Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Pranochhas

Bandopadhyay,jogendranath · 2009/11/3

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

প্রাণােচ্ছ্বাস
বা.
বিবিধ বিষয়ক কবিতামালা।
শ্রীযােগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিদ্যাভূষণ, ওম এ-প্রণীত।
ননীপোপাল মুখোপাধ্যায় কর্তৃক
প্রকাশিত।
কলিকাতা
৫৪২১ নং গ্রে স্ত্রীট, আৰ্যযন্ত্রে,
গিরিশ্চন্দ্র ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত।
১২৯৫ সাল।
মূল্য।• কানা মাত্র।

No text on this page.

* মুখবন্ধ। এ সংসারে অল্প বিস্তর পরিমাণে সকলেই কবি। হৃদয়ের ভাবে স্থাসকে ছন্দোবন্ধে গ্রথিত করিয়া সকলে প্ৰকাশ করিতে পারে না বটে, কিন্তু তরঙ্গের ঘাত প্রতিঘাতে সকলেরই হৃদয় সময়ে সময়ে আলােড়িত হইয়া থাকে। সেই বিলােন কালে ছন্দোময়ী রচনা অল্পায়াসেই বহির্গত হয় । যাহার ঐকান্তিক সাধনা আছে, তিনিই ইহাতে সিদ্ধি লাভ করিয়া থাকেন। কবিকুলচূড়ামত্রি কালীদাসের সাধনা ও সিন্ধি এ বিষয়ে আমাদের অনুকূলে সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। কালীদাস নিতান্ত মূখ হইয়াও ঘােরতর সাধনাবলে ছন্দোময়ী রচনাতে অসাধারণ সিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। বিকীরিত রবি-কিরণের ততদূর দাহিকা-শক্তি নাই। কিন্তু সেই বিকীরিত রবি-কিরণ যখন কাচ খণ্ডে সঙ্কীরিত বা সংশ্লেষিত হয়, তখন তাহার প্রচণ্ড দাহিকা.শক্তি জন্মে। সেইরূপ আমাদের ভাবােচ্ছ্বাস যখন গদ্যে বিকীরিত থাকে, তখন ইহার উদ্দীপনা-শক্তির তত তীব্রতা থাকে না। কিন্তু সেই ভাবােচ্ছাস যখন ছন্দোময়ী রচনায় সঙ্কীরিত হয়, তখন ইহার উদ্দীপনা-শক্তি অনেক পরিমাণে বাড়িয়া উঠে। এই জন্যই জগতে কবিত্বের এত আদর । ছন্দোময়ী রচনা মাত্রই যে কবিতা তাহা আমি বলি না। যেখানে ভাবোচ্ছ্বাস নাই, কেবল ছন্দ ও শব্দের চাতুর্য মাত্র আছে, তাহা ছন্দোময়ী রচনা হইতে পারে, কিন্তু প্রকৃত কবিতা নহে। আবার ছন্দোবন্ধে অঙ্গহীন হইলেও ভাবময়ী রচনাও অনেক স্থলে কবিতা-পদ- বাচ্য হইতে পারে। বিশ্বপ্রেম ও ভগবদ্ভক্তিই, কবিত্বের অনন্ত উৎস। সেই উৎসের নিৰ্ম্মল জলপানে অনেক কবিই অনুপ্রাণিত হইয়াছেন। এই জলে চিমুকুর বিধৌত হইলে তাহাতে বীণাপাণি সহজেই আবিভূতা হন।

সেই প্রেম ও ভক্তিতে যখন আমার হৃদয় উচ্ছসিত হইয়াছে, বা সংসারের ঘটনাবলীর ঘাত প্রতিঘাতে যখন আমার চিত্ত আলােড়িত হইয়াছে, তখনই আমি এই কবিতাগুলি লিপিবদ্ধ করিয়াছি এই জন্যই এই কবিতায়ালার নাম ‘প্রাণোচ্ছাস রাখিলাম। অতি অল্পদিনের মধ্যে এই কয়টা কবিতা লেখা হইয়াছে। আর ছন্দোময়ী রচনাতে আমার এই প্রথম উদ্যম। এই দুই কারণে আশা করি সুধীগণ আমার ক্ৰটী মার্জনা করিবেন। কিমধিকমলম। নিবেদক পাবনা, ১৮১ • শকাব্দা, চৈত্র। } যােগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ। বিজ্ঞাপন। আমার দিনাজপুরে অবস্থিতি কালেই রাজ-অভ্যর্থনা ভিন্ন আর সব কয়টা কবিতা লিখিত হয়। আমার দূরে অবস্থিতি নিবন্ধন প্রাফ সংশোধনাদির অনেক ত্রুটি হইয়া গিয়াছে। পাঠকগণ যদি কোন স্থলে কোন ভ্ৰম প্রমাদ দেখিতে পান, অনুগ্ৰহ করিয়া আমায় লিখিলে আমি বিশেষ অনুগৃহীত হইব, এবং দ্বিতীয় সংস্করণ কালে সেই ভ্রম গুলি সংশোধন করিয়া লইব। যদি এই কবিতাগুলি পাঠ করিয়া এক জন পাঠকও প্রীতি লাভ করেন, তাহা হইলে আমার মুদ্রাক্ষনব্যয় সার্থক হইল বলিয়া মনে করিব। গ্রন্থকারস্য।

প্রাণোচ্ছ্বাস।
স্তোত্র
নমাে-বিশ্বরূপায় ! নমাে-বিশ্বকুহকিনে।
(১)
দয়াময়, হে ঈশ্বর পতিত-পাবন।
দীন হীনে দয়া কর, করুণা-নিধান !
এ জগতে বল মাের, কে আছে এমন
পরম আত্মীয় জন, তুমি হে যেমন ?
(২)
তুমি বিনা গতি মুক্তি, অনাথের নাথ।
কি আছে জীবের আর, জানিনা ! জানিনা !
নির্বোধ মানব তবু, বুঝেও বােঝে না !
জেনেও জানে না, সদা মােহে ভুলে রয়!
( ৩ )
মােহে ভুলে, ভুলে যায় জগৎ-জননী।
পিতা মাতা পাত ধাতা-সকলি গাে তুমি-
তুমি ভাই, তুমি বােন্“তুমি সাথী সখা
তুমি সখী, তুমি জায়া, তুমি জীবকায়া !

প্রণােম্বাস।
( ৪ )
তুমি গাছ, তুমি পাতা,তুমি শাখা মূল !
তুমি গিরি, তুমি নদী, তুমি হে সাগর ।
তুমি পােত, তুমি পাল তুমি হে নাবিক!
তুমি তৃণ লতা ঘাস, তুমি সরােবর।
(৫)
তুমি ফুল, তুমি ফল, তুমি হে মুকুল।
ফুলের সুবাস তুমি, তুমি গন্ধবহ !
তুমি ক্ষিতি, তুমি অপু, তুমি হে মরুৎ !
তুমি তেজ, তুমি ব্যোম,তুমি পঞ্চভূত !
( ৬ )
যে দিকে ফিরাই আঁখি, যা কিছু হে দেখি,
পঞ্চের বিকার সব—সেই পঞ্চভূত
তােমারি মায়ার ফল !–তাই বলি নাথ !
বিশ্বে বিশ্বরূপে কিবা আছয়ে প্রভেদ ?
(৭)
ঐ যে রয়েছে রবি গগনে উদিত,
রজত কিরণে দিক্ করিয়া উজ্জ্বল,
ললাট-ভালেতে তব যেন শ্বেত ফোটা !
সে রবি অভিন্ন কভু নহে তােমা হতে।
( 8 )
ঐ যে নক্ষত্রমালা গগন-শােভন!-
পৃথিবীর অন্ধকার হরিয়া লইয়া,
কিরণ-বসনে অঙ্গ ঢেকেছে ইহার,
এরাও অভিন্ন কভু নহে তােমা হতে।

প্রাণোচ্ছাস।
(৯)
আর যে চন্দ্রমা ওই—পূর্ণ মনােহর
নক্ষত্ৰ-ফুলের মালা ধরিয়া বক্ষেতে,
সুধা বষিয়া ঠাণ্ডা করিছে ভূতল,
সে চন্দ্র অভিন্ন কভু নহে তােমা হ’তে।
(১০)
যে চন্দন ভক্তিভাবে, অঙ্গেতে লেপন,
করিয়া প্রফুল্ল লােক হয় হে সতত,
যাহার পবিত্র-বাসে, ভক্তি গদগদ
হয় যাহার মন, সে জন পামর ।
(১১)
সেই যে চন্দন দেব-দুল্লভ সামগ্রী
তাহাও যেমতি তুমি; তেমতি হে তুমি-
ওই ন্যক্কারজনক মল মূত্ৰ পূজ!
মেধ্যামেধ্য সব তুমি ওহে বিশ্বরূপ।
(১২)
আমি যে অজ্ঞান, তাই বুঝিতে না পারি,
: কি সাধ্য আমার নাথ! বুঝিহে তােমায়
দিলে বুঝায়ে মােরে কৃপা বিতরিয়া-
নয়ন থাকিতে অন্ধ, মােহ-অন্ধকারে।
(১৩)
দিয়াছিলে জ্ঞান-নেত্র অর্জুনে যেমন,
দেওহে তেমতি মাের ফুটায়ে নয়ন,
দেখি প্রাণভরে কত রূপ ধর তুমি,
ওহে বিশ্বনাথ ! কত সাজে সেজে আছ।
,

প্রাণোচ্ছাস।
(১৪)
ভক্ত জন সদা হয় অবােধ অজ্ঞান !
যােগ্যতা বুঝেনা তারা, সদা আদার
বাপের নিকটে পেতে যা-কিছু হে ভাল ;
সাজে হে আবদার বলি করেহে আবদার।
(১৫)
জানে সবে ভক্ত-বাঞ্ছাকল্পতরু তুমি !
বিদিত পুরাণে, তন্ত্রে, তথা স্মৃতি বেদে ;
তাই ভক্ত আমি আজ ডাকিহে তােমায়,
দেখাও তােমার সেই অনন্ত মূরতি !
(১৬ )
ঘুচে যাক্ মােহ মাের! নিবুক আগুণ
জ্বলিছে অন্তরে যাহা-ধিকি ধিকি সদা
রাবণের চিতা সম-অমৃত বর্ষণে
অমৃত দর্শনে—তাহা হােক নির্বাপিত !
(১৭)
শােক দুঃখ মনস্তাপ হে বিশ্ব-ভূপতি!
সকলি তােমারি মায়া ;-পাঠাও তাদের
করিতে ছলনা জীবে, মায়া-মৃগ-রূপে;
অবোধ মানব মরে, পড়ে সে কুহকে।
(১৮ )
হে বিশ্ব-কুহকী! কার আছে হেন সাধ্য
বুঝে ইন্দ্রজাল তব, না বুঝয়ে দিলে।
স্কুল-বুদ্ধি লােকে মাত্র বুঝে ল স্কুল,
ভিতরে প্রবেশ করে অতি অল্প লােকে।
;

প্রাণেশ্বাস। (১৯) যারা প্রাণ মন দেহ সকলি অর্পণ করেছে চরণে তব ; তুমি নিরন্তর শােক দুঃখ মনস্তাপ দেহে তাদের ; দগ্ধে দগ্ধে কর খাঁটি সােণীর মতন। ( ২০ ) কাড়ি লও ধন বস্ত্র—স্ত্রীপুত্র হিতা- সৰ্বস্ব কাড়িয়া লও-যা-কিছু হে ভাল্প- সতী ভাৰ্য্যা কাড়ি লও-কাহারাে বেলায় আদর্শ সতীরে কর আদর্শ অসতী। (২১) যে ভক্ত যাহাতে রক্ত—তার তাই লও কাড়ি ;-কে বুঝে মহিমা তােমার অপার ? কিন্তু লীলা সব তব জীব-শুভ-হেতু, যে জানে তাহার মন রয় হে অটল । ( ২২ ) যাকে যত ভালবাস-তার তত কষ্ট ! ধার্মিকের প্রাণে সদা বাজে তব শেল, কামার-হাতুড়ী যথা পিটায় লােহায়, করিতে ইহায় দৃঢ় কঠিন ইস্পাত ! (২৩) পিটালে লােহা কভু হয় কি ইস্পাত ? না পােড়ালে সোণা কভু হয় কি নির্মল ? শাসিলে ছেলে কভু হয় কি সুশীল ? না পােড়ালে কাদা কভু হয় কি ইষ্টক ?

প্রণোসি।
(২৪)
আদুরে ছেলের বুল কবে কি হয়েছে ?
বিনা কষ্টে রত্ন মিলে কে কবে দেখেছে।
বিধাতার দণ্ড কভু যে না সহিয়াছে,
তাহার অদৃষ্টে দুঃখ নিশ্চয় রয়েছে।
(২৫)
অটল-অচল-সমভক্তের অন্তর,
ঝঞাবাতে বিচলিত কভু নাহি হয় ;
তৃণতে সামুতে বল কিসের অন্তর,
উঠিলে বাতাস যদি কাপয়ে উভয় ?
(২৬)
বিশ্বাস অটল যার তব বিশ্বরূপে,
বিপদে তাহার মন কেন বিচলিবে ?
সে জানে-নাবিক যিনি, তিনিই তরঙ্গ
সে তরঙ্গে রঙ্গে তাই অঙ্গ ভাসাইবে।
( ২৭)
তরঙ্গ কাটায়ে ভক্ত বীরের মতন,
সহ কর্ণধার তরি-যাবে স্বর্গধাম ;
তথা গিয়া জ্ঞান-নেত্রে দেখিবে সকল,
অজ্ঞান মােহের হাত হইতে এড়াবে।
( ২৮ )
সাধু! সাধু! সাধু! বলি ওহে দীননাথ।
লইবে তুলিয়া কোলে তব ভক্ত জনে,
যখন দেখিবে তার বিশ্বাস অটল
তব বিশ্বরূপে, ভেদ বুদ্ধি গেছে সব।

প্রাপােস।
( ২৯ )
এক হ'তে পঞ্চ কোষে আবৃত জীবাত্মা
মেঘমুক্ত-সূৰ্য্য-সম হইবে উজ্জ্বল।
এক এক কোষ করি যবে পঞ্চ কোষ
পুড়িয়া হইবে ভস্ম দুঃখ-হুতাশনে !
( ৩০) •
চৈতন্যে চৈতন্যে তা অপূর্ব মিলন
দেখিয়া বিস্মিত হবে দর্শকের মন ।
ব্যক্তিত্ব ঘুচিয়া যাবে—বিশ্বত্ব আসিবে,
বিদেহ মুক্তিতে জীব চৈতন্য পাইবে।
ও স্বস্তি। ওঁ স্বস্তি !! ওঁ স্বস্তি !!!

রাজা রামমােহন রায়ের প্রতি।
(১)
কে তুমি শুইয়া এই মন্দির-ভিতরে
অনন্ত নিদ্রায় আছ সমাধি-নিহিত ?
যােগ-রত-যােগি-মত, বল হে আমায়,
দেব কি দানব কিম্বা মানব-প্রধান ?
এসেছি এথায় আমি খুজিতে হায়
এসেছেন এথা যিনি, করিতে মােচন
ভারতের দুঃখ রাশি, হয়ে প্রতিনিধি-
প্রজার পঁচিশ কোটী, মহাসভা-কাছে।
( ৩ )
শুনেছি আর্ণোর গুহা আছে শ্বেতদ্বীপে,
তথায় আছেন তিনি সমাধি-নিহিত,
হারায়ে আপন প্রাণ ভ্রাতৃ-কাৰ্য্য-তরে !
এই কি আর্ণোর গুহা,–এই সে মন্দির ?
(৪)
বলে দেও পথিকেরে কে আছি হেথায়,
বিদেশী আমি গাে হায়ণ না জানি সন্ধান।
বলে দেও দেব নর যে আছ হেথায়,
ব্যাকুল অন্তর মম-বিলম্ব সহে না !

প্রাণােস।
(৫)
কোথা হতে যেন বাণী উঠিল আকাশে,
কে যেন বলিল মােরে—এই আর্ণো-গুহা-
এই সে মন্দির-যথা অনন্ত নিদ্রায়,
শায়িত আছেন রামমােহন রতন!”
( ৬ )
আনন্দে উৎফুল্ল আমি হইনু তখন!
শ্রবণ-দর্শন-আদি ইন্দ্রিয়-পঞ্চক
প্রবেশি সকলে নেত্রে দেখিতে লাগিল
সেই অপূৰ্ব্ব মন্দির, নেত্ৰ-মনন-হারি !
(৭)
ভক্তিভাবে করযােড়ে রহিনু তখন
মন্দির-সমীপে আমি, করি নত জানু ;
কহিনু—এসেছি দেব, ভক্তি-উপহার,
দিয়া পূজিতে তােমায়, ভারত-ইইতে।
(৮)
লহ পূজা মাের দেব—করি দয়া মােরে !
অকৃতজ্ঞ মােরা—তাই তােমা হেন জনে
পূজি না সকলে! বীরপূজা-বীরা…না
যে দেশে না হয়, কবে সে দেশ উঠেছে ?
(৯.)
ধৰ্ম্মবীর—দয়াবীর আর দানবীর,
যুদ্ধবীর-সম-পূজ্য—অথবা অধিক
পূজ্য ; যেহেতু তাঁহারা অধিক মঙ্গল
করেন ধরার ; তাই পূজিব তােমায়।

১০ প্রাণোচ্ছাস। . . (১০) দীনহীন আমি-নাহি মাের অন্য ধন- ভক্তি কৃতজ্ঞতা বিনা ; অমূল্য সে ধন ! লহ দয়া করি দেব! তব যােগ্য তাহা ; অসার সে পূজা দেব! ভক্তি-শূন্য যাহা ! (১১) স্বামি-চিতানলে দগ্ধ হ’ত সতীগণ জাতি-কুল-ভয়ে, কিম্বা কুটুম্ব-তাড়নে অনিচ্ছায় ! তুমি দেব রাজাকে বুঝায়ে করিলা আইন, যাতে সে বীভৎস প্রথা- (১২) হইল রহিত। সতীগণ ব্রহ্মচর্য্য করিয়া দেখাতে নিজ প্রকৃত সতীত্ব সুবিধা পাইল দেব! পুড়িয়া মরিলে নিভিল সকল ক্লেশ! কিন্তু দিন দিন (১৩) করি বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়া উপহার যে সতী করয়ে পূজা নিজপতি দেবে, 'তাহার তুলনা দেব, নাহি এ জগতে। আমরণ ব্রহ্মচর্য শ্রেষ্ঠ সব হ’তে ! (১৪) সহমরণ কঠোর। কিন্তু তাহা হ'তে ব্রহ্মচর্য, আমরণ—অধিক কঠোর, অধিক পরীক্ষাস্থল! প্রতিপদে বিপ্ন! সে মহাপরীক্ষা দিতে পারে কয় সতী ? । !

প্রাপেশ্বাস। ০ --- (১৫) তাই বলি দেব। রক্ষিয়া সতীরে, রক্ষিয়াছ নারীকুলে; প্রকৃত সতীরে পরীক্ষা দিবার তুমি—দিয়াছ সুবিধা ; পুড়িয়া মরিলে তার কি হ’ত সুবিধা ? (১৬) নারী-হৃদয়-ভাণ্ডার অনন্ত স্নেহের উৎস। সে উৎস হইলে রুদ্ধ-মরুম হইত ভারত! তুমি রক্ষিলা ভারতে আজ রক্ষিয়া সতীরে চিনল হতে। (১৭) আর ভারতবাসীর হৃত অধিকার উদ্ধার করিয়া তুমি সাধিলে মঙ্গল! কত গুণ তর দেব! বলিব কেমনে? হায় ক্ষীণজিহ্ব আমি—তথা জ্ঞানহীন। (১৮) সত্য আৰ্য-ধৰ্ম্ম তুমি করিতে প্রচার, এসেছিলে শ্বেতদ্বীপে ; বলিতে সকলে অৰ্য্য-ধৰ্ম্ম ব্ৰহ্মময়—নহে পৌত্তলিক- আৰ্য্যধৰ্ম্মে ব্ৰহ্মজ্ঞান একমাত্র বীজ। (১৯) হইল সকলে স্তব্ধ শুনি এ বারতা। জানিত ইহারা—মােরা পুতুল-পূজক ! আৰ্য্যধর্মে ব্ৰহ্মজ্ঞান একমাত্র বীজ শুনিয়া বিস্মিত এরা হয়েছে এখন। .

প্রাণােচ্ছল। (২০ ) ঘােষিলে জগতে তুমি মহিমা অপার তার—যিনি সর্বব্যাপী সত্য নিরঞ্জন। যিনি সর্বদশী নিত্য অজর অমর। যিনি সর্বশক্তি-সৰ্ব্ব-দয়ার নিধান। (২১) ব্ৰহ্মবাদী,ব্রহ্মজ্ঞানী—ভারতসন্তান- হইল পূজিত আজ ধার ভিতরে ; বিস্মিত খৃষ্টান আজ ভুলিয়া বিদ্বেষ ভ্ৰাতৃভাবে নিল তারে আপন আলয়ে। (২২) তােমারি গুণেতে দেব এভাব-বিপ্লব। অথচ আমরা হায় পূজিনা তােমায় ! অকৃতজ্ঞ মােরা—তাই রেখেছি তােমায় দেক! অনাদরে এই অজ্ঞাত গুহায়। (২৩) চল দেব নিজ গৃহে ; এসেছি হেথায়- আমি লইয়া যাইতে ভারতে তােমায় চল ত্বরা করি দেব! তব ভ্রাতৃগণ, দেখিতে উৎসুক বড় হয়েছে এখন। (২৪) বিশ্বপ্রেমিক যে জননাহিক তাঁহার কোন নির্দিষ্ট আলয়-সবে ভাই তার । প্রত্যেক ভ্রাতার গৃহহার আলয়। প্রতিদেশ, প্রতিরাজ্য-র বাসস্থান!

প্রণােম্বাস। (২৫) স্বদেশ স্বজাতি তঁার হয়গাে বিলীন সেই মহা-বিশ্ব-ভাবে। স্বধর্ম তাঁহার বিশ্বধর্ম ! গৃহ তার অনন্ত জগত্ ! অনন্ত গগন তার গৃহ-চন্দ্রাতপ ! (২৬ ) খ্ৰীষ্ট বৌদ্ধ মহম্মদী সকলে তােমায় আপন বলিয়া জানে—তব শব ল’য়ে : হয়েছিল হুলস্থুল ! কিন্তু হিন্দুগণ জানে তুমি হও দেব ! তাদেরি কেবল ? (২৭) হৃদয়-মন্দিরে তারা স্থাপিবে তােমায়, অসংখ্য মন্দিরে তুমি করিবে হে বাস ! তুচ্ছ এ মন্দির হয় তার তুলনায় ! চল আর কাজ নাই বিদেশেতে বাস। ( ২৮ ) সাজেনা—সাজেনা আর বিদেশেতে বাস, • ভারত জেগেছে এবে জ্ঞানের বিকাশে, দেখিয়া হৃদয়ে তব হইবে উল্লাস ঐ শুন আনন্দ-ধ্বনি ভারত-আকাশে। (২৯) পঞ্চবিংশ-কোটী-সংখ্য মায়ের সন্তান- তব আগমনী গায় হয়ে একতান'; চল দেব ত্বরা করি যাইয়া তথায়, দিবে যােগ প্রাণভরে জাতীয় সভায়। ।

t প্রাণোচ্ছ্বাস। ( ৩০ ) ধর্ম রাজনীতি ল’য়ে তৰ ভাতৃগণ, করিছে তুমুল কাণ্ড—ভারত-ভিতরে ; উচিত কি থাকা তব ঘুমায়ে এখন ? —চল ত্বরা করি স্বদেশ-মাঝারে । ( ৩১ ) ঘুমায়ে ভারত, দেব! ছিল এত দিন, তখন তােমার মূল্য বুঝেনি তাহার! আজ জাগিয়া তােমায় না দেখি সন্তান- হয়েছে সকলে যেন আত্মহারা। (৩২) নগরে নগরে ফিরে গেয়ে ব্রহ্মনাম। কিন্তু তােমায় না পেয়ে হতাশ তাহারা। সেনাপতি বিনা সেনা যেন দিশাহারা ! হয়ে ছিন্ন ভিন্ন তারা-কঁদে অবিরাম। (৩৩ ) আজ তব মুক্তিসেনা হত বিজয়িনী যদি তােমা মত নেতা থাকিত সম্মুখে ! দিগ্বিজয়িনী হইত ভারত-জননী। জগৎ গাইত তাঁর যশ শত মুখে ! (৩৪) মহাসমিতি বসিছে নগরে নগরে তুলিতে ভারতে আজ সৌভাগ্য-চুড়ায়। বীর-চূড়ামণিতু মি ঘুমায়ে এথায়। একি শােভা পায় ? চল আপন মন্দিরে।

বিদ্যাসাগরের প্রতি।
(১)
হে বিদ্যাসাগর । দয়ার সাগর।
হয়ে অগ্রসর-সমাজ সংস্কার
করিলে ভারতে, জগতে ঘােষিতে
সুনাম তোমার-করুণা অপার!
*
ভারত-বিধবা । শোচনীয় কিব।
অবস্থা তােমার, বলতে আমার
বদরে হৃদয় ! সে যাতনা হায়
বলিবয় নয়--কবই বা কায় ?
কিশোর বয়সে বিধবা হয়ে সে
রহিবে কেমনে-বিষম যৌবনে ?
বলনা তােমরা—বিরূপ ঘঁহারা ।
দেশ সুগম-পালন বিষম ।
( ৪}
মরিলে অাপন, পত্নী গো ক জন
থাকে গাে অনূঢ় ? করে গেসে মুট
তখনি বিবাহ,—বিলম্ব অসহ।
নারীরি বেলাই–ব্যবস্থা সদাই

প্রণােম্বসি।
:
(৫)
চির-ব্রহ্মচর্য্য! এ বড় আশ্চর্য্য।
বৎসর না যেতে, আন কোথা হতে
নব যুবতীরে, নিজ শূন্য ঘরে !
বল বন্ধুজনে, থাকিতে নির্জনে
( ৬ )
পার নাকে আর। তবে বিধবার
যন্ত্রণা অপার, কেমনে আবার
বুঝেও বুঝনা ?—মলেও ভাবনা-
তাদের-জীবন—চির-বিড়ম্বন।
(৭)
বাল-বিধবার, বিয়ে পুনর্বার
শাস্ত্রের বচন, যুক্তির বচন
সঙ্গত গাে কয়!তবে কেন ভয়-
করগাে তােমরা—হয়ে আত্মহারা ?
( ৮ )
অভাগিনী তারা। স্বামীর চেহারা
অনেকে দেখিনি। অনেকে করেনি
স্বামি-গৃহ-বাস! পিতৃ-গৃহ-বাস—
আজন্ম তাদের, লিপি ললাটের।
(৯)
পতিহীন নারী, আহা মরি মরি ।
পরের আশ্রয়ে, পরের আলয়ে,
রন্ধনশালায়, কিম্বা গো-শালায়,
কাটায় হে কাল, হতে প্রাতঃকাল।

১৭
-
।
.
প্রাণােচ্ছল ।
(১০)
অথবা প্রাঙ্গণে, রত সৎমাজ্জনে
করে লয়ে ঝাটা ; কার সাধ্য সেটা
দেখে সম্বরিতে, বারি নয়নেতে
পারে বল মােরে ? বলিব তাহারে
(১১)
পাষাণে নির্মিত, দয়ায় বর্জিত,
যে পারে দেখিতে, অব্যাকুল চিতে,
রাজার গৃহিণী, আজ ভিখারিণী ।
পরগৃহে দাসী-কাঁদে দিবানিশি।
(১২)
হে হিন্দুসমাজ! করিলে কি কাজ
বাধা দিয়া হয়। বালবিধবায় :
পুনঃ পরিণয়-করিতে ধরায় !
আদেশ বিষম—পালিতে অক্ষম
(১৩)
তাহারা তােমার ! আদেশ তােমার
থাকিতে প্রবল—তার বাঁধি দল,
ক্রমশঃ উঠিছে—ক্রমশঃ করিছে
বিধান লঙ্ঘন। সমাজ-বন্ধন
(১৪)
ক্রমশঃ শিথিল—ক্রমশঃ বাতিল
হতেছে এখন! বিবাহ-বন্ধন .
করিয়া ছেদন, করিছে উত্থান
ভারত-ললনা—তাকায়ে দেখনা।

প্রাণেজ্বিাস।
(১৫)
দিবে না বিবাহ ? করিবে বিবাহ
হয়ে স্বয়ম্বরা ! না দিলে তােমরা
হ’তে স্বয়ম্বরা--ক দিন পাহারা
দিবে গাে তাহায় ? রােধিৰে গাে হায়—
(১৬)
তাহায় ক দিন ? নিজ ইচ্ছাধীন
করিবে সে কাজ! কুকাজ সুকাজ
বাছিবে না আর! কেমনে তােমার
কুলমান রবে? থাকিবে নীরবে-
(১৭)
হেঁট মুখ হয়ে—নানা-নিন্দা স’য়ে।
হইয়া সহায়ণহত্যা হায়
করাইবে তায়! হবে মহাদায় !
রাজদণ্ড-ভয়ে-থাকিবে সভয়ে !
(১৮)
নাহি কিছু সুখ—সকলে বিমুখ ।
ফিস ফিস্ করে—যদি কেহ কারে
কোন কথা কয়—মনেতে গাে ভয়
হইবে উদয়—একি হ’ল দায়!
(৯)
এ যন্ত্রণা হ’তে, পরিত্রাণ পেতে
যদি ইচ্ছা হয়, দেহ বিধবায়—
বিবাহ আবার, করিতে তাহার
নিজ ইচ্ছামত-এ কাজ সঙ্গত।

প্রাণোচ্ছ্বাস। ( ২০ ) সুশিক্ষিত দল, হায় রে কপাল হইল বিমুখ ; নাহি মনে সুখ- তাই গাে তাহার। সুখের সংসার দুঃখকারাগার, অদৃষ্টে তাহার ! (২১) ভারত-পুরুষ, আত্মসুখ-বশ! সদা আছে যত, আত্ম-মমােমত ভােগের বস্তুতে। নারীর দুঃখেতে কভু নাহি হয়, গলিত-হৃদয়। ( ২২ ) ব্রহ্মচর্যব্রত, করিতে সতত- বলেগাে সকলে যেন গাে সলীলে করা তাহা যায়! বুঝেনা গাে হায় সহজ কথায় কাজে না কুলায়! (২৩) চির-উদ্যাপিতে, ব্রহ্মচর্য-ব্রতে যে সতী সক্ষম, বৈধব্য বিষম সহুন সে সতী! তিনি মহামতি জগৎ-পূজিতা—সর্ব-সম্মানিতা ! ( ২৪ ) ব্রহ্মচৰ্য্য-ধারী, কয় জন নারী- আছে গাে ভারতে—পারে কে বলিতে ? বাহ আড়ম্বর, বিড়ম্বনার ঘর। অন্তর্বাহ-সমমিলা গাে বিষম ।

প্রণােসি।
(২৫)
হে ব্ৰহ্মচারিণ, ভারত-রমণী।
মস্তকের মণি।যথা হয় ফণী-
শিবের মাথায়,আমারাে মাথায়
তুমি গাে তেমনি–পূজিতা রমণী ।
(২৬)
বিবাহ তোমাকে, করিতে বলে কে ?
বিবাহ বলেতে, কাহার করিতে
প্রবৃত্তি গাে হয়? এত কার দায়
করে অনিচ্ছায়, বিবাহ তােমায় ?
(২৭)
পুনঃ-পরিণয়, প্রয়ােজন হয়,
ব্ৰহ্মচৰ্যব্রতে, অক্ষম পক্ষেতে;
অক্ষম বালায়, দেহ পরিণয়-
ব’ধ-মাকো আর, বাঁধি করে তার
(২৮ )
রক্ষিয়া বালায়, বিষম জ্বালায়,
রক্ষ কুল মান, রক্ষ ধৰ্ম্ম-জ্ঞান !
ঈশ্বর-কৃপায়, লভ পুণ্যচয়,
লভ যশােমান, সুদীর্ঘ জীবন।
( ২৯ )
জণহত্যা-পাপে, নিত্য মনস্তাপে,
দগ্ধিছে ভারত, হওগাে বিরত,
নিৰ্যাতন হতে ; দেওগো হইতে
বিধবা বালার, বিবাহ আবার ।
(

প্রাণোচ্ছাস। = ( ৩০) ওহে গুণিরাজ। সাধিয়া এ কাজ- পেয়েছ যে যশ, নাহিক বিনাশ, তার কোন দিন, বলিছে এ দীন। ঘােষিবে ভারত—জেনােহে নিশ্চিত। ( ৩১ ) যদি তােমা মত, আর জন কত, জন্মিত ভারতে, তা হলে দেখিতে, অদ্ভুত ঘটিত, আর না রহিত বিধবার দুঃখ ! বিধাতা বিমুখ (৩২) তাহাদের প্রতি, নতুবা এ মতি, হইবে গাে কেন, কালেতে এ হেন- শিক্ষিতগণের ? বিধবা-বালার প্রতি কেন হায়! এতই নির্দয়। (৩৩) ভােগের হাটেতে, পূরােদমে মে’তে, বেড়াচ্চ তোমরা, হয়ে আত্মহারা। কি দোষে বলনা, ভারত-ললনা, কাটিবে জীবন, কঁাদি নিশিদিন ? (৩৪) পার্শ্বের ঘরেতে, লইয়া বনিতে, নিজে বিহরিবে, অথচ কহিবে,, বিধবা ভগ্নীকে, অথবা কন্যাকে- “ব্রহ্মচর্য্য কর—চিরত ধর।

২২ প্রাণোচ্ছ্বসি। (৩৫) অশীতি বর্ষেতে, খাকিতে ভােগেতে, মানস তােমার, বিবাহ আবার তখনাে করিছ, কিন্তু গো বলিছ- থাকিতে বালায়, বৈধব্য-দশীয় । (৩৬) থাকিতে ঘুরতে, প্রাণের বনিতে, গণিকা-আলয়ে, বন্ধুগ্নণ লয়ে আমােঙ্গে মাতিছ, এ দিকে বলিছ— বাল-বিধবায়, থাক এ দশায় ! (৩৭) করিয়া বঞ্চনা, তাদের বল না পাইবে কি সুখ? কোথায় গাে মুখ, পাইবে তােমরা, বধিয়া অবলা- অনাথিনী বালা, নিরীহ সরলা ? (৩৮) হে বিদ্যাসাগর, তােমার অন্তর, গলিত দয়ায়। নিরীহ বালায়, বিধবা দেখিয়া, কাতর হইয়া করেছিলে পণ, নিজ সৰ্ব্ব ধন-- (৩৯ ) উদ্ধারিতে তায়; কিন্তু দুঃখ হায় ! এই আমাদের, বৈধব্য তাদের ঘুচিল না এবে। কবে কি হইবে, জানেন বিধাতা, তিনি মাত্র ৱাতা! -

২৩
প্রাণোচ্ছ্বসি।
(৪০ )
সত্যের বিজয়, হইবে নিশ্চয়।
ন্যায়ের শাসন, কে করে লঙ্ঘন ।
ন্যায়-সত্য-ময়, ব্ৰহ্ম দয়াময়!
কালেতে তাঁহার, হইবে বিজয়।
(৪১)
তখন সকলে, তব নাম লু’য়ে,
আন্দোলন করে, ভারত-ভিতরে,
বেড়ারে ঘুরিয়া ; মূরতি স্থাপিয়া -
তব স্মৃতি তারা, করিবে সজীব।
(৪২)
অশ্রুজলে আর, দেহ বিধবার
ভাসিবে না, সবে—সদয় হইবে—
তাহাদের প্রতি। বিধাতা সুমতি
দিরেন সকলে ; পতিহীনা বাল,
দিবে গাে করিতে বিবাহ আবার
(৪৩)
ব্রহ্মচর্য্যধারী, পতিহীনা নারী-
পুনভূ রমণী, কর্তব্য-পালিনী-
একই চক্ষেতে—একই ভাবেতে-
দেখিবে সকলে-স্মৃণা যাবে চলে।
(৪৪)
হে মধুসূদন, হ’য়ে সকরুণ,
হর বিধবার, চির-দুঃখ-ভার,
অযশ-কালিমাহে দুর্গে হর মা !
ভারত আবার—উজল হউক।

পিতৃদেবের প্রতি (১) পিতাগাে দেওগাে দেখা! ডাকে পুত্র তব ; বৈকুণ্ঠ হইতে এস! দেখি প্রাণভরে ! কত দিন দেখি নাই, তাই দেখিবারে হয়েছে বড়ই সাধ—এস ত্বরা করে। (২) কত ভাল বেসেছিলে অভাগা সন্তানে, কেমনে বর্ণিব আমি এক মাত্ৰাননে ? ফেলিয়া আমায় সেই কিশাের বয়সে, গিয়াছ চলিয়া দেব—আর খোঁজ নাই ! (৩) অপরাধ কি চরণে করেছিনু, মন- ভাবিয়া করিতে স্থির পারেনাকো মম ; যেই অপরাধে তুমি দিয়া বিসর্জন স্নেহমায়া পুত্র-প্রতি, গেলা স্বর্গধাম। (৪) কত যে কাঁদিমু আমি—মেলিয়া নয়ন, দেখিলে না-তুমি পিতঃ! নিষ্ঠুর নির্দয় । অথবা কেমনে আমি বলিব তােমায় নিষ্ঠর নির্দয় ? তুমি দয়ার নিধান!

প্রাণেছিলি ২৫ বলিত সকলে—তুমি ধৰ্ম্ম-অবতার, দয়াবীর, স্নেহবীর! করুণা অপার ছিল দরিদ্রের প্রতি! দাতাকর্ণ দানে। শান্তিবারি দিতে তুমি শােকাতুর জনে! ( ৬ ) যত দিন ছিলে তুমি জীবিত ধরায় মনােদুঃখ কাকে,তুমি দেওনি সজ্ঞানে ; ছাড়িয়া পৃথিবী যবে গেলা স্বর্গধামে, করিলে ব্যত্যয় এর ! একি চমৎকার। (৭) যে নীতি ধরায় লােকে করেগাে পালন, স্বর্গে গেলে তার কিগাে হয় ব্যভিচার ? জানিনা অজ্ঞানী আমি স্বর্গের বিধান ! বলে দেও পিতঃ মােরে আমি গে অজ্ঞান। ( ৮ ) ঘুমায়ে শয্যায় আমি থাকিতাম যবে কতই শুশ্রুষা তুমি করিতে আমার বসি শয্যাপাশ্বে কভু করিতে ব্যজন! কভু গাত্ৰঘৰ্ম্ম বস্ত্রে করিতে মার্জন। (৯) গালে হাত দিয়া কত করিতে সােহাগ! জাগিয়া কৃত্রিম-নিদ্রা-ব্যজে দেখিতাম-- আমি সব ! হ্রায় কোথা সে সুখের দিন- অপার আনন্দে আমি যবে ভাসিতাম। ' প্রাণোচ্ছল। (১০) পিতৃস্নেহ গাঢ়তর ভুঞ্জিয়া শৈশবে, যৌবনে দিয়াই পাদ হলেম বঞ্চিত সেই স্বর্গসুখ হতে-অদৃষ্টের দোষে করেছিনু মহাপা" তাই এ দুর্দশা ! (১১) তা না হলে ঋষিসম পাইয়া জনক, অকালে হারাবে কেন অভাগা তাহায় ? যােগর ঋষিগণ দীর্ঘজীবী হন, যােগরত পিতা মাের কেন স্বল্পজীবী ? (১২) আমারি অদৃষ্ট-দোষে ! নতুবা তাহার ছিলনা কোনও দোষ-- নিষ্কলঙ্ক চাঁদ। আমারি.কম-দোষে অকালে তাহার- হইল মরণ; হায় কি অভাগা আমি । (১৩) ভুলি নাই একদিন-তরে সে মূরতি সদাশিব-মূর্তিসম নয়ন-মােহন। ভক্তি-উদ্দীপক! তথা শান্তির আধার। দেখিলে সমস্ত দুঃখ বিদূরিত হয় ? (১৪) প্রতিষ্ঠা করেছি আমি হৃদয়-মন্দিরে সে দেব-মূরতি ! নিতি নিতি পূজি রে- দিয়া ভক্তি-পুস্পাঞ্জলি ! আদর্শে তাঁহার, গঠিত চরিত মম, চেষ্টি করিবারে। : = ==

প্রাণোচ্ছাস।
२१
(১৫)
সরল, সুধীর, শান্তি, দয়া-বিগলিত,
বিশ্বপ্রেমে মাখা, নিত্য-ধৰ্ম্ম-পরায়ণ,
সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, মধুর-ভাষিত,
সৰ্বগুণাধার পিতা ছিলেন আমার।
(১৬)
এখন সেরূপ লােক দেখিনা নয়নে,
এখন স্বার্থের রাজ্য এসেছে ভুবনে ;
নিজ নিজ ভােগ তরে সকলে ব্যাকুল !
পরের দুঃখেতে কাঁদে অতি অল্প জনে।
(১৭)
সৰ্বস্ব পরকে দিয়া আপনি ফকির
হইতে কজন পারে বলগাে এখন ?
পরের সর্বস্ব লয়ে, এখন দস্তুর,
সকলে পাইতে চাহে লৌকিক সম্মান।
(১৮)
পয়সা হইল যার - হ’ক না পামর
তথাপি তাহার পদ, অনেকে লেহন
করিতে কুণ্ঠিত নহে-কুকুরের মত।
ধৰ্ম্ম পড়িয়াছে বলি- ধনের মন্দিরে।
(১৯)
হয়েছি আমরা ঢাল বিদেশী ছাঁচেতে,
আৰ্য্যধর্মে কিন্সর্জন দিয়ে এবে মােরা-
হয়েছি বিকৃত মতি! চেনা নাহি যায়—
করিলে তুলনা পূৰ্ব্ব-পুরুষের সঙ্গে।

প্রাণােচ্ছ্বাস।
(২০)
চৈতন্য হয়েছে এবে; বুঝেছি এখন
ভুলিতে হইবে সব— যা শিখেছি মাের।
বিদেশীর কাছে। তাই আদর্শ তােমার
পিতঃ ! এত প্রিয় মাের হয়েছে এখন।
(২১)
উঠিয়া সূর্যের চাগে করি প্রাতঃস্নান,
বসিতে সন্ধ্যায় তুমি,- উঠিতে যখন
উঠিত মস্তকে সূৰ্য্য ; করি মিতাহার,
লভিতে বিশ্রাম-সুখ-মিত পরিমাণ।
(২২ )
বৈকালে সংসার-কাৰ্য্য করি সমাপন,
আবার বসিতে তুমি সন্ধ্যায় আপন ,
জপ তপ সন্ধ্যাধ্যানে থাকিতে মগন
বহুক্ষণ ধরি, পরে করিতে অশন।
(২৩)
করিয়া সমাপ্ত নৈশ অশন, শয়ন
করিতে শয্যায় তুমি, স্মরি ভগবানে ;
ছয় ঘণ্টাকাল মাত্র করিয়া শয়ন,
আবার উঠিতে তুমি স্মরি ভগবানে।
(২৪)
পিতাগাে করগা মােরে এই আশীর্বাদ
তােমা সম ধৰ্ম্মরত ভক্ত যেন হই।
পর দুঃখে আত্মসুখ দিয়া বিসর্জন,
যেন সদানন্দে রই যেন দেখা পাই।
ও স্বস্তি। ওঁ স্বস্তি ! ওঁ স্বস্তি !!

৩২ প্রাণোচ্ছ্বাস। (১৫) গাও সবে মিলে আজ যত ভারত-সন্তান- একতান-মনপ্রাণ ভারতের দুঃখ-গান ! সেই সন্তান-ক্রন্দনে, কাদিবে মায়ের প্রাণ, পাষাণের মেয়ে বটে, কিন্তু মা নহে পাষাণ । (১৬) এখন হইতে মার বিসর্জন নাহি হবে, সােনার ভাঙ্গতে এই দুর্দিন যদিন রবে, থাকিতে দুর্দিন এই, রব কেমনে নীরবে ? যতকাল রবে দুঃখ, পূজিব মায়েরে সবে। (১৭) রাবণের গ্রাস হতে জানকী-উদ্ধার-তরে, করেছিল রঘুমণি, অকালে বােধন মার; দানবের গ্রাস হ’তে জননী-উদ্ধার-তরে, আমরা সকলে নিত্য করিব বােধন মার । ( ১৮ ) বিশাল ভারত-ক্ষেত্র হইবে মায়ের পীঠ, তুষার-মণ্ডিত হিম-গিরি হইবে মুকুট ; অসংখ্য বিচিত্র মেঘ হইবে মায়ের চাল, অনন্ত ভারতীকাশ হবে চাঁদোয়া-পাল ! (১৯) নর্মদা, যমুনা, সিন্ধু, তথা গঙ্গা, গােদাবরী- ব্ৰহ্মপুত্র, দামােদর, কৃষ্ণা, তাতী, কাবেরী- সরস্বতী ভাগীরথী, সরফু, গােমতী—আর অবশিষ্ট নদ নদী হইবে রজত-হার! ;

; প্রাণোচ্ছসি। ৩৩ ( ২০ ) নিঝর-ঝর-শব্দ হইবে ঢাকের রব, সানাই বাজনা হবে বিহঙ্গকুলের রব । সাগর-তরঙ্গ-ধ্বনি হবে কামানের রব, সে রবে কাহার সাধ্য পারে থাকিতে নীরব ? (২১) সে রবে রবেনা দুঃখ, জুেনােহইবে নীরব-- প্রজাদ্রোহী পশু যত! কোটী কোটী জন-র- শুনিয়া তাহারা যাবে, পলায়ে যথায় সব আছয়ে কুটুম্ব জন ; আশা কেবল কেশব ! (২২) নাহি অস্ত্র, নাহি শস্ত্র,-নাহি কামান বন্দুক, নাহি বারুদ গােলক, আছয়ে কেবল মুখ ; কোটী কোটী মুখে মাের করিব মায়ের স্তব ! শুনে প্রতিধ্বনি, হবে ভয়েতে কম্পিত সব ! (২৩) রাম রঘুমণি ল’য়ে করেতে ধনুক বাণ,. নীলােৎপল তরে নিজ নয়ন যুগল যান উৎপাটিতে; অমনি মা ধরিলা করেতে তারে, সন্তুষ্ট হইয়া দেৰী বর দিলেন তাহারে। (২৪) আমরা পঁচিশ কোটী মায়ের সন্তান মাকে উৎপাটি নয়ন দিব উপহার ঝাঁকে ঝুঁকে। দেখি মা প্রসন্ন নাহি ক দিন হইতে পারে ? সন্তানের পূজা কভু মা কি উপেক্ষিতে পারে ? ;

কৃতজ্ঞতাপ্রকাশ ও প্রার্থনা। (১) কেমনে বলিব তুমি নহ বিদ্যমান । হে আনন্দময়ী মাতঃ ! দেখি অনুক্ষণ হবে এ বিশ্বসংসারে, অপূৰ্ব্ব কৌশল তব প্রত্যেক বস্তুতে ; অদ্ভুত সকল! (২) মাতৃ-কুক্ষিকারাগারে ছিলাম যখন, কেমন সুন্দরভাবে রক্ষিলে আমায় । পাছে কোনরূপে লাগে গায়েতে বেদন, বলে, জলকোষ সৃজিলা তথায় ! ( ৩ ) অক্ষম জানিয়া মােরে করিতে আহার, মাতৃ-নালে মম নাল করিলা যৈাজিত ; জননী যাহাই খান আমার আহার- হয় গাে তাহাতে; তব অপরূপ লীলা। ( ৪ ) ভূমিষ্ঠ হইনু যেই, জননীর স্তনে দিল তুমি দুগ্ধ মম তরে সুমধুর ! দেখিবার তরে দিলা নয়ন আননে, কর্ণ দিলা গতি বাদ্য শুনিতে মধুর ।

;
প্রাপাস।
(৫)
বিবিধ সুরস দ্রব্য আস্বাদন তরে-
দিলা মােরে জিহ্বা তুমি ; দিলা ঘ্রাণেন্দ্রিয়
বিবিধ ফুলের বাস আম্রাণের তরে ;
স্পর্শমুখ ভােগ জন্য দিলা স্পর্শেন্দ্রিয় ।
( ৬ )
হস্ত দিলা কাজকৰ্ম্ম করিবার তরে ;
পদদ্বয় দিলা মােরে করিতে ভ্রমণ
একস্থান হতে অন্য স্থানেতে গমন ;
যে যে যন্ত্র প্রয়ােজন দিলা অকাতরে।
(৭)
তব কৃপাগুণে মাগাে! শশিকলা-সম
দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে হইনু এমন।
পড়েছিনু কতবার রােগেতে বিষম !
বচিতাম না গাে বিনা তােমার যতন।
(৮)
বিপদে পড়িনু কত নাহিক গণনা,
উদ্ধার কেমনে হব ভাবিয়া না পাই।
কিন্তু মাগো যত বার ডেকেছি তােমায়,
অমনি আসিয়া তুমি করেছ উপায় !
(৯)
কাল কি খাইব তার, না ছিল সংস্থান ;
(কিন্তু)কোথাহ’তে আসে অর্থ, না জানি সন্ধান;
মায়ের, ভক্তের প্রতি আশ্চৰ্য্য বিধান।
যে করেছে মার পায়ে, আত্মবলিদান ।

প্রাণোচ্ছসি। (১০) নিজের তরে না শুধু, পরের জন্যেতে। যা চেয়েছি তা পেয়েছি, মায়ের কাছেতে ; এযে অদ্ভুত ঘটনা, কে করে বর্ণনা ?. মায়ের ভক্তের প্রতি অপার করুণ । (১১) প্রতি দিন কৃপা তব দেখিয়া নয়নে, অভাগা, তােমাকে মাগাে ভুলিবে কেমনে ? অবিশ্বাস, কৃতঘ্নতা- দুই মহাপাপ করিলে পাইব শেষে বড় মনস্তাপ! (১২) , তাইমা বলি গাে শুন দেহ মােরে বর- যেন অবিশ্বাসী, যেন কৃতঘ্ন, না হই ; জানি নাহি প্রায়শ্চিত্ত এ দুই পাপের ! জানি নাহি প্রায়শ্চিত্ত এর মৃত্যু বই! ( ১৩. ) জ্বলন্ত তােমার মূর্তি দেখি স্তরে স্তরে ! দেখি অপূৰ্ব্ব কৌশল আপন শরীরে ; একটি মানব-দেহ একটি জগৎ। তাহার ভিতরে আছে শৃঙ্খলা বৃহৎ। (১৪) স্কুল সূক্ষম বহু যন্ত্র করে অবিরাম, কাজ তথা; চলে রক্তহ’তে রক্তধাম- শিরায় শিরায় তথা ধমনী-ভিতরে, যােগায় ধমনী শিরা রক্ত স্তরে স্তরে।

৪৭
প্রাণোচ্ছ্বাস।
(১৫)
ধুইয়া সকল দেহ দিয়া বল তারে,
দুৰ্বল দূষিত রক্ত ফেরে নিজ ঘরে ;
দ্বিধা-বিভক্ত সে ঘর ; হৃৎপিণ্ড নামেতে
বিদিত বিজ্ঞানে তাহা ; না পারি বর্ণিতে-
(১৬)
সূক্ষ শিল্প ইহাতে যা আছে অপরূপ ।
অপূৰ্ব ফুস্ ফুযন্ত্র—এর অনুরূপ।
দুইটী পরদা তার,—নিৰ্ম্মল বাতাস
ঢোকে একটা-ভিতরে ; দূষিত বাতাস
(১৭)
বাহিরায় অন্য দিয়া ; দেহের পূরণ
আর দেহের শােধন করে এইরূপে।
বায়ুকে বলেছে প্রাণ—ইহারি কারণ ,
প্রাণ বন্ধ হলে প্রাণী বঁচিবে কি রূপে ?
(১৮ )
নিশ্বাস প্রশ্বাস সাম্য-ভাবে যতক্ষণ
থাকে, ততক্ষণ প্রাণী সুস্থভাবে ;
ব্যত্যয় হইলে এর, যায় অন্য ভাবে ;
বায়ুর প্রকোপ হলে হয় তনু ক্ষীণ।
(১৯)
সেই রূপ পিত্ত কফ হইলে কুপিত
কিম্বা বায়ু পিত্ত কফ,—অথবা একটী-
এর হইলে কুপিত, হয় উপস্থিত
ঘাের গণ্ডগোল। খসে নক্ষত্র একটী
৪

খ্রণোদাম। (২৬) সামঞ্জস্য তুমি মাগাে! সতত রেখেছ ; না জেনে কেবল মােরা তােমার নিয়ম, দূষি গাে তােমায় কত ! অপরাধ ক্ষম কৃপাময়ী বলে তুমি চরণে রেখেছ। (২১) মস্তক মস্তিষ্কাধার— কেমন সুন্দর কেশে ঢাকা, আর কপালে আবৃত। জ-পল্লব-দ্বারা নেত্র রক্ষিত সুন্দর! শ্রবণ বিবর কিবা কেশেতে রক্ষিত । (২২) সা, মজ্জা, অস্থি, আর ধমনীমণ্ডল, গ্রন্থি, লােম, লােমকূপ, অঙ্গুলি-সকল প্রত্যেকে দেদীপ্যমান অপূৰ্ব্ব কৌশল তব, হেম্মানন্দময়ী! সুন্দর শৃঙ্খলা ! (২৩), গলনলী দিয়া খাদ্য যায় পাকস্থলী তথায় পচিত হয়ে যায় পায়ুদেশে; জীর্ণ খাদ্য হ’তে রক্ত যায় রক্তস্থলী, অসার খাদ্যের অংশ যায় বহির্দেশে । (২৪) শ্রান্তিদূর তরে নিদ্রা করেছ সৃজন ; দিবসে করিয়া শ্ৰম ক্লান্ত জীবগণ- আশ্রয় লয় গো তার ; নবীভূত হয়— তাহে সমস্ত শরীর, তােমার কৃপায় । = }, প্রাণোচ্ছ্বাস। (২৫) আমার তরেতে তুমি সৃজিলা পাপ- লতা ; ফলপুষ্পে পূর্ণ করিলে তাহায় । সে তরু-তলেতে বসি কত দিন জপ করিলাম আমি-স্নিগ্ধ হলেম ছায়ায় । ( ২৬ ) সুস্বাদ ফলেতে তার, উদর পূরণ করিলাম কত আমি! কুসুম চয়ন করিলাম কত লতা হ’তে অগণন ! করিলাম মনসাধে তোমার পূজন ! (২৭) ধন ধান্যে পূর্ণ ধরা, করিলা জননী সকলি আমার তরে ; দিলা অরণ্যানী করে পূর্ণ শাখি-গণে, তথা পশুপালে ; কত সুখ লিখেছ মা আমার কপালে । ( ২৮ ) সুখের তীব্রতা মাগো! অনুভব তরে- তেমতি দিয়াছ দুঃখ ভুঞ্জিবারে মােরে ; মিষ্টান্ন অনেক খেলে হয় রুচি যথা- তেঁতুল ভক্ষণে, সুখ-পরে দুঃখ তথা ! ( ২৯) মম পানীয়ের তরে করিলা সৃজন- কত নদ নদী কত হ্রদ ও সাগর । তাহে ছাড়ি দিলা কত মৎস্য অগণন । সৃজিলা তীরেতে কত অপূর্ব প্রান্তর।

প্রাণোচ্ছাস। " ; (৩০) দিলা মুক্তা শুক্তি-মধ্যে, অনেক প্রবাল- দ্বীপ সৃজিলা জলেতে ; সুবর্ণ রজত হীরা রাখিলা খনিতে ; রাখিলা মৃণাল জলে কমল-সহিত ; মণি মরকত— ( ৩১) সৃজিলা; সৃজিলা তথা কত পদ্মরাগ ; সৃজিলা চন্দন, ধূপধূনা ও গুগ্গুল ! সৃজিলা সূরজ শশী তথা তারাদল ! দিয়াছ সকলে তুমি নিজ নিজ ভাগ ! (৩২) -বঞ্চিত কাহাকে তুমি করােনি ধরায় ! অতি দীন হীন মাগাে! তােমার কৃপায়- পেয়েছে সকলি যাহা তার প্রয়ােজন, না বুঝে কেবল করে দুঃখ অনুক্ষণ। স্কুল সূক্ষে নাহি ভেদ! সকলি সমান জ্ঞানীর নয়নে! দেখ ক্ষুধা শান্তি পায়- মােটা সরু ভাতে! মােটা কাপড়.সমান সরু কাপড়ের সঙ্গে নিবারণ হয় (৩৪) লজ্জা শীত উভয়েতে ; প্রবৃত্তি যেমন! রুচি-অনুসারে হয় মায়ের বিধান। বাঞ্ছাকল্পতরু তিনি। যিনি যাহা চান- একাগ্র সুদৃঢ় মনে, তিনি তাহা পান। ন ** ৪১ এসোসি। (৩৫) কেমনে বিশ্বাসী ভক্ত ভুলিবে তােমায় বল ?, যতক্ষণ তার মনেতে রয়েছে- গাঁথা যত উপকার পেয়েছে ধরায় রাশি রাশি, অগণন মাগাে! তব কাছে। (৩৬) তাই বলি মাগাে! দেহ মােরে এই বর- যত দিন দেহে রবে প্রাণ, তত দিন। করি যেন মাগাে! তব মহিমা ঘােষণ, সহি যেন দুঃখ কষ্ট হইয়া নীরব। (৩৭) সন্দেহ আসিলে ভক্তি রবেনা কখন, আসন্ন মরণ তব জানিও তখন ; অবিশ্বাস মহাপাপ! সন্দেহ বিষম- শত্রু, গ্রাসিলে তােমায়, ঘটিবে বিষম। (৩৮ ) তাহ’তে নির্গম নাই সহজে তােমার রক্ষা নাই। রক্ষা নাই! বিনা কৃপা মার; এস তাই প্রাণভরে ডাকি মাকে ভাই, উচ্চৈঃস্বরে একতানে ডাকি মাকে তাই। ( ৩৯ ) এস ডাকি মাকে যাতে পরিত্রাণ পাই- এস প্রাণ ভরে মাকে ডাকি গাে-সবাই এ গ্রহ না ঘটে যেনতােমার দোহাই করা মা! এদের হাত যাহাতে এড়াই।

প্রাণোচ্ছ্বসি।
(৪০)
ওমা! বলি শুন দেহ মােরে এই বর,
যতক্ষণ মম ক্ষীণ কণ্ঠে রবে স্বর,
গাইতে গাইতে তব মহিমার গান,
ধরা হ’তে যেন পারি করিতে প্রয়াণ ।
ওঁ স্বস্তি। ওঁ স্বস্তি । ওঁ স্বস্তি ॥

স্বপ্ন। (১). দেখিনু স্বপনে এক মূরতি মধুর, মেহের অনন্ত খনি—পূর্ণ গণিী। অনুপম রূপরাশি, শােভিছে চিকুর- দাম প্রফুল্ল আননে, প্রেম-পাগলিনী ! (২) সুনীল কমলদুটী আননে বসান, বিকীরিত করিতেছে অপূৰ্ব্ব কিরণ। অবিরাম হইতেছে অমৃত ক্ষরণ, আপ্লুত ত দর্শক-দেহ, সিঞ্চিত বদন। ( ৩ ) অপূৰ্ব স্বর্গীয় মূর্তি। মন-প্রাণ-হরা ! দেখিলে নিশ্চিয় তুমি হবে আত্মহারা , কুলসিত দুনয়ন সে কিরণ-জালে, অনুপম গতি তার জিনেছে মরালে। (৪) ধীরে ধীরে আসি দেবী বসিলা সমীপে, করিল নিস্তেজ তার দেহাভা প্রদীপে , মিটি মিটি দীপালােক মাঝে সেই জ্যোতি- স্ময় রমণী-মুরতি শােভিতেছে অতি।

১৪ . প্রাণোচ্ছ্বাস। (৫) মৃদু মৃদু স্বরে দেবী জিজ্ঞাসা করিলা- কুশল-বারতা মম,আর জিজ্ঞাসিলা- কেন আমি বিষাদিত ? কি দুঃখ আমার ? একাকী কেন বা আছি ? অভাব কিসের? (৬) কোন্ দেশে’বাড়ী মম, কি কাজ করিতে- এসেছি হেথায় আমি, কে আছে বাটীতে ? ইচ্ছা-সুখে আসিয়াছি ?—অথবা জ্বালায় ? অথবা বিরাগী হয়ে আপন ইচ্ছায় ? (৭) শুনি প্রশ্নাবলী স্তব্ধ চকিত হইনু। পড়িলাম অকস্মাৎ যেন হ’তে সানু ; ইতি-কর্তব্যবিমূঢ় হইনু তখন, কি দিব উত্তর ভেবে আকুলিত-মন! (৮) মনের অবস্থা মম বুঝিয়া রমণী ধরিলা হস্তেতে মাের বাহিরিল মুখে তার,—কি ভয় তােমার ? শােক দুঃখ থাকে—আছে প্রতিকার তার। (৯) বল তুমি মন খুলে দিতেছি অভয়, বলিলে আমার কাছে নাহি কোন ভয় ; বুলিলে মনের জ্বালা জুড়াবে এখন দুঃখের রজনী যাবে আসিবে সুদিন। ক সুমধুর বাণী .

৪৫
tv)
প্রাণোচ্ছল।
(১০)
শুনিয়া আশ্বাসবাক্য সাহসে নির্ভর
করিয়া বলিনু আমি, কাহিনী দুর্ভর।
দেবী আমি চির দিন প্রেমের কাঙ্গালী
যে প্রেমে নাহিক স্বার্থ-নাহি দলাদলি।
(১১)
জগতে যে প্রেম দেখি, সৰু স্বাধ-দুষ্ট,
স্বার্থের সংশ্রবে প্রেম সব হয় নষ্ট ।
কলসী-পূরিত দুগ্ধে এক ফোটা চোণ—
যেমতি ; তেমতি প্রেমে স্বার্থ এক কণা।
(১২)
এক কণা স্বার্থ পড়ি প্রেমের ভাণ্ডেতে,
প্রেম-সুধা বিষ করে বিদিত জগতে,
সে বিষপানেতে হয় মানুষ অসুর,
দেবত্ব ঘুচিয়া হয় সমান পশুর।
(১৩)
সেবিষে জর্জর দেহ হয়েছে আমার,
এসেছি হেথায় তাই ছাড়িয়া সংসার,
আছে মাের দারা সুত দুহিতা জননী,
ভাই বন্ধু সব আছে ধনে মানে মানী।
(১৪)
কিন্তু কই ভালবাসা—নিষ্কাম অটল ?
প্রাণােৎসর্গ কই আর বিশ্বাস অটল ?
অল্পেতে ভঙ্গুর সব+সহজে চঞ্চল!
এই আছে এই নাই—স্বার্থই প্রবল।

প্রাণোচ্ছসি
(১৫)
থাকে কাছে যতক্ষণ অপৰ্য্যাপ্ত ধন,
ততক্ষণ আমি বড় আদরের ধন !
বুদ্ধি-বিদ্যা-গুণবত্তা-রূপের আধার !
যেই আমি লক্ষীছাড়া, অমনি আঁধার ।
(১৬),
চাইনা তেমন প্রেম মুহূর্তে ভঙ্গুর,
চাইনা তাহাকে যেন করয়ে সবুর !
চাইনা তাহাকে ‘দেও’ বলিৰামাত্রেতে
যথা তথা হতে এনে হবে যারে দিতে।
(১৭)
শান্তি নাই, সুখ নাই-সংসার ভিতরে ।
আপন ইচ্ছায় তাই—এসেছি হেথায়,
একাকী রয়েছি শুয়ে,-স্থণ্ডিল শয্যায় ;
অনন্ত শূন্যের ভাব-হৃদয়-ভিতরে !
(১৮)
অভাগার দুঃখরাশি করিতে দ্বিগুণ
কেন দেবী দেখা দিলে ?—কি কাজ হেথায়-
তব বুঝিতে না পারি ! সম্বর এখন
তব আয়ত লোচন- না চাহি তােমায় !
(১৯)
মধুর হাসিয়া দেবী বলিলা আমায়,
হে ভদ্র এসেছি আমি স্বরগ হইতে,
ঈশ্বর-অদেশে হেথা লইতে তােমায়;
আমা সাথে তথা তব হইবে যাইতে।
;
৫।

প্রাণোচ্ছাস।
( ২০ )
প্রেমের ভিখারী তুমি- প্রেম-শূন্য ধরা !
এখানে তােমার বাস যােগ্য নাহি হয়,
বৈকুণ্ঠ-ধামেতে চল পাবে প্রেম-ধারা ;
অনন্ত অসীম ধারা শুষ্ক নাহি হয়।
( ২১)
এক বিন্দু প্রেমসুধা যদি পান কর,
হইবে অমর তুমি চির শান্তি পাবে ।
শােক দুঃখ দূরে যাবে—পাইবে অপর
মূৰ্ত্তি কাঞ্চন-সন্নিভ—চিরসুখী হবে ।
(২২ )
নিষ্কাম প্রেমের ভূমি—স্বরগের-পুরী,
নয়ন মােহিত হয় দেখিলে মাধুরী!
স্বার্থক জীবন তার যে দেখে তঁাহারে,
ধরা তাকে দূরে থাক ! ছুতে যমে নায়ে ।
(২৩)
স্বার্থক জীবন তব ! দেখিতে যাহারে
না পান মহর্ষিগণ, দেখিতে তােমারে
ব্যাকুল অন্তর তার—চল ত্বরা করি,
যথায় আছেন বসে বৈকুণ্ঠের হরি।
( ২৪ )
উঠাইলা বামা মােৱে, ধরিয়া করেতে ।
উঠি তখনি আমি ঘুমের ঘােরেতে ।
উঠি উঠিয়া ব্যায়, দেখিনু আঁধার।
কোথা সেই দেবীমূৰ্ত্তি ? সব শূন্যাকার।

s
প্রাণোচ্ছ্বাস।
(২৫)
জ্বালিয়া দ্বিগুণ মাের হৃদয়-আগুণ
জগৎ আঁধার করি-হায় অন্তর্ধান
করেছেন স্বর্গ-দেবী। করি হায়! হায়
অভাগা অবার শুলাে স্থণ্ডিল-শয্যায়।
( ২৬ )
কাতরে করুণা করি শান্তি-বিনাশিনী
নিদ্রাদেবী আসি ক্রোড়ে নিল অভাগারে।
আবার দেখিনু স্বপ্নে মূৰ্বতি মােহিনী--
কিন্তু সে মূরতি নহে—এবে ভিমাকারে।
( ২৭)
অপূৰ্ব মুরতি বটে—কিন্তু স্নেহময়ী-
জননী-সদৃশ, আসি উঠাইলা মােরে
ধরি করে, নিলা তুলি ক্রোড়ে, দয়াময়ী-
সন্নেহ বচনে কত জিজ্ঞাসিলা মােরে ।
( ২৮ )
করযােড়ে জিজ্ঞাসিনু কোন্ দেশ হতে
মাগাে এসেছ হেথায়! অভাগার প্রতি
এত দয়া কেন মাতঃ ? কোথা হবে যেতে
হেথা হ’তে ? বল দয়া করি পুত্র প্রতি।
( ২৯)।
জননী আনন্দময়ী শুনিয়া বচন
মােঝ-বলিলেন বৎস! লইতে তোমায়
এসেছি বৈকুণ্ঠ হতে—যাইৱ তথায়-
লইয়া তােমায়—এই আদেশ-বচন।

প্রাণেন্দ্বিন্সি।
৪১
০
-
সৃদয় তােমার প্রতি বৈকুণ্ঠের নাথ।
এসেছিল স্বর্গ-দেবী তাঁহার আদেশে
লইতে তােমায়, কিন্তু নিদ্রার আবেশে
তুমি হইয়া রিভাের, ছেড়ােছ সে সাথ।
( ৩১ )
আবার এসেছি আমি তাঁহার আদেশে,
লয়ে যাব তােমা-ধনে সে অমর দেশে
চল ত্বরা করি—যথা বৈকুণ্ঠের পতি-
তােমাধনে দেখিবারে সমুৎসুক অতি ।
( ৩২ )
নিষ্কাম প্রেমের খনি—বৈকুণ্ঠ নগরী।
প্রেমের ভিখারী তুমি-প্রেমের ভাণ্ডারী
হরি, ভকত-অধীন ; ভকত যে জন
পায় প্রেম অবিরাম বিনা আকিঞ্চন।
(৩৩)
পরম ভকত তুমি—তােমার কারণ
নির্মিত হয়েছে বাটী—অপূৰ্ব্ব-গঠন
ভকত-মণ্ডলী-মাঝে, থাকিবে তথায়,
হরি-প্রেম-গান গায় নিয়ত যথায় ।
( ৩৪ )
করি হরিধ্বনি যথা ভ্রমর ঝঙ্কারে,
করি হরিধ্বনি যথা পাখী গান করে,
হরিধ্বনি হয় যথা পৰ্বত-নিঝরে,
হরি-প্রতিধ্বনি হয় পৰ্বত-গহ্বরে।
•

প্রাণোচ্ছাস। ( ৩৫) হরি বােল হরি বােল ভিন্ন অন্য বােল— যথায় নাহিক অরি। সকলে পাগল— কেবল হরির নামে ! গায় পিককুল- কেবল হরির নাম! ডাকে হরি গােকুল। (৩৬) আকুল সবাই হরিব’লে! হরিনাম- সুধা কেবল আহার! গায় হরিনাম। খায় হরি নাম—মাখে গাত্রে হরিনাম। যখা ধন ধান্য রত্ন এক হরিনাম। (৩৭) দুরিনামে স্বার্থ ভুলে সকলে আপন হয়েছে তথায়, নাই আত্মপরজ্ঞান। উপকার করে নাহি চায় প্রতিদান! স্বার্থের উপরে ন্যস্ত নহে প্রেমধন। ( ৩৮ ) চল বাছা ত্বরা করি বৈকুণ্ঠ নগরী, যাহার সকাশে তুচ্ছ হয় স্বর্গপুরী কি কব ধরার কথা এত যম-পুরী। বিলম্ব সহেনা বাছা রহিতে না পারি। ( ৩৯ ) অমনি চলিনু আমি তাঁহার পশ্চাতে, পুষ্পক-রথেতে তুলি লইলা পার্শ্বেতে ; নিমেষ-মধ্যেতে রথ বৈকুণ্ঠ নগরী উত্তরিল—দাঁড়াইল ছাড়ি দ্বার দ্বারী।

প্রাণোচ্ছল।
(৪০ )
দয়াময়ী দয়া করে করেতে ধরিয়া,
লয়ে গেলা যথা হরি ছিলেন বসিয়া ;
দয়াময় দয়া করি নিলা মােরে কোলে,
হরি হরি হরি ধ্বনি বলিল সকলে!

অধীনতা
অমূল্য রতন।
t
(১)
স্বাধীনতা-ধন
‘শবৃত্তির্ণ কদাচন'—শাস্ত্রের শাসন,
ব্রাহ্মণের প্রতি এই কঠোর বিধান।
পতিত ব্রাহ্মণ তাহা—করেনা পালন।
( ২ )
উপবীত-ধারী সব—কলিতে এখন
যবন-অধীনে করে লেখনী চালন!
মসীজীবী হয়ে সবে—ধৰ্ম্মে বিসর্জন
দিয়াছেন এবে; নাই ইহার মার্জন।
( ৩ )
ঋষিগণ যােগরত ছিলেন যখন,
করেছিল এই দেশ কি শােভা ধারণ !
তখন ভারত ছিল স্বর্গের মতন!
পবিত্র ভারত হয়, নরক এখন!
( 8 )
পরপদলেহী যত পতিত সন্তান,
রত্নগর্ভা জননীর কলঙ্কের স্থান,
ভাবিলে এসব কথা বিদরে পরাণ ।
ভাবে তাই কয় জন পাষণ্ড সন্তান ?
.

প্রাণেন্দ্বিাস। (৫) ভাবিতে ভাবিতে কভু দুঃখ-অবসান হ'লেও হইতে পারে। কে করে নির্বাণ মনানল, যদি সবে ঘুমে অচেতন। না করে কেহই যদি দুঃখের চিন্তন, ( ৬ ) দাসত্বে চলিয়া যায় মানসিক তেজ। মানসিক বৃত্তি গুলি থাকেনা সতেজ ধরায় পতিত গ্যাসক্ষয়ে ব্যোমযান, মানব পতিত হলে তেজ-অন্তর্ধান। ( ৭ ) নিস্তেজ মানব হ’তে কি আশা বলনা ? রাজ-শূন্য রাজ্যতরি কদাচ চলেনা, কর্ণধার-শূন্য তরি কখন চলেনা, বাস্পশূন্য লৌহযন্ত্র কখন নড়েনা। ( ৮ ) তেজঃক্ষয় যাতে হয় করােনা এমন- কাজ ; ব্ৰহ্মতেজ বিনা-নহে হে ব্রাহ্মণ কেহ; যদি তুমি হতে চাও সুব্রাহ্মণ করােনা চাকরী কভু থেক হে স্বাধীন। (৯) অধীনতা নানাবিধ আছয়ে সংসারে সামাজিক-রাজনীতি-পরিবার-গত, সকল অপেক্ষা জ্বালাকর ব্যক্তিগত। ভােগে সে গগ সে যন্ত্রণা, দাসত্ব যে করে। == = ৫. ক প্রাণোচ্ছ্বাস। (১০ ) উঞ্ছবৃত্তি ভাল পর-দাসত্ব-অপেক্ষা, অনশনে মৃত্যু শ্রেয়ঃ হয় তদপেক্ষা! পতিত আমরা তাহা-বুঝেও বুঝিনা, ঘৃণা লজ্জা নাই, তাই ভেবেও ভাবিনা। (১) ধৰ্ম্মবিসর্জন দিয়া অধিক বেতন- পাইতে লােপ মােরা ! কি লজ্জার কথা! বলিতে সকল কথা বড় পাই ব্যথা। নির্দোষীকে দোষী বলে দিই বিসর্জন। (১২) লঘু পাপে গুরুদণ্ড করিগাে বিধান করিতে মনিবে তুষ্ট নির্দয় এমন! যেন অর্থ ভিন্ন নাই—আর কিছু ধন! যেন চতুৰ্বর্গ-ফল এক প্রমােশন! (১৩) এমন অনেক ঘটে, কিছু লাভ নাই— কেবল সাহেবে তুষ্ট করিতে যাইয়া, অনেক ঘরের কথা কে বলে দিই— মাতৃ-কন্যা-কুৎসা গাই তথায় যাইয়া । (১৪) অকারণে বাবা ” বলে—কলঙ্ক রটাই, মায়ের, নির্জনে ধূলি লইগােপায়ের, লইয়া মাথায় দিই- ছি ছি কি বালাই, বাহিরে আসিয়া নিন্দা করি সাহেবের! ।

প্রাণোচ্ছাস।
(১৫)
ছি ছি কি লজ্জার কথা! মরিগাে মরমে।
মরিগো দুঃখের কথা বলিতে, শরমে!
হায় বিধি, কেন মােরা জন্মিয়া মরিনি।
শুনিতে না হ’ত মলে দারুণ কাহিনী ।
(১৬)
অর্য্যের সন্তান হয়ে, দাসত্ব-লাঞ্ছনা ।
একি বিধি বল মাের ললাট-লেখনা !
লিখিতে বিদরে প্রাণ!-সহেনা যাতনা ।
বলবিধি এর কভু, শেষ কি হবেনা?
(১৭)
বল কবে হবে এই দুঃখ-অবসান ?
নিশা যায় দিন আসে দেখিগাে বিধান।
আমাদের নিশার কি নাহি অবসান ?
অনন্ত অসীম নিশা! একিগাে বিধান ?
(১৮)
গগণে উদিত চন্দ্র হয় প্রতিপদে,
মাের নিশা গাঢ় হয় প্রতি প্রতি পদে;
শুক্লপক্ষ নাহি আসে সদা কৃষ্ণপক্ষ।
মম পক্ষে কেন বিধি জানিনা বিপক্ষ ।
(১৯)
এইরূপে চির দিন যদি যায় দিন,
কিসের লাগিয়া প্রাণ ধরিবে এ দীন ।
বিষহীন-ফণী-পারা হয়ে তেজোহীন,
মৃতের মতন আর কাটাব কদিন ?

প্রাণোচ্ছ্বাস।
( ২০ )
দয়াময়! দয়া করে লহ সবে কোলে,
কাতর হইয়া ডাকি আমরা সকলে;
দাসত্ব-পীড়িত জনে দেহ পদাশ্রয় ,
ভারত-বাসীরা আজ বড় নিরাশ্রয় ।
(২১)
আছে এমন জন কঁাদে কাছে যার,
পরাণ খুলিয়া বলে হৃদয়-যাতনা ।
পুজের দুঃখেতে কাদে হৃদয় তােমার,
তােমার নিকট আশা পাইতে সান্তনা ।
(২২)
বিদিত জগতে তুমি অতি দয়াময়,
নিরাশ্রয়, শােকাতুর, দীনের সহায় !
দীন নিরাশ্রয় তাই ভারত-সন্তান,
লয়েছে শরণ তব পেতে পরিত্রাণ।
(২৩)
অনেক যন্ত্রণা তারা পেয়েছে জীবনে,
আরও যন্ত্রণা দিলে সহিবে কেমনে ?
পরীক্ষা হয়েছে শেষ, দেহ পরিত্রাণ!
এই ভিক্ষা মাগি মােরা ভারত-সন্তান!
( ২৪ )
তুমি না করিলে ত্রাণ,সাধ্য আর কার
অসাধ্য রোগের হায় ! করে প্রতিকার ?
এস দয়াময়! দীনে করহ উদ্ধার
তাপিত সন্তান ডাকে সহিত শ্রদ্ধার!

বিদায়। (১).. প্রিয় সহােদর ! তব হৃদয়-গগণে ছিনু একদিন আমি অকলঙ্ক ভদ। কুটিল কালের গতি বুঝিব কেমনে? হইনু এখন আমি সকলঙ্ক চাঁদ। (২) যা ছিনু তাহাই আছি; তবে কেন হেন বিপরীত ভাব ? কেন স্নেহের অভাব ? ক্ষণিক জগতে সব, জানিয়াও কেন- সবে পড়ে স্নেহপাশে ? অজ্ঞানের ভাব। ( ৩ ) থাকে স্নেহ যতক্ষণ, রঞ্জিত নয়নে- দেখে লােকে ; যেই সেই স্নেহ চলে যায়, অরঞ্জিত দেখে সব! সকলি এক্ষণে আবৃত আঁধারে! শ্বেতে কৃষ্ণ জ্ঞান হয় ! ( ৪ ) মায়াময় এ জগৎ। মায়ার ছলনে- স্নেহ ভালবাসা সব! মায়ার অভাবে নিজ পর হয়। সেই মায়ার প্রভাবে পর নিজ হয়! বদ্ধ প্রেমের বন্ধনে।

প্রাণোচ্ছ্বাস।
(৫)
দেখ ! পরে দুহিতা প্রেমের বন্ধনে
হয়, স্বামীর অধীন। প্রেমাভাব হ'লে—
সেই পতিগতপ্রাণা—মরে উদ্বন্ধনে !
প্রেমের অসাধ্য কিছু নাহি পৃথ্বীতলে!
( ৬ )
যতক্ষণ ভালবাসা, ততক্ষণ সব
সুন্দর নির্মল! হয় যেই স্নেহাভাব
যাহাছিল এক দিন অকলঙ্ক চাঁদ,
দেখে বােধ হয় তাকে সকলঙ্ক চাঁদ।
(৭).
দোষ দিবনা তােমার দোষ অদৃষ্টের !
দোষ আমার! নাহ’লে জানিয়া নশ্বর
স্নেহ ভালবাসা -কেন পড়িলাম আমি-
স্নেহপাশে ? ইচ্ছা তাঁর যিনি অন্তর্যামী।
(৮ )
জেনেছি এখন তিনি বিনা গতি নাই—
তাই সব ছেড়ে করেছি এসঙ্কল্প এবে-
দৃঢ়,যতদিন দেহে মম প্রাণ রবে,
জগৎ-ঈশ্বরে আমি ডাকিব সদাই।
(৯ )
স্নেহ ভক্তি ভালবাসা, যা কিছু আমার
আছয়ে ‘অন্তুরে, সব দিব উপহার
চরণে তাঁহার ; হব বিক্রীত চরণে
তঁার, দিয়া আত্মবলি ; কি ভয় মরণে
-

প্রাণোস।
(১০)
তার, যার চিত্ত নহে বদ্ধ মায়াপাশে ?
মায়ার বন্ধন ছিন্ন করা অতি ভার,
কিন্তু ছিড়িলে তাহায়, না থাকে কাহার—
মৃত্যুভয় ! ধায় মন ঈশ্বরসকাশে।
(১১)
(তাই) ছিড়িয়া বন্ধন এবে ইয়েছি স্বাধীন,
ভগবানে চিত্ত মম করেছি অর্পণ ;
ধৰ্ম্ম-পরায়ণ নহে যমের অধীন
পরহিতে করে যেই আত্ম-বিসর্জন।
(১২)
দেহ সহােদর! মােরে বিদায় এখন ;
যাই চলি যথা নিত্য-নর নারীগণ
(তথা) পশুপক্ষিগণ করে হরি-গুণ-গান,
যথা—পাব আমি নিত্য-স্নেহ, প্রতিদান ।

জাহাজ মঙ্গলার প্রতি।
( ১ )
কি কাজ করিলে হায় ! তুমি গাে মঙ্গলে।
ডুবাইলে রসাতলে তিন শত জনে ?
তিন শত জন সহ আপনি ডুবিলে
অতল গঙ্গার জলে। কারণ কে জানে?
( ২ )
ভাসাইলা অশ্রুজলে কত শত জনে!
কাঁদিছে জননী কত আজ পুত্র-শােকে !
কঁদে কত সতী আজ পতি-মৃত্যু-শােকে !
হয়ে পাগলিনী তারা—হৃদে বজ্র হানে।
( ৩ )
প্রতি গৃহে আজ শুন ক্রন্দনের রোল !
শিশু কাঁদে, পত্নী কাঁদে, কাঁদে মাতৃগণ।
আকুল ভারত আজ শুনি গণ্ডগােল !
শশাকেতে আকুল আজ সৰু ভ্রাতৃগণ !
(৪)
হায় কি কুক্ষণে তারা, মঙ্গলা-উপরে-
উঠিয়া বাটার দিকে ধাবিত হইল।
হায়! কেন অন্ধকারে জাহাজ ছাড়িল ?
নিয়তির গতি বল কে রােধিতে পারে ?

প্রাণোচ্ছল। (৫) কত অভাগিনী—আজ হয়ে নিরাশ্রয়- কাঁদে উচ্চৈঃস্বরে হয়ে আকুল হৃদয় ! চতুর্দিকে অন্ধকার দেখে নিরন্তর। তাদের কপালে আজ যেন যুগান্তর । আহার প্রস্তুত করে, কত যে রমণী প্রতীক্ষা করিতেছিল প্রাণপতি তরে গণনা তাহার নাই। রতি-পতি-জিনি প্রাণপতি আসিছেন—ভাবিছে অন্তরে। (৭) এক এক করি চারি প্রহর রজনী-- জাগিয়া কাটাল তারা, আশার প্রদীপ নিভিল, নিভাল দীপ! আকুল রমণী ভাবিয়া পতির তরে। জ্বলে চিন্তাদীপ- ( ৮ ) অন্তর-ভিতরে হায় ! ধিকি ধিকি ধিকি ! এদিকে সূরজ ওই, অরুণ নয়নে, পূরব সাগর হতে—মারি উকি ঝুকি দেখিতে লাগিল সেই কাতর ললনে ! (৯) • বাড়াইতে তাহাদের অন্তর্দাহ যেন, অনিচ্ছক হয়ে রবি ধীরে গগণেতে উঠিতে লাগিল। কিন্তু তাদের এহেন দুঃখের দুর্দিনে ব্যথা পাইল তাহাতে।

প্রাচ্ছে।
(২০ )
বলিল মনেতে তারা-“হে সূরজদেব !
কেন উদিলে গগণে আজবাড়াইতে
অভাগিনী-দুঃখ-ভার? বল কোথা দেব !
রেখে এলে পতিগণে, মােদের বধিতে ?
(১১)
বলে দেও কোথা তারা এবে, যাই চলি-=
তথা বিহঙ্গ-গতিতে, আনি পতিগণে।
পতি বিনা গতি নাই! পতিই সকলি—
সতীর! অাঁধার সব পতির বিহনে।
(১২)
প্রত্যুষে উঠিয়া শয্যা হ’তে মাতৃগণ,
জিজ্ঞাসিল বধূজনে কোথা পুত্ৰ ধন ?
রাত্রিতে আসেনি, শুনে প্রাণের রতন,
অমঙ্গল-ভয়ে করে অশ্রু বিসর্জন ।
(১৩)
তাহা দেখি শিশুগণ কাঁদিয়া উঠিল,
বাবা বাবা করে তারা ডাকিতে লাগিল !
কোথা বা কোথা তুমি ? এস ঘরে ফিরে
লহ লহ আমাদের কোলের ভিতরে।
(১৪)
কত যে খাবার তুমি আন প্রতিদিন
আমাদের তরে! আজ কোথায় রহিলে--
তুমি ভুলিয়া মােদের ? মোরা দীনহীন
কাঙ্গালসন্তান মত ভাসি অশ্রুজলে।

- প্রাণোচ্ছ্বাস। (১৫) এস বাবা ত্বরা করি বিলম্ব সহে না ! তােমার জননী কাঁদে । আমাদের মা- তােমার তরেতে কাঁদে, আসিয়া দেখনা ? মােদের অদৃষ্টে কিগাে, করিলে বিধাতা ? (১৬) এইরূপ আন্দোলনে কাটে কিছুকাল ; এমন সময় এল বারতা করল- ‘মঙ্গলা ডুবেছে গঙ্গা-জলের ভিতরে, লইয়া বক্ষেতে তার শত শত নরে! (১৭) প্রতি গ্রামে প্রতি ঘরে উঠিল ক্রন্দন। বড়াইল প্রতিধ্বনি সেই ভীম য়ােল। শত শত মাতা হ’ল পুত্র-শূন্য-কোল! গগণ বিদীর্ণ করে সতীর ক্রন্দন। (১৮) শিশুগণ-যােগ দেয় সে মহাক্রন্দনে, উলটি পালটি করে কাঁদে শিশুগণ ! সতীগণ কোলে লয়, আপন নন্দনে, মুখ পানে চেয়ে করে অশ্রু বিসর্জন। (১৯) আবার ফেলিয়া তারে দেয় ধরাতলে । ছােটে পাগলিনী-প্রায় স্বামীর উদ্দেশে। শশাকের জ্বালায় কভু ডুবিতে সলিলে- ধায়! উন্মাদিনী-প্রায় ফিরে' গৃহে আসে- প্রাণোচ্ছল। (২০ ) আবার ছুটিয়া ! যেন কোন লক্ষ্য নাই ? দৃষ্টি লক্ষ্য-শূন্য! গতি নিলক্ষ্য চঞ্চল। উন্মাদের চিন্তু সব ! য়েন সংজ্ঞা নাই ! •ধুলি-বিলুণ্ঠিত তার বসন-অঞ্চল। ( ২১) বন্ধুর দেখি ভাব, শাশুড়ী ব্যাকুল ! সম্বরি আপন শােক,বধূর তরেতে উঠিয়া দাড়ায়ে ধরে বন্ধুরে বসাল, মাথায় জলের ছিটা লাগিল দিইতে। ( ২২) ‘মা! মা!’ করি শিশুগণ ডাকিতে লাগিল, অনেক ক্ষণের পর চৈতন্য হইল , তখন সতীর মুখে কথা বাহিরিল বলিল তখন সতী—কোথা প্রাণপতি ? ( ২৩) সে কথা শুনিয়া সবে কাঁদিয়া উঠিল । উঠিল কান্নার রােল গগন-মণ্ডলে ! এইরূপে প্রতিগৃহ হয়ে সােকাকুল- কাদিল! করিল কত বিলাপ কে বলে ? (২৪) হায়! আজ শূন্য প্রাণে শূন্য গৃহে সবে হয়ে আত্মহারা রয়! কে করে সান্ত্বনা ? সবে জ্ঞানহারা। লক্ষ্য বুদ্ধি-হারা সবে। মৃত্যু যবে দেখা দিবে, যাবে ও যন্ত্রণা। ।।

প্রাণোচ্ছাস।
-:
(২৫)
দয়াময় হে ঈশ্বর ! দেহ দয়া করি
অবলে সান্ত্বনা তুমি! হায় শূন্য ঘরে
শূন্য প্রাণ ল’য়ে সতী, কাটাবে কি করি,
দুৰ্ভর জীবন-কাল! জিজ্ঞাসি তােমারে ?
( ২৬)
ভারত-রমণী হায়! অতি অভাগিনী।
পতি বিনা গতি তার নাহি এ জগতে
জগৎ-পতিরে তাই ডাকে কাঙ্গালিনী,
বলে দেও কি লইয়া থাকিবে ভারতে ?
( ২৭)
দুগ্ধপােষ্য শিশু ওই ! কি খাইয়া বল,
বাঁচিবে ?-কাহার কাছে দাঁড়াবে এখন?
বলে দেও দীননাথ! সংসার অচল
হলে, পূরাবে অভাব, এবে কোন্ জন ?
( ২৮ )
রাজার গৃহিণী হায়! হয়ে কাঙ্গালিনী,
কেমনে বলগাে ভিক্ষা মাগিবে এখন ?
কার দ্বারে দাসী-বৃত্তি করি অনাথিনী-
পূরাবে উদর-ভার, হে মধুসূদন ?
( ২৯)
আর জননী দুঃখিনী হয়ে পাগলিনী
পুত্র-শশাকে—কত দিন কাটাইবে কাল ?
অশ্রু-জলে হ'য়েঅন্ধ হায়! অভাগিনী
অচিরে হারাবে প্রাণ! নিভিবে অনল ।

- প্রাণেজ্বিাস। (৩) হে বিধাতঃ ! তব চক্র বুঝে কার সাধ্য ? অভিপ্রায় কি সাঁধিলে, তুমি শুদ্ধ জান। সৃষ্টির কৌশল বুঝা নরের অসাধ্য! দুজ্জের বিষয়ে মন হয় সন্দিহান। ( ৩১) কে বলিতে পারে কেন দুঃখের আগার— এই জগৎ-সংসার ? কেন হাহাকার চতুর্দিকে শ্রুত হয়! কেন অশ্রুজল- হায় বহে নিরন্তর চক্ষে সবাকার ! (৩২) দারিদ্র্য, অকালমৃত্যু, রােগ, শােক, তাপ- ধরার ভিতরে কেন প্রভুত্ব করয়ে ?- শ্মশানের পাশ্বে নৃত্য করে মনস্তাপ- দেয় কেন শােক-দগ্ধ জনের হৃদয়ে ? (৩৩) প্রগাঢ়-তিমির-মাঝে বিদ্যুৎ-বিকাশ যেমতি করয়ে হায়! তিমিরে প্রকাশ, তেমতি দুঃখের মাঝে সুখের বিকাশ- হইয়া করয়ে দুঃখ অধিক প্রকাশ । (৩৪) হাসি কান্না এক স্থানে দেখা নাহি যায়। হাসির সময় হাসি, কান্নার সময় কান্না সামঞ্জস্য হয়! হাসি কান্না হায়! এ সংসারে পাশ্বাপাশি পরিদৃষ্ট হয়। } প্রাণেশ্বাস। (৩৫) শােক দুঃখ তুলনায় দ্বিগুণিত হয় । শশাকেতে অধীর মম অন্তর যখন, অন্যদিকে হুলুধ্বনি পড়িছে তখন! জন্ম মৃত্যু পাশাপাশি—দেখি প্রতিক্ষণ। ( ৩৬) উদর-অম্নের তরে আমি লালায়িত। পাশ্বের বাটীতে খায় একই সময়ে চ্য চোষ্য লেহ পেয় খাদ্য অগুণিত। দেখিয়া জঠরানল জ্বলে দ্বিগুণিত। (৩৭) শীতবস্ত্রভাবে আমি কাঁপি থর থর ! শাল দোশালা পরে যায় ধনিগণ। কুটীরে বসতি মাের—সম্মুখে সুন্দর সুরম্য প্রাসাদ ওই—দগ্ধিছে অন্তর । ( ৩৮ ) যাদের মরেছে লোেক তারা হাহাকার করিতেছে অনুক্ষণ ! পাশ্বেতে তাহার- তাশ পাশা খেলিতেছে-যুবকের দল! কেহবা কররে শুন সঙ্গীত তরল । (৩৯) সহিতে কি পারে ইহা যারা শােকাকুল ? এ সকল দৃশ্যে হৃদে বাজে যেন শেল! আমােদ প্রমােদ সৰ সুখের সময়- লাগে ভাল। এ সময় যন্ত্রণালয়।

প্রাণোচ্ছ্বাস। (৪০ ) হে করুণাময় ! হয়ে করুণানিধান- নহে সৃজিলা সংসার সামঞ্জস্যময় কেন হায় ! জান তুমি ইহার কারণ- তাই ভক্ত জন আজ জিজ্ঞাসে তােমায়। (৪১) বলে দেও যাতে পারি বলিতে সবায়— এ সংসার নহে গাে অসামঞ্জস্যময় । দয়াময় ন্যায়-পর তুমি হে ঈশ্বর ! ভেদাভেদ তব কাছে অসম্ভবপর ! (৪২) বলে দেও সৃষ্টিতত্ত্ব ভকত জনেরে ; মহিমা-প্রচার তব হউক সংসারে। অবিশ্বাস চলে যা মন হতে দূরে ; সান্ত্বনা পাউ লোেক আপন অন্তরে।

বিশ্বনিন্দুকের প্রতি (১) হে বিশ্বনিন্দুক। বল কি কাজ তােমার এ সংসারে—মক্ষিকার বৃষ্টি ভিন্ন আর? মক্ষিকা যেমতি ক্ষত স্থান অন্বেষয়ে- নিরন্তর, তেমতি গাে তুমি যথা দিয়ে (২) যাও, কেবল দেখ গাে কার কোথা ক্ষত! কোন্ পরিবারে কোন ব্যক্তিতে কি দোষ? যথা ক্ষত নাই, তথা কর নব ক্ষত- হুল ফুটাইয়া নিজে, মক্ষিকার মত । ( ৩ ) পরনিন্দা পরকুৎসা—যে দিন করিতে পাও তুমি, সে দিন হজম না হয়- অন্ন উদরে তােমার। নানা স্থান হতে- তাই আহর বারতা নিন্দা-কুৎসা-ময়। (৪) কীটপুঞ্জ যথা চায় থাকিতে তথায়, মলমূত্র লােক করে ত্যাগ যেথা,তুমি- সেইরূপ ভালবাস থাকিতে তথায়, যেথা পরনিন্দা-কুৎসা করে দুষ্টমতি।

প্রাণােচ্ছল ।
{
৫
(৫)
তব হৃদয়-ভাণ্ডার নরক-সমান।
হয় পূরিত বিষেতে—মলমূত্ৰ পূজে
অহৃিত করিছ যাহা প্রতি দেহ হতে,
তথা প্রতি পরিবার হতে তুমি নিশিদিন ।
( ৬ )
নরকের কীট তুমি অথবা হে কৃমি!
ঘৃণা-ন্যক্কারজনক আকৃতি তােমার ।
প্রকৃতিও ততোধিক! যার গৃহে তুমি-
কর পদাপর্ণ, নাহি নিস্তার তাহার।
(৭)
বন্ধুভাবে প্রবেশিয়ে, মমতা দেখায়ে,
বাহির করিয়া লও, গৃহচ্ছিদ্র তার ।
গােপনে রাখিবে বলি প্রতিশ্রুতি দিয়ে
বাহির হইয়া কর প্রকাশ তাহার !
(৮ )
সে গৃহের শন্তিভঙ্গ করিয়া আবার
ঢোক গৃহান্তরে হায় বধিতে অপরে!
গাঢ় মৈত্রী দেখাইয়া, সকল তাহার
বাহির করিয়া লও। ক্ষণকাল পরে-
(৯)
বাহির বাজারে কর সে গৃহ-বারতা !
এইরূপেপ্রতিদিন ফের ঘরে ঘরে।
মজলিসে বড়ই নাম—সম ৰীরতা
আজ কাল তর, পাছে পাছে সবে ফিরে।

প্রাণােচ্ছল।
(১০)
কিছুদিন পরে সবে দেখে, গুপ্তকথা
সকল গৃহের সব বাহিরে প্রকাশ!
কোন গৃহ ছিদ্ৰশূন্য ? সৰ্ব্ব-গৃহ-কথা-
আজ বাজারে কথিত! সকলে হতাশ ।
(১১)
প্রতিজনে প্রতিজন দেখে
আপনার
প্রতিবিম্ব-অল্পভেদ। নিন্দুক আপন
মুখ দেখে অন্য-মুখে! কাহারাে নিস্তার
নাহিক কাহারাে হাতে! মহা-আন্দোলন
(১২)
হইতে লাগিল হাটে! কার ছিদ্র বড়-
এই ল’য়ে মহাতর্ক উঠিল তথায় ।
মেপে মেপে ঠিক করা হ’ল ছােট বড়,
বিশ্ব-নিন্দুকের ছিদ্র হ’ল সৰ্ব্ব-বড়! •
(১৩)
অসতী বড়ই সতী দেখায় নিজকে-
জটিল কুটিলা তার দৃষ্টান্ত গাে হয় !
প্রকৃত সতীর কভু বড়াই না হয়,
প্রমাণ হইবে দেখে সাবিল্লী সীতাকে।
(১৪)
যার গৃহে ছিদ্র বড়, পর ছিদ্র ল’য়ে-
আন্দোলন তার তত! ঢাকিতে আপন
ছিদ্র, পরচ্ছিদ্র মূঢ় করে অন্বেষণ
নিরন্তর। বৃথা কার্যে বেড়ায় বেড়িয়ে।

প্রাণোচ্ছ্বাস। (১৫) দেখায়ে পরের ছিদ্র নিরন্তর ফেরে দ্বারে দ্বারে, সকলের ঘৃণা পাত্র হয়ে। নিন্দা বটে শুনে সবে প্রফুল্ল অন্তরে, (কিন্তু) নিন্দুককে ঘৃণা করে নিন্দিতের চেয়ে! ( ১৬ ) হে বিশ্বনিন্দুক। তাই বলি উপদেশ, পাচ্ছিদ্র-অন্বেষণে বৃথা কেন ক্লেশ- করিয়া বেড়াও তুমি হায় অকারণ! আপন ঘরেয় ছিদ্র কর সংশােধন। (১৭) পাপপুণ্যময় নর, পাপ শূন্য নয় ! পাপের অধিক মাত্রা হইলে তাহায় বলে গো সকলে পাপী! মাত্রা কমাইতে, কর চেষ্টা নিরন্তর। পরের কথাতে- (১৮) কি কাজ তােমার ? পরনিন্দা মহাপাপ কথিত শাস্ত্রেতে। তাই বলি ছাড় তাহা ! সবে মিত্র হবে। নলে পাবে মনস্তাপ, সৰ্ব-মিত্র হলে তুমি পাবে সুখ মহা !

বিরহিণী-বিলাপ।
(১)
প্রাণ কাদে যে আমার আমারি তরে রে
রে!
যাতনা কাহারে কই ?
কহিলে কে দিবে বারি সেই অনলে রে ?
দেহ হ’ল খাক সই ?
(২)
বরিনু মনেতে প্রাণপতি বলে যারে
পূজিনু অন্তরে সই।
দিনু বরমাল্য গলে-প্রফুল্ল অন্তরে,
তার দেখা পাই কই ?
( ৩ )
সমাজ-অধীন তিনি, সমাজের ভয়ে-
ব্যাকুল অন্তর ভার।
অভাগিনী-পূজা তাই লয়েন সভয়ে-
কভু নাহি ঠিক তার ।
( 8 )
দুঃখিনীর এক মাত্র আরাধ্য দেবতা।
পূজি তাই নিশি দিন ;
কিন্তু তার আছে গৃহে অপর বনিতা,
(তাই) মাের প্রতি কৃপহীন।
৭

ও t প্রাণোচ্ছল। ( ৫ ) সখী! সঁপেছি সকলি চরণে তাহার প্রাণ মন দেহ সব! আমি লয়েছি শরণ চরণে তাহার (কিন্তু) তিনি ভুলেছেন-সব ! ( ৬ ) নহিলে কেমনে সই—বল গাে আমায় শুনিয়া যাতনা মম, রহিলেন হ’য়ে স্থির ভুলিয়া আমায় । হ’ল প্রমাদ বিষম ! (৭) দেখে তাহারে সই, প্রাণ যে কি করে, তাহা বর্ণিব কেমনে ? নহি কবি আমি সই-হ’লে চিত্র করে-- দেখাতেম মম মনে। (৮) দিবানিশি সখী! জপি নাম তঁার- তিনিই আমার প্রাণ। প্রাণেশ্বর বিনা সখী। সকলি আঁধার ! পতি বিনা যায় প্রাণ! (৯) নিঠুর মিদয় তিনি—জানিয়া আমায়- হাতে বিলীন প্রাণ, আছেন কেমনে স্থির—বলে দে আমায় । হতেছে সন্দেহ নানা !

প্রণোদাস।
(১০)
সখী? বলে দে আমায়-নিষ্ঠুর নিদয়,
কেমনে ভুলিল মােরে-
জেনে সব!-জেনে মাের জীবন সংশয়
হবে না দেখে তঁাহারে ।
(১১)
সখী ! পুরুষ কঠিন জানিলা এবে,
বুঝি সঁপিনু প্রাণ।
ফরম-দোষেতে তাই, ভুঞ্জিতে হইবে
দুঃখ! নাহি পরিত্রাণ ।
(১২)
স্বামী নিঠুর নিদয় যাহাই হউন,
সতীর সকলি তিনি!
সঁপেছি ভঁাহারে প্রাণ—যা ইচ্ছা করুন,
মাের দণ্ডকর্তা তিনি!
{ ১৩ )
অন্য-পূৰ্ব্বা আমি—মম এই অপরাধে,
সখী । শ্বাশুড়ী বিমুখ ।
তাই বুঝি এবে তিনি বাধিলেন সাধে,
বুঝি পতিও বিমুখ ।
(১৪)
না—সুখী ! পতি মম পরম ধার্মিক ।
নাহি ঘৃণা ভার মনে!
জননীর ভয়ে তিনি আমাতে বিমুখ
বহে নহে তথা মনে।

প্রাণোচ্ছ্বাস। (১৫) বিষম সমস্যা ভার হয়েছে এখন! ভাবিয়া আকুল তিনি! ধরম প্রল তার মনেতে যখন- ত্যজ্য হবে না দুঃখিনী! (১৬) ভাবিনা তার জন্য—অবিশ্বাস নাই ! তবে না দেখে তাহারে প্রাণ যে আকুল হয়-কাঁদি আমি তাই। জ্বলে প্রাণের ভিতরে। (১৭) তিনি বিনা কেহ নাই—দুঃখিনীর আর! সখী! বাঁচি গাে কেমনে- আমি না দেখে হায়—যিনি অনিবার চিন্তার বিষয় মনে! (১৮) ভুলিব ভুলিব করি—ভুলিতে না পারি। সদা জাগরূপ মনে- সেই মুরতি মধুর ভুলিতে কি পারি- সেই প্রাণপতি-ধনে ? (১৯) ভুলিতে না পারি আঁরে—ভুলিতে আমারে- পারিগো সহজে সই। প্রাণে প্রাণে গাঁথা তিনি-হিঁড়িলে তাহারে মরিব প্রাণেতে সই। == প্রাণোচ্ছ্বাস। ৩৭ , শ ( ২০ ) সখী! করেছি সঙ্কল্প আমি মনে এই- মূর্তি পূজিব তাহার যদি দেখা তার নাহি—এ জীবনে পাই। সখী! কে আছে আমার ? ( ২১) সখী ! কে আছে আমার বল তিনি বই ? বল কে আছে আমার এ সংসার-মাঝে, আমি যারে লয়ে রই। সব তিনিই আমার। (২২ ) তাই পূজিব ভঁহার সে দেব-মূরতি হৃদি-মন্দিরে স্থাপিয়া। সে হৃৎপূজাতে হবে কুসুম ভকতি, ! ধোব পাদ অশ্রু দিয়া । ( ২৩) তিনি মাের প্রাণেশ্বর—আমি তার দাসী। ভােগে অধিকার নাই ? আমি চাহিনা সে ভােগ-ভােগ সর্বনাশী !- পূজিব তঁাহারে সই। ( ২৪ ) পতি-পূজা ছিল পূৰ্বে—আবার তাহার প্রতিষ্ঠা করিব সই! পতি-ভােগ স্বার্থ-দুষ্ট—প্রার্থী নহি তার পতি-পূজা-মাত্র চাই! =

প্রাণোচ্ছ্বাস।
(২৫)
পতিই ঈশ্বর মাের এ জগতে সই।
তিনি ভিন্ন কিছু নাহি
জানি আমি আর—অন্তর্বাহে দেখি তাই,
মূর্তি তাঁর সুধাবাহী।
(২৬)
নয়ন মুদিয়া ধ্যানে সম্মুখে তাহায়-
দেখিতে পাই গাে সখী।
নয়ন মেলিলে পুনঃ সমক্ষে হায়
দেখে হই নতমুখী।
( ২৭)
ইষ্টদেব-নাম জপ করিতে বসিলে,
তার নাম মুখে আসে!
প্রতিবিম্ব দেখি তঁার, সখী গাে সলিলে !
দেখি তঁারে আসে পাশে!
( ২৮ )
সূর্যোদয় হলে যবে সূরজ দেবেরে—
যাই প্রণমিতে সখী।
সূৰ্য্য-মণ্ডল-মধ্যেতে জ্যোতির আকারে
প্রতিবিম্ব তাঁর দেখি ।
(২৯)
জ্যোৎস্নাময়ী রজনীতে জ্যোৎস্নার বিকাশে,
দেখি দেহ-কান্তি তঁার !
পূর্ণিমার চন্দ্র যবে গগণে প্রকাশে,
দেখি মুখচন্দ্র তঁার!

প্রাণেশ্বাস।
( ৩০ )
নীরদে বিজলী যবে খেলয়ে, তখন
দেখি মধু হাঁসি তার!
নীরদ গম্ভীর-নাদ করয়ে যখন
শুনিকণ্ঠধ্বনি তার।
( ৩১)
প্রত্যুষে উদ্যানে আমি যাই গােযখন
পুষ্প চয়ন করিতে,
শিশিরে আচ্ছন্ন দেখি তরুলতাগণ,
হয় উদিত মনেতে
(৩২)
বুঝি তারা শুনে মাের দুঃখের কাহিনী,
অশ্রুজল বিসর্জিয়া,
প্রকাশিছে তাহাদের—সানা-দায়িনী
সম-বেদনা অমিয়া !
( ৩৩ )
কোকিলের কুহুরব শুনে মনে হয়,
মম দুঃখেতে তাহারা-
উহু! উহু! করি সমবেদনা দেখায়।
তারা হয়ে আত্মহারা
(৩৪)
জানে না হায় গাে সখী। আমি রাজরাণী!.
হৃদয়-রাজ্যেতে মাের,
এক নরপতি, আমি নহি গাে দুঃখিনী !
অন্তর্বাহে এক মাের।

. . প্রাণোচ্ছ্বাস। (৩৫) অন্তর্বাহে এক মাের নিত্য বিদ্যমান। মম আর কিছু নাই। ‘একশ্চন্দ্ৰস্তমােহন্তি’-একের সমান- এথা আর কিছু নাই। (৩৬) বাহ চন্দ্র অমিত হয় প্রাতঃকালে - তথা অমাবস্যা হলে, মাের চন্দ্র বিরাজিত হৃদে সর্বকালে- দেখা হলে নাও হলে ! ( ৩৭ ) কিসে দুঃখিনী আমি গাে তবে বল সই- বল কেন গো দুঃখিনী ? প্রাণের ঈশ্বর যবে প্রাণে, তবে দুঃখ কই ? নাই।—আমি সুভাগিনী। (৩৮) সপত্নী ভুজুক স্থূল দেহ তার, মাের- নাহি অভিলাষতাতে ! সূক্ষে সূক্ষে মিলে, আমি তঁার তিনি মোর ! সখী! কি কাজ স্কুলেতে ? (৩৯) আত্মাতে আত্মাতে মিলে মৃত্যুর পরেতে, নিত্য-যুক্ত হ’ব দোহে ! তথায় সমাজ কিম্বা সপত্নী জনেতে বাধা দিতে ক্ষম নহে!

প্রাণােচ্ছ্বাস। (৪০ ) একই প্রার্থনা মাের ঈশ্বর-সমীপে যদি পুনর্জন্ম হয়, যেন পাই তঁারে জন্মান্তরে পতিরূপে যেন বিচ্ছেদ না হয়। (৪১) আর যদি মুক্তি পাই—এইজনমেতে, মুক্তি যেন দোহে পাই- একই সময়ে ! যেন একই কালেতে ইহলােক হ'তে যাই। ( ৪২ ) উভয়ে একত্র হয়ে চৈতন্যে মিশিয়ে ভুঞ্জিব স্বর্গীয় সুখ ! যে সুখে বিচ্ছেদ নাই—সতত ভুঞ্জিয়ে নাহি অবসাদ-দুঃখ!

রাজ-অভ্যর্থনা (১) কেন প্রতি গৃহ আজ পরে দীপমালা ? কেন কলিকাতাবাসী এত প্রফুল্লিত ? প্রতি তােরণেতে কেন ঝােলে পুষ্পমালা ? বারাণ্ডা ছাদেতে আজ কেন লোক এত ? (২) কেন হুলুধ্বনি আজ হয় প্রতি গৃহে ? নিশান ধরিয়া ছুটে কেন ছাত্রগণ ? একতান বাদ্য বাজে কেন প্রতি গৃহে ?' আনন্দে উৎফুল্ল কেন নাগরিকগণ ? ( ৩ ). সারি গাঁথি লােক কেন যায় পাদপথে ? জীবন-তটিনী যেন বহে দুই ধারে ! জগন্নাথ দেব যেন উঠেছেন রথে , দেখিতে ছুটিছে যেন আনন্দে তাহারে। (৪) রাজ-অভ্যর্থনা হেতু উন্মত্ত নগর- একদৃষ্টি হয়ে পথ আছে নিরীক্ষিয়া । কখন আসেন লর্ড রীপণ সুধীর , ভাবিছে অন্তরে তাই একাগ্র হইয়া । *

প্রাণোচ্ছল।
(৫)
ঘহেনা নিশ্বাস ! চক্ষে পড়েনা পল্লব!
সহিতে অক্ষম সবে বিলম্ব বিস্তর ।
জীবন-লক্ষণ নাই, নিষ্পন্দ নীরব !
মণিহারা ফণীমত, অধীর-অন্তর।
( ৬ )
দেখিতে দেখিতে রথ আইল অদূরে,
নিদাঘ-সন্তপ্ত ভূমে, যেন বারিধারা !
বারিধারা দাবানলে যেন! প্রাণভরে
রিপণে দেখিয়া হ’ল তেমতি তাহারা।
( ৭ )
গগনবিদারী রব উঠিল অমনি
‘জয় রিপণের জয়,—ভারতের জয়!
ফিরাইয়া সেই ধ্বনি, বলে প্রতিধ্বনি,
‘জয় ভারতের জয় , রিপণের জয়!
( ৮ )
আবাল-বৃদ্ধ সবে করে জয়ধ্বনি,
একতান বাদ্য বাজে শকট-উপরে ;
যুবতীর সৌধ-ছাদে করে হুলুধ্বনি,
প্রাচীন প্রাচীনা করে আশীৰ্বাদ তারে।
(৯)
•
রিপণের রথােপরি করে অবিরাম,
লাজ-কৃষ্টি, পুষ্পবৃষ্টি পুরাঙ্গুনাগণ ;
শঙ্খ ঘন্টা বাজে কত, নাহিক বিরাম,
কাঁশর, মুরলী, বীণা বাজে একতান।

১
.
:
প্রাণােস্থল।
(১০)
‘সাম্য-স্বাধীনতা-ন্যায়পরতা’-অঙ্কিত
পতাকা কম্পিত করে-যত ছাত্রগণ,
সাম্য-স্বাধীনতা-ন্যায়পরতা-অন্বিত
রিপণ কম্পিয়া শির করেন সম্মান।
(১১)
“দীর্ঘজীবী দীর্ঘজীবী হউন রিপণ ।-
। সমস্বরে সবে বলে—নাহি বর্ণভেদ।
‘দিউন তাহাকে বিধি অনন্ত জীবন’
বলিয়া সকলে ভঁরে করে আশীৰ্বাদ।
(১২)
মুদ্রাযন্ত্র-স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র-শাসন,
ধৰ্ম্ম-প্রবণতা, বিনা নাহি জাতি উঠে
‘জাতি বর্ণ ভেদ নাহি—বিধির নিকটে’-
‘বাহুবল বল নয়, বল ধৰ্ম্মবল’
(১৩)
ইত্যাদি—অক্ষরাঙ্কিত পতাকা লইয়া,
বি এ, 'এম্ এ কত যান পশ্চাতে ধাইয়া,
ব্যারিষ্টার, সম্পাদক, উকিল, হাকিম ,
বণিক, কেরাণী, ধনী-হরেক রকম
(১৪)
পরিধায়ী পরিচ্ছদ যান মহােল্লাসে ;
ভলান্টিয়ার, বডিগার্ড শিখসৈন্যগণ,
চলে সবে কুতূহলে রিপআবাসে,
সমস্ত সহর চলে হয়ে একপ্রাণ।

প্রাণােচ্ছাস। • । (১৫) রাখিয়া ভবনে তারে নাগরিকগণ- মহােৎসবে মহােল্লাসে যাপয়ে রজনী নৃত্য গীত প্রমােদেতে অধিবাসিগণ, বিভাের অন্তরে কাটে সমস্ত যামিনী। (১৬) বিবিধ বাজির খেলা গগনেতে হয়, শত শত ব্যোমস্ফোটে গগন বিদরে ; তারা বাজী ফুল বাজী করে আলােময়— আকাশ ভূতল ! সুখী সকলে সহরে। (১৭) কেবল দুঃখের ভার বহে শ্বেতগণ ; করিয়া চৌরঙ্গি স্থান তিমিরে আবৃত, ঈর্ষার কালিমা-রেখা ব্রিটনীয়গণ, ধরেছে বক্ষেতে হয়ে লজ্জায় আনত। (১৮) ভারতের হিতাকাঙ্খী বলিয়া রিপণ— হয়েছেন তাহাদের বিরাগভাজন। চাহেনা—তাহাৱা তারে—নামে তাঁর জ্বলে, তাই আজ পূজা দেখি কাঁদিছে বিরলে। (১৯ ৩) জানেনা নির্বোধ তারা, অস্ত্রে দেশ জয়- করা যায় সত্য, কিন্তু মানব-হৃদয়- বশ্য হয় না অস্ত্রেতেবিনা প্রেমডােরে— বিনা পাশে বাঁধা নাহি যায় তারে।

প্রাণোচ্ছ্বাস। ** ( ২০ ) ভারতের অধিবাসী পঞ্চ বিংশ কোটী; উপনিবেশ-সমেত সবে তিন কোটী- শ্বেতদ্বীপ-অধিবাসী; পারে কি বলেতে- শুদ্ধ, এত অল্প লােকে শাসনে রাখিতে- ( ২১) ভারতের পঞ্চ বিংশ কোটী মানবেরে, প্রায় নবগুণিত মানব—এক জন নয় জনে ? তাও নয় ; যেহেতু কি নিগুঢ় কারণে, অধিক ইংরাজ হেথা বসতি না করে । (২২) দুইলক্ষ সবে মাত্র ব্রিটন ভারতে। একজনে বার শতে, কেবল বলেতে। কভু কি রাখিতে পারে ? ভারত-সন্তান- নহে তত হীনবল ; তার নিদর্শন (২৩) আফগান-রণজয়,-মিসর-সমর। ‘আধুনিক সভ্যতার আদর্শ-ব্রিটন- আসিয়াছে ভারতের মঙ্গল কারণ— বলিয়া আসিছে এই কথা বরাবর। ( ২৪ ) ধৰ্ম্মশীল হিন্দু জাতি, সেই কথা শুনে, আত্মসমর্পণ করে, ছিল স্নিগ্ধ মনে ; ভাবেনি তখন তারা, অন্তর সরল, উঠিবে অমৃত হ’তে কখন গরল। - প্রাণোচ্ছ্বাস। (২৫) ভাবেনি তখন তারা, হিতৈষী ইংরাজ- উন্নতি-রােধ হবে; ভাবেনি তাহারা, আশ্রয় লয়েছে যাকে ভাবিয়া চন্দন- সে নহে চন্দন-তরু উগ্র ফণিরাজ । অদৃষ্ট নিতান্ত মন্দ, না হলে এমন— বিষম ঘটিবে কেন ? সর্বস্ব করিয়া পণ, যে ইংরাজ জগৎ হইতে দারুণ কঠোর দাসত্ব-প্রথা সাগর মন্থিয়া (২৭) তুলিয়া বেড়ান—সেই দয়া ইংরাজ- কোন্ ভাগ্যদোষে হন ভারতে নির্দয় ? বল মা ভারতভূমি ! করেছ কি কাজ গহিত এমন, যাতে সুধা বিষ হয় ? ( ২৮ ) রাজভক্তি-হীন তুমি ? নাহ’তে পারে না। যত দিন লেখা আছে বক্ষেতে তােমার নৃপতি ঈশ্বর’—যদি কেহ এ ধারণা করে থাকে বলি তারে নিতান্ত পামর। ( ২৯) আর কি বলিব তারে ? পূর্বের কাহিনী তারে বলি গুটিকত, যবে রমণি- গেলা বনবাসে, সঙ্গে গেল যত প্রজা; যেহেতু প্রজার তিনি মনােমত রাজা।

প্রাণোচ্ছ্বাস। ( ৩০ ) জগতে বিদিত তিনি প্রজা-প্রাণধন, যেহেতু ত্যজিলা সীত প্রাণপ্রিয়তরা- প্রজার অন্তর শুদ্ধ করিতে রঞ্জন, জানিয়া নির্দোষী তারে বিচ্ছেদে কাতরা। ( ৩১ ) ভাল রাজা হলে সবে তার প্রশংসায়, রামরাজ্যে বাস করি বলে তুলনায় ; আদর্শ নৃপতি রাম আজিও ভারতে, ভালবাসা কভু হিন্দু জানে না ভুলিতে। (৩২) ভাল বাসিলে বসিতে জানে হিন্দুগণ, ভক্তির উচ্ছাসে তারা নহে কারাে নূন, প্রশংসা করিয়া ক্ষান্ত হয়নি হিন্দুরা, দেবভাবে পূজে রামে আজিও তাহারা। ( ৩৩) বিশ্বশ্রুত বাদশাহ আকবর সাহা- হিন্দু যবনেতে তাঁর ছিল সমভাব, আকব্বরি মােহরের সমাদর মহা- আজিও ভারতে তাই, জড়ে ভক্তি-ভাব। ( 38 ) গুণে মুগ্ধ হয়ে আজ দেখ সেইরূপ- জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভুলে ভারত-ললনা, লাজপুস্পবৃষ্টি করে রিপণ-উপরে, হুলুধ্বনি দিয়া পূজে আপন রাজারে। - - প্রাণোচ্ছ্বাস। (৩৫) বালবৃদ্ধ হয়ে মত্ত ছুটে নৃপ-পাশে, সুশিক্ষিত দল ছুটে সাজি নানা সাজে, ইহাপেক্ষা রাজভক্তি আছে কোন্ দেশে ? কোন দেশ দেবভাবে পূজে নিজ-রাজে? ( ৩৬ ) , অস্ত্রবিধি শেল-সম যদিও সবার হৃদয়ে বাজিছে; যদিও সে রাহু-গ্রাম- আজ করেছে ভারতে অর্ধ-বীৰ্য-সার। তথাপি যখন বহে ভারতে নিশ্বাস- (৩৭) পঞ্চবিংশ-কোটী-দেহে, কি ভয় অন্তরে ? পঞ্চবিংশ কোটী প্রজা হইতে আগুণ- লােল-জিহ্বা হয়ে উঠি পােড়াবে তাহারে, যে কেহ স্পর্শিবে কেশে নৃপতি রিপণ। ;

ধ্যান ও প্রার্থনা।
০
(১)
প্রাণের মাঝারে দেখি, অপূৰ্ব্ব আলােক !
অমৃত-সমান-স্নিগ্ধ, তেজ অলৌকিক !
নয়ন মুদিলে দেখি, মেলিলে আঁধার ।
আলােক-কিরণে দেখি সব একাকার।
(২)
একাকার দেখি আমি ভূলােক খলােক !
গলিত-রজত-মাখা এ বিশ্ব-সংসার ।
রজত-সাগর-মাঝে বিলীন ত্রিলোেক।
আমি নাই, তুমি নাই—আছে সারাংসার !
(৩)
অদ্বৈত ভাবেতে মন বিগলিত হয়,
নাহি থাকে ভেদাভেদ, ব্যক্তিত্বের জ্ঞান।
আমি তুমি সব এক ব’লে জ্ঞান হয়,
অলৌকিক জ্ঞান আসি নাশয়ে অজ্ঞান।
(৪)
এ বিশ্ব-সংসার যেন এক পরিবার
এক কৰ্ত্তা—এক রাজা হয় তথাকার !
আমরা সকলে যেন তার পরিবার,
অভিন্ন তঁাহার সাথে-সব একাকার!

প্রাণোচ্ছ্বাস। ক্ষালিত কল্মষজাল রজত-চ্ছটায়, বিধৌত ধমনী সব বিদ্যুৎ-প্রবাহে, অনন্তকালের পাপ তেজে দগ্ধ হয় ! মুকুর-সন্নিত দেহ! প্রতিবিম্ব যাহে (৬) পড়ে তার যিনি নিত্য শুদ্ধ নিরঞ্জন ; অপূৰ্ব স্বর্গীয় দেহ নেত্ৰখকর! যে পেয়েছে সেই ধন্য জগৎ-নন্দন। প্রণতি চরণে প্রভাে! দেহ মােরে বরণ (৭) ও চরণে রতি যেন সদা থাকে মাের। সদা যেন ধ্যানে দেখি রজত-চরণ- তব হে করুণাময়। মিনতি দাসের যেন মৃত্যুপরে পাই ও সাদা চরণ। (৮) আর কি চাহিব নাথ ! কি আছে এমন- মূল্য অপূর্ব দ্রব্য ত্রিজগৎ-মাঝে ? তুলনা নাহিক তার, নাহি উপমান, অনুভরে বিদ্যমান ভক্ত-হৃদি-মাঝে । (৯), আর কি চাহিব নাথ ?-দিয়াছ সকলি, দিয়াছ সলিল নাথ! দিয়াছ পবন ; দিয়াছ আলােক দেব ! দিয়াছ বিজলী- জীবের জীবন-রূপ! দিয়াছ অশন-

৯২
প্রাণােচ্ছ্বাস।
(১০)
বসন ভুষণ সব, যা কিছু যে চাহে-
শস্য-ক্ষেত্ৰ শস্যপূর্ণ বৃক্ষ ফলে ভরা !
খনি সব রত্নে পূর্ণ, সে পায় যে চাহে
যাহা, বাঞ্ছাকল্পতরুকাছে প্রাণভরা !
(১১)
কিন্তু দাস নাহি মাগে তাহা, তুচ্ছ ধন!
সব বিনশ্বর, ক্ষণস্থায়ী, অদ্যতন!
&দ্ধ স্থূল নহে, অতি সূক্ষম ধন,
মাতৃ-স্নেহ পত্নী-প্রেম-তাও অকিঞ্চন
(১২)
ক্ষণস্থায়ী—স্বার্থ-দিগ্ধ-সহজে ভঙ্গুর !
পুত্র-কন্যা-স্নেহ ? তাও কামনা-অঙ্কুর ।
তব ও চরণ কিন্তু নিত্য চিরস্থায়ী,
তাই মাগে দাস এই এক ধন স্থায়ী।
t
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Pranochhas

Author
Bandopadhyay,jogendranath
Title
Pranochhas
File name
Pranochhas
Text
OCR done
Citation
1888
Published
2009/11/3
Publisher
Nanigopal Mukhopadhyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
99
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Bandopadhyay,Jogendranath
DLI number
513087
Barcode
4990010020098.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Ajk6haZyGwD
Download PDF

Pranochhas