Bally Sadharan Granthagar
Ai Simante Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
এই সীমান্তে
নবেন্দুভূষণ ঘোষ
বেঙ্গল পাবলিশাস’
বঙ্কিম চাটুজে স্ট্রীট, কলিকান
বেঙ্গল পাবলিশার্সের পক্ষে প্রকাশক-বাৰা মুণ্ডাপাধ্যায় নি
টুটে এবং পতি প্রেসের পক্ষে মুদ্রাক-বিভূৰিণ বিশ্বাস, ১৯নংডি, এল
আয়ট, কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ-জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫২.
আড়াই টাকা
লেখকের অন্যান্য বই
ডাক দিয়ে যাই (২য় সং), নায়ক ও লেখক, মানুষ
এপট একেছেন আশু বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্লক ও প্রচ্ছদপট মুদ্রণ-ভাত
ফোটোটাইপডি।
গত সরবরাহ করে সহায়তা করেছেন বেল পেপার মিলসের
না সির।
মাঝি হঠাৎ নৌকাটি একটি ঘূর্ণিপাকে পড়িয়া এক ঘুরপাক খাইতে ভৈবর তাড়াতাড়ি কাটা নামাইয়া রাখিয়া গর্জন করিয়া উঠিল “ইস নাই ত’র ছাগল কোথাকার,-ছােট নৌকার হালটাও ঠিক ভাবে ধইরা রাখতে পার না বলিতে বলিতে সে প্রাণপণ শক্তিতে দাঁড় টানিতে লাগিল নৌকাটি ঘুরপাক খাইতেই রাখাল একটু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয় পড়িয়াছিল। সে একটু অন্যমনস্ক হইয়া ভাবিতেছিল তাহার বিবাহের কথা, কারণ কয়েক দিন পূর্বে তাহার পিতা তারাপদ নবাবপুরে, এক মেয়েকে দেখিতে গিয়াছিল। মানসনেত্রে সে মেয়েটিকে একা লক্ষ্মীপ্রতিমার মত দেখিতে পাইতেছিল। ভৈরবের হঙ্কারে বলিষ্ঠ মুষ্টি দ্বারা হালটাকে একটু ঘুরাইয়া দৃঢ়ভাবে নৌকাকে উত্ত মুখে পরিচালিত করিতে করিতে লজ্জিতভাবে বলিল-“একট কথা ভাৱত্যাছিলাম, তাই ভৈরব তখন প্রাণপণে পাড় টানিয়েছে। বর্ষার পদ্ম দানৰী মত শক্তিশালিনী, ঘূর্ণিপাকের বাহিরে আসিবার জন্য তাহা প্রত্যেকটি পেশী তখন দাঁড় চালনায় নিযুক্ত। মােটা মােটা শিরনি সর্বদেহে ফুলিয়া উঠিয়াছে, নিঃসও পড়িতেছে দ্রুততর, উল্ল বুকটা আরও উন্নত আরও বিশাল হইয়া উঠিয়াছে। রাখালের কথা কোনও উত্তর সে তৎক্ষণাৎ দিল না। মিনিট তিনেক পরে নৌক যখন. অবশেষে ঘুর্ণিপাকের বাহিরে আসিয়া শ্রোতভরে উড়ন্ত পালে সাহায্যে. তর করিয়া ভাসিয়া চলিল, তখন সে বড়টা কি
২
এই সীমান্তে
গায়ে আটকাইয়া রাখিয়া, গামছা দিয়া গলাটের ঘাম মুছয়া, চক্ষু
ঘুরাইয়া বলিল, “ভাবতাছিলা? আহা, খায়া র পােলার কথা
শুইনা মইরা যাইরে—“বলি কি ভাবত্যাছিলা?
রাখাল প্রত্যুত্তরে শুধু একটু হাসিল।
ভৈরব হাত নাড়িয়া প্রশ্ন করিল, “কি কত্ত, বলি ভাবত্যাছিল
কি?”—তারপরে সে হাসিয়া ফেলিয়া বলিল—“ছােট্ট এউক্কা
রাঙা মুখের কথা-না ?”
রাখাল লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল, “ধ্যেৎ, কি যে হাবিজাবি
• কথা কও ভৈরব-ধ্যেৎ-”
ভৈরব মাথা নাড়িয়া মুচকি হাসিয়া বলিল—“বেবাক বুঝিরে
সোেক বুঝি। আরে, তা অমন অইয়াই থাকে, আমি কি
আর বিয়া করি নাই?”
রাখাল লজ্জায় মাথা নীচু করিয়া হাসিতে লাগিল নির্বোধের
মর্ত।
ভৈরব এবার হাঃহাঃ করিয়া খানিকটা হাসিল, পরে রাখালের
নির্বাক হাসি ব্যতীত আর কোন সহযগিতা না পাইয়া সে অগত্যা
কাটা আবার টানিয়া লইল। -তামাক টানিতে টানিতে সদু
ওরফে সৌদামিনীর কথা তাহার মনে পড়িয়া গেল। বিবাহের
কথায় তার নিজের জীবনের সেই একটি অরণীয় দিবসের কথা
চোখের সামনে অল করিয়া ফুটিয়া উঠিল। সদু তখন ছিল মাত্র
'এগার বৎসরের। একটি দিনের জন্য সে কিন্তু রাজার মত সমাদর
লাভ করিয়াছিল। লাল চেলি পরিয়া, চন্দনের ফেঁটা কপালে,
টোপর পরিয়া বগুন সে বিৰাহমণ্ডপে গিয়া দাঁড়াইয়াছিল, তখন
তাকে তৈরৰ মাৰি বলিয়া কে চিনিতে পারে নাই। সেই
গণ আত্রে কতকগুলি মেয়ে কিন্তু তাহাকে চিমটি কাটিয়া, কাণ
मावि
মলিয়া দিয়া বড় জ্বালাতন করিয়াছিল। আর তাহার ক্রোধ ও
মেয়েগুরি হাৱি দেখিয়া সদু মাথার ঘােমটা ফেলিয়া খিলখিল
করিয়া হাসিয়া উঠিয়াছিল। সম্পৰ্কীয়া এক বুড়ী ঠানলি ছুটিয়া
আসিয়া গালে হাত দিয়া বলিয়াছিল, “ওমা, পােড়ার মুখ জামাইয়ের
সামনেই কেমন হাসত্যাছে-ওমা!”
ভৈরব তামাক খাইতে খাইতে নিজের মনে নিঃশব্দে হাসিল।
সেই বুড়ীটি বড় রসিকা ছিল। সদুকে লইয়া বাড়ী ফিরিবার।
সময় বুড়ী তাহার গলা জড়াইয়া কান্নার সুর করিয়া বলিয়াছিল,---
“আমারে কেইলা, আমার সব্বনাশ কইরা যাইত্যাছ ক্যান গো,
আমি ক্যামনে বাচু আমি যে তুমার ছিচরণের দাবী-ভৈব
আবার নিজের মনে হাসিল হ্যা, সেই বুড়ী ভারী রসিকা ছিল।
কিন্তু সে আজ প্রায় তের বৎসর আগেকার কথা।
ভৈরব হকাটা রাখালের হাতে দিয়া বলিল, “আইজ আর বােধ
হয় বিষ্টি অইব না।”
রাখাল মাথা নাড়িল, “তা কিছুই কওন যায় না, রােজ যে রকম
বিষ্টির নমুনা দেখতাছি।”
ভৈরব আকাশের দিকে একবার দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল, “না,
আইজ আর তেমন কই?”
হুকায় এক টান দিয়া রাখাল বলিল, “তবু, বিশ্বাস নাই।”
ভৈরব সায় দিল, “
ইহা ঠিক কইচ।”
একটু পরে সে আবার বলিল, “এই বারকার মতন এত বিষ্টি
আমার জন্মে আর দেখি নাই রে, আমার মনে হয় এইবার জলে সব
ডুবাইব।”
“তা অঈর পারে।”
পাশভরে ছােট নৌকাটি গর্তমান তরঙ্গের বক্ষ ভেদ
৪ এই সীমান্তে ভাসিয়া চলিল। সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছিল, সূৰ্য্য পশ্চিম দিকের জলে লাল হইয়া ডুবিতেছিল, ভাঙ্গা ভাঙ্গা কালো মেঘে পার্শ্বদেশে, সেই ডুবন্ত লাল ৰ্য্যের রঙীন স্পর্শ। দিগন্ত বিস্তৃত অসীম জল- প্রবাহের মধ্যে অসংখ্য আবর্ত, অস্ত্র ফের রাশি মাঝে মাঝে উন্মত্ত জল-কল্লোলের শব্দের সহিত বড় বড় মাটির চাপ ভাঙ্গার শব্দ ভালিয়া আসে। একটি মহাজনী নৌকা কাছাকাছি আসিতে ভৈরব হক, দিল, কোন গাঁওখানে আইত্যাছ মাঝি ভাই?” আবছা অন্ধকারে ছায়া মূর্তির মত একজন মাঝি মহাজনী নৌকাটি হইতে উত্তর দিল, “ঈশানপুর—তােমরা মেলা দিছ কই ?” গলাচ্ছাড়িয়া ভৈরবও প্রশ্নের উত্তর দিল-“তেতুল বােরা- মহাজনী নৌকাটা ক্রমে দুরে চলিয়া গেল। অন্ধকারও ক্রমে ঘনাইয়া • আসিল। রাখাল বাতিটা জ্বালাইয়া বিশ্রাম করিতে জলের শব্দ শুনিতে শুনিতে সে আবার একটি মেয়ের মুখ কল্পনায় আঁকিতে আরম্ভ করিল। খানিক পরেই ডান দিকের খাল ধরিয়া নৌকা চলিল। হাট, ইস্কুল ঘর, কাছারী, দত্তবাড়ী, সৰ ছাড়াইয়া অবশেষে নৌকা মাঝি-পাড়ায় থামিল। • অদ্যকার জীবন সংগ্রাম শেষ হইল। এখন বিশ্রাম। আঃ। একটি বাবলা গাছের সঙ্গে নৌকার শিকল ও তালা লাগাইয়া খাওড়ার ঝােপ, বাঁশবন, হিজল ও বেতবনের মধ্যবর্তী গ্রাম্য পথ দিয়া ভট ফুলের আঘ্রাণ লইতে লইতে ভৈরব ও রাখাল বাড়া দিকে চলিল। প্রত্যেকের হাতে একটি করিয়া লণ্ঠন ও দাড়। রাখা সােল পথ ধরিয়া চলিয়া গেল। তাহার বাড়ী আরও একটু দূরে, তৈবের বাড়ী কিন্তু খাল হইতে মাত্র তিন চার মিনিটের রাস্তা। রণি ভৈরবের সঙ্গেই নৌকা চালায়, তাহার বা ও অন্যান্য তিন বলি।
ভাইয়ের একটি গয়নার নৌকা চালায়। ভৈরবের সহিত রাখালের দশ আনা ছয় আনা সম্বন্ধ। উভয়ে মিলিয়া তাহারা মল রােজগার করে না। পেট ভরিয়া খাবার তাহাদের জুটিয়া যায় বসনেরও অভাব হয় না। কেবল গরমের দিনে রােজগার একটু মন্দা হইয়া পড়ে। তা আর কি করা যাইবে, অবস্থা যে বােজই এক থাকে , মাঝিরা সে কথা বিশ্বাস করে। আনের আলােতে পথ দেখিতে দেখিতে ভৈরব চলিল। নিবারণ . মার্কির বাড়ীর দাওয়ায় শ্রীনাথ বসিয়া ছিল, সে ডাকিয়া বলিল, “কে, ভৈরব না কি ?” “কোন গাঁয়ে গেছিলি আইজকা ?” “পলাশপুর- শ্রীনাথ চুপ করিল, ভৈরব এবার প্রশ্ন করিল,-“তুই আইজ যা নাই ক্যান? “পােলাটার বড় ব্যারাম অইচে “কৰেখনে?” “কাউলকা রাত্রিরথনে বমি আর আর অইতেছে”- ভৈরব চলিতে চলিতে একবার হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। তাহার এমন সুখের সংসার অথচ তাহার একটিও সন্তান হইল না। একটি যদি পুত্র হইত, তবে আজ তাহার কত বয়স হইত? কবে হইলে? আন্দাজ ? মনে মনে হিসাব করিতে করিতে সে বাড়ী পৌছাইল। সদু দরজা বন্ধ করিয়া রান্না করিতেছিল, কড়া নাড়ার শব্দে আসিয়া দরজা খুলিয়া দিল, হাতে একটি কেরােসিন তৈলের ডিবা, তাহার মান ও কম্পিত আলােকে, কালাে পাথরে খােদাই করা নিখুত প্রস্তর মূর্তির মত নুর সুগঠিত দেহ দেখিতে দেখিতে ভৈরবেশ এই সীমান্তে রক্ত কেমন যেন নাচিয়া উঠে। তের বৎসর যাবৎ তাহাদের বিবাহ হইয়াছে, এই তের বৎসর যাবৎ সে সদুকে দেখিয়া আসিতেছে তাহার দেহে যৌবনের নিত্য নৃতন ভাব প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র একটি কিশােরীকে যুবতীতে পরিণত হইতে সে লক্ষ্য করিয়াছে এবং মুগ্ধ হইয়াছে। কিন্তু আজ হঠাৎ আবছা আলােতে দ্বারপার্শ্বে দণ্ডায়মান সদুর মধ্যে সে যৌবনের সমস্ত রূপ এক সঙ্গে দেখিতে পাইয়া আর চকু ফিরাইতে পারিল না। দেখিতে দেখিতে কেমন যেন অদ্ভুত, রহস্যময় বােধ হইতে লাগিল। ভৈরব বর্ষার নদীর উন্মত্ততাকে ভয় করেনা, ঝড়ের রাত্রির উচ্ছল তরঙ্গাশিকে গ্রাহ করে না, কিন্তু সদুর ঐ পালা ওষয়, সমুন্নত বক্ষদেশ, বলিষ্ঠ অঙ্গের অশ্রুত ছন্দ, হঠাৎ হাসি আর চক্ষু ঘুরান দেখিলে সত্যই ভয় পায়। ভয় পায় সহু হঠাৎ রহস্যময়ী হইয়া উঠে বলিয়া। আজও সে দেখিল, কিন্তু আজ যেন সদু আরও রহময়ী। সদু হাসিয়া কথা বলিল, “ওমা, আইজ যে বড় সকাল সকাল ?” ভৈরবের চমক ভাঙ্গিল, দরজাটা বন্ধ করিতে করিতে সে বলিল, 'আইজ-বেশীদূর যাইতে হয় নাই—তাই আইজ আর তর লাইগ্যা--* সদু খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। সদু এখনও পর্যন্ত ছেলে- মানুষের মত। কোনও সন্তান না হওয়ায় তাহার মধ্যে গাম্ভীৰ্য্যময়ী নারীত্বের প্রকাশ হয় নাই। হাসিতে হাসিতে সে প্রশ্ন করিল, “আমার লাইগ্যা?” “আমি বিশ্বাস করলাম না।” “না অইলে আর কি করুম ক'।” আমার গাইয়া কও। মা ও নট নামাইয়া রাখি খপ কৱি সংকে এক হাতে ৭ টানিয়া লইয়া ভৈরব হাসিয়া বলিল, “তর গও দুইয়াই কই- ত্যাছি- সদু হঠাৎ জিভ, বাহির করিয়া ফেলিল, “ওমা, তোমার গায়ে কি ঘাম আর পািেক প্যাক -মাও যাও, পাও যােও গিয়া।” ভৈরবের হাত হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া সদু রান্নাঘরে ভৈরব জল লইয়া মুখ হাত ধুইতে বসিল। মুখ ধুইতে ধুইতে সে · ডাকিল-“বৌ।” রান্নাঘর হইতে উত্তর দিল, “কি কও?" “পিসী আইব কবে?” “ক্যান?” “তর এমন একলা একলা থানটা খারাপ, আমি যাই আমার “আমার ভয় লাগে না।” “তবুও একলা মাইয়া লােক মানুষ “পিসী মাইয়ার বাড়ী গ্যাছে, আইবনে দিনদশেক পরে।” দূর সম্পর্কের এক পিসী তাহাদের সঙ্গে থাকে, কিন্তু সেও প্রায় দিন কুড়ি হইল তাহার একমাত্র মেয়ের ঘর বাড়ীতে মেয়েকে দেখিতে গিয়াছে। বুড়ী চলিয়া যাইবার পর হইতেই তৈয়বের মনে সব সময়েই ভাবনা। নৌকা চালাইতে চালাইতে সে সহুর কথা ভাবে। একলা সদু বাড়ীতে রহিয়াছে, তাহার হয়ত কোনও বিপদ হইতে পারে, এমনি নানা কথা। যদিও সে পাশের বাড়ীর রজনীর মাকে সহুর উপর নজর রাখিতে বলিয়া যায়, তবুও সে নিশ্চিন্ত হইতে পারে না। মাঝে মাঝে সে ভাবে যে কোনও একতির লোেক অত সহু একাকীত্বের সুযােগে তাহার কোনও রূপ এৰি ৱিতে পা
এই সীমান্তে
যদিও এরূপ চিন্তা নিতান্ত বালকোচিত, তবু চিন্তা মাথায়
আসিতেই তাহার চক্ষু মুখ কালাে হইয়া উঠে, বিশাল ও লােশ বক্ষটা
ক্রোধে ঘন ঘন ফুলিয়া উঠে, অদৃশ্য ও কল্পিত শত্ৰুটির মনে মনে মুণ্ডপাত
করিতে করিতে সে বারংবার দাত ঘষিতে থাকে।
খানিক পরে কাটা হাতে লইয়া ভৈরব বাহির হইল বিগুদের
আড্ডায় গল্পগুজব করিতে। সদু ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ফিরবা
• কথন ?”
চলিতে চলিতে ভৈরব জবাব দিল-“ঘণ্টাখানিকের মধ্যে ফিরু।”
ভিতরে যাইতে যাইতে সদু বলিল, “তাড়াতাড়ি ফিরা আইসাে
কিন্তু একলা ভাল লাগে না
ভৈরলের মুখ হাসিতে ভরিয়া গেল—“ক্যান ক'তত বৌ?”
“জানি না”—বলিয়া সদু ভিতরে চলিয়া গেল।
ভৈরব হাসিয়া চলার বেগ বাড়াইয়া দিল।
দুইটি বাড়ীর পরেই বিশুর বাড়ী। সেখানে প্রায়ই আড্ডা জমে,
আজও বসিয়াছে।
ভৈরব গিয়া হাক দিল, “কৈ রে, বিশু গেলি কৈ ?”
“আয় রে—বিশু ভিতর হইতে ডাকিল।
ভিতরে আজ্ঞা পুরাদমে জমিয়া উঠিয়াছে। তামাকের ধোঁয়ায়
আর গন্ধে ঘরের আবহাওয়া ভারী। কয়েকজন মিলিয়া এক কোণে
বহু পুরাতন বিৰি মাৰ্কা তাস নিবিষ্ট চিত্তে খেলিতেছিল।
ভৈরব ঘরে প্রবেশ করিতেই বিশু বলিল, “আইজকার খবর
জনস নি?”
ভৈরব বৃসিতে বসিতে মাথা নাড়িল।
নিশু চক্ষু বিজারিত করিয়া বলিল, “জানসনা ইটা কি ক। আরে,
ণ যে কাইন রাঙিরে ডুইবা গ্যাছে”
মাৰি গতরাত্রিতে প্রবল ঝড় হইয়াছিল। বিশু তাহারই গল্প বলিতে, লাগিল। অন্ধকারে পথ ভুলিয়া ভারিণী একেবারে মাঝ গাঙে গিয়া পড়িয়াছিল। ঝড় আর তরঙ্গের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া অবশেষে নৌকাসহ তারিণ ও আরও দুইজন যাত্রী ডুবিয়া মারা গিয়াছে। তারিণীর সহচর কালুই কেবল বাঁচিয়া সে সংবাদ বহন করিয়া লইয়া আসিয়াছে। কিন্তু এ গল্প শুনিয়া ভৈরব কাতর হইল না। মাঝিদের জীবনে এরকম বিপদ কত আসে, প্রতি বৎসরই কত মাঝি অমনি ডুবিয়া যায়; কিন্তু তাহার আর কি করা যাইবে? যে জল হইতে তাহাদের জীবিকা উপার্জন হয় সেই জলে দু'একজনের মৃত্যু হইবেই। পদ্মার ক্ষুধা মিটাইতে হইবেই। ঘণ্টাখানেক পরে যখন ভৈরব বাড়ীর কাছাকাছি আসিল, তখন সে অন্ধকারে হঠাৎ একজন লােকের মুখােমুখী পড়িয়া গেল। লােকটি তাহার বাড়ীর দিক হইতেই আসিতেছিল। থমকিয়া দাড়াইয়াসে প্রশ্ন করিল, “কেডা?” লােকটি দাড়াইল না, চলার বেগ আরও বাড়াইয়া দিয়া বলিল- “আমি।” ভৈরব মনে মনে একটু ক্রুদ্ধ হইয়া বলিল, “আরে আমি কইলেই ত’ চলব না, আমি কেডা?” লােকটি উত্তর দিলনা, ভৈরব পিছু পিছু গিয়া ধরিলে পর তথন বলিল—“আমি সাধুচরণ।” ভৈরব বলিল, “ও, তা কইখনে আইত্যাছ ?” একটু থতমত খাইয়া সাধুচরণ বলিল, “রজনী বাড়ীখি।” লাছুরণ চলিয়া গেল। সন্দিহান সৃষ্টিতে ভৈৰ একবার তাই
এই সীমান্তে
গমনপথের দিকে তাকাইয়া বাড়ীর দিকে চলিল। সাধুচরণ ছােকয়াকে
সে বরাবরই সহ করিতে পারে না। ছােরা দুশ্চরিত্র বলিয়া গ্রামে
বদনাম আছে। “গীপাড়ার ফুলীকে ফুসলাইয়া লইয়া যাওয়ার
অপরাধে সে এক বৎসর জেল খাটিয়া মাসখানেক হইল গ্রামে
ফিরিয়া আসিয়াছে। হঠাৎ ভৈরবের কি একটা খেয়াল হওয়াতে
সে রজনীর বাড়ী গেল। রজনী বাড়ী ছিল না, তাহার মাকে
সে প্রশ্ন করিল, খুড়ী, তােমাগাের এই খানে সাধুচরইনা আইছিল
নাকি?”
রজনীর মা মাথা নাড়িয়া বলিল না তােআর এ হারামজাদারে
এহানে আইতে আমি দিমু নাকি-ই”
ভৈরব আর কোনও কথা না বলিয়া বাড়ী ফিরিল। তাহার মনে
হঠাৎ সন্দেহের অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল। কি একটা চিন্তা মাথায়
আসিতেই তাড়াতাড়ি বাড়ী গিয়া ডাকিল, “বৌ, ও বৌ।”
কাজ বন্ধ ছিল, কাঘাত করিতে করিতে সে আবার ভাকিল,
“শুনসনা, নৌ বৌ*।
নিম্নাজড়িত কণ্ঠে এবার সছ ভিতর হইতে উত্তর দিল, “যাই,
দরজা খুলিয়া সে হাসিয়া বলিল, “পাক অইয়া গিছে, বইস্যা থাকতে
থাকতে ঘুমে ধরচিল।
তৈয়বের মাথার দুশ্চিন্তাগুলি নিমেষে নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল, সেও
হাসি বলিল, “পাক অইচে? ভাল, চল খাইবার দিবিউ!
খিদাই যে লাগছে।
আকাশে তালা মেঘের মধ্য দিয়া আখালি কুমড়ার মত চঁাদকে
দেখা যাইতেছিল। জলে সিক্ত হিজল আর নারিকেল গাছের পাতায়
পাতায় রূপালী আলাের চমকানি। পিছনের জঙ্গলে কি কি
@কার গৰিম ডাক।
১১ মাৰি বিছানায় শুইয়া সই প্রশ্ন করিল, “এবার নাকি খুব অল বাড়ত্যাছে গাে?”, ভৈরব পান চিবাইতে চিবাইতে উত্তর দিল, “ই'-সােনাডাঙ্গা, মীরপুর, আইল—এই সৰ গেরামই একেবারে ডুইবা গ্যাছে, আমাগাের খালও ত' ইস্যা গেল বইলা- সদু সশঙ্কভাবে প্রশ্ন করিল, “আমাগাে গেমও ডুবুৰ নাকি?” “না, তবে জল যে বাড়বই এটা ঠিক।” সদু ভীতকষ্ঠে বলিল, “ওমা, কি কও! যদি বেবাক ডুইবা যায়?” ভৈরব দুইহাতে সদুকে বুকের কাছে টানিয়া আনিল। সদুর উত্তপ্ত ও কোমল দেহের স্পর্শে মাঝির সারাদিনের ক্লান্ত শরীরে রক্তধারা আবার উদ্দাম হইয়া উঠিল। সহরের শিক্ষিত নয়, সুতরাং প্রেমের সূক্ষ্ম রইত সে জানো=বােঝেনা, মানসিক বিশ্লেষণের কোনও ধারই সে ধারে না। সে সহুকে ভালবাসে, পষ্ণেক্রিয়ের সমস্ত উগ্রতার সে ভালবাসা। আর সেই ভালবাশার গুঞ্জনধ্বনি সে করে সহুর দেহকে ঘিরিয়া, সহুর দেহই তাহার নিকট আসল, তাহারি উদ্দেশে তাহার প্রেমের ঋতি, মনের খোজ সে বড় একটা রাখে না। ডিবাটা নিভাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, জানালাটা দিয়া ঘরের ভিতর যে এক রেশ চাদের আলাে প্রবেশ করিয়াছিল, তাহারই স্পর্শে সহুকে বড় সুন্দর দেখায়। তাহাকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া ভৈরব মেহের সহিত বলিল, “ডরাস ক্যান বৌ, আমি থাকতে তর ডর কিসের লাে? হেই রকম কিছু অয় তাে আর এক গেয়ামে না তাের বাপের বাড়ী যামু গিয়া”—বলিয়াই সে সনুর মুখটা তুলিয়া ধরিয়া নিজের মুখটা আগাইয়া লইয়া গেল, কি সই একহাতে তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া পাশ ফিরিয়াদলিল-“না।”
১২ এই সীমান্তে ভৈরব বড় কৌতুক অনুভব করিল, “না ক্যান, রাগ করলি নাকি ? “না তাে।” “তবে?” “হগ্গল সময়েই কি ভাল লাগে ?” ভৈরব হি হি করিয়া হাসিয়া উঠিল, “ভাল লাগে না? আচ্ছা আমার দিকে একবার চাইয়া দেখ,—চা" বলিষ্ঠ বাহুর নিকট সদুকে অবশেষে পরাজয় স্বীকার করিতেই হইল, ভৈরবের চুম্বনতলে আত্মসমর্পণ করিতে হইল। কিন্তু ভৈরব হঠাৎ চুম্বন করিয়া অনুভব করিল সুদুর প্রতিদানের শৈথিল্য, অন্যদিনের মত তাহাকে নিবিড়ভাবে সে আলিঙ্গন করিল না, চুম্বনে সে, উত্তাপও নাই। সৃথচ এমনি ত’ হাসিয়া কথা বলিতেছে! আর সছু ত রাগও করে নাই। ভৈরব আর বেশী ভাবিল না। বর্ষার রাত্রিতে চাদকে নিত্য খুঁজিয়া পাওয়া যায় না, চাদ থাকিলেও সে হয়ত বাড়ী থাকে না, তাহা ছাড়া তাহার রক্তধারাও আজ লুব্ধভাবে চলাফেরা করিতেছে, সুতরাং ভাবনা বিসজ্জিত হউক। পরদিন ভােরবেলায় সে যখন বাহিরে যাইবার উপক্ৰম করিতেছিল, এমন সময় জমিদারের নায়েবের লােক আসিয়া বলিল, “কত্তা জিগাইতেছেন তেনারে লইয়া মনসাপােতা যাইতে পারব কিনা?” যাইতে না পারার কোনই কারণ নাই, ভৈরব তৎক্ষণাৎ রাজী হইয়া গেল। ভিতরে গিয়া সদুকে সে বলিল, “ওলাে বৌ, শুনচনি, আমি নাও লইয়া মনসাপােতা চল্লাম, আইজ আর ফিরমু না।” সদু ঘর লেপিতেছিল, মাথা তুলিয়া বলিল, “আইজকা ফিরবানা?” তাহার কণ্ঠস্বর যেন কাপিয়া উঠিল।
মাঝি
*
“কাইল আইবা তাে?”
ভৈর মাথা নাড়িয়া বলিল, “ই। তা ডরাস ক্যান? রজনীর মা
তর সঙ্গে রাত্তিরে ইবনে।”
সদু উষ্ণভাবে বলিল, “আমার ডর করে—কেউ। কইল শুনি?”
তৈয়ব হাসিয়া বলিল, আরে তরা মাইয়ালােক মানুষ,
বােঝ না?”
মাথা নাড়িয়া সদু মুখ ভেংচাইল-“উক, খাউক—আর কথা
কওনের কাম নাই।”-সতু এখনও ছেলেমানুষের মত।
দ্বিপ্রহরের সময় নায়েবকে লইয়া ভৈরব আর রাখাল যখন
পলাসােনা গ্রামের পাশ দিয়া যাইতেছিল, তখন নায়েব মশাই হঠাৎ
মুখ বাড়াইয়া বলিলেন, “তৈর, পলাসােনা বুঝি রে ?”
ভৈরব বলিল, “আইজ্ঞা হ’ কতা।”
নায়েব একটু ভাবিয়া বলিলেন, “আচ্ছ, তবে বাজারের ঘাটে
আইজকার মতন নৌকার পাহাগাড় রে”
ভৈরব বলিল, “ইটা কি কন ! মনসাপােতা না বলে যাইবেন?”
নায়েবমশাই বাধা দিলেন, “না, আইজ আর যামু না, এইখানে
আমার এক পিসাত বইন আছে—তারে অনেকদিন দেখি না।”
ভৈরব নৌকা ভিড়াইল। নায়েবমশাই ভাড়া দিতে দিতে বলিলেন,
“আইজ তরা থাকবি তাে ?
একটু ভাবিয়া বলিল, “না কত্তা।”
রাখাল হঠাৎ ভাবিয়া পাইল না কেন ভৈরব অস্বীকৃত হইতেছে,
সে অনুযােগ করিয়া বলিল, “কিয়ের লাইগ্যা এই পনর কোশ আবার
লগগি ঠ্যালবা ভৈরবদা ?”
ভৈরব ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল, “না আইজই গেরামে ফিরুম, বাসাত
আছে, বাজায় টাইনা দিলে এহনই উইড়া যাইবােনে।”
১৪
এই শীমান্তে
রাখাল নাৱেৰ মশাইএর বাক্স ও বিছানা মাথায় বহন করিয়া
তাহাকে পৌছাইতে চলিল। ভৈরব রান্নার উদ্যোেগ করিতে লাগিল,
সকালে সে পাতিত খাইয়া বাহির হইয়াছিল বটে, কিন্তু তাহার
প্রচণ্ড ক্ষুধা পাইয়াছে। আগুন ধরাইতে খাইতে সে ভাবিতে
লাগিল। রাখালের ইচ্ছা যে আজ এখানে থাকিয়া ডবল উপার্জন
করে, কিন্তু ভৈরবের আজ যেন কেমন একটা অস্বস্তিভাব মনের
মধ্যে ; তাহার কেন যেন আজ সদর নিকট ফিরিয়া যাইবার জন্য
বারংবার মনটা শুধু আকুলিবিকুলি করিতে লাগিল।
দুইঘণ্টা পরে পালভরে নৌকা আবার ফিরিয়া চলিতেছিল।
রাখাল হাসিয়া বলিল, “আইচ্ছা রকম বৌয়ের আঁচল ধরা লােক তাে
তুমি ভৈরবদা।
ভৈরব হাল ধরিয়াছিল, কুঞ্চিত করিয়া সে প্রশ্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিয়া প্রশ্ন করিল, “ক্যান ?
খাল তেমনি হাসিমুখে বলিল, “তা না অইলে দুইডা ট্যাক।
ছাইড়া ক্রি, ক্যান?”
তৈয়ৰ হাসিয়া উঠিল, “ও-আইচ্ছা-আইচ্ছ, দেখুমনে তর
এউকা টুকটুইকা বৌ আইলে কি করস তুই। বৌ যে কি জিনিষ তা
তুই বুঝবি ক্যামনে? হাঃ হাঃ হাঃ-
রাখাল লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল। বিবাহের কথা কেহ বলিলেই
তাহার বড় মজা লাগে।
ঘণ্টা তিনেক পরে যখন তারা ঈশানপুরের কাছাকাছি
আসিয়াছে, এমন সময় তাহাদের আকাশের দিকে দৃষ্টি পড়িল। উত্তর
দিক হইতে গাঢ় কৃষ্ণবর্ণের মেঘের রাশি আকাশ ছাইয়া ফেলিতেছে,
ৰাভাসফটুও নাই, পালও পড়িয়া গিয়াছে।
রাখাল বলিল, “দেওয়ার গতি ভাল না, তুফান আইতে পারে।
১৫ তৈয়ব কোনও উত্তর না দিয়া দাড় টানিতে লাগিল। কিন্তু হাহা আধঘণ্টাখানেক অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সলেই আকাশ অন্ধকার করিয়া বৃষ্টি নামিল আর সঙ্গে আসিল ঝড়। পালটা খুলিয়া ফেলা হয় নাই,হঠাৎ দমকা বাতাসের বেগে তাহা ফুলিয়া উঠিল নৌকাটা সেই বেগে হেলিয়া দুলিয়া সােজা, তীব্রবেগে, ডানদিকে কাৎ হইয়া ছুটিল;-রাখালের দৃঢ় মুষ্টিকেও বােকা বানাইয়া হালটা বারকয়েক ঘুরিয়া গেল। ভৈরব বলিল, “সামলে সামলে, সকালে বাদাম লামাইয়া ফালা।” কিন্তু খুলিতে যাইবার পূর্বেই পালের একটা কোণ ছিড়িয়া ঝুলিয়া পড়িল, ৗেকার গতিবেগ ইহাতে একটু প্রতিহত হইয়া ডান দিকে আরও বেশী কাৎ হইয়া পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি ড্র তরঙ্গ পাটাতনের উপর ছিটকাইয়া পড়িল। অতিকষ্টে পাল খুলিয়া ভৈরব নৌকার ভিতরের জল সেচিয়া বাহির করিয়া দিতে লাগিল। অন্ধকার ও বৃষ্টির ধারাতে দশহাতের পরে আর সৃষ্টি পৌঁছায় না, হারিকেনের ক্ষীণ আলােকেও বেশী কিছু পরিষ্কার দেখায় না। মাঝে মাঝে আকাশের বুক চিরিয়া বিদ্যুৎ চমকায় আর তাহাতে দেখা যায় মত্ত দানবীর মত ক্ষিপ্তা পদ্মর বিরাট জলরাশির অনন্ত তরঙ্গ সকলের বজ্রপাতের শব্দ, মেঘগর্জন আর গভীর কল্লোলের ধ্বনি মিলিয়া কাণে তালা লাগিয়া যায়, কিন্তু তবুও ভাল লাগে। স্রোতের বিরুদ্ধে, তরল প্রতিহত করিয়া নৌকা চালনা করিতে হাতের মাংস পেশীগুলি ব্যথায় টন্টন করে, তবু বড় ভাল লাগে। এই অসীম জলরাশির উপর দিয়া সে নিত্য যে জীবন যাপন করে, তাহাতে যে কৰিত্ব আছে তাহা ভৈরব কোনও দিন বুঝিতে পারে না, শুধু সে এইমাত্র উপলব্ধি করে যে ইহাতে অনেক বৈচিত্র্য আছে। অল সেচিতে সচিতে সে বলিল, “বায়ে ভিড়াইয়া চলরে রাখালে- চাঞ্চল্য।
गौमात्र জলে, ঘামে, কাদায় একাকার হইয়া ক্লান্তিতে অবসন্ন হইয়া, তাহারা যখন অবশেষে গ্রামে পোহাইল, তখন অনেক রাত্রি হইয়াছে। রাখাল নিজের বাড়ীর দিকে পা বাড়াইল। জলে ভিজিয়া যাওয়ায় হারিকেনটা আলানাে যায় নাই, তাহা লইয়া ভৈরব বাড়ীর দিকে চলিল। বৃষ্টি থামে নাই, একই ভাবে পড়িতেছিল। খালের জল বাড়িয়া তাহার বাড়ীর দিকের রাস্তাটা পর্যন্ত গিয়াছে—সেই জল 'ভাঙ্গিয়া সে চলিল। বাড়ীর দাওয়ায় উঠিয়া সে দেখিল, ভিতরে বাতি জ্বলিতেছে। তাহার কৌতুহল জন্মিল, এত রাত্রেও সদু জাগিয়া রহিয়াছে নাকি? বেড়ার একটি ছিদ্রপথে দৃষ্টি সংবদ্ধ করিয়া সে আর চ ফিরাইতে পারিল না। এক মুহূর্তে কি যেন হইয়া গেল। ভৈরবের সারা অল থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল, তাহার দৈত্যের মত বলিষ্ঠ দেহটা অবশ হইয়া পড়িল, কণ্ঠ গেল রুদ্ধ হইয়া, বিস্ফারিত দৃষ্টির সম্মুখে একটি অন্ধকার যবনিকা আত্মপ্রকাশ করিল। কঁপিতে বসিয়া পড়িল। বসিবার সময় লণ্ঠনটি হস্তচ্যুত হইয়া মাটির সিড়ির ধাপ দিয়া গড়াইয়া সশব্দে নীচে পড়িয়া ঝাপিতে সে . গেল। বেভার ছিদ্রপথ দিয়া ভৈরব দেখিতে পাইয়াছিল যে বিছানার উপর স’র নগ্ন বক্ষের উপর মাথা রাখিয়া সাধুচরণ হাসিতেছে। হারিকেন পড়ার শব্দে ঘরের ভিতরের বাতি নিভিয়া গেল। নিজেকে একটু সামলাইয়া লইয়া ভৈরব উঠিয়া দাঁড়াইল, অবশ ভাবটা কাটিয়া যাইতেই তাহার দেহ ক্রোধে ফুলিয়া উঠিল, সমস্ত জীবনে ভালবাসা, আকাঙ্ক্ষা, সাথ, অকার বর্ষাবিক্ষুব্ধ রাত্রির মই ভয়াবহ হইয়া উঠিল। ঘৃণা আর হিংসায় তাহার চক্ষু দুইটা আপদের মত লিখেছে। জ্ঞান ফিরিতে তাহার মনে পড়িল যে ১৭ ভিতরে সাধুচরণ তাহার স্ত্রীকে লইয়া ছিনিমিনি খেলিতেছে। তাহার মাথায় খুন চাপিয়া যায়। পদাঘাতে দরজা আহত করিয়া সে সগর্জনে ডাকিল-“কবাট খােল”- কোনও উত্তর আসিল না । ভৈরবের ক্রোধ বাড়িয়া গেল। ক্রোধে আত্মহারা হইয়া অতি কুৎসিৎ ভাষায় গালি দিয়া সে আবার দরজায় পদাঘাত করিয়া বলিল, “এই মাগীরজা খােলস না ক্যান?” এইবার সদুর ক্ষীণ কণ্ঠের ধ্বনি শুনিতে পাওয়া গেল, “আইচ নাকি? এই খুতাছি- দরজা খুলিয়া সদু ডিবা জ্বালাইল—তাহার আলােকে ভৈরব দেখিল যে ঘরের মধ্যে কেবল সদুই একা রহিয়াছে। একবার হার এই মিথ্যাটাকেই বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হইল, কারণ সে যদুকে ভালবাসে সমস্ত রক্তপ্রবাহ দিয়া। কিন্তু সত্য বড় রূঢ়, যে দেহকে সে পূজা করে, সেই দেহটা সে আজ অন্যের কুরায়ত্ত দেখিয়াছে । মিথ্যাকে বিশ্বাস করিবার মত শক্তিও তাহার আর নাই। এই তেবৎসর যাবত সদু কি এইরূপ গুপ্তপ্রেম বরাবর করিয়া আসিতেছে? স্বপ্নেও ত’ সে কোনও দিন কল্পনা করিতে পারে নাই যে এই সদু তাহার দেহকে, অন্যের মত অপর একজনকে দান করিবে। ভৈরব একবার এদিক ওদিক চাহিয়া দেখিল। সদু তক্তপােষের একপার্শ্বে বসিয়া মুকভাবে ভৈরবের দিকে আড়নয়নে তাকাইয়া ছিল। স্বামীকে দেখিয়া ভয়ে তাহার রক্ত জল হইবার উপক্রম হইল। ভৈরবের নাকটা ফুলিয়া উঠিয়াছে, বিশাল লােমশ বক্ষদেশ বারংবার ফুলিয়া উঠিতেছে, চক্ষে উভ্রান্ত হিংতা। ভৈরব প্রশ্ন করিল, “রজনীর মায় তর লগে শােয় নাই ক্যান ? নতমুখে স দুবাব দিল, “সে আহে নাই।” ০ ১৮ এই সীমান্তে তৈরৰ একেবারে লাফাইয়া উঠিল, “হারামজাদী-মিছা কথা কল। সে আহে নাই, না তুই তারে আইতে না করচস?” হঠাৎ সুর নীচু করিয়া অস্বাভাবিক গম্ভীর হইয়া বলিল, “সাধু চাইনা কই?” সহু চমকিয়া মুখ তুলিল, মুখ তুলিতেই ভৈরবের চক্ষের সহিত তাহার চোখাচোখী হইয়া গেল। তৎক্ষণাৎ মুখ আবার নামাইয়া কম্পিতকঠে সে বলিল, “আমি তার কি জানি- ভৈরব কি যেন ভাবিল, একটু চুপ করিয়া সদুর দিকে একপদ অগ্রসর হইয়া বলিল, “সাউদা আইচিল, এই একটু আগেই তর কাছে সে হালার পাে শুইয়া ছিল, আমি সে সব জানি। এখন ক’ দেখি ঐ উল্লুকটা গ্যাল কোনহানে-খবরদার, মিচ্ছা কথা কইস না।” সছু নিৰ্বাকভাবে বসিয়া ঘামিতে লাগিল। বাহিরে বৃষ্টি আর ঝড় সমান বেগে চলিয়াছে। ভৈরবের বুকের মধ্যেও যেন ঝড় উঠিয়াছে, একবার সে ঝড়ের বেগ কমিয়া যায়, আবার তাহা বাড়িয়া যায়। সে আবার গর্জন করিয়া উঠিল, “বলি কদিন ধইয়া তােমাগাের এই পিরীত চলত্যাছে—কি গো চাঁদবদনী সহু ভৈরবের ভৈরবমূর্তি দেখিয়া ভয়ে কাঠ হইয়া গিয়াছিল। সে একটু নড়িও না, কথাও বলিল না, নতমুখে ঠায় একভাবে বসিয়া রহিল। ভৈরবের ক্রোধ উত্তরােত্তর বাড়িতেছিল। আর একপদ অগ্রসর হইয়া সে সহুর একটি হাত ধরিয়া হেঁচকা টান দিয়া তাহাকে দাড় করাইয়া দিল, আর এক হাতে তাহার বুকের বসন খুলিয়া ফেলিয়া কর্কশ-কণ্ঠে বলিল-“তােমার এই বুকের উপর মাখা রাইখ্যা যিনি তােমারে সােহাগ করতাছিলেন তেনার লগে তােমার কম্মিন ধইরা পিরীত চলত্যাছে রে হালী?”- बादि সদু শুধু কাঁপিতে লাগিল, উত্তর দিবার শক্তি তাহার মুগু হইয়া গিয়াছে। ভৈৰ দেখিতেছিল সদুর নগ্ন বক্ষ, মুখ। সেই একই দেহ। নিখুত, যৌবন দৃপ্ত, বলিষ্ঠ। এই দেহের প্রতিটি স্তরকে সে চিনে, ভালবাসিয়াছে, অথচ এই দেহটা আজ তাহার অধিকারের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। কেমন করিয়া সম্ভব হইল? সাপের মত খল যে মনটা এই দেহের অন্তরালে রহিয়াছে, তাহাকে কি সে তৃপ্ত করিতে পারে নাই? না পারিলই বা, সে তাহার স্বামী, একথা সদু ভুলিল কেন? না, ক্ষমা নাই। একটি প্রচণ্ড চড়ে, সদুর চক্ষু বাহিয়া অশ্রুর ধারা গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। দাতে দাত ঘষিতে ঘষিতে ভৈরব বলিতে লাগিল, “বেশ্যা মাগী, তর এই কাণ্ড! তরে না ভালবাসতাম! কিলাে হারামজাদী, কথা কস না ক্যান?” অতি কষ্টে, কাদিতে কাদিতে সদু লিল “ক্যান এমন করত্যাছ আমি তর কি করছি?” ভৈরব আর সহ করিতে পারিল না। থাক, সাধুচরণের বিচার কাল তাহার রক্ত সইয়া সে করিবে। আজ এই বিশ্বাসহন্ত্রী ষ্টার বিচার। তাহার মাথাটার ভিতর কি একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়া গেল, স্থান বিবেক সব লুপ্ত হইয়া গেল। দুই হন্তে সে সদুর গলা টিপিয়া ধরিল। সন্তু কয়েকবার ছাড়াইবার চেষ্টা করিল, একবার চীৎকার করিতে চাহিল, কিন্তু কিছুই পারিল না। মিনিট দুয়েকের মধ্যে তাহার অচেতন দেহটা মাটীতে লুটাইয়া পড়িল। একটি নিঃশ্বাস ফেলিয়া ভৈরব অস্ফুট স্বরে বলিল, “বাউক সব শ্যাষ হইচে-সদু মরচে-” ডিবাটি নিকটে লইয়া সে একবার সদুর অর্ধনগ্ন দেহের প্রতি তাকাইল সেই একই দেহ। দেখিতে দেখিতে হঠাৎ তাহার চক্ষু, ২০ हे गौमाप्त ছাপাইয়া জল আসিল। সদুর দেহের উপর অপরিসীৰ ৰেছনার সহিত হাত বুলাইল। যেখানে সাধুচরণ মাথা রাখিয়াছিলেন, সেইখানটাতে সে একটি প্রগাঢ় চুম্বন আঁকিয়া দিল, যেন সে সদুর দেহের অদৃশ্য কলঙ্ক কালিমা নিজে লেহন করিয়া লইল। কিছুক্ষণ সে দাঁড়াইয়া ভাবিতে লাগিল, পরে দরজায় শিকল লাগাইয়া নিপদে ঘর হইতে বাহির হইয়া আবার খালের দিকে অগ্রসর হইল। অন্ধকারে হাতভাইয়া, আন্দাজে, নিজের নৌকাটা খুলিয়া কে তাহাতে উঠিয়া বসিল-তারপর খাল ছাড়াইয়া পদ্মাতে গিয়া পড়িল। স্রোতমুখে নৌকা মধ্যের দিকে অগ্রসর হইল। নিঃসাড়ের মত সে বসিয়া রহিল, কাণ পাতিয়া শুনিতে লাগিল বর্ষার পদ্মার গর্জন, মেঘের ডাক, আর বজ্রের হুঙ্কার। বিদ্যুৎচমকে সে দেখিতে লাগিল অনন্তু গতিভঙ্গী-ঘূর্ণাবর্তের বিপুল প্রসার, ফেণরাশির নৃত্য, ভাসমান দগ্ধ কাষ্ঠ খণ্ড—সমস্ত বাহ জ্ঞান সে তখন হইয়াছে। তরঙ্গের পরদিন সকালে সকলেই সদুকে জীবিত দেখিয়াছিল, যেমন অন্যান্য দেখিয়া থাকে, সুতরাং তাহারা কিছুই ভাবে নাই। আরও তিন চার দন পরে, ক্রোশ দশেক দূরে, বিশালাক্ষ্মীর চরে একটি মৃতদেহ আবিষ্কৃত ইয়াছিল। বিগলিত মৃতদেহ। তাহার পেটের দিকটা শিয়াতে বাইয়া ফেলিয়াছিল রাত্রি টগর সাজিতে বসিল। ঘণ্টাখানেক পূর্বে এক পশলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে, আকাশ এখনও মেঘাচ্ছন্ন, পূবের আর্ত বাতাসে একটু শীত বােধ হয়। পাঁচটা বাজিয়া গিয়াছে। সময় হইয়াছে। সময় হইয়াছে বৈকি। অন্যান্য দিন অপেক্ষা আজ বরং একটু দেরী হইয়াছে, টগর আজ বেশীক্ষণ ঘুমাইয়াছে। পান্না আসিয়া বার দুয়েক তাহাকে ডাকিয়াছিল, কিন্তু সে উঠে নাই। হ্যা, সময় হইয়াছে বৈকি। বহুদিনের পুরাতন ষ্টোভের উপর চায়ের পাত্রটা চড়াইয়া দিয়া টগর সাজিতে বসিল। সেই পুরাতন সাজ। সাত বৎসর প্রত্যহ সে একই ধরণের সাজ করিয়াছে। জড়ির পাড়ওয়ালা নীল সাড়ি, গিন্টি করা গহনা, ললাটে একটি খয়েরের টিপ, চোখের কোণে কাজলের সুক্ষ্ম রেখা, পায়ে আলত্যুর ঘন প্রলেপ, সস্তা পাউডার আর ‘দিলবাহার’ এসেন্স। সাজসজ্জা শেষ হইলে টগর দেওয়ালে বিলম্বিত বড় পশটির সম্মুখে গিয়া দাড়াইল। ঠিক আছে। নিত্যকার রাত্রি জাগরণে চোখের কোণে কালাে ছায়া ঘন হইয়াছে, অলক্ষ্যে সময় তাহার ললাটে দুর্বোধ্য রেখায় কি যেন লিখিয়াছে, দেহ হইয়াছে ঈষৎ মেদবহুল, বক্ষ আর কটিদেশ আগেকার মত আকর্ষণীয় নয়, তবু চলিবে। এখনও আরও কিছুদিন চলিবে। চালেটগবগ করিতেছে।
এই সীমান্তে
“আমায়ও এক কাপ ৫ ভাই”—মান আলিয়া গড়াইল।
মানা প্রৌঢ়া, স্থূলাঙ্গী, মুখে বড় বড় বসন্তের দাগ, রংটা শ্যামবর্ণ।
এককালে তাহার চেহারা ভালই ছিল, আর ব্যবসাও চলিত ভাল,
কিন্তু আজকাল।
“বােস ভাই-টগর বলিল।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কিছুক্ষণ পরে সে প্রশ্ন করিল,
শশী কোথায় মানদা ?”
মানদা ঠোট উল্টাইল, “সে হারামজাদার কি আর কোন জ্ঞানগম্যি
আছে—কাল রাত থেকেই ত’ উধাও।”
টগরকে একটু চিন্তিত বােধ হইল; আজ মুখপােড় গেল।
কোথায় কে জানে।”
মানদা মুচকি হাসিয়া বলিল-“জানিস, হতভাগা
ভালবাসে?
টগর হাসিল। ভালবাসা। বহুদিন পূর্বেকার কথা-সুধীর
নামক একটি সুদর্শন যুবক বিমলাকে ভালবাসিত। সেই বিমলা আজ
টগর হইয়াছে -আর সুধীর?
চায়ের কাপটা নামাইয়া রাখিয়া মানদা বলিল, “যাই ভাই,
আমিও তৈরী হইগে।
নানা চলিয়া গেল। এখন আর তাহার সেদিন নাই, একটি
লােকও হার দিকে আকৃষ্ট হয় না, আর সকলের দাসীবৃত্তি করিয়াই
সে আজকাল ৰাচিয়া আছে। তবুও অন্যান্য সকলের মত সেও
সাজিয়া জিয়া ঘারপার্থে দাড়ায়, পথগামী লােকদের প্রতি কটাক্ষ
হানে, সসিকতা করে, অশ্লীল কথা বলে। রক্তের মধ্যে অভ্যাসটা
যেন বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে।
উগর বসিয়া রহিল। শণর ভালবাসা। এবার আর হাসিল
রাত্রি না। ধীরে ধীরে তাহার দৃষ্টি স্তিমিত হইয়া উঠিল, পাউডারে অবলিপ্ত ললাটের রেখায় আবার পরিস্ফুট হইল, চোখের কোণের । কাজলের রেখার উপর একবিন্দু জল টলমল • করিতে লাগিল। ভালবাসা ! সে কবেকার কথা। দিনের আলাে মান হইয়া আসিয়াছে। মেঘলা দিনের আলাে। সেই আলাে যেন হঠাৎ অন্ধকারে পরিণত হয় আর সেই অন্ধকারের মধ্যে ছায়াছবির মত কতকগুলি ছিন্নভিন্ন ছবি ভাসিয়া যায়, কতক গুলি পুরাতন কথা পুনর্জীবন লাভ করে। সুধীর বলিল, “বিমলা, তােমায় আমি ভালবাসি।” বিমল। লজ্জায় অধােবদন হইল। বাহিরে সূর্য অস্ত গিয়াছে। আকাশের মেঘে মৃত, সূর্বের শােণিত চিহ। সুধীর বলিল, “বিমলা, তুমি আমার”- বিমলা বলিল, “আর তুমি আমার। গলিতে ভীড় বাড়িতেছে। বিসর্পিল গলি। গলির মােড়ে কানাইয়ের মাংসের দোকান। পূবের ঠাণ্ডা বাতাসে মাংসের তরকারীর গন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে। সুধীরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ বিমলা। সুধীর বলিল, “বিমলা, চল-পালিয়ে যাই। বিলা বলিল-“চল- তাহার পর এক নগর। সেখানে গভঙ্গ। পাখী উড়িল। মাতৃত্বের ভারে বিমলাকে ভারাক্রান্ত করিয়া একদিন সুধীর অদৃশ্য হইল। তারপর নূতন নূতন লােলুপ মূখ আর ক্ষুধিত দৃষ্টির মাঝে একটি শিশুর কান্না শােনা গেল। তারপর এ লেঃ গালে হাত দিয়ে কি ভাৰছিল, ভাই?”
২৪ এই সীমান্তে চমক ভাগিল। বুচী। সন্ধ্যার অন্ধকারও ঘনাইয়া আসিয়াছে, গলির বাতিগুলি জ্বলিয়া উঠিয়াছে, মানুষের ভীড় বাড়িয়াছে। তাহাদের হাসির শব্দ আর কোলাহল শােনা যায়। “বলি কি ভাবছিস লা পােড়ারমুখী ? টগর হাসিল-“তাের কথা রে বুচী।” বুচী নিজের গােলমুখে আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি ফুটাইয়া বলিল, “যাঃ মাইরি-ইয়ার্কি করিসনা। বল না ভাই- কোন সে পুরুষশ্রেষ্ঠ হরিয়াছে। চিত্ত তব দেবেন্দ্ৰষােগ্য ?”- বুচী কোন থিয়েটারে একবার এক সখীর ভূমিকায় অভিনয় করিয়াছি। তাহার অভিনয় প্রথমবারেই শেষবারে পৰ্যবেসিত হইয়াছিল, যেহেতু সে ষ্টেজে নামিয়া একটি কথাও বলিতে পারে নাই, অনেক লােক দেখিয়া সে ভয় পাইয়াছিল। কিন্তু ষ্টেজে যে কথা: তাহার বলা হয় নাই তাহা প্রায়ই বেশ সুর করিয়া আবৃত্তি করিয়া মাঝে মাঝে টগর পান্না প্রভৃতিকে কারণে অকারণে শােনায়। টগর হাসিল। বেশ মেয়ে এই বুচী। বুচী আবার বলিল-“কি, বলি কোন মনচোরের ভাবছিলে?” মনচুরি। সে ভুল একবার হইয়াছিল। সে কবেকার কথা! তাহার পর ‘পুরুষশ্রেষ্ঠ নয়, বহু পুরুষ আসিয়াছে, নিত্য নূতন। বৃদ্ধ, যুবা, প্রৌঢ়। সুস্থকায় আর ব্যাধিগ্রস্ত। এখনও আসে, নিত্য তাহার চতুর্দিকে গুহার ভীড় করে, গুঞ্জনধ্বনি তােলে। টগরের নয়, বিমলার মন একবার চুরি গিয়াছিল বটে। কিন্তু সে হতভাগী: ত’ আর বাঁচিয়া নাই। কথা
बाजि
“বুচী”-
“কি প্রাণেশ্বর?”
“আর বাজে কথা বল্লে চলবে না।”
“কেন হৃদয়বল্লভ ?”
“সবাই চলে গেছে, বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখ,”
বুচীর জ্ঞান হইল; “তাই ত! চল্ চল”-
ফটকের সামনে গিয়া তাহার দাঁড়াইল। ল্যাম্প পােষ্টের
‘আলােতে তাহাদের দেহ আর পােষাক আর গিল্টির গহনাগুলি
ঝকঝক্ করিয়া উঠিল। আলাের ইন্দ্রজাল।
রাত্রি হইয়াছে। তাহাদের জীবন আরম্ভ হইল।
তাহারা সকলে দাড়াইল—এক বাড়ীতে তাহারা পাঁচজন থাকে।
মানদাও দাড়াইয়াছে! রক্তের মধ্যে অভ্যাসটা বদ্ধমূল হইয়া
গিয়াছে।
পান্না হাসিয়া বলিল, “মাইরি টগর, তাের রূপের দিন দিন
খােলতাই হচ্ছে।”
টগর নিরুত্তরে হাসিল। হঠাৎ তাহার দৃষ্টি পড়িল রাধার দিকে।
এককোণে সে গম্ভীরভাবে একটা সাদা সাড়ী পড়িয়া দাঁড়াইয়া আছে।
টগর বিস্মিত হইল।
“রাধা-লে ডাকিল।
রাধা তাহার মুখের দিকে চাহিল।
“তুই এলি যে, আজই না তুই পধ্যি করেছিস?”
রাধা শুকণ্ঠে বলিল-“হ্যা”
“কেন এলি তবে?
“টাকা চাই, বাড়ীউলি আজ আমায় অনেক কথা শুনিয়েছেন
গৰ আয় কি বলিৰে ।
২৬
এই সীমান্তে
রাখা চলমান অনতার দিকে দুইটি বড় বড় চোখের নিষ্প্রভ দৃষ্টি
কেলিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। রােগ ভােগের পর তাহার শর্ণ আকৃতি
অধিকতর শীর্ণ হইয়াছে, কালাে রং মিশকালাে হইয়াছে, গাল ভাঙ্গিয়া
গিয়াছে আর মাথার চুল কিছু উঠিয়া গিয়াছে। গাধার বুকে নাকি কি
এক দুর্বোধ্য ব্যাধি হইয়াছে, জীবনের আশা খুব কম, শ্বাস প্রশ্বাস
লইতে তাহার আজকাল বড় কষ্ট হয়। পরেশ ডাক্তার তাহাকে খুব
সাবধানে থাকিতে বলিয়াছে।
প্ৰেতিণীর মত মাংসহীন, লিকলিকে একটি বাহু দিয়া দরজার
: পার্শ্বদেশ আঁকড়াইয়া ধরিয়া রাধা বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল।
টাকা চাই।
কনক বলিল-“সত্যি তুই শুয়ে থাগে লাে থা, এখনও আরও.
কয়েকদিন তাের জিরােন উচিত।”
রাধা নড়িল না, কথাও বলিল না।
“বিবিসায়েব, গােলামের সেলাম নাও।”
একটি কালাে ও মােটা লোেক। গায়ে ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবী,
পায়ে পেটা।
পান্না একগাল হাসিয়া আগাইয়া গেল—“মর মিনসে, কত ঢংই
গান, চল ভেতরে।”
লােকটি হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল। পান্না থাকে মিয়া
টানিয়া ভিতরে লইয়া গেল।
গলিতে ভীড় জমে বাড়িয়া উঠে। নানারকমের এসে, পাউডার
আর দেহের গন্ধ। নানারকমের মুখ, পােষাক আর কথা। হাসি আর
পানের পিচ আর সিগারেটের ধোঁয়া।
“ঐ মেয়েটা মন্দ নয়।
“কোনটা?
“ঐ যে কোমরে হাত দিয়ে—আহাহা, শরীরের গড়নটা দেখছিস?**
একটি যুবক এদিক ওদিক একবার ত্বরিতগতিতে দেখিয়া লইয়া
টগরের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।
“শােন-সে বলিল।
“আমায় বলছেন?” টগর হাসিল।
বুচী ঝঙ্কার দিয়া উঠিল, “মর ছুড়ী-আর কাকে ?
যুবকটি ঘামিয়া উঠিয়াছে। সে এ গলিতে মৰাগত।
“কি কথা, বসুন-টগর নিপুণ কটাক্ষ হানিয়া প্রশ্ন করিল।
“ভেতরে চল।”
“সে কি ? দরদস্তুর !”
*সে পরে হবে।
সকলে খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল, কেবল রাধা হাসিল না।
নিজের ঘরে গিয়া টগর বলিল, “বসুন।”
যুবকটি সলজ্জভাবে বসিল। পকেট হইতে একটি সিগারেট বাহির
করিয়া সে ঘন ঘন টানিতে লাগিল।
“পান খাবেন? টগর প্রশ্ন করিল।
ওই যুবকটি তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, বারংবার তাহার
নাসিকা ফীত হইতে থাকে। সুদর্শন, সুকুমার যুবক। টগর মনে মনে
হলে। নূতন পথিক।
“কতদিন এপথে এসেছে?
টগর শ্লেষতি কণ্ঠে বলিল, “ওসব জেনে কি করবেন দেবদাস
ৰেন নাকি?”
যুবক অপ্রতিভ হইল—“না-না, মানে-
শাক ওসব কথা, বাতি নিভিয়ে দেব?
এই সীমান্তে
সিগারেট বারান্দায় নিক্ষেপ করিয়া শষ্যায় বসিয়া যুবক কম্পিতকণ্ঠে
বলিল, “দাও।”
“আগে দু’টো চাকা দিন।”
দুইটা টাকার আওয়াজ। অন্ধকার হইল।
অন্ধকারে উষ্ণ রক্তের মন্ত ইতিহাস। নিবিড় আলিঙ্গনে টগরের
খাস রুদ্ধ হইয়া আসে, দেহগ্রন্থিগুলি টনটন করে।
বারান্দায় সিগারেটটা নিভিতে চলিয়াছে।
আলাে জ্বলিল।
যুবকটির মাথা নত। সে উঠিয়া দাঁড়াইল, অবিন্যস্ত চুলে একবার
হাত বুলাইয়া সিড়ির দিকে পা বাড়াইল।
“একটা সিগারেট দিন ত”-টগর বলিল।
যুবকটি তাহার দিকে চাহিল না, কেবল নিরুত্তরে একটি সিগারেট
বাহির করিয়া তাহার হাতে দিল।
তাহার দিকে চাহিয়া মৃদু হাসিয়া টগর বলিল, “বন।”
“না”—পাপের অবসাদ তাহার কণ্ঠে ধ্বনিত হইল।
“আমার জীবনকাহিনী শুনবেন না?”
যুবক মাথা নাড়িল।
“কালকে আসবেন ত?”
যুবক লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল। মুহুকাল দাঁড়াইয়া ধাকিয়াসে।
সিড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়া গেল।
টগর হাসিল। সে জানে ঐ যুবক আবার একদিন আসিবে।
এখন তাহার মাথা নীচু হইয়াছে বটে, কিন্তু দেহাভ্যন্তরস্থিত নিস্তেজ
শিরাগুলি যখন আবার উষ্ণ রক্তের শ্রোতােবেগে উদ্দাম হইয়া উঠিবে,
মন তখন আবার বদলাইবে, সে আবার আসিবে।
বাতাসে কানাইয়ের দোকানের মাংসের গন্ধ। পাশের ঘরে পা
রাত্রি
হাসিতেছে। ওপাশের বড় বাড়ীটায় সুকেশী গান ধরিয়াছে।
মহানগরীর বুকে রাত্রি গভীর হয়।
আয়নায় মুখ দেখিয়া, খোঁপা ও বেশ ঠিক করিয়া লইয়া টগর সিড়ি
বাহিয়া নীচে নামিতে লাগিল।
এমন সময়ে আসিল শশী।
সিড়ির কয়েক ধাপ উঠিয়া রেলিঙে ভর দিয়া দাড়াইয়া সে হাসিল,
“ততাকেই খুঁজছিলাম টগর।”
টগর ঝঙ্কার দিয়া উঠিল, “কেন, কি দরকার আমার খোঁজে, এখন
বুঝি ক্ষিদে পেয়েছে?”
“না-তা নয়, দুটো পয়সা চাই।”
“ওপরে চল।”
টগরের পিছনে শশী ঘরে ঢুকিল।
ঘরের আলােতে শশীর চেহারা এইবার পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।
একটি সরুপাড় ময়লা সাড়ী পরণে, গায়ে একটা অর্ধছিন্ন পাঞ্জাবী,
মাথায় একরাশ ফাপিয়া ওঠা রক্ষ চুল। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ দেহ তাহার
অতিমাত্রায় দীর্থ, অস্বাভাবিক শীর্ণ, হাতের শিরাগুলি স্ফীত, লম্বাটে
মুখের মাংসহীন দুইটী গালের উপর গরুর মত একজোড়াশ্যাবডেবে ও
ক্লান্ত চক্ষু।
পয়সাতে গিয়া শশীর দিকে ভাল করিয়া চাহিল, হৃদয়ে একটা
ব্যথা মােচড় খাইয়াও উঠিল। হতভাগা শী। কবে কোন এক
বেশ্যার গর্ভে এই গলির এক অন্ধকার ঘরে সে জন্মগ্রহণ করিয়াছে
তাহার আর মনে নাই, উদ্দেশ্যহীন ছন্নছাড়া জীবনের স্রোতে নিজেকে
সমৰ্পণ করিয়া দিয়া সেই কথা সে দুলিতে চায়। কোথায় যায়,
কোথায় কখন থাকে, কি খায়, কিছুই ঠিক নাই।
“বলি মাজ খেয়েছিস ত ?” টগর প্রশ্ন করিল।
০
এই শীতে
ক্ষুদ্র শিশুর মত মাথা দুলাইয়া শ বলিল,হ্যা।”
“কোথায় ?”
মুহূর্বকাল চুপকরিয়া থাকিয়া টগর বলিল—“আচ্ছা শশী”-
“”-
“কেন মরতে এখানে থাকিস বল ত—অন্য কিছু করতে পারিস
না?”
শশীর শান্ত ও ক্লান্ত দৃষ্টিতে হঠাৎ যেন আগুন জ্বলিয়া উঠিল,
“এখানে যে নাড়ীর টান আছে।”
“না শী, বাজে কথা নয়।”
শশী একটু গম্ভীর হইয়া বলিল, “ততাদের মায়া ছাড়তে পারি না।”
শশী তাহার উত্তর দিল না, হঠাৎ একটা কথা যেন তাহার মনে
পড়িয়া গিয়াছে এমনিভাব মুখে ফুটিয়া উঠিল। সে বলিল, “আজ
গণেশের ওখানে একটি ভারী অদ্ভুত লােকের সঙ্গে দেখা হল টগর,
বয়স বেশী নয় কিন্তু কি তার জ্ঞান। সে আমায় বল্লে”-সে
খামিল।
“কি বল্পে?”
‘তার আগে একটা কথার উত্তর দে ত।”
কি ?”
“এই জীবন কি তাের ভাল লাগে ?”
টগরের দৃষ্টি স্তিমিত হইয়া আসিল, মাথা নাড়িয়া ধীরে ধীরে সে
বলিল, “না, কিন্তু বাঁচতে হবে ত, অন্য আর কি উপায় আছে?”
শ মাথা নাড়িল, “লােকটি সেই কথাই বয়ে যে এমন একটা
দিন আসবে যখন তাদের এ জীবনের আর দরকার হবে না, মানুষ
আর সমাজ একদিন ভেঙ্গে পিষে নতুনভাবে তৈরী হবে।
৩১ রাত্রি শীর কণ্ঠস্বর আবেগে ঝাপিতে থাকে, কথা শেষ করিয়া সে বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল। টগর ঠিক কথাগুলি বুঝিতে পারে না, তবুও অহা কেমন যেন ভাল লাগে। সমাজ আর মানুষ ! ঠিকই । মুহূর্তে তাহার সারা অতীত আবার চক্ষের সম্মুখে ভাসিয়া উঠে। কিন্তু এই অতীতের স্মৃতিতে কোথায় যেন একটা পীড়াদায়ক যন্ত্রণা লুক্কায়িত আছে, টগর তাহা সহ করিতে পারে না। জোর করিয়া হাসিয়া সে বলিল- “আচ্ছা এবার নীচে চল।” শশী হঠাৎ তাহার দিকে আসিয়া তকঠে, উত্তেজিত ভাবে বলিল টগর”- “কি ?" “চল না কোথাও বেরিয়ে পড়ি, এই কুকুরের জীবন, এই গলির ভ্যাপসা দুর্গন্ধ আর অন্ধকার ছেড়ে চলনা কোথাও চলে যাই। যাবি?” টগর হাসিল, “তা আমাকে এত দয়া কেন রে মুখপােড়া, আরও ত’ কত লােক রয়েছে-বুচী, মানদা, পান্না—তাদের বলগে না।” “তােকে যে ভালবাসি।” “কি। মানদার কথাগুলি টগরের মনে পড়িল, সঙ্গে সঙ্গে অতীতের ভালবাসার গুলি চোখের সামনে ভীড় করিয়া দাঁড়াইল। যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করিয়া সে বলিল, “ভালবাসা। যা যা শ দুর হ, বেশ্যাকে ভালবাসতে এসেছেন, বলি কত টাকা আছে রে তাের হামজা?” শীর বড় বড় চোখ দুইটি যেন এবার ফাটিয়া বাহিরে আসিবার উপক্রম হইল, “নাই বা থাকল টাকা, টাকাওয়ালাদের মত রাতের বেলায় এসে এক ঘণ্টার জন্য ত’ তােকে ভালবাসি না আমি, আর বের ছেলে আমি, বেশ্যাকে ভালবাস না ত কাকে ভালবাস?”
এই সীমান্তে টগর বিরক্ত বােধ করে, “পথের কুকুর মাথায় উঠেছিস না? প্রেমের কথা শোনাতে এয়েছেন বাবু, বলি ভাত য়ে গিলিস, আজ কটা লােককে এনেছিস রে মুখপােড়? যা যা দূর হ মুখ থেকে।” মুহূর্তে শশীর মুখের রূপান্তর ঘটিল, আবার পূর্বেকার সেই নিরীহ পশুর মত ক্লান্ত ভাব ও দৃষ্টি ফিরিয়া আসিল, একটু হাসিয়া বলিল, “ঠিকই ত, বাইরে যে একটা বুড়ােকে দাড় করিয়ে এসেছি।” টগর একটু চুপ করিয়া বলিল, “যা-নিয়ে আয়।” “যাই।” লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া শশী চলিয়া গেল। কেবল যাওয়ার সময় একবার কি ভাবিয়া টগরের দিকে বিষন্ন দৃষ্টিতে ফিরিয়া চাহিল। ঘরের আলাে তির্যক গতিতে সিড়ির উপর পড়িয়াছে, তাহাতে সিড়িটা সম্পূর্ণভাবে আলােকিত হয় নাই। সেই আধো আলাে, আধাে অন্ধকারে শশীর গরুর মত ড্যাবডেবে চোখের মধ্যে যেন কি একটা ভাষা। টগর বুঝিয়াও বােঝে না। ভারী অদ্ভুত এই শশী, একেবারে পাগল। টগর বিছানায় গিয়া বসিল। ঘরের ভিতর বর্ষাকালের ঠাণ্ডা বাতাস আসিতেছে। বাহিরে নক্ষত্রহীন অন্ধকার আকাশে মেঘরাশি আবার পুঞ্জীভূত হইতেছে। টগর ভাবে। ভালবাসা ! শশীর ভালবাসা। সুধীর আর বিমলা। সন্ধ্যাবেলায় অতীত জীবনের কথা চিন্তা করিতে করিতে যেখানে ছেদ পড়িয়াছিল, সেইখান হইতে সে আধার ভাবিতে আরম্ভ করিল- এক নগর। সেখানে হঠাৎ একদিন একটি শিশুর ক্রন্দনে বিমলার নেশা ভাঙ্গিল, সে বুঝিতে পারি যে পাতের জীবনে ফিরি বার আর কোনও উপায় নাই। এদিকে মধুলােভী মুগ্ধ মরদের ভীড় বাড়িয়া চলিল। ইঙ্গিতে দৃষ্টিতে কৰ্য্য পিপাসা আর প্রলােতন।
রাত্রি
ওদিকে পাপের বােঝাটি দিবারাত্র টা টা করে। বিমলা বড় মুস্কিলে
পড়িল, সে কি করিবে? অবশেষে সে একদিন নিজের পাপকে
ভুলিতে চাহিল। এক মত্ত মুহূর্তে সে ঐ শিশুটির, কোমল গলদেশ
নিপীড়ন করিয়া তাহাকে এই পৃথিবী হইতে বিদায় দিল। যন্ত্রণায়
বেচারীর দেহটি কয়েকবার কপিয়া উঠিয়াছিল মাত্র আর কিছু নয়।
তারপর দূরে এক জঙ্গলে, মাটীর নীচে তাহার কচি দেহ চাপা পড়িল।
হায়, বিমলা ভুল করিয়াছিল। পাপ দূর করিতে গিয়া সে তাহাকে
আরও কায়েমী করিয়া তুলিল, অজ্ঞাত নিয়তির আকর্ষণে সে থামিল
এই গলিতে। তাহার পর এই গলির অন্ধকারে বহু মানবের আলিঙ্গনে
নিপিষ্ট হইয়া বিমলা হইল টগর। সে কবেকার
পদশব্দ।
একজন বৃদ্ধ আসিল। বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। সুদেহ,
শীর্ণকায়, মাথার চুলগুলি কঁচাপাকা, ছােট ঘােট চোখে সর্বদা সন্দিগ্ধ
দৃষ্টি, পরণে কেঁচম ধুতি, পাঞ্জাবী আর সিঙ্কের চাদর।
আসুন”-টগর বলিল।
বারান্দা হইতে শশী একবার উকি মারিয়া চলিয়া গেল;
বৃদ্ধ হাসিল, “আসুন কিগাে, এসেছি।”
“বন।”
অনুবলি “তােমার নামই টগর বুঝি ?”
“আজ্ঞে হ্যা
“বেশ বেশ, তা বাছা শশী মিথ্যে কথা বলেনি তুমি দেখতে
মন্দ নয়।
টগর হাসিল, “পানি খাবেন?”
“নিশ্চয়ই, অনেক পান ত’ খেলাম, তােমার হাতেরটাও খেয়ে
দেখি। দেখাে যেন গুন কম না ভাই।
৩;
এই সীমান্তে
বৃদ্ধ রসিক।
টগর ও রসিকতা করে, “গুণ করলেই বা ভয়ের কি, আমি কি
ৰাধ ?”
‘বাঘ! কে বলে তা ? তােমরা বাঘের চেয়েও বড়–তােমরা
হচ্ছ বাঘের মাসী।”
বৃদ্ধ হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল। কিন্তু হঠাৎ দেওয়ালে বিলম্বিত
কাশীর পটের উপর দৃষ্টি পড়ায় তাহার হাসি থামিয়া গেল, দৃষ্টি
নত হইল, ফিসফিস করিয়া সে বলিল, “বাতিটা নিভিয়ে দাও ত”-
“কেন?” টগর বিস্মিত হয়, “এত তাড়াতাড়ি, গল্প করবেন না?”
“নেভাও বলছি।
অন্ধকার।
“ঘরে মায়ের ছবি রেখেছ কেন?” বুদ্ধ, প্রশ্ন করিল।
“আমরা কি মায়ের সন্তান নই?”
“না, তা বলছি না—কিন্তু মায়ের ছবির সামনে ভয় হয়।”
“তবে ফিরে যান।
অন্ধকারে হাত বাড়াইয়া বৃদ্ধ টগরকে নিকটে টানিয়া লইল।
লােল চৰ্ম্মের স্পর্শ।
“পাগল, এখানে যারা আসে, তারা কি কিরবার জন্য আসে ?”
টগর মৃদু হাসিল, “ছবি না রাখলে কি মা এসব --
দেখতে পান না ?
“না—তা নয়-তবে’
“কেন তবে এই ফাকি, পাপ করছেন আবার নিজেকে ভুলও
বােঝাচ্ছেন।”
বৃদ্ধ নিবিড়ভাবে টগরকে আলিঙ্গন করিয়া বলিল, “ও বাবা,
তুমি যে অনেক বড় বড় কথা জান মাইরি।”
রাত্রি
৩৫
সিড়ির উপর দাঁড়াইয়া শশ যেন কি ভাবিতেছে। বেশ্যার
ছলে শশী।
আলাে জ্বলিল ।
বৃদ্ধ মন হাসিয়া বলিল, “নেশা কাটলে যেমন সব বিস্বাদ মনে
য় এখন তেমনি মনে হচ্ছে। ভাবছি-কেন এসেছিলাম?
“কেনাএসেছিলেন?”
“তা কি জানি-মনকে সামলাতে পারি না। ঘরেতে আমার
বী ছেলে-মেয়ে নাতি নাতনী সবই ত’ আছে তবু তােমাদের
খানে একবার না এসে পারি না কেন?”
“আমাদের ভালবাসার টান”-টগর হাসিয়া বলিল।
বৃদ্ধ মাথা নাড়িল, “তােমাদের ভালবাসা। সে ত’ মিথ্যা
-অভিনয়।”
সে নীচে নামিয়া গেল।
মিথ্যা-অভিনয়! বিমলার ভালবাসা কি মিথ্যা ছিল। •
রাধা তখনও একই ভাবে ঠায় দাড়াইয়া আছে। একটি সােকও
হার দিকে ফিরিয়া চাহে না।
মানদাও একপাশে দাড়াইয়া ছিল, টগরকে দেখিয়া একগাল
সিয়া বলিল—“তােদেরই ভাগ্যি মাইরি।”
“কেন?”
“একটা যাচ্ছেত’ আরেকটা আছে।”
টগর মৃদু হাসিল।
“বুচী, পান্না, কনক—এরা বুঝি ঘরে ?”
মানদা সাগ্রহে রাস্তার দিকে তাকায়। কেহ কি মুগ্ধ হইল।
কদিন কিন্তু তাহার দ্বারে লােকেরা হুড়ি খাইয়া পড়িত। সেই
.
এই সীমান্তে
যে এক মারওয়াড়ী, কি বিরাট ভুড়ী ছিল তার। সে একদিন
আসিয়া মানদার পা এড়াইয়া ধরিয়া কত সাধিয়াছিল তাহার সহিত
যাইতে, কিন্তু সে যায় নাই। আর আজ? নিজের মুখের বসন্তের
দাগগুলির উপর মনদা হাত বুলায়।
রাধার দিকে চাহিয়া টগরের মনটা কেমন যেন করে। মােলায়েম
পরে সে ডাকিল-রাধা।”
রাধা ক্লান্তভাবে তাহার দিকে চাহিল।
“তাের টাকার দরকার তাে একটা টাকা নিস আমার কাছ
থেকে, তুই এখন ভেতরে যা ভাই।
বাধা নিয়ে মুখ ফিরাইয়া লইল।
রাত্রি বাড়িতেছে। রাত্রির কালাে ধমনীতে তাহার কালো
আত্মার স্পন্দন। গলির মধ্যে ভীড়। নানা মুখ আর নানা কথা,
হাসি আর ইঙ্গিত, মদ আর পানের পিচ, অদৃশ্য বীজাণুর হাসি আর
কানাইয়ের দোকানের মাংসের গন্ধ। হ্যা, রাত্রি বাড়িতেছে।
আবার শ আসিল।
আর একটাকে এনেছি”—সে বলিল।
তাহার পশ্চাতে একটি লােক টলিতেছিল।
তাহার মাথার
চুলগুলি অৰিত, অত্যাচারে গাল ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, রক্তাত দৃষ্টিতে
অর্থহীন চাহনি। চেহারাটা তাহার ভালই, দেখিয়া অবস্থাপন্ন ও ভদ্র
বলিয়া মনে হয়।
“নিয়ে আয়-বলিয়া টগর সিড়ির দিকে অগ্রসর হইল।
তাহাকে অনুসরণ করিতে করিতে জড়িতরে লােকটি বলিল, “অত
হনহন করে যেয়ােনা ভাই, মুখখানা একবার দেখাও”-
টগর থামিল, লােকটির দিকে অগ্রসর হইয়া বলিল, “দেখুন না কত
দেখবেন।”
রাত্রি
৩৭
।
লােকটি টলিয়া চলিয়া দেখিতে দেখিতে হাসিল, “বেশ মুখ ।”
লােকটিকে টগরও দেখিতেছিল। দেখিতে দেখিতে অকস্মাৎ তাহার
সারা দেহের রক্তস্রোত উদ্দাম হইয়া উঠিল, প্রতি কোষে উপকোষে
হিংস্রতার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল, দুই হাত বাড়াইয়া কঠিনভাবে
লোকটির গলা টিপিয়া ধরিয়া সে উচ্চকণ্ঠে ডাকিল, “শী।”
শশীর লম্বা ছায়া সিড়ির ধাপে পড়িল।
“এ হারামজাদাকে বের করে দে।”
*বের করে দে বলছি।
লােকটির নেশা তাজিয়া গিয়াছে। প্রাচীরে হেলান দিয়া হাঁপাইতে
হাঁপাইতে সে বলিল, “তােমায় যেন চিনি—তুমি কে?”
টগর অদ্ভুত হাসিয়া বলিল, “চিনে দরকার নেই আর, এ গলিতে
আর কোন দিন যেন তােমার মুখ না দেখা যায়।
“তুমি কে?”
“আমি টগর-বেস্যা—আবার কে।”
“না, ঠিক করে বল তুমি কে?”
টগর গর্জন করিয়া উঠিল, “শশী-হতভাগা আমার কথা কি তাের
কানে যায় নি...বের করে দে এ কুকুরটাকে।”
শশী লোকটির হাত ধরিয়া টানিয়া বাহিরে ঠেলিয়া দিল।
তবুও লােকটি আকুলকণ্ঠে বলিল—“তােমায় যেন চিনি-
তুমি কে?”
শণ আবার তাহাকে ধাক্কা দিল।
টগর একটা সিড়ির ধাপে বসিয়া পড়িল।
দুইটি কাবুলীওয়ালাকে লইয়া রাধা উপরে চলিয়া গেল। আহার
টাকা চাই-অজই।
.
এই সীমান্তে
হঠাৎ টগর উঠিল, দ্রুতপদে দ্বারপার্শ্বে গিয়া গলির একপ্রান্ত হইতে
অপর প্রান্ত পর্যন্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টি মেলিয়া একবার চাহিয়া দেখিল। লােকটি
টলিতে টলিতে গলির মােড়ে অদৃশ্য হইল। সুধীর অদৃশ্য হইল।
হইবে না ত’ কি-টগর ত বিমলা নয়। বিমলা তাহাকে ভালবাসিত,
টগরের সে শক্ত।
মানা প্রশ্ন করিল, “ফিরিয়ে দিলি কেন রে?”
নিরুত্তরে টগর নিজের ঘরে গিয়া বিছানায় এলাইয়া পড়িল।
মুহূর্তে কি যেন হইয়া গেল। না দুঃখ, না ক্রোধ, না হতাশা, এমনি
একটা অবর্ণনীয় ভাবে আচ্ছন্ন হইয়া সে নিঝুমের মত পড়িয়া রহিল
আর অতীতের ছবিগুলি একের পর এক ভােজবাজীর মত মিলাইয়া
যাইতে লাগিল। কেবল একটি দূর দূরান্তরের কোন এক অঙ্গলের
মাটীর বাধাকে ভেদ করিয়া একটি রুদ্ধশ্বস কচি শিশুর কান্না ভাসিয়া
আসিতে লাগিল।
বাহিরে মেঘগর্জন শােনা গেল।
পাশের ঘরে কাবুলীওয়ালা দুইটি তাহাদের দুর্বোধ্য ভাষায় কি সব
রসিকতা করিয়া হাসিতেছে। রাধা।
শশী আসিল।
“খাবি না টগর ?”
“তুই খেয়েছিস?”
“তুই আগে খা।”
টগর উত্তর দিল না।
বারান্দায় বসিয়া শশী বলিল, “পুরাননা দিনের কথা ভাবিস না,
এমনি হয়, অথচ কত কথাই না ভেবেছিস এই অপদার্থ লােকটার
বিষয়ে।
*ওসব কথা ছাড় দেখি।* টগর তিক্ত হইয়া উঠিল।
শশী জ্ঞান হাসিল, “আচ্ছা তবে খেয়ে নে চারটি।”
টগর উঠিল। দিনের বাধা ভাত একটি পাত্রে কিছু দিয়া বলিল,
“নে খা।
শশী খাইতে বসিল।
পাশের ঘরে রাখা একটু গােঙাইয়া উঠিল।
টগর খাওয়া দেখে। একগাল ভাতের চাপে শশীর দক্ষিণ গালটা
ক্ষণেকের জন্য মাংসল বলিয়া মনে হয়। অনেকক্ষণ পরে বোধ হয় সে
খাইতেছে তাই আরামে তাহার চক্ষু অর্ধনিমীলিত হই আসে।
টগরের মমতা বােধ হয়। শী নাকি তাহাকে ভালবাসে! ভালবাসা।
টগর হাসিল, “কি রে এখনও আমায় ভালবাসিস?”
খাওয়া থামাইয়া শশী তাহার দিকে চাহিল, কোনও উত্তর দিল না,
কেবল তাহার গরুর মত ড্যাবডেবে চক্ষু দুইটিতে একটা করুণ মিনতি
ফুটিয়া উঠিল। পরে একটু মৃদু হাসিয়া সে বলিল, “খেয়ে নে তুই
এবার।
টগর নিজের বালা টানিয়া লইল।
বাহিরে বৃষ্টি নামিল। সঙ্গে বাতাস।
কাবুলীওয়ালা দুইটি উত্তেজিত ভাবে কি বলাবলি করিতে করিতে
তরতর করিয়া নীচে নামিয়া গেল।
“এক গেলাস জল দে ত’ শশী।
“দিই।”
হাত ধুইয়া শী টগরকে জল দিল। একটি বিড়ি ধরাইয়া ধোঁয়া
ছাড়িতে ছাড়িতে সে পরে বারান্দার উপর গড়াইয়া পড়িল।
“কি রে, খালি মাটীতে শুবি।”
শশী রসিকতা করিবার চেষ্টা করিয়া বলিল, “শরীরটাও মাটীর তা
আনিস, একদিন তা মাটীতে মিশে যাবে--বাউলের গান শুনিস নি?”
এই সীমান্তে
মাটা
ঝঙ্কার দিয়া রুদ্ধকর্থে টগর বলিল “বেশ কথা বলিস না হারামজাদা
-ওঠ, বলছি ! খেয়ে নিই, একটা মাদুর আর বালিস দিচ্ছি।”
“আচ্ছা।”
মানদার চীৎকার শােনা গেল—“ওরে তােরা শিগগীর আয়ও
বুচীও টগর, শিগগীর আয়-রাধা নড়ে না যে!”
“এ!" টগর উঠিয়া দাঁড়াইল।
“তুই বা না, আমি দেখে আসি” রাবার বুয়ের দিকে
গেল।
কি হইল রাধার ? টগর আর খাইতে পারে না।
শশী ফিরিয়া আসে না।
বুচীর কান্না শােনা যায়, “ও তাই রাধারাধা।”
টগর যন্ত্রচালিতের মত গিয়া রাধার ঘরের সম্মুখে দাঁড়াইল। মলিন
শয্যার উপর রাধা মূচ্ছিত হইয়া পড়িয়া আছে। কিন্তু কাবুলীওয়ালা
দুইটি অকৃতজ্ঞ নয়, তাহারা একটি টাকা তাহার মাথার নিকটে রাখিয়া
।
গিয়াছে।
ঘরের ভিতর ভীড় জমিয়া গেল। পাশের বাড়ীর কমল, মতি
প্রভৃতি আর বাড়ীউলী আসিল। অনেক জেয়া, অনেক চীৎকার, জল
ঢালা আর পাখার বাতাস। রাত্রি গভীর হইতেছে।
নিজের ঘরে অনেকক্ষণ পরে ফিরিয়া গিয়া টগর ভাবে। রাধার
নিস্পন্দ দেহটা চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিতেই একটা দুর্নিবার বিবমিষা
পাকস্থলীতে পাক খাইয়া উঠিল। সে বমি করিতে আরম্ভ করিল।
বাহিরে বৃষ্টি জোরে আরম্ভ হইয়াছে। রাত্রি অন্ধ
এ গলির
অন্ধকার আর তাহাদের অন্ধকার জীবনের মত।
বেঙার ছেলেটা মমতায় ভাঙ্গিয়া পড়ে। টগরের মাথায় এল
রাত্রি
৪১
ঢালিয়া তাহাকে শয্যায় শােয়াইয়া দিয়া শশী বলিল, “এবার ঘুমাে টগর
-ঘুমােলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে? আচ্ছা- চকু মুদ্রিত করিয়া টগর আবার
তাবিতে আরম্ভ করিল। বিমলা। মাটী। টগর তােমায় যেন চিনি
-তুমি কে ? রাধার মাংসহীন দেহ আর রক্ত। টগর কি করিবে।
শশী মেঝেটা ধুইয়া বাতি মিভাইয়া বারান্দায় গিয়া ইল।
রাত গভীর হইতে থাকে। বৃষ্টি থামে না, একটানা সুরে অবিরাম
পড়িতে থাকে। কালির মতাে কালাে আকাশ।
হঠাৎ টগর বিছানা হইতে উঠিল, বাতিটা আবার জ্বালাইয়া শশীর
নিকট গিয়া তাহার দেহে ঠেলা দিয়া বলিল, “শশী ।”
শশী জাগে না, সারা দিনের ঘুম তাহার চোখে।
“ও শশী-শশী?”
“আমি।”
“কে-টগর?”
“কি হল?
“চল।”
“কোথায় ?”
“এই না আজ সন্ধ্যাবেলা বলেছিলি কোথায় নিয়ে যাবি আমায়,
এই কুকুরের জীবন থেকে আমায় না তুই মুক্ত করতে চা?”
শশীর ঘুমভরা চোখে বিস্ময় ফুটিয়া উঠে, টগরের দিকে চাহিয়া স্বপ্ন
দেখিতেছে কি না তাহাই সে কেবল ভাবিতে লাগিল।
‘নিয়ে চল আমায় শশীও শশী—তুই না আমায় ভালবাসিস?”
টগরের কণ্ঠে ক্ষুদ্র বালিকার মত কাতরতা, সে যেন বড় অসহায় হইয়া
পড়িয়াছে।
৪২ এই সীমান্তে মুহূর্তে শশীর চেহারা বদলাইয়া যায়, গরুর মত ড্যাবডোব ও নিভ চক্ষু দুইটিতে মধ্যাত্নের সুৰ্য্য জ্বলিয়া উঠে। ‘টগরের ডান হাতটা চাপিয়া ধরিয়া সে প্রশ্ন করিল, “সত্যি বলছিল টগর—না মিথ্যে কথা ?” দুই হাতে টগর এবার শশীকে আঁকড়াইয়া ধরিল, ফিসফিস করিয়া বলিল-“সত্যি-সত্যি, এক্ষুণি চল শী, দেরী করলে আর হয়ত হবে না।” টগরের কটিদেশ জড়াইয়া ধরিয়া শশ ভারী মিষ্টি হাসিয়া বলিল- “চল তবে।” রাত্রি গভীর। কেহ জাগিয়া নাই। বৃষ্টি পড়িতেছে অবিরাম আৰু আকাশটা যেন কালাে কালি। রাস্তায় নামিয়া বৃষ্টিতে ভিজিতে ভিজিতে তাহারা দুইজনে চলিল। “বড় বিষ্টি-না ?” টগর বলিল। শশী মাথা নাড়িল, “তাতে কি।” চারিদিক নিস্তদ্ধতাকে অনুভব করিয়া টগর আবার বলিল, “রাত অনেক হয়েছে—আর বড় অন্ধকার-নাশী ?” বেশ্যার ছেলেটা গভীর অনুরাগের সহিত টগরকে আরও নিবিড়তর সামীপ্যে টানিয়া লইয়া বলিল, “হােৰু না, ভয় কি, আমি তােকে আকাশের সুয্যি এনে দেব।” রাত্রি গভীর। কেহ জাগিয়া নাই। বৃষ্টি পড়িতেছে অৰিাম আর আকাশটা যেন কালাে কালি। তবু-ভয় নাই, বৃষ্টি থামিবে, লােকেরা জাগিবে, রাত্রি শেষ হইবে, বেশ্যা টগর আর বেশ্যার ছেলে শশী বিন নুতন দিনের আলােতে উজ্জ্বল হইয়া উঠিবে। এ আলাে পশ্চাতে ফেলিয়া আসা গলিতে কোনও দিন ছিল না, সাকিবেও না সেখানে ত, চিন্ধকার রাত্রির চিরন্তন বিলাল।
অধিকার
জানকী কঁদিতে আরম্ভ করিল।
“আগে মাইয়া-ইকা ভৈ হাে'-
বুধন সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। রাত গভীর, বীর সকলে ঘুমাইয়া
পড়িয়াছে, দক্ষিণের গােরস্থান হইতে এখনও তাহার পশ্চাদ্ধাবনকারী
কুকুরদের ক্রুদ্ধ চীৎকার শােনা যাইতেছে। এমন সময়ে কেরােসিনের
ডিবার আলােকে তাহার ভাঙ্গা পা দেখিয়া জাকী দিতে আরম্ভ
করিল।
বুধন সান্ত্বনার সুরে বলিল, ”কা ভৈলু রে, কুছ নেহি-
জানকী তবু থামে না। সংসারে তাহার ভাই নাই, বােন নাই,
মা দু’বছর আগে মারা গেছে, বাপ তারও আগে খুন কুরিয়া ফাঁসী
গিয়াছে, একমাত্র অবলম্বন তাহার এই স্বামী। তাহার কিছু একটা
হইলে সে কি করিয়া স্থির থাকে।
বুধন জাকীর কান্না দেখে। কাদিলে জাকীকে মানায় ভাল।
জানকীর বয়স মাত্র উনিশ, সে স্বাস্থ্যবতী। রংটা কালাে কিন্তু তাতে
কি আসে যায়। গাছের সবুজ পাতা কি দেখিতে সুন্দর নয় ? নারীর
সৌন্দৰ্য যে ক্ষয়ের মধ্যে নয় তা বুধন বিশ্বাস করে।
জাকী বলিল, “কেন তুই বারবার যাস ?”
বুধন হাসিল, “তাহলে খাব কিরে পাগলী?”
জানকী মাথা নাড়িল, “কোনদিন সিপাহী ধরে নেবে, তারপর
জেলখানায় বসে বসে পচবি”-
বুধন আর হাসিল, “ই, কোন্ শালা ধরবে আমায়? কতবার
চুরি করেছি, ধরা পড়েছি ?”
।
এই সীমান্তে
“ধরা পড়িনি বটে, পড়তেও ত’ পারিস।”
সিপাহীদের কন্যাদের নামে একটি অশ্লীল উক্তি করিয়া বুধন বলিল,
“এ জন্মে নয়, বুধণ কাহার অত বুরবক নয়-হা-উই-জানকী,
পাটা এবার ভারী টন্ করছে”—
যন্ত্রণায় বুধন মুখ বিকৃত করিয়া অটশ্বরে গােঙাইতে লাগিল।
জাকীর ঠোট আবার ফুলিয়া উঠিল, তাহার চোখের স্তিমিত
পাতার আড়ালে শীর্ণদেহ স্বামীর যন্ত্রণাকাতর মুখচ্ছবিকে কেন্দ্র করিয়া
অর বন্যা জাগিল।
স্বামীর নিকট গিয়া আকণ্ঠে আবার সে কাঁদিয়া বলিল, “আইগে
মাইয়া-ইকা ভৈল হে, অৰ, হম কা করি ?”
বুধন এবার বিরক্তবোধ করে। যন্ত্রণায় তাহার শরীর অবশ হইয়া
আসিতেছে, আর জাকী কিনা কঁদিতেছে!
“আরে মোগী চুপ, কর, চেঁচিয়ে কি বন্তীকে জাগাবি?
জানকীর অভিমান হইল। সে চুপ করিল।'
“উহু হুআরে দাড়িয়ে রইলি কেন, যা না কোন দাওয়াই
জানকী ঠোট উলটায়, “কাহে ? আমি কি হাকিম নাকি?”
বুধন রসিকতা করে, “তু হাকিমা শশুড় বা
জানকী একটু মুচকি হাসিল। তবু তাহার অভিমান পূর্ণমাত্রায়
দূর হইল না। কেন অতিমান ? তাহার কোনও কারণ লাই।
দিনের মধ্যে দশবার এমনি অতিমান হয়, ঝগড়া হয়, গালাগালি হয়—
তাহাতে কি? তাহাদের ভালবাসার ওগুলি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
জানকী ঘরের কোণে গেল। অতি ক্ষুদ্র সংসার, সুতরাং
তাহাদের আসবাবপত্রের ও কোন বালাই নাই। এক কোণে একটা
উনুন, তিন চারটা বাসন, কয়েকটা শিশি . আর হাঁড়ি। একটা
অধিকার ৪৫ হাঁড়ির ভিতর হইতে দুইটি হলুদ বাহির করিয়া সে বাটিতে আরম্ভ করিল। বুধন বিচালির বিছানার উপর কাৎ হইয়া শুইয়া যন্ত্রণা আর অবসাদের মধ্যে চক্ষু বুজিয়া ভাবে। আজ গিয়াছিল সে এক উকীলের বাড়ী। না গিয়া উপায় কি? কোথায় নাকি লড়াই হইতেছে অথচ তাহার জালায় চাল-ডালের দাম বাড়িয়াছে আগুনের মত। তাহার সঞ্চয়ই বা কতটুকু। মাসখানিক আগে শহরের একজন বাঙ্গালীবাবুর বাড়ীতে চুরি করিয়া সে যাহা আনিয়াছিল, তাহাতে এক মাস কাটিয়াছে। দিন তিনেক ধরিয়া আবার অভাব দেখা দিয়াছে। অথচ তাহাকে, জানকীকে বাঁচিতে হইবে। সেইজন্য আজ সে বাহির হইয়াছিল বারটার পরে। কৃষ্ণপক্ষের রাত, অন্ধকার বেশ গাঢ়। গােরস্থানের পরে যে আমবাগানটা আছে তাহারই মধ্যে উকীলটীর বাড়ী। তাহার বাড়ীর চতুর্দিকে উঁচু দেওয়াল। দেওয়ালের পাশে একটা আমগাছ ছিল, তাহাতে চড়িয়া সে দেওয়ালে চড়ে, তারপর উঠানে নামে। কিন্তু সে জানিত না যে উকীলের ছােট ছেলে তখনও জাগিয়া পড়িতেছে। উঠানের উপর অসতর্ক পদক্ষেপের ফলে সে পিচ্ছিল মাটির উপর আছাড় খায়। কাল পর্যন্ত বৃষ্টি হইয়াছিল কি না তাই। সেই শকে এই ছােরা চীৎকার করিয়া সকলকে জাগায়। মুহূর্তের মধ্যে একলাফে সে দেওয়ালে উঠিয়া লাফ দেয়। অন্ধকারে তাড়াহুড়ায় তাহার পা ঠিকভাবে মাটি ছুইতে পারে নাই, ফলে ডান পাটা একটু ভাঙ্গিয়াছে। তারপরে উদ্ধশ্বাসে গগারস্থানের নরুম মাটির উপর দিয়া দে ছুটতে ছুট। কয়েকটা কুকুর ছিল, শালারা তাহাকে তাড়া করিল-উ, আজ দিনটা ভারী খারাপ কাটিয়াছে। চূণ হলুদ গরম করিয়া জানকী তাহার পায়ের উপর লাগাইয়া দিল।
ও
गौमांड
যন্ত্রণার উপশম বােধ করিয়া বুধন বলিল-আঃ-
“কম ভৈল, না হাে?”
হাত ধুইয়া প্রদীপ নিভাইয়া জানকী স্বামীর পাশে গিয়া শুইল।
কিন্তু একটু দূরে। বুধন তাহাকে রাগ করিয়া মৌগী’ বলিল কেন?
বুধন হার দেহের উপর হাত রাখিয়া ডাকিল, “অগে-
কোনও উত্তর নাই।
“শুনত, হৈ !”
“ইধর আ না।”
“না।”
“মাফ কর জানকী”-
“না”-
“মানজা হামার রাণী”—বুধনের স্বরে কাকুতি।
খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিয়া জাকী স্বামীর বুকে মাথা রাখিল।
খানিক পরে সে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিল, “তাহলে আজত কিছুই
পেলি না, কি হবে?”
বুধন চট করিয়া জবাব দিতে পারে না। তাইত কি করিবে সে?
“অন্য কোনও কাজ দেখনা-জাকী বলিল।
“কি কাজ?”
“এই চুরি করা কি ভাল?”
“ভাল না ত জানি, কিন্তু কাজ পেলে ত?”
“কুলিগিরি কর না।”
প্রস্তাবটা মন্দ নয়। দেখা যাক।
'বুনের পা ঠিক হইতে সপ্তাহখানিক লাগিল। রামজী সাওয়ের
অধিকার ৪৭ দোকানে পিতলের ঘটিটা আর হাতের রূপার বালাটা বন্ধক রাখিয়া জানকী এই কয়দিন চালাইল। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় জান্ধী বাজার হইতে চালডাল কিনিয়া ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “শুনত, হাে জী।” বুধন বিড়ি টানিতে টানিতে উত্তর দিল, “কি ?” “তাের দোস্ত, কৈলাস আমায় যা তা বলেছে।” “কি বলেছে? “কি আবার? জওয়ান মেয়ে মানুষ দেখলে মাদরা যা বলে তাই।” “তুই কি বল্লি ?” “হারামজাদাকে চুলােয় যেতে বলেছি।” “বেশ করেছি।” জাকী রান্নার সরঞ্জাম লইয়া বসিল। বুধন বসিয়া ভাবে। জানকীর কথায় কৈলাসের উপর তাহার রাগ হইয়াছে বৈকি। কিন্তু এত গরীবের নিত্যকার ইতিহাস। তাই বলিয়া রােজই সে খুন খারাপি করিবে না কি? কৈলাসকে সে ধমকাইয়া দিবে—ব্যস্। কৈলাস তাহার বহুদিনের পুরাতন দোন্ত। বহুবার একসঙ্গে তাহারা চুরি করিয়াছে। একবার তাহাকে সে বাঁচাইয়াছিল। তাহার উপর সে চট করিয়া রাগ করিতে পারে না। আর সতীত্ব? বহুদিন পূর্বেকার কথা মনে পড়িল। দুইদিন অনাহারে থাকার পরে বাধ্য হইয়া সে এক বাবুর কাছে জানকীকে দাসীবৃত্তি করিতে পাঠাইয়াছিল। দাসীবৃত্তিমানে বেশ্যাবৃত্তি। জাকী প্রথমে অস্বীকার করিয়াছিল বৈকি, কিন্তু বাঁচার আগ্রহ,যাদের আছে তারা সব সহ্ন করে। জাকীও তাহাই করিয়াছিল। “বুধন ভাই-
এই সীমান্তে
“বাড়ীর প্রাঙ্গণে আসিয়া কৈলাস দাড়াইয়াছে। নেশায় তাহার
পা কাপিতেছে। হাতে একলনি তাড়ি।
“ক্যা রে।”
জানকী একবার পিছন ফিরিয়া দেখিয়া বলিল “হারামজাদা
এসেছে-
বুধন বাহিরে দাওয়ার উপর বসিল।
কৈলাস বসিয়া বলিল—“তাের বৌ আমায় আজ গাল দিয়েছে
রে বুধন।”
“বেশ করেছে।”
‘সত্যি, তাের বৌ বড় দেখতে সুন্দর, লােভ হয়।”
বুধনের চোখ দুইটি জ্বলিয়া উঠিয়াই আবার নিভিয়া যায়।
তাড়ির ভাড় দেখাইয়া তালপাতার গােটা বাড়াইয়া দিয়া কৈলাস
বলি –“লে, দী।”
পয়সা নাই তাই দিন পাঁচেক সে তাড়ি খাইতে পারে নাই। বুধন
সাগ্রহে কোটা লইল।
একটু পরেই শরীরটা তাহার বেশ চাঙ্গা হইয়া উঠিল।
নানা কথাবার্তার পর কৈলাস বলিল—“তাের খবর কি?”
“কিছু না।”
“নতুন কোথাও যাসনি?
“না।”
“আমাদের সঙ্গে যাবি?”
“কোথায়?”
“ষিটার দিকে।
ততাদের সঙ্গে মানে ডাকাতি করতে ত ?
“না ভাই। ডাকাতি করাটা বুনের সয় না।
*তে শালে বড়া ডরফোক।”
নানা বাজে কথা বলিয়া, রান্নাঘরের দিকে বারংবার চাহিয়া
অবশেষে কৈলাস বিদায় লইল।
যাওয়ার সময় শেষবারের মত
রন্ধনরতা জানকীকে শুনাইয়া গাহিয়া গেল “তীর মায়া রে, হাঁতীর
মারা যে-
কৈলাস চলিয়া গেলে বুধন হ হহ করিয়া হাসিয়া উঠিল।
“হাসছিস কেন?” জাকী প্রশ্ন করিল।
“কৈলাসওয়া তেহার লাগি পাগল ভৈল হাে।
জানকী একটু মুচকি হাসিল। পুরুষের মুখদৃষ্টি দৃষ্টিকটু হইলেও
নারীচিত্তে সাড়া জাগায় বৈকি।
হাসি থামাইয়া বুধন ভাবে। কিন্তু ডাকাতি করা তাহার
লাগে না, কিন্তু চুরিতেও ত’ সুবিধা হইতেছে না।
তাহার সঙ্গীরা ত’ জেলে। পিয়ারীলাল আর লছমত আলবৎ
বাহাদুর ওরা, মার খেয়েও তার নাম করেনি। ওরা ত জেলে। একা
ফুরিতে সুবিধা হয় না। এই পা-ভাঙ্গা তার সাক্ষ্য। কিন্তু উপায় কি?
জানকীকে দিয়া পয়সা রােজগার করান? দাসীবৃত্তি আর বেশ্যাবৃত্তি?
না। সে মরদ না? অতএব ? হ্যা, কুলিগিরিই সে করিবে।
কয়েকদিন সে লুকাইয়া লুকাইয়া ষ্টেশনে গিরি করিল। বেশ
চলিল। কিন্তু একদিন কুলিরা তাহাকে বেদম মার দিল।
বুধন কুলিগিরি ছাড়িল।
রাত্রে আবার জাকী কাঁদে, প্রহায়-জর্জরিত,বামীর দেহে হাত
এবার ? বুধন চন্থ বুজিয়া ভাবে। কারও বাড়ীতে চাকুরী ।
. এই সীমান্তে বুখন তাহা মরিলেও পারিবে না। বাবুদের মত সেও কি মানুষ না? এটা কর, ওটা কর, পা টিপে দে এই সব ফরমাস সে সহ করিতে পারে না। অতএব ? আবার চুরি। পাপ? মানুষে মানুষে বৈষম্য যতদিন থাকিবে, ততদিন বুধন চুরি করিবেই। স্বার্থান্ধ মানুষের বৈষম্য সৃষ্টি করা যদি পাপ না হয়, তবে তাহার চুরি করাও পাপ নয়। বুধনের জীবনের এই দার্শনিক সিদ্ধান্ত। তিনদিন পরে একদিন দুপুর বেলা বুধন সারা কদমঠুয়া ঘুরিয়া বেড়াইল, সব বাড়ীর প্রবেশপথ পৰ্যবেক্ষণ করিল। অবশেষে বাখর- গঞ্জের গলির একটি দ্বিতল বাড়ী তাহার পছন্দ হইল। গৃহস্বামী অবস্থাপন্ন বলিয়াই মনে হইল। বাড়ীটির পিছনদিকে একটি নল আছে, তাহা বাহিয়া অনায়াসে বারান্দায় উঠা যাইবে। বারান্দার দক্ষিণ দিকের ঘরটিই আসল ঘর। বাড়ীটির পিছনে একটি সরু গলি, - গিয়া শেষ হইয়াছে সাহেবদের গােরস্থানের পিছনে। ঠিক, আজ এই বাড়ীতেই সে আসিবে। কোওয়ালির ঘণ্টায় যখন বারটার ঘা পড়িল তখন বুধন উঠিয়া দাড়াইল। জানুর্কী বিছানায় উঠিয়া বসিল। “কোথায় যাচ্ছিস?” সে প্রশ্ন করিল। -এমনি। “চুরি করতে?” “না।” জানকী আসিয়া তাহার হাত ধরিল। “পাগলামি করিসনা জানকী।” “কেন, অন্য কিছু কাজ কবৃনা।” “দার নতি ত’ সেদিন দেখলি।”
অধিকার ৫১ তবে চাকর হ।” “মরে গেলেও তা পারব না।” “তবে আমি দাসীগিরি কবুব।” জাকীর কণ্ঠে মিনতি। “দাসীগিরি করতে গেলে কি করতে হয় মনে নেই তাের?” জানকী লজ্জায় মাথা নীচু করিল, তাহার দেহ শিহরিয়া উঠিল। অন্ধকারে চলিতে চলিতে জানকীর কণ্ঠস্বর বুধনের কাণে ভাসিয়া আসিল। জানকী স্বামীর জন্য ঈশ্বরের নাম জপ করিতেছিল- -“সীয়ারাম-সীয়ারাম”- বাড়ীটির পশ্চাতে গিয়া বুধন দাড়াইল। পরে এদিক ওদিক চাহিল। না, গলিতে কেহ নাই। বাড়ীটির দিকে একবার চাহিল। টা অন্ধকার, সকলে ঘুমাইয়াছে। মুহূর্তে তাহার বুকের ভিতর হৃদপিণ্ডটা সজোরে চলিতে আরম্ভ করিল, রক্তস্রোত উদ্দাম হইয়া উঠিল। . - দুই হাত মুখে লাগাইয়া হঠাৎ সে কুকুরের কান্নার হুবহু নকল করিতে লাগিল। যেন ভারী দুঃখে একটি কুকুর কাদিতেছে।" ওস্তাদ বদরীপ্রসাদ তাহাকে ইহা শিখাইয়াছিল, গৃহস্থেরা জাগ্রত কিনা তাহা রীক্ষা করিবার জন্য। কৈানও সাড়াশব্দ শােনা গেল না। না, কেহ জাগিয়া নাই। নল বাহিয়া বুধন উপরে উঠিতে লাগিল। সকালে সেদিন বৃষ্টি হইয়াছিল, নলটা একটু পিচ্ছিল। বুধন সন্তর্পণে উঠিতে লাগিল। এমন সময় গলির প্রান্তে একজন লােক আসিল। সে বুধনকে দেখিতে পাইয়া একটু থমকিয়া দাড়াইল। বুধন তাহাকে দেখিতে পায় নাই। লােকটি হঠাৎ চীৎকার করিয়া উঠিল, “চোর হয় হাে, পাকুড়াে পাড়াে”- ৫৪ । पर गौमारत একটু ভয়ও জন্মিয়া গিয়াছিল। আজকাল সে একা চুরি করিতে যায়, চট করিয়া কিছু করা উচিত নয়। কদমফুঁয়ার দিকে এখন ত’ নয়ই কারণ সকলে সতর্ক হইয়া গিয়াছে। সারাদিন ধরিয়া বুধন এদিক ওদিক ঘুরিয়া বেড়ায় আর প্রায়ই দেখে মিছিল চলিয়াছে জাতীয় পতাকা লইয়া চীৎকার করিতে করিতে। তাহা দেখিতে বেশ লাগে বুধনের। একটু ঈর্ষাও হয়। বন্দেমাতরম্ আর ‘ইনফ্লাব জিন্দাবাদ’ সেও বলিতে পারে, যদি পেটের চিন্তাটা দূর হইত। ঐ লােকদের সকলেরই খাবার আছে তাই অমন করিয়া চেঁচাইতে পারে। কিন্তু সে চোর, তাহার সে উপায় নাই। সে অন্ধকারের জীব। কিন্তু সত্যি—এবার কি হইবে ? জানুকীর হাতে ত একটিও পয়সা নাই। কুলিগিরি, চাকর হওয়া পােৰাইবে না—অতএব ? ৯, সেদিন অমনি কাটিল। তাহার পরদিন বন্তীর একজন বাবুর বিছানা ষ্টেশনে পৌঁছাইয়া সে দু’আনা পয়সা পাইল। তাহা দিয়া সে ছাতু কিনিয়া বাড়ী ফিরিল। তাহাতেই আজ চলিয়া যাইবে। সেদিন কংগ্রেসীদের মিছিল আর চেঁচামেচি আরও বেশীমাত্রায় দেখা যাইতে লাগিল। কদমকুঁয়ার মােড়ের পানের দোকানটার সামনে সে দুপুরবেলায় বসিয়াছিল। এমন সময় দেখা হইল কৈলাসের সহিত। সে বেশ বাবু সাজিয়াছে। ডাকাতী। কিন্তু বুধনের দ্বারা তাহা এইবে না। ক্যারেকা খবর?” কৈলাস প্রশ্ন করিল। *ভাল না। বুধন বলিল।
অধিকার “একা সুবিধে হচ্ছে না। “বল্লাম আমাদের সঙ্গে চল, দেখছি আমার পােষাক-সব ওরি গুণে”- “হু—কিন্তু আমার দ্বারা ও হবে না, আমার ভয় করে।” “দুর কায়র (কাপুরুষ) কোথাকার-লে, বিড়ি খা।” তাহার পরদিন আনুকী তাহার সখী রামবতী’র নিকট হইতে একসের চাল ধার করিয়া আনিল। কি করিবে বুধন? তাহার লজ্জা হয়, কিন্তু নিজের যা ক্ষমতা তাহার অতিরিক্ত সে আর কিছুই করিতে পারে না। উত্তরাধিকারসূত্রে সে পিতার নিকট হইতে চুরি করিতেই শিখিয়াছে। আর কিছুই তাহার দ্বারা হইবে না। রাত্রিবেলায় জাকী বলিল, “কৈলাস কি বলছিল জানিস?” “বলছিল তােদের হালৎ এখন খারাপ ; আমার কাছ থেকে টাকা নে দশ বিশ—যা লাগে’-- “আর ?” “তার বদলে মাঝে মাঝে রাতের বেলায় ওর ওখানে গিয়ে আমায় শুতে বল্ল- চুপ করিয়া বসিয়া বুধন ভাবে। আজ? না, আজ চুরি করা ৰাইবে না। মেজাজ ভাল না। কৈলাস হারামজাদা জানকীকে লােভ দেখায়—কিন্তু জানকী সে রকম না, সে "জাঝী”- এই শীতে “আমি চোর, আমি গরীব, আমি তােকে ভালভাবে খাওয়াতে পারি না, তবু তুই কি আমায় পিয়ার করিস?" নিরুত্তরে জানকী কাণী বুধনের উপর উত্তর মত লাফাইয়া পড়িয়া তাহাকে চুম্বনে চুম্বনে অস্থির করিয়া তুলিল। ভালবাসা। হ্যা, সে ভালবাসে তাহার নামীকে। পরদিন জাকী কলাইকরা লােহার থালাটা বন্ধক রাখিল। বুধন আজ কোথাও চুরি করিবেই স্থির করিল। দুপুরবেলায় সেই উদ্দেশ্যে ঘুরিতে ঘুরিতে সে গােলঘরের দিকে গেল। সেখানে গিয়া সে দেখিল যে বিরাট জনতা চলিয়াছে সেক্রেটারিয়েটের দিকে। পুলিশ তাহাদের বাধা দিতে চলিয়াছে কিন্তু বিরাট, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আর উত্তেজিত জনতাকে তাহারা আটকাইতে পারিল না। • সেই কোলাহল, লােকদের সেই উত্তেজিত দৃষ্টি বুধনকে ভাবাইয়া তুলিল। লােকগুলি কি চায়? স্বরাজ। স্বরাজ পাইলে লােকদের দুঃখ দূর হইবে, এমন কি বুধনকেও চুরি করিতে হইবে না। বর্তমানের এই সমাজব্যবস্থা ভাঙ্গিয়া যাইবে, বুধনের আর চুরি করিবার দরকার পড়িবে না। বুধনও উত্তেজিত হইয়া উঠিল। যা, স্বরাজ চাই। সেও সেই জনতায় মিশিয়া গেল। রাত্রে স্বপ্নাবিষ্টর মত বাড়ী ফিরিয়া সেক্রেটারিয়েট প্রাঙ্গণে জনতার উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের কথা স্মরণ করিয়া শিহরিয়া উঠিয়া সে জানকীকে বলিল—“উ:, জাকী, কত খুন পড়েছে-" “খুন?”—জাকী চমকিয়া উঠে। “হ-উ-কত লােকের খুন আজ দেখলাম্, হরী খেলার খুনখারাবি রংয়ের মত লাল খুন- “তুইও গিয়েছিলি, সিকিটারিটে?”-
অধিকার
“আগে মাইয়া, তোহার দিমাগ খারাপ তৈল কা?”
পরদিন।
বাড়ীতে চাল নাই, ডাল নাই, জীবনধারণের কোনও উপকরণ
নাই। জাকী কি করে, কার কাছে ভিক্ষা করে, তাহা বুধন
দেখে না। শহরের আন্দোলন তাহার চিন্তাকে বদলাইয়া দিয়াছে, ।
সেক্রেটারিয়েটে নিহত দেশভক্তদের রক্তস্রোত অহরহ তাহার মাথায়
ঘুরিয়া বেড়ায়। হ্যা, স্বরাজ চাই, তাহা না হইলে এই অচলায়তন
সমাজের শিকড় নড়িবে না, তাহার চুরি করা শেষ হইবে না।
মানুষ হিসাবে তাহার কতকগুলি অধিকার আছে। সকলের মত
বাঁচিয়া থাকা তাহাদের মধ্যে একটি।
সেদিনও সে সারাদিন উচ্ছল জনতার সহিত সহরময় ঘুরিয়া
বেড়াইল, টেলিগ্রাফের লাইন কাটিল, রাস্তা খুড়ি, গাছ কাটিল,
সাহেব-বেশধারী লােকদের অপমান করিল। দিনের বেলায় সে
আর বাড়ী ফিরিল না। একজন মাড়ােয়ারী তাহাদের কয়েকজনকে
খাওয়াইল।
' বাড়ী ফিরিল সে অনেক রাত্রে।
জাকী তখনও অভুক্ত ছিল।
পরদিন সকালবেলায় জানকী বলিল, “কিছুই যে নেই”—
বুধনের মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল, “তাই নাকি?”
“আচ্ছা--আজ চুরি করব।”
“কেন খালি চুরি করবি; অন্য কাজ দেখ, না।”
এই সীমান্তে
বুধন মাথা নাড়িল, “না, চুরি করাই আমার অধিকার জানকী।”
জানকী অতি কষ্টে ভিক্ষা করিয়া দিনেরবেলার খাদ্য সংগ্রহ করিল।
দুপুরবেলায় সেদিন গােরা সৈন্যেরা আসিয়া পথ বন্ধ করিল।
বাহাদের নিকট পাস আছে, তাহারা ছাড়া আর কেহ পথ দিয়া যাইতে
পারিবে না। বন্তীর শেষে, কদময়ার মােড়ে তাহারা একদল আড্ডা
গাড়িল। সঙ্গে সঙ্গে কারফিউ অর্ডার জারী হইল যে সন্ধ্যা সাতটার
পয় কেহ পথে বাহির হইতে পারিবে না।
মােড়ের মাথায় বসিয়া বসিয়া বুধন গােরা সৈন্যদের দেখিল, ঝকঝকে
বেয়ােনেট লাগানাে বন্দুক হাতে, সিগারেট মুখে তাহারা তাহাদের
ভারী বুটের শব্দে রাস্তা কাপাইয়া তুলিয়াছে, তাহাদের পিঙ্গল চোখে
অবরুদ্ধ ক্রোধ।
বুধনের বড় মুস্কিল হইল। বাড়ীতে কিছু চাই, অথচ চুরি না
.. করিলেও চলিবে না। কিন্তু কেমন করিয়া চুরি করে সে? শুধু এই
এক জায়গায় নয়, সহরের সর্বত্র, এমনকি রেললাইনে পৰ্যন্ত কড়া
পাহারা রাখা হইয়াছে, তাহা ছাড়া গােরা সৈন্যেরা নাকি রাস্তায়
রাস্তায় টহলও দিবে। সাতটার পর কাহাকেও দেখিলে তাহারা নাকি
গুলি করিবে। সেক্রেটারিয়েটের রক্তাক্ত-স্মৃতি।
রাত্রিবেলায় কিছুই ছিল না। আকী আর বুধন দুইজনেই
অনাহারে রহিল।
মধ্যরাত্রে বুধন উঠিয়া দাঁড়াইল।
জানকী ব্যাকুলকণ্ঠে প্রশ্ন করিল, “আজ আবার কোথায় ?
“না খেয়ে আছি মনে নেই।
“তাতে কি?
যাই, দেখি কিছু জানতে পারি কিনা*-
“বাৰু-কি দরকার নেই। কাকী তাহার হাত ধরিল।
.
।
।
“বাঃ, না খেয়ে ক’দিন থাকবি ?
যে ক’দিন পারি-
‘পাগল
“দোহাই তাের, গােরাদের গুলিতে জান দিবি?
“দূর-লুকিয়ে পাড়ার ভিতরেই যাব”—জোর করিয়া হাত
ছাড়াইয়া লইয়া বুধন বাহির হইয়া গেল।
চুপি চুপি পা টিপিয়া টিপিয়া সে রাস্তার পিছনকার জলার ধার দিয়া
গিয়া সাহেবদের গরস্থানের দিকে গেল। আর বিশ হাত দূরেই
গােরাদের ঘাঁটি। কিন্তু উপায় কি ? বস্তাতে কাহার ওখানে সে চুরী
করিবে? সবাই গরীব, আর সবাই সন্দেহ করে যে বুধন চোর।
বর রামজী সাওয়ের দোকানে আজ সে যাইবে। সুতরাং এই রাস্তা
তাহাকে পার হইতেই হইবে।
রাস্তার অপর পার্শ্বে গােরস্থান। রাস্তাটা পার হইয়া গােরস্থানে
পৌছাইলেই হইল। বালেশ্বরের আস্তাবলের আড়াল হইতে সে
একবার রাস্তার দুই পার্শ্বে উকি মারিল। কেহ নাই। দুরে
গােরারা দাড়াইয়া আছে।
হামাগুড়ি দিয়া সে রাস্তার উপর অগ্রসর হইল। হঠাৎ একটি
টর্চের আলো তাহার অনতিদুরে পড়িল। সে ধরা পড়িয়াছে।
বিদ্বেগে উঠিয়া আবার সে জলার দিকে উদ্ধশ্বাসে দৌড়
পরমুহূর্তে রাইফেলের গর্জন ধ্বনিতে মধ্যরাত্রির নিস্তব্ধতা কাপিয়া
বুধন থামিল একেবারে বাড়ী গিয়া
বিছানার উপর উপুড় হইয়া শুইয়া জানকি ঝাদিতেছি আকুল
হইয়া। রাইফেলের শলে,শুনিয়াছিল।
এই সীমান্তে জানকীর পাশে শুইয়া পড়িয়া বুধন চোখ বুজিল। জাকীর কান্না শামিল। পরদিন সকালে উঠিয়াই বুধন দেখিতে পাইল যে সিপাহী আর গােরারা মিলিয়া রাস্তার নিম্নশ্রেণীর লােকদের ধরিয়া রাস্তা পরিষ্কার করাইতেছে, অনেকে মারও খাইতেছে। ভয়ে বুধন আর বাহির হইল না। কিন্তু না বাহির হইলে চলে কি করিয়া? ক্ষুধায় পেট জ্বলিয়া যাইতেছে। জানকীর অবস্থাও ত’ একই, কিন্তু সে ত’ মুখ ফুটিয়া কিছুই বলিবে না। বুধন বাহির হইল। বন্তীর ভিতর ঘুরিতে ঘুরিতে সে চন্দল কামারের ওখানে গিয়া হাজির হইল। অনেক চোরাই বাসন সে চয়ের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় করিয়াছে। “কি খবর বুধন ভাই?” “এমনি দেখাশােনা করতে এলাম ভাই।” “বােস, বােস—তারপর কি হালচাল ?” “হালচাল ত’ খারাপ ভাই- “, তা ত’ দেখতেই পাচ্ছি, এবার ত’ খালি মার-কাট, দাঙ্গা আর লড়াই হবে- তারপর? কিছু মাল আছে নাকি?” চন্দর ইসারা করিল। “না ভাই- “তােমার কাছে একটু দরকার ছিল তাই।
অধিকার ১১ ‘আমাকে চার আনা পয়সা উহার দেবে ?” “রামরাম ভাইয়া, এমন মহংগা বাজারে পয়সা কি আর হাতে খাকে?” “বড় দরকার ভাই”- “ভগবানের কসম-ভাই, নেই।” বুধন উঠিয়া দাঁড়াইল। সারাদিন দুইটি প্রাণীর অনাহারে কাটিয়া গেল। কাহারও নিকট হইতে কিছু পাওয়া গেল না। কিন্তু মাথার উপরকার অনন্ত নীল সমুদ্র, পাখী, মানুষের কোলাহল, জনতার মিছিল, কাকী, নিজের হৃদপিণ্ডের অন্তয়ালস্থিত প্রাণের স্পন্দন আর ক্ষুধার্ত জঠর সকলেই জানায়-বাচ—যেমন ভাবেই হােক। অতএব ? সন্ধ্যাবেলায় নতমস্তকে বুধন ডালি, জাফী”- “শােন- ঘর অন্ধকার। ডিবায় তেল নাই। অন্ধকার ঘরের মধ্যে তাহাদের দুইজনের ক্ষুধাকাতর ক্ষীণকণ্ঠ দফা বাতাসের সঙ্গে উথিত তৃণের বিলাপের মত শােনায়। “কি বল না।” জাকী বলিল। “ক্ষিদেয় তাের ভারী কষ্ট হচ্ছে, না?” “না”- : “মিথ্যে কথা বলিস না- জানকী জবাব দিল না। “আমারও ভারী কষ্ট হচ্ছে—বুধন ৰলিল।
L
पहेगौमारक
অন্ধকারে অদৃশ্য দুটি কালাে হাত বুবনের গলা জড়াইয়া ধরে।
“একটা কথা বলব জানকী ?”
“বল,
“জিন্দগী বড় পিয়ারা—সুতরাং ইজ্জতে কি হবে?”
জানকীর শরীরটা ঈষৎ কাপিয়া উঠিল।
বুধন বলিয়া চলিল,-“একবার ইজ্জত বেচে আমরা বেঁচেছিলাম
জানকী, আজও তাই কর।”
দৃঢ় বাবেষ্টনে বুধনকে নিষ্পেষিত করিয়া জানকী কাদিয়া বলিল
“তাতে কি জাকী, বদন একবার অপবিত্র হলেই বা, তাের মন
ত’ আমার, তুই ত’ আমাকেই ভালবাসিস। একবার খেলেই আমার
চুরি করার মত গায়ে তাকত হবে, তখন আর এ অপমান তােকে
সইতে হবে না।”
“না।”--জানকী আবার কাজিল।
“না! আচ্ছা তবে থাক, না গেলি।” অস্ফুট কঠে বুধন
বলিল।
মূঢ়ের মত বুধন বসিয়া রহিল। বুকের উপর তাহার নরম দেহ
এলাইয়া দিয়া জানকী কাদিতেছে ।
খানিকক্ষণ কাটিল।
ঘরের ভিতর একটা গুমােট ভাব।
জানকী উঠিল।
“কোথায় বাস ?” বুধন অতিকষ্টে প্রশ্ন করিল, তাহার মাথা ঝিম
. ঝিম্ করিতেছে।
কৈলাসের ওখানে-
মৃগ্ধ লােহার মত জ্বালাময় জাকীর ঐ কথাগুলি।
“কোথাও বেয়ােস না তুই”—কী বলিল। . অন্ধকারে জাকীর লঘু পদশব্দ মিলাইয়া গেল। লজ্জায়, ঘৃণা, ধিক্কারে বুধন শয্যায় মুখ লুকাইল। শয়তানের মত সে কেমন করিয়া নিজের স্ত্রীকে উত্তেজিত করিল। কি দরকার এই জীবনে, যাহাকে বাঁচাইয়া রাখিতে মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে হয়, স্ত্রীকে বেশ্যাবৃত্তির দিকে ঠেলিয়া দিতে হয়? কেন আমাদের জীবন এমন ? পরাধীনতা? হঠাৎ তাহার সমস্ত শিরায় শিরায় ক্রোধান্ধ অনলস্রোত প্রবাহিত হইতে লাগিল। সে মুষ্টিবদ্ধ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। সমাজ-ব্যবস্থায় কেন এই বৈষম্য? কোন্ পাপাচারের পাপের ফলে তাহাকে চুরি করিতে হয় ? সে আজই চুরি করিবে। ঘর হইতে সেও বাহির হইল। ক্ষণ- কালের জন্য জাকীর কথা সে বিস্মৃত হইল। অন্ধকারে তাহার কালাে চোখের তারায় কালাে আগুনের শিখা কেবল দপ, কপ, করি অলিতে লাগিল। চুরি করিবে সে। হ্যা, চুরি করার অধিকার আছে। একজনের পাপের ফলে আর একজন পাপ করে। উপায় নাই। ধীরেপদে সে বস্তির রাস্তা বাহিয়া কদমফুঁয়ার রাস্তার দিকে অগ্রসর হইল। কেন তাহাকে চুরি করিতে হয়? বুধন ভাবে। কতকগুলি অস্পষ্ট, আবছায়া, নানা জটে জটিল কথা তাহার মাথায় যােরে। তাহার শিক্ষা, তাহার সংস্কৃতি কিছুই নাই। তাই সে সেগুলি বিশ্লেষণ করিতে পারিল না। কেবল এইটুকুই হঠাৎ তাহার উত্তেজিত মস্তিষ্কের কোষ বাহিয়া মনের উপর ছাপ দিল যে, ৪ এই শীতে পরাধীনতাই ইহার জন্য দায়ী। এবার দেশ স্বাধীন হইলে প্রাচীন কালের মত হইবে না। এবারের স্বাধীনতায় আসিবে চাষ মজুরের রাজত্ব। হ্যা, যতদিন তাহা না আসে, চুরি করাই বুখনের একমাত্র বাঁচিবার উপায়। 'ইহা তাহার অধিকার। ক্লান্ত অথচ হিংস্র শ্বাপদের মত সে আগাইয়া চলিল। দূরে রাজপথ দেখা গেল। গােরা সৈন্যেরা সেখানে পাহারা দিতেছে। তাহাকে আটকাইবে? কে তাহারা? তাহার নিজের দেশে স্বচ্ছন্দমত সে ঘুরিয়া বেড়াইবে, নিজের জীবিকা আহরণ করিবে-তাহা যেভাবেই হােক। কেন তাহাকে পরদেশীরা বাধা দিবে? আইন? কেন মানব আমরা অন্য জাতের আইন? গুলি করবে ? দেখা যাক। চলিতে চলিতে এবার জানকীর কথা তাহার মনে পড়িল। তাহার স্বর্ণ দেহ মুহূর্তে অসুরের জালাতে খাড়া হইয়া উঠিল। কৈলাসের কামাতুর মুখচ্ছবি, তাহার আলিঙ্গনে আবদ্ধা অসহায় ও ক্ষুধাতুর জানকী’র নগ্নদেহ তাহার মানসপটে ফুটিয়া উঠিল। ক্রোধে, অবরুদ্ধ একটা ক্রন্দনের বেগ চাপিতে চাপিতে সে রাস্তার দিকে অগ্রসর হইল। প্রায় ছুটিতে ছুটিতে। নারীর নারীত্ব, মানুষের মনুষ্যত্ব, স্বাধীনতার অভাবে এমনি ভাবেই চিরদিন নির্যাতিত হইবে। কে তাহাকে বাধা দিবে? সে আর মৃত্যুকে ভয় করে না। রাজপথে গিয়া সে দাঁড়াইল। চুরি করিতে হইলে তাহাকে ঘাঁটি পার হইয়া পূবদিকে যাইতেই হইবে। হঠাৎ অন্ধকারের মধ্য হইতে বজ্রকণ্ঠের হুমকি আসিল “ঠাহরাে -বিদেশী ভাষায় আরও কত কি যেন তাহার সহিত ভাসিয়া আসিল। • দুরে, অন্ধকারের প্রচ্ছদপটে রাইফেলধারী গােরা সৈন্য দুইটির চেহারা দেখিয়া বুধনের মন্তিকের ভিতর আগ্নেয়গিরির বিক্ষেরণ অধিকার ঘটিল। স্বাধীনতা চাই। কে আমার অধিকার হইতে আমায় বঞ্চিত করিবে। হঠাৎ কি ভাবিয়া সে চীৎকার করিয়া উঠিল, “বন্দেমাতরম্”- প্রত্যুত্তরে দুইটি রাইফেলের গুলি অন্ধকারের বুকে শিষ, দিতে দিতে রাত্রির নিস্তব্ধতাকে দীর্ণ-বিদীর্ণ করিয়া বুধনের বুকে আসিয়া লাগিল। একটি ক্ষীণ আর্তনাদ। তারপরে নিজের রক্তের শয্যার উপর আসন্ন মৃত্যুর দ্রুত পদধ্বনি শ্রবণ করা। টুকরা টুকরা কতকগুলি ছবি শেষবারের মত মনে পড়ে। সেক্রে- টারিয়েট, খুনখয়াৰী রংয়ের মত লাল রক্ত, জাকী, কৈলাস। হ্যা, জানকী বাঁচিবে। দিনের পর দিন তাহার নরম দেহের বিনিময়ে, সতীত্বের বিনিময়ে সে অর্থ পাইবে, খাদ্য পাইবে, বাচিবে। আঃ, বুক্তের মধ্যে কেমন যেন একটী নােতা স্বাদ- বুট জুতার ঠেলা লাগিল বুধনের মুখে। “Stone dead”-একজন সৈনিক বলিল। "Yah-আর একজন উত্তর দিল। প্রথম সৈনিকটি থুথু ফেলিয়া একটি সিগারেট ধরাইল।
পলাতক চন্দ্রালােকিত নির্জন প্রান্তরের ভেতর দিয়ে তারাপদ চলছে। দক্ষিণ দিক থেকে একটা ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা বাতাসের সােত বয়ে চলেছে শ দিয়ে, তারাপ’র গায়ে তার ছোঁয়া লাগে। আঃ! তার ঘুমােতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ঘুমােলে চলবে না। চারিদিকের নির্জন মাঠে ধানের আর পাটের নবীন চারাগুলাে ঝিমােচ্ছ, আকাশে ত্রয়ােদশীর চাঁদের উচ্ছসিত যৌবনের শােভা, বাতালে দক্ষিণ সমুদ্রের অস্পষ্ট সঙ্গীত, রাতের পৃথিবীর তাবিজড়িত প্রশান্তি-এর মাঝখান দিয়ে চলতে কারুর ইচ্ছে করে না বটে, ঘুমােতে ইচ্ছে করে। কিন্তু উপায় নেই, ঘুমােলে চলবে না— রাত শেষ হবার আগেই তাকে বুড়ীগঙ্গা পার হতে হবে, নইলে তারাপদ চমকে উঠল। খুনী আসামীর মত সন্ত্রস্ত, চকিত তার সৃষ্টি। কেউ কোথাও নেইত? না। তবু বিশ্বাস নেই, কিছুই তারাপদ বিশ্বাস করে না। ব্ৰহ্মদেশে সে দেখেছে-এমনি নির্জন, পরিত্যক্ত প্রান্তরে, ঝােপ ঝাড়ের আড়াল থেকে হঠাৎ লৌহশিরস্ত্রাণ ঝকঝক করে উঠেছে, রাইফেল আর মেশিনগানের অগ্নদগারের শব্দে পায়ের নীচের মাটা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। কেউ কোথাও নেইত ? যদি কেউ দেখে, যদি কেউ বুঝতে পারে যে সে পলাতক, তবে? ফুনওয়ার সিং, লতিফ, হীরা, মুকুন্দ—তাদের কথা তার মনে পড়ল। তারাও পালিয়েছিল। দিন দশেক পরে দেখা গেল তার ধরা পড়েছে। তারপরে একেবারে ফ্রন্টে।
৬৭ লিবিয়ার কথাও মনে পড়ল। মাসখানেক সে যখন ইতালীয়দের শিবিরে ছিল, তার মধ্যে সে তিন চার বার দেখেছে যে ভােরবেলায় মরুভূমির চক্ৰবালে সূৰ্য্য উঁকি মারবার আগে কুড়ি পচিশটা রাইফেলের গুলির আঘাতে কয়েকজন ইতালীয় বালুর ওপর লুটিয়ে পড়েছে। তার সঙ্গী লেফটেন্যান্টকে জিজ্ঞেস করতে উত্তরে শুনেছিল যে, ওরা পলাতক। তারাপদ শিউরে ওঠে। সে ধরা পড়লেও কি এমনি শান্তি পাবে ? পাগল। তারাপদ নিজের মনে হাসল। বৃটিশ সরকার অত নিষ্ঠুর নয়। আর হীরা, কুনওয়ার, এদের ত’ এরকম কিছুই হয় নি। তাছাড়া জেলও ত’ হতে পারে, সে তিনবছর কাজ করেছে—একথা ভেবে দেখবার মত। দোহাই ভগবান জেলই যেন তার হয়.•• কে? কুনওয়ার, হীরা, লতিফ আর মুকুন্দ-ফ্রন্ট থেকে এরা ফিরে আসল না কেন?, কি হল তাদের? বিশ্রমের সময় ওদের ভাড়ামিতে, অশ্লীল ইয়ার্কিতে, দুঃসাহসিক নৈশ অভিযানে সমস্ত সৈনিকদলের মধ্যে 'ওরা আনন্দের পরিবেশন করত। কিন্তু কোথায় তারা? কোন গাছের আড়ালে, পাহাড়ের খাদে, নদীর গর্ভে ওরা চির-বিশ্রাম করছে তারাপদ চলতে লাগল। শরীর ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ছে, চোখে তার ঢেউ। তবু চলতে হবে। ভাের হবার আগেই ঢাকা পার হতে হবে, বুড়ীগঙ্গা পার হতে হবে। তারপর সে চলবে পশ্চিম দিকে-ক্ষেতের বুকের ভিতর দিয়ে আঁকাবাকা সরু রাস্তা ধরে, বাঁশঝাপ আর বেতের বনের পাশ দিয়ে, নিশানপুর পার হয়ে, তেতুলবােরা পার হয়ে, বুড়ীগঙ্গার খালটা সে পেয়ােবে-তারপরে ধলেশ্বরীর ধারে সে পোঁছােবে। কলাতিয়া। সেখানে ভাঙ্গা ঘরের কোণে একটি উষ্ণ বুকের কোমলতায় তার বিশ্রাম লাভ হবে, জরাগ্রস্ত বু ও বৃদ্ধার উত্তপ্ত নয়না আশীর্বাদ হয়ে পড়বে তার মাথার উপর।
खरगौनाटक আপা চালাও তারাপদ—পা চালাও। লাইট, লেফট, কুইক গুরু-গুরু-গুরু সারা আকাশ আর পৃথিবী হঠাৎ কেঁপে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তারাপদ মাগীর উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। আজ যদি থাকত কুনওয়ার, হীরা, মুকুন্দ আর লতিফ তার সঙ্গে—তবে তারা হেসে উঠত হাে হাে করে তার কাণ্ড দেখে। কুনওয়ার নিশ্চয়ই বলত “আরে তারা, তু শালা অওরৎ আছে— তারাপদ পরমুহূর্তেই লজ্জিত হয়ে উঠে পড়ল। ছিঃ-কোথায় বােমাবর্ষণ? আকাশের কোণে-গাঢ় কালির মত মেঘ দেখা দিয়েছে, এ তারি গান। কি লজ্জার কি আছে। সংস্কারের মত রক্তের মধ্যে এ বিষয়েও একটা সচেতনতা জন্মে গিয়েছে। তক্ৰক ছেড়ে পশ্চাদপসরণের কথা মনে পড়ে। সেই সকাল থেকেই চলা হচ্ছিল। প্রতি মুহূর্তে পায়ের নীচে সাহারা মরুভূমি অগ্নিস্তুপের মত হয়ে উঠছে, অগ্নিপিণ্ডের মত আকাশের সূৰ্য্যটা যেন ক্রমেই তাদের মাথার ওপর এগিয়ে আসছে আর দূরের বালিয়ারীগুলাে অস্থিৰুপের মত ভয়ঙ্কর শুত্র হয়ে উঠছে। তারি মাঝে হঠাৎ শােনা যায় বিমানের শব্দ—আর অমনি শুয়ে পড়া মরুসমুদ্রের সুবিশাল নগ্নবক্ষের উপর, নিজেদের বক্ষতলে লুকায়িত জীবনের জন্য। অতএব লজ্জা কি ? ধীরে ধীরে মেঘের আড়ালে চাঁদ ডুবে গেল, ঘনীভূত অন্ধকারে দক্ষিণের বাতাস থামল-উঠল ঝড়। তারাপদ জোরে জোরে পা ফেলতে লাগল। একটা গাঁয়ে এবার সে পৌছুল। সবাই সুখ মনে হচ্ছে। রাত এখন কটা? বড় জোর এগারটা কি বারটা। হয়ত তারও বেশ। সময়ের গণ্ডীকে সে অতিক্রম করেছে, ঘড়ির টা অনুযায়ী তার জীবন
পলাতক
এ তিনবছর কাটেনি। কেন সে পালিয়েছে। এ কথা হয়ত সবাই
জানতে চাইবে। কেন? থাক সে কথা-
জোরে বৃষ্টি নামল। সঙ্গে প্রবল বাতাস। তারাপদ ভিজে গেল।
গায়ে তার একটা গেঞ্জী, পরণে একটা ছেড়া কাপড়। তার সমস্ত
পােক সে ফেলে এসেছে ধরা পড়বার ভয়ে।
তারাপদ আর চলতে পারে না। বহুদিন যুদ্ধক্ষেত্রে সে কাটিয়েছে
-বহু মানুষের ভয়াবহ ও বিচিত্র মৃত্যু সে দেখেছে, দিনের পর দিন
ছিন্ন ভিন্ন শবদেহ আর বাদের ধোঁয়ার আড়ালে সে তিলে তিলে
নিজের সাহস হারিয়েছে, তাই আজ প্রকৃতির এই দুর্যোগময়ী রূপে সে
ভয় পায়, একাকীত্ব বােধ করে। অথচ প্রকৃতি মানুষের চেয়ে নির্মম
নয়, তা সে জানে। থামতে হবে।
একটি বাড়ীর দাওয়ায় গিয়ে সে দাড়াল।
খানিকক্ষণ ইতস্ততঃ করার পর সে ডাকল—কেউ জেগে
আছেন?”
কোনও সাড়াশব্দ নেই। বৃষ্টির শব্দ আর মেঘগর্জন আর বাতাসের
একটানা শে। শোঁ আওয়াজ।
আবার সে ডাকল—“কেউ জেগে আছেন মশাই?”
এবার উত্তর শােনা গেল-“কে?” করে জড়তা আর বিরক্তি।
ভিতরে একটা নড়বড়ে তক্তাপােষের শব্দ। খড়মের আওয়া।
তারপরে দর খুলল।
একন বয়স্ক ব্রক্ষণ। হারিকেনের আলােতে সে দেখলাে
তারাপদকে। উঙ্কো খুস্কো চুল, লম্বা, রােগা চেহারা, ক্ষুধিত ও ক্লান্ত দৃষ্টি।
“কে তুমি?” ব্রাহ্মণ প্রশ্ন করল।
তারাপ উত্তর দেওয়ার আগেই ভিতর থেকে নারীকণ্ঠের গাওয়া
০
এই সীমান্তে “কে না কে-রাতদুপুরে তার কথায় সাড়া দেওয়া আর তাকে অত কথা জিজ্ঞেস কূরার দরকার কি বাপু?” ব্রাহ্মণ সে উক্তিতে ক্রুক্ষেপ না করে আবার প্রশ্ন করল, “কি বাবা, কি চাই?” তারাপদ বাইরের দিকে তাকাল। অন্ধকার, বৃষ্টি, বাতাস আর বিদ্যুৎ। লিবিয়ার মরুভূমি আর ব্রহ্মদেশের পার্বত্য অরণ্য থেকে প্রেতাত্মারা এলে যেন বাইরের ঐ প্রান্তরে অপেক্ষা করছে। অস্বাভাবিক স্থৈৰ্যের সঙ্গে ধীরকণ্ঠে তারাপদ বলল-“আমি একজন পলাতক সৈনিক, আজকে কিছুক্ষণের জন্য আমায় আশ্রয় দেবেন—বৃষ্টি না থামা পৰ্য্যন্ত ?- ব্রাহ্মণ কথা খুজে পায় না। তারাপদ নিজের গলা শুনতে পায়-“আমি পালিয়ে এসেছি, মানুষের মৃত্যু-তাণ্ডব সহ্ন করতে না পেরে আমি পালিয়ে এসেছি। পেছনে আমার ওয়ারেন্ট আছে, হয়ত জানলে আপনাদের পুলিশ জ্বালাতন করতে পারে-তবু আমায় আজ কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় দেবেন?” নারীকণ্ঠ আবার গর্জে উঠল—“বেরিয়ে যাও বাপু-আমরা নিরীহ প্রাণ-ও সব হাঙ্গামায় নেই- তারপদর চোখে মৃত সৈনিকের মত দৃষ্টি। ব্রাহ্মণের কণ্ঠ এবার ধ্বনিত হল-“আঃ—চুপ কর শুভীর মা- তােমার কি জ্ঞানগম্যি নেই। শােন বাবা, তুমি আজ যতক্ষণ ইচ্ছে থাকতে পার এখানে-এস-ভেতরে এসে বােস-" তাপদ ভিতরে গিয়ে বসল। “কি খাবে?”-ব্রাহ্মণ প্রশ্ন করল। • তারাপদ জবােধ করে। কোথায় ছিল তার এ লজ্জা যুদ্ধক্ষেত্রে?
পলাতক ৭১ বন্দী অবস্থায় ইতালীয় শিবিরে সে একদিন রামলালকে ঘুসী মেরে অজ্ঞান করে তার খাবার কেড়ে নিয়েছিল। ইতালীয়রা তাদের পর্যাপ্ত খাবার দিত না, আর আজ? “না---*সে মাথা নাড়ল। সেকি মনে হচ্ছে- -তুমি অনেকক্ষণ কিছু খাওনি। না না, কিছু খাও। ওমা শােভা-নিয়ে আয় ত কিছু ভিতরে শুভীর মা’র অস্পষ্ট কণ্ঠে বিরক্তি। কিছুক্ষণ পরে একটি যুবতী মেয়ে থালায় কিছু মুড়ি, মােয়া আর দুধ নিয়ে এল। মেয়েটি ভারী সুন্দরী। চাপা ফুলের মত গায়ের রঙ। তারাপদ খেল গােগ্রাসে। সারাদেহে তার কিছুক্ষণের মধ্যে পরি তৃপ্তির চেতনা ঝঙ্কত হয়ে উঠল। এই দেহ বিচিত্র কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র। বােম ফাটল-এই বিচিত্র ‘দেহ সে আঘাতে শূন্তে উৎক্ষিপ্ত হল- তারপর যখন আবার মাটীতে পড়ল তখন হয়ত তাতে একটা হাত নেই, দুটো পা নেই—কেবল সাদা আর রক্তাভ একটা মাংসপিণ্ড। ব্রাহ্মণ কিছুক্ষণ তারাপদর মুখে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা শুনল। তারাপদ তাকে বলল সে কেমন করে পালিয়েছে। দিনের বেলা শক্রর খোঁজে মার্চ করতে করতে সে পেছিয়ে পড়ে। তার পরে দৌড় আর দৌড়। ইরাবতীর ঘােলা জলের মধ্যে সেগুন কাঠের ভেলার ওপর বাঁশের ছােট ঘর ; সেখানে একটি সহৃদয় লােকের সহায়তায় ধান-বােঝাই মহাজনী নৌকায় আশ্রয়লভ। প্রােম। সেখান থেকে আবার পায়ে হাঁটা। আরাকান-ইয়ােম পাহাড় পার হয়ে আকিয়াব। কুলাদান নদীর তীর ধরে অনাহারে অনিদ্রায় হিংস্র শ্বাপদসঙ্কুল পথ দিয়ে চট্টগ্রাম পৌছান। সেখান থেকে চাঁদপুর-পদ্মা-নারায়ণগঞ্জ, তারপরে আবার পাটো।
এই সীমান্তে কিছুক্ষণ পরে ব্রাহ্মণ বলল-“আচ্ছা বাবা তুমি এবার শােও- ভাের বেলায় আমি তােমায় ডেকে দেব।” • ৰাহ্মণ চলে গেল। তাঁরাপদ একা একা বসে অন্ধকারে ভাবে। যুদ্ধের সােমহর্ষণতার কথা। দিনের পর দিন কি করে তার কোমল মন নিষ্ঠুর, হিংস্র আর বিবেকহীন হয়ে উঠেছিল তার কথা। যুদ্ধের সময় যখন সে শত্রুর বুকে অন্ধের মত নিষ্কম্প হতে বেয়ােনেট বিদ্ধ করেছে সেই সময়কার অবর্ণনীয় যন্ত্রণাকর অনুভূতির কথা তার মনে পড়ল। সেই দিনটি। মাথার ওপর ইতালীয় বােমারু বিমানগুলাে অতিকায় ক্ষুব্ধ চিলের মত গর্জন করে ঘুরপাক খাচ্ছে, বােমা ফাটছে, মেসিনগানের গুলী ঝাঁকে ঝাঁকে ছিটকে পড়ছে বালুর ওপর, ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার হয়ে উঠছে আর সঙ্গী সৈনিকেরা একের পর এক আর্তনাদ করে পড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ট্রেঞ্চের ভেতর থেকে জোসেফ লাফিয়ে বেরিয়ে গেল টমি- গানটা ফেলে। নিজের মাথার শিরস্ত্রাণটা খুলে সে পাগলের মতাে চীৎকার করতে করতে এগােতে লাগল। সকলে উৎকণ্ঠায় চীৎকার করে ডাকল—“জোসেফ, জোসেফ- এই পাগলা কুকুর ফিরে আয়, ফিরে আয়- কি জোসেফ সে ডাক শােনেনি। তার কান বোমার আওয়াজে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। সে চীৎকার করে এগােতে লাগল—“কমরেডগণ-দোহাই ঈশ্বরের -থামাও এ খেলা, তােমরা কি ক্লান্তিবােধ করছ না? থামাও এ সব—এ পৃথিবী সকলের জন্য—কেন তবে এই রেষারেষি। আর যদি না থাম বেজম্মার, তবে যিশুর রক্তের দিব্যি-আমায় মার* “যিশুর রক্তের দিব্যি ইতালীয় সই করতে পারল না স্থির লক্ষ্যে জোসেফকে মাটিতে লুটিয়ে দিল। অনেকগুলো, ছিদ্রপথ দিয়ে ৭ বাতাস বেরিয়ে গেলে যেমন বেলুনটা কুঁকড়ে যায় তেমনি ভাবে কুঁকড়ে জোসেফ মারা গেল। জোসেফ একজন স্কট দেশীয় শ্রমিক ছিল। সে পৃথিবীর সব মানুষের সাম্যের অধিকার স্বীকার করত। তারাপদ’র চোখ জ্বালা করে। যেন বারুদের ধোয়া ঘরের মধ্যে কুলায়িত হয়ে উঠেছে। ভিতরে সকলে বােধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। এই পৃথিবী সুন্দর, বেঁচে থাকা আরও ভাল। এই পৃথিবীতে সবাই শক্ত নয়—এখানে বর্মী মাঝির মত সহৃদয় লোেক আছে, এই ব্রাহ্মণ গৃহস্থের মত দয়ালু মানুষ আছে। হােক না তার স্ত্রী সন্দিগ্ধমনা। আর শােভা ? চাপ ফুলের মত গায়ের রঙ। নারী। উঃ, সে কতদিন তার বৌ মীরাকে দেখেনি। প্রায় দেড় বছর। দেড় বছর আগে লিবিয়া থেকে আহত হয়ে ফিরে এসে সে দু’দিনের জন্য বাড়ী গিয়েছিল। মীরা। রূপসী পর জলে সে তার যৌবনকে পনের বছর ধরে ধৌত, পরিপুষ্ট করে ধলেশ্বরীর তীরে তারাপদ'র সঙ্গে বাসা বেঁধেছে। পদ্মার নির্জন চড়ায় শেষ ফাত্তনের মধ্যাহ্নকালীন উদাস শােতার মত মীরা সুন্দর। আরও মনে পড়ে—আলেকজালিয়া, কায়রো, ত্ৰিপােলি••••••পিরামিড, হাজার বছর আগেকার প্রস্তরীভূত রাজারা (তারা নাকি আবার বেঁচে উঠতে পারে-এমনি বিশ্বাস ছিল তাদের) ••••আর রূপাের বালা- পরা, নাক পৰ্য্যন্ত ঢাকা আরবীয় নারীরা। কায়নাের কাফেতে, আলেকজান্দ্রিয়ার সস্তা হােটেলে তাদের তারাপদ সু-প্ৰমত দৃষ্টি দিয়ে দেখেছে, তাদের সঙ্গে প্রেম করেছে নিছক দৈহিক প্রেম। তাদের দেহ ছিল সাহারার বালুকণার মত জালাময়ী, কোমল; তাদের কয়ে ছিল দুর্বোধ্য অথচ ইন্দ্রিয়কে আচ্ছন্নকারী সঙ্গীত আর চোখে ছিল রহস্যময় আরব্য রজনীর কামনাৰ্জর অন্ধকার। আর সেই আলু কাঠের মত চকচকে কালােনিগ্রো মেয়েটি ••••রাত কটা? :
। ৭০ এই সীমান্তে বাইরে বৃষ্টি থেমেছে, আকাশে মেঘ পাৎলা হয়ে উড়ে চলেছে। এবার চলা যাক। ব্রাহ্মণকে ডেকে কষ্ট দেবার দরকার নেই—আর এ ঘরেও ত কিছু নেই। তারাপদ নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। আঃ-মেঘ- মুক্ত চাঁদের আলােয় আবার সমস্ত পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়েছে, বৃষ্টিস্নাত গাছের পাতাগুলি রূপাের মত চকচক করছে,-পা চালাও তারাপদ, পা চালাও। রাইট, লেফট, রাইট, লেফট, ডবল মার্চ•• তখনও ভাের হয়নি। হাল্কা অন্ধকার তখনও পাৎলা চাদরের মত পেছনের সহরকে জড়িয়ে রয়েছে। কেবল বুড়ীগঙ্গার জল চক করছে। নৌকোগুলাে তীরে বাঁধা। মাছিরা ঘুমাচ্ছে। আসন্ন বিদায়ের বেদনায় শেষ রাত্রি স্তব্ধ। বাতাস নেই অথচ একটা মিষ্টি ঠাণ্ডা আমেজ, একটা তালস প্রশান্তি চারিদিকে পরিব্যাপ্ত। বুড়ীগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে তারাপদ চারিদিকে তাকাল। এই নদীর ওপারে, সবুজ ধান আর পাটের খেতের মাঝখান দিয়ে, অজস্র খাল বিলের পাশ দিয়ে, সপ্ত ঘুম-ভাঙ্গা মাটীর গন্ধে ঝিমােননা বাতাসে তার বুক পরিপূর্ণ করে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে চলতে চলতে সে থামবে গিয়ে কলাতিয়ায়। তারপরে মা আর বাবা আর মীরা আর তার ছােট ছেলেটা। কেমন দেখতে হয়েছে সেটা? ভাবতে ভাবতে তারাপদ’র ঘুম পায়। দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে খানিকক্ষণ স্বপ্ন দেখে । হঠাৎ চমক ভাঙ্গতেই সে এগিয়ে একটি ছােট ডিঙ্গির সামনে গিয়ে দাড়ায়। বুড়াে মুসলমান মাঝিটি ঘুমাচ্ছে। “ও মাঝি ভাই, শুনছও মিঞা .আঙ্গা-রহিমতুল্লা-কেডা? মাঝি তার ঘুমন্ত গলায় বাঙাল ভাষায় জিজ্ঞেস করল। তারাপদও সেই ভাষাতেই বলল, ৭৫ “আমাকে ওপায়ে পৌছে দেবে মিঞা ভাই?” “হু-দেব, কিন্তু চার আনা লাগবে কত্তা—” চার আনা। তা হােক, তারাপদ’র কাছে এখনও টাকা খানেক আছে। “তাই দেব—চল তুমি।” ‘আনুন নায়ে বাবু- তারাপদ নৌকায় চড়ে বসল। মাঝি নদীর জলে চোখ মুখ ধুয়ে নৌকো ছাড়ল। নৌকো চলতে থাকে আস্তে আস্তে। মাঝির পেশল বাহুতে, পায়েতে তখনও ঘুমের নেশা। লগি মেরে সে নৌকোকে জমে গভীর জলের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল। নৌকো চলল হেলে দুলে, বুড়ীগঙ্গার জলকে ভেদ করে, সশব্দে। “মাঝি ভাই- “বাবু?* “দেশের কি খবর? “আর দেশের কি খবর বাবু, দিনকাল বড় ভাল না। জিনিষপত্রের দাম যুদ্ধের জন্য এত চড়ে গেছে যে কি বলব- সে পুরানাে দিন আর নাই— বুড়া মাঝি তার যৌবনের দিনের কথা ভাবে। তখন দেশে অর্থ ছিল, খাস্ত ছিল। তার ঐ পেশল বাহু, বক্ষ আরও দৃঢ় ও কঠিন ছিল। তখন বুড়ীগঙ্গার জল আরও গভীর ছিল, রাতের বেলায় তখন জল- দস্যদের নৌকো ঘুরে বেড়াত লুটের আশায়। আঃ সে পুরানাে দিন আর নেই- যুদ্ধ। তারাপদ ভাবে। জলের স্রোতের শব্দ শুনতে শুনতে সে আবার ভাৰে। কেন মানুষ যুদ্ধ করে। জোসেফের কথা মনে পড়ে এই সীমানে, তার মুখে লতিফ শুনেছিল আসল কথা। লতিফ ইংরিজি একটু জানত। জোসেফ বলেছিল যে, এসব যুদ্ধ হয় একজন দু’জনের ললাভের অষ্ট। উঃ, কি লােভ এই সব মানুষদের। তাদের সারা পৃথিবী দিলেও খুসী হবে না, হয়ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্যান্ত গ্রহকেও অধিকার করতে যাবে। এদেরই জন্য কোটী কোটী লােক বেঁচেও বাঁচতে পারে না। পৃথিবীর রূপ, রস, বর্ণ, বৈচিত্র্য তাদের কাছে তাই ছবির মতই মিথ্যা থেকে যায়। কিন্তু কেন? পৃথিবীটা ত’ তাদেরও বুড়াে মাঝির গলা শােনা যায়, “বুঝলেন না কা-রাজায় রাজায় যু হয়—আর আমাদের পরাণ যায়- * রাজা! রাজাদের দিন শেষ হয়ে আসছে। জোসেফ বলেছিল। জোসেফ মারা গেছে। বায়ু-নিঃশেষিত বেলুনের মত। যুদ্ধ। ছিঃ- ভিন্ন নরদেহ, রক্তকর্দম, কাঞ্জানি, ধোঁয়া আর শব্দ। বােমা, এরােপ্লেন, ট্যাঙ্ক আর মেশিনগান। সৈনিকগণ, অগ্রসর হও। থাম। কনুয়ের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়। মাথার উপর শিষের মত শব্দ করতে করতে ছুটুক গুলী। ওঠ। দৌড়ােও। বেয়ােনেটকে উদ্যত করে সমূলে বিধিয়ে দাও শত্রুদের বুকে লাল রক্তের ছিটে লাগুক তােমার রক্তে। কিন্তু তা ভেদ করবে তোমার দেহকে—নিঃশৰে। অসংখ্য অদৃশ্য রােমকূপের মধ্য দিয়ে তােমার রক্তের মধ্যে তা মিশবে। মৃতেরা বাঁচৰে তােমার মধ্যে। তুমি মারতে পার না তারাপদ, মানুষকে মেরে শেষ করতে পার না। তারাপ’র মনে পড়ে একদিনের ছবি। পাগলের মত তখন তারা লিৰিয়ার একটি শত্রুদের ঘটি নিতে যাচ্ছে, হাতাহাতি বেশ খানিকটা যুদ্ধ হয়েছিল। সেই সময় সে একজন জার্মান সৈনিককে দেখতে পেল। তার দু’টো পা হাঁটু থেকে উড়ে গেছে বা হাতটা বেয়নেটের খোচা। তাকে দেখেই সে প্রায় বেয়ােনেট ৭৭ উচিয়ে সােন্তাসে এগিয়ে গেল। রক্তের গন্ধে তখন তার মাথা ঝিমােচ্ছ। জার্মানটি তার দিকে কাতদৃষ্টিতে তাকিয়ে কি কথা বলেছিল তা সে জানে না। কিন্তু সে যা বলেছিল তা সে বুঝতে পেরেছিল। তার কাতর অসমাকুল দৃষ্টি, থরথর ঠোট, চাপা কান্নায় ভারী গলা—সবই তার কথায় সায় য়ে, মানুষে মানুষে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে, শত্রুতা ভুলে এই কথাই বলেছিল-বাচাও ভাই, আমায় মের না, আমিও মানুষ কিন্তু সে শােননি, তার দক্ষিণের পাজরার ভেতর এমন জোরে সে বেয়ােনেটের খােচা দিয়েছিল যে তার পাঁজরাগুলাে পাট কাঠির মত মটু মটু করে উঠেছিল—কেন মানুষ যুদ্ধ করে। যুদ্ধ! কায়রাে, আলেকজান্দ্রিয়া, ত্রিপােলি, তব্ধক। আলেকজামিয়ার সেই স্পেনদেশীয় বারবণিত। • তার চোখে ছিল ধারাল ছুরীর শাণিত ঝলক। আর সেই তক্রকের অনতিদুরে-সেই নিগ্রো মেয়েটি, যার চোখে ছিল আফ্রিকার অন্ধকার অরণ্যের বিভীষিকাময় রহস্যের কালিমা-•••••• “নামেন বাবু নৌকো তীরে ভিড়েছে। তারাপদ নাম। তােমায় যেন কেউ না চেনে, তুমি পলাতক। ধরা পড়লে তােমার জেল নয় তত মৃত্যু।••••• খালেতে জল বেশ নেই। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস, এর আগে দু'এক পশলা বিষ্টি হয়ে গেছে, তার জন্য খালের জল ঘােলাটে। খালটা তারাপদ পায়ে হেঁটেই পার হল। মােটে এক কোমর জল। খালটা পেরিয়ে সে এদিক ওদিক তাকিয়ে অগ্রসর হল মান্দার গাছের ঘনবসতির মাঝখান দিয়ে। দূরে, বাঁশঝােপের একপাশে তাদের টিনের বাড়ীটা উঁকি মারছে। তারাপদ’র সারা দেহে একটা নতুন শক্তির সঞ্চার হল। .
৭
এই সীমান্তে
বাড়ীর সামনে গিয়ে সে দাড়াল। সৰ তেমনি আছে, কেবল
চালার ওপরে লাউয়ের লতাটা আরও ঘন হয়ে উঠেছে, দাওয়ার মাটী
কিছু খসে পড়েছে, বাঁশের বেড়ার যায়গায়-যায়গায় ভেঙ্গে গেছে।
দাওয়ার ওপর একটি বছর তিনেকের নগ্নশিশু খেলা করছে, তার
কোমরে একটা ঘুনসী বাঁধা, আর কোনও আভরণ নেই। ছেলেটি
যেন চেনা চেনা। তার স্বগৌর মুখ, কোকড়া চুলের রাশি, ব্ৰহ্মদেশে
দেখা ধ্যানী বুদ্ধের মত আয়ত অথচ স্বপ্নালস ও শান্ত দৃষ্টি দেখে
একজনের কথা মনে পড়ে তারাপদ’র। সে মীরা। একি তারই
ছেলে ?
“এসাে বাবা–এসাে” তারাপদ ডাকল।
ছেলেটি সবিস্ময়ে তার দিকে একটু তাকাল, তারপরে দরজার
চৌকাঠের দিকে তাড়াতাড়ি হেলতে হেলতে টলতে টলতে গিয়ে
আধ আধ স্বরে ডাকল-“মা”
“কেনরে সােনা ?” ভেসে এল একটি নারীর কণ্ঠস্বর।
আওয়াজে তারাপদ কেঁপে ওঠে আনন্দে। মীরার গলা।
“কি হল তাের——” বলতে বলতে একটি যুবতী বাইরে
এল। কিন্তু তারাপদকে পেছন থেকে একটু দেখেই দ্রুতপদে ঘােমটা
টেনে চলে গেল। মুহূর্তের জন্য তারাপদ ঘাড় ফিরিয়ে দেখল মীরার
দু’গাছি চুড়ি-পা ও হাতের ভঙ্গিমা, তার জলে ভেজা দুটি নিখুত
পায়ের ত্বরিৎ গতি।
তারাপদ নিজের মনে একটু হাসল। মীরা তাকে চেনে নি।
ছেলেটি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে—তার দিকে। তার ছেলে।
“এসাে বাবা, এসাে—কোলে এসে সে ডাকল।
হঠাৎ দ্বারপ্রান্তে একটি বৃদ্ধার আবির্ভাব হল।
কে বাকি চাও ?”
পলাতক
৭E
তারাপদ আস্তে আস্তে বৃদ্ধার দিকে তাকাল।
বৃদ্ধার হঠাৎ কথা থেমে গেল। তার সারা দেহ ধীরে ধীরে কাঁপতে
লাগল, চোখ দু’টি ক্রমে স্তিমিত, অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।
তারাপদ ডাকল—“মা আমি তারা*
মা এবার কেঁদে ফেলল—“তারা-তুই তারা আর কিছু তার
মুখ দিয়ে বেরােল না।
তারাপদ এগিয়ে গিয়ে মায়ের পায়ের ধূলাে নিল। মায়ের চেহারা
অনেক বদলেছে, মাথার চুলগুলি আরও পেকেছে, কোমরটা আরও
ভেঙ্গে পড়েছে, ফুলে ফুলে গাল দু’টো ভেঙ্গে গেছে।
মাও ছেলেকে দেখে। ছেলেকে চেনাই যায় না। তার মাথার
গুলাে ছােট করে ছাঁটা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফ, ভাঙ্গা গালের
উপর দুটি পদ্মফুলের মত সুন্দর চোখে আভা নাই আর তার ছেলের
সেই পাহাড়ের মত চেহারাও নাই, অনেক রােগা হয়ে গেছে।
ছেলেকে মা বুকে জড়িয়ে ধরল।
নগ্ন ছেলেটি ডাকল—“ঠাম্মা*
ঠাকুমা’র চমক ভাঙ্গল-“ওরে তারা, বাছাকে কোলে নে, কোলে
আহা, তাের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম সােদাদু-জানিস
তার-ওর নাম রেখেছি কার্তিক-এসাে দাদু, বাবার কাছে এস-*
তারাপদ ছেলেকে কোলে টেনে নিল। ছেলে একটুও কাঁদল না
বা ভয় পেল না। তারাপদ ভারী খুশী হয়, ছেলে তাকে চিনেছে।
রক্তের সম্পর্ক যে।
“বাবা কোথায় মা?”
“গেছেন কোবরেজের কাছে—আজকাল বাতে প্রায় চলতেই
পারেন না—অ’ বৌমা–কাতুর বাবা এসেছে গাে-
তারাপদ ভেতরে ঢুকে নিজের ঘরে গিয়ে বসল। ঘর তেমনি
ক
নে।
बरेनौमाटर
আছে। ঝকঝকে, তকতকে। কুলুঙ্গীতে মা কালীর পট। মীরার
পূলো হয়ে গেছে। ভগবান, জোসেফ বলেছিল—‘ভগবান! সে
আবার কে ?”
“ছুটি নিয়ে এসেছিল বুঝি তারা, জিনিষপত্তর কৈ ?”
“আনি নি।
“কেন?”
“ছুটা নিয়ে আসিনি মা-পালিয়ে এসেছি
“তাই নাকি?” মা খুশী হয়ে উঠল—“বেশ করেছিস-আর
চিন্তা করতে পারি না বাবা। না খেতে পেয়ে মরতে হয় তাও ভাল
চোখের সামনে মরবি, কিন্তু যুদ্ধে কোথায় সকলের নাগালের বাইরে,
'কত হাজার মাইল দূরে-না বাবা, যাসনি কোথাও
“কিন্তু আমার কথা জানতে পারলেই পুলিশ আমায় ধরে নিয়ে
যাবে না, আমার পেছনে ওয়ারেন্ট আছে। ধরা পড়লে আর নিস্তার
নেই, আর ফিরতে পারব না—হয় জেল না ত মরণ—
মায়ের চোখে ভয়ের চিহ্ন। দরজার আড়ালে কে যেন দাঁড়িয়ে
আছে। তার ফুলের মত দেহের গন্ধে বাতাস মদির।
হ্যা মা—আজই, কিম্বা কাল এখান থেকে আমি চলে যাব,
যাব পিসেমশাইয়ের ওখানে—বিড়ুলিয়াতে—এখানে থাকলে ধরা
বাবা এসে ঢুকল ধরে। তারাপদ প্রণাম করে। বাবার বাতরােগ
যেন কণেকের জন্য সেরে যায়। যে মানুষ চলতে পারে না, সে-ও
খাড়া হয়ে দাড়ায়।
“তারা—কবে এলি বাবা?”
“এখুনি বাবা-
তারপরে আরও অনেক কথা হল। যুদ্ধের কথা, কি করে মনের
খােলস দিন দিন বদলে বিত্র হয়ে যায় তার কথা আর নিঃসঙ্গ, আত্মীয়হীন জীবনে তার কতবার মৃত্যু এসেও ফিরে গেছে তার কথা। দরজার আড়ালে কে যেন দাড়িয়ে উৎকর্ণ হয়ে শুনছে সব কথা। কাতু। তার ছেলে। এই তারাপদ’র বাড়ী। এখানে মরুভূমির বালু নেই, অপরিচিত দেশের ভয়াবহতা নেই, নেই বারুদের গােলা আর ঝকঝকে বেয়ােনেটের আড়ালে শত্রুদের নির্মম মুখ। এখানে শুধু শাস্তি। দারিদ্র আছে, অভাব আছে কিন্তু তবুও শান্তি আছে। দরজার আড়ালে কার কোমল বুকের স্পন্দন যেন দ্রুত হয়ে উঠেছে। মা, বাবা একটু পরে অন্য ঘরে চলে গেল। লঘু পদশৰ ধ্বনিত হল। রূপসী পদ্মর একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল তারাপদ’র সামনে। ভরা নদীর টলমল জলের মত পরিপূর্ণ তার যৌবন অথচ গ্রীষ্মের নদীর শীর্ণতাও আছে। বসন ভূষণে কোনও পারিপাট্য নেই। পদ্মার গভীরতার মত দু’টি গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন চোখের নীচে চিন্তার কালিমা। মীরা। তারাপদ উঠে দাড়াল—এগিয়ে গেল সে সাগ্রহে। মীরা তার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। তার চোখ দিয়ে জলও পড়ছে। সে আর মাথা তােলে না। তার স্ত্রী। একে ছেড়ে সে কোথায় গিয়েছিল? আলেকজান্দ্রিয়া, কায়রো, তক, ব্ৰহ্মদেশ। সেই সব নারীরা—যারা—মত্ততার মুহূর্তে, মৃত্যুর অস্তিত্বে ক্লান্ত ভারাক্রান্ত আবহাওয়ার অন্ধকারে এসেছে তার জীবনে, তাদের সঙ্গে কত পার্থক্য এই মীরার। পদ্মার তীরের রূপসী, ওঠ, বুকে এসাে। তারপর মীরার গলা শুনতে পায়—“আর কোথাও যেয়াে না গাে, দিনরাত, সারাক্ষণ ধরে পারি না এ যন্ত্রণা সইতে। প্রতি মুহূর্তে ভয় হয়—কখন বুঝি মুছল আমার সীথির সি দুর। ওগাে শুনছ -আর যেও না কোথাও, বল যাবে না-বল- ২ এই সীমান্তে মীরা কাদছে। পদ্মাতীরের মীরা। সে রাজকন্যার মত সুন্দরী। যে কত চালােকিত রাত্রে পদ্মার তীরভূমিতে সখীদের সঙ্গে বসে কাঞ্চনমালা, মণিমালা আর কত শত রাজকন্যাদের গল্প শুনেছে, কল্পনায় অসীম আকাশেরও সীমা খুঁজে পেয়েছে, সে কঁদছে আর তােমায় যেতে মানা করছে যুদ্ধক্ষেত্রে। সৈনিক তার কি জবাব দেবে তুমি? তারাপদ মীরাকে টেনে তুলল। মীরার দুটি হাত তার কণ্ঠদেশ নাগিনীর মতন হিংস্রভাবে জড়িয়ে ধরল। সারাদিন তারাপদ বাড়ীতে রইল। তার ঘুম পেয়েছিল কিন্তু মীরা কাজ সেরে আসতেই তা কেটে গেল। কারও সঙ্গে সে দেখা কমতে পে । উপায় কোথায় ? কিন্তু সন্ধ্যে হবার খানিক আগে সে আর তিষ্ঠোতে পারল না। বহুদিনের অদেখা নির্জন পথগুলাে, ধলেশ্বরীর তীর তার মনকে নিরন্তর আকর্ষণ করতে লাগল। চুপে চুপে সে বেরিয়ে পড়ার উপক্রম করল। কিন্তু ধরা পড়ে গেল মীরার কাছে। “কোথায় যাচ্ছ গাে?” “একটু বেড়িয়ে আসিগে বৌ।” “কেন আজ জিয়ােও না—এতদিন ত’ হেঁটে বেড়ালে- মীরা তারাপদকে চোখের আড়াল করতে চায় না। কে জানে কি হবে। এতদিন ত’ ছিল কোথায় কোন দূর দেশে। আজ যে সে এসেছে তা যেন এখনও বিশ্বাস হয় না। মীরার। এটা যেন একটা স্বপ্নের ঘাের। তাই মীরা চায় যে, তারাপদ আজ সারাক্ষণ তার চোখের সামনে, তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্ন অনুভূতির গণ্ডীতে আবদ্ধ থাকুক, গার আগমন তার কাছে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হােক।
পলাতক ৩ কিন্তু তারাপদ মাথা নাড়ল—“না বৌ, একটু ঘুরে আসিগে— “যাবে তা বেশ, কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি এসাে, নইলে তােমায় বন্দী করা হবে— তারাপদ হেসে উঠল, পায়ে পা লাগিয়ে মিলিটারী কায়দায় অতি- বাদন করে বলল-“ইয়েস কমাণ্ডার মীরা খিল খিল করে হেসে উঠেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে রান্নাঘরে ছুটে পালাল। পথ। দেবদারু, আম, জাম আর কাঁঠাল গাছের নীচে পড়ন্ত রােদের খেলা। তারাপদ লুকিয়ে হাটের পিছন দিককার রাস্তা ধরে, সাহাদের জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে ধলেশ্বরীর দিকে এগিয়ে চলল। সাহাদের বড় অট্টালিকা দেখা যায়। সাহারা মরুভূমি। খামাদান ঝড় বয়ে চলেছে, বালুস্তম্ভের ঘূর্ণমান বাতি। আকাশে প্রসারিত- পক্ষ অতিকায় চিল গর্জন করছে। ঐ যে দুরে নদীর জল চকচক করছে। বিউগলের আওয়াজ শােনা যাচ্ছে-তঁাবু ভাঙ্গ সৈনিকগণ, শত্রুরা আসছে। কি ভাবছে তারাপদ ? ধলেশ্বরী। শীর্ণ রূপসীর সঙ্গীতের মত তার জলকল্লোল। বাদামী পালওয়ালা একটা নৌকা তীরে নােঙ্গর ফেলে রয়েছে, দূরে তার বক্ষ ভেদ করে তিনটে মহাজনী নৌকা দিগন্তের দিকে ভেসে চলেছে। তীরের ওপরে একটা ছাগল ঘাস খাচ্ছে, তার একটা বাচ্চা স্তন্যপান করার জন্য লাফালাফি করে তাকে জ্বালাতন করছে। একটা প্রজাপতি গান গেয়ে কোথায় উড়ে গেল! গাঙচিলেয়া এলের ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই কবে শােনা ছােটবেলার গল্পগুলাে মনে পড়ে। মাঝিরা বলেছিল তাদের স্বপ্নের কথা। সােনার ময়ুরপঙ্খী নৌকা আর রূপাের ইলিশ মাছ নাকি
৪
এই সীমান্তে
আছে ধলেশ্বরীর গর্ভে। রূপকথা। আকাশের সূৰ্য্য বেচারা হঠাৎ
রাতের কালাে কুলের ছায়া দেখে লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। আঃ-
কাব্যের মত মিষ্টি এই পারিপার্শ্বিক। একটি অদৃশ্য ছন্দের হােত বয়ে
চলেছে এই আকাশ বাতাস, সূৰ্য্য, জল, গাছপালা, মাটী আর
তারাপদ’র মধ্য দিয়ে। কমরেডগণ, কেন এই রেষারেষি, এই সুন্দরী
পৃথিবী ত’ সকলেরই মা। তারাপদ ভীরু নয়, কিন্তু কার জন্য যুদ্ধ
করবে সে? সত্য, ন্যায়, মনুষ্যত্ব—তারা কোথায়? সে কেন যুদ্ধ
করবে পরের জন্য যারা তাদের শােষক। আলেকজান্দ্রিয়া, কায়রাে,
••••••সেই নারীরা, আর তক্ৰকের সেই নিগ্রো মেয়েটি। মসৃণ
আবলুসের মত নিখুত কালাে ছিল তার রঙ। স্বল্প পােষাকের আড়াল
থেকে তার যৌবন-পরিপুষ্ট অঙ্গ প্রত্য তাদের ইন্দ্রিয়কে কলুষিত
আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তারপরে সেই দিন রাত্রে
কুনওয়ার বলল-“চল দোস্ত,সব, একটু বেড়িয়ে আসি-
রাত্রিবেলায় তাবুর বাইরে যাবার নিয়ম ছিল না, চারদিকে কড়া
পাহারা।
হীরা বলল—“হ্যা—ঘুমও আসছে না, চল ভাই একটু বেড়িয়ে
আসা যাক-*
মুকুল আর লতিফ, ওরাও রাজী হােল। প্রথম লাইন তখন পাঁচ
মাইল এগিয়ে গেছে জাৰ্মাণদের পশ্চাদ্ধাবন করে। রাত্রিবেলায়
অতর্কিতে তারা তাদের আক্রমণ করেছিল।
রাত তখনও বেশ হয়নি। সবে দশটা। বাতাস বইছে, কিন্তু
তাও গরম। মাঝে মাঝে দূরাগত মেঘগর্জনের মত কামান আর
বােমা বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসছে।
খালি পায়ে ভাড়া দৌড়তে আরম্ভ করল নিগ্রোপল্লীটির দিকে।
অন্ধকারে—একটি অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করে নিগ্রোপল্লীর
।
পলাতক ৫ লােকেরা তার চারদিকে গোল হয়ে বসে গান বাজনা করছিল। ঢাকের মত একটি বাদ্যের গুন্ গুন্ শব্দে চারদিক কেঁপে উঠছে, একটি মেয়ে আর একটি ছেলে মাঝখানে নাচছে। পেছনের লােকরা গাইছে একটি প্রাচীন সঙ্গীত, যার ভাবে আর ভাষায় রয়েছে আদিম অরণ্যের ভয়াবহ অথচ মনোমুগ্ধকর সৌন্দৰ্য্য। নৃত্যরত যুবক যুবতীর কালাে দেহ কম্পিত আলােতে চকচক করছে। একপাশে একটি বছর পনেরর নিগ্রো মেয়ে বসে তাল দিচ্ছিল, তার অনাবৃত বক্ষে নবীন বসন্তের কৃষ্ণকলি, তার চোখে স্বপ্ন। কুনওয়ার সােল্লাসে অস্ফুট শিষ দিল—“চিজটা ভালা আছে, না রে তারাপদ? তারা সকলে মাথা নেড়েছিল। কিছুক্ষণ পরে মেয়েটি উঠল, উঠে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। তখনও গান চলছে। সে কালে দেহের নিচেকার কালাে আত্মার সঙ্গীত, রক্তের সমুদ্রে তা সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়ে। গান চলছে। ‘কোয়াবাডা আঙডুবা’—রাতের যৌধন সবে হয়েছে। কুনওয়ার বলল-“চল পিছে পিছে- তারপরে অন্ধকারে যুবতীর আর্তনাদ। অন্ধকারে তারা একের পর এক নিজেদের পাশবিক কামনা চরিতার্থ করল। লতিফ মেয়েটার মুখে রুমাল গুজে দিয়েছিল। তারপরে যখন তারা চলে আসছিল—তখন শক্ত মাটীর উপর দিয়ে নগ্ন ও রক্তাক্ত দেহে পাঁচটি পশুর নখদন্তের আঘাতচিহ্ন নিয়ে, । মেয়েটি হামাগুড়ি দিয়ে চলবার চেষ্টা করছিল। তার নিম্নাঙ্গ তখন যন্ত্রণায় অসাড়। মুখ দিয়ে তার এক অস্ফুট গােঙানির শব্দ কেবল থেকে থেকে বেরােচ্ছিল, কিন্তু দুরের কামান নিখোষ আর সঙ্গীতের তালে তা চাপা পড়ে যাচ্ছিল। রাতের যৌন সবে সরু হয়েছে।'
৬ এই সীমান্তে তারাপদ শিউরে উঠল। কি করে সে তখন জ্ঞান হারিয়েছিল! একদিন তাকে সুদে আসলে এই অত্যাচারের প্রতিফল পেতে হবে। যুদ্ধ। জীবনকে কি করে দেয় ঝকঝকে বেয়ােনেটের স্পর্শ ! সন্ধ্যে দুজন লােক পশ্চিম দিক দিয়ে আসছে। তারাপদ চলতে আরম্ভ “আরে কে ? তারাপদ না ?” থানার দাবােগা অজিত বাবু। সর্বনাশ। আফ্রিকার অরণ্য থেকে অকস্মাৎ একটা হিংস্র বাঘ লাফিয়ে এল। তারাপদ মুখ না ফিরিয়ে চলতে লাগল দ্রুতপদে। রািপদ-শােন—এই- তারাপদ দৌড় দিল। সৈনিক, তােমায় চিনে ফেলেছে। বাড়ী ফিরে সে সব কথা সকলকে জানাল। রাতের শেষেই তাকে ঘর থেকে আবার বেরােতে হবে। মীরার মুখ বেদনায় ম্লান হয়ে এল। পদ্মার বুকের ওপর মেঘের ছায়। সে বলল-“তখনই তােমায় বারণ কল্লাম- তারাপদ নিজের দোষ বােঝে, কিন্তু উপায় কি। ছেলেকে কোলে করে সে ঘরের কোণে চুপ করে বসে রইল। রান্নাঘর থেকে পায়েসের গন্ধ ভেসে আসে। তার আগমন উপলক্ষ্যে আজ বিশেষ ব্যবস্থা। কিন্তু সৈনিক, আর দেরী নেই। এবার কোথায়? রেঙ্গুন, না, রেঙ্গুন ত’ গেছে। রাত তখন প্রায় দশটা হতে চলেছে। তারাপদ খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছে। বাবা নিজের ঘরে ইকো টানছে।
পলাতক ৭ তারাপদ ভাবে। এবার ? যুদ্ধের চাকরি ত’ গেল, কি করে সংসার চলবে? হবে, হবে, নিশ্চয়ই একটা কিছু হবে। হঠাৎ বাইরে গাঁয়ের চৌকীদার বিপিনের বাজখাই গলা শােনা গেল-“ও মণ্ডল মশাই—দরজাটা খুলুন ত’ একবার মীরা দ্রুতপদে ঘরের মধ্যে ছুটে এল, ফিসফিস করে কেঁদে বলল- “ওগােদারােগা পুলিশ এসেছে, তুমি পালাও- বিপিন আবার “ডাকল—“আরে ও মণ্ডল মশাই-শুনছেন- কামানের গােলার আওয়াজের চেয়েও ভীষণ বিপিনের ডাক। আহত পশুর মত তারাপদ লাফিয়ে উঠে একটা জামা গায়ে গলিয়ে নিল। মীরা বাইরে গেল। বাবা, মা ঘরে এল। তাদের মুখে বিবর্ণতা। মা জিজ্ঞেস করল-“পালাতে পারবি ত’?”-অস্বাভাবিক স্থির আর গলা। বাবার বাম অঙ্গ থরথর করে উত্তেজনায় আর বিচ্ছেদের দুঃখে কাপছে। “মণ্ডল মশাই-দরজা খুলুন না-দারােগা সয়ে এসেছেন ছেলের দিকে একবার তারাপদ তাকাল। রাজাদের সৈনিক হয়ে না পুত্র। অন্ধকারে পেছন দিক দিয়ে তারাপদ মিলিয়ে গেল। গায়ের রাস্তাটা যেখানে মােড় ফিরেছে, সেখানে কে যেন দাড়িয়ে ছিল। তারাপদকে দেখেই সে তাকে জড়িয়ে ধরল। “ কেকে? তারাপদ’র ভীতু, চকিত কণ্ঠ। প্রত্যুত্তরে কান্নার শষ শােনা গেল। রূপসী পদ্মার ঢেউ অন্ধকারে তারাপদ’র বুকে আছড়ে পড়ে। “আবার কবে দেখা পাৰ গাে?”
এই সীমান্তে “তিনটে মাস কাটলে ওয়ারেন্ট তামাদী হবে—তারপরে আসব। আর আমায় কেউ নিয়ে যেতে পারবে না মীরা-এবার ছাড়া আর দেরী করা উচিত নয়।” মােহিনী লতার বাঁধন ছিড়ল। অন্ধকার পথ। পেছনে কান্নার শব্দ। থাক্। বিড়লিয়া নয়, আছাইলে মাসীর ওখানে যাবে সে। । ঘণ্টা চারেক চলে তারাপদ আর পারে না। আশা, আকাঙ্ক্ষা, আত্মা, চেতনা, অনুভূতি, সুখ, দুঃখ, রক্ত, মাংস, অস্থি, শিরা-নানা বিচিত্রের সমাবেশে এই বিচিত্র দেহ ক্লান্ত। ঘুম চাই। তারাপদ একটা গাছের তলায় শুয়ে পড়ল। রাত শেষ হয়নি। নানা ছবিতে মাথাটা ভরপুর হয়ে ওঠে। পলাতক সৈনিক,..এবার? কেন সে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে না। তার বুদ্ধ ভাল লাগে না তবু কেন তাকে যেতে হবে যুদ্ধে! সুম আসে। কালােঘুম। সেই কালো নিগ্রো যুবতী। পাপ। কার পাপ ? এক জনের, দশজন লােভীর পাপের ফল সারা মানবজাতি ভােগ করবে। জোসেফ। মানুষ ভাই, তােমরা সবাই সমান। সভ্যতা। সভ্যতা ভেঙ্গে যাচ্ছে—বােমার আঘাতে সব গুড়াে হয়ে যাচ্ছে••••• লণ্ডন, বার্লিন, প্যারিস, রেঙ্গুন-মানুষের বুদ্ধি মানুষকে ধ্বংস করছে। ধ্বংস- তুপের আড়াল থেকে নতুন সৃষ্টির অঙ্কুরোদগম হবে কি? মানুষের রাজ্য কবে হবে? রাজার রাজ্যে আগুণ লেগেছে। রাজা। রাজাদের দিন রক্তাক্ত অস্তের দিকে এগিয়ে চলেছে—মানুষ তাই, পরের জন্য মানুষকে গুলি মেরাে না। মূর্খ, রাজাদের প্রত্মরীভূত শবদেহে আর প্রাণ আসবে না•••••তারাপদ ঘুমােও ০ পলাতক অতলস্পর্শী বিস্মৃতির মধ্য থেকে তারাপদ’র চেতনাকে কে যেন হঠাৎ টেনে তুলছে। কে যেন তাকে ধাক্কা মারছে। তারাপদ চোখ মেলল। নূতন সূর্যের আলােতে অসংখ্য প্রাণের বীজ। “সুপ্রভাত-* তারাপদ চমকে উঠল। অজিতবাবু হাসল। সঙ্গে তার দুটি কনষ্টেবল। “এই যে দারােগা বাবু তারাপদ হাসল। আর উৎকণ্ঠা নেই, আর চিন্তা নেই। “চল আমাদের সঙ্গে, কেন মিথ্যে কষ্ট দিলে বাপু তবুও তারাপদ একবার চেষ্টা করে। অজিত বাবুই তাকে যুদ্ধে নাম লিখে পাঠিয়েছিল—সে হয়ত বুঝবে তার তিক্ত, যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞ তার কথা। “অজিতবাবু-বিশ্বাস করুন, যুদ্ধের বিভীষিকা আর সহ করতে পারি নি বলেই অজিতবাবু মাথা নাড়ল—“মিথ্যে বলছ ওসব কথা তারাপদ, আইনকে ফাকি দিতে আমি পারি না আর তুমিও পারবে না। মাস- খানেক ধরে তােমার পরওয়ানা এখানে পড়ে রয়েছে, উঃ কি নাকালই না সারারাত করিয়েছ তুমি। নাও হে কেশরসিং, হাতকড়ি লাগাও- তারাপদ হাত বাড়িয়ে দিল। উপায় নেই। কালাে ছাড়া পৃথি- বীতে আর কোনও রঙ নেই। “চল তারাপদ-* “চলুন* তারাপদ সামনের দিকে তাকাল। মীরা, মা, বাবা, কাতু। দুঃস্বপ্নে .
এই সীমান্তে দেখা প্রেতের দল। আবার যুদ্ধক্ষেত্র। লিবিয়া, আলেকজান্দ্রিয়া, কামরে, ব্রহ্মদেশ। রাজারা মরছে। আবার ট্যাঙ্কের ঘর্ঘর শব্দ, মেসিনগানের অগ্নদগার, বােমার বিস্ফোরণ, উদ্যত বেয়ােনেটের মুখে মরণের বিদ্যুৎঝলক। আবার কলুষিত শূন্যপথে মৃত্যুর ডানা ঝলসাবে ট্রেঞ্চের মধ্যে, কাটার তারে, ছিন্নদেহের রক্ত পচবেগুনছ—কেউ বাঁচবে না। আহাহা—কেউ বাঁচবে না, এই সুন্দর পৃথিবীতে সন্ধ্যার লাল সূৰ্য্য কেউ দেখবে না, ছােট ছোট কাতুরা আর খেলবে না— হাসবে না; পদ্মা তীরের রূপসীরা তারাপদ’দের বুকে উন্মত্ত সঙ্গীতের ছন্দ জাগাবে না-ফুলের কেউ ফুটবে না— তাই ভাল। পায়ে পা লাগাও সৈনিক, মাথাটা খাড়া কর, স্থির দৃষ্টি সামনে রাখ, তারপর চল। লেফট, রাইট, লেফট, রাইট- . ত্রিশঙ্কু ছােট ছেলেমেয়ে দুইটির ক্ষুধার্ত কান্নার ধ্বনি ভাসিয়া আসিল। নন্দলাল মুহুরি লাফাইয়া বিছানা ছাড়িয়া নামিল। উন্মুক্ত বাতায়নপথে শরতের প্রভাত সূর্যের উজ্জল ও সােনালী আলাে আসিয়া কক্ষে প্রবেশ করিয়াছে। নন্দলালের চোখের সম্মুখ হইতে নিত্রার যবনিকা মিলাইয়া গেল। প্রতিদিন সে মধ্যরাত্রে ক্ষুধিত জঠরে বসিয়া বসিয়া অন্ধকার রাতের কৃষ্ণবর্ণ দেবতাকে প্রার্থনা জানাইয়া বলে, তুমি চিরস্থায়ী হও। কিন্তু হায়, প্রতিদিন সে প্রার্থনা নিস্ফল হয়। আজও হইল।
ছেলেটির বয়স বছর দশেক। ছােট মেয়েটির বয়স আট বছর।
তাহারা কঁদিতেছিল।
ঘরে একদানা চাল নাই, এমন কিছুই নাই যাহ, দিয়া উহাদের
ক্রন্দন নিবারণ করা যাইতে পারে। অতএব নন্দলাল মুহুরির স্ত্রী বিমলা
আর মেয়ে সীতা বারান্দায় বসিয়া মিণ্ট আর টুনির কান্না একমনে
শুনিতেছিল। অনাহারেও তাহাদের বুদ্ধি লােপ পায় নাই।
“ক্ষিদে পেয়েছে মা”-মিন্টু, বলিতেছিল।
“মাগোচাষ্টি খেতে দে মা”—টুনি ফোপাইয়া ফোপাইয়া
কাঁদিতেছিল।
নন্দলাল বাহির হইয়া আসিল।
“ওরা কাঁদছে কেন গাে?”
বিমলা কোনও জবাব দিল না, শুধু একবার স্বামীর মুখের দিকে
চাহিয়া মুখ ফিরাইয়া লইল।”
সীতা বলিল-“ওদের ক্ষিদে পেয়েছে-
“কিছু নেই?
নন্দলাল মুহুরির দৃষ্টি স্তিমিত হইয়া আসিল।
“মা-শুই না? ওমা” টুনি ডাকিল।
“নেই? কিছু নেই ? দেখ, না মা একটু খুঁজে পেতে”-নন্দলাল
বলিল।
সীতা মাথা নাড়িল-“নেই বাবা-কিছু নেই।”
“আর পারি না গো মা চাটি খেতে দে।”
নন্দলাল ছেলেমেয়েদের দিকে চাহিল। যুবতী মেয়ে সীতা।
তাহার সে সৌন্দৰ্য্য কোথায় ? মিন্ট, টুনি—তাহাদের বুকের পাঁজরা-
গুলি গােণা যায়এক, দুই, তিন, চার-। দোষ নাই। কতদিন
এই সীমান্তে
যাবত একবেলা শুধু ফেন ভাত আর নূন খাইয়া তাহারা বাঁচিয়া আছে।
পঁচিশ টাকা মাহির নন্দলাল মুহরির মাথা ঝিম্ ঝিম্ করে।
সে আবার ঘরে ঢুকিল।
ছিল, ময়লা কামিজটা ধীরে ধীরে সে গায়ে দিল।
বিমলা নিঃশব্দ পদে তাহাকে অনুসরণ করিয়া কক্ষে প্রবেশ
করিয়াছিল। সে প্রশ্ন করিল, “কোথায় যাচ্ছ?”
*এই একটু বাইরে, দেখি যদি কিছু হয়।”.
“কি আবার হবে? কে তােমায় ধার দেবে বলত?”
“তাহলে?” নন্দলাল একবার স্ত্রীর দিকে চাহিল। শীর্ণা বিমলা
-তাহার দেহে একটি শাখা ও লৌহ বলয় ব্যতীত আর কিছুই নাই।
নন্দলাল কৈলাস করার দোকান চেনে। স্ত্রীর গহনা সে সেখানে
একে একে সব দিয়া আসিয়াছে। আর নাই।
“বিমলা-
*এা ?”
“তােমার কাছে কি সােনাদানা আর কিছুই নেই ?
বিমলা মৃদু হাসিয়া মাথা নাড়িল, “না”।
মিন্ট, কাদিতেছে—“অদিদি তাের পায়ে পড়ি।
“তাহলে? নন্দলাল আবার ভাবে।
“আমি বলছি শােন, পেতলের একটা থালা আর একটা ঘটি আছে,
তাই নিয়ে কাসারীর দোকানে যাও, দেখ যদি কিছু হয়।”
“খাৰে কিসে?”
“ঐ একটা থালাতেই চলবে—ডেীতে রান্না করব, কড়াই আছে,
দুটো বাটা আছে, বালতিটা আছে”
“ওতেই আমাদের চলে যাবে?”
“হ্যা গাে”—
“আচ্ছ। তাই দাও, তাই এনে দাও- টুনির কান্না ভাসিয়া আসে। ([ কমরেড ! তুমি আমায় গল্প লিখতে বলেছ। তােমার জন্যই লিখছি। ভােরের রঙীণ আলাে প্রজাপতির পাখার মত সুন্দর, ওতে অজস্র জীবনের বীজ চঞ্চল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শরতের শিউলি আর শিশির স্নাত দ্বাসের গন্ধ বাতাসে ভেসে এসে আমার বুকের ভিতরটা সুরভিত করে তুলছে। আমি বেঁচে আছি। করে। ভেবেছিলাম তােমায় শােনাবার জন্য একটি প্রেমের গল্প লিখব কারণ প্রেম শাশ্বত। কিন্তু কে জানত যে অসংখ্য মৃতের ক্ষুধিত প্রেতাত্মারা এসে আজ আমার সে প্রেমের গল্পকে ভুলিয়ে দেবে? কমরেড, আমায় ক্ষমা করাে।] অকস্মাৎ যেন কোথা হইতে ক্ষুধিত ব্যাঘ্র সম্মুখে লাফাইয়া পড়িয়া পথরােধ করিয়াছে। নন্দলাল থমকিয়া দাঁড়াইল। বাহিরের রকে বাড়ী- ওয়ালা তার বাবু বসিয়া। চারি মাসের বাড়ী ভাড়া বােল টাকা বাকী। “এই যে! তারক বাবু—কেমন আছেন? জোর করিয়া হাসি- বার চেষ্টা করিল নন্দলাল। ভারী খাপছাড়া সে হাসি। “ভাল নয় মশাই”—তারক বাবু বলিল, “আর থাকবই বা কোথেকে । আপনারা যা আরম্ভ করেছেন- “হেঁ হেঁকি যে বলেন- নন্দলাল বােকার মত হাসিয়া বলিল। অন্তরাত্মা তাহার শুকাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছে, মস্তিষ্কের বুদ্ধি কোথায় যেন উধাও হইয়া গিয়াছে। তারক বাবু ধমক দিয়া বলিল—“হেঁ হেঁ করবেন না মশাই-ভাড়া কবে দিচ্ছেন?” “দেব-দেব বই কি, আরও কয়েকদিন সবুর করুন তারক বাবু”- থালা আর ঘটিটাকে আড়াল করিবার চেষ্টা করে নন্দলাল।
১৪
এই সীমান্তে
তারক বাবুর দৃষ্টি বড় তী-নন্দলালের হাতের থালা ও ঘটি সে
লক্ষ্য করিয়াছে, খানিকক্ষণ কম করিয়া চাহিয়া থাকিয়া সে বলিল,
“কাল সকালে আসব-চব্বিশ ঘণ্টা সময় পাবেন, যদি কাল টাকা না
পাই তবে বাড়ীতে আমি তালা লাগাব।”
হন্ হন্ করিয়া তার বাবু চলিয়া গেল।
ক্ষণকাল বিঢ়ের মত নন্দলাল দাড়াইয়া রহিল।
মিণ্টর কান্নার শব্দ গলিতে দাঁড়াইয়াও শােনা যায়।
নন্দলাল পা বাড়াইল। চব্বিশ ঘণ্টা সময় আছে।
গলির শেষে, বড় রাস্তার সম্মুখে চরণ কাসারীর দোকান।
চরণ ভাল করিয়া থালাটি ও ঘটিট পরীক্ষা করিয়া দেখিল।
রীক্ষা শেষে সে গুলি একপাশে রাখিয়া হুকা টানিতে আরম্ভ
করিল।
“নেবে ত?” নন্দলাল আশঙ্কায় প্রশ্ন করিল।
“উ, হু—কিন্তু বড় পুরানাে
“না ভাই, মাত্র দু’বছর আগের কেনা”-
“ই-তা তিনটাকার বেশী ত’ হবে না।”
“বল কি ভাই! আজকালের বাজারে ওগুলাের দাম কম করেও
আট টাকা দেওয়া উচিত।”
“অন্ত দোকানে যান মশাই, অন্য দোকানে যান। লােকে খেতে
পায় না-থালা বাটি কিনলে কি পেট ভরবে যে দাম বাড়িয়ে বিক্রী
করব ?”
“আর কিছু দেও-তিন টাকা বড় কম।”
“এক কথা শুনবেন?”
বল ভাই।”
“পাচ টাকা।
ত্রিশঙ্কু
‘এক কথাই অবশেষে শেষ কথা হবে। পাঁচটি টাকা লইয়া
নন্দলাল উঠিল।
মুদির দোকানে গিয়া নন্দলাল এক পাশে বসিল।
“এই যে নন্দবাবু-কি খবর?” বিশু মুদী জিজ্ঞাসা করিল।
“চলে যাচ্ছে ভাই”—
“তা আমার আটটা টাকা কবে দেবেন?”
“দেব ভাই দেব-শীগগীরই দেব।”
বিশু মুদী একবার মৃদু হাসিল, পরে কি ভাবিয়া বলিল, “কি চাই?
এখন বলুন ত।”
“সাত সের চাল দিন।”
“কোন চাল?”
“এক সের সওয়া পাঁচ ছটাক করে যেটা
“দামটা দিন”
নন্দলাল টাকা পাঁচটি বাহির করিয়া বিশুর হাতে দিল। বিশু
তাহা গুণিয়া বলিল, “এতাে আগের বাকী টাকার, তবে তিনটে এখনও
বাকী রইল।”
“মানে?” নন্দলালের পায়ের নীচে মাটী নাই।
“মানে নগদ টাকা আরও পাঁচটি দিলে যা চান তা পাবেন।
টাকা জলে ফেলার অভ্যেস আমার নেই।”
ব্যাকুল কঠে নন্দলাল বলিল, “ভাই বিশুদয়া কর, আজ কিছু
নেই আমার কাছে।”
বিশু নিজের চকচকে ভুড়ীর উপর হাত বুলাইয়া বলিল, ‘
মাফ,
করুন নন্দবাবু, ব্যবসাতে দয়া নেই।”
“আমার ছেলে মেয়েরা আজ না খেয়ে থাকবে ভাই-*
“আমার উপায় নেই-আমি গরীব দোকানদার
এই সীমান্তে
“হাত জোড় করছি তােমার কাছে-দয়া কর”-
বিশু জবাব দিল না।
নন্দলাল নিজের অঞ্জলিবদ্ধ হাতের দিকে একবার চাহিয়া দাঁড়াইল।
পায়ে পড়িবে বিশুর ? সে ভবিল। পাগল, ভদ্রলােকের ছেলে সে
-নীচের, নির্দয়ের পা ধরিবে সে।
টলিতে টলিতে নন্দলাল রাস্তায় নামিল। মস্তিষ্কে কোনও চিন্তা
নাই, দেহে শক্তি নাই, দৃষ্টিতে জ্যোতি নাই, জঠরে অন্ন নাই।
ছেলে মেয়েদের কান্নার শব্দ যেন এখনও ভাসিয়া আসিতেছে।
বেলা দশটা।
বাড়ী।
• বিমলা আসিয়া দাড়াইল।
“বাজার করে আন নি গাে?
“কেন?”
টাকা নিয়ে নিল।”
“কে? বিমলার কণ্ঠস্বর কপিয়া উঠিল।
“বিশু মুদী।”
“তার টাকা পাওনা ছিল যে
বিমলা চুপ করিয়া রহিল।
নিঃশব্দতা।
“আপিস যাবে না?” বিমলা প্রশ্ন করিল।
“—যাব।” ..
“চান করে নাও”-
১৭ “অত ভেবােনা—ভগবান আছেন, একটা উপায় হবেই।” “হবে ? ভাল-নন্দলাল হাসিল। বিশীর্ণ, প্রেতের হাসি। নন্দলাল উঠিয়া দাঁড়াইল। “কোথায় যাও ?” “আপিস- “চান করবে না?” বিষল। চোখ মুছিয়া বলিল। “না—চান করলেই ক্ষিদে পাবে”— নন্দলাল ঘর হইতে বাহির হইল। এমন সময় কোথা হইতে টুনি আসিয়া মায়ের আঁচল ধরিয়া টান দয়া বলিল-“দিলে না—বামুন মাসীরা চাল দিলে না—আমায় এবার খতে দাও মা, আর পাচ্ছি না”- নন্দলাল থমকিয়া দাঁড়াইয়া, মেয়ের দিকে চাহিল। পাঁজার ডুগুলি গােনা যায়। এক-দুই-তিন-চার- [ কমরেড। বাইরে শরতের রােদ্দর শাণিত অস্ত্রের মত ক্ষুরধার য়ে উঠেছে,-বাতাসে শিউলির গন্ধ ম্লান হয়ে এসেছে, শিশিরের স্বপ্ন ভঙ্গে গেছে। কমরেড! আমার হাতের এ কলম আর ভাল লাগছে না। গছি—যদি আমার এই কাঠের কলমকে তুমি লােহার রাইফেলে পান্তরিত করতে পারতে। ভাবচি—যদি আমার বুকের ভিতরটা বহু প্রাচীন প্রস্তরের মত কঠিন ও মমতাহীন করে তুলতে পারতে। বিছি কমরেড। ভয় করােনা, শুধুই ভাবছি।) মার্চেন্ট অফিস। বড় বাবুর সম্মুখে গিয়া নন্দলাল দাঁড়াইল। যদি কয়টা টাকা . ম্যাডভান্স পাওয়া যায় এই আশায়। ৭
১৮
এই সীমান্তে
“এই যে নন্দলাল বাবু-একটা কথা আছে-
“আজ্ঞে”-
“আমরা ভারী দুঃখিত যে, আমাদের লােকজন কমাতে হচ্ছে—
আজকালকার অবস্থা ত জানেনই। তা ছাড়া ফার্মের অবস্থাও বিশেষ
ভাল নয়”-
‘আঙ্কে-
“তাই কাল থেকে অর্থাৎ তেইশ তারিখ থেকে আপনাকে আমরা
আর রাখতে পারব না”--
“আজ্ঞে ? কি—বছেন ?”
“ঠিক বলছি-তবে সত্যি আমরা ভারী দুঃখিত।
অকস্মাৎ নন্দলালের প্রাণের স্পন্দন যেন থামিয়া যায়।
বাহিরে শরতের উজ্জ্বল আলাের সমুদ্রে অজস্র প্রজাপতির মেলা।
“দয়া করুন বড় বাবু-নইলে বৌ আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে
মরে যাব”-
“আমি কি করব নন্দবাবু? আমিও ত’ আপনার মতই চাকর।
সায়েব দশ দিন বাদে আসবেন-তাকে বলবেন। হাকাল থেকে
আর তাহলে আপনি আসবেন না, আজ কাজ করুন।”
“বড় বাবু-দয়া করুন।”
“দয়া করার ক্ষমতা থাকলে করতাম বৈকি-যান, কাজ করুনগে।
আপনার মাইনে পয়লা তারিখে নিয়ে যাবেন।
বাতায়ন পথ দিয়া আকাশকে দেখা যায়। নীল, নীল আকাশ।
অপূর্ব।
সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেছে।
রাজপথে অজস্র জনতার ভীড়। কোলাহল, হাসি, নানারঙের
পােবাক, মুর্ণ আর আলাে।
ত্রিশ
ফুটপাথে একটি লােক মরিয়া পড়িয়া আছে। অতি সূক্ষ্ম চামড়ার
আবরণে আবৃত একটি কঙ্কাল।
নন্দলাল সেই মৃতদেহ দেখিয়া ভয়ে সরিয়া গেল।
তাহার পা ক্ষুধায় টলিতেছে—মাথা ঝিম ঝিম করিতেছে, দৃষ্টি
স্তিমিত।
কিছু নাই-পকেটে কিছু নাই।
ভিক্ষা করিলে কেমন হয় ?
এক পাশে দাড়াইল নন্দলাল। হাতটা বাড়াইয়া দিল জনতার
দিকে।
কিন্তু মুখ দিয়া আর কথা বাহির হয় না।
“দয়া কর”—অস্ফুট কণ্ঠে সে একবার বলিল।
জনতা নির্বিকার ।
হঠাৎ লজ্জায়, ধিকারে নন্দলালের হৃদয় ফুলিয়া উঠিল। সে
তাড়াতাড়ি হাত গুটাইয়া লইয়া এদিক ওদিক সন্ত্রস্তভাবে চাহিল।
, কেহ দেখে নাই। পাগল হইয়া গিয়াছিল সে। ভদ্রলােকের
ছেলে সে, ভিক্ষা করিবে।
বাড়ী আসিয়া পড়িয়াছে।
সন্ধ্যার অন্ধকারে বাড়ীর দ্বারপার্শ্বে একটি যুবককে দণ্ডায়মান
দেখিতে পাওয়া যায়—সে সীতার সহিত কথা বলিতেছে।
নন্দলাল দাঁড়াইল।
যুবকটি সীতার হাতে কি যে দিতে গেল।
“সীতা”—নলাল গর্জন করিয়া বলিল।
যুবকটি হাত গুটাইয়া লইয়া এক লাফে গলির অন্ধকারে মিলাইয়া
গেল।
পাথরের মত নিশ্চল হইয়া সীতা দাঁড়াইয়া রহিয়াছে।
এই সীমান্তে “কে ওই ছেড়া- “ও বাড়ীর নিমুদা”- “কি দিচ্ছিল তােকে ?” F- সীতার চক্ষু সেই অন্ধকারে জ্বলিয়া উঠিল, “খাবার অ-আর পাচ্ছি না। নন্দলাল গর্জন করিয়া উঠিল—“চুপ-খবরদার-ফের যদি দেখি, তবে তােকে খুন করে ফেলব। ক্ষিদে সহ করতে পাচ্ছিস না? বেশ ত’ তবে মরু-শুকিয়ে, কুঁকড়ে, তিলে তিলে ম”— “কি হয়েছে ?” বিমলার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শােনা গেল। “কিছু না নিজের ঘরে গিয়া বসিল নন্দলাল। “কিছু পেলে গাে? বিমলা প্রশ্ন করিল। “না” বিমলা ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। কোথায় এবং কেন গেল তাহা নন্দলাল মুহরি জানে। বিমলা কঁদিতে এবং ভাবিতে গেল। বাহিরে চীৎকার শােনা গেল—“নন্দবাবু—অ’ মশাই”— “পাশের বাড়ীর সুরেশ বাৰু”—বিমলা বাহির হইতে বলিল। “কেন ডাকে?” “জানি না।” নন্দলাল বাহিয়ে গেল। বাহিরে সুরেশ বাবু মিণ্ট আর টুনির কাণ ধরিয়া দাড়াইয়া, সঙ্গে আরও দু' তিন জন লােক।
O ত্রিশ ১১ “এই যে মশাই-বেশ ছেলেমেয়ে আপনার, হাড়ে হাড়ে বজ্জাতি। চোর মশাই—চোর এরা”- “কি বলছেন।” “বলছি কি আর সাধে-বৌ সবে রান্নাঘর থেকে ঠাকুর ঘরে গেছে —আর আপনার ছেলেমেয়ে এদিকে রান্না ঘরে গিয়ে সব গােগ্লাসে গিলছে। ভদ্র লােকের ছেলেমেয়ে—একি ব্যভার মশাই! লজ্জায় যে মরে যাই”- নন্দলাল হাত জোড় করিয়া বলিল, “মাফ করুন সুরেশ বাবু-ওদের হয়ে আমি মাফ চাইছি।” “বিলক্ষণ—তার কি দরকার। আপনি এদের আগে ঠিক করুন- বাল্যকালে চুরি বিদ্যাটি বড় মারাত্মক যে মশাই “আজ্ঞে হা”- ছেলেমেয়ে দুইটি কঁদিতেছে। সুরেশ বাবু তাহাদের যথেষ্ট প্রহার করিয়াছেন। তবুও নন্দলাল তাহাদের চুলের মুঠি ধরিয়া হিড়হিড় করিয়া টানিতে টানিতে ভিতরে লইয়া গেল। “আহা ছেড়ে দাও—ছেড়ে দাও গাে-যথেষ্ট মার মেরেছে ওরা- বিমল বলিল- “না বিমলা-না।” “মরে গেলাম গাে মা-মরে গেলাম”—তারস্বরে চীৎকার করিয়া টুনি কঁাদে। মিন্টুর চোখে জল, কিন্তু মুখে শব্দ নাই। “আজ তােদের মেরেই ফেলব-চুরি কৰ্তে শিখেছিস শেষে ! এ? হঠাৎ হাত তুলিয়া ছেলেমেয়েদের কিল চড় মারিতে গিয়াই নন্দলালের হাত অবশ হইয়া আসিল। আহা, ছেলেমেয়েগুলির বুকের পাজরাগুলি গােনা যায়। এক-দুই-তিন-চার।
১০২
এই সীমান্তে
রাস্তায় দৃষ্ট সেই মৃতদেহের ছবিটি নন্দলালের চোখের সম্মুখে
ভাসিয়া উঠিক।
মুহূর্তে গলা নামাইয়া সে বলিল, “বেশ করেছিস তােরা, আমি বাপ
হয়েও খেতে দিতে পারি না বলে তােরা না খেয়ে থাকবি কেন? চুরি
করে খাবিনিশ্চয় খাবি”—
কথা শেষ না করিয়া বাহিরের অপ্রশস্ত বারান্দার এক পার্শ্বে গিয়া
নন্দলাল দাড়াইল।
অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সে দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল।
বাড়ীতে তাহার কষ্ট হইতেছে।
গলির ভিতরটা ভারী অন্ধকার।
[ কমরেড,! আমি তােমায় বিশ্বাস করি। আমার এই কাঠের
কলমকে তুমি লােহার রাইফেল করে দাও-আমার ভীরু, পলাতক ও
দুৰ্বল দেহ মনকে তুমি পাথর করে দাও। করেড-আমার কথা রাখ ।]
উদ্দেশ্যহীন, নিতান্ত উদ্দেশ্যহীন ভাবে নন্দলাল পথে পথে ঘুরিয়া।
বেড়াইল। আধাে আলাে, আপ অন্ধকারের মধ্য দিয়া মহানগরীর
বিচিত্র রূপের কালাে ছবি দেখিয়া দেখিয়া নন্দলাল ক্লান্ত হইয়া পড়িল।
আবার বাড়ীর দিকে।
রাত বাড়িয়াছে।
বিমলা”
“দরজা খােলাই আছে, এসাে”-বিমলার ডাক শােনা গেল।
ঘরের ভিতর অন্ধকার। কেরাসিন তেলের পয়সা নাই।
বিমলা-
* “ঘুমােওনি?”
এই সব অর্থহীন প্রশ্নের জবাব দিতে বিমলার ভাল লাগে না।
.
ত্রিশ
১০৩
নন্দলাল খানিকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
রাত্রি গভীর হইতে চলিল।
দূরে আকাশে চাঁদ উঠিতেছে। অন্ধকার একটু স্বচ্ছ হইয়া আল । অস্পষ্ট
অালোর ভৌতিক পরিবেষ্টনীর মধ্যে নন্দলাল দেখিল সীতা বারান্দার
একপাশে শুইয়া রহিয়াছে, শীর্ণা যােগিনীর মত। তাহার তৈলহীন
রুক্ষ্ম চুলের রাশি আর ছিন্ন শাড়ীর অঞ্চল চারিদিকে ছড়াইয়া রহিয়াছে।
নন্দলাল বিমলার দিকে চাহিল। বিমলা যেন একটি প্রেতিনী।
তাহাকে দেখিয়া নন্দলাল মুহুরি শিহরিয়া উঠিল।
“বিমলা”—সে ডাকিল।
“কি?” ক্লান্তকণ্ঠে বিমলা উত্তর দিল।
“মিণ্ট আর টুনি কোথায়?”
“ওরা ঘরে শুয়েছে-
“ওঃ-আচ্ছা বিমলা’
“কিছু খেয়েছ?”
বিমলা জবাব দিল না।
“কোখেকেই বা খাবে? আমি স্বামী, আমি কি কিছু স্নানতে
পারি ?” নিজের চাকুরীর বিয়ােগান্ত সংবাদটা একবার বিমলাকে
জানাইতে ইচ্ছা হইল তাহার, কিন্তু পরমুহুর্তেই সে ভাবিল যে কি হইবে
তাহা জানাইয়া, পরে আপনা হইতেই জানিবে।
নন্দলাল উষ্ণ স্পর্শে চমকিয়া টুঠিল। বিমলা নিকটে সরিয়া আসিয়া
তাহার দেহের উপর হাত রাখিয়াছে।
“তােমার কষ্ট হচ্ছে, না গাে? বিমলা রুদ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করিল।
ছেলেমানুষের মত বিমলাকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া নন্দলাল বলিল,
“আমি তুমি ত ব নই বিমলা, ভাবছি ছেলেমেয়েগুলির কথা-
১৪
এই সীমান্তে
.
বিমলা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিল।
অনেকক্ষণ তাহারা অমনিভাবে বসিয়া রহিল। পরস্পর বুকের
ভিতরে যে শূন্যতার আলােড়ন আর জ্বালা জ্বলিতেছিল তাহা যেন
প্রত্যেকে অনুভব করিবার চেষ্টা করিল। অবশেষে বিমলা এক
সময়ে নিজেকে মুক্ত করিয়া লইল।
সে বলিল-“রাতটা কাটিয়ে দাও কোনও রকমে-ভগবান আছেন,
একটা কিছু হবেই।”
ভগবান? নন্দলাল হাসিল, “তুমি শােও বিমলা”-বিমলা মাটীতে
শুইয়া পড়িল।
ভগবান? নন্দলাল আকাশের দিকে চাহিল। একখানি শীর্ণ
চাঁদের আলােতে আকাশ অস্পষ্ট ভাবে আলােকিত-নক্ষত্রের দীপ্তি
বিশেষ স্লান হয় নাই।
আচ্ছা—তারা গুণিলে কেমন হয়? নন্দলাল ভাবে।
নন্দলাল ভাবিতে থাকে। রাজপথে দেখা সেই মৃত লােকটির মুখ
মনে পড়ে। অবশেষে চাদ অন্তোন্মুখ হয়।
নন্দলাল ভাবে। চাকুরী গিয়াছে। বাজারে দেন।
প্রাণধারণের মত কিছুই নাই। দিন দিন অনাহারে দেহ শীর্ণতর
হইবে। বাঁচিবার কি উপায় নাই? আছে। সীতার কাছে অন্ধকারে
অনেক যুবক, অনেক পুরুষ আসিবে। সে টাকা বাজাইয়া গুণিয়া
লইবে। মিন্টু, আর টুনি পরের বাড়ীর আনাচে কানাচে চুরি করিয়া
খাদ্যলাভের চেষ্টা করিবে। পথের প্রান্তে কোথাও বসিয়া বিমলা
হয়ত ঘােমটাটা একটু টানিয়া লিলিকে একটি হাত বাড়াইয়া দিয়া
ব্যস্ত, মৃত্ত
ণেশের নয়া ভিক্ষা করিয়া ক্ষীণকণ্ঠে বলিবে—“দয়া কর
গো বাবা-বাচাও-চাটি খেতে দাও—আর সে ? মানে নন্দলাল
মুহুরি? না, নন্দলাল এই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখিতে চাহে না। কাল
।
ত্রিশ সকালে তারকবাবু আসিবে। না, নন্দলাল ভিক্ষা করিতে পরিবে না স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে লইয়া নীচে নামিতে পারিবে না। সে ভদ্রলােক। তাহা হইলে কি করিবে নন্দলাল ! উপায় আছে বই কি? নিজের পরিধেয় খুলিয়া নন্দলাল ভাল করিয়া পাকাইল। পরে রান্না ঘরে গিয়া জানালার শিক ধরিয়া উপরে ঝড় লণ্ঠন টাঙ্গাইবার যে হুটা ছিল তাহাতে সে তাহা কোনও রকমে বাঁধিল। এই বাঁধাবাঁধিতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগিল, পরিশ্রমে তাহার অনাহারে দুৰ্বল দেহ থরথর করিয়া কাপিতে লাগিল। অবশেষে কাপড়ের দড়ির মাঝে একটি ফাস তৈয়ার করিয়া অতি সন্তর্পণে নন্দলাল তাহা নিজের গলায় পরিল। তারপরে হঠাৎ সে নিজের দেহ ছাড়িয়া দিল। কাপড়ের ফাস গলা বসিতে লাগিল। বিমলা, সীতা, মিন্ট, টুন্নির মুখের ছবি তাহার বিস্ফারিত দৃষ্টির সম্মুখে কয়েকবাল ভাসিয়া । গেল। অবশেষে নন্দলাল মুহুরির জীবন-মঞ্চের যবনিকা পাত হইল। কিন্তু তাহার পরেও তাহার দেহ মৃত্যুকালীন বেগের ও মুক্তিপ্রয়াসের নিল চেষ্টার ফলে খানিকক্ষণ ধরিয়া দুলিতে লাগিল। অবশেষে তাহাও থামিল। নন্দলাল মুহরি মরিল। [ কমরেড, নন্দলালেরা মরবেই! ত্রিশঙ্কুর বংশধর ওরা—স্বর্গ আর মর্ত্যের মাঝামাঝি যে অনন্ত শুন্য তার মধ্যে ওরা চিরদিন দুলবে। নন্দলালেরা মরবেই। আগুণ জ্বালিয়ে লােহ পুড়িয়ে আমি লাল করেছি। আমার একটি রাইফেল চাই। কমরেড। তােমার হাতুড়ীটা তুলে ধর, আমার উত্তপ্ত লাল লােহা নরম দুয়ে আছে তাকে তুমি রূপ দাও।
এই সীমান্তে হঠাৎ ঝড় উঠিল। হাহ শব্দে পশ্চিম দিগন্ত হইতে অগ্নিময় ধূলাজালে বৈশাখী আকাশের সূৰ্যদগ্ধ শাণিত দীপ্তিকে স্নান করিয়া দিয়া ঝড় আসিল। পাগলের মত। আর চলা যায় না। হারাণ ডাকিল, “ফুলী- ফুলী ক্লান্তপদে পশ্চাতে দাঁড়াইয়া পড়িয়াছিল, সেখান হইতেই সে ক্ষীণকণ্ঠে উত্তর দিল, “কি?” “কষ্ট হইতাছে-না?” ফুলী মাথা নাড়িল। রৌদ্রে তাহার কাতর মুখমণ্ডল কালাে হইয়া উঠিয়াছে-তদুপরি সে গর্ভবতী—পরিশ্রমে, অবসাদে সে ভাঙ্গিয় হারাণের কষ্টও কম নয়। তাহার ডান পাটা একটু ছােট-চলাটা তাহার নিকট রীতিমত একটি কসরৎ। কিন্তু না চলিয়া ভিক্ষুক-দম্পতির উপায় নাই। একজায়গায় আজ- কাল একবারের বেশী ভিক্ষা জোটে না। “আর, এই গাছতলায় একটু জিরাইয়া লই- ফুলী নিরুত্তরে মাঠের প্রান্তের শিমূলগাছটার তলায় গিয়া বসিল। হারাণ পিঠের বোঁচকাটা নামাইয়া পাইতে লাগিল । ঐ বোঁচকাটাই তাহাদের সংসার। তিনটি টিনের বাটী, একটি খালা, একটি গেলাস। রাস্তায় কুড়াইয়া পাওয়া দু’একটা সিগারেটের কৌটা; ছিন্ন কাপড়ের কতকগুলি টুকরা ও একটি অতি ময়লা কথা। হারাণ ফুলীর দিকে চাহিল। ফুলী হাঁপাইতেছে। তাহার ললাটে, ০ •এই সীমান্তে নাকে, গালে চকচকে ঘামের স্রোত। তাহার উজ্জল শ্যামবর্ণ মুখ আর রুক্ষ ও কুঞ্চিত কেশের উপর ধূলার আস্তরণ পড়িয়াছে। গর্ভের ভারে তাহার সুগঠিত দেহের সৌন্দৰ্য্য চাপা পড়িয়াছে, অনাহারে তাহার চোয়াল দুইটি উঁচু হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু তবুও তাহার চোখে, তাহার মুখমণ্ডলে এক অপূর্ব নিগ্নতা, এক অপূর্ব শ্ৰী যাহা ক্ষুৎপিপাসায় কাতর ও অবসন্ন হারাণের স্নায়ুকোষেও উন্মাদনা জাগায়। “ফুলী”- “কষ্ট হইত্যাছেনা? ফুলী মাথা নাড়িল—“না”- “মিছা কথা কইস না--আমি বুঝি সব”- ফুলী উত্তর দিল না। নিরুত্তরে সে আকাশের দিকে ক্লান্ত চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া রহিল। ধূলায় ঢাকা কাচের মত আকাশে উত্তপ্ত সূর্যালােকের সঙ্গীত। হারাণ খানিকটা আপনমনেই বলিয়া চলিল, “সব বুঝি—সব বুঝি, কিন্তু কি করুম ক’, আমাগোর কপালের দোষ- বাতাসের স্রোতে ধুলার ঘূর্ণাবর্ত। দূরে প্রান্তরের শেষ সীমানা কুয়াশায় ঢাকা মনে হয়। ঝড়ের শব্দে যেন সহস্র সহস্র সৈনিকের মত্ত কলরব। হঠাৎ হারাণ চমকিয়া উঠিল। ফুলী যেন যন্ত্রণায় কাত্রইল। “কি হইচে ফুলী?” ফুলীর মুখমণ্ডল বেদনায় বিবর্ণ। বায়ুবেগে তাহার মাথার রুক্ষ চুল উড়িতেছে। দুলে মাঠের উপর শুষ্ক তৃণরাশি উড়িতেছে। “ও ফুলকুমাৰী-কি হইছে?” হারাণ আদর করিয়া ব্যকটে প্রশ্ন করিল। গৃহ নাই, অর্থ নাই, আশা নাই, এই নিরক্ষণ
১০৮
এই সীমান্তে
পরিবর্তনশল, ভয়সঙ্কুল যাযাবর জীবনের একটি বন্ধন, একটিমাত্র
ঐশ্বৰ্য্য ঐ ফুলী। হারাণ আদর করিয়া তাহাকে ‘ফুলকুমারী’ বলিয়া
ডাকিতে পারে বৈকি।
ফুলী এতক্ষণে কথা বলিল, জোরে নিঃশ্বাস টানিয়া লইয়া মৃদুকণ্ঠে
সে বলিল, “একটু ব্যথা মনে হইতাছে”-
“ব্যথা! কিসের ব্যথা?” হারাণ বুঝিতে পারে না।
ফুলী বিশীর্ণ হাসি হাসিল-“আইজ হয়ত”—
হারাণ বুঝিতে পারিল। ভয়ে তাহার মুখমণ্ডল পাংশু হইয়া গেল,
মুহূর্তে তাহার বুদ্ধি লােপ পায়।
“তা হইলে কি অইব? সে ফুলীকেই প্রশ্ন করিল।
ফুলী একটু হাসিল, “কি আবার অইব—আবার উঠ—একটা
গাঁওতে পৌছাইতে হইব।”
হারাণু দূরের ধূলিজালে বিলীয়মান বনরেখার দিকে চাহিয়া বলিল
—“অই একটা গাও—ঐদিকে চল—কেমন ?
ফুলী উঠিয়া দাঁড়াইল।
“কষ্ট হইব ত, আমার কান্ধে ভর দিয়া চল।” হারাণ
বলিল।
“না, কেউ দেখব।”
“কেডা দেখবরে পাগলী-কেউ ত’ কাছে নাই।”
ফুলী মাথা নাড়িল, “না।”
তাহারা চলিতে লাগিল।
ফুলী চলিতে চলিতে মাঝে মাঝে হঠাৎ থমকিয়া দাড়ায় আর
অনুভব করে যে, ভলপেটে একটা ক্ষীণ ব্যথার অন্তরাল হইতে
মাঝে মাঝে ভী সুচ্যগ্রফলার আঘাতের মত এক
একটা উৰ্দ্ধমুখী জালা
ঘুরিয়া ঘুরিয়া উঠিতেছে।
এই সীমান্তে
হারাণের ডান পা ছোেট। মাটী ছাড়িয়া উপরে উঠিয়া ডানাভাঙ্গা
পাখীর মত শূন্যে কয়েকবার পাক খাইয়া হঠাৎ আবার মাটীতে পড়ে।
আবার ওঠে।
বৈশাখের রৌদ্রে যেন অসংখ্য সঙীণের নিষ্ঠুর দীপ্তি।
একটা খাল পার হইয়া তাহারা গ্রামটিতে ঢুকিল। গ্রামের নাম
নাকি নিশানপুর। গ্রামের এক প্রান্তে যেখানে হাট বসে তাহারই
অনতিদূরে তাহারা আস্তানা গাড়িল।
বেলা তখন দুই প্রহর। ফুলীর বেদনা বাড়িয়া চলিয়াছে।
হারাণ দুইটি ইট যােগাড় করিয়া আগুন জ্বালাইল। তিন চার
মুষ্টি ক্ষুদকুড়া ছিল ময়লা, পাঁচমিশালী। তাহাই ধুইয়া সে টিনের বড়
বাটিটায় চাপাইয়া দিল।
ফুলী যন্ত্রণায় ঘামিলেছে। সে বলিল, “বাইক, আমিই বন্ধি”-
হারাণ হাসিল-“হ হইছে, ত’র যে কষ্ট হইতাছে আমি বুঝি
দেখতাছি না? আর রন্ধনের আছেই বা কি রে যে কষ্ট হইব
আমার” ?-
আজ বােধ হয় হাটবার নয়—তাই ভীড় নাই। মাঝে দু'একজন
চালডালের দোকানটিতে আসে। তাহাদের মধ্য হইতেই দু'একজন
মাঝে মাঝে তাহাদের পাশ দিয়া চলিয়া যায় বেতবনের পার্শ্বস্থিত সরু
পথটা ধরিয়া।
অধিকাংশই দরিদ্র, চাষী শ্রেণীর লোেক।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাটিটার মধ্যে জল ফুটিতে থাকে টগবগ করিয়া ।
অসিদ্ধ ক্ষুদের একটা গন্ধ ঝড়ের পরেরকার স্তিমিত বায়ুতরঙ্গে পাক
খাইয়া বেড়াস। হারাণের শুক জিহ্বাটা লালায় সিক্ত হইয়া উঠে।
ফুলীও একবার তাকায়।
এই সীমান্তে দুই জন লােক আসিতেছিল। অল্পবয়স্ক, একটু বাবু গােছের। -বাবু-দমা করেন—হারাণের কণ্ঠ হইতে আপনা হইতেই কথা- গুলি বাহির হইয়া আসে। লােক দুইটি ফিরিয়া চাহিল। যে লােকটির গায়ে নীলরঙের জামা ছিল, সে থমকিয়া দাড়াইল। “বাবু—একটা পয়সা দ্যা বাবু”- লােকটি সঙ্গীকে ডাকিয়া বলিল,-“আরে দ্যাখ, সঙ্গী মাথা নাড়িয়া হাসিল। তাহাদের চো রাত্রি। “বাবু'- -কি চাসরে?” “কিছু খাই নাই বাবু-একটা”- “পয়সা-না? চুলায় কি সিদ্ধ হইতেছে তবে?” “একমুঠা ক্ষুদ—কিন্তু মাের যে দুইজন প্রাণী”— “হ” লােকটি হঠাৎ ফুলীর দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিল, “ওটি কে ত? কইখিকা ফুসলাইয়া আলি ?” হারাণের মস্তিষ্কে মুহূর্তে আগুন জ্বলিয়া উঠিল—তা কইবেন না বাবু-উটি আমার বৌ”- “ইস (-হালার ত্যাজ দেখছস রে ছিদাইমা-চ”— ছিদাম কি যেন বিড়বিড় করিয়া বলিল। পরক্ষণেই দুইজনে হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিয়া চলিয়া গেল। রাণ অবরুদ্ধ ক্রোধে দাতে দাত চাপিয়া বলিল, “শালা- শয়ার- E
এই সীমান্তে
১১১
ফুলী কাত্যাইতেছে।
“যন্ত্রণা বাড়ত্যাছে নাকিরেও ফুলকুমারী
“হ। আইজই অইব”—
একটু পরেই ক্ষুদ-সিদ্ধ নামিল।
একটু লবণ মিশ্রিত সেই উত্তপ্ত ও তরল পদার্থের স্পর্শে জিহ্বা
যখন শিহরিত হইয়া উঠিল তখন তাহাদের চোখে জল আসে।
কিন্তু হায়, চার পাঁচ গ্রাসের পরেই তাহা নিঃশেষ হইয়া গেল।
পেটের মধ্যে একটা হাহাকার উঠিল।
বেলা পড়িয়া আসিতেছে। রৌদ্রের তাপ এখন পড়ন্ত। বেতের
ডগাগুলি দুলিয়া উঠিতেছে, বাঁশের পাতাগুলি সস শব্দ করিয়া
কি যেন বলিতেছে, দূরে কোথায় যেন একদল ছেলে কোলাহল করিয়া
খেলিতেছে। বেলা পড়িয়া আসে।
বিকালবেলায় হাণ ভিক্ষায় বাহির হইল।
কেহই দিল না। সন্ধ্যার দিকে ভিক্ষা দেওয়া গ্রামের রীতি নহে।
কেবল একটি বাড়ীতে দুই মুষ্টি ধানমিশানাে ক্ষুদকুড়া সে
পাইল।
সন্ধ্যার পর হইতেই ফুলীর যন্ত্রণা বাড়িল।
বাজারের দিকে ক্রমশ নির্জন হইয়া আসিতেছে। কেবল দুরে
খালের বাঁকে একটি নৌকা বাঁধা—যাত্রীদের লইয়া মীরপুরগামী
সাড়ে আটটার হােট জাহাজটিতে করিয়া পৌছাইয়া দিবে ধলেশ্বরীর
তীরবর্তী কল্যতিয়ায়। অন্ধকার গাছপালার পাতার আড়ালে নিবিড়
হইয়া উঠিতেছে।
ফুলী গােঙাইতেছে। পশুর অবরুদ্ধ আর্তনাদের মত, তাহা হারাণের
কাছে ভয়ঙ্কর মনে হয়।
১২
এই সীমান্তে
=
ওগাে
“কি ফুলী ?* হারাণ ব্যগ্রকণ্ঠে উত্তর দেয়।
ফুলীর ক্ষীণকণ্ঠ শােনা যায়-“একটু জল গরম কইয়াে-আর
ছুরিটারে একটু আগুণে পােড়াইয়া লও—কাজে লাগবে-
“আইচ্ছ। এহনই করুম নাকি?”
“না—একটু পরে”—
অসহ্য যন্ত্রণাকে দাতে দাত দিয়া চাপিবার চেষ্টা করে ফুলী। তাহার
বড় বড় নিঃশ্বাস ভাসিয়া আসে।
ক্রমে চারিদিক আরও নির্জন হইয়া উঠে, হাটে আর কারও
কথাবার্তা শােনা যায় না, গয়নার নৌকাটা কয়েকবার হাঁক দিয়া
ছাড়িয়া দেয়, খালের জলের ছলাৎছল শক পূবের বাতাসে পাল
তুলিয়া চলে, অন্ধকারের রঙ্গমঞ্চে ঝি ঝি পােকারা তাহাদের বহু
পুরাতন অথচ রহস্যমধুর আবহসঙ্গীত আরম্ভ করিয়া দেয় আর শুষ্ক
পাতার উপর মাঝে মাঝে কি সব পােকা মাকড় চলাচল করায় সর্বস
শক উখিত হয়। রাত বাড়ে।
আরও একটু পরে অন্ধকার আবার স্বচ্ছ হইয়া আসিতে থাকে
দূরে পূর্ব দিগন্তে আধফালি চাঁদ দেখা দেয়।
“ওঃ-মাগো-মা”—ফুলীর কান্না শােনা যায়।
হারাণের বুকের ভিতর ধ্বৰু করিয়া উঠিল, ফুলীর সেই কান্নার শব্দে
তাহার মাথার ভিতরটা ঝিম্ ঝিম্ করিতে লাগিল।
“কি হইছে গাে? ফুলকুমারী—ও ফুলকুমারী”-
ফুলী সাড়া দিল না।
“ও ফুলকুমারী”-
“আগুণ জ্বালাইয়া জলটা গরম কর এইবার
আইচ্ছা-
০
এই সীমান্তে
১১৩
চাদের আলাে আরও স্পষ্ট হইয়া আসিতেছে।
হারাণ আগুণ জ্বলাইল। আগুণের কম্পিত আলাের বেশ
পড়ে ফুলীর মুখের উপর। ঘামে ও যন্ত্রণায় তাহার মুখ বিকৃত
হইয়া উঠিয়াছে।
“ওঃ-ওঃ"দাঁতে দাঁত চাপিয়া ফুলী গােঙায়।
হারাণ দিশাহারা হইয়া উঠে।
হঠাৎ ফুলী উঠিয়া বসিল-হামাগুড়ি দিয়া সে সামনের গাছের
আড়ালে যেখানে আলাে একটু অস্পষ্ট, সেইখানে গেল।
“ফুলী—কৈ যাস?” হারাণ ভীতকণ্ঠে প্রশ্ন করিল।
“এদিকে আইসাে না”- ক্ষীণকণ্ঠে ফুলী উত্তর দিল।
হারাণ আগুণের দিকে চাহিয়া পাথরের মত বসিয়া রহিল। জলের
পাত্রে জল টগবগ করিয়া ফুটিতেছে। আকাশের একফালি চাঁদের
আলাের সহিত আগুণের আলাে মিশিতেছে। ফুলীর যন্ত্রণাকাতর
গােঙানির শব্দ মুহুহু শােনা যায়। গ্রামের রাত নিঃশব্দ।
-উঃ-আর্তনাদ।
হারাণের শরীর কঁপিয়া উঠিল।
অনেকক্ষণ নিঃশব্দ।
হঠাৎ একটি শিশুর কান্না শােনা গেল।
“ফুলী”—হারাণ উত্তেজিতভাবে চাপা গলায় ডাকিল।
“গরম জল আর ছুরি লইয়া আস”-ফুলীর কথা শােনা গেল। যেন
কবরের নীচ হইতে কেহ কথা বলিতেছে।
হারাণ ছুটিয়া গেল। আশঙ্কায়, উত্তেজনায়, আগ্রহে ও ভালবাসায়
তাহার সারা দেহ কঁপিতেছে।
“কি ফুলী ?*
রক্ত আর ক্লেদের মাঝে ফুলী পড়িয়া আছে।
১৪ এই সীমান্তে “নাড়ীটা কাট- হারাণ তাহা কাটিল। এই কাপড় দিয়া নাড়ীটা বান্ধ- হারাণ বাঁধিল। “পােলা না মায়া ?” “পােলা”— ফুলী আর কথা বলিল না। “ফুলী-এবার কি করুম?” ফুলী উত্তর দিল না। হারাণ তাহার উপর ঝুকিয়া ডাকিল-“ফুলকুমারী”— ফুলী মূচ্ছ। গিয়াছে। কোলের উপর ছেলেটা আবার ক্ষীণকণ্ঠে কাঁদিয়া উঠিল । ক্লেদাক্ত সজীব মাংসপিণ্ড। তাহার ক্ষীণ বক্ষস্পন্দন হারাণের হাতের শিরা বাহিয়া তাহার সারাদেহে পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়ে। ধুক ধুক ধুক ধুক। নূতন জীবনের স্রোতের শব্দ। হারাণ ছেলেটাকে বুকে চাপিয়া ধরিল। * ভােরের আলাের সঙ্গে সঙ্গেই হারাণের ঘুম ভাঙ্গিল। গাছপালার পাতার উপর সুবর্ণের স্পর্শ—চতুর্দিকে গভীর প্রশান্তি। নিজের পারি- পার্শ্বিককে হারাণ কতকটা উপলব্ধি করে, ভাল লাগে। কিন্তু সে কতক্ষণ? একটু পরেই যখন চোখের সামনে সব কিছু আরও পরিষ্কার হইয়া আসিল, যখন বিগত নিদ্রার জড়তা ক্রমে অন্তর্হিত হইল, তখন হারাণ বুঝিল যে, 'চতুর্দিকের গাছপালার শ্যাম শোভা, সূর্যালােকের সুবর্ণমদিরা, আর প্রভাত বায়ুর স্নেতে প্রবহমান প্রশান্তিই সব কিছু
এই সীমান্তে
১১৫
নয়। তাহাদের অন্তরালে নিরন্তর সংগ্রামশীল জীবনের আর্তনাদ
আছে, অভাব আছে, ক্ষুধা আছে।
নিজের জঠরের পীড়াদায়ক শূন্যতা সম্বন্ধে হারাণ সচেতন
হইল।
ফুলী নির্জীবের মত ঘুমে অচৈতন্য। রাতারাতি তাহার আকৃতির
বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটিয়াছে। কোন প্রেতলােক হইতে যেন সে
সবেমাত্র ফিরিয়া আসিয়াছে। যন্ত্রণায়, বেদনায় তাহার চক্ষু আরও
কোটরগত হইয়াছে, বর্ণ মলিনতর হইয়াছে। বুকের পার্শ্বে সদ্যোজাত
ছেলেটা। শীর্ণ, কঙ্কালসার, অসহায় মানব-শিশু—একটি চামচিকার
মত ক্ষুদ্র।
হারাণ উঠিয়া দাড়াইল। তিনটি প্রাণীর ক্ষুধা।
কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক ধরিয়া সারা গ্রাম ঘুরিয়াও পেট ভরিবার মত সে
কিছুই পাইল না। ভিক্ষার পাত্রে দুই মুষ্টি চাল আর তিন চারিটি আলু
ছাড়া আর কিছুই পড়িল না।
কিন্তু চাই-ই। কয়েকটা পয়সা, না তাে খানিকটা দুধ। ফুলীর
দুৰ্বল শরীর।
একটি অবস্থাপন্ন গৃহস্থের বাড়ীতে গিয়াসে দাড়াইল।
“এক মুঠি ভিক্ষা দ্যা গাে বাবু”-
কোনও উত্তর পাওয়া যায় না।
“বাবু-দয়া করেন বাবু-ভগমান আপনাদের রাজা কইরবাে।”
“কেডারে ?” একজন বয়স্ক লােক বাহির হইয়া আসিল। হাতে
হুকা।
“দয়া রেন বাবু
“য়া! দয়া করণের দিন গেছে গিয়া-আগে বাড়, আগে
বাড়—
১১৬ এই সীমান্তে t “দুইটা পয়সা স্থান বাবু-আপনাদের ভগবান অনেক দিব। লােকটি মুখ বিকৃত করিয়া উত্তপ্তকণ্ঠে বলিল, “আরে থাম বাবা- অনেক দিব না কচু-যাও-ও- “আমার বৌএর কাইল রাতে একটি ছেইলা হইছে বাবু-একটু দুধ খাওয়াইতে হইব-বড় কাহিল। দ্যান বাবু—দুইটা পয়সা জান্ বাবু”- লােকটি কলিকায় ফু দিতেছিল, হঠাৎ মুখ তুলিয়া জিহ্বাটা সজোরে তালুদেশে স্পর্শ করিয়া এক অদ্ভুত শব্দ সৃষ্টি করিয়া বলিল, “ইল্লো— হালার সখ, দেইখা বাঁচি না। দুধ চাই—দুধ-ক্যান? তােমার বৌএর পােলা হওনের কি দরকারটা ছিল?-যাও-যাও- লােকটি ভিতরে চলিয়া গল । দূর দিগন্তের পরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকাইলে যেমন দিগন্ত পৰ্য্যন্ত আলােকিত হইয়া উঠে তেমনি লােকটির কটুক্তির জালা হারাণের রক্তস্রোতে আগুন জ্বালাইয়া দিল আর সেই আগুনের সর্পশিখার দীপ্তি তাহার ক্ষীণ শিরাগুলি বহিয়া তাহার ঘােলাটে, নিষ্প্রভ চক্ষুতারকাদ্বয়কে ক্ষণকালের জন্য রক্তাভ ও উদ্ভাসিত করিয়া তুলিল। ফিরিয়া গিয়া সে ভিক্ষালব্ধ চাল আর আলু দিয়া যাহা রাঁধিল তাহা ফুলীকে জোর করিয়া খাওয়াইল। খানিকপরে সে ডাকিল-“ফুলী- “চলবার পারবি?” “এহানে কেউ কিছু দেয় না—চল অন্য গাঁয়ে যাই।” “এহনি ?” “হ। তাের হয়ত কষ্ট হইব—কিন্তু কি করুম সােনা-ক’?” ফুলী একবার নিজের দুর্বলতাকে ওজন করিঘা দেখিল, একবার ৰক্ষলগ্ন ক্ষুদ্রাকার নির্জীব শিশুটিকে দেখিল, পরে বলিল—“চল-
১১৭
এই সীমান্তে
তাহার উঠিয়া দাড়াইল।
উঠিতে গিয়া ছেলেটার বুঝি একটু লাগিল, সে কঁদিয়া উঠিল। অতি
ক্ষীণ অতি দুর্বল তাহার কণ্ঠস্বর। যেন কঁদিতে তাহার সাহস নাই।
হারাণের মুখে হাসি খেলিয়া যায়-ছেলেটার মুখের উপরে ঝুকিয়া
বলে, “কাল ক্যান? কাল ক্যান গো সােনামাণিক ?”
ফুলী ম্লান হাসিয়া ধীরে ধীরে পা বাড়াইল।
হারাণের ডান পা’ মাটী ছাড়িয়া কঁপিতে কপিতে উপরে উঠে।
পরক্ষণেই ছিন্নপক্ষ পাখীর মত মাটীতে পড়ে—আবার উঠে
আবার •
দূরে দিগন্তের ওপারে যে নূতন গ্রাম আছে, সেখানকার মানুষগুলির
হয়ত দয়া আছে সেখানে হয়ত খাদ্য আছে—আঃ চল, তাড়াতাড়ি
চল।
নূতন গ্রামের নাম তেতুলঝােরা। গ্রামের দক্ষিণ দিকে ধলেশ্বরী।
বৈশাখের বাতাসে তাহার জল তরঙ্গসঙ্কুল।
গ্রামটি বেশ বর্ধিষ্ণু।
গ্রামের হাটবাজার নদীর তীরেই। তাহারই একপাশে একটা
ভগ্ন চণ্ডীমণ্ডপ—অনেকদিন আগে যখন নদী আরও দূরে ছিল তখনকার
দিনের।
পাকা ভিটা, ধূলা, আবর্জনা আর ঝােপ ঝাড়ে অর্ধ
লুকায়িত। কিন্তু দরিদ্র ও উদ্দেশ্যহীন পথচারী, ভিক্ষুক ও সন্ন্যাসীরা
সেই চণ্ডীমণ্ডপের মধ্যে বাস করিয়া পরবর্তী সমগােত্রীদের জন্য
বালােপথােগী স্থান করিয়া রাখিয়াছে।
হারাণ স্ত্রীপুত্র লইয়া সেইখানেই বহির্পাশ্বে ক্ষণ-নড় বাধিল।
তখন অপরাহ্ন। বাহিরে সূৰ্য-দগ্ধ আকাশ তখনও যেন দর্পণের
মত, তাকানাে যায় না।
১১৮ এই সীমান্তে “বড় কষ্ট হইছে, না ফুলকুমারী ?’-হারাণ বসিয়া সস্নেহে বলিল। ফুলীর মাথা ঝিমঝিম করিতেছিল। মাথার উপরকার উত্তপ্ত আলো চারিদিকের উত্তপ্ত বাতাস আর দীর্ঘ পথ—ফুলীর দোষ নাই। তবুও সে হাসিল, এক অদ্ভুত নিরাসক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে উত্তর দিল, “না।” কোলের ছেলেটা কাঁদিয়া উঠিল। “কালে ক্যান গাে?” হারাণের পিতৃত্ব সজাগ হইয়া উঠিল। “ক্ষিদা পাইছে”—বাম শুনটি ছেলেটার মুখে দিতে দিতে ফুলী উত্তর দিল। তারপরে সে তাহার ক্লান্ত চক্ষু দুইটিকে নিবদ্ধ করিল দূরে-হাটশেষে ধলেশ্বরীর ক্ষুব্ধ জলরাশির ওপারে—ধূলিধূসর তীর ভূমির যে অস্পষ্ট রেখা দেখা যাইতেছে—তাহার উপর। মাঝে মাঝে ফুলকুমারীর এমনই হয়। যখন তাহার দেহ ও মন অনাহারে, পরিশ্রমে দুর্বল হইয়া উঠে, তখন সে মাঝে মাঝে দূরের দিকে তাকায় আর ভাবে। কি ভাবে তাহা কে জানে, কি অদৃশ্য সঙ্কেত-লিপি সে কাহার জন্য রচনা করে তাহাই বা কে জানে। কেবল মাঝে মাঝে নানা রঙের আমদানি হয় তাহার দৃষ্টির সামনে, নানা হাতের হাতছানি সে দেখিতে পায় দূর দিগন্তের ধূসর সীমা- রেখায়। মাঝে মাঝে ফুলকুমারীর এই হয়। কাহার যেন কাশির শব্দ শােনা গেল। হারাণ একটু নড়িয়া উঠিল। “কোয়ান থিকা আইত্যাছ তােমরা—এা ?” কে যেন প্রশ্ন করিল। হারাণ পিছন দিকে ফিরিয়া চাহিল। এতক্ষণ সে লক্ষ্য করে নাই, পশ্চাতে বেদীর মত যে উঁচু মাটির ঢিবিটা তাহার অপর পার্শ্বে একটি লােক শুইয়া ছিল। লম্বা চওড়া জোয়ান সে, খাড়া নাক, মাথায় একরাশ কঁপিয়া উঠা রুক্ষ চুল, উজ্জ্বল চক্ষু। পরণে এই সীমান্তে তাহার একটি ময়লা ও ছেড়া কাপড়, দেহে একটি অতিমলিন জামা। বয়স গােটা ত্রিশেক হইবে। লােকটি হাসিয়া আবার প্রশ্ন করিল, “কোয়ান থিকা আইত্যাছ?” হারাণের কেমন যেন লােকটিকে পছন্দ হইল না, সে উত্তর দিল, “নিশানপুরের ঐ দিক থিকা।” “তােমরা ভিখারী?” “হ'—তাতে কি ?” হারাণ তিক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করিল। “না—কিছু না। আমিও ভিখারী”—লােকটি হাসিল, পরে আবার বলিল, “আমার নাম কিষ্টচরণ, তােমার ?” “হারাণ- “ওঃ”—লােকটি এবার ফুলীর দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “সঙ্গে তােমার বৌ বুঝি ?” ফুলী এতক্ষণে সচেতন হইয়া লােকটির দিকে ফিরিয়া চাহিল । লােকটির ছেড়া জামার অন্তরালে তাহার বলিষ্ঠ দেহ দেখা যাইতেছে। যেন পাথর। লােকটা তাহার দিকে চাহিয়া আছে নিষ্পলক ও জ্বলন্ত দৃষ্টিতে।সে দৃষ্টিতে একটা বিমুগ্ধভাব আর তাহারি সহিত এক দুর্ণিবার কামনার আবেদন। ফুলীর শরীরে হঠাৎ রােমাঞ্চ খেলিয়া হারাণ লোকটির সেই দৃষ্টি দেখিয়া মনে মনে ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিল। শালা, হারামজাদা, নিজের মনে সে কয়বার বলিল। পরে ঈষৎ ঝাঝালােকণ্ঠে ফুলীকে বলিল, “দ্যাখ, না--ছ্যা ঘুমাইচে নাকি!” ফুলী হারাণের দিকে ফিরিয়া চাহিল। রুগ্ন হারাণের জীর্ণ শরীর, তাহার ভিক্ষুকের চাহনি।
এই সীমান্তে
“তােমাদের সংসার আছে—বেশ-বেশ-খানিকটা নিজের মনে
কিষ্টচরণ বলিল, “আমার কিন্তু হালার কেউ নাই--
. সে একটু থামিল, পরে পকেট হইতে একটা বিড়ি ও দিয়াশলাই
বাহির করিয়া হারাণকে আহ্বান করিল, “বিড়ি খাবা?”
হারাণ সজোরে মাথা নাড়িল, “না”— শােকটিকে সে সহ
করিতে পারিতেছে না।
কিষ্টচরণ একটু হাসিয়া নিজেই বিড়িটি ধরাইল।
দেশলাইয়ের কাঠিটির জ্বলার শবে ফুলী আর একবার লােকটির
দিকে চাহিল। লােকটিও তাহার দিকে চাহিয়া আছে। ফুলী মুখ
ফিরাইল।
দূরে ধলেশ্বরীর জলে একটা পানসী নাচিয়া নাচিয়া ভাসিয়া
ভাসিয়া চলিয়াছে। বৈশাখের বাতাসে তাহার পালের বুক ফুলাইয়া
উপরের নিরুদ্দেশযাত্রী মেঘের মত কোথায় বেন
চলিয়াছে।
সে ভাসিয়া
সেদিন গ্রামের হাটবার।
বিকালবেলা হারাণ ভিক্ষায় বাহির হইয়াছিল, ফিরিল সন্ধ্যায়—
শূন্যহন্তে। নাই, নাই, দেশে অন্ন নাই। একমুষ্টিও তণ্ডুলকণা নাই,
এই কথাটা মনের মধ্যে আলােড়িত হইতেই তাহার পেটের মধ্যে যেন
আগুণ আরও তীব্রবেগে জ্বলিয়া উঠিল। একবার সে ফুলীর দিকে
চাহিল। ঐ দুৰ্বলদেহী প্রসূতিকে দেখিয়া তাহার বুক দুঃখে ফুলিয়া
উঠিল।
ছেলেটাকে বুকের কাছে চাপিয়া ধরিয়া ফুলী যেন কি ভাবিতেছে।
ফুলীর ভাবনা যেন বাড়িয়াছে। ক্রমবর্ধমান অন্ধকারের পটভূমিতে
ফুলীকে অস্পষ্টভাবে দেখা যাইতেছে। তাহার যেন প্রাণ নাই।
এই সীমান্তে ফুলী মুখ না ফিরাইয়া একবার ধীরে ধীরে প্রশ্ন করিল, “কিছু পাইলা?” “না”—হারণ অস্ফুটস্বরে বলিল। ফুলী আর কিছু বলিল না। এমন সময় কিষ্টচরণ ফিরিয়া আসিল। তাহার কাছে একটি বড় ঝোলা, হাতে একটি লাঠি। সেই লাঠিতে ভর দিয়া সে কষ্টে সূষ্টে আসিতেছিল। মনে হয় যেন সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। কিন্তু সেই ভগ্ননীড়ের সম্মুখে আসিয়াই সে সহজ পদক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিল। তাহাঁদের দিকে চাহিয়া সে হারাণকে বলিল, “কি ভাই কেমন ভিক্ষা পাইলা?” হারাণ সে প্রশ্নের জবাব দিল না, লােকটির মিথ্যা অভিনয় দেখিয়া সে হিংসায় অধীর হইয়া বলিল, “বাইরে বুঝি দেখাও যে তােমার বাত- ব্যাধি হইছে?” কিষ্টচরণ হাসিল, “হ।” “ক্যান ?” “তা নইলে কেউ দয়া করব না।” তাহার নির্লিপ্ত ও সহজ কণ্ঠে হারাণ আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল, আমি কালি সবাইরে কইয়া দিমু তােমার জালিয়াতির কথা”- কিষ্টচরণ নিরুত্তরে ঝােলা ও লাঠিটি একপাশে রাখিয়া বসিল, তাহার পরে একটি বিড়ি বাহির করিয়া দেশলাই জ্বালাইয়া তাহা ধরাইয়া বলিল, “কেউ বিশ্বাস কইরবাে না—আমার বাম অঙ্গে চুইচ ফুটাও, আগুণের ছ্যাকা দ্যাও, কিচ্ছু হইব না—গাখবা?” বলিয়াই সে একটি কাঠি জ্বালাইয়া তাহার শিখাটি নিজের বাম হস্তের নীচে
১২২
এই সীমান্তে
ধরিল। তাহার মুখে একটুও বিকার পরিলক্ষিত হইল না, তাহার দেহ
একটুও নড়িল না।
কাঠিটি যখন নিভিয়া গেল, তখন তাহা দূরে নিক্ষেপ করিয়া
কিষ্টচরণ বলিল, “কেউ তােমারে বিশ্বাস কইরবাে? হাঃ হাঃ হাঃ-
উচ্চকণ্ঠে সে হাসিয়া উঠিল। তাহার হাসির বেগে তাহার বলিষ্ঠ
দেহটি কাপিয়া কাপিয়া উঠিতে লাগিল।
ফুলী কিষ্টচরণের দিকে চাহিল। তাহার দুই চক্ষু যেন অলিতেছে।
হঠাৎ হাসি থামাইয়া বিড়িতে এক টান দিয়া ও আর একটি বিড়ি
ছেড়া জামার পকেট হইতে বাহির করিয়া কিষ্টচরণ হারাণকে বলিল,
“বিড়ি খাবা ভাই ?”
হারাণ হঠাৎ চীৎকার করিয়া বলিল, “
নান”–
একটা নিরুপায় ও নিষ্ফল ক্রোধের তরঙ্গ তাহার সারা দেহকে
অবশ করিয়া ফেলিল।
কিষ্টচরণ ফুলীর দিকে চাহিল, পরে নিঃশব্দে একবার হাসিয়া
ভাটিয়াল সুরে গান শুরু করিল,
“হায় গাে হায়, এ আমার কি হইল !
রাজার কন্যার স্বপন দেইখা
চোখের ঘুম যে পালাইল,
এ আমার–কি হইল!
বেশ গায় কিষ্টচরণ। ফুলী কান পাতিয়া শুনিতে লাগিল। ক্ষুধায়,
বেদনায় অবসন্ন স্নায়ুকোষের অন্তরালে তাহার মন কেন যেন বারংবার
বলিতে লাগিল যে সে রাজকন্যা আর কেহ নহে—সে ফুলকুমারী, সে
ফুলকুমারী।
একটু পরেই কিষ্টচরণের উনুন জলিল।
হারাণের সংসারে এবেলা অনাহার।
.
এই সীমান্তে
১২৩
কিষ্টচরণ ভাতের হাঁড়ীতে চাল ঢালিয়া দিয়া প্রশ্ন করিল, “তোমরা
পাক কইরবা না?
হারাণ বিরক্ত হইয়া বলিল, “না।”
কিঃচরণ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকিয়া আবার প্রশ্ন করিল, “ক্যান?”
কি বেহায়া লােকটা ! হারাণ জ্বলিয়া উঠিল, চোখ বড় বড় করিয়া
সে বলিল, “আমাগাের খুসী”-
কিষ্টচরণ একটুও অপ্রতিভ না হইয়া বলিল, “রাগ ক্যান? আমার
কাছে চাইল বেশী আছে—চাইট্টা নাও-না খাইলে পােয়াতী মানুষের
কষ্ট হইব।”
হারাণ মুহূর্তে ফাটিয়া পড়িল, “খবরদার—তােমার দরদের ধার ধারি
, তােমার কাছে কিছু চাই নাই, নিমুও না,”-
কিষ্টচরণ হাসিল--“আইচ্ছা ভাই-আইচ্ছা-
হারাণ চুপ করি। ফুলী চুপ করিয়াই আছে। বুকের উপর
সদ্যোজাত শিশুটি নির্জীবের মত স্তন্যপান করিতেছে। অনাহারে দুৰ্বল,
বেদনায় অবসন্ন দেহের স্বা রক্তের সমুদ্র হইতে উথিত ক্ষীরধারা পাইয়া
সে পরিতৃপ্ত। কিন্তু ফুলী ?
রাত বাড়িল। ওপাশে কিষ্টচরণ খাওয়া দাওয়া সাফিয়া শুইয়া
পড়িয়াছে। কুলীও শুইয়াছে। কিন্তু হারাণের চোখে আর ঘুম
আসে না। থাকিয়া থাকিয়া নিজের পৌরুষের উপর তীব্র ধিক্কারে
তাহার হৃদয় ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেছে। পাশের অভুক্ত প্রসূতির কথা
মনে করিয়া তাহার চোখে অন্ধকারে জলের জোয়ার আসে।
রুদ্ধকণ্ঠে সে ডাকিল—“ফুলকুমারী
ফুলী কোন উত্তর দিল না। বােধ হয় সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে।
হারাণের চোখে অবশেষে ঘুম আসিল।
কিন্তু ফুলী জাগিয়াই ছিল। রাত অন্ধকার। আজ চাদ দেরীতে
২৪ এই সীমান্তে উঠিবে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা, উপরে আকাশের অজস্র চোখের চঞ্চল তারার দুর্বোধ্য ভাষা। চারিদিকের সেই অন্ধকারকে ভেদ করিয়া ফুলীর চোখের তারা কিসের উপর যেন নিবদ্ধ। ফুলীর চোখে ঘুম আর আসে না। তবু সে চুপ করিয়া পড়িয়াই রহিল। একটু পরে নিকটেই কোথাও একদল শৃগাল চীৎকার করিয়া উঠিল। দৃশ্য ও অদৃশ্য নিশাচর নিশাচরীদের তাহারা যেন মধ্যরাত্রির সংবাদ জানাইয়া দিল। ফুলী বুঝিতে পারিল যে, কিষ্টচরণ উঠিয়া বসিয়াছে। সেও ঘুমায় নাই। সে স্পন্দিত হৃদয়ে চক্ষু মেলিল। অন্ধকারের মধ্যে নিজের মিশকালাে চেহারা মিশাইয়া দিয়া কিষ্টচরণ পা টিপিয়া টিপিয়া যেন কোথায় গেল। কিষ্টচরণের পায়ের চাপে শুক পত্রের রাশি ধ্বনি তুলিয়া যেন প্রতিবাদ জানাইল। ক্রমে তাহা আবার মিলাইয়া গেল—দুরে আবার সেই অন্ধকার ও থমথমে রাত। এবার পূর্বের দিক হইতে একটা ঠাণ্ডা ঝিরঝিরে বাতাস আসিল। তাহার স্পর্শে চতুঃপার্শ্বস্থ বৃক্ষশ্রেণী যেন নিদ্রাজড়িতকণ্ঠে তাহাকে ফিস ফিস করিয়া স্বাগত সম্ভাষণ জানাইল। রাত বাড়ে। ফুলীর চোখে সবে মাত্র তন্দ্রা আসিয়াছে এমন সময় দূরের একটি কোলাহলের ধ্বনিতে তাহা ভাঙ্গিয়া গেল। মধ্যরাত্রির নিস্ততাকে শিহরিত করিয়া কাহারা যেন চীৎকার করিতেছে-‘চোর-চোর’-। ফুলী উঠিয়া বসিল। অন্ধকার পাতলা হইয়া আসিয়াছে, কৃষ্ণপক্ষের আকাশের এক কোণে স্তিমিত দীপের মত এক ফালি চাঁদ। কাহার দ্রুত পদক্ষেপ শােনা গেল।
লে এই সীমান্তে ১২৫ পরক্ষণেই একটি পােক ছুটিয়া আসিয়া সেই ভাঙ্গা চণ্ডীমণ্ডপের অপর পার্শ্বে প্রবেশ করিল। ফুলী চিনিল সে কিষ্টচরণ। মুহূর্তে নিশীথ রাত্রি পটভূমিকায় নিদ্রোখিত ভয়ার্ত গ্রামবাসীদের চীৎকারের কারণ তাহার নিকট পরিষ্কার হইয়া গেল। সে মৃদুকণ্ঠে দাড়াইয়া প্রশ্ন করিল, “কেডা?” আবছা অন্ধকারে তাহার সম্মুখে কিষ্টচরণের দীর্ঘ দেহটা ছায়ামূর্তির মত আবির্ভূত হইল। উত্তর হইল, “আমি কিষ্টচরণ”—তাহার কণ্ঠস্বর কঁপিতেছে। যে অনেকখানি পথ দৌড়াইয়া আসিয়াছে তাহা বােঝা গেল। “তুমি আমার নাম জানলা ক্যামনে? “আমি জানি।” ফুলী হাসিয়া বলিল, “চুরী কইরা ফিরলা?” কিষ্টচরণের হাসি শােনা গেল, সে উত্তর দিল, “হ- “তুমি চোর ?”—অন্ধকারে বিদ্যুতের মত জ্বালাময় হইয়া উঠিল ফুলীর চক্ষু। কিষ্টচরণ আরও কাছে সরিয়া আসিল, এত কাছে যে তাহার দ্রুত নিঃশ্বাস যেন ফুলী অনুভব করিতে পারে। দাঁতে দাতে চাপিয়৷ কিষ্টচরণ বলিল, “তুমি ঠাট্টা করত্যাছ বুঝি ? হ—আমি চোর-ভালভাবে যখন উপায় হয় না তখন আমি এই করি, ঠিকই করি। এই দুনিয়ায় চোরেরাই চিরদিন বাঁচব।” ফুলী হাসিল, “তুমি রাগ ক্যান?” কিষ্টচরণ আরও সন্নিকটে আসিল। তাহার দেহের নৈকট্যে ফুলীর সারা দেহ কঁপিয়া উঠিল। সে একবার সরিয়া দাড়াইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না।
. এই সীমান্তে কিষ্টচরণের কণ্ঠস্বর বদলাইয়া গেল, “তুমি আমার সঙ্গে এত কথা বলত্যাছ! আমার কি ভাইগ্য। হ—আমি চোর—দ্যা কি আছি? গয়না—সােনার গয়না”—এই বলিয়া সে কোমর হইতে একটি পুটলী বাহির করিয়া খুলিয়া ধরিল। শীর্ণ চাঁদের বিচ্ছিন্ন ও ম্লান আলোকের স্পর্শে এক রাশ সােনার গহনা ঝক ঝক করিয়া উঠিল। ফুলীর দেহ সেই অস্পষ্ট পীতাভ রঙের ছোঁয়াচে যেন অবশ হইয়া আসে। কিষ্টচরণ বলিল,-“নিবা তুমি ? চাই তোমার এগুলি? গয়না নিয়া কি করুম আমি ? ফুলকুমারী—আমার কেউ নাই এই পিথিমীতে -তুমি আমার হও। সােয়ামীর কথা ভাবত্যাছ? বল ত’ গলা টিইপা দেই ওরে শেষ কইরা”- ফুলী চকি স্বামীর দিকে চাহিল। ক্ষুৎপিপাসায় নির্জীব হারাণ অতি ক্লান্ত, অতি অসহায়ভাবে শুইয়া আছে। মুহূর্তে সেই অৰ্ধালােকে, অৰ্ধান্ধকারে তাহার মধ্যে দেবাসুরের যুদ্ধ আরম্ভ হইয়া গেল। ধুলি মলিন পথের জীবনেও সংস্কার থাকে—মানুষের সংস্কার। সেই সংস্কার আর সুবর্ণের দীপ্তিতে ভাস্বর কামনার দলে বিরােধ ঘনাইয়া উঠিল। হঠাৎ ফুলী নিজেকে সচেতন করিয়া তুলিল। ছেলেটা একা পড়িয়া আছে। সে পা বাড়াইল। মুহূর্তে কিষ্টচরণ তাহার দক্ষিণ হাত চাপিয়া ধরিল, “ফুলকুমারী বল—এহনও আন্ধার আছে” সেই বলিষ্ঠ হস্তের স্পর্শে রক্তের সমুদ্রের মধ্যে পরিব্যাপ্ত ও সুপ্ত বাড়বানল যেন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। তবুও জোর করিয়া হাত ছিনাইয়া লইয়া অতি দুর্বলকণ্ঠে ফুলী বলিল, “ নানা”- ছুটিয়া গিয়া সে ছেলেটাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া মুখ গুজিয়া পড়িয়া রহিল।
১২৭
এই সীমান্তে
কিষ্টচরণ থমকিয়া দাড়াইল, পরে বলিল, “ফুলকুমারী—তুমি কি
আমারে চিনলা না? কত জনম তােমার স্বপন দেখছি আমি-
ফুলকুমারী”—
ফুলী নিঃশব্দে চুপ করিয়া পড়িয়া রহিল।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়া, একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কিষ্টচরণ
নিজের জায়গায় ফিরিয়া গেল।
সেই দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ ফুলী শুনিল বইকি, তাহার শ্রবণেন্দ্রিয়
বারংবার তাহার প্রতিধ্বনি রচনা করিল। তারপর চোখের সামনে
অদৃশ্য যবনিকার উপর নানাবর্ণের নানাছবির মধ্যে বারংবার কতকগুলি
গহনা ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। ভূগর্ভের অন্ধকার হইতে উখিত
পীতাভ ঐশ্বৰ্য্য—সুবর্ণ।
ঘুম আর আসেনা।
অন্ধকারের যবনিকা সরাইয়া নূতন দিনের সূৰ্য্য আবার উঠিল।
ক্ৰমে বেলা বাড়ে।
সূৰ্য্য যথাসময়ে মধ্যগগনে আরােহণ করিল।
কিন্তু হারাণের জঠরের শূন্যতা একটুও বদলাইল না।
কেহ কিছু দিল না। নাই, নাই, দেশে অন্ন নাই।
ক্লান্তপদে টলিতে টলিতে হারাণ চলে। আর কোনও বাড়ী বাকী
নাই হাতের পাত্রে দুইটি আলু সম্বল।
, ডােবার ঐ অপর পার্শ্বের বাড়ীটিতে যাওয়া হয় নাই। হারাণ
ফিরিয়া দাড়াইল ।
বাহিরের দিকে লােকজন নাই।
হারাণ উঠানের একধারে গিয়া দাড়াইল।
বাড়ীর মেয়েরা আহারে বসিয়াছে।
बहे गोपाल
সমস্ত জঠর জুড়িয়া কাহারা যেন কলরব করিয়া উঠিল। ভাত,
ভাত। গ্রামের পর গ্রাস তুলিয়া মেয়েরা খাইতেছে। ধরণীর বুকের
অমৃতশিপ্রাণের অজস্র কণিকা।
“মা গােয় কর”-হারাণ আর্তনাদ করিয়া বলিল।
মেয়েরা চমকিয়া উঠিল।
ও মাড্যাকরার সাহস দেখত্যাছ! ওরে মাইক-তাড়াইয়া
দেত’ আবাগীর পুত রে”—একটি বৃদ্ধা বলিল।
“কাইল থিকা খাই নাই—একমুঠ ভাত দ্যাও মা গাে"—হারাণ
কাদিয়া বলিল।
ঘর হইতে মাণিক বাহির হইয়া আসিল, আসিয়াই হারাণের গলায়
ক্কিা দিয়া বলিল, “বাইর হ’-অন্দরে ঢুকত্যাছ হালা! চোর
কোথাকার—দিনে ভিক্ষা, রাইতে চুরী—সব বুঝি বাবা-হ।
কাইলকা যে সাউগাে বাড়ীতে চুরী হইছে তার জন্য তােমারেই পুলিশে
ধরাইয়া দিমু হালা-বাইর হ”—
আবার পথ।
ডােবার পার্শ্বে ফিরিয়া আসিয়া হারাণ বলিয়া পড়িল।
অসহ্ ক্ষুধায় তাহার দেহ কঁপিতেছে । আহা ঐ রক্তাভ অল্পের
এক মুষ্টি যদি সে পাইত। তাহার গলনালী বাহিয়া ধীরে ধীরে তাহা
তাহার পেটের মধ্যে গিয়া থামিত, তারপরে সেই অনুরাশি রূপান্তরিত
হইত অমৃতে, ছড়াইয়া পড়িত তাহার নির্জীব রক্তকণিকায় আর তাহার
সঞ্জীবনী স্পর্শে তাহারা জীবন্ত হইয়া প্রবেশ করিত শিরায় শিরায়,
দ্রুতবেগে আর প্রবাহিত হইত প্রতি উপশিরায়, অস্থিতে, মজ্জাতে
সে বাচিত।
হঠাৎ হারাণ হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। ছেলেমানুষের মত।
সেই জনবিরল পথের একাংশে সে কান্না কেহ দেখিল না, শুনিল না।
এই সীমান্তে
কেবল একবার উপরের দিকে চাহিয়া সে বলিল-“ভগমান”–
অনেকক্ষণ পরে তাহার কান্না থামিল। তবুও সে কিছুক্ষণ চুপ
করিয়া বসিয়া রহিল।
হঠাৎ তাহার নজর পড়িল যে সম্মুখে ডােবাটা কলমীশাকে পরিপূর্ণ।
জলে নামিয়া সেই পঙ্কিল জল অঞ্জলি ভরিয়া অনেকখানি পান করিয়া
সে একগাদা কলমীশাক ছিড়িয়া লইয়া উঠিল।
আবার পথ।
মাতালের মত টলিয়া টলিয়া চলে হারাণ। তাহার খােড়া পাটা
ঘুরিয়া ঘুরিয়া ক্লান্তভাবে শূন্যে ওঠে, আবার মাটীতে পড়ে—শূন্যে ওঠে,
আবার
ফুলী ঝিমাইতেছিল। দুজনিত তার ঘরে। ছেলেটাও
নিদ্রিত।
হারাণ ধপ করিয়া বসিয়া পড়িল। ফুলী চক্ষু মেলিল।
“কিছু পাইলা?”-ফুলীর কণ্ঠে ক্ষুধা।
শাক আর আলু দুইটি মাটীর উপর ফেলিয়া দিয়া হারাণ বলিল,
“এই সিদ্ধ কর”-
ফুলী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
হারাণ এদিক ওদিক তাকায়। কিষ্টচৰণ নাই।
ফুলী এবার উঠিয়া আগুণ জ্বালাইল।
কলমীশাক আর আলু কিছুক্ষণ পরে সিদ্ধ হইল।
একটু নুন দিয়া তাহাই দুইজনে গিলিল। ক্ষুধাতুর জিহ্বার আর
ভালমন্দ জ্ঞান নাই।
হারাণ একটু লজ্জিতকঠে খানিক পরে বলিল, “বড় কষ্ট হইল, না
ফুলকুমারী
এই সীমান্তে
চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিল।
ফুলী হঠাৎ চীৎকার করিয়া উঠিল, “না, কষ্ট হইৰ ক্যান? আমি
ত’ মানুষ তা জানােয়ার-কলমী শাক সে ত’ ভাল জিনিষই—তাতে
কষ্ট হইব ক্যান? কি ভাতার রে আমার! ঘাস খাওয়াইয়া বাহাদুরী
চায়—আবার আদর কইরা ডাকে-ফুলকুমারী!” বলিয়াই সে
একপাশে বসিয়া সদ্য জাগ্ৰত ছেলেটাকে স্তপান করাইতে লাগিল
দুগ্ধহীন স্তন।
হারাণ অপরাধী বােধে কি যেন দু’একবার বলিবার চেষ্টা করিল,
পরে কি ভাবিয়া চুপ করিয়া চক্ষু বুজিয়া পড়িয়া রহিল।
একসঙ্গে এতগুলি কথা কিন্তু ফুলকুমারী কোনওদিন বলে নাই।
বেলা পড়িয়া আসিয়াছে।
বিকালবেলা হারাণ আবার বাহির হইয়াছিল এখনও ফিরে
নাই।
চামচিকার মত জীর্ণকায় ছেলেটা ফুলীর কোলে কাঁদে।
সে ধমক দেয়, “চুপ কর হাড় হাবাইত্যা–চুপ”-
কিন্তু অসহায় মানুষ সন্তানটা কিছু বােঝে না।
“তােমার সােয়ামী বুঝি ভিক্ষায় বাইর হইছে?”
ফুলী ফিরিয়া চাহিল। কিঃচরণ। পানের রসে রঞ্জিত দাত মেলিয়া
সে হাসিয়া প্রশ্ন করিতেছে।
‘
হনীরসভাবে ফুলী উত্তর দিল।
কিষ্টচরণ ফুলীর উত্তরের ভঙ্গীতে চুপ করিল। খানিকক্ষণ নিঃশব্দে
তাহাকে পৰ্যবেক্ষণ করিয়া সে বলিল, “র”--
ফুলী মুখ না ফিরাইয়াই জিজ্ঞাসা করিল, “কি ?”
“তুমি।”
এই সীমান্তে ১১ ফুলী কিচরণের দিকে চাহিল, “তােমার ফষ্টি নষ্টি আমার ভাল লাগতাছে না-খবরদার”— ‘ফুলকুমারী-তুমি রাগ করচ ?” ফুলী উত্তর দিল না। কিষ্টচরণ নিজের জায়গায় গিয়া বসিল। কিন্তু সে নির্লজ্জ, একটু পরেই আবার বলিল, “আইজ খাইচ তা?” “খাই না খাই-তােমার তাতে কি ?” কিষ্টচরণ কণ্ঠস্বর মােলায়েম করিয়া বলিল, “একজন মানুষ আর একজন মানুষেরে খাইচে কিনা জিগাইলে কি দোষ হয় ফুলকুমারী?” ক্রুদ্ধকণ্ঠে ফুলী বলিল, “আমার নাম ধইরা তুমি ডাইকো না বুঝ?” “আইচ্ছা ফুলকুমারী।” সে নিজের পুটলী খুলিয়া এক বাটি চাল লইয়া ফুলীর সামনে রাখিয়া বলিল, “আমি ভিখারী, আমি চোর—কিন্তু আমি মানুষ। মানুষের দুঃখ, ক্ষিদার জালা আমি বুঝি। ফুলকুমারী এই চাইল কয়টা তুমি লও- “না”- ‘না’ কইও না—আমার মাথার কিরা। ফুলী সম্মুখে রক্ষিত বাটির চালের দিকে চাহিল। চাল। উত্তপ্ত জলের মধ্যে ঐ গুলি ঢালিয়া দিলে ওগুলিও টগবগ করিয়া জলের সহিত ফুটিবে, ক্রমে তাহা নরম হইবে, ফেনের ধারা গড়াইয়া পড়িবে আগুনের উপর, বাতাসে ভাসিবে একটা মৃদু সৌরভ। তারপরে একটু নুনের ছিটা। রসনায় জল আসে ফুলীর। ফুলী হাত বাড়াইয়া চালের বাটিটা টানিয়া লইল।
এই সীমান্তে
দুরে ক্লান্ত হারাণের পায়ের নীচে ও পত্ররাশি আর্তনাদ করিয়া
উঠিল। থমকিয়া দাঁড়াইয়া সে দেখিল যে ফুলীর অত্যন্ত সন্নিকটে
দাড়াইয়া কিষ্টচরণ যেন কি বলিতেছে। শুধায় অবসন্ন স্নায়ুকোষে
অকস্মাৎ কোথা হইতে যেন আগুনের ঝড় আসিল।
সে ফুলীর নিকটে গিয়া শূ পাত্রটি নিক্ষেপ করিয়া পরুষ কষ্টে প্রশ্ন
করিল, “কি হইয়াছে ?”
কিষ্টচরণ স্বস্থানে ফিরিয়া গেল।
ফুলী কিষ্টচরণের চালের বাটিটা নির্দেশ করিয়া বলিল, “কিছু চাইল
দিল এই লােকটা-তাই নিলাম”—
হারাণের শরীর ক্রোধে কাঁপে, “ক্যান্ নিলি?”
ফুলী মৃদুকণ্ঠে বলিল, “কিছু নাই যে—
“ইল্লো-নাই বইলা যার তার কাছ থিকা নিবি! বেশ্যা মাগী
কোথাকার—না খাইয়া আমি নাই ?
ফুলী সবেগে ঘুরিয়া একবার হারাণের মুখের দিকে চাহিল।
হারাণের ক্রোধে বিবর্ণ শীর্ণ মুখমণ্ডলের দিকে ক্ষণকাল জ্বলন্ত দৃষ্টিতে
চাহিয়া থাকিয়া সে আবার মুখ ফিরাইয়া লইল।
১. হারাণ লাথি মারিয়া চালের বাটিটা দুরে নিক্ষেপ করিল। অজস্র
চালের কণা চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল আর তাহারই দিকে চাহিয়া
নিস্পন্দভাবে ফুলী বসিয়া রহিল। হারাণ সেখানেই থামিল না,
অগ্নিবর্ষী দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া কিষ্টচরণের নিকটে সে আগাইয়া
গেল, “খবরদার শালা-তােমার বদমাইসি কিন্তু আমি সহ
করুম না
কিষ্টচৰণ নির্বিকারভাবে বসিয়াছিল, হারাণের দিকে একটু
অবজ্ঞাভরে চাহিয়া মৃদুকণ্ঠে সে বলিল, চেঁচামেচি না কইরা মাথা
ঠাণ্ডা কর, যাও বস গিয়া
এই সীমান্তে
হারাণ গর্জন করিয়া উঠিল—“না, আমি বসুম না-তুই কেরে
শালা যে আমারে বসবার হুকুম দিবি?"
কিষ্টচরণের চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল, সে উঠিয়া দাড়াইল, “দেখ হারাণ
গাইল দিও না”
“ক্যান দিমু না? আমার বৌয়ের লগে পিরীত করতে আসৰি
আর কিছু কমু না-হালা শুয়ারকোণাকার”—–
মুহূর্তের জন্য কিষ্টচরণের পেশীগুলি কঠিন হইয়া উঠিল, পরমুহূর্তেই
তাহার দক্ষিণ হাতটি উর্ধে উঠিল এবং একটি চড়ে হারাণ কাপিতে
কপিতে বসিয়া পড়িল।
দাতে দাত চাপিয়া কিষ্টচরণ বলিল, “চুপ কর হতভাগা”-
হারাণ নিশ্চল অবস্থায় বসিয়া রহিল।
ফুলী নিঃশকে এলক্ষণ জব দেখিতেছিল, নিঃশব্দেই সে উঠিয়া
আলিয়া স্বামীর নিকটে দাড়াইল! একবার কিষ্টচরণের দিকে এক
দুর্বোধ্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া সে হারাণকে বলিল, “উঠ”—
হারাণ এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরাইয়া পাইল। ফুলীর দিকে সে চাহিল।
তাহার পরাজিত পৌরুষের সমস্ত আক্রোশ এবার হিংস্রভাবে তাহাকে
ফুলীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া তুলিল।
ধীরে ধীরে সে উঠিয়া দাড়াইল, একবার ফুলীকে পৰ্যবেক্ষণ করিল,
শিকারের উপরে লম্ফনােত বন্য পশুর মত। পরক্ষণেই ফুলীর
রুক্ষকেশের রাশি ধরিয়া টানিয়া সে নিজের জায়গার দিকে চলিল।
বেদনায় বিবর্ণ হইয়া ফুলী বলিল, “ছড়িছাড়”-
—ছাড়ত্যাছি মাগী ছাড়ত্যাছি—তােমার পিরীত বাইর কইরা
তবে ছাড়ত্যাছি”.
নিষ্ঠুরভাবে, নির্দয়ভাবে, অন্ধের মত, পশুর মত হারাণ ফুলীকে
প্রহার করিল। মাটীতে লুটাইয়া, নিঃশৰে, ধূলিধূসর দেহে ফুলী তাহা
-
১৩৪
এই সীমান্তে
সহ করিল। অবশেষে যখন হারাণ ক্লান্ত হইয়া পড়িল, তখন সে
ফুলীকে ছাড়িয়া একপাশে বসিয়া পড়িয়া হাঁপাইতে লাগিল। তাহার
রক্তবর্ণ চোখ বাহিয়া অঞর ধারা নামিয়াছে।
চামচিকার মত শীর্ণ, কুৎসিত মানবকটি কঁদিয়া উঠিল। খানিকক্ষণ
কাদিয়া আবার সে চুপ করিল। কেহ নড়িল না।
কিষ্টচরণ উঠিয়া কোথায় যেন চলিয়া গেল।
সব চুপচাপ।
ক্রমে অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল।
হারাণ ডাকিল, “ফুলী”—
উত্তর নাই।
“ফুলী মাফ কর”-
নিঃশব্দতা।
হারাণ কাঁদিয়া বলিল, “ক্ষিদার যন্ত্রণায় আমি জানােয়ার হইয়া
গেছি—আমি তােরে মন্দ ভাবচি—আমায় মাফ, কর ফুলকুমারী
ফুলকুমারী উত্তর দিল না।
অন্ধকারে হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া ফুলীর দেহে হাত রাখিয়া হারাণ
ভদিল, “ফুলকুমারী-
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত ফুলী উঠিয়া বসিল, যেন কোনও অগুটি বস্তুর
স্পর্শ হইতে তাহার দেহকে রক্ষা করিবার জন্য সে হারাণের হাতটা
সবেগে ঠেলিয়া দিয়া বিকৃতকঠে বলিল, “খবরদার—আর আমারে
চুইও না”—
হারাণের হাত শিথিল হইয়া গেল, ফুলীর সেই কয়টি কথার মধ্যে
যে অপরিসীম ঘৃণা ধ্বনিত হইল তাহার আঘাতে হারাণ যেন পাথর
ইয়া গেল।
অনেকক্ষণ হারাণ চুপ করিয়া একজায়গায় বসিয়া রহিল। রাত
এই সীমান্তে ১৩৫ বাড়িতেছে, অন্ধকার গাঢ় হইল। তাহার ক্ষুধায় ক্লান্ত, অবসন্ন দেহ ঋপিতে আরম্ভ করিল। সে শুইয়া পড়িল। ক্রমে সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হইল। না ঘুম, না জাগরণ-ক্ষুধার জ্বালায় সৃষ্ট এক গভীর তন্দ্রা। ফুলী ঘুমায় নাই। সে ঠায় বসিয়া আছে। ছেলেটা কাঁদিয়া উঠিল। সে নড়িল না। ছেলেটা অনেকক্ষণ দিল, পরে সে ক্লান্ত হইয়া চুপ করিল। মধ্যরাত্রে গ্রামের মধ্যে আবার সেই আর্ত কোলাহল উঠিল- “চোর-চোর- অন্ধকারের স্রোত ঠেলিয়া, দৌড়াইয়া কিষ্টচরণ ফিরিয়া আসিল। আসিয়াই সে বসিয়া পড়িয়া, অস্ফুটস্বরে কিছুক্ষণ গােঙইল। তারপরে নিজের পোঁটলাপুটুলী গুছাইয়া লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। অন্ধকারে একবার চারিদিকে কাহাকে যেন সে খুঁজিল, তারপরে রাস্তায় নামিল। হঠাৎ সে চমকিয়া উঠিল। কেহ ডাকিতেছে। অন্ধকারে একটি নারীমূর্তি টলিতে টলিতে তাহার পাশে কড়াইল। ফুলকুমারী-তুমি! “কি চাও?” “কই যাইত্যাছ তুমি ? “অন্য কোথাও—আইজ পুলিসের খবর পাইচে। আইজও চুরী করতে গেছিলাম, কিছু পাই নাই-আর-একজনের সড়কির দায়ে বাও হাতটা জখমও হইছে”- এই সীমান্তে “খুব বেশ লাগছে নাকি?” “একটু যন্ত্রণা হইতাছে, তবে বেশ কিছু না-আর-ওরকম অনেক ঘা খাইচি, আমি যে দাগী চোর”—কিষ্টচরণ মৃদু হাসিল, “আইচ্ছা ফুলকুমারী—আমি চল্লাম- “তুমি যাইবা? আচ্ছা চল। আমিও তােমার সঙ্গে যামু’- “কি বলত্যাছ? তুমিও আসবা? কিষ্টচরণের কণ্ঠে বিষ্ময় ধ্বনিত হইল। “হ”—ফুলী শান্তকণ্ঠে উত্তর দিল। “তােমার পােলা-সােয়ামী?” “আমার কেউ নাই”- অন্ধকারে কিষ্টচরণ ফুলীর সম্মুখে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলিল, তােমারে আমি দ্যাব তার ভাণ্ডার লুইটা আইনা দিমু ফুলকুমারী”- ফুলী মৃদু হাসিয়া বলিল “তাড়াতাড়ি চওরা জাগব”- ফুলী টলিতে টলিতে চলে। “তুমি টলত্যাছ! তােমার কষ্ট হইত্যাছে।” কিষ্টচরণ বলিল। “বাঃ রে—আমি দেখতাছি যে- বলিয়াই কিষ্টচরণ পাজাকোলা করিয়া একটি ছােট মেষশাবকের মত ফুলীকে তুলিয়া লইল। “তােমার হাতে লাগব”—ফুলী বলিল। “কিচ্ছু হই না ফুলকুমারী।” কিরণ রুদ্ধকণ্ঠে বলিল। অন্ধকারে গোঁসাইদের বড় বাড়ীটার পিছন দিয়া, নবীন কুর আড়তের পাশ দিয়া, মাধব মুখায্যের মস্ত বড় বাগানটা হইয়া, মাঠের মধ্য দিয়া হারাণ ফুলীকে বহন করিয়া ধলেশ্বরীর তীরে গিয়া
এই সীমান্তে
১৩৭
পৌছাইল। সারা পথে তাহার ক্ষতমুখ নিঃসৃত লাল রক্ত তাহার
পদচিহ্নকে রঞ্জিত করিল।
শােন”-ফুলী ডাকিল।
“কি?”
“গয়নাগুলি আমারে পরবার দ্যাও'—
“ন্যাও না—সবই তাে তােমার ফুলকুমারী”—
কিষ্টচরণ গহনাগুলি খুলিয়া ধরিল।
রাত্রি পশ্চিমের দিকে ঢলিয়া পড়িয়াছে। নদীর তীরে অন্ধকার
একটু পালা। গহনাগুলিকে অস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
একে একে সবগুলি গহনা ফুলী পরিল। কোনটা ছােট হয়,
কোনটা আলগা হয়—তবুও সে সব পরিল। অন্ধকারে সে নিজেকে
দেখিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু ভাল বুঝিতে পারিল না। একটু পরেই
চাদ যখন উঠিবে, তখন হয়ত সে তরঙ্গময় ধলেশ্বরীর জলে নিজের
ভাঙ্গা ভাঙ্গা প্রতিবিম্ব দেখিবে। দেখিবে যে সে বদলাইয়া গিয়াছে।
তাহার সঙ্গে ত দর্পণ নাই
তীরে তিন চারিটি জেলে ডিঙ্গি বাঁধা ছিল। ৰােলার ভিতর
হইতে একটি ছুরি বাহির করিয়া একটির দড়ি কাটিয়া কিষ্টচরণ নির্ণ
আশফুলকুমারী”—
ফুলী নৌকাতে উঠিল।
নৌকাতে ঠেলা দিয়া কিষ্টচরণ লাফ দিয়া তাহার উপর
চড়িল।
হঠাৎ ছায়াছবির মত খোড়া হরণের শণ, ক্রন্দনরত মুখ, তাহার
রক্তের কণা, অনুকণা হইতে গঠিত, চামচিকার মত অসহায় মানব
১ শিশুটির মুখ ফুলীর চোখের সম্মুখ দিয়া ভাসিয়া গেল। মুহূর্তে মস্তিষ্কের
ভিতর অনেক স্মৃতির আবর্ত আরম্ভ হইল।
।
১৩৮
এই সীমান্তে
আর্তনাদ করিয়া ফুলী বলিল, “না না, আমারে নামাইয়া দ্যাও
গাে-আমারে নামাইয়া ও
কিষ্টচরণ তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “চুপ”—ফুলীর দেহ
কপিতে লাগিল।
পুটলী হইতে একটা খাবারের ঠোঙ্গা বাহির করিয়া ফুলীর পিঠে
হাত বুলাইয়া দিতে দিতে কিষ্টচরণ আবার বলিল, “এই চাইটা খাইয়া
লও,ফুলকুমারী—ও ফুলকুমারী”—
খাদ্য। জীবন। ফুলীর রসনায় জল আসিল, মস্তিষ্ক ঠাণ্ডা হইল,
কঁপুনী থামিল। খাইতে খাইতে নিজের দেহের অলঙ্কারের উপর
একবার সে হাত বুলাইল। আছে-সব আছে।
অন্ধক। ধলেশ্বরীর স্রোতে নৌকা ভাসিয়া গেল
|
শেষরাতে হারাণের সেই অবসন্ন নিদ্রা ভাঙ্গিয়া গেল।
ছেলেটা কাদিতেছে।
হারণ ডাকিল—“ফুলী”-
কেহ উত্তর দিল না।
ফুলকুমারী -আর রাগিস না-আমারে এবার মাফ কর”
কে জবাব দিবে?
“পােলাটা কানে যে—শুন না-ও ফুলী”-
এবারও কোন সাড়া না পাইয়া হারাণ উঠিল।
শেষ রাত্রিতে চাদ উঠিয়াছে। সেই আলােতে হারাণ দেখিল যে
ফুলী নাই, ছেলেটা একা পড়িয়া কঁদিতেছে।
“ফুলী”–গভীর আশঙ্কায় হারাণ ডাকিল।
“ফুলীও ফুলী—উচ্চকণ্ঠে আবার সে ডাকিল।
এদিক ওদিক ভাল করিয়া দেখিতে দেখিতে সে উপলরি করিল
ক
১৯
এই সীমান্তে
যে, কিষ্টচরণও নাই। এক মুহূর্তে তাহার সমস্ত সমস্যার সমাধান হইয়া
গেল। ফুলী কিষ্টচরণের সহিত পলাইয়াছে। সেই উপলব্ধিতে
হারাণের সমস্ত শরীর ঝিম্ ঝিম্ করিয়া উঠিল, দেহের সমস্ত রক্ত পলকে
মাথায় উঠিয়া আবার নামিয়া আসিল। তাহার চক্ষু দিয়া উষ্ণ জলের
বন্যা নামিল।
ছেলেটাকে কোলে তুলিয়া লইয়া আৰ্ত্তকণ্ঠে কাঁদিয়া উঠিয়া সে
বলিল, “কান্দিস না বাপ, কান্দিস না—কাইল থিকা তরে আমিই দুধ
খাওয়ামু। তর মা? সে মইরা গেছে-
সেদিনও কিছু জুটিল না। ছােট ছেলেটাকে দেখিয়াও কাহারও
দয়া হইল না। নাই, নাই, দেশে অন্ন নাই।
ছেলেটাকে জল খাওয়ায়, নিজেও হারাণ জল খাইল।
মধ্যাহ্নে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। ছেলেটা কেমন যেন নিঃসাড়ের
মৃত।
ক্ষুধায়, দুঃখে, লজ্জায় হারাণ কাঁদে। ক্ষুধার জ্বালা সহ করিতে না
পারিয়াইত ফুলী পলাইয়াছে। সে স্বামী—অথচ সে তাহাকে
খাওয়াইতে পারে নাই। ফুলী কেন পাইবে না।
বিড় বিড় করিয়া সে বলিল, “ফুলী-ফুলী”-
ক্ষুধায় ঘুম আসে নাই, দেহ দুর্বল, চলিতে মাথা ঝিম্ ঝিম্ করে,
দৃষ্টি ঝাপসা হইয়া আসে।
সারা গ্রাম সে ঘুরিয়া বেড়ায়। বুকের উপরে রক্ষিত রক্ত মাংসের
ক্ষুদ্র ও জীবন্ত পিণ্ডটার মধ্যে তখনও প্রাণের স্পন্দন আছে।
মধ্যাহ।
“এক মুঠা ভাত দ্যাও গাে বাবা-
১৪০ এই সীমান্তে “ভাগ, ভাগ”- এই মা-মরা পােলাটারে একটু দুধ দ্যাও মাগাে-দয়া কর- “মাফ কর বাছা—এটা কি দুধের আড়ত নাকি?” আর সে পারে না। “বাবু”—একটি বাড়ীর দাওয়ার সম্মুখে সে বসিয়া পড়িল। দাওয়ার উপরেই বাবু বসিয়াছিল। “কি চাস? “এই পােলাটারে বিক্রি কম বাবু-এক প্যাট ভাত দেন-আর একটা ট্যাকা।” হারাণের চক্ষু জলে। বাবু নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া বলিল, “পােলা কিনুম? ক্যান? আবার নিজেরইত পাঁচটা পােলা আছে। আর কিনলেও এই বন্দরের বাচ্চা কিম ক্যান যা-আগে যা”- রাস্তায় চলিতে চলিতে হারাণ বিড় বিড় করিয়া ছেলেকে বলে, তাের কোনও দাম নাই—হতই। ঠিকইত—যারে মায়ে ফেইলা যায় তারে কে কিন—কে কিনব?” অমাভাঙ্গা মুমু পাখীর মত হারাণের ডান পা ঘুরিয়া ঘুরিয়া ধীরে ধীরে উপরে উঠে—আবার পড়ে। আর পা চলে না। ক্ষেতের মাঝখান দিয়া হাটের দিকে অগ্রসর হয় হারাণ। ছেলেটা বুকের উপর নিঃশব্দে পড়িয়া জোরে জোরে নিঃশাস টানিতেছে। হাটের ঘাটে বড় বড় কয়েকটা মহাজনী নৌকা। তাহাতে একজন খাকী প্যান্ট-পরিহিত কৰ্মচাৰী-পাশে দুইজন পুলিশ। নবীন কুণ্ডুর এই সীমান্তে ১৪১ গােলা হইতে চালের বস্তা বাহির হইতেছে। মজুরেরা নৌকা বােঝাই করিতেছে। হারাণের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ, শুষ্ক কণ্ঠনালী দিয়া কথা বহির হয় না, “বাবু, একমুঠা চাইল জান-মইরা যাইতাছি—মা-মরা তিনদিনের এই পােলাটারে দয়া করেন হুজুর- ভাগ, শ্বশুরা”—পুলিশের গর্জন শােনা গেল। “মইরা গেলাম বাবু, বাঁচান, দোহাই”- “তবেরে শালে”—পুলিশটি দ্রুতপদে আসিয়া তাহাকে ধাক্কা দিল। সে ধাক্কায় কাপিতে কাঁপিতে হারাণ বসিয়া পড়িল। ক্ষণকালের জন্য সে সব অন্ধকার দেখে। ধীরে ধীরে সে উঠিয়া আবার পথ ধরিল। নদীর তীর বাহিয়া দে পথ চলিয়া গিয়াছে দূরে-পূর্ব দিকে। কর্মচারীটি বলিল, “ত্ত সব আপদ-ারে চৌবে-কয় বা হল ?” “একশাে দো হুজুর”- নাই, নাই, দেশে অন্ন নাই। পথটা আঁকিয়া বাঁকিয়া চলিয়াছে। খানিকদূর গিয়াই একটা বড় বাগান। হারাণ খামিল। আর চলা যায় না। কোল হইতে ছেলেকে নামাইয়া একটা গাছের নীচে সে শওয়াইল। ছেলেটা নড়ে না। -হারাণ তাহার বুকে হাত দিল। অতি ক্ষীণ প্রাণের শ্রোতােক। এখনও বাঁচিয়া আছে। ।
১৪২ এই সীমান্তে নদীতে নামিয়া এক বাটি জল লইয়া আসিল হারাণ। একটু জল ছেলেটার মুখে দিয়া সে বলিল, “খা-খালি জল খাওনের অভ্যাসটা এহৰ থিকাই শিখা রাখ”- ছেলেটার দুই কস্ বাহিয়া সেই জল গড়াইয়া পড়িল। সে গিলিতে পারিল না। শুধু জলের স্পর্শে একবার ক্ষুদ্র ও নিষ্প্রভ চক্ষু দুইটিকে মেলিল। তাহাকে দেখিতে দেখিতে হঠাৎ হারাণের মাথা উত্তপ্ত হইয়া উঠিল। দায় ফেলিয়া গিয়াছে তাহার উপরে বেশ্যা মাগীটা। আর সে তাহা বহন করিবে! বটে! হঠাৎ এক দুর্ণিবার ক্রোধে তাহার দুর্বল দেহ কঠিন হইয়া উঠিল, চোখের তারায় হিংস্রতার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল। দুই হাত বাড়াইয়া সে ছেলেটার কণ্ঠনালী চাপিয়া ধরিল। অতি সহজে, সেই নরম, অর্ধপরিণত মাংসপিণ্ডের উপর তাহার আঙ্গুলগুলি বসিয়া পড়িল, ছেলেটার মুদিত চক্ষু বিস্ফারিত হইয়া উঠিল—তারপরে একবার দেহটা একটু কাঁপিয়াই স্থির হইয়া গেল। ধীরে ধীরে হাত দুইটি সরাইয়া লইল হারাণ, “মরচস! বেশ হইচে ইচা আর কি করবি রে ব্যাটা ?” ছেলের চোখের দিকে চাহিয়া সে তাহা বন্ধ করিয়া দিয়া আবার , বলিল, “ঘুমা বাবা–ঘুমা”- নদীর তীরের নরম মাটি খুঁডিয়া সে ছেলেটিকে মাটী চাপা দিল। খানিকক্ষণ সেইখানে স্থিরভাবে বসিয়া সে আবার উঠিল। কিন্তু কিছুদূর গিয়াই সে আবার ফিরিয়া আসিল। সেই মাটীর চিবির উপর কাণ রাখিয়া কি যেন শুনিবার চেষ্টা করিল। অনেকক্ষণ। তারপরে আবার উঠিল। বেলা পড়িয়া আসিতেছে।
এই সীমান্তে ১৪ ঘন জঙ্গলে রাত্রি ঘনাইয়া আসিল। জঙ্গলটা অতিক্রম করিলেই একটা ক্ষেত, সেটি পার হইলেই নুতন গ্রামে পৌছানাে যাইত। কিন্তু আর চলা যায় না। মাটীর উপর শুইয়া পড়িল হারাণ। সে রাত্রিও কাটিল। দিনের আলােতে অতি কষ্টে হাঁটিয়া, হামাগুড়ি দিয়া, অবশেষে মাটীতে গড়াইয়া, জঙ্গলের শেষ সীমানায় সে পৌছাইল। কিন্তু আর চলা যায় না। দিন কাটিল। আবার সন্ধ্যা হইল। হারাণ চোখে আর কিছু দেখে না। প্রতি নিঃশ্বাসে তাহার দেহ কঁপে। ডাঙ্গায় রক্ষিত মাছের মত সে বারংবার মুখব্যাদান করিয়া খাস টানে, বাঁচিতে চায়। কিন্তু হারাণ বাঁচিবে না। আবার রাত্রি ঘনাইয়া আসিবে, ভাের হইবে, পরদিন অন্ধকার রাত্রি যখন আবার প্রত্যাবর্তন করিবে তখন হারাণ মরিবে, আর ক্ষুধিত শৃগালেরা তাহাকে ঘেরাও করিয়া জলসার আয়ােজন করিবে। হারাণ মরিবেই। দেশে অন্ন নাই। কিন্তু হারার সম্মুথের বিস্তৃত ক্ষেত হয়ত একদিন বর্ষার অজস্র বারিসিঞ্চনে সুস্নিগ্ধ ও সুকোমল হইয়া হরিৎ জীবনের অঙ্কুরে ভরিয়া উঠিবে, আলাে ও বাতাস হইতে অমিত জীবনের কণিকা আহরণ করিয়া হয়ত সেগুলি ক্রমে বড় হইবে, ক্রমে পাকিয়া সুবর্ণের মত ঝক ঝক করিবে, মানুষকে বাঁচাইবে কিন্তু তাহাতে হারাণের কি লাভ? হারণ সেদিন মাটীতে মিশিয়া যাইবে।) জমান্তে সৈনিক চাই।
কল্কি অবশেষে মেঘান্ধকার রাত্রি শেষ হইল । ফুটপাথের উপর—যেখানটায় একটু আচ্ছাদন আছে, সেইখানে তাহারা শুইয়া ৰাত্ৰিশেষেরই কামনা করিতেছিল। হয়তাে নূতন দিনের আলােতে খাদ্য আসিবে, জীবন বাঁচিবে। হয়তাে। তাহারা শুইয়া ছিল সারি সারি, অসংখ্য—নগ্নগাত্র, অর্ধাঙ্গ নর ও নারী, শিশু ও বৃদ্ধ—রক্তহীন শুষ্ণচর্মে আবৃত জীবন্ত কঙ্কালের সারি। তাহারা শুইয়া ছিল। নিদ্রার জন্য নয়, দুর্বলতার জন্য। ক্ষুধা। আকাশ ঘােলাটে। বৃষ্টি পড়িতেছে ঝিরঝির করিয়া। মেধাবৃত সুৰ্যের অস্পষ্ট আললা শহরের বুকের উপরীরে ধীরে ছড়াইয়া পড়ে। তারা সৰ্বশেষে শুইয়া ছিল। বুকের উপর দেড় বছরের ছেলেটা বিমাইয়া ঝিমাইয়া স্তন্যপান করিতেছে। ডান দিকে ছয় বছরের ছেলে ভােলা, বাম দিকে দশ বছরের মেয়ে দুর্গা। মা।ভােলা উঠিয়া বসিল। কঠে তারা প্রশ্ন করিল, কি রে ? ক্ষিদে পেয়েছে। তারা চুপ করিয়া রহিল। মা, ও মা, গুনিস না ক্যানে? বলছি না, ক্ষিদে পেয়েছে- দশ বছরের মেয়ে হইলে কি হয়, দুর্গার বুদ্ধি আছে। সে মায়ের নীয়তার কারণ অনুমানে বুঝিতে পারিয়া বলিল, ক্ষিদে পেলেই বা কি রে হতঙ্গাগা-বেলা বাড়ুক, ভিক্ষে করে পেলে তবে খেতে পার্টি। না, আমায় খেতে দে না, শুনছিস না ক্যান?
कदि ১৪৫ চুপ কর-দুর্গা ধমক দিল। তুই চুপ কর হারামজাদী।ভােলা পাল্টা ধমক দিল। তারা চুপ করিয়াই রহিল। ছেলেমেয়েদের দোষ কি? নিজের জঠরের অভ্যন্তরে যে জ্বালা, যে শূন্যতা পাক খাইয়া খাইয়া নিরন্তর দেহকে দগ্ধ করিতেছে, দুৰ্বল করিতেছে, তাহা যে কি যন্ত্রণাদায়ক তাহা তারা জানে, আর জানে বলিয়াই চুপ করিয়া থাকা ছাড়া অন্য কোনও উপায় তাহার নাই। তারা ভােলার দিকে চাহিল। শীর্ণ ভােলা। পেটটা প্লীহায় স্ফীত, বুকের পাঁজরাগুলি বিকটভাবে প্রকট, চোয়ালের হাড় দুইটি উচু, লিকলিকে হাত-পা, ময়লা জমিয়া দেহের ময়লা রঙ আরও ময়লা হইয়া উঠিয়াছে, আর পীড়াদায়ক বুভুক্ষার নিষ্ঠুর হুতাশন তাহার দুই চোখের তারায় জলজল করিতেছে। দ্বগ্নার চেহারাও তেমনই। বুকের উপরে শায়িত ছেলেটার দিকেও তারা চাহিল। শীর্ণ, অতি শীর্ণ ও নগ্ন ছেলেটা। মায়ের শুষ্ক কঙ্কালসার দেহের অবশিষ্ট শােণিত- ধারা তাহার দুগ্ধহীন বক্ষ হইতে শােষণ করায় সে ব্যস্ত। কিন্তু সুবিপুল প্রয়াসে তাহার কোমল, লালাসি * জিহ্বার দ্বারা প্রাণপণে চেষ্টা করিয়াও সে একবিন্দু ক্ষীরধারা পায় না। ছেলেটা কাদিয়া উঠ ক্ষীণকণ্ঠে। [ পাঠক, এবার ওঠ। বেলা আটটা হয়েছে, এবার নরম বিছানা ছেড়ে ওঠা যেতে পারে, নয় কি? [ উঠে ব’স। পাশের ঘরে একটি সুডৌল হাতের চুড়ির টুংটাং শব্দ হচ্ছে, সেই সুমধুর শব্দকারিণীকে তো তুমি চেন। তিনি চা তৈরি করছেন। [ তােমার শিয়রে টেবিলের ওপর তােমার চাকর আজকের ‘স্টোল’খানা রেখে গেছে (কাগজ পড়তে হয় তো ইংরেজী ১৪৬ এই সীমান্তে সত্যি)। আজ রবিবার। তুলে নাও। বাঃ, অনেকগুলাে ছবি বেরিয়েছে তাে আজ। ক্ষুধার্ত নরনারীদের ছবি। সত্যি, ভারী দুঃখের বিষয়। কি যে হচ্ছে আজকাল দেশের। যুদ্ধের জন্য এ অবস্থা, কি করা যেতে পারে? ঈশ্বরকে ধন্যবাদ-আমরা চাকরি করি ; সরকারও দয়ালু-ব্যাশন দেন; তা ছাড়া আমাদের প্রতিপত্তি আছে। অবশ্য একটু বেগ পেতে হয় বইকি। তবু, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। [ পাতা ওল্টাও। “An All-India Disgrace'। ব্যাপার কি ? পড়। বাঃ, বেশ লিখেছে তাে! এমন লেখা কেবল সায়েরাই লিখতে পারে। কিন্তু কি ফানি! সায়েবা না বােঝালে আমরা বুঝি না, না? [ পাঠক, সেই সুডৌল হন্তের অধিকারিণী কক্ষে প্রবেশ করেছেন। শিশির-স্নাত পদ্মের মত মুখে মৃদু হাসিরু রেশ, রাত্রিজাগরণ-খিন্ন ডাগর চোখের কোণে বিদ্যুতের জালা। পাঠক, মুগ্ধ হও। বল, এই যে- সুস্বাগত দেবী। দেবী হেসে বলবেন, ধন্যবাদ দেব। টেবিলের ওপর চায়ের কাপ। বল, এই ছবিগুলাে দেখ। তিনি দেখে বলবেন, আহা! বুল, সত্যি, বড় দুর্দিন এসে গেছে-চাল ডাল পাওয়া আজকাল যে কি ব্যাপার—উঃ। উত্তরে শুনবে, ঠিক বলেছ, হ্যা, ভাল কথা, মাস শেষ হলেই আরও তিন মণ চাল বেশি কিনে রাখ, বুঝলে? ব্যথা নাড়। আচ্ছা। [ বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। অন্ত্রের গুড়াের মত। একটু একটু বাতাস আছে, অস্পষ্ট আলো। দেহে প্রত্যাখ্যাত তার মদির অনুভূতি, সম্মুখে সুন্দরী নারী, তার চোখে কটাক্ষ, সান্নিধ্যে উষ্ণতা। [ পাঠক, কাগজটা মুড়ে রাখ। সুবর্ণের মত পীতাভ চা। চায়ের কাপ থেকে পােয় উঠছে। একটা সিগারেট ধরাও।
कदि
১৪৭
সিগারেট পুতুক-ভােরের আর্দ্র বাতাসে সিগারেটের মুরভিত ধোয়া
নৃত্যরতা অপ্সরীর সূক্ষ্ম দেহাবরণের মত উড়ে যাক, উড়ে যাক—
অন্যান্য সকলের কথাবার্তা, কোলাহল তার কানে ভাসিয়া
আসে।
সে কি জল—কি তার গর্জন-উঃ।
চারডি ভাত ও গো-চারডি বাসী ভাত--
বাড়ি ঘর সবই ছিল ভাই, সবই ছিল
কতদিন ভাত খাই নি-কতদিন
একটুকুন ফ্যানই না হয় দাও গাে বাবা, মরে গেলাম।
মা খেতে দেভােলা ডাকিল।
তারা নড়ে না, তাহার মাথা ঝিমঝিম করিতেছে।
জনতা বাড়িয়া চলিয়াছে । মহানগরী। মহানগরীর নাগরিকেরা।
তাহারা হাসিতেছে, কথা বলিতেছে। তাহাদের জঠরে অন্ন আছে,
দেহে রক্ত আছে, তাহারা বাচিয়া আছে। এই অজস্র মুস্থ, জীবিত
নাগরিকের আশেপাশে তাহারা পড়িয়া আছে।
সেই ক্ষুধার্ত
নরনারীরা।
দ্যাও গাে বাবু, একমুঠ বাসী ভাত দাও।
দুর্গার বুদ্ধি আছে। সে পথচারীদের প্রতি আবেদন জানায়, চারডি
খেতে চাও বাবা, মরে গেলাম গাে বাবা।
আরে! লােকটা যে মরে গেছে। কে যেন বলিল।
তারা চাহিয়া দেখিল। দুরে বছর পঞ্চাশের একটি কঙ্কাল মরিয়া
কাঠ হইয়া রহিয়াছে। তাহার চক্ষু উন্মীলিত, দৃষ্টি স্থির, রক্তাভ ;
প্রাচীন মমির মত তাহার গাল ভাঙা, চামড়া কুঞ্চিত ও শুষ্ক। খােলা,
• মুখের দুই পাশে মাছিরা বসিয়া পরমানন্দে লােকটির অবিনশ্বর আত্মার
নম্বর আখাটিকে লেহন করিতেছে।
১৪ এই সীমান্তে আমরাও অমনই মরব।-একজন বলিল। চারডি খেতে দ্যাও গাে বাবু, না হয় দুটো পয়সা স্থাও—দুর্গার গলা শােনা যায়। উঃ আর পারি না।-কে যেন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল। [ পাঠক। বায়ুসমুদ্র বেয়ে সে ক্ষীণ দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দ আমাদের কানে ভেসে আসতে পারে না। আর কি দরকারই বা তার? তার চেয়ে রেডিওটার সুইচ টিপে দাও। কুমারী সুচরিতা সেন গাইছে। সঙ্গীতের মূচ্ছনায় তােমার কক্ষ ঝক্ত হােক। বাঃ!] কেবল মধুসূদনই লজ্জাহারী নন। ক্ষুধাও লজ্জাহারী। তাই কমলার লজ্জা নাই। শতচ্ছিন্ন শাড়ীটার অন্তরাল হইতে তাহার দেহের অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ দৃষ্ট হয়। যৌবনের কঠিন ও কোমল রূপ । মানুষের চোখ আছে। ভগবান দিয়াছেন। চোখের নিয়ম দেখা। তাই শতসহস্র চোখের অদৃশ্য শায়ক আসিয়া কমলার দেহে বিদ্ধ হয়। কমলার বাঁচিবার আশা আছে। তারা নিজের পরিধেয়ের প্রতি চাহিল। হাঁটু পর্যন্ত একটি ছিন্ন শাড়ী-অতি মলিন ও দুর্গন্ধযুক্ত। তাহাতে লজ্জা-নিবারণ হয় না। দুর্গাও ভােলার মত অবুঝ হইয়া উঠিয়াছে, মা, আর যে পারি না ভিক্ষে চেয়ে দ্যাখ, মা—তারা শুইয়া শুইয়াই বলিল। তাহার দেহ অবশ হইয়া আসিয়াছে। আজ ষষ্ঠ দিন যে সে বাঁচিয়া থাকার উপযুক্ত কিছু খায় নাই। আজ পনেরো দিন যাবৎ সে অন্নের মুখ দেখে নাই। বাবুমশয় গাে, দয়া করেন, চারডি খেতে যান বাবু।—ভােলা বলিল। দুর্গা ভােলার কথা শেষ করে, ভগবান আপনাকে রাজা করবে, চারডি ভাত দ্যাও গো বাবু। বাবুর উত্তর দেয় না। আকাশে মেঘ পাতলা হইয়া আসিয়াছে। রৌদ্র দেখা দিয়াছে। রাজপথ জনাকীর্ণ। একটি বছর ছয়েকের অতিশীর্ণ ও নগ্ন মেয়ে কন্তুি ১৪৯ ফুটপাতের এক কোণে বসিয়া কাঁদিতেছিল। শব্দহীন কান্না। শব্দ করিয়া কঁদিবার মত তাহার ক্ষমতা নাই। সরু কাঠের ফালির মত লিকলিকে হাত-পা, কেশহীন মস্তকে একটি দগদগে ঘা। হাত নাড়িয়া মাঝে মাঝে পথচারীদের সে কি যেন বলিবার চেষ্টা করিতেছে। বুঝিয়াও কেহ বােঝে না। এই বিপুল পৃথিবীতে মেয়েটির কেহ নাই। তাহার মা-বাপ তাহাকে ফেলিয়া কোথায় গিয়াছে, কেন গিয়াছে, সে তাহা জানে না। হাত-পা নাড়িয়া মেয়েটি খাইতে চায়। ক্ষিদেয় মরে গেলাম, বাঁচাও গো-দুর্গা বলিল। এই যে, ঠিক জায়গায় পৌছেছি।-একজন যুবক বলিল। যুবকটির সঙ্গী কঁাধে ঝোলানাে ক্যামেরা খুলিয়া ছবি তুলিবার জন্য প্রস্তুত হইল। তাড়াতাড়ি করে রমেশ; আবার মেঘলা হ’ল বলে। হ্যা, এই যে। চারিটি ছবি তােলা হইল। [ পাঠক। কালকের ‘স্টেটসম্যান’ বা ‘আনন্দবাজার’ কিনাে। ওই ছবিগুলাে তাতে দেখতে পাবে। সেগুলাে দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, ‘আহা" বলে আমরা আমাদের ঔদার্য প্রকাশের সুযােগ পাব, কেমন ? [ এই যে তােমার একজন বন্ধু এসেছেন। বসাও। বিশ্ব-রাজনীতি নিয়ে আলােচনা হােক। কমিউনিজম ভাল, না ক্যাপিটালিজম ? রাশিয়ার জয় হলে কি হবে? ভারতবর্ষ সম্বন্ধেও একটু আলােচনা হতে পারে। খাদ্য-সমস্যার বিষয়টাও গুরুতর বটে। আলােচনা জমে পটল আর সই করিতে পারিতেছিল না। মুহূর্তে তাহার মস্তিষ্কের
R
এই সীমান্তে
ভিতরটা অন্তর্দাহী অগ্নির সূচীমুখী জালার তাড়নায় আলোড়িত হইয়া
উঠিল। আর পারা যায় না। সে উঠিয়া বসিল।
পূবদিক হইতে একটি মােটর আসিতেছে। সে এক পাশে
দাড়াইল।
মােটরটি যেমনই নিকটস্থ হইল, অমনিই সে লাফাইয়া পড়িল
তাহার সামনে। ড্রাইভার বড় কৌশলী। মুহূর্তে সে ব্রেক কষিয়া
সজোরে গাড়ি ডান দিকে ঘুরাইয়া দিল। পটল ছিটকাইয়া অজ্ঞান
হইয়া পড়িল।
রক্ত। হৈচৈ। ভিড়। পুলিস।
মাথায় জল ঢালাতে রক্ত থামিল। পটল জ্ঞান ফিরিয়া পাইল।
মোটরের বাবুরা তাহাকে মােটরে চড়াইয়া হাসপাতালে লইয়া চলিল।
পটল মরিল না।
ক্রোধে, দুঃখে সে নিজের মনে বলিল, যদি একবার ভগবানকে
পেতাম। কিন্তু ভগবান রসিক লােক। তাহাকে পাওয়ার রাস্তা তিনি
অনেক ভাবিয়া বন্ধ রাখিয়াছেন।
তারা সব দেখিল। কোলের মূক শিশুটিকে সে বুকে চাপিয়া
তাহার বুকের ভিতর দুর্বল হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ সজোরে
উত্তেজিতভাবে চলিতেছে।
দুর্গা সমানে ক্ষীণকণ্ঠে বলিয়া চলিয়াছে, দয়া করে চারডি খেতে
ব্যাও গাে বাবুরা, চারডি স্যাও
ভােলা কাঁদিয়া বলিল, কিছু পাচ্ছি না যে মা, অ্যাই মা!
পাবি বাবা, পাবি।—তারা উত্তর দিল ।
ছাই পাব, কলা পাব, দে, আমায় খেতে দে।
চুপ কর বাবা।
, চুপ করব না সে সহসা দাড়াইয়া নিজের পেটের উপর দুই
ধরিল।
কজি ১৫১ হাত দিয়া চাপড়াইতে চাপড়াইতে কাঁদিয়া বলিল, না, খেতে দে, আমায় খেতে দে রাক্ষুসী, শিগগির খেতে দে। তারা হাউহাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। সে কথা খুঁজিয়া পায় না। একজন বৃদ্ধ ভদ্রলােক থমকিয়া দাড়াইল, পকেট হইতে একটি আনি বাহির করিয়া ভােলার দিকে নিক্ষেপ করিয়া বলিল, এই নে বাবা। ভােলা চিলের মত ছো মারিয়া সেই আনিটা উঠাইয়া লইয়া ক্ষণকাল কি যেন ভাবিল। পরক্ষণেই সে দৌড় দিল, যত জোরে পারে। দুর্গা চীৎকার করিয়া উঠিল, থাম, ওরে ভােলা, থাম ভাই। ভােলা ততক্ষণে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। দুর্গা কাঁদিয়া উঠিল, রাক্কস, রাজুসীর পেটের বাস। চুপ ক বাছা, তােকেও দেবে খন। ছাই দেবে, কচু দেবে, ও লব খেয়ে ফেলবে। ও রাস মরবে, নিশ্চয় মরবে। দুর্গা!-তারা ধমক দিল। দুর্গার দুই ভাঙা গাল বহিয়া অঞ নামিল, মুখ ফিরাইয়া সে আবার বলিতে লাগিল, দয়া কর, বাবু গাে, চারডি ভাত দাও, চাডি খেতে গাও- বেলা বাড়িতেছে। আকাশ আবার মেঘলা। বৃষ্টি আবার পড়িতেছে। রাস্তায় জনতা, শব্দ, কোলাহল, হাসি। দূরে কন্ট্রোলের দোকানের সামনে সারি বাঁধিয়া অগণন নর-নারী দাঁড়াইয়া আছে। বেলা বারােটায় দোকান খুলিবে। সেই পঞ্চাশ বছরের লােকটির শবদেহ তেমনই পড়িয়া আছে। 'মাছিগুলি তাহার মুখের লালা লেহন করিয়া এবার তাহার চোখের তারার উপর বসিয়াছে। [ পাঠক! আজ রবিবার, আজ একটু ভাল খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করেছ হে? ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, আমাদের প্রতিপত্তি আছে। তােমার
এই সীমান্তে
সেই ডেপুটি বন্ধুটিকে চাল আর তেলের ব্যবস্থাটা করে দেবার জন্যে
কাল একবার বলাে। আর যদি প্রমথ দারােগার সঙ্গেও দেখা করতে
পার তত ভাল হয়। সত্যি, ঈশ্বর আছেন বলেই আমরা খেয়ে বেঁচে
আছি। তা না হলে কি হ’ত? আমি কল্পনা করে অনেকবার ভয়
পেয়েছি। যদি রাস্তার ওই সব গরিবগুলাের মত তােমার অবস্থা হত,
তা হলে? তােমার ওই মসৃণ চামড়া শুকিয়ে কুঁকড়ে যেত, গালটা
মাংসহীন হয়ে যেত, চোখ দুটো বড় বড় হ’ত, ভেতরের হাড়গুলাে মাথা
ঠেলে আত্মপ্রকাশ করত, তিলে তিলে ধীরে ধীরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে
তুমি প্রতি মুহূর্তে এগােতে। ভয় হচ্ছে বুঝি? তবে থাক। ঈশ্বরকে
ধন্যবাদ, তােমার আমার সে অবস্থা নয়। ঈশ্বর পরম দয়ালু।
[ বাঃ, বাইরে কি ঘনঘটা! মেঘের ছায়ায় চারিদিক আবরিত,
আকাশের বাধন ভেঙে সঙ্গীতের সৃষ্টি করে বর্ষার জলধারা পড়ছে,
অবিরাম পড়ছে, মনটা কোথায় যেন উধাও হয়ে যেতে চায়, না?
[ রান্নাঘর থেকে মাংসের গন্ধটা ভেসে আসছে বােধ হয় ?
[ পাঠক! তােমার দেবী এসেছেন।
[ ব’স, নমিতা, বস।
( কেন ?
[ একটা গান গাও।
[ দূর, আমার রান্না শেষ হয় নি।
[ সে বামুন দেখবে 'খন, ব’স, একটা গান গাও।
[ কি গাইব?
[ এমন দিনে তারে বলা যায়।
[ গান হােক।
সমাজ সংসার মিছে সব
মিছে এ জীবনের কলরব
কল্কি কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব। পাঠক! গভীর অনুরাগভরে সুকণ্ঠী গায়িকার একটি উচ্চ ও সুকোমল হাত নিজের হাতে টেনে নাও। সমাজ সংসার সব মিছে, বাইরের অন্ধকারে তা মিশে যাক, মিলিয়ে যাক।] দয়া করিবার মত কেহ নাই! দুর্গার গলা ধরিয়া আসিয়াছে, সে মাকে বলিল, আর পারছি না, কেউ তাে কিছু দেয় না মা। তারা ভাবিতে চেষ্টা করে যে, আর কি নৃতন কথা বলিয়া সে মেয়েকে সান্ত্বনা দিবে। এমন সময়ে ভােলা ফিরিয়া আসিল। দুর্গা তাহাকে দেখিয়া উৎফুল্ল হইয়া উঠিল, দে ভাই চারডি, কি এনেছিস। ভােলার চোখের তারায় প্রাণের অতি ম্লান জ্যোতি, সে বলিল, কিছু আনি নি তাে। দুর্গা বিশ্বাস করিল না, যাঃ, দে না ভাই, লক্ষ্মীটি। চার পয়সায় কটা ফুলুরী মিলবে রে হারামজাদী ? আনিস নি কিছু? দুর্গা ক্রোধে ফাটিয়া পড়িল, পাজী, গাধা, রাক্কস, সব খেয়ে ফেলেছিস ? মা, ও মা, শুনছিস ? আমার জন্যে কিছু আনে নি। হারামজাদা। গাল দিস না দিদি। ইস! দেব না, একশাে বার দেব, মুখপােড়া শুয়ােরের বাচ্চা। বলিয়াই দুর্গা দুম করিয়া ভােলার পিঠে এক কিল বসাইয়া দিল। পর- মুহূর্তেই ভােলা হিংস্র জন্তুর মত বােনের চুলের মুঠি ধরিয়া ঝুলিয়া পড়িয়া- উচ্চৈঃস্বরে কাদিতে কঁদিতে বলিল, তােকে খুন করে ফেলব রাশী, মা মেরে ফেললে আমায়, ও মা!
। ১৫৪ এই সীমান্তে তারা কাঁদিতে কাদিতে উঠিয়া ছেলেমেয়েদের ছাড়াইয়া দিতে গেল। কিন্তু কেহ ছাড়ে না। অতিকষ্টে তাহাদের থামাইয়া সে বলিল, তােদের পায়ে পড়ি, থাম, থাম। বাঃ রে, আমায় কিছু দিলে না, আর আমি ছেড়ে দেব? আমি যে মরে যাচ্ছি, সেটা দেখিস না ? তারা কঁদিয়া ফেলিল, দেখছি বই কি, কি করবি মা, ভগবানকে ডাক্। ভগবান? দুর্গা ভগবানের নাম শুনিয়াছে, কিন্তু তাহাকে ডাকার কোনও সার্থকতা আছে কি না, তাহা তাে সে আজও উপলব্ধি করে নাই। দুর্গা রাস্তার দিকে আবার মুখ ফিরাইয়া বসিল, তাহার চোখে অশ্রুর ধারা। অনুনাসিক সুরে সে বলিতে লাগিল, মরে গেলাম গাে, চারডি খেতে দ্যাও, একমুঠো ভাত দাও গাে বাবুরা • শুধু দুৰ্গা নহে, সেখানে তাহাদের মত আর যাহারা ছিল, তাহারাও দুর্গার মত কাঁদিয়া কাঁদিয়া ভিক্ষা করিতেছিল। অজস্র লােকের মিছিল চলিয়াছে। ট্রাম, বাস, রিকশা, মােটর। বড় বড় অট্টালিকা আর ঐশ্বৰ্য্য। উপরে দুইটি বােমারু বিমান বায়ু তরঙ্গে বড় বড় ঢেউ তুলিয়া সশকে চলিয়া গেল। ঝিরঝির, ঝিরঝির বৃষ্টি পড়িতেছে। আকাশ খানিকটা পরিষ্কার হইয়া আসিতেছে বটে, কিন্তু পূবের আকাশে আবার ঘনকৃষ্ণ মেঘের পুঞ্জ পাহাড়ের মত মাথা ঠেলিয়া উঠিতেছে। দূরে কন্টেলের দোকানের সামনে নর-নারীর সারি দীর্ঘতর হইয়া উঠিয়াছে। বৃষ্টিতে, কাদায় তাহারা ভিজিয়া উঠিয়াছে, কিন্তু তবুও কেহ নড়ে না। জাহাদের কোলাহল ভাসিয়া আসিতেছে। শুনছ তােমরা?-ছাতা মাথায় একজন বাঙালী ও একজন মাড়ােয়ারী আসিয়া তাহাদের সম্মুখে দাঁড়াইল।
কল্কি বাঙালীটি বলিল, তােমরা সকলে আগরওয়ালাবাবুর মােড়ের ওই বড় বাড়ীতে চল, ওখানে খেতে দেবে। দমকা বাতাসে যেন শুষ্ক মৃত পত্ররাশি মর্মরধ্বনি তুলিল। মাছােয়রীটি ডাকিল, দের কছে না, এস শিগগিরি করে। ছেলেমেয়েদের ডাক দিয়া দ্রুতকর্থে তারা বলিল, শিগগির চল, শিগগির চল রে। চল মা।ভােলা লাফাইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি চল মা-দুর্গাও প্রতিধ্বনি তুলিল। তারা উঠিয়া দাঁড়াইল। পা দুইটি একবার থরথর করিয়া কঁপিয়া উঠিল, চোখের সম্মুখে একবার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল। প্রাণপণে সে নিজেকে সামলাইয়া লইল। সকলেই উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে। অনেকে দ্রুতপদে চলিতেও আরম্ভ করিয়াছে। আসন্ন খাদ্যের আশায় তাহারা হঠাৎ জোরে জোরে কথা বলিতেছে, জোরে জোরে পা ফেলিতেছে। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি। কেবল পড়িয়া রহিল সেই পঞ্চাশ বছরের লােকটার শীতল দেহ। আরও দুইটি প্রাণী পড়িয়া রহিল। একজন বৃদ্ধা। চটের মত মােটা একটা নােংরা কাপড় কোমরে জড়াইয়া রহিয়াছে। তাহারই সম্মুখে একটি কছর পঁয়ত্রিশের লােক ফুটপাতের এক পাশে হাত পা ছড়াইয়া চোখ বুজিয়া পড়িয়া আছে। মাঝে মাঝে লােকটি চক্ষু মেলিতেছিল আর মুখব্যাদন করিয়া জোরে জোরে নিশ্বাস লইতেছিল। যাহারা খাদ্যের লােভে ছুটিতেছিল, তাহাদের মধ্যে একজন লােক পিছন ফিরিয়া ডাকিল, এই বুড়ী,'তােরা যাবি নি ? বুড়ী মাথা নাড়ল। ক্যানে।. বুজ শায়িত লােকটিকে অঙ্গুলিনির্দেশে দেখাইল।
এই সীমান্তে
কি হয়েছে?
মরছে।
লােকটি ক্ষণকাল চুপ থাকিয়া প্রশ্ন করিল, উটি তাের কে?
বুড়ী হাসিয়া বলিল, আমার ছেলে, দশ মাস ওকে আমি পেটে
ধরেছিলাম।
লােকটি দ্রুতপদে সরিয়া গেল।
[ পাঠিকা! মেঘমেদুর মধ্যাহ্নের অপরূপ সৌন্দৰ্য্য কি তুমি দেখবে
? বাতায়ন খুলে দাও। অভ্রের গুড়ের মত বৃষ্টি পড়ছে, ঝিরঝির
ঝিরঝির। বাঃ! অলস দেহ এলিয়ে দাও শুত্র শয্যার ওপর।
বাতায়ন-পথ দিয়ে দূরে চাও। তােমার সুন্দর মুখের ওপর বায়ুতাড়িত
অলকগুচ্ছ বারংবার এসে পড়ুক, কালাে চেেেখ স্বপ্ন ঘনাক।
[ নিজের সংসারের কথা একবার ভাব। সব আছে। তুমি সুখী।
পাশে তােমার চার বছরের মােমের পুতুল, তােমার স্বামীর বুকের
মানিক, তােমার ছেলে। তার দিকে একবার সস্নেহে তাকাও। একদিন
ও বড় হবে, বিলেত যাবে, আই. সি. এস, হবে, না ? নিশ্চয়ই।
[ পাঠিকা! আজ বিকেলে তোমায় রিহার্সালে যেতে হবে। দেশের
দুঃস্থ নরনারীদের সাহায্যের জন্য চ্যারিটি হবে, না? তােমার কৃতিত্ব
যে এতে অনেক, তা আমি জানি। তুমিই মেয়েদের গান শেখাবে, নাচ
শেখাবে। পাঠিকা, তুমি যে দেশের নর-নারীর দুঃখ সহ করতে পার
, তা আমি জানি। তুমি আমার প্রণাম গ্রহণ কর।
[ আঃ ধোয়ার মত পাতলা মেঘ আকাশে উড়ে যাচ্ছে—উড়ে
যাচ্ছে।]
বৃষ্টিতে ভিজিয়া, অতি কষ্টে ছেলেমেয়েদের লইয়া তারা পৌছাইল।
তাহার শরীর ভাঙিয়া পড়িতেছে। আর শক্তি নাই।
সামনের দিকে চাহিয়া তারা হতাশ হইয়া বসিয়া পড়িল।
কল্কি
১৫৭
কুৎকাতর জনসমুদ্রের উন্মত্ততা। ঠেলাঠেলি, মারামারি, আর্তনাদ,
গালিগালাজ। সবাই আগে প্রবেশ করিতে চাহিতেছে। যাহারা
অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তাহারা পশ্চাতে বসিয়া আছে। তারাও ছেলে-
মেয়েদের লইয়া বসিল।
দুর্গা কাদিয়া বলিল, চল না মা, এগিয়ে চল না।
ভােলা হাত ধরিয়া টানিল, চল না এক পাশ দিয়ে মা।
তার মাথা নাড়িল, মরে যাব না, তার চেয়ে এমনই থাক, না হয়
একটু দেরিতে পাব।
দুর্গা কঁাদিয়া বলিল, সব যে ফুরিয়ে যাবে মা, শিগগির চল্।
তারা আর মাথা খাড়া রাখিতে পারে না, সে শুইয়া পড়িয়া বলিল,
পাগলী কোথাকার, ডেকে নিয়ে এল যে !
বৃষ্টিতে তাহাদের সর্বাঙ্গ ভিজিয়া গিয়াছে।
দুই ঘণ্টা পরে। মাড়ােয়ারীর বাড়ির ফটক বন্ধ হইল। অনেক
অভুক্ত নর-নারী তখনও অবশিষ্ট। এত ভিড় প্রত্যাশা করা যায়
নাই।
অভুক্তেরা আর্তনাদ করিয়া উঠিল।
পূৰ্বোক্ত বাঙালী বাবুটি ফটকের ওপাশ হইতে চীৎকার করিয়া
বলিল, আজ সব ফুরিয়ে গেছে, তােমরা কাল এসাে।
অভুক্তদের কোলাহল বাড়িয়া গেল। কিন্তু ফটকটা আর খুলিল
। লােহার ফটক, ভাঙাও যায় না।
কাল ? তারা বিশীর্ণ হাসি হাসিল। কাল ? সে তাে অনেক
দেরী, অ-নে-ক দূর।
দুর্গা মায়ের হাত ধরিয়া টান দিল, ও মা, ফুরিয়ে গেল যে।
তার উত্তর দিল না।
১৫৮
এই সীমান্তে
দুর্গা ডুকাইয়া কাঁদিয়া উঠিল, তখনই তাে তােক বললাম, তুই
শুনলি না। তুই রাক্ষুসী, না খাইয়ে তুই আমায় মেরে ফেলতে চাস।
ভােলা কঁদিতেছে, মা খেতে দে, খেতে দে।
দুর্গা গর্জন করিয়া উঠিল, ম, ম মুখপােড়, চার পয়সার ফুলুরি
খেয়েও তাের পেট ভরে নি ?
ভােলা রুখিয়া উঠিল, গাল দিস না, খবরদার, পেত্নী কোথাকার।
পরক্ষণেই ভাইবােনে মারামারি আরম্ভ হইয়া গেল। কোলের
ছেলেটাও কঁদিতেছে। ক্ষীণ, অতি ক্ষীণ ক্রন্দন।
দাঁড়াইল। দেহ থরথর করিয়া কঁপিতেছে।
আয়, মারামারি করিস না, লক্ষ্মীর, আয়, দেখি কি পাই।
ছেলেমেয়েদের ছাড়াইতে তাহার দম বন্ধ হইয়া আসে।
বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ নাচাইয়া দুর্গা ভেঙচাইল, কচু কচু, কচু পাবে।
তারা উঠিয়া
রাস্তা দিয়া চলিতে চলিতে দুর্গা ভিক্ষা চায়, এক মুঠো ভাত চাও
গাে, মরে গেলাম।
দুটো পয়সা দ্যাও বাবু, দয়া কর।-লােও বলে।
তারা একটি গলিতে প্রবেশ করিল। দূরে একটি ডাস্টবিন দেখা
গেল। দুর্গা ও ভােলা উদ্ধশ্বাসে ছুটিল। সেই দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনার
স্তুপ সরাইয়া সরাইয়া তারা একটি ছাইমাটি-লাগানাে শুষ্ক রুটি ও
ভােজনশেষে পরিত্যক্ত শালপাতা পাইল। শালপাতায় কয়েকটি
ভাত লাগিয়া আছে। দুর্গা মায়ের হাত হইতে রুটিটি কাড়িয়া লইল।
ভােলা সেই শালপাতা পরম আগ্রহে লেহন করিতে লাগিল।
দূরে একটি হৃষ্টপুষ্ট দেশী কুকুর শুইয়া আছে। সে নির্লিপ্ততাৰে
তাহাদের দেখিয়া মুখ ফিরাইয়া লইল। ওই খাদ্যে তাহার লােহ
নাই।
कवि
ছিন্ন শাড়ীর প্রান্ত দিয়া রুটিটি মুছিয়া দুর্গা তাহা ছিড়িয়া নিজে
একটু বেশি লইয়া ভােলাকে কমটুকু দিল।
ভােলার কণ্ঠে অনুযােগ ধ্বনিত হইল, আমায় এত কম দিলি যে?
দুর্গা ফোস করিয়া উঠিল, এই যে দিয়েছি এই তাের বাপের ভাগ্যি,
তুই আমায় ফুলুরি দিয়েছিলি রে রাকস?
মা, ভাল হবে না কিন্তু।
থা, ওরে, খা, এবার ফিরে চ বড় রাস্তায়, ইদিকে কি পাব না।
তারার দেহে আর শক্তি নাই।
দুর্গা আর ভােলা সেই রুটির টুকরা চিবাইতেছে। বন্যপশু-শাবকের
মত ধারালাে তাহাদের দাত, ক্ষুধায় তাহার ধার আরও বাড়িয়াছে।
হউক না রুটি শুষ্ক কঠিন, তাহারা খাইবেই।
গলির শেষের বাড়িটার দোরগােড়ায় গিয়া দুর্গা ডাকিল, কে আছ
গাে, দয়া কর, মরে গেলাম গো মা।
একটি বৃদ্ধা দরজার সামনে দাঁড়াইয়া ছিল, সে তাহাদের দেখিয়া
লেধ হয় বিচলিত হইল। সে ডাকিল, দিদি, ও নীলুদি !
একটি তেরো-চোদ্দ বছরের মেয়ে আসিয়া দাড়াইল।
কি ঠাকমা ?
কিছু যদি থাকে তো এনে দে তাে।
বা: রে, তুমি ঠাকমা সব্বাইকে দয়া করতে আরম্ভ করলে আমরা
কিন্তু মারা পড়ব, বাড়িতে কিছু নেই।
দেখ, দিদি, লক্ষ্মীটি।
মেয়েটি ভিতরে গেল। খানিক পরে একটি বাটিতে কয়েকমুষ্টি
ডালভাত সে লইয়া আসিল। দুর্গা তাঁহাদের বাটিটা আগাইয়া দিল।
বাটিতে পড়িতেই ভােলা আর দুর্গা তাহা লইয়া কাড়াকাড়ি করিতে
নামিল
।
পথে
১৬০ এই সীমান্তে ঠাকমা, ভেতরে এস। চল বাছা। দরজা বন্ধ হইল। খাদ্য লইয়া দুই ভাইবােনে আবার মারামারি আরম্ভ করিয়াছে। তারা তাহাদের মধ্যে গিয়া জোর করিয়া আধমুঠি কাড়িয়া লইয়া বুকের ছেলেটার মুখে দিল। ছেলেটা তাহা গিলিল। ছেলেটাকে খাওয়াইতে আর ভােলা ও দুর্গার খাওয়া দেখিতে দেখিতে তারার রসনায় জল আসিল। ভাত! আঃ ! সে ক্ষীণকণ্ঠে ডাকিল, দুগগা, মা, ক্যামন নাগছে রে? দুর্গার কানে সে কথা গেল না। ওরে, শুনছিস তােরা, আমায় চারডি দিবি?-তারার চোখ ঝাপসা হইয়া আসিল। মায়ের ভিক্ষা কেহ শুনিল না। [ পাঠক! আজ সন্ধ্যায় মেট্রোতে ভাল ঘূৰি আছে। তা ছাড়া দু-একজনের সঙ্গে দেখাও তােমাদের করতে হবে। গৃহিণীকে রূপসজ্জা করতে বল। [ পাঠিকা! এবার বৃষ্টি থেমেছে, আকাশ পরিষ্কার হতে চলেছে, সময় হয়েছে। এবার ওঠ। চ্যারিটি শাে’র রিহার্সাল। ড্রাইভারকে ডেকে মােটর বার করতে বল। তারপরে দর্পণের সামনে যাও। দর্পণে তােমার সুঠাম দেহের প্রতিচ্ছবি। হােমর দর্পণ তােমার অন্ধ। স্তাবক নয়। সে বলছে, তুমি বড় সুন্দর শুনছ ? তােমার দীর্ঘ কেশকে আঁচড়ে ঠিক করে তোমার কুশুভ্র মুখমণ্ডলে, তােমার রক্তিম গালে বিলিতী পাউডার আর ক্রীম লাগাও। তােমার ঠোটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠুক। ভয় নেই, তােমার ও রক্তিম গাল অনাহারে বসে যাবে না, তােমার চোয়ালের হাড় দুটো অনশনক্লিষ্ট দেহের দৈন্য জানাতে মাথা ঠেলে উঠবে না। তােমার সৌন্দর্য অম্লান। তােমার ভয় নেই। ভয় তাদের, যারা দারি-পাপে পাপী। [ পাঠিকা! যদি আমার কথায় নির্লজ্জতা প্রকাশ পায়, যদি তােমর মনে হয় যে, আমি অভদ্র, আমায় ক্ষমা করাে ] আবার সেই ফুটপাথ। তারা শুইয়া পড়িয়াছে। তাহার সারা দেহ অবশ হইয়া আসিয়াছে। ফুটপাথ জলে কাদায় একাকার, তাহাদের পরিধেয় সিক্ত। কোলের ছেলেটা কাঁদিয়া উঠিল। তারা নিঃশব্দে ছেলেটার মুখে একটি বিশুদ্ধ গুন গুজিয়া দিল। ছেলেটা গভীর আগ্রহে তাহা চুষিতে লাগল। কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই কোনও ফল না পাইয়া সে আবার কাদিতে আরম্ভ করিল। অতি ক্ষীণকণ্ঠে তারা ডাকিল, দুগগা। কি মা? বাটিতে করে একটু জল নিয়ে এসে এটাকে খাওয়া। আচ্ছা মা। ভােলা ভিক্ষা চাহিতেছে, দুটো খেতে দ্যাও গাে বাবুরা, রাজাবাবুরা, আর যে পারছি না। বেলা পড়িয়া আসিয়াছে। রাস্তায় ভিড়। সুবেশ নর-নারী, যুবক- যুবতী। ট্রামে বাসে অজস্র যাত্রী। হাসি। কোলাহল। দুরে সিনেমার বাহিরে বড় ভিড়। আজ একটি নূতন ছবি দেখানাে হইবে। বাতাসে বিলাসীদের দেহসৌরভ আর সিগারেটের ধোঁয়া। তারা ভাবে। ক্ষুধায় অবসন্ন, নির্জীব চেতনার সমুদ্র হইতে অতীতের ভাঙা জাহাজটা, ভাসিয়া উঠিতেছে। ছবির মত গ্রামের
=
M
।
১৬২
এই সীমান্তে
বুকে একটি কুটীর ছিল, জোয়ান স্বামী ছিল; ক্ষেতে ধান ছিল—ছিল,
ছিল সবই ছিল।
[ পাঠিকা! সবাই এসেছে তাে? মিস দাস, মধু, আমিতা, চিত্রা,
সুজাতা, মিঃ সরকার, মিঃ সেন, ললিত, অশােক, ফানী এবং আর
সকলে? হ্যা, তারা এসেছে। তারা আলােচনা করছে। যুদ্ধের
অতি-আধুনিক অবস্থা কি? বাংলা দেশের এই দুর্দশার জন্য দায়ী
কে? (মিঃ সেন পি, এইচ-ডি, নয়?): চ্যারিটিতে কত টাকা
উঠতে পারে ? লাইট আর ড্রেসের জন্য অর্ডার দেওয়া হয়েছে তাে?
* ফাস্ট এম্পায়ারে, না শ্লোবে ? কোথায় হবে?
[ পাঠিকা! তুমি আলােচনার অবসান করাও। যন্ত্রশিল্পীর
বৃত্তাকারে বসুক। মৃদঙ্গের বােলের সঙ্গে সেতার ও সরােদ ঝঙ্কার
তুক। অমিতাকে ডেকে তুমি সামনে দাঁড় করাও। তুমি তাকে
'শেখাও-উৰ্বশী-নৃত্য। দক্ষিণ পদ শ্লথভাবে বাম পদের পার্শ্বে রাখ,
দক্ষিণ হতে পতাকা-মুদ্রায় নৃত্যের সুচনা হাে৮। গ্রীবা বাম পার্শ্বে
নত করে, ৰাম হস্তের আলপদ্ম-মুদ্রায় তুমি তােমার অনন্ত যৌবনের
ইঙ্গিত দাও,তােমার আকৰ্ণ-বিজান্ত নিমীলিত নেত্রের কোণে দেবজয়ী
কটাক্ষের জালা বহ্নিমান হয়ে উঠুক। উর্বশীর নূপুর-নিকণে বিমুগ্ধ
মুসভা ঝঞ্ছত হােক। নৃত্য হােক তবে।]
সেই লােকটি মরিয়াছে। তাহার বৃদ্ধা মাতা' তাহার শিয়রে
নিঃশব্দে গুইয়া আছে। কমলার বাপ প্রশ্ন করিল, তােমার ছেলে এখন
ক্যান?
: বুড়ী তাহার দিকে চাহিয়া ক্ষীণকণ্ঠে উত্তর দিল, ম'রে
গেছে।
তারা তিমিত ঝাপসা দৃষ্টি মেলিয়া দেখিতেছিল যে, রাস্তার ওপর
* মুটপায়ে একটি লােক রধিতেছে।
ভােলা ভিক্ষা চাহিতেছে, দুটো পয়সা দ্যাও গাে বারু, দুটো পয়সাই গও। সন্ধ্যা হইয়াছে। ভীতা মহানগরী আলাে জ্বালিবে না। • [ পাঠিকা! তোমার নৃত্য অপূর্ব। আলােলিত মস্তকে প্রকম্পিত গ্রীবাদেশকে পরিবাহিত কর। উভয় হন্তের শিখর ও চন্দ্রকলা মুদ্রাকে মৃগশীর্ষে রূপান্তরিত করে বিপরীত বাহুর উপর প্রতি হত স্থাপন কর। তােমার কালাে চোখের আগুন মহেক্কের বকেও তুচ্ছ করে। উর্বশী, তােমাকে জয় করার মত অস্ত্র কর্পের তূণীরেও নেই। [ মৃদঙ্গ ধ্বনিত হােক, তােমার নৃত্যরত দেহের গতিতে বায়ু গুৱ গতি। পাঠিকা! তােমার নৃত্য অপূৰ্ব্ব!] -নিঃশব্দপদচারী পদের মত রাত্রি আসিল। রাত্রি গভীর হয়। কোলাহল ক্রমে ক্ষীণ হইয়া আসে। আবার বৃষ্টি পড়িতেছে। যানবাহনের চলাচল কৃমিয়াছে। কাহার যেন ফিসফিস করিয়া কথা বলিতেছে! অন্ধকারে, পথের মাঝখানে আসিয়া মেয়েরা দাঁড়াইয়াছে। অন্ধকারে চিনিবে না, সুতরাং লজ্জা নাই। তাহারা অপেক্ষা করে। প্রতিটি পথচারীকে তাহারা ডাকে। যদি একমুষ্টি অন্নলাভ হয়, কে জানে! অন্ধকারে ফুটপাথ হইতে অনেক পুরুষ উঠিয়া দাড়ায়। গলি বাহিয়া দিনের আলােতে দেখা বাড়ির দেওয়াল টপকাইয়া তাহারা বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে। . মাকে মাঝে চীৎকার ভাসিয়া আসে, চোর-চোর। পুলিসের হইল। একটি শােক আসিয়া কমলার কাছ ঘেঁষিয়া দাঁড়াইল। এই, ভাত খাবি?-লােকটি হাসিল। দ্যও খাও, চারডি ও গাে।—সকলে কলরব করিয়া উঠিল।
১৬৪ এই সীমান্তে দুর্গা মাকে ঠেলা দিল, মা, খেতে দে, ওমা। ভােলা হঠাৎ বমি করিতে আরম্ভ করিল। লােকটি ডাকিল, আমার সঙ্গে আয়। কমলার মা ফিসফিস করিয়া বলিল, যা না হতভাগী। কমলা বাপের মুখের দিকে চাহিল। বাপ বলিল, যা। কমলা উঠিয়া দাঁড়াইল। অন্ধকার। সেই অন্ধকারে ফুটপাৰে তাহারা পড়িয়া থাকে। অজস্র নরনারী। একদল নরনারী রাস্তা দিয়া চলিয়া গেল। পরদিন কন্ট্রোলে অল্প দামে যদি কিছু চাল মুন পাওয়া যায় তাহারই জন্য। কিন্তু। একদিন ওরাও এই ফুটপাথে আসিয়া শয়ন করিবে। ভােলা বমি করিতে করিতে কাঁদিতেছিল। দুর্গা ডাকিল, মা, মা গাে, দেখ, না ভােলা ক্যামন করছে। তারা কথা বলিতে পারে না। বলয় ছােট ছেলেটি তন্দ্রাচ্ছন্ন। পূবের বাতাস বহিতেছে। শীত বােধ হয়। ভােলা রাস্তার একপাশে গিয়া মলত্যাগ করিতে বসিল। কালাে আকাশে কালাে মেঘ। বৃষ্টি পড়ে। পুলিসের বুটের শব্দ। খট খট খট খট। দুর্গা ডাকিল, মা, শুনছিস না ক্যানে? দেখ, ভােলা ক্যামন ভােলা মায়ের পাশে গড়াইয়া হাঁপায়, কথা বলিতে পারে না। [ পাঠক-পাঠিকা! ঘুমােবার সময় হয়েছে।] রাত্রি বাড়ে। কমলা ফিরিয়া আসে। তাহার হাতে একটি শাল- পাতার ঠোঙায় ভাত ও তরকারি। এনেছিল?ভাত এনেছিল? তাহার বাপ-মা উত্তেজিত “ইয়া কৰি ১৬৫ দে, আমায় দে। বা রে, গতর খাটিয়ে আনলাম, আমি খাব না? কমলা বসিয়া গােগ্রাসে ভাত গিলিতে লাগিল। হঠাৎ তাহার বাপমাও সেই ভাতের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল, দে, দে, চাডি খেতে দে মা। তাত। তারার অবশ চেতনায় যেন তড়িৎস্পর্শ হইল। দুর্গা তন্দ্রামগ্ন। ভােলার জ্ঞান নাই। কলেরার শেষ অবস্থা। তারা প্রাণপণ চেষ্টা করিয়া উঠিয়া, হামাগুড়ি দিয়া কমলার পিছনে গিয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের দিকে একটি হাত প্রসারিত করিয়া সে বলিতে চাহিল, আমায় একমুঠো দ্যাও। কিন্তু পারিল না। কমলার বাপ ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাকে ধাক্কা দিয়া বলিল, যা যা, মাগী, এখানে ভাত কোথায় রে? তারা মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়া গেল। খানিকক্ষণ পড়িয়া থাকিয়া সে আবার হামাগুড়ি দিয়া স্বস্থানে ফিরিয়া গেল । অনেকক্ষণ সে চুপ করিয়া পড়িয়া রহিল। ছােট ছেলেটার ঘুম ভাঙিয়াছে। সে কাঁদিয়া উঠিল। চোখে আর তারা দেখিতে পায় না। হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া সে ছেলেটাকে বুকে টানিয়া লইল। মনে পড়ে-গৃহ, স্বামী, সবুজ ধানের ক্ষেত, তারার সংসার। তারা একবার মেয়ের মাথায় হাত রাখিয়া কি যেন বলিতে চাহিল, কিন্তু পারিল না। তাহার জীবনীশক্তি আর নাই। আবার হাতড়াইয়া, হাতড়াইয়া লে ভােলার দেহে হাত রাখিল। ভােলার নিস্পন্দ দেহ বরফের মত ঠাণ্ডা। তারা ছেলেকে ডাকিতে ষ্টো করিল, পারিল না। রাত্রি আরও বাড়ে। তারার নিশ্বাস টানা বন্ধ হইল। ছােট रे गौमांस ছেলেটা কিন্তু পরম যত্নের সহিত শীর্ণদেহী মায়ের শুক রসহীন স্তন। শােষণ করিতে থাকে। [ পাঠক-পাঠিকা! ঘুম আসছে না? শুভরাত্রি। তােমরা ঘুমােও'। [ আমারও ঘুম আসছে। কিন্তু আমি তাে ঘুমােতে পারব না। নিদ্রায় জাগরণে সদাসর্বদা আমি আজকাল একটা দুঃস্বপ্ন দেখি। আমার ভয় হয় যে করি পালা শুরু হতে আর দেরী নেই। মনে হয় সব ধ্বংস অংশ হয়ে ছড়িয়ে যাবে চারদিকে ধবংস হবে আমারই সম্মুখে, এই মুহূর্তে। [ তােমরা ঘুমােও, সমস্ত জাতি ঘুমােচ্ছ। কেন ঘুমােবে না? কিন্তু আমি তাে ঘুমােত পারছি না। মনে হচ্ছে প্রচণ্ড বস্ত্রের আঘাত হেনে তােমাদেরও ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিই।আমার চোখে ঘুম নেই– তােমাদেরও ঘুম হরণ করি। [ কিন্তু পারছি কৈ? অতৰ তােমরা ঘুমােও, কোনাে ভয় নেই। [ কিন্তু বল, আমি কি করে ঘুমােব?] ন - বাঁকা তলােয়ার তিনটি প্রাণী। স্বামী স্ত্রী আর একটি বছর চারেকের মেয়ে। উহাদের দেখিলে ভয় করে। মানুষের মতই হাত আছে, পা আছে, চোখ আছে, মুখ আছে—কিন্তু তবুও মানুষ নয় যেন। মাটীর গর্ভান্তরালের কোনও প্রেতলােক হইতে যেন কোনও অদৃশ্য আগ্নেয়- গিরির বিস্ফোরণের ফলে উহারা বাহির হইয়া আসিয়াছে। অনির্বাণ অগ্নিকুণ্ডের লেলিহান অগ্নিশিখার মত জালাময়ী ক্ষুধার সর্বগ্রাসী ছায়া উহাদের চোখে, অতি প্রাচীন মমিদের যত শুরু কালাে ও অস্থিচর্মসার উহাদের দেহ।
বাঁকা তলােয়ার,
দিনকয়েক আগে গ্রামেতে একটি লঙ্গরখানা খােলা হইয়াছিল।
কয়েকদিন উহারা এক প্রকার তরল ও স্বাদহীন দিব্যবস্তুর স্বাদ গ্রহণ
করিতে পারিয়াছিল। কিন্তু সে দ্রব্য দেবতাদের ভাগ্যেও বােধ হয়
বিরল, তাই বেশীদিন তাহারা আর তাহা পাইল না। গ্রামেতে খাদ্য
নাই, খাদক আছে, প্রাণ নাই, মৃত্যু আছে। তাই মহানগরীর
রাজপথকে উহারা ধন্য করিতে আসিয়াছে।
কিন্তু মহানগরীর রাজপথ ত’ গ্রামের পথ নয়। গ্রামের পথ।
মাটির। মাটির প্রাণ আছে, তাহাতে বীজ বপন করিলে অঙ্কুরােদগম
হয়; মাটির প্রাণরসে সে অঙ্কুর সঞ্জীবিত হয়। মহানগরীর রাজপথ
প্রস্তর নির্মিত। সেখানে প্রাণ কই? উহাদের ক্ষুধার জ্বালা সেইজন্য
কমিল না, সহ-মুখ বৃশ্চিকের দংশন জালার মত তাই নিরন্তর উহাদের :
শুন্য জঠরের মৰ্ম্মকোষ অনাহারের জ্বালায় জ্বলিয়া পুড়িয়া থাক্ হইতে
লাগিল।
অভ্যাস নাই তাইঠিকভাবে ভিক্ষা করিতে পারে না। ফুটপাথে ,
বসিয়া বসিয়া ফ্যাল ফ্যাল করিয়া উহারা শুধু চারিদিকে তাকায়, ..
মেয়েটা দে।
তিনদিন পর।
শ্রীলোকটি বলিল,“ওগাে আর ত’ পারি না।
কোলের মেয়েটা নির্জীবের মত পড়িয়া আছে।
পুরুষটি প্রশ্ন করিল, “কি করব এ ?”
“চাও, ভাল করে ভিক্ষে চাও।
“আচ্ছা।
মহানগরীর জনসমুদ্রে জোয়ার আসিয়াছে। সেই জোয়ারের
লুখে দাড়াইয়া দুই শূন্য করতলকে প্রসারিত করিয়া লােকটি ভিক্ষা :
চায়।
১৮ এই সীমান্তে “দয়া করুন বাবু-মরে গেলাম বাবু।” স্ত্রীলােকটি কোলের মেয়েটির দিকে তাকায়। শেষ সম্বল। মনে পড়ে—আরাে দুইটি সন্তান ছিল। ছয় বছরের একটি ছেলে আর সাত বছরের একটি মেয়ে। মেয়েটি কুখাদ্য খাইয়া কলেরায় মারা গিয়াছে। আর ছেলে- “এই কোলের মেয়েটার দিকে তাকান-দয়া করুন গাে বাবু, দয়া শ্রীলােকটি ভাবে। দিন সাতেক আগেকার কথা। সহরে আসার সময় একটি গ্রামের বাগানের ধারের পথের উপর সে স্বামী, পুত্র আর মেয়েকে লইয়া শুইয়াছিল। ছেলেটা অনাহারে অচৈতন্যের মত এক পাশে পড়িয়াছিল। মাঝ রাতে একদল শিয়ালের চীৎকারে একবার ঘুম ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। দূরে অন্ধকারে তাহারা কি যেন কামড়াকামড়ি করিয়া খাইতেছিল। ভোের হইলে জানা গেল যে, শিয়ালদের সেই খাদ্য আর কিছু নয়, আর কেহ নয়—তাহাদের ছেলে। স্ত্রীলােকটি কাঁদে। শক্তিহীনের শব্দহীন কান্না। “মরে গেলাম গাে বাবু—একমুঠো খেতে দিন-একমুঠো”- লােকটি বলিয়া চলিয়াছে। জনসমুদ্রে জোয়ার আসিয়াছে—তাহার গতিরোধ করা কি সহজ? হঠাৎ স্ত্রীলােকটি কপিতে কাঁপিতে উঠিয়া দাঁড়াইল। “উঠছিস ক্যান?” “চল- “কোথায় ? “বাচার চেষ্টা করতে—এই মেয়েটাকে বাঁচাতেই হবে—নাও, ওঠা- “চ”-হঠাৎ লােৰুটি থমকিয়া দাড়াইল “তুই কানছিস?” ।
বাঁকা তলােয়ার
নভােচারী বিমানের চক্ৰধ্বনিতে উপরের আকাশ মুখর হইয়া
উঠিয়াছে।
অক্ষয়বাবু একটু আগে পূজা আহ্নিক সারিয়াছেন। বাহিরের ঘরে
খবরের কাগজের পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে তিনি চায়ের কাপে
চুমুক দিতেছিলেন। এমন সময় দ্বারপ্রান্তে তিনটি ক্ষুধা-প্রেতের মুখ
দেখা গেল।
“কি চাই এথেনে, এ! যা—যা।”
লােকটি বলিল—একমুঠো খেতে দিন বাবু মরে-” সে কথা আর
শেষ করতে পারিল না।
সেই পুরাতন কথা।
অক্ষয়বাবু খেকাইয়া উঠিলেন, “তা মরলে আমি কি করব স্থা,
এ্যা? আমি কি দানছত্তর খুলেছি না দরিদ্রনারায়ণকে খাওয়াবার ভার
নিয়েছি। যা বেরিয়ে এখেন থেকে লােকটি আর কথা খুজিয়া
পায় না।
এইবার স্ত্রীলােকটি আগাইয়া আসিল, মৃদুকণ্ঠে ডাকিল, “বাবা-
স্ত্রীলােকটির কণ্ঠে যেন কি ছিল তাই ওই ‘বাবা’ শব্দটি এমন মর্মস্পর্শী
ও করুণ শােনাইল যে, অক্ষয়বাবু হঠাৎ গুব্ধ হইয়া গেলেন।
“বাবা; আপনাদের বাড়ীতে দাসী চাকর হয়ে থাকব আমরা
আমাদের বাঁচান।” অক্ষয়বাবু তাহাদের দিকে চাহিলেন। তাহার
অরের মধ্যে এইবার সহজে পুণ্য সঞ্চয়ে একটা দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা
জাগিয়া উঠিল।
তিনি ডাকিলেন-“ওগো শুনছ, ওগগা।”—
হেমাঙ্গিনী দেবী ডাক শুনিয়া আসিয়া দাঁড়াইলে, “কি বলছ?”
“তুমি না বলেছিলে তােমার শরীরটা আজকাল একটু খারাপ
.
১৭
बहे गौषादर
যাচ্ছে, তাছাড়া বাড়ীর কাজ কর্মও ত’ আছে-রেখার ছেলেমেয়ে-
গুলাে আর রাজুটাকে দেখাশােনা করার জন্যও তাে লােক চাই। তুমি
একা পেরেউঠবে কেন? এ্যা?”
ভুরু কুঁচকাইয়া সন্দিগ্ধভাবে হেমাজিনী বলিলেন, “ব্যাপারটা কি ?
“একজন লােক রাখ না কেন, মাইনে অল্পস্বল্পই দেবে, কি বলিস
বাছা? রাজী?”
স্ত্রীলােকটি যেন প্রাণ পাইল, তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়া, কঠে
সে বলিল,-“আজ্ঞে হ্যা বাবা।”
হেমাঙ্গিনী তাহাদের দিকে তাকাইলেন, “ওমা! এই এদের রাখব
আম—এই একপাল। এদের খাওয়াতে হলে যে আমি পথে দাড়াব
স্ত্রীলােকটি করুণ কণ্ঠে বলিল, “না মা, আমাদের দু'জনের মধ্যে
একজনকেই রাখুন,
আপনি আমাদের বাঁচান।'
হ্যা, একজনকে রাখব আর বাকী সব ?”.
“আমাদের মধ্যে একজন একটা চাকরী যােগাড় করে নেবে, আর
টিত বাচ্চা মা।”-
“আমায় আর শেখাতে হবে না বাছা হালি বাচ্চারা কি খেতে
জানে না ? একজনকে ত’:রাখব, আর একজনের চাকরী না হওয়া
পৰ্যন্ত কি হবে?”
“ওই একজনের খাবারই সবাই ভাগ করে খাবাে. মা-স্ত্রীলােকটির
কঠে মিনতি।
অক্ষয়বাবুও বলিলেন, “রাখাে গাে জিতুর মা, বাইরের ঘরটাতে
ওরা পড়ে থাকবে খন-আহা। বড় মায়া হচ্ছে। '
“হয়েছে হয়েছে—আমাদের যেন পাথরের মন। কিন্তু রাখবে
কাকে
।
'
১৪)
বাকা তলােয়ার :
“লােকটাকে।
হেমাঙ্গিনী নাক সিটকাইলেন। লােকটির চেহারা শুষ্ক ও রসহীন
আমড়ার আঁঠির মত—শিবহুল ও চৰ্মাবৃত কঙ্কাল। মাথায় তাহার
ঝাকড়া ঝাকড়া চুল আর সারা মুখে একটা পশুর মত লােলুপতা।
“তাের নাম কিরে ?” হেমাঙ্গিনী ধমকাইয়া প্রশ্ন করিলেন।
এক্সে-মাণিক-লােকটির কণ্ঠস্বর ভাঙ্গা রেকর্ডের শব্দের মত।
“ইস—মা-ণি-মাণিক না বলে জন্তু বল্লেই শােনাত ভাল।
অক্ষয়বাবু উদারতাব্যঞ্জক হাসি হাসিলেন।
হেমালিনী স্ত্রীলােকটির মুখের দিকে তাকাইলেন।
মেয়েটির বয়স বােধ হয় বছর চব্বিশেক। চরম অভাব ও নিদারুণ
অনাহারেও তাহার শ্যামবর্ণ মুখের অন্তরালে কোথায় যেন একটা অদৃশ্য
কমনীয়তা, মাদকতা লুক্কায়িত আছে—মনকে তাহা নাড়া দেয়।
“আর তাের না কি?”
“পার্বতী।”
“তুই-ই কাজ করবি বাছা। তাের জন্তুটি যেন দু'একদিনের
ভেতরেই কাজ বাগিয়ে নেয়, বুঝলি?' মাইনেটাইনে কিন্তু এখন পাবি
বাপু। একজনকে খাওয়াতে চল্লিশটি করে টাকা লাগে, তা
জানিস ?”
পার্বতী ঘাড় নাড়িল। “হ্যা।
মনে পড়ে। একটুকরা মাটির উপর তাহাদের একটি চালাঘর।
ঝকঝকে তকতকে মাটির প্রাঙ্গণ, তরিতরকারীরবাগান, মাচার উপর
লাউ গাছের সবুজ পাতার সমারােহ। ছেলেমেয়েদের কলরব, গুরের
হাসি, স্বামীর মুখে যাত্রা দলের গান। ছােট্ট সংসারের সর্বত্র, চঞ্চলা
পল্লী অঞ্চল উড়াইয়া বেড়াইত। হায়—
( পাৰ্ব্বতী, তােমার সেই দিনগুলি কোথায় গেল?)
.
.
১৭২ এই সীমান্তে অক্ষয়বাবুর সংসারটি বৃহৎ। দুই বড় ছেলে, তাহাদের বৌ, ছোেট ছেলেরা, মেয়ে, নাতিনাতনী, স্ত্রী-সব মিলিয়া জনদশেক। ছেলেরা বাজার কৰুে মেয়েরা গৃহকর্ম করে, তাই সামর্থ্য থাকিলেও আজকাল- কার বাজারের কথা ভাবিয়া কোনও চাকর রাখা হয় নাই। মাণিক কাজকর্মের খোঁজে বাহিরে গিয়াছে। কাজ অনেক। মেয়েটাকে কোলে লইয়া দুর্বল শরীরে কাজ করিতে করিতে পার্বতীর মাথা ঘােরে দেহ কাপে। হেমাঙ্গিনী ঝঙ্কার তুলিয়া বলিলেন, “মেয়েটাকে কোল থেকে নামিয়ে কাজ কর না বাপু-ভাত জোটে না যার, তার এত আদর পাৰ্বতী মেয়েকে উঠানে নামাইয়া দিল, “একটু বসে থাক্ মা- এখুনি আসছি, কেমন?” মেয়েটা বােঝে না। অনাহারের অগ্নিলা উহাকেও দগ্ধ করিয়াছে, সে জালা হইতে মাই যে ওকে রক্ষা করিতেছে সেটা সে কেমন করিয়া যেন উপলব্ধি করিয়াছে, তাই মাকে ও এক মুহূর্তে জন্যও ত্যাগ করিতে চায় না। মাটিতে নামাইতেই মেয়েটি আর্তকণ্ঠে চীৎকার করিয়া উঠিল। সমস্ত শক্তি দিয়া, গলার নীল শিরাগুলিকে কীত করিয়া সে কাঁদে। ওইটুকু দেহে অতটা শফ যে কোথায় লুকাইয়াছিল তাহা ভাবিতে আশ্চর্য লাগে। “না মা, কঁদে না-থামথাম-লক্ষ্মী আমার, সােনা আমার। তবু মেয়েটা থামে না। হেমাঙ্গিনীর সাত বছরের ছােট ছেলে রাজু একটি নাসপাতিতে কামড় দিতে দিতে মেয়েটার কাছে আসিয়া ঈড়াইল, এই খবরদার. কঁদিনি এই
বাঁকা তলােয়ার
১৭
মেয়েটা আরও জোরে দে।
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, “ধন্যি মেয়ে বাবা, কি গলাটাই করেছে-
উঃ ! নে বাপু, তুই কাজ করূগে। আমার বাড়ীতে মেয়ে ঋখে নিয়ে
কাজ করা চলবে না”
পার্বতী নিঃশব্দে কাজ করিয়া চলিল।
মেয়েটা কাঁদিতে কাঁদিতে অবশেষে ক্লান্ত হইয়া মাটির উপরেই
ঘুমাইয়া পড়িল।
বেলা আড়াইটা নাগাদ একটি লােহার থালায় কয়েক মুষ্টি কেড়ে
ঠাণ্ডা ভাতুও একটু ডাল লইয়া পাৰ্বতী বাহিরে ছােট্ট নোঙর ঘরটায়
মাণিক মেয়েকে কোলে লইয়া অবসন্ন হইয়া বসিয়াছিল, পার্বতীকে
দেখিয়া নড়িয়া উঠিল। ভাত- সঞ্জীবনী রসের বুদ!
“ওমাও টু-ওঠ, মা, নে, খা।”
মেয়েকে জাগাইয়া পরম যত্নের সহিত পার্বতী তাহাকে খাওয়াইল।
মেয়েটা গােগ্রাসে পরম উৎসাহের সহিত প্রতিটি গ্রাস গিলিল।
“কেমন লাগছে মা?” মাণিকের জিহ্বা লালায় সিক্ত হইয়া
উঠিল।
“আ”—মেয়েটা উত্তর দিল। ভাল লাগে, ভাল লাগে।
“তাই বলি, তুই এখেনে। আমি ভাব গেল কোথায় মাগী?
দ্বারপ্রান্তে হেমাঙ্গিনী আসিয়া উকি মারিলেন।
“কি মা?
“তুই বুঝি খাবার এনে ওদের খাওয়াচ্ছিস, এসব চলবে না বাপু,
আমি তিনজনকে পুষতে পারব না, বুঝলি?
“না মা-আপনি যা দেবেন তাই তিনজনে খাব—বেশ চাইব
:৭৪
এই সীমান্তে
“হ্যা, মনে রেখাে।
হেমাঙ্গিনী চলিয়া গেলেন।
“নাও খাও”-পার্বতী স্বামীকে ডাকিল।
“খাচ্ছি-তুমি আগে খাও।”
মাণিক একগ্লাস মুখে তুলিল। তাহার চর্বণরত মুখে পরিতৃপ্তির
: ছায়া ক্রমশ পরিব্যাপ্ত হইতে দেখিয়া পার্বতীর চোখে জল আসিল।
“নে’-মাণিক এক গ্রাস তাহার মুখের সামনে ধরিল।
“আমার মাথার দিব্যি-খ।
পার্বতী কাদিয়া ফেলিল।
“আবার কানছিস?”
মনে পড়ে। ক্ষেতের ধানের মিষ্টিভাত, মাছের তরকারী, একটু
ফুধ, এসবের অভাব কোনও দিন ছিল না। পূজা পার্বণে অতিরিক্তের
ব্যবস্থা দু'একজন আত্মীয় বন্ধুরাও তাহাদের বাড়ীতে কতদিন
খাইয়াছে। তাহার শ্বশুর তাহাকে ডাকিত, অন্নপূর্ণা বলিয়া।
• (অন্নপূর্ণা, আজ তােমায় কে অন্ন দিবে?)
তিনদিন পর।
সামনেরই একটি বাড়ীতে মাণিক চাকুরী পাইল। ভদ্রলােক
রিটায়ার্ড জয়। ফলে পার্বতীর কাজ বাড়িল। স্বামী থাকিলে
মেয়েটাকে তবু কোলে লইয়া থাকিত, এখন তাহাকেই রাখিতে হইবে।
মেয়েটা কোল ছাড়া থাকিতে চায় না। মাটিকে ওর ভীষণ ভয়, স্কুলের
জীব যেমন জলকে ভয় করে।
গুৰু উপায় নাই। মেয়েটাকে মাটিতে ফেলিয়াই কাজ করিতে
বাঁকা তলােয়ার
হয়। বলির পশুর মত পরিত্রাহি চীৎকার করিয়া মেয়েটা তার
প্রতিশােধ নেয়।
হেমাঙ্গিনী বলেন, আমার অমন মেয়ে হলে গলা টিয়ে ধরতাম,
বাপরে বাপ, কি গলা!”
অক্ষয়বাবু মাঝে মাঝে ভিতরে ছুটিয়া আসেন, “আমার মাথাটা
ঝালাপালা করে দিলেরে বাবা-এই মেয়ে-এ্যাই—চোপ-চোপ।”
মেয়েটা আরও জোরে কঁদিয়া উঠিল।
. অসহায় হইয়া পার্বতী মেয়ের পিঠে দুম দুম করিয়া কিল বসাইল,
“মর হতভাগী মর!”
হেমাঙ্গিনী তাহাতেও খুশী হন না, “আবার রাগ করে মেয়েকে যে
বড় মারা হচ্ছে। ওসব আমার বাড়ীতে চলবে না, বুঝলি? মাটির
মত মুখ বুজে কাজ করতে হবে, হ্যা।”
পার্বতী মেয়েকে লইয়া আড়ালে গেল। সেখানে মেয়েকে বুকে
চাপিয়া ধরিয়া আদর করিয়া দিয়া বলিল, “বড় নেগেছে, না মা?
আহা—না, কঁাদে না.লক্ষ্মী আমার, সােনা আমার।
' স্তন্যপান করাইয়া মেয়েকে সে ঠাণ্ডা করিতে চেষ্টা করে। কিন্তু
মেয়েটার ক্ষুধাও পাইয়াছে, সে কান্না থামায় না।
বড় বৌ লুচি ভাজিতেছিল ছেলেমেয়েদের জন্য। পার্বতী সেখানে
গিয়া দাড়াইল।
“বৌদি।”
“কি চাস?
আমার এই মেয়েটাকে একটা স্থাও না গো।
“কি?”
“একটা সুচি।
: “ও মা।'তাের সখ ত কম নয় । ওমা শুনছেন?
১৭৬
এই সীমান্তে,
“কি বৌমা ?”“হেমাঙ্গিনী আগাইয়া আসিলেন।
“পার্বতী লুচি চাইছে মেয়ের জন্য।”
“বটে। তাের মেয়ের নলা ত’ কম নয়। অত সথে কাজ নেই,
বুঝলি? কথা বলছিস না যে, বলি শুনলি ?”
“হ্যা মা।”
(পাৰ্বতী তােমার মেয়ের ক্ষুধাটা না থাকিলে ভাল হইত, না?)
মাস দেড়েক পরে বাড়ীতে একজন অতিথি আসিল। অক্ষয়বাবুর
শ্যালক অনুপম। ছাব্বিশ সাতাশ বয়স, অত্যধিক সৌখীন যুবক।
পশ্চিমে কোথায় কাজ করিত, সেখান হইতে বদলী হইয়া আসিল।
দুপুর বেলায় সেদিন অনুপমের নজর পড়িল মাণিকের উপর।
“তুই কে রে?”
“এক্তে আমি পার্বতীর সােয়ামী।
অনুপম সকৌতুকে তাহার দিকে চাহিল। মাণিকের চেহারার
ইতিমধ্যে একটু পরিবর্তন হইয়াছে। গ্রামেতে ধাত্রার দলে, কবির
দলে সে প্রায়ই থাকিত, সখ তাহার কম ছিল না। বড়লােকের বাড়ীতে
চারটি খাইতে পাইয়া তাহার চেহারায় একটু সুস্থতার চিহ্ন ফিরিয়া
আসিয়াছে, আর সঙ্গে সঙ্গে পুরাতন সখও মাথা চাড়া দিয়া উঠিয়াছে।
জজ-বাড়ীতে একটি পুরাতন পায়জামা ও একটি সার্ট পাইয়াছে
সে—তাহাই বেশ পরিপাটি করিয়া পরিয়াছে। কর্তাদের কাছ
হইতে দু’এক আনা পয়সা চাহিয়া লইয়া সে দশ আনা ছয় আনা করিয়া
চুলও ছটিয়াছে। 'আবার এক পয়সার পানের রসে তাহার ওষ্ঠ
রঞ্জিত-এক বিচিত্র চেহারা হইয়াছে তাহার।
ও—তুই পার্বতীর সােয়মী, তােরই নাম জন্তু।”
আচ্ছা পা টেপ, দেখি।”
বাঁকা তলােয়ার ১৭৭ “এজ্ঞে।” “টেপ, বেটা-টেপ,।” মাণিকের মুখের উপর একটা কালাে ছায়া পড়িল, তবু সে, আদেশ পালন করিতে বসিল। উপায় কি? পার্বতীর চেহারারও রূপান্তর ঘটিয়াছে। স্বামী-কন্যাকে নিজের আহারের অংশ দিয়া যেটুকু সে খায় তাহা বিশেষ কিছু নয়। কিন্তু তাহাতেই তাহার দেহের শ্রী বদলাইয়াছে। তাহার রুগ্ন দেহের উপর মাংসের আস্তরণ পড়িয়াছে, সুস্নিগ্ধ শ্যামল সৌন্দর্য্যে তাহার যৌবন- সরসী টলমল করিতেছে। মেয়েটারও গায়ে মাংস দেখা যায়। হেমাঙ্গিনী অক্ষয়বাবুকে বলেন, “দেখছ গাে—আমার বাড়ীতে খেয়ে খেয়ে কেমন মােটা হয়ে উঠছে ওরা, এ্যা?” অক্ষয়বাবু মাথা নাড়েন। পার্বতী নিঃশব্দে কাজ করিয়া যায়। কাজের আর শেষ নাই তাহার। একজন ভাদের কাঙালকে বাড়ীতে পাইয়া সবাই তাহাকে প্রাণপণে খাটাইতেছে। অনুপম আজকাল অন্দরমহলে একটু বেশী ঘােরাফেরা করে। কি একটা কাজে তখন সে আসিয়াছিল। হঠাৎ পার্বতী একবার চাহিতেই দেখিতে পাইল যে, অনুপম তাহার দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া আছে। যেন তাহার সর্বাঙ্গ লেহন করিতেছে। অনুপম হাসিল। পার্বতী মাথা নীচু করিল। অনুপমের দৃষ্টিতে কি একটা প্রার্থনা ছিল-পার্বতী শিহরিয়া উঠিল। মাণিকের লােলুপতা আজকাল বাড়িয়া গিয়াছে। প্রায়ই এটা : সেটা ভালমন্দ মুখরােচক জিনিষ সে কোথা হইতে যেন লইয়া আসে
১৭
परे भौधारक
আর খায়। বিড়ির বদলে মাঝে মাঝে তাহাকে সিগারেট টানিতেও
দেখা যায়।
পার্বতী একদিন জিজ্ঞাসা করিল, “এত সব ভালমন্দ কোথায় পাও?”
“কেন—জজ-বাড়ী থেকে-তারা দেয় যে।”
পার্বতী বিশ্বাস করিল না।
সেদিন রাত্রে রহস্যটা উদঘাটিত হইল। মাণিকের চাকুরী
গিয়াছে। সে চুরি করিয়া রােজ ঐসব খাবার অনিত। আজ রাত্রে
ধরা পড়িয়া গিয়াছে। কয়েকদিন কিছু পয়সাও চুরি গিয়াছিল, তাহার
জন্যও তাহাকে ধরা হইয়াছে। বাবুরা ও অন্যান্য চাকরেরা চাদা
করিয়া প্রহার দিয়া তাহাকে তাড়াইয়াছে।
অন্ধকার ঘরের মধ্যে শুইয়া শুইয়া মাণিক গােঙায়।
পার্বতী কাজ সারিয়া মেয়ে ও খাবার লইয়া ভিতরে আসিয়াই
চমকাইয়া উঠিল।
“কি হয়েছে গাে? পার্বতী সব শুনিয়াছিল হেমাঙ্গিনীর মুখে
একটু আগেই। জজ-বাড়ী হইতে একজন আসিয়া বলিয়া গিয়াছে।
“শালার। বড় মেইরেছে গো—উঃ, সারা শরীরটা টনটন করছে।”
পার্বতী কঁদিয়া বলিল, “চুরি করেছিলে—ছিঃ।
মাণিক খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিল, পরে বলিল, “চারডি খেতে
“নাও-খাও।”
“উঠতে পারছি।
পাৰ্বতী মেয়েকে শােয়াইয়া স্বামীকে খাওয়াইয়া দেয়।
মনে পড়ে। সুন্দর, ছােট্ট গ্রামটি। খামশােয় ঝলমল করিতেছে
অবারিত মাঠ-শ্বশুর সেখানে লাঙ্গল লইয়া গিয়াছে। শরতের
নষ্টীয় মর স্রোতে গা এলাইয়া জেলেডিঙ্গিগুলি কোথায় চলিয়াছে-
১৭১
বাঁকা তলােয়ার
কলসী কাখে পার্বতী চলিয়াছে ছুতাের বৌয়ের সঙ্গে স্নান করিতে।
উপরে গােবরে নিকানাে উঠোনের মত ঝকঝকে আকাশে শচিলের
প্রসারিত পক্ষ। আঃ-
( পার্বতী, অতীতকে কি ভােলা যায় না?)
অনুপম অফিস যায় নাই। শরীর একটু অসুস্থ বলিয়া ছুটি লইয়াছে।
ধরে বসিয়া সে কি যেন একটা বই পড়িতেছিল।
পার্বতী অক্ষয়বাবুর নাতিকে শােয়াইতে পাশের ঘরে গেল।
অনুপম ডাকিল-“এই পাৰ্বতীশােন্।”-
“বাবু?”
এদিকে আয় না।”
পার্বতী দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইল।
অনুপম হাসিল, “অত লজ্জা কেন? ভেতরে আয় না”-বলিয়াই
খপ করিয়া পার্বতীর একটি হাত ধরিয়া টান দিল।
“ছিঃ”-পাৰ্বতী অবরুদ্ধ কণ্ঠে গর্জন করিয়া হাত ছাড়াইয়া
লইয়া ছুটিয়া পলাইল। বাহিরে গিয়া থরথর করিয়া কাপিতে
ঝাপিতে সে বসিয়া পড়িল। ভগবান!
মাণিক তখনও ফেরে নাই, কাজের চেষ্টায় কোথায় যেন গিয়াছে।
পার্বতী খাবার লইয়া বসিয়া থাকে।
অনেকক্ষণ পরে মাণিক ফিরিল। চেহারা পাগলের মত।
“আজ খাবে না নাকি?-পাৰ্বতী প্রশ্ন করিল।
“খাব কোখেকে? তাের কি, তুইত নেমন্তন্ন খাচ্ছি—আমি শালা
কি আর
পার্বতী চীৎকার করিয়া উঠিল, “এই কথা বলতে পারছ তুমিও
আমি মাথা খুঁড়ে মরব তবে’-বলিয়াই সে দুঃখে মেঝেতে মাথা
ঠুকিতে লাগিল।
১০ এই সীমান্তে “হা-হা-কি করছিস-তাের পায়ে পড়ছি, আমি ঠাট্টা করছিলামরে” -সাতঙ্কে মাণিক পার্বতীকে জড়াইয়া ধরিল। মেয়েটা ভয়ে কাঁদিয়া উঠিল আৰ্ত্তকণ্ঠে। অনুপমের গলা শােনা গেল “এই ব্যাটা জন্তু, মেয়ের কান্না থামা। মাণিকের মেজাজ গরম হইয়া উঠিয়াছে, “বাচ্চা মেয়ে, কাছে ত’ কি করব ? মেরে ফেলব নাকি?” অনুপম ছুটিয়া আসিল, “রাস্কেল, মুখের ওপর কথা বলছিস।” বলিয়াই ঠাস করিয়া মাণিকের গালে এক চড় কষাইয়া দিল। মাণিকের চোখ দুইটি একবার দপ করিয়া জ্বলিয়াই নিভিয়া গেল। সে নিস্ফল আক্রোশে শুধু কঁপিতে লাগিল। অনুপম চলিয়া গেল। পাৰ্বতী মেয়েকে স্তন্যপান করাইয়া ঠাণ্ডা করিবার চেষ্টা করে। খানিক পরে সে বলিল, “নাও খেয়ে নাও।” মাণিক নড়িল না। রাত্রে কাজের এক ফঁাকে পার্বতী মেয়েকে ঘরে ঘুম পাড়াতে- ছিল। হঠাৎ পিছন হইতে কে যেন তাহার দেহের উপর হাত রাখিল। “কে? পাৰ্বতী চমকিয়া উঠিল। “আমি, চুপ,। অনুপম ! “পালান শিগগীর পালান, নইলে চেঁচাব আমি।” এমন সময়ে দ্বারপ্রান্তে মাণিককে দেখা গেল। দুৰ্বল স্বামীর চক্ষু আহত শ্বাপদের চক্ষুর মত জ্বলিয়া উঠিল। মুহূর্তে সে হিংস্র পশুর মত অনুপমের উপর লাফাইয়া পড়িল। কিন্তু বেশীক্ষণ যুদ্ধ চলে না। প্রহারে জর্জরিত হইয়া মাণিক একপাশে পড়িয়া গােঙাইতে লাগিল। পার্বতীর চীৎকারে বাড়ীর মেয়েরা ছুটিয়া আসিল। পুরুষেরা আর কেউ ছিল না।
বাকা তলােয়ার
“কি-কি হয়েছে রে অনু?” -হেমাঙ্গিনী তকণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন।
পকেট হইতে মণিব্যাগটি তুলিয়া ধরিল অনুপম-“এইটে এই
ব্যাটা চুরি করেছিল।”
“মিথ্যাবাদী-তুমি আমার বৌয়ের গায়ে হাত দিয়ে কি বলছিলে
-এা? তুমি না ভদ্দরনােক!” মাণিক হাঁপাইতে হাপাইতে বলিল।
“চোপর-চোপ, ইষ্টুপিড, চোর কোথাকার—আবার ভাইকে
আমার দোষ দিচ্ছে। বেরিয়ে যা আমার বাড়ী থেকে--বেরােচোর
ছাচোড় আমি রাখব না আমার বাড়ীতে, বেরাে—* হেমাঙ্গিনী
ফাটিয়া পড়িলেন।
“মা”—পাৰ্বতীর চোখে জলের ধারা। কি যেন সে বলিতে চাহিল।
“
নানিকালাে—চুরি করবি আবার আমার ভাইয়ের বদনাম
করবি -নিকালে হারামজাদ্রী, গেট আউটু।”
পার্বতী একবার কলের মুখের দিকে চাহিল। নিষ্করুণ হিংসায়
সকলের মুখ কঠিন ও কুৎসিত হইয়া উঠিয়াছে।
মেয়েকে কোলে তুলিয়া, স্বামীর হাত ধরিয়া সে বলিল—“চল
—ওঠ।*
তাহারা বাহির হইয়া গেল।
অনুপমের মুখে ক্ষীণ হাসির রেখা।
রাজপথ। পাথরের প্রাণ নাই।
“দয়া করুন বাবু—বাবু গাে।
দয়া কি জিনিষ? কেহ জানে না।
মেয়েটা কাদে।
মাণিক ক্ষীণকণ্ঠে বলে, “মাই খাওয়া লাে শুনছিস?”
“শুনছি ত কান নেই নাকি আমার -খা রাঙ্গুলী।”
১৮২
এই সীমান্তে
বুকে দুধ নাই তবু মেয়েটা লেহন করে। পশাবকের মত
ধারালাে, খসখুসে ওর জিহ্বা।
পথ। গলি। পথ। ভিক্ষা। শূন্য জঠর। এক ইতিহাস বদলায় না।
চাকুরীর চেষ্টাও মাঝে হয়। কেউ চায় না।
মাঝে মাঝে ডাষ্টবিন দেখা যায়। তাহাতেও কিছু নাই।
ক্ষুধার্তের মিছিল। রাজপথে সারি বাঁধিয়া প্রেতেরা গান গায়
অন্নং দেহি।
আর পারি না-পার্কের ধারে বসিয়া পড়িয়া মাণিক জোরে
জোরে শ্বাস টানে।
বাবুমশায়-দয়া করুন গাে—এক মুঠা খেতে দিন গাে।”
নাই, নাই। দেশে অন্ন নাই।
মাঝে মাঝে দুই একজন একটু দাড়াইয়া, চোখের জ্যোতিকে
প্রখর করিয়া পার্বতীর সারাদেহ লেহন করে। '
দিন কাটে। দিনের পর দিন কাটে।
মাণিক মরিতে চলিয়াছে। ওর আর ক্ষমতা নাই।
“চারডি ভাত খাওয়াবি পার্বতী, ও পার্বতী।”
পার্বতী কটমট করিয়া তাহার দিকে তাকাইল, ক্ষণকাল কি যেন
ভাবিল পরে বলিল, “হ্যা খাওয়াব।”
“খাওয়া, আমি যে মরে যাচ্ছি পার্বতী—ও পাৰ্বতী”—মাণিক
হয়।
“চুপ করে থাক কতক্ষণ, মেয়েটাকে দেখাে, আমি খাবার নিয়ে
আসছি, কেমন ?
আচ্ছ—
প্রেতের মত লিকলিকে হাত দুইটি বাড়াইয়া অতি কষ্টে মেয়েটাকে
বুকের কাছে টানিয়া লইয়া ঝিমায়। অবসন্ন মৃত্যুর সুবিপুল অন্ধকারের
:
বাঁকা দেয়ার
১
ছায়া তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। প্রতি নিঃশ্বাসে তাহার
সারা দেহ কঁপিয়া কাপিয়া উঠে।
মেয়েটা কাঁদে। মা ছাড়া সে থাকিতে চায় না।
পাৰ্বতী সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলাইয়া গেল।
অনুপম চমকিয়া উঠিল।
জানালার ধারে কে যেন ডাকিতেছে-“বাবু-বাৰু।”
আমি পার্বতী।
“পার্বতী। কি চাস?*-অনুপম হাসিল।
দরজা খােল, যা চাও তাই তুমি পাবে।দাতে দাত চাপিয়া
পার্বতী বলল।
এদিক ওদিক চাহিয়া অনুপম বারান্দার দিকের দরজা খুলিল।
পাৰ্বতী ঘরে ঢুকিল। তাহার হাত ধরিয়া মৃদুকণ্ঠে অনুপম বলিল,
বড় রােগা হয়ে গেছিসততা !”
পৰ্বতী স্নান হাসিল, “কেন পছন্দ হচ্ছে না?”
“না-না, তা নয় যা”—অনুপমের ললাটে স্বেদবিন্দু চকচক করে ।
টলিতে টলিতে পাৰ্বতী ফিরিয়া আসিল। আঁচলে কাগবে।
ঠোঙ্গায় কিছু ভাত ও তরকারী।
“ওগাে-মাণিককে সে ঠেলা দিল।
মাণিক জবাব দেয় না।
“ওগাে—এই—ও টুনুর বাপ।
মণিক মরিয়াছে।
পার্বতীর হাত হইতে ভাতের ঠোঙ্গা পড়িয়া গেল।
সে চারিদিকে চাহিল। মেয়েটা কই?
।
১৮৪
এই সীমান্তে
টুং-টু-ও মা।”
কোনও জবাব নাই।
পাগলের মত পার্বতী পার্কের ভিতরে খুজিয়া আসিল, পথেতে
খুঁজিল। কোথাও নেই।
“হ্যা গা, একটা ছােট মেয়েকে দেখেছ ইদিকে, ছােট মেয়ে লাল
পিরান গায়ে-এা ?” সে প্রশ্ন করে সবাইকে।
। কেউ জানে না মেয়েটা কোথায়। শেষ সম্বলটাও গেল।
যাক। শরীর অবশ হইয়া আসিতেছে।
অনেকক্ষণ পরে টলিতে টলিতে ক্লান্তপদে পাৰ্বতী আবার স্বামীর
পাশে ফিরিয়া আসিল। তাহার বুকের কাপড় সরিয়া গিয়াছে, মাথার
কুন্ম খােলা চুল বিপৰ্যন্ত হইয়া পিঠে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। চোখে
জ্বালাময়ী দৃষ্টি। ভৈরবীর মত।
মৃত স্বামীর মুখের দিকে সে চাহি। মাণিকের মুখে মাছি
বসিয়াছে। ভাতের ঠোঙ্গায় ভাত নাই, কেহ লইয়া গিয়াছে।
পার্বতী কালে না, একটুও না।
গ্যাসের সেড দেওয়া আলােতে সে হাত মেলিয়া ধরিল। একটা
এক টাকার নােট ও খুচরা কয়েক আনা পয়সা। পয়সাগুলি ঝক্ঝক
করিয়া উঠিল। অনুপম কথা দিয়াছে—তাহার আবার বহাল হইবে।
সেই পয়সার দিকে চাহিয়া হঠাৎ পার্বতীর ঠোট দুইটি কাপিয়া
উঠিল—কিছু বলিতে চাহিল বােধ হয়। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করিল।
পার্বতী হাতের দিকে চাহিয়া ভাবে—অতীতের কথা নয়,
ভবিষ্যতের। নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতের মধ্যে সে যেন একটা বাঁকা
তলােয়ার খরিয়া আছে। দুই চক্ষু তাহার নির্বাণোন্মুখ চিতাগ্নির মত
লজ্জল করিতে থাকে।
( পার্বতী ভয় নাই। সৈনিকেরা প্রস্তুত আছে)।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.