Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Sree Brindabon-shatok Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দরবেশ গ্রন্থাবলী-৩,
বনশতক
শ্রীশ্রীমৎ প্রবােধানন্দ সরস্বতী
বিরচিত
কিরণ দরবেশ অনূদিত
দ্বিতীয় সংস্করণ
আট আনা
শ্ৰীশশধর মিত্র
২নং নাথু সাহু ব্ৰহ্মপুরী,
বারাণসী।
১৩২৬
কলিকাতা
২৫নং রায়বাগান স্ট্রীট, ভারতমিহির যন্ত্রে
শ্রীহরিচরণ রক্ষিত দ্বারা মুদ্রিত।
ভূমিকা কলিযুগ-পাবনাবতার শ্ৰীশ্ৰীমন্মহাপ্রভুর পার্ষদ শ্রীমৎ প্রনােধানন্দ সরস্বতী বিরচিত “শ্রীশ্রীবৃন্দাবন-শতক” অপূৰ্ব গ্রন্থ। প্রেমিক ও রসঙ্ক ভক্তগণ ইহা আস্বাদন করিয়া নিজকে ধন্য মনে করিয়া থাকেন। বর্তমান পুস্তক উক্ত সুললিত গ্রন্থেরই পদ্যানুবাদ। সন ১৩০৫ সালে মদীয় গুরুদেব ভগবান শ্ৰবিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী- দেবের শ্রীচরণাশয়ে আমি পুরীধামে বাস করিতেছিলাম। সেই সময়ে তিনি আমাকে এই অনুবাদ কাৰ্যে প্ৰবৰ্ত্ত করাইয়াছিলেন। আমি সংস্কৃত ভাষায় একেবারেই অজ্ঞ ; তাই তাহারই আদেশে মদীয় গুরু-ভ্রাতা স্বর্গীয় সতীশচন্দ্র মুখােপাধ্যায় তত্ত্ববাগীশ বি. এ. মহাশয় শ্লোকগুলির বঙ্গানুবাদ করিয়া দিতেন, আর আমি উহা মূলের সহিত মিলাইয়া একটি- দুইটি করিয়া ছন্দে গ্রথিত করিতাম । যেদিন যতটা রচিত হইত, সন্ধ্যার পরে ঠাকুর উহা শ্রবণ করিতেন; এবং যেস্থানে যে পরিবর্তন আবশ্যক, তাহা বলিয়া দিতেন । এইরূপে ৯৬টি শ্লোকের অনুবাদ হইবার পরে, ১৩০৬ সালের ২২শে জ্যৈষ্ঠ তারিখে, গােস্বামী-দেব দেহরক্ষা করেন। তদবধি আর ইহাতে আমি হস্তাপণ করি নাই। আজ এতকাল পরে তাহারই আদেশ রক্ষা করিতে পারিলাম বলিয়া নিজকে ধন্য ও কৃত কৃতার্থ মনে করিতেছি। অর্থাভাব বশত ঠাকুরের অভিপ্রেত এই অনুবাদ প্রকাশিত হইতেছেনা দেখিয়া, আমার প্রিয়তম বন্ধু ও সতীর্থ কবিবর শ্ৰীযুত দেবকুমার রায় চৌধুরী ভায়া, এই সংস্করণ প্রকাশের সমস্ত ব্যয় স্বতপ্রবৃত্ত হইয়া বহন করিয়াছেন। এই কার্যের জন্য তাহাকে ধন্যবাদ দিবার বা [ ৪ ] সামান্য কৃতজ্ঞতা জানাইবার অধিকার পর্যন্ত আমার নাই। কি আর বলিৰ ? তস্মিন্ প্রীতি প্রিয়কাৰ্য্যসাধনঞ্চ তদুপাসনামব।” পরিশেষে নিবেদন, শ্রীমৎ প্রবােধানন্দ সরস্বতী মহারাজের যে ক্ষুদ্র চরিত-কথা এই পুস্তকে গ্রথিত হইল, প্রধানত স্বর্গীয় শিশিরকুমার ঘােষ মহাশয়ের গ্রন্থ হইতে উহা সঙ্কলিত হইয়াছে। এজন্য সেই বৈষ্ণব-চুড়ামণির উদ্দেশে হৃদয়ের গভীর কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। কাশী-যােগাশ্রমবাসী পরম শ্রদ্ধাস্পদ পণ্ডিত শ্ৰীযুত ভুবনমােহন বিদ্যারত্ন মহাশয় সংস্কৃত শ্লোকগুলির আদ্যোপান্ত অশেষ শ্ৰম স্বীকার করিয়া দেখিয়া দিয়াছেন। তজ্জন্তু উক্ত পণ্ডিত মহাশয়ের সমীপে আমার অপরিসীম ঋণ ও ঐকান্তিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতেছি। শ্ৰীবৃন্দাবনেশ্বরী তাহাকে স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু প্রদান করুন। উপসংহারে, আর দুইটি কথা না বলিলে আমার বক্তব্য অসম্পূর্ণ থাকে। প্রথম কথা,কবিতার মিল। এই অনুবাদে “ভূমি ও আমি” “চি ও ঘুচি” “ছবি ও ডুবি” “তনু ও কানু” “অর্ঘ্য ও দীর্ঘ” ইত্যাদি বর্তমান যুগের রুচি-বিরুদ্ধ, কিছু কিছু অমিল’ দৃষ্ট হইবে। একটু সামান্য চেষ্টা কৰিলেই, মুলের অর্থে বিশেষ গােল না বাধাইয়াও, আমি এই সামান্য সামান্য দুষ্ট-পদগুলি সারিয়া লইতে পারিতাম; কিন্তু আমার ঐ প্রকার পরিবর্তন করিতে সাহস হয় নাই। যে-অনুবাদ গোঁসাইজী স্বয়ং দেখিয়া অনুমােদন করিয়াছিলেন, নিতান্ত আধুনিক রুচির পারিপাট্যের খাতিরে উহা বদলাইয়া দিবার প্রয়ােজন থাকিলেও, সামর্থে কুলাইল না। পাঠক যদি মনে রাখেন,-এই গ্রন্থ অনুবাদ মাত্র, মূল কবিতা নহে; ভাহা হইলেই এই সামান্য ত্রুটির জন্য অনুবাদককে ক্ষমা করা কঠিন হইবে না।
দ্বিতীয় কথা,-গ্রন্থের সর্বশেষে যােজিত গ্রন্থকারের পরিচয়-সূচক কবিতাটি। বর্তমান যুগে এই প্রকার স্ব-বিজ্ঞাপন একেবারেই অচল। কিন্তু দায়ে পড়িয়া আমাকে এই প্রাচীন রীতির অনুসরণ করিতে হইয়াছে। আমার একান্ত প্রিয় একজন, পরিচয়-সূচকটি এই পুস্তকে সন্নিবেশিত করিবার জন্য এক সময়ে আমাকে অনুরােধ করিয়াছিলেন ; আমিও খেয়াল বশত জানি না কেন, তৎকালে তাহার কথায় স্বীকৃত হইয়াছিলাম। আজ সে ব্যক্তি পরলােকে। যদি জীবিত থাকিত, তবে যে উপায়ে হউক, তাহাকে আমার স্বীকৃতি হইতে নিষ্কৃতি দেওয়াইবার চেষ্টা করিতাম । কিন্তু আজ সেই স্নেহ-সিক্ত তরুণ প্রাণটি স্মরণ করিয়া, যাহা স্বীকার করিয়াছিলাম, তাহার অন্যথাচরণ করিতে পারিলাম না। কতখানি লজ্জা ও নির্বুদ্ধিতার বােঝ নিজের স্কন্ধে লইয়া সাহিত্য-সমাজে, এই পয়ারটি ছাপাইয়া ধরিতে হইল, তাহা মনে করিয়া সহৃদয় পাঠকগণ, আশা করি এই মেহান্ধ নির্জীবকে ক্ষমা করিবেন ।
No text on this page.
উৎসর্গ পত্র
পরম ভাগবত সতীর্থ
স্বগীয় সতীশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়
নিত্য-ধাম নিকেতনে
ভাই সতীশ,
আজ তুমি ব্ৰহ্মাদি দেবতারও দুর্লভ লােকে বাস করিতেছ, এই
মৰ্ত্তবাসী হীন ভাতার দিকে একটু কৃপা-কটাক্ষ করিবে কি ভাই?
জীবিত কালে তােমার শ্রীগুরুচরণে ঐকান্তিক নিষ্ঠা, মহাপ্রসাদে অদ্ভুত
অনুরক্তি এবং জগন্নাথদেবে অসাধারণ বিশ্বাস দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলাম ;
তােমার মধুর সঙ্গ দুর্বলকে সবল ও দুস্থকে নিরাময় করিত। আজও
তােমার কথা মনে হইলে চক্ষের জল রাখিতে পারি না। তুমি নিত্য
বৃন্দাবনের নিত্যলীলায় অধিকারী হইয়াছ; ধন্য তুমি !
এতদিন পরে তােমার আদরের শ্রীবৃন্দাবন-শতক” প্রকাশ করিতে
সমর্থ হইলাম। পতিত পাবন শ্রীগুরুদেবের আদেশে ও তােমর সাহায্যে
যে অনুবাদ আরব্ধ হইয়াছিল, এতদিনে তাহা সম্পূর্ণ হইল। ভাই,
তােমার প্রিয় বৃন্দাবন-শতক” আজ তােমারই উদ্দেশে সমৰ্পণ করিয়া
কৃতার্থ হইলাম।
রাখি-পূর্ণিমা,
২০ শাবন, ১৩২১
১৩২১
দীন ভ্রাতা
কিরণ
No text on this page.
প্রবােধাদ ফে4 (১) ১৪০৭ শকে লীলাবতার শ্রীগৌরাঙ্গ-মহাপ্রভু নবদ্বীপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, এবং ১৪৩১ শকে সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্বক নীলাচলে বাস করিতেছিলেন। এই সময়ে বারাণসীধামে শ্রীমৎ প্রকাশানন্দ সরস্বতী সন্ন্যাসীগণের শীর্ষ স্থান অধিকার করিয়া অবস্থিতি করিতেছিলেন। প্রকাশানন্দের জন্মস্থান, কাবেরী তীরে—প্রসিদ্ধ শ্রীরঙ্গপত্তন ক্ষেত্রে। তাহারা তিন ভাতা ছিলেন। জ্যেষ্ঠ বেঙ্কট ভট্ট, মধ্যম মিল্ল ভট্ট, আর কনিষ্ঠ প্রকাশান। প্রকাশানন্দের গৃহস্থাশ্রমের নাম কি ছিল, তাহা জানিবার কোনও উপায় নাই। জ্যেষ্ঠ বেঙ্কট ভট্টের পুত্রই পরম পণ্ডিত বৈষ্ণব-স্মৃতিগ্রন্থের প্রণেতা শ্রীমৎ গােপাল ভট্ট গােস্বামী । প্রকাশানন্দ যখন গৃহী ছিলেন, তখনই তঁাহার পাণ্ডিত্য-খ্যাতি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হইয়াছিল। তাহার ন্যায় প্রসিদ্ধ বেদজ্ঞ পণ্ডিত তখনকার দিনেও সুলভ ছিল না। তাহার নিকট শিক্ষা পাইয়া তদীয় ভ্রাতুস্পুত্র গােপাল ভট্ট অতি অল্প বয়সেই শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছিলেন। গােষ্ঠী বৈষ্ণব ছিলেন,-ঐশ্রীলক্ষ্মীনারায়ণ ইহাদের উপাস্য। প্রকাশানন্দ বেদান্তবাদী হইয়া সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্বক কাশীধামে অবস্থান করিলেন, এবং অঙ্গান্য সন্ন্যাসীদিগকে বেদান্ত শিক্ষা দিতে লাগিলেন। প্রকাশানন্দ সরস্বতী অপরিসীম শক্তিমান পণ্ডিত ছিলেন। তঁাহার কৃত “শ্রীচৈতন্য-চন্দ্রামৃত” গ্রন্থের একজন টীকাকার-নৃসিংহ মহান্তের শিষ্য আনন্দি—যাহা লিখিয়াছেন, তাহার মর্ম এই :- আমি মাত্র অনুবাদ দিলাম) “জগতের একমাত্র পরিব্রাজক-শ্রেষ্ঠ প্রকাশানন্দ সরস্বতী,-বেদান্ত, তর্ক, শঙ্খ, বৈশেষিক, জ্ঞান, মীমাংসা, অগম, নিগম, মহাপুরাণ, ইতিহাস, - শ্রীবৃন্দাবন-শতক পঞ্চরাত্র, অলঙ্কার, কাব্য, নাটকাদির রহস্য-সদ্ধান্ত বিষয়ে অনর্গল বক্তৃতা দ্বারা কাশী-নিবাসী অসংখ্য ছাত্রের আনন্দ-পদ্ম প্রস্ফুটিত করিতেন।” প্রকাশাননের মত পণ্ডিত-সন্ন্যাসী তৎকালে আর কেহ ছিল না। কাশীতে অবস্থান করিতে করিতে প্রকাশানন্দ একদিন শ্রবণ করিলেন, তাহার ভ্রাতুপুত্র ও শিষ্য গােপাল ভট্ট একটি সন্ন্যাসী দেখিয়া পাগল হইয়াছে, এবং তাহার এত কালের শিক্ষা পরিত্যাগ করিয়া ভাবমার্গে প্রবেশ করিয়াছে। এই সংবাদে প্রকাশান মনে বড় ক্লেশ পাইলেন, ও নিজকে অপমানিত বোধ করিলেন। তিনি ভাবিলেন, ভারতবর্ষে আমার উপরে আবার সন্ন্যাসী কে? এমন স্পর্ধা কাহার যে, আমার নিজ হাতে গড়া প্রিয় ছাত্র গােপালকে বিপথে লইয়া যায় ? অনুসন্ধানে প্রকাশানন্দ অবগত হইলেন, এই ভাবুক সন্ন্যাসী নীলাচলে বাস করেন। তীর্থ দর্শন করিতে দক্ষিণদেশে গিয়া তাহাদের আলয়ে চাতুৰ্ম্মাস্তের চারিমাস অবস্থান করিয়াছিলেন, এবং তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বেঙ্কট ভট্টকে সপরিবারে কৃষ্ণনামে পাগল করিয়া আসিয়াছেন। সন্ন্যাসীর বয়স অতি অল্প, এবং রূপ অতি মনােরম ;-তপ্তকাঞ্চন বর্ণ, পদ্ম-নেত্র, সুবিশাল দেহ, উন্ধে প্রায় সারে চারি হস্ত। ইহারই সঙ্গে জুটিয়া তাহার পুজ্যতম জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও প্রিয়তম ভ্রাতুপুত্র নাচিতে ও কঁদিতে শিখিয়াছেন। এই সন্ন্যাসী বঙ্গদেশীয় ব্রাহ্মণ-সন্তান, এবং নিতান্ত হীন ভারতী সম্প্রদায়ের কেশব ভারতীর শিষ্য ; ইহার নাম শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য । আরও ভয়ানক কথা এই যে, এই সন্ন্যাসীকে তাঁহারই আত্মীয়-স্বজন, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলিয়া নির্ধারণ করিয়াছে। শুনিয়া প্রকাশানন্দ মহারাজ এই অজ্ঞাত বালক- সন্ন্যাসীর উপরে মর্মান্তিক ক্রোধান্নিত হইলেন। প্রকাশানন্দ যমন তৎকালে সর্বপ্রধান বৈদান্তিক পণ্ডিত ছিলেন, নীলাচলে সেই প্রকার বাসুদেব সার্বভৌম সর্বশ্রেষ্ঠ বেদান্ত-দী নৈয়ায়িক ।
প্রবােধান পণ্ডিত ছিলেন। উরিষ্যার অধিপতি গজপতি-প্রতাপরুদ্র আদর করিয়া এই সার্বভৌমকে, তৎকালে ন্যায়চর্চার জন্য জগৎবিখ্যাত নবদ্বীপ হইতে লইয়া গিয়া, নিজ সভার শােভা বর্ধন করিয়াছিলেন। ভারতবর্ষের সর্বস্থান হইতে শিষ্যের এই সাৰ্বভৌমের নিকট পাঠ করিতে আসিত। প্রকাশানন্দ অবাক হইয়া শুনিলেন, এই পরম-জ্ঞানী সৰ্বশ্রেষ্ঠ নৈয়ায়িক পণ্ডিতও সেই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে দেখিয়া পাগল হইয়াছেন। শুনিয়া ঈর্ষায় ও ক্রোধে প্রকাশাননের সর্বাঙ্গ জ্বলিতে লাগিল। তিনি এই সন্ন্যাসীকে মায়াবী স্থিব করিলেন। প্রকাশানন্দ অদ্বৈতবাদী, শঙ্করাচার্যের মতাবলম্বী। সাধারণত অদ্বৈতবাদীরা যাহা হইয়া থাকেন, তিনিও তাহাই ;-নিতান্ত শুষ্ক ও নিরস। ভগবান পৃথক কেহ আছেন, প্রকাশান তাহা বড় একটা মানিতেন না; সেই ভগবানের আবার অবতার। প্রকাশান মনে করিলেন, ইহা নিতান্তই হাস্যকর। শঙ্করাচার্যের মতাবলম্বী অনেক সন্ন্যাসী দৃষ্টি গােচর হয়, কিন্তু হায়, শঙ্করের মত প্রেমিক ও রসগ্রাহী মায়াবাদী আর কোথায় ও দৃষ্টিগােচর হয় না। প্রিয়তম গােপালের বিপথগমনের বার্তা পাইয়া প্রকাশান খুবই আঘাত পাইয়াছিলেন; এখন আবার বিশ্ব-বিশ্রত পণ্ডিত সাৰ্বভৌমের অধঃপতনে তাহার সে দুঃখ বিদ্বেষে পরিণত হইল। তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। একটা শ্লোক লিখিয়া নীলাচলগামী কোনও যাত্রিকের সঙ্গে শ্রীগৌরাঙ্গ সমীপে পাঠাইয়া দিলেন। (২) মহাপ্রভু দক্ষিণ-ভ্ৰমণ করিয়া আসিয়া নীলাচলে বাস করিতেছেন, এমন সময়ে একদিন প্রকাশানন্দের শ্লোক তাহার নিকটে পৌছিল । শ্লোকটি এই-
১২
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
যাস্তে মণিকর্ণিকা মলহরা স্বর্দীর্ঘিকাদীর্ঘিকা
রত্নাকমােক্ষং তনুমৃতে শম্ভুঃ স্বয়ং যচ্ছতি।
এতদ্ভূতধামতঃ সুরপুরােনিৰ্বাণমার্গস্থিত
মুছেহিন্য মরীচিকা পণ্ডবৎ প্রত্যাশয়া ধাবতি।
“যে স্থানে মণিকর্ণিকা ও পাপনাশিনী মন্দাকিনী দীবিকা, যে স্থানে
স্বয়ং শম্ভু দেব-দুর্লভ তারক-মােক্ষ-প্রদ নিৰ্বাণ-পথস্থিত রত্ন প্রদান করেন,
মূঢ় জনেরাই সেই স্থান ও রত্ন পরিত্যাগ করিয়া পশুর ন্যায় মৃগতৃষ্ণিকায়
অন্য পথে ধাবিত হয়।”
অর্থাৎ “হে মুঢ় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য । এই কাশীধামে স্বয়ং বিশ্বনাথ
মুক্তি দিয়া থাকেন। তুমি এমন স্থান ছাড়িয়া কেন নীলাচলে বাস
করিতেছ?” এই শ্লোকের রচয়িতা প্রকাশনই পরিশেষে শ্রীবৃন্দাবনের
অনির্বচনীয় মাধুরী বর্ণনা করিয়া শত শত শ্লোক রচনা করিয়াছিলেন।
শ্রীভগবানের এমনই অপূৰ্ব্ব ভঙ্গি।
শ্লোক পড়িয়া শ্রীগৌরাঙ্গ-প্রভু ঈষৎ হাস্য করিলেন, এবং মহামান্য
প্রকাশানন্দ সরস্বতী মহাশয়ের সম্মান রক্ষার্থে সেই লােক সঙ্গেই একটি
উত্তর লিখিয়া পাঠাইলেন। যথা :-
ঘৰ্মাদ্যোমণিকর্ণিকা ভগবতঃ পদাধু ভাগীরথী
কাশীনাম্পতিরন্ধমেব ভজতে শ্রীবিশ্বনাথ স্বয়ং।
এতস্যৈবহিনাম শম্ভু নগরে নিস্তারকং তারকা
তস্মাৎ কৃষ্ণপদাজং ভজ সখে শ্রীপাদনিৰ্বাণং।
মণিকর্ণিকা যাহার ঘর্মজল, ভাগীরথী যাহার চরণ-বারি, কাশীপতি
বিশ্বনাথ স্বয়ং যাহাতে লীন হইয়া ভজনা করেন, এবং বারাণসী নগরে
যিনি নিস্তারক তারকব্রহ্ম নামে খ্যাত। 'হে সখে, সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের
নির্বাণ চরণ কমল ভজনা কর।
}
*
প্রবােখনিন্দ পাঠক, শ্লোক দুইটি একটু অনুধাবন করিলেই, ইহার মধ্যে প্রকাশানন্দের উৎকট বিদ্বেষ ভাব ও মহাপ্রভুর মধুর মহত্বের পরিচয় পাইবেন। প্রকাশানন্দ মহাপ্রভুকে সম্বােধন করিয়াছেন,-“হে মূঢ়!”; আর ঠাকুর তাহার উত্তরে বলিতেছেম,-“হে সখে!” । এমন বিচিত্রতা একমাত্র মহাপ্রভুতেই সম্ভবে। যাহা হউক, প্রকাশান লিখিয়াছিলেন,-“হরি কিছু নয়, হরকে ভজনা কর; রঙ্গ দেখিবার জন্য তাই প্রভু বলিলেন,-“তােমার হরও হরিকে ভজনা করেন; অতএব হরির চরণকমল আশ্রয় কর। সুচতুর প্রকাশনন্দ উত্তর পাইয়া বুঝিলেন, এ তর্কে বড় সুবিধা হইবে না। হর ও হরির শ্রেষ্ঠত্বের বিবাদ কখনও মীমাংসা হইতে পারে না; কেননা দুইই এক। তাই শত্রুতার যাহা সনাতন পন্থা—অর্থাৎ গালাগালি—তাহাই অবলম্বন করিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গদেব কখনও মহাপ্রসাদ উপেক্ষা করিতেন না। শ্রীশ্রীজগ- ন্নাথ দেবের যে সমস্ত রাজভােগ হইত, তাহা সুমিষ্ট ও রসনা তৃপ্তিকর বলিয়া সন্ন্যাসীগণের পক্ষে নিষিদ্ধ হইলেও, সে মহাপ্রসাদ লইয়া কেহ মহাপ্রভুর নিকট উপস্থিত হইলে তিনি অবিচারে তাহা গ্রহণ করিতেন। ইহা কাহারও অগােচর ছিল না,—প্রকাশানন্দও জানিতেন। তাই প্রভুকে নিন্দা করিয়া এবার প্রকাশানন্দ লিখিয়া পাঠাইলেন - বিশ্বামিত্র-পরাশয়-প্রভৃতয়ােতায়ুপর্ণাশিনঃ এতে স্ত্রীমুখপঙ্কজং সুললিতং দৃষ্টব মােহং গতা। শাল্যান্নঃ সঘৃতং পয়েদধিযুতং যে ভুঞ্জতে মানব যােমিয়িনিগ্রহে যদি ভবেদ্বিস্তরেৎ সাগর। “বিশ্বামিত্র পরাশর প্রভৃতি মুনিগণ বায়ু-জল-পত্ৰ মাত্ৰ আহার করিয়াও মনােহরা রমণীৰদন দর্শন মাত্রে মােহপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন ; যে মানৰ ধৃত ১৪ শ্রীবৃন্দাবন-শতক দধি-দুগ্ধ সংযােগে শালি-ধান্যের অন্ন ভােজন করে, সে যদি ইন্দ্রিয় দমন করিতে পারে, তবে বিন্দুও সিন্ধু লজ্জন করিবে।” বলা বাহুল্য, এই শ্লোক প্রকাশনন্দের মত জ্ঞানী ব্যক্তির উপযুক্ত হয় নাই। কিন্তু নিজের অপ্রতিহত সম্মানে আঘাত পাইলে, অতি মাত্র জ্ঞানবাও মােহপ্রাপ্ত হন; তাই প্রকাশানন্দের মত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিও ক্রোধে আত্মহারা হইলেন। মহাপ্রভু এই শ্লোক পড়িয়া, ইহা উত্তরের উপযুক্ত নয় বলিয়া উপেক্ষা করিলেন। কিন্তু ভক্তগণ তাে ছাড়িবার পাত্র নয়। তাহারা নীরবে ইহা সহ করিবেন কেন? প্রভুর অগােচরে নীলাচলবাসী ভক্তেরা ইহার একটা উত্তর লিখিয়া পাঠাইলেন। পাঠকগণের কৌতুহল তৃপ্তির জন্য আমি সে শ্লোকটা তুলিয়া দিলাম :- সিংহােবলী দ্বিাদশূকরমাংস ভােগী সংবৎসরে কুরুতে রতিমেকবারং। পারাবত তৃণশিখকণমাত্র ভােগ কামীভবেদিনং বদ কোহত্ৰ হেতুঃ। “বলবান্ সিংহ, হস্তীশূকর প্রভৃতির মাংস ভক্ষণ করিয়াও সারা বৎসরে একবার মাত্র রতিক্রীড়া করে; আর কপােত, সামান্য শস্যের কণামাত্র ভক্ষণ করিয়াও নিয়ত রতিক্রীড়া করিতেছে। ইহার মধ্যে এমন কি হেতু আছে, বল।” প্রকাশানন্দ ইহার পর আর কোনও পত্রিকা প্রেরণ করেন নাই। (৩) পর বৎসর তীর্থ পৰ্যটনে বাহির হইয়া মহাপ্রভু কাশীধামে আগমন করিলেন। কাশীতে আসিয়া তিনি পরম ভক্ত চন্দ্রশেখরের গৃহে বাস করিলেন এবং তপন মিশ্রের বাড়ীতে ভিক্ষা নির্বাহ করিতে লাগিলেন।
এবােধান মহাপ্রভুর এক আশ্চর্য্য প্রভাব ছিল—যে স্থানে যাইতেন, যাওয়া মাত্র তাহার আগমনবার্তা সর্বত্র প্রচারিত হইয়া পড়িত এবং অসংখ্য লােক প্রত্যহ তাহার দর্শনে আসিত। কাশীধামে অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রচারিত হইল, এক অপূর্ব সন্ন্যাসী আসিয়াছেন; তাঁহার অনিন্দ্য কান্তি ও অসীম প্রেম। শুনিয়া হাজার হাজার লােক চন্দ্রশেখরের ক্ষুদ্র ভবন তােলপাড় করিয়া তুলিল। ক্রমে সন্ন্যাসীমণ্ডলীতে একথা উঠিল এবং প্রকাশানন্দের কর্ণগােচর হইল। প্রকাশানন্দ অনুসন্ধান লইয়া জানিলেন—এই সেই ধূর্ত শ্রীকৃষ্ণ- চৈতন্য। জানিয়া বড় খুসি হইলেন। ভাবিলেন, এবার তিনি প্রতা- রককে উপযুক্ত শিক্ষা দিবেন। কিন্তু প্রভু তাে তাহার নিকট গমন করিলেন না। ইহাতে সরস্বতী বড় বিপদে পড়িলেন। তিনি কাশী-বাসী সন্ন্যাসীমণ্ডলীর মস্তকস্বরূপ হইয়া তাে আর নগণ্য শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের কাছে যাইতে পারেন না। কোনও প্রসিদ্ধ সন্ন্যাসী কাশীধামে আসিলে অবিলম্বে গিয়া সরস্বতী-ঠাকুরের চরণ বন্দনা করিত। সেই তিনি কেমন করিয়া শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের কাছে যাইবেন? কিন্তু যে ধূৰ্ত্ত তাহার স্ব-গােষ্ঠীর ধর্ম নষ্ট করিল, তাহাকেই বা কাছে পাইয়া সাজা না দিয়া ছাড়িয়া দেন কি করিয়া!-প্রকাশানন্দ মনে মনে বড়ই ক্লেশ পাইতে লাগিলেন। তদুপরি যখন-তখন যে সে তাহার সভায় আসিয়া এই অপরূপ সন্ন্যাসীর প্রশংসা করিতে লাগিল। ক্রমেই প্রকাশানন্দের পক্ষে অসহ হইয়া উঠিল। তিনি সকলকেই বলিতেন, “তােমরা ঐ যাদুকরের কাছে যেয়ো না। সে মূখ— সন্ন্যাসী নামের কলঙ্ক। সন্ন্যাসীর কর্তব্য বেদান্ত পাঠ করা, সে তা করে না ; কেবল ভাব দেখিয়ে বেড়ায়। এরূপ লােকের সঙ্গ কলে ধৰ্ম ভ্রষ্ট হতে হয়। শুনেছি, সে এমন মােহিনী জানে যে,লােকে তাকে শ্রীকৃষ্ণ বলতে কুষ্ঠিত হয় । দেখছ না, ভয়ে সে আমার দিকে আসছে না, দূরে দুরে থাকছে।”
শ্রীবৃন্দাবন-শতক তপন মিশ্র ও চন্দ্রশেখরের কর্ণে প্রকাশানন্দের প্রভু-নিন্দার সংবাদ পৌছিল। শুনিয়া তাহারা বড় ক্লেশ পাইয়া ঠাকুরের চরণে নিবেদন করিলেন, “প্রভু, তােমার নিন্দা আর সইতে পারি না।” মহাপ্রভু ঈষৎ হাস্য করিলেন, কোনও উত্তর দিলেন না। কাশীতে “বিশ্বরূপ-ক্ষোর দিনে” সমস্ত সন্ন্যাসীর একত্র হইতে হয় ; ইহা সন্ন্যাসীদের ধর্ম। সেই ক্ষৌর দিন সম্মুখে আগত। ধর্মসংস্থাপক শ্রীগৌরাঙ্গ কখনও ধৰ্ম্মলন করিতে পারেন না। কাশীতে থাকিলে ঐ দিন সন্ন্যাসীদের সঙ্গে মিলিতে হইবে। সুতরাং উহার দুই দিন পূর্বেই তিনি বারাণসী পরিত্যাগ করিয়া শ্রীবৃন্দাবন যাত্রা করিলেন। তখন সন্ন্যাসীদলে মিলিতে তঁাহার ইচ্ছা ছিল না; কেন ছিল না, তাহা মাত্র তিনিই জানেন। ক্ষৌর দিন সম্মুখে পাইয়াও শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রস্থান করিয়াছেন শুনিয়া, প্রকাশান নিশ্চয় করিলেন,—নিতান্ত ভীত হইয়াই ভারতী কাশী ত্যাগ করিয়াছেন। কিন্তু যিনি সমস্ত ভয়ের ভয়হারী, তিনি ভীত হইবেন কাহার ভয়ে তখন পর্যন্ত প্রকাশানন্দের সুসময় উপস্থিত হয় নাই বলিয়াই বুঝি, দয়ানিধি শ্রীগৌরাঙ্গ অপেক্ষা করিতেছিলেন। নতুবা তিনিতাে জানিতেন, এই প্রকাশনল তাহার চিহ্নিত দাস! সে তাে আর অন্য কেহ নয়-শ্ৰমতীর প্রিয় সখী তুঙ্গবিদ্যা। ধৈৰ্য্য ধরিয়া অপেক্ষা কর সরস্বতী ঠাকুর। তােমার মরা গাঙে জোয়ারের দিন আসিতেছে । (৪) গৌরীদেব বৃন্দাবন দর্শন করিয়া দুই মাস পরে আবার কাশীতে প্রত্যাগ করিলেন। এই সময়ে গৌড়ের বাদশাহ হােসেনসহেয় মন্ত্রী সনাতন, কাশীতে ?
প্রধান ১৭ আসিয়া প্রভুর চরণে আশ্রয় লইলেন। এই সনাতনকে দিয়া ধর্মপ্রচার করাইতে হইবে; তাই চন্দ্রশেখরের বাড়ীতে থাকিয়া নিভৃতে মহাপ্রভু সনাতনকে শিক্ষা দিতে লাগিলেন। এই শিক্ষা দিতে দুই মাস লাগিল ; সুতরাং বাধ্য হইয়া দীর্ঘ দুই মাস এবার প্রভুকে কাশীতে অবস্থান করিতে হইল। প্রকাশান গুনিলেন, শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য আবার আসিয়াছেন। কিন্তু এবারও প্রভু সন্ন্যাসীমণ্ডলীতে মিলিত হইতে কোনও প্রকার আগ্রহ প্রকাশ করিলেন না। একদিন মহারাষ্ট্রদেশীয় একজন প্রধান ব্রাহ্মণ প্রকাশানন্দের সভায় গিয়া মহাপ্রভুর গুণানুবাদ করিতে লাগিলেন। কলিলেন, “স্বামীজী । এক অতি অপুর্ব সন্ন্যাসী এই নগরে এসেছেন। তাঁর রূপ অনুপম, কাৰ্য্য অমানুষিক। তাকে দেখলে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলে মনে হয়। মানুষে কখনাে এত প্রেম সম্ভবে না।” এই কথা শুনিয়া প্রকাশান হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিলেন । বলিলেন, “জানি হে জানি, তার নাম চৈতন্য-সে কেশৰ ভারতীর শিষ্য। অতি ধূর্ত ও প্রবঞ্চক; লােককে নাচায়-গাওয়ায়। সন্ন্যাসীর যা’ কর্তব্য তা করে না। দেখা হলে তাকে বললা-কাশতে তার ভাবকালি বিকোবে না; এখানে আসা পণ্ডশ্রম মাত্র।” শুনিয়া ব্রাহ্মণ মনে বড় ক্লেশ পাইলেন। শ্রীপ্রভুকে তিনি দেখিয়াছেন, —তাহার মন পূর্বেই মহাপ্রভুর চরণে বিকাইয়া গিয়াছে। সুতরাং প্রভুর নিন্দা শুনিয়া মর্মাহত হইয়া তিনিনীরবে সরস্বতীর সভা পরিত্যাগ করিলেন। প্রভুর নিকট আসিয়া অতি কাতরভাবে বলিলেন, “ঠাকুর, আমি নির্বদ্ধিতা- বশত প্রকাশানন্দের সভায় গিয়েছিলাম। সে আপনাকে উপহাস করে। এমন কি অবজ্ঞা করে আপনার পুরা নামটি পর্যন্ত না বলে কেবল চৈতন্য বলে। বলেছে-কাশীতে নাকি আপনার এ ভাবকালি বিকোবে না। . d বৃন্দাবন-শতক দয়াল শ্রীগৌরাঙ্গ ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “বােঝা মাথায় করে এসেছি, যদি নিতান্তই না বিকোয়—বিলিয়ে দিয়ে যাব; ফিরিয়ে নেব না।” কিন্তু মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণের মন ইহাতে শান্ত হইল না। তিনি মনে করিলেন, প্রকাশন প্রভুকে দেখে নাই, তাই নিন্দা করে। একবার কোনও গতিকে সাক্ষাৎ হইলেই প্রকাশানন্দের আর কুকথা বলিবার অবসর থাকিবে না। চন্দ্রশেখর, তপন মিশ্র, পরমানন্দ ও সনাতনের সঙ্গে পৰামৰ্শ করিয়া মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ প্রভুর সঙ্গে প্রকাশানন্দের মিলনেব এক উপায় স্থির করিলেন। ব্রাহ্মণ সমস্ত সন্ন্যাসীমণ্ডলীকে তাহার বাড়ীতে একদিন ভিক্ষার জন্য নিমন্ত্রণ করিলেন। করিয়া মহাপ্রভুর কাছে আসিয়া তাহার চরণে পতিত হইয়া বলিলেন, “প্রভু, আমি সমস্ত সন্ন্যাসীকে আগামী কল্য নিমন্ত্রণ কয়েছি। আপনাকেও কৃপা করে আমার বাড়ীতে কাল ভিক্ষা নির্বাহ করতে হবে। নইলে আমি কিছুতেই চরণ ছাড়ব না।” শ্রীগৌরাঙ্গ ঈষৎ হসিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, আমি যাব; সেজন্য এত মিনতি কেন?” মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণের আলয়ে বৃহৎ সভা বসিয়াছে। প্রকানন্দ সন্ন্যাসীমণ্ডলী সহ সভায় বিরাজ করিতেছেন। তিনি শুনিয়াছেন যে, শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছেন। এ পর্যন্ত তিনি এরূপ নিম- স্ত্রণে কখনও স্বীকৃত হন নাই—এবার হইয়াছেন। সুতরাং সন্ন্যাসীদলে মহাপ্রভুর কথা লইয়া বেশ একটু আন্দোলন ও আলােড়ন হইতেছে। সকলেই আগ্রহের সঙ্গে প্রভুর আগমন প্রতীক্ষা করিতেছেন। প্রকাশানন্দ প্রভুকে শিক্ষা দিবার এ সুযােগ পরিত্যাগ করিবেন না, মনে মনে সংকল্প করিতেছেন। এমন সময়ে মহাপ্রভু প্রসন্ন বদনে সুমিষ্ট মৃদু স্বয়ে হরেকৃষ্ণ” বলিতে প্রয়ােধান বলিতে সভায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সঙ্গে সমান, চন্দ্রশেখর, তপন মিশ্র ও পরমানন্দ। প্রভু আসিতেছেন দেখিয়া, “ঐ চৈতন্য আসিতেছে” বলিয়া সভায় একটা মৃদু কলরব উঠিল। সকলেই কৌতুহল বশত উকি দিয়া দেখিলেন—সাড়ে চারি হস্ত প্রমাণ দীর্ঘ, সুবলিত বাহ, প্রকাণ্ড শরীর, কঁচা সােনার বর্ণ, গৈরিকধারী একটি অনুপম যুবা, অতি মন্থর গতিতে অবনত বদনে আগমন করিতেছেন। মুখখানি রমনীয় ও কমনীয়, ললাট উন্নত, নেত্র ঢুলু ঢুলু-কেমন একটি সশঙ্কিত ও সলজ্জিত ভাব। বদন মলিন অথচ প্রফুল ;-যেন অন্তরে কি একটা দুঃখময় আনন্দ রহিয়াছে। প্রভু আসিয়া সৰ্ব্বাগ্রে করযােড়ে “নমাে নারায়ণায়” বলিয়া সকলকে নমস্কার করিলেন। পরে পাদ-প্রক্ষালণের স্থানে গিয়া পদ ধৌত করিলেন। করিয়া সেই স্থানেই বসিয়া পড়িলেন। প্রভুর শ্রীমুখ দর্শন করিয়া প্রকাশানন্দের চিরকালের শত্রুতা মুহূর্ত মধ্যে লুপ্তপ্রায় হইল। সুন্দর কমনীয় মুখখানি তাহার প্রাণকে বড় জোরে টানিতে লাগিল; মনে হইল, এ মুখ যেন তাহার কত যুগ-যুগান্তের পরিচিত আপনজনের মুখ। তিনি আত্মসম্বরণ করিয়া তাড়াতাড়ি গাত্রোখান করিলেন। করিয়া প্রভুকে বলিলেন, “শ্রীপাদ ! সভার মধ্যে আগমন করুন। অপবিত্র স্থানে উপবেশন করে কেন আমাদের মনে ক্লেশ দিচ্ছেন?” দীনতার প্রতিমূর্তি শ্রীগৌরাঙ্গ করযােড়ে বলিলেন, “আমি হীন ভারতী সম্প্রদায়ের-আপনার উচ্চ সম্প্রদায়ের। আপনাদের সঙ্গে একাসনে উপবেশন করা আমার শােভা পায় না। এই দীনতায় সকলেই বড় মুগ্ধ হইলেন। প্রকাশানন্দ স্বয়ং প্রভুর হাত ধরিয়া আলিয়া সভার মধ্যস্থলে বসাইলেন। প্রকাশান প্রভুর অনিন্দ্যকান্তি ও সরল মিখ ভাব দেখিয়া মুগ্ধ ২০ বৃন্দাবন-শতক হইলেন। তিনি মহাশয় ব্যাক্তি ; প্রভুকে দর্শন করিয়া বুঝিলেন, প্রভুর প্রতি তাহার ক্রোধ ছিল বটে, কিন্তু প্রভুর তাহার প্রতি বিন্দু মাত্র ক্রোধ নাই। ইহাতে তাহার একটু অনুতাপের উদয় হইল। তিনি ধীরে ধীরে বলিলেন, “শ্রীপাদ । শুনেছি আপনি কেশব ভারতীয় শিষ্য; আপনার নাম শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ভারতী। আপনি কাশীতে রয়েছেন, অথচ আমরা আপনার এক আশ্রমের হয়েও দর্শন পাই না কেন? এতে আমাদের বড় দুধ হয়।” চতুর চুড়ামণি এ কথার কোনও উত্তর না দিয়া, নিতান্ত অপরাধীর মত অবনত বদনে বসিয়া রহিলেন। তখন সরস্বতী ঠাকুর পুনরায় বলিলেন, “শ্রীপাদ ! আপনার তেজ ও ভাব দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আপনাকে সরল ভাবে জিজ্ঞাসা করি, আপনি সন্ন্যাসীর যে প্রধান ধর্ম বেদান্ত পাঠ, তা করেন না কেন? আবার নিতান্ত দূষনীয় নৃত্যগীত প্রভৃতি ভাবকালিতে মগ্ন থাকেন? আপনি সুবােধ, আমাদের সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যাক্তি; আপনার পক্ষে এই হীন ধর্ম-বিরুদ্ধ আচার আমাদের বড় ক্লেশের কারণ হয়।” সরস্বতীর তখন আর বিন্দু মাত্র বিদ্বেষ নাই। থাকিলে-সরল ভাবে এমন প্রশ্ন করিতে পারিতেন না। শ্রীগৌরাঙ্গ অবনত মস্তকে ধীরে ধীরে উত্তর করিলেন, “শ্রীপাদ ! আমি মনের কথা নিবেদন করিতেছি, শুনুন। আমি যখন প্রথম শ্রীগুরুর চরণে আশ্রয় পেলাম, তখন গুরুদেব আমাকে কৃপা করে বলেন, “বাপু, দেখছি তুমি মুগ্ধ। বেদান্ত পড়| তাের কাজ নয়। কিন্তু তাতে দুঃখিত হয় না। তােমাকে আমি উত্তম বস্তু দিচ্ছি। তুমি এই শ্লোকটি কণ্ঠস্থ কর হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কোম্। কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাত্যেৰ গতিরথা ॥” .
প্রবোধনিন্দ মধুর কণ্ঠে মহাপ্রভু এই শ্লোকটি উচ্চারণ করিলেন। করিয়া শ্লোকের ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। সে ব্যাখ্যা অতি অদ্ভূত। যিনি ভারতবর্ষজয়ী দিগ্বিজয়ী কেশব পণ্ডিতকে নবদ্বীপের গঙ্গাতীরে অগাধ বিদ্যার পরিচয় দিয়া স্তম্ভিত করিয়াছিলেন, যিনি ভারত-ৰিখ্যাত নৈয়ায়িক বাসুদেব সার্বভৌমকে অপরিসীম জ্ঞানের আলােকে আপন চরণে টানিয়া লইয়াছিলেন, যিনি এক “আত্মারাম” শ্লোকের ৬১ প্রকার অর্থ করিতে সমর্থ, সেই পণ্ডিত চুড়ামণি যখন “হরের্নাম” শ্লোকের ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন, সমস্ত সন্ন্যাসী মণ্ডলী বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়া তাহা শ্রবণ করিতে লাগিল। এই ক্ষুদ্র শ্লোকের এমন ব্যাখ্যা হইতে পারে, ইহা কেহ পুর্বে কল্পনাও করেন নাই। শ্লোকের ব্যাখ্যা করিয়া শ্রীমহাপ্রভু বলিলেন, “তাই শ্রীগুরুর আদেশে আমি শুধু হরিনাম জপ করি। কিন্তু শ্রীপাদ ! নাম জপতে জপতে আমার বুদ্ধি কেমন ভ্রান্ত হয়ে গেল। আমাতে আর আমি রইলেম না । কখনো হাসি, কখনাে কান্না, কখনাে বা অকারণে নাচতে ইচ্ছা হতে লাগলাে। তখন ভীত হয়ে গুরুজীকে জিজ্ঞাসা করুলেম, ঠাকু, আমায় এ কি নাম দিলে ? আমি যে দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছি। গুরু বলেন, তুমি মহা সম্পদ লাভ করেছ। নামের শক্তিই এই প্রকার। তুমি সুদুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম পেয়েছ। এই কথা শুনে, আমার আশঙ্কা দূর হলাে। অতএব শ্রীপাদ ! আমি যে হাসি-কাদি, সে আমার নিজের ইচ্ছায় নয়।” শ্রীগৌরাঙ্গ যখন দৈন্তের সহিত এই সব কথা বলিলেন, তখন মুগ্ধ হইয়া সকলে শুনিয়া গেলেন। প্রকাশানন্দ একেবারে গ্রলিয়া গেলেন। কিন্তু তখনও তাঁহার অভিমান যায় নাই। তাই পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, শ্রীপাদ যা বল্লেন, এতে অতি উত্তম কথা। কৃষ্ণ নাম জপে তে কোনাে মানা নাই। কিন্তু সন্ন্যাসীর যে প্রধান কর্ম বেদান্ত পাঠ, আপনি তা করেন কেন ?”
শ্ৰীবৃন্দাবন শতক প্রভু বলিলেন, “শ্রীপাদ ! এ কথার যথার্থ উত্তর দিলে হয়তো আপনি বিরক্ত হবেন। তবে যদি অপরাধ না লয়েন, তাে বলতে পারি। প্রকাশানন্দ আগ্রহের সহিত বলিলেন, “না-না-অপরাধ কিসের? আপনি বলুন।” প্রভু বলিলেন, “বেদ অপৌরুষেয় ; এতে কোন প্রকার ভ্ৰম-প্রমাদ সম্ভবে না। এই বেদের যে মুখ্য অর্থ, তা সূত্রেই পরিষ্কার লেখা রয়েছে। আচাৰ্য শঙ্কর যে ব্যাখ্যা করেছেন, সেটা তার নিজের কথা, ঈশ্বর বাক্য নয়। সূত্রের সরল অর্থ থাকতে ভাষ্য পড়বার আবশ্যকতা কি? সে ভাষ্য জটিল—মন কল্পিত। সূত্রের যথার্থ অর্থের সঙ্গে আচার্যের ভাষ্য মেলে না।” শুনিয়া সন্ন্যাসীরা একটু চকিত ও বিরক্ত হইলেন। শঙ্করাচার্যের ব্যাখ্যার দোষ ধরিতে পারে, এমন কেহ আছে,—ইহা তাহাদের কল্পনাতীত। তাঁহারা এক বাক্যে বলিয়া উঠিলেন, “শ্রীপাদের এমন অসমসাহসের কথা বস্তার হেতু কি আছে ? শঙ্করাচার্য জগৎগুরু—সকলের নমস্য। তার দোষারােপ করূছেন,—এ যে বাতুলতা মনে হয়।” শ্রীগৌরাঙ্গ যুক্তকরে বলিলেন, “শঙ্করাচাৰ্য জগৎগুরু সন্দেহ নাই। কিন্তু ঈশ্বর সকলের বড়,আর বেদ তারই মুখের আজ্ঞা। এই বেদের অর্থ অতি সরল। শঙ্কর যে ব্যাখ্যা করেন, তা’ শােটেই সরল নয়। শঙ্কর কোনাে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই মনােকল্পিত ব্যাখ্যা করেছিলেন। আপনাদের আক্তা-ক্রমে আমি তা দেখাচ্ছি।” এই বলিয়া অগাধ পণ্ডিত্যের অনন্তাম্বােধি মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য শঙ্করাচার্যের ভাষ্যের দোষ দৰ্শাইতে লাগিলেন। সন্ন্যাসীরা অবাক ও শুদ্ধ হইয়া তাহা শুনিতে লাগিলেন। “শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে সে বক্তৃতার কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যায়। সনাতন সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। এই প্রবােধান , সনাতনের মুখে শ্রবণ করিয়াই কৃষ্ণদাস কব্রিজ গোস্বামী সে অদ্ভুত পাণ্ডিত্যের কতক অংশ বৰ্ণনা করিতে চেষ্টা করিয়াছেন প্রকাশান দেখিলেন, এই অপরূপ বালক-সন্ন্যাসী শুধু পরম সুন্দর ও পরম ভক্ত নয়,পরম জ্ঞানীও বটে। তাহার নিজ মনে যে পাণ্ডিত্যের অভিমান ছিল, তাহা চুর্ণ হইয়া গেল। তিনি ধীরে ধীরে বলিলেন, “শ্রীপাদ । আপনি শারুভাষ্যের যে দোষ দৰ্শাইলেন, তা শুলাম। . আপনার কথার প্রতিবাদ করূতে আমার ইচ্ছা হচ্ছে না। মনে হয়, আপনি স্যায্য কথাই বলেছেন। শঙ্করের মৃত খণ্ডন করা অসীম শক্তির কাজ; এখন আর কিছু শক্তির পরিচয় দিন। বেদের মুখ্য-অর্থ করুন, দেখি আপনি কিরূপ বেদ বুঝেছেন।” তখন শ্রীগৌরাঙ্গ বেদের মুখ্যার্থ করিতে লাগিলেন। একটি-একটি সূত্র বলিতে লাগিলেন, আর ধীরে ধীরে তাহর ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। এইরূপ ব্যাখ্যা করিলেন যে,-ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ, আর প্রেমই জীবের পরম পুরুষার্থ । মণ্ডলী সহ প্রকাশানন্দ স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। প্রকাশানন্দের অদম পাণ্ডিত্যাভিমান দয়ানিধি শ্রীগৌরাঙ্গ এই প্রকারে পাণ্ডিত্য দ্বারাই চুর্ণ করিলেন। প্রকাশানন্দ ভাবিতে লাগিলেন, এই যে অনুপম রূপবান যুবা সন্নাসী, অগাধ পাণ্ডিত্য দেখাইয়া শঙ্করাচার্যের ভাষ্যের দোষ দৰ্শাইলেন, এই যে বেদের মুখ্য ও সরল অর্থ স্থাপন করিলেন, এ অসাধারণ পুরুষটি ? ভাবিতে ভাবিতে বড় কাতর হইয়া প্রভুকে বলিলেন, “শ্রীপাদ আপনার বিনয় ও পাণ্ডিত্য দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি। আপনি জানেন আপনাকে বরাবর আমি নিন্দা ও ঘৃণা করেছি। আমি দম্ভে উন্মত্ত হয়ে জ্ঞান সুস্থ ছিলেন। আজ আমার চৈতন্য হয়েছে। আজ জানলেম, আপনি সাক্ষাৎ বেদ ও নারায়ণ। আজ বেদের প্রকৃত অর্থ বুঝলেম; আপনি আমার গুরু।”
বৃন্দাবন-শতক তখন সমস্ত সন্ন্যাসী ভক্তিতে গদগদ হইয়া উচ্চৈস্বরে কৃষ্ণ” “কৃষ্ণ” ধ্বনি করিলেন। ইহার পর, ভােজন অবশেষে, যে যাহার আশ্রমে ফিরিয়া গেলেন। (৬) প্রভুর কথা লইয়া সন্ন্যাসী মহলে মহা আন্দোলন উপস্থিত হইল। কিন্তু প্রকাশানন্দ সে আন্দোলনে যােগ দিতে পারিলেন না। সন্ন্যাসীরা তাহার সভায় বসিয়া শ্রীগৌরাঙ্গের অপরিসীম পাণ্ডিত্য ও অনিন্দনীয় সৌন্দর্যের আলােচনা করিতে লাগিল, আর তিনি নীরবে উৎকর্ণ হইয়া চির বুভুক্ষু ও পিপাসাতুর ব্যক্তির ন্যায় আকণ্ঠ ভরিয়া তাহা পান করিতে লাগিলেন। মহাপ্রভুর চিন্তা এক মুহূর্তের জন্য তাহার অন্তর পরিত্যাগ করিল না। কোথায় রহিল বেদ-বেদান্ত, কোথায় রহিল নিয়ম-নিষ্ঠা, কোথায় রহিল তাহার পাণ্ডিত্যাভিমান। তিনি শয়নে স্বপনে জাগরণে কেবল শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেমনিধি অপরূপ কান্তি দর্শন করিতে লাগিলেন। জ্ঞানহারা প্রকাশ নন্দের চক্ষুর সম্মুখ হইতে সমস্ত সংসার যেন লুপ্ত হইয়া গেল। কিন্তু তিনি লজ্জায় কাহাকেও তাহার মনের এই দুরবস্থার কথা বলিতে পারিলেন না; শুনিলে লােকে যে হাসিবে! ইহার দুই-তিন দিন পরে, মহাপ্রভু একদিন পঞ্চ-গঙ্গায় স্নান করিয়া বিন্দু-মাধবের মন্দিরে দর্শন করিতে গেলেন। গিয়া ঠাকুর দর্শন করিয়া আর নিজকে সামলাইতে পারিলেন না,-আনন্দে নৃত্য আরম্ভ করিলেন । সঙ্গের ভক্তগণ হাত তালি দিয়া কীর্তন করিতে লাগিলেন। গৌরাঙ্গ-দেবের নৃত্য, সে এক অপূর্ব ব্যাপার। ক্রমে ক্রমে সে স্থানে অসংখ্য লােকসমাগম হইল। সমবেত জন-সঙ্গ এই অপূৰ্ব্ব বস্তুটির বিচিত্র ললিত নৃত্য-ভঙ্গি দর্শন করিয়া মন্ত্রমুগ্ধবৎ দণ্ডায়মানরহিল। বিন্দুমাধব হরির শ্রীমন্দির-সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণ প্রেমের বন্যায় প্লাবিত হইল।
এবােধানন্দ এই বিন্দু-মাধবের মন্দির সন্নিকটেই প্রকাশানন্দের মঠ। প্রকাশানন্দ শুনিলেন—প্রভু নৃত্য করিতেছেন। শুনিয়া আর স্থির থাকিতে পারিলেন । পুত্রহারা জননী তাহার হারা সন্তানের অকস্মাৎ আগমন সংবাদ পাইলে যেমন উন্মাদিনীর মত বাহ্যজ্ঞান বিহিত হইয়া ছুটিয়া যায়, কোনও দিক- পাশ জ্ঞান থাকে না; তিনিও তেমনি ভাবে ছুটিয়া চলিলেন। সন্ন্যাসীর দল তাহার পিছনে পিছনে চলিল। গিয়া প্রকাশান কি দেখিলেন? তিনি “শ্রীচৈতন্য চন্দ্রামৃত” গ্রন্থে নিজেই তাহার বর্ণনা করিয়াছেন, যথা :- উচ্চৈস্ফালয়ং করচরণমহাে হেমদণ্ডেী প্রকাণ্ডেী বাহু প্রোত্য সভাৰতরলতনুং পুণ্ডরীকাক্ষং। বিশ্বস্যামঙ্গলং কিমপি হরি হরীত্যুন্মদানন্দানাদৈ- ব্বতেং দেবচুড়ামণিমতুলরবিষ্ট চৈতন্যচং। “দেব-শ্রেষ্ঠ অতুল রসমুগ্ধ বন্দনীয় শ্রীচৈতন্যচন্দ্ৰ নৃত্য করিতে করিতে চতুর্দিকে কর ও চরণদ্বয় আস্ফালন করাইতেছেন; সুবর্ণ-দণ্ড-সদৃশ বাহুদ্বয় উন্ধে উত্তোলন করিয়া স্বীয় শরীরকে তরজায়মান করিতেছেন; এবং আনন্দময়, ‘হরি-হরি’ ধ্বনিতে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের অশুভ যেন ধ্বংস করিতেছেন।” প্রকাশানন্দ প্রাণ ভরিয়া দেখিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে তাহার চৈতন্য লুপ্তপ্রায় হইল। তিনি কি দেখিলেন ?-যথা ( শ্রীচৈতন্য চামৃতে ):- প্রবাহৈরণাং নবজলদকোটী ইব দৃশে দৰং প্রেমা পরমপদকোটাঃ প্রহসনং। বমন্তং মাধুৰ্য্যৈৰমৃতং নিধিকোটী রিত টাভিকং বলে হরি মহসন্ন্যাস কপট ॥ ।
. শ্রীবৃন্দাবন-শতক এই যাহার কোটি নববন-সদৃশ অশ্রুধারায় নয়ন-যুগল ভাসিয়া যাইতেছে; যিনি স্বীয় প্রেম-সম্পত্তি দ্বারা কোটি বৈকুণ্ঠের ঐশ্বৰ্য্যকে লজ্জা দিতেছেন; যিনি স্বীয় অঙ্গ-লাবণ্য ও মাধুৰ্য্য দ্বারা কোটি অমৃতসিন্ধু উদগার করিতেছেন; ইনি তাে মানুষ নহেন।-এ বে কপট সন্ন্যাস-বেশধারী স্বয়ং শ্রীহরি।” প্রকাশাননের দুই নয়ন ৰহিয়া দর-দর ধারা, বিগলিত হইতে লাগিল। তিনি কৃতার্থ হইলেন। কিছুক্ষণ পরে প্রভুর বাহ-চৈতন্য হইল। তিনি স্থির হইয়া, সম্মুখে প্রকাশানকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি গিয়া তাহার পদধূলি লইলেন। তখন প্রকাশান আর থাকিতে পারিলেন না ।-সেই অসংখ্য জন-মণ্ডলীর মধ্যে চীৎকার করিয়া গিয়া মহাপ্রভুর শ্রীচরণে পতিত হইলেন। কাতর প্রাণে বলিলেন,-“প্রভু, প্রভু, আর আমায় এমন করে পায়ে ঠেলেনা।” প্রকাশানন্দের পুনর্জন্ম হইয়া গেল। সেই দিনই রাত্রে তিনি চন্দ্রশেখরের বাড়ী গিয়া প্রভুর নিকটে উপস্থিত হইলেন। প্রভু সহাস্য বদনে সেই দিন তাহার নূতন নাম রাখিলেন-প্রবধান; আর আদেশ করিলেন, গিয়া বৃন্দাবনে বাস করিতে। এই শ্রীবৃন্দাবনে বাস করিতে করিতে বৃন্দাবন-মাধুর্য্যে উন্মত্তপ্রায় হইয়া অনুরাগী, প্রবধান কয়েকশত মধুমাখা শ্লোক রচনা করিয়াছিলেন । উহার মাত্র প্রথম শতক পাওয়া যায়। প্রথম শতকে সৰ্ব্ব মােট ১২৬টি শােক আছে। বর্তমাম গ্ৰন্থ তাহারই পদানুবাদ।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
নমস্তস্মৈ কস্মৈ চিদপি পুরুষায়াদ্ভুত-মহা
মহিন্নে বিভ্রাজৎ কণকরুচি ধামে স্বকৃপয়া।
অসঙ্কোচেনৈবাশ্বপচমখিলেভ্যঃ স্বয়মহাে
দদৌ যন্তদ্ভক্তিং বিমলতর-নানারসময়ীং৷
কনক-লাবণ্য-দ্যুতি, যাঁর শ্রীঅঙ্গের জ্যোতি,
অদভুত মহিমা যাহার,
নিজ গুণে জগ ভরি,
অধম চণ্ডালে মরি,
অসঙ্কোচে করিলা উদ্ধার
নানা প্রেম-রস-যুত,
সুবিমল গুদ্ধ পূত,
দি ভক্তি করিলা প্রদান।
অজ্ঞাত-অশেষ সেই,
চরণে প্রণতি এই
জয় জয় পুরুষ-প্রধান।
যস্মিন্ন প্রবিশেষ্মনােহপি মহং কা তত্ত্ব-বাৰ্তা পুনঃ
শাস্ত্রাণাং জ্ঞপিতঞ্চ যদ্ভগবতা ভজ্যৈব ভক্তোদ্ধবে।
ত বৃন্দাবনমুম্মদেন রসিক দ্বনে কেনাপ্যহাে
নিত্যক্রীড়তয়া গৃহীতমিহ কো বিদ্যায় গৌরপ্রিয়ঃ ।
ত কথা ঝুরি ঝুরি,
যার তত্ত্বে যায় উড়ি,
ব্যর্থ যেথা মহতের মন;
বৃন্দাবন-শতক
ভগবান ভক্তি ভরে,
ভক্তরা উদ্ধবেরে,
যেই শাস্ত্র করিলা আপন ;
উন্মাদ রসিক দুটি,
একমাত্র জানে খাটি,
লীলা-রসে যেথা বিহরয় ;
গৌরাঙ্গের অতি প্রিয়, এমন কি আছে কেহ,
যে জানেনা তার পরিচয় ?
গুণৈঃ সর্বৈবহীনােপ্যহমখিল-জীবাধমতমােহহ
প্যশেষৈদোষারৈপিচ বলিতে দুৰ্ম্মতিরপি।
প্রসাদাৎ যস্যৈবাত্ব বিদমহহ, রাধাং ব্ৰজপতেঃ
কুমারং শ্ৰীবৃন্দা বনমপি স গৌরী মম গতিঃ ।
পরম করুণাময়,
অবিশেষ গুণালয়,
জয় গােরা অগতির গতি।
অখিল জীবের মাঝে,
অধম পতিত সাজে,
গুণহীন আমি দুরমতি।
তবু তাে শ্রীবৃন্দাবনে, রাধা-শ্যাম দুই জনে,
জানিয়াছি তােমারি কৃপায় ;
জয় রে জয় রে জয়,
শ্রীগৌরাঙ্গ কৃপাময়,
অশেষ প্রণতি রাঙা পায়।
শ্রীবৃন্দাবনকেলিঙ্গ সহজং সৌন্দয্য শশা ভাবয়ে
বৈদাদি-চমৎকৃতেঃ পরতরং বিশ্রান্তিধামাদ্ভূতং
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
উজল উন্মাদ রসে,
তম্মে মােহন দিব্যনাগরবর দ্বন্দং মিথজীবনং
গৌ শ্যামলমুজ্জ্বললাম্মদ সাবিষ্টং হৃদিজ্জতু।
সুখময় বৃন্দাবনে,
কেলিস আস্বাদনে,
বিহরয়ে রঙ্গে দুই জন
অপরূপ রূপ-আভা,
কিশাের বয়স-শােভা,
স্বাভাবিক সহজ মিলন।
মগন আবেলা,
বৈদগ্ধাদি লীলা চমৎকার ;
গােপত রহস্যময়,
অতুলন তনু,
কনক-শ্যামল শােভা সার।
সে যুগল মনচোর,
মন-মােহনিয়া মাের,
লাবণের শহর-লহরী
এ মাের হিয়ার মাঝে, সদানন্দে যেন রাজ্যে
ইহা বিনা আশা নাহি করি।
•
ইহ ভ্রামং ভ্রামং জগতিনহি গন্ধোহপি কলিতে,
যদীয় স্তত্রৈবাখিল নিগম দুল্ল ক্ষ্যং শরণৌ।
অপারে শ্রীবৃন্দাবন মহিমপীযুষ জলধৌ
মহাশ্চর্যোশ্মীনে মধুরি মণি চিত্তং লগতুমে ।
জয় জয় জয় বৃন্দাবন।
মিয়া ভুবনময়,
তুলনা নাহিকো হয়,
বেদ-বিধি অগােচর ধন।
A
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
অকূল বৃন্দাবন,
পীযুষগায়রে মন,
ডুবিয়া রহুক চিরতরে ।
মীন প্রায় সারাবেলা,
আনন্দে করুক খেলা,
আশ্চৰ্য সে সুধা-সরােবরে।
জয়তি জয়তি বৃন্দারণ্যানসিন্ধোর
অনুপমমিব সারং শারদাকোট্যকথ্যং।
খগ-মৃগ-তরু-বল্লী-কুঞ্জ-বাপী-তড়াগ
স্থল-গিরি-দিনীনা সদ্ভূতৈঃ সৌভগাদ্যৈঃ ।
জয় রে জম রে বৃন্দাবন।
অফুরন্ত সিন্ধু-ছাকা,
অনুপম প্রেমমাখা,
কোটি যুগে না-যায় বর্ণন।
তুঙ্গ শৈলমালা বেড়া,
তরুলতা কুঞ্জ ঘেরা,
মিথুনবাপী সুশীতল হ্রদ ।
বিহগ-কুজিত বনে,
মৃগ চড়ে ফুল মনে,
অতুলন সৌভাগ্য-সম্পদ।
বৃন্দাবণ্যে চর চরণ দৃক পস্য বৃন্দাবন শ্রীর
জিয়ে বৃন্দাবন গুণগােন কীৰ্ত্তয় শ্রোত্র-দৃষ্টান্।
বৃন্দাটব্যা ভজ পরিমলং ঘ্রাণ গাত্র ত্বমস্মিন্
বৃন্দাবণ্যে লুঠ পুলকিতং কৃষ্ণকেলি স্থলী।
গুন গুন রে মাের চরণ!*
সুখময় বৃন্দাবনে,
দিব্য রম্য উপবনে,
মন-মুখে কর বিচরণ।
বন-শতক
মধু বৃন্দাবনে যত,
অপরূপ তে শত,
রে নন ! কর দরশন;
রসনা ! ভরিয়া প্রাণ,
কর সেই গুণগান,
ৰল জয় জয় বৃন্দাবন।
হইয়া বিভাের মন,
সে অমৃত, গুঞ্জরণ
শ্রবণ শ্রবণে কর পান।
নব গন্ধে ঢল ঢল,
বৃন্দাবন পরিমল,
নাশিকায় কর রে আম্রাণ।
নশ্বর শরীর মোর।
লুটায়ে সৰ্বাঙ্গ তাের,
বৃন্দাবনে দাও গড়াগড়ি;
কেলি-কুঞ্জ-রজে লুটে, সব তাপ যাবে ছুটে,
পুলক জাগিবে ভব ভরি।
মহােজ্জ্বল-রসােম্মদ-প্রণয়সিন্ধু নিঃস্পন্দিনী
মহা-মধুর রাধিকারমণ-খেলনানন্দিনী।
রসেন সমধিষ্ঠিতা ভুবনবন্দয়া বৃন্দয়া
চকাস্তু হৃদিমে হরেঃ পরমধাম বৃন্দাটবী।
পিরীতেসায়রে চুপে,
উচ্ছলিত যিম্বরূপে
মহােজ্জল রস বহমান;
রাধিকা-রমণ চিতে,
সুমধুর ক্রীড়াদিতে,
সদানন্দ যে করে প্রদান;
যারে ত্রিভুবন-বন্ধ্যা, সুচরা দেবী বৃন্দা,
প্রেম-সে করিল স্থাপিত
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
সেই বৃন্দাবন-নাম,
হরির পরম-ধাম,
হিয়া মাঝে হােক উদ্দীপিত।
জন্মনি জন্মনি বৃন্দাবনভুবি বৃন্দারকেন্দ্র বন্দ্যায়াং।
অপি তৃণ-গুল্মকভাবে ভবতু মমাশা-সমুল্লাসঃ ।
ধন্থ হয় জীবন আমার,
তৃণ-গুল্ম হয়ে যদি,
বৃন্দাবনে নিরবধি,
বসবাসে পাই অধিকার।
দেবেন্দ্ৰতি ধাম,
হে বিপিন অনুপাম,
মনস্কাম পূর্ণ কর মাের;
জনমে জনমে যেন,
শ্রীচরণ পাই হেন,
এই আশে থাকি সদা তাের।
১০
হরিপদপঙ্কজসম্বাহনরস মনুভূয় পূনর্মাহপি।
যত্রাদ্ধৰ আশাস্তে তৃণতাং তমৌমি রাধিকাবিপিনং ।
কি কহিব উদ্ধবের কথা।
হরিচরণ কিবা,
সেবিলেন নিশি-বি,
তবু'র ঘুচিল না ব্যথা।
প্রাণে জাগে সঙ্গোপনে, নিরজন যেই বনে,
হইতে তৃণের মত হীন;
জয় জয় প্রেমধাশ,
বৃন্দাবন তার নাম,
নমাে নম রাধিকা-বিপিন!
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
রাধাবল্লভ পাদ পল্লবজুষাং সদ্ধৰ্ম্মনীয়ুষাং
নিত্যং সেবিত বৈষ্ণবাঘি রজসাং বৈরাগ্যজীবস্পশাং।
হন্তৈকান্তরস প্রবিষ্ট মনসামপ্যস্তিযদ্দরতম্
তদ্ৰাধাকরুণাবলােকমচিরাদ্বিদন্তু বৃন্দাবনে ॥
শ্রীরাধাবল্লভপদ,
সেবা করে অবিরত, .
কাটে জন্ম স্বধৰ্ম্ম-পালনে ;
বৈষ্ণব চরণ-রুলি, যে তারে কহেনা ধুলি,
সেবনের সাধ সদা মনে;
আজন্ম বিরক্ত যারা, জানেনা বৈরাগ্য ছাড়া,
অনাসক্তি যাদের জীবন ;
তারাও জানেনা হায়, কোথা কোন্ নিরালায়,
দিব্য ধাম রয়েছে গোপন।
হে ভক্ত! হে মহাজন!
শুন মাের নিবেদন,
অবিলম্বে কররে গমন;
ব্রজেশ্বরী-কৃপা পেয়ে, মহানন্দে নেচে-গেয়ে,
বৃন্দাবনে কর বিচরণ।
১২
রাধা নন্দকিশােরেী নিরবধি রস সাগরে নিমগ্নেী।
নিজ কেলিম বৃন্দাবিপিন মূদ্বীক্ষ্যৈব সৌখ্যমপয়তঃ
সকল রসের সার সুমধুর
মধুর রসের সায়রে ডুবে,
বিহরতি রাধানন্দকিশাের
প্রেমে ভােয় নিতি নীরবে চুপে।
৩৪
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
হেন কেলিধাম শ্রীবৃন্দাবন
যে জন সুদুরে দেখিতে পায়,
সৌখ্য মসের অনাদি সায়রে
লহরে শহরে ভাসিয়া যায়।
উদ্দাম প্রমদোজ্জ্বলৈক রসয়া ভাবিধূতাবৃতে
ব্যক্তং কস্যচিদেব চিত্তমুকুরে ততদিগাভােগবৎ।
স্বস্মিন্ দিব্য বিচিত্র কেলিমিথুনং তৎশ্যামগৌরং বিধু-
জ্যোৎস্নাবৎ পরিচায়েত্তদিহকিং বিদেহথ বৃন্দাবনং ।
ভানুর কিরণে আলােকে উজল
' প্রকাশিত দশদিকের মত,
রসিক-ভক্ত-চিত্ত মুকুরে
শ্যামল-কনক প্রতিভাত।
উন্মদ-প্রেম-উজ্জল বসে
নবীন মিথুন ভ্ৰমিছে খেলি।
চন্দ্র-স্নিগ্ধ-জ্যোছনার মত
যে-দিব্য ধামে করিছে কেলি ;
হেন মধুময়
বিচিত্র দ্যুতি
সুন্দর চারু বৃন্দাবন।
এজনমে তার আশ্রয় পাব,-
হবে কি আমার এমন ক্ষণ?
১৪
বিশুদ্ধাদ্বৈতৈক প্রণয়রস পীযুষ জলধের
ঘনীভূতদ্বীপে সমুদয়তি বৃন্দাবন মহ।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
মিথঃ প্রেমােদর্য
“সিক মিথুন-ক্রীড়মনিশং
তদেবাধ্যাসীনঃ প্রবিশতি পদে কাপি মধুরে ।
বিশুদ্ধ অদ্বৈত-নামা
অকৈতব রস-প্রেমা,
অমৃতের জলধির মাঝে,
ঘনীভূত দ্বীপে হেন, দিব্য বৃন্দাবন যেন
কি সুন্দর আনন্দে বিরাজে।
সেই প্রেম ঘুর্ণি জলে, দিবা নিশি হাসি খেলে,
রসিক মিথুন যুগল ;
গােপনে সে দ্বীপপাপরে, যে জন বসতি করে,
সে কি চায় যেতে অন্য স্থল ?
নাহং বেক্সি কথং নু মাধবপদাভোজ দ্বয়ং ধ্যায়তে
কা বা শ্ৰীশুকনারদাদ্যকলিতে মাগোহস্তি মে যােগ্যতা।
তস্মাদ্ভদ্রমভদ্রমেব যদি নামাস্তাং মমৈকং পরং
রাধাকেলিনিকুঞ্জলতরং বৃন্দাবনং জীবনং।
একাতে আগ্রহ ভরে,
জানিনা কেমনে করে,
শীরাধামাধবপদ ধ্যান ;
শ্রীক-নারদ ঋষি,
যে পথে চলিলা হাসি,
জানিনা সে পথের সন্ধান।
অনেক ভাবিয়া তাই, বাসনা করেছি ভাই,
ভালমন্দ কিছু নাহি জানি,
রাধা-কেলি বৃন্দাবনে,
মঞ্জু কুঞ্জ উপবনে,
পাতিয়া রাখিব হিয়াখানি।
বৃন্দাবন-শতক
যৎ সীমানমপি স্পৃশনিগমাে দূরাৎ পরং লক্ষ্যতে
কিঞ্চি গুঢ়তয়া যদেব পরমানন্দোৎসবৈকাবধি।
যন্মাধুৰ্যকলাপ্যবেদি ন শিব স্বায়ম্ভুবাদ্যৈ রহং
ত বৃন্দাবননামধামরসদং বিন্দামি রাধাপতেঃ ।
সুনিগুঢ় যে মহিমা,
আগম নাপায় সীমা,
দূরে রহি সবিস্ময়ে চায়;
শিব-স্বয়ম্ভু আদি,
ধ্যান করি নিরবধি,
যে মাধুৰ্য্যকণা নাহি পায় ।
রাধারমণের প্রাণে,
সদা প্রেম রস দানে,
পরানন্দ করে বিতরণ ;
কি বলিব ওরে ভাই, সৌভাগ্যের সীমা নাই,
মিলিয়াছে হেন বৃন্দাবন।
১৭
কদানুবৃন্দাবন কুঞ্জ মণ্ডলে
ভ্রমং মং হেমহরিন্মণি প্রভং।
সংখৃত্য সংস্মৃত্য তদদ্ভুতপ্রিয়ং
দ্বয়ং দ্বয়ং বিস্মৃতিমেতুমেহখিলং ।
কবে সদানন্দ মনে,
বৃন্দাবন কুঞ্জবনে,
নিরজনে করিব ভ্রমণ ;
কনক-সবুজ মণি নিন্দিত যুগল খনি,
প্রিয়তমে করিব, স্মরণ ।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
নিখিলের যত বাধা,
সুখ দুঃখ হাসা কাদা,
সব যাবে নিমেষে ভাসিয়া ;
লাভালাভ ভালমন্দ, ঘুচিবে সকল দ্বন্দ্ব,
বনে বনে ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া।
ছিদ্যেত খণ্ডশ ইদং যদি মে শরীরং
ঘােরা বিপতিতয়াে যদি বা পন্তি।
হা হন্ত হন্ত ন তথাপি মমেহ ভূয়া
বৃন্দাবনাদিতর তীর্থপদে পিপাসা ।
- মাের এই তুচ্ছ দেহ,
খণ্ড খণ্ড করি কেহ,
কভু যদি দেয় গাে ছিড়িয়া,
অথবা বিপদ-রাশি, ঘিরে মােরে যদি আসি,
অমঙ্গল-মুরতি ধরিয়া ;
তথাপি যেন রে হায়,
বৃন্দাবন কুঞ্জ-ছায়,
জুড়াইতে চায় মাের মন ।
এ শােভা-সম্পদ ছাড়ি
বৃন্দাবন পরিহরি,
আন স্থানে নাহি প্রয়ােজন।
স্বয়ং পতিত পত্ৰকান্ত মৃতবৎ ক্ষুধাভক্ষয়
তৃষা মিহিরনন্দিনী শুচি পয়ােহঞ্জলিভিঃ পিবন্ ।
কদা মধুর-রাধিকারমণ-রাসকেলিস্থলীং :: ::
বিলােক্য রসশেবধিং অধিবসামি বৃন্দাবনং।
বৃন্দাবন-শতক ; কবে হায়, হবে হেন দিন, পরিত্যক্ত পত্র লগ্ন, পবিত্র অমৃত অন্ন,- খাইয়া গোঁয়াৰ চিরদিন। কবে রবি-নন্দিনীর, শুচি মি পুত নীর, পিব আমি অঞ্জলি ভরিয়া রাধারমণের কেলি- রসময়-রাসস্থলী, ধন্য হব কবে নেহারিয়া। পূর্ণ হবে মরমের আশা; পরমরসের খনি, বৃন্দাবন রত্ন-মণি, কবে তথা বাঁধিব গো বাসা। २० ভূমি যত্র সুকোমল বহুবিধ-প্রদ্যোতিতুচ্ছটা নানা-চিত্র-মনােহরা খগমৃগাদ্যাশ্চর্য রাগান্বিত। বল্লী ভূরুহ জাতয়ােহদ্ভুততমা যত্র প্রসূনাদিভিস্ তন্মে নন্দকিশাের-কেলিভবনং বৃন্দাবনং জীবনং। সুকোমল যেই ভূমে, স্নিগ্ধ জ্যোছনার চুলে, কত হীরা-মােতি ঝলমলে ; অপরূপ কুঞ্জ-বীথি, বৃক্ষতা নানা জাতি, মহিমায় পুলকে উছলে ; মৃগপদ সঞ্চরণে, বিহগের সুনিনে, বাজে কত রাগিনীর ধ্বনি। হেন বৃন্দাবন নাম, নন্দকিশোরের ধাম, এ মাের জীবন বলি গণি।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক H সাক্ষাদিবান্তে পুরুষােমাঘি, সেবারসাদপ্যধিকে। রসৌঘঃ। স্যতে বৃন্দাবিপিনেপি দৃষ্টে রাধাপ্রিয়াে যাে ভুবনস্য সাক্ষী। পুরুষােম-পদ, সেবা করি অবিরত, যে-আনন্দ রস জাগে মনে, তা হতে অধিক অতি, রস-সুধা মূৰ্তীমতী, বহিতেছে মধু বৃন্দাবনে। রসে ঝরণা মাঝে, ললিত লাবণ্য সাজে, বাধা-প্রিয় করিছে বিহার ; ভুবনের সাক্ষী সে যে, তবু ত্রিভুবন মাঝে, সে লীলা বুঝিবে সাধ্য কার। ৭ २२ * জাগৰ্তি দুন্দুভিরব পরমােত্র রাধা- বৃন্দাবনং বনমতি প্রকটং পুরাণে। তস্যাবিধেয় মসমাের্ধ মহানুরাগ- মূৰ্ত্তেন্তদঙ্গন মপােহ হরিং ক পশেঃ। দুন্দুভি নিনাদে, বনিতেছে নিখাদে, যে দেশে; প্রসিদ্ধ পুরাণে, বর গুণ বা নে, শত লীলা যেখানে, শ্রীবৃন্দাবন-শতক বর্ধিত পিরীতি অনুরাগ মূরতি, প্রেমময়ী শ্ৰীমতী, সে আঙিনা ছাড়িয়া, শ্রীহরির লাগিয়া, বৃথা মর ঘুরিয়া, কি আশে ! বিলাসে; মিলন্তু চিন্তামণি-কোটি-কোটয়ঃ স্বয়ং বহিষ্টিমু পৈতু বা হরিঃ। তথাপি বৃন্দাবন ধূলি ধূসরং ন দেহ মন্যত্র কদাপি যাতুমে ॥ কোটি কোটি রত্ন-খনি, দীপ্ত-রাগ চিন্তামণি, অনায়াসে মিলে যদি ভাগে ; অথবা শ্রীভগবান, হয়ে যদি মুর্তিমান, কাছে আসি দাড়ায় সােহাগে; বৃন্দাবন- ধূলি-অনু মাখা মাের ক্ষীণ তনু, তথাপি কখনাে যেন হায়, এই ব্ৰজ ভূমি ছেড়ে, অণিক কম-ফেরে, কোনাে স্থানে যাইতে না-চায়। ২৪ কৃপয়তু ময়ি বৃন্দারণ্য বাজী মনাগ- প্যতি বহন কৃপােক স্নেহ ভাদুদিষ্ণু! ফলতু তদনুকম্পা কল্পবল্লী ফলং তৎ প্রভবতু বসতির্মে তৎ প্রিয়ারাম শীল্পি ।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
৪১
বৃন্দাবন ! জয় বৃন্দাবন !
করুণার বােঝাটিয়ে,
লইয়া আনত শিরে
দাঁড়াইয়া তরুলতা গণ":
দয়ার সে গুরুভার,
বহিতে না-পারি আর,
কারে যেন বিলাইতে চায়!
অধম কাঙাল জনে,
যদি দিতে সাধ মনে,
কণা মাত্র বিতরনী আমায়।
এ ক্ষীণ কণ্ঠের ডাকে,
কৃপা-কল্পতরু শাখে,
হেন ফল কভু কি ফলিবে ?
কৃষ্ণ-প্রিয়া রাধকার,
আরাম-কুঞ্জের ধার,
চিরদিন বসতি হইবে ?
২৫
তেনাকারি সমস্ত এব ভগবদ্ধৰ্ম্মোহপি তেনাদ্ভুত
সম্মাৎ পুরুষার্থতােহপি পরমঃ কশ্চিৎ করস্থী কৃতঃ।
তেনাধায়ি সমস্ত মূৰ্দণি পদং ব্রহ্মাদয়স্তং নম
ত্যাদেহাম্ভমধারি যেন বসতো বৃন্দাবনে নিশ্চয়ঃ ।
ধন্য ধন্য জীবন তঁাহার,
আজীবন পূত মনে সুখময় বৃন্দাবনে,
বাস লাগি বাসনা যাহার।
ভাগবত ধর্ম, সেই জানে তার মৰ্ম্ম,
বাঞ্ছা যার বৃন্দাবন দাসে;
সৰ্ব্ব-পুরুষার্থ-সার: . শ্রেষ্ঠ পুরুষার্থীর
কল্পতল হয় অনায়াসে t; ..
৪২
শ্রীবৃন্দাবশতক
ব্ৰহ্মাদি দেবতা স্বত,
শির করি অবনত,
বারম্বার করে নমস্কার ;..
অখিলের সুসম্পদ,
রাতুল যুগল পদ,
মস্তকের ভূষণ যাহার।
পুলিনে পুলিনে কলিজায়
বিচরং শ্যাপি তলে তলে তরূণা।
প্রণয়াদ্ভূত সৌখ্য কন্দ বৃন্দা-
বিপিনে হন্ত কদা দিনানি নেয্যে।
শ্রীকলি-নন্দিনীর সুন্দর পুলিন-ভূমি,
কবে তরু তলে-তলে ভ্ৰমিয়া বেড়াব আমি ।
ঘন সৌথ্য-রসময় মধুমাখা সে বিপিনে,
কবে মাের দিনগুলি কাটিবে গাে দিনেদিনে ।
২৭..
গৌর শ্যামল মিথুনং খেলতি কন্দর্পলীলয়া যত্র।
রাধামাধবনা প্রথিতং তন্নোমি কাননং কিমপি।
শ্রীরাধামাধব নাম, বিশ্রুত সে গৌরাম,
অনুরাগী মিথুন-যুগল ;
কি জানি গাে কোন্ বনে,
খেলা করে নিরজনে,
কাম রসে উন্মাদ উছল।
কেলি-কুম"ওগাে সুন্দর কানন।
কাঙাল আমারে দেহ শীতল চরণ।
বৃন্দাবন শতক
২
খগবৃন্দং পশুবৃন্দং দ্রুমবল্লীবৃন্দ মুন্মদ প্রেশ্ন।
প্রণয়দমৃত রসেন খ্যাতং বৃন্দাবনং নমতি।
যে-অমৃত রস কৃরি পান,
পাগল বিটপীলতা,
কহে অকথিত কথা,
প চড়ে-পাখী গাহে গান;
অমৃতের ধারা:যুত,
মধুময় প্রতির ভাণ্ডার,
জয় জয় বৃন্দারণ্য,
আজি মােরে কর ধন্য,
তব পদে কোটি নমস্কার।
উন্মাদ প্রণয়-পুত,
উষরমপি হরিভক্তেনানা দু মার্গনিষ্ঠমপ্যধমং।
বৃন্দাবিপিনমচিন্ত্য প্রভাব মুম্মাদয়তে প্রো ।
সুকোমল স্নিগ্ধ শান্ত,
শীতল সবুজ কান্ত,
ভক্তিরূপা হরিক্ষেত্র মাঝে,
কঠিন উষর ভূমি,
নিরপ-নিস আমি,
লিপ্ত প্রাণ একান্ত কাজে।
সন্ন্যাসী বেদা-বত,
ও তর্কে অবিরত
কাটে দিনহীন কোনােমতে ;
সহজ সরল পথ
ছাড়ি মম মন-রথ,
চলিয়াছে দুর্গম বিপথে।
অবােধ অজনাবৃত,: :: অধম কে মোর মত,
নিষ্ঠাশূন্য বাসনা-বিহ্বল
৪ শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক তথাপি শকতিশালী, অবিচিত্ত বৃন্দাস্থলী, প্রেম দিয়া করিল পাগল। ভক্ত্যেকয়ান্যত্র কৃতার্থ মানিনাে ধীরান্তদেতন্ন বয়ং বিদামঃ। শ্রীরাধিকামাধব-বল্লভং নঃ পরন্তু বৃন্দাবনমেব সংশ্রয়ঃ । . আন তীর্থে একমাত্র লতি ভক্তিপদ, যাঁহারা কৃতার্থ করি মানে আপনারে ; হােক তঁারা মহাজ্ঞানী শাস্ত্র-বিশারদ, আমি কিন্তু ধীর বলি গণিব না তারে। রাধামাধবের প্রিয় লীলার আগার- সুখময় বৃন্দাবন আশ্রয় আমার। দোষাকরােহং গুণলেশ হীন সৰ্বাধমাে দুলভবস্তুকাঙক্ষী। বৃন্দাটবী মুজ্জ্বল ভক্তির- বীজং কদা প্রাপ্য ভবামি পূর্ণ। অশেষ দোষের খনি লেশ-গুণহীন, সবার অধম আমি অতিশয় দীন। তথাপি লভিতে আশা দুর্লভ তন: উজল ভক্তির সার-বীজ বৃন্দাবন।
৪৫ শ্রীবৃন্দাবম-শতক কবে আশা পূর্ণ হবে ঘুচিবে সংশয়, কবে পাব প্রিয় বৃন্দাবনের আশ্রষ? শুদ্ধোজ্জ্বল-প্রেম-রসামৃতাব্ধে রনন্ত পারস্য কিমদারং। রাধাভিধং যত্র চ কাস্তি সারং তদেব বৃন্দাবিপিনং গতির্মে। শুদ্ধ উজল প্রেমরসময় অমৃতসায় খানি, অন্ত-বিহীন অসীম উদার,নাম তার ধারাণী। যেই মহাদেশে তরঙ্গোলাসে সে সায়র বহমান, সুখময় সেই বৃন্দা-বিপিন ভিন্ন না-জানি আন। সর্ব-সাধন-হীনােহপি বৃন্দারণ্যৈক-সংশয়ঃ । যঃ কোপি প্রাপুয়াদেব রাধাপ্রিয় রসােৎসবং। সকল সাধন-বিহীন যে জন, সার করে যদি সে বৃন্দাবন, যে হােক সে হােক যায় দুথ-শোক, দিন-বামী থাকে তার চিত-মন- রাধা-প্রিয় উৎসবে নিমগন । ওঃ ত্যজন্তু স্বজনাঃ কামং দেহবৃত্তিশ্চ নাস্তুবা। ন বৃন্দাবন সীমাতঃ পদং মে চলতু ক্বচিৎ ।
বৃন্দাবন-শতক স্বজন সকলে যদি পরিহরি যায়, জীবিকার যদি কোনাে না-থাকে উপায় ; ভাল ভাল, সেও ভাল,তবু এ চরণ- বৃন্দাবন ত্যজি যেন না-করে গমন। সমে ন মাতা সচ মে পিতা ন সমে ন বন্ধুঃ সচ মে সখা ন। সমে ন মিত্রং সচ মে গুরু ন যােমে ন বৃন্দাবন বাস মাদিশেৎ। বৃন্দাবনে করিতে বাস আদেশ নাহি করে, সে জন সনে সঙ্গ যেন হয় না ক্ষণতরে। আমার তারা কেহই নহে আত্মীয়-আপন, পিতা কি মাতা বন্ধু সখা মিত্র গুরুজন। তচ্ছাং মম কর্ণমূলমপি ন স্বপ্নেহপি যায়াদহহ শ্ৰীবৃন্দাবিপিন যত্ৰ মহিমা নাত্যদ্ভুতঃ শায়তে। তে মে দৃষ্টিপথং ন যান্ত নিতরাং সম্ভাষ্যমাণুযু যে বৃন্দাবন বৈভবে শ্রুতিগতে নোল্লাসিন স্তোহখিলাঃ বৃন্দাবনের পরম মহিমা বর্ণিত নাই যথা, কভু যেন কানে না-পশে স্বপনে এমন শপ্রি-কথা। বৃন্দাবনের সম্পদ শােভা—অতুলন বৈভব, হীরক রতনে খচিত মাণিক, গুণে জগ পরাভব ;
বৃন্দাবনতক
৭
হেন বিভবের বর্ণনা শুনি উলসিত নাহি হয়,
সে জনের সনে ক্ষণেকের তরে কাজ নাই পরিচয়।
অলমলমিহ যােষিদগর্দভী সঙ্গরঙ্গৈ
রলমলমিহ বিত্তাপত্যবিদ্যাযশােভিঃ।
অলমলমিহ নানা সাধনায়াস-দুঃখৈঃ
ভবত ভবত বৃন্দারণ্যমাশ্ৰিত্য, ধন্যাঃ ।
আর কাজ নাই,
ছাড় ছাড় ভাই,
রমণী-রাসী সঙ্গ ।
অসার বিত্ত,
ছাড় অপত্য,
মিছে পণ্ডিতি-রঙ্গ।
ধন-মান লাগি
দিবা নিশি জাগি,
একি পাতিয়াছ খেলা!
যশ-মন্দিরে,
আপনার শিরে,
আপনি মারিছ ঢেলা।
বিফল যতনে,
কৃচ্ছ, সাধনে,
সময় করিলে ক্ষয় ;
সব ছাড়ি এবে,
সমাহিত ভাবে,
ব্ৰজ কর আশ্রম।
৩৮
বৈকুণ্ঠং কোটি কোটি প্রগুণিত মপিনােযদ্রজো লেশমাত্রং
প্ৰােন্মীলৎ সৌভগর্ধেলমপি লভতে শুদ্ধভাবােলায়াঃ।
৪
বৃন্দাবন-শতক
কুর্বার ভক্তি কোটি:ভগবতি ন তথাপ্যদ্ভুত প্রেমমূত্ত্বেঃ
শ্রীরাধায়া অতক্তৈঃ কিমপিন কলিং নৌমি বৃন্দাটবীং তাং ।
শুদ্ধ পূত নিরমল,
ভাব রসে ঢল ঢল,
শ্রীরাধার বৃন্দাবন-স্থান ।
কোটি কোটি গুণশালী,
অতুল বৈকুণ্ঠ স্থলী,
নুহে তঁার রজের সমান।
অনন্ত শােভার সার,
সম্পদের পারাবার,
নাহি তার কোনােই তুলনা ;
বৈকুণ্ঠ-বৈভব যত,
বৰ্ধিত হইলে শত,
সে ধামের নহে এক কণা।
বৈকুণ্ঠের ভক্ত যত,
হইলে অনুগত
শ্ৰীমতীর রাতুল চরণে,
বুঝেনা যাহার খেলা ;
হেন আনন্দের মেলা
দণ্ডবৎ দিব্য বৃন্দাবনে।
ইদমপি ভবিতাকিং যত্ৰ কুত্রাপি বৃন্দা
পদমপি মম জাতং শ্রোত্রবীথী মকস্মাৎ।
মধুর মধুর রাধামাধবানঙ্গ খেলা-
বন মুপনয়ন্ত দাস্যতে প্রেম মূচ্ছাং।
হায় হায় হেন দিন কভু কি হইবে?
বৃন্দা”-বর্ণদ্বয় কবে,
...অকস্মাৎ সুধা-রবে,
মাের শ্রুতিমূল পশিবে
৪৯
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
মধুর অনঙ্গ লীলা,
রাধামাধবের খেলা,
যেই বনে হয় অভিনীত,
সে কাননে লুটাইয়া, প্রেমে মুরছিত হিয়া,
হারাইবে সকল সম্বিত !
৪০
কদানু বৃন্দাবন বীথিকাস্বহং
পরিভ্রমন্ শ্যামলগৌরমদ্ভূতং।
কিশাের মূর্তিদ্বয়মেক-জীবনং
পুরঃ স্ফুরদ্বীক্ষ্য পতামি মুচ্ছিতঃ ॥
কবে হেন শুভদিন হইবে আমার?
বৃন্দাবন-বীথিকায়,
ভ্রমিয়া ভ্ৰমিয়া হায় !
নেহারিব লীলা দোহাকার।
কনক-শ্যামল স্নেহ
এক প্রাণ দুই দেহ,
কৈশােরের পাব দরশন ;
হেরিয়া যুগল শোভা, চিদানন্দ মনলোভা,
মুচ্ছিত হইবে চিত্ত-মন।
৪১
কিমেতাদৃভাগ্যং মম কলুষ-মূর্তেরপি তবে
নিবাসস দেহান্তাবধি যদিহ বৃন্দাবনভুবি।
তয়েঃ শ্ৰদম্পতত্যান্ন বনৰ বিলাসৈ ৰ্বিহরতঃ
পদ জ্যোতিঃ-পূরৈরপি তু মম সঙ্গোপি ভবিতা।
৫০ শ্রীবৃন্দাবন-শতক কলুষ-মুরতি আমি, পাপ-পথ অনুগামী, মাের ভাগ্যে এমন কি হবে- এ দেহ পতনাবধি, বৃন্দাবনে নিরবধি, বাস করি জীবন কাটিবে ? নিতি নব লাস-হাসে, দম্পতি সুবিলাসে, কি সুন্দর চরণের জ্যোতি। সে চরণে লুটাইব, যুগলের সঙ্গ পাব, বৃন্দাবনে উপজিবে রতি। 82 ভূতং স্থাবর জঙ্গমাত্মকমহাে যত্র প্রবিষ্টং কিম প্যানকৈ ঘনাকৃতি স্বমহসা নিত্যোৎসবং ভাসতে মায়ান্ধীকৃত দৃষ্টিভিস্তু কলিতং নানা বিরূপাত্মনা তদ্বৃন্দাবিপিনং কদাধিসতঃ স্যান্মে তনুশ্চিন্ময়ী । পশু-পাখী নর-নারী, তরুলতা সারি সারি, যে-ধামে বসতি করি, পুলকে পাগল ; আনন্দ-ঘন দেহে দীপ্ত উজল স্নেহে নিতি নব উৎসাহে, করে ঝলমল; মায়ার গোলাম যারা, আঁধারে সুপথ-হারা, অজ্ঞান বশে তারা, হেলা করে যার ; ত্রিভুবনে অতুলন হে বৃন্দা-উপবন ! চিন্ময় তনু-মন কর হে আমার। যত্র প্রবিষ্টঃ সকলােহপি জন্তু সর্ব পদার্থোপ্যৰুধৈরদৃশ্যঃ।
। শ্রীবৃন্দাবন-শতক স্বানন্দ সীত ঘনত্বমতি তদেব বৃন্দাবন মাশয়। কৃমি-কীটাবধি যত জীব-আদি, একবার যদি পায় গো স্থান; আনন্দ-লাসে, চিদঘন বেশে, রহে যেই দেশে বিরাজমান। অবােধ যে জন, আঁধারে মগন, বুঝেনা কেমন সে ব্রজভূমি ; হে জ্ঞানী মানব! কয় তার স্তব, বৃথা কলরব ছাড় গাে তুমি। 1 ৪৪ বৃন্দাবনস্থেপি যেহত্ৰ দোষা আরােপয়ন্তি স্থিরজঙ্গমেষু। আনন্দ মূর্তিপরাধিনস্তে শ্রীরাধিকামাধবয়ােঃ কথং ঃ । বৃন্দাবন-নন্দনের স্থাবর জঙ্গম, আনন্দ-মূরতিঘন তনু অনুপম। অপরাধী যারা তার করে নিন্দা-গান, রাধা-কৃষ্ণ পদে তারা পায় কি গাে স্থান । যে বৃন্দাবনবাসি নিন্দনরতা যে বা ন বৃন্দাবনং শ্লাঘন্তে তুলয়ন্তি যে চ কুধিয়ঃ কেনাপি বৃন্দাবনং।
বৃন্দাবন-শতক
যে বৃন্দাবন মত্র নিত্যসুখচিপং সহন্তে ন বা
তৈঃ পাপিষ্ঠনরাধমৈ ন ভবতু স্বপ্নেহপি মে সঙ্গতি।
বৃন্দাবন-ধাম আর ব্রজবাসী-জন;
যে-জন কুবুদ্ধি বসে করয়ে নিন ।
বৃন্দাবন গুণ-গাথা যার মুখে নাই,
অথবা খুজিয়া ফিরে তুলনার ঠাই ।
‘চিন্ময়ী শ্ৰীব্রজধাম নিত্য সুখময়
-এই সত্যবাক্যে যার প্রত্যয় না হয় ।
কভু হেন নরাধম পাপিষ্ঠের সনে,
বসতি করিতে যেন হয় না স্বপনে।
৪৬
অসহ্য বহু দুর্বচো যদিহ বদন্তি সাক্ষান্মম
স্ক্রিয়ং বলাদপহরন্তি প্রিয় সুতাদিকং 'ব্লন্তি বা :
ধনাদ্যপিচ জীবনং যদি হরন্তি বৃন্দাবন স্থিতা
স্তদপি তে প্রিয় মম ভবন্তি বন্দ্যাঃ পরং।
বৃন্দাবন-বাসী
যদি কভু আসি।
অসহ কটুক্তি করে ;
যদি পশু-বলে,
ছলে কি কৌশলে,
পরের রমণী হরে ।
বধে স্ব-সন্তান,
হরে ধনশান,
অথবা জীবনয় ;
তথাপি সে-জন,
মাের প্রিয় জন,
সদা বন্দনীয় হয়।
শীবৃন্দাবন-শতক ৪৭ পরস্ব স্তেয়ৈক ব্যসনমপি নিত্যং পরবধূ- প্রসক্তং বিশ্বেষমহহ বহুধা হিংসকমপি। দুরাচারং লােভাপহতমপি ভ্রাতররুণং দিবান্ধ ত্বং বৃন্দাবন গতজনং নাবগণয়েঃ । পরধন হরণে, পরবধূ গমনে, কাটে দিন ব্যসনে, পাপের ভরে ; হিংসায় নাচিয়া, লোভে ফিরে যাচিয়া সদাচার ত্যজিয়া, মিথ্যাচারে। হেন ব্রজবাসীরে, পদ ধরি এ শিরে, ঘুচে যায় শরীরে মােহ কালিমা ; অন্ধের আঁখিতে পায় কিগাে দেখিতে ? নারে তাই বুঝিতে ব্ৰজ-মহিমা। ৪৮ পরধন-পরদার-দ্বেষ-মাৎসৰ্য-লােভ- নৃত-পরুষ পরাভিদ্রোহ মিথ্যাভিলাপান। ত্যজতি য ইহ ভক্তো রাধিকা-প্রাণনাথে . ন খলু ভবতি বন্ধ্যা তস্য বৃন্দাবনাশা। পরস্ব-হরণ, পরস্ত্রী-গমন, হেষ লােভ মৎসৰ্য্য, ‘অসত্য-কথন, পরুষ-বচন, পরের অনিষ্টকাৰ্য্য ;
বৃন্দাবন-শতক
এ সব ছাড়িয়া,
বৃন্দাবন গিয়া,
শ্রীকৃষ্ণে যে সঁপে প্রাণ,
আশা নব বধু,
হাসি মৃদু-মধু,
শুভ ফল দেয় দান।
৪৯
কুরু সকল মধৰ্ম্মং মুঞ্চ সবং স্বধৰ্ম্মং
ত্যজ গুরুমপি বৃন্দারণ্য বাসানুবােধা ।
স তব পরম ধৰ্ম্মঃ সা চ ভক্তি গুরূণাং
সকিল কলুষরাশি যদ্ধি বাসান্তরায়ঃ ।
সুখময় বৃন্দাবনে বাসের কারণ,
ছাড়িবারে হয় যদি স্বধর্মাচরণ;
নিখিল অধর্ম যদি হয় আচরিতে,
গুরুজনগণে যদি হয় তেয়াগিতে ;
সেই তো পরম ধৰ্ম্ম নাহিক সংশয়,
সে অমান্য-গুরুজনে ভকতি নিশ্চয়।
বৃন্দাবন বাস-বিপ্ন যত কিছু কর্ম,
একান্ত পাপের ভরা-নিতান্ত অধৰ্ম্ম । .
৫০
নিৰ্ম্মৰ্য্যাদাশ্চৰ্য্য কারুণ্য পূর্ণে।
রাধাকৃষ্ণো পতশ্চেৎ কদাচিৎ ।
ষঃ কোপ্যস্মিন্ যাদৃশ স্তাদৃশােৰা
দেহস্যান্তে প্রাপ্ন যাদেব সিদ্ধিং .
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
অসীম করুণাঘন,
রাধা-শ্যাম দুহুজন,
ক্ষণ যদি মিলে দরশন।
যেজন সেজন হােক, যে-ভাবে সেভাবে রাে’,
দেহ-অন্তে পায় সিদ্ধি-ধন।
রাধা-মধুপতি পাদামুজ ভক্তি রসপূর দূর মুক্তস্য।
অজিতেন্দ্রিয়স্য কৃপয়ামম বৃন্দারণ্য মাএয়ােভবতু।
রাধা-গােবিন্দ পদারবিন্দে ভক্তির রসপুর,
ধন্য-ভাজন মান্য-জনের আমি একান্ত দূর ।
অজিতেন্দ্রিয় অধম পামর আর কোনো গতি নাই ;
হে বৃন্দাবন ! সুন্দর ধাম! আশ্রয় যাচি তাই ।
রাধামাধব পাদপঙ্কজ রজঃ প্রেমােন্মদৈতৎ প্রিয়-
ক্রীড়াকানন বাসিষু স্থিরচর প্রাণিপি দ্রোহিমু।
প্রদ্বেষং পরমাপরাধমহহ ত্যক্তেতরৈরপ্যঘৈ
যুক্তোপ্যা মরণান্ত লব্ধবসতি বৃন্দাবনে স্যাৎকৃতী।
শ্রীরাধামাধব-পদ-পঙ্কজ-রাজীবে,
প্রেম-উন্মদ সাজে,
কেলি-কাননের মাঝে,
অনায়াসে নিরলসে বাস করে যে-জীবে ;
তারা যদি হয় অরি,
তথাপি না দ্বেষ করি,
আমরণ যে-নিবাসে শ্রীবৃন্দা-বিপিনে ;
বৃন্দাবন-শতক
আন অপরাধ যত,
সব তার হয় গত,
পরম সুতিশালী—ত্রিভুবন সে জিনে।
ন লােক বেদোদ্ধত মার্গ ভেদৈ
রাবিশ্য সংক্লিস্যত রে বিমূঢ়াঃ।
হঠেন সং পরিহৃত্য বৃন্দা
বনান্তরে পর্ণকুটীং কুরুধ্বং।
রে বিমূঢ় জন,
এত আয়োজন
কিসের লাগিয়া কর !
যত লোকাচার,
বেদের বিচার,
খুটি-নাটি পরিহর।
অসংখ্য পথ,
অসংখ্য মত,
শত দিকে তােরে টানে ;
হয়ে এক মন,
কৰ বৰ্জন
লৌকিক অভিমানে।
শ্রীবৃন্দাবনে,
অতি নিরজনে
পর্ণ কুটীর রচি।
কাননের বুকে,
বাস কর মুখে,
সব দ্বিধা যাক ঘুর্চি।
৫৪
যদ্বন্তু শাস্ত্ৰাণ্যহহ জনতয়া গৃহতং যত্তদেব
স্বং স্বং যত্তম্মতং স্থাপয়তু লঘুমতিস্তকমাত্রে প্রবীণঃ।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
অস্মাকং ভূঙ্লৈকোন্মদ বিমলরস প্রেমপীযুষমূর্তে
শ্রীরাধায়া বিহারাটবি মিহ ন বিনান্যত্র নির্যাতি চেতঃ।
শাস্ত্র সকল,
করি কোলাহল,
বকে যা যাহা খুসি ;
মানুষ তা খুঁজি, প্রয়ােজন বুঝি,
যে-ব্যাখ্যা নিক চুষি।
প্রবীণ পাগল
পণ্ডিত দল,
বুণিয়া তর্ক-জাল,
হয়ে লঘু মন,
করুক স্থাপন
স্বমতের জঞ্জাল।
মোদের সে সবে,
বৃথা কলরবে,
নাই তিল প্রয়ােজন ।
বিমল উজল,
রসে ঢল ঢল,
আছে এক উপবন।
প্রণয়ামৃত
সায়রশায়িত
শ্রীরাধা-বিহারভূমি।
জীবনে মরণে,
একান্ত মনে,
রহিব সে ধূলি চুমি।
স্নিগ্ধ শ্যামাভিরামচ্ছবি মৃদু মসৃণােত্তপ্ত হেমাবদাত
জ্যোতিদ্বন্দং কিশােরাকৃতি মধুর মহােঘূর্ণমানং রসেন।
নিত্যং যত্রৈব খেলায়তি মদনকলা কৌতুকেনাত্যুদারং
সারং সারাদশেদ বহু দশদিশঃ শ্ৰীবৃন্দাবন না।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
মৃদুল চিকণ,
অতি অনুপাম,
প্রিয় অভিরাম,
মােহন শ্যামল ছবি ।
হেমল বরণ,
জ্যোতি মাঝে আছে ডুবি।
যুগল মাধুরী, কিশাের-কিশােরী,
দুই দেহে এক মন ;
রসের হিল্লোলে, কৌতুকে দোলে,
নিতি নৰ আয়ােজন।
কাম-কলা-কেলি
রসে কুতুহলি,
কলিত উদার ধাম,
হে সারাৎসার,
প্রেম-কারি,
বৃক্ষ হে দশগ্রাম।
অপার করুণাকরং ব্রজবিলাসিনী নাগরং
মুহুঃ সুবহু কাকুভি নতিভি রেতদভ্যর্থয়ে।
অনর্গল মহন্মহা প্রণয়সীধুসিন্ধেী মম
কচিজ্জমুষি জায়তাং রতিরিহৈব বৃন্দাবনে ॥
ব্রজবিলাসিনী-পরাণ-নাগর!
ন হে অপার করুণা-আকর!
তেঁাহারি চরণে বহুত প্রণতি,
নিবেদি আমার প্রাণের আকুতি :-
মহান প্রণয়-মদিরা-সায়র,
অবাধ প্রবাহে বহে খরতর ;
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
সে পিরীতি-মাখা বৃন্দাবনে,
জনমে জনমে রতি রহু মনে।
নানা মার্গরােেহপি দুৰ্ম্মতিরপি ত্যক্তস্বধৰ্ম্মোপি হি
স্বচ্ছন্দাচরিতােহপি দূরভগবৎসম্বন্ধগন্ধাহপি চ ।
কুন্ যত্ৰ স্বকামলােভশতে বাসং সমস্তোত্তমং.
যাদেব রসাত্মকং পরমহং তন্নোমি বৃন্দাবনং।
আমি রে কুকুরাধম মহাপাপে লীন।
আপন ধরম ছাড়ি,
নানা পথে ঘুরি-ফিরি,
স্বেচ্ছাচারে মত্ত চিত দুৰ্ম্মতি মলিন ;
বিবিধ বিপথগত,
কদাচারে অনুরত,
ভগবান সনে তিল সম্বন্ধ বিহীন।
কাম ও লােভের বশে,
বসতি এ ব্ৰজবাসে,
তবু তাে পেয়েছি গতি উত্তম নবীন ;
এ হেন মহিমাময়,
পরম সুরসাল,
চরণে প্রণাম তব হে বৃন্দা-বিপিন!
ইহ সকল সুখেভ্যঃ সূত্তমং ভক্তি সৌখ্যং
তদপি চরমকাষ্ঠাং সম্যগাপস্নাতি যত্র।
তদিহ পরমপুংসাে ধাম বৃন্দাবনাখ্যং
নিখিল নিগমগুঢ়ং মুঢ়বুদ্ধি ন বেদ ।
এ জগতে শত, সুখ আছে কত,
সকলের সেরা ভকতির মুখ ;
বৃন্দাবন-শতক সেই সে পরম সুখ অনুপম, যে ধামে নিয়ত আছে জাগরুক্ ; নাহি জানে মূঢ়, নিয়ম-নিগুঢ় চরম সে সুখ-ধামের মহিমা ; জয় অতুলন শ্রীবৃন্দাবন , পরম-পুরুষ-বিলাস-গরিমা । ভজন্তমপি দেবতার মথার ব্রহ্মণি স্থিতং পশুদেব বা বিষয়ভােগমাত্রে রং। অচিন্ত্য নিজশক্তিতঃ স্বগত রাধিকামাধব- প্রগাঢ় রস দুর্মদং কুরুত এব বৃন্দাবনং। আন দেবে যার রতি, কিম্বা ব্ৰহ্ম ধ্যানে মতি ; অথবা পশুর মত বিষয়ের ভােগে রত ; হেন বিড়ম্বিত জনে যদি রহে বৃন্দাবনে, করুণায় প্রেম-ধাম পূর্ণ করে মনস্কাম। যুগল পিরীতি রস দিয়া চিত করে ব; গাঢ় প্রেম রস-বান মহু করে তার প্রাণ।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
৬১.
যৎ কোট্যংসমপি স্পৃশেন্ন নিগমাে যন্নোবিদু যোগিনঃ
শ্ৰীশ ব্ৰহ্ম শুকাৰ্জ্জুনােন্ধব মুখাঃ পশ্যন্তি ষন্ন চিৎ।
অন্যৎ কিং ব্রজবাসিনমপি ন যৎ দৃশ্যং কদালােকয়ে
ত বৃন্দাবনরূপ মদ্ভূতমহং রাধাপদৈকাশ্রয়ঃ ।
আগম-নিগম যার এক কণা
ধরিতে চুইতে নারে,
স্তিমিত-লােচন যােগী-ঋষিগণ
সদা ধ্যান করে যারে ;
ব্ৰহ্মা মহেশ পায় না তো শেষ,
লক্ষ্মী খুজিয়া ফেরে,
শ্রীকৃষ্ণ-সখা অৰ্জ্জুন যার
ভাবনায় যায় হেরে ;
শুক উদ্ধব স্তব্ধ নীরব
চাহে খার দরশন,
মনে আশা জাগে, যদি কোনাে যুগে
পূরয়ে আকিঞ্চন ;
রহু আন জন, ব্রজবাসীগণ
দরশন নাহি পায়,
যে ধামের রীতি, পিরীতি মুরতি,
ঠিকানা মিলেনা হয় ।
শ্ৰীমতী চরণে আশ্রয় পেয়ে
এ আশা পূরিবে কবে ?
বৃন্দাবন-শতক
সে অপ্রাকৃত নিত্য শ্রীধাম
স্ব-স্বরূপ দেখাইবে ?
বিস্মৃত দ্বৈতমাত্রং প্রণয়ময় মহােজ্যোতিরেকার্ণবান্তঃ
শ্ৰীবৃন্দারণ্যমতুচ্চলতুলরসান্তোধি তস্মিন্ সখে ত্বং।
বেশং কিঞ্চিাহীত্বোজ্জ্বল মখিলকলা কোমলাভীরবালা
প্রাণা শ্রীরাধিকায়া কিমপি রসনিধে শ্চাটুকারং ভজেথাঃ
বিমল উজল রসে ঝলমল অমল জ্যোতির মাঝে,
তুলনা বিহীন উছল উৰ্ম্মি, রসের জলধি রাজে।
উন্মাদ নব পিরীতি-সায়র সে মধু বৃন্দাবন ;
ভুলিয়া দ্বন্দ্ব, ভাল ও মন্দ, শরণ লহরে মন!
তিল-আধ আর করিয়ােনা দেরি, শুন সখে, মােয়র কথা,
উজল রসের লাস-বেশে সাজি ত্বরিতে চলরে তথা ।
প্রেমরস-নিধি রাধার পরাণ, অনুপ মাধুরী ঢালা,
ছলাকলালাসে সুনিপুণা অতি কোমলা আভীর বালা।
তাদের চরণে লহরে শরণ, আর কোনাে পথ নাই,
হয়ে চাটুকার, ব্ৰজের নাগরী ভজরে ভজরে ভাই।
দুর্বাসনা-সুদৃঢ়-রঙ্কুশতৈ নিবদ্ধ
আকৃষ্য সর্বত ইদং স্ববলেন কৃষ্ণ।
বৃন্দাবনে বিহরতঃ সহ রাধুয়া তে
পাদারবিন্দ সবিধং নয় মানসং মে।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
অধম-তারণ পতিত-পাবন রাধিকা-রমণ শ্যাম।
শুন শুন নাথ, পতিতের বাণী—মােরে না হইয়াে বাম।
কুবাসনা-ডোরে, পাপের খোটাতে, শতপাশে বাঁধা মন ;
তুমি বিনে এই পাশ ঘুচাইবে, না-দেখি এমন জন।
প্রচণ্ড মম দুর্বার মন—চারিদিকে ধেয়ে যায়,
সৰ্ব্ব-চিত্ত-কর্ষণকারী তুমি হে কৃষ্ণরায় !
মধুর মধুর মধুময় বনে প্রেমময়ী রাধা সঙ্গে,
রসের সায়রে ভাসিয়া ভাসিয়া বিহরিছ কত রঙ্গে।
নিখিলাকর্ষী পরাণ বঁধুয়া, আমারে টানিয়া লহ,
সুকোমল তব শীতল চরণে চির আশ্রয় দেহ।
বশীকং শক্যো নহি নহি মনাগিন্দ্রিয়গণণা
গুণােহভূন্নৈকোহপি প্রবিশতি সদা দোষনিচয়।
ক যামঃ কিং কুৰ্ম্মে হরি হরি ময়ীশােহপ্যকরুণঃ
স্ববাসং শ্রীবৃন্দাবন বিতর মাহনগতিকম্।
দুর্বার এই ইন্দ্রিয়গণ।
নেনা আমার কথা ।
কি করিব বলল, বশ নাহি হলাে,
টেনে নেয় যথা-তথা ।
দোষের আকর মুইরে পাময়,
কোনাে গুণ নাই মাের;
হায় হায় হায়, পাপচিন্তায়
রহি হইয়া ভাের।
৬
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
হরি হরি হরি, কি করি কি করি,
কোথা গে’ জুড়াব ভাই।
অধম নারকী এ পাপীর প্রতি
বিধিরাে করুণা নাই।
সুখের আলয় বৃন্দা-বিপিন,
কর এ করুণা দান,
অনগতি হীনমতি মােরে
তব কোলে দেহ স্থান।
৬৪
জাতি প্রাণ ধনানি যান্ত সুযশােরাশিঃ পরিক্ষীয়তাং
সদ্ধর্ম বিলয়ং প্রশান্তু সততং সর্বৈশ্চ নির্ভৎস্যতাং ।
আধিব্যাধিশতেন জীতু বপুলুপ্ত প্রতীকারতঃ
শ্ৰীবৃন্দাবিপিনং তথাপি ন মনাক্ত্যক্তং মমাস্তাং মতিঃ
মাের ধন প্রণ, জাতি অভিমান, কিম্বা সুযশরাশি,
ধরম করম যাহা কিছু আছে, সকল যাউ ভাসি।
অথবা সবাই অতি অকারণে বাজাইয়া হাতে তালি,
যাহা মুখে আসে, তাই বলে মােরে দিক্ সদা গালাগালি ।
শতেক বেয়াধি প্রবেশিয়া দেহে করুক শরীর জীর্ণ ;
এ বপু আমার চিরদিন তরে হউক অকর্মণ্য।
রাধা-রসময় প্রেমের আলয় শুন হে বৃন্দাবন !
স্বপনেও যেন, তথাপি তােমারে ছাড়িতে না-হয় মন।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
রক্ষতি সংসারভয়া দোষাকরম্
অপ্যশেষ দেহ তৃবৃন্দ।
বৃন্দাবনমিতি তেন প্রথিতং
তন্নোমি কাননং কিমপি।
‘বৃন্দ—সমুদয়, আর ‘অবন’-রক্ষণ ;
তাই তুমি ধরিয়াছ নাম বৃন্দাবন।
সৰ্ব্ব-গুণহীন
বহু দোষের আকর,
প্রাণী-বৃন্দ আছে যত তােমার গােচর ;
অবিচারে সকলের দোষ করি ক্ষয়,
তােমার শীতল ছায়ে দিয়েছ আশ্রয়।
পরম করুণাময় হে কানন-ভূমি!
কোটি দণ্ডবৎ তব শ্রীচরণ চুমি।
বৃন্দারণ্যান্য প্রকৃতে রন্তর্বহির্বাপি।
নৈবাস্তি মধুরং বত্যিকলিতং যৈ নমস্তেভ্যঃ ।
বিশ্বের ভিতরে,
অথবা বাহিরে,
বৃন্দাবন সম ঠাই,
প্রেম-রসময়
মধুর আলয়
জগতে কোথাও নাই।
হয়ে ভাগ্যবান,
এই দৃঢ় জ্ঞান
প্রত্যয় হয়েছে যার,
।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
ভক্তি-পুত মনে, তার চরণে,
মাের কোটি নমস্কার।
বিভ্ৰাজত্তিলকা কলিন্দতনয়া নীরৌঘ নীলাম্বরা
উদঞ্চৎকাঞ্চনচম্পকচ্ছবি রহহ নানারসােল্লাসিনী
কৃষ্ণপ্রেম পয়ােধরেণ রসদেনাত্যন্ত সম্মােহিনী
গােপাজবল্লভ বিজয়তে রাধে বৃন্দাটবী ।
জয় চারু ছবি বৃন্দা-অটবী,
রাধা-সমা মনলােভা ;
তিলক-ধারিণী রাধার নিছনি,
তিলক তরুর শােভা।
দুকূল রূচির কালিন্দী নীর,
বেষ্টিত চারু অঙ্গে,
চম্পক দ্যুতি ঠিকরিছে যেন
কনক চাপার সঙ্গে।
ফুটন্ত ফুলে, ফলে ও মুকুলে,
রসাল শীতল ছায়া,
রস-লাস ভরে উলসিতা যেন
শ্ৰীমতীর কমকায়।
শ্যাম-প্রেম-রস-সিন্ধু যেমন
উছলিছে পয়ােধৰে,
স্নিগ্ধ শীতল কুণ্ড-৫ষমা
তেমনি মানস হরে।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক গােপেন্দ্র-সুত-বল্লভ রামা শ্রীরাধা-রাধার ধাম; জয় জয় জয় বৃন্দা-বিটপী, পূরাও মনস্কাম !! যস্মিন্ কোটিরবৈভবযুতা ভূমীরুহাঃ পােষকাঃ ভক্তিঃ সদ্বনিতা, মহারসময়ী যত্র স্বয়ং শ্লিষ্যতি। যত্র শ্রীহরিদাসবগণিতাঃ খট্টায়মানাঃ শিলা স্ত বৃন্দাবনমদ্ভূতং সুখময়ং কো নাম নালম্বতে। অনন্ত কোটি কল্পতরুর সমান বিভবশালী, যে-দেশের প্রতি তরুর শুষমা বৈভব দেয় ঢালি ; মহারসময়ী সতী-শিরােমণি স্বয়ং ভক্তি-দেবী, যে-দেশে আসিয়া প্ৰেমালিঙ্গনে তােষে মন সদা সেবি সুকোমল চারু শয্যার মত শিলার আস্তরণ, বিস্তৃত যেথা কাননে-কাননে ফুলময় সে শয়ন ; শ্রীহরির দাস যে-দেশে নিবাসে পরম পুলক ভরে, হেন অপূৰ্ব্ব কু-ভবন কে-না আশ্রয় করে ? •• বিন্দন্তি যাবৎ প্রণয়ং ন মন্দা বৃন্দাবনে প্রেম-বিলাসকলে। তাবন্ন গােবিন্দ-পদারবিন্দ- সচ্ছন্দ-সন্তুক্তি-রহস্যলাভঃ। :
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক শুন শুন ভাই, শুন সার কথা,আমার বচন ধর, গােবিন্দ পদে আশ্রয় পেতে যদি রে বাসনা কর, প্রণয়-বিলাস-মধুরী-মাখনাে-মধুর বৃন্দাবনে, সুবিমল রতি, শুদ্ধ পিরীতি, যা আছে তােমার মনে, সে সব তুলিয়া, নিন্দা গাহিয়া, মন্দ বুদ্ধিগণ, কত-না কুৎসা করিবে রটনা, তাতে না টলায় মন। আপন-নিন্দা ফুল্ল-মালিকা, যে-জন না গলে পরে, সহজ সরল যুগল পিরীতি কভু নহে তার তরে। ৭০ স্মারং স্মারং নবজলধরশ্যামলং ধাম বিদ্যুৎ- কোটিজ্যোতিস্তমুলতিকয়া রাধয়া শ্লিষ্যমাণম্ । উচ্চৈরুচ্চৈঃ সরসসরসং প্রােজ্জ্বলীজ মান- প্রেণাবিষ্টো ভ্ৰমতি সুকৃতিঃ কোহপি বৃন্দাবনাঃ কোটি-বিদ্যুৎ-উজল-কান্তি-তনু-লতা-বেড়া-তনু, নব-জলধর শ্যামল-শুষমা চারু-তরু মোর কানু। প্রেম-উন্মাদে স্মরিয়া তাহারে, ব্ৰজের পুণ্যবান আবিষ্ট মনে করছে ভ্রমণ, গাহি লীলা-গুণ-গান। ৭১ রাধ পদাঙ্কভূষিত বৃন্দারণ্য স্থলীষু নির্ভর প্রেশ্ন। হরি হরি কদা লুঠামি প্রতিপদ গলদশ্রুরুল্লসৎপুলকঃ । শ্রীরাধিকা-পদধুলি- ভূষিত শ্ৰীবৃন্দাস্থলী, অপরূপ পরম শোভন ;
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
কবে পুলকিত গাত্রে, প্রণয়-সজল নেত্রে,
নির্ভয়ে করিব বিচরণ।
চলিতে চলিতে কবে,
মহা-ভাব উপজিবে,
হরি হরি! হবে কি সে দিন ?
রজে গড়াগড়ি দিয়া,
উল্লাসে নাচিবে হিয়া,
হেন প্রেম দিবে সে-বিপিন ?
৭২
পূর্ণোজ্জ্বলৎ প্রেমরসৈকমূৰ্ত্তি
ত্রৈব রাধা বিজয়ী হরীতি।
তদেব বৃন্দাবনমাশ্রিতানাং
ভবেৎ পরং ভক্তিরহস্যলাভঃ ।
সুপরিপূর্ণ উজ্জ্বল প্রেম রসের মুরতি শ্যাম,
রাধা-মনচোর যথায় বিরাজে, বৃন্দাবন সে ধাম।
হেন রসময় নন্দিত ধাম আশ্রয় যেবা করে,
পরম-ভকতি-প্রেম-রহস্য বুঝিতে শকতি ধরে।
সৰ্ব্ব ত্যক্ত। সরসবিশদ প্রেমপীযুষসান্দ্রে
বৃন্দাবণ্যেহদ্ভুত তরুলতাগুল্মকাদ্যৈ মনােজ্ঞে।
রাধাকৃষ্ণোজ্জ্বল গুণগণণাগানমালিকীরৈ
নীরেণাপি স্থিতিমিহ তনােৱধ্যবস্যাবসস্তু ।
অপরূপ তরু-লতা-বীথি ঘেয়া, শীতল সসি ময়,
গাহরে সততু বাঞ্ছিত সেই বৃন্দাবনের জয়।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
প্রণয়-পীযূষ ঘন-উজ্জ্বল মধুর অমল গুণ,
মত হইয়া শুক-অলিকুল করে সদা গুন-গুন ;
মন করি থির কুঞ্জ-কুটীরে বাসনার কর লয়,
সুন্দর সেই বৃন্দা-বিপিনে বসতি যেন রে হয় ।
৭৪
শ্রীরাধায়াঃ কনকরুচিরজ্যোতিরঙ্গচ্ছটোঘৈঃ
শুদ্ধ প্রেমােজ্জ্বলরসময়ৈঃ সেব্যমানং' সমন্তাৎ।
গােবিন্দশ্যাম্বুদরূচিতনাে জ্যোতিরম্ভোধিপূরৈঃ
সান্দ্রানন্দাত্মভিরপি চিতং নৌমি বৃন্দাবনং তৎ ।
কনক রূচির দ্যুতি শ্ৰীমতীর অঙ্গ,
শুদ্ধ প্রেম উজলিত রসের তরঙ্গ
জলদ-রূচির তনু নিজ ঘনানন্দ,
উজল জ্যোতির মহা-সায়র গােবিন্দ।
এই দুহু নিসেবিত জয় বৃন্দাবন,
কোটি দণ্ডবৎ হই ধরিয়া চরণ।
৭৫
নিন্দা বা স্তুতিরেব বা বহুবিপৎ সম্পত্তিরেবাস্তু বা
পাণ্ডিত্যং বত মূখতাপি যদি বা রাগােবিরাগােহথা।
যৎ কিঞ্চিদ্ভবতু তেরপি মনা লক্ষ্যং যদ্বৈতবং
ত বৃন্দাবিপিনং ন জীবনমহং স্বপ্নেহপি হাতুং ক্ষমঃ !
স্তুতি-অখ্যাতি সম্পদ-মতি
অথবা ৰিপদ হােক,
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
মাের অনুরাগী কিম্বা বিরাগী
হােক-না সকল লোক ;
পণ্ডিত নামে বিদেশে কি গ্রামে
খ্যাতি থাক্ বারােমাস,
অথবা সকলে মুখ টা বলে,
করুক-না পরিহাস।
নিগম যাহার মহিমার ভার
বিন্দু বুঝিতে নারে;
স্বপনেও মন সে-বৃন্দাবন
কভু কি ছাড়িতে পারে ?
৭৬
;
চণ্ডাল শ খরাদি বা যদি জনাঃ কুন্তি সর্বেব তিরস্কারং
দুর্বিসহঞ্চ তেন নহি মে খেদোস্ত্যনীয়ানপি।
দেবা দেব্য ইমে চ ভূতনিবহাঃ প্রাণাংশ্চ দ্যুমহা
স্নেহাষ্টিমতো ন মে গুরু তৃষা বৃন্দাবনীয়ে বসে।
চণ্ডাল গাধা কিম্বা কুকুর, যাহা খুশি তাই বলি,
বিশ্ব ভরিয়া সকলে আমায় দেয় যদি গালাগালি ;
অসহনীয় সে কঠোর বচনে কিবা আসে যায় ভাই ?
নিন্দায় মাের বিন্দুমাত্র খেদ নাই—খেদ নাই।
স্বর্গের যত দেব-দেবীগণ, মর্ত্যের জীব আর
আমার লাগিয়া মম তার বশে ছাড়ে যদি প্রাণ তার ;
একান্ত সেই বান্ধরের এ অযাচিত প্রাণ-দানে,
বিন্দুমাত্র তুষ্টি আমার নাই ভাই, নাই প্রাণে।
৭২ শ্রীবৃন্দাবন-শতক কেবলানন্দ সুন্দর সেই রসের বৃন্দাবন ; তাহারি লাগিয়া পিপাসিত প্রাণ, ক্ষুধিত এ তনু-মন। ৭৭ ভ্রাতঃ সমস্তান্তপি সাধনানি বিহায় বৃন্দাবনমায়। যথা তথা প্রাক্তন বাসনাবশাৎ শরীর বাণী হৃদয়ং বিচেষ্টং। মূত্র-পুষি-ক্লেদময় এই সাপের শরীর হায় । না-শুনিয়া কথা, যা যথা-তথা, নিরাশ হয়োনা তায়। বাসনার বশে রসনা তােমার বলুনা যাহা খুসি ; থাকুক সতত তুরসে মগন, কাজ নাই তারে দুষি । দুৰ্বার হিয়া প্রাক্তন-বলে হইয়া বিষম ক্ষিপ্ত, অশেষ প্রকার গহিত কাজে অবিরত থাক্ লিপ্ত। এই সব বৃথা ভাবনায় তাের নাই কোনো প্রয়ােজন । সাধন ভজন সকল ছাড়িয়া স্মররে বৃন্দাবন। ৭৮ , দৃক্ কামমা ভবতু ভগব যেন কস্যাঞ্চিদেণী দৃশ্যাসক্তোহপহহ ন বহির্যামি বৃন্দাটবীতঃ। দৃগদম্ভোহপুদয়তু তথাহষ্কৃতিশ্চাপি মে স্যাৎ যেনাপ্যস্মিন্ রসময়বনে যােচয়ে নিত্যবাসং। এমন বাসনা হােক ভগব। এমন বাসনা হােক- বর্ণনাতীত। শ্রীমতীর বনে গমনের সদা ঝে।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
৭৩
এমন দম্ভ হে মোর মনে
অহঙ্কারের বশে,
সময় বনে অবিরত যেন বাস করি রুচি-রসে।
বরং বৃন্দারণ্যে হরি হরি করে খর ভৃতে
মামাে ভৈক্ষার্থং শপচগৃহবীথীষু দিনশঃ।
তথাপি প্রাচীনৈঃ পরমসুকৃতৈ রত্র মিলিতং
ন নোমােহন্যত্র কচিদপি কথঞ্চিপুরিদং ।
নিশিদিন কোনাে মতে,
বেড়াইব পথে পথে,
থাকিয়া শ্রীবৃন্দাবন বাসে ;
খর্পর লইয়া করে,
চণ্ডালের ঘরে ঘরে,
ভিক্ষা মেগে খাব অনায়াসে।
তথাপি সুকৃতিশালী,
প্রাচীন পণ্ডিত বলি,
এ দেশের বিখ্যাত যাহারা,
-সে-সবার সহ-ক্রমে,
মাের এ শরীর ভ্রমে,
কোথাও না-যাবে ব্রজ ছাড়া।
*
৮০
•
জরৎকন্থামেকাং দধদপিচ কৌপীনমনীশং
প্রগায় শ্রীরাধামধুপতি রহঃকেলি লহরীং।
ফলং বা মূলং বা কিমপি দিবসন্তে কবল
কদা নেষে বৃন্দাবন ভুবি দশাং জীবনময়ীং ॥
কবে রে হইব কৌপিনধারী, গায়ে দিব ছেড়া কথা,
গাহিয়া বেড়াব রাধা-রমণের বিলাস-লহরী গাথা।
৭৪
বৃন্দাবন-শতক
ভ্ৰমিয়া ভ্ৰমিয়া দিবা-অবসানে ফল-মূল যাহা পাব,
অবিচারে তাই মস্তকে ধরি, তার দান বলে খাব।
একান্ত মন প্রাণের বাসনা পূর্ণ হইবে কবে ?
শ্রীবৃন্দাবনে আনন্দ-মনে আজীবন বাস হবে।
প্রকৃত্যুপরি কেবলে সুখনিধৌ পরব্রহ্মণি
শ্রুতি প্রথিতবৈভবং পরপদং বিকুণ্ঠাভিধং।
তদন্তরখিলােজ্জ্বলং জয়তি মাথুরং মণ্ডলং
মহারসময়ং সখে কলয় তত্র বৃন্দাবনং।
প্রকৃতির উর্দ্ধে আঁকা, অবিমিশ্র সুখ-হুঁকা,
পরব্রহ্মে স্থির অবস্থিত
বেদ-বিধি অগােচর,
অনন্ত বৈভবধর,
শ্রীবৈকুণ্ঠ ধাম বিরাজিত।
সে দীপ্ত বৈকুণ্ঠ মাঝে, অখিল উজল সাজে,
জয়যুক্ত মথুরা মণ্ডল।
সে মণ্ডল মধ্য-মণি,
অনন্ত রসের খণি,
আছে সখা, বৃন্দাবন-স্থল।
৮২
.
কদা বৃন্দারণ্যং শ্রবণ রসন স্পর্শন নিরী-
ক্ষণ ঘ্রাণাদ্যৈ মেভবতি রসসিন্ধু স্রবদিব।
কদা বা তল্লোকোত্তররসমদান্ধো মধুপতে
গুণানুচ্চৈরুচ্চৈঃ সরসমিহ গাশ্যামি পরিতঃ ॥
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
হায়রে, আমার হেন শুভদিন আর কতদিনে হবে।
বৃন্দা-বিপিন-গুণগান সদা শ্রবণে লাগিয়া রবে ;
রসাল মধুর ফল-মূল কবে রসনায় দিবে সুখ,
রস-লাসময় কুঞ্জ-কুটীর পরশনে যাবে দুখ ;
হেরিয়া মাধুরী, বিলাস চাতুরী, নয়নে বহিবে লাের,
চন্দনপূত-অঙ্গ-গন্ধ-পরিমলে হব তাের ;
রসের সিন্ধু ধারা বরিষণে রস-মদে হব অন্ধ,
রস-নগরের যশ-লীলা গানে ধ্বনিবে মানস-ছন্দ।
স্বানন্দ সচ্চিদঘন রূপতা মতি
যাবন্নবৃন্দাবনবাসি জন্তু।
তাবৎ প্রবিস্ফোহপি ন তত্র বিন্দুতে
ততােহপরাধাৎ পদবীং পরাৎপরাং।
‘বৃন্দাবনবাসী যত জীব-জন্তুচয়,
আনন্দ-সচ্চি-ঘন-নাহিক সংশয়।
হেন অনুভূতি যার প্রাণে নাহি জাগে,
সাধন-দুল্লভ-পদ নহে তার ভাগে।
যদৈব সচ্চিদ্ৰসরূপ বুদ্ধি
বৃন্দাবনস্থ স্থির জঙ্গমেষু। ..
স্যানিৰ্ব্যলীকং পুরুষস্তদৈব
চকান্তি রাধাপ্রিয়সেবিরূপঃ ।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
‘বৃন্দাবনে আছে যত স্থাবর জঙ্গম,
সৎ-চিৎ-রস-রূপ অতি অনুপম।
হেন সত্য যার চিত্তে হয়েছে প্রত্যয়,
শ্ৰীমতীর প্রিয় সেবা পেয়ে ধন্য হয়।
সকল বিভব সারং সর্ব ধৰ্ম্মৈক সারং
সকল ভজন সারং সর্ব সিদ্ধৈক সার।
সকল মহিম সারং বস্তু বৃন্দাবনান্তঃ
সকল মধুরিমাস্তোরাশি সারং বিহারং ।
জয় জয় বৃন্দা-বিহার!
সকল বিত্ত, সকল ধৰ্ম্ম,
সকল ভজন সার।
নিখিল সিদ্ধি লুটায় চরণে,
সীমা নাই মহিমার ;
জয় অচিন্ত্য ঘন মধুরিমা
অমিয়ার পারার।
দৈবীবা প্রতিষেধিনী ভবতু মে স্যাদ্বা গুরূণাং গিরাং
শ্রেণী শাস্ত্রবিদামিহাস্তু বহুধা যঃ কোহপী কোলাহলঃ।
ত্যক্ত। সাধনসাধ্যজাত মখিলং লগ্নস্তু মে রাধিকা
ক্রীড়াকানন বাস সম্পদি মনাক ব্যাবৰ্ত্ততে নােমন।
ফুকারি সঘন,
মুদি মোরে কহে আন,
দৈৰ বচন,
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
গুরুজন যদি হইয়া বিরােধী
করে গুরু বাধা দান;
শাস্ত্র সকল,
তুলি কোলাহল
নিষেধ বচন ঝড়ে,
তথাপি কখন
লগ্ন এ মন
কভু কি ফিরাতে পারে ?
অখিলারাধ্য,
সাধন-সাধ্য,
শ্রীরাধার ক্রীড়া ভূমি ;
বাস-সম্পদে
আছি মনােমদে,
এ সােনার ধুলি চুমি।
৮৭
প্রগায়ন্নটদ্ধসন্ন লুন্ বা
প্রধাবন্ রুদন্ সম্পন্মুচ্ছিততা বা।
কদা বা মহাপ্রেম মাধ্বী মান্ধ
শ্চরিষ্যামি বৃন্দাবন-লােকবাহঃ।
হরি হরি, কবে হ’ব বৃন্দাবন বাসী!
ছাই দিয়া লােক-মুখে
গাহিব নাচিব সুখে,
কঁদিয়া বেড়াব দিবানিশি।
সেদিন ক’দিনে হবে,
ব্ৰজের ধুলায় কবে,
হেসে হেসে গড়াগড়ি দিব ;
প্রেম-মদে মতলিয়া,
উল্লাসে নাচিবে হিয়া,
পেয়ে নিধি মূচ্ছিত হইব।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
কালিন্দীর কূলে কূলে,
আনন্দে বেড়াব তুলে,
দুরে যাবে সকল ধরম ;
ব্রজের নেশায় মাতি, মিশে যাবে দিবা-রাতি,
এই মাের একান্ত মরম।
৮৮
ন লােকং ন ধম্মং ন গেহং ন দেহং
ন নিন্দাং ন স্তুতিং বা পি সৌখ্যং ন দুঃখ
বিজান কিমপুম্মদঃ প্রেমমধ্বা
গ্রহগ্রস্তবৎ কহি বৃন্দাবনে স্যাম্ ॥
বিধি-ধৰ্ম্ম লােকাচার,
গৃহ-পরিজন আর,
সুখ-দুঃখ গণিবনা মনে ;
দেহ-চিন্তা পরিহরি,
স্তুতি-নিন্দা শিরে ধরি,
বিচবি দিব্য বৃন্দাবনে।
প্রেম-সুরা করি পান, খসে যাবে অভিমান,
উনম রসে মাতােয়াল ;
কবে গ্রহগ্রস্তু-বৎ,
ঢুড়িব ব্রজের পথ,
এই আশা মনে চিরকাল।
হরেকৃষ্ণ কৃষ্ণেতি কৃষ্ণেতি মুখ্যা
মহাশ্চৰ্য্য নামাবলী সিদ্ধ মন্ত্রান্।
কৃপামূৰ্তি চৈতন্যদেবেন' গীতা
কদাভ্যস্য বৃন্দাবনে স্যাং কৃতার্থঃ ।
বৃন্দাবন-শতক ; হরেকৃষ্ণ কৃষ্ণ রাম, শক্তিশালী সিদ্ধ নাম, ঐশ্বৰ্য্য ও মাধুর্যের খণি করিলেন পরচার, করুণার অবতার শ্রীচৈতন্য ন্যাসী-শিরােমণি। সদানন্দ অভিরাম, প্রেম-রসে মাখা নাম, কত দিনে হইবে অভ্যাস ? জপিতে জপিতে কবে, কৃতার্থ হইব ভবে, করিব শ্ৰীবৃন্দাবনে বাস। হৈমস্যাটিকপদ্মরাগ-রচিতৈ মাহেন্দ্রনীলৈ মৈ নানা রত্নময়স্থলীতিরলিভি ঝঙ্কারিভােদ্বল্লিভিঃ। চিত্রৈঃ কীর-ময়ূর-কোকিলমুখৈ নানা বিহঙ্গৈ সৎ- পদ্মাদ্যৈশ্চ সয়নাভিরদ্ভূত মহং ধ্যায়ামি বৃন্দাবন ৷ কনক-ফটিক-পদ্মরাগের বুচিত মুকুতা পাঁতি, মেঘ-নীলমণি বিটপী লতায় খেলে যথা দিবা-রাতি ; অযুত রতন-ছানিত মাধুরী-উজল মাণিকে বেড়া, ফুল কুসুমে অলি গুঞ্জন-কুঞ্জ-কাননে ঘেরা ; শুক শারী আর ময়ুর কোকিল বিহঙ্গ নানা জাতি, কত-না রঙ্গে স্বর-তরঙ্গে গাহে আনন্দে মাতি ; চাৰু শােভাময় সরােবর মাঝে কমল বিকশি হাসে; হেন অদভূত বৃন্দা-বিপিন যেন মাের ধ্যানে আসে। তাল-পান-মনােহর-মােদকাদি- রমে লসন্মদুল-পল্লব-চারু তল্পে।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
দ্বারস্থিলিভিরহে সুহৃদাববেক্ষ্য
বৃন্দাবনং স্মর নিকুঞ্জ-গৃহৈমনােজ্ঞ ।
সুকোমল নব পল্লবদলে রচিত শয়ন খানি,
বিহরয়ে মাের নন্দকিশাের-বামে শোভে রাধারাণী।
সুন্দর চাৰু কুঞ্জ-কুটীর শােভিছে রম্য বনে,
সরস খাদ্য মােদকাদি কত-শীতল পানীয় সনে।
তাম্বুলাধারে রসাল পর্ণ কপুর-বাসে ভরা,
মঞ্জ, কুঞ্জে ভূক্সয়ে রতি, রস-লাসে মাতােয়ারা।
দ্বারের বাহিরে দাড়ায়ে গােপনে সখীরা নীরব হেসে-
লতা-বাতায়নে দু’নয়ন দিয়া হেরে লীলা অনিমেষে।
হেন নন্দিত বৃন্দা-বিপিন ত্রিভুবনে অতুলন,
একান্ত প্রাণে অবিরাম ধ্যানে স্মরণ কর রে মন!
কচিদ্ৰতি বিমর্দিত প্ৰসর তল্পকৈঃ কুচি
রতােপকরণান্বিত প্রিয় মৃদু প্রসূনাস্তরৈঃ।
কচিৎ প্রমদরাধিকামধুপতি প্রবৃত্তোৎসবৈঃ
সদা নব নিকুঞ্জকৈঃ স্মর সুমঞ্জু বৃন্দাবন ৷
রতি-কেলি-বিমর্দিত, হীরা-মােতি-সুখচিত,
পরিসর ফুলের বিছানা ।
মৃদুল সুগন্ধি মাখা,
প্রফুল প্রমুনে ঢাকা,
ঝলমল চন্দ্রাতপ থানা।
রাধা-শ্যাম দুজনে,
বিহরে প্রমত্ত মনে,
নিকুঞ্জ কানন করি আলা;
৮১
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
নিত্য নব মহোৎসবে,
রতি-রাগ করবে,
রাস-রসে প্রেমে আত্ম-ভােলা।
মদির মাধুরীময়,
চিদানন্দ সুধালয়,
সুকোমল চারু বৃন্দাবন ।
রসের সে নিকেতনে, নিবিড় একান্ত মনে,
আনন্দে স্মরণ কর মন!
রাধাকৃষ্ণ রহঃ সুহৃৎ ক্ষিতিধরস্যোপত্যকা স্ফুর
নানা কেলি নিকুঞ্জবীথিষু নবােন্মীলৎকদম্বাদিমু।
ভ্রামং ভ্রাম মহর্নিশং ননু পরং শ্রীরাসকেলিস্থলী
রম্যাস্বেব কদাপ্রকাশিতরহঃ প্রেমা ভবেয়ং কৃতী।
রাধামাধবের লীলা-মাধুরীর মধুর মদির ধাম ;
জয় প্রিয়তম গিরি অনুপম-শ্রীগােবর্ধন নাম।
নানা কেলিময় নিকুঞ্জ-পথে বেষ্টিত চারু কায়া,
নব বিকশিত কদম্ব তরু বিতরে শীতল ছায়া।
গােপত গুহার গহন বিজনে গােপন রসের খেলা,
সে লীলা হেরিয়া, ঘুরিয়া ঘুরিয়া, কাটিবে কি সারা বেলা?
৯০
অলং ক্ষয়িসুখদুঃখদৈ যুবতি পুত্র বিত্তাদিকৈ
বিমুক্তি কথয়াপ্যলং মম নমম বিকুণ্ঠশ্রিয়ে।
পরহি ভবে ভবে ভবতু বার্ষভানব্যথাে
ব্রজেন্দ্রতনয়য় বৃনে বসতি যত্র তস্মিন্ রতিঃ।
বৃন্দাবন-শতক
দুখের আলয়, দিনে দিনে ক্ষম, দারা সুত ধন জন ;
ক্ষণিক সুখের ব্যর্থ আরামে নাই মাের প্রয়ােজন।
মুক্তি পথের তত্ত্ব-কথায় মত্ততা নাহি মম;
ঊর্জে থাকুন বৈকুণ্ঠ, দুর হতে করি নম।
ব্ৰজেন্দ্রসুতবৃষভানুসুতা যে-দেশে বিহার করে,
জনমে জনমে সে রসের ভূমে মাের চিত-মন হরে।
নামামি বৃন্দাবনমেব মূর্ধ।
বদামি বৃন্দাবনমেব বাচা।
স্মরামি বৃন্দাবনমেব বুদ্ধ্যা
বৃন্দাবনাদন্য দহং ন জানে ।
রম্য কানন শ্রীবৃন্দাবনে আমি নােয়াইব মাথা ;
আমার বদনা শুধুই গাহিবে ব্রজমণ্ডল-গাথা।
বুদ্ধি-চিত্ত স্মরিবে নিত্য, সত্য বৃন্দাবন ;
বৃন্দা-বিপিন ভিন্ন অন্য জানেনা আমার মন।
রাধাপতি রতিকং বৃন্দাবনমেব জীবনং যেষাং।
তক্ষরণাম্ভোজরেগণা রাশামেবাহমাশাসে।
রাধাপতি-রতিক
শ্ৰীবৃন্দাবন ভূমি;
যাঁর জীবনের বন্দ্য,
তঁাহার চরণে নমি।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
মাখিয়া সে পদ-রেণু
ব্রজ ধামে লব বাসা ;
সার্থক হবে তনু,
একান্ত এই আশা।
গৃণন্তি শুকশারিকাঃ সুচরিতানি রাধাপতে
স্তদেক পরিতুষ্টয়ে তরুলতাঃ সদোৎফুল্লিতাঃ।
সরাংসি কমলােৎপলাদিভিরধুশ্চ যত্ৰ শ্রিয়ং
তদুৎসবকৃতে মনঃ স্মরতদেব বৃন্দাবনং।
শ্রীরাধাপতির সুচরিত-গাথা শুক-শারী গান করে,
নব পল্লবে তরুলতাদল মুকুলিত তঁার তরে।
শ্রীরাধাপতির উৎসব লাগি সরােবরে এ কি মেলা,
কমল-কুমুদ-কহলার সনে সমীরণ করে খেলা।
শ্রীরাধাপতির রতি-কেলিময় সুন্দর উপবন,
একান্ত মনে, বসি নিরজনে, স্মরণ কর রে মন!
১৮
নানাকেলি নিকুঞ্জ মণ্ডপযুতে নানাসরােবাপিকা-
রম্যে গুল্মলতামৈশ্চ পরিতাে নানাবিধৈঃ শােভিতে।
নানাজাতিসমুল্লসৎখগগৈ নানাবিলাসস্থলী-
প্রদ্যোততিরােচিষি প্রিয় কদা ধ্যেয়ােহসি বৃন্দাবনে।
কেলি-কলা-মুখরিত বিচিত্র সুন্দর,
কি নিবিড় নিকুঞ্জ-মণ্ডপ মনােহর।
৮।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
স্থানে স্থানে রম্য বাপী সরসী অতল,
তরু-লতা-গুল্ম-ঘেরা ছায়া সুশীতল।
নানা জাতি পশু-পাখী উল্লাসে বিয়ে,
অপরূপ খামৃগ সদানন্দে চরে।
বিলাস-কৌতুকময় রম্য বৃন্দাবন,
হে প্রিয় । ধ্যানের গম্য হবে কি কখন ?
যত্রৈবাতিরসােম্মদং বিহরতে মৎ প্রেষ্ঠবস্তুদ্বয়ং
ভক্তিঃ কাপি মহারসােৎসবময়ী যত্রৈব নিঃস্যন্দতে।
যত্রৈব প্রবিশন্তি নৈব নিগম শ্রেণীগিরাং ভঙ্গয়
স্তম্মিন্নেব মমাস্তু ধীঃ প্রণয়িণী বৃন্দাবনে পাবনে।
মম প্রিয়তম দুহু-অতি রসভরে-
যে দেশে পাগল-পারা উল্লাসে বিহরে ;
মহামহােৎসবময়ী ভকতির ধারা
উছলি বহিয়া যায়-প্রেমে মাতােয়ারা ;
বেদের বচন ভঙ্গি—যাহার দুয়ারে
থমকি দাড়ায়ে রয়-প্রবেশিতে নারে ;
অখিল-পাবন সেই মধু বৃন্দাবনে,
লাগু পিরীতি-রস আমার এ মনে।
১০০
বাণ্য গদ্গদয়া কদা মধুপতে নামানি সংকীৰ্ত্তয়ে
ধারাভিনয়নাসাং তরুতল ক্ষৌণীং কদা পঙ্কয়ে।
';
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক দৃষ্টা ভাবনয়া পুরােমিলদিব স্বান্তস্যভােগ্যং মহাে- দ্বন্দং হেমহরিন্মণিচ্ছবি কদা নংস্যে মুহুর্বিহলঃ। মধুসূদন নাম গাহিয়া গাহিয়া, গদগদ হবে বাণী—উথলিবে হিয়া ; নয়নে বহিবে ধারা কবে অবিরল, পঙ্কিল হইবে তাহে বিটপীর তল। হেম-নীলমণি-দ্যুতি একান্ত-যুগল, অন্তর-দীপালি কবে আলিবে উজল । অনুরাগী যােগী-ভােগ্য যুগ্ন ছবি হেরি, বিহবল হইয়া কবে দিব গড়াগড়ি। ১০১ বৃন্দারণ্যনিকুঞ্জসীমনি বসন্ প্ৰেমান্তরশ্চিন্তয় স্ব প্রাণৈকধনং কিশােরমিথুনং দ্রক্ষ্যাম্যকস্মাৎকদা। শ্যামাঃ কাশ্চনচন্দ্রিকা রসময়ী গৌরীশ্চ কাশ্চিচ্ছটাঃ পশ্যামি শৃণুয়াঞ্চ শীত মধুরাঃ কাশ্চিম্মিঘাে বাধাঃ । কবে রম্য বৃন্দাবণ্যে, নিকুঞ্জ-নিভৃতে, একান্তে চিন্তিৰ বসি প্রেমাতুর চিতে! আমার জীবন-ধন কিশাের-কিশােরী, অকস্মাৎ পাব দেখা যুগল মাধুরী । কবে শ্যাম-কাঞ্চনের জোছনা উজল রসময়ী ছটা মাখি হইব পাগল। কবে স্নিগ্ধ সুমধুর দুই সম্ভাষণ- গুনিয়া সার্থক হবে তৃষিত শ্রবণ।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক ১০ বৃন্দাবণ্যে কিমপি জনতা দুপ্রবেশং প্রদেশ গত্বা প্রােচ্চৈ নিজদয়িতয়াের্নাম জল্পমুদ। অত্যন্তার্ত্তা বিকলবিকলো দিব্যমূৰ্ত্তা কয়াপি ঐশ্বৰ্ষাজ্ঞারমূগদৃশা বাকসুধাস্বাদিতঃ স্যাং। বৃন্দাবনের জনতাবিহীন দুর নিরজন বনে, নীরবে পশিয়া, নিভৃতে বসিয়া, অরিব পরাণ-ধনে। হা রাধে হা রাধে হা কৃষ্ণ বলি, ঝরিবে নয়নে জল, প্রাণবঁধু লাগি আকুলি-ব্যাকুলি কাদিব গো অবিরল। শুনিয়া আৰ্ত্তি, দিব্য মূর্তি পরমেশ্বরী রাই- হরিণ-নয়না কিঙ্করী তার পাঠাবেন মম ঠাই। আসিয়া সে ধনী সান্ত্বনা-মাখা কহিবে কতই কথা ; শুনিয়া বচন জুড়াবে জীবন, ঘুচিবে সকল ব্যথা। ১০ এতৎ কারুণ্যপুঞ্জং কতিদিনকলিত স্বায়প্রৌঢ়রাধা- কৃষ্ণাদ্যি দ্বন্দ্ব গৃঢ় প্রণয়ভব রসাত্যঞ্জিতােদারদৃষ্ট। শ্রমবৃন্দাবনং মে নিজ পরম চমৎকারিরূপেণ সান্দ্রা- নন্দৌঘস্পন্দি বচ্ছেলিত মধুরিমৈকাণবেনাবিরাস্তাম্। অনন্ত করুণামাখা সৌভাগ্যের সার- কবে বৃন্দাবন হবে আশ্রয় আমার। নিগূঢ় প্রণয়-ভাব-রসে মাতােয়ারা, পরশি যুগলপদ হস্তানহারা। -
বৃন্দাবন-শতক
উদার আনন্দ-ঘন স্বরূপকল্লোলে,
অদ্বিতীয় মধুরিম সিন্ধু যায় চলে ;
উচ্ছলিত বেলা-ভূমি অতি চমৎকার,
কবে আবির্ভূত হবে অন্তরে আমার।
১০৪
কদা সুদৃঢ় ভাবনােদিত নিজেষ্টরূপং মনা-
গপিস্মৃত শরীরকেণ হি রসে প্রবিষ্টোহস্তুতে।
ক্ষণং কিমু মুহূৰ্ত্তকং কিমথ যামমেবাস্থিতে
বহির্গপি মুগ্ধবৎ ব্যবহারামি বৃন্দাবনে ।
সুদৃঢ় ভাবনা-ফলে নিজ ইষ্ট মূর্তি
চিমাঝে ধীরে ধীরে কবে হবে ঘূর্তি!
অসীম অদ্ভুত রসে আবিষ্ট হইয়া,
দেহের সীমানা কবে যাব হারাইয়া।
প্রহরেক তরে, কিম্বা ক্ষণকাল চিত,
অথবা মুহূৰ্ত্ত মাত্র হবে সমাহিত।
সকল হইবেলুপ্ত—মন রবে স্থির
অন্তরে একান্ত হব-লুকাবে বাহির।
।
নান্যদ্বদামি ন শৃণােমি ন চিন্তয়ামি
নান্য জামি ন ভজামি ন চায়ামি।
পশ্যামি জাগ্ৰতি তথা স্বপনেহপি নাৎ
শ্রীরাধিকা রতিবিনােদনং বিনাহং।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
শ্রীরাধার রতিকেলি-বিনােদকানন,
সেই মম ধ্যান-জ্ঞান জীবন মরণ।
আর কোনাে কথা মাের বলিবার নাই,
আর কিছু কথা আমি.শুনিতে না-চাই ;
অন্য রূপ চিন্তা করি নাহি প্রয়ােজন,
অন্য কোনাে দেশে আমি যাবনা কখন ;
বৃন্দাবন বিনা কিছু ভজিতে না-চাই,
এমন আশ্রয় আর ত্রিভুবনে নাই।
জাগরণে নয়নে না নেহারি আন,
স্বপনেও বৃন্দাবন ভাবনা-ধেমান।
“কিং মাং খেদয়সে বিমুঞ্চ বসনং” “তল্লোমেস্মিন্ সুখে
নাগত্য স্বপিহি” “ত্যজ ত্যজ ভুজংশ্লিষ্যামি কান্তে সকৃৎ।”
“আঃ কিং নির্দয় মুঞ্চ মুঞ্চ” “ন কিমপ্যাপীড়য়ে” রাধিকা
কৃষ্ণালাপমিমং কদা মু শৃণুয়াং বৃন্দাটবী কীরতঃ।
“কেন দুখ দাও-অঞ্চল ছাড়”
কহে চঞ্চল রােষে ;
“ৰারেক আসিয়া এ মুখ শয়নে
ওতে কে তামারে দোষে ?”
শুনিয়া মিনতি কহিছে শ্ৰীমতী,
বৰ্দ্ধিত রতি-রাগে,
এমন করিয়া ধরিগােনা হত,
ছেড়ে দাও-বড় লাগে।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
রসের আকর কহিছে নাগর,
ওগাে প্রিয়ে, ভয় নাই ;
একবার শুধু ও-রস-তমুর,
আলিঙ্গন যে চাই।”
রাই কহে “বঁধু, নির্দয় তুমি,
ছাড় ছাড়াই কাজ ;
“বিন্দু বেদনা তােমারে দিবনা”
হাসি কহে রসরাজ।
বৃন্দাটবীর উচ্চ শাখায়
পুচ্ছ নাচায়ে শুক,
হেন রসাল করিবে আলাপ,
শুনিয়া ঘুচিবে দুখ।
১০৭
কদা বা স্বচ্ছন্দং দিনরজনি বৃন্দাবনবনে
চরম্নেকঃ স্বস্ত্যদ্ভুত নব নিকুঞ্জালিষু বিশ।
অকস্মাদেকসৌকীর মধুর কৈশাের সুধয়া
‘ইতাে ন ত্বং যায়’ ইতি মৃদুগিরা বারয়তি মাং।
দিবস-যামিনী স্মৃন্দাবনের বনে বনে বিচরি,
একান্ত মনে ভ্রমিতে ভ্রমিতে নিকুঞ্জে প্রবেশিব।
অদ্ভুত সেই বিলাস-কুঞ্জ-দুয়ারে যাইব যবে,
মৃদুল বচনে নিবারিবে শুক, সুন্দর সুধা রবে-
“ওদিকে যেখােন-ওদিকে যেয়োনা*সে বড় মধুর বাণী !
স্তম্ভিত আমি রহিব দাঁড়ায়ে, জুড়িয়া যুগল পাণি।
বৃন্দাবন-শৃর্তক
১০৮
কদা বা তুষ্ণীকঃ শিথিল সমস্ত ব্যবহৃতিঃ
ত্যজ দীর্ঘশ্বাসং কথমপি গৃহীতৈক কবলঃ।
সদা জাগ্ৰপ্ৰায়ঃ ক্ষণমুদিততদ্রোহতি মধুরং
তদালােকে বৃন্দাবনভুবি নিজপ্রাণমিথুনং।
কবে ছুটে যাবে সব ব্যবহার-কৰ্ম্ম,
মৌন-আচার হবে মরমের ধর্ম ;
যাহা-পাব-তাই হবে উদরের অর্ঘ্য,
বিরহে বহিবে সদা নিশ্বাস-দীর্ঘ ;
জাগ্ৰত-প্রায় ঘুমে হবে যবে তন্দ্রা,.
আনন্দে নেহারিব দুহু-মুখ-চন্দ্রা।
অকস্মাদেকস্মান্নবললিতকুঞ্জুাদ্বত বহি-
ভবৎ স্মিা নব্যং তরুণমিথুনং লৌকিকমিব ।
গতত দূরং দৃষ্টপুনরথ নিবৃত্য স্ব দয়িতো
বিতর্ক স্যাং বৃন্দাবনভুবি মহাপ্রেমবিলয়ঃ ।
কবে একদিন ললিত মােহন কুঞ্জের দ্বারে বসি,
হেরিব তরুণ নবীন মিথুন বাহিরিবে যুগ-শশী ।
ভাবিৰ-এ কোন্ যুবক-যুবতী, খেলা করে রস-অঙ্গে;
এ প্রেম লীলায় দিবনা তো বাধা, কাজ নাই গিয়ে সঙ্গে।
হাসিতে হাসিতে রসিক যুগল সুদূরে যাইৰে যবে,
“এই তো আমার প্রাণের দয়িত”-ঝট করি মনে হবে।
জীবৃন্দাবন-শতক হায় হায় হায়, কোথায় কোথায়? চিনিতে নারিনু ভূলে ! বিরহে ব্যাকুল দিব গড়াগড়ি, বৃন্দাবনের ধূলে। ১১০ কদা পূর্ণজ্যোৎস্নাধবলরজনৌ রাসৰলয়ে চরম্নেকো বৃন্দাবনপতি বিলাস স্মৃতিপরঃ। অকস্মাদানন্দাষুধি লহরি কোলাহলমিব ধ্বনিং দিব্যং বেণােলয়রসনাদেশ্চ শৃণুয়াং। জ্যোছনা-উজোর রাকা-রজনীর কৌমুদী-স্নাত লগনে, কবে দিকে-দিকে ভ্রমিব একেলা,- অলস আবেশ মগনে। বৃন্দাবনের নন্দিত লাস- বিলাস-মাধুরী স্মরিব । আনন্দ-ঘন-অম্বুধি মাঝে শহরের ধ্বনি শুনিব । বেণু-কিঙ্কিনী-ঝঙ্কার মৃদু ভাসিয়া আসিবে পবনে; সােহাগ-জড়িত আধ-বাণী কবে পশিবে ভূষিত অবশে! ১১১ কদা বা কস্যাপি স্ফুটনবকদম্বস্ত বিটপে স্ফুর গােপীভঃ কিমপি কলয়ে স্মেরবদন।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
কদা রাধায়াঃ কুসুমচয় লােলঞ্চ ললিতং
করং, বীক্ষে বৃন্দাবনভুবি লতৌঘে কচিদপি।
বিকসিত নব পুষ্পিত চারু কদম্বতরু-ডালে,
মাধবের মৃদু হসিত ৰয়ান হেৰিব কি কোনাে কালে?
কুসুম চয়নে চঞ্চল গতি মতির হেম কর,
লতা-কুঞ্জের আড়ালে থাকিয়া হেরিব কি মনােহর ?
ইদং মে কিং ভাবি দ্রুতকনকগৌরচ্ছবি হরি-
ন্মণিশ্যামং ধামদ্বয়মিহ মিথােহংসাৰ্পিত ভুজম্।
নিরীক্ষে তৎ স্মেরং মম বহুবিধপ্রেমবিতং
মুখং পশ্চাচ্ছায়াদ্বয়মথ পুরাে মূচ্ছয়তি মাম্ ।
অভাগা আমার কবে,
সৌভাগ্য উদয় হবে,
দিব্য রূপ হেরিব নয়নে ;
গলিত কনকাতি, গােরােচনা রূপ ভাতি,
মরত শ্যামলের সনে।
দুই ভুজ দুই কাধে,
গমন ললিত ছাদে,
মুখে মৃদু মন্দ মন্দ হাসি ;
যুগলবিগ্রহ-কায়া,
সম্মুখে পশ্চাতে ছায়া,
জ্যোতির্ময় রসের বিলাসী ।
নয়নের অভিরাম,
হেরিয়া যুগল ঠাম,
সকল সম্বিত হরাইব ;
মহিমার পায়ায়,
বৃন্দাবনে কবে আর,
প্রেমে মুগ্ধ মুচ্ছিত হইব।
শ্রীবৃন্দাবন-শতক
১১৩
অপি প্রেমােৎকট্যাৎ ক্ষিতিষু বিলুঠৎ স্বং বপুরিদং
করেণ স্পষ্ট। মামনুচরয়তে রাধা প্রিয়যুতা।
অহহ বৃন্দারণেইদ্ভুতমহিমসীমন্যপি সুদু-
ঘঁটাশা কাপ্যেকা সমুদয়তি হ কিং ন ভবিতা।
এমন কি হবে,
প্রেম-গৌরবে
চিত রবে উৎকণ্ঠিত ;
বিরহ-ব্যথায়,
আশা-নিরাশায়,
ক্ষিতিলে হব লুষ্ঠিত।
হেরিয়া আভি,
যুগল মূর্তি
কাছে এসে দিবে সান্ত্বনা ;
কোমল হন্ত
পরশে দুঃস্থ
হিয়ার মিটিবে যন্ত্রণা।
মহিমান্য
বৃন্দারণ্য!
ঘুচাও দুরাশা-ক্রন্দনে ;
হয়ে দিবানিশি
কাটে যেন সেবা-বন্দনে।
যুগলের দাসী
১১৪
কদা বা কালিন্দীতট নিকট বৃন্দাবন লতা
নিকুঞ্জান্তঃ সুপ্তং তদতিসরসং প্রেস্টমিথুন
মিথােগাঢ়শ্লিষ্টং মৃদুমৃদু ময়া লালিতপদং
মুদা বীক্ষে স্বপ্নেপ্যহহ সুখনিদ্ৰাগতমহং ।
শ্রীবৃন্দাবন-শক
#
কবে রে এমন মধুর স্বপন ভাতিবে মানস-পটে,
সুন্দর চারু কুঞ্জ-কানন হেরিব যমুনা তুটে।
আলস-শয়নে অবশ যুগল শায়িত বিলাস সুখে,
ভুজে ভুজে আর বুকে বুকে তার বন্ধন মুখে মুখে।
স্বপনে হেরিয়া সরস মাধুরী হরষে পাগল প্রায়
মৃদু মৃদু কবে ললিত চরণ সেবন করিব হয় ।
১১৫
মহাশ্চৰ্যানন্ত স্বমহিমলাদেব সকলা-
ধমস্যাপ্যাশানাং ব্যতিকরমসম্ভাব্যমপি মে।
কদা বৃন্দারণ্যং স্ববসতিকথামাত্র প্রবহৎ
কৃপাপূরং সপ্রয়তু পরতােহপ্য দজনে।
শ্ৰীবৃন্দাবনে বসতির মতি হেরিয়া আমার প্রাণে,
করুণা-সাগর বৃন্দা-বিপিন তােষিবে কি দয়া দানে ?
কোটি জনমের দুরাশাপুঞ্জ অধমের এ মানসে,
হে মহা অসীম! কর হে পূর্ণ নিজ মহিমার বশে।
১১৬
স্বকৰ্ম্ম স্রোতভিঃ সততমভিতশ্চালিতমমুং
প্রভাে জীবং যত্র চিদপি ন যাত্যন্ত বিবশং।
পরতােবন্মে ভবতু ভবদুঃখার্দিতহৃদে
প্যবিশ্রান্তং বৃন্দাবন পদপরে বাস্তু রসনা।
কৰ্ম্মের ভীম প্রবল প্রবাহ বহিতেছে খরত,
হেরি তাই প্রভু, দীনহীন মাের প্রাণে জাগে বড় ডর।
বৃন্দাবন-শতক
পরবশ এই দুৰ্ব্বার মন, না শুনিয়া মাের কথা,
স্বকৰ্ম্ম স্রোতে বিজন বিপথে খায় যদি যথা-তথা ;
যেন এ রসনা কখনাে ভুলেনা ‘শ্রীবৃন্দাবন নাম,
সংসার-দুখ-তাপিত হিয়ায় এ মাের বাসনা শ্যাম !
১১৭
ন সত্যাখ্যে লােকে স্পৃহয়তি মনাে ব্ৰহ্মপদবীং
ন বৈকুণ্ঠে বিষ্ণোরপি মৃগয়তে পার্ষদতনুং।
পরং শ্রীমদ্বৃন্দাবন সরস ভাবােৎসব বং
নিবাসে ধন্যানাং সুবহু কৃমিজন্মপি মৃগয়তে ।
সত্যলােকের ব্ৰহ্মপদবী, কাজ নাই—কাজ নাই;
বিষ্ণুর ধামে পার্ষদ তনু, বারেক নাহিক চাই।
ব্ৰজের সরস ভাব উৎসবে মগনজনের গৃহে,
কৃমি-কীট রূপে জনমিয়া দেহ ধন্য হইতে চাহে।
১১৮
শ্রীমদ্বৃন্দাবিপিন কুসুমামােদবাহী সমীয়রা
যস্মিন্ দেশে সরতি তদবচ্ছিন্নকৃষ্ণাপ্ততা বা।
যেষাং বৃন্দাবনমন্ত সকৃৎ গ্রীবয়া সন্নতং বা
তত্রৈবাস্তাং মম খলু জনি হন্ত তেষাং গৃহেপি।
বৃন্দাবনের কুসুম গন্ধ, মন্দ মলয়া বাহি,
যে-দেশে ছড়ায় সৌরভ রাশি, সে-দেশে জনম চাহি।
পূর্ণ যুবতি কালিন্দী সতী লােল তরঙ্গ তুলি,
যেই দেশ দিয়া যায় গাে বহিয়া, হব সে দেশের ধূলি।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
বারেক যে-জন, স্মরিয়া এ বন, অবনত করে শির ;
জনমে জনমে তার ঘরে যেন, জনময়ে এ শরীর।
মমাপি স্যাদেতাদৃশমপি দিনং কিছু পরমং
যদা বৃন্দাটব্যাঃ কথমপি কৃতস্পর্শনমপি।
অহহ দেহং দুরাদপি সমবলােক্যাপি জনুষাং
মুহুধন্যং মধ্যে ধরণিপতিতস্যাং কৃতনতিঃ ।
অভাজন এই হীনের ভাগ্যে হবে কি এমন দিন ?
কোনাে মতে গিয়া পরশিব করে রসময় সে বিপিন ?
দূর হতে হেরি কুঞ্জ-সুষমা ধন্য হইব কবে?
ব্ৰজের ধূলায় কুণ্ঠিত তনু প্রেমে লুষ্ঠিত হবে।
১২০
যপি চ মম নাস্তি শ্রীলবৃন্দাবনীয়ে
মহিমনি ম সমাের্ধে হন্ত বিশ্বাসগন্ধ।
যদপি মম ন তস্মিন্নাস্তি বাসৈষণাপি
প্রসরতু মম তাদৃশ্যের বাণী তথাপি |
বৃন্দাবনের অসীম মহিমা -নাহি তুলনার ঠাই,
যদিও আমার সে মহান্ ধামে তিল-মাষা রতি নাই ;
নিরজন চারু গহন কাননে নিবসিতে অনুরাগে,
যদিও সতত একান্ত সাধ অন্তরে নাহি জাগে;
তথাপি রসনা নিশি-দিন যেন ফুকারে গে৷ অবিরাম
জয় জয় জয় বৃন্দা-বিপিন-জয় ছয় ব্রজধাম।
;
বৃন্দাবন-শতক ৯৭ Ml- অচৈতন্যপ্রায়ং জগদিদমহাে সৰ্ববিদপি প্রথীয়ঃ শ্ৰীবৃন্দাবন মহিম বীজাজ্জনি মতিঃ। অহো ভাম্যদৃষ্টা বিবিধসদসৎ বসু তথা ন পূর্ণং স্যাচ্চিত্তং পমিহ নিষেবে পদরজঃ। কত পথ কত মত ঘুরিয়াছি ভাই, কোথাও মিলেনি স্নিগ্ধ জুড়াবার ঠাই। জগৎ চৈতন্থহীন মােহে নিমগন, ত্রিভুবনে নাহি হেরি পূর্ণ জাগরণ। একান্ত বাসনা তাই-হােক প্রজে রতি, হৃদয়ে জাগুক পদ-রজ-সেবা-মতি। ১২২ হা বৃন্দাবন হ মহারসময় প্রেমৈকম্পন্নিধে। হা রাধারতিনাগরস্মরকলাসাক্ষি মদেক প্রিয়। হা রাসেশ্বর বিশ্বমূৰ্ছন লতাবল্লীখগাদ্যদ্ভুত ! শ্ৰীমন্ হা প্রকৃতেঃ পরাদপি পর। ত্বং মে গতি স্বংগতিঃ ॥ মহারসময় হে বৃন্দাবন ! প্রেম-সম্পদ-নিধি । রাধা-নাগরের-লীলা-চাতুরীর-দর্শক-নিরবধি ! হে আমার প্রিয় ! হে রাসেশ্বর ! হে ভুবন-বিমােহন। অদ্ভুত-তরু-লতা-বিজড়িত হে শোভার নিকেতন ! বিহগ-কাকলি-মুখরিত বন। প্রকৃতি-জিনিয়া ভাতি! তুমিই আমার গতি ওহে ধাম! তুমিই আমার গতি। ৭
বৃন্দাবন-শতক
নমােপ্ত বৃন্দাবন সুন্দরাভ্যাং
নমােস্ত বৃন্দাবন বিভ্রমাভ্যাম্।
নমােস্তু বৃন্দাবন জীবনাভ্যাং
নমােস্ত বৃন্দাবন নাগরাভ্যাম।
বৃন্দাবনের সুন্দরতম
যুগলে নমস্কার।
নদন-শাসিত-বেশ-বিভ্রম
যুগলে নমস্কার।
বৃন্দা-বিপিন-জীবন-মাধুরী
যুগলে নমস্কার।
তরুণ-দিব্য-নগর-নগরী
যুগলে নমস্কার।
১২
নমােস্ত বৃন্দাবন সৎকৃপাভ্যাং
নমােস্ত বৃন্দাবন সদ্ৰসাভ্যাম্।
নমােস্তু বৃন্দাবন পূর্ণতাভ্যাং
নমােপ্ত বৃন্দাবন গােচরাভ্যাম্।
বৃন্দাবনের পরম করুণ
যুগলে নমস্কার।
বৃন্দাবনের রসিক মিথুন
যুগলে নমস্কার ।
শ্ৰীবৃন্দাবন-শতক
বৃন্দাবনের পূর্ণিমতি
যুগলে নমস্কার।
চির-প্রকটিত-ব্যক্ত-মুরতি
যুগলে নমস্কার।
১২৫
বৃন্দাবণোত্তমং নাস্তি নাস্তি মত্তোহধমঃ চিৎ।
রাধানামঃ প্রভাবেণ যদি স্যান্মেলনং তয়োঃ ।
স্বর্গে মর্ত্যে উত্তম নাই বৃন্দাবনের সম ;
সীমাহীন এই ত্রিভুবন মাঝে আমি রে অধম-তম।
‘রাধা রাধা নাম জপিতে জপিতে যদি কৃপা-ধারা বয়,
হীন অধমের উত্তম সনে তবে সে মেলানি হয়।
শ্ৰীমন্দাবনেশ্বৰ্যাঃ সন্নামৈক মঙ্গলং।
সাশ্চৰ্যানন্ত শক্তি মুখে বিজয়ং মম।
শীবৃন্দাবন-অধিশ্বরীর এক মঙ্গল নাম,
অতি অদ্ভুত অনন্ত রতি-শক্তির পূত ধাম।
একবার শুধু মলিন বয়ানে হােক সে নামের ধ্বনি।
বিজয়-যুক্ত-নামের নিনাদে ত্রিভুবন মাহি গণি।
শ্রীবৃন্দাবন-শহৰু,
বন্দনা
বৃন্দাবনের জয় দেহ ভাই,
বৃন্দাবনের জয়।
রাধামাধবের আদরের ঠাই
বৃন্দাবনের জয়।
নন্দন-দেববন্দিত-বাম
বৃন্দাবনের জয়।
রাগ-রূপ-রস-গন্ধ-বিরাম
বৃন্দাবনের জয়।
নব-রস-রাস-বিলাস-কুঞ্জ
বৃন্দাবনের জয়।
পুস্পিতকম-কুসুম-পুঞ্জ
বৃন্দাবনের জয়।
তরুছায়াময়-স্নিগ্ধ-সুষমা
বৃন্দাবনের জয়।
লতা-বীথি-ঘেরা চারু মনোরম
বৃন্দাবনের জয়।
স্বর্ণ-পাংশু-তনু-বিলেপিত
বৃন্দাবনের জয়।
কালিন্দী-কল-নাদ-নিনাদিত
বৃন্দাবনের জয়।
কোকিল-কাকলি-কলা-আকুলিত
বৃন্দাবনের জয়।
শ্ৰন্দাবন-শতক
.
ময়ূর-কলাপ-নৃত্য-কলিত
বৃন্দাবনের জয়।
শত শুক-শাৰী-গীত-মুখরিত
বৃন্দাবনের জয় )
সু-মৃগ-ধেৰিচরিত
বৃন্দাবনের জয়।
আভীর-কামিনী-কামনার ধন
বৃন্দাবনের জয়।
আবীর-অগভূষিত-কানন,
বৃন্দাবনের জয়।
পিরীতি-মূৰতি শ্ৰীমতীর ছায়া
বৃন্দাবনের জয়।
উজ্জল-হেম-নীলমণি-মায়া
বৃন্দাবনের জয়।
সুন্দর-চির সুন্দরতম
বৃন্দাবনের জয়।
নন্দিত-ঘন-প্রেম-অনুপম
বৃন্দাবনের জয়।
প্রবধানন্দ-রচিতছন
বৃন্দাবনের জয়।
দীন-দরবেশ-ভাষা-নিবন্ধ
বৃন্দাবনের জয়।
=
বৃন্দাবন-শতক
ফরিদপুরের মাঝে শ্রেষ্ঠ গণ্ডগ্রাম,
মাদারিপুরের থানা নহে দূরতর ;
জয় জয় জন্মভূমি খালিয়া যে নাম,
বহিছে কুমার নদ শান্ত মৃদু-স্বর।
মাতা রসময়ী দেবী, কুলচন্দ্র পিতা,
ঈশ্বরী-ঈশ্বর যেন ব্যক্ত মোর তরে ;
প্রেয়সী সরেজবালা সতীপতিব্রতা,
জন্ম মম চট্টো কুলে কুলীনের ঘরে।
দেবতা গ্রজ ঐশ, ভগ্নী গিরিবালা,
যাদের স্নেহের স্মৃতি জুড়ায় পরাণ ;
সংসারে ছিলনা দৈন্য, কিম্বা সুখ ঢালা,
এ মাের বীণায় জাগে আনন্দের গান
প্রাণের পবিত্রতম প্রীতি-পরিবার,
দেবতা বিজয়কৃষ্ণ প্রেম-অবতার।
দরবেশ গ্রন্থাবলী
০ ০ ০
০
০ ০ ০
বিজলী সঙ্গীত ( ৪র্থ সংস্করণ)
০
•০০
•••
গানের খাতা
fo
ly০
কাবেরী (কবিতা)
কপঞ্জী (গুরু নানক বিরচিত)
সঙ্গীত-সুধা (ভগবান বিজয়কৃষ্ণ বিরচিত)
মন্দির ( গীতিকাব্য)
no
১০
• ০।
jo
# ০ ০
সাম-সন্ধ্যা-গাথা।
কলিকাতা গুরুদাস লাইব্রেরী
কাশী যােগামে গ্রন্থকারের
নিকট পাওয়া যায়।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.