহাসিকগণের মতামত উদ্ধৃত করিয়া, পরে আমাদিগের মতামত জানাইব। কোন কোন যুরােপীয় পণ্ডিত রামায়ণকে মহাভারত অপেক্ষা আধু- নিক গ্রন্থ বলিয়া প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু Mrs. Manning বলেন যে রামায়ণের রচনা দেখিয়া মনে হয় রামায়ণ মহাভারত অপেক্ষা প্রাচীনতর গ্রন্থ। * রসিডেভিড, ইহাকে বৌদ্ধযুগে রচিত বলিয়া মনে করেন। . এই লিপির এক স্থল লিখিত আছে - The Seven Kings of the Yale Tribes of the country of Yavan (or Yunam who dwelt in an island of the Western sca at the dis tance of seven days from the coast and the name of whose country had never been heard by my ancestors, the kings of Assyria and Chaldize from the remotest tine-Rawlinson's Herodotus. P. 7. * The Comparative age of these poems have given rise tog রামায়ণ-যুগের ভারত। হইয়াছে। ২ পণ্ডিতপ্রবর Wiliam সাহেব বলেন যে, রামায়ণের ন্যায় বৃহৎ আয়তনের পুস্তক কখন একজন কবির দ্বারা রচিত হইতে পারে না। বহু শতাব্দী ধরিয়া ধীরে ধীরে এই গ্রন্থ রচিত হইয়া থাকিবে। সম্ভবত খৃষ্ট শতাব্দীর কিছু পূৰ্ব্ব হইতে আরব্ধ হইয়া প্রথম শতাব্দীতে ইহা সম্পূর্ণ সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, রামায়ণের কাল নির্ণয় করা সহজ নয়। এ কথা স্বয়ং ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল ও প্রতিভাবান্ রমেশচন্দ্র স্বীকার করিয়াছিলেন,—অন্য পরে কা কথা। ভারতবর্ষের পুরাতত্ব বিস্মৃতির স্বপ্ন-সমুদ্রে নিমগ্ন রহিয়াছে। যে তপস্বী শান্ত-রসাস্পদ পুণ্যাশ্রমের স্নিগ্ধচ্ছায়ায় উপবেশন করিয়া, রামায়ণ-রচনা করিয়াছিলেন এবং স্বীয় রচিত কাব্যের রচনা-গৌরবে অনুরক্ত ভক্তবৃন্দের নিকট অদ্যাপি দেবতার ন্যায় পূজা পাইতেছেন, ভারতের বাহিরে তাহার মহত্ত্ব সম্বন্ধে একটা অস্পষ্ট-ধারণা আছে মাত্র। রামায়ণের রচনাকাল নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট চেষ্টাস্বত্বেও বিচারপদ্ধতি তর্ককোলাহলে অভিভূত হইয়া ব্যর্থ হইয়া পড়িতেছে। রামায়ণের সকল কথা সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে রচনাকাল নির্ণয়ের প্রয়ােজন। যে যুগে রামায়ণ রচিত হইয়াছে, তাহা আজ অতীতে মিশিয়াছে । “পুরাণ তাহার প্রমাণ দিবার চেষ্টা করিয়া স্বয়ং অপ্রামাণ্য হইয়া পড়িয়াছে”। কল্পনাও তাহার ধারণা করিতে যাইয়া শ্রান্ত হইয়া পড়ে। এরূপ ক্ষেত্রে সেই অতীত যুগের কাল নির্দিষ্ট হইবে কি করিয়া ? much able discussion from which we gather that some portions of the Mahabharata were probably more ancient than ang portion of the Ramayana ; but that taken as a whole the Ramayana is probably the older composition, >! See 'The Budhist India, Mi Vide contra William's Epic poetry.

রামায়ণের রচনাকাল। আমরা প্রসঙ্গক্রমে বলিয়াছি, অনেকের বিশ্বাস যে, মহাভারত রামায়ণ অপেক্ষা প্রাচীনতর। বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষিত ভারত- বাসী এই মত ' পােষণ করিয়া থাকেন। সুতরাং দেখা যাউক মহা- ভারত অপেক্ষা রামায়ণ প্রাচীনতর এই সাধারণ বিশ্বাস অটুট রাখিবার পক্ষে কোন যুক্তি আছে কি না। আমাদিগের বিবেচনায় নিম্নলিখিত কারণগুলিই রামায়ণকে মহাভারত অপেক্ষা প্রাচীনতর বলিয়া স্বীকার করিবার পক্ষে যথেষ্ট। (১) রামায়ণ পাঠ করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, রামায়ণের সময়ে দাক্ষিণাত্যে আৰ্য্যসভ্যতা সম্যক্ প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। সে সময়ে দাক্ষিণাত্যের অধিকাংশ স্থানই বন্যশ্বাপদ-অরণ্যানী পরিবেষ্টিত। মহাভারতের সময়ে ভারতের নানা স্থানে আৰ্যসভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, মহাভারতের সভাপৰ্ব পাঠ করিয়া তাহা বেশ বুঝা যায়। যুধিষ্ঠিরের সভাগৃহে ভারতের নানা স্থান হইতে নৃপতিবৃন্দ উপস্থিত হইয়াছিলেন। উভয় গ্রন্থের আলােচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, দাক্ষিণাত্যের ঐরূপ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটিতে বহু শতাব্দী অতীত হইয়াছে। ইহাতে মনে হয় রামায়ণ মহাভারত অপেক্ষা বহু প্রাচীনতর। (২) রামায়ণের ভাষাতত্ত্ব আলােচনা করিলে দেখা যায় যে, ইহাতে আৰ্যপ্রয়ােগের যেরূপ ছড়াছড়ি, লৌকিক কোন সংস্কৃত গ্রন্থে এরূপ বাহুল্য দেখা যায় না। রামানন্দ প্রভৃতি টীকাকারগণ ‘প্রমুমােদেতি Mrs, Manning এবং ভারতীয় উপাসক-সম্প্রদায়। ১। মহাভারতের সময়ে কলিঙ্গ, বিড়, পাণ্ড্য ও কেবল এবং পূর্বদিকে অঙ্গ, শব্দ, প্রাগজ্যোতিষ, মণিপুর, ও সাগরতট পর্যন্ত, আধ্যসভ্যতা বিস্তৃত হইয়াছিল। সতাপৱব ২৫-৩০ এবং ৫৫-৫১ অধ্যায়, উদ্যোগপর্ব ১৯৬, অশ্বমেধ পর্ব ৭৩-৮• অধায় ১২ রামায়ণ-যুগের ভারত। ছান্দসং পরস্মৈপদ ব্যাখ্যার দ্বারা উক্ত আৰ্য প্ৰয়ােগগুলি বৈদিক ব্যাকরণ অনুসারে সিদ্ধ বলিয়া গিয়াছেন। ইহাতেই মনে হয় যে, যে সময়ে বৈদিক রীতি ত্যাগ করিয়া, লৌকিক রীতিতে সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হইয়াছিল, বাল্মীকির মূল রামায়ণ সেই সময়েই রচিত হয়। ১ তাহা হইলে রামায়ণ বেদের পরে এবং উপনিষদের পূর্বেই রচিত হইয়াছিল। ২ ইহাতে নিঃসন্দেহ প্রমাণিত হয় যে, রামায়ণ মহা- ভারত অপেক্ষা প্রাচীনতর। (৩) রামায়ণ পাঠে দেখিতে পাওয়া যায় যে, তখনও ভারতে সহমরণ-প্রথা প্রচলিত হয় নাই। সহমরণ-প্রথা বেদের সময়ে ভারতে প্রচলিত ছিল না; ইহা পরবর্তিযুগে প্রচলিত হইয়া থাকিবে। কিন্তু মহাভারতে সহমরণের কথা পাঠ করিয়া স্পষ্টই বােধ হয় যে, মহাভারত রামায়ণের বহু পরে রচিত হইয়াছে। ৩ (৪) এতদ্ব্যতীত মহাভারতে রামায়ণের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ৪ উদাহরণস্বরূপে মহাভারতের বনপর্ব ও দ্রোণপৰ্বের উল্লেখ করা যাইতে পারে। ৫ উপরি উদ্ধত বিষয়সমূহ আলােচনা করিলে রামায়ণকে মহাভারতের Princep's useful Tables, ২। পঞ্চানন তর্করত্ন লিপিত “রামায়ণ-মহাভারত” প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। ১৩০৯ সালের নব-প্রভায় “মহাভারত ও রামায়ণ” শীর্ষক প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। $1 Secondly it is also worthy of remark in this connection, as suggested by a very erudite friend ( Prof. R. G. Bhandarcara ) that whereas the Mahabharata does allude to Rama and his exploits, the Ramayana nowliere makes' any mention of Pandavas or Kurus or any of the Principle Characters at the great action of other Epochs-Kashi Nath Trimbak Telang. । রামচরিত বর্ণনাকালে ভারতকার রামায়ণের উল্লেখ করিয়াছেনঃ- রামায়ণের রচনাকাল। পূর্ববর্তী বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। সুতরাং মহাভারতের কালনির্ণয় করিতে পারিলে, রামায়ণের রচনাকাল অনেকটা নির্ধারিত হয়। এ পর্যন্ত মহাভারতের কালনির্ণয় করিবার দুইটী প্রণালী দেখা যায়। প্রথম প্রণালীমতে হিন্দুর যুগগণনা-সাহায্যে মহাভারতের কালকে থষ্ট শতাব্দীর বহু সহস্র বৎসর পূর্ববর্তী বলিয়া স্বীকার করা হয়। শ্রদ্ধেয় শ্রীদুর্গাদাস লাহিড়ী প্রভৃতি ব্যক্তি উক্তমতের পক্ষপাতী। সম্প্রতি আরও কতিপয় বাঙ্গালী লেখক এই পন্থা অনুসরণ করিয়াছেন। কিন্তু এই মত প্রতিষ্ঠিত করিতে হইলে, বর্তমানের সমুদয় ঐতিহাসিক যুক্তির অসারতা দেখাইতে হয়, ইহা কখনই সুসাধ্য নয়। অধিকন্তু ইহা কখনই সৰ্ববাদিসম্মতিক্রমে গৃহীত হইতে পারে না। দ্বিতীয় উপায়ে যথাসম্ভব রামায়ণের রচনাকাল কমাইলেও রামায়ণের গৌরব অটুট থাকে। ইহাতে বৰ্তমান ঐতিহাসিক মতগুলি অক্ষুন্ন থাকিবে। দ্বিতীয় উপায়ে মহাভারতের রচনাকাল নির্ধারণ করিতে চেষ্টা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, মহাভারতকে খৃষ্টপূৰ্ব্ব নবম শতাব্দীতে রচিত বলিবার পক্ষে যুক্তির অভাব নাই। * এই স্থলে একটী অবান্তর কথার উল্লেখ প্রয়ােজন। পাণিনির গ্রন্থে, কয়েকজন মহাভারতীয় নায়কের উল্লেখ আছে; কিন্তু রামায়ণের নায়কগণের নাম না থাকায়, অনেকে রামচন্দ্রের প্রাচীনত্বে সন্দিহান হন। বােধ হয় এই কারণেই শ্রদ্ধেয় শৃনু রাজ! যথা বৃত্তমিতিহাসং পুরাতন। ৩২৭৩৬ দ্রোণপর্বে বাল্মীকি রচিত শীতের উল্লেখ আছে : “অপিচায়ং পুরাগীতঃ শ্লোকে বাল্মীকি ভুবি।” * শ্ৰীযুক্ত কানাইনাল ঘােষাল মহাশয় ১৩০২ সালের ভারতীতে “যুধিষ্ঠির ও মহাভারত” শীর্ষক প্রবন্ধে জ্যোতিষ শাস্ত্রানুসারে দেখাইয়াছেন যে, ভারত খৃঃ পুঃ নবম শতাব্দীতে রচিত হইয়াছে। বিস্তারিত বিবরণের জন্য ১৩১৭ সালের আষাঢ় সংখ্যা বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত “মহাভারতের রচনা কাল’ প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য।

১৪ রামায়ণ-যুগের ভারত। অক্ষয়কুমার মৈত্র মহাশয় রামায়ণকে পাণিনির পরবর্তী বলিয়া বিশ্বাস করেন। ১ কিন্তু এ মত যে অসার, তাহাতে সন্দেহ নাই। সমসাময়িক গ্রন্থে বা প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে রামাদির নাম উল্লেখ না থাকিলেই যে তাঁহাদিগের প্রাচীনত্ব চলিয়া যায়, তাহা নহে। নানাকারণে পূর্ণাবয়ব সংস্কৃত সাহিত্য দৃষ্ট হয় না। এতদ্ব্যতীত বৈয়াকরণ প্রচলিত সমস্ত শব্দ ব্যবহার করিতে বাধ্য নন। কৃষ্ণের নাম ঋগ্বেদের মন্ত্রসংহিতায় ৪৫ স্থানে উক্ত হইয়াছে। তথাপি পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীতে কৃষ্ণ শব্দের উল্লেখ দৃষ্ট হয় না। সুতরাং কেমন করিয়া বলিব যে রামের নাম পাণিনিতে দেখা যায় না বলিয়া, রামায়ণের প্রাচীনতা চলিয়া যায়। ২ পণ্ডিত সখারাম গণেশ দেউস্কর যাহা বলেন, তাহাও প্রণিধানযােগ্য। তিনি বলেন, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীর কোন সূত্রে রামায়ণের উল্লেখ না থাকায় বুঝিতে হইবে যে, ঐ শব্দে ব্যাকরণগত কোন বিশেষত্ব নাই। সুতরাং ব্যাকরণে ইহার উল্লেখ নিষ্প্রয়ােজন। ৩ এইবার রামায়ণের রচনাকাল নির্ধারণ করিতে চেষ্টা করা যাউক। কোন কোন পাশ্চাত্য পণ্ডিত রামায়ণকে খৃষ্টপূর্ব ১২শ শতাব্দীতে রচিত বলিয়া মনে করেন। উদাহরণস্বরূপে মাস মন ও আরনল্ড সাহেবের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। ৪ কিন্তু ইহাও আমাদিগের এ বিষয়ে ১। তি ন বলেন পাণিনির পরে ও কাত্যায়নের পূর্বে কোন সময়ে রামায়ণ রচিত হইয়া থাকিবে—বঙ্গদর্শন ১৩১৭। ২। পাণিনিতে রামের নাম দৃষ্ট না হইলেও একটী সূত্রে কৌশল্য পদটী সার্থ হইয়াছে। ৩। শ্রীসখারাম গণেশ দেউস্কর লিখিত মহাভারতের রচনাকাল প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। 81 He (Ram) is perhaps the earliest of defied gods as his age is generally fixed at 1200 years before our Era- History of India.

রামায়ণের রচনাকাল। ১৫ নিকট সত্য বলিয়া মনে হয় না। সুতরাং আমরা অন্য উপায়ে রামায়ণের কাল নির্দেশ করিতে চেষ্টা করিব :- (১) মহাভারতের বংশতালিকা দৃষ্টে বুঝা যায় যে, মহাভারতীয় ৩১ জন নৃপতির পূর্বে রাম জীবিত ছিলেন। ইহাতে রামায়ণ মহাভারত অপেক্ষা দেড় সহস্র বৎসরের প্রাচীনতর বলিয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে। সুতরাং রামায়ণ খৃষ্টপূর্ব প্রায় তিন সহস্র বৎসর পূর্বে রচিত। (পণ্ডিত প্রবর উইলিয়ম জোন্সও এই মতের পক্ষপাতী)। (২) কাশ্মীরদেশীয় প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ রাজতরঙ্গিণীতে রামায়ণের উল্লেখ আছে। কোন সময়ে কাশ্মীরদেশীয় কতিপয় ব্রাহ্মণ- পণ্ডিত কাশ্মীরপতি দ্বিতীয় দামােদর নামক রাজাকে শাপ দেন। পরে শাপ-বিমােচনের উপায় নির্ধারণের প্রসঙ্গে বলেন, “মহারাজ! যদি আপনি রামায়ণ শ্রবণ করেন, তবে শাপ হইতে মুক্ত হইবেন।” এই দামােদর তনুবংশীয়। ইনি খৃষ্টপূৰ্ব্ব এয়ােদশ শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন। সুতরাং দেখা যাইতেছে, ইহার বহু পূর্বেই রামায়ণ শুধু রচিত নয়, ইহার আখ্যান সুপরিচিত ও ইহার প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। (৩) রামচন্দ্রের জন্মকাল লইয়া, যে জ্যোতিষিক বচন প্রচলিত দেখা যায়, তাহাতে রামচন্দ্রের জন্ম ৫০০০ বৎসর পূর্বে হয়, ইহাই প্রতিপন্ন হইয়াছে। মহারাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ জ্যোতিষী জনার্দন বালাজি মােড়ক মহাশয় ইহা নিঃসহ প্রমাণ করিয়াছেন। সুতরাং উপরে যাহা লিখিত হইল, তাহাতে এই কয়টী বিষয় প্রমাণিত হইতেছেঃ-(১) রামায়ণ মহাভারত অপেক্ষা প্রাচীনতর গ্রন্থ। ১। অশেষমেকেনৈবাঙ্গা সামায়ণং তব। শাপিস্য শান্তিভবতেতুত্মচিরে তে প্রসাদিতা। al Rajtarangini' by Traye..r রামায়ণ-যুগের ভারত। (২) ইহা বৌদ্ধযুগের বহু পূৰ্ব্বে রচিত, সুতরাং ইহা বৌদ্ধগ্রন্থ দশরথ জাতকের অনুকরণ নহে। (৩) হােমারের কাব্যের ছায়া লইয়া, রামায়ণ রচিত নহে। (৪) রামের ব্যক্তিত্বে সন্দেহ করিবার কোন কারণ নাই। (৫) ইহা অন্যূন ৫০০০ বৎসর পূর্বে রচিত। এই কয়টা বিষয় স্মরণ রাথিয়া রামায়ণ পাঠ করিলে, প্রাচীন ইতিহাসের বহু উপকরণ রামায়ণ হইতে পাওয়া যাইতে পারে। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে তাহারই আলােচনা করিব। উপসংহারে আর একটা কথা বলা প্রয়ােজন। রামায়ণে লিখিত আছে যে, বাল্মীকিপ্রণীত গ্রন্থে চতুর্বিংশতি সহস্র শ্লোক, পঞ্চ শত সর্গ এবং সাতটী কাণ্ড আছে। * এই সাতটী কাণ্ডের নাম বালকাণ্ড, অযযাধ্যাকাণ্ড, কিস্কিন্ধ্যাকাণ্ড, অরণ্যকাণ্ড, লঙ্কাকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ড। কিন্তু অনেকে বিশ্বাস করেন যে, এই শেষ কাণ্ড (উত্তর- কাণ্ড) বাল্মীকিপ্রণীত নহে। ইহার রচনা-প্রণালীর সহিত অন্যান্য সর্গের রচনা-প্রণালীর যথেষ্ট পার্থক্য আছে। এই কারণে বালকাণ্ডের শ্লোকটীকে (পাদটীকায় উদ্ধত) অনেকে প্রক্ষিপ্ত বলিয়া মনে করেন। কোন কোন য়ুরােপীয় পণ্ডিত উত্তরকাণ্ডকে নিতান্ত আধুনিক বলিয়া মনে করেন। ২ ফোট উইলিয়ম কলেজের তত্ত্বাবধায়ক বনাম সাহেব প্রাপ্ত রাজস্য রামস্য বাল্মীকিভগবান্ ঋষিঃ। চকার চরিতং কৃৎস্নং বিচিত্রপদমর্থবৎ। চতুর্বিংশসহস্রাণি শ্লোকানি পােবন ঋষিঃ। তথা সৰ্গশন পঞ্চ ষটকাঙানি তথােত্তরং। ( বালকাও ৪র্থ সর্গ) ১। রাজেন্দ্রনাথ দত্ত প্রণীত। (‘ভারতীয় গ্রন্থাবলী” ১ম ভাগ) ২। The Journal of the Indian Archipelago সাময়িক পত্রিকা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, যবদ্বীপ হইতে সংগৃহীত রামায়ণের মধ্যে উত্তরকাণ্ড সন্নিবেশিত হয় নাই। বিস্তারিত বিবরণের জন্য অক্ষয়কুমার দত্তের উপাসক সম্প্রদায়” পুস্তকের গত রামায়ণ মহাভারত” প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। Vide also Griffith's Ramayan রামায়ণের রচনাকাল। ঝলেন, “কালে রামায়ণে অনেক সংযােজন হইয়াছে।” সুতরাং বােধ হয়, রামায়ণ রচিত হইবার পর কোন কবি উত্তরচরিত রচনা করিয়া, রামায়ণের সহিত তাহাকে জুড়িয়া দিয়া থাকিবেন। এ মত নানা কারণে আমাদিগের অসঙ্গত বলিয়া বােধ হয় না। সুতরাং আমাদিগের আলােচনা উক্ত ছয়টী সর্গের মধ্যেই নিবদ্ধ থাকিবে। রামায়ণ বলিতে আমরা বালকাণ্ড প্রভৃতি উক্ত ছয়টী সৰ্গই বুঝিব এবং শেষ কাণ্ডটীর সম্বন্ধে কোন কথাই তুলিব না।

রামায়ণী সভ্যতা ও সমাজ। আৰ্য সমাজ অতি প্রাচীন। অতীতের কোন্ সুদূর যুগে ইহা সভ্যতার উচ্চতম গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, তাহা সঠিক করিয়া বলিবার উপায় নাই। রামায়ণে আমরা সেই সুপ্রাচীন সমাজ ও সভ্যতার একটা আভাষ পাই। প্রাচীন সাহিত্য আলােচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, রামায়ণী- যুগের পূৰ্ব্বে সমাজে দেব-ভাষা ও মনুষ্য-ভাষা প্রচলিত ছিল। বেদগুলি দেব-ভাষায় রচিত। এই দেব-ভাষা আবার তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। তৎকালে সৰ্ব্বশুদ্ধ চারি প্রকারের ভাষা প্রচলিত ছিল। প্রথম মন্ত্রের ভাষা, দ্বিতীয় কল্পের ভাষা, তৃতীয় ব্রাহ্মণের ভাষা এবং চতুর্থ প্রচলিত লৌকিক ভাষা। ১ রামায়ণের সময়ে দুরূহ দেবভাষার প্রচলন উঠিয়া যায় এবং তৎস্থলে বিশুদ্ধ ও সহজ সংস্কৃতের প্রচলন হয়। এই সহজ, সরল ভাষাতেই রামায়ণের শ্লোক রচিত । তৎকালে অনাৰ্য্য সমাজ ব্যতীত সর্বত্রই প্রায় কথােপকথনের জন্য সংস্কৃত ভাষা ব্যবহৃত হইত। ব্রাহ্মণ ও সম্রান্ত ব্যক্তিগণ সংস্কৃত ভাষায় কথােপকথন করিতেন, রামায়ণ পাঠে তাহা বুঝা যায়। অরণ্যকাণ্ডের ১১শ সর্গে ইল-বাতাপি উপাখ্যানে লিখিত আছে যে, ইল ব্রাহ্মণরূপ * সায়ন বলেন যে, বেদের সময়ে চারি প্রকারের ভাষা প্রতি ছিল :- চারি বা পরিমিত পাদানি তানি বিদু ব্ৰহ্মণা মনীষিণঃ। গুছাত্রীণি মেহি নেং গয়স্তি তুরিয়ং বাচঃ মনুষ্যা বদন্তি। ১১৬৪|৪৫ ১। আর্যাবর্ত ১৩১৭ ( আশ্বিন) পৃঃ ৩৮৬।

রামায়ণী সভ্যতা ও সমাজ। ১৯ ধারণ করিয়া সংস্কৃত ভাষায় কথােপকথনের দ্বারা শ্রাদ্ধের ছলনায় ব্রাহ্মণ গণকে নিমন্ত্রণ করিত। ১ অপর স্থানেও দেখা যায় যে, হনুমান লঙ্কাপুরীতে প্রবেশ করিয়া, সীতার সহিত সাক্ষাৎ করিবার অভিপ্রায়ে ভাবিতেছেন :-“আমি ক্ষুদ্রকায়, তাহাতে আবার বানর। যাহা হউক, মানুষের মত সংস্কৃত কথাই বলিব। দ্বিজাতি অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের (বিশুদ্ধ) ভাষায় কথা বলিলে সীতা আমাকে রাবণ মনে করিয়া ভীত হইবেন। অতএব সাধারণ মনুষ্যের মত কথা বলাই আমার অবশ্য- কৰ্ত্তব্য, নচেৎ কোনরূপেই তাহাকে সান্ত্বনা করিতে পারিব না।” ইহার দ্বারা সহজেই বুঝিতে পারা যায় যে, তৎকালে সাধারণের মধ্যে সংস্কৃত ভাষা ব্যতীত, লৌকিক ভাষারও প্রচলন ছিল। অনাৰ্য্য-সমাজে পৈশাচী ভাষা ব্যবহৃত হইত। পাণ্ড্য, বাহলী, ভােট, গান্ধার প্রভৃতি দেশকে পিশাচ দেশ বলা হইয়াছে। * এই সব স্থানে পৈশাচী ভাষা প্রচলিত ছিল। অর্থশাস্ত্রের মেরুদণ্ড মুদ্রা। মুদ্রার উপর সমাজের বহু উন্নতি নির্ভর করে। এই জন্য অতি প্রাচীনকাল হইতেই মুদ্রার প্রচলন দেখা যায়। ঋগ্বেদের ন্যায় সুপ্রাচীন গ্রন্থেও হিরণ্যপিণ্ডের ও নিষ্ক নামক এক প্রকার মুদ্রার উল্লেখ আছে। ২ ইংরাজ ঐতিহাসিকগণও স্বীকার করিয়া ধারয় ব্রাহ্মণং রূপমিনঃ সংস্কৃতং বদন্। আমন্ত্রয়তি বিন্ স শ্রাদ্ধমুদ্দিশ্য নির্ধনঃ। পাণ্ড্য-কেকয়-বাহীকসহ-নেপাল-কগুলা। সুধেনা-ভোেট-গান্ধার-হৈব-কনোজনা-খা এতে পিশাচদেশাঃ সুপ্তদেশ্যগুগুণে। ভবেৎ ৪/৭২।

রামায়ণ-যুগের ভারত। থাকেন যে, ভারতবাসী অতি প্রাচীন যুগেই মুদ্রার ব্যবহার জানিতেন। ২ রামায়ণের বহুস্থানে নিষ্ক ও সুবর্ণ নামক মুদ্রার উল্লেখ দেখা যায়। তৎকালে অঙ্গুরীয় প্রভৃতি নামাঙ্কন করিবার প্রথার আভাষ রামায়ণে দেখিয়া মনে হয়, মুদ্রাকে নামাঙ্কিত করিবার চেষ্টা তৎপূর্বেই আর হইয়াছিল। ৩ রামায়ণযুগে বিবাহ-প্রথার আলােচনা করিলে, ইহার প্রাচীন সহজেই প্রতিপন্ন হইয়া পড়ে। ঋগ্বেদের বহু-পত্নীকতা ও দেবরের সহিত বিধবার বিবাহ প্রভৃতি বৈদিক আচার তখনও পূর্ণমাত্রায় রামায়ণী সমাজে বর্তমান ছিল, রামায়ণে তাহার স্পষ্ট উল্লেখ দেখা যায়। পরবর্তী যুগে শঙ্খ ও দেবল প্রভৃতি স্মৃতিশাস্ত্রকারগণের গ্রন্থে বহুবিবাহের প্রয়ােজন মত বহুবিধান পরিলক্ষিত হয়। পৌরাণিক ও আধুনিক রাজাদের বই বিবাহের কথা সুপরিচিত। কিন্তু বর্তমান সময়ের কথা ছাড়িয়া, ভারতীয় যুগেও দেখা যায় দেবরকে পতিরূপে গ্রহণ নিন্দনীয় বলিয়া বিবেচিত হইত। * রামায়ণীযুগে দেবর-পতিত্ব-গ্রহণ কেবল অনাৰ্য সমাজে প্রচলিত ছিল না। নিয়ােগ বিধিতে বাধ্য হইয়া পুত্রোৎপাদনার্থে দেবর-নিয়ােগশাস্ত্র বিধিসম্মত ; এই জন্য মনুতেও ইহার বিধান আছে, - *1 If we may trust Aryan, the Hindus had coined money before Alexander-Wilson. ৩। হনুমান্ রামের একটা নামাঙ্কিত অঙ্গুরী অভিজ্ঞানস্বরূপ সীতার নিকট উপস্থিত করেন। অনেকে অনুমান করেন যে বেদোক্ত ক্ষুরজ সাহায্যে এই ধাতুলিপি সম্পন্ন হইত। ৪। দশরথের বহু বিবাহ ও সুগ্রীবের সহিত বালী-পত্নীয় বিবাহ ইহার উদাহরণ। ভারতে চিরদিনই বহ-পত্নীকতা প্রচলিত রহিয়াছে। বেদে লিখিত আছে-- যদেকস্মিন্ যপে বেশনে পরিব্যয়তি, তস্মাৎ একো জায়ে বিলে,-যেমন যজ্ঞকালে রামায়ণী সভ্যতা ও সমাজ। ভ্রাতুমৃতস্য ভাৰ্য্যায়াং যােহনুরজ্যেত কামতঃ। ধৰ্ম্মেণাপি নিযুক্তাগাং সজ্ঞেয় দিধিপতি। ঋগ্বেদের একটী শ্লোক পাঠ করিয়া বুঝিতে পারা যায় যে, প্রাচীন ভারতে বরের অভিভাবকগণ উপযুক্ত পাত্রীর অন্বেষণ করিয়া বেড়াইতেন। কন্যার পিতা পাত্রের যােগ্যতার পরিচয় পাইলে, তাহার হস্তে কন্যা সম্প্রদান করিতেন। রামায়ণেও এই ভাবের কথা দেখিতে পাওয়া যায়। বিশ্বামিত্রের যজ্ঞস্থান সম্ভবতঃ আধুনিক বিহারের কোশগ্রামে অবস্থিত ছিল। এই স্থান হইতে দরভঙ্গের ৩৫ মাইল উত্তরে সীতার জন্মভূমি জনকপুরে বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রকে সঙ্গে লইয়া জনকের ভবনে সীতার সহিত রামচন্দ্রের বিবাহের প্রস্তাব উপস্থিত করেন। ইহাতে মনে হয় যে, অনাৰ্য্য সমাজে রাক্ষস ও বিভিন্ন প্রকারের বিবাহ প্রচলিত থাকিলেও, আৰ্যসমাজে সাধারণতঃ পাত্র-পাত্রী অভিভাবকগণ কর্তৃকই নির্বাচিত হইতেন। মহাভারতের কোন কোন প্রতাপশালী নরপতি মধ্যে মধ্যে একাধি কারের চেষ্টা করিয়াছেন, রামায়ণের উত্তরকাণ্ড ব্যতীত আর কোথাও এরূপ চেষ্টার কথা পাঠ করিতে পাওয়া যায় না। রামায়ণের সময়ে এক যুপে দুই রঞ্জু বেষ্টন করা হয়, সেইরূপ এক পুরুষ দুই স্ত্রী বিবাহ করিতে পারে। ঋগ্বেদে দেবরের সহিত বিবাহ সম্বন্ধে লিখিত আছে : কুহ স্মিদ্দোষ কুহ বস্তোরখিনা। কুহাভিপিত্বং করতঃ কুহােষতু- কো বাং শযুত্ৰা বিধবেব দেবরং। মৰ্য্যং ন যােষ কৃণুতে সধিস্থ আ। ১০৪ ০২। অর্থাৎ হে অখিদ্ধয়, তােমরা দিবাভাগে কি রাকালে কোথায় গতিবিধি কর, কোথায় বা কালযাপন কর। যেরূপ বিধবা রমণী শয়নকালে দেবরকে সমাদর করে, যজ্ঞস্থলে তদ্রুপ সমাদরের সহিত কে আমাদিগকে আহ্বান করে।

২২ রামায়ণ-যুগের ভারত। আৰ্যভূমি বহুতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক রাজ্যে এক এক অধীশ্বর থাকিতেন। ইনি আপন অধিকারের মধ্যে যথাসম্ভব “অনন্যরাজশাসনব” হইয়া শাসনকার্য সমাধা করিতেন।* রাজ্য- শাসন বহু মন্ত্রীতে বিভক্ত হইত। মন্ত্রিগণ অধিকাংশ সময়েই ব্রাহ্মণ জাতীয় হইতেন। রাজনীতির মেরুদণ্ড মন্ত্র গুপ্তি তৎকালে অজ্ঞাত ছিল না। রামচন্দ্র ভরতকে প্রত্যেক তীর্থে তিনজন গুপ্তচর প্রেরণ করিবার পরামর্শ দিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত রাজকার্য সম্পাদনের জন্য রামায়ণে অষ্টাদশ কর্মচারীর উল্লেখ আছে। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে রামায়ণযুগে অবলম্বিত রাজনীতি অধুনা যুগের রাজনীতি হইতে বিশেষ স্বতন্ত্র ছিল না। মধ্যযুগে জৰ্ম্মণী প্রভৃতি য়ুরােপীয়জাতির মধ্যে রাজ-দেবত্বের ভাব এবল হইয়াছিল। সালেমান প্রভৃতি সম্রাটগণ আপনাদিগকে দেবতার উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া জনসাধারণের নিকট হইতে উচ্চসম্মান লাভ করিয়া গিয়াছেন। তারপর নানা ঘটনা-বৈচিত্রের মধ্যে য়ুরােপের যে অত্যদ্ভুত ইতিহাস ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহাতে ক্রমশঃই য়ুরােপে রাজ- ভক্তি উন্মুলিত হইয়া পড়িতেছে। * বাল্মীকি ও তৎসাময়িক বৃত্তান্ত । ১। রাম ভরতকে চিত্রকুট পৰ্বতে রাজ্যের কুশল জিজ্ঞাসাচ্ছলে বলেন--“দেখ, শাস্ত্রবিশারদ অমাত্যগণের প্রযত্নে মন্ত্র সুরক্ষিত হইলে, নিশ্চয়ই জয়লাভ হয়।”-- হেমচন্দ্র। পুনশ্চ-—“তুমি ও তােমার মন্ত্রী, তােমরা যাহা গােপন করিয়া রাখ, তর্ক ও বুক্তির দ্বারা তাহাও কেহ উদ্ভাবন করিতে পারে না।” ২। মন্ত্রী, পুরােহিত, যুবরাজ, সেনাপতি, দৌবারিক, অন্তঃপুরাধিকারী, বন্দনা- গরাধিকারী, ধনাধ্যক্ষ, রাজাজ্ঞানিবেদক, ব্যবহারজিজ্ঞাসক (জজ পণ্ডিত) ধৰ্মাসনাধি- ফারী, ব্যবহারনির্ণায়ক সভ্য, বেতনদানাধ্যক্ষ, বেতনগ্রাহী নগরাধ্যক্ষ, আটকি দাধিকারী, এবং দুর্গপাল।

রামায়ণী সভ্যতা ও সমাজ। ২৩ ইহা নিতান্ত পরিতাপের বিষয় সন্দেহ নাই। কিন্তু সুখের বিষয় যে, হিন্দুর মনে রাজ-ভক্তি আজ পর্যন্ত অক্ষুন্নভাবে বিরাজিত। আজও ভারতের নরনারী প্রাণের সহিত বিশ্বাস করেন,—“রাজাই সত্য, রাজাই ধৰ্ম্ম, রাজাই মানীর মান, রাজাই পিতা, রাজাই মাতা এবং রাজাই সকলের হিতকারী”। রামায়ণে রাজার সংজ্ঞা অত্যন্ত ব্যাপক। কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডে লিখিত আছে যে, যিনি ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কামকে সময়ােচিত সেবা করিয়া থাকেন, তিনিই রাজা * “রাজা কেবল বসুন্ধরা ভােগ করিয়াই যাইবেন না। প্রকৃতিপুঞ্জের প্রতিও তাহার গুরুতর কর্ত্তব্য আছে। যিনি লােকরক্ষার ভার গ্রহণ করিবেন,-প্রজার রক্ষার্থে তাঁহাকে কি নৃশংস, কি পাপকর, কি অপযশস্কর–সকল কাৰ্য্যই করিতে হইবে”।১ রামচন্দ্র ভরতকে রাজকাৰ্য্য উপদেশ দিবার ছলে প্রকৃতিপুঞ্জের প্রতি রাজার দায়িত্ব বুঝাইবার জন্য বলিয়াছেন,-“ধনী বা দরিদ্র যাহারাই হউক, বিবাদ- রূপ সঙ্কটে তােমার অমাত্যেরা ত অপক্ষপাতে ব্যবহার পর্যালােচনা করিয়া থাকেন; দেখ যাহাদিগের উপর মিথভিযােগের সম্যক্ বিচার না হয়, সেই সকল নিরীহ লােকের নেত্র হইতে যে, অশ্রুবিন্দু নিপতিত হইয়া থাকে, তাহা ঐ ভােগাভিলাষী রাজার পুত্র ও পশু সকল বিনষ্ট করিয়া ফেলে।” এরূপ ন্যায়রত প্রজাবৎসল রাজা যে দেবতারই প্রতিমূৰ্ত্তি তাহাতে সন্দেহ কি ? রামায়ণীযুগে ভারতে শিক্ষাদানের কিরূপ ব্যবস্থা ছিল, রামায়ণ ধৰ্ম্মমর্থ কামঞ্চ কালে যন্তু নিষেবতে। বিভজ্য সততং বীর স রাজা হরিদত্তমম্। (কিঃ ৩৮২১) সৌরভ-কার্তিক ১৩১৯ পৃঃ ৪ ১।

২৪ রামায়ণ-যুগের ভারত। পাঠ করিয়া তাহা ঠিক বলিতে পারা যায় না। রামায়ণ পাঠ করিয়া, শিক্ষা সম্বন্ধে যে সহজ ধারণায় উপনীত হওয়া যায় তাহার কথাই সংক্ষেপতঃ আমি বলিতেছি। আদিকাণ্ডে দেখিতে পাওয়া যায়, রাম- লক্ষ্মণাদি রাজপুত্রগণ প্রাপ্তবয়স্ক হইলে, রাজা দশরথ তাঁহাদিগের শিক্ষার আয়ােজন করেন। রাজকুমারগণ ও শিক্ষাগুণে অত্যল্পকাল মধ্যে সৰ্ববিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করেন।* ইহাতে অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে তৎকালে রাজকুমারদিগের এবং সম্ভবতঃ (?) জন- সাধারণের শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। বেদাধ্যয়ন, অস্ত্রপরিচালন, নীতিশিক্ষা, অশ্বারােহণ এবং পিতৃসেবাই তৎকানে শিক্ষণীয় বিষয় ছিল বলিয়া মনে হয়। এই বিদ্যা গুরুগৃহে সম্পন্ন হইত কিনা তাহাও জানিবার উপায় নাই। রামায়ণের কুত্রাপি লিপি শব্দের উলেখ দেখা যায় না। এস্থলে লিপি বলিতে আমি লেখনী-সম্ভবা লিপির কথাই বলিতেছি। ইহাতেই অনেকেই অনুমান করেন রামায়ণীযুগে লিপির প্রচলন ছিল না, মৌখিক শিক্ষাদান প্রচারিত ছিল, এবং শাস্ত্রাদি গ্রন্থকারে নিবদ্ধ না থাকিয়া, জনগণের স্মৃতিমন্দিরেই বিরাজিত থাকিত। কিন্তু ইহা সঙ্গত নয়। বৈদিক কালে ও লিপি-জ্ঞানের অস্তিত্ব ছিল।১ প্রত্যুত ভারতে অতি প্রাচীন যুগেই লিপি-জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। ঋগ্বেদ হইতে আমরা তিনটী স্থান উদ্ধৃত করিয়া, আমাদিগের কথার যাথার্থ প্রতিপন্ন করিতেছি। । * সৰ্বে বেদবিদঃ শূরাঃ সর্বে লােকহিতে কতাঃ। সৰ্বে জ্ঞানসম্পন্নাঃ সর্বে সমুদিতা গুণৈঃ। ১৮শ সর্গ। ১। উপাসনা ৬ষ্ঠ বর্ষ ১৩০ পৃষ্ঠা রামায়ণী সভ্যতা ও সমাজ। } ১। উতত্ব প ন দদর্শবাচমুত ত্বঃ শৃথন্ ন শৃপােতত্যনাম্ ; উতে স্মৈ তম্বং বিসগ্রে জায়েব পত্যউতসী সুবাসা। ১০৭১৪ ২। যুং বৈ সূৰ্য্যং ভানুস্তমনাবিধ্যাদাসুরঃ অত্রয়স্ত মম্ববিন্দ নহি অন্যে অশঙ্কুব। ৪২১২ ৩। বেদমাসাে ধৃতবতে দ্বাদশ প্রজাত। বেদা উপজায়তে ১২ এই তিনটী ঋকের আলােচনা প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় শ্রীঅমূল্যচরণ ঘােষ বিদ্যাভূষণ যাহা বলেন তাহা প্রণিধান-যােগ্য ; আমরা নিম্নে তাহা উদ্ধৃত করিলাম ;- “এই তিনটা ঋকের মধ্যে প্রথমটীতে মূর্খ ও জ্ঞানী লােকের বর্ণনা করা হইয়াছে। ঋটির মর্মার্থ এই যে, কেহ কেহ বাক্যকে দেখে, অথচ দেখে না—কেহ কেহ বাক্যকে শােনে অথচ শােনার ফল পায় না। এই জন্য কেহ শুনাইলেও সে তাহার অর্থ বুঝিতে পারে না। কাময়মানা রমণী যেমন সুবস্তুদ্বারা অলঙ্কত হইয়া, আপনার পতির নিকট দেহ সমর্পণ করে; সেইরূপ বাক্য সকল এই দুই প্রকার লােক ভিন্ন আর এক প্রকার লােকের নিকট আপনার দেহ ও মূর্তি সমর্পণ করে না। এখন দেখা যাইতেছে যে, একই ঋকে একই প্রসঙ্গে ‘বাক্যের দর্শন ও শ্রবণ যখন দুইটী অর্থ প্রয়ােগ আছে, তখন দর্শন শব্দে পুস্তক লিপিরূপে দর্শন ভিন্ন অন্য কি অর্থ হইতে পারে ? দ্বিতীয় ঋক্‌টী হইতে স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে যে, রাহু নিজের ছায়া দ্বারা সূৰ্য্যকে বিদ্ধ করিলে যে বেধ হয়, তাহা আত্রেয় ঋষি অবগত ছিলেন। অবশ্য অন্য ঋষি জানিতেন না। অত্রি-গােত্রীয় ঋষিগণ গ্রহ-গণনার আদি গুরু ছিলেন। যে ঋষিরা গ্রহ-গণনা করিতে পারিতেন, তাঁহারা যে লিখিতে পারিতেন না, একথা কে বিশ্বাস করিবে ?

রামায়ণ-যুগের ভারত। তৃতীয় ঋটি আৰ্যদিগের জ্যোতিষ জ্ঞানের একটি জ্বলন্ত নিদর্শন। যাহারা জ্যোতিষ জানিতেন, তাহারা যে লিপি জানিতেন না, ইহা নিতান্ত অসম্ভব”।১ রামায়ণেও এক স্থলে লিপি বিদ্যমানতার প্রমাণ পাওয়া যায়। রামায়ণে লিখিত আছে যে, হনুমান্ সীতাদেবীকে রামের নামাঙ্কিত অঙ্গুরী প্রদর্শন করেন। সুতরাং কেমন করিয়া বলিব যে রামায়ণী- যুগে ভারতে লিপিজ্ঞান ছিল না ? রামায়ণ পাঠে জানিতে পারা যায় যে, তৎকালে ভারতে বেদের প্রতি সাধারণের সমধিক শ্রদ্ধা ছিল। অযযাধ্যা বর্ণনাপ্রসঙ্গে অযােধ্যা- বাসীর পরিচয় দিবার কালে কবি বলিয়াছেন যে, অযােধ্যাবাসী বেদপাঠ নিরত ও সত্যবাদী। ইহার দ্বারা বুঝিতে হইবে যে, যে শক্তিমান পুরুষের আবির্ভাবে বৈদিক ক্রিয়া কৰ্ম্ম লােপ পাইয়াছিল, তখনও সেই অহিংসাবাদী বুদ্ধদেব ও তৎপ্রচারিত বৌদ্ধধর্ম ভারতে দেখা দেয় নাই। রামায়ণে বহু স্থানে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হইতে দেখিয়া নিঃসন্দেহে বলিতে পারা যায় যে, ভারতে তখন বর্ণাশ্রম সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। * ভারতীয় আর্য্যগণের জ্যোতিষ সম্বন্ধে গভীর জ্ঞানের কথা ইংরাজগণও স্বীকার করিতেছেন। তাঁহারা বলেন যে, বেদের বহু ঋকের জ্যোতিযিক ব্যাখ্যা আছে। কেহ কেহ বা বেদের ইন্দ্রকে personification of the sumaier solstice বলিয়াছেন। See "Ancient ("alandars." ১। সাহিত্য ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা পৃঃ ৬৫০। যাঁহারা লিপির প্রাচীনতা সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ জানিতে চান, তাঁহাদিগের পক্ষে উক্ত প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। ২। বানবােহহং মহাভাগে দূতত রামস্য ধীমতঃ। রামনামাঙ্কিতূঞ্চেদং পশ্য দেব্যঙ্গুরীয়ক। (সুন্দরকাণ্ড ৩৬২) রামায়ণী সভ্যতা ও সমাজ। ২৭ রামায়ণযুগের ভারতের সমধিক আর্থিক উন্নতি সাধিত হইয়া থাকিবে। শিল্প, বাণিজ্য ও সুসভ্য জনপদের কথা পাঠ করিয়া, মনে এই বিশ্বাসই বদ্ধমূল হয়। নানা তােরণবিভূষিত প্রাসাদাদি নির্মাণােপ- যােগী শিল্পাদির বিবরণ বিস্তারিতভাবে পরবর্তী পরিচ্ছেদে বর্ণিত হইয়াছে। ঐ সব কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিবার জন্য বহুতর শিল্পীর প্রয়ােজন। তাহাদিগের শিক্ষাপ্রণালী কিরূপ ছিল, এবং এখনকার ন্যায় শিক্ষা সুগম করিবার জন্য তখন কোন সুব্যবস্থা ছিল কি না জানিবার উপায় রাময়ণে দেখিতে পাওয়া যায় না, সাময়িক সাহিত্যেও সে কথা মীমাংসিত হয় নাই। অতীতের কুঙ্কটিকা অপসৃত করিয়া, জ্ঞান-বত্তিকা-হস্তে উপস্থিত হইয়া, যে ঐতিহাসিক আমাদিগের অজ্ঞানতা সর্বপ্রকারে দূর করিয়া, অতীত ভারতের জ্যোতির্ময়ী মূর্তি আমাদিগের চক্ষের সমক্ষে উপস্থাপিত করিবেন, দুঃখের বিষয় বাঙ্গালার সাহিত্য-আসরে আজও তিনি দেখা দেন নাই। যতদিন তাহার আগমন সূচিত না হয়, ততদিন ভারতের ইতিহাসের আশা বিড়ম্বনা। ভারতবর্ষ দুইভাগে বিভক্ত। উত্তর ভাগ আৰ্য্যাবৰ্ত্ত ও দক্ষিণ ভাগ দাক্ষিণাপথ। আৰ্যেরা প্রথমে আর্যাবর্তে আসিয়াই বাস করেন। নমু আৰ্যাবর্তের সীমা নির্ধারণ করিয়াছেন।* রামায়ণের সময়ে আর্য্যগণ আর্যাবর্তে আপনাদিগের শাসন প্রতিষ্ঠিত করিয়া, উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিলেন, রামায়ণে তাহার সঙ্কেত আছে। * আসমুদ্ৰা বৈ পূৰ্বাদাসমুদ্ৰাত্ত পশ্চিমাৎ। তয়ােরেবান্তর গিয্যোরায্যাবর্তং বিদুৰ্বধা । ১। শঙ্করশ্বশুরো নামা হিমবানিতি বিশ্রুতঃ। বিন্ধ্যপর্বতমাসাদ্য নিরীক্ষেতে পরস্পর। তয়ােমধ্যে সমভবৎ যজ্ঞস্য পুরুষােত্তম । আদি ৩৪-৫।

২৮ রামায়ণ-যুগের ভারত। রামায়ণে দেখিতে পাওয়া যায় যে, কৈকেয়ী বেদোক্ত তেত্রিশটি দেবতার নামে দশরথকে শপথ করান। বেদে দ্বাদশজন আদিত্য, একাদশ রুদ্র, অষ্ট বসু, ও অশ্বিনী কুমারদ্বয়—এই তেত্রিশ দেবতার উল্লেখ আছে।* ইহাতে বােধ হয় বেদের ও রামায়ণের দেবতা একই, পুরাণােক্ত অসংখ্য দেব-দেবীর কল্পনা তখন পরিকল্পিত হয় নাই। এই খানে একটী ঐতিহাসিক সমস্যা সমাধান করা উচিত। কৈকেয়ী বৈদিক দেবতাগণকেই শ্রদ্ধা দেখাইলেও, রামায়ণের পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন যে, ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের কথা রামায়ণে দেখা যায়। ঐতিহাসিকগণ স্থির করিয়াছেন যে, পৌরাণিক যুগে উক্ত দেবতাত্রয়ের জন্ম। সুতরাং স্বীকার করিতেই হইবে যে, উক্ত দেবতায়সংশ্লিষ্ট যে সকল গল্প রামায়ণে স্থান পাইয়াছে, তাহা পরবর্তী প্রক্ষিপ্ত রচনা। রামায়ণের এক স্থানে বুদ্ধমতের উল্লেখ দেখা যায় ; যথা- যথা হি চৌরঃ স তথাহি বুদ্ধ- থাগত নাস্তিক বিদ্ধি। তদ্ধি যঃ শ্যতমঃ প্রজানা স নাস্তিকে নাভিমুখাে বুধঃ স্যাৎ | (অযাে ধ্যা ১০৯৩৪) “চোর যেরূপ দণ্ডাহ, বুদ্ধমতানুসারী তথাগত নাস্তিক এবং আপনিও সেইরূপ দণ্ডাহঁ জানিবেন। প্রজাগণের বুদ্ধি পরিশুদ্ধির জন্য নাস্তিক দণ্ডিত করা রাজার কর্তব্য। পণ্ডিত ব্যক্তি নাস্তিকের সহিত আলাপ, করে না”। ইহা যে সংঘােজন তাহাতে আর সন্দেহ নাই। রামায়ণযুগে ভারতে মূর্তিপুজা প্রবর্তিত হয় নাই। কেবল উত্তর- কাণ্ডের এক স্থলে শিবপূজার উল্লেখ আছে। । ঋগ্বেদে (৩৯৯) ৩৩৩৯-দেবতার কথা আছে। সায়ণ ইহার ব্যাখ্যায় বলেন যদের দেবতা কেবল ৩৩ জন, ৩৩৯ সংখ্যা সঁহাদিগের মহিমা মাত্র।

রামায়ণযুগের শিল্প। উপরিলিখিত বিষয়গুলি হইতে বুঝিতে পারা যায় যে, রামায়ণযুগে ভারতের সামাজিক অবস্থা বৈদিক অবস্থারই অনুরূপ ছিল। কিন্তু তখন সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক উন্নতি বলিতে যাহা বুঝাইত, বিংশ শতাব্দীর তুলনায় তাহা নিতান্ত নিকৃষ্ট ছিল না, প্রত্যয়ের খাতিরে একথা স্বীকার করিতেই হইবে। রামায়ণযুগের শিল্প। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস আলােচনার ফলে প্রাচীন ভারতে গৌরব-কাহিনী ক্রমশঃ প্রচারিত হইয়া পড়িতেছে। ইহারই ফলে অধঃপতিত ভারতের কথা বিশিষ্টগণ আলােচনা করিয়া বলিতেছেন যে, ভারতের সংস্কৃত ভাষা গ্রী সাহিত্য অপেক্ষা অনেকাংশে কৌতুহল উদ্রেক করিতে সমর্থ। (১) আবার এমন কথাও কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, এই ভারতবর্ষই মানবজাতির আদি বাসভূমি। (২) ভারতভূমির আৰ্যগণের করত জ্ঞানবর্তিকা-নিঃসৃত আলোক-ধারাই পৃথিবী-পৃষ্ঠে ছড়াইয়া পড়িয়া পৃথিবীকে জ্ঞানালােকে উদ্ভাসিত করিয়াছে। (৩) ফল কথা – ভারত যে একদিন সভ্যতার উচ্চতম গ্রামে অধিষ্ঠিত হইয়াছিল, সে (..) What can India teach us by Max Muller. (২) The Bible in India. (৩) শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় তাহার জাতীয় ইতিহাসের বৈশ্যখণ্ডে দেখাইয়াছেন যে, ভারতীয় বণিকগণই বাবিল, আসিরিয়া, ইজিপ্ত প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্যব্যপদেশে গমনাগমন করিবার কালে ভারতীয় ধর্ম ও সভ্যতা বিস্তার করেন এবং তাহারই ফলে অতি প্রাচীনকালে ঐ সমুদায় স্থান সুসভ্য জনপদ বলিয়া গণ্য হইতে সমর্থ হয়।

রামায়ণ-যুগের ভারত। বিষয়ে বিশিষ্টগণের মধ্যে কোন মতভেদ নাই। কিন্তু সেই গৌরবময় দিনের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে সকলে এখনও একমত হইতে পারেন নাই। অনেকে সেই গৌরবের দিনকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত টানিয়া লইয়া যান ; আবার কাহারও বা বিশ্বাস যে, সৃষ্টির প্রথম দিন হইতেই ভারতীয় আৰ্য্যগণ জ্ঞান ও সভ্যতার পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া গিয়াছেন। পক্ষান্তরে কোন কোন য়ুরােপীয় পণ্ডিতগণের মতে গ্রীকদিগের ভারতে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবাসিগণ বিজেতৃগণের সংস্পর্শে আসিয়া উচ্চতর জ্ঞান ও সভ্যতার অধিকারী হন। ইহার পূৰ্বে আৰ্য্যগণ একরূপ সভ্য ছিলেন; কিন্তু নূতন আদর্শের নিকট সে সভ্যতা-আৰ্যসভ্যতা নিতান্তই নগণ্য বলিয়া বিবেচিত হইবার যােগ্য। আমাদিগের দুরদৃষ্ট যে বৌদ্ধযুগের পূর্ববর্তী কোন ঘটনাই জোর করিয়া বলিবার উপায় নাই। কিন্তু তথাপি এই উক্তির অসারতা প্রতিপাদন করা কঠিন নহে। গ্রীগণের নিকট হইতে হিন্দুগণ উন্নতিবিধায়ক কোনরূপ সাহায্য লাভ করিয়াছেন, তাহা বিশ্বাস করিবার পক্ষে কল্পনাপুষ্ট জনশ্রুতি ব্যতীত কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই ; (৪) বরং যে গ্রীকৃগণ বহুকাল ভারত অবস্থানের পরও আপনাদিগের প্রভুত্ব-পরিচায়ক কোন নিদর্শনই রাখিয়া যাইতে পারেন নাই, তাহারা ভারতবাসীর সভ্যতার উপর কোন কালেই যে কোনরূপ আধিপত্য স্থাপন করিতে সমর্থ হন নাই, এরূপ বিশ্বাস করিবার যথেষ্ট হেতু আছে। (৫) আমরা দেখাইব যে, রামায়ণযুগে যেরূপ শিল্পাদির কথা (%) The Indo-Aryan Vol I. P. 10. রাজেন্দ্রবাবু বলেন I venture to question the fact that no authentic stone building has been met with of an age anterior to the time o Asoka. (e) Asoka by V Smith.

রামায়ণ-যুগের শিল্প। শুনা যায়, তাহাতে সেই প্রাচীন রামায়ণীযুগেও তঁাহারা উন্নতির পথে যথেষ্ট অগ্রসর হইয়াছিলেন। আদিম মনুষ্য-সমাজ অরণ্যে হিংস্র পশুদিগের সহিতই বাস করিত। ক্রমশঃ মনুষ্যজাতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাহারা বন কাটাইয়া দলবদ্ধ হইয়া বাস করিতে শিখিয়াছে। তারপর যে স্থানে দিবালােকেও হিংস্র পশুগণ নিঃশঙ্ক বিচরণ করিত, আজ তাহাদের বদ্ধিবলে সে স্থানে বৈদ্যুতিক আলােক উদ্ভাসিত প্রশস্ত রাজপথ ও সুরম্য হৰ্ম্ম-শশাভিত বিপণী শ্রেণী শােভা পাইতেছে। কিন্তু এই উঠি এক দিনে হয় নাই। মনুষ্যের বুদ্ধি পরিপক্ক হইতে কত যুগ কাটিয়া গিয়াছে ইতিহাস তাহার আলােচনা করিতে যাইয়া শান্ত হইয়া পড়ে। সাধারণের বিশ্বাস যে রামায়ণযুগেও, ভারতীয় আর্য্যগণ ইষ্টক প্রস্তরের ব্যবহার জানিতেন না। (৬) তখনও তাহারা সামান্য মৃন্ময় কুটীর নির্মাণ করিয়া বাস করিতেন। দশরথের রাজ প্রাসাদ সামান্য কুটীর ব্যতীত আর কিছুই হইতে পারে না। ইহার চারিধারে কোনরূপ প্রাচীর ছিল না। সুদীর্ঘ বংশদণ্ডের সাহায্যে- রক্ষিত কুটীর পানির মধ্যে দশরথ পরিবার সহ বাস করিতেন। (৭) ফাগুসান সাহেব এই মতই সমর্থন করিয়াছেন। এসম্বন্ধে তাহার উক্তি পাদটীকায় উদ্ধত করিয়াছি ; তাহার মর্ম এই যে, দশরথের রাজত্ব কালেও ভারতবাসিগণ প্রস্তরাদির ব্যবহার জানিতেন না, তাহার প্রমাণ যথেষ্ট আছে। এই সময় হইতে মাটি ছাড়িয়া প্রস্তরগৃহ নির্মিত হয়। (৮) তাহার স্থির বিশ্বাস যে হিন্দুগণ ইষ্টকগৃহ নির্মাণবিদ্যা ব্যাকটেরিয়ান (U) See Ancient and Madi, ivul India Vol I. P. 395. (9) History of India by Wheeler. (b) It is a well-anthenticated example of his ( Dasarath's ) reign, and, though cut in granite rock, every form, every detail, is copied from some wooden original, showing that at the time it was ৩২ রামায়ণ-যুগের ভারত। গ্রীদিগের নিকট হইতে শিক্ষা করেন। (৯) তাহার মতে অশােকের রাজত্বকালে স্থপতি বিদ্যার আলােচনা ও উন্নতি সাধিত হয়। সেই সময় হইতেই ভারতে এই বিদ্যার সমধিক প্রচলন আরব্ধ হয়। (১০) কিন্তু কনিংহাম ও রাজেন্দ্রলাল প্রমুখ পণ্ডিতগণ এই উক্তির অসারতা দেখাইয়া গিয়াছেন। পূৰ্বপক্ষ যে কারণ বশতঃ ভারতবাসীকে গ্রীকদিগের নিকট স্থপতি বিদ্যার জন্য ঋণী করেন, তাহা সংক্ষেপতঃ এই- বৌদ্ধযুগের পূর্ববর্তী কোন প্রস্তরনিৰ্ম্মিত অট্টালিকাদির অদ্যাপি সন্ধান পাওয়া যায় না। যে সময় হইতে ভারতবাসিগণ গ্রীকৃগণের সংস্রবে আসেন, সেই সময় হইতেই ভারতবাসিগণ কর্তৃক প্রস্তরাদি সংযােগে গৃহাদি নির্মাণের পরিচয় ইতিহাস হইতে পাওয়া যায়। সুতরাং ইহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে যে, হিন্দুগণ আলেকজান্দারের ভারত আক্রমণের পর হইতে ভারতীয় গ্রীকদিগের নিকটে স্থপতিবিদ্যা শিক্ষা করেন। কিন্তু ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল দেখাইয়াছেন যে ভারতে গ্রী আগমনের পূর্বেও প্রস্তর-খােদিত গুহামন্দিরের একান্ত অভাব নাই। ভুবনেশ্বরের নিকটবর্তী উদয়গিরির গুহাগুলি নন্দবংশীয় নৃপতিগণের শাসনকালে খােদিত হইয়াছিল, ইহা তিনি প্রমাণ প্রয়ােগে প্রচার করিয়াছেন। (১) পুরাতন রাজগৃহ হইতে আনীত জরাসন্ধুর ‘বৈটক’ executed, stone-architecture was unknown in India and men were only beginning to think of a more durable material-Lecture on Indian Architecture P.9, (a) The Indians learnt this art from the Bactrian Greeks History of Architecture P, 171. (.) It cannot be too strongly insisted upon or too often repeated that stone-architecture commences with the age of Asoka (B. C. 250)-Tree and Serpent worship p. 77, (>) Antiquities of Orissa Vol P. II. 78.

রামায়ণ-যুগের শিল্প।
দেখিয়া, কনিংহাম সাহেব অনুমান করেন যে, হিন্দুগণ অন্যূনপক্ষে
খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রস্তরের ব্যবহার জানিতেন। (১২)
ইহা অপেক্ষা প্রাচীনতর যুগেও যে আর্যগণ পুরাদি নিৰ্মাণ করিয়া
বাস করিতে জানিতেন, সে বিষয়েও প্রমাণের অভাব নাই।
উইশন
সাহেব তাঁহার ঋকবেদের অনুবাদ গ্রন্থ হইতে
স্বপত্য প্রভৃতি
দেখাইয়াছেন যে, ঋকবেদে প্রস্তরনিৰ্ম্মিত গৃহাদি ও
সুরক্ষিত নগরের যথেষ্ট উল্লেখ দেখিতে পাওয়া
(১৩)
বস্তুতঃ ঋকবেদের সময়েও আৰ্যেরা রাজা পুরপতি গ্রামণী প্রভৃতি
উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। (১৪) সেই প্রাচীন যুগেও আৰ্য্যগণ
গ্রাম ও নগরের মধ্যে পার্থক্য বেশ বুঝিতেন। পুরপতি সহস্র নগরের
উপর রাজত্ব করিতেন। (১৫) ইহা হইতেই বেশ বুঝিতে পারা যায় যে,
তৎকালে নগর ও গ্রাম স্বতন্ত্র ছিল। এসম্বন্ধে বিশ্বকোষ হইতে একাংশ
উদ্ধত হইল :-
“তঁাহারা লৌহনিৰ্মিত নগর, (৭৩৭, ১৫|১৪) প্রস্তরনির্শিত শত
সংখ্যক পুরী, (৪৩২১) সহস্র দ্বার ও সহস্র স্তম্ভবিশিষ্ট গৃহ (১১১৩৪)
নিৰ্মাণ করিতেন। উৎকৃষ্ট গৃহ ও সামান্য কুটীর ( ১১০১৮) ও শতদ্বার
বিশিষ্ট যন্ত্রগৃহ (১৫১৩) প্রভৃতি তাহারা অবগত ছিলেন। ইষ্টকাদি দ্বারা
(32) Archäological Survey Report III. P. 142-3.
Canningham সাহেবের কথা এই To the Aryans belong the
Stone-Walls of old Rajagriha or Kusagarapur, the capital of
Bimbisara as well as the Jarasandha-ka-Baithak and the Bimbhar
and Sobhandar Caves, all of which date certainly as early as
B. C. 5oo.
(30) Wilson's Rig Veda 111. P. XIV.
(১৯) বিশ্বকোষ—আৰ্যশ দ্রষ্টব্য।
(se) Wilson's Rig Veda 1. 127.

৩৪ রামায়ণ-যুগের ভারত। তাহারা গৃহাদি নির্মাণ করিতে পারিতেন। (বাজসেন ১৩৩১), যাতায়াতের সুন্দর রাস্তা ( ঋক্ ১৫৮১) ও দুর্গম পার্বত্যদেশে সুগম পথ নিৰ্মাণ করিতেন”। (১১১৬২০) মুয়র সাহেব অনুমান করেন যে, বেদে দেবােদ্দেশে উক্ত হাদি অর্থ- বােধক বাক্যগুলি অলঙ্কাররূপে (Figuratively) ব্যবহৃত হইয়াছে। (১৬) কিন্তু তিনি স্বীকার করিয়াছেন যে, বেদের ঋষিণ নিশ্চয়ই হৰ্মাদির সহিত পরিচিত ছিলেন ; নতুবা শুধু কল্পনাবলে কখনই এরূপ অলঙ্কার ব্যবহার করিতে পারিতেন না। (১৭) সুতরাং আৰ্য্যগণ অতি প্রাচীনকালে যে এই স্থপতি বিদ্যার সহিত পরিচিত ছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কোন সুপ্রাচীন যুগে ভারতে ইহার সূত্রপাত হইয়াছিল, তাহা সঠিকরূপে বলিতে না পারিলেও, ইহা বেশ জোরের সহিত বলিতে পারা যায় যে, ভারতীয় আর্য্যগণের হৰ্ম ও গুহানিৰ্মাণপদ্ধতি অদ্ভুত ; ইহার সহিত গ্রীসিয় বা আসিরিয় প্রথার কোন সাদৃশ্য নাই। আৰ্য্যগণ কাহারও নিকট এবিদ্যা শিক্ষা করেন নাই। কোথা হইতে এই বিদ্যা ভারতে প্রচারিত হইল ঐতিহাসিকগণ এখনও তাহার সন্ধান পান নাই। (১৮) এক্ষণে দেখা যাউক - রামায়ণযুগে ইহার কি প্রকার উন্নতি সাধিত হইয়াছিল। আমাদিগের বিশ্বাস রামায়ণযুগেই এই বিদ্যার চরম উন্নতি সাধিত হয়। রামায়ণের নানা স্থানে যেরূপ হাদির উল্লেখ দেখা যায়, তাহাতে বেশ বুঝিতে পারা যায় যে, তৎকালে অযযাধ্যা নগরী বর্তমান সময়ের কোন বিশিষ্ট নগরী হইতে কোন অংশে নূন ছিল না। আমরা অন্যত্র দেখাইব যে, রামায়ণে সুরম্য হশ্রেণী-পরিশােভিত প্রশস্ত রাজপথের (১৬) Sanskrit Text V. 451. (১৭) ibid V. P. 455. (36) Indo Aryan Vol. I. P. 35.

রামায়ণ-যুগের শিল্প। কথা পড়িতে পড়িতে মনে হয় যেন রামায়ণের কবি বর্তমান যুগের কোন সুসভ্য নগরীর চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন। সমস্ত অযােধ্যা নগরী রামের অভিষেক বাৰ্তা শ্রবণ করিয়া আনন্দ-স্রোতে ভাসমান। কেবল সেই বার্তা মৰ্ম্মবিদ্ধ শলাকার ন্যায় একজনকে ব্যথা দিতেছিল। তাহার দুষ্ট-বুদ্ধি-প্রসূত ষড়যন্ত্রে রামচন্দ্রের সৌভাগ্য আকাশকুসুমে পরিণত হইয়াছিল। বিদ্বেষ-উদগীরিত কৃষ্ণ মেঘ তাহার সৌভাগ্য-সূৰ্য্যকে কবলিত করিয়া ভবিষ্যতের পশ্চাতে এক করুণ অভিনয়ের সূত্রপাত করিতেছিল। এই সময়ে আমরা রাজ- প্রাসাদের একদিককার (Side picture ) চিত্র দেখিতে পাই। এই উৎসবের দিনে মন্থরার শান্তি নাই। সে রাজ-অট্টালিকার দ্বিতল-সংলগ্ন প্রকোষ্ঠের গবাক্ষ দ্বার দিয়া আনন্দস্রোতে ভাসমান প্রজামণ্ডলীকে দেখিতেছে। প্রশস্ত রাজপথ উৎসবের কোলাহলে মুখরিত। তাহার সে দৃশ্য ভাল লাগিল না। এই বর্ণনা পাঠ করিয়াই মনে কেমন সন্দেহ উপস্থিত হয়; মনে হয় দশরথের বাসভবন তবে ত প্রকৃতই মৃন্ময় কুটীর হইতে পারে না। তার পর অবােধ্যা বর্ণনা পাঠ করিয়া বেশ বুঝিতে পারা যায় যে ইহা কেবল তথাকথিত ঐতিহাসিকগণের রচা কথা। আমরা নিমে সংস্কৃত রামায়ণ হইতেমহাকবি-বর্ণিত অঘােধ্যার চিত্র উদ্ধত করিলাম। কোশলাে নাম মুদিতঃ স্ফীতােজনপদো মহান্ । নিবিষ্টঃ সর তীরে পশু-ধাধনৰ্দিমান্। অযােধ্যানাম তাসীন্নগরী লােকবিতা। মনুনা মানবেণে পুরৈব পরিনিৰ্মিতার আয়তা দশ চ দে চ যােজনানি মহাপুরী। শ্রীমতি ত্ৰীণি বিস্তীর্ণা নবসংখ্যান-শােভিতা। অবিভক্তান্তরদ্বারা সুবিস্তীর্ণ-মহাপথা।

{
রামায়ণ-যুগের ভারত।
শশাভিতা রাজমার্গেণ জলসংশান্তরেণুনা।
নানা বণিজনােপেত নানারত্নবিভূষিতা।
মহাশলাবৃতদুর্গা উদ্যানবনশােভিতা।
দুর্গগম্ভীরপরিখা নানায়ুধ-সমন্বিতা।
কবাটতােরণযুধা উপেতা ধনিভিঃ সদা ।
রাজা দশরথাে নাম মহাত্মা রাষ্ট্রবর্ধনঃ ।
তাং পুরীং পালমাস স্বপুরীং মঘবানিব ।
বৃহদ্বারপ্রতােলিকাং সুবিভক্তান্তরাপণাম্।
নানাযন্ত্ৰায়ুধবতীং নানাশিল্প-গুণান্বিতাম্।
শতন্নীপরিখােপেতামুচ্ছিতধ্বজততারণা।
হস্ত্যশ্বরথসম্পূর্ণাং নানানসমাকুলাম্।
নানাপথিকদুতৈশ্চ বণিগুভিশ্চোপশােভিতাম্।
দেবতায়তনৈশ্চৈব বিমানৈৰিব শােভিতাম্।
সভােদ্যানপ্রপাভিশ্চ রুচিরাভিরলঙ্কৃতাম্।
প্রবিভক্ত-মহাহাং নরনারীগণান্বিতাম্।
বিদ্বদ্ভিৱাৰ্যপুৰুষৈরাকীৰ্ণামমনােপমৈঃ।
আবােহমিব রত্নানাং প্রতিষ্ঠানমিব শিয়ঃ ।
মহাপ্রাসাদশিখরৈঃ শৈলাগৈরিব ভূষিতাম্।
বিমানশতসধামিবােমরাবতীম্।
অষ্টাপদপদালিখৈরম্যামালিখিতামিব।
নানারচয়েশ্চিত্ৰাং ধন-ধান্যসমন্বিতাম্।
অবিচ্ছিন্নান্তরগৃহাং সমভূমিনিবেশিতা।
মৃদঙ্গবেণুবীণানাং রমৈঃ শবৈর্নিনাদিতাম্।
উপরি উদ্ধত বর্ণনাপাঠে কাহার মনে আৰ্যগণের স্থপতি বিদ্যালােচনা

রামায়ণ-যুগের শিল্প। বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকিতে পারে না। “তােরণ” “হ” “দেবায়তন “প্রাসাদ প্রভৃতি সংস্কৃত বাক্যগুলি কখনই মৃন্ময় কুটীরের প্রতি প্রযােজ্য হইতে পারে না, একথা সংস্কৃতবিদগণের অবিদিত নাই। তথাপি যদ্যপি ঐতিহাসিকের কথায় বৌদ্ধযুগের পূর্বে ভারতে স্থপতিবিদ্যানভিজ্ঞতা স্বীকার করিয়া লইতে হয়, তবে যে পরিমাণ যুক্তিতর্কের প্রয়ােজন আছে, ইংরাজ ঐতিহাসিক হুইলার সাহেব সে পরিমাণ যুক্তিতর্ক প্রদর্শন করিতে পারেন নাই। আলেকজান্দারের ভারত আক্রমণের পূর্বে ও রামায়ণযুগের কিঞ্চিৎ পরে, ভারতে যে স্থপতি বিদ্যার যথেষ্ট উন্নতি হইয়াছিল, বৈদেশিক ঐতিহাসিকগণের গ্রন্থে সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেখিতে পাওয়া যায়। (১৯) ভারত আক্রমণকালে আলেকজান্দার বহুতর ইষ্টক প্রাচীর-পরিক্ষিত নগরী দখিয়াছিলেন। (২০) এই সব বিষয়ের আলােচনা করিয়াই বােধ হয় পরবর্তী কালে Burgess সাহেব বলেন যে “But we do not even say that the Hindus had no stone buildings before the time of Alexander ; but we say we know of none" আলেকজান্দারের পূৰ্ব্বে হিন্দুদের প্রস্তর নির্মিত অট্টালিকা ছিল না, একথা বলিনা ; আমরা কোন অট্টালিকার সন্ধান পাই নাই, এই কথাই বলিতে চাহি।” (২১) বার্জেস সাহেবের এই উক্তির সহিত এক মত হইতে পারি। তিনি এই মত প্রচার করিয়া ধীরতা ও সত্যানুসন্ধিৎসুতার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। r (9) Indo Aryan Vol1 P. 44. (20) Rooke's Arrian Vol II. (MI) Bombay Review, March 1880. P. 214.

রামায়ণ-যুগের ভারত। সুপ্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থাদি ও পুরাণাদিতে আমরা এক দানবের নাম দেখিতে পাই। তিনি এক অদ্বিতীয় শিল্পী। তাঁহার উদ্ভাবনী শক্তির নিকট দেবগণও পরাভব স্বীকার করিতেন। তাহার নাম ময়— সাধারণতঃ ময়-দানব নামে পরিচিত। কথাসরিৎসাগর হইতে, (২২) জানিতে পারা যায় যে, অনাৰ্য ময় স্বীয় সম্প্রদায় পরিত্যাগ করিয়া আৰ্য- দিগের শরণাগত হন এবং পরে তাঁহাদের দ্বারা উৎসাহিত হইয়া ইন্দ্রের সভা নিৰ্মাণ করেন। তিনি ভারতের প্রথম শিল্পী ও যন্ত্রশাস্ত্রের প্রকৃত প্রবর্তক বলিয়া পুরাণাদিতে কীৰ্তিত হইয়াছেন। (২৩) রামায়ণে লিথিত আছে যে, তাহার নাম কন্যা মন্দোদরী। ময়দানব ঋষিকুলােৎপন্ন রাবণকে স্বীয় কন্যা সম্প্রদান করেন। (২৪) কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডে (৫০৫১ সর্গে) লিখিত আছে যে, বানরগণ সীতান্বেষণে চারিদিক পৰ্যটন করিতে করিতে ময়দানব-রক্ষিত ঋক্ষবিল নামক স্থানে উপস্থিত হয়। কবি-বর্ণিত তথাকার গবাক্ষশােভিত সপ্ততল গৃহ প্রভৃতির বর্ণনা পাঠ করিয়া ময়দানবের শিল্পনৈপুণ্যের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। এই ময়দানব কোন্ সময়কার লােক, তাহা নির্ধারণ করিতে পারিলে ভারতীয় শিল্পের উৎপত্তিকাল নির্ধারণ করা অনেকাংশে সহজ হইয়া পড়ে। ময়দানব শুধু শিল্পপ্রবর্তক নন। তিনি “ময়শিল্প” নামক একখানি শিল্পগ্রন্থ-প্রণেতা। স্থপতি বিদ্যাবিশারদ বিখ্যাত রামরাজ ময়শিল্পনামক সংস্কৃত পুথি দেখিয়া অনুমান করেন যে,ময়দানব রামায়ণযুগের লােক (২৫) রামায়ণে ময়দানবের সম্বন্ধে লিখিত বর্ণনা হইতে উদ্ধত বর্ণনা পাঠ (২২) মদনম কালক—৩র তরঙ্গ। (২৩) প্রবাসী কাৰ্ত্তক ১৩১৮। (২৪) উত্তর কাণ্ড ১২ সর্গ। (25) Essay on the Architecture of the Hindus.

রামায়ণী সভ্যতা ও সমাজ। করিয়া, এই মতই সমীচীন বলিয়া বােধ হয়। তাঞ্জোর হইতে প্রাপ্ত ‘ময় শিল্প’ নামক পুথি দেখিয়া পণ্ডিতপ্রবর রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহাশয় স্পষ্টতঃ বলিয়াছেন যে, এই পুথি মহাভারতের বহুপূর্বে রচিত হইয়াছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। রামায়ণের পূর্বে আর কোথায়ও ময়শিল্পীর নামাে- ল্লেখ দেখা যায় না। সুতরাং তিনি যে রামায়ণযুগের লােক, এ' মত পােষণ করিবার যথেষ্ট ঐতিহাসিক যুক্তি আছে। স্থাপত্য সম্বন্ধে ময়দানবের মতই বহুকাল প্রাচীন ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া থাকিবে। আজও যেমন আমরা শিল্পের সহিত বিশ্বকর্মার নামােল্লেখ করিয়া, তাহার নৈপুণ্য বুঝাইয়া থাকি, সেইরূপ রামায়ণের পরেও অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগে যাবতীয় শিল্পনৈপুণ্য-প্রকাশক প্রাসাদা- দির নির্মাতৃরূপে ময়দানব পরিকীর্তিত হইয়াছেন। ইহাতে তাহার কৃতিত্বই প্রকাশ পাইতেছে মাত্র। অযযাধ্যা-বৰ্ণনা, স্বর্ণলঙ্কা-বৰ্ণনা প্রভৃতি রামায়ণের বহুস্থান পাঠ করিয়া বেশ বুঝিতে পারা যায় যে, আৰ্য্যগণ সেই প্রাচীনকালেও শিল্প বিষয়ে চরম উন্নতি সাধন করিয়াছিলেন। বর্তমান যুগে যে সমুদয় বিজ্ঞানসম্মত যন্ত্রের প্রচার করিয়া মুরােপ জগতের পূজ্য হইয়াছেন, তৎ-অর্থবােধক যন্ত্রের উল্লেখ রামায়ণে একাধিক স্থানে দেখা যায়। তথাপি যদি ইংরাজী স্কুলে পঠিত ইংরাজ ঐতিহাসিকের গ্রন্থ পাঠ করিয়া স্বীকার করিতে হয় যে, গ্রীকদিগের ভারতে পদার্পণের পুৰ্বে আৰ্য্যগণ মৃন্ময় কুটীরে বাস করিতেন, তবে আমাদের নিতান্তই বিড়ম্বনা বলিতে হইবে। পণ্ডিতগণ স্থির করিয়াছেন যে, একদিন আমাদের পূর্বপুরুষগণ পরিচ্ছদের ব্যবহার জানিতেন না, পশুচর্মে ভূষিত বদি হইয়া আতপতাপ নিবারণ করিতেন। সে কোন অতীত যুগের কথা, ইতিহাস তাহা স্পষ্ট বলিতে পারে না; পুরাণাদি ৪৩ রামায়ণ-যুগের ভারত। একটা সুপ্রাচীন যুগের আভাসমাত্র দেয়। কিন্তু যে মনুষ্য-সমাজের উদ্ভাবনী-শক্তিবলে প্রত্যহ কত নব তত্ত্বের প্রচার হইতেছে এবং বিজ্ঞানবলে প্রকৃতিদেবী কিঙ্করীর ন্যায় সাহচর্যে নিযুক্ত আছেন, সে মনুষ্য-জাতির অদ্ভুত বুদ্ধি তাহাদিগকে এই অবমাননার মধ্যে অধিক দিন অতিবাহিত করিতে দেয় নাই। প্রত্যুত, অতি প্রাচীন যুগ হইতেই ভারতে পরিচ্ছদের প্রচলন দেখা যায়। (১) ঋক্ সংহিতায় সূত্রের উল্লেখ দেখিয়া (২), পণ্ডিতগণ স্থির করিয়াছেন যে, আৰ্য্যগণ সেই প্রাচীন বৈদিক যুগেও পরিচ্ছদের ব্যবহার অবগত ছিলেন। সায়ন একটি স্তোত্রের ভাষ্যে লিখিয়াছেন যে, তন্তুবায়ের সূত্রগুলিতে ভাতের মাড় দেওয়া থাকে বলিয়া ইন্দুরেরা খাইতে ভালবাসে। সুতরাং ইহা হইতে অনুমান করা যাইতে পারে যে, সেই সুপ্রাচীন যুগেও কার্পাস হইতে বস্তুবয়ন-প্রণালী আবিষ্কৃত হইয়াছিল। (৩) কৃতপক্ষে সংহিতার এত অধিক স্থলে পরিচ্ছদের উল্লেখ দেখা যায় যে, সহজেই বুঝা যায়, প্রাচীনেরা তৎকালে বস্ত্রবয়নকৌশল সুচারুরূপে অবগত ছিলেন। এস্থলে সমুদায় মন্ত্রগুলি উদ্ধৃত করিলে, পাঠকের ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিতে পারে। তবে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের পক্ষে ইহা বলিলেই (1) Indo-Aryans Vol. I, P. 166, ২। মূযাে ন শিষ্ম ব্যদন্তি মাধ্যঃ স্তোতারতে শতক্রতা বিত্ত মে অস্ত যােদশী। (১৫৮) রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় ইহার এইরূপ অনুবাদ করিয়াছেন। মুষিক যেরূপ সূত্র দংশন করে, হে শতক্রতাে! আমি তােমার তোতা, দুঃখ আমাকে সেইরূপ দংশন করিতেছে। ৩। বিশ্বকোশ। কাপাস শব্দ দ্রষ্টব্য। ৪। এতদ্ব্যতীত ৩৩৯২, ১১৩৪৪ এবং ৫৪৭৬ খ্ৰীষ্টব্য। ৫৭৬ কােত্রে ‘ব্য পুত্রায় মাতম্নে বস্তি’ দৃষ্ট হয়।

। রামায়ণ-যুগের শিল্প। ৪১ যথেষ্ট হইবে যে, ঋক্‌সংহিতার ১১৪০১, ১১৫২১, ২১৪৩, ৯৮৬, ৯৯৬১ প্রভৃতি মন্ত্রগুলি আলােচনা করিলে বেশ বুঝা যায় যে, তৎকালে বেদী ও বঙ্গস্থানের আচ্ছাদন-বস্ত্রের বহুল প্রচার ছিল। অথৰ্ব্ববেদের মন্ত্রে বস্ত্রের উলেখ দেখা যায়। ভারতে এই বয়ন-বিদ্যার ক্রমােন্নতি সাধিত হইয়াছে। ভগবান্ মনু-রচিত স্মৃতিগ্রন্থে এই বয়নবিদ্যা ও বস্ত্রের উল্লেখ আছে। যে সময়ে কেবল লজ্জানিবারণােপযােগী পরিচ্ছদ ব্যতীত স্ত্রীলােকের অঙ্গ-সৌষ্ঠবের জন্য নানা অলঙ্কারবহুল পরিচ্ছদেরও প্রচলন হইয়া থাকিবে। সালঙ্কত। নববধূর কথা সংহিতার নানা স্থানে দৃষ্ট হয়। (৫) এই সব কথা আলােচনা করিলে অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, অতি প্রাচীন কাল হইতেই আৰ্য্যগণ বস্তুবয়নবিদ্যা আয়ত্ত করিয়াছিলেন এবং ভারতে পরিচ্ছদের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। (৬) এক্ষণে আমরা রামায়ণ-যুগে পরিচ্ছদ কিরূপ ছিল, তাহার আলােচনা করিব। রামায়ণযুগ হইতেই নানাবর্ণরঞ্জিত বিভিন্ন প্রকারের পরিচ্ছদের প্রভূত প্রচলন ঘটিয়াছিল, একথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বিশ্বমিত্রের সঙ্গে রাম-লক্ষ্মণ মিথিলা-নরপতি জনকের যজ্ঞভূমিতে উপনীত হইলে, সীতার সহিত রামের, এবং উৰ্মিলার সহিত লক্ষ্মণের উদ্বাহ নারী যাননি বং বাতে পাপা বাধােগতিং খ্রীধনানি তু তে মােহদুপজীবন্তি বান্ধবাঃ। কোন পাশ্চাত্য পণ্ডিত বলেন, No trace of linen cloth made from flax is to be found in Manu of any other earlier works of the Hindus, and it is probable that flax has never been made from the linseed plant for the manufacture of yarn. কিন্তু মনুসংহিতায় ‘সর্বঞ্চ তাস্তব রক্ত শাণ ক্ষৌমাবিকানি চ' প্রভৃতি চরণ পাঠ করিলে সে কথা যথার্থ বলিয়া মনে হয় না।

৪২
রামায়ণ-যুগের ভারত।
যথারীতি সম্পন্ন হয়। ইহাতে মিথিলাপতি বহুধনাদির সহিত সুসজ্জিত।
কন্যাকে রামচন্দ্রের হস্তে অর্পণ করেন। রামায়ণে-এরূপ বর্ণনা আছে।
যথা-
অথ রাজা বিদেহানাং দদৌ ধন বহু।
গবান্ শতসহস্রাণি বহুনি মিথিলেশ্বরঃ।
কম্বলানাঞ্চ মুখ্যানাম্ ক্ষৌম্যান্ কোট্যম্বরাণি চ।
হস্ত্যশ্বরথপদানাম্ দিব্যরূপম্ অলঙ্কৃতম্ ।
ইহার পর রাজবধুগণ অযােধ্যা-নগরীর সন্নিহিত হইলে কৌশল্যা, সুমিত্রা
প্রভৃতি রমণীগণ তাহাদের গ্রহণ করিতে গিয়া দেখিলেন যে, রেশমী বন্ত্রে
শশাভিতা হওয়াতে তাহাদের স্বভাব-সৌন্দৰ্য্য শতগুণে বর্ধিত হইয়াছে।
(৭) রামায়ণের নানাস্থানে এইরূপ নানাবর্ণের রেশমী পােষাকের উল্লেখ
দেখা যায়। গ্রিফিথ, সাহেবের অনুবাদ হইতে পাদটীকায় এই উক্তি
সমর্থক একাংশ উদ্ধৃত হইল।*
রামায়ণ ও মহাভারতের নানাস্থানে রেশমী বস্ত্রের উল্লেখ দেথিয়া
উইলস অনুমান করেন যে অতি প্রাচীন কালে, চীন দেশ হইতে রেশম
ভারতে প্রেরিত হইত। সুতরাং আৰ্য্যগণ যে সময় রেশমবস্ত্রের ব্যবহার
জানিতেন। (৯)
.
7. Gorresio's Ramayan, Part, I. P. 297.
৪. Griffith's Ramayan, Il. P. 270.
Go quickly hence, and with you bear
Fine silken vestures, rich and rare,
And gems and many a precious things
As gifts to Bharat and the king.
g. On the Productive Resources of India. P. 117.

রামায়ণ-যুগের শিল্প। ৪৩ রেশমবস্ত্র ব্যতীত অন্য প্রকারের পরিচ্ছদও প্রচলিত ছিল। রামায়ণ- যুগে ব্রাহ্মণগণ কৌষেয়বস্ত্র পরিধান করিতেন। (১০) অযযাধ্যাকাণ্ডে ৩৭ অধ্যায়ে শুভ্র বসনদ্বয় পরিত্যাগপূৰ্ব্বক রাম-লক্ষ্মণের চীরধারণের কথা আছে। রামায়ণের অন্যত্র আমরা দেখিতে পাই যে, সীতাদেবী ব্রাহ্মণ, গণকে উর্ণাদি দ্রব্যজাত নানাবর্ণের বস্ত্র প্রদান করিয়াছিলেন। (১১ রামায়ণের আদিকাণ্ডের ৭৭ অধ্যায়ে দেখা যায় যে, অযােধ্যাপতি দশরথ বধুচতুষ্টয়কে লইয়া স্বরাজ্যে প্রত্যাবৃত্ত হইলে, কৈকেয়ী প্রভৃতি রাজপত্নীরা ক্ষৌমবাস পরিধান করিয়া দেবালয়ে পূজা দিবার জন্য গমন করেন। এই সকল আলােচনা করিয়া জানা যায় যে, রামায়ণীয় যুগে শুরু, কষায়রঞ্জিত বস্ত্র এবং শুভকাৰ্যে ক্ষৌমবাসের প্রচলন ঘটিয়াছিল।” (১২) মহাভারতের সভাপৰ্ব হইতে যুধিষ্ঠিরের রাজসভায় আনীত রাজ- বর্গের উপঢৌকনের তালিকা পাঠ করিয়া বেশ বুঝা যায় যে, ভারতে বিভিন্ন জনপদ অতি প্রাচীন যুগেই কতিপয় শিল্পের জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। সেই সভায় হিন্দুকুশের নরপতি নানাকারুকার্যবিশিষ্ট রেশমী বস্ত্র এবং কর্ণাট ও মহীশূরপতি সূক্ষ্ম কার্পাসবস্ত্র পাঠাইয়াছিলেন। ইহা হইতে অনুমান করা যায় যে, পূর্ব হইতেই এই সকল স্থান উক্ত দ্রব্যের জন্য খ্যাতিলাভ করিয়া থাকিবে। (১৩) রামায়ণের মধ্যেও নানাপ্রকার পরিচ্ছদোপযােগী দ্রব্যের উল্লেখ দেখিয়া মনে হয়, ভারতীয় পরিচ্ছদের উন্নতি এই সময়েই সাধিত হইয়া থাকিবে এবং মহাভারতােক ১০। রামায়ণ-২৩২১৬ ২৫২৮৯ ১২। বিশ্বকোষ-বয়ন শব্দ দ্রষ্টব্য। 13. Journal of the Royal Asiatic Society, Vol. VII. P. 140, ৪৪ রামায়ণ-যুগের ভারত। কার্পাসবস্ত্র প্রভৃতির জন্য বিখ্যাত জনপদসমূহ এই সময় হইতেই উক্ত দ্রব্যসমূহের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করিয়া থাকিবে। রামায়ণীয় যুগে শিল্পাদির কতদুর উন্নতি সাধিত হইয়াছিল, তাহা আমরা ঠিক বলিতে পারি না। কিন্তু ইহাতে আৰ্যদিগের শিল্পভিজ্ঞতা- সম্বন্ধে হতাশ হইবার কোন কারণ নাই। (১৪) কারণ, রামায়ণীয় যুগের অব্যবহিত পরবর্তী যুগেই আমরা ভারতীয় শিল্পের আদর আশিয়া মাইনর প্রভৃতি স্থানে দেখিতে পাই। বাইবেলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, ভারত- বাসিগণ বস্ত্রাদি বয়ন করিয়া বিদেশে পাঠাইয়া দিত। (১৫) Heeren স্পষ্টতঃ বলিয়াছেন যে টায়ার ও বাবিলনে বিক্রয়ার্থ আনীত সুরঞ্জিত বস্ত্রাদি যে ভারতজাত তাহা সন্দেহ করিবার কোন হেতু নাই। (১৬) সুতরাং যখন পৃথিবীতে সভ্যতার রক্তিম ঊষালােক ছড়াইয়া পড়ে নাই, যখন অতি প্রাচীন সুসভ্য জনপদও অজ্ঞতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল, তখন ভারতীয় আৰ্য্যগণ জ্ঞানবর্তিকা হস্তে পৃথিবী ভ্রমণ করিয়া আলােক ছড়াইয়াছেন; সুসভ্য জনপদের অভাব দূর করিয়াছেন, বিদেশের লজ্জা দূর করিবার জন্য স্বদেশে সৌখীন বস্তু বয়ন করিয়া বিদেশে বিক্রয় করিয়াছেন। কিন্তু তথাপি তথাকথিত ঐতিহাসিকের ‘রচা’ কথা পড়িয়া যদি বিশ্বাস করিতে we ১৪, ঐতিহাসিক চিত্রে প্রকাশিত “রামায়ণের শিল্প প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। 15. Ezekiel, XXVII. 24, where read-These were thy merchants in all sorts of things, In blue clothes, and broidered work, And in chests of rich apparel, bound with cords, and made of cedar, among thy merchandise, 16. Heeren in his Historical Researches, III, P. 363 says "That the coloured cloth and rich apparel brought to Tyre and Babylon from distant countries were partly of Indian manufacture will scarcely be doubted."

- রামায়ণ-যুগের শিল্প। ৪৫ হয়, যে বৌদ্ধযুগের পরবর্তী যুগ হইতেই আৰ্যসভ্যতার সৃষ্টি হইয়াছে, তবে আমাদের ইতিহাস-পাঠ বিড়ম্বনামাত্র। (১৭) রামায়ণ-যুগে কি প্রকার (style) পরিচ্ছদের প্রচলন ছিল, তাহার আলােচনা করিয়া প্রবন্ধ শেষ করিব। আলেসন্দরের ভারতীক্রমণের সময় পর্যন্ত হিন্দুগণ ধুতি ও চাদর ব্যতীত অন্য সূচীব কোনরূপ পরিচ্ছদের ব্যবহার অবগত ছিলেন না, কোন কোন বিদেশীয় ঐতিহাসিক এ কথার প্রচার করিতে কোন কুণ্ঠা বােধ করেন নাই। জনসাধারণের ধুতি ও চাদর একমাত্র পরিচ্ছদ হইলেও, ইহা কখনই বিশ্বাস্য নয় যে, রাজগণ ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিসমূহ সৰ্ব্বসময়ে ধুতি ও চাদরমাত্র ব্যবহার করিতেন। (১৮) ঋক্ সংহিতায় সূচীকাৰ্যবিশিষ্ট বন্ত্রের উল্লেখ দেখা যায়। সে প্রাচীন যুগেও আৰ্য্যগণ বস্ত্র কাটিয়া সূচের সাহায্যে উচ্চ অঙ্গের পরিচ্ছদপ্রস্তুত প্রণালী অবগত ছিলেন। (১৯) যাহারা উড়িষ্যার দেবমন্দিরগাত্রে অঙ্কিত মুক্তির প্রতি লক্ষ্য করিয়াছেন, তাহারা অবগত আছেন, অধিকাংশ মূর্তিই নানাবিধ সুন্দর সুদৃশ্য পরিচ্ছদে সজ্জিত। উদয়গিরির রাণী-গুম্ফায় একটা মূর্তির গাত্রে বর্তমান সময়ােপযােগী চাপকান দেখিতে পাওয়া যায়। (২০) আমরা ভুবনেশ্বরের মন্দিরগাত্রে কতিপয় মূর্তির পাদদ্বয় চৰ্ম্মনির্মিত পাদুকায় আচ্ছাদিত দেখিয়াছি। কর্ণেল মেডােস্ টেলার সাহেব অজন্তার গিরিগাত্রে একটি মূর্তিকে গ্রীস দেশীয় সুন্দর পরিচ্ছদের ন্যায় বেশভূষায় ১৭। কোন কোন পাশ্চাত্য পণ্ডিত এই মত পােষণ, করেন, তাহা ইতিহাস পাঠকের অবিদিত নাই। i8, Indo-Aryan, Vol I, P. 177. 19. Wilson's Rig-veda 11. P, 28; and IV, P. 60. 20. A popular account of Manners and Customs of India, P, 520 ৪৮ রামায়ণ-যুগের ভারত। লেখনীমুখে এমন এক বিচিত্র চিত্র পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে যে ভারতের আবাল-বৃদ্ধবনিতা কাহারও নিকট সে ঘটনা অবিদিত নাই। এই পাদুকার কথা যে শুধু কবিকল্পনা নয় , একথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে। Arrian তাহার পুস্তকে এইরূপ পাদুকার স্পষ্টতঃ উল্লেখ করিয়াছেন। তাঁহার বর্ণনা পাঠ করিয়া আজও উড়িষ্যাপ্রদেশের পাদুকার কথা মনে পড়ে। (২৫) উপসংহারে বলা যাইতে পারে যে, আৰ্য্যগণ অতি প্রাচীন যুগে, শুধু যে আধ্যাত্মিক উন্নতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন তাহা নয়, পরন্তু য়ুরােপ আজি বসন ও ভূষণের যে মাপ কাটিকে সভ্যতার পরিমাপক বলিয়া মনে করেন,তাহার দ্বারাও প্রাচীন ভারতের সভ্যতা মাপিতে যাইলে তাহার স্থান অনেক উচ্চে দেখিয়া এবং প্রাচীনগণের সর্ববিষয়ে পারদর্শিতা লক্ষ্য করিয়া যুগপৎ বিস্ময়ে ও আনন্দে অভিভূত হইয়া পড়িতে হয়। 25. They, the Indians, wear shoes made of white leather and these are elaborately trimmed, while the soles are variegated and made of great thickness, to make the wearer seem so much taller. M'crindles Translation, Þ. 220.

জনপদ।
রামায়ণে অনেকগুলি জনপদের উল্লেখ দেখা যায়। নিম্নে তাহাদিগের
নাম উদ্ধৃত করিলাম -
১। বীক-ইংরাজ ঐতিহাসিকগণের মতে ইহারই আর একটা
নাম ব্যাকূটিয়া। বর্তমান সময়ে ইহা বক্সা নামে পরিচিত।
২। কথােজ—ইহা হিন্দুকুশের উত্তর। কালিদাসের রচনায় ইহার
উল্লেখ আছে। তাঁহার বর্ণনায় মনে হয়, ইহা হিমালয়ের উত্তরে অবস্থিত
ছিল।
৩। সুবীর-ইহা অতি প্রকাণ্ড জনপদ। রাজপুতনার দক্ষিণ
পশ্চিমে ইহা অবস্থিত ছিল।
৪। মৎস্য-কনিংহাম সাহেবের মতে রাজপুতনার অন্তর্গত জয়পুরের
অধিকাংশ পূৰ্ব্বে মৎস্যদেশ নামে পরিচিত ছিল।
৫। বিরাট-জয়পুর ইহতে ৪১ মাইল দূরে বিরাট রাজ্য অবস্থিত
ছিল।
৬। সঙ্কাশ-কনােজ হইতে ৩৩ মাইল দূরে অবস্থিত।
৭। বিদর্ভবর্তমান সময়ে বেরার ও বেদার বলিতে যে ভূখণ্ড
বুঝায়, পূর্বে তাহা বিদর্ভ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।
৮। ' ধৰ্ম্মরণ্য-মধ্য দেশের অন্তর্গত অরণ্য।
৯। বৈশালী-কনিংহাম সাহেব বলেন যে, গণ্ডক নদীর পশ্চিমে
বিশাড় নামক ক্ষুদ্র জনপদই প্রাচীন বৈশালী।
১০। হস্তিনাপুর-বর্তমান দিল্লী সহর হইতে ৫৭ মাইল উত্তর-পূর্বে
অবস্থিত ছিল।

রামায়ণ-যুগের ভারত। ১১। পঞ্চাল—থানেশ্বরের পূর্বে অবস্থিত ছিল। মহাভারতের সময়েই ইহার প্রসিদ্ধি ঘটে। ১২। মাল্যবৎ-ভবভূতির উত্তরচরিতে ইহার উল্লেখ আছে ; যথা-সােহয়ং শৈলঃ কবুত—সুরভি মাল্যবান্ নাম যস্মিন্। ডাউসন সাহেব বলেন যে, মালাবারের সন্নিকটে অবস্থিত পশ্চিমঘাট নামক শৈলের একাংশের নাম মাল্যবৎ। ১৩। মহেন্দ্ৰপৰ্বত- সম্ভবতঃ পূর্বঘাট পর্বতশ্রেণী । ১৪। বেদস্মৃতি-আরাবলী অঙ্গ—ইহার প্রাচীন রাজধানীর নাম চাম্পাপুর। অঙ্গ লােমপাদ ঋষির রাজ্য ছিল, ইহা গঙ্গা ও সরযুর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ছিল। ১৬। ভরদ্বাজ আশ্রম-ভরদ্বাজ ঋষির আশ্রম সম্ভবতঃ বর্তমান এলাহাবাদের নিকট অবস্থিত ছিল। রামচন্দ্র দণ্ডকারণ্যে যাইবার কালে ভরদ্বাজের আশ্রমে উপস্থিত - কেকয়-বিয়াস ও সটলেজ নদীর উপকূলে কৈকেয়ী-পিতার রাজ্য- ১৮। কিষ্কিন্ধ্যা—মধ্যভারত। ১৯। শৰ্বণ—উনাও হইতে ২৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ছিল। এইখানে অন্ধমুনির পুত্র সিন্ধু দশরথের হস্তে নিহত হন। ২০। বাল্মিকী আশ্রম—বিথুর ২১। বিশ্বামিত্র আশ্রম--এইখানে রামচন্দ্র তাড়কাকে নিহত করেন। ইহার বর্তমান নাম বক্সার। ২২। গান্ধার—ইহা অতি প্রাচীন জনপদ। ঋগ্বেদেও ইহার উল্লেখ

জনপদ।
আছে। (১১২৬৭) পূৰ্ব্বকালে পাঞ্জাবের পশ্চিমাংশ ও প্রায় সমুদায়
আফগানিস্তান গান্ধার নামে অভিহিত হইত।
২৭। শিবাট—ইহার বর্তমান নাম সেবিস্তান।
২৮। ক্ষত্রিয় -সিন্ধুনদের পশ্চিমে ও ডেরাইসমাইলখার দক্ষিণে এই
রাজ্য অবস্থিত ছিল।
২৯। পৌরবগােয়ালিয়র ও তাহার উত্তর বিভাগ পৌর নামে
অভিহিত হইত। টলেমী ইহাকেই Poprouari বলিয়াছেন।
৩০। জাঞ্চল—পাচকরা ও সিন্ধুনদের মধ্যবর্তী বর্তমান বুনার
নামক স্থানের উত্তর।
৩১। তক্ষশিলা--রামায়ণের উত্তরকাণ্ড পাঠ করিয়া বুঝিতে পারা
যায় যে, ভরতপুত্রের নামানুসারে এই স্থানের নাম তক্ষশিলা হইয়াছে।
গ্রীকগণ ইহাকে ট্যাশিলা বলিয়াছেন। বর্তমান নাম শাহ ধেরী।
৩২। তিমির—ইহাকে Zamerai বলিয়াছেন। ইহা গারাে পাহাড়ে
অবস্থিত ছিল।
৩৩। মিথিলা-চম্পারণ ও দ্বারভঙ্গ।
৩৪। চেদি-(৪৪১১৪) বুন্দেলখণ্ড ও তাহার দক্ষিণ প্রদেশ।
৩৫। সৌরাষ্ট্র-গুজরাট।
৩৬। অনাও-কাথিয়াবাদ।
৩৭। আভীর—আরাবল্লীর পশ্চিমদিকৃৎ প্রদেশ।
৩৮। বিশাল--পাঞ্জাব।
উক্ত জনপদ সমূহের মধ্যে কতিপয় জনপদের সম্বন্ধে বিশেষভাবে
আলােচনা করিব।

অযােধ্যা। রামায়ণী সভ্যতার কেন্দ্র-ভূমি অযােধ্যা। কলনাদিনী সরযূর তরঙ্গ- চুম্বিতা মহানগরী অযযাধ্যা ধনে, জ্ঞানে ও সভ্যতায় অতি উচ্চস্থান অধিকার করিয়াছিল। তাহার সেই অতীত সম্পদ আজ কোন্ স্বপ্ন- সমুদ্রে চিরদিনের জন্য বিলীন হইয়াছে, তাহার সভ্যতা উপহসিত, অম্বর- চুম্বী প্রাসাদসমূহ কালের কঠোর নিয়মে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হইয়াছে। নগরের নানা অতীত সাক্ষী, জীর্ণস্তুপ, ভগ্ন অট্টালিকা ও কল্পনা-পুষ্ট জনপ্রবাদ অপসারিত করিয়া আজি তাহার অতীত ইতিহাসের ধারণা করিতে চেষ্টা করা বাতুলতা কি না কে বলিতে পারে? একদিন ছিল, যখন তাহার নাম ভারতের নর-নারীকণ্ঠে ঘােষিত হইত। তখন আবাল- বৃদ্ধ-বনিতা জানিত “অযযাধ্যা, মথুরা, মায়া, কাশী, কাঞ্চী, অবন্তিকা ; পুরী, দ্বারাবতী চৈব সপ্তৈতা মােক্ষদায়িকাঃ।” কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে কিছুই অপরিবর্তনীয় নহে। তাহার পর ভারতের রাজনৈতিক গগন অন্ধকার করিয়া ঝড় উঠিল। ভারত-জননীর স্বর্ণ-মুকুট অশনিসম্পাতে খসিয়া পড়িল, ভারতের রত্নসিংহাসন অতলে ডুবিয়া গেল। তাই কাল যেথায় মর্ত্যে নন্দনকানন ছিল, যাহার উৎসবের কলহাস্যে দিগন্ত মুখরিত হইত, যাহার পারিপাট্য সকলকে মােহিত করিত; আজ আছে সেথায় ধ্বংসস্তুপ, ক্ষীণ স্মৃতি, ভক্তের অঞ ও ঐতিহাসিকের আজন্ম সাধনার উপাদান। অযযাধ্যার অপর নাম সাকেত। রামায়ণে লিখিত আছে যে, অশ্বজিত সাকেতপতি দশরথের হস্তে স্বীয় কন্যা কৈকেয়ীকে সমর্পণ করেন। ইহা সরযুর উপকূলে অবস্থিত ছিল। কনিংহাম সাহেব বলেন যে য়ুয়েংশং যে জনপদ। ; বিশাখা নগরের উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা রামায়ণের অযােধ্যা। বিশাখা বৌদ্ধজগতে সুপরিচিত। বৌদ্ধশাস্ত্র হইতে জানিতে পারি যে, তিনি সাকেত বা অযযাধ্যায় বাস করিতেন। সম্ভবতঃ তাহারই নামানুসারে অবােধ্যা বৌদ্ধজগতে পরিচিত হইয়া থাকিবে। চৈন পরিব্রাজক কৌশল্পী দর্শন করিয়া, তথা হইতে ১৭৩১৮০ লি (প্রায় ২৫/৩০ ক্রোশ) অতিক্রম পূৰ্ব্বক বিশাখা রাজ্যে উপনীত হন। তাঁহার সময়েও ইহা একটী প্রসিদ্ধ রাজ্য ছিল ; ইহার বহু বিস্তৃত রাজধানী ও শান্ত এবং মােক্ষকামী অধিবাসিগণের উল্লেখ করিয়া, য়ুয়েংশং প্রসঙ্গক্রমে ইহার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন। তৎকালে বিশাখায় ২০টী সঘারাম প্রতিষ্ঠিত ছিল, এবং তথায় হীনায়ন সম্প্রদায়ভুক্ত ৩০০০ শ্ৰমণ বাস করিতেন। রাজধানীর উত্তরে রাজপথের বামপার্শ্বে একটী বৃহৎ সঘারামে ধৰ্ম্মপাল বােধিসত্ত্ব বাস করিতেন। ইহারই নিকটে বুদ্ধদেবের নির্মাল্যপরিত্যক্ত পুষ্পবীজোৎপন্ন একটী বৃক্ষ বিদ্যমান ছিল। ইহা উচ্চে প্রায় ৭ ফিট। এইস্থানে বিশাখা একটী সঘারাম প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন বলিয়া বৌদ্ধশাস্ত্রবিৎ হার্ডি সাহেব অনুমান করেন। রামায়ণে কথিত হইয়াছে যে, অযােধ্যা দ্বাদশ যােজন বিস্তৃত ছিল। এই বিস্তৃত নগরে ব্যবসাব্যপদেশে দেশদেশান্তরের বণিকগণ ক্রয়-বিক্রয়ার্থ উপস্থিত হইত। সুবিভক্ত রাজপথ, নানায়ুধসমন্বিতা দুর্গপরিখা এবং বিচিত্র পুষ্পরাজি শশাভিত উদ্যান ইহার যশঃ দেশ বিদেশে ঘােষিত করিয়াছিল। তথায় প্রজাগণ পরম সুখে বাস করিত; বেদাধ্যয়নরত ব্রাহ্মণগণের বেদপাঠে সমস্ত নগর মুখরিত থাকিত। প্রজাগণ জিতেন্দ্রিয় ও সত্যবা ছিলেন। পরম শক্তিশালী দশরথ, ইন্দ্রের ন্যায় এই পুরী শাসন করিতেন। এই পুরী স্বয়ং মনু নির্মাণ করেন। অযােধ্যার এবম্বিধ বর্ণমা পাঠ করিয়া স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে, ভারতবর্ষের মধ্যে আমােধ্যা ৫৪ রামায়ণ-যুগের ভারত অতি প্রাচীনকালেই প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। সূৰ্য্যবংশীয় নৃপতিগণ কর্তৃক বহুকাল এইস্থান শাসিত হইবার পর মহাভারতের মহাসমরকালে অযযাধ্যার অবনতি ঘটে। বিক্রমাদিত্য পুনরায় বন কাটাইয়া এইস্থানে বৰ্ত্তমান নগরের প্রতিষ্ঠা করেন। কনিংহাম প্রভৃতি প্রাচ্য পণ্ডিতগণ অনুমান করেন যে বর্তমান সময়ে তত্ৰত্য হিন্দু-মন্দিরাদি রাজচক্রবর্তী বিক্রমাদিত্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। ইহা অপেক্ষা প্রাচীনতর নিদর্শন অযযাধ্যায় দেখিতে পাওয়া যায় না। অনেকে অনুমান করেন যে, অনেকে অনুমান করেন যে, বৌদ্ধ-বিপ্লবের সময়ে নাগেশ্বর মহাদেবের মন্দির প্রভৃতি বহু প্রাচীন মন্দিৱাদি বিনষ্ট হইয়াছে। অযােধ্যায় বহু রাজ্য-বিপ্লব ঘটিয়াছে। সূৰ্য্যবংশীয় নরপতিগণের রাজত্ব শেষ হইলে, বিক্রমাদিত্য এই স্থান শাসন করেন। তৎপরে সমুদ্রপাল নামক জনৈক যােগী বিক্রমাদিত্যকে পরাস্ত করিয়া এই স্থান অধিকার করেন। প্রবাদ আছে যে, ইহার সপ্তম পুরুষ পৰ্য্যন্ত প্রায় ৬৪৩ বৎসর ধরিয়া এই স্থান সমুদ্রপালদিগের অধিকারে ছিল। বহু ধৰ্ম্মবিপ্লবের জন্যও অযযাধ্যা প্রসিদ্ধ। বুদ্ধদেব অযযাধ্যায় আসিয়া ধর্মপ্রচার করেন। তৎকর্তৃক পরিত্যক্ত দাতন বৃক্ষের কথা পূর্বেই বলিয়াছি। ইহার সন্নিকটে শ্রাবন্তী। ইক্ষাকু হইতে অষ্টমপুরুষ পরে যুবনাশ্বের পুত্র শ্রাবস্ত রাজা এই নগর স্থাপন করেন। এই স্থান বৌদ্ধধর্মের অনুশীলনের জন্য বিখ্যাত ছিল। জৈনদিগের প্রথম তীর্থঙ্কর আদিনাথ অযযাধ্যায় জন্ম গ্রহণ করেন। এতদ্ব্যতীত দ্বিতীয় তীর্থঙ্কর অজিতনাথ, চতুর্থ তীর্থঙ্কর অভিনন্দন নাথ, ষষ্ঠ তীর্থঙ্কর সুমন্তনাথ এবং চতুর্দশ তীর্থঙ্কর অনন্তনাথ ইহারা সকলেই অযােধ্যায় জন্মগ্রহণ করিয়া জৈনধৰ্ম্ম প্রচার করেন। খৃঃ অষ্টম শতাব্দীতে আরু নামক এক অসভ্য পার্বত্য জাতি হিমালয় জনপদ। পৰ্বত হইতে আসিয়া অযােধ্যার জঙ্গল পরিষ্কার করে, কিন্তু তাহারা রাজ্য বিস্তার করিবার কোন চেষ্টা করে নাই। অযােগ্যায় আৰুগণের পদার্পণের পর, একশত বৎসর গত হইলে, জৈনধর্মাবলম্বী সােমবংশীয় নৃপতিগণ আৰুগণকে অযযাধ্যা হইতে বহিষ্কৃত করিয়া প্রায় দুইশত বৎসর ধরিয়া এই স্থান শাসন করেন। একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে কনােজের রাজা চন্দ্রদেব, চন্দ্রবংশীয় নরপতিগণকে দূরীভূত করিয়া, অঘােধ্য অধিকার করেন। ইহার পর অযােধ্যা ভড় নামক অসভ্য জাতির অধিকারে আইসে। ১১৯৪ খৃষ্টাব্দে শাহাউদ্দীন ঘােরী কনােজ জয় করিয়া অযযাধ্যা লুণ্ঠন করেন। এই সময়েই প্রাচীন অযযাধ্যা নগরী যবন-অধিকারভুক্ত হয়। অযযাধ্যায় বহু হিন্দু মন্দির আজিও মােক্ষকামী হিন্দুর ভক্তি আকর্ষণ করিতেছে। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ববিদের নিকট তাহারা প্রাচীনত্বের দাবী রক্ষা করিতে পারে নাই। ঐতিহাসিকগণ স্থির করিয়াছেন যে, তাহারা নিতান্তই আধুনিক যুগে নির্মিত ; কোন কোনটী ২০০ শত বৎসরের অধিক পুরাতন নয়। তথাপি আমরা নিয়ে কতিপয় প্রসিদ্ধ স্থানের উল্লেখ করিলাম ;- ১। অযযাধ্যার মধ্যে রামকোট একটী প্রসিদ্ধ স্থান। ইহা নগরের পূৰ্বধারে অবস্থিত। কথিত আছে, শ্রীরামচন্দ্র নগর রক্ষা করিবার জন্য প্রাচীরবেষ্টিত এই দুর্গ নির্মাণ করেন। ইহার চারিধারে বিশটী বুরুজ ছিল ; হনুমান্ সুগ্রীব প্রভৃতি সেনাপতিরা ইহার উপরে অবস্থান করিয়া নগর রক্ষা করিতেন। এই দুর্গের উপরে একটী ক্ষুদ্র মন্দির দৃষ্ট হয়। কনিংহাম সাহেব বলেন যে, এই স্থান বহু পুরাতন এবং ইহাতে সন্দেহ করিবার কারণ নাই। কিন্তু রামকোটের উপরিস্থিত মন্দির মােগল সম্রাট, ঔরঙ্গজেবের সময়ে নির্মিত হইয়াছে। ;

রামায়ণ-যুগের ভারত। ২। অযােধ্যায় প্রবেশ করিলেই নিকটে মণি পৰ্ব্বত। লক্ষ্মণ শক্তিশেলে আহত হইলে হনুমান্ বিশল্যকরণী আনিতে গিয়া সমস্ত গন্ধমাদন পর্বত মস্তকে ধারণ করিয়া শূন্যপথে আসিবার সময়ে ভরতণ-নিঃসৃত বাণহত হইয়া ভূমিতে পড়িয়া যান। গন্ধমাদনের ভগ্নাংশই বর্তমান মণি পৰ্বত। মণি পৰ্বত উচ্চে ৪৪ হাত। ইহা ভগ্ন ইষ্টক ও কঙ্করে পরিপূর্ণ। এক কালে ইহার চারিধারে প্রাচীর ছিল, ইহার এক একখানি ইট ১১ দীর্ঘ। এই স্কুপের কাল নির্ণয় করিতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র। অনেকের ধারণা যে, ইহা একটী বৌদ্ধ স্তুপ মাত্র। য়ুয়েংশং যে অশােক স্তুপের উল্লেখ করিয়াছেন, অনেকের বিশ্বাস মণি পৰ্বত সেই অশােক স্তুপ। কিন্তু এই স্তুপের নিয়ে একবার একখানি ফলক পাওয়া গিয়াছিল; তাহাতে লিথিত আছে যে, মগধরাজবংশের নন্দবর্ধন নামক জনৈক নরপতি মণি পৰ্বত নিৰ্মাণ করাইয়াছিলেন। ৩। মণি পৰ্বত ব্যতীত অযযাধ্যায় কুবের পৰ্বত ও সুগ্রীব পৰ্ব্বত নামক দুইটী কৃত্ৰিম ক্ষুদ্র স্তুপ দেখিতে পাওয়া যায়। কুবের পর্বত উচ্চতায় ২৮ ফিট এবং সুগ্রীব পৰ্বত ১০ ফিট মাত্র। ইহারা এক্ষণে ধ্বংসস্তুপ ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ। কুবের পৰ্ব্বতের নিকটে গণেশকুণ্ড নামক একটী ক্ষুদ্র জলাশয় দেখিতে পাওয়া যায়। মুসলমানগণ প্রতি বৎসর এই জলাশয়ে তাজিয়া বিসর্জন দেয় বলিয়া, তাহারা ইহাকে “ইমাম তলাও” নামে অভিহিত করে। যুয়েংশংয়ের বর্ণনা হইতে জানিতে পারা যায় যে, অযােধ্যার একটা পে বুদ্ধের কেশ ও নখ রক্ষিত হইয়াছিল। পরবর্তী প্রত্নতত্ত্ববিদগণ এই স্তুপের অনুসন্ধান করিয়াছেন। কনিংহাম সাহেব বলেন যে, আলােচ্য স্তুপ বৰ্তমান সময়ে কুবের পৰ্বত নামে পরিচিত। এই স্কুপের সন্নিকটস্থ গণেশকুণ্ড নামক জলাশয়ের উল্লেখ উক্ত স্তুপের বর্ণনাপ্রসঙ্গে জনপদ। পের দেখা যায়। ইহাতে তাহার মত সমীচীন বলিয়া বােধ হয়। সুগ্রীব পর্বত দৈর্ঘ্যে ৫০০ ফিট এবং বিস্তারে ৩০০ ফিট হইবে। য়ুয়েংশং অযযাধ্যায় একটা বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠের উল্লেখ করেন। মহাবংশে বর্ণিত পূৰ্বরামই উক্ত মঠ বলিয়া পরবর্তী ঐতিহাসিকগণ স্থির করিয়াছেন। কনিংহাম সাহেব বলেন, কুবের পৰ্বত উক্ত মঠের ধ্বংসাবশেষ। ইহার বিস্তৃতি ও আকার তাহার মতই সমর্থন করে। এতদ্ব্যতীত এই মধ্যস্থলে কতিপয় গৃহ ও একটি কূপের চিহ্ন আবিষ্কৃত হওয়াতে এককালে যে ইহা একটি বৌদ্ধ মঠ ছিল, এ বিষয়ে আর কাহার সন্দেহ নাই। ৪। মণি পৰ্বতের নিকট দুইটি কবর আছে। মুসলমানগণ বলেন, ঐ কবরে সেখ ও জব পয়গম্বর সমাহিত আছেন। গুডউইন্ সাহেব কর্তৃক অনুদিত আইনী আকবরী গ্রন্থেও এই কবরটির উল্লেখ দেখা যায়। তৎ- কালে এই দুইটি কবর যথাক্রমে দৈর্ঘ্যে ৭ ফিট ও ৬ ফিট ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে ইহারা যথাক্রমে দৈর্ঘ্যে ১৭ ফিট ও ১২ ফিট হইবে। ইহারই নিকটে সােমগিরি নামে আরও দুইটি ছােট ঘােট স্তুপ আছে। সােমগিরির বিশেষ বৃত্তান্ত জানা যায় না। অযযাধ্যায় এখন সৰ্বসমেত ৯৬টি মন্দির আছে। তন্মধ্যে ৬৩টি বিষ্ণু- মন্দির এবং ৩৩টি শিবমন্দির। কথিত আছে, বিক্রমাদিত্য ৩৬০টি মন্দির নির্মাণ করাইয়াছিলেন। তাহার অনেকগুলিই কালে বিনষ্ট হইয়া থাকিবে। বর্তমান সময়ে স্বর্গদ্বারের অতিশয় দুরবস্থা। যশোবন্ত রায়ের পত্নী অহল্যা বাইয়ের অর্থে স্বর্গদ্বারস্থ রামসীতার মন্দিরের সংস্কার হয়। আজিও এই দেবালয়ের ব্যয়নিৰ্বাহাৰ্থ ইন্দোর হইতে প্রতি বৎসর ২৩১১ টাকা বৃত্তি পাওয়া যায়। অযযাধ্যায় প্রতি বৎসর রামনবমীর সময়ে একটা মেলা হয়, তাহাতে বহু লক্ষ লােকের সমাগম হয়। হিন্দু মন্দির ব্যতীত অযযাধ্যায় কতিপয় মসজিদ ও কয়েকটী বৈষ্ণব রামায়ণ-যুগের ভারত। দিগের মঠ আছে। স্বর্গদ্বারের নিকট মুসলমানদিগের একটি মসজিদ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা ঔরঙ্গজেবের সময় নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। হনুমান গড়ে নিৰ্ব্বাণী সম্প্রদায়ের একটি মঠ আছে। এই সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবেরা চারিটি শাখায় বিভক্ত ;-যথা কৃষ্ণদাসী, তুলসীদাসী, মণিরামী এবং জানকীশরণ দাসী। এতদ্ব্যতীত রামঘাটে ও গুপ্তঘাটে নিম্মোহীসম্প্রদায় ভুক্ত বৈষ্ণবদিগের একটি আখড়া আছে। ইহারা সকলে নিষ্করভূমি ভােগ করিয়া থাকেন। অযযাধ্যা, কোশল রাজ্যের রাজধানী ছিল। এই সমৃদ্ধিশালী জনপদের ইতিহাস এখনও সংগৃহীত হয় নাই, কখন হইবে কি না সন্দেহ। আৰ্য্য সভ্যতা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অতি প্রাচীনকালে কোশল রাজ্যের উন্নতি হইয়াছিল। বহুদিন হইল তাহার সে গৌরব-জ্যোতিঃ অপসৃত হইয়াছে। প্রকৃত পক্ষে অযযাধ্যার ধ্বংসকাৰ্য্য বহুদিন পূৰ্বেই আরব্ধ হইয়াছে। প্রাচীন ভারতের সেই সুবিখ্যাত রাজধানী দুইবার জনহীন প্রান্তরে পর্যবসিত হইয়াছিল। তাহার পর তাহার শেষ স্মৃতিটুকু বিস্মৃতির তমঃকীর্ণ যবনিকার অন্তরালে বিলীন হইয়াছে।

বিদেহ। বিদেহের অপর নাম মিথিলা। ইহা অতি পুরাতন জনপদ। যে প্রাগৈতিহাসিকযুগের পুরাবৃত্ত অতীতের বিস্মৃতিগর্ভে লুপ্ত হইয়াছে, সেই যুগ হইতেই বিদেহের নাম দেশবিদেশে পরিচিত হইয়াছিল। কিন্তু আজ সেই অতীত গৌরব-দিনের ক্ষীণস্মৃতি মাত্র বিদ্যমান। তাহার ধারাবাহিক ইতিহাস অনাদরে কালক্রমে বিলুপ্ত হইয়াছে। আজ সেই পুরাণ-বিশ্রুত মিথিলার স্থান ও সীমা নির্দেশ করা পর্যন্ত একরূপ অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। মিথিলার স্থান নির্দেশ করিতে যাইয়া ইংরাজ ঐতিহাসিকগণ নানারূপ বিরুদ্ধমতের সৃষ্টি করিয়াছেন। কাহারও মতে, বিদেহ বৰ্তমান ত্রিহুতের অন্তর্গত, আবার কাহারও মতে অন্যই। সেই তর্কবিতর্কের আলােচনা করিয়া অনর্থক সময় নষ্ট করিয়া ফল নাই। আমাদের মনে হয় যে, আলােচ্য মিথিলা বা বিদেহ ত্রিহুত জিলার অন্তর্গত ছিল। এই মতপ্রতি- পােষক যুক্তি আমরা প্রদর্শন করিতেছি। ১। ইংরাজ ঐতিহাসিক হণ্টার-প্রমুখ ব্যক্তিগণ স্পষ্টতঃ মিথিলাকে বর্তমান ত্রিহুতের অন্তর্গত জনপদ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। Buddhist India নামক পুস্তকের ৩৭ ও ৩৮ পৃষ্ঠায় বিদেহের আলােচনা করিয়া বৌদ্ধশাস্ত্রবিৎ বিখ্যাত অধ্যাপক রিজ ডেভিডস যাহা বলিয়াছেন, তাহার সার মর্ম এই :- বিদেহ একটি প্রাচীন জনপদ ; মিথিলা ইহার রাজধানী ছিল। এক সময়ে বিদেহরাজ্য বিশেষ সমৃদ্ধিসম্পন্ন ছিল। নানা বৌদ্ধ জাতকে ইহার উল্লেখ আছে। এক সময়ে মিথিলা নগরের পরিধি ৫০ মাইলের অধিক রামায়ণযুগের ভারত। ছিল। ইহা বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্র বৈশালী বা বিশালীর ৩৫ মাইল উত্তর- পূর্বে অবস্থিত ছিল। ইহা বর্তমান ত্রিহুতের অন্তর্গত। ২। বিহুত জিলার অন্তর্গত জনকপুর, মহর্ষি গৌতমাশ্রমের ভগ্না- বশেষ এবং লােকপরম্পরাপ্রচলিত বহু কিম্বদন্তী এই অতীত জনপদের স্মৃতি অক্ষুন্ন রাখিয়াছে। ইহা যে বিহুত জেলার অন্তর্গত জনপদ—এই মত পােষকতার পক্ষে ইহারা যথেষ্ট সহায়তা করিয়া থাকে। ৩। আমরা রামায়ণ হইতে জানিতে পারি যে, তপােধন বিশ্বামিত্র রাম-লক্ষ্মণকে সঙ্গে লইয়া অঘােধ্যা হইতে অর্ধযােজন পথ অতিক্রমপূর্বক সরষুর দক্ষিণতীরে আসিয়া উপনীত হয়েন। সে স্থান হইতে তাহারা নৌকাযােগে গঙ্গাবক্ষে দক্ষিণদিকে অগ্রসর হইয়া একটি শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্য দেখিতে পান। নদীতীর হইতে অর্ধযােজন পথ অতিক্রম করিয়া তাঁহারা তাড়কার বাসভবনের সন্নিহিত হয়েন। এই স্থানে যজ্ঞ-সমাপন পূৰ্ব্বক, উত্তরদিকে গমন করিয়া ক্ৰমশঃ গিরিব্রজ (মগধ) অতিক্রম করিয়া তাহারা বিশালাধিপতি সুমিতির আতিথ্য গ্রহণ করেন। পরদিবস তাহারা বিশাল হইতে যাত্রা করিয়া পূৰ্বোত্তর কোণাভিমুখে জনকের যজ্ঞক্ষেত্রে উপনীত হয়েন। এই বর্ণনা হইতে বেশ বুঝিতে পারা যায় যে, বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রামলক্ষ্মণ মগধ অতিক্রম করিয়া ৱিত অভিমুখে যাত্রা করেন। ৪। মিথিলা যে প্রাচীন তীরভূমি বা ত্রিহুতের অন্তর্গত ছিল, এ কথা চীনপরিব্রাজক ঝুয়েংশং স্পষ্টতঃ স্বীকার করিয়াছেন। তাহার সময়ে গঙ্গার উত্তরতীর সমস্ত প্রদেশ বৃজ্জি নামে অভিহিত হইত। এই প্রদেশ আবার নানা জনপদে বিভক্ত ছিল। তন্মধ্যে বৈশালী বা বিশালা, তীরভূমি বা ত্ৰিত এবং মিথিলাই প্রধান। ৫। বিহুত প্রদেশে মিথিলার অবস্থান সম্বন্ধে শাস্ত্রীয় প্রমাণের জনপদ। অভাব নাই। এ বিষয়ে ভবিষ্যৎপুরাণে উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়, যথা- নিমে পুত্ৰস্তু তত্রৈব মিথিৰ্ণাম মহাস্মৃতঃ। প্রথমং ভুজবলৈনে তৈরহুতস্য পাশ্বতঃ। নিৰ্ম্মিতং স্বীয় নামা চ মিথিলাপুরমুত্তমম্ পুরীজননসামর্থ্যাজ্জনকঃ সচ কীৰ্ত্তিতঃ। এই রাজ্য কখন বা মিথিলা কখন বা বিদেহ কখন বা ত্রিহুত নামে পরিচিত হইয়াছে। শক্তিসঙ্গমতন্ত্রে গণ্ডকীতীর হইতে আরম্ভ করিয়া চম্পারণ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত ইহা বিস্তৃত ছিল বলিয়া কথিত হইয়াছে। গণ্ডকীতীরমারভ্য চম্পারণ্যাগে শিবে। বিদেহতুঃ সমাখ্যাতাঃ তৈরভুক্তাভিধঃ স চ ৷ এইরূপ আরও বহুতর শাস্ত্রীয় প্রমাণ উদ্ধৃত করা যাইতে পারে। তাহাতে মিথিলাকে প্রাচীন বিহুতের অন্তর্গত ভূভাগ বলিয়া অনুমান করিবার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ আছে বলিয়া মনে হয়। রামায়ণে বিদেহ, মগধ প্রভৃতি দেশকে অপবিত্র বলা হইয়াছে। ইহাতে বােধ হয় যে, তখনও এই সকল দেশে আৰ্যসভ্যতা সম্যক্ প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এই কারণে বঙ্গদেশে আসিতে হইলে প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা ছিল। এ কারণেও আমরা মিথিলাকে ত্রিহুতের সন্নিহিত কোন জনপদ বলিয়া মনে করি। ভারতের ইতিহাস নাই। কত শত পুণ্যজনপদের পবিত্র স্মৃতি বিস্মৃতি- সাগরে লীন হইয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। সুতরাং মিথিলার ধারাবাহিক ইতিহাস প্রকাশ করা সম্ভব নহে। কেবল ইহার গৌরবময় দিনের অস্তিত্ব বুঝিবার উপযােগী একটি ক্ষীণস্মৃতি আজও ভারতবাসীর হৃদয়ে বর্তমান রহিয়াছে। তাহাতে বুঝিতে পারা যায় যে, ভারতবর্ষের মধ্যে ইহা এক- কালে গৌরবের স্থান ছিল। শাস্ত্রে দেখিতে পাই যে, এককালে শত শত পুণ্যাত্মা ঋষির পবিত্র তপস্যায় এই স্থান পূত হইয়াছিল। মহাভারতের ৬২ রামায়ণ-যুগের ভারত। সময়েও মিথিলার গৌরবের হ্রাস হয় নাই। ভারতীয় মহাসমরে বিদেহ- রাজ কৌরবের পক্ষ হইয়া যুদ্ধ করিয়াছিলেন। অতি প্রাচীন কালেই এই জনপদ সভ্যতার উচ্চতম গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। বর্তমান সময়েও ন্যায়শাস্ত্রের জন্য এ স্থান সমধিক প্রসিদ্ধ। বাঙ্গালার প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক বাসুদেব সাৰ্বভৌম মিথিলায় ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, কেবল কল্পনাপুষ্ট দুইএকটি কিম্বদন্তী এই প্রাচীন স্থানের ইতিহাসের স্থান অধিকার করিয়া বসিয়া আছে। মিথিলার রাজনৈতিক ইতিহাস অতি সংক্ষিপ্ত। তাহা যতটুকু অব- গত হওয়া যায়, তাহা সংক্ষেপতঃ এই—চন্দ্রবংশীয় নৃপতিগণের অব্যবহিত পরেই মহাভারতের সময়ে যদুবংশীয় নৃপতিগণ মিথিলার শাসনদণ্ড পরি- চালন করেন। ঐতিহাসিক যুগে যে সকল নরপতি মিথিলা শাসন করিয়াছেন, তন্মধ্যে কর্ণাট হইতে আগত প্রমরবংশীয় ক্ষত্রিয় নৃপতিগণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। এই বংশের আদিনৃপতি ১১১ শকে বা ১০০৯ খৃষ্টাব্দে ত্রিহুতে আগমন করেন। প্রায় ২৩৫ বৎসর রাজত্বের পর এই বংশের শেষ রাজা হরিসিংহ দেব যবনহস্তে পরাজিত হইয়া নেপালের অরণ্যমধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তৎপরে এক ব্রাহ্মণবংশ মিথিলা শাসন করেন। এই বংশের শিবসিংহ দেবের সময়ে বিখ্যাত কবি বিদ্যাপতি বৰ্ত্তমান ছিলেন। ইহার পর হইতে বিহুতের নাম আর শুনা যায় না, সে প্রাচীন জনপদ অতীতের স্বপ্নসমুদ্রে ডুবিয়া যায়। আমরা বিদেহরাজ জনকের বিষয় আলােচনা করিতে বসিয়া প্রসঙ্গ- ক্রমে মিথিলার পুরাতত্ত্বের আলােচনা করিয়াছি। এই বার রাজর্ষির বিষয় আলােচনা করা যাউক। মহাভাগ জনকের উৎপত্তি সম্বন্ধে বিষ্ণুপুরাণে এইরূপ লিখিত আছেঃ- রাজা নিমি অপুত্রক ছিলেন। তাঁহার মৃত্যু হইলে রাজ্যে অরাজকতার জনপদ। আশঙ্কা করিয়া মৃত নিমির শরীর মুনিগণ অরণিতে মথন করেন । এই মথনের ফলে যে কুমার উৎপন্ন হয়েন তাহারই নাম জনক। তাঁহার পিতা বিদেহ (দেহ-রহিত) বলিয়া তাহার নাম বিদেহ। মথনের ফলে উৎপন্ন বলিয়া তিনি মিথিল নামেও প্রসিদ্ধ। সুতরাং মিথিলা, বিদেহ এবং জনক এক ব্যক্তিরই নামান্তরমাত্র। শ্রীমদ্ভাগবতেও এই উক্তি সমর্থিত হইয়াছে, যথা- অরাজক ভয়মন্বণা মমানামহর্ষয়ঃ দেহম্ মমাঃ ম নিমে কুমারঃ সমজাত। জন্মনা জনকম্ সােহভূদ্বিদেহস্তুবিদেহজঃ মিথিলাে মথনজ্জাতে মিথিলাযেন নিৰ্ম্মিত। কিন্তু রামায়ণ হইতে আমরা জানিতে পারি যে, নিমির পুত্র মিথি এবং মিথির পুত্র জনক। রামায়ণকে অধিকতর প্রামাণিক গ্রন্থ বােধে পণ্ডিতেরা জনককে মিথির পুত্র বলিয়াই অঙ্গীকার করিয়া লয়েন। অযযাধ্যা- পতি মহাত্মা দশরথ যে সময়ে প্রাদুর্ভূত হয়েন তৎকালে মিথিতনয় জনক মিথিলা শাসন করিতেন। তিনি ধার্মিক ও ব্রহ্মপরায়ণ। তিনি রাজ্যে পর হইয়াও ভিখারী। তিনি মণিময় সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত থাকিলেও এই স্বার্থসংক্ষুব্ধ জগতের নীচতা তাহাকে স্পর্শ করিতে পারিত না। ফলতঃ তিনি সর্বপ্রকার ভােগ্যবস্তু দ্বারা নিয়ত পরিবেষ্টিত থাকিয়াও এক দিকে তৎসমুদায়ে যেমন একেবারে স্পৃহাশূন্য হইয়াছিলেন, অপর দিকে তেমনই প্রজাপালনপরিদর্শনেও কিছুমাত্র পরাম্মুখ ছিলেন না। ভারতে যে সময় কর্মকাণ্ডের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিবার জন্য নানাস্থানে যজ্ঞবেদী নির্মিত হইয়া ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্মের গৌরব অক্ষুন্ন করিতেছিল, সেই সময়ে ব্রহ্মবিদ্যা নামে পরিচিত উপনিষদবর্ণিত তত্ত্বজ্ঞান ভারতের রাজন্য- গণ কর্তৃক ধীরে ধীরে উদ্ভাবিত, প্রচারিত ও পরিশােধিত হইতেছিল।

৬৪ রামায়ণ-যুগের ভারত। এই অভিনব বিদ্যা ব্রাহ্মণগণ ক্ষত্রিয়দিগের নিকট হইতে শিক্ষা করিতেন। ইহারই ফলে উদার বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাবের পথ সুগম হইয়াছিল। মহা- ভাগ জনক এই অমূল্য তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। ব্রাহ্মণগণ তত্ত্ব জিজ্ঞাসু হইয়া তাহার নিকট আসিতে কিছুমাত্র কুণ্ঠা বােধ করিতেন না। তাঁহার ধর্মজ্ঞানে মুগ্ধ হইয়া প্রাচীন আর্যসমাজ তাহাকে রাজর্ষি আখ্যায় ভূষিত করিয়াছিলেন। বিখ্যাত যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি তাহার আশ্রমে থাকিয়া শতপথ ব্রাহ্মণ রচনা করেন। এই শতপথ ব্রাহ্মণ হইতে জানিতে পারা যায় যে, রাজর্ষি জনক কতিপয় ব্রাহ্মণকে অগ্নিহােত্রের বিষয় প্রশ্ন করেন। তাহারা কেহই তাহার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিলেন না। কেবল যাজ্ঞবল্ক্য আংশিকভাবে তাহার প্রশ্নের উত্তর দিলেন। ইহাতে ব্রাহ্মণ- গণ কুপিত হইয়া প্রস্থান করিলে যাজ্ঞবল্ক্য জনকের অনুসরণ করেন। ক্ষত্রিয়গণের নিকট ব্রাহ্মণগণের পরাভবের কথা বহু উপনিষদের নানাস্থানে লিখিত আছে। তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন জনকের নিকট তত্ত্বজিজ্ঞাসু ঋষিগণের আগমনবিষয় পাঠ করিয়া বুঝিতে পারা যায় যে, বৌদ্ধযুগে ব্রাহ্মণপ্রভাব খণ্ডিত ও রাজশক্তি স্থাপিত হয়। উপনিষদ সেই যুগের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিল। জনকের সময় হইতেই এই ব্রহ্মবিদ্যার সূত্রপাত হয়। যে মহাত্মার আবির্ভাবে এমন মতের সৃষ্টি হইয়াছে, যাহার উদারতার নিকট বিংশ শতাব্দীর অধ্যাত্ম তত্ত্বও ম্লান হইয়া যায়, এবং যাহার প্রতি সভ্যতাগর্বিত য়ুরােপীয় সমাজও সম্মান দেখাইতে কুষ্ঠিত হয়েন না, সেই মহাপুরুষের জীবনের একটি চিত্র রামায়ণে দেখিতে পাওয়া যায়। সে চিত্র কি উন্নত। সংসারত্যাগী বিরাট পুরুষ কর্তৃব্যানুবােধে সিংহাসনে উপবিষ্ট। তপােবনের স্নিগ্ধ ছায়ায় রাজা জনক স্ত্রীপুত্র লইয়াও সন্ন্যাসী।

কিষ্কিন্ধ্যা কিষ্কিন্ধ্যার অবস্থান লইয়া, ঐতিহাসিকগণের মধ্যে যেরূপ মতভেদ দেখা যায়, তাহাতে ইহার প্রকৃত স্থান নির্দেশ করিতে যাওয়া, আপা- ততঃ নিতান্তই বিড়ম্বনা বলিয়া বােধ হয়। ভারতে বহু প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। কত কলনাদিনী স্রোভস্বতীর গতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানারত্ন-বিভূষিতা ভারতের প্রাচীন নগরী স্থলিত-সৌভাগ্য হইয়া নগণ্য-গ্রামমাত্রে পর্যবসিত হইয়াছে ; তাহার দীনাভরণের নিয়ে কোন অমূল্য রত্ন লুকায়িত রহিয়াছে, তাহা কেহ জানে না, কেহ তাহা জানিতে চেষ্টাও করে না। আজ কয়টী জনপদের প্রকৃত ও বিস্তৃত ইতিহাস লিখিত হইয়াছে ? ইহার উপর আবার কত শত জনপদের চিহ্ন পৰ্য্যন্ত কাল সহকারে অতীতের অসীম আবর্তে পড়িয়া ভবিতব্যের বিধানে লােপ পাইয়াছে; আজ শত চেষ্টা করিলেও হয়ত আর তাহাদিগের সন্ধান পাওয়া যাইবে না। সুতরাং প্রাচীন সাহিত্য-বণিত জনপদাদির ভৌগােলিক-স্থান নির্দেশ করা নিতান্ত দুরূহ ব্যাপার, এবং অতি ধীর- ভাবে সমস্ত বিষয়ের আলােচনা না করিয়া, মতামত দিবার চেষ্টা করিলে, তাহা যে সঙ্কুল হইতে পারে, তাহা আর বিশেষ করিয়া বলিবার প্রয়ােজন নাই। বছ ইংরাজ ঐতিহাসিকই কিষ্কিন্ধ্যার অবস্থান নির্দেশ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু নানা বিচার ও বিতর্কের পর, তাহারা কেহই অন্যের সহিত একমত হইতে পারেন নাই। তাঁহাদিগের মধ্যে মনিয়ার উইলিয় বলেন, যে রামায়ণে কিষ্কিন্ধ্যার বর্ণনা দেখিয়া মনে হয় ইহা বর্তমান সময়ের ওদ্রা (Odra) প্রদেশে অবস্থিত ছিল। গ্রিফিথ সাহেব ইহা রামায়ণ-যুগের ভারত। অঙ্গীকার করিতে প্রস্তুত নন। তিনি বলেন যে, কিষ্কিন্ধ্যার উত্তরে দণ্ডকারণ্য এবং পূৰ্ব্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণে অপার সমুদ্র থাকায়, ইহা দাক্ষি ণাত্যের একাংশ হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই। বর্তমান মহীশূর রাজ্য ইহার অন্তর্গত ছিল। বর্তমান সময়ে এই মতই সমধিক প্রচলিত। কিন্তু ইহা আমাদিগের নিকট সমীচীন বলিয়া বােধ হয় না। আমরা রামা- যুণ হইতেই কিষ্কিন্ধ্যার অবস্থান নির্দেশ করিতে চেষ্টা করিব। এইখানে একটি কথা বলিয়া রাখি। যাহাদিগের ধারণা রামায়ণ- বর্ণিত জনপদগুলি কবির উৰ্বর মস্তিষ্কপ্রসূত, কোন দিনই তাহাদিগের অস্তিত্ব ছিল না, তাহার ধৈর্যের সহিত রামায়ণ পাঠ করেন নাই। রামায়ণ-বর্ণিত একটী জনপদও কল্পিত নয়। মহাকবি এমন সুন্দররূপে প্রসঙ্গক্রমে প্রত্যেক জনপদের বর্ণনা ও স্থান নির্দেশ করিয়াছেন যে, তাহা পাঠ করিলে, স্বীকার করিতেই হইবে কবি স্বর্ণতুলিকা হন্তে লইয়া কেবল কল্পনারাজ্যেই বিচরণ করিতেন না, তিনি তখনকার ভার- তের সমগ্র তথ্য অতি দক্ষতার সহিত আয়ত্ত করিয়াছিলেন। * কথা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা যাইতে পারে। এতদ্ব্যতীত অন্ বারুণির ভারতে কিষ্কিন্ধ্যার উল্লেখ আছে। ১ তাহাতে বেশ বুঝা যায় মহাকবি আমাদিগের ন্যায় স্বল্পমতি ঐতিহাসিকগণকে প্রবঞ্চিত করিবার জন্য অলীক কাহিনীর সৃষ্টি করেন নাই। রামায়ণে লিখিত আছে যে, পিতৃরাজ্য পরিত্যাগ করিয়া রাম দণ্ড- কারণ্যে উপস্থিত হন; এবং পরে মহর্ষি অগস্ত্যের আশ্রমে উপস্থিত হইয়া বলেন, “হে মহর্ষে! আমাকে এমন একটি স্থান নির্দেশ করিয়া দিন, এ * N. C. Dass's Ancient Geography Compiled from the Ramayana 31 Indian Antiquary 1893.

জনপদ। যেখানে প্রচুর জল ও বহু কানন আছে। আমি সেইরূপ স্থানে আশ্রম নিৰ্মাণ করিয়া, সুখে বাস করিতে ইচ্ছা করি।” ২ ইহার উত্তরের জন্য ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া মহর্ষি রামকে বলেন, “বৎস, এই স্থান হইতে দুই যােজন দূরে, পঞ্চবটী নামে একটী পরম রমণীয় স্থান আছে। সেখানে জল ও ফল-মূল প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। সেইখানে আশ্রম নির্মাণ কর ; তাহা গােদাবরী নদীর নিকটে এবং মৈথিলীও সেখানে পরম সুখে কালযাপন করিবেন। ৩ ইহার দ্বারা পঞ্চবটীর অবস্থান নিরূপিত হয়। উপরেই বলা হইয়াছে যে, অগস্ত্য-আশ্রমের দ্বিযােজন দূরে এবং গােদাবরীর সমীপে পঞ্চবটী অবস্থিত ছিল। গােদাবরী নদী বিন্ধ্যাচলের দক্ষিণে প্রবাহিত হইত। ইহাতেই ঐতিহাসিকগণ স্থির করিয়াছেন যে, বর্তমান নাসিকেরই অপর নাম পঞ্চবটী। ৪ সীতা অপহৃতা হইলে, রাম-লক্ষ্মণ তাহার অনুসন্ধান করিতে করিতে কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যে উপনীত হন। এই রাজ্যের অন্তর্গত ঋষ্যমুক পৰ্ব্বতে সুগ্রীবাদি বানরাদির সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়। সুগ্রীব ও রামচন্দ্রের মধ্যে মিত্রতা স্থাপিত হইলে, অঙ্গদাদি কপিগণ সীতার অন্বেষণার্থ দক্ষিণমুখে গমন করে। কিয়দ্র গমনের পর, তাহার বিন্ধ্য পৰ্বতে আসিয়া উপস্থিত হয়। সহশিখর বিন্ধ্যপর্বতের গুহাকাননাদি স্থান অনুসন্ধানের পর তাহারা এক পুষ্প-পর্ণ বিবর্জিত ঘাের নির্জন রণ্যে প্রবেশ করে। তথায় সীতার অন্বেষণের পর, “বিন্ধ্য-কানন- সঙ্কীর্ণাং বিচেরুদক্ষিণাং দিশঃ” (কিষ্কিন্ধ্যা-৪৯১৫)—তাহারা বিন্ধ্যকানন, ২। কিন্তু ব্যাদিশ মে দেশং সােদক বহু কানন। যত্ৰামপদং কৃত্বা বসেয়ং চিরতঃ সুখম্। (আরণ্য ১৩) ৩। আরণ্য ১৩শ (১৩-১৮) Dowson's Hind Myth.

রামায়ণ-যুগের ভারত। সমাকীর্ণ দক্ষিণ দিকে গমন করে। তথায় লেবনে শারদাপ্রতিম রজত-পৰ্বতে ও বহু শৈল- করে বৈদেহীর অনুসন্ধান করিয়াও, যখন তাহার কোন সংবাদই পাইল না, তখন তাহারা বিন্ধ্যাচলের প্রথমা- বধি সমস্ত প্রদেশই অনুসন্ধান করিল। অর্থাৎ তাহারা প্রথমে দক্ষিণ- দিকে অগ্রসর হইয়া বিন্ধ্যের উত্তরে উপস্থিত হয়, এবং তথায় দক্ষিণেও সীতার সন্ধান না পাওয়াতে পৰ্ব্বতের সর্বত্র পরিভ্রমণ করে। ইহাতে মনে হয় কিষ্কিন্ধ্যা বিন্ধ্যপর্বতের উত্তরেই অবস্থিত ছিল। সেই পৰ্বতের দক্ষিণ পশ্চিমস্থিত শৃঙ্গে এক মাস অবস্থানের পর তাহারা ঋষবিল নামক প্রকাণ্ড বিলে প্রবেশ করে। তথায় স্বয়ম্প্রভাবাস করিতেন। বানরগণ তাহাকে নির্গমনের পথ জিজ্ঞাসা করায়, তৎকর্তৃক নিঃসারিত হইয়া, নানা মলতাযুক্ত বিন্ধ্যাচল ও পার্শ্বভাগে সাগর দেখিতে পায়। ১ “এই বর্ণনা পাঠে স্পষ্টই পতীত হয় যে, কিষ্কিন্ধ্যা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক কপিগণ দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে অগ্রসর হইয়া, বিন্ধ্যপর্বতের শৈল- সমাচ্ছন্ন পথে উহার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তবর্তী গিরিশৃঙ্গে উপস্থিত হয় এবং তথা হইতে আরব্য সাগরের তটাভিঘাতী তরঙ্গমালা দেখিতে পায়।” ২ এইখানেই তাহারা সুগ্রীবের ভয়ে প্রায়ােপবেশনে প্রাণত্যাগ করিতে কৃত- সঙ্কল্প হইলে জটায়ু ভ্রাতা সম্পাতির নিকট হইতে সীতা ও লঙ্কার সংবাদ প্রাপ্ত হয়। ইহারই শত যােজন দূরে লঙ্কাপুরী অবস্থিত ছিল। ইহাতে বুঝা যায় যে, কিষ্কিন্ধ্যা বিন্ধ্য-গিরির উত্তরে অবস্থিত ছিল। * বিন্ধ্যমেবাদিতঃ কৃত্বা বিচ্চরুশ্চ সমন্ততঃ। { কিষ্কিন্ধ্যা ৪৯২২ ১। এষ বিন্ধ্যো গিরিঃ শ্রীমান্ননামলতাযুতঃ। এষ প্রস্রবণঃ শৈল এষ পার্শ্বে মহােদধিঃ [ গােরেসিত্ত সং কিষ্কিন্ধ্যা ৫২৩১-৩২। ২। ভারতী ১৩০৬ ভাদ্র ৪২০ পৃঃ।

জনপদ। কিষ্কিন্ধ্যার ৪১ সর্গে লিখিত আছে যে, কিষ্কিন্ধ্যার দক্ষিণে নর্মদা, গােদাবরী, বিন্ধ্য, বেত্রবতী (বর্তমান বেটওয়া) এবং দােন অবস্থিত ছিল। ইহার পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র, দ্বারাবতী, সিন্ধু, সৌবীর ও অমি এবং (বােম্বাই সংস্করণ মতে) বালুকাময় মরুস্থলী প্রভৃতির উল্লেখ আছে এবং ইহার উত্তরে শূরসেন (মথুরা) ও মৎস্যদি প্রদেশের অবস্থান বর্ণিত হইয়াছে। সুতরাং মহীশুর অঞ্চলে যাহারা কিষ্কিন্ধ্যার অবস্থান নির্দেশ করেন, উক্ত বচনগুলি যে তাহাদিগের মতের প্রতিকূলতা আচরণ করে, তাহা বলাই বাহুল্য। রামায়ণ-বর্ণিত কিষ্কিন্ধ্যার অবস্থান পাঠ করিয়া, কোনরূপেই বলা যায় না যে, কিষ্কিন্ধ্যা মহীশূর প্রদেশে অবস্থিত ছিল। যুক্ত নবীনচন্দ্র দাস মহাশয় তাহার ইংরাজী পুস্তকে * বলেন যে, বর্তমান সময়ে আমরা মধ্যভারত বলিতে যতটা বুঝি, তাহার অনেকটা লইয়াই কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্য গঠিত হইয়া ছিল। ইহা মধ্যভারতেই অবস্থিত ছিল; কিষ্কিন্ধ্যার সম্বন্ধে এই পরিচ্ছেদে যাহা লিখিত হইয়াছে, তাহ স্থিরভাবে পাঠ করিলে এই মই যথার্থ বলিয়া মনে হয়। ৩। কিষ্কিন্ধ্যা ৪৩ সর্গ । * The Ancient Geography of Asia.

সুবর্ণদ্বীপ বা লঙ্কা রামায়ণ-বর্ণিত লঙ্কার বিবরণ পাঠ করিতে করিতে মনে হয়, কবি বুঝিবা বিংশ শতাব্দীর কোন উন্নত জনপদের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। সে রমণীয় চিত্র অতীব চমকপ্রদ ;-একদিকে বিলাসিতার উজ্জ্বল চিত্র, অপর দিকে সৌন্দর্য্যের নিখুঁত বর্ণনার এমন অদ্ভুত, সংমিশ্ৰণ কবির অমৃত- ময়ী লেখনীমুখে সম্ভবপর হইয়াছে যে, তাহা পাঠ করিতে করিতে মনে কলিকাতা নগরী দূরে থাক্‌, লণ্ডন-প্যারিও তাহার নিকট মলিন হইয়া পড়ে। মণি-বিদ্রুম-বৈদূৰ্য্য মুক্তা বিরচিত’ তােরণ প্রাচীরাদির কথা ছাড়িয়া দিয়া, দুর্গাদির বিষয় পাঠ করিতে করিতে মনে হয়, লঙ্কা অনাৰ্য্য-প্রদেশ বলিয়া কথিত হইলেও, তাহা কখনই অসভ্য নরমাংস- ভােজী Cannibal প্রদেশ হইতে পারে না।* রামায়ণে লঙ্কার এইরূপ বর্ণনা দেখা যায় —(১) মহতী রথসংপূর্ণা রক্ষোগণনিষেবিতা ॥১০ রাজিভিশ্চ সুসংপূর্ণা সা পুরী দুর্গমাপরৈঃ। দৃঢ়বদ্ধকপাটানি মহা পরিখচণ্ডিচ ॥১১ তত্ৰেযু-পলযন্ত্রাণি বলবন্তি মহান্তি চ। আগতঃ পরসৈন্যং তৈস্তত্র প্রতিনিবাৰ্য্যতে ॥১২ * রামায়ণ পাঠে দেখা যায় সীতা রাবণকে অনাৰ্য বলায় ইন্দ্রজিৎ রামকে অনাৰ্য্য বলিয়াছিলেন। ইহাতে কেহ কেহ মনে করেন, তখন আৰ্য্য ও অনাৰ্য্য শব্দ প্রচলিত থাকিলেও, অনাৰ্য্য বলিয়া ভারতে কোন জাতি ছিল না। এখনকার ন্যায় তখনও অনাৰ্য কথা বধ হয় গালাগালির ভাষাই ছিল। কিন্তু রামায়ণেই স্পষ্টতঃ উক্ত হইয়াছে,-রাবণ অনাৰ্য্য নহেন, ক্ষত্রিয়। ১। লঙ্কাকাণ্ড ৪র্থ সঃ।

জনপদ। ৭১ দ্বারেষু সংস্কৃভীমাঃ কায়সময়াঃ শিতাঃ। শতশাে রচিতবীরৈঃ শতঘ্ন্যো রক্ষসাং গণৈঃ ॥১৩ দ্বারেষু তাসাং চত্বরঃ সংক্রমঃ পরমাতাঃ। বরুৈপে বহুভিমহদ্ভিগৃহপংক্তিভিঃ ॥১৪ ভাবার্থ।-লঙ্কা বহু রথ-গজ-বাজিপূর্ণা দুর্গম পুরী। চারিটা মহাদ্বার মহা পরিবেষ্টিত নানাবিধ যন্ত্রাদি, সেতু (Daw Bridge?) জলপূর্ণ পরিখা উচ্চ প্রাচীরসমন্বিতা লঙ্কা-পুরী। অগ্নিপুরাণে লিখিত আছে যে, লঙ্কাপুরী ত্রিংশৎ যােজন বিস্তীর্ণা, এবং ইহার প্রাকারসমূহ সুবর্ণ নির্মিত। * এই স্থান অতীব রমণীয় ; নানাস্থান নীল, বৈদূৰ্য্য মণি ও পদ্মিনী সমূহ পতঙ্গ দলে আবৃত, আবার কোন স্থানে রজত ও কাঞ্চন নির্মিত বিমানসকল শােভা পাইতেছে এবং স্থানে স্থানে মুক্তাজালে সমাবৃত সুবর্ণগবাক্ষযুক্ত হেম ও রজত নির্মিত গৃহসকল বিদ্যমান। মহাতেজা মায়াবী ময় দানব মায়াবলে এই কাঞ্চনময় বনভূমি নির্মাণ করেন। ১ (ইহার মহােচ্চ শিখর গগন স্পর্শ করিয়াছে, লঙ্কানগরী পিরবর্ণ মেঘ সদৃশ সুবর্ণ ও রজত প্রাসাদ এবং বিমান সমূহে বিভূষিত।) তথায় চম্পক, অশােক, বকুল, শাল, তাল, তমাল, পনস, নাগ-কেশর, হিল, অর্জুন, কদম্ব, খন্তর্প, তিলক, কণি- কার ও পটল প্রভৃতি উদ্ভিদ জন্মিত। ২ এরূপ সুমহতী পুরীর কথা পাঠ করিয়া, কাহার না ইহার ইতিহাসাদি জানিতে ইচ্ছা হয় ? আমরা লঙ্কার সম্বন্ধে যতদূর জানিতে পারিয়াছি, তাহাই বলিতেছি। (ময় দানবের অপূৰ্ব্ব কীর্তি, মহাকবিবর্ণিত স্বর্ণ-লঙ্কার ভৌগলিক * অগ্নি পুঃ কপিলদর্শন নামাধ্যায়। ১। কিষ্কিন্ধ্যা ৫১ সঃ। ২। লঙ্কাকাণ্ড ৩৯ সঃ।

१२ রামায়ণ-যুগের ভারত। অবস্থান লইয়া, বর্তমান ঐতিহাসিকগণের মধ্যে অত্যন্ত মত-ভেদ দেখা যায়। অনেকের মতে বর্তমান সিংহল বা সিলােনেরই প্রাচীন নাম লঙ্কা। আবার কেহ কেহ বা এমন কথাও বলেন যে, লঙ্কা বলিতে আৰ্য্যগণ যে জনপদ নির্দেশ করিয়াছেন, বর্তমান সময়ে তাহা অষ্ট্রেলিয়া নামে পরিচিত। কিন্তু ইহার ভৌগলিক অবস্থান নির্দেশ করিবার পূর্বে আমরা একটি অবান্তর বিষয়ের অবতারণা করার প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করিতেছি। (প্রাচীন গ্রন্থপাঠ করিয়া, আমরা বুঝিতে পারি পূৰ্ব্বকালে ভারতীয় আর্যগণ দেশ বিদেশে উপনিবেশ স্থাপনব্যপদেশে পৃথিবীর নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিয়াছেন। রামায়ণ ও মহাভারত পাঠে এই ধারণাই বদ্ধমূল হইয়া পড়ে। রামায়ণে প্রাচীন ব্রাহ্মণ ধৰ্ম্মাবলম্বী হিন্দুগুণের বিন্ধ্যপর্বত অতিক্রম করিয়া, দক্ষিণাপথে, অনন্তর ভারতবর্ষ ছাড়িয়া, সিংহল প্রভৃতি ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ দ্বীপসমূহে কাৰ্যানু- রােধে গমনাগমনের কথা লিখিত আছে। আৰ্যদিগের মধ্যে মুনিবর অগস্ত্য দক্ষিণাপথে গমন করেন। সম্ভবতঃ (?) তাহার দ্বারাই তথায় আৰ্যসভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎপরে তাঁহারা দক্ষিণ সমুদ্রস্থ দ্বীপ সমূহে যাতায়াত করিতে থাকেন। রামায়ণে তাহারই আভাস পাওয়া যায়। আৰ্যপ্রবর রাম ও লক্ষ্মণ সীতা উদ্ধারে তথায় গমন করেন। রামায়ণে লঙ্কার ভৌগলিক অবস্থানের এইরূপ পরিচয় পাওয়া যায়- মলয় পর্বতের পরে, তাম্রপর্ণী নদী, এই নদী সাগরে মিলিত হইয়াছে। এই নদী উত্তীর্ণ হইলেই পাণ্ড্য নগর, ইহার পুরদ্বার সুবর্ণ নির্মিত। পাণ্ড নগরের পরেই সমুদ্র, সমুদ্র পার হইয়াই সমুদ্রমধ্যস্থিত অগস্ত্য- নিবেশিত মহেন্দ্র পর্বত দেখিতে পাওয়া যায়। ইহারই অপর পারে প্রভাযুক্ত একটি দ্বীপ আছে, তথায় রাবণ বাস করেন।* মলয় পৰ্ব্বতের * কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড ৪১ অঃ ১৫-২৫।

জনপদ। ৭৩ নাম পশ্চিম ঘাট, এই পৰ্ব্বতের যে স্থান হইতে তাপণী উৎপন্ন হইয়াছে, সেই স্থানকে অদ্যাপি অগস্ত্যাদ্রি বলে।১ তাম্রপর্ণী নদী তিনীবেলী প্রদেশের মধ্য দিয়া, সাগরে আসিয়া মিলিয়াছে। এই নদীর তীরে স্থাপিত রামায়ণবর্ণিত পাণ্ড্য নগরকে প্রাচীন আরব ও গ্রীক ভৌগলিকগণ “কোলকে” ও “কো এল” এবং তন্নিকটস্থ সাগরকে “কোলকিকস” বলিতেন। ২ এই সমুদ্র পার হইয়াই মহেন্দ্র পর্বত। ঐতিহাসিকগণের মতে ইহাই সিংহল দ্বীপের মহিঙল পৰ্বত। ৩ রামায়ণের সময়ে তাম্রপর্ণী নদীপ্রবাহিত ভূমিখণ্ড দক্ষিণাংশে আরও অনেকটা বিস্তীর্ণ ছিল। এই নদী অতিক্রম করিয়া সিংহল দ্বীপে যাইতে হইত বলিয়াই পৌরাণিক কালে সিংহলকে তাম্রপর্ণ বলা হইত। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, সিংহল ও লঙ্কা দুইটী স্বতন্ত্র জনপদ। আমাদিগের পুরাণাদি শাস্ত্রেও এই মত সমর্থিত হইয়াছে। ৪ সিংহলের অন্তর্গত লঙ্কা নামক পৰ্বত থাকায়, অনেকেই সিংহল ও লঙ্কা একই জনপদ বলিয়া মনে করিয়া ভ্রম করিয়াছেন। যাঁহারা এই যুক্তির দ্বারাই আপনাদিগের মত প্রতিষ্ঠিত করিতে চান, তাহাদিগকে এই বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, সিংহলের লঙ্কা ব্যতীত কাশ্মিরেও লঙ্কা নামে একটি দ্বীপ দেখিতে পাওয়া সুতরাং ইহাকেও রাবণের লঙ্কা বলা যাইতে পারে। ৫ ফল কথা, কেবল নামের মিল পাইলেই প্রাচীন জনপদাদির অবস্থিতি নিরূপিত যায়। > I Caldwell's Dravidian Grammar. Intro. P. 48. ২। লেসন সাহেব বলেন ইহার বর্তমান নাম মান্নার উপসাগর। ৩। বিশ্বকোষ ১৭শ ভাগ ১৪৬ পৃঃ। ৪। মহাভারতে সিংহল ও লঙ্কার স্বতন্ত্র উল্লেখ আছে, যথা—সিংহল রান স্লেচ্ছান যে চ লঙ্কানিবাসিন। ( মহা ৫১ অঃ ২২।) ৫। J. A. S. B. Vol. XXXV. Pt. I, P III.

৭৪ রামায়ণ-যুগের ভারত। হইতে পারে না। উভয় স্থানের ভূতত্ত্ব, চতুর্সীমা প্রভৃতির সহিত বৰ্ত্তমান নির্দিষ্ট স্থানাদির ভূতত্ত্বাদির সৌসাদৃশ্য হইলে, তবে মতামত জোরের সহিত দেওয়া যাইতে পারে। ব্ৰহ্মাণ্ড পুরাণে লিখিত আছে যবদ্বীপের পর মলয়দ্বীপ এবং মলয় নামক দ্বীপের অন্তর্গত পৰ্বতের সানুদেশে লঙ্কাপুরী। ৬ রামায়ণে লঙ্কা- পুরীর আর একটা নাম সুবর্ণ-দ্বীপ। রামায়ণে এইরূপ সুবর্ণদ্বীপের ভৌগলিক অবস্থানের কথা পাঠ করা যায়। যথা- যত্নবন্তো যবদ্বীপং সপ্তরাজ্যোপশশাভিত। সুবর্ণরূপকদ্বীপং সুবর্ণকরমণ্ডিতম্। কিষ্কিন্ধ্যা ৪৯৩. ইহার দ্বারা বেশ বুঝা যাইতেছে যে, যবদ্বীপের নিকটে সুবর্ণ ও রূপকদ্বীপ। যবদ্বীপই বৰ্তমান যাবা। পূৰ্ব্ব উপদ্বীপের অন্তর্গত শ্যাম দেশের দক্ষিণ দিক্‌স্থ ভূখণ্ডকে মলয় প্রায়ােদ্বীপ বলে, উহা যবদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত। রামায়ণে এই মলয় ভাষার উল্লেখ আছে। এই মলয়ভাষী জাতিগণই যে রামায়ণে রক্ষঃ বা রাক্ষস নামে অভিহিত হইয়াছে, এরূপ অনুমান করিবার কারণ আছে। এখনও যবদ্বীপের নিকটবর্তী ফোলিস দ্বীপে এক প্রকার ভীষণ কৃষ্ণবর্ণ জাতি বাস করে, তাহারা রক্ক বা রাক্ষস নামে পরিচিত। ঐ দ্বীপের মধ্যেই লরান্তক নামে একটী নগর আছে, তাহা সংস্কৃত নরাত্তক শব্দের অপভ্রংশ মাত্র। এই দ্বীপের নিকটেই এখনও রাম, লক্ষ্মণ, নীল প্রভৃতির নামে বহু কীৰ্ত্তি বিদ্যমান আছে। প্রমাণ দ্বারা বােধ হয় যে, রাবণের রাজত্বকালে সেই গণনাতীত সময়ে লঙ্কারাজ্য বর্তমান সুমত্রা প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জ হইতে আরম্ভ করিয়া ৬। ব্রহ্মাণ্ডে অনুষঙ্গপাদ ৫৩ অঃ।

জনপদ। ৭৫ মাদাগাস্কার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। * হিন্দুগণ সুমাত্রা দ্বীপে স্বর্ণ আহরণের জন্য যাতায়াত করিতেন। এবং নগরের সংস্কৃত নামাদি আজিও হিন্দু- প্রাধান্যের পরিচয় দিতেছে। এই লঙ্কায় রাবণ বাস করিতেন। তাহার দ্বারা জিলােক দ্রাবিত ও ভীত হইত বলিয়াই তিনি রাবণ নামে খ্যাত। তিনি ব্রহ্মার প্রপৌত্র ; তাহার পিতার নাম বিশ্রবা। সীতাদেবীর অপহরণ জনিত কলহের ফলে রাম-রাবণের যুদ্ধে তাহার পতন হয়। রামায়ণে লিখিত আছে যে, রাবণ নিহত হইলে অন্তরীক্ষে শুভসূচক দেবদুন্দুভি বাদিত হয়, নভােমণ্ডল হইতে মনােহর ও অনন্যদুর্লভ, পুষ্পবৃষ্টি পতিত হইয়া, রামচন্দ্রের রথকে বিকীরিত করে, এবং পৃথিবীর ভার হ্রাস হওয়ায়, পৃথিবী সুস্থ হন। কবে রাম-রাবণের যুদ্ধ শেষ হইয়াছে। বলদীপ্ত রাবণ বল্কল-সম্বল ধৰ্ম্মরূপী রামের হস্তে পরাজিত হইয়াছেন। ভারতের নরনারী সেই কাহিনী কণ্ঠস্থ করিয়াছে; কিন্তু জগৎ আজিও তাহার মহতী শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারে নাই। তাই আজি আবার অর্থবলদীপ্ত অহঙ্কার মূর্তি-পরিগ্রহ করিয়া ধর্মের উপর, নৈতিক শক্তির উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করিবার চেষ্টা করায়, প্রাচ্য সভ্যতার আদর্শের সহিত প্রতীচ্য সভ্যতার আদর্শের সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছে, কিন্তু তাহাতে আবার ভারতীয় সভ্য- তাই প্রাধান্য লাভ করিবে, এমন সম্ভাবনাও দেখা যাইতেছে। সম্পূর্ণ। * বিশ্বকোষ ২য় ভাগ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ramayan-juger Bharat

Author
Mitra,surendranath
Title
Ramayan-juger Bharat
File name
Ramayan-juger Bharat
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2010/04/21
Publisher
Nirmal Chandra Ghosh, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
86
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epics
Keywords
Ayodhya
DLI number
510669
Barcode
4990010016302.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
AhO2306oBtm
Download PDF

Ramayan-juger Bharat