Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prabhabati Kabya
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রভাবতী কাব্য।
( দৌলতপুর হিন্দু একাডেমীর ইতিহাস ও বাঙ্গালা
সাহিত্যের অধ্যাপক শ্ৰীযুত সতীশচন্দ্র মিত্র
বি, এ, লিখিত ভূমিকা সম্বলিত।)
“মালঞ্চ” রচয়িতা
শ্ৰীখগেন্দ্রনাথ বসু প্রণীত।
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায়
বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরী
২১ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, কলিকাতা।
মুল্য দশ আনা।
গ্রন্থকার কর্তৃক পুস্তকের
সমস্ত স্বত্ব সংরক্ষিত
কলিকাতা
৬০ নং মৃজাপুর স্ট্রীট,
বণিক যন্ত্রে
সত্যচরণ দাস দ্বারা মুদ্রি ।
“ন স্বর্গং নাপবর্গং বা কাময়ে জগদীশ্বর। সেবকং জন্মভূমে মাং কুরু জন্মনি জন্মনি।”
No text on this page.
উৎসর্গ স্বর্গীয় নিবারণচন্দ্র বসু পিতৃদেব মহােদয়ের শ্রীচরণােদেশে— পিতঃ ! ; সে আজ কত দিনের কথা—তােমার পদ্মকরে অর্পণ করিবার জন্য আমি এই কুসুমের মালা কত যত্নে গাথিয়াছিলাম ; আজ তাহাই লইয়া উপস্থিত হইয়াছি। কিন্তু আজ তুমি কোথায়? আমি তােমার অধম সন্তান ;-অধমের পূজা লইবে না বলিয়াই বুঝি পূর্ব হইতে কোথায় কোন্ বহু দূর দেশে চলিয়া গিয়াছ, আর ফিরিয়া আসিবে না। আজ এ দুঃখ কোথায় রাখিব ? তুমি নাই, মনে হইলে বুক ফাটিয়া যায়। চারিদিক হইতে সংসারের নানা বিপদে জড়িত হইয়াও তুমি পর্বতের ন্যায় অচল, অটল থাকিয়া আপন কর্তব্য সাধিয়া গিয়াছ, তাই মনে হয়—তুমি মানব ছিলে না ; স্বর্গের কোন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শাপভ্রষ্ট হইয়া এই ধরাতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলে—যে কার্যের জন্য আসিয়াছিলে, তাহাই সম্পন্ন করিয়া আবার চলিয়া গেলে। তুমি চলিলে কিন্তু আমরা তােমার সংসারানভিজ্ঞ অকৃতী সন্তান-
১/০
গণ-আমাদিগকে অকূল পাথারে ভাসাইয়া চলিলে। পুণ্যভূমি
স্বর্গধামে বসিয়া আশীর্বাদ কর আমরা যেন মানুষ হই তােমারি
মতন সমুহ বিপদকে উপেক্ষা করিয়া কৰ্ত্তব্যকর্মে স্থিরপ্রতিজ্ঞ
হই—যেন আমাদের দ্বারা তােমার সুনামের অবমাননা না হয়।
ইতি,
গুণমুগ্ধ
খগেন্দ্র নাথ।
ভূমিকা।
যে সুন্দরবনের নামে আজ আতঙ্ক উপস্থিত হয়, তাহার
অনেকস্থল একসময় সুন্দর বনশােভায় বিভূষিত ছিল।
এ সুন্দরবন যে কতবার উঠিয়াছে পড়িয়াছে, তাহা বলা
যায় না। তবে একবার যেমন উঠিয়াছিল, তেমন আর উঠে
নাই। সে আজ তিন শত বৎসরের কথা। সুন্দরবন তখন
অরণ্যবহুল হইলেও, সম্পূর্ণ জনকোলাহলশূন্য ছিল না।
যখন পাঠান রাজত্ব যায় যায়, মােগল অধিকার আসে নাই,
তখন একদা বঙ্গের শেষ পাঠান-নৃপতির প্রধান অমাত্য
বিক্রমাদিত্য গৌড়ের ধনরত্ন সহ সুন্দরবন প্রদেশে আসিয়া
রাজার মত বসতি নির্দেশ করেন। এদিকে পাঠানদিগকে
বহুযুদ্ধে হটাইয়া, উড়িষ্যা অঞ্চলে পাঠাইয়া বাদশাহ আকবর
বঙ্গের বক্ষে বিজয় কেতন উড়াইয়া দেন, তখন বিক্রমাদিত্যের
পুত্র প্রভূতবিক্রমশালী প্রতাপাদিত্য এক প্রকার ছলে বলে
পিতার সিংহাসন লাভ করিয়া, নদীবহুল অরণ্যসঙ্কুল যশাের
প্রদেশে এক শক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। গৌড়ের সমৃদ্ধিগৌরবে
প্রাচীন যশাের তখন “যশােহর” নামের উপযুক্ত হইল এবং
প্রতাপের বলদৰ্পে তাহার রাজ্যের সীমা ক্রমে দূরে সরিয়া যাইতে
লাগিল।
1. দানা হয়, বঙ্গদেশে বহুদিন কেহ স্বাধীনতার আস্বাদন পায় নাই। শর্করার সরবতে যখন মিছরীর দানা ( crystal ) বাধিতে লাগে, তখন দেখা গিয়াছে, প্রথম একটি ক্রমে ঐ ঘন সরবত হইতে দানার পর দানা আসিয়া প্রথম দানাটির গায়ে লাগে এবং পরিশেষে সরবতের সমস্ত শর্করা মিছরীপিণ্ডে পরিণত হইয়া যায়। মানুষের ইতিহাসে শক্তিসঞ্চয়ও এই ভাবে হইয়া থাকে। কোন জনস্থানে প্রথমে একজন শক্তিশালী বীরপুরুষ দণ্ডায়মান হন, ক্রমে তাঁহার প্রতিবেশীর ভিতর হইতে বীরের পর বীর আসিয়া তাহার পাশ্বভুক্ত হইতে থাকেন। ক্রমে যে প্রদেশ দৰ্দরবৎ নিরীহ প্রজাপুঞ্জে পূর্ণ ছিল, তাহাই এক বারের রণক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রতাপাদিত্যের মন্ত্রশক্তিতে যশােহরে এক বীরত্বের কেন্দ্র গঠিত হইয়াছিল। পাঠান-বিজয়ী মােগল- প্রতাপ তাহাতে বাধা প্রাপ্ত হইয়া স্তম্ভিত হইয়াছিল। প্রদেশ ব্যানক্রের বক্রপ্রতাপে অগম্য ছিল, তাহাই এখন প্রতাপাদিত্যের প্রবল প্রতাপে শত্রুর পক্ষে দুর্ভেদ্য হইয়া পড়িল। গর্বভরে সুন্দরবন আবার উঠিল। স্বাধীনতার মন্ত্র চারিদিকে গীত হইতে লাগিল। এই মন্ত্রবলে মাতা, ইষ্টদেবতা এবং স্বদেশ—এই তিন জননী মিশিয়া একীভূত হইয়া যান ; ললাকে সংসারধর্ম ও ধৰ্মকৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া একমাত্র স্বদেশ-জননীর পদপ্রান্তে সমস্ত ধৰ্ম্ম উৎসর্গ তখন অপূর্ব-মাতৃমন্ত্রে হৃদয়যন্ত্র ঝঙ্কার দিতে লাগে ।
সে ঝঙ্কার-প্রবাহে মানবের যাবতীয় নীচতা, সংকীর্ণতা ও স্বার্থ- পরতাকে একেবারে ডুবাইয়া ফেলে। শক্তির সঙ্গে সঙ্গে দেবচরিত্র অবতীর্ণ হয়; তখন শুধু বীরত্বে নহে, পদে পদে দেবত্বে মানুষের বিশেষত্ব লক্ষিত হয়। এই জন্য স্বাধীনতার যুগকে সুবর্ণ যুগ বলে। রাজকীয় স্বাধীনতার জন্যই যে সকল লােক লালায়িত তাহা নহে। প্রাচ্যদেশে এমন অনেক কৰ্ম্মনিরস্ত পুরুষ আছেন, তাঁহারা ধৰ্ম্মলিপ্ত থাকিতেই ভালবাসেন। তাহারা রাজনৈতিক স্বাধীনতার কপালে কি হয়, তৎপ্রতি লক্ষ্য করেন না। তবে স্বাধীনতার আনুষঙ্গিক ফল অতীব মূল্যবান। ইহার জন্য নীচত্ব যায়, দেবত্ব আসে; স্বার্থপরতা আত্মােৎসর্গে পরিণত হয় ; ধর্মের অনুষ্ঠান ও ভাষার সম্পদ বাড়ে; ক্ষুদ্র গৃহপ্রাঙ্গনের গণ্ডী ছাড়িয়া মনুষ্যপ্রীতি সমস্তদেশে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে। দেশের প্রতি মমতার সঙ্গে যখন সকলের উদ্দেশ্যের সমতা উপস্থিত হয়, তখন এক অপূর্ব প্রেমের টান ও স্নেহের বন্ধন আত্মপর ভেদজ্ঞান রহিত করিয়া ফেলে। অমনি মানবের ভাবরাজ্যে শান্তি ও প্রীতির মধুর হিল্লোল বহে। স্বাধীনতা চাহিলেও স্বাধীনতার এই সুফলরাজি কে না চাহে ? প্রতাপ যে স্বাধীনতার মন্ত্র শুনাইলেন, তাহার ফলে এইরূপ বহু সুফল ফলিয়াছিল। দেশময় এক হৃদয়ের প্রশান্ত ও মস্তিষ্কের উর্বরতা জাগিয়াছিল। দক্ষিণবঙ্গের ভাগ্যে তেমন যুগ আর আসে নাই। সুতরাং সে যুগের ইতিহাস যেভাবে যেখানে ;
৯/০ লখিত হউক না কেন, তাহা বঙ্গবাসীর শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিবার যােগ্য। প্রতাপের প্রসঙ্গ লইয়া এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে না হউক, বাঙ্গালাভাষায় অনেকগুলি পুস্তক লিখিত হইয়াছে। সেকালের সেই “মন্ত” পুস্তক “বঙ্গাধিপ পরাজয়” হইতে আরম্ভ করিয়া রবীন্দ্র নাথের “বৌঠাকুরাণীর হাঠ” ও শ্ৰীযুক্ত হারাণচন্দ্র রক্ষিতের “বঙ্গের শেষ বীর” নামক উপন্যাসগুলিতে প্রতাপপ্রসঙ্গে প্রকৃত ও আরােপিত অনেক কথা আছে। রামরাম বসু ও মৃত্যুঞ্জয়ের জীবন চরিত এবং ঘঠক কারিকার অনেক কীৰ্ত্তি তালিকা শ্ৰীযুক্ত সত্যচরণ শাস্ত্রীর “প্রতাপাদিত্য চরিতে” পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। অবশেষে প্রসিদ্ধ অবশেষে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক শ্ৰীযুক্ত নিখিলনাথ রায় তৎপ্রণীত “প্রতাপাদিত্যে” দেশী বিদেশী নানাভাষা হইতে প্রতাপসম্পর্কীয় যাবতীয় তথ্য ও দলিলাদি সংগ্রহ করিয়া দিয়া সাধারণের অশেষ কৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছেন। ক্ষীবােদ বাবুর “প্রতাপাদিত্য” নাটক বঙ্গবীরগণকে প্রকাশ্য নাট্যমঞ্চে অবতীর্ণ করাইয়া ঘন ঘন করতালি শুনাইয়াছে। প্রায় ৩০ বৎসর পূর্বে “বঙ্গের বীর পুত্র” নাম দিয়া শ্ৰীযুক্ত যােগেন্দ্রনাথ ঘােষ এবিষয়ে একখানি ‘মহাকাব্য” রচনা করেন। আমার প্রিয়তম ছাত্ৰ শ্ৰমান্ খগেন্দ্রনাথ বসু সেই একই প্রসঙ্গে এই “প্রভাবতী কাব্য রচনা করিয়াছেন। আমাদের দেশে একটা কথা আছে মহাভারতের কথা- মাত্রেই অমৃত সমান। বিষয় ভাল হইলে, তদবলম্বনে যাহা লেখা যায়, তাহাই ভাল। সুতরাং বিষয়গৌরবে এই ক্ষুদ্র
Top
কাব্য সমাদর পাইতে পারে। কাব্যরচনা দুরূহ ব্যাপার,
বিশেষতঃ অমিত্রাক্ষর ছন্দে। শ্ৰীমান্ খগেন্দ্রনাথ চেষ্টা
করিয়াছেন, কিন্তু সে প্রথম চেষ্টা। সে চেষ্টা সফল হইয়াছে
কি না, পাঠকগণ বিবেচনা করিবেন। সে বিষয়ে আমার মন্তব্য
পক্ষপাতদুষ্ট বলিয়া পরিত্যক্তও হইতে পারে। তবে তার
চেষ্টা যতটুকু সফল হয়, তাহাই আমাদের আনন্দের বিষয় এবং
উদীয়মান কবির গৌরবের কথা।
একাব্যের প্রধান দ্রষ্টব্য প্রভাবতীর চরিত্র। সে অতি
অপূৰ্ব চরিত্র। স্বাতিনক্ষত্রের বারিপাতের মত যে স্বাধীনতার
মন্ত্রে রত্নের সম্ভব করিয়া থাকে, তাহাতেই প্রভাবতীর চরিত্র
রত্ন গড়িয়াছিল। নবীনবয়সে অসম্ভব স্বার্থত্যাগ, কুসুম-কোমল
দেহে কঠোর দৃঢ়তা, বঙ্গরমণীর রণক্রীড়া এবং সর্বশেষে
অতৃপ্ত লালসা লইয়া স্বদেশের জন্য, জননীর জন্য, বীর প্রণয়ীর
পার্শ্বে অন্তিম শয্যা—ইহাই প্রভাবতীর চরিত্রকে সমুজ্জ্বল করিয়া
রাখিবে। নারীহৃদয়ে দেবপ্রকৃতি না জাগিলে, জাতীয় জীবন
জাগে না।
দৌলতপুর কলেজ।
সতীশচন্দ্র মিত্র।
২১শে শ্রাবণ, ১৩১৯।
No text on this page.
গ্রন্থকারের নিবেদন।
চারি বৎসর পূর্বে যখন দৌলতপুর কলেজে অধ্যয়ন করিতাম,
তখন আমাদিগের বাঙ্গলা সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন শ্রীযুক্ত
সতীশচন্দ্র মিত্র ; তাহারি প্ররােচনায় প্রথম কবিতা লিখিতে
শিক্ষা করি এবং বলা বাহুল্য তাহার ফলে আমার এই
ক্ষুদ্র কাব্যের উৎপত্তি। সুতরাং কাব্য-শৈলে এই আমার প্রথম
আরােহণ; পদে পদে পদঙ্খলন হইবারই সম্ভাবনা অধিক; পাঠক
মহােদয়দিগের নিকট সে জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
এই ক্ষুদ্র কাব্যখানি যখন লিখিত হয়, তখন স্বপ্নেও ভাবি
নাই যে, ইহা কোন দিন লােক সমাজে প্রকাশ করিতে পারি,
বিশেষতঃ নাটক-উপন্যাস-প্লাবিত-বঙ্গদেশে আমার ন্যায় ক্ষুদ্র
ব্যক্তির কাব্য প্রকাশের কোনও প্রয়ােজন আছে, ইহা আমার
ধারণাই ছিল না। সুতরাং বাক্সের এক কোনেই ইহার পাণ্ডু
লিপির স্থান নির্দিষ্ট হইয়াছিল। পরে কতিপয় বন্ধুর অপ্রত্যাশিত
অনুরােধে এহেন অসমসাহসিক কার্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছি।
এইক্ষণে পাঠক সমাজে আদর লাভ করিলে সকল শ্রম সার্থক
জ্ঞান করিব।
• প্রভাবতী চরিত্র গ্রন্থকারের স্বকপােল"কল্পিত সুতরাং ইহার
জন্য কেহ ইতিহাসের খােজ না করেন ইহাই অনুরােধ। পুস্তকের
ঐতিহাসিক ভাগ শ্ৰীযুত সত্যচরণ শাস্ত্রী এবং শ্ৰীযুত ক্ষীরােদপ্রসাদ
. বিদ্যাবিনােদ মহাশয়দ্বয়ের গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত হইয়াছে। এই জন্য ঐ দুই মহাত্মার নিকট আমি বিশেষ ভাবে ঋণী। এই পুস্তক প্রকাশ সম্বন্ধে বন্ধুপ্রতিম শ্ৰীযুত জিতেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত আমার জন্য প্রাণান্ত করিয়া পরিশ্রম করিয়াছেন, তার পরে অগ্রজ স্থানীয় সুহৃদ শ্ৰীযুত নীরদরঞ্জন সেন কাব্যতীর্থ সাস্থ্যতীর্থ মহাশয় ইহার আদ্যন্ত প্রফ শিট সংশােধন করিয়া আমার যথেষ্ট উপকার করিয়াছেন, সে জন্য আমি উক্ত দুই মহাত্মার নিকট চির কৃতজ্ঞ আছি। পরিশেষে, যিনি আমার পথপ্রদর্শক ও উৎসাহদাত, দৌলত- পুর কলেজের ইতিহাস এবং বাঙ্গলা সাহিত্যের সেই সুযােগ্য অধ্যাপক শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র মিত্র বি, এ, মহােদয় এই পুস্তকের ভূমিকা লিখিয়া দিয়া আমাকে কৃতার্থ করিয়াছেন, এজন্য আমি তাঁহার নিকট চিরদিনের জন্য ঋণগ্রস্ত হইয়া রহিলাম । সর্বশেষে বক্তব্য—আমাদের আন্তরিক চেষ্টা সত্বেও কয়েকটি ভ্রম প্রমাদ রহিয়া গেল। পরবর্তী সংস্করণে তাহা সংশােধন করিবার প্রয়াস পাইব। কলিকাতা শ্রীখগেন্দ্রনাথ বসু শ্রাবণ ১৩১৯। নিস -৮০ ছু, শখ
সূচীপত্র।
বিষয়।
পৃষ্ঠাঙ্ক।
২৫
প্রথম সর্গ—যুবক যুবতী
দ্বিতীয় সর্গ-বিদায় গ্রহণ
তৃতীয় সর্গ-প্রভাবতী
চতুর্থ সর্গ—অগ্রা দরবার
পঞ্চম সর্গ-কল্যাণী
ষষ্ঠ সর্গ-শঙ্কর
সপ্তম সর্গ—মুক্তিযুদ্ধ
অষ্টম সর্গ—কলঙ্ক
নবম সর্গ--বাসনাপূরণ
দশম সর্গ-স্বর্গারােহণ
৬১
০০০
এ এ এ
१२
৮৮
::
...
.
. . .
প্রভাবতী কাব্য।
প্রথম সর্গ।
যুবক যুবতী।
"There be none of Beauty's daughters
With a magic like thee;
And like inusic on the waters
Is thy sweet voice to me :19
George Gordon, Lord Byron.
দিবা অবসান, নেমে আসে সন্ধ্যাদেবী
কোন স্বর্গরাজ্য হতে যশাের নগরে
ইচ্ছামতী নদীতীরে ; তার চারু ছবি
পড়িয়াছে পুণ্যতাে তটিনীর পরে।
ওই ডােবে পশ্চিম-আকাশ-সিন্ধুমাঝে
নলিনী-বিলাসী ; রক্তবর্ণ আভা তার
ইচ্ছামতী-বীচি-পরে মনােহর সাজে,
বায়ুসনে খেলিয়া বেড়ায় ; (কি সুন্দর !)
অনুকূল স্রোতমুখে তরীগুলি দিয়া
ওই যায় মাঝিগণ সঙ্গীত গাহিয়া।
প্রভাবতী কাব্য
যখনি ডুবিল রবি-পূরব আকাশে,
কুমুদরঞ্জন শশী কৰ্তব্য লইয়া
হইলা উদয়, (সুখে ধরাবাসী হাসে,
আনন্দে করিল নৃত্য কুমুদিনী-হিয়া)।
বৃক্ষপত্র মধ্যদিয়া কঁচা হরিদ্রার
সম, সমুজল কান্তি পড়ে নদী’পরে ;
আদিত্যের শেষ কর সঙ্গে মিশি তার
অপূর্ব মােহন এক দৃশ্য সৃষ্টি করে,
‘জলে পরিপূর্ণ’ আর নাহি যায় দেখা,
হয়েছে গলিত এক সুবর্ণের রেখা।
নদীতীরে উদ্যান মাঝারে ফুটিয়াছে
কত ফুল, ফুটিতেছে কত বৃদ্ধি করি
কাননের শােভা ; কত বা আবার আছে
আচ্ছাদনে মুখ ঢাকি যথা কুলনারী।
গুণ, গুণ,
করি শুধু শেষবার তরে
আসে ধেয়ে শিলীমুখ, যায় সে ত্বরিতে
গুষ্ঠিতার কাছে ; হতাশ হইয়া ফেরে ;
ভাবে “একি বিড়ম্বনা ?” পারে কি তিষ্ঠিতে
কভু সতী সন্নিকটে পাপাত্মা বর্বর ?
তার কাছে সতীতেজ শত সূৰ্যকর।
(২)
প্রথম সর্গ।
;
কে রমণী ওই ? কেন সাজের বেলায়
আসিয়াছ উদ্যান মাঝারে তুমি ? কই
কোন্ প্রয়ােজনে এবে এসেছ হেথায় ?
নারিনু বুঝিতে ; দেবী না মানবী? লহ
গুণ, ত্যজ অপরাধ, কে তােমার পাশে
অনিন্দ্য সুন্দর মুর্তি যুবক প্রর?
এসেছ ত্রিদিব হ’তে, কহ কোন্ আশে
পুষ্পেষ্ঠানে ? বল কে পাঠাল ধরাপর ?
অচঞ্চল,-কারুমুখে কথা নাহি পাই,
ব্রজে রাধাকৃষ্ণ, শুধু বাঁশী সঙ্গে নাই।
(পরিণয়-সূত্রে
বহুক্ষণ পরে তবে সস্নেহে বলিলা
যুব,—সূৰ্য্যকান্ত, সহচর প্রতাপের
যেই আবদ্ধ আছিল।
প্রভাবতী সনে)-“প্রিয়ে রাত্রি হ’ল ঢের ;
নির্বাক, নিস্পন্দ এবে রহিলে দাঁড়ায়ে ;
মুখে মাত্র কথা নাই—ইন্দ্রজাল দিয়া
কে যেন রেখেছে তােমা নির্বাক্ করিয়ে,
পথ চেয়ে পিতা তব আছেন বসিয়া ;
নিস্তব্ধতা ল’য়ে নিশি বাড়িতেছে ক্ৰমে ;
একবার শুধু, কথা কও প্রিয়তমে।
(৩)
;
;
প্রভাবতী কাব্য।
“শুনিতেছি পরষ্পর,—আগ্রা দরবারে
সম্রাটের কাছে শীঘ্র যাবেন কুমার
কূটরাজনীতিশাস্ত্র শিখিবার তরে,
তাই যদি হয়,
প্রিয়ে, জানিও --আমার
যেতে হবে সাথে, কবে যে আসিয়া ফিরে
নেহারিব ও মূরতি--সুতান বীণার
শুনিব কৌতুকে—পারি না বলিতে।” ধীরে
মিশিল বাতাস সনে কণ্ঠস্বর তার,
নিঃশব্দে দাঁড়ায়ে দোহে ইচ্ছামতী তীরে,
বলিতে লাগিলা পরে প্রভাবতী ধীরে। -
“আগ্রা দরবারে তবে যাবেন কুমার
কূটরাজনীতিশাস্ত্র শিখিবার তরে?
তুমিও তথায় নাথ, যাবে সাথে তার ?”
ক্ষণেক নিস্তব্ধ থাকি হায় রুদ্ধ করে
ভাবী বিচ্ছেদের অশ্রু, লাগিলা বলিতে।
“শুনি এ বারতা নাথ, তব মুখে আজ
হইনু সুখিনী, বঙ্গ জননীর হিতে
সর্বদা সচেষ্ট থাকা সন্তানের কাজ,
গাত্র-অলঙ্কার তার করিতে হরণ
সবেগে ধাইয়া ওই আসিছে যবন।
(৪)
প্রথম সর্গ
“বস্তুতঃ বঙ্গের আজি উপস্থিত ঘাের
দুরদিন, চারিদিকে পীড়িছে যবন
শান্ত প্রজাগণে, কোন দিনে হায়, ভাের
হবে তার দুঃখ নিশা-উদিবে তপন
লইয়া শান্তির কর—কে পারে বলিতে ?
বিক্রম-আদিত্য অহহ ধাম্মিক নৃপতি
সর্বথা চেষ্টিত এবে অরাতি নাশিতে,
কিন্তু হায় এবে বিধি বাম তার প্রতি ;
তাই আজি যবনের এত অত্যাচার,
তাই আজি প্রজাবৃন্দ করে হাহাকার।”
;
পারে না বর্ণিতে আর হৃদি বিদ্ধকর
যবনের অত্যাচার ; যুবা বিনােদিনী
সহসা থামিয়া গেল,-নয়ন তঁাহার
বাষ্পে পূর্ণ হ’ল, গিরি-হৃদে স্রোতস্বিনী
সম ঘৰ্ম্মধারা দেহে বহিতে লাগিল
জিজ্ঞাসিলা সূৰ্য্যকান্ত,-“হায় প্রিয়ে কেন
যে বীণা শশাকের তান গুঞ্জরিতেছিল,
ছিড়ে গেল তন্ত্রী তার অসময়ে হেন ?
প্রভাবতী, নিরুত্তর। কি কবে উত্তরে ?
লজ্জাবতী লতা যেন নত লজ্জাভরে।
(৫)
প্রভাবতী কাব্য
“নিরুত্তর,” হায় বীর যুবক বুঝিতে
পার না-অবােধ ।--বীণা বাজিবে কেমনে,
ছিড়ে গেছে তন্ত্রী যার? পারে না বাজিতে ;
পুনরায় যুবাবর সস্নেহ বচনে
আরম্ভ করিতে যায়, হেন কালে তাঁর
কমনীয় মুখপানে দেখিল চাহিয়া
একবিন্দু নেত্রনীর (খণ্ড মুকুতার)
পড়িল গ্রীবায় শেষে কপােল বহিয়া।
চতুরা যুবতী তাহা কৌশলে ঢাকিতে
নীচু হৈলা ভূমিচম্পা চয়ন করিতে।
নারিল ঢাকিতে কিন্তু ; মস্তক যেমন
উঠাইল উচু করি, অশ্রু অবিরত
অমনি বহিয়া গণ্ড চুম্বিল ভুবন,
উথলিল একেবারে সিন্ধু শত শত,
যে নদী চলেছে হায় ভীম গরজিয়া
সাগর উদ্দেশে ; বল, কে পারে রােধিতে
তার খরস্রোত, বালুকার বাঁধ দিয়া ?
অতি সূক্ষম রঞ্জু দিয়া কে পারে রাখিতে
স্বাধীন মৃগেন্দ্রে বল করিয়া বন্ধন ?
মিথ্যা সে কল্পনা অহহা মিথ্যা সে যতন।
প্রথম সর্গ।
“একি প্রিয়তমে?” প্রভাবতী-মনােহর
এই বলি কাছে গিয়া আরম্ভিলা কথা,
সান্তুনা করিতে তারে বলিলা আবার
(নহে পূর্বকথা এবে প্রকৃতির গাঁথা)।
“দেখ প্রিয়ে, দেখ চেয়ে পুণ্যতােয়া নদী
ইচ্ছামতী, দয়ালু কুমার প্রতাপের
কীর্তিগাঁথা প্রচারিতে যেন নিরবধি
বহিতেছে ; প্রচারিবে স্বকীয় মনের
জাগিছে কুমার
আজি শুভক্ষণে
স্বদেশ কল্যাণ তরে জাগ প্রজাগণে।
কথা,
“ওই দেখ প্রিয়তমে তটিনীর তীরে
মন্দির যশােরেশ্বরী অদূরে শােভিছে,
বাসন্তী সন্ধ্যার চর বায়ু , ধীরে ধীরে
উড়াইয়া তার শির-পতাকা, বহিছে,
মন্দিরে হইছে বুঝি দেবীর আরতি,
তাই ঝাঁঝ, শঙ্খ, ঘণ্টা নানা বাদ্য বাজে ;
প্রকৃতির এ হেন সময়ে হে সুমতি।
কহ এই মলিনতা তােমায় কি সাজে?
রাত্রি হ'ল যুক্তি নহে থাকিতে হেথায় ;
প্রফুল্ল বদনে প্রিয়ে করহে বিদায়।
(৭)
প্রভাবতী কাব্য ; '' শীঘ্র আগ্রা হতে ফিরে সদনে তােমার লইব শরণ মহাসমারােহে হবে শুভ পরিণয় ; বিবাহ-বন্ধন-তার দুটী প্রাণ এক করে বাঁধিয়া রাখিবে—” বাধা দিয়া বাক্যে তাঁর বলে প্রভাবতী “ছি ছি একি বীরােচিত কথা প্রাণেশ্বর ? বােঝে না এ দাসী, কেন তব ভ্রান্ত মতি। দুটীপ্রাণ বেঁধে রেখেছে ত একতার, থাক্ প্রাণনাথ, এবে কাজ নাই ব'লে পরিণয় কথা; যবনের পদতলে- “দলিত মােদের জন্মভূমি মাতা ; ঘাের দুর্দিনে আমরা তাঁর সন্তান হইয়া নারিব তাহার নিশা করাইতে তাের ? ধিক তবে নরজন্মে ; কি ফল রাখিয়া এ তুচ্ছ পরাণ ? তােমা বলিতেছি তাই, প্রেমের আনায় হ'তে এবে নিরদয়- হিয়া, ভিন্ন করি শুধু বলিবারে চাই- প্রত্যেক বিপলে পলে চলিছে সময় ; অই দেখ জননীর কাতর বয়ান, অই শােন জননীর করুণ আহ্বান,” (৮) প্রথম সর্গ। উপস্থিত হ’ল এবে পালা যুবকের পুণ্যা ইচ্ছামতী তীরে কুসুম কানন- রঙ্গমঞ্চ'পরি হবে তার বিদায়ের অভিনয় ; কিন্তু একি ? স্বেদ নির্গমন ! যুবকের সর্বদেহে হ’ল প্রবাহিত স্বেদ স্রোতস্বিনী, শুধু বারেকের তরে কপিল পুরুষ, বহুদিনের পীড়িত রুগ্নমানবের সম, অতি মৃদুস্বরে বলে—“যাব দূর দেশে স্বদেশ কল্যাণে ; কিন্তু বল প্রিয়ে তুমি থাকিবে কেমনে? একি কথা সূৰ্য্যকান্ত, শ্রবণে পশিয়া মরমে লাগিছে ; একি বীর রমণীর সহ বীরােচিৎ সম্ভাষণ, বীর হিয়া তােমার-বুঝিতে তুমি অক্ষম হে বীর), পবিত্র প্রণয় পাশে পড়িয়াছে বাঁধা বহুক্ষণ, তাই আজি এত মলিনতা- বিদায়ের কালে চক্ষে লাগিয়াছে ধাঁধা, কিন্তু সুবিচার করি কহ সত্য কথা - স্বদেশের অথবা নারীর-গুরুতর কোন্ প্রেম? হের ওই সম্মুখে তােমার (৯) ক
প্রভাবতী কাব্য
;
বিশাল কৰ্ত্তব্য সিন্ধু ভীম গরজিয়া
ডাকিছে তােমায় ; যাও বীর ; ভবিষ্যৎ
করি বিচার, বাঁধি তব বীর হিয়া
নিদয়-পাশে, নিরভীক সৈন্যবৎ
ঝম্প দাও সিন্ধু বক্ষে ; স্ববলে ভেদিয়া
উত্তাল তরঙ্গমালা যাও পর পারে,
মর্মভেদী ‘হা হুতাশ’ নিশ্বাস ত্যাজিয়া
মুহূর্তে মুহূর্তে থাকি পশ্চাদ্ভাগে ফিরে
চাহিও না সজল নয়নে রমণীর
রম্যমুখপানে; ফেলিও না অশ্রনীর,-
=
••
উত্তরিলা প্রভাবতী যুবার বচনে
শষ্যাগ রােগিণীর সম ক্ষীণস্বরে
(তাহার(ও) হৃদয় হাজি তীক্ষ্ণ প্রেমবাণে
জর্জরিত)—ডাকিয়া বলিলা যুবাবরে -
‘নাহি চিন্ত প্রিয়তম আমার লাগিয়া
স্বদেশ কল্যাণ ভরে যাবে দূর দেশে,
যাও নাথ আমি শুধু মম ভগ্ন হিয়া
লইয়া থাকিব হেথা এলােথেলাে কেশে,
যশাের-ঈশ্বরী কাছে কল্যাণে তােমার
পূজা দিব ভক্তিভরে
-কি বলিব আর ?
(১০)
প্রথম সর্গ। ; ; ‘কিন্তু এক অনুরােধ, মাত্র এককথা, সে গাে অতি যতনের, হৃদি অন্তস্থল ভেদ করি উঠিতেছে হৃদে পা’ব ব্যথা রাখিলে তায় ঝরিবে নয়ন জল, এত বলি শুধালে সুন্দরী, উত্তরিলা যুবা “কেন রাখিব না ? রাখিতেই হবে রাখিবার যােগ্য হলে ; তবে আরম্ভিলা প্রভা, জানিনা গাে তুমি কাৰ্যশেষে কবে আসিবে ফিরিয়া, কিন্তু বড় সাধ মনে, নিজ করে পুষ্পে তােমা সাজাব যতনে।” যুবার সম্মতি পেয়ে তবে প্রভাবতী তুলিতে লাগিলা ফুল কতই প্রকার- বেল, যাতি, যুথী, চাপা, মল্লিকা, মালতী- দুটী উষ্ণ অশ্রুবিন্দু পড়ে তারপর পবিত্র করিল তাহে, সেই পুষ্প দিয়া মুহূর্তের মধ্যে সতী কত আভরণ কুন্তল, বলয়, হরি, প্রস্তুত করিয়া পরা’ল যুবক-অঙ্গে-বলিলা তখন “যাও নাথ জন্মভূমি ডাকিছে তােমারে ছিন্ন কর মায়াপাশ, চাহিয়াে না ফিরে। (১১)
দ্বিতীয় সর্গ।
বিদায় গ্রহণ।
"Iron sharpeneth iron so a mau
sharpeneth the countenance of his
friend."
-Old Testament.
বিক্রম আদিত্য স্বর্ণ সিংহাসনে
আছেন বসিয়া উল্লাসিত মনে
সব পাত্র মিত্রে বেষ্টিত হয়ে ;
যথা কলানিধি অনন্ত আকাশে
তারকা বেষ্টিত হইয়া প্রকাশে
জন-মনােহর স্বরূপ ল'য়ে।
রাজসভা ভর সুরঞ্জিত হয়,
ভীষণ সে হৰ্ম্ম কুবের আলয়,
সম্মুখে দাড়ায়ে স্তম্ভের সারি,
উঠিয়াছে তার অতি উচ্চ চূড়া
প্রহরীর দল যেন আছে খাড়া
নানা বরণের পােষাক পরি।
(১২)
দ্বিতীয় সর্গ।
প্রাচীরের গাত্রে, নৃপতির পাছে,
কত মনােহর ছবি আঁকা আছে,
ভারতের শিল্পী-গৌরব-স্মৃতি
ওই দেবাসুর-ভীষণ-সমরে,
সংহারিণী কালী ভীমা মূৰ্ত্তি ধরে,
দানব নাশিতে—জন্মায়ে ভীতি।
কৈলাশ পর্বত শােভিছে অদূরে,
যথা উমাপতি নগেন্দ্র-বালারে
দক্ষযজ্ঞে যেতে নিষেধ করে,
হেথা দেখ অই শােভিছে সুন্দর
বসিয়া নারদ দেব-ঋষিবর
বীণাখানি তার করেতে ধরে।
তার পাশে হের মনাে সরােবর ;
খেলিছে ভ্রমর নলিনী-উপর,
অগ্নি জ্বলে যেন সলিল পরি,
কৃষ্ণ-ভৃঙ্গরূপে ধূয়া উঠে, আসে;
শ্বেত, কৃষ্ণ হংস মনের উল্লাসে
সরসীর বুকে বেড়ায় চরি।
খণ্ড খণ্ড মেঘ ভ্রমিয়া বেড়ায়
যথা দূর নীল আকাশের গায়
আবিল বসন্ত-জ্যোৎস্না-নিশায়,
(১৩)
প্রভাৰতী কাব্য।
বাল্মীকির পুণ্যবন তার পাশে ;
গর্ভবতী সীতা দিয়া বনবাসে
সৌমিত্রী ফিরে গেলা অযযাধ্যায় ।
লাগিলা কাঁদিতে পতি শােকাতুরা,
বিহগী, বিহগ-বিরহ-বিধূরা
একাকিনী বন মাঝারে যথা
মুকুতার খণ্ড সদৃশ তঁাহার,
কপােল বহিয়া পড়ে অশ্রুধার ;
কেমন চিত্রিত রয়েছে হােথ।
বসন্তে ডাকিয়া বিক্রম সবােষে
বলিতে লাগিলা অতি তীব্রভাষে
“কেন তব আজি বিমর্ম মন ?
জ্যেষ্ঠ অগ্রজের পালিতে আদেশ
কেন গাে তোমার আজি এত ক্লেশ ?
হেন ভাব দেখি নাই কখন।
ত্বরা প্রের দূত প্রতাপে ডাকিতে,
আদেশ তাহারে আগ্রায় যাইতে
প্রতি পলে পলে সময় যায়।”
শুনিয়া এ হেন নিষ্ঠুর বারতা
অবনত মুখে দোষী জন যথা)
দাড়ায়ে রহিলা বসন্ত রায়,
(১৪)
দ্বিতীয় সর্গ।
ভাবে মনে হয়, কেন এ বারতা
তীক্ষ্ণশর সম হৃদে হানে ব্যথা
নয়নে চৌদিক অাধার হেরি।
শিশুকাল হ’তে যতনে যাহারে
পেলেছিনু, আজি কি বলিয়া তারে
বিদেশে বিদায় করিতে পারি ?
“যাও বৎস যাও’ কেমনে বলিব,
জ্যেষ্ঠাগ্রজ আজ্ঞা কেমনে পালিব ?
বুঝিতে অধম অক্ষম আজ,
অত্যন্ত বালক প্রতাপ আমার
দরবার মাঝে প্রবেশি, আগ্রার
বুঝিনা কেমনে করিবে কাজ।
সেই দূর দেশে কে তারে দেখিবে,
উদ্ধত বালক—গােল বাধাইবে;
জানি কি মাের কপালে আছে।”
বসন্ত এরূপ আক্ষেপ করিয়া-
প্রহরীরে বলে আনিতে ডাকিয়া
প্রতাপ আদিত্যে–ফিরিয়া পাছে,
আসিল প্রতাপ সঙ্গে দুইজন,
সূৰ্য্যকান্ত আর শঙ্কর ব্রাহ্মণ
বাঙালী-গৌরব-বীরের মূর্তি,
(১৫)
প্রভাবতী কাব্য
;
যেন বা সহসা রাজসভা মাঝে
তিন দিবাকর উদিয়া বিরাজে
প্রকাশে বয়ানে অনিন্দ্য স্ফুর্তি,
প্রণমি’ বসন্তে প্রতাপ বলিলা
কি হেতু পিতৃব্য এখন ডাকিলা ?
বল কোন্ কাজ সাধিতে হবে,
শুনিয়াছি আগে জন্মভূমি ত্যাজি
আগরা যেতে হবে, সে হেতু কি আজি
ডেকেছ পিতৃব্য-বলহ তবে।
ত্যাজি দীর্ঘশ্বাস বলিলা বসন্ত,
(দুনয়নে অশ্রু-নাহি তার অন্ত ;
কপােল বহিয়া বসন তিতে।
“হায় প্রাণাধিক।
জানিছ ত সব,
দিয়াছেন আজ্ঞা পিতৃদেব তব ;
ত্যাজি জন্মভূমি আগরায় যেতে।
লহ তব সাজ; এই শুভক্ষণে
যাত্রা কর বৎস ; যেয়াে সাবধানে
বলিতে বলিতে বসন্ত রায় ;
ক্ষুদ্র শিশু সম দিলা আবার
‘শিরােধার্য্য মম, আদেশ তােমার
প্রতাপ বলিতে লাগিলা হায়-
(১)
•
দ্বিতীয় সর্গ।
‘‘কিন্তু হে পিতৃব্য কহ এবে তুমি,
স্বর্গ হতে প্রিয়তর জন্মভূমি
ত্যাজি’ আগরা যাব কিসের হেতু ?”
বলিলা বসন্ত,-“কুমার এখন
সময়ে পাইবে রাজ সিংহাসন,
রাজনীতি দিয়া বাঁধিবে সেতু।
কি আর প্রতাপ বলিব তােমায়,
একমাত্র রাজনীতি-ক্ষেত্র হয়
আগরা নগরী ভারত-মাঝে,
রাজনীতি শাস্ত্র শিখিবার তরে,
কতস্থান হতে নর সে নগরে-
ঘুরিছে, ফিরিছে আপন-কাজে,
কালের প্রবাহে স্রোত-অনুকূলে
ভেসে যেতে হয় আবশ্যক হলে,
তা’তে কি আছে দুঃখের বিষয়।”
এতেক বলিয়া ঝঞ্ঝাবাতে যথা
গুবাক পাদপ নুয়ে পড়ে মাথা
সেরূপ ধরিলা বসন্ত রায়,
দুইবন্ধু-পানে তখন ফিরিয়া
বলিলা প্রতাপ কাতরে ডাকিয়া,
“বন্ধুর সূৰ্য্যকান্ত !- শঙ্কর।
(১৭)
প্রভাবতী কাব্য আমার সহিত তােমরা কি যাবে ? অথবা একেলা মাের যেতে হবে ত্যাজি’ পিতামাতা সুহৃদ আর ? হায়, শৈবলিনী-অনুকূল-স্রোতে যাব কি গাে তবে ভাসিতে ভাসিতে কিনারা দেখিতে পাব না তার ? জন্মভূমি হতে বহুদূরে থাকি, উদাস-হৃদয়ে ভ্রমিব একাকী, স্বদেশে ফিরিতে পাব না আর ; কত ছিল মনে, স্বদেশের হিত- সাধিব যতনে,-কিন্তু বিপরীত দেখিয়া হৃদয় দহিছে এবে।” নীরবিল যুবা এতেক বলিয়া, শুধু ক্ষণেকের তরে বিশ্ব-হিয়া হ’ল যন্ত্রহীন যেন কি ভেবে। ক্ষণপরে তবে সূৰ্য্য ও শঙ্কর, যুগপৎ দোহে করিলা উত্তর, “সুহৃৎ! একাকী যাইবে কেন ? মােরা আছি তব জীবনের সঙ্গী, ( শিব অনুচর যথা নন্দী ভৃঙ্গী) তবে কেন শুনি বিলাপ হেন ? (১৮) --
দ্বিতীয় সর্গ।
;
যথা যাবে তুমি তথায় যাইব,
স্মিতমুখে মােরা অগ্নি আলিঙ্গিব
যদ্যপি মুখের আদেশ পাই ;
তুমি মহীরুহ, মােরা শাখায় ;
ঝঞ্ঝাবাতে যদি বৃক্ষ পড়ে যায়
আমরা(ও) ধূলায় লুষ্ঠিত হই।
রাজত্বের মাত্র এক তীক্ষ্ণ অস্ত্র
শিখিতে কুটিল রাজনীতি শাস্ত্র
আগ্রায় যাইবে সম্রাট কাছে ;
তবে ভীরুসম কেন তব হিয়া
কম্পিত হতেছে থাকিয়া থাকিয়া,
শঙ্কা করিবার ইথে কি আছে ?
ক্ষত্রিয় যুবক-দৃপ্ত সিংহসম
দূরে নিক্ষেপিবে বিদেশি-তমঃ
আপনার বীৰ্য দেখায়ে সেথা;
ভীরু কাপুরুষ স্বদেশের তরে
বিদেশে যাইয়া কাজ নাহি করে,
বায়স, শকুনি, শৃগাল যথা।
চল বন্ধুবর এ শুভ প্রভাতে-
যাত্রা করি সবে, যমুনা-সৈকতে--
তরণী সজ্জিত মােদের তরে ;
(১৯)
প্রভাবতী কাব্য
;
পরে তিনবন্ধু স্বীয়-নিকেতনে
যাইয়া জনক জননী চরণে
বিদায় চাহিয়া প্রণাম করে।
যমুনার ঘাটে আসিলা ত্বরিত,
এদিকে সকলে পাইয়া ঈঙ্গিত
কুমার-বিদায় আসে দেখিতে
কত মানবের হয়েছে মিলন,
আবাল স্থবির কে করে গনন?
স্থান নাই তিল-প্রমাণ ইথে।
ভক্তি, প্রীতি, স্নেহ প্রদর্শন করি’
বাঙালীর বীর-মােগলের অরি
আশ্বাস প্রদানি' মানবগণে,
ত্বরিতে উঠিলা তরণীর পর,
সূৰ্য্যকান্ত, শঙ্করাদি সহচর ;
বসন্ত, সুন্দর তাহার সনে,
অনুকূল-স্রোতে ছাড়িল তরণী,
তীর সম বেগে ছুটিল তখনি ;
পথ, ঘাট, মাঠ ফেলিয়া পাছে ;
পদ্মাবক্ষে ক্রমে তাহারা পড়িল,
এক্ষণে বসন্ত প্রতাপে ডাকিলা ;
মিনমুখে যুবা বসিলা কাছে।
(২)
দ্বিতীয় সর্গ
-
••
অতি মৃদুস্বরে সজল-নয়নে
গুণানন্দ-সুত বিক্রমনন্দনে
(পৃষ্ঠদেশে হস্ত রাখিয়া) বলে,-
“বহুদূর বৎস পড়েছি আসিয়া,
নিকেতনে এবে যাইব ফিরিয়া
ম্লানমুখে কেন বসিয়া বলে,
তাপ্রাপ্তবয়স্ক যুবরাজ তুমি,
ত্যাজিয়া জননী পুণ্য জন্মভূমি
কখন(ও) বিদেশে যাওনি বৎস!
যেও সাবধানে,-কৃষ্ণমেঘ যবে
সুনীল আকাশ ঢাকিয়া ফেলিবে
ছুটিতে থাকিবে বায়ুর উৎস,
কথা রেখােতবে দুর্গানাম স্মরি’
স্রোতস্বিনীকূলে বাঁধি তব তরী
শান্তির প্রতীক্ষা করিবে তুমি,
আগরা নগরীতে প্রবেশিবে যবে,
সকলের প্রতি বিনয় দেখা’বে ;
সংক্ষেপে এযুক্তি দিলাম আমি।”
এইরূপ বলি’ লয়ে ভগ্ন-হিয়া
রাজ-নিকেতনে আসিলা ফিরিয়া
প্রতাপ-পিতৃব্য-বসন্ত রায়,
(২১)
প্রভাবতী কাব্য। •• পদ্মার সলিলে নয়ন-আসার মিশায়ে প্রতাপ, শঙ্কর, সুন্দর, সূৰ্য্যকান্ত ধীরে চলিয়া যায়। ক্রমে উপস্থিত গঙ্গার উপরে পূর্ব রাজধানী ‘গউড়’ নগরে বঙ্গের পূরব গৌরব-স্থলে ; দেখিলা বিস্ময়ে নাহি পূৰ্বদিন, বহুদিন জ্যোতি হইয়াছে ক্ষীণ এবে নির্বাপিত বিধি-কৌশলে, যে নগর হায় সর্বদা থাকিত, জন কোলাহলে সম্পূর্ণ পূরিত, নাম ছিল যার লক্ষণাবতী, আজি একি দশা হইয়াছে হায় ! শ্মশান-ভূমিতে পরিণতপ্রায় ; দেখে ট’লে যায় সুদৃঢ় মতি, রাজ-সৌধমালা উচ্চশির যার, অনুভব হয়-স্পর্শিছে অম্বর, যা’র কারুকার্য জগৎ-খাত, হয়েছে এখন কুকুর-শৃগাল- হিংস্র-পরাণির আবাসের স্থল, ( একি লীলা তাের হায় বিধাত) (২২) দ্বিতীয় সর্গ। “কতকাল-স্থায়ী মানব জীবন? প্রতি মুহূর্তেই লীলা-সম্বরণ- করিয়া মানব চলিয়া যায়, তবে কেন তারা স্বাধীনতা-তরে নশ্বর জীবন অর্পণ না করে, নির্বোধ মানব বােঝে না হায়! পদ্মপত্ৰনীর-তুল্য এ জীবন, সম্মুখে দেখিয়া কেন নরগণ পীড়িত পরাধীনতার শরে ? শস্যাগারে যদি থাকে শস্য ভরা, বুঝিতে পারিনা তবে কেন তারা; অনশনাগুণে পুড়িয়া মরে।” এরূপে বিলাপি” তঁাহারা সকলে অসার মানবে ধিক্কারিয়া চলে, চলিতে চলিতে অনেক দূর,- দেখিলা সম্মুখে জানুবীর তীরে রাজম(হা)ল, তা’র শির উচু করে দাঁড়ায়ে প্রাচীন কুসুমপুর ; প্রবল-প্রতাপে যথা নন্দবংশ করিলা রাজত্ব ; করেছিলা ধ্বংস কূটনীতি-জালে চাণক্য যাঁরে, (২৩) ==
প্রভাবতী কাব্য
ধৰ্ম্মপ্রাণ নৃপ অশােক যথায়,
শ্ৰমণদিগকে বিদেশে পাঠায়
বৌদ্ধ ধরমের প্রচার তরে।
কিছুদিন হেথা বিশ্রাম করিয়া
চলিতে লাগিল। বিষ্ণুপদী দিয়া
কাশীতে আগত হইলা পরে,
সমাপন করি পুণ্যকৃত্য সব,
আলােচনা করি’
অতুল
বিভব
ছাড়িলা তরণী আগ্রার তরে।
(২)
তৃতীয় সর্গ
প্রভাবতী।
"A soul as white as heaven"
Beaumont and Fletcher.
রজনী প্রভাতা হ’ল—পূরব আকাশে
শুকতারা শুধু শেষবার তরে, জ্বলি’
মিটি মিটি (নির্বাপিতপ্রায় আলােকের
সম) অনন্তের সহ মিলাইয়া গেল।
রাণী যেন পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ' পরি
করে’ গেলা অভিনয় ; তাই ক্ষণপরে
সূৰ্য্যদেবল’য়ে তার সহস্র কিরণ
হইলা উদয়, তার আগমনে যত
পশু পক্ষিগণ ছিন্ন করি’ ঘুমভাের—
শয্যা পরিত্যাগি’ সবে আসিল বাহিরে,
নিজ নিজ কর্মে সবে হইলা নিরত।
নিষ্ঠাবান্ ব্রাহ্মণেরা আবক্ষসলিলে
অবগাহি’ ইচ্ছার সলিলে উচ্চারিছে
দিবাকর-স্তবমালা, সে মধুর ধ্বনি
গন্ধবহ সঙ্গে মিশি’ কাননে, প্রান্তরে,
(২৫)
প্রবর্তী কাব্য।
নদীবক্ষে, লহরে লহরে বেড়াইছে
ভাসিয়া ; সলিলপরি ব্রাহ্মণের সেই
দীর্ঘায়ত দেহখানি চিত্রার্পিত-প্রায়
অচঞ্চল জল’পরে রহিয়াছে আঁকা,
ছাত্রগণ শুনিতেছে সংযত হইয়া
গুরুমুখে ধৰ্ম্মের কাহিনী, কৃষকেরা
হাল কঁাধে করি ধাইতেছে মাঠপানে।
যশাের-ঈশ্বরী-মন্দিরের সম্মুখেতে
অদূরে শাভিছে অই প্রকাণ্ড উদ্যান।
নারিকেল, তাল, আর গুবাক, খর্জুর,
কানন-সভার মাঝে প্রহরীর সম
শান্তি-সংস্থাপিতে যেন রয়েছে দাড়িয়া।
আতপত্রধারী বট, অশ্বত্থ, রসাল,
বিস্তারি’ প্রশাখা শাখা, ফেলিছে ঢাকিয়া
সুনীল গগন। তা’র মাঝে প্রতিষ্ঠিত
সামান্য কুটীর এক, দীন
নৃপসম
নিস্তব্ধতা-রাজদণ্ড লইয়া স্ব-করে
করিছে রাজত্ব, মরি কি সুন্দর দৃশ্য !
সেই ক্ষুদ্র-কুটীরের বারান্দায় বসি
আছেন অশীতিপর বৃদ্ধ একজন,
বপু তার দীর্ঘায়ত,—অঙ্গের সৌষ্ঠব
(২৬),
তৃতীয় সর্গ।
---
;
দৃঢ় যুবাতুল্য,
-দেখিলেই মনে হয়
কেশরী-প্রতিম বল ধরে সে স্থবির ;
মস্তিষ্ককোটরে কিন্তু প্রবেশিছে হায়।
চিন্তানামে কীট এক দুর্জয় ভীষণ;
তাই তাঁর কাৰ্যফল প্রকাশিত হয়
কুঞ্চিত-রেখার রূপে ললাট-প্রদেশে।
সম্মুখে বসিয়া এক যােড়শী যুবতী,
রূপের প্রভায় যাঁর গৃহ আলােকিত,
বৃদ্ধ-পিতৃদেব-পাদ-অম্বুজের ছায়ে
আসিয়াছে সে রমণী শুনিতে ভারত
উপাখ্যান, সম্বােধিয়া পিতৃদেবে বামা
লাগিলা বলিতে,-“পিতঃ! বল, তারপর,
কি হইল ? বলেছিলে গতকল্য তুমি,
সত্যভামা প্রতি দ্রৌপদীর উপদেশ
বলিবে গাে আজি’ বল কি কি উপদেশ
দিয়াছিল যাজ্ঞসেনী কৃষ্ণের প্রিয়ারে ?”
“বৎসে প্রভাবতি । শােন চিত্তস্থির করি’
দ্রৌপদীর উপদেশ বলিতেছি আমি।”
এতেক বলিয়া বৃদ্ধ আরম্ভিলা কথা,
“স্বামীকে আনিবে বশে ভাৰ্য্যা গুণবতী;
কিন্তু কিরূপে করিবে তায় বশীভূত ?
(২৭)
-
==
প্রভাবতী কাব্য সে নহে বশীকরণ,-মণি-মন্ত্র-আদি- তিলকধারণ, আর,—জপ, হােম, পূজা, অঞ্জন, ঔষধি লভ্য ; পাপপরায়ণা নীচাশয়া রমণীরা গােবৈদ্যের মত বিষাক্ত ঔষধ হেন প্রয়ােগ করিয়া ফল পায় বিপরীত, বুদ্ধিমতী তুমি বুঝিতে পার না কেন, যে পাপিনী নারী জানে বশীকরণের মন্ত্র, স্বামী তার সর্বদা শঙ্কিত থাকে, দূর হ’তে তায় ফণিনীর প্রায় করে সদা পরিহার, হেন মূখ বল দেখি কে আছে ভূতলে প্রাণ দিয়ে ফণিনীরে ভালবাসে যেই ? কৃষ্ণের মহিষী তুমি বুদ্ধিমতী সতী উচিত কি তব সখি । হেন কল্পনারে স্থান দিতে হৃদি মাঝে ? অভিমান, ক্রোধ, কাম, অহঙ্কার ত্যাজি’ সর্বস্ব জীবন- রতন আহুতি দেও সেই পূত-পতি- পদ-সেবা-হুতাশনে; সুন্দর যুবক, গন্ধর্ব অথবা দেব, কাহারেও কভু আনিওনা মনােরাজ্যে ; প্রত্যুষে উঠিয়া গৃহ পরিষ্কার করি’ সময়ে করিবে (২৮) ;
তৃতীয় সর্গ।
পাক, প্ৰদানিয়া তরে, পরে তুমি নিজে
করিবে গ্রহণ, স্বামী যদি ভুলক্রমে
তিরস্কার করেন তােমায়, তবে তাই
সুধা-বরিষণ বলি’ করিবে গ্রহণ,
থাকিবে না কভু দুষ্ট-রমণী-সংসর্গে ;
ভর্তার আদেশক্রমে চলিবে সতত।
পতি যেন চূতবৃক্ষ রাখিও স্মরণে,
ভাৰ্য্যা তা’র পাদমূলে মাধবীলতিকা ।
এহেতু উচিত তাঁর (রক্ষিতে নিজেকে )
সতত বেষ্টিয়া থাকে চূতবৃক্ষ-দেহ।
প্রতিদিন অকপট প্রেম প্রকাশিয়া,
প্ৰদানিয়া মনােহর-গন্ধ-মাল্যচয়ে
সতত করিবে তুমি কৃষ্ণ-আরাধনা।
যে রমণীগণ, তব কৃষ্ণ-অনুরাগে
মত্ত হয়ে করে সদা তাঁর আরাধনা,
বিবিধ উপায়ে তুমি তাদেরে তুষিয়া
করিয়া প্রয়ােগ, নানাবিধ কুহকাস্ত্র
কাৰ্যপটুতার সহ কৃষ্ণ-সহবাস
ছিন্ন করি দিবে ; করিবে না আলাপন
প্রদ্যুম্ন, শাম্বের সহ কৃষ্ণ অসমক্ষে ;
(যদিও তাহারা তব আদরের ধন।)
(২৯)
প্রভাবতী কাব্য। এই উপদেশ মত যদি তুমি সখি ! হতে পার অগ্রসর, দেখিবে অচিরে বিপথ হইতে স্বামী এসেছেন পথে, অচিরে হবেন তিনি (জেনাে সখি !) তব হৃদি-রাজ্য-অধীশ্বর, নাহিক সংশয়। বীর-প্রসবিনী আৰ্যা মম শত্রুদেবী কুন্তীর আদেশ আমি পালি সযতনে, যদ্যপি কখন তিনি করমে ঔদাস্য হেরি’ তীব্র তিরস্কার করেন আমারে, লজ্জা-অবনতশিরে সহ্য করি তাহা ; সেই হেতু জানি আমি সে ভৎসনা শুধু আমারি কল্যাণতরে, প্রতিদিন আমি স্ব-করে করিয়া পাক, অন্ন পরিচ্ছদে করি তার সেবা, ভ্রমবশবর্তী হয়ে (ও) বসন ভূষণ ভাল কভু তার চেয়ে করিনা গাে পরিধান, ধৰ্ম্ম-উপদেশ- অনুসারে তাঁর, ভিক্ষা, বলি, শ্রাদ্ধ আর,- সুধীপূজা প্রতিদিন যত্নে পেলে থাকি।” হইলেন তুষ্ণীত এত বলি বৃদ্ধ ; চিন্তাযুক্ত-চিত্তে বামা পিতৃ-মুখপানে বহুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া (৩০) তৃতীয় সর্গ। “পাঞ্চালীর উপদেশ শুনি’ আজি তব মুখে পিতঃ হইলাম ধন্যা, আজি মম সার্থক জীবন, কিন্তু এককথা বৃদ্ধি করিতেছে কৌতুহল, নিঝরের জল বাড়ে যথা দিবানিশি বর্ষা-আগমনে স্বামীই) স্ত্রীর একমাত্র গতি, তবে বল পশে যদি বীরবেশে স্বামী রণমাঝে অৰ্ধাঙ্গিনী কি গাে র যাইবে না সাথে? যেহেতু স্বামীই স্ত্রীর একমাত্র গতি। উত্তরিলা বৃদ্ধ তবে প্রভার বচনে, “নহে প্রভাবতী, ভুল বুঝিয়াছ তুমি ; সত্য বলিয়াছি স্বামী(ই) স্ত্রীর একমাত্র গতি, আরবার বলি, বলি শত শত- বার স্বামী(ই) স্ত্রীর একমাত্র গতি; কিন্তু বিদেশে যদ্যপি পতি যায় অর্থাজ্জনে, কহ বৎসে! স্ত্রী কি তা’র যাবে সাথে সাথে ? দ্রৌপদীর উপদেশে আছে কি এ কথা, পশে যদি বীরবেশে স্বামী রণমাঝে স্ত্রী কি তার যাবে সাথে রণবেশ ধরি’ ? সভয়ে, সলজ্জে তবে বলে প্রভাবতী, “বুঝিনু জনক, কিন্তু কোন্ দোষ ইথে, (৩১), *
প্রভাবতী কাব্য
“শিক্ষা করি’ রণ-বিদ্যা, সংহারিণী মূর্তি
ধরিয়া যদ্যপি পশে তুমুল সংগ্রামে
ক্ষুধিতা সিংহীর সম বঙ্গ-কুলনারী
লভিতে স্বাধীনতার অত্যুৎকৃষ্ট ফল?”
বলিলা তনয়ে বৃদ্ধ ঈষৎ হাসিয়া,
“যুদ্ধক্ষেত্রে বিপক্ষের সহ যুদ্ধ করা
নহে স্ত্রীলােকের ধৰ্ম্ম, স্ত্রীলােকের ধর্ম
যাহা, বলিয়াছি আগে উপদেশ মাঝে,”
“জানি আমি সে ধরম, কিন্তু পিতঃ কহ
তার চেয়ে বেশী কিছু, তার চেয়ে কিছু
গুরুতর ধৰ্ম্ম আছে কিনা ধরাপরে
স্ত্রীলােকের ?” জিজ্ঞাসে সুন্দরী প্রভাবতী,
বিস্ময়ের সহ পুনঃ বলিলা স্থবির,-
“তার চেয়ে বেশী, তার চেয়ে গুরুতর ?
তবে কি পৰ্যাপ্ত নহে স্বামী-পদসেবা?
প্রতিদিন দেবপূজা, অতিথী ভােজন,
জননীর তুল্যা দেবীর পূজন,
আর আর গৃহকৰ্ম্ম যত, এর চেয়ে
গুরুতর—বেশী—আর কি আছে সুমতি ?”
“আছে পিতঃ এক, তার চেয়ে গুরুতর,”
সাহঙ্কারে তবে বালা বলিতে লাগিলা,-
(৩২)
তৃতীয় সর্গ।
“মাতৃগর্ভ হতে যার’পরে নরনারী
পড়িয়া বাড়িতে থাকে, (যথা চন্দ্রকলা)
যাহার বাতাসে, জলে পুষ্ট হতে থাকে
দিন দিন এই দেহ, তার উপকার
অমর বাঞ্ছিত, স্বর্গ হতে প্রিয়তর,
সেই স্বদেশের প্রেম নহে কি জনক
সব চেয়ে গুরুতর ? জবাকুসুমের
সম চক্ষু দুটী ধরে রক্তবর্ণ আভা ;
ক্ষীণ হ’ল কণ্ঠস্বর ; কাঁপিতে লাগিল
দেহ, উত্তরিলা তবে স্থবির প্রবর,-
সত্য বটে স্বদেশের প্রেম সব চেয়ে
গুরুতর, তার আলােচনা নহে বৎসে !
স্ত্রীলােকের ধৰ্ম্ম, গৃহকৰ্ম্ম লয়ে তারা
লয়ে স্বামী পুত্রগণে থাকিবে সতত।
যুবক যাহারা-কেশরীর সম বল
শরীরে ধারণ করে (জয় করিয়াছে
অলসতা রিপু) থাক্ তারা স্বদেশের
প্রেম লয়ে, তােমাদের কি কাজ তাহাতে ?”
“একি অদভুত কথা শুনিতেছি পিতঃ
তব মুখে ?” সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসিলা প্রভা,-
“গরীয়সী জন্মভূমি কল্যাণ সাধন
(৩৩)
প্রভাৰতী কাব্য রমণী কুলের ধৰ্ম্ম কিসে নহে পিতঃ : জন্মভূমি-জননীর দুইটী সন্তান নরনারীরূপে, সেই পুণ্যা জননীর সাধিবে কল্যাণ, নর সরব প্রকারে, নারী শুধু অকৃতজ্ঞতার ডালি শিরে ধরি’ নেহারিবে দূর হতে হীন-দশা নিষ্ঠ রা, নির্মম পর-আত্মজা-সদৃশ, কোন্ যুগে, কোন্ দেশে, কোন্ ইতিহাসে পরাজুখী স্বদেশের কল্যাণ সাধিতে নারীকুল ? সুলতান মামুদ যখন অমিত বিক্ৰমে করে ভারত আক্রম, তখন কি বামাকুল হীরক-সুবর্ণ- ভূষণ বিক্রয় করি’ পরায়ুখী ছিল পাঠাতে যুদ্ধের সংস্থান রোমানেরা যখন কার্থেজ রাজ্য ( উচ্ছেদ করিতে ) করেছিল আক্রমণ, তখন হে পিতঃ, কার্থেজের নারীগণ কামুক-ছিলার তরে, শির-শােভা কেশ ছেদন করিয়া পাঠাইয়া ছিলা নাকি ? এইমাত্র বুঝি আবশ্যক হ'লে পরে, স্বদেশের তরে অর্পিতে জীবন তুচ্ছ পারে নারীগণ (৩৪) ?
তৃতীয় সর্গ।
যুঝি শত্রুপক্ষ সহ পশি’ রণমাঝে
সংহারিণী মূৰ্ত্তি ধরি’, ধরেছিল যথা
শিব-প্রিয়া ভগবতী নাশিতে দুর্দান্ত
দানব নিশুম্ভ শুন্তে দেবাসুর-রণে।”
রক্তবর্ণ দীপ্ত চক্ষে যবে উচ্চৈঃস্বরে
যুবতী বলিতেছিলা রণপ্রবেশের
কথা, বৃদ্ধ ধরে তবে ভাব সুগম্ভীর,
গম্ভীর যেমতি সিন্ধু অনিল বিহীন
প্রদোষ সময়ে নিস্তব্ধতা আগমনে ;
তেমতি গম্ভীর-স্বরে বলিলা জনক
ডাকিয়া তনয়ে,—“প্রভাবতি, প্রাণাধিকে,
তােমা হেন বীরহিয়া যুবতীর—যােগ্য
কথা এই, ধন্য আমি পিতা হয়ে তব,
বুঝিলাম নহ তুমি সামান্যা মানবী।
বাংলার দুর্দিনে আজি তােমার সদৃশ
যদ্যপি প্রত্যেক নারী বুঝিত তাহার
স্বদেশের দুরদশা, তবে কি বাঙ্গালা-
দেশ আজি যবনের নিষ্ঠুর চরণে
লাঞ্ছিতা ঘৃণিত হয় ? তবে কি গাে তাজি
স্বকরে তুলিয়া দেয় সন্তান তাহার
ধনরত্নরাজি দুষ্ট যবনের করে ?
(৩৫)
প্রভাবতী কাব্য
জননী যাদের স্বয়ং সরােজবাসিনী
ক্ষীরাব্ধি-তনয়া রমা, হায় ! প্রতিদিন
তাহারা সহস্র শত হতেছে পতিত
অনশম-রাক্ষসের করাল-কবলে।
(৩৬)
চতুর্থ সর্গ।
আগ রা-দরবার।
“Give me a look, give me a face,
That inakes simplicity a grace.”
Ben Jonson.
শােভিছে সুন্দর ওই যমুনার তীরদেশে
সুবিশাল আগ্রানগরী,
আকবর সম্রাটের বিলাসিতা পরিচয়
নরগণে পরকাশ করি'।
সুন্দরী যুবতী তুল্য আগরা নগরী আজি
ধরিয়াছে মনােহরা শােভা,
অভ্রলেখী সৌধমালা, নিৰ্ম্মল যমুনাজলে
ফেলিয়াছে তার চারু আভা।
সুবিস্তীর্ণ রাজপথে অসংখ্য অসংখ্যনর,
পদাতিক অশ্বারােহী কত,
চলিতেছে, ফিরিতেছে, করিতেছে কোলাহল
যাহার যেমন অভিমত।
(৩৭)
প্রভাবতী কাব্য
রাখিয়াছে সাজাইয়া বহুমূল্য পণ্যদ্রব্য
দোকানে বণিক সম্প্রদায়,
উৰ্দ্ধ চন্দ্রশালা-চূড়ে উড়িয়া নিশান শত
মােগলের গৌরব জানায়।
গৃহমাঝে কোন নারী গবাক্ষের দ্বার দিয়া
নীলাকাশে তারকার ন্যায়,
আছে চাহি পথপানে, কোথাও গৃহস্থ এক
শূন্যমনে বসে বারান্দায়।
যমুনার কূল হতে কিছু দূরে দুর্গ এক
সৈন্য প্রায় শােভিছে সুন্দর ;
তার পাশে রাজবাটী, যাহার প্রাচীর-গাত্রে
শােভে রক্তবর্ণের প্রস্তর।
বহির-দেশে এক দাঁড়ায়ে মন্সবদার
( দূরে যাঁর শিবির শােভিছে, )
বন্দুক, কীরিচ তার ঝকমকে সূর্যালােকে ;
রক্তবস্ত্র নিশান উড়িছে।
রাজপ্রাসাদের মাঝে প্রবেশ করিতে হলে
দেখিবে বিস্তীর্ণ কাৰ্যালয়”
অগনন শিল্পকার যতনে প্রস্তুত করে
রাজ ব্যবহার্য দ্রব্যচয়,
সুবর্ণ খচিত বস্ত্র, মখমল, মলিন,
(৩৮)
;
চতুর্থ সর্গ। --- -- মনােহর চন্দ্রাতপ শাল, বেগমের পরিধেয় স্বর্ণ-রৌপ্য-অলঙ্কার প্রস্তরের নানাবিধ মাল । কত বা বর্ণিবে কবি-মােগল আগ্রানগরী জিনিয়াছে নন্দন কানন, সে দৃশ্য দেখেছে যেই সুধন্য পুরুষ সেই- ধন্য তার দুইটী নয়ন। আশ্চৰ্য্য দেখিতে পাই-সম্রাটের অন্তঃপুর কুবের-কন্দর্প-নিকেতন, দেখি পৃথিবী মাঝে ধন রত্ন পাপরাশি অল্প ভূমি-মাঝারে এমন। রতন খচিত তার অন্তঃপুর কক্ষরাজি সুমণ্ডিত ধবল-প্রস্তরে, নন্দনকানন নিন্দি’ শােভিছে উদ্যানমালা অদ্বিতীয় ভারতভিতরে। উর্বশী-মেনকা-গর্ব খর্ব করি’ পুরনারী আলােকিছে রাজ-অন্তঃপুর, আলােক বিতরে যথা অসংখ্য-তারকারাজি থাকি নীল গগনে সুদূর। সুন্দর সুরম্য হৰ্ম আগ্রা-দরবারগৃহ রঙ্গিন-প্রস্তরে সুবেষ্টিত, ( ৩৯)
প্রভাবতী কাব্য।
নিম্নদেশে রত্নপত্র-লতিকা-বিহঙ্গদোলে ;
উৰ্দ্ধদেশ দর্পণে মণ্ডিত।
শােভে ধারে ধারে তার স্বর্ণ কামদার বীট
চন্দ্রাতপ রৌপ্যের তারের,
শােভিতেছে উৰ্দ্ধদেশে নীলাকাশে তারাসম,
তা’তে ক্ষুদ্র মতির ঝালর।
প্রাসাদ-মেজের’পরে কোমল গালিচা শশাভে
সদ্যোঙ্খিত তৃণে উপহাসি',
তা’র’পরে সিংহাসন গজদন্ত-নিরমিত,
আকবর সম্রাট বিলাসী
অধিষ্ঠিত তার’পরে যত সভাসদ লয়ে ;
নাতি খবি সম্রাট প্রবর,
সমুজ্জ্বল শ্যামবর্ণ-কৃষ্ণবর্ণ নেত্রদ্বয়
অলিদ্বয় যথা পদ্ম’পর।
সুবিভক্ত দেহ তঁার, উন্নত,—ললাট, বক্ষ,
সুদীর্ঘ তাহার ভূজদ্বয় ;
মু'খানি সুন্দর করি’ নাসিকার বামভাগে
শােভি'ছে আঁচিল মাংসময়।
গম্ভীর ভঁহার স্বর, বাক্য সুমধুর যেন
ঐশী-শকতি ধারণ করে,
তা'র চতুষ্পর্শ্বে বসে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান,
(৪০)
চতুর্থ সর্গ।
পারসী, জৈন, রৌপ্য-রেলধারে।
প্রতাপপ্রমুখ করি’ প্রাণের সুহৃদ চারি
উঠে আসে সভার মাঝার
সম্রাটে কুর্ণিশ করে একপদ উঠে যবে
আর পদে কুর্ণিশ আবার
আর পদ উঠে তারা কুর্ণিশ করিয়া পুনঃ ;
পেছিল সম্রাট সন্নিধান ;
লইল আপনস্থান সম্রাটের পশ্চাদ্ভাগে,
কেহই না লইল সন্ধান।
নদীর স্রোতের ন্যায় রাজদরবার-কৰ্ম্ম
অবিরত চলিতে লাগিল,
সময়ে বসিল সভা, রাজকাৰ্য সমাপনে
পুনরায় সময়ে ভাঙ্গিল।
এদিকে প্রতাপ আদি মানবচরিত্র বােঝে
চারিদিক ভ্রমণ করিয়া
সূক্ষমরূপে রণনীতি সাম্রাজ্য-শাসনরীতি
অল্পকালে লইল শিখিয়া।
একদিন দরবারে আকবর সভ্যগণে
একটী সমস্যা জিজ্ঞাসিলা,
সভ্যগণ একে একে কবিতা রচনা করি
সমস্যার পূরণ করিলা।
(৪১)
প্রভাবতী কাব্য,
৩.
হইল মনােনীত, ডাকিয়া গম্ভীর স্বরে
সম্রাট আদেশে পুনর্বার,
নিস্তব্ধতা ল’য়ে সবে ব'সে আছে ভিন্নমনে
কারু মুখে কথা নাহি আর।
যদ্যপি সর্ষপ এক পড়ে উচ্চ স্থান হতে
সেই স্থির-গম্ভীর-সভায়,
মনে হয় প্রতি সভ্য, নিকটে অথবা দূরে
সে শব্দ শুনিতে বুঝি পায়।
প্রতিভার সু-আধার প্রতাপ আদিত্য এৰে
কুনিশ করিয়া আকবরে--
কহিলা গম্ভীর-স্বরে,-“জাঁহাপনা আজ্ঞা হলে
সমস্যা পূরিতে দাস পারে।”
আদেশিলা আকবর ; বিস্ময় উৎপন্ন করি
যুবরাজ সমস্যা পূরিল ;
তখনি সভার মাঝে ধন্য ধন্য মহাশব্দে
চারিদিক কম্পিত হইল।
ঃ সম্রাটের সমস্যা--
সেত ভুজঙ্গিনী যাত চলি হেঁ।
প্রতাপের পূরণ
শােবর কামিনী নীর নিহারতি রিভলি হে,
চিরম-চরকে গঠপর-বাপিকে ধারেছু চলচলি হেঁ;
রায় বেচারী আপন মনমে উপাসাও চারি হে।
কেছঙ্গময়ােরতি সেত ভুজলিনী যত চলি হে।
(৪২)
চতুর্থ সর্গ। । নানাবিধ বহুমূল্য দ্রব্য পুরস্কার-রূপে সম্রাট প্রতাপে প্ৰদানিলা ; সেই হ'তে প্রতাপের ভাগ্যাকাশে পূর্ণশশী দীপ্তি লয়ে উদয় হইলা। একদিন যুবরাজ হইলেন উপস্থিত মানসিংহ শিবির মাঝারে, মহারাজ সসম্রমে বসিতে আসন দিয়া সম্বৰ্ধনা করিলেন তারে। বলিতে লাগিল তবে কুমার প্রতাপাদিত্য- সেলিম-শ্যালকে সম্বােধিয়া, “মহারাজ কি কারণ কহ মােরে বন্ধুজন আত্মীয় স্বজন তেয়াগিয়া- লয়েছ মােগল পক্ষ; স্বদেশদ্রোহিতা কেন ? “স্বদেশদ্রোহিতা কিসে হ’ল ?” বাধা দিয়া কুমারের বাক্যে, বলে মান-সিংহ, ক্রোধে চক্ষু জ্বলিতে লাগিল, “স্বদেশদ্রোহিতা কিসে হ’ল কই যুবরাজ! আমাদের সম্রাট মােগল, অবলম্বি’ তার পক্ষ, সাধিব তাহার কাজ প্রয়ােগিয়া ছল কিম্বা বল। বিরুদ্ধাচরণ তা’র রাজ-বিদ্রোহিতা বলি’ (৪৩)
প্রভাবতী কাব্য।
মহাপাপ শাস্ত্রের বচনে”,
“ধিক্ রে পামর তােরে, শতধিক রসনায়
হেন কথা আনিলি বদনে।
বারেক ভাবিয়া দেখ জয়পুর-রাজবংশে
জন্মেছিলে কোন্ মহাকূলে ?
হায়, পিতৃ-পুরুষের গৌরব-মাণিক্য দিলে
যবনের পদ’পরি তুলে ?”
“সাবধান যুবরাজ আমার শিবিরে বসি’
তুমি মাের নিন্দাবাদ কর ?
কে আমি জাননা মূঢ়, কর্কটিকা হয়ে বুঝি
আশু মৃত্যু তরে গর্ভধর।”
উত্তরিলা যুবরাজ,-“জানি আমি সুনিশ্চিত
স্বদেশের কুলাঙ্গার তুমি,
শ্রাবণের ধারা প্রায় অবিরত অশ্রু ফেলে
মনটদুঃখে তব জন্মভূমি।
স্বদেশের কুলাঙ্গার, -তব পিতামহ হ'তে
তােমাদের পুড়িছে কপাল,
যবন-সম্রাটে তিনি কন্যা সম্প্রদান করি’
হয়েছেন স্বদেশের কাল।
যতদিন ইতিহাস বিরাজিবে এ ভারতে
কুকীর্তির সাক্ষ্য প্ৰদানিবে,
(৪৪)
চতুর্থ সর্গ। তােমাদের উপাখ্যান শুনি’ ভারতের যত নরনারী মরমে মরিবে। জানি তােমা সুনিশ্চিত, কুলাঙ্গার তুমি বীর, পদাঘাতি’ আত্মীয় স্বজনে, সেলিমে দিয়াছ ভগ্নী, হয়েছ শ্যালক তার তাই এত স্পর্ধা তব মনে।” “সাবধান, এই দণ্ডে পাঠাব যমের পুরে” মানসিংহ বলিল আবার ; ক্রোধে চক্ষু রক্তবর্ণ, শজারু কণ্টক- -কেশ আসি ঝঞ্চে পিধান-মাঝার। সরােষে কুমার তবে বলিতে লাগিলা তারে “শুন মহারাজ, নাহি ডরি, তব রক্তবর্ণ চক্ষে কিম্বা অসি ঝনৎকারে ভ্রান্ত মতি, ভয় নাহি করি— যবন-সেবকে আমি ; যে দিন ধরেছি অসি— ত্যাজিয়াছি জীবনের মায়া, কিন্তু হে রাজন তুমি কোন্ ভয়ে আকাঙ্ক্ষিত লভিতে যবন-পদছায়া ? স্থির হও মহারাজ। স্মর’ বারেকের তরে শুধু রাণা-প্রতাপের কথা, স্বাধীনতা-রক্ষা-তরে কেমনে ভ্রমিছে সদা (৪৫) প্রভাবতী কাব্য। কান্তারে, প্রান্তরে, বনে, যথা- ক্ষুদ্র শৃগালের কাছে পরাভব হেয় জ্ঞানে করে দৃপ্ত বিপন্ন কেশরী । গৃহশত্রু তুমি, তাই সম্রাটের কাছে তার অবস্থিতি পরকাশ করি’ সাধিয়াছ হায় আজি তঁাহার এ হেন দশা ; কি কব অধিক ? বিভীষণ রামের সহায় যদি না হ'ত লঙ্কা-আক্রমে তা’ হলে সমর-হুতাশন- পারে কি করিতে ভস্ম কনক সিংহলদেশ ?” মানসিংহ কিছু নম্র-স্বরে— বলিতে লাগিলা পুনঃ,-“কিন্তু যুবরাজ, বিদ্রোহিতা রাজ-বিরুদ্ধে যে অসি ধরে, রাজদ্রোহিতার পাপে নিশ্চিত নিমগ্ন সেই তবে কেন বল যুবরাজ, সম্রাটের প্রতিকূলে প্রতাপের সঙ্গে মিশি’ করিব বিদ্রোহিতার কাজ ?” “রাজ বিদ্রোহিতা ? সে(ই) কি মােগল ভারতরাজ ?” বিস্ময়ে জিজ্ঞাসে যুবরাজ, “কে রাজা ?-মােগল দুষ্ট আজি ভারতের রাজা ? মনে করি’ দেখ মহারাজ! (৪৬)
চতুর্থ সর্গ।
কোথায় তাদের গৃহ’-কোন্ অধিকারে এবে
লভিয়াছে রাজসিংহাসন ?
দুগ্ধ রম্ভা প্ৰদানিয়া কহ সে কালসর্পের--
বিষবৃদ্ধি করে কোন্ জন ?
“কুমার ! অদৃষ্ট-লিপি কিন্তু খণ্ডন কে করে?”
মানসিংহ আরাে নম্রস্বরে-
বলিলা প্রতাপদিত্যে, সরােষে প্রতাপ বলে,--
(গাত্রদাহে ভীম মূর্তিধরে)।
“কি বলিলে মহারাজ, এসব অদৃষ্ট লিপি ?
ধিক্ তােমা হেন কুলাঙ্গারে,
এই কি হে মহারাজ, ক্ষত্রিয় উচিত কথা ?
(অরণ্যে রােদন; বলি আমি কারে ?)
নহে ক্ষত্রিয়ের কথা এই ; অদৃষ্ট না মানে
সে জাতি এ পৃথিবী মাঝারে,
আপনার বাহুবলে ধরা মাঝে কি না সাধে ?
কেন বৃথা দোষ অদৃষ্টরে ?
নরকের কীট তুমি, পবিত্র ক্ষত্রিয়-কুলে
করিতেছ কালিমা লেপন,
তাই হৃদি বিদারিকা এরূপ নিষ্ঠুরা আশা
জাগে তব হৃদে সর্বক্ষণ।”
অকস্মাৎ যথা ধৃতহুতাশন সংস্পর্শে
(৪৭)
;
প্রভাবতী কাব্য হায় জ্বলে উঠে দপ ক'রে, তথা ক্রোধে গ গ মহারাজ মানসিংহ যুবরাজে বলে তীব্র স্বরে, “সিংহের বিবরে পশি” যদ্যপি শৃগাল শিশু অহহ অপমান করে তার, তা’র প্রতিশােধ ল’তে কভু কি পশ্চাৎপদ হয় তবে মৃগেন্দ্র প্রবর ? এবার নাহিক ক্ষমা, সাধ্য যদি যাকে তব- এই মম ত্যাজিলাম বাণ, প্রত্যাখ্যান কর এবে,—এত বলি মানসিংহ কুমারে করিলা আক্রমণ, প্রতাপের সহচর বীর সূৰ্য্যকান্ত গুহ ঝম্প দিয়া পড়ে মাঝখানে, নিরস্ত হইয়া তবে উভয়ে দুঃখিতমনে চলিল। যাহার স্ব-স্ব-স্থানে। এদিকে প্রতাপাদিত্য স্বাধীনতা-সুধাভান্তে সুধারাশি করি’ পরিমাণ, শ্রেষ্ঠব্যক্তিগণ সহ পরিচয়ি সবিশেষ রহিত করেন করদান। জিজ্ঞাসিলে আকবর, উত্তরিলা যুবরাজ,- “জাহাপনা জনক এখন, (৪৮)
চতুর্থ সর্গ।
ত্যজিয়া বিষয় কাৰ্য-বসন্ত রায়ের’পর
রাজ্যভার করেন অর্পণ।
বুঝি কোন অভিসন্ধি-বশবর্তী হয়ে তিনি
করেন শৈথিল্য-প্রদর্শন,
এ বিষয়ে জাহাপনা অনভিজ্ঞ দাস তব
কিন্তু এর জানিতে কারণ,
স্বদেশে প্রেরেছি দূত, বুঝিবা অরাজকতা
উপস্থিত রাজ্যের মাঝারে ;
অথবা নিরীহ প্রজা হইতেছে প্রপীড়িত
অত্যাচারী কর্মচারী-করে।”
সুবুদ্ধি প্রতাপাদিত্য অবলম্বি' মৌনভাব
ক্ষণকাল দাড়াইয়া র’ন্।
নীতিজ্ঞ সম্রাটবর ডাকিয়া গম্ভীর-স্বরে—
যুবরাজে বলেন তখন,
“শুন যুবরাজ, তুমি সক্ষম যদ্যপি হও
প্রদেয় রাজস্ব প্ৰদানিতে,
তাহা হ'লে সেই রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করি তােমা
যুবরাজ আনন্দিত চিতে
সম্মত হইলা তাহে; স্বল্পকাল মধ্যে তিনি
প্রদেয় রাজস্ব প্ৰদানিয়া
অচিরাৎ সম্রাটের হইলেন প্রিয় পাত্র ;
(৪৯)
প্রভাবতী কাব্য।
আকবর সন্তুষ্ট হইয়া
তিন লক্ষ মুদ্রা আর ফরুমান্ প্ৰদানিয়া
দেশে তারে করেন প্রেরণ ;
যুদ্ধপ্রিয় রণদক্ষ দ্বাবিংশ সহস্র সৈন্য
তার সঙ্গে করিল গমন।
(৫০)
পঞ্চম সর্গ।
কল্যাণী।
“Pains of love be sweeter far
Than all other pleasures are."
John Dryden.
“কেন সখি, বসে বিরসবদনে ?
গরাসিছে রাহু সুধাংশু-রতনে
মুক্তাখণ্ড-অশ্রু ঝরে দুনয়নে
কেন গাে সজনি কিসের তরে?"
প্রভাবতী জিজ্ঞাসিলা কল্যাণীরে
প্রবেশিয়া ভার গৃহে ধীরে ধীরে
অঞ্চলে মুছায়ে নয়নের নীরে
বক-গ্রীবা তার জড়ায়ে ধরে।
পেয়ে উত্তর জিজ্ঞাসে আবার,
“কেন গাে সজনি ?—কি দোষ আমার ?
রহিলে নীরব,—এই কি তােমার
সখীর পবিত্র প্রণয়রাশি ?
(৫১)
প্রভাবতী কাব্য।
“তবু নিরুত্তর-তবে কেন আর ?
ছিড়িয়া ফেলিব এ বন্ধুত্ব-তার
এই শেষ দেখা সহিত তােমার--
করহ বিদায় এখন আসি।”
এত বলি মানভরে প্রভাবতী,
পিছন ফিরিয়া যায় ধীর গতি
এহেন সময়ে কল্যাণী সুমতি
অঞ্চল তাহার টানিয়া ধরে,
“শুনি কেন সখি! আমার কাহিনী
দাহিবে তােমার শান্তি হিয়া-খানি
শুনিতে চাহিয়াে না তাহা ;” কল্যাণী—
খেদোক্তি করিলা গম্ভীর-স্বরে।
“সখীর প্রণয় এই কি গাে তবে?
বল মৰ্ম্ম কথা, লাঘব হইবে
তব দুঃখ রাশি; এ নশ্বর ভৰে
নতুবা সজনী কেন গাে হায়।
“তবে বলি শােন” প্রভাবতী-পানে
চাহিয়া কল্যাণী কাতর-বচনে
লাগিলা বলিতে,—“বিষাদ স্বপনে
দহে হিয়া তুষানলের প্রায়।
(৫২)
পঞ্চম সর্গ।
‘কল্য নিশীথিনী দেখেছি স্বপন
পীড়িত আমার হৃদয় রতন,
হায় মম ঊরু করি উপাধান
শয়ন করিয়া মুদিয়া আঁখি,
“কত কি ঔষধি খাওয়াই তারে,
কিছুতেই উপশম হয় নারে ;
হা দগ্ধ অদৃষ্ট!—বুঝি এই বারে
পিঞ্জর ভাঙ্গিয়া পলায় পাখী।”
নীরবিলা তবে শঙ্কর-গৃহিণী,
বায়ু বিনা যথা নিস্তব্ধ মেদিনী
অথবা যেমতি বীণা-যন্ত্রখানি
সব তন্ত্রী যায় ছিড়িয়া যবে।
বলে প্রভাবতী তারে আসিয়া,-
‘মিথ্যা স্বপ্ন কেন হৃদয়ে পােষিয়া,
বিমরিষ-মিথ্যা কল্পনা লইয়া,
স্বপ্ন সত্য হয় শুনেছ কবে?"
আবার বলিতে লাগিল। কল্যাণী
অঞ্চলে তাহার মুছিয়া মু'খানি;
ব্যাধের সদৃশ তীক্ষশর হানি’
প্রভার তরল হৃদয় মাঝে,
=
প্রভাবতী কাব্য “নাথের এহেন অবস্থা যখন, ঢাকিয়া সে স্থান-ধাধিয়া নয়ন- সম্মুখে দাড়াল সৈন্য অগনন- প্রত্যেকে সাজিয়া বীরের সাজে। “জীবন নাথের করে সুকোমল বন্ধন করিয়া সুদৃঢ় শৃঙ্খল টানিতে লাগিল সৈনিক সকল আগ্রা অভিমুখে যাইতে চায়।”- একি ? এ কিসের এত কোলাহল এ্যন্ত ভাবে দূরে পালায় সকল, যথা ভীত ক্ষুদ্র হরিণের দল পালে ব্যাঘ্র যবে ধাইয়া যায়। মুখের বচন মুখেই রহিল, চকিতার ন্যায় উভয়ে কাপিল, বুঝি ঘটনা চাহিয়া রহিল উভয়ে উভয় মুখের পরে ; এ কিরে ঘটনা হ’ল আকস্মিক। দশ বার জন সশস্ত্র সৈনিক, কিছু অশ্বারােহী আর পদাতিক পশিল সকলে কল্যাণী-ঘরে। (৫৪)
পঞ্চম সর্গ।
ছুটিল তাহারা কল্যাণীর পানে;
দেখা দিল তার কালিমা বয়ানে;
ভীম আৰ্তনাদ উঠিল গগনে;
কাপিল চৌদিক প্রান্তর বন ;
হিন্দু রমণীর সতীত্ব রতন
এই বার বুঝি করিল হরণ,
সের খাঁর আজ্ঞা করিয়া পালন
যতেক সশস্ত্র সৈনিকগণ।
না বুঝি তারা এবার নারিল,
পিছন হইতে তােপ-ধ্বনি হল;
সেই তােপে এক সৈনিক মরিল
আর আর সবে স্তম্ভিত করি।
সবিস্ময়ে তারা দেখিল চাহিয়া
সম্মুখেতে বামপদ হেলাইয়া
দক্ষিণ-পিছনে আছে দাড়াইয়া
বীর সূৰ্য্যকান্ত বন্দুক ধরি'।
( আগ্রা হতে সবে ফিরিবার কালে
পথি মাঝে শুনি ভীম কোলাহলে
ছুটে আসে সূৰ্য্য, যাঁর বাহুবলে
সমস্ত পৃথিবী কম্পিত হয়।
(৫৫)
প্রভাবতী কাব্য
টঙ্কারি’ কাৰ্ম্মকে
এখনও হায়, প্রতাপ, শঙ্কর
পারেনি পৌছিতে কল্যাণীর ঘর ;
এখনাে তাহারা ইচ্ছামতী’পর,
তরণী ভিতরে বসিয়া বয়।)
সূর্যকে হেরিয়া সৈনিক নিকর
ঝম্প দিয়া পড়ে, যথা মৃগবর
ভীষণ শাৰ্দল ক্ষুধায় কাতর
মু'খানি তাহার ব্যাদান করি'।
হেথা দৃঢ়মনে সূর্যকান্ত বীর
কে তেয়াগিল তীর ;
(কে বুঝিবে হায় কি খেলা বিধির ?)
পড়িল ভূতলে জনৈক অরি।
তখনি আবার দুই তিন জন
লক্ষ্য করি’ সূৰ্য্যকান্তের নয়ন
ছাড়িতে লাগিল তীর অগনন,
বিধিল কতক শরীরে হায় ।
ছাড়িতে উদ্যত রক্তাক্ত শরীরে
অরি-শির লক্ষ্য করি’ এক তীরে,
হায় রে ! তখনি হস্ত হতে ধীরে
ভূমে সেই তীর পড়িয়া যায়।
(৫৬)
পঞ্চম সর্গ।
বিপক্ষ হইতে অরি এক তীর
বিঁধিল অমনি সূৰ্যের শরীর,
সহস্রধারায় পড়িল রুধির ;
সহসা ভূতলে পড়িল দেহ।
প্রভা ও কল্যাণী দেখিলা চাহিয়া,
অশ্রু-বিন্দু পড়ে কপােল বহিয়া,
ভীম সংহারিণী মূরতি ধরিয়া
সহসা তাহারা পশিল গেহ।
অবশিষ্ট শত্ৰু পশ্চাতে ছুটিল,
ক্ষণপরে তারা আশ্চর্য্যে দেখিল
(ক্ষণেকের তরে হৃদয় কঁপিল )
দেখিল সম্মুখে মূরতি দু’টী ;
দেখিল চকিতে—প্রভা ও কল্যাণী,
ব’রেছে মূরতি সংহার-কারিণী ;
শঙ্করের জায়া এবে শাঙ্গপাণি,
অন্য দিক হতে চলিল ছুটি।
অব্যর্থ সন্ধান !-ধরাশায়ী হ’ল
শত্রু একজন,—এবে আক্রমিল
ভীম গরজিয়া বিপক্ষ সকল,
প্রভা এবে অসি ধরিল করে ।
(৫৭)
প্রভাবতী কাব্য।
ভীতিপ্রদর্শিকা মূরতি ভীষণ
সে দুই সজনী ধরিল তখন
কালী-জয়া যেন করিতেছে রণ
সুভীষণ দেবাসুর-সমরে।
অলক-কুন্তল পড়িতেছে স'রে,
সরা’য়ে চকিতে তারা ডান করে,
বাম-করে আর শমনের পুরে
প্রেরণ করিছে শত্রু-নিকরে।
কে দেখিবি তােরা, আয় ছুটে আয়,
বাঙ্গালী-রমণী-বীরত্বের যায়
সের খ। প্রেরিত সৈন্য সমুদায়
একে একে ধীরে সকলে মরে।
গৃহের সম্মুখে প্রাঙ্গন মাঝারে
পড়ে আছে মৃত দেহ ; শত ধারে
বহিছে শােণিত পরিপূর্ণ করে
রুধির প্লাবনে প্রাঙ্গনখানি
প্রভা ও কল্যাণী ত্বরিতে ছুটিল
সূৰ্য্যকান্ত যথা ধরাশায়ী ছিল;
(বদন-চন্দ্রমা ধূলায় লুঠিল
মানবের মনে বিস্ময় মানি)
(৫৮)
;
পঞ্চম সর্গ
কল্যাণী তাহার শির উত্তোলিয়া
উরু-উপাধানে স্থাপন করিয়া
মাতৃতুল্য তার শিরে কর দিয়া
এক দৃষ্টে চাহে বদন’পরি।
ঝটিতি আনিল জল প্রভাবতী,
প্রক্ষালন করে কল্যাণী সুমতী
রুধিরাক্ত দেহ সযতনে অতি;
প্রভা বসে দু’টী চরণ ধরি।
হ’ল কিছু পরে জ্ঞানের সঞ্চার,
চাহিয়া দেখিলা সূৰ্য্য চারিধার ;
আসিয়া বসিলা প্রভা এইবার
অনিন্দ্য সুন্দর মুখের কাছে।
প্রভাবতী পানে চাহিলা সে বীর,
চিত্তের আবেগে অমনি রুধির
ছুটিল শতধা, ছােটে যথা তীর
বীরহস্ত হতে শক্রর পাছে।
আবার শুশ্রুষা করিতে লাগিলা,
আবার পীড়িত নয়ন মেলিল,
আবার চৌদিক চাহিয়া দেখিলা ;
বয়ানে উদিল আনন্দরেখা ;
(৫৯)
প্রভাবতী কাব্য
আসিলা প্রতাপ, শঙ্কর, সুন্দর,
মিলিলা সকলে প্রাঙ্গন মাঝার,
বহিল সহস্র উল্লাসের ধার ;
লাবণ্য-আলােক দিলগাে দেখা
( ৬০ )
ষষ্ঠ সর্গ।
শঙ্কর।
"Remote, unfriended, melancholy, slow.*
Oliver Goldsmith.
"I will not give sleep to mine eyes, or
slumber to mine eye-lids."
Old Testament.
প্রতাপ ফিরিয়া যবে আসেন যশােরে
সূৰ্য্যকান্ত শঙ্করাদি ল’য়ে সহচর,
পিতৃব্য, জনক, মহা-আনন্দের-ভরে
আহ্বান করিলা তারে ; আহবানিলা আর
প্রতিবাসী তাহাদের প্রকাশিয়া হর্ষ,
করে যথা সতী নারী যবে পতি ফেরে
নিজ গৃহে প্রবাসে থাকিয়া বহুবর্ষ।
মহাসমারােহে শুভ অভিষেক পরে
ভাবিলা প্রতাপ,—স্বীয় বশে আনয়ন
করিবে সমগ্র দেশ কোন্ পন্থা ধরে ;
কেমনে ভুঞ্জিবে বীর স্বাধীনতা-ধন।
ডাকাইলা সূৰ্য্যকান্তে, শঙ্করে, সুন্দরে
পরামর্শ করি, পরে তাহাদের সনে
প্রেরিলা বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন জনে
(৬১)
প্রভাবতী কাব্য।
প্রতি অধীশ্বর কাছেছছদিতে ভীষণ
মােগল রাজত্ব-পাশ,-গুপ্ত ভাবে আর
জানিতে প্রজার স্থিতি; করিল গমন
প্রতাপের আজ্ঞাক্রমে সুহৃদ শঙ্কর
রাজ ম(হা)লে কাৰ্যতরে। হায়, একদিন
যবন পীড়িত এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ
( অনশনে অনিদ্রায় তনু যাঁর ক্ষীণ )
ধাবিত হইয়া ভীত কুরঙ্গ সমান
আসিলা শঙ্কর কাছে ; বলিলা হায়
কম্পিতস্বরেতে (দেহ লাগিল কঁপিতে-
কঁপিতে লাগিল তার ওপ্রান্তদ্বয়,
গােলাপ কুসুম যথা মধুর বায়ুতে
কঁপে ধীরে বসন্তের আগমন হ'লে )
নিপট কম্পিত স্বরে তবে দ্বিজ বলে—
‘রক্ষা কর মহাভাগ। দরিদ্র ব্রাহ্মণে
ধাইয়া আসিছে অই রাক্ষসের প্রায়
নিষ্ঠুর যবন; রক্ষা কর দীন জনে।”
কপিতে লাগিলা তবু যেমতি রে হায়
নবমী পূজার ছাগ-শিশু, সদ্য-স্নাত,
বলি-কাষ্ঠে বাঁধা,—করি’ তারে আশা দান
(৬২)
যষ্ঠ সর্গ।
বলিল, শঙ্কর-“কেন দ্বিজ শঙ্কা এত ?
যতক্ষণ দেহে মম আছে তুচ্ছ প্রাণ
কারেও না দিব আমি ছুতে তব দেহে।”
এত বলি আশ্বাসিলা শঙ্কিত ব্রাহ্মণে ;
যত্নে ল’য়ে গেল নিজ পর্ণশালা গেহে।
তুষ্ট করিলেন তারে অশনে, বসনে।
সম্রাটের কর্মচারী নিষ্ঠুর যবন
সের খা, শঙ্কর-স্পর্ধা জানিল তখন।
যথাকালে সের খাঁ নিষ্ঠুর কর্মচারী
পাঠাইলা প্রহরীরে ধরিয়া আনিতে
শঙ্করে সভার মাঝে ;–যবনের অরি
(দিয়াছে আশ্রয় যেই আপন কুটীতে
যবনের আকাঙিক্ষত দরিদ্র ব্রাহ্মণে।)
সের খ সম্মুখে যবে হৈলা উপস্থিত
দয়াবীর রাজসখা, হায় রে তখনে
বলিলা ক্রোধের ভরে—“যদি চাহ হিত,
শীঘ্ৰ গতি ছেড়ে দাও দরিদ্র ব্রাহ্মণে।”
‘ক্ষম মােরে জাহাপনা,” শঙ্কর উত্তরে ;-
“হয়েছে শরণাপন্ন ব্রাহ্মণ এক্ষণে
আমার কুটীরে, হায় বলহ কি করে
(৬৩)
।
প্রভাবতী কাব্য।
আপনার করে তারে অর্পণ করিব?
কেমনে শরণাপন্ন খাদ্য নিক্ষেপিৰ
যমকল্প খাদকের বদন ব্যাদানে ?
যে ক্ষতি করেছে দ্বিজ, পূরণিতে তাহা
সম্পূর্ণ প্রস্তুত দাস, অনুকম্পাদানে
সেই এক কঠোরা ভিন্ন, আর যাহা
সাধিতে বলিবে তুমি সাধিব এখনে;
শুধু এক অনুরােধ-বারেকের তরে
ছাড়ি দেহ জাহাপনা দরিদ্র ব্রাহ্মণে।”
শঙ্করের বাক্যে তবে সেরখা উত্তরে
( সে নিষ্ঠুর বিচারক লাগিলা করিতে
ক্রোধে গরগর, করে যথা বিষধর
অভীতি খাদ্য তা’র বদন হইতে
যদি কেহ কাড়ি লয় “পাপিষ্ঠ শঙ্কর
সমুচিৎ প্রতিফল দিব আমি তােরে।”
প্রতিহারি! কারাগারে রাখ বন্দী করে।
মূৰ্ত্তিমান্ যমদূতকল্প সে প্রহরী
ল'য়ে গেলা কারাগারে বিক্রমী শঙ্করে।
আজি তাঁর দীপ্ত চক্ষু, যেমতি কেশরী
পড়ে বাঁধা যবে শত্রু-আনায়-মাঝারে।
(৬৪}
যষ্ঠ সর্গ।
হিমাদ্রি-প্রতিম তার অটল হৃদয় ;
শান্তমূৰ্ত্তি ধরে বীর, অবনী যেমনে-
ভীম তুফানের পূর্বে; কিম্বা যথা হায়
তরুবর রাত্রিযােগে বাতাস বিহনে।
শান্তমূৰ্ত্তি-মাঝে শােভে বীরত্ব-আভাস,
বারিদ-পুঞ্জের অন্তরালে রবিকর
যথা উজ্জ্বলতা সহ হয় সুপ্রকাশ;
অথবা যেমতি ভস্ম-পের মাঝার
ফুটিয়া রহিয়া থাকে মানব নয়ন
বাঁধি, মরকত মণি (হরিৎবরণ।)
মানব-মনীষা বুঝি বিকসিত হয়
বিপত্তি সময়ে, ঋতুরাজ আগমনে
উদ্যান ভিতরে যথা পুষ্প সমুদয় ,
তাই আজি দেখিতেছি শঙ্কর ব্রাহ্মণে
অটলতা গাম্ভীর্যের মধুর মিলন।
সংসার করম ক্ষেত্র, বিজয়ী হইতে
সে তুমুল রণে ইচ্ছা করে যেই জন,
সমরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ধরিতে
হইবে তাহার ভিন্ন ভিন্ন অঞ্জ যত,
অটলতা শরাসন কভুবা ধরিবে
(৬৫)
প্রভাবতী কাব্য ; ত্যাজিবে শিঞ্জিনী তার অর্জুনের মত ; কভুবা ধীরত্ব-অসি করেতে লইবে ; ক্ষিপ্রহস্ততা’র খড়গ লইবে নিমেষে, গাম্ভীর্যের সন্ধিপত্র হ'বে অবশেষে। শঙ্করের কারাগৃহ প্রকোষ্ঠ সুন্দর, চারিধার সুসজ্জিত,রাজা কিম্বা কোন সুসম্পন্ন মানবের উপযুক্ত ঘর। শঙ্কর অধােবদনে কারা-গৃহে হেন আছেন বসিয়া ওই প্রদোষ সময় ; অদূরে তাহার, ক্ষুদ্র প্রদীপ জ্বলিছে- করিতেছে টিপ, টিপ, নির্বাপিত প্রায় ; অস্থির বাতাস সনে অস্থির হইছে ; উজ্জ্বল হইছে কভু, কখনও বা ক্ষীণ, আরাে ক্ষীণ, ক্ষীণতর, হায় অবশেষে নিবে গেল আঁধারিয়া গৃহ, আয়ুহীন মানবের মত, মৃদু মধুর বাতাসে, নির্জন-তমিস্রময় সেই কারাঘরে অন্যের তাতে হায়, পড়ে ধরপরে --- একবিন্দু অশ্রু শুধু শঙ্কর নয়ন- হ’তে, হায় বুঝি তাঁর প্রিয় স্বদেশের (৬৬) যষ্ঠ সর্গ। প্রিয়তম সুহৃদের—আত্মীয় স্বজন আর ভবিষ্যৎ তার জীবনারণ্যের একমাত্র সহচরী সতী কল্যাণীর ভক্তি-প্রীতি-স্নেহরাশি এক হয়ে সব পড়িল নয়ন হ'তে একবিন্দু নীর- রূপে; আজি সারাদিন কল্যাণীর ধব দিনপাত করিছেন বসি' অনশনে, ধৰ্ম্মে দিয়ে জলাঞ্জলি কেমনে ব্রাহ্মণ যবনের স্পষ্ট অন্ন তুলিবে বদনে ? কারাগৃহে অনশন-ব্রতের পালন পরবেশ কৃতান্তের রাজ্যের মাঝার- তার চেয়ে শতগুণে হয় শ্রেয়স্কর। কতক্ষণ পরে তবে মুক্ত বাতায়নে উঠিয়া আসিল দ্বিজ, দেখিলা সম্মুখে বসন্তের সপ্তমীর সুধাংশু-কিরণে মানবের যাতায়াত ; গগনের বুকে অসংখ্য তারকা-রাজি করিছে বিরাজ প্রকাণ্ড হ্রদের মাঝে—অর্থ বিকসিত কেহ,—কেহবা সম্পূর্ণ স্ফুট, কমলজ শত শত রয়েছে ফুটিয়া, বিবাসিত (৬৭) ন
প্রভাবতী কাব্য।
বিপন্ন শঙ্কর পানে রয়েছে চাহিয়া
প্রকাশি’ সহানুভূতি, মধু শশধর,
প্রদানিছে ম্লান-জ্যোতিঃ দুঃখিত হইয়া
যেন বা তাহার দুঃখে, এক্ষণে শঙ্কর
গাহিল বিরহ গীতি, মন্ত্রধ্বানে তাঁর
কম্পিত হইল গৃহ, উপবন আর ।
গীত।
উদিল গগনে শশী।
মুক্ত বাতায়ন দিয়ে দেখাদিছে
অমল ধবল হাসি।
আশে পাশে তার তারকা নিকর,
সুনীল আকাশে শােভিছে সুন্দর
এ হেন সময়ে মনােমুগ্ধকর
কোথায় যশােরবাসী ?
আমি কেন গবাক্ষের দ্বারে আজি
কি জানি কি ভেবে বসি?
কোথায় প্রতাপ প্রাণসখা মাের -
কোথা সূৰ্য্য, সুন্দর ?
আজি এ নিশীথে কি করিছে তারা
কি করিছে যশােহর ?
(৬৮)
যষ্ঠ সণ, অাধার গগনে সুধাংশু-তিন কল্যাণী মাের কি করিছে এখন ? কে আছে আমার সুহৃদ এমন কে বলিবে পরকাশি? আমি হেথা আজি শূন্যমনে আছি কি জানি কি ভেবে বসি ? ক্ষণপরে প্রতিহারী প্রদীপ লইয়া উপস্থিত হ'ল সেই প্রকোষ্ঠ মাঝার ; বিষন্ন ব্রাহ্মণে তবে বলিল ডাকিয়া, “প্রহরীর প্রতি কি আজ্ঞা হে দ্বিজবর ? প্রস্তুত তৰ খাদ্য হয়েছে এখন, আজ্ঞা পেলে এনে দিই প্রকোষ্ঠ মাঝার।” বাধা দিয়া বাক্যে দ্বিজ বলিলা তখন, “নরাধম, এককথা শুনি বারবার তব মুখে, জানিও নিশ্চয়—এ ব্রাহ্মণ অনাহারে জজ্জরিত হয়ে তেয়াগিবে অন্ধকার কারাগৃহে এ ছার জীবন, তীক্ষ অসি বক্ষমাঝে আমূল বিঁধিবে, প্রহরি। কখনাে তবু বিধর্মী যবন- স্পৃষ্ট অন্ন পরশ না করিবে ব্রাহ্মণ।” (৬৯)
প্রভাবতী কাব্য
“বুঝি আমি সব, জানি আমি দ্বিজবর ।
আমারাে ধরম আছে ;” প্রহরী শঙ্করে
লাগিল বলিতে, (আহা কি মধুর স্বর!)
“আমারাে পরাণ আছে এদেহ মাঝারে;
‘এক ঈশ্বরের সৃষ্ট’-তােমারি মতন
বাৎসল্য, মমতা, দেহে আছে দয়া মায়া ;
গৃহে আছে পরিবার দারা সুতগণ;
উচাটন চিত্ত সদা তাদের লাগিয়া,
কি করিব দ্বিজবর, জঠর জ্বালায়-
ধরেছি দাসত্ব-বৃত্তি;—গােলাম হয়েছি,
নিষ্ঠুর, নির্মম সেই প্রভুর সেবায়
ভীষণ শাৰ্দল-মূৰ্ত্তি সেহেতু ধরেছি।
কি বলিব সেরখাকে বল দ্বিজবর।”
এত বলি চাহি থাকে তার মুখ’পর।
ঘৃণায়, লজ্জায়, রােষে থাকিলা শঙ্কর
বসিয়া হধােবদনে ; প্রহরী-কথায়
হেলা করি’ বীরবর করে না উত্তর ;
প্রতিহারী পুনরায় শুধালে তাহায়,
করিলা উত্তর দান, “বল গিয়া তারে,
শুদ্ধাচারী সুব্রাহ্মণ স্বহস্ত-রচিত
(৭০)
ষষ্ঠ সগ।
পাক স্বীয়হস্তে দেয় যদ্যপি আমারে,
তবে জেনাে সেই অন্ন হইবে ভক্ষিত
নতুবা কখনাে নহে জেনাে সুনিশ্চিত ;
যদি বাঞ্ছা হয় তব, যাও সেই স্থানে।”
বদনের কুটী করিলা আচম্বিৎ,
প্রকাশিলা তাহে শুধু ঘৃণা, অপমানে।
প্রহরী “যে আজ্ঞা” বলি চলিল সত্বর,
শূন্যমনে চাহিয়া থাকিল বীরবর।
(৭১)
সপ্তম সর্গ।
মুক্তিযুদ্ধ।
"Cowards die manytiines before their deaths ;
The valiant never taste of death but once."
William Shakespeare:
"Never euding, still beginning.
Fighting still and still destroying."
Jolin Dryden.
রক্তিমা ছটায়
রঞ্জিয়া তপন
পূরব আকাশ
মানব নয়ন
উঠিল ধীরে,
ধাঁধিয়া সে ছটা
ইচ্ছার নীরে।
শােভিল সুন্দর
লইয়া সবিতা
উজল মরীচি
প্রবেশিল রাজ
শঙ্কর চিন্তায়
সভার মাঝে,
চিন্তিত সকলে-
আপন কাজে।
মগন সকলে
(৭২)
সপ্তম সর্গ। তটিনী গায় ; যশােরের ভীম বিক্রমী শার্দল বদ্ধ আজি দুষ্ট যবন-জালে, কেমনে তাহারে উদ্ধার করিবে ভাবিছে,-কৌশলে অথবা বলে । কেন সূৰ্য্যদেব ক্রমে উষ্ণ-কর বিতরি’ পীড়িছ যশাের জনে? কাটা ঘায়ে কেন নুন প্ৰক্ষালিয়ে যন্ত্রণার বৃদ্ধি করিছ মনে ? শঙ্কর চিন্তায় চিন্তিত তাহারা ছুটিছে ঘরম শীতল কিরণ কর বিতরণ ওহে বিরােচন। ধরেছি পায়। কতক্ষণ পরে সুগম্ভীর স্বরে সূৰ্য্যকান্তে ডাকি প্রতাপ বলে,- “কহ প্রিয়সখা প্রধান সচিব। শঙ্কর উদ্ধার করি কি কলে?” রাজ-আসনের বামপার্শ্বে বীর বসিয়া আছিলা প্রতাপের বাক্যে এবে বীরবর সগর্বে উত্তর (৭৩) চিন্তিত-মন; করিলা দান ;- প্রভাবতী কাব্য “হে রাজন্ যদি পাই গাে মুখের শঙ্কর-উদ্ধার বিপর্যস্ত করি আদেশ বাণী ; কি ছার কম ? এ ধরা খানি। দেহ আজ্ঞা মােরে সঙ্গে দাও কিছু বাঁধিয়া আনিব সের খা যবনে উধারিতে তারে সৈনিকজনে, সম্মুখে তােমার অমাত্য-সনে। শঙ্কর মােদের প্রাণ প্রিয়সখা বন্দী আজি হায় বিক্রমী শাৰ্দল আবদ্ধ যবন- যবন-করে ; ভাগ্য-বিপৰ্যয়ে পাশ ভিতরে। নিষ্ঠাবান্ তিনি ব্রাহ্মণ তনয়- জানি না কি ভাবে যবন গেহে; যাপিছেন কাল; হায় অনশনে, বুঝি বা আছেন বিষন্ন দেহে। শরীর ভিতরে থাকিতে পরাণ কেমনে নীরবে সহিয়া থাকি ? হে রাজন্ ত্বরা করি’ দেহ আজ্ঞা, চঞ্চল দাসের পরাণ-পাখী।” (৭৪) সপ্তম সর্গ । নীরবিলা যুবা ; পিধান মাঝারে অসিধ্বনি হ’ল সুপরকাশ; যােগ দিলা তাহে ধ্বনিয়া অস্ফুট সুন্দর-কমল- ভবানীদাস। প্রশান্ত-নয়নে সূৰ্য-পানে চাহি, কহিলা প্রতাপ গম্ভীর ধ্বনে, “তব যােগ্য কথা এই বটে বীর, বীর (ই) বীরত্বের মহিমা জানে। কিন্তু সূৰ্য্যকান্ত, কি ঘাের শঙ্কট, কি ঘাের দুর্দৈব সম্মুখে এবে ; কৌশল অথবা বল অবলম্বি যাব কোন পথে দেহ ভেবে। সহস্র সহস্র সৈন্য অগনন সের খাঁ অধীনে সজ্জিত আছে; কিছু সৈন্য লয়ে কি করিবে ভার, ঢিল ছােড়া শুধু পর্বত কাছে। তার চেয়ে ছল হবে শ্রেয়স্কর শঙ্করের কারা গৃহ-প্রহরী ; বিভাবরী-যােগে ছেড়ে দিতে পারে উৎকোচের লােভ মােহহতে পড়ি। (৭৫) প্রভাবতী কাব্য তাই যদি হয় পাঠাও তথায় অন্য অলক্ষিতে প্রহরীর কাছে অদ্য নিশিথিনী জনৈক বীরে ; কারাগৃহ-ঘরে যাইবে ধীরে। কে যাইবে বল ?” আজ্ঞা পেলে দাস প্রশান্ত বদনে সাহঙ্কারে বীর বলিলা প্রতাপ এক্ষণে কেমনে শঙ্করের মুক্তি ব্যাঘ্র প্রায় আক্র- “হে রাজন্ তব যাইতে পারে ; কুঞ্চিত ললাটে উত্তর করে। “না না সূৰ্য্যকান্ত, যাইবে তুমি, হইলে, সের খ মিবে এ ভূমি। তাহার সহিত করিতে হবে।” নীরব সকলে ; গম্ভীরভাবে। প্রদানিতে রণ সৈন্যের সংগ্রহ নীরবিলা নৃপ; বসিয়া সকলে সহসা রে এক সভার মাঝারে উঠিল মূরতি তালবৃক্ষ প্রায় বরণ ধবল মধুর কায় ; দেহের উচ্চতা, কৌমুদী প্রায়। (৭৬) সপ্তম সর্গ। সুবলিষ্ঠ দেহ ; বাহুযুগ্ম তার মনে হয় যেন শ্মশ্রু গুস্থ মাঝে বসন্ত-আকাশে স্পর্শিছে জানু, মু'খানি তাহার সন্ধ্যার ভানু। প্রতাপ সমীপে, পারে এ দাস। সে বীরের পানে লাবণ্য-ভাস। বলে ধীরে ধীরে “সে কাৰ্য সাধিতে চাহিলা প্রতাপ চাহিয়া দেখিল চাহিয়া দেখিলা- সরসিজ, স্থির ললাটে তাহার == প্রশান্ত বয়ান, সলিল’পরে ; বীরত্বের রেখা সতত সমর আকাঙক্ষা করে। সে বীরের পানে চাহিয়া প্রতাপ হইল স্তম্ভিত বিস্মিত আর আহলাদিত মনে ; আনন্দ উচ্ছাসে আদেশিলা উধা- রিতে শঙ্কর। অমনি ছুটিল আনন্দ কল্লোল পূর্ণবেগে সভা প্রবাহ’পরি ; প্রতাপের জয়' বলিয়া সকলে উঠাল ঝঙ্কার দিগন্ত ভরি'। (৭৭)
প্রভাবতী কাব্য
—
সভা ভঙ্গে বীর শঙ্কর উদ্ধারে
করিল প্রয়াণ
রাজ-মহালে ;
দ্বিতীয় প্রহর নিশীথে তথায়
উপস্থিত হয়ে দ্বারীকে বলে,
“কোথায় শঙ্কর ? কি ভাবে সে বীর
যাপিছেন কাল এ কারাগারে ?
এইক্ষণে হায় কি ভাবে আছেন
বারেক দেখাতে পার কি তারে ?”
“কে তুমি মানব এ ঘাের নিশীথে ?”
বলিতে লাগিল শঙ্কর-দ্বারী,
“এসেছ হায় রে কারাগার মাঝে
জীবনের মায়া বর্জন করি।
জীবনের মায়া করিয়া বর্জন
এসেছ করাল
ব্যাঘের মুখে,
সের খা আদেশে এই তীক্ষ্ণ অসি
এখনি বসাব তােমার বুকে।”
পিধান হইতে উঠাইয়া অসি
সৌদামিনীগতি
সম্মুখে ধরে ;
অমনি চকিতে সে বীর-প্রবর
প্রত্যাখ্যান, অসি. আঘাতে করে।
(৭৮)
সপ্তম সর্গ। নাহি ডরি তাহে” বলিলা পুনঃ “বসাইও পরে জলদ-নির্ঘোষে ও বীরত্ব তব যাহা বলি আগে তুচ্ছ বীরকাছে “এই কি আদেশ নিশীথে যদ্যপি আমূল বিঁধিয়া শাণিত রঞ্জিত তাহাই শুন, তােমার প্রভুর আইসে কেহ, তীক্ষ্ণধার অসি করিবে দেহ?” প্রভুর আমার মৃদুল-স্বরে ; কারাগার হতে ছাড়িয়া কারে(ও),” প্রতাপের চর ; “ এই আদেশ বলিলা প্রহরী “কি করিবে প্রভু যদি তুমি দেও এতেক বলিয়া চাহিয়া থাকিল আশঙ্কার চিহ আকর্ণ বিস্তৃত আগেকার মত আবার প্রহরী “বন্দীর মুকতি, সের খার বজ মুখের পানে দেখা দিল তার নয়ন-কোণে। মেদুর-নিস্বনে বলিল তারে, কি ভীষণ কথা ! পড়িবে শিরে।” ৭৯) প্রভাবতী কাব্য। “জান কি প্রহরী বিনা দোষে বন্দী “জেনে কি করিব প্রভু সঙ্গে বাদ “জান না কি দ্বারী অধৰ্ম্মের ক্ষয় সত্য বটে আছে শঙ্কর মােদের যবন-করে।” গােলাম কি কভু করিতে পারে?” ধরমের জয় অবশ্য হয়, ধরমের পথে কণ্টকচয়। সহ সহস্র গন্তব্য স্থানেতে উপেক্ষিতে হবে নির্ভীকতা-ডােরে কর্মক্ষেত্রে হও এত বলি চর প্রহরীর করে যাইতে হইলে কণ্টক-রাশি; বাধ হিয়া তব সৎ-সাহসী।” উৎকোচ-মুদ্রা ; ক্ষণেকের তরে তঁার পানে দ্বারী গুজিয়া দিল বিস্মিত হইয়া চাহিয়া র’ল। অহিফেন-ভােজী অফেন ধরিলে তার বলে যথা কাৰ্য করে ; মুদ্রার প্রভাবে তাসাধ্য সাধিল তেমতি প্রহরী মুহূর্ত পরে। (৮০) সপ্তম সর্গ। বলিহারি যাই ওগাে মুদ্রাদেবী জগতে অসাধ্য তব কি কাৰ্য্য, তােমার মহিমা অতুল জগতে; অক্ষম লেখনী কি করে ধার্য্য। যােড়শােপচারে পৃজিছে মানব স্থাপি' লৌহ-কাষ্ঠ- মন্দির মাঝে ; তােমাকে লভিতে সাজিছে তাহারা বিকট শ্মশান, প্রেতের সাজে। প্রিয় সােদরের মেহবক্ষে অসি বিধিতে তাহারা কভু না ডরে ; রাম লক্ষণের পবিত্র প্রণয় ভুলেছে তাহারা তােমারি তরে। কতক্ষণ দ্বারী থাকিল সে ভাবে ফেরে চিত্তগতি বিজুলী প্রায় বিপ্রে মুক্ত করি’ গারদ বাহিরে চরের সহিত রাখিয়া যায় । বালার্কের আগমনে রাজ-মহলের আবাল বৃদ্ধ বনিতা শুনিল সকলে শঙ্করের পলায়ন কথা,—শিহরিল- তরাসে সবার দেহ হ’ল কণ্টকিত ; ভাবিল নিমেষে—আজি বুঝি নিরমম (৮১) ;
প্রভাবতী কাব্য সের খার মহাব ব্রাহ্মণের শিরে হইবে পতিত; তাই সেই দুৰ্ম্মতির এই দুষ্টমতি—সের খার অসাক্ষাতে রাত্রিযােগে পলায়ন কারাগার হতে। যথাকালে নিরমম যবন সের খ শুনিল সে বার্তা, উঠিল গর্জিয়া, যথা বিষধর- কবল হইতে ভেক যবে দূরে পলাইয়া যায় বিধির কৌশলে । ডাকিলা সে প্রহরীরে, শঙ্করের দ্বারে আছিল যে রাত্রিযােগে, রাখিল পূরিয়া ভীষণ-তমিস্রময় সেই কারাগৃহে। চৌদিকে প্রেরিল যত গজারােহী আর অশ্বারােহী, পদাতিক চর অগনন ধরিয়া আনিতে সেই পলাতক দ্বিজে অবিলম্বে সভামাঝে সের খা সম্মুখে। কিছুদিন পরে রাজ্য-চতুর্দিক হ'তে ফিরে এল চরগণ শুধু নিরাশার- ডালি শিরে ধরি’ সের খাঁর সম্মুখেতে। চতুর শঙ্কর দ্বিজ পলায়ন পরে লুকায়েছে কোন্ গুপ্তস্থানে হায়, তার সন্ধান না পেল কেহ ; আদেশিলা তবে (৮২) সপ্তম সর্গ = সের খাঁ সৈনিকগণে পশি’ অস্ত্রাগারে সাজিতে বীরের সাজে-করিতে সমর প্রতাপ-আদিত্য সনে, যেই সুচতুর কায়স্থ-নৃপতি-চর প্রহরীরে নানা- ছলে ভুলাইয়া সাধিয়াছে শঙ্করের উদ্ধার, কি স্পর্ধা তার! শুনি হাসি পায় ক্ষুদ্ৰাদপি ক্ষুদ্র ফেরু হয়ে চায় পূর্ণ- আধিপত্য মৃগেন্দ্রের পরে। সৈন্য ল'য়ে আক্রমিলে কোন্ বীর সমর্থ হইবে রক্ষিতে তাহারে ? দারাসুতগণ সহ অন্ধকার কারাগৃহে রাখিলে পূরিয়া কার হেন সাধ্য আছে বাধা দিতে পারে ? ছুটিল সমর কথা প্রতি মুখে মুখে ; কত আন্দোলন পড়ে গেল পথে পথে নাগরিকবৃন্দ-মাঝে ; কেহ বলে কারে এইবার প্রতাপের দর্পচূর্ণ হবে ; বলে অন্যজন,—কিন্তু শঙ্কর-বন্দীতে বৰ্ত্তিছে সম্পূর্ণ দোষ সের খার পরে। শঙ্কর দয়ালুচিত্ত ;-এক দ্বিজ পরে কৃপা প্রদর্শন হায় করিতে যাইয়া এ হেন দুর্গতি তাঁর সের খার করে। (৮৩) .
প্রভাবতী কাব্য
সহ।
=
কৃপার নাহিক লেশ শরীর ভিতরে,
এইরূপে বলাবলি করিতেছে কত,
নানামুনি নানামত করিছে প্রচার।
সসৈন্যে করিলা যাত্রা সেরখ। দুমতি
যশােহর পানে—দিতে রণ প্রতাপের
রাজ মহাল আর যশােরের
মাঝখানে স্থাপিলা শিবির, পথক্লান্তি
দিল দূরে তাড়াইয়া বিশ্রামের বলে
কিছুদিন শিবির মাঝারে । প্রতাপের
অনুচর, জেনে গেল যুদ্ধ সজ্জা তঁার -
যুদ্ধের কৌশল, গুপ্ত অভিসন্ধি আর ।
যথাকালে চরমুখে সেরখ।-সংবাদ
পাইয়া সাজিল বীর প্রতাপ-আদিত্য
রণসাজে ; সাজে আর সূৰ্য্যকান্ত
শঙ্কর, সুন্দর ; রাজম’ল অভিমুখে
বাজাইয়া রণভেরী চলিলা সকলে।
যথাকালে উপস্থিত যুদ্ধক্ষেত্রে তারা,
যথাস্থানে স্থাপিলা শিবির। রণভেরী
উঠিল বাজিয়া তথা, নৃপতি প্রতাপ
রচিলা কৌশলে বৃহ—বিভক্ত করিল।
দুই ভাগে সৈন্যবৃন্দ ;-বামভাগে তার
(৮৪)
;
সপ্তম সর্গ। অধ্যক্ষ শঙ্কর বীর-দক্ষিণে প্রতাপ- সহযােগী সূয্যকান্ত,—পদাতিক যত দাড়ায় সম্মুখ ভাগে—পশ্চাদ্ভাগে তার অশ্বারােহী, গজারােহী সৈন্য অগনন। আবার বাজিল ভেরী, আরম্ভিল রণ; দুই দলে মহাযুদ্ধ-কামুক টঙ্কার— অসির নিস্বন-সৈন্যদের জয়ােল্লাস পূরিল দিগন্তব্যাপি, দু’পক্ষের হায় সৈন্য শত শত শত পড়িছে ভূতলে ; কে করে গণনা তার ? পড়ে ধরাপরে ছিন্ন হয়ে শত্রু অস্ত্রে ; প্রলয়ের কালে অসংখ্য তারকা যেন পড়িছে খসিয়া, এহেন সৈন্যের ক্ষয় হেরিয়া প্রতাপ মাইতে রণমদে ডাকিয়া বলিলা স্বীয় সৈন্যবৃন্দে—“শুন মম সৈন্যগণ ! সম্মুখে কৰ্ত্তব্য হের রয়েছে পড়িয়া, জ্বলিছে সমরানল উচ্চ শিখা তুলি ; বিস্মরি’ সংসার-মায়া, মায়া দয়া আর দারাসুত জ্ঞাতি কুটুম্বের, ঝাপ দেও আজি সেই অনলের মাঝে, দূর কর যশােরের---তব প্রিয়তম স্বদেশের (৮৫)
প্রভাতী কাব্য
;
কলঙ্ক কালিমা; মুছ অশ্রুবিন্দু তার ;
সাধিতে তাহার হিত যবনের সহ
কর যুদ্ধ প্রাণপণে; যবনের দেহ হ'তে
ছিন্ন কর মুণ্ড, দেখ চেয়ে অই
ভীমামূৰ্ত্তি মহাকালী সম্মুখে দাড়ায়ে,
পিপাসু রসনা তঁার করে লক্ লক্।
উদ্গ্রীব যবন-রক্ত করিবারে পান।
অই হের করে তার তীক্ষ্ণধার অসি-
শােভিছে উজল—কঁপিতেছে বারবার
ঝলসি’ মানব চক্ষু-জানাইয়া বুঝি
সমর বাসনা যবনের রক্তপান।”
নববৎসাহে সেরসেনা দেখিতে দেখিতে
আক্রমে শঙ্কর-সৈন্য ভীম শালের
পাল সম ; তীক্ষ্ণ অসি আঘাতে শঙ্কর
ছেদন করিলা মুণ্ড সম্মুখ সৈন্যের ;
নীলাকাশ হ'তে ঋক্ষ পড়িল খসিয়া,
অমনি সহস্র সৈন্য আক্রমে আবার ;
শঙ্করের সৈন্যগণ প্রাণপণ রাখি-
বাধাদিতে তাহাদের হ’ল অগ্রসর ;
কিন্তু অগনন সৈন্য-প্রবাহ কেমনে
মুষ্টিমেয় সৈন্য-বালুকার কণা দিয়া
(৮৬)
সপ্তম সর্গ।
রাখিবে রােধিয়া, হায় শুধু বিড়ম্বনা !
শঙ্করের সৈন্যগণ লাগিল ছুটিতে
পশ্চাদ্ভাগে জলাভূমি মাঝে, জয়ােল্লাসে
হুঙ্কারি “আল্লাহহা আকবর” সের খার
সৈন্য ছুটে তাহাদের পাছে, জয়ােল্লাসে
হইল আত্ম-বিস্মৃত ; ক্রমে চলে যায়
সেই জলাভূমি মাঝে, সুযোগ বুঝিয়া
বীরগণ সূৰ্য্যকান্ত প্রতাপ এবার
সের খার মেষপালে দৃপ্তব্যাঘ্র-সম
হইল পতিত, এবে লাগিলা ছেদিতে
অবিরত যবনের মুণ্ড, আল্লাদিত
বালক যেমতি অস্ত্র ল’য়ে কচুবনে
পশিয়া ছেদিতে থাকে ত্যজি তার মায়া।
হয়ে গেল এলােথেলাে যবনের সৈন্য
সেই জলাভূমি মাঝে, ক্রমে ক্রমে ক্রমে
নিঃশেষ হইয়া আসে সৈন্য অগনন।
“জয় প্রতাপের জয়” ভীষণ নিনাদ
উঠিল গগনমার্গে, হ’ল প্রতিধ্বনি
যুদ্ধক্ষেত্ৰ-মাঝে “জয় প্রতাপের জয়।
সেই জলাভূমি পরে কাপাইয়া জল
হ’ল প্রতিধ্বনি “জয় প্রতাপের জয়।”
(৮৭)
অষ্টম সর্গ।
কলঙ্ক।
"But yesterday, the word of Ceasare might
Have stood against the world , now lies he there
And none so poor to do him reverence."
William Shakespeare.
আজি কি মােহনসাজে হের, সাজিয়াছে ওই
যশাের নগর ;
রাজপ্রাসাদের স্থানে স্থানে আনন্দের ধ্বজ
উড়িছে সুন্দর।
চলিতেছে দিবসের সরব প্রথম অঙ্ক,
তেঁই বিরােচন,
গগনে উদিত হয়ে, মত্ত করে ধরা, লয়ে
সহ কিরণ।
পাপিয়া, দোয়েল, পিক, শাখা’পরে ধরিয়াছে
সুমধুর তান ;
কি মহান ভাবাবেশ-বহিতেছে ধরাপরে
কি প্রেম তুফান্।
(৮৮)
অষ্টম সর্গ বসন্তরায়ের আজি বাৎসরিক পিতৃশ্রাদ্ধ, রাজবাটী তাই; লােকে পূর্ণ চলিতেছে, ফিরিতেছে কত লােক, নেহারিতে পাই। চাহিয়া উদাসমনে দেখিছে কাঙ্গালগণ- বিস্ময়ে মগন ; পুলকে বিস্মৃত হ'য়ে-ভাবিতেছে,—রাজাদের কাৰ্যই এমন। বসন্তরায়ের আজি বাৎসরিক পিতৃশ্রাদ্ধ ; কি সুখ বাসর ! ছুটেছে প্রবাহ-কি মহা-কোমলতাময় কি আনন্দকর ! আসে কতস্থান হতে লােক, জলপথে কেহ- কেহ স্থলপথে ; আসিলা প্রতাপ আর, নিমন্ত্রণপত্র পেয়ে ধূমঘাট হতে। প্রফুল্ল বদন তার আজি ম্লান, নিদাঘের প্রসূনের প্রায় ; কঁপিছে শরীর ভার—মৃদুতে নীর সম কঁপে ওষ্ঠদ্বয়। (৮৯) প্রভাবতী কাব্য বহুদিন হ'তে জাতি-দ্বেষানলে পুড়িতেছে হায়, চিত্ত তার ; প্রবঞ্চনা-ঘৃতে খল ভবানন্দ জ্বালাইছে দ্বিগুণ আবার। ‘বসন্ত, প্রতাপে হিংসা করে’--বহুদিন হ'তে বিক্রম-তনয় পােষিতেছে এ ধারণা—তাই দুরু দুরু আজি তাহার হৃদয়। খিন্নমনে বীরবর প্রবেশিলা বসন্তের গৃহের ভিতর ; - ; দেখিলা সম্মুখে তার—দাড়ায়ে বসন্তরায় যথা তরুবর। ভঁরাে মুখপদ্ম আজি কি যেন কি খরতাপে হয়েছে মলিন ; পিতৃব্য ও ভ্রাতুস্পুত্র—চিত্রে আঁকা দুটী ছবি পলক বিহীন। ডাকিয়া বসন্তরায়ে বিষয় বিভাগ কথা জিজ্ঞাসিলা বীর- “হে পিতৃব্য, চাক্সিরি পরগণা দিয়া মােরে করই সুস্থির। (৯০ ) = তাহার অভাব দেব, হায়, পারিব না সহ- করিতে কখন ; আজি উৎসবের দিনে তব কাছে সেবকের এই আকিঞ্চন। “কেন গাে প্রতাপ কেন তব মুখে আজি হেন কথা বিপরীত ? দেখ বস। দেখ, সর্বপ্রকারেতে আমি তব সাধিতেছি হিত।” ক্ষণেক নিস্তব্ধ থাকি আবার বসন্তরায় লাগিলা বলিতে, “রাজ্যের ছ’আনা রাখি দশ আনা দিছি তােমা; কেন বাদী ইথে ?” উত্তরিলা বীরবর “চাহি না গাে দশ আনা ; লও রাজ্য তব ; ফিরে লও সব এবে--শুধু চাই চাকসিরি— তাতে (ই) সুখী হ'ব।” “একি কথা শুনি আজি ?” বলিলা বসন্তরায় কণ্ঠে সুকোমল ; ( কিন্তু সে বচনে তঁার মহাবিস্ময়ের ভাব ছিল গাে প্রবল।) (৯১)
প্রভাবতী কাব্য.
;
“শুনি নাই হেন কথা, প্রতাপ, তােমার মুখে
পূর্বে কোন দিন
পর ভাবিতেছ মােরে ?” সহসা বয়ান তার
হইল মলিন।
“আমার তনয়গণে উপেক্ষা করিয়া বৎস!
পেলেছি তােমায়
অপত্য-নিরবিশেষে-আজি তার প্রতিফল
এই বুঝি হায়।
কি ছার অসার নর, কি ছার অসার রাজ্য
অসার সংসার
ক্ষণস্থায়ী—দু’দিনের তরে এসেছে, সময়ে
যাইবে আবার।
চাহ তুমি চাকসিরি, কিন্তু এই ক্ষণকাল
আনি গঙ্গাজল ;
পুরাব বাসনা তব, অতি যতনের আশা
করিব সফল।”
এতবলি গঙ্গাজল আনিতে বসন্তরায়
আদেশে ভৃত্যরে।
হায় অবিমৃষ্যকারী প্রতাপ-আদিত্য বীর
বুঝিল না তারে।
(৯২)
অষ্টম সর্গ।
“গঙ্গাজল’বসন্তের তীক্ষ্ণধার অসি, হায় !
তাহাই বুঝিলা ;
খাপ হতে অসি তুলি লক্ষ করি তঁার শির
সরােষে বলিল,-
“কি বলিলে হে পিতৃব্য! “গঙ্গাজল এনে মাের
বাসনা পূরাবে ?
এই যে কৃতান্ত তব-স্মর এবে ইষ্টদেবে
আর না এ ভবে-
বলিতে বলিতে হায় অবিমৃষ্যকারী বীর
হানিল সে অসি;
১)
দেহ হতে মুণ্ড তাঁর উল্কার সমান পড়ে
ধরাতলে খসি।
হায় অবিমৃষ্যকারী বুঝিতে পারিলে না কি
কি কাজ করিলে ?
পিতৃব্য হনন করি' সুশুভ্র-চরিত্রে তব
কালিমা লেপিলে ?
যত্নে যত্নে যে তােমারে এতদিন রেখেছিল
বুকের মাঝারে ;
আজি কি প্রত্যুপকার করিলে হে বীরবর
কাটি তার শিরে ।
(৯৩)
প্রভাবতী কাব্য
যত দিন চন্দ্র, সূৰ্য্য, তারা ঘােষিবে জগৎ ;
বহিবে পবন;
একলঙ্ক শুভ্রবস্ত্রে কালিফোটা-মানবের
ধাধিবে নয়ন।
না না প্রতাপাদিত্য ইথে বিচিত্রতা মােরা
দেখিতে না পাই;
ভ্ৰমান্ধ মানব, তাই, অকারণ তােমা’পরে
দোষ দিতে যাই।
অসম্পূর্ণ ধরাপরে অসম্পূর্ণ সব হায়—
জীব জন্তুগণ;
তবে কেন বীরবর তােমার চরিত্র-র
হইবে পূরণ ?
যে বিধি পাষাণ-মনে সুধাংশু-রতনে হায়
কলঙ্ক লেপিছে, ;
মানবের অগােচর অগাধ জলধিতলে
রতন রাখিছে।
যে বিধি পাষাণ-মনে কমলে কণ্টক দিছে,
মরু পৃথিবীতে,
সে বিধি মানব-মনে দিয়াছে কুবুদ্ধি রাশি
কলঙ্ক রাখিতে।
(৯৪)
অষ্টম সগ
পিছনে গােবিন্দ রায় প্রতাপে করিয়া লক্ষ্য
তেয়াগিল তীর ;
অমনি মুহূৰ্ত্ত মধ্যে সকৌশলে প্রত্যাখ্যান
করিলা সে বীর।
বুঝিলা ভ্ৰমান্ধ বীর এ উৎসব আজি শুধু
ষড়যন্ত্র হায় ।
পিতৃব্য বসন্তরায় প্রতাপে করিতে হত্যা
পেতেছে আনায় ;
অমনি ছুটিলা বীর গােবিন্দ রায়ের পানে ;
তার দেহ হতে,
;
উপাড়িলা মুণ্ড হায় ; শােণিতের স্রোতেধারা
বহে প্রাসাদেতে।
উঠিল ক্রন্দনরােল দেখিতে দেখিতে সেই
রাজ-অন্তঃপুরে ;
উৎসবের সুখ-খেলা কোন্ স্বপনের মত
চ'লে গেল দূরে !
উঠিল ক্রন্দন ঝােল-কপায়ে রাজপ্রাসাদ
স্পর্শিল গগন।
রাজপ্রাসাদের ভ্রান্তি নিমেষে ঘুচিয়া গেল ;
হইল শ্মশান।
(৯৫)
প্রতাপ উত্মত্ত প্রায়--আজি বহিতেছে দেহে
হিংসার রুধির ;
ছুটিলা রাজপ্রাসাদ-মাকে ল'তে প্রতিশােধ
ছােটে যথা তীর।
নিরীহ মেষের পালে পড়িয়াছে ভীমতেজে
শাল ভীষণ।
ছুটিতেছে চীৎকারিয়া হেথা সেথা যে দিকে যে
পায়িছে যেমন।
প্রতাপ, হিংসা-অনলে জ্বালালাে নিষ্ঠুর-মনে
রাজপরিবার ;
অনুতাপ জন্য শুধু ছায়েখারে দিল সেই
সােণার সংসার।
বসন্তের রাজ্ঞী আজি লুকা’তে হৃদয় নিধি
উন্মত্তার প্রায় ;
তনয় রাঘব—শিশু পড়ে প্রতাপের
হাতে বুঝি হায় !
আর সব পলায়েছে—পারেনি রাঘব শুধু
পলাইবে কোথা ?
লুকাতে হৃদয় রত্ন চকিতনয়না দেখ--
উন্মাদিনী হােথা।
(৯৬)
অষ্টম সর্গ।
হােথা উচ্চ কচুবনে চেয়ে দেখ উন্মাদিনী
রাখিল লুকায়ে,
অমূল্য হৃদয়নিধিবালক রাঘবরায়ে
পাতা ঢাকা দিয়ে।
উন্মাদিনি! পুত্রপৗনে চকিতনয়নে কেন
চাও ফিরে ফিরে ?
করেছ মনন,প্রতাপের করে প্রদানিবে
আজি পুত্র-শিরে?
যাও উন্মাদিনী যাও, চাহিও না ফিরে আর
তনয়ের পানে ;
অপিয়া শঙ্করকরে তােমার রাঘব-প্রাণ,
যাও নিকেতনে।
আয়ু যদি থাকে তার, হয় যদি তব নিধি-
অবশ্য পাইবে ;
বদনচন্দ্রমা হেরি পতিশােক, পুত্রশােক
ভুলিয়া যাইবে।
কে বুঝে মায়ের প্রাণ, পারিল না ফিরে যেতে
তনয় ফেলিয়া ;
লুকাইয়া তনয়েরে আপনি প্রচ্ছন্ন-বেশে
থাকে লুকাইয়া।
(৯৭)
1s
প্রভাৰতী কাব্য।
কে বুঝে বিধির খেলা এ ভবসংসারে তার
দেখি কত খেলা ;
আঁধি সাধি অন্বেষণ করিয়া প্রতাপাদিত্য
আলয়ে ফিরিলা।
জননীর বঙ্গোনিধি-রাঘব জীবন ধন
গেলগাে বাঁচিয়া ;
প্রতাপ লইয়া গেলা কলঙ্ক কালিমা ডালি
মস্তকে করিয়া ।
(৯৮)
নবম সর্গ।
বাসনা পূরণ।
"Ah how sweet it is to love !
Ah, how gay is
young Desire !
And what pleasing pains we prove !
When we first approved Love's fire !"
John Dryden.
“আবার মিলেছি মােরা সেই ইচ্ছামতী তীরে;
কল ক ক কল
চলিছে যমুনা জল,
সেই মধু সমীরণ বহিতেছে ধীরে ধীরে।
“যমুনেচ্ছা প্রসঙ্গমে কি শােভা উঠেছে ফুটে,
তরঙ্গে তরঙ্গ তুলি
বীচি বক্ষ উঠে ফুলি
রবিকরে তরতর সাগরে চলিছে ছুটে।”
আষাঢ়ের অপরাহু, পশলা বৃষ্টির পরে
পরিষ্কার নীলাম্বর ;
মেঘ মুক্ত
দিবাকর
অপূর্ব জ্যোতির ছটা প্ৰদানিছে নীলাম্বরে।
(৯৯)
প্রণবী কায়
মধুর তান
ভিজিয়া কুলায় বসি, আবার বিহঙ্গগণ
ধরিছে
মাতায়ে জগৎ প্রাণ;
লহরী উঠায় তার, সরিৎ, প্রান্তর, বন।
গগনে উদিত দেখি দিবাকরে হাস্যমুখে
রাখালেরা পুনরায়
প্রান্তরে ছুটিয়া যায়,
নবীন পর্যায়ে খেলা আরম্ভিল মনসুখে।
আত্ৰ গাত্র গাভীগণ ঝাড়িয়া গাত্রের জল
অশ্বথের তলা ছাড়ি
আবার ছুটিল দৌড়ি ;
লভিতে অধীর হ’ল নবকুশাঙ্কুর দল।
প্রমত্ত ভ্রমরকুল আবার বসিল ফুলে ;
শাখা হতে জল ঝরে,
কে যেন বর্ষণ করে
অর্চনার পূত বারি স্বর্গ হ'তে, ধরাতলে
চলিল পথিক পুনঃ আপন গন্তব্য স্থানে;
আবার ‘ইচ্ছার পরে
তর তর তর তরে
ছুটিল তরণী কত মহাসাগরের পানে।
(১০০)
নব সর্গ।
সূর্যকান্ত, প্রভাবতী, অদূরে কুসুমােদ্যানে --
সূৰ্য্যকত স্নেহ ভরে
ডাকিয়া প্রিয়তমানে
বলিলা (যেমতি বীণা বাজে সুমধুরতানে ):-
“আবার মিলেছি মােরা সেই ইচ্ছামতী তীরে
ক ক ক কল্
চলিছে তটিনী জল,
সেই মধু সমীরণ বহিতেছে ধীরে ধীরে।
“ঢালিয়া দিতেছে কিবা পবিত্রতা শান্তিময় ।
সমর-স্রোতের মুখে
চলিছে যে সুখে দুঃখে
ক্ষণিক বিশ্রাম তার কাছে কি সুখ-উদয় ”
এতেক বলিয়া বীর থাকিলা নীরব হয়ে ;
নয়ন-আসারে ভাসি
প্রকৃতি-সৌন্দৰ্য-রাশি
পুনরায় কতদিন পরে দেখিলা চাহিয়ে।
সমর-নিগড়ে বদ্ধ হয়ে এতদিন ছিল
মুক্ত এবে বীরবর,
তাই যথা মুক্তশর
ফুল্ল প্রভাবতী পাশে দ্রুত ছুটিয়া আসিল।
(১০১)
;
প্রভাৰতী কাৰ্য হৃদয়ের ভাব সিন্ধু-বুকে প্রেমের লহরী উঠিতেছে উথলিয়া ; আজি কি যে প্ৰদানিয়া নিবারিবে তারে, ভেবে না পায় যবন-অরি। পাইছে ভাষা প্রকাশিতে মনের বেদন; প্রেমিক ভুলিয়া গেছে কেমনে প্রেমিকা কাছে আরম্ভিবে কথা, তাই প্রথমেই সম্ভাষণ- “আবার মিলেছি মােরা সেই ইচ্ছামতী তীরে কল্ কল কল ক চলিছে যমুনা জল ; সেই মধু সমীরণ বহিতেছে ধীরে ধীরে।” আরম্ভিলা যুদ্ধ কথা কিছু পরে প্রভাবতী- “বল মােরে প্রাণেশ্বর, বাসনা কি গাে আমার করিবে পূরণ এবে—সে যে মরমের অতি । “বাসনা দাসীর নাথ! শুনিবে সমর কথা; তব কাৰ্য্য পরিচয়- সের খার পরাজয়--- শুনিয়া জুড়াবে তার হৃদয়ের মৰ্ম্ম-ব্যথা। (১২) নবম সর্গ। “কেমনে প্রতাপ বীর বারবার অরি-সৈন্য- -কৌশলে অথবা বলে দলিয়া চরণতলে- বল কৃপাকণাদানে--সাধিলা অশেষ দৈন্য। “ভীষণ সমর ক্ষেত্রে রাখিতে মায়ের নাম কি করিল শঙ্কর ? কেমনে সে বীরবর যশঃসিন্ধু-মাঝে ঢালে নিরমল গুণগ্রাম।” জালিতে রহস্য-দীপ পত্নী-চিত্ত-মন্দিরেতে, সূৰ্য্য সুকোমল স্বরে উত্তর প্রদান করে। “কেন ধনি, বাঞ্ছা তব সমরের সংবাদেতে? “নারী তুমি, সুকোমল হিয়া তব পাবে ব্যথা; হয় বুঝি সে অনিলে দেহ-লতা ধরাতলে যাবে গড়াগড়ি; শুনিও না সে ভীষণ কথা। “আহতের হাহাকার—ভীম অশনি গজ্জন— তৃষ্ণার্তের কাতরতা শুনে হৃদে পাবে ব্যথা; সমরের বিভীষিকা—কি ভীষণ ! কি ভীষণ । (১৩)
প্রভাবতী কাব্য।
“চেয়াে না শুনিতে প্রিয়ে সে শােক-সংবাদ আর
“অবশ্য চাহিতে পারি”
বলিলা সে বীর নারী
কুঠার আঘাত করি মূলদেশে তামাসার।
“শুনিতে চাহিব না গো হায়, কি কথা—
বলিলে ?
7;
;
বীরের প্রেয়সী আমি,
যদি না বলিবে তুমি
রণ-কথা, তবে কেন রণ-বিদ্যা শিখাইলে ?"
“নারিনু বুঝিতে এতকালে (ও) রমণীর মন।
বলিল সূৰ্য্য উত্তরে-
“তামাসার ছল ক'রে
বলিনু ও কথা; কিন্তু পূর্বে কে জানে এমন ?”
বামার বদন-শশী আরক্তিম হ’ল এবে ;
অধােমুখে লজ্জা ভরে
দাড়াইলা দূরে সরে
বিচারক কাছে যেন চিরাপরাধিনী ভেবে।
মহামতি সূৰ্য্যকান্ত বুঝিয়া নিজের ভ্রম
প্রভাকে টানিয়া বুকে
চুম্বন
করিলে মুখে
রক্তবর্ণ হ'ল মুখ রক্তজবাফুলসম।
(১০৪)
নবম সর্গ • “না বুঝে করেছি দোষ, করিবে কি ক্ষমা মােরে? পদাজে অভাগিনী হয়েছে অপরাধিনী; ধন্যা হ’ব ক্ষম যদি -বলে প্রভা মানভরে। “যে দোষ করেছ তুমি প্রিয়ে, নাহি ক্ষমা তার” এতেক বলিয়া যুব। পার্শ্বে ফিরাইয়া গ্রীবা উঠিল হাসিয়া ; যােগ দিলা রমণী এবার। প্রেয়সীর মুখে বীর হাস্য-রেখা নিরখিরা বলিতে লাগিল। তবে মাতৃ যজ্ঞে—ঘােরাহবে বিপর্যস্ত করিয়াছে অরি সৈন্য কি করিয়া- “কালী যাঁর সেনাপতি, তঁার কি আছে ভাবনা ? জিনিবে প্রত্যেক রণ, সন্দেহের কি কারণ ? পড়েছে চৌদিকে প্রতাপের বিজয় ঘােষণা। “সের খার সঙ্গে যুদ্ধে”—বলিতে লাগিলা বীর- “যখন দেখিনু হায়-- জয়-লক্ষী চলে যায় বিপক্ষ যবন দলে-করিনু উপায় স্থির। (১০৫)
প্রভাবতী কাব্য।
“বামপার্শ্বে সেনাপতি মােদের শঙ্কর ছিলা
বিপক্ষ আঘাতে হায়,
তার সৈন্য সমুদায়
হ’ল বিপর্যস্ত; অমনি উপায় প্রয়োগিলা।
“সৈন্য সহ ফেরে পশ্চাদ্ভাগে জলাভূমি’পরে,
ভাবি—পৃষ্ঠ প্রদর্শন
অরি সৈন্য অগণন
ছুটে পাশেজয় নাদে গগন বিদীর্ণ করে ।
“জয় প্রতাপের জয়' বলি আমাদের যত
সৈন্য, পশ্চাদ্ভাগ হ'তে
অরি সৈন্য সঙ্ঘাতে
পড়িল শার্দল তেজে, অসংখ্য হইল হত;
“কেহ বা নিহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র তেয়াগিয়া
হায়, পলাইয়া গেল ;
চৌদিক ধ্বনিত হ'ল
জয়নাদ-সমীরণ পথে চলিল ভাসিয়া।
এইরূপে আগ্রা সম্রাটের সেনাপতি কত
সসৈন্যে সমর ভূমে
পরাজয়-শােক-ধূমে
আঁধার দেখিল চক্ষে ; হইল আহত,হত।
{১৬ )
নবম সর্ম।
“এইরূপে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্বাবিংশ আমির হায়,
হইয়াছে পরাজিত ;
চারিদিকে নিনাদিত
হইয়াছে মুহুর্মুহু ‘জয় প্রতাপের জয়'।”
সহসা করিলা চুপ, সূৰ্য্য এতেক বলিয়ে,
আবার মুহূর্ত পরে
বলিতে আরম্ভ করে-
“এইক্ষণ আমাদের পরিণয় হ'লে প্রিয়ে,
“ভাতিবে কি সুখশশী হৃদিনভােমণ্ডলে।
স্বদেশের কুলাঙ্গার
মানসিংহ এই বার
আসিতেছে সৈন্য সহ প্রতাপে ধরিবে বলে।
“যুঝিতে সমরক্ষেত্রে আবার নামিতে হবে
সেইহেতু প্রিয়তমে
পরিণয়ে এইক্ষণে
হবে কিবা সুখােদয়, মনঃকষ্ট দূরে যাবে।
‘যদিও বিবাহ বিনে আছি মহাসুখ-ভরে,
তবু ভেবে দেখ প্রিয়ে,
কি প্রতিবন্ধক দিয়ে
কে যেন পরাণ দুটী রেখেছে বিভিন্ন করে।
(১০৭)
প্রভাবতী কাব্য
“মাঝে যেন মহাসিন্ধু—মােরা দু’জন দু’পারে,
ঘুচেনা মনের ব্যথা---
পেীছে না প্রেমের কথা-
কি ভীষণ বৈশ্বানরে চিত্ত যেন জ্ব'লে মরে।”
“সত্য বটে” উত্তরিলা বামা সুমধুর স্বরে-
“কিন্তু কি বলিব আমি,
সকলি বুঝিছ তুমি,
বিবাহ সময় বুঝি এখনও বহু দূরে।
“আসিছে বিপক্ষ সৈন্য আগে যুদ্ধ
দিতে হবে,
হ'লে আমাদের জয়,
হবে পরে পরিণয় ;
মাতৃযজ্ঞ অনুষ্ঠানে কেন গাে নীরবে রবে ?
“কিন্তু এক অনুরােধ তােমার রাখিতে হবে,
যাবে তুমি যুদ্ধ-আশে
দাসীও পুরুষবেশে
সাধিতে দেশের হিত রণ-মাঝে প্রবেশিবে।”
“পুরুষের বেশে ?” বীরবর বলে মৃদুস্বনে-
“সাধে বলি পাগলিনী
কিন্তু ইথে বাধা আমি
দিব না প্রেয়সী; যেয়াে সাথে সে ভীষণ রণে।”
(১০৮)
দশম সর্গ।
স্বর্গারােহণ।
"Nothing in the world is single,
All things by a law is divine
In one spirit meet and mingle,
Why not I with thive ?*
P. B. Shelly.
;
সবে মাত্র সন্ধ্যা দেবী উত্তীর্ণ ধরায়
আষাঢ়ের পূর্ণ শশী মেঘ-অন্তরালে
লুকাইয়া মুখ তা’র ঢালিতেছে নিম্নে
ধরাতলে স্নান জ্যোৎস্না, গৃহস্থ-ভবন
হ'তে শুনা যায় কোলাহল ; কি মাধুৰ্য্য
মিশ্রিত তাহাতে; কিবা মাধুৰ্য্য মিশ্রিত
শিশুর ক্রন্দনে—যারা উঠিছে কান্দিয়া
থেকে থেকে শান্তিময় নিদ্রা কোল ছাড়া
হ'য়ে ; যােগ দিছে তায় তক্ষক বিহঙ্গ
অপূর্ব মধুর রবে; ‘কাণাকুয়া আর
(১০৯)
প্রভাবতী কাব্য
‘কু' ‘কু স্বরে ডাকি মাতাইছে বসুমতী ;
মেঘাবৃত তপনের ছটা মনে করি
সুধাংশু কিরণে, কোথা কোন্ শাখা'পরে
অকাল কোকিল ওই ঢালিছে সুধারা;
ধ্বনিছে কচিৎ তাহে গৃহ সারমেয় ।
আহা কি মাধুৰ্য্যময় আষাঢ়ের সন্ধ্যা
সােণার ভারতবর্ষে, প্রকৃতি যথায়
মাতৃরূপে সর্বদা করেন দূর তার
সন্তানের সর্বরােগ শােক দুঃখ তাপ।
কিন্তু আছে কি সে দিন আর ? অহহ আছে
সে প্রকৃতি, কিন্তু কোথা শান্তি? অহহ আছে
সে জননী, কিন্তু কোথা স্নেহ ? দিবারাত্র
দুঃখানলে দহিছে হৃদয় যার, হায়,
কোথা তার স্নেহ-আশীর্বাদ ? হায় আছে
কি সে দিন আর ? বহুদিন হইয়াছে
অস্তমিত কাল-অন্ত-গিরি কূট’ পরে।
সে দিন গিয়াছে অস্ত’ যেই দিন হায়
নির্বোধ বাঙ্গালী খাল কাটি’ আনিয়াছে
কুম্ভীর হেথায় ; হায় কে বলিতে পারে
আবার কি সেই দিন’ বাল-কর ল’য়ে
উদিবে পূব দিকে—আলােকিবে ধরা
(১১০)
; দশম স পবিত্র মায়ের মুখ করিবে উজ্জ্বল ? আর কি সে দিন আছে ? তার পরিবর্তে হের আজি আষাঢ়ের বারিধারা সঙ্গে প্রতি ঘরে ঘরে ‘ম্যালেরিয়া' রাক্ষসের ভীষণ প্রকোপ-সন্তানের মৃত্যু শয্যা- জননীর আর্তনাদভীষণ চীৎকার- জনকের দীর্ঘশ্বাস—সহধর্মিণীর ধূলিশয্যা—আর পড়শীর হাহাকার। হের আজি বিকারের ভীষণ মূরতি ; বিভীষিকা ! বিভীষিকা ! ভীষণ ! ভীষণ ! পূর্বজন্ম পাপ-ফলে সােণার ভারত আজি শাপগ্রস্ত হয় ; বুঝি ঈশ্বরের সুখময় স্নেহরাশি হতে প্রতারিত, তাই আজি তাঁর হায় এহেন দুর্দশা ; প্রতাপের অস্ত্রাগারে ওই দাঁড়াইয়া বীর সূৰ্য্যকান্ত,—তার পাশে প্রভাবতী পুরুষের বেশে;—পশিয়াছে অস্ত্রাগারে সাজিতে বীরের সাজেকরিতে সমর যবনের সাথে-সাধিতে দেশের হিত। হায়, ছিল ‘এক দিন এই বঙ্গভূমে যথায় রমণীগণ স্বদেশের তরে (১১১)
প্রভাবতী কাব্য।
পশিত সমরমাঝে ভীমামূৰ্ত্তি ধরে।
বঙ্গ-জননীর মুখ একদিন বুঝি
করেছিলা সমুজ্জ্বল উপযুক্তা সুতা
তার-রাণী দুর্গাবতী, পদ্মিনী, বিলা।
রমণীশক্তির অংশ-শক্তি-মহাশক্তি,
সেই শক্তি স্ব-ইচ্ছায় যেই পক্ষ ল'বে
কোথা তার পরাজয়,—সর্বদা বিজয়-
লমী তার অঙ্কগতা, কিসাধ্য জিনিবে
সমর, বিপক্ষ দল ; তাই হের আজি
বার প্রিয় প্রভাবতী তাস্ত্রের অগারে।
চেয়ে দেখ যত বাঙ্গালার বিলাসিনী
বামাকু !-তাজ বিলাসিতা--জীবনের
মায়া-ভেবে দেখ স্বদেশের দুরদশা-
বধ হিয়া নিদরত-পাশে; হে জননি ।
তাজ্ঞা কর সুবরে পশিতে সমরে
তোমার আদেশ বাণী আনিবে নির্জীব
জীবনে নূতন বল ;--সহধরমিণি!
বুল্ল মুখে বল বারেকের তরে শুধু
পশিতে সমর মাঝে ; প্রফুল্ল বদনে
পতিকে বিদায় কর, শুধু তা হলেই
নরা নদী পুনরায় জলের প্রাচুর্য্যে
{ ১১২)
দশম সর্গ।
হেলে দুলে হেলে দুলে দুকূল ভাসা’য়ে
চলিবে সতত তঁার অভিপ্রেত স্থানে।
ভ্রান্ত যুব, দেখ আজি সম্মুখে তােমার
অসীম কর্মের সিন্ধু, কোন্ পন্থা স্থির
করিয়াছ তুমি এষে তার পারে যেতে?
এত নহে শিশুক্রীড়া, লােভূমি পরে
বালুকার কণা লয়ে বাললীল নহে
যুবকের ধর্ম; সম্মুখে অসীম সিন্ধু-
পারে যেতে হবে, দেখ সম্মুখে তােমার
রহিয়াছে ভাৰ্য্যা-তরী, কর উপযুক্ত
তারে, ভাৰ্য্যা বীর-জীবনের সহচরী।
দেও বীরােচিত শিক্ষা, সম্মুখেতে ধর
দুর্গাবতী, পদ্মিনীর বীরত্ব-আদর্শ।
তবে ত সক্ষম হবে যেতে পরপারে,
তবে ত সমর ক্ষেত্রে হইতে পারিবে।
বিপক্ষের সমকক্ষ, উন্মুক্ত করতে
তবে ত সক্ষম হবে দাসত্ব-নিগড়
জননীর পদ হতে, নতুবা তােমার
এত আশা, এত যত্ন, শুধু শূন্যমার্গে
সৌধের নির্মাণ-স্বপনের আধিপত্য।
প্রভাবতী কাব্য
আপনি সাজিলা বীর নানাসাজে, আর
সাজাইলা প্রেয়সীরে, হাসিলা আপনি,
হাসিলা রমণী আর, দেখিলা চাহিয়া-
কি সুন্দর যুবা বীর সেজেছে রমণী!
পরিতৃপ্ত করি’ বীর নেত্রের বাসনা
বারবার দেখে চাহি রমণীর মুখ।
হাসিলা আবার বীর, জিজ্ঞাসিলা তারে
“কহ বীর, কিবা নাম তব, কোথা হতে
আসিতেছ হেথা ?” “নাম মম প্ৰসিংহ,
লাগিলা বলিতে ছদ্মবেশী সে রমণী -
“নাম মম, প্রভাসিংহ, রাণা প্রতাপের
সহচর ; মহারাজ প্রতাপের কাছে
বণ প্ৰদানিতে মানসিংহের সহিত
প্রেরিছেন প্রভু মােরে, এতেক বলিয়া
নীরব হইল বামা, আবার হাসিলা
সূৰ্য্যকান্ত,প্রেমাতে ভাসিল নয়ন,
চন্দ্রমার আকর্ষণে যথা সাগরের
জল উঠে উথলিয়া ; হাসিলা রমণী
তাহারো গলাটে কি যেন কি সুখ-রেখা
হাসিছে লুকায়ে থাকি। কতক্ষণ পর
আসিলা উভয়ে তবে গৃহের বাহিরে।
১১২ (২)
দশম সর্গ।
ধূ ধূ করি রণ-অগ্নি— উঠিছে জ্বলিয়া,
দিল্লী সম্রাটের সৈন্য পতঙ্গের দল
পুড়িয়া মরিছে তাহে, পরাজয়—তার
পরে পরাজয়-পরাজয় কতবার
পরাজিত সের খা—হায়রে সেনাপতি
কত, পরাজিত প্রতাপের সঙ্গে রণে।
পরাজিত যুদ্ধক্ষেত্রে দ্বাবিংশ আমীর।
আকবর পরলােকে, পুত্র জাহাঙ্গীর
অধিষ্ঠিত সিংহাসনে ; শ্যালক প্রবর
মানসিংহে বঙ্গদেশে করেন প্রেরণ।
মহারাজ মানসিংহ আসিলেন বঙ্গে
সম্রাটের আজ্ঞা পেয়ে; স্বদেশ বিদ্রোহী
নরকের কীট হায় বসন্ত তনয়
কচুরায় রূপরাম ভগ্নীপতি ল'য়ে
সম্মিলিত হইয়াছে মানের সহিত।
কচুরায়, বয়সেতে কিশাের বালক,
পরামর্শ দানে—কোথা লাগে তার কাছে
রাবরায় যাহাকে তাহার মাতা প্রতাপের হস্ত হইতে উদ্ধার কবিবার জন্য
কচুবনে লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন।
(১১৩)
প্রভাবতী কাব্য
==
প্রবীণ স্থবির ?)—প্রতাপের গৃহছিদ্র
করি’ অন্বেষণ—করিতে অভীষ্ট সিদ্ধি-
আপনি মায়ের পদে পরা’তে শৃঙ্খল
জানাইলা মানসিংহে, জানাইলা আর
প্রতাপের গতিবিধি ; খল-শিরােমণি
ভবানন্দ, কচুরায়, আর রূপরাম
সঙ্গে করি আসিলেন মানসিংহ
ভাগীরথীতীরে, প্রতাপের গুপ্তচর
জানাইলা এ সংবাদ বহুপূর্বে তার।
প্রতাপ-আদেশে তাই কিছু সৈন্যলয়ে
পর্তুগীজ জলদস্যু মহাবীর ‘রুডা
উভ' ভাগীরথীতীর করিতে রক্ষণ
পেঁ ছিলেন তথা, মানসিংহ-গতিরােধ
করিবার আশে তরী সব জলমধ্যে
রাখিলেন নিমজ্জিত, (তাহাতে কি হবে)
হায়, খল-শিরােমণি ভবানন্দ-কীট
প্রবেশ করিছে যে গৃহ-কুসুমে, কোথা
তার সুবিমল কান্তি ? ধন্য রে খলতা,
বিচিত্র জগতে, অসম্ভব সম্ভবেতে
বুঝি হতে পারে পরিণত, গিরিশৃঙ্গে
( ১১৪ )
দশম সর্গ
ক
শতদল প্রস্ফুটিতে পারে ; খদ্যোতিকা
তীব্র ভানুতেজ পারে করিতে হরণ,
ব্রাহ্মণের ব্ৰহ্মতেজ—তাও লোপ পায়
কালচক্রে,—কিন্তু হায়, কে কোথা দেখেছে-
খলতা ত্যাজিয়া খল সরল স্বভাব
ধরিয়াছে ? বসিয়াছে মজ্জায় মজ্জায়
যে খলতা-মলিনত্ব-সহস্র সহস্র
প্রক্ষালনে (ও) হায় তাহা যায় কি মুছিয়া ?
অঙ্গারের মলিনত্ব কে মুছিতে পারে ?
হে খল শঠতা করি রাজ পরিবার
সােণার সংসার নিক্ষেপিল ভস্মস্তপে
যে খল শঠতা করি প্রতাপের দ্বারা
বসন্ত-গগাবিন্দরায়ে হায়, পাঠাইলা
শমনসদনে—সেই খল রাজ্য লােভে
পদাঘাত করি স্বর্গ-স্বাধীনতা শিরে—
প্রতাপের গতিবিধি পরিজ্ঞাত হয়ে
সাধিল মানের ভাগীরথী উত্তীরণ।
মানসিংহ ভাগীরথী উত্তীর্ণ হইয়া
বহুকষ্টে নবপন্থা করি আবিষ্কার
প্রতাপের রাজধানী যশাের নিকটে,
(১১৫)
প্রভাবতী কাব্য ; ; বিশাল যােজনব্যাপী কুশলী প্রান্তরে, স্থাপিলা শিবির বীর ; আষাঢ়ের ঘন বর্ষা’ এক হপ্তা ব্যাপী ধরিত্রীর পরে করে বারি বরিষণ : শিবির মাঝারে নিক্ষেপিলা লক্ষীদেবী সৈন্যগণ প্রতি পরুষ কটাক্ষ এক ; একে বরিষার অত্যাচার, তার পরে হায়, অন্নকষ্ট দুর্গতির একশেষ, দুর্ভিক্ষ ভীষণ, বিভীষিকা-অভিনয় সে শিবির মাঝে আরম্ভ হইল এবে, কত শত সেনা সেই অভিনয়-স্রোতে চলিল ভাসিয়া ; পাঠাইলা মানসিংহ প্রতাপ সমীপে একদূতে, পত্র, অসি, শৃঙ্খল প্ৰদানি। যথাকালে সেই সব ল’য়ে দূতবর- উপস্থিত প্রতাপ সমীপে, সম্মুখেতে রাখিয়া সে সব বলে তঁারে সম্বােধিয়া- “হে রাজ, মহারাজ মানসিংহ তব তরে প্রেরিছেন এই পত্র, অসি, আর সুদৃঢ় শৃঙ্খল, বিজ্ঞ তুমি হে রাজ কি ক'ব অধিক আর-বুঝিতেছ সব।” (১১৬) দশম সর্গ। সুবক্তা কেশব ভট্ট, প্রতাপ ঈঙ্গিত পেয়ে উত্তরিলা তাহে--“হে দূত প্রবর কি ক’ব তােমায়, দূত তুমি, শাস্ত্রমতে অবধ্য হয়েছ তাই, সশরীরে এবে যাও নিজ গৃহে ফিরে, স্বদেশ বিদ্রোহী স্বদেশের কুলাঙ্গার সেই মানসিংহে জানাইবে—অচিরাৎ এ লৌহনিগড় উঠিবে তাহার পদে কিম্বা খরশান এ অসি বিঁধিয়া বক্ষঃস্থলে, পৃথিবীর দেহ শীতলিবে শত রুধির ধারায়”। যথাকালে দূতৰর প্রভুর সমীপে উপস্থিত হয়ে প্রতাপের আস্পর্ধার কথা জানাইল রে, ক্ষণেকের তরে মানসিংহ-হিয়া বুঝি উঠিল কঁপিয়া, প্রতাপের গৃহ-ছিদ্র অন্বেষণকারী কচুরায় মন্ত্রীবরে ডাকিলে নিকটে মন্ত্রণার অভিপ্রায়ে, বলিলা সে ধূর্ত- “মহারাজ, প্রতাপের সহিত সমর নহে উপহাস কথা, অসামান্যবীর- প্রতাপআদিত্য, কালী তার সেনাপতি, (১১৭) প্রভাৰতী কাব্য। স্থলযুদ্ধ, জলযুদ্ধ, সবযুদ্ধে হায় সুদক্ষ সে বীরবর, শিবানীর বরে পশেছে যে রণে, অনায়াসে লভিয়াছে তাহার বিজয় লক্ষমী, হে রাজ, সত্য বটে, বহুদেশে, বহুযুদ্ধে করিয়াছ জয়লাভ তুমি, বহু সেনাপতি হস্তে পরায়েছ লৌহের শৃঙ্খল, হায় সেই সব হতে (ও। বুঝি প্রতাপের সঙ্গে রণ কি যেন মহারহস্যময়, তাই বলি- সাবধানে অগ্রসর হও যুদ্ধক্ষেত্রে।” বাজিল সমরভেরী, উভয় পক্ষের সুগম্ভীর সৈন্যনাদ স্পর্শিল গগন। রচনা করিলা বৃহ সেলিম শ্যালক, অশ্বারােহী পদাতিক দক্ষিণে থাকিল, গজারােহী, গােলন্দাজ বামভাগে তার- পশ্চাতে আমীরগণ সারি সারি সারি উদ্যান মাঝারে যথা নানাবিধ তরু--- উচ্চ-নীচ স্ব স্ব শ্রেণী লইয়া শােভিছে সুন্দর ; যশােরেশ্বর অবিলম্বে তার সাজাইলা সৈন্যবৃন্দে, আবার—আবার (১১৮) দশম সর্গ E উঠিল দুন্দুভি ধ্বনি কঁপাইয়া ক্ষেত্র। সৈন্যমাঝে শরবর্ষা হইতে লাগিল। সে শর-প্লাবনে হায় সৈন্য তাগণন করাল কৃতান্তপুরে চলিল ভাসিয়া। যবনের অশ্বারােহী, গজারােহী সৈন্য পড়িল প্রতাপ দলে ভীম পরাক্রমে । অসির আঘাতে ছিন্ন করিতে লাগিল অগণ্য সৈন্যের শিরহায় পিছাইতে লাগিল যতেক সৈন্য-আর কি হইল ?) প্রতাপ মুহুৰ্ত্ত তরে দুনয়নে তার দেখিলা আঁধার, ভাবিলেন—প্রতিকূল কেন কালী তার প্রতি, আজি বুঝি আর যবনের পরাজয় নহে কালিকার অভিপ্রেত, সম্বােধিয়া সমগ্র সৈনিকে মলিন বদন পানে চাহি তাহাদের আশ্বাসিয়া বলিলেন প্রতাপ সুধীর,- “একি সৈন্যগণ ? হৃদে ধর দৃঢ় বল- অমিত বিক্রমে যুঝ’ যবনের সাথে- বাঙ্গালীর বাহুবল দেখাও তাহারে। পাদপের মধ্যভাগে রােহিছ এবে- (১১৯)
প্রভাবতী কাব্য।
ক
আর বেশী দূর নয়—অই দেখ শিরে
অত্যুৎকৃষ্ট স্বাধীনতা-ফল ! ( কি সুন্দর
ধর হৃদে দৃঢ় বল-হও অগ্রসর
অটল সাহস ভরে রণরঙ্গে মাতি,
মধ্যভাগ হ'তে কভু পড়িওনা ঝরে
পাদপের মূলদেশে, করিও না কভু
বাঙ্গালীর দীপ্তমুখে কালিমালেপন।”
প্রতাপের আশ্বাসের বাণী শুনি যত
সৈন্যগণ আক্রমিলা নবীন উৎসাহে
যবনের সৈন্যগণে, বাধিল তুমুল
রণ,-সমর নিনাদে কাঁপিল গগন ।
অবিরত যুদ্ধস্রোত চলিতে লাগিল।
ক্ৰমে সন্ধ্যা সমাগতা—কোনও পক্ষের
—কিম্বা পরাজয় হইল না স্থির।
জয়লক্ষী কোন পক্ষে অঙ্কগতা হবে,
পারি করিতে স্থির-সন্ধ্যাকাল হেরি
দু'পক্ষের মাঝখানে রহিলেন স্থির।
সে দিনের তরে যুদ্ধ থাকিল স্থগিত ।
পরদিন প্রাতঃকালে প্রতাপের সেনা
নবতেজে ঝম্পে পড়ে অরি-সৈন্য মাঝে।
( ১২০ )
দশম সর্গ। মানসিংহ-সৈন্যমাঝে নবীন উৎসাহে কেহ ত্যজে তীর, কেহ অসির আঘাতে করিল আহত, হত, প্রতাপের সৈন্য- শত শত, পশ্চাদ্ভাগে নবসৈন্য এসে পূরিল সেস্থান, যতই বিনাশ হয়— ততই প্রকাশ যেন রক্তবীজ বংশ। বিস্ময়সাগরে ডুবি মানসিংহ এবে আক্ষেপিল। ভিন্নমনে-“বুঝিতে না পারি মম সঙ্গে কিবা খেলা খেলিছেন বিধি। কাশ্মীরে, কাবুলে, বঙ্গে, কত দেশে আমি জিনিয়াছি কত যুদ্ধ,—দেখিয়াছি কত সেনা,কিন্তু হেন যুদ্ধ যুঝি নাই কভু দেখি নাই হেন সেনা রহস্য জড়িত। এবার সম্মুখে বুঝি মৃত্যু উপস্থিত। বুঝিতে পারি না আমি কোন মুখ ল'য়ে দিল্লি সম্রাটের কাছে ফিরিব আবার। এ হেন খেদোক্তি শুনি বলিল আশ্বাসি,—“মহারাজ কেন এবে ভগ্নচিত্ত ? যুদ্ধ প্রায় জিনিয়াছি মােরা, এবে মলিনতা বীর সাজে কি তােমায় ? (১২১) কচুরায়, তারে প্রভাবতী কাব্য। কল্য নিশীথিনী-যােগে দেখেছি স্বপন প্রতাপের বক্ষঃ ছাড়ি ভাগ্যলক্ষী দেবী এসেছেন আমাদের পক্ষে-কর রণ, সে স্বপ্ন অবশ হবে সত্যে পরিণত।” প্রতাপের বীরশিশু উদয় আদিত্য কেমনে যুঝিছে অই অরি সৈন্যমাঝে । মৃগেন্দ্রের বীৰ্য্য ধরে শাবক তাহার । ঘেরিল অগণ্য সৈন্য সে বীর শিশুরে— ঘেরেছিল যথা সপ্তরথী, বীরশিশু অভিমন্যু বীরবরে ; দেখিলা প্রতাপ, সে প্রতাপ তনয়ের, কিন্তু আরাে হায় দেখিলা বিপদরাশি ঘেরিছে তাহারে। প্রভাবতী, সূৰ্যকান্তে পাঠাইলা তথা সাহায্য করিতে তারে, হায় যেতে যেতে পড়িল সে বীরশিশু শত্রুর আঘাতে মাতা বসুমতী পরে, হায় কি অদৃষ্ট । প্রভাবতী সূর্যকান্ত আক্রমিলা শত্র- করিতে লাগিলা রণ অমিহবিক্রমে। কিন্তু কতক্ষণ? প্রতাপের ভাগ্যলক্ষী বহুক্ষণ তাঁর অঙ্ক গিয়াছে ত্যজিয়া (১২২) --
দশম সর্গ।
যবনের পক্ষে, তাই বীর সূৰ্য্যকান্ত
শত্রু-তীর বিদ্ধ হয়ে পড়িলা ভূতলে।
বাঙ্গালার ভাগ্যাকাশ হ'তে হায় এক
উজ্জ্বল নক্ষত্র কিন্তু পড়িল খসিয়া।
রুদ্ধকণ্ঠে সঙ্গিনীরে বলিলা ডাকিয়া -
“প্রিয়তমে প্রভাবতি পড়িনু সমরে--
বিপক্ষের তীক্ষশর বাজিল ভীষণ
এ দগ্ধ হৃদয়মাঝে -কত ভেবেছিনু-
হইল না পূর্ণ তাহা, চলিলাম হায়
হইতে জীবনের বাসনা-সমাধি
করাল কৃতান্ত হায় দিল না দেখিতে
স্বাধীনতা-ভাতি চিরারাধ্যা জননীর,
বলিতে পারি না কথা রুদ্ধ হয়ে আসে
কণ্ঠস্বর, কত-আশা হৃদে পুষেছিনু-
দূরীভূত করি মাতৃ-দাসত্বশৃঙ্খল
গাঁথিব প্রণয়-হার দু’জনে বসিয়া,
করিব সঙ্গিনী তােমা সমরে শান্তিতে।
কিন্তু হায় কে বলিবে কোথায় সে আশা
সৰ্ব্ব-শান্তিমূলাধার ?—সে আশা নিষ্ঠুর
মরুভূমে পথিকের কাছে সরিতের
(১২৩)
প্রভাবতী কাব্য
--
---
সম যাইতেছে স'রে, আর যে পারি না
যাই তবে প্রভাবতি জনমের মত।”
বলিতে বলিতে বীর মুদিল নয়ন।
“যাও নাথ” প্রভাবতী বলিতে লাগিলা
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠস্বরে, -আকুল নয়নে
“যাও নাথ, ওই হের ত্রিদিব আলয়ে
স্বর্ণ সিংহাসন তব তরে রহিয়াছে
সুসজ্জিত, ওই হের দেব বালাগণ
ডাকিছে তােমায়,যাও তাহাদের পাশে।
ধন্য ধন্য তুমি—ধরেছিলে ধন্যকায়া -
উদ্ধারিতে মাতৃভূমি অধীনতা-পাশ
হ'তে,—মাতৃষজ্ঞে ত্যজিলে জীবন ধন ।
ধন্য ধন্য আমি তাই সঙ্গিনী তােমার।
যাও নাথ, আমি (ও) আসিতেছি তব সাথে
আজি আমাদের নাথ ! সুখ-পরিণয়,
আজি আমাদের হবে সুখের বাসর ।
হয়েছে সময় এবে—চল নাথ চল—
হবে সুখ-পরিণয়-পাব চির শান্তি।”
বলিতে বলিতে বামা পতি বক্ষঃস্থলে
পড়িল ঢলিয়া, লতা প্রভঞ্জনে যেন।
(১২৪)
দশম সর্গ।
2
জননীর বস্ত্রাঞ্চল প্রান্ত হ'তে হায়,
মহামূল্য দুটী রত্ন পড়িল খসিয়া,
সৌভাগ্য-মন্দির বঙ্গে স্বাধীনতা দীপ
কেমন জ্বলিতেছিল ধরি ধরি ধরি,
বহিল কালের ঝা, নিভিল সে ভাতি
আসিল বঙ্গের ভাগ্যে তমসার রাতি।
কত যুগ গত কত মহাপাপ ফলে
যবন-নিগড়ে বঙ্গ নিবদ্ধ হইল;
কত শতাব্দীর পরে প্রায়শ্চিত্ত শেষ
কে জানে হইবে কবে ? বিধির বিধান
খণ্ডনীয় নহে কভু; রাজ্য, দেশ, জাতি,
প্রকৃতির তূলাদণ্ডে ও হইয়া তুলিত
ভাগ্য অনুরূপ ফল লভিছে সতত।
সমাপ্ত ।
(১২৫)
গ্রন্থকার প্রণীত
সতীলক্ষীর আদরের ধন, মাথার মণি
অপূৰ্ব্ব পৌরাণিক কাহিনী
মালঞ্চ
১। সুভদ্রা ও অর্জুন। ২। উষা ও অনিরুদ্ধ ।
৩। রুক্মিণী ও শ্রীকৃষ্ণ। ৪। উত্তরা ও অভিমন্যুর
পবিত্র প্রণয়ের কাহিনী ও তাহার জয়
বঙ্গের মহিলাকুলের উপযােগী করিয়া
লিখিত হইয়াছে
পুস্তকখানি ২ খানি তিন রং ৫ খানি বিভিন্ন রং এবং কভারিং
তিন রঙের ছবি দ্বারা সুশােভিত করা হইয়াছে।
‘ইংরাজী হরপে দুই রকম কালিতে ছাপা।
মূল্য আট আনা মাত্র।
প্রকাশক–শ্রী গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়,
২০১ কর্ণওয়ালিশ খ্রীট, কলিকাতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.